ইরা চৌধুরী

লেহ লাদাখ

লেহ-লাদাখ ভ্রমন ডায়েরি এক দিল্লী থেকে লেহ বিমানযোগে লাগে এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট ।ভোর পাঁচটায় দিল্লী থেকে রওয়ানা হয়ে যখন লেহ র ঘন কালো পাহাড় ঘেরা কুশক বাকুলা রিনপোছে বিমানবন্দরে নামলাম তখন আকাশ ভরা আলো ।বিমান থেকে নেমে মাটিতে পা রাখা মাত্র Public Address system এ ঘোষনা কানে এল ।সমুদ্রতল থেকে সাড়ে এগারো হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত লেহ অঞ্চলে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম হওয়ায় অনভ্যস্থ যাত্রীদের শ্বাস কষ্ট ছাড়াও অন্যান্য সম্ভাব্য শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে ।অতয়েব নিজেদের শরীরের প্রতি যাত্রীদের বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে । সতর্কবার্তার মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল অল্প ক্ষনের মধ্যেই – শুরু হল মাথার যন্ত্রণা । শুধু রক্ষে লেহ তে আমাদের প্রথম দিনে কোন কার্যক্রম ছিলনা ।বিমানবন্দর থেকে চমৎকার মসৃন পথে ধরে ভ্রমন সংস্থার গাড়িতে হোটেল লা সো তে ডেরা বাঁধার পর থেকে গোটা দিনটা বরাদ্দ ছিল আমাদের সম্পূর্ণ বিশ্রামের মধ্যে থেকে পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের “এক্লেমাটাইজ” করে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়ার জন্য । নতুন জায়গায় আসার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কিছুটা থিতিয়ে এলে মনে হল এ কোন দেশে এসে পড়লাম রে ভাই।কোথায় মনের সুখে ডানা মেলে উড়ে বেড়াব তা নয় ,শরীর একটা বোঝা হয়ে ঘাড়ে চেপে বসে আছে । দুই একদিন টানা বিশ্রামের পর একটু ধাতস্থ হবার পর শুরু হল আমাদের পথ চলা। উত্তরে দিগম্বর কারাকোরাম আর দক্ষিনে ঘন নীল হিমালয়ে ।এই দুই বিস্তৃত পর্বতমালার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌছে গেলাম তিব্বতী দ্রকপা সম্প্রদায়ের মনাস্ট্রী হেমিস গু্মফা ।একশ আশি ধাপ উঠে এই তিব্বতী মনেস্ট্রীর দালান ।ভিতরে আছে বুদ্ধের ধ্যানস্থ মূর্তি ,আছে একটি সংগ্রহশালা ।সংগ্রহশালায় বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাক্রমের বহু চিত্র ছাড়াও রয়েছে অনেক তৈজসপত্র , আর নানান আকারের ধাতব পাত্র । জানা গেল জুন মাসে নাকি এখানে পালিত হয় বর্ণাঢ্য উৎসব । হেমিস গুম্ফা থেকে বেরিয়ে আর চল্লিশ কিমি পথ পার হয়ে এসে পৌছলাম থিকসে নামে অপর একটি গুম্ফায়।সেখানে দেখা মিলল বিশাল এক বুদ্ধমূর্তির ।তার চোখে মুখে ছড়িয়ে আছে অনাবিল শান্তি আর স্মিত হাসি । সুউচ্চ পাহাড়চুড়ায় অবস্থিত গুম্ফাটি মনে শ্রদ্ধা জাগায়। থিকসে গুম্ফাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলি ।কিছুদুর যেতে না যেতেই দেখা হয়ে যায় সিন্ধু নদের সাথে ।রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি ।এই সেই সিন্ধু নদ যার তীরে একদা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা । তিব্বতের মানস সরোবর এর কাছাকাছি এর উৎস । সেখান থেকে তার সুদীর্ঘ চলার পথে এসে মিলেছে অসংখ্য শাখা নদী বিভিন্ন জায়গায়। দুর্গম পাহাড়ি পথে চলতে চলতে চোখে পড়ে কত বিভিন্ন আকৃতির পর্বতমালা কত রঙের বাহার তাদের ! কোথাও সে গেরুয়া কোথাও ঘন নীল । খুব আশ্চর্য লাগে সম্পূর্ণ গাছপালাবিহীন ন্যাড়া পাহাড় গুলোকে দেখে ।সামান্যতম সবুজের আভাস মাত্রও চোখে পড়েনা কোথাও । গাছগাছালি অনুপস্থিত কাজেই পাখির কুজন কাকলীও শোনা যায়না কোথাও ।মাথার ওপরে গাঢ নীল আকাশ আর পায়ের তলায় ,আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়ের পর পাহাড় !এ স্তব্ধ প্রকৃতি যেন এক মৃত্যু উপত্যকা । অবশ্য তারই মধ্যে জায়গায় জায়গায় চোখে পড়ে নীল আকাশের বুকে খন্ড খন্ড সাদা মেঘের দল অলস ভঙ্গীতে ভেসে চলেছে আবার কোথাও পাহাড়ের মাথা আলতো করে ছুঁয়ে । অবাক চোখে মেলে সেই সবদেখতে দেখতে একসময়ে পৌঁছে যাই চাংলা পাস । এই রাস্তা পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মোটর চলাচলের রাস্তা । গাড়ি থামার পর মাটিতে নেমে অনুভব করি শ্বাস কষ্ট ।কিন্তু সেটুকু কষ্ট উপেক্ষা করেই ধীরে ধীরে হেঁটে চারপাশটা দেখেনিই । কিছু দৃশ্য হয় ক্যামেরাবন্দী চাংলা পাস থেকে গাড়ি আমাদের নিয়ে এবারে ঢালু পথে ঘুরপাক খেতে খেতে চলল নিচের দিকে ।গন্তব্য প্যাংগং লেক । তিন সমুদ্রতল থেকে ৪৩৫০মিটার উচ্চতায় অবস্থিত একশো পঁয়ত্রিশ কিমি দীর্ঘ প্যাংগং লেক এর চারভাগের তিনভাগই চীনের ভূখন্ডের অন্তর্গত ।শুনেছিলাম সুউচ্চ পাহাড়ের পায়ের তলে লুটিয়ে থাকা লেকের জল সূর্যালোকে থেকে থেকে রঙ বদলায় । কিন্তু আমাদের বিধি বাম ।লেকের জলে সেই নয়নাভিরাম রঙের খেলা দেখা আমাদের ভাগ্যে ছিলনা ।তাই হঠাত কোথা থেকে কাল মেঘ এসে আকাশকে ঢেকে ফেলল ।শুরু হয়ে গেল রিমঝিম বৃষ্টি । প্যাংগং লেকের জলে রঙের মেলা দেখা হলনা ।অতয়েব ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এলাম হোটেলে । পরের দিন নুব্রাভ্যালি যাবার পথে পড়ল খারদুংলা পাস ।নানা দিক দিয়ে এই গিরিবর্ত্ম টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । একসময়ে এই পথ দিয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে চলত বানিজ্য । ঘোড়া ও উটের পিঠে পন্যসামগ্রী বোঝাই করে এই পথ দিয়ে চলত ক্যারাভ্যান । তা ছাড়াও সামরিক দিক দিয়েও এই গিরিবর্ত্ম ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । সিয়াচীন হিমবাহে প্রহরারত ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহ হয়ে এই পথেই । খারদুংলা পাসের উচ্চতা নিয়ে কিছুটা ধন্দ আছে।শুনেছিলাম খারদুংলা পাস নাকি দুনিয়ার সর্বোচ্চ মোটর চলাচলের পথ ।সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতা ১৮৩৬০ফুট ।তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী উচ্চতাটা আসলে সাড়ে সতেরহাজার ফূটের মত । খারদুংলায় পৌঁছনর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল তুষারপাত । চারিদিক আবছা হয়ে এল ।আমাদের ঘিরে থাকা পাহাড়গুলো পাতলা বরফের আলপনা আঁকা চাদর গায়ে দিয়ে সেজে উঠল ।আগের দিনের প্যাংগং লেকের হতাশা ঝেড়েফেলে নিজেদের বয়স ভুলে মেতে উঠলাম মাটি থেকে বরফের তাল কুড়িয়ে একে অপরের দিকে ছুঁড়ে মারার খেলায় ।খেলার ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পাচ্ছিলাম কুয়াশার মত অস্পষ্টতা আমাদের ঘিরে ধরেছে । সেই আধোআঁধারিতে চারপাশের কারাকোরাম পর্বতমালা কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠল ।ছেলেমানুষী খেলা ভুলে মোহাবিষ্টের মত তাকিয়ে থাকি সেই দিকে । তবে এবারে ভ্রমন সংস্থার গাইডের তাড়নায় ফিরে আসতে হল গাড়ির গর্ভে । আবার চলা । পথ চলতে চলতে একজায়গায় পৌছে দেখি সার দিয়ে সব গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে । কি ব্যপার , না সামনের রাস্তায় পাহাড়ি ধ্বস নেমেছে । ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরা রাস্তা সাফ করে চলাচলের উপযোগী করে তোলার কাজ চালাচ্ছে । সুখের কথা মাত্র ঘন্টাখানেকের প্রচেষ্টায় রাস্তা খুলে গেল । গাড়ি সচল হবার পর অল্পক্ষণের মধ্যে পৌছলাম নুব্রাভ্যালিতে।চারিদিকে পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে শায়ক নদী ।এই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে পড়বে সিয়াচীন হিমবাহ ।ভারত-চীন Actual Line of control .সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলে যাবার জন্য নুব্রাভ্যালি আসার পথে একটি চেক পোস্টে আমাদের বিশেষ পারমিট সংগ্রহ করতে হয়েছিল । যদিও সে কাজে বিশেষ জামেলা পোহাতে হয়নি। আমাদের ভ্রমন সংস্থার লোকজনই সব কাগজপত্র সাজিয়ে নিয়ে পারমিট সংগ্রহ করে এনেছিল । তবে আমরা সিয়াচীন হিমবাহের দিকে গেলামনা –গেলাম ন্যুরা ভ্যালির হোটেলে । নুব্রাভ্যালির হোটেলে পৌছে দেখা মিলল সবুজ গাছপালা আর পাখি ।হোটেলের বাগানে গাছে গাছে আপেল এপ্রিকট খুবানী আর আঙুর ফলেছে ।অবাক হলাম এখানে চড়ুই পাখি দেখে । লাঞ্চ সেরে নিয়ে আমরা চললাম হুন্ডার কোল্ড ডেজার্ট দেখতে । সেখানে দেখা পেলাম দুই কুঁজ ওয়ালা রোমশ এক নতুন ধরণের উটের । ভ্রমনার্থীরা প্রায় সকলেই সেই উটের পিঠে চড়ে কোল্ড ডেজার্ট ঘুরে দেখছেন দেখে আমারও সখ হল উটের পিঠে চড়ার । কিন্তু কি কুক্ষণেই যে আমার অমন দুর্মতি হয়েছিল তা ঈশ্বরই জানেন । প্রথমতঃ শত কসরত সত্বেও আমি কিছুতেই চড়তে পারিনা উটের পিঠে –ডান প্যাঁ তুলে উটের পিঠে চড়ার চেষ্টা চালাই কিন্তু হা হতোস্মি। পারিনা কিছুতেই ।সে এক বিদ্ঘুটে অবস্থা ।আমার সহিস তো হালই ছেড়ে দিল। আমি নাছোড়বান্দা। শেষেএকলাফ দিয়ে উটের পিঠে সওয়ার হওয়া গেল ।উট আমাকে পিঠে নিয়ে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ানর সময়ে এমন বিকট আওয়াজ করল যে তাতেই আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম হল । তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল ,কিন্তু উটের চাল ভারি অদ্ভুত রকমের ।উটের একএকটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর এমন ভাবে তরঙ্গ দোলায় দুলতে আরম্ভ করল যে ভয়ে মরি কখন বুঝি উটের পিঠ থেকে আছাড় খেয়ে একেবারে “পপাত চ মমার চ” অবস্থা হয় আমার । এদিকে উটের সহিস ক্রমাগত চেঁচিয়ে আমাকে উপদেশ দিচ্ছে সোজা হয়ে না বসে শরীরটাকে একটু পেছন দিকে হেলিয়ে বসতে ।কিন্তু আমার কি আর তখন সে সব শোনার মত অবস্থা আছে? ফলে উটের পিঠ থেকে পড়লামনা বটে কিন্তু উটের সওয়ারির শেষে উটবাবাজি আমাকে পিঠ থেকে নামানর জন্য যেই না তার সামনের পাদুটো মুড়ে বসতে যাবে অমনি আমি টাল সামলাতে না পেরে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম উটের পিঠের ওপরে। উটের কুঁজে বিশ্রিভাবে আমার মুখটা গেল ঠুকে ।উটএর সহিস তখন তারস্বরে চেঁচিয়ে আমাকে বকেই চলেছে । আমি ততক্ষণে এক লাফে মাটিতে। চার ন্যুব্রা ভ্যালির হোটেলে এক রাত কাটিয়ে পরের দিন ফিরে এলাম লেহ ‘র হোটেলে এ ।সেখান থেকে অন্য একটি রাস্তা ধরে এবারে যাব কারগিল এ। একেবারে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যবর্তী Line of control অবধি ।সকালে ঘুম থেকে উঠেই কারগিল এর কথা টা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করি ।আমার ধারণা কারগিল যুদ্ধের স্মৃতি প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের মনে একই রকমের উত্তেজনার জন্ম দেবে ।বিশেষ করে যে জায়গায় ভারতীয় ফৌজ মরণপণ সংগ্রাম করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল সেই যুদ্ধক্ষেত্রে আমি সশরীরে হাজির হব সেই ভাবনার রোমাঞ্চ লিখে বোঝাই এমন সামর্থ আমার নেই । সকালবেলা ছটা নাগাদ চা ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে বসি । এখান থেকে কারগিল প্রায় দুশো কুড়ি কিলমিটার ।আগেরদিন প্যাংগং লেক এর রাস্তাছিল খুবই খারাপ ।গাড়িতে যেতে যেতে ঝাঁকুনিতে কোমর আর পিঠে ব্যথা হয়ে গিয়েছিল তার উপরে উটে চড়ার অভিজ্ঞতাটা ও শরীরের পক্ষে মোটেই সুখকর হয়নি ।তাই দীর্ঘ পথ গাড়িতে যাবার কথা চিন্তা করে কিছুটা ভাবনা হচ্ছিল বটে,কিন্তু দেখলাম কারগিলে যাবার সড়কটি ভারি চমৎকার ।মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে আর আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে সিন্ধু নদ ।হাজার হাজার বছর ধরে সিন্ধু নদ এই ভাবেই নিঃশব্দে বয়ে চলেছে ।পথের দুপাশে সৌন্দর্য অপরূপ । এক নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে চলতে চলতে পৌছলাম দ্রাস নামে একটি নদীর ধারে গড়ে ওঠা একটি ছোট্ট পাহাড়ি শহর দ্রাসে । উচ্চতা জনিত কারণে শ্বাস কষ্ট ত ছিলই ,সেই সঙ্গে এবার যোগ হল প্রচন্ড ঠান্ডার কামড় । তবে এখানে আপাতত আমরা থামলামনা ।যদিও গাইড জানালেন কারগিল থেকে ফেরার সময়ে এই দ্রাসে একটি অদ্ভুত জিনিষ দেখতে পাব ।কিন্তু অদ্ভুত জিনিষ যে ঠিক কি তা কিন্তু তখনই ভাঙতে চাইলেননা । এই পথেই পড়ল লামায়ুরু নামে একটি গ্রাম – মুনল্যান্ড অফ লাদাখ বলে যার খ্যাতি ।এ গ্রামকে ঘিরে থাকা চারপাশের পাহাড়্ গুলি যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আলোকিত । বেশ কয়েকটি মনাস্ট্রী আর গোম্ফা আছে এখানে।তবে আমরা সেগুলিতে যাবনা । পাঁচ কারগিলে পৌঁছতে বেলা বেড়ে লাঞ্চের সময় হয়ে গিয়েছিল ।তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে নিয়ে আমরা ছুটলাম কারগিলের যুদ্ধক্ষেত্রে । কারগিল এর যুদ্ধে যে সব বীর ভারতীয় জওয়ান নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন তাদের স্মৃতিতে কারগিল পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত হয়েছে কারগিল শ্রদ্ধাঞ্জলি বেদি । বেদির মাঝখানে একশো ফুট উঁচু দন্ডের শীর্ষে উড়ছে ভারতের জাতীয় পতাকা ।অহর্নিশি জ্বলছে অমর জ্যোতি ।শ্রদ্ধাঞ্জলি বেদির একপাশে ফুলের বাগানে কারগিল যুদ্ধে যে সব সৈনিক শহীদ হয়েছেন তাদের নাম খোদাই করা অসংখ্য প্রস্তর ফলক রয়েছে ।বাগানের দুই পাশে রাখা আছে কারগিল যদ্ধে ব্যবহৃত বোফর্স কামান ,সাথে আছে একটি ছোট ফাইটার প্লেন । কাছেই একটি সংগ্রহশালায় কারগিল যুদ্ধে ব্যবহৃত নানান জিনিষ । এবার পালা আমাদের কারগিলে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে line of control যেখানে ,সেই জায়গায় যাবার। যে গাড়ি চেপে আমরা কারগিল এসেছিলাম সে গাড়ি সামনের সঙ্কীর্ণ পথে যেতে পারবেনা। তাই গাড়ি বদল হল। এবার আমরা ছোট গাড়িতে ।সে গাড়ি যতই পাহাড়ের ওপর দিকে উঠতে থাকে ততই দেখি সংকীর্ণ পথের দুই পাশে খাদ গভীরতর হতে থাকে। প্রায় ঘন্টা তিনেক পাকদন্ডী পথ অতিক্রম করে পাহাড় চুড়ায় পৌঁছে দেখতে পেলাম আমাদের অবস্থান থেকে অনেকটা নিচে প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানের গ্রাম – তার ঘরবাড়ি মসজিদ ...।কথায় কথায় জানতে পারলাম Line of control এর এপারে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাটাকে দেখছি তেমনি ওপারের পাকিস্তানী সেনাও সতর্ক নজরদারিতে রেখেছে আমাদের ।এ ভারি রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতা । কারগিল যুদ্ধের ক্ষত শুকিয়ে গেছে কিন্তু ক্ষতচিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে যায়নি ।জানাগেল এখনও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পোঁতা বহু মাইন ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ।সামান্য অসাবধানতায় মুহূর্তের মধ্যে ডেকে আনতে পারে ভয়ঙ্কর বিপদ । ১৯৯৯সালের হানাদারির পুনরাবৃত্তি রুখতে তাই এখন এত বছর পরেও ওই রকম দুর্গম জায়গায় অকরুণ প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে ভারতীয় সেনাবাহিনী সদাজাগ্রত প্রহরায় মোতায়েন রয়েছে ।Line of control এর এ পারে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর তৈরি করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখা হল ।ওই এলাকায় ছবি তোলা নিষিদ্ধ তা না জেনেই কিছু ছবিও তুলেছিলাম –যদিও সে ছবি প্রকাশ্যে দেখান অনুচিত কাজ হবে বলেই সেগুলি আড়ালেই থাক । কারগিল থেকে লেহ’তে ফেরার পথে পাহড়ের গায়ে মেঘ আর রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে বেশ কিছু দূর চলার পর গাড়ি এসে থামল এমন একটি জায়গায় যেখান থেকে অনেকটা নীচে পাহাড়তলিতে জান্সকার আর সিন্ধু নদের সঙ্গম স্থল টি ভালোভাবে দেখা যায় । আমরা বিমুগ্ধ হয়ে দেখলাম দুপাশের পাহাড়ের খাঁজে জান্সকার নদীর নীলচে জল গিয়ে মিশে গেছে সিন্ধু নদের ঘোলাটে জলধারার সঙ্গে । গোটা পরিবেশটা যেন কোন নিপুণ শিল্পীর তুলিতে আঁকা । কারগিলে যাবার কালে পথে দ্রাসে একটি চমকপ্রদ জিনিষ দেখতে পাব বলে জেনেছিলাম আমাদের গাইডের কাছে । এই বারে আমরা সেই জায়গায় পৌঁছলাম ।গাইড মজা করার মত করে বললেন কারগিলে যাবার সময় আপনাদের একটা চমকপ্রদ জিনিষ দেখাব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ।এবারে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার পালা । আমরা এবার দেখব ম্যাগনেটিক হিল এর ম্যাজিক ।কথাগুলি বলতে বলতে ড্রাইভারকে কিছু ইঙ্গিত করলেন। গাড়ির চালক অমনি ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে ,ব্রেকের ওপর থেকে সরিয়ে নিল তার পা । অবাক কান্ড !!সাধারণত এমন অবস্থায় ঢালু পথে গাড়ি নিচের দিকে গড়িয়ে যাবার কথা ।কিন্তু আমাদের সবাইকে আশ্চর্য চকিত করে দিয়ে গাড়ি পিছনের চড়াই পথে পিছু হটতে শুরু করল । পরে গাইড আমাদের বোঝালেন যে এই অঞ্চলে পাহাড়ের নিচে আছে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র যার আকর্ষণে আমাদের ধাতব গাড়িটি নিচের দিকে গড়িয়ে না গিয়ে ঢালের বিপরিতে ওপরের দিকে আকর্ষিত হয়েছিল ।সত্যিই এটা এমনই একটা চমকপ্রদ ঘটনা যে স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । ম্যাগনেট হিল এর ম্যাজিক দেখে লেহ তে হোটেলে ফিরে এলাম ।পরের দিন সকাল সাতটায় লেহ বিমানবন্দর থেকে উড়ে চললাম ফিরতি পথে – দিল্লীর দিকে ।আর কোনদিন এখানে ফিরে আসব এমন দুরাশা করিনা ।তাই কিছুটা বিষন্ন দৃষ্টিতে প্লেনের জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি হিমালয় আর কারাকোরাম পর্বতমালা। মনে হল তারা যেন আকাশের দিকে হাততুলে আমাদের বলছে অলবিদা ...।

55

4

মনোজ ভট্টাচার্য

ইদিপাস থেকে বেটি এম্বেরেকো !

ইডিপাস কমপ্লেক্স কি শুধুই একটা ফ্রয়েডিয়ান মনোজগতের বিশ্লেষণ – একটা লিগাসি । শুধুমাত্র পুরুষদের ক্ষেত্রেই কি এটা সীমায়িত থাকে । নাকি নারী পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই এর দেখা মেলে ! সোফোক্লিশের গ্রীক ট্র্যাজেডি প্রায় খৃষ্টপূর্ব সাড়ে চার সো বছর আগেকার কাহিনি ও এর অনেক মনোস্তাত্তিক বিশ্লেষণ হয়েছে । গ্রীক পুরানের রাজা ইদিপাস বা আউদিপাউস কে নিয়ে এই কাহিনী কি শুধু বিয়োগান্ত নাটক ? এর কি কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই ! এমনও হতে পারে – এই ইদিপাস কমপ্লেক্স কেবল বাস্তবের কিছু বিকৃত মনোস্কামনার প্রতিফলন ! আমি কিন্তু দেখেছি এক বাস্তব কাহিনী – বন্ধুর মাকে নিয়ে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে । সেটা অবশ্য নিজের গর্ভধারিণী মা নয় ! - হয়ত এরকম অনেক ঘটনাই ঘটে । আমরা জেনেও ঘাড় ঘুরিয়ে থাকি। কিম্বা বিতর্কিত বিষয়ের দিকে যেতে চাই না ! অতি সম্প্রতি জিম্বাবুয়েতে ৪০ বছরের বেটি এম্বেরেকো নামে এক মহিলা তার ২৩ বছর বয়সী ছেলের সাথে যৌনমিলনে ছ মাসের সন্তান সম্ভাবনা হয়েছে । আর তাই তারা কোর্টে পরস্পরকে বিয়ে করবে বলে অনুমতি চেয়েছে । বেটি বারো বছর আগে স্বামীহারা হয়েছে । তারপর দেওররা তাকে বিয়ে করতে চাওয়া সত্ত্বেও সে কাউকে বিয়ে করতে চায় নি । - তখন তার ছেলেকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম করেছে । ছেলেকে স্কুল ও কলেজে পড়িয়েছে । - এই সময়ে স্বভাবতভাবে দুজনে দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে । বেটি যখন কোর্টে বলে – যেহেতু ছেলেকে বড় করেছে কলেজে পড়িয়েছে – তাই তার ছেলের প্রতি তার অধিকার রয়েছে । তাই ছেলে অন্য বান্ধবীকে বিয়ে করার আগেই সে ছেলের সঙ্গে যৌনতায় মিলিত হয়েছে ও তার বাচ্চার মা হতে চলেছে । তাই সে ছেলেকে বিয়ে করার অনুমতি চাইছে ! – এই খবরে সেখানে খুব তোলপাড় শুরু হয়েছে । এখানে ব্যাপারটা নিয়ে বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় – রাজা অদিপাউস যুদ্ধে জিতে পিতাকে হত্যা করে তার স্ত্রীয়ের দখল নিল । সে কিন্তু তখনও জানত না – নিহত রাজা ও তার স্ত্রী - তারই জন্মদাতা পিতা ও মাতা ! – তাই তাদের মিলনে চার সন্তান হয় ! এক মেয়ের নাম অ্যান্টিগোনে ! সেই প্রতিবাদিনী মেয়ে অ্যান্তিগনে ! তখন তো থীবেস শহরে বিরাট আন্দোলন পড়ে গেছে ! – সে তো গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী ! কিন্তু জিম্বাবয়ের ঘটনায় বেটি সজ্ঞানে ও অকপটভাবে দাবি করছে – সে তার দেওরদের বিয়ে না করে ও ছেলের বান্ধবীর হাত থেকে অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে চায় ! বেটির এই দৃঢ়তার জন্যে সেখানকার আদালত তাকে বিয়ের অনুমতি দিতে বাধ্য হচ্ছে ! মনোজ

40

1

শিবাংশু

দুর্গগুড়ির মিথুনমূর্তিরা

পশ্চিমি চালুক্যরা মন্দিরটি যখন নির্মাণ করেছিলেন, অর্থাৎ সপ্তম-অষ্টম শতকে, তখন দেশে গুপ্তযুগের শানশৌকতের স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়নি। উত্তরভারতের প্রতাপী রাজারা ছিলেন কনৌজে যশোবর্মণ, কাশ্মিরে ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়। ওড়িশায় ভৌমকার বংশের শিবাকর উন্মত্তকেশরী তখন সিংহাসনে। দুর্গগুড়ির সমসাময়িক উল্লেখযোগ্য মন্দির অবশেষ আমি দেখেছি ভুবনেশ্বরের পরশুরামেশ্বর মন্দিরে। এই দুই মন্দিরে স্থাপত্য বা ভাস্কর্যের উৎকর্ষ নিয়ে কোনও মন্তব্যই হয়তো যথেষ্ট নয়। তবে সেই সময়ের মন্দির স্থাপত্যে মিথুন বা যুগলমূর্তির প্রচলন তেমনভাবে দেখতে পাওয়া যায়না। কিন্তু পশ্চিমি চালুক্যদের দুর্গাগুড়িতে দেবদেবীনিরপেক্ষ যুগল ও মিথুন মূর্তির সুলভতা একটু অবাক করেছে। এর পিছনে তৎকালীন জনজীবনে বৌদ্ধ তন্ত্র বা শৈব তন্ত্রের প্রাবল্য প্রতিফলিত হয়। পাথরে খোদিত এসব কবিতা তেরোশো বছর কালের কবলে থাকার পরেও আমাদের চমকে দেয়। বুন্দেলখণ্ডি বা কলিঙ্গ মিথুনকাল্ট তখনও দু-তিনশো বছর দূরে। অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে থেকে কয়েকটি নমুনা এখানে থাকলো। তৎকালীন পোষাক-আশাক, সাজসজ্জা, প্রসাধন-শৃঙ্গারের প্রামাণ্য আভাস পাওয়া যায় এইসব ভাস্কর্যে। আপনাদের জন্য,

40

3

Ranjan Roy

গুপী গাইন বাঘা বাইন পঞ্চাশ বছর পর

<গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখে কোন সার্থক শিল্পে এমন কিছু উপাদান থাকে যা স্রষ্টার নিজের কালখন্ড পেরিয়েও দর্শক / পাঠকের মনে ঢেউ তুলতে পারে। দর্শক নিজের পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে সেখানে সম্পর্ক খুঁজে পায়, তার মনে হয় এ তো আমারই কথা । এই অভিঘাত সবসময় শিল্পী বা স্রষ্টার অভিপ্রেত নাও হতে পারে। কিন্তু তাতে কি আসে যায়! এক শতাব্দী আগের এক রাত । রাশিয়ায় নতুন ধারার নাটকের দল মস্কো আর্ট থিয়েটার করছে ইবসেনে’র ‘এনিমি অফ দ্য পিপল’ ( সত্যজিতের চিত্ররূপ ‘গণশত্রু’)। শহরের রাস্তায় তখন শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলিত জনতা গড়ে তুলছে ব্যারিকেড, দমন ও সংঘাত চলছে। স্তানিস্লাভস্কি লিখেছেন যে সেদিন বিভিন্ন নাট্যমুহুর্তে এবং ডায়লগে দর্শকেরা যেভাবে সাড়া দিচ্ছিল তা অভুতপূর্ব। স্তকমান যখন একটা ছেঁড়াশার্ট নিয়ে কিছু বললেন দর্শক উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। কারণ ঘোড়সওয়ার পুলিশের হামলায় ‘ছেঁড়া শার্ট’ সহজেই দর্শককে আবেগে ভাসিয়ে দিচ্ছে। নাটক দেখে অনেকেরই আবার ব্যারিকেডে ফিরে যাওয়ার কথা । এসব কথা বলার একটাই কারণ। অর্ধশতাব্দী পরে সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ দেখে সেটা আজ ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হওয়া। ১৯৬৯ সালে যখন ছবিটি মুক্তি পায় তখন শহর কোলকাতায়ঃ ‘স্কুল কলেজে খিল, রাস্তায় মিছিল। ক্র্যাকারের শব্দে কাঁপে রাজপথ কিনু গোয়ালার গলি। হীরের টুকরো ছেলেরা সব অশ্বমেধের বলি।‘ সেইসব দিনে আঠের-উনিশ বছরের ছেলেদের চোখে এই ফিল্মটি তার যোগ্য মর্যাদা পায় নি । মনে হয়েছিল যে রূপকথার মোড়কে এটি একটি শান্তিবাদী ফিল্ম। এই ফিল্ম ন্যায় ও অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে কোন ফারাক করে না । বাস্তবজীবনের প্রতিনিয়ত হিংসা ও অন্যায়কে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে শিখিয়ে আসলে এটি স্থিতাবস্থার পক্ষে ওকালত করে । তারপর গত পঞ্চাশ বছর ধরে গঙ্গা – যমুনা-নর্মদা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আজকে সত্তর বছরের বুড়িছোঁয়া চোখে এই ফিল্ম আবার দেখলে মনে হয় এর কমিউনিকেশনের সুর অনেক সূক্ষ্ম তারে বাঁধা। এর আবেদন মানুষের প্রাকৃতিক শুভবুদ্ধির কাছে। কারণ মানুষ জীবনকে উপভোগ করতে চায়—একা একা নয় , মিলে মিশে। মানুষ পেট ভরে খেতে চায়, আনন্দে বাঁচতে চায়, ভালবাসতে চায়। উলটো দিকে ক্ষমতার লোভে মদমত্ত মন্ত্রী ও বরফি জাদুকরের দল প্রজাদের বোবা করে রাখতে চায়, হিংসার বিষবাষ্পে ওদের চেতনায় জাগিয়ে তোলে পড়শি দেশের জন্যে ঘৃণা ও রক্তের স্বাদ পাবার ইচ্ছে। হাল্লা যখন নিজেকে ভুলে যুদ্ধোন্মাদ হয়ে বর্শা হাতে নিয়ে বীরবিক্রমে বেয়নেট চার্জের অভ্যাসে মেতে ওঠে ও সবাইকে এই কুচকাওয়াজে বাধ্য করে , তখন আমরা চমকে উঠে যেন শুনতে যেই ‘দুশমনকে ঘর ঘর মেঁ ঘুসকর মারেঙ্গে।‘ যে রণদামামা এই ভোটের বাজারে প্রতিনিয়ত বেজে চলেছে এ যেন তারই প্রতিধ্বনি। গান ও নাচ চলে ‘সকলে মিলিয়া শুনহ তোমরাহাল্লা চলেছে যুদ্ধে’। জনতা উন্মাদনায় মেতে উঠছে। ভুলে যাচ্ছে শুণ্ডি ও হাল্লা --দুটি রাজ্যই একসময় অভিন্ন ছিল, শুধু পরে দুইভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে দুটো আলাদা রাজ্য হয়েছে। খিদেয় কাতর গুপ্তচর চিন্ময় রায় লোভী দৃষ্টিতে মন্ত্রীর ভুরিভোজনের দিকে তাকিয়ে ধমক খায়। শোনে –এখন প্রতিবেশি রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে তখন কি খিদের কথা শোভা পায় ? চিন্ময় মেনে গুটিয়ে যান। আমরাও মেনে নিই যে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রশ্নই বড়। এখন কি চাষির আত্মহত্যা, বেকারত্ব, বাড়তি দাম নিয়ে কথা বলা উচিৎ? তাহলে কেমন দেশপ্রেমী আমরা? আমরা মেনে নেই আমরা প্রজা; দেশ চালাচ্ছেন রাজারা। তাঁদের প্রশ্ন করা চলবে না । এও দেখি যে শাসক শিল্পরসিক, সে দুর্বল। তাকে যে কেউ আক্রমণ করতে পারে। তাই শুন্ডি নয় আমাদের চাই হাল্লা রাজা। সে আমাদের সুরক্ষা কবচ। শুন্ডির তো ঘোড়া নেই, হাতি নেই, উট নেই। এমন দেশে থাকব কেন ? আমাদের মিগ চাই , অগাস্টা হেলিকপ্টার চাই , রাফেল ফাইটার প্লেন চাই , তবে আমরা নিশ্চিন্ত। কিন্তু গুপী ও বাঘা যে উলটো গায়ঃ ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল! মিথ্যে অস্ত্রশস্ত্র ধরে প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে রাজ্যে রাজ্যে হানাহানি সবার অমঙ্গল! এমন অলুক্ষুণে কথা ! মানছি, সীমান্ত থেকে কাশ্মীর থেকে মাঝে মধ্যেই কফিন আসছে। পতাকায় মোড়া বডি, গান স্যালুট, পদক সবই হচ্ছে। সবই সত্যি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে সরকারি চাকরির, কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের। কথা নিশ্চয়ই রাখা হয়, আমরা জানতে পারি না । এহ বাহ্য। ভাল হত না যদি কোন গ্রামেই কোন কফিন না যেত? না এপারে, না ওপারে।সব সৈনিক ছুটিতে বাড়ি ফিরতে পারত—কফিনে না শুয়ে? আমরা কি গুপীর গানের প্রতিধ্বনি করছি? এটা কি রাষ্ট্রবিরোধী ফিল্ম? শুরুতেই দেখুন ঝামেলা। রাজার পছন্দ হয় নি গুপীর বেসুরো গান। তাই উলটো গাধায় চড়িয়ে গাঁ থেকে ওকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। উল্লাসে ফেটে পড়ছে আমোদগেঁড়ে জনতা। দূর থেকে কাপড়ের খুঁটে চোখ মোছে গুপীর বাবা কানু কাইন। ও তো আগেই ছেলেকে মানা করেছিল রাজার কাছে গিয়ে গান গাইবার বোকামি না করতে! শুনলে তো? হ্যাঁ, আমরাও শিল্পীর লাঞ্ছনায় চোখের জল লুকিয়ে মুছে ফেলছি। যখন আজকালকার রাজা সায়েবের রুচির বিরুদ্ধে বলে গাইতে দেওয়া হচ্ছে না গজল গায়ক পাকিস্তানের গুলাম আলীকে, কেরালার এক গায়ককে। আমরা চোখ মুছেচি আগেও যখন বুড়ো বয়সে শিল্পী হুসেনকে হেনস্থা করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হল। বাহাদুর শাহের মতনই তাঁরও হিন্দুস্তানে ‘দো গজ জমিন’ নসীব হল না । আমির খান, নাসিরুদ্দিন শাহকে বারে বারে পাকিস্থান যেতে বলা হল। এমনকি বরখা দত্ত, নাসির ও আরও কয়েকজনকে দেশের আভ্যন্তরীণ শত্রু আখ্যা দিয়ে ঘরে ঢুকে টেনে বের করে মারার নিদান দেওয়া হল, প্রকাশ্যে। এই রূপকথার ফিল্মে হিংসা হেরে যায়, প্রত্যাশামত । মন্ত্রী মশাই ষড়যন্ত্রীমশাই এবং বরফি যাদুকরের দল হাওয়ায় মিলিয়ে যায় । দুই পড়শি দেশ মোহমুক্ত হয়ে কোলাকুলি করে । এই ভোরের স্বপ্ন কি আমাদের জীবনে সত্যি হবে? ততদিন আমরা শুনব গুপীবাঘার সেই গান যা সবাই গাইতে পারে নিজের মত করে আর যে গানের দুনিয়ায়‘উঁচা -নীচা-ছোট-বড় ভেদ নাই’।>

38

7

মনোজ ভট্টাচার্য

গন্ধ নিয়ে কটা কথা !

এ নামটা শুনে কিরকম - শিবরাম চক্রবর্তীর গন্ধ চুরির মামলা ধরনের মনে হচ্ছে না ? পয়সার অভাবে স্রেফ ভাত খেত গন্ধের সঙ্গে মাখিয়ে ! - কিন্তু শুধুমাত্র পাঠকরাই বুঝতেই পারবেন – চুরি বা চৌকিদারি – এসব কিছু নয় ! আমি তো আর গল্প লিখতে পারিনা – বানাতেও পারি না । যেগুলো লিখি সেগুলি নেহাতই অন্য কারুর লেখার ওপর খানিকটা কেরদানি মারা ! অর্থাৎ কিনা কারুর কোন লেখার গুনকীর্তন করা । - আবার এত ভাল ভাল লেখা চোখে পড়ে – যে সেই সব লেখার প্রশস্তি লিখতে হলে আমাকেই ভাল লিখতে হবে ! গন্ধের ব্যাপারে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে যে গন্ধটা সেটা হল নতুন বইয়ের গন্ধ ! সেটা অবশ্য শুধু গন্ধই নয় – দর্শনও বটে ! নতুন বইয়ের ঝক-ঝকে মলাট আর কাগজের গন্ধ ! – কোন নতুন বই কিনতে পারলে – মনে হয় আমি লেখককে প্রকাশককে আর দপ্তরিকে একসঙ্গে কিনে ফেলেছি ! ইচ্ছে করেই কদিন হাতে করে ঘুরে বেড়াই – সবাই দেখুক ! - সঙ্গে সঙ্গে আবার চিন্তা – কেউ চেয়ে বসলেই মুস্কিল । চিরকাল শুনে এসেছি – বই আর বউকে নাকি কাউকে ধার দিতে নেই ! – কেউই ফেরত দিতে চায় না ! আজকাল অবশ্য বউকে ধার নেয়ও না কেউ । দ্ৰৌপদিকে নিয়ে যা ক্যাচাল হয়েছিল ! একটা সময় ছিল যখন কলেজ থেকে বেড়িয়ে কফি হাউসে যেতাম – হাতে থাকত লোলিটা বা লেডি চ্যাটারলিজ লাভার ! নিজে বুঝি বা না-বুঝি - মনে ভাবতাম অন্যে বুঝবে না ! কিন্তু লোলিটার একটা উত্তাপ ছিল – প্রত্যেকেই একবার হাতে নিয়ে দেখত ! এ ছাড়া গন্ধ - - ! আমার পিতামহর বইয়ের আলমারিতে অনেক ইংরিজি সাহিত্যের বই ছিল । তাঁর মধ্যে ডফিন দ্য ম্যরিয়ের একটা বই ছিল । বইটা চুরি করে পড়তাম ও সবাইকে দেখানর জন্যে হাতে নিয়ে ঘুরতাম । পড়ার পর দেখলাম গল্পটা শুধু রগরগেই নয় – বেশ গুরুতর ধরনের ! মানে সত্যি করেই যাকে বলে - অ্যাডাল্ট ! না - গন্ধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি । - একদিন সকালে বাজারে যাচ্ছি – হঠাৎ নাকে ভেসে এলো ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ ! – আরে ! এত সকালে ইলিশ-মাছ ভাজে কে ! ইলিশ-মাছ ভাজা যে আমার খুব প্রিয় – তা নয় ! তবু পয়লা বৈশাখে নাকি পাঁচ হাজারে মাছ বিক্রি হয়েছে ! পড়ে বেশ একটা – আঙ্গুর ফল টক গোছের আত্মশ্লাঘা বিধ করি ! - নিজেকে সান্ত্বনা দিই – কারুর হয়ত সকাল সকাল কাজে যেতে হয় ! – পরের দিন আবার গরম ভাতের ওপর মুশুর ডালের গন্ধ ! এটা আমার প্রথম জীবনের খাদ্য ছিল । খুব সকালে কাজে যেতে হত ! সে গন্ধ ভুলি কি করে ! আর এই গন্ধটা মনে হলেই পেটের মধ্যে একটা গুড়গুড় ভাব হতে থাকে ! – কিন্তু রোজ রোজ এমন গন্ধ নাকে আসেই বা কোত্থেকে ! পরে জানতে পেরেছিলাম – কোন একটা ফ্ল্যাটে সকাল সকাল রান্না করে দোকানে সাপ্লাই করতে হয় ! এই কমপ্লেক্সের চারদিকে প্রচুর সোনা কারবারিদের বসবাস এবং তারই সঙ্গে সোনা পরিশোধনের অ্যাসিড প্রয়োগ - ফলে সক্কাল সক্কাল আমরা সোনার স্বপ্ন দেখিনা বরং সোনা পরিশোধনের গন্ধ নিশ্চয় পাই ! সে কি দুর্গন্ধ ! সকালে প্রাতর্ভ্রমণ করতে আজকাল ডাক্তাররা বারন করে । বাতাসে নাকি অক্সিজেনের বদলে দূষিত কার্বন ভেজাল আসছে ! – এটা ঘুম-কাতুরে মানুষদের পক্ষে খুব ভাল অজুহাত ! গন্ধের কথা উঠলোই যদি – তবে বলি রবার্ট ব্লেক আর ইন্সপেক্টর স্মিথ, কিরীটী রায়- সুব্রত এবং ফেলুদা-তোপসের কথা খুব মনে আসে । - কোন খুনের দৃশ্যে গিয়েই কিরকম শুঁকতে শুরু করে । সেই দৃশ্যে তো মৃতদেহ ছাড়া আর কিছুই শোঁকার মতো নয় । অথচ ভাবখানা যেন – খুনী খুন করার আগে ড্রেসিং টেবিলে বসে সেন্ট মেখে খুন করেছে ! – এইসব মনে এলেই মনটা খুব উদাস হয়ে যায় । অনেকদিন পর্যন্ত আমার খুব ইচ্ছে ছিল – ডিটেকটিভ হবার । - হাসবেন না যেন – সেই উদ্দেশ্যে গ্লোব ডিটেকটিভ কোম্পানিতে গেছিলামও ! – কিন্তু মুস্কিল হল – ওরা কোন পয়সা দেবে না ! পয়সা না পেলে ডিটেকটিভদের চলে কি করে ! – তা সেই ভাবনাও ছাড়তে হল ! ডিটেকটিভ হওয়া আর হল না ! এবার বলি একটু বিদেশের কিছু কথা । বেশ কিছুদিন বিদেশে থাকার ফলে ওখানকার রাস্তায়-ঘাটে গাড়িও চালাতে হত । আর হাইওয়েতে স্পীড লিমিট পঁয়ষট্টি মাইল হওয়া সত্ত্বেও – কখন যে পায়ের চাপে নব্বই একশ হয়ে যেত - বোঝাই যেত না । - চিক চিক আলো আর ওঅ্যাঁও ওঅ্যাঁও আওয়াজ পাশে এসে গেলেই গাড়ি থামাতে হত । - সুদর্শন ইনস্পেক্টর এসে আগেই জানলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে শুঁকতে থাকে । প্রথম প্রথম বুঝতেই পারতাম না । কি শোঁকে ! গাড়িতে যদি জন্মদিনের পোশাক পড়ে কেউ থাকে – তাতে ওরা তাকিয়েও দেখবে না । - পরে বুঝেছি ওরা ড্রাগ বা অ্যালকোহলের গন্ধ খোঁজে । - কোনোক্রমে একটু গন্ধ পেলেই – গাড়ি থেকে নামাবে – নাকের সামনে ইনহেলার ধরবে- তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে মেরী ক্রিসমাস বলে – টিকিট ধরিয়ে দেবে ! – শুনেছি ওদেরও মাসিক কোটা থাকে টিকিটের । একটা গন্ধ – কেউ সেটা পছন্দ করবে না । তাই সেটা আর লিখছি না ! মনোজ

59

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের শেষ বাদশা !

কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের শেষ বাদশা ! আচ্ছা – জন্মভূমি বললে কি কেবল শস্যশ্যামলা ধানক্ষেত, পুকুরের মাছ, আর দৃষ্টি সীমান্তে রেল লাইন – যেখান দিয়ে কু-ঝিক ঝিক ট্রেন যাচ্ছে । সেই পথের পাঁচালির অপু-দুর্গার সিল্যুয়েট বোঝায় ! – আমার মতে জন্মভূমির মধ্যে শহর আসে – তার মধ্যে শতাধিক বছরের পুরনো বাড়ি – সেখানে বাড়িওলা ভাড়াটেরা থাকে – বাইরে রাস্তা দিয়ে ফিটন ল্যান্ডো গাড়ি, গরুর গাড়ি –দুপুরে ভিস্তিওলার জল দিয়ে রাস্তা ভেজানো । সেই জল সামলে কোনক্রমে ট্রামের সেকেন্ড ক্লাশের যাত্রী হয়ে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে আড়াইটে নাগাদ নেমে পড়া – এবং রুপালি পর্দার হাতছানি । - উদয়ের পথে! আচ্ছা – এটা কি হতে পারে – চিত্রা হলে আমি প্রথমে মহাপ্রস্থানের পথে দেখেছি ? উনি বললেন – আমার তা মনে নেই – তবে উদয়ের পথে চিত্রায় রিলিজ হয়েছিলো ! আমার প্রশ্ন – আগে তো চিত্রা নাম ছিল – কবে থেকে মিত্রা হল ! – উত্তরটা একটু জটিল । কারন ১৯৩১ সালে - চিত্রা হলটা তৈরি করেছিল স্বয়ং বীরেন সরকার ! প্রকৃতপক্ষে বীরেন সরকারের হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র-জগৎ তৈরি হয়েছিলো ! – সেই হেন বীরেন সরকারকে আইনের মামলায় হেরে যেতে হয়েছিল । - সেটা অবশ্য ওদের পারিবারিক ঘটনা । আইনের ছাত্র দিপেন মিত্তির পরিবারকে বাঁচাতে এসে হাল ধরলেন মিত্রার ১৯৬৩ সালে । তখন থেকে এক নাগাড়ে এই হলটাই ওনার ঘরবাড়ি হয়ে গেল । অথচ প্রথম দিনেই গেটের দরোয়ান ঢুকতে দিতে চায়নি – মালিককে চেনেনা বলে ! বাবার নাম বলতে ঢুকতে পারে । একাদিক্রমে চালিয়ে - ছেচল্লিশ বছরের সন্তানকে মৃত ঘোষণা করা খুবই কঠিন ! তবু সতেরজন সহকর্মীর যথাসম্ভব বন্দোব্যস্ত করে – ও একমাত্র ভাইপোর ঘাড়ে ওদের দায়িত্ব দিয়ে রেহাই চান । কারন ওনারও শারীরিক অবনতি হচ্ছে ! এই হলটা যতটা আপনার – ততটাই আমাদেরও । কারন খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা এই হলে আসছি, লাইনে দাঁড়িয়ে মারপিট করেছি নিকাশিপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে । - পাঁচ আনা থেকে শুরু করে কত যে পয়সা দিয়েছি ! – তাই যত রক্তক্ষরণ হচ্ছে আপনার হৃদয় – তত রক্ত আমাদেরও গেছে – লাইনের মারামারিতে ! তবু মনটা হু হু করে ওঠে যখন – সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে - খোলা হলের ভেতর তাকাই । বিরাট প্রেক্ষাগৃহের ভেতরটা শুধু অন্ধকার নয় – বাংলা সিনেমার ইতিহাসও জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে বিরাট মুখব্যাদন করে আছে । – মনে করার চেষ্টা করি শেষবার সিনেমা দেখতে এসে কোথায় বসেছিলাম । যতদূর মনে পড়ে – আগে চিত্রা হলে হিন্দি সিনেমাই রিলিজ হত । - কিন্তু পরের দিকে বাংলা হিন্দি এমনকি ইংরিজি সিনেমাও রিলিজ হয়েছে ! ভেতরের দেওয়ালের কারুকাজ মোটামুটি একই ছিল । কিন্তু সিটের অবস্থান বদল হয়েছে । - অতি সম্প্রতি আরও একবার পালটানো হোল । যদি আরও দর্শক আনা যায় ! – কিন্তু – পতনোন্মুখ পাথরের গতি কে আটকাতে পারে ! সবাই এখন আইনক্স-গামী ! এই প্রসঙ্গে লিখি – আমেরিকাতেও ঠিক একইভাবে প্রেক্ষাগৃহের শেষ অবস্থা হয়েছিল । টেলিভিশন শিল্পের উন্নতির ফলে – সিঙ্গল স্ক্রিনের হলগুলোর প্রায় সমাপ্তি ঘটছিল । কিন্তু চলচ্চিত্র-শিল্পের অবনতি হয় নি ! – ক্রমে আইনক্সের টিকিটের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে আবার পুরনো হলেই ফিরে এসেছে দর্শকেরা । - একই সঙ্গে আইনক্সও চলছে সিনেমা হলও চলছে ! – এই কারনে আমি খুবই আশাবাদী ! – পুরনো হলগুলো এখনই মল বা ফ্ল্যাটবাড়িতে রূপান্তরিত না করাই সমীচীন হবে ! – কারন আমাদের সিনেমা-শিল্পের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে ! দর্শক আবার ফিরে আসবেই ! এ-কথা ও-কথা সে-কথার আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে কেটে গেল প্রায় দুঘণ্টা । তার পর যখন ফেরার কথা বলেছি – তখনই আগামি সাক্ষাতের দিনটাও ঠিক করে নিতে চান । - খুবই মিশুকে খোলামেলা দর্জিপাড়ার মিত্তিরদের এই ভদ্রলোক । অথচ হলের ভার সামলাতে সামলাতে – না কোথাও ঘুরেছেন না কোন সামাজিকতা রক্ষা করেছেন। বিশ্বাস করুন – নিজের বিয়েটাও করে উঠতে পারেন নি ! যাইহোক, আমাদের তুলে দিতে এসে – দেখলাম তাঁর জনপ্রিয়তা । ওপার থেকে অনেকে এপারে এসে দাঁড়িয়েছে ওনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে ! – আমাদের গাড়িটা আসতে দেরি হচ্ছিল । ততক্ষণ ঐ প্রতিবেশী ও মিত্রার সহকর্মীরা আমাদের একটা ব্যারিকেড মতো করে ভিড়ের থেকে আটকাচ্ছিল ! – গাড়িটা সামনে আসতে আমরা উঠে পড়ি । পেছন ফিরে দেখি অনেক লোকের মধ্যেও কিরকম একাকী – ভীষণ একাকি একটা ফাঁকা সিনেমা হলের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের শেষ বাদশা ! মনোজ বেশ কিছুদিন আগে এনাকে নিয়েই একটা লেখা দিয়েছিলাম - আরেক সিনেমাওয়ালা ! তখনও মিত্র্রাকে রক্ত দেওয়া হচ্ছিল | তখনও চিন্তা করছিলাম - হয়ত বেঁচে যাবে এবার ! কিন্তু এবার মালিকই যে বিপন্ন ! কে কাকে বাঁচাবে ?

67

4

শিবাংশু

পুরিয়াধনাসি

সুখের গান একদিন থেমে যায়, শুধু গুঁড়ো গুঁড়ো সুখস্মৃতি ধুলোর সঙ্গে মাখামাখি হয়ে ছড়িয়ে যায় চরাচরে। কিন্তু বিষাদ সঙ্গীত কখনও ফুরোয়না। মিড় গমক মূর্চ্ছনার ধরন হয়তো পাল্টে যায় অনাগত প্রজন্মে, কিন্তু আরোহ অবরোহের স্বর একই থাকে। সেই গান যখন শুনি মিহির সেনগুপ্ত বা তপন রায়চৌধুরির মতো ওস্তাদদের থেকে তখন তার ঝলক হয়তো উজ্জ্বলতর, কিন্তু অন্যরাও যখন সেই রাগই ধরেন নিজস্ব ধরনে, চুপ করে শুনতে হয়। মার্সিয়া, কাফিয়ার কি কোনও জাত আছে? এই অলেখাটি তিন বছর আগে লিখেছিলুম। হঠাৎ ফিরে এলো আজ । আবার এমন একটা সময়ে যখন আমাদের নিজের দেশকে যেন অচেনা লাগতে শুরু করেছে। আমরা এপারের লোক। এই যে ছবিটা নীচে। এটা আমার প্রপিতামহের গ্রাম। কামারপুকুর থেকে গড়বেতার পথের ধারে। কিছুটা হুগলি, কিছুটা মেদিনীপুর। টাটার বড়োসাহেব পিতামহ প্রাসাদ হাঁকিয়েছিলেন গড়বেতায় রাধানগরে। স্টেশনের পাশে বর্ধিষ্ণু আধাশহর। কিন্তু আমাদের মামাবাড়ি ওপারে। দাদামশাই মাদারিপুর, দিদিমা চাঁদসি। দ্যাশে সম্পন্ন গৃহস্থ, উচ্চমধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী ছিলেন জামশেদপুরে। অনাড়ম্বর জীবন কাটাতেন খোট্টাদের দেশে আর প্রতিমাসে রোজগারের সিংহভাগ মনিঅর্ডারে যেতো দ্যাশে দাদার কাছে আরও জমি কেনার ইচ্ছায়। দাদার পোস্টকার্ড মাঝেমাঝেই, অমুকের zমি সস্তায় পাইলাম। মনে মনে বেড়ে উঠতো অবসরের পর দ্যাশে গিয়ে আদিগন্ত নিজের জমি দেখতে দেখতে একটু অম্বুরি তামাকের স্বপ্নবিলাস। পাঁচ মেয়ের বাবা। অন্য লোকে তাঁর জন্য দুশ্চিন্তা করলে নাকি বলতেন, আমার টাকা খায় কে? আরও অনেক অনেক লোকের মতো বিশ্বাসই করতে চাননি একদিন বুলবুলি ধান খেয়ে যেতে পারে। যখন সত্যিই বুলবুলি ধান খেয়ে গেলো, সাত মাসের মধ্যে সেরিব্রাল ও পক্ষাঘাত। প্রাণোচ্ছল, উচ্চপদাসীন মানুষটি নির্বাক, শয্যাশ্রয়ী হয়ে আরও বছর খানেক জীবনটিকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। ডাক্তার বিধান রায় দিদিমাকে বলেছিলেন, এঁর চিকিৎসার পিছনে আর খরচ কোরোনা, যা খুদকুঁড়ো বেঁচেছে তা দিয়ে মেয়েদের বিয়ে দাও। তার পর আরও কোটি মানুষের মতো শুধু লড়াইয়ের গল্প। মাদারিপুর আর কামারপুকুরের দিগন্তরেখা মিশে যায় মানুষের কান্না-ঘাম-রক্তে। মানুষগুলি আলাদা, কিন্তু গল্পগুলি সব একরকম। আমাদের দেশও তো এরকমই। কিন্তু সবার গল্পই মনে হয় যেন আরো শুনি। আমাদের পরের প্রজন্মে এর কোনও ছাপ থাকবে না, জলের আল্পনার মতো মিলিয়ে যাবে। কিন্তু যতোক্ষণ আমরা আছি এতো ফুরোবার নয়। কিন্তু ভোটছাপের রাজারা তো শোনেনা আমাদের গল্প। তারা বলে ভালোবাসা অলীক বস্তু। "...যুদ্ধ শেষ হ’য়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল; মানুষের লালসার শেষ নেই; উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতু ক্ষণ অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ অপরের মুখ ম্লান ক’রে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই। কেবলি আসন থেকে বড়ো, নবতর সিংহাসনে যাওয়া ছাড়া গতি নেই কোনো। মানুষের দুঃখ কষ্ট মিথ্যা নিষ্ফলতা বেড়ে যায়।" ব্যাধের জাল থেকে পাখি উড়ে যাওয়ার গল্পের মতো। কিন্তু কোন আকাশে যাবে পাখি? সিরিয়া থেকে সারাজেভো, কুর্দিস্তান থেকে পাকিস্তান.... কোথাও কি আকাশ বেঁচেছে কিছু?

85

6

Joy

ভোটের রঙ্গ-তামাশা ও আমরা দ্যাশবাসী...

আসব আসব করে এসেই গেল এবারের লোকসভা নির্বাচন| ভোট এলেই প্রতিবারের মত এবারেও অলোচনা‚ চর্চা‚ ভোট প্রচার‚ দেওয়াল লিখন‚ মীটিং‚ মিছিলের ভোট রঙ্গ| তিনটি দল বা সম্মিলিত শক্তি এবারের মুখ্য ভুমিকায়| কংগ্রেস‚ বিজেপি-এনডিএ এবং আঞ্চলিক দলগুলির জোট| জোট না ঘোট সেটা সময়ই বলবে| তবে এই জোট উত্তরপ্রদেশে এসপি-বিএসপি‚ পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস‚ ওড়িশায় বিজেডি‚ অন্ধ্রে টিডিপি‚ বিহারে আরজেডি এই দলগুলো বিজেপিকে কড়া টক্কর দেবে মনে হয়| পশ্চিম বঙ্গে বিজেপি দুটো-তিনটির বেশি আসন পাবে বলে মনে হয় না| এখানে সারদা-রোজভ্যালির মত আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে| পুলিশ-প্রশাসনেও দুর্নীতি| যা আগের সরকারের আমলেও ছিল‚ কিন্তু এখন অনেক বেশী হয়েছে| পাড়ায় পাড়ায় সিন্ডিকেট রাজ মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছে| এখানে সবাই রাজা| মস্তানদের আবার অনেক শাখা-প্রশাখা| যদিও দিদির ও দাদাদের কথায় কন্যাশ্রী‚ যুবশ্রী‚ সবুজসাথী আর নীল-সাদায় রং এ শ্রী ফিরেছে রাজ্যের| মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তা কমলেও আসনের কোনো হেরফের হবে বলে মনে হয় না| চারদিকে ফ্ল্যাগ‚ পোস্টার‚ দেওয়াল লিখন শুধু তৃণমূলের দখলে| ৯০% আর কোনো দলের প্রচার নেই| এককালের প্রভাবশালী সিপিএম পার্টির কয়েকজন সদস্যের দু:খ করে বলছিলেন সব দেওয়াল ওরা দখল করে নিয়েছে‚ আমরা কোথায় লিখব‚ বলুন তো? মনে পরে গেল কয়েক বছর আগের পুনরাবৃত্তি| সেই সময় সব দেওয়াল সিপিএম এর দখলে থাকত| পাড়ায় পাড়ায় ফ্ল্যাগ-ফেস্টুনে ভরে যেত| শুধু রংটা বদলে গেছে‚ বাকিটা একই আছে| বরং আরও খারাপই হয়েছে| পশ্চিম বঙ্গে একটা ট্রেন্ড অনেক দিন ধরেই দেখে আসছি এখানে যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা অনেকদিন ধরে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকে| আর সেই সময় বিরোধী দলগুলো খুব নগন্য বা গুটিয়ে থাকে| প্রতিপক্ষ দল ভালো না হলে যা হয় একছত্র আধিপত্য‚ স্বজন পোষন‚ দুর্নীতি ইত্যাদি| যা গনতন্ত্রের জন্যে মোটেও ভালো নয়| দিল্লিতেই একই অবস্থা| মোদী সরকারের প্রতিপক্ষ দল বলতে কংগ্রেস| সেই বিজেপির কাছে খুব কম শক্তিশালী| তবুও রাহুল গান্ধী আগের তুলনায় এখন অনেক পরিনত| গত পাঁচবছরে বিজেপি শাসিত মোদী সরকারের সুফলের প্রচার খুব ভাল ভাবে প্রচার হলেও অনেক প্রশ্ন থেকেই যায়| বিগত কয়েক বছরে রাহুল গান্ধী দেশের প্রতিটি প্রান্ত চষে ফেলেছেন| যেভাবে তিনি অনিল আম্বানীর কোম্পানীর রাফাল বিমান কেনা-বেচার মত ভয়ংকর দুর্নীতি নিয়ে প্রচার‚ চৌকিদার চোর হ্যায়‚ নোটবন্ধীর অসাফল্য জনমানসে কতটা প্রভাব ফেলে সেটা ভোটের বাক্সেই প্রমান হবে| আর ভোটের প্রচারে বোন প্রিয়ংকা গান্ধী বঢ়রাকে নিয়ে এসে কিছুটা চমক তো দিয়েছেন সেটা বলতেই হবে| কিন্তু প্রিয়ংকা গান্ধী শুধু ভোট প্রচারে না এসে ভোটে প্রতিদ্বন্বিতা করলে হয়ত ফলাফলটা অনেকটা অন্যরকম হত| প্রিয়ংকার চলাফেরা‚ দেখার সঙ্গে তার ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধীর অনেক মিল আছে| কিন্তু স্বামী রবার্ট বঢ়রার দুর্নীতির তদন্তের কারনেই মনে হয় তিনি পিছু হটলেন| পাঁচ বছর আগের মোদী আর এখন মোদীর অনেকটাই পার্থক্য আছে| তখন দেশের মানুষ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের বদলে বিজেপিকে কে চাইছিলেন| পরিবর্তন চেয়েছিলেন| মানুষের আশা-আঙ্খাখা অনেক ছিল| কিন্তু এই কয়বছরে তাদের সেই আশা ভরসা বেশির ভাগই পূরণ হয় নি| জাতীয়বাদে দেশবাসীকে আপ্লুত করে দিয়েছে বিজেপি ও তার সরকার| উরি ও তরপর সার্জিক্যাল আক্রমন হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে| কতটা সফল হয়েছে সেই অভিযান সেটা তর্ক সাপেক্ষ| প্রাচার প্রচুর হয়েছে| আমার দেশবাসী জাতীয়তাবাদে গদগদ হয়ে গেছি| এর আগে কোন যুদ্ধই হয়নি পাকিস্তান বা সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে আমাদের| এই প্রথমবার| তবে এর আগে এত প্রচার হয়নি|এত আক্রমনের পরেও পাকিস্তাএর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মোদী তথা বিজেপি সরকারের প্রতি সমর্থন জানানো গট আপ খেলা নয় তো? কে জানে রাজনীতিতে কত কিছুই তো হয়| বিজেপি এলে রামমন্দির হবেই হবেই| লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হবে| হিন্দুত্বদের দিকে আমরা আর ধাপ এগিয়ে যাব| গরুর মাংস খাওয়া| গরুর নাম করে খাসির মাংস ভক্ষনকারীদের পিটিয়ে মারা হবে| ভোটের জন্যে নগ্ন সাম্প্রদায়িকতাকে জিইয়ে রাখব| এখন ফেসবুকে হঠাৎ করে দেখি প্রচুর দেশভক্ত মানুষজন| যারা কিছু বিকৃত ভিডিও দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে| উস্কে দেয় সাম্প্রদায়িকতাকে| পুলওয়া হামলার পর পাড়ায় পাড়ায় বাকইধারী কিছু উটকো যুবকদের বন্দেমাতরম আর বিজেপির শ্লোগান খটকা লাগে এরা কারা| যত দেশভক্তি কি বিজেপির ই আমদানী? আমাদের প্রতিবেশী বেশিরভাগ দেশগুলির সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো নয়| এটা কি বিজেপি সরকারের ব্যর্থতা নয়| আমেরিকা সুপার পাওয়ার একটি দেশ কিন্তু শুধু আমেরিকাকে সন্তুষ্ট রাখলেই হবে না| মানুষ গরীব থেকে গরীবতর হয়েছে| এই সরকারের আমলেও অনেক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে| পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলির মত কেন্দ্রেও সেই রকম ইস্যু গুলো কেউ সেই ভাবে তুলে ধরতে পারেনি| রাহুল গান্ধী কিছুটা চেষ্টা করেছেন| তবে উত্তরপ্রদেশে সপা-বসপা এর সঙ্গে জোট বেঁধে যদি কংগ্রেস ভোটে লড়াই করত‚ তবে বিজেপির আসন অনেক কম হত| যদিও প্রচার ও অর্থ ক্ষমতায় বিজেপি লোকসভা ভোটের লড়াইতে অনেকটা এগিয়ে থাকবে| কংগ্রেস সব রাজ্যে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে ভালো ভাবে জোট বন্ধন করতে পারেনি| তবে এবারে বিজেপির আসন সংখ্যা আগের বারের থেকে কমবে তা বলাই বাহুল্য| আর পরে থাকে মমতার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক দলগুলির জোট বন্ধন| এরা ঠিকভাবে একইসুত্রে বেঁধে ভোটে লড়াই করলে এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা অন্যরকম হতেই পারে| তবে এই জোট কতটা ভালো দেশের জন্যে| আর কতদিন ঠিক থাকবে এই জোটের বন্ধন সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়| জোট মানেই জোট বদ্ধ সব পার্টির নিজের নিজের পার্টির ও নেতা-নেত্রীর অনেক স্বার্থ জড়িয়ে আছে| দেশ অনেক পরে| তার মধ্যে অনেকেই আবার দুর্নীতিগ্রস্থ| পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস দুটো-তিনটে আসন পেলও অনেক পাওয়া বলা যাবে| মুর্শিদাবাদে অধীরের দুর্গে ভাঙ্ন ধরেছে| আর অধীরের সেই একছত্র আধিপত্য আর নেই| মালদা আর রায়গঞ্জে কংগ্রেস কি করে দেখা যাক| সিপিএম তথা বামফ্রন্টের একটি আসনও পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিনা| যদিও রাজ্যে কংগ্রেস-সিপিএম জোট হত তাহলে দুপক্ষেরই কিছু লাভ হত| কিন্তু না হওয়াতে দিদির পোয়াবারো| দেওয়ালে দেওয়ালে তৃণমূলের শ্লোগান বিয়াল্লিশে-৪২| কোনো বিরোধী নেই| ভ্য় হয় সুস্থ গনতন্ত্র থাকবে তো?? লেখাটা কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়| ভোটের আগে এই রকম আলোচনা হওয়া উচিত বলেই আমার মনে হয়| তাহলে আমরা অনেক সচেতন ভাবে ভোট দিতে পারি| আলোচনা চলুক| আপনাদের মূল্যবান মতামত দিয়ে ব্লগটি সমৃদ্ধ করুন| যে কেউ এখানে অংশ গ্রহন করতে পারেন| তবে কোন ব্যক্তি আক্রমণ বা কুৎসা নয়| যুক্তি‚ তথ্য সমৃদ্ধ হোক আপনার আলোচনা| অপেক্ষায় থাকলাম| দিব্যেন্দু মজুমদার

97

3

জল

দীঘা ডায়েরী

31/03/19 - ভোর পাঁচটা ................| মনটা বেশ খারাপ| কখন থেকে উঠে বসে আছি‚ অথচ আকাশের মুখ ভার| আজও সানরাইজ দেখা হবে না| থোকা থোকা মেঘ আকাশের বুকে ইতি-উতি উড়ে চলেছে| দেখা যখন হবেই না‚ তখন না হয় একটু পরেই যাব মনে করে আবার গড়াবার প্ল্যান করি| কিন্তু একবার উঠে পড়লে হাজার চেষ্টা করেও আমি আর গড়াতে পারি না| অতএব ঘুমুন্ত গুল্লুর কানে কানে বলি 'সমুদ্রে পা ভেজাবি তো চল"| মন্ত্রের মত কাজ হয়ে‚ যাকে তোলাটাই বেশ কষ্টের‚ নিমেষে উঠে রেডি হয়ে নেয়| এত সকালেই চায়ের দোকানে ভিড় উপচে পড়েছে| বেশ কিছু পর্যটক এসে অপেক্ষা করছে রাস্তার মোড়ে চেক ইন করবে বলে| চেক ইন টাইম সকাল দশটা| সব হোটেলেই এটাই এখন নিয়ম| এবারে একটা জিনিস নজরে পড়ল যে আগের কয়েকবার একেবারেই লক্ষ্য পড়েনি‚ সেটা হল প্রচুর মুসলিমরা দীঘাতে আজকাল বেড়াতে আসছে| এত সকালেই রাতে মোমো‚ চাউমিন দিনে কচুরির দোকানে কচুরি ভাজার প্রস্তুতি চলেছে| অন্যান্য খাবার দোকানেও প্রস্তুতি চুড়ান্ত| আমরা আজ সরাসরি সমুদ্রপাড়ে না গিয়ে‚ সমুদ্রপাড় ধরে নিউদীঘার দিকে হাঁটতে থাকি| আমাদের মতই অনেকে হাঁটছে| এখনও গতদিনের বর্জ্য পুরোপুরি পরিস্কার হয়নি‚ ঝাড়ু চলেছে কোথাও কোথাও| পাড়ে বাঁধানো থানের ওপর অনেকেই ব্যাগ মাথায় দিয়ে শীতল হাওয়ায় ঘুমোচ্ছে| মেয়ে-পুরুষ দুই আছে| মেঘলা আকাশ সকালের হাওয়ায় হাঁটতে বেশ ভালো লাগছে| অনেকটা হেঁটে চলে যাই| এবার আবার ফিরতি পথে হাঁটা| যারা এতক্ষণ ব্যাগ মাথায় দিয়ে ঘুমোচ্ছিলো‚ তারা এখন সমুদ্রে নেমে পড়েছে| সম্ভব্ত স্থানীয় লোক| সমুদ্রে স্নান করে‚ সুলভ শৌচালয়ে বাকি কাজ সেরে আশে পাশে ঘুরে‚ হোটেলে খেয়ে সন্ধ্যায় হয়ত ফিরে যাবে| এখন তো সুলভ শৌচালয় এতগুলো যে সেখানেই স্নানসহ প্রাত্যহিক কাজ অনায়াসেই সেরে নেওয়া যায়| আজকের সমুদ্র বেশ উত্তাল| অনেকটা ওপর অবধি জল উঠে আসছে| শেষবারের মত পা ভিজিয়ে নেওয়া| রোদের আতস এখনো তেমন নেই| আলোর রেখা মেঘ থেকে মেঘে চুঁইয়ে গেলেও রোদের দেখা নেই| সূর্য লুকিয়ে মেঘের আড়ালে| সাতটা বাজতে চলেছে| হোটেলে ফিরি‚ সেই কচুরির দোকানে মস্ত ভিড়| এত সকালেই গরম গরম কচুরি পাতে পাতে| স্নান করে নিচে নেমে চা খেয়ে আমরা সমুদ্রপাড়ের সেই কচুরির দোকানেই চলে আসি| সকালের প্রাতরাশটা একটু বেশিই করে নিতে হবে‚ কারণ দুপুর বারোটার আগে কোন হোটেলেই ভাত মিলবে না| আমাদের হোটেল রেঁস্তোরাতেও নয়| এখন রেলওয়ে সময় মেনে চলে হোটেলগুলো| প্রচন্ড ভিড় দোকানে| ছ থেকে সাতজন হিমশিম খাচ্ছে| কেউ বেলছে‚ কেউ পুর ভরছে‚ কেউ ভাজছে‚ কেউ খেতে দিচ্ছে‚ কেউ ধুচ্ছে আর ভিতরে মস্ত ডেকচিতে চলেছে ময়দা মাখা| ৬ টা কচুরি কুড়ি টাকা| দু প্লেট নেওয়া হল| সত্যি খেতে ভালো কচুরি আর তরকারী| তরকারী ভালো না হলে কচুরি খেয়ে মজা নেই| কিন্তু এত বাতাসার সই কতক্ষণ থাকবে পেটে কে জানে? কচুরি গুল্লুও খেল খাবো না খাবো না করে| কেউ কেউ আবার প্যাকও করে নিচ্ছে| কচুরি খেয়ে আরও মিনিট কুড়ি বসি‚ রোদ এখন চড়চড় করে বাড়ছে| শুধু শুধু সকালটা মেঘে ঢেকে রাখল| আর সময় নেই| সকাল সাড়ে নটায় চেক আউট| গ্রেস টাইম আধঘন্টা| তারপরেও থাকতে হলে ওয়েটিংরুমে ওয়েট করা| আমাদের সব গোছানো একরকম‚ তাও শেষপর্যায়ের পাড়ে থাকা জিনিস সব গুছিয়ে নি| ঠিক দশটায় রিসেপশনে ফোন করতেই ওদের লোক এসে সব দেখে নেয়| রুটিন ব্যাপার| আমাদের হোটেল থেকে অটোস্ট্যান্ড একটুখানি| অটো ভর্তি না হলে ছাড়বে না| এইসব অটো উদয়পুর যাবে‚ উদয়পুর মাথাপিছু পঞ্চাশ| ল্যাগেজের জন্যও ভাড়া দিতে হল| নেমে গেলাম বাসগুমটিতে| পরপর বাস ছাড়ছে| ট্রেন না পেয়ে বেশিরভাগই বাসে ফিরছে| ট্রেনে ওয়েটিং চলছে ৩৫০| অতএব বাসই ভরসা| আমাদের বাস ১১-০০ টায়| এখন সাড়ে দশটা| বসি| আমাদের বাসের কোন খবর হয় না| তার মাঝেই পরের বাস বেড়িয়ে যায়| তাত বাড়ছে| এবার যেন মন ফেরার জন্য উদগ্রীব| মন সত্যিই বিচিত্র| একটু আগেই খারাপ লাগছিল এখন আবার ঘরে ফেরার টান| ১১-২০ তে বাসের খবর হয়| মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে বাস ছেড়ে দেয়| যতদূর দেখা যায় সমুদ্র চোখে পড়ে| হঠাৎ করেই চোখে পড়ে কোকলা হাউস| এতবার এসেছি‚ কোনদিন তো দেখিনি‚ এবার প্রথম চোখে পড়ল| আমার মায়ের পিসতুতো দাদার বাড়ি| এ বাড়ির কিছু অন্য গল্প আছে| এই কোকলা আর কোকের মধ্যে মিশিয়ে ফেলার একটা সমস্যা ছোটবেলাতে ছিল| কিন্তু দুটোর কোন মিলই নেই| কোকলা ছিল একটা হেয়ার ওয়েলের কোম্পানী| মায়ের পিসেমশায় মাথায় করে ফেরি করতে করতেই একসময় মস্ত কোম্পানী খুলে ফেলেছিলেন| সেই তেল বিক্রি করে কিনে ফেলেছিল কলকাতায় আরপুলি লেনে মস্ত বাড়ি| ঠিক এই বাড়ির গায়েই আমার পিসিমণি বাড়ি কিনেছিলেন| এখনও আছে| পরে মায়ের পিসতুতো ভাইরা ব্যবসা আরও বড় করে ফেলে| অন্যান্য অনেক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে| অর্থ সমাগম জলের মত হতে থাকে| এসবই মায়ের কাছে শোনা| মা এসবই দাদামশায়ের কাছে শুনেছিলেন| কারণ তখন তো মা জন্মাননি| পরে মা'ও কিছু কিছু দেখেছিলেন|প্রসঙ্গ্ত আরপুলি লেনের কোকলা বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়| সেখানেই ভাড়া নিয়ে আমার বিয়ে হয়েছিল| সে যাই হোক‚ একটা বাড়ি থেকে একাধিক বাড়ি‚ সম্পত্তি হয়| এই পারিবারিক ইতিহাস খুবই আকর্ষণীয়| তবে এর বেশি এ স্থলে আর বলা সম্ভব নয়| তাদেরই একটা বাড়ি কোকলা হাউস| এখন মনে হয় ভাড়া দেওয়া হয়| বাসটা খুব ভালো চালাচ্ছেন| আসার দিনে ঠিক যতটা উৎসাহ থাকে ফেরার দিনে কিন্তু ততটা থাকে না| গুল্লু তো গাড়ি দীঘা ছাড়ার আগেই ঘুমে কাদা হয়ে গেছে| আমাদেরও ঝিমুনি আসছে| কনটাই পৌঁছেই বাসের ভিড় দেখে কে? যেখান থেকে যতলোক যেন এই বাসেই উঠেছে| চারিদিকে ধানের খেতে সোনালী ধান‚ কোথাও কোথাও আবার সুড়কির সরু রাস্তার ওপর পলিথিন পেড়ে শুকোনো হচ্ছে ধান| সেই ধানের ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছে সাইকেল| ক্ষেতে চাষ চলছে| শহর আর গ্রাম যেন পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে| চন্ডীপুর পেরিয়ে যায় বাস| দুপুর একটা বেজে গেছে| গুল্লু উশফিশ করে| তুলে দি ঘুম থেকে| সেই সকাল নটা'র আগে বাতাসার মত হালকা কচুরি কি আর এতক্ষণ পেটে থাকে? বিস্কুট দি| খিদে পেয়েছে‚ খেয়ে নেয়| আমিও শুকনো মুখে বসে থাকি না| বেচারা দীপঙ্কর এমন ম্যানিয়াগ্রস্থ যে খালি পেটের ভয়ে জল বাদে আর কিছুই খায় না| দুপুর ২-২০ ... বাস এখন কোলাঘাটে| দশ মিনিটের ব্রেক| পা ছাড়াতে নিচে নামি| চাঁদিফাটা রোদ কাকে বলে| শশা কিনতে বলি| টুকটাক লজেন্স‚ বাদাম এসবও কিনি| এখনো দুঘন্টার জার্নি| বাস ছাড়ে| একাধিক কোম্পানীর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী চোখে পড়ে| চেনা নাম‚ চেনা লোগো| একই দৃশ্য| মাঝে মাঝেই কীর্তনের বোল ভেসে আসে| দূরে কটা পানের বরোজ চোখে পড়ে| বালিপাথুরে মাটি পানচাষের উপযুক্ত| ঝন্টু বলেছিল‚ পান চাষ করে কেউ রাজা আবার কেউ ফকির হয়ে যেতে পারে| ধুলাগড় পেরিয়ে গেছি| আর যেন তর সইছে না| পিছনের সিটে বসে থাকা বাচ্চাটা আর পারছে| গুল্লুও না| 'কখন নামব মামমাম?' 'এই তো সাড়ে চারটের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাব|' আবার সেই বকবকানি| দোতলা বাস দেখব বলে চোখ মেলে বসেছিলাম‚ কিন্তু বাসটা অন্য রাস্তা নিয়েছে মনে হয়| বালির নতুন ব্রিজটা দিয়ে চলে এলাম খুব সহজেই| বিকেল ৪-২০‚ আমাদের স্টপেজে নেমে পড়ি| বাকি রাস্তা গুল্লুই ল্যাগেজ ব্যাগটা টেনে বাড়ি ফেরে| আবার সেই থোরবড়ি জীবনে ফিরে আসা| অথ দীঘা ডায়েরী|

188

24

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

বিগত কয়েক মাস ধরে অপেক্ষার পরে অবশেষে সপ্তাহ দুয়েক আগে হাতে পেয়েছি মিশেল ওবামার আত্মজীবনী‚ ‘Becoming’| আমার আগে হাজারখানেক খানেক লোকের লাইন ছিল‚ আমার পরেও হাজারখানেক লোক পড়ার আশায় বসে আছে| পড়ার সময় সীমা তিন সপ্তাহ‚ যার মধ্যে সপ্তাহ দুই এখনই অতিক্রান্ত! অথচ অর্ধেকও শেষ হয়নি| তাই জলে‚ স্থলে‚ জঙ্গলে একে সাথে নিয়ে ঘুরছি আর যখনই সময় পাচ্ছি‚ গোগ্রাসে গিলছি| সত্যি খুব ভালো লাগছে| আত্মজীবনী পড়তে এমনিতেই ভালোবাসি| আর পছন্দের ব্যক্তির আত্মজীবনী হলে তো কথাই নেই! ষাটের দশকের আমেরিকার শিকাগো শহরের এক কালো‚ অর্থনৈতিক দিক থেকে নিম্ন শ্রেণীর‚ কিন্তু কৌলিন্যে ধনী পরিবারের কথা জানতে পারছি| দ্রুত পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মাঝে মধ্যেই থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে কোনো কোনোখানে| নিজেদের কৃষ্টি‚ কালচারের সঙ্গে তুলনা এসেই যায়| আমাদের সংস্কৃতি‚ চিন্তা-ভাবনা দৃষ্টিভঙ্গির কত পার্থক্য‚ ভাবতে বাধ্য হই| যেমন বাবার কথায় একজায়গায় তিনি লিখেছেন..| তার আগে জানাই‚ মিশেল ওবামার ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা Multiple sclerosis রোগে অসুস্থ থাকতেন| কিন্তু কোনোদিনও ডাক্তারের কাছে যাননি| কেউ কেমন আছেন জানতে চাইলে সংক্ষেপে ভালো থাকার বার্তা জানিয়েই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি অন্য প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতেন| অনেক বছর পরে‚ মিশেল ওবামা যখন ল ফার্মে চাকরি করেন‚ এমন একদিন‚ ওঁর মা বেরিয়ে গেছেন কাজে‚ বাবা নিচের তলায় আর মিশেল ওপরের তলায় কাজে যেতে প্রস্তুত হচ্ছেন| তখন তাঁর বাবার চলাফেরা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল| বহু সময় নিয়ে‚ শারীরিক বেদনা নিয়ে তিনি স্বপ্ল দূরত্ব অতিক্রম করতেন| কিন্তু নিজের কষ্ট এবং যন্ত্রণার কথা ভুলেও কারুর কাছে উল্লেখ করতেন না| যাইহোক‚ সেইদিন পেছনের দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেয়ে মিশেল দোতলা থেকে বুঝলেন যে তাঁর বাবা এইবারে কাজে বেরিয়ে গেলেন| খানিক পরে নীচে রান্নাঘরে এসে তিনি দেখতে পেলেন বাবার শূন্য ওয়াকারটা‚ যার আশ্রয় নিয়ে তিনি ঘরের মধ্যে চলাফেরা করেন‚ সেটা পেছনের দরজার পাশে রাখা আছে| কি মনে হওয়াতে‚ মিশেল পেছনের দরজার কাচের peephole দিয়ে গ্যারাজে দিকে উঁকি দিলেন| তিনি নিশ্চিত ছিলেন দেখবেন যে বাবা‚ তাঁর নিজস্ব ভ্যান গাড়িটা চালিয়ে এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে গেছেন| কিন্তু তারবদলে তিনি দেখলেন‚ ভ্যানটা এখনো সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে আর তাঁর বাবা সিঁড়ি দিয়ে খানিক নেমেই ব্যথায়‚ ক্লান্তিতে সেখানেই বসে রয়েছেন| “…he looked just too weary to carry on. It seemed clear he was trying to summon enough strength to turn around and come back inside.” তিনি লিখেছেন‚ “Seeing my dad on the stoop, I ached in a way I never had. My instinct was to rush outside and help him back into the warm house…” মিশেল কিন্তু সেদিন শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছাকে দমন করে রেখেছিলেন| চেষ্টা করে নিজের কষ্টকে সরিয়ে রেখে তাঁর বাবার জুতোয় পা রেখে ঘটনাটির তাৎপর্য চিন্তা করে দেখেছিলেন| বুঝেছিলেন‚ তাঁর বাবার যেরকম আত্মসম্মান জ্ঞান তাতে করে ঐ অবস্থায় দৌড়ে গিয়ে যদি তিনি বাবাকে সাহায্য করেন তবে “… it would be just another blow to his dignity.“ তাই সেদিন দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে ধীরে ধীরে তিনি দরজা থেকে সরে গিয়ে আবার ওপরের তলায় চলে গেছিলেন| এই ব্যাপারটা আমাকে খুব নাড়া দিয়ে গেল| আপনারা ভেবে দেখুন‚ আমরা হলে কি করতাম? বাবার সম্মানের‚ আত্মবিশ্বাসের কথা ভেবে মিশেলের মত বাবাকে সময় দিতাম নাকি তাঁকে অমন অবস্থায় দেখে কেঁদে কঁকিয়ে ছুটে যেতাম? তাঁকে উদ্ধার করে পরম যত্নে-মমতায়-ভালোবাসায় অথবা প্রচন্ড বকাবকি করে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসতাম না কি? ভালো কি মন্দ জানিনা‚ কিন্তু নিজের দুর্ভাবনা‚ কষ্টকে নিজের ভেতরে রেখে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঘটনার বিচার করে এইরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া‚ যতই কাছের‚ যতই ঘনিষ্ট সম্পর্ক হোক না কেন‚ নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে রেখে অপর ব্যক্তি কি চাইছে বা সে কিসে স্বচ্ছন্দবোধ করবে তাতে প্রাধান্য দেওয়া‚ এই অভিনব ব্যাপারটা এদেশে এসে প্রথম উপলব্ধি করি| সেইজন্যে আগে নিজের যে সমস্ত কাজকে অন্যের সুবিধার্থে করছি ভেবে মনে মনে সন্তুষ্টিবোধ করতাম‚ তা সত্যিই কতটা নিজের কথা ভেবে ( যে সে কষ্টে থাকলে আমারো কষ্ট বা গিল্টি হবে)‚ আর কতটা অন্যের ইচ্ছে অনিচ্ছে উপলব্ধি করে‚ নিজেকে সেই প্রশ্ন করি বারে বারে| মিশেল ভেবেছিলেন খানিক অপেক্ষা পরে বাবা যখন নিজের ক্ষমতায় ঘরের ভেতরে উঠে আসবেন‚ তখন তিনি এগিয়ে গিয়ে বাবার জন্য করণীয় যা কিছু ব্যবস্থা নেবেন| পাঁচ মিনিট‚ আরো পাঁচ মিনিট‚ আরো খানিক অপেক্ষা করার পরেও মিশেল যখন দেখলেন বাবা আসছেন না| তখন তিনি আবার নীচে নেমে এলেন| দরজার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখলেন‚ অসম্ভব শরীর খারাপ হওয়া সত্বেও তাঁর বাবা কখন যেন সিঁড়ি থেকে উঠে গাড়ি চালিয়ে কাজে বেরিয়ে গেছেন| দশকের পর দশক ধরে প্রচন্ড শরীরের কষ্ট সহ্য করেও তিনি একদিনও তাঁর কাজে অনুপস্থিত থাকেন নি|

2505

168

দীপঙ্কর বসু

অরণ্যবাসী এক শিল্পীর সঙ্গে কয়েকঘন্টা

পূর্ণেন্দু মাহাতো –অরণ্যচারী আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই শিল্পীর নামটাই শুধু শুনেছিলাম জামশেদপুরে থাকা কালে। কিন্তু পরিচয় ছিলনা – সে সূযোগ ও পাইনি এতকাল । এবারে দৈবক্রমে সেই দুর্লভ সূযোগ পেয়ে গেলাম । সিংভুমের বসন্ত বনে ক্ষ্যাপা হাওয়ার মত এলোমেলো ছুটে বেড়ানোর এক ফাঁকে গিয়ে উপস্থিত হলাম পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা শিল্পীর টালির চাল ওয়ালা বাড়িতে । চমৎকার পরিশীলিত ইংরিজিতে আমাদের অভ্যর্থনা করলেন পূর্ণেন্দু মাহাতো এবং তাঁর স্ত্রী রচনা মাহাতো । কর্মব্যস্ত ইস্পাত নগরীর কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে প্রায় নির্জন পাহাড়ের কোলে বসে পূর্ণেন্দু পেতেছেন তাঁর খেলাঘর । ছোট্ট বাড়িটিকে ঘিরে রয়েছে বিশাল বাগান - সেখানে ইতস্ততঃ ছড়ানো শিল্পীর গড়া কিছু মূর্তি ।নজর কাড়ল আদিবাসী সম্প্রদায়ের দুই শ্রদ্ধেয় পুরুষ – বিরসা মুন্ডা ও নির্মল মাহাতোর আবক্ষ মূর্তি দুটি । তাছাড়াও পাহাড় জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কাঠের টুকরো ,গাছের ডাল সংগ্রহ করে যে ভাবে অসাধারণ নৈপূন্যে তাদের মধ্যে সুপ্ত রূপকে ভাষা দিয়েছেন ,তা মনে করিয়ে দেয় অবনীন্দ্রনাথের “কুটুমকাটাম”দের কথা। কিন্তু সে সবই পূর্ণেন্দু মাহতোর খন্ডিত পরিচয় মাত্র । বরোদার MS Univarsity র কলা বিভাগের ছাত্র হিসেবে গ্রাফিক্স বিষয়ে পঠন-পাঠন চলা কালে এবং পরবর্তী সময়ে সাইকেল চেপে ভারতবর্ষ তথা ইউরোপ পরিভ্রমন করার কালে শিল্পী তাঁর নিজস্ব মাটি,সিংভুম তথা সংলগ্ন এলাকা গুলির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন । যে ভাবে ইউরোপের ক্ষুদ্রতম শহরে বা গ্রামে ও বিভিন্ন সংস্থা কী বিপুল উদ্যমে স্থানীয় শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং প্রচারের সুচারু ব্যবস্থা করেছেন তা পূর্ণেন্দুর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে আজও । অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পূর্ণেন্দু স্বীকার করেন British Museum এর Curator of Indian Antiquities বিভাগের Richard Blurton এর দিগদর্শনের ঋণ । Richard Blurton পূর্ণেন্দুকে তাঁর নিজভূমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সে বিষয়ে অবশ্য পাঠ্য বইয়ের একটি তালিকাও তৈরি করে দেন । ১৯৮৯ সালের প্রথম দিকে দেশে ফিরে পূর্ণেন্দুর মনযোগ আকর্ষণ করে চান্ডিল এ সুবর্ণরেখা নদী বাঁধ নির্মান প্রকল্পের এলাকাভুক্ত দুলমি ,ইচাগড় ও তৎসংলগ্ন কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চিরদিনের মত জলের অতলে তলিয়ে হয়ে যাবার বিষয়টি । আসন্ন বিপদের মুখে শুধু এলাকার বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হবার সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ প্রত্নতাত্বিক সম্পদও নিশ্চিতভাবে চিরকালের মত অবলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়ে ছিল । ঠিক এই অবস্থায় সময় অপচয় না করে পূর্ণেন্দু তাঁর প্রিয় বাহন সাইকেলে চেপে গোটা এলাকাটা ঘুরে ওই অঞ্চলের একটি রিপোর্ট তৈরি করে ফেলেন এবং তারই ভিত্তিতে ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগকে রাজি করান এলাকাটিতে অনুসন্ধান ও খননএর কাজে নামতে ।অবশ্য এ কাজে তিনি আরো বহু মানুষের সক্রিয় সহায়তা পেয়েছিলেন তার মধ্যে ছিলেন পূর্ণেন্দুর শিক্ষক সহপাঠী ,টাটা স্টীল এর রুসি মোদি । একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষনের কাজে পাশে পেয়ে গেলেন ছৌ শিল্পী রমেশ সিং মুন্ডা,স্থানীয় গ্রাম প্রধান সীতারাম মাহাত এবং তাঁর অপর এক সহযোগী আনন্দী মাহাতো কে ।এদের সহায়তায় তৈরি হল Aborigins’ society for art and recreation –সংক্ষেপে ASAR ।সংস্থাটি র তত্বাবধানে চান্ডিল নদীবাঁধের কাছেই রয়েছে “পাতকুম সংগ্রহশালা যেখানে সংরক্ষিত হয়েছে স্থানীয় এলাকাগুলি থেকে উদ্ধার করা বহু প্রত্নতাত্বিক বস্তু যার মধ্যে বেশ কিছু ভাস্কর্য দ্বাদশ –ত্রয়োদশ শতকের পাল ও সেন রাজত্বকালের সমসাময়িক। সংগ্রহশালার সামনেই তৈরি হয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ বা Amphitheater . যেখানে ASAR এর ব্যবস্থাপনায় চান্ডিল নদী বাঁধ নির্মাণের ফলে বাস্তুচ্যুত আদিবাসী জনসমুদায় ,যারা অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারা একত্রিত হয়ে প্রতিবছর বিদাই-মিলন উৎসব পালনকরে ওই মুক্তমঞ্চে ।দুর্ভাগ্য ক্রমে পঁচিশ তিরিশ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সংগ্রহশালাটি স্বচক্ষে দেখে আসার মত সময় আমাদের হাতে ছিলনা ।সেটি পরবর্তী কোন এক সময়ে দেখতে যাবার মনবাসনা মনে রেখেই ফিরতে হল আমাদের ।

75

8

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

চান্নিপসর চান্নিপসর আহা রে আলো কে বেসেছে কে বেসেছে তাহারে ভালো..... পাগলি‚ খুব অবাক হয়ে গেলে তো এই চিঠি পেয়ে? আমিও কম অবাক হই নি লিখতে শুরু করে| কি জানি কেন‚ হঠাৎ লিখতে ইচ্ছে হল আজ| আসলে চাঁদটা দায়ী‚ জানো…… উদ্দাম হোলি খেলে স্নান সেরে সন্ধ্যে না হতেই রানীর মত সেজেগুজে আকাশে তারাদের সভা আলো করে জাঁকিয়ে বসেছে চাঁদটা আজ| সুখটান দিতে ছাদে উঠতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল একেবারে| আবীরের রঙ সবটা ওঠে নি গাল থেকে‚ লালচে আভা উঁকি দিচ্ছে জোছনার ওড়নার আড়াল থেকে| চোখ ফেরাতে পারছিলাম না‚ নির্লজ্জের মত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই রইলাম আর ঐ চাঁদ দেখতে দেখতেই হঠাৎ তোমার মুখটা মনে পড়ল‚ তোমার উস্কোখুস্কো চুল‚ ধেবড়ে থাকা কাজল‚ তোমার কলকল হাসি…… তোমার আকাশেও কি আজ এমন চাঁদ? এমন ফাগে রাঙা‚ এমনি উছলযৌবনা? যদি জানতে চাই কেমন আছো‚ খুব কি রাগ করবে? থাক তাহলে‚ জানতে চাইবো না| মনে মনে ভেবে নেব‚ তুমি ভালো আছো‚ খুব ভালো আছো‚ তোমার গেরস্থালি নিয়ে‚ বাগানের গাছ-ফুল-ভোমরা নিয়ে‚ কবিতার খাতা নিয়ে‚ গুনগুন গান নিয়ে| গানের কথায় মনে পড়ল‚ "আজ যেমন করে গাইছে আকাশ" ….. গানটা একবার হলেও শুনো আজ| কার গলায় -সে কি আর নতুন করে বলে দিতে হবে তোমায়? জানো-ই তো ঐ গান একমাত্র বিক্রমই গাইতে পারেন অমন করে সবটুকু নিংড়ে দিয়ে| শুনো কিন্তু‚ চাঁদের আলোয় নাইতে নাইতে শুনবে| আমি ঠিক জানি‚ এমন চাঁদরাতে এই মোম জোছনায় না ভিজে আজ থাকতে পারবে না তুমি| ভেজো‚ খুব করে ভেজো আর কান-মন-প্রাণ ভরে শুনতে শুনতে গুনগুন কোর…… "আজ হাওয়া যেমন পাতায় পাতায় মর্মরিয়া বনকে কাঁদায়‚ তেমনি আমার বুকের মাঝে কাঁদিয়া কাঁদাও গো……" দোল খেললে আজ? আবীর মেখেছো? যে রঙ চেয়েছিলে তা দেওয়া হয় নি| দিতে কি পারতাম না? হয়ত পারতাম‚ কিন্তু মন:স্থির করে উঠতে পারি নি‚ পারি না| জানো-ই তো আমাকে‚ চিরটাকাল এই দোলাচলেই কাটল‚ দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের জটিল অন্তরায় পেরিয়ে সহজের হাত ধরে হাঁটা ---- সে আর হল কই জীবনে? হল না কিন্তু তাই বলে তো তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা মিথ্যে হয়ে যায় না| 'ডুবতে রাজি আছি‚ আমি ডুবতে রাজি আছি' বলে গলা ছেড়ে গান গাইতে পারি‚ কিন্তু নদী কাছে আসতে চাইলে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাই‚ ভীতুর ডিম আমি‚ ডোবা আর হয় না| সাগরে নাইতে গিয়ে দ্বীপের চড়ায় বাঁধা পড়ে যাই‚ পাহাড় খুঁজতে বেরিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে মরি| তোমার মত পাগলপন কি সবাইকে সাজে? না রে পাগলি‚ সবার দ্বারা সব সম্ভব নয়| তাই তো এড়িয়ে থাকি| পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি‚ চিঠি পড়তে পড়তে ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হাসছো| অ্যাই‚ একদম ঐভাবে ঠোঁট কামড়াবে না| নাহ হাসো‚ জানো-ই তো ঐ হাসি আমার কত প্রিয়…... চর্মচোক্ষে দেখতে না পেলেও মনে মনে ঠিক দেখছি| ধুসস‚ জিজ্ঞাসা করেই ফেলি‚ কেমন আছিস পাগলি আমার? জানতে চাইবি না আমি কেমন আছি? হাঁদারাম.....

1466

99

দীপঙ্কর বসু

একটি কথপোকথন

দুপুর বেলা। লেখালেখি ,ছবি এডিটিং ইত্যাদি সব কাজ সেরে কম্পিউটার বন্ধ করে খেতে বসব - তখনই ফেসবুকের মেসেঞ্জারে এক বন্ধুর মেসেজ এল। - কী ভালো গাইছ বস । শোনা যায় প্রশংসায় দেবতাও গলে যান ,তা আমি তো কোন ছার। পিছিয়ে দিলাম দ্বিপ্রাহরিক আহার পর্ব । বন্ধু বলে চলেন আমি শ্রোতা ।কেবল বাক্যালাপটাকে চালু রাখার খাতিরে দুই একটা মন্তব্য করছিলাম মাত্র। সাধারণভাবে দুজন মানুষের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা জনসমক্ষে নিয়ে আসাটা শোভন নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আলাপচারিতার বিষয়টা গান -যে বিষয়ে সাধারণের য়াগ্রহ থাকতে পারে। সেই জন্যেই মনে নানান দ্বিধা দ্বন্দ থাকা সত্বেও মেসেঞ্জারের কথপোকথনটাকে কপি করে এখানে সাঁটিয়ে দিলাম । বিশেষ কারণ বশত বন্ধুর পরিচয়টা আপাততঃ গোপনই রাখছি ।শুধু এই টুকু জানাই যে বন্ধু কলকাতার অন্যতম নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা এবং ইনি একসময়ে দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী ছিলেন । কী ভালো গাইছ! বস। Thank you 1:07 PM আজ আবার শুনলাম। পাতারা ঘিরে তারে কানে কানে বলে -- না না না আচ্ছা জানো চোখে জল ভরে এল। এত ইমোশনাল তো আমি নই! বাহ।খবরটা আমাকে আপ্লুত করল বরকে শোনালাম। সে কোনও পাত্তা দিল না। হা হাহা নাকি ওই জায়গাটা ভালো হয়নি কোন জায়গাটা যে তার ভালো লাগল না তা কে জানে তাই? আমিও ওর কথাকে পাত্তা দিলাম না যাই যাই যাই ভালো হয়নি? চোখে জল আসার কারণ হল তুমি মনের আনন্দে থাকো আর গান করো <img class="emojione" alt="👍" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F44D.png?v=1.2.4"/> 1 সেভাবে কী আর রেয়াজ করো? কিন্তু এত ভালো গাইছ এখনও। একে বলে আনন্দাশ্রু। সবার ভাল লাগা কি আর এক রকম হ নাহ আর রেয়াজ করার ধৈর্য নেই তোমার সব গান কি প্রতিদিন এত ভালো লাগে আমারও? সেটা সম্ভব নয় তোমার গায়নরীতি আলাদা। পরিস্থিতিও কিছুটা সাহায্য করেছে। শরীর খুব খারাপ ছিল কাল। সব গান ভাল লাগবে সে দুরাশা রাখিনা খুব আরাম লাগল। আলাদা গায়ন রীতিটার জন্য ই জর্জ দার চোখে পড়েছিলাম তবে তোমার একটা জিনিস সর্বদাই লক্ষ্য করি টেনে রাখা। কি কেটে না দেওয়া। না না না হয়তো সকলেই টেনে রাখবে। কিন্তু তাই তাই তাই এর শেশ তাই কেটে দেবে দম দেবার জন্য। সেটা ই তো দরকার <img class="emojione" alt="👎" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F44E.png?v=1.2.4"/> 1 হ্যাঁ ও প্রসঙ্গত বরকে জিগেস করলাম কার মত? বলল দেবব্রত বিশ্বাস। হি ইজ নট আ ফ্যান পুরোদস্তুর দেবব্রত ফ্যান নয়। আমি অসুস্থ হবার পর সিগারেট ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।দমটা তাই বেড়েছে ও তাই বলো। লিখতে যাচ্ছিলাম ক্রমশ যেন আরও ভালো গাইছ। আমার গানে জর্জ দার কিছু প্রভাব তো আছেই <img class="emojione" alt="👍" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F44D.png?v=1.2.4"/> 1 ধরা পড়ে না। আমার মনে হয় তুমি নিজের মত গাও। সে প্রভাব ভেতর থেকে ইন্সপায়ার করে আমাকে সেটা ই তো জর্জ দার নির্দেশ ছিল আমার প্রতি সাধে কি তোমার লেখাটা আমাকে এত টেনেছিল? আমার গান নিয়ে একটা শংসাপত্র লিখে দাও আর তো তেমন স্বীকৃতি পেলামনা আমার শংসাপত্রের কোনও মূল্য নেই সেটা আজ বুঝলাম তোমার মত এত ভাল শ্রোতা আর পেলাম কই একজনকে বলছিলাম সে ফোন করেছিল কেন কি বলেছিলে সবই বললাম। তোমার লেখা থেকে শুরু করে আলাপ ও তুমি কেমন আলুর চপ খাও আচ্ছা হাহাহা তাকে স্পর্শ করল না যে আমারও চোখে জল এসেছে। এটার মূল্য খালি আমি জানি নাই বা করল চোখের জলের মত মূল্যবান আর কিছুই নয় কথাটা খুব সত্যি। You made my day আমার তো হিংসে হওয়ার কথা ছিল। কিচ্ছু হিংসে হয়নি এটা আমার পরম প্রাপ্তি এবার আমি যাই। ভালো থাকো। আমিও যাব খেতে তুমি ও টাটা। Chat Conversation End Type a message... Chat (66) More stories loaded.

109

3

জল

বিগত সময়ের তরী বেয়ে

(১৪) 'এই মানতাশার জোড়াটা বিদ্যার অসুখে বাঁধা রাখতে হয়েচিল‚ ভেবেচিলাম তোর বাবু একসময় ছাড়িয়ে নেবে‚ কিন্তু সে সুজোগ পেলাম না| বিদ্যা সেরে উঠতে না উঠতেই গঙ্গাটা পড়ল| বিক্রি করে দিতে হল' | মেনকা গয়নার বাক্সটা খুলে কোন কোন গয়না ভেঙ্গে কি বানাবে বা কোনটা পালিশ করেই দিয়ে দেবে সেই নিয়েই সকাল থেকে বসেছে মেয়েদেরকে নিয়ে| কর্তা বিয়ে পাকা করে এসেছেন| এদিকটাও তো গুছিয়ে রাখতে হবে আর কাকে কি দেবে সে এখন থেকেই ঠিক করে রাখা ভালো| কিন্তু সুবাকে একটু বেশিই দেবে সে‚ প্রথম মেয়ের বিয়ে বলে কথা| একটা মানতাশা তো আর দেওয়া যায় না‚ ওটা ভেঙ্গেই কিছু গড়িয়ে দেবে| গয়নাগুলো আজকাল আর পড়ে না সে| শেষ কবে পড়েছিল ঠিক মনে পড়ে না| আসলে ছেলে-পুলে বড় হবার আগেই তো রঙীন শাড়ি পড়ার শখ ছেড়ে দিতে হয়েছে| কানের ঝোলা ঝুমকো‚ গলার কলার‚ নেকলেস‚ রতনচুড়‚ আমলেট‚ সোনার বাগান সবই আলমারীতে তুলে দিতে হয়েছে| ছেলেপুলে বড় হলে যে মা'কে অনেককিছু ত্যাগ করতে হয়| সেইসব গয়নার বদলে গলায় গোটচেন বা মটরমালা হার‚ হাতে হাঙরমুখী বালা বা শুধু সোনার চুড়ি| এর বেশি কিছু পড়লে যে সমাজে নিন্দে হয়| মেনকাও আর পড়েনি| এখনও যেন নতুন গন্ধ লেগে রয়েছে| 'মা‚ দাদা আর ভাই-এর কি হয়েছিল?' সুবেশা প্রশ্ন করে| 'তোর বড়দা ছোটতে তো একবার জলে ডুবে গেছিল ‚ যে দেখতে পেয়ে তুলেচিল ‚ সে কোনকিচু না পেয়ে মাথার চুল ধরে টেনে তুলেচিল| সে থেকে এমন ঘা হয়েচিল যে যায় যায়| কিচুতেই সারে না‚ তখন অন্য ডাক্তার দাকা হল| ডাক্তার কনক বড়াল‚ তখনই তার ভিজিট অনেক ট্যাকা| তখন যে জারমান ওষুধ দিয়েচিল তা কলকাতার দেশ মেদিকেল ছাড়া কোথাও মেলে না| ওষুধের দামও অনেক| ওষুধই বা কে আনবে? সে এক দিন গেছে| ডাক্তারের্র ভিজিট দেব না ওষুধ আসবে| তোর বাবু তো তখন অসুস্থ| অফিসে মাইনে পায় না| অফিস বের হতে পারে না| চাকরী চিল এই যা| আমিই বা কি করি‚ একা মেয়েমানুষ‚ ঘরে তেমন ট্যাকাও নেই‚ যা জমানো চিল তাইতে সংসার চলচিল‚ তার মাঝেই এই কান্ড‚ ভেবে দেকলাম গয়নাগুলো কি চিবিয়ে খাবো‚ আমার ছেলের চেয়ে পিয় তো নয় সেগুলো‚ তার একটা বের করে দিলাম তোর বাবুকে| তা তিনিও বেশিদুর যেতে পারেন না‚ আলসারে তার পেটেও এমন ঘা‚ চলতে গেলে লাগে‚ তা পারায় একজনের কাছে মানতাশাখানা বাধা রেখে দেশ মেদিকেল থেকে জার্মান ওষুধের মিকচার এল| তারপর তো অনেকদিন চিকিচ্ছা করে সারল| আর তোর ভাইকে একন যেমন দেকিস‚ তেমনটা মোটে চিল না‚ খুব দুরন্ত ছিল| একদিন ইস্কুল থেকে ছেলে আর ফেরে না‚ আমি তো ভেবে ভেবে মরি| পরে একজন এসে খবর দিল ‚ যে গঙ্গা নাকি গাড়ি চাপা পড়েচে| বাড়িতে কান্নাকাটি পরে গেল| ওমা খানিক পরে দেকি সে ফিরেছে‚ মুকে হাসি| জিগ্যেস করতে বলল‚ গাড়ি আমায় চাপা দেবে কি করে‚ আমি তো গাড়ির তলায় শুয়ে পড়েছিলাম আর গাড়িটা তো দারিয়ে চিল| ভাগ্গিস দাড়িয়ে চিল‚ না হলে কি হত| তকনও জানি না আরও কান্ড করে এসেছে সে| ফেরার পথে মেডিকেলের মর্গে মরা দেকতে গেচিল| তকন তো কিচু বোঝেনি‚ সেই রাতেই এল মারাত্মক জ্বর| সে জ্বর আর নামে না‚ হুঁশ নেই| আবার ডাক্তার কনক বড়ালকে ডাকা হল| তিনি চিকিচ্ছা করলেন| তোর ভায়ের রঙ তোরা দেকিসনি সুবা| সাহেববাচ্চার মত রঙ‚ বাদামী চুল‚ সব গেল সেই নিমোনিয়াতে| যাক ছাড়‚ এসব তো কতবার শুনেচিস|' 'ভালো লাগে মা শুনতে|' সুবার সাথে বাকি দুই বোন সুকেশী আর সুন্দরীও গলা মেলায়| 'তোমরা কেউই ভুগতে বাকি রাখোনি| যার যখনি কিচু হয়েচে সবই সাঙ্ঘাতিক হয়েচে আর আমার একখানা করে গয়না বিসর্জন গেচে| যাগকে সে দুক্খু করি না| নাও এবার দেখ কোনটা কে নেবে? কাজ তো আমার কম কিচু নেই‚ সারাদিন ঐ কবে কি হয়েচে মনে করে বসে থাকলে চলবে?' মুখে বলে বটে‚ তবে স্মৃতিচারণা করতে তারও মন্দ লাগে না| মনে হয় এই তো সেদিনকার কথা‚ সব কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল| সুবাকে কানের ঝুমকোজোড়া দেবে নাকি মিনে করা কানপাশা দেবে? হাতে বাউটি আর বালা‚ হাত যেন খালি খালি না লাগে| ট্যায়রাটা দেবে সুবাকে ‚ সুকিকে সোনার চিরুনী আর বাগান আর সুন্দরকে টিকলি| মনে মনেই এইসব ঠিক করতে থাকে সে| 'মা দিদিকে যা দেবে দাও‚ ঝুমকোজোড়া কিন্তু আমার রেখো'‚ সুকেশী বলে| 'হ্যাঁ মা তাই ওর জন্যই রাখো|'‚ সুবেশাও সায় দেয়| 'বেশ‚ তবে এই মিনে করা কানপাশাদুটো তুই পড়িস|' 'হ্যাঁ মা ওখানা দিদিকে খুব মানাবে‚ কানের পাটাদুটো চওড়া তো|' সুকেশী বলে| দোতলায় যখন এইসব চলছে‚ ঠিক তখনই নিচ থেকে কথা কাটাকাটির আওয়াজ ভেসে আসে| মেনকা গয়নাগুলো চটপট আলমারীতে তুলে চাবি দিয়ে নিচে নেমে আসে| কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনে বোঝে সদরের বাইরে দামোদর আর সদন দত্তের মধ্যে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটি চলছে| দামোদর স্বভাব আলস্যে| খায় দায় আর বনের মোষ তাড়ায়| কাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে‚ কাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ছাড়াতে হবে ‚ লালপার্টির মিছিলে যেতে হবে এইসব করে বেড়াচ্ছে| সে তো বাড়ির কোন ব্যাপারে থাকেই না‚ তার সাথে কি নিয়ে গন্ডগোল ভেবে পায় না মেনকা| বেরিয়ে যে দেখবে সেও তো শোভা দেবে না| চিত্তিরটাও নেই‚ দিনকয়েকের জন্য দেশে গেছে| উঠোনে নেমে গিয়ে দরজায় কান পাতে কি কথা হচ্ছে তা শোনার জন্য| কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারে না| 'দামু‚ কি হয়েচে? দরজার বাইরে দারিয়ে কার সাথে কথা বলচিস?' মেনকা হাঁক পাড়ে| 'মা এই সদন দত্তের বড় দেমাক হয়েছে‚ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে|' দামোদর ক্ষুব্ধ গলায় বলে ওঠে|' আসলে আমি বুঝি না ভেবেছেন না‚ বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে বড় ঘরে তাই সহ্য হচ্ছে না? জন্ম হিংসুটে লোক মশাই আপনি?' দামোদর ছোবল মারে| 'দেখ দামু‚ ছোট মুখে বড় কথাই কইবি না| ক্ষমতা নেই আবার বড় বড় কথা| বড় ঘরে তোর বোনের বিয়ে হচ্ছে বলে আমার কেন হিংসে হবে শুনি? দিয়ে দেখা দিকি‚ ভিখিরি তো তোরা| বড়ঘরে দেবার মত কি আছে তোদের? বর নিয়ে ফেরত চলে যাবে এই বলে দিলাম|' কথাগুলো গায়ে যেন সূঁচের মত বেঁধে| ও বাড়ির বারান্দা থেকে কয়েকটা মুখ উঁকিঝুঁকি মারে| একে বলে শত্রুহাসানো| সদন দত্ত ওঁৎ পেতে বসেছিল দামোদরকে পাকড়াও করে কথাগুলো বলবে বলে| লোকটা কারও ভালো দেখতে পারে না কেন কে জানে? এদিকে শ্বশুরের পয়সায় ফুলে কলাগাছ হয়েছে‚ দেমাকে পা মাটিতে পরে না| মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না| অন্য ছেলেরা গুরুত্ব দেয় না‚ কিন্তু এই ছেলেকে কিছু বললেই সে উত্তর দেবেই| ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা! 'ভিতরে আয় দামু| কেন শুদু শুদু মুখ লাগাচ্চিস? লোকটাকে তো আজ দেকচিস না| ভিতরে আয়|' স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে মেনকা দরজাটা খুলে দাঁড়ায়| 'আপনিও যান| নিশ্চিন্ত থাকুন আপনার কাচে হাত পাততে যাবো না| ভিকিরির মেয়ের বিয়েতে পাত পেড়ে খেয়ে যাবেন আর তকন না হয় আরও চাট্টি নিন্দে করে যাবেন| একন বললে আর কজন শুনবে?' মেনকা ঠান্ডা স্বরে কথাগুলো বলেই দেখতে পায় একটু দুরেই ছোট গিন্নী দাঁড়িয়ে| 'তোমাদের বাড়ি আসচিলাম ছোটবৌ| ঘাটের মরা লোকটাও যে একানে মরতে এসেচে জানব কি করে? একদিকে ভালো হয়েচে‚ না এলে তো শুনতেও পেতাম না| দেকেচ তো ইটটি মারলে পাটকেলটি কেমন খেতে হয়| তবু তোমার শিখ্যে হবে না‚ কোনকালে হবে না‚ তুমি ঐ কুকুরের বাঁকা লেজের মত| ' ঝামটা দিয়ে ওঠে সদন দত্তের বৌ| মেনকা আর দামোদর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে| একটাও কথা বলে না| 'মুরোদ থাকলে ওমন একখানা ঘরে তোমায় মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দেখাও দিকি? পারবে? তবে বুঝব তুমি একটা কাজের কাজ করলে| তা না‚ লোকের বাড়িতে এসে ভ্যাংচাতে এসেচ? ' জ্বলে ওঠে সদন দত্তের বৌ| ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকে সদন দত্ত| এই একটা মানুষকে ভালোবেসেও পেল না‚ হ্যাঁ কয়েকটা সন্তানের মা করতে পেরেছে ঐ পর্যন্ত‚ আজও মন বুঝে উঠতে পারল না| মনে স্থান পেল না| সদন দত্ত ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়| ''কিচু মনে করো না ছোটবৌ‚ এই লোকটার হয়ে আমি তোমার কাচে ক্ষমা চাইছি| আমার আর কিচু বলার যে মুখ নেই ছোটবৌ'‚ থমথমে গলায় কথাগুলো বলে সে| কদিন ধরে তারও যে মন ভালো নেই‚ যবে থেকে শুনেছে সুবেশার বিয়ে সর্বেশ্বর মল্লিকের ছেলের সাথেই স্থির হয়েছে| হিংসে নয়‚ নিজের মেয়েটাকেও যদি এমনই একটা ঘর-বরে দেওয়া যেত‚ তাহলে সমাজে মান যেত বেড়ে| এমনিতে তো নিজে বড় ঘরে পড়েনি‚ বাপের পয়সা ছিল তাই বাপ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জামাইকে| না হলে ঐ কালো মুষন্ড লোকটাকে কে বিয়ে করত| এখনকার কাল হত বেঁকে বসত সে| সবই কপাল! 'ভেতরে এসো ছোটগিন্নী|' ডাক দেয় মেনকা| 'না আজ আর যাব না‚ মনটা বিগড়ে গেল| পরে আসব ভাই| তুমি কিচু মন করো না|' বলে সদন দত্তের বৌ মেনকার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে| তারপর বেরিয়ে যায়| মেনকা সদর দরজা ভেজিয়ে দেয়| কিন্তু তখনি ওখান থেকে চলে আসতে পারে না| উঠোনেই দাঁড়িয়ে থাকে| সদন দত্ত কি যেন বলে গেল‚ বর তুলে নিয়ে যাবে| বিয়ের আগে ভাঙচি দিতে পারে আবার বিয়ের দিনকে কিছু ঘটাতে পারে| ও মানুষকে বিশ্বাস নেই|ঈর্ষাকাতর মানুষের পক্ষে সবকিছু করাই সম্ভব| ছোটগিন্নীকে যা ভরসা করা যায়| লোকটা বৌকে যমের মত ভয় পায়| সেদিন যদি না আসে তবে ভালো হয়| কিন্তু ছোটগিন্নীও কিসব বলল‚ 'যে ঐরকম ঘরে বিয়ে দিয়ে দেখাও'| ছোটগিন্নীও কি ঠিক খুশী নয়‚ নাকি কোথাও একটা চাপা ঈর্ষা কাজ করছে| আসলে অনেকসময়ই তো সবকিছু ছাপিয়ে স্বার্থটাই প্রধান হয়ে ওঠে| খুব একটা বেশি দোষ দেওয়া যায় না তার জন্য| আর মেয়ের মা বলে কথা| সেও তো চাইবে মেয়ে ভালো ঘরে পড়ুক| চারহাত এক না হওয়া অবধি নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না| ...|ক্রমশ|

603

79

মানব

ওপারের ডাক

১ তখন আহত বোধিসত্ত্ব কে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। মঙ্গলাশ্বরূপী বোধিসত্ত্ব রাজাকে বললেন, ‘আমি আর আমার সওয়ার আজ যে কাজ করলাম তার পুরস্কার এই সাত রাজাকেই দিন। এদের হত্যা না করে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিন যেন এরা আর কখনও হিংসা না করে। সেই সঙ্গে আপনিও অহিংসা ও শান্তির পথে চলবেন।’ আহত মঙ্গলাশ্বটির সাজ পোষাক খুলে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হল। রাজা যথাযখ সম্মানের সঙ্গে তার অন্তিম কাজ সমাধা করলেন। তারপর ওই সাত রাজাকে অহিংসার পথে চলবার অঙ্গীকার করিয়ে নিয়ে ছেড়ে দিলেন। *** তাহলে এই জাতকের থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই? সমবেত ছাত্ররা এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পন্ডিত আনন্দভট্টের কথাগুলো শুনছিল। শুধু একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সর্বদা অহিংসার পথে চলা উচিৎ?’ ‘প্রথমত, প্রশ্ন করবে না, উত্তর দেওয়ার সময় দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দেবে। বসে পড়ো। খুব ভালো প্রচেষ্টা। আসলে এই জাতক আমাদের এই শিক্ষা দেন যে, জ্ঞানী বিপদের মধ্যেও দিশেহারা না হয়ে কর্তব্য পালন করেন, এমনকী প্রাণ দিয়েও। আজ তোমাদের এখানেই ছুটি। আর হ্যাঁ, এই সমস্ত পাঠগুলো যেন শুধুমাত্র গল্পেই সীমাবদ্ধ না থাকে। দৈনন্দিন জীবনেও এগুলো মেনে চলবার চেষ্টা করবে।’ ছাত্ররা চলে যাওয়ার পরে আনন্দভট্ট একটু বিশ্রামকক্ষে যাবেন বলে যেই দরজার বাইরে পা দিয়েছেন, দেখেন এক অদ্ভুত কান্ড। সাদা জোব্বা পরিহিত এক ভদ্রলোক মাটিতে পদ্মাসনে বসে তাঁরই দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে চোখ পড়তেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, 'আপনার পাঠদান শুনছিলাম। অপূর্ব আপনার কন্ঠ আর তেমনই অপূর্ব আপনার শিক্ষাদান।' হতচকিত হয়ে আনন্দ ভট্ট প্রশ্ন করে বসলেন, ' আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না। আপনার নিবাস কি এই দেশেই?' এইবার ভদ্রলোকটি উঠে দাঁড়ালেন, সরিয়ে ফেললেন তার মাথা ও মুখে জড়িয়ে থাকা চাদর। কি অপূর্ব সে রূপ। সদ্য জাগ্রত রবি কিরনের রূপচ্ছটা কেও হার মানিয়ে দিচ্ছিল সে রূপ। তার উপর গলায় পরিহিত রক্তরুদ্রের মালা তাঁকে করে তুলেছে অপূর্ব জ্যোতির্ময়। হঠাৎ আনন্দভট্ট খেয়াল করলেন ভদ্রলোকের কপালে সুস্পষ্ট তৃতীয় নয়নখানি, আর তৎক্ষণাৎ তিনি করজোড়ে বসে পড়লেন তাঁর পদতলে। ‘হে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের অধিকর্তা মহাকালেশ্বর, আপনাকে আমি চিনতে পারিনি মার্জনা করবেন।’ এই বলে যেই তিনি ওনার পা দুখানি জড়িয়ে ধরতে যাবেন অমনি আনন্দভট্টকে দুহাতে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তারপর স্নেহভরে বললেন, ‘আর্য, আমি আপনার ব্যবহারে অত্যন্ত আহ্লাদিত। কিন্তু আমি যে ভগবান নই, সেই তথ্যও আপনার নিকট পরিবেশন করা আমার কর্তব্য।’ ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন, হে প্রভু, আপনার দর্শনে আমি ধন্য। আমার কুটিরে এমন ধন নাই যা দিয়ে দেবতার আপ্যায়ন করি। কিন্তু আমি এও জানি যে নিষ্কাম ভক্তিতেই আপনি সন্তুষ্ট হোন। তাই দয়া করে আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।’ এইবার একটু ইতস্ততঃ হয়ে ভদ্রলোকটি বললেন, ‘এমন ভক্তিতে ভগবান সন্তুষ্ট না হয়ে থাকতেই পারবেন না। কিন্তু এও সত্য যে আমি ভগবান নই। আমার বাসস্থান এই পৃথিবীলোক থেকে পাঁচ আলোকদিবস দূরের একখানি গ্রহে, যার নাম উচ্চভূ। এখানে এসেছিলাম আপনাদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য। কিন্তু পাছে আমার তৃতীয় নয়ন দেখে আপনারা ভয় পান তাই এই চোখখানি ঢেকে রাখি। আপনার গ্রহে আসতে আমি ভয়ই পেতাম। কিন্তু এখন আপনার আচরণে আমি যথেষ্ট আনন্দিত।’ ‘তাই যদি হয় তাহলে গরীবের কুটিরে পদার্পন করে কিছু আহার্য গ্রহণ করুন প্রভু।’ ‘প্রভু নয়, আমাকে আমার নিজের নামেই ডাকবেন। আমি মনাকদ্ম। আমরা মনুষ্য নই, আমরা কদ্ম।’ ‘কদ্ম অর্থে কি কোনও উচ্চ আত্মিক স্তরের...’ ‘ঠিক তেমনটি না, আমরাও আপনাদের মতই ভিন্ন প্রজাতির জীব। আত্মা ভেবে ভুল করবেন না। চলুন আপনার গৃহে কিছু আহার্য গ্রহণ করি। এমনিতেও বেশ ক্ষুধার্ত আমি।’ আশ্রমের এই দিকটায় বড় একটা কেউ আসেনা। রাজা মহীপালের বঙ্গদেশে স্বামী স্ত্রী মিলে বেশ শান্তিতেই এই বিহারের দায়িত্ব সামলে আসছেন বিগত কয়েক বছর ধরে পণ্ডিত আনন্দভট্ট। সুস্বাদু দুগ্ধদ্রব্যের সঙ্গে পরিবেশিত হল অল্প মিষ্টান্ন। খেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হলেন সদ্য প্রৌঢ়ত্বপ্রাপ্ত মনাকদ্ম। ‘আচ্ছা আপনি কি এই প্রথমবার পৃথিবীতে এলেন?’ আনন্দভট্ট তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলেন না যেন, তাঁর পাশে ভোজনরত মানুষটি, না মানুষ নয়, কদ্মটি এসেছেন অনেক দূরের কোনও এক জগৎ থেকে যার নাম উচ্চভূ। যে গ্রহের দিকে লক্ষ্য করে আলো নিক্ষেপ করলে সেই আলোরও যেতে সময় লাগে পাঁচ দিন। ‘হ্যাঁ এর আগেও এসেছিলাম, প্রায় একশ বছর আগে। ধর্মগুরু যীশুখ্রীষ্ট জন্মালেন যেবার।’ ‘কিন্তু সে তো বহুকাল আগের কথা, প্রায় হাজার বছর... ’ ‘হ্যাঁ, বলতে ভুলেই গেছি, আমাদের গ্রহের এক বছর মানে আপনাদের গ্রহের দশ বছর। আর আমরা কদ্মরা আমাদের গ্রহের হিসাবে বাঁচি প্রায় পাঁচশ বছর। কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে তো!’ ‘এখন আপনার বয়স...’ ‘তিনশ বছর...আমাদের হিসাবে।’ ‘তিন হাজার বছর বেঁচেছেন আপনি... তাহলে তো এই মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার সাক্ষী আপনি। আপনাকে ভগবান ছাড়া আর কিই বা বলা যায় বলুন। আমাদের মত তুচ্ছ মানব প্রজাতি যারা কিনা আশি নব্বই বছর বাঁচলেই বিশ্বের ক্লান্তির বোঝা এসে ভর করে, সেখানে তিন হাজার বছরেও আপনি ভিনগ্রহে ভ্রাম্যমান!’ মনাকদ্ম একটু ইতস্ততঃ করলেন। প্রশংসা শুনে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে বুঝে আনন্দভট্ট চুপ করলেন। ‘হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, সেবারে নেমেছিলাম মিশর দেশে। অগাস্টাস নামে এক রোমদেশীয় রাজা সেখানকার শাসনকার্য চালাতেন। ঠিক চালাতেন বললে ভুল হবে, জোর খাটাতেন। রোমান এবং গ্রীকরা সেখানে প্রাধান্য পেলেও মিশরীয়দের সেখানে রাখা হয়েছিল সবচেয়ে নিম্নশ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। আমি আমার দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, এই বঙ্গদেশের দশাও একদিন ওইরকম হতে চলেছে। কালের চক্রের উপর আমার কোনও হাত নেই। শুধু মাঝে মাঝে চোখের সামনে অনেক দৃশ্য ভেসে ওঠে। সেসব থেকেই বলতে পারি, এখন থেকেই যদি নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনারা সচেতন না হোন, অথবা আপনাদের থেকে একটু অন্য ধরণের সুঠাম দেহবল্লরীবিশিষ্ট মানুষ দেখলেই ভগবান ভগবান করে মাথায় তুলে নাচতে থাকেন... এই যেমন আমায় করলেন, তাহলে আপনাদের পতন কেউ বাঁচাতে পারবেনা। অতিথিদের ভগবানরূপে সেবা করলেও সে যাতে আপনার দুর্বলতার সুযোগ না নিতে পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখুন।’ *** সেবারে আরও অনেক অনেক কথা হয়েছিল আনন্দভট্টের সাথে। আজ পৃথিবীর বুকে একবিংশ শতাব্দী। সেযুগের সাথে এযুগের কত পার্থক্য। কত কত ভিনদেশী এল আর গেল, অবশেষে বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়ে একখণ্ড রয়ে গেছে ভারতের সাথে, আর একখণ্ড নিজেকে স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করেছে। ভাবতেও মনটা কেমন ভার হয়ে আসে মনাকদ্মের। পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন তিনি, কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের জন্য এই বঙ্গে ঘুরতে এসে যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন তা আর কোথাও পেয়েছেন বলে মনে পরে না। সেবারে নিজ গ্রহে ফিরে যাওয়ার সময় তো তিনি দুগ্ধদায়ী গাভী ও একটি ষাঁড়কেও নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক অনেক প্রজন্মের বিস্তারে সেখানে রীতিমতো এক বৃহৎ গোশালাও গড়ে উঠেছে। দুগ্ধদায়ী গাভীকে ঘরে রেখে দেওয়া যায়, কিন্তু ষাঁড়ের সংখ্যা অত্যধিক হলে তাদের বসে বসে খাওয়াতে মোটেই ভাল লাগে না। আবার ছেড়ে দিলেও শষ্যের ক্ষতি সাধন করে। একবার তো তিনি ভেবেছিলেন এই ষাঁড় সমস্যার সমাধানে এক বড় মহাকাশযানে চড়িয়ে সমস্ত ষাঁড়কে তুলে এনে পৃথিবীর মাটিতে ছেড়ে দেবেন। তারপর নিজেরই মায়া হল, এমনিতেই এখানে মানুষের খাবার জোটেনা, আবার পশু বাড়লে নাজানি কি গোলমাল হবে... এই এত বছরের অভিজ্ঞতা... পৃথিবীর হিসাবে যা প্রায় চার হাজার বছর... সেই বৃদ্ধ মনাকদ্মের আত্মা আজ তান্ত্রিক শ্রীঅংশুমানের মায়াজালে বন্দি। ২ উচ্চভূ গ্রহ থেকে পৃথিবীলোকে মাত্র তিপ্পান্ন দিনে পৌঁছতে দিতে যে কি ভীষণ উচ্চশক্তিসম্পন্ন যানের এবং তার জন্য যে কি বিশাল পরিমানে জ্বালানি বা শক্তির প্রয়োজন হয় তা বুঝেই কর্মাদ্মক একটা নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। গ্রহের জ্বালানি ছেড়ে সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে চালানোর নতুন প্রযুক্তি আমদানি করেছেন। অবশ্য এ প্রযুক্তি তার বাবা মনাকদ্মের রেখে যাওয়া পুঁথিগুলো ঘেঁটেই পাওয়া গেছে। তিপান্ন দিন অর্থাৎ পৃথিবীর হিসাবে যা হবে পাঁচশ তিরিশ দিন। মহাকাশযান ‘অলক্ষ্য’ আবার বহুকাল পরে তার কাজ পেল। আবার পৃথিবীতে পাড়ি দিল সে। তবে এবার বাবা নয়, ছেলের সাথে। সাত দিন কাজের সূত্রে বাড়ির বাইরে ছিল সে। তারই মধ্যে ঘটে গেছে এই অদ্ভুত ঘটনা। বাবার শরীর থেকে আত্মা উধাও। এমনিতে বাবা ধ্যানের উচ্চস্তরে পৌঁছে গেলে ফিরে আসেন প্রায় দুদিন পরে। আত্মিক স্তরে পৌঁছে বিভিন্ন দেশ, গ্রহ ইত্যাদিতে ঘুরে বেড়ানো তাঁর শখ। এই জিনিসটা কর্মাদ্মক এখনও রপ্ত করতে পারেনি। কর্মস্থানের চাপ শেষ করে মানসিক স্তরের খুঁটিনাটিগুলোর অনুসন্ধানের মেজাজ আর থাকেনা। ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। তৃতীয় নয়নে একটু ক্লান্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ অনুসন্ধানী মন আত্মিক স্তরের নিচে আর কাজ করবেনা। বাবা গল্প করতেন, তাদের এই তৃতীয় নয়ন এক সময়ে সম্পূর্ণ রূপে কর্মক্ষম ছিল। এত ক্লান্তি আসতনা, যেকোন সময়ে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সুস্পষ্ট ছবির মত দৃশ্যমান হয়ে উঠত ইচ্ছা করলেই। এমনকি মনঃশক্তি দ্বারা অনেক কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত। তারপর এল বিধাতার পাঠানো বিষন্নতা-ভয়-ক্রোধ। সেই সমস্ত চাপ তাদের তৃতীয় নয়নের দৃষ্টিকে আবছা করে তোলে ধীরে ধীরে। যদিও দীর্ঘ চর্চায় সেই ক্ষমতা ফিরে পাওয়া সম্ভব, যেমনটি হয়েছে তার বাবার ক্ষেত্রে। দিদি যদি তিন চারদিন আগেও বলত তাহলে বাবাকে খুঁজে বের করা সহজ হত। অতিরিক্ত উত্তেজনায় আর চিন্তায় মন কাজ করছে না। এখন সাহায্য নিতে হবে যন্ত্রের। ‘অলক্ষ্য’ নিয়ে বেরোবার সময় গোষ্ঠী থেকে সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, এবং আরও কয়েকজনকে সাহায্যের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে সুস্পষ্টরূপে দৃশ্যমান হিংসাকে লক্ষ্য করেই কর্মাদ্মক তাদেরকে সঙ্গে নিতে রাজী হননি। পরশু রাত্রেই তো, ধ্যানে বসেছিল কর্মাদ্মক। হঠাৎ অনুভব করল অনেক দূর থেকে বাবা যেন বলছেন, ‘আমার ঘরের সিন্দুকটা খুলে দেখবি ১৩ তম তাকের একদম ভেতরের দিকে একটা যন্ত্র দেখতে পাবি। ওটা হল আত্মার অবস্থান নির্ণায়ক। ওটা দিয়ে আমার মুখের একটা ছবি তুলে ‘সন্ধান করুন’ এ স্পর্শ করবি। আমি যেখানেই থাকি, খুঁজে পেয়ে যাবি। এখন আমি এক তান্ত্রিকের জালে বন্দী। সে আত্মাকে সম্মোহিত করে মানুষের জীবন মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে, হতে চাইছে ত্রিকালদর্শী, এমনকী সে আত্মা বিক্রীর ব্যবসাও ধরেছে। মনুষ্য সমাজের অনেক ক্ষতি সে করেছে। নাম শ্রীঅংশুমান।’ ধ্যান ভেঙ্গে যায়, কথাগুলো শুনে প্রথমেই রাগে উত্তেজনায় মনুষ্যজাতিটাকেই শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবে সে। মাথা ঠাণ্ডা হলে মনে হয়, একজন মানুষের জন্য সমস্ত মানুষজাতিকে মেরে ফেলে কি লাভ! তারপর যখন ঐ তান্ত্রিকটাও মানুষেরই ক্ষতি করছে... হোক না সে মানুষ, কিন্তু মনুষ্যবিরোধী। তাই সে ঠিক করল, সে একাই ওর অপরাধের শাস্তি দেবে। দীর্ঘ পথ, কখনও আলো, কখনও অন্ধকার। সুর্যের রশ্মি না থাকলে সঞ্চিত শক্তিতে কাজ চালাতে হয় অবশ্য সেটাও সৌররশ্মি থেকেই সংগৃহীত। কোমরবন্ধক টা খুলে নিয়ে শীতল ঘরটার দিকে গেল সে। পাশেই বাবার দেহটা ঘুমিয়ে আছে এক অসীম তৃপ্তিতে। এখন কি উচ্চভূ তে দিন, নাকি রাত? ঘড়িটা দেখতেও ইচ্ছা করেনা তার। খাবার বা শক্তির অপচয় এখন আর করা উচিৎ হবেনা। আর একটা কাঁচের বাক্সের মধ্যে ঢুকে গেল সে। নরম বিছানায় শরীরে নেমে এল এক অসীম তৃপ্তি, আলো নিভে এল। যেন অনেক দূর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। চোখ বুজে এল। ৩ ‘শ্রীঅংশুমান বাবু, কিংস ভ্যালি থেকে লিখছি। আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় বেশ কয়েকটি পিরামিডের প্রাথমিক খননকার্য আটকে দিয়ে সেখান থেকে চোরাপথে আমাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বের করে নিতে সক্ষম হয়েছি আমরা। এটাও সেরকমই আর একটা প্রয়াস। কয়েকদিন আগে মুস্তাফা ফিরেছে। ওর কাছেই শুনলাম আপনি অসুস্থ, তাই আপনার সুস্থতা কামনা করি এবং আপনি আপনার সময়মত উত্তর দেবেন এই কামনা করি। আপনি যে এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে যথাশীঘ্র জানাবেন সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট আস্থা আছে। তারপরই আপনার টিকিট এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বন্দোবস্ত করে ফেলা হবে। - ওমর’ মেলটা চোখে পরতেই চোখ চকচক করে ওঠে শ্রীঅংশুমানের। আবার অনেকগুলো টাকা। তাছাড়া শুধুমাত্র টাকাই বা বলি কেন, আবার একরাশ ক্ষমতার অধিকার... একটা আত্মাকে বন্দী করা হবে আবার। তারপর তাকে দিয়ে ইচ্ছামত... একেকটা আত্মার একেকরকম গুণ, সম্মোহিত করে যা খুশী করিয়ে নেওয়া যায় তাদের দ্বারা। এই যে পরের জৈষ্ঠে এক হাজার বছর বয়স অতিক্রম করবে সে, সে আয়ু কি আর এমনি এমনি এসেছে! একেকটা আত্মার থেকে অল্প অল্প করে আয়ু জমিয়ে কখন যে এতদিন হয়ে গেছে, সে নিজেও বোঝেনি। শুধু তার মা যদি এতদিন বেঁচে থাকত, সন্তানের এই সাফল্যে কতই যে খুশী হত ভাবতেও মন খারাপ হয়ে যায়। তবে এখন পিছন ফিরে তাকানোর সময় নয়। তার সাধনা বড়ই গোপন। তাই প্রায়ই স্থান ও বেশ বদল করতে হয় তাকে। হাজার বছরের একটা মানুষের কথা জানতে পারলে কেউ কি আর ছেড়ে দেবে? খবরের চ্যানেলে ইন্টারভিউ, এখানে সেখানে ডাকাডাকি... নিজের সাধনাটাই হয়ত মাটি হয়ে যাবে। তারপর বেশী হিতৈষী হলে হয়ত মেরে ফেলে শরীরের অঙ্গগুলিকে পরীক্ষা করে দেখতে আর বুঝে নিতে চাইবে এই দীর্ঘজীবনের রহস্য। তার চেয়ে এই অজ্ঞাতবাসই ভালো। অবশ্য ছোটোখাটো কিছু পার্টি ধরে এই ধরণের কাজগুলি সে বহুদিন ধরে পেয়ে আসছে। এতে পেট যেমন চলে, তেমনি সংগ্রহে বাড়তে থাকে একের পর এক আত্মা। এইতো সেদিন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বেইমান আত্মা হঠাৎ সুপ্তাবস্থা থেকে জেগে উঠল। বাধ্য হয়ে তাকে একটা কাজ দিতেই হল। কাজ না পেলে আবার রেগেমেগে অন্যান্য আত্মাদের আক্রমণ করতে পারে... এ ব্যাটা বেশ শক্তিশালী। অনেকদিন ধরে বাইরের দেশের এক জঙ্গীর অর্ডার এসে পড়ে আছে। তাকে নাকি এমন এক আত্মা ভাড়া দিতে হবে যে আত্মঘাতী হামলা করতে যাওয়া ব্যাক্তির মগজ ধোলাই করবে তার উপর ভর করে। ভোররাত্রে জঙ্গী হামলায় আক্রান্ত হল বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র। প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু... এ জিনিস বিশ্ব ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায়না। অংশুমানের দৃঢ় বিশ্বাস, যত বেশী মানুষের আয়ু সে তাড়াতাড়ি শেষ করে দিতে পারবে, ততই একটু একটু করে পূর্ণ হয়ে উঠবে তার আয়ুর পাত্রটি। হচ্ছেও, তা নাহলে কি আর পরে জৈষ্ঠে সে হাজার বছর অতিক্রম করতে পারত! একটু একটু করে এগিয়ে গেল সে সামনের টেবিলে কাঁচের জারে রাখা পুতুলটার দিকে। এই পুতুলটা এখন তার বড্ড প্রিয় হয়ে উঠেছে। হবে নাই বা কেন! অন্যান্য সব আত্মাকে সে বন্দী করেছে জীবিত অবস্থায়, আর এটা একটা জীবিত প্রাণীর আত্মা... নিজেকে কেমন যেন ভগবান ভগবান মনে হতে লাগল তান্ত্রিক শ্রীঅংশুমানের। পরণে রক্তবস্ত্র, কপালে লাল তিলক। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওই জারেরই পাশ থেকে তুলে নিল সেই পাথরের বাক্সটা... যেটা নাহলে হয়ত এই আত্মাকে বন্দী করা তার পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হতনা। ব্যবহৃত জিনিস থেকে স্মৃতিকে বের করে আনার বিদ্যা সে গুরুর কাছেই পেয়েছে বহু বছর আগে। অবশ্য এখনও চাইলেই সে গুরুর কাছে উপদেশ নিতে পারে। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি প্রকাশ পেল তার, তারপর দৃষ্টি গেল ঘরে পূর্ব দেওয়ালে তাকগুলোয় রাখা বয়ামগুলোর দিকে। সবারে উপরে তাকে মাত্র একটা বয়াম, যেটায় সকাল সন্ধ্যে পূজো হয় যথাবিহিত সম্মান সহকারে। সেখানে সিঁদুরের অক্ষরে লেখা আছে, “ওঁ অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্। তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।।" ৪ টিঁক টিঁক টিঁক করে বেজেই চলেছে অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্রটা। গত কয়েক ঘন্টার মধ্যে অনেকখানি অবস্থান বদল করেছে আত্মাটা পৃথিবীর পশ্চিমে। এই দেখে স্বয়ংক্রিয় চালকও হতভম্ব হয়ে পড়েছে তাকে ঠিক কোথায় যেতে হবে... তাই বাধ্য হয়েই শীতল অবস্থা থেকে জাগিয়ে তোলা হল কর্মাদ্মক কে। পর্দায় জ্বলজ্বল করে ফুটে উঠেছে, ‘আপনি কি গন্তব্যস্থল পরিবর্তন করতে চান?’ ‘হ্যাঁ’ তে স্পর্শ করে এবার নিশ্চিন্ত হয়ে বসল সে। এ যন্ত্র যে ভুল করতেই পারেনা সে সম্পর্কে একটা ধারণা ধীরে ধীরে বহুজনের মন্তব্যে গড়ে উঠেছে তার। আজও তার কেরামতি সে দেখতে পেল এইভাবে। এই ভিনগ্রহে একা একা ঘুরতে আসতে যে সাহসের প্রয়োজন হয় তার অনেকটাই এই মহাকাশযানের ভরসায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবীর অভিকর্ষ সীমায় প্রবেশ করবে তার যান। তাই সোজা পথ ছেড়ে এবার কৌণিক ভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবীর পরিধি বরাবর ঘোরার ভান করতে করতে অভিকর্ষ বলকে ফাঁকি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে সে। সেই উদ্যোগ ‘অলক্ষ্য’ অনেক আগেই নিতে শুরু করেছে বুঝতে পারল কর্মাদ্মক। তাই কোমরবন্ধকটা বেঁধে নিয়ে বসে পড়ল সে। কানের পর্দায় চাপের তারতম্য কম বোধ করেই জানলাটা খুলে দিল সে। রৌদ্রে চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। তার উপর সাদা সাদা মেঘের রাশির উপর আলোর প্রতিফলন। হ্যাঁ আর বেশী দূরে নয় অভিপ্রেত জায়গাখনি, যেখানে পাওয়া যাবে তার বাবার আত্মাকে। তারপর সসম্মানে সে আত্মাকে দেহে প্রতিষ্ঠা করে নিয়ে যাবে নিজের গ্রহে, যেখানে তার বোন অপেক্ষা করে আছে বাবার নিজের হাতে তৈরী গোশালার দুগ্ধ দিয়ে তৈরী নানা সুস্বাদু খাবার হাতে, নতুন গ্রহের রোমাঞ্চকর ঘটনার কাহিনী শুনবে বলে। বাবা বাড়িতে না থাকলে যে কারওরই মুখে খাবার রোচে না। কাঠের মেঝেতে গোল হয়ে বসে খাবার পিঁড়িটায় সবাই মিলে খেতে বসার আনন্দ আবার কবে ফিরে পাবে... ভাবতেই দুচোখ ছলছল করে উঠল অশ্রুর প্লাবনে। অনেকক্ষণ সাদা মেঘের রাজ্যে বন্দী থাকার পর এবার দেখা পাওয়া গেল ভূপৃষ্ঠের। কিন্তু এ জমি এত রুক্ষ কেন? সবুজের লেশমাত্র নেই। শুধু ধুসরতার ভরা প্রান্তর... আর মাঝে মাঝে কালো কালো ছায়া, এত উপর থেকেও যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তাদের কোনটা সাদা মেঘের, কোনটা কালো... কোনটা আবার কমলা রঙের মেঘের থেকে সৃষ্ট। ‘ই ওয়ে’... চমকে পাশ ফিরে তাকাল কর্মাদ্মক এক অচেনা নারী কণ্ঠে। বালিপাহারের মাঝে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হল যে জায়গাটা সেখানে মহাকাশযানটা রেখে ইতস্ততঃ ঘোরাঘুরি করছিল সে। ডাক শুনে ঘুরে তাকিয়ে এমন হতভম্ব হয়ে গেল যে দেখতেই পেলনা হাতঘড়িটার পর্দায় তখন ফুটে উঠেছে “এই কথার অর্থ হল ‘আপনাকে স্বাগতম’। এর উত্তরে আপনাকে বলতে হবে ‘এম হোতেপ’।” মেয়েটির আরও দুবার ডাকে সম্বিত ফিরল তার। ইশারায় মেয়েটি তার সঙ্গে যেতে বলে হাঁটা লাগাল। অবুঝের মত পিছু পিছু এগিয়ে চলল সে। অদূরেই একটা ঘেরা জায়গা যেখানে রয়েছে শয়ে শয়ে মেষ। তারই ভিতরে একটা খাটিয়ায় বসতে দিল মেয়েটি। চোখে মুখে তার বড্ড মায়া। দেখেই বুঝেছে ছেলেটি ক্ষুধার্ত। একটা পাত্রে কিছু খেজুর আর বদনা ভর্তি গরম তরল এনে রাখল ছেলেটির সামনে। তারপর একটা পেয়ালায় ঢেলে দিল পানীয় আর একটায় নিজে খেয়ে দেখিয়ে দিল কিভাবে খেতে হয়। দেখাদেখি কর্মাদ্মকও বেশ কয়েকবার পান করল সে পানীয়, কয়েকটা খেজুর মুখে দিয়েই বুঝল তার অপূর্ব স্বাদ। বঙ্গদেশের মানুষের আতিথেয়তার গল্প সে শুনেছে বাবার মুখে, কিন্তু এই ধরণের আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা, অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্রের ঘন সবুজের বদলে বালুরাশির মধ্যে নিয়ে আসা - সব যেন কেমন অন্যরকম মনে হতে শুরু করল তার। চোখ বুজে এল। সন্ধ্যার পর গরম বালুরাশি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। আকাশের গায়ে টিমটিম করে জ্বলছে রাতের তারারা। ওদের অনেকেই হয়ত আজ আর বেঁচে নেই, তবুও বেঁচে আছে ওদের আলো, যেমন করে মৃত্যুর পর রয়ে যায় স্মৃতিগুলো। তারাদের বিশাল আয়তনের জন্যই হয়ত ওদের স্মৃতিগুলো এত দীর্ঘস্থায়ী। আকাশের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবছিল কর্মাদ্মক। এরই মাঝে কাঁপতে শুরু করল থলিতে রাখা আত্মার অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্রটা। কিন্তু কোথায় সেই মেষপালিকা আর কোথায় তার পালিত ভেড়াগুলির শব্দ-গন্ধ অথবা অনুভূতি? শুধু একটা খাটিয়ার উপরে সে, আর চরিদিকে ঘন অন্ধকার। হাতঘড়িটা দুবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে আলো জ্বালল সে। না, পাথুরে বালি আর নির্জনতা ছাড়া কিচ্ছু চোখে পড়ছেনা। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল সে। ৫ অনেকক্ষণ চলার পরে হঠাৎ রাস্তা গেল থেমে। সামনে বিরাট এক বেলেপাথরের দেওয়াল। কিন্তু দিক নির্দেশ করা আছে এদিকেই। অতএব এগোতে হবে... কিন্তু কিভাবে। ঠিক এইসময় ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। হাতের আলোটা গেল নিভে। তার বদলে দেওয়ালের গা বরাবর দেখা গেল একটা ফাটল, তার ভিতর থেকে হালকা আলোর রেখা চোখে পড়ছে। ফাটলে কান পাতল সে। ‘কিন্তু আমার ছেলেকে আমি কেন মারব?’ এ তো বাবার গলা, হতচকিত হয়ে উঠল সে। ‘কারণ নাহলে আপনার উপর যে অত্যাচার হবে তা আপনি সহ্য করতে পারবেন না শ্রী মনাকদ্ম। মনে পড়ে সেই রাতের কথা? যখন পণ্ডিতমশাইয়ের আতিথেয়তার সুযোগে তার বাড়িতে কাজ করতে আসা ছোট্ট মেয়েটাকে ভালোবাসার লোভ দেখিয়ে... ছিঃ ধিক আপনাকে। না না, পালানোর কথা মনেও আনবেন না। বয়ামের মধ্যে দুটো কুঠুরি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন, সাদা দিকটায় আপনার ভালো সত্ত্বাটাকে মন্ত্রবলে আটকে রেখেছি, যে অংশটাকে কাজ করতে পাঠাব সেটা কালো দিক অর্থাৎ আপনার খারাপ সত্ত্বা। তাই পালিয়েও আপনি সম্পুর্ণ নিজেকে কখনওই ফিরে পাবেন না, বাকী অর্ধের টানে বারে বারে এই পাত্রে আপনাকে ফিরে আসতেই হবে।’ এটাই কি তবে সেই তান্ত্রিক, বাবা যার কথা বলেছিল! কিন্তু ও কে? ফাটলের মধ্যে দিয়ে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে যে জিনিস চোখে পড়ল তাতে পা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হল কর্মাদ্মকের। একটা কারুকার্য করা একটা বাক্সে নানারকম খোদাই করা। তারই মাঝখান থেকে উঠে বসেছে এক নারীমুর্তি, যেন অর্ধেক শক্তি অর্ধেক শরীর। ধীরে ধীরে সে সম্পূর্ণ নারীমুর্তির রূপ পেল। তারপর তান্ত্রিককে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘এবার আমাকে মুক্তি দিন, আমি আপনার কথামত ছেলেটির আত্মাকে এনে হাজির করেছি এই গম্বুজের বাইরে, আপনার উপহার গ্রহণ করে আমায় ছেড়ে দিন। আর উপহার হিসাবে রেখে দিন এই প্রাসাদ, আপনার সাধনার গৃহ হিসেবে। সারাজীবন।’ আত্মা? কি বলছে মেয়েটা? হঠাৎ করেই নিজেকে প্রাসাদসম বাক্সের ভিতরে আবিষ্কার করল সে। ডানপাশের বয়ামটায় বাবার আত্মা ভীষণভাবে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আর বাঁদিকেরটায় সেই অর্ধেক শক্তি আর অর্ধেক শরীর মেয়েটা, যে খিদের সময় তার হাতে তুলে দিয়েছিল খাদ্য, পানীয়, আর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল কয়েক ঘন্টার শান্তির ঘুমের। ‘তাহলে আজ কটা হল তান্ত্রিক মশাই?’ এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন মশালের আলোয় আলোকিত গম্বুজটার ভিতরে। ‘আরে মুস্তাফা, এসো এসো। তা খান দুয়েক হল বুঝলে আজ। ভেতর থেকে এই কন্যাকে পাওয়া গেল, আর ফাউ হিসাবে এটা।’ পাশাপাশি রাখা মেয়েটা আর কর্মাদ্মক এর বয়ামগুলোর দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করল তান্ত্রিক। ‘এবার আসুন অন্যান্য জিনিসপত্রগুলো ভাগ বাটোয়ারা করে রাত্রের মধ্যেই সরে পড়া যাক।’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ চলো, সেই বরং ভালো।’ *** ‘আচ্ছা বাবা, আমরা কি আর কখনওই গ্রহে ফিরে যেতে পারবনা?’ ‘আমি তোমার দেহটাকে তোমার আকাশযানের ভেতরের শীতল ঘরে রাখিয়ে দিয়েছি। যতদিন না লোকের নজরে পড়ছে আর সৌরশক্তির যোগান আছে, তোমরা দুজন জীবিতই থাকবে। হয়ত কোন একদিন আবার আকাশের ওপার থেকে তোমাদের ডাক আসবে, তোমরা ফিরে পাবে তোমাদের আত্মীয় স্বজন, কাছের মানুষদের।’ বহুকাল আগের মমি থেকে বেরিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া মেয়েটির আত্মা বলে উঠল। ‘আমার ভুলের জন্য তোকেও... পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা।’ হতাশ মনাকদ্মের গলা ধরে এল। *** দেশে ফিরে গুরুদেবের তাকের উপরে আর একটা তাক বানাল শ্রীঅংশুমান, শুধুমাত্র মনাকদ্মের জন্য। সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখানো হল, ‘‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপ। পিতোরি প্রিতিমা পন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ।।’’ বাকী দুজনের ঠাঁই হল অন্য আত্মাদের পাশে।

81

4

অপন

যে শারদীয়া বেরোয়নি

বৃদ্ধাশ্রমে'র কথা ডালিয়া মুখার্জী .............. এ লেখা আমি যখন বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করতুম মানে স্বেচ্ছাসেবিকা ছিলুম তখনকার। আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে সোমবার দুপুরটা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের নিয়ে খেলাবার দুপুর। এখানে আমার নিজেরও একটা খেলার গ্রুপ আছে। বেশ কয়েক বছর ধরে এই খেলানোর কাজটা করছি। তাই আমার গ্রুপের সকলকেই আমি ভাল ভাবেই চিনি। এই গ্রুপে এক মহিলা আসেন, হুইল চেয়ারে বসা। তার স্বামী তাকে এনে আমার গ্রুপে বসিয়ে দেন। ভদ্রমহিলার হাতে তত জোর নেই। তবু নিজের মত খেলে চলেন। এরমধ‍্যে তিনমাস দেশে চলে গেছিলুম। ফিরে এসে আবার এই কাজে যোগ দিলুম। সেদিনও গেছি খেলাতে। অনেকদিন পরে উক্ত মহিলাকে আবার আমার গ্রুপে দেখতে পেলাম। জিভটা বেরিয়ে আছে, বাকশক্তি রোহিত। দেখে চমকাবারই কথা। নার্স কে জিজ্ঞেস করলাম ‌কি হয়েছে ওঁনার। নার্স উত্তর দিলেন স্রেরিবাল অ্যাটাকে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। কি আর করা যাবে। খুবই কষ্টের ওঁনাকে বোঝা। ভাবলুম সত‍্যি কি আর করা যাবে। যে মহিলাকে হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখে এসেছি অনর্গল কথা বলতেন, আজ ভগবান তার কথা বলার শক্তিটুকুও নিয়ে নিলেন। ব‍্যাথায় বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠলো। একি শাস্তি মহিলার ! কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু কেউই যে তার কথা বুঝতে পারছে না। মনে হল এই কি ছিল তার শেষ বয়সের প্রাপ্তি! বিধির কি নিষ্ঠুর পরিহাস। জিজ্ঞেস করলাম. ‘ম‍্যাডাম চা কফি কিছু খাবেন।?’ গলা দিয়ে শুধু ঘরঘর শব্দ বের হোলো। কিছুই বুঝতে পারলুম না। নার্স বললেন চা, কফি উনি খেতে পারবেন না। আস্তে আস্তে হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এলুম টেবিলের সামনে। হাতে যতটুকু জোর ছিল তাই দিয়েই ঘুঁটিগুলো ফেলতে লাগলেন। কিন্তু হাতের জোরটুকুও বোধহয় ভগবান কেড়ে নিয়েছেন। আস্তে আস্তে তবু কি অক্লান্ত পরিশ্রমই না ভদ্রমহিলা করে চলেছেন একটি ঘুঁটি ঘরের ভেতর ঢোকাবার জন‍্যে। মাঝে মাঝে মহিলাকে পিঠ চাপড়ে বলতে লাগলুম খুব ভাল খেলছেন। এটা সকলকেই বলতে হয়। তাহলে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা খুব খুশি হন। মনে মনে মহিলার প্রশংসা না করে পারলুম না। খেলা শেষে পয়েন্ট যোগ করে দেখলুম ভদ্রমহিলার ১২০ পয়েন্ট হয়েছে। যদিও এটা খুব একটা বেশি নয়। তবু মহিলাকে বলতেই একটু যেন হাসার চেষ্টা করলেন। আজ অত‍্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এসেছি বাড়িতে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেবলই ভদ্রমহিলা জিভ বার করা মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একজনের মুখে শুনেছিলুম শারীরিক কষ্ট ওষুধে লাঘব করা যায়, কিন্তু মানসিক কষ্টের লাঘব নেই। আজ ভাবছি সত‍্যিই কি তাই? আমার গ্রুপে আরও একজন মহিলা ছিলেন যার সঙ্গে তার মেয়ের বত্রিশ বছর কোন সম্পর্ক নেই। দু'বছর আগে স্বামী মারা গেছেন , মেয়েকে খবরও দিতে পারেননি। মেয়ে কোথায় আছে জানেন না। আমার সঙ্গে বসে মাঝে মাঝে কথা বলতেন , মেয়ের কথা আর কাঁদতেন। তখন আমারও খুব কষ্ট হোত। এখন এই শারীরিক অসুস্থ মহিলাকে দেখে দুজনের মধ্যে তুলনা করতে শুরু করেছি। বত্রিশ বছর মেয়ের সঙ্গে দেখা নেই মেয়ের মুখটাও বোধহয় তিনি ভুলে গেছেন। তবু প্রতি সোমবারেই তাকে দেখি খেলতে আসেন। আর এই বাকশক্তি রোহিত মহিলাও আসেন খেলতে। একজন যুদ্ধ করছেন মনের সঙ্গে। অন‍্যজন শরীরের সঙ্গে। কার কষ্টটা তবে বেশি? জানি না কোনদিন এর উত্তর আমি পাব কি না, তবু মনে মনে সেই বিরাট শক্তির কাছে মাথা নত করলুম।বললুম এদের দুজনের কষ্টই তুমি লাঘব কর প্রভু। আজ এই মহিলারা আমার মনে যে দাগ কেটে গেলেন তা কি আমি কোনদিন ভুলতে পারব ? আজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মনে হয় যে বিরাট শক্তি সারা বিশ্বকে চালাচ্ছেন কখনও তিনি মানুষ কে বসান সোনার সিংহাসনে, কখনো বা মানুষের জন‍্যে রাখেন কন্টক শয‍্যা। কি অদ্ভুত তার বিচার।!তবু এই বিরাট শক্তি কে প্রণাম না করে পারি না।

496

65

মনোজ ভট্টাচার্য

অবশেষে – আদ্রার বৃদ্ধাবাস !

‚ মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে এসেছিলেন ও থেকেছেন – এ তথ্য জানতাম না ! এদেরই পত্রিকা পূর্বাশা ২০১৮ সংখ্যায় শ্রী অমিয় কুমার সেনগুপ্তর একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে এই ইতিহাস দেওয়া আছে । আমি চেষ্টা করছি একটু সংক্ষেপে লিখতে । ১৮৭২ সাল । তখন পুরুলিয়ার রাজনৈতিক ম্যাপ অন্যরকম ছিল । কাশিপুর পঞ্চকোট রাজ্যের সম্পত্তি সারা পুরুলিয়া জুড়েই ছড়িয়ে ছিল । পঞ্চকোট রাজ্যের অধিপতি ছিলেন নীলমণি সিংহদেও । সিপাহি বিদ্রোহের তাণ্ডবের জেরে ও মামলা মোকদ্দমার ফলে ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে তার কারাবাস হয় একাধিকবার । এইসময় নাগাদ পুরুলিয়ার আদালতে একটা মামলার সুবাদে মাইকেল মধুসূদনকে আসতে হয় । যদিও তার এই আগমনের বিষয়টাকে খুব গোপন রাখা হয়েছিলো । ফলে তিনি কার পক্ষে – কী মামলায় লড়তে এসেছিলেন – সঠিকভাবে কিছুই জানা যায়নি । তবে আদালতে সওয়াল জবাবের সময়ে অবশ্য একথা আর গোপন রাখা যায় নি । ঐদিনই তাকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছিল – তা হল গসনার ইভানজেলিক লুথেরান চার্চ । মাইকেলের পুরুলিয়ার আসার খবর ঐ চার্চের দুই পুরোহিতের কানে যাওয়ার সাথে সাথে সাথে তারাও তাকে মিশনারিদের পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা দেবার মনস্থ করে । কিন্তু মাইকেল আগে থেকে তৈরি ছিলেন না । তাঁর কলকাতায় ফেরার কথা ছিল । তা স্বত্বেও তিনি চার্চ কর্তৃপক্ষর অনুরোধ ফেরাতে পারেন নি । - কবি তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিমায় গির্জার মাঠে সেই সন্মান গ্রহন করে খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছে কৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ হলেন । এ ছাড়াও আরেকটি অনুষ্ঠানে তাকে থাকতে হয়েছিলো । ঐ চার্চের অন্যতম সদস্য কাঙ্গালি চরন সিংহের পুত্র কৃষ্ণদাস সিংহের খৃস্টধর্মে দীক্ষা অনুষ্ঠানে ধর্মপিতার ভুমিকা পালন করতে হয় । এবং এদের অনুরোধে মাইকেল লিখলেন একটি সনেট – কবির ধর্মপুত্র । এরপর মধুসুদন কলকাতায় ফিরে যান । এদিকে ক্রমাগত ব্রিটিশ বিরোধিতার কারনে রাজা নীলমণি সিংহদেওকে বেশ কয়েকবার কারাবন্দী হতে হয়েছে । তারই মধ্যে আরও একটি মামলায় তাকে জড়িয়ে পড়তে হল। সেই মামলায়ও তিনি হেরে গেলেন । সেই সময় তিনি শুনলেন মধুসুদন দত্ত নামে এক কলকাতার ব্যারিস্টার-কবি পুরুলিয়া শহরে মামলার কাজ নিয়ে এসেছেন । তাকে নিয়ে আসার জন্যে লোক পাঠানো হলে – মাইকেল ইতিমধ্যে কলকাতায় ফিরে গেছেন। মহারাজ নীলমণি ঠিক করে ফেললেন – মধু-কবিকে চাকরি দিয়ে পুরুলিয়ায় আনবেন । মাইকেলের নাকি মনোগত ইচ্ছে ছিল কোন রাজ সভার সভাকবি হওয়া । তাঁর আর্থিক অবস্থাও তখন স্বচ্ছল যাচ্ছিল না । তিনি মহারাজার চাকরি গ্রহন করলেন ও ১৮৭২ সালের মার্চ মাসে পুরুলিয়ায় এলেন । কিন্তু মুলত যে মামলাটি লড়বার জন্যে মাইকেল এসেছিলেন – সেই মামলাটি তিনি হেরে যান । অর্থাৎ মহারাজারও হার হল । - তিনি ধরেই নিলেন তাঁর আর এই রাজদরবারে থাকার প্রয়োজন নেই - হয়ত তাঁর পক্ষে ক্ষতিকারক ও বিপজ্জনক হতে পারে । এই সময় মাইকেল মানসিকভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়েছেন । কলকাতায় তখন তাঁর বিপুল ধার-দেনা । - তবু এখানে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হল না । - নীলমণি মহারাজার হয়ে যে জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে তিনি মামলা লড়লেন – তাদেরই এক আত্মিয়র সাহায্যে মাইকেল রাজবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন । ১১ই সেপ্টেম্বর বা ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৮৭২ সালে তিনি জয়চন্ডী পাহাড়ের পাশ দিয়ে রঘুনাথপুর হয়ে তিনি চলে এলেন । এর পর মাত্র ন’মাস মধুসুদান বেঁচে ছিলেন – ২৯শে জুন, ১৮৭৩ । মাইকেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে খুব বথিত হৃদয় মাইকেলের বকেয়া মাইনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । - মহাকবির এই পুরুলিয়া-অধ্যায়টি বড়ই বিতর্কিত ও বিয়োগান্ত ! এর মধ্যে রাজার মামলা হেরে যাওয়া নয়, রাজসভার চক্রান্ত ও রাজার কন্যা চন্দ্রকুমারীর কাল্পনিক প্রেম সংক্রান্ত ঘটনা । মনোজ ( মাইকেলের পুরুলিয়া আসার এই অংশটা এখানে না দিলেও হত । কিন্তু এতো বড় একটা ঘটনা - না দিলে একেবারে না-জানা থেকে যেত !)

108

4

মানব

নতুন খাতা

{s2} দশ বছরের ঋণ {/s2} ধর, তোর সাথে আবার হল দেখা, হয়ত তখন নেই আর তুই একা। ধর, তোর বাড়িতে তিনটে ঘরই পাকা, একখানাতে থাকিস তোরা, বাকী দুটোই ফাঁকা। আমার হয়ত টালির ছাদে ফুটো, কানাকড়ি নেইত হাতে, ঝড়ের তোড়ে ঘরে আসে কুটো। মেট্রো সিটের অন্য দিকে তুই, অবাক চোখে শুধুই চেয়ে রই, চিনতে কি আর পারবি তখন তুই? মণ্ডি হাউস পেরিয়ে যখন প্রগতি ময়দানে, নেমে যাবি হয়ত তখন অচেনা কোন টানে। হেঁটে হেঁটে ফেরার সেসব দিন আলতো করে দুঃখ দেবে, ঝুলি ভর্তি দশ বছরের ঋণ।

164

24

দীপঙ্কর বসু

দেউনিয়া য় একটা দিন

দেউনিয়ায় একটা দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা বাবলার ফোনে পেলাম লং ড্রাইভে যাবার আমন্ত্রণ ।গন্তব্য পশ্চিম মেদিনিপুরের শ্যামচক এ । সেখানে বাবলা শ্যামচকের দেউনিয়া গ্রামের দেবাশিব ওম এর সঙ্গে যৌথ ভাবে পশুপালন এর উদ্যোগ পত্তন করেছে । আপাততঃ সেখানে মুর্গি পালনের কাজ চলছে দেবাশিববাবুর ছোট ছেলে সাহেব এর তত্বাবধানে ।সে পশুপালন বিষয়ে বিস্তর পড়াশনা করেছে । ভবিষ্যতে মুর্গি পালন ছাড়াও পরিকল্পনা আছে ছাগল পালনের । আমার স্মৃতিশক্তির ওপরে বোধহয় বাবলার ততটা ভরোসা নেই ,তাই আবার শণিবার রাতে ফোনে জানতে চাইল আমার গোছগাছ সম্পূর্ণ কিনা – আমি যাত্রার জন্য প্রস্তুত কিনা । জবাবে ওকে বললাম “গোছগাছের আর কি আছে , পরণের প্যান্টটা থাকলেই হল ।সেটা আছে হাতের কাছেই”। পরের দিন সকালে ঢাকুরিয়া থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন আমাদের অপর এক জামশেদপুরতুতো বন্ধু ,গবেষক ও সুলেখক শ্রী অলোকরঞ্জন বসুচৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী জুঁই ।অলোকরঞ্জনের লেখা রবীন্দ্রনাথের চোখে স্বামী বিবেকানন্দ ,ব্রহ্মবান্ধব এবং ঋষি অরবিন্দ –এই বিষয়ে “রবীন্দ্রবীক্ষণে তিন স্বদেশী নায়ক” শীর্ষক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে সাম্প্রতিক বইমেলায় ।সে কথা হবে প্রসঙ্গান্তরে আপাততঃ বলি ওদের তুলে নিয়ে আমরা চললাম সাঁতরাগাছি পেরিয়ে বম্বে রোড ধরে ।কি চমৎকার ছয় লেন এর ঝকঝকে রাস্তা ।হুহু করে ছুটে চলল গাড়ি ।ভেতরে আমরা মেতে আছি গানে গল্পে । মাঝে একবার থামতে হল কোলাঘাট পার হয়ে ।ব্রেকফাস্ট সারা হল শের-এ-পাঞ্জাব ধাবায় । আমি ,অলোকরঞ্জন এবং জুঁই খেলাম দোসা – বাবলা সায়েব মানুষ – সে খেল চীজ স্যান্ডুইচ । কফি দিয়ে ব্রেকফাস্ট পর্ব শেষ করে আবার ছুটে চলা । মাঝে পথভুলে একটু এগিয়ে গিয়ে আবার ঘুরে এসে সঠিক রাস্তা খুঁজে নিয়ে বম্বে রোড ছেড়ে মোরামের রাস্তায় নেমে পড়লাম ।বড় রাস্তা থেকে মোরামের রাস্তা ধরে প্রায় দুই কিলোমীটার পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম “আশ্রমে”।একটা ঝিলের ধারে এসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া ঘর ,ট্যাঁর পাশেই লম্বা খাঁচা - যেখানে মুর্গি পালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে ।মুর্গি পালনের নানান খুঁটি নাটি আমাদের বুঝিয়ে দিল সাহেব । এমনকি ভবিষ্যতে ছাগল পালনের জন্য প্রয়োজনীয় নেপিয়ার ঘাসের চাষ হচ্ছে তাও দেখাল ।এই জাতীয় ঘাসের খাদ্যগুন নাকি সাধারণ ঘাসের চেয়ে প্রায় তিনগুন বেশি । যাক সে কথা । “আশ্রমের” আঙিনায় বসে চা বিস্কুট খেয়ে বাকিরা যখন গল্পগুজবে মেতে উঠল আমি বেরিয়ে পড়লাম ছবির খোঁজে । যেদিকে দুচোখ যায় সবুজ ধানক্ষেত ।সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দুচোখ জুড়িয়ে যায় ।এই হল আমাদের শষ্য শ্যামল গ্রাম বাংলা । বেলা দেড়টা নাগাদ পেটে খিদের ডাক শোনা গেল । আমাদের দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্যবস্থা করা ছিল সাহেবের বসত বাড়িতে । সেখানে আমাদের গাড়ির আগে আগে সাহেব তার বাইক চালিয়ে নিয়ে চলল বাড়ির পথে অনেকটা ঠিক ভগীরথের মত । আঁকাবাঁকা মোরাম ঢাকা পথ দিয়ে আমরা চলেছি – আমাদের দুপাশে ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি । সেই সরু রাস্তা দিয়ে বাবলার গাড়ির চালকে যে অসামান্য দক্ষতায় আমাদের নিয়ে গেল তা বিশেষ উল্লেখ করার মত । পথে যেতে যেতে বাবলা আমাদের একটি অত্যন্ত জরুরী বিষয়ে অবগত করল ।বাবলার কথায় জানলাম যে বাড়িতে আমরা চলেছি সেখানে একটি ছোট্ট ডল পুতুলের মত বাচ্চা মেয়ে আছে । তার একটা অদ্ভুত সমস্যা আছে – বাড়িতে নতুন লোক এলে সে যে ভাষায় তাদের অভ্যর্থনা জানায় সেটা ঠিক ভদ্রজনোচিত নয় ।এই অশ্লীল শব্দগুলির মানে না বুঝেই মেয়েটি যন্ত্রবৎ সেগুলি আউড়ে যায় ।সুতরাং আমরা যেন শকড না হই । যদিও বাস্তবে বাবলার আশঙ্কা সত্য হয়নি ।মেয়েটি হাসি মুখেই আমাদের অভ্যর্থনা করল । অবশ্য তাকে নাম জিজ্ঞেস করায় শিশু সুলভ চাপল্যে সে জবাব দিল – “বলবুনি” । তা শুনে আমি সঙ্গে সঙ্গেই স্থির করেনিলাম তাকে আমি মিস বলবুনি নামেই ডাকব । ভালো লেগে গেল বাচ্ছা মেয়েটিকে । আমি ক্যামেরা বের করেছি দেখে সে নিজেই পোজ দিয়ে দাঁড়ালো ।বেশ কয়েকটি ছবি তুললাম তার ।বলবুনি ও দেখলাম ব্যপারটা বেশ উপভোগ করছে । আলাপ হল গৃহকর্তা দেবাশিব ওম বাবুর সঙ্গে । সহজ সিধেসাদা গ্রামীন ভদ্রলোক ।কথায় বার্তায় মেদিনিপুরিয়া টান স্পষ্ট । খেতে বসে জানা গেল মুর্গির মাংস তিনি নিজে আমাদের জন্য রেঁধেছেন । দেবাশিববাবুর বড় বৌমা মেয়েটি ও ভারি সুন্দরী সুশীলা তো বটেই , সেই সঙ্গে ইংরিজিতে এম এ্ । খাওয়াদাওয়ায় আড়ম্বর বিশেষ ছিলনা – ভাত ডাল আলুভাজা সঙ্গে নিজেদের পুকুরে ইয়াবড় মাপের বাটা মাছ ভাজা ,মুর্গির মাংস দৈ ,মিষ্টি ইত্যাদি । খিদের তাড়নায় ,নাকি পরিবেশনের গুনে জানিনা ভারি তৃপ্তি করে খেলাম । খাওয়ার শেষে সাহেব ব্যবস্থা করল বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের আলের ধারে বসে গল্প গুজবে আর মিস বলবুনির কলকলানি শুনে। এক সময়ে বেলা গড়িয়ে বিকেল হল আমাদের এবার ফেরার পালা । ওম বাড়ির সকলের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা ফিরে চললাম কলকাতার দিকে আমাদের নিত্যদিনের জীবনে ।

78

6

দীপঙ্কর বসু

ফিরে ফিরে চাই ...

প্ল্যানচেটে পরলোকগত আত্মাদের সঙ্গে আলাপ করার ব্যপারটা যৌবনে বাবার একটা প্রিয় ব্যসন ছিল । খড়্গপুরে রেলেওয়ে ওয়ার্কশপের কর্ম জীবনে ওঁদের বন্ধুবান্ধব মহলে ওঁরা প্রায়ই প্ল্যানচেটে বসতেন বলে শুনেছি । আমার জ্ঞানবয়সে দুই একবার জামশেদপুরের বাড়িতে ও প্ল্যানচেট এর আসর বসান হয়েছিল যেখানে আমার মা এর মাধ্যমে আমাদের পরলোকগত আত্মীয়দের সঙ্গে “কথা” হয়েছিল । পরে বাবার জামশেদপুরের বন্ধুরাও ব্যপারটি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে প্ল্যানচেটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বেশ কয়েকবার ।সেই সব প্ল্যানচেটের আসরে রবীন্দ্রনাথ ,শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও আর অনেক পরলোকগত “আত্মার” সঙ্গে আল্প হয়েছিল ।বেশ কৌতুকর মন্তব্য ভেসে আসত মীডিয়াম এর লেখনী মাধ্যমে । যেমন আমার ভাই শরতচন্দ্র কে কিছু একটা প্রশ্ন করায়(প্রশ্নটি কি ছিল তা আমার মনে নেই) শরতচন্দ্রের আত্মা জবাবে বলেছিলেন “তুমি তো বেশ জ্যাঠা ছেলে হে” ! যেদিন রবীন্দ্রনাথের আত্মার সঙ্গে প্ল্যানচেটে কথা হয়েছিল সেদিন নানা কথার মধ্যে জর্জ দার গান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আত্মার অভিমত জানতে চাওয়া হলে জবাব এসেছিল দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্র সংগীতের শ্রেষ্ঠ গায়ক । বাবা এই সংবাদটি দিয়ে জর্জ দাকে চিঠি দিয়েছিলেন ।তারই জবাবে জর্জ দা নিচের চিঠিটি লিখেছিলেন । পড়ুন সেই চিঠি - &lt;Debabrata Biswas Date 5.12.77 174E Rash Behari Avenue, Calcutta700 029 প্রীতিভাজনেষু পদ্মলোচনবাবু – বহুদিন বাদে হঠাৎ আপনার ১.১২.৭৭ তারিখের চিঠি এল;পড়তে পড়তে আমার একটি বহু পুরোনো গল্প মনে পড়ে গেল ।শুনেছি-(ঠিক কিনা জানিনা)রবিবাবুর অনিষ্টকর নয় এমন কিছু ব্যামো ছিল ।রবিবাবু যখন লেখার কাজে নিবিষ্টভাবে ব্যস্ত থাকতেন তখন হঠাৎ কোনো কিছুর প্রয়োজন হলেই –তাঁর পূত্রকে “রথী ঈ রথী” বলে চেঁচিয়ে ডাক্কতেন।এই ব্যারামটা নাকি আরেকজন নামজাদা লেখকের মাথায় সংক্রমিত হ’য়েছিল ।লেখকটির নাম তারাশঙ্কর বাবু ।তারাশঙ্কর বাবুও নাকি খুব মশগুল হ’য়ে লেখার কাজ চালিয়ে যেতেন।লিখতে লিখতে হঠাৎ যখন তাঁর একটু হুঁকোয় তামাক খাবার ইচ্ছে হোতো তখন তিনিও হঠাৎ “রথী- ঈ- ঈ – রথী” ব’লে চেঁচিয়ে ডাকতে শুরু করতেন।পরে অবশ্যি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাঁর পূত্রের আসল নাম ধরেই ডাকতেন ।কিন্তু ব্যামোটি রবিবাবুর কাছ থেকে পেয়েছিলেন ব’লে প্রায়ই এই ধরণের ভুল হত । রবিবাবুর নাকি আরেকটি ব্যামো ছিল “প্ল্যানচেট প্ল্যানচেট” খেলা । হাতে এবং মাথায় যখন কোনো কাজ থাকতনা তখন তিনি এই খেলা খেলতে খুব ভালোবাসতেন ।গতবৎসর কোনো একটি পত্রিকাতে(দৈনিক নয়)দেখেছিলাম শ্রী অমিতাভ চৌধুরী নামে একজন লেখক রবিবাবুর এই “প্ল্যানচেট প্ল্যানচেট” খেলা নিয়ে অনেক কিছু লিখেছিলেন।আপনার চিঠিখানা পড়ে বেশ বুঝতে পারলাম রবিবাবুর ঐ খেলার ব্যামোটি আপনাকে এবং ওখানকার সেই চক্রের সভ্যদের বেশ জেঁকে ধরেছ ।এই খেলাটি সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণাই নেই।তবে আপনাকে তো কয়েক বৎসর আগে আমি জানিয়েছিলাম যে গান আমি শিখিনি – কিন্তু গানে গানে ক্রিকেট খেলার কায়দাটি আমি খুব রপ্ত করে ফেলেছিলাম।মনে আছে তো ? বহুদিন আগেই আমার এই খেলায় আমার বোলিং এ আউট হয়েছিলেন অনেকেই ।্যারা জীবিত নেই তাদের মধ্যে ছিলেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী(রবিবাবুর ভ্রাতুস্পুত্রী),প্রশান্ত মহলানবিশ , প্রফুল্ল মহলানবিশ(তাঁকে বুলাদা ডাকতাম),অনাদি দস্তিদার,রথীন্দ্রনাথ , চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য্য এবং ব্রাহ্মসমাজের বহু নাম করা লোক । যাঁরা জীবিত আছেন তাঁদের নামের উল্লেখ করা এখানে প্রয়োজন নেই । পরলোকগতদের নাম কেন উল্লেখ করলাম তার কারণ পরে বলছি। রবিবাবুর আরো দুটি কঠিন ব্যামো ছিল – আপনারা তা জানেন কি – না জানিনা ।একনম্বর হল – তিনি অত্যন্ত কান পাতলা লোক ছিলেন – আর দুই নম্বর হল তিনি নানা সময়ে নানান ধরণের উল্টো পালটা কথা বলতেন । আপনারা নিশ্চই জানেন যে রবীন্দ্রসংগীত-অভিজ্ঞ পন্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদেরমতে আমি রবীন্দ্রসংগীত জগতে “হরিজন”।আমার বিরূদ্ধে অভিযোগ – আমি এই রবীন্দ্রসঙ্গীতের শুদ্ধতা বিনষ্ট ক’রে বিকৃত করেছি। প্রায় দশ বৎসর হ’ইয়ে গেল এই অভিযোগ শুরু হয়েছিল ।কিন্তু যে সব পরলোকগত ব্যক্তিদের নাম আগে উল্লেখ করেছি তাঁদের মধ্যে দুজন ছাড়া (অর্থাৎ ইন্দিরা দেবী ও অনাদি দা) আর কারোরই রবীন্দ্রসংগীত সম্বন্ধে কোনো পান্ডিত্য বা জ্ঞান ছিলনা –তবুও তাঁরা আমার গানের খেলায় আউট হয়ে গিয়েছিলেন । আমার মনে হচ্ছেএযে তাঁদের আত্মা পরলোকে পৌঁছেই রবিবাবুর আত্মার কাছে আমার সম্বন্ধে নানা কানমন্ত্র দিয়েছিলেন- এবং তিনি ওদেরকে খুব ভালোবাসতেন বলেই ওঁদের কথা বিশ্বাস করেছিলেন।কানপাতলা লোক ছিলেন তো । কিন্তু বর্তমান কালে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে আমার কী হাল ট্যাঁর রিপোর্ট রবিবাবুর আত্মা এখনো পাননি ।তাই আপনাদের প্ল্যানচেটে ওঁর আত্মা আমার সম্বন্ধে ঐধরণের মন্তব্য ক’রেছেন । হালে জ্যোতিরন্দ্র মৈত্র পরলোকে যাত্রা করেছেন –ওঁর আত্মা আবার রবিবাবুর আত্মার কাছে আমার সম্বন্ধে কী রিপোর্ট করবেন কে জানে? দুই নম্বর ব্যামোর কথায় বলি –উনি যে নানা সময়ে নানা উল্টো পালটা কথা বলতেন-আপনি নিশ্চই তা জানেন । তা ছাড়া উনি নিজেই তো ইহলোকে স্বীকার করে গিয়েছিলেন ।উনি লিখেছিলেন “ মত বদলিয়েছি।কতবার বদলিয়েছি টাড় ঠিক নেই”(সংগীত চিন্তা ২৪১পৃঃ)সুতরাং ভবিষ্যতে আপনাদের সেই চক্র যদি রবিবাবুর আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন তা’হলে আবার হয়তো দেখবেন যে ওঁর আত্মার মতে দেবব্রত বিশ্বাস একটি অতি নিকৃষ্ট গাআইয়ে ।কারণ উনি মত বদলাতেন –প্রলোকবাসী হ’ইয়ে মতবদলাবার অভ্যাসটি ছারহাবার মতো কোনো কারণ ঘটেছে কিনা জানিনা। যাইহোক –প্ল্যাঞ্চেটের আমার সম্বন্ধে খবরটি চক্রের বাইরের কাউকে দয়াকরে বলবেননা-কারণ তাহ’লে হয়তো আপনাদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা হ’তে পারে যাতে আপনারা “জামশেদপুর টু রাঁচী” শরীর খুব খারাপ-হাঁপানী এবং সর্বাঙ্গে বাতের বেদনায় খুব কষ্ট পাচ্ছি।আশাকরি সপরিবারে ভালোই আছেন। আন্তরিক শুভেচ্ছা ও নমস্কারান্তে আপনাদের –জর্জ দা

375

18

stuti..

কলকাতার সাবেকী ঘরবাড়ি

ভূকৈলাশ রাজবাড়ি &lt;দাঁত খিঁচুনি দিয়ে , না কি গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তা জানিনা । মোট কথা হল কলকাতা নগরের সাবেক গোবিন্দপুর অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেল্লা ,ফোর্ট উইলিয়াম তৈরির জন্য জমির প্রয়োজন মেটাতে ঘোষাল বংশের আদিপুরুষ কন্দর্প ঘোষাল মশায় ১৭৫৮ খৃষ্টাব্দে গোবিন্দপুরের বাস উঠিয়ে সপরিবারে অধুনা খিদিরপুর অঞ্চলে সরে গিয়ে বসবাস আরম্ভ করেন । অতঃপর ঘোষালবংশের শ্রীবৃদ্ধির সূত্রপাত হয় । কন্দর্প ঘোষালের এক পূত্র গোকুল চাঁদ ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে লবনের ব্যবসায়ে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেন এবং কালে তিনি অধূনা বাংলাদেশের অন্তর্গত চট্টোগ্রামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন । তবে বংশের সম্পদ এবং প্রভাব প্রতিপত্তি শতগুনে বৃদ্ধি পায় কন্দর্প ঘোষালের অপর পূত্র কৃষ্ণচন্দ্রের পূত্র জয়নারায়ণের আমলে । জয়নারয়নের জন্ম হয়েছিল গোবিন্দপুরের সাবেক বাসভবনে ১১৫৯বঙ্গাব্দের তেসরা আশ্বিন (ইংরেজি ১৭৫২ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে)।বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংস্কৃত , বাংলা উর্দু ফার্সি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেন এবং তাঁর সাহিত্যানুরাগ ও কবি প্রতিভা বিশেষ প্রসিদ্ধিলাভ করেছিল তৎকালে । রাজা রামমোহন রায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং অন্যান্য জ্ঞানীগুণী জনের সঙ্গে মিলে স্কুল হাসপাতাল অনাথ আশ্রমের মত বিভিন্ন জনকল্যান্মূলক হিতকর কাজে অরথ সাহায্য করেন ।এমন কি ১৭৮২ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট জন’স চার্চের নির্মাণ প্রকল্পে অর্থ সাহায্য করেন । শুধু কলকাতায় নয় , বারাণসিতেও স্কুল স্থাপন , মন্দির নির্মাণের মত কাজএর সঙ্গে ও জয়নারায়ণের নাম জড়িয়ে আছে ।দিল্লীর মুঘল বাদশাহ মোহম্মদ জাহান্দার শাহ জয়নারায়ণকে তিনহাজারি (মতান্তরে সড়ে তিন হাজারি)মনসবদারী সনদ সহ “মহারাজ বাহাদুর” উপাধীতে ভূষিত করেন ।সম্ভবত এই উপাধী প্রাপ্তির সূত্রেই ঘোষাল বাড়িটি রাজবাড়ী নামে খ্যাত হয় লোকমুখে । রাজবাড়ীর সামনে এক বিশাল দিঘী আর তার উত্তর পারে জোড়া শিবমন্দির নির্মান করিয়েছিলেন রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল ১৭৮১খৃষ্টাব্দে।মন্দির দুটিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রক্তকমলেশ্বর এবং কৃষ্ণচন্দ্রেশ্বর নামের কষ্টিপাথরের দুটি অতিকায় শিবলিঙ্গ ।শিবলিঙ্গ গুলি উচ্চতায় এগারো ফুট !এত বড় শিবলিঙ্গ নাকি ভারতবর্ষের আর কোথাও পাওয়া যায়না ।আমার অবিশ্বাসী চোখে উচ্চতার মাপে একটু ফাঁকি আছে বলে মনে হল ।তবে সেটা খুব একটা বড় কথা নয় । মন্দির দুটির মাঝে খোলা আকাশের নীচে আছে নন্দীর মূর্তি।ভারি সুন্দর সে মূর্তি ।বেশ কিছুটা সময় কাটালাম দিঘী তথা জোড়া শিবমন্দিরের পাঁচিল ঘেরা চত্বরে আনমনে ঘুরে বেড়িয়ে ।সেই ঘেরা জায়গায় ছয়টি ছোট ছোট খুপরির একএকটিতে সাজান আছে হরগৌরী , রাধাকৃষ্ণ,রাম সীতা আর লক্ষন ,বীণাপাণি দেবী সরস্বতি ,সিদ্ধিদাতা গনেশ এবং বজরংবলীর প্রস্তর মূর্তি ।তবে এই ছোট ছোট পাথরের মূর্তিগুলি সম্ভবত খুব একটা প্রাচীন নয় ।এগুলির গড়নে পরিচিত অবাঙ্গালিয়ানার ছাপ আছে । এই সব দেখতে দেখতে একসময়ে পৌঁছলাম দিঘীর দক্ষিন পারে ।সেখানে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলাম দিঘীর স্বচ্ছজলে জোড়ামন্দিরের প্রতিবিম্ব ।ভারি মনোহর সে দৃশ্য । জনশ্রুতি সাধক রামপ্রসাদ এসেছিলেন এখানে এবং তাঁর বোধ হয় মনে হয়েছিল মহারজ যেন শিবের আবাস কৈলাশ পাহড়কেই তুলে এনেছেন কলকাতার বুকে ।তাই বোধ হয় এই জোড়া শিবমন্দিরের শোভায় মুগ্ধ হয়ে জায়গাটির নাম তিনি রেখেছিলেন ভূকৈলাশ।বস্তুতঃ গোটা এলাকাটায় শিব লিঙ্গের ছড়াছড়ি দেখলে মনঃে হওয়া স্বাভাবিক যে বুঝি শিব ঠাকুরের আপন দেশে পৌঁছে গেছি । রাজবাড়ীর অবস্থা বর্তমানে নিতান্ত জীর্ণ ভগ্নপ্রায় হয়ে এলেও অতীতের সমৃদ্ধশালী পরিবারটির বিভিন্ন শরিক বসবাস করছেন আজও বাড়িটিতে ।এই পরিবারগুলির কোনো একটির একসদস্য শ্রী শুভজিৎ ঘোষালের সংবাদ পাওয়া গেল যিনি বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী IT Professional.। আরো জানলাম শুভজিৎ বাবু রাজা জয়নারায়ণ ঘোষালের অধস্তন অষ্টম পুরুষ ।রাজবাড়ির বিভিন্ন শরিক সাবেক বাড়িটিতে বসবাস করছেন বটে ,কিন্তু ঐতিহাসিক বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষনের ব্যপারে তারা আশ্চর্য রকমের উদাসীন । তবে বসতবাড়ীটির ভগ্নদশা হলেও বসতবাড়ি সংলগ্ন অঙ্গনে কুলদেবী পতিতপাবনী দুর্গার মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণে কোন খামতি নেই । অষ্টধাতু নির্মিত প্রতিমার নিত্যপূজা হয়ে আজও সে মন্দিরে। ১৭৮১ খৃস্টাব্দে ভূকৈলাশ এলাকার ১০৮ বিঘা জমি কূলদেবী পতিতপাবনী দুর্গার দেবোত্তর সম্পত্তির অন্তর্গত ছিল ।তবে বর্তমানে তার অল্পই যে দেবীর ভাগে বাকি পড়ে রয়েছে তা চারপাশে গজিয়ে ওঠা ফ্ল্যাটের ভীড় দেখে সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায় । অঙ্গনে ভদ্রাসনের ঠিক উল্টোদিকে কূলদেবীর মন্দির সেদিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডান দিকে পড়বে মন্দির প্রাঙ্গনে প্রবেশের দ্বার ।বর্গাকার অঙ্গনটির প্রবেশদ্বারের ঠিক উল্টোদিকে নাটমন্দির ।নাট্মন্দিরের দুই পাশে দুটি ছোটো ছোট কামান দেখা যায় ।আর ছোটো ছোট দুটি মন্দিরে অধিষ্ঠিত আছেন যথাক্রমে “শ্রীশ্রী বাবা পঞ্চানন শিব” এবং “শ্রীশ্রী মাতা কালীগঙ্গা”।একই ভাবে প্রবেশদ্বারের দুই পাশে অধিষ্ঠান মহাদেব শিব লিঙ্গ আর কালভৈরব এর । প্রায় ঘন্টা তিনেক ভূকৈলাশ রাজবাড়ি আর শিবমমন্দির প্রাঙ্গনে কাটানর সময়ে মনে একটা আফসোস জাগল বাংলার প্রাচীনতম জমিদারী গুলির অন্যতম ভূকৈলাশের এই মন্দির আর রাজবাড়ী কি নিদারুণ অবহেলায় এই রকম ঘিঞ্জি বাজারের আবর্জনা স্তুপে পড়ে রয়েছে না দেখলে কল্পনা করা যায়না! ডিঃ একমাত্র ছবি গুলি ছাড়া এই লেখাটিতে ব্যবহৃত যাবতীয় তথ্যই গুগলের বিভিন্ন লিঙ্ক ঘেঁটে পাওয়া । চিত্র পরিচিতিঃ (প্রথম সেট) জোড়া শিবমন্দির ,রক্তকমলেশ্বর শিবের মন্দিরের অলঙ্করণ , রক্তকমলেশ্বর শিবলিঙ্গ , নন্দী , রক্তকমলেশ্বর শিব মন্দির , রাজবাড়ির সামনের দিক ,

822

14

মনোজ ভট্টাচার্য

পালাতে পালাতে – কদ্দুর !

পালাতে পালাতে – কদ্দুর ! অনেকেই আমাকে অনুরোধ করেছে – ছেলেবেলার কিছু গল্প করতে । আমিও মাঝে মাঝে ভাবি – ছেলেবেলার কথা কিছু লিখি । - কিন্তু ছেলেবেলা আমায় ছেড়ে এত দূর চলে গেছে বা বলা যায় আমি ছেলেবেলা ছেড়ে এতদূর সরে এসেছি ! কোথায় তাকে খুঁজি – কোথা থেকেই বা শুরু করি ! এখন ভাবি – সত্যি কি আমার ছেলেবেলা বলে কিছু ছিল ! নাকি আমরা ভাবতে ভালবাসি – আমাদের ছেলেবেলার কথা । কলকাতা তখন শৈশব কাটিয়ে উঠেছে । যদিও কলকাতা উত্তর থেকেই আরম্ভ হয়েছে – কিন্তু শ্যামবাজার বাগবাজার তখনো যেন ঘুমন্ত ! পিচরাস্তার ওপরে ঘোড়ার গাড়ি, বাড়ির পাশে গ্যাসের বাতি, রোজ সকালে রাস্তার নিচু কল থেকে বিরাট পাইপ লাগিয়ে রাস্তা ধোয়া, সকালে গরুর পাল নিয়ে চড়াতে যেত ও বিকেলে আবার তাদের ফেরত আনা হত ! আর টিপকল থেকে জল তুলে ভিস্তি করে বাড়িতে বাড়িতে দেওয়া ! – ও, মাথায় করে বিষ্ঠা বয়ে নিয়ে যাওয়া ! – হ্যাঁ – সেও তো কলকাতা ছিল ! সবে ইলেকট্রিক স্ট্যাম্প বসানো হচ্ছে, বেশ কিছু অস্টিন গাড়ি চলে তখন, আর ট্রাম তো ছিল । দোতলা ছাদ খোলা বাস দেখেছি বলে মনে পরে না । আগে আগে একটা কথা খুব চালু ছিল – ছেলেধরা । - পুরনো কাগজ রাস্তা থেকে কুড়তো এক শ্রেণীর মানুষ – কাঁধে একটা চটের থলি হাতে আঁকশি । ওরাই নাকি ছেলেধরা ছিল ! ময়লা দেখলেই সেখানে ঘেঁটে কাগজ বার করত ও থলেতে পুড়ত । - আগে ভাবতাম – ঐ কাগজ দিয়ে ঠোঙ্গা বানানো হয় । পরে জেনেছি – তা নয় – ও গুলো দিয়ে ব্যান্ডেজ ও আরও কিছু বানানো হত ! এই প্রসঙ্গে বলি, আমার খুব প্রিয় বন্ধু – নাম ছিল বাঘা – হঠাত একদিন বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল । - কোন বাড়িতে বিরাট বিরাট সদর দরজা বন্ধ হত না । পাশের বাড়িতে থাকত – যখন তখন এ বাড়ি ও বাড়ি যাতায়াত করতাম আমরা । দুপুরে স্নান করে ইজের পড়েই দরজা দিয়ে বেরিয়েছে । - মা তখন খাবার বাড়ছে । - সেই যে উধাও হল – কোন পাত্তা পাওয়া গেল না । ওর বাবা কাকা সবাই খুঁজল – আমরা আমাদের লুকোবার সব জায়গা খোঁজ করতে লাগলাম । পাড়ার যুগান্তর পত্রিকায় ছাপানো হল নিরুদ্দেশ কলমে । তিপান্ন সালে আমরা টালিগঞ্জে থাকতে গেলাম । সেখানে বাড়িওলার – ঠিক আমার বয়েসি এক ছেলেও নাকি হারিয়ে গেছে আগের বছর । কাগজের কাটিং ইত্যাদি দেখাতো । আর - আর – হ্যাঁ তিরাশি সালে আমরা বিদেশে চলে যাওয়ার পরে পরেই আমার চেয়ে অনেক ছোট সুদিন গুহ নামে একজন ছেলে – অফিশ থেকে বাড়ি ফিরল না ! আমি চিঠিতে এই খবরটা পেয়ে খুব অবাক হয়েছিলাম ! – সে অবশ্য পার্টি করত – শত ঘোষের পাড়ায় ! তখন এরকম অনেক যুবকের উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে । এশিয়ার নতুন সূর্যের দাপট ! আমাদের কৌতূহল কিন্তু ঐ কাগজ-কোরানো-ওয়ালার ঐ চটের থলি নিয়ে । - কি আছে ঐ থলির মধ্যে । - কটা বাচ্ছা ছেলেকে ধরে রেখেছে । - বাচ্ছাগুলো চেঁচায় না কেন ! ওদের নিয়ে কোথায় বা যায় ! – এই সময় নাগাদ মানিক সিনেমাটা দেখেছি । বাচ্ছাদের ধরে নিয়ে গিয়ে যে পকেটমার বানায় – সেটা জেনেছিলাম । অনেকদিন পরে একটা ইংরিজি সিনেমায় - একটা ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে একটা বাজে আড্ডায় গিয়ে পড়েছিল। বাড়ির বাইরের স্বাধীনতাটা কিভাবে তার কেটেছিল সেটা বেশ দর্শনীয় । পরে অবশ্য একটা কালো ছেলে তার বন্ধু হয়ে গেছিলো ও তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল ! গল্পের মধ্যে বাড়ির বাইরে যে স্বাধীনতা – সেটা কিন্তু খুবই উপভোগ্য হয় । ঠিক সেই ধরনের বাড়ির বাইরের স্বাধীনতা – আমার ছোট-বেলাকেও ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল । আমিও থেকে থেকেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়ে কোথায় কোথায় চড়ে বেড়াতাম – এখন ভাবলেও বেশ রোমাঞ্চকর মনে হয় ! কখনও ঘোড়ার গাড়ির পেছনে উঠে ও খানিক বাদে সহিসের ছিপটি খেয়ে পালিয়ে গেছি । কখনো কাঁধে গামছাওলা লোকের গামছা তুলে নেওয়া ! – রাস্তার ছেলে নামে একটা ডাক ছিল – সেটাই আমাদের ডাকনাম ছিল । একটা খেলা ছিল – হুশ-হুশ ! দু-দল ছেলের একদল পালিয়ে যাবে ও আরেক দল তাদের খুঁজে বার করবে । - একজনকেও দেখতে পেলে – সেই দল হেরে যেত । কখনো চিতপুর রেল ইয়ার্ড, কখনো উল্টোডাঙ্গা কাঠগুদামের ফাঁকে, আবার কখনো উল্টোডাঙ্গা লঞ্চঘাটে ! কখনো আবার বাগবাজার বিচালি ঘাট – ব্যোম-কালিতলা ! কিম্বা রাস্তায় রাস্তায় ছিল মাদারী কা খেল ! সেই খেলার জেরে আমার হাতে ঢুকে গেল একটা বড় ছোরার দু-ইঞ্চি ফলা ! - আর সন্ধ্যে-বেলায় থিয়েটার হলগুলোর দরজা টেনে ভেতরে ঢুকে পড়া । কতবার গেট-কিপার টেনে বার করে দিয়েছে । আমাদের বাড়িগুলো কিরকম এলোমেলো ধরনের ছিল । একগাদা লোকজন – কে যে কোথায় – কে ধরবে ! কোথায় গেছি - নিজেদের বাড়িতে বলি মামার বাড়ি ছিলাম । আর মামার বাড়িতে বলতাম – বাড়িতে ছিলাম ! ধরা পড়লে বেশ উত্তম মধ্যম জুটত । পিঠ আর কান-মাথা তো সার্বজনীন – বড়রা যে পারত প্র্যাকটিস করত ! তখন জন্মাষ্টমীর পরের দিন নন্দলাল কৃষ্ণ-বলরামকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সিধে বা চাল-ডাল-ফল-মুল ও পয়সা নিতে আসত । একবার ওদের পেছনে পেছনে যেতে আরম্ভ করলাম । ওরা তিনজনে যাচ্ছে আমারই পাড়া দিয়ে – খুব চেনা রাস্তা দিয়ে । কিন্তু আমি খুবই মোহগ্রস্ত অবস্থায় ওদের অনুসরন করছি। ভুপেন বোস এভিনিউ পার হয়ে আরেকটা গলি দিয়ে কর্ণওআলিশ পেরিয়ে সার্কুলার পেরিয়ে একেবারে নিকাশিপাড়া দিয়ে দেশবন্ধু পার্কের মধ্যে দিয়ে চলে এসেছি খালপাড়ে ! দুপুরবেলা – রাস্তা প্রায় ফাঁকা । এখন কিছুতেই মনে পরে না । কিসে আমার মোহ ভাঙল ও ওখানেই থেমে গেলাম । - সেদিনই প্রথম বুঝতে পারলাম – সেখান থেকে আমাদের বাড়ির দূরত্ব কতটা ! তারপর থেকে আর কোনোদিন মনে পরে না ঐরকম কাউকে অনুসরন করেছি ! কিন্তু ঐ যে বলেছি না – মাথার মধ্যে - পালিয়ে যাওয়ার একটা খেয়াল-পোকা যেন রয়েই গেল ! – সেই পাগলামির ভুত আমাকে ক্লাশ এইটের শেষে সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে টেনে বার করলো । - না বোম্বে নয় – অন্য কোথাও - অন্য কিছুর ধান্দায় ! অনেকদিন পর – যখন সুস্থিরভাবে সংসারে ডুবে গেছি – তখন্ সেই গোছানো সংসার ভেঙ্গে দুজনেই চাকরি ছেড়ে বিদেশে ভেগে গেছি । সবাই ভেবেছে – আমরা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছি । - আসলে কিন্তু আমি পালিয়েই গেছি ! তা নয়ত – পুরো পরিবার নিয়ে একেবারে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়া ! সচরাচর এরকম ঝুঁকি বোধয় কেউ নেয় না ! মনোজ

93

4

শিবাংশু

আত্মদীপো ভব

কথায় বলে, 'সোনার ঠাকুর, মাটির পা'। অর্থাৎ, মহান মানুষদের মহিমা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পদযুগল পর্যন্ত পৌঁছোয় না। কাদামাটির মলিন, গদ্যময় পৃথিবীতে দৃঢ়মূল, আবহমানকাল ঋজু দাঁড়িয়ে থাকতে পারার এলেম ইতিহাসে মাত্র এক-দুজন মানুষের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই 'মহান' মানবদের ঔজ্জ্বল্যের উৎস থাকে ভক্তের হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত মহিমার দীপ্তিতে। আমাদের গুরুবাদী দেশে যাঁরা নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন, তাঁদের অবিলম্বে আমরা 'গুরু'র মঞ্চে বসিয়ে দিই। শেষ পর্যন্ত তাঁদের নসিবে রাখা থাকে দেবতার জন্য নির্দিষ্ট নিষ্প্রাণ, শীতল স্বর্ণ সিংহাসন। আড়াই হাজার বছর আগে একজন মানুষ এদেশে এসেছিলেন। যিনি গুরুবাদে বিশ্বাস রাখতেন না। নিজেকে বলতেন শিক্ষক, শাস্তা। কোনও ধর্মমত প্রচার করতেন না। নিশ্ছিদ্র যুক্তি ও অমেয় করুণার ধারায় অসহায় মানুষের দুঃখ ধুইয়ে দেবার ব্রত নিয়ে জীবনযাপন করে গিয়েছিলেন। এদেশে অন্য সমস্ত গুরু'রা দাবি করেন প্রশ্নহীন আনুগত্য ও দ্বিধাহীন ভক্তি। তিনি শিষ্যদের বলেন প্রশ্ন করতে, বলেন শাস্তার বাণী নির্দ্বিধায় গ্রহণ না করতে। বলেন দেবতা, ঈশ্বর, অলৌকিক ভেলকিবাজি, শাস্ত্রীয় কোলাহল, কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে প্রদীপ করে তোলো। নিজেকেই আশ্রয় করে তোলো। যাতে দুঃখকাতর মানুষ নিজের শক্তিতেই তিমিরবিনাশী হয়ে উঠতে পারে। অথচ এই যুক্তিসত্ত্ব মানুষটির জীবন, কীর্তি, দর্শন কেন্দ্র করে গত আড়াই হাজার বছর সারা পৃথিবীতে অগণিত ভাববাদী, রহস্যবাদী, কাল্পনিক, মনের মাধুরীময় ডিসকোর্স গড়ে উঠেছে। তাদের আড়াল থেকে মহামানব শাক্যমুনিকে চিনে নেওয়ার পথ সাধারণ মানুষ আর খুঁজে পাননা। কলিকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা-২০১৯ মিডিয়াসেন্টারে আয়োজিত একটি প্রাসঙ্গিক আলোচনাসভায় এই কথাগুলিই বলেছিলুম আমি। বিষয়টি নিয়ে আমার রুচি আছে টের পেয়ে 'ঋতবাক প্রকাশন' গত বইমেলার পর থেকেই আমাকে ক্রমাগত চাপে রেখেছিলেন। তাঁরা বাংলাভাষায় এমন একটি গ্রন্থ প্রকাশ করতে চাইছিলেন, যেখানে মানববুদ্ধ, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ 'সর্বশ্রেষ্ঠ মানব' আখ্যা দিয়েছিলেন, তাঁর বিশদ পরিচয় থাকবে। সঙ্গে বৌদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধধর্মের সামগ্রিক রূপরেখা একুশ শতকের নবীন, কৌতুহলী প্রজন্মের পাঠকদের জন্য যথাসম্ভব সরলভাবে বিবৃত করা হবে। বিষয়টি অতি জটিল এবং ইদানিংকালে আমার মাতৃভাষায় এনিয়ে কোনও সামগ্রিক, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা চোখে পড়েনি। গত একবছর ধরে কুড়িটি প্রবন্ধের মাধ্যমে আমি এই আলোচনাটি নথিবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছি। বিশ্বাস আছে, সাধারণ পাঠক ও অনুসন্ধিৎসু গবেষক উভয়েই তাঁদের নানা প্রশ্ন, কৌতুহল, দ্বিধানিরসনের সূত্র প্রবন্ধগুলি থেকে পেয়ে যাবেন। বিষয়টির ব্যাপ্তি প্রাঞ্জল করতে এখানে প্রায় একশোটি আলোকচিত্র নিবদ্ধ রয়েছে। যেগুলি বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশে আমারই তোলা ছবির সংগ্রহ থেকে নির্বাচিত। আলোচনাসভাটি সাঙ্গ হতে আমি বন্ধুপরিজন সহকারে মেলায় অলস বিহার করছিলুম। হঠাৎ আহ্বান এলো প্রকাশকের বিপণীতে সত্বর উপস্থিত হবার জন্য। সেখানে গিয়ে দেখি তিনজন সম্পূর্ণ অচেনা প্রবীণ ও নবীন পাঠক বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন তাঁদের বইগুলিতে গ্রন্থকারের স্বাক্ষর নেবার ইচ্ছায়। তাঁদের একজন কথাপ্রসঙ্গে জানালেন তাঁর বয়স চুরাশি পূর্ণ হয়েছে। আমি চমৎকৃত। তাঁদের বলি, আপনারা কেন এই বইটির প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন? তাঁরা জানান কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে তাঁদের বিশ্বাস হয়েছে বইটিতে এমন কিছু সারবস্তু আছে, যা তাঁদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারবে। আমি নিশ্চিন্ত ও কৃতজ্ঞ বোধ করি। প্রকাশক যে পর্যায়ের যত্ন ও ব্যয়স্বীকার করে গ্রন্থটি প্রস্তুত করেছেন তার জন্য সাধুবাদ দিতেই হয়। কিছু আভাস সঙ্গের ছবিগুলির মধ্যে থাকলো।

102

3

Aloka

মাঝে মাঝে

বই-খাতা-কাগজ-কলম একটু আধটু যা পড়াশুনো করেছি তা কি ভাবে শুরু হয়েছিল তাই ভাবছিলাম| বইয়ের কথায় প্রথমেই মনে পড়ে বর্ণ পরিচয়ের কথা |সেই গোলাপি মলাটের নিউজ প্রিণ্ট ধরনের কাগজে ছাপা সাইজে ছোট| অজ ‚ আম এর পৃষ্ঠা টা মনে পড়ছে তার আগে বর্ণ গুলো চেনার নিশ্চয়ই ক টা পৃষ্ঠা ছিল নাঃ সে গুলোর চেহারা মনে পড়ছে না| তাহ লে ঐ যে অ য়ে অজগর আসছে তেড়ে ‚ আমটি আমি খাব পেড়ে... আমাদের কালে তাবৎ শিশুদের যা দিয়ে শিক্ষার সূচনা হত সেটা কোন বই ? একটা বইয়ের কথা মনে পড়ছে..নামটা ছিল বোধ হয় কথা শেখা..সাইজে বেশ খানিকটা বড় ‚ সচিত্র ছিল আর ছবি গুলো রঙীন ছিল...এটা কি সেই বই .. কি জানি | স্কুল পাঠ্য আর একটা বই এর কথামনে পড়ছে.. সেটা অবশ্য আর একটু উঁচু তে.....কিশলয়...সে কালে এই বই পড়ে নি এমন কেউ বোধ হয় খুব কম ই আছে| ক্লাস ফোর অবধি ছিল এই বই | সেই বইয়ে পড়া দু/ একটা পদ্য...এখনো মনে আছে| সহজ পাঠের কথা আর নতুন করে বলার কিছু নেই | তবে বিভিন্ন জায়্গায় সহজ পাঠ নিয়ে চর্চা এখনো দেখতে পাই | জানি না স্কুলে এখনও এই সব পড়ানো হয় কিনা| তখন বছর বছর সিলেবাস পাল্টাতো না.| একই বই এক বাড়িতে একাধিক জন পড়েছে এরকম ই হত |সেই রকম আর একটি বই হল পাঠ সঙকলন| বাংলা পাঠ্য বই ‚ ক্লাস নাইন থেকে পাঠ্য ছিল | এই বইয়ে পড়া দুটি গদ্য যার দু একটি লাইন খুব ই ব্যবহৃত হয় এখনো অবধি মনে আছে | একটি হল " নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ ?" গদ্যাংশটির নাম ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে‚ লেখক জগদীশ চন্দ্র বসু| আর একটি ‚ " সেই ট্রাডিশন সমানে চলিয়াছে" ‚ গদ্যাংশ ভারত বর্ষ‚ লেখক এস ওয়াজেদ আলি | এই বাক্যাংশ গুলো বহুল ব্যবহৃত তবে এখনকার কালের ক জন এর উৎ্পত্তি জানেন সে বিষয়ে আমার বেশ সন্দেহ আছে‚ পাঠ্সঙ্কলন না পড়লে আমি নিজেও তো জানতাম না | স্লেট পেন্সিলে লেখার পর্ব টা কতদিন ছিল কি জানি | স্পন্জের তখনো আবির্ভাব হয় নি | ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে স্লেট মুছতে হত | তবে লেখা ছাড়া স্লেটের অন্য উপযোগিতা আমাদের কাছে বেশী জরুরী ছিল | এক্কাদোক্কা খেলার কাজে স্লেটের ভাঙা টুকরো বিশেষ উপযোগী ছিল| সেই দিস্তে খাতা এখনো আছে কিনা জানি না| দিস্তে হিসেবে সাদা কাগজ কিনে চার ভাঁজ করে সেলাই করা| প্রত্যেকটা পাতা য় মার্জিন টানা .. সে বেশ কঠিন কাজ ছিল | ঐ ডেকে হেঁকে কিলিয়ে মারো নিয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি করার চেয়ে বেশী কাজ দিত শেষ পাতা গুলোয় কাটাকুটি খেলা |যারা ষাটের দশকের পরে জন্মেছ তারা জানোনা বুঝি ডেকে হেঁকে.... র মর্ম| এ হচ্ছে সেই যুগের কথা ..বেশ কিছুদিন...আগে মেট্রিক সিস্টেম চালু হলেও তখনো ঠিক সড়গড় হয় নি. ওগুলো হল মনে রাখার জন্য ডেকা-হেক্টো-কিলো-মিটার এর স্ংক্ষেপণ ( তুলনীয় ইতিহাসের বাবার হইল একবার জ্বর সারিল ঔষধে) ..... ও আদর্শ লিপির কথা ত বলাই হল না | ছিল একটা তবে তাতে কোনদিন লিখেছি কিনা মনে পড়ছে না| একটা খুব সুন্দর মলাটের খাতার কথা না বলে পারছি না | বাসন্তী রঙএর মলাট মাঝখানটা জুড়ে গোল করে কচি কলাপাতা র্ংএর বাঁশ ঝাড় | হাতির ওয়াটার মার্ক ও ছিল| কাগজ টা বোধ্হ্য় টিটাগড় পেপার মিলসের কোথাও যেন একটা লেখা ছিল| সেটা বোধহয় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর বছর | একধরনের খাতা বেরোল প্রত্যেকটা খাতার মলাটের ওপর এল ছোট ছোট কবিতা যেমন ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদাব্যঙ্গ করে ধ্বনি কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে অথবা কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যা রবি শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা কেরোসিন শিখা বলে এস মোর দাদা| এইরকম আরো কত ছিল |বেশ কিছুদিন চালু ছিল এই খাতা| মাত্র দুটো লিখলাম আরো যে গুলো আর লিখলাম না সে গুলো কিন্তু মনে হচ্ছে সেই খাতা দেখে শেখা পরে তো আর সে ভাবে আলাদা করে এ গুলো পড়ি নি বহুদিন পরে জেনেছি ঐ গুলো "কণিকা"" র অন্তর্গত| কালি কলম মন‚ লেখে তিনজন সে যুগ ত বহু পিছনে ফেলে এসেছি.... কি হল সেই কালি কোম্পানী গুলোর...সুলেখা ‚ কুইঙ্ক ‚ চেলপার্ক... এই তিনটে কালির নাম মনে পড়ছে আর কিছু ছিল কিনা জানি না তবে লিখতাম সুলেখা কালিতে কত রকমের র্ং ই না ছিল...|সবুজ ‚ ব্লু ব্ল্যাক ‚ ব্ল্যাক ..আমাদের বাড়িতে আসত রয়্যাল ব্লু| আর লাল ....সে ত ইস্কুলের দিদিমণিদের জন্য এক্সক্লুসিভ ছিল |আর এই কালিগুলোর আধার ছিল বেশীর ভাগই রাইটার পেন ‚ সব থেকে কম দাম ছিল | তবে দাম নিয়ে তো তখন মাথা ঘামাতাম না হরেক র্ং য়ের থেকে কোনটা নেব বিচার্য ছিল সেটাই | এর একটু ওপরের ধাপে ছিল পাইলট পেন কি কারণে যেন একবার একটা পেন প্রাপ্তি হয়েছিল..নাম ছিল উইং সাং সোনলী র্ংয়ের ক্যাপ আর লাল র্ংএর গা.| কি সুন্দর দেখতে ছিল বহুদিন টিঁকেছিল .. হবে না কেন . অতি যত্নে রাখা ছিল...লেখা খুব কমই হয়েছিল তাতে| তারপর তো এল ডট পেনের যুগ.. কালি ভরার ব্যাপার নেই‚ মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলে..তবে পরীক্ষা গুলোবোধ হয় ঐ ঝর্ণা কলম তথা ফাউণ্টেন পেন এই লিখতে হত | এই ২০১৯ লিখতে বসে যদি প্রথম দেখা ডট পেনের কথা বলি হয়্ত খুবই হাস্যকর শোনাবে তাও লিখছি| পিছিয়ে যাচ্ছি পাঁচ দশক ..সঠিক দিন তারিখ মনে নেই হয়্ত ১৯৫৭-৫৮ কি ঐরকম কোন সময়্র হবে আমেরিকা থেকে সদ্য ফিরেছেন বাবা..অনেক কিছু এনেছেন তার মধেয় একটা হল এক আশ্চর্য পেন তাতে কালি ভরতে হয় না মাথায় একটা উঁচু মত আছে সেটা টিপলে নিব বেরিয়ে আসে.. আমাদের এখানে তখনো পর্যন্ত অদৃষ্ট্পূর্ব এই পেন দাদা দিদিদের হাতে হাতে ঘুরত তাকে ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্যও আমার হয় নি..আমি ত তখন নিতান্ত এলেবেলে হাতেখড়িও হয় নি..এ খানে অপ্রাসন্গিক হলেও আমার জন্য আনা সেই পুতুলটার কথা না বলে পারছিনা সোনালি চুল..তাতে নীল টুপি.|নীল গাউন পরা পুতুল্টাকে শুইয়ে দিলে তার নীল চোখ বন্ধ হয়ে যেত আবার তুলে দিলে সে চোখ খুলত...এ হেন পুতুল এখানে তখনো কেউ দেখে নি.. চোখ বুঁজলে আমি এখনো সেই পুতুল টা দেখতে পাই| যতই সুবিধে থাকুক ফাউণ্টেন পেন এর কৌলীন্য বা আভিজাত্য ডট পেন বোধহয় অর্জন করতে পারে নি...টিভির পর্দায় তো দেখি হয়্ত দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে কোন চুক্তি সই হবে ..রক্ষীর বাড়িয়ে দেওয়া সুদৃশ্য ট্রে থেকে রাষ্ট্রপ্রধান রা তুলে নিচ্ছেন অভিজাত ফাউণ্টেন পেন হয়্ত. পার্কার ‚হয়ত‚ শেফার্স কিম্বা ম্ঁ ব্লা..| নাঃ এই সব নিয়ে লিখতে বসলে মহাভারত লেখা হয়ে যায় নাই বা থাকল কালি কলম আছে কী বোর্ড ‚ মোবাইল ফোন কিন্তু হারিয়ে গেছে ধৈর্য আমার হারিয়ে গেছে মন| অতএব এখানেই থামলাম

1702

107

Ranjan Roy

দেবু জ্যেঠু

কেটে গেছে আরও বছর ছয়। আমি কলেজ পেরিয়ে চাকরি সূত্রে অন্য জেলায়। মাসের গোড়ায় মাইনে পেয়ে একবার বাড়ি আসি। সংসারের দায়িত্ব একটু একটু করে আমার কাঁধে চেপে বসছে। বাবা আগামী বছর রিটায়ার করবেন। জেঠুর সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়। উনি রিটায়ার করেছেন তিন বছর আগে। হ্যাঁ, মেয়ে এবং বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, ছোটটি এখনও নিজের পায়ে দাঁড়ায় নি। জ্যেঠিমা বাতে শয্যাগত। কিন্তু জেঠুর কথা ওঠায় মা একটু মুখ বেঁকালেন। -- জানিস, প্রত্যেক মাসে তোর বাবার থেকে টাকা নেয়, আমাকে লুকিয়ে। বাবা অপ্রস্তুত। --আহা, সে তো ধার নেন। হাত হাওলাত। -- বাজে কথা বল না। ধার? কোন দিন একপয়সা ফেরত দিয়েছেন? বরাবর অমন ইল্লুতে স্বভাব। পরের পয়সায় মদ গেলা। --- কেন বাবা? উনি তো পুলিশ অফিসার্স মেসে মদ খেতে যেতেন। বাবা অন্যদিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বল্লেন-- কী জানিস, সব দিন সমান যায় না তো। উনি কেন্দ্রীয় সরকারের সেই কাজটার থেকেও ছুটি পেয়েছেন। সবকিছুরই একটা বয়েস আছে তো! এখন কেউ ওঁকে কোন তদন্তে ডাকে না। ওঁর সময়ের অফিসাররাও হয় রিটায়ার্ড, নয় বদলি হয়ে গিয়েছে। এখনকার ছোকরারা কেউ 'দাদা ভট্টাচারি' বললে চিনতে পারে না। তাই উনি পুলিশ অফিসার্স মেসেও পার্সোনা নন গ্রেটা! -- কিন্তু বড় ছেলে তো চাকরি করে। আর ওঁর পেনশন ? -- সে হিসেবে কোন বড় দায়িত্ব নেই বটে, কিন্তু সেভিংস বলতে বিশেষ কিছুই নেই। আমাদের কোম্পানিতে পেনশন নেই। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সামান্য মাসোহারা পান। অসুস্থ স্ত্রীর জন্যে নার্স রাখতে হয়েছে। আর সারাজীবনের মদের নেশা কি এককথায় ছাড়া যায়? না ওর জন্যে ছেলের কাছে হাত পাতা যায়? সেদিনটা ছিল রোববার। আমি বাজার করে গলদঘর্ম হয়ে হাতের ব্যাগ মাত্র নামিয়েছি; মা মাছের আর তরকারির থলে আলাদা করে গুছিয়ে রাখছেন-- এমন সময় জ্যেঠুর আবির্ভাব। আবির্ভাবই বটে। কচি কলাপাতা রঙের বাফতার শার্ট, মাখন জিনের সাদা প্যান্ট। টাকমাথায় সামান্য চুলগুলো বেশ কায়দা করে ছাঁটা। -- কী ভায়া! তৈরি তো? আর দু'ঘন্টার মধ্যে জীপ এসে পড়বে। আমরা অবাক , বাবা মাথা চুলকোচ্ছেন। মা মুখ খুললেন,-- কী ব্যাপার দাদা? কোথায় যাচ্ছেন? -- সে কি বৌদি! ও আপনাকে কিছু বলে নি? আপনার কত্তাটিকে দিন তিনেকের জন্যে বোম্বাই নিয়ে যাচ্ছি। উড়োজাহাজে করে। সব খরচ আমার, যাতায়াত-থাকা-খাওয়া সব। কিছুই বুঝলাম না। বাবার দিকে মা তাকাতেই বাবা গড়গড় করে তোতাপাখির মত বলে চললেন। -- ইংল্যান্ড থেকে ওঁর পুরনো বন্ধু এসেছেন, উঠেছেন বোম্বাইয়ের হোটেলে। উনি দাদার সঙ্গে দেখা করতেই সাতসমুদ্দূর পাড়ি দিয়ে এসেছেন। দাদার বয়স হয়েছে দেখে সঙ্গী হিসেবে আমার জন্যেও প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি তিনদিনের ক্যাজুয়াল লীভ নিয়েছি। মার অপ্রসন্ন মুখ। --সব বুঝলাম। তলে তলে সব গোছানো হয়েছে। কিন্তু আমাকে কিছু বলা হয় নি কেন? বাবা বাগানের গেটের বোগেনভিলিয়ার পাতা গুণছেন। হা-হা করে হেসে উঠলেন জেঠু। -- ওর দোষ নেই বৌদি। আমার ওই বিলিতি বন্ধুটি একজন বুড়ি মেমসায়েব। ভায়া একটু বেম্মজ্ঞানী টাইপের তো,বলতে লজ্জা পেয়েছে। মায়ের মুখের মেঘ কাটল না। পরের রোববারে আমি আবার হাজির। জেঠুর বুড়ি মেমসায়েবের গল্প শুনবো। ইংল্যান্ড থেকে কেন এসেছিলেন? জেঠুকে কিছু সম্পত্তি-টম্পত্তি দিতে চান নাকি? আমাদের চোখে তো সায়েব-মেমসায়েব সবই বিরাট পয়সাওলা। আমি কথা তুলতেই মা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন। -- ও আবার শোনার মত নাকি? যত সব ইল্লুতে হাঘরে স্বভাব! বাবা নতুন সিগ্রেট খেতে শেখা ছেলেদের মত ছাদের দিকে ধোঁয়ার রিং ছাড়ছেন? বিকেলবেলা । বাবা ছেলে চা নিয়ে বসেছি।মা সেজেগুজে মজুমদার কাকিমার বাড়ি হয়ে আসছি বলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাবার দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ ঢঙে মাথা নাড়লেন। বাবার চোখের পাতা কাঁপল, স্পষ্ট দেখলাম। -- শোন, দেখলাম সেই বিলিতি মেমসায়েব মহিলাকে। ন্যান্সি ইভান্স। একমাথা সাদা চুল। চোখে চশমা। অত্যন্ত ডিগনিফায়েড চেহারা। আলাপ পরিচয়ের পর আমি বললাম-- আপনারা পুরনো বন্ধু, কথা বলুন। কত কথা জমে আছে। আমি কোলাবার দিকে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটু দেখা করে আসি। ইচ্ছে করে সন্ধ্যে নাগাদ ফিরলাম। রাত্তিরের প্লেন। ফিরে দেখি তোর জেঠু লাউঞ্জে বসে আছেন। মেমসায়েবের রুমের দরজা বন্ধ। আমরা ফিরে এলাম। বাকিটা আমার ফেরার পথে ভটচাজদার মুখ থেকে শোনা। তোকে যা বলছি শুনে ভুলে যাস কিন্তু। বঙ্গদেশের নৈহাটি-ভট্টপল্লি এলাকার বৈদিক ব্রাহ্মণ কুলের বিশিষ্ট পন্ডিত বংশে জন্মানো দিব্যজ্যোতি ভট্টাচার্যের বিদ্যাস্থানে বিধাতা বিরাট ঢ্যাঁড়া কেটে রেখেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই গঙ্গার পাড়ে জেলেবস্তির ডানপিটে ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, নৌকো খুলে নিয়ে ভেসে পড়া, মাছ চুরি, মারপিট করে পোক্ত দেবুর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না। পিতৃদেব সত্যধন ভট্টাচার্যি বিশুদ্ধ গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার অনুমোদিত পন্ডিতমন্ডলীর একজন। উনি পূর্বজন্মের কর্মফলে বিশ্বাসী। ছেলেকে বকাঝকা না করে তার হস্তরেখা অভিনিবেশ সহকারে দেখে বল্লেন- নিয়তি কেন বাধ্যতে! এ আমাদের মত টুলো পন্ডিত হবে না। একে জীবন নিজের হাতে গড়ে পিটে নেবে। সে যা হোক , এই অবাধ্য একবগ্গা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দিব্যজ্যোতি বা দেবু ভটচাজ প্রথম সুযোগেই বাড়ি থেকে পালালেন। কোলকাতা-খিদিরপুর ডকে মালজাহাজের খালাসী; শেষে ভেসে পড়লেন কোন গোরাজাহাজে। ভাগ্যের থাপ্পড় খেয়ে লিভারপুলের রাস্তায় ঠান্ডায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা কপর্দকহীন দেবুকে হাসপাতালে দিয়ে বাঁচিয়ে তুললেন এক দয়াবতী। ন্যান্সি ইভান্স। বয়সে বছর তিন বা আরো একটু বড়। মধ্যবিত্ত। সন্তানহীন ডিভোর্সি। স্নেহে ভালোবাসায় বুনো পশুও বশ মানে। এই নারীকে ফ্রেন্ড ফিলজফার গাইড হিসেবে পেয়ে দেবুর জীবন বদলে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। জর্জ টেলিগ্রাফ বা অমনি কোন প্রফেশনাল ইনস্টিট্যুট থেকে টেলিকম ডিপ্লোমা প্রাপ্ত ডেভ ভট্টার সহজেই বৃটিশ আর্মির টেকনিক্যাল কোরে চাকরি পেলেন। পোস্টিং মধ্যপ্রাচ্যে। মরুভূমির যুদ্ধে রোমেলের মহড়া নেওয়া বৃটিশ বাহিনীর অধীনে। কীভাবে ওকে বৃটিশ ইনটেলিজেন্স গুপ্তচরবৃত্তিতে নিযুক্ত করল, প্রশিক্ষণ দিল-- সে গল্প কোনদিনই জানা যাবে না। যুদ্ধ শেষ। দিব্যজ্যোতি ফিরে এলেন ভারতে।দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। নৈহাটি রয়ে গেছে বঙ্কিমের 'রাজমোহনস্‌ ওয়াইফ' এর যুগেই। পিতা গত হয়েছেন। ভাটপাড়ার ব্রাহ্মণ সমাজে ম্লেচ্ছ আচার-বিচারে অভ্যস্ত দেবুর স্থান প্রান্তিক। আঁতে ঘা লাগল। নৈহাটির সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেবু এলেন মধ্যপ্রদেশের ওই পাবলিক সেক্টর কোম্পানির টেলিকম ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিতে। কিন্তু লিভারপুলের একটি অধ্যায় সবার কাছে গোপন রয়ে গেল। ন্যান্সি সবই জানতেন। দেবুর নিজের দেশে ফিরে যাওয়া, সংসার পেতে বসা এর মধ্যে কোন অসংগতি দেখেন নি উনি। মেনে নিয়েছেন বিধাতার বিধান। কিন্তু খবর রাখতেন। সময় অসময়ে অর্থসাহায্যও করেছেন গোপনে। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে ডেকে পাঠালেন ডেভ ভট্টারকে , বোম্বাইয়ের এক হোটেলে, প্লেনের টিকিট ও আনুষঙ্গিক খরচা সমেত। দেবু যেন কুলীন ব্রাহ্মণ। -- ডেভ, তোমার চেহারায় একটা প্রশান্তি, একটা পীস দেখতে পাচ্ছি। সব কিছুই পেয়েছ। -- হ্যাঁ, ন্যান্সি। বাই দ্য গ্রেস অফ গড। -- বেশ, আমার কথাটা মনে আছে তো? যে কথা দিয়েছিলে? দেবু চুপ। -- ভুলে গেলে? তোমার ছেলে মেয়েদের বিয়ে থা দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে আমার সঙ্গে ফিরে যাবে? কথা দিয়েছিলে না? -- হ্যাঁ, দিয়েছিলাম। -- সেসব টাস্ক তো কম্প্লিট, ইজ’ন্ট ইট? -- ও ইয়েস, ন্যান্সি, বাই দ্য গ্রেস অফ গড। -- তবে চল আমার সঙ্গে, বাকি জীবনটা বুড়োবুড়ি একসঙ্গে কাটাব। -- তা হয় না ন্যান্সি। -- কেন? কেন হয় না? আমি যে সারাজীবন অপেক্ষায় আছি। -- তোমাকে বোঝাতে পারব না, হয় না-ব্যস্‌! - ইজ ইট সো? আচ্ছা, এক কাজ কর। তোমার ছোট ছেলেটিকে আমায় দাও। ওকে তেমনি করে দাঁড় করিয়ে দেব, যেমন কয়েক যুগ আগে করেছিলাম। -- তাও হয় না। -- হয় না? হয় না ডেভ? - নো নো। ইট ইজ ইম্পসিবল। আই কান্ট ইম্পোজ ইট অন মাই সন। -- বেশ, লেট দ্য ম্যাটার এন্ড হিয়র। এই আংটিটা ফেরত নাও। পরের দিন বোম্বাইয়ের সব ইংরেজি পত্রিকায় ছোট করে একটি খবর বেরোল। গতকাল মিডল্যান্ড হোটেলের একটি সুইটে এক বয়স্কা বিদেশি মহিলাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পাসপোর্ট অনুযায়ী তিনি লিভারপুল নিবাসী ন্যান্সি ইভান্স। মৃত্যুর কারণ হার্ট অ্যাটাক বলে ডাক্তারেরা মনে করছেন। দেহটি বৃটিশ হাই কমিশনকে সঁপে দেওয়া হয়েছে। (সমাপ্ত)

124

21

Ranjan Roy

নখদর্পণ (সত্যঘটনা অবলম্বনে)

কী যা তা! মানস তো ক্লাস টেন এর ফার্স্ট বয়। তাতে কী! পড়াশুনোয় ফার্স্ট বয় কি চুরিবিদ্যায় ফার্স্ট হতে পারে না? মানস কেন চুরি করবে? চোর কেন চুরি করে? টাকার জন্যে। ওর এখন টাকার দরকার। আজ ওর বাবা নেই বলে এমন নোংরা কথা বলতে পারলি? ধেত্তেরি! যা সত্যি তাই তো বললাম। সন্তোষস্যার সবাইকে চুপ করতে বললেন। হ্যাঁরে অনিল, ঠিক করে বলতো –কী হয়েছিল? -কালকে ছুটির পরে আমি স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। বইয়ের ব্যাগ, ফুলপ্যান্ট আর ঘড়ি একসাথে করে গোলপোস্টের পাশে রেখেছিলাম। খেলার শেষে প্যান্ট পরে ব্যাগ তুলতে গিয়ে দেখি প্যান্টের পকেটে রাখা রিস্টওয়াচটা নেই। ওটা আমার জন্মদিনে মাসিমণির গিফট—ফেবার লুইবা। -- গোলপোস্টের কাছে মানস ছিল? --হ্যাঁ স্যার। সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসের সেকেন্ডবয় থার্ডবয় চেঁচিয়ে উঠল। --স্যার, আরও অনেক ছেলে ছিল। আমরাও ওর সঙ্গে ছিলাম। সন্তোষবাবুস্যার সাদামাটা ভাল মানুষ। মানসকে ডেকে বললেন—যদি নিয়ে থাক তো দিয়ে দাও। মানসের চোখমুখ বসে গেছে। কোনরকমে বলল—স্যার! আমি নিইনি। বিশ্বাস করুন, মা সরস্বতীর দিব্যি! এবার গোটা দলটা সন্তোষস্যারকে নিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার রাজেন্দ্রস্যারের চেম্বারে গেল। পেছন পেছন আমরা , হোস্টেলের ছেলেরা। রাজেন্দ্রস্যার জানতে চাইলেন যে অনিল মানসকেই চোর ঠাঊরেছে কেন? অনিল বলল যে ও এক তান্ত্রিকের আশ্রমে গেছল। সেখানে তান্ত্রিকবাবা যজ্ঞ করে যজ্ঞবেদীর ছাই দিয়ে নখদর্পণ করেন। তাতে অনিলের নখে ঘড়ি হাতে মানসের ছবি ফুটে উঠেছে। চারদিকে গুন গুন শুরু হয়ে গেল। দেখলি তো? নখদর্পণে চোর ধরা পড়েছে। যত্ত গাঁজাখুরি কথা। অনিল কী দেখতে কী দেখেছে কে জানে? ওইটুকু নখের মধ্যে ছবি দেখে কাউকে চেনা যায় নাকি! একটা কথা ভাব। ও মানসের ছবিই কেন দেখল? সুমনসের কেন দেখল না? রাজেন্দ্রস্যার গম্ভীর। —আচ্ছা, তোমার তান্ত্রিক অন্য কারো আঙুলে নখদর্পণ করে চোর দেখাতে পারেন? --হ্যাঁ স্যার। তার নাম প, ম, র অথবা স দিয়ে শুরু হতে হবে। আর তার জন্মের রাশি তুলা, মেষ বা কন্যা হতে হবে। রাজেন্দ্রস্যার সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। --তোমাদের মধ্যে কেউ আছ? ভলান্টিয়ার হতে রাজি হবে? আবার আমি পা বাড়িয়ে লেঙ্গি মারলাম। --আমি স্যার, আমি। সবার চোখ আমার দিকে। -আমার নামের প্রথম অক্ষর স। আর রাশি কন্যা। আমি রাজি। --বেশ, আমি গেটপাস বানিয়ে দিচ্ছি। বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে ফিরে এসে স্টাফ রুমে রিপোর্ট করবে। আমি আর অনিল গেটের দিকে এগোই। মানসের মুখে একটু ভয়ের ছায়া খেলে গেল কি? (৩) উদাসীবাবার আখড়ায় আশ্বিন মাস। দুপুরের রোদে বেশ ঝাঁঝ । আমি ও অনিল হাঁটছি। গন্তব্য নিউ তরুণ সিনেমার কাছে তান্ত্রিকের ডেরা। এর মধ্যে অনিল একটা গলির ভেতরের দোকান থেকে একটু অগুরু, ধূপকাঠি, দেশলাই আর ছোট্ট ঘিয়ের শিশি কিনেছে। আর আছে একটা ছোট শিশি তাতে সাদা জলীয় কিছু টলটল করছে। জানলাম ওটা কারণ বারি। কালীমাতার পূজো ও যজ্ঞে লাগে। খরচ হল ছ’টাকা তিন আনা। --আর জবাফুল নিলি না? -- আশ্রমেই গাছ আছে, পঞ্চমুখী রক্তজবা ও লংকাজবা। অনেকটা পথ। অনিল বকবক করছে। -- মানস চুরি করবে ভাবতে পারি নি। ভাগ্যিস তান্ত্রিকবাবা ছিলেন। নইলে চোর ধরা পড়ত না। ঠিক কী না বল! আমি মাথা নাড়ি। কিছুই শুনছিলাম না। তান্ত্রিকের আড্ডায় যাচ্ছি। কী জানি কি হয়! পেটের মধ্যে গুরগুর করছে। নিউ তরুণ সিনেমাহল তো এসে গেল। এবার? অনিলের চেহারায় কেমন একটা ভাব। আমার হাত ধরে একটা গলির মধ্যে বন্ধ বাড়ির পেছনে নিয়ে গেল। এই কি আশ্রম? ভাঙা পাঁচিলের পাশ দিয়ে মাথা নীচু করে ঢুকে একটা তিনদিক ঘেরা আঙিনামত। একদিকে অন্য একটি বাড়ির বন্ধ দেয়াল। তার গায়ে খাঁজকাটা কুলুঙ্গিতে একটি ছোট্টমত কালীমূর্তি। অন্য দিকের পাঁচিল ঘেঁষে একটি মাটির বাড়ি,টালির চাল। গা বেয়ে পুঁই আর কুমড়োলতা জড়াজড়ি করে মাথা তুলেছে। আর একটি বাঁকাচোরা কুঁজো মত টগর ফুলের গাছ। হ্যাঁ, অনিলের কথামত তিনটে জবাফুলের গাছও দেখতে পেলাম। ছ্যাতলা পড়া স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। কিন্তু ওই কুঁজো টগরফুলের গাছ থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না কেন? কেমন একটা অজানা আতংক আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে। গাছটাকে কেন জীবন্ত মনে হচ্ছে? কেন যে পাকামি করতে গেলাম! মানসকে অনিল চোর ঠাউরেছে তো আমার কী? ওর ডে স্কলার বন্ধুর দল তো রয়েছে। ঘড়ঘড়ে আওয়াজে কেউ বলল- এইচিস? তা জিনিসপত্র সব ঠিক ঠিক এনিছিস? এবার দেখতে পেলাম একজন সাদা দাড়ি সাদা চুল বুড়োকে। ওর পরণে একটা ময়লা লুঙ্গি আর খালি গায়ে পৈতে ও বুকের সাদা চুল মিলে মিশে গেছে। এই তবে বাবাজি? অনিলকে দেখলাম কোন কথা না বলে ঝোলা থেকে জিনিসপত্তর বের করে বাবাজির পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে উবুড় হয়ে প্রণাম করল। --বাবা, এই ছেলেটি আমাদের সঙ্গে পড়ে। স্যার বলেছেন ওর নখেও নখদর্পণ করে চোর দেখাতে। বাবাজি আমাকে চেরা চোখে জরিপ করে বললেন—নাম? --সুমনস মুখোপাধ্যায়। -- ব্রাহ্মণ? তা বেশ। ভাল আধার। কিন্তু রাশি ও গোত্র? -- কন্যা রাশি। ভরদ্বাজ গোত্র। -- বাঃ, নখদর্পণ হবে। আমার ভৈরবী বগলা মা সব ব্যবস্থা করে দেবে। বগলা!ওঠ। ওকে শুদ্ধ কর, আচমন করাও, তারপর যজ্ঞের আয়োজন কর। টগর গাছকে দেখে কেন জীবন্ত মনে হচ্ছিল এবার বুঝতে পারলাম। মা বগলা টগর গাছের পাশে এমনভাবে বসেছিলেন যেন উনি গাছেরই আর একটা কান্ড। ওঁর বয়স বাবার থেকে অন্ততঃ কুড়ি বছর কম। কিন্তু মাথার না আঁচড়ানো তেলহীন লম্বা চুল জটপাকিয়ে বিশাল জটার আকার নিয়েছে। ঠিক যেন আর একটা টগর গাছ। উনি আমার মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেন। তারপর কালীমূর্তির সামনে একটি কুশাসনে বসিয়ে সামনে খানিকটা জায়গা গোবর দিয়ে লেপে তার উপর তামার কোশাকুশি ও একটি চৌকোণা তামার পাত্র বসিয়ে কিছু শুকনো কাঠকুটো সাজিয়ে তাতে অনিলের আনা ঘি খানিকটে ঢেলে দিলেন। তারপর বললেন—বাবা,এবার আসুন। আমার থেকে একটু দূরে অনিল বসে উত্তেজনায় কাঁপছে। বাবাজি একের পর এক মন্ত্র পড়ছেন ও মাঝে মাঝে হুংকার দিয়ে উঠছেন। বগলা আমার পিঠের কাছে বসে একহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। যজ্ঞের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। মাঝে মাঝে ধোঁয়ায় চারদিক ভরে যাচ্ছে, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিছু বুঝতে পারছি না। এই যজ্ঞ আর কতক্ষণ চলবে? আমার ঘুম পাচ্ছে। খালি কানে আসছে ওঁ হ্রীং ক্লীং! বষটকারিণ্যৈ নমঃ। দক্ষিণাকালিকায়ৈ নমঃ। মা বগলার ছোঁয়ায় জেগে উঠেছি। যজ্ঞ মনে হয় শেষ। এবার তার ভস্ম আর ঘি মিশিয়ে খানিকটা কালো থকথকে জিনিস বানিয়ে আমার আর অনিলের কপালে টিপ পরিয়ে মা বগলা আমার ডানদিকে বসলেন। আমার পেছনে ইঁটের দেয়াল। সামনে বাবাজি। --ওকে বজ্রাসনে বসাও বগলা! বাবাজি একের পর এক নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমি নির্দেশমত হাঁটু মুড়ে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসলাম। বগলা আমার ডানহাতের বুড়ো আঙুলের নখে ওই থকথকে কালোমত জিনিসটা লেপে দিয়ে আমার ডান হাত ওঁর দক্ষিণ করে ধারণ করে বাম হাতে পেছন দিক দিয়ে বেষ্টন করে বসেছেন। বাবাজি নখদর্পণের মন্ত্র পড়ছেন। বুঝতে পারছি ভাষাটা ঠিক সংস্কৃত নয়। হঠাৎ হুংকার দিয়ে বললেন—মুহুর্ত আগত। ওর দক্ষিণ করের বৃদ্ধাংগুষ্ঠ ধারণ করে দর্পণে চোরের মুখ দেখাও। কানের কাছে মুখ নিয়ে বগলা বললেন—কী দেখছ? --কিছু না। --দেখ, ভাল করে দেখ। আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমিও পাবে। এবার দেখ। -- হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। --কী দেখছ? -- আমাদের মিশন স্কুলের লোহার গেট। --ঠিক। এবার? --স্কুলের তিনতলা বিল্ডিং। -- বাঃ, এখন স্কুলের ছাদ, জলের ট্যাংক। আর কিছু না। -- মানসকে দেখ নি? --নাঃ। বাবাজি আবার হুংকার দিলেন। --আয়! মানস আয়! যেখানেই লুকিয়ে আছিস, বেরিয়ে আয়। তোর পালাবার পথ সব বন্ধ করে দিয়েছি। আয়! আয়! কার আজ্ঞে? হাড়িপ বাবার আজ্ঞে! বগলার গলায় উত্তেজনার ছোঁয়া। --এইবার দেখতে পাবে। এইবার! আমার মনেও ছোঁয়াচ লাগে। --হ্যাঁ , হ্যাঁ। এই তো দেখতে পারছি। মানস! মানস! অনিল আমার দিকে হাঁটু গেড়ে এগিয়ে আসে। ঠিক দেখেছিস? মানসই তো? --হ্যাঁ, ঘড়িতে টাইম দেখে রাখ। --তিনটে চল্লিশ। সাবাশ! এবার ও ঘড়ি না দিয়ে যাবে কোথায়! বগলা মা আমাকে ছাড়েন নি। -- কী দেখছ? মানস এখন কী করছে? -- ও ছাদের ট্যাংকের নীচের থেকে কাপড়ে মোড়া একটা ছোট পুঁটুলি বের করে খুলছে। --এবার? -- ওর হাতে একটা ছোট জিনিস চকচক করছে। জিনিসটা—জিনিসটা একটা ফেবার লুইবা রিস্টওয়াচ। --এবার? --কিছু না; সব ধোঁয়া ধোঁয়া। কিছু না। আমি ক্লান্ত। আধো অন্ধকার এই আঙিনায় শ্যাওলাধরা স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গন্ধ, অগুরু ধূপের ধোঁয়া, ঘি ও কারণবারির গন্ধ, মা বগলার বিশাল জটার উৎকট গন্ধ সব মিলে আমার গা গোলাচ্ছে। মিনমিন করে বলি—আমায় এবার ছেড়ে দিন, আমাদের যেতে দিন। ফেরার পথে অনিলের মুখে খই ফুটতে থাকে। আমি নির্বাক। মিশনের কাছে এসে ও বলে—হ্যাঁরে, তুই যা যা দেখেছিস সব ঠিক ঠিক স্যারেদের সামনে বলবি তো? (৪) অলটারনেটিভ প্রুফ স্টাফরুমে ভীড় ভেঙে পড়েছে। এমন আজব ঘটনা! আমাদের দুটো সেকশনের ছেলের দল, ল্যাব সহকারীরা মায় স্কুলের চাপরাশি বৈকুন্ঠ ও ঘনশ্যাম। রাজেন্দ্রস্যার প্রশ্ন করেন—সুমনস, নখদর্পণ হল? কী দেখলে? --আগে অনিল বলুক। অনিলের বর্ণনা শেষ হলে সন্নাটা সন্নাটা। তবে মানস চোর? সবার চোখ এখন ওর দিকে। --হ্যাঁ স্যার! সুমনস দেখেছে ও ছাতের উপর জলের ট্যাংকের নীচে আমার ফেবার লুইবা রিস্ট ওয়াচ লুকিয়ে রেখেছে। হ্যাঁ স্যার, আমি তখন ঘড়ি দেখেছিলাম—তিনটে বেজে চল্লিশ! রাজেন্দ্রস্যারের নির্দেশে ঘনশ্যাম চাপরাশি ছাদে জলের ট্যাংকএর নীচের থেকে ঘড়ি উদ্ধার করতে গেল। কিন্তু স্টাফরুমে স্যারেদের আর ক্লাস টেনের ছেলেদের মধ্যে ফিসফাস কথা শুরু হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়িয়েছেন কেমিস্ট্রির বাণীব্রত স্যার। --আমাদের কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। রাজেন্দ্রস্যার অবাক হয়ে কেমিস্ট্রির স্যারের দিকে তাকালেন। --বলতে চাই যে সুমনস মানস নয়,অন্য কাউকে দেখেছে। -- মানে? -- স্যার, আজ ওদের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস ছিল। তিনটের থেকে সওয়া চারটে পর্য্যন্ত। মানস আর অরবিন্দ একটা সল্ট টেস্ট করছিল, আমার সামনে। তাই তিনটে চল্লিশে ওর তিনতলার ছাতের ট্যাংকের নীচে কিছু লুকনোর প্রশ্নই ওঠে না। --হ্যাঁ স্যার, ও আর আমি তখন থেকে একসঙ্গে আছি। অরবিন্দ মুখ খোলে। অনিল চেঁচিয়ে ওঠে। নিশ্চয় ও বাথরুম যাবার নাম করে ক্লাসের বাইরে গিয়েছিল, স্যারের মনে নেই। বাণীব্রত স্যার ধমকে ওঠেন—থাম হে ছোকরা! ইতিমধ্যে চাপরাশি রাধেশ্যাম ফিরে এসেছে। জলের ট্যাংকের নীচে কিছু নেই। মানস সরালো কখন? রাজেন্দ্রস্যার বলেন—এবার আমরা সুমনসের কথা শুনব। আমি একবার গোটা ঘরের সবার দিকে চোখ বুলি নিই। সবাই কেমন অপেক্ষায় রয়েছে। --স্যার, এই তান্ত্রিকের নখদর্পণ ব্যাপারটা পুরো বুজরুকি! আমি কিচ্ছু দেখি নি। দেখা সম্ভব নয়। এসব ওই বাবাজি ও বগলা মার চালাকি। একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ বানিয়ে জোর করে সাজেস্ট করে কিছু দেখেছি এ’রকম বলতে বাধ্য করা। ওইটুকু নখের মধ্যে কালি লেপে স্কুলের ছাদ, জলের ট্যাংক, মানসের মুখ আর ঘড়িটা যে ফেবার লুইবা—এসব দেখা ও চিনে ফেলা সম্ভব? অনিল চেঁচিয়ে ওঠে—কী বলছিস কি তুই! ওকে রাজেন্দ্রাস্যার এক ধমকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন—আর কিছু বলবে সুমনস? --রাশি স্যার। আমার রাশি তো কন্যারাশি নয়। তাহলে আমি দেখলাম কী করে? -- তুমি—তুমি আমাকে মানে আমাদের সবাইকে মিথ্যে কথা বলেছিলে? --না স্যার! অলটারনেটিভ প্রুফ। আপনিই শিখিয়েছিলেন। আমার রাশি তান্ত্রিকের লিস্টির কোন রাশি নয়। নখদর্পণ সত্যি হলে আমার নখে কিছু দেখতে পাওয়া যাবে না। তাহলে বগলা মা কী করে সব দেখালেন? অর্থাৎ প্রথম প্রেমিসটাই ভুল। ব্যাপারটাই জালি। রাজেন্দ্রস্যার হো হো করে হেসে উঠলেন। দু’মাস্ কেটে গেছে। পূজোর পর স্কুল খুলতেই মানস ফিরে এসেছে আমাদের মধ্যে, নিয়মিত বসছে ব্যাকবেঞ্চে। ঘড়িচোর ধরা পড়েছিল ফেবার লুইবা ঘড়ি বেচতে গিয়ে। সেদিন মানস জিজ্ঞেস করল—আচ্ছা, কন্যারাশির বিকল্প প্রমাণ তো বুঝলাম, কিন্তু তোর আসল রাশিটা কী? -আমি জানি না রে! জানতে চাই না। ==================================================

86

10

Ranjan Roy

নখদর্পণ (সত্যঘটনা অবলম্বনে)

নখদর্পণ নখদর্পণ রঞ্জন রায় (১) ফার্স্ট বেঞ্চ লাস্ট বেঞ্চ মানসকে জব্দ করার এমন সু্যোগ পাওয়া যাবে কে ভেবেছিল? সাতটা দিনও যায় নি আমরা ঝগড়া করে কথা বলা বন্ধ করেছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি খালি ঝগড়া নয়, একটু হাতাহাতিও হয়েছিল। আসলে মানস হচ্ছে অতিচালাক। কথায় বলে না – অতি চালাকের গলায় দড়ি! আরে এটা কী বললাম! গলায় দড়ি! না, না। মানস আমাদের মিশনের বাগানের আমগাছের ডাল থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে এ আমি কল্পনাই করতে পারি নে, সে যতই ঝগড়া হোক। আর সত্যি কথাটা হচ্ছে একসময় আমরা খুব বন্ধু ছিলাম। একসময় মানে? মানে এই গতবছর পর্য্যন্ত। কবে থেকে? সেই ক্লাস সিক্স থেকে। এখন আমরা টেনে পড়ি। ও হল আমাদের ফার্স্ট বয়। আরে সব ক্লাসেই তো একজন করে ফার্স্ট বয় থাকে। তাতে কী! আমি খুব খারাপ ছাত্র নই, তবে ক্লাসে এগারো নম্বর। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে আমি একনম্বর। শুধু ওপেনিং ব্যাটই নই, ফার্স্ট স্লিপে ক্যাচ ফসকায় না। আর মানস হল আমাদের আম্পায়ার। রুল বুক গুলে খেয়েছে। এল বি ডব্লিউ এর সমস্ত নিয়ম, বলের মাপ ও ওজন, পিচের কন্ডিশন, কখন খেলা বন্ধ হওয়া উচিত এসব ও স্যারদের থেকেও ভাল জানে। এসব নিয়ে কোন ঝামেলা ছিল না। প্রব্লেম হল মানস এ বছর থেকে হোস্টেল ছেড়ে ডে স্কলার হয়ে যাওয়ায়। একটু খুলে বলি। ক্লাস সিক্সে, এক রোববারে আমি মিশনের হোস্টেলে ভর্তি হলাম। ছোট ছেলেদের জন্যেএকটা বড় হলে বারো জন করে থাকার ব্যবস্থা। আমাদের ক্যাপ্টেন শিবুদা। ক্লাস এইটে পড়ে, তিন বছরের পুরনো বলে খুব ঘ্যাম নেয়। পরের দিন সকালে একটা বালতি আর ন্যাতা দেখিয়ে বলল—এই যে নতুন ছেলে! আজ তোমার ঘর মোছার ডিউটি। ঘর বলতে গোটা হলটা। ভাল করে ন্যাতা নিংড়ে কষে মুছবে। জলে ভেজা চুবচুবে ন্যাতা আলতো করে বোলালে আবার মুছতে হবে। ফাঁকিবাজি চলবে না। আমি কখনো ঘর মুছিনি। আমাদের কোলকাতার ভাড়াবাড়িতে ঘরগুলো অনেক ছোট। এত বড় হলঘর! আমাকে একলা মুছতে হবে? কান্না পেয়ে গেল। এমন সময় মানস এগিয়ে এল। --শিবুদা, এই হল তো রোজ দু’জনে মিলে মুছি। আজ নতুন ছেলেকে হটাৎ করে গোটা হলটা একা করতে বলছ কেন? শিবুদা থতমত খেয়ে সামনে নিল। বাঃ, নতুন এসেই উকিল ধরেছে দেখছি। দেয়ালে লাগানো চার্ট দেখ । আজ নীলু আর নতুন ছেলে সুমানস এর পালা। নীলু শনিবার বাড়ি গেছে, কাল রাত্তিরেও আসেনি। তাই সুমানস একা মুছবে। আমি কিন্তু কিন্তু করে বললাম—শিবুদা, আমার নাম কিন্তু সুমনস, সুমানস নয়। --ওটা আবার কোন নাম হল নাকি? নামটা সুমানসই হবে, খামকা তক্কো করিস না। -- না শিবুদা, নতুন ছেলে ঠিক বলেছে। সুমনস মানে ফুল। ওটা তৎসম শব্দ। শিবুদা বিষম খেল। --আচ্ছা আচ্ছা, তোর যখন নতুন ছেলেটার জন্যে এতই দরদ, তুই নিজে ওর সঙ্গে হাত লাগা না! আর তুই—সুমানুস না বনমানুষ- ভাল করে শোন; আমাকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকবি, কোন দাদা-টাদা নয়। সেই দিন থেকে ও আর আমি ভীষণ বন্ধু হয়ে গেলাম। মানস আর সুমনস, হোস্টেলের মানিকজোড়। ছূটিতে বাড়ি গিয়েও আমরা একজন আরেকজনকে চিঠি লিখতাম। ছুটি থেকে ফিরে একই রুমে সিট না পেলে ওয়ার্ডেন স্যারকে রিকোয়েস্ট করতাম। ক্লাসে দুজনেই পেছনের বেঞ্চে বসতাম। ফার্স্ট বয়কে লাস্ট বেঞ্চে বসতে দেখে স্যারেরা অবাক হতেন। আসলে হোস্টেল থেকে ভাত খেয়ে এসে প্রথম পিরিয়ড একটু এগোতেই আমার বড্ড ঘুম পেত। ঠান্ডা কাঠের বেঞ্চে আলতো করে গাল রাখলে একটু পরে বাংলা স্যারের কথাগুলো আমার কানে অস্পষ্ট হতে হতে ভ্রমরগুঞ্জন হয়ে শেষে কোথায় হারিয়ে যেত। বাংলা স্যার বেশ বেঁটে, একটা লম্বা ছেলের পেছনে বসা আমাকে সহজে দেখতে পেতেন না। যদি বা দেখে ফেলতেন তখন মানস পাঁজরায় আঙুলের খোঁচা দিয়ে আমাকে জাগিয়ে দিত, স্যার পড়া ধরলে পাশ থেকে ঠোঁট না নাড়িয়ে চমৎকার প্রম্পট করত। আবার টিফিনের পর হিন্দি ক্লাস; রবিনবাবু অদ্ভূত উচ্চারণে পড়াতেন—অগর ন নভ মেঁ বাদল হোতে! আর মানস সেই সময় লাইব্রেরি থেকে আনা ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘চরিত্রহীন’ মাথা গুঁজে পড়তে থাকত। অবশ্যি বইটার গায়ে ভাল করে খবরের কাগজের মলাট চড়ানো আর তাতে কালি দিয়ে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা ‘ আদর্শ হিন্দি ব্যাকরণ অউর নিবন্ধ’। রবিনবাবু পড়াতে পড়াতে চক ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতেন। ওঁর পড়ানো বন্ধ হত না, কিন্তু কাউকে অন্যমনস্ক হতে বা ঝিমুতে দেখলে নিখুঁত টিপে চকের টুকরো ওদের মাথা তাক করে ছূঁড়তেন, কদাচিৎ ফস্কাতেন। আমার কাজ ছিল স্যারের দিকে চোখ রাখা আর বিপদ বুঝলেই মানসকে সতর্ক করা। একবার রবিনবাবু ইশারায় আমাকে না নড়তে বলে মানসের দিকে চক ছুঁড়লেন। আমি অসহায়। কিন্তু আমার অজান্তেই আমার হাতের লাল খাতাটা টেবিল টেনিসের মত ব্যাকহ্যান্ড ড্রাইভ করে চকের টুকরোটাকে সোজা স্যারের টেবিলে ফিরিয়ে দিল। গোটা ক্লাস হেসে উঠল। জীবনে প্রথম নিল ডাউন হলাম। গতবছরের শেষের দিকে মানস ছুটি থেকে ফিরল ন্যাড়া মাথা হয়ে। ওর বাবার স্ট্রোক হয়েছিল। আসানসোল রেল হাসপাতাল থেকে আর ফিরে আসেন নি। নভেম্বর মাসে জানলাম যে ওর জেঠু হস্টেলের খরচ দিতে পারবেন না। উনি বরানগরেই থাকেন। নৈনানপাড়ায় ওঁর মনিহারি দোকান। মানস ওর মার সঙ্গে এখন থেকে জেঠুর সংসারেই থাকবে। বার্ষিক পরীক্ষার আগেই ও হোস্টেল ছেড়ে দিয়ে ডে স্কলার হয়ে গেল। কিন্তু শেষ ক’টা দিন আমার পাশে লাস্ট বেঞ্চেই বসত। ( ২) গজব রে গজব! নতুন বছর শুরু হল। আর যা ঘটল তা স্বপ্নেও ভাবি নি। আমাদের হোস্টেলে বিহার থেকে পড়তে আসা দীনু বলে উঠল—গজব রে গজব! এবার থেকে ফার্স্ট বয় ফার্স্ট বেঞ্চে! মানস আমাদের সঙ্গে না বসে বসছে একেবারে ফার্স্ট বেঞ্চের প্রথম সিটে। কোন কৈফিয়ৎ না দিয়ে। অন্য ছেলেদের থেকে কানাঘুষোয় জানা গেল যে ওর জেঠু ওকে লাস্ট বেঞ্চে বসতে বারণ করেছেন। ওতে নাকি রেজাল্ট খারাপ হয়। আর মানস যদি প্রথম দশজনের মধ্যে না আসে তা হলে উনি আর পড়াবেন না। মানসকে ওঁর দোকানে বসতে হবে। যার সঙ্গে গত কয়েকবছর সকাল-সন্ধ্যে একসাথে কাটিয়েছি আজ তার সঙ্গে কথাই হয় না। ফার্স্ট আর লাস্ট বেঞ্চের দূরত্ব যে অনেক। পিরিয়ডের ফাঁকে ফাঁকে উঠে গিয়ে কথা শুরু করি, কিন্তু ওর আড়ষ্ট ভাব আর চোখে চোখ না রাখা আমার আগ্রহে জল ঢেলে দেয়। এ হতে পারে না, এ রকমটা হয় না। ভগবানের দরবারে এত অবিচার! নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ আছে। একদিন টিফিনের সময় ওকে ধরলাম। কী হয়েছে আমাকে বল, তোকে বলতে হবে। ও নিস্পৃহ গলায় বলে হাতটা ছাড়। তারপর ক্লাসের সেকন্ড বয়, টবিন রোডের মলয়ের সঙ্গে গল্প করতে থাকে। আমার গালটা জ্বালা করে ওঠে, ফিরে আসি নিজের জায়গায়। পরের দিন প্রেয়ার শুরু হল –“ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণম্”। বারান্দায় লাইনের মধ্যে কোথাও মানস চোখে পড়ল না। ও তো সহজে ক্লাস কামাই করে না! প্রেয়ার এগিয়ে চলেছেঃ বায়ুর্যমোগ্নির্বরুণঃ শশাঙ্কঃ। হন্তদন্ত হয়ে বারান্দায় ঢুকছে মানস। তাড়াহুড়ো করে আমাদের ছাড়িয়ে লাইনের পেছনের দিকে যাবার সময় আমি কিছু না ভেবেই পা বাড়িয়ে দিলাম। আছড়ে পড়ল মানস। মাথাটা বেঁচেছে, কিন্তু হাতে ও হাঁটুতে নুনছাল উঠে গেছে। সরি বলতে যাব কিন্তু তার আগেই আমার উপর ও ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্ধের মত মেরে চলেছে। আমি আটকাতে পারছি না। আমাদের দুজনকেই হেডস্যারের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। আমি কেন ল্যাং মেরেছিলাম তার কোন সদুত্তর দিতে পারলাম না। আমি নিজেই জানি না যে! দ্বিতীয়বার নিল ডাউন হলাম। হোস্টেল আর ডে স্কলার। লাস্ট বেঞ্চ বনাম ফার্স্ট বেঞ্চ। একটা গোপন প্রতিযোগিতা, একটু আকচা আকচি এদের মধ্যে ছিলই। কিন্তু সেদিন আমার নিল ডাউন হওয়া নিয়ে ভাগাভাগি প্রকট হয়ে উঠল। ডে স্কলারদের মতে আমি বিনা কারণে ক্লাসের ফার্স্ট বয়কে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছি। আবার হোস্টেলের ছেলেদের চোখে মানস হল ‘গদ্দার’। এত বছর হোস্টেলে কাটিয়ে আজ ডে স্কলারদের দলে! ফিরে আসি গানের ধ্রুবপদে, সাতদিন আগের ঘটনায়। ম্যাথসের ক্লাস। অ্যসিস্টান্ট হেডমাস্টার রাজেন্দ্রস্যার কোয়াড্রাটিক ইকোয়েশন বা দ্বিঘাত সমীকরণ বোঝাচ্ছেন। সেদিনের ক্লাসে উনি দেখাচ্ছিলেন যে কোন সমীকরণের যত ঘাত বা পাওয়ার, তার তত রুটস বা মূল হবে। তাই দ্বিঘাত সমীকরণের দুটোই রুটস হবে। তিনটে হতে পারে না। এবার উনি এই উপপাদ্যের অলটারনেটিভ প্রুফ নিয়ে পড়লেন। -মনে কর, এই সমীকরণে দুটোর জায়াগায় তিনটি রুটস আছে- আলফা, বেটা, গামা। এবার এইভাবে এগোতে গিয়ে দেখব যে এমন জায়গায় পৌঁছেচি যা আপাতবিরোধী বা সেলফ-কন্ট্রাডিক্টরি। তার মানে? তার মানে হল প্রথম প্রেমিস বা আ্যসাম্পশানটাই ভুল বা গোড়ায় গলদ। ঠিক আছে? আচ্ছা, এই ‘অলটারনেটিভ প্রুফ’ কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ কী হতে পারে? কে বলবে? আমি হাত তুললাম। তার আগেই প্রথম বেঞ্চ থেকে হাত তুলেছে মানস। স্যার একটু ভ্রূ কুঁচকে লাস্ট বেঞ্চকে দেখলেন। আমি বললাম—বিকল্প প্রমাণ। --না স্যার! ওটা হবে বৈকল্পিক প্রমাণ। মানসের গলা। স্যার বললেন-বাঃ। --কেন স্যার? বিকল্প প্রমাণ কথাটা কি ভুল? --না, না। ভুল কেন হবে? তবে ‘বৈকল্পিক প্রমাণ’ আরও নান্দনিক। ওরা মুচকে হাসল। আমরা দাঁতে দাঁত পিষলাম। এবার আজকের দিনটা। হোস্টেলের রাঁধুনি পঞ্চা ভাত পুড়িয়ে ফেলায় আমাদের ক্লাসে আসতে দেরি হল। ঢুকে দেখি তুলকালাম। ব্যাপারটা একেবারে পাঞ্জুরিতে তিড়িতংক! সেকশন বি’র ডে স্কলার অনিল আমাদের ক্লাস টিচার বাংলার স্যার সন্তোষবাবুর কাছে নালিশ করেছে যে এ’ সেকশনের মানস ওর রিস্টওয়াচ চুরি করেছে।

62

1

Ranjan Roy

আহার- নিদ্রা- মৈথুন (বড় গল্প)

মানুষ ভাবে এক, আর হয় আর। বিল্লু রয়ে গেছে, আমার দোকানদারি চলছে; আর আমি এখন নিয়মিত আমার ঘরে ঘুমুতে যাবার আগে রোজ একটা নীল ছবির ক্যাসেট নিজের কম্পিউটারে লাগাই। না, আমার সংকোচ কেটে গেছে। কোন অপরাধবোধ নেই। ধীরে ধীরে এটা অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে, ভালো লাগছে। এ একটা অন্য দুনিয়া। এর রাজ্যে আগে আমার প্রবেশ ছিল না, শুধু কিছু ভাসা ভাসা ধারণা ছিল। বলাই বাহুল্য, এই লাইনের সাপ্লায়ার হল বিল্লু; নিয়মিত ক্যাসেট যোগান দিয়ে যায়। কিন্তু আমরা এ নিয়ে কোন কথা বলি না। ও রোজ দুপুরে একটা নতুন ক্যাসেট এনে আমার টেবিলের ডানদিকের ড্রয়ারে রাখে আর সেখান থেকেই আগের দিনেরটা নিয়ে যায়। হ্যাঁ, শোভা আমার জীবনে আর ফিরে আসেনি। চেষ্টা করেছিলাম, হাঁকিয়ে দিয়েছিল। ওকে দোষ দিই নে, কিন্তু আমার কী দোষ? আমি নিজের মত একরকম ভালই ছিলাম। ওকে কে বলেছিল এই ল্যাবেন্ডিসের জীবনে জবরদস্তি এন্ট্রি নিয়ে সব এলোমেলো করে দিতে? মা একটা গান গুন গুন করত—মোর না মিটিতে আশা ভাঙিল খেলা। খবর পাই শোভা এখন টাটা স্কাইয়ের ওই অফিসে বড় দায়িত্ব সামলাচ্ছে। ওর ভাল হোক। পচাদার কথায় বুঝতে পারি যে শোভা এখন ওর নাগালের বাইরে। ওর কথা উঠলে বিরক্ত হয়। বিড়বিড় করে বলে—অকৃতজ্ঞ! একদিন পচাদা আবার ডেকে পাঠাল। কী জ্বালা! বিল্লু ম্যাজিকে আমার বাকি ভাড়া ও বাজারের ধার তো কবেই চুকে বুকে গেছে। আজও অফিসে সেই আর্কিটেক্ট ও দেঁতো উকিল বসে। আমাকে দেখেই পচাদা চেয়ার থেকে উঠে আয়-আয় করে হাত ধরে টেবিলের একদিকে ওই উকিলব্যাটার পাশে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। একরাউন্ড চা আর সিগ্রেটের পর পচাদা আসল কথায় এল। ---বুঝলি নীলু, তোর তো কাজকম্ম ভালই চলছে। বিল্লুর থেকে সব খবরই পাই। এবার তোর একটা ঠাঁই হওয়া দরকার। আমি কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ এত দরদ! --আরে ওই দোকানঘরের পেছনে একটা গুদামঘরে সারাজীবন কাটবে নাকি? তোর একটা নিজের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হওয়া দরকার। আর সংসারধর্ম করবি তো? -- কী যে বল! আমার নিজের একটুকরো জমি আছে—পাটুলির ওদিকে। আর আমি তো একবার বিয়ে করেছি। -- শোন, ওই জলাভূমির ধারের ওই জমি কোন কাজের না। ওখানে করপোরেশন একটা বড় বাজার বানাবে, আমি ওদের ম্যাপ দেখেছি। ওখানে কেউ বাড়ি বানাতে পারবে না। তুই পরে কিছু কমপেন্সেশন পেয়ে যাবি, ব্যস। -- খারাপ কি! -- দূর ব্যাটা ল্যাবেন্ডিস! তোর জন্যে আমার একটা প্ল্যান আছে। উঃ , কবে যে এরা আমার জন্যে প্ল্যান করা বন্ধ করবে! --শোন, ভাল করে বাঁচতে বাড়ি ও নারী দুটোই দরকার। আমি একটা এপার্টম্যান্ট বানাচ্ছি, চারতলা, এই নাকতলার কাছেই। তোকে একটা দু’কামরার ফ্ল্যাট দিয়ে দেব। আর ছাঁদনাতলায় বসার ব্যবস্থাও করব। --রক্ষে কর। আমার ফ্ল্যাট কেনার মত পয়সা নেই। আর বিয়ে কি রোজ রোজ হয় নাকি? -- আরে, তোদের ওই বিয়ে তো পুতুলখেলা। শোভা খুব ধড়িবাজ মেয়ে। তোকে ডিভোর্স দেয় নি। ওদিকে অফিসের বসের সঙ্গে ইন্টুমিন্টু চলছে। -- পচাদা, যাই হোক ও তোমার শালী, আমার বউ । ওকে নিয়ে এভাবে অফিসে বসে কথা বলা আমার ভাল লাগছে না। দেঁতো উকিল সরু গলার চড়া আওয়াজে তিড়বিড় করে উঠল। --নীলুবাবু, ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আপনার দাদার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। আমরাই নন-কনজুমেশন অফ ম্যারেজ চার্জ এনে তাড়াতাড়ি আপনার ডিভোর্সের ডিক্রি পাইয়ে দেব। আপনাকে এ্যালিমনি দিতে হবে না। কোন ফীস লাগবে না। আপনি খালি পিটিশন সাইন করে দিন। আমি ওর দিকে না তাকিয়ে পচাদাকে বললাম – যদি আর কোন কাজ না থাকে তো আমি বাড়ি যাই। --আরে তোর দেখি এখনও খুব আঠা! বোস, বোস; আসল কথাটাই তো বলা হয় নি। আমি ভাবলেশহীন মুখে একটা চেয়ার টেনে আবার বসে পড়লাম। কফি এল। পচাদার ইশারায় আর্কিটেক্ট লোকটি একটা নীলমত কাগজ ব্রিফকেস থেকে বের করে টেবিলের উপর বিছিয়ে দিল। একটা ম্যাপ, তাতে নানারকম নকশা। আমার হটাৎ খুব হাসি পেল। --কী ব্যাপার? কোন গুপ্তধনের খোঁজ পেলে নাকি? সেই ‘পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা’? ---আরে কাউকে পায়ে ধরে সাধতে হবে না। শুধু একটা সই করবি, ব্যস। --মানে? আর্কিটেক্ট মুখ খুলল। নাকতলার লাগোয়া এই জমিটায় আমরা একটা চারতলা এপার্টমেন্ট তুলছি, নকশা পাশ হয়ে যাবে, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তুমি একটা ফ্ল্যাট পাবে। কী আবোল তাবোল বকছেন! আমি ফ্ল্যাটকেনার টাকা কোথায় পাব? ধ্যেৎ, তোমার কোন টাকা দিতে হবে না, তুমি তো এই জমিটার মালিক! এরা কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছে? আমার এখন খিদে পাচ্ছে। এসব ভাল লাগছে না। পচাদা, এসব কী? তুমি ফ্ল্যাটবাড়ি তোলো গে যাও, আমি কেন ফ্ল্যাট কিনতে যাব? মিনিমাগনা? আর আমি কিসের জমির মালিক? আমার জমি তো পাটুলিতে। --ওরে ল্যাবেন্ডিশ, কথাগুলো মন দিয়ে শোন। তুই ফ্ল্যাট কিনবি না, জমিটা কিনবি, আর আমি তোকে জমির মালিক হিসেবে একটা ফ্ল্যাট দেব। বাকি ফ্ল্যাট বেচে দেব। বুঝলি? -- না, বুঝলাম না। আমি খামোকা এই জমি কেন কিনতে যাব? টাকা কোথায় পাব? তারপর ওরা যা বলল তাতে আমার খিদে লোপ পেল। এই জমিটার দাম দু’লাখ টাকা। তুই তোর পাটুলির প্লট বেচে দে, আমার আর্কিটেক্টকে। সেটা দিয়ে নাকতলার গায়ে এই জমিটা কিনবি, তাতে আমি ফ্ল্যাট বানাব, তুই কিছু টাকা আর একটা ফ্ল্যাট পাবি। সব একনম্বরে, তোর কোন খিঁচখিঁচ থাকবে না। তুমি হটাৎ এত দয়ালু কেন হলে? জমিটা নিজে কেন কিনছ না? আমার ঘাড়ে বন্দুক রাখবে? মনে কর তাই। আমার নিজের নামে কেনার প্রব্লেম আছে। আসলে জমিটার আসল দাম পাঁচ লাখ। তিনলাখ আমি জমির মালিককে ক্যাশ দেব। রেজিস্ট্রি হবে তোর নামে, দু’লাখ টাকায়। তোর লাভ বিনা ঝামেলায় একটা ফ্ল্যাট পাচ্ছি। ওই পাটুলির জমির কোন ভবিষ্যৎ নেই; ভেবে দেখ। আমি নকশা, কাগজপত্র সব দেখব। হ্যাঁ, হ্যাঁ সব দেখেশুনে নে। তারপর ভাল লাগলে সাইন করবি। কোন জোরজবরদস্তি নয়। হ্যাঁ, কাগজপত্র সব তৈরিই ছিল। জনৈক মণীন্দ্রনাথ দাসের নামে জমির চারকাঠার টুকরো। মন দিয়ে ম্যাপ ও নকশাটা দেখতে থাকি। ধীরে ধীরে মাথায় একটা টিউব লাইট জ্বলে ওঠে। এই জায়গাটা – এটা আমার বউ শোভার বাড়ির কাছে না? মনে হচ্ছে যেন ওর বাড়ির খুব কাছে? সবাই মন দিয়ে আমাকে দেখছে, কোন কথা বলছে না। আমি মুখ তুলি—পচাদা? পচাদা হাত তুলে থামায়। ঠিকই চিনেছিস, এটা শোভাদের বাড়ির লাগোয়া জমিটাই। ওদের বাড়িটা তিনকাঠার, সঙ্গের চারকাঠার জমিটা ওর মণিকাকার। হ্যাঁ, ওর কাকা এতদিন বাঙলাদেশে ছিল, মানে থাকে। আমরাই খবর দিয়ে এনেছি। ওর টাকার দরকার। তাই অমন জমি পাঁচলাখে ছেড়ে দিচ্ছে। সাতদিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে ফিরে যাবে। তুই নিবি তো বল, নইলে অনেক লোক লাইনে আছে। প্রথমে মনে হল না করে দিই, ওইখানে ফ্ল্যাটে থাকলে শোভার সঙ্গে প্রায় রোজ দেখা হবের সম্ভাবনা। কেন ফালতু ঝামেলা বাড়াই! তারপর মনে হল এই সুযোগ, রোজ শোভার নাকের ডগা দিয়ে নিজের অফিসে যাব। ওকে পাত্তা দেব না। দেখিয়ে দেব যে আমি বেশ আছি। না হাভাতে, না হাঘরে। আমি কলম খুলে ‘এগ্রিমেন্ট টু সেল’ ডকুমেন্টে সাইন করলাম। সবাই হুররে করে উঠল। পচাদা একটা হুইস্কির বোতল খুলল। সব যেন স্বপ্নের মত ঘটছে। জমির সেল ডিড, রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট, করপোরেশন থেকে প্রাথমিক নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট সব রেডি। কাল বেস্পতিবার বাস্তুপূজো হবে। জমিতে পূজো করে পিলার বসিয়ে আমরা প্রসাদ খাব। তারপর রেজিস্ট্রি হবে পরশু শুক্রবার। নাঃ, উকিলব্যাটা বেশ কাজের, সে যতই চপচপ করে পান চিবোক না কেন! পচাদা নকশা দেখিয়ে জানতে চাইল যে ফার্স্ট ফ্লোরের কোনদিকের ফ্ল্যাট আমার পছন্দ? প্রথমে দক্ষিণ-পূব খোলা ফ্ল্যাটের ঊপর আঙুল রাখলাম। কিন্তু ওর বারান্দা মনে হল শোভার আঙিনার দিকে খোলে। তাই অন্য ফ্ল্যাট পছন্দ করলাম। পচাদা আমার পিঠ চাপড়ে দিল, অন্যেরা হেসে উঠল। তারপর পচাদা আমাকে বলল যে আমার পূজোয় না গেলেও চলবে। প্রসাদ ওরা দোকানে পৌঁছে দেবে। আমার আসল কাজ হল রেজিস্ট্রির দিনে। সেই ভাল। সন্ধ্যেবেলা। আমি অফিস বন্ধ করে ভেতরের ঘরে যাব। বিল্লু যথারীতি নতুন সিডি দিয়ে গেছে। দরজায় কড়া নড়ে উঠল। আমি বিরক্ত মুখে উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছি, তার আগেই কেউ অধৈর্য হাতে চার পাঁচবার দরজায় দুম দুম করে ধাক্কা মারতে শুরু করেছে। এসব কী হচ্ছে? এক ঝটকায় দরজা খুলেই পাথর। দরজার চৌকাঠে শোভা দাঁড়িয়ে, চোখ থেকে ঘেন্না ঝরে পড়ছে। --তুই এত নীচ? আমি কোন কথা না বলে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। ওকে দেখি—একটু মোটা হয়েছে, চেহারায় একটু কমনীয়তা। --চুপ করে থেকে পার পেয়ে যাবি ভেবেছিস? আমাকে চিনিস তো, এত সহজে হার মানব না। সবকটাকে জেলের ঘানি টানাব, তোদের পালের গোদা ওই পচাদা শুদ্ধু। --কী হয়েছে বলবে? -- জালিয়াতটার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে আমার ভিটে থেকে উচ্ছেদ করতে চাস? এত বিষ তোর মনে? আমার পায়ের তলা থেকে যেন জমিন সরে গেছে। তবু প্রতিবাদ করি। বলি যে ওর কোথাও ভুল হচ্ছে। আমাদের রাস্তা আলাদা হয়েছে, কিন্তু ওকে ওর বসতবাটি থেকে উচ্ছেদ করার কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। আমি নকশা দলিল সব দেখে ওর কাকার ভাগের জমিটা কিনছি, তাতে ওর কীসের আপত্তি? ও আমাকে জানাল যে ওর কোন কাকা নেই। যে জমি আমি কিনছি সেটা আসলে হরিকাকার পাট্টায় নেওয়া জমি, যার ওপরে ওর টালির ঘর দাঁড়িয়ে আছে। ও খবর পেয়েছে যে কাল ও কাজে বেড়িয়ে গেলে ভিতপূজোর নাম করে পচাদা দলবল নিয়ে এসে ওর বাড়িটা ভেঙে দিয়ে সেখানে পিলার তুলে বোর্ড লাগিয়ে দেবে। তখন ও যদি আদালতে যায়, তাহলে দশবছর মালিকানা নিয়ে সিভিল কেস চলবে। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ নয়। ওর অফিসের মালিক নিজের উকিল লাগিয়ে কোর্টে পচাদার বিরুদ্ধে কেস ঠুকছে। করপোরেশনেও কাল নোটিস দেবে। আমি যদি অনেস্ট হই, তাহলে যেন কাল ওই পূজো-ফুজোর সময় ওখানে না যাই। শোভা ওদের ট্র্যাপ করতে অফিসে বেরিয়ে গিয়ে থানায় যাবে। ওরা বাড়িটা খানিকটা ভাঙা শুরু করলে পুলিশ নিয়ে ওদের হাতে নাতে ধরে ফৌজদারি কেসে খাইয়ে ঘানি টানাবে। বরাবরের মত বিষ দাঁত ভেঙে দেবে। সকাল হল। সারারাত ঘুমোতে পারি নি। পচাদা শোভা – কেউ চায় না যে আমি ভিতপূজোর ওখানে যাই। আমার কোন রোল নেই, সাইড রোলও নয়। আমি ল্যাবেন্ডিস। শোভার কথা সত্যি হলে পচাদারা আজ সকালে গিয়ে ওর টালির চালা ভেঙে দিয়ে পিলার তুলে পাঁচিল গেঁথে দেবে। আর শোভা মাঝপথে পুলিশ এনে ওদের হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়ে জেল খাটাবে। আমার এসব থেকে দূরে থাকাই মঙ্গল। কিন্তু আমি তো এখনও শোভার স্বামী। আমার কি কিছুই করার নেই? আমি যদি পচাদাদের থেকে জমি কিনে শোভাকে দিয়ে দিই? মানে, রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে যদি প্রোমোটারের সঙ্গে চুক্তিটা ক্যানসেল করে দিই? সে রাইট তো আমার আছে। কোন মারদাঙ্গা হবে না। শোভার জমি ওরই থাকবে। ও আমার বউ। ওর জমি যে আমারও জমি। কিন্তু পচাদা কি আমায় ছেড়ে দেবে? কী করতে পারে? আমার কাজ বন্ধ করিয়ে দেবে, দোকানটা কেড়ে নেবে। তখন আমি কোথায় যাব, কী করব? সেটা তখন ভাবব। যে এতদিন ধরে বাড়ির সাহায্য ছাড়াই বিজনেস করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে –সে কেন এত ভাববে? এত ঘাবড়াবে? কিছু না কিছু ঠিক জুটে যাবে। একটা তো পেট। আচ্ছা, আমি যদি শোভার জমির বেদখল আটকে দিই, শোভা কি আমাকে এই লাইনে কোথাও লাগিয়ে দিতে পারবে না? ওর বসকে বলে? বা অন্য কোথাও? সেসব পরে হবে, আগে তো আমি আমার কাজ করি। মাঠে পৌঁছে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। দেরি হয়ে গেছে। অন্ততঃ ছ’জন মুশকো ষন্ডামার্কা লাঠি দিয়ে শোভাদের বাড়ির চালটা প্রায় ভেঙে ফেলেছে। এবার শাবল দিয়ে দেয়ালের গায়ে ঘা দিচ্ছে। কিন্তু পুলিশ কোথায়? আমি দৌড়ুতে থাকি। সোজা গিয়ে লোকগুলোকে বলি—পালাও, পালাও! পুলিশ আসছে। শোভা আর ওর বস পুলিশ নিয়ে আসছে। সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। ওরা অবাক হয়। আমাকে দেখে। থেমে যায়। তারপর মাঠের এককোণায় একটা চেয়ারে বসে থাকা পচাদার দিকে তাকায়। এবার আমি পচাদাকে দেখতে পাই। আজ একটা সিল্কের পাঞ্জাবি আর ধুতি পরেছে। পাশে দাঁড়িয়ে বিল্লু। আমাকে দেখে ওদের ভুরূ কুঁচকে গেল। আমি একদৌড়ে পচাদার কাছে গিয়ে হাঁফাতে থাকি। --তুই এখানে কেন এসেছিস? বারণ করেছিলাম না! আমি আবার বলি যে শোভা পুলিশ নিয়ে আসছে, নিজের মুখে বলেছে। ওরা হেসে ওঠে। --দূর ব্যাটা ল্যাবেন্ডিস, কোন পুলিশ আসবে না। তার ব্যবস্থা করে এসেছি। শোভা এ জমিতে আর পা রাখতে পারবে না। আমার মাথা ঘুরে ওঠে। এই পচাদাকে আমি চিনি না। আমার ভেতর থেকে কেউ চেঁচিয়ে ওঠে –জমিটা আমার। --ভাগ, এখনও রেজিস্ট্রি হয় নি। ওটার মালিক শোভার কাকা। --সব জালি, তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। এই বাড়িটা তো তোমার নকশায় ছিল না। -- তো? এখনও তোর পাটুলির জমি বিক্রি হয় নি। তোর সঙ্গে ডিল ক্যানসেল। তুই এখান থেকে কেটে পড়। এই, তোরা হাত চালা। শাবল, গাঁইতি চলতে শুরু করে। ভেঙে পড়ছে দেয়াল। ধূলোর ঝড়। আমার মাথা কাজ করে না। অন্ধের মত দৌড়ে গিয়ে একটা লোকের পা ধরে হ্যাঁচকা টান মারি। লোকটা পড়ে যায়। আমি আরেকটা লোকের হাতের শাবল কেড়ে নেওয়ার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হয়। আমি মাটিতে পড়ে যাই। একজন আমাকে লাথি মারে। আমি ব্যথার চোটে গড়িয়ে গিয়ে একজনের পায়ে কামড়ে দিই। মাথার মধ্যে একটাই কথা ঘুরতে থাকে। আমার বৌয়ের বাড়ি ভাঙতে দেব না। একটা ভোঁতা কিছু মাথায় এসে লাগে। তারপর আর কিছু মনে নেই। আবছা আবছা টের পাচ্ছি। কালো কালো ঢেউ। গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে, চলে যাচ্ছে। কেউ একজন আমার মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে। আমার গালে ওর ঠোঁটের স্বাদ, ওর ভারি বুকের চাপ। এই ছোঁয়া, এই গন্ধ আমার চেনা। কতদিন আগে? কিন্তু এখন আমার ঘুম পাচ্ছে। আমার আর কিছু চাই না। শুধু ঘুম পাচ্ছে। (সমাপ্ত)

229

20

মনোজ ভট্টাচার্য

বাণপ্রস্থের ঠিকানাগুলো !

বাণপ্রস্থের ঠিকানাগুলো ! A life may be short, but many people pack a lot into it. কথায় বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো - ! আমার কিন্তু তা মনে হয় না । আমার মতে – আমাদের সমস্যা আমরা না দেখিলে আর কে দেখিবে ! – তাই তো খুঁজে খুঁজে বাণপ্রস্থের ঠিকানাগুলোতে ঢুঁ মারি । এখন তো সব বৃদ্ধাবাসগুলো ঠিক অনাথ-আশ্রম নয় । দস্তুর মতো তারকা ওলা হোটেল বলা যেতে পারে । - তবে কিছু নিয়মকানুন থাকে – নিরাপত্তা জন্যে ! কাল গেছিলাম একটা বানপ্রস্থ আশ্রমে ! গাঙ্গুলি বানপ্রস্থ আশ্রম । হয়ত অনেকেই পরিচিত আছেন ।- প্রথমে এর সি ই ও গাঙ্গুলিমশাইয়ের কথা না লিখলেই নয় ! কোন পারমিশান নেওয়া নেই অবশ্য ! খুব ছোটবেলায় কলকাতায় বঙ্গবাসী স্কুলে পড়ার পর চলে যান বোম্বাই । সেখানেই তাঁর আত্মীয়দের বাস । সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরি পান এমন একটা সংস্থায় – যার দৌলতে মাসে প্রায় দুবার সুইজারল্যান্ড যাতায়াত করতে হয় !সুদীর্ঘ কাল ধরে সব কটা মহাদেশই ঘুরতে হয় । ফলে বিয়ে করার সুযোগ হয় নি । একাই রয়ে গেছেন । দেশে মামা ও মামী ! সুইজারল্যান্ডে রেস্টুরেন্টে কফি খেতে খেতে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হয় । বন্ধুরা কর্মপলক্ষে বিদেশে । বাবা-মাকে সেখানে ঘোরাতে নিয়ে যায় । ছোট্ট দেশ সুইজারল্যান্ডে তিনদিকে তিনটে ভাষা । বাবা-মায়ের সে সব বোঝা সম্ভব নয় – বলা তো নয়ই । - তাহলে বার্ধক্যে মা-বাবা থাকবে কোথায় ! কে রাখবে তাদের ! টাকা দিয়েও তো আত্মীয়দের রাখতে বলা যায় না ! ভাবতে ভাবতে ঠিকই করে ফেললেন – অবসর নিয়ে দেশে – মানে কলকাতায় – এমন একটা আশ্রম খুলবেন – যেখানে বয়স্কদের আশ্রয় হতে পারে । তাদের দেখাশোনার জন্যে লোক রাখা হবে । নিজের বাড়ির স্বাদ পেতে চারপাশে গাছ পালা চাষবাস পুকুরে মাছ – একেবারে প্রাকৃতিক পরিবেশ ! এবং যাতে নির্মল বাতাস নিতে পারে । শহর থেকে দূরে – একেবারে গ্রামের ভেতরে । অনেক অনেকদিন ধরে খোঁজ করার ফলে পেলেন সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গা । দত্তপুকুরে কাশিমপুর । স্টেশনের কাছে – তবু শহর থেকে অনেক ভেতরে ! যদিও গাঙ্গুলিমশাই ডিরেকশান দিয়েছিলেন – তবু ঐ লাইনে রাস্তার হাল তো সবার জানা । পাক্কা দেড় ঘণ্টা লাগলো । কিন্তু ট্রেনে গেলে দত্তপুকুর স্টেশানের কাছেই । পথেই পড়লো রাধানাথ শিকদারের মামাবাড়ি – অধুনা খেয়ালী সংঘ ! – কি বিরাট কম্পাউন্ড ! মধ্যে দুটো সাদা বাড়ি । একটা বিরাট ঝিল মতো । তাতে ভর্তি মাছ। সব রকম মাছই আছে। বিরাট মাছগুলো জলে ভাসছে । ওপাশে দেখলাম বেশ কিছু সবজীর গাছ । - ওপাশে বলল – অনেক রকম সবজির চাষ হয় । এক মহিলা আমাদের আপ্যায়ন করে ঐ বাড়ির ঘরগুলো দেখালেন । ঘরগুলো খুবই বড় – মানে দুজন বোর্ডারের জন্যে । প্রচুর আলো বাতাস । দুপাশে বারান্ডা । বেশ কিছু বোর্ডার আছেন – তার মধ্যে আবার এক রাশিয়ান-আমেরিকান কাপল আছে । শীতের দুপুরে বেশ কিছু মহিলা-বোর্ডার দেখলাম রোদে বাগানে বসে আছে ! - বেশ ঝকঝকে – এ পর্যন্ত কোন বৃদ্ধাবাস এত পরিস্কার ও ঝকঝকে তকতকে দেখিনি ! পাশে আরো একটা আবাস তৈরি হচ্ছে দেখলাম । সেই মহিলার কাছে খাবার-খবর নেওয়া হল । সকালে ব্রেক ফাস্টে চা বিস্কুট, প্রাতরাশে ব্রেড বা রুটি ইতাদি, মধ্যাহ্ন-ভোজনে ভাত ডাল দুরকম শব্জী, মাছ বা মাংস দই – সপ্তাহে একদিন ভেজ, বিকেলে স্ন্যাক্স ও রাত্রে যথারীতি রুটি বা ভাত ডাল শব্জী ও ডিম মিষ্টি । পরের বাড়িটাও প্রায় একই রকম । এখানে গাঙ্গুলি মশাইয়ের ঘর । - ঘরে বেশি আসবাব নেই । একটাই বিছানা – তাঁর ওপর কাগজপত্র ছড়ানো । বেশ ছিমছাম ! চুরাশি বছরের এক যুবক আমাদের স্বাগত জানিয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন । ভদ্রলোক দেখলাম খুবই মিশুকে ! - অনেকক্ষণ ধরে ওনার সঙ্গে সামাজিক সমস্যা সম্বন্ধে আলোচনা হল । ফেরার পথে আরেকটা আরও একটা বৃদ্ধাবাস দেখে ভেতরে ঢুকে গেলাম । এটা রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রম । ঢুকতেই দেখি একটা মন্দির। তার দালানে বসে ম্যানেজার । আর বাগানে বসে রোদ পোহাচ্ছেন অনেক বয়স্ক মহিলা – ও কয়েকজন পুরুষ । এনারা আমাদের খুব একটা স্বাগত জানালেন না ! কিন্তু আমরা যে সেখানে থাকতে যাই নি – সেটা জেনে বোধয় নিশ্চিত হলেন । - যদিও দক্ষিণা খুব একটা কম নয় – তবু আপাত দৃষ্টিতে খুব একটা মনোরম লাগলো না ! আলোচনা করে বোঝা গেল খাবার দাবার মোটামুটি সব একই রকম ! কিন্তু কোন এককালীন সিকিউরিটি লাগে না ! মনোজ

99

2

মানব

স্বপনচারিণী

১ উদয়পুর শহরে যতবারই যাওয়া হয়, কেমন যেন একটা ভালোলাগা বেড়ে যায় শহরটার প্রতি। তাই শুভ্র এই বছরেও পুজোর ছুটিটা ঠিক করেছে ওখানেই কাটাবে। এদিকে একই শহরের প্রতি এত ভাললাগা যে ভাল নয় সেটা বোঝাতে না পেরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে বাপের বাড়ি চলে যাওয়া ঠিক করল স্ত্রী নির্মলা। বিয়ের প্রায় তিন বছর পার হয়েছে। প্রথমবার পুজোর ছুটিটা বাড়িতে কাটালেও তারপরই যাওয়া হল উদয়পুর। পরের বারেও তাই, আবার এই বছরও বলে কিনা... শুধু মধুচন্দ্রিমা যাপনটা হয়েছিল পুরীর সমুদ্রের তীরে একটা হোটেল ঘরে, তাও মাত্র তিন দিনের জন্য। তৃতীয় দিনেই একটা ফোন আসে আর তাড়াতাড়ি তাকে অফিস জয়েন করতে হয়। এইসব স্মৃতিচারণ করতে করতে ব্যাগ গোছাচ্ছিল আর মনে মনে গজগজ করছিল সে, হঠাৎ সামনে এগিয়ে এল একটা হাত যার তালুটা উপরের দিকে করা, সম্ভবত কিছু চাওয়ার ভঙ্গীতে। আর তারপর ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস পড়ায় সচকিত হয়ে পিছন ফিরে তাকায় সে। ‘শুভ্র – তু তু তুমি কখন এলে, নক করলেনা তো?’ কাঁপাকাঁপা গলায় ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল সে। ‘দরজাটা খোলাই ছিল, ভাবলাম ঢুকে পড়ি। ভয় পেলে নাকি?’ এমন রসিকতা দেখে গা জ্বলে নির্মলার, রেগে ফুঁসে ওঠে সে, ‘এইভাবে চমকে দেওয়ার কি মানে হয়? জা জা জানোইতো এইভাবেই আমার জ্যেঠু মারা গেছিল! অবশ্য জেনেই বা কি করবে! এখন তো আমাকে আপদ বলেই মনে হয়। এই আমি চললাম, যাও নিজের ইচ্ছামত উদয়পুর যাও, যেখানে খুশী ঘুরে এসো। কেউ কিচ্ছু বলবেনা।’ তিন বছরে মেয়েটাকে যতটুকু চিনেছে তাতে তার রাগের কারণটা ভালোই বুঝতে পারে শুভ্র। এই নাতিদীর্ঘ দাম্পত্যে ঝগড়া মারামারি অনেক হয়েছে তাদের মধ্যে, কিন্তু ভালোবাসার এতটুকু কমতি হয়নি। এখনও... ওইতো গজগজ করার পরও টিপট থেকে কেমন দুকাপ চা বের করে টেবিলটায় এসে বসল নির্মলা। ‘বিস্কুট নেবে না টোস্ট?’ নির্মলা শান্ত গলায় বললেও সেই কথার মধ্যে কেমন একটা ক্ষোভ, ব্যঙ্গ সবকিছু মিশে আছে। ‘আরে নানা, কিচ্ছু লাগবেনা। এই আমি বসলাম। এবার বলি আমি কি চাইছিলাম হাত পেতে। উঃ যা বাড়াবাড়ি কর না, আমাকেও একটু বলবার সুযোগ দেবে তো?’ ‘ছুটিটা হচ্ছেনা, তাইতো?’ ‘সে একরকম বলতে পারো, তবে একটা সারপ্রাইজও আছে। দাও দেখি তোমার পাসপোর্ট টা দাও।’ ‘আমি তো চলেই যাচ্ছি, আর পাসপোর্ট দিয়ে কি হবে?’ ‘আবার ছেলেমানুষী করে, দেখো এই চিঠিটা দেখো। মিশর থেকে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে ওদের শহরে এসে পাঁচমাস কাটিয়ে যাওয়ার জন্য। ওখানে আমাদের অফিসের যে শাখা আছে ওখানে আমার স্কিলে এক্সপার্ট কোনও লোক নেই, তাই আমাকে ডেকেছে। এখন তুমি যদি না বলো তো ওদের জবাব দিয়ে দিই...’ ‘মানে পিরামিডের দেশ?’ উত্তেজনায় বেশ জোরে কথাগুলো বলে ওঠে নির্মলা। তারপরই কেমন যেন লজ্জা পেয়ে এসে শুভ্রর বুকে মুখ লুকায়। ব্যাস এই সুযোগটাই খুঁজছিল শুভ্র। তৎক্ষণাৎ নির্মলার মুখটা তুলে কপালে একটা চুমু খেয়ে নেয় সে। তারপর চোখে চোখ রেগে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি রাজী তো?’ নীরবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় সে। ২ একটা ট্যাক্সি এসে ছেড়ে দিয়ে গেল তাদের কলকাতা এয়ারপোর্টে। এখান থেকে দুবাই, দুবাই থেকে কায়রো। প্রায় বারো ঘন্টার যাত্রা। এবারের পুজোটা বাড়িতে কাটবেনা ভেবে একটু দুঃখ পেলেও মনে মনে নির্মলা বেশ খুশী সেটা বোঝা যায়। দুসপ্তাহ আগের সেই রাগী আচরণ আর নেই। বরং উৎসাহিত হয়েই সব কাজ করছে সে। ‘এই, দুবাইটা একবার ঘুরে দেখা যায়না?’ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সে প্রশ্ন করে। ‘আমাদের এই দেশের ভিসা নেই তো, অবশ্য ভিজিটর পাস করিয়ে নেওয়া যেত, সে বড্ড ঝামেলা। ছাড়ো ওসব। একবার তোমাকে নিয়ে নিজের পয়সায় এদেশে আসব।’ বাচ্চা ছেলেকে যেমন করে ভোলানো হয়, ঠিক তেমনভাবে বৌকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে শুভ্র। পরদিন দুপুর বারোটার দিকে নামল দুজনে কায়রো এয়ারপোর্টে। ইমিগ্রেশন হয়ে গেলে নিজেদের ব্যাগ সংগ্রহ করে এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দাঁড়ায় তারা। ‘তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা মিশরে এসে পড়লাম, কি বলো!’ নির্মলাকে কথাগুলো বেশ গর্বের সঙ্গে বলে সে। ‘এবার?’ ‘কিচ্ছু চিন্তা করতে হবেনা, ওরা বলেছে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে। দেখো হয়ত কেউ হাতে আমার নামের বোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।’ শুভ্রর আত্মবিশ্বাস তখন চরমে। কিন্তু অনেক খুঁজেও তেমন কারোর দেখা পাওয়া গেলনা। একটা সিমকার্ড অবশ্য সে নিয়ে রেখেছিল এয়ারপোর্টের ভিতর থেকেই। সেটা ফোনে লাগিয়ে ই-মেলে পাওয়া ড্রাইভারের নম্বরটায় ফোন করল সে। অনেক কষ্ট করেও একটাই কথা শুধুমাত্র সে বুঝতে পারল, ‘আরবি মালুম?’ ঘাড় নাড়িয়ে সম্পূর্ণ বাংলায় বলল শুভ্র, ‘না।’ ‘কি গো, কি হল?’ নির্মলাকে চিন্তিত দেখায়। ড্রাইভারের সঙ্গে এই অদ্ভুত কথোপকথনে কিছুটা মুষড়ে পড়ে শুভ্র। ভাবে আর একটু অপেক্ষা করাই যাক না। নিজের দাবিটা তো সে রেখেছে ড্রাইভারের কাছে। নিশ্চয়ই ‘এয়ারপোর্ট’ কথাটা ড্রাইভার বুঝতে পারবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কত ড্রাইভার যে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার দাবী করল তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তারা তো জানেই না কোথায় যেতে হবে। সেসব কথা এখন ওদের বোঝানো যায় কেমন করে। ড্রাইভারদের এহেন ঘন ঘন আগমনে বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে নির্মলা তো বলেই ফেলল, ‘আপনাদের তো বারবার নিষেধ করা হচ্ছে। আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না!’ এহেন চিৎকারের সঙ্গে বাংলা ভাষার প্রয়োগে কাজ হল বৈকি! ভয় পেয়ে আর কেউ সেদিকে ঘেঁষবার সাহস করলনা। আরও মিনিট পনের পরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। ড্রাইভারের হাতে প্রিন্ট করা কাগজ, আরে এ তো তারই পাসপোর্টের কপি। কোনওরকমে বুঝিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল তারা। সৈয়দ পোর্ট শহরের দিকে রওনা দিল তারা। প্রায় তিনঘন্টার যাত্রা। জায়গায় জায়গায় বালির স্তুপ, মরুভূমি, আবার কোথাও বেশ কিছুটা সবুজের ছোঁয়া। মরুভূমির মাঝে অনেকে আবার তৈরী করছে রাজপ্রাসাদ সমান বাড়ি। এই জায়গায় না এলে সে হয়ত ভাবতেই পারতনা যে এরকম একটা জায়গায়ও মানুষ অট্টালিকা স্থাপন করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি জীবনের। তারা উঠল একটা বেশ নামী হোটেলে। ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যায় খেজুর গাছের সারি। আর একটুআর একটু দূরে চোখ পড়লেই দেখা যায় ভূমধ্যসাগরের দিগন্তবিস্তৃত জলের রেখা। স্নানটা সেরে নিয়ে রেস্তোঁরায় খাওয়াদাওয়া করে দুজনেই লম্বমান হল। ক্লান্তি এতক্ষণে বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বোঝা গেল। ৩ ‘এই হুসানি তাড়াতাড়ি কর। আন্দাজ আরও তিনটে জায়গায় যেতে হবে আমাদের এই সপ্তাহে। ওই যে মাসুদ কে চিনিস তো! ওর বাবা যক্ষায় পড়েছিল, শেষ অবস্থা চলছে, তারপর আরও দুটো আছে... হাত চালা হাত চালা।’ টেবিলের উপর শোয়ানো নুবিয়ার মৃতদেহের পেটের ভিতর খুব সাবধানে নুনের গোলাগুলো ভরতে ভরতে বলল জাবারি। ‘করছি তো ভাই। আজকাল এত লোক মরছে না! এই মেয়েটাকেই দেখ না। বাবাকে দেখতে কদিন আগেই পাশের ছোট্ট পিরামিডটায় এসেছিল। আমাদের দলের দুতিন জন তো ওর দিকে জুলজুল করে তাকিয়েই ছিল। শেষে আমাদের নেতার কড়া নজরে ওরা কাজে মন দেয়। সত্যিই কি অপরূপ রূপ ছিল মেয়েটার! আর কটা দিন বাদেই বিয়ে হত... ওর দিকে তাকিয়ে দেখ, যেন অপার মুগ্ধতায় নিদ্রামগ্ন। ডাকলেই হয়ত উঠে হাই তুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলবে, ‘শুভ সন্ধ্যা।’ ’ ‘কাজ কর কাজ কর। আমাদের এত কল্পনা সইবেনা।’ ‘তাই তো করছি। তবু যদি টাকাপয়সাটা ঠিকমতো পেতাম।’ নুনের স্তুপের মধ্যে পেট থেকে বের করে আনা প্রত্যঙ্গগুলো ভরে রাখতে রাখতে হতাশ গলায় বলে উঠল হুসানি। এতক্ষণ দূরে বসে থাকা দলনেতা সেনেব সব শুনছিল। সে এবার চেয়ার থেকে নেমে মাটিতে এসে বসল। তারও গলায় হতাশা, ‘ফ্যারাও ও আজকাল মরছেনা। তাহলে একটা কাজ করে বেশ কয়েকটা কাজের সমান অর্থ উপার্জন করা যেত। এইসব ছোটোখাটো কাজে খাটুনি বেশি, পয়সা কম। না না না...হুসানি যকৃতটা শুকাবার দরকার নাই। আজ এটা আমাদেরই থাক না। কি হে জাবারি, তুমি কি বল?’ জাবারির তখন নুনের পুর দেওয়া শেষ। এখন একটা হালকা সেলাই দেওয়ার কথা ভাবছিল সে। মুখ তুলে বলল, ‘হ্যাঁ, সে মহাত্মা সেনেব যা ভালো বুঝবেন। তবে হ্যাঁ, আগেরবার মনুষ্য যকৃতের সাথে সুরাপানে যে স্বাদকোরক কি অসীম তৃপ্তি পেয়েছিল, তা বলে আর তাকে খর্ব করতে চাইনা।’ ‘লোকজন মৃতের সঙ্গে এত জিনিসপত্র দিচ্ছে, এদিকে আমাদের দেওয়ার সময় ওদের পকেটে টান। আরে মরার সঙ্গে এতগুলো রাত কাটানো কি চাট্টিখানি কথা?’ সেনেবের গলায় হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘সে নাহয় হল, কিন্তু তাহলে আমাদের এই ভগবান ইমসেটির পাত্রটা যে ফাঁকা থেকে যাবে। যদি কেউ জেনে যায়...’ চিন্তিত হুসানি বলে ওঠে। এবার জাবারি বলে, ‘ধুর, এসব কেউ আজকাল দেখেনা। ওই যে বাক্সভর্তি অলংকার আছে, সব কি রেখে দেব ভাবছিস। উপর দিয়ে একটা রাস্তা রেখে দেওয়া আছে। সব চুকে যাক, তারপরে লোকজনের আনাগোনা যখন কমে আসবে, তখন এসব নিয়ে যাওয়া হবে। শুধু একটু নজরে নজরে রাখতে হবে, এই যা।’ সেনেব সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। হুসানি এবার বলে, ‘তাহলে যকৃতের পাত্রে লিনেন ভরে দিয়ে ব্যাপারটাকে চাপা দিলেই তো পাত্র আর খালি থাকেনা।’ ‘সাবাশ, তোমার বুদ্ধিটাও বেশ খুলেছে দেখছি’, হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। ################### ছোট্টো পিরামিড তৈরী হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরে এক শীতের সন্ধ্যায় পিরামিডটার উপর দিয়ে রেখে দেওয়া গোপন দরজাটা দিয়ে অল্প কিছু অলংকার বের করে আনে তারা তিনজন। তারপর ডিঙি বেয়ে একদম নীলনদের পূর্বপাড়ে আসবে এই ছিল বাসনা। নদীর একদম মাঝখানে ডিঙি এসে হাজির, এমন সময় ফিসফিস শব্দে চমকে তাকায় পিছন ফিরে, তিনজন একসাথে। তারা তিনজন ছাড়াও আরও একজন এসে হাজির নৌকার উপর। ও কে? বড্ড চেনা চেনা মুখ, সেই মায়াময় দৃষ্টি... শুধু ডানহাতে সদ্য কেটে আনা একটা যকৃত... আর সেনেবের ছেঁড়া পোষাকের পেটের অংশ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্ত। হুসানি আর জাবারি দুজনেই ঝাঁপ দেয় নীলনদের বুকে। কোনও রকমে সাঁতরে পূর্বপারে ফিরে আসে জাবারি, তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় অসীম যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নীলনদের বুকে মিলিয়ে গেল হুসানির দুটো হাত। ৪ চমকে দুপুরের ভাতঘুম থেকে উঠে পড়ে নির্মলা, শুভ্রর আদরের নিরু। এখানে আসার এক সপ্তাহ পর থেকে প্রায় দিনই এই স্বপ্নটা দেখছে সে... প্রায় একমাস ধরে। আজ শুক্রবার, এখানে ছুটির দিন, তাও অফিস যেতেই হবে শুভ্রকে। অনেক বলেও বোঝানো যায়না যে বৌকে সময়টাও দিতে হয়। বিদেশে এনে ফেলে রাখলেই সে খুশী হয় না। কি যেন একটা কোডিংয়ের কাজে তাকে অফিস যেতেই হচ্ছে শুক্রবারই হোক বা শনি। তারপর রবিবারে যখন ফ্রেশ মুডে সবাই অফিস আসে, ওর ক্লান্ত মুখখানা দেখেও কি কিছু মনে হয়না লোকজনের? এসব ভাবনা মাথা থেকে যেতেই তার মাথায় আসে স্বপ্নটার কথা। কয়েকদিন ধরে একই স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎই তার নজর চলে যায় স্বপ্নের হুসানির হাতের দিকে। তার বাঁ হাতে একটা জরুলের মতো, নাকি আঁকা ছবি কে জানে। তবে যে জিনিসটা তার সবথেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেটা হল, শুভ্ররও ঠিক ওই জায়গায় একটা জন্মদাগ আছে। আর দুটোর মধ্যে কি অদ্ভুত মিল... দুটোই যেন অনেকটা গুবরে পোকার মতো দেখতে... তবে কি শুভ্রই... নানা তেমন যদি হয়েই থাকে তবুও এজন্মে শুভ্র তার। কোনও অসুবিধা যাতে তার স্বামীর না হয় তা দেখাও স্ত্রী হিসাবে তার কর্তব্য। ভুলে থাকার চেষ্টা করেও ভুলতে পারেনা সে। এখন দুপুর দুটো। কিভাবে যেন নীলনদের ওপার তাকে আকর্ষণ করে চলেছে কি এক অদম্য টানে। চাইলেও তাকে রোধ করার ক্ষমতা তার নেই। একটা গাড়ি ডেকে নিল নিরু। ভাগ্যবশত ড্রাইভার জুটে গেল ভারতীয়। নাম মুস্তাফা। লক্ষ্ণৌ শহর থেকে সে এসেছে প্রায় বছর কুড়ি আগে। এখন সপরিবারে এখানকার বাসিন্দা। যাওয়ার যায়গাটা দেখে মুস্তাফা সতর্ক করে দিল তাকে, ‘কাঁহা জাইয়েগা ম্যাডাম। ইয়ে জাগা তো বিলকুল খালি হ্যায়। রেগিস্তান মে আপ কো অকেলে ক্যায়সে ছোড় সকতা হুঁ ম্যায়!’ সিনেমা দেখার সুবাদে হিন্দী ভাষাটা মোটামুটি বুঝতে পারত সে। কিন্তু বলতে গেলেই... ‘ঠিক হে ঠিক হে, মে দেখ লুঙ্গা।’ ‘জ্যায়সি আপকি মর্জি’ এই বলে গাড়িতে স্টার্ট দিল মুস্তাফা। রিজিওনাল রিং রোড দিয়ে নীলনদের উপরের ব্রিজটা পেরনোর সময় তার মনে একটা শিহরণ খেলে গেল। যেন বহু বছর আগের কোন স্মৃতির ভাণ্ডারে প্রবেশ করছে সে। সবুজের ছোঁয়ার মধ্যেও সে দেখতে পায় বালির ঝড় – শয়ে শয়ে উট ছুটে চলেছে সেই বালির বুক দিয়ে। তারই মাঝে ছোট্ট একটা পিরামিড, আর তার মধ্যে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে নুবিয়া। সেই তিনজন ব্যাক্তি করে চলেছে মমি তৈরীর কাজ সঙ্গে আরও দুজন বাক্স জুড়ে খোদাই করে চলেছে একজোড়া চোখ... যেন এই চোখ দিয়েই নুবিয়ার বাবা তাকিয়ে থাকবে অনন্তকাল ধরে, রক্ষা করবে তার মেয়েকে। ‘ম্যাডাম, ম্যাডাম’ সম্বিত ফিরে পায় নিরু। এসে গেছে তার গন্তব্য। কিন্তু এই জায়গাটাই কি? হ্যাঁ এই জায়গাটাই হবে। কত বছর আগের স্মৃতির পিছুডাক, নীলনদের গতিপথ পাল্টে যেতে পারে, তলিয়ে যেতে পারে পুরনো সব সৌধ বালির ভিতর, কিন্তু সেইসব স্মৃতি কি মিথ্যা বলতে পারে! টাকাপয়সা মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়ল সে। সাড়ে পাঁচটা বাজে প্রায়। দ্রুত আলো থাকতে থাকতে জায়গাটা খুঁজে পেতেই হবে। নাহলে অন্ধকারে... বাড়ি ফেরার চিন্তাটা আপাতত তার মাথাতেই আসেনা। পা চালায় সে মরুভূমির বালিতে। ৫ মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে শুভ্রর। ঠিক এই জায়গাটায় কিভাবে কোডিং করবে কিছুতেই মাথায় আসছেনা তার। ঠিক এই সময়েই নিজের দেশের অফিসটাকে মিস করে সে। ওখানে থাকলে নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে বের করতে পারত। আসলে নিজের ওই চেয়ারটায় কিছু না কিছু আছে, যার জন্য ওটাতে বসলেই মাথা চলতে শুরু করত। এদের কিসব গোপনীয়তার জন্য এখানে এসেই নাকি কাজ সারতে হবে। কি আর করা যায়! ল্যাপটপটা লক করে দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। একটা সিগারেট ধরিয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঘাঁটতে শুরু করল সে। ইস! জিপিএসটা অন করা আছে, শুধু শুধু ব্যাটারি ডিসচার্জ হয়ে গেল অনেকটা। তখনই নিকটবর্তী বন্ধুদের লিস্টে চোখ যেতেই এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল সে। নিরুকে দেখাচ্ছে তিনশ কিলোমিটার দূরে। একটা ফোন করতেই হচ্ছে। ফোনটা সুইচ অফ করা। নিশ্চই কিছু একটা হয়েছে সন্দেহ করে একটা গাড়ি ধরে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সে। অফিসে আজ কেউ নেই, তাই বলবারও কেউ নেই। বাড়ি পৌঁছেই দেখে গেটে তালা। তালা খুলে ভিতরে ঢুকে দুতিনবার তাও ডাক দেয়। এবার সত্যিই কিছু একটা হয়েছে সন্দেহ করেই আবার একটা গাড়ি ডেকে চড়ে বসে সে। শেষ দেখানো লোকেশন দেখে সেই পথেই রওনা দেয় শুভ্র। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়ি চালানোর অনুরোধ করে সে। ৬ কতক্ষণ চলেছে তার আর কোন হিসাব নেই নিরুর। ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে, ঘড়িটাও ফেলে এসেছে বাড়িতে। নির্জন, জনবসিতিহীন এই জায়গাটা চাঁদের আলোয় অপরূপ দেখাচ্ছে। তার মন বলছে, খুব কাছেই রয়েছে সেই কাঙ্খিত জায়গা। যার জন্য তার এই দীর্ঘ পদযাত্রা। ওই যে একটু দূরেই দুটো ছোট্টো ছোট্টো টিলার মত দেখা যাচ্ছে, তবে কি ওদুটোই? আরও এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল ওদুটো বালির স্তুপ ছাড়া আর কিছুই নয়। হাওয়ায় বালি উড়িয়ে এরকম স্তুপ মাঝে মাঝেই তৈরী করে ফেলে এই মরুভূমি অঞ্চলে। দুটো স্তুপের মাঝখানটা অনেকটা বালি সরে ফাঁকা হয়ে গেছে। সেই চাঁদের আলোতেও স্পষ্ট দেখতে পেল সে, একটা স্তম্ভের চূড়ার মত কিছু একটা যেন... পায়ে পায়ে নিচে নেমে গেল সে। এটা তো অনেকটা পিরামিডের চূড়ার মত। স্বপ্নে ঠিক যেমনভাবে দেখেছিল তেমনিভাবে উপরের ছোট্ট অংশটা ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে আলতো ঘুরিয়ে দিতেই অবাক কাণ্ড... পিরামিডের এক মানুষ উচ্চতার অংশ একটা মোটা লোহার রডের উপর ভর করে উঁচু হয়ে উপরে উঠে গেল। চাবির রিংটা ব্যাগ হাতড়ে বের করল সে। আজকাল সব জিনিসেই একটা করে ছোট্ট টর্চলাইট লাগিয়ে দেয় কোম্পানিগুলো। এতে অবশ্য আজ তার বেশ সুবিধাই হচ্ছে। দৈত্যের মত দেখতে রিংটার ভুঁড়িতে চাপ দিতেই আলো জ্বলে উঠল। এ যে একটা সিড়ি নেমে গেছে সোজা নিচে। অন্য সময় হলে ভয়ে তার শরীর আড়ষ্ট হয়ে যেত এই নির্জন মরুভূমিতে একা একা এরকম একটা অজানা সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে। কিন্তু আজ যেন সে বাহ্যজ্ঞানহীনা। কি এক অমোঘ আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে চলেছে নিচের দিকে। সরু গুহার মত সিড়িটা দিয়ে সে নেমে গেল বেশ খানিকটা, অবশেষে তল পেল। একটা ঘরের মত, তার চারিদিকে ছড়িয়ে আছে বাক্স, চকচকে সব অলংকার আর একটা তীব্র গন্ধ। আড়শোলার গন্ধের সাথে কেরোসিন তেল আর আর পচা মাছের গন্ধ মিশিয়ে দিলে যেটা হবে ঠিক সেই রকম অনেকটা। ধীরে ধীরে গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করল। মাথা ঝিমঝিম করে আসছে। অন্ধকার ভূতল ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে... একটু জল যদি কেউ দিত... বড্ড তেষ্টা... জ্ঞান হারাবার আগে হাত থেকে পড়ে যাওয়া টর্চের আলোয় শেষবারের জন্য সে যেটা দেখতে পেল সেটা হল একটা মমির বাক্স... বাক্সের উপর একটা মেয়ের ছবি, অবিকল তার স্বপ্নে দেখা মেয়েটার মুখের আদলে। আর বাক্সের গায়ে আঁকা দুটো চোখ, যেন সেই দুটো দিয়ে অবিরত বাক্সের ভিতর থেকে কেউ দেখে চলেছে তার দিকে। ৭ শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে গেল যেখানে মোবাইলটা শেষ লোকেশন দেখিয়েছিল তার একটু আগে। গাড়ি আর যাবেনা। খানিকটা এগিয়ে যেতেই দেখে একটা টিস্যু পেপারের মত কি যেন পড়ে আছে দেখতে পেল সে। এরকম একটা জায়গায়... নিরু অবশ্য এই জিনিসটা ব্যবহার করে। তুলে নিয়ে দেখল, হ্যাঁ সেই একই ব্র্যান্ডের ডিস্পোজেবল ফেস টাওয়েল। আর একটু এগিয়ে যেতে দেখে আর একটা। এইভাবে দুটো পড়ে থাকা টাওয়েল ধরে সরলরেখা বরাবর চলতে চলতে আরও বেশ কয়েকটা ওই একই জিনিস খুঁজে পেল সে। নির্মলা যে এই পথেই সোজা গেছে তা নিয়ে শুভ্রর আর কোনও সন্দেহ রইল না। দ্রুত পা চালাল সে। মাঝে মাঝে ছোটার চেষ্টা করে, পড়ে যায়। আবার উঠে যতটা সম্ভব জোরে হাঁটার চেষ্টা করে সে। অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এসে সে দেখতে পেল দুটো বালির স্তূপ। আরও কাছে গিয়ে দেখল মাঝখানে একটা নিচু হয়ে যাওয়া অংশ। পায়ে পায়ে নেমে গেল সে। একটা পিরামিডের ছোট্ট মাথা যেন উঁচু হয়ে উঠে আছে। পায়ের কাছে পড়ে ওটা কী? একটা ফেস ক্রিম। তবে কি এর নিচেই তলিয়ে গেছে নিরু? ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা দুবার ডাইনে বাঁয়ে ঝাঁকিয়ে নেয় শুভ্র। আলো জ্বলে ওঠে। উঁচু হয়ে থাকা চূড়াটার নিচেই একটা সিড়ি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেমে যায় সে। একটা যেন তীব্র গন্ধ নাকে আসছে। সেই সঙ্গে কারও ভয়ার্ত, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর। ভালো করে আলোটা ঘুরিয়ে ঘরিয়ে দেখে সেই পাতালঘরের এক কোণায় বসে নিরু থরথর করে কাঁপছে। ‘নিরু, তুমি?’ কোনও কথা বলে না নিরু। শুধু আঙুল দিয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে দেখিয়ে দেয়। ওপাশে জমে থাকা চাপা অন্ধকারের মাঝেও টর্চের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় সে, একটা মমির বাক্স, খোলা। আর সেখান থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে যে জীবটা দাঁড়িয়েছে তার সর্বাঙ্গ ব্যান্ডেজে ঢাকা। ভয়ে কারও মুখ দিয়েই কথা বেরোয় না। জীবটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে নিরুর দিকে। হঠাৎ পত্নীপ্রেম তীব্র হয়ে ওঠে শুভ্রর মনে। এতটা যখন সে এসেছে, নিরুকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাবেই সে। তাই শ্লথগতির মমিটার থেকে অনেক দ্রুতবেগে নিরুর হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরোতে যায় সে। দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখে সেই মমিটাই, এবার একদম সামনে। অর্থাৎ বেরনোর একমাত্র রাস্তাও বন্ধ। ‘বাবা তুমি সরে যাও, ওরা আমার যকৃত চিবিয়ে খেয়েছে। দুটোকে শেষ করেছি। এখন একেও না শেষ করা অব্দি আমার শান্তি নেই।’ হাজার হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস যখন বাবা বলে ডেকে উঠল তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রবলভাবে দেখা দিল তার মধ্যে। মমির ইশারা নিরুর দিকে। হয়ত এমন কিছু নিরু করেছে কোন এক পূর্বজন্মে যাতে মমি অসন্তুষ্ট। প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেল সে। নিতান্ত আন্দাজেই বলে উঠলঃ ‘না মা না, যে তোর অঙ্গ ভক্ষণ করেছে সে সম্পূর্ণ অন্য মানুষ ছিল। চেয়ে দেখ, ওর সাথে তোর কোনও শত্রুতা নেই।’ ‘হ্যাঁ, আমি ঠিক চিনতে পেরেছি, ওকে আমি ছাড়বনা।’ মমি ধীর পায়ে এগিয়ে চলে। ‘যে তোর সাথে অনাচার করেছে সেই জাবারি, নদী পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর এক ডাকাতদলের হাতে মারা যায়। ওর কাছে সোনাদানা কিছু না পেয়ে তারা ওকে খুনই করে ফেলে। ভালো করে ভেবে দেখ মা... আমি বলছি, সে তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়ে গেছে।’ চমকে ওঠে শুভ্র। কেউ যেন তার ভিতর থেকে কথাগুলো বলছে। অথচ তার মুখ দিয়েই উচ্চারিত হচ্ছে। এরকম তো আগে কখনও হয়নি। কিচ্ছু বুঝতে না পেরে বিনা বাধায় যা হচ্ছে হতে দেওয়াই ঠিক বলে মনে করে সে। ‘কিন্তু... আমি নিজের হাতে ওকে শাস্তি দিতে চাই।’ ‘দেখ এই জন্মে কিন্তু ও পুরুষ নয়, একজন মহিলা, তার উপরে গর্ভবতী। একটা ভরা সংসার আছে ওর। এইভাবে একজনের জীবন শেষ না করে দিয়ে রাগকে নিয়ন্ত্রণ কর মা। তাহলেই মুক্তিলাভ করবি। ক্ষমা করতে শেখ, ক্ষমা।’ এইবার সম্ভবত সে বুঝল। প্রচণ্ড চিৎকারে চারিদিক কাঁপিয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা শরীর থেকে এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে এসে দম্পতির চারিদিক বেশ কয়েকবার পাক খেয়ে সিড়ি দিয়ে বেরিয়ে মহাশুন্যে মিলিয়ে গেল। আর পার্থিব শুকনো দেহটা পড়ে রইল ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে, অন্ধকারে। দুজনে মিলে দেহটাকে ধরে বাক্সবন্দী করে ফিরে এল উপরে। মোটা রডটায় লেগে থাকা একটা পাথরে অল্প চাপ দিতেই চূড়াটা নামতে শুরু করল। সাবধান হয়ে সরে গেল তারা। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যতটা সম্ভব বালি দিয়ে ঢেকে দিল তারা। এই জায়গার কথা তারা কাউকেই জানাবেনা। খোঁজ পেলেই সেই দেহটাকে নিয়ে মিউজিয়ামে টেনে নিয়ে যাওয়া, কাটাছেঁড়া আরও কতকি। তার চেয়ে এই বেশ শান্তিতে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকবে আত্মাহীন দেহটা। চাঁদের আলো এখন বেশ ঝলমলে হয়ে মরুভূমিকে রূপময় করে তুলেছে। ঈষৎ ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে, তবে সেটা বেশ ভালোই লাগছে তাদের। ‘এই তুমি ওসব কি বলছিলে গো। এইসব ভাষা জানো আগে বলনি তো?’ প্রশ্ন করে নিরু। ‘কই কোন ভাষা? আমি তো সম্পূর্ণ বাংলায়...’ ‘বুঝেছি, বলবেনা তাইত? বেশ কি কথা হল তোমাদের মধ্যে সেটা তো বলো।’ হোটেলে ফিরতে ফিরতে দুজনেই দুজনের কাছে নিজের নিজের ঘটনাটা বলল। দুটো মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ ঘটনার রূপ পেলো তারা। এবং এরপর থেকে কেউই যে কাউকে না জানিয়ে কোনও কাজ করবেনা সেবিষয়ে দুজনেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হল। ####################### দেশে ফেরার কয়েকমাস পর তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্মাল। ভালবেসে নিরু তার নাম রাখল নুবিয়া – অর্থাৎ সোনার টুকরো মেয়ে।

63

1