ঝড়

রূপকথা - উপকথা - পুরাণ

কালী সৃষ্টি ,স্থিতি এবং বিনাশ দেবী , মহাবিদ্যা , মাতৃকা মন্ত্র ওঁ ক্রীং কাল্যই নমঃ, ওঁ কপালিন্যই নমঃ, ওঁ হ্রিং শ্রিং ক্রিং পরমেশ্বরি কালিকে স্বাহা গায়ত্রীːকালিকায়ৈ বিদ্মহে শ্মশানবাসিন্যৈ ধীমহি। তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ। অস্ত্র খড়্গ সঙ্গী শিব Mount শৃগাল (শিবা) কালী বা কালিকা হলেন একজন হিন্দু দেবী। তাঁর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। প্রধানত শাক্ত ধর্মাবলম্বীরা কালীর পূজা করেন। তন্ত্রশাস্ত্রের মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশ জন দেবীর মধ্যে প্রথম দেবী। শাক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদিকারণ মনে করে। বাঙালি হিন্দু সমাজে দেবী কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। পুরাণ ও তন্ত্র গ্রন্থগুলিতে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে তাঁর মূর্তিতে চারটি হাতে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড, বর ও অভয়মুদ্রা; গলায় মানুষের মুণ্ড দিয়ে গাঁথা মালা; বিরাট জিভ, কালো গায়ের রং, এলোকেশ দেখা যায় এবং তাঁকে তাঁর স্বামী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ব্রহ্মযামল মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।[১] কালীর বিভিন্ন রূপভেদ আছে। যেমন – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন মন্দিরে "ব্রহ্মময়ী", "ভবতারিণী", "আনন্দময়ী", "করুণাময়ী" ইত্যাদি নামে কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা ও পূজা করা হয়।[২] আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। এছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা ও জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় প্রতি অমাবস্যা এবং প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবারে কালীপূজা হয়ে থাকে। কালী দেবীর উপাসকরা হিন্দু বাঙালি সমাজে বিশেষ সম্মান পেয়ে থাকেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। কালীকে বিষয়বস্তু করে রচিত "শ্যামাসংগীত" বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কালী সাধকেরা এবং কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বিশিষ্ট কবিরা অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত লিখেছেন। "মৃত্যুরূপা কালী" হল দেবী কালীকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত দীর্ঘকবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামে একটি কালী-বিষয়ক বইও রচনা করেছিলেন। ব্যুৎপত্তি ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ, যার অর্থ “কৃষ্ণ, ঘোর বর্ণ” (পাণিনি ৪।১।৪২)। মহাভারত অনুসারে, এটি দুর্গার একটি রূপ (মহাভারত, ৪।১৯৫)। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী একটি দানবীর নাম (হরিবংশ, ১১৫৫২)। ‘কাল’, যার অর্থ ‘নির্ধারিত সময়’, তা প্রসঙ্গক্রমে ‘মৃত্যু’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এর সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু লৌকিক ব্যুৎপত্তির দৌলতে এরা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে গেছে। মহাভারত-এ এক দেবীর উল্লেখ আছে যিনি হত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন। তাঁর নাম কালরাত্রি বা কালী। সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, এই শব্দটি নাম হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে আবার ‘কৃষ্ণবর্ণা’ বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। [] রূপভেদ তন্ত্র ও পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের কথা পাওয়া যায়। তোড়ল তন্ত্র মতে কালী অষ্টধা বা অষ্টবিধ। যথা – দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালী। মহাকাল সংহিতা অনুসারে আবার কালী নববিধা। এই তালিকা থেকেই পাওয়া যায় কালকালী, কামকলাকালী, ধনদাকালী ও চণ্ডিকাকালীর নাম। অষ্টধা কালী মূল নিবন্ধ: দক্ষিণাকালী দক্ষিণাকালীর কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামে আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়। সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বুকে ও বামপদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত। মূল নিবন্ধ: গুহ্যকালী গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের। মূল নিবন্ধ: মহাকালী তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ,চক্র,গদা,ধনুক,বাণ,পরিঘ,শূল,ভূসুণ্ডি,নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর প্রথম চরিত্র শ্রী শ্রী মহাকালীর ধ্যানমন্ত্র এইরূপ ওঁ খড়্গং চক্রগদেষুচাপপরিঘান শূলং ভুসূণ্ডিং শিরঃ| শঙ্খং সন্দধতীং করৈস্ত্রিনয়নাং সর্বাঙ্গভূষাবৃতাম্ || নীলাশ্মদ্যুতিমাস্যপাদদশকাং সেবে মহাকালিকাম্ | যামস্তৌচ্ছয়িতে হরৌ কমলজো হন্তুং মধুং কৈটভম্ || মূল নিবন্ধ: ভদ্রকালী, ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।[] মূল নিবন্ধ: চামুণ্ডা চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে। মূল নিবন্ধ: শ্মশানকালী কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়। শ্রীকালী গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।

1288

28

মানব

ইছামতী

বৃষ্টি তুই ****************************** কে জানত তোকে আজও পাব কে জানত তোর সাথেই খাব ঝালমুড়ি বাইপাসে বসে। তোকে নিয়ে ভেবে ভেবেই শেষে ছন্দ গিয়েছে জানলার কাঁচে মিশে অথবা মেঘেদের দেশে। ঘুম থেকে উঠেই কাপে কফি জোটেনি তো কোনদিন, আশায় থাকি বর্ষাতির আলিঙ্গনে। ছাদ থেকে জল পরে রোজ আসবে এক ফালি রোদ ভাবি মনে মনে।

903

12

Somen dey

নাগরিক হেমন্তিকা

আজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জানলার পর্দা সরাতেই ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল এক রাশ হাওয়া ।তাকে আমি চিনি । সে হাওয়ার ডাক নাম শিরশির, আর ভালো নাম হিমেল ।নবীন অভিনেতার স্টেজে প্রথম এপিয়ারেন্সে দেওয়ার মত উত্তেজনা তার হাবে ভাবে । বেসিনের কল খুলতেই যে জল হাতে এসে পড়ল সেও দিল এক দিনবদলের আগাম খবর । তাহলে কি বিদায় শরৎ , বিদায় শেফালি - সময় যে তার হল গত / নিশি শেষের তারার মত ? বাংলা ক্যালেন্ডার বলছে এখন মধ্য-কার্তিক । মানে হেমন্তর তো এসে যাওয়ারই কথা । আমাদের ছোটো বেলার টেক্ট বইতে গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় আস্থা রেখে সব ঋতুর জন্যে দু মাসের কোটা ভাগ করে দেওয়া হয়ে ছিল ।কিন্তু ঋতুরা তো আর তেমন বাধ্য নয় , পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঘন্টা বেজে গেলেই লক্ষী ছেলের মত খাতা জমা দিয়ে চলে যাবে । ঋতুরঙ্গ নাটকে শরৎ আর হেমন্তের রঙ্গমঞ্চে exit আর entry নিয়ে বোঝাপড়ার বিস্তর গন্ডগোল আছে ।মাঝে সাঝে এ ওর ডায়লগ বলে দেয় ভুল করে । অথবা ইচ্ছে করেই করেই হয়ত ওরা এ ওর এলাকায় করে ফেলে একটু আধটু ওভারল্যাপিং । দুই ঋতুর জন্যে বেঁধে দেওয়া বেড়ার মাঝে আছে ভারত-বাংলাদেশ ছিট মহলের ‘তিনবিঘা করিডোর’ এর মত বেশ খানিকটা কাঁটাতারবিহীন জায়গা। যেখান দিয়ে মাঝে মধ্যে ওপারের আয়েষারা এপারের খাল বিল থেকে কলমি শাক তুলতে চলে আসে , মাঝে মাঝে এ পারের অর্চনারা ও পারের পুকুর থেকে গেঁড়ি গুগলি ধরতে চলে যায় । তা নিয়ে অবশ্য বিশেষ বিবাদ বাধে না । আসলে হেমন্ত তো আর হেমন্ত মুখুজ্জের মত বড় জাতের স্টার গায়ক নয় । তার আসা যাওয়ায় বিশেষ হাঁক ডাক নেই ।সে আসে ধীরে যায় লাজে ফিরে ।বিশেষ করে এই প্রাণহীন শহরে । তাই তেমন করে তার দিকে কেও নজর করে না । হ্যাঁ নজর করেছিলেন একজন । তার নাম জীবনানন্দ দাশ । তিনি ছিলেন হেমন্ত-অন্ত প্রাণ । হেমন্তের রুপে বেবাক মজে ছিলেন সারা জীবন । কত কবিতায় যে কতভাবে হেমন্ত তার কাছে ধরা দিয়েছে । হয়ত আজকের মত এমনই এক হেমন্তের সকাল বেলায় তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল – ‘ শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা রেখে অলস গাঁইয়ার মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার – চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান , হয়তো বিষন্নতার কুয়াশা জড়ানো , ধুসর শুন্যাতায় মগ্ন, এক উদাসীন , দুখজাগানিয়া হেমন্তের সঙ্গে হয়তো তিনি তাঁর নিজের খুব মিল খুঁজে পেতেন । তাই বার বার নানাভাবে ফিরে এসেছে হেমন্ত তাঁর কবিতায় । যে হেমন্ত শুধু এক ঋতু নয় যেন এক তাঁর নিজস্ব পৃথিবী যেখানে জীবনের প্রতি তীব্র ভালোবাসা হাত ধরে থাকে এক নিরুক্ত অনাসক্তি । যে বাংলাদেশ কে তিনি দেখেছিলেন ,চিনেছিলেন, ভালবেসেছিলেন সে বাংলা দেশের ভিতরে যেন আর একটা বাংলাদেশ – অপার্থিব , মায়াময় ,রহস্যাবৃতা – তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে গঙ্গাফড়িং , পানকৌড়ি , শ্যামা পোকা , বেতের নরম ফল , ধুঁধুলের বীজ , শালিখ, খঞ্জনা , মুথা ঘাস , হিজলের ছায়া , কলমীর ঘ্রাণ ।সেখানে হেমন্ত এলে সব যেন বদলে যায় – ‘ঢের কথা ব’লে তবু এক আকাশের মত নিঃশব্দতা হৃদয় আকাঙ্ক্ষা করে-শর-বনে বিজন বাতাস পানকৌড়ি’র ডাক-শীতের অস্পষ্ট গন্ধ-বিকেলের রোদ নদীতে দুইটি রাজহাঁস এরা সবই নিঃশব্দতা নিঃশব্দতা যত দূর চ’লে যেতে পারে এদের সবেরই মুখোমুখি ছায়া-হৃদয়ের ভুলে একটি হেমন্ত ঋতু কাটাতেছে মানুষের মতন আকারে।‘ শুধু নিসর্গের মোহ নয় হেমন্তের বাংলা কতটা রুপসী হতে পারে তার সন্ধান তিনিই জানতেন ।তাঁর ব্যাক্তিগত সফলতাহীন , বিষাদময় , ক্লিষ্ট জীবনে দু দন্ড শান্তি আর এক আধ খানা লুকানো বিস্ময় মনের অন্তপুর থেকে আহরন করে তাঁর জীবনকে এনে দিতে পারত একমাত্র হেমন্তই – ‘…… জীবন অনেক দেয়- তবুও জীবন আমাদের ছুটি দেয় তারপর- একখানা আধখানা লুকানো বিস্ময় অথবা বিস্ময় নয়- শুধু শান্তি- শুধু হিম কোথায় যে রয়েছে গোপন অঘ্রাণ খুলেছে তারে- আমার মনের থেকে কুড়ায়ে করেছে আহরণ। ’ আমাদের নাগরিক জীবনে হেমন্ত বিড়ম্বিত হয় বারে বারে । আমরা বরং শীতের জন্যে দিন গুনি । শীত যেন সেই আমাদের সেই বহু কাঙ্খিত ‘অচ্ছে দিন’ ।যে সেলোফেন পেপারের মুড়ে আমাদের জন্য নিয়ে আসবে সুখের উপহার । তখন অনেক সবুজ সব্জী আসবে বাজারে ,ইচ্ছে জাগবে এখানে ওখানে বেড়াতে যাওয়ার , চড়ুই ভাতি , ডোভার লেন , পৌষ মেলা , ক্রিকেট , বইমেলা আরো কত কি যে আসবে। হেমন্ত আসলে সেই প্যাসেজ টু শীতকাল । হেমন্তকে তাই বড়জোর ওই দুতের সন্মান টুকু দেওয়া যায় । তার চেয়ে বেশি আগ্রহ নেই তার জন্যে । আসলে যেখানে গেলে ধানের উপরে মাথা রেখে ভোরের রোদ কে শুয়ে থাকতে দেখা যাবে , সেখানে যাওয়া তো আমাদের হয়ে উঠবেনা । তাই হেমন্তের সঙ্গে আমাদের যে টুকু হাই-হ্যালো সম্পর্ক , সে শুধু ঐ জীবনানন্দের দু চার পংক্তি ধার করতে পারি বলে । রবীন্দ্রনাথ বর্ষা কে নাকি বসন্ত কে বেশি ভালোবাসতেন তা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে । কিন্তু জীবনানন্দ যে সারা জীবন হেমন্তের প্রেমে ফিদা হয়ে ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ হেমন্তে বসন্তের বানী খুঁজে পেয়েছিলেন , জীবনানন্দ বসন্তেও খুঁজে বেড়াতেন হেমন্ত কে । সে হেমন্তের বাস ছিল একেবারে তাঁর অস্তিত্বের অভ্যন্তরে । নইলে কি আর এমন ভাবে বলা যায় - যখন হেমন্ত আসে গৌড় বাংলায় কার্তিকের অপরাহ্ণে হিজলের পাতা শাদা উঠানের গায় ঝ’রে পড়ে, পুকুরের ক্লান্ত জল ছেড়ে দিয়ে চ’লে যায় হাঁস, আমি এ ঘাসের বুকে শুয়ে থাকি- শালিখ নিয়েছে নিঙড়ায়ে নরম হলুদ পায়ে এই ঘাস; এ সবুজ ঘাসের ভিতরে সোঁদা ধুলো শুয়ে আছে- কাঁচের মতন পাখা এ ঘাসের গায়ে ভেরেন্ডাফুলের নীল ভোমরারা বুলাতেছে- শাদা স্তন ঝরে করবীর : কোন এক কিশোরী এসে ছিঁড়ে নিয়ে চ’লে গেছে ফুল, তাই দুধ ঝরিতেছে করবীর ঘাসে ঘাসে : নরম ব্যাকুল। ******

1087

11

শিবাংশু

ঘোষাল, আহা ঘোষাল....

আমি যখন বালক ছিলুম, তখন ডালিয়াদি আমাদের ইশকুলের দিদিমণি ছিলেন। সেকালের রামকৃষ্ণ মিশন ইশকুলের 'দিদিমণি', সে অন্য জিনিস। একালের ইং-মিডি মিসিবাবা টাইপ 'ডেন্টিং পেন্টিং' জনতা নয়। তাই এতো প্ররোচনা সত্ত্বেও আমি অন্ততঃ চুপচাপ থাকি। নয়তো আমরাও " খেলা খেলেছিলেম, আমরাও গান গেয়েছি।" চতুর্দিকে ঝাড়ির গপ্পো হচ্ছে, তবু গান্ধিজিকে স্মরণ করে মৌনব্রত নিয়ে আছি। তবে যখন তিনি শেষ পর্যন্ত 'ঘোষাল' তুললেন, তখন আর চুপ থাকা যাচ্ছেনা। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখি, চঞ্চলের 'জামশেদপুরি'ত্বে আমার কিঞ্চিৎ সন্দো আছে। কোপারেতি কলেজে পড়েছে, আর 'ঘোষাল'কে বলে মিষ্টির দোকান ???!!! --------------------- যাকগে, ঘোষাল হোটেল হলো জামশেদপুরের আদি ঝাড়ির ঠেক। 'প্রাপ্তেষু ষোড়শ' হবার প্রধান লক্ষণ হলো ছেলে ঘোষাল হোটেলে চক্কর মারছে। চারদিকে অতিব্যস্ত বিষ্টুপুর বাজার। তার ঠিক মাঝখানে ঝড়ের ভরকেন্দ্রে অদ্ভুত ছায়াসুনিবিড় শান্তিঘেরা ঢালুছাদের বাংলো টাইপ একটা বাড়ি। এককালে টাটার কোনও একটা অফিস ছিলো সেখানে। সেখানেই ঘোষালবাবু একটি রেস্তোঁরা খোলেন। চারফুট উঁচু ডিভাইডার দিয়ে ঘেরা সবুজ রেক্সিন মোড়া কেবিনগুলি। নাহ, সেখানে পর্দাটানা কোনও আড়াল ছিলোনা। দিনের বেলাতেই কেমন 'নেই' হয়ে থাকতো জায়গাটা। সন্ধেবেলায় তো পুরো নির্জনতা। আমরা বলাবলি করতুম, কলকাতা শহরে যদি এরকম একটা জায়গা থাকতো, তবে প্রতি বর্গফুটে অন্তত" গোটা পাঁচেক যুগলকে ঠেলাঠেলি করতে দেখা যেতো। কিন্তু জামশেদপুর গ্রাম জায়গা। প্রতিটি হর্মোনসুন্দর ছেলে বা মেয়ের পিছনে গোটা দশেক কাকা'মামার শ্যেনচক্ষু সদা বরকরার। তাই খুব দুঃসাহসী না হলে সেকালে 'ঘোষালগিরি' করা যেতোনা। আমরা যেখানে থাকতুম, সেই টেলকো শহর ঘোষাল থেকে প্রায় দশ-এগারো কিমি। কলেজ থেকেও অন্ততঃ তিন-চার কিমি। ক্লাসের ফাঁকে ভাগা যায়না। যাতায়াত বলতে তো সাইকেল ভরোসা। কী সাইক্লিং করতুম তখন, জামশেদপুরের পাহাড়ি ওঠানামা করা রাস্তায়, ভাবা যায়না। -------------------------- ঘোষালে'র স্পেশালিটি ছিলো কবিরাজি কাটলেট, মোগলাই পরোটা আর কশা মাংস। এসব দ্রব্য একটার বেশি খাবার মতো রেস্তো থাকতো না তখন পকেটে। কিন্তু অতো লম্বা সাইক্লিং করে খিদে পেতো খুব। কী আর করা? পুরো এক বোতল টোম্যাটো কেচাপ প্লেটে ঢেলে চামচ দিয়ে মেরে দিতুম আমরা। এই পদার্থটায় ঘোষালবাবু কোনও কার্পণ্য করতেন না। ঘোষালবাবুর একটা বিশেষত্ব ছিলো। তাঁর মতো রমনীয় কোমল কণ্ঠ আমরা কদাপি কোনও পুরুষের ঠোঁট থেকে বেরোতে শুনিনি। আড়াল থেকে শুনলে পুরো সুচিত্রা সেন। -------------------- আমাদের জোয়ানবয়সে জামশেদপুরে পীরিতি করাটাকে 'পেট গরমের ধাত' মনে করা হতো । তাই চতুর্দিকে ছেলেমেয়েদের 'চরিত্র' ঠিকঠাক রাখার জন্য স্বনিয়োজিত গার্জেনরা থিকথিক করতেন। ছেলে বা মেয়ে নিজেরা বিয়ে ঠিক করেছে জানতে পারলে বাপ-মা ( কিছু শুভানুধ্যায়ীসহ) দু'চার দিন প্রচুর ড্রামাবাজি করার পর অপমানে অতি কাতর হয়ে ডিপ্রেশনে চলে যেতেন। সেমত যুগে মেয়েবন্ধু সহ ঘোষালে বসতে অসম্ভব এলেম লাগতো। কিন্তু মানুষের আসল ভগবান তো ঐ বিন্দুবৎ হর্মোন গ্রন্থিগুলি। তারাই জয়ী হতো শেষ পর্যন্ত। --------------------------- এবার একটা 'গপ্পো হলেও সত্যি' শোনাই। যেখানে ঘোষাল হোটেল আসল নায়ক। আমাদের এক বন্ধু ছিলো ( ছিলো কেন, এখনও আছে বহাল তবিয়ত, পুরো মাথায় একটাও চুল বেঁচে নেই এখন তার, তবু হৃদয় কি আর মরে? ) তা সে বরিশাইল্যা পাড়ু'র শরীরে কী করে যেন জিন মিউটেশন হয়ে কলকাত্তিয়া ডিএনএ ঢুকে গিয়েছিলো। তার সম্বন্ধে আমরা বলতুম , মানুষ হবার দরকার নেই, যে কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার শরীরে xx জিন আছে, খবর পেলে সে লাক ট্রাই করতে পৌঁছে যাবে। নিজেদের মধ্যে তাকে আমরা স্বামী ছুঁকছুঁকানন্দ বলতুম। মানে ছুঁকছুঁক করাতেই তার আনন্দ। পাঁচ-ছ কেলাস হতে না হতে সে প্রায় সফল ফ্রকচেজার। তার উপর সে গিয়ে জুটলো কো-এড আমবাগান ইশকুলে। সেতো প্রায় বেন্দাবন। আমাদের কপালে আর ডি টাটা, যতো মারকুট্টে ছেলেদের গুঁতোগুঁতির আড্ডা। কলেজ পৌঁছোতে পৌঁছোতে স্বামীজির কীর্তিময় জীবনী লিখে ফেলতে পারলে নবকল্লোলে নিশ্চিত ছাপা হয়ে যেতো। একেবারে হলিউডি না হলেও, শ্যামবাজারি ফাস্ট জীবন তার। ডি এম লাইব্রেরির মেম্বার হলো। নাহ, বই পড়ার কোনও বালাই নেই। কিন্তু ওখানে মেয়েরা বই নিতে, ফেরত দিতে আসে অনেক। কিউপিডের কুপুত্তুর সেখানে তেষ্টা মেটাতে সদা হাজির। যাকগে, সে কথা। একবার প্রায় তিন-চার দিন আড্ডা থেকে গরহাজির । আমরা চিন্তায় পড়ে গেলুম। তার নতুন বিজয়কাহিনী না শুনতে পেলে শরীর মাটি মাটি করে। ঠিক এরকম একটা সময়ে এক বন্ধু বিষ্টুপুর থেকে ফিরে বলে, ওরে পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে। স্বয়ং ঘোড়ার মুখ থেকে (মানে ঘোষালবাবু) শোনা সে এক নিদারুণ গপ্পো। কী হয়েছে? ----------------------- আমাদের স্বামীজি কিছুদিন ধরেই বলছিলো একটা ভালো শিকার ধরেছে। খুব ভালো মেয়ে (মানে ঠিক এই ভাষায় নয়। জামশেদপুরের এ সংক্রান্ত চলিত ভাষা এই পারিবারিক পাতায় ব্যবহার করা যাবেনা)। আমরা বলি, 'ভালো মেয়ে' হলে তোর চক্করে কখনও পড়ে? মাথার ভিতরে পুরো গ্যাপ। সে রেগে গিয়ে আমাকে হিংসুটে আঁতেল বলে। যাকগে, একদিন সেই নতুন শিকারটির সঙ্গে অ্যাপো হয়েছে, সন্ধেবেলা ঘোষালে। সে মেয়ে নাকি বলেছিলো সে একা আসতে পারবে না। বাড়িতে ছাড়বে না। সঙ্গে এক বন্ধু থাকবে। স্বামীজি তো তাতে আরো পুলকিত। আসলের সঙ্গে আবার ফাউ। ঠাকুর ভালো করো। ----------------------- সন্ধেবেলা সাজুগুজু করে তো সে পৌঁছেছে ঘোষাল ঠেকে। মালিক তার খুবই চেনা। তার সব 'ডেঞ্জারাস লিয়াজঁ'র সাক্ষী সে মক্কেল। একটু ফিক করে হেসে তিনি জানান। এসে গেছে। চার নম্বরে চলে যান। বিজয়গর্বে সে এগিয়ে যায় চার নম্বর টেবিলের দিকে। তার পরে একটি প্রবল বিস্ফোরণের কোলাহল। দু'টি চামুন্ডা তরুণী একজন বিপর্যস্ত পরম প্রেমময় বঙ্গবীরকে প্রায় পদদলিত করে ঘোষাল থেকে বেরিয়ে বাইরে চলে যায়। ঘোষালবাবু কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর পরম কোমল স্বরে প্রশ্ন করেন, " এ নিয়ে ক'টা হলো?" মানে, ইয়ে, হয়েছে কি প্রাক্তন ও বর্তমান দুই শিকারই যে নিজেদের মধ্যে বন্ধু এবং তারা যে এভাবে একযোগে আবির্ভূত হতে পারে, সেটা স্বামীজির হিসেবে ছিলোনা। ঘোষাল, আহা... ঘোষাল...!!

1055

5

দীপঙ্কর বসু

গানের টুকি টাকি

প্রথমেই জানিয়ে রাখি সুর তরঙ্গের প্রভাব মানুষের স্নায়ু তন্ত্রে কি ভাবে কাজ করে তার কোন যুক্তি গ্রাহ্য ব্যখ্যা আমার জানা নেই । হয়ত মনস্তত্ত্ববিদেরা এই বিষয়টির ওপরে আলোকপাত করতে পারবেন । তাও সেটা কতটা বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা হবে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। ভারতীয় সংগীত তত্ত্ববিদ ভেঙ্কটমুখী (নামের বানানটা ঠিক হল কিনা জানিনা )সাতটি শুদ্ধ ও পাঁচটি বিকৃত মিলিয়ে মোট বারোটি স্বরের পারমুটেশন কম্বিনেশনের অঙ্ক কষে বাহাত্তরটি ঠাটের প্রস্তাবনা করেছিলেন । কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তার মধ্যে মাত্র দশটি ঠাটের মধ্যেই কেবল সাংগীতিক সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ ঠাট ভুক্ত সাতটি শুদ্ধ বা বিকৃত অথবা শুধু মাত্র শুদ্ধ স্বর গুলি দিয়ে সুরের এমন এক একটি প্যাটার্ন গড়ে তোলা সম্ভব যা আমাদের চিত্তকে রঞ্জিত করতে পারে, আমাদের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে পারে । এই বিশেষ রঞ্জনাশক্তি বিশিষ্ট সুরের প্যাটার্ন গুলিই হল এক একটি রাগ । প্রশ্ন জাগতে পারে রাগের মধ্যেকার রঞ্জনাশক্তির উৎসটা কোথায় । সংগীত তত্ত্বের যতটুকু আমি বুঝেছি তাতে আমার বিশ্বাস রাগরাগিণীর রঞ্জনা শক্তির মূল উৎস হল সংগতি রক্ষা করে সুরের চলনের বৈচিত্র । একটা উদাহরণ দিলে হয়তো আমার বক্তব্যটাকে সঠিক ভাবে বোঝাতে পারব । কাফি ঠাটের দুটি রাগ মিয়া কি মল্লার এবং বাহার এর কথা ভাবা যাক । ভিন্ন ঋতুতে গেও রাগদুটিতে ব্যবহার্য স্বরগুলি একই । যথা - স র জ্ঞ ম প ধ ন ণ ( আকার মাত্রিক স্বরলিপি অনুসারে জ্ঞ = কোমল গান্ধার , ন =শুদ্ধ নিষাদ এবং ণ= কোমল নিষাদ ।) একই স্বর ব্যবহার করেও তা হলে দুটি রাগকে কি ভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করা যাবে সে প্রশ্নের উত্তর হলও স্বরগুলির প্রয়োগের বৈচিত্রই এনে দেবে দুটি রাগের দুটি ভিন্ন রূপ । মিয়া কি মল্লার রাগে স্বরগুলির চলন হবে – র ম র স , ম র , প, ণ ধ ন স । স ণ প,ম প, জ্ঞ ম ,র স বাহার রাগে চলনটা পালটে গিয়ে দাঁড়াবে – ন স , জ্ঞ ম , প জ্ঞ ম,ধ ,ন স । স, ণ প ম প,জ্ঞ ম , র স বলে রাখা ভাল যে এই প্রাথমিক অতি সরলীকৃত উদাহরণটিই রাগরূপের একমাত্র বৈচিত্র নয় । রাগগুলির প্রকৃত চলনবৈচিত্র ফুটে উঠবে একমাত্র গায়ন বা বাদনের মাধ্যমে – যা লিপিবদ্ধ করা এক প্রকার অসম্ভব। ঠিক এই জায়গাতেই প্রয়োজন হয় প্রথাগত শিক্ষার – তা সে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতই হোক বা পাশ্চাত্য সংগীত । এবারে দেখা যাক ভৈঁরো রাগ শুনে অন্তরে সত্যিই ভোরের আবহটা অনুভব করা যায় কিনা । প্রথমেই জানাই ভৈঁরো আমার মনে সত্যিই ভোর হবার অনুভবের জন্ম দেয় । ললিতের সুরে অতি প্রত্যুষের আলোআঁধারির রঙ আমার চেতনায় ধরা দেয়,রামকেলী শুনে শুভ্র সকালের আলোর স্পর্শ পাই । তা হয়তো আমার সংগীত-সংস্কারের কারণেই ঘটে । আমি নিশ্চিত নই বলেই কোন মন্তব্য না করে দুই দিকপাল সংগীতবেত্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করব শুধু । রবীন্দ্রনাথের “সংগীতের মুক্তি” প্রবন্ধ থেকে – “বিশ্বের একটা হৃদয়ের আভা নিয়ত প্রকাশ পাইতেছে ।ভোরবেলার আকাশে হাওয়ায় এমন কিছু একটা আছে,যেটা কেবল মাত্র বস্তু নয় ,ঘটনা নয় , যেটা কেবল মাত্র রস । এই রসের ক্ষেত্রেই আমাদের অন্তরের সঙ্গে বাহিরের রাগ অনুরাগের মিল । এই মিলের তত্বটি অনির্বচনীয় ।যাহা নির্বচনীয় তাহা পৃথক,তাহা আপনাতে আপনি সুনির্দিষ্ট । যেখানে পদ্মফুলের নির্বচনীয়তা সেখানে তার আকার আয়তন ও বস্তু-পরিমাণ সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধভাবে তার আপনারই ।কিন্তু যেখানে পদ্মটি অনির্বচনীয় সে যেন আপনার সমস্তটার চেয়েও আপনি অনেক বেশী । এই বেশীটুকুই তার সংগীত”। ঊনবিংশ শতকের অপর এক সংগীতচিন্তা নায়ক ,রবীন্দ্রনাথের অগ্রজস্থানীয় কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন তাঁর “গীতসূত্রসার”(খ্রীঃ১৮৮৫) গ্রন্থে । কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন – “এক এক রাগ চিরকালই এক নির্দিষ্ট সময়ে গাওয়া ও শুনা অভ্যাস হওয়াতে, অন্য সময়ে সেই রাগ গীত হইলে তত সুরস বোধ হয়না । অভ্যাস অতি প্রবল ব্যপার; অভ্যাসে নূতন স্বভাবের উৎপত্তি হয় । অনেকে বলেন যে, ভৈরবের সহিত প্রাতঃকালের কোন সম্বন্ধ যদি নাই তবে তাহা বৈকালে কি রাত্রে গাইলেও প্রাতঃকাল মনে হয় কেন? ইহার কারণ স্মৃতি-উদ্দীপনা ।কোন দুইটি দ্রব্য বা কার্য সর্ব্বদাই একত্রে দেখা কি শুনা অভ্যাস হইলে তাহার একটীকে দেখিলে কি শুনিলে অপরটী স্মৃতিপথে উদিত হয়,ইহা নৈসর্গিক নিয়ম”। আপাতত ক্ষান্ত দিই । জানিনা বিষয়টাকে বোঝাতে সক্ষম হলাম না আরো গুলিয়ে দিলাম ।যাই হোক বুঝলে দীপঙ্করদা বুঝদার লোক নৈলে ফাগল ।

1013

5

stuti..

বাপের বাড়ি যাত্রা

কাশের বনে বিষাদের সুর ।ধূপ আরতি ,পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে চলছে মায়ের বিদায়ের আয়োজন । ভক্তরা আকুল প্রার্থনা আর চোখের জলে মাকে বিদায় জানাচ্ছে  । মা দোলায় চেপে বসেছেন ।। গণেশ কলাবউকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে । সরস্বতীকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে । মোবাইল হাতে বার বার পায়চারি করছে । মুশকিল হয়েছে এখন ও লক্ষী ,কার্তিকের দেখা নেই । সবাইকে পই পই করে বারণ করেছিল আজ যেন কেউ কোথাও না বেরোয় । কিন্তু কে শোনে কার কথা …...। কার্ত্তিক তো সেই মামাবাড়িতে পা দিয়েই ধড়াচূড়া ফেলে দিয়ে জিনস -টিশার্ট চড়িয়ে বান্ধবীদের সাথে বেড়িয়ে গেছিল । এখন আবার বাবু গেছেন বান্ধবীদের বিদায় জানাতে । গতবার ওর দেরী করে ফেরার জন্যই মায়ের কৈলাসে ফিরতে দেরী হয়ে গেছিল । বান্ধবীদের বিদায় জানাতে গিয়ে এক নাছোড়বান্দা বান্ধবীর পাল্লায় পরেছিল , কিছুতেই কাটাতে পারছিল না ।অবশেষে গ্যাটের কড়ি খসিয়ে একখানা দামী উপহার নিয়ে তবেই সে ছেড়েছিল । মা মোবাইলে ধরার চেষ্টা করছে কার্তিককে , সে বার বার বলেছে - চিন্তা করো না ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব । লক্ষী গেছে মলে লাস্ট মিনিটের বাজার করতে  । তার নাকি তানিস্কের একটা সেট ভীষণ পছন্দ হয়েছে ,সেটা না নিয়ে সে কিছুতেই নড়বে না । এবার মার ও ইচ্ছা ছিল কিছু আধুনিক বেশভূষা কেনেন  । কিন্তু সময় কোথায় ? আগে বাপের বাড়ি এসে বিশ্রাম করে তারপর মণ্ডপে বসতেন । এখন তো আসার আগে থেকেই হোয়াটসঅ্যাপে ঝাঁকে ঝাঁকে মেসেজ এসে মার মোবাইল হ্যাঙ করে দেয় । মায়ের নাওয়া নেই খাওয়া নেই । আসতে না আসতেই ভক্তরা চ্যাঙদোলা করে মণ্ডপে বসিয়ে দেয় । ভক্তদের দিনকে দিন যা বাড়বাড়ন্ত ,কিছুতেই তর সয় না । মা মণ্ডপে বসতে না বসতেই করজোরে প্রার্থনা শুরু করে দেয় । মা এবার প্রাইজটা যেন হাতছাড়া হয়ে না যায় ।। ঢাক -ঢোল ,কাসর ঘন্টার আওয়াজে মার কান ঝালাপালা । মিষ্টি খেতে খেতে গা গুলাচ্ছে । মার ও মাঝে মাঝে দাঁত কিড়মিড় করতে ইচ্ছা করছে ভক্তদের ওপর । নিজেরা তো মাকে উপলক্ষ্য করে মোগলাই , বিরিয়ানি্‌ ,ডিমের ডেভিল খুব সাটালো আর মাকে খাওয়ালো কেবল ল্যাবড়া -খিচুড়ি -চাটনি । এই ফিউসনের যুগে অন্য রকমও তো কিছু ভাবতে পারে …......। ধূপের ধোঁয়ায় চোখ কচলাতে কচলাতে মা বার বার সরস্বতীকে বলছে -দেখ ওরা কোথায় রয়ে গেল । সরস্বতী বিচলিত  । লক্ষীর মোবাইল বার বার বলছে আউট অফ রিচ । কি জানি পেঁচা আবার দিক ভুল করে অন্য দিকে চলে গেল নাকি । গণেশ তল্পিতল্পা নিয়ে মায়ের পাশেই আছে । তার পাশে একগলা ঘোমটা টেনে কলাবউ । এবার একদল ভক্ত মাকে একটা গোলাপী গাউন দিয়েছে । মা ভেবেছেন ওটা কলাবউকে দিয়ে দেবেন । মা তো আর এ বয়সে গাউন পড়বেন না । যদিও আজকাল শিবঠাকুর বাঘছাল বারমুডা পরা শুরু করেছে । সিংহ ওদিকে হালুম হুলুম শুরু করে দিয়েছে । বেশী রাত হলে বাবার কাছে তাকে জবাদিহি করতে হবে । তাছাড়া সন্ধ্যের পর কৈলাসের রাস্তাঘাট ও খুব একটা নিরাপদ নয় । অসুরদের উপদ্রব খুব বেড়েছে । এবার স্পেসশিপ বানিয়েছিল যে ভক্তরা তারা অবশ্য অভয় দিয়েছে এভারেস্ট অবধি লিফট দিয়ে দেবে । মা এবার বেজায় খাপ্পা পুলিশভক্তদের উপর । সেই কবে থেকে একদল ভক্ত মার সবচেয়ে উঁচু প্রতিমার প্রচার চালাচ্ছিল । ফেবুকে সে খবর পড়ে মা তো আহ্লাদে আটখানা । মুখে প্রকাশ না করলেও মনে মনে খুব খুশি ছিলেন । ভেবেছিলেন আগে ওখানেই যাবেন । পিতিবার থিম থিম শুনে কান পচে গেছে । এবার নতুন কিছু হচ্ছিল । কিন্তু পুলিশভক্তরা পাকা ধানে মই দিয়ে দিল । সব বানচাল হয়ে গেল । মায়ের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিল বিরাট পর্দা  ।পূজা বন্ধ । সেই থেকে মেজাজটা খিঁচড়ে আছে । এখন আবার ছেলেমেয়েদের দেখা নেই । নীলকন্ঠ সেই কখন উড়ে গেছে । এতক্ষনে বোধহয় কৈলাসে পৌঁছিয়ে গেল । কতবার বললেন বাপু একটু ধীরে ধীরে উড়ো । তা কে শোনে কার কথা । সে ও খবর পৌঁছে নিজের ছুটি করতে ব্যস্ত ।যাবার সময় নেপালে একবার দাঁড়াতে হবে মোমো কেনার জন্য ।কর্তার জন্য কিছু না নিয়ে গেলে আবার দক্ষযক্ষ বাঁধাবে । গতবার মোমোর সাথের ঐ ঝাল চাটনিটা গাঁজার সাথে দারুণ জমেছিল । শেষে বলে কিনা এতটুকু আনলে কেন ? এবার একটু বেশী করে নিয়ে যাবেন ভেবেছেন । বেশী রাত হয়ে গেলে আবার ওদের মোমো শেষ হয়ে যায় । ঐ যে লক্ষী আর কার্ত্তিক হন্তদন্ত হয়ে আসছে । আর দেরী করা যাবে না  । বিদায় ভক্তের দল । আসছে বছর আবার দেখা হবে ।ততদিন তোমরা নতুন থিম দিয়ে কি করে অন্যকে টেক্কা দেওয়া যায় তাই ভাবতে থাক ।

1055

14

মনোজ ভট্টাচার্য

কেয়া সংক্রান্ত কিছু মিছু !

মহিনবাবুর বে আর মোহিনীবালার বে ! কফি হাউসে আমার যাতায়াত স্কুল শেষ হওয়ার আগে থেকেই I তখনও কফি হাউসে দোতলা হয় নি I এত উচ্ছৃঙ্খলতাও আরম্ভ হয় নি I ইউনিভার্সিটি আর প্রেসিডেন্সির ছাত্র-ছাত্রীই বেশি আসত I সিটি, বিদ্যাসাগরের ছাত্ররাও আসত I কিন্তু খুব বেশি না I সেই সময় তিন-চার জন সহপাঠি সঙ্গে করে হল ঘরে প্রবেশ করতেন মক্ষীরানি ! কফি খেতে থাকা বা না থাকা কারুর সাধ্য ছিল না তার দিকে না তাকানোর ! মেয়েদের তুলনায় লম্বা , সোজা ঘাড় - মরাল গ্রীবা ( খানিকটা রাজহাসের মত ) ! হাসির ও কথা বলায় যে অত সুন্দর নদীর মত ধ্বনি হতে পারে ! ইংরিজি অনার্স - প্রথম শ্রেণীতে প্রথম ! সহপাঠি তো বটেই অধ্যাপকরা পর্যন্ত সান্নিধ্য লোভী ! – দুপাক লাট্টুর মতো পাক খেয়েই কোনও না কোন অধ্যাপকের টেবিলে বসতেন ! একটি যুবক, নাম হওয়া উচিত ছিল দীপক, মুখমন্ডলে হরপ্পার কারুকাজ, তালগাছের মত লম্বা I শুধুমাত্র ভালো ফুটবল খেলত বলে নামকরা কলেজে বিনা পয়সায় ঢুকতে পারল I পরে অবশ্য ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয় ইংরিজী নিয়ে পড়তে পেরেছিল I কানাডা প্রবাসী দাদার সংসারে থাকা ও নিজের চা-চারমিনারের খরচ ওঠে টিউশানিতে I তখন থেকেই ইবসেন, চেকভ অনুবাদ করে নাটকের ফর্মে লিখছে I বেশ জনপ্রিয় হয়েছে I কিন্তু কোনো রূপসীর সঙ্গে ভাব হওয়া ! স্বপ্নেও ছিল না ! তবু কিভাবে যে কি হলো, বিউটির সঙ্গে বিস্ট মিললো ! কিন্তু চাঁদ তো থাকে আকাশে, তার সাথে মধ্যবিত্তের মানুষ মেলে কিকরে ! তার সামাজিক অবস্থান কোথায় ! তো চাঁদ ফুরুত হয়ে গেল কানাডায় I আর দীপক ! অবিশ্বাস্য হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে, জীবনের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহননের পথ নিল I - একটা চিঠি লিখে পাঠালো আরেকজনের কাছে I নিজে গেল গঙ্গার ধারে জলে ডুবতে I যার কাছে চিঠি গেল, ধরা যাক তার নাম 'জয়া' ! নাটকের ব্যাপারে জয়া খুবই মানে দীপককে ! জয়ার কথা পরে লেখা যাবে'খন I সে দৌড়ালো গঙ্গার ধারে দীপককে বাঁচাতে I দীপক বাঁচলো I শুধু দীপকই যে বাঁচলো. তা নয় i বাঁচলো ভবিষ্যত নাট্য জগতও ! পরবর্তী কালে চরিত্ররা নাট্যকারের খোঁজ করলো ! আর হরপ্পা ছাপ চেহারায় আরেক রূপসীর আবির্ভাব হলো ! এই সবকিছুর সাক্ষী হয়ে রইল একজনা ! চিঠিটা সে দেখেছিল একবারই ! দুজনেই ছিল একই নাট্যদলে ! – একসঙ্গে নাটক লেখা – নাটক করা – নাটক নিয়ে বাইরে যাওয়া ! ক্রমশ তাদের সম্পর্ক প্রগাড় হয়েছিলো ! জয়া খুব খোলা চরিত্রের ছিল । তাদের সম্পর্ক নিয়ে কোনও লুকোছাপা করত না ! আর এই কোর্টশিপও অনেকদিন চলছিল ! এই সময়ের মধ্যেই আমার হঠাৎ বিয়া হয়ে গেল ! আমাদের কফি হাউজে নিয়ে গিয়ে খুব হৈ হল্লা হল ! তারপরেই চাপ পরে ওদের ওপর ! দুজনেই চাকরি বাকরি করছে – মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত । বিয়ে না করার কোনও কারন নেই ! – স্বাভাবিক ভাবেই ওদের বিয়ে হয়েছিলো ! কিন্তু আমি সেই সময় ছিটকে গেছিলাম অন্য কোনও গ্রহে ! মনোজ

1044

8

মনোজ ভট্টাচার্য

আমি ড্রপ পড়ে গেলাম !

আমি ড্রপ পড়ে গেলাম ! হঠাৎ ঠিক হল - আড্ডা মহারাজের বাড়ি এক বিরাট উৎসব হবে ! হৈ চৈ পড়ে গেল । দিকে দিকে জ্ঞানী গুনী শিল্পী কুল্পী সব প্রস্তুত হতে লাগলো । কে কি গান গাইবে – কে কি পোশাক পড়বে ! কে লাইট লাগাবে – কে মাইক লাগাবে! কে ফুল দেবে ! কে তদারকী করবে ! - সে কী উদ্দীপনা ! উৎসব মানেই তো গান বাজনা খাওয়া দাওয়া ! কেউ কেউ কাউন্টডাউনও শুরু করে দিল ! আড্ডা প্রাসাদের এক কোনে আশ্রিত এক বদ্দিবুড়ো থাকে । মাঝে মাঝে সামনে গাছের নীচে খঞ্জনী বাজিয়ে গুন গুন করে গান গায় ! দু একজন দিদিমনি দাদামনি ছাড়া কেউই তার খবর জানে না ! তারা মাঝে মধ্যে শোনে – বদ্দি-কাকুর গান ! তা এই বিরাট উৎসবের আতিশয্যে লাফালাফি ওড়াউড়ির মাঝে দুই দিদিমনি ও দাদামনি বদ্দি বুড়োকে বলেই ফেলল – ও বদ্দিকাকা, তুমি কি বাজাবে গো ? আমি - আমি আর কি বাজাতে পারি ! আমি তো কিছুই জানি না ! বদ্দি বুড়ো কাঁচু মাচু হয়ে উত্তর দিল ! না না - তা বললে হবে না ! - সেজো দাদামনি বলে উঠল । - তুমি তো খঞ্জনী বাজিয়ে সুন্দর গান গাও ! তাই বাজাবে ! তোমার খঞ্জনীর সঙ্গে আমি একটা গান গাইবো ! অ্যাঁ ! আর কিন্তু সময় নেই বদুকাকা ! এখন থেকে প্র্যাকটিস করো । - ন-দিদিমনি আদুরে গলায় জুড়ে দিল । বদ্দিবুড়ো কি আর করে ! দিদিমনি দাদামনি বলে কথা ! ওদের অনুরোধই ওর কাছে আদেশ ! বয়েসের ধরা গলায় খঞ্জনী বাজিয়ে গাইতে লাগলো – কি গাবো আমি কি শুনাবো - - ! এদিকে আড্ডা-প্রাসাদে মহোৎসবের সেই দিন এসে গেল ! – সারা পৃথিবী থেকে নিমন্ত্রিত শিল্পীরা এসে গেল । - কেউ সিন্থেসাইজার, কেউ সেতার, কেউ গীটার, কেউ তবলা, কেউ বংগোজ ইত্যাদি ! এসেই সবাই স্থলপথ, জলপথ, শূন্যপথ – যে যার পথ বেছে নিয়ে গুছিয়ে বসেছে ! আবার কেউ এডিটিং । কেউ তদারকি ! আবার কেউ খবরদারি করছে ! – একেবারে জি বাংলার সা রে গা মা পা জমজমাট প্রোগ্রাম ! নানারকম গান – কেউ গুছিয়ে করছে কালোয়াতি, কেউ আবার এখান ওখান থেকে জালিয়াতি ! তারই বাহবা – কেয়াবাত - তালি এবং নিভৃতে গালি ! সন্ধ্যে থেকে বাইরে বসে বদ্দিবুড়ো – হাতে খঞ্জনী ! কাচা একটা পাজামা পড়ে এসেছে। যদি কেউ ডাকে ভেতরে – যেতে তো হবে ! ভয় পেলে চলবে না ! হাজার হোক – আড্ডা-প্রাসাদের সম্মান বলে কথা ! দাদামনি বলেছে সঙ্গে গাইবে ! মাঝে মাঝে ঘুমে ঢুলে পড়লেও – তাড়াতাড়ি গা ঝেড়ে নিচ্ছে ! জেগে থাকার জন্যে চিমটিও কাটছে নিজেকে ! আর অপেক্ষা করছে ! যদি - - ! যত আলো ঝলমল সন্ধ্যেই হোক – একসময় নিঃশেষিত তেলের প্রদীপের মতো সেও শেষ হয় । রাত পার হয়ে যায় । পুব আকাশের কোনায় দিগন্তের আলো ভেসে ওঠে ! বদ্দিবুড়োর ঘুমও চটকে যায় ! এ কি – এ যে সকাল হয়ে গেছে ! বাড়ির ভেতর তো এখন কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না ! মাইক বন্ধ ! সবাই কি তাহলে চলে গেছে! উৎসব কি শেষ হয়ে গেছে তাহলে ! – ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখে ঘরের ভেতর এক বিশৃঙ্খল অবস্থা । সবাই গড়াগড়ি যাচ্ছে - বোতলের মতন – কার্পেটের ওপর ! বাদ্য যন্ত্র আর শিল্পীদের পার্থক্য বোঝাই যাচ্ছে না ! নানাধরনের নাসিকা গর্জনের মধ্যেই - কেউ যেন বিড়বিড় করে উঠল – বদ্দিবুড়োর খঞ্জনীর সঙ্গে আমার গান গাওয়া হল না ! – আমি ড্রপ পড়ে গেলাম ! – বদ্দি বুড়োর মনে হল দাদামনি যেন একটু একটু জেগে আছে ! পায়ে পায়ে বদ্দিবুড়ো ঘরের বাইরে চলে এলো ! প্রাসাদের উৎসব থেমে গেছে । কিন্তু বাইরে সারা বাড়িতে তখনও আলোগুলো ঝলমল করে জ্বলছে ! ক্রমশ পাখীদের কোলাহল বাড়ছে ! বদ্দিবুড়োর কানে এখনো বাজছে তার সেজো দাদামনির সেই গোঙানি – বদ্দিবুড়োর খঞ্জনীর সঙ্গে আমার গান গাওয়া হল না ! – আমি ড্রপ পড়ে গেলাম ! মনোজ

874

8

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ২২.০৯.২০১৫ ক্ষ সকাল সাতটা।বেড টী হাজির।মানে এক ঘন্টার মধ্যে তৈরী হয়ে নিচে গাড়িতে বসা।চা খেতে খেতে ছাদে বেড়িয়ে এলাম। সকালের আলো তালের স্বচ্ছ শান্ত জলে।ঘন গাছপালা আর পাহাড়ের সাথে নৈনাদেবীর মন্দির যেন পটে আঁকা এক ছবি।শহর আর মন্দিরের মাঝে ঝিলের জল যেন স্বর্গ মর্ত্যের এল ও সী।নীচে রাস্তা গাড়িঘোড়া বিহীন এক গা এলানো সরিসৃপ।জগ্গারস দের আওতায়।স্কুলের গাড়ি বেড়িয়ে পড়েছে।বাচ্চা আর তাদের মায়েদের আনাগোনা শুরু।চটপট তৈরী হই। আজ আবার সুখহালের গাড়ি শহরের প্রান্তে আমাদের অপেক্ষায়।যথাসময়ে আমরাও হাজির।দক্ষ হাতে গাড়ি নিয়ে সে চলল।যেন পক্ষিরাজ।আমিও মজলাম ভ্রমণে।রাস্তার ধারে গাছেরা পরম আত্মিয়ের মতন সার বেঁধে দাঁড়াল।যেন জানে এপথে আর ফিরছিনা।ওক পাইন দেওদার যারা এই দশ দিন সব সময় সাথে সাথে ছিল আরো কাছে আরো কাছে ঘন হয়ে এল।দূরের পাহাড়ের চূড়োরা মাথায় সাদা কালো মেঘের ওড়না দোলাল।জানলা দিয়ে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া বন জঙ্গলের সুবাস নিয়ে এল।গভীর খাদ অন্ধামোড় পাহাড়ে ক্রমাগত চড়া নামা সব পরীক্ষায় সফল।পৌঁছুলাম ভীম তাল।নৈনিতাল শহর থেকে বাইশ কিমী।জেলা নৈনিতাল।উচ্চতা ১৩৭০মী।ভীমতালের সৌন্দর্য্য ও বৈশিষ্ট তার ছোট্ট দ্বীপ।ঝিলের মাঝে দ্বীপ যেন কচ্ছপের পীঠ।ভুস করে ডুবে গেলেই হল! ভীমেশ্বরা মহাদব মন্দির আছে ঝিলের ধারে।ভীমের করকমলের পরশ ধন্য।অজ্ঞাতবাসের সময় পঞ্চপান্ডবের বাস স্থান ছিল বলে খ্যাত এই ভীমতাল।এখনকার মন্দির নির্মানে সাহায্য করেন কুমায়ুঁর চাঁদ বংশীয় রাজা বাজ বাহাদুর।জানা গেল ভীমতাল থেকে কাঠগোদাম যাওয়ার পায়ে হাঁটা পথের কথা।এখান থেকে তিব্বত আর নেপাল যাওয়ার পথ আছে।রোমাঞ্চ হল যখন শুনলাম এ অঞ্চল সিল্করুটের ছিল তালিকাভুক্ত।ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ নৈনিতাল ছিল নেপালের অংশ।১৮১৪-১৬সালের এঙ্গলো নেপালীজ ওয়ারের পর এই অঞ্চল হয় বৃটিশ শাসনাধিন।ভীমতাল পাহাড় আর সমতলের মধ্যে এক বিশ্রামস্থল। ভীমতাল থেকে পাঁচ কিমী দূরে সাততাল।পাহাড় পর্বত বন জঙ্গলে ঘেরা অতি মনোরম।পাহাড়ে হিড়িম্বা মন্দির।মনে পড়ে গেল মানালির হিড়িম্বা মন্দিরের কথা ।পাইন গাছে ঘেরা প্যাগোডা ধরনের। দেখলাম বিশাল হনুমানজীর প্রতিমা।সাথে অনান্য মন্দির।প্রাচিন নয় বলে তেমন প্রভাবিত হলাম না।যেন মন্দির মানেই পাথরের গায়ে কারুকার্য্য।গর্ভগৃহে ঢোকার সাথে সাথে ধূপ চন্দন গুগ্গুল ফুলমালা বেলপাতা তুলসীদূর্বোর মিশ্রিত ঘ্রাণ ।যেন মন্দির মানেঅন্ধকারে জলতে থাকা প্রদীপ বাইরে চত্বরে বট অশ্বত্থ বেল শিউলির জটলা পাশে তির্ তির্ করে বয়ে যাওয়া নদী ।যেন মন্দির মানে মন্দিরের সুউচ্চ বিমান বিশাল পতাকায় শোভিত।যেমনটি দেখেছিলেম সোমনাথ মন্দিরে। দুফুর দুটো।পাহাড়ের রাস্তা পার হয়ে গাড়ি এসে গেল সমতলে।কিছুদুর যেতেই এসে গেল জিম করবেট ম্যুজিয়ম।কালাধুন্গির এই বাঙ্গলোয় থাকতেন জিম করবেট।ওনার ব্যাবহৃত জিনিষ সাজান।কত মানুষখেকো বাঘের শিকার করেছেন শুধু মানুষকে বাঁচাতে।বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমর্থক।বিশাল জমি মারা যাওয়ার আগে গরিব গ্রামবাসিদের দান করে গেছেন। ম্যুজিয়াম দেখে চললাম দেখতে পার্ক।গাড়ির বনে প্রবেশ নিষেধ।নিজেদের নাম আর প্যান নাম্বার জানিয়ে পাওয়া গেল বনে প্রবেশাধিকার।এল হুডখোলা জিপসী।চলল গাড়ি পার্কের দিকে।বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর পার্কের গেটের কাছে আবার বিরতি।গাইড বিনা ভীতরে না যাওয়াই ভাল।আমরা গেটের পাশেই ঘোরাঘুরি করে অপেক্ষা করতে থাকি।এলেন গাইড।চেহরা ছবি দেখে মনে হল এক্স মিলিট্রী ম্যান।গাড়ি ধরল বনের পথ।হিমালয়ের শিবালিক শ্রেণীতে এই পার্ক।তাই নুড়ি পাথরের উপর নাচতে নাচতে চলল আমাদের জিপসী।কোথাও কোথাও ছোট ছোট পাহাড়ি নদী পার হল।ঠিক যেন জিপসীর বিজ্ঞাপন।গাইড হঠাৎ চুপ থাকার ইশারা করলে।দেখি কিছু দূরে কয়েকটা হাতি।ধুলোমাখা।শরির স্বাস্থ্য ভাল নয়।গাইড দেখালেন জমির উপর তাজা পাগ মার্ক।গাছের গায়ে বাঘের নখ ধার করার চিন্হ।প্রচুর হরিন দেখা গেল হর্নবিলকে উড়ে যেতে দেখলাম।তাছাড়া কিছুই দেখলাম না।তবে সঘন গাছপালা আর পাখীর কলতানে বিকেল ছিল বেশ উপভোগ্য।জঙ্গলে মঙ্গল মঙ্গল করে যখন পার্কের গেটের কাছে তখন দেখি লোকের জটলা।সবাই উত্তেজিত।কি ব্যাপার!আমাদের গাইড নেমে গেলেন খবর নিতে। কি কান্ড !কয়েক মিনিট আগেই বাঘ এসে একটা বাঁদরকে ধরেছে।বাঁদরের চিৎকার শুনে গেটের পাশের অফিসঘর থেকে লোকজন বেড়িয়ে আসে।দেখে বাঘ বাঁদর নিয়ে জঙ্গলে ঢুকল। ওখানে সব লোক চিন্তিত।কারণ বাঘ কখনও লোকালয়ের এত কাছে আসেনি।ওখান দিয়ে গ্রামের লোকেরা করে সারাদিন আসা যাওয়া।চিন্তার বিষয়ই বটে।আমরা সব মনে মনে তখন ভাবছি একটু আগে আমরাও এখানে ঘুরেছি ফিরেছি।কি সব্বোনাশ!বাঘের ভোজন হইনি এই রক্ষে!!! সন্ধ্যে ছটা।গাড়ি চলল কাঠগোদাম। ঝক ঝকে পরিষ্কার কাঠগোদাম স্টেশন ।রাত দশটায় গাড়ি।ঠিক সময়ে গাড়ি ছাড়ল। অলবিদা ওক দেওদার পাইন অলবিদা কোশি সরজু গোমতী রামগঙ্গা অলবিদা বরফ আর মেঘে ঢাকা পাহাড়চূড়ো অলবিদা নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা অলবিদা চন্দ্রযান ও তার পাইলট সুখহাল অলবিদা কাঠগোদাম

902

1

মনোজ ভট্টাচার্য

সাদা না কালো !

সাদা না কালো ! মাইকেল জ্যাকশনের সেই গানটা মনে পড়ে – ব্ল্যাক অর হোয়াইট ! খুব ছোটবেলায় একবার আমার স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হয়েছিলো । এখন যদিও আমার মনেই পড়েনা – ঝগড়াটা কি নিয়ে হয়েছিলো । - কিন্তু সেইদিন আমরা যে শিক্ষা পেয়েছিলাম - সেকথা আমি কোনোদিন ভুলিনি ! আমার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে – আমি যা বলছি তাই ঠিক , আর বন্ধুটি যা বলছে তা ভুল । - আবার আমার বন্ধুও ঠিক সেইভাবে ভাবছে – সে যা বলেছে – সেটাই ঠিক আর আমি যা বলেছি – তা ভুল ! – তখন আমাদের দিদিমনি ঠিক করলেন – এমনভাবে আমাদের শেখাবেন যাতে আমরা দরকারি শিক্ষাটা ভুলে না যাই ! তিনি প্রথমে আমাকে ক্লাশের একদম সামনে নিয়ে গেলেন । টেবিলের একদিকে গিয়ে দাঁড়ালেন আর আমাকে বললেন টেবিলের আরেকদিকে দাঁড়াতে ! তারপর টেবিলের ওপর একটা বড় গোলাকৃতি বস্তু রাখলেন । - আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম – গোলাকার বস্তুটি কালো । দিদিমনি আমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন – সেটা কি রঙের ? সে উত্তর দিল – জিনিসটি সাদা ! আমি তো অবাক ! বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না – বন্ধু কিকরে একটা কালো জিনিসকে সাদা বলল ! ওটা কালো না সাদা - তাই নিয়ে আরেকবার তর্কাতর্কি হতে পারত ! তারপর দিদিমনি আমাকে বললেন আমার যায়গায় ফিরে গিয়ে দাঁড়াতে । - আর আমার বন্ধুটিকে বললেন সামনে গিয়ে টেবিলের ওপাশে দাঁড়াতে । - তার মানে আমাদের স্থান পরিবর্তন হল ! – তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – এই জিনিষটা কি রঙের ? – আমি দেখলাম সাদা । তাই বললাম – সাদা ! তখন আমার বন্ধু চেঁচিয়ে বলল – না, সেটা কালো ! আসলে এটা এমন বস্তু – যা আমার দিক থেকে সাদা দেখাচ্ছে ! আবার আমার বন্ধুর দিক থেকে সেটা কালোই দেখাচ্ছে ! আসলে যে কোনও সমস্যার সমাধান করতে হলে তার গভীরে গিয়ে দু দিক থেকেই বিচার করতে হবে ! শুধু মাত্র শিক্ষালব্ধ বিদ্যার মাধ্যমেই তার সমাধান হয় না ! ( খুব পুরনো একটা লেখা ছিল আমার – ওয়ার্ডে নয় – দিয়ে দিলাম ! ) মনোজ

903

4

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ২০.০৯.২০১৫ ঘুট ঘুটে অন্ধকার।জানলার বাইরে থমকে আছে রাত।কটা বাজে?মোবাইল হাতরে দেখি সাড়ে তিনটে।ভোর হতে দেরি আছে।কম্বল জড়িয়ে চুপচাপ পড়ে থাকি।ঘুমোলে চলবেনা।কৌশাণীর সূর্য্যোদয় দেখা চাই।ইন্তেজার কা ফল মিঠা।চিন্তা যখন ব্যাকুলতা হয়ে উঠল।মনে পড়ল গীতায় বলেছে কর্ম করে যাও মা ফলেষু কদাচন।যত সব ।এদিকে তখন সবে আলো ফুটছে পুবদিকে।থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে পাখীর ডাক।কোন রাতের পাখী গায় একাকী সঙ্গি বিহিন অন্ধকারে!সত্যি কি ওএকলা!মনে পড়ে যায় ছোট বেলায় পড়া জয়শঙ্কর প্রসাদের কয়েকটা পঙ্ক্তি।খগ কুল কুল সা বোল রহা।কিশলয় কা অঞ্চল ডোল রহা।একি আলো হওয়ার সাথে সাথে দেখি শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা।টুপ টাপ বৃষ্টি শুরু।হায়রে !! বুঝলাম কপালে নেই সূর্য্যোদয় দেখা।বৃষ্টি থামল।পাহাড়ের চূড়ো সোনালী আলোয় ভরে গেল। পাহাড়ের গা বেয়ে যিনি উঠে এলেন তাঁকে জবা কুসম সঙ্কাশং বলা যাবেনা।ঝক ঝকে এক সোনার থালা।মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।যা দেখলাম তাও কিছু কম নয়।সালাম কৌশাণী।সালাম তোমায়। ইতিমধ্যে এসে গেল চা আর গরম জল।ব্রেকফাস্ট সারা হল।আজ আমরা যাব রাণীক্ষেত হয়ে নৈনিতাল।কৌশাণীর থেকে রাণীক্ষেত ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা।মন মাতানো। চোখজোরানো।দূরের নীল আকাশ সবুজ গাছপালা ছলাক ছলাক নদী। হাতছানি দেয়।কাছে গেলেই আবার দূরে সরে যায়।খেলায় খেলায় গাড়ি এসে যায় রাণীক্ষেত।উচ্চতা১৮৬৯মী.হিল স্টেশন।ক্যান্টনমেন্ট শহর।আছে বৃটিশ আমলের মিলিট্রী হস্পিটল।আছে কুমায়ুঁ রেজিমেন্ট আর নাগা রেজিমেন্ট।পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহর।দূরে দেখা যায় পশ্চিম হিমালয় শ্রেণী।পাইন,ওক আর দেওদার সারিবদ্ধ।মনে হয় এক্ষুনি বাঁয়ে সে বাঁয়ে কন্ধা মিলিয়ে মার্চ পাস্ট হবে শুরু।শুধু কমান্ডারের উদঘোষের অপেক্ষা। জানাগেল রাজা সুধারদেব রাণী পদ্মিণীর মন জয় করেছিলেন।পরিবর্তে এই রমণীয় স্থান উপহার দেন রাণীকে।তাই নাম রাণীক্ষেত।যদিওনেই কোথাউ কোনো মহল কিম্বা তার ভগ্নাবশেষ। রাণীক্ষেতের আকর্ষন তার গল্ফকোর্স।এশিয়ার উচ্চতম গল্ফকোর্সের অন্যতম।নরম ঘাসে ছাওয়া প্রান্তর।দিগন্ত বিস্তৃত।ওক পাইন আর দেওদারের ছায়ায় সুনিবিড়।পাইন ফুল।নয়নাভিরাম। মানকামেশ্বর মন্দির,গুরুদ্বারা,বিনসার মহাদেব,হেয়ডাখান মন্দির দর্শণীয়।রানীক্ষেতের কুমায়ুঁ রেজিমেন্টের ম্য়ুজিয়াম দেখি অধির আগ্রহে।দুই বিশ্বযুদ্ধের নানান অস্ত্র,গোলা গুলি,কোনো জাপানী সৈনিকের রক্তমাখা বস্ত্র,বিশেষ ধরনের নৌকো,কারগিল যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র বিশ্বের আরেক রুপ তুলে ধরে।কুমায়ঁ রেজিমেন্ট দু দুবার পেয়েছে পরমবীর চক্র।দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন অনেক যুবা।তাঁদের ছবি দেয়লের গায়ে।ভীষণ ভাবে জীবিত।দুই চোখের কোনে অদম্য সাহসের হাসি।গাইডের গলায় গর্বের সুর।ইয়ে কুমায়ঁ কে জাঁবাজ দেশ কে লিয়ে কর গয়ে জান কুরবান।কর চলে হম ফিদা জাঁ আউর তন সাথিয়োঁ।অব তুম্হারে হওয়ালে বতন সাথিয়োঁ।অজান্তেই চোখে ভরে আসে জল। প্রায় প্রায় এসে গেছি।কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাব নৈনাতাল।তার আগেই লাঞ্চের হল ব্যাবস্থা।অশোক(আমাদের কুক)সাপ্লাই করল ধোকার ডালনা।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি এ সম্ভব হল কি ভাবে।বলে বাড়ির থেকেই ডাল ভেজে গুঁড়ো করে আনা হয়েছে যাহ্ বাবা।ইচ্ছে থাকলে কি না হয়। লোহাঘাট যাওয়ার পথে পড়ে জাগেশ্বর ।রামগঙ্গার তীরে।মুগ্ধকর প্রাচিন স্থাপত্য।তেমনি দৃষ্টিনন্দন বাগেশ্বরের শিব মন্দির।সরজু নদীর তীরে।বৈজনত্থার শিব মন্দিরের প্রাচিনত্ব ভাবিয়ে তোলে।পাশেই নিঃশব্দে বয়ে চলেছে গোমতী নদী।রাণীক্ষেতের মন্দিরের স্থাপত্যে প্রাচিনত্বের অভাব।জাগেশ্বর,বাগেশ্বর আর বৈজনত্থার সামনে ফিকা।বৈজনত্থা যাওয়ার পথে এক ব্রীজ পার হওয়ার সময় দেখি ব্রীজের গায়ে লেখা ডিজাইন্ড এন্ড ইরেক্টেড বাই মার্টিন এন্ড বার্ণ,ক্যালকাটা।বেশ লাগল। গাড়ি আচমকা থামায় চিন্তায় পড়ল বাধা।স্থাপত্যের তুলনা আপাততঃ থাক তোলা। ব্যাপার কি? জানা গেল আমাদের গাড়ির নৈনিতাল শহরে প্রবেশ অধিকার বঞ্চিত।সব বাইরের গাড়ির হাল হাকিকত একই।শহরের রাস্তা ওনলী ফ শহরের গাড়িজ।নাও এবার।। অন্য গাড়ি ভাড়া করা হল।আমরা লটবহর নিয়ে সেই গাড়িতে উঠলাম।পিছনের গাড়িরা আমাদের দম ফেলার সময় দিতে নারাজ।আমরা প্রবিণারা সমতলের বাসিন্দা।স্থুল আর স্লথ।এক লাফে গাড়ি চড়া বস কী বাত নহী।দুলকি চালে ওঠা হল। কি কান্ড!সারা শহর লোকে লোকারণ্য।গাড়ির গতি শম্বুক।কিন্তু মল্লিতালের সবুজ জল তার উপর ঝুঁকে পড়া আকাশ ভুলিয়ে দেয় ভীড়ভাট্টা আর হট্টমালার দেশ। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম হোটেল এ।ঘরের সামনে বিরাট টেরেস।নীচে দুই থাকে রাস্তা।তারও নীচে জল থই থই মল্লিতাল।দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঘন বনে ঢাকা পর্বতমালা।তার মাথায় কালো মেঘ।ব্যাপার সুবিধের লাগল না। যা ভেবেছি।সন্ধের মুখে নামল ঝম ঝমিয়ে ।রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান হল না।রাতের নৈনিতাল ঝলমল করে উঠল টুনি বাল্বের আলোয়।এখন নৈনা দেবীর উৎসব।সুতরাং এই আলোকসজ্জা।তার সাথে ভক্তদের অবিরাম ভীড়।রাত বাড়তেই দেখি পাহাড়ের মাঝে চাঁদ।হঠাৎ মেঘের চাদর সব ঢেকে দিল। তাড়াতাড়ি ডিনার সারা হল।কাল সকালে যাব নৈনা দেবী দর্শনে।দুফুর বিকেল সন্ধে কাটাব নৈনিতালের পথে পথে ।সে রকমই ইচ্ছে নিয়ে শুয়ে পড়ি। ২১.০৯,২০১৫ নৈনিতাল।ঝিলের শহর।সাত পাহাড়ের চূড়ো যেন শহর কে রেখেছে আগলে। সবচে'উচুঁ নৈনা শিখর।তার থেকেই শহরের নাম নৈনিতাল।পুরাণে আছে সতির চোখ(নৈনা)এখানে খসে পড়েছিল।তাল সৃষ্টি হয়েছে চোখের জলে।সম্পূর্ণ কুমায়ুঁ নৈনা দেবী /নন্দা দেবী অথবা দূর্গার উপাসক। আমরা চললাম নৈনাদেবীর মন্দিরে।ঝিলের উত্তর ভাগ মল্লিতাল।দক্ষিণ ভাগ তল্লিতাল।নৈনিতালের জলের আছে বিশেষ বৈশিষ্ট।বর্ষার পর জলের রঙ সবুজ।গরম কালে গৈরিকা।আর শীত কালে তুতে নীল।আমরা ঝিলের ধার দিয়ে দিয়ে এগোতে থাকি।আমাদের বাঁদিকে ঝিল।তার সবুজ জলে খেলে বেড়াচ্ছে ছোট বড় অসংখ্য মাছ।আমাদের ডান দিকে রাস্তা।দুই ধাপে।সে রাস্তার ধারে দোকান পাটের পশরা।ব্রীজ পার হয়ে মন্দির।ব্রীজের উপর পোস্ট অফিস।বিশ্বে নজির বিহীন।ব্রীজের উপরেই ট্যাক্সি স্টেন্ড।ব্রীজ পার হলেই ফ্লাট।সমতল ভূমি।নৈনাদেবী মন্দিরের পাশেই দেখি মশজিদ আর গুরুদ্বারা।নৈনাদেবী দর্শন হল।মন্দির চত্বর দেখে বোঝা যায় মন্দিরের বয়স বেশী নয়।জানা গেল মুল মন্দির১৮৮০ তে ধ্বসের দরুন চাপা পড়ে গেছে। দেবীদর্শন হল।লোকাল নৃত্য দেখে অভিভুত।বাজনার তালে তালে নাচ।বাজানদারদের সাজ গোজ ঝকমকে।যে নেচে চলেছে সে পুরুষ না নারি বোঝা গেলনা।ছিপ ছিপে শরির।টুকটুকে লাল শাড়ি সামলিয়ে নাচে মেতে আছে।তাল এমন যে পারলে দর্শকও যোগ দেয়।ভিডিও নিলাম।লোকনৃত্য দেখার সুযোগ আসে কই! রোপ ওয়ে দিয়ে পাহাড়ে যাওয়া হল।অদ্ভুত দৃশ্য ।তালের জলে গাছপালা পাহাড় পর্বত ঘর বাড়ি সবের ছায়া স্থির হয়ে আছে। দুটো নাগাদ ফিরে আসি হোটেলে।লাঞ্চ সেরে দিবানিদ্রার আয়োজন।তখন টের পেলাম ভিডিও করার সময় সোয়টার রেখেছিলাম এক জায়গায়।আসার সময় আর সেই কথা মনে নেই। বিকেলে ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু।আমরা কয় জন বেড়িয়ে পড়লাম।পৌঁছে গেলাম মন্দিরে। হাওয়ার দাপটে মেঘ গেল উড়ে।নির্ভয়ে মেলায় ঘুরলাম।এবার পালা ফেরার। আগামি কাল আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন।কত কিছুই দেখার থাকল বাকি।অবশ্য কালকের লিস্টে আছে জিম করবেট ন্যাশনল পার্ক।কি জানি ব্যাঘ্রকুলের দেখা পাব নাকি!সম্পূর্ণ কুমায়ু মন্ডলে আছে বাঘের ডেরা।দেখা দিলে হয়। ডিনার শেষ।গল্প শেষ।সব্বাইকে শুভরাত্রি

954

0

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ১৮.০৯.২০১৫ ভোর পাঁচটা।লজের বারান্দায় এসে দাঁড়াই।ঠান্ডা আছে।দূরে ঘন জঙ্গল।বিশাল এক হলুদমাঠকে ঘিরে আছে।পাহাড় যেন সাগরের ঢেউ।মন্ত্রপুত।অনড়।অটল।মনে পড়ে রবার্ট ফ্রস্ট The woods are lovely,dark and deep But I have promises to keep And miles to go before I sleep And miles to go before I sleep আজ আমরা যাব মুন্সিয়ারি।লম্বা ঘুরপাক। শুনলাম মুন্সিয়ারি প্রাচিন সিল্করুটের অন্তরভুক্ত।গোরিগঙ্গা বয়ে চলে নিজের ধুনে।মিলাম গ্লেশিয়ার তার উৎস।ট্রেকিং এর স্বর্গ রাজ্য।উচ্চতা ২২০০ মীটর।বরফের মুকূট পড়া পঞ্চচুল্লি।মুন্সিয়ারির আসল আকর্ষন। আমরা তৈরী হয়ে নিলাম।গাড়িরও সাজ শেষ।আজ বিশ্বকর্মা পুজো।ড্রাইভার সুখহাল গাড়ির পুজোপাঠ সারল।আমরাও উঠে পড়লাম।আবার সেই পার্বত্য রাস্তা!কখনও গোরিগঙ্গা কাছে আসে।কখনও যায় সরে।কখনও বাঁয়ে কখনও দাঁয়ে।রাস্তা এবার হল বিপদ সঙ্কুল।বাঁক গুলো অদভুত দক্ষতা দাবি করে।উনিশ বিশ হলেই বিনা টিকিটে স্বর্গারোহণ।অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্না।পাহাড়ের গায়ে বিকট দর্শন পাথর।ওয়েদারিং আর ইরোজনের প্রভাব।গভীর খাদ।পিলে চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দুফুর বারোটা নাগাদ পৌঁছেগেলাম বির্থী ফল্স।প্রায় ১২৫ মীটর উঁচু।পাশেই এক রেস্তরাঁ।সবার মন রাখতে চা হাজির। রাস্তায় পড়ল এক কালিবাড়ি।কালিবাড়ির এক ঘরে দেখি এক বাবাজি।বাঙ্গালী।নির্জনে কেমন লাগে।বললেন একা কই।আপনারা সবাই আছেন।রসিক বটে।শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছিলেন রসে বসে রাখিস মা শুকনো সন্ন্যেসী করিসনে দুফুর তিনটে নাগাদ পৌছে গেলাম মুনশিয়ারি।ইতিমধ্যে পথেই সারা হল লাঞ্চ।কারণ হোটেলে পৌঁছেই বেরুতে হবে এক স্থানিয় মন্দির দেখতে হোটেলে ঢুকেই দিল খুশ।দেখি পঞ্চচুল্লি নিজের সঙ্গিসাথি নিয়ে বিরাজমান।তবে মেঘের দৌরাত্মি এখানেও।পঞ্চচুল্লির উচ্ছতা ৬৩৩৪মী.থেকে ৬৯০৪মী.কথায় আছে এই পঞ্চচুল্লিতে পঞ্চপান্ডব শেষবারের মতন রান্না সারেন।ওনাদের স্বর্গারোহণ এখান থেকে শুরু।তার আগে শেষ খাওয়া(লাস্টসাপার) এখানেই। বিকেলে ঘুরে এলাম দূর্গামন্দির থেকে।মন্দিরে পৌঁছে মনে হল পৃথিবীর শেষ কিনারায় এসে গেছি।চারিদিকে পাহাড় আর পাহাড়।সবুজ বনাণি দিয়ে ঢাকা।আছে সবুজের সব শেড।সবুজের পরেই কে যেন তুলি দিয়ে হলুদ রঙ লেপে দিয়েছে।ধাপে ধাপে সেই রঙ নেমে গেছে গভীর খাদে।মন্দির সাদামাটা।কিন্তু অদ্ভুত প্রশান্তি ।মনে হয় আর কিছু করার নেই।মিটেছে হিসেবের লেনদেন।শুধুই পারাপারের অপেক্ষা। ম্যানেজারের কথায় মনে পড়ল বিকেলের চায়ের সময় প্রায় পেড়িয়ে গেছে।ফিরে চলি হোটেলে।ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই গরম গরম চা আর টা।তোফা!রাত নটায় খাওয়া দাওয়া শেষ। শুতে যাওয়ার আগে আমার দরদে দিলের দাস্তাঁ না শোনালে রয়ে যাবে কাহানি অধুরি।পাতালভুবনেশ্বরে নামার দরুন হাতে পায়ের মাসলে বেদম ব্যাথা।বাস থেকে নামতে উঠতে মারে বাবারে করছি মনে মনে।জোরে বললে আবার সঙ্গিরা হয়ে যাবে ব্যাতিব্যাস্ত।এতেই শানাল না ।বোঝার উপর শাকের আঁটির মতন কোমরে খিঁচ লেগে গিয়ে আরেক কেলো হলো।রাতে শুতে গিয়ে দেখি কোমর হয়ে গেছে লাকড়ি।আঢ়া পাটনা হিলে যাচ্ছে মগর আমার কমর না হিলেলা পেনকিলার গিলে চললাম শুতে।আশাকরি কাল মুখে হাসি ফুটবে।শুভরাত্রি ১৯.০৯.২০১৫ আজ আমরা চললাম কৌশাণী।চন্দ্রযান রেডী।আমরাও ব্রেকফাস্ট সেরে যানে চড়ে বসলাম।গাড়ি স্টার্ট নিল।মন টপ গীয়ারে।মনে হয় সারা জীবন এরম হুহু করেএগিয়ে চলি।ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়।কোথা দিয়ে।জানলা খুলে দিই।ঠান্ডা হাওয়া এসে মুখে সস্নেহে হাত বোলায়।চোখ বুজে আসে।ওহ নো।ঘুম এস না ভাই এখন।চোখ ভরে দেখে নিতে হবে যে!ফির মুলাকাত হো ন হো।কুমায়ুঁ সৌন্দর্যের পশরা নিয়ে হাজির। পথে যেতে যেতে ছবি তোলা হয়।ধরে রাখি পাহাড়ের দৈনন্দিন জীবন।ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ব্যাগ কাঁধে চলেছে স্কুলে।মেয়েরা মাঠে কাজে ব্যাস্ত।এদের শাড়ি পরার রকম আমাদের থেকে আলাদা।শাড়ির আঁচল কোমরের চারপাশে বেড় দেওয়া কাঁধ অবধি আসেনা।মাথা একটা আলাদা কাপড়ের টুকড়ো দিয়ে ঢাকা  ।এরা খুব কর্মঠ।লবঙ্গ লতিকা বালা মৃদু মৃদু হাসিনি।যখন চকিতে তাকায় ঠোঁটে আর চোখের কোনায় স্মিত হাসি।দুঃখের বিষয় ক্যামেরা বন্দি করা গেল না।ছবি নিতে পারলাম এক মেশপালকের।দেখি এক স্কুলের মাঠে বাচ্চারা হয়েছে জড়ো।মনে হয় স্কুলে এ্যনুয়াল স্পোর্টস। নদির ধারে এক খাওয়ার দোকানে আমাদের নাস্তার বন্দোবস্ত।কাকভোরে আমাদের কুক অশোক রেঁধেবেড়ে সব গুছিয়ে এনেছে।তাই দিয়ে সারাহল ব্রেকফাস্ট।একটু বিশ্রাম নিয়ে সুখহাল আবার স্টীয়রিং এ।শুরু হল পথ চলা। টানা চার ঘন্টা ঘুরপাক খেয়ে পৌঁছেগেলাম বাগেশ্বর।মন্দিরের পিছনে বয়ে চলেছে সরযু নদি।শিতল জলে পা ডুবিয়ে দিই।আহ।সব পথকষ্ট শেষ।মন্দিরে হয় বিগ্রহ দর্শন।শিব ঠাকুর বিরাজমান।নজর কাড়ে মন্দিরের স্থাপত্য।পাথরের উপর পাথর বসান।দুই পাথরের মাঝে আছে এমন মশলা যা সময়ের ঘাত প্রতিঘাতকে করে চ্যালেঞ্জ। মন্দির দর্শন সারা হলে শুরু হল লাঞ্চ।আমরা মোটামুটি এসে গেছি কৌশাণীর কাছে।সুখহাল সন্ধের আগেই পৌঁছে যেতে চায় গন্তব্যে। আলমোড়ার থেকে ৫২ কিমী দূরে কৌশাণী ।জিলা বাগেশ্বর।উচ্চতা ১৮৯০মী.পঞ্চচুল্লি নন্দদেবী ত্রিশূল ৩০০ কিমী ব্যাপ্তিতে ঠায় দাঁড়িয়ে।সাথে ঘন পাইনের বন।একদিকে সোমেশ্বর ভ্যালী।অন্যদিকে গরুড় বেইজনাথ কট্যুয়ারি।আলমোড়া বাগেশ্বর হাইওয়ে। দূরে দূরে বরফের চুড়ো।কৌশাণী রুপে গুনে সুইটজারল্যান্ড।গান্ধিজী তাই বলেছিলেন।আমরাও সহমত।খান কয়েক গ্লেশিয়ার আছে।পিন্ডারী ,সুন্দর ঢুংগা,মিলাম আর কট্যুয়ার।ট্রেক যোগ্য।বলতে ভুলে যাচ্ছি বাগেশ্বর অবস্থিত গোমতী আর সরজু নদির সঙ্গমে। হোটেলে পৌঁছেই দেখ তে বেড়লাম অনাসক্তি আস্রম।এখানে গান্ধিজী অনাসক্তি যোগাভ্যাস করেছিলেন।।আশ্রম থেকে বেড়িয়ে বাইরে বাজারে ঘোরার ইচ্ছে ছিল।হোটেল মালিক বললেন আপনারা হোটেলের ছাদে যেতে পারেন।ভিউ খুব সুন্দর।অগত্যা ছাদে যাওয়াই ঠিক হল।রাতে খেতে বসে পেলাম আসল খবর।কিছুদিন আগে এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক সন্ধের পরে অনাসক্তি আশ্রমের গেটের কাছে একটা টেবিলের উপর বসে ছিলেন।হঠাৎ এক বাঘ দড়াম করে পড়ল এসে ওনার ঘাড়ে।টেবিল সহিত ভদ্রলোক চিতপটাং।উনি বাঘের সাথে মোলাকাতের দরুন হলেন বেহুঁশ।লাঠিসোঁটা নিয়ে লোকজন ছুটে আসাতে সে যাত্রা পেলেন রক্ষা। খেতে বসে গল্প শুরু হওয়া মানে একের পর এক চলবে।বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে শুতে এলাম।ঘরের বাইরেই ছাদ।বেড়িয়ে সিম্পলি স্পেলবাউন্ড।রাতের কৌশাণীর রুপই আলাদা সব তারারা নিচে পড়ে আছে।ঠাসবুনোট নেকলেস পড়ে দিব্যি মিটিমিটি হাসছে সদ্য যুবতি কৌশাণী শুয়ে পড়লাম।রাতও অনেক।বিশাল হোটেলে পিন ড্রপ সাইলেন্স। চোখের পাতা বোজার আগে আল্লাতালাকে একটা ছোট্ট আর্জি জানালাম ।আগামী কাল যেন সানরাইস দেখতে পাই।সানসেট দেখা গেলনা।মেঘ আর বৃষ্টির দৌলতে।কৌশাণীর সানরাইস আর সানসেট অতুলনীয়। দেখি কাল কি হয়।মধুর তোমার শেষ যে নাহি পাই।ধরা দিও হে সানরাইস

1024

4

দীপঙ্কর বসু

মেঘমুলুকে কয়'টি দিন

ছয় ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসন কালে বৃটিশদের হাতে দার্জিলিং ,কারসিয়াং ইত্যাদি পাহাড়ি জনপদ গুলো ক্রমশঃ অবকাশ যাপনের পক্ষে আদর্শ জায়গা হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এখানকার জলবায়ু গ্রীষ্ণকালে উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী , সামরিক বাহিণীর কর্তা ব্যক্তিদের সমতলের প্রচন্ড দাবদাহের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে , আরণ্যক প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিয়েছে মন । তাদের অনেকেই এখানকার বনজ সম্পদ কে ব্যবহার করে ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন । সেই সঙ্গে প্রধানত তাদের সন্তানসন্ততিদের কথা মাথায় রেখে তারা বেশ কিছু অভিজাত শ্রেণীর স্কুল ও তৈরী করেছিলেন সে সময় । নানান বিষয়ে পড়াশনার পাশাপাশি ইউরপিয়ান অভিজাত সমাজে প্রচলিত আদবকায়দা আচার আচরনে শিক্ষিত করে তোলার ওপরেও যথেষ্ট জোর দেওয়া হত এই সব স্কুল গুলিতে । বেশ কিছু বিত্তশালী ভারতীয়দের সন্তানরাও স্থান পেতেন এই সব স্কুলে – তারাও মানুষ হতেন অভিজাত ইউরোপীয়ান জীবন ধারার মধ্যে । এর ভালোমন্দ দুই রকমের প্রভাবই পড়েছিল সেখালের সামাজিক জীবনে । সে স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ – আপাতত পাশে সরিয়ে রাখলাম । আজ স্থানীয় এমনই কয়েকটি নামি দামি স্কুলে যাবার পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের দলটা বেরিয়েছে । যেহেতু এই কাজের সঙ্গে আমার কোনরকম ব্যবহারিক বা মানসিক যোগ ছিলনা, আমি এই স্কুলগুলির বর্তমান হালহকীকতের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টাও করিনি । শুধু এদের দুই একটি স্কুল বাড়ি দেখে মনে মনে সাধ জেগেছিল আগামি কোন জন্মে এমনি কোন একটি স্কুলে পড়াশোনা করার সূযোগ পাবার । যেমন কোলাহল মুখর দৈনন্দিন জীবনের থেকে দূরে ইউরোপীয়ান স্থাপত্যের আদলে তৈরী ডাও হিল স্কুলভবনটি ভারি পছন্দ হয়ে গেল আমার । স্কুল এর চারপাশে নিবিড় বনাঞ্চল – লম্বা লম্বা ক্রিপ্টোমেরিয়া (Cryptomeria Japonica , জাপানী ভাষায় “Sugi”) গাছেরা ভিড় করে ঘিরে রেখেছে ভবনটিকে । সে নিবিড় অরন্যভূমির ফাঁক ফোঁকরে থম মেরে আছে জমাট বাঁধা কালচে সাদা মেঘ । যেন অতর্কিতে শ্ত্রুর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় আত্মগোপন করে আছে । সেই অরণ্যভূমির গা ঘেঁষে রাস্তা আরো ওপরের দিকে চলে গেছে । যে অকাজের বরাত নিয়ে এসেছি এই মেঘমুলুকে , তারই তাড়নায় ঘুরতে ঘুরতে কয়েকটি বনফুলকে ক্যামেরা বন্দী করে ফেললাম । পথের ধারে ইতস্তত নিতান্ত অবহেলায় , নিছক ফুটে ওঠার আনন্দে ফুটে আছে নানা বর্ণের নানা আকৃতির , কত নাম না জানা ফুল । এরা সব সময়েই আমার চোখকে টানে । কানে কানে এসে বলে “আমায় দেখ । আমি কত সুন্দর”।সত্যিই তাদের অনেকেই গড়নে ,বর্ণে একেবারে অসাধারণ সুন্দর । এরাই পথ চলাকে করে তোলে পরম রমনীয় । কিন্তু ঝোপে ঝাড়ের আড়ালে আবডালে যেমন এই সব বনফুলেরা তারে গড়নের সৌন্দর্যে , ডেলিকেট রঙের গৌরবে পথচারীকে প্রলুব্ধ করে তেমনি ঝোপে ঝাড়ে থাকে অসংখ্য বিষাক্ত পোকামাকড় ও । কিন্তু সে কথা পরে হবে । আর একটি স্কুল আমাকে আকর্ষণ করল – সেটি ১৮৭৯ সালে স্থাপিত ভিক্টোরিয়া বয়েজ । বিশাল এলাকা জুড়ে স্কুল ভবন । এই স্কুলেই মাঠের মধ্যে আপনমনে বেড়াতে বেড়াতে দেখা হয়ে গেল স্কুলেরই একজন শিক্ষকের সঙ্গে । অচেনা একটি লোককে স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে অকারণে ঘোরাঘুরি করতে দেখে স্বভাবতই তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল আমি কে ,কোথা হইতে আসিয়াছি । আমার তরফ থেকে একটা সন্তোষজনক উত্তর পাবার পর ভদ্রলোক বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে নানান কথায় মেতে উঠলেন । স্কুলের যে মাঠ টিতে আমরা দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলছিলাম তার এক ধাপ নিচের একটি খেলার মাঠের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জানালেন “দেখুননা ক’দিন আগে ঐ মাঠে সিএম এর একটা মীটিং হয়েছিল । আর তার পর কি অবস্থায় মাঠটাকে ছেড়ে গেছে দেখুন” মাঠের দিকে তাকিয়ে সত্যিই আমার লজ্জা হল । চার দিকে ছেঁড়া কাগজের টুকরো , পেপার কাপ আরো হাবিজাবি অনেক আবর্জনা ছড়িয়ে আছে সারা মাঠ জুড়ে । পরনের হাল্কা চকোলেট রঙের স্যুট ,পরিস্কার করে কামানো দাড়ি এবং সযত্নে ছাঁটা মোটা গোঁফ ,আর সর্বোপরি ভদ্রলোকের ঋজু মেদহীন চেহারা আমাকে ঈর্ষান্বিত করে তুলল । ঝকঝকে চেহারা ও সুবেশী মানুষটির সঙ্গে আলাপ চলল বর্তমান স্কুল শিক্ষাব্যবস্থার নানান সমস্যা নিয়ে । কথার মাঝেই ভদ্রলোকের ডাক পড়ল কোন কাজে তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন কাজে । ততক্ষণে আমার সাথীরাও তাদের কাজ সেরে ফিরে এসেছে । সাথীদের কাজের নির্ঘণ্টে দেখা গেল কিছুটা সময় হাতে আছে । ঠিক হল এই অবসর সময় টুকুর মধ্যে গিদ্দা পাহাড়ে অবস্থিত নেতাজি ভবনটি দেখে নেওয়া হবে । অতয়েব সেই উদ্দেশ্যে গাড়ি ছটল গিদ্দা পাহাড়ের দিকে। নেতাজি ভবনে যাবার পথে আমাদের গাড়ির চালক ডানদিকে একটি টিলার মাথায় ছাউনি দেওয়া ঘেরা জায়গা দেখিয়ে জানাল ওটি ভিউ পয়েন্ট । ওখান থেকে আপনারা সমতলভুমির কিছু অংশ দেখতে পাবেন পাহাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে । টিপটিপে বৃষ্টি মাথায় করেই আমরা উঠে গেলাম ভিউ পয়েন্টে – সেখান থেকে দেখলা দূরে সবুজ সমতল ভূমিতে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী , তার ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের দল । চার দিকে কোথাও নীল বর্ণের ,কোথাও সবুজ রঙের নানা আকৃতির পাহাড় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । আঁকাবাঁকা অনেক পাহাড়ি পথ তাদের সাপের মত যেন জড়িয়ে ধরেছে । বেশ কিছু ছবি তুললাম আমরা সকলেই । কিছু ভাল ছবি তুলতে পারার তৃপ্তির পাশাপাশি একটা আফসোস ও রয়ে গেল – “আকাশটা যদি এমন মুখ গোমড়া করে না থাকত…”। ভিউ পয়েন্টের খুব কাছেই একটা পাহাড়ি টিলার গায়ে সুন্দর ভিলা র মত বাড়িটি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের দাদা শরৎ চন্দ্র বোস কিনেছিলেন ১৯২২ সালে ।আবার এই বাড়িতেই শরৎ চন্দ্র বোস ১৯৩৫ সালে গৃহবন্দী হয়ে ছিলেন বৃটিশ রাজের কোপে পড়ে । নেতাজি ও ১৯৩৬-৩৭ সালে এই বাড়িতে গৃহবন্দী হয়েছিলেন । এই বাড়িতে বসেই নেতাজি ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে তাঁর প্রদত্ত ভাষণের খসড়া রচনা করেছিলেন । এ সব তথ্যই বাড়িতে ঢোকার মুখেই একটি বোর্ডে পাওয়া গেল । বেশ বড় মাপের বাড়িটি বর্তমানে নেতাজির স্মৃতি সংগ্রহালয় ও নেতাজি সম্পর্কিত গবেষণাকেন্দ্রে পরিনত হয়েছে । বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে নেতাজির পরিবারের বহু ছবি প্রদর্শিত হয়েছে । বিশেষ করে এমিলি শেঙ্কল এবং নেতাজি কণ্যা অনিতার বালিকা বয়েসে তোলা একটি আলোক চিত্র আমায় আকর্ষণ করল । কয়েকটি ঘরে শরৎচন্দ্র বোস এর ব্যবহার করা আসবাব পত্র রাখা আছে যেমন ছোট্ট একফালি শোবার ঘরে পালঙ্ক ,অপর একটি ঘরে লেখাপড়ার টেবল ,আরাম কেদারা ইত্যাদি । এই বাড়ির অভ্যন্তরে ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও লোভে পড়ে একটু অসদুপায় অবলম্বন করতেই হল । মোবাইলে কিছু ছবি তুলে ফেললাম সবার অগোচরে । কিন্তু বিধি বাম । সে সময়ে লোড শেডিং এর ফলে ঘরের মধ্যে আলো অত্যন্ত কম থাকায় ছবি গুলি ভালো হলনা । বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার মুখে বাগানে একটি ক্যামেলিয়া গাছের দিকে নজর গেল । একটী বোর্ডে লেখা দেখে জানতে পারলাম গাছটি শরৎ ছন্দ্র বোসের স্বহস্তে রোপণ করা । গাছটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে চেষ্টা করলাম অতীতের একটুকু ছোঁয়া পাবার আশায় । মনে জাগল অদ্ভুৎ রোমাঞ্চ ।

1202

22

মনোজ ভট্টাচার্য

প্যান্ডেল প্রায় শেষ !

প্যান্ডেল প্রায় শেষ ! অক্টোবরের প্রথমে প্রখর সূর্য তার অগ্নি তপ্ত রোদ্দুর বিছিয়ে রেখেছে অলস রাস্তায় । শরতকালে যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ও উৎসবের ব্যস্ততা ও উৎসাহ দেখা যায় – তা যেন একটু ম্লান । এদিকে আর মাত্র দু সপ্তাহ বাকি দুর্গাপুজোর ! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্যান্ডেল শেষ করতেই হবে । ঘরামিরা উঁচু প্যান্ডেলের সবচেয়ে উঁচু বাঁশ ও মোটা তক্তা দিয়ে তাকের মতো তৈরি করছে – প্যান্ডেলের বাঁধনটাকে আরও শক্ত করছে । আগে তো দেখতাম পাটের দড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বাঁধত । এখন দেখি লাল নীল হলদে সবুজ ইত্যাদি রঙিন কাপড়ের দড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বাঁধছে । প্যান্ডেল বা কোনও কিছু গড়ার কাজ ও কর্মব্যস্ততা দেখতে আমার খুব কৌতূহল হয় ! ঘরামি অত উঁচুতে উঠে কাজ করছে । আর আমি যেন ঘরামি হয়ে ওখান থেকে বসে বসে নীচে লোকেদের যাতায়াত ও কৌতূহল দেখতে পাচ্ছি ! আমি যেহেতু নিচে – তাই ঘরামি হয়ে আমাদের ভাবনাটাও বুঝতে পারছি ! চেম্বার স্ট্রিট বলে এক রাস্তায় একটা অনেক উঁচু তলার বাড়ি হচ্ছিল । আর আমি রোজ লাঞ্চএর সময় বের হয়ে খুব উৎসাহ ভরে দেখতাম – কিভাবে ক্রেনের সাহায্যে একটার পর একটা জিনিস তুলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ওপরে – আর টুক টুক করে পরের পর স্লাইডগুলো লাগাচ্ছে ! মনে হচ্ছিল খুব তাড়াতাড়ি করছে – কিন্তু এক বছরের বেশি লেগে গেল শুধু স্ট্রাকচার তৈরি করতে ! ঐ এক বছর ধরে আমি দেখেছি কিভাবে একটু একটু করে যে কোন জিনিস গড়তে হয় । রোজ একাধিকবার গুনতাম কত তলা পর্যন্ত বাড়িটা উঠল ! আর কয়েকদিনের মধ্যেই এই প্যান্ডেল তৈরি হয়ে যাবে । তারপর এদের কাজ শেষ । তখন আসবে প্যান্ডেল সাজাবার লোকজন – আলো লাগাবার লোকজন ! – ঢাকিরা এলেই লোকেদের পুরো আনন্দ উপচে উঠবে । অবশেষে আসবে প্রতিমা । তারপর আসবে পুরুত ঠাকুর । কোনও কোনও ক্ষেত্রে হয়ত একাধিক পুরুত আসে । কোনও খুঁটিনাটিতে যেন ভুল না হয় ! কোথাও যদি কোনও ভুল হয় – তো দেবী দুর্গা – যতই দয়াময়ী হন না কেন – রাগ করতে পারে ! হয়ত অভিশাপও দিতে পারে! দু বছর আগে দেখেছিলাম – বিসর্জনের দিন – সিঁদুর খেলার পর – এয়ো রীতি করার সময় প্রদীপের শিখাতে দুর্গার অঙ্গে আগুন লেগেছিল । সঙ্গে সঙ্গে সবাই চেঁচামেচি করে তাড়াতাড়ি সেই মহিলাকে ধরে নামিয়ে – জল ঢেলে নেভানো হয়েছিলো ! – কি খানিক অং বং চং করে সবাইকে বোঝানো হল – শাস্ত্রমতে আগুন লাগে নি ! হয়ত বিসর্জনএর সময় পার হয়ে গেছিল বলেই – আগুন নির্দোষ হল ! আপাতত এইসব প্যান্ডেল তৈরি দেখলেই মাথার মধ্যে ঢাকির ঢাক বাজানোর শব্দ অনুরণিত হতে থাকে ! – যেমন এই এখন – মাথার মধ্যে অভিজিতের সেই ঢাক বাজানোর গানটা হতে আরম্ভ করেছে ! - ঢাকের তালে - - - ! মনোজ

991

5

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা। ১৬.০৯.২০১৫ সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গল।বেড টী হাজির।আজ যাব লোহাঘাট মিনিবাস চলল পাহাড়ি পথে।প্রতি বাঁকে নতুন সাজে সে।লোহাঘাট।ঝিরঝির বয়ে চলে সাথে সাথে লোহাবতী নদি।কখনও দুই পাহাড়ের মাঝে খেলায় মেতে।কখনও গাছপালার নেয় আড়াল।মুশ্কিল হয় ছবি নেওয়া।কে যেন বলেছে কাশ্মীর গিয়ে স্বর্গ দেখা বাতুলতা।লোহাঘাট বরফ চুড়ো পাইন দেবদার নদি ঝড়না দিয়ে ঘেরা জন্নত।সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা ১৭৫৪মী।আসাও খুব আসান।নব্বই কিমী দূরে রেলওয়ে স্টেশন টনকপুর।এয়ার পোর্ট নৈনি সৈনী।লোহাঘাট পৌরাণিক স্থল।বাণাসুরকে বধ করেন শ্রীকৃষ্ণ।আছে বাণাসুর কিলা।স্বামী অবেধানন্দ স্থাপিত মায়াবতী আছে কিছুদূরে।স্বামী বিবেকানন্দের আগমনে ধন্য।মায়াবতীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দর্শককে করে দেয় অভিভুত।সংলগ্ন গ্রন্থাগারে আছে অসংখ্য বই।বই প্রেমিকরা বই কিনতে পারেন ।এখানে গেস্টহাউসে আছে থাকার সুব্যাবস্থা।তবে কোলকাতা অদ্বৈত আশ্রমের চাই অনুমোদন।আশ্রমের আসে পাশে বাঘ কখনও কখনও দেখা দেয়।জাপানী স্বামিজী তাই বললেন।আমাদের এক সঙ্গি ইতিমধ্য়ে পাশের পাহাড়ে উঠে গেছেন।বিবেকানন্দের ধ্যান করার জায়গা দেখতে।মহাবিপদ।এত ঘন জঙ্গল!অক্ষত ফিরলে বাঁচি।ফাঁড়া কাটল।উনি ফিরলেন। পাহাড়ি পথে ঘুরে ঘুরে বাস পৌঁছেগেল চিতই/গোলা দেবতার মন্দির।মন্দিরে ঢুকে হতবাক্।ছোট বড় মাঝারি হাজার হাজার(লক্ষও হতে পারে।গোনার সাহস নেই)ঘন্টা।সাথে চিঠি।অদ্ভুত দৃশ্য।গ্রামবাসীরা নিজের সমস্য়া জানিয়ে এই দেবতাকে চিঠি দেয়।সাথে কাঁসার ঘন্টা।মনে হয় ঘন্টা রিং টোনের প্রতিক।লোকগাথায় আছে গোলা দেবতা ছিলেন এক রাজপুত্র।নিজের গ্রামের দুঃখ কষ্ট দূর করাই ছিল তার কাজ।তাই সে দেবতাতে রূপান্তরিত। পৌঁছেগেলাম জাগেশ্বর।শিব মন্দির।পাশ দিয় বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী।রামগঙ্গা।মন্দিরে বাল শিব বুঢ়া শিব দুজনেই ধ্য়ানমগ্ন।মন্দিরের স্থাপত্য মনে আনে সম্ভ্রম।পাথরের উপর পাথর বসানো।সেই জামানায় এই বিশাল কান্ড !! ভাবা যায়! আবার পথ চলা।বাঁকের পর বাঁক পার হওয়া।শুধু আসা।শুধু যাওয়া ।শুধু পিছু ফিরে দেখা।দেখে দেখে আশ মেটেনা।কত রকম গাছ।ফুলের বৈচিত্রও কম নয়।অবাক হলাম যেখানে সেখানে কুমড়ো ফুল আর কুমড়ো ঝুলছে দেখে।এরা নির্ঘাত কুমড়ো ফুলের বড়া খায়না।নাহলে পথেঘাটে অনাদরে পড়ে থাকে! সন্ধে হওয়ার আগেই ঘরে ।আগামি কালের গোছগাছ।আট ঘন্টার সফর।টারগেট চকৌরি।মন খুশ।রহস্যঘন হিমালয়।কাল না জানি কি দেখি। শুভরাত্রি লোহাঘাট ১৭.০৯.২০১৫ বাসের জানলা দিয়ে হু হু করে ঢুকছে ঠান্ডা হাওয়া।সর্পিল পথ ।গভির খাদ ।দূরে পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গ্রাম।ধাপে ধাপে নেমে গেছে শস্যের ক্ষেত।ধানগম শাগসব্জি আর কত কি।নিল আকাশের গায়ে সাদা মেঘের ভেলা।হঠাৎ মন কি একটু উদাস হল! পৌঁছেগেলাম পাতালভূবনেশ্বর।মাইথোলজী অনুসারে এখানে তিরিশ ফুট নিচে গুফায় অবস্থান করতেন শিব।এই গুফায় পঞ্চ পান্ডব কিছুকাল ছিলেন।গুফা দর্শন করলে এক সাথে কেদারনাথ বদ্রিনাথ আর অমরনাথ দর্শনের ফল পাওয়া যায়। আমাদের ম্যানেজার সবাইকে সাবধান করলে।ভিতরে না নামাই ভাল।আমার মনে হল নিচে নামলে কেমন হয়।ধাপে ধাপে সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে নাইন্টি ডিগ্রী এঙ্গেলে।ঢোকার মুখেই সাবধান বাণী।বরসাত কে কারণ ফিসলন হ্য়ায় ঔর অক্সিজন কম।ব্লডপ্রেশর ঔর সুগার কে মরিজ নিচে ন উতরে।ম্যানেজর ,কুক,ড্রাইভার,রায়জী আর আমি শুরু করলাম নামতে।কিছুটা নেমে বুঝলাম কি সাংঘাতিক রাস্তা মাঝে মঝেই বিশাল গ্যাপ।আমার সাথিরা লম্বা পায়ের দরুন নেমে গেল ।আমি নিরুপায় হয়ে বসে নামতে লাগলাম।পিছল থেকে বাঁচার জন্য দু পাশের লাগান শিকল কষে ধরে থাকলাম।তিরিশ ফুট গভিরে বিভৎস গরম।বোঝাগেল অক্সিজেনের অভাব।আমার নিশ্বাসের কষ্ট শুরুহল।নিচে নেমেই একটা বারো বাই পোনেরোর মতন ছোট্ট জায়গা।আমাদের গাইঢ কাম পুরোহিত দেখাল শেষনাগের মাথা শিবের জটা।গলা কাটা গনেশের উপর গরুর থন থেকে দুধ নেমে আসছে।আবার শিব লিঙ্গের পূজো সেরে নিয়ে আমাদের ফুল প্রসাদ দিলে।আসলে লাইম স্টোন এরিয়া।জলের প্রভাবে নানান আকৃতি নিয়েছে রুপ।সারাক্ষণ আমায় আমার সঙ্গিদের সামলাতে হল।নিশ্বাস চলছে হাপরের মতন।সেই স্টীপ সিঢ়ি উঠতে গিয়ে আমি মৃত প্রায়।সঙ্গিরা সাহস জোগায়।দিদি ভয়ের কিছু নেই।আমরা সাথে আছি।সে তো বুঝলাম।কিন্তু আমায় নিঃশাস কে জোগাবে।শেষ কয়েক ধাপের কাছে এসে আমার জীভগলা শুকিয়ে কাঠ।মুখে ফেনা।ড্রাইভার ছেলেটি আমার আগে ছিল।সে আমায় তোলার জন্য হাত বাড়াল।অত কষ্টেও আমার কমন সেন্স নষ্ট হয়।ভাবছি আমায় তুলতে গিয়ে ও আমি একসাথে নিচে না পড়ে যাই ।ছেলেটি আমার মনোভাব বুঝেছিল কিনা জানিনা।আমার ভাবনার পরোয়া না করে এক হ্যেঁচকায় আমায় তুলে আনল।বাইরে বেড়িয়ে বুঝলাম আমি আবার ভূমিষ্ঠ হলাম।সে যে কি অনুভূতি বোঝান যাবেন।বুকের মধ্যে হালকা ব্যাথা আর নিঃশ্বাসের কষ্ট বেশ কিছুক্ষণ আমার সাথি হল।নল থেকে জল খাওয়ার উপায় নেই সারা হাতে কাদা।জলের বোতল বাসে।বাস ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে।নিরুপায় হয়ে মাধবী নিজের হাতের আঁজলা ভরে ভরে জল আনল।জল খাওয়াল। বাস রওণা হল দুফুর দুটো নাগাদ।বলা বাহুল্য় ইতিমধ্যে সারা হয়েছে লাঞ্চ।বিকেল বিকেল পৌঁছেগেলাম চকৌরী।আজব সুন্দর।চারিদিকে পাহাড়ের ঘেরাটোপ।ঝোপেঝাড়ে বিচিত্র বর্ণ ফুলের সমারোহ।ঠান্ডা?আছে বৈকি।বিকেল কাটল বারান্দায় আড্ডা মেরে।সাথে চা।রাত আটটা বাজতেই খাওয়ার ডাক এল।সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা মাঠ পেড়িয়ে ডাইনিং হল।খাওয়া সেরে ফিরলাম।শোওয়ার জোগাড়যন্ত্র চলছে হঠাৎ গেস্ট হাউসের লোক এসে সতর্ক করে গেল।ডাইনিং হল থেকে কেউ রাতে এদিকে আসবেনা।কোনো দরকার পড়লেও যেন আমরা কাউকে না ডাকি।ক্যিউঁরে বাবা।বাঘ আয়া হ্যায় ।অন্ধেরে মে কহীঁ ঘাত লগাকে বৈঠা হ্য়ায়।ওরা নাকি ওদের কুকুর গরু সব ঘরে ঢুকিয়ে ফেলেছে।আঁতকে উঠে বলি আরে সিঁড়ি পর দরওয়াজা নেই।উপর আগয়া তো? না উপর নহী আয়েগা।কি বলে!বাঘ কি সিঁড়ি চড়তে পারেনা?এখানকার লোকেদের কথা অদ্ভুত যেন বাঘ নয় গরু ছাগল।এই একটুক বাগানে ঢুকে পইড়েছে।ঘরের জানলায় কেবল নেট আর গ্লাস।বাঘ তো একথাবাতে নেট ছিঁড়ে ফেলবে।গ্লাস ভাঙ্গতেই বা কতক্ষণ।বড়ী বওয়াল!ঘুরতে এসে শেষে বাঘের পেটে!লোকনাথ বাবা স্মরণ করলে কেমন হয়!রণে বনে জলে জঙ্গলে আমায় স্মরণ করো।তাই করি।মরতা ক্য়া ন করতা।একবার ভাবলাম লাইট জ্বালিয়ে শুই।তারপর ভাবলাম লাইটে আরো ভাল দেখা যাবে৬৭কেজীর নধর শরির।দরকার কি।তার থেকে অন্ধকারে ব্যাটা চোখ সেট করুক।কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। হরি ওম তত্ সত্।শুই গা।আজ রাতে বাঘের পেটে না গেলে সগ্গাল সগ্গাল হবাইরে সালাম কমু। শুভরাত্রি।সব্বা খৈর।গুড নাইট।হগ্গল ভাষায় কইয়া লই।হেশ কথা কিনা কেজানে!একটা মন্ত্র পড়ে শুতে চলে যাই।সিংহ আমার ব্য়াটা।বাঘ আমার পূত।রাম লক্ষণ বুকে আছে করবে আমার কি>

930

2

Somen dey

বড়কত্তা এবং সরগমের নিখাদ

বড়কত্তা এবং সরগমের নিখাদ ********************** জীবনানন্দ দাস ছিলেন সারা জীবন গ্রাম বাংলার রুপে আপাদমস্তক obsessed একজন কবি  । শুধু ‘রুপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থেই নয় , তাঁর বেশির ভাগ কবিতাতেই কোনো না কোনো না কোনো ভাবে ছাপ ফেলেছে বাংলাদেশের গাছ পালা , খাল বিল নদী , পাখী এমন কি কীট পতঙ্গও । কুমার শচীন্দ্র দেববর্মন তেমনি ছিলেন বাংলার লোক গানে obsessed একজন সঙ্গীত সাধক  । ধ্রুপদ সঙ্গীত সহ এ দেশের সব ধরনের এবং কিছুটা পশ্চিমেরও সঙ্গীত কে তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের মত ।নাড়া বেঁধে সঙ্গীত শিখেছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় , কৃষ্ণ চন্দ্র দে , বাদল খাঁ , আলাউদ্দিন খাঁর মত মার্গ সঙ্গীতের মহীরুহদের কাছে । কিন্তু অন্তরে গ্রহন করেছিলেন যা কি কিছু তাঁর মন কেড়েছিল তাকেই ,তিনি নিজে গান গেয়েছেন সম্পুর্ন নিজের মেজাজে ।সে মেজাজের মধ্যে সুর সৃষ্টি করেছেন খোলা মন নিয়ে ,একেবারে নিজের স্টাইলে । সে স্টাইলে ছিল সাঙ্গিতীক মেধার সঙ্গে হৃদয়ের কোমনীয়তার এক অসাধারন মিশ্রণ ।তিনি রুপকার ছিলেন লোক সঙ্গীতের সঙ্গে কাব্য সঙ্গীতের অসবর্ণ অথচ সার্থক বিবাহের ।কিন্ত সুর রচনার সময়, বিশেষ করে সিনেমার সুর রচনার সময়, সব চেয়ে বেশি গুরত্ব দিয়েছে সাধারণ মানুষের কানের কাছে সে সুরের গ্রহণযোগ্যতা কে । ******* কুমিল্লার ষাট বিঘা জমির উপর তৈরি বিরাট রাজপ্রাসাদের বসবাসকারী যুবরাজের সাধারন লোকেদের সঙ্গে মেলা মেশা করাটা রাজ পরিবারের রীতি বিরুদ্ধ ছিল । প্রাসাদে অনেক পরিচারক পরিচারিকা । কিন্তু তাদের সঙ্গে কুমার শচীনের হুকুম দেওয়ার সম্পর্ক । বাবার কাছে নবদ্বীপ চন্দ্র দেব বর্মন অবশ্য সঙ্গীত রসিক ছিলেন , সেতার বাজাতেন নিজে । তাই সঙ্গীতের প্রথম তালিম বাবার কাছেই পাওয়া ।বাড়ির ছোট বলে ছেলে বাবার একটু বেশিই আদর দিতেন । তবু বালক শচীন কি জানি কেন একটা টান অনুভব করত মাটির কাছাকাছি জগতটার জন্যে । তাঁর নিজের কথায় – ‘ ত্রিপুরার ধানের খেতে চাষী গান গাইতে গাইতে ধান চাষ করে , মাঝিরা গানের টান না দিয়ে নৌকা চালাতে জানেনা , জেলেরা গান গেয়ে মাছ ধরে, সেখানের লোকেদের গানের গলা ভগবান প্রদত্ত ’ । কিন্তু সেই জগতে তার অবাধ বিচরণ করার অনুমতি ছিল না । তবে বাবার নির্দেশে সন্ধাবেলায় ভাই বোনেরা মিলে যে উপাসনার আসর বসত , সেখানে উপাসনা ছাড়া মার্গ সঙ্গীত আধারিত গান বাজনার আসরও হত। তাঁর এক দাদা কিরন কুমার দেববর্মন আর এক দিদি তিলোত্তমা দেবীও ভাল গাইতেন । এ ছাড়া দোল উৎসবে বিখ্যাত গায়ক গায়িকারা আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন তাদের বাড়িতে গান শোনাতে । এ ভাবে বালক শচীন্দ্রের গান বাজনা শিক্ষা চলতে লাগল । ক্লাস ফাইভে উঠে স্কুলে সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে গায়ক শচীন্দ্রের প্রথম পাব্লিক এপারিয়ারেন্স । সে গান সবার ভালো লেগেছিল । স্কুলের হেডমাস্টার মশাই তার সুখ্যাতি করে শচীন্দ্রের বাবাকে একটা চিঠি দিয়েই বসলেন । এর পর তার বাবা তাকে প্রথাগত ভাবে গান শেখাতেও আরম্ভ করলেন । ***** কিন্তু এই শিক্ষায় কোথাও একটা খুঁতখুঁতানি রয়ে যেত কুমার শচীন্দ্রের মনে । কোথাও একটা সেই মাঠে ঘাটে শোনা গান সম্মন্ধে জানার আকুতি তাকে অস্থির করতো । কিন্তু রাজবাড়ির আভিজাত্যের বলয় থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠছিল না । কিন্তু একটা উপায় বোধহয় ঈশ্বরই করে দিলেন । জীবনের উপান্তে এসে , দেশ পত্রিকার সম্পাদকের সাধাসাধিতে তিনি কিস্তিতে একটি অতি সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনী লিখেছিলেন । তাতে তিনি তাঁর যে দুজন সঙ্গীত গুরুর নাম করেছিলেন তাঁরা কেও কোনো উস্তাদ সঙ্গীতজ্ঞ নন । তাদের একজনের নাম মাধব আর আর একজনের নাম আনোয়ার । তারা আসলে ছিল রাজবাড়ির দুই পরিচারক । মাধবের কাজ ছিল ছুটির দিনে দুপুর বেলা বাড়ির সবাইকে রামায়ন পাঠ করে শোনানো । তার সম্মন্ধে তিনি নিজেই লিখেছিলেন – ‘... সে যখন রামায়ন পড়ত তখন তান-খটকি ছাড়া সরল-সোজা গানের ধরণ গানের ধরণ আমাকে পাগল করে দিত । ’ আর আনোয়ার সম্মন্ধে - ‘ ... আনোয়ার রাত্রে তার দোতারা বাজিয়ে যখন ভাটিয়ালি গান করত , তখন আমার ব্যাকরণ মুখস্ত করারা দফারফা হয়ে যেত আর পরের দিন স্কুলে মাস্টারমশাই এর কাছে বকুনিও খেতাম । কিন্তু রাত্রে আবার ব্যাকরণ মুখস্ত ও অঙ্ক কষা ছেড়ে আনোয়ারের কোল ঘেঁষে বসে তার ভাটিয়ালি সুরে ও কথায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম ।’ বহু বছর পরে যখন যখন শচীন কত্তা তাঁর বোম্বাইয়ের বাড়িতে বসে বিমল রায়ের ছবির জন্যে সুর করছিলেন – ‘সখিরি বিরহা কে দুখ সহ সহ কর যব রাধে বেসুধ হোলি তো একদিন অপনে মনমোহন সে যাকর ইঁয়ু বোলি আজ সজন মোরে অঙ্গ লগালো জনম সফল হো যায়ে হৃদয় কী পীড়া , দেহ কি অগ্নি সব শীতল হো যায় ...’ তখন হয়ত অলখ থেকে কোথাও হয়ত সেই রামায়ন পড়া মাধব তাঁকে জুগিয়ে দিচ্ছিলেন সুর । আবার যখন সুর করছিলেন ‘গাতা রহে মেরা দিল / তুহি মেরী মঞ্জীল’ , বিজয় আনন্দের জন্যে , তখন হয়ত চুপি চুপি তাঁর পাশে এসে বসেছিলেন সেই অঙ্ক ভুল করিয়ে দেওয়া, ভাটিয়ালি গাওয়া সেই ছোটো বেলার আনোয়ার । (চলবে )

973

9

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ১৫.০৯.২০১৫ভ্রমণের রোজনামচা ১৫.০৯.২০১৫ লখনউ স্টেশন।বাঘ এক্সপ্রেসে চড়ব বলে আমরা আট জনা আর আমাদের ম্যানেজার আর কুক সাকুল্যে দশ জন বিশাল লট বহর নিয়ে হাজির।আমাদের অবাক করে ঠিক রাত বারোটা পাঁচে বাঘ এক্সপ্রেস চাগ চাগ করে স্টেশনে ঢুকে পড়লে।সুরেশ প্রভুকে সলাম ঠুকে আমরা হুড়মুড়িয়ে চরে বসলাম।অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা যে যার মত গুছিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লাম।ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে লখনউ ভেসে উঠে থেকে থেকে ।খুবই মায়াবী এই শহর।আর কেতাদুরস্ত।পহলে আপ।পহলে আপ।সারাদিনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে অবধের নবাবদের সাথে।সাহদত খান।সফদরজঙ্গ।আসিফ-উদ-দৌলা।আর ওয়াজিদ আলি শাহ।এক মিউজিয়ামে গিয়ে এনাদের বিশাল বিশাল ছবির সাথে হলাম মুখোমুখি।গাইড বললে আপনারা যেদিকে এগোবেন ওনাদের পায়ের নাগরার চোঙ আর ওনাদের চোখ আপনাদের দিকে ঘুরে যাবে।তাজ্জব কী বাত।সত্যিই তাই।কে একজন বললে এনারা কি মহিলারা এলেই নড়ে চড়ে ওঠেন।ব্যানার্জীদা গাইডকে নিষ্প্রিহভাবে জিজ্ঞেস করে বসলেন ওনাদের বেগমসংখ্যা।গাইডের চোখে থেকে কি জানি কেন বেড়ল এক ঝলক আগুন।পরে রাণীবাগ এসে অটোওয়ালা জানালে এই মহলে থাকতেন আসিফ-উদ-দৌলাল তিনশো পঁয়সট্টী জন বেগম।সেই মহলের সামনেই নক্কাশীদার সুরম্য কুঠি।জানাগেল তখনকার নাচঘর।আর এখানেই কামাল আমরোহির বিখ্যাত বই 'পাকিজা'র ডান্স সিকোয়েন্স হয়েছিল ক্যামেরা বন্দি।চোখের সামনে ফুটে উঠল ঠাঁট বাট জাক জমক সহ সেই নাচ।মীনা কুমারী।ইন্হী লোগোঁ নে লে লী দুপট্টা মেরা। লগনউয়ের শেষ নবাব ছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ।যিনি একাধারে কবি,গায়ক,শায়র ও নাচ গানের সংরক্ষক।ওনাকে বলা হয় হিন্দুস্তানী থিয়েটরের প্রথম লেখক।রাধা কিষণ কী কিস্সা ওনার কৃতি।উনি কথক নাচের করেন পূনরুদ্ধার।জুহি,জোগি আর শাহ প্রসাদ রাগের জন্মদাতা।উনি লাইট ক্লাসিকল ঠুমরির প্রনেতা।ভৈরবী ঠুমরি বিশেষ ভাবে ওনার প্রিয়।যে গান কে এল সায়গল এবং অনেকে গেয়েছেন।গানের লব্জ হৃদয়স্পর্শী। बाबुल मेरा नैहर छूटल जाय चार कहार मिल,मेरी डोलिया उठाये मेरा अपना बेगाना छूटो जाय आँगन तो पर्वत भयो और भयी विदेश जाय बाबुल अपना घर,मैं चली विदेश ১৮০১সাল থেকে অবধ বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাফার স্টেট।কোম্পানি নিজের উত্তর দক্ষিণ আর পূর্ব দিকের রাজ্যের মাঝে এক পাহারাদার বসিয়েছে।উদ্দেশ্য কোনো বাহানায় ছিনিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা।সুযোগও এল।নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ গেরুয়া ধারণ করে জোগী সাজে ।শের শায়রিতে থাকে মগন।ইংরেজ বলে টোটাল ললেসনেস।প্রজারা যেখানে গান বাজনা নিয়েই ব্যাস্ত।সে দেশ অবশ্যই ইংরেজ করতলগত হওয়ার যোগ্য।ফেব্রুয়ারী ১৮৫৬।অবধ ওয়াস এন্যাক্সড।ওয়াজিদ আলিকে পাঠান হল কোলকাতার মেটিয়াবুরুজে।সেখানেই৩০ জুলাই ১৮২২ অবধের শেষ নবাবের দেহাবসান।এই সন্দর্ভে সত্যজিত রায়ের শতরঞ্জ কে খিলাড়ীর কথা উল্লেখ করতেই হয়।অনবদ্য। সারারাত অবধের কথা ভাবতে ভাবতে কখন জানি পড়েছি ঘুমিয়ে।চোখ খুলতেই দেখি গাড়ি বরেলী স্টেশন ছেড়ে দিয়েছে।বাইরের দৃশ্য এমন কিছু নজরকাড়া নয়।কিন্তু ক্ষেতক্ষামার বাড়িদালান স্কুল কলেজ বট অশ্বত্থ ছোট নদি ব্রীজ পার হওয়া ঝমাঝম দূরে মিলিয়ে যাওয়া ছোট ছোট গ্রাম ।গাড়ি এসে গেল কাঠগোদাম।নেমেই মনে হল হিমালয় কাছেই।আর ট্রেন নয়।এবার মিনি বাসে হল সফর শুরু।যাব আলমোড়া।ধীরে ধীরে গাড়ি সমতল ছেড়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরল।হেয়ার পিন বেন্ড।নো রেস নো রেলী।এনজয় দ ভ্যালী।সাথে সাথে বয়ে চলল কখনও কোশী(কৌশিকী)নদী।কখনও সুয়াল।অনেকটা কাশ্মিরের পহলগাঁওয়ের লীডর নদির মতন।কখন কোনো বাঁকে কাছে আসে কখনও লুকিয়ে যায়।পাইন আর ফার গাছ।কোনিফেরাস।মানে জম ঠান্ডা পড়ে।বরফের হাত থেকে গাছকে বাঁচাবার জন্য প্রকৃতির ব্যাবস্থা। রাস্তায় পড়ল রামকৃষ্ণ কুটীর।বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি নেমে এই আশ্রম।শান্ত পরিবেশ।মহারাজ আমাদের বালমিঠাই দিলেন।আবার গাড়ি চলল।পৌঁছুলাম লোহাঘাট।এখানেই আজকে রাতের মতন ডেরা।লাঞ্চ খেয়ে বেরতে হল মায়াবতীর জন্য।দেড় ঘন্টা মতন লাগল।এখানে বিবেকানন্দ ১৯০১এ এসেছিলেন।মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রম দেখাশুনো করছেনএক জাপানী ভক্ত।সুন্দর বাংলায় আমাদের সাথে চালালেন বার্তালাপ।আমরা গদগদ। আলমোড়া নাম কিলমোড়া প্লান্ট থেকে হয়েছে।এই ঘাস দিয়ে কাতারমল মন্দিরের তৈজসপত্র মাজা ঘসা হত। আলমোড়ার পূর্ব দিকে পিথোরাগঢ়,পশ্চিমে গহঢ়ওয়াল,উত্তরে বাগেশ্বর আর দক্ষিণে নৈনিতাল।এসব কুমায়ুর অংশ।কাঠগোদাম থেকে ৮২কিমী।আলমোড়ায় অনেক দেব দেবীর মন্দির।চিতাই দেবতা আর নন্দা দেবী প্রমুখ।নন্দা দেবী দর্শন হল সন্ধে বেলা।গলি তস্য গলি।তারপর মন্দির। ফেরার পথে দেখি আলমোড়া রাতের অন্ধকারে এক গা হীরে চুন্নি পান্নার গয়না পড়ে ঝিকমিকিয়ে আছে।ভালবাসতে বাধ্য। আলমোড়া কাল আবার কোন রুপে ধরা দেয়! অধির আগ্রহে শুতে চললাম

989

3

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা১৪.০৯.২০১৫ সকাল হতেই সাজ সাজ রব।আজ আমরা দেখব লখনউ শহরের বিশেষ বিশেষ দর্শণীয় স্থল।পৌঁছে গেলাম শহরের সর্বাধিক আকর্ষণস্থল বড়া ইমামবড়া।আর্কিটেক্ট কিফায়ততুল্লা ইরাণী আর অবধের চতুর্থ নবাব আসিফ-উদ-দৌলার অদ্ভুত ইমারত।১৭৮৪এনেছিল অবধে ঘোর অকাল।গরিবের জান অনাহারে যায় যায়।নবাব আসিফ-উদ-দৌলা প্রজাকে অনাহার থেকে বাঁচাবার জন্য বার করলে এক অভিনব উপায়।উনি এক বিশাল সৌধ নির্মানের নিলেন সিদ্ধান্ত।যা হয়ে রইল এক দৃষ্টান্ত।যতক্ষণ সূর্যের আলো থাকবে গরীবগুরব মহল করবে নির্মাণ।সূর্যাস্তের পর ঘন অন্ধকার নামলেই ধনী অমির এসে গুড়িয়ে দেবে সেই সৌধ।যদিও নবাব চেয়েছিলেন ভাঙ্গাগড়া চলবে সাথে সাথে।কিন্তু ধনীরা বসল বেঁকে।এইসা কৈসে হো সকতা।তাঁদের ইজ্জত মান সম্মান বলে কি নাই কিছুই।গরীব কে সাথ কন্ধা মিলানা।নৈব নৈব চ।রাতের আঁধারে বরণ ভাল।গরীবের কাজের রইলনা অভাব।মেহনতানা নসীব হল বেরোকটোক।তাই নবাবের প্রজার মুখে মুখে ঘুরে ফিরে একই কথা জিসকো ন দে আল্লা উসকো দে আসিফ-উদ-দৌলা। বড়া ইমামবড়ার সৌধ বিশাল।আসিফ ইমামবড়া নামেও খ্যাত।মুহর্রমের সময় এখানে সিয়া মুশলিমদের হয় জমায়েত। বিশ্বের সর্ব বৃহত এই মহলের সভাগার।যার দৈর্ঘ পঞ্চাশ মিটার আর উচ্চতা পনের মিটার ।সভাগারের ছাদ এশিয়া ট্রে।সংলগ্ন দুই ঘরের ছাদ ক্রমশঃচাইনীজ বাওল আর কাটা খরবুজা ।এই মহলের ভীতরেই সভাগার ঘিরে বারান্দা।তার এক কোনায় দাঁড়িয়ে দেশলাই জ্বলালে আমাদের গাইড।বহুদূর থেকে তা আমরা শুনলাম। এবার চললাম আমরা বড়া ইমামবাড়ার তৃতীয় ভাগে।ভুলভুলাইয়া।গাইড বললে এর ভীতর চারটে রাস্তা কিন্তু এক রাস্তা হী সহী।এর ভীতরে জব ভী আইয়ে সাথ মে গাইড জরুরী।রোজ সূর্য্য অস্ত যাওয়ার আগেই ভুলভুলাইয়ার ভীতর চেকিংগ হয়।কহীঁ কোই ফসা তো নহী।কেউ আটকে থাকলে তাকে উদ্ধার করা হয়।এবং নাচিজ থেকে ফাইন নেওয়া হয়।এই ভুলভুলাইয়া সাবিত করে দিওয়ারোঁ কে ভী কান হৈ।সরু সরু গলির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় গাইড দেখাল কোথাউ দাঁড়িয়ে কথা বললে সে কথা সবার কানে আসবে।সম্পূর্ণ মহলে নো বীমস নো গারডার নো পীলারস।ভুলভুলাইয়া তৈরী মাটি রাইস হাস্ক গুড় ডিমের যরদা দিয়ে।এই ভুলভুলাইয়া সম্পূর্ণ মহলকে ঘিরে রেখেছে।ইন্জিনিয়ারিং মার্ভেল।নো ডাউট।এখানে ইলেকট্রিসিটীর ব্যাবস্থা নেই।দিনমানেই দেখে লিতে হবেক। এবার মহলের চতূর্থ ভাগ।ছাদে ওঠা হল।অদ্ভুত অপূর্ব।দূর দিগন্তে দেখা যায় কিং জর্জ মেডিকেল কলেজ।রুমি দরওয়াজা।জামা মশজিদ।ওয়াচ টাওয়ার। ছাদ থেকে নেমে পাশের বাউলিতে যাওয়া হল।আশ্চর্য্য হতে হয়ে কিয়াফতউল্লার স্থাপত্যকলা দেখে ।দাদ দিতে হয়।বাউলির(well কুয়ো)প্রবেশ দ্বার।দেখতে সাদামাটা।কিন্তু তার মধ্যে যে এত কারিকুরি কে জানত।যে প্রবেশ দ্বারে এসে দাঁড়াবে তার ছায়া অভিনব উপায়ে পড়বে কুয়োর জলে।গাইডের ভাষায় লগভগ ঢাইশো সাল পহেলেকা সী সী টীভী ক্যামেরা।যার ছায়া জলে পড়ল সে জানেনা ।অথচ কয়েক কিলো মিটার দূর থেকে নবাবের সেনার সে নজরবন্দ।অবাঞ্ছিত।খতম।আমরা খতম না হয়ে পৌঁছেগেলাম সেই প্রান্তে যেখান থেকে দেখা গেল কারা প্রবেশ করছেন বাউলি দেখার জন্য।তিন চার তলা গভীর বাউলি।নীচে তাকিয়ে দেখি নো ওয়াটার। তাহলে ছায়া পড়ছে কোথায়?অবাক হয়ে জুনিয়র পী সী সরকারের ভাষায় বলতে ইচ্ছে হল এরেই কয় ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া। বড়া ইমামবাড়ায় শায়িত আছে আসিফ -উদ-দৌলা আর তার শার্গিদ ইন্জিনিয়ার কিফায়তউল্লা ইরানীর দেহ। বোধহয় যতবার এই স্থাপত্য দেখব ,তারা এসে সাথে সাথে চলবে।দর্শকের আচম্ভিত হওয়াই তাঁদের আসল পাওনা।আর দর্শকদের কাছে এ এক সুন্দর রমণীয় স্থান।প্রাচিন হয়েও অত্যাধুনিক।এ তো পরম পাওয়া। ওয়াচ টাওয়ার।ম্যুজিয়াম।ছোটা ইমামবাড়া।রানীবাগ দেখে ফেরার পথে সারা হল শপিং।লখনউয়া চিকন তো নিতেই হবে।নচেৎ লখনউ আসা বৃথা হোটেলে ফিরেই শুরু হল গোছগাছ।রাত বারোটায় বাঘ এক্সপ্রেস।যাব কাঠগোদাম।

832

1

মনোজ ভট্টাচার্য

পলিটিক্স কী !

পলিটিক্স কী ! ছোট্ট বিল্টু বাবাকে জিজ্ঞেস করলো – বাবা পলিটিক্স মানে কি ! বিল্টুর বাবা একটু চিন্তায় পরে গেল । তারপর ভেবে ভেবে ব্যাখ্যা করতে লাগলো – আমি হচ্ছি এই বাড়ীর মুখ্য রোজগেরে মানুষ । ধরে নাও আমি হচ্ছি ক্যাপিটালিস্ট মানে এই সংসারের মালিক । তোমার মা বাড়ির সব কিছু দেখা শুনা করে – তাহলে তাকে আমরা সরকার বলতে পারি । সে তোমাদের সব কিছু প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটায় । তাহলে তোমাদের আমরা জনগন বলেতে পারি । আর যে আমাদের কাজকর্ম করে – ন্যানি – তাকে আমরা শ্রমজীবী শ্রেনী বলতে পারি । - আর তোমার যে ছোট্ট ভাই আছে – তাকে আমরা ভবিষ্যৎ বলে ডাকতে পারি । - এখন এইগুলো নিয়ে চিন্তা করতে থাকো । দেখো তোমার মাথায় ঢোকে কিনা ! বাবার এই দীর্ঘ ভাষন শুনে বিল্টু - চিন্তা করতে করতে তখনকার মতো চলে গেল। ঐদিনই রাত্তিরে ছোটো ভায়ের কান্না শুনে বিল্টুর ঘুম ভেঙ্গে গেল । ভায়ের বিছানার কাছে গিয়ে দেখল – ভাইএর ডাইপার ভিজে গেছে । বিল্টু আর কি করে – মা-বাবার ঘরে গেল তাদের ডাকতে । - দেখে – মা বিছানায় একা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে । মাকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছে করলো না তার । তাই গেল ন্যানির ঘরে - ন্যানিকে ডাকতে । - ন্যানির ঘর ভেতর থেকে বন্ধ । বিল্টু দরজার চাবির ছোট্ট ফাঁক দিয়ে দেখল – বাবা ন্যানির সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোচ্ছে । বিল্টু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল । নিজের যায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল । পরের দিন সকালে – ছোট্ট বিল্টু বাবাকে বলল – বাবা , আমার মনে হচ্ছে – পলিটিক্স সম্বন্ধে একটা ধারনা আমার হয়েছে । বাঃ ! – বাবা বেশ উৎসাহভরে বলল – তাহলে সেটা তোমার ভাষায় একটু বুঝিয়ে বল তো দেখি ! ছোট্ট বিল্টু বলতে আরম্ভ করলো – ঠিক আছে । যখন মালিকরা শ্রমজীবী মানুষের ওপর অত্যাচার করতে থাকে আর সরকার নাক ডাকিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে – সাধারন জনতা অবহেলিত হয় – তখন ভবিষ্যৎ গভীর পঙ্কে নিমজ্জমান হয়ে যায় ! (আমি ইচ্ছে করেই পলিটক্সের বাংলা রাজনীতি করিনি ! আর এটা একটু অর্থনৈতিক ছোঁয়াচে বক্তব্যও বটে) ! মনোজ

1854

2

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা:১২.০৯.২০১৫ আবার পথের হাতছানি।ঠিক হল নৈনিতাল।তার আসপাশ ।উঠল বাই কটক যাই।আসানসোলের শুভেচ্ছা ভ্রমণ আমাদের ফ্রেন্ড ফিলোসোফার গাইড।টিকিট হল।প্রতি যাত্রাই আমাদের রহস্যঘন।ভরা ভুলভ্রান্তি ।এবারইবা বাদ যায়ে কেন।আমাদের দলে যে সবচে খুঁতখুতে আর সাবধানি সেই তপনদার ভাগ্যে নাকি এই কান্ড!ফিমেল।আসি বছর।রিসার্ভেশন লিস্টের হেন যথেচ্ছাচার সওয়া চাড্ডিখানি কতা নয়।তপনদা বাক্যিহারা।বলতে চাইলেন অনেক কিছুই কিন্তু রাগের মাথায় উনি কি বললেন নিজেই বুঝলেননা।ট্যুর ম্যানেজার আবার ফ্রেশ টিকিট আনিয় এহেন ঘটনার টানলেন সমাপ্তি। ১৩.০৯.২০১৫ রাতএকটা।ঘন অন্ধকার চিড়ে আপ পঞ্জাব মেল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বেগে ধাবমান।ঘুম ঘুম চোখ।বাইরের আবছা দৃশ্য।সব শান্ত।পাটনা।ওরে একি!দলে দলে পোলাপান।তারা না মানে নিয়ম।না মানে কিছু।তারা চলেছে বেনারস।দিতে পরীক্ষা লোকপালের লেখপাল।কোন অসুবিধাই তাদের পারেনা করতে কুপোকাত।হাসি গল্প আর কথা।যদিও বোধহয় জানে ওদের সাফল্যের অনিশ্চিততা।কিন্তু এত বহতা পানি রমতা যোগি।ইতিমধ্যে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া গেল।ট্যুর ম্যানেজার সবার জন্য আনলে কেক মিষ্টি।ইত্যাদি ইত্যাদি।কিন্তু আমরা আছি অন্য অপেক্ষায়।বেনারসে আসবে আমার ছোট ভাই আর ভাবজ।কেতকী মানে আমার ভাইয়ের বৌ রান্নায় ওস্তাদোঁ কে ওস্তাদ।জানি ওরা এলে ভালমন্দ নিয়ে আসবে।যা ভেবেছি।তাই হল।গরম গরম লুচি ।সাথে আলু মটরশুঁটির দম।আর বেনারসের বরফি।বলতে ভুলে যাচ্ছি ফ্রাইড রাইসও ছিল।উফফফ কি স্বাদ।বুঝে পাইনা লোকে এত ভাল রাঁধে কি করে!রন্ধনে বৃহন্নলা না কি বলে সেই।মোদ্দা কথা খাওয়া জম্পেশ হল।তারপরে কি আর চোখ খুলে রাখা যায়।লাগাও ঘুম।চোখ খুলে দেখি গাড়ি প্রায় লখনউ এর কাছে হোটেল এ সেট হত হতেই এসে গেল প্যায়াজ পকোড়া আর চা।রাতের মেনু চিকেন রোটি। চলি এখন।পর বাত জারি রহেগা।রাত বাকি

855

1

মানব

জাঙ্গলিক

সক্কাল সক্কাল ঘুম ভেঙ্গে গেল। কেন? কোনদিন তো এরকম হয়না, আজ কি তবে... হ্যাঁ খাতাটা সামনে টেনে নিল দেবেশ। রাত্রে ব্রাশ করা হয়েছিল। এখন আপাতত না করলেও চলবে। যা মাথায় ঘুরছে সেটা লিখে ফেলাই ভাল। - তোমার লাস্ট-সিন এর টাইম দেখতে দেখতে একটা বেজে যায়। রাত বাড়ে আরও গভীর হয় চাহিদা, আর নিবিড় করে পেতে চাওয়া হৃদয়ের তাগিদ কুলারটা শব্দ করে ওঠে হঠাৎ জোরে তারপর থেমে যায় চোখের পাতা খোলাই থাকে সারারাত, প্যাচপ্যাচে ঘামে নাকি তোর নামে? একলা থাকলে কি মানুষের কবিতা পায়? কবিতা পেলে কাউকে তো শোনানোও দরকার। কেউ একটু প্রশংসা করলে মনের ভার অল্প লাঘব হয়… ************************************************************************************ গল্পটা লিখতে লিখতে মানসিক ভাবে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ল সম্বিত। নিজের জীবন নিয়ে আর কতটুকুই বা গল্প টানা যায়। এর ওর জীবন থেকে আরও কিছু খুঁচিয়ে বের করে আনলে তবেই না গল্প। কাল মশারিটাকে খাটের তলায় ফেলে দিয়েই গল্পটাকে শেষ করবে ভেবেছিল। সেই মত গল্পটাকে পোষ্টও করে ফেলে নিজেদের বানানো একটা আড্ডার সাইটে। তারপর সাইটের পাঠকবর্গ দাবি করে গল্পটা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেবেশ আরও একটু সাহসী হলে ভালো হয়। দেবেশ সাহসী হবে? কিন্তু কিভাবে? সাহসী ছিলেন ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বিনয়-বাদল-দীনেশ। এখনকার দিনেও সবাই চায় এনাদের মত মানুষ জন্মান। তবে অবশ্যই নিজের বাড়িতে নয়, পাশের বাড়িতে হলেই ভাল হয়। হোয়াটস্যাপ টা চেক করল সম্বিত। মেসেজ এ ভর্তি। এই গ্রুপগুলোর জ্বালায় দরকারী মেসেজগুলো আর পড়া যায় না। না দেখে বিরক্তিভরে কিছু মেসেজ ডিলিট করল সে। তারপর একজায়গায় এসে থামতেই হল। মেঘনার মেসেজ। একটা কবিতার মত কিছু একটা লিখেছে মনে হচ্ছে, “বৃষ্টি হয়েছিল পথে সেদিন অনন্ত মধ্যরাতে বাসা ভেঙ্গে গিয়েছিল, গাছগুলি পেয়েছিল হাওয়া সুপুরিডানার শীর্ষে রূপোলি জলের প্রভা ছিল আর ছিল অন্ধকারে – হৃদয়রহিত অন্ধকারে মাটিতে শোয়ানো নৌকো, বৃষ্টি জমে ছিল তার বুকে...” কাল রাত্রে গল্পটা পোষ্ট করার পর তার লিঙ্ক অবশ্য সে মেঘনাকে পাঠিয়েছিল। এটা কি তারই অন্তরাগ? - খুব সুন্দর রে। তোর লেখা নাকি? - ছাগল, এটা শঙ্খ ঘোষের লেখা। সকাল এরকম সাদর সম্ভাষণ পাবে ভাবেনি সে। ভেবেছিল ওই গল্পের দেবেশেরই মত কাল, পরশু, বা পরে কখনও ‘অনলাইন’ দেখানো সন্ধ্যায়; যখন বিরক্তির মাত্রা চাপিয়ে মাথাচাড়া দেবে কারুণ্য, কাঠিন্যকে ছাড়িয়ে যাবে পাশের বাড়ির শঙ্খধ্বনি, কিম্বা পড়াশুনার চাপে মাথা যখন বারো কেজির বাটখারা। জানিনা মেয়েটার হঠাৎ কি হল। এত তাড়াতাড়ি উত্তর তো গালে চড় মারলেও মানুষ দেয় না। - আমি মেঘনা আছি, মেঘনাই থাকব। তোর পারুল হতে যাব না। আজ কি ব্যাপার এত মেসেজ! সাধারণ দিনে তো এরকম হয়না। আচ্ছা, আজ তো তৃতীয় দিন। গত দুদিন ওর কোন মেসেজ আসেনি। নিতান্ত অপ্রস্তুতি কাটিয়ে একটা চলনসই জবাব দিয়ে ফেলল সম্বিত। - গল্পটার সাথে যদি নিজের কোন মিল পেয়ে থাকেন, তাহা কাকতালীয় জাঙ্গলিক বলিয়া জানিবেন। মেঘনাও কম যায় কিসে। অমনি তারও জবাব এসে গেল, - কবিতাটার সাথে আপনিও যদি নিজের কোন মিল পেয়ে থাকেন, তাহা নিছক শঙ্খঘোষীয় মাঙ্গলিক বলিয়া জানিবেন। - না রে। নিজের লাইফ খুঁচিয়ে গল্প বের করতে করতে পাবলিক তার খাই-ক্ষমতা হারাচ্ছে।(একটা একচোখা স্মাইলি)। এবার লোকজনের লাইফ খুঁচিয়ে গল্প বের করতে হবে। একদিকে এখানে কাস্টমার এখনও সন্তুষ্ট হচ্ছে না। রোজ নতুন নতুন দাবিদাওয়া করেই চলেছে। - তোর কাস্টমার? (পাঁচটা দন্তবিকশিত ও দুইচক্ষুনিঃসৃত আনন্দাশ্রুর সঙ্গমঘটিত স্মাইলি)। - হ্যাঁ, কেন? - ঠিক করে বল, কোম্পানির কাস্টমার। নাহলে পাবলিকে ভুল বুঝবে। - (মুচকি হাসির স্মাইলি) - (দুষ্টু হাসির স্মাইলি) - অ্যাই গল্পের নিচে পাবলিক কিসব কমেন্ট করছে। তুই নাকি সাহসী হবি! আমার চেয়েও বেশী? অবশ্য আমার কাছে সাহসী হবার ছোট্ট উপায় আছে, বাতলাবো? - কই দে দেখি, সাহসী হবার সহজ উপায়। -" শুন্যতাই জানো শুধু? শুন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সেকথা জানো না?" (সেই দন্তবিকশিত ও দুইচক্ষুনিঃসৃত আনন্দাশ্রুর সঙ্গমঘটিত স্মাইলি, এবার গোটা দশেক।) - ঢেউ? - হ্যাঁ ঢেউ। দেখি চল তুই কতটা সাহসী হতে পারিস! সামনাসামনি না হোক, গল্পে অন্তত আজ মেঘনা পারুল ঝড় ঢেউ সব এক। - চল তবে দেখা হবে, ঘুমের ঘরে আড্ডাঘরে। - বি.টি.ডব্লিউ., সাজেস্ট কর, কিভাবে সাহসী হওয়া যায়... - (একটা গোলাপি ঠোঁটের ইমোশান, সঙ্গে একটা একপাটি দাঁত বের করা মাথার খুলি ইমোশান)। - এক পাটি দাঁত রাত্রে ভাঙ্গে খাট। না থাক, বেশি গভীরে যাওয়া উচিত হবেনা। চেপে যাই। - বলিস কি? তুই খাট ভাঙবি? মাল খেয়েছিস নাকি? - মাল খাওয়া ধরতে পারলে হয়ত বেঁচে যেতাম এই চাপের দিনে। আচ্ছা আমি তো রোজ নিজের ই গল্প বলি। তোর কথা তো জিজ্ঞেসি করা হয়না। নিজের থেকে কিছু বলার ইচ্ছে করলে বল না। - নাথিং। - সাম্থিং ইন দ্যাট নাথিং? - নাহ। তারপর তুই ওটাকেই গল্প বানিয়ে ছেড়ে দে আর কি। - গুড আইডিয়া। - ব্যাড আইডিয়া। - আরও কিছু বল যাতে গল্পটাকে আর একটু বাড়ানো যায়। দেবেশের কি হবে? - তোর গল্প তুই জানিস। আমি এর মধ্যে নট মেল্টিং মাই নোজ। - তাহলে দেবেশ চুলোয় যাক, আমি এই চ্যাটবক্স টাকেই নাম ভাঁড়িয়ে গল্প করে ছেড়ে দিচ্ছি। ওই দেখ এক্ষুণি একজন কমেন্ট করেছে, দাবি করেছে যে গল্পটাকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতেই হয়, একটু অন্যভাবে, অর্থাৎ দেবেশ পারুলের গায়ে যেন বড় কোন আঁচড় না পড়ে। - আমি আমার চ্যাটবক্সের কপিরাইট দাবি করছি। - ওই প্লিজ... - ঠিক আছে। তাহলে গল্পটাকে আর বাড়াস না। একদিন দেখবি গল্পের ভিতর গল্প তার ভিতর আবার একটা... এইভাবে এমন গভীরে চলে যাবি যে আর বেরোতে পারবিনা। - হ্যাঁ, তারপর হরি পোদ্দার এর সিরিজ হয়ে যাবে (মুচকি হাসির ইমোশন) - হরি পোদ্দার? - আরে ওই হ্যারি...পটার না কি যেন। - হ্যারি পটার কে হরি পোদ্দার বানালে দাঁত ভেঙ্গে দেবো।

940

9

মনোজ ভট্টাচার্য

কোপাই নদীর জলে কথা ভেসে যায় রে - হাঁসুলি বাঁকের কথা বলবো কারে ভাই !

মঞ্চে অনেক গাছ ও – প্রস্তরবৎ তিনটে মূর্তি । এক বুড়ি মঞ্চের বা দিকে - ডানদিকে এক বুড়ো । আর মাঝখানে ঘোরাঘুরি করছে গম্ভীরা – সেও এক কুশলী ! কোপাই নদীর জলে - হাঁসুলি বাঁকের কথা কবে শেষ হয়ে গেছে – সবাই চলে গেছে শিল্পের নগরীতে । এক তো যুদ্ধ নিয়ে গেছে গ্রামের সব খাদ্য । সমস্ত আনাজ-শস্য ভীষণ আক্রা ! গ্রাম কে গ্রাম – উজাড় হয়ে যাচ্ছে – হামলিনের সেই বাশীওয়ালার সুরে ! সবাই চলেছে কাজের খোঁজে রেলের কাজে বা কোনও কারখানার কাজে ! বুড়ো শিবের অভিশাপ বন্যা হয়ে ধুয়ে দিচ্ছে হাঁসুলি বাঁকের গ্রাম ! শেষ হয়ে যাচ্ছে সামন্ততন্ত্র – জমিদারবাবুরা পর্যন্ত চলেছে শহরে ! তারাশঙ্করের হাঁসুলি বাঁকের কথা – একটা অমর সৃষ্টি ! বাংলার অর্থনীতির ইতিহাসে একটা খুব প্রয়োজনীয় সংযোজন ! – ঐ উপন্যাস থেকে নাটক করা কতটা শক্ত বা সহজ – তা বলা মুস্কিল ! কিন্তু কৌশিক কর – সেটা করেছে । মঞ্চের জন্যে কুশলীরা না কুশলীদের জন্যে মঞ্চ – আজকাল সেই কনসেপ্টটাই যেন পাল্টে যাচ্ছে ! সময় সময় মনে হচ্ছে – মঞ্চটাও যেন নাটকের এক শিল্পী ! – মঞ্চের বড় বড় গাছগুলো যখন ঝড়ে প্রচণ্ড দুলছে – সেই দুলুনিতে আমরাও ভুলে যাচ্ছি - আমরা মঞ্চের ভেতরে নেই ! নাটকের আঙ্গিক যে এত সুন্দর হয়ে যাচ্ছে ! শুধু কলাকাররা নয় – আঙ্গিকও একটা বড় ধরনের রোল ! – একটা নাটকে তো দেখেছিলাম – সমস্ত হলটা কুয়াশাচ্ছন্ন করে দিয়েছিল ! সে অন্য কথা ! শান্তিলাল ব্যানারজি ছাড়াও অন্যান্য শিল্পীরাও দারুণ অভিনয় করেছে ! সবার নাম মনে রাখা সম্ভব নয় – অথচ প্রত্যেকেই পুরো নাটকটাকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছে । এমনকি গম্ভীরাও ! ওর উপস্থিতি আমি এই প্রথম দেখলাম ! নাটকের মতোই অরিজিনাল গানগুলোও অনেক পাল্টেছে ! গানের ব্যাপারে – আমার মনে হয় – পুরনো সুর বা গানের পুরো অংশ রাখলে ভালো লাগত ! গানগুলো তাদের অর্থগুলো নিয়ে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল তো ! – আর সেটের মধ্যে অন্তত একটা দুটো উইন্ডমিল বা কারখানার চিমনী রাখা যেতে পারত ! মনোজ

996

6

Somen dey

আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা ......

আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা ...... ****************** কারণ আমি পথ চিনি কিনা আমি নিজেই জানি না ।তাই চান্স নেবার কি দরকার । কে করে অত সব ঝামেলা , খুঁজে বেড়াও মগজের অলি গলি , গ্রে সেল গুলো অযথা নাড়া চাড়া কর । আছে তো কাছে আইপ্যাড প্রো । সেই নেবে সব ভার । আমার মন খারাপ হলে সেই আমার মন ভালো করার গান বেছে দেবে । আমার একলা লাগলে সেই আমার সঙ্গে গল্প করবে । আমার জন্যে বেছে দেবে জানলার পর্দার রঙ , বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার ,দু দিনের ছুটিতে বেড়াতে যাবার ঠিক জায়গা । প্রেম পত্র লিখতে গিয়ে আটকে গেলে জুগিয়ে জুৎসই কোটেশন , গল্প লিখতে গিয়ে আটকে গেলে বলে দেবে দারুন একটা প্লট , কবিতার জন্যে জুগিয়ে দেবে সঠিক প্রতিশব্দ । বেড়াতে গেছি – আদ্দিস আবাবা , সিন সিনাটি অথবা দামাস্কাস । ওখানের লোকেদের কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না আমার ভাষা । আইপ্যাড প্রো দোভাষীর কাজ করে দেবে । অনেকদিন পরে বেড়াতে গেছি এক আত্নীয়ের বাড়ি । থালা সাজিয়ে খেতে দিয়েছে চিত্তরঞ্জনের রসগোল্লা , ভীমনাগের সন্দেশ ।খেতে লোভ হচ্ছে , কিন্তু খাওয়া টা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিনা । আইপ্যাড প্রো এই মুহুর্তে রক্তে শর্করার পরিমান মেপে বলে দেবে খাওয়া চলবে কি না । বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে দু পেগের পর তৃতীয়টা আর খাওয়া চলবে কিনা , সেই মুহুর্তের রক্ত চাপ মাপ করে নিয়ে আইপ্যাড প্রোই বলে দেবে । যদি হটাৎ ইচ্ছে হয় দেখতে , নিজেকে দাড়ি গোঁফ রাখলে (অথবা কামিয়ে ফেললে ) কেমন লাগবে ,অথবা পাঁচ কিলো ওজন কমালে , চুলে লাল রঙ করে নিলে কেমন লাগবে দেখিয়ে দেবে সেই আইপ্যাড প্রো । কিম্বা যদি দেখতে ইচ্ছে হয় , সাহারায় বৃষ্টি পড়লে , বা জেকোকাবাদে বরফ পড়লে কেমন লাগে । কিম্বা যদি ইচ্ছে হয় জ্যোতি বসু কে হাসলে বা জনি ওয়াকার কে কাঁদলে কেমন দেখতে লাগতো , আইপ্যাড প্রো ই সে রকম ছবি তৈরি করে দেখিয়ে দেবে । ইলেক্ট্রিকের বকেয়া বিল , ব্যাঙ্কের না দেওয়া ইন্সটলমেন্ট , কোন ওষুধ কখন খেতে হবে - সব মনে করিয়ে দেবে ।এমন কি শরীর বেগড়বাঁই করলে সরাসরি ডাক্তার কে খবর দিয়ে দেবে আইপ্যাড প্রো । আইপ্যাডের পরের এডিশন টা নিশ্চয় আরো এক ধাপ যাবে ।হয়তো সেই যন্ত্রটি উলটো দিকে বসা মানুষটির মনের কথা বুঝে নেবে , বস কে খুশি করার দাওয়াই বাতলে দেবে। কোনটা মিছে কথা কোনটা সত্যি ঠিক ধরে ফেলবে । স্টিভ জোভ না থেকেও স্বর্গ থেকে নেড়ে যাচ্ছেন কলকাঠি । তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন মনুষ্য জাতি তার উদ্দেশে একদিন গান গেয়ে বলবে - তোমার উপর করিনু নির্ভর তোমা বই কারেও জানি না আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা আমি যে পথ চিনি না ......। সে স্বপ্ন সত্যি হল বলে । সেই সঙ্গে সত্যি হবে নাতো বুড়ো আইস্টাইনের দুঃস্বপ্ন ? – ‘ I fear the day that technology surpass our human interaction . The world will have a generation of idiot.’

1344

4

মনোজ ভট্টাচার্য

আট্লান্টায় কী ঘটেছিল !

আটলান্টায় কী ঘটেছিল ! ১৯৯০ সালের পরে কয়েক মাস আটলান্টায় থাকতে হয়েছিল । সেই সময় আটলান্টায় অলিম্পিক হবে বলে শহরের ভাংচুর আরম্ভ হয়ে গেছে । পিচ ট্রি রোড এর ওপর রেড হুক ইন নামে একটা মোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম ! একেবারে শহরের মাঝখানে - আশেপাশে কোনো দোকান-পাট নেই । উল্টোদিকে একটা আটতলা পার্কিং বিল্ডিং ! সারাক্ষন আলোয় ঝলমল করছে ! এই মোটেলটাও ভাঙ্গার তালিকায় ! তবে এখনো দেরী আছে । মোটেলের মালিকও যতদিন পারে ভাড়া দিচ্ছে ! যেহেতু এই বাড়িটা ভাঙ্গা হবে - তাই এখানে বোর্ডার আর বিশেষ আসে না - বেশির ভাগ ঘরই খালি পরে আছে । সারা তিনতলায় একমাত্র আমি আছি ।যদি আমাকেও যেতে বলে - তবে ওরাই অন্য মোটেলে ব্যবস্থা করে দেবে ! হোটেল ও মোটেলের তফাত আছে । আমি সব কিছুর মধ্যে যাচ্ছি না ! মূল পার্থক্য হলো - নিরাপত্তা ! মোটেলের বাসিন্দাদের কোনো নিরাপত্তা নেই । যে কোনো সময় বাইরের যে কেউ ঘরের দরজায় হাজির হতে পারে - বন্দুকধারিও হতে পারে ! বারান্দার দুটো সিঁড়ি সবসময় খোলা । কোনো দরজা নেই ! এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যে বেলায় ঘরে ফিরে জামা-কাপড় পাল্টে চা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়েছি । চোখ গেল পাশের ঘরের দিকে ! একটি কালো মেয়ে দাড়িয়ে আছে দরজায় ! - সকালে দেখেছি বটে পাশের ঘরে বোর্ডার এসেছে ! সেই বোর্ডারই কি এই মেয়ে - হতে পারে ! রাস্তায় তখন ফিরতি গাড়ির জ্যাম - সবাই বাড়ি ফিরছে I ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল - মেয়েটি ওর দরজা থেকে আমার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে । আসলে আমাকে ডেকে কিছু বলতে চাইছে । ' - কিছু বলছ আমাকে ?' ' - তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে !' - শুনে ভালো করে দেখলাম মেয়েটিকে ।একটি দুঃস্থ মেয়ে - স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো । অনেকেই জানেন - আমেরিকায় দুটো জাতি থাকে - 'আছে' আর 'নেই '! - উত্তরে, পশ্চিমে বা টেক্সাসে - মোটামুটি 'আছে'দের প্রাধান্য । আর দক্ষিনে ও মধ্যে - 'নেই'দের প্রাধান্য ! আমেরিকাতে সাদা-কালো ছাড়াও অর্থনৈতিক ভাবে - আমাদের দেশের মতই অনেক গুলো শ্রেণী আছে ।ধনী, উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দুঃস্থ ! - এই দুঃস্থ শ্রেনীর মধ্যে সাদা বা কালো - দুইই আছে । এরা সরকারি সব রকম সাহায্যই পায় - যেমন এস এস আই , ফুড স্ট্যাম্প ইত্যাদি - আমি সব জানিও না । কিন্তু এদের মধ্যে লেখা-পড়া বা চাকরি-বাকরি করার কোনো ব্যাপার নেই ! অপরাধ-প্রবনতা এদের যেন রক্তের মধ্যে ! ছেলে-মেয়েদের পোশাক-আশাকের মধ্যে দিয়েই সামাজিক অবস্থান প্রকট হয়ে ওঠে ! ' - কি কথা !' - আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি । ' - তুমি ভেতরে চলো - বলছি ' বলেই মেয়েটি আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে গেছে ! ' - আরে তুমি ভেতরে ঢুকছো কেন ? কি বলবে - এখানে বলো ' - আমার তখন বুঝতে আর বাকি নেই - মুরগী হতে চলেছি ! ' - আমায় দুটো টাকা (ডলার ) দেবে ? আজ সারাদিন খাই নি ! ' - ততক্ষনে আমার বিছানায় বসে পড়েছে ! আর বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে আমার টাকার ব্যাগ ! আমি অনন্যোপায় হয়ে বললাম : ' - তুমি উঠে বাইরে এসো - আমি টাকা দিচ্ছি '! ' - কেন - তুমি আমার পাশে বসো না ! আমরা গল্প করি !' - বলেই যে কাজ করলো - আমি অত তাড়াতাড়ি ভাবতেও পারিনি - কেউ এরকম করতে পারে ! টি-শার্টটা খুলে ফেলেছে ! একেবারে টপলেস ! কিছুদিন আগেই এখানে কোনো এক জায়গায় - এই কালো মেয়েকে নিয়েই একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছিল ! কালো-সাদা বিভাজন হয়ে গিয়ে - সে এক বিশ্রী ব্যাপার ! - পুলিশ এসে আগে অভিযুক্তকে হাতকড়ি পরিয়ে নিয়ে যায় ! কাগজে-টি ভি তে ছবি-টবী উঠে একাক্কার হয় ! আর সরকার অভিযুক্তকে দিয়ে প্লী ডীল করিয়ে নেয় ! - কালোদের চটাবে না - অনেকটা আমাদের দেশের মতই ! এক গাদা টাকা গুনাগার দিতে হবে - অথবা কারাবাস ! ' - তুমি শীগগির জামা পরে নাও আর উঠে বাইরে এসো - বলছি -' আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম - ভয়েতেই বোধায় ! - 'এখুনি আমি পুলিশে ফোন করব ।' ' - আমায় কুড়ি টাকা দাও - আমি চলে যাবো ! তা নাহলে আমিই পুলিশ ডাকবো !' - বলে ফোনটা তুলে নিল ক্র্যাডেল থেকে । আমি কলকাতার মানুষ - আমায় টুপি পড়াবে ! - রাগের চোটে তেড়ে গিয়ে ও'র হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে জিরো ডায়াল ঘুরিয়ে দিলাম । রিসেপশানে এখন অরবিন্দ আছে - দেখেছি । ' - অরবিন্দ - এখুনি একবার আমার ঘরে আসবে ? আমার ঘরে একটা মেয়ে ঢুকে পড়েছে । জামা খুলে ফেলেছে আর আমাকে ভয় দেখাচ্ছে পুলিশের ! ' অরবিন্দ 'এখুনি আসছি' বলে ফোন নামিয়ে রাখলো । আমার এই তৎপরতায় মেয়েটা ঝিমিয়ে পরেছিল - তাড়াতাড়ি জামাটা পরে ফেলল - কিন্তু একভাবে বসেই রইল ! খানিক্ষনের মধ্যেই অরবিন্দ একজন স্প্যানীশ সঙ্গীকে নিয়ে ওপরে চলে এলো ! - মেয়েটাকে দেখেই অরবিন্দর সঙ্গী বোধয় চিনতে পেরেছে - এই মারে কি সেই মারে।- আমার কাছে সব শুনে নিয়ে মেয়েটাকে পুলিশের ভয় দেখালো । ও এখানে উঠে এলো কি করে ! পাশের ঘরের দরজা খোলা কেন ? পরের দিন শুনলাম - মেয়েটিকে কোনো একজন বোর্ডার ডেকেছিল - কিন্তু সে নেই ঘরে ! তাই মেয়েটি চেষ্টা করেছিল যদি কোনো খদ্দের পেয়ে যায় ! ঘটনার পরে আমার মনে হয়েছিল - আমি তো ওকে দুটো টাকা দিতেই পারতাম ! বলেছিল সারাদিন খাওয়া হয় নি ! যদিও সেটা সত্যি নয় - কারণ ওদের যাবতীয় খরচ আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই হয় ! - কিন্তু আমিও বৃহত্তর বিপদের ভয় পেয়ে গেছিলাম । কাগজ - টি ভি – পুলিশ-কারাবাস ! ওরে বাবা ! আমি ওসবে নেই ! - আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নী-নিষ্ট ভদ্রলোক ! মনোজ

916

5

সুতপা সেনগুপ্ত।

ভালো মানুষ|

দুনিয়াতে ভালো মানুষের স্ংখ্যা কিন্তু এখ্নও বেশ আছে| কিছুদিন আগে আমার এক আত্মীয়া দিদির সাথে বাজারে গেছি‚ সেখানে একজন ভদ্রলোকএর তাড়াহুড়োর চোটে সেই দিদি রাস্তায় পড়ে গিয়ে তার ঠোঁটে স্টীচ পড়ে‚ emergency তে ডাক্তার বলে দেন একদিন ছাড়া একদিন dressing করাতে হবে| তা উনি ঠিক করলেন বাড়ীতেই dresser ডেকে উনি dressing করাবেন| আমি সেই মতন ওষুধের দোকান থেকে এক ভালো ড্রেসার এর খোঁজ পেয়ে তার বাড়ী যাই‚ সেইখানে গিয়ে দেখি ওনার একটা চোখ পুরোপুরি বন্ধ| কথায় কথায় জনতে পারি কোনো accident এ ওনার চোখটি চলে গেছে| কিন্তু উনি তাও বাড়ী বাড়ী গিয়ে ড্রেসিং করতে যান| সেই মতো আমার সেই আত্মীয়া দিদি বাড়ীতেও ঐভাবে dressing করে আসেন| সেখানে একদিন আমিও ছিলাম‚ সেই সময় উনি আসেন‚ তখন জানতে পারি উনি নাকি টাটা মেন হাসপাতালে দীর্ঘ ৪৩ বছর চাকুরি করেছেন | অনেক বড়ো বড়ো ডাক্তারের নাম বল্লেন যাদের সাথে উনি কাজ করেছেন| যাই হোক সাতদিন এইভাবে করার পরে আমার ঐ আত্মীয়ার ঠোঁটের স্টীচ ও উনি কেটে দেন| তারপরে আর একদিন খালি ওনার আসার কথা ছিলো‚ কিন্তু বিকালে জানতে পারলাম কেউ একজন ফোনে এ জানিয়েছেন ওনার নাকি রোড অ্যাক্সিডেন্ট হোয়ে পা ভেন্গে গেছে‚তাই উনি হাসপাতালে ভর্তি হোয়েছেন| অপারেশন করে সেট করতে হবে| আমার এই টা জেনে খুব ভালো লাগল উনি নাকি ফোনে জানতে চেয়েছেন আমার সেই আত্মীয়া দিদি কেমন আছেন‚ এবং ড্রেসার এর দরকার হলে উনি কারোকে পাঠিয়েও দেবেন| আমি কেবল ভাবলাম যে মানুষটা পা ভেন্গে অপারেশন এর প্রতিক্ষায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন‚ তিনি নিয়মিত খবর নিচ্ছেন কার? যার সাথে মাত্র কয়েকদিনের আলাপ| আমি একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে রইলাম| দুনিয়ায় ভালো মানুষের স্ংখ্যা নেহাৎ কম নয়| এই ভালো লাগাটুকু এইখানে সবার সাথে শেয়ার করলাম|

1038

8

Somen dey

অমল শৈশব , মাসুম সওয়াল এবং অচেনা সময়

কয়েকদিন আগে কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে একটি আলোচনা চলাকালীন জনৈক অভিজ্ঞ মনস্তত্ববীদ কে এ রকম এ রকম মন্তব্য করতে শুনলাম যে আমরা এমন একটা সময়ে এসে পড়েছি যেখানে সম্পর্ক নিয়ে আমাদের চিরাচরিত ধারণা গুলো , চ্যালেঞ্জেড হয়ে যাচ্ছে । মা-বাবা-সন্তান এই সম্পর্ক গুলোকে আগের ধ্যান ধারণা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে হয়ত আমার কোথাও ভুল করে ফেলব। শোনার পর থেকে কথাটা গলায় বেঁধা মাছের কাঁটার মত মাঝে মাঝেই খুব অস্বস্তিতে ফেলছিল । আমাদের এতদিনকার লালিত অনুভুতি, আবেগ, বিশ্বাস , ধারণা , প্রবাদ , উপকথা সব কি তাহলে তামাদি হয়ে গেল ? সেই স্নেহ নামক বিষম বস্তুর অপ্রতিরোধ্য নিম্নগামী প্রবাহ , সেই ‘কুমাতা’র অসম্ভাব্যতার ধারণা , সেই ঈশ্বর পাটনীর চিরন্তন প্রার্থনা ।যুগ যুগ ধরে সভ্যতার ইঁটের পরে ইঁটের গাঁথার মাঝে অদৃশ্য সিমেন্ট টুকু যুগিয়ে দেয় তো এই বিশ্বাসই । সেটাই চ্যালেঞ্জড হয়ে গেলে এ পৃথিবীর আম-আদমীরা বাঁচবে কি নিয়ে ? কি দিয়ে গড়বে তাদের দুদিনের খেলাঘর । অনুভুতির গভীরে যদি মা মায়ের মত না হয় বাবা বাবার মত না হয়, সন্তান সন্তানের মত না হয় , তাহলে আর রইলটা কি ? বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় সুখটুকু উবে গেলে আর টাকা দিয়ে কি কিনবে মানুষ ? প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না । অস্বস্তি বাড়ছিল । মনে হচ্ছিল ‘সবার উপরে’ থাকার নিশ্চিন্ত জায়গাটি এবার বোধহয় ছেড়ে দিতে হবে মানুষকে।তবু কোথাও একটা সন্দেহ মাথা তুলছিল- সত্যিই কি এতটা অচেনা হয়ে গেল সময়টা ? **** আজ সকালে কাগজ পড়তে পড়তে হারানো বিশ্বাস কিছুটা যেন ফিরে এল । মনে পড়ল সেই অপুর সংসারের কাজলের কথা । যার কাছে তার একজন স্বপ্নের বাবা ছিল ।যে তাকে দাদুর কড়া শাসন থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে । যে স্বয়ং অপুকেই প্রশ্ন করেছিল –তুমি আমাকে আমার বাবার কাছে নিয়ে যাবে ? এই নিঃসঙ্গতায় বেড়ে ওঠা শৈশবকে আমরা অনেকবার বার অনেক জায়গায় দেখেছি । আমাদের পাড়ায় ,বা অন্য পাড়ায় ।আমাদের সাহিত্যে, সিনেমায় । যে বালিকাটি , মনের কথা কাউকে বলবার মত না পেয়ে লিখে রাখে ডায়রির পাতায় , তার প্রতিটি ছত্রে উথলে ওঠে তার স্বপ্নের বাবার প্রতি অভিমান – কেন সে ফোন করে না তাকে , কেন সে আসেনা তাকে দেখতে , বাবার কথা শুনে সে তার বড় নখ কেটে ফেলেছে , মন দিয়ে পড়া শোনা করছে , তবু কেন সে ফোন করেনা ? এই অচেনা সময়েও তাকে অন্তত আমরা চিনতে পারি । কিছুদিন আগে দেখা সিনেমার একটি বালকের সেই তার বাবাকে ‘পরেশান’ করা ‘মাসুম সওয়াল’ গুলির কথা মনে পড়ে যায় আমাদের ।হাজার কোটির হিসাব বোঝেনা এই শৈশব । শুধু মায়ের গায়ের গন্ধের মধ্যে সে ঘুমাতে চায় , হোঁচট খেলে ধরতে চায় বাবার আঙ্গুল  ।আমাদের এই ধারণাটা তাহলে অন্তত চ্যালেঞ্জড হয়নি এখনো । গল্পের কাজল বা রাহুল খুঁজে পেয়েছিল তাদের স্বপ্নের বাবাদের । শিনা পেলো না । এই হত্যার অপরাধী কে আদালত ঠিক করে দেবে । তার আগে আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইব যাকে সে হল এই লাগামবিহীন ভোগবাদী সময় । কিন্তু তাকে কে শাস্তি দেবে ?

851

7

দীপঙ্কর বসু

শতচক্ষু অর্গাস ও মার্কারির কাহিনী

পুরাকালে নক্ষত্রলোকের রাজা জুপিটার ও তাঁর রাণী জুনোর মধ্যে আইও নামে এক জলপরীকে নিয়ে বিবাদ উপস্থিত হয়েছিল । মহারাণি জুনোর বিষ নজর থেকে আইও কে রক্ষা করতে জুপিটার আইও কে একদিন যাদুবলে ধবধবে সাদা এক সুন্দর গোবৎসে রূপান্তরিত করে দিলেন । কিন্তু জুপিটারের এই চালাকি সত্বেও জুনোর মনে সন্দেহ ছিল ধবলী গোবৎসটি আসলে ছদ্মবেশধারী আইও । তাই গোবৎসটির ওপর নজররাখার জন্য রানী জুনো অর্গাস নামে এক বিশ্বস্ত রাজ প্রহরীকে ভার দিলেন গোবৎসটির ক্রিয়াকলাপের ওপরে নজরদারি চালানর । রাণী জুনোর প্রতি বিশ্বস্ত হওয়া ছাড়া আরো একটি বিশেষত্ব ছিল অর্গাসের । তার ছিল একশোটি চোখ এবং সে ঘুমিয়ে পড়লেও তার সব কটি চোখ বন্ধ হতনা – অন্ততঃ একজোড়া চোখ খোলা থাকত । কাজেই তার পক্ষে গোবৎসটির ওপরে চব্বিশ ঘন্টা নজরদারি চালান সহজ ছিল । রাণীর হুকুম – গোবৎসটির ওপরে কড়া নজর রাখতে হবে ,যাতে সে কোনভাবেই না অন্য কোথাও পালিয়ে যায় । এদিকে আইওর অন্য ভাই বোনেরা সুন্দর গোবৎসটিকে দেখে তাকে খুব আদর যত্ন করতে আরম্ভ করল ,যদিও তারা জানতনা যে গোবৎসটি আসলে তাদেরই বোন আইও । এই নিয়ে আইও র নিজের মনেও কষ্ট হত । তাই একদিন সে নিজের আসল পরিচয়টা নিজের ভাইবোনেদের অতি সন্তর্পণে প্রকাশ করার বাসনায় পা দিয়ে মাটির ওপরে আই ও এই দুটি অক্ষর লিখল । তাতে আইওর পরিবারের সকলেই গোবৎসটির আসল পরিচয় বুঝতে পারল । আইও র ধারণা ছিল যে সে আত্মীয়পরিজনদের কাছে নিজের পরিচয় জানালেও প্রহরারত অর্গাস তার বিন্দুবিসর্গ টের পাবেনা । দুর্ভাগ্য আইওর – লেখাটি অর্গাসের নজর এড়ায়নি । “আই ও” অক্ষরদুটি চোখে পড়া মাত্র সে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে গোবৎসটি আর কেউ নয় স্বয়ং আইও । আরো কড়া প্রহরায় রাখবে বলে অর্গাস আইওকে নিয়ে গেল আইও র আত্মীয় পরিজনদের থেকে বহুদূরবর্তী এক নির্জন পাহাড়তলীতে । ভাই বোন আত্মীয় স্বজনদের থেকে বহু দূরে এই নির্জন পাহাড়তলীতে এসে স্বাভাবিক ভাবেই নিরানন্দে দিন কাটতে লাগল আইওর । আর আইওকে অসুখী দেখে রাজা জুপিটারেরও মনে শান্তি নেই । তিনি দিবারাত্রি ভেবেই চলেন কি ভাবে আইওকে তার স্বরূপে ফিরিয়ে আনা যায় এবং অর্গাসের নজরদারি থেকে উদ্ধার করা যায় । মুস্কিল হল অর্গাসকে পুরোপুরি ঘুম পাড়িয়ে দিতে না পারলে , তার সব কটি চোখ মুদ্রিত না হলে আইওকে তার স্বরূপে ফিরিয়ে আনা যাবেনা বা তাকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা যাবেনা । অনেক ভাবনা চিন্তা করে জুপিটার অবশেষে তার আজ্ঞাবাহক মার্কারিকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে নির্দেশ দিলেন মার্কারি যেন অবিলম্বে অর্গাসের কাছে গিয়ে যেমনভাবেই হোক তাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে দেয় ,আর ঘুমের সময়ে যেন অর্গাসের সব কটি চোখই বন্ধ হয়ে যায় তা নিশ্চিত করতে । রাজার আজ্ঞা পাওয়া মাত্র মার্কারি রওয়ানা হয়ে গেল এবং অচিরেই এক রাখাল বালক রূপে সেই জায়গায় পৌছে গেল যেখানে একটি গাছের ছায়ায় বসে অর্গাস আইওকে পাহারা দিচ্ছিল । দূর থেকে নিজের রাখালিয়া বাঁশিতে একটা আনন্দের সুর বাজাতে বাজাতে একটু একটু করে অর্গসের দিকে এগোতে লাগল মার্কারি । কর্তব্যের খাতিরে এই দূর প্রবাসে এসে স্বয়ং অর্গাস ও খুব একটা সুখে দিনাতিপাত করছিল তা নয় । বস্তুত সঙ্গিহীন এই নির্জন প্রান্তরে আইওকে পাহারা দিতে গিয়ে সে নিজেই বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ।তাই এক নতুন সাথীকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে সে ভারি আহ্লাদিত বোধ করল । অনেকদিন পর কারো সঙ্গে কথা বলতে পেরে সে যেন নতুন করে বেঁচে উঠল । নতুন বন্ধুর বাঁশির খুব প্রশংসা করল । প্রশংসা শুনে মার্কারি যেন খুব খুশী হয়েছে এমন একটা ভান করে মার্কারি তার বাঁশিতে মোলায়েম সুরে ধরল এক ঘুমপাড়ানিয়া সুর । সেই সুর শনতে শুনতে অর্গাসের প্রথমে হাই উঠতে লাগল তার পর ধীরে ধীরে ঘুমে তার প্রায় সবকটি চোখ বন্ধ হয়ে এল ।তখন বাঁশি বাজান বন্ধ রেখে মার্কারি তাকে অতি দুর্বোধ্য ভাষায় একটানা সুরে দীর্ঘ গল্প শোনাতে শুরু করল । তাতে ,একটু একটু করে অর্গাসের আটানব্বইটি চোখ বন্ধ হয়ে গেল ,কিন্তু মুস্কিল হল মার্কারি হতাশ হয়ে দেখল যে অর্গাসের দুটি চোখ তখনও জুলজুল করে চেয়ে আছে । এবার কি করা যায়, কি করে ওই দুট চোখও বন্ধ করে দেওয়া যায় তাই ভাবতে ভাবতে শেষ চেষ্টা হিসেবে মার্কারি আবার তার বাঁশি তুলে নিল । এবারে আগের চেয়েও নরম সুরে বাজাতে লাগল ঘুমপাড়ানিয়া এক মোহময় সুর । সেই সুর শুনতে শুনতে অর্গাসের অবশীষ্ট চোখ দুটিও ঘুমে মুদে গেল । অর্গাসকে্ গভীর ঘুমে অচেতন দেখে মার্কারি আর সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে গোবৎসরূপী আইওকে নিয়ে সরে পড়ল – তাকে নিয়ে উপস্থিত হল জুপিটারের কাছে ।জুপিটার তাকে তার পূর্ব রূপ এ ফিরিয়ে আনলেন । আইও মনের আনন্দে তার পরিবারের সবার সঙ্গে মিলিত হল । এদিকে রানী জুনো অনেকদিন অর্গাসের খবরাখবর না পেয়ে একদিন গিয়ে উপস্থিত হলেন সেই পাহাড়তলীতে ,যেখানে অর্গাসের পাহারাদারিতে ছিল গোবৎসারূপী আইও । রাণী চারিদিকে চেয়ে খুজতে থাকেন আইওকে ,কিন্তু কোথায় সে ! উলটে রাণীর নজরে এল যে একটি গাছের ছায়ায় শুয়ে অর্গাস নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে আর তার সব কটি চোখই বন্ধ হয়ে আছে । রাণি বুঝতে পারলেন অর্গাসের অসাবধানটার সূযোগে আইও পালিয়েছে । নিদারুণ রাগে গজরাতে গজরাতে রাণী নিদ্রিত অর্গাসকে ঘুম থেকে তুলে ভর্তসনা করতে লাগলেন – “ তুমি একটা অপদার্থ । তোমার জন্যই আইওকে হাতের মুঠোয় পেয়েও হারাতে হল । তোমার একশোটা চোখ থাকার সার্থকতাই বা কোথায় । তার চেয়ে এই চোখগুলি আমার সাধের ময়ুরীর পেখমে বেশী মানাবে । এই বলে অর্গাসের একশোটি চোখই তার থেকে নিয়ে রাণী ট্যাঁর পোষা ময়ুরীর পেখমে লাগিয়ে দিলেন । আজও তাই ম্যুরের পেখমে আমরা সেই আকশোটি চোখ দেখতে পাই ।

847

3

দীপঙ্কর বসু

ফিটন ও সূর্য রথ

প্রাচীনকালে গ্রীসের একটি অখ্যাত গ্রামে বাস করত ফিটন নামে এক বালক ও তার মা । বন্ধুদের সবারই বাবা আছে কিন্তু ফিটন এর বাবা কোথায় ? ছেলের অনুসন্ধিৎসা দেখে থাকতে না পেরে মা ফিটনকে জানিয়েছিলেন যে সে সূর্যদেব এপোলো তার বাবা । এমনকি প্রায়ই ফীটনকে আকাশে উদীয়মান সূর্যের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বলতেন – “ওই দেখো খোকা , তোমার পিতা এপোলো তাঁর স্বর্ণ রথে চেপে আকাশ পথে চলেছেন” । গর্বে ,আনন্দে ভরে ওঠে বালক ফিটনের বুক – সে এপোলো দেবতার সন্তান ! তার বাবা রোজ স্বর্ণ রথে চেপে আকাশ পথে যাতায়াত করেন !! কথাটা নিজের মধ্যে আর চেপে রাখতে পারেনা সে । খেলার সময়ে সমবয়সী বন্ধুদের কাছে সগর্বে জানায় সে সূর্য পূত্র –স্বয়ং এপোলো তার বাবা। ভেবেছিল সংবাদটা পেয়ে বন্ধুরা তাকে একটা বিশেষ সম্ভ্রমের চোখে দেখবে । কিন্তু আদতে ঘটল উল্টোটাই । গ্রামের ছেলেরা তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপে ফিটনকে উত্যক্ত করতে করতে প্রায় পাগলা করে দিচ্ছিল “এপোলো দেবতা তোর বাবা ? তা হলে উনি তোদের বাড়িতে আসেননা কেন ,তোদের এই রকম দূরবস্থার মধ্যে রেখে দিয়েছেন কেন” ? এ প্রশ্নের জবাব সহজ সরল বালক ফিটনের জানা নেই ,সে বোবা দৃষ্টিতে বন্ধুদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে শুধু । আর বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে । লজ্জায় অপমানে জেরবার হয়ে অবশেষে একদিন ফিটন মনে মনে স্থির করে সে তার বাবার কাছে যাবে ,তাঁর কাছে নিজেদের দূরবস্থার কথা জানাবে এবং তাঁকে অনুরোধ করবে তিনি যেন মায়ের সম্মান রক্ষার্থে অন্তত একবার তাদের গ্রামের বাড়িতে আসেন । ছেলের সিদ্ধান্তে চমকে ওঠেন মা । একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে তাঁর বুক । স্বর্গের দেবতা তাঁর সন্তানকে স্বীকার করবেন তো ? যদি না করেন ছোট্ট ফিটন সেই অস্বীকার এর আঘাতটা সহ্য করতে পারবে তো? কিন্তু ছেলের আগ্রহের আতিশয্য দেখে তাকে নিরস্ত করেননা । ফিটন রওয়ানা হয়ে যায় এপোলোদেবের রাজ প্রাসাদের উদ্দেশ্যে । দীর্ঘ পথ পার হয়ে অবশেষে এক সময়ে ফিটন পৌছে যায় প্রাসাদের সামনে , কারুকার্যখচিত প্রবেশদ্বারপ পেরিয়ে বিশাল রাজ দরবারে পা রাখা মাত্র দরবারে রাজ সিংহাসনে আসীন এপোলো দেবতার মণিমুক্তা খচিত সোনার মুকুটের ঝলকানিতে তার চোখ ঝলসে গেল – প্রায় অন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল ফিটনের । আগন্তুক বালকের দিব্যকান্তি সুগঠিত চেহারাদেখে মুগ্ধ এপোলো আগন্তুকের অসুবিধার কথা বুঝে নিয়ে নিজের মুকুটটি মাথা থেকে খুলে পাশে রেখে ফিটনের কাছে জানতে চান –“কে তুমি বালক ?, কি তোমার পরিচয় ? কি চাও তুমি”? “আমি আপনারই পূত্র হে দেব । আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না পিতা” ? নির্ভীক চিত্তে এপোলোকে উদ্দেশ্য করে বলে ফিটন , সে কোথা থেকে আসছে তার আসার উদ্দেশ্য ,মায়ের কথা সবই জানায় অকপটে । সাদরে সন্তানকে স্বীকার করে নিজের কোলে টেনে নেন এপোলো । বন্ধুদের কাছে ছেলের অপদস্থ হবার কথা শুনে তিনি ছেলেকে আস্বস্ত করেন - যে বন্ধুদের কাছে ছেলের মান রক্ষা করার প্রয়োজনে তিনি সব কিছু করতে প্রস্তুত । ছেলের কাছে জানতে চান “তুমিই বল তুমি কি ভাবে তোমার বন্ধুদের ব্যঙ্গবিদ্রূপের জবাব দিতে চাও ,তুমি যা চাইবে তাইই হবে”। পিতার আশ্বাস পেয়ে এবার ফিটন বলে – “পিতা আমি একদিনের জন্য আপনার সূর্য রথের সওয়ার হয়ে আপনার মত আকাশ প্রদক্ষিণে বেরতে চাই” । চমকে ওঠেন এপোলো । একজন বালকের পক্ষে কি সূর্য রথের সপ্তাশ্বকে বাগে রাখা সম্ভব !! তারা যেমন প্রবল পরাক্রমশালী ,তেমনি বলবান এবং দুরন্তগতি সম্পন্ন । তাদের গতি নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা এক মাত্র তিনি ছাড়া আর কোন দেবতার সাধ্যাতীত ,আর ফিটন তো বালক মাত্র । ফিটন অবিচলিত । অগত্যা নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার খাতিরে এপোলোকে রাজি হতেই হয় ফিটনকে একদিনের জন্য সূর্য রথে চেপে আকাশ পরিক্রমায় বেরোতে । পরের দিন ভোর হবার আগেই ফিটন উঠে বসলেন সূর্য রথে ,হাতে তুলেনিলেন সপ্ত অশ্বের লাগাম । পূত্রকে পরামর্শ দিলেন এপোলো – “খুও বেশি উচ্চতা বা খুব নিচু দিয়ে রথ চালিয়োনা পূত্র । মাঝামাঝি উচ্চতা দিয়ে রথ চালিয়ে নিয়ে যেও” “আপনার আদেশ শিরোধার্য” বলে রথ ছুটিয়ে দিল ফিটন আকাশ প্রদক্ষিনে । কিছুক্ষণ চলার পরই রথের ঘোড়াগুলি বুঝতে পারল আজ তাদের লাগাম এপোলো দেবের হাতে নেই , একটি বালকের ওজনই বা কত টুকু তাই রথ ও অস্বাভাবিক ভাবে দুলছে ,লাফাচ্ছে । তারা ভয় পেয়ে গিয়ে দিশেহারার মত দুর্বার গতিতে ছুটতে শুরু করে দিল । দিগভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে তারা নিচের দিকে চলতে থাকল – ধাক্কা খেল পাহাড়ের চূড়ার সঙ্গে ,তাদের তপ্ত নিশ্বাসে নদী নালা সব শুকিয়ে গেল ,যেন মহা প্রলয় নেমে এল পৃথিবীর পরে । ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল পৃথিবীর সবার মধ্যে আর তখনই সূর্য রথের ঘোড়াগুলি হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে ঊর্ধ্বাকাশে নক্ষত্রলোকের দিকে ছুটে চলল । ত্রস্ত বালকের হাত থেকে ততক্ষণে লাগাম ছেড়ে গেছে । ফিটন প্রানপনে মণে করতে চেষ্টা করল ঘোড়াগুলির নাম ,যাতে তাদের নামধরে ডেকে শান্ত হতে বলতে পারে। নক্ষত্রলোক থেকে নক্ষত্ররাজ জুপিটার লক্ষ্য করলেন সূর্য রথ উন্মাদের মত দূরন্ত গতিতে ধেয়ে আসছে নক্ষত্রলোকের দিকে – সে রথের চালকের আসনে এপোলো র বদলে ভয়বিহ্বল এক বালক । নক্ষত্রলোক সহ গোটা ব্রহ্মান্ডের ধ্বংস আসন্ন বুঝে তিনি মহাশক্তিশালী বজ্র নিক্ষেপ করলেন সূর্য রথকে লক্ষ্য করে । বজ্রের আঘাতে রথ থেকে ছিটকে পড়ল ফিটন – নক্ষত্রপতনের মত তার দেহ দ্রুতগতিতে নেমে এল নিচের দিকে এরিদানুস নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেল তার দেহ । স্তম্ভিত এপোলো এতক্ষণে সম্বিত ফিরে পেয়ে উচ্চৈস্বরে ডাক দেন তার অশ্বগুলিকে । সূর্য রথের অশ্বগুলি প্রভুর কন্ঠস্বর শুনে শান্ত হয়ে ফিরে আসে প্রভুর কাছে । শান্তি নেমে আসে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে ।

773

4

প্রবুদ্ধ

আবার নাগরিক

৪| নোনা দেওয়ালের থেকে যীশু ছলছল চোখে হাত তুলে আশ্বাস দেয় এখনো ------------------ আর্নির সাথে আলাপ শেয়ালদার দিকে ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে গিয়ে| খুবই অ্যামেচার লেভেলে তখন মাঝে মাঝে এরকম খেলতে যেতাম‚ সেসময় ক্লাস ইলেভেনে পড়াশোনা না করলেও চলতো|ওরা থাকতো গোরিস্তান লেনে| থিয়েটার রোড আর পার্ক স্ট্রীটের মাঝখানে একটা গলি| প্রথম আলাপে ওকে "তোরা কি অ্যাঙ্গলো? " জিগ্যেস করায় বলেছিলো‚ কেন রে‚ শুধু ইন্ডিয়ান বলতে পারিস না? এই প্রশ্নের উত্তর ওরা কারোর থেকেই পায়নি| কিন্তু আর্নির সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেলো| ক্লিশে গুলোর দিকে যাচ্ছি না| অঞ্জনদা মেরী অ্যানের মতো চমৎকার একটা গান লিখেও বো ব্যারাকের মতো মিথ্যা একটা ছবি বানিয়েছিলেন| মদ‚ বলড্যান্স‚ পরকীয়া‚ নিজভুমে পরবাসী‚ নাহুম‚ বড়দিন এসবের বাইরে আর্নির মতো অনেক"ওরা" কিন্তু আসলে আমাদের মতই ছিলো| আর্নিও আমাদের মতই বয়সোচিত দুষ্টুমি করতো‚ স্কার্টের নীচে সায়া দেখা যাওয়াকে "সান্ডে ইজ লঙ্গার দ্যান মানডে" বলে ফিচেল হাসতো‚ কোনো মেয়েকে দেখিয়ে হয়তো বলতো‚ কিরকম পটাকা দেখেছিস| আমাদের বাঙ্গাল-ঘটির মতই ওদেরও ব্রিটিশ পুর্বপুরুষ না পোর্তুগীজ পুর্বপুরুষ এই নিয়ে অনেক ইগোর লড়াই হতো| আর্নিদের বাড়ীতে প্রথম প্যাট বুন শুনি| রেকর্ডের কভারে হাই হিল সাদা জুতো কাউবয় হ্যাট আর সাদা জ্যাকেটে সেই মার্লবরো ম্যান বা বম্বে ডায়িং-এর করন কাপুরের মতো ঘোষিত পৌরুষ| আর কি আওয়াজ| কিন্তু এইন'ট দ্যাট শেম এর চেয়ে ওর গসপেলগুলো শুনতে বেশী ভালো লাগতো| এলভিসের দাপটে দ্রুত ফেড হয়ে যেতে যেতে বুন পরের দিকে গসপেলই গইতেন| আর সত্যি বলতে এলভিসের ঐ আইসক্রীম-গলানো আওয়াজে কোনো এক কোমল গ্রীবায় নাক ঘষতে ঘষতে Baby let me be your lovin teddy bear"-এর সামনে কি আর কোনো রোমান্টিক গান পাত্তা পায়| গানটা এরা কিন্তু সত্যি ভালোবাসতো| তা সে ন্যাট কিং কোলের জ্যাজ হোক বা মার্ল হ্যাগার্ডের কান্ট্রি‚ আর্নিদের বাড়ীতেই আমার জন্য এসবের দরজা খুলে যাওয়া| ফ্রী স্কুল স্ট্রীটের ক্যাসেটের দোকানগুলো চলতই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া অ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ানদের বিক্রী করে যাওয়া পুরোনো গানের সম্ভার দিয়ে| ক্লিফ রিচার্ডের প্রতি এদের আলাদা শ্রদ্ধা ছিলো‚ কারণ উনিও এদেশে জন্মেছিলেন (লখ্ণৌতে‚ ওঁর বাবা রেলে ক্যাটারিং করতেন)| নিজের জীবনে ব্যাচেলর বয় এই গায়ক অনেক সুরেলা দুপুর উপহার দিয়েছিলেন আমাকে| আর ক্লাসিক্যালের ভ্যাটিক্যান সিটি তো ছিলই যমুনা সিনেমার সামনে টোনি ব্রগাঞ্জার শপ অ্যারাউন্ড দ্য কর্নারে| পুনরাবৃত্তি হবে তাই থামলাম| ও:, ডীন মার্টিনের সেই যে বালিশে শুয়ে তুমি স্বপ্ন দেখেছিলে সেটা আমায় দিয়ে দাও.... কতো গান কতো গান... ও‚ এই শহরের গ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইতিহাসে অ্যাঙ্গলোদের সেই সব অসাধারণ রান্নাগুলোর অবদান নিয়ে তো একটু বলতেই হয়| দেশী মশলা দিয়ে বিদেশী খানা বানানোর যে ফিউশন তার সাথে পরিচয়ও আর্নিদের বাড়ীতে| কেকটেক ছেড়ে দিলাম‚ মাংসের কোফ্তা আর রোদে শুকনো মাংস দিয়ে ডিংডিং কারি‚ অগর ফিরদৌস বর রু-ই জমীন অস্ত‚ হমীন অস্ত হমীন অস্ত হমীন অস্ত| আর দুটো দক্ষিণী স্টাইল পদ খেয়েছি‚ একটা হলো ঝালফ্রেজী আর অন্যটা পেপার ওয়াটার| প্রথমটা এদেশে বসবাসকারী ব্রিটিশদের রান্নাঘরে তৈরী হতো‚ রাতের বেঁচে যাওয়া নন-ভেজকে লঙ্কা আর মশলা দিয়ে ভেজে ঘন কালো ঝোল‚ ঝালটা মাস্ট| আর পেপার ওয়াটার মানে গোলমরিচ দেওয়া সম্বর| শুধু রান্নার গুণেই নয়‚ পরিবেশনের আন্তরিকতায় এসব খাবারের স্বাদ‚ ঐ যে‚ স্বর্গ যদি কোথাও থাকে তো এখানেই‚ এখানেই‚ এখানেই| ওদের বাড়ীর কাছে জিমি'জ কিচেন বলে একটা ছোটো রেস্তোঁরা ছিলো‚ সেখানে এক সন্ধ্যায় আমরা দুজন বীফস্টেক খেয়ে ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম‚ বার্বিকিউ সসটা ছিলো প্রেমের চেয়েও সুস্বাদু| সেদিনের সেই নিষ্পাপ অর্থহীন বয়েজ টক‚ ঝাল সস খেতে খেতে হুশহাস শব্দ| আমরা কি জোরে জোরে হাসছিলাম| শহরটা তো বদলে যেতে যেতেও রয়ে গেছে‚ সেই সন্ধেটাকেও যত্ন করে রেখে দিয়েছি‚ কিন্তু অঞ্জনদার কালো মেমের মতই আর্নিও আস্তে আস্তে কোথায় হারিয়ে গেলো|

968

35

অরিন্দম

শুধু দু'দিনের জন্য

পর্ব ৫ ঘরে বাইরে আমার সকাল হয় সকালের অনেক আগে। একটু শুয়ে থাকি, গড়াই। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাই। নরম আলো। মোরগের ডাক। সুদীপও উঠে পড়েছে, -চল একটু ঘুরে আসি... এই একটু ঘুরে আসা মানেটা এখন আমি বুঝি। আপ-ডাউন মিলে ১২কিমি হবে। এখন লেগ মাসলগুলো শক্ত হয়েছে, তবুও। নতুন জায়গার আকর্ষণ। সে বড় মারাত্মক। - তুই আগে যাবি? "বড়" সাইন দেখিয়ে, আমার পাঁচ মিনিট লাগবে। - তুই যা। ও গেল। আমি বিছানায় আর একটু আয়েশ। তারপর একটা রাউন্ড দিয়ে নেমে, বাইরে। শহরের সকাল সুন্দর কিন্তু এতটা! আসলে ফাঁকা থাকেনা। চারপাশে উঁচু উঁচু বাড়ি। টুকটাক গাড়ি। এখানে ফাঁকা। চারপাশ। হাত পা ছুঁড়ে সকাল খেলেতে পারে। খেলে। আমরা বেরিয়ে পড়ি। হেলেদুলে... -হ্যাঁরে সুদীপ। চারপাশে এত সবুজ। ফসল তো ভালই হবে, তাও পুরুলিয়া কৃষিপ্রধান নয় কেন? - তুই পড়েছিস তো। বাইদ গেল ফাটো ফুট্যে বহাল গেল ছাতে উঠ্যে... সবচে নীচু ও উর্বর সচ্‌বহাল। তার থেকে উঁচু বহাল। চাষ মন্দ নয়। তারপর কানালি। একেবারে অনুর্বর, বাইদ। আমরা বহালে আছি। -শুধু বহালে নয় গুরু। বহালতবিয়েত বল... আমরা এগোই। কখনও পাশ দিয়ে একজন সাইকেলে গেলে। আবার একটু এগোলাম, দেখছি গরুকে খড় বিচুলি কেটে দিচ্ছে কেউ। কয়েকজন, আঁকাবাঁকা আলপথে ধরে। আসছে। দূরে থেকে রেলের কামরা মনে হয়। আমরা এগোই। একেবারে ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে। নীচু হয়ে দেখি। প্রতিটি পাতায় শিশির, আর প্রতিটি পাতার অগ্রভাগে একটি করে শিশির। ঝুলছে। কানের দুল। অ্যামেজিং। হাঁটছি। অযোধ্যা মোড় পেরিয়ে এক জায়গায় দেখি লেখা, প্যারামেডিক্যাল কোর্সে ভর্তি চলছে। বুঝুন। এই কোর্সটাই ফালতু! তবুও রমরম করে। ব্লক অফিসের পাশেই। ১-২জন এম বি বি এস। তারা একরকমভাবে মারে। মারছে। বাকীরা এই হাঁতুড়ে। ঝটপট শেষ করে দেয়। এই হ'ল আমার দেশের গ্রামের বর্তমান। ও ভবিষ্যত। রাস্তা ধরে এগোই। এখানে গাড়ি চলে। একটা সাপ থাৎলানো। দুটো ছেলে বেড়াচাঁপার কাঠি দিয়ে ওটাকে তুলে নমস্কার করল...অদ্ভুত। আমরা এগিয়ে গেলাম। সুদীপ বলল, দেখলি। - হ্যাঁ। এখানে আসা থেকে দেখছি খুব মনসা ঠাকুর তৈরী হচ্ছে। - এইসময় এদের ক্ষেতে খুব কাজ নেই। ধান দাঁড়িয়ে গেছে। হতে হতে অক্টোবর নভেম্বর। এখন এই পুজো নিয়ে মেতে আছে। মনসা পুজো চলবে সারা মাস ধরে। আমরা হাঁটছি। একটা ট্রেকার বেরিয়ে গেল। পুরুলিয়া যাচ্ছে। লোকজন ঠাসা। চায়ের দোকানে উনুনে সবে আচ। হাল্কা ধুঁয়ো। আমরা হাঁট্ছি। হঠাৎ একটা ঘরের দেওয়ালে চোখ পড়ল, দু'জনেই হাসছি, দুজনেই - ওরে ন্না। টোট্যাল। ছবি'ত তুলতেই হবে। দেওয়ালে লেখা ও ছবি- "চিন্তাশীল হোন, মাতাল নয় মুক্তমনা হোন, বোতলবন্দী নয়।" একটু হেঁটে একটা কার্লভাটের ওপর বসলাম। সেই সকালে বেশ ঘামছি, অথচ ভাল লাগছে। দুজনে বসে আছি। সুদীপ বাঁশি বাজাচ্ছে, "প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন..." আমি পাশে । বসে আছি। আমার সকল নিয়ে। একটা জীবন। একটাই। অথ্চ বলার মতন কিছু নেই। জন্মানো, বড় হওয়া, চাকরি, সন্তান, প্রতিপালন, এল আই সি। পেনশান। অপেক্ষা। চোখে তুলসী। বল হরি হরি বোল। না সুনীল। না পিনাকী। অবশ্য ফেসবুকে ৩৫টা লাইক। লেখক। হো হো, বাঙালি যত কেরানী তত লেখক। ঘরেঘরে। এসবই ক্ষণিকের। উঠে পড়ি। হাঁটি। কিছুটা এগোতে একটা কান্ড ঘটল। আমরা হাঁট্ছি। একটা লোক ষন্ডা চেহারা, নিম দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছে। কাছে যেতেই, - কোত্থেকে? আমরা দাঁড়ালাম। আবার, কোত্থেকে...? সুদীপ এগোল। আমি পিছনে। আবার সেই প্রশ্ন। সুদীপ বলল, ছবি তুলছি। - বলি কোত্থেকে? আমি দেখছি সুদীপের চোয়াল শক্ত হচ্ছ। -কেন বলুনতো? কী দরকার? আমি পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলছি, আরে বলে দেনা কলকাতা থেকে, ঘুরতে...কী দরকার... সুদীপ নাছোড় ও ব্যাটাও... শেষে সুদীপ অমরদা টিচার, ঝুমুর গায়ক, বুধুরাম, যাত্রা। ওর গাঁয়ের দু একজন এবং অবশেষে পিনাকীর নাম। কর্ণের কবচকুন্ডল... লোকটা হেসে- হ। অর্থাৎ তার মানে যা দাঁড়ায় আরে দাদা আগে বলবেন তো, আপনি আমাদেরই লোক। আমরা এগোই। সুদীপ বলে, এই লোকটাকে দেখলি হতে পারে সাধারন গ্রামবাসী বা পুলিশের খোচর। নতুন লোক দেখেছে তাই সন্দেহ। আসলে অশান্তি কেউ চায়না। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। তবুও। ম্যান মেড। অনেকটা চষে ফেলেছি কিন্তু নজরে আসেনি হুমকি পোস্টার। স্টার আনন্দ পেয়েছে। হয়ত আছে। -সুদীপ একটা মিনিমাম লেবেলে উন্নতি হয়েছে। এই সকালে সেইভাবে কিন্তু কাউকে দেখছিনা দল বেঁচে আলের ওপর এদিকে ওদিকে অ্যা করতে। - হ্যাঁ। হয়েছে। কিছু কাজ। দু একজনকে দেখবি তবে সেটা স্বভাব। - অনেকটা ধুমপায়ীদের মতন, সকালের সুখটান না দিলে হয়না। - ঠিক। কাজ হয়েছে কিছু কিছু। তবে অনেক বাকী। এই '১৬র আগে দেখবি রাজ্য জুড়ে ১২টা কলেজ খুলবে। ১০০ দিনের কাজ। কন্যাশ্রী। উপকৃত হয়েছে অনেকে। - তারমানে আরও পাঁচ বছর। নীল হাওয়াই। হাওয়া হাওয়াই হল'না। এইরকমই। টুকটাক গল্প। ছবি-টবি। দোকানে বসে দু-কাপ চা-নিমকি। ফিরতে থাকা। ফিরে আসা। ঝলমলে রোদ। পিনাকী আর ধর্মেন্দ্র এসে গেল বাইক নিয়ে। আবার । চাকা ঘুরল। পিনাকীর পিছনে সুদীপ। ধর্মেন্দ্র পিছনে আমি। চাড়িদা পেরোতেই। দুপাশে ধান ক্ষেত। ডান দিকে অযোধ্যা পাহাড়। মাখনের মতন রাস্তা। উড়ে চলেছি। ডাভা। তেরাং পার হলাম। দুপাশে শালের জঙ্গল। তারপর পলাশ। আবার শাল। শাল-পলাশ। বুরদা। বড় গ্রাম। গ্রাম মানেই গরু ছাগলের রঙবাজি। প্রভু দয়া করো দীনজনে, একটু যেতে দাও। পাশ কাটিয়ে। এরপর শুরু হ'ল লাল মাটির রাস্তা। ধুলো উড়ছে। শালপাতা বোঝাই করে কেউ কেউ। কেউ কেউ কাস্তে নিয়ে। রাস্তা শেষ হতেই হট করে চোখের সামনে দিগন্ত খোলা সবুজ প্রান্তর। হাত বাড়ালেই পাহাড়। দূর থেকে জলের শব্দ। এত সবুজ! ক্লিক ক্লিক ক্লিক। তবুও ভরিল না চিত্ত। বারবার। আস্তে আস্তে পায়ে চলার সরু পথ দিয়ে ড্যামের ওপর। কয়েরাবেড়া। চারদিকে পাহাড়। মাঝখানে লেক। একদিকে ড্যাম থেকে জল গড়াচ্ছে। সাদা ফেনা। মনমাতাল। দূরে পাহাড়ের কোলে কয়েকটা ছোট ছোট কটেজ। গর্ভমেন্টের ট্যুরিস্ট লজ তৈরী হচ্ছে। উফফ। বারে বারে মুখ থেকে এই, উফ্ফ্‌ কী জায়গা! লোকে খরচা করে নৈনিতাল, ভীমতাল, সাততাল, তালে তাল দেখতে যায়, অথ্চ হাতের কাছে। পা বাড়ালেই। রোদ্দুরে চিৎ হয়ে সবুজ ঘাসে শুয়ে শুয়ে। আকাশ। পাশ ফিরলে জল। এইরকম জায়গায় সম্ভব একটু না খেলে, অগত্যা তিন ঢোক। চাকা ঘোরে সারজুমাতু, সুইসা, কান্দা। ধর্মেন্দ্রর গলায় কিশোর। পর পর। গাতা রহে..., পল পল, অশা ছিল... - আরে ধর্মেন্দ্র তুমি'ত ভাল গান কর। ফাংশান করো? - কী যে বলেন দাদা! মনের খুশিতে গাই। কিশোরকুমার গুরু... যেতে যেতে দেখি গুলি খেলছে। বাচ্চারা। সেই খেলা। দূর থেকে ছোঁড়া। পিলের কাছে যে সে আগে মারবে। পিল হলে এবার অন্যকে হিট। ছোট বড় মাঝারি গুলি। চুনি আছে। স্মৃতিতে কারেন্ট। একটা সময় কত খেলতাম। সাফসুফ, নট সাফসুফ। পকেট ভর্তি গুলি। ঝনঝন... চাকা ঘোরে। কালিমাটী মোড়। একটু নাস্তা। আলুর বড়া, ঘুগনি, ডিম ভাজা। হাল্কা বৃষ্টি এল। বাইকে। এই'ত জীবন কালীদা। এসে নামলাম আনন্দমার্গ পরিচালিত একটি আবাসিক স্কুলে। কলরব শিশুদের। ওদের খুশি দেখে কোথাও নিজেই একটু হোঁচট খাই। প্রর্থনা ঘর একটি। বাকী চারটে হোস্টেলের ঘর। বড় বড় টিনের স্যুটকেস। না ওগুলোকে ট্রাঙ্ক বলতাম। কাঠের তক্তাপোষ। তার ওপর গোটানো বিছানা। অনেকদিন পর দেখলাম এইরকম টিনের ট্রাঙ্ক। ঠাকুমার ছিল একটা। খাটের নীচে। আচার, আমসত্ব, নকুলদানা। টুকুটাকি ছেঁড়া কাপড়। হলদে ঘ্ষা ছবি, ভাঙা ফ্রেমে। গুপ্তধন! এইখানে তৈরী হয়, আগামীদিনের ছো শিল্পী। সুদীপ ওদের সঙ্গে বসে গল্প করে, আমি ঘুরি। প্রস্তুতি দেখি। কী বডি ফিটনেশ। এয়ারে ভল্ট খায়। সেখান থেকে এবার ফেরা। মাঝপথে পীনাকির বাইক পাংচার। একেবারে শাল পলাশের জঙ্গলের ভিতর। একটু নামি। টুকটাক কথা। পিনাকী বলে ফেব্রুয়ারী মার্চ এলে চারপাশে শুধু লাল দেখবেন। ভাগ্যিস পলাশ ছিল নইলে এখন লাল কোথায়!(মনে মনে) জোরে বলি, পিনাকী এখানে হলুদ পলাশ নেই? - না দাদা। - আরে কী কান্ড। সল্ট্লেকে করুণাময়ী থেকে বৈশাখী লালের পাশে হলুদ। - একটা বীজ যোগাড় করে রাখবেন। শিমের মতন। আমি'ত যাই দাদার অফিসে(সুদীপকে দেখিয়ে) নিয়ে আসব। একটু আনন্দ। হু হু বাবা। পলাশ বরণ উৎসবে আমরা পিছিয়ে নেই। পিনাকীর গাড়ি সারাতে সময় লাগবে, তাই ওর কথামতো ধর্মেন্দ্র আমাদের দুজনকে নিয়ে চাড়িদার দিকে এগিয়ে যায়। সুদীপের বইতে রামপদ কালিন্দীর ছবি ও গল্প পড়েছি। বলা ছিল ওর ঢোল আর গনেশ বন্দনা শুনব। ধর্মেন্দ্র ডেকে আনতে গেল, যাওয়ার পথে বলে গেল দাদা স্টকে আছে'ত "একটু" রামাপদ পেলে খুশি হবে। - স্টক প্রচুর তুমি চিন্তা করোনা। রামপদ কালিন্দী আসে ঢোল নিয়ে। স্কুলের বারান্দায় পাশাপাশি বসি। হাতে মুখে উল্কি। কুঁচকানো চামড়ার। মলিন পোষাক কিন্তু একমুখ হাসি। দেশ বিদেশের গল্প। ঢোল বাজাতে রামপদ প্যারিস, হল্যান্ড, জার্মান গিয়েছেন। মাসখানেক ছিলেন। তবুও রামপদ এখনও বিপিএল-এর আওতায়। "তা কেটে, ধা কেটে" মুখের বোলের সঙ্গে ঢোল বেজে ওঠে... পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার কথা মনে আসে- ঐ লাচই হইল্য। সত্যি। রামপদর সঙ্গে গল্প করি। ও বলে, দেখি, অশায় আছি, সরকার যদি... আমরা গল্প করি। আমি বলি, এমা আপনার জন্য বানিয়ে আনলাম, আর আপনিতো মুখে দিলেন না। ওর সংকোচ স্পষ্ট। -আরে লজ্জার কী! এই'ত আমিও খাচ্ছি। খান। বিদেশে গিয়ে খেতেন না? - না বাবা উসব কী জিনিস খেলে কী হবে... নিশ্চিত না হলেও ধরে নিতে পারি রামপদ, কমলকুমার পড়েনি। অথচ খলাসিটোলার প্রিন্সের বাণী মনে রেখেছে, "বিজাতীয় জিনিস ছুঁয়ো না, সামলাতে পারবে না। যা ধর্মে সয় তাই বরণীয়" বারেবারে আমার সঙ্গে। একই সঙ্গে মদ্যপানে কুন্ঠা। হাত জড়ো করা বসা। রামপদ একজন শিল্পী তাও... দুনিয়া মে রাজ করে গা প্যায়সা(রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান) রামপদ রাজু নয়। রাজু, শাহরুখ খান। সিনেমা। মেগাস্টার। কলকাতার ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডর। এরপর স্নানটান সেরে। সেই হোটেল টাটা। আমি-সুদীপ-পিনাকী-ধর্মেন্দ্র। একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া। গল্প। ফিরে এসে। একটু হেঁটে ROSE-এর পিছনে পদ্মপুকুরের ধারে বসে ল্যাদ। আহা!। সামনে পুকুর ভর্তি সাদা পদ্ম। তারপর মাঠ। সবুজ। তারপর সবুজ অযোধ্যা পাহাড়। কী জায়গা! আহারে! এই সুন্দর স্থির। অচঞ্চল। এ সুন্দরের চিরস্থায়ী বসন্ত। কিন্তু সময় চঞ্চল। উঠতে হ'ল। বিকেলে গাড়ি বলা ছিল। আর কী! বরাভুমে নামলাম। ঠিক সাতটা পাঁচে হাওড়া চক্রধরপুর নড়ে উঠল... ভোর ৪টে ১০। হাওড়া। -মা এসে গেছি। - ট্যাক্সি পেয়েছিস তো? শরীর ঠিক আছে? ঘুম ভাঙে আমার শহরের। আমার ঘুম ঘুম পায়... এই'ত, "শুধু দু'দিনের জন্য ঘর ছেড়ে বাহিরে বেরুনো দু'দিনের জন্যে শুধু ঘর ছেড়ে পথের উপর- বনের ভিতর বাংলো, বাংলো থেকে দেখা যায় নীচে কাকচক্ষু জলস্রোত ভেসে আছে নদীর পিরিচে দু'ধার উধাও ঐ জঙ্গলের পাহাড়ের দিকে দু'ধার নেমেছে নীচে রমনীর ঊরুর মতন সানুদেশে, উপত্যকা জুড়ে এক দৃশ্যের সুষমা দু'দিনের জন্য টানে, চিরদিন নয়! চিরদিন ঘরে থাকা, পরে থাকা অন্তরে, গভীরে...( শুধু দু'দিনের জন্য, যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো, শক্তি চট্টোপাধ্যায়) (সমপ্ত)

1250

38