শিবাংশু

আত্মদীপো ভব

কথায় বলে, 'সোনার ঠাকুর, মাটির পা'। অর্থাৎ, মহান মানুষদের মহিমা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পদযুগল পর্যন্ত পৌঁছোয় না। কাদামাটির মলিন, গদ্যময় পৃথিবীতে দৃঢ়মূল, আবহমানকাল ঋজু দাঁড়িয়ে থাকতে পারার এলেম ইতিহাসে মাত্র এক-দুজন মানুষের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই 'মহান' মানবদের ঔজ্জ্বল্যের উৎস থাকে ভক্তের হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত মহিমার দীপ্তিতে। আমাদের গুরুবাদী দেশে যাঁরা নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন, তাঁদের অবিলম্বে আমরা 'গুরু'র মঞ্চে বসিয়ে দিই। শেষ পর্যন্ত তাঁদের নসিবে রাখা থাকে দেবতার জন্য নির্দিষ্ট নিষ্প্রাণ, শীতল স্বর্ণ সিংহাসন। আড়াই হাজার বছর আগে একজন মানুষ এদেশে এসেছিলেন। যিনি গুরুবাদে বিশ্বাস রাখতেন না। নিজেকে বলতেন শিক্ষক, শাস্তা। কোনও ধর্মমত প্রচার করতেন না। নিশ্ছিদ্র যুক্তি ও অমেয় করুণার ধারায় অসহায় মানুষের দুঃখ ধুইয়ে দেবার ব্রত নিয়ে জীবনযাপন করে গিয়েছিলেন। এদেশে অন্য সমস্ত গুরু'রা দাবি করেন প্রশ্নহীন আনুগত্য ও দ্বিধাহীন ভক্তি। তিনি শিষ্যদের বলেন প্রশ্ন করতে, বলেন শাস্তার বাণী নির্দ্বিধায় গ্রহণ না করতে। বলেন দেবতা, ঈশ্বর, অলৌকিক ভেলকিবাজি, শাস্ত্রীয় কোলাহল, কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে প্রদীপ করে তোলো। নিজেকেই আশ্রয় করে তোলো। যাতে দুঃখকাতর মানুষ নিজের শক্তিতেই তিমিরবিনাশী হয়ে উঠতে পারে। অথচ এই যুক্তিসত্ত্ব মানুষটির জীবন, কীর্তি, দর্শন কেন্দ্র করে গত আড়াই হাজার বছর সারা পৃথিবীতে অগণিত ভাববাদী, রহস্যবাদী, কাল্পনিক, মনের মাধুরীময় ডিসকোর্স গড়ে উঠেছে। তাদের আড়াল থেকে মহামানব শাক্যমুনিকে চিনে নেওয়ার পথ সাধারণ মানুষ আর খুঁজে পাননা। কলিকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা-২০১৯ মিডিয়াসেন্টারে আয়োজিত একটি প্রাসঙ্গিক আলোচনাসভায় এই কথাগুলিই বলেছিলুম আমি। বিষয়টি নিয়ে আমার রুচি আছে টের পেয়ে 'ঋতবাক প্রকাশন' গত বইমেলার পর থেকেই আমাকে ক্রমাগত চাপে রেখেছিলেন। তাঁরা বাংলাভাষায় এমন একটি গ্রন্থ প্রকাশ করতে চাইছিলেন, যেখানে মানববুদ্ধ, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ 'সর্বশ্রেষ্ঠ মানব' আখ্যা দিয়েছিলেন, তাঁর বিশদ পরিচয় থাকবে। সঙ্গে বৌদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধধর্মের সামগ্রিক রূপরেখা একুশ শতকের নবীন, কৌতুহলী প্রজন্মের পাঠকদের জন্য যথাসম্ভব সরলভাবে বিবৃত করা হবে। বিষয়টি অতি জটিল এবং ইদানিংকালে আমার মাতৃভাষায় এনিয়ে কোনও সামগ্রিক, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা চোখে পড়েনি। গত একবছর ধরে কুড়িটি প্রবন্ধের মাধ্যমে আমি এই আলোচনাটি নথিবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছি। বিশ্বাস আছে, সাধারণ পাঠক ও অনুসন্ধিৎসু গবেষক উভয়েই তাঁদের নানা প্রশ্ন, কৌতুহল, দ্বিধানিরসনের সূত্র প্রবন্ধগুলি থেকে পেয়ে যাবেন। বিষয়টির ব্যাপ্তি প্রাঞ্জল করতে এখানে প্রায় একশোটি আলোকচিত্র নিবদ্ধ রয়েছে। যেগুলি বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশে আমারই তোলা ছবির সংগ্রহ থেকে নির্বাচিত। আলোচনাসভাটি সাঙ্গ হতে আমি বন্ধুপরিজন সহকারে মেলায় অলস বিহার করছিলুম। হঠাৎ আহ্বান এলো প্রকাশকের বিপণীতে সত্বর উপস্থিত হবার জন্য। সেখানে গিয়ে দেখি তিনজন সম্পূর্ণ অচেনা প্রবীণ ও নবীন পাঠক বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন তাঁদের বইগুলিতে গ্রন্থকারের স্বাক্ষর নেবার ইচ্ছায়। তাঁদের একজন কথাপ্রসঙ্গে জানালেন তাঁর বয়স চুরাশি পূর্ণ হয়েছে। আমি চমৎকৃত। তাঁদের বলি, আপনারা কেন এই বইটির প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন? তাঁরা জানান কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে তাঁদের বিশ্বাস হয়েছে বইটিতে এমন কিছু সারবস্তু আছে, যা তাঁদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারবে। আমি নিশ্চিন্ত ও কৃতজ্ঞ বোধ করি। প্রকাশক যে পর্যায়ের যত্ন ও ব্যয়স্বীকার করে গ্রন্থটি প্রস্তুত করেছেন তার জন্য সাধুবাদ দিতেই হয়। কিছু আভাস সঙ্গের ছবিগুলির মধ্যে থাকলো।

115

3

Aloka

মাঝে মাঝে

বই-খাতা-কাগজ-কলম একটু আধটু যা পড়াশুনো করেছি তা কি ভাবে শুরু হয়েছিল তাই ভাবছিলাম| বইয়ের কথায় প্রথমেই মনে পড়ে বর্ণ পরিচয়ের কথা |সেই গোলাপি মলাটের নিউজ প্রিণ্ট ধরনের কাগজে ছাপা সাইজে ছোট| অজ ‚ আম এর পৃষ্ঠা টা মনে পড়ছে তার আগে বর্ণ গুলো চেনার নিশ্চয়ই ক টা পৃষ্ঠা ছিল নাঃ সে গুলোর চেহারা মনে পড়ছে না| তাহ লে ঐ যে অ য়ে অজগর আসছে তেড়ে ‚ আমটি আমি খাব পেড়ে... আমাদের কালে তাবৎ শিশুদের যা দিয়ে শিক্ষার সূচনা হত সেটা কোন বই ? একটা বইয়ের কথা মনে পড়ছে..নামটা ছিল বোধ হয় কথা শেখা..সাইজে বেশ খানিকটা বড় ‚ সচিত্র ছিল আর ছবি গুলো রঙীন ছিল...এটা কি সেই বই .. কি জানি | স্কুল পাঠ্য আর একটা বই এর কথামনে পড়ছে.. সেটা অবশ্য আর একটু উঁচু তে.....কিশলয়...সে কালে এই বই পড়ে নি এমন কেউ বোধ হয় খুব কম ই আছে| ক্লাস ফোর অবধি ছিল এই বই | সেই বইয়ে পড়া দু/ একটা পদ্য...এখনো মনে আছে| সহজ পাঠের কথা আর নতুন করে বলার কিছু নেই | তবে বিভিন্ন জায়্গায় সহজ পাঠ নিয়ে চর্চা এখনো দেখতে পাই | জানি না স্কুলে এখনও এই সব পড়ানো হয় কিনা| তখন বছর বছর সিলেবাস পাল্টাতো না.| একই বই এক বাড়িতে একাধিক জন পড়েছে এরকম ই হত |সেই রকম আর একটি বই হল পাঠ সঙকলন| বাংলা পাঠ্য বই ‚ ক্লাস নাইন থেকে পাঠ্য ছিল | এই বইয়ে পড়া দুটি গদ্য যার দু একটি লাইন খুব ই ব্যবহৃত হয় এখনো অবধি মনে আছে | একটি হল " নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ ?" গদ্যাংশটির নাম ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে‚ লেখক জগদীশ চন্দ্র বসু| আর একটি ‚ " সেই ট্রাডিশন সমানে চলিয়াছে" ‚ গদ্যাংশ ভারত বর্ষ‚ লেখক এস ওয়াজেদ আলি | এই বাক্যাংশ গুলো বহুল ব্যবহৃত তবে এখনকার কালের ক জন এর উৎ্পত্তি জানেন সে বিষয়ে আমার বেশ সন্দেহ আছে‚ পাঠ্সঙ্কলন না পড়লে আমি নিজেও তো জানতাম না | স্লেট পেন্সিলে লেখার পর্ব টা কতদিন ছিল কি জানি | স্পন্জের তখনো আবির্ভাব হয় নি | ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে স্লেট মুছতে হত | তবে লেখা ছাড়া স্লেটের অন্য উপযোগিতা আমাদের কাছে বেশী জরুরী ছিল | এক্কাদোক্কা খেলার কাজে স্লেটের ভাঙা টুকরো বিশেষ উপযোগী ছিল| সেই দিস্তে খাতা এখনো আছে কিনা জানি না| দিস্তে হিসেবে সাদা কাগজ কিনে চার ভাঁজ করে সেলাই করা| প্রত্যেকটা পাতা য় মার্জিন টানা .. সে বেশ কঠিন কাজ ছিল | ঐ ডেকে হেঁকে কিলিয়ে মারো নিয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি করার চেয়ে বেশী কাজ দিত শেষ পাতা গুলোয় কাটাকুটি খেলা |যারা ষাটের দশকের পরে জন্মেছ তারা জানোনা বুঝি ডেকে হেঁকে.... র মর্ম| এ হচ্ছে সেই যুগের কথা ..বেশ কিছুদিন...আগে মেট্রিক সিস্টেম চালু হলেও তখনো ঠিক সড়গড় হয় নি. ওগুলো হল মনে রাখার জন্য ডেকা-হেক্টো-কিলো-মিটার এর স্ংক্ষেপণ ( তুলনীয় ইতিহাসের বাবার হইল একবার জ্বর সারিল ঔষধে) ..... ও আদর্শ লিপির কথা ত বলাই হল না | ছিল একটা তবে তাতে কোনদিন লিখেছি কিনা মনে পড়ছে না| একটা খুব সুন্দর মলাটের খাতার কথা না বলে পারছি না | বাসন্তী রঙএর মলাট মাঝখানটা জুড়ে গোল করে কচি কলাপাতা র্ংএর বাঁশ ঝাড় | হাতির ওয়াটার মার্ক ও ছিল| কাগজ টা বোধ্হ্য় টিটাগড় পেপার মিলসের কোথাও যেন একটা লেখা ছিল| সেটা বোধহয় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর বছর | একধরনের খাতা বেরোল প্রত্যেকটা খাতার মলাটের ওপর এল ছোট ছোট কবিতা যেমন ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদাব্যঙ্গ করে ধ্বনি কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে অথবা কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যা রবি শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা কেরোসিন শিখা বলে এস মোর দাদা| এইরকম আরো কত ছিল |বেশ কিছুদিন চালু ছিল এই খাতা| মাত্র দুটো লিখলাম আরো যে গুলো আর লিখলাম না সে গুলো কিন্তু মনে হচ্ছে সেই খাতা দেখে শেখা পরে তো আর সে ভাবে আলাদা করে এ গুলো পড়ি নি বহুদিন পরে জেনেছি ঐ গুলো "কণিকা"" র অন্তর্গত| কালি কলম মন‚ লেখে তিনজন সে যুগ ত বহু পিছনে ফেলে এসেছি.... কি হল সেই কালি কোম্পানী গুলোর...সুলেখা ‚ কুইঙ্ক ‚ চেলপার্ক... এই তিনটে কালির নাম মনে পড়ছে আর কিছু ছিল কিনা জানি না তবে লিখতাম সুলেখা কালিতে কত রকমের র্ং ই না ছিল...|সবুজ ‚ ব্লু ব্ল্যাক ‚ ব্ল্যাক ..আমাদের বাড়িতে আসত রয়্যাল ব্লু| আর লাল ....সে ত ইস্কুলের দিদিমণিদের জন্য এক্সক্লুসিভ ছিল |আর এই কালিগুলোর আধার ছিল বেশীর ভাগই রাইটার পেন ‚ সব থেকে কম দাম ছিল | তবে দাম নিয়ে তো তখন মাথা ঘামাতাম না হরেক র্ং য়ের থেকে কোনটা নেব বিচার্য ছিল সেটাই | এর একটু ওপরের ধাপে ছিল পাইলট পেন কি কারণে যেন একবার একটা পেন প্রাপ্তি হয়েছিল..নাম ছিল উইং সাং সোনলী র্ংয়ের ক্যাপ আর লাল র্ংএর গা.| কি সুন্দর দেখতে ছিল বহুদিন টিঁকেছিল .. হবে না কেন . অতি যত্নে রাখা ছিল...লেখা খুব কমই হয়েছিল তাতে| তারপর তো এল ডট পেনের যুগ.. কালি ভরার ব্যাপার নেই‚ মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলে..তবে পরীক্ষা গুলোবোধ হয় ঐ ঝর্ণা কলম তথা ফাউণ্টেন পেন এই লিখতে হত | এই ২০১৯ লিখতে বসে যদি প্রথম দেখা ডট পেনের কথা বলি হয়্ত খুবই হাস্যকর শোনাবে তাও লিখছি| পিছিয়ে যাচ্ছি পাঁচ দশক ..সঠিক দিন তারিখ মনে নেই হয়্ত ১৯৫৭-৫৮ কি ঐরকম কোন সময়্র হবে আমেরিকা থেকে সদ্য ফিরেছেন বাবা..অনেক কিছু এনেছেন তার মধেয় একটা হল এক আশ্চর্য পেন তাতে কালি ভরতে হয় না মাথায় একটা উঁচু মত আছে সেটা টিপলে নিব বেরিয়ে আসে.. আমাদের এখানে তখনো পর্যন্ত অদৃষ্ট্পূর্ব এই পেন দাদা দিদিদের হাতে হাতে ঘুরত তাকে ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্যও আমার হয় নি..আমি ত তখন নিতান্ত এলেবেলে হাতেখড়িও হয় নি..এ খানে অপ্রাসন্গিক হলেও আমার জন্য আনা সেই পুতুলটার কথা না বলে পারছিনা সোনালি চুল..তাতে নীল টুপি.|নীল গাউন পরা পুতুল্টাকে শুইয়ে দিলে তার নীল চোখ বন্ধ হয়ে যেত আবার তুলে দিলে সে চোখ খুলত...এ হেন পুতুল এখানে তখনো কেউ দেখে নি.. চোখ বুঁজলে আমি এখনো সেই পুতুল টা দেখতে পাই| যতই সুবিধে থাকুক ফাউণ্টেন পেন এর কৌলীন্য বা আভিজাত্য ডট পেন বোধহয় অর্জন করতে পারে নি...টিভির পর্দায় তো দেখি হয়্ত দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে কোন চুক্তি সই হবে ..রক্ষীর বাড়িয়ে দেওয়া সুদৃশ্য ট্রে থেকে রাষ্ট্রপ্রধান রা তুলে নিচ্ছেন অভিজাত ফাউণ্টেন পেন হয়্ত. পার্কার ‚হয়ত‚ শেফার্স কিম্বা ম্ঁ ব্লা..| নাঃ এই সব নিয়ে লিখতে বসলে মহাভারত লেখা হয়ে যায় নাই বা থাকল কালি কলম আছে কী বোর্ড ‚ মোবাইল ফোন কিন্তু হারিয়ে গেছে ধৈর্য আমার হারিয়ে গেছে মন| অতএব এখানেই থামলাম

1727

107

Ranjan Roy

দেবু জ্যেঠু

কেটে গেছে আরও বছর ছয়। আমি কলেজ পেরিয়ে চাকরি সূত্রে অন্য জেলায়। মাসের গোড়ায় মাইনে পেয়ে একবার বাড়ি আসি। সংসারের দায়িত্ব একটু একটু করে আমার কাঁধে চেপে বসছে। বাবা আগামী বছর রিটায়ার করবেন। জেঠুর সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়। উনি রিটায়ার করেছেন তিন বছর আগে। হ্যাঁ, মেয়ে এবং বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, ছোটটি এখনও নিজের পায়ে দাঁড়ায় নি। জ্যেঠিমা বাতে শয্যাগত। কিন্তু জেঠুর কথা ওঠায় মা একটু মুখ বেঁকালেন। -- জানিস, প্রত্যেক মাসে তোর বাবার থেকে টাকা নেয়, আমাকে লুকিয়ে। বাবা অপ্রস্তুত। --আহা, সে তো ধার নেন। হাত হাওলাত। -- বাজে কথা বল না। ধার? কোন দিন একপয়সা ফেরত দিয়েছেন? বরাবর অমন ইল্লুতে স্বভাব। পরের পয়সায় মদ গেলা। --- কেন বাবা? উনি তো পুলিশ অফিসার্স মেসে মদ খেতে যেতেন। বাবা অন্যদিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বল্লেন-- কী জানিস, সব দিন সমান যায় না তো। উনি কেন্দ্রীয় সরকারের সেই কাজটার থেকেও ছুটি পেয়েছেন। সবকিছুরই একটা বয়েস আছে তো! এখন কেউ ওঁকে কোন তদন্তে ডাকে না। ওঁর সময়ের অফিসাররাও হয় রিটায়ার্ড, নয় বদলি হয়ে গিয়েছে। এখনকার ছোকরারা কেউ 'দাদা ভট্টাচারি' বললে চিনতে পারে না। তাই উনি পুলিশ অফিসার্স মেসেও পার্সোনা নন গ্রেটা! -- কিন্তু বড় ছেলে তো চাকরি করে। আর ওঁর পেনশন ? -- সে হিসেবে কোন বড় দায়িত্ব নেই বটে, কিন্তু সেভিংস বলতে বিশেষ কিছুই নেই। আমাদের কোম্পানিতে পেনশন নেই। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সামান্য মাসোহারা পান। অসুস্থ স্ত্রীর জন্যে নার্স রাখতে হয়েছে। আর সারাজীবনের মদের নেশা কি এককথায় ছাড়া যায়? না ওর জন্যে ছেলের কাছে হাত পাতা যায়? সেদিনটা ছিল রোববার। আমি বাজার করে গলদঘর্ম হয়ে হাতের ব্যাগ মাত্র নামিয়েছি; মা মাছের আর তরকারির থলে আলাদা করে গুছিয়ে রাখছেন-- এমন সময় জ্যেঠুর আবির্ভাব। আবির্ভাবই বটে। কচি কলাপাতা রঙের বাফতার শার্ট, মাখন জিনের সাদা প্যান্ট। টাকমাথায় সামান্য চুলগুলো বেশ কায়দা করে ছাঁটা। -- কী ভায়া! তৈরি তো? আর দু'ঘন্টার মধ্যে জীপ এসে পড়বে। আমরা অবাক , বাবা মাথা চুলকোচ্ছেন। মা মুখ খুললেন,-- কী ব্যাপার দাদা? কোথায় যাচ্ছেন? -- সে কি বৌদি! ও আপনাকে কিছু বলে নি? আপনার কত্তাটিকে দিন তিনেকের জন্যে বোম্বাই নিয়ে যাচ্ছি। উড়োজাহাজে করে। সব খরচ আমার, যাতায়াত-থাকা-খাওয়া সব। কিছুই বুঝলাম না। বাবার দিকে মা তাকাতেই বাবা গড়গড় করে তোতাপাখির মত বলে চললেন। -- ইংল্যান্ড থেকে ওঁর পুরনো বন্ধু এসেছেন, উঠেছেন বোম্বাইয়ের হোটেলে। উনি দাদার সঙ্গে দেখা করতেই সাতসমুদ্দূর পাড়ি দিয়ে এসেছেন। দাদার বয়স হয়েছে দেখে সঙ্গী হিসেবে আমার জন্যেও প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি তিনদিনের ক্যাজুয়াল লীভ নিয়েছি। মার অপ্রসন্ন মুখ। --সব বুঝলাম। তলে তলে সব গোছানো হয়েছে। কিন্তু আমাকে কিছু বলা হয় নি কেন? বাবা বাগানের গেটের বোগেনভিলিয়ার পাতা গুণছেন। হা-হা করে হেসে উঠলেন জেঠু। -- ওর দোষ নেই বৌদি। আমার ওই বিলিতি বন্ধুটি একজন বুড়ি মেমসায়েব। ভায়া একটু বেম্মজ্ঞানী টাইপের তো,বলতে লজ্জা পেয়েছে। মায়ের মুখের মেঘ কাটল না। পরের রোববারে আমি আবার হাজির। জেঠুর বুড়ি মেমসায়েবের গল্প শুনবো। ইংল্যান্ড থেকে কেন এসেছিলেন? জেঠুকে কিছু সম্পত্তি-টম্পত্তি দিতে চান নাকি? আমাদের চোখে তো সায়েব-মেমসায়েব সবই বিরাট পয়সাওলা। আমি কথা তুলতেই মা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন। -- ও আবার শোনার মত নাকি? যত সব ইল্লুতে হাঘরে স্বভাব! বাবা নতুন সিগ্রেট খেতে শেখা ছেলেদের মত ছাদের দিকে ধোঁয়ার রিং ছাড়ছেন? বিকেলবেলা । বাবা ছেলে চা নিয়ে বসেছি।মা সেজেগুজে মজুমদার কাকিমার বাড়ি হয়ে আসছি বলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাবার দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ ঢঙে মাথা নাড়লেন। বাবার চোখের পাতা কাঁপল, স্পষ্ট দেখলাম। -- শোন, দেখলাম সেই বিলিতি মেমসায়েব মহিলাকে। ন্যান্সি ইভান্স। একমাথা সাদা চুল। চোখে চশমা। অত্যন্ত ডিগনিফায়েড চেহারা। আলাপ পরিচয়ের পর আমি বললাম-- আপনারা পুরনো বন্ধু, কথা বলুন। কত কথা জমে আছে। আমি কোলাবার দিকে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটু দেখা করে আসি। ইচ্ছে করে সন্ধ্যে নাগাদ ফিরলাম। রাত্তিরের প্লেন। ফিরে দেখি তোর জেঠু লাউঞ্জে বসে আছেন। মেমসায়েবের রুমের দরজা বন্ধ। আমরা ফিরে এলাম। বাকিটা আমার ফেরার পথে ভটচাজদার মুখ থেকে শোনা। তোকে যা বলছি শুনে ভুলে যাস কিন্তু। বঙ্গদেশের নৈহাটি-ভট্টপল্লি এলাকার বৈদিক ব্রাহ্মণ কুলের বিশিষ্ট পন্ডিত বংশে জন্মানো দিব্যজ্যোতি ভট্টাচার্যের বিদ্যাস্থানে বিধাতা বিরাট ঢ্যাঁড়া কেটে রেখেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই গঙ্গার পাড়ে জেলেবস্তির ডানপিটে ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, নৌকো খুলে নিয়ে ভেসে পড়া, মাছ চুরি, মারপিট করে পোক্ত দেবুর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না। পিতৃদেব সত্যধন ভট্টাচার্যি বিশুদ্ধ গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার অনুমোদিত পন্ডিতমন্ডলীর একজন। উনি পূর্বজন্মের কর্মফলে বিশ্বাসী। ছেলেকে বকাঝকা না করে তার হস্তরেখা অভিনিবেশ সহকারে দেখে বল্লেন- নিয়তি কেন বাধ্যতে! এ আমাদের মত টুলো পন্ডিত হবে না। একে জীবন নিজের হাতে গড়ে পিটে নেবে। সে যা হোক , এই অবাধ্য একবগ্গা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দিব্যজ্যোতি বা দেবু ভটচাজ প্রথম সুযোগেই বাড়ি থেকে পালালেন। কোলকাতা-খিদিরপুর ডকে মালজাহাজের খালাসী; শেষে ভেসে পড়লেন কোন গোরাজাহাজে। ভাগ্যের থাপ্পড় খেয়ে লিভারপুলের রাস্তায় ঠান্ডায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা কপর্দকহীন দেবুকে হাসপাতালে দিয়ে বাঁচিয়ে তুললেন এক দয়াবতী। ন্যান্সি ইভান্স। বয়সে বছর তিন বা আরো একটু বড়। মধ্যবিত্ত। সন্তানহীন ডিভোর্সি। স্নেহে ভালোবাসায় বুনো পশুও বশ মানে। এই নারীকে ফ্রেন্ড ফিলজফার গাইড হিসেবে পেয়ে দেবুর জীবন বদলে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। জর্জ টেলিগ্রাফ বা অমনি কোন প্রফেশনাল ইনস্টিট্যুট থেকে টেলিকম ডিপ্লোমা প্রাপ্ত ডেভ ভট্টার সহজেই বৃটিশ আর্মির টেকনিক্যাল কোরে চাকরি পেলেন। পোস্টিং মধ্যপ্রাচ্যে। মরুভূমির যুদ্ধে রোমেলের মহড়া নেওয়া বৃটিশ বাহিনীর অধীনে। কীভাবে ওকে বৃটিশ ইনটেলিজেন্স গুপ্তচরবৃত্তিতে নিযুক্ত করল, প্রশিক্ষণ দিল-- সে গল্প কোনদিনই জানা যাবে না। যুদ্ধ শেষ। দিব্যজ্যোতি ফিরে এলেন ভারতে।দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। নৈহাটি রয়ে গেছে বঙ্কিমের 'রাজমোহনস্‌ ওয়াইফ' এর যুগেই। পিতা গত হয়েছেন। ভাটপাড়ার ব্রাহ্মণ সমাজে ম্লেচ্ছ আচার-বিচারে অভ্যস্ত দেবুর স্থান প্রান্তিক। আঁতে ঘা লাগল। নৈহাটির সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেবু এলেন মধ্যপ্রদেশের ওই পাবলিক সেক্টর কোম্পানির টেলিকম ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিতে। কিন্তু লিভারপুলের একটি অধ্যায় সবার কাছে গোপন রয়ে গেল। ন্যান্সি সবই জানতেন। দেবুর নিজের দেশে ফিরে যাওয়া, সংসার পেতে বসা এর মধ্যে কোন অসংগতি দেখেন নি উনি। মেনে নিয়েছেন বিধাতার বিধান। কিন্তু খবর রাখতেন। সময় অসময়ে অর্থসাহায্যও করেছেন গোপনে। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে ডেকে পাঠালেন ডেভ ভট্টারকে , বোম্বাইয়ের এক হোটেলে, প্লেনের টিকিট ও আনুষঙ্গিক খরচা সমেত। দেবু যেন কুলীন ব্রাহ্মণ। -- ডেভ, তোমার চেহারায় একটা প্রশান্তি, একটা পীস দেখতে পাচ্ছি। সব কিছুই পেয়েছ। -- হ্যাঁ, ন্যান্সি। বাই দ্য গ্রেস অফ গড। -- বেশ, আমার কথাটা মনে আছে তো? যে কথা দিয়েছিলে? দেবু চুপ। -- ভুলে গেলে? তোমার ছেলে মেয়েদের বিয়ে থা দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে আমার সঙ্গে ফিরে যাবে? কথা দিয়েছিলে না? -- হ্যাঁ, দিয়েছিলাম। -- সেসব টাস্ক তো কম্প্লিট, ইজ’ন্ট ইট? -- ও ইয়েস, ন্যান্সি, বাই দ্য গ্রেস অফ গড। -- তবে চল আমার সঙ্গে, বাকি জীবনটা বুড়োবুড়ি একসঙ্গে কাটাব। -- তা হয় না ন্যান্সি। -- কেন? কেন হয় না? আমি যে সারাজীবন অপেক্ষায় আছি। -- তোমাকে বোঝাতে পারব না, হয় না-ব্যস্‌! - ইজ ইট সো? আচ্ছা, এক কাজ কর। তোমার ছোট ছেলেটিকে আমায় দাও। ওকে তেমনি করে দাঁড় করিয়ে দেব, যেমন কয়েক যুগ আগে করেছিলাম। -- তাও হয় না। -- হয় না? হয় না ডেভ? - নো নো। ইট ইজ ইম্পসিবল। আই কান্ট ইম্পোজ ইট অন মাই সন। -- বেশ, লেট দ্য ম্যাটার এন্ড হিয়র। এই আংটিটা ফেরত নাও। পরের দিন বোম্বাইয়ের সব ইংরেজি পত্রিকায় ছোট করে একটি খবর বেরোল। গতকাল মিডল্যান্ড হোটেলের একটি সুইটে এক বয়স্কা বিদেশি মহিলাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পাসপোর্ট অনুযায়ী তিনি লিভারপুল নিবাসী ন্যান্সি ইভান্স। মৃত্যুর কারণ হার্ট অ্যাটাক বলে ডাক্তারেরা মনে করছেন। দেহটি বৃটিশ হাই কমিশনকে সঁপে দেওয়া হয়েছে। (সমাপ্ত)

139

21

Ranjan Roy

নখদর্পণ (সত্যঘটনা অবলম্বনে)

কী যা তা! মানস তো ক্লাস টেন এর ফার্স্ট বয়। তাতে কী! পড়াশুনোয় ফার্স্ট বয় কি চুরিবিদ্যায় ফার্স্ট হতে পারে না? মানস কেন চুরি করবে? চোর কেন চুরি করে? টাকার জন্যে। ওর এখন টাকার দরকার। আজ ওর বাবা নেই বলে এমন নোংরা কথা বলতে পারলি? ধেত্তেরি! যা সত্যি তাই তো বললাম। সন্তোষস্যার সবাইকে চুপ করতে বললেন। হ্যাঁরে অনিল, ঠিক করে বলতো –কী হয়েছিল? -কালকে ছুটির পরে আমি স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলছিলাম। বইয়ের ব্যাগ, ফুলপ্যান্ট আর ঘড়ি একসাথে করে গোলপোস্টের পাশে রেখেছিলাম। খেলার শেষে প্যান্ট পরে ব্যাগ তুলতে গিয়ে দেখি প্যান্টের পকেটে রাখা রিস্টওয়াচটা নেই। ওটা আমার জন্মদিনে মাসিমণির গিফট—ফেবার লুইবা। -- গোলপোস্টের কাছে মানস ছিল? --হ্যাঁ স্যার। সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসের সেকেন্ডবয় থার্ডবয় চেঁচিয়ে উঠল। --স্যার, আরও অনেক ছেলে ছিল। আমরাও ওর সঙ্গে ছিলাম। সন্তোষবাবুস্যার সাদামাটা ভাল মানুষ। মানসকে ডেকে বললেন—যদি নিয়ে থাক তো দিয়ে দাও। মানসের চোখমুখ বসে গেছে। কোনরকমে বলল—স্যার! আমি নিইনি। বিশ্বাস করুন, মা সরস্বতীর দিব্যি! এবার গোটা দলটা সন্তোষস্যারকে নিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার রাজেন্দ্রস্যারের চেম্বারে গেল। পেছন পেছন আমরা , হোস্টেলের ছেলেরা। রাজেন্দ্রস্যার জানতে চাইলেন যে অনিল মানসকেই চোর ঠাঊরেছে কেন? অনিল বলল যে ও এক তান্ত্রিকের আশ্রমে গেছল। সেখানে তান্ত্রিকবাবা যজ্ঞ করে যজ্ঞবেদীর ছাই দিয়ে নখদর্পণ করেন। তাতে অনিলের নখে ঘড়ি হাতে মানসের ছবি ফুটে উঠেছে। চারদিকে গুন গুন শুরু হয়ে গেল। দেখলি তো? নখদর্পণে চোর ধরা পড়েছে। যত্ত গাঁজাখুরি কথা। অনিল কী দেখতে কী দেখেছে কে জানে? ওইটুকু নখের মধ্যে ছবি দেখে কাউকে চেনা যায় নাকি! একটা কথা ভাব। ও মানসের ছবিই কেন দেখল? সুমনসের কেন দেখল না? রাজেন্দ্রস্যার গম্ভীর। —আচ্ছা, তোমার তান্ত্রিক অন্য কারো আঙুলে নখদর্পণ করে চোর দেখাতে পারেন? --হ্যাঁ স্যার। তার নাম প, ম, র অথবা স দিয়ে শুরু হতে হবে। আর তার জন্মের রাশি তুলা, মেষ বা কন্যা হতে হবে। রাজেন্দ্রস্যার সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। --তোমাদের মধ্যে কেউ আছ? ভলান্টিয়ার হতে রাজি হবে? আবার আমি পা বাড়িয়ে লেঙ্গি মারলাম। --আমি স্যার, আমি। সবার চোখ আমার দিকে। -আমার নামের প্রথম অক্ষর স। আর রাশি কন্যা। আমি রাজি। --বেশ, আমি গেটপাস বানিয়ে দিচ্ছি। বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে ফিরে এসে স্টাফ রুমে রিপোর্ট করবে। আমি আর অনিল গেটের দিকে এগোই। মানসের মুখে একটু ভয়ের ছায়া খেলে গেল কি? (৩) উদাসীবাবার আখড়ায় আশ্বিন মাস। দুপুরের রোদে বেশ ঝাঁঝ । আমি ও অনিল হাঁটছি। গন্তব্য নিউ তরুণ সিনেমার কাছে তান্ত্রিকের ডেরা। এর মধ্যে অনিল একটা গলির ভেতরের দোকান থেকে একটু অগুরু, ধূপকাঠি, দেশলাই আর ছোট্ট ঘিয়ের শিশি কিনেছে। আর আছে একটা ছোট শিশি তাতে সাদা জলীয় কিছু টলটল করছে। জানলাম ওটা কারণ বারি। কালীমাতার পূজো ও যজ্ঞে লাগে। খরচ হল ছ’টাকা তিন আনা। --আর জবাফুল নিলি না? -- আশ্রমেই গাছ আছে, পঞ্চমুখী রক্তজবা ও লংকাজবা। অনেকটা পথ। অনিল বকবক করছে। -- মানস চুরি করবে ভাবতে পারি নি। ভাগ্যিস তান্ত্রিকবাবা ছিলেন। নইলে চোর ধরা পড়ত না। ঠিক কী না বল! আমি মাথা নাড়ি। কিছুই শুনছিলাম না। তান্ত্রিকের আড্ডায় যাচ্ছি। কী জানি কি হয়! পেটের মধ্যে গুরগুর করছে। নিউ তরুণ সিনেমাহল তো এসে গেল। এবার? অনিলের চেহারায় কেমন একটা ভাব। আমার হাত ধরে একটা গলির মধ্যে বন্ধ বাড়ির পেছনে নিয়ে গেল। এই কি আশ্রম? ভাঙা পাঁচিলের পাশ দিয়ে মাথা নীচু করে ঢুকে একটা তিনদিক ঘেরা আঙিনামত। একদিকে অন্য একটি বাড়ির বন্ধ দেয়াল। তার গায়ে খাঁজকাটা কুলুঙ্গিতে একটি ছোট্টমত কালীমূর্তি। অন্য দিকের পাঁচিল ঘেঁষে একটি মাটির বাড়ি,টালির চাল। গা বেয়ে পুঁই আর কুমড়োলতা জড়াজড়ি করে মাথা তুলেছে। আর একটি বাঁকাচোরা কুঁজো মত টগর ফুলের গাছ। হ্যাঁ, অনিলের কথামত তিনটে জবাফুলের গাছও দেখতে পেলাম। ছ্যাতলা পড়া স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। কিন্তু ওই কুঁজো টগরফুলের গাছ থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না কেন? কেমন একটা অজানা আতংক আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে। গাছটাকে কেন জীবন্ত মনে হচ্ছে? কেন যে পাকামি করতে গেলাম! মানসকে অনিল চোর ঠাউরেছে তো আমার কী? ওর ডে স্কলার বন্ধুর দল তো রয়েছে। ঘড়ঘড়ে আওয়াজে কেউ বলল- এইচিস? তা জিনিসপত্র সব ঠিক ঠিক এনিছিস? এবার দেখতে পেলাম একজন সাদা দাড়ি সাদা চুল বুড়োকে। ওর পরণে একটা ময়লা লুঙ্গি আর খালি গায়ে পৈতে ও বুকের সাদা চুল মিলে মিশে গেছে। এই তবে বাবাজি? অনিলকে দেখলাম কোন কথা না বলে ঝোলা থেকে জিনিসপত্তর বের করে বাবাজির পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে উবুড় হয়ে প্রণাম করল। --বাবা, এই ছেলেটি আমাদের সঙ্গে পড়ে। স্যার বলেছেন ওর নখেও নখদর্পণ করে চোর দেখাতে। বাবাজি আমাকে চেরা চোখে জরিপ করে বললেন—নাম? --সুমনস মুখোপাধ্যায়। -- ব্রাহ্মণ? তা বেশ। ভাল আধার। কিন্তু রাশি ও গোত্র? -- কন্যা রাশি। ভরদ্বাজ গোত্র। -- বাঃ, নখদর্পণ হবে। আমার ভৈরবী বগলা মা সব ব্যবস্থা করে দেবে। বগলা!ওঠ। ওকে শুদ্ধ কর, আচমন করাও, তারপর যজ্ঞের আয়োজন কর। টগর গাছকে দেখে কেন জীবন্ত মনে হচ্ছিল এবার বুঝতে পারলাম। মা বগলা টগর গাছের পাশে এমনভাবে বসেছিলেন যেন উনি গাছেরই আর একটা কান্ড। ওঁর বয়স বাবার থেকে অন্ততঃ কুড়ি বছর কম। কিন্তু মাথার না আঁচড়ানো তেলহীন লম্বা চুল জটপাকিয়ে বিশাল জটার আকার নিয়েছে। ঠিক যেন আর একটা টগর গাছ। উনি আমার মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেন। তারপর কালীমূর্তির সামনে একটি কুশাসনে বসিয়ে সামনে খানিকটা জায়গা গোবর দিয়ে লেপে তার উপর তামার কোশাকুশি ও একটি চৌকোণা তামার পাত্র বসিয়ে কিছু শুকনো কাঠকুটো সাজিয়ে তাতে অনিলের আনা ঘি খানিকটে ঢেলে দিলেন। তারপর বললেন—বাবা,এবার আসুন। আমার থেকে একটু দূরে অনিল বসে উত্তেজনায় কাঁপছে। বাবাজি একের পর এক মন্ত্র পড়ছেন ও মাঝে মাঝে হুংকার দিয়ে উঠছেন। বগলা আমার পিঠের কাছে বসে একহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। যজ্ঞের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। মাঝে মাঝে ধোঁয়ায় চারদিক ভরে যাচ্ছে, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিছু বুঝতে পারছি না। এই যজ্ঞ আর কতক্ষণ চলবে? আমার ঘুম পাচ্ছে। খালি কানে আসছে ওঁ হ্রীং ক্লীং! বষটকারিণ্যৈ নমঃ। দক্ষিণাকালিকায়ৈ নমঃ। মা বগলার ছোঁয়ায় জেগে উঠেছি। যজ্ঞ মনে হয় শেষ। এবার তার ভস্ম আর ঘি মিশিয়ে খানিকটা কালো থকথকে জিনিস বানিয়ে আমার আর অনিলের কপালে টিপ পরিয়ে মা বগলা আমার ডানদিকে বসলেন। আমার পেছনে ইঁটের দেয়াল। সামনে বাবাজি। --ওকে বজ্রাসনে বসাও বগলা! বাবাজি একের পর এক নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমি নির্দেশমত হাঁটু মুড়ে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসলাম। বগলা আমার ডানহাতের বুড়ো আঙুলের নখে ওই থকথকে কালোমত জিনিসটা লেপে দিয়ে আমার ডান হাত ওঁর দক্ষিণ করে ধারণ করে বাম হাতে পেছন দিক দিয়ে বেষ্টন করে বসেছেন। বাবাজি নখদর্পণের মন্ত্র পড়ছেন। বুঝতে পারছি ভাষাটা ঠিক সংস্কৃত নয়। হঠাৎ হুংকার দিয়ে বললেন—মুহুর্ত আগত। ওর দক্ষিণ করের বৃদ্ধাংগুষ্ঠ ধারণ করে দর্পণে চোরের মুখ দেখাও। কানের কাছে মুখ নিয়ে বগলা বললেন—কী দেখছ? --কিছু না। --দেখ, ভাল করে দেখ। আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমিও পাবে। এবার দেখ। -- হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। --কী দেখছ? -- আমাদের মিশন স্কুলের লোহার গেট। --ঠিক। এবার? --স্কুলের তিনতলা বিল্ডিং। -- বাঃ, এখন স্কুলের ছাদ, জলের ট্যাংক। আর কিছু না। -- মানসকে দেখ নি? --নাঃ। বাবাজি আবার হুংকার দিলেন। --আয়! মানস আয়! যেখানেই লুকিয়ে আছিস, বেরিয়ে আয়। তোর পালাবার পথ সব বন্ধ করে দিয়েছি। আয়! আয়! কার আজ্ঞে? হাড়িপ বাবার আজ্ঞে! বগলার গলায় উত্তেজনার ছোঁয়া। --এইবার দেখতে পাবে। এইবার! আমার মনেও ছোঁয়াচ লাগে। --হ্যাঁ , হ্যাঁ। এই তো দেখতে পারছি। মানস! মানস! অনিল আমার দিকে হাঁটু গেড়ে এগিয়ে আসে। ঠিক দেখেছিস? মানসই তো? --হ্যাঁ, ঘড়িতে টাইম দেখে রাখ। --তিনটে চল্লিশ। সাবাশ! এবার ও ঘড়ি না দিয়ে যাবে কোথায়! বগলা মা আমাকে ছাড়েন নি। -- কী দেখছ? মানস এখন কী করছে? -- ও ছাদের ট্যাংকের নীচের থেকে কাপড়ে মোড়া একটা ছোট পুঁটুলি বের করে খুলছে। --এবার? -- ওর হাতে একটা ছোট জিনিস চকচক করছে। জিনিসটা—জিনিসটা একটা ফেবার লুইবা রিস্টওয়াচ। --এবার? --কিছু না; সব ধোঁয়া ধোঁয়া। কিছু না। আমি ক্লান্ত। আধো অন্ধকার এই আঙিনায় শ্যাওলাধরা স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গন্ধ, অগুরু ধূপের ধোঁয়া, ঘি ও কারণবারির গন্ধ, মা বগলার বিশাল জটার উৎকট গন্ধ সব মিলে আমার গা গোলাচ্ছে। মিনমিন করে বলি—আমায় এবার ছেড়ে দিন, আমাদের যেতে দিন। ফেরার পথে অনিলের মুখে খই ফুটতে থাকে। আমি নির্বাক। মিশনের কাছে এসে ও বলে—হ্যাঁরে, তুই যা যা দেখেছিস সব ঠিক ঠিক স্যারেদের সামনে বলবি তো? (৪) অলটারনেটিভ প্রুফ স্টাফরুমে ভীড় ভেঙে পড়েছে। এমন আজব ঘটনা! আমাদের দুটো সেকশনের ছেলের দল, ল্যাব সহকারীরা মায় স্কুলের চাপরাশি বৈকুন্ঠ ও ঘনশ্যাম। রাজেন্দ্রস্যার প্রশ্ন করেন—সুমনস, নখদর্পণ হল? কী দেখলে? --আগে অনিল বলুক। অনিলের বর্ণনা শেষ হলে সন্নাটা সন্নাটা। তবে মানস চোর? সবার চোখ এখন ওর দিকে। --হ্যাঁ স্যার! সুমনস দেখেছে ও ছাতের উপর জলের ট্যাংকের নীচে আমার ফেবার লুইবা রিস্ট ওয়াচ লুকিয়ে রেখেছে। হ্যাঁ স্যার, আমি তখন ঘড়ি দেখেছিলাম—তিনটে বেজে চল্লিশ! রাজেন্দ্রস্যারের নির্দেশে ঘনশ্যাম চাপরাশি ছাদে জলের ট্যাংকএর নীচের থেকে ঘড়ি উদ্ধার করতে গেল। কিন্তু স্টাফরুমে স্যারেদের আর ক্লাস টেনের ছেলেদের মধ্যে ফিসফাস কথা শুরু হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়িয়েছেন কেমিস্ট্রির বাণীব্রত স্যার। --আমাদের কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। রাজেন্দ্রস্যার অবাক হয়ে কেমিস্ট্রির স্যারের দিকে তাকালেন। --বলতে চাই যে সুমনস মানস নয়,অন্য কাউকে দেখেছে। -- মানে? -- স্যার, আজ ওদের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস ছিল। তিনটের থেকে সওয়া চারটে পর্য্যন্ত। মানস আর অরবিন্দ একটা সল্ট টেস্ট করছিল, আমার সামনে। তাই তিনটে চল্লিশে ওর তিনতলার ছাতের ট্যাংকের নীচে কিছু লুকনোর প্রশ্নই ওঠে না। --হ্যাঁ স্যার, ও আর আমি তখন থেকে একসঙ্গে আছি। অরবিন্দ মুখ খোলে। অনিল চেঁচিয়ে ওঠে। নিশ্চয় ও বাথরুম যাবার নাম করে ক্লাসের বাইরে গিয়েছিল, স্যারের মনে নেই। বাণীব্রত স্যার ধমকে ওঠেন—থাম হে ছোকরা! ইতিমধ্যে চাপরাশি রাধেশ্যাম ফিরে এসেছে। জলের ট্যাংকের নীচে কিছু নেই। মানস সরালো কখন? রাজেন্দ্রস্যার বলেন—এবার আমরা সুমনসের কথা শুনব। আমি একবার গোটা ঘরের সবার দিকে চোখ বুলি নিই। সবাই কেমন অপেক্ষায় রয়েছে। --স্যার, এই তান্ত্রিকের নখদর্পণ ব্যাপারটা পুরো বুজরুকি! আমি কিচ্ছু দেখি নি। দেখা সম্ভব নয়। এসব ওই বাবাজি ও বগলা মার চালাকি। একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ বানিয়ে জোর করে সাজেস্ট করে কিছু দেখেছি এ’রকম বলতে বাধ্য করা। ওইটুকু নখের মধ্যে কালি লেপে স্কুলের ছাদ, জলের ট্যাংক, মানসের মুখ আর ঘড়িটা যে ফেবার লুইবা—এসব দেখা ও চিনে ফেলা সম্ভব? অনিল চেঁচিয়ে ওঠে—কী বলছিস কি তুই! ওকে রাজেন্দ্রাস্যার এক ধমকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন—আর কিছু বলবে সুমনস? --রাশি স্যার। আমার রাশি তো কন্যারাশি নয়। তাহলে আমি দেখলাম কী করে? -- তুমি—তুমি আমাকে মানে আমাদের সবাইকে মিথ্যে কথা বলেছিলে? --না স্যার! অলটারনেটিভ প্রুফ। আপনিই শিখিয়েছিলেন। আমার রাশি তান্ত্রিকের লিস্টির কোন রাশি নয়। নখদর্পণ সত্যি হলে আমার নখে কিছু দেখতে পাওয়া যাবে না। তাহলে বগলা মা কী করে সব দেখালেন? অর্থাৎ প্রথম প্রেমিসটাই ভুল। ব্যাপারটাই জালি। রাজেন্দ্রস্যার হো হো করে হেসে উঠলেন। দু’মাস্ কেটে গেছে। পূজোর পর স্কুল খুলতেই মানস ফিরে এসেছে আমাদের মধ্যে, নিয়মিত বসছে ব্যাকবেঞ্চে। ঘড়িচোর ধরা পড়েছিল ফেবার লুইবা ঘড়ি বেচতে গিয়ে। সেদিন মানস জিজ্ঞেস করল—আচ্ছা, কন্যারাশির বিকল্প প্রমাণ তো বুঝলাম, কিন্তু তোর আসল রাশিটা কী? -আমি জানি না রে! জানতে চাই না। ==================================================

97

10

Ranjan Roy

নখদর্পণ (সত্যঘটনা অবলম্বনে)

নখদর্পণ নখদর্পণ রঞ্জন রায় (১) ফার্স্ট বেঞ্চ লাস্ট বেঞ্চ মানসকে জব্দ করার এমন সু্যোগ পাওয়া যাবে কে ভেবেছিল? সাতটা দিনও যায় নি আমরা ঝগড়া করে কথা বলা বন্ধ করেছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি খালি ঝগড়া নয়, একটু হাতাহাতিও হয়েছিল। আসলে মানস হচ্ছে অতিচালাক। কথায় বলে না – অতি চালাকের গলায় দড়ি! আরে এটা কী বললাম! গলায় দড়ি! না, না। মানস আমাদের মিশনের বাগানের আমগাছের ডাল থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে এ আমি কল্পনাই করতে পারি নে, সে যতই ঝগড়া হোক। আর সত্যি কথাটা হচ্ছে একসময় আমরা খুব বন্ধু ছিলাম। একসময় মানে? মানে এই গতবছর পর্য্যন্ত। কবে থেকে? সেই ক্লাস সিক্স থেকে। এখন আমরা টেনে পড়ি। ও হল আমাদের ফার্স্ট বয়। আরে সব ক্লাসেই তো একজন করে ফার্স্ট বয় থাকে। তাতে কী! আমি খুব খারাপ ছাত্র নই, তবে ক্লাসে এগারো নম্বর। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে আমি একনম্বর। শুধু ওপেনিং ব্যাটই নই, ফার্স্ট স্লিপে ক্যাচ ফসকায় না। আর মানস হল আমাদের আম্পায়ার। রুল বুক গুলে খেয়েছে। এল বি ডব্লিউ এর সমস্ত নিয়ম, বলের মাপ ও ওজন, পিচের কন্ডিশন, কখন খেলা বন্ধ হওয়া উচিত এসব ও স্যারদের থেকেও ভাল জানে। এসব নিয়ে কোন ঝামেলা ছিল না। প্রব্লেম হল মানস এ বছর থেকে হোস্টেল ছেড়ে ডে স্কলার হয়ে যাওয়ায়। একটু খুলে বলি। ক্লাস সিক্সে, এক রোববারে আমি মিশনের হোস্টেলে ভর্তি হলাম। ছোট ছেলেদের জন্যেএকটা বড় হলে বারো জন করে থাকার ব্যবস্থা। আমাদের ক্যাপ্টেন শিবুদা। ক্লাস এইটে পড়ে, তিন বছরের পুরনো বলে খুব ঘ্যাম নেয়। পরের দিন সকালে একটা বালতি আর ন্যাতা দেখিয়ে বলল—এই যে নতুন ছেলে! আজ তোমার ঘর মোছার ডিউটি। ঘর বলতে গোটা হলটা। ভাল করে ন্যাতা নিংড়ে কষে মুছবে। জলে ভেজা চুবচুবে ন্যাতা আলতো করে বোলালে আবার মুছতে হবে। ফাঁকিবাজি চলবে না। আমি কখনো ঘর মুছিনি। আমাদের কোলকাতার ভাড়াবাড়িতে ঘরগুলো অনেক ছোট। এত বড় হলঘর! আমাকে একলা মুছতে হবে? কান্না পেয়ে গেল। এমন সময় মানস এগিয়ে এল। --শিবুদা, এই হল তো রোজ দু’জনে মিলে মুছি। আজ নতুন ছেলেকে হটাৎ করে গোটা হলটা একা করতে বলছ কেন? শিবুদা থতমত খেয়ে সামনে নিল। বাঃ, নতুন এসেই উকিল ধরেছে দেখছি। দেয়ালে লাগানো চার্ট দেখ । আজ নীলু আর নতুন ছেলে সুমানস এর পালা। নীলু শনিবার বাড়ি গেছে, কাল রাত্তিরেও আসেনি। তাই সুমানস একা মুছবে। আমি কিন্তু কিন্তু করে বললাম—শিবুদা, আমার নাম কিন্তু সুমনস, সুমানস নয়। --ওটা আবার কোন নাম হল নাকি? নামটা সুমানসই হবে, খামকা তক্কো করিস না। -- না শিবুদা, নতুন ছেলে ঠিক বলেছে। সুমনস মানে ফুল। ওটা তৎসম শব্দ। শিবুদা বিষম খেল। --আচ্ছা আচ্ছা, তোর যখন নতুন ছেলেটার জন্যে এতই দরদ, তুই নিজে ওর সঙ্গে হাত লাগা না! আর তুই—সুমানুস না বনমানুষ- ভাল করে শোন; আমাকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকবি, কোন দাদা-টাদা নয়। সেই দিন থেকে ও আর আমি ভীষণ বন্ধু হয়ে গেলাম। মানস আর সুমনস, হোস্টেলের মানিকজোড়। ছূটিতে বাড়ি গিয়েও আমরা একজন আরেকজনকে চিঠি লিখতাম। ছুটি থেকে ফিরে একই রুমে সিট না পেলে ওয়ার্ডেন স্যারকে রিকোয়েস্ট করতাম। ক্লাসে দুজনেই পেছনের বেঞ্চে বসতাম। ফার্স্ট বয়কে লাস্ট বেঞ্চে বসতে দেখে স্যারেরা অবাক হতেন। আসলে হোস্টেল থেকে ভাত খেয়ে এসে প্রথম পিরিয়ড একটু এগোতেই আমার বড্ড ঘুম পেত। ঠান্ডা কাঠের বেঞ্চে আলতো করে গাল রাখলে একটু পরে বাংলা স্যারের কথাগুলো আমার কানে অস্পষ্ট হতে হতে ভ্রমরগুঞ্জন হয়ে শেষে কোথায় হারিয়ে যেত। বাংলা স্যার বেশ বেঁটে, একটা লম্বা ছেলের পেছনে বসা আমাকে সহজে দেখতে পেতেন না। যদি বা দেখে ফেলতেন তখন মানস পাঁজরায় আঙুলের খোঁচা দিয়ে আমাকে জাগিয়ে দিত, স্যার পড়া ধরলে পাশ থেকে ঠোঁট না নাড়িয়ে চমৎকার প্রম্পট করত। আবার টিফিনের পর হিন্দি ক্লাস; রবিনবাবু অদ্ভূত উচ্চারণে পড়াতেন—অগর ন নভ মেঁ বাদল হোতে! আর মানস সেই সময় লাইব্রেরি থেকে আনা ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘চরিত্রহীন’ মাথা গুঁজে পড়তে থাকত। অবশ্যি বইটার গায়ে ভাল করে খবরের কাগজের মলাট চড়ানো আর তাতে কালি দিয়ে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা ‘ আদর্শ হিন্দি ব্যাকরণ অউর নিবন্ধ’। রবিনবাবু পড়াতে পড়াতে চক ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতেন। ওঁর পড়ানো বন্ধ হত না, কিন্তু কাউকে অন্যমনস্ক হতে বা ঝিমুতে দেখলে নিখুঁত টিপে চকের টুকরো ওদের মাথা তাক করে ছূঁড়তেন, কদাচিৎ ফস্কাতেন। আমার কাজ ছিল স্যারের দিকে চোখ রাখা আর বিপদ বুঝলেই মানসকে সতর্ক করা। একবার রবিনবাবু ইশারায় আমাকে না নড়তে বলে মানসের দিকে চক ছুঁড়লেন। আমি অসহায়। কিন্তু আমার অজান্তেই আমার হাতের লাল খাতাটা টেবিল টেনিসের মত ব্যাকহ্যান্ড ড্রাইভ করে চকের টুকরোটাকে সোজা স্যারের টেবিলে ফিরিয়ে দিল। গোটা ক্লাস হেসে উঠল। জীবনে প্রথম নিল ডাউন হলাম। গতবছরের শেষের দিকে মানস ছুটি থেকে ফিরল ন্যাড়া মাথা হয়ে। ওর বাবার স্ট্রোক হয়েছিল। আসানসোল রেল হাসপাতাল থেকে আর ফিরে আসেন নি। নভেম্বর মাসে জানলাম যে ওর জেঠু হস্টেলের খরচ দিতে পারবেন না। উনি বরানগরেই থাকেন। নৈনানপাড়ায় ওঁর মনিহারি দোকান। মানস ওর মার সঙ্গে এখন থেকে জেঠুর সংসারেই থাকবে। বার্ষিক পরীক্ষার আগেই ও হোস্টেল ছেড়ে দিয়ে ডে স্কলার হয়ে গেল। কিন্তু শেষ ক’টা দিন আমার পাশে লাস্ট বেঞ্চেই বসত। ( ২) গজব রে গজব! নতুন বছর শুরু হল। আর যা ঘটল তা স্বপ্নেও ভাবি নি। আমাদের হোস্টেলে বিহার থেকে পড়তে আসা দীনু বলে উঠল—গজব রে গজব! এবার থেকে ফার্স্ট বয় ফার্স্ট বেঞ্চে! মানস আমাদের সঙ্গে না বসে বসছে একেবারে ফার্স্ট বেঞ্চের প্রথম সিটে। কোন কৈফিয়ৎ না দিয়ে। অন্য ছেলেদের থেকে কানাঘুষোয় জানা গেল যে ওর জেঠু ওকে লাস্ট বেঞ্চে বসতে বারণ করেছেন। ওতে নাকি রেজাল্ট খারাপ হয়। আর মানস যদি প্রথম দশজনের মধ্যে না আসে তা হলে উনি আর পড়াবেন না। মানসকে ওঁর দোকানে বসতে হবে। যার সঙ্গে গত কয়েকবছর সকাল-সন্ধ্যে একসাথে কাটিয়েছি আজ তার সঙ্গে কথাই হয় না। ফার্স্ট আর লাস্ট বেঞ্চের দূরত্ব যে অনেক। পিরিয়ডের ফাঁকে ফাঁকে উঠে গিয়ে কথা শুরু করি, কিন্তু ওর আড়ষ্ট ভাব আর চোখে চোখ না রাখা আমার আগ্রহে জল ঢেলে দেয়। এ হতে পারে না, এ রকমটা হয় না। ভগবানের দরবারে এত অবিচার! নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ আছে। একদিন টিফিনের সময় ওকে ধরলাম। কী হয়েছে আমাকে বল, তোকে বলতে হবে। ও নিস্পৃহ গলায় বলে হাতটা ছাড়। তারপর ক্লাসের সেকন্ড বয়, টবিন রোডের মলয়ের সঙ্গে গল্প করতে থাকে। আমার গালটা জ্বালা করে ওঠে, ফিরে আসি নিজের জায়গায়। পরের দিন প্রেয়ার শুরু হল –“ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণম্”। বারান্দায় লাইনের মধ্যে কোথাও মানস চোখে পড়ল না। ও তো সহজে ক্লাস কামাই করে না! প্রেয়ার এগিয়ে চলেছেঃ বায়ুর্যমোগ্নির্বরুণঃ শশাঙ্কঃ। হন্তদন্ত হয়ে বারান্দায় ঢুকছে মানস। তাড়াহুড়ো করে আমাদের ছাড়িয়ে লাইনের পেছনের দিকে যাবার সময় আমি কিছু না ভেবেই পা বাড়িয়ে দিলাম। আছড়ে পড়ল মানস। মাথাটা বেঁচেছে, কিন্তু হাতে ও হাঁটুতে নুনছাল উঠে গেছে। সরি বলতে যাব কিন্তু তার আগেই আমার উপর ও ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্ধের মত মেরে চলেছে। আমি আটকাতে পারছি না। আমাদের দুজনকেই হেডস্যারের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। আমি কেন ল্যাং মেরেছিলাম তার কোন সদুত্তর দিতে পারলাম না। আমি নিজেই জানি না যে! দ্বিতীয়বার নিল ডাউন হলাম। হোস্টেল আর ডে স্কলার। লাস্ট বেঞ্চ বনাম ফার্স্ট বেঞ্চ। একটা গোপন প্রতিযোগিতা, একটু আকচা আকচি এদের মধ্যে ছিলই। কিন্তু সেদিন আমার নিল ডাউন হওয়া নিয়ে ভাগাভাগি প্রকট হয়ে উঠল। ডে স্কলারদের মতে আমি বিনা কারণে ক্লাসের ফার্স্ট বয়কে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছি। আবার হোস্টেলের ছেলেদের চোখে মানস হল ‘গদ্দার’। এত বছর হোস্টেলে কাটিয়ে আজ ডে স্কলারদের দলে! ফিরে আসি গানের ধ্রুবপদে, সাতদিন আগের ঘটনায়। ম্যাথসের ক্লাস। অ্যসিস্টান্ট হেডমাস্টার রাজেন্দ্রস্যার কোয়াড্রাটিক ইকোয়েশন বা দ্বিঘাত সমীকরণ বোঝাচ্ছেন। সেদিনের ক্লাসে উনি দেখাচ্ছিলেন যে কোন সমীকরণের যত ঘাত বা পাওয়ার, তার তত রুটস বা মূল হবে। তাই দ্বিঘাত সমীকরণের দুটোই রুটস হবে। তিনটে হতে পারে না। এবার উনি এই উপপাদ্যের অলটারনেটিভ প্রুফ নিয়ে পড়লেন। -মনে কর, এই সমীকরণে দুটোর জায়াগায় তিনটি রুটস আছে- আলফা, বেটা, গামা। এবার এইভাবে এগোতে গিয়ে দেখব যে এমন জায়গায় পৌঁছেচি যা আপাতবিরোধী বা সেলফ-কন্ট্রাডিক্টরি। তার মানে? তার মানে হল প্রথম প্রেমিস বা আ্যসাম্পশানটাই ভুল বা গোড়ায় গলদ। ঠিক আছে? আচ্ছা, এই ‘অলটারনেটিভ প্রুফ’ কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ কী হতে পারে? কে বলবে? আমি হাত তুললাম। তার আগেই প্রথম বেঞ্চ থেকে হাত তুলেছে মানস। স্যার একটু ভ্রূ কুঁচকে লাস্ট বেঞ্চকে দেখলেন। আমি বললাম—বিকল্প প্রমাণ। --না স্যার! ওটা হবে বৈকল্পিক প্রমাণ। মানসের গলা। স্যার বললেন-বাঃ। --কেন স্যার? বিকল্প প্রমাণ কথাটা কি ভুল? --না, না। ভুল কেন হবে? তবে ‘বৈকল্পিক প্রমাণ’ আরও নান্দনিক। ওরা মুচকে হাসল। আমরা দাঁতে দাঁত পিষলাম। এবার আজকের দিনটা। হোস্টেলের রাঁধুনি পঞ্চা ভাত পুড়িয়ে ফেলায় আমাদের ক্লাসে আসতে দেরি হল। ঢুকে দেখি তুলকালাম। ব্যাপারটা একেবারে পাঞ্জুরিতে তিড়িতংক! সেকশন বি’র ডে স্কলার অনিল আমাদের ক্লাস টিচার বাংলার স্যার সন্তোষবাবুর কাছে নালিশ করেছে যে এ’ সেকশনের মানস ওর রিস্টওয়াচ চুরি করেছে।

69

1

Ranjan Roy

আহার- নিদ্রা- মৈথুন (বড় গল্প)

মানুষ ভাবে এক, আর হয় আর। বিল্লু রয়ে গেছে, আমার দোকানদারি চলছে; আর আমি এখন নিয়মিত আমার ঘরে ঘুমুতে যাবার আগে রোজ একটা নীল ছবির ক্যাসেট নিজের কম্পিউটারে লাগাই। না, আমার সংকোচ কেটে গেছে। কোন অপরাধবোধ নেই। ধীরে ধীরে এটা অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে, ভালো লাগছে। এ একটা অন্য দুনিয়া। এর রাজ্যে আগে আমার প্রবেশ ছিল না, শুধু কিছু ভাসা ভাসা ধারণা ছিল। বলাই বাহুল্য, এই লাইনের সাপ্লায়ার হল বিল্লু; নিয়মিত ক্যাসেট যোগান দিয়ে যায়। কিন্তু আমরা এ নিয়ে কোন কথা বলি না। ও রোজ দুপুরে একটা নতুন ক্যাসেট এনে আমার টেবিলের ডানদিকের ড্রয়ারে রাখে আর সেখান থেকেই আগের দিনেরটা নিয়ে যায়। হ্যাঁ, শোভা আমার জীবনে আর ফিরে আসেনি। চেষ্টা করেছিলাম, হাঁকিয়ে দিয়েছিল। ওকে দোষ দিই নে, কিন্তু আমার কী দোষ? আমি নিজের মত একরকম ভালই ছিলাম। ওকে কে বলেছিল এই ল্যাবেন্ডিসের জীবনে জবরদস্তি এন্ট্রি নিয়ে সব এলোমেলো করে দিতে? মা একটা গান গুন গুন করত—মোর না মিটিতে আশা ভাঙিল খেলা। খবর পাই শোভা এখন টাটা স্কাইয়ের ওই অফিসে বড় দায়িত্ব সামলাচ্ছে। ওর ভাল হোক। পচাদার কথায় বুঝতে পারি যে শোভা এখন ওর নাগালের বাইরে। ওর কথা উঠলে বিরক্ত হয়। বিড়বিড় করে বলে—অকৃতজ্ঞ! একদিন পচাদা আবার ডেকে পাঠাল। কী জ্বালা! বিল্লু ম্যাজিকে আমার বাকি ভাড়া ও বাজারের ধার তো কবেই চুকে বুকে গেছে। আজও অফিসে সেই আর্কিটেক্ট ও দেঁতো উকিল বসে। আমাকে দেখেই পচাদা চেয়ার থেকে উঠে আয়-আয় করে হাত ধরে টেবিলের একদিকে ওই উকিলব্যাটার পাশে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। একরাউন্ড চা আর সিগ্রেটের পর পচাদা আসল কথায় এল। ---বুঝলি নীলু, তোর তো কাজকম্ম ভালই চলছে। বিল্লুর থেকে সব খবরই পাই। এবার তোর একটা ঠাঁই হওয়া দরকার। আমি কিছুই বুঝলাম না। হঠাৎ এত দরদ! --আরে ওই দোকানঘরের পেছনে একটা গুদামঘরে সারাজীবন কাটবে নাকি? তোর একটা নিজের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হওয়া দরকার। আর সংসারধর্ম করবি তো? -- কী যে বল! আমার নিজের একটুকরো জমি আছে—পাটুলির ওদিকে। আর আমি তো একবার বিয়ে করেছি। -- শোন, ওই জলাভূমির ধারের ওই জমি কোন কাজের না। ওখানে করপোরেশন একটা বড় বাজার বানাবে, আমি ওদের ম্যাপ দেখেছি। ওখানে কেউ বাড়ি বানাতে পারবে না। তুই পরে কিছু কমপেন্সেশন পেয়ে যাবি, ব্যস। -- খারাপ কি! -- দূর ব্যাটা ল্যাবেন্ডিস! তোর জন্যে আমার একটা প্ল্যান আছে। উঃ , কবে যে এরা আমার জন্যে প্ল্যান করা বন্ধ করবে! --শোন, ভাল করে বাঁচতে বাড়ি ও নারী দুটোই দরকার। আমি একটা এপার্টম্যান্ট বানাচ্ছি, চারতলা, এই নাকতলার কাছেই। তোকে একটা দু’কামরার ফ্ল্যাট দিয়ে দেব। আর ছাঁদনাতলায় বসার ব্যবস্থাও করব। --রক্ষে কর। আমার ফ্ল্যাট কেনার মত পয়সা নেই। আর বিয়ে কি রোজ রোজ হয় নাকি? -- আরে, তোদের ওই বিয়ে তো পুতুলখেলা। শোভা খুব ধড়িবাজ মেয়ে। তোকে ডিভোর্স দেয় নি। ওদিকে অফিসের বসের সঙ্গে ইন্টুমিন্টু চলছে। -- পচাদা, যাই হোক ও তোমার শালী, আমার বউ । ওকে নিয়ে এভাবে অফিসে বসে কথা বলা আমার ভাল লাগছে না। দেঁতো উকিল সরু গলার চড়া আওয়াজে তিড়বিড় করে উঠল। --নীলুবাবু, ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আপনার দাদার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। আমরাই নন-কনজুমেশন অফ ম্যারেজ চার্জ এনে তাড়াতাড়ি আপনার ডিভোর্সের ডিক্রি পাইয়ে দেব। আপনাকে এ্যালিমনি দিতে হবে না। কোন ফীস লাগবে না। আপনি খালি পিটিশন সাইন করে দিন। আমি ওর দিকে না তাকিয়ে পচাদাকে বললাম – যদি আর কোন কাজ না থাকে তো আমি বাড়ি যাই। --আরে তোর দেখি এখনও খুব আঠা! বোস, বোস; আসল কথাটাই তো বলা হয় নি। আমি ভাবলেশহীন মুখে একটা চেয়ার টেনে আবার বসে পড়লাম। কফি এল। পচাদার ইশারায় আর্কিটেক্ট লোকটি একটা নীলমত কাগজ ব্রিফকেস থেকে বের করে টেবিলের উপর বিছিয়ে দিল। একটা ম্যাপ, তাতে নানারকম নকশা। আমার হটাৎ খুব হাসি পেল। --কী ব্যাপার? কোন গুপ্তধনের খোঁজ পেলে নাকি? সেই ‘পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা’? ---আরে কাউকে পায়ে ধরে সাধতে হবে না। শুধু একটা সই করবি, ব্যস। --মানে? আর্কিটেক্ট মুখ খুলল। নাকতলার লাগোয়া এই জমিটায় আমরা একটা চারতলা এপার্টমেন্ট তুলছি, নকশা পাশ হয়ে যাবে, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তুমি একটা ফ্ল্যাট পাবে। কী আবোল তাবোল বকছেন! আমি ফ্ল্যাটকেনার টাকা কোথায় পাব? ধ্যেৎ, তোমার কোন টাকা দিতে হবে না, তুমি তো এই জমিটার মালিক! এরা কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছে? আমার এখন খিদে পাচ্ছে। এসব ভাল লাগছে না। পচাদা, এসব কী? তুমি ফ্ল্যাটবাড়ি তোলো গে যাও, আমি কেন ফ্ল্যাট কিনতে যাব? মিনিমাগনা? আর আমি কিসের জমির মালিক? আমার জমি তো পাটুলিতে। --ওরে ল্যাবেন্ডিশ, কথাগুলো মন দিয়ে শোন। তুই ফ্ল্যাট কিনবি না, জমিটা কিনবি, আর আমি তোকে জমির মালিক হিসেবে একটা ফ্ল্যাট দেব। বাকি ফ্ল্যাট বেচে দেব। বুঝলি? -- না, বুঝলাম না। আমি খামোকা এই জমি কেন কিনতে যাব? টাকা কোথায় পাব? তারপর ওরা যা বলল তাতে আমার খিদে লোপ পেল। এই জমিটার দাম দু’লাখ টাকা। তুই তোর পাটুলির প্লট বেচে দে, আমার আর্কিটেক্টকে। সেটা দিয়ে নাকতলার গায়ে এই জমিটা কিনবি, তাতে আমি ফ্ল্যাট বানাব, তুই কিছু টাকা আর একটা ফ্ল্যাট পাবি। সব একনম্বরে, তোর কোন খিঁচখিঁচ থাকবে না। তুমি হটাৎ এত দয়ালু কেন হলে? জমিটা নিজে কেন কিনছ না? আমার ঘাড়ে বন্দুক রাখবে? মনে কর তাই। আমার নিজের নামে কেনার প্রব্লেম আছে। আসলে জমিটার আসল দাম পাঁচ লাখ। তিনলাখ আমি জমির মালিককে ক্যাশ দেব। রেজিস্ট্রি হবে তোর নামে, দু’লাখ টাকায়। তোর লাভ বিনা ঝামেলায় একটা ফ্ল্যাট পাচ্ছি। ওই পাটুলির জমির কোন ভবিষ্যৎ নেই; ভেবে দেখ। আমি নকশা, কাগজপত্র সব দেখব। হ্যাঁ, হ্যাঁ সব দেখেশুনে নে। তারপর ভাল লাগলে সাইন করবি। কোন জোরজবরদস্তি নয়। হ্যাঁ, কাগজপত্র সব তৈরিই ছিল। জনৈক মণীন্দ্রনাথ দাসের নামে জমির চারকাঠার টুকরো। মন দিয়ে ম্যাপ ও নকশাটা দেখতে থাকি। ধীরে ধীরে মাথায় একটা টিউব লাইট জ্বলে ওঠে। এই জায়গাটা – এটা আমার বউ শোভার বাড়ির কাছে না? মনে হচ্ছে যেন ওর বাড়ির খুব কাছে? সবাই মন দিয়ে আমাকে দেখছে, কোন কথা বলছে না। আমি মুখ তুলি—পচাদা? পচাদা হাত তুলে থামায়। ঠিকই চিনেছিস, এটা শোভাদের বাড়ির লাগোয়া জমিটাই। ওদের বাড়িটা তিনকাঠার, সঙ্গের চারকাঠার জমিটা ওর মণিকাকার। হ্যাঁ, ওর কাকা এতদিন বাঙলাদেশে ছিল, মানে থাকে। আমরাই খবর দিয়ে এনেছি। ওর টাকার দরকার। তাই অমন জমি পাঁচলাখে ছেড়ে দিচ্ছে। সাতদিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে ফিরে যাবে। তুই নিবি তো বল, নইলে অনেক লোক লাইনে আছে। প্রথমে মনে হল না করে দিই, ওইখানে ফ্ল্যাটে থাকলে শোভার সঙ্গে প্রায় রোজ দেখা হবের সম্ভাবনা। কেন ফালতু ঝামেলা বাড়াই! তারপর মনে হল এই সুযোগ, রোজ শোভার নাকের ডগা দিয়ে নিজের অফিসে যাব। ওকে পাত্তা দেব না। দেখিয়ে দেব যে আমি বেশ আছি। না হাভাতে, না হাঘরে। আমি কলম খুলে ‘এগ্রিমেন্ট টু সেল’ ডকুমেন্টে সাইন করলাম। সবাই হুররে করে উঠল। পচাদা একটা হুইস্কির বোতল খুলল। সব যেন স্বপ্নের মত ঘটছে। জমির সেল ডিড, রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট, করপোরেশন থেকে প্রাথমিক নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট সব রেডি। কাল বেস্পতিবার বাস্তুপূজো হবে। জমিতে পূজো করে পিলার বসিয়ে আমরা প্রসাদ খাব। তারপর রেজিস্ট্রি হবে পরশু শুক্রবার। নাঃ, উকিলব্যাটা বেশ কাজের, সে যতই চপচপ করে পান চিবোক না কেন! পচাদা নকশা দেখিয়ে জানতে চাইল যে ফার্স্ট ফ্লোরের কোনদিকের ফ্ল্যাট আমার পছন্দ? প্রথমে দক্ষিণ-পূব খোলা ফ্ল্যাটের ঊপর আঙুল রাখলাম। কিন্তু ওর বারান্দা মনে হল শোভার আঙিনার দিকে খোলে। তাই অন্য ফ্ল্যাট পছন্দ করলাম। পচাদা আমার পিঠ চাপড়ে দিল, অন্যেরা হেসে উঠল। তারপর পচাদা আমাকে বলল যে আমার পূজোয় না গেলেও চলবে। প্রসাদ ওরা দোকানে পৌঁছে দেবে। আমার আসল কাজ হল রেজিস্ট্রির দিনে। সেই ভাল। সন্ধ্যেবেলা। আমি অফিস বন্ধ করে ভেতরের ঘরে যাব। বিল্লু যথারীতি নতুন সিডি দিয়ে গেছে। দরজায় কড়া নড়ে উঠল। আমি বিরক্ত মুখে উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছি, তার আগেই কেউ অধৈর্য হাতে চার পাঁচবার দরজায় দুম দুম করে ধাক্কা মারতে শুরু করেছে। এসব কী হচ্ছে? এক ঝটকায় দরজা খুলেই পাথর। দরজার চৌকাঠে শোভা দাঁড়িয়ে, চোখ থেকে ঘেন্না ঝরে পড়ছে। --তুই এত নীচ? আমি কোন কথা না বলে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। ওকে দেখি—একটু মোটা হয়েছে, চেহারায় একটু কমনীয়তা। --চুপ করে থেকে পার পেয়ে যাবি ভেবেছিস? আমাকে চিনিস তো, এত সহজে হার মানব না। সবকটাকে জেলের ঘানি টানাব, তোদের পালের গোদা ওই পচাদা শুদ্ধু। --কী হয়েছে বলবে? -- জালিয়াতটার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে আমার ভিটে থেকে উচ্ছেদ করতে চাস? এত বিষ তোর মনে? আমার পায়ের তলা থেকে যেন জমিন সরে গেছে। তবু প্রতিবাদ করি। বলি যে ওর কোথাও ভুল হচ্ছে। আমাদের রাস্তা আলাদা হয়েছে, কিন্তু ওকে ওর বসতবাটি থেকে উচ্ছেদ করার কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। আমি নকশা দলিল সব দেখে ওর কাকার ভাগের জমিটা কিনছি, তাতে ওর কীসের আপত্তি? ও আমাকে জানাল যে ওর কোন কাকা নেই। যে জমি আমি কিনছি সেটা আসলে হরিকাকার পাট্টায় নেওয়া জমি, যার ওপরে ওর টালির ঘর দাঁড়িয়ে আছে। ও খবর পেয়েছে যে কাল ও কাজে বেড়িয়ে গেলে ভিতপূজোর নাম করে পচাদা দলবল নিয়ে এসে ওর বাড়িটা ভেঙে দিয়ে সেখানে পিলার তুলে বোর্ড লাগিয়ে দেবে। তখন ও যদি আদালতে যায়, তাহলে দশবছর মালিকানা নিয়ে সিভিল কেস চলবে। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ নয়। ওর অফিসের মালিক নিজের উকিল লাগিয়ে কোর্টে পচাদার বিরুদ্ধে কেস ঠুকছে। করপোরেশনেও কাল নোটিস দেবে। আমি যদি অনেস্ট হই, তাহলে যেন কাল ওই পূজো-ফুজোর সময় ওখানে না যাই। শোভা ওদের ট্র্যাপ করতে অফিসে বেরিয়ে গিয়ে থানায় যাবে। ওরা বাড়িটা খানিকটা ভাঙা শুরু করলে পুলিশ নিয়ে ওদের হাতে নাতে ধরে ফৌজদারি কেসে খাইয়ে ঘানি টানাবে। বরাবরের মত বিষ দাঁত ভেঙে দেবে। সকাল হল। সারারাত ঘুমোতে পারি নি। পচাদা শোভা – কেউ চায় না যে আমি ভিতপূজোর ওখানে যাই। আমার কোন রোল নেই, সাইড রোলও নয়। আমি ল্যাবেন্ডিস। শোভার কথা সত্যি হলে পচাদারা আজ সকালে গিয়ে ওর টালির চালা ভেঙে দিয়ে পিলার তুলে পাঁচিল গেঁথে দেবে। আর শোভা মাঝপথে পুলিশ এনে ওদের হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়ে জেল খাটাবে। আমার এসব থেকে দূরে থাকাই মঙ্গল। কিন্তু আমি তো এখনও শোভার স্বামী। আমার কি কিছুই করার নেই? আমি যদি পচাদাদের থেকে জমি কিনে শোভাকে দিয়ে দিই? মানে, রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে যদি প্রোমোটারের সঙ্গে চুক্তিটা ক্যানসেল করে দিই? সে রাইট তো আমার আছে। কোন মারদাঙ্গা হবে না। শোভার জমি ওরই থাকবে। ও আমার বউ। ওর জমি যে আমারও জমি। কিন্তু পচাদা কি আমায় ছেড়ে দেবে? কী করতে পারে? আমার কাজ বন্ধ করিয়ে দেবে, দোকানটা কেড়ে নেবে। তখন আমি কোথায় যাব, কী করব? সেটা তখন ভাবব। যে এতদিন ধরে বাড়ির সাহায্য ছাড়াই বিজনেস করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে –সে কেন এত ভাববে? এত ঘাবড়াবে? কিছু না কিছু ঠিক জুটে যাবে। একটা তো পেট। আচ্ছা, আমি যদি শোভার জমির বেদখল আটকে দিই, শোভা কি আমাকে এই লাইনে কোথাও লাগিয়ে দিতে পারবে না? ওর বসকে বলে? বা অন্য কোথাও? সেসব পরে হবে, আগে তো আমি আমার কাজ করি। মাঠে পৌঁছে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। দেরি হয়ে গেছে। অন্ততঃ ছ’জন মুশকো ষন্ডামার্কা লাঠি দিয়ে শোভাদের বাড়ির চালটা প্রায় ভেঙে ফেলেছে। এবার শাবল দিয়ে দেয়ালের গায়ে ঘা দিচ্ছে। কিন্তু পুলিশ কোথায়? আমি দৌড়ুতে থাকি। সোজা গিয়ে লোকগুলোকে বলি—পালাও, পালাও! পুলিশ আসছে। শোভা আর ওর বস পুলিশ নিয়ে আসছে। সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। ওরা অবাক হয়। আমাকে দেখে। থেমে যায়। তারপর মাঠের এককোণায় একটা চেয়ারে বসে থাকা পচাদার দিকে তাকায়। এবার আমি পচাদাকে দেখতে পাই। আজ একটা সিল্কের পাঞ্জাবি আর ধুতি পরেছে। পাশে দাঁড়িয়ে বিল্লু। আমাকে দেখে ওদের ভুরূ কুঁচকে গেল। আমি একদৌড়ে পচাদার কাছে গিয়ে হাঁফাতে থাকি। --তুই এখানে কেন এসেছিস? বারণ করেছিলাম না! আমি আবার বলি যে শোভা পুলিশ নিয়ে আসছে, নিজের মুখে বলেছে। ওরা হেসে ওঠে। --দূর ব্যাটা ল্যাবেন্ডিস, কোন পুলিশ আসবে না। তার ব্যবস্থা করে এসেছি। শোভা এ জমিতে আর পা রাখতে পারবে না। আমার মাথা ঘুরে ওঠে। এই পচাদাকে আমি চিনি না। আমার ভেতর থেকে কেউ চেঁচিয়ে ওঠে –জমিটা আমার। --ভাগ, এখনও রেজিস্ট্রি হয় নি। ওটার মালিক শোভার কাকা। --সব জালি, তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। এই বাড়িটা তো তোমার নকশায় ছিল না। -- তো? এখনও তোর পাটুলির জমি বিক্রি হয় নি। তোর সঙ্গে ডিল ক্যানসেল। তুই এখান থেকে কেটে পড়। এই, তোরা হাত চালা। শাবল, গাঁইতি চলতে শুরু করে। ভেঙে পড়ছে দেয়াল। ধূলোর ঝড়। আমার মাথা কাজ করে না। অন্ধের মত দৌড়ে গিয়ে একটা লোকের পা ধরে হ্যাঁচকা টান মারি। লোকটা পড়ে যায়। আমি আরেকটা লোকের হাতের শাবল কেড়ে নেওয়ার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হয়। আমি মাটিতে পড়ে যাই। একজন আমাকে লাথি মারে। আমি ব্যথার চোটে গড়িয়ে গিয়ে একজনের পায়ে কামড়ে দিই। মাথার মধ্যে একটাই কথা ঘুরতে থাকে। আমার বৌয়ের বাড়ি ভাঙতে দেব না। একটা ভোঁতা কিছু মাথায় এসে লাগে। তারপর আর কিছু মনে নেই। আবছা আবছা টের পাচ্ছি। কালো কালো ঢেউ। গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে, চলে যাচ্ছে। কেউ একজন আমার মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে। আমার গালে ওর ঠোঁটের স্বাদ, ওর ভারি বুকের চাপ। এই ছোঁয়া, এই গন্ধ আমার চেনা। কতদিন আগে? কিন্তু এখন আমার ঘুম পাচ্ছে। আমার আর কিছু চাই না। শুধু ঘুম পাচ্ছে। (সমাপ্ত)

258

20

মনোজ ভট্টাচার্য

বাণপ্রস্থের ঠিকানাগুলো !

বাণপ্রস্থের ঠিকানাগুলো ! A life may be short, but many people pack a lot into it. কথায় বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো - ! আমার কিন্তু তা মনে হয় না । আমার মতে – আমাদের সমস্যা আমরা না দেখিলে আর কে দেখিবে ! – তাই তো খুঁজে খুঁজে বাণপ্রস্থের ঠিকানাগুলোতে ঢুঁ মারি । এখন তো সব বৃদ্ধাবাসগুলো ঠিক অনাথ-আশ্রম নয় । দস্তুর মতো তারকা ওলা হোটেল বলা যেতে পারে । - তবে কিছু নিয়মকানুন থাকে – নিরাপত্তা জন্যে ! কাল গেছিলাম একটা বানপ্রস্থ আশ্রমে ! গাঙ্গুলি বানপ্রস্থ আশ্রম । হয়ত অনেকেই পরিচিত আছেন ।- প্রথমে এর সি ই ও গাঙ্গুলিমশাইয়ের কথা না লিখলেই নয় ! কোন পারমিশান নেওয়া নেই অবশ্য ! খুব ছোটবেলায় কলকাতায় বঙ্গবাসী স্কুলে পড়ার পর চলে যান বোম্বাই । সেখানেই তাঁর আত্মীয়দের বাস । সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরি পান এমন একটা সংস্থায় – যার দৌলতে মাসে প্রায় দুবার সুইজারল্যান্ড যাতায়াত করতে হয় !সুদীর্ঘ কাল ধরে সব কটা মহাদেশই ঘুরতে হয় । ফলে বিয়ে করার সুযোগ হয় নি । একাই রয়ে গেছেন । দেশে মামা ও মামী ! সুইজারল্যান্ডে রেস্টুরেন্টে কফি খেতে খেতে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা হয় । বন্ধুরা কর্মপলক্ষে বিদেশে । বাবা-মাকে সেখানে ঘোরাতে নিয়ে যায় । ছোট্ট দেশ সুইজারল্যান্ডে তিনদিকে তিনটে ভাষা । বাবা-মায়ের সে সব বোঝা সম্ভব নয় – বলা তো নয়ই । - তাহলে বার্ধক্যে মা-বাবা থাকবে কোথায় ! কে রাখবে তাদের ! টাকা দিয়েও তো আত্মীয়দের রাখতে বলা যায় না ! ভাবতে ভাবতে ঠিকই করে ফেললেন – অবসর নিয়ে দেশে – মানে কলকাতায় – এমন একটা আশ্রম খুলবেন – যেখানে বয়স্কদের আশ্রয় হতে পারে । তাদের দেখাশোনার জন্যে লোক রাখা হবে । নিজের বাড়ির স্বাদ পেতে চারপাশে গাছ পালা চাষবাস পুকুরে মাছ – একেবারে প্রাকৃতিক পরিবেশ ! এবং যাতে নির্মল বাতাস নিতে পারে । শহর থেকে দূরে – একেবারে গ্রামের ভেতরে । অনেক অনেকদিন ধরে খোঁজ করার ফলে পেলেন সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গা । দত্তপুকুরে কাশিমপুর । স্টেশনের কাছে – তবু শহর থেকে অনেক ভেতরে ! যদিও গাঙ্গুলিমশাই ডিরেকশান দিয়েছিলেন – তবু ঐ লাইনে রাস্তার হাল তো সবার জানা । পাক্কা দেড় ঘণ্টা লাগলো । কিন্তু ট্রেনে গেলে দত্তপুকুর স্টেশানের কাছেই । পথেই পড়লো রাধানাথ শিকদারের মামাবাড়ি – অধুনা খেয়ালী সংঘ ! – কি বিরাট কম্পাউন্ড ! মধ্যে দুটো সাদা বাড়ি । একটা বিরাট ঝিল মতো । তাতে ভর্তি মাছ। সব রকম মাছই আছে। বিরাট মাছগুলো জলে ভাসছে । ওপাশে দেখলাম বেশ কিছু সবজীর গাছ । - ওপাশে বলল – অনেক রকম সবজির চাষ হয় । এক মহিলা আমাদের আপ্যায়ন করে ঐ বাড়ির ঘরগুলো দেখালেন । ঘরগুলো খুবই বড় – মানে দুজন বোর্ডারের জন্যে । প্রচুর আলো বাতাস । দুপাশে বারান্ডা । বেশ কিছু বোর্ডার আছেন – তার মধ্যে আবার এক রাশিয়ান-আমেরিকান কাপল আছে । শীতের দুপুরে বেশ কিছু মহিলা-বোর্ডার দেখলাম রোদে বাগানে বসে আছে ! - বেশ ঝকঝকে – এ পর্যন্ত কোন বৃদ্ধাবাস এত পরিস্কার ও ঝকঝকে তকতকে দেখিনি ! পাশে আরো একটা আবাস তৈরি হচ্ছে দেখলাম । সেই মহিলার কাছে খাবার-খবর নেওয়া হল । সকালে ব্রেক ফাস্টে চা বিস্কুট, প্রাতরাশে ব্রেড বা রুটি ইতাদি, মধ্যাহ্ন-ভোজনে ভাত ডাল দুরকম শব্জী, মাছ বা মাংস দই – সপ্তাহে একদিন ভেজ, বিকেলে স্ন্যাক্স ও রাত্রে যথারীতি রুটি বা ভাত ডাল শব্জী ও ডিম মিষ্টি । পরের বাড়িটাও প্রায় একই রকম । এখানে গাঙ্গুলি মশাইয়ের ঘর । - ঘরে বেশি আসবাব নেই । একটাই বিছানা – তাঁর ওপর কাগজপত্র ছড়ানো । বেশ ছিমছাম ! চুরাশি বছরের এক যুবক আমাদের স্বাগত জানিয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন । ভদ্রলোক দেখলাম খুবই মিশুকে ! - অনেকক্ষণ ধরে ওনার সঙ্গে সামাজিক সমস্যা সম্বন্ধে আলোচনা হল । ফেরার পথে আরেকটা আরও একটা বৃদ্ধাবাস দেখে ভেতরে ঢুকে গেলাম । এটা রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রম । ঢুকতেই দেখি একটা মন্দির। তার দালানে বসে ম্যানেজার । আর বাগানে বসে রোদ পোহাচ্ছেন অনেক বয়স্ক মহিলা – ও কয়েকজন পুরুষ । এনারা আমাদের খুব একটা স্বাগত জানালেন না ! কিন্তু আমরা যে সেখানে থাকতে যাই নি – সেটা জেনে বোধয় নিশ্চিত হলেন । - যদিও দক্ষিণা খুব একটা কম নয় – তবু আপাত দৃষ্টিতে খুব একটা মনোরম লাগলো না ! আলোচনা করে বোঝা গেল খাবার দাবার মোটামুটি সব একই রকম ! কিন্তু কোন এককালীন সিকিউরিটি লাগে না ! মনোজ

107

2

মানব

স্বপনচারিণী

১ উদয়পুর শহরে যতবারই যাওয়া হয়, কেমন যেন একটা ভালোলাগা বেড়ে যায় শহরটার প্রতি। তাই শুভ্র এই বছরেও পুজোর ছুটিটা ঠিক করেছে ওখানেই কাটাবে। এদিকে একই শহরের প্রতি এত ভাললাগা যে ভাল নয় সেটা বোঝাতে না পেরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে বাপের বাড়ি চলে যাওয়া ঠিক করল স্ত্রী নির্মলা। বিয়ের প্রায় তিন বছর পার হয়েছে। প্রথমবার পুজোর ছুটিটা বাড়িতে কাটালেও তারপরই যাওয়া হল উদয়পুর। পরের বারেও তাই, আবার এই বছরও বলে কিনা... শুধু মধুচন্দ্রিমা যাপনটা হয়েছিল পুরীর সমুদ্রের তীরে একটা হোটেল ঘরে, তাও মাত্র তিন দিনের জন্য। তৃতীয় দিনেই একটা ফোন আসে আর তাড়াতাড়ি তাকে অফিস জয়েন করতে হয়। এইসব স্মৃতিচারণ করতে করতে ব্যাগ গোছাচ্ছিল আর মনে মনে গজগজ করছিল সে, হঠাৎ সামনে এগিয়ে এল একটা হাত যার তালুটা উপরের দিকে করা, সম্ভবত কিছু চাওয়ার ভঙ্গীতে। আর তারপর ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস পড়ায় সচকিত হয়ে পিছন ফিরে তাকায় সে। ‘শুভ্র – তু তু তুমি কখন এলে, নক করলেনা তো?’ কাঁপাকাঁপা গলায় ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল সে। ‘দরজাটা খোলাই ছিল, ভাবলাম ঢুকে পড়ি। ভয় পেলে নাকি?’ এমন রসিকতা দেখে গা জ্বলে নির্মলার, রেগে ফুঁসে ওঠে সে, ‘এইভাবে চমকে দেওয়ার কি মানে হয়? জা জা জানোইতো এইভাবেই আমার জ্যেঠু মারা গেছিল! অবশ্য জেনেই বা কি করবে! এখন তো আমাকে আপদ বলেই মনে হয়। এই আমি চললাম, যাও নিজের ইচ্ছামত উদয়পুর যাও, যেখানে খুশী ঘুরে এসো। কেউ কিচ্ছু বলবেনা।’ তিন বছরে মেয়েটাকে যতটুকু চিনেছে তাতে তার রাগের কারণটা ভালোই বুঝতে পারে শুভ্র। এই নাতিদীর্ঘ দাম্পত্যে ঝগড়া মারামারি অনেক হয়েছে তাদের মধ্যে, কিন্তু ভালোবাসার এতটুকু কমতি হয়নি। এখনও... ওইতো গজগজ করার পরও টিপট থেকে কেমন দুকাপ চা বের করে টেবিলটায় এসে বসল নির্মলা। ‘বিস্কুট নেবে না টোস্ট?’ নির্মলা শান্ত গলায় বললেও সেই কথার মধ্যে কেমন একটা ক্ষোভ, ব্যঙ্গ সবকিছু মিশে আছে। ‘আরে নানা, কিচ্ছু লাগবেনা। এই আমি বসলাম। এবার বলি আমি কি চাইছিলাম হাত পেতে। উঃ যা বাড়াবাড়ি কর না, আমাকেও একটু বলবার সুযোগ দেবে তো?’ ‘ছুটিটা হচ্ছেনা, তাইতো?’ ‘সে একরকম বলতে পারো, তবে একটা সারপ্রাইজও আছে। দাও দেখি তোমার পাসপোর্ট টা দাও।’ ‘আমি তো চলেই যাচ্ছি, আর পাসপোর্ট দিয়ে কি হবে?’ ‘আবার ছেলেমানুষী করে, দেখো এই চিঠিটা দেখো। মিশর থেকে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে ওদের শহরে এসে পাঁচমাস কাটিয়ে যাওয়ার জন্য। ওখানে আমাদের অফিসের যে শাখা আছে ওখানে আমার স্কিলে এক্সপার্ট কোনও লোক নেই, তাই আমাকে ডেকেছে। এখন তুমি যদি না বলো তো ওদের জবাব দিয়ে দিই...’ ‘মানে পিরামিডের দেশ?’ উত্তেজনায় বেশ জোরে কথাগুলো বলে ওঠে নির্মলা। তারপরই কেমন যেন লজ্জা পেয়ে এসে শুভ্রর বুকে মুখ লুকায়। ব্যাস এই সুযোগটাই খুঁজছিল শুভ্র। তৎক্ষণাৎ নির্মলার মুখটা তুলে কপালে একটা চুমু খেয়ে নেয় সে। তারপর চোখে চোখ রেগে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি রাজী তো?’ নীরবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় সে। ২ একটা ট্যাক্সি এসে ছেড়ে দিয়ে গেল তাদের কলকাতা এয়ারপোর্টে। এখান থেকে দুবাই, দুবাই থেকে কায়রো। প্রায় বারো ঘন্টার যাত্রা। এবারের পুজোটা বাড়িতে কাটবেনা ভেবে একটু দুঃখ পেলেও মনে মনে নির্মলা বেশ খুশী সেটা বোঝা যায়। দুসপ্তাহ আগের সেই রাগী আচরণ আর নেই। বরং উৎসাহিত হয়েই সব কাজ করছে সে। ‘এই, দুবাইটা একবার ঘুরে দেখা যায়না?’ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সে প্রশ্ন করে। ‘আমাদের এই দেশের ভিসা নেই তো, অবশ্য ভিজিটর পাস করিয়ে নেওয়া যেত, সে বড্ড ঝামেলা। ছাড়ো ওসব। একবার তোমাকে নিয়ে নিজের পয়সায় এদেশে আসব।’ বাচ্চা ছেলেকে যেমন করে ভোলানো হয়, ঠিক তেমনভাবে বৌকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে শুভ্র। পরদিন দুপুর বারোটার দিকে নামল দুজনে কায়রো এয়ারপোর্টে। ইমিগ্রেশন হয়ে গেলে নিজেদের ব্যাগ সংগ্রহ করে এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দাঁড়ায় তারা। ‘তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা মিশরে এসে পড়লাম, কি বলো!’ নির্মলাকে কথাগুলো বেশ গর্বের সঙ্গে বলে সে। ‘এবার?’ ‘কিচ্ছু চিন্তা করতে হবেনা, ওরা বলেছে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে। দেখো হয়ত কেউ হাতে আমার নামের বোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।’ শুভ্রর আত্মবিশ্বাস তখন চরমে। কিন্তু অনেক খুঁজেও তেমন কারোর দেখা পাওয়া গেলনা। একটা সিমকার্ড অবশ্য সে নিয়ে রেখেছিল এয়ারপোর্টের ভিতর থেকেই। সেটা ফোনে লাগিয়ে ই-মেলে পাওয়া ড্রাইভারের নম্বরটায় ফোন করল সে। অনেক কষ্ট করেও একটাই কথা শুধুমাত্র সে বুঝতে পারল, ‘আরবি মালুম?’ ঘাড় নাড়িয়ে সম্পূর্ণ বাংলায় বলল শুভ্র, ‘না।’ ‘কি গো, কি হল?’ নির্মলাকে চিন্তিত দেখায়। ড্রাইভারের সঙ্গে এই অদ্ভুত কথোপকথনে কিছুটা মুষড়ে পড়ে শুভ্র। ভাবে আর একটু অপেক্ষা করাই যাক না। নিজের দাবিটা তো সে রেখেছে ড্রাইভারের কাছে। নিশ্চয়ই ‘এয়ারপোর্ট’ কথাটা ড্রাইভার বুঝতে পারবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কত ড্রাইভার যে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার দাবী করল তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তারা তো জানেই না কোথায় যেতে হবে। সেসব কথা এখন ওদের বোঝানো যায় কেমন করে। ড্রাইভারদের এহেন ঘন ঘন আগমনে বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে নির্মলা তো বলেই ফেলল, ‘আপনাদের তো বারবার নিষেধ করা হচ্ছে। আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না!’ এহেন চিৎকারের সঙ্গে বাংলা ভাষার প্রয়োগে কাজ হল বৈকি! ভয় পেয়ে আর কেউ সেদিকে ঘেঁষবার সাহস করলনা। আরও মিনিট পনের পরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। ড্রাইভারের হাতে প্রিন্ট করা কাগজ, আরে এ তো তারই পাসপোর্টের কপি। কোনওরকমে বুঝিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল তারা। সৈয়দ পোর্ট শহরের দিকে রওনা দিল তারা। প্রায় তিনঘন্টার যাত্রা। জায়গায় জায়গায় বালির স্তুপ, মরুভূমি, আবার কোথাও বেশ কিছুটা সবুজের ছোঁয়া। মরুভূমির মাঝে অনেকে আবার তৈরী করছে রাজপ্রাসাদ সমান বাড়ি। এই জায়গায় না এলে সে হয়ত ভাবতেই পারতনা যে এরকম একটা জায়গায়ও মানুষ অট্টালিকা স্থাপন করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি জীবনের। তারা উঠল একটা বেশ নামী হোটেলে। ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যায় খেজুর গাছের সারি। আর একটুআর একটু দূরে চোখ পড়লেই দেখা যায় ভূমধ্যসাগরের দিগন্তবিস্তৃত জলের রেখা। স্নানটা সেরে নিয়ে রেস্তোঁরায় খাওয়াদাওয়া করে দুজনেই লম্বমান হল। ক্লান্তি এতক্ষণে বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বোঝা গেল। ৩ ‘এই হুসানি তাড়াতাড়ি কর। আন্দাজ আরও তিনটে জায়গায় যেতে হবে আমাদের এই সপ্তাহে। ওই যে মাসুদ কে চিনিস তো! ওর বাবা যক্ষায় পড়েছিল, শেষ অবস্থা চলছে, তারপর আরও দুটো আছে... হাত চালা হাত চালা।’ টেবিলের উপর শোয়ানো নুবিয়ার মৃতদেহের পেটের ভিতর খুব সাবধানে নুনের গোলাগুলো ভরতে ভরতে বলল জাবারি। ‘করছি তো ভাই। আজকাল এত লোক মরছে না! এই মেয়েটাকেই দেখ না। বাবাকে দেখতে কদিন আগেই পাশের ছোট্ট পিরামিডটায় এসেছিল। আমাদের দলের দুতিন জন তো ওর দিকে জুলজুল করে তাকিয়েই ছিল। শেষে আমাদের নেতার কড়া নজরে ওরা কাজে মন দেয়। সত্যিই কি অপরূপ রূপ ছিল মেয়েটার! আর কটা দিন বাদেই বিয়ে হত... ওর দিকে তাকিয়ে দেখ, যেন অপার মুগ্ধতায় নিদ্রামগ্ন। ডাকলেই হয়ত উঠে হাই তুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলবে, ‘শুভ সন্ধ্যা।’ ’ ‘কাজ কর কাজ কর। আমাদের এত কল্পনা সইবেনা।’ ‘তাই তো করছি। তবু যদি টাকাপয়সাটা ঠিকমতো পেতাম।’ নুনের স্তুপের মধ্যে পেট থেকে বের করে আনা প্রত্যঙ্গগুলো ভরে রাখতে রাখতে হতাশ গলায় বলে উঠল হুসানি। এতক্ষণ দূরে বসে থাকা দলনেতা সেনেব সব শুনছিল। সে এবার চেয়ার থেকে নেমে মাটিতে এসে বসল। তারও গলায় হতাশা, ‘ফ্যারাও ও আজকাল মরছেনা। তাহলে একটা কাজ করে বেশ কয়েকটা কাজের সমান অর্থ উপার্জন করা যেত। এইসব ছোটোখাটো কাজে খাটুনি বেশি, পয়সা কম। না না না...হুসানি যকৃতটা শুকাবার দরকার নাই। আজ এটা আমাদেরই থাক না। কি হে জাবারি, তুমি কি বল?’ জাবারির তখন নুনের পুর দেওয়া শেষ। এখন একটা হালকা সেলাই দেওয়ার কথা ভাবছিল সে। মুখ তুলে বলল, ‘হ্যাঁ, সে মহাত্মা সেনেব যা ভালো বুঝবেন। তবে হ্যাঁ, আগেরবার মনুষ্য যকৃতের সাথে সুরাপানে যে স্বাদকোরক কি অসীম তৃপ্তি পেয়েছিল, তা বলে আর তাকে খর্ব করতে চাইনা।’ ‘লোকজন মৃতের সঙ্গে এত জিনিসপত্র দিচ্ছে, এদিকে আমাদের দেওয়ার সময় ওদের পকেটে টান। আরে মরার সঙ্গে এতগুলো রাত কাটানো কি চাট্টিখানি কথা?’ সেনেবের গলায় হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘সে নাহয় হল, কিন্তু তাহলে আমাদের এই ভগবান ইমসেটির পাত্রটা যে ফাঁকা থেকে যাবে। যদি কেউ জেনে যায়...’ চিন্তিত হুসানি বলে ওঠে। এবার জাবারি বলে, ‘ধুর, এসব কেউ আজকাল দেখেনা। ওই যে বাক্সভর্তি অলংকার আছে, সব কি রেখে দেব ভাবছিস। উপর দিয়ে একটা রাস্তা রেখে দেওয়া আছে। সব চুকে যাক, তারপরে লোকজনের আনাগোনা যখন কমে আসবে, তখন এসব নিয়ে যাওয়া হবে। শুধু একটু নজরে নজরে রাখতে হবে, এই যা।’ সেনেব সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। হুসানি এবার বলে, ‘তাহলে যকৃতের পাত্রে লিনেন ভরে দিয়ে ব্যাপারটাকে চাপা দিলেই তো পাত্র আর খালি থাকেনা।’ ‘সাবাশ, তোমার বুদ্ধিটাও বেশ খুলেছে দেখছি’, হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। ################### ছোট্টো পিরামিড তৈরী হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরে এক শীতের সন্ধ্যায় পিরামিডটার উপর দিয়ে রেখে দেওয়া গোপন দরজাটা দিয়ে অল্প কিছু অলংকার বের করে আনে তারা তিনজন। তারপর ডিঙি বেয়ে একদম নীলনদের পূর্বপাড়ে আসবে এই ছিল বাসনা। নদীর একদম মাঝখানে ডিঙি এসে হাজির, এমন সময় ফিসফিস শব্দে চমকে তাকায় পিছন ফিরে, তিনজন একসাথে। তারা তিনজন ছাড়াও আরও একজন এসে হাজির নৌকার উপর। ও কে? বড্ড চেনা চেনা মুখ, সেই মায়াময় দৃষ্টি... শুধু ডানহাতে সদ্য কেটে আনা একটা যকৃত... আর সেনেবের ছেঁড়া পোষাকের পেটের অংশ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্ত। হুসানি আর জাবারি দুজনেই ঝাঁপ দেয় নীলনদের বুকে। কোনও রকমে সাঁতরে পূর্বপারে ফিরে আসে জাবারি, তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় অসীম যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নীলনদের বুকে মিলিয়ে গেল হুসানির দুটো হাত। ৪ চমকে দুপুরের ভাতঘুম থেকে উঠে পড়ে নির্মলা, শুভ্রর আদরের নিরু। এখানে আসার এক সপ্তাহ পর থেকে প্রায় দিনই এই স্বপ্নটা দেখছে সে... প্রায় একমাস ধরে। আজ শুক্রবার, এখানে ছুটির দিন, তাও অফিস যেতেই হবে শুভ্রকে। অনেক বলেও বোঝানো যায়না যে বৌকে সময়টাও দিতে হয়। বিদেশে এনে ফেলে রাখলেই সে খুশী হয় না। কি যেন একটা কোডিংয়ের কাজে তাকে অফিস যেতেই হচ্ছে শুক্রবারই হোক বা শনি। তারপর রবিবারে যখন ফ্রেশ মুডে সবাই অফিস আসে, ওর ক্লান্ত মুখখানা দেখেও কি কিছু মনে হয়না লোকজনের? এসব ভাবনা মাথা থেকে যেতেই তার মাথায় আসে স্বপ্নটার কথা। কয়েকদিন ধরে একই স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎই তার নজর চলে যায় স্বপ্নের হুসানির হাতের দিকে। তার বাঁ হাতে একটা জরুলের মতো, নাকি আঁকা ছবি কে জানে। তবে যে জিনিসটা তার সবথেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেটা হল, শুভ্ররও ঠিক ওই জায়গায় একটা জন্মদাগ আছে। আর দুটোর মধ্যে কি অদ্ভুত মিল... দুটোই যেন অনেকটা গুবরে পোকার মতো দেখতে... তবে কি শুভ্রই... নানা তেমন যদি হয়েই থাকে তবুও এজন্মে শুভ্র তার। কোনও অসুবিধা যাতে তার স্বামীর না হয় তা দেখাও স্ত্রী হিসাবে তার কর্তব্য। ভুলে থাকার চেষ্টা করেও ভুলতে পারেনা সে। এখন দুপুর দুটো। কিভাবে যেন নীলনদের ওপার তাকে আকর্ষণ করে চলেছে কি এক অদম্য টানে। চাইলেও তাকে রোধ করার ক্ষমতা তার নেই। একটা গাড়ি ডেকে নিল নিরু। ভাগ্যবশত ড্রাইভার জুটে গেল ভারতীয়। নাম মুস্তাফা। লক্ষ্ণৌ শহর থেকে সে এসেছে প্রায় বছর কুড়ি আগে। এখন সপরিবারে এখানকার বাসিন্দা। যাওয়ার যায়গাটা দেখে মুস্তাফা সতর্ক করে দিল তাকে, ‘কাঁহা জাইয়েগা ম্যাডাম। ইয়ে জাগা তো বিলকুল খালি হ্যায়। রেগিস্তান মে আপ কো অকেলে ক্যায়সে ছোড় সকতা হুঁ ম্যায়!’ সিনেমা দেখার সুবাদে হিন্দী ভাষাটা মোটামুটি বুঝতে পারত সে। কিন্তু বলতে গেলেই... ‘ঠিক হে ঠিক হে, মে দেখ লুঙ্গা।’ ‘জ্যায়সি আপকি মর্জি’ এই বলে গাড়িতে স্টার্ট দিল মুস্তাফা। রিজিওনাল রিং রোড দিয়ে নীলনদের উপরের ব্রিজটা পেরনোর সময় তার মনে একটা শিহরণ খেলে গেল। যেন বহু বছর আগের কোন স্মৃতির ভাণ্ডারে প্রবেশ করছে সে। সবুজের ছোঁয়ার মধ্যেও সে দেখতে পায় বালির ঝড় – শয়ে শয়ে উট ছুটে চলেছে সেই বালির বুক দিয়ে। তারই মাঝে ছোট্ট একটা পিরামিড, আর তার মধ্যে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে নুবিয়া। সেই তিনজন ব্যাক্তি করে চলেছে মমি তৈরীর কাজ সঙ্গে আরও দুজন বাক্স জুড়ে খোদাই করে চলেছে একজোড়া চোখ... যেন এই চোখ দিয়েই নুবিয়ার বাবা তাকিয়ে থাকবে অনন্তকাল ধরে, রক্ষা করবে তার মেয়েকে। ‘ম্যাডাম, ম্যাডাম’ সম্বিত ফিরে পায় নিরু। এসে গেছে তার গন্তব্য। কিন্তু এই জায়গাটাই কি? হ্যাঁ এই জায়গাটাই হবে। কত বছর আগের স্মৃতির পিছুডাক, নীলনদের গতিপথ পাল্টে যেতে পারে, তলিয়ে যেতে পারে পুরনো সব সৌধ বালির ভিতর, কিন্তু সেইসব স্মৃতি কি মিথ্যা বলতে পারে! টাকাপয়সা মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়ল সে। সাড়ে পাঁচটা বাজে প্রায়। দ্রুত আলো থাকতে থাকতে জায়গাটা খুঁজে পেতেই হবে। নাহলে অন্ধকারে... বাড়ি ফেরার চিন্তাটা আপাতত তার মাথাতেই আসেনা। পা চালায় সে মরুভূমির বালিতে। ৫ মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে শুভ্রর। ঠিক এই জায়গাটায় কিভাবে কোডিং করবে কিছুতেই মাথায় আসছেনা তার। ঠিক এই সময়েই নিজের দেশের অফিসটাকে মিস করে সে। ওখানে থাকলে নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে বের করতে পারত। আসলে নিজের ওই চেয়ারটায় কিছু না কিছু আছে, যার জন্য ওটাতে বসলেই মাথা চলতে শুরু করত। এদের কিসব গোপনীয়তার জন্য এখানে এসেই নাকি কাজ সারতে হবে। কি আর করা যায়! ল্যাপটপটা লক করে দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। একটা সিগারেট ধরিয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঘাঁটতে শুরু করল সে। ইস! জিপিএসটা অন করা আছে, শুধু শুধু ব্যাটারি ডিসচার্জ হয়ে গেল অনেকটা। তখনই নিকটবর্তী বন্ধুদের লিস্টে চোখ যেতেই এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল সে। নিরুকে দেখাচ্ছে তিনশ কিলোমিটার দূরে। একটা ফোন করতেই হচ্ছে। ফোনটা সুইচ অফ করা। নিশ্চই কিছু একটা হয়েছে সন্দেহ করে একটা গাড়ি ধরে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সে। অফিসে আজ কেউ নেই, তাই বলবারও কেউ নেই। বাড়ি পৌঁছেই দেখে গেটে তালা। তালা খুলে ভিতরে ঢুকে দুতিনবার তাও ডাক দেয়। এবার সত্যিই কিছু একটা হয়েছে সন্দেহ করেই আবার একটা গাড়ি ডেকে চড়ে বসে সে। শেষ দেখানো লোকেশন দেখে সেই পথেই রওনা দেয় শুভ্র। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়ি চালানোর অনুরোধ করে সে। ৬ কতক্ষণ চলেছে তার আর কোন হিসাব নেই নিরুর। ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে, ঘড়িটাও ফেলে এসেছে বাড়িতে। নির্জন, জনবসিতিহীন এই জায়গাটা চাঁদের আলোয় অপরূপ দেখাচ্ছে। তার মন বলছে, খুব কাছেই রয়েছে সেই কাঙ্খিত জায়গা। যার জন্য তার এই দীর্ঘ পদযাত্রা। ওই যে একটু দূরেই দুটো ছোট্টো ছোট্টো টিলার মত দেখা যাচ্ছে, তবে কি ওদুটোই? আরও এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল ওদুটো বালির স্তুপ ছাড়া আর কিছুই নয়। হাওয়ায় বালি উড়িয়ে এরকম স্তুপ মাঝে মাঝেই তৈরী করে ফেলে এই মরুভূমি অঞ্চলে। দুটো স্তুপের মাঝখানটা অনেকটা বালি সরে ফাঁকা হয়ে গেছে। সেই চাঁদের আলোতেও স্পষ্ট দেখতে পেল সে, একটা স্তম্ভের চূড়ার মত কিছু একটা যেন... পায়ে পায়ে নিচে নেমে গেল সে। এটা তো অনেকটা পিরামিডের চূড়ার মত। স্বপ্নে ঠিক যেমনভাবে দেখেছিল তেমনিভাবে উপরের ছোট্ট অংশটা ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে আলতো ঘুরিয়ে দিতেই অবাক কাণ্ড... পিরামিডের এক মানুষ উচ্চতার অংশ একটা মোটা লোহার রডের উপর ভর করে উঁচু হয়ে উপরে উঠে গেল। চাবির রিংটা ব্যাগ হাতড়ে বের করল সে। আজকাল সব জিনিসেই একটা করে ছোট্ট টর্চলাইট লাগিয়ে দেয় কোম্পানিগুলো। এতে অবশ্য আজ তার বেশ সুবিধাই হচ্ছে। দৈত্যের মত দেখতে রিংটার ভুঁড়িতে চাপ দিতেই আলো জ্বলে উঠল। এ যে একটা সিড়ি নেমে গেছে সোজা নিচে। অন্য সময় হলে ভয়ে তার শরীর আড়ষ্ট হয়ে যেত এই নির্জন মরুভূমিতে একা একা এরকম একটা অজানা সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে। কিন্তু আজ যেন সে বাহ্যজ্ঞানহীনা। কি এক অমোঘ আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে চলেছে নিচের দিকে। সরু গুহার মত সিড়িটা দিয়ে সে নেমে গেল বেশ খানিকটা, অবশেষে তল পেল। একটা ঘরের মত, তার চারিদিকে ছড়িয়ে আছে বাক্স, চকচকে সব অলংকার আর একটা তীব্র গন্ধ। আড়শোলার গন্ধের সাথে কেরোসিন তেল আর আর পচা মাছের গন্ধ মিশিয়ে দিলে যেটা হবে ঠিক সেই রকম অনেকটা। ধীরে ধীরে গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করল। মাথা ঝিমঝিম করে আসছে। অন্ধকার ভূতল ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে... একটু জল যদি কেউ দিত... বড্ড তেষ্টা... জ্ঞান হারাবার আগে হাত থেকে পড়ে যাওয়া টর্চের আলোয় শেষবারের জন্য সে যেটা দেখতে পেল সেটা হল একটা মমির বাক্স... বাক্সের উপর একটা মেয়ের ছবি, অবিকল তার স্বপ্নে দেখা মেয়েটার মুখের আদলে। আর বাক্সের গায়ে আঁকা দুটো চোখ, যেন সেই দুটো দিয়ে অবিরত বাক্সের ভিতর থেকে কেউ দেখে চলেছে তার দিকে। ৭ শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে গেল যেখানে মোবাইলটা শেষ লোকেশন দেখিয়েছিল তার একটু আগে। গাড়ি আর যাবেনা। খানিকটা এগিয়ে যেতেই দেখে একটা টিস্যু পেপারের মত কি যেন পড়ে আছে দেখতে পেল সে। এরকম একটা জায়গায়... নিরু অবশ্য এই জিনিসটা ব্যবহার করে। তুলে নিয়ে দেখল, হ্যাঁ সেই একই ব্র্যান্ডের ডিস্পোজেবল ফেস টাওয়েল। আর একটু এগিয়ে যেতে দেখে আর একটা। এইভাবে দুটো পড়ে থাকা টাওয়েল ধরে সরলরেখা বরাবর চলতে চলতে আরও বেশ কয়েকটা ওই একই জিনিস খুঁজে পেল সে। নির্মলা যে এই পথেই সোজা গেছে তা নিয়ে শুভ্রর আর কোনও সন্দেহ রইল না। দ্রুত পা চালাল সে। মাঝে মাঝে ছোটার চেষ্টা করে, পড়ে যায়। আবার উঠে যতটা সম্ভব জোরে হাঁটার চেষ্টা করে সে। অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এসে সে দেখতে পেল দুটো বালির স্তূপ। আরও কাছে গিয়ে দেখল মাঝখানে একটা নিচু হয়ে যাওয়া অংশ। পায়ে পায়ে নেমে গেল সে। একটা পিরামিডের ছোট্ট মাথা যেন উঁচু হয়ে উঠে আছে। পায়ের কাছে পড়ে ওটা কী? একটা ফেস ক্রিম। তবে কি এর নিচেই তলিয়ে গেছে নিরু? ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা দুবার ডাইনে বাঁয়ে ঝাঁকিয়ে নেয় শুভ্র। আলো জ্বলে ওঠে। উঁচু হয়ে থাকা চূড়াটার নিচেই একটা সিড়ি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেমে যায় সে। একটা যেন তীব্র গন্ধ নাকে আসছে। সেই সঙ্গে কারও ভয়ার্ত, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর। ভালো করে আলোটা ঘুরিয়ে ঘরিয়ে দেখে সেই পাতালঘরের এক কোণায় বসে নিরু থরথর করে কাঁপছে। ‘নিরু, তুমি?’ কোনও কথা বলে না নিরু। শুধু আঙুল দিয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে দেখিয়ে দেয়। ওপাশে জমে থাকা চাপা অন্ধকারের মাঝেও টর্চের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় সে, একটা মমির বাক্স, খোলা। আর সেখান থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে যে জীবটা দাঁড়িয়েছে তার সর্বাঙ্গ ব্যান্ডেজে ঢাকা। ভয়ে কারও মুখ দিয়েই কথা বেরোয় না। জীবটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে নিরুর দিকে। হঠাৎ পত্নীপ্রেম তীব্র হয়ে ওঠে শুভ্রর মনে। এতটা যখন সে এসেছে, নিরুকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাবেই সে। তাই শ্লথগতির মমিটার থেকে অনেক দ্রুতবেগে নিরুর হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরোতে যায় সে। দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখে সেই মমিটাই, এবার একদম সামনে। অর্থাৎ বেরনোর একমাত্র রাস্তাও বন্ধ। ‘বাবা তুমি সরে যাও, ওরা আমার যকৃত চিবিয়ে খেয়েছে। দুটোকে শেষ করেছি। এখন একেও না শেষ করা অব্দি আমার শান্তি নেই।’ হাজার হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস যখন বাবা বলে ডেকে উঠল তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রবলভাবে দেখা দিল তার মধ্যে। মমির ইশারা নিরুর দিকে। হয়ত এমন কিছু নিরু করেছে কোন এক পূর্বজন্মে যাতে মমি অসন্তুষ্ট। প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেল সে। নিতান্ত আন্দাজেই বলে উঠলঃ ‘না মা না, যে তোর অঙ্গ ভক্ষণ করেছে সে সম্পূর্ণ অন্য মানুষ ছিল। চেয়ে দেখ, ওর সাথে তোর কোনও শত্রুতা নেই।’ ‘হ্যাঁ, আমি ঠিক চিনতে পেরেছি, ওকে আমি ছাড়বনা।’ মমি ধীর পায়ে এগিয়ে চলে। ‘যে তোর সাথে অনাচার করেছে সেই জাবারি, নদী পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর এক ডাকাতদলের হাতে মারা যায়। ওর কাছে সোনাদানা কিছু না পেয়ে তারা ওকে খুনই করে ফেলে। ভালো করে ভেবে দেখ মা... আমি বলছি, সে তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়ে গেছে।’ চমকে ওঠে শুভ্র। কেউ যেন তার ভিতর থেকে কথাগুলো বলছে। অথচ তার মুখ দিয়েই উচ্চারিত হচ্ছে। এরকম তো আগে কখনও হয়নি। কিচ্ছু বুঝতে না পেরে বিনা বাধায় যা হচ্ছে হতে দেওয়াই ঠিক বলে মনে করে সে। ‘কিন্তু... আমি নিজের হাতে ওকে শাস্তি দিতে চাই।’ ‘দেখ এই জন্মে কিন্তু ও পুরুষ নয়, একজন মহিলা, তার উপরে গর্ভবতী। একটা ভরা সংসার আছে ওর। এইভাবে একজনের জীবন শেষ না করে দিয়ে রাগকে নিয়ন্ত্রণ কর মা। তাহলেই মুক্তিলাভ করবি। ক্ষমা করতে শেখ, ক্ষমা।’ এইবার সম্ভবত সে বুঝল। প্রচণ্ড চিৎকারে চারিদিক কাঁপিয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা শরীর থেকে এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে এসে দম্পতির চারিদিক বেশ কয়েকবার পাক খেয়ে সিড়ি দিয়ে বেরিয়ে মহাশুন্যে মিলিয়ে গেল। আর পার্থিব শুকনো দেহটা পড়ে রইল ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে, অন্ধকারে। দুজনে মিলে দেহটাকে ধরে বাক্সবন্দী করে ফিরে এল উপরে। মোটা রডটায় লেগে থাকা একটা পাথরে অল্প চাপ দিতেই চূড়াটা নামতে শুরু করল। সাবধান হয়ে সরে গেল তারা। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যতটা সম্ভব বালি দিয়ে ঢেকে দিল তারা। এই জায়গার কথা তারা কাউকেই জানাবেনা। খোঁজ পেলেই সেই দেহটাকে নিয়ে মিউজিয়ামে টেনে নিয়ে যাওয়া, কাটাছেঁড়া আরও কতকি। তার চেয়ে এই বেশ শান্তিতে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকবে আত্মাহীন দেহটা। চাঁদের আলো এখন বেশ ঝলমলে হয়ে মরুভূমিকে রূপময় করে তুলেছে। ঈষৎ ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে, তবে সেটা বেশ ভালোই লাগছে তাদের। ‘এই তুমি ওসব কি বলছিলে গো। এইসব ভাষা জানো আগে বলনি তো?’ প্রশ্ন করে নিরু। ‘কই কোন ভাষা? আমি তো সম্পূর্ণ বাংলায়...’ ‘বুঝেছি, বলবেনা তাইত? বেশ কি কথা হল তোমাদের মধ্যে সেটা তো বলো।’ হোটেলে ফিরতে ফিরতে দুজনেই দুজনের কাছে নিজের নিজের ঘটনাটা বলল। দুটো মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ ঘটনার রূপ পেলো তারা। এবং এরপর থেকে কেউই যে কাউকে না জানিয়ে কোনও কাজ করবেনা সেবিষয়ে দুজনেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হল। ####################### দেশে ফেরার কয়েকমাস পর তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্মাল। ভালবেসে নিরু তার নাম রাখল নুবিয়া – অর্থাৎ সোনার টুকরো মেয়ে।

72

1

অর্ণব(অরিন্দম রায়)

অপ্রকাশিত

{s1} নীল খরগোশ {/s1} {s2} লেখক: মণিকুন্তলা সেনগুপ্ত {/s2} ছোটবেলার কথা ভাবতে গেলে স্কুলের কথাই বেশি মনে আসে| কারণ বোধ হয় এই যে অনেকগুলো বছর ধরে প্রতিদিনের অনেকটা সমায়‚ ভালই হোক বা মন্দই হোক‚ স্কুলে কেটেছে | আমার প্রথম স্কুলের নাম মনে নেই‚ বোধ হয় জানতামই না| সেটা ছিল নিউ ইয়র্কের কুইন্স অঞ্চলের একটি প্রাইমারি স্কুল| বাড়ির কাছে বাস এলো মা উঠিয়ে দিল| স্কুলে পৌঁছলে এক মহিলা ‚ অবশ্যই মেমসাহেব‚ আমাকে একটা ক্লাসে নিয়ে গেলেন| তখনকার দিনে ওদেশেও এখনকার মত introduction ইত্যাদি ছিল না| তাই একবর্ণ ইংরিজি না জানা বোকাসোকা ৬ বছরের আমি স্কুল শুরু করলাম| বিশেষ কিছুই মনে নেই কারণ খুবই অল্পদিন গিয়েছিলাম| মনে আছে দিদিমনির নাম ছিল মিসেস ওকানল‚ মানে আমি তাই শুনেছিলাম‚ এখন ভাবি বোধ হয় ওটা ছিল Mrs.O'Connol| পড়া কিছুই হতোনা গান হতো কিসব যেন where is pumpkin where is pumpkin. etc etc etc, ড্রয়িং ক্লাসে ঐ ওকানল দিদিমনি একটা খরগোসের আউটলাইন দিয়ে রং করতে বল্ল আর আমি একটা গাঢ় নীল রং পেন্সিল দিয়ে খরগোশটাকে নীল বর্ণ করে দিলাম| এ নিয়ে পরে বাড়িতে প্রচুর হাসাহাসি খ্যাপানো হয়েছে কিন্তু ঐ হাসিমুখ দিদিমনি কিন্তু রাগ করেননি | মিষ্টি হেসে লাল পেন্সিল দিয়ে খরগোশটার একটা চোখ এঁকে দিলেন‚ মানে চক্ষুদান করলেন আর কি| অবস্থাবিপর্যয়ে মা একাই আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে চলে এলেন কলকাতায়| জীবন থেমে থাকতে দেয়্না| তাই আবার শুরু হলো তার যাত্রা| সে অন্য কথা| আজকের কথা আমার স্কুল নিয়ে| আবার স্কুলে ভর্তি হলাম| বিদ্যে বুদ্ধি তো কিছুই নেই| বাংলায় বিষণ্ণ ষণ্ণবতি আর ইংরিজিতে CAT BAT FAT| অঙ্কের কথা আর না বলাই ভাল| তবুও ভর্তি হলাম | ছোট নতুন স্কুল| কেজি থেকে ক্লাস থ্রী| এই স্কুলের স্মৃতি বেশ মধুর| বড় দিদিমণি আর মেট্রন মাসিমা স্কুল চালাতেন| তাঁরা ও অন্য দিদিরাও খুব স্নেহময়ী ছিলেন| একটা মজার কথা মনে পড়লো আমাকে বোধ হয় ক্লাস ওয়ানে নিয়েছিল আমার বিদ্যে বুদ্ধির তল না পেয়ে| মাস দুই পরে বড়দি বল্লেন মাকে আসতে বলবে‚ বই কিনতে হবে আর কাল থেকে তুমি অন্য ঘরে বসবে| শুনেই মা রেগে গেল আবার বই? এই তো সবে বই কেনা হলো| পরে জানা গেল আমাকে ক্লাস টু তে উন্নীত করা হয়েছে| সে যে ক্লাসেই পড়ি না কেন স্কুলে বেশ আনন্দ ছিল| কোনোদিন হয়তো পড়াতে এসে দিদিমণি বল্লো‚ চলো আজ আর পড়ে কাজ নেই আমরা সবাই চিড়িয়াখানায় যাই| কোন দিন পোস্ট অফিস এর প্রজেক্ট তো কোনদিন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর গল্প অভিনয় করা| .. তা এই আনন্দের দিন বেশিদিন টিঁকল না| কারণ ক্লাস থ্রী ও শেষ হয়ে গেল| এবার অন্য স্কুল| সেই অন্য স্কুলটির প্রথমদিকের কথা ভাবলেই হৃৎকম্প হয়| আসলে সেটা ছিল সত্যি সত্যি স্কুল ‚ বড়দিদিমণির খেলাঘর নয়| দুটো নাম শুনলেই বোঝা যাবে তফাৎটা| সেটা ছিল Children's Sweet Home কিরকম কানে সুধা ঢালে ‚ তাই না? আর এটি হলো St. John's Diocesan Girls' High School| ওরে বাবারে !!!! প্রথম তো অ্যাডমিশন টেস্ট | প্রশ্নই বুঝিনি তো উত্তর কি লিখব? কিন্তু নিয়ে নিল আমায়| বোধহয় অনেক সিট খালি ছিল ওদের| ক্লাস শুরু হলো| অনেক বিষয়‚ প্রতি বিষয়ে দুটো করে খাতা‚ প্রতি সপ্তাহে টেস্ট‚ প্রতি মাসে রিপোর্ট‚ আর দিদিমণি নয় সবাই মিস অমুক | |মিসেস তমুক | যদিও তারা বাংলাই বলতেন| আর একবারেই স্নেহময়ী ছিলেন না| কিছু না পারলে খুব বকুনি দিতেন| কারণটা পরে বুঝেছিলাম ‚ সেকথা এখানে নয়| স্কুল বাস নিয়েও একটা ঝামেলায় পড়েছিলাম দুটো বাস ছিল ঠিক একরকম দেখতে| কিন্তু তাদের নাম বড় বাস আর ছোট বাস| আমকে উঠতে হবে ছোট বাসে| কিন্তু চিনবো কি করে? সাহায্য টাহায্য কেউ করতো না| শেষে বাসের নম্বরটা মুখস্থ করে ফেল্লাম| আর অসুবিধা হয়নি| বেশ সময় লেগেছিল এই স্কুলে অভ্যস্ত হতে মনে আছে| তাই তখন শুক্রবার এলে আনন্দ হতো আর রবিবার সন্ধ্যা ছিল নিরানন্দ| আবার সেটাই কেমন উল্টে গেল উঁচু ক্লাসে উঠে যখন স্কুলটা হল আড্ডার জায়গা আর বাড়িটা তখনকার ভাষায় বড়ই বোরিং!!! তাই স্কুলের শেষ ৪ / ৫ বছর কেটেছে মহানন্দে| আড্ডা মেরে‚ টীচারদের নিয়ে মজা করে‚ স্কুলের উল্টোদিকের ফুটপাথে ফুচকা খেয়ে| সিনিয়ার স্কুলের শিক্ষয়িত্রীরা বেশ সহানুভূতিশীল ছিলেন‚ যদিও সেলাই ‚ আঁকা আর অঙ্ক ক্লাসের বিভীষিকাটা থেকেই গিয়েছিল| সে তিনটে যখন পার হয়ে গেল তখন কি আনন্দ আকাশে বাতাসে| ঘরে বাইরে হাজার বাধা নিষেধ মেনেও কি করে এত আনন্দে কেটেছিল তাই এখন ভাবি| ৪০ বছার পরে আবার কলকাতায় তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে কি ভাল যে লাগলো| এখনো যখন যাই তাদের সাথে দেখা করি| একটানা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন যাদের সাথে ওঠাবসা ‚ বা যদের সঙ্গে একসাথে বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে ওঠা তাদের পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতার কোন তুলনা নেই| সেটা বোধহয় আজীবন রয়ে যায় {/x2} {x1i}pjimage.jpg{/x1i}

194

7

মনোজ ভট্টাচার্য

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের একটা দিন !

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের একটা দিন ! সত্তরের দশকের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলির কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে আছে ! একদিকে যেমন স্বৈরাচারের অবিশ্রান্ত অত্যাচার , অন্যদিকে নকশালপন্থীদের হঠকারিতায় কংশালের জন্ম ! তারই মধ্যে বিশেষকরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে ! আমরা সেই সময়ে চিনা ভাষা শেখবার জন্যে সন্ধের ক্লাশে ভর্তি হয়েছি ও সপ্তাহে চারদিন অফিশের পরে আসতে হচ্ছে । আর যথারীতি কফি হাউসে খানিক আড্ডা মেরে ফেরা হত। - যেহেতু দিনের বেলায় আসা হত না – তাই দিনের বিশৃঙ্খলার ব্যাপার দেখার সুযোগ হত না । একদিন আচমকা একটা ঘটনা চাক্ষুষ করলাম । - আমরা বসতাম কিচেনের সামনে পার্টিশানের পাশেই । কোথা থেকে একটা কাঁটা চামচ উড়ে এসে এক বয়স্ক কর্মীর গায়ে লেগে আমাদের টেবিলের পাশেই পড়লো । আর উড়ে আসতে লাগলো – কিছু বাছা গালাগাল । হঠাৎ আমাদের পাশের টেবিলে বসা এক দীর্ঘকায় লোক উঠে দাঁড়িয়ে – কে মারল রে ! বলে চেচিয়ে উঠল । আমরাও উঠে পড়েছি । দেবুদা, তুমি এর মধ্যে নাক গলিও না ! এটা আমাদের ব্যাপার ! – একটু ভেতরের দিক থেকে কটা কম বয়েসী ছেলে তেরিয়া হয়ে খুব অসংযতভাবে দাঁড়িয়ে উঠেছে ! তাহলে ইনিই দেবুদা ! এনার কোথা শুনেছি বটে । কিন্তু চিনতাম না । ইনি একজন নামকরা শিল্পী ! কিন্তু তাঁর চেয়েও বড় – ইনি এখানে অনেক উপকার করেন ও বিপদে আপদে সবার পাশে এসে দাঁড়ান । দেবুদা সোজা গিয়ে সেই ছেলেগুলোর সামনে দাঁড়াল ও যে ছেলেটি বলেছিল – তাঁর কলার ধরে জিগ্যেস করলো – তোর কি ব্যাপার আছে – বল আমাকে । এইটুকু ছেলে । গলা টিপলে দুধ বেরয় । তোর বাপের বয়েসী লোককে চামচে ছুঁড়ছিস – গালাগাল দিচ্ছিস ? কখন থেকে কাটলেট অর্ডার দিয়েছি – শুনছেই না ! – শালা আমাদের ইগনোর করছে । তখনো তার কলার দেবুদার হাতে । সেটা ছাড়াবার চেষ্টা করছে । - দেবুদা এটা ভালো হবে না বলছি । আমার কলার ছেড়ে দাও । একে দেবুদার বেশ বড় সড় চেহারা, তায় আমরা সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে । অন্য ছেলেরা একেবারে চুপসে গেছে । তুই কি তোর বাবার সঙ্গে গাল দিয়ে কোথা বলিস ? রহমতকাকা তোর বাপের চেয়েও বড় – তা জানিস । এইভাবে কথা কাটাকাটি হবার মাঝেই হঠাৎ একটা ছেলের হাতে ফট করে একটা ছোরা দেখা গেল । সবাই একটু পিছিয়ে গেল । - কিন্তু দেবুদা খুব তাড়াতাড়ি ছেলেটির কনুই ধরে ফেলল । ও চেঁচিয়ে বলল – ম্যানেজার, পুলিশ ডাকো তো ! – এখানে এরা মাস্তানি দেখাচ্ছে – ছুরি নিয়ে ! এদের এখানে আসা আমি বন্ধ করছি ! – আগের ছেলেটি মিইয়ে গেছে ও চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে । আর ছুরি হাতে ছেলেটিও হাত নাড়তে পারছে না । বেশ খানিক্ষণ এরকম চলছিল । তারই মধ্যে কেউ বলে উঠল – দেবুদা ওদের ছেড়ে দাও । কোথাকার চ্যাংরা এখানে এসেছে । শুধু সময় নষ্ট ! দেবুদা আগের ছেলেটাকে বলল – ক্ষমা চা রহমতকাকার কাছে ! চাপাচাপিতে ছেলেটা রহমতচাচার দিকে তাকিয়ে ক্ষমার মতো করে দাঁড়াল । তারপর ওদের ছেড়ে দেওয়া হোল ! তখন সাড়ে নটা বেজে গেছে – কফি হাউস বন্ধ হবার সময়ও হয়ে গেছে । আজ কেন – পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এসব মনে পড়ছে ! – কারন আজকাল পত্রিকার শারদ সংখ্যায় দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের শতবার্ষিকী উপলক্ষে দুটো প্রবন্ধ বের হয়েছে ! সঞ্জয় ঘোষের – যে আগ্নেয়গিরি বিষাদকেও জানে । আর কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের – এক দুঃসাহসী ছবিপুরুষ । তাঁর দুঃসাহসের কথা লেখা হয়েছে ! সেদিনকার সেই দুর্জয় সাহসের কথা এতদিন পরে লিখতে পেরে নিজেকে ঋণমুক্ত মনে হচ্ছে ! – তাঁর সঙ্গে আমার কোন পরিচয় নেই । - কিন্তু পরিচয় তো কেবল তার কাজেই ব্যক্ত হয় ! মনোজ

116

5

Joy

শীতের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা...

চতুর্থ পর্ব: সন্ধ্যে হলেই আমাদের বাড়িতে তাস না হলে দাবা খেলার আসর বসত| মামার বন্ধুরা আসত| সঙ্গে চলত চায়ের আসর| লন্ঠন বা হ্যাজাকের আলোতে আলোকিত হত চারিদিক| দূরের কোন বাড়ি থেকে ভেসে আসে রেডিওতে গানের সুর| সেই এক শীতের বিকেলে অভিদার সঙ্গে আলাপ| অভিদারা মায়ের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়| ওরা থাকত কান্দীর কাছে এক জায়গায়| শীতকালে ওরা আসে এখানে| ওদের জমির ধান তুলতে| অভিদা ব্যায়াম করত| আমাকে কিছু ব্যায়ামের টিপস দিয়েছিল| একদিন ওর সঙ্গে বাড়িতে না বলে ভিডিও দেখতে গিয়েছিলাম| চট‚ ত্রিপল দিয়ে মাঠ ঘিরে দিয়ে ওখানে ভিডিও দেখানো হত| কলকাতাতে যে সিনেমাটা অনেক দিন আগে রিলিজ করে চলে গেছে| এখানে সেই সিনেমাটা ভিডিও পার্লারে রম-রম করে চলছে| রাত হয়ে গিয়েছিল| সেদিনও বাড়িতে বকা খাওয়ার ভয় ছিল| কিন্তু অভিদার সঙ্গে গিয়েছিলাম বলাতে রক্ষা পেয়েছিলাম| তারপর অভিদার সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়| শুভদাও আমার এক দূর সম্পর্কের দাদা| শুভদার বাবা খুব নামকরা ডাক্তার ছিলেন| Alopathy ডাক্তার তবুও গ্রামেই প্র্যাকটিস করতেন| শহরে ভালো সুযোগ পেলেও উনি শহরে যেতে চাননি| গ্রামের গরীব লোকেদের খুবই কম টাকায় চিকিৎসা করতেন| পারুলিয়া ও আশ-পাশের গ্রাম থেকে বহু রোগী আসতেন| কিন্তু খুব মেজাজী ছিলেন| একটাই সমস্যা ছিল কারও বাড়ী যেতেন না উনি| আমাকে খুব ভালোবাসতেন| আমরা মামা বলতাম| ওদের বাড়ী ওপাড়ায়| আমার বাড়ী ছিল এ পাড়ায়| ওপাড়ায় মা ক্ষেপীর মন্দির ছিল| মা ক্ষেপী খুব জাগ্রত| মা ক্ষেপীর বিগ্রহ অষ্ট ধাতুর গড়া| মন্দিরের গা ঘেঁষেই ডাক্তার মামার চেম্বার| শরীর খারাপ হলে মা আমাদের নিয়ে যেতেন দেখাতে| ডাক্তার মামা মাকে দেখলেই বলতেন অঞ্জলি তুই কতদিন এসেছিস আর আমাদের বাড়ী আসিস নি| তোর বৌদি খুব রাগ করে আছে| মা বলেন হ্যাঁ দাদা আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা না করে কলকাতা চলে যাব ভাববেন না| আসব একদিন| একদিন বিকেলে মা ও আমরা যেতাম ডাক্তার মামার বাড়ী| বড় বাড়ি| ওদের বাড়ীর উঠোনের শেষ প্রান্ত স্পর্শ করছে মা ক্ষেপীর মন্দির প্রাঙ্গন| মন্দিরটা খুব বড় জায়গা নিয়ে| অনেকটা ফাঁকা জায়গা| এখানে কীর্তন বা অনুষ্ঠান হয়| মন্দিরের উত্তর-পূর্ব দিকে বিরাট বাড়ি| রায় চৌধুরীদের বাড়ি| তিনতলা পাকা বাড়ি| রায় চৌধুরী বাড়ির সবাই খুব শিক্ষিত| কেউ কলকাতায়‚ কেউ ধানবাদ ও অন্য শহরে বড় চাকরি করতেন| বৃদ্ধা মা একাই এখানে থাকেন| মা ক্ষেপীর সেবা করেন| পশ্চিম দিকে সেন দের বাড়ি| এটাও দো-তলা বাড়ি| বাড়িতে খুব বড় একটা ইঁদারা ছিল| ডাক্তার মামার বাড়িতে চওড়া উঠোনের মাঝে মস্ত ধানের গোলা| এখন সব বাড়িতেই মাঠ থেকে ধান তুলে আনা হচ্ছে| ধান ঝাড়াই‚ ধান মাড়াই| সবাই ব্যস্ত| ডাক্তার মামার এক ছেলে শুভদা| আর মেয়ে শান্তনা দিদি| শুভদা বয়সে আমাদের থেকে অনেক বড় হলেও আমাদের খুব প্রিয় ছিল| শুভদা‚ অভিদার সথে আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে আমাদের বাড়িতে ছাড় ছিল| শুভদা বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করত| শীতের ছুটিতে বাড়ি আসত| শুভদা একটু রিজার্ভ| শুভদার সঙ্গে সব কথা শেয়ার করা যেত না| অভিদা প্রাণখোলা| মজাদার মানুষ| শীতের বিকেলে আমরা মাঝে মাঝে ক্রিকেট খেলতাম| কারও বাগানে বা ধান তোলা এবড়ো-খেবড়ো মাঠে| বাপন‚ পিতন‚ শুভদা‚ অভিদা‚ আমরা আর উদয়‚ আশীষরা| এই ভাবেই কেটে যেত আমাদের শীতের ছুটি| একবার আমাদের কলকাতার বাড়ি এসেছিল অভিদা| তার আগে মাঝে আমি কয়েক বছর পারুলিয়া যাই নি| অভিদার সঙ্গে চিঠিতে রাগারাগি| একদিন আমাদের সল্টলেকের কোয়ার্টারে অভিদা হাজির| তখন আমরা বৈশাখীতে থাকি| ও মুর্শিদাবাদী সিল্কের ব্যব্সা করে| ব্যব্সা খুব ভালো না| কিন্তু চেষ্টা করছে তখন ও| সঙ্গে শুভদা| অভিদা আমার সঙ্গে কথা বলছে না| বা বললেও অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলছে| আরে যাব রে অভিদা| পড়াশোনার চাপ থাকার জন্যে পারুলিয়া যেতে পারিনি| অভিদা বলে তুই জানিস তো তুই না গেলে ভালো লাগে না| মজা‚ দুষ্টুমি‚ অনেক গোপন কথা আমাদের মধ্যেই থাকত| হ্যাঁ পরের বার যাব| চিন্তা করিস না| আবার মজা হবে| আর তুই শুভদার সঙ্গে মাঝে মাঝে এখানে চলে আসবি| শুভদার বোন শান্তনা দিদির বিয়ে হয়েছিল কলকাতার পাইক পাড়ায়| তা ছাড়াও ওদের অনেক আত্মীয় কলকাতায় থাকত| ফলে শুভদার এখনে আসা যাওয়া ছিল| অভিদা রেগে আমাকে বলল‚ তুই পারুলিয়া না গেলে আমি আর এখানে আসব না| তোর সাথে কথাও বলব না কোনদিন| শুভদা আর অভিদাই আমাদের সঙ্গে পারুলিয়ার যোগসূত্র রচনা করত| চলত চিঠি লেখালিখি| আর মাঝে মাঝে ফোন| পরের বারও যেতে পারিনি পারুলিয়া| অভিদার ব্যবসা ভাল চলছিল না| ওর মায়ের সঙ্গে কিছু ব্যাপারে অভিদার মনোমালিন্য হয়| একদিন সকালে বাপনের ফোন এল| অভিদা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে| বেশ কিছুদিন ধরেই ও নিরাশায় ভুগছিল| আমাকে কোনদিন জানতে দেয়নি| কিছু বলেও নি| আমি কথা রাখতে পারিনি| কিন্তু অভিদা ওর কথা রেখেছিল| শীত আসে শীত যায়| সোনালী ধান ক্ষেত| গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শীর্ণকায়া নদীটি| পড়্ন্ত বিকেলের কমলা রঙের মায়াবী আলো| জমির মাঝখান দিয়ে অসমান ভাবে শুয়ে থাকা আলপথ‚ সব ছেড়ে অভিদা চলে গেছে দূর অনন্ত মাঝে|

287

14

দীপঙ্কর বসু

সালতামামি ২০১৮

জন্ম বেহিসেবি আমি। জীবনের চলার পথে কবে কোথায় কি পেয়েছি ,কি খুইয়েছি তার হিসেব করিনি কোনদিন।ভালো করেছি কি মন্দ ,তা জানিনা ।শুধু জানি আমি আনন্দে বেঁচেছি । তবু ঝিনুক দিদিমনি যখন বলছেন তখন দেখি একবার চেষ্টা করে এ বছরের জমাখরচের হিসেবটা মেলান যায় কি না । ছোট বড় লোকসান কিছু কিছু হয়েছে বটে- কিন্তু সে লোকসানের দরুণ হাহুতাশের বোঝা অনর্থক বয়ে বেড়িয়ে কি লাভ?জীবনের পথে হাল্কা হয়ে চলাই শ্রেয় – যা গেছে তা যাক।বরং যা পেয়েছি তার কথাই বলি । এ বছরের সবচাইতে বড় প্রাপ্তি আমার যা হয়েছে তা হল শিবাজির(শিবাংশু দে)দৌলতে আমার প্রথম যৌবনের এক অনুরাগী বন্ধুর সঙ্গে প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল বাদে নতুন করে যোগাযোগ এবং তারই সূত্র ধরে প্রায় ভুলে যাওয়া স্কুল কলেজের সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে পুনর্মিলন ।ঘটনাটা আমার হালের ঢিমেতেতালে গড়িয়ে চলা জীবনে শুধু যে নতুন করে গতির সঞ্চার করেছে,তাই নয় – আমার সমগ্রজীবনের জমাখরচের খাতায় একটা খুব বড় অঙ্কের লাভ আমার চোখের সামনে তুলে ধরেছে। নিজের একটা পরিচয় এর সন্ধান আমি পেয়েছি ।আজ মনে হচ্ছে – জীবন হয়নি ফাঁকি , ফলে ফুলে ছিল ঢাকি, যদি কিছু রহে বাকি কে তাহা লবে” রবীন্দ্রনাথের গান - যা প্রায় শৈশব কাল থেকে আমার একটা প্যাশন, তাকে একটি সন্তোষজনক পরিণতিতে পৌছে দিতে পেরেছি।এই বোধ আমার কাছে পরম তৃপ্তিদায়ক।দেশ বিদেশের বহু রবীন্দ্রসংগীতপ্রেমী মানুষের প্রতিক্রিয়া পড়ে প্রত্যয় জেগেছে যে আমার গাওয়া গান বিশাল সংখ্যক শ্রোতাকে না হোক কিছু কিছু সংবেদনশীল মানুষের অন্তর স্পর্শ করতে পেরেছে । এটা খুব কম প্রাপ্তি নয় । এ কালের কলকাতার এক জনপ্রিয় শিল্পী ইউটিউবে আমার গান শুনে লিখেছেন –“কতশিল্পীর নাম শুনিনি ,গান শুনিনি ।আমাদের আলোকিত পৃথিবী থেকে একটু তফাতেই হয়তো ওরা থাকেন।কিম্বা হয়ত জীবনই তাঁদের তফাতে রেখে দেয়।কিন্তু কী আত্মনিমগ্ন গায়নে তাঁরা গান গেয়ে যান এই আলোহাওয়া রোদের পৃথিবীতে ।...হায়, আমি জানিনা তিনি কোথায় থাকেন,কী তাঁর পরিচয় ।কিন্তু তাঁর মগ্ন গায়নে রইল আমার অন্তরের শ্রদ্ধা”। শেষ হয়ে আসা এই বছরের আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমার আকস্মিক অসুস্থতা ।হাসপাতালের বিছানায় শায়িত অবস্থায় এক এক সময়ে মনে হয়েছিল আমার “শেষের সে দিন” বুঝি সমাগত ।(বস্তুত সেই সময়েই এক রাতে আমার পাশের বেডের এক বৃদ্ধ আমারই মত প্রবল শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে করতে এক সময় নিথর হয়ে গেলেন ।)জীবনের সেই সঙ্কট এর মধ্যে থেকে আমাকে উদ্ধার করে আনল আমার নিজের পরিবারের সদস্যরা – বিশেষ করে ছেলের গভীর উদ্বেগ, বহু পরিচিত স্বল্পপরিচিত মানুষের দিবারাত্রের খবরাখবর নেওয়া, মঙ্গলকামনার কথা কী ভোলা যায় ?

125

5

মানব

গোয়েন্দারাজ গোবিন্দরায়

কহে রাজা, ‘ভূত টুত কোনদিন দেখেছ’ কি মন্ত্রী? দেখে থাকো যদি তবে বলে ফেলো তাড়াতাড়ি।’ মন্ত্রী বলেন, ‘রাজা, শুন তবে মন দিয়ে, এককালে ভুতেদের ফেরাতাম কাঁদিয়ে। তুমি রাজা দেখোনিতো সেসবের ছিটেফোঁটা শুধু শুধু দিয়ে যাও ভূত নিয়ে মোরে খোঁটা।’ রাজা বলে, ‘শুধু শুধু দিইনাতো গালি আমি, করতে চাও তুমি আমায় বিপথগামী? বিজ্ঞানের যুগ ভায়া ভূত বলে নাই কিছু, চোরেতেই করে চুরি বাগানের যত লিচু।’ এই শুনে মন্ত্রী চুপ করে চোখ বুজে ধ্যানেতে বসলেন দুই কানে তুলো গুঁজে। পাঠ করলেন কত অদ্ভুত মন্ত্র, ঝোলা থেকে বেরোল যত আজব যন্ত্র। ‘এইবার দেখো রাজা, পালাবে ভূত যত, কাল থেকে দেখব, খেতে পারো লিচু কত।’ রাজা বলে লিচু যদি কাল থেকে খেতে পাই, আমার চরণে তব চিরদিন রবে ঠাঁই। তার সাথে পাবে তুমি যত চাও বখশিশ নিজের দুঃখের দিন করবেই তুমি মিস, না যদি বাঁচে লিচু যাবে তব গর্দান দুপুরেই গাবে তুমি বেলাশেষের গান। পরদিন থেকে আর হল নাকো লিচু চুরি সেজে ওঠে গাছে গাছে লালরঙা সুন্দরী রাজা খুশী মনে মনে খুশী হল প্রজা সব মন্ত্রীমশাই শুধু রইলেন নীরব। এহেন আচরণে সন্দিহান রাজা নিযুক্ত করলেন চারজন খাস প্রজা। কী করে মন্ত্রী, সভার কাজ সেরে? ভাতঘুম দেয় নাকি এপথ সেপথে ফেরে? প্রজারাও পাহারায় সাধারণ পোষাকে দিনরাত মন্ত্রীকে নজরে নজরে রাখে। একদিন দুদিন গেল তৃতীয় দিন লিচু চুরি হল ফের, সমাধান কঠিন। ‘লিচুর বাগানে তবে পাহারা দিন' এই বলে ওঠে যেই জনৈক দীন, রে রে করে তেড়ে আসে সভাসদ গণ, ‘আমরা তো আছি নাকি! কে তুমি ঘোতন!’ মাথা খাটিয়ে রাজা ভাবলেন ভাল করে, চোরের পিছনেই তিনি শুধু শুধু ধাওয়া করে অপব্যয় করেছেন লিচু এবং অনেকটা সময় লিচুকেই পাহারায় রাখলে কেমন হয়! চুপি চুপি তাই তিনি মন্ত্রীর বাড়ি ছেড়ে, বাগানেতে পাঠালেন চারজন প্রহরীরে। ********************** গমগমে রাজসভা, আজ হবে সমাধান কে খালি করে দেয় রাজার বাগান। সেকি শুধু ভূত নাকি রাজার খাস লোক যে ঘটায় রাজার মনমাঝে লিচুশোক! গলা খাঁকারি সাথে শুরু হল রাজকাজ একটা হেস্তনেস্ত হবেই হবে আজ। অবশেষে এল সেই ঘোষণার ক্ষণ শুরু হল কাহিনী, শোনে সভা-জন। ‘যেদিন লিচুচুরি প্রথম হল বন্ধ সেদিনই লেগেছিল আমার মনে ধন্দ। মন্ত্রীর বৌয়ের কানে খবরটা গেল যেই, দড়ি দিয়ে খাটে বেঁধে মন্ত্রীকে রাখে সেই। ঘুমের ঘোরে চলা মন্ত্রীর চোরা লিচু বেচে দিয়ে খেয়ে নিয়ে রোজগার হত কিছু। যেই শুনলেন তিনি বকশিশের কথা ভাবলেন বেঁধে রেখে ঘোচাবেন অর্থ-ব্যাথা। কিন্তু অঘটন ঘটালেন মালী, ভূত গেছে নিশ্চয়ই এবার রাস্তা খালি! এই ভেবে ঝেড়ে দেন লোভে পড়ে একদিন বুঝলেন এরোগের চিকিৎসা কঠিন। অতএব পরদিনও এলেন যেই হাতেনাতে ধরা পরে গেলেন সেই।' এতেক বলে রাজা ফেলেন দীর্ঘশ্বাস করবেন না তিনি আর কারেও বিশ্বাস এবং সিদ্ধান্ত নিলেন আরেক খানা যুগান্তকারী বলতে তা করবেনা কেউ মানা। এবার কড়া হবে দ্রব্যের প্রহরা তাহলেই চোরকে আর করতে হবেনা তাড়া।

90

4

Stuti Biswas

মোলায়েম ঠাণ্ডার পাহাড়

পাহাড় ,সবুজ আর মোলায়েম ঠাণ্ডার দেশ ল্যান্সডাউন। ছকেবাধা জীবন , শহরের যান্ত্রিকতা ও কোলাহল থেকে ছুটি নিয়ে স্নিগ্ধ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে কাটিয়ে দিলাম কয়েকটা দিন । <তথাকথিত শৈলশহরগুলির মধ্যে ল্যান্সডাউনের জায়গা নেই । কিন্তু পাহাড়ের সবুজ , নিরিবিলি , স্তব্ধতা উপভোগ করতে চাইলে ল্যান্সডাউনের জুড়ি নেই । শনিবার সকাল সকাল তল্পিতল্পা গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ল্যান্সডাউনের উদ্দেশ্যে । দিল্লি থেকে দূরত্ব মাত্র ২৫০ কিমি । রাস্তা বেশ ভাল । দিল্লী থেকে মোদীপুরম অবধি ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল । তারপরে জনবসতি কম। শুরু হল প্রকৃতির অনন্য বিস্ময় । বিস্ময় কে আবিস্কার করতে আমরাও চলেছি । প্রথমেই দেখা হল আকাশের দিকে সঙিন উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার সৈন্যের - মাঠের পর মাঠ আখের ক্ষেত । কোথাও ক্ষেতে আখ কাটা হচ্ছে । কোথাও ট্র্যাক্টরে আখ বোঝাই চলছে। এখুনি ছুটবে চিনিকলের উদ্দেশ্যে । আমাদের গাড়ীও ছুটছে দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে দ্রুত । রাস্তার দুই ধারে বড় বড় গাছ । মাইলের পর মাইল আম বাগান ।শীতের শেষে পাতার ফাঁকে মুকুল দেখা দেবে । সকালে চা খেয়ে বেড়িয়ে ছিলাম । খিদে অনুভব করতেই দাঁড়িয়ে পড়লাম চিতল রেঁস্তোরায় । প্রাতঃরাশ সাঙ্গ করে আবার পথে নামা। এবার সৈন্যসামন্তদের তেমন দেখা মিলল না। চোখ ধাঁধিয়ে গেল হলুদের ঝলসানিতে । বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সরষে ফুলের মন মাতানো গন্ধ । ঝমঝম করে পাড় হলাম বিজনোরের গঙ্গা ব্যারেজ । গঙ্গাপাড়ের মানুষ আমি । আজকাল কালেভদ্রে তার সাথে দেখা হয় । শিশিরে ভেজা মেঠো পথ । দূরে দূরে চিনির কল । কলের মাঠে আখ বোঝাই ট্র্যাক্টরের লাইন । মেশিনের ঘড়ঘর ...। সকালের আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠা ছোটছোট জনপদ দেখতে দেখতে কখন যে পৌঁছে গেলাম কোট দ্বার বুঝতেই পারলাম না । কোটদ্বার বেশ বড় জায়গা বাজারের মধ্যে একটু জ্যামে পড়তে হল ।এখান থেকে পাহাড়ী রাস্তা ।খানিকটা এগতেই দেখি রাস্তায় বেশ ভিড় । শুনলাম সামনের দুর্গা দেবীর মন্দির । দর্শনে চলেছে ভক্তের দল । আমি তো সৃষ্টি ছাড়া ... ভগবানকে মাথায় রেখে এগিয়ে চললাম প্রকৃতির টানে । চড়াই উতরাই পথের প্রথম বাঁকে আমাদের স্বাগত জানাল খো - তিরতিরে ঠান্ডা জলের পাহাড়ী নদী । নদীর ওপারে জঙ্গল । তারপরই কালচে সবুজ পাহাড় ।পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আকাশটা । দূরে পাহাড়গুলোর সোনা রঙের চূড়া দেখা যাচ্ছে । আমাদের সাথী খো পাথর ডিঙ্গিয়ে আগে আগে ছুটল পথ দেখিয়ে । পেছন পেছন আঁকাবাঁকা পথে আমরা নালা পেরিয়ে খানা ডিঙ্গিয়ে চলছি । দেখতে দেখতে এসে গেল ছোট্ট জনপদ দুগদা - অল্প জনবসতি ।সকালের বাজারে কেনাকাটা চলছে । দুগডা থেকে রাস্তা দুইভাগ হয়ে গেছে । জাতীয় সড়ক ৫৩৪ চলে গেছে পৌড়ী । আমরা নিলাম ল্যান্সডাউনের রাস্তা । জাতীয় সড়ক দিয়ে গুমখল হয়ে ল্যান্সডাউন যাওয়া যায় । রাস্তাটি বেশ ভাল ও চওড়া । আমরা জানতাম না । রোড সাইন দেখে গেলাম ল্যান্সডাউনের রাস্তা্য়। এই রাস্তাও ভাল তবে অত চওড়া নয় । উত্তরাখণ্ডের পৌড়ী গাড়োয়ালের ছোট্ট শহর ল্যান্সডাউন । ছিমছাম, নির্জন । মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চল । পর্যটকদের ঢল নামে না এখানে । যেখানেসেখানে ব্যাঙের ছাতার মত হোটেল গজিয়ে ওঠে নি । নিরিবিলিতে হিমালয় উপভোগ করার আদর্শ জায়গা । আমাদের রিসোর্ট শহর থেকে ১০ কিমি দূরে ছোট্ট গ্রাম জয়হরিখল এ । একদিকে পাহাড় অন্যদিকে গভীর খাদ । গাড়ীর জানলা দিয়ে আসা মিঠে রোদ মেখে আচমকা ঢুকে পরছিলাম অন্ধকার স্যাতস্যাতে পরিবেশে । গায়ের ওপর এসে পড়ে মস, ফার্নের ঝোপ । লম্বা লম্বা শতাব্দী প্রাচীন গাছের আড়াল নিচ্ছিল সূরয। এইভাবেই পথ পেরিয়ে প্রধান সড়ক থেকে বেশ কিছুটা কাঁচা রাস্তা দিয়ে নিচুতে রিসোর্টে পৌছাতে দুপুর গড়িয়ে গেল । রিসোর্টটি বেশ সুন্দর -কোনকালে এক সাহেবের বাংলো ছিল । অনেকখানি জায়গা জুড়ে বাগান আর বেশ ছড়ানো ছিটান । নিচে পাহাড়ের ঢালে অ্যাক্টিভিটি র বন্দোবস্ত আছে । একটু উঁচুতে সারিবদ্ধ কটেজ । কটেজে গিয়ে জামা কাপড় ছেড়ে হাত পা ধুয়ে নিলাম ।বারান্দায় বেতের সোফায় গা এলিয়ে গরম গরম পকোড়া আর চা খেতে খেতেই দেখি সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে । সামনের গাছে গাছে কিচিরমিচির.........জায়গা দখলের লড়াই চলছে। সন্ধ্যের ধূসর ছায়া নামছে । দূরে পাহাড়ে জোনাকীর মত জ্বলে উঠছে দু একটা বাতি । লনে আগুন জ্বেলে দিয়ে গেল একটী ছেলে । আগুন পোহাতে পোহাতে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার রাতের মায়াবী রুপ দেখতে লাগলাম । এ এক অন্য ধরণের উপলব্ধি । সকালে ঘুম ভাঙল টীয়া পাখির টি টি ডাকে । বাইরে দেখি সামনের দেবদারু গাছে এক ঝাঁক টিয়া উড়ে বেরাচ্ছে । বারান্দার রেলিং থেকে উঁকিঝুকি মারছে লম্বা লেজওলা এক অচেনা পাখি -নতুন অতিথিদের খবর নেবার খুবই তারা তার । আমায় দেখেই ডানা ঝপটে পাইন গাছের মাথায় গিয়ে বসল । নাম না জানা পাখিরা নেচে বেড়াচ্ছে লনে ...এ যেন কোকিল গুরুর তত্ত্বাবধানে পাখিদের পাঠশালা চলছে । রিসোর্টটা ভাল করে ঘুরে দেখলাম ।। সামনে সুবিস্তীর্ণ প্রান্তর ।উঁচু গাছপালা সূর্যদেবের আত্মপ্রকাশের পথকে অবরুদ্ধ করতে পারে নি । সকালের স্নিগ্ধতা আর সূর্যালোক মিলিয়ে এক দুরলভ মাধুর্য প্রকৃতিদেবী দুই হাতে বিলোতে শুরু করেছে । চা খেয়ে বেড়াতে বেড়লাম পায়ে হেঁটে । ছোট্ট বাজার নিত্য ব্যবহার্য জিনিষপত্রের কয়েকটি দোকান । পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে ছেলে মেয়েরা চলেছে স্কুলে ।ওদের অনাবিল হাসি , ব্যাগ টানাটানি ,এ কে অপরকে অকারনে ধাক্কা দেওয়া , ছোট ভাইবোনের হাত ধরে হাঁটা দেখে সেই ছোটবেলায় ফিরে ফিরে যাচ্ছিলাম । মোলায়েম রোদে হাঁটতে ভালই লাগছিল । ফেরার পথে দেখলাম স্কুলের ছাদ সোনালি রোদে ভরে গেছে । ক্লাস চলছে । ছাত্ররা চাদর পেতে মাটিতে বসেছে আর দিদিমণি টুলে । পুরাতন ধারায় পড়াশুনা চলছে । আমাদের দেখে শিক্ষিকা বই দিয়ে মুখ ঢেকে নিলেন । ব্রেকফাস্ট করে গাড়ী নিয়ে বেড়োনো হল । টিপ এন টপ ল্যান্সডাউনের সবচেয়ে উঁচু জায়গা । গাড়োয়াল বিকাশ নিগমের ক্যাফেটেরিয়ায় আছে । অবসারভেটারি ডেস্ক থেকে পাহাড় , জঙ্গলের অন্য এক রুপ ধরা দিল । দূরে পাহাড়ে ছবির মত ছোট ছোট গ্রাম । তুষারময় শৃঙ্গ । সবুজ পাহাড়ের প্রশান্তি । নীচে ভুল্লা তাল । ছোট্ট লেক । চারিধারে শীতের মরসুমী ফুলে সাজানো বাগান । লেকের ওপরে ছোট্ট লোহার পুল । বোটিংর বন্দোবস্ত আছে । সবই সেনাবাহিনী পরিচালিত বলে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি। ল্যান্সডাউন গাড়োয়াল রেজিমেন্টের হেডকোয়াটার । প্রাকৃতিক পরিবেশে ব্রিটিশ আমলের গির্জা , সেনা মিউজিয়াম এখানকার সৌন্দর্য আরও বাড়ীয়ে তুলেছে ।পরের দিন গেলেম গুমখল । এখানকার বাজার একটু বড় । শহুরে ভাষায় শপিং বলতে যা বোঝায় সেরকম কিছু পাওয়া যায় না । আমার একটূ মাটির সাথে প্রীতি বেশী তাই কিনে ফেললাম কয়েকধরনের পাহাড়ী ডাল , আদা । স্বাদ সত্যি আলাদা । প্রকৃতির কোলে কেটে গেল তিন দিন ।পাহাড়ের সৌন্দর্য অপরুপ । অনেকটা উপভোগ করলাম আবার পরে রইল অনেক কিছু । মন চায় না কিন্তু ফিরতেতো হবেই । পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে চললাম সমতলের পথে ।/

113

4

মনোজ ভট্টাচার্য

১৯১১ ও কিছু জাতীয়তাবাদী ঘটনা !

১৯১১ সালের মোহনবাগানের শীল্ড জয়ের প্রস্তুতি আসলে অনেকদিন আগেই শুরু হয়েছিল । "বাঙ্গালীর এই ফুটবল !" ১৮৭৮ সালে মায়ের সঙ্গে ময়দানের পাশ দিয়ে যাবার সময় নগেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারীর নজরে পড়ল সাহেবরা গোল মতো একটা জিনিষ নিয়ে খেলছে । একবার সেটা ছিটকে কাছে এসে পড়াতে – সাহেবরা চেঁচিয়ে ‘কিক ইট বয় – কিক ইট’! নগেন্দ্রনাথ কিছু না বুজেই একটা শট মারল । সেই প্রথম বাঙ্গালীদের ফুটবলে পা দেওয়া ! তারপর সেই নেশাতে ধর্মতলা থেকে একটা বল কিনে এনে হেয়ার স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলতে থাকে । সেটা আসলে রাগবি বল ! পরে প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক স্ট্যাক একটা ফুটবল কিনে এনে ভুল ভাঙ্গান । ও কিছুদিন পরে অধ্যাপক গুলিগান প্রশিক্ষণ দিয়ে খেলা শেখায় । এইভাবেই শুরু হয় ‘- - বাঙ্গালীর এই ফুটবল -’! ১৯৭৮ সালে সাহেবদের ‘ক্যালকাটা ট্রেডস অ্যাসোসিয়েশান’ গড়ে তোলে কলকাতার প্রাচীনতম ফুটবল ক্লাব – ‘ট্রেডস ক্লাব’ । পরে এরই নাম হয় ‘ডালহৌসি অ্যাথলেটিক ক্লাব’। এই ক্লাবটা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই খ্যাতনামা ‘ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবে’র জন্ম হয় ১৮৮৪ সালে । এদেরই উদ্যোগে ১৮৮৯ সাল থেকে শুরু হয় ‘ট্রেডস কাপ’ – আর সেটাই ভারতের প্রথম কোন ফুটবল প্রতিযোগিতা । - ইতিমধ্যে বাঙ্গালীদের মধ্যে ফুটবল খেলা শুরু হয়ে গেছে । ফুটবল মাঠে জাতীয়তাবাদের শুরু ! ১৮৮৪ সালে কলকাতায় চারটি ভারতীয় ক্লাবের জন্ম হয় – শোভাবাজার, টাউন, কুমারটুলি ও ন্যাশানাল । ন্যাশানাল ছাড়া বাঁকি তিনটি ক্লাবই ছিল্ উত্তর কলকাতার । এর মধ্যে শোভাবাজার ক্লাবই একমাত্র ভারতীয় ক্লাব – ‘ট্রেডস কাপ’এ অংশ নিতে পেরেছিল । এই শোভাবাজার ক্লাবই প্রথম একটি সাদা চামড়ার ফৌজি দলকে হারিয়ে দিয়েছিল ১৮৯২ সালে । - যেহেতু সেই সময়ে রাজনৈতিক আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছিল – ফলে ভারতীয় দলের এই জয় – বিরাট উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল । এর কিছুদিন পরেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডক্টর মন্মথ গাঙ্গুলির তৈরি ‘ন্যাশানাল ক্লাব’ ঘটালো এক যুগান্তকারী ঘটনা । ১৯০০ সালে ট্রেডস কাপ ফাইনালে তারা শিবপুর বি ই কলেজকে হারিয়ে ট্রেডস কাপ চ্যাম্পিয়ন হল । এই প্রথম একটা দেশীয় ক্লাব সাহেব-প্রধান খেলায় চ্যাম্পিয়ন হল ! এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে এক বিরাট উদ্দীপনার সৃষ্টি হল – ভারতীয় দলগুলির ভেতরে জাতীয়তাবাদী চেতনা পুরোপুরি গেড়ে বসল ! মাঠের খেলায় প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের শাসকের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে লাগলো । ১৯০২ সালের মার্চে তৈরি হোল বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’ । বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’! বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বয়কট, মিছিল, ব্যাপক ধরপাকড় ইত্যাদি, তারপর মানিকতলা বোমা-মামলা, ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসির প্রতিবাদে বিক্ষোভ আবার ১০ই নভেম্বর কানাইলালের ফাঁসি ও তাঁর দেহ নিয়ে বিরাট শোক মিছিল – এই সব উত্তাল ঘটনা - মিলিয়ে বিশ শতকের গোড়ার দিকে খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব পড়েছিল । ইতিমধ্যে একাধিক ভারতীয় দল গড়ে উঠেছে ও দাপটের সঙ্গে সাহেবদের সঙ্গে খেলছে ! এরই মধ্যে বেশ কিছু উত্তেজনাকর ঘটনা ফুটবল মাঠে ঘটেছে । ১৯০৪ সালে মোহনবাগানের সঙ্গে ডালহৌসির খেলায় – দাপুটে খেলোয়াড় বিজয়দাস ভাদুরি ল্যাং মেরে ফেলে দেন ডালহৌসির স্টুয়ার্টকে। স্টুয়ার্ট তখন উঠে নেটিভ বিজয়দাসের গলা টিপে ধরে । ব্যস, সারা মাঠে তখন ধুন্ধুমার কাণ্ড শুরু হয়ে যায় । দর্শকের মধ্যে থেকে ইট পাটকেল বোতল ইত্যাদি নিয়ে নেমে এলো। অপরদিকে পুলিশও প্রচণ্ড প্রহার ও গ্রেপ্তার করলো অনেককে । বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারি স্ট্রেইটফিল্ড মাঠে ছিল ও পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী । আই এফ এ ও পুলিশ কর্ত্রীপক্ষের কাছে সাক্ষ্য দেন - দোষ সম্পূর্ণ ডালহৌসির স্টুয়ার্টের – খেলার মধ্যে তার মোটেই ওভাবে গলা টিপে ধরা উচিত হয়নি ! মোহনবাগান জিতেছিল তাই - আই এফ এ তাদের বিজয়ী ঘোষণা করে । - এর মধ্যে দুটো জিনিস – এক স্ট্রেইটফিল্ডের এই সাক্ষ্য একটি ব্যতিক্রম – আর দুই তখন আই এফ এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন – দাপুটে ব্যক্তিত্ব ডাক্তার মন্মথ গাঙ্গুলি । - স্টুয়ার্ট সাহেবের বিজয়দাস ভাদুরির গলা টিপে ধরা ও মোহনবাগানের শিরোপা জিতে নেওয়া – খেলোয়াড় ও দর্শকদের মনে যে কি পরিমান জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি করেছিল তার কোন সন্দেহ নেই ! ১৯১১ সালে ইস্ট ইয়র্ককে হারিয়ে – শিবদাস ভাদুরির নেতৃত্বে মোহনবাগানের আই এফ এ শীল্ড জয় – এতই জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছিল – সে ইতিহাস সবারই জানা ! সেই ঐতিহাসিক জয়ের শেষে জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের হেঁটে হেঁটে নিজেদের তাঁবুতে আসার সময়ে – রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটারজি হাঁটছিলেন । আচমকা এক সাধুবেশী বৃদ্ধ সুধীরবাবুর সামনে এসে উইলিয়ামস দুর্গের মাথায় ওড়া ইউনিয়ন জ্যাক দেখিয়ে জিগ্যেস করেছিলেন – ‘মাঠে তো এটা হোল, কিন্তু ঐটা কবে নামবে ?’ সুধীরবাবু কোন জবাব না দিলেও – তাঁর পাশে থাকা এক বন্ধু বলেছিলেন – যেবার মোহনবাগান দ্বিতীয়বার শীল্ড জিতবে – সেই বছরই আমাদের দেশে স্বাধীনতা আসবে’ ! অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল অত্যন্ত কাকতালীয় ভাবে – ১৯১১ সালের পর দ্বিতীয়বার মোহনবাগান আই এফ এ শীল্ড জিতেছিল ১৯৪৭ সালে ! ১৯১১ সালের মোহনবাগানের এই জয় সমাজের নানা ক্ষেত্রে প্রচণ্ড ভাবে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল । সব ঘটনা লিখতে গেলে এক মহাভারত হয়ে যাবে – তার পরিসর এখানে নয় । কিন্তু এই ঘটনাটি না লিখলে ইতিহাসের প্রতি অন্যায় করা হবে । স্পোর্টিং ইউনিয়নে খেলতেন প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় । একদিন ময়দানে একটি সাহেবি দলের বিরুদ্ধে খেলায় সাহেবরা কিছুতেই তাঁর সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না । সেই রাগে এক ফরওয়ার্ড, তাঁর বুট পড়া পায়ে সজরে আঘাত করলেন প্রতুলবাবুকে । ফলে, বুকে বুটের প্রচণ্ড আঘাতে তখনই মাঠে দম বন্ধ হয়ে মারা যান । পরাধীন ভারতে বাংলা তথা ভারতের মাঠে বোধয় উনিই একমাত্র শহীদ ! পরাধিনতার জ্বালায় ফুটবলের ক্ষেত্রেও খেলোয়াড়রাও প্রচুর সাহসিকতা দেখিয়েছেন । আর ফুটবল খেলাও অনেক আধিপত্য দেখাতে পেরেছেন । অনেক দিন পর্যন্ত বাঙ্গালিরাও সেই ফুটবল খেলতে পেরেছেন দাপটের সঙ্গে । ক্রমশ সেই দাপট কমে এসেছে ! এখন কলকাতার দলগুলোতে বাঙ্গালির সংখ্যা খুবই ক্ষীণকায় । - তখনকার - ‘বাঙ্গালীর এই ফুটবল’- এখনকার ফুটবলের সেই বাঙ্গালী কোথায় ! ( সৌজন্যে ; অভীক চট্টোপাধ্যায় ) মনোজ

116

2

দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

আজ এই অতুলপ্রসাদী গানটা শোনাতে ইচ্ছে হল https://youtu.be/zBScDuxPFKY

1812

138

মনোজ ভট্টাচার্য

ছেলেবেলার রান্নাবাটি !

ছেলেবেলার রান্নাবাটি ! মিলুর পছন্দ অনুযায়ী ওর বর সাজবে অমু , আর দিপু হবে ওর দেওর , ছানু আর মানু হবে দুই ননদ, ছন্দা হবে শাশুড়ি অন্য বন্ধুরা কেউ পিসি বা মাসি বা প্রতিবেশী । ওদের রান্নাঘরের খেলায় এইভাবেই মিলু সংসার সাজাতো । কেউ আপত্তি করলে মিলু নানা অজুহাত দেখিয়ে নিজের আবদারটাই বজায় রাখত । হয়ত কোনদিন দিপু আপত্তি করল । - মিলু, এটা তোর মোটেই ভাল নয় । ওই বা রোজ রোজ বর সাজবে কেন ? আমি বুঝি তোর বর হতে পারি না ! ওর চেয়ে আমি অনেক ফর্সা আর ভালো দেখতে ! হ্যাঁ , কিন্তু অমু খুব ভোলা ভালা – আমার সব কথা শোনে ! দেখিস না অমু সব সময় আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, যা করতে বলি তাই করে ! কিন্তু তাই বলে তুই ওকে রোজ চুমু খাবি, অতো আদর করবি ? দিপু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে । দিপু, তুই খুব হিংসুটে ! – দেখিস না ও ওসব কিছুই বোঝে না – কিরকম হাঁদা-ভোঁদা ! তাছাড়া তোর সঙ্গেও তো আমার খুব ভালো সম্পর্ক ! তুই না আমার দেওর ! – জানিস না লক্ষণ কত ভালো দেওর ছিল ! রেল কলোনির ক-ঘর পরিবারের ছেলে-মেয়েদের নেহাতাই খেলনার সংসার ! তখন তো প্রি-স্কুল ছিল না ! নেহাতাই বঁইচি ফুলের মালা গাঁথা ! কোন কোন দিন হয়ত এই খেলা পাল্টে গেল । ক্রমশ ছেলেরা খেলত লাগলো রবারের বল, আর মেয়েরা খেলত পুতুল ! মিলু কিন্তু অমুকে একেবারে নিজস্ব করে রাখত ! ক্রমশ ওরা হাই-স্কুলে গেল । স্কুল আলাদা আলাদা হয়ে গেল । সেই খেলার সংসার আর রইল না । এর মধ্যে অবশ্য অমুর বাবার ট্র্যান্সফার হয়ে গেল বিহার না ঝাড়খণ্ডের কোন শহরে । - তাদের আর খবর রাখত না কেউ । আর দিপুরা কলকাতায় ওর দাদুর বাড়িতে চলে গেল । কিন্তু ওর কলেজে যাওয়া ও ভালো চাকরি পাওয়ার খবর মিলুর বাবা-মা ঠিকই রাখত । আর মিলুও মোটামুটি পাশ টাশ করে একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে কাজ জুটিয়ে নিল । কিন্তু মিলুর মায়ের তত্ত্বতল্লাসে ও মিলুকে অনেক বোঝানোর পর মিলুর বিয়ে হল ভালো ছেলে দিপুর সঙ্গে । বিয়েতে ওদের অনেক পুরনো বন্ধুও এলো ! ওদের একটি পুত্রও হল যথারীতি ! বেশ ক-বছর পরে ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাবার সময় দেখল কোন-এক অমল কান্তি দাসের কোয়ার্টারের নেম-প্লেট ! – সেই অমু গাড়ি থেকে নামার সময় মিলুকে চিনতে পারল । - অনেকদিন পরে দেখা – মিলুর প্রশ্ন কি শেষ হয় । - অমু কি করে, বিবাহিত কিনা, কটা ছেলেমেয়ে ইত্যাদি শতেক প্রশ্নের সাথে – ‘আমার বাড়ি আয় না’ ! যেদিন অমু সস্ত্রীক মিলুদের বাড়িতে এলো – অমু এবং দিপু পরস্পরের সাথে খুব আন্তরিক মেলামেশি, খাওয়া-দাওয়া এবং যথারীতি পরিমিত মদ্য-পান ! মদ্যপানের কারনে পরের দিন সকালে ছেলের পিঠে পড়ল কয়েক ঘা – অঙ্ক না পারাতে ! আবার উল্টোরথের দিন অমুদের বাড়িতে কিঞ্চিৎ সেবন । পরের দিন সকালে আবার ছেলের পিঠে কয়েক ঘা ! এবার মিলু এগিয়ে এলো – অমুদের এ-বাড়িতে ডেকে এনেছিলাম আমি ! আর অমুরা আমাদের খাইয়ে দিল আজ , ব্যস – শোধবোধ হয়ে গেল । আর কোনদিন ওদের সঙ্গে দেখা হবে না – কথাও হবে না ! ব্যস এই শেষ ! - ছেলের ওপর শোধ তুলো না ! – কোন প্রশ্ন উঠল না – ছেলেকে মারার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক ! ওদের মধ্যে আর কোন যোগাযোগ রইল না । মাঝে মাঝে অমুরা ফোন করত, কিন্তু না দিপু না মিলু – কেউ ফোন তুলত না । মিলু বা দিপু – অমুদের সঙ্গে আর কোন সম্পর্কই রাখল না । কিছুদিন পর মিলু ওর ফোনে আরেকটা সিম কার্ড ভরে নিল ! - এই নম্বরটা শুধু অমু জানে ! উপ-সংহার ! এপর্যন্ত ওদের খবরাখবর বিশেষ কেউ রাখত না ! একেবারে ভুলে যাবার আগে একদিন কাগজে নাম বেরল - মিলি ও দিপুর ! মিলু ও অমু – পরস্পরের দেখাসাক্ষাৎ হত ঠিকই ! কখনো কোন মলের কাফেতে বা সিনেমাক্সে । কখনও কোন বহুতল দোকানে – নানান জিনিশ কিনে গাড়ি করে ফেরার সময় কোন বস্তিতে সেগুলো বিতরণ করে দিত । এর মধ্যে মিলুর ব্যাঙ্কে একটা অতিরিক্ত কাজ শুরু হোল – বাইরে গিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা ! মিলু সেখানে সঙ্গে করে অমুকে নিয়ে যেত । অমুর তো সরকারি চাকরি । গাড়িও আছে ! বাধা ছিল না কোন । দিপুর ছিল চাকরি-অন্ত প্রান ! ওর নজর ওপর দিকে ! তাই দিনের অনেকটা সময় চলে যেত – চাকরির চাকরিতে ! – এমন কি নিজের দাম্পতিক সম্পর্কেও কোন উৎসাহ নেই ! বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাক্যালাপ খুবই সীমিত ! - ছেলেটি অবশ্য তাদের প্রয়োজনীয় সান্নিধ্য পেত ! কিছুদিন ধরে দিপুর অফিশের কিছু সহকর্মী ও প্রতিদ্বন্দ্বী খবর আনতে লাগলো – দিপুর স্ত্রীকে কারুর সঙ্গে এখানে দেখা গেছে । সেখানে দেখা গেছে ! সর্বত্রই একজন সঙ্গে থাকা অবস্থায় ! দিপু তো জানতই মিলুর কাজের কথা ! আর যে একজনের কথা – সে তো ব্যাঙ্কের কোন লোক হতেই পারে ! – তবু সন্দেহের রুমাল ! – কে সে একজন ! – ঘর ক্রমশ হয়ে উঠল – জতুগৃহ ! – কথা কাটাকাটি থেকে এমন কি গায়ে হাত তোলা ! শুধু একমাত্র সন্তানের জন্যে ডিভোর্সের কথা ওঠে না ! একদিন মিলু অফিশের কাজে রাতে ফিরতে পারল না ! ওদের ছেলেই দেখল সকালে – বাবা সিলিঙের থেকে দড়ির প্যাঁচে ঝুলছে ! ওর কাছে মার ফোন নম্বর ছিল । পুলিশেও ফোন করতে ভুলল না ! মিলু কি তখনো তার ছেলেবেলার বরকে আরও আঁকড়ে ধরল ? মনোজ

150

2

Ranjan Roy

আহিরণ নদী সব জানেঃ রঞ্জন রায়

) ‘রঙ পিচকারি, সন্মুখ মারি, ভিগি আঙিয়া, অউর ভিগি শাড়ি’ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সহজ হলেও এতদিনের আড়ষ্টতা কি সহজে কাটে? তবু ভেবেছিল হোলিতে এবার দিন দুইয়ের ছুটি নিয়ে ভিলাই যাবে। কিন্তু ভেতর থেকে কোন উৎসাহ পাচ্ছে না রূপেশ। আসলে ওর চাকরি পাকা হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে একটা বিয়ে বিয়ে হাওয়া উঠেছে। মায়ের চিঠিতে ইঙ্গিত স্পষ্ট, বড়ী ভাবীর কোন মাসতুতো বোন নাকি খুব গুণের মেয়ে, রূপে গুণে অপ্সরী ও বিদ্যাধরী। আবার ভিলাইনগরের সিরিয়ান ক্রিশ্চানদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হোলি ক্রস থেকে পাশ করে গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে মাইক্রো-বায়োলজি নিয়ে মাস্টার্স করেছে। আবার ভাতখন্ডে সংগীত মহাবিদ্যালয় থেকে তিনবছর গান শিখেছে। তা বেশ, কিন্তু অমন গুণবতী কন্যে এই অজ আদিবাসী বহুল পাড়াগাঁয়ে কেন আসবে রূপেশ ভেবে পায় না। তবে মাতারাম জানিয়েছেন যে ওই পরিবারের মেয়ে সব জায়গায় মানিয়ে নিতে পারবে। অমনই ট্রেনিং পেয়ে বড় হয়েছে, তাছাড়া আজ নয় কাল ছেলের প্রমোশন হবে , তখন নিশ্চয় কোন শহর বা মহকুমা সদরে ওর ট্রান্সফার হবে, গ্রামীণ ব্যাংক বলে কি সারাজীবন বনবাসে কাটাতে হবে? তাই হোলিতে দু’দিন ছুটি নিয়ে ঘরে আসলে দু’পক্ষেই ভাল রকম দেখাশোনা হতে পারে । আর এই সম্ভাবনাকেই ভয়। মেয়েটিকে ঠকানো ! কী করে একটি অচেনা মেয়েকে প্রথম দেখাতেই বলবে যে ও যেখানে চাকরি করে সেখানে ব্যাংকের কোয়ার্টারে কোন সেপটিক ট্যাংক নেই , আধুনিক কিচেন নেই , রান্না হয় কেরোসিনের জনতা স্টোভে? সামনের রাস্তাটিতে নুড়ি পাথর বিছানো, স্নান করতে হবে দোতলার পেছনের বারান্দায় পর্দা টাঙিয়ে, রাস্তায় বেরোলে দশজোড়া চোখ এমন হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে যেন কোন মাদারির ভালুক অথবা বহুরূপীর সঙ দেখছে। পেছন থেকে মহিলাদের ছুঁড়ে দেওয়া কমেন্ট ভেসে আসবে , ‘কেইসন বেশরম অউরত! মুড় নাহি ঢাকে ও?’ কেমন মেয়েছেলে গো, লাজ-লজ্জার বালাই নেই ? মাথায় ঘোমটা নেই গো! মেয়েটির জন্যে কোন সিনেমা হল নেই , ইংরেজি পত্রিকা নেই , সারাদিন ওপর তলায় বন্দী হয়ে থাকতে হবে? আলাপ করার মত কাউকে পাওয়া যাবে না । একটা ট্রানজিস্টর রেডিও আছে গান ও খবর শোনার জন্যে, আর বিয়ের কথা শুরু হতেই রূপেশ টি ই বিলের পয়সা জমিয়ে একটা প্যানাসোনিক টেপ রেকর্ডার কিনেছে; কেন? তা নিজেই জানে না । রোজ রোজ বাজার হাট হবে না । তবে উইক এন্ডে বাসে বা মোটর বাইকে স্বামীর পেছনে বসে কোরবায় মালগুদামের মত সিনেমাহলে ভ্যাপসা গন্ধওলা সীটে বসে সিনেমা দেখে কোন রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে গাঁয়ে ফেরা যেতে পারে । রূপেশের রকম সকম দেখে নতুন জয়েন করা ফিল্ড অফিসার ভগতরাম ধৃতলহরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল—স্যার, হোলিতে বাড়ি যাবেন না ? --ভাবছি; কিছু কাজ পেন্ডিং আছে। -- আরে কাজ তো সারাজীবনই থাকবে; একটা শেষ হলে আরেকটা। ওর কি শেষ আছে? কিন্তু আগের দিন সন্ধ্যেয় হোলিকা দহন করে সকাল বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে এ’পাড়া ও’পাড়া বে’পাড়া সে’পাড়া করা, হাসিমুখে গাল পাড়া ও গাল শোনা –এর মজাই আলাদা! রূপেশ হেসে ফেলে। বিলাসপুরের চাটাপাড়া, জুনি লাইন, তিলক নগর, সাত্তাইশ খোলি, তারবাহার –এ’সব জায়গায় রঙ মেখে সাইকেলে চেপে দল বেঁধে হো-হো করে ঘুরে বেড়ানো, লালাপড়ায় যোগেশ শ্রীবাস্তবের বাড়িতে ভাঙের পকোড়া এবং হুইস্কির অবাধ আচমন; আর একটা টুলের ওপর অ্যামপ্লিফায়ারের বাক্স বসিয়ে বাজারচলতি হিন্দি গানের সঙ্গে ধিড়িং ধিড়িং নাচা এসব দশ বছর আগেও করেছে। কোন পঁহুচা হুয়া বন্ধু হয়ত ধরতাই দেবে —‘লালাজি কা লাল গাঁড় পিত্তল কা পৌয়া’, এরা সঙ্গে সঙ্গে কোরাসে চেঁচিয়ে উঠবে—‘লালা জহাঁ গাঁড় মারাবে তহাঁ নাচে কৌয়া।‘ সেই পরীক্ষা হলে মোবাইল স্কোয়াডের টুকলি ধরার ঘটনার পর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক ‘কাচ্চি’ হয়ে গেছে। তবু কোন কোন হোলিতে বাড়ি গেছে। রঙে অ্যালার্জির অজুহাতে খেলা এড়িয়ে বাবাপ-মাকে দাদা- বৌদিকে প্রণাম সেরে ঘরে বই পড়ে আর রেডিওতে বিবিধ ভারতী শুনে নমো নমো করে ছুটির দিনটা কাটিয়ে দিয়েছে। এবার জুটেছে নতুন ফ্যাকড়া। বৌদির ভগিনীটি ও তাহার মাতা ঠাকুরাণীর একান্ত ইচ্ছা প্রস্তাব অধিক অগ্রসর হইবার পূর্বে পাত্র-পাত্রীর চারিচক্ষের মিলন, আলাপচারিতা ইত্যাদি হঊক। আজকাল কী পড়িলিখি লড়কী। খুদ নাপতোল কে দেখনা চাহতী হ্যাঁয়—ছেলেটা ঠিক কতটা গেঁয়ো , আর ছেলের মুখ থেকে শুনে বুঝে নিতে চায় ছুরিকলাঁ গ্রাম ঠিক কত অজ পাড়া গাঁ! রূপেশের পিত্তি চলে যায়। ঠিক করে ফেলে হোলির সময় এখানেই থাকবে। মেয়েপক্ষ জোরাজুরি করলে পরে কোন উইক এন্ডে, সে দেখা যাবে’খন। হোলিকা দহন অথবা একদিন আগে ‘হোলিকা’ রাক্ষসীকে পুড়িয়ে মারার অনুষ্ঠানের দিন ও সবাইকে তিন ঘন্টা আগে ছেড়ে দিল। সূর্য ডুবলেই বাসের সংখ্যা কমে যায়, কারণ বিভিন্ন মোড়ে নির্জন পথের বাঁকে খালের ধারে বাসরাস্তায় কে বা কাহারা বোল্ডার দিয়ে ব্যারিকেড করে বাসের রাস্তা আটকে দেয় । ড্রাইভার কন্ডাকটর খালাসী ও যাত্রীরা মিলে ‘দম লগা কে হেঁইসা’ করে পাথর সরায়। কোথা থেকে ছুটে আসে ঢিল। এই খেলাটা বহু দশক ধরে পরম্পরা অথবা রীতি-রেওয়াজের নামে সবার গা সওয়া হয়ে গেছে। তাই ঘরে ফেরা সরকারি কর্মচারির দল সন্ধ্যের আগেই ঘরে ফিরতে চায়। তবে ছুরি গাঁয়ের সরকারি চাকরিজীবিদের আরও একটা তাড়া আছে। প্রতি বছর এই রাতে কয়েকজন সরকারি কর্মচারিদের বন্ধ দরজার সামনে ‘মটকি ফোঁড়’ খেলা হয়। অর্থাৎ একটা মাটির হাঁড়ি ওদের বারান্দায় আছড়ে ফেলে ক’জন দুদ্দাড় করে ছুটে পালায়। আর ভাঙা হাঁড়ি থেকে গড়িয়ে পরে থকথকে হলদে পূতিগন্ধময় আবর্জনা, যা কয়েকদিন ধরে এই উপলক্ষে জমিয়ে রাখা ছিল। এ নিয়ে নালিশ করে লাভ নেই । সবাই বলবে—‘বুরা না মানো, হোলি হ্যাঁয়’। গত দুই বছরে রূপেশ ছাড় পেয়েছে, কারণ ও ব্যাচেলর! কিন্তু ঠুল্লু এসে বিকেলের চা দেবার সময় জানিয়ে গেল, কানাঘুষোয় শুনছে এবার ছাড়া নাও পেতে পারে। --সাহাব, আজ রাত বারো বাজে তক জাগতে রহনা, অউ বারান্দা কী বাত্তি রাতভর জ্বলনে দীজিয়ে। সকালে ঠুল্লুর দরজা খটখটানোয় ঘুম ভাঙে। ও কলিং বেল বাজায় না । রূপেশেরই বারণ; এর আওয়াজটা বিচ্ছিরি, ঠাস ঠাস! বুকে এসে লাগে। নাঃ , রাতটা ভালোয় ভালোয় উতরেছে; এবারেও ছাড়। কিন্তু সকাল ন’টা দশটা নাগাদ রঙ খেলার দল বেরিয়ে পড়বে, মিছিল করে নাচতে গাইতে। ঠুল্লু চা-জলখাবার দিয়ে একঘন্টার মধ্যে ভাতে-ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ ও ডিমের ঝোল রেঁধে ফেলে। যাবার আগে বলে যতই দরজা বন্ধ করে রাখুন, ইয়ার-দোস্ত এলে খুলতেই হয়। ধরুন, যদি রামখিলাওন, গিরীশ, সদনলাল, কুমারসাহেব এরা এসে ডাকতে থাকেন? তাই একটা পুরনো কুর্তা আর পাজামা পরে রেডি হয়ে থাকুন। আজ সবার সঙ্গে মিলিয়ে মিছিলে হাঁটুন, রঙ মাখান, রঙ লাগান। তারপর সবাই মিলে বড়া তালাওয়ে বেলা একটা নাগাদ ডুবকি লাগিয়ে সাফ সুতরো হয়ে নেবেন। যদি ভাঙ খাবার ইচ্ছে থাকে তো আমাকে বলবেন, সদনলালের ঘরে ভাঙের শরবত , ভাঙের পকৌড়া –সব বন্দোবস্ত হয়েছে। আর পকেটে রাখুন লাল গুলালের এই ছোট্ট প্যাকেটটি—জোশী মহারাজ মন্ত্র পড়ে শোধন করে দিয়েছেন, আপনার এলার্জি হবে না ঘন্টাদুই পরে গাঁয়ের সদর রাস্তা দিয়ে হোলির মিছিলের চলা শুরু হল। কে নেই তাতে? সদনলাল, রামখিলাওন, দুই বিদুষক ঠিবু ও রসেলু, পান ঠেলার ইতোয়ারু, আয়ুর্বেদিক ডাক্তার জৈন, স্কুলের দুই গুরুজি ধীরহে স্যার ও মিশ্রজি- সবাই চলেছে নাচতে গাইতে। মাঝে মাঝে হররা উঠছে , হোলি হ্যাঁয়, হোলি হ্যাঁয়। হ্যাঁ রে বাবা! সবাই জানে আজ হোলি, এত বলার কী আছে? রূপেশ কী একটু বিরক্ত হচ্ছে! ও কি ইদানীং একটু বুড়োটে হয়ে পড়েছে? সদনলাল ইতিমধ্যেই বেশ ক’পাত্তর চড়িয়েছে । ও এক ডিগ্রি গলা চড়িয়ে শূন্যে ঘুষি ছুঁড়ে বলছে – মা কসম, আজ হোলি হ্যাঁয়। সেই শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ছে মিছিলের ছেলে বুড়ো। ভিড়ের থেকে এগিয়ে এসেছে একটি ছেলে। তার হাতে একটি আধখানা আলুর টুকরো। সে এসে রূপেশের বুকে স্ট্যাম্প মারার মত করে টুকরোটা চেপে দেয় । তাতে কিছু লেখা, রূপেশ পড়ার চেষ্টা করে। ভিড়ের মধ্যে গর্জন উঠে—চোদা লে! রূপেশ চমকে ওঠে, হাসির হররার মধ্যে ডাক্তার জৈন বলেন—এ হে হে! একদম গ্রামীণ ব্যাংক কা স্ট্যাম্প লগ গয়া। কিউঁ ম্যানেজার সাহাব। অপ্রস্তুত রূপেশ বুঝতে পারে যে ওই প্রাকৃত শব্দযুগ্ম ওর জামার বুকে লেগে আছে। ছেলেটিকে চিনতে পারে-- ডাক্তার জৈনের ছেলে, বিলাসপুরের কলেজে পড়ে । গতমাসে ‘শিক্ষিত বেরোজগার’ স্কিমের নাম করে পঞ্চাশ হাজার লোন চাইতে এসেছিল; খালি হাতে ফিরে গেছে। মিছিল এগিয়ে চলে, এবার সহিস মহল্লা হয়ে বাজারের দিকে। রাস্তার দুদিকের বারান্দায় মেয়েরা এসে ভিড় করে হাসিমুখে মিছিল দেখছে। তবে এই গাঁয়ে নারীপুরুষের প্রকাশ্যে রঙ খেলার চলন নেই । একটা হট্টগোল। সহিস মহল্লার পাশে একটা এক কামরার টালির ঘর থেকে ঘাসীরাম আগরওয়াল ও ঠিবু টেনে বের করছে এক পাকাচুল ষাটের ঘর ছোঁয়া বুড়োকে। সাদা খাদির কুর্তা ও একই কাপড়ের পাজামা পরা মানুষটি লজ্জা ও সংকোচে নুয়ে পড়েছেন। একটু তোতলা এই ভদ্রলোক স্থানীয় মানুষ ন’ন। দু’বছর হল এখানে একটি হাতকর্ঘা সঙ্ঘের ছোট্ট বিপণি খুলেছে, উনি তার প্রতিনিধি এবং একমেবাদ্বিতীয়ম সেলসম্যান। ব্যাংকে জমাখাতা খোলার সুবাদে রূপেশ জানতে পেরেছে উনি গোয়ালিয়রের অধিবাসী। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোন ঝামেলা হওয়ায় চাকরিটা যেতে বসেছিল। শেষে কিছু পলিটিক্যাল মুরুব্বি ধরায় চাকরি যায় নি, তবে ঝাঁসি থেকে একহাজার কিলোমিটার দূরে এই আদিবাসী এলাকায় আসতে হয়েছে। রূপেশ টের পেয়েছে যে ওঁর বিক্রিবাটার হিসাব-কিতাব পাকা ও সাফ সুতরা নয়। কিন্তু রূপেশ কী করতে পারে , গোটা দুনিয়ার ভালোমন্দের বোঝা কি ওর কাঁধেই ভগবান চাপিয়েছেন? না ; এত অহংকার ভাল নয়। আর উনি একটু লক্ষ্মীট্যারা। এই নিয়ে গাঁয়ের স্কুলে দু’পাতা পড়া ছেলে ছোকরার দল ওঁর নাম দিয়েছে ‘ লুকিং লণ্ডন, টকিং টোকিও’। কিন্তু ঘাসীরাম সদনলাল এদের উৎসাহের পেছনে অন্য কারণ। সামান্য আয়ের এই মানুষটি দেশের বাড়িতে যান বছরে একবার , দীপাবলীর সময়। এখানে গাঁয়ের সমাজ ওকে আপন করে নেয় নি; পরদেশি ছাপ লাগিয়েই ছেড়েছে। এই বয়েসে হাত পুড়িয়ে খেতে ইচ্ছে করে না । তাই এখানকার নীরস জীবনে একটু খানি মাধুর্‍্যের ছোঁয়া পেতে উনি চুড়ি পরিয়ে ঘরে তুলেছেন একটি জোয়ান মেয়েছেলেকে; সহিস মহল্লার। একে এখানে বলা হয় ‘চুড়িহাই পত্নী’। তবে এর জন্যে সমাজের বৈঠক ডেকে মেয়ের বাপ-মাকে মোটা টাকা ফি দিতে হয়েছে। তবে মেয়েটির বয়েস তিরিশেরও কম। সবাই হাসে; বলে – বুড়ো দাদু নাতনিকে বে করেছে। কিন্তু সেদিন মেয়েটি আবদার ধরল যে ওকে একটা ট্রাঞ্জিস্টার কিনে দিতে হবে, নইলে ও ফিরে যাবে। ভদ্রলোক, অর্থাৎ পেন্ডারকরজি মেয়ের বাপ-মার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে শেষে মাসিক কিস্তিতে একটা এনে দিলেন। সেটাই কাল হল। রেডিও পেয়ে ওর ফুর্তি গড়ের মাঠ। সন্ধ্যে বেলা হস্তকর্ঘা শিল্পের, মানে হ্যান্ডলুমে তৈরি জামাকাপড়ের দোকান বন্ধ করে উনি ঘরে ফিরে দেখলেন যে ওনার দু’বোতল মহুয়া ফাগনী বাঈ একাই মেরে দিয়ে টুন হয়ে আছে। ভাতের হাঁড়ি বাড়ন্ত, উনুনে জল ঢালা। রাগের চোটে মুখ দিয়ে কথা বেরোল না । তোতলাতে তোতলাতে এসবের মানে কি জিজ্ঞেস করায় ফাগনী বাঈ ওঁর থুতনি নেড়ে গেয়ে উঠল—‘লারে লাপ্পা, লারে লাপ্পা, লাই রাখদা”! পেন্ডারকর বুড়ো হলে কী হবে, পুরুষ বটেন! তাই নেভা উনুনের চ্যালাকাঠ তুলে মেয়েটাকে বেধড়ক পেটালেন। ফল ভাল হল না । হাজার হোক, উনি পরদেশি আর ফাগনী বাঈ ছোটজাত হলেও এই গাঁয়েরই মেয়ে। ও রেডিও কাঁধে ঝুলিয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করল। সে রাতেই জাতি পঞ্চায়েতের বৈঠক বসল। আর পেন্ডারকরকে ৫০০ টাকা জরিমানা করল। উনি ব্রাহ্মণ, নইলে নিঘঘাৎ মার খেতেন। পুরো ব্যাপারটা গাঁয়ে জানাজানি হয়ে গেলে যত আমোদগেঁড়ে তামাশবীন ওঁকে কাকের পালে ফেঁসে যাওয়া শালিকছানার মত সময়ে অসময়ে ঠোকরাতে লাগল। তবে রূপেশ ওঁর অন্য একটি পরিচয় ও জানে। ভদ্রলোক অসাধারণ সুরে গান গাইতে জানেন। তখন একেবারে তোতলাতে হয় না। হোলির একপক্ষ আগে থেকে যখন ছেলে ছোকরার দল সকাল বিকেল নাগাড়া বাজিয়ে বেসুরো গলায় চিৎকার করে ‘ফাগ’ (হোলি বিষয়ক লোকসংগীত) গাইতে থাকে, তখন উনি এক সন্ধ্যায় ইমন ও ছায়ানটে উত্তর ভারতের লোকসংগীত এবং বিহারের চৈত্রমাসের গান ‘চৈতা’ এবং ‘চৈতি’ গেয়ে রূপেশের মনমেজাজ একদম ‘গার্ডেন- গার্ডেন’ করে দিয়েছিলেন। ওঁর হেনস্থা সহ্য করতে না পেরে রূপেশ বলে – আরে আপনি চলুন আমাদের সঙ্গে, কোন সংকোচ করবেন না । আমাদের হোলির গান শুনিয়ে মাহোল উমদা করে দেবেন। সবাই অবাক। এই ঘাটের মড়া বুড়ো হাবড়া গান গাইতেও জানে? খালি মেয়েবাজি নয়? ঠিক আছে, ম্যানেজার সাহাব যখন নিজে বলছেন। উনি রূপেশের দিকে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে হেসে তুতলে তুতলে বললেন—তাহলে একটু পেট্রল ভরে নিই? হাসির হররার মাঝে মিছিল দাঁড়িয়ে পড়ে । উনি মাথা নীচু করে একটি ঝোপড়ার মধ্যে ঢুকে যান ও মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বেরিয়ে আসেন। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ভিজে গোঁফ মুছে সবার দিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চোখ মেলে তাকান। আর স্পষ্ট উচ্চারণে বলেন—একটি শর্ত আছে, আমি এক লাইন গাইব, তারপর সবাইকে সেটা রিপিট করতে হবে। হুঁ হুঁ করে সুর ভেজে শুরু করেন—রাধা গয়ে হ্যাঁয় মেলে, শ্যাম অকেলে। মিছিল সরু মোটা আওয়াজে গলা মেলায়। মিছিল এগিয়ে চলে—এবার রহসবেড়া হয়ে গাঁয়ের শেষপ্রান্তে রাজবাড়ির দিকে। মিছিল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে এক জলদ গম্ভীর কন্ঠস্বরে শ্যাম নামের নটখট রাখাল যুবকের প্রণয়লীলা, ছলাকলা, রাধার অবর্তমানে অন্য গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলা । রাধা মেলায় যান, একলা ঘরে শ্যাম ক্রমশঃ ছুরিকলাঁ গাঁয়ের অধিবাসীদের মানসে ধরা পরে তাদের বহুপরিচিত এক চালচিত্র। এই লীলা, এই কিশোরীকে বাঁশির ডাকে ভোলানো, তারপর একদিন অন্য কারও দিকে ঢলে পরা—এ তো বহুবার ঘটেছে। কারও কারও নিজেদের জীবনে, কারও চেনা পরিবারের মধ্যে। এইভাবে মিছিল পৌঁছে যায় রাজপরিবারের সিংহদরজার সামনে। জোরে জোরে বাজতে থাকে মাদল, বাজে ঝাঁঝ। ‘রঙ পিচকারি, সন্মুখ মারি, ভিগি আঙিয়া, অউর ভিগি শাড়ি’ খবর পেয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন যুবরাজ সাহাব। চন্দ্রচুড় অনঙ্গপাল সিং। মুখে বসন্তের দাগ, পরিষ্কার করে কামানো গাল, আজ পরনে সিল্কের ধুতি ও কুর্তা। সামনে পেতলের বিশাল থালায় ফাগ ও পেঁড়া নিয়ে দু’জন নৌকর। সবাই ওঁর পায়ে আবির দেয় , উনি মাথায় হাত রাখেন ও নৌকর সবার হাতে একটি করে পেঁড়া তুলে দেয়। শেষের দিকে পেঁড়া ভেঙে আধখানা করা হয়। মিছিলে লোক যে অনেক! রূপেশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিংহ দরজার মাথায় খোদাই করা ওঁদের কোট অফ আর্মস দেখছিল। সাল লেখা ১৯০৩। উনি খেয়াল করে হাত তুলে ডেকে নিজহাতে গুলাল লাগিয়ে কোলাকুলি করলেন আর ওঁর ইশারায় নৌকর ওকে দিল এক গেলাস ঠান্ডাই মেশানো শরবত । ভ্যাবাচাকা রূপেশ চোঁ চোঁ করে গেলাস খালি করে ফেরৎ দিল। ওর একটু লজ্জা করছিল, দু’মাস আগে যুবরাজ সাহেবের দশ হাজার টাকার লোনের আবেদন ও খারিজ করে দিয়েছে যে! জানে, ওই পয়সা ফেরৎ পাওয়া মুশকিল। কারণ, এঁর রাজওয়াড়ার ভেতরে হাঁড়ির হাল। এবার ফেরার পালা। সবাই গাইছে—“ হোলি মেঁ ঝুম গয়ে শ্যাম, আরে হোলি মেঁ!” ফেরার পথে সবাই জোরাজুরি করলে রূপেশ একটু নেচে দিল। হো-হো ও হাততালি! ও বুঝতে পারল যে শরবতে সিদ্ধি মেশানো ছিল। অনেকদিন পরে আবার পুকুরে স্নান। এই গাঁয়ে সাতটা পুকুর। তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়, মাঝখানে প্রায় দু’বাঁশ গভীর। গ্রীষ্মকালেও এর জল শুকোয় না । সবাই বলে পুকুর পাড়ে বটগাছের তলায় যে বাড়রাণীর মন্দির, তার মহিমায় এই জল অতল অথৈ । জামাকাপড় পারে রেখে ডোরাকাটা আন্ডারওয়ার পরে জলে নামার সময় ওর হাত টেনে ধরে ডাক্তার কাশ্যপের ‘ভুরা’ কম্পাউন্ডার। বলে সাঁতার না জেনে বেশি এগোনো ঠিক নয়। বুক জলে নেমে সাবান মেখে ডুব দিলেই হবে। গরুমোষ ধোয়ানো? হ্যাঁ , তা হয় বইকি। তবে এ পাশে নয়, ঠিক উলটো পাড়ে। ভাঙাঘাটের দিকে। এদিকে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে দুটো ঘাট বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে শুধু স্নান করার জন্যে, ছেলেদের ও মেয়েদের ডুব দিয়ে উঠে গা মুছতে শুরু করেছে কি কানে এল অশ্রাব্য গালাগাল। গরু ধোয়ানোর ঘাট থেকে ঘাসীরাম চেঁচাচ্ছে ভুরা কম্পাউন্ডারের উদ্দেশে। সম্পর্ক জুড়ছে এর বোন ও বৌয়ের সঙ্গে। রূপেশ ভয় পায়, এবার কি একটা হাতাহাতি শুরু হবে? এ ভাবেই একটা সুন্দর দিন নষ্ট হবে? কিন্তু ভুরা যে হেসেই খুন। তারপর ও কিছু পালটা দিল, তবে ঘাসীর সঙ্গে খিস্তি করায় পেরে ওঠা দুষ্কর। রূপেশের বিব্রত ভাব দেখে ভুরা আশ্বস্ত করে। ঘাবড়াবেন না , ও আমার বন্ধু। বন্ধু? তা বলে ওইসব সম্বোধন? ওই ইতর ভাষা? আরে এটা হোলি যে! আজ সাতখুন মাপ। হোলির দিন এই দিয়েই শেষ হয়। আপনি ওই দোঁহাটি শোনেন নি? “ হোলি মেঁ হম ঝুম গয়ে সব, মুঁহ মেঁ ভাঙ কী গোলি হ্যাঁয়। অগর কিসীকা পোল খোলে তো বুরা না মানো হোলি হ্যাঁয়।“ ভিজে পোষাকে ঘরে ফেরে রূপেশ। মাথাটা ভার ভার, সিদ্ধির প্রভাব টের পাচ্ছে। তালা খুলে ঘরে ঢুকে কাপড় মেলে খাবারের ঢাকনা খুলে গোগ্রাসে খেতে থাকে। ঠুল্লু একটা বাটিতে করে খানিকটা ক্ষীর (পায়েস) দিয়ে গেছে। এবার ঘুমনোর পালা। ঘুম, ঘুম। শ্রান্ত শরীরের ক্লান্তিহরা ঘুম। আজ রূপেশ কোন স্বপ্ন দেখে না । কতক্ষণ কেটেছে জানে না । কলিংবেল বাজাচ্ছে কেউ। অনেকক্ষণ ধরে। ভারি চোখের পাতা এঁটে বসেছে। এই অসময়ে কে এল? বিছানায় উঠে একটু বসে নেয়, তারপর দরজা খোলে। খুলে পাথর হয়ে যায়। কারুকাজ করা রুমালে ঢাকা একটা থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দ্রুপতী বাঈ; এবার ওর অবস্থা দেখে প্রায় ঠেলা মেরে ভেতরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিল। টেবিলের উপর থালা নামিয়ে বলে ঢাকনা খুলে দেখায়—এক বাটি মাংস আর পায়েস, ওরা বলে ‘ক্ষীর’। চোখে ঝিলিক দিয়ে বলে –আমি নিজে রেঁধেছি, আপনার খারাপ লাগবে না । তারপর আঁচলের খুঁট থেকে একটু আবির নিয়ে নীচু হয়ে রূপেশের পায়ে দিতে গেলে ও বাধা দেয় । কিন্তু ও দ্রুত হাতে পায়ে হাত দিয়ে মাথা তোলার সময় রূপেশের থুতনিতে টক্কর লাগে। অপ্রস্তুত দ্রুপতী থুতনিতে হাত বুলিয়ে শুধোয়—সাহেবের লেগেছে কি না ? তারপর হাসিমুখে রূপেশের দিকে নিজের আঁচলের ফাগ এক চিমটি দিয়ে অপেক্ষা করে আশীর্বাদী রঙ লাগানোর। রূপেশ কেঁপে ওঠে, সারা শরীরের তার ঝন ঝন করে। এমন অনুভূতির সঙ্গে ওর পরিচয় ছিল না । দু’আঙুলে রঙ নিয়ে কোথায় লাগাবে ভেবে পায় না। চোখে পড়ে মেয়েটির এগিয়ে আসা মুখ, কপালে কাটা দাগ। কোনরকমে তড়িঘড়ি করে সেই কাটা দাগের উপর লেপে দেয় লাল আবির। চমকে উঠে পিছিয়ে যেতে গিয়ে দ্রুপতীর পা হড়কায়; আর কিছু না ভেবেই রূপেশের ক্রিকেট খেলা হাত ওকে স্লিপ ফিল্ডারের মত ধরে সামলে নেয়। কিন্তু রূপেশ যে ওকে ছেড়ে দিতে পারছে না , ধরেই আছে। ওর মাথায় ছবি আসে, বিহারী টকিজে দেখা রাজ কাপুরের ‘আর কে ফিল্মস’ এর লোগো। হাত ছাড়িয়ে মুক্ত হয় দ্রুপতী হয়। ওর চোখে বিস্ময়। তারপর শাড়ি ঠিক করতে করতে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে – এ গাঁয়ে আপনাকে সবাই দেবতা বলে, আমিও। আপনি চাইলে না করতে পারব না । আপ বহুত বড়ে হ্যাঁয়, সেই পিকনিকের সময় দেখে নিয়েছি। অব আপ যো কহতে হ্যাঁয়— রূপেশের শরীর ঝিমঝিম করে। অবশ শরীরে ও মাথা নেড়ে পাশের চেয়ারে বসে পড়ে । দ্রুপতী চলে যাওয়ার সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যায়।

3079

92

দীপঙ্কর বসু

আমি যে গান গেয়েছিলেম

চিঠিপত্রের বান্ডিল ঘাঁটতে গিয়ে একটা বিশ্রী ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ পোস্ট কার্ড হাতে উঠে এল।বহুবার পঠিত পোস্টকার্ড টা হাতে নিয়ে আবার করে পড়লাম – “প্রীতিভাজনেষু পদ্মলোচনবাবু , আপনার ২৬/২/৮০ র চিঠিতে শ্রীমান দীপঙ্করের সাফল্যের কথা জেনে খুব খুশি তো হয়েছিই আবার খুব অবাক ও হলাম । All credit goes to soul of Rabindranath . শুভেচ্ছা ও নমস্কারান্তে আপনাদের জর্জ দা” সংক্ষিপ্ত চিঠিটির মর্মোদ্ধার করতে হলে পেছিয়ে যেতে হবে সাত আঠ বছর আগের একটি সকালে। আকাশবানী কলকাতা থেকে রবীন্দ্রসংগীতের অডিশন এর ডাক পেয়েছি শুনে শ্রীমতী মায়া সেন,পরামর্শ দিয়েছিলেন অডিশনে বসার আগে যে গানগুলি আমি গাইব সে গুলি যেন ওনাকে শুনিয়ে প্রয়োজন মাফিক সংশোধন করিয়ে নিই। এইখানে বলে রাখি শ্রীমতী মায়া সেন বেশ কয়েক বছর জামশেদপুরের টেগোর সোসাইটির রবীন্দ্রসংগীত বিভাগে পরীক্ষক হিসেবে এসেছিলেন।আমার সৌভাগ্য যে সে সময়ে প্রতিশ্রুতিবান পরীক্ষার্থী হিসেবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম এবং ক্রমে বিশেষ স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছিলাম । কাজেই মায়া দির পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৭২/৭৩ সালের এক সকালে পিতৃদেবের সঙ্গে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম মায়াদির বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে । সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম দেবব্রত বিশ্বাস যিনি ক্রমে আর সবার মত আমারও জর্জদা হয়ে উঠেছিলেন । মায়াদির সঙ্গে পরিচয় ছিলনা আমার পিতৃদেবের ।তাঁরা যতক্ষন নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় সেরে নিয়ে প্রাথমিক কথা বার্তা সারছিলেন আমি লক্ষ্য করেছিলাম মায়াদির বেশ বড় ড্রইং রুমের একধারে একটি চেয়ারে লুঙ্গী ও সাধারণ ফতুয়া গায়ে এক বয়স্ক মানুষ চুপচাপ বসে মায়াদি ও আমার পিতৃদেবের আলাপ আলোচনা শুনছেন । মজার কথা হল মানুষটি যে স্বনামধন্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস তা আমার মাথাতেই আসেনি । অথচ সেই সময়েই তাঁর রবীন্দ্রসংগীত গায়নশৈলী নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে ।একটি বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রের রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে স্বয়ং সম্পাদক “কার গানে কার সুর” শিরোনামে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিরূপ সমালচনা লিখে চলেছেন । রেডিওতে,গ্রামাফোন রেকর্ডে তাঁর গান প্রায়ই শুনি - কাজেই দেবব্রত বিশ্বাস নামটা আমার কাছে অপরিচিত ছিলনা ।শুধু মানুষটিকে সেদিনের আগে কোনদিন চোখে দেখিনি । তাঁর পরিচয় পেলাম মায়া দি যখন প্রাথমিক কথা বার্তা সেরে নিয়ে গানের প্রসঙ্গে এলেন ।বললেন ভালই হল “ আজ জর্জদা উপস্থিত আছেন । দীপঙ্কর জর্জদাকে তোমার গান শুনিয়ে দাও”। জর্জদাও দেখলাম চেয়ারে বসেই হারমোনিয়ামটিকে কোলের কাছে টেনে নিলেন ।স্মিতহাসিমুখে বললেন – “কই কি গান করবেন,করেন শুনি” কথাগুলি ঠিক এই ভাষায় তিনি বলেননি – বলেছিলেন পূর্ববঙ্গীয় বাংলায় যাকে তিনি নিজের “ফাদার বা মাদারটাং” বলে উল্লেখ করতেন । ঠিক এমন একটা পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে আমি প্রস্তুত ছিলামনা ।তাই বেশ ভয়ে ভয়ে গান শুরু করি – আমার শেষ পারাণীর কড়ি কন্ঠে নিলেম । গান কন্ঠে নিলেম । আরো দুই একটি গান শুনলেন আমার পছন্দ করা গানের তালিকা থেকে । কিছুকিছু গানে বিশেষ বিশেষ শব্দ কি ভাবে উচ্চারণ করতে হবে তা নিজে গেয়ে দেখালেন ।এবং সব শেষে বললেন “গান তো আপনি ভালই গাইসেন ।কিন্তু আমার মনে হয়না আপনি অডিশনে পাশ করতে পারবেন । আকাশবানীতে অডিশন পাশ করতে হইলে আপনারে ওদের মত পাঁসালি(পাঁচালি) গাইতে হবে । সে আপনি পারবেননা বুঝতে পারছি”।আমার বিপন্ন মুখ দেখে সহাস্যে ব্যখ্যা করলেন নিজের বক্তব্যের । শোনেন নাই অরা কেমন বিরস কন্ঠে পাঁচালি গানের মত টেনেটেনে একঘেয়ে সুরে রবীন্দ্রসংগীত গায় ...পারবেন অমন করে গাইতে?পারবেন না । বলা বাহুল্য কিছুটা হতচকিত গিয়েছিলাম ওনার কথা শুনে । পরে জর্জদার সঙ্গে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হবার পর বুঝেছিলাম এ হল শিল্পীর অভিমানের প্রকাশ । যে পরিমান অকরুণ সমালোচনা এবং অবিচার মানুষটিকে সহ্য করতে হয়েছে রবীন্দ্রসংগীত নামক প্রতিষ্ঠানটির সমাজপতিদের কাছ থেকে ,তাতে এই ধরণের অভিমানের প্রকাশ ঘটা অস্বাভাবিক নয় । সেদিন সকালে নিজে থেকেই বেশ কয়েকটি গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন । তার মধ্যে একটি গানের কথা এত বছর পরেও বেশ মনে পড়ে ।গেয়েছিলেন – উদাসিনী বেশে বিদেশিনী কে সে ,নাই বা তাহারে জানি গানটি । গানেটির অন্তরা্ - পূবের হাওয়ায় তরীখানি তার এই ভাঙা ঘাট কবে হল পার...। লাইনটির “হাওয়ায়” শব্দটির শেষ দুটি অক্ষরকে গর গর মগ মগ প –এই রকম স্বর গুচ্ছের আন্দোলনে সুস্পষ্ট অথচ পেলব তরঙ্গায়িত ভঙ্গীমায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন যে আমি সত্যিই যেন ওই ড্রইং রুমে জর্জদার্ মুখোমুখি বসে ভিজে পূবালী বাতাসের কোমল স্পর্শ পেয়েছিলাম ।মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছিলাম মৃদুমন্দ বাতাসে নদীর জলের ছোট ছোট ঢেউএর দোলায় দুলতে দুলতে সত্যিই যেন একটি পালতোলা নৌকা ভেসে চলেছে!রবীন্দ্রসংগীতের কথা ও সুরের কুশলী প্রয়োগে গান যে কী অপরূপ চিত্ররূপ ধারণ করতে পারে তা এতদিন আমার কল্পনাতেও আসেনি । বস্তুত মায়াদির বাড়িতে সেদিন সকালে আমার রবীন্দ্রসঙ্গীতের নতুন করে দীক্ষা হয়েছিল । ২ জর্জ দার কথা ফলে গিয়ে ছিল ।সেবারের অডিশনে আমি সত্যিই পাশ করতে পারিনি । আকাশবাণীর স্বীকৃতি পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ সাত আঠ বছর । স্বীকার করতে দ্বিধা নেই সেবার অডিশনে পাশ না করতে পারায় বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম । কিন্তু সে হতাশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি কারণ এমন একটা সজীব ক্রিয়াত্মক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে আশৈশব আমি বড় হয়েছি তা আমার মনকে এমনভাবে সচল করে রাখত,এতটাই ভরিয়ে রাখত যে সেখানে সাময়িক অসাফল্যের বেদনা হতাশা প্রভৃতি ঋণাত্মক ভাবনাগুলি মনের মধ্যে স্থায়ী ভাবে বাসা বাঁধতে পারতনা । তার সঙ্গে যুক্ত হল জর্জদার কাছে পাওয়া শিকল ভাঙার মন্ত্র । জর্জদার গাওয়া গান শুনতে শুনতে ,বিভিন্ন সময়ে নানান অবসরে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে বুঝতে পারছিলাম কেবল মাত্র নিখুঁত ভাবে স্বরলিপিধৃত সুরটিকে কন্ঠে তুলে নিয়ে মননহীন পরিবেশনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান সার্থকতা পায়না । রবীন্দ্রনাথের গান তখনই সার্থক হয়ে ওঠে যখন সে গান শ্রোতার ইমোশন এবং ইন্টেলেক্ট কে স্পর্শ করতে পারে । মনে পড়ে জামশেদপুরে এক রবীন্দ্রসংগীতের আসরে অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন “কে গো অন্তরতর সে /আমার চেতনা আমার বেদনা তারি সুগভীর পরশে” গানটি গেয়ে ।এতটুকু অতিশয়োক্তি করছিনা গানটি শুরু হওয়া মাত্র নিজের অজান্তেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম আমি । সেদিন সন্ধ্যায় না ছিল কোন সহায়ক যন্ত্রানুসঙ্গ না ছিল তালবাদ্য শুধু মাত্র হারমোনিয়াম সহযোগে গাওয়া সে গান আমাকে পৌছে দিয়েছিল সেই রসলোকে যেখানে “এত রূপের খেলা রঙের মেলা অসীম সাদায় কালোয়” শ্রোতার অন্তরে এমন প্রলয় জাগান গান আরো বহু গেয়েছেন যেমন - যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারে বারে

253

8

মুনিয়া

আমার পুজো‚ তোমার পুজো

আমার পুজো তোমার পুজো – লেখাগুলো দেখতে দেখতে ও পড়তে পড়তে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে – কদিন ধরে ! কারুর লেখা নিয়ে নয় বরং বলা যায় দৈনন্দিন ঘটনাসমুহ নিয়ে । এক তো আমাদের আগে সংবাদপত্র পুজোর জন্যে দুদিন ছুটি থাকত । - এখন একেবারে চারদিন ! আমি খেয়াল করে দেখেছি – যেদিন সংবাদপত্র বন্ধ থাকে – মনে হয় সেদিনই সব খবর বেরিয়ে গেল ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ! সব যেন একদিনেই ঘটে যাচ্ছে ! হবি তো হ – এবারেই রাবন পোড়াতে গিয়ে কত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল অমৃতসরে ! দোষ তো সব সময়েই জনগনের হয় ! কিন্তু মানুষের মৃত্যু নিয়ে কি নোংরা রাজনীতি – মানুষের প্রতি মানুষের আর কোন ভাব-অনুভাব – দরদ অবশিষ্ট নেই ! – শুধু সংখ্যা আর মৃত্যু-মুল্য ! তাই তো পরস্পরের দেখা হলেই জিগ্যেস করি – কত হোল শেষপর্যন্ত ! ক্রিকেট-টেস্টে বিরাটের রান নয় – অমৃতসরে মৃত মানুষের সংখ্যা কত হোল ! ব্যাঙ্কও তাই । - এখানে বোধয় ব্যাঙ্কের একদিনের ছুটিকে আর ছুটি বলে মনে হয় না ! – সোমবার ব্যাঙ্কে বসে বসে শুনছি – ফোন আসছে – আজ কি ব্যাঙ্ক খোলা আছে ! অর্থাৎ ব্যাঙ্কের কাজের দিনের একটা ক্যালেন্ডার আমাদের কাছে থাকা উচিত ! কবে কবে ব্যাঙ্ক খোলা থাকবে – তাই জানার জন্যে ! অথবা কাগজের পাতায় আজকের তাপমাত্রার নিচেই যদি লেখা থাকে – আজ ব্যাঙ্ক খোলা থাকিবে ! মনে হয় আমাদের মতো গাঁইয়া লোকেদের কিছু সুবিধে হতে পারে ! কমপ্লেক্সের পুজো-মন্ডপে বসে বসে ভিড়ের পরিমাপ করতে থাকি ! কত লোক আসে । এটা কোন একডালিয়া বা দম দমের ভাসমান বা লন্ডনের রাজবাড়ির দুর্গা নয় ! সামান্য এক আবাসনের পুজা ! কোত্থেকে এত লোক তাদের মুখ দেখাতে আসে । - মুখ দেখাতে অর্থাৎ কিনা মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে শেলফি তোলা । শুধু প্রতিমার নয় বা প্যান্ডেলের নয় – আমি যে সামনে দাঁড়িয়ে – সেটার প্রমাণ রইল ! সম্প্রতি আত্মহত্যারও শেলফি রাখতে হয় ! - আর নতুন পোশাকের ! পোশাকের চমকদারী দেখতে হলে – এখন আর কোন ফ্যাশন প্যারেডে বা গড়িয়াহাটের মোড়ে যাওয়ার দরকার নেই ! – ছেলেদের সুবিধে হচ্ছে – একটা নকশাদার শার্ট ও প্যান্ট পড়লেই হোল ! কিন্তু মেয়েদের পোশাক ! - স্মৃতিটুকু থাক থেকে আরম্ভ হয়ে একেবারে রাস্তা ঝাঁট দেওয়া ঘাগরা ! আর পাল্লু তো থাকে কি থাকেনা – অপরের কাঁধে ! খুব বয়স্কা ছাড়া শাড়ি – আজকাল দোকানেই দেখা যায় ! প্রতিবারেই দেখি সার্বজনীন পুজোর সংখ্যা বেড়েই চলেছে ! কোনবারই দেখলাম না – গতবারের তুলনায় একটাও কম ! বরং সবই দেখি – একশো দুশো বছরের প্রাচীন ! এবং আদি ! – আর কেন জানিনা আমার চোখ ক্লান্ত হয়ে কমলাকান্তের মতো গঞ্জিকা প্রভাবে ভাবতে বসে – আমাদের পুজা-কমিটি ঘোষণা করিতেছে যে - দু শো ছিয়ানব্বই বছরের প্রাচীন দুর্গাপূজা এখানে আর অনুষ্ঠিত হইবে না ! - আমাদের শোক সাগরে ভাসাইয়া দিয়া এইবারই শেষবার আবির্ভাব হইতেছেন ! কারুর অনুপ্রেরণায় মন্ডপে দুর্গা-মাকে রাখবো না – বিজয়ার দিনেই যথাযথ সন্মানে বিসর্জন দিব ! – বল দুর্গা মায়ি কী - ! যাহ্‌ ! গঞ্জিকায় একশো শতাংশ - ভেজাল ছিল ! মনোজ

455

36

দীপঙ্কর বসু

আমার পুজো

‚আজ নবমী - এখানে বাজার হাট সব বন্ধ|দুই একটি দোকান যদিবা খোলা আছে তাদের ভান্ডার শুন্য | দুধ নেই ‚পাউরুটি নেই ডিম নেই কিচ্ছু নেই কিচ্ছু নেই|কারণ ডেয়ারিফার্মে পুজোর ছুটি ,বেকারি, পোল্ট্রি ফার্মের অবস্থাও তথৈবচ- সবাই পুজোর ছুটি উপভোগ করছে । কি বললেন? এসেনশিয়াল সার্ভিস মারাচ্ছেন ? এসেনশিয়াল সার্ভিসের লোকেদের কি বিবি বাচ্চা থাকতে নাই?| তাদের দুটো সখ আহ্লাদ থাকতে পারেনা? অকাট্য যুক্তি ,সেই সঙ্গে আছে সরকারি ফরমানের সাপোর্ট । চেপে যাওয়াই মঙ্গল । এককালে শুনেছি কোথাও কোথাও নর বলি হত !! কে বলতে পারে কখন কার মধ্যে সেই আদিম ভক্তিরস উথলে পড়বে ।অতয়েব দুই ঘটি জল খেয়ে পেটে খিল দিয়ে ঘুমিয়ে নবমীর নিশি ভোর করে দেওয়াই ভালো অথচ ছেলে বেলায় একদিকে ছিল সম্বৎসরের দুর্গোৎসবকে ল্যাজা মুড়ো সুদ্ধ চেটেপুটে খেয়ে নেবার দিন অন্য দিকে সারাদিন মনের মধ্যে বাজতে থাকে বিদায় ব্যথার ভৈরবী।তারই মাঝে একটু আড়াল খুজে নিয়ে সবার কান বাঁচিয়ে ঝলমলে ফ্রকপরা কিশোরীটি তারা দিদির এত্তেলা জানিয়ে যায় "দিদি সন্ধ্যেবেলা রামমন্দিরে আসতে বলেছে"কথা কটি চাপা গলায় বলে দিয়েই দেচ্ছুট । আজকের দিনে সব বাঙালির একটাই কামনা। নবমী নিশি যেন ভোর না হয় । কিন্তু কালচক্রকে থামায় কার সাধ্যি তবু নবমীনিশি ভোর হয় ।ঝুপ করে থেমে যায় কদিনের হাসি খুশীর মেলা ।

232

8

মানব

কল্প-গল্প

বিমলবাবুর মগজাস্ত্র ________________________________________________________________________________ "বুঝলে গিন্নী, আমাদের মস্তিষ্কের মাত্র দশ শতাংশ আমরা ব্যবহার করি। বাকি নব্বই ভাগ অব্যবহৃতই থেকে যায়।" বিজ্ঞের মত করে কথাগুলো নিজের স্ত্রীকে বললেন বিমলবাবু। "তাই নাকি? আর বাকি নব্বই ভাগ কি মাথার ওজন বাড়ায়? ওসব তোমার হতে পারে আমার নয়। যেমন তোমার নিরেট মাথার ওজন তেমনি তোমার ভুঁড়ির। পাল্লা দিয়ে খাচ্ছে দাচ্ছে আর ওজন বাড়াচ্ছে। তারপর আবার এইসব আজগুবি কথাবার্তা কোত্থেকে শুনে এসে আমারও মাথা খাচ্ছে। জীবনটা আমার নরক করে দিলে গোওওওও......" সকাল সকাল এমন একটা উত্তর বৌএর কাছে আশা করেননি তিনি। আগের দিন অফিসের একটা সেমিনারে একজন এই কথাগুলোই বলছিলেন। আমাদের মস্তিষ্কের অব্যবহৃত অংশগুলো ব্যবহার করে নাকি আমরা নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারি। সেটা শোনার পর থেকেই তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, 'তার মানে জনতা আমাকে যতটা বোকা মনে করে, আমি ঠিক ততটা নই!' নিজেকে বোকা থেকে চালাক পর্যন্ত বিস্তৃত ত্রৈমাত্রিক স্তম্ভের যে স্তরে তিনি রাখেন তা প্রশম স্তরের থেকে অনেকটাই নীচে। গতকাল সেমিনারে বক্তার কথাবার্তা শুনে তাঁর মনে হল তিনি প্রশম স্তর থেকে কিছুটা উপরে উঠে গেছেন; আজ আবার এমন চরম অপমানের পর তিনি আগের অবস্থানেই ফিরিয়ে আনলেন নিজেকে। তবুও অভ্যাসমতো মগজাস্ত্রে শান দেওয়ার জন্য তিনি ধ্যানে বসলেন। তবে আজ একটু অন্যরকমভাবে। ধ্যানমগ্ন হয়ে তিনি সর্বশক্তিমানকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে শুরু করলেন। "আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাব? কেন আমার এই দুর্দশা এই পৃথিবীতে? দশ ভাগ ব্যবহার করে নাহয় আমি বোকা হয়ে রয়ে গেছি, কিন্তু আমাকে বাকি নব্বই ভাগের মধ্যে অন্ততঃ কিছুটা ব্যবহার করার অধিকার দাও হে প্রভু।" **************************************************** বিমলবাবুর বাড়ির পাশ দিয়েই একজন দেবদূত যাচ্ছিলেন বান্ধবীর সাথে। সকালের শিউলির মনমাতানো গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গুনগুন করে কি যেন একটা চেনা সুরে গান ধরেছেন তাঁরা। দেবদূতের নাম ধীরজকুমার, আর তাঁর বান্ধবী রেণুকুমারী। উভয়েই তাঁদের কুমারত্ব এবং কুমারীত্বের দম্ভ বজায় রাখার জন্য বিবাহ করেননি। এইতো কয়েকদিন আগেই উচ্চ আদালত বিনা বিবাহে সম্পর্ক বজায় রাখাকে আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। যদিও নথিভুক্ত আইন না থাকাকালীনও তাঁরা এসব গ্রাহ্য করতেন না, তবুও একটা নিয়ম রাখা ভাল এই ভেবে সর্বোচ্চ বিচারক এই সিদ্ধান্ত নেন। হাজার হোক, তাঁকে আর বারবার যুবক-যুবতীরা আইন অবমাননা করছে এই অভিযোগ শুনতে হবেনা। পৃথিবীলোকের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আজকাল দেবদূতের নিয়োগ বাড়াতে হচ্ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে মাইনে, অন্যান্য খরচ ইত্যাদি। তাই স্বর্গরাজ্যে আর একটা অভিনব পন্থা নেওয়া হয়েছে। কাজের সময়েও দেবদূত প্রেমিক প্রেমিকাদের একসাথে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে যেমন যানবাহনের জ্বালানির খরচ বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি খুশীমনে কাজ করতে পারছে এরা। তাই অযথা দাবীদাওয়া কমেছে, কমেছে আন্দোলন, পরকীয়া, বিবাহ-বিচ্ছেদ(অবশ্য বেশিরভাগ কর্মচারী বিবাহই যখন করছেনা, বিচ্ছেদের প্রশ্নই আসছেনা)। এমনি উৎফুল্ল মনে যখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুজনে, হঠাৎই বিমলবাবুর মস্তিষ্কের তরঙ্গ শব্দের আকারে নিক্ষিপ্ত হল তাঁদের কানে। ইহজগতের সমস্ত স্মৃতি মুছে দেওয়ায় তাঁরা এখন নিজেদের দেবতাদেরই অংশ বলে মনে করেন। বিমলবাবুর কথা শুনে ধীরজ মনে মনে বললেন, 'হায়রে মনুষ্য, যখন তোদের মস্তিষ্ক পুরোটা ব্যবহার করার সময় ছিল তখন তার ব্যবহার না করে তোরা আবিষ্কার করেছিস যন্ত্র। যে মস্তিষ্কের তরঙ্গ দিয়ে যোগাযোগ করা যেত ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, সেখানে তোরা আটকে গেলি আলোর গতিবেগে। আর এখন তোদের মনে হচ্ছে তোরা পুরোটা ব্যবহার করিসনি। আসলে তোদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কমে গেছে। এখন বাকী নব্বই শতাংশ ঢুকে গেছে কম্পিউটারে, মোবাইলে। যত এইসব যন্ত্রের ক্ষমতা বাড়বে, পাল্লা দিয়ে কমবে তোদের মাথা খাটানোর ক্ষমতা।' ওদিকে রেণুকুমারী মনে মনে উতলা হয়ে উঠেছেন। তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে ধীরজকুমার বললেন, 'উতলা হয়োনা। আমি জানি, ভালো মানুষদের সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য, কিন্তু নিজে হাতে সবটা করে দিলে ও আবার আমাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। চেয়ে দেখো, ও চোখ খুলছে। আজ যে জ্ঞান ওকে আমি প্রদান করছি, তাই দিয়েই স্বনির্ভর হয়ে মানুষের ভালো করতে পারবে ও। হাসিমুখে ধ্যানমগ্ন বিমলবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন তাঁরা দুজনে। **************************************************** ওদিকে বিমলবাবু ধ্যান করতে করতে আজ এমন উচ্চস্তরে চলে গিয়েছিলেন যে ধীরজকুমারের মনের কথাও তিনি শুনতে পেলেন। ভুলে গেলেন তাঁর উপর হওয়া সমস্ত অপমান। এখন তাঁর জীবনে শুধু একটাই উদ্দেশ্য, স্বনির্ভর হওয়া। চোখ খুললেন তিনি। প্রথমেই মাথায় এলো, কোথায় কোথায় তিনি মগজাস্ত্রের বদলে যন্ত্রের উপর নির্ভর করেন। তারপর শুরু করলেন আত্মজাগরণ। প্রথমেই অফিসের কাজগুলোকে দেখবার চেষ্টা করলেন। অফিসের বেশিরভাগ কাজই এক্সেল-এ হয়। সেই কবে কে ফর্মুলা তৈরী করে দিয়ে গিয়েছিল, সেখানেই শুধুমাত্র সংখ্যা টাইপ করে করে নিজেকে কেমন যেন রোবট মনে হতে শুরু করেছিল তাঁর। আজ তিনি দেখলেন কি কি সূত্র দিয়ে হচ্ছে সেসব গণনা, কিভাবে আসছে লাভ-ক্ষতি-অনুপাতের হিসেবনিকেশ। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি এত গভীরে ঢুকে গেলেন যে জানার দরকার হয়ে পড়ল লক করে রাখা ট্যাবগুলোর ফর্মুলা জানার। সেসব পাসওয়ার্ড অনেকদিন আগেই হারিয়ে গেছে, মনে নেই কারও। তাই কেউই সদুত্তর দিতে পারলেন না তার। তবে একটা জিনিস সবাই বুঝতে পারলেন, বিমলবাবুর মগজাস্ত্র ধারালো হচ্ছে দিনে দিনে। যে লোকটা বাড়ি যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকত, সে আজকাল সবকিছু সবিস্তারে খুঁটিয়ে দেখছে। 'কি করতে হবে' সেই প্রশ্নের সঙ্গে আর একটা প্রশ্নও করছেন তিনি, 'কেন করতে হবে?' আজকাল কেউ তাকে খুব একটা ঘাঁটায় না। এমনকি গিন্নীও না... এইতো সেদিন গিন্নী তাঁকে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'গামছাটা কোথায় রেখে দিয়েছ শুনি? কোন জিনিস যদি দরকারের সময় পাওয়া যায়...'। বিমলবাবু মিষ্টি হেসে বললেন, 'তবে তোমার কোমরে বাঁধা ওটা কী?' এবং জিভ কেটে লাজুক মুখে গিন্নীর প্রস্থান। **************************************************** ধীরজ-রেণু জুটি এই কয়দিন কোথাও যাননি। তাদের প্রথম বড় কেস বলে কথা। বছর কুড়ি আগেও নিজেদের অফিসঘর থেকে তারা মানুষের মনের কথা শুনতে পেতেন, অবশ্য তখন তাঁদের বস-এর অর্ডারে কাজ করতে হত। এখন তারা নিজেরাই কেস হ্যান্ডেল করেন। কিন্তু মোবাইল টাওয়ারের যা উৎপাত মানুষের মস্তিষ্ক-তরঙ্গ অতদূরে পৌঁছতেই পারেনা আজকাল। তার উপর বিবর্তনের প্রভাবে অন্যান্য জীবজন্তুদের চিন্তাশক্তি বাড়ছে। হয়ত অচিরেই উন্নততর কোন জীবের আবির্ভাব হবে হঠাৎ করেই। তার আগেই মানুষকে সচেতন করতে হবে, অনেক অনেক মানুষকে। প্রথম কাজটা যখন সফলভাবে হয়েছে, পরেরগুলো নিশ্চয়ই আরও তাড়াতাড়ি এবং সফলভাবেই সম্পন্ন হবে। এই আশায় তাদের রথ রওনা দিল অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বহু বছর আগে ফুরিয়ে যাওয়া তারারা তখনও সগৌরবে জ্বলজ্বল করে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ জাহির করে চলেছে পৃথিবীর মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে।

286

10

ঝিনুক

এ এক অন্য পুজোর গল্প ......

সপ্তাহ দু'য়েক আগে বুধসন্ধ্যাতে হাঁটতে গিয়ে এ'কথায় সেকথায় দুই বন্ধুতে মিলে ঠিক করে ফেললাম থ্যাঙ্কসগিভিঙের উইকএণ্ড পুরোটাই পাহাড়ে কাটাতে হবে| ব্যস‚ উঠল বাই তো কটক থুড়ি পাহাড়ে যাই| এত দেরি করে বুকিং পাব‚ সত্যিই ভাবি নি| কিন্তু 'যে খায় চিনি' - সেই লজিকে চিন্তামণি জুটিয়ে দিলেন একখানা ঘর| আসলে পুজো-গণ্ডা‚ উৎসবের দিনে বোধহয় আমরা প্রিয়জনকে আরো বেশি করে মিস করি‚ আরো বেশি করে খালি খালি লাগে বুকের ভিতরটা| থ্যাঙ্কসগিভিঙের আগমার্কা খাঁটি কেনেডিয়ান টার্কী ডিনারের জম্পেশ নেমন্তন্ন ছিল রবিবার সন্ধ্যায়| কিন্তু ক'দিন ধরেই মনটা বড্ড দুখাচ্ছে গাণুশের জন্য| ইচ্ছে করছিল না কারো বাড়ি গিয়ে থ্যাঙ্কসগিভিঙ মানাতে| অগত্যা সকল দু:খহরণ -- আমার পাহাড়| শনিবার প্রায় ন'টা বাজিয়ে ঘুম থেকে উঠে জুতো-জামা-দন্তমঞ্জন (পিওর বাংলা কিন্তু) গুছিয়ে নিয়ে দুই বন্ধুতে মিলে রওনা দিলাম পাহাড়ের পানে| তিনদিন আগেকার উদ্দাম তুষারঝড়ের কোন দিশা কোথাও নেই ঝকঝকে আকাশে‚ শুধু রয়ে গেছে তার থৈ থৈ চরণচিহ্ন সারা পাহাড় জুড়ে‚ দুইফুট বরফে ঢাকা পাহাড়িয়া পাকদণ্ডীতে| জুতোয় স্পাইক লাগাতে হল পাহাড়ে চড়ার আগে| অনেক দেরি করে শুরু করেছি দিন| ছোট্ট একটা ৮ কিলোর মিঠেকড়া হাইক দিয়ে খাতা খোলা হল থ্যাঙ্কসগিভিঙ উইকএণ্ডের| নতুন আর কি লিখি‚ কি লেখা বাকি আছে আমার পাহাড়ের কথা? যতবারই যাই‚ যেদিকেই চাই‚ শুধু একটাই লাইন ফিরে ফিরে গুণগুণ করে গাই‚ ..... "আজ ত্রিভুবন-জোড়া কাহার বক্ষে দেহ মন মোর ফুরালো- যেন রে নি:শেষে আজি ফুরালো" ..... পরের দিন মানে রবিবারও ধবধবে কাচা নীল নীল সুনীল আকাশ‚ পুজো পুজো রোদ| বরফের শুভ্রতায় রোদ্দুর ঠিকরে চোখে ধাঁধা লেগে যেতে চায় রোদচশমা ভেদ করে| আজকের অভিযান সোনালি লর্চ সন্দর্শনের মানসে| কি এত বিশেষত্ব এই সোনালি লর্চের? কেন তার জন্য দুস্তর বরফ ঠেঙিয়ে‚ খাড়াই চাড়াই পেরিয়ে এই মরণপণ লাফালাফি? সেটা চর্মচক্ষে না দেখলে বুঝিয়ে বলা অসম্ভব| তবে কেজো কথায় যতটুকু বোঝানো সম্ভব‚ সেটুকু চেষ্টা তো করা যেতেই পারে‚ নাকি? এই লর্চ হল দুনিয়ার একমাত্র পর্ণমোচী কনিফার| কনিফার বলতেই আমাদের মনে পড়ে পাইন‚ ফার‚ স্প্রুস‚ সীডার ইত্যাদি ইত্যাদি| মানে যারা চিরসবুজ..... শীত‚ বসন্ত‚ গ্রীষ্ম‚ হেমন্ত‚ ঋতুনির্বিশেষে যারা সদা সর্বদা সবুজ আর সবুজ‚ যাদের পাতা ঝরে না হেমন্তের হিমেল বায়ে‚ শীতের তুষার মেখেও যারা দিব্যি পরিপাটি সবুজ হয়ে থাকতে পারে| একমাত্র ব্যতিক্রম এই লর্চ| বসন্তে নরম সবুজ নতুন পাতায় সেজে ওঠে‚ অন্য কনিফেরাস গাছের মতই সুঁচের মত সরু সরু পাতা‚ ইংরেজিতে যাকে বলে নীডলস| তবে লর্চের নীডলসগুলো খুব মোলায়েম‚ নরম| হেমন্তে সেই নীডলসগুলো সব তুমুল সোনালি রঙে পাল্টে যায় ঝরে যাওয়ার আগে| মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহ হেমন্তের শুরুতে‚ তার মধ্যেই সবুজ থেকে হলুদ‚ তারপর গাঢ় সোনালি হয়ে ঝরে যায় শেষতম নীডলটাও| গরম তাদের মোট্টে সয় না‚ তাই পাহাড়ের অনেকটা উপরে (subalpine উচ্চতায়) ট্রীলাইনের শেষ সীমানায় তাপমান যেখানে চিরকালীন অনুষ্ণ‚ সেইখানে তাদের সুখের বসত| কানাডা আর সাইবেরিয়াই মূলত এদের দেশগাঁ‚ বাকি খবর গুগল জ্যেঠুর কাছে শুধিয়ে জেনে নিন| "সাতটি যে পৃথিবীর বিস্ময়‚ তুমি তারও চেয়ে বেশি মনে হয়"...... পাহাড়ের মাথায় সোনালি শরীরে হৈমন্তী রোদ্দুর মেখে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি লর্চ‚ সত্যিই অনন্য‚ অনুপম| কোন ভাষা‚ কোন ছবিই যথেষ্ট নয় সেই রূপ বোঝাতে| আর কোন পুণ্যের ফলে যে আমি এই বিরল সৌভাগ্যের ভাগী জানি না‚ তবে কানাডার লর্চ সেন্ট্রাল আমার ভদ্রাসন থেকে মাত্রই দু'ঘন্টার ড্রাইভ| সারা পৃথিবী থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসে লর্চের এই পীঠস্থানে‚ এই দুর্লভ দৃশ্যের সাক্ষী থাকতে‚ এই অসাধারণ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে| কাছে যেতে হলে‚ ভালোবেসে স্পর্শ করতে হলে খাড়াই পাহাড় ভাঙতে হবে| কিন্তু দূর থেকে দেখতে (পড়ুন ঝারি মারতে) তো কোন খচ্চা থুড়ি পরিশ্রম নেই| আর তার জন্য সবার সেরা ভিউয়িঙ গ্যালারি হল হাইউড পাস‚ ৭০০০ ফুট উচ্চ্তায় কানাডার সবচেয়ে উঁচু হাইওয়ে| ডিসেম্বরের এক তারিখ থেকে জুন মাসের ১৫ তারিখ অবধি ছমাস বন্ধ থাকে এই রাস্তা| রকির বুক চিরে দুইপাশে উত্তুঙ্গ পর্বশৃঙ্গ আর সুগভীর সবুজ পাইনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে এই পথ| ধারে ধারে ব্যবস্থা করে দেওয়া আছে পথিকের জন্য‚-- ক্ষণিকের বিশ্রামের‚ দশদিগন্ত আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য| আর আছে অজস্র ট্রেইলহেড| শুধুই দূর থেকে দেখে যাদের পিপাসা মেটে না‚ "প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসী" বলে যারা তীর্থযাত্রা করবে চড়াই ভেঙে তাদের যাত্রাপথের শুরু এই সব ট্রেইলহেড থেকে| পাহাড় সুন্দর‚ জঙ্গল সুন্দর‚ সারা বছরই সুন্দর| ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে তার ভিন্ন ভিন্ন সাজ| কিন্তু এই দু'তিনটে সপ্তাহ‚ বিশেষ করে ঝরে যাওয়ার আগে যখন পুরোপুরি রঙ পাল্টে আগুনের মত সোনালি হয়ে যায় সব লর্চ‚ দূর থেকে মনে হয় যেন সোনালি জরির মিহিন কাজ করা ঘন সবুজ জারদৌসিতে সেজেছে পাহাড়| মাথায় বরফের তাজ‚ উপরে সুনীল আকাশের অসীম বিস্তার‚ আর এমন নয়নাভিরাম সাজ‚ সেই ব্যাপ্তি‚ সেই সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়ালে মাথা আপনি নত হয়ে আসে| এবারের অভিসার সেই ঊষসী লর্চকে নিবিড়ভাবে ছুঁয়ে দেখতে| প্রাতরাশ সেরে হাল্কা লাঞ্চ প্যাক করে রওনা দিলাম হাইউড পাস ধরে| গন্তব্য Highwood Medows... এখান থেকে অনেকগুলো ট্রেইলের যাত্রা শুরু| আমাদের আজকের তীর্থ Ptarmigan Cirque... শতাব্দী প্রাচীন স্প্রুস‚ ফার আর পাইনের ঠাসবুনোট জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বরফে পিছল পথ একটু একটু করে এঁকে বেঁকে খাড়া উঠে গেছে পাহাড়ের মাথায়| হাঁসফাঁস করতে করতে একটু যাই‚ দম নিতে একটু জিরাই| প্রতিটা বাঁকে বাঁকে বর্ণনার অতীত সব কোডাক মোমেন্ট‚ থামতেই হয় ছবি তুলতে| গাছের ফাঁক দিয়ে গলে আসা সোনা রোদ সুচারু আলপনা আঁকে পায়ের কাছে বরফের উপর| এ হল ভালুকরানীর খাসতালুক‚ তার ঘরের উঠোন দিয়ে চলার অনুমতি চেয়ে জোরে জোরে গান গাই গলা ছেড়ে বেজায় বেসুরে| খানিকটা উঠতেই দেখা হয়ে গেল প্রথম লর্চের সাথে| ঝুরু ঝুরু ঝরছে তার পাতা‚ পায়ের কাছে সোনালি হয়ে আছে বরফ| জড়িয়ে ধরে বললাম‚ "শুধু তোমার জন্যই এলাম"| সে দুলে উঠে ঝুরিয়ে দিল আরো কিছু সোনালি পাতা আমার মুখে মাথায়| যত উপরে উঠতে থাকলাম‚ লর্চের সংখ্যাও বাড়তে থাকল| এইভাবেই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম একসময়| কাঁধের থেকে ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে রেখেই গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নিলাম কয়েক পাক দুই হাত তুলে| এক এক করে চারদিক ঘুরে ঘুরে শুধালাম‚ "তোমার নাম কি গো‚ মহারাজ?" উত্তর এল প্রতিধ্বনিতে‚ "মহারাজ..... রাজ..... রাজ......" হাঠাৎ মনে হল সামনের চূড়াটা ঘাড় হেলিয়ে আমায় শুধাচ্ছে‚ "তোমার নাম কি?" "পাগলি বলে ডাকে লোকে‚ হ্যাঁ গো‚ পাগলি"‚ উত্তর দিই| শুনি‚ পাহাড় ডাকছে আমায় নাম ধরে মন্দ্র স্বরে‚ "পাগলি..... পাগলি-ই-ই-ই....পাগলি-ই-ই-ই....." বন্ধু হেসেই খুন আমার কীর্তি দেখে‚ বলে‚ "তুমি এক্কেবারে পাগল"| বললাম‚ "সেই কথাটাই তো বলছিলাম পাহাড়কে"| একটা বড়সড় পাথর দেখিয়ে বন্ধুকে বললাম‚ "ঐ যে‚ ঐ টেবিলটাতে আমাদের রিসার্ভেশন|" গুছিয়ে বসলাম দুজনে মধ্যাহ্নভোজন সারতে| খেয়েদেয়ে মুখ মুছে বললাম‚ "থ্যাঙ্ক ইয়ু ঝিনুক‚ এমন চমৎকার একটা লাঞ্চের জন্য|" বন্ধু হেসে লুটোপাটি| আআআহ‚ পাহাড়ের মাথায় থেবড়ে বসে আঙুল অবশ করা ঠাণ্ডার মধ্যে গরম আদা-চায়ে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুকে শুধালাম "স্বর্গ কি এর চেয়েও সুন্দর‚ সিনথিয়া?" সে যে কি অপার্থিব শান্তি চরাচর জুড়ে! চারপাশ ঘিরে পাহাড়ের মাথায় পড়ন্ত বিকেলের কমলালেবু রঙের নরম আলো‚ সোনালি মেখলা পরে আহ্লাদী লর্চ পরীরা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের কোলের কাছটি ঘেঁষে‚ কুলুকুল আওয়াজ করে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণতোয়া ঝোরা ......"আমার আদি ও অন্ত জুড়ালো- আমি কেমন করিয়া জানাব আমার জুড়ালো হৃদয় জুড়ালো"..... হস্টেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল| আজকাল তো সাতটা না বাজতেই অন্ধকার হয়ে আসে| ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে পোর্টের বোতল খোলা হল| চিপস‚ চীস আর সসেজ-- থ্যাঙ্কসগিভিঙ সন্ধ্যার অ্যাপেটাইসার| ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে আর গল্প করতে করতে থ্যাঙ্কসগিভিঙ ডিনার রাঁধলাম দুজনে মিলে‚ আমি মাছ আর আলুভাজা‚ বন্ধু স্টাফড টার্কী ব্রেস্ট আর স্কোয়াশ| ডিনারের সাথে হোয়াইট ওয়াইন| হস্টেল ম্যানেজার যোগ দিলেন আমাদের সাথে খাবার টেবিলে| আজকের এই রাত থ্যাঙ্কসগিভিঙের রাত‚ কৃতজ্ঞতা জানানোর পরম লগ্ন--- ভগবানের উদ্দেশ্যে| Thank you God for everything.... হে দুনিয়ার মালিক তোমায় প্রণাম-- ক্ষুধার অন্ন‚ তৃষ্ণার জল‚ সব কিছুর জন্য‚ এই জীবনের জন্য‚ প্রতিটি দিনের জন্য| আমার তো ভগবান নেই‚ গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে প্রাণভরে ধন্যবাদ জানালাম আমার পাহাড়কে‚ ধন্যাবাদ জানালাম লর্চসুন্দরীদের আজকের এই অসাধারণ দিনটার জন্য‚ ধন্যবাদ জানালাম কানাডাকে‚ ধন্যাবাদ জানালাম আমার জন্মভূমিকে| ধন্যবাদ জানালাম আমার গাণুশকে‚ Thank you baby for always being there for me... মনে মনে আভূমি প্রণতি জানালাম আমার বাবাকে‚ আমার মাকে| প্রণাম করলাম আমার ধরিত্রী জননীকে‚ মাপ চেয়ে নিলাম সব অপকর্মের জন্য‚ "ক্ষমা করে দিও গো মা আমাদের যত ভ্রষ্টাচার‚ সব অত্যাচার|" আর আমার সুজন সখাকে‚ "মোর অন্ধকারের অন্তরে তুমি হেসেছ‚ তোমায় করি গো নমস্কার" ..... গল্প করতে করতে খাওয়াটা একটু ভারিই হয়ে গেল| ফায়ারপ্লেসের আগুন ঘিরে বসে আরো কিছু গল্পগাছা হল ডিনার শেষে‚ পরের দিনের প্ল্যান প্রোগ্র্যাম হল| সারাদিনের পরিশ্রম‚ ভরপেট খানা এবং পিনার পরে চোখ জুড়ে আসতে চাইছিল| কিন্তু একটা গুরুতর অ্যাজেণ্ডা বাকি রয়ে গেছে| তাই একটা অবধি আগুন উসকে বসে রইলাম দুজনেই| তারপর পার্কা কোট‚ বুট‚ টুপি‚ স্কার্ফ‚ গ্লাভসে ভূষিত হয়ে বাইরে গিয়ে বসলাম ঊর্ধ্বমুখে আমরা দুজন‚ অরোরা দর্শনের অভিপ্রায়ে| অমাবস্যার মহানিশা‚ মেঘমুক্ত আকাশ কুচকুচে কালো‚ তাতে লক্ষ তারার সলমা জরি‚ তিরতির করে কাঁপে ছায়াপথ (মিল্কি ওয়ের বাংলা তো এটাই?)| এর থেকে পারফেক্ট রাত আর হতে পারে না মেরুজ্যোতি দেখার জন্য| ফোরকাস্টও আছে‚ কিন্তু আসবে কি সে আজ রাতে আমরা জেগে থাকতে থাকতে? 'ঝুম ঝুম ঝুম রাত নিঝুম' ..... নিস্তব্ধ জঙ্গল‚ এমনকি একটা রাতচরা পাখির ডাকও শোনা যায় না| শুধু গাছেদের সাথে হাওয়ার ফিসফাস আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা এভ্যালাঞ্চের শব্দ| ঘন্টাখানেক বসে রইলাম‚ রাত নিবিড় থেকে নিবিড়তর হল‚ পুরু কোট ভেদ করে ঠাণ্ডা চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকতে শুরু করল শরীরে‚ বাতাস দিক পাল্টে বেশ জোরে বইতে শুরু করল‚ গাছগুলো ঝাপটাঝাপটি শুরু করল পাগলের মত‚ কিন্তু 'সে তো এল না‚ এল না'| দেখা হল না তার সাথে আমাদের এ'যাত্রায়| সোমবার সকালে উঠতে বেলা আটটা বেজে গেল| জলখাবার বানিয়ে খেয়ে‚ ব্যাগবোঁচকা সব গুছিয়ে‚ গাড়িতে চাপিয়ে‚ দুপুরের জন্য স্যাণ্ডুইচ‚ চা বানিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চেক আউট করে| বাড়ি ফিরে যাবার আগে আর এক দফা তীর্থভ্রমণ| আবার হাইউড পাস‚ আজ যাব Pocaterra.. আজ আকাশের মুখভার‚ স্নো পড়ছে‚ তেমন মারাত্মক কিছু নয়‚ তবে একেবারে মন্দও নয়| আবার সেই তুষারিত খাড়া বনপথ পেরিয়ে চলা-থামা-চলা‚ লর্চের শাখায় ভালোবেসে এঁকে দেওয়া ঠোঁটের স্পর্শ‚ চমকে যাওয়া কাঠবিড়ালি‚ থমকে যাওয়া হরিণছানা‚ ধীরে ধীরে পৌঁছে যাওয়া‚ তুষারের উজ্জ্বল সাদা প্রেক্ষাপটে ছবির মত লর্চের সোনালি প্রান্তর‚ পাহাড়ের মুখোমুখি বসে লাঞ্চ‚ অবশ দুই হাতে থার্মোসটা জড়িয়ে ধরে মৌজ করে চায়ে চুমুক দেওয়া| তবে আজ সাথী তুলো তুলো বরফ| বেশ জোরে হাওয়াও বইছে‚ খুরধার ছুরির মত ঠাণ্ডা হাওয়া| আজ যাত্রীর সংখ্যাও অনেক কম পথে| কখনো কখনো পুব আর পশ্চিমে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়| যেমন আজ- ঐ স্বর্ণালি লর্চের ক্যানভাসে ফুটে উঠতে থাকে সোনার বরণী গৌরীর মুখখচ্ছবিটি| এপারে আজ থ্যাঙ্কসগিভিঙের ছুটি| পৃথিবীর অপর পারে মহালয়া| নেমে আসার আগে হাতের গ্লাভস খুলে আঁজলা ভরে তুলে নিই বরফ‚ আঙুলগুলো অসাড় হয়ে যেতে থাকে মুহূর্তের মধ্যেই‚ আমি চোখ বন্ধ করে বলতে থাকি...."ওঁ আব্রহ্মভুবনাল্লোকা দেবর্ষি পিতৃমানবাঃ। তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্বে মাতৃমাতমহোদয়ঃ । অতীত কুলকোটীনাং সপ্তদ্বীপনিবাসিনাম। ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ম।।” .... তারপর সুবিশাল এক লর্চের পায়ের গোড়ায় ঢেলে দিই আমার মন্ত্রপূত বরফের অঞ্জলি| এই আমার মহালয়া| তর্পণ শেষ করে আমার ধন্যবাদ জানাই বর্ষীয়ান সেই গরীয়সী লর্চকে‚ পাহাড়কে ডেকে বলি "Thanks again",.... "এই নম্র নীরব সৌম্য গভীর আকাশে তোমায় করি গো নমস্কার"..... এবার ফেরার পালা| নি:শব্দে ঝরে পড়ে বরফ‚ নিরুচ্চারে ঝরতে থাকে লর্চের সোনালি পল্লব| আচ্ছা লর্চের বাংলা কি? নাহ‚ লর্চের বাংলা নেই| মহালয়ার যেমন ইংরেজি হয় না‚ লর্চেরও তেমনি বাংলা হয় না| সারাটা পথ সবাইকে বলতে বলতে চলতে থাকি‚ "ভালো থেকো‚ ভালো থেকো‚ আবার আসব‚ আবার দেখা হবে সামনের বছর"..... যেতে পা সরে না‚ তবু যেতে তো হবেই| ফিরে ফিরে দেখতে থাকি বারবার| সামনের সপ্তাহেই যদি ফিরে আসি‚ এই রঙ‚ এই ছবি হয়তো পুরোটাই বদলে যাবে‚ ঝরে যাবে সব সোনা‚ ঘুমিয়ে পড়বে লর্চেরা সবাই| ঠিক যেন দশমীর প্রতিমা বিসর্জনএর পর শূণ্য বেদীটি| তাই একটু যাই‚ আবার ফিরে চাই‚ একবার এদিক‚ একবার ওদিক| শেষবারের মত আর একবার| এই তো আমার পুজো‚ আমার বোধন‚ আমার অধিবাস‚ আমার সন্ধিপূজা‚ এইভাবেই আমার দশমী ..... "এ এক অন্য প্রেমের গান‚ এ এক অন্য প্রেমের সুর"..... এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সুন্দর শান্তি আজ পাহাড়ে| কালকের রৌদ্রস্নাত পাহাড় আর আজকের মেঘের চাদর গায়ে জড়ানো বরফভেজা পাহাড়‚ একেবারে দুটো আলাদা রূপ‚ শুধু মুগ্ধতাটুকু আমার একই রয়ে যায় ..... "আজ গিয়েছি সবার মাঝারে, সেথায় দেখেছি আলোক-আসনে- দেখেছি আমার হৃদয়-রাজারে, আমি দু'য়েকটি কথা কয়েছি তা সনে সে নীরব সভা-মাঝারে- দেখেছি চিরজনমের রাজারে, আমি কেমন করিয়া জানাব "......

188

2

শিবাংশু

পঞ্চ-ম'কার নিয়ে দুচার কথা

"তন্ত্রসাধনার মূল স্রোতটি যে আচারপদ্ধতিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে, তা হলো পঞ্চ ম-কার ক্রিয়া । এই পদ্ধতিটি নিয়ে আবহমানকাল ধরে নানা ধরনের পরস্পর বিপ্রতীপ মতামত প্রচলিত রয়েছে। প্রায় সোয়াশো বছর আগে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবার উপক্রমনিকা হিসেবে একটি কৈফিয়ৎ যেমনভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো, ''...ভারত-প্রচলিত তান্ত্রিক উপাসনার প্রকৃত মর্ম ও পঞ্চ মকারের মূল উদ্দেশ্য আমাদের জ্ঞানে যতদূর উদ্বোধ হইয়াছে এবং ইহার আধ্যাত্মিক-তত্ত্ব যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে....'' ইত্যাদি । অর্থাৎ এই ব্যাখ্যাটির প্রামাণ্যতা নির্ভর করছে দু'টি বিষয়ের উপর, 'আমাদের জ্ঞান' ও ''যতদূর জানিতে পারা গিয়াছে''। এ বিষয়ে সাক্ষী মানা হয়েছে 'আগমসার' নামের একটি প্রাচীন গ্রন্থের । এই গ্রন্থে প্রথম-ম, অর্থাৎ 'মদ্য' সাধন বিষয়ে বলা হয়েছে, '' সোমধারা ক্ষরেদ যা তু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ বরাননে । পীত্বানন্দময়ীং তাং য স এব মদ্যসাধকঃ ।।'' তাৎপর্যঃ- '' হে পার্বতি ! ব্রহ্মরন্ধ্র হইতে যে অমৃতধারা ক্ষরিত হয়, তাহা পান করিলে, লোকে আনন্দময় হয়, ইহারই নাম মদ্যসাধক । মাংসসাধনা সম্বন্ধে বলা হচ্ছে, ''মা, রসনা শব্দের নামান্তর, বাক্য তদংশভূত ; যে ব্যক্তি সতত উহা ভক্ষণ করে, তাহাকেই মাংসসাধক বলা যায় । মাংসসাধক ব্যক্তি প্রকৃত প্রস্তাবে বাক্যসংযমী মৌনাবলম্বী যোগী ।'' মৎসসাধনার তাৎপর্য আরও গূঢ় ও প্রতীকী । '' গঙ্গা-যমুনার মধ্যে দুইটি মৎস্য সতত চরিতেছে, যে ব্যক্তি এই দুইটি মৎস্য ভোজন করে, তাহার নাম মৎস্যসাধক । আধ্যাত্মিক মর্ম গঙ্গা ও যমুনা, ইড়া ও পিঙ্গলা; এই উভয়ের মধ্যে যে শ্বাস-প্রশ্বাস, তাহারাই দুইটি মৎস্য, যে ব্যক্তি এই মৎস্য ভক্ষণ করেন, অর্থাৎ প্রাণারামসাধক শ্বাস-প্রশ্বাস, রোধ করিয়া কুম্ভকের পুষ্টিসাধন করেন, তাঁহাকেই মৎস্যসাধক বলা যায় ।'' মুদ্রাসাধনার তাৎপর্য এ রকম, '' .... শিরঃস্থিত সহস্রদল মহাপদ্মে মুদ্রিত কর্ণিকাভ্যন্তরে শুদ্ধ পারদতুল্য আত্মার অবস্থিতি, যদিও ইহার তেজঃ কোটিসূর্য্যসদৃশ, কিন্তু স্নিগ্ধতায় ইনি কোটি চন্দ্রতুল্য । এই পরম পদার্থ অতিশয় মনোহর এবং কুন্ডলিনী শক্তি সমন্বিত, যাঁহার এরূপ জ্ঞানের উদয় হয়, তিনিই প্রকৃত মুদ্রাসাধক হইতে পারেন।'' মৈথুনতত্ত্ব সম্বন্ধে 'অতি জটিল' বিশেষণ আরোপ করা হয়েছে আগমসার গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে, মৈথুনসাধক পরমযোগী । কারণ তাঁরা '' বায়ুরূপ লিঙ্গকে শূন্যরূপ যোনিতে প্রবেশ করাইয়া কুম্ভকরূপ রমণে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন।'' আবার অন্য ঘরানার তন্ত্রে বলা হচ্ছে,'' মৈথুনব্যাপার সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কারণ, ইহা পরমতত্ত্ব বলিয়া শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে। মৈথুন ক্রিয়াতে সিদ্ধিলাভ ঘটে এবং তাহা হইলে সুদুর্লভ ব্রহ্মজ্ঞান হইয়া থাকে।'' যে 'সাধারণ' লোকেরা তন্ত্রের প্রথম উদ্গাতা ছিলো এবং ম-কার যাদের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ, তাদের প্রতি পুরোহিতশ্রেণীর আশংকা, ''.... সাধারণ লোকে উদ্দেশ্য ও প্রকৃত মর্ম বুঝিতে না পারিয়া তন্ত্রশাস্ত্র ও তন্ত্রোক্ত পঞ্চ-মকারের প্রতি ঘোরতর ঘৃণা ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।'' উল্লেখ্য, বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য , উভয় ঘরানার তন্ত্রেরই আকর উৎস বিভিন্ন আগমশাস্ত্র । আগমশাস্ত্র বস্তুতঃ আদি প্রযুক্তিপ্রকৌশলের গ্রন্থিত সংগ্রহ । খেটেখাওয়া শ্রমজীবী সাধারণ মানুষই আদিতে যাবতীয় আগমশাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলো। কালক্রমে এইসব ভৌতশাস্ত্র আধিদৈবিক অতীন্দ্রিয় কর্মকান্ডের রূপ পরিগ্রহ করে ইতরজনের নাগালের বাইরে চলে যায়। 'সাধারণ' জনগোষ্ঠীর নৈতিকতায় 'মৈথুন' কখনই ''কদর্য, কুৎসিত'' বোধ হয়নি । এই বোধটি আর্যায়নের সঙ্গে এসেছিলো । শাস্ত্রকার এভাবে ব্যাখ্যা করছেন, ''....আপাততঃ মৈথুন ব্যাপারটি অশ্লীলরূপে প্রতীয়মান হইতেছে, কিন্তু নিবিষ্টচিত্তে অনুধাবন করিলে, তন্ত্রশাস্ত্রে ইহার কতদূর গূঢ়ভাব সন্নিবেশিত আছে তাহা বুঝা যাইতে পারে । যেরূপ পুরুষজাতি পুংঅঙ্গের সহকারিতায় স্ত্রীযোনিতে প্রচলিত মৈথুন কার্য করিয়া থাকে, সেইরূপ 'র' এই বর্ণে আকারের সাহায্যে 'ম' এই বর্ণ মিলিত হইয়া তারকব্রহ্ম রাম নামোচ্চারণরূপে তান্ত্রিক অধ্যাত্ম-মৈথুন ক্রিয়া নিষ্পাদিত হইয়া থাকে।'' শারীরিক মৈথুনের বিভিন্ন অঙ্গ, যেমন, আলিঙ্গন, চুম্বন, শীৎকার,অনুলেপ, রমণ ও রেতোৎসর্গ, তেমনই আধ্যাত্মিক মৈথুন ও যোগক্রিয়ায় তার সমান্তরাল কৃত্যও কল্পনা করা হয়েছে । সেখানে 'তত্ত্বাদিন্যাসের' নাম আলিঙ্গন, ধ্যানের নাম চুম্বন, আবাহনের নাম শীৎকার, নৈবেদ্যের নাম অনুলেপন, জপের নাম রমণ আর দক্ষিণান্তের নাম রেতঃপাতন। এই সাধনাটির নাম 'ষড়ঙ্গসাধন' এবং শিবের ইচ্ছায় একে 'অতীব গোপন' মোহর দেওয়া হয়েছিলো । তা ছাড়া '' কলির জীব পঞ্চ ম-কারের মর্ম বুঝিতে পারিবে না বলিয়া কলিতে ইহা নিষিদ্ধ হইয়াছে ।'' অতএব ইতরজনের জন্য এইসব দর্শন 'নিষিদ্ধ' হয়ে গেলো এবং উচ্চবর্গ তাদের হাতে শেষ পর্যন্ত পেন্সিল ছাড়া আর কিছু থাকতে দিলোনা । ইতরজন ও নারীজাতি এই সব শাস্ত্র প্রণয়নের সময় একই ধরনের সম্মান(?) লাভ করতো। সাধনসঙ্গিনী নির্বাচনের যে প্রথাপ্রকরণ এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, সেখানে নারীকে একধরনের বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বোধ হতে পারে । নামে নারীই 'শক্তি' , কিন্তু শক্তি সাধনের ষটকর্মে সাধনসঙ্গিনীর যে সব লক্ষণ নির্দেশ করা হয়েছে তার থেকে সম্মাননা বা অবমাননার ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু উল্লেখ করা যায় । যেমন, সাধনসঙ্গিনী হিসেবে পদ্মিণী নারী শান্তিদায়িনী । সে হবে গৌরাঙ্গী, দীর্ঘকেশী, সর্বদা অমৃতভাষিণী ও রক্তনেত্রা । শঙ্খিণী নারী হয় মন্ত্রসিদ্ধকারী । সে হবে দীর্ঘাঙ্গী এবং নিখিল জনরঞ্জনকারিণী। যে নারী নাগিনী গোত্রের, তার লক্ষণ হলো শূদ্রতুল্যদেহধারিণী, নাতিখর্বা, নাতিদীর্ঘ, দীর্ঘকেশী, মধ্যপুষ্টা ও মৃদুভাষিণী । এর পর কৃষ্ণাঙ্গী, কৃশাঙ্গী, দন্তুরা, মদতাপিতা, হ্রস্বকেশী, দীর্ঘঘোণা, নিরন্তর নিষ্ঠুরবাদিনী, সদাক্রুদ্ধা, দীর্ঘদেহা, মহাবাবিনী, নির্লজ্জা, হাস্যহীনা, নিদ্রালু ও বহুভক্ষিণী নারীকে ডাকিনী বলা হয় ( যোগিনীতন্ত্রম)।"

188

1

অনভিপ্রেত

https://www.justori.com/justori/stories/particularStoryDetails/1305/1224

107

0

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আনন্দমেলা টায় হাত দিয়ে দেখছিল মিমি| মা দেখতে পেলেই বকবে| অনেক সাধ্যসাধনা করে বইটাকে পাশে রাখার অনুমতি পেয়েছে| কি সুন্দর কার্টুনের মত দুর্গাঠকুর‚ পেছনে শরতের স্ব্চ্ছ নীল আকাশ| ভেতরে দারুণ দারুণ গল্প‚ আঁকা‚ উপন্যাস ‚ কার্টুন অপেক্ষা করছে তার জন্য| উফফ আর একটা দিন‚ কালকেই প্রিটেস্ট শেষ| বাড়ি এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে বইটার ওপর| ভেবে আবার টেন টিচার্সের পাতায় মন দেয় মিমি| সংবিধান পড়তে একদম ভালো লাগে না| মনে থাকে না কিছুই| তাও পড়তেই হবে| "মা‚ জল খাবো|" চেঁচায় রুমি| মিমির চেয়ে দু'বছরের বড় রুমি| মা রান্নাঘর থেকে এসে দু'জন কে দু গ্লাস জল দিয়ে যায়| বাপি রেগে ওঠে‚ "তোরা মা'র জন্য পড়ছিস? জল গিয়ে খেয়ে আসতে পারিস না?" মা কিছু বলে না| মিমি বোঝে না বাপির রেগে যাবার কি হল| পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে হাঁপ ছাড়ে| বাইরে গাড়িতে মা বসে আছে| ওদেরকে নিয়ে নিউ মার্কেট যাবে| যাহ‚ আনন্দমেলা পড়াটা পিছিয়ে গেল| নিউ মার্কেট পৌঁছে অবশ্য ভুলে যায়| পুজো পুজো গন্ধ পায় মিমি| নতুন একটা দোকান হয়েছে| ওয়েস্টার্ন ড্রেস পাওয়া যাচ্ছে| মা দিদিকে একটা আর তাকে একটা সুন্দর টপ কিনে দিল| এক একটার দাম ১০০ টাকা| অবাক হয়ে যায় মিমি| একটা টপের দাম ১০০ টাকা নিল! এবার আর ট্রেজার আইল্যান্ড যাওয়া হল না| গত বছর খুলেছে এসি মার্কেটটা| মা এর সাথে এসেছিল| একদল ছেলে কি সুন্দর কোটপ্যান্ট পরে ঘুরছিল| দিদি বললো মনে হচ্ছে লা মার্টসের ছেলে| স্কুলের থেকেই এসেছে| কি সুন্দর স্কুলড্রেস ওদের| সাহেবদের মত| খুব স্মার্ট দেখাচ্ছিল ছেলেগুলোকে| তাদের যে কেন ওরকম ড্রেস হয় না! ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলে মেয়েরা যেন অন্য জগতের মানুষ| স্মার্ট‚ ঝক্ঝকে‚ কথায় কথায় ছোট ছোট ইংলিশ শব্দ গুঁজে দেয়| সুলেখা পিসির ছেলের জন্মদিনে প্রমা এসেছিল| কি সুন্দর লম্বা‚ দারুণ দেখতে| কোন স্কুলে পড়ো জিজ্ঞেস করতে বললো‚ "লোরেটো ধরমতলা"| ধরমতলা‚ ধরমতলা‚ মনে মনে আউড়ে নিল মিমি| ধর্মতলাকে ওরা বলে ধরমতলা| পরীক্ষা মোটামুটি হলে বলে ‚' সো সো'| মিমিও আউড়ায়‚ 'সো সো'| হোঁচট খেল এসব হাবিজাবি ভাবতে গিয়ে| 'আউচ্'‚ জোর করে বললো মিমি| মা বকলো‚ 'এত কায়দা করছিস কেন? আউচ আবার কি!' মিমি চুপসে গেল| সত্যি ‚ সত্যি আউচ তার স্বাভাবিক ভাবে আসে না| কিন্তু কেতার এই শব্দ টা অনেক কষ্ট করে সঠিক জায়গায় লাগনও অভ্যেস করছে সে| মা যে কি না! বড্ড শাসন করে| একটা প্যান্ট কেনার ইচ্ছে| নাকি ট্রাউজার্স! কখন যে প্যান্ট বলে আর কখন ট্রাউজার্স বোঝে না সে| মা কে বললো| মা দোকানের ছেলেটাকে বললো ওর জন্য একটা জিনস দেখাও তো| ছেলেটা মাপ দিতে ডাকলো| মিমি মাপ দেবে না| দোকানের ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে| বুঝতে পারছে না মাপ না দিয়ে প্যান্ট কিনবে কি করে| মিমি আন্দাজে একটা তুলে নিল| ছেলেটার চেহারাটা ভারি মিষ্টি| মা কাউন্টারে পয়সা মেটাচ্ছে| ছেলেটা আড়ে আড়ে দেখছে ওদেরকে| মিমির বেশ মজা লাগলো| দোকান থেকে বেরিয়ে মা ব্যস্ত হয়ে পাড়লো বাইরে ঝুড়ি নিয়ে বসা হকারদের সাথে - দড়ি‚ ক্লিপ‚ সেফটিপিন কত যে কেনার থাকে মা এর|

1763

110

মনোজ ভট্টাচার্য

বৃদ্ধাবাসের ভাবনা !

বৃদ্ধাবাসের ভাবনা ! লেখার গুনে সাধারন গোল গোল করে লেখাও তরিয়ে যায় ! আর আমার কত কষ্ট করে বিশেষ বিশেষ লেখাও পঠনযোগ্য হয়ে ওঠে না ! কি দুঃখ - কী দুঃখ ! থুথু ফেলে ডুবে মরব – এ জীবন আর রাখবো না – এসব কথাও যে ভাবিনা তা নয় ! তখন আবার নন্দলালের কথা মনে পড়ে ! প্রসঙ্গ হল শ্রী-র বৃদ্ধাবাস সম্বন্ধে কিছু কৌতূহল ! – খুব সম্প্রতিই আকাশ আট এর বৃদ্ধাশ্রম সিরিজটা শেষ হয়েছে ! – এই সিরিজের শুরুর দিকে আমাদের - উত্তরপাড়ায় ওদের মেলায় যেতে হয়েছিলো ! – আমরা যেহেতু বৃদ্ধাবাস নিয়ে কাজ করি – তাই আমাদেরও আলোচনা ইত্যাদির জন্যে ডাকা হয়েছিলো ! কিছু বিতর্কে যোগ দিতে হয়েছিলো ! এসব টি ভি তে প্রচারও হয়েছিলো । আমি আগেও এখানে বিশেষ করে – লিখেছিলাম ! কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত আমরা বৃদ্ধাবাস সম্বন্ধে খুব উৎসাহী ছিলাম – ফ্ল্যাট না থাকলে হয়ত আলমবাজারের অথবা ব্যারাকপুরের বৃদ্ধাবাসে গিয়েই উঠতাম ! – এখানে আসা থেকে প্রবীণ নাগরিকদের নিয়ে ছোটখাটো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ক্রমশ বৃদ্ধাবাস নিয়েও জড়িয়ে পড়তে হয় । তথাকথিত বৃদ্ধাশ্রম – আমি বলি বৃদ্ধাবাসগুলোতে গিয়ে গিয়ে খোঁজ খবর করা ও তাদের রিপোর্ট দেওয়া করেছি । - আর আমার নিজের জায়গা – এই আড্ডাতে - অনেক কিছু লিখেছিও ! – বৃদ্ধাবাস শুধুমাত্র আবেগ নয় ! এখন এটা যথেষ্ট প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে ! এক সময় আমাদের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রম কথাটা খুব একটা সন্মানজনক বলে মনে করা হত না ! আগে আগে শুনেছি বৃদ্ধা পিসি-মাসি – এমন কি ঠাকুরমাকে পর্যন্ত কাশী বৃন্দাবনের কোন আশ্রমে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হত ! – এর পর তাদের যে কী দশা হত সে আর বলে কাজ নেই ! – যত দুর মনে পড়ে – বাম ফ্রন্ট সরকারে আসার পর থেকেই সেই সব বয়স্ক মানুষদের নিজ দেশেই থাকার জন্যে এখানে সরকারী উদ্যোগে কয়েকটা বৃদ্ধাবাস তৈরি হয় ! ক্রমশ সরকারী তহবিল কমে যাওয়ার ও মাঝপথে সেই অর্থ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সেই আবাসনগুলো খুবই দুর্দশায় পড়ে ! কিছুদিন আগে কল্যানীর একটা সরকারী বৃদ্ধাবাসে গিয়ে দেখি সেটা বন্ধ করে আরও একটা পর্যটন কেন্দ্র করার পরিকল্পনা হচ্ছে ! বর্তমান পঞ্চায়েত শাসকের কেউ আমাদের সঙ্গে কোন কথাই বলতে চাইল না ! ঘাটালের কাছাকাছি তিনটে বৃদ্ধাবাসের দুরবস্থা দেখে এসেছি ! সরকারী অনুদান ঠিকমতো আসে না তো বটেই – সরকারী কর্মচারীদের ঘুষের দাবী এত বেড়ে গেছে – যে পরিচালকেরা প্রায় হাল ছেড়ে দিতে চাইছে । আমরা সেই রিপোর্ট দেখাতে – তারা অস্বীকার করলো ! - আঞ্চলিক ব্যবসায়ীদের শুধু চাল ডাল ভিক্ষাতে - আশ্রম চলে ? শারীরিক দেখা-শুনা তো অনেক দুরের কথা ! এই সুযোগে অনুপ্রবেশ ঘটছে বৃদ্ধাশ্রম ব্যবসায়ীদের ! এরা আবার প্রতিশ্রুতি দেয় হেলথ কেয়ারের ! সপ্তাহে একদিন ডাক্তার এসে রুটিন চেক আপ করে যায় । যথারীতি তাদের ক্লিনিকেই টেস্টগুলো করানো হবে – ইত্যাদি ! – এদের পরিচালন বোর্ডের মধ্যে প্রাক্তন কোম্পানির চেয়ারম্যান, এককালের স্বনামধন্য দেশসেবিকা ও এক জায়গায় তো দেখি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এক স্নেহধন্য শিশ্য আছে ! বৃদ্ধাবাসগুলো উন্নীত হল তিনতারা চারতারা হোটেল এ ! কিছু কিছু আশ্রম তো আবার সুইটের মধ্যে রান্নার জায়গাও দিচ্ছে ! আবার অনেকে যাবজ্জীবন মালিকানা ও মৃত্যুর পরে সত্তর শতাংশ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ! – তবু এদের বৃদ্ধাশ্রমই বলে ! কারন অনেক অনাবাসী বাঙ্গালি দেশে একটা বৃদ্ধাশ্রম করে দেশ-সেবা করবেন বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ! তাদেরই সেই আশ্রমের প্রসপেক্টাস দেখলেই আমার কথার যৌক্তিকতা মানবেন ! – মাসে কুড়ি হাজারের ওপর খাওয়া দাওয়ার চার্জ আর সিকিউরিটি জমা দশ লাখের ওপর – মৃত্যুর পর সত্তর শতাংশ ফেরত ! – এসব দেশ-সেবা কিনা – সে নিয়ে আমি কথা বলার কে ? কিন্তু এ কথা ঠিক মধ্যবিত্ত খুব কম লোকই তা গ্রহন করতে পারে ! আর মা কিম্বা বাবার হয়ে সেই নিস্ফল ইনভেস্টমেন্ট কারা করতে পারে ? এবার বলি এক অংশের কথা, যারা অরিন্দমের কথায় -'কিন্তু চিত্র বদলাচ্ছে আরও বদলাবে বাঙালি বুঝবে বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয় বরং হাত-পা ছেড়ে চূড়ান্ত মস্তিতে বাঁচা। স্বাধীন ভাবে বাঁচা ও বাঁচতে দেওয় (স্বাধীন মানে স্ব-অধীনে থেকে)। বার্ধক্যের সঙ্গে দু-ফোঁটা উদাসীনতা মিশিয়ে জীবনটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা।‘ – হ্যাঁ এটা খুব সত্যি কথা ! আমার বন্ধু স্ত্রী মারা যাবার পরেই স্বেচ্ছায় চলে এলেন বৃদ্ধাবাসে ! আবার আলমবাজারের বৃদ্ধাবাসে গিয়ে দেখা হল এক স্বাধীনতা কর্মীর সঙ্গে ! উনিই একটা গল্প বলেছিলেন – এখানে লিখেছিলাম ! ‘দাড়াও পথিকবর’! – ভাইপো-নাতির হাতে নিপীড়িত হবার আগেই পালিয়ে এসেছিলেন ! – মণিকুন্তলার – ‘আমাদের জেঠি খুড়ি মা মাসিরা বলতেন লাথিঝাঁটা খেয়েও নাকি ছেলের বাড়িতে থাকা সম্মানের|’ – আমাদের এক আত্মিয়ার কথায় – বাড়িতে ভাত ছাড়া সবই খেতাম – এখানে ভাতটা তো খেতে পাই ! তাই বলি – এসব যত লিখবো ততই – অরিন্দমের ভাষায় - ‘দুঃখই তো বিক্রী হয় সবচেয়ে বেশী... ‘! বৃদ্ধাবাস এখন আর অপশন নয় – হয়ত বাধ্যতামুলক ! গতকাল ও আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে দু জায়গায় সেমিনারে গেছিলাম । এক বিদগ্ধ জন – বোঝালেন – আমরা আবার নাকি যৌথ পরিবারের দিকেই ফিরে যাচ্ছি ! কি রকম ? না – বৃদ্ধবয়েসের একাকীত্ব ও শিশুদের একাকীত্ব – মিলিয়ে দেবে পিতা-মাতাদের আবার একসঙ্গে বাস করতে ! – কিরকম সোনার-পাথরবাটি – ধরনের শোনাচ্ছে না ! মনোজ বৃদ্ধাবাসের জানালা ! - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই বয়েসে এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারত ? বৃদ্ধাবাসের ঘরের জানালায় বসে শ্রাবন মাসের সদ্য-বর্ষণযুক্ত এই সকালবেলায় ঝকঝকে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুড়ো মানুষটি ভাবেন, সত্যি-ই আর কিছু হতে পারত কি ? নিজেকে এই প্রশ্ন করে নিজেই মনে মনে উত্তর দেন না , পারত না । বুড়ো মানুষটির ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে । তারা তাঁকে একা এখানে ফেলে না রেখে যে যার কাছে নিয়ে যেতে চায় । তিনি যান না । কিন্তু মুখে কিছু না বললেও ভাবেন যে , আর কোথায় গেলে এই সমবয়েসী মানুষদের সঙ্গ তিনি পাবেন , আর পাবেন এই জানালা ? না, এর চেয়ে ভালো আর কিছু হয় না । জানালার ধারে বসে ঝকঝকে নীল একটা তিনি দেখেন । আর দেখেন যে , কালো মেঘগুলি এরই মধ্যে বকের পাখার মতো সাদা হয়ে যাচ্ছে ।

201

6

সৃজিতা

ঐতিহাসিক শহর চুঁচুড়া

পর্তুগীজ বণিকরা চুঁচুড়া শহরের পা দিয়েছিল ১৫৭৯ সালে। চুঁচুড়া তখন ছিল ভুরশুঁট পরগনার অন্যতম বন্দর। ভুঁড়শুট পরগণা প্রাচীন বাংলার একটি অঞ্চল। বর্তমান হাওড়া ও হুগলি জেলার বৃহত্তর অংশ জুড়ে ছিল এর অবস্থান। পর্তুগিজরা ঠিক চুঁচুড়া শহরে পা দেয়নি, তারা পা দিয়েছিল গুল্ম শহরে। এই গুল্ম শহরই পরবর্তীকালে হুগলী নামে পরিবর্তিত হয়। পর্তুগীজদের সাথে তৎকালীন মোগল সম্রাট শাহজাহানের বিরোধ বাধে। তিনি বিশাল সৈন্য পাঠিয়ে পর্তুগীজ দমন করেন, সেই সাথে উদারতার পরিচয় দেন। পর্তুগিজ বণিকদের জন্য গঙ্গাতীরে বিশাল একখণ্ড জমি দেন গির্জা নির্মাণের জন্য। বর্তমানে এটি ব্যান্ডেল চার্চ নামে পরিচিত। পর্তুগীজদের পরপরই ডাচ বণিকরা আস্তানা গড়ে তোলেন এই অঞ্চলে। চুঁচুড়া শহরের মূলত ডাচ আধিপত্যই ছিল। ডাচেরা একটি গুস্তেভাস বা দুর্গ করে চুঁচুড়ার গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে। বর্তমানে তা বিলীন। তবে প্রাচীন বেশ কিছু নথিপত্রে তার প্রকাশ পাওয়া যায়। আজও চুঁচুড়ার একাধিক জায়গায় ডাচ স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। চুঁচুড়ার অত্যন্ত প্রাচীন একটি জায়গা হল তোলা ফটক। তােলাফটক নামটির পিছনে আছে এক সুন্দর ইতিহাস। চুঁচুড়া শহর তখন ডাচদের অধীনে, প্রতিবেশি চন্দননগর ফরাসীদের। তাই দুই স্থানের মাঝে ছিল একটি গড়। আর তার উপর ছিল একটি ভাঁজ যুক্ত সেতু। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সেতু খোলা ও তোলা হত। সেই থেকেই এই অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় তোলাফটক । আজও এই ফটকের ডান দিকে স্তম্ভটি জীর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান। চুঁচুড়া শহরের অনেক বয়স্ক মানুষই মনে করতে পারবেন, বাম দিকের লোহার দরজা বেশ কিছু বছর আগেও ছিল। রাস্তা সম্প্রসারণ করলে তা ভেঙ্গে ফেলা হয়। একটি স্তম্ভের যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা ভালো করে লক্ষ্য করলে আজও লােহার দরজার কড়া দেখা যাবে। © Copyright--- EKNOJORE HOOGHLY CHUCHURA

250

9

সৃজিতা

প্রোমোশন

আজ সাতসকালে ঘুম ভেঙ্গে গেছে ঝিল্লীর| অন্যদিন আটটায় ঘুম থেকে উঠে সোজা অফিসের জন্যে রেডি হয়ে যায়| কিন্তু কাল সারারাত ঘুম হয়নি‚ ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে গেছিল| তাও ছ্'টার পরেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে| চিন্তার কারণ একটাই‚ আজ বসের সাথে লাঞ্চ করতে যাবে| ঝিল্লী যে অফিসে চাকরী করে সেই অফিসের দুটো ব্রাঞ্চ এশহরে আছে| একটা ব্রাঞ্চ কোম্পানীর মালিক সামলায়‚ অন্যটা মালিকের কোন এক আত্মীয় দেখাশোনা করে| ঝিল্লী এই দ্বিতীয় ব্রাঞ্চে পোস্টিং আছে| কোম্পানির মালিক‚ লোকটা খারাপ না| কিন্তু ওনার যে আত্মীয় মানে ঝিল্লীর অফিসের বস‚ তার থেকে সবাই একটু দূরে দূরেই থাকতে চায়| আজ সেই বস সন্দীপণ ঘোষ ঝিল্লীকে লাঞ্চে ইনভাইট করেছে| প্রথমে অবশ্য ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল| ঝিল্লী নানা অছিলায় কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল| কিন্তু শেষ অবধি লাঞ্চ করতে রাজী হতে হয়েছে ঝিল্লীকে| রাজী না হয়ে উপায় ছিল না ঝিল্লীর| বস বলে কথা‚ আবার সামনে প্রোমোশনের সুযোগ আছে| বসের পার্সোনাল আসিস্টেন্ট মোনা এই কোম্পানীর জব ছেড়ে অন্য কোম্পানীতে জয়েন করেছে| সেই পোস্ট খালি আছে| এছাড়া মালিক যে ব্রাঞ্চে আছে সেখানেও একটা পোস্ট খালি আছে| যেকোন একটা পোস্টে জয়েন করলেই মাইনে অনেকটা বেড়ে যাবে| ঝিল্লীর যদিও বসের আসিস্টেন্ট হবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই| কিন্তু এই বস সহজে পিছু ছাড়বে না| মোনার মতো মেয়েরা চাকরীতে উন্নতি করার জন্য অনেক কিছু করতে পারে| মোনার সাথে সন্দীপণ স্যারের সম্পর্ক অফিসে চর্চার বিষয় ছিল| ঝিল্লী সেরকম মেয়ে নয়| কিন্তু মোনা চলে যাবার পর এখন ওর ওপর বসের নজর পড়েছে| কাজের অছিলায় প্রায়ই নিজের রুমে ডেকে পাঠায়| তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে থাকে| ঝিল্লীর খুব অস্বস্তি হয়| কিন্তু কিছু বলতে পারেনা| দুদিন আগে বস নিজের রুমে ঝিল্লীকে ডেকে পাঠালো| তারপর--- ----কাল ইভনিং এ তুমি ফ্রী আছো তো? ----হ্যাঁ‚ মানে কেন স্যার? ----তাহলে অফিসের পর একসাথে ডিনার করা যায়| ----না‚ মানে স্যার কাল তো হবে না| ----কেন‚ কি প্রবলেম?! -----আসলে মা'র শরীরটা কদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না| কাল মাকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাব| ----ও‚ তাহলে পরশু? ----পরশু‚ না পরশু তো হবে না| সে দিন তো বিকেলে আপনার মিটিং আছে| ----ওহ‚ আমি তো ভুলেই গেছিলাম| তুমি কত খেয়াল রাখ| ভেরি গুড| তো দুপুরে তো আমরা যেতেই পারি| এই ১২টা নাগাদ| ---কিন্তু স্যার ঐ টাইমে অফিস থেকে বেরোনো যাবে? ----ওহ‚ একসাথে বেরোনো ঠিক হবে না| ঠিক আছে সে দিন তোমাকে অফিসে আসতে হবে না| অফিসের গাড়ি ঠিক টাইমে তোমাকে নিতে চলে যাবে| তোমাকে নিয়ে সোজা রেস্টুরেন্টে চলে যাবে| তুমি তৈরী থেকো| -----ওকে স্যার| আর কথা না বাড়িয়ে ঝিল্লী রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছিল| সেদিন থেকে ঝিল্লীর রাতের ঘুম উড়ে গেছে| একা পেয়ে ব্স তার সাথে কি করবে‚ সেই ভেবেই ওর খিদে-তৃষ্ঞা সব চলে গেছে| ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানাতেই চুপচাপ শুয়ে ছিল ঝিল্লী| মা এসে ওকে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায়---- ----কিরে‚ এখনও শুয়ে আছিস?! -----শরীরটা ভালো লাগছে না| -----কি হ্'ল আবার? জ্বর এল নাকি? -----না তেমন কিছু নয়| আজ আর অফিসে যাব না| -----সে না যাস‚ না যাবি| আজ একটু রেস্ট নে| চা খাবি তো? টেবিলে আয়| মা চলে গেল| যাক কিছু বুঝতে পারেনি| ঝিল্লী উঠে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল| চা খাবার পর‚ বিস্কুটের কৌটো নিয়ে ঘরে চলে এল| মাকে বলল খিদে পেলে বিস্কুট খাবে| অন্য আর কিছু খাবে না| সময় এগিয়ে চলেছে| ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে| না এবার রেডি হতে হবে| ঝিল্লী রেডি হয়ে নেয়| সন্দীপণ ঘোষ লোকটা খুব ফিটফাট থাকতে পছন্দ করেন| যে কোনো জিনিষই দামী ব্র্যান্ডের প্রডাক্ট ব্যবহার করেন| অফিসের স্টাফেদেরও সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছ্ন্ন দেখতে চান| রেডি হয়ে ঝিল্লী ঘর থেকে বের হ্'ল| সামনেই মা‚ -----কিরে আবার কোথায় চললি?! -----অফিস থেকে ফোন এসেছিল| একবার যেতেই হবে| -----একটা দিনও ছুটি দিতে পারে না! তাড়াতাড়ি ফিরো| একে শরীর ভালো নেই| তবু যেতেই হবে| মা গজগজ করতে থাকে| ঝিল্লী বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরে| গলি থেকে বেড়িয়ে মোড়ের মাথায় আসে| অন্যদিন এখান থেকেই বাসে ওঠে| আজ আরও এগিয়ে সামনের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ায়| এখান থেকেই গাড়িতে উঠবে| দূর থেকে বসের গাড়ী দেখা যায়| গাড়ী এলে ঝিল্লী গাড়ীতে উঠে পড়ে| হোটেলের সামনে গাড়ী এসে থামে| গাড়ী থেকে নেমে ড্রাইভার ওকে হোটেলের নির্দিষ্ট রুমের সামনে পৌঁছে দেয়| যা আন্দাজ করেছিল তাই| রুম বুক করা হয়েছে| যা হবে বন্ধ ঘরের মধ্যে| ঝিল্লী রুমে নক করে| বস দরজা খুলে দেয়| একটা স্মাইল দিয়ে ঝিল্লী ঘরে ঢোকে| সুসজ্জিত বেডরুম| বেডের সামনে সোফা| সোফার সামনে টেবিলে অনেক রকম খাবার| হালকা সুরে মিউজিক বাজছে| একেবারে পরিপূর্ণ আয়োজন| ------আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো? -----না স্যার| ------ওকে| এই স্যার বলাটা তুমি ছাড়ো তো‚ অফিসে বাইরে নো স্যার| ওনলি সন্দীপণ| এবার বসো| ঝিল্লী সোফায় বসে পড়ে| বস এসে ওর পাশে বসে| প্লেটে খাবার তোলে| ------নাও শুরু করো| ------আপনি আগে শুরু করুন| -------না‚ আজকে তোমার দিন‚ তাই তোমাকে দিয়ে শুরু হোক| ঝিল্লী ইতস্তত করতে থাকে| খাবার ইচ্ছা হলেও খেতে পারেনা| সন্দীপণ আরও কাছে সরে আসে| একটা হাত ঝিল্লীর কাঁধের পেছনে সোফায় রাখে| ------কি হ্'ল খাও| ঝিল্লী চোখে চোখ রাখে| সন্দীপণ আরও কাছে সরে আসে| ঝিল্লীর নি:শ্বাস সন্দীপণের মুখে পড়ে| একটু দূরে সরে যায় সন্দীপণ| কিছু অস্বস্তি বোধ করে| তারপর একটু হেসে আবার কাছে সরে আসে| কাঁধে মাথা রেখে সঙ্গে সঙ্গেই সরিয়ে নেয়| পাশ থেকে উঠে গিয়ে সামনের চেয়ারে গিয়ে বসে| -----আমার মিটিং এর দেরী হয়ে যাচ্ছে| আমি এখনি বেড়িয়ে যাব| ------সেকি‚আপনি তো কিছুই খেলেন না| আর মিটিং তো.চারটেয়| -------না টাইম এগিয়ে গেছে| দুটোর মধ্যে আমাকে পৌঁছাতে হবে| তুমি খেয়ে নিয়ে চলে যেও| ------আমি কিসে যাব? গাড়ী তো আপনি নিয়ে চলে যাচ্ছেন| ------ঠিক আছে| আমাকে পৌঁছে দিয়ে তোমাকে নিতে আসবে| ------ওকে স্যার| বস তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে গেল| ঝিল্লী ওয়েটারকে ডেকে খাবার গুলো প্যাক করে দিতে বলল| খাবারের বিশাল প্যাকেট নিয়ে ঝিল্লী বাড়ী ফিরল| মা দেখে অবাক| -----কিরে‚ এসব কি?! -----খাবার| অফিস থেকে দিল| আমি নিয়ে চলে এসেছি| ------আমার তো রান্না হয়ে গেল| -------ফ্রিজে রেখে দাও‚ রাতে খাব| এখন এগুলো মাইক্রো ওভেনে গরম করে দাও| আমি স্নান করেই আসছি| খুব খিদে পেয়েছে| প্যাকেটটা মায়ের হাতে দিয়ে ঝিল্লী ঘরে এসে জামা-কাপড় নিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে গেল| সকালে থেকে শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে আছে| ব্রাশ না করে ও অন্য কিছু খেতে পারেনা| | এদিকে কাল রাতে স্যালাডে বেশী করে পিঁয়াজ খেয়েছে| নি:শ্বাসের গন্ধে টের পাওয়া যাচ্ছে| তাছাড়া সকালে স্নানও করেনি| জামাটাও কাচতে হবে‚ এই নিয়ে তিনদিন ধরে পড়া হ্'ল| কাল বাড়ী ফেরার সময় বাসে এত ভিড় ছিল‚ খুব ঘেমে গেছিল ঝিল্লী| বাড়ী ফিরে জামাটা গুটিয়ে রেখে দিয়েছিল কাচবে বলে| আজ সেটাকেই তুলে পড়ে নিয়েছে| গুটিয়ে রাখার জন্যে ঘামের গন্ধটা জামায় বসে গেছে| আর ঝিল্লী কোন বডিস্প্রে ব্যবহার করেনি| ঘামের গন্ধে ঝিল্লীর নিজেরই একএক সময় বিরক্তি লেগে যাচ্ছিল| পরের দিন অফিসে ঝিল্লীর টেবিলে প্রোমোশন লেটার পৌঁছে গেল| অন্য ব্রাঞ্চে পোস্টিং| এখানে আর রাখবে না| |

197

5

শিবাংশু

স্মৃতি দিয়ে ঘেরা

দক্ষিণে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। উত্তরদিকে গড়িয়ে যাওয়া ওঠানামা করা পাহাড়ি জমিতে ছড়িয়ে আছে বিস্তৃত বৌদ্ধবিহারের অবশেষ। চন্দ্রশিলার ধাপগুলির পাশে, খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সেই রহস্যময় বৌদ্ধ তান্ত্রিকদেবী, কুরুকুল্লা। যাঁকে 'তারা কুরুকুল্লা'ও বলা হয়। প্রথম থেকে তেরো শতকের মধ্যে নির্মিত ইঁটমাটির চোদ্দোটি সমাধিস্তূপও আছে তাঁকে ঘিরে। কিছুক্ষণ সামনে দাঁড়ালে মনে অন্যরকম অনুভূতি আসে। পিছনে দিগন্তবিস্তৃত নদীমাতৃক হরিৎ শষ্যখেত। দিকচক্রবালে নীলপাহাড়ের সারি। চোখ আর মন থাকলে এই পরাবাস্তব চরাচর আগন্তুককে অনেক প্রাপ্তির ইশারা জানায়। রত্নগিরি যাবার পথে সামান্য ঘুরপথে গেলেই চমকে দেবে এই রত্নখনিটি। দুটি পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় বনজঙ্গলের মধ্যে আত্মগোপন করেছিল এই পুরাবশেষ।এই সেদিন পর্যন্ত কেউ জানতই না এদেশের এরকম একটি বৃহৎ বৌদ্ধ পুরানিদর্শন এভাবে মাটির নীচে লুকিয়ে রয়েছে। সন্ধান চলেছে ১৯৫৮ থেকেই। কিন্তু তাকে কিছুটা খুঁজে পাওয়া গেছে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালে খননের পর। এই পুরাবশেষটি এখনও পর্যন্ত ওড়িশার বৃহত্তম বৌদ্ধ ইতিহাসের নিদর্শন। ওড়িশায় ভুবনেশ্বরের কাছে উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি নামে যুগল পাহাড়ে অতি প্রাচীন জৈন গুহামন্দিরের যেসব অবশেষ জনপ্রিয় ও বহুজানিত, তার সঙ্গে বৌদ্ধ উদয়গিরির সম্পর্ক নেই। এটি আছে জাজপুর জেলায় এবং রত্নগিরির কাছে। বৌদ্ধ ইতিহাসে এর নাম ছিল 'মাধবপুরা মহাবিহার'। খননসুবাদে এখানে বিশাল ইঁটনির্মিত বৌদ্ধবিহার ও নানা মূর্তিভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। সত্যি কথা বলতে কী, পণ্ডিতেরা বলেন এখন পর্যন্ত যা উদ্ধার হয়েছে তার পরিমাণ প্রকৃত নির্মাণের ছোট্টো ভগ্নাংশ মাত্র। দুই পাহাড়ের মাঝখানে সবুজে সবুজ উপত্যকায় নির্মিত এই বিহারটির সৌন্দর্য এককথায় অনুপম। এখানের প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাবশেষে এখনও পর্যন্ত আবিষ্কার হয়েছে একটি স্তূপ, দুটি বিহার, একটি প্রাচীন সিঁড়িভাঙা কূপ এবং অসংখ্য মহাযানী বৌদ্ধ মূর্তি। এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে এই বিহারটির নির্মাণ হয়েছিল সপ্তম থেকে বারো শতকের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এর সময়কাল ললিতগিরি ও রত্নগিরির পরবর্তী যুগে। একটু বিস্ময় লাগে যখন আমরা দেখি মাধবপুরা মহাবিহারে বজ্রযানী বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতির নিদর্শন এখনও বিশেষ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত বজ্রযানী বৌদ্ধতন্ত্রের কেন্দ্র রত্নগিরির প্রাধান্য পরবর্তীকালে কমে গিয়েছিল। উৎখননের পর উদ্ধার করা অসংখ্য অতি উচ্চমানের পাথরের মূর্তি ও ভাস্কর্য এখানে খোলা আকাশের নীচে রাখা আছে। মহাযানী বৌদ্ধ দেবতাকুলের নানা দেবদেবী, বিশেষত বোধিসত্ত্ব ও ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তিগুলির সৌন্দর্য মোহিত করে। ইতিহাস ও শিল্পপ্রেমী মানুষজনের কাছে এই জায়গাটির আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। কেউ জানেনা এখনও মাটির নীচে কোন সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে। যাঁরা ট্রেকিং করেন, তাঁদের জন্য সংলগ্ন পাহাড়গুলির আহ্বান এড়ানো মুশকিল। উৎখনিত অবশেষগুলির দুটি ভাগ আছে। এক এবং দুই। একটি ইংরেজি ইউ-আকারের উপত্যকায় যে মহাস্তূপটি দেখা যায়, সেটি মহাযানী মতের স্থাপত্য। তার চারটি কুলুঙ্গিতে চারজন ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। মহাযানী বিশ্বাস মতো এইসব বুদ্ধেরা চারটি দিক রক্ষা করেন। এছাড়া একটি বর্গাকার বিহারও রয়েছে এখানে। তার কারুকার্যময় তোরণ পেরোলে শাক্যমুনি বুদ্ধের ভূমিস্পর্শ মুদ্রার মূর্তি স্থাপিত আছে। এছাড়া বৌদ্ধ দেবতাকুলের তারা, মঞ্জুশ্রী, ভৃকুটি, হারীতী,চুন্দ,অবলোকিতেশ্বর, মৈত্রেয়, অপরাজিতা, বৈরোচন, জটামুকুট লোকেশ্বর, ললিতাসন অমিতাভ এবং বসুধারার মূর্তিও দেখা যায়। মাধবপুরা মহাবিহার, ললিতগিরি ও রত্নগিরির মতো অতি বৃহৎ পুষ্পগিরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ ছিল। এই তিনটি পুরানিদর্শনকে একসঙ্গে ওড়িশার রত্নত্রিভুজ বলা হয়।

179

4