Ranjan Roy

আহিরণ নদী সব জানেঃ রঞ্জন রায়

) ‘রঙ পিচকারি, সন্মুখ মারি, ভিগি আঙিয়া, অউর ভিগি শাড়ি’ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সহজ হলেও এতদিনের আড়ষ্টতা কি সহজে কাটে? তবু ভেবেছিল হোলিতে এবার দিন দুইয়ের ছুটি নিয়ে ভিলাই যাবে। কিন্তু ভেতর থেকে কোন উৎসাহ পাচ্ছে না রূপেশ। আসলে ওর চাকরি পাকা হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে একটা বিয়ে বিয়ে হাওয়া উঠেছে। মায়ের চিঠিতে ইঙ্গিত স্পষ্ট, বড়ী ভাবীর কোন মাসতুতো বোন নাকি খুব গুণের মেয়ে, রূপে গুণে অপ্সরী ও বিদ্যাধরী। আবার ভিলাইনগরের সিরিয়ান ক্রিশ্চানদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হোলি ক্রস থেকে পাশ করে গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে মাইক্রো-বায়োলজি নিয়ে মাস্টার্স করেছে। আবার ভাতখন্ডে সংগীত মহাবিদ্যালয় থেকে তিনবছর গান শিখেছে। তা বেশ, কিন্তু অমন গুণবতী কন্যে এই অজ আদিবাসী বহুল পাড়াগাঁয়ে কেন আসবে রূপেশ ভেবে পায় না। তবে মাতারাম জানিয়েছেন যে ওই পরিবারের মেয়ে সব জায়গায় মানিয়ে নিতে পারবে। অমনই ট্রেনিং পেয়ে বড় হয়েছে, তাছাড়া আজ নয় কাল ছেলের প্রমোশন হবে , তখন নিশ্চয় কোন শহর বা মহকুমা সদরে ওর ট্রান্সফার হবে, গ্রামীণ ব্যাংক বলে কি সারাজীবন বনবাসে কাটাতে হবে? তাই হোলিতে দু’দিন ছুটি নিয়ে ঘরে আসলে দু’পক্ষেই ভাল রকম দেখাশোনা হতে পারে । আর এই সম্ভাবনাকেই ভয়। মেয়েটিকে ঠকানো ! কী করে একটি অচেনা মেয়েকে প্রথম দেখাতেই বলবে যে ও যেখানে চাকরি করে সেখানে ব্যাংকের কোয়ার্টারে কোন সেপটিক ট্যাংক নেই , আধুনিক কিচেন নেই , রান্না হয় কেরোসিনের জনতা স্টোভে? সামনের রাস্তাটিতে নুড়ি পাথর বিছানো, স্নান করতে হবে দোতলার পেছনের বারান্দায় পর্দা টাঙিয়ে, রাস্তায় বেরোলে দশজোড়া চোখ এমন হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে যেন কোন মাদারির ভালুক অথবা বহুরূপীর সঙ দেখছে। পেছন থেকে মহিলাদের ছুঁড়ে দেওয়া কমেন্ট ভেসে আসবে , ‘কেইসন বেশরম অউরত! মুড় নাহি ঢাকে ও?’ কেমন মেয়েছেলে গো, লাজ-লজ্জার বালাই নেই ? মাথায় ঘোমটা নেই গো! মেয়েটির জন্যে কোন সিনেমা হল নেই , ইংরেজি পত্রিকা নেই , সারাদিন ওপর তলায় বন্দী হয়ে থাকতে হবে? আলাপ করার মত কাউকে পাওয়া যাবে না । একটা ট্রানজিস্টর রেডিও আছে গান ও খবর শোনার জন্যে, আর বিয়ের কথা শুরু হতেই রূপেশ টি ই বিলের পয়সা জমিয়ে একটা প্যানাসোনিক টেপ রেকর্ডার কিনেছে; কেন? তা নিজেই জানে না । রোজ রোজ বাজার হাট হবে না । তবে উইক এন্ডে বাসে বা মোটর বাইকে স্বামীর পেছনে বসে কোরবায় মালগুদামের মত সিনেমাহলে ভ্যাপসা গন্ধওলা সীটে বসে সিনেমা দেখে কোন রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে গাঁয়ে ফেরা যেতে পারে । রূপেশের রকম সকম দেখে নতুন জয়েন করা ফিল্ড অফিসার ভগতরাম ধৃতলহরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল—স্যার, হোলিতে বাড়ি যাবেন না ? --ভাবছি; কিছু কাজ পেন্ডিং আছে। -- আরে কাজ তো সারাজীবনই থাকবে; একটা শেষ হলে আরেকটা। ওর কি শেষ আছে? কিন্তু আগের দিন সন্ধ্যেয় হোলিকা দহন করে সকাল বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে এ’পাড়া ও’পাড়া বে’পাড়া সে’পাড়া করা, হাসিমুখে গাল পাড়া ও গাল শোনা –এর মজাই আলাদা! রূপেশ হেসে ফেলে। বিলাসপুরের চাটাপাড়া, জুনি লাইন, তিলক নগর, সাত্তাইশ খোলি, তারবাহার –এ’সব জায়গায় রঙ মেখে সাইকেলে চেপে দল বেঁধে হো-হো করে ঘুরে বেড়ানো, লালাপড়ায় যোগেশ শ্রীবাস্তবের বাড়িতে ভাঙের পকোড়া এবং হুইস্কির অবাধ আচমন; আর একটা টুলের ওপর অ্যামপ্লিফায়ারের বাক্স বসিয়ে বাজারচলতি হিন্দি গানের সঙ্গে ধিড়িং ধিড়িং নাচা এসব দশ বছর আগেও করেছে। কোন পঁহুচা হুয়া বন্ধু হয়ত ধরতাই দেবে —‘লালাজি কা লাল গাঁড় পিত্তল কা পৌয়া’, এরা সঙ্গে সঙ্গে কোরাসে চেঁচিয়ে উঠবে—‘লালা জহাঁ গাঁড় মারাবে তহাঁ নাচে কৌয়া।‘ সেই পরীক্ষা হলে মোবাইল স্কোয়াডের টুকলি ধরার ঘটনার পর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক ‘কাচ্চি’ হয়ে গেছে। তবু কোন কোন হোলিতে বাড়ি গেছে। রঙে অ্যালার্জির অজুহাতে খেলা এড়িয়ে বাবাপ-মাকে দাদা- বৌদিকে প্রণাম সেরে ঘরে বই পড়ে আর রেডিওতে বিবিধ ভারতী শুনে নমো নমো করে ছুটির দিনটা কাটিয়ে দিয়েছে। এবার জুটেছে নতুন ফ্যাকড়া। বৌদির ভগিনীটি ও তাহার মাতা ঠাকুরাণীর একান্ত ইচ্ছা প্রস্তাব অধিক অগ্রসর হইবার পূর্বে পাত্র-পাত্রীর চারিচক্ষের মিলন, আলাপচারিতা ইত্যাদি হঊক। আজকাল কী পড়িলিখি লড়কী। খুদ নাপতোল কে দেখনা চাহতী হ্যাঁয়—ছেলেটা ঠিক কতটা গেঁয়ো , আর ছেলের মুখ থেকে শুনে বুঝে নিতে চায় ছুরিকলাঁ গ্রাম ঠিক কত অজ পাড়া গাঁ! রূপেশের পিত্তি চলে যায়। ঠিক করে ফেলে হোলির সময় এখানেই থাকবে। মেয়েপক্ষ জোরাজুরি করলে পরে কোন উইক এন্ডে, সে দেখা যাবে’খন। হোলিকা দহন অথবা একদিন আগে ‘হোলিকা’ রাক্ষসীকে পুড়িয়ে মারার অনুষ্ঠানের দিন ও সবাইকে তিন ঘন্টা আগে ছেড়ে দিল। সূর্য ডুবলেই বাসের সংখ্যা কমে যায়, কারণ বিভিন্ন মোড়ে নির্জন পথের বাঁকে খালের ধারে বাসরাস্তায় কে বা কাহারা বোল্ডার দিয়ে ব্যারিকেড করে বাসের রাস্তা আটকে দেয় । ড্রাইভার কন্ডাকটর খালাসী ও যাত্রীরা মিলে ‘দম লগা কে হেঁইসা’ করে পাথর সরায়। কোথা থেকে ছুটে আসে ঢিল। এই খেলাটা বহু দশক ধরে পরম্পরা অথবা রীতি-রেওয়াজের নামে সবার গা সওয়া হয়ে গেছে। তাই ঘরে ফেরা সরকারি কর্মচারির দল সন্ধ্যের আগেই ঘরে ফিরতে চায়। তবে ছুরি গাঁয়ের সরকারি চাকরিজীবিদের আরও একটা তাড়া আছে। প্রতি বছর এই রাতে কয়েকজন সরকারি কর্মচারিদের বন্ধ দরজার সামনে ‘মটকি ফোঁড়’ খেলা হয়। অর্থাৎ একটা মাটির হাঁড়ি ওদের বারান্দায় আছড়ে ফেলে ক’জন দুদ্দাড় করে ছুটে পালায়। আর ভাঙা হাঁড়ি থেকে গড়িয়ে পরে থকথকে হলদে পূতিগন্ধময় আবর্জনা, যা কয়েকদিন ধরে এই উপলক্ষে জমিয়ে রাখা ছিল। এ নিয়ে নালিশ করে লাভ নেই । সবাই বলবে—‘বুরা না মানো, হোলি হ্যাঁয়’। গত দুই বছরে রূপেশ ছাড় পেয়েছে, কারণ ও ব্যাচেলর! কিন্তু ঠুল্লু এসে বিকেলের চা দেবার সময় জানিয়ে গেল, কানাঘুষোয় শুনছে এবার ছাড়া নাও পেতে পারে। --সাহাব, আজ রাত বারো বাজে তক জাগতে রহনা, অউ বারান্দা কী বাত্তি রাতভর জ্বলনে দীজিয়ে। সকালে ঠুল্লুর দরজা খটখটানোয় ঘুম ভাঙে। ও কলিং বেল বাজায় না । রূপেশেরই বারণ; এর আওয়াজটা বিচ্ছিরি, ঠাস ঠাস! বুকে এসে লাগে। নাঃ , রাতটা ভালোয় ভালোয় উতরেছে; এবারেও ছাড়। কিন্তু সকাল ন’টা দশটা নাগাদ রঙ খেলার দল বেরিয়ে পড়বে, মিছিল করে নাচতে গাইতে। ঠুল্লু চা-জলখাবার দিয়ে একঘন্টার মধ্যে ভাতে-ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ ও ডিমের ঝোল রেঁধে ফেলে। যাবার আগে বলে যতই দরজা বন্ধ করে রাখুন, ইয়ার-দোস্ত এলে খুলতেই হয়। ধরুন, যদি রামখিলাওন, গিরীশ, সদনলাল, কুমারসাহেব এরা এসে ডাকতে থাকেন? তাই একটা পুরনো কুর্তা আর পাজামা পরে রেডি হয়ে থাকুন। আজ সবার সঙ্গে মিলিয়ে মিছিলে হাঁটুন, রঙ মাখান, রঙ লাগান। তারপর সবাই মিলে বড়া তালাওয়ে বেলা একটা নাগাদ ডুবকি লাগিয়ে সাফ সুতরো হয়ে নেবেন। যদি ভাঙ খাবার ইচ্ছে থাকে তো আমাকে বলবেন, সদনলালের ঘরে ভাঙের শরবত , ভাঙের পকৌড়া –সব বন্দোবস্ত হয়েছে। আর পকেটে রাখুন লাল গুলালের এই ছোট্ট প্যাকেটটি—জোশী মহারাজ মন্ত্র পড়ে শোধন করে দিয়েছেন, আপনার এলার্জি হবে না ঘন্টাদুই পরে গাঁয়ের সদর রাস্তা দিয়ে হোলির মিছিলের চলা শুরু হল। কে নেই তাতে? সদনলাল, রামখিলাওন, দুই বিদুষক ঠিবু ও রসেলু, পান ঠেলার ইতোয়ারু, আয়ুর্বেদিক ডাক্তার জৈন, স্কুলের দুই গুরুজি ধীরহে স্যার ও মিশ্রজি- সবাই চলেছে নাচতে গাইতে। মাঝে মাঝে হররা উঠছে , হোলি হ্যাঁয়, হোলি হ্যাঁয়। হ্যাঁ রে বাবা! সবাই জানে আজ হোলি, এত বলার কী আছে? রূপেশ কী একটু বিরক্ত হচ্ছে! ও কি ইদানীং একটু বুড়োটে হয়ে পড়েছে? সদনলাল ইতিমধ্যেই বেশ ক’পাত্তর চড়িয়েছে । ও এক ডিগ্রি গলা চড়িয়ে শূন্যে ঘুষি ছুঁড়ে বলছে – মা কসম, আজ হোলি হ্যাঁয়। সেই শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ছে মিছিলের ছেলে বুড়ো। ভিড়ের থেকে এগিয়ে এসেছে একটি ছেলে। তার হাতে একটি আধখানা আলুর টুকরো। সে এসে রূপেশের বুকে স্ট্যাম্প মারার মত করে টুকরোটা চেপে দেয় । তাতে কিছু লেখা, রূপেশ পড়ার চেষ্টা করে। ভিড়ের মধ্যে গর্জন উঠে—চোদা লে! রূপেশ চমকে ওঠে, হাসির হররার মধ্যে ডাক্তার জৈন বলেন—এ হে হে! একদম গ্রামীণ ব্যাংক কা স্ট্যাম্প লগ গয়া। কিউঁ ম্যানেজার সাহাব। অপ্রস্তুত রূপেশ বুঝতে পারে যে ওই প্রাকৃত শব্দযুগ্ম ওর জামার বুকে লেগে আছে। ছেলেটিকে চিনতে পারে-- ডাক্তার জৈনের ছেলে, বিলাসপুরের কলেজে পড়ে । গতমাসে ‘শিক্ষিত বেরোজগার’ স্কিমের নাম করে পঞ্চাশ হাজার লোন চাইতে এসেছিল; খালি হাতে ফিরে গেছে। মিছিল এগিয়ে চলে, এবার সহিস মহল্লা হয়ে বাজারের দিকে। রাস্তার দুদিকের বারান্দায় মেয়েরা এসে ভিড় করে হাসিমুখে মিছিল দেখছে। তবে এই গাঁয়ে নারীপুরুষের প্রকাশ্যে রঙ খেলার চলন নেই । একটা হট্টগোল। সহিস মহল্লার পাশে একটা এক কামরার টালির ঘর থেকে ঘাসীরাম আগরওয়াল ও ঠিবু টেনে বের করছে এক পাকাচুল ষাটের ঘর ছোঁয়া বুড়োকে। সাদা খাদির কুর্তা ও একই কাপড়ের পাজামা পরা মানুষটি লজ্জা ও সংকোচে নুয়ে পড়েছেন। একটু তোতলা এই ভদ্রলোক স্থানীয় মানুষ ন’ন। দু’বছর হল এখানে একটি হাতকর্ঘা সঙ্ঘের ছোট্ট বিপণি খুলেছে, উনি তার প্রতিনিধি এবং একমেবাদ্বিতীয়ম সেলসম্যান। ব্যাংকে জমাখাতা খোলার সুবাদে রূপেশ জানতে পেরেছে উনি গোয়ালিয়রের অধিবাসী। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোন ঝামেলা হওয়ায় চাকরিটা যেতে বসেছিল। শেষে কিছু পলিটিক্যাল মুরুব্বি ধরায় চাকরি যায় নি, তবে ঝাঁসি থেকে একহাজার কিলোমিটার দূরে এই আদিবাসী এলাকায় আসতে হয়েছে। রূপেশ টের পেয়েছে যে ওঁর বিক্রিবাটার হিসাব-কিতাব পাকা ও সাফ সুতরা নয়। কিন্তু রূপেশ কী করতে পারে , গোটা দুনিয়ার ভালোমন্দের বোঝা কি ওর কাঁধেই ভগবান চাপিয়েছেন? না ; এত অহংকার ভাল নয়। আর উনি একটু লক্ষ্মীট্যারা। এই নিয়ে গাঁয়ের স্কুলে দু’পাতা পড়া ছেলে ছোকরার দল ওঁর নাম দিয়েছে ‘ লুকিং লণ্ডন, টকিং টোকিও’। কিন্তু ঘাসীরাম সদনলাল এদের উৎসাহের পেছনে অন্য কারণ। সামান্য আয়ের এই মানুষটি দেশের বাড়িতে যান বছরে একবার , দীপাবলীর সময়। এখানে গাঁয়ের সমাজ ওকে আপন করে নেয় নি; পরদেশি ছাপ লাগিয়েই ছেড়েছে। এই বয়েসে হাত পুড়িয়ে খেতে ইচ্ছে করে না । তাই এখানকার নীরস জীবনে একটু খানি মাধুর্‍্যের ছোঁয়া পেতে উনি চুড়ি পরিয়ে ঘরে তুলেছেন একটি জোয়ান মেয়েছেলেকে; সহিস মহল্লার। একে এখানে বলা হয় ‘চুড়িহাই পত্নী’। তবে এর জন্যে সমাজের বৈঠক ডেকে মেয়ের বাপ-মাকে মোটা টাকা ফি দিতে হয়েছে। তবে মেয়েটির বয়েস তিরিশেরও কম। সবাই হাসে; বলে – বুড়ো দাদু নাতনিকে বে করেছে। কিন্তু সেদিন মেয়েটি আবদার ধরল যে ওকে একটা ট্রাঞ্জিস্টার কিনে দিতে হবে, নইলে ও ফিরে যাবে। ভদ্রলোক, অর্থাৎ পেন্ডারকরজি মেয়ের বাপ-মার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে শেষে মাসিক কিস্তিতে একটা এনে দিলেন। সেটাই কাল হল। রেডিও পেয়ে ওর ফুর্তি গড়ের মাঠ। সন্ধ্যে বেলা হস্তকর্ঘা শিল্পের, মানে হ্যান্ডলুমে তৈরি জামাকাপড়ের দোকান বন্ধ করে উনি ঘরে ফিরে দেখলেন যে ওনার দু’বোতল মহুয়া ফাগনী বাঈ একাই মেরে দিয়ে টুন হয়ে আছে। ভাতের হাঁড়ি বাড়ন্ত, উনুনে জল ঢালা। রাগের চোটে মুখ দিয়ে কথা বেরোল না । তোতলাতে তোতলাতে এসবের মানে কি জিজ্ঞেস করায় ফাগনী বাঈ ওঁর থুতনি নেড়ে গেয়ে উঠল—‘লারে লাপ্পা, লারে লাপ্পা, লাই রাখদা”! পেন্ডারকর বুড়ো হলে কী হবে, পুরুষ বটেন! তাই নেভা উনুনের চ্যালাকাঠ তুলে মেয়েটাকে বেধড়ক পেটালেন। ফল ভাল হল না । হাজার হোক, উনি পরদেশি আর ফাগনী বাঈ ছোটজাত হলেও এই গাঁয়েরই মেয়ে। ও রেডিও কাঁধে ঝুলিয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করল। সে রাতেই জাতি পঞ্চায়েতের বৈঠক বসল। আর পেন্ডারকরকে ৫০০ টাকা জরিমানা করল। উনি ব্রাহ্মণ, নইলে নিঘঘাৎ মার খেতেন। পুরো ব্যাপারটা গাঁয়ে জানাজানি হয়ে গেলে যত আমোদগেঁড়ে তামাশবীন ওঁকে কাকের পালে ফেঁসে যাওয়া শালিকছানার মত সময়ে অসময়ে ঠোকরাতে লাগল। তবে রূপেশ ওঁর অন্য একটি পরিচয় ও জানে। ভদ্রলোক অসাধারণ সুরে গান গাইতে জানেন। তখন একেবারে তোতলাতে হয় না। হোলির একপক্ষ আগে থেকে যখন ছেলে ছোকরার দল সকাল বিকেল নাগাড়া বাজিয়ে বেসুরো গলায় চিৎকার করে ‘ফাগ’ (হোলি বিষয়ক লোকসংগীত) গাইতে থাকে, তখন উনি এক সন্ধ্যায় ইমন ও ছায়ানটে উত্তর ভারতের লোকসংগীত এবং বিহারের চৈত্রমাসের গান ‘চৈতা’ এবং ‘চৈতি’ গেয়ে রূপেশের মনমেজাজ একদম ‘গার্ডেন- গার্ডেন’ করে দিয়েছিলেন। ওঁর হেনস্থা সহ্য করতে না পেরে রূপেশ বলে – আরে আপনি চলুন আমাদের সঙ্গে, কোন সংকোচ করবেন না । আমাদের হোলির গান শুনিয়ে মাহোল উমদা করে দেবেন। সবাই অবাক। এই ঘাটের মড়া বুড়ো হাবড়া গান গাইতেও জানে? খালি মেয়েবাজি নয়? ঠিক আছে, ম্যানেজার সাহাব যখন নিজে বলছেন। উনি রূপেশের দিকে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে হেসে তুতলে তুতলে বললেন—তাহলে একটু পেট্রল ভরে নিই? হাসির হররার মাঝে মিছিল দাঁড়িয়ে পড়ে । উনি মাথা নীচু করে একটি ঝোপড়ার মধ্যে ঢুকে যান ও মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বেরিয়ে আসেন। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ভিজে গোঁফ মুছে সবার দিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চোখ মেলে তাকান। আর স্পষ্ট উচ্চারণে বলেন—একটি শর্ত আছে, আমি এক লাইন গাইব, তারপর সবাইকে সেটা রিপিট করতে হবে। হুঁ হুঁ করে সুর ভেজে শুরু করেন—রাধা গয়ে হ্যাঁয় মেলে, শ্যাম অকেলে। মিছিল সরু মোটা আওয়াজে গলা মেলায়। মিছিল এগিয়ে চলে—এবার রহসবেড়া হয়ে গাঁয়ের শেষপ্রান্তে রাজবাড়ির দিকে। মিছিল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে এক জলদ গম্ভীর কন্ঠস্বরে শ্যাম নামের নটখট রাখাল যুবকের প্রণয়লীলা, ছলাকলা, রাধার অবর্তমানে অন্য গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলা । রাধা মেলায় যান, একলা ঘরে শ্যাম ক্রমশঃ ছুরিকলাঁ গাঁয়ের অধিবাসীদের মানসে ধরা পরে তাদের বহুপরিচিত এক চালচিত্র। এই লীলা, এই কিশোরীকে বাঁশির ডাকে ভোলানো, তারপর একদিন অন্য কারও দিকে ঢলে পরা—এ তো বহুবার ঘটেছে। কারও কারও নিজেদের জীবনে, কারও চেনা পরিবারের মধ্যে। এইভাবে মিছিল পৌঁছে যায় রাজপরিবারের সিংহদরজার সামনে। জোরে জোরে বাজতে থাকে মাদল, বাজে ঝাঁঝ। ‘রঙ পিচকারি, সন্মুখ মারি, ভিগি আঙিয়া, অউর ভিগি শাড়ি’ খবর পেয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন যুবরাজ সাহাব। চন্দ্রচুড় অনঙ্গপাল সিং। মুখে বসন্তের দাগ, পরিষ্কার করে কামানো গাল, আজ পরনে সিল্কের ধুতি ও কুর্তা। সামনে পেতলের বিশাল থালায় ফাগ ও পেঁড়া নিয়ে দু’জন নৌকর। সবাই ওঁর পায়ে আবির দেয় , উনি মাথায় হাত রাখেন ও নৌকর সবার হাতে একটি করে পেঁড়া তুলে দেয়। শেষের দিকে পেঁড়া ভেঙে আধখানা করা হয়। মিছিলে লোক যে অনেক! রূপেশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিংহ দরজার মাথায় খোদাই করা ওঁদের কোট অফ আর্মস দেখছিল। সাল লেখা ১৯০৩। উনি খেয়াল করে হাত তুলে ডেকে নিজহাতে গুলাল লাগিয়ে কোলাকুলি করলেন আর ওঁর ইশারায় নৌকর ওকে দিল এক গেলাস ঠান্ডাই মেশানো শরবত । ভ্যাবাচাকা রূপেশ চোঁ চোঁ করে গেলাস খালি করে ফেরৎ দিল। ওর একটু লজ্জা করছিল, দু’মাস আগে যুবরাজ সাহেবের দশ হাজার টাকার লোনের আবেদন ও খারিজ করে দিয়েছে যে! জানে, ওই পয়সা ফেরৎ পাওয়া মুশকিল। কারণ, এঁর রাজওয়াড়ার ভেতরে হাঁড়ির হাল। এবার ফেরার পালা। সবাই গাইছে—“ হোলি মেঁ ঝুম গয়ে শ্যাম, আরে হোলি মেঁ!” ফেরার পথে সবাই জোরাজুরি করলে রূপেশ একটু নেচে দিল। হো-হো ও হাততালি! ও বুঝতে পারল যে শরবতে সিদ্ধি মেশানো ছিল। অনেকদিন পরে আবার পুকুরে স্নান। এই গাঁয়ে সাতটা পুকুর। তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়, মাঝখানে প্রায় দু’বাঁশ গভীর। গ্রীষ্মকালেও এর জল শুকোয় না । সবাই বলে পুকুর পাড়ে বটগাছের তলায় যে বাড়রাণীর মন্দির, তার মহিমায় এই জল অতল অথৈ । জামাকাপড় পারে রেখে ডোরাকাটা আন্ডারওয়ার পরে জলে নামার সময় ওর হাত টেনে ধরে ডাক্তার কাশ্যপের ‘ভুরা’ কম্পাউন্ডার। বলে সাঁতার না জেনে বেশি এগোনো ঠিক নয়। বুক জলে নেমে সাবান মেখে ডুব দিলেই হবে। গরুমোষ ধোয়ানো? হ্যাঁ , তা হয় বইকি। তবে এ পাশে নয়, ঠিক উলটো পাড়ে। ভাঙাঘাটের দিকে। এদিকে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে দুটো ঘাট বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে শুধু স্নান করার জন্যে, ছেলেদের ও মেয়েদের ডুব দিয়ে উঠে গা মুছতে শুরু করেছে কি কানে এল অশ্রাব্য গালাগাল। গরু ধোয়ানোর ঘাট থেকে ঘাসীরাম চেঁচাচ্ছে ভুরা কম্পাউন্ডারের উদ্দেশে। সম্পর্ক জুড়ছে এর বোন ও বৌয়ের সঙ্গে। রূপেশ ভয় পায়, এবার কি একটা হাতাহাতি শুরু হবে? এ ভাবেই একটা সুন্দর দিন নষ্ট হবে? কিন্তু ভুরা যে হেসেই খুন। তারপর ও কিছু পালটা দিল, তবে ঘাসীর সঙ্গে খিস্তি করায় পেরে ওঠা দুষ্কর। রূপেশের বিব্রত ভাব দেখে ভুরা আশ্বস্ত করে। ঘাবড়াবেন না , ও আমার বন্ধু। বন্ধু? তা বলে ওইসব সম্বোধন? ওই ইতর ভাষা? আরে এটা হোলি যে! আজ সাতখুন মাপ। হোলির দিন এই দিয়েই শেষ হয়। আপনি ওই দোঁহাটি শোনেন নি? “ হোলি মেঁ হম ঝুম গয়ে সব, মুঁহ মেঁ ভাঙ কী গোলি হ্যাঁয়। অগর কিসীকা পোল খোলে তো বুরা না মানো হোলি হ্যাঁয়।“ ভিজে পোষাকে ঘরে ফেরে রূপেশ। মাথাটা ভার ভার, সিদ্ধির প্রভাব টের পাচ্ছে। তালা খুলে ঘরে ঢুকে কাপড় মেলে খাবারের ঢাকনা খুলে গোগ্রাসে খেতে থাকে। ঠুল্লু একটা বাটিতে করে খানিকটা ক্ষীর (পায়েস) দিয়ে গেছে। এবার ঘুমনোর পালা। ঘুম, ঘুম। শ্রান্ত শরীরের ক্লান্তিহরা ঘুম। আজ রূপেশ কোন স্বপ্ন দেখে না । কতক্ষণ কেটেছে জানে না । কলিংবেল বাজাচ্ছে কেউ। অনেকক্ষণ ধরে। ভারি চোখের পাতা এঁটে বসেছে। এই অসময়ে কে এল? বিছানায় উঠে একটু বসে নেয়, তারপর দরজা খোলে। খুলে পাথর হয়ে যায়। কারুকাজ করা রুমালে ঢাকা একটা থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দ্রুপতী বাঈ; এবার ওর অবস্থা দেখে প্রায় ঠেলা মেরে ভেতরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিল। টেবিলের উপর থালা নামিয়ে বলে ঢাকনা খুলে দেখায়—এক বাটি মাংস আর পায়েস, ওরা বলে ‘ক্ষীর’। চোখে ঝিলিক দিয়ে বলে –আমি নিজে রেঁধেছি, আপনার খারাপ লাগবে না । তারপর আঁচলের খুঁট থেকে একটু আবির নিয়ে নীচু হয়ে রূপেশের পায়ে দিতে গেলে ও বাধা দেয় । কিন্তু ও দ্রুত হাতে পায়ে হাত দিয়ে মাথা তোলার সময় রূপেশের থুতনিতে টক্কর লাগে। অপ্রস্তুত দ্রুপতী থুতনিতে হাত বুলিয়ে শুধোয়—সাহেবের লেগেছে কি না ? তারপর হাসিমুখে রূপেশের দিকে নিজের আঁচলের ফাগ এক চিমটি দিয়ে অপেক্ষা করে আশীর্বাদী রঙ লাগানোর। রূপেশ কেঁপে ওঠে, সারা শরীরের তার ঝন ঝন করে। এমন অনুভূতির সঙ্গে ওর পরিচয় ছিল না । দু’আঙুলে রঙ নিয়ে কোথায় লাগাবে ভেবে পায় না। চোখে পড়ে মেয়েটির এগিয়ে আসা মুখ, কপালে কাটা দাগ। কোনরকমে তড়িঘড়ি করে সেই কাটা দাগের উপর লেপে দেয় লাল আবির। চমকে উঠে পিছিয়ে যেতে গিয়ে দ্রুপতীর পা হড়কায়; আর কিছু না ভেবেই রূপেশের ক্রিকেট খেলা হাত ওকে স্লিপ ফিল্ডারের মত ধরে সামলে নেয়। কিন্তু রূপেশ যে ওকে ছেড়ে দিতে পারছে না , ধরেই আছে। ওর মাথায় ছবি আসে, বিহারী টকিজে দেখা রাজ কাপুরের ‘আর কে ফিল্মস’ এর লোগো। হাত ছাড়িয়ে মুক্ত হয় দ্রুপতী হয়। ওর চোখে বিস্ময়। তারপর শাড়ি ঠিক করতে করতে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে – এ গাঁয়ে আপনাকে সবাই দেবতা বলে, আমিও। আপনি চাইলে না করতে পারব না । আপ বহুত বড়ে হ্যাঁয়, সেই পিকনিকের সময় দেখে নিয়েছি। অব আপ যো কহতে হ্যাঁয়— রূপেশের শরীর ঝিমঝিম করে। অবশ শরীরে ও মাথা নেড়ে পাশের চেয়ারে বসে পড়ে । দ্রুপতী চলে যাওয়ার সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যায়।

735

92

দীপঙ্কর বসু

আমি যে গান গেয়েছিলেম

চিঠিপত্রের বান্ডিল ঘাঁটতে গিয়ে একটা বিশ্রী ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ পোস্ট কার্ড হাতে উঠে এল।বহুবার পঠিত পোস্টকার্ড টা হাতে নিয়ে আবার করে পড়লাম – “প্রীতিভাজনেষু পদ্মলোচনবাবু , আপনার ২৬/২/৮০ র চিঠিতে শ্রীমান দীপঙ্করের সাফল্যের কথা জেনে খুব খুশি তো হয়েছিই আবার খুব অবাক ও হলাম । All credit goes to soul of Rabindranath . শুভেচ্ছা ও নমস্কারান্তে আপনাদের জর্জ দা” সংক্ষিপ্ত চিঠিটির মর্মোদ্ধার করতে হলে পেছিয়ে যেতে হবে সাত আঠ বছর আগের একটি সকালে। আকাশবানী কলকাতা থেকে রবীন্দ্রসংগীতের অডিশন এর ডাক পেয়েছি শুনে শ্রীমতী মায়া সেন,পরামর্শ দিয়েছিলেন অডিশনে বসার আগে যে গানগুলি আমি গাইব সে গুলি যেন ওনাকে শুনিয়ে প্রয়োজন মাফিক সংশোধন করিয়ে নিই। এইখানে বলে রাখি শ্রীমতী মায়া সেন বেশ কয়েক বছর জামশেদপুরের টেগোর সোসাইটির রবীন্দ্রসংগীত বিভাগে পরীক্ষক হিসেবে এসেছিলেন।আমার সৌভাগ্য যে সে সময়ে প্রতিশ্রুতিবান পরীক্ষার্থী হিসেবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম এবং ক্রমে বিশেষ স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছিলাম । কাজেই মায়া দির পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৭২/৭৩ সালের এক সকালে পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম মায়াদির বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে । সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম দেবব্রত বিশ্বাস যিনি ক্রমে আর সবার মত আমারও জর্জদা হয়ে উঠেছিলেন । মায়াদির সঙ্গে পরিচয় ছিলনা আমার পিতৃদেবের ।তাঁরা যতক্ষন নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় সেরে নিয়ে প্রাথমিক কথা বার্তা সারছিলেন আমি লক্ষ্য করেছিলাম মায়াদির বেশ বড় ড্রইং রুমের একধারে একটি চেয়ারে লুঙ্গী ও সাধারণ ফতুয়া গায়ে এক বয়স্ক মানুষ চুপচাপ বসে মায়াদি ও আমার পিতৃদেবের আলাপ আলোচনা শুনছেন । মজার কথা হল মানুষটি যে স্বনামধন্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস তা আমার মাথাতেই আসেনি । অথচ সেই সময়েই তাঁর রবীন্দ্রসংগীত গায়নশৈলী নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে ।একটি বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রের রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে স্বয়ং সম্পাদক “কার গানে কার সুর” শিরোনামে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিরূপ সমালচনা লিখে চলেছেন । রেডিওতে,গ্রামাফোন রেকর্ডে তাঁর গান প্রায়ই শুনি - কাজেই দেবব্রত বিশ্বাস নামটা আমার কাছে অপরিচিত ছিলনা ।শুধু মানুষটিকে সেদিনের আগে কোনদিন চোখে দেখিনি । তাঁর পরিচয় পেলাম মায়া দি যখন প্রাথমিক কথা বার্তা সেরে নিয়ে গানের প্রসঙ্গে এলেন ।বললেন ভালই হল “ আজ জর্জদা উপস্থিত আছেন । দীপঙ্কর জর্জদাকে তোমার গান শুনিয়ে দাও”। জর্জদাও দেখলাম চেয়ারে বসেই হারমোনিয়ামটিকে কোলের কাছে টেনে নিলেন ।স্মিতহাসিমুখে বললেন – “কই কি গান করবেন,করেন শুনি” কথাগুলি ঠিক এই ভাষায় তিনি বলেননি – বলেছিলেন পূর্ববঙ্গীয় বাংলায় যাকে তিনি নিজের “ফাদার বা মাদারটাং” বলে উল্লেখ করতেন । ঠিক এমন একটা পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে আমি প্রস্তুত ছিলামনা ।তাই বেশ ভয়ে ভয়ে গান শুরু করি – আমার শেষ পারাণীর কড়ি কন্ঠে নিলেম । গান কন্ঠে নিলেম । আরো দুই একটি গান শুনলেন আমার পছন্দ করা গানের তালিকা থেকে । কিছুকিছু গানে বিশেষ বিশেষ শব্দ কি ভাবে উচ্চারণ করতে হবে তা নিজে গেয়ে দেখালেন ।এবং সব শেষে বললেন “গান তো আপনি ভালই গাইসেন ।কিন্তু আমার মনে হয়না আপনি অডিশনে পাশ করতে পারবেন । আকাশবানীতে অডিশন পাশ করতে হইলে আপনারে ওদের মত পাঁসালি(পাঁচালি) গাইতে হবে । সে আপনি পারবেননা বুঝতে পারছি”।আমার বিপন্ন মুখ দেখে সহাস্যে ব্যখ্যা করলেন নিজের বক্তব্যের । শোনেন নাই অরা কেমন বিরস কন্ঠে পাঁচালি গানের মত টেনেটেনে একঘেয়ে সুরে রবীন্দ্রসংগীত গায় ...পারবেন অমন করে গাইতে?পারবেন না । বলা বাহুল্য কিছুটা হতচকিত গিয়েছিলাম ওনার কথা শুনে । পরে জর্জদার সঙ্গে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হবার পর বুঝেছিলাম এ হল শিল্পীর অভিমানের প্রকাশ । যে পরিমান অকরুণ সমালোচনা এবং অবিচার মানুষটিকে সহ্য করতে হয়েছে রবীন্দ্রসংগীত নামক প্রতিষ্ঠানটির সমাজপতিদের কাছ থেকে ,তাতে এই ধরণের অভিমানের প্রকাশ ঘটা অস্বাভাবিক নয় । সেদিন সকালে নিজে থেকেই বেশ কয়েকটি গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন । তার মধ্যে একটি গানের কথা এত বছর পরেও বেশ মনে পড়ে ।গেয়েছিলেন – উদাসিনী বেশে বিদেশিনী কে সে ,নাই বা তাহারে জানি গানটি । গানেটির অন্তরা্ - পূবের হাওয়ায় তরীখানি তার এই ভাঙা ঘাট কবে হল পার...। লাইনটির “হাওয়ায়” শব্দটির শেষ দুটি অক্ষরকে গর গর মগ মগ প –এই রকম স্বর গুচ্ছের আন্দোলনে সুস্পষ্ট অথচ পেলব তরঙ্গায়িত ভঙ্গীমায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন যে আমি সত্যিই যেন ওই ড্রইং রুমে জর্জদার্ মুখোমুখি বসে ভিজে পূবালী বাতাসের কোমল স্পর্শ পেয়েছিলাম ।মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছিলাম মৃদুমন্দ বাতাসে নদীর জলের ছোট ছোট ঢেউএর দোলায় দুলতে দুলতে সত্যিই যেন একটি পালতোলা নৌকা ভেসে চলেছে!রবীন্দ্রসংগীতের কথা ও সুরের কুশলী প্রয়োগে গান যে কী অপরূপ চিত্ররূপ ধারণ করতে পারে তা এতদিন আমার কল্পনাতেও আসেনি । বস্তুত মায়াদির বাড়িতে সেদিন সকালে আমার রবীন্দ্রসঙ্গীতের নতুন করে দীক্ষা হয়েছিল । ২ জর্জ দার কথা ফলে গিয়ে ছিল ।সেবারের অডিশনে আমি সত্যিই পাশ করতে পারিনি । আকাশবাণীর স্বীকৃতি পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ সাত আঠ বছর । স্বীকার করতে দ্বিধা নেই সেবার অডিশনে পাশ না করতে পারায় বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম । কিন্তু সে হতাশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি কারণ এমন একটা সজীব ক্রিয়াত্মক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে আশৈশব আমি বড় হয়েছি তা আমার মনকে এমনভাবে সচল করে রাখত,এতটাই ভরিয়ে রাখত যে সেখানে সাময়িক অসাফল্যের বেদনা হতাশা প্রভৃতি ঋণাত্মক ভাবনাগুলি মনের মধ্যে স্থায়ী ভাবে বাসা বাঁধতে পারতনা । তার সঙ্গে যুক্ত হল জর্জদার কাছে পাওয়া শিকল ভাঙার মন্ত্র । জর্জদার গাওয়া গান শুনতে শুনতে ,বিভিন্ন সময়ে নানান অবসরে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে বুঝতে পারছিলাম কেবল মাত্র নিখুঁত ভাবে স্বরলিপিধৃত সুরটিকে কন্ঠে তুলে নিয়ে মননহীন পরিবেশনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান সার্থকতা পায়না । রবীন্দ্রনাথের গান তখনই সার্থক হয়ে ওঠে যখন সে গান শ্রোতার ইমোশন এবং ইন্টেলেক্ট কে স্পর্শ করতে পারে । মনে পড়ে জামশেদপুরে এক রবীন্দ্রসংগীতের আসরে অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন “কে গো অন্তরতর সে /আমার চেতনা আমার বেদনা তারি সুগভীর পরশে” গানটি গেয়ে ।এতটুকু অতিশয়োক্তি করছিনা গানটি শুরু হওয়া মাত্র নিজের অজান্তেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম আমি । সেদিন সন্ধ্যায় না ছিল কোন সহায়ক যন্ত্রানুসঙ্গ না ছিল তালবাদ্য শুধু মাত্র হারমোনিয়াম সহযোগে গাওয়া সে গান আমাকে পৌছে দিয়েছিল সেই রসলোকে যেখানে “এত রূপের খেলা রঙের মেলা অসীম সাদায় কালোয়” শ্রোতার অন্তরে এমন প্রলয় জাগান গান আরো বহু গেয়েছেন যেমন - যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারে বারে

104

6

মুনিয়া

আমার পুজো‚ তোমার পুজো

আমার পুজো তোমার পুজো – লেখাগুলো দেখতে দেখতে ও পড়তে পড়তে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে – কদিন ধরে ! কারুর লেখা নিয়ে নয় বরং বলা যায় দৈনন্দিন ঘটনাসমুহ নিয়ে । এক তো আমাদের আগে সংবাদপত্র পুজোর জন্যে দুদিন ছুটি থাকত । - এখন একেবারে চারদিন ! আমি খেয়াল করে দেখেছি – যেদিন সংবাদপত্র বন্ধ থাকে – মনে হয় সেদিনই সব খবর বেরিয়ে গেল ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ! সব যেন একদিনেই ঘটে যাচ্ছে ! হবি তো হ – এবারেই রাবন পোড়াতে গিয়ে কত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল অমৃতসরে ! দোষ তো সব সময়েই জনগনের হয় ! কিন্তু মানুষের মৃত্যু নিয়ে কি নোংরা রাজনীতি – মানুষের প্রতি মানুষের আর কোন ভাব-অনুভাব – দরদ অবশিষ্ট নেই ! – শুধু সংখ্যা আর মৃত্যু-মুল্য ! তাই তো পরস্পরের দেখা হলেই জিগ্যেস করি – কত হোল শেষপর্যন্ত ! ক্রিকেট-টেস্টে বিরাটের রান নয় – অমৃতসরে মৃত মানুষের সংখ্যা কত হোল ! ব্যাঙ্কও তাই । - এখানে বোধয় ব্যাঙ্কের একদিনের ছুটিকে আর ছুটি বলে মনে হয় না ! – সোমবার ব্যাঙ্কে বসে বসে শুনছি – ফোন আসছে – আজ কি ব্যাঙ্ক খোলা আছে ! অর্থাৎ ব্যাঙ্কের কাজের দিনের একটা ক্যালেন্ডার আমাদের কাছে থাকা উচিত ! কবে কবে ব্যাঙ্ক খোলা থাকবে – তাই জানার জন্যে ! অথবা কাগজের পাতায় আজকের তাপমাত্রার নিচেই যদি লেখা থাকে – আজ ব্যাঙ্ক খোলা থাকিবে ! মনে হয় আমাদের মতো গাঁইয়া লোকেদের কিছু সুবিধে হতে পারে ! কমপ্লেক্সের পুজো-মন্ডপে বসে বসে ভিড়ের পরিমাপ করতে থাকি ! কত লোক আসে । এটা কোন একডালিয়া বা দম দমের ভাসমান বা লন্ডনের রাজবাড়ির দুর্গা নয় ! সামান্য এক আবাসনের পুজা ! কোত্থেকে এত লোক তাদের মুখ দেখাতে আসে । - মুখ দেখাতে অর্থাৎ কিনা মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে শেলফি তোলা । শুধু প্রতিমার নয় বা প্যান্ডেলের নয় – আমি যে সামনে দাঁড়িয়ে – সেটার প্রমাণ রইল ! সম্প্রতি আত্মহত্যারও শেলফি রাখতে হয় ! - আর নতুন পোশাকের ! পোশাকের চমকদারী দেখতে হলে – এখন আর কোন ফ্যাশন প্যারেডে বা গড়িয়াহাটের মোড়ে যাওয়ার দরকার নেই ! – ছেলেদের সুবিধে হচ্ছে – একটা নকশাদার শার্ট ও প্যান্ট পড়লেই হোল ! কিন্তু মেয়েদের পোশাক ! - স্মৃতিটুকু থাক থেকে আরম্ভ হয়ে একেবারে রাস্তা ঝাঁট দেওয়া ঘাগরা ! আর পাল্লু তো থাকে কি থাকেনা – অপরের কাঁধে ! খুব বয়স্কা ছাড়া শাড়ি – আজকাল দোকানেই দেখা যায় ! প্রতিবারেই দেখি সার্বজনীন পুজোর সংখ্যা বেড়েই চলেছে ! কোনবারই দেখলাম না – গতবারের তুলনায় একটাও কম ! বরং সবই দেখি – একশো দুশো বছরের প্রাচীন ! এবং আদি ! – আর কেন জানিনা আমার চোখ ক্লান্ত হয়ে কমলাকান্তের মতো গঞ্জিকা প্রভাবে ভাবতে বসে – আমাদের পুজা-কমিটি ঘোষণা করিতেছে যে - দু শো ছিয়ানব্বই বছরের প্রাচীন দুর্গাপূজা এখানে আর অনুষ্ঠিত হইবে না ! - আমাদের শোক সাগরে ভাসাইয়া দিয়া এইবারই শেষবার আবির্ভাব হইতেছেন ! কারুর অনুপ্রেরণায় মন্ডপে দুর্গা-মাকে রাখবো না – বিজয়ার দিনেই যথাযথ সন্মানে বিসর্জন দিব ! – বল দুর্গা মায়ি কী - ! যাহ্‌ ! গঞ্জিকায় একশো শতাংশ - ভেজাল ছিল ! মনোজ

299

36

দীপঙ্কর বসু

আমার পুজো

‚আজ নবমী - এখানে বাজার হাট সব বন্ধ|দুই একটি দোকান যদিবা খোলা আছে তাদের ভান্ডার শুন্য | দুধ নেই ‚পাউরুটি নেই ডিম নেই কিচ্ছু নেই কিচ্ছু নেই|কারণ ডেয়ারিফার্মে পুজোর ছুটি ,বেকারি, পোল্ট্রি ফার্মের অবস্থাও তথৈবচ- সবাই পুজোর ছুটি উপভোগ করছে । কি বললেন? এসেনশিয়াল সার্ভিস মারাচ্ছেন ? এসেনশিয়াল সার্ভিসের লোকেদের কি বিবি বাচ্চা থাকতে নাই?| তাদের দুটো সখ আহ্লাদ থাকতে পারেনা? অকাট্য যুক্তি ,সেই সঙ্গে আছে সরকারি ফরমানের সাপোর্ট । চেপে যাওয়াই মঙ্গল । এককালে শুনেছি কোথাও কোথাও নর বলি হত !! কে বলতে পারে কখন কার মধ্যে সেই আদিম ভক্তিরস উথলে পড়বে ।অতয়েব দুই ঘটি জল খেয়ে পেটে খিল দিয়ে ঘুমিয়ে নবমীর নিশি ভোর করে দেওয়াই ভালো অথচ ছেলে বেলায় একদিকে ছিল সম্বৎসরের দুর্গোৎসবকে ল্যাজা মুড়ো সুদ্ধ চেটেপুটে খেয়ে নেবার দিন অন্য দিকে সারাদিন মনের মধ্যে বাজতে থাকে বিদায় ব্যথার ভৈরবী।তারই মাঝে একটু আড়াল খুজে নিয়ে সবার কান বাঁচিয়ে ঝলমলে ফ্রকপরা কিশোরীটি তারা দিদির এত্তেলা জানিয়ে যায় "দিদি সন্ধ্যেবেলা রামমন্দিরে আসতে বলেছে"কথা কটি চাপা গলায় বলে দিয়েই দেচ্ছুট । আজকের দিনে সব বাঙালির একটাই কামনা। নবমী নিশি যেন ভোর না হয় । কিন্তু কালচক্রকে থামায় কার সাধ্যি তবু নবমীনিশি ভোর হয় ।ঝুপ করে থেমে যায় কদিনের হাসি খুশীর মেলা ।

126

8

মানব

কল্প-গল্প

বিমলবাবুর মগজাস্ত্র ________________________________________________________________________________ "বুঝলে গিন্নী, আমাদের মস্তিষ্কের মাত্র দশ শতাংশ আমরা ব্যবহার করি। বাকি নব্বই ভাগ অব্যবহৃতই থেকে যায়।" বিজ্ঞের মত করে কথাগুলো নিজের স্ত্রীকে বললেন বিমলবাবু। "তাই নাকি? আর বাকি নব্বই ভাগ কি মাথার ওজন বাড়ায়? ওসব তোমার হতে পারে আমার নয়। যেমন তোমার নিরেট মাথার ওজন তেমনি তোমার ভুঁড়ির। পাল্লা দিয়ে খাচ্ছে দাচ্ছে আর ওজন বাড়াচ্ছে। তারপর আবার এইসব আজগুবি কথাবার্তা কোত্থেকে শুনে এসে আমারও মাথা খাচ্ছে। জীবনটা আমার নরক করে দিলে গোওওওও......" সকাল সকাল এমন একটা উত্তর বৌএর কাছে আশা করেননি তিনি। আগের দিন অফিসের একটা সেমিনারে একজন এই কথাগুলোই বলছিলেন। আমাদের মস্তিষ্কের অব্যবহৃত অংশগুলো ব্যবহার করে নাকি আমরা নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারি। সেটা শোনার পর থেকেই তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, 'তার মানে জনতা আমাকে যতটা বোকা মনে করে, আমি ঠিক ততটা নই!' নিজেকে বোকা থেকে চালাক পর্যন্ত বিস্তৃত ত্রৈমাত্রিক স্তম্ভের যে স্তরে তিনি রাখেন তা প্রশম স্তরের থেকে অনেকটাই নীচে। গতকাল সেমিনারে বক্তার কথাবার্তা শুনে তাঁর মনে হল তিনি প্রশম স্তর থেকে কিছুটা উপরে উঠে গেছেন; আজ আবার এমন চরম অপমানের পর তিনি আগের অবস্থানেই ফিরিয়ে আনলেন নিজেকে। তবুও অভ্যাসমতো মগজাস্ত্রে শান দেওয়ার জন্য তিনি ধ্যানে বসলেন। তবে আজ একটু অন্যরকমভাবে। ধ্যানমগ্ন হয়ে তিনি সর্বশক্তিমানকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে শুরু করলেন। "আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাব? কেন আমার এই দুর্দশা এই পৃথিবীতে? দশ ভাগ ব্যবহার করে নাহয় আমি বোকা হয়ে রয়ে গেছি, কিন্তু আমাকে বাকি নব্বই ভাগের মধ্যে অন্ততঃ কিছুটা ব্যবহার করার অধিকার দাও হে প্রভু।" **************************************************** বিমলবাবুর বাড়ির পাশ দিয়েই একজন দেবদূত যাচ্ছিলেন বান্ধবীর সাথে। সকালের শিউলির মনমাতানো গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গুনগুন করে কি যেন একটা চেনা সুরে গান ধরেছেন তাঁরা। দেবদূতের নাম ধীরজকুমার, আর তাঁর বান্ধবী রেণুকুমারী। উভয়েই তাঁদের কুমারত্ব এবং কুমারীত্বের দম্ভ বজায় রাখার জন্য বিবাহ করেননি। এইতো কয়েকদিন আগেই উচ্চ আদালত বিনা বিবাহে সম্পর্ক বজায় রাখাকে আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। যদিও নথিভুক্ত আইন না থাকাকালীনও তাঁরা এসব গ্রাহ্য করতেন না, তবুও একটা নিয়ম রাখা ভাল এই ভেবে সর্বোচ্চ বিচারক এই সিদ্ধান্ত নেন। হাজার হোক, তাঁকে আর বারবার যুবক-যুবতীরা আইন অবমাননা করছে এই অভিযোগ শুনতে হবেনা। পৃথিবীলোকের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আজকাল দেবদূতের নিয়োগ বাড়াতে হচ্ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে মাইনে, অন্যান্য খরচ ইত্যাদি। তাই স্বর্গরাজ্যে আর একটা অভিনব পন্থা নেওয়া হয়েছে। কাজের সময়েও দেবদূত প্রেমিক প্রেমিকাদের একসাথে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে যেমন যানবাহনের জ্বালানির খরচ বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি খুশীমনে কাজ করতে পারছে এরা। তাই অযথা দাবীদাওয়া কমেছে, কমেছে আন্দোলন, পরকীয়া, বিবাহ-বিচ্ছেদ(অবশ্য বেশিরভাগ কর্মচারী বিবাহই যখন করছেনা, বিচ্ছেদের প্রশ্নই আসছেনা)। এমনি উৎফুল্ল মনে যখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুজনে, হঠাৎই বিমলবাবুর মস্তিষ্কের তরঙ্গ শব্দের আকারে নিক্ষিপ্ত হল তাঁদের কানে। ইহজগতের সমস্ত স্মৃতি মুছে দেওয়ায় তাঁরা এখন নিজেদের দেবতাদেরই অংশ বলে মনে করেন। বিমলবাবুর কথা শুনে ধীরজ মনে মনে বললেন, 'হায়রে মনুষ্য, যখন তোদের মস্তিষ্ক পুরোটা ব্যবহার করার সময় ছিল তখন তার ব্যবহার না করে তোরা আবিষ্কার করেছিস যন্ত্র। যে মস্তিষ্কের তরঙ্গ দিয়ে যোগাযোগ করা যেত ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, সেখানে তোরা আটকে গেলি আলোর গতিবেগে। আর এখন তোদের মনে হচ্ছে তোরা পুরোটা ব্যবহার করিসনি। আসলে তোদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কমে গেছে। এখন বাকী নব্বই শতাংশ ঢুকে গেছে কম্পিউটারে, মোবাইলে। যত এইসব যন্ত্রের ক্ষমতা বাড়বে, পাল্লা দিয়ে কমবে তোদের মাথা খাটানোর ক্ষমতা।' ওদিকে রেণুকুমারী মনে মনে উতলা হয়ে উঠেছেন। তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে ধীরজকুমার বললেন, 'উতলা হয়োনা। আমি জানি, ভালো মানুষদের সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য, কিন্তু নিজে হাতে সবটা করে দিলে ও আবার আমাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। চেয়ে দেখো, ও চোখ খুলছে। আজ যে জ্ঞান ওকে আমি প্রদান করছি, তাই দিয়েই স্বনির্ভর হয়ে মানুষের ভালো করতে পারবে ও। হাসিমুখে ধ্যানমগ্ন বিমলবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন তাঁরা দুজনে। **************************************************** ওদিকে বিমলবাবু ধ্যান করতে করতে আজ এমন উচ্চস্তরে চলে গিয়েছিলেন যে ধীরজকুমারের মনের কথাও তিনি শুনতে পেলেন। ভুলে গেলেন তাঁর উপর হওয়া সমস্ত অপমান। এখন তাঁর জীবনে শুধু একটাই উদ্দেশ্য, স্বনির্ভর হওয়া। চোখ খুললেন তিনি। প্রথমেই মাথায় এলো, কোথায় কোথায় তিনি মগজাস্ত্রের বদলে যন্ত্রের উপর নির্ভর করেন। তারপর শুরু করলেন আত্মজাগরণ। প্রথমেই অফিসের কাজগুলোকে দেখবার চেষ্টা করলেন। অফিসের বেশিরভাগ কাজই এক্সেল-এ হয়। সেই কবে কে ফর্মুলা তৈরী করে দিয়ে গিয়েছিল, সেখানেই শুধুমাত্র সংখ্যা টাইপ করে করে নিজেকে কেমন যেন রোবট মনে হতে শুরু করেছিল তাঁর। আজ তিনি দেখলেন কি কি সূত্র দিয়ে হচ্ছে সেসব গণনা, কিভাবে আসছে লাভ-ক্ষতি-অনুপাতের হিসেবনিকেশ। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি এত গভীরে ঢুকে গেলেন যে জানার দরকার হয়ে পড়ল লক করে রাখা ট্যাবগুলোর ফর্মুলা জানার। সেসব পাসওয়ার্ড অনেকদিন আগেই হারিয়ে গেছে, মনে নেই কারও। তাই কেউই সদুত্তর দিতে পারলেন না তার। তবে একটা জিনিস সবাই বুঝতে পারলেন, বিমলবাবুর মগজাস্ত্র ধারালো হচ্ছে দিনে দিনে। যে লোকটা বাড়ি যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকত, সে আজকাল সবকিছু সবিস্তারে খুঁটিয়ে দেখছে। 'কি করতে হবে' সেই প্রশ্নের সঙ্গে আর একটা প্রশ্নও করছেন তিনি, 'কেন করতে হবে?' আজকাল কেউ তাকে খুব একটা ঘাঁটায় না। এমনকি গিন্নীও না... এইতো সেদিন গিন্নী তাঁকে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'গামছাটা কোথায় রেখে দিয়েছ শুনি? কোন জিনিস যদি দরকারের সময় পাওয়া যায়...'। বিমলবাবু মিষ্টি হেসে বললেন, 'তবে তোমার কোমরে বাঁধা ওটা কী?' এবং জিভ কেটে লাজুক মুখে গিন্নীর প্রস্থান। **************************************************** ধীরজ-রেণু জুটি এই কয়দিন কোথাও যাননি। তাদের প্রথম বড় কেস বলে কথা। বছর কুড়ি আগেও নিজেদের অফিসঘর থেকে তারা মানুষের মনের কথা শুনতে পেতেন, অবশ্য তখন তাঁদের বস-এর অর্ডারে কাজ করতে হত। এখন তারা নিজেরাই কেস হ্যান্ডেল করেন। কিন্তু মোবাইল টাওয়ারের যা উৎপাত মানুষের মস্তিষ্ক-তরঙ্গ অতদূরে পৌঁছতেই পারেনা আজকাল। তার উপর বিবর্তনের প্রভাবে অন্যান্য জীবজন্তুদের চিন্তাশক্তি বাড়ছে। হয়ত অচিরেই উন্নততর কোন জীবের আবির্ভাব হবে হঠাৎ করেই। তার আগেই মানুষকে সচেতন করতে হবে, অনেক অনেক মানুষকে। প্রথম কাজটা যখন সফলভাবে হয়েছে, পরেরগুলো নিশ্চয়ই আরও তাড়াতাড়ি এবং সফলভাবেই সম্পন্ন হবে। এই আশায় তাদের রথ রওনা দিল অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বহু বছর আগে ফুরিয়ে যাওয়া তারারা তখনও সগৌরবে জ্বলজ্বল করে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ জাহির করে চলেছে পৃথিবীর মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে।

184

10

ঝিনুক

এ এক অন্য পুজোর গল্প ......

সপ্তাহ দু'য়েক আগে বুধসন্ধ্যাতে হাঁটতে গিয়ে এ'কথায় সেকথায় দুই বন্ধুতে মিলে ঠিক করে ফেললাম থ্যাঙ্কসগিভিঙের উইকএণ্ড পুরোটাই পাহাড়ে কাটাতে হবে| ব্যস‚ উঠল বাই তো কটক থুড়ি পাহাড়ে যাই| এত দেরি করে বুকিং পাব‚ সত্যিই ভাবি নি| কিন্তু 'যে খায় চিনি' - সেই লজিকে চিন্তামণি জুটিয়ে দিলেন একখানা ঘর| আসলে পুজো-গণ্ডা‚ উৎসবের দিনে বোধহয় আমরা প্রিয়জনকে আরো বেশি করে মিস করি‚ আরো বেশি করে খালি খালি লাগে বুকের ভিতরটা| থ্যাঙ্কসগিভিঙের আগমার্কা খাঁটি কেনেডিয়ান টার্কী ডিনারের জম্পেশ নেমন্তন্ন ছিল রবিবার সন্ধ্যায়| কিন্তু ক'দিন ধরেই মনটা বড্ড দুখাচ্ছে গাণুশের জন্য| ইচ্ছে করছিল না কারো বাড়ি গিয়ে থ্যাঙ্কসগিভিঙ মানাতে| অগত্যা সকল দু:খহরণ -- আমার পাহাড়| শনিবার প্রায় ন'টা বাজিয়ে ঘুম থেকে উঠে জুতো-জামা-দন্তমঞ্জন (পিওর বাংলা কিন্তু) গুছিয়ে নিয়ে দুই বন্ধুতে মিলে রওনা দিলাম পাহাড়ের পানে| তিনদিন আগেকার উদ্দাম তুষারঝড়ের কোন দিশা কোথাও নেই ঝকঝকে আকাশে‚ শুধু রয়ে গেছে তার থৈ থৈ চরণচিহ্ন সারা পাহাড় জুড়ে‚ দুইফুট বরফে ঢাকা পাহাড়িয়া পাকদণ্ডীতে| জুতোয় স্পাইক লাগাতে হল পাহাড়ে চড়ার আগে| অনেক দেরি করে শুরু করেছি দিন| ছোট্ট একটা ৮ কিলোর মিঠেকড়া হাইক দিয়ে খাতা খোলা হল থ্যাঙ্কসগিভিঙ উইকএণ্ডের| নতুন আর কি লিখি‚ কি লেখা বাকি আছে আমার পাহাড়ের কথা? যতবারই যাই‚ যেদিকেই চাই‚ শুধু একটাই লাইন ফিরে ফিরে গুণগুণ করে গাই‚ ..... "আজ ত্রিভুবন-জোড়া কাহার বক্ষে দেহ মন মোর ফুরালো- যেন রে নি:শেষে আজি ফুরালো" ..... পরের দিন মানে রবিবারও ধবধবে কাচা নীল নীল সুনীল আকাশ‚ পুজো পুজো রোদ| বরফের শুভ্রতায় রোদ্দুর ঠিকরে চোখে ধাঁধা লেগে যেতে চায় রোদচশমা ভেদ করে| আজকের অভিযান সোনালি লর্চ সন্দর্শনের মানসে| কি এত বিশেষত্ব এই সোনালি লর্চের? কেন তার জন্য দুস্তর বরফ ঠেঙিয়ে‚ খাড়াই চাড়াই পেরিয়ে এই মরণপণ লাফালাফি? সেটা চর্মচক্ষে না দেখলে বুঝিয়ে বলা অসম্ভব| তবে কেজো কথায় যতটুকু বোঝানো সম্ভব‚ সেটুকু চেষ্টা তো করা যেতেই পারে‚ নাকি? এই লর্চ হল দুনিয়ার একমাত্র পর্ণমোচী কনিফার| কনিফার বলতেই আমাদের মনে পড়ে পাইন‚ ফার‚ স্প্রুস‚ সীডার ইত্যাদি ইত্যাদি| মানে যারা চিরসবুজ..... শীত‚ বসন্ত‚ গ্রীষ্ম‚ হেমন্ত‚ ঋতুনির্বিশেষে যারা সদা সর্বদা সবুজ আর সবুজ‚ যাদের পাতা ঝরে না হেমন্তের হিমেল বায়ে‚ শীতের তুষার মেখেও যারা দিব্যি পরিপাটি সবুজ হয়ে থাকতে পারে| একমাত্র ব্যতিক্রম এই লর্চ| বসন্তে নরম সবুজ নতুন পাতায় সেজে ওঠে‚ অন্য কনিফেরাস গাছের মতই সুঁচের মত সরু সরু পাতা‚ ইংরেজিতে যাকে বলে নীডলস| তবে লর্চের নীডলসগুলো খুব মোলায়েম‚ নরম| হেমন্তে সেই নীডলসগুলো সব তুমুল সোনালি রঙে পাল্টে যায় ঝরে যাওয়ার আগে| মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহ হেমন্তের শুরুতে‚ তার মধ্যেই সবুজ থেকে হলুদ‚ তারপর গাঢ় সোনালি হয়ে ঝরে যায় শেষতম নীডলটাও| গরম তাদের মোট্টে সয় না‚ তাই পাহাড়ের অনেকটা উপরে (subalpine উচ্চতায়) ট্রীলাইনের শেষ সীমানায় তাপমান যেখানে চিরকালীন অনুষ্ণ‚ সেইখানে তাদের সুখের বসত| কানাডা আর সাইবেরিয়াই মূলত এদের দেশগাঁ‚ বাকি খবর গুগল জ্যেঠুর কাছে শুধিয়ে জেনে নিন| "সাতটি যে পৃথিবীর বিস্ময়‚ তুমি তারও চেয়ে বেশি মনে হয়"...... পাহাড়ের মাথায় সোনালি শরীরে হৈমন্তী রোদ্দুর মেখে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি লর্চ‚ সত্যিই অনন্য‚ অনুপম| কোন ভাষা‚ কোন ছবিই যথেষ্ট নয় সেই রূপ বোঝাতে| আর কোন পুণ্যের ফলে যে আমি এই বিরল সৌভাগ্যের ভাগী জানি না‚ তবে কানাডার লর্চ সেন্ট্রাল আমার ভদ্রাসন থেকে মাত্রই দু'ঘন্টার ড্রাইভ| সারা পৃথিবী থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসে লর্চের এই পীঠস্থানে‚ এই দুর্লভ দৃশ্যের সাক্ষী থাকতে‚ এই অসাধারণ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে| কাছে যেতে হলে‚ ভালোবেসে স্পর্শ করতে হলে খাড়াই পাহাড় ভাঙতে হবে| কিন্তু দূর থেকে দেখতে (পড়ুন ঝারি মারতে) তো কোন খচ্চা থুড়ি পরিশ্রম নেই| আর তার জন্য সবার সেরা ভিউয়িঙ গ্যালারি হল হাইউড পাস‚ ৭০০০ ফুট উচ্চ্তায় কানাডার সবচেয়ে উঁচু হাইওয়ে| ডিসেম্বরের এক তারিখ থেকে জুন মাসের ১৫ তারিখ অবধি ছমাস বন্ধ থাকে এই রাস্তা| রকির বুক চিরে দুইপাশে উত্তুঙ্গ পর্বশৃঙ্গ আর সুগভীর সবুজ পাইনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে এই পথ| ধারে ধারে ব্যবস্থা করে দেওয়া আছে পথিকের জন্য‚-- ক্ষণিকের বিশ্রামের‚ দশদিগন্ত আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য| আর আছে অজস্র ট্রেইলহেড| শুধুই দূর থেকে দেখে যাদের পিপাসা মেটে না‚ "প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসী" বলে যারা তীর্থযাত্রা করবে চড়াই ভেঙে তাদের যাত্রাপথের শুরু এই সব ট্রেইলহেড থেকে| পাহাড় সুন্দর‚ জঙ্গল সুন্দর‚ সারা বছরই সুন্দর| ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে তার ভিন্ন ভিন্ন সাজ| কিন্তু এই দু'তিনটে সপ্তাহ‚ বিশেষ করে ঝরে যাওয়ার আগে যখন পুরোপুরি রঙ পাল্টে আগুনের মত সোনালি হয়ে যায় সব লর্চ‚ দূর থেকে মনে হয় যেন সোনালি জরির মিহিন কাজ করা ঘন সবুজ জারদৌসিতে সেজেছে পাহাড়| মাথায় বরফের তাজ‚ উপরে সুনীল আকাশের অসীম বিস্তার‚ আর এমন নয়নাভিরাম সাজ‚ সেই ব্যাপ্তি‚ সেই সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়ালে মাথা আপনি নত হয়ে আসে| এবারের অভিসার সেই ঊষসী লর্চকে নিবিড়ভাবে ছুঁয়ে দেখতে| প্রাতরাশ সেরে হাল্কা লাঞ্চ প্যাক করে রওনা দিলাম হাইউড পাস ধরে| গন্তব্য Highwood Medows... এখান থেকে অনেকগুলো ট্রেইলের যাত্রা শুরু| আমাদের আজকের তীর্থ Ptarmigan Cirque... শতাব্দী প্রাচীন স্প্রুস‚ ফার আর পাইনের ঠাসবুনোট জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বরফে পিছল পথ একটু একটু করে এঁকে বেঁকে খাড়া উঠে গেছে পাহাড়ের মাথায়| হাঁসফাঁস করতে করতে একটু যাই‚ দম নিতে একটু জিরাই| প্রতিটা বাঁকে বাঁকে বর্ণনার অতীত সব কোডাক মোমেন্ট‚ থামতেই হয় ছবি তুলতে| গাছের ফাঁক দিয়ে গলে আসা সোনা রোদ সুচারু আলপনা আঁকে পায়ের কাছে বরফের উপর| এ হল ভালুকরানীর খাসতালুক‚ তার ঘরের উঠোন দিয়ে চলার অনুমতি চেয়ে জোরে জোরে গান গাই গলা ছেড়ে বেজায় বেসুরে| খানিকটা উঠতেই দেখা হয়ে গেল প্রথম লর্চের সাথে| ঝুরু ঝুরু ঝরছে তার পাতা‚ পায়ের কাছে সোনালি হয়ে আছে বরফ| জড়িয়ে ধরে বললাম‚ "শুধু তোমার জন্যই এলাম"| সে দুলে উঠে ঝুরিয়ে দিল আরো কিছু সোনালি পাতা আমার মুখে মাথায়| যত উপরে উঠতে থাকলাম‚ লর্চের সংখ্যাও বাড়তে থাকল| এইভাবেই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম একসময়| কাঁধের থেকে ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে রেখেই গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নিলাম কয়েক পাক দুই হাত তুলে| এক এক করে চারদিক ঘুরে ঘুরে শুধালাম‚ "তোমার নাম কি গো‚ মহারাজ?" উত্তর এল প্রতিধ্বনিতে‚ "মহারাজ..... রাজ..... রাজ......" হাঠাৎ মনে হল সামনের চূড়াটা ঘাড় হেলিয়ে আমায় শুধাচ্ছে‚ "তোমার নাম কি?" "পাগলি বলে ডাকে লোকে‚ হ্যাঁ গো‚ পাগলি"‚ উত্তর দিই| শুনি‚ পাহাড় ডাকছে আমায় নাম ধরে মন্দ্র স্বরে‚ "পাগলি..... পাগলি-ই-ই-ই....পাগলি-ই-ই-ই....." বন্ধু হেসেই খুন আমার কীর্তি দেখে‚ বলে‚ "তুমি এক্কেবারে পাগল"| বললাম‚ "সেই কথাটাই তো বলছিলাম পাহাড়কে"| একটা বড়সড় পাথর দেখিয়ে বন্ধুকে বললাম‚ "ঐ যে‚ ঐ টেবিলটাতে আমাদের রিসার্ভেশন|" গুছিয়ে বসলাম দুজনে মধ্যাহ্নভোজন সারতে| খেয়েদেয়ে মুখ মুছে বললাম‚ "থ্যাঙ্ক ইয়ু ঝিনুক‚ এমন চমৎকার একটা লাঞ্চের জন্য|" বন্ধু হেসে লুটোপাটি| আআআহ‚ পাহাড়ের মাথায় থেবড়ে বসে আঙুল অবশ করা ঠাণ্ডার মধ্যে গরম আদা-চায়ে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুকে শুধালাম "স্বর্গ কি এর চেয়েও সুন্দর‚ সিনথিয়া?" সে যে কি অপার্থিব শান্তি চরাচর জুড়ে! চারপাশ ঘিরে পাহাড়ের মাথায় পড়ন্ত বিকেলের কমলালেবু রঙের নরম আলো‚ সোনালি মেখলা পরে আহ্লাদী লর্চ পরীরা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের কোলের কাছটি ঘেঁষে‚ কুলুকুল আওয়াজ করে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণতোয়া ঝোরা ......"আমার আদি ও অন্ত জুড়ালো- আমি কেমন করিয়া জানাব আমার জুড়ালো হৃদয় জুড়ালো"..... হস্টেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল| আজকাল তো সাতটা না বাজতেই অন্ধকার হয়ে আসে| ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে পোর্টের বোতল খোলা হল| চিপস‚ চীস আর সসেজ-- থ্যাঙ্কসগিভিঙ সন্ধ্যার অ্যাপেটাইসার| ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে আর গল্প করতে করতে থ্যাঙ্কসগিভিঙ ডিনার রাঁধলাম দুজনে মিলে‚ আমি মাছ আর আলুভাজা‚ বন্ধু স্টাফড টার্কী ব্রেস্ট আর স্কোয়াশ| ডিনারের সাথে হোয়াইট ওয়াইন| হস্টেল ম্যানেজার যোগ দিলেন আমাদের সাথে খাবার টেবিলে| আজকের এই রাত থ্যাঙ্কসগিভিঙের রাত‚ কৃতজ্ঞতা জানানোর পরম লগ্ন--- ভগবানের উদ্দেশ্যে| Thank you God for everything.... হে দুনিয়ার মালিক তোমায় প্রণাম-- ক্ষুধার অন্ন‚ তৃষ্ণার জল‚ সব কিছুর জন্য‚ এই জীবনের জন্য‚ প্রতিটি দিনের জন্য| আমার তো ভগবান নেই‚ গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে প্রাণভরে ধন্যবাদ জানালাম আমার পাহাড়কে‚ ধন্যাবাদ জানালাম লর্চসুন্দরীদের আজকের এই অসাধারণ দিনটার জন্য‚ ধন্যবাদ জানালাম কানাডাকে‚ ধন্যাবাদ জানালাম আমার জন্মভূমিকে| ধন্যবাদ জানালাম আমার গাণুশকে‚ Thank you baby for always being there for me... মনে মনে আভূমি প্রণতি জানালাম আমার বাবাকে‚ আমার মাকে| প্রণাম করলাম আমার ধরিত্রী জননীকে‚ মাপ চেয়ে নিলাম সব অপকর্মের জন্য‚ "ক্ষমা করে দিও গো মা আমাদের যত ভ্রষ্টাচার‚ সব অত্যাচার|" আর আমার সুজন সখাকে‚ "মোর অন্ধকারের অন্তরে তুমি হেসেছ‚ তোমায় করি গো নমস্কার" ..... গল্প করতে করতে খাওয়াটা একটু ভারিই হয়ে গেল| ফায়ারপ্লেসের আগুন ঘিরে বসে আরো কিছু গল্পগাছা হল ডিনার শেষে‚ পরের দিনের প্ল্যান প্রোগ্র্যাম হল| সারাদিনের পরিশ্রম‚ ভরপেট খানা এবং পিনার পরে চোখ জুড়ে আসতে চাইছিল| কিন্তু একটা গুরুতর অ্যাজেণ্ডা বাকি রয়ে গেছে| তাই একটা অবধি আগুন উসকে বসে রইলাম দুজনেই| তারপর পার্কা কোট‚ বুট‚ টুপি‚ স্কার্ফ‚ গ্লাভসে ভূষিত হয়ে বাইরে গিয়ে বসলাম ঊর্ধ্বমুখে আমরা দুজন‚ অরোরা দর্শনের অভিপ্রায়ে| অমাবস্যার মহানিশা‚ মেঘমুক্ত আকাশ কুচকুচে কালো‚ তাতে লক্ষ তারার সলমা জরি‚ তিরতির করে কাঁপে ছায়াপথ (মিল্কি ওয়ের বাংলা তো এটাই?)| এর থেকে পারফেক্ট রাত আর হতে পারে না মেরুজ্যোতি দেখার জন্য| ফোরকাস্টও আছে‚ কিন্তু আসবে কি সে আজ রাতে আমরা জেগে থাকতে থাকতে? 'ঝুম ঝুম ঝুম রাত নিঝুম' ..... নিস্তব্ধ জঙ্গল‚ এমনকি একটা রাতচরা পাখির ডাকও শোনা যায় না| শুধু গাছেদের সাথে হাওয়ার ফিসফাস আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা এভ্যালাঞ্চের শব্দ| ঘন্টাখানেক বসে রইলাম‚ রাত নিবিড় থেকে নিবিড়তর হল‚ পুরু কোট ভেদ করে ঠাণ্ডা চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকতে শুরু করল শরীরে‚ বাতাস দিক পাল্টে বেশ জোরে বইতে শুরু করল‚ গাছগুলো ঝাপটাঝাপটি শুরু করল পাগলের মত‚ কিন্তু 'সে তো এল না‚ এল না'| দেখা হল না তার সাথে আমাদের এ'যাত্রায়| সোমবার সকালে উঠতে বেলা আটটা বেজে গেল| জলখাবার বানিয়ে খেয়ে‚ ব্যাগবোঁচকা সব গুছিয়ে‚ গাড়িতে চাপিয়ে‚ দুপুরের জন্য স্যাণ্ডুইচ‚ চা বানিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চেক আউট করে| বাড়ি ফিরে যাবার আগে আর এক দফা তীর্থভ্রমণ| আবার হাইউড পাস‚ আজ যাব Pocaterra.. আজ আকাশের মুখভার‚ স্নো পড়ছে‚ তেমন মারাত্মক কিছু নয়‚ তবে একেবারে মন্দও নয়| আবার সেই তুষারিত খাড়া বনপথ পেরিয়ে চলা-থামা-চলা‚ লর্চের শাখায় ভালোবেসে এঁকে দেওয়া ঠোঁটের স্পর্শ‚ চমকে যাওয়া কাঠবিড়ালি‚ থমকে যাওয়া হরিণছানা‚ ধীরে ধীরে পৌঁছে যাওয়া‚ তুষারের উজ্জ্বল সাদা প্রেক্ষাপটে ছবির মত লর্চের সোনালি প্রান্তর‚ পাহাড়ের মুখোমুখি বসে লাঞ্চ‚ অবশ দুই হাতে থার্মোসটা জড়িয়ে ধরে মৌজ করে চায়ে চুমুক দেওয়া| তবে আজ সাথী তুলো তুলো বরফ| বেশ জোরে হাওয়াও বইছে‚ খুরধার ছুরির মত ঠাণ্ডা হাওয়া| আজ যাত্রীর সংখ্যাও অনেক কম পথে| কখনো কখনো পুব আর পশ্চিমে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়| যেমন আজ- ঐ স্বর্ণালি লর্চের ক্যানভাসে ফুটে উঠতে থাকে সোনার বরণী গৌরীর মুখখচ্ছবিটি| এপারে আজ থ্যাঙ্কসগিভিঙের ছুটি| পৃথিবীর অপর পারে মহালয়া| নেমে আসার আগে হাতের গ্লাভস খুলে আঁজলা ভরে তুলে নিই বরফ‚ আঙুলগুলো অসাড় হয়ে যেতে থাকে মুহূর্তের মধ্যেই‚ আমি চোখ বন্ধ করে বলতে থাকি...."ওঁ আব্রহ্মভুবনাল্লোকা দেবর্ষি পিতৃমানবাঃ। তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্বে মাতৃমাতমহোদয়ঃ । অতীত কুলকোটীনাং সপ্তদ্বীপনিবাসিনাম। ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ম।।” .... তারপর সুবিশাল এক লর্চের পায়ের গোড়ায় ঢেলে দিই আমার মন্ত্রপূত বরফের অঞ্জলি| এই আমার মহালয়া| তর্পণ শেষ করে আমার ধন্যবাদ জানাই বর্ষীয়ান সেই গরীয়সী লর্চকে‚ পাহাড়কে ডেকে বলি "Thanks again",.... "এই নম্র নীরব সৌম্য গভীর আকাশে তোমায় করি গো নমস্কার"..... এবার ফেরার পালা| নি:শব্দে ঝরে পড়ে বরফ‚ নিরুচ্চারে ঝরতে থাকে লর্চের সোনালি পল্লব| আচ্ছা লর্চের বাংলা কি? নাহ‚ লর্চের বাংলা নেই| মহালয়ার যেমন ইংরেজি হয় না‚ লর্চেরও তেমনি বাংলা হয় না| সারাটা পথ সবাইকে বলতে বলতে চলতে থাকি‚ "ভালো থেকো‚ ভালো থেকো‚ আবার আসব‚ আবার দেখা হবে সামনের বছর"..... যেতে পা সরে না‚ তবু যেতে তো হবেই| ফিরে ফিরে দেখতে থাকি বারবার| সামনের সপ্তাহেই যদি ফিরে আসি‚ এই রঙ‚ এই ছবি হয়তো পুরোটাই বদলে যাবে‚ ঝরে যাবে সব সোনা‚ ঘুমিয়ে পড়বে লর্চেরা সবাই| ঠিক যেন দশমীর প্রতিমা বিসর্জনএর পর শূণ্য বেদীটি| তাই একটু যাই‚ আবার ফিরে চাই‚ একবার এদিক‚ একবার ওদিক| শেষবারের মত আর একবার| এই তো আমার পুজো‚ আমার বোধন‚ আমার অধিবাস‚ আমার সন্ধিপূজা‚ এইভাবেই আমার দশমী ..... "এ এক অন্য প্রেমের গান‚ এ এক অন্য প্রেমের সুর"..... এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সুন্দর শান্তি আজ পাহাড়ে| কালকের রৌদ্রস্নাত পাহাড় আর আজকের মেঘের চাদর গায়ে জড়ানো বরফভেজা পাহাড়‚ একেবারে দুটো আলাদা রূপ‚ শুধু মুগ্ধতাটুকু আমার একই রয়ে যায় ..... "আজ গিয়েছি সবার মাঝারে, সেথায় দেখেছি আলোক-আসনে- দেখেছি আমার হৃদয়-রাজারে, আমি দু'য়েকটি কথা কয়েছি তা সনে সে নীরব সভা-মাঝারে- দেখেছি চিরজনমের রাজারে, আমি কেমন করিয়া জানাব "......

90

2

শিবাংশু

পঞ্চ-ম'কার নিয়ে দুচার কথা

"তন্ত্রসাধনার মূল স্রোতটি যে আচারপদ্ধতিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে, তা হলো পঞ্চ ম-কার ক্রিয়া । এই পদ্ধতিটি নিয়ে আবহমানকাল ধরে নানা ধরনের পরস্পর বিপ্রতীপ মতামত প্রচলিত রয়েছে। প্রায় সোয়াশো বছর আগে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবার উপক্রমনিকা হিসেবে একটি কৈফিয়ৎ যেমনভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো, ''...ভারত-প্রচলিত তান্ত্রিক উপাসনার প্রকৃত মর্ম ও পঞ্চ মকারের মূল উদ্দেশ্য আমাদের জ্ঞানে যতদূর উদ্বোধ হইয়াছে এবং ইহার আধ্যাত্মিক-তত্ত্ব যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে....'' ইত্যাদি । অর্থাৎ এই ব্যাখ্যাটির প্রামাণ্যতা নির্ভর করছে দু'টি বিষয়ের উপর, 'আমাদের জ্ঞান' ও ''যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে''। এ বিষয়ে সাক্ষী মানা হয়েছে 'আগমসার' নামের একটি প্রাচীন গ্রন্থের । এই গ্রন্থে প্রথম-ম, অর্থাৎ 'মদ্য' সাধন বিষয়ে বলা হয়েছে, '' সোমধারা ক্ষরেদ যা তু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ বরাননে । পীত্বানন্দময়ীং তাং য স এব মদ্যসাধকঃ ।।'' তাৎপর্যঃ- '' হে পার্বতি ! ব্রহ্মরন্ধ্র হইতে যে অমৃতধারা ক্ষরিত হয়, তাহা পান করিলে, লোকে আনন্দময় হয়, ইহারই নাম মদ্যসাধক । মাংসসাধনা সম্বন্ধে বলা হচ্ছে, ''মা, রসনা শব্দের নামান্তর, বাক্য তদংশভূত ; যে ব্যক্তি সতত উহা ভক্ষণ করে, তাহাকেই মাংসসাধক বলা যায় । মাংসসাধক ব্যক্তি প্রকৃত প্রস্তাবে বাক্যসংযমী মৌনাবলম্বী যোগী ।'' মৎসসাধনার তাৎপর্য আরও গূঢ় ও প্রতীকী । '' গঙ্গা-যমুনার মধ্যে দুইটি মৎস্য সতত চরিতেছে, যে ব্যক্তি এই দুইটি মৎস্য ভোজন করে, তাহার নাম মৎস্যসাধক । আধ্যাত্মিক মর্ম গঙ্গা ও যমুনা, ইড়া ও পিঙ্গলা; এই উভয়ের মধ্যে যে শ্বাস-প্রশ্বাস, তাহারাই দুইটি মৎস্য, যে ব্যক্তি এই মৎস্য ভক্ষণ করেন, অর্থাৎ প্রাণারামসাধক শ্বাস-প্রশ্বাস, রোধ করিয়া কুম্ভকের পুষ্টিসাধন করেন, তাঁহাকেই মৎস্যসাধক বলা যায় ।'' মুদ্রাসাধনার তাৎপর্য এ রকম, '' .... শিরঃস্থিত সহস্রদল মহাপদ্মে মুদ্রিত কর্ণিকাভ্যন্তরে শুদ্ধ পারদতুল্য আত্মার অবস্থিতি, যদিও ইহার তেজঃ কোটিসূর্য্যসদৃশ, কিন্তু স্নিগ্ধতায় ইনি কোটি চন্দ্রতুল্য । এই পরম পদার্থ অতিশয় মনোহর এবং কুন্ডলিনী শক্তি সমন্বিত, যাঁহার এরূপ জ্ঞানের উদয় হয়, তিনিই প্রকৃত মুদ্রাসাধক হইতে পারেন।'' মৈথুনতত্ত্ব সম্বন্ধে 'অতি জটিল' বিশেষণ আরোপ করা হয়েছে আগমসার গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে, মৈথুনসাধক পরমযোগী । কারণ তাঁরা '' বায়ুরূপ লিঙ্গকে শূন্যরূপ যোনিতে প্রবেশ করাইয়া কুম্ভকরূপ রমণে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন।'' আবার অন্য ঘরানার তন্ত্রে বলা হচ্ছে,'' মৈথুনব্যাপার সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কারণ, ইহা পরমতত্ত্ব বলিয়া শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে। মৈথুন ক্রিয়াতে সিদ্ধিলাভ ঘটে এবং তাহা হইলে সুদুর্লভ ব্রহ্মজ্ঞান হইয়া থাকে।'' যে 'সাধারণ' লোকেরা তন্ত্রের প্রথম উদ্গাতা ছিলো এবং ম-কার যাদের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ, তাদের প্রতি পুরোহিতশ্রেণীর আশংকা, ''.... সাধারণ লোকে উদ্দেশ্য ও প্রকৃত মর্ম বুঝিতে না পারিয়া তন্ত্রশাস্ত্র ও তন্ত্রোক্ত পঞ্চ-মকারের প্রতি ঘোরতর ঘৃণা ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।'' উল্লেখ্য, বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য , উভয় ঘরানার তন্ত্রেরই আকর উৎস বিভিন্ন আগমশাস্ত্র । আগমশাস্ত্র বস্তুতঃ আদি প্রযুক্তিপ্রকৌশলের গ্রন্থিত সংগ্রহ । খেটেখাওয়া শ্রমজীবী সাধারণ মানুষই আদিতে যাবতীয় আগমশাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলো। কালক্রমে এইসব ভৌতশাস্ত্র আধিদৈবিক অতীন্দ্রিয় কর্মকান্ডের রূপ পরিগ্রহ করে ইতরজনের নাগালের বাইরে চলে যায়। 'সাধারণ' জনগোষ্ঠীর নৈতিকতায় 'মৈথুন' কখনই ''কদর্য, কুৎসিত'' বোধ হয়নি । এই বোধটি আর্যায়নের সঙ্গে এসেছিলো । শাস্ত্রকার এভাবে ব্যাখ্যা করছেন, ''....আপাততঃ মৈথুন ব্যাপারটি অশ্লীলরূপে প্রতীয়মান হইতেছে, কিন্তু নিবিষ্টচিত্তে অনুধাবন করিলে, তন্ত্রশাস্ত্রে ইহার কতদূর গূঢ়ভাব সন্নিবেশিত আছে তাহা বুঝা যাইতে পারে । যেরূপ পুরুষজাতি পুংঅঙ্গের সহকারিতায় স্ত্রীযোনিতে প্রচলিত মৈথুন কার্য করিয়া থাকে, সেইরূপ 'র' এই বর্ণে আকারের সাহায্যে 'ম' এই বর্ণ মিলিত হইয়া তারকব্রহ্ম রাম নামোচ্চারণরূপে তান্ত্রিক অধ্যাত্ম-মৈথুন ক্রিয়া নিষ্পাদিত হইয়া থাকে।'' শারীরিক মৈথুনের বিভিন্ন অঙ্গ, যেমন, আলিঙ্গন, চুম্বন, শীৎকার,অনুলেপ, রমণ ও রেতোৎসর্গ, তেমনই আধ্যাত্মিক মৈথুন ও যোগক্রিয়ায় তার সমান্তরাল কৃত্যও কল্পনা করা হয়েছে । সেখানে 'তত্ত্বাদিন্যাসের' নাম আলিঙ্গন, ধ্যানের নাম চুম্বন, আবাহনের নাম শীৎকার, নৈবেদ্যের নাম অনুলেপন, জপের নাম রমণ আর দক্ষিণান্তের নাম রেতঃপাতন। এই সাধনাটির নাম 'ষড়ঙ্গসাধন' এবং শিবের ইচ্ছায় একে 'অতীব গোপন' মোহর দেওয়া হয়েছিলো । তা ছাড়া '' কলির জীব পঞ্চ ম-কারের মর্ম বুঝিতে পারিবে না বলিয়া কলিতে ইহা নিষিদ্ধ হইয়াছে ।'' অতএব ইতরজনের জন্য এইসব দর্শন 'নিষিদ্ধ' হয়ে গেলো এবং উচ্চবর্গ তাদের হাতে শেষ পর্যন্ত পেন্সিল ছাড়া আর কিছু থাকতে দিলোনা । ইতরজন ও নারীজাতি এই সব শাস্ত্র প্রণয়নের সময় একই ধরনের সম্মান(?) লাভ করতো। সাধনসঙ্গিনী নির্বাচনের যে প্রথাপ্রকরণ এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, সেখানে নারীকে একধরনের বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বোধ হতে পারে । নামে নারীই 'শক্তি' , কিন্তু শক্তি সাধনের ষটকর্মে সাধনসঙ্গিনীর যে সব লক্ষণ নির্দেশ করা হয়েছে তার থেকে সম্মাননা বা অবমাননার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু উল্লেখ করা যায় । যেমন, সাধনসঙ্গিনী হিসেবে পদ্মিণী নারী শান্তিদায়িনী । সে হবে গৌরাঙ্গী, দীর্ঘকেশী, সর্বদা অমৃতভাষিণী ও রক্তনেত্রা । শঙ্খিণী নারী হয় মন্ত্রসিদ্ধকারী । সে হবে দীর্ঘাঙ্গী এবং নিখিল জনরঞ্জনকারিণী। যে নারী নাগিনী গোত্রের, তার লক্ষণ হলো শূদ্রতুল্যদেহধারিণী, নাতিখর্বা, নাতিদীর্ঘ, দীর্ঘকেশী, মধ্যপুষ্টা ও মৃদুভাষিণী । এর পর কৃষ্ণাঙ্গী, কৃশাঙ্গী, দন্তুরা, মদতাপিতা, হ্রস্বকেশী, দীর্ঘঘোণা, নিরন্তর নিষ্ঠুরবাদিনী, সদাক্রুদ্ধা, দীর্ঘদেহা, মহাবাবিনী, নির্লজ্জা, হাস্যহীনা, নিদ্রালু ও বহুভক্ষিণী নারীকে ডাকিনী বলা হয় ( যোগিনীতন্ত্রম)।"

79

1

অনভিপ্রেত

https://www.justori.com/justori/stories/particularStoryDetails/1305/1224

37

0

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আনন্দমেলা টায় হাত দিয়ে দেখছিল মিমি| মা দেখতে পেলেই বকবে| অনেক সাধ্যসাধনা করে বইটাকে পাশে রাখার অনুমতি পেয়েছে| কি সুন্দর কার্টুনের মত দুর্গাঠকুর‚ পেছনে শরতের স্ব্চ্ছ নীল আকাশ| ভেতরে দারুণ দারুণ গল্প‚ আঁকা‚ উপন্যাস ‚ কার্টুন অপেক্ষা করছে তার জন্য| উফফ আর একটা দিন‚ কালকেই প্রিটেস্ট শেষ| বাড়ি এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে বইটার ওপর| ভেবে আবার টেন টিচার্সের পাতায় মন দেয় মিমি| সংবিধান পড়তে একদম ভালো লাগে না| মনে থাকে না কিছুই| তাও পড়তেই হবে| "মা‚ জল খাবো|" চেঁচায় রুমি| মিমির চেয়ে দু'বছরের বড় রুমি| মা রান্নাঘর থেকে এসে দু'জন কে দু গ্লাস জল দিয়ে যায়| বাপি রেগে ওঠে‚ "তোরা মা'র জন্য পড়ছিস? জল গিয়ে খেয়ে আসতে পারিস না?" মা কিছু বলে না| মিমি বোঝে না বাপির রেগে যাবার কি হল| পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে হাঁপ ছাড়ে| বাইরে গাড়িতে মা বসে আছে| ওদেরকে নিয়ে নিউ মার্কেট যাবে| যাহ‚ আনন্দমেলা পড়াটা পিছিয়ে গেল| নিউ মার্কেট পৌঁছে অবশ্য ভুলে যায়| পুজো পুজো গন্ধ পায় মিমি| নতুন একটা দোকান হয়েছে| ওয়েস্টার্ন ড্রেস পাওয়া যাচ্ছে| মা দিদিকে একটা আর তাকে একটা সুন্দর টপ কিনে দিল| এক একটার দাম ১০০ টাকা| অবাক হয়ে যায় মিমি| একটা টপের দাম ১০০ টাকা নিল! এবার আর ট্রেজার আইল্যান্ড যাওয়া হল না| গত বছর খুলেছে এসি মার্কেটটা| মা এর সাথে এসেছিল| একদল ছেলে কি সুন্দর কোটপ্যান্ট পরে ঘুরছিল| দিদি বললো মনে হচ্ছে লা মার্টসের ছেলে| স্কুলের থেকেই এসেছে| কি সুন্দর স্কুলড্রেস ওদের| সাহেবদের মত| খুব স্মার্ট দেখাচ্ছিল ছেলেগুলোকে| তাদের যে কেন ওরকম ড্রেস হয় না! ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলে মেয়েরা যেন অন্য জগতের মানুষ| স্মার্ট‚ ঝক্ঝকে‚ কথায় কথায় ছোট ছোট ইংলিশ শব্দ গুঁজে দেয়| সুলেখা পিসির ছেলের জন্মদিনে প্রমা এসেছিল| কি সুন্দর লম্বা‚ দারুণ দেখতে| কোন স্কুলে পড়ো জিজ্ঞেস করতে বললো‚ "লোরেটো ধরমতলা"| ধরমতলা‚ ধরমতলা‚ মনে মনে আউড়ে নিল মিমি| ধর্মতলাকে ওরা বলে ধরমতলা| পরীক্ষা মোটামুটি হলে বলে ‚' সো সো'| মিমিও আউড়ায়‚ 'সো সো'| হোঁচট খেল এসব হাবিজাবি ভাবতে গিয়ে| 'আউচ্'‚ জোর করে বললো মিমি| মা বকলো‚ 'এত কায়দা করছিস কেন? আউচ আবার কি!' মিমি চুপসে গেল| সত্যি ‚ সত্যি আউচ তার স্বাভাবিক ভাবে আসে না| কিন্তু কেতার এই শব্দ টা অনেক কষ্ট করে সঠিক জায়গায় লাগনও অভ্যেস করছে সে| মা যে কি না! বড্ড শাসন করে| একটা প্যান্ট কেনার ইচ্ছে| নাকি ট্রাউজার্স! কখন যে প্যান্ট বলে আর কখন ট্রাউজার্স বোঝে না সে| মা কে বললো| মা দোকানের ছেলেটাকে বললো ওর জন্য একটা জিনস দেখাও তো| ছেলেটা মাপ দিতে ডাকলো| মিমি মাপ দেবে না| দোকানের ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে| বুঝতে পারছে না মাপ না দিয়ে প্যান্ট কিনবে কি করে| মিমি আন্দাজে একটা তুলে নিল| ছেলেটার চেহারাটা ভারি মিষ্টি| মা কাউন্টারে পয়সা মেটাচ্ছে| ছেলেটা আড়ে আড়ে দেখছে ওদেরকে| মিমির বেশ মজা লাগলো| দোকান থেকে বেরিয়ে মা ব্যস্ত হয়ে পাড়লো বাইরে ঝুড়ি নিয়ে বসা হকারদের সাথে - দড়ি‚ ক্লিপ‚ সেফটিপিন কত যে কেনার থাকে মা এর|

1656

110

জল

গল্প

জীবনেরও খেলা আকাশপারে .......................... আর কদিন বাদেই পুজো| আকাশের দিকে তাকালেই থোকা থোকা মেঘ জানান দিচ্ছে শরৎ এসে গেছে| ঋতুচক্রের এই মাসটা বড় প্রিয় ঋতুজার| আকাশে-বাতাসে একটা পুজো পুজো গন্ধ লেগে থাকে| মন উচাটন হয়ে থাকে| দিনগুলো যেন মেঘের ভেলায় ভাসতে ভাসতেই কেটে যায় দ্রুত| তবে এই বছরটা কোনভাবেই ভালো যাচ্ছে না| কিছু না কিছু লেগেই আছে| এই তো কদিন আগেই শারদকে নিয়ে কি ভোগাটাই না ভুগল| শুধু কদিন আগে নয় তার প্রায় মাসখানেক আগেও শারদের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল| তখনও এক্প্রস্থ ভুগতে হয়েছিল| সংসারে শারদই একমাত্র উপার্জক| আর বলতে গেলে হেসে-খেলেই চলে যায় সংসার| কোথাও কোন অভাবের ছাপ নেই| তিনতলা বাড়ি‚ গাড়ি‚ একটা সন্তান| বলতে গেলে বেশ সুখেই আছে ঋতুজা| হাত নেড়ে যা রান্নাটাই করতে হয়‚ বাকি সব কাজ করার জন্য বাড়িতে ঠিকে কাজের লোকও আছে| ছুটির দিনে শারদ বসে থাকার পাত্র নয়‚ সমানে সে বউকে সাহায্য করে যায়| এসব সত্ত্বেও এবার কিন্তু ঋতুজার মনটা ভালো নেই| কারণটা আর কিছুই নয়‚ এবার এত অসুখ-বিসুখের জ্বালায় বিস্তরখানেক টাকা খরচ হয়ে গেছে| সেসব সামাল দিতেই নিজেকে একটু বুঝিয়েছে সে| দুটো আলমারী ভর্তি শাড়ি‚ কতই বা পরে সে| এখন তো সব জায়াগাতেই চুরিদার নয়ত কুর্তি-লেগিংস পড়েই চালিয়ে দেয়| একবছরের চুরিদার-কুর্তি অন্যবছরে পড়ে না সে| কিন্তু শাড়ির বেলা সেই নিয়মটা খাটে না| তাকভর্তি দামী তসর‚ সিল্ক‚ হ্যন্ডলুম‚ ডিজাইনার কি নেই| একটা আস্ত শো'রুম তার আলমারীর তাকগুলো| তবু মানুষের তো এটাই প্রকৃতি যে যত পায়‚ সে তত চায়| ঋতুজাই বা ব্যতিক্রম হয় কি করে| তাই মনটা বেশ খারাপ| যদিও নয় নয় করে গোটা তিনেক সালোয়ার স্যুট বানিয়ে বাড়ি আনা হয়ে গেছে‚ গোটা তিনেক আগের কেনা নতুন শাড়ির ডিজাইনার ব্লাউজও দিনকয়েকের মধ্যে ডেলিভারী দিয়ে দেবে| আর দুটো কুর্তি‚ সাথে লেগিংসও কিনেছে| কিন্তু এতে কি আর মন ভরে! তাই উদাস নয়নে সে তাকিয়ে থাকে আকাশের সাদা মেঘগুলোর দিকে| দেখছে কিন্তু দেখছেও না| ------- একটু আগেই আকাশটা বেশ মেঘলা করে এসেছিল| দৌড়ে গিয়ে সব জামাকাপড়গুলো তুলে ফেললেন মীরা| সকাল থেকে চড়া রোদ ছিল| কাচা জামা-কাপড়গুলো সব মড়মড়ে হয়ে শুকিয়ে গেছে| সেগুলো ভিজে গেলে খুব গায়ে লাগত| তাই মেঘলা হতেই তুলে নিলেন| একটু আগে হলে সোনামণিই সব তুলে নিত| যেমন বের হল‚ অমনি আকাশটা মেঘ করে এলো| কাপড়জামাগুলো তুলে ছাদের কার্ণিশ দিয়ে মুখটা বাড়াতেই গলির মোড় থেকে সোনামণির শাড়ির আঁচলটা অদৃশ্য হয়ে গেল| পিছন পিছন জামাই| মীরার ঠোঁটের কোনে একচিলতে হাসি খেলে যায়| জামাই ঠিক যেন সোনামণির বাবার মত| বয়স হয়ে যাবার পরও চোখে হারাতেন বউকে‚ যেমনটা শারদ হারায়| ধীরে ধীরে সরে আসেন কার্ণিশ থেকে| আজকাল নিচের দিকে তাকালেই মাথা ঘোরে বনবন করে| কি যে এক রোগে পেল তাকে| জামাকাপড়গুলো ডাঁই করে রেখে সোফাতে গা এলিয়ে দেন| বয়স জানান দিচ্ছে‚ আজকাল আর পরিশ্রম সহ্য হয় না| সিঁড়িতে ওঠানামা করলেই হাঁটুর ব্যথাটা চাগাড় দেয়‚ কোমরটা কটকট করে| এসব তো আগেও ছিল‚ এখনও আছে‚ পাত্তা দেন না| কিন্তু এই যে থেকে থেকেই উঠতে গেলেই মাথা ঘুরে ওঠা‚ হট করে ঝটকা খাওয়া এসব তো কোনকালেই ছিল না| রোগ-বালাই কোনকালেই তার ছিল না| সোনামণির বাবাকে একপয়সা কোনকালে খরচ করতে হয়নি তার ওপরে| জ্বর-জ্বালা হলে দুদিন শুয়ে-বসে থাকলেই সেরে যেত| খুব বেশি হলে পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে একটা আধটা ওষুধ| তিনি কিন্তু খুব যত্নে রাখতেন‚ একটাও কাজ করতে দিতেন না| টিভিতে একটা জনপ্রিয় ধারাবাহিক চলছে| রোজই তো বারতিনেক একই সিরিয়ালের রিপিট টেলিকাস্ট চলে সবকটা চ্যানেল জুড়ে| চ্যানেল বদলে বদলে মীরা প্রিয় ধারাবাহিকগুলো দেখে নেন| আজও টিভি দেখছিলেন‚ তখনই মেঘলা করে এলো| এ বাড়িতে টিভি দেখার ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই| যখন ইচ্ছে টিভি দেখ| এই ধারাবাহিকগুলো যেন এখন মীরার জীবনের অঙ্গ| অথচ খোকনের সংসারে এইসব ধারাবাহিক দেখার কোন সুযোগ ছিল না| এর ঘর ওর ঘরে গিয়ে দেখতেন| তাতেও অশান্তি| ছেলে-বৌ বের হবার মুখে টিভির সমস্ত কানেকশনগুলো খুলে দিয়ে যেত| পাছে তিনি খুলে টিভি দেখেন| মাপা জীবন ছিল সেখানে| যতটা খেতে দিত ঠিক ততটাই খেতে হত| একটু চিনি খেতে ভালোবাসেন ‚ একটু চা খেতে ভালোবাসেন| নাহ সেসবেও অধিকার ছিল না| যে ফ্ল্যাটটায় থাকতেন‚ সেটাতে খোকনের বাবার বেশকিছু টাকা লেগেছিল| বাকিটা খোকন ব্যাঙ্কলোন নিয়েছিল| যেহেতু খোকনই শোধ করবে লোন তাই ফ্ল্যাট কেনা হয় খোকনের নামে| বাবা-মা অন্তপ্রাণ খোকন যে বদলে যাবে সেটা কি আর সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন| পরের মেয়ের দোষ দেন না তিনি| খোকনের দোষ‚ নাকি নিজের কপালের? আসলে একটা গোটা বছরের তিনশ পঁয়শট্টি দিনের শুরুর জীবন আর শেষের জীবন যে এক থাকে না| চড়া রঙের দিনগুলো সময়ের সাথে সাথে ফ্যাকাসে হতে শুরু করে‚ সেই বোধটা যদি আগেই এসে যেত তবে হয়ত জীবনটা অন্যরকম হত| টিভির ধারাবাহিকের কাহিনী নতুন রোমহর্ষক মোড় নয়| মীরা টিভির দিকে বিষন্ন নয়নে দেখতে থাকেন| টিভি দেখেন নাকি নিজের অতীতকে বারবার দেখতে থাকেন নিজেই সময়ে সময়ে বোঝেন না| ...........| 'এবার একটা শাড়ি তোমাকে পছন্দ করতেই হবে|' শরাদ জানায়| অফিসে বাকি কাজটা স্টাফেদের বুঝিয়ে হাফ ডে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল| ঋতুকে আগাম কিছুই জানতে দেয়নি| একটা চমক দিতে চেয়েছিল| ঋতু অসময়ে শারদকে ফিরতে দেখে প্রথমে ভেবেছিল আবার বুঝি কিছু একটা সমস্যা হয়েছে| তারপর খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠেছে| শারদ ঋতুকে এইভাবেই দেখতে চায়| সদা সর্বদা হাসি-খুশি| তিন তিনটে বাজার ঘুরে এবার ঢুকেছেন একটা নামী দোকানে| এখানে নিশ্চয় ঋতুর শাড়ি পছন্দ হবেই| আর এইসব বড় দোকানের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে কিছুতেই কাস্টমারকে ছাড়া যাবে না| পছন্দ করিয়েই ছাড়বে| নিতান্ত একটা দুটো কাস্টমার হাত ফসকে যায়| একের পর এক শাড়ি দেখেই চলেছে| তিনতলা বাড়ির সবটাই ঘোরা হয়ে গেল| এবার একটু হতাশ লাগে শারদের| তবে কি একটাও শাড়ি পছন্দ হবে না? 'এই শুনছ? দেখ না এই শাড়িটা তোমার পছন্দ হয়?' শাড়ি তেমন চেনেন না‚ বোঝেনও না| শুধু বোঝেন ঋতুজার পরণে যাই উঠবে তাই সুন্দর হয়ে যাবে| একটু এগিয়ে যায় সে| মধ্যবয়সী ঋতুজা আজও একইরকম সুন্দর| লাবন্য যেন ঝরে পড়ছে|কোমর ছাপানো ঘন চুল গদীর ওপর লুটিয়ে পরে আছে| চোখ ফেরাতে পারে না শারদ| 'নিয়ে নাও‚ তোমাকে খুব মানাবে?' 'সাড়ে নয় বলছে যে?' 'আরে‚ নিয়ে নাও|' কড়কড়ে সাড়ে ন'হাজার টাকা বার করে দেয়| ঋতুজার মুখে শেষবিকেলের মোলায়েম রেশের মত হাসি ছড়িয়ে পড়ে| এবার একটু খাওয়া-দাওয়া আর বাড়ির জন্য খাবার কিনে তারপর বাড়ি ফেরা| শাড়িটা কিনে বাইরের ভিড়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে থাকে| .................| বাড়িতে কেউ নেই| নাতি গেছে অফিস‚ ওরা গেছে জামাকাপড় কিনতে| কখন ফিরবে কে জানে? কিছুতেই মাথা তুলতে পারে না মীরা| আজ তিনমাস হয়ে গেল| কোন উপশমই হচ্ছে না| তিনটে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বদলে ফেলেছে কিন্তু কিছুতেই কিছু না| দুদিন ভালো থাকেন তো দশদিন খারাপ| এইভাবে চলবে কি করে? নিজের হাতে তো কিছু নেই| পরহস্ত ধন হয়েই সারাজীবন কেটে গেল| ও বাড়ির গিন্নী বলছিল একটা অ্যালোপাথি ডাক্তার দেখাতে| কিন্তু সে যে অনেক খরচ| দেখালেই তো হল না‚ গাদাগুচ্ছের টেস্ট দেবে| এত টাকা কোথায় পাবেন তিনি? এক তো জামাইয়ের ওপর বোঝা হয়ে বসে আছেন| এখানে তিনি স্বাধীন| তবে কোনকিছু কি আর এমনি এমনি মেলে? মেলে না| এখানে তিনি গতর দেন‚ সেটা খোকনের সংসারেও দিতেন| চেষ্টা তো করেছিলেন‚ খুব চেষ্টা করেছিলেন মুখ বুজে ছেলের সংসারে পড়ে থাকতে| পারলেন কই| শেষ অবধি সোনামণি অবশ্য এখানে নিয়ে আসল| না হলে হয়ত একটা সময় মরেই যেতেন| তবু জামাইভাতি বড় লজ্জার|কিছুতেই যেন অধিকারবোধ আসতে চায় না| তাও সোনামণিকে বলেছিলেন ঠারে ঠোরে| মেয়ে সরাসরি মুখের ওপর বলে দিল‚ 'দেখ মা‚ তোমার জামাইয়ের রোগের জন্য এত খরচ খরচা হল নিজের চোখেই তো সব দেখলে| আবার এই অসুখেও এত খরচ| তোমার মেয়ে তো রোজগার করে না মা‚ যে তোমার জন্য কিছু করবে? এর ওপর তোমার জন্য কি করে বলি বলত?' সত্যি তো এই যুক্তি কি অস্বীকার করা যায়? নাহ আজ আর কিছুতেই মাথা তুলতে পারছেন না| মরার মত শুয়ে থাকেন| সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ আসছে| ওরা ফিরল বুঝি| ' মা‚ ও মা‚ দেখ নো মা‚ তোমার জামাই এই শাড়িটা আমায় দিয়েছে|' উঠে বসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মীরা| ঐ কাৎ থেকে এইপাশে ফিরে মেয়ের হাতে মেলে ধরা শাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখেন| সত্যি সুন্দর হয়েছে| খুব মানাবে সোনামণিকে| 'এত দামের কিনব না বললাম‚তা তোমার জামাই শুনলে তো মা?' শারদের প্রতি ছদ্ম ক্ষোভ এনে বলে ঋতুজা| 'প্রায় দশ পড়ে গেল মা| ভালো হয়েছে না?' মীরা ঘাড় নেড়ে ঐ কাৎ এ আবার ফিরে যান| ক্ষণিকের জন্য মনে হয়‚ ' এই দশহাজার কি মায়ের জন্য একবার শাড়ি না কিনে কি খরচ করা যেত না? তোর তো শাড়ির অভাব নেই|' পরক্ষণেই লজ্জিত হন| এসব কি ভাবছেন তিনি| 'আজ আর রাতের রান্না তোমায় করতে হবে না মা| খাবার কিনে এনেছি|' রঙীন প্রজাপতির মত উড়ে যায় ঋতুজা এই ঘর থেকে ঐ ঘরে| মীরার চোখ ক্রমশ ঝাপসা হতে শুরু করে| কোথাও একটা যন্ত্রণা হচ্ছে‚ কোথাও একটা কষ্ট হচ্ছে| কুঁকড়ে যেতে থাকে শরীরটা নিস্তব্ধে কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে|

2170

185

মনোজ ভট্টাচার্য

বৃদ্ধাবাসের ভাবনা !

বৃদ্ধাবাসের ভাবনা ! লেখার গুনে সাধারন গোল গোল করে লেখাও তরিয়ে যায় ! আর আমার কত কষ্ট করে বিশেষ বিশেষ লেখাও পঠনযোগ্য হয়ে ওঠে না ! কি দুঃখ - কী দুঃখ ! থুথু ফেলে ডুবে মরব – এ জীবন আর রাখবো না – এসব কথাও যে ভাবিনা তা নয় ! তখন আবার নন্দলালের কথা মনে পড়ে ! প্রসঙ্গ হল শ্রী-র বৃদ্ধাবাস সম্বন্ধে কিছু কৌতূহল ! – খুব সম্প্রতিই আকাশ আট এর বৃদ্ধাশ্রম সিরিজটা শেষ হয়েছে ! – এই সিরিজের শুরুর দিকে আমাদের - উত্তরপাড়ায় ওদের মেলায় যেতে হয়েছিলো ! – আমরা যেহেতু বৃদ্ধাবাস নিয়ে কাজ করি – তাই আমাদেরও আলোচনা ইত্যাদির জন্যে ডাকা হয়েছিলো ! কিছু বিতর্কে যোগ দিতে হয়েছিলো ! এসব টি ভি তে প্রচারও হয়েছিলো । আমি আগেও এখানে বিশেষ করে – লিখেছিলাম ! কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত আমরা বৃদ্ধাবাস সম্বন্ধে খুব উৎসাহী ছিলাম – ফ্ল্যাট না থাকলে হয়ত আলমবাজারের অথবা ব্যারাকপুরের বৃদ্ধাবাসে গিয়েই উঠতাম ! – এখানে আসা থেকে প্রবীণ নাগরিকদের নিয়ে ছোটখাটো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ক্রমশ বৃদ্ধাবাস নিয়েও জড়িয়ে পড়তে হয় । তথাকথিত বৃদ্ধাশ্রম – আমি বলি বৃদ্ধাবাসগুলোতে গিয়ে গিয়ে খোঁজ খবর করা ও তাদের রিপোর্ট দেওয়া করেছি । - আর আমার নিজের জায়গা – এই আড্ডাতে - অনেক কিছু লিখেছিও ! – বৃদ্ধাবাস শুধুমাত্র আবেগ নয় ! এখন এটা যথেষ্ট প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে ! এক সময় আমাদের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রম কথাটা খুব একটা সন্মানজনক বলে মনে করা হত না ! আগে আগে শুনেছি বৃদ্ধা পিসি-মাসি – এমন কি ঠাকুরমাকে পর্যন্ত কাশী বৃন্দাবনের কোন আশ্রমে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হত ! – এর পর তাদের যে কী দশা হত সে আর বলে কাজ নেই ! – যত দুর মনে পড়ে – বাম ফ্রন্ট সরকারে আসার পর থেকেই সেই সব বয়স্ক মানুষদের নিজ দেশেই থাকার জন্যে এখানে সরকারী উদ্যোগে কয়েকটা বৃদ্ধাবাস তৈরি হয় ! ক্রমশ সরকারী তহবিল কমে যাওয়ার ও মাঝপথে সেই অর্থ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সেই আবাসনগুলো খুবই দুর্দশায় পড়ে ! কিছুদিন আগে কল্যানীর একটা সরকারী বৃদ্ধাবাসে গিয়ে দেখি সেটা বন্ধ করে আরও একটা পর্যটন কেন্দ্র করার পরিকল্পনা হচ্ছে ! বর্তমান পঞ্চায়েত শাসকের কেউ আমাদের সঙ্গে কোন কথাই বলতে চাইল না ! ঘাটালের কাছাকাছি তিনটে বৃদ্ধাবাসের দুরবস্থা দেখে এসেছি ! সরকারী অনুদান ঠিকমতো আসে না তো বটেই – সরকারী কর্মচারীদের ঘুষের দাবী এত বেড়ে গেছে – যে পরিচালকেরা প্রায় হাল ছেড়ে দিতে চাইছে । আমরা সেই রিপোর্ট দেখাতে – তারা অস্বীকার করলো ! - আঞ্চলিক ব্যবসায়ীদের শুধু চাল ডাল ভিক্ষাতে - আশ্রম চলে ? শারীরিক দেখা-শুনা তো অনেক দুরের কথা ! এই সুযোগে অনুপ্রবেশ ঘটছে বৃদ্ধাশ্রম ব্যবসায়ীদের ! এরা আবার প্রতিশ্রুতি দেয় হেলথ কেয়ারের ! সপ্তাহে একদিন ডাক্তার এসে রুটিন চেক আপ করে যায় । যথারীতি তাদের ক্লিনিকেই টেস্টগুলো করানো হবে – ইত্যাদি ! – এদের পরিচালন বোর্ডের মধ্যে প্রাক্তন কোম্পানির চেয়ারম্যান, এককালের স্বনামধন্য দেশসেবিকা ও এক জায়গায় তো দেখি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এক স্নেহধন্য শিশ্য আছে ! বৃদ্ধাবাসগুলো উন্নীত হল তিনতারা চারতারা হোটেল এ ! কিছু কিছু আশ্রম তো আবার সুইটের মধ্যে রান্নার জায়গাও দিচ্ছে ! আবার অনেকে যাবজ্জীবন মালিকানা ও মৃত্যুর পরে সত্তর শতাংশ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ! – তবু এদের বৃদ্ধাশ্রমই বলে ! কারন অনেক অনাবাসী বাঙ্গালি দেশে একটা বৃদ্ধাশ্রম করে দেশ-সেবা করবেন বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ! তাদেরই সেই আশ্রমের প্রসপেক্টাস দেখলেই আমার কথার যৌক্তিকতা মানবেন ! – মাসে কুড়ি হাজারের ওপর খাওয়া দাওয়ার চার্জ আর সিকিউরিটি জমা দশ লাখের ওপর – মৃত্যুর পর সত্তর শতাংশ ফেরত ! – এসব দেশ-সেবা কিনা – সে নিয়ে আমি কথা বলার কে ? কিন্তু এ কথা ঠিক মধ্যবিত্ত খুব কম লোকই তা গ্রহন করতে পারে ! আর মা কিম্বা বাবার হয়ে সেই নিস্ফল ইনভেস্টমেন্ট কারা করতে পারে ? এবার বলি এক অংশের কথা, যারা অরিন্দমের কথায় -'কিন্তু চিত্র বদলাচ্ছে আরও বদলাবে বাঙালি বুঝবে বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয় বরং হাত-পা ছেড়ে চূড়ান্ত মস্তিতে বাঁচা। স্বাধীন ভাবে বাঁচা ও বাঁচতে দেওয় (স্বাধীন মানে স্ব-অধীনে থেকে)। বার্ধক্যের সঙ্গে দু-ফোঁটা উদাসীনতা মিশিয়ে জীবনটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা।‘ – হ্যাঁ এটা খুব সত্যি কথা ! আমার বন্ধু স্ত্রী মারা যাবার পরেই স্বেচ্ছায় চলে এলেন বৃদ্ধাবাসে ! আবার আলমবাজারের বৃদ্ধাবাসে গিয়ে দেখা হল এক স্বাধীনতা কর্মীর সঙ্গে ! উনিই একটা গল্প বলেছিলেন – এখানে লিখেছিলাম ! ‘দাড়াও পথিকবর’! – ভাইপো-নাতির হাতে নিপীড়িত হবার আগেই পালিয়ে এসেছিলেন ! – মণিকুন্তলার – ‘আমাদের জেঠি খুড়ি মা মাসিরা বলতেন লাথিঝাঁটা খেয়েও নাকি ছেলের বাড়িতে থাকা সম্মানের|’ – আমাদের এক আত্মিয়ার কথায় – বাড়িতে ভাত ছাড়া সবই খেতাম – এখানে ভাতটা তো খেতে পাই ! তাই বলি – এসব যত লিখবো ততই – অরিন্দমের ভাষায় - ‘দুঃখই তো বিক্রী হয় সবচেয়ে বেশী... ‘! বৃদ্ধাবাস এখন আর অপশন নয় – হয়ত বাধ্যতামুলক ! গতকাল ও আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে দু জায়গায় সেমিনারে গেছিলাম । এক বিদগ্ধ জন – বোঝালেন – আমরা আবার নাকি যৌথ পরিবারের দিকেই ফিরে যাচ্ছি ! কি রকম ? না – বৃদ্ধবয়েসের একাকীত্ব ও শিশুদের একাকীত্ব – মিলিয়ে দেবে পিতা-মাতাদের আবার একসঙ্গে বাস করতে ! – কিরকম সোনার-পাথরবাটি – ধরনের শোনাচ্ছে না ! মনোজ বৃদ্ধাবাসের জানালা ! - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই বয়েসে এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারত ? বৃদ্ধাবাসের ঘরের জানালায় বসে শ্রাবন মাসের সদ্য-বর্ষণযুক্ত এই সকালবেলায় ঝকঝকে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুড়ো মানুষটি ভাবেন, সত্যি-ই আর কিছু হতে পারত কি ? নিজেকে এই প্রশ্ন করে নিজেই মনে মনে উত্তর দেন না , পারত না । বুড়ো মানুষটির ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে । তারা তাঁকে একা এখানে ফেলে না রেখে যে যার কাছে নিয়ে যেতে চায় । তিনি যান না । কিন্তু মুখে কিছু না বললেও ভাবেন যে , আর কোথায় গেলে এই সমবয়েসী মানুষদের সঙ্গ তিনি পাবেন , আর পাবেন এই জানালা ? না, এর চেয়ে ভালো আর কিছু হয় না । জানালার ধারে বসে ঝকঝকে নীল একটা তিনি দেখেন । আর দেখেন যে , কালো মেঘগুলি এরই মধ্যে বকের পাখার মতো সাদা হয়ে যাচ্ছে ।

119

6

সৃজিতা

ঐতিহাসিক শহর চুঁচুড়া

পর্তুগীজ বণিকরা চুঁচুড়া শহরের পা দিয়েছিল ১৫৭৯ সালে। চুঁচুড়া তখন ছিল ভুরশুঁট পরগনার অন্যতম বন্দর। ভুঁড়শুট পরগণা প্রাচীন বাংলার একটি অঞ্চল। বর্তমান হাওড়া ও হুগলি জেলার বৃহত্তর অংশ জুড়ে ছিল এর অবস্থান। পর্তুগিজরা ঠিক চুঁচুড়া শহরে পা দেয়নি, তারা পা দিয়েছিল গুল্ম শহরে। এই গুল্ম শহরই পরবর্তীকালে হুগলী নামে পরিবর্তিত হয়। পর্তুগীজদের সাথে তৎকালীন মোগল সম্রাট শাহজাহানের বিরোধ বাধে। তিনি বিশাল সৈন্য পাঠিয়ে পর্তুগীজ দমন করেন, সেই সাথে উদারতার পরিচয় দেন। পর্তুগিজ বণিকদের জন্য গঙ্গাতীরে বিশাল একখণ্ড জমি দেন গির্জা নির্মাণের জন্য। বর্তমানে এটি ব্যান্ডেল চার্চ নামে পরিচিত। পর্তুগীজদের পরপরই ডাচ বণিকরা আস্তানা গড়ে তোলেন এই অঞ্চলে। চুঁচুড়া শহরের মূলত ডাচ আধিপত্যই ছিল। ডাচেরা একটি গুস্তেভাস বা দুর্গ করে চুঁচুড়ার গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে। বর্তমানে তা বিলীন। তবে প্রাচীন বেশ কিছু নথিপত্রে তার প্রকাশ পাওয়া যায়। আজও চুঁচুড়ার একাধিক জায়গায় ডাচ স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। চুঁচুড়ার অত্যন্ত প্রাচীন একটি জায়গা হল তোলা ফটক। তােলাফটক নামটির পিছনে আছে এক সুন্দর ইতিহাস। চুঁচুড়া শহর তখন ডাচদের অধীনে, প্রতিবেশি চন্দননগর ফরাসীদের। তাই দুই স্থানের মাঝে ছিল একটি গড়। আর তার উপর ছিল একটি ভাঁজ যুক্ত সেতু। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সেতু খোলা ও তোলা হত। সেই থেকেই এই অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় তোলাফটক । আজও এই ফটকের ডান দিকে স্তম্ভটি জীর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান। চুঁচুড়া শহরের অনেক বয়স্ক মানুষই মনে করতে পারবেন, বাম দিকের লোহার দরজা বেশ কিছু বছর আগেও ছিল। রাস্তা সম্প্রসারণ করলে তা ভেঙ্গে ফেলা হয়। একটি স্তম্ভের যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা ভালো করে লক্ষ্য করলে আজও লােহার দরজার কড়া দেখা যাবে। © Copyright--- EKNOJORE HOOGHLY CHUCHURA

145

9

সৃজিতা

প্রোমোশন

আজ সাতসকালে ঘুম ভেঙ্গে গেছে ঝিল্লীর| অন্যদিন আটটায় ঘুম থেকে উঠে সোজা অফিসের জন্যে রেডি হয়ে যায়| কিন্তু কাল সারারাত ঘুম হয়নি‚ ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে গেছিল| তাও ছ্'টার পরেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে| চিন্তার কারণ একটাই‚ আজ বসের সাথে লাঞ্চ করতে যাবে| ঝিল্লী যে অফিসে চাকরী করে সেই অফিসের দুটো ব্রাঞ্চ এশহরে আছে| একটা ব্রাঞ্চ কোম্পানীর মালিক সামলায়‚ অন্যটা মালিকের কোন এক আত্মীয় দেখাশোনা করে| ঝিল্লী এই দ্বিতীয় ব্রাঞ্চে পোস্টিং আছে| কোম্পানির মালিক‚ লোকটা খারাপ না| কিন্তু ওনার যে আত্মীয় মানে ঝিল্লীর অফিসের বস‚ তার থেকে সবাই একটু দূরে দূরেই থাকতে চায়| আজ সেই বস সন্দীপণ ঘোষ ঝিল্লীকে লাঞ্চে ইনভাইট করেছে| প্রথমে অবশ্য ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল| ঝিল্লী নানা অছিলায় কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল| কিন্তু শেষ অবধি লাঞ্চ করতে রাজী হতে হয়েছে ঝিল্লীকে| রাজী না হয়ে উপায় ছিল না ঝিল্লীর| বস বলে কথা‚ আবার সামনে প্রোমোশনের সুযোগ আছে| বসের পার্সোনাল আসিস্টেন্ট মোনা এই কোম্পানীর জব ছেড়ে অন্য কোম্পানীতে জয়েন করেছে| সেই পোস্ট খালি আছে| এছাড়া মালিক যে ব্রাঞ্চে আছে সেখানেও একটা পোস্ট খালি আছে| যেকোন একটা পোস্টে জয়েন করলেই মাইনে অনেকটা বেড়ে যাবে| ঝিল্লীর যদিও বসের আসিস্টেন্ট হবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই| কিন্তু এই বস সহজে পিছু ছাড়বে না| মোনার মতো মেয়েরা চাকরীতে উন্নতি করার জন্য অনেক কিছু করতে পারে| মোনার সাথে সন্দীপণ স্যারের সম্পর্ক অফিসে চর্চার বিষয় ছিল| ঝিল্লী সেরকম মেয়ে নয়| কিন্তু মোনা চলে যাবার পর এখন ওর ওপর বসের নজর পড়েছে| কাজের অছিলায় প্রায়ই নিজের রুমে ডেকে পাঠায়| তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে থাকে| ঝিল্লীর খুব অস্বস্তি হয়| কিন্তু কিছু বলতে পারেনা| দুদিন আগে বস নিজের রুমে ঝিল্লীকে ডেকে পাঠালো| তারপর--- ----কাল ইভনিং এ তুমি ফ্রী আছো তো? ----হ্যাঁ‚ মানে কেন স্যার? ----তাহলে অফিসের পর একসাথে ডিনার করা যায়| ----না‚ মানে স্যার কাল তো হবে না| ----কেন‚ কি প্রবলেম?! -----আসলে মা'র শরীরটা কদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না| কাল মাকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাব| ----ও‚ তাহলে পরশু? ----পরশু‚ না পরশু তো হবে না| সে দিন তো বিকেলে আপনার মিটিং আছে| ----ওহ‚ আমি তো ভুলেই গেছিলাম| তুমি কত খেয়াল রাখ| ভেরি গুড| তো দুপুরে তো আমরা যেতেই পারি| এই ১২টা নাগাদ| ---কিন্তু স্যার ঐ টাইমে অফিস থেকে বেরোনো যাবে? ----ওহ‚ একসাথে বেরোনো ঠিক হবে না| ঠিক আছে সে দিন তোমাকে অফিসে আসতে হবে না| অফিসের গাড়ি ঠিক টাইমে তোমাকে নিতে চলে যাবে| তোমাকে নিয়ে সোজা রেস্টুরেন্টে চলে যাবে| তুমি তৈরী থেকো| -----ওকে স্যার| আর কথা না বাড়িয়ে ঝিল্লী রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছিল| সেদিন থেকে ঝিল্লীর রাতের ঘুম উড়ে গেছে| একা পেয়ে ব্স তার সাথে কি করবে‚ সেই ভেবেই ওর খিদে-তৃষ্ঞা সব চলে গেছে| ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানাতেই চুপচাপ শুয়ে ছিল ঝিল্লী| মা এসে ওকে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায়---- ----কিরে‚ এখনও শুয়ে আছিস?! -----শরীরটা ভালো লাগছে না| -----কি হ্'ল আবার? জ্বর এল নাকি? -----না তেমন কিছু নয়| আজ আর অফিসে যাব না| -----সে না যাস‚ না যাবি| আজ একটু রেস্ট নে| চা খাবি তো? টেবিলে আয়| মা চলে গেল| যাক কিছু বুঝতে পারেনি| ঝিল্লী উঠে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল| চা খাবার পর‚ বিস্কুটের কৌটো নিয়ে ঘরে চলে এল| মাকে বলল খিদে পেলে বিস্কুট খাবে| অন্য আর কিছু খাবে না| সময় এগিয়ে চলেছে| ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে| না এবার রেডি হতে হবে| ঝিল্লী রেডি হয়ে নেয়| সন্দীপণ ঘোষ লোকটা খুব ফিটফাট থাকতে পছন্দ করেন| যে কোনো জিনিষই দামী ব্র্যান্ডের প্রডাক্ট ব্যবহার করেন| অফিসের স্টাফেদেরও সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছ্ন্ন দেখতে চান| রেডি হয়ে ঝিল্লী ঘর থেকে বের হ্'ল| সামনেই মা‚ -----কিরে আবার কোথায় চললি?! -----অফিস থেকে ফোন এসেছিল| একবার যেতেই হবে| -----একটা দিনও ছুটি দিতে পারে না! তাড়াতাড়ি ফিরো| একে শরীর ভালো নেই| তবু যেতেই হবে| মা গজগজ করতে থাকে| ঝিল্লী বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরে| গলি থেকে বেড়িয়ে মোড়ের মাথায় আসে| অন্যদিন এখান থেকেই বাসে ওঠে| আজ আরও এগিয়ে সামনের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ায়| এখান থেকেই গাড়িতে উঠবে| দূর থেকে বসের গাড়ী দেখা যায়| গাড়ী এলে ঝিল্লী গাড়ীতে উঠে পড়ে| হোটেলের সামনে গাড়ী এসে থামে| গাড়ী থেকে নেমে ড্রাইভার ওকে হোটেলের নির্দিষ্ট রুমের সামনে পৌঁছে দেয়| যা আন্দাজ করেছিল তাই| রুম বুক করা হয়েছে| যা হবে বন্ধ ঘরের মধ্যে| ঝিল্লী রুমে নক করে| বস দরজা খুলে দেয়| একটা স্মাইল দিয়ে ঝিল্লী ঘরে ঢোকে| সুসজ্জিত বেডরুম| বেডের সামনে সোফা| সোফার সামনে টেবিলে অনেক রকম খাবার| হালকা সুরে মিউজিক বাজছে| একেবারে পরিপূর্ণ আয়োজন| ------আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো? -----না স্যার| ------ওকে| এই স্যার বলাটা তুমি ছাড়ো তো‚ অফিসে বাইরে নো স্যার| ওনলি সন্দীপণ| এবার বসো| ঝিল্লী সোফায় বসে পড়ে| বস এসে ওর পাশে বসে| প্লেটে খাবার তোলে| ------নাও শুরু করো| ------আপনি আগে শুরু করুন| -------না‚ আজকে তোমার দিন‚ তাই তোমাকে দিয়ে শুরু হোক| ঝিল্লী ইতস্তত করতে থাকে| খাবার ইচ্ছা হলেও খেতে পারেনা| সন্দীপণ আরও কাছে সরে আসে| একটা হাত ঝিল্লীর কাঁধের পেছনে সোফায় রাখে| ------কি হ্'ল খাও| ঝিল্লী চোখে চোখ রাখে| সন্দীপণ আরও কাছে সরে আসে| ঝিল্লীর নি:শ্বাস সন্দীপণের মুখে পড়ে| একটু দূরে সরে যায় সন্দীপণ| কিছু অস্বস্তি বোধ করে| তারপর একটু হেসে আবার কাছে সরে আসে| কাঁধে মাথা রেখে সঙ্গে সঙ্গেই সরিয়ে নেয়| পাশ থেকে উঠে গিয়ে সামনের চেয়ারে গিয়ে বসে| -----আমার মিটিং এর দেরী হয়ে যাচ্ছে| আমি এখনি বেড়িয়ে যাব| ------সেকি‚আপনি তো কিছুই খেলেন না| আর মিটিং তো.চারটেয়| -------না টাইম এগিয়ে গেছে| দুটোর মধ্যে আমাকে পৌঁছাতে হবে| তুমি খেয়ে নিয়ে চলে যেও| ------আমি কিসে যাব? গাড়ী তো আপনি নিয়ে চলে যাচ্ছেন| ------ঠিক আছে| আমাকে পৌঁছে দিয়ে তোমাকে নিতে আসবে| ------ওকে স্যার| বস তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে গেল| ঝিল্লী ওয়েটারকে ডেকে খাবার গুলো প্যাক করে দিতে বলল| খাবারের বিশাল প্যাকেট নিয়ে ঝিল্লী বাড়ী ফিরল| মা দেখে অবাক| -----কিরে‚ এসব কি?! -----খাবার| অফিস থেকে দিল| আমি নিয়ে চলে এসেছি| ------আমার তো রান্না হয়ে গেল| -------ফ্রিজে রেখে দাও‚ রাতে খাব| এখন এগুলো মাইক্রো ওভেনে গরম করে দাও| আমি স্নান করেই আসছি| খুব খিদে পেয়েছে| প্যাকেটটা মায়ের হাতে দিয়ে ঝিল্লী ঘরে এসে জামা-কাপড় নিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে গেল| সকালে থেকে শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে আছে| ব্রাশ না করে ও অন্য কিছু খেতে পারেনা| | এদিকে কাল রাতে স্যালাডে বেশী করে পিঁয়াজ খেয়েছে| নি:শ্বাসের গন্ধে টের পাওয়া যাচ্ছে| তাছাড়া সকালে স্নানও করেনি| জামাটাও কাচতে হবে‚ এই নিয়ে তিনদিন ধরে পড়া হ্'ল| কাল বাড়ী ফেরার সময় বাসে এত ভিড় ছিল‚ খুব ঘেমে গেছিল ঝিল্লী| বাড়ী ফিরে জামাটা গুটিয়ে রেখে দিয়েছিল কাচবে বলে| আজ সেটাকেই তুলে পড়ে নিয়েছে| গুটিয়ে রাখার জন্যে ঘামের গন্ধটা জামায় বসে গেছে| আর ঝিল্লী কোন বডিস্প্রে ব্যবহার করেনি| ঘামের গন্ধে ঝিল্লীর নিজেরই একএক সময় বিরক্তি লেগে যাচ্ছিল| পরের দিন অফিসে ঝিল্লীর টেবিলে প্রোমোশন লেটার পৌঁছে গেল| অন্য ব্রাঞ্চে পোস্টিং| এখানে আর রাখবে না| |

108

5

শিবাংশু

স্মৃতি দিয়ে ঘেরা

দক্ষিণে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। উত্তরদিকে গড়িয়ে যাওয়া ওঠানামা করা পাহাড়ি জমিতে ছড়িয়ে আছে বিস্তৃত বৌদ্ধবিহারের অবশেষ। চন্দ্রশিলার ধাপগুলির পাশে, খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সেই রহস্যময় বৌদ্ধ তান্ত্রিকদেবী, কুরুকুল্লা। যাঁকে 'তারা কুরুকুল্লা'ও বলা হয়। প্রথম থেকে তেরো শতকের মধ্যে নির্মিত ইঁটমাটির চোদ্দোটি সমাধিস্তূপও আছে তাঁকে ঘিরে। কিছুক্ষণ সামনে দাঁড়ালে মনে অন্যরকম অনুভূতি আসে। পিছনে দিগন্তবিস্তৃত নদীমাতৃক হরিৎ শষ্যখেত। দিকচক্রবালে নীলপাহাড়ের সারি। চোখ আর মন থাকলে এই পরাবাস্তব চরাচর আগন্তুককে অনেক প্রাপ্তির ইশারা জানায়। রত্নগিরি যাবার পথে সামান্য ঘুরপথে গেলেই চমকে দেবে এই রত্নখনিটি। দুটি পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় বনজঙ্গলের মধ্যে আত্মগোপন করেছিল এই পুরাবশেষ।এই সেদিন পর্যন্ত কেউ জানতই না এদেশের এরকম একটি বৃহৎ বৌদ্ধ পুরানিদর্শন এভাবে মাটির নীচে লুকিয়ে রয়েছে। সন্ধান চলেছে ১৯৫৮ থেকেই। কিন্তু তাকে কিছুটা খুঁজে পাওয়া গেছে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালে খননের পর। এই পুরাবশেষটি এখনও পর্যন্ত ওড়িশার বৃহত্তম বৌদ্ধ ইতিহাসের নিদর্শন। ওড়িশায় ভুবনেশ্বরের কাছে উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি নামে যুগল পাহাড়ে অতি প্রাচীন জৈন গুহামন্দিরের যেসব অবশেষ জনপ্রিয় ও বহুজানিত, তার সঙ্গে বৌদ্ধ উদয়গিরির সম্পর্ক নেই। এটি আছে জাজপুর জেলায় এবং রত্নগিরির কাছে। বৌদ্ধ ইতিহাসে এর নাম ছিল 'মাধবপুরা মহাবিহার'। খননসুবাদে এখানে বিশাল ইঁটনির্মিত বৌদ্ধবিহার ও নানা মূর্তিভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। সত্যি কথা বলতে কী, পণ্ডিতেরা বলেন এখন পর্যন্ত যা উদ্ধার হয়েছে তার পরিমাণ প্রকৃত নির্মাণের ছোট্টো ভগ্নাংশ মাত্র। দুই পাহাড়ের মাঝখানে সবুজে সবুজ উপত্যকায় নির্মিত এই বিহারটির সৌন্দর্য এককথায় অনুপম। এখানের প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাবশেষে এখনও পর্যন্ত আবিষ্কার হয়েছে একটি স্তূপ, দুটি বিহার, একটি প্রাচীন সিঁড়িভাঙা কূপ এবং অসংখ্য মহাযানী বৌদ্ধ মূর্তি। এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে এই বিহারটির নির্মাণ হয়েছিল সপ্তম থেকে বারো শতকের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এর সময়কাল ললিতগিরি ও রত্নগিরির পরবর্তী যুগে। একটু বিস্ময় লাগে যখন আমরা দেখি মাধবপুরা মহাবিহারে বজ্রযানী বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতির নিদর্শন এখনও বিশেষ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত বজ্রযানী বৌদ্ধতন্ত্রের কেন্দ্র রত্নগিরির প্রাধান্য পরবর্তীকালে কমে গিয়েছিল। উৎখননের পর উদ্ধার করা অসংখ্য অতি উচ্চমানের পাথরের মূর্তি ও ভাস্কর্য এখানে খোলা আকাশের নীচে রাখা আছে। মহাযানী বৌদ্ধ দেবতাকুলের নানা দেবদেবী, বিশেষত বোধিসত্ত্ব ও ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তিগুলির সৌন্দর্য মোহিত করে। ইতিহাস ও শিল্পপ্রেমী মানুষজনের কাছে এই জায়গাটির আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। কেউ জানেনা এখনও মাটির নীচে কোন সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে। যাঁরা ট্রেকিং করেন, তাঁদের জন্য সংলগ্ন পাহাড়গুলির আহ্বান এড়ানো মুশকিল। উৎখনিত অবশেষগুলির দুটি ভাগ আছে। এক এবং দুই। একটি ইংরেজি ইউ-আকারের উপত্যকায় যে মহাস্তূপটি দেখা যায়, সেটি মহাযানী মতের স্থাপত্য। তার চারটি কুলুঙ্গিতে চারজন ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। মহাযানী বিশ্বাস মতো এইসব বুদ্ধেরা চারটি দিক রক্ষা করেন। এছাড়া একটি বর্গাকার বিহারও রয়েছে এখানে। তার কারুকার্যময় তোরণ পেরোলে শাক্যমুনি বুদ্ধের ভূমিস্পর্শ মুদ্রার মূর্তি স্থাপিত আছে। এছাড়া বৌদ্ধ দেবতাকুলের তারা, মঞ্জুশ্রী, ভৃকুটি, হারীতী,চুন্দ,অবলোকিতেশ্বর, মৈত্রেয়, অপরাজিতা, বৈরোচন, জটামুকুট লোকেশ্বর, ললিতাসন অমিতাভ এবং বসুধারার মূর্তিও দেখা যায়। মাধবপুরা মহাবিহার, ললিতগিরি ও রত্নগিরির মতো অতি বৃহৎ পুষ্পগিরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ ছিল। এই তিনটি পুরানিদর্শনকে একসঙ্গে ওড়িশার রত্নত্রিভুজ বলা হয়।

78

4

মনোজ ভট্টাচার্য

কিস্যা আটলান্টা কা !

কিস্যা আটলান্টা কা ! ১৯৯০ সালের পরে কয়েক মাস আটলান্টায় থাকতে হয়েছিল । সেই সময় আটলান্টায় অলিম্পিক’৯৬ হবে বলে শহরের ভাংচুর আরম্ভ হয়ে গেছে । পিচ ট্রি রোড এর ওপর রেড হুক ইন নামে একটা মোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম ! একেবারে শহরের মাঝখানে - আশেপাশে কোনো দোকান-পাট নেই । উল্টোদিকে একটা আটতলা পার্কিং বিল্ডিং ! সারাক্ষন আলোয় ঝলমল করছে ! এই মোটেলটাও ভাঙ্গার তালিকায় ! তবে এখনো দেরী আছে । মোটেলের মালিকও যতদিন পারে ভাড়া দিচ্ছে ! যেহেতু এই বাড়িটা ভাঙ্গা হবে - তাই এখানে বোর্ডার আর বিশেষ আসে না - বেশির ভাগ ঘরই খালি পরে আছে । সারা তিনতলায় একমাত্র আমি আছি । যদি আমাকেও যেতে বলে - তবে ওরাই অন্য মোটেলে ব্যবস্থা করে দেবে ! হোটেল ও মোটেলের তফাত আছে । আমি সে সবে কিছুর মধ্যে যাচ্ছি না ! মূল পার্থক্য হলো - নিরাপত্তা ! মোটেলের বাসিন্দাদের কোনো নিরাপত্তা নেই । যে কোনো সময় বাইরের যে কেউ ঘরের দরজায় হাজির হতে পারে ! – এমন কি বন্দুকধারিও হতে পারে – ওখানে ওটাই স্বাভাবিক ! বারান্দার দুটো সিঁড়ি সবসময় খোলা । কোনো দরজা নেই ! এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যে বেলায় ঘরে ফিরে জামা-কাপড় পাল্টে চা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়েছি । সামনে পীচ ট্রি স্ট্রিটে আপনা আপনি ট্র্যাফিক সিগন্যাল জ্বলছে নিভছে । চোখ গেল পাশের ঘরের দিকে ! একটি কালো মেয়ে দাড়িয়ে আছে দরজায় ! - সকালে দেখেছি বটে পাশের ঘরে বোর্ডার এসেছে ! সেই বোর্ডারই কি এই মেয়ে - হতে পারে ! রাস্তায় তখন ফিরতি গাড়ির জ্যাম - সবাই বাড়ি ফিরছে I ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল - মেয়েটি ওর দরজা থেকে আমার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে । আসলে আমাকে ডেকে কিছু বলতে চাইছে । ' - কিছু বলছ আমাকে ?' ' - তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে !' - শুনে ভালো করে দেখলাম মেয়েটিকে ।একটি দুঃস্থ মেয়ে - স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো । অনেকেই জানেন - আমেরিকায় দুটো জাতি থাকে - 'আছে' আর 'নেই '! - উত্তরে, পশ্চিমে বা টেক্সাসে - মোটামুটি 'আছে'দের প্রাধান্য । আর দক্ষিনে ও মধ্যে - 'নেই'দের প্রাধান্য ! আমেরিকাতে সাদা-কালো ছাড়াও অর্থনৈতিক ভাবে - আমাদের দেশের মতই অনেক গুলো শ্রেণী আছে । ধনী, উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দুঃস্থ ! - এই দুঃস্থ শ্রেনীর মধ্যে সাদা বা কালো - দুইই আছে । এরা সরকারি সব রকম সাহায্যই পায় - যেমন এস এস আই , ফুড স্ট্যাম্প ইত্যাদি – আরও কি কি - আমি সব জানিও না । কিন্তু এদের মধ্যে লেখা-পড়া বা চাকরি-বাকরি করার কোনো ব্যাপার নেই ! অপরাধ-প্রবনতা এদের যেন রক্তের মধ্যে ! ছেলে-মেয়েদের পোশাক-আশাকের মধ্যে দিয়েই সামাজিক অবস্থান প্রকট হয়ে ওঠে ! ' - কি কথা !' - আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি । ' - তুমি ভেতরে চলো - বলছি ' বলেই মেয়েটি আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে গেছে ! ' - আরে তুমি ভেতরে ঢুকছো কেন ? কি বলবে - এখানে বলো ' - আমার তখন বুঝতে আর বাকি নেই - মুরগী হতে চলেছি ! ' - আমায় দুটো টাকা (ডলার ) দেবে ? আজ সারাদিন খাই নি ! ' - ততক্ষনে আমার বিছানায় বসে পড়েছে ! আর বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে আমার টাকার ব্যাগ ! আমি অনন্যোপায় হয়ে বললাম : ' - তুমি উঠে বাইরে এসো - আমি টাকা দিচ্ছি '! ' - কেন - তুমি আমার পাশে বসো না ! আমরা গল্প করি !' - বলেই যে কাজ করলো - আমি অত তাড়াতাড়ি ভাবতেও পারিনি - কেউ এরকম করতে পারে ! টি-শার্টটা খুলে ফেলেছে ! একেবারে টপলেস ! কিছুদিন আগেই এখানে কোনো এক জায়গায় - এই কালো মেয়েকে নিয়েই একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছিল ! কালো-সাদা বিভাজন হয়ে গিয়ে - সে এক বিশ্রী ব্যাপার ! - পুলিশ এসে আগে অভিযুক্তকে হাতকড়ি পরিয়ে নিয়ে যায় ! কাগজে-টি ভি তে ছবি-টবি উঠে একাক্কার হয় ! আর সরকার অভিযুক্তকে দিয়ে প্লী ডীল করিয়ে নেয় ! - কালোদের চটাবে না - অনেকটা আমাদের দেশের মতই ! এক গাদা টাকা গুনাগার দিতে হবে - অথবা কারাবাস ! ' - তুমি শীগগির জামা পরে নাও আর উঠে বাইরে এসো - বলছি -' আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম - ভয়েতেই বোধয় ! - 'এখুনি আমি পুলিশে ফোন করব ।' ' - আমায় কুড়ি টাকা দাও - আমি চলে যাবো ! তা নাহলে আমিই পুলিশ ডাকবো !' - বলে ফোনটা তুলে নিল ক্র্যাডেল থেকে । আমি উত্তর কলকাতার মানুষ - আমায় টুপি পড়াবে ! - রাগের চোটে তেড়ে গিয়ে ও'র হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে জিরো ডায়াল ঘুরিয়ে দিলাম । রিসেপশানে এখন অরবিন্দ আছে - দেখেছি । ' - অরবিন্দ - এখুনি একবার আমার ঘরে আসবে ? আমার ঘরে একটা মেয়ে ঢুকে পড়েছে । জামা খুলে ফেলেছে আর আমাকে ভয় দেখাচ্ছে পুলিশের ! অরবিন্দ 'এখুনি আসছি' বলে ফোন নামিয়ে রাখলো । আমার এই তৎপরতায় মেয়েটা ঝিমিয়ে পরেছিল - তাড়াতাড়ি জামাটা পরে ফেলল - কিন্তু একভাবে বসেই রইল ! খানিক্ষনের মধ্যেই অরবিন্দ একজন স্প্যানীশ সঙ্গীকে নিয়ে ওপরে চলে এলো ! - মেয়েটাকে দেখেই অরবিন্দর সঙ্গী বোধয় চিনতে পেরেছে - এই মারে কি সেই মারে।- আমার কাছে সব শুনে নিয়ে মেয়েটাকে পুলিশের ভয় দেখালো । ও এখানে উঠে এলো কি করে ! পাশের ঘরের দরজা খোলা কেন ? পরের দিন শুনলাম - মেয়েটিকে কোনো একজন বোর্ডার ডেকেছিল - কিন্তু সে নেই ঘরে ! তাই মেয়েটি চেষ্টা করেছিল যদি কোনো খদ্দের পেয়ে যায় ! ঘটনার পরে আমার মনে হয়েছিল - আমি তো ওকে দুটো টাকা দিতেই পারতাম ! বলেছিল সারাদিন খাওয়া হয় নি ! যদিও সেটা সত্যি নয় - কারণ ওদের যাবতীয় খরচ আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই হয় ! - কিন্তু আমিও বৃহত্তর বিপদের ভয় পেয়ে গেছিলাম । কাগজ - টি ভি – পুলিশ-কারাবাস ! ওরে বাবা ! আমি ওসবে নেই ! - আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নী-নিষ্ট বাঙ্গালি ভদ্রলোক ! মনোজ অনেক দিনের পুরোনো একট লেখা দিচ্ছি ! ব্লগের দিকটা খুব খালি খালি দেখাচ্ছে !

95

3

Ranjan Roy

< নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা—একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া>

< নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা—একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া [এটি সন্মাত্রানন্দ রচিত “ নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা- অতীশ দীপংকরের পৃথিবী” উপন্যাসটির পুস্তক সমালোচনা নয়, সে যোগ্যতা আমার নেই, -- বড়জোর এক মুগ্ধ পাঠকের প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। ] পাতা ওল্টাতেই বিস্ময়। দর্শনের গুঢ় এবং কূট প্রশ্ন ও কয়েক শতাব্দী আগে জন্মানো এক ক্ষণজন্মা বাঙালী মেধা অতীশ দীপংকরকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা ভেবেছেন প্রথম জীবনে রামকৃষ্ণ মিশনে সেবাব্রতী এক সন্ন্যাসী! এই পাঠকের মিশনের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক তাতে ওখানকার সন্ন্যাসীরা গৌতম বুদ্ধকে জয়দেব গোস্বামীকৃত দশাবতার স্তোত্রের বেঁধে দেয়া ভূমিকা অনুযায়ী বিষ্ণুর এক অবতার --‘নিন্দসি যজ্ঞবিধেয়রহযাতম, সদয়হৃদয়দর্শিতপশুঘাতম’ হিসেবে ভাবতেই অভ্যস্ত। কিন্তু ‘অনাত্মবাদীন’ ‘ক্ষণিকবাদীন’ বৌদ্ধদর্শনের অভিঘাত মিশনের জীবনে কোন অভিঘাত সৃষ্টি করে না । কারণ রামকৃষ্ণদেব ও বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক মানসভূমি বেদান্ত এবং ধর্মাচরণের বাহ্যিক দিকটি শাক্তমত ও তন্ত্র আশ্রিত। ঠাকুরের ভৈরবীসাধনা ও বেলুড়ে কালীপূজোর রাতে পশুবলি জনসাধারণের গোচরে। অথচ বইটি ইতিহাসের গবেষণাপত্র নয়, কোন দার্শনিক পাত্রাধার-কি-তৈল কিংবা তৈলাধার-কি-পাত্র বিচারে কণ্টকিত গ্রন্থ নয় । এটি আদ্যন্ত নিটোল একটি উপন্যাস। ইহাতে কল্পনার যাদুমিশ্রণ, প্রেম-প্রত্যাখ্যান-বিরহ-বলিদান-প্রতিহিংসা-জয়-পরাজয় সবই আছে। উপন্যাসটি লিখলেন সন্মাত্রানন্দ! প্রথমেই সংশয়। একজন গার্হস্থ্যজীবন পরিত্যাগী মানুষ কী করে ফুটিয়ে তুলবেন ষড়রিপুর তাড়নায় জ্বলেপুড়ে খাক হওয়া মানুষের ছবি? যিনি এই রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শের জগতকে অবিদ্যাজনিত মিথ্যাত্বের সাময়িক সৃষ্টি বলে মেনে নিয়েছেন তাঁর কলমে কী করে ফুটবে এর সৌন্দর্য ও কন্টকিত রূপ? এই পূর্বাগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। অবশ্য সন্ন্যাসীর সাহিত্যচর্চা একেবারে কালাপাহাড়ি কিছু নয়। স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছেন ‘সখার প্রতি’ ও ‘দি কাপ’ এর মত কবিতা। অতি আধুনিক বাংলায় ছোট ছোট বাক্যবন্ধে ‘প্রবাসে’র মত জার্নাল। পন্ডিচেরির নিশিকান্তের কবিতাও স্মরণীয়। তবে সেসব আধ্যাত্মিক স্টেটমেন্টের কাব্যরূপ। কবিতার শৈলীর আবশ্যকীয় অ্যাবস্ট্রাকশন সেই স্পেস দেয় । কিন্তু গদ্যরচনা? বিশেষ করে উপন্যাস? এখানে তো চরিত্ররা রক্তমাংসের, সময় অতীতচারী হয়েও ছুঁয়ে যাবে সমকালের যন্ত্রণাকে, নইলে তা পর্যবসিত হয় জাদুঘরের দ্রষ্টব্যে। উপন্যাস লেখার এ’সব ঝামেলার সঙ্গে সন্মাত্রানন্দ সম্যক অবহিত। তাই বইটির প্রস্তাবনায় তিনি অকপট—“ – অতীশ দীপংকরের জীবনেতিহাস এ উপন্যাসের আশ্রয়, কিন্তু বিষয় নয়।– শাশ্বত মানবীসত্তাই ‘নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু। কখনও সে-নারীসত্তার নাম কুন্তলা, কখনও স্বয়ংবিদা, কখনো –বা জাহ্নবী”। গজব রে গজব! এই সংশয় শুধু আমার নয়। বইটি পড়ে জানতে পারলাম যে মিশন কর্তৃপক্ষ ও একই দোলাচলে ভুগেছেন সন্মাত্রানন্দের সাহিত্যকৃতি নিয়ে, অবশ্য আমার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। তাই একদিন তাঁকে নিজের ঝোলা কাঁধে তুলে মিশন থেকে বেরিয়ে আসতে হল। শ্রেয় ও প্রেয়র দ্বন্দ্বে উনি কলমকেই বেছে নিলেন আর আমরা পেলাম এই উপন্যাসটি। এই ঘটনাটি, এই নির্ণয় তাঁর মানসে এক অমিট ছাপ ফেলেছে। তাই বইটির কথক হিসেবে নিজের জীবনের আদলে বর্ধমান থেকে কোলকাতায় এসে সোনারপুরের হোস্টেলে থেকে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে স্ট্যাটিস্টিক্সে এম এস সি করে সন্ন্যাসী হওয়া এবং সাহিত্যচর্চার তাগিদে মিশন থেকে বেরিয়ে এসে লেখক হওয়া শাওন বসু চরিত্রটির নির্মাণ। তাই ভিক্ষু মৈত্রীগুপ্ত বিক্রমশীলা বিহারে সঙ্ঘনির্দিষ্ট আচারবহির্ভূত আচরণের জন্যে অতীশ দীপংকরের আদেশে সঙ্ঘ থেকে বহিষ্কারের মুখোমুখি হয়েও অবিচলিত শান্ত ও নির্বিকার থেকে যান । এবার আসি মূল বইটির কথায়। এর ‘কথনশৈলী’ আদৌ একরৈখিক নয় । এতে সময় তিন খন্ডে বিভক্ত—দশমের শেষ থেকে একাদশ শতক,ত্রয়োদশ শতক ও একবিংশ শতক। কিন্তু এই ত্রিস্তর কালখন্ডগুলো বিচ্ছিন্ন (ডিস্ক্রিট) নয়; বরং ‘ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বস্তুত একই সমতলে অংকিত পরস্পরছেদী তিন বৃত্তের মতন। এর পর আরও জটিল গঠন চোখে পরে । যেমন, “ওই তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দুগুলোর মধ্য দিয়ে কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে এক যুগের চরিত্রগুলোর সঙ্গে অন্য যুগের চরিত্রদের’ দেখা হয়ে যায়, বিনিময়ও হয়। একে কী বলব? বাঙলাভাষায় লেখা প্রথম যাদু-বাস্তবতার উপন্যাস? জানি না । সেই নান্দনিক বিচারের ধৃষ্টতা আমার নেই । তবে আমি বলব যে এই প্রচেষ্টায় লেখার প্রসাদগুণ, কালোপযোগী ভাষার পরিবর্তন ও লেখার টান আমাকে বাধ্য করেছে সারারাত জেগে একটানা পড়ে উপন্যাসটি শেষ করে পরের দিন দুপুরে পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখে ফেলতে। কারণ, দেরি করলে সেটা হবে সুচিন্তিত এক সমীক্ষা; আতসকাঁচে ধরা পড়া অনেক ফাঁকি-ফোকর। কিন্তু উপে যাবে আমার তাৎক্ষণিক ভালো লাগা, পূর্বাগ্রহ কাটিয়ে মুগ্ধতায় ভেসে যাওয়া। কেন মুগ্ধতা? প্রথম কারণটি সন্ন্যাসীর কলমে প্রকৃতি ও নারীর রূপবর্ণনা, তাও একজন সাধারণ পঞ্চেন্দ্রিয়তাড়িত পুরুষের রূপমুগ্ধতার দৃষ্টিতে। কোথাও কোথাও দুই এক হয়ে গেছে। কাহিনীর আশ্রয় বাঙ্গালাদেশের ঢাকা- বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মানো রাজপুত্র চন্দ্রপ্রভ কেমন করে সুবর্ণদ্বীপে (ইন্দোনেশিয়া) আচার্য ধর্মকীর্তির কাছে পাঠশেষ করে বিক্রমশীলা মহাবিহারের আচার্য অতীশ দীপংকর হয়ে উঠলেন। কিন্তু মূল সুরটি হল প্রতিবেশী কিশোরী কুন্তলার বিফল কামনা, ও তন্ত্রসাধনার মধ্য দিয়ে কখনো স্বয়ংবিদা কখনও অন্যরূপে অতীশকে পাওয়ার প্রয়াস। এইভাবে এবং একবিংশ দশকে সেই বজ্রযোগিনী গ্রামে কৃষক অনঙ্গ দাসের কন্যা জাহ্নবীর মধ্যেও সেই চিরন্তন নারী হৃদয়ের আকুতির প্রকাশ। আর কালচক্রের পরস্পরছেদী তিন বৃত্তের ঘুর্ণনে চিরন্তন নারী কখনও ইয়ংচুয়া, কখনও স্বয়ংবিদা, কখনও বা জাহ্নবী। বাৎসল্য, প্রেম ও দাম্পত্যের মধ্যে নারীর তিন রূপের প্রকাশ। তাই তারাদেবীর ও তিনটি মূর্তি,--কাঠের, পাথরের ও ব্রোঞ্জের। এবার একটু তিব্বতী শ্রমণ চাগ লোচাবার চোখে স্বয়ংবিদার রূপ দর্শন করা যাক। ‘শ্বেত রাজহংসের মত দৃঢ়পিনদ্ধ শুভ্র কঞ্চুলিকা, সুনীল উত্তরী পীনোন্নত বক্ষদেশকে আবৃত করে স্কন্ধের উপর বিলম্বিত ও দীর্ঘিকার মন্দবাতাসে উড্ডীন। ----- ‘স্বয়ংবিদা প্রশ্ন করলেন, “কী দেখছ লামা? একে রূপ কহে। এই রূপসমুদ্র অতিক্রম করতে পারলে সন্ন্যাসী হবে। আর যদি অতিক্রম করতে অসমর্থ হও, যদি এতে নিমজ্জিত হও , তবে কবি হবে”। (পৃ- ১২৭) ‘অশ্রুর প্লাবনের ভিতর অপরূপা রমণীর দৃঢ় কুচাবরণ কঞ্চুলিকা শিথিল হ’ল। শিহরিত চাগ দেখলেন, সেই সুবিপুল কনককলসবৎ স্তনকুসুমের যুগ্ম কুচাগ্রচূড়া অনাবৃত বিস্ময়ে তাঁরই দিকে উন্মুখ হ’য়ে তাকিয়ে রয়েছে। --- আহ! এ কী জ্বালা! রমণীর চুম্বনে এত বিষ , এত ব্যথা! ‘(পৃ- ১৩৬) আর চুয়াল্লিশটি অধ্যায়ে বিবৃত ও প্রায় ৩৫০ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত এই উপন্যাসটিতে ধ্রুবপদের মত ঘুরেফিরে আসে একটি বৌদ্ধ তান্ত্রিক দোঁহা—‘ যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস/ নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধুলিকালীন মেঘ/ পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে/ আর পালতোলা নৌকো ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতোধারায়---/ সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে—আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালা;/ তখন –কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব ---‘। দ্বিতীয় মুগ্ধতা সন্ন্যাসী লেখকের সমকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের প্রতি সজগতা ও সংবেদনশীলতা। বিশ বছর পরে কলকাতায় ফিরে এসেছে স্বামী শুভব্রতানন্দ, পূর্বাশ্রমের শাওন বসু হয়ে। দেখছে এই কোলকাতাকে সে চিনতে পারছে না । ‘উড়াল পুলের ঘোমটা আর বাইপাসের ওড়না পরেছে কল্লোলিনী।--- কলকাতার নিজস্ব সম্মান ছিল তার কৃষ্টিতে, তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে, এখন ব্যবসায়ীদের হাতে বিকিয়ে গেছে। ক্রমশঃ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে মানুষ, কেমন খিঁচিয়ে কথা বলে আজকাল সবাই। কেউ কাউকে একটু সরে বসে জায়গা দিতে রাজি নয়’। আবার দেখুন রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘ আদর্শ কিছু নয় ক্ষমতাই সব। --- কেন্দ্রে সমাসীন এই ধর্মধ্বজীরা যাকে হিন্দুধর্ম বলে মানে, সেটা পৌরাণিক হিন্দুধর্মেরও একটা অবক্ষয়িত রূপ। এবং তারা নিজেদের সবথেকে বড়ো দেশপ্রেমিক বলে মনে করে। অহিন্দুরা কি ভারতীয় নয়?’ জে এন ইউয়ের কানহাইয়া কুমারের ঘটনায় বিচলিত প্রাক্তন শিক্ষক সন্মাত্রানন্দ লেখেন—‘ গ্রেপ্তার হয়ে গেল ছাত্রটি। বিচারের আগেই দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা ছেলেটির ওপর প্রচন্ড প্রহার চালাল। ---- ‘ছাত্ররা কি রাজনীতি করবে? নাকি, ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ? (আহা! কী অভিনব চিন্তা!)বিচারের আগেই আইনজীবীরা কি আইন নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারেন? তাঁদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে না কেন কেউ? এসব বহু তাত্ত্বিক আলোচনার অন্তে ছাত্রটি যখন ছাড়া পেল, তখন রাজনৈতিক দলগুলি এই যুবক ছাত্রটির মধ্যে তাদের মেসায়াকে খুঁজে পেতে লাগল’।(পৃ-১৪৩)। তৃতীয় কারণ, পৃ-১৫৬তে মতবাদ ও সত্যের আপেক্ষিকতা নিয়ে প্রাঞ্জল ব্যাখ্যাটিঃ ‘মানুষ সত্যের এক-একটি রূপ কল্পনা করে মাত্র। আর সত্যের উপর আরোপিত বা কল্পিত সেই সব রূপকেই ‘মতবাদ’ কহে। অধিকারীবিশেষে প্রতিটি মতবাদই প্রাথমিকভাবে উপকারী, কিন্তু কোনও মতবাদই সত্যকে সাক্ষাৎ দেখিয়ে দিতে পারে না । যুক্তি প্রয়োগ করলে সমস্ত মতই অন্তিমে খন্ডিত হয়ে যায়’। বিতর্কসভায় দীপংকরের মুখে এই বাক্যটিতে এক লহমায় ধরা পরে সমস্ত ‘বাদ’, --হিতবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, জাতীয়তাবাদ থেকে সমাজবাদ ও মার্ক্সবাদ—এর উপযোগিতা ও সীমাবদ্ধতা। জীবন চলমান আর সমস্ত ‘বাদ’ দেশ ও কালে আবদ্ধ। তাই স্থবির। মুগ্ধতার শেষ কারণটি একটু ব্যক্তিগত। পৃষ্ঠা ৮৬ থেকে পাচ্ছি অতীশ দীপংকরের ভাবনাবিশ্ব। এখানে পৌঁছে চমকে গেলাম। প্রাক্তন বৈদান্তিক সন্ন্যাসী কত সংক্ষেপে ও সহজ করে দীপংকরের অনুভবের মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করছেন বৌদ্ধদর্শনের সার। বিশেষ করে এই দুটো তত্ত্ব--তার ‘ল অফ কজালিটি’ বা কার্য-কারণ সম্পর্ এবং নির্বাণ বলতে কী বোঝায়। আর বৌদ্ধদের মধ্যেও সেই ধারণাগুলির বিবর্তন। প্রতি বিষয়ে প্রাচীন সর্বাস্তিবাদী ও সৌত্রান্তিক( মোটা দাগে হীনযানী) এবং শূন্যবাদী ও বিজ্ঞানবাদীদের ( মহাযানী) মধ্যে কোথায় তফাৎ ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে তুলে ধরেছেন মহাযান ও হীনযান নামের উদ্ভব ও সার্থকতা। উঠে এসেছে আদি বুদ্ধিজম ও পরবর্তী সংশোধনের যাথার্থ্য নিয়ে বিতর্ক। অনেকটা যেন ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট প্রভেদ, বা কম্যুনিস্ট শিবিরের গোঁড়া মার্ক্সবাদী ও সংশোধনবাদীদের বিতন্ডা। আমি কয়েকবছর আগে কাংড়ার ধর্মশালায় তিবেতান ইন্সটিট্যুট এর বারান্দায় এক তরুণ লামাকে চেপে ধরে বৌদ্ধদর্শনের কার্য-কারণ তত্ত্ব (পতীচ্চসমুৎপাদ) বোঝার চেষ্টা করি। এঁরা নাগার্জুনের মাধ্যমিক দর্শন বা শূন্যবাদের অনুগামী। তারপর দিল্লির টিবেট হাউসে অধ্যক্ষ লামার দর্শন ক্লাসে যাই ও ‘গতে গতে পারাগতে’র ব্যাখ্যা শুনি যা এই উপন্যাসে দীপংকরের ভারতে গুপ্তভাবে গ্রন্থ পাঠানোর প্রয়াসে কোড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তারপর মন না ভরায় কোলকাতায় থেরবাদীদের প্রধান ভিক্ষু সুমনপালের কাছে যাই। উনি মিলিন্দ-পঞহো অর্থাৎ রাজা মিনান্দার ও ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পড়তে বলেন। কিন্তু এখানে এই বারো নম্বর অধ্যায়ে সন্মাত্রানন্দ সংক্ষেপে সুন্দর বুঝিয়েছেন। “ ইতি ইমস্মিং সতি, ইদং হোতি। ইমসসুপ্পাদা, ইদং উপজ্জতি।–যদি এই কারণটি উপস্থিত থাকে, তবে এই ফল হবে। কারণ উৎপন্ন হলে কার্যও উৎপন্ন হবে। ইতি ইমস্মিং অসতি, ইদং ঞ হোতি। ইমস্ম নিরোধা, ইদং নিরুজ্ঝতি। -- যদি এই কারণ না থাকে তাহলে এই ফলও থাকবে না । কারণটির নিরোধ হলে কার্যটিও নিরুদ্ধ হয়ে যাবে”। (এখানে কি লেখক এই ধারণাটির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা ‘ডিপেন্ডেন্ট অরিজিনেশনে’র পক্ষে?) তারপর এসেছে এই কার্য-কারণ শৃংখলার বারোটি কড়া বা নিদান; যথাক্রমে অবিদ্যা, সংস্কার, বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভব, জাতি ও দুঃখ। এর একটি থাকলেই অপরটি থাকবে, একটি চলে গেলেই অপরটিও নির্বাপিত হবে। আর এই চক্রাকারে আবরতনের নাভি হল তৃষ্ণা। তাই নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যে জয় করতে হবে সমস্ত তৃষ্ণাকে, এমনকি নির্বাণের তৃষ্ণাকেও! কোথাও কি এলিয়টের নাটক ‘মার্ডার ইন ক্যাথিড্রাল’ এ রাজদন্ডে মৃত্যুর আগে বিশপ অফ ক্যান্টারবেরির কাছে শহীদ হওয়ার লোভ ত্যাগের প্রস্তাবের কথা মনে পড়ছে! তারপর এল পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মত করে এল এই নির্ণায়ক কথা যে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বা আত্মচেতনার প্রবাহ –এই পঞ্চস্কন্ধ মিলেই ‘আমি’। এর বাইরে আর কোন জ্ঞেয় বস্তু নেই । তারপর বিতর্কসভার মধ্য দিয়ে আমরা হীনযান ছেড়ে মহাযানে পৌঁছালাম, আরও বলতে গেলে অসঙ্গ –বসুবন্ধুর বিজ্ঞানবাদে। এখানে সন্মাত্রানন্দ কি মহাযানের পক্ষে একটু টেনে খেলিয়েছেন? কারণ আলয়বিজ্ঞান ও বিজ্ঞপ্তিমাত্রতার ধারণার সঙ্গে (জ্ঞাতা-জ্ঞেয় অভেদ) যে অদ্বৈত বেদান্তের (অহং ব্রহ্মোস্মি) বেশ মিল! আর উপন্যাসকারের সে স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু সতর্ক লেখক ধরিয়ে দেন যে বৌদ্ধমতে সকলই ক্ষণিক, নিয়ত পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে উপনিষদের কথিত ‘আত্মা’ জীবের অপরিবর্তনীয় সত্তা। আমার পরিচিত অনেকের কাছে এই অধ্যায়টি বাহুল্য এবং কাহিনীর গতিরোধক মনে হয়েছে। আমার তা মনে হয় নি। উপন্যাসে কাহিনীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশ-কাল-চরিত্রকে এবং তাদের মধ্যের সংঘাতকে তুলে ধরা। তাই ভাল উপন্যাসে একটি ডিসকোর্স থাকবেই। আর এই দার্শনিক অভিঘাতের মধ্যেই রয়েছে দীপংকর চরিত্রের অনীহার বীজ যা তাকে সংসার , ঐশ্বর্য এবং নারীর প্রেমের আহবানকে প্রত্যাখ্যান করতে প্রেরিত করে। আমার মুগ্ধতার চতুর্থ কারণ, আচার্য ধর্মকীর্তির চরিত্রচিত্রণ ও তাঁর সঙ্গে অতীশ (চন্দ্রগর্ভ) এর আলোচনায় বৌদ্ধদর্শনের নির্বাণ ও বোধিলাভের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনে অবিচার ও অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার অনুসন্ধান করা। ধীমান আচার্য ধর্মকীর্তি বুদ্ধিষ্ট লজিকের বিরাট ব্যক্তিত্ব, ‘প্রমাণবার্তিকে’র মত গ্রন্থ লিখেছেন। আর একদিকে সহজ সরল ও বালকের মত কৌতুক ও পরিহাসপ্রিয়। ছবিটি মিলে যায় পঞ্চাশ বছর আগে কোলকাতায় প্রকাশিত অবন্তীকুমার সান্যাল ও জয়ন্তী সান্যাল সম্পাদিত ‘হাজার বছরের প্রেমের কবিতা’সংকলনে ধর্মকীর্তির রচনা বলে প্রকাশিত একটি চার লাইনের কবিতায়। যার সারাংশ হচ্ছেঃ নারীকে দেখেই আমি বুঝেছি ভগবান বুদ্ধের কথাটি যথার্থ যে এই বিশ্বের স্রষ্টা কোন ঈশ্বর হতে পারে না। কারণ, তাহলে নারীকেও ঈশ্বরই সৃষ্টি করতেন। তারপর কি তিনি তাঁর এই অপরূপ সৃষ্টিকে ছেড়ে দিতেন! উপন্যাসের ১১০ পাতায় সংশয়দীর্ণ ধর্মকীর্তি শিষ্য অতীশ দীপংকরকে প্রশ্ন করেনঃ পীড়িত জনতা আনন্দময় জীবনের স্বপ্ন দেখে। তারা নির্বাণ চায় না, বাঁচতে চায় । তারা চায় দূঃখ-অতিক্রমী আনন্দময় জীবনযাপনের কৌশল। তাদের এই চলমানতার দর্শন যদিও কী বৈদিক, কী শ্রামণিক শাস্ত্রদ্বারা সমর্থিত নয়, তবু আস্তিক, নাস্তিক, লোকায়ত, উপাসনাকেন্দ্রিক সকল প্রকার চিন্তাকেই তা আত্মস্থ করে নিয়ে সমাজজীবনে স্থান দিয়েছে। ‘আমি তাই ভাবি, বস্তুত আমাদের ধর্মদেশনা কি লোকসাধারণের উপকার করে? অথবা, আমরাই লোকসাধারণের দ্বারা উপকৃত হই?’ এ সংশয় একেবারেই ঘটমান বর্তমানের সংশয়। আমাদের সবার মনেই অহরহ এ প্রশ্ন ওঠে, নানাভাবে। আবার তরুণ অতীশ বলেন— যে কোনও যুগেই পরপীড়ক রাজশক্তি লোকসাধারণের ওই দারিদ্র্যবিজয়ী দুঃখজয়ী জীবনীশক্তি শোষণ করে নিতে চায়, কিন্তু তা নিবিয়ে দিতে পৃথিবীর তাবৎ নৃপতিই অসমর্থ। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ওরা কাজ করে’ পড়ছি বা শুনছি ‘জরুরী অবস্থার’ দিনে ফক্কড় কবি বাবা নাগার্জুনের লেখা দুটি লাইনঃ ‘সুকখী ঠুট পর বৈঠ কর কোয়েলিয়া কর গই কুক, বাল বাঁকা না কর সকী শাসন কা বন্দুক।“ অস্যার্থঃ শুকনো ডালে বসেও কোয়েল দিচ্ছে কুক, ঠেকাতে পারল কই তাকে ক্ষমতার বন্দুকন তাহলে এই পরীক্ষামূলক আঙ্গিকে লেখা উপন্যাসটি কতদূর সার্থক? আমার কাছে এ প্রশ্ন অবান্তর। অনেক সমীক্ষকের মতে দার্শনিক বিতর্কের মধ্যে কোথাও মাঝখানে দাঁড়ি টেনে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ষড়দর্শনকে প্রতিযোগী করে না দেখিয়ে একই মননের বিভিন্ন ভাবের প্রকাশ হিসেবে দেখানো যেন একটু জোর করে হয়েছে। আর এক সমীক্ষকের মতে ভাষায় কোথাও কোথাও সমস্যা আছে। কিছু শব্দের তদ্ভবীকরণ যেন ঠিকমত দাঁড়ায় নি। এহ বাহ্য। চারদিকে সিরিয়াল-গন্ধী উপন্যাসের প্লাবনের মধ্যে এই আখ্যানটি এক আনন্দদায়ক ব্যতিক্রম। আজকের এই অসূয়া-হিংসা- অনাচার- মদগর্বী পশুতার দিনে ভারতে বুদ্ধের বাণী, মাত্র শান্তিজল ছিটানো নয়, হিংসার অসারতা, অনিত্যতা ও আত্মঘাতী প্রবণতাকে বোঝা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। চাইব, এই বইটি আরও লোকে পড়ুক, আলোচনা করুক। ==========================================>

180

3

মনোজ ভট্টাচার্য

ক্লীন-মিট বা ল্যাব মিট !

বন্ধুগন, একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চাই – আশা করি আপনারা সাহায্য করবেন । মানেকা গান্ধী কয়েকদিন আগে হায়দ্রাবাদে একটা সভায় পশুবহনকারী মানুষদের গণপিটুনি ও গণ-হত্যার প্রতিষেধক হিসেবে – এক ‘ল্যাব-মিট’ বা ‘ক্লীন মিট’ এর নাম করেছেন । - আজ সেই বিষয় জানতে গিয়ে এই সময়ের এক প্রতিবেদন পড়ে খুব কৌতূহল জাগল । লিখেছেন - মৃন্ময় চন্দ । অবশ্য সমস্ত লেখাটাই নেওয়া হয়েছে পল শ্যপিরর --- Clean Meat: - বইটা থেকে ! এই প্রতিবেদনে এমন অনেক কিছু তথ্য আছে – যা আমার মত নিরেট মাথায় ঢুকতে পারছে না ! সোজা বুদ্ধিতে যেটা মনে হচ্ছে – এই প্রক্রিয়াও সেই ক্লোনিং পদ্ধতি ! গৃহপালিত বা খামারজাত পশুর স্রেফ একটি কোষ থেকেই উৎপন্ন অঢেল মাংস ! জৈব প্রযুক্তি ! আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনবিস্ফরিত বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্য সমস্যা মেটাবে ! আমেরিকার ‘ফনালিটিক্স’ নামে এক সংস্থার উদ্যোগে এক সমীক্ষা হয় । তাতে দেখা যায় – ৬৬% মানুষ চায় পরিচ্ছন্ন মাংস বা ক্লীন-মিট । যদিও মাত্র ২৫% মানুষ ক্লীন মিটের কথা শুনেছে ! এমন কি ৪০% মানুষ ক্লীন মিটের জন্যে ২৫% বেশি মুল্য দিতেও চায় ! এরা কিন্তু সবাই অবহিত – যে ক্লীন মিট বা ল্যাব মিট মানেই সয়াবিন জাতীয় কোন খাদ্য নয় । এটা প্রকৃত মাংসই । যার পুষ্টিগুন চিরাচরিত জবাই করা মাংসের চেয়ে অনেক বেশি । - মানেকা গান্ধী কতটা কি জানে- জানি না । - কিন্তু শ্যপিরো পশুপ্রেমী, কমপ্যাশন ওভার কিলিং এর প্রতিষ্ঠাতা, হিউমেন সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্টও বটেন ! তার মতে – মানুষ গৃহপালিত পশুকে খাদ্য বানিয়েছে । তবে এবার গরু বা মুরগির একটা কোষ থেকে অফুরন্ত মাংসের আমদানি হবে ! আমরা যদিও তত জ্ঞাত নই – কিন্তু পাশ্চাত্যে এই ক্লীন মিট প্রক্রিয়া বেশ পুরনো । একটা মুরগির ডানা বা একটা স্টেক খেতে – আস্ত পশুকে মারার দরকার নেই । সেই অঙ্গগুলো পৃথকভাবে ল্যাবে কালচার করে পাওয়া যাবে । যেসব পশুর চেরা খুর ও যারা জাবর কাটে – তাদের মাংসেই ক্লীন মিট বলা হয়েছে । ক্লীন মিট প্রস্তুতকারী সংস্থাও তাই ধরে নিয়েছে । সুতরাং গরু মোষ ষাঁড় ছাগল ভেড়া কৃষ্ণসার ও অনেক পশুই ক্লীন মিটের পর্যায়ভুক্ত । গবেষণাগারে ক্লিন মিট তৈরি করতে একটা মাত্র কোষ প্রয়োজন ! – কি প্রক্রিয়ায় কিরকম বা কিসের মাংস তৈরি হয় ইত্যাদি দেওয়া আছে ! ক্লিন মিট পরিবেশ-বান্ধব । উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চেয়ে – ডাল, সয়াবিন ইত্যাদির তুলনায় – গোমাংস ইত্যাদির প্রোটিন প্রায় কুড়ি গুন বেশি ! ২০১৩র আগস্টে নেদারল্যান্ডের মাস্ত্রিখটি ইউনিভার্সিটির ডক্টর মার্ক পোষ্ট লন্ডনের সাংবাদিক সন্মেলনে প্রথম ক্লিন মিটে তৈরি বিফ বার্গার ভক্ষণ করেন । ২০০০০ মাংসতন্তু থেকে তৈরি বার্গারের খরচ পরেছিল – তিন লাখ ডলার । সাড়ে তিন বছর পড়ে সেই বার্গারের খরচ পরেছে ১১.৩৬ ডলার । - এখন এই খরচ নেমে এসেছে সাধারন বার্গারের সমতুল ! বর্তমানে বানিজ্যিক ক্লিন মিট তৈরি করছে মেম্ফিস মিট, মডার্ন মিড, হ্যাম্পটন ক্রিক, ইত্যাদি । বিশ্ব খাদ্য সূচকে ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০ নম্বরে ! ভারত ও নেপালও ভারতের আগে ! তাই আমাদের ক্লীন-মিটের প্রয়োজন বৈকি ! এই সম্বন্ধে আমরা ওয়াকিবহাল হলে আগামি দিনে আমরা ক্লীন-গো-মিট খাবো কিনা – গো-সন্তানদের কাছে পারমিসান নিতে হবে কিনা – সব জানা জরুরী কি না ! - কিন্তু গো-মুত্র বা গো-ময় ক্লীন মিটের পর্যায় পড়ে কিনা – সেটাও তো জানা দরকার ! মনোজ

108

2

শিবাংশু

গোসাঁইজি কি মল্হার

কানে মর্চে ধরে গেলে যে দুয়েকজনের গান শুনে সেটা পরিষ্কার করে নিই। ইনি তাঁদের মধ্যে একজন। একটা লেখা নিয়ে বসেছিলুম। সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়। আমার মুদ্রাদোষবশত বিষয়টি বেশ জটিল। তিন চারটি রেফারেন্স যা পেলুম কেউ এক কথা বলছে না। আমিও রীতিমতো বিড়ম্বনায়। ধ্যুৎ, কিছুক্ষণের বিরতি লাগবে। ইতোমধ্যে আমার ডেস্কে অবিরাম বেজে চলা গানের স্রোতে কখন যে এঁর গান শুরু হয়ে গেছে, খেয়ালই করিনি। বাইরে কখনও বৃষ্টি পড়ছে, কখনও থামছে। ভাদুরে ভেজা তপ্ত কলকাত্তাই অসহ্য আবহাওয়া। আমাদের মতো বহিরাগতদের জন্য বড্ডো চাপ। কিছুক্ষণ আগে পালুসকর সাহেবের সুরদাসী মল্হার শুনছিলুম। একটু বাতাস লাগছিল প্রাণে। কিন্তু লেখা আটকে গেলে বড়ো বিরক্তি। মন'টা সমে পৌঁছোতেই চাইছে না। সেসময়ই কানের মর্চে ছাড়ানো এই গান। তাঁর নাম জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, প্রথম শুনেছিলুম আমার পিতামহের কাছে। তিনি মুক্তকণ্ঠে বলতেন তাঁর গানের দাপটের কথা। বিষ্ণুপুরের মানুষ বলে হয়তো দাদুর কিঞ্চিৎ শ্লাঘাও ছিল। বয়সে পাঁচ'ছ বছরের কনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু দাদু 'রাধিকা গোসাঁইয়ে'র ভাইপো ও শাগির্দ 'জ্ঞান গোসাঁইয়ের ফুরিয়ে যাওয়াটা কিছুতেই তিনি মেনে নিতে পারতেন না। জ্ঞান গোসাঁই মুক্তকণ্ঠ হয়ে গান গেয়েছেন বড়ো জোর চার-পাঁচ বছর। তার মধ্যেই অফুরন্ত মণিমুক্তো। বাবুদের বৈঠকখানায় গান শোনাতে তাঁর ছিল বিপুল অনীহা। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে "‘ওখানেই আমি থাকবো আর রাধামাধবের কাছে গান করবো" বলে যে কলকাতা ত্যাগ করে বিষ্ণুপুর চলে গেলেন, আর থাকতে ফিরে আসেননি। বছরে মাত্র একবার সরস্বতীপুজোর দিন গোকুল মিত্রের বাড়ি এসে তাঁদের বাড়িতে বিষ্ণুপুরের মদনমোহন বিগ্রহকে গান শুনিয়ে যেতেন। শালপ্রাংশু, সুদর্শন, শক্তিমান, দাপুটে, বাঙালির গর্ব এই শিল্পী চলে গেলেন মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে। কেন গেলেন, কোথায় গেলেন, কে জানে? যাঁরা এই লেখা পড়বেন, তাঁরা সবাই তাঁর গান প্রাণ ভরে শুনেছেন। আজ তাঁর গাওয়া ছোট্টো 'মিয়াঁ কি মল্হার' শুনতে শুনতে ভাবছিলুম মর্চেধরা স্নায়ুগুলোকে কীভাবে তিনি সুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে সাফ করে দিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই অনুপম বয়ানটি মনে পড়ে, "বেঁচে থাকার অনেক আশা, প্রিয়তমা বধূ আমার তোমাকে ভালোবাসার মত একান্ত বেঁচে থাকা ...." https://www.youtube.com/watch?v=h4-Qe88SqNY

102

5

মনোজ ভট্টাচার্য

সে দেশের কিছু কিছু কথা !

ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলাম না ! অনেকদিন পর্যন্ত আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না ! বিদেশে যাবার আগে তো শুনতাম – গাড়ি চালাতে না জানলে – ওখানে জীবন অচল ! দুধ কিনতে পর্যন্ত যেতে হয় গাড়ি চালিয়ে যোজনখানেক দূরে ! অমরনাথ যাবার আগে খুব শুনতাম – পহেলগামের পর থেকেই নাকি শুধু বরফ ! এপাশে ওপাশে বরফ ! সবাই গল্প শোনাত চন্দনবারি – থেকে – পিশু চড়াই – সব তুষারাচ্ছন্ন – রাস্তা দেখাই যায় না ! – এদিকে আমার তো স্নো-বুট পর্যন্ত নেই । আমি কি তাহলে যেতে পারব না ! একদিন ভয়ে ভয়ে অমরনাথ গেছে এমন একজনকে জিগ্যেসই করে ফেললাম – অমরনাথের রাস্তায় কি পাথর টাথরের রাস্তা নেই ? গাড়ি টারি চলে না! লোকে যায় কি করে ! – তাড়াতাড়ি সে বলে ফেলল – হ্যাঁ হ্যাঁ – রাস্তা থাকবে না কেন ! মাঝে মাঝে বরফ পড়ে রাস্তা ঢেকে যায় ! – যাক ! নিশ্চিন্ত হয়ে অমরনাথ ঘুরে এলাম ! বরফ টরফ আছে বটে – তবে রাস্তাও আছে ! আর সেটাই প্রধান ! ঠিক তেমনি – ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া ভিসা হয় - প্লেনে চড়তেও দেয় – এমন কি ওদেশে ঢুকতেও দেয় ! আমাদেরও দিল ! অস্বীকার করবো না – গাড়ি ছাড়া অসুবিধে হয় । বিশেষ করে শহরতলি অঞ্চলে । পাবলিক বাস টাস না থাকলে অসুবিধে হয়ই ! – তবে জীবন স্তব্ধ হয়ে যায় না ! – শহরে বাস ও মেট্রো রেল খুব সুবিধের । বরং গাড়ির বিপদ হল – পার্কিং ! পার্কিং এর এত অসুবিধে । পরে যাদের গাড়ি ছিল না – তাদের দেখে সুখী মনে হত ! এদিকে গাড়ি কেনার প্রথম ক্রাইটেরিয়া হল – ড্রাইভিং লাইসেন্স ! – ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েই প্রথম চান্সেই ফেল ! – দোষটা ঠিক আমার ছিল বলে মনে হয় না । জীবনে গাড়ি চালাই নি । গাড়ি যেমন সোজা চলে – তেমনি এদিক ওদিক ঘোরাতেও হয় ! – আমি তো বুঝতেই পারি নি – গাড়ি ডানদিকে না বাঁদিকে যাচ্ছে ! ট্রেনার থামাতে বলতে – যেই থামিয়েছি – দরজা খুলেই উল্টোদিকে দৌড় ! – বুঝলাম ট্রেনারের তাড়া আছে - গাড়ির আগে পৌছতে চায় ! – ফে-ই-ল ! – একগাদা টাকা নষ্ট ! কি করা যায় ! এদিকে কেউ কেউ বুদ্ধি দিল – মোটর ভেহিকল ডিপার্টমেন্টকে টাকা দেওয়ার মানে হয় না ! বাইরে থেকে লাইসেন্স বার করতে হবে ! বাইরে থেকে মানে ? সুপার মার্কেটে কি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় ? কাগজে টি ভিতে দেখি কত জায়গায় লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে ! মানে নকল লাইসেন্স ! তা আসল না পেলে নকলই সই ! – এই সময় বাংলাদেশী বন্ধুরা পথ দেখাল । সবাই বলল – এমন কিছু নেই যা বাংলাদেশে নকল হয় না ! লাইসেন্স তো কিছুই নয় ! দরকার হয় গ্রিন কার্ড পর্যন্ত – বার করে দেবে ! সবই হবে নিউ ইয়র্কে বসেই ! শুধু ডলার ফেলো ! – সেই সময়ে নাগাদ প্রচুর - ভিসার ডুপ্লিকেট – ট্রিপ্লিকেট বের হচ্ছিল । পাসপোর্টের ডুপ্লিকেট বের হচ্ছিল ! আমরা স্বচক্ষে দেখেছি – মাথা কাঁটা পাসপোর্ট ! – রাম খানের পাসপোর্ট – তাতে ভিসা সাঁটা আছে । রাম গিয়ে থানায় রিপোর্ট করলো – তার পাসপোর্ট হারিয়ে বা চুরি হয়ে গেছে ! থানা থেকে এফ আই আর এর রিপোর্ট নিয়ে – সেটা পাঠিয়ে দিল দেশে । দেশ থেকে আরেকটা পাসপোর্টের ডুপ্লিকেট বার হয়ে গেল – ছবিটা গলার থেকে পালটানো – অর্থাৎ রাম ভরোশার ! রাম ভরোশার নিউ ইয়র্কে পা রাখার এক দু সপ্তাহের মধ্যে যথারীতি দ্বিতীয় পাসপোর্টটাও চুরি হয়ে গেল এবং এফ আই আর হয়ে গেল । এইভাবে এবার আবির্ভাব হচ্ছে – রাম বাবার ! – এইভাবে এক ভিসার জোরে রাম খান ধরে রাখল – আসল পাসপোর্ট, দ্বিতীয় পাসপোর্ট রইল – রাম ভরসার আর তৃতীয় পাসপোর্ট রইল রাম বাবার ! নাম একটাই – রাম খান ! আবার এ তো সবাই জানে – রহিম খানের স্ত্রী রসিদা বানুর ভিসা হয়ে যাবার পর প্লেনে করে এসে পৌঁছল কাদের খানের স্ত্রী নাসিম বানু ! একদিন দাই-হাট-স্যু পড়ে বাংলাদেশ হাই কমিশনের অফিশে ঢুঁ মারলাম । - খুব ভিড় হয় সেখানে – লাইন দিয়ে অনেক পরে দেখা পেলাম জনাব জাফর আলি সাহেবের সঙ্গে ।বেশ বেঁটে মতন চেহারা । - জানিনা অফিশে আসার আগে তার স্ত্রী ফোন করেছিল কিনা – অথবা দেশের সরকার আবার পাল্টালো কিনা – ভদ্রলোকের মেজাজ একেবারে তিল-তিরিক্ষে হয়ে ছিল ! কি নাম? নাম বলার পরেই – আপনি কোথাকার বাসিন্দা ? ভারত না বলে আমি বললাম – কলকাতার ! – উনি প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন – আপনি ইন্ডিয়ার বাসিন্দা হয়ে বাংলাদেশের লাইসেন্স পাবেন কি করে ? – খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা ! আমি আরও মাখন গলায় বলি – আপনি তো বাঙালি – সবাই বলল – বাঙ্গালিদের সাহায্য করেন ! বাংগালি নয় বলুন বাংলাদেশী ! আমরা বাংলাদেশী ! আর আমরা একজন ইন্ডিয়ানের জন্যে বে-আইনি কাজ করবো কেন ? ওসব ইন্ডিয়াতে হয় – এখানে নয় ! – এমনভাবে দাঁত-মুখ খেঁচালো যে খোদ কিস্কিন্দার বাসিন্দারাও লজ্জা পাবে । আমারও জাত্যাভিমান এমন চেগে উঠল যে – যে কারনে এসেছি – সেইটাই উড়ে গেল ! বেশ দু-চার কথা শুনিয়ে বেরিয়ে এলাম ! বাড়ি ফেরার পর আমার প্রতিবেশীরা সব শুনে খুবই অবাক ! – এহ – দাদা ! এটাও পারলেন না ! – ওরা তো ফেক লাইসেন্স করে দেয় ! – আপনাকে কেন দিল না ! বোঝো কান্ড – আমাকে কেন দিল না – তাও আমাকে বলতে হবে ! – এ তো বলা যায় না যে আমি বাংলাদেশী নয় বলে দেয় নি ! – তবে এও ঠিক সেই প্রথম শুনলাম বাঙালি আর বাংলাদেশী আলাদা ! ওদের সেই জনাবের ব্যবহার সেদিন এত খারাপ লেগেছিল – যে মনে মনে ওকে অনেক শাপ দিয়েছিলাম ! কিন্তু ঐ ভদ্রলোকই আইনত ঠিক ! – সে যাইহোক, আর কখনও সেই অফিশে যাওয়ার সুযোগ হয় নি ! শেষ পর্যন্ত বার কয়েক পরীক্ষা দেবার পর লাইসেন্স পেয়েছিলাম ! মনোজ

319

35

শিবাংশু

প্যার মেঁ সওদা নহি...

শুধু আমি নই, গোয়া আমাদের সবার কাছেই অতি প্রিয় একটা ছোট্টো স্বর্গ। ভুলিয়ে দেওয়া, হারিয়ে যাবার অনন্ত ঠিকানা। বহুদিন ধরে সারাদেশ থেকে, সারা পৃথিবী থেকে কতশত মানুষ ভিড় জমিয়েছে এখানে। কতরকমের কালচার জড়াজড়ি করে রয়েছে এখানে। অবসরের পর ভেবেছিলুম কয়েকবছর এখানে থাকবই। পোস্টিঙের সুযোগ হয়নি বটে। কিন্তু তখন আর ছেড়ে দেওয়া যায়না। আগের মজলিশে আমাদের এক প্রিয়জন প্রিয় গোস্বামীর একটি ঠেক আছে ওখানে। বছরে একবার স্যামচাচার দেশ থেকে কয়েকমাসের জন্য আয়েশ করতে আসেন এখানে। প্রিয়দাকে বহুবার কথা দিয়েও রাখতে পারিনি। তাঁর উদার আমন্ত্রণ অকারণ উড়ে গেছে আরব সাগরের পাগলা হাওয়ায়। তা গোয়ার চ্যালাচামুণ্ডারা মাণ্ডবীর উত্তরে একটা দু'চার বছর থাকার মতো ঠেকও ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। কিন্তু ঐ যে... যাহা চাই, ইত্যাদি... গোয়ায় একটি নাচের ঘরানা আছে, 'দেখন্নি'। সব চেয়ে বিখ্যাত দেখন্নির গানটি কম্পোজ করেছিলেন কার্লোস ইউজেনিও ফেরেরা, ১৮৮৭ সালে। সাকিন, কর্জ্যুয়েম, আলডোনা। তাঁর ভাই এডুআর্ডো ছিলেন পিয়ানোবাদক। ১৮৯৫ সালে পারীতে 'কোঙ্কনী ব্যালাড' নামে এই সুরটি বাজিয়ে খ্যাত হয়েছিলেন। অনেক পরে, ১৯২৬ সালে তিপোগ্র্যাফিয়া র্যা ঞ্জেল গানটিকে আবার গোয়ায় ফিরিয়ে আনেন। দেখন্নি'কে নৃত্যপরা বালিকাদের গানও বলা হয়। একটি মেয়ে বন্ধুর বিয়েতে যাবে নদীর ঐ পারে। মাঝি কিন্তু রাজি নয়। খুব দরাদরি করছে। মেয়েটি তাকে ফুল দিলো, অলংকার দিলো, কিন্তু মাঝি রাজি নয়। সে মেয়েটির থেকে একটি চুম্বনের প্রার্থী। তা না নিয়ে সে আর ছাড়বে না। ফেরার পথে আবার একই দুর্যোগ। মাঝি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেনা। তার আরো বেশি কিছু চাই। মেয়েটি তার আরাধ্য দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করে। হামলাবাজ দুর্বৃত্তকে আঘাত করে নদীতে নিক্ষেপ করে। নিজেই নৌকো বেয়ে ঘাটে পৌঁছে যায়।ভোরবেলা ক্লান্তপায়ে বাড়ির পথে ফেরা। বিষন্ন একলা মেয়েটির আকুতি এই গানে.... লোককথাটির পিছনে ইতিহাসের একটা বিষাদ-অধ্যায়ও লুকিয়ে আছে। সেকথা থাক এখন। এই সুরটি অবিকল অনুসরণ করে লক্ষ্মী-প্যারে সেই অবিস্মরণীয় গানটি বেঁধেছিলেন আমাদের জোয়ান বয়সে। এই গানের সঙ্গে পা মেলায়নি এমন ছেলে-মেয়ে ছিলনা সেকালে। হঠাৎ সেদিন আবার গানটি শুনে মনে পড়ে গেলো পুরোনো কথা। মূল গানটিও শুনলুম গোনজাগা কুটিন্হোর কণ্ঠে। সিনেমার গানের জাঁকজমক নেই তাতে। কিন্তু সেই একলা মেয়েটির আকুতিটি সমান ভাবে বরকরার। ট্রাম্পেটেও তার সুর এখনও নেশা ধরায়। আর মান্না'দার গলায় আমাদের কিশোরবয়সের স্বপ্নের গানটা না শুনলে তো ঠাকুর অনিঃশেষ পাপ দেবেন। তা কী আর সহ্য হয়....? ভিভা লা গোয়া... https://www.youtube.com/watch?v=eC2O1RnnQ0g

146

6

"Gems the ঢপবাজ"

জেম'দার রাফ খাতা

জেমস বন গয়া রাঁধুনী| @ভোঁদড় @ স্যার| Monk fish এর নাম শুনেছেন? আমার সাম্প্রতিক আবিষ্কার- প্রোডাক্ট অফ নিউজিল্যান্ড| Costco তে পাবেন মনে হয়| ব্যাটারা যদি আপনাদের দেশের মাছ ‚ হ্যালিবাট (ডু নট কনফিউজ উইথ ডিক চেনীর কোম্পানী - হ্যালিবার্টন) রাখতে পারে এখানে বেচবার জন্যে তাহলে আপনাদের ওখানে মঙ্ক ফিশ কেন নয়| আপনার পুরাতন বাবুকে জিগিয়ে দেখুন‚ পুয়োর ম্যানস লবস্টার| এমনই তার সোয়াদ! কি প্রকারে রন্ধন করিলাম? এই নিয়ে মম তৃতীয় প্রয়াস| প্রথমবার নো রিস্ক কালিয়ার রেসিপি মোতাবেক| দেখুন: https://www.fishex.com/seafood/recipes/rinas-fish-kalia একটু কনফি পেতেই ইম্প্রোভাইজেশান; সেসব প্রচেষ্টা কি এখানে উল্লেখ করা শোভন অথবা সাহসিকতার পরিচয় হবে‚ নামী দামী সকল Chefনীর এর ভিড়ে? (১) নো মোর ভাজা ভাজি| অতি নরম এই মাছ| একটু গ্রিল করে নিলেই হবে‚ আট থেকে দশ মিনিট @ ১৮০ সেলসিয়াস| (আমার ওভেন এর মাপে)‚ একটু জল বেরোয়‚ অফ করে শুকোতে দেবেন‚ বেশী আঁচে শক্ত ও বাদামী হয়ে যায়‚ ঐ স্যামনের মতো ই| আপনি তো আবার সাহেব| তাহলে একটু গোলমরিচের গুঁড়ো‚ এ ড্যাশ অফ লাইম‚ একটু সী-সল্ট আর ঐ সাদা থকথকে সস কি যেন নাম‚ তার্তার দিয়ে টুং টাং‚ কাঁটা চামচে উইথ বেকড পোট্যাটো‚ পাম্পকিন‚ রাঙাআলু দিয়ে মেরে দিতে পারেন| সঙ্গতে যথাযোগ্য সোমরস| নো ফ্যাট‚ নো গিল্টি ফীলিং| (২) ফিশ ফ্রায়েড রাইস ও হতে পারে| হয়ে ও ছিল! বক চয়‚ ব্রকোলি‚ মাশরুম‚ হ্যানা তানা; সয় সস‚ অয়েস্টার সস দিয়ে ঘুঁটে ছোট ছোট পুন্নি রাইস (আন্ধ্রা রাইস) দিয়ে মন্দ হয়নি| পেঁয়াজের কথা আর বললাম না‚ সে তো থাকবেই| (৩) আর আজকেরটা? স্যার‚ এক্কেবারে যা তা! পিয়োর পরীক্ষা নিরীক্ষা| না উতরোতেও পারতাম| ইন ফ্যাক্ট কেঁচিয়ে ফেলেছিলাম| উপকরণ ও পদ্ধতি নিম্নরূপ: গ্রিলড মঙ্ক ফিশ| ও বলতেই ভুলে গেছি‚ ফিলেট (আমি ফিলে বলে আঁতলামি করতে অপারগ‚ প্যারিস ইজ নট প্যারী যেমন চন্দনগর ইজ নট চন্দা'র নাগর)| বাঙলা গাদা'র মতো করে টুকরো করে কেটে নেবেন| পেঁয়াজ আর অল্প লাল ক্যাপসিকাম ভেজে- অবশ্যই কুচি কুচি‚ কালো জিরে‚ একটু পাঁচফোড়নের ছিটে‚ লঙ্কার গুঁড়ো এবং? বলেই ফেলি| লাহোরি ফিশ মশলা আর কোফতা মশলা দিয়ে নাড়াবেন‚ সামান্য আদাবাটা ও রসুনও| (কেন এই মশলা? আমি রন্ধন সম্রাট‚ মশলার হারেমে সকল প্যাকেট সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে‚ এই দুটো দেখে মনে ধরলো‚ বেছে নিলাম)| প্যাকেট থেকে সোজা কড়াই তে| এটাই এখানেই কেলো করে ফেলেছি‚ বেশী ঢালা হয়ে গেছে| তার উপর বড় বড় শেফ লেবুর rind ঘষে ঘষে দেয় দেখেছি‚ ঐ কর্মটি করে আমি আরও কেঁচিয়ে ফেলিতং| বেশ একটু হালকা তেতো| (লেবু কচলানোর মেটাফর আমা পানে কতবার যে বর্ষিত হয়েছে| বাট হু কেয়ারস!) একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা তো করতেই হয়| এই ধরুন মহকুমা সদরের ইশকুলে গিয়েছিলাম কমার্স পড়তে‚ গ্রামের মাল বি এ বি কমই শুধু জানতাম‚ সায়েন্স কি বস্তু‚ ফিজিক্স‚ কেমিষ্ট্রির নামই শুনিনি| অঙ্ক- ইয়েস| তো হেডস্যার ইন্টারভিউ নিয়ে বললেন সায়েন্সে ভর্তি হতে| সেই শুরু হলো ইমপ্রোভাইজেশনের‚ সারাটা জীবন ঐ করেই কাটালাম| ওহ ভাজা ভাজা হয়ে গেলে‚ গরম জল ঢালুন আন্দাজ মতো| এই বার মনে পড়েছে‚ আজ দই দিতে ভুলে গেছি| ঐ তেতো ভাবটা কেটে যেত| আমি ম্যানেজ করতে চেষ্টা করেছি‚ ট্যোমাটো পেষ্ট দিয়ে‚ ভাঁড়ারে diced টিনও ছিল না| সব উলটো পাল্টা হয়ে যাচ্ছে| একটু ফুটে এলেই নামিয়ে গামলায় (যাকে আপনারা মিক্সিং বাউল বলেন) ফেলে ফুররররর; মানে stick grinder দিয়ে ঘুঁটে নিলাম| এইটে কিন্তু খুব কাজের| পুরো ফ্লেভারটা মিশে যায়‚ ডুমো ডুমো ট্যোমাটো‚ পেঁয়াজ ঝোলে ভাসে না| এমনি যে কোন ঝোলে‚ ঝালে ব্যবহার করে দেখতে পারেন‚ ব্রথ টা সমান কনসিস্টেন্সির হয়‚ আর রঙও খোলে| তারপর আবার কড়াইতে (কড়াই= নন স্টিক পাত্র)| আন্দাজ মতো জল ঢেলে দিন| নুন মিষ্টি ‚ এই একটু সামান্য‚ অতি সামান্য চিনি ছড়িয়ে দিলেই হবে| এইবার চেখে দেখা| মশলা একটু বেশীই দিয়ে ফেলেছি‚ বেশ কড়া হয়েছে মালটা| আলু সেদ্ধ থাকলে ডুমো ডুমো করে দিলে টেনে নিতো; স্লাইসড কচুর মুখী handy ছিল‚ তাইই সই| টেনে নিল| একা একাই খেলাম‚ গৃহিণীর আজ নিরামিষ আহার‚ শ্রাবণের সোমবার কিনা | তা ভাল‚ তিনি খেলে কপালে দু:খ ছিল| আর‚ নিজের রান্না কি কখনও বিস্বাদ লাগে? দেড়খানা রুটি দিয়ে মেরে দিলাম| ওহ‚ ইয়েস‚ পুরো এক কিলো ফিলেট‚ খুবই মেহঙ্গা মাছ এটা‚ ২৭ ডলার কিলো| বাকীটা ফ্রীজায়িত‚ ফির কাভি| যেদিন খুব ক্ষিধে পাবে (আপনারা কাব্য করে বলবেন‚ অতীতের তীর হতে বহিবে বাতাস ) ফ্রিজ ফাঁকা‚ সেদিনের জন্য তোলা রইলো| জয়রামজীকী| ডি: উপরোক্ত পদ্ধতি আদৌ কোন স্বীকৃত রন্ধন প্রণালী নহে| মালের (সরি মাছের) দায়িত্ব আরোহীর!

230

7

ঝিনুক

স্বপ্নের থেকেও সুন্দর ইয়োহো ভ্যালি.....

"দিন চলে যায়, সবই বদলায় শুধু যে আমার এ মন যা ছিল থাকে তেমন পুরনো হয় না কত কি শোনা কথা, কত সুখ কত ব্যথা, হারানোর দলে লেখে নাম শুধু তুমি যে নাম লিখেছো মোছা যায় না ……" গাড়ি গান শোনায়, শুনতে শুনতে পার হয়ে যাই ব্যানফ ন্যাশন্যাল পার্কের চেনা পাহাড়, চেনা জঙ্গলে ঘেরা অতিচেনা পথ। এযাত্রা গন্তব্য চেনা গণ্ডি ছড়িয়ে অচেনা Yoho Valley.... আমাদের রাজ্য আর পাশের রাজ্যের সীমানায় রকির Yoho National Park... ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের একটা। আমাদের স্পর্শ, গন্ধ, পদধ্বনি তো বোধ হয় মুখস্থ হয়ে গেছে এই পাড়ার রকি আর তার জঙ্গলের। সারা বছরে কতবার যে হানা দিই পাহাড়ে তার কোন লেখাজোখা নেই, বিশেষ করে সামারের প্রায় কোন উইকএণ্ডই বাদ যায় না সম্ভব হলে। ইয়োহো পার করে, পাহাড় ডিঙিয়ে কেলৌনা, কামলুপস, ভ্যাঙ্কিউভার, সেও গিয়েছি একাধিকবার। কিন্তু পাহাড়ের এই দিকটাতে অনেকদিন ধরেই যাই যাই করেও যাওয়া আর হয়ে ওঠে নি। অবশেষে সেই ইয়োহো- প্রায় ২৫০ কিলোমিটার আমাদের এই শহর থেকে, রওনা দিতে দিতে শুক্কুরবার বিকেল প্রায় সাতটা বেজে গেল। পৌঁছোতে পৌঁছোতে আলো কমে যাবে, তার ওপর যাত্রাপথের শেষটুকু খুবই খাড়াই আর অপ্রশস্ত, এক্কেবারে অপরিচিতও বটে। তাই সেই শুক্রবার রাতটা পথে একটা ছোট্ট ডিট্যুওর করে আইসফিল্ড পার্কওয়েতে mosquito creek-এর একটা লজে বুক করা ছিল। শহর ছাড়ার আগেই ডিনার তুলে নিলাম, আহ, সারাদিনের কাজের শেষে হীটেড সীটে আরাম করে পা মুড়ে বসে রিল্যাক্স করে খেতে খেতে পছন্দের গানের সাথে পাহাড়ের পথে, এমন কেন রোজ হয় না আহা!! কুচকুচে কালো মেঘ, অঝোর বৃষ্টি সারাটা পথে, পাহাড়ে বৃষ্টির প্যাশনই অন্যরকম, অন্যরকম তার ঝরার ধরণ। খুব poor visibility, হেডলাইট হাই বীমে দিয়েও সামনেটা প্রায় ঘষা কাঁচের মত, তার মধ্যে দিয়েই চলা। স্পীড লিমিটও কমিয়ে ৯০ করে দিয়েছে আজকাল পার্কের সীমানায় ঢুকতেই। যা হোক, ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা ঝরোঝরো বর্ষা নীচে ফেলে আরো ওপরে উঠে গেলাম, পরের আধা ঘন্টা গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘের মধ্যে দিয়ে চলা। জানালার কাচ নামিয়ে দিলাম, কৌতূহলী মেঘেরা ঢুকে পড়ল জানালা খোলা পেয়ে (যারা দার্জিলিঙের ঘুম স্টেশনে বা অন্য কোন শৈলশহরে মেঘে ভিজেছেন তারা বুঝবেন কি বলতে চাইছি)। গাড়ির ড্যাশে দেখাচ্ছে ৭ ডিগ্রী, তবু ভীষণ ভাল লাগে চোখে মুখে গলায় মেঘের ভেজা ঠোঁটের ছোঁয়া। এই লজে আগে কখনো থাকি নি। লজের সাইন মিস করে টার্নটা পার করে চলে গেলাম বেশ কিছুদূর। সাড়ে দশটা বাজে, অন্ধকার হয়ে যেতে শুরু করেছে ততক্ষণে। পাহাড়ে জঙ্গলে আঁধার একটু যেন আগেই ঘনায়, তার ওপর আকাশ ভরা মেঘ। এই সব পাহাড়ি হাইওয়েতে একবার কোন টার্ন মিস করে গেলে আবার ঘুরে আসার জন্য বেশ খানিকটা রাস্তার ধাক্কা। গাড়ি ঘুরিয়ে লজের পার্কিঙে যখন পৌঁছোলাম, তখন এমন ঝুপঝুপে নিকষ অন্ধকার যে নিজের হাতখানাও আর ঠাহর হচ্ছে না। গাড়ি থেকে নামতেই জঙ্গল যেন কথা বলে উঠল ঝিঁঝিগুঞ্জনে। খুব কাছেই কোথাও বয়ে যাওয়া কোন ঝোরা বা ক্রীকের মৃদু কিন্তু একদম নির্ভুল আওয়াজ ভেসে আসছে। ঝিকমিক জোনাকির লক্ষপ্রদীপ জ্বলছে স্বাগত জানাতে। পায়ের কাছে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই সরু পায়ে চলা পথটা ধরে। একটু দূরে ছায়ার মত একটা বাড়ির আদল। সামান্য আলোর রেখা চুঁইয়ে আসছে বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে। ঘনঘোর জঙ্গলের মধ্যে গাছ কেটে এক খাবলা জমি খালি করে এই কাঠের লজটা বানানো হয়েছে, মোট চারটে বাংলো, প্রত্যেকটায় দুদিকে দুটো করে ঘর। বিজলি আছে, মুঠিফোনও কাজ করছে, তবে নো রানিং ওয়াটার। ভুল বললাম, রানিং ওয়াটারও আছে, তবে সেটা কলের জল নয়, বাংলোর পাশ দিয়েই কুলুকুলু বয়ে যাওয়া ক্রীক, মসকিউইটো ক্রীক। কি যেন একটা তড়বড় করে সরে গেল পায়ের কাছ থেকে,ভাবি খরগোস হবে হয়তো। আলো ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি একটা শেয়াল, দুই চোখে হলুদ আলো জ্বেলে সন্তর্পণে আমাদের জরিপ করছে। 'স্যরি বেটা', ওকে ওর মত থাকতে দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। শুধু শেয়াল কেন? ভালুক, নেকড়ে, ক্যিউগার সবই আছে এই জঙ্গলে। শুধু এই অন্ধকারে আহ্লাদ করতে না এলেই কাফি। টুপটাপ জল ঝরছে আমাদের উপর বৃষ্টিভেজা গাছগুলো থেকে। লজের সামনে পৌঁছোতেই মোশন সেনসর অ্যাক্টিভেটেড বাইরের আলোটা জ্বলে উঠল। গোটা উঠোনটা ভরে গেল ফ্যাটফেটে সাদা প্রাণহীন আলোয়। শহুরে মনটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, অন্য মনটা গিলটি কনসেন্সে মাথা নীচু করে, কি অন্যায্য উপদ্রব এমন একটা মেঘমেদুর বৃষ্টিধোয়া রোম্যান্টিক জঙলা রাতে! এই অনধিকার চর্চার জন্য মনে মনে ক্ষমা চাই নিভৃতচারী অরণ্যের বাসিন্দাদের কাছে। চেক ইন করে রাতের মত থিতু হওয়া গেল। কেয়ারটেকার বারবার বলে দিয়েছেন, রাতে ওয়াশরুমে যেতে হলে একা একা না যেতে। ভালুকের খাসতালুকের আঙিনায় লজটা। কাজেই এই চেতাবনি খুবই স্বাভাবিক। ও, ভুলেই গেছি বলতে, ওয়াশরুমগুলো সব বাঙলোর পিছনদিকে আলাদা আউটহাউসে। গোটা উঠোনটা পেরিয়ে যেতে হবে। এমনিতেই ঘুমের সঙ্গে আমার ভাসুর-ভাদ্রবৌ সম্পর্ক, অনেক সাধ্যসাধনায় তেনার দেখা মেলে। তায় অচেনা বিছানা (সে যতই আরামের হোক না কেন), মেঘবাদল সজল এমন পাইনগন্ধী রাত, রিমঝিম সুরে বহতা ঝোরার নুপুর বাজছে সমানে মাথার দিকে জানালার ওপারে। ঘুম কি আর আসে? সে আজ তেপান্তর পার করেও আরো কয়েক যোজন দূরে। সমানে উসখুস করতে থাকি, অন্ধকারেই জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করি। উফফ, কি কালো যে হতে পারে অন্ধকার!! কিচ্ছু দেখা যায় না। ঝিল্লিমুখর, শুনশান বাইরেটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। খুব ইচ্ছে করতে থাকে ক্রীকটার পারে গিয়ে বসতে। কিন্তু শোয়ার আগে আজ প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে বাপ বেটা দুজনের কাছেই, কোন কারণেই আমি একা একা বেরোব না আজ রাতে অভিসারে। কাজেই একবার এপাশ, একবার ওপাশ। বিছানা থেকে নেমে ফায়ারপ্লেসে আগুনটা উসকে দিই, আর এক টুকরো কাঠও গুঁজে দিই। ঢকঢকিয়ে জল খাই বেশ কয়েকবার। একটা, দুটো, আড়াইটে, সময় আর এগোতে চায় না। এই ‘সময়’ ব্যাপারটাকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না, যখন তাড়া থাকে, সময় দৌড়োতে থাকে, শত চেষ্টাতেও তার সাথে তাল রেখে উঠতে পারি না। আর এই না-ঘুম রাতে সময়ও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে বাকি পৃথিবীটার সাথে! অবশেষে তিনটে প্রায় বাজে বাজে, কর্তা নড়ে চড়ে উঠলেন। আমিও তড়াক করে এক লাফে উঠে চেয়ারের উপর থেকে শালটা টেনে জড়িয়ে নিলাম ভালো করে। বাইরে পা দিতেই অবাক কাণ্ড, মেঘ-বৃষ্টি সব উধাও, চাঁদও পলাতক, কৃষ্ণা চতুর্দশীর নিবিড় রাত, আকাশটার নির্ভেজাল কালো বালুচরী আঁচলের প্রতি ইঞ্চিতে অযুত রুপালি তারার জরিন নক্সা আর একদম ঠিক মাঝ বরাবর থিরথিরে আলোর ঢেউয়ের মত ছায়াপথ, ঠিক যেন স্বর্গের সিঁড়িটি, মনে হচ্ছিল, ইচ্ছে হলেই বুঝি হাত বাড়িয়ে ছোঁওয়া যায়। রাতের আকাশের রূপ জঙ্গলে যেমনটি, তেমন আর কোত্থাও সম্ভব না। জঙ্গলের অনেক আকর্ষণের মধ্যে এটা একটা মূখ্য কারণ। জঙ্গলে জঙ্গলে বহু রাত মাটিতে চিত হয়ে আকাশ দেখেছি, তারা গুণেছি। আমার জন্য অন্য লোকজন ঘুমোতে যেতে পারে নি, কিন্তু আকাশগঙ্গাকে এমনভাবে এর আগে আর কখনো দেখি নি, so up, close and personal.... "পুবদিগন্ত দিল তব দেহে নীলিম রেখা", সকাল হল একরাশ মুগ্ধতায়। সত্যি সত্যিই "শ্যামল সঘন নববরষার কিশোর দূতের" মতই ঠেকতে লাগল সদ্যস্নানসারা ঝিলমিলে জঙ্গলটাকে। রাতের রহস্য যত, দিনের আলোয় সব ঢাকা পড়ে গেছে। এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ালাম জঙ্গলের মধ্যে কিছুক্ষণ। সেই নাম লিখলাম একটা গাছে যত্ন করে। ঝোরাটায় পা ডুবিয়ে জল ছপছপিয়ে একটা কাঠবিড়ালিকে বেজায় চমকে দিলাম। বেচারা হকচকিয়ে পালাতে গিয়ে মুঠোর বাদামটা হাতছাড়া করে ফেলল। ক্ষতি পোষাতে আমার এক কামড় দেওয়া আপেলের যেটুকু বাকি ছিল সেটা ছুঁড়ে দিলাম। জলটা যথারীতি কনকনে ঠাণ্ডা। একটু পরেই পায়ের পাতা অসাড়। গ্লেসিয়ারের বরফগলা জলের কারণেই এই তল্লাটের যত নদী, ঝরনা, লেক, সবই এমনতরো ঠাণ্ডা। ক্রীকটার অন্যপারে একটা ক্যাম্পগ্রাউণ্ড। ঘুম ভেঙে উঠে লোকজন দিন শুরু করছে। কিছুক্ষণ বসে বসে দেখলাম তাদের প্রাতঃকালীন আড়মোড়া ভাঙা, হাই তোলা, স্টোভ জ্বালানো, কফির জল বসানো। একদম সোজাসুজি উল্টোদিকের টেন্টটা থেকে অল্পবয়সী দুটো ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে আদর করল, তারপর হাত ধরাধরি করে চলে গেল, সম্ভবত ওয়াশরুমের অভিমুখে। একটা টলোমলো বাচ্চা ছেলের হাত ধরে উস্কোখুস্কো তরুণ বাবাটি এসে বসল উল্টোদিকের পারে, স্মিত হেসে আমায় সুপ্রভাত জানালো। আমিও প্রত্যভিবাদন জানালাম। বাচ্চাটার চোখে তখনও ঘুম, কেমন বোধিগ্রস্ত চোখে ঝুম হয়ে বসে রইল বাবার পাশে। একটু পরে মা এল, হাতে ব্রাশ-পেস্ট। আমি উঠে পড়লাম। চা খেয়ে রেডি হয়ে নিলাম। আবার যাত্রা। লেক লিউইসে গিয়ে একবারে ব্রাঞ্চ সেরে আবার হাইওয়েতে পড়ার পরিকল্পনা। পথে ক্রোফুট গ্লেসিয়ার দেখতে ভিউপয়েন্টে দাঁড়ানো হল। সীমিত ফোটোসেশন, গাণুশের সাথে একটু ছোঁয়াছুয়িও খেলে নিলাম এক ফাঁকে। কতদিন পরে ছেলেটা সাথে এসেছে এবার! বড় হয়ে যাওয়া গাণুশ আমার আজকাল তো আর আমাদের সাথে সাথে বেড়ায় না সর্বত্র। তাই যতটা পারি উপভোগ করে নিই প্রত্যেকটা মিনিট। খাওয়াদাওয়া সেরে প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ আবার শুরু হল চলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পেরিয়ে গেলাম রাজ্যের সীমানা। আধাঘন্টার মধ্যেই ইয়োহো পার্কের দুয়ারে। মধ্যে একটা স্টপ স্পাইর‌্যাল টানেল দিয়ে ট্রেন যাওয়া দেখতে। এই স্পাইর‌্যাল টানেল ব্যাপারটা শুধু কানাডাতেই নয়, সারা বিশ্বেই একটা ঐতিহাসিক পরিকাঠামো। কানাডার অ্যাটলান্টিক প্রান্ত থেকে প্যাসিফিক, কোস্ট ট্যু কোস্ট দূরত্ব ছ'হাজার কিলোমিটারেরও বেশি, আগাগোড়া ট্রেনলাইনে যুক্ত, যার নাম কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেইল। একটু আন্দাজ দিতে চেষ্টা করি, নিউ ইয়র্ক থেকে লণ্ডন সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার আর লণ্ডন থেকে কলকাতা প্রায় আট হাজার কিলোমিটার। বলাই বাহুল্য যে এই কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেল কানাডার ব্যাবসায়িক মানচিত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় দেশটা গোটা পার করে এসে এইখানে রকি পাহাড়ের মত একটা দুর্লঙ্ঘ্য বাধাকে ডিঙিয়ে যেতে হয় সেই ট্রেনকে। সে বড় সহজ কাজ নয়। এই রেলললাইন যখন প্রথম পাতা হয়েছিল, এই খাড়া পাহাড় পেরোন ছিল খুব ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ আর কষ্টসাধ্য যাত্রা। আগে পিছে এক্সট্রা ইঞ্জিন, শয়ে শয়ে অতিরিক্ত কর্মচারী লাগতো ট্রেনগুলোকে এই খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠাতে, ডিরেইলমেন্ট ঠেকাতে spur line লাগতো। ১৮৮৪ সালে প্রথম যে ট্রেনটা এই লাইনে রওনা দিয়েছিল, সেটা ডিরেইল হয়ে তিনজন কর্মচারী মারা গিয়েছিলো, তারপরে স্পার লাইন পাতা হয় ডিরেইলমেন্ট ঠেকাতে। সেই স্মৃতিতে স্মারক আছে ঐ স্পটে, যার নাম ছিল বিগ হিলস সেই যুগে, আছে পুরনো সেই স্পার লাইনগুলো আর ডিরেইল হয়ে যাওয়া একটা পুরনো লোকোমোটিভ। ১৯০৯ সালে ভ্দ্রস্থ গ্রেডের স্পাইর‌্যাল টানেল দুটো (লোয়ার টানেলটা ৮৯১ মিটার, গ্রেড ১৫ মিটার আর আপার টানেলটা ৯৯১ মিটার, গ্রেড ১৭ মিটার) তৈরী হয় এই খাড়াই পাহাড় নিরাপদে পেরনোর জন্য। It's an engineering marvel.... এই টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খুবই চ্যালেঞ্জিং, আজকের দিনেও। থেকে থেকেই পাহাড়ে পাথরের ধ্বস নামে, বৃষ্টি বেশি হলে মাডস্লাইড শুরু হয়, আর শীতে তুষারধ্বস তো আছেই। তবু সব বাধা অতিক্রম করেও মানুষ ঠিক পথ কেটে নেয়, ট্রেন যায়, ট্রেন আসে টানেল ধরে পাতা লাইন বেয়ে। টানেলের গল্প এখানেই শেষ করবো, যদি আরো জানার ইচ্ছে হয়, গুগলজ্যেঠুকে শুধালেই পাতাকে পাতা ইনফো পেয়ে যাবেন এই জোড়া টানেলের ব্যাপারে। জেট থেকে রকেটের গতিতে উত্তরিত হোক জীবন, চাই কি আলোর গতিতেই চলুক না, তবু ট্রেন ব্যাপারটা আদ্যন্ত রোম্যান্টিক হয়েই থেকে যাবে বলে আমার মনে হয়। কু-উ-উ-উ-উ-উ ঝিকঝিক করতে করতে ট্রেনটা টানেলে ঢুকে আবার বেরিয়ে চলে গেল পাহাড়ের অন্য পারে। যেতে যেতে প্রতিধ্বনি ফেলে গেল পিছনে পাহাড়ের দেওয়ালে দেওয়ালে। অজস্র স্বপ্ন ভিড় করে এল দুই চোখ ভরে আমার। সেই স্বপ্ন মেখে আবার রওনা দিলাম। ইয়োহো ন্যাশন্যাল পার্ক বলতে বেশির ভাগ দর্শনার্থীই এমারেল্ড লেক, ওয়াপ্টা ফলস বা বার্জেস শেল ফসিল বেড বোঝেন। কোনটাই ফেলনা নয়, কিন্তু ইয়োহো ভ্যালির সৌন্দর্য বা গরিমা কোন বর্ণনার অতীত। সাধারণত ক্যাম্পিং বা ব্যাকপ্যাকিঙের জন্যই লোকে ইয়োহো ভ্যালিতে হানা দেয়। চটজলদি ভেকেশনারদের ভিড় তাই বিশেষ নেই এই পথে। ভীষণ খাড়াই পাহাড়ি পথ ধরে একটার পর একটা switch back (hairpin bend) road বেয়ে আমরা এবার উঠে যেতে থাকি আমাদের Yoho Valley-র গন্তব্যে। এই সুইচ ব্যাকগুলোতে শুধু গাড়িটাই উঠতে পারে, গাড়ির লেজে বেঁধে ট্রেইলর নিয়ে যাওয়া যায় না, একচুল এদিক থেকে ওদিক হলেই পাশের খাদে ঠিকানা লেখা। শহুরে স্বাচ্ছন্দ্য বাদ দিয়ে একটি বেলাও বাস করা প্রায় অসম্ভব বলেই যাদের মনে হয়, আমরাও প্রায় সেই দলভুক্ত। কাজেই জঙ্গলে খোলা আকাশের নীচে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প করে ভালুক, হরিণ, ক্যিউগারের সাথে একটা রাতও কখনো ভাগ করে নেওয়া হয় নি। যতদূর অবধি গাড়ির চাকা গড়াতে পারে, দিনশেষে মোটামুটি চলনসই হোটেলের বিছানা একটা পাওয়া যায় গা এলিয়ে দিতে আর একটা পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, সেই পর্য্যন্তই অভিযান থমকে থেকেছে এতকাল। এই প্রথম জঙ্গল-পাহাড়ের এমন এক উপত্যকায় পৌঁছে গেলাম, যেখানে পথটা সত্যি সত্যি ফুরিয়ে গেল, কালো একটা সাপের মত আঁকাবাঁকা অ্যাসফল্টের রাস্তা শেষ হয়ে গেল একটা তকতকে পার্কিং লটে এসে। এর পরে যা কিছু সব পদব্রজে জঙ্গলের মাঝটি দিয়ে, পাহাড় ভেঙে। থাকার জন্য ক্যাম্পগ্রাউণ্ড রয়েছে গোটা চারেক, একটা লগকেবিন হস্টেল, আর আরো বেশ খানিকটা হাইক করে উপরে উঠে গেলে অ্যালপাইন ক্লাবের একটা ব্যাককানট্রি হাট। এই ভ্যালিতে সব থাকার ব্যবস্থাই সামার ওনলি। জুনমাসের মাঝামাঝি বা শেষ থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরু (ওয়েদার পারমিটিং), গ্রীষ্মের এই কটা দিনই খোলা থাকে ব্যকপ্যাকিঙের অতুলনীয় স্বর্গ, দুর্গম এই ভ্যালি। শীতের সময়ে নিত্য এভাল্যাঞ্চ থুড়ি তুষারধ্বস উপেক্ষা করেও কোন দুঃসাহসী যদি জমে যাওয়া ইয়োহো নদী বেয়ে স্কি করে উজিয়ে আসতে পারে তো বরফে ঢাকা এই গোটা ভ্যালি, পাহাড়্চূড়া, জঙ্গল, স-অ-অ-অ-ব একা তার। তণ্বী প্রপাতটির নাম Takakkaw falls... এটা বোধ হয় কানাডার সবচেয়ে উঁচু ফলসগুলোর একটা, প্রায় হাজার ফুট উঁচু থেকে উদ্দাম, উচ্ছ্বল কলহাসিতে মাতোয়ারা মরণপণ ঝাঁপ দিয়ে ঝরছে, সামার আর ফল-এর সমস্ত দিনরাত মুখর করে। দেখেই ছোটবেলার একটা ভুলে যাওয়া গান মনে পড়ে গেল..... "এখানে নেই কারো মুখে মুখোস কোন এখানে সবাই তো সহজ সরল, নেই তো মনে কারো গরল এসো-ও-ও, দূ-উ-রে কেন এসো পাশে, দূ-উ-রে কেন এসো পাশে, ঝর ঝর ঝরে ঝিলমিল ঝরনা, খিলখিল হাসি, ও খিলখিল হাসি...." Takakkaw.... শব্দটা আদতে ক্রী ভাষা থেকে এসেছে ('ক্রী' হল কানাডার সবচেয়ে বেশি কথিত বা প্রচলিত নেটিভ ভাষা) যার মানে হল magnificient ....... Yoho শব্দটাও ক্রী, মানে awesome, wonderful.... সার্থকনামা, কোন সন্দেহ নেই। পা ফেলা মাত্র সত্যি সত্যিই এই শব্দগুলোই মনে আসবে। Takakkaw falls-এর ঠিক পায়ের তলায় জঙ্গলের মধ্যে দুধারে ছড়ানো ক্যাম্পগ্রাউণ্ড, না বিজলিবাতি, না আছে কোন শহুরে আরামের আয়োজন। তবু কত মানুষ যে জঙ্গলের সঙ্গে সময় কাটাবার নেশায় তাঁবু খাটিয়েছে! পার ছুঁয়ে বয়ে চলেছে নিদারুণ খরস্রোতা হিমশীতল দুধসাদা ইয়োহো নদী। আক্ষরিক অর্থেই দুধের মত সাদা নদীটা, সুপারমিহি গ্লেসিয়াল পলির সাসপেনশন এত বেশি নদীর জলে। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় ইয়োহো গ্লেসিয়ার নীলচে সাদা স্তব্ধতায় থমকে রয়েছে। না তাঁবু খাটিয়ে থাকি নি আমরা, আমরা ছিলাম জঙ্গলের মধ্যে হস্টেলিং ইন্টারন্যাশন্যালের সেই লগ কেবিনে, বাহুল্যবর্জিত অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু ছিমছাম বন্দোবস্ত হাতে গোণা অল্প কয়েকজন লোকের জন্য, সারা দিন হাইকিঙের শেষে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে রাতের মত বিশ্রাম নেবার একটা ঠেক। এই প্রথম অনেক অপরিচিত মানুষের সাথে একসাথে থাকার অভিজ্ঞতা হল। নটা সাড়ে নটা নাগাদ সূর্যটা পাহাড়ের পিছনে চলে যেতেই সমস্ত ভ্যালিটা এক অদ্ভুত আলোয় ভরে গেল। এমন মায়াগোধুলি আগে দেখি নি কোনদিন। পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ঢেকে ফেলল গোটা উপত্যকা, রাত নামার বেশ খানিকটা আগেই। পাহাড়ের পিছন থেকে তখনও অস্তসূর্যের আভা ঠিকরাচ্ছে, চূড়াগুলোতে সব আগুন ধরে গেছে বলে মনে হতে থাকে। অন্ধকার হয়ে গেলে গ্যাসের বাতি জ্বালানো হল সব ঘরে, সামনের টানা বারান্দায়। রান্নাঘরে স্টোভও সেই গ্যাসেই জ্বলে, স্নানের জলও সেই গ্যাসেই গরম হয়। নো মাইক্রো-ওয়েভ, নো টিভি, নো নেট, নো ফোন। না, সেল থুড়ি মোবাইলও অকেজো, কোন সিগন্যাল নেই। শান্তি, অপার শান্তি, জলপ্রপাতের কলধ্বনি, আর আদিম, অকৃত্রিম জঙ্গলের একান্ত আপনার ভাষা। হিডেন লেক অবধি, খুব ছোট্ট করে একটা হাইকিংয়ে গিয়েছিলাম আমরা দুপুরবেলা পৌঁছেই, যাওয়া আসা মিলিয়ে ছয় কিলোমিটারের কিছু বেশি। মানুষের ভিড় কম, পশুপাখিই বেশি। হাইকিং ট্রেইলে পাশাপাশি দুজন হেঁটে যাওয়া যায় না, এত সঙ্কীর্ণ আর তেমনি খাড়াই। ঘোরতর জঙ্গল। সবুজ লেকটার পারে বন্যজন্তুদের পর্যাপ্ত পায়ের ছাপ, হ্যাঁ, এমনকি ভালুকেরও। বোঝা গেল, এই লেকের জল খুব প্রিয় তাদের সবার। হরেকরকমের কাঠবিড়ালিদের কথা বাদই দিলাম, সেই দিনেদুপুরে আমাদের পরোয়া না করেই হরিণ, এলক, মাউন্টেইন গোট, বিগহর্ণ ভেড়া দিব্যি পাশে পাশেই চরে বেড়ালো। একটা হেলানো গাছের গুঁড়ির ওপর বসে চানাচুর, ক্যাণ্ডি, কোলা দিয়ে উদযাপন করা হল। ইয়োহো গ্লেসিয়ার অবধি আর যাওয়া হবে না এই যাত্রা, কারণ সেটা গোটা একটা দিনের মামলা। আমরা তো দিন অর্ধেক খচ্চা করেই এসে পৌঁছেছি। কাজেই রয়ে সয়ে লেকটাকে প্রদক্ষিণ করে আবার ফেরার পথ ধরা। সেই প্রদক্ষিণের পথে আমি আমার রিচ্যুয়াল সেরে ফেলি গাছের গায়ে প্রিয়নামটি লিখে ফেলে একফাঁকে। হাঁসফাঁস করতে করতে পাহাড়ে চড়াটা অবতরণের চেয়ে সহজ বলেই আমার মনে হয় সবসময়। এত খাড়াই বেয়ে নামা ভারি কঠিন কাজ। আর আগের রাতের বৃষ্টিতে সমস্ত পথটাই পিছল, জায়গায় জায়গায় দিব্যি ক্ষীণকটি ক্ষণিকের ঝোরা বয়ে চলেছে পথের মধ্যে দিয়ে। আমার গাণুশের জন্য তেমন কিছু অন্তরায় নয়, সে তিড়িং তিড়িং করে লাফাতে লাফাতে অবলীলায় নেমে যেতে থাকে, কিন্তু আমার মত ভাঙাচোরা মানুষের জন্য সে বড় সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকবার পদস্খলন হল। আছাড় খেতে খেতে আমি যত না ভয় পাই, আমার মালিক তার চেয়ে দ্বিগুণ ত্রস্ত। এই বৃদ্ধ বয়সে এমন একটি নোকরানি বেঘোরে হারালে কি মনোমত আর একটি খুঁজে পাওয়া যাবে? কিন্তু সখা কোথায় পাই এই ঘোর অরণ্যে যে হাত ধরে নিয়ে যাবে আমায়? অগত্যা আমার গাণুশই ত্রাতার ভূমিকায় আমার হাত ধরে নামতে সাহায্য করে। হস্টেলে পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় ছ'টা বেজে গেল। স্নান সেরে কম্যিউন্যাল রান্নাঘরে সাপার বানালাম অন্য বোর্ডারদের সাথে স্টোভ শেয়ার করে, গল্প করতে করতে, চিকেন ন্যুডল স্যুপ আর সসেজ ভাজা। শেষ পাতে চীসকেক। বাইরে উঠোনে পাতা কাঠের টেবিল চেয়ারে বসে সাপার। ওয়াইন দিয়ে আচমন, স্কচ দিয়ে মুখশুদ্ধি, আমার গাণুশের জন্য ওর পছন্দের বিয়ার। জঙ্গলের মধ্যে বসে খাবার স্বাদই কুছ অলগ হ্যায়, সে যত সামান্য খাবারই হোক না কেন। ডিসপোসেবল প্লেট, গ্লাস, কাটলারি নিয়ে গিয়েছিলাম। খেয়ে উঠে বাসন ধুতে আমার বিস্তর অ্যালার্জি.... আজ এতগুলো বছর পরেও। গার্বেজ ডিসপোস করে স্কচের গ্লাস রিফিল করে গ্লেসিয়ারের দিকে মুখ করে আরাম করে এলিয়ে বসলাম, ডানদিকে রইলো পাগলির মত খিলখিল করে হাসতে থাকা টাকাক্ক ফলস। প্রাকসন্ধ্যের আলো আঁধারিতে একটা ক্যিউগার দেখা করতে এল। হেলো, হাই, এমনকি একটা মিনি ফোটোসেশনও হল। একটা সজারুও এল। কিন্তু ক্যিউগারটার মত অমন স্পোর্টসম্যানশিপ থুড়ি স্পোর্টসক্যিউগারশিপ তার নেই কো মোটেই, আমাদের দেখেই এক ছুট্টে পালিয়ে গেল। ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘিরে এল। এল জোনাকিরা। শুরু হল ঝিঙুরের মেহফিল। হুল্লাট একটা ক্যাম্পফায়ার জ্বেলে দিল হস্টেলের কেয়ারটেকার। আমরা কয়েকজন গিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসলাম। কোমরে বাঁধা হাল্কা জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে নিলাম, হুডটা মাথায় তুলে দিলাম। সূর্য ডুবতেই হিম পড়তে শুরু করেছে। মোট চারটে গ্রুপ আগুন ঘিরে আমাদের বাদ দিয়ে। কেয়ারটেকার আর তার বান্ধবী, আর একটা কাপল লোক্যাল। জনাপাঁচেকের দল স্টেটস থেকে, আর সবচেয়ে বড় দলটা ইউরোপ থেকে, মূলত ফ্র্যান্স, তিনজন বেলজিয়ামের আর একজন বোধ হয় জার্মানি থেকে এসেছে। বেশির ভাগই তরুণ তুর্কি। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে গল্প জমে উঠল। মারশমেলো আগুনে সেঁকে খাওয়া হল সবাই মিলে। মাথার উপর তারায় বোনা অমানিশার তীব্র কালো আকাশের চাঁদোয়া, পিঠে বাতাসের হিমেল স্পর্শ, পায়ের কাছে প্রথম প্রেমের মত উষ্ণ আগুন, সে এক সুররিয়্যাল রাত। সেই তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে, আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে আনমনা হয়ে যেতে থাকে মন, নিরুচ্চারে বার বার বলতে থাকি, "ভালোবাসি ভালোবাসি"। ফরাসী একটি মেয়ে গান গাইতে শুরু করলো। আমার ফ্রেঞ্চ হিন্দির চেয়েও করুণ। কথা কিছু বুঝলাম, বেশিটাই বুঝলাম না। কিন্তু সুরটা মন ছুঁয়ে গেল। এর পরে সেই কেয়ারটেকার ছেলেটি আর তার বান্ধবী, মেয়েটাই গাইছিল, ছেলেটাও মাঝে মাঝে গলা মেলাচ্ছিল। আমার খুব প্রিয় গানটা, তাই আমিও গুণগুণ করি সাথে সাথে...... The embers of a fire still burning as they die Stay bright to keep us side by side Baby, there's no better time No better time, baby, we can't find Oh-whoa-whoa, oh-whoa-whoa With eternal love, the stars above All there is and ever was I want it all, I want it all I want it all, I want it all A blade of grass, a grain of sand The moonlit sea, to hold your hand I want it all, I want it all I want it all, I want it all..... ব্যাকগ্রাউণ্ডে ফলসের কলকল মিউসিক, শণশণ হাওয়া আর গাছেদের ফিসফিস সঙ্গত, সবাই মিলে কোরাসে গলা মেলায়, বার বার ফিরে ফিরে একটাই লাইন I want it all, I want it all.... মনে হচ্ছিল যেন জঙ্গলের গাছগুলোও সেই একই গান গাইছে ফিসফিসিয়ে, I want it all, I want it all.... দেখতে দেখতে বারোটা বেজে গেল। সকলে সমস্বরে হ্যাপি বার্থডে গেয়ে উঠল, একইসাথে ইংরেজি আর ফ্রেঞ্চে। আমিও গলা মেলালাম। ওদের দলের একটি মেয়ের ২৫ বছর হল এই রাতে। মুখে অনেক শুভেচ্ছা জানালাম, জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘষে আদরও করলাম নিয়মমাফিক, কিন্তু মনে মনে অনেক ঈর্ষা দিলাম মেয়েটাকে, আমার যে পঁচিশ, আরো যত অভাগিনীর যত পঁচিশ ভেসে গেছে বা যাবে পচা পানাপুকুরে, তাদের তরফ থেকে। আগুন নিভিয়ে বিছানায় যাবার সময় হল। আমার জেন্টলম্যান বাবি সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে চলে গেল। সোজাসুজি বারান্দার পানে না গিয়ে আমি একটু ঘুরপথে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে রওনা দিই। মিত্তিরমশাই না পারেন ফেলতে, না পারেন গিলতে। শেষে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আর মধুবচন শোনাতে শোনাতে সেই পিছনে পিছনেই এলেন পৈতৃক প্রাণের মায়া ত্যাগ করে। বললাম, "একটু ফলসটার কাছ থেকে ঘুরে আসি, চলো না".... উত্তর কি হবে জানাই ছিল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে ওনার পিছু পিছু বাধ্য মেয়ের মত ঘরে গিয়ে দোর দিই। কেন যে মানুষ অকারণে এত ভয় পায় জঙ্গলকে! মানুষের থেকে ভয়ঙ্কর কোন জীব বিধাতা আজও গড়তে পেরেছেন কি? পরের দিনের সকাল তো বিদায়ী সকাল, মনখারাপের সকাল। পাহড়, জঙ্গল ছেড়ে ফিরে আসতে আদ্যন্ত জংলী আমার একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু তবু ফিরতে হয়। ব্রেকফাস্ট সেরে সব গুছিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিই। বাড়তি যা কিছু শুকনো খাবার সাথে ছিল, সব কাপবার্ডে রেখে দিলাম। এই ফেসিলিটি শুধুই গ্রীষ্মের অভিযাত্রীদের জন্য। কিন্তু এই রান্নাঘরটাতে কোন তালাচাবির ব্যবস্থা নেই। রান্নাঘরে যে কারো অ্যাকসেস সারা বছর যে কোন সময়ে। এক কাপ গরম জল কি দু'তিন প্যাকেট শুকনো স্ফ্যাগেটি বা ন্যুডলস, টিনের টুনা, সার্ডিন, হ্যাম, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, কফি, চাই কি খানকতক টি-ব্যাগ সারা বছরই মিলবে যে কোন সময়ে। যদি কেউ নিদারুণ অসময়ে এসে পড়ে সেইজন্য এইটুকু অতিথিসেবার ব্যবস্থা। পার্কিং লটে পৌঁছে দেখি, গাড়ির ডানদিকের পেছনের চাকা বসে গেছে। ভাগ্যি গাণুশ ছিল সেদিন সাথে। নাহলে যে কি হত ...... মিনিট পনেরোর মধ্যেই ফেঁসে যাওয়া চাকা পাল্টে স্পেয়ার লাগিয়ে ফেলল ও। জিনিষপত্র সব লোড করে ফলসের দিকে হাঁটা দিলাম কারো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই। দশ মিনিটের ছুটি মঞ্জুর হল যাবতীয় পাগলামি মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। এক ছুট্টে একদম তার পায়ের কাছটিতে গিয়ে দাঁড়াই। আর সব প্রপাতের মতই তুমুল অবতরণের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে ছিটকে আসা জলের ছিটে আর বাষ্পের সম্মিলিত সমাহারে ভালোমত স্নান হয়ে যাবার যোগাড়। ভিজতে আমার চিরকালই ভালো লাগে। তাই থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভিজি কয়েক মুহূর্ত, মনে মনে চোখ বন্ধ করে কারো বুকে মাথা রাখলাম কি অজস্র চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করেই? তারপর আরো দুই পা এগিয়ে যাই, বিশাল এক শতাব্দীপ্রাচীন স্প্রুস গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে আমি এক পাগলি আর এক পাগলির একদম মুখোমুখি চুপ করে দাঁড়াই। তারপর জিন্সের পকেট থেকে আমার ছোট্ট ছুরিটা বার করি। খুব যত্ন করে খোদাই করি আমার প্রিয়নাম গাছটার পুরু বাকল খোদাই করে। খুব মৃদু স্বরে বলি, "মনে রেখো".... মানুষের দরবারে আমার যে দাবি কোনদিন কখনো নেই, জঙ্গলের কাছে কেন যে সেটাই চেয়ে মরি প্রতিবার, জানি না। তারপর ফেরার পথ ধরি, একটিবারও পিছু না ফিরে.....

120

3

সিনথিয়া আফরিন

<img class="emojione" alt="👥" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F465.png?v=1.2.4"/>

96

0

"Gems the ঢপবাজ"

আজকের আপডেট

পার্ট ২/২| এই দোকানী নিজে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় নির্জন মরুভূমিসম স্থানে খনন করিতেন‚ মূল্যবান gemstone এর খোঁজে বিশেষত: ওপাল| ওপালের বাঙ্গালা কি তাহা জানি না তবে বড়ই সুন্দর‚ নীল‚ সাদা বিভিন্ন রঙের ঝিলিক মারে| কিছু কিছু আবার সবুজায়িত শ্লেষ্মার ন্যায় দেখিতে| জেম-প্রসপেক্টিং অতীব কষ্টদায়ক ও আনন্দদায়্কও বটে| সংক্ষেপে সারি| এবারে দোকানীর সনে যাইবার প্রয়োজন দুই| গৃহিনীকে কে যেন বলিয়াছেন‚ পান্না ধারণ করিলে সংসার সুখের হইবে‚ অগাধ ধনরত্নের অধিকারী হইবো‚ কোলেস্টেরল কমিবে এবং পা ঘামিবে না! অনেক কষ্টে পান্নার ইংরাজী খুঁজিয়া পাইয়াছি| পিটার অর্থাৎ দোকানী একটি শস্তা পান্নার কুচি খুঁজিয়া দিয়াছেন| নম্বর দুই| রাধানগর বীচে তোয়ালে পরিহিত স্বয়ং আমি যখন ভ্রমণ করিতেছিলাম| কিঁউ তোয়ালে? একটি মাত্র হাফ পেন্টলুন লইয়া মূল দ্বীপ পোর্ট ব্লেয়ার থিকা হ্যাভলকে| কাছের সমুদ্রে ভিজিতং এবং শীতের রোদে নো ড্রাই| সঙ্গী সাথী সমভিব্যহারে গাড়ীতে তোয়ালে পরিহিত অবস্থায় ভ্রমণ| হু কেয়ারস! যবতক হ্যায় ক্রেডিট কার্ড‚ তবতক নো প্রবলেম| এমতবস্থায় বীচে ঘুরিবার সময় একটি লকেট খুঁজিয়া পাই| উহা কি এতবধি সন্দেহ ছিল‚ তবে ইহা কাচ নয় তাহা আন্দাজ করিতে পারি| পিটার বলিল‚ ইয়া মুনস্টোন| বাঙ্গালায় কি বলে? জোতিষীকে জিগাইতে হবে‚ ইহাধারণ করিলে আমার প্রাত:কৃত্য সুসম্পন্ন করিতে সুবিধা হইবে কি না| ডি: এযাবৎ এই দেবকান্তি অঙ্গে কুনো প্রকার অলঙ্কার মায় বিবাহের অঙ্গুঠী ধারণ করি নাই‚ ঠাকুরের ন্যায় গা চিড়বিড়াইয়া উঠে| আভি এই emerald কা কেয়া হোগা| পূর্বে গ্রামাঞ্চলে ধীবর সম্প্রদায়ের নাদান বাচ্চাদের কোমরে ঘুনসি দিয়া ফুটা পয়সা বাঁধা থাকিত‚ সেইরূপ কোন উপায়? (১৯)

2199

155

মনোজ ভট্টাচার্য

এও এক একাকীত্ব !

এও এক একাকীত্ব ! আমার স্বামী কাজ থেকে এখনও ফিরল না কেন ? এত রাত হয়ে গেল ! – হাসিদির কথা শুনে প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে – এ ওর মুখের দিকে তাকায় । খানিক বাদেই আবার বললেন – ও, সে তো অনেকদিন হোল মারা গেছে – আসবে কি করে ! হিরুবাবু সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন । পড়ানো ছাড়া ওনার বেশ কতগুলো বাংলা ভাষার ওপর বই বাজারে প্রকাশ পেয়েছে । সেগুলো অধ্যাপক মহলে খুব আলোচ্য হয়েছে ! – তাছাড়া আশী ও নব্বইয়ের দশকের বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত ছোটগল্পের ওপর একটা সঙ্কলনও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল ! ওনার বত্রিশ পাতার সম্পাদকিয় লেখাটাও খুব ভালো হয়েছিল ! সেই হিরুবাবু কলেজ থেকে অবসর নিতে প্রায় বাধ্য হন । তার মাথার একটু গণ্ডগোল দেখা দিতে থাকল । মাথার গণ্ডগোল মানে যে পাগলামি তা নয় কিন্তু । স্নায়বিক দুর্বলতার জন্যে নানারকম সমস্যা দেখা দিতে থাকল । ক্রমশ ওনার একটা ধারনা হয়ে গেল – গাড়িগুলো যেন ওনাকে চাপা দিতে আসছে । প্রথমে ট্যাক্সিতে যাতায়াত করতেন কলেজে যেতে । ক্রমশ রাস্তায় বেরতেই ভয় পেতে লাগলেন । শেষপর্যন্ত রাস্তায় বেরনো বন্ধই করে দিলেন ! - তাই কমপ্লেক্সের মধ্যে পরিচারকের হাত ধরে একেবারে ধার ঘেঁসে চলা ফেরা করতেন ! তখন আমি বিদেশ থেকে প্রায়ই যাতায়াত করতাম ! আমার সঙ্গে খুব আলাপ হয়ে গেল । ওনার ফ্ল্যাটে বসে আমাদের খুব আলোচনা হতো । মজার কথা আমি নান্দিকার ও কয়েকটা নাট্য গোষ্ঠীর যাদের চিনতাম – তাদের সঙ্গে ওনারও আলাপ ছিল । এমন কি যাকে আমি চিত্তদা বলতাম – সেই চিত্তরঞ্জন ঘোষের সঙ্গে ওনারও আলাপ ছিল ! উনি যে সাহিত্য গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন – তাদের অনেকের সঙ্গে আমারও অল্প বিস্তর পরিচয় ছিল ! সেইসব আলোচনা খুব পরিস্কার ভাবেই হতো । গলায় কোন জড়তা ছিল না ! হিরুবাবুর সঙ্গে কথা হয়ে গেছিল – একদিন গাড়ি ভাড়া করে কলকাতায় কোথাও কোথাও ঘুরবো । - কিন্তু যেদিনই বলতাম – উনি বলতেন – আজ না ! আরেক দিন যাবো ! অর্থাৎ তার সেই স্নায়বিক দুর্বলতা কাটাতে পারছিলেন না ! তার পরের বছর – আমরা কলকাতায় এসে দেখলাম উনি খুবই অসুস্থ । শেষ পর্যন্ত – মারাই গেলেন ! – ওনার নিজস্ব কোন ছবি ছিল না বলে – আমার ফোনের কামেরায় তোলা ছবি এনলারজ করে শেষকৃত্যে ববহার করা হোল ! এসব চার বছর আগের কথা । তারপর হাসিদি আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছেন বা আমরাও ওনার ফ্ল্যাটে গেছি ! দিব্যি কথাবার্তা ! কখনও অস্বাভাবিক মনে হয় নি তার ব্যবহার ! কিছুদিন পরে শুনলাম হাসিদি দুজন আয়া রেখেছেন দিনে-রাতে । প্রতিদিন ওদের আলাদা করে বাজার করতে দেন – যাতে কেউ না অসন্তুষ্ট হয় ! – আমরা ভাবলাম – দারুন বুদ্ধিমতী তো ! দুজন আয়াকেই খুশি করছেন ! – কথায় বলে লোভের হাত লম্বা হয় ! শুনলাম – হিরুবাবুর অনেক বই ছিল নানারকমের – সেগুলো নাকি চুরি হচ্ছে ! আবার হাসিদি কার কাছে অভিযোগ করেছে – ওনার গয়নাও সরে যাচ্ছে । ক্রমশ একতলার প্রতিবেশীরা অভিযোগ করা শুরু করল – ওদের কাছে গিয়ে হাসিদি অভিযোগ করে – আয়ারা চুরি করছে । আবার আয়ারাও অভিযোগ করে – হাসিদি নাকি তাদের চোর বলে । প্রায় রোজই চেঁচামেচি হয় ! আমি ও আমার স্ত্রী মাঝে মাঝেই ওনাকে দেখতে যাই । ওনার ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক ছিল তখনো । এরপর একদিন আমাকে বোঝাতে লাগলেন – উনি যে ঘরে থাকেন – সেই ঘরে নাকি কোন নকশাল ছেলেকে ছুরি দিয়ে মারা হয়েছে ! যতই বলি – এখানে কোন ফ্ল্যাট ছিল না – একটা কাগজ কল ছিল । ততই উনি বোঝাতে থাকেন – ঠিক কিভাবে ছেলেটিকে মারা হয়েছিল ! শ্যামবাজারে উনি যেখানে থাকতেন – সেখানে বেশ নকশাল ছেলেদের কংশালরা মেরেছিল । –অথচ শ্যামবাজারের বাড়িতে সুনীলবাবু শক্তিবাবুরা এসে কিভাবে ঘর নোংরা করে দিত । বিশেষ করে শক্তিবাবু ! শ্যামবাজারের কথা সঠিক ভাবে মনে করতে পারেন। হাসিদিকে একবার বলেছিলাম কাছের বৃদ্ধাবাসে থাকতে চান কিনা । তাতে উনি প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী বৃদ্ধাবাসের ওপর অশ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন । - আমরা কিন্তু বুঝতে পারছিলাম – ওনার কাছে কোন আয়াই কাজ করতে চায় না ! – হাসিদির এক ভাইয়ের সাথে আমার আলাপ হয়ে গেছিলো । কত করে তার ফোন নাম্বার চেয়েছি । কিন্তু পাই নি। একদিন রাতে ফেরার সময়ে দেখি হাসিদি – হাতে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে সিকিউরিটির কাছে বলছে – একটু মুড়ি এনে দিতে । বাড়িতে খাবার কিছু নেই । শুনে খুবই খারাপ লাগে ! আপনার আয়া কোথায় ? ও তো মোড়ের মাথায় গেছে মেলা দেখতে ! আপনাকে বলে গেছে ? না । ওরা তো বলে যায় না । - আমি তো জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম ! সে কী ! আপনি জানলা দিয়ে অত দূরে দেখতে পেলেন ? হ্যাঁ – এখান থেকে দেখা যায় তো ! - আপনি বিশ্বাস করেন না ! আপনার ভাইরা কোথায় থাকে ? আমার সঙ্গে দেখা করে না কেন ? ওরা তো ছাদের ঘরে থাকে – নম্বর জানি না ! অসংলগ্ন কথাবার্তা সবাই বুঝতে পারছে – অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে । অথচ ওনার এক আত্মিয় নাকি এই কমপ্লেক্সেই থাকে । এখানে এলে কারুর সঙ্গে কোন কথাই বলেনা ! – আর আমি তো বুঝতেই পারিনা – কখন আসে ! ওপর থেকে আমার স্ত্রী এক বাটি মুড়ি আর মিষ্টি দিল – তাই দিয়ে এলাম ! কি জানি সত্যি রাতে কিছু খাবার ছিল কিনা ! পরের দিন – হঠাৎ সন্ধে বেলায় লিফটে উঠে এসে আমাদের ঘরের বেল টিপেছে । আমি দরজা খুলতে – বলে – আপনি বলেছিলেন আমার আয়াকে বলবেন ! এখন ও এসে আমাকে কি অপমান করছে । খুব চেঁচামেচি করছে – বলেছে আমার হার খুলে দিতে । কেন ? – আপনার কাছে টাকা পায় ? বোধয় পায় ! এখনো তো মাস শেষ হয় নি ! – আমার কাছে তো টাকা নেই এখন ! আপনি আসবেন একবার ? ওর সঙ্গে একটু কথা বলবেন ? আপনার কথা শুনবে ! আমি তাড়াতাড়ি ওনাকে নিয়ে লিফটে করে একতলায় এসে দেখি । ওনার ফ্ল্যাট খোলা । কিন্তু কেউ নেই । ভেতরেও কেউ নেই ! বললাম – কই – কোথায় আপনার আয়া ? ভেতরে নেই ? তাহলে আপনার ভয়ে পালিয়ে গেছে ! – আবার আসবে কাল ! এলেই আপনি আমাকে বা যাকে হোক ডাকবেন ! – আর গেট বন্ধ করে রাখবেন ! কদিন পরে শুনলাম হাসিদি নাকি খাটের কাছে পড়ে গিয়ে মাথায় কেটে গেছে - ফুলে গেছে – ডাক্তার বলেছে সিটিস্ক্যান করতে । গিয়ে দেখি – এসব সত্যি । পরিচারিকার ওপর রাগ করে মুড়ির কৌটো ছুড়েছেন । আর সেই সময়েই জলের গেলাশ পড়ে ভেঙ্গেছে । - দেখে খারাপ লাগলো । ওনাকে বলে এলাম – ওনার একজন ভাইজি নাকি আসে –দেখতে ও পরিচারিকাকে নির্দেশ দিয়ে যায় । এবার এলেই যেন আমাদের সঙ্গে দেখা করে । কিন্তু সে যে কখন আসে – আমরা টেরই পাই না ! অন্তত তার সঙ্গে কথা বলেও তো কিছু করা যায় ! – এভাবে অসহায় অবস্থায় – যে কোনোদিন কিছু হয়ে যেতে পারে ! মনোজ

149

6

শিবাংশু

কী ঘর বানাইব আমি

আমি ভারতবর্ষের মূল ভূখন্ডের বাইরে কখনও থাকিনি। আবার কলকাতা শহরেও বসবাস করার কোনও অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে আমি যেখানেই থাকিনা কেন, আমি একজন মূল স্রোতের ভারতীয় এবং শতকরা দুশো ভাগ বাঙালি। এই সত্ত্বাটিই আমাকে অন্য দেশবাসীর অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম করে। ---------------------- যে কোনো আলোচনার দুটি সমান্তরাল সমীকরণ থাকে। একটি আবেগসম্পৃক্ত আর অপরটি নিরাবেগ। আমাদের যাবতীয় জৈবিক বা আত্মিক সিদ্ধান্তগুলি আমরা এই দুটি পরিপ্রেক্ষিত থেকেই গ্রহণ করি। ------------------------- আবেগগ্রস্ত একটি অতিশয়োক্তি, যেমন, ' দেশের কুকুর ধরি, ফেলে বিদেশী ঠাকুর' আবার অপরপক্ষে ক্যাথেরিন মেয়োর চশমা পরে ভারতকে দেখা, যাকে গান্ধি বলেছিলেন 'Drain Inspector's Report', দুটো ই সমানভাবে ত্যজ্য। ------------------------------- আমার পিতৃকূলের পূর্বপুরুষ মোকাম কলকাতা থেকে পাশ দিয়ে ভারতের প্রথম শিল্পশহরে জীবিকাসন্ধানে এসেছিলেন। আবার মাতৃকূলের পূর্বসূরি তৎকালের সুদূর মাদারিপুর, ফরিদপুর থেকে এসে একই শহরে উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের যা শিক্ষাদীক্ষা ছিলো তাতে তাঁরা অনায়াসেই কলকাতা বা ঢাকায় সম্মানসূচক বৃত্তি গ্রহণ করে থাকতে পারতেন। কিন্তু প্রায় একশো বছর আগে তাঁরা যেহেতু সেকালের হিসেবে সুদূর 'প্রবাসে' এসেছিলেন, তাই তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম ভারতবর্ষকে অনেক বেশি সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে চিনতে পেরেছে। তবে 'বাড়ির' টান তাঁদের মধ্যে এতো প্রবল ছিলো যে তাঁরা চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ' বেহারে আর থাকবো না', এমত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের 'চোদ্দ পুরুষের ভিটে'তে প্রচুর অর্থব্যয় করে বিশাল অট্টালিকা ও ভূসম্পত্তি ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। এপার বাংলায় আমাদের যে বিপুল ভদ্রাসন ছিলো, সেখানে বসবাস করার মানুষ না থাকার জন্য তা এখন আর আমাদের নেই। আবার ওপার বাংলায় তাঁদের অর্জিত যেসব ভূসম্পত্তি ছিলো, একটি সুন্দর সকালে তা সব বেহাত হয়ে যাবার শোকে সন্ন্যাসরোগে আমার মাতামহ অকালে কালগতি প্রাপ্ত হন। -------------------------------- আমাদের অনেকেরই ইতিহাস প্রায় একরকম। মানুষের শিকড়টা যে কোথায়, সেটা খুঁজতে খুঁজতেই তো আমাদের খোঁজাটা ফুরিয়ে যায়। -------------------------------------- কলকাতা তো একটা ভুঁইফোড় জায়গা। একশো বছর আগেও কোনও কলকাতার নাগরিককে 'বাড়ি কোথায়' প্রশ্ন করলে উত্তর আসতো বাঁকুড়া বা বরিশাল। কলকাতাকে 'বাড়ি' হিসেবে সাবর্ণ রায়চৌধুরি বা বৈষ্ণব চরণ শেঠের বংশধর জাতীয় লোকজন ছাড়া আর কেউ স্বীকার করতো না। এভাবেই নিজের 'বাড়ি' আমার কাছে একটা এনিগমা হয়ে থেকে গেছে। --------------------------- কৌটীল্য বলেছিলেন 'অপ্রবাসী' ও অঋণী' মানুষই সুখী। এই 'প্রবাস' একটি আবেগমাত্রিক অনুভূতি আর 'ঋণ' হলো নিরাবেগ হিসেবনিকেশ। 'প্রবাস' একটি শারীরিক অবস্থানজনিত মানসিক অপূর্ণতার অনুভূতি। যখন মানুষের জন্ম বা সামাজিক পরিচয়, তার আত্মমর্যাদা বা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যকে মর্যাদা দেয়না, তখনই সে প্রবাসী। 'ঋণ' একটি ঐহিক অপূর্ণতা, যেখানে তার ভৌত সুখস্বাচ্ছন্দ্য ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা বা অবকাশ থাকে। আমাদের শারীর বা মানসিক বেঁচে থাকায় উভয়েরই অন্তহীন প্রভাব আছে। কোনটিকেই অস্বীকার করার প্রচেষ্টা মূর্খতা মাত্র। ------------------------------------ নিজস্ব অভিজ্ঞতাপ্রসূত আমার একটা তত্ত্ব আছে। যতোদিন কর্মজীবনে মানুষ ওতোপ্রোত থাকে ততোদিন তার মনে 'শিকড়' বা 'অবস্থান' নিয়ে প্রশ্নগুলি তেমন প্রবল থাকেনা। কিন্তু তার পরে যখন তার সত্যিই একলা হবার সময়, তখন এই সব প্রশ্নই অমোঘ হয়ে ওঠে। কিন্তু যেহেতু মানুষের বেঁচে থাকাটা চিণ্ময় জগতে, মৃণ্ময় জগতের মায়া কাটিয়ে ওঠাটাই শ্রেয়। মানুষ যতোক্ষণ বেঁচে আছে, মানুষের কাছেই আশ্রয় চায়, তার পর তো অনন্ত মাটিতে মিশে যাওয়া ছাড়া কোনও ব্যতিক্রম নেই। সেই মনের মানুষেরা যেখানে থাকবে সেটাই আমার সব পেয়েছির জগত। সেটা পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তেই হতে পারে। -------------------------- ছবির দোচালা বাড়িটি রাঢ়বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক-দেড়শো বছর আগে আমাদের ভদ্রাসন ছিল। আমার পিতামহ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গত শতকের প্রথম দশকে কলকাতা চলে যান। সেখান থেকে চাকরি নিয়ে প্রথমে উত্তরভারতে, তার পর জামশেদপুর। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে শিকড় ছিল বহুদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমার ভয়ে আমার পিতৃদেবের বাল্যকালে কিছু সময় এই বাড়িতে কেটেছিল। তার পর তিনি আর আসেননি। খুব বিচিত্রভাবে সম্প্রতি আমরা দু ভাই এবং আমার ছোটকাকা রীতিমতো স্বর্ণসন্ধানীদের মতো অভিযান করে এই বাড়িটি 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' করেছি। সে গল্পও লেখার মতো। ইতিহাস, ভূগোল, সমাজতত্ত্ব, স্মৃতিকথা আর অন্তঃস্রোত যাপনের ইতিকথা। শিকড়ের সন্ধানে মানুষের অনিঃশেষ আকুলতা যেন। যেখানে আমাকে হাসপাতাল বা শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য মানুষকে ডেকে আনতে হবেনা, যেখানে তারা নিজেরাই অনাহূত, রবাহূত হয়ে এগিয়ে আসবে, সেটাই তো 'আমার সাড়ে তিন হাত ভূমি'। হাসনরাজার ঘর।

129

7

"Gems the ঢপবাজ"

Gems ফ্রম আড্ডাবিল

(১) বিষয়- Bigotry “একটা জাতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে "কালুয়া" "বাঁধাকপি" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন তখন তা রেসিস্ট বিহেভিয়র ই হয় । এমন শব্দ ব্যবহার করার পিছনে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান দেওয়া দুরের কথা -মানুষ এর প্রতি বিদ্বেষ ই পোষণ করা হয় । “ --- “যাইহক দেখেশুনে এক বাঁধাকপির ( সর্দারজী ) দ্বারস্থ হলাম আমরা ।“ “ছো: - কে যাবে তেতুলদের আড্ডায়? “ --- “আমার মতে কোনো মানুষকে জাতি‚ ধর্ম এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে ফেলে তার চরিত্র বিচার করা অত্যন্ত অসহনুভূতিশীল কাজ|”” “লাখ কথার এক কথা । আরো অনেক অনেক লাইক দিতে পারলে তাই দিতাম ।“ --- “নাক চ্যাপ্টা‚ চোখ সরু‚ পীতবন্নো‚ মানুষের মত দেখতে‚ মানে দুটো হাত‚ দুটো পা| সি-কারান্ত‚ C- দিয়ে শুরু------ এর জন্য মানেবই যদি লাগে‚ বলতে হবে‚ তুই খুব লাকি যে এই ভয়ানক জীবগুলোর সঙ্গে তোকে কোথাও কখনো ডিল করতে হয় নি| কিপ ইট দ্যাট ওয়ে………..-“ --- “ওহ - বুঝেছি এইবার| আরে কি বলছ” --- “আমার একটাই জিজ্ঞাস্য - নিউ জার্সী প্রভৃতি জায়গায় কি বিহারী বা উত্তর প্রদেশের ঐ অসভ্য লোকগুলো পৌছেছে ! - পশ্চিম বঙ্গে যেরকমভাবে ভিন প্রদেশের অসভ্য মানুষের আগমন‚ ও অসংস্কৃত আচরন … ================================================" (২) বিষয়- দেশকর্তব্য ABP অমর্ত্য সেন| এদেশের হাল হকিকত, ভালমন্দ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এ দেশে এসে চব্বিশ ঘণ্টা অষ্টপ্রহর বসবাস করতে হবে। নব্য ভারতের নতুন ফরমান পেয়েছেন বস্টন নিবাসী ভারতচিন্তায় মগ্ন সেন মহাশয়। ………………………… তিনি নিয়মিত ছুটে যান গ্রাম-ভারতে। সম্যক বোঝার চেষ্টা করেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনের হালহকিকত, প্রতিনিয়ত আলাপ আলোচনা করেন সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষাবিদ, সবার সঙ্গে। মহাসাগরপ্রমেয় জ্ঞানের সঙ্গে প্রখর অন্তর্দৃষ্টি মিলিয়ে লেখেন, কথা বলেন, এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন। ……………………………………. অমর্ত্য সেনের এমনধারা আচরণ অনুচিত। অনুচিত, কারণ তিনি বিদেশে থাকেন! অর্থাৎ, জানা গেল, চিন্তার ভৌগোলিক গণ্ডি আছে, দর্শনেরও আছে কাঁটাতারের বেড়া! ………………….. Source: https://www.anandabazar.com/editorial/do-we-have-to-accept-this-stupid-intolerance-1.834584?ref=strydtl-state-topnav -------------------------------------------------------------------------------------- "এই রে দেশের প্রতি কোন কর্তব্য না করেই আপনি এমন লিখলেন যে? একেবারে একশো শতাংশ খাঁটি কথা । স্বাধীনতার পর থেকে আজ এই আবধি যেটুকু এগিয়েছে দেশ তা এ দেশের লোকেদের দ্বারাই সম্পাদিত হয়েছে । আমাদের এক এক জনের সমষ্টিই তো "দেশের লোক" সেখান থেকে আজ এই টেলিফোন জমানায় এসে পৌঁছনো গেছে‚ সে তো এমনি এমনি নয়| দেশের প্রতি সম্পাদিত কর্মের হাত ধরেই|" ---------------------------------------------------------------------------------- ডি: প্রফেসর সেনের পদরেণু যদি সমুদ্রের জলে মেশানো হয় তার এক বিন্দুরও যোগ্য নই|

131

1

চঞ্চল

পধারো মাহরো দেশ

(১৪) সুর্য অস্তাচলের দিকে| আর সময় নেই| রুকমণি তৈয়ারি হয়ে বেড়িয়ে পড়ে কিলার পিছনের টিলার উদ্দেশ্যে‚ হাতে একটা প্যাঁটরা আর একটা থলে| পালিওয়ালদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার খবর সলিমকে নিশ্চয় খবরীরা দেয় নি| কারণ ওরা জানতে পারেনি নিশ্চিত| তাহলে সলিম আজ এত সেজেগুজে বিয়ে করতে যেত না| তাও সাবধান হওয়া ভালো‚ যেমন করেই হোক বাপুসা আর ভাইকে নিয়ে আজই রাতের অন্ধকারে এই রাজ্য ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে হবে| সলিমকে সে খুব ভালো করে চেনে‚ সেই ছোট থেকে দেখছে| নিজের ঈপ্সিত জিনিস না পেলে যে সলিম কতখানি নৃশংস হতে পারে তা আর জানতে বাকি নেই তার| টিলার পাশে মেয়েটা একটা ছোট পুঁটলি বুকের কাছে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| মেয়েটাকে এই প্রথম দেখল রুকমণি| সত্যি সুন্দরী| মেয়েটার মুখে বিষাদের ছায়া দেখে রুকমণির কষ্ট হয়| কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটাকে আশ্বাস দেবার চেষ্টা করে ‚' কিছু ভাবিস না বহন‚ আমি তো আছি তোর সাথে| আমি বেঁচে থাকতে কেউ তোর বাল ভি বাঁকা নহি কর পায়েগা|' লিলা কোনদিন বাপুসা আর মাসাকে ছেড়ে একা কোথাও থাকেনি‚ রুকমণির আশ্বাস পেয়ে লিলার রুকমণিকে বড় কাছের মানুষ মনে হল | সেও আঁকড়ে ধরল রুকমণিকে| একটা উটের গাড়ি আগে থাকতেই তৈয়ার হয়ে অপেক্ষা করছিল| ওরা দুজনে উঠে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল গ্রামের দিকে| একটা চিন্তা রুকমণির মনকে নাড়া দিচ্ছে‚ ঐ শয়তানটা গ্রামে গিয়ে কাউকে না পেয়ে‚ না জানি কি উৎপাত করছে? গ্রামে তো বাপুসারা আর পন্ডিত ছাড়া কেউ নেই| কার ওপরেই বা অত্যাচার করবে? মনে মনে হঠাৎ বেশ একটা কৌতুক অনুভব করে সে| বাপুসারা তো সলিমের খবরী‚ তাই বাপুসাদের নিশ্চয় কিছু করবে না| রইল পন্ডিত‚ কিন্তু পন্ডিতজী যথেষ্ঠ বলিষ্ঠ মানুষ‚ সলিম তাকে বেশ ভয় করেই চলে| গাড়ি ছুটে চলেছে পাকা রাস্তা ধরে| আজ যেন নিজেকে হঠাৎ করেই বেশ স্বাধীন মনে হচ্ছে রুকমণির| অবশ্য হভেলীতেও সে স্বাধীনই ছিল| তবু কেন এমনটা মনে হচ্ছে? হয়ত মেয়্কাতে যখন মেয়েরা যায় এমনটাই সবারই মনে হয়| তারও যদি বিয়ে হয়ে যেত‚ তাহলে এই রক্ষাবন্ধনে সেও যেত ভাইকে রাখী বাঁধতে| আরে কালই তো রক্ষাবন্ধন ছিল| 'একবার রোকনা'‚ রুকমণি উটওয়ালাকে বলে গাড়ি থামিয়ে কাছেই কিছু খোলা দোকানের একটায় ঢুকে রাখি চাইল‚ 'ভাই এক রাখি দেনা?' 'রক্ষাবন্ধন তো কাল ছিল?'‚ দোকানী অবাক হয়েই প্রশ্নটা করে| গতদিনের বিক্রি না হওয়া রাখি থেকে কয়েকটা রুকমণির দিকে এগিয়ে দিল| রুকমণি তার মধ্য থেকে একটা ভালো রাখি বেছে নিল| 'হা ভৈয়া‚ কাল তো যেতে পারিনি ‚ তাই আজ যাচ্ছি'‚ পয়সা দিতে দিতে রুকমণি উত্তর দিল| দোকানী হাসিমুখে পয়সা নিয়ে গল্লাতে রাখল| রুকমণি গাড়িতে উঠে উটওয়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল‚'ভৈয়া‚ থোড়া জলদি চলাও না|' সারা রাস্তাতেই লিলা চুপচাপ বসেছিল গাড়িতে| এখনও রুকমণির রাখি কেনা দেখেও কিছু বলল না| অন্ধেরা হয়ে এসেছে‚ গাড়ি পাকা রাস্তা ছেড়ে এবার কাঁচা রাস্তা ধরে চলেছে| বালির ওপর উটের গাড়ির চাকার ঘসঘস আওয়াজ আর উটের গলার ঘন্টির আওয়াজ ছাড়া বাতাবরণে আর কোন আওয়াজ নেই| দুরে গ্রামটাকে আবছা দেখা যাচ্ছে বটে‚ কিন্তু কোন আলো দেখা যাচ্ছে না তো| আগেও রাতের দিকে গ্রামে এসেছে রুকমণি‚ দুর থেকেই গ্রামের আলো চোখে পড়ত‚ আজ কিন্তু কোন আলো দেখা যাচ্ছে না| গ্রামের দিকে তাকিয়ে লিলা ফুঁপিয়ে উঠল| রুকমণি লিলাকে কাছে টেনে নিল| 'কাঁদিস না রে বহন‚ কালই তো তুই তোর মাসা আর বাপুসাকে দেখতে পাবি| এখন চুপটি করে বোস| আমি চট করে আমার বাপুসা আর ভাইকে নিয়ে আসি| | ভয় পাবি না তো একলা থাকতে?' লিলা ঘাড় কাৎ করে জানালো যে সে ভয় পাবে না| গাড়িটা গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছুতেই সে দাঁড় করিয়ে দিল| এখানে থেকে হেঁটে গেলে একশো কদম মত লাগবে| তা লাগুক কিন্তু গাড়ি এখানে দাঁড় করিয়ে রাখাই ভালো| রক্ষীর তো এখানেই থাকার কথা| গেল কোথায় লোকটা? হঠাৎ করেই রুকমণিকে চমকে দিয়ে সামনে হাজির হল সেই রক্ষী| 'কি খবর?' রক্ষীর কাছে জানতে চাইল রুকমণি| 'এক গড়বড় হয়ে গেছে'‚ রক্ষী ইতঃস্তত করে বলল‚'সলিমজী এখনও নদীর পাড়ের খেমাতেই আছে|' 'সেকি‚ ও এখনও এখানে কি করছে?'‚ রুকমণি ঘাবড়ে যায়| 'ঐ মেয়েটিকে না পেয়ে পুরা পাগল হয়ে গেছে| আর তার উপর কে যেন বলেছে পালিওয়ালরা বাড়ির ভিতরে মাটির নীচে ধন-সম্পত্তি সব পুঁতে রাখে ‚ পালাবার সময় নিশ্চয় সব সম্পদ নিয়ে যেতে পারে নি| সেই শুনে‚ শহর থেকে কিছু লোক আনিয়ে সব বাড়ির ফর্শের খুদাই চলছে|' রুকমণি ভয় পেয়ে যায়‚ কিছু কিছু করে অনেক সঞ্চিত ধনই সে বাড়িতে সরিয়ে এনেছে| এই খুদাই করতে গিয়ে না‚ তার বাবার বাড়িতে নজর পড়ে| একটাই ভরসা যে তারা পালিওয়ালী না | সলিম শুধু পালিওয়ালীদের বাড়িগুলোতেই ধনের খোঁজ করবে | 'আমার বাপুসা আর ভাই কোথায়?' অধীর হয়ে জানতে চায় রুকমণি| রক্ষী কোন জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে রইল| রুকমণির মনটা কু ডাকল‚ দৌড়লো নিজের বাড়ির দিকে| বাড়িটা গ্রামের বাইরে‚ প্রায় নদীর কাছে| হাতে নিয়ে নিল কোমরে গোঁজা খ্ঞ্জরটা| বেসুধের মত দৌড়ে সে নিজের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালো| একটু শ্বাস নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজাটা দুহাট হয়ে গেল| মশাল নিয়ে সেই রক্ষীও রুকমণির পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে| খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে এসে মশালটা উঁচু করে ধরতেই আঙ্গনের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখল বাপুসা আর ভাইয়ের রক্তাক্ত দেহ| এই দৃশ্য দেখে রুকমণি মেঝেতে বসে পড়ল| হাঁ করে চেয়ে রইল দেহগুলোর দিকে| তার জীবনের শেষ আশা-ভরসা সব শেষ হয়ে গেল| বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে‚ চোখ জ্বালা করছে‚ তবু চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না সে| চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল তার| চিৎকার করে কাঁদতে পারলে হয় তো এই জ্বালা কিছুটা মিটতো| এবার কি করবে সে? কোথায় যাবে সে ? তার তো সব আশা স্বপ্ন শেষ হয় গেল ? 'কে খুন করেছে এদের ? সলিম না আরও কেউ ?' রুকমণিগলার আওয়াজ সাপের হিসহিসানির মতো শোনালো | ‘হ্যা জি , এ হত্যা সলিমই করিয়েছে | তোমার বাপুসা ওর পা ধরে ওর জুতি মাথায় নিয়ে অনেক বলেছিলো যে তোমার ভাই কে ছেড়ে দিতে কিন্তু শয়তানটা কোনো কথা শোনেনি ওর', মাথা নিচু করে পুরো ঘটনাটা শোনায় রক্ষী| নাহ‚ এইভাবে শোক করে বসে থাকলে হবে না এখন‚অনেক কিছু করা বাকি এখনো| ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে‚ তারপর ধীর পায়ে বাইরে বেড়িয়ে আসে| বাইরে বেড়িয়েই প্রথমে চোখ গেল মন্দিরের দিকে| কে যেন একটা মন্দিরে ঢুকছে না? কে ও? অন্ধকারে ঠাহর হয় না‚ তবু মনে হল লিলাই হবে| দৌড়ালো মন্দিরের দিকে| 'ওকে বলেছিলাম না গাড়ি থেকে না বের হতে‚ বেরলো কি করে ?' মেয়েটা ভারী অবাধ্য তো ! রুকমণি বার বার মানা করেছিল ওকে যে, উটের গাড়ি থেকে যেন না নামে| মনে মনে প্রশ্নগুলো করতে করতেই লিলার চিৎকার কানে ভেসে এল| পড়িমরি করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরের ভিতরে ঢুকল| রক্ষীও রুকমণিকে অনুসরণ করে মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়েছিল| আবার সেই একই দৃশ্য‚ পন্ডিতজী মেঝেতে পড়ে আছেন রক্তাক্ত শরীরে| রক্তে ভেসে গেছে ওঁনার চারপাশ| চোখটা বিগ্রহের দিকে‚ ঠোঁটে মৃদু হাসি লেগে রয়েছে| লিলা মেঝেতে বসে কাঁদছে‚ তার পাশেই রুকমণি ধপাস করে বসে পড়ে| শয়তানটা এঁনাকেও ছাড়েনি? কেন মারল পন্ডিতকে? কি দোষ ওঁনার? আর সহ্য করতে পারছে না রুকমণি| দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন| যতই শক্ত মেয়ে হোক রুকমণি, এতো মৃত্যু এক সাথে দেখে আর যেন সহ্য করতে পারছে না সে | এতো শয়তান ও কেউ হতে পারে? 'লিলাকে লে যাও গাড়ি মে| খেয়াল রেখো আমি ফিরে না আসা অব্দি ও গাড়ির থেকে কিসি ভি হালত মে যেন না নামে| আমি আসছি এখনি'‚ কঠিন ভাবে নির্দেশ দিলো সে রক্ষীকে| 'কিন্তু বাইসা আপনি একলা কি করবেন ? আমিও আসছি আপনার সাথে' রক্ষী কিছুতেই একলা ছাড়বে না রুকমণিকে. 'আমার জন্য ভেবো না | আমার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না, তুমি যাও ওকে নিয়ে| আমি ঠিক ফিরে আসবো, চিন্তা করো না |' রক্ষী রুকমণির দৃঢ় কঠিন স্বর কে উপেক্ষা করতে পারলো না | অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে লীলা কে নিয়ে গ্রামের বাইরে চলে গেল | ওদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো | ওরা গ্রামের রাস্তায় অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই সে ভাবতে শুরু করলো এবার সে কি করবে | কয়েক মুহূর্ত ভেবে সে দৌড়ালো সৈন্যদের খেমার দিকে| খেমার পঞ্চাশ গজ দুরে সে দাঁড়িয়ে পড়ল| ভেতরে তখন খুব হৈচৈ চলছে| খুদাই করে যা কিছু পাওয়া গেছে তার ভাগ-বাঁটোয়ারা চলছে কুত্তাদের মধ্যে| সলিমের গলার আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে| চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে| .... শালারা কুকুরের মত কামড়াকামড়ি করছে লুটের মাল ভাগ-বাঁটোয়ারা করার জন্য| লুট করে যা পাওয়া গিয়েছে তা সলিমের কাছে কিছুই না| এসব কোন কাজেই আসবে না| পালিওয়ালরা দামী কিছুই তেমন ছেড়ে যায়নি| তবুও খুদাই চলছে‚ দামী কিছু পাওয়া যাবে এই আশা করে| অনেক আগে থাকতেই খবর ছিল যে পালিওয়ালরা একটা যৌথ সঞ্চয় রাখে বিপদ-আপদে ব্যবহার করার জন্য| এখনও পর্যন্ত খুদাই করে তেমন বড় কোন গর্ত চোখে পড়েনি‚ সবই ছোটখাটো গর্ত বাড়ির মধ্যে| কোথাও না কোথাও তো হবেই সেই খজানা| যদি সেই খজানা ওরা নিয়ে গিয়েও থাকে তাও তো বড় গর্তটা পাওয়া তো যাবেই| এখনো যখন পাওয়া যায়নি‚ তাহলে পাওয়া যাবে আশা করতে ক্ষতি কি? এই ভরসাতেই য়ার-দোস্তরা মজুরদের দিয়ে খুদাই চালু রেখেছে| তা যা ইচ্ছে করুক ওরা‚ তার মনে শুধু একটাই কষ্ট আর অপমান যে লিলাকে সে পেল না| যেমন করেই হোক লিলাকে পেতেই হবে| সলিমের ইজ্জত দাঁও পে লেগে আছে| দুপুর থেকে অনেক দারু হয়ে গেছে| একটা অবসাদ যেন শরীর-মনকে কাবু করে রেখেছে| এদের চেঁচামিচিতে মাথা ধরে গেছে| একটু বাইরের তাজা হাওয়া লাগলে হয়ত ভালো লাগবে| নেশায় চুর সলিম টলমল পায়ে খেমার বাইরে বেড়িয়ে এল| নদীর ঠান্ডা হাওয়াটা ভালো লাগছে এখন| বুকভরে শ্বাস নিল সে| একটা চেনা ইত্ররের গন্ধ নাকে এসে লাগল‚ খুবই চেনা গন্ধটা| মনে করার চেষ্টা করল গন্ধটা কোথায় যেন পেয়েছে| গন্ধটা মনে হচ্ছে পিছনদিক দিয়েই আসছে| ঘুরে দাঁড়াতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠল সে| কে যেন দাঁড়িয়ে আছে| 'কৌন হ্যেয় রে তু?'‚ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল সে| ' আমি রুকমণি'‚ বলেই আর অপেক্ষা না করে| ঝাঁপিয়ে পড়ল খঞ্জরটা নিয়ে সলিমের ওপর| তারপর পাগলের মত এলোপাথাড়ি চালাতে থাকলে সলিমের পেটে‚ বুকে| রুকমণির এই আচমকা আক্রমণ সামলাতে পারে না সলিম‚ পড়ে যায় মাটিতে| কিন্তু রুকমণি থামে না‚ খঞ্জরের প্রতিটি বিষবিন্দু সলিমের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে চায় সে| প্রতিটা আঘাতের সাথে চেঁচাতে থাকে‚ ' বল বল কেন মেরেছিস আমার বাপুসা আর ভাইকে? কি ক্ষতি করেছিল ওরা তোর?' সলিম চিৎকার করে ওঠে আঘাত খেয়ে‚ তার চিৎকার শুনে খেমার থেকে কিছু সৈনিক বেড়িয়ে আসে| তারা সলিমের ঐ অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায়‚ বাকি সৈন্যদের চিৎকার করে ডাকতে থাকে| কিন্তু কেউই রুকমণির? ঐ ভয়ঙ্কয় রূপ দেখে এগোবার সাহস পেল না| 'বাইসা ‚ অব বস করো| উঠে এসো তুমি|' পিছনে কার একটা গলার আওয়াজ পেয়ে সম্বিত ফিরে পেল রুকমণি| হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়ালো| কেউই টের পায়নি‚ সেনাপতি হুকুম সিং তার সৈন্যদের নিয়ে কখন যেন রুকমণির পিছনে এসে নিঃস্তব্ধে দাঁড়িয়েছে| একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে‚ সেনাপতি নিজের সৈন্যদের আদেশ করল খেমার মধ্যে যে বাগি সৈন্যরা আছে তাদের বন্দী করতে| মহারাওলের এটাই আদেশ| মাটিতে পড়ে তখনও বিষের জ্বালায় ছটফট করছে সলিম আর রুকমণি পাথরের দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে| যেন সে সলিমের মৃত্যুটা উপভোগ করতে চাইছে | 'আপ যাইয়ে বাইসা| আমরা আছি এখানে| এই শয়তানের শেষ দেখেই আমরা যাব'‚ সেনাপতি হাতজোড় করে বললেন| দু-তিনবার অনুরোধ করার পর যেন সেনাপতির কথা রুকমনির কানে ঢুকলো | সম্বিত ফিরে পেয়ে সে এবার চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নিলো | নিজের আলুথালু পোশাকটা ঠিক করে, যেন কিছুই হয় নি সে ভাবে আস্তে আস্তে সে গ্রামের দিকে রওনা দিলো | এখনো তো অনেক কাজ বাকি | সেনাপতি এক রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন রুকমণিকে তার গাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য| রুকমনি হাত তুলে মানা করলো সৈন্য কে তার সাথে না আসতে | ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল | রুকমণি এসে দেখল লিলা চুপচাপ গাড়িতে বসে| এই বয়সেই মেয়েটা অনেক কিছু সে দেখে ফেলল| তার দদ্দুর এই নৃশংস মৃত্যু সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না| রুকমণিকে দেখে তার জন্যও চিন্তা হল| সে না হয় এই রুকমণি বাইসার সাহায্যে বাপুসা- মাসার কাছে পৌঁছে যাবে‚ কিন্তু ইনি কি করবেন ? 'এবার তুমি কি করবে বাইসা?' লিলা জানতে চায়| এই প্রথম সে কথা বলল| এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল রুকমণি| সত্যি তো এবার সে কি করবে? চমকে ওঠে লিলার প্রশ্নে| 'জানি না রে|' অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল সে| তারপর লিলার দিকে তাকিয়ে বলল‚ ' পন্ডিতজীকে কথা দিয়েছিলাম‚ তোকে তোর পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে দেব| সে কথা আমি রাখব| তুই চিন্তা করিস না|' বলে লিলার পিঠে আশ্বাসের হাত রাখল| তারপর উটওয়ালাকে আওয়াজ দিল‚ ' চলো ভৈয়া চলো‚ বহুত দের হয়ে হয়ে গেছে|' হঠাৎই চারপাশ থেকে একটা গুমগুম শব্দ উঠল| মাটি দুলে উঠল জোরে| উটটা বিকট চিৎকার করে উঠল| উটওয়ালা জোরে আওয়াজ দিল‚ 'আপলোগ গাড়িসে উতর যাইয়ে‚ জলদি|' রুকমণি আর লিলা নেমে পড়ল গাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি| মাটিতে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছেনা‚ এত জোরে নড়ছে| দুরে আর্ত চিৎকার আর পাথরের বাড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ যেন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে| একটু পরেই থেমে গেল সব| কিছু লোকের আওয়াজ বাদ দিয়ে আর কোন আওয়াজ নেই| আধো অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে গ্রামের একটা বাড়িও আর আস্ত নেই| শুধু মন্দিরের চুড়োটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে| ওটাই একমাত্র ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাইনি| 'চলো ভৈয়া চলতে হ্যেয়| এখানে আর কার জন্য দাঁড়াবো আমরা|' হতাশ হয়ে বলল রুকমণি| গাড়িওয়ালা আর অপেক্ষা করল না| চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে দিল| আস্তে আস্তে অদ্ধকারে হারিয়ে গেল ওদের গাড়ি| পিছনে পড়ে রইল ভুমিকম্পে ধংস হয়ে যাওয়া কুলধারা গ্রাম, অনেক রহস্য আর গল্প বুকে নিয়ে| ………………. ক্রিং! ক্রিং! অফিস পিয়ন কে ডাকার জন্য বেলটা বাজালেন অমিতেশ স্যার | অমিতেশ নন্দী, নামকরা এক পাবলিশিং হাউসের এডিটোরিয়াল ডিরেক্টর | পাবলিশিং হাউসের মালিকের অত্যন্ত প্রিয় লোক | হবেন নাই বা কেন ? বইয়ের জগতের একজন নামকরা লোক তিনি | নামী- অনামী লেখকেরা এঁনার আশেপাশে ঘুরঘুর করেন | এঁনার কৃপা দৃষ্টি যার উপর থাকবে সে লেখক বা লেখিকা এক আধটা অ্যাওয়ার্ড যে পেয়েই যাবে সে ব্যাপারে সবাই এক মত | এই হাউস তো এঁনার নামেই চলছে | 'একটু সান্যাল বাবুকে ডেকে দাও তো !' ম্যানুস্ক্রিপ্ট থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন | একটু পরেই দরজায় টোকা পড়লো | 'আসতে পারি স্যার ?' 'আসুন ভেতরে, বসুন' শান্ত গলায় বললেন অমিতেশ স্যার | ' এটা কি ? ' হাতের ফোল্ডারটা সান্যাল বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন | সামনের চেয়ারে বসতেই প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন সান্যাল বাবু, সিনিয়র এডিটর | 'মানে স্যার ?' 'এটা কোন দিক দিয়ে গল্প লেগেছে আপনার?' একটু রাগত গলায় বললেন অমিতেশ স্যার | 'দেখুন রেকমেন্ড করছেন সে ঠিক আছে| কিন্তু একটা গল্প তো হওয়া উচিত নাকি? এই বাজারে রাজা রানীর গল্প কে পড়ে মশাই? আর এই ধরনের গল্প ছাপতে গেলে তো এই পাবলিশিং হাউস লাটে উঠবে ?' 'হ্যাঁ স্যার ' মিনমিন করেই বললেন সান্যাল বাবু 'আসলে স্যার, আমার খুব পুরোনো বন্ধু, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে | গল্প লেখার খুব শখ ওর | খুব ইচ্ছে যে ওর নামে একটা বই বেরোক | তাই এনেছিলাম আপনার কাছে স্যার | যদি কিছু করে দেন |' 'আপনার কি মাথা খারাপ হয় গেল সান্যাল বাবু ? আমি এই বই ছাপাবো? তাও যদি একটু পদের হতো তাহলে না হয় আপনার কথা ভেবে দেখতাম | এ তো বাচ্চাদের বই, বড়োজোর টিভি সিরিয়াল হতে পারে এই গল্প থেকে, তার উপর না আছে, মানে ওই গরম করা কিছু ঘটনা, না আছে কথার খেলা, কোন দিক থেকে এইটাকে উপন্যাসের পর্যায় ফেলা যায় আপনিই বলুন না ? না না সান্যালবাবু আপনি বর্ষীয়ান স্টাফ এখানকার, আপনাকে অনেক সন্মান করি , কিন্তু সরি, আমি আপনার অনুরোধ রাখতে পারবো না | আমাকে তো এই হাউসের রেপুটেশনের কথা ভাবতে হবে না কি ?' বিরক্ত হয়েই বললেন | না না এ ছাপা যাবে না সান্যাল বাবু | আপনি বলে দিন ওঁনাকে, তবে ভবিষ্যতে যদি ভালো কিছু ওঁনার কলম থেকে বেরোয় তখন না হয় ভাবা যাবে |' 'ঠিক আছে স্যার, আমি বলে দেব ওঁনাকে, আমি যাই তাহলে ' একটু ক্ষুন্ন হয়েই বললেন সান্যাল বাবু | 'হ্যা, ঠিক আছে, আপনি বরং বিকেলে ছুটির পর ম্যানুস্ক্রিপ্টটা নিয়ে যাবেন আমার কাছ থেকে... আর হ্যাঁ, একটু পর সাগরদা আসবেন, ওঁনার জন্য ওঁনার পছন্দের নরম সন্দেশ আর ডাব আনিয়ে রাখতে ভুলবেন না যেন |' 'হ্যাঁ স্যার, আমি জানি উনি আসছেন, আমি আগের থেকেই আনিয়ে রেখেছি | কিন্তু স্যার এবারের উপন্যাসটা উনি আমাদের না দিয়ে সরস্বতী প্রেস কে দিয়ে দিলেন |এইটা কি উনি ঠিক করলেন?'কাজের কথায় এলেন সান্যাল বাবু | 'তা কি আর আমি ভাবি নি ভাবছেন? আসলে টাকা টাকা, বুঝলেন না? খাঁইটা ওনার বেড়েছে যে! আমি খোঁজ নিয়েছি, বেশ ভালোই টাকা দিচ্ছে ওরা | আমাদের ও কিছু ভাবতে হবে | আপনি বরং ওঁনার আগের বারের চেকটা তৈরী করিয়ে রাখুন | কিছু অ্যাডভান্স ও ওতে জুড়ে রাখবেন | দেখি কি করতে পারি' বেশ চিন্তাতেই আছেন যে স্যার বোঝা যাচ্ছে | 'ঠিক আছে, আমি রেডি করে রাখছি কিন্তু স্যার দেখবেন এবার পূজার লেখাটা যেন আমরাই পাই ' বলে কেবিনের দরজা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলেন উনি | মনটা খারাপ হয় গেল একটু, গল্পটা এমনিতে এতো খারাপও ছিল না | কিন্তু বড্ডো মুষড়ে পড়বে শেখর | অনেক আশা করেছিল ও, এবারেরটা ঠিক বেরোবে ছাপা বই হয়ে | ওকে বরং বলবো অন্য কোনো পাবলিশিং হাউসের সাথে কথা বলতে | 'নমস্কার সান্যালদা , কেমন আছেন?' একদম সামনেই দাঁড়িয়ে সাগর, মানে সাগর ভৌমিক. বাংলার সবচেয়ে নামী-দামী লেখক | শুধু বাংলা কেন, বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও ওঁর গল্প নিয়ে বেশ কয়েকটা সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে | দাম তো হবেই ওঁর | 'আরে সাগর এস এস , স্যার তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন, যাও ভেতরে যাও' বলে, স্যারের ঘরের দরজাটা খুলে এক পাশে সরে দাঁড়ালো সান্যাল বাবু | 'আপনিও না সান্যালদা, দরজা খোলার কি দরকার আমি তো যাচ্ছিলামই ওঁনার ঘরে ' সংকুচিত হয়েই বললো সাগর | এই সম্মানটা সবাই করে সান্যালবাবুকে, উনিও তো কম দিন হলো না এই ইন্ডাস্ট্রিতে | সান্যালবাবু আর প্রেসের দিকে গেলেন না| কি জানি কোনো কিছুর দরকার হতেই পারে | উনি অ্যাকাউন্টস সেক্শনে গিয়ে পেমেন্ট রেডি করার নির্দেশ দিয়ে ফিরে ওখানেই একটা চেয়ারে বসে পড়লেন | এখন থেকে অমিতেশ স্যারের ঘরের দরজা দেখা যায় | দরকার পড়লে যেতে অসুবিধা হবে না | কিছুক্ষণ পর স্যারের ঘরের বেল বেজে উঠলো | পিয়ন ভেতরে গিয়ে একটু পরে হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে এলো | 'কি রে, ওটা কি?' এমনিই অভ্যেসবশতঃ জিজ্ঞেস করলেন সান্যাল বাবু | 'স্যার বললেন ফটোকপি করিয়ে আনতে' পিয়ন কোনো রকমে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে বাইরের দরজার দিকে দৌড় লাগলো| 'বাইরে যাচ্ছিস কোথায়? ফটোকপি মেশিনে তো ওদিকে!' অবাক হয় বললেন উনি | ' না, স্যার যে বললেন বাইরে থেকে তাড়াতাড়ি করে করিয়ে আনতে, আমি তো বললুম যে এখানকার মেশিন থেকে করিয়ে দি? তাতে উনি বকা দিলেন আমায়, বললেন যা বলা হচ্ছে তাই করো, বেশি মাথা চালাতে হবে না তোমার !' সেও বোধহয় একটু অবাক হয়েই ছিল |নিজের মনে বকতে থাকে সে | প্যাকেটটা ওর হাত থেকে নিয়ে খুলে দেখলেন শেখরের হাতে লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট| কোনো কথা না বলে প্যাকেটটা পিয়নকে আবার দিয়ে দিলেন সান্যালবাবু |হাত নেড়ে ওকে যেতে বললেন | বুঝতে তো আর কিছু বাকি ছিল না তার | আস্তে আস্তে উঠে উনি প্রেসের দিকে এগোলেন | পা আর চলতে চাইছে না তার | বিকেলে গিয়ে উনি কি বলবেন শেখরকে? এই খেলা তো উনি সারাজীবনই দেখে এসেছেন কিন্তু আজ নিজের বন্ধুর সাথে হওয়াতে বোধহয় বুকে বেশি করে লাগলো | শেষ|

1226

109

শিবাংশু

দেবীপাট ও জলজঙ্গল

নীরবতাই ভাষা সেখানে।শব্দ মানে ট্রেসপাস। দেবীর রাজত্ব। যতোদূর চোখ যায়। শাল, সেগুন, গামার, সিসু, কেঁদ, কদম, পলাশ, শিমুল। দেবতারা সারি সারি বনস্পতি সেজে দাঁড়িয়ে আছেন। লালমাটির পথ ওঠে পড়ে। বের, করমের ডাল গায়ে এসে পড়বে এদিকওদিক করলেই। দেবরিগড় অভয়ারণ্যের পথ চলে গেছে চউরাসিমল পর্যন্ত। একুশ কিমি। বড়াখাণ্ডিয়া আর চউরাসিমলের মাঝেই দেখা যাবে জঙ্গলসংসারের ছোটো তরফ, বড়ো তরফ। বাইসন, সম্বর, বুনো শুয়োর, জংলি কুকুর। হয়তো চিতাও দেখা দিয়ে দেবে মর্জি হলে। জায়গাটা হিরাকুঁদ বাঁধের উল্টোদিক। সম্বলপুর হয়ে যেতে হয়। মহানদীকে বেঁধে রাখা জলসাম্রাজ্য দেশের প্রথম নদীবাঁধ। তার বিপুলতা আর তো কোথাও দেখিনি। মহানদী নিজেই তো এক মায়ার প্লাবন। নিজেকে বারবার নতুন করে সাজায়। তার জন্মপ্রপাত ছত্তিসগড়ের সিহাওয়া পাহাড় থেকে ধামতারি, দণ্ডকারণ্যের মাঝখান দিয়ে ঢুকে যায় ওড়িশার পশ্চিম সীমান্ত। সম্বলপুর শহরের ধাত্রী মহানদী। সেখান থেকে পূর্বদিকে সাগরে বিলীন হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘপথের দুধারে সাজিয়ে রেখেছে সবুজের সাম্রাজ্য, জলের রাজতরঙ্গিনী। দেবরিগড়ের বনবাংলো একটা রূপকথার দেশ। অনন্ত জলের পারে, অরণ্যঘেরা একটা নীরবতার চুপসাকিন।তাই তার নাম 'নির্বাণ'। দিনের বেলা নীলজলের দিকে তাকিয়ে চোখের তরী বাওয়া। সাঁঝ ঢললেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া নেইদেশের সীমাপার। দূর থেকে জলের শব্দ, বনের শব্দ, বনবাসীদের মেজাজে ডাকাডাকি। বাতি নিভিয়ে চুপ করে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চাঁদ নিজের বাড়ি ছেড়ে পথে নেমে আসে। রাতে বেরোনো সখত মনা। কিন্তু ভোরবেলা উঠতে পারলে দেবী উজাড় করে দেন তাঁর অক্সিজেন আর ক্লোরোফিলের ভাণ্ডার। এমন একটা দিকশূন্যপুরের বনবাংলো, কিন্তু সেখানে এসি আছে, গিজার আছে, আছে নিরামিষ পদের ভোজ্য। জঙ্গলে আমিষ খাওয়া মানা যে। খরচটা হয়তো একটু বেশিই লাগে। সরকার বলেন বনভোজনে আসা উদ্দণ্ড জনতাকে আটকাতে নাকি এই ব্যয়বাহুল্য। যে যাই বলুক দেবরিগড় না গেলে কিছু ছেড়ে যায়। আবার ঘুরে আসতেই হবে...

104

5

শিবাংশু

জগন্নাথের জাত যদি নাই... .

জগন্নাথের প্রচলিত রূপটি হয়তো আর্যদের বিশেষ পছন্দ ছিলোনা। তাই একটি গল্পের অবতারণা করতে হয় তাঁদের। ভেসে আসা নিমকাঠটি থেকে দেবমূর্তির রূপ দেবার জন্য পিতামহ ব্রহ্মা'র ইচ্ছায় স্বয়ং বিষ্ণু এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে অবতীর্ণ হ'ন। তাঁর শর্ত ছিলো যতোদিন না কার্যসমাধা হবে, কেউ তাঁকে বিরক্ত করবে না। বেশ কিছুদিন পরেও যখন কাজটি সম্পূর্ণ হলোনা, তখন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পত্নীর অনুরোধে মন্দির কক্ষের দরজা বলপূর্বক খুলে দেখেন সেই ব্রাহ্মণ কোথাও নেই আর কিছু 'অর্ধসমাপ্ত' দারুমূর্তি রাখা আছে। আর্য অহমের একটি প্রকাশ এখানে পাওয়া যাবে। অনার্যদের কল্পিত জগন্নাথবিগ্রহ তাঁদের বিচারে 'অর্ধসমাপ্ত'। কারণ সেটি নান্দনিক বিচারে আর্য উৎকর্ষের নির্দিষ্ট স্তর স্পর্শ করেনা। আসলে এখন বিস্ময় লাগে, কীভাবে জগন্নাথবিগ্রহ স্তরের একটি সার্থক পরাবাস্তব শিল্পবস্তু সেই পুরাকালের শিল্পীদের ধ্যানে রূপ পেয়েছিলো। নিজেদের ধ্যানধারণা থেকে বহুক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বাধ্য হয়েছিলো জগন্নাথদেবকে নিজেদের বিষ্ণুকেন্দ্রিক প্যান্থিয়নে সসম্মানে স্থান করে দিতে। তার মূল কারণ দেশের এই প্রান্তে জগন্নাথের প্রশ্নহীন বিপুল লোকপ্রিয়তা। যেভাবে পূর্বভারতে প্রচলিত নানা শিব ও শক্তিভিত্তিক দেবদেবীদের জন্য ব্রাহ্মণ্যধর্মকে দরজা খুলে দিতে হয়েছিলো, সেভাবেই জগন্নাথও বিষ্ণুদেবতার সমার্থক হয়ে আর্য-অনার্য নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন। এখনও জগন্নাথদেবের মূলপূজারী অব্রাহ্মণ, সাবর্ণ হিন্দুগোষ্ঠীর বাইরের মানুষ। সত্যিকথা বলতে কি সারা দেশে অন্ত্যজ, নিম্নবর্গীয় মানুষজনদের জন্য জগন্নাথমন্দিরের মতো এই পর্যায়ে 'শাস্ত্র'সম্মত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা আর কোথাও দেখিনি। কবি যখন বলেন, " জগন্নাথের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই...", একটি আর্ষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এহেন একজন ইতরের দেবতা, স্রেফ লোকপ্রিয়তার জোরে সর্বগ্রাসী ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্যকে জিতে নিয়ে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সমগ্র 'জগতের নাথ'। হয়তো একটু অন্য রকমভাবে ভাবার দাবি তিনি রাখতেই পারেন। ব্রাহ্মণ্য অধ্যাত্মজগতে সম্ভবত এটিই একমাত্র সাম্রাজ্য যেখানে মুখ্য পূজারী দৈতপতির দল অনার্য শবরদের বংশধর। জগন্নাথ সৃজনের স্বীকৃতি হিসেবে অনার্যদের রাণী গুন্ডিচা, যিনি লোককথা অনুসারে একাধারে রাজা 'ইন্দ্রদ্যুম্নে'র মহীষী ও জগন্নাথ রূপকল্পের মুখ্য ধাত্রী, তাঁর গৃহে জগন্নাথকে বছরে মাত্র সাতদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলো। সঙ্গে এলো কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের রথযাত্রার আয়োজন। যেহেতু 'ভগবানে'র মা কোনও মানবী হতে পারেন না, তাই তাঁকে মায়ের ভগ্নী মাসিমা হিসেবে সম্বোধন করা হয়। জগন্নাথ ধারণাকে ভ্রূণ থেকে সাবালকত্ব পর্যন্ত প্রতিপালন করার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান সমস্ত কৌম অনার্য মায়েদের গরিমান্বিত করে। 'গুন্ডিচা' শব্দটি মনে হয় দ্রাবিড়িয় ভাষা থেকে এসেছে। বীরত্বের সঙ্গে শব্দটির যোগাযোগ আছে। তিনি একজন অনার্য গ্রামদেবী। লোককথায় ইন্দ্রদ্যুম্নের রাণী । এভাবেই গুন্ডিচা'কে নিয়ে আর্য বৈষ্ণব দুনিয়াকে আপোস করতে হয়েছিলো। এই নারী বা দেবী জগন্নাথের কাছে যাননা, জগন্নাথ তাঁর কাছে আসেন রথে চড়ে। যাবতীয় ঐশী অহংকারকে তাকে রেখে। --------------------------------------- অনেকেই বিশ্বাস করেন জগন্নাথ আরাধনার ঐতিহ্য বৌদ্ধ মহাযানী পূজার্চনার বিবর্তন হিসেবে এসেছে। আগে উল্লেখ করেছি, বেশ কিছু পণ্ডিত জগন্নাথের নবকলেবরে 'ব্রহ্মস্থাপন'কে বৌদ্ধস্তূপের অন্দরে বুদ্ধের দেহাবশেষ রক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। চতুর্থশতকে ফাহিয়েন কলিঙ্গবাসকালে দন্তপুর নামক স্থানে বুদ্ধের দেহাবশেষ নিয়ে শোভাযাত্রা দেখেছিলেন। বর্তমানে এই আচারটি শ্রীলংকার ক্যাণ্ডিতে অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত যেমন উইলসন, ফার্গুসন বা কানিংহামসাহেব জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে বৌদ্ধ ত্রিরত্ন বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের সমতুল বলে মতপ্রকাশ করেছিলেন। বৈদিকধর্মে দেবালয় নির্মাণের কোনও প্রথা ছিলোনা। যাবতীয় জ্ঞান ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিলো মুনিঋষিদের আশ্রম বা অরণ্যকুটীরগুলি। বৌদ্ধধর্ম ও লোকাচারে উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে স্তূপ বা চৈত্যের নির্মাণ প্রথম শুরু হয়। পরবর্তীকালে এই পথ অনুসরণ করে তন্ত্রমতে শিব বা শক্তির নামে দেবমন্দির তৈরি হতে শুরু করে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে অনেকেই তন্ত্রমতে নির্মিত বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য রত্নসিংহাসনের ভৈরব বা শ্রীচক্রের উপস্থিতি ছাড়াও মন্দিরের গায়ে মিথুনমূর্তি বা প্রচলিত দেবদাসীপ্রথা তন্ত্রচর্চার সঙ্গে সম্বন্ধিত লোকাচার। জগন্নাথের রথযাত্রাও বস্তুত অনার্যসমাজের প্রাচীন প্রথা। সনাতনধর্মে এর অনুপ্রবেশ বৌদ্ধরীতির হাত ধরেই। নাস্তিক্যবাদও জগন্নাথ ও বুদ্ধের মধ্যে একটা প্রধান যোগসূত্র। সনাতনধর্মে শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে দেবতা জগন্নাথকে নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে গত হাজার বছর। প্রাথমিকভাবে পূর্বভারতে অনার্য ও নিম্নবর্গীয় জনতার দেবতা শিব বুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। পিয়দস্সি অশোক ও মৌর্যশাসনের পর বৌদ্ধসংস্কৃতির নাভিকেন্দ্র যখন সম্রাট কণিষ্কের রাজত্ব , অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে সরে যায় তখন দেশের এইপ্রান্তে অন্ত্যজ, অনার্য মানুষজনের কাছে শিব বা মহাদেব ও বুদ্ধদেবের ভাবমূর্তির মধ্যে ব্যবধান প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো। যুক্তিগতভাবে সেটাই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু কুমারিলভট্ট, মণ্ডন মিশ্র এবং আদিশংকরের ক্রমাগত প্রয়াসে ব্রাহ্মণ্য ভাবধারার পুনরুজ্জীবন ঘটে। বিষ্ণুপূজক, বর্ণাশ্রমবাদী শক্তিগুলি আবার মানুষের অধ্যাত্মিক স্পেসটি দখল করে নেয়। মধ্য গুপ্তযুগে রচিত হরিবংশ বা শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধের কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু পরবর্তী পুরাণযুগে, অর্থাৎ সনাতনবাদী পুনরুত্থান ঘটে যাবার পর সংকলিত পদ্মাপুরাণে লেখা হয় বিষ্ণু বুদ্ধশরীর গ্রহণ করেছিলেন। অগ্নিপুরাণেও বলছে বিষ্ণু শুদ্ধোদনপুত্র হয়ে জন্ম নিয়ে ছিলেন 'মায়ামোহ' নামক দানব প্রবৃত্তিগুলি নাশ করার জন্য। এছাড়া গরুড়পুরাণ, ভাগবতপুরান ইত্যাদি সংকলনে কোথাও বিষ্ণুকে জিনপুত্র (জৈনমতে) বা মোহনাশক বুদ্ধের অবতারে বর্ণনা করা হয়েছে। মোদ্দাকথা, বিষ্ণুপূজকরা পূর্ণ প্রয়াস করেছেন বুদ্ধকে নবম অবতার হিসেবে প্রতিপন্ন করতে। ওড়িশায় বিষ্ণুর নবম অবতার হয়ে এসেছেন জগন্নাথ। পুরীর মন্দিরে মূল প্রবেশদ্বার, সিংহদ্বারের শীর্ষে বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্তি রয়েছে। সেখানে হলধর ও কল্কি অবতারের মাঝে নবম অবতার হিসেবে জগন্নাথের প্রতিকৃতি দেখা যাবে। এছাড়া ভিতরে জগমোহনের সামনে গরুড়স্তম্ভের পাশের দেওয়ালেও দশাবতারের নবম সদস্য হিসেবে জগন্নাথকে দেখা যাচ্ছে। ওড়িশার সনাতনধর্মীয় ভক্তবৃন্দ বুদ্ধ ও জগন্নাথকে এক করেই দেখে এসেছেন পুরাণযুগ থেকে। ('নীলমাধব: একটি বিকল্প নিমপুরাণ' থেকে কিছু অংশ "দেবতার সন্ধানে-একটি অনার্য অডিসি")

167

10