Joy

অন্ধকার সরিয়ে আবার এক নতুন দিন আসবেই...

করোনা নামক ভয়াল মারণ ভাইরাসের কল্যানে আমরা কয়েকদিন গৃহবন্দী| লক-ডাউন রাজ্য তথা সারা দেশ জুড়ে| যদি ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ে তাহলে হয়ত আরও কিছুদিন লক-ডাউনের সীমা বাড়তে পারে| এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীর কাছে ভয়ানক আতঙ্ক হয়ে উঠেছে| এর করাল থাবায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে| আরও না জানি কত মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে| দু দুটো বিশ্ব যুদ্ধ‚ আরও অনেক ভয়ানক যুদ্ধকেও হার মানিয়েছে এই মাইক্রোস্কোপিক ভাইরাস| সমস্ত পৃথিবী এখন এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টায় নিমগ্ন| ডাক্তার‚ নার্স‚ স্বাস্থ্য কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন এই রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টায়| প্রচুর মানুষ আজ কর্মহীন‚ ঘরবন্দী| প্রচুর শ্রমিক‚ দিন মজুর যারা কাজের জন্যে‚ দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্যে‚ একটু ভালো ভাবে বাঁচার জন্যে দূর দেশে বা অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন| তাদের অনেকের কাজ নেই এখন| কারখানা বন্ধ| দোকান বন্ধ| হোটেল বন্ধ| গ্যারেজে কাজ করা শ্রমিকরা আজ বেকার| কেউ বা ভয়ে চলে আসতে চাইছেন তাদের নিজের বাড়ি| নিজের পরিবার‚ আত্মীয় স্বজনদের কাছে| লক ডাউনের ফলে গাড়ি‚ বাস‚ ট্রেন সব বন্ধ| সেই সব শ্রমিকরা অন্য রাজ্য থেকে খালি পায়েই হাঁটা শুরু করেছেন মাইল এর পর মাইল রাস্তা| শুনশান রাস্তায় শুধু শোনা যায় এই সব দরিদ্র মানুষের পায়ের শব্দ| শোনা যায় মায়ের কোলের শিশুর কান্না| ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে গড়িয়ে পরে ঘাম| পা কেটে রক্ত পরে| জিভ শুকিয়ে আসে জল তেষ্টায়| কিন্তু যেতে তাদের হবেই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে| সেখানেও নেই কোন কাজের হদিশ| তবু বিদেশে না খেয়ে মরার থেকে দেশে নিজের মানুষের কাছে মরা ভালো| এই হাইওয়েতে মাঝে মাঝে আসে অত্যাবশ্যকীয় পন্যের বড় গাড়ি| গাড়ির ধাক্কায় পিষ্ট হন কিছু শ্রমিক| এরা জানে না একসাথে গা ঘেঁষে থাকলে করোনা ছড়িয়ে পড়ে| দিল্লির বাস স্ট্যান্ডে হাজার হাজার শ্রমিক ভিড় জমায়| যদি কিছু বাস বা গাড়ি পাওয়া যায় বাড়ি পর্যন্ত| কেউ বা হেঁটেই যেতে চেয়েছিল তার প্রিয়জনের কাছে| কিন্তু পারেনি রাস্তাতেই মারা গেছে| হয়ত এদের লক ডাউনের আগেই রাজ্যে ফেরার ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হত| যেমন বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ প্লেনে ফিরেছিলেন এদেশে| তবুও দিল্লিতে সরকার ও অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এইসব শ্রমিকদের খাবার ব্যবস্থা করেছেন বাড়ি ফেরার ব্যব্স্থা করেছেন| তাদের অনেক ধন্যবাদ| শুধু দিল্লি নয় সারা ভারতবর্ষেই অনেক শিল্পপতি‚ অভিনেতা‚ খেলোয়াড়‚ ক্লাব‚ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন| তাদের কুর্নিশ জানাই| এই সব ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরাই নয় আরও অনেক অসংগঠিত কর্মচারী‚ ছোট ব্যবসায়ী‚ বেসরকারী কর্মক্ষেত্রের কর্মচারীরাও সমস্যায় পরবেন লক ডাউনের ফলে| টাকা পয়সার সমস্যা যেমন হবে তেমন ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনারও অনেক ক্ষতি হবে| কিন্তু কিছু উপায় নেই অপেক্ষা করা ছাড়া| কুর্নিশ জানাই সেই সব ডাক্তার‚ নার্স‚ সাফাই কর্মী‚ পুলিশদের যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমাদের ভালো রাখার জন্যে| সেই সব ডাক্তার‚ নার্সরাও কখনো কখনো বাড়িওয়ালা‚ প্রতিবেশী দ্বারা অপমানিত বা বিতারিত হচ্ছেন| সেটা কখনই কাম্য নয়| শুধু ভারতবর্ষই নয় সমস্ত পৃথিবীই এই সমস্যায় আক্রান্ত| এর ভয়াবয়তা অনেক সুদূর প্রসারী হবে| অর্থনৈতিক মন্দা হওয়ার আশঙ্খা আছে| অনেকে মানুষ মারা যাবেন রোগে তার থেকেও বেশি মানুষ মারা যাবেন অনাহারে| এর প্রতিরোধের জন্যে আমাদের লড়াই করতেই হবে| আমাদের এক জোট থাকতেই হবে| যদি চেইন সিস্টেমকে ভেঙ্গে দিতে পারলেই করোনাকে আটকানো যায় তবে আমাদের একটু ধৈর্য ধরে তাই করতে হবে| যা ক্ষতি হবে আমরা সবাই মিলেমিশে ভাগ করে নেব| তবুও কাউকে যেন অনাহারে মরতে না হয় সে মানুষ হোক বা অবলা পশু| আমাদের যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন ভাবে মানুষ‚ সমাজ পরস্পরকে সাহায্য করতে পারি| এখানে কোন ধর্ম নেই‚ জাত নেই| গরীব নেই বড়লোক নেই| এখন আর দোষারোপের পালা নয়| রাজনীতির খেলা নয়| আমাদের সবাইকে এখন এক হয়ে লড়তে হবে করোনা ও করোনার পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্যে| জিততে আমাদের হবেই| যেমন এর আগে অনেক মারণ রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে বৈজ্ঞানিকরা আমাদের সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়েছেন| আর দেরী নেই অন্ধকার পেরিয়ে আলো আসবেই| কিন্তু আমরা ছোট হলেও কিছু ভালো কাজ সমাজের জন্য করতে পারি| কিছু অসহায় মানুষের মুখের হাসির কারন হতে পারি| অন্ধকার বার বার আসবেই আবার নতুন সূর্যোদয় হবে| কিন্তু অন্ধকার কেটে যায় যদি আকাশে অনেক অনেক ছোট ছোট নক্ষত্র থাকে| এই অসংখ্য ছোট ছোট নক্ষত্ররা অন্ধকারে এগিয়ে যাবার সাহস যোগায়| দিব্যেন্দু মজুমদার

316

3

শিবাংশু

মেঘগিরির মায়াকানন

একটা ঝিল। ছায়াঘেরা, শালুকপাতা আর ফুলে ছেয়ে আছে সারাটা। পাশে দাঁড়ালেই একটা শান্তিকল্যাণের স্পর্শ লাগে প্রাণে। নাম তিস্স বেওয়া । সিংহলদ্বীপের আদি রাজাধিরাজ তিস্সের নাম বহন করে এই সরোবর। বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। সেখান থেকে উত্তর দিকে তাকালেই রুয়ান ওয়েলিয়া স্তূপের চূড়া চোখে পড়বে। পৃথিবীর একটি আদিতম এবং বৃহত্তম বৌদ্ধ তীর্থ সেখানে। ঠিক তার সামনেই দৃশ্যের জন্ম হয়ে আসছে প্রায় ইতিহাসপূর্ব কাল থেকেই। ইসুরুমুনিয়া। পৃথিবীতে একেকটা জায়গা আছে, যেখানে ইতিহাস, পুরাণ, উপকথা সব জড়াজড়ি করে রয়ে গেছে হাজার হাজার বছর ধরে। এরকমই একটা নাম, ইসুরুমুনিয়া । সিংহলদ্বীপের আদি রাজধানী অনুরাধাপুরা মহাবিহারের কাছেই। উপকথা বলে, এই সেই জায়গা, যেখানে পুরাণের পুলস্ত্য ঋষি বসবাস করতেন। প্রবাদের স্বর্ণলংকার রাজা রাবণের জন্মস্থান ছিলো এই মাটিতে। ইতিহাস বলছে, সিংহলের আদিযুগের রাজা তিস্স দেবানামপ্রিয়, রাজধানী অনুরাধাপুরার পাশে নির্মাণ করেছিলেন বেশগিরি বিহার। কালক্রমে যেটি স্থানান্তরিত হয়ে যায় ইসুরুমুনিয়ার মন্দিরে। রাজা তিস্স ছিলেন মগধের রাজা পিয়দস্সি অশোকের সমসাময়িক (৩০৭-২৬৭ খ্রিস্টপূর্ব)। তাঁর সময়েই সম্রাট অশোক তাঁর সন্তান ভিক্ষু মহিন্দ এবং ভিক্ষুণী সংঘমিত্তাকে সিংহলে বুদ্ধের ধর্ম প্রচার করতে পাঠিয়েছিলেন। পঞ্চম শতকে সিংহলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার জোয়ার আসে। উচ্চবর্ণের পাঁচশোজন সন্তান একসঙ্গে সদ্ধর্মের শরণ নিয়েছিলেন। তখন রাজা কস্যপ-১ (৪৭৩-৪৯১ খ্রিস্টাব্দ) নিজের ও দুই কন্যার নামে এখানে একটি বিহার তৈরি করে দেন। একটি গ্র্যানাইট টিলার ভিতরের গুহার সঙ্গে এই বিহারটি যুক্ত ছিলো। পাহাড়ে টিলাটির পাশে একটি ছোটো স্তূপও রয়েছে। স্তূপটি অবশ্য আধুনিক কালের। পাহাড়টির গোড়ায় রয়েছে একটি অদ্ভুত সুন্দর ছোট্টো সরোবর। সরোবরের জল যেখানে পাহাড়টিকে স্পর্শ করছে সেখানে পাথরে খোদাই করা এক ঝাঁক হাতির যূথ বাস রিলিফে। রানমাসু উয়ান (উদ্যান) ঘিরে আছে গোটা বিহার ও মন্দিরটিকে। প্রাচীন মন্দিরটি রয়েছে একটি গিরিগুহার মধ্যে। পাথরের স্তম্ভ গুলি কারুখোদিত। ভিতরে উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি। এই মন্দিরে বুদ্ধের পূত দেহাবশেষ রাখা ছিলো একসময়। মন্দিরে উঠে যাবার সিঁড়ির দুপাশে সুচারু দুই মুরুগল। তাঁদের হাতে 'পুনকল' বা পূর্ণ কলস। পবিত্র প্রতীক। সামনে কারুকার্যময় 'সন্দকদ পাহান' (চন্দ্রপাষাণ) বা মুনস্টোনের পাদপীঠ। পাহাড়টির বৃহৎ শিলাগুলি মন্দিরের পাশের দেওয়ালের কাজ করছে। তার শীর্ষে বিখ্যাত 'মানব ও অশ্ব' নামক 'অর্ধ-উন্নত ভাস্কর্য ' বা বাস রিলিফটি দেখা যাবে। নবনির্মিত মন্দিরটি একটি উজ্জ্বল, রঙিন মূর্তিময় বৌদ্ধ গুহ উপাসনাগৃহ। সেখানে একটি বিশাল বুদ্ধের অনুপম মহাপরিনির্বাণ ভঙ্গির মূর্তি রয়েছে। রয়েছে গুহাকন্দরে ভিক্ষু মহিন্দের শিষ্যদের উপদেশরত একটি রচনা। তা ছাড়াও বুদ্ধ ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা মূর্তি দেখা যায়। মন্দিরের শেষপ্রান্তে একটি বোধিবৃক্ষ শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে ব্যপ্ত হয়ে আছে । এই বৃক্ষটি অনুরাধাপুরা বিহারের মূল বোধিবৃক্ষের অঙ্কুর জাত। 'ইসুরুমুনিয়া' নামটি এসেছে ঈশ্বরমুনি থেকে। বৌদ্ধমতে তথাগতই সেই ঈশ্বরমুনি। হিন্দুরা কেউ কেউ দাবি করেন এটি শিবের বিশেষণ। আবার অনেক পণ্ডিতের মতে শিলাভাস্কর্য অনুযায়ী এই মন্দিরটি সূর্য ও পর্জন্য (মেঘ) দেবতার মন্দির ছিলো। সরোবরটির জলে ক্রীড়ারত হাতিদের মূর্তিগুলি আসলে মেঘের প্রতীক। সেই জন্য এই ইসুরুমুনিয়া মহাবিহারের আদি নাম ছিলো মেঘগিরি মহাবিহার। তবে ধারাবাহিকভাবে এই দেবালয়টি বৌদ্ধ উপাসনার স্থান হিসেবেই গণ্য হয়েছে। শ্রীলংকার বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এই মন্দিরটির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। একটি অন্য কারণেও এই মন্দিরের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। সিংহলি শিল্প-ইতিহাসে অতিখ্যাত 'ইসুরুমুনিয়া-যুগল' নামের একটি বাসরিলিফ মূর্তি একটু দূরের মূল বেশগিরি মহাবিহার থেকে এনে এই মন্দিরে রাখা হয়েছে। এই সৃষ্টির পটভূমি নানারকম কিংবদন্তি আশ্রিত। ভাস্কর্যটির সিংহলি নাম 'পেম-যুবল' বা প্রেমিকযুগল। একটা গল্প অনুযায়ী সিংহলের বিখ্যাত রাজা দুতুগেমুনুর (দূতগমন) পুত্র সালিয় (শল্য) প্রণয়াসক্ত ছিলেন অশোকমালা নামে এক শূদ্রদুহিতার। প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে তিনি সিংহাসনের অধিকার হারিয়েছিলেন। এই মূর্তিটি নাকি তাঁদের স্মরণ করেই তৈরি হয়েছিলো। আবার একটি ব্রাহ্মীলিপিতে উৎকীর্ণ শিলালিপি বলছে এই মূর্তি রাজা কুবের বৈশ্বরণ এবং তাঁর রানি কুনিদেবীর। রামায়ণের উল্লেখ মানলে এই রাজা, রাবণেরও আগে বেশগিরিতে অধিষ্ঠান করে লঙ্কাদ্বীপে রাজত্ব করতেন। ষষ্ঠ শতকের গুপ্তশৈলীতে নির্মিত এই মূর্তিটির সঙ্গে তামিল পল্লব ভাস্কর্যের মিল পাওয়া যায়। শ্রীলংকায় যে শৈলীর ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এর তফাত আছে। দেশে বিদেশে মাপে হয়তো বিশাল নয়, কিন্তু সৌন্দর্যে অনুপম,, অনেক শিল্পস্থাপত্যের নমুনা দেখেছি। কিন্তু মেঘগিরি বিহার বা বেশগিরি বিহার বা ইসুরুমুনিয়া মহাবিহারের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সবার মধ্যে মনে থেকে যায়। 'বিন্দুতে সিন্ধু' (সারদা বাঁচিয়ে) জাতীয় একটা অনুভূতি হতে পারে। ঘালিবের ভাষায় বলতে গেলে, অবশ্যই এর 'অন্দাজে বয়াঁ অওর' ...

251

4

শিবাংশু

শ্যামলছায়া, নাই বা গেলে ...

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আজকের তারিখে জন্মেছিলেন। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো সাতাশি। চলে গেছেন উনিশ বছর আগে। কোনও মানে হয়না। এই লেখাটির সঙ্গে অবশ্য তার কোনও যোগাযোগ নেই। আবার আছেও। কয়েকদিন ধরে তাঁর গল্পসংগ্রহটি ছাড়া ছাড়া ভাবে পড়ছি। তাঁকে নিয়ে একটা কিছু লিখবো সেই জন্য। একটু কম চার দশক আগে তাঁর সঙ্গে একটা মুঠভেড় হয়েছিলো এই অধমের। বাংলা গদ্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো না তা। যাকগে, সে রামও নেই, সে সুগ্রীবও নেই। আরও একটু সময় লাগবে হয়তো, ইচ্ছে হয়ে থাকা লেখাটি নামাতে । মনে থাকে, সাহিত্যের ন্যারেটিভকে বাঙালি একসময় সিনেমায় দেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতো। শ্যামল সেটা করতেন না। বলা ভালো পারতেন না। শব্দের আকুল ফ্রেমে বেঁধে নিজেকে উদ্ধার করে আনা ছাড়া আর কোনও চতুরতা স্পর্শ করতো না তাঁকে। গুপ্তধনের মতো। তার সিনেমা হয়না। আঁধার রাতে ক্যানিং লাইনের শেষ ট্রেন ধরে যখন চম্পাহাটিতে টুক করে নেমে গেলেন, তখন মনে হলো এইতো যাওয়া। আসলে তিনি তো 'কথক' ছিলেন না। কিন্তু তাঁর 'সময়'টা ছিলো কথকদের। বাঙালির সাইকিটি কথকতার। বাংলায় সফল লিখিয়েরা সবাই কথকঠাকুর। যেমন ধরা যাক, বিমল মিত্র। ভাষার উপর দারুণ দখল। প্লটের পর প্লট নিপুণভাবে গেঁথে যান। চরিত্রদের খেলাতে পারেন। অতো অতো লিখতে পারেন। আর রয়েছে সহজাত গল্প বাঁধার কৌশল। কিন্তু বাংলায় 'উপন্যাস' নামক নির্মাণটি, যেটা সম্ভবত বিলিতি নভেল থেকে ধার করা, চারিত্র্যে একেবারেই আলাদা। সেটা ওঁর আসেনা। তা বলে কি তিনি 'লেখক' ন'ন? তিনি একজন 'ট্রেন্ডসেটার',অবশ্যই। তাঁর লোকপ্রিয়তা অসাধারণ। কারণ, বাঙালির একটাই চাহিদা, 'গল্প ভালো, আবার বলো'। বড়ো সাহিত্যিকরা তাঁদের সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে এমনভাবে তৈরি করেন, অন্য কোনও শিল্পী তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কেউ কখনও 'ঢোঁড়াই'য়ের সিনেমা বানাতে পারবেন কি? চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোনও বড়ো ছবিকর হলে সতীনাথ নয়, তাঁর নিজের 'ঢোঁড়াই'কে তৈরি করবেন। সেটা কোনও অবস্থাতেই 'সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ' হবেনা। হবে না 'কুবেরের বিষয়আশয়' বা 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'. বাঙালি লেখকরা গত একশো বছরের অধিককাল ধরে অপার-অনন্ত 'উপন্যাস' রচনা করে আসছেন। তার মধ্যে শারদীয়া প্রসাদ টাইপ বারোটি 'উপন্যাস' অথবা চোদ্দোটি 'উপন্যাসোপম' বড়ো গল্প ইত্যাদি লেখালেখি পঁচানব্বই ভাগ। আট-দশফর্মা এলোমেলো 'মশলাদার' 'উপন্যাস' প্রকাশকরা নিয়মিত ছেপে যেতেন। একটা লেখা, 'অরণ্যের দিনরাত্রি'। লেখাটার 'জঁর'টা যে কী, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। কিন্তু মানিকবাবুর হাতে পড়ে তার ভোল পাল্টে গেলো। ঐ ছবিটাকে কি 'সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ' বলা যাবে? জানিনা। 'সাহিত্যমূল্যে' লেখাটি ঠিক কোথায় থাকবে, এতোদিন পরেও তা স্পষ্ট নয়। সুনীলবাবু পছন্দ করেননি মানিকবাবুর কাজটি। শ্যামলের লেখা ‘সিনেমা’ করা নিয়ে তো কেউ ভাবেইনি। আমাদের কালে সেই একজন ছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। পাড়ার লাইব্রেরিতে বসতুম। তাঁর বইয়ের হাই ডিমান্ড। যেমনভাবে আমরা ছ-সাত ক্লাসে 'কঠোরভাবে কলেজ স্টুডেন্ট দের জন্য' স্বপনকুমারের 'বিশ্বচক্র সিরিজ' গুনে গুনে পড়তুম। তেমনই লোকে নিমাই ভট্টাচার্য পড়তেন বই গুনে গুনে। তাঁর ম্যাগনাম ওপাস 'মেমসাহেব'। 'মেমসাহেব'কে 'সাহিত্য' বলতে বাঙালিই পারে। এককথায় একটা তৃতীয় শ্রেণীর টলি-চিত্রনাট্য। আমাদের সময়েই সাত কেলাস পেরোবার পর ওসব পড়া চাপ ছিলো। আমাদের গ্রামে দেখেছি 'মেমসাহেব' ও 'মুকদ্দর কা সিকন্দর' দেখে বিপুল সংখ্যায় বাষ্পাকুল মহিলারা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নটরাজ ও করিম টকিজ থেকে বেরিয়ে আসছেন। আমরা অভিভূত হয়ে পড়তুম। এখন কী হয়, জানিনা। এমন নয় যে লোকের মোটা মোটা বইয়ের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিলো। যেমন ছিলেন 'বনফুল'। বিখ্যাত লিখিয়ে। অনেক লিখেছেন। ওঁর বিশেষত্ব বিচিত্ররস। ঘষাদুনিয়ার বাইরের ঘটনা, ভূগোল, লোকজনকে নিয়ে কারবার। একসময় জনপ্রিয়ও ছিলেন। 'অধৈর্য' পাঠকদের রাজা। তাঁর লেখা সবসময় মাপে হ্রস্ব। এখনকার পার্ল্যান্সে 'ফেবু' লেখক। 'স্থাবর' বা 'জঙ্গম' ব্যতিক্রম। ঐ লেখাগুলি এখন কেউ পড়েন কি না, জানিনা। তাঁর বেশ কিছু লেখা ছবি হয়েছে। হাটেবাজারে, অগ্নীশ্বর, অর্জুন পণ্ডিত, ভুবন সোম। 'অগ্নীশ্বর' একজন সত্যিকারের ডাক্তারের জীবন নিয়ে লেখা। যদ্দূর মনে পড়ছে তিনি শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের বড়দা ছিলেন। ভুল হতে পারে। মানুষটি ও উপন্যাসের চরিত্রটি একরকমই ছিলেন বলে শুনেছি। বাকি ছবির চরিত্রগুলিও বাস্তব মানুষদের আদলে লেখা। এঁরা ছিলেন আদর্শবাদী, স্বদেশসচেতন, আত্মসম্মানী, নির্লোভ, অনেক গুণ সম্পন্ন । সাধারণ বাঙালি দর্শক এমন মানুষদের ভালোবাসেন । কিন্তু নিজেরা হয়ে উঠতে পারেননা। হিরো ওয়রশিপে বাঙালি বঙ্গবিভীষণ পাবার যোগ্য। অগ্নীশ্বর, অধিকলাল বা অর্জুন মণ্ডল বনফুলকে জনপ্রিয় করতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের বিচারে কালজয়ী করতে পারেনা। তাঁদের নিয়ে 'বই' তৈরি হতে থাকে। কিন্তু 'সিনেমা'র ভিতর দিয়ে তাঁকে চেনা যায় না। বনফুলের স্বভাবসিদ্ধ ভাষা আর ট্রিটমেন্ট ছবির ভাষায় আনা যায়না। বড়ো ছবিকর হলে সম্পূর্ণ অন্য একটি সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে 'সাহিত্যে'র কোনও সম্পর্ক থাকবে না। কোনও লেখা থেকে ছবি তৈরি হওয়ার খবর থাকলে সেই সব বই খুব বিক্রি হতো একসময়। প্রকাশকরা বিজ্ঞাপন দিতেন, ছবি দেখার আগে বইটি পড়ে যান। এই সব ছেলেমানুষি এখনও হয় কি না জানিনা। বছর পঁচিশ হলো নতুন বাংলা ফিকশন পড়ার প্রয়াস নিইনি। 'বাংলাসাহিত্য' থেকে 'বই' কি এখন তৈরি হয়? ঠিক জানিনা। সিনেমার ভিতর দিয়ে ভারি ভারি কথা বলার ধরনটি এখন আর দেখা যায়না। যাপনের গরমিল থেকে উঠে আসা দুঃখযন্ত্রণার রূপকথা এখন ক্যানভাস পাল্টেছে। সময়ের প্রাসঙ্গিক মাত্রাগুলি বড্ডো পাল্টে গেছে গত দু দশকে। 'বই' থেকে আর 'বই' তৈরি হয়না। সেই সব রীতি ধরে নতুন ছবি করা যায়না। গল্পের টানে ছবির গুন আর টানা যায়না। সিনেমা সাবালক হয়েছে। তার ভাষা আর বইয়ের ধার ধারেনা। ম্যাটিনি শো'তে 'বই' দেখতে যাওয়া লোকজনও তো এখন সানসেট ব্যুলেভার্ডের পথিক। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়দের এখন জেগে ওঠার সময় হয়েছে।

264

2

Stuti Biswas

শ্যামলী নদীর খোঁজে পাঁচমারীতে...

পর্ব- ৩ বেড়ানো কারও শখ , কারো নেশা কারও কাছে জীবন । আমার কাছে বেড়নো মানে শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখা বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া নয় । রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে বেড়িয়ে প্রকৃতির মাঝে আয়েস করে কয়েকটা দিন কাটানো । কয়েকদিন একটু অন্য ভাবে যাপন করলে মন হালকা হয় । জীবনের গাড়ী চালানোর জন্য তাজা হাওয়া ভরে নেওয়া যায়। সকালে ঘুম ভাঙ্গল টিয়াপাখির কলরবে । বেরিয়ে দেখি ঝলমলে রোদ । আজ উঠতে একটু দেরী হয়ে গেছে । বারান্দার পাসের ঝাঁপাল গাছের সারিতে পক্ষীকুল সমাগত প্রাতরাশের জন্য । কাছেই চার্চ । প্রাতভ্রমনে বেড়িয়ে ওদিকেই গেলাম । রাজভবনের সামনে দিয়ে রাস্তা । গভর্নরের গ্রীষ্মকালীন বাসভবন ।পাশেই সরকারি আমলার বাংলো । সুন্দর বাগান দিয়ে সাজানো বাংলোগুলি  । পাহাড়ের কোলে শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে ছোট্ট ছিমছাম চার্চ । হোটেলে ফিরে স্নান সেরে ডাইনিং রুমে যাবার পথে ম্যানেজারকে বললাম জীপ ঠিক করে দিতে । বুফে ব্রেকফাস্ট , একটা করে ঢাকনা খুলছি আর পিছিয়ে যাচ্ছি । সেই ঘিসাপিটা ব্রেড ,ডিম , ইডলি, ধোসা । লাস্টের ঢাকনা খুলতেই মন আনন্দে ডগমগ করে উঠল । ফুলকো লুচি পাশেই আলুর দম । আহা আর কি চাই । ম্যানেজার ফিসফিস করে বলে গেল ওগুলো নেবেন না গরম গরম আসছে । সকালে ঠিক করেছিলাম হালকা ব্রেকফাস্ট করব কারন তারপরই বেড়ব ফলস দেখতে । চড়াই উতরাই পথে ওঠা নামা করতে হবে । সব প্ল্যান মাথায় উঠল বেশ কখানা লুচি খেয়ে ফেললাম । তৈরি হয়ে বেড়িয়ে দেখি বিশাল ভুড়িওলা ড্রাইভার হুডখোলা জীপ নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।আমাদের দেখেই বিরাট নমস্তে করল । মন যতই নাচানাচি করুক শরীর মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয় অত তরবর করো না  । জীপে চড়তে একটু বেগ পেতে হল । চাকার ওপর পা দিয়ে তড়াং করে লাফিয়ে জীপে উঠতে গিয়ে পপাতধরনীতলে  । তবে আসপাসের লোকজন বেশ ভদ্র আমায় দেখে হো হো করে কেউ হাসেনি । অবশেষে সিঁড়ী বেয়ে হাঁকুপাঁকু করে চড়লাম । যাত্রা সুরু। ছোটবেলায় পড়াশুনা না করার জন্য বকুনি খেলেই , মাঝে মাঝে প্রবল ইচ্ছা জাগত বনে গিয়ে কুঁড়ে বানিয়ে থাকব ।গাছে উঠে ফল পারব। ছিপ দিয়ে মাছ ধরব । কি মজা হবে । কেউ পড়তে বলবে না । তখন তো জানতাম না জঙ্গলে যাবার অনেক হ্যাপা  । পারমিশন নিতে হয় , টিকিট কাটতে হয় । অনিচ্ছাস্বত্বেও গাইডকে বগলদাবা করতে হয় । সংসারে বিরক্ত হয়ে যারা ভাবে বনে গিয়ে স্বাধীন জীবন কাটাবে তারাও বোধহয় বনে যাবার হ্যাপা সম্বন্ধে অবগত নয় । ইতিহাসের পাতা উল্টে নিই । ১৮৫৭ সাল , সিপাহী বিদ্রোহের দামাম বেজে উঠেছে । বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশরা হিমশিম খাচ্ছে । হঠাত খবর এল বিদ্রোহের অন্যতম নেতা তাঁতিয়ে তোপী সাতপুরা পর্বতে লুকিয়ে আছে । ক্যাপ্টেন জে ফোরসিথ তাঁতিয়ে তোপীকে ধাওয়া করতে করতে আকস্মিক ভাবে পৌঁছে যান ঢেউ খেলানো মালভূমিতে  । একদল বাইসন সাহেবের পথ অবরোধ করে দাঁড়ায় ।মিশন অসফল হওয়ায় সাহেব বিমর্ষ  । কিন্তু মালভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ সাহেবের মন কেড়ে নেয়  । অভিভূত ক্যাপ্টেন জায়গাটিকে বসবাস যোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা করেন । ফোরসিথ ১৮৬২ সালে সর্বপ্রথম এখানে বাড়ী বানান  । বাড়ীটির নাম দেন বাইসন লজ । পরবর্তীতে পাঁচমারীতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান মিলিটারী বেস গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাইসন লজে সরকারি টিকিট কাউন্টার । জঙ্গলে ঘুরতে হলে ওখান থেকেই টিকিট কাটতে হয়  ।নিজের গাড়ীতে ঘুরলে ৬০০টাকা টিকিট । লোকাল জিপসী ভাড়া করলে ৩০০টাকা । জঙ্গলে একা ঘুরতে দেবে না গাইড গুজে দেবেই । সব মিলিয়ে হাজার টাকা , গাড়ীভাড়া আলাদা ( ড্রাইভারের ইচ্ছা অনুযায়ী ) । নিজ গাড়ী নিয়ে গেলে জংগলের গেটের থেকে ২কিমি দূরে পারকিং , গাড়ী দাঁড় করিয়ে দেবে । তারপর হন্টন । জীপসি হলে ভেতরে বেশ কিছুটা যাবে । মানে হরেদরে জিপসী ভাড়া করতেই হবে । ড্রাইভার গেল টিকিট কাটতে আমরা মিউজিয়ামে  । মিউজিয়ামে পাঁচমারীর ম্যাপ , জঙ্গল , প্রানী ও উদ্ভিজ জগত সম্পর্কে কিছুটা ধারনা হল । বেড়িয়ে দেখি ড্রাইভার একটি লোকের সাথে খোস গল্পে মেতেছে । আমাদের দেখে লোকটি এগিয়ে এসে বলল সে আমাদের জংগলে পথ দেখাবে । গাইড  । গাড়ীর হ্যাণ্ডেল শক্ত করে ধরে বসে আছি । উতরাই রাস্তা । গাড়ী হু হু করে নামছে জঙ্গলের পথে  । শহরের যেটুকু চিহ্ন ছিল , অল্প চলার পরই তা পিছনে পরে রইল । ইষ্ট নাম জপতে জপতে ভাবছি যদি একবার হাত ছেড়ে যায় , জীবনের ঘূর্ণিপাক থেকে ছিটকে কোথায় গিয়ে পরব কে জানে । তবে বাঘের লাঞ্চ/ ডিনার টেবিলে শোভা পাব না এটা নিশ্চিত । গাইডকে যাতে বাঘ দেখানোর জন্য পীড়াপীড়ি না করি তাই সে প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছে সাতপুরা ন্যাশনাল পার্ক খোলার পর মাস দুয়েক বাঘ দেখা গেছিল । পরে( বোধহয় সেরকম দর্শক না পাওয়ায় )বাঘেরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে গেছে । মাঝে মধ্যে চিতা , লেপার্ড রাজত্ব ঠিক আছে কিনা এসে দেখে যায় । তবে বন আমাদের হতাশ করেনি । সোনালি লেজওলা একদল বাঁদর গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে অভিনন্দন জানাল । গলা ছেড়ে গান ধরল রংবেরঙের পাখিরা  । অজানা ঠিকানা থেকে উড়ে এসে নাচতে শুরু করল রঙিন প্রজাপতির দল । জঙ্গল বাড়তে লাগল । পাতাঝরা বন । মাঝে মাঝে বাঁশের ঝাড় ,শালের জঙ্গল তলায় পাতার স্তুপ । হাওয়া দিলেই হুড়হুড়ি পরে যাচ্ছে বনে। বড় বড় বহেড়া , কুহমি গাছ নীরব প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে । সারি সারি । ,চিরহীদানা (চিরঞ্জী ) গাছে ফুল এসেছে  । অরন্যের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মাঝে মাঝে গম্ভীর স্বরে কুবো পাখি ডেকে উঠছে কুব কুব............ । কানে আসছে অস্পষ্ট জলের শব্দ । বি-ফলসের কাছাকাছি এসে গেছি । জিপসিতে আমাদের সহযাত্রী পরিবারটি তে দুটী বাচ্চা  । তারা আগেই জানিয়ে দিল ঝরনার নীচে যাবে না  ।গাড়ী থেকে নামার সময়ই গাইড জানতে চাইল আমরা ঝরনার নিচে যেতে ইচ্ছুক কিনা । হ্যা বলাতে গাইডের মুখখানা কেলো হাঁড়ির মত হয়ে গেল । পাথরের ফাঁক দিয়ে শান্ত জল্ধারা বয়ে চলেছে খানিকটা । তারপরই খাড়া পাহাড়  । কয়েকশ ফুট নীচে ঝাঁপিয়ে পরছে পাহাড়ী ঝোঁড়া  । ভিঊ পয়েন্টে নিয়ে গিয়ে গাইড নানা টালবাহানা কথা বলে নীচে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের নিরস্ত করতে লাগল । কিন্তু আমরা বদ্ধপরিকর । ও বোধহয় এমন নাছোড়বান্দা বুড়োবুড়ী আগে দেখেনি । নীচে নামার সিঁড়ি দেখিয়ে ব্যাজার মুখে পাথরের ওপর বসে রইল । একপাশে খাঁড়া পাহাড় অন্য দিকে ঝরনা । মাঝখান দিয়ে পাথরের সিঁড়ী । পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কত গাছ , রঙিন বুনো ফুলের ঝাঁরে অচেনা পাখির কিচিরমিচির । পাথরের ফাঁক দিয়ে চেনা আকাশটা আশ্চর্য সুন্দর দেখাল । নিচে নেমে দেখি প্রবল জলরাশি ঝাঁপিয়ে পরছে স্ফটিকের মত ছোট্ট জলাশয়ে। তারপর পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছুটে চলছে । জলে পা ডুবিয়ে বসে মৌমাছির গুনগুনানির মত জলোচ্ছ্বাসের শব্দ শুনলাম  । সাহেবরা ঝরনার নাম দিয়েছে বি-ফলস । স্থানীয় লোকেরা বলে যমুনা প্রপাত । একসময় এই প্রপাত ছিল শহরের পানীয় জলের উতস। অনেকেই দেখলাম স্নান করছে । পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আমরাও কিছু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করলাম । ফেরার সময় সিঁড়ী দিয়ে উঠতে প্রান বেড়িয়ে যাবার উপক্রম । মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়ে তারপর উঠলাম। ওপরে উঠে এসে দেখি গাইড হন্তদত্ন হয়ে পায়চারী করছে । ভাবছে বোধহয় আমরা নিচেই সংসার পেতে ফেলেছি । আমাদের দেখে আশ্বস্ত হয়ে গাড়ীতে গিয়ে বসল । ড্রাইভার ঝিমাচ্ছে । হঠাত ঝিমুনি ভেঙে আমাদের দেখে কি করবে বুঝে না পেয়ে এমন সাবাসি দিতে লাগল , মনে হল এই বয়সে আমরা যেন এভারেষ্ট জয় করে এসেছি । গাড়ী স্ট্রাট করল । গাড়ী সেকেন্ড গীয়ারে চলছে । রাস্তা বলতে কিছু নেই বনের পথ । প্রচুড় ঝাঁকুনি । নির্জন পাহাড়ী চড়াই ভেঙে দুই পাহাড়ের মাঝে বিরাট খাঁজে এসে দাঁড়ালাম । প্রকৃতি নিপুন হাতে বানিয়েছে এম্পিথিয়েটের  । চারিদিকে পাথরের দেওয়াল ওপরে নীল আকাশ । মুখে হাত দিয়ে ইকো করতেই সবুজ মেঘের মত এক ঝাঁক টিয়া তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে ডাকতে উধাও হয়ে গেল । বাইরে সূয্যিমামা বেশ জ্বলিয়ে পুড়িয়ে দিলেও ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে ঠাণ্ডা ।জায়গাটির নাম রিচগড় । রিচগড় একসময় ভালুকের আস্তানা হলেও বর্তমানে পর্যটকদের দখলে । বনের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী সুন্দর এক গাছের সাথে পরিচয় হল । কুসুম গাছ । পাতলা গোলাকার পাতা । পাতাতে সবে লাল রঙ ধরেছে। বসন্তশেষের বনে হোলিখেলার আমন্ত্রন জানাচ্ছে । হাওয়ার ঢেউয়ে কম্পমান পাতা , জলের শব্দ, পাখির ডাক কেমন যেন আনমনা করে দেয় । বিকালের কাঁচপোকা রোদে সঙ্কীর্ণ উতরাই পথে নিচে নামতা থাকি । গাছের ফাঁক দিয়ে রজত প্রপাতের সফিন জলরাশি চোখে পড়ছে । ভিউ পয়েন্টে এসে দাঁড়াই । কয়েকশ ফুট উঁচু থেকে সগর্জনে আছড়ে পরছে গভীর খাদে । অপূর্ব দৃশ্য । নিস্তব্দতারও ভাষা আছে ।সে ভাষা গুঞ্জরিত হয় পাচমারীর বনে পাহাড়ে আকাশে বাতাশে । নির্জন বনে হাঁটাতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা পাহাড়ের সাথে , প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা পাগলা ঝোড়া , রহস্যময় গুহা , গভীর খাদের সাথে । বাতাসে ভেসে বেড়ায় পুটুস ঝোপের কটু গন্ধ । গায়ে লুটিয়ে পরে সোণালী ধূ ধূ ঘাসের বন  । গাছের পাতায় সওয়ার হাওয়া ইলিবিলি কাটে দিনরাত । নির্জন বনে হাঁটাতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় গোন্দ আদিবাসীদের সাথে । নির্জনতা আর এডভেঞ্চারের অদ্ভুত মিলন বাধাঁ পরেছে সাতপুরার রানীর আঁচলে । শেষ বিকালের গন্ধ মেখে ফিরে এলাম হোটেলে । রাতে খাওয়ার পর চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসলাম । লনে আগুন জালানো হয়েছে । তাকে ঘিরে অল্প বয়সী কয়েকটি ছেলে গীটার বাজিয়ে গান গাইছে। হাওয়ায় পিঠে চড়ে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পরছে পাহাড়ে জঙ্গলে । রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ী চলে গেল  । টেল লাইটের আলোটা মিলিয়ে গেল জঙ্গলের পথে । একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাক , বনের শিশির , কুয়াশা চাঁদের আলোর সাথে মিলেমিশে এক স্বপ্নরাজ্য তৈরি করেছে । জংগলে যতবারই আসি কি যে ভাল লাগে । কত গন্ধ , শব্দ , দৃশ্য । জীবনের টানাপোড়েন ভুলে মেতে উঠি এক অদ্ভুত আনন্দে ।

375

10

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

তুমি কী মরীচিকা না ধ্রুবতারা? "কী নিবিড় কী নিবিড় সমুদ্রসবুজ আমার অপেক্ষার রঙ। ডুবে যাওয়ার ভয়ে নিজেকে নিজের দু'হাতে বেড় দিয়ে থাকি। পায়ের তলা থেকে সাঁতার সরে সরে যায়। ওই রঙ আমার জন্মাবধি প্যানিকের দিন আনি দিন খাই সংসার। মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে তোমার সঙ্গে ইমাজিনারি প্রেম অবধি পুরোটাই ক্রমশ খুব চাপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে গো।আমাকে ওষুধ বলে দাও। শুশ্রূষা দাও। একবার তাকাও। কী নিস্তব্ধ কী নিস্তব্ধ তোমার চাহনি। অথচ গড়নটা বাঙ্ময়। কার সঙ্গে কথা বলো কার সঙ্গে হেসে ওঠো মেঘ মেঘ দুপুরের মতো। পপলারে বসন্ত লাগার মতো। আমি তো সারাজীবন বসন্তের অপেক্ষা করে করে উবু হয়ে বসে আছি সমুদ্রসবুজ ম্যানিক ডিপ্রেসিভ সাইকোসিসের ধারে। সঙ্গে ধর্মতলার সভ্যতা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা রোদ চশমা। কাজেই বুঝতেই পারবে না আমার চোখে ঢুলে আসা স্বপ্নের ফিউনারেল। তা সে না বুঝতেই পারো। তোমার জন্যে, শুধু তোমার জন্যেই আমার মরণোত্তর দেহদান। এরপর যা যা হবে তা খুবই নিয়মমাফিক, আর সমুদ্রসবুজ রঙটা ক্রমশ একটা বিস্তীর্ণ কালশিটে হয়ে যাবে। যেন একটা ফুটে উঠতে থাকা ক্যাকটাসের ফুল। এত কিছু, এত কিছুর পর বসন্ত আর ভাল্লাগে না সত্যি । একা একা পরিত্যক্ত বাসস্টপে সিগারেট ধরাই। কী অসম্ভব ছড়িয়ে পড়ে তার সমুদ্রসবুজ ধোঁয়া। যেন তার মধ্যে দিয়ে তোমার ধারালো একা থাকা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে তিনটের রাত্তিরে। নির্বাক ইমাজিনারি বসন্তে, অন্ধকার শিমুলে পলাশে।"....মন্দাক্রান্তা সেন তোমায় দিলাম| কি ভীষণ বরফ যে পড়ছে‚ ভাবতে পারবে না| তেমনি ঝোড়ো বাতাস সাথে| আর আমার সময়ের ঘরে তো সর্বদাই মা ভবানী| তবু আজ সব ঝড়‚ সব দুর্যোগ‚ সব ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও চুয়াচন্দনে লাজাতে বসলাম তোমার বরণের এই মালা| সারাদিন উন্মনা আজ তোমায় ভেবে| তোমার পলাশ‚ তোমার কোকিল‚ তোমার রোদ্দুর‚ তোমার উষ্ণ শ্বাস‚ তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা স্মরণের বাতায়ন খুলে জড়িয়ে নিচ্ছে সকলের অলক্ষ্যে| আনমনে গুনগুন করেই যাচ্ছি "গন্ধে উদাস হাওয়ার মতো উড়ে তোমার উত্তরী, কর্ণে তোমার কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরী, তরুণ হাসির আড়ালে কোন্‌ আগুন ঢাকা রয়- এ কি গো বিস্ময়..." ভালো থেকো গো আমার ফাগুন সংক্রান্তি| আবার কথা হবে আগামী ১৪-ই মার্চে| ভালোবাসা‚ পাগলি-

2031

108

শিবাংশু

চড়ুই পাখি ও ভোরের রোদ্দুর

মেয়েরা বড়ো হলে মায়ের বন্ধু হয়ে ওঠে । একটু বড়ো হলেই তাদের পরস্পর কলকাকলির মধ্যে বাবা যেন বেশ বেমানান । বাবা কি মেয়েদের 'বন্ধু' হয়ে উঠতে পারে । বোধ হয় না । বাবার সঙ্গে অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু 'বন্ধুত্ব'..........? সেটার স্তর আলাদা । পাহাড়ের সঙ্গে কি বন্ধুত্ব হয় । পাহাড় মেঘ দেয়, ছায়া দেয়, সবুজের শান্তি এনে দিতে পারে । কিন্তু তার তো নদীর ভাষা জানা নেই । সে শুধু প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দিতে পারে । মা আর মেয়েরা সেই ভাষা জানে, নিজের মতো করে জেনে ফেলে । তারা সবাই তো পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতস্বিনী, পাহাড়ের ছায়ায় স্বচ্ছন্দ, সাবলীল, স্বতস্ফূর্ত । তাদের প্রেম, স্নেহ, কলহ, অভিমান যে মাত্রায় খেলা করে যায়, সেই চতুর্থ মাত্রাটির নাগাল পাওয়ার ক্ষমতা প্রকৃতি বাবা'দের দেয়নি । ------------------------------ আমার মেয়েরা যখন পড়াশোনার জন্য বা জীবিকার খোঁজে বাড়ির চেনা চৌহদ্দি থেকে দূরে চলে যায় তখন তাদের 'বাড়ি' বলতে দিনের শেষে মায়ের সঙ্গে ফোনে আড্ডা । সেটা কখন শুরু হয়, কখন শেষ হয় , কেউ জানেনা । আদৌ 'শেষ' হয়কি? জানিনা । শুধু আমি বাড়ি এলেই শুনতে পাই মায়ের সংলাপ, তোর বাবা এসেছে, এখন রাখছি । যখন একজন বাইরে ছিলো, তখন তার জন্য রাখা থাকতো নির্দিষ্ট সময়, ফোন করার অছিলায় । অপরজন ঈর্ষাতুর তাকিয়ে থাকতো, মা শুধু দিদির সঙ্গে গল্প করে । তার পর দু'জনেই যখন বাইরে গেলো, তখন সময় ভাগাভাগি নিয়ে তাদের কোন্দল । দু'জনে একবাড়িতে থাকে, বহুদূরে কোনও এক শহরে, কিন্তু মায়ের সঙ্গে কথা বলবে আলাদা করে, এক্স্ক্লুসিভ । মা'কে প্রায় স্টপওয়াচ নিয়ে কথা বলতে হবে । কারো সময় কমবেশি হওয়া চলবে না । যেদিন বাবা'র কানে যায় সেসব আলাপ প্রলাপ, বাবা বেশ বিস্মিত থাকে । নির্বিষয়, নির্গুণ, নির্নিমেষ কথা, শব্দবিনিময় । শব্দের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা সেই সব মেয়ের, শব্দই তাদের মায়ের আঁচল, গায়ের ঘ্রাণ । তার মধ্যে বাবা কোথায় ? একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে যায় । বাবা যেন একটা বিদ্যুত প্রকল্প, শহর থেকে সর্বদা একটু দূরে থাকে । কিন্তু শহরের সব বাতি ঝলমল জ্বালিয়ে রাখার জন্যই তার বেঁচে থাকা । --------------------------------------- মা'য়ের সঙ্গে আমার কথা, যার মধ্যে বিশ্বচরাচর ছেয়ে থাকে । সংসার, অসার, শুদ্ধসার, বিষয়ের কোনও অভাব নেই । কিন্তু মা আমার 'মা', বন্ধু নয় । বন্ধুর তো অভাব নেই কোনও। ভালোবাসতে জানলেই শত বন্ধু হাত বাড়িয়ে দেয় । কিন্তু বাবা-মা তো একটাই । তারা পায়ের তলার মাটি, মাথার উপর আকাশ । তারা নির্ভরতার শেষ দেবতা । অন্য কেউ কি সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারে ? না, পারেনা । তাই মায়ের কাছে বলে যাওয়া কথা, যেন নদীকে শুনিয়ে যাওয়া গান । বাবার কাছে দুদন্ড বসে থাকা, তপ্ত আগুনরোদের থেকে চুরি করে আনা একটুকরো ছায়ার বৃত্ত । -------------------------------- অনেক সময় দেখেছি, সন্তানের সঙ্গে অসম্ভব জড়িয়ে থাকা মায়েরা কেমন একা, অসহায় হয়ে যায় । পৃথিবীর কক্ষপথে সাবলীল নিজস্ব অবস্থান খুঁজে পাওয়া সন্তানেরা হয়তো জানতেই পারেনা তাদের মায়েদের নিতল নি:সঙ্গতা । পোস্ট পার্টাম সিনড্রোম ? একমাত্র সন্তান কন্যাটির বিয়ে হয়ে যাবার আমার এক আত্মীয়াকে বলতে শুনেছি, সব কাজ ফুরিয়ে গেলো । এবার গেলেই হয় । তখন তাঁর বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স । মানুষ কি একফলা গাছ । প্রসূত ফলটির নিজস্ব বীজবিস্তার করা হয়ে গেলেই কি গাছের শিকড় ঢিলে হয়ে যাবে ? একেবারে না । পৃথিবীর থেকে অনেক দেনাপাওনা তাঁর এখনও বাকি থেকে গেছে । এই নি:সীম আনন্দযজ্ঞে শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত অগ্নিহোত্রের কাজ করে যাওয়াই তো আমাদের ভবিতব্য । ------------------ ছেলেরা কি মা'কে কম চেনে ? মায়েদের সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্বটা কি ছেলেদের বেশি হয় ? মনে হয় , উত্তরটা নেতিবাচী । শারীরিক বৃত্তে হয়তো মেয়েরা মায়েদের বেশি কাছে থাকে, কিন্তু মানসিক বৃত্তে সেরকম কোনও বিচ্ছিন্নতা নেই । এই নৈকট্যের একমাত্র সূত্র বোধের সংবেদনশীলতা । দু'জন সংবেদনশীল মানুষ, মা ও তাঁর সন্তান, সহজ নিয়মেই পরস্পরকে স্পর্শ করে থাকতে পারে । শারীর দূরত্ব বা লিঙ্গভেদ তেমন কোনও তাৎপর্য রাখেনা । শুধু মানসিক দূরত্বই সম্পর্কের শেষ চন্দ্রবিন্দু । --------------------------- চড়ুই পাখিদের শুধু চাই অলিন্দের একটা কোণ । ঝড় থেকে, জল থেকে, বিপর্যয় থেকে আড়াল করে রাখবে যে । বাবার মতন । মা হলেন ভোরের প্রথম রোদ , যার ডাক পেয়ে তারা কথা বলতে শুরু করবে অনর্গল, অনিবার, অফুরন্ত ...... নির্জন প্রাণঝরণার অবিরাম ছাপিয়ে যাওয়া মাটির কলস আর তাদের নির্মল কলস্বর ... জিন্দগি ইসি কা নাম হ্যাঁয় ......

273

4

মনোজ ভট্টাচার্য

চলোনা দীঘার সৈকত - - !

চলোনা দীঘার সৈকত - - ! কী লিখি ! কিছু একটা লিখবো বলে চেষ্টা করে যাচ্ছি । কিন্তু স্মৃতির অ্যালবাম খুলে দেখি – ছবিগুলো শুধু ধুসরই হয়নি – স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের মতো চুন-বালি খসে খসে পড়ছে ! দুরছাই বলে চলেও যেতে পারিনা – আবার দেখতে দেখতে চোখ জ্বালাও করে ! এ এক নৈর্ব্যক্তিক যন্ত্রণা ! সবার আগে একটা বাংলা বা হিন্দি ছবির ক্লিপিং দিই । - ট্রেনে আমাদের সামনের সীটে বসা কয়েকজন লোকের আলাপ হচ্ছিলো । সাধারনত এসব আলোচনা ট্রেনের গতির কাছে হেরেই যায় । কিন্তু কান সচকিত হয়ে গেল । ওরা কেবলই বাগবাজার শ্যামবাজারের নাম করেই যাচ্ছে । - আরে এতদিন তো জানতাম - বাগবাজার কেবল আমাদেরই সম্পত্তি ছিল – তার মধ্যে অন্যেরা আসে কোত্থেকে ! সহ্য করি ধৈর্যের সঙ্গে । ট্রেনের শেষ স্টপ এসে গেল । - আমরা তো সবার শেষে নামবো – তাই নামার যাত্রীদের দেখি । আমাদের সামনের সীটের যাত্রীরা উঠে দাঁড়াতেই আমার স্ত্রীই জিগ্যেস করলো – আপনারা খুব বাগবাজার শ্যামবাজারের নাম করেই যাচ্ছেন ! আপনারা কি ওখানে থাকেন ? হ্যাঁ – আমরা তো বাগবাজারেরই বাসিন্দা । - সে কি বাগবাজারে কোথায় থাকেন ? তারপর যা বর্ণনা দিল – সেটা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের বাড়িটা – মিত্তিরদের বাড়ি ! – আর যার নাম বলল – সে আমার বন্ধু ভদ্রেশ্বর । অথচ আমাদের চেনে না ? যেন আমি ওখানে রোজই থাকি । তিরাশি সাল থেকে আমরা সেখানে থাকি না । আমরা উদ্বাস্তু হয়েছি আইনত ২০০০ সাল থেকে ! ঐ মিত্তিরবাড়িটা আমার ধারনা মতে আমার মাতামহের বাড়ি ছিল । কিন্তু আগেকার ব্যবসাদার মানুষ – বরং দেওঘর শিমুলতলায় বাড়ি কিনে রেখেছে – কিন্তু নিজেদের একটা বাড়ি করতে পারেনি -কলকাতায় । ঐ মিত্তিররা তাদের মামলায় হারিয়ে নিজের বাড়ি দখল করে নিয়েছে । আর দেওঘর শিমুলতলা – মালিদের গহ্বরে গেছে ! আর ঐ বাড়িতেই আমার জন্ম ! হ্যাঁ – ঐ বাড়িটাই আমার মামার বাড়ি ! তখন ঐ বাড়িটায় অনেক অনেক লোক থাকত । আত্মিয়-স্বজন – রঘুনাথ - কাঠের মিস্ত্রি – আনন্দ সিং - রান্নার ঠাকুর – ইত্যাদি ইত্যাদি ! তো এসব লিখতে গেলে আরেকটা সাহেব-বিবি-গোলাম হয়ে যাবে ! আপাতত থাক – পরের জন্মে চেষ্টা করা যাবেখন ! ক্ষিধে , হোটেলে ঢোকা, ইত্যাদি কারনে মিত্তিরদের সবাই এগিয়ে গেল । আমরা দুজন বের হলাম – দীঘার প্ল্যাটফর্ম যে অত বড় – কখনো খেয়াল করিনি – কিন্তু আমাদের জন্যে অন্তত একজন অটোওলা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল । সেই আমাদের যত্ন করে সৈকতাবাসে পৌঁছে দিল । আমাদের কোন অগ্রিম বুকিং নেই । জানি – দুজনের একটা ঘর হবেই । - না – সব ঘরই আগে থেকে বুক করা । তাবলে আমরা ছাড়বো কেন ? এখানেই তো বারবার উঠেছি – প্রচলন থেকেই তো অধিকার জন্মায় । একটু জানাশোনা তো হয়েছেই ! অগত্যা ম্যনেজার একটা ঘর দিতে বাধ্য হল । একটা তিন বেড ওলা ঘর দিল । আবার দোতলায় উঠতে কষ্ট হবে বলে একতলাতেই দিল । কে বলে ভদ্রতা সৌজন্য সব উঠে গেছে ! বাঙ্গালীদের তিনটে জায়গা - দীপুদা – দীঘা পুরী আর দার্জিলিং – বড্ড ক্লিশে হয়ে গিয়েছে । যতবার ভাবি এই জায়গা-গুলোতে আর আসবো না – ঠিক ঘুরে ফিরে এই তিনটে যায়গায়ই এসে পড়ি । আগে দীঘায় প্রায় মাসে দুমাসে আসতাম । তখন খড়গপুর থেকে বাসে করে আসতে হত । - এখন অবশ্য সরাসরি ট্রেনে আসা যায় ! – ট্রেনে রিজার্ভেশানও পাওয়া যায় । - এর আগে ছ-জন এসেছিলাম । আমরা দিন সাতেক ছিলাম । এবারই প্রথম আমরা দুজন এলাম । - কিন্তু দেখলাম আমরা একা নয় – প্রচুর লোকের সঙ্গে আলাপ হতে লাগলো । সবই অচেনা । প্রত্যেকেই জেচে পরে এসে আমাদের খোঁজ খবর করতে লাগলো । খুব সম্ভবত কলকাতায় খবর হয়ে গেছে – দুই বুড়ো-বুড়ি কলকাতা থেকে উধাও হয়ে গিয়ে দীঘাতে আশ্রয় নিয়েছে ! “চলনা দীঘার সৈকত ছেড়ে ঝাউবনের ছায়ায় ছায়ায়- - শুরু হোক পথ চলা- “ পিন্টু ভট্টাচার্যের এই গানটা এক সময়ে আমাদের প্রায় জাতীয় সঙ্গীত হয়ে গেছিলো । আর একটা গান “ - - ঐ ডাকছে - ঐ ডাকছে নীল সমুদ্র ডাকছে- চলো চলো চলো চলো - বেড়িয়ে পড়ি - “ বোধয় অমল মুখোপাধ্যায়ের । - ঝাউবনই বা কোথায় - কোথায়ই বা ঝাউবনের লুকোচুরি খেলা ! – যারা সম্প্রতি দীঘা যাননি – তাদের প্রতি সতর্কীকরণ – যাবেন না – নিজেদের ছেলেবেলার স্বপ্ন ভাঙ্গতে । - কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে – ! যতটা অঞ্চল ঝাউয়ের বন ছিল – সবটাই ভর্তি হয়েছে হোটেলে । এমন কি ‘ও-ওআই-ও’ মার্কা হোটেল ! - আর মল - ! সারা কলকাতায় যত দোকান আছে দীঘাতে বোধও তার চেয়ে বেশি স্টল - এমনকি অনেক অনেক স্টলে কোন বস্তু পর্যন্ত নেই – বন্ধ ! কিন্তু সব ছোট স্টলে ভরাট ! সেখানেও নানা দিদি-বৌদির রেস্টুরেন্ট । এখানেও এখন সেই ধর্ম সঙ্কট ! আগে তো এখানে কোথাও কোন বাবা-মা-বটঠাকুর ছোট-ঠাকুরের মন্দির দেখিনি ! এবার দেখলাম – কোন এক ভবা পাগলার মন্দির । আরও বেশ কতগুলো ছোটবড় মন্দির ব্যবসা ফেঁদে বসেছে । বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী ! কিন্তু লক্ষ্মীর বদলে – কালী ! – মানে বন্দুক অধিকারি ! একপক্ষে ভালোই হয়েছে – আমাদের যৌবনের দীঘা – আমাদের বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে প্রৌঢ় হয়ে যাচ্ছে । তবে আমরা যখন থাকবো না – দীঘা কিন্তু তখনো থাকবে ! দীঘার ওপর দিয়েও তো কম ঝড় ঝাপটা যায় নি ! সুনামি, আইলা – আরও কত কি ! শেষাশেষি যে আইলা দীঘাকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিল – তারপর তো দীঘা পুনর্গঠন করলো দীঘা উন্নয়ন বোর্ড – যার সর্বময় কর্তা হোল অধিকারীরা । প্রত্যেক স্টলের জন্য সর্বনিম্ন দুলাখ টাকা ধার্য হোল – এখনও অনেকেই সেই ইন্সটলমেন্ট দিয়ে যাচ্ছে । রাজ্য সরকারকে না – দীঘার সরকারকে । অনেকেই তাই দীঘা ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র । ও, আমাদেরও অবশ্য জিজিয়া কর দিতে হচ্ছে – মাথা-প্রতি দশ টাকা । তার কোন রসিদ বা প্রমাণ নেই । কিন্তু প্রত্যেক হোটেল-ওলাই নিচ্ছে । নেহাত দশ টাকা – তাই এব্যাপারে কেউ উচ্চ-বাচ্চ্য করে না । আগে জানতাম – সৈকতাবাস সরকারী ভবন । গতবার দেখেছিলাম সৈকতাবাসের পুনর্গঠন হচ্ছে । এবারে সেকাজ প্রায় শেষ । কিন্তু এবার শুনলাম – এটা সরকারী নয় – তবে কার মালিকানা – কেউই বলল না । মুল সৈকতাবাস এখন পেছনে অনেকটা বেড়েছে – মুখ্যমন্ত্রীর জন্যে ‘দিঘী’ হয়েছে । আবার রেস্টুরেন্টের আগেই ছোট্ট একটা সুন্দর দেখতে বাড়ি – অন্য রঙের – কেউ বলল না সেটা কার ! তবু বলবো – দীঘার সবটাই অন্ধকার নয় । অন্তত এক মাইল মতো রঙিন আলো । খুব সুন্দর রাস্তা । সমুদ্রতটের বিরাট বিরাট পাথরের স্ল্যাব । বসার জন্যে – কিন্তু খুব বেশি লোকে সেখানে বসছে না । তট বরাবর সুন্দর পাঁচিল দিয়ে বাঁধানো । - আর আছে চা, ঝালমুড়ি, খেলনা ইত্যাদির ফিরিওলারা । আগে আগে ঘোড়ায় চড়ার বদলে – ব্যাটারির টয় বাইক ও গাড়ির চালানোর ভিড় । বাচ্ছা বাচ্ছা ছেলেরা ঐ গাড়ি নিয়ে পর্যটকদের ভাড়া খাটাচ্ছে । পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী । নগরের উন্নয়ন তার সঙ্গেই জড়িয়ে । আমরাও কয়লার ইঞ্জিন থেকে ডিজেল – ইলেকট্রিক হয়ে এখন ম্যাগনেটিক ট্রেনে চরছি । কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধেই হয় মেনে নিতে । তবু তো মেনে নিতেই হয় ! কারন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি মাথা চারা দেয় বৈকি ! তাই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি ! কিছুদিন আগে ভার্জিনিয়া বীচে গেছিলাম । - দীঘা সে তুলনায় ছোট হলেও - খানিকটা তারই দেশী সংস্করণ ! মনোজ

378

4

Joy

ভালবাসার কোন দিন হয় না...

আজ কি শুধু প্রেমিক‚ প্রেমিকার ভালোবাসার দিন| ভালোবাসার কি কোন নির্দিষ্ট দিন হয়| হয়ত হয়| কার্ড‚ চকোলেট‚ গিফ্ট‚ আর ভালোবাসার মানুষের মিঠি স্পর্শ| আর যারা ভালোবাসার মানুষ বা নারীকে কাছে পেল না| তাদের কাছেও থাকে ভালোলাগার ও ভালোবাসার অনুভূতি| সব ভালো কিছুই কি পেতেই হয়| দূরেই থাক না তার না জানা গরিমা নিয়ে| কিছু কলুষিত না হয়েও তো কাছে থাকা যায়| ভালোবাসা তো অমর| এর মৃত্যু নেই‚ শেষ নেই| হয়ত বা কোন এক নতুন বেশে আসবে অন্য নাম নিয়ে| ভালোবাসার জন্যে সব ত্যাগ করা যায়| আমরা যারা ৮০-৯০ দশকের জীবাশ্মরা যারা পুরোনো আর নতুন দুটোর মেলবন্ধন| আমাদের সময় এত জাকিয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে পালন হত না| লুকিয়ে চিঠি দেওয়ার চল ছিল| রাস্তার পাশে‚ মেয়েদের স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলগোছে মেয়েটির দিকে তাকানো ছিল| অথবা কোন বিয়ে বাড়ি| বাসর জাগা‚ গানের লড়াই| আর ভালো লাগার জনকে কিছু না বলতে পারা| সে কি জানতে পারত আমাদের মনের কষ্ট| হয়ত পারত‚ কিন্তু বাড়ি‚ সমাজের ভয়ে আবার কোনো বিয়ে বাড়ির প্রতীক্ষা| দূর্গা পুজোর প্রতীক্ষা| প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিতে গিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা| স্কুল‚ কলেজ যাবার সয়ম বাস স্টপে আলতো হাসি| বাস মিস| কিছু কথার বর্ণমালা| ছিল খোলা খামের মধ্যে সুন্দর গন্ধ মাখা একটা ছোট্ট চিঠি| অথবা অনেক গল্প| হয়ত তার বিয়ে ঠিক হওয়ার গল্প| অব্যক্ত কান্না| কিছু তো করার ছিল না কারন ছেলেটি তখনও চাকরীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে| কি ভাবে সে আসবে তার ভালালাগার নারীটির কাছে| তার বাড়িতে হাত ধরার অঙ্গীকার নিয়ে| সানাইএর সুর আর ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| না ভ্যালেন্টাইন ছিল না| আর যারা প্রেমের জন্যে‚ মনের কাছের মানুষটির জন্যে বাড়ির সঙ্গে‚ সমাজের সঙ্গে লড়াই করেছেন তাদের সময় তো ভ্যালেন্টাইন ডে ছিল না| পরিবারে রক্ষনশীলতার বেড়া ভেঙ্গে যারা পাশে পেতে চেয়েছে তাদের পছন্দের নারী বা পুরুষটিকে| কেউ বা অনার কিলিং এ হারিয়ে গেছেন চিরতরে| না তখন ভ্যালেন্টাইন ডে ছিল না| প্রেমের কোন দিন হয় না| ভালোবাসার দিনটি কেন শুধু প্রেমিক‚ প্রেমিকার জন্যেই সংরক্ষিত থাকবে| বন্ধুত্বও তো এক অমলিন ভালবাসা| ভালোবাসা তো বন্ধুত্বের আর এক নাম| বিশ্বাসের নাম| এর কোন চাওয়া নেই‚ পাওয়ার চাহিদা নেই| আছে বিশ্বাস‚ পাশে থাকার অঙ্গীকার| মন খারাপ হলে বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে পারার মত বিশ্বস্ত জায়গা| যে পুরুষটি সারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার স্ত্রী-সন্তানের জন্যে‚ তাদের খুশি করার জন্যে| বাড়ি‚ সন্তান‚ স্বামীর সেবায় মুখ বুঝে‚ সব সুখ ভুলে সংসারে হাসি ফুটিয়ে তোলা সেই নারীটি তারা ভ্যালেন্টাইন ডে জানে না| হয়ত জানবার দরকারও পরে না| পরস্পরের সঙ্গে‚ দু:খ‚ কষ্ট‚ সুখ‚ কর্তব্য ভাগাভাগি করেই জীবনের সব ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পায়| আজ একটু তাড়াতাড়ি এসো| কাজের ফাঁকে ফোনে করে খাওয়া হয়েছে তোমার? জমানো টাকায় কোথায় দু দিনের বেড়াতে যাওয়া| ক্লান্ত শরীরটা বাড়িতে বয়ে নিয়ে গিয়ে একটু মৃদু বকুনি সাথে গরম চা আর পকোড়া| কত না বলা ভালো বাসা| ভালবাসা বিশ্বাস‚ সম্মান‚ আত্মমর্যাদার এক নাম| এর কোন দিন হয় না| প্রতিটি দিন ই হোক ভ্যালেন্টাইন ডে| থাকুক ভালোবাসা‚ বিশ্বাস‚ মর্যাদা| যেখানে থাকবে না কোন ঘৃনা বা অভিমান| কাউকে যাদি ভালো বাসতে না পারেন তাকে তার যোগ্য সন্মান না দিতে পারেন তবে এই দিনগুলোর কোন মূল্য নেই| তার থেকে অনেক ভালো দূর থেকেই ভালবাসা| যে কোন দিন আপনার কাছে হয়ত আসবে না‚ কিন্তু তার চোখে আপনি সম্মানের সঙ্গেই বেঁচে থাকবেন| সেই খোলা খাম‚ নীল ইনল্যান্ডের চিঠি| না বলা কথা| সেই বুকে তোলপাড় করা অন্তাক্ষরীর সুর| বাস স্ট্যান্ডের বাস মিস করা মেয়েটিকে এক ঝলক দেখা| রাস্তায় পাশের জানালায় খোলা চুলে কমলা লেবুর কোয়ার মত ঠোঁট দুটিতে স্মিত হাসি| বেঁচে থাকুক সেই ভাললাগা| ভালোবাসার তো কোন দিন হয় না|

261

4

মানব

নিভেছে কলম

নিভেছে কলম আজ, বোঝাপড়া সব শোধ, অধম সংসর্গে শুধু, পঙ্গু বিরোধ। বেনামী চিঠি আর রোজগারী নামচায় কলমের কালিই আজ পাথরের প্রায়। ঘুণধরা বইগুলো ঝরে ঝরে পড়ে, লাগোয়া বইগুলো ফের ঘুণে ধরে। বৎসর চান্দ্র হোক, অথবা সৌর – রেহাই পাবে না হোক বঙ্গ বা গৌড় ও। অষ্ট ও শতনামে আড্ডার সূচনা, শেষ হয় সেদিনের ইতিহাস রচনায়। কার কোল খালি হল, কার গুড়ে পড়ে বালি! জুটে যায় অপমান বারে বারে কার খালি! আলোচনা শুরু হয়, হয়ে যায় শেষ। ঘরে ফিরে কিছু তার রয়ে যায় রেশ। জৈবেরা বিকৃত হয় খনির অতলে, বহুদিন পার হলে উঠে অকুস্থলে বাতাসের সাথে মিশে অপেক্ষারত, একটু উষ্ণ ছোঁয়া যদি পাওয়া যেত - শীতল ভীত যত মুখ সারি সারি ধারালো গরম লাল হত তরবারি।

221

4

মনোজ ভট্টাচার্য

চলিতে চলিতে পথে - - !

চলিতে চলিতে পথে - - ! জর্ডন এয়ারলাইন্সেই আসা যাওয়া করি তখন । - এক তো ভাড়া তুলনা মুলক ভাবে কম । দ্বিতীয়ত, সহ-যাত্রীরা মোটামুটি নিউ-ইয়র্ক নিউ-জার্সি, কানেক্টিকাট অঞ্চলের । কথাবার্তা বলতে সুবিধে হয় । আমাদের বাড়ি জ্যাকসন হাইটসে হওয়ার ফলে ট্রাই-স্টেট অঞ্চলের লোকেদের খুবই পরিচিত । ফলে মাছের বাজার, প্যাটেল ব্রাদার্স ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে । তার ওপর জর্ডন এয়ারলাইনসে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করার ফলে পরিচিত হয়েছে আমাদের ধরন ধারন – যেন ফ্লাইটে গণ্ডগোল হলে আমরা হেঁটেই কলকাতায় চলে যেতে পারব । নিউ ইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্টের ভেতর চেক আউট, ইমিগ্রেসান আর বাড়ি থেকে বয়ে আনা খাবার – যা প্লেনে নিয়ে যাবার অনুমতি নেই – ইত্যাদি ফেলে দেওয়া - -! এইসব ইত্যাদি প্রভৃতির টেনশান কাটিয়ে যখন লাউঞ্জে বসার সময় পাই তখন আর কারুর দিকে তাকিয়ে খেজুরে করার মতো উৎসাহ থাকে না । - তার ওপর লাউঞ্জের ভেতর দিয়ে বিমানের চেহারা দেখে – এয়ারপোর্টেশ্বরির করুনা প্রার্থনা বা আটলান্টিকের শুভ মর্জির অনুরোধ করি । প্লেন আকাশে উঠে স্থিত হলে খাবার, গান বা ভিডিওর মধ্যে ডুবে যাই । তার পরের দিন হোটেল থেকে ফিরে আম্মান এয়ারপোর্টে বসে পরস্পরের আলাপচারিতায় মগ্ন হই । সেইরকমই একবার আম্মানে বসে নিজেরা গল্প করছি । সেখানে একজন কলকাতার গায়িকাও আছেন । শুনলাম তিনি নিউ-ইয়র্কে ও নিউ-জার্সিতে গান শেখাতে আসেন । নিউ-জার্সিতে তার এক আত্মিয় থাকেন । সেখানেই গান শেখান তিনি । এইরকম আলাপ-ঘন আলাপচারিতার মধ্যে সবাই মগ্ন । হঠাৎ দেখা গেল – দুজন সিকিউরিটি বা পুলিশ নিয়ে এক জাপানি মেয়ে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে কিছু খুঁজছে । মুখটা খুব কাঁদো-কাঁদো – ওদের মুখ তো এমনিই কাঁদো-কাঁদো ! - ওমা ! ওরা যে আমাদের দিকেই আসছে ! এই সেরেছে ! কে আবার কি করলো ! – পুলিশ এসে আমাদের বেঞ্চ থেকে সবাইকেই উঠে দাঁড়াতে বলল – অবশ্য খুবই ভদ্রভাবে । - সবাই উঠতেই চোখে পড়লো সবারই – বেঞ্চির একধারে একটা লেডিজ ওয়ালেট । তার ওপর বসাতে একটু বিকৃত হয়ে গেছে । জাপানি মেয়েটি একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওয়ালেটটা তুলে নিল । তারপর সবার সামনেই ওটা খুলে দেখল । সবাই দেখতে পেল – তার মধ্যে বেশ কিছু ডলার । না – আরও কিছু ইউরো ও জাপানি ইয়েন রয়েছে ! আমাদের তো বেশ বিভ্রান্তিকর অবস্থা ! যদিও আমাদের একেবারেই অজানা । তারই মধ্যে মেয়েটি ভাঙা ইংরিজিতে জানালো – ও ওর ওয়ালেটটা মাথায় রেখে ঘুমিয়েছিল । তারপর ভুলে উঠে টয়লেটে গেছে । ফিরে এসে আর দেখতে পাচ্ছে না – তাই পুলিশ ডেকে এনে দেখছে । - যাইহোক ওয়ালেটটা পেয়ে বেঁচে গেছে । এছাড়া ওর কাছে আর টাকা-পয়সা নেই । - আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে উনি সিকিউরিটি নিয়ে চলে গেলেন । আমাদের অবস্থা তো একেবারে কাঁচুমাচু । বিশেষ করে যে মহিলা ধারে বসেছিলেন – তিনি তো কিছু বুঝতেই পারেন নি । - ওয়ালেটটা অবশ্য খুব একটা ছোটও ছিল না ! – বাকিরা সবাই তাকে সেই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে – ঠাট্টা করে – স্বাভাবিক করা হোল । কারন উনিও কলকাতাতেই যাচ্ছেন তো ! মনোজ

425

7

Joy

NRC‚ CAA এবং নোংরা রাজনীতি...

আধার কার্ড‚ ভোটার কার্ড‚ প্যান কার্ড এইগুলো কোনটাই আর ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় নয়| হাজার‚ হাজার বছর ধরে যারা এই দেশে বসবাস করল‚ ভোট দিয়ে সরকার গঠন করল তাদের আজ প্রমান দিতে হবে সে এই দেশের নাগরিক কি না| যে সমস্ত কৃষক দিনের পর দিন নিজের শরীরের ঘাম‚ রক্ত দিয়ে দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন‚ তাদের আজ প্রমান দিতে হবে তারা ভারতীয় কি না| যে সমস্ত সৈনিক তাদের মুল্যবান জীবন দেশের জন্যে উৎসর্গ করেছেন‚ কেউ বা যুদ্ধে পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছেন‚ তাদের আজ প্রমান দিতে হবে তারা ভারতীয় কি না| প্রমান দিয়ে যাও আধার কার্ড কর হল| জীবনের সব কাজে আধার লিঙ্ক করা হল‚ এখন জানা যাচ্ছে সেই কার্ড নাগরিকত্বের বৈধ পরিচয় পত্র নয়| এর পর NRC এর জন্যে আমরা কি তথ্য জোগাড় করব| আরে বাবা এত উতলা হচ্ছেন কেন? সব জানতে পারবেন| সরকার আমাদের মা-বাবা| সব জানিয়ে দেবেন| তথ্য জোগড় করার জন্যে আপনি হন্যে হয়ে ঘুরবেন| কাজ-কর্ম লাটে উঠবে| যেমন নোট-বন্দীর সময় দেশবাসীর হয়েছিল| অনেক কালো টাকা উদ্ধার হয়েছিল| সেই টাকায় তো আমাদের দেশের অনেক উন্নয়ন হল| আপনি দেখতে পেলেন না? সে কি তাহলে আপনার নিশয়ই চোখ খারাপ| অর্থ্নীতি গোল্লায় যাক| GDP শূন্যে নেমে যাক কি হয়েছে আমারা তো আগে বাড়ছি| খুব বড় মন্দির হবে| সবাই দেখতে যাব| দেশের উন্নয়ন হচ্ছে তো| আরে বাবা কৃষক আত্মহত্যা করছে করুক| সব লাভ্দায়ক সরকারী কোম্পানি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে যাক| উন্নয়ন তো হচ্ছে| ধূর আপনারা কিছুই দেখেন না| পাকিস্তানের সঙ্গে মাঝে মাঝে যুদ্ধ যুদ্ধ নাটক হবে| কোটি টাকা খরচ হবে তাহলে উন্নয়ন তো হচ্ছে| এর আগে এত উন্নতি‚ সমৃদ্ধি আগে কোনো সময় ভারতবর্ষে হয়েছে? কোনো সরকার এত কাজ করেছে? নোট বন্দীর পর কোনো জঙ্গি আক্রমণ হয়েছে‚ হয়ই নি| কাশ্মীর তো আমাদের দেশেই ছিলনা| এখ্ন ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে আমাদের দেশের সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত হল| কিন্তু ওখানের স্থানীয় মানুষ এর ভালোটা বুঝল না| কত ভালো ভালো কাজ হচ্ছে| কত চোর-ছ্যাচড় দল বদল করে নিল বলে কোন কিছু তদন্ত হল না| দল বদলে তারা সাধু হয়ে গেল| তাহলে আপনি কোন ভালো কাজ দেখতে পেলেন না? প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়েছে| আমরা গরীব থেকে গরীবতর হয়েছি| এইটাও তো উন্নয়নের অঙ্গ| এত ভালো কাজ করেও সরকারের চোখে ঘুম আসে না‚ সরকার আমাদের জন্যে আরও অনেক কিছু ভালোকরতে চান| এবার ধর্ম নিয়ে খেলা করা যাক| ধর্ম‚ জাত নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মানুষ মানুষে বিভাজন করা যায়| কি ভাবছেন খেতে পান না বা না পান‚ শিল্প হোক বা না হোক মন্দির তো হবে| গাদা গাদা ভন্ড বাবা তো আছে| চূপ করুন তো উন্নয়ন তো চলছে| নতুন নতুন আইন আসছে| প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী‚ শরনার্থীদের আমরা আশ্রয় দেবো কিন্তু এক ধর্ম বাদে| সব ধর্ম নিলে ভোট বাক্সে ভোট পরবে? গাদা গাদা বাইরের লোক আসবে আমাদের দেশে আমাদের খাবার-দাবার‚ বাসস্থান‚ চাকরি‚ শিক্ষার উপর অনধিকার চাপ পড়বে| কি যায় আসে ভোট যে বড় বালাই| অন্য ধর্মের মানুষ এলে আমাদের অর্থনৈতিক‚ সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়বে না‚ শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষ এলেই সর্বনাশ| আর কতদিন এই সাম্প্রদায়িক খেলা চলবে| কেউ তোষমোদ করে মুসলিমদের‚ কেউ বা হিন্দুদের| আমাদের মনে রাগ‚ হিংসা‚ বিভেদ ঢুকিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে| যে রাজনৈতিক দল বা নেতা যে কোন ধর্ম বা জাত নিয়ে রাজনীতি করে তাদের ঘৃণা করতে শিখুন| তদের ভোট ব্যাঙ্ক সুরক্ষিত হয়‚ কিন্তু সেই জাতি বা ধর্মের মানুষদের কোন উপকার হয় না| তারা যে তিমিরে আছেন সেই তিমিরেই থাকেন| যদি সত্যিই তাদের কোন উপকার করতে হয় শিক্ষা‚ কু-স্ংস্কার মুক্ত করতে হবে| শুধু ধর্মের রাজনীতি তে কিছু লাভ হয় না| কি করে আলাদা করবেন ঐ চাষীদের যারা আমাদের জন্যে ফ্সল ফলায়‚ ওদের কি ধর্ম আমরা জানতেও চাই না| সৈনিকদের ধর্ম-জাত জানতে চাই না ওরা যুদ্ধ করে শহীদ হয় আমাদের জন্যে| যারা শিল্পী‚ যারা অভিনেতা তাদের জাত-ধর্ম আলাদা করা যায় কি| আমরা সব মিশে গেছি| আমরা সবাই ভারতীয়| তবে কেন এত ভেদাভেদ আজকে| কেন জাতের নামে‚ ধর্মের নামে দেশকে ভাগ করার চক্রান্ত চলছে? কার লাভ এতে? এই মুখোশধারী শয়তানদের কথায় কান দেবেন না| এরা অর্থলোভী‚ এরা দাঙ্গালোভী| এরা ক্ষমতালোভী| এদের ঘৃণা করুন| এখন ভারবর্ষের রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ খুব শক্তিশালী না‚ বা সেই ভাবে বিরোধীরা সরকারের ভূল ধরাতে ব্যর্থ| সেই জন্যে দেশের এই অরাজকতা| কিন্তু ভূল করেও আপনি শাসকশ্রেনীর ভূল ধরতে যাবেন না| ভূল ধরাতে গেলেই বা কিছু প্রতিবাদ করলেই এখন হয় মাওবাদী না হয় পাকিস্তানির তকমা দেওয়া হয়| শাসকশ্রেনী নিজেদের ভূল বুঝতে চায় না| তারা যেটা করছে সেটাই ঠিক| সবাইকে সেটাই মেনে চলতে হবে| না হলেই আমরা দেশদ্রোহী| কি অদ্ভূত এই দেশ| আমরা সরকারের সমলোচনা করি| বাসে‚ ট্রেনে‚ চায়ের দোকানে তর্কের তুফান তুলি| কিন্তু ভোট দিই না| ভোটের সময় এই ভন্ড‚ মিথ্যেবাদীদের মুখোশ খুলে দিই না| আমরা আমাদের প্রতিদিনের সমস্যার কথা ভুলে যায়| জাত-ধর্ম‚ মন্দির‚ মসজিদ‚ গির্জা নিয়ে তরজায় মেতে উঠি| আমাদের ধর্ম-জাত‚ মন্দির‚ মসজিদে যেন ব্যস্ত রাখা যায়‚ এই দল আর নেতাগুলো সেটাই চায়| যাতে আমাদের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়| আমরা তর্কের জন্যে তর্ক না করে সত্যি সত্যি প্রতিবাদ করিনা| আমরা টিভি‚ খবরের কাগজেই নিজেকে আবদ্ধ রাখতে ভালবাসি | দাঙ্গা লাগে‚ আগুন জ্বলে| হাজার হাজার মানুষ ঘর ছাড়া হয়| মেয়েদের সন্মান-ইজ্জত লুট হয়| মানুষ মারা যায়| আবার ভোট হয় ধর্মের নামে| জাত-পাতের নামে| ছাড়ুন তো এত চিন্তা করে কি হবে বলুন তো আগে আমি বাঁচি তার পর তো অন্যের চিন্তা করব‚ তাই নয় কি? কিন্তু কতদিন আমরা ভালো থাকব বলতে পারেন? দাঙ্গার আগুনে হাজার হাজার ঘর ছাড়া লোকগুলো| হিংসার আগুনে খুন হওয়া মানুষটা| মান-ইজ্জত হারানো মেয়েটার কোনো জাত বা ধর্ম হয় কি? সেটা যদি আপনার কোনও কাছের লোকের সঙ্গে হয় আপনার খারাপ লাগবে না| যন্ত্রনায় আপনি ছট্পট করবেন না| আপনি মানুষ বলে আপনার বিবেক দংশন হবে না? হবে নিশ্চয়ই হবে‚ কারন আপনি মানুষ| ঐ রাজনৈতিক দল বা নেতা-নেত্রীদের মত অমানুষ নন| যার হিংসা‚ দাঙ্গায় উস্কানি দেয় তারা দেখুন ভালো চাকরী করেন| অথবা ভাল ব্যবসা‚ অবস্থাপন্ন| তদের লড়াই করতে হয় না খাবারেরে জন্যে| লড়াই করতে হয় না প্রতিদিনের বাঁচার জন্যে| তাদের উস্কানিতে পা দেবেন না| লড়াই করুন অন্যায়ের বিপক্ষে| কালা আইনের বিপক্ষে| চূপ করে থাকাটাও অন্যায়| চুপ থাকতে থাকতে একদিন আমরা হারিয়ে যাব| প্রতিবাদ ছোট হোক‚ কিন্তু প্রতিবাদ করাটা খুব দরকার| যে যেভাবে পারেন প্রতিবাদ করুন‚ অন্যায়ের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ান| আমরা ধর্ম চাই না দুবেলা ভাত চাই| আমরা জাত চাই না চাকরি চাই| আমরা শিল্প চাই| মজবুত অর্থ্নীতি চাই| আমরা গগনচুম্বী মন্দির-মসজিদ-গীর্জা চাই না সম্প্রীতি চাই| দাঙ্গা চাই না‚ স্কুল‚ কলেজ চাই| হাসপাতাল চাই| মেয়েদের অসন্মান নয়‚ সুরক্ষা চাই| দেশের সৈনিকদের মৃত্যু চাই না‚ শান্তি চাই| দিতে পারেন এইসব| যদি না পারেন তহলে গদি ছেড়ে দিন| আমরা আবার যোগ্য মানুষ কে ভোট দিয়ে নতুন দেশ গড়ব| গান্ধীজী‚ নেতাজী সুভাষ‚ স্বামী বিবেকানন্দ‚ কবীর‚ গুরু নানক‚ রবীন্দ্রনাথ‚ শিবাজী‚ ড: আবুল কালাম‚ রানি লক্ষী বাই‚ মাদার টেরিজার দেশ আমাদের| যারা আমাদের সেবা‚ ভালোবাসা‚ মানবতার মন্ত্র দিয়েছেন| আমরা সব ধর্ম‚ সব জাতের মানুষ একসাথে যুগ যুগ ধরে আছি এবং থাকব| কোন দুষ্ট‚ চক্রান্তকারী আমাদের আলাদা করতে পারবে না| আমার প্রতিবাদের ছোট্ট প্রয়াস সবার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি| এই প্রতিবাদ আমার একার নয়| আমার‚ আপনার সবার| সবাই খুব ভালো থাকবেন| দিব্যেন্দু মজুমদার

321

5

মনোজ ভট্টাচার্য

গরবেতার গনগনি !

গরবেতার গণগনি ! গনগনি উপত্যকায় গেছিলাম ! হঠাতই কদিন আগে গনগনি নামটা শুনেছি ও পড়েছি । গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ফলসের মতো পশ্চিম মেদিনীপুরেও একটা জায়গা আছে । চারদিকে উঁচু সমতল থেকে শিলাবতি নদীর জল অনেক নীচুতে পড়ছে – প্রায় ৭০ ফুট । গুগুলে তো দারুন দারুন সব ছবি দিয়েছে । খেয়াল-পোকা এখনও মাথায় নাড়া দেয় ! একটা গাড়ি তো বুক করেই দিল আমার স্ত্রী । আমরা আর কাউকে কিছু জানাইনি । - এমনিতে দশই ডিসেম্বর আমাদের ছেলের মৃত্যুদিন – তাই কোথাও পালানো দরকার । তখনই মনে পড়লো গনগনির কথা । সকালে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে আজকাল । আটটার সময়ে বেড়িয়ে গাড়িতে যেতে মন্দ লাগে না ! যাচ্ছি একেবারে উল্টোদিকে – তাই ট্র্যাফিকের ভিড় নেই । রাজীব বলল – খড়গপুর হয়ে যাবে । - ঘণ্টা দুই পরে উলুবেড়িয়ার একটা রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেলাম । কিছুমিছু খেয়ে নিয়ে আবার যাত্রা । - আমার বাইরে যাওয়ার একটা আকর্ষণ হোল – সকালে বাইরে যে কোন রেস্টুরেন্ট বা ধাবায় বসে খাওয়া । কি খাচ্ছি – সেটা নয় । এই যে ব্যস্ত হাইওয়েতে বসে – দ্রুতগামী লরি-বাস-গাড়ি-টোটোর সমাহার ! এই দ্রুত-গতিই তো আমাদের জীবনের প্রতিফলন ! এই প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততার মধ্যে আমরা অলস বসে দেখছি ওদের । ঠিক যেন অনেক উঁচু থেকে দেখা নীচে কালো পিঁপড়ের সারি – খুব ব্যস্ত-সমস্ত চলা ! একটু জিরিয়ে নিয়ে আমরাও আবার সেই গাড়ির ভিড়ে মিশে গেলাম । যেতে যেতে কোলাঘাটের আগে সেই উঁচু প্রমোদ-বৃদ্ধাবাস । এখানে আগে এসেছিলাম । যাইহোক, প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পার করে এলাম গরবেতা । এই গরবেতার রাস্তা ধরেই যাওয়া । এই রাস্তাটা আবার শালগাছের আকাশ হয়ে আছে । আগে হয়ত শালের জঙ্গল ছিল । এখন তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা হয়েছে । তারই মধ্যে রাস্তার একপাশে একটা সাবধান-বানী – এখান দিয়ে হাতি চলাচল করে । - হাতি অবশ্য পাল বেঁধে যায় । - অনেকটা আসার পর একটা সাইন দেখা গেল – গনগনি যাবার রাস্তা ! সেই রাস্তার শেষ হোল – গনগনি উপত্যকা । বিরাট পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে একদম শুকনো – এখন আর জল নেই । কিন্তু চারদিক থেকে জল পড়ে সেই নীচে ! – নীচে বয়ে চলেছে শিলাবতি নদী ! শিলাবতি নদী – অথবা শিলাই নদী – পুরুলিয়ার চক-গোপালপুরে উৎপন্ন হয়ে এসেছে । তারপর ঘাটালে গিয়ে দ্বারকেশ্বর নদে গিয়ে মিশেছে রূপনারায়ণ ও তারও পরে হুগলী নদীতে মিশে – সমুদ্রে পড়েছে । ওপর থেকে সোজাসুজি অত নীচে দেখা যায় না । আবার ধারে যেতেও বারন । রাস্তা আছে নীচে যাওয়ার । বেশ কিছুটা সিঁড়ি – তারপর থেকে ভেঙ্গে একাকার হয়ে গেছে রাস্তার সঙ্গে । - আগে হলে নীচে নামার সাহস হত । এখন লাঠি হাতে আর ভরসা পাই না । নানান জায়গা থেকেই ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করি । অন্যান্য যায়গায় দেখেছি – ধ্বংসস্তূপকে সাজিয়েই কত পয়সা রোজগার করা হয় । সারা জায়গা জুড়ে কত দোকানপাট, কিয়স্ক – সাজানো থাকে । আর এই গনগনি দেখছি – একেবারেই দুয়োরানীর সাজে হেলায় পরে আছে । কয়েকটা আইসক্রিম ও ছোলা বিক্রি ছাড়া কোথাও কিচ্ছুটি নেই । এমনকি ন্যুনতম পরিষেবারও অভাব । অবশ্য বিস্তৃত উন্মুক্ত প্রান্তর ছেড়ে কে আর ছোট ঘরে ঢুকতে চায় ! – পাশেই আছে একটা পিকনিকের ঘেরা জায়গা । কেউ কেউ বলল বর্ষাকালে প্রচুর জল আসে নদীতে । তবে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কথা কেউই শোনেনি । ওখানে আবার মহাভারতের গল্পও হাজির ! কথায় আছে না – যা নেই মহাভারতে তা নেই সারা ভারতে ! বকাশুরের কথা তো আমরা শুনেছি । তার গুহায় এসে ভীম থেকেছিল । সেই নিয়ে ভীমের সঙ্গে বকাশুরের প্রচণ্ড লড়াই হয়েছিলো । ওদের পাথর ছোঁড়াছুড়ির ফলে এত গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছে ! – উপত্যকার ওপর এসে দাঁড়ালে – দেখা যাবে – চারিদিকে বড় বড় পাথরের চাই । আর নিচে দুদিকে যতদূর চোখ যায় – শিলাবতি নদী বয়ে চলেছে ! ঠিক একা নয় – দুদিকে শাল গাছের জঙ্গল পাহারা দিয়ে যাচ্ছে ! এখানেও যথারীতি মন্দির আছে – সর্বমঙ্গলা দেবীর মন্দির । পুরাকালে অনার্য মানুষেরা শিকার করতে যাবার আগে এনার পুজা দিয়ে যেত । - এই জায়গাটিকে বলে বগরী বা বক দ্বীপ । এই নামে আবার সেই বকাশুরের নামটা উঠে আসে ! অনুমান – আইচ বংশের প্রথম রাজা গজপতি সিংহ এই মন্দিরটি স্থাপনা করেন । ও, আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা – যদি মেট্রো রেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ফেল মারে – এখানে শিওর শট ! আছে একটা সুইসাইড স্পট – সব পাহাড়ে যেমন থাকে – এখানেও আছে তেমনি ! মনোজ

286

4

মানব

ছাই

কৃতজ্ঞতাঃ গুপ্ত সাধক শ্যামা ক্ষ্যাপা ১ - তো মানস কো হি ভেজ দেতে হ্যায়। ক্যা বোলতে হো পাণ্ডেজি? সর্দারজি প্রশ্ন করলেন সরাসরি অশোক পাণ্ডের দিকে তাকিয়ে। অশোক পাণ্ডে আমার ডিপার্ট্মেন্টাল ম্যানেজার। মিটিং চলছে, কয়লার ছাই নিয়ে। ছাইয়ের মধ্যে অদগ্ধ কার্বনের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, সম্পূর্ণ দহন না হওয়ার ফলে। এ বিষয়েই ডাকা হয়েছে মিটিং। আমি মানস সেনগুপ্ত, ‘খোপোলি ও এন্ড এম’ এর প্ল্যানিং ইঞ্জিনিয়ার। জীবনের প্রথম চাকরিতে জয়েন করার সবে দেড়বছর পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু কাজের চাপ বেড়েই চলেছে। ‘ও এণ্ড এম’ – অর্থাৎ অপারেশন এণ্ড মেইন্টেনেন্স। বিভিন্ন কোম্পানির ক্যাপটিভ প্ল্যাণ্ট চালানো এবং তার রক্ষণাবেক্ষণই আমাদের কোম্পানির কাজ। এখন যে প্ল্যান্টে আছি তার প্রায় সবটাই এককালে সরকারী শেয়ারে ছিল, যা এখন কমে কমে পনের শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। যাইহোক, কাস্টমারের তরফ থেকে টেবিলের ওপাশে প্ল্যান্ট হেড সর্দারজি, তাঁর পাশে মিঃ তিওয়ারী – অপারেশন হেড, মিঃ সরকার – মেইন্টেনেন্স হেড, এবং আরও দুজন ইঞ্জিনিয়ার। টেবিলের এপাশে আমাদের তরফ থেকে সবার প্রথমেই রয়েছেন মিঃ সিং – মানুষটির বয়েস প্রায় পঁচাত্তর, কিন্তু শখ ষোল আনা বজায় আছে। এই বয়েসে মাসে দেড় লাখের কাছাকাছি মাইনের লোভ ছাড়তে পারেননি, তাই বাচেলর অ্যাকোমডেশনেই রয়ে গেছেন। উনি অবশ্য বলেন, বাড়ি গেলেই ছেলে বউয়ের অধীনে থেকে যেতে হবে, সেই বন্দীদশা থেকে মুক্তির জন্যই এখানে থেকে যাওয়া। তারপর রয়েছেন মিঃ পাণ্ডে, আমার ম্যানেজার, সংসারী মানুষ, দুটি মেয়ে – বড়টির জন্য পাত্র খুঁজছেন। আমাকে এই নিয়ে তিনবার জাতি, গোত্র ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে ফেলেছেন। তারপর রয়েছেন মিঃ ত্রিপাঠি – একটু নাদুস নুদুস গড়ন, আরাম আয়েসে থাকতে ভালোবাসেন। চুপিচুপি বলে রাখি, এই ত্রিপাঠিবাবুর মেয়ে আমাকে একবার ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠিয়েছিল, রিজেক্ট করেছিলাম। তার পর রয়েছি আমি। আমার পর একটা ফাঁকা চেয়ার। সিংবাবু বরাবরই ক্লান্ত থাকেন – বয়স তো হয়েছে, তাছাড়া সবসময় প্ল্যান্টের ভালোর কথা চিন্তা করলে ক্লান্তি তো আসবেই। তাই উনি মাঝে মাঝেই ঢুলে পড়ছেন, আর সর্দারজির গলা একটু উঁচু হলেই চোখ খুলে চমকে উঠছেন। ত্রিপাঠিবাবু আরাম আয়েসের মানুষ, আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে – অথচ আপনি জানতেই পারবেন না, উনি আসলে ঘুমোচ্ছেন। পাণ্ডেজি ওনাদের মাঝখানে বসে সর্দারজি ও অন্যান্য দুইজন হেড এর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। উনি সাহিত্যিক মানুষ, অন্য এক দুনিয়ায় থাকেন। ভাবের ঘোরে প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুলে গিয়ে প্রায়ই তাকান আমার দিকে – এখন সর্বকনিষ্ঠ এই ছেলেটির উপর যদি এতবড় একটা কোম্পানি ভরসা করে থাকে, তাহলে আমাকেও ওনাদের ভরসার মর্যাদা রাখতে হয় বৈকি। পাণ্ডেজি আমার দিকে তাকালেন। আমিও ঘাড় নাড়লাম। পাণ্ডেজিও সর্দারজির দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন, - ঠিক হ্যায়, ভেজ দিজিয়ে। ২ এমনিতে আমার জেনারেল শিফট – আটটা থেকে পাঁচটার ডিউটি, অথচ পাঁচটায় বাড়ি গেলে কোম্পানির বাস আপনাকে ছাড়তে আসবেনা, কোম্পানির বাস টাইম হল বিকেল ৬ টায় – কেমন অরাজকতা বলুন দেখি। আপনি চান বা না চান, এক ঘন্টা এক্সট্রা আপনাকে ভিতরে থেকে যেতেই হয় - হেঁটে হেঁটে অতদূর যাওয়া পোষায় না। একদিনের অফিস না যাওয়ার আনন্দ, তার উপরে সকাল সকাল চিতোরগড়ের প্ল্যান্টে কয়লা আর ছাইয়ের স্যাম্পল পৌঁছে দিতে যাওয়ার নতুন অভিজ্ঞতা – সব মিলিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলাম। সময়মত ড্রাইভার চলে এল। ঠিক করা ছিল প্ল্যান্ট থেকে ফতেহনগর গিয়ে তারপর বাঁদিকে ঘুরে চিতোরের উদ্দেশ্যে যাওয়া হবে। লোকটার নাম সুলতান সিং, বেশ মিশুকে স্বভাব। কথায় কথায় অনেক কিছু আলোচনা হল। এই জায়গাটা আগে জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, গ্রামের মানুষের অর্থনীতিতে কিভাবে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে এই প্ল্যান্ট ইত্যাদি। প্রায় মিনিট দশ চলার পর হঠাৎ গাড়ি বাঁদিকে ঘোরালো সে। কেমন একটা খটকা লাগল, আমার দিকে তাকাতেই জিনিসটা টের পেয়ে সে বলল, - ইয়ে শর্টকাট হ্যায় সাব। - রাস্তা থাকলেই হল, চলো চলো। সেই একঘেয়ে পিচ রাস্তার থেকে কিছুটা নরম, কিছুটা পাথুরে রাস্তা পেরিয়ে যেতে বেশ ভালোই লাগছিল। এ এক অন্য রাজস্থান। যেন কোন সুদূর অতীত রাজ্যে পাড়ি দিয়েছি, যেখানে মানুষের মনে না ছিল কোনও টেনশন, না ছিল কোনও তাড়া। কেউ গাছতলায় খাটিয়া পেতে আড্ডায় মশগুল তো কেউ এক-গোরুর গাড়িতে মালপত্র বোঝাই করে চলেছে বাজারের উদ্দেশ্যে। হ্যাঁ, এটাই তো জীবন, বাড়ি ছেড়ে সুদূরে, মাথায় একরাশ চাপ নিয়ে, কাঁচবন্ধ গাড়িতে যেতে যেতে অজান্তেই বেশ কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লাম এই মানুষগুলোর প্রতি। এরপরের কথোপকথন যেহেতু কিছুটা চলতি হিন্দী, চলতি রাজস্থানী মিশিয়ে হয়েছিল, তাই সুবিধার জন্য সবটাই বাংলা করে বলি। - সাব, ওই যে পুকুরটা দেখছেন, ওটা আমাদের। ওই যে জমিটা, তারপর ওই যে শ্বেতপাথরের পাহাড়টা… - বলো কি! তাহলে এত বড়লোক হয়ে গাড়ি চালাতে এসেছ কেন? - সে আপনি ঠিকই বলেছেন, টাকাপয়সার খুব একটা অভাব নেই। কিন্তু বসে খেলে রাজার সম্পদও শেষ হয়ে যায়। কিছু তো একটা করতে হবে, না কি! রোজগারও খুব একটা কম হয়না এই গাড়ি চালিয়ে। - তা বেশ, তা বেশ। তা টাকাপয়সা কেমন পাও বলা যাবে কি? তারপর লোকটার মাসিক আয় শুনে আমার চোখ কপালে। এইরকম গ্রাম্য অঞ্চলে একটা গাড়িকে প্ল্যাণ্টে ভাড়া খাটিয়ে যা টাকা পায় তা আমার মাইনের প্রায় দ্বিগুণ। - সাব, পাঁচশো টাকা হবে? বাড়িটা পেরিয়ে এলাম, তখন আনতে ভুলে গেছি। ফেরার সময় এই পথেই ফিরব, তখন নিয়ে দিয়ে দেব। - তোমার বাড়ি এখানে? - হ্যাঁ, আবার পিছিয়ে যাব! আপনার লেট হয়ে যাবে। তাড়া আমার মোটেই ছিলনা। কিন্তু হাবভাব দেখাতে আমিও ছাড়লাম না। - ঠিক আছে, এই নাও। বলে পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলাম। রাস্তার ধারে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে সে দুখানা বোতল আনল – ঠাণ্ডা, ইংরাজীতে । - এই নিন, একটা আপনার, একটা আমার, একটা আপনার। - আরে নানা। ওসব আমি খাইনা। - তাহলে নেমে আসুন, কিছু খেয়ে যাবেন। - চলো দেখি, এমনিতেও সকালে কিছু খাওয়া হয়নি। ততক্ষণে প্রায় আধঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অবশেষে নেমে গিয়ে খাবার জন্য যেখানে ঢুকলাম, একটা তীব্র গন্ধ নাকে ঢুকতেই বুঝলাম, সেটা আসলে একটা মদের ঠেক। মদ্যাভ্যাস আমার নেই। একটা ডিমভাজা আর চা অর্ডার করতেই দোকানের মালিক রে রে করে তেড়ে এল। ভয় পেয়ে বেড়িয়ে এসে সুলতানকে জিজ্ঞেস করলাম, - এরকম হইচই করে উঠল কেন? - কী খেতে চেয়েছিলেন? - ডিমভাজা আর… - ওই তো, ঝামেলাটা এখানেই করে ফেলেছেন, এখানে নন ভেজ চলেনা। যান, অন্য কিছু অর্ডার করুন। অবশেষে, সামোসা আর চা খেয়ে উঠে পড়তে যাব এমন সময়, - সাব, মদ টদ তো খেলেন না। আমাদের অন্য কিছুরও কিন্তু ব্যবস্থা আছে, চাইলে রুমও ফ্রি হয়ে যাবে। একদম সেফ – কোনও ভিডিও ক্যামেরা নাই… - কত হয়েছে? টাকাটা নিন। দোকানের মালিকের এহেন কথায় কোনরকমে রাগ চেপে রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখি বাইরে খাটিয়ায় তখনও গ্লাসে মজেছে সুলতান। - আচ্ছা, এবার কি ওঠা যায়? অনেক তো দেরী হল। - হ্যাঁ সাব। চলুন, এই লাস্ট গেলাসটা শেষ করেই উঠছি। একটু ভয় ভয় করছিল বৈকি। সকাল সকাল এমন মদ গিলে গাড়ি চালালে কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তার তো কোনও ঠিকানা নাই। তাছাড়া যেখানে যাচ্ছে, গেটে যদি কেউ এর মুখের গন্ধ শুঁকে ফেলে তাহলে ঢুকতে তো দেবেইনা, উলটে আমাকেও অপমান করে তাড়াবে। রাগে গজগজ করতে করতে তাকে ওঠালাম। যদি গাড়ি চালাতে পারতাম, তাহলে হয়ত ওকে চালাতেই দিতামনা, কিন্তু আমি নিরুপায়। অবশেষে, গাড়ি এগিয়ে চলল পাথুরে রাস্তা ধরে, আরও আরও ঝাঁকুনিতে মুখ দিয়ে শুধুই বেরিয়ে এল রাগ আর হতাশার মেলবন্ধন। মিনিট দশেক পর গাড়ি আবার থামল। - এটা আমার প্রেমিকার বাড়ি। চলুন একটু জল টল খেয়ে আসবেন, আলাপ করবেন। এই বয়েসে প্রেম! অবাকই হলাম। অবশ্য প্রেমিকাটিকে দেখে বুঝলাম, এ এক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক। মহিলাটির কপালে চওড়া সিঁদুর। ততোধিক চওড়া টিকা নিয়ে পাগড়ি পরিহিত ভদ্রলোক যে তাঁর স্বামী, এ ব্যাপারে আগেই অনুমান করেছিলাম। ধীরে ধীরে কথাবার্তায় তার প্রমাণও পাওয়া গেল। - তা বাবু, এসেছেন যখন একটু চা জল খেয়ে যান। - আরে নানা, এইমাত্র খেয়ে এলাম। - তাহলে একটু ছাঁচ নিন। এতে না করবেন না। একটা পাত্রে জলসা টক স্বাদের এক গ্লাস সাদা তরল এল। সেটাকে মুখে নিয়ে না পারি ফেলে দিতে, না পারি গিলতে। অবশেষে নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরেই সবটুকু চোঁচোঁ করে গিলে ফেললাম। ছোটবেলায় ঘোল খেয়েছি, গুড় আর নুন মিশিয়ে, সে এক অপূর্ব স্বাদ। কিন্তু এই দুগ্ধজাত দ্রব্যটি যেন খানিকটা তার মত হয়েও অনেকটা আলাদা। ততক্ষণে সুলতান আর সেই ভদ্রলোকটি জুয়ার মত কিছু একটা খেলতে শুরু করেছে। দেখলাম, ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে বাজী রাখলেন, এবং হেরেও গেলেন। - আচ্ছা, ঠিক আছে, হিসেব রাত্রে হবে। এখন একটু তাড়া আছে, চলি কেমন? এই বলে সুলতান উঠে পড়ল, আমিও তার আগে আগে দরজার দিকে এগিয়ে এলাম, দরজার কাছে পৌঁছতেই পায়ে লেগে একটা ছোট্ট ধাতব কিছু ছিটকে গেল। সচেতনভাবেই সেদিকে না তাকিয়ে এগোতে যাচ্ছি, পিছন থেকে সুলতান বলে উঠল, - ও মশাই, আপনার আংটি পড়ে গেছে, এই দেখুন। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একটা জ্বলজ্বলে আংটি। এ জিনিস সোনা না হয়ে যায়না। একবার তো নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু এই লোকটার এতক্ষণের আচরণে চক্রান্তের আভাষ পাওয়ায় সে হাত ফিরিয়ে নিয়ে বললাম, - এ আমার নয়। দেখো ওদের বাড়ির কারও পড়ে গেছে হয়ত। - আরে নানা, এ তোমারই। আহা লজ্জা পাচ্ছ কেন নিয়েই নাও না। এই বলে প্রায় হাতে গুঁজে দিতে যাবে এমন সময়, এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিয়ে সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলাম। ৩ “এখনো সেই রাধারাণী বাঁশির সুরে পাগলিনী অষ্টসখী শিরমণি নব সাজে রে।। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।।” ফোনের রিংটোন বাজছে, খেয়ালই করিনি। নতুন রিংটোন লাগালে এই হয়। মাঝে মাঝেই গান বাজছে, নাকি ফোন এসেছে, গুলিয়ে ফেলি। - হ্যালো। - আরে সুলতান বলছি, কোথায় আপনি। এতক্ষণ ধরে গেস্ট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, সব ফাঁকা। এতক্ষণের দেখা জনবসতি, শ্বেতপাথরের সারি সারি ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়, মানুষজন – সব চোখের নিমেষে হাওয়া। ফাঁকা প্রান্তে ফণিমনসা, তেশিরামনসা, বাবলার সারিরা শুধু জানিয়ে দিচ্ছে যে এটা পৃথিবীই, কোনও ভিনগ্রহ নয়। - কিসব যা তা ইয়ার্কি মারছ! আমি তো তোমার সঙ্গেই এতদূর এলাম, তোমার বাড়ি ছিল, শ্বেতপাথরের পাহাড় – প্রেমিকা – তারপর সব হাওয়া – কি যে হচ্ছে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। - কি বলেন স্যার, আপনিও? - আমিও মানে? - সে অনেক কথা। সামনে মন্দির দেখতে পাচ্ছেন কোনও। তার দাবী অনুযায়ী অনেকক্ষণ ধরে আশেপাশে ঘুরে ঘুরে, অনেক খোঁজার পরে দেখলাম, বহু পুরনো একটা মন্দির। কালের কবলে স্থানে স্থানে তার দেওয়াল ধসে পড়েছে, কিন্তু মূল কাঠামোটা রয়ে গেছে। - হ্যাঁ, একটা ভাঙাচোরা – - ব্যাস আর বলতে হবেনা, দশ মিনিটে আসছি। দশ মিনিট পরে সুলতান সিং এল। গাড়ির দরজাটা খুলে বলল, - ভিতরে এসে বসুন। ওঃ না না, এই কালো ঘোড়াটা ওই মন্দিরে রেখে আসুন। ভালই হবে, খারাপ কিছু হবেনা। ততক্ষণে আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কি করছি, কি হচ্ছে আমার সঙ্গে, কিছুই বুঝতে পারছিনা। মাটির ঘোড়াটা প্রনাম করে মন্দিরে রেখে এসে গাড়িতে বসতেই রওনা দিল সুলতান। - কি হচ্ছে বলতো, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। - প্রথমে বলুন আপনার সাথে কী কী হল। সবকিছু আগাগোড়া তাকে বলতেই সে বলল, - খুব জোর বেঁচে গেছেন। এরকম আগে আরও দুজনের সঙ্গে হয়েছিল, তাদের একজন বউকে খুন করে জেলে আছে, আর একজন পাগল হয়ে গেছে। - কিন্তু কেন? কিছু আইডিয়া দিতে পারো? - যাকে আপনি দেখেছেন তিনি আর কেউ নন, সাক্ষাত কলি। আর যে যে জিনিসগুলোর প্রতি আপনাকে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল সে সবেই কলির অবস্থান। কলির মন্দির মূলত চারটি জায়গায়, মদের ঠেক, যেখানে শরীর কেনাবেচা হয়, জুয়া খেলার জায়গা, এবং সোনায়। এই চারটি জিনিসের একটিতেও আপনি প্রলুব্ধ হননি, তাই এই প্রাচীন মন্দিরের সামনে আপনার পূজা চেয়ে গেছেন কলিদেব। এই ঘোড়াটা পুজো দিয়ে ওনার কাছ থেকে আপনি ওনার প্রভাব কাটালেন। আগের দুটো ঘটনাই আমার দেখা, তাই মন্দিরের নাম শুনেই ঠিক চিনে চলে এসেছি। - আচ্ছা, কত দাম ঘোড়াটার। - সে ঠিক চেয়ে নেব। চলুন চিতোরে নেমে তো কিছু খাওয়াদাওয়াও করতে হবে। সেসব নাহয় আপনি করালেন। জানেন, যে ভদ্রলোকটি তাঁর স্ত্রীকে খুন করেছিলেন, তাঁর সাথে জেলে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বড্ড সরল মনের মানুষ। ওনাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। অবশ্য ওই চারটি জিনিসের কোনও একটিতে অতিরিক্ত লোভ যাদের হয়, তাদের উনি ছাড়েন না। আপনার মত সরল মনের মানুষ পেয়ে উনি খুব চেষ্টা করেছিলেন বাগে আনার, ভাগ্যিস আপনি ড্রিঙ্ক করেন না! প্ল্যান্টে পৌঁছে স্যাম্পল জমা দিতে গেলে কেমিস্ট ভদ্রলোকটি বললেন, - এটা দেওয়ার জন্য আপনার আসার আবার কী দরকার ছিল। ড্রাইভারকে দিয়ে দিলেই তো পারতেন। মনে মনে ভাবলাম, তাহলে কি আর এমন অভিজ্ঞতা হত! *** হ্যাঁ, দেখেছেন, ভুলেই যাচ্ছিলাম। কলির প্রভাবে উনি যে আমার পাঁচশ টাকাটা ফেরৎ দিয়েছিলেন সেটা বলতেই ভুলে গেছি। ঘরে ফেরার সময় ফাঁকা বুকপকেটে কিভাবে যেন ফিরে এসেছিল সেই পাঁচশ টাকা। বিশ্বাস করুন, কলির ফেরানো টাকা বলে নোটবন্দীর সময়েও সে টাকা ভাঙাইনি। #মানব_নারায়ণ_সেন

253

3

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

1846

90

মনোজ ভট্টাচার্য

দুনিয়ার নির্যাতিত স্বামীরা - এক হও !

দুনিয়ার নির্যাতিত স্বামীরা - এক হও ! বাঁচাও ! কে আছো ! মরেছি যে স্বামী হয়ে - -! গত দুদিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছে – পুরুষদের সম্বন্ধে কিছু লিখি । তা দেখলাম কাগজেই সেই লেখা বেরিয়েছে । - পুরুষদের ওপর নির্যাতন ! বিশেষ করে বিবাহিত পুরুষ নামক অসহায় জীবটির প্রতি অত্যাচার । শারীরিক তো বটেই – মানসিক অত্যাচারও ! সেই অত্যাচারের ভার সামলাতে না পেরে – আমাকেও পুরানো লেখা থেকে এই লেখাটি বের করতে হোল । স্বামী নির্যাতন নাকি ৩৪% বেড়ে গেছে ! এতদিনে আরও বেড়ে গেছে নিশ্চয় ! – এদেশে তো বটেই এবং – অবশ্যই - চীনদেশে ! বেচারি স্বামী মহিলা কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন । তার স্ত্রী তাকে খেঁটে বাঁশ দিয়ে মেরেছে । ফলে তার মাথা তো বটেই পিঠে অনেক ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে ! ঘটনাটা কী ! – এক ভদ্রলোক রোজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে – তাদের বাচ্চা মেয়েটির তত্ত্বাবধানের জন্যে । কারন তার শাশুড়ি নাকি সেই বাচ্চাটিকে কারনে অকারনে পেটায় । তাই বাচ্চাটির জন্যেই পিতাকে বাড়ি ফিরতে হয় । আর সেই কারনে তার শাশুড়ি তাকে নানানভাবে গালিগালাজ করে । আর স্ত্রী বাড়িতে ঢুকলেই তার নামে নালিশ করে চেঁচিয়ে গালাগাল দিয়ে । তার ফলে তার স্ত্রী রাগের চোটে বাঁশের খেঁটে নিয়ে তাকে প্রহার করে ! মহিলা কমিশন সারা দেশে তদন্ত করে দেখেছে – দেশে স্বামী নির্যাতন সত্যিই ৩৪% শতাংশ বেড়ে গেছে । এই স্বামী নির্যাতন নিয়ে তারাও খুব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ! তাই বলি – স্বামী সাবধান ! তখন নীচের গল্পটার কথা মনে পড়ল । আগেও একবার দিয়েছিলাম । এটা বিদেশি একটা রসিকতা থেকে নেওয়া ! তবে রসিকতা কেন – বোঝা যাচ্ছে ! এক শহরে এক বেচারি জন বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখে – বেশ বড় একটা মিছিল যাচ্ছে । মিছিলের একজনকে জিজ্ঞেস করলো – কিসের মিছিল ! শোক মিছিল । কে মারা গেছে ! মিস্টার থমসনের শাশুড়ি । - কিকরে ? থমসনের কুকুর কামড়েছে । তাই নাকি – সে কুকুর কোথায় ! – একদম সামনের গাড়িতে মাল্যভূষিত হয়ে বসে আছে । - ওই কুকুরটাকে কি ভাড়া পাওয়া যাবে ? – নিশ্চয় যাবে । লাইন দিন । জন লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে দেখে – লাইন প্রায় আধ মাইল দীর্ঘ ! জন ভাবতে থাকে এত লোক শাশুড়ির দ্বারা নির্যাতিত ! এখানেও অবশ্য একজন পুরুষপন্থী নারী নন্দিনী ভট্টাচার্য । তিনি সর্ব বঙ্গ পুরুষ সঙ্ঘের সভাপতি । পুরুষের ওপর অত্যাচার আগের চেয়ে কমেনি তো বটেই – বরং বেড়ে গিয়েছে । তিনি এটা বুঝতে পেরেই এগিয়ে এসেছেন ! - আগে তো পুরুষরা নারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতেও চাইত না লজ্জাবশত । - কারন নাকি পুরুষরা কাঁদে না ! একটা ইংরিজি সিনেমাও দেখেছিলাম - মেন ডোন্ট ক্রাই’ নামে – সেটা এখন থাক ! – এখন কিন্তু পুরুষরা নারীদের বিশেষ করে স্ত্রীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেন ! নিচে একটা ছবি দিলেই সন্দেহ নিরসন হবে ! – আমি কিন্তু একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ট ভদ্রলোক ! মনোজ

322

2

জল

গল্প

ডাক .... সূচনা .... 'চলে যা‚ সামনে থেকে চলে যা| কেন এসেছিস? আমি যাব না|' সরকারী হাসপাতালের চারতলার বার্ণ ওয়ার্ড| লাঞ্চ শেষ করে সবেমাত্র ওয়ার্ডে ঢুকছে আয়ামাসীরা‚ মাঝখানের কিউবিকলে কর্তব্যরত নার্স অর সিস্টাররা কাজ করতে করতে দু একটা কথা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে মৃদুস্বরে| বেশ কিছু পেশেন্ট ঘুমোচ্ছে‚ কেউ কেউ যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে| আচমকাই চিৎকার করে বলা কথাগুলো তীব্রবেগে সবারই কানে ধাক্কা মারে| কর্তব্যরত নার্স জনৈক আয়ামাসীকে ইশারায় সংশ্লিষ্ট পেশেন্টের কাছে যেতে বলে| 'কি হয়েছে আপনার? কে এসেছে?' 'দেখতে পাচ্ছো না কে এসেছে? ঐ তো‚ ঐ তো আমার খাটের ধার ঘেঁষে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল| এখনও দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে| দেখতে পাচ্ছো না?' 'কেউ নেই‚ আমরা ছাড়া এখানে কেউ আসতে পারবে না| এখন তো দুপুর| আপনি একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করুন|' আয়ামাসী বলে| 'মাসী ও আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে| বিশ্বাস কর আমার কথা|' 'আচ্ছা‚ আচ্ছা ঠিক আছে| আপনি একটু ঘুমোন এবার| আমি আছি আপনার কাছে'| আয়ামাসী বেডের পাশে রাখা টুলটায় বসে| গতকাল মধ্যরাতে এই মহিলা পেশেন্ট বার্ণওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে| মুখের বেশ কিছুটা‚ বুক আর পেটের কিছুটা পুড়ে গেছিল| পুলিশ কেস| মদ্যপ স্বামীর সঙ্গে বচসার জেরেই আত্মহত্যার চেষ্টা করে মহিলা| পেশেন্ট আনতে দেরী হয়েছে| আক্তারবাবুরা ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছে| কিন্তু বাহাত্তর ঘন্টা কাটবে বলে মনে হচ্ছে না| ভাতঘুমে ঢুলতে থাকে আয়ামাসী| 'এই এই এখনও যাসনি তুই? আমি যাব না তোর সাথে| চলে যা তুই|' আয়ামাসী চমকে জেগে ওঠে| 'শান্ত হও‚ কেউ নেই‚ কেউ তোমায় নিতে আসেনি|' 'না না ও আমাকে নিয়ে যাবে‚ ও আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে এসেছে| ঐ দেখো ওর ঠোঁটে হাসি| ও হাসছে‚ ও প্রতিশোধ নেবেই|' কর্তব্যরত নার্স এগিয়ে এসে একটা ইঞ্জেকশন চ্যানেলের মধ্যে পুশ করে| ঘুমিয়ে পড়ে পেশেন্টটি| ............... ঘটনা কিম্বা রটনা .................... 'মেসো ও মেসো দরজাটা খোলো প্লিজ' দুপুররাতে বারংবার দরজা ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে যায় বসনের| ধড়মড় করে উঠে বারান্দা দিয়ে মুখ বাড়ায়| নিকষ কালো অন্ধকার চারিদিকে| রাস্তার আলোগুলো একটাও জ্বলছে না| 'কে চিঠি নাকি'? 'মেসো দরজাটা খোলো প্লিজ‚ সর্বনাশ হয়ে গেছে|' বসন নেমে এসে দরজা খুলে দেয়| চিঠি বসনের নতুন শালির মেয়ে| ছয় বোন তার বউরা| সবচেয়ে ছোট সপ্তপর্ণী ছিল বসনের বৌ| গতবছর ঠিক এইদিনেই বসনের বৌ সপ্তপর্ণী গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল| চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেনি| কোন পারিবারিক অশান্তি ছিল না| শুধু বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যবসাটা মন্দা যাচ্ছিল| ফলত সংসারের খরচ-খরচায় লাগাম টানতে বাধ্য হয়েছিল বসন| সপ্তপর্ণী সেটা মেনে নিতে পারেনি| হঠাৎ স্বাচ্ছন্দ্যে যেমন গা ভাসাতে পেরেছিল‚ তেমনি হঠাৎ আসা এই অস্বাচ্ছন্দ্যে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি| তাই বেছে নিয়েছিল আত্মহ্ত্যার রাস্তা| অবশ্য সপ্তপর্ণীর মা বা বোনেরা কেউই বসনকে দোষী শাবাস্ত না করায় কেস কোর্ট অবধি পৌঁছায়নি| তবে নিন্দুকেরা অন্য কথা বলে| তাদের মত চিঠির মা‚ বিস্তীর্ণার সাথে একটা লুকোছাপার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বসনের| আর সেটাই মেনে নিতে পারেনি সপ্তপর্ণী| 'কি সর্বনাশ হয়েছে রে?' 'মা একটু আগে গায়ে আগুন লাগিয়েছে|' চিঠি কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে পড়তে বলে| 'সেকি!!! তোরা জানতে পারলি কি করে?' 'রোজকার মত আজকেও মায়ের সাথে বাবার ঝগড়া হচ্ছিল| আমি বিরক্ত হয়ে ঘরে চলে গেছিলাম| আর তার খানিকক্ষণ পর মা চিৎকার করে ওঠে| আমি ছুটে যাই আর তখনি আমাকে দেখে মা বলে ওঠে 'চিঠি বাঁচা আমাকে|' আমি বাথরুম থেকে জলে এনে ঢেলে দি| কিন্তু অনেকটা পুড়ে গেছে মেসো| মা'কে বাঁচাও প্লিজ|' 'আর তোর বাবা কোথায়?' 'বাবার কোনো হুঁশ নেই মেসো| বাবার অপেক্ষায় থাকতে গেলে যে মা বাঁচবে না| প্লিজ মেসো কিছু একটা করো|' বসন ব্যস্ত হয়ে পড়ে| ঐ রাতে গাড়ি যোগাড় করাটাও সহজ হয় না| কাছাকাছি কোন নার্সিংহোম এই কেস নেয় না| সরাসারি সরকারি হাসপাতাল রেফার করে| ২০ কিমি দুরত্বও অতিক্রম করতে অনেকটাই যেন সময় চলে যায়| তারপর ফর্মালিটি‚ পুলিশ কেস সব মিলিয়ে রাত প্রায় শেষ হতে আসে| এই সবকিছুর মাঝে বসনের খালি সপ্তপর্ণীকে মনে পড়ে| ঠিক সেই রাত‚ সেই গাড়ি‚ সেই হাসপাতাল‚ শুধু তফাৎ একটাই বিস্তীর্ণা এখনও বেঁচে আছে আর সপ্তপর্ণীর দেহ ঠান্ডা হয়ে গেছিল| হাসপাতালে নিয়ে যেতেই ঘোষনা করেছিল মৃত| থানাতে বডি প্ল্যাস্টিকে মুড়ে বরফ দিয়ে বেড় দিয়ে আসতে হয়েছিল| পরদিন পোর্ষ্টমর্টেম| আর তারও পরদিন বডি ফেরত দিয়েছিল| বিস্তীর্ণা কি করল এটা| শুকদেবের সাথে মারামারি ঝগড়া তো রোজকার ঘটনা| গত উনিশ বছর ধরেই তো চলছে| কই কোনদিন তো এত অসহিষ্ণুতা দেখায় নি বিস্তীর্ণা| তবে আজ কেন? বিস্তীর্ণা তো আত্মহত্যা করার মত মানুষ নয়| বরং তারা তো অন্য একটা স্বপ্ন দেখছিল| শুকদেবের শারীরিক যা অবস্থা‚ তাতে বড়জোড় ছ'মাস| তারপর‚ তারপর তো ...মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে| ............... ঝিমুনি নাকি সত্যি? ........................... 'ওর সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই তাই না? সত্যি বলছিলে সেদিন? তবে সেদিন রাতে তোমরা দুজনে আমার ঘরে কি করছিলে?' বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে গেছিল| প্রশ্নটা এসে ধাক্কা মারে| খুব পরিচিত একটা কন্ঠ| কিন্তু চিনে উঠতে পারে না বসন| আশেপাশে কেউ তেমন নেই| শেষরাতের একটা কুয়াশা আস্তরণ ফেলেছে যেন চারিদিকে| আবছায়া মত ওটা কি? কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে| একটা অস্পষ্ট অবয়ব| খুব চেনা দাঁড়ানোর ভঙ্গী‚ গলার কাছে একটা কিছু যেন আটকে যেতে চায়| 'আমি চাই না‚ তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠুক| আমি সহ্য করতে পারি না| আমার ঐ খাটে তোমাদের দুজনকে দেখে আমার সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল জান| তুমি আমায় একদিন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে তাই না| কিন্তু আজ জানি তুমি আমাকে ভালোবাসোনি কোনদিন| তুমি দিদিকেও ভালোবাসো না| আসলে ভালোবাসো দিদির শরীরটাকে| দিদির জায়গায় অন্য কেউ হলেও তোমার চলবে| কিন্তু দিদির সথে তোমার এই সম্পর্কটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না| তাই তো চলে এলাম দিদিকে নিয়ে যেতে| সুযোগটা দিদিই করে দিল| কিম্বা দিদির নিয়তি| তোমাকে নিয়ে যাব ভেবেছিলাম ‚ কিন্তু ভেবে দেখলাম তোমাকে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই| তুমি একজন বিশ্বাসঘাতক| দিদিও তাই| তুমি তো আমাকে ভলোবাসোনি কোনদিন| তাই ওপারেও ভালোবাসবে এমনটা বিশ্বাস করি না| বরং দিদিকে তোমার থেকে সরিয়ে দেব আমি| এখন শুধু অপেক্ষা|' অস্পষ্ট অবয়বটা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে| সপ্তপর্ণী| কপাল থেকে মাঝবরাবর চেরা| চোখের মণি স্থির‚ ঘোলাটে‚ ঠোঁটে নেই কোন রক্ত| সাদা একটা রক্তশূন্য শরীর| অর্ধ‚ আবরণহীন একটা শরীর| বসন জ্ঞান হারায়| .................................................................................... শেষ অঙ্ক ................... 'সরি' ডাক্তার বলতেই মুখটা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় কর্তব্যরত নার্স| বাহাত্তর ঘন্টা পার করেও চলে গেল বিস্তীর্ণা| ডাক্তার নির্দিষ্ট সময় পার করে দিলেও সেরে ওঠার কোন লক্ষনই দেখা যায়নি| তাই পেশেন্টের বাড়ির লোককে কোন আশাই দেয়নি ডাক্তাররা| যতটুকু সময় সে জেগে থাকত সেই সময়েই সে শুধু ‚'যা চলে যা‚ চলে যা‚ আমি তোর সাথে যাব না'‚ বলে চিৎকার করত| তারপর একটা সময় সে বলে উঠল‚ ' বেশ তবে নিয়ে চল| তোর প্রতিশোধ পুর্ণ কর| কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোর সংসার ভাঙতে চাইনি‚ তোকে দুঃখ দিতে চাইনি| তবু সবকিছু ঘটে গেল| নিয়ে চল‚ আর পারছি না‚ নিয়ে চল'| আয়ামাসীরাই ঠিক তারপর পেশেন্টের শারীরিক অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করে| তবে কি সত্যি করেই মৃত্যুপথযাত্রীদের ডাক আসে!!!

3166

196

শিবাংশু

সাঁঝ ঢলি

লোকে মরতে আসে বারাণসিতে, বাঁচতেও আসে সমান মাত্রার আবেগ নিয়ে। আর কোথাও কি এমন চক্রধর তেহাই বাজে মহাকালের হাতে? জানিনা... যে সব পুরাণকথার মধ্যে ভারতধর্মের মূল ছাঁদটি ধরা আছে তার একটি হচ্ছে রাজা হরিশ্চন্দ্রের কিংবদন্তি । মূল্যবোধের যে স্তরে যাযাবর আর্য উপজাতিরা এদেশে নিজেদের উন্নীত করেছিলো, তার একটি নিখুঁত নমুনা এই লোককথা। গপ্পোটা সবার জানা, তাই পুনরুক্তি নয়। কিন্তু পটভূমি হিসেবে বারাণসিকেই কেন নির্বাচন করা হয়েছিলো সেখানে? ভারতধর্মের শ্রেষ্ঠ পরীক্ষাগার বলে কি? সেই রূপকথার রাজার নামে একটা ঘাট আছে এখানে। হরিশ্চন্দ্র ঘাট। অনেক অন্ত্যেষ্টি হয় এই ঘাটে আর হয় মণিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানরক্ষক অর্থাৎ ডোমসম্প্রদায়ের সদস্যদের শেষ কৃত্য। তাঁরা নাকি মণিকর্ণিকায় নিজেদের শবদাহ করেন না। বারাণসির এটাই প্রাচীনতম শ্মশানঘাট, তাই আদি মণিকর্ণিকাও বলা হয় একে। ১৭৪০ সালে পেশোয়াদের গুরু নারায়ণ দীক্ষিত এই ঘাটটি সংস্কার করে পাকা করে দিয়েছিলেন। আমার একটা তেমন সুলভ নয় ব্যসন রয়েছে। সেটা শ্মশানঘাটে 'বেড়াতে' যাওয়ার নেশা। না সেখানে গিয়ে কোনও ঐহিক নেশায় রুচি নেই, শুধু দেখতে যাওয়ার নেশা বলা যায়। আমাদের গ্রামে সুবর্ণরেখার ধারে যে সুন্দর সাজানো ঘাট রয়েছে, ছুটির দিনে সেখানে মাঝে মাঝে খেপ মেরে আসার অভ্যেস আমার বেশ পুরোনো। এ যাওয়া কিন্তু কোনও চেনা মানুষকে এগিয়ে দিয়ে আসার জন্য যাওয়া নয়, সেতো শতবার হয়ে গেছে, একে বলা যায় জীবনের শেষ স্টেশনের পথে ড্রাই রান। ভারতবর্ষে প্রাচীনতম যে দুটি শ্মশানঘাট রয়েছে, তার একটি পাটনার বিখ্যাত বাঁশঘাট। সেই বৌদ্ধযুগ থেকে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু জায়গা বদলেছে, কিন্তু ঘাটটি সগৌরবে রয়ে গেছে। তা পাটনা থাকাকালীন আমার দফতর আর বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায় ছিলো এই স্থানটি। আমার এক অগ্রজ সহকর্মী, তিনিও জামশেদপুরের লোক এবং এরকম একটি উদ্ভট নেশায় আমার সঙ্গী। প্রতি শনিবার বেলা থাকতে থাকতে যখন বাড়ি ফিরতুম, তখন বাঁশঘাটের পাশে গাড়িটি লাগিয়ে দুজন মিলে ও তল্লাটে একবার ঢুঁ মেরে আসার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। অনেকেই জানতো এই বিচিত্র নেশার কথা। কেউ অবাক হতো, কেউ পাগল ভাবতো, কেউ বা অন্যকিছু। তো বাঁশঘাট ছাড়া দেশের অন্য প্রাচীনতম আর ব্যস্ততম শ্মশানটি রয়েছে বারাণসিতে, সেটা একবার না দেখে তো ফেরা যায়না। কিন্তু যাবো রাতের দিকে, অন্ধকারে। সন্ধে হতেই দশাশ্বমেধে এসে আবার নৌকোয় চড়ে বসি। তরী এবার উত্তরবাহিনী। বাঁদিকে শ্মশানরাজ কালুডোমের বিশাল রাজপাট। ঘাট ছেড়ে নদীর দিকে উজানে বয় নৌকো। নদীর ঢেউয়ে দুলে যায় তীরের আলোকমালা। আসে মানমন্দির ঘাট, জয়পুরের রাজা নির্মিত অষ্টাদশ শতকের একটি মানমন্দির রয়েছে এখনও। তারপর ললিতা ঘাট বা নেপালি মন্দির ঘাট। নেপালি স্থাপত্যের একটি ভারি সুন্দর কাঠের মন্দির আছে সেখানে। মাঝির সঙ্গে গপ্পো জুড়ি, তার নাম দীপক মন্ডল। বলি দীপক নাম তো বাঙালিদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। সে বলে আমি তো কোলকাতার লোক। বাবুঘাটে নৌকো বাইতাম। বাবার তাড়নায় বনারস পালিয়ে আসি। ভোজপুরিতে সুখদুঃখের কথা হয়। প্রশ্ন করি, সব মাঝিই কেন শাড়ি মন্ডিতে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপিড়ি করে? সে জানায়, বনারসের সব ঘাটে যতো নৌকো আছে সবের মালিক মারওয়াড়ি শাড়ির ব্যবসায়ীরা। মাঝিরা ভাড়া খাটে দিনমজুরিতে। যা রোজগার হয় সব তুলে দিতে হয় মালিকের যে সব এজেন্টরা ঘাটে ঘুরে বেড়ায় তাদের হাতে। ভিড়ের মরশুমে বেশি কামাই হলেও মাঝির জন্য আলাদা কিছু নেই। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু গ্রাহককে রোজ মালিকের শাড়ির গদিতে নিয়ে যাবারও চাপ আছে। ব্যাংকারের মাথা কাজ করে। জিগাই, নিজে একটা নৌকো কেনোনা কেন? সে বলে এ রকম একটা নৌকোর দাম অন্তত নব্বই হাজার। কোথায় পাবো? আমাদের তো থাকারও একটা ঢঙের জায়গা নেই। বলি, ব্যাংক যদি দেয়? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সে নৌকো এখানে আমাকে কেউ বাইতে দেবেনা। নিরুত্তর, শূন্যপানে চাই। তখনই দূরে ভেসে ওঠে সারি সারি প্রজ্জ্বলিত চিতার আলো, সেই সব ভাগ্যবানের পঞ্চভূতে মিশে যাবার জাদু প্রতিবিম্ব, যারা অনেক পুণ্যে ঐ ঘাটে ঠাঁই পেয়েছে। এসে গেছে মণিকর্ণিকা। নৌকো একটু একটু করে ঘাটের কাছাকাছি যায়। একসঙ্গে ছ-সাতটি চিতা জ্বলছে পাশাপাশি। আবছা আলোয় দেখা যায় ঘিরে থাকা মানুষদের মুখ। প্রিয়তম স্বজনদের অগ্নিআহূতি দিতে জড়ো হয়েছে তারা। ডোমরা এসে চিতাকাঠ উল্টে দিয়ে যায়। সোনালি নীহারিকার মতো আগুনের ফুলকি সন্ধে হাওয়ায় উড়ে যায় কোন অজানার দেশে। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে প্রিয় কবির শব্দের সারি। আমার পিতৃদেব চলে যাবার কিছু দিন আগে এই কবিতাটি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করে ফিতেবন্দি করে গেছেন আমাদের জন্য। চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা তার ওপরে আমাদের পলকা নৌকোর নিঃশ্বাস মুখে এসে লাগে মণিকর্ণিকার আভা আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না হাতে শুধু ছুঁয়ে থাকি পাটাতন আর দু'এক ফোঁটা জলের তিলক লাগে কপালে দিনের বেলা যাকে দেখেছি চণ্ডাল আর রাত্রিবেলা এই আমাদের মাঝি কোনো ভেদ নেই এদের চোখের তারায় জলের ওপর উড়ে পড়ছে স্ফুলিঙ্গ বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে ভস্ম পাঁজরের মধ্যে ডুব দিচ্ছে শুশুক এবার আমরা ঘুরিয়ে নেবো নৌকো দক্ষিণে হরিশ্চন্দ্রের ঘাট দুদিকেই দেখা যায় কালু ডোমের ঘর চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা এক শ্মশান থেকে আরেক শ্মশানের মাঝখানে আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না । ( মণিকর্ণিকাঃ শঙ্খ ঘোষ) অনেকে দাবি করেন, কবিতা বুঝিনা। সত্যিই কি বোঝেন না? জানিনা.....

265

3

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের শেশ দৌড় !

(ছত্রিশ কোটি দেব-দেবীর – তারমধ্যে সর্বশ্রী অপনবাবু, অর্ণব, মুনিয়া, জলি ও খুশী ও আছেন – শ্রীচরনপদ্মে জলাঞ্জলি দিলাম । ভালো লাগিলে আমায় সাবাশ ও খারাপ লাগিলে উপরোক্ত দেবদেবীকে মন্দ বলিবেন ।) জীবনের শেষ দৌড় ! জীবন কাহিনীকে কয়েকটা পর্বে ভাগ করলে যা দাঁড়ায় সেটা হল শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য । আমার মতে এটা ঠিক নয় । শৈশবেরও দুটো পর্ব আছে - শৈশব ও এঁচোড়ে-পাকা শৈশব । সেটা ১৯৪০ সাল নাগাদ । আমার বাবা খুব কম বয়েসেই মেডিক্যাল পড়তে পড়তে বিয়ে করে ফেললেন – তাও আবার কায়স্থ বাড়ির মেয়েকে ! সেই নিয়ে দু-বাড়ির মধ্যে ভীষণ তোলপাড় হয়েছিল ! – দাদু তো ক্ষেপে গিয়ে বাবাকে ত্যাজ্যপুত্র করে দিলেন । আবার মায়েদের দিকেও ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে মেনে নিতে পারল না । বাবা নতুন রাস্তায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে গেলেন । আমার পিতামহ ছিলেন ভাটপাড়ার ভট্টপল্লির প্রথম মানুষ যিনি পৌরোহিত্য না করে ডাক্তার হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন । ওনার বিয়ে হয়েছিলো নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের ডাক্তার সুরেশ ভট্টাচার্যের কন্যার সঙ্গে । যেহেতু প্রপিতামহের নাম ছিল কৃষ্ণগোপাল ও ঠাকুরমার নাম ছিল রাধারানী – তাই বিয়ের পরে এক সপ্তাহ-ব্যাপি ঝুলন-যাত্রা ! এসব শোনা কথা । উনি পর পর দুবার কাউন্সিলার হয়েছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের । - এদেরই প্রযত্নে আট-নটি কন্যা ও একটি পুত্র হয়েছিলো । পুত্রটি পৃথিবীতে বেশিদিন যাপন করতে পারেন নি । মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে সংসারে চার পুত্র-কন্যা রেখে চলে গেলেন । এদেরই মধ্যে একজন হলেন শ্রীমান আমি । পরে কোন কারনে আবার নিজেদের বাড়িতে তিনতলায় আমরা ভাড়াটে হয়ে ছিলাম । বাবা ছিলেন প্লাম্বার । মাথায় টুপি পড়ে ওড়িয়া মিস্ত্রিদের দিয়ে কাজ করাতেন । সেই সময়ে রাস্তার ওপর কোন কাজ করতে হলে প্রথমে কর্পোরেশনের অনুমতি লাগত । সমস্ত কাজ রাত্তিরের মধ্যেই করে ফেলতে হত । যদিও ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেছে – কিন্তু সিস্টেমগুলো অটুট ছিল । সে যাইহোক, তিপান্ন সালে বাবা টালিগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন বলে টালিগঞ্জে ভাড়া বাড়িতে চলে গেলেন । বছর ঘুরতেই আমরা পিতৃহীন হয়ে সবাই ফিরে এলাম – সেই দাদুর বাড়িতেই ! আর সেই দশই জুন আমাকে দেখে দাদুর সেই ভবিষ্যতবাণী – হয় ভালো হবো – নয়ত চোর-জোচ্চোর-ডাকাত – কিছু হবো নিশ্চয় ! বাবা যখন চুয়ান্ন সালে মারা যান তখন আমার বয়েস ছিল এগারো । সেই বছরেই আমি সুদূর টালিগঞ্জ থেকে একা হেঁটে বাগবাজারে চলে এসেছিলাম । কেউই বিশ্বাস করেনি । পকেটে একটা চারআনি ছিল । ফেরবার জন্যে রেখে দিয়েছিলাম । তখন টালিগঞ্জের ভাড়া বাড়িতে ফোন না থাকায় – আমার দাদা-মশাই সেদিন সন্ধ্যেয় আমাকে নিয়ে টালিগঞ্জে ফেরত নিয়ে এলেন । - দাদা মশাইয়ের সেই শেষ টালিগঞ্জে আসা । কারন তারপরই উনি শয্যাশায়ী হলেন । সেই ভাবে উনি অনেকদিন ছিলেন ও পরে মারাও যান । টালিগঞ্জের ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওয় আমরা একটা সিনেমার ভিড়ের দৃশ্যে ছিলাম । রাজপথ জনপথ নামে ঐ সিনেমায় বসন্ত চৌধুরী, মিহির ভট্টাচার্য ইত্যাদি ছিলেন । কিন্তু সিনেমাটা রিলিজ হয়েছিলো কিনা জানি না । ওখানেই বাঙ্গুর স্কুলে মাইনে বেশি বলে আমরা একটা পাঠশালায় যেতাম । এখন সে যায়গাটার কি নাম তা মনে নেই । গল্ফ ক্লাব ডিঙ্গিয়ে যেতে হত । সেখানে নাকি একজন সাহেব গাড়ি করে টহল দিত । আর গলফের মাঠে কাউকে দেখলেই গুলি ছুঁড়ত । কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে – তা কে বলবে ! তবে কাঁটা তারের বেড়া ছিল । - তখন বেশ কটা গলফ স্টিক ও গলফ-বল ছিল আমাদের ! আর আমরা খেতে পেতাম না বটে – কিন্তু গলফ খেলতে শিখে গেছিলাম । এইখানে মাতামহের দিকে কিছুটা ফোকাস করি । প্রমাতামহ নাকি যশোর-জেলার সাব-জজ ছিলেন । এবং জমিদারি ইত্যাদি, প্রভৃতি । তারা কবে কলকাতায় এলেন জানা নেই । মাতামহের সঙ্গে হাটখোলা দত্ত-বাড়ির মেয়ের বিয়ে হয়েছিলো । - পরে যা দেখেছি – দিদিমার যথেষ্ট দাপট ছিল । - মাতামহের সেই সময় একটা ভালো ব্যবসা ছিল । ক্যানিং স্ট্রিটে অফিশ – বেঙ্গল মেরিন অ্যান্ড রেলওয়ে ইন্ডাস্ট্রি । গিলান্ডার ছাড়াও আরও অনেক কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা ছিল । রেল থেকে নৌকো বা লঞ্চের সমস্ত রকম সামগ্রী সাপ্লাই দিত । সেটা যুদ্ধের সময় ! পয়সার চেয়ে লোহা দামী ! তখনকার একটা দাম্ভিক উক্তি – পয়সার জোরে দুনিয়া ঘোরে ! এখানে বলি – সেকালের ধনি ব্যবসায়ীরা যত বাড়ি বিহারের শিমুলতলা মধুপুর দেওঘর এ বানিয়েছেন , তার কিয়দংশ যদি কলকাতায় নিজের বাড়ি বানাতেন – তবে তাদের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত হতে হত না। অনেককেই সেই সময়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে দেখেছি । যে বাড়িটা আমি জন্ম-ইস্তক জেনে এসেছিলাম মামার বাড়ি বলে, হঠাত একদিন দেখলাম – তাদের সব উৎখাত হতে হয়েছে ! – খাওয়া-দাওয়া ভোগ-বিলাস – মায়ে ল্যান্ডো ঘোড়ার গাড়ি প্রায় প্রতিদিন থিয়েটার-সিনেমা দেখা, সব সময়ে উৎসব উৎসব ভাব ! – কিন্তু নিজস্ব কোন বাড়ি ছিল না ! দেখেছি তখন সেই বাড়িতে কত আত্মীয়স্বজন । ধীরে ধীরে সেই ভিড় কমে গিয়ে রইল শুধু দাদু-দিদা আর দুই মামা । তার মধ্যে একজনের বৌ ত্যাগ করে চলে গেছে ও অন্যত্র বিয়েও করেছে । ফলত বড় মামার মাথা খারাপ হয়ে গেছে । আর একজনের লেখাপড়ার কোন ব্যাপারই নেই । পাড়ার বখাটে ছেলে । এই পর্বটিকে আমি এঁচোড়ে-পাকা শৈশব বলি । পাড়ার কিছু বখাটে ছেলের সঙ্গে মিশে যত উৎপটাং কাজ, রাতে থিয়েটার হলে গিয়ে কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢোকা অথবা ট্রামে টিকিট না কেটে ধর্মতলার সিনেমা হলে লাইন দিয়ে ইংরিজি সিনেমা দেখা । এই সময়ই রাস্তায় চাকা চালানো, ডাংগুলি খেলা , ইত্যাদি সব অপকর্মগুলো করার সুযোগ পেয়েছিলাম ! বৃন্দাবন পাল লেনের একটা বাড়িতে কয়েকজনে মিলে বোম বানানো ইত্যাদি ! কত দাদা-কাকা-জ্যাঠার কানমলা, গাট্টা খেয়েছি – তার ইয়ত্তা নেই । হয়ত সেটাই আমার যাযাবর মস্তিষ্কের শুরু । এর পর বেশ কয়েকবার পালাবার চেষ্টা করেছি, ও পালিয়েছিও বাড়ি থেকে ! বাবা মারা যাবার পর বাগবাজারে ফিরে এসেই আমাদের স্কুলে ঢোকানো হোল । তখন শৈলেন্দ্র সরকার ছিল প্রায় এক নম্বর। তখনকার জাতীয় শিক্ষক এই স্কুলেই ছিলেন । কিন্তু যেহেতু শৈলেন্দ্র সরকার স্কুল আমাদের পাড়ায় নয় – তাই বাগবাজার স্কুলেই যেতে হোল । কারন তার স্কুল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমার দাদু ! দাদুর টেবিলে একটা ইংরিজি বই – লন্ডনের ওপর – আমাদের পড়াতে বসালেই সেই বইটা থেকে পড়তে হত । লন্ডনের রাস্তা-ঘাট সম্বন্ধে আমি খুব ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছিলাম ! আমার পিসিদের মধ্যে একজন দীর্ঘদিন অবিবাহিতা ছিল, তার মাথায় ছিট ছিল । সে পরে খড়দহের এক স্কুলে মাস্টারি করত । মুলত তার অত্যাচারে মাকে দুই বোনকে নিয়ে মামার বাড়ি চলে যেতে হোল । মা একটা পেয়ারার জেলি তৈরি করত – তার বেশ চাহিদা ছিল । একই সঙ্গে মন্টেসরি স্কুলে চাকরি করত ও জেলির ব্যবসাটা চালিয়ে যেত । আমাদের কোন গৃহশিক্ষক বা কোচিং ছিল না । - সেই অবস্থায় কিভাবে যে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছিলাম – এমন কি গ্র্যাজুয়েট হলাম – কে জানে ! আবার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার প্রথম দিনে সেই পিসি একটা বঁটি নিয়ে মারতে এসেছিল । এই ঘটনার কথা এখানে আগেই লিখেছি । পরবর্তী কালে সেই স্কুলের এক কম বয়েসী শিক্ষককে বিয়ে করে এখান থেকে চলে গেছিলো । কিন্তু একজনের কথা না লিখলে খুব অন্যায় হয়ে যাবে । সে আমার বন্ধু, দিদি বা মেন্টর যাই লিখি না কেন – ঠিক মিলবে না । কেয়া চক্রবর্তী ! তাকে দিদি বলে ডাকতাম না বলে খুব অভিযোগ করত । অনেক ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করত । সত্যি কথা বলতে কি ও-ই আমাকে মেয়েদের সম্বন্ধে জানতে শিখিয়েছে ! ওর জন্যেই আমি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি – হয়ত কলেজে পড়াই হত না ! – আমি যেবার ক্লাশ এইটে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম – এবং ফিরেও এসেছিলাম সেই একই খাঁচায় – তখনো ও-ই একমাত্র আমার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল । আবার ও-ই আমাকে কফি হাউসের রাস্তা ও আড্ডা দেখিয়েছিল । ও-ই কোথায় ইংরিজি বই পাওয়া যায় কোন হলে ইংরিজি সিনেমা দেখানো হচ্ছে – জানান দিত তখন লাইট হাউসের ঠিক উল্টোদিকে ইংরিজি সাহিত্যের নতুন ও পুরনো বই পাওয়া যেত ও অন্যান্য বইও পাওয়া যেত । তখনকার দিনে খুব একটা সস্তাও ছিল না ইংরিজি বই । আর থিয়েটার সম্বন্ধে ধ্যান-ধারনা সবই প্রথমে কেয়া – তার পরে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় । - সেই সময়টায় আমি চুটিয়ে রাজনীতি, নাটক ইত্যাদি সব কিছু করার সুযোগ পেয়েছি । এই পর্যন্ত আমার শৈশব, এঁচোড়ে-পাকা শৈশব, কৈশোর কাল বলা যেতে পারে ! মনোজ ( ক্রমশ)

345

7

শিবাংশু

হেমন্তের দেবী

হেমন্তকালটার ঠিক কোনও নিশ্চিত লক্ষণ নেই। বৃষ্টি নেই, শীত নেই, রোদটাও নরম, ফুলও ফোটেনা। স্পষ্ট হয়ে কাছে আসেনা বলে তার আবেদনটা খুব রহস্যময়। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে যে ট্রেনটা তার একটা জানালায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকা একটি মেয়ের মুখ যেন। এক পলক মনে হয় তাকেই তো খুঁজছিলুম কতোদিন ধরে। দ্বিতীয়বার সে আর চোখে ধরা দেয়না। মনের মধ্যে রয়ে যায়। অস্পষ্ট, অধরা। শুধু টানটাই থেকে যাবে বহুদিন। একেই কি হেমন্তের পিছুটান বলে। পুরীতে তো সারাবছরই গ্রীষ্ম। কখনও জ্বলন্ত, কখনও ঘর্মান্ত। তার অন্ত নেই কখনও। কালীপুজোর সময় বারুদের হিমন্ত বাষ্পে ভারি হয়ে সন্ধে নেমে আসে বালুবেলায়। পুরী হোটেল থেকে স্বর্গদ্বার পর্যন্ত সারা রাস্তায় সরাইখানাগুলো নিজেদের সাজিয়ে রাখে ঝিকমিক জোনাকির ফোঁটা ফোঁটা আলোয়। কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা মধ্যবিত্ত বাঙালিরা দিনের বেলা বার্মুডা-নাইটি আর সন্ধে হলে পাঞ্জাবি-পাজামা , শলোয়ার-কামিজে ফুটপাথ ভরিয়ে রাজার মতো। মশলামুড়ি। দাদা-বৌদির দোকানে রুমালি রুটি দিয়ে চিলিচিকেনের অর্ডার দেয়। অদূরদর্শীরা স্বর্গদ্বার বাজারে চড়াইয়ের শেষে, খাজার দোকানের পিছনে সুরাসন্ধান করে। ঠিক পাশেই রয়েছে ওষুধের দোকান। লাইন দিয়ে হাঁপানি আর হজমের ওষুধ খোঁজা অবিরত চেনা মুখ।ঝলমলে শাড়ির দোকানে উপচে পড়া ওড়িশার ঐশ্বর্য। কাটাতেলের বিক্রম অটো ছিদ্রহীন ভিড়ের মধ্যে পথ করে ছুটে যাচ্ছে মন্দিরের রাস্তায়। বাজার সমিতির পুজোমণ্ডপে দেবী কালী পূজিত হবার অপেক্ষায় ঝলমলে সাজ পরে রেডি। বদনগঞ্জ-আরামবাগ থেকে আসা কম রেস্তোর রাতের পর্যটকেরা খাজা আর ছেনাপোড়ের সম্বল গুছিয়ে থানার কাছে পার্ক করা বাসের দিকে ধাবমান। এই অটো, কতো লেগা? দশ মিটার অন্তর ফুলঝুরি, তুবড়ি, রংমশাল নিয়ে বাচ্চারা, বাবারা, দাদারা বছরকার দিনে আলো দেখাচ্ছে অন্ধকার আকাশের তারাদলে। আমরা বেড়ুবেড়ু করতে করতে মহোদধির পার্কিঙে রাখা গাড়ি বার করে চলে যাই এক ও অদ্বিতীয় চাঙ-ওয়ায়। চক্রতীর্থের দিকে আলো জ্বলেনা ততো। রাতের বেলা রাস্তাও খালি। আজ আর দেবীর সঙ্গে নিশিজাগর নেই। ঢেউয়ের স্তিমিত শব্দের আবহে কার্তিক অমাবস্যার রাত ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে যায়।

331

6

Stuti Biswas

ঝটিকা সফরে আমেরিকা

কালকে লেখার সাথে ছবি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম হল না । আজ দেখি হয় নাকি

696

37

মনোজ ভট্টাচার্য

মিস মার্পলরা এখনো আছে !

মিস মার্পলরা এখনো আছে ! দিজ ইস প্রিলিমিনারি ওয়াটসন ! রুপা বলল – আত্মহত্যা করলে – মুখ-টুখ ফুলে যাবে না ? এটা কোন গোয়েন্দা কাহিনী নয় । অবশ্য নয়ই বা বলছি কেন ! খানিকটা মিস মার্পল ধরনের ঘটনা ! আমার স্ত্রী তো বলেই ফেলল – তুমি তো বেশ গোয়েন্দার মতো কাজ করেছো ! তোমার মাথায় এলো কি করে ! তবে পুরো ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক । জায়গার নাম বা চরিত্র গুলোর আসল নাম বলছি না – কারন এগুলো সত্যিকারের আদালতের ঘটনা । যদিও আগেই মীমাংসা হয়ে গেছে ! চন্দননগরের আশেপাশে কোন এক জায়গায় এক বৃদ্ধা তার দুই ছেলে হারান আর পরান কে- নিয়ে থাকতেন । রুপা – পরানের বৌ । পরানের মারা যাবার পর এক ছেলে কে নিয়ে কলকাতায় বাড়িভাড়া করে থাকে । কাজ করে বাড়ি বাড়ি । মাঝে মাঝে চন্দননগরে গিয়ে যায় । সেঝানে তো শাশুড়ি থাকে । একদিন রুপার ফোনে মেসেজ এলো – মা নাকি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে । রুপা কলকাতা থেকে চন্দননগরে চলে গেল । দেখে কিনা ওরা মার দেহ দাহ করতে যাচ্ছে – ওরই জন্যে অপেক্ষা করছিল । ওখানে একজন ডাক্তারও হাজির । রুপা মার কাছে গিয়ে খানিক দেখে সন্দেহ হওয়ায় বলে দিল - মা তো আত্মহত্যা করে নি । মাকে তো খুন করেছে ! - বজ্রপাতের মতন শোনালো রুপার এই কথা । ডাক্তার বলল – তোমার কি করে মনে হল – এটা আত্মহত্যা নয় - খুন ? আত্মহত্যা করলে মার গলায় দাগ নেই কেন ? আর জিভ তো বেরয় নি ? আরে তুমি দেখছি সব জানো ! এটা আত্মহত্যার কেশ ! আগেই পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে ! এবারে চেঁচিয়ে উঠল রুপার ভাশুর হারান । বেশ একটা সোরগোল উঠল ! যারা দেখতে এসেছিল তাদের কেউ কেউ রুপাকে সমর্থন করল । - রুপা আর কি করে, সোজা চলে গেল থানায় । সব খুলে বলতেই বড়বাবু বলে উঠল – পোস্টমর্টেম হয়েছে যখন – তখন সব ঠিক আছে । রুপা যতই চেষ্টা করছে বলতে – মা খুব মোটাসোটা ছিল । নিজে নিজে সিলিঙ্গে দড়ি টাঙাতেই পারবে না । কেউ তাকে পাত্তাই দেয় না । তবু রুপা জেদ ধরে রইল । অবশেষে বড়বাবু বলে উঠল – তুমি কি কোন প্রমাণ দ্যাখাতে পারবে ? বাড়ি চলে যাও – যদি কোন প্রমান আনতে পারো – তখন ইনভেস্টিগেট করবো আবার । রুপা আর কি করতে পারে – এতবড় একটা মার্ডার কেস – অথচ পুলিশ ওর কথা সিরিয়াসলি নিচ্ছেই না ! ও আর ওরই এক প্রতিবেশী বাড়ি থেকে শ্মশানে গেল । শ্মশানে গিয়ে দেখে – মার দেহ পুড়ছে আর হারান আর চার বন্ধু মিলে এক ধারে বসে – মদ গিলছে । আর টাকা পয়সা নিয়ে আলোচনা করছে । ওর প্রতিবেশির হাতে মোবাইল ফোন ছিল । তাড়াতাড়ি ভিডিও অন করে শুনতে লাগলো – কি কথা হচ্ছে । ওদের কথাবার্তা শুনে রুপা বুঝতে পারল – ওর মাকে কোমরে লাঠি দিয়ে মেরেছে – হারানের এক বন্ধু । আর ওর মা মরে যাবার পর আগে থেকে লেখা দলিলে সই করিয়েছে আরেক বন্ধু । এই দুই বন্ধু এখন বেশি হিস্যা চাইছে । আর ওর ভাশুর হারান ওদের পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে । তাই নিয়েই একটু গণ্ডগোল চলছে । রুপা খানিক বাদে ভিডিও বন্ধ করে দৌড়ল থানায় । গিয়েই বলল – প্রমাণ চেয়েছিলেন ! এই নিন প্রমাণ ! বড়বাবু দেখেই বুঝতে পারল – কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে সোজা শ্মশানে । দেহ ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। হারান আর ওর তিন বন্ধুকে পাকরাও করে নিয়ে এলো । আর যে বন্ধুটি দলিলে টিপছাপ নিয়ে ছিল – সে পালিয়েছে । পরে অবশ্য ধরা পড়েছিল । শেষপর্যন্ত বিচারে ওদের তিনজনের চোদ্দ বছর করে জেল হল – আর দুজনের কম সাজা হল । ছ বছর হয়ে গেছে । সেই বাড়িটায় এখন হারানের বৌ এক সন্তান নিয়ে থাকে । সেও বাড়ি বাড়ি কাজ করে খায় । তবে রুপাকে পাড়ার সবাই ওখানে যেতে বারন করেছে । কারন ওর নিজের লোককে জেল খাটাচ্ছে । এখানে প্রশ্ন জাগে অনেক ! কিন্তু আমি আর সেসব প্রশ্ন করিনি । আর এখানে রুপা অন্য নামে কাজ করছে । তবুও ওর সাহসের তারিফ করতেই হয় ! এই সংসারে এরকম কত রুপা আছে – যারা নীরবে সব সহ্য করে যায় ! মনোজ

362

6

শিবাংশু

দীন যে, দীনের বন্ধু…

তখন আমি তেরো। নয় ক্লাসে পড়ি। বিদ্যাসাগরের দেড়শোতম জন্মদিন পালনের আয়োজন শুরু হলো আমাদের শহরে। তখনও পর্যন্ত পড়ার বইয়ের বাইরে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষ চর্চা ছিলোনা। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক কিংবদন্তি, বাকিটা দেবতা। তেরো বছর বয়সে, বালকত্ব ও কৈশোরের মাঝামাঝি একটা সময়ে, বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষভাবে কৌতুহলী হওয়া আমাদের সময়েও বিরল ছিলো। এই সময়টিতে কলকাতার সাক্ষরতা সমিতি সুলভে বিদ্যাসাগর রচনাবলী প্রকাশ করেন। তিন খণ্ডে। অবিলম্বে সেগুলো ডাক মারফৎ আমার বাবার সংগ্রহের অংশ হয়ে যায়। ইতোমধ্যেই বাবার কাছে নানা সংস্থা, পত্রিকা থেকে অনুরোধ এসে গিয়েছিলো । বিদ্যাসাগরকে কেন্দ্র করে বহুমুখী লেখালেখি, ভাষণচর্চা ইত্যাদির প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে গেছে। বইগুলি আলমারিতে ওঠেনি। লেখার টেবিলেই রাখা থাকতো। তখনও ১৯৭০এর জুন আসতে কয়েকমাস বাকি। সকালের কাগজে কলেজ স্কোয়ারের ঘেরা জায়গাটায় তাঁর মুণ্ডহীন আবক্ষমূর্তির নিচে গড়িয়ে যাওয়া মাথাটির ছবি, বাবার শূন্যদৃষ্টিতে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকা,.... আরও কিছুদিন পরে। আমার বিদ্যাসাগরকে চেনা ঐ বয়স থেকে। 'শিশুপাঠ্য' বিদ্যাসাগরের জীবনী থেকে সোজা এসে পড়েছিলুম গোপাল হালদারে। ঐ রচনাবলীর সম্পাদনা করেছিলেন গোপাল হালদার। তিনটি খণ্ডেই তাঁর লেখা ভূমিকাগুলি বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বাংলায় লেখা সেরা আলোচনাগুলির মধ্যে পড়ে। তার পর খুঁজে পেতে বদরুদ্দিন উমর এবং বিনয় ঘোষ। অবশ্যই বিপিনবিহারী গুপ্তের 'বিবিধ প্রসঙ্গ'। ইশকুল ছাড়ার আগেই মোটামুটিভাবে 'ঈশ্বরলাভ' হয়ে গিয়েছিলো আমার। পরবর্তীকালে যথাসাধ্য সন্ধান চলেছে তাঁর পায়ের চিহ্ন খুঁজে। লেখালেখিও করেছি। সভাসমিতিতে আলোচনাও চলেছে এই অর্ধ শতক। একটাই লক্ষ নিয়ে এগোতুম। ভদ্রলোকের কিছু খুঁত বার করা বড্ডো প্রয়োজন। কিছুই পাওয়া যাচ্ছেনা। চারুবাবুর অনুগামীরা বলতেন সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে ইংরেজ সৈনিকদের থাকতে দিয়েছিলেন। তাই তিনি ইংরেজের দালাল। শুধু তাই নয়, বিদ্যাসাগর বাঙালি 'ভদ্রলোক' কালচারের প্রধান আইকন। যে মানুষকে এই প্রতিক্রিয়াশীল সমাজটি মান্য করে, তিনি ততোধিক প্রতিক্রিয়াশীল। আরও অনেক খুচরো অভিযোগ ছিলো। তর্ক-বিতর্ক-মতান্তর-মনান্তর ধারাবাহিক ভাবে চলেছে কতোশত লোকের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে জলের আল্পনার মতো মিলিয়ে গেছেন তাঁরা। তাঁর প্রতি আমার অবস্থানটি এখনও বদলাবার কারণ পাইনি। একটা জীবনের জন্য আধ শতক অনেক সময়। তবু অপেক্ষায় থাকি, কোনওদিন এমন কোনও তথ্য আবিষ্কার হবে, যখন বলতে পারবো, ঈশ্বরচন্দ্র, আমি তোমার মাটির পা দেখে ফেলেছি। যতদিন না সেসময় আসছে, তাঁর ছবির সামনে দাঁড়াতে গেলে নিজের তুচ্ছতা, হীনতাগুলো চোরা হেসে আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি চোখ ফিরিয়ে নিই। যদি বাকি দিনগুলোতেও তাই চলে, ক্ষতি কী? আমারও অন্বিষ্ট তাই....

377

7

মনোজ ভট্টাচার্য

হাওয়ায় ডলার ওড়ে !

হাওয়ায় ডলার ওড়ে ! ছিয়াশি সালের মাঝামাঝি – আমার মা আমার কাছে গেছিলেন ! ছেলে বিদেশে কি করে দিন কাটাচ্ছে তার সরেজমিন করতে ! চুরি-চামারি করে নাকি রাস্তায় ঝাঁট দেয় ! তখন এরকম শোনা যেত – ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না হলে বিদেশে গিয়ে রাস্তাঘাট ঝাঁট দিতে হয় ! দীর্ঘদিন শীতের পরে শহরের আবহাওয়া বেশ বসন্তময় হয়ে থাকে ! একটু শিরশিরে হাওয়া ! আবার তখনো দিনের আলো রয়েছে ! এই আবহাওয়াতেই এই শহরের রূপ যেন দ্বিগুণ হয়ে ওঠে ! – এই রকম সময়ে একদিন বিকেলে ! সাবওয়ে ষ্টেশন থেকে হেঁটে ফিরতে মন্দ লাগে না ! আট দশটা ব্লক হেঁটে গেলেই আমাদের বাড়ি ! সাতাত্তর স্ট্রিটের ওপর দিয়ে হাঁটছি । - আচমকা এক দমকা হাওয়ায় গাছের পাতা উড়ে পড়ল ! - এবং - - ! আমার মনে হল – আরও কিছু পড়ছে ! আমি হাওয়ায় দুহাত বাড়িয়ে দিলাম ধরবার জন্যে ! – কি জানিনা ! কিন্তু মনে হয়েছিল কাগজ জাতীয় কিছু ! কাগজ নয় - হাতের মুঠোয় ধরা পড়েছে – গোটা ছয় ডলার ! দু ডলারের ও এক ডলারের মিশিয়ে ছ ডলার ! সেই সময় ডলার কথাটার বেশ প্রেস্টিজ ছিল ! বাড়ি ফিরে মাকে দেখালাম – দেখো । এই শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে ! ধরতে পারলেই হল ! – ডায়ালগটা ছিল – শরৎচন্দ্রের ! এই শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে! ধরতে পারলেই বড়লোক হয়ে যায় ! না ধরতে পারলে ভিখিরি ! মা তো আমার হাতে সত্যি অতগুলো ডলারের নোট দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল ! – অবিশ্বাসীর মতো জিজ্ঞেস করলো – তুই সত্যি অতগুলো ডলার পেলি রাস্তায় ? হাওয়ায় ! আমি কেতা নেবার জন্যে কারেকশান করে দিলাম ! - রাস্তায় হাওয়ায় টাকা ওড়ে ! ধরতে পারলেই হল ! আমার মা – যে কিনা সারা জীবন প্রচন্ড কষ্ট করেছেন ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে – আমার রসিকতাটা সত্যি ভেবে বিশ্বাস করে নিলেন ! – কলকাতায় চিঠিতে তো লিখলেনই আর যে কেউ আমাদের বাড়িতে আসে – সবাইকেই বলেন ! মার দৌলতে মোটামুটি সবাই আমার ডলার-প্রাপ্তি জেনে গেল । আভি ভি পিকচার বাকি হায় গুরু ! বেশ কয়েক বছর পরে আমরা কলকাতায় এসেছি ! – কথায় কথায় আমার বোন সিরিয়াসলি বলে বসলো – তোদের তো ওখানে কাজ কর্ম কিছু করতে হয় না ! তার মানে ? আমাদের খাবার জোটে কি করে ! আমি তো সম্পূর্ণ অবাক ! ওখানে তো তুই হাওয়ায় ডলার পাস – তাইতেই তো চলে ! – আমার বোন সম্পূর্ণ নিরাসক্ত মুখে বলল ! হাওয়ায় ডলার পাই মানে ! কোত্থেকে শুনেছিস এসব কথা ! কেন – মা তো দেখেই এসেছে – তুই একগাদা ডলার পেয়েছিলিস হাওয়ায় ! আমার সব মনে পরে গেল ! – আমারই রসিকতা কি রকম বুমেরাং হয়ে আমারই দিকে ফিরে এলো ! – হাওয়ায় ডলার ওড়ে ! (এই ঘটনার কথা আগেই লিখেছি । কিন্তু এক ধরনের মজার বলেই আবার দিলাম! ) মনোজ

358

3

মনোজ ভট্টাচার্য

এবারের বিদেশ যাওয়া !

এবারের বিদেশ যাওয়া ! আমাদের তো নিউ ইয়র্ক আর ভার্জিনিয়া ছাড়া কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না । গত বছর তবু পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় নব বৃন্দাবন গেছিলাম । ভালোই লেগেছিল । নিউ ইয়র্কে এবারে একজন ছাড়া কাউকে জানানোই হয় নি – আমাদের যাবার কথা । এক বন্ধুর আত্মিয় বিয়োগ হওয়ার কারনে – তাদের জানাই নি । আরেক দম্পতি – অ্যারিজোনায় চলে গেছে । - এ ছাড়া একজনের বাড়িতেই একবার যেতে পেরেছিলাম । - বেশিরভাগ দিনই লা গোয়ার্ডিয়ার আকাশে এরোপ্লেন গুনতেই ব্যস্ত ছিলাম । তবে এবারে গেছিলাম ভার্জিনিয়া বীচে । একেবারে সমুদ্রের ওপরেই হোটেল-ঘর । ওরে বাবা ! সকালে জানলার পর্দা খুলবো কি ! সূর্য একেবারে এত রেগে কটমট করে তাকায় – যে তাড়াতাড়ি পর্দা টেনে দিতে হয় । সারাদিন ঘরে পর্দা ঢাকা আলো জ্বালা । - আর সন্ধ্যে হলেই – সমুদ্র যেন বাইরে থেকে হোটেলের ন তলায় ঢুঁ মারতে থাকে । - অনেক দূরে বিরাট বিরাট ঢেউ আর বড় বড় জাহাজ – ধূসর হয়ে যাওয়া ছবির মতন ! সকালে যেমন হোটেলগুলোর উল্টোদিকে ছায়ায় হেঁটে ঘোরা যায় । তেমনি সন্ধ্যেবেলায় তটভুমিতে হেঁটে ঘোরা যায় । - হ্যাঁ – কোন চা-ওলা, বা কোন ধরনের কোন ওলা আমাদের কাউকে বিরক্ত করতে আসে না । - তবে একধরনের চার সিটের চার জনেই প্যাডেল করতে পারে – এরকম গাড়ি সমানে যাওয়া আসা করে । - বাইকেও ছেলে-মেয়েরা সমানে ঘুরছে । - হোটেলের আলো – এদিকে থেকে ওদিকে ঝলমল করে । রাত দশটা বাজলে – সমুদ্রের ওপর নৌকো থেকে বাজী পোড়ানো আরম্ভ হয় । পনেরো থেকে তিরিশ মিনিট । সে কি আওয়াজ ! আর কি আলো – কত রকমারি বাজি ! – একেবারে যেন হোটেলের ঘরে এসে ধাক্কা মারছে ! ফেরার সময়ে এক ঘটনা ঘটল – যা আগে কখনো অভিজ্ঞতা হয় নি । আগের দিন রাত থেকেই পূর্বাভাষ ছিল – ঝড়-বৃষ্টির ! – আমরা তো দুপুর বারটা নাগাদ বের হলাম একদম শুকনো খটখটে । প্রায় দেড় ঘণ্টা পরেই আচমকা দেখি – একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী একেবারে রাস্তার ওপর প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়লো । কোথাও এক টুকরো মেঘও ছিল না ! – একেবারে রণ-দামামা বাজিয়ে ভীষণ ঝড় এসে পড়লো আমাদের ঘাড়ের ওপর । আগে পেছনে প্রচুর গাড়ি । আমাদেরই মতন কেউই কিছু বুঝতে পারেনি সেই হাওয়ার কুণ্ডলীর জোর । সমস্ত গাড়ি একেবারে এলোমেলো হয়ে রাস্তার ধারে চলে যাবার চেষ্টা করছে । সে কী বৃষ্টির জোর – সামনের কাচ যেন ভেঙ্গে যাবার জোগাড় ! ছেলে খুব সাবধানে গাড়ি নিয়ে চলল । কিন্তু যাদের গাড়ি ধাক্কা খেল বা লেন বন্ধ হোল – তাদের সেই বিরাট ট্র্যাফিকে পড়তে হবেই ! এটা আমি কখনো দেখিনি ও এর মধ্যে পড়িনি । আমি গাড়ি চালালে কি করতাম – জানি না ! – রাত নটা বেজে গেল বাড়ি ফিরতে ! ভার্জিনিয়ার রেস্টন অঞ্চলে আমার হাঁটার বেশ সুন্দর জায়গা আছে । - একটা ঐতিহাসিক পার্ক – যার মধ্যে সেই মিনি-পাব্লিক-লাইব্রেরি আছে, আছে একটা ছোট পুরনো মঞ্চ আর আছে একটা ট্রেলওয়ে । আর পড়ে আছে একটা ট্রেনের কামরা । - জায়গাটা বেশ রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় ! – রোজই লোকেদের সঙ্গে আলাপ হয় – হাই হুই করি । এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা দিব্যি কেটে যায় ! সব শেষে একটা কথা লিখি । শহরে পরিবর্তনের যে প্রভাব সোচ্চার স-বেগ – তা কিন্তু এইসব আধা শহর অঞ্চলে দেখা যায় না ! এখানে আমি বেশ কয়েকবার এসেছি । দ্রুত কোন পরিবর্তন দেখি নি । এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন । এক ধরনের মানুষ আছেন – যারা – বাসস্থান অঞ্চলে বিশেষ উন্নতি চান না । উন্নতি মানেই বাইরের মানুষ ঢুকে পড়বে – সেই ভয় ট্রেন স্টেশন বা বাস স্টপেজ করার বিরোধিতা করেন । ফলে পাশেই টাইসন কর্নার । সেখানে পরিবর্তন কি সরব ও সোচ্চার ! আর এই ভিয়েনা কি শান্ত জায়গা ! – এক মোড়ের মাথায় দেখলাম লেখা – আমরা অঞ্চলের উন্নয়ন চাইনা – কারন তাহলেই অনাহুত মানুষের আগমন হবে ( কথাটা আনওয়ান্টেড এলিমেন্ট বাংলা মানে আপদ ! ) ! মনোজ প্রথম ছবিটা একটা ছোট্ট মঞ্চের - যেখানে থিয়েটার ইত্যাদি হতে পারে | দ্বিতীয় ছবিটা সেই বিখ্যাত স্বয়ংপরিচালিত লাইব্রেরী | বই নিন‚ বাড়ি নিয়ে যান - পড়ুন এবং ঐ খানে ঠিক ঠাক রেখে দিন |

344

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কেবুদার অন্তর্ধন !

কেবুদার অন্তর্ধান ! দোকানটার অবস্থান সম্বন্ধে একটু বর্ণনা দিই । আগেকার অনেক বাড়ির সামনের দিকে একতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত এইরকম লাগানো দোকান দেখা যেত । লম্বায় ছ থেকে আট ফুট - আর চওড়ায় দেড় ফুট - খুব সরু । বাইরের থেকে টিনের ঝাঁপ । কোনক্রমে একজনই দোকানে বসতে পারে । দেওয়ালে সাজানো সিগারেটের প্যাকেট । কত রকমের সিগারেট – ক্যাপস্ট্যান, লুক, পাশিং শো, সীজারস (কাঁচি ), উইলিশ, চারমিনার, ইত্যাদি । প্যাকেটগুলো অবশ্য সবই খালি । গোটা কুড়ি – পঁচিশ চলতি প্যাকেট ছোট্ট কাঠের কাউন্টারের ওপরেই আছে । আর আছে দেশলাই ও বিড়ি বাণ্ডিল খানেক । দোকানের এক পাশে বিড়ি ধরাবার দড়ি । এই হোল কেবু-দার দোকান । - আগেকার দোকানদারেরা আবার সাজা-পানও বিক্রি করতো । তার সঙ্গে আবার সোডার বোতলও থাকত । বায়রনের সোডা । - কেবুদার অত সামর্থ্য নেই – পান সাজার বা সোডার বোতল খোলার । পয়সাও নেই উৎসাহও নেই । কোনক্রমে সারাদিনে কিছু বিক্রি করতে পারলেই হতো। যাকে বলে কুঁড়ের বাদশা – একেবারে আবু-হোসেন স্টাইল ! ওদের পারিবারিক ব্যাবসা – গাড়ির ব্যাটারির কারখানা ও শো-রুম । বাজারে দারুন চালু ব্যাটারি । ওর দাদা সামলায় । মানে সামলাতে হয় । ভাইদের অনেক বলেছে – কারখানায় যেতে, দোকানে বসতে । কিন্তু লরির ড্রাইভারদের সঙ্গে কথাবার্তা করতে পারেনা । তাই বড় ভাইকেই সামলাতে হয় । কেবুটা হয়েছে খুব কুঁড়ে । অবশ্য শালাদের কিছুটা সাহায্য পায় । কেবু দাদার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে কোন ভাবে এই দোকানটা করেছে । সিগারেট বিড়ির দোকান । -অনেকটা সেই – নিচে পানকা দুকান উপর মাসিকা মুকান – ধরনের । - ও, হ্যাঁ ! দোকানের আবার একটা উপর আছে । ঐ সরু দোকানের ওপরে একটা তলা আছে । মানে সেখানে বিছানা-বালিশ পাতা আছে । সেখানে কেবুদা ঘুমোয় । যখন ঘুমোয় – এমন নাক ডাকে যে – পচা মোষ খা – চেঁচিয়েও ঘুম ভাঙ্গানো যায় না । নাক ডাকার শব্দে – দোকানটা থরহরি কম্প ! বাইরে থেকে বোঝা যায় – কেউ আছে ভেতরে । বিশেষ কোন কারনে আমরা – কেবুদাকে ক্ষ্যাপাতাম – কেবুদার জঙ্গলে বাঘ ঢুকেছে – বলে। - ওহ শুনেই কি খিস্তি দিত আমাদের ! কেবুদাকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলত ! আমরাও নেক কিছু জানতাম ! কেবুদা দোকান খুলত প্রায় এগারোটা-বারোটা নাগাদ । দুপুরে বাড়িতে খেতে যেত । আবার সন্ধে নাগাদ বসতো । হঠাৎ একবার হোল কি – সারাদিন কেবুদার কোন খবর নেই । বাড়ি থেকে ওর বোন একবার খোঁজ নিয়ে গেল । - মাঝে মাঝেই কেবুদা এরকম হাওয়া হয়ে যেত । উদ্দেশ্যমুলকভাবে যে কোথাও যেত তা না । - যেমন কোন কাজে হয়ত ট্রেনে যাচ্ছে । তা ট্রেনে ঘুমিয়েই পড়লো । ট্রেন পৌঁছে গেল শেষ ষ্টেশনে । - আবার পরের ট্রেনে ফিরে এলো – মধ্যে একটা দিন বয়ে গেছে । - একবার ধরা পড়ে গেছিলো পুলিশের হাতে । পুলিশের ফোন পেয়ে ওঁর দাদা গিয়ে টাকা পয়সা গুনাগার দিয়ে কেবুদাকে ফেরত আনে । আর আমরা ছিলাম – তার ওয়াচ-ডগ । কোথায় যায় – কি করে ইত্যাদি সব গোপন খবরা-খবর রাখতে হয় আমাদের ! – তা আমরাও কোন পাত্তা পাচ্ছি না । প্রতিবারের মতো সবাই ধরেই নিয়েছে – এবারও নিশ্চয় ট্রেনে করে কোথাও চলে গেছে । - সারাদিন চলে গেল কেবুদার কোন খবর পাওয়া গেল না । পরের দিন সকালে আমাদের একটু তৎপর হতে হোল । মোটামুটিভাবে ওর গন্তব্য আমাদের জানা ছিল । খোঁজ খবর নেওয়া হোল । না – কোথাও কোন খবর নেই ! – তাহলে নিশ্চয় এবারেও কলকাতার বাইরেই কোথাও ঘুমিয়ে চলে গেছে ! বাড়িতে ওর বৌদি ছাড়া বিশেষ কেউ ওর মতন কুঁড়ে লোকের কোন গা-করত না ! দুপুরে খেতেও এলো না ! পকেটে পয়সা কড়ি আছে কিনা কেউ জানে না ! - কোথায় গেলা ! বিকেলে হঠাৎ দোকানের ভেতর থেকে টিনের দরজা পেটানোর আওয়াজ এলো । - এ কী ! দোকানটাই আমরা দেখিনি ! কিন্তু দোকানে তো তালা লাগানো ! – অনেক কষ্ট করে ওপরের দরজাটা খোলা হোল বাইরে থেকে । - কেবুদা ঐ সরু দরজা দিয়ে উঁকি মারছে - । চোখ ফুলে গেছে । দেড় দিন ধরে ঘুমোচ্ছে ! খাওয়া দাওয়া নেই ! কিন্তু দেখা গেল – খুব জ্বর হয়েছে ! বেশ হৈ চৈ পড়ে গেল কেবুদার দেড় দিন ঘুম নিয়ে । এ যে কুম্ভকর্ণের ঘুম ! এরপর অবশ্য ঐ দোকান রাখার আর দরকার পড়লো না । ওর বৌদির জোরাজুরিতে ওর দোকানে যাওয়া বন্ধ হয়েই গেল ! – মধ্যিখান থেকে আমাদের একটা খোরাকও বন্ধ হয়ে গেল ! মনোজ

296

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কিনু গোয়ালার ফ্ল্যাট !

কিনু গোয়ালার ফ্ল্যাট ! আমাদের বাড়িতে একতলায় একঘর ভাড়াটে ছিল । এক মহিলা – তার তিন ছেলেকে নিয়ে থাকতেন ।- তারা যে কিভাবে সংসার চালাত – তা আজ আর মনে নেই । কিন্তু ওদের ছোট ছেলে অনিল –আমাদের চেয়ে একটু বড় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বন্ধুই হয়ে গেছিলো । আর এখনও মনে আছে – আমাদের পাকানো বা বখানোর কাজটা ওরই । পরে অবশ্য নিজে থেকে নেভীতে নাম লিখিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিলো । - পরে একবার নেভী থেকে এসেছিল – তখন আমাদের কাছে তার সে কী ফান্ডা ! – সে আর জেনারেল মানেক স প্রায় একই । - সেই শেষ – আর তার সঙ্গে কখনো দেখা হয় নি । অবশ্য এই গল্প ওকে নিয়ে নয় । ওর ওপরের দাদা সুনীলকে নিয়ে । সুনীল ছোট্ট একটা দোকান চালাত । বাচ্ছাদের জামা কাপড়ের দোকান । তার থেকে যে আয় হতে পারে – সহজেই অনুমান করা যায় ! সারা দিন দোকানে কাটিয়ে – রাতে শুধু ঘুমোতে বাড়ি আসা । তবু – হ্যাঁ তবু – সেই অকিঞ্চিৎকর স্বল্প-আয়ের মানুষ – একদিনের জন্যে সবার সামনে রাজা হয়ে গেল ! – না – সে কোন লটারি জেতেনি । অত গরীব মানুষ লটারির টিকিট কিনবে কি ! আর এ পর্যন্ত কোন হা-ঘরে মানুষকে লটারি জিততেও দেখিনি । - আসলে এত ছোট্ট মানুষদের ওপর – না ওপরতলা – না নীচ তলা – কারুরই দৃষ্টি পড়ে না ! তবু সে একদিনের জন্যে রাজা হোল ! সুনীল তার এক বন্ধুর বিয়েতে বর-যাত্রী হয়ে হাওড়া জেলার কোন এক রামচন্দ্রপুর না কোথায় গেছিলো । বিয়ের সন্ধ্যেতেই ওঁর বন্ধুর ভীষণ শরীর খারাপ হয়ে গেল । তাকে নিয়ে আরেক বন্ধু গেল – প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রে । বাকি রইল – সুনীল । সামনে লগ্ন-ভ্রষ্টা হতে যাচ্ছে এমন একটি বাংলাদেশের হতভাগ্য মেয়ে ! গ্রামের সব শুভাকাঙ্ক্ষী ও পাত্রীপক্ষ জোর করে সুনীলের গলায় তাকে ঝুলিয়ে দিল । - পয়সা কড়ি হয়ত কিছু পেয়েছিল ! আমাদের আরেকটা বাড়ি – সবটাই ভাড়ার – উঠোনের আরেক পাশে । সেখানে সুনীলদের জ্ঞাতিভাইরা থাকে । তারাও জামাকাপড়ের দোকানদারি করে । প্রত্যেক ঘরে তাদের সংসার ঠাসা । সকালে তারা ব্যস্ত থাকে – কলঘর নিয়ে উনুন-ধরানো নিয়ে ঝগড়া-কলহ নিয়ে । উনুনের ধোঁয়া, কলের জলে বাচ্চাদের কাপড় কাচা বউদের খেউর মিশিয়ে একেবারে কিনু গোয়ালার গলি হয়ে যায় – একতলার ফ্ল্যাট । এই হট্টমেলার মধ্যেও হঠাৎ কেউ আবিস্কার করে বসে – ওদিকের দরজার মুখে একটা ধুতি-পাঞ্জাবী পড়া গলায় বর-মাল্য ও হাতে সেই রাজার মুকুট – পাশে একটি জড়সড় মাথা নত কলাগাছের মতো ছোট একটা বেনারসীর-পুঁটুলি ! – সে কী ! – আমাদের সুনীল বউঁ নিয়ে এসেছে ! ওরে শাঁখ বাজা - উলু দে ! বউকে বরণ কর । - বেশ শোরগোল পড়ে গেল ! কার কাছে ছিল শাঁখ, কে দিল উলু ! আলুথালু সব সম্পর্কিত বৌদিরা দৌড়ে চলে এলো । বেশ হই-চই পড়ে গেল ! হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল পরিবেশ ! বাচ্চারা উদোম গায়েই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল । কান্নার কথা ভুলে গিয়ে - হয়ত একটা বাতাসার আশায় তাকিয়ে রইল । - কয়েক মুহূর্তের জন্যে একতলাটা উৎসব-মুখর প্রাঙ্গন হয়ে গেল ! ওপর থেকে পিতামহ ঘরের মধ্যে বলল – ছোঁড়াটা বিয়ে করলো কিরে – খাওয়াবে কি ? নিজেরাই খেতে পায় না । ভাড়া দিতে পারে না ! ঠাকুরমা বলল – আহা ! মেয়েটা একেবারে বাচ্চা ! এতটুকু মেয়ের বিয়ে দিল বাবা-মা ! এই সময়ে অনিল ট্রেনিংএ ছিল । বউ-সমেত সুনীলদের যে ঘরে ঢোকানো হোল – সেই ঘরে অনিল ও তার মা থাকত । আরেকটা ঘরের সামনে প্রায় উঠোনের ওপরেই ওদের রান্না হত । সেই উঠোনের পাশে চটের আড়াল তুলে মায়ের শোবার জায়গা হোল ! বেশ কিছুদিন পর – বোধয় তিনি কোথাও চলে গেছিলেন । তাকে আর দেখা যায়নি । পরে অপুর সংসারে দেখা গেল – সেই দৃশ্য – অপু অপর্ণাকে নিয়ে টালার বাড়িতে ঢুকছে ! সমানে ভাবছি – লিছু লিখি । কিন্তু কি লিখি ! ভেবে ভেবে – চুপচাপ বসে না থেকে টুকটাক মুখে – লিখেই ফেললাম ! কি লিখলাম – জানি না ! মনোজ

306

5

শিবাংশু

ভোর ভই...১

' ত আলল্লা বনারস চশমে বদ দূর বহিশ্তে খুর্রমো ফিরদৌসে মামুর ইবাতত খানএ নাকুসিয়াঁ অস্ত হমানা কাবয়ে হিন্দোস্তাঁ অস্ত" ( হে ঈশ্বর, বনারস কে অশুভ দৃষ্টি থেকে দূরে রেখো। কারণ এ এক আনন্দময় স্বর্গের মতো স্থান। এইখানে ঘন্টাবাদক জাতির( অর্থাৎ হিন্দুদের) পূজাস্থল। এ তো আসলে হিন্দুস্তানের কাবা।) এইভাবেই বলেছিলেন নজমুদ্দৌলা, দবির-উল-মুল্ক, নিজাম জং মির্জা অসদুল্লা বেগ খাঁ ওরফে মির্জা ঘালিব, বনারসের মহিমা প্রসঙ্গে। তখনও আলো ফোটেনি ঠিক। বেশ শিরশিরে হিমেল স্নিগ্ধতা ভোর হাওয়ায়। সরাইখানা থেকে বেরিয়ে আসি দুজনে।একটু এগিয়ে সিগরার তিমুহানির মোড়। এতো সক্কালে কি কিছু সওয়ারি পাওয়া যাবে। যাকগে না পাওয়া গেলে চরণদাস ভরসা। সারা শহর তখন যেন উৎসব শেষের শ্রান্তি গায়ে জড়িয়ে নিঝুম হয়ে শুয়ে আছে। হঠাৎ একটি অটো এসে দাঁড়ায়। কঁহা জানা হ্যাঁয় সাব? গোদৌলিয়া জাই? জাই, পর মোড় পর উতরনা পড়ি। কো-ই বাত নইখে হো, চলি। অটোতে হাওয়া বেশ শীতল লাগতে থাকে। রথযাত্রা মোড় পেরিয়ে বাঁদিকে গুরুবাগের রাস্তা ধরে। সেখান থেকে লাক্সা রোড। গড়াতে গড়াতে গোদৌলিয়ার মোড় এসে যায়। ডানদিকে সন্ত থমাস গির্জা। সামনে রাস্তায় পুলিস ব্যারিকেড। এই পথেই গোদৌলিয়া হয়ে বিকেল থেকে প্রতিমার শোভাযাত্রা যাবে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে। আলো ক্রমে আসিতেছে। আমরা হাঁটতে থাকি নদীর দিকে। সেই বহুশ্রুত গোদৌলিয়ার পূর্বমুখী পথ। বনারসের স্নায়ুকেন্দ্র। দুধারে উঁচু সৌধগুলি, ভরা আছে বিপনীসারিতে। তাদের কপাট তখনও খোলেনি, কিন্তু সবজিওয়ালারা বসতে শুরু করেছে রাস্তার ধারে। চায়ের দোকান, পানের দোকান সব নড়ে চড়ে বসছে। স্নানশেষে ফেরা লোকজন, আবার স্নানযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া মানুষের সারি, মন্থর ষাঁড়, অনাবিল আবর্জনা, আশেপাশের ছোটখাটো মন্দির থেকে ভেসে আসা ঘন্টাধ্বনি, স্পিকারে মারুতিনন্দনের ভজন.... আর একটু এগিয়ে যেতেই বনারসের চিরপরিচিত ঘাটের সিঁড়ি। দশাশ্বমেধ ঘাট, গঙ্গানদীর সব চেয়ে বিখ্যাত তীরভূমি, রঘু রাইয়ের ছবি থেকে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ভোরবেলা গঙ্গা থেকে দিন উঠে আসার দৃশ্যকাব্য এভাবেই দেখতে যাওয়া মির্জা ঘালিবের হাত ধরে। অনন্ত সোপানবীথি স্পর্শ করে থাকে জলের আশ্লেষ পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই। একের পর এক সিঁড়ির ধাপ নেমে গেছে জলের কাছে। সিঁড়ি, নদী ও মানুষ এবং দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা বিবিধ প্রণালী, নানা অভ্যেস, যার অন্য নাম ভারতবর্ষ। উদ্যত সূর্য, কল্লোলিত জলরাশি আর শব্দের ঐক্যতান সাক্ষী রেখে আরেকটি দিন উঠে আসে অনন্ত মূহুর্তময় কালস্রোত থেকে। ভোর হওয়া বাকি আছে, তবুও কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়.... ভোর ভই বনারস মা .....

279

2

মানব

শ্রাবণীর বাঁকে

১ দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। বর্ষাকাল এখন, ধানের বীজতলাগুলো সবুজে সবুজ। প্রথম যখন ধান ছড়ানো হয়, এই বীজতলাতেই। তারপর একটু বড় আর ঘন হয়ে যখন এরা মনোমুগ্ধকর সবুজে ভরিয়ে দেয়, এদেরই তুলে নিয়ে গিয়ে লাগানো হয় সারা মাঠজুড়ে। কোথাও কোথাও সেই কাজ শুরুও হয়ে গেছে। গ্রামের নাম মনোহরা, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট নদী শ্রাবণী। সারা বছর অল্পবিস্তর জল বয়ে গেলেও বর্ষাকালে, বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে এই নদী ধারণ করে মাতৃমুর্তি। সেই জলে সমৃদ্ধ হয় এপারের গ্রাম মনোহরা আর ওপারের স্বর্ণগ্রাম, যাকে সবাই সোনাগাঁ বলেই চেনে। একটু একটু করে দৃশ্যপটে ফুটে উঠছে এপারের গ্রামখানি, মনোহরাই বটে। যেমন তার রূপ তেমনি সবুজে সবুজ। নদীর পারে একখানি খেলার মাঠ। লম্বায় চওড়ায় একটা বড় আয়তনের ফুটবল মাঠের চেয়ে কোনও অংশে কম হবে না। আজ একটা বিশেষ দিন, যে কারণে এই মাঠে এত বেশি খেলোয়ার জড়ো হয়েছে। অন্য দিন দুই দলে পাঁচ-ছয়জন করে খেলোয়াড় জোগাড় করতে হিমসিম খেতে হয়, আর আজ, পনেরজন করে খেলছে এক এক দলে। হবে নাই বা কেন। আজ যে এই গ্রামের গ্রাম্য দেবীর পূজো। গ্রামের ছেলেরা তো এসেছেই, আর এসেছে অতিথিরা। সারাদিনের পূজোর আনন্দ কাটিয়ে বিকেলটায় অল্প খেলাধূলা হবে। খিদেটাও বেশ বেড়ে যাবে এতে। সন্ধ্যেবেলার আহারটা ভালই জমবে। অল্প কাদায় খেলাটাকে দিয়েছে এক অন্য মাত্রা। এমন কাউকে দেখা যাচ্ছেনা যে কর্দমাক্ত হয়নি। তবুও সম্পূর্ণ উদ্যমে চলেছে সে খেলা। দুইপাশের গোলরক্ষক মনের আনন্দে বসে ঘাস চিবোচ্ছে, আর বল ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঝমাঠে, বলা বাহুল্য বাকী সব খেলোয়ারকে ওই মাঝমাঠেই দেখা যাচ্ছে। এই ধরণের কাদা মেখে খেলার একটা সুবিধা আছে, অসুবিধাও বলা যায়। যেমন ধরুন আপনি বল দাবী করলেন অন্য দলের ছেলের কাছে, সেও নিজের দল ভেবে বল বাড়িয়ে দিল। এতে আপনার যেমন সুবিধা হল, যেকোন সময়েই আপনিও এই অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারেন, এটাই অসুবিধা। আরে মশাই, নিজের নিজের দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে এগারোজনের মাঠে বড় বড় খেলোয়াররা ভুল করে, আর এখানে তো... এই খেলায় যেহেতু নিরপেক্ষভাবে বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন, সেহেতু আমি মাঠের দুটো দিকের একটাকে গ্রামের দিক অর্থাৎ এদিক আর অন্যটাকে ওদিক বলে অভিহিত করব। ...খেলা শুরু হওয়ার দশ মিনিট অতিক্রান্ত, এখনও পর্যন্ত কোনপক্ষই কোন গোল করতে পারেনি। অবশ্য গোল হতে গেলে ন্যুনতম বলটার স্থিতাবস্থার গতিশীল অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন। দুএকবার বলটার গতি এলেও তা এসেছিল মধ্যরেখা বরাবর। হবে নাই বা কেন। সার দিয়ে দুপাশে দশজন করে দাঁড়িয়ে থাকলে কি করেই বা বল এদিক ওদিক যেতে পারবে। এপাশের ট্যারা দেয় ওপাশের ভুতোকে। ভুতো আবার দুম করে একটা শট নেওয়ার চেষ্টা করে সোজা এদিকের গোল বরাবর, কিন্তু সঠিক ভাবে পায়ে-বলে না হওয়ার কারণেই হোক আর অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণেই হোক বল সোজা না এসে নব্বই ডিগ্রি গেল বেঁকে। আবার মধ্যরেখা বরাবর এপারের দিলীপ, দিলীপের থেকে বল কেড়ে নিল এপারেরই নেপাল (চিনতে ভুল করে বোধহয়)। দেখা যাক সে হয়ত নতুন কিছু করবে, কিন্তু না, দৌড়ে এসে ওপারের দুজন প্লেয়ার একসাথে পা চালাল বলের উপর। এরা সম্ভবত এই গ্রামের নয়, পুজোর ভোজ খেতে এসেছে এ-গাঁয়ের কোনও আত্মীয়বাড়ি। নেপাল একটু বল কাটাতে জানত, তাই এপা-ওপা করে বলের উপর আসা ওপারের আঘাত বাঁচানোর চেষ্টা করতে গেল, আর তখনই দুর্ভাগ্যবশত সেই আঘাত গিয়ে লাগল তার নিজেরই পায়ে। বিপক্ষের জোড়া পায়ের আঘাতে ‘ওরে বাবারে’ বলে বসে পড়ল সে বলের উপরে। আরও দুচারটে লাথি কষিয়ে নেপালের থেকে বল কেড়ে নিল তারা। কি ভাবছেন? ফাউল? ওসব দাবি করে সময় নষ্ট করে না এ গাঁয়ের ছেলেরা। রেললাইনটা বেশ কিছুটা দূরে হলেও ট্রেন এলে দেখা যায়। তাই চারটের ট্রেন গেলে খেলা শুরু হয় আর ছ-টার ট্রেন এলে খেলা শেষ। এর মাঝে যদি কারও কিছু ইয়ে পায় তাহলে কাছাকাছি থাকা নিজের দলের যেকোন সদস্যের অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে গেলেই হল। মোটকথা, কোন বিরতি এখানে দেওয়া হয়না। এইভাবেই অনেকক্ষণ ধরে মাঝমাঠে বল নিয়ে টানাহিঁচড়া করার পর এদিকে বল আসার একটা প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে এপারের রক্ষণভাগের শোভন জোরে একটা শট নিয়েই প্রচণ্ড বেগে ওপারের দিকে ছুটে গেল। যেহেতু সবাই মাঝমাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওপারে পৌঁছে বলও পেয়ে গেল সে। ওপারের গোলরক্ষক বিকাশ বেগতিক দেখে দৌড় দিল বলের পানে। এতক্ষণ পর মনে হল কিছু একটা হবে। গোলের প্রায় কাছাকাছি শোভন পৌঁছেও গেল। কিন্তু শেষ অব্দি বিকাশকে ছুটে আসতে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে কিছুটা আগে থেকেই নিল প্রচণ্ড জোরে একটা শট। এপারের বাকী চোদ্দজনের সমবেত চিৎকার গোওওওওওল...; কিন্তু বল গোলের দশ হাত বাইরে দিয়ে বেঁকে হাওয়ায় অনেকটা সাঁতরে সোজা পৌঁছলো নদীর ওপারে। এবার বাঁধল গোল। কে যাবে নদীর ওপারে সেই নিয়ে। যদিও বেশিরভাগ ছেলেই সাঁতার জানে, এবং নদীটাও ততটা চওড়া নয়, কিন্তু কেউই বর্ষাকালে স্ফীত নদী ডিঙিয়ে ওপারে যেতে রাজি হল না। তাছাড়া বলটা গেছে পরিত্যক্ত জঙ্গলটার দিকে; নিতান্ত জরুরী দরকার না পড়লে সচরাচর কেউ সেদিকে যায়না। ওই গাঁয়ের রাখালদের হাঁক দিলে হয়ত বলটা খুঁজে দেবে, কিন্তু তেমন কাউকে আজ দেখাও যাচ্ছেনা। হয়ত নেমন্তন্ন খেতে এপারের বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে এসেছে কেউ কেউ সেতু পেরিয়ে। কিন্তু সে সেতু তো অনেক দূর। প্রায় আধ ঘন্টার রাস্তা। তাহলে কি আজ আর খেলা হবেনা? আর একটা বল অবশ্য ছিল, পরশু সেটাও লিক হয়ে গেছে। এই হয়েছে আজকাল বড় এক অশান্তি। লিক হয়ে গেলে তা সারাবার লোক পাওয়া যায়না। প্রথমে যাওয়া হয়েছিল সাইকেল সারাবার দোকানে। সে বলল, সেলাই করা বা বলের চামরা কাটা তার কাজ নয়। সে শুধু লিক সারিয়ে দেবে। অনেক কষ্ট করে একজন সেলাই করার লোক পাওয়া গেল, সে বলল সে নাকি ফুটবলে হাত লাগাবেনা। অনেক নোংরা জিনিস মিশে থাকে এর মধ্যে। আর একজন সেলাইয়ের লোক আছে, কিন্তু তাকে পাওয়া যাবে পরের হাটবারে, আরও তিনদিন পর। ততদিন এই এক্সট্রা বলটাই ছিল ভরসা, সেটাও গেল। একে তো পুজোর দিন, এই আনন্দ কি আর সারাবছর পাওয়া যায়! সুতরাং, যেকোন ভাবে বলটা এনে এখনি খেলার ব্যবস্থা করতেই হবে। কিন্তু পূজোর দিনে নদীতে নামতে কেউই রাজী নয়। তখন সবার নজর গেল ছোট্ট বিনুর দিকে। সে বেচারা রোজ খেলবার আশা নিয়ে আলপথ, মাঠ পেরিয়ে এতদূর ছুটে আসে খেলতে সুযোগ পাওয়ার আশায়। যেদিন ছেলে খুব কম থাকে সেদিন সুযোগ পেলেও সাধারণত বড়দের সঙ্গে খেললে হাতে পায়ে লেগে যাবে এই অজুহাতে তাকে খেলতে নেওয়া হয়না। তাই গোলের পিছনে বল গেলে, কিংবা মাঠের বাইরে বেরিয়ে গেলে বল কুড়িয়ে একটা দুটো শত মেরে মাঠের ভিতরে পাঠিয়ে দিয়েই সে খুশী থাকে। - এই বিনু তুই একটু ওপার থেকে বলটা এনে দিবি? খেলতে পাবি তাহলে আজকে। - ধুর, এই ভিড়ের মধ্যে তোরাই খেলতে পাচ্ছিসনা আবার আমি খেলব... বিনুর সোজা সাপটা জবাব। ছোট বড় নির্বিশেষে এই মাঠে সবাই সবাইকে তুই বলেই ডাকে। - চানাচুর চলবে? পঞ্চাশ? - একশ হলে বল। একশ গ্রাম চানাচুরের চুক্তিতে বিনু নদী পার হতে রাজী হয়ে গেল। কি অপরূপ দক্ষতায় স্রোতস্বিনী নদী পার হয়ে তরতরিয়ে সে ওপারে চলে গেল। তারপর ঝোপের দিকটায় গেল বল আনতে। ......................................................................................... ‘মিনিট পনের কেটে গেল, এখনও ছেলেটা ফিরলনা। একবার দেখে আসা দরকার নাকি রে?’ সন্তোষ বলল। শোভন বেশ খানিকটা হতাশ হয়ে বসেছিল, মনেহয় গোলটা না হওয়ার দুঃখেই। সে এবার মুখ খুলল, ‘দেখ ফাজলামি করছে হয়ত। একবার ডেকে দেখি চল।’ সবাই মিলে এক এক করে ডাক দিল তারা, কোন সাড়া নেই। কোন বিপদ হলনা তো? শেষ পর্যন্ত ওপারে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। সবাই যেতে রাজী না হলেও জন দশেক ছেলে সঙ্গে পাওয়া গেল। জঙ্গলে সত্যিই যদি কোনও বিপদ থেকে থাকে তখন সবাই মিলে থাকলে একটা আলাদা মনোবল পাওয়া যায়। সাঁতরে ওপারে পৌঁছে যেটা দেখা গেল তাতে সবাই স্তব্ধ। একজন যুবকের মৃতদেহ, কিছুদিনের পুরনোই হবে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আর তার সামনে বসে ভিজে মাটিতে একটা কঞ্চি দিয়ে আঁক কেটে চলেছে বিনু। চারিদিক শান্ত, নিঃশব্দ। সাহস করে শোভন ডেকে বসল, ‘বিনু...বিনু...’ যে ক্রোধভরা হিংস্র দৃষ্টিতে ঘুরে তাকাল বিনু, তাতে অনেকেরই হাড় হিম হয়ে গেল। চোখ মুখ লাল, দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, অথচ শরীর যেন অবশ, কারও ছোঁয়া লাগলেই পড়ে যাবে, এমন। তারপর উঠে দাঁড়াল সে। দিলীপ এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কিরে বলটা কোথায়? অপ্রত্যাশিতভাবে, এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিল বিনু, আর দিলীপ ছিটকে গিয়ে পড়ল মাটিতে। কোমর ধরে বসে পড়ল সে। এরপর শোভন এগিয়ে গেলে, সামনে হাত বাড়িয়ে শোভনের বুকে সে এমন এক ধাক্কা দিল, হুড়মুড়িয়ে বাকি সবার উপর এসে পড়ল সে। তখন সবাই মিলে চেপে ধরে চেষ্টা করা হল বিনুকে শান্ত করার। কিন্তু ছোট্ট হাতের তখন সে কি জোর। সবাইকে ছিটকে ফেলে দেয় একসাথে। তারপর থরথর করে প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে থাকে আর বলে চলে একটাই ছড়া, ‘মুখ করে পূবপানে দাঁড়া মাঝখানে সোজা গিয়ে শেষকালে ঘোর তুই ডানে। এইভাবে কর আরও তিনেক বার জেনেও যেতে পারিস কিবা হবে আর।’ কয়েক বার চিৎকার করে এই ছড়া বলার পর মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। ওই ভয়ের মধ্যেও সবার মনের মধ্যে তীক্ষ্ণভাবে গেঁথে গিয়েছিল ছড়াটি। ছড়ার বয়ান অনুযায়ী পূর্বদিকে তাকায় সবাই। সেদিকে, মাটিতে কঞ্চির আঁচড়ে যে সংকেতটা আঁকা আছে, তা নিম্নরূপ, লে । চ । চা ছে । ভ । য র । ড়ি । বা পুলিশকে খবর দিতেই হল এবং তদন্তের সাহায্যার্থে পুলিশকে সবটা জানানো হল। সংকেত অনুযায়ী মাঝখানে আছে ‘ভ’, সেখান থেকে সোজা গেলে ‘ভচ’ তারপর ডানদিকে ঘুরে হয় ‘ভচচা’, তারপর আরও তিনবার ডানদিকে ঘুরে পাওয়া যায় ‘ভচচাযবাড়িরছেলে’। সোনাগাঁয়ে কোন ভট্টাচার্য পরিবার থাকেনা এবং মনোহরা গ্রামে একটি মাত্র পরিবার যেখানে মা আর ছেলে বাস করেন। পুলিশ তো এই সংকেত পেয়ে মহা খুশি এবং হাতেনাতে অলৌকিক শক্তির দ্বারা যে খুনি ধরা পড়ল, সর্বোপরি তাঁরাই যে গুপ্ত সংকেত-এর মানেটা উদ্ধার করেছেন সে খবর ফলাও করে ছাপা হল। তার ফলস্বরূপ ভট্টাচার্য বাড়ির একমাত্র ছেলেকে জেল খাটতে হল খুনের অপরাধে। ২ নমস্কার, আমি বিকাশ, এখন থেকে এই গল্পটি আমার বয়ানে পাবেন। কারণ আগের ঘটনাটি যিনি লিখেছিলেন, সেই নিশীথবাবু মারা গিয়েছেন দুদিন হল। স্থানীয় সংবাদপত্রে তার ডায়েরী থেকে উদ্ধার পাওয়া এই ঘটনাটি ছাপা হয়েছে জন সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। বিধির কি বিধান দেখুন! জনতাকে সচেতন করা হচ্ছে যাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে, উনি নিজেই এতটা অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও রয়ে গেলেন অসচেতন এবং ঘোর মৃত্যু এসে গ্রাস করল তাঁকে। বিনুর উপর দিয়ে যাওয়া সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার পর প্রায় দুবছর কেটে গেছে। এখন আমার ইঞ্জিনিয়ারিং - দ্বিতীয় বর্ষ। ক্লাস চলছে ফ্লুইড মেকানিক্স এর। প্রোফেসর দিগন্ত দেব নিজের মনে ক্লাস নিয়ে চলেছেন। এদিকে আমি নিজের মত করে লিখে চলেছি ক্লাস ডায়েরী। লাস্ট বেঞ্চে বসার এই এক সুবিধা। সেসব যাক, বরং ডায়েরীতেই মন দিইঃ সেই সব দিন, পাশের বাড়ির গৌরী গেয়েই চলেছে সকাল থেকে সেই এক কর্ণপীড়াদায়ী লাইন, ‘তোড়া যে যা বলিসস ভাই, আমাড় সোনাড় হড়িন চাই’; ‘স’ এর উচ্চারণ যেখানে প্রকৃতই ‘স’ এর মত। এদিকে গ্রামের বখাটে ছেলেরা একটা ছড়া বানিয়েছে যেটা রাস্তায় ঘাটে নাকি প্রায়ই শোনা যায়, ‘ভচচায বাড়ির ছেলে/খুনের দায়ে জেলে।’ নিশীথবাবুর হঠাৎ করেই মৃত্যু হল সেই একই জায়গায়, দুবছর আগে যেখানে ওই ঘটনাটি ঘটেছিল। এত এত ঘটনা রোজ গ্রামে ঘটে চলেছে আর আমি এখানে বসে সময় নষ্ট করছি সামান্য পড়াশুনার পিছনে? যেগুলো আগেই লোকে আবিষ্কার করে গেছে, নতুন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা যেখানে নেই, থাকলেও অন্তত আমার দ্বারা যেটা সম্ভব নয়, সেই বিষয়ে পড়াশুনা করে আমি কি পাবো? - চাকরী... এই যে ক্লাসে বসে এইসব হিজবিজি লিখলে চাকরী তো দূরের কথা, পাশই করবে না। দেখি দেখি কী লিখেছ? এই বলে তিনি আমার খাতাটা কেড়ে নিলেন এবং দুচারলাইন যা লিখেছিলাম পড়লেন। তারপর খাতার ফাঁকে রাখা ভচচায বাড়ির ছেলের জেলে যাওয়ার খবরের জেরক্সটা দেখলেন এবং চুপিচুপি বললেন, ‘এটা কি ভৌতিক ঘটনা? আমি রাখতে পারি একদিনের জন্য?’ কেউ বাংলা লেখা চেয়ে পড়লে মনটা খুশীতে ভরে যায়। বললাম, ‘নিশ্চয়ই রাখবেন। হ্যাঁ, এটা সত্যি ঘটনা, এবং আমার নিজের চোখে দেখা।’ দিগন্তবাবুর চোখদুটো চকচক করে উঠল, অবশ্য সেটা বুঝতে না দিয়ে জেরক্সটা নিয়ে টেবিলে গেলেন এবং গম্ভীর মুখে পড়ানোয় মন দিলেন। ক্লাস শেষে ধমকের সুরে আমাকে বলে গেলেন, ‘টিফিনের পর দেখা করবে একবার আমার সঙ্গে।’ টিফিনের খাওয়াদাওয়া শেষে ভয়ে ভয়ে গেলাম টিচার্স রুমে। না জানি কি ধরণের ব্যবহার করবেন তিনি আমার সাথে। উনি তখন গল্পের শেষ পাতাটা পড়ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘আরে বিকাশ যে, এসো। হ্যাঁ হ্যাঁ, এই চেয়ারটায় বসো।’ পাশেই বসে ছিলেন সুচন্দ্রা ম্যাডাম। উনি আমাদের মধ্যে কোনও গভীর ব্যাপারে আলোচনা হবে আন্দাজ করে উঠে গেলেন। এই ফাঁকে সুচন্দ্রা ম্যাডামের ব্যাপারে একটু বলে নিই। উনি স্বভাবে শান্ত, নিরীহ। শাড়ির সাথে কেটস জুতো পড়ে অফিস আসেন, এবং যেকোন প্রশ্নের, তা সে যত সহজই হোক না কেন, উত্তর দিলেই সারা ক্লাসকে হাততালি দিতে উৎসাহিত করেন। কোন জটিলতার মধ্যে এবং অন্যের কথায় থাকেন না। তাই হয়ত এই মুহূর্তে তিনি বেরিয়ে গেলেন। এখন দিগন্তবাবুর গম্ভীর ভাবটা কমে এসেছে। তিনি অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এটা সত্যি নাকি? এখানে আবার তোমার নামও আছে দেখছি। তার মানে তুমি এই পুরো ঘটনাটা সামনাসামনি দেখেছো?’ ‘হ্যাঁ, এবং যিনি এই গল্পটা লিখেছিলেন, তিনিও ওই একইভাবে, একই জায়গায় গতকাল মারা গেছেন।’ আমি হতাশার সুরে বললাম। ‘তাহলে তো ‘ভচচায বাড়ির ছেলে’ অভিযোগটা ধোপে টেকে না? নিশ্চয়ই এরপর ছেলেটা জেল থেকে ছাড়া পাবে।’ দিগন্তবাবুর চোখে তখন উত্তেজনা ভরপুর। ‘সে তো আগেই পাওয়া উচিৎ ছিল। পোস্টমর্টেমে যখন বেরোল যে শ্রী গোবিন্দনারায়ণ চৌধুরী হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন, তখন সেই পুলিশ অফিসারই পাল্টা অভিযোগ আনলেন, ‘হয়ত ও জঙ্গলে গিয়ে ভয় দেখিয়ে কিম্বা অন্য কোনভাবে হার্ট অ্যাটাক হতে বাধ্য করেছে। আর তাছাড়া গোবিন্দবাবুর আত্মা যখন ওই... কি যেন নাম ছেলেটার? ‘বিনু’, আমি ধরিয়ে দিলাম... ‘...হ্যাঁ যখন ও বিনুর মধ্যে ঢুকে তোমাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করল, তোমরাই তো বলেছ সবকিছু, সেসব কি মিথ্যা?’ এরপর আর কোনও ব্যাখ্যা চলেনা। তাছাড়া নিজে হাতে কেস সমাধা করার ক্রেডিট কেইবা হাতছাড়া করতে চায়। হয়ত বেশী কিছু বলতে গেলে ধরে ফাটকে ঢুকিয়ে দেবে। কিন্তু একটা খটকা আমাদের থেকেই গেল।’ ‘কি খটকা?’ ‘গোবিন্দবাবুর অশরীরী যদি বিনুর মধ্যে ঢুকেই থাকবে, তাহলে সোজাসুজি অপরাধীর নামটা বলে দিলেই তো পারতেন। এইরকম একটা বাজে ধাঁধাঁ তৈরী করে সনাক্তকরণের কি সত্যিই কোনও উদ্দেশ্য ছিল?’ ‘সেটা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা তুমি তো সেই সময় ওখানে ছিলে, ঠিক কি কি ঘটেছিল আর একবার বল তো। মানে এমন কিছু যা এখানে লেখা হয়নি...’ ‘মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বিনুর জ্ঞান ফেরানো হল। বিনু এবং আমরা তিন-চারজন বাদে বাকী সবাই ঘুরপথে বাড়ি ফিরে গেল। সাঁতার কাটার রিস্ক আর কেউই নিতে চাইল না। আমরা এতটাই হতভম্ব হয়েছিলাম যে শেষ পর্যন্ত দেখে যাওয়াই ঠিক করলাম। আমদের দুই গ্রামের থানা যেহেতু সোনাগাঁয়েই, তাই ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশ এল। অবশ্য তার কিছু আগেই আমাদের গ্রামের বেশ কয়েকজন এপারে পৌঁছে গেছেন সে দৃশ্য দেখতে; নিশীথবাবুও ছিলেন। অল্প অল্প পচনের গন্ধ আসছে, তবুও নাক চেপে থেকেও দেখার সে কি আগ্রহ। আমাদের কাছ থেকে সব শুনলেন তাঁরাও। নিশীথবাবু মৃতের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন এবং উপুড় হয়ে থাকা মৃতদেহকে সোজা করলেন। কি বীভৎস সে দৃশ্য। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে কি এক তীব্র আতঙ্কে। বিনু বেশ ভয় পেয়েছে বোঝা গেল। যদিও ওই হঠাৎ শক্তির উদয় হওয়ার ব্যাপারে কিছুই বলতে পারল না।’ ‘আচ্ছা এই নিশীথবাবু লোকটি ঠিক কেমন?’ ‘উনি অঙ্কের টিউশনি করেন এবং শখের কবি। আমি কোনওদিন ওনার কাছে পড়িনি, কিন্তু শুনেছি বিষয়গত জ্ঞান অসাধারণ। তার বাইরে সাধারণ মুখ চেনা আর কি।’ ‘তুমি বলছ গ্রামের লোকেদের মধ্যে নিশীথবাবুই প্রথম ওনার কাছে গিয়েছিলেন। ওনাকে ঘটনাস্থল থেকে কোন জিনিস পকেটস্থ করতে দেখেছ কি?’ দিগন্তবাবুর কৌতূহল তখন চরমে। ‘না তেমনভাবে আমরা লক্ষ্য করিনি। তবে অন্যরা যেখানে নাক সিঁটকে দূরে গিয়ে পুলিশ আসার অপেক্ষা করছিলেন, নিশীথবাবু কিন্তু ওই গোবিন্দবাবুর দেহের পাশেই ঘুরঘুর করছিলেন অনেকক্ষণ ধরে।’ ‘হুঁ, যেটা আন্দাজ করেছিলাম।’ দিগন্তবাবু টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা খুলে নিজের ক্যালেন্ডারটা দেখে নিলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা তোমাদের গ্রামে আমাকে একবার নিয়ে যাবে?’ ‘আপনি যাবেন স্যার?’ ‘হ্যাঁ তোমাদের ওই ভচচায বাড়ির ছেলের কেসটা একটু দেখতে হচ্ছে ভাই।’ ‘তা চলুন না আমাদের বাড়ি, কোনও অসুবিধা হবে না। কাল শুক্রবার, কাল বিকেলে তো বাড়ি যাবই।’ ‘না না কাল নয়, আজই। বিকেলের ট্রেনেই চলো বেরিয়ে পড়ি। এক কাজ করো, তুমি হস্টেলে গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। আমি ততক্ষণ প্রিন্সিপালকে বলে ছুটিটা নিয়ে আসি।’ এবার আমার একটু আমোদ লাগল, বললাম, ‘এইভাবে একজন ছাত্রকে কলেজ কামাই করতে উৎসাহ দিচ্ছেন স্যার?’ ‘সবে সেশন শুরু হয়েছে। একদিনের ক্লাসনোট তুমি অন্যদের কাছেও পেয়ে যাবে। কিন্তু একটা দিন পেরিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবেনা। বিশেষ করে যখন একজনের জেলে থাকা না থাকার প্রশ্ন চলে আসছে, যে করেই হোক সত্যিটা জানতেই হবে। যদি আমার কাছে এই ঘটনাটা এসে না পৌঁছাত তাহলে অবশ্য কোন ব্যাপার ছিলনা। কিন্তু যখন একবার আমার হাতে ভগবান কেসটা তুলে দিয়েছেন কিছু একটা তো করেই ছাড়ব।’ এমন যেচে ছাত্রের পড়া কামাই করিয়ে তারই বাড়িতে ঘুরতে যাওয়ার দাবী করা শিক্ষক এই প্রথমবার দেখলাম। দেখা তো দূরের কথা এমন ঘটনা আদৌ ঘটতে পারে সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিলনা। এ তো গেল কথার কথা। আসল কথা হল আমার ক্লাস নোট নেওয়া বা ক্লাস করার ব্যাপারে কোনও আগ্রহই ছিলনা। নেহাৎ বলতে হয় তাই... দূর্গাপুর থেকে ট্রেনে বর্ধমান এবং সেখান থেকে বাসে মনোহরপুর পৌঁছলাম। সন্ধ্যা সাতটা। বাস থেকে নেমেই বুঝলাম আগের সপ্তাহে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক খুনগুলো নিয়ে এলাকা বেশ অশান্ত। জায়গায় জায়গায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সাদা পোষাকের পুলিশদেরও চেনা যাচ্ছে মুখচোখ দেখে। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই তুলে নিয়ে যাবে একেবারে হাজতে। পরিস্থিতি তেমন খারাপ বুঝলে গুলিও চলতে পারে যখন তখন। ধীরে ধীরে এই জায়গাগুলোয় রিক্সা উঠে যাচ্ছে। দুএকটা দেখা গেলেও আগের সেই প্রাচুর্য আর নেই। সেই জায়গা দখল করেছে ই-রিক্সা বা যাকে বাংলায় আমরা টোটোগাড়ি বলি। তাতে করেই বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছলাম। আজ বাড়িতে কেউ নেই। সবাই গেছে এক আত্মীয়ের বিয়েতে। ব্যাপারটা ভুলেই গেছিলাম, নাহলে স্যার আসার আগেই কথাটা তুলতাম। পাশের বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে দরজাটা খুললাম। বাইরে মাইকে ঘোষণা করছে, আগামীকাল সন্ধ্যায় শ্রদ্ধেয় কবি ও লেখক নিশীথবাবুর স্মরণে এক কবি সম্মেলণের আয়োজন করা হয়েছে। ক্লাবঘরটায় আড্ডা জমেছে দেখলাম। একটু বাইরে পায়চারী করে নিয়ে বাড়ি এসে খিচুড়ি আর ডিমভাজা রেঁধে নিলাম। এ এমনই এক অমৃত যার কাছে স্বর্গসুখ তুচ্ছ। দুজনে খেয়ে উঠতে নটা বেজে গেল। রাস্তার ক্লান্তিতে ঘুমটাও এল খুব তাড়াতাড়িই। ......................................................................................... সকালে ঘুমটা ভাঙল ফোনের শব্দে। বিয়েবাড়ি থেকে আমাকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। আমার একেবারেই যে ইচ্ছা নেই তা নয়। কিন্তু এই অবস্থায় স্যারকে ফেলে যাই কেমন করে। তাই ঘটনাটা বেমালুম চেপে গেলাম। বারান্দায় বেরিয়ে দেখি স্যার একটা সিগারেটে সুখটান দিচ্ছেন আর রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ‘কি ভাবছেন স্যার?’ বলেই মনে হল যেন আমি একটা গভীর ভাবনার বিঘ্ন ঘটালাম। ‘আরে কিছু না, কখন উঠলে?’ হাসিমুখে স্যার বললেন। এই হাসিমুখটা যেন ক্লাসের সেই ক্লাস টিচার দিগন্তবাবুর গম্ভীর বদনটার থেকে অনেকটাই আলাদা। ‘এইমাত্র, ডাকতে পারতেন। বাড়িতে কেউ নেই, জানি আপনার অসুবিধা হচ্ছে, একটু মানিয়ে নেবেন প্লিজ। জানেনই তো হস্টেলে থাকি, সামাজিকতা থেকে অনেকটাই দূরে চলে গেছি।’ ‘আরে এসব নিয়ে নো টেনশন। আমিও তো বছর পাঁচেক আগে হস্টেলেই থাকতাম না কি! কোনও অসুবিধা হবেনা।’ বলেই চট করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন দিগন্তবাবু, ‘যাবে নাকি জায়গাটায় একবার?’ উৎসাহ আমারও ছিল, যদিও ব্যাপারটা আতঙ্কের। রাজী হয়েই গেলাম। মাঠ দেখতে যাচ্ছি এমন হাবভাব নিয়ে রওনা দিলাম দুজনে। খেলার মাঠটা থেকে অনতিদূরেই আমাদের বিঘা পাঁচেক জমি। সেখানটা একবার ঘুরে এসেই খেলার মাঠে যাব ঠিক করলাম। ‘শোনা যায় আমার প্রপিতামহ এই জায়গাগুলো কিনেছিলেন খুব অল্প দামে। চাষাবাদের পক্ষে বেশ উঁচু আর রুক্ষ, পাহাড়ের মত ছিল এখানটা তখন। কিন্তু একটা গোপন অভিসন্ধি ছিল তাঁর। সেটা হল গুপ্তধন। তিনি বেশ আশাবাদী ছিলেন এই জায়গাটাতেই লুকিয়ে রাখা আছে চৌধুরী পরিবারের গুপ্ত ধনসম্ভার।’ আমি বেশ ঐতিহাসিক ভঙ্গীমায় বললাম। ‘তারপর কিছু বেরিয়েছিল?’ ‘হ্যাঁ শয়ে শয়ে সাপ। আর পাহাড় কেটে যে মাটি পাওয়া গেল তা দিয়ে একটা সাময়িক ইঁটের কারখানা করা হল। সেটাও বেশিদিন টিকলনা। অবশেষে এই জায়গাটায় চাষবাস করাই ঠিক হল। তারপর এখানে ফলল স্বর্ণালী শস্য। এটাই তো গুপ্তধন, বলুন।’ ‘তা যা বলেছ। এবার চলো ওদিকটায় যাওয়া যাক।’ উনি পা বাড়ালেন। আমিও পিছু নিলাম। কার্তিকের সকাল। শ্রাবণীর দুপাশে রাশি রাশি কাশের বুকে ঝরে যাওয়ার ব্যাথা। ধানের জমিগুলোতে একটু একটু করে স্বর্ণালী আভা লাগতে শুরু করেছে। হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় মনে পরিয়ে দিচ্ছে সেই মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের দিনগুলো। এই হাওয়ায় একটা আতঙ্কের পরশ বয়ে যেত শিরদাঁড়া বেয়ে, খালি মনে হত কিছুই তো পড়া হয়নি। স্যারকে এপার থেকেই সবকিছু দেখালাম পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সহ। আসলে ওপারে যাওয়ার মত সাহস তখনও করে উঠতে পারিনি। কবি সম্মেলনে যাওয়ার জন্য বিকেল থেকেই আগ্রহ বাড়ছে। আর কিছুক্ষণ পরেই আরম্ভ হয়ে যাবে সেই অনুষ্ঠান। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের থেকেও বেশী আকর্ষণীয় নতুন নতুন কবিদের কবিতাপাঠ। তাড়াতাড়ি পৌঁছে সামনের দিকে চট পাতলাম। শহরের মানুষ উনি, হয়ত একটু অসুবিধা হবে, তাও মানিয়ে নিতে হবে আর কি। এই সভাতেই প্রথমবার নিশীথবাবুর কবিতা শুনলাম। আসলে উনি তো লিটল ম্যাগাজিনে লিখতেন, সেগুলো কিনে পড়ার খুব একটা সুযোগ হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় কবির কবিতা পাঠের সময় গ্রামের প্রবীণ গোছের মানুষ শ্যামচরণবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমিও কিছু বলতে চাই ওনার সম্পর্কে। একেতো তিনি লুঙ্গি পরে এসেছেন, তার উপর খালি গা। তাই ওনাকে উঠতে দেওয়া হলনা। যাইহোক, অনুষ্ঠানের বেশিরভাগটা জুড়েই তাঁর স্মৃতিচারণ আর কবিতাপাঠ। তাঁর কবিতার ছত্রে-ছত্রে ফুটে ওঠে গ্রামের প্রতি প্রেম, নিবিড় টানের কথা। সবার শেষে তাঁরই ছেলে পাঠ করলেন তাঁর লেখা একটা কবিতা যার লাইনগুলো বেশ মন টানল। কয়েকটা লাইন যেমন, পা ধুয়ে নিই প্রবাহমানা জলে, ছলাৎ ঢেউ উথলে উঠে বলেঃ শুনবি নাকি আমার কথা চুপে? কেমনে বাঁচি ইতিহাসের স্তুপে? এই রকমের আরও কতকগুলি কথা যা সহজ সরল, কিন্তু মন কেড়ে নেয়। ফেরার সময় দিগন্তবাবু বললেন, ‘চলো, একবার থানাটা ঘুরে আসি।’ ‘এখন, মানে এই রাত্রে?’ আমি অবাক হলাম। ‘হ্যাঁ, সাইকেল দুটো বের করো।’ এই দুদিনে স্যারের উপর বেশ খানিকটা ভরসা জন্মেছে। মনে হচ্ছে এই ঘটনার কিছু কিনারা করতে উনিই পারবেন। অতএব বিনা বাক্যব্যয়ে সাইকেলে রওনা হলাম থানার উদ্দেশ্যে। থানার যত কাছে এগিয়ে আসি, বুক ঢিপঢিপ ভাবটা ততই যেন বাড়তে থাকে। মনে হয় একদিন এই ভূতের খপ্পরে নাহলে পুলিশের খপ্পরে ঠিকই আমি মারা পরব। ‘কি দরকার?’ বাইরের চেয়ারে বসে থাকা খাঁকি পোষাকের ভদ্রলোক বললেন। ‘একটু বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে।’ স্যারের উত্তর। ভদ্রলোক শাণিত দৃষ্টিতে একটু মেপে নিয়ে বললেন, ‘অ্যাপয়নমেন্ট নিয়েছেন?’ ‘সেটা কিভাবে নিতে হয়? ভিতরে গিয়ে?’ স্যারের এই প্রশ্নে আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বললাম, ‘বলুন ওই শ্রাবণীর পারের কেসটা নিয়ে কিছু বলতে চায়, একজন প্রত্যক্ষদর্শী এসেছেন।’ এরপরে আর কেইবা আপত্তি করে! তবুও রাগত স্বরে ভদ্রলোক বললেন, ‘ফোনে কথা বলে আসতে হয় আগে থেকে। দাঁড়ান এখানে, জিজ্ঞেস করে আসছি।’ ভদ্রলোক ফিরে এলে জানা গেল বড়বাবু ডেকেছেন। ‘আসুন, বলে ফেলুন কি চাই? আপনি নিশীথবাবুর মার্ডারটা সামনে থেকে দেখেছেন?’ বড়বাবু সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন দিগন্তবাবুকে। ‘আমি। নিশীথবাবুর নয়, দুবছর আগের গোবিন্দবাবুর সময়ে আমরাই দেহটা প্রথম দেখেছিলাম স্যার। তারপরই তো বিনু... মানে ওই ছোট্ট ছেলেটার ওইরকম...’ আমি তোতলাতে থাকি। ‘এই গল্প আমার অনেকবার শোনা, নতুন কিছু থাকলে বলো।’ বড়বাবুর কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি। এবার হাল ধরলেন দিগন্তবাবু, ‘আসলে আমরা এই মৃত্যুটার প্যাটার্ন সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছি। যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি এই তদন্তে খানিকটা সাহায্য করতে পারি।’ ‘পুলিশ নিজের মত করে তদন্ত করছে, তুমি আবার নতুন কি করবে?’ ‘দেখুন স্যার ভুল বুঝবেন না, তবে আমি হলফ করে বলতে পারি ওই তন্ময় ভচচায নির্দোষ। শুধুমাত্র কিছু তথ্য জানার অপেক্ষা। আমি কলেজে পড়াই, এই দেখুন আমার কার্ড। কথা দিচ্ছি কোনওরকম অসুবিধার সৃষ্টি করবনা আপনাদের। শুধুমাত্র একটা সাহায্য চাই আপনার কাছে।’ ‘বলে ফেলুন, আমি তো দানছত্র খুলেই বসে আছি।’ বিরক্তি হতাশা সবকিছু মিলেমিশে একাকার বড়বাবুর গলায়। ‘মৃত নিশীথবাবুর কাছ থেকে সন্দেহজনক কিছু কি পাওয়া গিয়েছিল? জাস্ট এমনি জিজ্ঞাসা আর কি।’ ‘কিসব হিজিবিজি কাটা ভাঁজ করা কাগজ। দেখে তো মনে হয় বেশ পুরনো দিনের একটা চিঠি, বাংলা হরফে লেখা। কিন্তু এরকমের লেখা এতবছরের চাকরিজীবনে কখনও দেখিনি। মানেও বোঝা যায়না। ভদ্রলোক হয় পাগল ছিলেন নাহয় গোপনে ডাকাতদলে ভিড়েছিলেন, বুঝলেন?’ বলতে বলতে ফাইল থেকে একজোড়া কাগজ বের করে দেখালেন। প্রথম কাগজটাতে একটু চোখ বোলালাম, একটা চিঠি বলেই মনে হল। শুরুটা অনেকটা এরকম, “য়উ ঐমঐড় চএড়এজএড়কঔ চড়এদএনমএ, ............................................................ইত্যাদি” বাপরে, এমন দাঁতভাঙা বাংলায় কোনওকালে মানুষ কথা বলত নাকি, মনে মনে ভাবলাম। তবুও হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না। এখানে বোধগম্য কিছুই নেই, এই ভেবে পরের পাতায় গেলাম। পরের পাতার একদম শেষে খুব ছোট্ট হরফে একটা ছড়া, ছড়া না বলে ধাঁধাঁ বলাই ভাল, কারণ শেষের লাইনে তার উল্লেখ আছে। ‘শ্রাবণীর বাঁকে বাঁকে বর্ণ পরিচয় চন্দ্রকে গ্রহ করে পঞ্চাশে তাই রয়। বলবৎ বল ছেড়ে বাদ দিয়ে দেবে তাহলেই এ ধাঁধার মানে খুজে পাবে।।’ অনেক কষ্ট করে রাজি করিয়ে কাগজদুটোর জেরক্স নিয়ে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। অবশ্য আমাদের পরিচয় এবং ছবি সবকিছুই থানায় রেখে তবেই আমাদের ছাড়া হল। দিগন্তবাবু কাগজদুটো পেয়ে অব্দি ওদিকেই আটকে রইলেন। রাত বারোটা নাগাদ রান্না শেষ হল। ভাত, ডালসিদ্ধ, আলুসিদ্ধ, আর ডিম ভাজা। সঙ্গে বাড়ির ঘি। খেতে খেতে ওনার প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, শ্রাবণী নদীটার কোনও ম্যাপ আছে তোমাদের বাড়িতে?’ ‘তা হয়ত দলিলের বাক্সে থাকবে, কিন্তু সে দিয়ে কি হবে?’ ‘এই দেখেছিস, এখানে বলেছে, শ্রাবণীর বাঁকে বাঁকে... তারমানে নিশ্চয়ই... থাক, কাল সকালেই দেখব।’ এই বলে লম্বমান হলেন তিনি। হঠাৎ স্যারের মুখে ‘তুই’ ডাকটা কেমন যেন ভালো লাগতে শুরু করল, মনে হল উনি তো আমাকে ‘তুই’ বলতেই পারেন। ‘তুমি’ ডাকটা কেমন যেন কৃত্রিম। পরদিন সেকথা বেমালুম ভুলে গেলাম ওনার একের পর এক দাবীতে। চা খেতে খেতে প্রথম প্রশ্নই হল, ‘মনে আছে, সেদিন যে লোকটাকে স্টেজে উঠতে দেওয়া হলনা? ওনার কাছে একবার যেতে হবে।’ ‘হঠাৎ? ওখানে কিন্তু স্যার কিছুই জানা যাবেনা।’ ‘কেন?’ ‘উনি বড় ভালো লোক ছিলেন। কিন্তু ছেলে আর বৌয়ের অত্যাচারে, এখন কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে গেছেন। মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে তেড়ে আসেন। কিছুটা বিকারগ্রস্তও বলা যেতে পারে।’ স্যারের চাপে রাজী হতেই হল। এদিকে বিয়েবাড়িতে ফোন করে জানলাম, ওদের জোড়াজুড়িতে মা-বাবা আরও একদিন থেকে যেতে রাজী হয়েছেন, অর্থাৎ রবিবারে ফিরবেন। আমাদের হাতে স্বাধীন আরও একটা দিন পাওয়া গেল। হাজির হলাম সেই বৃদ্ধ অর্থাৎ শ্যামচরণ চক্রবর্তীর বাড়ি। খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ঘর, ছোট্ট বারান্দায় মশারি টাঙানো। ভদ্রলোক সম্ভবত বেরিয়েছেন কোথাও। পাশেই দোতলা দালান ঘর। তাঁর ছেলের। সকালের মিষ্টি হাওয়া আর নরম আলোয় পুকুর পারের বাড়িটাকে সবে ভালো লাগতে শুরু করেছে এমন সময়ে শ্যামবাবু নিমের দাঁতন করতে করতে ফিরলেন। ‘নমস্কার। আমরা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।’ ‘আপনারা? পুলিশের লোক তো নন মনে হচ্ছে।’ তারপর একটু অন্যমনস্ক হয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। দুটো চাটাই হাতে বেরিয়ে এলেন। আমাদের বসতে নিয়ে মশারিটা গোছাতে গোছাতে অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘আমি জানতাম একদিন কেউ না কেউ আসবে, আসবেই। আমাকে কেউ পাত্তা দেয়না জানেন। দিলে আমি কিছুটা উপকারে লাগলেও লাগতে পারতাম। কিন্তু...’ ‘আমরা পুলিশের লোক নই। শুধু জানতে এসেছি আপনি ওই মৃত্যুগুলোর ব্যাপারে যদি কিছু জানেন আর কি। বুঝতেই তো পারছেন, ভচচায বাড়ির ছেলে, তন্ময়, বিনা অপরাধে জেল খাটছে।’ ‘বিনা অপরাধে। হ্যাঁ সেই বটে। ওরা সবাই পূর্বপুরুষদের কর্মফল ভোগ করছে। তোমরা কিন্তু সাবধান। ওই লোভের ফাঁদে কখনও পা দেবে না।’ ‘কিসের লোভ?’ আমি প্রশ্ন করলাম। ‘তোমরা এটার জন্যই এসেছ তো?’ শ্যামবাবুর চোখে শাণিত চাহনি, হাতে একটা পুরনো দিনের জরাজীর্ণ ম্যাপ। নিচে লেখা শ্রাবণী-লিপি। ‘নিশীথবাবুও এসেছিলেন। কিচ্ছু উদ্ধার করে উঠতে পারেননি। শুধুমুধু প্রেতের হাতে প্রাণটা খোয়ালেন।’ ‘আপনি নিশ্চিত, এটা প্রেতেরই কাজ? মানুষের নয়?’ ‘হ্যাঁ, আর এও জানি একমাত্র আমিই পারব কিছু একটা সমাধান বের করতে।’ ‘তাহলে করছেন না কেন?’ সন্দেহের স্পষ্ট ছাপ দিগন্তবাবুর কণ্ঠে। ‘সেদিন স্টেজে আমাকে উঠতেই দেওয়া হলনা। এরকমই আরও কত কি হয় আমার উপর, তোমরা তার কোনও খবর রাখো? বরং এবার এসো তোমরা, নিজেরা যদি কিছুটা এগোতে পারো, তাহলে আবার এসো।’ ‘কিছু যদি মনে না করেন, এর একটা ছবি তুলতে পারি?’ ‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ মোবাইলটা বের করে ছবি তুললেন উনি। তারপর সেই ছবির বেশ কয়েকটা প্রিন্ট করানো হল। দিগন্তবাবু এক-একটা প্রিন্ট নেন আর বিভিন্ন রকম আঁক কাটেন। স্কেল দিয়ে নানান মাপ করেন আবার রেখে দেন। এভাবেই দুপুরটা কেটে গেল। বিকেলের দিকে বললেন, এই দেখো বুঝতে পারছ কিছু?’ কাগজটা হাতে নিলাম। বললাম, ‘কিছুটা। তার মানে এই হল আমাদের শ্রাবণী লিপি, তাইতো?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘হ্যাঁ এই দিয়েই উন্মোচিত হবে যত রহস্য। কই সেই চিঠিটা দাও দেখি।’ তাক থেকে চিঠিটা আনলাম। প্রথম লাইনটা এরকম, “য়উ ঐমঐড় চএড়এজএড়কঔ চড়এদএনমএ,” ‘য়’ অর্থাৎ ৪৭ নম্বর, ওটার জায়গায় হবে ৪৪ নম্বর অর্থাৎ ‘হ’। তারপর কি আছে? ‘উ’ মানে হল গিয়ে ৫, তার জায়গায় হবে ৯ অর্থাৎ ‘এ’। এইভাবেই প্রথম লাইনটার মানে দাঁড়ালঃ ‘হএ আমআর পঅরঅবঅরতঈ পরঅজঅনমঅ’ অর্থাৎ ‘হে আমার পরবর্তী প্রজন্ম’। ‘ধুর এইভাবে কার্ভ দেখে দেখে হচ্ছেনা। একটা ছক করো দেখি যাতে সহজেই জিনিসটা ডিকোড করা যায়।’ স্যার বললেন। অতএব আমি পয়েন্টগুলো থেকে ছক বানাতে শুরু করলাম। ছকটা মোটামুটি এরকম দাঁড়ালঃ ১ অ → ৯ এ ২ আ → ১০ ঐ ৩ ই → ১১ ও ৪ ঈ → ১২ ঔ ৫ উ → ১ অ ৬ ঊ → ২ আ ৭ ঋ → ৩ ই ৮ ঌ → ৮ ঌ ৯ এ → ৫ উ ১০ ঐ → ৬ ঊ ১১ ও → ৭ ঋ ১২ ঔ → ৪ ঈ ১৩ ক → ২৩ ট ১৪ খ → ২৪ ঠ ১৫ গ → ২৫ ড ১৬ ঘ → ২৬ ঢ ১৭ ঙ → ১৭ ঙ ১৮ চ → ২৮ ত ১৯ ছ → ২৯ থ ২০ জ → ৩০ দ ২১ ঝ → ৩১ ধ ২২ ঞ → ২২ ঞ ২৩ ট → ৩৩ প ২৪ ঠ → ৩৪ ফ ২৫ ড → ৩৫ ব ২৬ ঢ → ৩৬ ভ ২৭ ণ → ২৭ ণ ২৮ ত → ১৩ ক ২৯ থ → ১৪ খ ৩০ দ → ১৫ গ ৩১ ধ → ১৬ ঘ ৩২ ন → ৩২ ন ৩৩ প → ১৮ চ ৩৪ ফ → ১৯ ছ ৩৫ ব → ২০ জ ৩৬ ভ → ২১ ঝ ৩৭ ম → ৩৭ ম ৩৮ য → ৪৪ হ ৩৯ র → ৪৫ ড় ৪০ ল → ৪৬ ঢ় ৪১ শ → ৩৮ য ৪২ ষ → ৩৯ র ৪৩ স → ৪০ ল ৪৪ হ → ৪৭ য় ৪৫ ড় → ৪১ শ ৪৬ ঢ় → ৪২ ষ ৪৭ য় → ৪৩ স ৪৮ ং → ৪৮ ং ৪৯ ঃ → ৪৯ ঃ ৫০ ঁ → ৫০ ঁ এবার বেশ সহজ হয়ে গেল চিঠিটা পড়া। চিঠিতে পেলাম, “হে আমার পরবর্তী প্রজন্ম, ১৩ই মে, ১৯৩৩ আমি অনন্তনারায়ণ চৌধুরী, পিতা ঁবসন্তনারায়ণ চৌধুরী, নিবাস মনোহরা, জমিদারবাটি। যে বিশেষ কারণে এই পত্রের অবতারণা তাহা হইল, আমাদের বংশ আজ অতি সঙ্কটাপন্ন অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতেছে। দেশের যে ভয়াবহ অবস্থা তাহাতে যেকোন মুহূর্তে আমাদের নিকট হইতে সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইতে পারে, এই আশঙ্কা করিয়া পিতা যক্ষ কর্তৃক সম্পত্তি আগলাইবার ব্যবস্থা করিয়া যান। কুলপুরোহিত চক্রবর্তী মহাশয় তখন কোন এক অজ্ঞাত কারণে শহরে গিয়াছিলেন। অতএব ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ আসিয়া সেই আয়োজন সম্পন্ন করেন। কথিত আছে, গরীবের সন্তানকে যক্ষ বানাইলে তাহার মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটে, অথচ সেই যক্ষ সম্মান প্রদানের পূর্বেই বাগদী বালকটি প্রস্থান করিল সেই স্থান হইতে। সেই ক্ষণে আর একটি বালককে নদীতীরে দেখা যায় এবং তাহাকেই ভুলাইয়া নিবেদন করা হয় যক্ষ হিসেবে। উহাকে ভূতলে বন্দি করিবার পর দুই দিনকাল অতিবাহিত হয়। চক্রবর্তী মহাশয় আপন কার্য সমাধা করিয়া জানিতে পারেন উহার পুত্র নিখোঁজ। খোঁজ করিতে উনি জমিদার গৃহে আসিয়া উপস্থিত হন। তাঁহার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী সেই বালকটিই ছিল চক্রবর্তী মহাশয়ের সন্তান, যাহাকে যক্ষপুরীতে রাখিয়া আসা হইয়াছে। তাহাকে না বলা হইলেও কোনও এক তান্ত্রিক মারফৎ তিনি এই সংবাদ পান, এবং সন্তানের উদ্ধারে সেই স্থানে পৌঁছান। পিতার এক বাক্য, একবার যাহাকে যক্ষপুরীতে পাঠানো হইয়াছে, মৃত হউক বা জীবিত, উহাকে বাহিরে আনা যাইবেনা। বেগতিক দেখিয়া এবং ইংরাজ পুলিশদের নিকট খবর পৌঁছাইলে কি হইবে তাহা চিন্তা করিয়া লাঠিয়াল কর্তৃক চক্রবর্তী মহাশয়কেও হত্যা করিয়া যক্ষপুরী নিকটস্থ ভূমিতে প্রোথিত করা হয়। মৃত্যুপূর্বে উনি অভিসম্পাত করেন যে, এই বংশের শেষ রক্তবিন্দু দেখিয়া তবেই তিনি মুক্তি লইবেন। যদি আমাদের বংশের কেহ ওই ভূমির কাছাকাছি পৌঁছান তাহা হইলেই তাহার মৃত্যু হইবে। এক চতুর প্রেতবিশারদের শরণাপন্ন হইয়া পিতৃদেব উহার আত্মাকে স্মরণ করেন এবং ব্যক্ত করেন যে, সেক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীকে অর্থ প্রদান না করিয়া ওনার সন্তানের মুক্তি হইবে কিভাবে? অনেক অনুনয়ের ফলস্বরূপ ব্রাহ্মণ মহাশয়ের প্রেত নিয়ম কিছুটা শিথিল করেন। বলেন, যদি কেহ ঐ অর্থ ভোগের আশা না করিয়া, কোন জনকল্যানে ব্যয় করিবেন স্থির করেন তাহাকেই ঐ অর্থের উত্তরাধিকারী বলিয়া স্থির করা হইবে এবং তাহার উপর কোন অপঘাত ঘটিবে না। সুতরাং যেই আমার এই পত্রখানি পাইয়া থাকো, ভোগ সংবরণ করিয়া শুদ্ধচিত্তে ওই অর্থ লহিয়া জনকল্যানে ব্যয় করিবে এবং বংশকে অভিশাপমুক্ত করিবে, ইহাই আমার অভিপ্রায়। শ্রাবণীর উপরিস্থিত ত্রিভূজভূমি স-হ-ড় তে উহার সন্ধান পাওয়া যাইবে।” চিঠি শেষ করে আমার মনে হল শ্যামচরণবাবুর বাড়িতে একবার যাওয়া দরকার। স্যারকে সে কথা বলতে দেখলাম উনি এককথায় রাজী। হয়ত উনিও একই কথা ভাবছিলেন। সন্ধ্যেবেলা। রাস্তায় যেতে যেতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা এই ছড়াটার মানে কিভাবে বের করলেন একটু বলবেন। বেশ কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি, কিন্তু পুরোটা নয়।’ স্যারের হালকা হাসির আভাস তাঁর কথাতেই পাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, ‘চিঠিটার তারিখ হয়ত খেয়াল করেছ। সাল ১৯৩৩। তারই আগের বছর অর্থাৎ ১৯৩২-এ বর্ণপরিচয়ের সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সেখানে ছিল ১২ টি স্বরবর্ণ এবং ৪০ টি ব্যঞ্জন বর্ণ। তার মধ্যে দুটিকে বাদ দিতে হল, ‘ব’ আর ‘ৎ’, ‘বলবৎ’ এর ‘বল’ রেখে দিতে বলা হয়েছে নিশ্চয়ই দেখেছ। তার মানে একটা ‘ব’ থাকল আর একটা গেল বাদ। এবার আসি গ্রাফটার কথায়। এক-এ চন্দ্র, আবার এক-এ আসে প্রথম বর্ণ ‘অ’, নয়-এ নবগ্রহ আবার সেইসঙ্গে নয়-এ হয় নবম বর্ণ ‘এ’। অর্থাৎ শুরুর বিন্দুটি হল (১,৯)। শেষের বিন্দুটি ‘পঞ্চাশে তাই রয়’ অর্থাৎ (৫০,৫০)। এবার এক থেকে শুরু আর পঞ্চাশে শেষ হলে সমান ঊনপঞ্চাশ ভাগে ভাগ করতে হয় শ্রাবণীর গতিপথকে। সেটাই করলাম, আর ভাগ্য সুপ্রসন্ন, তাই মিলে গেল উত্তর।’ শ্য্যামবাবুর বাড়িতে কোনও দরজা নেই। দেখতে পেলাম একটা হ্যারিকেনের আলো-কে কমিয়ে রাখা হয়েছে, তার সামনে চোখ বুঝে বসে কি যেন সুর করে গাইছেন। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম। শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। চোখ খুলেই বলে উঠলেন, ‘চলো, বেরিয়ে পড়া যাক।’ এমন আকস্মিক দাবিদাওয়ার জন্য আমরা তৈরী ছিলাম না। তবুও বৃদ্ধের পথ ধরলাম। পথ ধীরে ধীরে পৌঁছচ্ছে শ্রাবণীর তীরে। নিশির টানে যেন আমরা এগিয়ে চলেছি রাত্রির বুক চিরে, আলপথ বেয়ে। ছোট্ট শিশু বিনুর সাথে যেমনটি হয়েছিল, ওর দেহে প্রবেশ করে কোন এক প্রেত সিদ্ধ করতে চেয়েছিল তার অভিপ্রায়, তেমনটি আমাদের সাথেও ঘটবে না তো। ওইরকম শিশু ছিটকে ফেলে দিয়েছিল দশজন তাগরা জোয়ানকে। তাও আবার যেমন তেমন ধাক্কা নয়, কারও হাতে যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল, কারও পায়ে, কেউ আবার হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল শ্রাবণীর জলে। কি মনে হতে নিজের হাতে প্রচণ্ড জোরে চিমটি কেটে নিজেই ‘আআআ’ করে উঠি। মানে এখনও সজ্ঞানেই আছি। আর এক সপ্তাহ পর কালীপূজো। আজ রাত্রের পর আর কোনও কালীপূজো আসবে কিনা সেই নিয়েই এখন দেখা দিয়েছে সংশয়। অমাবস্যা আসতে কয়েকদিন বাকী, তাই চাঁদের আলো এখনও পুরোটা নিভে যায়নি। দূরে অনবরত হুক্কাহুয়া স্বরে ডেকে চলেছে শিয়ালের দল। ঝিঁঝিরা গেয়েই চলেছে, এক সুরে। আর কি এক আদিম মোহে আমরা এগিয়ে চলেছি যক্ষপুরীর দিকে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে। আমরা সেতু ধরেই নদী পেরোলাম। রাত্রে অন্ততঃ নদী সাঁতরাতে হলনা। একটা ফাঁড়া থেকে তো রেহাই পেলাম। তারপরই সাঁই করে পিছন দিকে কে যেন চলে গেল মনে হতেই চমকে উঠলাম। স্যার বললেন, ‘কুকুর টুকুর হবে বোধহয়।’ আমরা পৌছে গেছি সেই জায়গায়, যেখানে বহু বছর ধরে বন্দি আছে এক ছোট্ট শিশুর আত্মা, অন্ধকারের গহবরে। এবার ঘটল আর এক ঘটনা, কাপড়ে জড়ানো একটা শাবল বের করে ফেললেন শ্যামবাবু। সেটা আমাকে দিয়ে একটা গাছের নিচে খুঁড়তে বললেন তিনি। ‘তার মানে আপনি সবটা...’ ‘হ্যাঁ, আমি সবটাই জানতাম। বাবাকে খুন করে যখন পুঁতে ফেলে, আমি তখন মায়ের পেটে। মা লুকিয়ে গিয়ে মাসির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তারপর দীর্ঘ বারো বছরের সংগ্রাম। স্বাধীনতার পর আমরা আবার গ্রামে ফিরে আসি অবশ্য। তখন জমিদারদের ক্ষমতাও অনেকখানি কমে গেছে। আর পূর্বপুরুষদের কুকীর্তির খবর ওরা নিজেরাই বুঝতে পারেনি হয়ত। নাহলে সেদিন গোবিন্দবাবু যখন ওই লেখাটা নিয়ে আমার কাছে এল, আমি কি আর অভিশাপের কথাটা বেমালুম চেপে গিয়ে ওকে এখানে পাঠাতে পারতাম? চৌধুরী বংশের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমার বাবার মুক্তি দেখে যেতে পারতাম?’ ‘আর নিশীথবাবুর ব্যাপারটা? তাকেও কি আপনিই...’ ‘নিশীথবাবুও আমার কাছে এসেছিলেন এই একই প্রশ্ন নিয়ে। আমি ওকে পুরো ঘটনাটা বলি এবং অনুরোধ করি যাতে উনি না আসেন এখানে। নিজের জেদ আর লোভের কাছে পুরোপুরি হেরে গিয়েছিলেন অত ভালো মানুষটা। হয়ত ওনার দুর্বল হৃদয় বাবার আত্মাকে দেখে ফেলেছিল, আর ওনার লোভকে দেখে ফেলেছিলেন আমার বাবার আত্মা। অতএব...’ বুক ঢিপঢিপ করছে, ইতিমধ্যে হাঁটুসমান খোঁড়া হয়ে গেছে। এরপর মাটিতে শাবলের আঘাত পরতেই ধাতব ঝঙ্কার শোনা গেল। সঙ্গে-সঙ্গে কোথা থেকে যেন শোনা গেল এক শিশুর গগনবিদারী অট্টহাসি। স্যারের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম। ওনারও যে হাত কাঁপছে বোঝা গেল। দুজনেই তাকালাম শ্যামচরণ বাবুর দিকে। ওনার মুখে প্রসন্ন হাসি, ‘ও কিছু নয়। অনেকদিন পর মুক্তির আশায় শিশুমনে খুশীর জোয়ার এসেছে। হাত চালাও তাড়াতাড়ি।’ একে তো ঘামে ভিজে গেছে সারা গা ভয়ে আর ক্লান্তিতে, তার উপর বৃদ্ধের এরকম আচরণ। আর হাত চালাতে পারলাম না। দেখলাম এইবার স্যার শাবলটা নিয়ে খুঁড়তে শুরু করলেন। একটু পরেই পাওয়া গেল লোহার একটা ঢাকনা। প্রচণ্ড শক্তিতে দুজনে মিলে খুলে ফেললাম সেটা। টর্চ লাইট জ্বেলে দেখা গেল ভিতরে একটা সিড়ি। হ্যাঁ, চলো নামা যাক। সামনে শ্যামবাবু, তারপর আমি আর সবশেষে দিগন্তবাবু, এইভাবে নামতে শুরু করলাম। হাসির শব্দটা থেমেছে। অনেক মাকড়সার ঝুল, বাদুড়ের আক্রমণ পেরিয়ে নিচে পৌঁছে যা দেখলাম তা একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল না। ছোট্ট একটা শিশু, অনেকদিনের না আঁচড়ানো জটবাঁধা চুল, দীর্ঘদিনের না খেতে পাওয়া হাড়সর্বস্ব শরীর, একদৃষ্টে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। চোখের পাতা পড়ছেনা একটুও, শুধু অবাক চাহনি তার দুচোখে। ‘দাদা... আমার দাদাটাকে ওরা এভাবে চাপা দিয়ে মারলে... না জানি কতদিন খেতে পায়নি, অন্ধকারে খিদের জ্বালায় ছটফট করেছে।’ কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধের গলা ধরে এল। শিশুটির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই গোপন কুঠুরীতেই আমাদের ঈশারা করে নিয়ে চলল কোন অজানার উদ্দেশ্যে। আমরাও সম্মোহিতের মত চললাম তার পিছু পিছু। একটু এগিয়ে গিয়ে উইয়ের ঢিবির মত জায়গায় পৌঁছে সেখানে উঠে গিয়ে শিশু অদৃশ্য হল। আন্দাজ যদি খুব একটা ভুল না হয়, হয়ত শিশুটির ইহজগতের কাজের এখানেই সমাপ্তি। কিন্তু কপাল তো আর সবসময় আন্দাজমত চলে না। এদিকে লক্ষ্য করে দেখলাম শ্যামবাবু আমাদের সঙ্গে আসেননি। সিড়িতেই বসে আছেন হয়ত। আবার শাবলের কাজ শুরু হল। দুর্বল ঢিবি গুঁড়িয়ে ঝরে ঝরে পড়ল। এবং বেরিয়ে এল একটা পিতলের বাক্স। তালা ছিল না, তাই সহজেই খোলা গেল। ভিতরে যা দেখলাম... এত সোনা জীবনে কখনো দেখিনি। কিন্তু না। এ আমার নয়, এ আমাদের। গ্রামের স্বার্থে খরচ করতে পারলে তবেই এতগুলো মানুষের আত্মবলি সার্থক হবে। হঠাৎ সিড়ির দিক থেকে শব্দ এলো, ‘ইউ আর আণ্ডার আরেস্ট মিস্টার চক্রবর্তী। আজ তোমার সব গল্প আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। এবার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অপরাধে বুড়ো বয়সে যে তোমায় জেলের ঘানি টানতে হবে বাছা।’ এরকম একজন বয়স্ক মানুষকে বাছা বলার প্রতিবাদ করতে যাব ততক্ষণে ওনার ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ফেলেছেন বড়বাবু। কিন্তু ঘুরে তাকানোর বদলে বন্দুকের সামান্য স্পর্শেই শ্যামবাবুর নিথর দেহটা উপুড় হয়ে সিড়ি থেকে পড়ে গেল। এবার বন্দুকের নল ঘুরল আমাদের দিকে। শ্যামচরণ ভট্টাচার্যকে খুন করে গুপ্তধন হাতানোর অপরাধে তোমাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হচ্ছি... বলতে বলতেই চোখ পাকিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন বড়বাবু। ‘ইনিও কি তাহলে টপকে গেলেন নাকি?’ বললাম আমি। ‘পুলিশের হার্ট এত দুর্বল নয়। এত সহজে টপকাবে না। বাইরে নিয়ে গিয়ে জলের ঝাপটা দাও ঠিক হয়ে যাবে।’ শ্যামবাবুর গলা শুনে দুজনেই চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। শুধু একরাশ আদিম গন্ধ নাকের উপর আক্রমণ হানিয়ে জানিয়ে যায় তার অব্যক্ত যন্ত্রণা। জ্ঞান ফেরার পর বড়বাবু নিজের উদ্যোগে গ্রামের উন্নতিকল্পে কিভাবে সেই গুপ্তধন ব্যয় করা যায় তার উপদেশ দিতে শুরু করলেন। আমরাও ওনার এহেন পরিবর্তনে হতবাক। শুধু শ্যামবাবুকে আর বাঁচানো গেল না। প্রতিশোধের আগুনে আর দাদার মুক্তির আশায় তিনি আশিটা বছর কাটিয়ে দিলেন। একেই বোধহয় বলে ভ্রার্তৃপ্রেম। হয়ত তাঁর পুত্র-পুত্রবধু এখন গভীর ঘুমে মগ্ন, জানতেও পারলনা বাবার এইভাবে মৃত্যুর কথা। কিন্তু পুলিশ আছে যখন, নিশ্চয়ই জানাবে। হাজার-হোক, রক্তের টান তো ওনাদের সাথেই। আমরা তো ওনার কাছে দুদিনের সহচর মাত্র। ‘আচ্ছা সবই তো হল, আরও একটা খটকা...’ আমি বললাম। ‘আবার!’ দিগন্তবাবু হাসতে হাসতে বললেন। ‘হ্যাঁ, বলছিলাম ম্যাপে যে দেখাচ্ছে উল্লিখিত স্থানটি অর্থাৎ স-হ-ড় ত্রিভূজটি আমাদের গ্রামে অবস্থিত। এদিকে আমরা গুপ্তধন পেলাম স্বর্ণগ্রামে। ব্যাপারটা যদি একটু খোলসা করেন...’ ‘ভূগোলে নিশ্চয়ই পড়েছ যে নদীর এই ধরণের অতিরিক্ত বাঁক ধীরে ধীরে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদে পরিণত হয়, আর নদী ধীরে ধীরে ঘুরপথ ছেড়ে সোজাপথে প্রবাহিত হতে শুরু করে। জঙ্গলের ওই পাশে জলাশয়টা খেয়াল করেছ? আচ্ছা এবার তোমাকে একটা টেকনিক্যাল প্রশ্ন করি।” ‘নিশ্চয়ই’, আমি বললাম। ‘আগের দিন ফ্লুইডের ক্লাসে লাগ্রেঞ্জিয়ান অ্যাপ্রোচ আর অয়লারিয়ান অ্যাপ্রোচ পড়িয়েছিলাম। বর্তমান ঘটনাটাকে তুমি এই দুটোর মধ্যে কোন শ্রেণীতে ফেলবে?’ এই চ্যাপ্টারের প্রথমে থাকা এই দুটো জিনিসই মাত্র আমি পড়েছিলাম। তাই উত্তর দিতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলনা। ‘নিঃসন্দেহে অয়লারিয়ান ভূত এগুলো। লাগ্রেঞ্জিয়ান হলে তো দেশে দেশে ঘুরে লোক মেরে বেড়াত।’ ‘একদম, প্রাক্টিক্যালে তোমার জন্য দশ নম্বর এক্সট্রা রইল।’ আনন্দে মনে মনে নেচে নিলাম খানিকটা। .......................................................................................... রবিবার সকাল। বাড়ির সবাই আজ দুপুরে ফিরবে। আমরাও এসপ্তাহের ছুটি শেষ করে ফিরে যাব কলেজ জীবনে। তার আগে একবার খেলার মাঠটা দেখতে এলাম। শ্রাবণীর ধারে বসে দিগন্তবাবু গুনগুন করে কি যেন বলছেন। ভালো করে কান পেতে শুনলাম, এ যে নিশীথবাবুর সেই কবিতাঃ ‘পা ধুয়ে নিই প্রবাহমানা জলে, ছলাৎ ঢেউ উথলে উঠে বলেঃ শুনবি নাকি আমার কথা চুপে? কেমনে বাঁচি ইতিহাসের স্তুপে?’ আমিও গলা মেলালাম তাঁর সাথে, ‘কতটা পথ পেরিয়ে এসেছো তুমি, আরও কতক পেরিয়ে যাওয়া বাকী; আমার ঘড়ি তোমার জলস্রোত, ইতিহাসের পরোয়া করে নাকি!’ {/x2} {x1i}3725e884-7b40-4395-bcb4-9ff01a880e05_srabonir.png{/x1i}

361

3

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

দেশের ডায়েরি- ৪ আমাদের ছোটবেলায় কল্যাণী একটি প্রায়-গ্রামদেশ ছিল । আম, জাম, তেঁতুল, নিমের বৃক্ষ ছিল অগুনতি। দিগন্ত বিস্তৃত (তখন সেইরকমই লাগত) মাঠ আর নানাপ্রকারের সবুজের হাল্কা ঘন শেডের ফাঁকে ফোকরে ‌কোলকাতা শহর থেকে দুদিনের জন্য হাঁপ ছাড়তে আসা শৌখিন মানুষদের বাড়ি ছিল গোনাগুনতি। সুন্দর সুন্দর বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। কোনো বাড়ির ভিত কাটা হলেই কেমন করে যেন আমরা খবর পেয়ে যেতাম। যতক্ষণ না ইঁট, বালি, সুরকি, সিমেন্ট পড়ছে, ততক্ষণ সেই কাটা ভিতে, মাথা সমান মাটির গভীরে ঢুকে আমাদের ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা চলতো সারা বিকেল। মাঝে মাঝে বাড়ির মালিকেরা কলকাতা থেকে এসে গাছের তলায় মাদুর পেতে বসে স্বপ্ন বিধুর চোখে, তদগত চিত্তে সেই খালি জমির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কখনো পুরোনো বাসিন্দাদের সাথে বাড়ি সংক্রান্ত আলাপ আলোচনায় মেতে উঠতেন। আমরা ছোট ছিলাম কিন্তু তবুও বুঝতে অসুবিধে হতনা যে বাড়ি ঘিরে তাঁদের কত শত স্বপ্ন! সামনে কেয়ারি করা এক চিলতে ফুলের বাগান হবে। পাঁচিলের পাশ ঘেঁষে সারি সারি দেবদারু গাছ বিকেলের রোদ মেখে লেকের থেকে আসা মিষ্টি হাওয়ায় পাতা নাড়বে মুহুর্মুহু। একদিকে শক্ত পোক্ত কোনো গাছের ডাল বেয়ে দোলনা ঝুলবে। বাড়ির গেট খুললেই লালচে সুরকি বেছানো পথের পাশে সম্ভ্রম জাগানো তুলসী মঞ্চ থাকবে। আর তাতে একটি বাচ্চা তুলসীগাছের ছোট্ট শীর্ষ দীপ্ত ভঙ্গিতে আকাশ ছুঁতে চাইবে। পেছনে কেয়ারটেকারের ঘরের ছাদের অ্যাসবেসটারের চাল বেয়ে লাউ, কুমড়োর লকলকে লতা লতিয়ে উঠবে একদিন। আর আজকের মধ্যবয়সের দ্বার ছুঁয়ে থাকা থাকা যুবক, কালকে প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তে পৌঁছে, ধুলো ধোঁয়ার শহরের পাট চুকিয়ে সবুজের সমারোহে, সতেজ আবহাওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত অলস জীবন কাটাবার স্বপ্ন সাকার করতে এসে পৌঁছবে এই ঠিকানায়। যদিও তাঁদের স্বপ্নালু চোখ বিরক্তিকর কুঁচকে উঠতো যখন তাঁরা তাঁদের ভবিষ্যত স্বপ্নপ্রতীম বাসস্থানে আমাদের হুটোপাটা করতে দেখতেন। তবুও সত্যিই বকাঝকা খাইনি বিশেষ। হয়ত ভবিষ্যত অতি বিচ্ছু প্রতিবেশীদের বিগড়ে রাখবেন না এই সংকল্পে মুখখানা পেঁচোপনা করে নিজেদের বিরক্তি-ক্রোধ কোনক্রমে গিলে নিতেন। সেই সব মায়াবী দিনগুলোতে তাদের আগমন ছিল নিয়মিত। কিন্তু কখনো তারা ঘরের চৌহদ্দির ভিতরে পা বাড়াত না। দূরে, বাগানে আচমকা ঘন সবুজ পাতার আড়ালে আবডালে তাদের পোড়া মুখ নজরে আসত। অনেক সময় কিছু দেখা না গেলেও যখন সজোরে আম-জামগাছের ডালগুলো আচমকা উত্তাল হয়ে উঠত, তখন বোঝা যেত যে তারা এসেছে। আজ সেইসব বৃক্ষের দল অন্তর্হিত। একসময় যে তেঁতুলগাছটির মস্ত গুঁড়ির আনাচে-কানাচে, মাটির ওপর তীব্রভাবে উঁচু হয়ে জেগে থাকা শিকড়ের গলি ঘুপচিতে আমাদের কাল্পনিক পাঠশালা ছিল, এখন সেখানে ঝাঁ চকচকে অ্যামাজনের অফিস। কালবৈশাখীর তুমুল ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে দৌড়ে সবার আগে পৌঁছনোর তীব্র উল্লাস মনে নিয়ে যে কাঁচামিঠে আম দিয়ে জামার কোঁচড় ভরাতাম, সেই আমগাছের জায়গা এখন নিয়ে নিয়েছে আধুনিক বিউটি পার্লার। পুজো পার্বনে একছুটে দুর্বা নিয়ে আসা ঘাস জমিতে শান বাঁধানো সিমেন্টের প্রলেপ। প্রতিবেশী দেশের বহু মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে, রাশি রাশি কাঁচা টাকা সহ এদেশে এসে কল্যাণীতে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছেন। অকাতরে গাছের পরে গাছ কেটে, বস্তা বস্তা সিমেন্ট ফেলে তাদের জন্য কংক্রিটের খুপরি তৈরী হচ্ছে। বিধান রায়ের সুপরিকল্পিত ছোট্ট শিল্পাঞ্চলটিতে এমস আসছে। শুনলাম এয়ারপোর্টও নাকি তৈরী হবে। প্রতিদিন জ্ঞাতে অজ্ঞাতে কত যে পাপকর্ম সাধিত হচ্ছে আমাদের দ্বারা! বাপ-ঠাকুর্দার বয়সী, মা-দিদিমার মত, যারা জন্ম থেকে শুধু দিয়েই এসেছে, উন্নয়নের লোভে তাদের ওপর কুঠারের আঘাত হানছি নির্মম হস্তে। বোবা, তাই তাদের বিলাপ আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছোয় না, আর আমরা ‌এমন অন্ধ যে নিজেদের ভবিষ্যতও দেখতে চাইনা। নিজেরা খেয়ে পড়ে, ভালোভাবে শ্বাস নিয়ে এই জীবন হয়ত পার করে দেব। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম? সেই নিয়ে কথা বলতে একদিন দেখা করতে গেলাম গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের সাথে। তাঁরাও যে ভাবছেন না তা নয়। এটা ওটা করছেন। তবে ভেবে আর আড্ডাপাতায় গদ্যরচনা করে তো কোনো লাভ নেই, কঠোর বাস্তবকে উপলব্ধি করে সুপরিকল্পিত কিছু ব্যবস্থাপনা চাই। এত বছরের পাপ ধুতে সামনের বহু বছরের একনিষ্ঠ কর্মযোগ চাই। দেখা যাক। যা বলছিলাম, এখনও হনুমানের দল মাঝে মাঝে আসে। আসলে আসে না, হানা দেয় বলাই সঙ্গত। পাঁচ সাতজনের মিলিত দল। মা হনুর কোঁখে সদ্যোজাত। চোখ ফোটা অবস্থা থেকেই তারা মায়ের বুকে লেগে থেকে থেকে দিব্যি চুরি- ছিনতাইয়ের থিওরিক্যাল অংশটি শেখে। উন্নয়নের জেরে তাদের খাদ্য সম্ভারে স্বাভাবিকভাবেই টান পড়েছে। তাই তারা এখন প্রচন্ড হিংস্র হয়ে উঠেছে। সোজাপথে খাবার না জুটলে, কেড়ে কামড়ে খাবার সংগ্রহ করতে একটুও দ্বিধা দেখায়না। ওদের দলনেতা প্রথম সুযোগেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে আসে। অপেক্ষারত বাকি সদস্যরা তখন পাঁচিলে ওপর সার সার বসে কিচকিচে ভাষায়, মুখ ভেঙচে একে অপরের সাথে আলাপচারিতায় মত্ত থাকে। আপনি হয়ত বারান্দায় বসে একমনে সকালের খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়ে গরমাগরম চায়ে গলা ভেজাচ্ছেন। হঠাৎ দেখতে পারেন, হনুনেতা খোলা সদর দরজা দিয়ে গটগট করে আপনার পাশ কাটিয়ে আপনারই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল! আর খানিক পরে হতভম্ব আপনার দিকে দৃকপাতও না করে, ডাইনিংয়ের টেবিলের ওপরে রাখা ফল পাকুড় ছেড়ে ফ্রিজের ওপরে রাখা চকোলেটবা বিস্কুট নিয়ে ধীরে সুস্থে বেরিয়ে গেল। পছন্দের জিনিস তুলে ঘর থেকে বেরোবার পথে যদি আপনার প্রতিবাদের সম্মুখীন হয় তবে কি হতে পারে তার চাক্ষুষ প্রমাণও পেলাম। সত্যি মিথ্যা জানিনা, বাজারে দূর থেকে এক ভদ্রলোককে দেখানো হল। স্কার্ফ দিয়ে মাথা, মুখ পেঁচিয়ে ঢাকা। শুনলাম এক হনু তাঁর বাড়ির খাদ্যদ্রব্য ছিনতাই করে পালাবার পথে ভদ্রলোক তার সাথে সম্মুখ রণে অবতীর্ণ হন। ফল স্বরূপ হনুমানটি তাঁর ডানগালে এক মোক্ষম চাপাটি কষিয়ে এমন আঁচড় দিয়েছে যে তাঁর ডানগালে এখন নেই ভূমির মানচিত্র জ্বলজ্বল করছে। একটু পরে মাছ কিনতে গিয়ে তাঁর সাথে পাশাপাশি দেখা! ওজনে ঠকাচ্ছে সন্দেহে বয়স্ক মাছওয়ালাকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তুমুল বকাবকি করছেন। বুঝলাম, হনু শুধু গালে দাগ রেখে যায়নি, স্বভাবেও ছাপ ফেলে গেছে!

1895

61

শিবাংশু

বাইশ বেলা

কোথা যে উধাও হলো পরস্বপর শ্রাবণ বায়োস্কোপ অপেক্ষায় আদুল গায় রাত কাটলো পথে সারা জনম বাইশ বেলা ও মোর দরদিয়া .... https://www.youtube.com/watch?v=2TfkSI2WAqs&fbclid=IwAR3Oyr_B-EweQJA7uD26bRNnkFv_-i4sNb4yyIBiK5jkAGS1T5EpBuWlqYc

294

3