মনোজ ভট্টাচার্য

দালালির ভাগাভগি !

দালালির ভাগাভাগি - ! কিছু কিছু জিনিস আছে – যা মানুষকে বলে বিশ্বাস করানো যায় না । আগে সে সব বেশি পরিমান ছিল – এখন খানিকটা শিক্ষার ফলে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে পালটেছে পালটাচ্ছে ও পালটাবে বা পালটাবে না । যেমন এখনও এক কে সি পালের রাস্তায় রাস্তায় লিখে রাখা – সূর্য পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ! – সে তার কাজ করেই যায় । আমাদের মনে হয় – সত্যিই কি ভদ্রলোক বিশ্বাস করেন ! – কিম্বা এখনও অম্বুবাচীর উপোষ করা হয় ! আমাদের ঠাকুরমা বা দিদিমারা তো এক সময় বিশ্বাস করতেনই মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে বিধবা হয় ! – জানিনা বিয়ে না হলে কিকরে বিধবা হয় ! অথবা বিধবা হওয়ার পরে লেখাপড়া শিখলে কি হয় ! আমার এক পিসেমশাই গত শতাব্দীতে কালাপানি পেরিয়ে বিলাতে গিয়ে – তাঁর মায়ের কোপে পড়ে ত্যজ্যপুত্র হয়েন । তার ফলে - তাঁর কোন ক্ষতি কিছুই হয় নি । কিন্তু মেম-সাহেব নিয়ে ফিরে এসে সবার বাড়িতেই সমাদর পেয়েছিলেন । - আর সেই মায়ের দাপটে তাঁর চেয়েও উচ্চশিক্ষিত আরেক পুত্র দেশেই বন্দী হয়ে রইল ! গ্রহনের দিন আগেকার রান্না সব ফেলে দিতে হয় নাকি । আগে একবার বড়বাজার দিয়ে আসার সময় দেখছিলাম – কত বাড়ি থেকে রান্না করা সব খাবার – ভিখিরিদের দান করে পুণ্য অর্জন করছে ! একদিকে ভিখারিদেরই লাভ ! - এ ব্যাপারে আমার এক আত্মিয়া একেবারে অবাক করে দিয়েছে । গত গ্রহনের দিনে নাকি করোনা ভাইরাস দেখা দিয়েছিল – তাই এই গ্রহনের পরে করোনা ভাইরাস শেষ হয়ে যাবে ! তাই ঐ সময়ে রান্না করায় নি । গ্রহন তো শেষ হয়ে গেছে – অথচ করোনা রোগ তো কমে নি ! কে দেবে তাঁর উত্তর ! আমার গুরু – তিনি আবার একশো-তেত্রিশ কোটি মানুষের দেবতাও বটেন – বলেছিলেন – বাইরের জগত দেখতে হলে – অন্তত জানলাটা খুলতে হবে ! বৃষ্টি হচ্ছে কিনা জানলা দিয়ে দেখে তবেই বলা যাবে ! – আমি আন্দামানে গেলাম না – স্রেফ গুগুল দেখেই বলে দিলাম – আদিবাসীরা এখনও মানুষ খায় – উলঙ্গ হয়ে থাকে ! – পর্যটকেরা খুব লুব্ধ হয়ে ক্যামেরা বাগিয়ে বিভিন্ন দ্বীপে গিয়ে সেসব কিছু দেখতে না পেয়ে হতাশ হল ! যেন আন্দামানে কেবলমাত্র জারোয়াদের দেখতেই যাওয়া হয় ! নানান জনের নানান মতামত তো হয়েই ! কিন্তু সেটাই যে একমাত্র ধ্রুব সত্য – তা নয় ! আমি ছা-পোষা গরীব ঘরের – পাতি বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র ছিলাম । নামী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মতো বাছা বাছা শব্দ ব্যবহার করতে পারিনা । তাতে ভাষার উৎকর্ষতা বাড়ে বলে মনে হয় না ! আমারও কোন মানহানি হয় না ! তাই আমি মনে করি কোন জাতি সম্পর্কে বা তার ভাষা সম্পর্কে কোন মন্তব্য করলে আর কারুর নাহক – নিজের ব্যক্তিত্বের নীচতা প্রকাশ পায় । আমার সুযোগ হয়েছিলো – আমেরিকা যাওয়ার ও চীনদেশে যাওয়ারও ! সারা দেশ বা সমস্ত জাতিকে দেখার সুযোগ হয় নি । তবু যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে – তার কথা এখানে লিখেওছি । দু-দেশের মধ্যে চীনদেশ হল সবচেয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ! না দেখেছি কোন ভবঘুরে-ভিখারি, না দেখেছি রাস্তায় কোন জঞ্জাল ! এই কথা পড়েই তো কয়েকজন অনেক তথ্য আউরে গেলেন - । আমাদের নাকি সেসব যায়গায় নিয়েই যাওয়া হয়নি ! আমাদের পর্যটন ব্যবস্থা তো চিন সরকার করেনি ! করেছে এক ইন্দো-আমেরিকান কোম্পানি । তাই যা দেখেছি তারই ছবি তুলেছি । ধর্ম আছে ! দেখেছি মন্দিরে মোমবাতি জ্বালাতে বা প্রার্থনা করতে ! আগে তো জানতাম কমিউনিস্ট দেশে ধর্ম থাকে না ! – সম্প্রতি মুসলিম ধর্মীয় বাড়াবাড়ি রীতির ওপর বেশ হ্রাস টেনেছে ! – বাজারে নকল জিনিসের দোকানগুলো সব সীল করে দিয়েছে । বন্ধ গেটের ওপর খদ্দেরদের জন্যে সাবধানবানী সাঁটা আছে ! চিরকাল শুনে এসেছি – পিকিংএর রাস্তায় শুধু সাইকেল আর সাইকেল । এ নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে । কিন্তু আমরা গিয়ে দেখি দামি দামি গাড়িও চলছে আবার ছোট ছোট মোপেড ভর্তি । সে পঙ্গপালের মতো । রাস্তা ফুটপাথ – পারলে বিল্ডিঙের থামের নিচ দিয়ে ফুরুত ফুরুত করে যাচ্ছে ! মোপেডের জন্যে অবশ্য ট্র্যাফিক জ্যাম হয় না ! আমাকে তো চৌষট্টি সালের পর থেকে চিনের দালাল বলে – লাঠি মেরেছে – মাথা ফাটিয়েছে যুব কংগ্রেস । তাতে আর কি এসে গেল । আমি যে পাতি ভারতীয় ছিলাম – তাই আছি । আবার এখন নাহয় কেউ কেউ সেই একই কথা বলে তাদের ইস্কুলে শেখা বাছা বাছা বিশেষণ – মানে বুঝুক বা নাই বুঝুক – প্রয়োগ করে তাদের পরিচয় দেবেন ! কিন্তু আমাদের চেয়ে কম সময়ে উন্নতি কোথায় যেতে পারে – সেটা সত্যিই বিস্ময়কর ! শুধু কটা বড় বড় অট্টালিকা দেখেই অবাক হবার কিছু নেই ! উন্নতির প্রথম সোপান হল অর্থনীতি – সেটা নিশ্চয় স্বীকার্য ! সেই অর্থনীতির পাখনা দেখা যাবে আমাদের কেরালার ব্যাক ওয়াটার অঞ্চলে গেলে । যুদ্ধে যে কোন দেশের জয় বা পরাজয় হয় – কেউই তা বিশ্বাস করেনা । শুধু প্রানহানি, অর্থহানি আর ট্যাক্স চাপানো ! কদিন প্রচুর মিডিয়ার আস্ফালন – নেতাদের বিবৃতি নিয়ে । এমন কি স্টুডিওতে রণাঙ্গন তৈরি করে প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা পেশ করা হয় ! – তারপর হয় মার্কিন দাদার নয়ত রুশ-দাদার হাত ধরে একটা থোড় বড়ি খাড়া চুক্তি করে মুখ রক্ষা হয় ! – তার চেয়ে ঢের উপকৃত হয় দেশের মানুষ – যদি একটা স্কুল – একটা চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি হয় ! – বিগত পনের বছর ধরে একটা ইশকুলও তৈরি হয় নি । বরং গ্যারেজে গ্যারেজে ইংরিজির কারখানা তৈরি হয়েছে লাখ খানেক ! আমার মতে কোন দেশকে - তার বাসিন্দাদের সম্বন্ধে উল্টোপাল্টা বিশেষণ না দিয়ে, বরং বোঝার চেষ্টা করলে – নিজেদের মর্যাদা দেওয়া হবে ! নিজেদের মধ্যে দালালি ভাগাভাগি না করাই মনে হয় সন্মানজনক ! মনোজ

303

3

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

মনে থাকা মুখ্গুলো এই মুখ গুলোর কোনটাই বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য মুখ একেবারেই নয়| বর্ং কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি পাথর..যার না আছে ঔজ্জ্বল্য না আছে কোন দাম| তবু কেন যে ছটি দশক পরেও মনে আছে তার কোন কারণ খুঁজে পাই নি| ল্ক্ষ্মীর মা - লক্ষ্মীর মা ছিল আমদের ঝি | শব্দটা আজকাল উঠেই গেছে কিন্তু তখনকার দিনে এটাই ছিল তাদের পরিচয়| তবে ঝি বলে কাউকে কখনো উল্লেখ করতে শুনি নি| অমুকের মা তমুকের ঠাকুমা এই বলেই তারা পরিচিত ছিল | তা আমাদের এই লক্ষ্মীর মা ছিল কুচকুচে কালো তবে মুখটা ছিল বেশ ঢলঢলে| কপালে বড় একটা সিঁদুরের টিপ পরত| নাকে ছিল একটা সাদা পাথরের নাক্ছাবি | সব্সময় ঘোমটা থাকত মাথায় | তার একটা স্ব্ভাব ছিল ঘর মুছতে মুছতে কেউ যদি ঘরে না থাকত তবে আয়্নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোমটা সরিয়ে চুল ঠিক করা| কখনো কখনো গুন গুন করে গানও নাকি করত|বাড়িতে এটা নিয়ে বেশ হাসাহাসি চলত| একদিন ওকে বলতে শুনেছিলাম কাকীমা আপনাকে আমি ঘেরতকুমারীর পাতা এনে দেব আমাদের বাড়ীতে আছে | ঘেরতকুমারী কি বস্তু তা তখনো জানতাম না .| বহুদিন পরে যখন ঘৃতকুমারী কি তা জানলাম তখন মনে পড়ত এই ঘেরতকুমারী তথা লক্ষীর মার কথা| বুড়ো মুচি ‚ পরামাণিক সাদা গেন্জী খাটো ধুতি শীত গ্রীষ্ম বুড়ো মুচির ছিল এই এক পোষাক | একটা কাঠের বাক্সে সাজ সরঞ্জাম আর কাঁধে থাকত একটা ‚ কি বলি‚সেটার নাম ত আজ অব্ধি আমি জানি না‚ তিন বাহু ওয়ালা একটা জিনিস‚ সব জুতো সারাইওয়ালাদেরই থাকে| বিহারে দেশ ছিল বছরে একবার করে যেত|জুতো পালিশ করা‚ চটি ছিঁড়ে গেলে পেরেক ঠুকে ঠিক করা ছাড়া আরেকটা কাজ ছিল সোল ক্ষয়ে গেলে হাফসোল লাগানো| এটা এখন উঠেই গেছে তবে ভ ঙ্গ প্রেমের ব্যাপারে এই হাফসোল কথাটা আজকাল শুনি| একবার দেশ থেকে আমাদের জন্য আম নিয়ে এসেছিল| সোজা কথা নাপিত না বলে তাকে সব সময় পরামাণিক কেন বলা হত তা জানি না| আশুতোষ মার্কা গোঁফ| কাঁচা পাকা চুল নিয়ে সে আসত বাবার চুল কাটতে| বারান্দায় একটা টুল পেতে বাবা বসতেন| একটা খবরের কাগজের মাঝখানের জোড়া পাতার মাঝখানটা কেটে মাথা গলিয়ে দিতেন শুরু হত চুল কাটা সঙ্গে গল্প গুজব | ও ক্ষুর চালাচ্ছে আর চুল ঝরে ঝরে পড়ছে.. আমার বেশ মজা লাগত দেখতে| আমাদের পাড়ার জাভেদ হাবিবের দোকানের সামনে দিয়ে যখন যাই এই দৃশ্যটা আমার মনে পড়ে‚ ও আর একটা কথা..|কাগজে মাঝে মাঝে পড়ি গুণ্ডা বদমাশ দের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে আর এক জন আর এক্জনের গায়ে ক্ষুর চালিয়ে দিল..কিছুতেই ভেবে পাই না ঐ নিরীহ দর্শন ক্ষুর কি করে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে তপন দা- সাদা শার্ট সাদা প্যাণ্ট নীল চোখ টকটকে গায়ের র্ং ‚ছ ফুটের -মত লম্বা---- এই হলেন তপন দা ‚ আমাদের সম্মিলনী আসরের মধ্যমণি| ২৬শে জানুয়ারী আর ১৫ ই অগস্টের ভোর এ ঘুম ভাঙত ওনার বিউগল এর আওয়াজে | প্রত্যেক গলির মোড়ে গিয়ে বিউগল বাজিয়ে সেই রাস্তার সবাইকে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে তিনি মাঠে গিয়ে প্রভাত ফেরী র তোরজোড় শুরু করতেন | আমরা হাজির হতাম অনেক পরে| উনি কিন্তু আমাদের অঞ্চলের লোক ছিলেন না | আসতেন দূর থেকে সাইকেলে..তপন দা আসেন নি এমন কোনদিন হয় নি| একটা অদ্ভুত গান শিখিয়েছিলেন একটা লাইন মনে আছে ...এক সময়ে বর্ষাকালে‚ ইস্কুল থেকে পালিয়ে‚ যাচ্ছে ও কে পুকুর ধারে আস্তে আস্তে এগিয়ে| ও ভাই কান্ত ও ভাই কান্ত ..|কান্তর উত্তর টা আর মনে নেই জানো কেউ এই টা? আসরের প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ের ভালোমন্দের দিকে সজাগ দৃষ্টি ছিল | যে কোন দরকারে‚ সে পরীক্ষার সময় স্কুলে পৌঁছে দেওয়া‚ দ্র্কারে ডাক্তার ডাকা‚ ওষুধ আনা ইত্যাদি যে কোন কাজে সব সময় হাজির| উপলব্ধি - তখন অতশত বোঝার বয়স হয় নি| তা ছাড়া তখন মোটামুটি ভাবে "সকলের তরে সকলে আমরা" গোছের একটা ব্যাপার ছিল|এই প্রান্তবেলায় এসে যখন দেখি ডাক্তার হাসপাতাল করার লোকের খুব অভাব তখন তফাৎ টা বুঝি| তপন দার মত লোক এখনও আছে তবে কিনা তখন ছিল " মন্দ যদি তিপ্পান্ন/ ভালোর স্ংখ্যা তিনশ তিন" ( কি জানি বাবা উদ্ধৃতিটা ঠি হল কিনা.|)অনুপাত টা এখন উল্টে গেছে এই আর কি ছোটবেলার সঙ্গী রা -- পাশের বাড়ী সেন লজ এ কাজ করত আঙুরের মা | বেশ মনে পড়ে সেন লজের মস্ত উঠোনের এক কোণে কলতলায় বাসন মাজছে আঙুরের মা আর উঠোনে কুমীর ডাঙা খেলা চলছে আমাদের ‚মানে আঙুর ‚ওর খুড়্তুতো দুই বোন লিচু আর খুকি‚ সহ পাড়ার আরো অনেক বাচ্চা দের| কত আর বয়স হবে তখন আমাদের এই ৮/৯ কি বড় জোর ১০| উলি ঝুলি চুলের‚ ছেড়াঁ খোঁড়া জামা পরা আঙুর আর তার বোনদের কখনো বেমানান মনে হয় নি আমাদের সেই খেলার দলে| আর একটু বড় হতে ‚একটু পা বেড়েছে তখন‚ খেলার জায়্গা পাল্টে গেল | কুমীর ডাঙার মত নাবালক দের খেলা ছেড়ে তখন বড়দের কাটা ব্যাডমিন্টন কোর্টে গাদি ‚হা ডুডু এই সব খেলা হত| নতুন অনেক সঙ্গীও এ দিক ও দিক থেকে জুটল| এদের মধ্যে ডাকাবুকো ছিল দু জন‚ উমু আর ভুলু| দু জনে যদি এক দলে পড়ল তাহলে উল্টো দলের সেদিন খেলায় জেতার কোন সম্ভাবনা থাকত ন| আবার যদি দু জনে দু দলে পড়ত তাহলে বেশীর ভাগ দিন তুমুল ঝগড়া ঝাঁটিতে শেষ হ্ত খেলা |একদিনের কথা মনে আছে| সে দিন দল তৈরী হবার আগে তুমুল ঝগড়া বেধেছে উমু আর ভুলুর মধ্যে| যে যার নিজের পছন্দের জনকে দলে টানার চেষ্টা করত| তার জন্য নানারকম কৌশল ও ছিল| সে দিন ঝগড়া এমন পর্যায়ে গেল যে খেলা ভেস্তে যাবার উপক্রম হয় আর কি| বাদবাকি সকলের চেষ্টায় যাই হোক খেলা শুরু হল তবে সকলেরই আশঙ্কা এর পরে ওদের হয়তো জন্মের মতো আড়ি হয়ে যাবে | খেলা শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই উঃ বলে ভুলুমাটিতে পড়ে গেল| মনে হয় কিছুতে হোঁচট খেয়েছিল‚ হতবুদ্ধি আমরা....উমু সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বসে পড়ে ওর পা টা কোলে তুলে খানিক হাত বুলিয়ে দিল‚ মালিশ ‚ ঐ আর কি‚ করল আমাদের বলল যা প্রভাত জ্যাঠাদের বাড়ি থেকে গাঁদা ফুলের পাতা নিয়ে আয়| কে বলবে খানিক্ষণ আগেই ওর সঙ্গেই তুমুল ঝ্গ্ড়া হয়েছিল এদের সঙ্গেই কেটেছে আমার ছোটবেলা খোলামেলা আর অবারিত পরিবেশে..যার খুব অভাব দেখি এখন| উমু অকালে ইহলোকের মায়া কাটিয়েছে আর সব সঙ্গীরা যে কোথায় হারিয়ে গেল কি জানি .. কবেই বা বড় হয়ে গেলাম হারিয়ে গেল সেই সোনালী বিকেল গুলোর ছোটবেলা

2704

148

ঋক

ঋকানন্দের দিনকাল

ভুটে_আর_ছোটকা 'আ আ এইভাবে, যেরকম বাজিছে সেভাবে গলা মেলা। না না অত চড়ায় ধরলে তো তারপরে আর ধরে রাখতে পারবিনা। আচ্ছা আবার শুরু কর। ' মা যত্ন করে গান শেখান, ভুটের শিখতে ভুল হয়ে যায় কেবলই। ভুটের গলায় সুর নেই, চড়ায় গেলে ভেঙে যায়। রাগ করে দুম দাম করে পালায়। ছুট ছুট ছুট। কোথায় যাস রে ভুটে। থাকবো না এখানে, আমি পারছিনা। পালালেই পারবি বুঝি? ভুটে তাও পালায়। অস্থির ভঙ্গীতে ঝাঁপায় পুকুরে, গান না হয় নাই হল, আজ ডুব সাঁতারে অভিকে হারিয়ে দেবে। 'ভুটে ওঠ,উঠে আয় শিগগিরই, লজ্জা করেনা, মাস্টারমশাই এসে বসে আছেন, এতক্ষন ধরে চান করতে হয়! জ্বর বাধিয়ে বোসে থাকবি আর পরীক্ষায় ধ্যারাবি তাই ইচ্ছে বুঝি।' আবার ছুট ছুট ছুট। বাজনা থেকে শুরু করে ইউটিউব হয়ে পালাচ্ছে ভুটে। অ্যাই ভুটেদা খেলবে আমাদের সাথে? ভুটে ফুটবলে শট মারতে পারেনা, স্কোয়ার কাট দূরে থাক ভুটে জানেনা কেমন করে বল এলে আটকাতে হয়। দৌড় দৌড় দৌড়, দাঁড়াও ভুটে। দৌড়ে তো কোথাও পালানো যায় না.... ধড়মড় করে উঠে বসে ভুটে। স্বপ্ন দেখছিল। ঘেমে নেয়ে গেছে। বিকেল হয়ে গেছে সেই কখন। ঘুম থেকে উঠে এক মুহূর্ত বুঝতে বেভুল হয় সকাল না সাঁঝ কোথায় আছে সে। কেন এমন স্বপ্ন দেখলো সে। অস্থির লাগে।জানলার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো মাখা আকাশ দেখা যায়। ছোটকাকে খুঁজতে হবে। বুকের মধ্যে কেমন ছটফট লাগছে। -ছোটকা? - বল। এমন অসময়ে যে ভুটে সর্দার। কী ব্যপার? - ছোটকা অস্থির লাগছে। একটা স্বপ্ন দেখলাম। ভারী অদ্ভুত জানো। নানার দৃশ্য সব, আমি ছুটছি, কে যেন বলছে ছোটো, পালাও, আর কে যেন ছুটতে নিষেধ করছে। এ কেমন স্বপ্ন ছোটকা? হাসছো তুমি? তুমি জানো কেন এমন হয়? - না রে ভুটে অত জানলে আমি তো বিরাট কেউকেটা একজন হতাম। - তুমি আমায় ছোট ভাবো তাই জানোনা, আমি জানি, তুমি আসলেই কেউকেটা। সবাই যখন ভালো ভালো চাকরি নিয়ে দূর দূর দেশে চলে গেল, তুমি কোন দূরে বসে বসে ফসল ফলালে, স্কুল খুললে সেই স্কুলে আবার যারা পড়ে তাদের কাউকে তুমি সিলেবাসের পড়া পড়ালে না, ইতিহাসে গল্প বললে সে এমন গল্প আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়ও অত জানেনা। দেশ বিদেশের গল্প বললে, তারা চেনালে, গাছপালা চেনালে, পাখির ডাকের পার্থক্য শেখালে ঋতু ভেদে, অংক কষতে শেখালে। আমার তো ইচ্ছে করে সব ছেড়ে তোমার স্কুলেই চলে যাই। - না রে পাগলা। এদের গাছপালা আমি চেনাবো কি, এরা বেশীরভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে এসব চেনে, এরা আমার চেয়ে বেশী ভালো পাখি চেনে।কোন ফুলের মধুতে কোন কেমন গন্ধ কেমন স্বাদ সব চেনে। আমি খালি আমাদের পুরোনো বইপত্র খুঁজে কোন ওষধিতে কী কাজ হয়, সে সব বলেছি। দেখ এদের তো তোদের পড়া পড়ে লাভ নেই। তাই এসব পড়াই। - কেন লাভ নেই? - মাথা খাটাও ভুটেবাবু। আমাদের দেশে এত লোক, সবাই থোড়াই চাকরি পাবে? বরং এরা যা জানে সেই শিক্ষার সাথে আমাদের শিক্ষার মিশেল দিলে এরা এখানেই অনেক বেশী ভালো থাকবে। ছাড় এসব শক্ত শক্ত কথা।তোকে আমার কলেজের গল্প বলি শোন। আমার কলেজটা একটা জঙ্গলের মধ্যে বলেছিলাম তোকে। আমার তখন তেমন বন্ধু বান্ধব নেই। সবাই প্রেম টেম করছে, যারা করছেনা তারা খেলাধূলা করছে। মোদ্দা কথা ভয়ানক একা পড়ে গেছিলাম। আমার সে সময় কেন জানিনা পালাতে ইচ্ছে করতো খুব। - কেন ছোটকা? - ঠিক জানিনা। খুব দুর্বল ছিলাম, ফিট করতাম না ঠিক সবার সাথে তাই হয়ত। কিংবা ওই উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে আমার ঘরের মধ্যে থাকতে ভালো লাগতো না। কিংবা নিজেকে নিজে সইতে পারতাম না, আমি ঠিক জানিনা। - কোথায় পালাতে ছোটকা? এখন আর পালাও না কেন? - পালাতাম, মানে আশেপাশেই, পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে। ছোট ছোট গ্রাম, নদী, শুষ্ক প্রান্তর। পথ হারিয়ে কত সময় হয়েছে অচেনা কারোর বাড়ি পৌঁছে গেছি।ওখানকার গ্রামের মানুষজন খুব গরীব জানিস, তাও তারা আমায় ঝকঝজে মাজা ঘটিতে জল খেতে দিত। কেউ কখনো রিফিউজ করেনি। খেয়ে যেতে বলত। আমরা বলিনা কিন্তু। যাইহোক সেসব দারুণ সময় ছিল বুঝলি। আবার ভয়ানক সময় ছিল। - এ কেমন কথা। দারুণ সময় আবার ভয়ানক কেন? - দারুণ মানে ওই রকম পালিয়ে পালিয়ে ঘুরে বেড়াতে দারুণ লাগতো তো। ফিরতে ইচ্ছেই করত না। আর ভয়ানক কারন নিজেকে নিজের পোষাতো না। - কেন? - সে ম্যালা কারন আছে। কিন্তু কথা হল অমন পালিয়ে পালিয়ে কিন্তু সমস্যার সুরাহা হল না। তাই শেষমেষ পা বাড়িয়েই দিলাম যা করতে হবে তার দিকে। - কিন্তু তাতে তো ভয়ানক সমস্যা আসতে পারে। - সে তো পারেই। কিন্তু কী জানিস, পড়ব পড়ব ভয়, পড়লে কিছু নয়। একবার সাহস করে নিজের পথে হাঁটতে শুরু করলে দেখি রাস্তা তৈরী হতে সময় নেয় না। তখন সমস্যা গুলোকেও ফেস করার জোর চলে আসে। কেন জানিস? কারন তুই নিজের মতো চলছিস। - সত্যি এমন হয়? - হয়, ভুটেরাম হয়। কাল তো স্ট্রীম চুজ করার দিন, একবার সাহস করে ঘুরে দেখই না, সত্যিই ভয় পাবার কিছু আছে না স্রেফ কলাগাছকে পূর্নিমায় পেত্নী ভাবছিস। ছোটকা তো আছেই তারপর। কিন্তু ভুটেবাবু নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হয়, বাকিরা বড়জোর সারথি হতে পারে। - থ্যাংক ইউ ছোটকা। -থ্যাংক ইউ কিরে ব্যাটা। এই শনিবার দুজনে মিলে নলেনগুড়ের আইস্ক্রীম খেতে যাব বুঝলি?

436

29

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের জন্যে সঞ্চয় !

জীবনের জন্যে সঞ্চয় ! আবার মাথায় কিছু লেখার তাগিদ চেপেছে ! – কিছু কিছু মানুষের সব সময়েই নিজেকে প্রতিপন্ন করার তাগিদ মাথায় চেপেই থাকে । ঐ যে বলে না – আশি বছেরেও বুদ্ধি পাকে না ! সেই রকম – কেউ পড়ে না – আপনি মোড়ল ! মনে আছে – দেবানন্দ শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার আগের সপ্তাহেও স্টুডিয়োর ঘরে এসে বসে পরবর্তী কোন মুভির চিত্রনাট্য লিখতেন ! – শোনা কথা ! - কিন্তু এটা নিজের চোখে দেখা – একটা এ্যাওয়ার্ড শো তে - সয়েফ আলিকে কথা দিয়েছিলেন – ওনার পরবর্তী ছবিতে একটা সুযোগ দেবেন – নিশ্চয় ! – বেচারি সইফ ! আমাদের “অর্পণ” গড়ার সময় পুলিশের সঙ্গে মিটিঙে – আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম – ইচ্ছুক লোকেদের নিয়ে সামাজিক কোন কাজ করানো যায় কিনা ! যেমন সিভিক ভলান্টিয়ার বা ঐ ধরনের কিছু ! কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম – সেটা এদেশে সম্ভব নয় । এর বিভিন্ন যুক্তিযুক্ত কারণও আছে । সে আলোচনা করে কোন লাভ নেই ! – তাছাড়াও আমরা সাধারনত গ্রহন করতে যত আগ্রহী – প্রদান করতে তত নয় ! আমাদের অবসর পত্রিকায় লেখার জন্যে – প্রবীণদের জন্যে বিষয় খুঁজতে আরম্ভ করলাম । দেখলাম নানান দেশে স্বেচ্ছাশ্রম ব্যাপারটা খুব পরিচিত ও প্রচলিত ! – স্কুল থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা ‘সময়’ নিয়ে কোন হাঁসপাতালে গিয়ে প্রবীণ রোগীদের কাছে গিয়ে বসে ! শুধু প্রবীণ রোগীই নয় – শিশু রোগীদের কাছে গিয়েও নানা রকম ছবি আঁকার কাগজ রঙ পেন্সিল দিয়ে তাদের উৎসাহ দেবার চেষ্টা করে ! লাইব্রেরীতে গিয়ে অন্যদের সাহায্য করে । গির্জায় গিয়ে প্রার্থনাসভায় কিছু সাহায্য করে । এখানে মন্দির বা মসজিদে অবশ্য সে সুযোগ একেবারেই না-না ! পান্ডাদের কাজে হস্তক্ষেপ করলে ধর্ম-বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী ! ছাত্ররা যে গিয়ে অন্যত্র স্বেচ্ছাশ্রম করে – সেটা কিন্তু পয়সার বিনিময় নয় ! কিন্তু বিনা স্বার্থে নয় ! তাদের স্কুলের পরীক্ষায় এই স্বেচ্ছা-শ্রমের বদলে ক্রেডিট দেওয়া হয় ! আবার হাসপাতালে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দিলে যে ক্রেডিট দেওয়া হয় – সেই ক্রেডিট কলেজে – বিশেষ করে মেডিকাল পড়তে খুব সাহায্য করে ! এছাড়াও হাসপাতাল-গুলোর অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক শিক্ষার কাজে লাগে ! অনেক দেশে এই স্বেচ্ছাশ্রম বা স্বেচ্ছা-সেবা দেবার রেওয়াজ আছে । অনেক ইচ্ছুক মানুষে হাঁসপাতাল বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরিষেবা দেয় । অনেকে আবার প্রবীণ মানুষদের বাড়িতে গিয়েও পরিষেবা দেন । - মানে আয়ার কাজ বা স্রেফ সঙ্গ দেওয়ার জন্যে পরিষেবা । দোকান বাজার করে দেওয়া বা ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত কাজ ইত্যাদির জন্যে । তারজন্যে এরা টাকা নেয় না । তবে একেবারে নিঃস্বার্থেও নয় ! এনারা প্রবীণদের বাড়িতে গিয়ে যে পরিষেবা দেন – তাঁর বিনিময় এনাদের একটা ‘টাইম-কার্ড’ এ যত ঘণ্টা পরিষেবা দেওয়া হয় তা ক্রেডিট হিসেবে জমা থাকে । আর এই ক্রেডিট জমতে থাকে ততদিন পর্যন্ত – যতদিন না উনি নিজেই কারুকে আয়া বা সঙ্গী হিসেবে ভাড়া করতে পারেন ! পরিষেবক এতদিন যত ঘণ্টা পরিষেবা জমিয়েছেন – সেই পরিষেবা উনি পাবেন – তাঁর নিজের বা স্পাউসের জন্যে । এবং সেই পরিষেবা হবে বিনা পয়সায় ! তিনি ইচ্ছে করলে নিজের বাড়িতে বা বৃদ্ধাবাসে কাউকে সঙ্গী বা আয়া হিসেবে ডাকতে পারেন ! অতি সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের একটা সামাজিক বার্ধক্য পরিষেবার কথা দেখতে পেলাম । সুইজারল্যান্ডে এই ধরনের একটা পরিষেবা চালু আছে । পরিষেবা প্রদানকারীর নিজস্ব সোশ্যাল সিকিউরিটি পদ্ধতি মারফত তাঁর প্রদত্ত পরিষেবা পার্সোনাল টাইম কার্ডের একাউন্টে জমা থাকে । আর তিনি তাঁর বার্ধক্যে সেই জমা পরিষেবা সেই টাইম কার্ড মারফত ব্যবহার করতে পারেন । প্রকৃতপক্ষে ইউরোপীয় অনেক দেশেই প্রবীণ মানুষদের জন্যে বেশ কিছু কল্যাণকর ব্যবস্থা চালু আছে । তারমধ্যে খুব ভালো পেনশান ও সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার পদ্ধতি । এই বার্ধক্যে সেবা প্রদানকারী প্রকল্প সেখানে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে । কারন হিসেবে বলা যায় – এর ফলে অর্থনীতির ওপর চাপ কম পড়ে ! আমরা কি এই স্বেচ্ছা-শ্রম টাইম-কার্ড এখানে – এদেশে প্রচলন করতে পারিনা ! উত্তর খুব স্বাভাবিকভাবেই হবে – রীতিমাফিক না ! – কারন ‘ না’ শব্দটাই সবচেয়ে সহজ উত্তর ! এ ছাড়াও বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক বাধা আছে ! – আছে বর্তমান চাকরিজীবীদের চাকরির ভয় ! আছে – জন্মগত নেতিবাচক একটা শব্দ – ‘না’ ! এই একটা ক্ষেত্রে অন্তত ‘আমার কি লাভ’ – কথাটা টিকবে না ! কারন পুরো ব্যাপারটাই তো আমার ভবিষ্যতের জন্যে ! আমি আমার কর্মজীবনে যত ঘণ্টা স্বেচ্ছা-শ্রম প্রদান করবো কাউকে বা কোন প্রতিষ্ঠানে – অর্থাৎ কোন সরকারি বে-সরকারি হাসপাতালে বা অন্য কোথাও – সেটা তো আমার টাইম কার্ডে জমা থাকবেই – হয়ত বোনাস-ঘণ্টাও জমা হবে ! – বার্ধক্যে আমার অসুখের সময়ে – আয়া বা নার্স দরকার হলে সেই টাইম-কার্ড দেখিয়ে আমার খরচ বেঁচে যাবে । হয়ত খুব সামান্য ব্যয় হবে ! এখানে ব্যাঙ্কে টাকা রাখার মতো সুদের ব্যাপার নেই ! তাই স্বেচ্ছা-শ্রমের বর্তমান আর্থিক-মুল্য ও ভবিষ্যতের আর্থিক-মুল্য তুলনা অবান্তর হবে ! প্রধান বাধা হবে – নার্স বা আয়া সেন্টারগুলোর উঠে যাবার আশংকা ! ওরা সবাইকে তাই বোঝাবে ! কিন্তু সত্যিই কি ওদের কাজ বন্ধ হবে ! মোটেই না ! ওদের ব্যবসা যেমন চলছে তেমনি চলবে ! কারন ওদের কাছ থেকেই নার্স বা আয়া ভাড়া করতে হবে ! হয়ত রুগীর সঙ্গে আয়া সেন্টারের আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার থাকবে না ! আমার মনে হয় এই স্বেচ্ছা-শ্রম টাইম-কার্ডের পদ্ধতি নিয়ে আমাদের একটু ভাবনা-চিন্তা করা উচিত ! স্বেচ্ছা-শ্রমও আমাদের একটা সঞ্চয় ! আমাদেরই জন্যে ! মনোজ

265

5

মনোজ ভট্টাচার্য

লকডাউনের গাথা !

লকডাউনের গাথা ! প্রথমে একটা উপক্রমণিকা - মানে ধ্যানাই পানাই - করে নিই ! আমার বাঁ চোখের অপারেশন হল আঠেরোই মার্চ । ফাইনাল চেক আপ করে পাওয়ার দেবে পচিশে মার্চ । সবই ঠিক । আচমকা লকডাউন শুরু হল তেইশে মার্চ । সব কিছু বন্ধ হয়ে গেল ! চোখের হাসপাতাল, চশমার দোকান, বাস, গাড়ি, অটো-রিকশা, দোকান-বাজার, এমনকি রাত্তিরে রাস্তায় বেরনো পর্যন্ত ! আগে কখনো তো লকডাউন দেখিনি । তাই বুঝতে সময় লাগলো – লকডাউন কী ! মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা-সাক্ষাৎ, বাড়ি থেকে অ-দরকারে বেরনো – সব কিছু বন্ধ ! অর্থাৎ সামাজিক কারফিউ ! প্রথম কদিন তো দুধ ও কাগজও দেখতে পাই নি ! বাড়ির পাশেই দু-দুটো ব্যাঙ্ক – বন্ধ ! মেসিনে টাকা নেই ! লকডাউন - প্রথম কদিন একধরনের সর্বাত্মক হরতালের রূপ ধারন করলো । কিন্তু হরতালের মধ্যে যেমন একটা পুলিশী সন্ত্রাস ভাব আছে – সেসব নেই । নেইই বা বলছি কেন ! তাও তো হয়েছে । প্রথম দিকে পুলিশ কুলি-মজুরদের বেশ পিটিয়ে নিয়েছে । বেচারিরা তখনো পর্যন্ত বুঝতেই পারেনি – লকডাউনটা ঠিক কি ! – যুদ্ধের ব্যাপারটা সবারই অল্প-বিস্তর জানা আছে । সব সময়ে হয় চীনা নাহয় পাকিস্তান ভারাতের সঙ্গে যুদ্ধ করে – দেশে সন্ত্রাসী পাঠায় ! - কিন্তু এখন তো করোনা – তার সঙ্গে যুদ্ধ ! অস্ত্রশস্ত্র নেই – বিরুদ্ধ প্রোপাগান্ডা নেই – দেশাত্মবোধক গান – টি ভিতে হচ্ছে না ! শুধু রোজ কাগজে ও টি-ভি তে করোনাতে মৃত-মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতেই থাকছে ! তাহলে করোনা হল একটা সাঙ্ঘাতিক রোগ । - মহামারী বলতে বয়স্ক মানুষের কাছে এক প্লেগ রোগের ভয়াবহ স্মৃতি আছে । আমরা আবার সে সব শরৎচন্দ্রের গল্পে পড়েছি । কলকাতায় নাকি ভয়াবহ প্লেগের প্রাদুর্ভাব । রোগের ভয়ে লোকে কলকাতা ছেড়ে বিহার পালাচ্ছিল । বাড়িতে কারুর এই রোগ হলে – আত্মীয়রা তাকে ফেলেই পালিয়ে যেত ! একমাত্র শরত বাবুর নায়িকা বা নায়ক ছাড়া কেউই ধারে কাছে থাকত না ! তাহলে করোনা রোগ সম্বন্ধে পড়া বা জ্ঞাত হওয়ার চেষ্টা করা শুরু হল । গুগুল এ ডেলি-হান্টে, ফেস বুকে – যেখানে যাকিছু বেরয় – তাই দিতে থাকি নিজ নিজ ওয়েবসাইটে ! ভাবটা হল - আমরা কি কিছু কম জানি নাকি ! আজ কাগজে দেখি ১৯১৮ সালে একটা ভয়াবহ স্পানীশ ফ্লু রোগে মৃত প্রায় ৫০ মিলিয়ন – মানব সভ্যতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক মর্মান্তিক মহামারী ! – তারও পরে এসেছিল – সার্শ - কোভিড ২ । এই রোগের থেকে বাঁচার একটিই উপায় ছিল – সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ! এখনও সেই সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং – বিখ্যাত বা কুখ্যাত সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব ! অর্থাৎ ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না বধু – ঐখানে থাকো ! তা তো হল ! আমাদের রোজকার জীবনে এসবের প্রতিফলন কি ! প্রথমেই যেটা বয়স্ক মানুষদের সন্মুখীন হতে হল – বাড়িতে গৃহ-সেবকদের আসা বন্ধ হল । আমরা ভেবেছিলাম বোধয় দু-চারদিন ! সবাই এত কষ্ট করছে – আর আমরা এক সপ্তাহ সহ্য করতে পারব না ! – হাসি হাসি মুখ করে রান্না ও বাসনমাজা ঘর ঝাঁট দেওয়া করা শুরু হল ! – ফলে কোমরে ব্যথা ! ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ ! ওষুধের দোকানে লা-ই-ন ! একদিন তৃণমূলের চার-পাঁচ জনের একটা দল এসে দুটো কাপড়ের মাস্ক ও আধ বোতল সোপ দিয়ে গেল – সঙ্গে বানী – কোন অসুবিধে হলেই ফোন করে দেবেন ! – ফোনের ওধারে ‘আপনি যাকে ফোন করছেন, তিনি এখন ফোনটি ধরছেন না ‘! হঠাৎ বাজারে খাবারের জিনিসে টান ধরল । পাউরুটি, বিস্কুট কমে গেল । আনাজ উধাও হয়ে গেল । সবচেয়ে আতঙ্কজনক – চাল নেই ! দোকান বন্ধ ! আমাদের কম্পাউন্ডের বাইরে একটা সুপারমার্কেট ‘মোড়’ – চব্বিশ ঘণ্টা খোলা । সেখানে ডাব্বাগুলো খালি ! কি - না গাড়ি বন্ধ – মাল আসছে না ! দুদিন পর থেকে দুধ আসতে আরম্ভ করল । কাগজও এলো – কিন্তু গেট পর্যন্ত । কাগজ-ওলারা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে ! কিন্তু বাকি পৃথিবী রইল পড়ে – বিনায়কের বাইরে ! এক সপ্তাহের মধ্যেই – যত রিকশওলা, অটো-ওলারা কোথা থেকে আনাজপাতি এনে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাড়ির সামনে । গাড়ি তো নেই – তাই রাস্তায় একেবারে হাট বসে গেল ! তারপর এসে গেল রিকশ । লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে । বাজারে, সিঁথির মোড়ে, অন্যত্র ! মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে – কারুর কোন রোজগার নেই ! মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি এসে খুব হম্বি তম্বি করে ! ওরাও গোছাতে আরম্ভ করে – যেন এই উঠে যাচ্ছে ! কিন্তু ওঠা আর হয় না ! অভ্যেস অনুযায়ী একদিন রিকশাওলাদের বললাম – তোমরা মুখে মাস্ক পরছ না কেন ? পুলিশে ফাইন করে দেবে ! একজন এগিয়ে এসে বলল – কি হবে – পুলিশে ধরবে ? থানায় গেলে – খেতে তো দেবে ! - কি বলবো ! এর চেয়ে বাস্তব সত্যি আর কি আছে ! – কাগজে দেখি – এদের ব্যাংক একাউন্টে নাকি টাকা দেওয়া হচ্ছে, এদের রেশনে চাল-ডাল ইত্যাদি দেওয়া হয় ! এমন একজনকেও পেলাম না – যার একাউন্টে টাকা এসেছে । তবে পাঁচজনের পরিবারে সপ্তাহে পাঁচ কেজি চাল দেওয়া হয় । বাকি – চাল নেই ! কোথায় ডাল ! আলু তরি তরকারি ! – আমরা যেখান থেকে রেশন দিলাম – সেখানে তো চাল-ডাল-আলু-টমেটো-বিস্কুটের ছোট প্যাকেট-দুধ ! কমপ্লেক্সের বয়স্ক মানুষ বা মহিলাদের বাজার কিনে নিয়ে গেট থেকে নিজেদের ব্লকে হেঁটে যেতে কষ্ট । ম্যানেজমেন্টের কাছে কম্পাউন্ডের ভেতরে যাতায়াতের জন্যে একটা রিকশার বন্দোব্যস্ত করা গেল । সে কম্পাউন্ডের ভেতর থাকবে । বাসিন্দাদের হাতে করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে না । আমার সন্ধেবেলায় বাইরে বেরুনো অভ্যেস । কম্পাউন্ডের সামনে যাই । রোজই সিকিউরিটি আমাকে বাইরে যেতে বারন করে । ধুত-তেরি বলে বাইরে বেরুনো বন্ধ করে দিলাম । - ক্রমে ক্রমে আমাদের অর্জিত উদ্যানটি শূন্য মরূদ্যানের চেহারা পেতে লাগলো । কেউই আর সেখানে দেখা দেয় না ! এখন সব ফোনে ফোনে ! আর আমাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে কথা হয় । - বাজারে যাতায়াতে দু একজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয় । - আমাদের দিন যাপন খুব সঙ্কুচিত হয়ে গেল ! সন্ধেবেলায় এখন শুধু টি ভি । তবু আমাদের জিও নেওয়া আছে বলে – অনেক চ্যানেল বেশি পাই । বিভিন্ন চ্যানেলে পুরনো সিনেমা ও পুরনো সিরিয়াল দেখতে পাওয়া যায় । যেমন সুবর্ণলতা – প্রায় তিন শোর মতো এপিসোড – বিনা বিজ্ঞাপনে দেখতে আরম্ভ করলাম ! দেখতে দেখতে আমাদের সবাকারই জীবনের ধরন প্রায় এক হয়ে যেতে লাগল । সুদুর বিদেশে গৃহবন্দী ছেলে ও তাঁর বৌ যেমনভাবে দিন কাটাচ্ছে, এই আড্ডার বন্ধুরা যেভাবে দিন কাটাচ্ছে – আমরাও সেই একইভাবে দিন কাটাচ্ছি ! করোনার কারুণ্যে সবারই জীবনধারা একাকার ! রোজ কাগজের ও টি-ভির খবর দেখতে দেখতে নিজেদের ওপর ক্রমশ অবসন্ন ও হতাশ হওয়া ছাড়া কিছু রইল না ! মানুষের মানুষীপনার ওপর সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগলো ! হাসপাতাল থেকে নার্সেরা বাড়ি ফিরতে পারেনা ! রুগীদের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয় না ! সারা ভারতে ছড়িয়ে কর্মরত মানুষেরা ফিরবে – তাদের কাজ নেই, অতএব সেখানে আর থাকতে দেওয়া হবে না । তারা কি করে ফিরবে – তার কোন ব্যবস্থা হল না । রাস্তা দিয়ে, ট্রেন লাইন দিয়ে হেঁটে ফিরতে গিয়ে কত লোকের প্রান চলে গেল । লড়ি করে ফিরতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া হল । - উড়ো খইয়ের মতো ওদের প্রান চলে যেতে লাগলো । তখনো গেরুয়া সবুজের রাজনীতি ! – যারাও বা বাড়ি ফিরতে পারল – তবু বাড়ি ঢুকতে পারল না । তাদের কখনো স্কুল বাড়িতে, কখনো শ্মশানঘরে থাকতে হল ! এ কি কোরোনা-শাসিত সমাজের পত্তন হয়ে গেল আমাদেরই সংস্কারের মধ্যে ! এই কি আমরা শিক্ষিত সংস্কৃত বলি নিজেদের ! স্বেচ্ছাসেবী যারা ত্রান নিয়ে পরিযায়ী মানুষগুলোর কাছে যেতে চায় – তাদের হয় পুলিশে ধরছে – নয় লুম্পেন দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে ! এই তথাকথিত মানুষেরা হাতিকে গরুকে বারুদ খাইয়ে হত্যা করে মজা পাচ্ছে ! একদিন এই কোরোনা-যুদ্ধ থেমে যাবে ! আবার মানুষে গাদাগাদি করে বাসে ট্রেনে যাতায়াত করবে ! কিন্তু যে মানুষের স্রোত ভেসে গেলো করোনা ঝড়ে – তাদের বাবা-মা-সন্তান-আত্মিয় স্বজন সেই পরিস্থিতি কিভাবে মেনে নেবে ! তবে আমাদের বর্তমান এত প্রবল – বাঁচবার তাগিদে – সবই একদিন দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে যাবে ! – নদীর জল যেমন প্রতিনিয়ত বয়েই চলে উজানে ! থেমে কোথাও রয়ে যায় না ! প্রতিদিনই ভাবি – আধা অন্ধ হয়ে এই দেখছি । যদি আর চোখে দেখতে নাই পাই, কোন অনুভুতিই আর না থাকে – এর চেয়ে কি খারাপ হবে ! - তখনো কি আকাশের দিকে মুখ করে কেনেস্তারা পেটাবো ? মনোজ

282

4

Nazmus Saquib

করোনা-An Evolution!

2060 পুরনো দিনের ডায়রি হাতাতে হাতাতে পেলাম Thanosএর বলা কিছু ডায়ালগ, যা যত্ন করে লিখে রেখেছিলাম কৈশোরে! "Little one, it's a simple calculus. This universe is finite, its resources, finite… if life is left unchecked, life will cease to exist. It needs correction." এখনো এসব পড়লে ২০২০ এর কথাই মনে পড়ে। কে ভুলতে পারবে ২০২০ সালের কথা?!?। যে সাল কেড়ে নিয়েছিল পৃথিবীর ১/৪ জনসংখ্যা, যা অব্যাহত থাকে ২০৪০ পর্যন্ত। এবং তার ধাক্কা কাটাতে কাটাতে লেগে যায় আরো ২০ বছর। কিন্তু পুরোপুরি কাটিয়ে নেয়া আর সম্ভব হয়নি। পৃথিবী এখন কোলাহলমুক্ত, সুজলা-সুফলা উর্বর ভূমি। মানুষ যখন লড়ছিল করোনার সাথে, পৃথিবী তখন নিজের ক্ষতচিহ্ন ভরাট করছিল নিজে নিজেই! করোনাক্রান্ত দিন দিন বাড়ছিল জ্যামিতিক হারে, মৃত্যও বাড়ছিল তালে তাল রেখে। সে সময়ের তরুণ প্রজন্মের চোখে দেখা সবচেয়ে স্পষ্ট এবং বৃহদাকার দূর্যোগ! করোনা ধীরে ধীরে বিবর্তিত হতে হতে ধারণ করতে থাকে আরো বিশাল এবং বিধ্বংসী আকার। মানুষের সাথে ছড়িয়ে পড়ে সকল প্রাণীর মাঝে। একসময় আমরা এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাই, এরই মাঝে দূর্বলরা ঝরে পড়ে, আর সারভাইভাররা হয়ে যায় বিবর্তিত, নতুনের সাথে খাপ খায়িয়ে নেয়া। এটাই Natural Evolution... একসময় এ পৃথিবীর বুকে Dinosaur ছিল, আজ নেই! একদিন আমরাও বিলুপ্ত হবো, পৃথিবীও বিলুপ্ত হবে, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত আমাদের বিবর্তন ঘটতে থাকবে! Marvel এর Thanos এর কথা মনে আছে?! He was real! So real! সে এসেছে। সে আসে প্রতিবারই, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার কাজটা করে আবার চলে যায়। শুধুমাত্র সে মুভির মত কোনো প্রাণীর রূপ নিয়ে আসেনা! কখনো এস্ট্রোয়েড হয়ে, কখনো ভূমিকম্প-সুনামি হয়ে, কখনো বা বিশ্বযুদ্ধ হয়ে কিংবা করোনা, ফ্লু, কলেরা, জলবসন্ত রূপে। হারিয়ে যায় ডায়নাসোর, হারিয়ে যায় এটলান্টিস, মাচু-পিচু, মোহেঞ্জো-দারো, ট্রয় নগরী। ধ্বংস হয়ে যায় ইনকা, ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় সভ্যতা! পৃথিবীর কোলাহল কমে যায় কিন্তু পিছিয়ে যায় বছরের পর বছর। Thanos এর ভাষায় Perfectly balanced as all things should be! মানুষ পেয়েছে তার পৃথিবীর প্রতি অবিচারের ফল, নিজেদের আধুনিকতার নামে ধ্বংসের প্রতিদান! লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এভাবেই সবকিছু চলে আসছে এবং চলতে থাকবে চক্রাকারে!

278

4

শিবাংশু

রিস্টার্ট, বাবিদা

এই যে ছবিটা। আমার বাড়ি গানের আড্ডায় বাবিদার গান গাওয়া। সম্ভবত আসরে গাওয়া ওঁর শেষ সোনার তরী। কারণ এর কিছুদিন পরেই পুজোর সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল। তার পর বারবার অচল হয়ে যাওয়া শরীরের গল্প। বাবিদাকে চিনি জ্ঞান বয়্স থেকে। তিনিও চিনতেন। আমার থেকে সাত-আট বছরের বড়ো । ওঁদের এবং আমাদের পরিবার বাঁধা ছিলো রবীন্দ্রডোরে, চিরকাল। বাবিদার বাবা পদ্মলোচন বসু এবং আমার পিতৃদেব ছিলেন ঘনিষ্টতম সুহৃৎদের দলে। বাবিদার একেবারে ছোটো বোন আমার সহপাঠী ছিলো। পারস্পরিক বিনিময়ের মাত্রাটি ছিলো নিত্যদিনের। প্রত্যহ লেগে থাকা সাহিত্যসভা, গানবাজনা, অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির সব দিক নিয়ে নাড়াচাড়া, আমাদের দেখা হয়ে যেতো। যতোদিন ছিলুম ঐ শহরে, ছেদ পড়েনি। মনে পড়ছে আমাদের 'বিসর্জন' নাটক। পদ্মজেঠু (ওঁর পিতৃদেবকে তাই বলে ডাকতুম আমরা) নির্দেশক। ওঁদের বাড়িতেই রোজ মহলা। একদিন বললেন সাত দিন বন্ধ থাকবে। কারণটি জানতুম আমরা। বাবিদার বিয়ে। সাতাত্তর সাল। সেদিন মনে হয়। প্রচুর খাওয়াদাওয়া হলো। মনে আছে চপটি খেতে ছিলো খুব সুস্বাদু। এক একটা স্মৃতি এরকমই। বৌদি ভারি মিষ্টি দেখতে। বাবিদা আমাদের শহরে সম্ভবত সব চেয়ে নিষ্ঠাভরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছিলেন। যেরকম দেখতুম, মনে হতো তাঁর বাবার প্রিয় সন্তান ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে যাঁরা ওঁর গান শুনেছেন, তখন কণ্ঠস্বর অনেক খিন্ন হয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে, প্রথম থেকেই নিচু স্কেলে (সি-ন্যচরাল) গান গাওয়ার জন্য পরের দিকে ওঁর গলা ভারি হয়ে গিয়ে স্ফূর্তিটি হারিয়ে যায়। আর একটা কারণ ছিলো নিরবচ্ছিন্ন সিগারেট। দুটো নিয়েই আমি তাঁকে বলেছিলুম। তিনি স্বীকার করলেন। কিন্তু বললেন, আর ফেরা যাবেনা। শ্রোতা হিসেবে আমাদের ক্ষতি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি চাকরিসূত্রে আমি দীর্ঘদিনের জন্য জামশেদপুর ছেড়ে দূরে চলে যাই। বছর আষ্টেক পর যখন ফিরে আসি দেখতে পাই একটা ছন্দপতন ঘটেছে। তাঁর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে। টেগোর সোসাইটিতে তখন আর গান শেখান না। কিছু মনান্তর ঘটেছিলো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। অন্তত বিশ বছরের সম্পর্ক ছিলো সেটি। পারিবারিক জীবনেও সম্ভবত। ২০১৮ তে পুজোর সময় আমি জামশেদপুরে ছিলুম। দশমীর দিন ভোরবেলা একটা বার্তা পেলুম ফোনে। ‘আর পারছি না...'। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলুম। পেলুম না। কয়েকবার করার পর ধরলেন। বললেন অসম্ভব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অন্য লক্ষণগুলিও একেবারে ভালো নয়। থাকেন একটা পাণ্ডববর্জিত জায়গায়। সোনারপুর স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে একটা গ্রামীণ বসতিতে। একেবারে একা। পড়শিরাও কেউ নেই তখন। সবাই পুজোর ছুটিতে বাইরে। ওঁর ছোটো ভাই এখন কলকাতাবাসী হলেও সেই মুহূর্তে বিদেশে। ওঁর একমাত্র পুত্র তো দীর্ঘকাল বিদেশবাসী। আমি বলি, এক্ষুনি নিচে নেমে একটা অটো করে পিয়ারলেস হাসপাতাল চলে যান। তিনি বলেন, হাঁটতে পারছি না। অটো স্ট্যান্ড অনেকটা দূর। আমি তো তখন বহু দূরে। কলকাতাতেই নেই। এক অগ্রজ বন্ধুকে ঘুম ভাঙিয়ে ফোন করলুম। যাঁর সঙ্গে আমার বাড়িতেই বাবিদার যোগাযোগ হয়েছিলো। তিনি আশ্বাস দিলেন। আধ ঘন্টা পর ফোন করলুম। বাবিদা ধরলেন। তিনি কোনও ক্রমে রাস্তায় এসে একটা অটো ধরে হাসপাতাল চলেছেন। অন্য বন্ধু ততোক্ষণে পৌঁছে গেছেন হাসপাতালে। সে যাত্রা বাবিদা রক্ষা পেলেন বটে, কিন্তু জীবনযাত্রায় কোনও তফাত হলোনা। যাবতীয় পান, ধূম বা তরল, অথবা ভুতোর দোকানের 'বিরিয়ানি' কিছুতেই ক্ষান্তি নেই। মানা করলে একই উত্তর, চলে গেলেই বা কী হবে? তারপর থেকে ক্রমাগত অসুস্থতা। একবার এই হাসপাতাল বা অন্য জায়গায়। ততোদিনে ছোটো ভাই কলকাতা ফিরে এসেছেন। তিনিই সামলান যথাসাধ্য। শেষে অবস্থাটি গুরুতর থেকে গুরুতম। তেইশে মে তো শেষই হয়ে গেলো। আমি তখন সদ্য ফিরেছি কলকাতায়। গরমে হিট ফিভার নিয়ে। কেওড়াতলা পর্যন্ত যেতে পারিনি। আধ শতকেরও অনেক বেশি দিন যে পরিচয় তা শুধু শরীরের সঙ্গে চলে যায়না। মানছি, জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেক দিন আগেই। অতো অনিয়মিত জীবন শরীর নেয়না। স্বভাব 'দোষে' ঠিক 'সামাজিক' হয়েও থাকতে পারেননি। তাঁর অনেক পরে কলকাতা এসেও আমার বন্ধুবৃত্তের পরিধি হয়তো বেশ খানিকটা বড়ো। সেই বৃত্তে তাঁকে আনতে চেয়েছি। পারেননি। যে নির্বাসন মানুষের কাম্য নয়, সেই গহ্বরে শান্তি খুঁজতেন। গৃহস্থ মানুষের যা কিছু থাকলে সে পরিপূর্ণ বোধ করে, তা সবই ছিলো তাঁর। শুধু সেই যাপনটি তাঁর জন্য ছিলোনা। হয়নি। তবু ভাবি, যদি দেখা হতো, তবে বলতুম, বাবিদা, একবার রিস্টার্ট করে দেখবেন নাকি? জীবনটা? অনেক ভাইরাস নিজে থেকে মুছে গেলেও যেতে পারে। গুরু বলেছেন, আমারে তুমি অশেষ করেছো। তাঁকে আর একটা চান্স দিয়ে দেখুন না। নাহ, জীবন তাঁকে আর চান্স দিলোনা।

339

7

মনোজ ভট্টাচার্য

প্লট চুরির মুখবন্ধ !

প্লট চুরির মুখবন্ধ ! একটা দুর্দান্ত সাস্পেন্সিভ ও মজাদার উপন্যাসের প্লট চুরি করাতে পারি । ‘চুরি’ কথাটা খুব রুঢ় হয়ে গেল বোধয় ! আমি তো সেটা নিয়ে কোন উপন্যাস লিখছি না প্রকাশের জন্যে ! অবশ্য সে ক্ষমতা আমার কখনই ছিল না ও এখনও নেই । তবে কিনা একটা লেখা লিখে বাংলা আড্ডায় দেওয়া যেতেই পারে । অন্তত চারজন পাঠক/পাঠিকা তো পড়তেও পারে ! এক্ষেত্রে সেই চুরিকে অনুপ্রেরণা বলা যেতে পারে ! – তবু আগে ভাগে একটা মুখবন্ধ দিয়ে রাখলাম । যারা বা ধরে ফেলতে পারেন - তাদের যেন না মনে হয় – মনোজদা এটা অমুক শো থেকে ঝেড়েছে ! প্রায় দুঘণ্টা ধরে – বেশ কয়েকটা এপিসোড দেখে – কতবার একই বিজ্ঞাপন সহ্য করে দেখাটাও তো আমার অসীম ধৈর্য ও কৃতিত্ব ! – কিন্তু স্বীকার করতেই হবে এত সুন্দর গুছিয়ে রহস্যময় কাহিনী তৈরি করা খুবই কঠিন ! ইংরিজিতে অবশ্য এরকম কাহিনী দেখেছি ! মনে করা যাক – গুগুলধাম আবাসনের এক বাসিন্দা একটা তত নাম না করা পত্রিকার সাংবাদিক ফোকটলাল – কোন একজন দুখীরাম নামে দুঃস্থ লোককে তাঁর হাসপাতালে ভর্তি স্ত্রীর চিকিতসার জন্যে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল । যদিও সেই দুঃস্থ লোকটি ধার শোধ দেবার অঙ্গীকার করেছিল – তবুও ফোকটলাল সেটা সাহায্য হিসেবেই দিয়েছিল । - কিন্তু সেই লোকটি কৃতজ্ঞতাবশত তাঁর পকেটে থাকা কোন এক লটারির টিকিট ফোকটলালকে দিয়ে দিল ! – লটারির টিকিটের নম্বর – যেভাবে হোক আবাসনের সম্পাদক ভিদের মনে রইল – কারন নম্বরটা ওর মোবাইল নম্বরের সঙ্গে মেলে । পরদিন সকালে ভিদে পড়ার জন্যে কাগজ খুঁজতে – ওর স্ত্রী মাধবী সেটা এনে দিল । তিনি পাঁপড় তৈরি করেন – সাইড বিজনেস হিসেবে । তাই কাগজটা সেই কাজে লেগেছিল । কাগজটা পেয়েই ভিদের মনে পড়লো ফোকটলালের লটারির কথা । - লটারির পাতায় নম্বরে দেখতেই – দেখল সেই নম্বরটা হুবহু এক ! দুজনেই তো খুব উত্তেজিত ! ওদের আবাসনের একজন লটারি পেয়েছে – এক কোটি টাকা ! যেন ওরাই লটারি পেয়েছে ! ফোন করলো ফোকটলালকে । ফোকটলাল অনেক রাত পর্যন্ত খবরের কাগজের অফিশে কাজ করে । ফলে বাড়ি ফিরতে রাত হয় ! ফোন বন্ধ ! অথচ টিকিট তো তাঁর কাছে ! নম্বর মেলানো দরকার । দুজনে ঠিক করলো – ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে এই সুখবরটা জানানো – ও লটারি পেয়েছে ! ভিদে সস্ত্রীক ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়েই দেখা হোল আরেক প্রতিবেশী বাল্লে বাল্লে সিং এর সাথে । প্রাতর্ভ্রমণে যাচ্ছে ! ওরা জানালো ফোকটলালের একটা সুখবর আছে । ওরাও সঙ্গী হোল । ক্রমে ক্রমে আবাসনের সব প্রতিবেশীরাই জানতে পারল ফোকটলালের একটা সুখবর আছে । সবাই ধরে নিল – ফোকটলালের পাত্রীর ব্যাপার । ভালো খবর । পরে যখন শুনল – ফোকটলাল এক কোটি টাকার লটারি পেয়েছে – সবাই নাচতে লাগলো । অনেকে অতি উৎসাহে একটা ছোট ব্যান্ড পার্টি নিয়ে এলো । সে এক তুমুল কান্ড ! নিচ থেকে সবাই ফোকটলালকে ডাকাডাকি করছে – একই সঙ্গে ড্রাম এবং বিউগলের আওয়াজ ! ফোকটলাল ঘুমোয় কি করে ! বারান্দায় এসে খুব বিরক্ত হয়ে বাজনা থামাতে বলল । নিচে এসে সবার কাছে জানতে পারল – ও এক কোটি টাকা লটারি জিতেছে ! – সেই আনন্দে সেও নাচতে লাগলো । খানিক নাচ হবার পর কেউ মনে করিয়ে দিল – টিকিটের কথা । - তাই তো লটারির টিকিটটা তো আনা দরকার, দেখা দরকার । সত্যি টিকিটের নম্বর মিলেছে কিনা ! তাই ফোকটলাল ওপরে গেল টিকিটটা আনতে । নিচে ব্যান্ড পার্টি চলতেই লাগলো । সেই হট্টগোলে সামিল – আবাসনের বাসিন্দারা – সস্ত্রীক ! এদিকে ফোকটলাল গেছে তো গেছেই । - একজন গেল ওপরে তাঁর খোঁজে । ওপরে এসে দেখে ফোকটলাল সমস্ত জামাকাপড় ওলট পালট করে ফেলেছে । সমস্ত কাগজপত্র ছত্রাকার করেছে । ঘরের মধ্যে প্রায় দৌড়োদৌড়ি করছে । কিছুতেই মনে করতে পারছে না – কোথায় সেই লটারির টিকিটটা রেখেছে ! ইতিমধ্যে নিচ থেকে অনেকেই ওপরে এসে গেছে – ও জানতে পেরেছে – টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না । একজন বলল – গতকালের সেই লোকটিকে টাকা দেবার ও লটারির টিকিট পাবার পর থেকে – মনে করতে – ফোকটলাল কি কি করেছিল বা কোথায় কোথায় গেছিলো । এইভাবে আচমকা মনে পরে গেল – কাল সন্ধ্যাবেলায় চা খাবার সময়ে – চা ছলকে পড়েছিল জামার ওপর । সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলল – কাল তুমি হলদে শার্ট পরেছিলে না ? – ব্যস – মনে পরে গেল – কাল রাত্তিরেই হলদে শার্টটা চায়ের দাগ তোলার জন্যে ধোপাকে দিয়েছে । এই যাহ ! সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসল । আর কি হবে ! এতক্ষণে তো ধোপার কাচা হয়ে গেছে নিশ্চয় ! – কেউ একজন বলে উঠল – আরে এত সকালে কি কাচা হয় ? ধোপার কাছে খোঁজ নেওয়া যায় না ? – ঠিক কথা ! সবাই চলল ধোপার লন্ড্রিতে । দোকান তো বন্ধ ! – কেন ? আজ তো বেস্পতিবার নয় ! – এদিক-ওদিক জিজ্ঞাসাবাদ করতে জানা গেল – ধোপা কাপড়-চোপড় দিতে গেছে ধোবীঘাটে । একটা হুডখোলা ট্রেকার গাড়িতে ছ-জন উঠে খুঁজতে বেরুল – কোথায় ধোবীঘাট –কোথায় কাপড় কাচা হচ্ছে – কোথায় তাদের ধোবীলাল কাপড় কাচাচ্ছে ! একজনের ঘরের সামনে গিয়ে পাওয়া গেল – ধোবীলালের ঘর । সেখানে তাঁর দুই ছেলে ধোবীলালের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে এলো । তিনি স্বীকার করলেন – ধোবীলাল কাচার কাপড় খুঁজে যা পায় –সব একটা ছোট মিট-সেফের ওপর রেখে দেয় । কিন্তু টাকা-পয়সা ছাড়া সব কাগজই তিনি বিক্রি করে দেন – কাগজওলাকে । কোথায় সেই কাগজওলা ? – ঐ তো সামনেই ! - কাগজওলা বলল – সে এইধরনের ছোট ছোট কাগজ – চানা-ওলাদের বিক্রি করে দেয় ! – সে কি একজন নাকি ! এই ছ-জন লোক কাছাকাছি পার্কের সব কজন চানাওলার কাছে গিয়ে দেখতে লাগলো – সেই হলুদ রঙের লটারির টিকিটখানি কারুর কাছে পাওয়া যায় কিনা ! চানা খেয়ে তো সবাই কাগজের টুকরোটা ফেলেই দেয় – জঞ্জাল ফেলার ঝুড়িতে । - সবাই খুঁজতে লাগলো – সব ঝুড়িগুলো । যদি পাওয়া যায় সেই টুকরো কাগজ ! ইউরেকা ! জেঠালাল ময়লা ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়ে গেল – সেই লটারির টিকিটটা ! – বাবুসাব ! আপনারা এখানে কি খুঁজছেন ? আমার ঘরে গেছিলেন – খুঁজতে ? একী ! দুখীরাম – তুমি এখানে ? – তোমার বিবি কেমন আছে ? ভালো না সাব ! কাল ওকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে ! – তা আপনারা নাকি লটারির টিকিট খুঁজতে গেছিলেন ! আমার ছেলেকে জিগ্যেস করছিলেন ! - পেয়েছেন ? এইত পেলাম ! তোমার ছেলে কে ? ঐ তো চানা বিক্রি করছে ! যে ছেলেটির কাছে ওরা ছোট কাগজের টুকরোর খোঁজ করছিলো – সে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে । তাঁর কাছ থেকে পুরো ডালা ভর্তি চানা কিনে ওরা খেল – ভিড়ের সবাইকে দিল। সবাইর শুভেচ্ছা নিয়ে ওরা গাড়িতে উঠে বসল । কিন্তু ফোকটলাল কোথায় ? সবাই দেখল – ফোকটলাল দুখীরামকে কাছে ডেকে সেই লটারির টিকিটটা দিয়ে দিচ্ছে ! – দুখীরামও কিছুতেই নেবে না । সে তো টিকিটটা দিয়েই দিয়েছে ! ওটা তো আর তাঁর নয় ! কিন্তু ফোকটলাল ওকে বোঝালো – দুখীরামের দেওয়া টিকিট আবার ওর কাছেই ফিরে এসেছে । তাঁর মানে – সেটা ওরই ! সবাই বুঝতে পারল – ফোকটলাল কিপটে হতে পারে কিন্তু কতটা হৃদয়বান ! দুখীরামের স্ত্রীর অসুখ ও ওদের দুরবস্থা দেখে – ওকেই দিতে চাইছে । এর মধ্যেই সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলো । ভিড়ের সবাই ফোকটলালকে বাহবা দিতে লাগলো ! দুখীরাম দীর্ঘদিন ধরে লটারির টিকিট কিনছে – কিন্তু এ পর্যন্ত কোন লটারি ওঠেনি ওর ! টিকিটটা দেখতে দেখতে ফোকটলালকে জড়িয়ে ধরে - হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল । এতদিনে ওর কি ভাগ্য ফিরল ! মনোজ

282

2

মুনিয়া

Tell me something good

তালা‚ সকাল থেকে কি যে বোর লাগছে! শোনো একটা ছোট্ট মিত্তি গল্প বলি| …………… সন ১৯৪৫| তেরো বছরের মাধবীলতার বাড়িতে সাজ সাজ রব| তাকে দেখতে ২৭ বছরের শিবশঙ্কর আসবে পরিজন পরিবার সমেত| মাধবীর ঠাকুমা নাতনিকে রূপসী প্রতিপন্ন করতে সকাল থেকে উঠে পড়ে লেগেছেন| কাঁচা হলুদ- দুধের সরবাটা অঙ্গে ডলে ডলে চিকন ত্বক উজ্জ্বল-মসৃণ হয়েছে| বেলেমাটি দিয়ে মাথা ঘষে ধূপের ধোঁয়ায় চুল শুকানো হয়েছে| তারপর ঠাকুমা এক বাটি চন্দন বেটে রেখেছেন| তাই দিয়ে পরতের পর পরত বসিয়ে মাধবীর বোঁচা নাক চোখা করা হবে| মেয়ের এই একটিই খুঁত| নাকটি বড়ই চাপা| দু দুটি সম্বন্ধ ভেঙে গেছে এই কারণে| ঠাকুমায়ের হাতের চাপে‚ চন্দনের প্রলেপে মাধবীর দমবন্ধ হয়ে যাবার জোগার| ঠাকুমায়ের কড়া হুকুম| সাজিয়ে গুছিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হবে| তারপর একদম যেন নড়াচড়া নয়| পাত্রপক্ষকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করারও কোনো দরকার নেই| বসে হাত জড় করলেই চলবে| যথাসময়ে পাত্রপক্ষের সামনে মাধবীকে সাবধানে ধরে এনে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন পিতামহ| তখন থেকে একটানা কাঠ হয়ে বসে আছে সে| খোঁপার ভারে মাথা টনটন করছে| জরির শাড়ি অঙ্গে জ্বালা ধরাচ্ছে| গা কুটকুট করছে তবুও ঠাকুমায়ের আদেশে পুতুলের মত বসে আছে| পর্দার ওপার থেকে ঠাকুমা কড়া চোখে চেয়ে আছেন‚ সে জানে| একটু এদিক ওদিক হলে পিঠে কিল পড়বে গোনাগুন্তি| ভয়ের চোটে এবার সে চোখও তুলছেনা| আগের সম্বন্ধের লোকজন যেদিন দেখতে এসেছিল সেদিন হবু শ্বশুরের মাথার পাশ থেকে ঘুরিয়ে আনা টাক ঢাকা চুল হাতপাখার হাওয়াতে কেমন ফাঁকা তেল চকচকে মাথার ওপর লুটোপুটি খাচ্ছিল সেই দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল সে! হিং এর কচুরি‚ আলুরদম ঠেলে ফেলে রেখে পাত্রপক্ষ নির্লজ্জ মেয়ের ব্যবহারে অতি রূষ্ট হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন সেদিন| তারপর মাধবীর যা দৈন্যদশা হয়েছিল ঠাকুমায়ের হাতে! সে কথা স্মরণ করে সে আর কোনো দিকেই চাইছেনা আজ| পাত্রপক্ষ বেশি সন্তুষ্ট নয়| পাত্রের পিসিমায়ের মতে গায়ের রঙ মনমত হলেও কন্যা বড়ই খাটো| ছেলের বুকের কাছাকাছি হবে| জিলিপিতে কামড় দিয়ে তিনি অপছন্দ জাহির করেন| মাধবীর মনটা ভারী হয়ে যায়| এবারেও বিয়ে স্থির হলনা বোধহয়! চোখে জল আসা রোধ করতে ভুল করে নাক মুছতে যায় সে| আর সেই মুহূর্তে তার হাতে চন্দনের চোখা নাক উঠে আসে| ভয়ে শিহরিত তার দুই চোখ এসে মেলে ঘরের অপরপ্রান্তে বসে থাকা এক যুবকের হাস্যজ্জল দুই চোখে! কৌতুকে সেই দুটি চোখ তার নকল নাকের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসি বিচ্ছুরণ করে চলেছে| ঠাকুমায়ের আদেশ বিস্মৃত হয়ে শাড়ি লুটিয়ে‚ খোঁপা খসিয়ে এক দৌড়ে অন্দরমহলে পালায় সে| এরপরেও বিয়েটা কিন্তু হয়েই গেল| একমাত্রই পাত্রের জেদে| ব্রিটিশ সরকারকে লুকিয়ে চুপিচুপি চন্দননগরের এক বাগানবাড়িতে| আজকের মত স্বাধীনতা পূর্বের সেই সময়েও শাসক দলের নিষেধাজ্ঞা ছিল যে কোনো উপলক্ষ্যে যে কোনো জমায়েতের| বিয়ের পরেও অনেক বছর ধরে সে শাশুড়ির গঞ্জনা শুনেছে‚ বুঝলে বৌমা‚ তোমাকে একটা কথা বলি| কিছু মনে কোরোনা বাছা| আমরা গ্রামের মানুষ| আমাদের মুখে যা‚ মনে তাইই| তুমি বাপু‚ ভয়ঙ্কর রকমের খাটো| আমার ছেলের নখের যুগ্যি নও| ততোদিনে আত্মবিশ্বাসী চোদ্দ বছরের পাকা গিন্নি‚ বোঁচা নাকে নথ ঝিকমিকিয়ে কটকট করে তার শাশুড়িকে বলে উঠত‚ তবে আমায় নিয়ে এলে কেন‚ মা? আমার বাবাতো তোমাদের পায়ে ধরেনি! এই বলে তার শাশুড়ির বুক চাপড়ানো হাহুতাশ অগ্রাহ্য করে দুমদুম করে পা ফেলে অন্যত্র গিয়ে সে তার পুতুলদের সাজাতে বসত!

1655

101

Joy

অন্ধকার সরিয়ে আবার এক নতুন দিন আসবেই...

করোনা নামক ভয়াল মারণ ভাইরাসের কল্যানে আমরা কয়েকদিন গৃহবন্দী| লক-ডাউন রাজ্য তথা সারা দেশ জুড়ে| যদি ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ে তাহলে হয়ত আরও কিছুদিন লক-ডাউনের সীমা বাড়তে পারে| এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীর কাছে ভয়ানক আতঙ্ক হয়ে উঠেছে| এর করাল থাবায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে| আরও না জানি কত মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে| দু দুটো বিশ্ব যুদ্ধ‚ আরও অনেক ভয়ানক যুদ্ধকেও হার মানিয়েছে এই মাইক্রোস্কোপিক ভাইরাস| সমস্ত পৃথিবী এখন এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টায় নিমগ্ন| ডাক্তার‚ নার্স‚ স্বাস্থ্য কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন এই রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টায়| প্রচুর মানুষ আজ কর্মহীন‚ ঘরবন্দী| প্রচুর শ্রমিক‚ দিন মজুর যারা কাজের জন্যে‚ দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্যে‚ একটু ভালো ভাবে বাঁচার জন্যে দূর দেশে বা অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন| তাদের অনেকের কাজ নেই এখন| কারখানা বন্ধ| দোকান বন্ধ| হোটেল বন্ধ| গ্যারেজে কাজ করা শ্রমিকরা আজ বেকার| কেউ বা ভয়ে চলে আসতে চাইছেন তাদের নিজের বাড়ি| নিজের পরিবার‚ আত্মীয় স্বজনদের কাছে| লক ডাউনের ফলে গাড়ি‚ বাস‚ ট্রেন সব বন্ধ| সেই সব শ্রমিকরা অন্য রাজ্য থেকে খালি পায়েই হাঁটা শুরু করেছেন মাইল এর পর মাইল রাস্তা| শুনশান রাস্তায় শুধু শোনা যায় এই সব দরিদ্র মানুষের পায়ের শব্দ| শোনা যায় মায়ের কোলের শিশুর কান্না| ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে গড়িয়ে পরে ঘাম| পা কেটে রক্ত পরে| জিভ শুকিয়ে আসে জল তেষ্টায়| কিন্তু যেতে তাদের হবেই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে| সেখানেও নেই কোন কাজের হদিশ| তবু বিদেশে না খেয়ে মরার থেকে দেশে নিজের মানুষের কাছে মরা ভালো| এই হাইওয়েতে মাঝে মাঝে আসে অত্যাবশ্যকীয় পন্যের বড় গাড়ি| গাড়ির ধাক্কায় পিষ্ট হন কিছু শ্রমিক| এরা জানে না একসাথে গা ঘেঁষে থাকলে করোনা ছড়িয়ে পড়ে| দিল্লির বাস স্ট্যান্ডে হাজার হাজার শ্রমিক ভিড় জমায়| যদি কিছু বাস বা গাড়ি পাওয়া যায় বাড়ি পর্যন্ত| কেউ বা হেঁটেই যেতে চেয়েছিল তার প্রিয়জনের কাছে| কিন্তু পারেনি রাস্তাতেই মারা গেছে| হয়ত এদের লক ডাউনের আগেই রাজ্যে ফেরার ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হত| যেমন বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ প্লেনে ফিরেছিলেন এদেশে| তবুও দিল্লিতে সরকার ও অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এইসব শ্রমিকদের খাবার ব্যবস্থা করেছেন বাড়ি ফেরার ব্যব্স্থা করেছেন| তাদের অনেক ধন্যবাদ| শুধু দিল্লি নয় সারা ভারতবর্ষেই অনেক শিল্পপতি‚ অভিনেতা‚ খেলোয়াড়‚ ক্লাব‚ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন| তাদের কুর্নিশ জানাই| এই সব ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরাই নয় আরও অনেক অসংগঠিত কর্মচারী‚ ছোট ব্যবসায়ী‚ বেসরকারী কর্মক্ষেত্রের কর্মচারীরাও সমস্যায় পরবেন লক ডাউনের ফলে| টাকা পয়সার সমস্যা যেমন হবে তেমন ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনারও অনেক ক্ষতি হবে| কিন্তু কিছু উপায় নেই অপেক্ষা করা ছাড়া| কুর্নিশ জানাই সেই সব ডাক্তার‚ নার্স‚ সাফাই কর্মী‚ পুলিশদের যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমাদের ভালো রাখার জন্যে| সেই সব ডাক্তার‚ নার্সরাও কখনো কখনো বাড়িওয়ালা‚ প্রতিবেশী দ্বারা অপমানিত বা বিতারিত হচ্ছেন| সেটা কখনই কাম্য নয়| শুধু ভারতবর্ষই নয় সমস্ত পৃথিবীই এই সমস্যায় আক্রান্ত| এর ভয়াবয়তা অনেক সুদূর প্রসারী হবে| অর্থনৈতিক মন্দা হওয়ার আশঙ্খা আছে| অনেকে মানুষ মারা যাবেন রোগে তার থেকেও বেশি মানুষ মারা যাবেন অনাহারে| এর প্রতিরোধের জন্যে আমাদের লড়াই করতেই হবে| আমাদের এক জোট থাকতেই হবে| যদি চেইন সিস্টেমকে ভেঙ্গে দিতে পারলেই করোনাকে আটকানো যায় তবে আমাদের একটু ধৈর্য ধরে তাই করতে হবে| যা ক্ষতি হবে আমরা সবাই মিলেমিশে ভাগ করে নেব| তবুও কাউকে যেন অনাহারে মরতে না হয় সে মানুষ হোক বা অবলা পশু| আমাদের যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন ভাবে মানুষ‚ সমাজ পরস্পরকে সাহায্য করতে পারি| এখানে কোন ধর্ম নেই‚ জাত নেই| গরীব নেই বড়লোক নেই| এখন আর দোষারোপের পালা নয়| রাজনীতির খেলা নয়| আমাদের সবাইকে এখন এক হয়ে লড়তে হবে করোনা ও করোনার পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্যে| জিততে আমাদের হবেই| যেমন এর আগে অনেক মারণ রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে বৈজ্ঞানিকরা আমাদের সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়েছেন| আর দেরী নেই অন্ধকার পেরিয়ে আলো আসবেই| কিন্তু আমরা ছোট হলেও কিছু ভালো কাজ সমাজের জন্য করতে পারি| কিছু অসহায় মানুষের মুখের হাসির কারন হতে পারি| অন্ধকার বার বার আসবেই আবার নতুন সূর্যোদয় হবে| কিন্তু অন্ধকার কেটে যায় যদি আকাশে অনেক অনেক ছোট ছোট নক্ষত্র থাকে| এই অসংখ্য ছোট ছোট নক্ষত্ররা অন্ধকারে এগিয়ে যাবার সাহস যোগায়| দিব্যেন্দু মজুমদার

428

3

শিবাংশু

মেঘগিরির মায়াকানন

একটা ঝিল। ছায়াঘেরা, শালুকপাতা আর ফুলে ছেয়ে আছে সারাটা। পাশে দাঁড়ালেই একটা শান্তিকল্যাণের স্পর্শ লাগে প্রাণে। নাম তিস্স বেওয়া । সিংহলদ্বীপের আদি রাজাধিরাজ তিস্সের নাম বহন করে এই সরোবর। বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। সেখান থেকে উত্তর দিকে তাকালেই রুয়ান ওয়েলিয়া স্তূপের চূড়া চোখে পড়বে। পৃথিবীর একটি আদিতম এবং বৃহত্তম বৌদ্ধ তীর্থ সেখানে। ঠিক তার সামনেই দৃশ্যের জন্ম হয়ে আসছে প্রায় ইতিহাসপূর্ব কাল থেকেই। ইসুরুমুনিয়া। পৃথিবীতে একেকটা জায়গা আছে, যেখানে ইতিহাস, পুরাণ, উপকথা সব জড়াজড়ি করে রয়ে গেছে হাজার হাজার বছর ধরে। এরকমই একটা নাম, ইসুরুমুনিয়া । সিংহলদ্বীপের আদি রাজধানী অনুরাধাপুরা মহাবিহারের কাছেই। উপকথা বলে, এই সেই জায়গা, যেখানে পুরাণের পুলস্ত্য ঋষি বসবাস করতেন। প্রবাদের স্বর্ণলংকার রাজা রাবণের জন্মস্থান ছিলো এই মাটিতে। ইতিহাস বলছে, সিংহলের আদিযুগের রাজা তিস্স দেবানামপ্রিয়, রাজধানী অনুরাধাপুরার পাশে নির্মাণ করেছিলেন বেশগিরি বিহার। কালক্রমে যেটি স্থানান্তরিত হয়ে যায় ইসুরুমুনিয়ার মন্দিরে। রাজা তিস্স ছিলেন মগধের রাজা পিয়দস্সি অশোকের সমসাময়িক (৩০৭-২৬৭ খ্রিস্টপূর্ব)। তাঁর সময়েই সম্রাট অশোক তাঁর সন্তান ভিক্ষু মহিন্দ এবং ভিক্ষুণী সংঘমিত্তাকে সিংহলে বুদ্ধের ধর্ম প্রচার করতে পাঠিয়েছিলেন। পঞ্চম শতকে সিংহলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার জোয়ার আসে। উচ্চবর্ণের পাঁচশোজন সন্তান একসঙ্গে সদ্ধর্মের শরণ নিয়েছিলেন। তখন রাজা কস্যপ-১ (৪৭৩-৪৯১ খ্রিস্টাব্দ) নিজের ও দুই কন্যার নামে এখানে একটি বিহার তৈরি করে দেন। একটি গ্র্যানাইট টিলার ভিতরের গুহার সঙ্গে এই বিহারটি যুক্ত ছিলো। পাহাড়ে টিলাটির পাশে একটি ছোটো স্তূপও রয়েছে। স্তূপটি অবশ্য আধুনিক কালের। পাহাড়টির গোড়ায় রয়েছে একটি অদ্ভুত সুন্দর ছোট্টো সরোবর। সরোবরের জল যেখানে পাহাড়টিকে স্পর্শ করছে সেখানে পাথরে খোদাই করা এক ঝাঁক হাতির যূথ বাস রিলিফে। রানমাসু উয়ান (উদ্যান) ঘিরে আছে গোটা বিহার ও মন্দিরটিকে। প্রাচীন মন্দিরটি রয়েছে একটি গিরিগুহার মধ্যে। পাথরের স্তম্ভ গুলি কারুখোদিত। ভিতরে উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি। এই মন্দিরে বুদ্ধের পূত দেহাবশেষ রাখা ছিলো একসময়। মন্দিরে উঠে যাবার সিঁড়ির দুপাশে সুচারু দুই মুরুগল। তাঁদের হাতে 'পুনকল' বা পূর্ণ কলস। পবিত্র প্রতীক। সামনে কারুকার্যময় 'সন্দকদ পাহান' (চন্দ্রপাষাণ) বা মুনস্টোনের পাদপীঠ। পাহাড়টির বৃহৎ শিলাগুলি মন্দিরের পাশের দেওয়ালের কাজ করছে। তার শীর্ষে বিখ্যাত 'মানব ও অশ্ব' নামক 'অর্ধ-উন্নত ভাস্কর্য ' বা বাস রিলিফটি দেখা যাবে। নবনির্মিত মন্দিরটি একটি উজ্জ্বল, রঙিন মূর্তিময় বৌদ্ধ গুহ উপাসনাগৃহ। সেখানে একটি বিশাল বুদ্ধের অনুপম মহাপরিনির্বাণ ভঙ্গির মূর্তি রয়েছে। রয়েছে গুহাকন্দরে ভিক্ষু মহিন্দের শিষ্যদের উপদেশরত একটি রচনা। তা ছাড়াও বুদ্ধ ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা মূর্তি দেখা যায়। মন্দিরের শেষপ্রান্তে একটি বোধিবৃক্ষ শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে ব্যপ্ত হয়ে আছে । এই বৃক্ষটি অনুরাধাপুরা বিহারের মূল বোধিবৃক্ষের অঙ্কুর জাত। 'ইসুরুমুনিয়া' নামটি এসেছে ঈশ্বরমুনি থেকে। বৌদ্ধমতে তথাগতই সেই ঈশ্বরমুনি। হিন্দুরা কেউ কেউ দাবি করেন এটি শিবের বিশেষণ। আবার অনেক পণ্ডিতের মতে শিলাভাস্কর্য অনুযায়ী এই মন্দিরটি সূর্য ও পর্জন্য (মেঘ) দেবতার মন্দির ছিলো। সরোবরটির জলে ক্রীড়ারত হাতিদের মূর্তিগুলি আসলে মেঘের প্রতীক। সেই জন্য এই ইসুরুমুনিয়া মহাবিহারের আদি নাম ছিলো মেঘগিরি মহাবিহার। তবে ধারাবাহিকভাবে এই দেবালয়টি বৌদ্ধ উপাসনার স্থান হিসেবেই গণ্য হয়েছে। শ্রীলংকার বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এই মন্দিরটির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। একটি অন্য কারণেও এই মন্দিরের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। সিংহলি শিল্প-ইতিহাসে অতিখ্যাত 'ইসুরুমুনিয়া-যুগল' নামের একটি বাসরিলিফ মূর্তি একটু দূরের মূল বেশগিরি মহাবিহার থেকে এনে এই মন্দিরে রাখা হয়েছে। এই সৃষ্টির পটভূমি নানারকম কিংবদন্তি আশ্রিত। ভাস্কর্যটির সিংহলি নাম 'পেম-যুবল' বা প্রেমিকযুগল। একটা গল্প অনুযায়ী সিংহলের বিখ্যাত রাজা দুতুগেমুনুর (দূতগমন) পুত্র সালিয় (শল্য) প্রণয়াসক্ত ছিলেন অশোকমালা নামে এক শূদ্রদুহিতার। প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে তিনি সিংহাসনের অধিকার হারিয়েছিলেন। এই মূর্তিটি নাকি তাঁদের স্মরণ করেই তৈরি হয়েছিলো। আবার একটি ব্রাহ্মীলিপিতে উৎকীর্ণ শিলালিপি বলছে এই মূর্তি রাজা কুবের বৈশ্বরণ এবং তাঁর রানি কুনিদেবীর। রামায়ণের উল্লেখ মানলে এই রাজা, রাবণেরও আগে বেশগিরিতে অধিষ্ঠান করে লঙ্কাদ্বীপে রাজত্ব করতেন। ষষ্ঠ শতকের গুপ্তশৈলীতে নির্মিত এই মূর্তিটির সঙ্গে তামিল পল্লব ভাস্কর্যের মিল পাওয়া যায়। শ্রীলংকায় যে শৈলীর ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এর তফাত আছে। দেশে বিদেশে মাপে হয়তো বিশাল নয়, কিন্তু সৌন্দর্যে অনুপম,, অনেক শিল্পস্থাপত্যের নমুনা দেখেছি। কিন্তু মেঘগিরি বিহার বা বেশগিরি বিহার বা ইসুরুমুনিয়া মহাবিহারের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সবার মধ্যে মনে থেকে যায়। 'বিন্দুতে সিন্ধু' (সারদা বাঁচিয়ে) জাতীয় একটা অনুভূতি হতে পারে। ঘালিবের ভাষায় বলতে গেলে, অবশ্যই এর 'অন্দাজে বয়াঁ অওর' ...

340

4

শিবাংশু

শ্যামলছায়া, নাই বা গেলে ...

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আজকের তারিখে জন্মেছিলেন। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো সাতাশি। চলে গেছেন উনিশ বছর আগে। কোনও মানে হয়না। এই লেখাটির সঙ্গে অবশ্য তার কোনও যোগাযোগ নেই। আবার আছেও। কয়েকদিন ধরে তাঁর গল্পসংগ্রহটি ছাড়া ছাড়া ভাবে পড়ছি। তাঁকে নিয়ে একটা কিছু লিখবো সেই জন্য। একটু কম চার দশক আগে তাঁর সঙ্গে একটা মুঠভেড় হয়েছিলো এই অধমের। বাংলা গদ্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো না তা। যাকগে, সে রামও নেই, সে সুগ্রীবও নেই। আরও একটু সময় লাগবে হয়তো, ইচ্ছে হয়ে থাকা লেখাটি নামাতে । মনে থাকে, সাহিত্যের ন্যারেটিভকে বাঙালি একসময় সিনেমায় দেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতো। শ্যামল সেটা করতেন না। বলা ভালো পারতেন না। শব্দের আকুল ফ্রেমে বেঁধে নিজেকে উদ্ধার করে আনা ছাড়া আর কোনও চতুরতা স্পর্শ করতো না তাঁকে। গুপ্তধনের মতো। তার সিনেমা হয়না। আঁধার রাতে ক্যানিং লাইনের শেষ ট্রেন ধরে যখন চম্পাহাটিতে টুক করে নেমে গেলেন, তখন মনে হলো এইতো যাওয়া। আসলে তিনি তো 'কথক' ছিলেন না। কিন্তু তাঁর 'সময়'টা ছিলো কথকদের। বাঙালির সাইকিটি কথকতার। বাংলায় সফল লিখিয়েরা সবাই কথকঠাকুর। যেমন ধরা যাক, বিমল মিত্র। ভাষার উপর দারুণ দখল। প্লটের পর প্লট নিপুণভাবে গেঁথে যান। চরিত্রদের খেলাতে পারেন। অতো অতো লিখতে পারেন। আর রয়েছে সহজাত গল্প বাঁধার কৌশল। কিন্তু বাংলায় 'উপন্যাস' নামক নির্মাণটি, যেটা সম্ভবত বিলিতি নভেল থেকে ধার করা, চারিত্র্যে একেবারেই আলাদা। সেটা ওঁর আসেনা। তা বলে কি তিনি 'লেখক' ন'ন? তিনি একজন 'ট্রেন্ডসেটার',অবশ্যই। তাঁর লোকপ্রিয়তা অসাধারণ। কারণ, বাঙালির একটাই চাহিদা, 'গল্প ভালো, আবার বলো'। বড়ো সাহিত্যিকরা তাঁদের সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে এমনভাবে তৈরি করেন, অন্য কোনও শিল্পী তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কেউ কখনও 'ঢোঁড়াই'য়ের সিনেমা বানাতে পারবেন কি? চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোনও বড়ো ছবিকর হলে সতীনাথ নয়, তাঁর নিজের 'ঢোঁড়াই'কে তৈরি করবেন। সেটা কোনও অবস্থাতেই 'সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ' হবেনা। হবে না 'কুবেরের বিষয়আশয়' বা 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'. বাঙালি লেখকরা গত একশো বছরের অধিককাল ধরে অপার-অনন্ত 'উপন্যাস' রচনা করে আসছেন। তার মধ্যে শারদীয়া প্রসাদ টাইপ বারোটি 'উপন্যাস' অথবা চোদ্দোটি 'উপন্যাসোপম' বড়ো গল্প ইত্যাদি লেখালেখি পঁচানব্বই ভাগ। আট-দশফর্মা এলোমেলো 'মশলাদার' 'উপন্যাস' প্রকাশকরা নিয়মিত ছেপে যেতেন। একটা লেখা, 'অরণ্যের দিনরাত্রি'। লেখাটার 'জঁর'টা যে কী, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। কিন্তু মানিকবাবুর হাতে পড়ে তার ভোল পাল্টে গেলো। ঐ ছবিটাকে কি 'সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ' বলা যাবে? জানিনা। 'সাহিত্যমূল্যে' লেখাটি ঠিক কোথায় থাকবে, এতোদিন পরেও তা স্পষ্ট নয়। সুনীলবাবু পছন্দ করেননি মানিকবাবুর কাজটি। শ্যামলের লেখা ‘সিনেমা’ করা নিয়ে তো কেউ ভাবেইনি। আমাদের কালে সেই একজন ছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। পাড়ার লাইব্রেরিতে বসতুম। তাঁর বইয়ের হাই ডিমান্ড। যেমনভাবে আমরা ছ-সাত ক্লাসে 'কঠোরভাবে কলেজ স্টুডেন্ট দের জন্য' স্বপনকুমারের 'বিশ্বচক্র সিরিজ' গুনে গুনে পড়তুম। তেমনই লোকে নিমাই ভট্টাচার্য পড়তেন বই গুনে গুনে। তাঁর ম্যাগনাম ওপাস 'মেমসাহেব'। 'মেমসাহেব'কে 'সাহিত্য' বলতে বাঙালিই পারে। এককথায় একটা তৃতীয় শ্রেণীর টলি-চিত্রনাট্য। আমাদের সময়েই সাত কেলাস পেরোবার পর ওসব পড়া চাপ ছিলো। আমাদের গ্রামে দেখেছি 'মেমসাহেব' ও 'মুকদ্দর কা সিকন্দর' দেখে বিপুল সংখ্যায় বাষ্পাকুল মহিলারা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নটরাজ ও করিম টকিজ থেকে বেরিয়ে আসছেন। আমরা অভিভূত হয়ে পড়তুম। এখন কী হয়, জানিনা। এমন নয় যে লোকের মোটা মোটা বইয়ের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিলো। যেমন ছিলেন 'বনফুল'। বিখ্যাত লিখিয়ে। অনেক লিখেছেন। ওঁর বিশেষত্ব বিচিত্ররস। ঘষাদুনিয়ার বাইরের ঘটনা, ভূগোল, লোকজনকে নিয়ে কারবার। একসময় জনপ্রিয়ও ছিলেন। 'অধৈর্য' পাঠকদের রাজা। তাঁর লেখা সবসময় মাপে হ্রস্ব। এখনকার পার্ল্যান্সে 'ফেবু' লেখক। 'স্থাবর' বা 'জঙ্গম' ব্যতিক্রম। ঐ লেখাগুলি এখন কেউ পড়েন কি না, জানিনা। তাঁর বেশ কিছু লেখা ছবি হয়েছে। হাটেবাজারে, অগ্নীশ্বর, অর্জুন পণ্ডিত, ভুবন সোম। 'অগ্নীশ্বর' একজন সত্যিকারের ডাক্তারের জীবন নিয়ে লেখা। যদ্দূর মনে পড়ছে তিনি শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের বড়দা ছিলেন। ভুল হতে পারে। মানুষটি ও উপন্যাসের চরিত্রটি একরকমই ছিলেন বলে শুনেছি। বাকি ছবির চরিত্রগুলিও বাস্তব মানুষদের আদলে লেখা। এঁরা ছিলেন আদর্শবাদী, স্বদেশসচেতন, আত্মসম্মানী, নির্লোভ, অনেক গুণ সম্পন্ন । সাধারণ বাঙালি দর্শক এমন মানুষদের ভালোবাসেন । কিন্তু নিজেরা হয়ে উঠতে পারেননা। হিরো ওয়রশিপে বাঙালি বঙ্গবিভীষণ পাবার যোগ্য। অগ্নীশ্বর, অধিকলাল বা অর্জুন মণ্ডল বনফুলকে জনপ্রিয় করতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের বিচারে কালজয়ী করতে পারেনা। তাঁদের নিয়ে 'বই' তৈরি হতে থাকে। কিন্তু 'সিনেমা'র ভিতর দিয়ে তাঁকে চেনা যায় না। বনফুলের স্বভাবসিদ্ধ ভাষা আর ট্রিটমেন্ট ছবির ভাষায় আনা যায়না। বড়ো ছবিকর হলে সম্পূর্ণ অন্য একটি সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে 'সাহিত্যে'র কোনও সম্পর্ক থাকবে না। কোনও লেখা থেকে ছবি তৈরি হওয়ার খবর থাকলে সেই সব বই খুব বিক্রি হতো একসময়। প্রকাশকরা বিজ্ঞাপন দিতেন, ছবি দেখার আগে বইটি পড়ে যান। এই সব ছেলেমানুষি এখনও হয় কি না জানিনা। বছর পঁচিশ হলো নতুন বাংলা ফিকশন পড়ার প্রয়াস নিইনি। 'বাংলাসাহিত্য' থেকে 'বই' কি এখন তৈরি হয়? ঠিক জানিনা। সিনেমার ভিতর দিয়ে ভারি ভারি কথা বলার ধরনটি এখন আর দেখা যায়না। যাপনের গরমিল থেকে উঠে আসা দুঃখযন্ত্রণার রূপকথা এখন ক্যানভাস পাল্টেছে। সময়ের প্রাসঙ্গিক মাত্রাগুলি বড্ডো পাল্টে গেছে গত দু দশকে। 'বই' থেকে আর 'বই' তৈরি হয়না। সেই সব রীতি ধরে নতুন ছবি করা যায়না। গল্পের টানে ছবির গুন আর টানা যায়না। সিনেমা সাবালক হয়েছে। তার ভাষা আর বইয়ের ধার ধারেনা। ম্যাটিনি শো'তে 'বই' দেখতে যাওয়া লোকজনও তো এখন সানসেট ব্যুলেভার্ডের পথিক। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়দের এখন জেগে ওঠার সময় হয়েছে।

336

2

Stuti Biswas

শ্যামলী নদীর খোঁজে পাঁচমারীতে...

পর্ব- ৩ বেড়ানো কারও শখ , কারো নেশা কারও কাছে জীবন । আমার কাছে বেড়নো মানে শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখা বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া নয় । রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে বেড়িয়ে প্রকৃতির মাঝে আয়েস করে কয়েকটা দিন কাটানো । কয়েকদিন একটু অন্য ভাবে যাপন করলে মন হালকা হয় । জীবনের গাড়ী চালানোর জন্য তাজা হাওয়া ভরে নেওয়া যায়। সকালে ঘুম ভাঙ্গল টিয়াপাখির কলরবে । বেরিয়ে দেখি ঝলমলে রোদ । আজ উঠতে একটু দেরী হয়ে গেছে । বারান্দার পাসের ঝাঁপাল গাছের সারিতে পক্ষীকুল সমাগত প্রাতরাশের জন্য । কাছেই চার্চ । প্রাতভ্রমনে বেড়িয়ে ওদিকেই গেলাম । রাজভবনের সামনে দিয়ে রাস্তা । গভর্নরের গ্রীষ্মকালীন বাসভবন ।পাশেই সরকারি আমলার বাংলো । সুন্দর বাগান দিয়ে সাজানো বাংলোগুলি  । পাহাড়ের কোলে শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে ছোট্ট ছিমছাম চার্চ । হোটেলে ফিরে স্নান সেরে ডাইনিং রুমে যাবার পথে ম্যানেজারকে বললাম জীপ ঠিক করে দিতে । বুফে ব্রেকফাস্ট , একটা করে ঢাকনা খুলছি আর পিছিয়ে যাচ্ছি । সেই ঘিসাপিটা ব্রেড ,ডিম , ইডলি, ধোসা । লাস্টের ঢাকনা খুলতেই মন আনন্দে ডগমগ করে উঠল । ফুলকো লুচি পাশেই আলুর দম । আহা আর কি চাই । ম্যানেজার ফিসফিস করে বলে গেল ওগুলো নেবেন না গরম গরম আসছে । সকালে ঠিক করেছিলাম হালকা ব্রেকফাস্ট করব কারন তারপরই বেড়ব ফলস দেখতে । চড়াই উতরাই পথে ওঠা নামা করতে হবে । সব প্ল্যান মাথায় উঠল বেশ কখানা লুচি খেয়ে ফেললাম । তৈরি হয়ে বেড়িয়ে দেখি বিশাল ভুড়িওলা ড্রাইভার হুডখোলা জীপ নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।আমাদের দেখেই বিরাট নমস্তে করল । মন যতই নাচানাচি করুক শরীর মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয় অত তরবর করো না  । জীপে চড়তে একটু বেগ পেতে হল । চাকার ওপর পা দিয়ে তড়াং করে লাফিয়ে জীপে উঠতে গিয়ে পপাতধরনীতলে  । তবে আসপাসের লোকজন বেশ ভদ্র আমায় দেখে হো হো করে কেউ হাসেনি । অবশেষে সিঁড়ী বেয়ে হাঁকুপাঁকু করে চড়লাম । যাত্রা সুরু। ছোটবেলায় পড়াশুনা না করার জন্য বকুনি খেলেই , মাঝে মাঝে প্রবল ইচ্ছা জাগত বনে গিয়ে কুঁড়ে বানিয়ে থাকব ।গাছে উঠে ফল পারব। ছিপ দিয়ে মাছ ধরব । কি মজা হবে । কেউ পড়তে বলবে না । তখন তো জানতাম না জঙ্গলে যাবার অনেক হ্যাপা  । পারমিশন নিতে হয় , টিকিট কাটতে হয় । অনিচ্ছাস্বত্বেও গাইডকে বগলদাবা করতে হয় । সংসারে বিরক্ত হয়ে যারা ভাবে বনে গিয়ে স্বাধীন জীবন কাটাবে তারাও বোধহয় বনে যাবার হ্যাপা সম্বন্ধে অবগত নয় । ইতিহাসের পাতা উল্টে নিই । ১৮৫৭ সাল , সিপাহী বিদ্রোহের দামাম বেজে উঠেছে । বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশরা হিমশিম খাচ্ছে । হঠাত খবর এল বিদ্রোহের অন্যতম নেতা তাঁতিয়ে তোপী সাতপুরা পর্বতে লুকিয়ে আছে । ক্যাপ্টেন জে ফোরসিথ তাঁতিয়ে তোপীকে ধাওয়া করতে করতে আকস্মিক ভাবে পৌঁছে যান ঢেউ খেলানো মালভূমিতে  । একদল বাইসন সাহেবের পথ অবরোধ করে দাঁড়ায় ।মিশন অসফল হওয়ায় সাহেব বিমর্ষ  । কিন্তু মালভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ সাহেবের মন কেড়ে নেয়  । অভিভূত ক্যাপ্টেন জায়গাটিকে বসবাস যোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা করেন । ফোরসিথ ১৮৬২ সালে সর্বপ্রথম এখানে বাড়ী বানান  । বাড়ীটির নাম দেন বাইসন লজ । পরবর্তীতে পাঁচমারীতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান মিলিটারী বেস গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাইসন লজে সরকারি টিকিট কাউন্টার । জঙ্গলে ঘুরতে হলে ওখান থেকেই টিকিট কাটতে হয়  ।নিজের গাড়ীতে ঘুরলে ৬০০টাকা টিকিট । লোকাল জিপসী ভাড়া করলে ৩০০টাকা । জঙ্গলে একা ঘুরতে দেবে না গাইড গুজে দেবেই । সব মিলিয়ে হাজার টাকা , গাড়ীভাড়া আলাদা ( ড্রাইভারের ইচ্ছা অনুযায়ী ) । নিজ গাড়ী নিয়ে গেলে জংগলের গেটের থেকে ২কিমি দূরে পারকিং , গাড়ী দাঁড় করিয়ে দেবে । তারপর হন্টন । জীপসি হলে ভেতরে বেশ কিছুটা যাবে । মানে হরেদরে জিপসী ভাড়া করতেই হবে । ড্রাইভার গেল টিকিট কাটতে আমরা মিউজিয়ামে  । মিউজিয়ামে পাঁচমারীর ম্যাপ , জঙ্গল , প্রানী ও উদ্ভিজ জগত সম্পর্কে কিছুটা ধারনা হল । বেড়িয়ে দেখি ড্রাইভার একটি লোকের সাথে খোস গল্পে মেতেছে । আমাদের দেখে লোকটি এগিয়ে এসে বলল সে আমাদের জংগলে পথ দেখাবে । গাইড  । গাড়ীর হ্যাণ্ডেল শক্ত করে ধরে বসে আছি । উতরাই রাস্তা । গাড়ী হু হু করে নামছে জঙ্গলের পথে  । শহরের যেটুকু চিহ্ন ছিল , অল্প চলার পরই তা পিছনে পরে রইল । ইষ্ট নাম জপতে জপতে ভাবছি যদি একবার হাত ছেড়ে যায় , জীবনের ঘূর্ণিপাক থেকে ছিটকে কোথায় গিয়ে পরব কে জানে । তবে বাঘের লাঞ্চ/ ডিনার টেবিলে শোভা পাব না এটা নিশ্চিত । গাইডকে যাতে বাঘ দেখানোর জন্য পীড়াপীড়ি না করি তাই সে প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছে সাতপুরা ন্যাশনাল পার্ক খোলার পর মাস দুয়েক বাঘ দেখা গেছিল । পরে( বোধহয় সেরকম দর্শক না পাওয়ায় )বাঘেরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে গেছে । মাঝে মধ্যে চিতা , লেপার্ড রাজত্ব ঠিক আছে কিনা এসে দেখে যায় । তবে বন আমাদের হতাশ করেনি । সোনালি লেজওলা একদল বাঁদর গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে অভিনন্দন জানাল । গলা ছেড়ে গান ধরল রংবেরঙের পাখিরা  । অজানা ঠিকানা থেকে উড়ে এসে নাচতে শুরু করল রঙিন প্রজাপতির দল । জঙ্গল বাড়তে লাগল । পাতাঝরা বন । মাঝে মাঝে বাঁশের ঝাড় ,শালের জঙ্গল তলায় পাতার স্তুপ । হাওয়া দিলেই হুড়হুড়ি পরে যাচ্ছে বনে। বড় বড় বহেড়া , কুহমি গাছ নীরব প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে । সারি সারি । ,চিরহীদানা (চিরঞ্জী ) গাছে ফুল এসেছে  । অরন্যের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মাঝে মাঝে গম্ভীর স্বরে কুবো পাখি ডেকে উঠছে কুব কুব............ । কানে আসছে অস্পষ্ট জলের শব্দ । বি-ফলসের কাছাকাছি এসে গেছি । জিপসিতে আমাদের সহযাত্রী পরিবারটি তে দুটী বাচ্চা  । তারা আগেই জানিয়ে দিল ঝরনার নীচে যাবে না  ।গাড়ী থেকে নামার সময়ই গাইড জানতে চাইল আমরা ঝরনার নিচে যেতে ইচ্ছুক কিনা । হ্যা বলাতে গাইডের মুখখানা কেলো হাঁড়ির মত হয়ে গেল । পাথরের ফাঁক দিয়ে শান্ত জল্ধারা বয়ে চলেছে খানিকটা । তারপরই খাড়া পাহাড়  । কয়েকশ ফুট নীচে ঝাঁপিয়ে পরছে পাহাড়ী ঝোঁড়া  । ভিঊ পয়েন্টে নিয়ে গিয়ে গাইড নানা টালবাহানা কথা বলে নীচে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের নিরস্ত করতে লাগল । কিন্তু আমরা বদ্ধপরিকর । ও বোধহয় এমন নাছোড়বান্দা বুড়োবুড়ী আগে দেখেনি । নীচে নামার সিঁড়ি দেখিয়ে ব্যাজার মুখে পাথরের ওপর বসে রইল । একপাশে খাঁড়া পাহাড় অন্য দিকে ঝরনা । মাঝখান দিয়ে পাথরের সিঁড়ী । পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কত গাছ , রঙিন বুনো ফুলের ঝাঁরে অচেনা পাখির কিচিরমিচির । পাথরের ফাঁক দিয়ে চেনা আকাশটা আশ্চর্য সুন্দর দেখাল । নিচে নেমে দেখি প্রবল জলরাশি ঝাঁপিয়ে পরছে স্ফটিকের মত ছোট্ট জলাশয়ে। তারপর পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছুটে চলছে । জলে পা ডুবিয়ে বসে মৌমাছির গুনগুনানির মত জলোচ্ছ্বাসের শব্দ শুনলাম  । সাহেবরা ঝরনার নাম দিয়েছে বি-ফলস । স্থানীয় লোকেরা বলে যমুনা প্রপাত । একসময় এই প্রপাত ছিল শহরের পানীয় জলের উতস। অনেকেই দেখলাম স্নান করছে । পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আমরাও কিছু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করলাম । ফেরার সময় সিঁড়ী দিয়ে উঠতে প্রান বেড়িয়ে যাবার উপক্রম । মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়ে তারপর উঠলাম। ওপরে উঠে এসে দেখি গাইড হন্তদত্ন হয়ে পায়চারী করছে । ভাবছে বোধহয় আমরা নিচেই সংসার পেতে ফেলেছি । আমাদের দেখে আশ্বস্ত হয়ে গাড়ীতে গিয়ে বসল । ড্রাইভার ঝিমাচ্ছে । হঠাত ঝিমুনি ভেঙে আমাদের দেখে কি করবে বুঝে না পেয়ে এমন সাবাসি দিতে লাগল , মনে হল এই বয়সে আমরা যেন এভারেষ্ট জয় করে এসেছি । গাড়ী স্ট্রাট করল । গাড়ী সেকেন্ড গীয়ারে চলছে । রাস্তা বলতে কিছু নেই বনের পথ । প্রচুড় ঝাঁকুনি । নির্জন পাহাড়ী চড়াই ভেঙে দুই পাহাড়ের মাঝে বিরাট খাঁজে এসে দাঁড়ালাম । প্রকৃতি নিপুন হাতে বানিয়েছে এম্পিথিয়েটের  । চারিদিকে পাথরের দেওয়াল ওপরে নীল আকাশ । মুখে হাত দিয়ে ইকো করতেই সবুজ মেঘের মত এক ঝাঁক টিয়া তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে ডাকতে উধাও হয়ে গেল । বাইরে সূয্যিমামা বেশ জ্বলিয়ে পুড়িয়ে দিলেও ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে ঠাণ্ডা ।জায়গাটির নাম রিচগড় । রিচগড় একসময় ভালুকের আস্তানা হলেও বর্তমানে পর্যটকদের দখলে । বনের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী সুন্দর এক গাছের সাথে পরিচয় হল । কুসুম গাছ । পাতলা গোলাকার পাতা । পাতাতে সবে লাল রঙ ধরেছে। বসন্তশেষের বনে হোলিখেলার আমন্ত্রন জানাচ্ছে । হাওয়ার ঢেউয়ে কম্পমান পাতা , জলের শব্দ, পাখির ডাক কেমন যেন আনমনা করে দেয় । বিকালের কাঁচপোকা রোদে সঙ্কীর্ণ উতরাই পথে নিচে নামতা থাকি । গাছের ফাঁক দিয়ে রজত প্রপাতের সফিন জলরাশি চোখে পড়ছে । ভিউ পয়েন্টে এসে দাঁড়াই । কয়েকশ ফুট উঁচু থেকে সগর্জনে আছড়ে পরছে গভীর খাদে । অপূর্ব দৃশ্য । নিস্তব্দতারও ভাষা আছে ।সে ভাষা গুঞ্জরিত হয় পাচমারীর বনে পাহাড়ে আকাশে বাতাশে । নির্জন বনে হাঁটাতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা পাহাড়ের সাথে , প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা পাগলা ঝোড়া , রহস্যময় গুহা , গভীর খাদের সাথে । বাতাসে ভেসে বেড়ায় পুটুস ঝোপের কটু গন্ধ । গায়ে লুটিয়ে পরে সোণালী ধূ ধূ ঘাসের বন  । গাছের পাতায় সওয়ার হাওয়া ইলিবিলি কাটে দিনরাত । নির্জন বনে হাঁটাতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় গোন্দ আদিবাসীদের সাথে । নির্জনতা আর এডভেঞ্চারের অদ্ভুত মিলন বাধাঁ পরেছে সাতপুরার রানীর আঁচলে । শেষ বিকালের গন্ধ মেখে ফিরে এলাম হোটেলে । রাতে খাওয়ার পর চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসলাম । লনে আগুন জালানো হয়েছে । তাকে ঘিরে অল্প বয়সী কয়েকটি ছেলে গীটার বাজিয়ে গান গাইছে। হাওয়ায় পিঠে চড়ে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পরছে পাহাড়ে জঙ্গলে । রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ী চলে গেল  । টেল লাইটের আলোটা মিলিয়ে গেল জঙ্গলের পথে । একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাক , বনের শিশির , কুয়াশা চাঁদের আলোর সাথে মিলেমিশে এক স্বপ্নরাজ্য তৈরি করেছে । জংগলে যতবারই আসি কি যে ভাল লাগে । কত গন্ধ , শব্দ , দৃশ্য । জীবনের টানাপোড়েন ভুলে মেতে উঠি এক অদ্ভুত আনন্দে ।

484

10

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

তুমি কী মরীচিকা না ধ্রুবতারা? "কী নিবিড় কী নিবিড় সমুদ্রসবুজ আমার অপেক্ষার রঙ। ডুবে যাওয়ার ভয়ে নিজেকে নিজের দু'হাতে বেড় দিয়ে থাকি। পায়ের তলা থেকে সাঁতার সরে সরে যায়। ওই রঙ আমার জন্মাবধি প্যানিকের দিন আনি দিন খাই সংসার। মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে তোমার সঙ্গে ইমাজিনারি প্রেম অবধি পুরোটাই ক্রমশ খুব চাপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে গো।আমাকে ওষুধ বলে দাও। শুশ্রূষা দাও। একবার তাকাও। কী নিস্তব্ধ কী নিস্তব্ধ তোমার চাহনি। অথচ গড়নটা বাঙ্ময়। কার সঙ্গে কথা বলো কার সঙ্গে হেসে ওঠো মেঘ মেঘ দুপুরের মতো। পপলারে বসন্ত লাগার মতো। আমি তো সারাজীবন বসন্তের অপেক্ষা করে করে উবু হয়ে বসে আছি সমুদ্রসবুজ ম্যানিক ডিপ্রেসিভ সাইকোসিসের ধারে। সঙ্গে ধর্মতলার সভ্যতা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা রোদ চশমা। কাজেই বুঝতেই পারবে না আমার চোখে ঢুলে আসা স্বপ্নের ফিউনারেল। তা সে না বুঝতেই পারো। তোমার জন্যে, শুধু তোমার জন্যেই আমার মরণোত্তর দেহদান। এরপর যা যা হবে তা খুবই নিয়মমাফিক, আর সমুদ্রসবুজ রঙটা ক্রমশ একটা বিস্তীর্ণ কালশিটে হয়ে যাবে। যেন একটা ফুটে উঠতে থাকা ক্যাকটাসের ফুল। এত কিছু, এত কিছুর পর বসন্ত আর ভাল্লাগে না সত্যি । একা একা পরিত্যক্ত বাসস্টপে সিগারেট ধরাই। কী অসম্ভব ছড়িয়ে পড়ে তার সমুদ্রসবুজ ধোঁয়া। যেন তার মধ্যে দিয়ে তোমার ধারালো একা থাকা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে তিনটের রাত্তিরে। নির্বাক ইমাজিনারি বসন্তে, অন্ধকার শিমুলে পলাশে।"....মন্দাক্রান্তা সেন তোমায় দিলাম| কি ভীষণ বরফ যে পড়ছে‚ ভাবতে পারবে না| তেমনি ঝোড়ো বাতাস সাথে| আর আমার সময়ের ঘরে তো সর্বদাই মা ভবানী| তবু আজ সব ঝড়‚ সব দুর্যোগ‚ সব ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও চুয়াচন্দনে লাজাতে বসলাম তোমার বরণের এই মালা| সারাদিন উন্মনা আজ তোমায় ভেবে| তোমার পলাশ‚ তোমার কোকিল‚ তোমার রোদ্দুর‚ তোমার উষ্ণ শ্বাস‚ তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা স্মরণের বাতায়ন খুলে জড়িয়ে নিচ্ছে সকলের অলক্ষ্যে| আনমনে গুনগুন করেই যাচ্ছি "গন্ধে উদাস হাওয়ার মতো উড়ে তোমার উত্তরী, কর্ণে তোমার কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরী, তরুণ হাসির আড়ালে কোন্‌ আগুন ঢাকা রয়- এ কি গো বিস্ময়..." ভালো থেকো গো আমার ফাগুন সংক্রান্তি| আবার কথা হবে আগামী ১৪-ই মার্চে| ভালোবাসা‚ পাগলি-

2134

108

শিবাংশু

চড়ুই পাখি ও ভোরের রোদ্দুর

মেয়েরা বড়ো হলে মায়ের বন্ধু হয়ে ওঠে । একটু বড়ো হলেই তাদের পরস্পর কলকাকলির মধ্যে বাবা যেন বেশ বেমানান । বাবা কি মেয়েদের 'বন্ধু' হয়ে উঠতে পারে । বোধ হয় না । বাবার সঙ্গে অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু 'বন্ধুত্ব'..........? সেটার স্তর আলাদা । পাহাড়ের সঙ্গে কি বন্ধুত্ব হয় । পাহাড় মেঘ দেয়, ছায়া দেয়, সবুজের শান্তি এনে দিতে পারে । কিন্তু তার তো নদীর ভাষা জানা নেই । সে শুধু প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দিতে পারে । মা আর মেয়েরা সেই ভাষা জানে, নিজের মতো করে জেনে ফেলে । তারা সবাই তো পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতস্বিনী, পাহাড়ের ছায়ায় স্বচ্ছন্দ, সাবলীল, স্বতস্ফূর্ত । তাদের প্রেম, স্নেহ, কলহ, অভিমান যে মাত্রায় খেলা করে যায়, সেই চতুর্থ মাত্রাটির নাগাল পাওয়ার ক্ষমতা প্রকৃতি বাবা'দের দেয়নি । ------------------------------ আমার মেয়েরা যখন পড়াশোনার জন্য বা জীবিকার খোঁজে বাড়ির চেনা চৌহদ্দি থেকে দূরে চলে যায় তখন তাদের 'বাড়ি' বলতে দিনের শেষে মায়ের সঙ্গে ফোনে আড্ডা । সেটা কখন শুরু হয়, কখন শেষ হয় , কেউ জানেনা । আদৌ 'শেষ' হয়কি? জানিনা । শুধু আমি বাড়ি এলেই শুনতে পাই মায়ের সংলাপ, তোর বাবা এসেছে, এখন রাখছি । যখন একজন বাইরে ছিলো, তখন তার জন্য রাখা থাকতো নির্দিষ্ট সময়, ফোন করার অছিলায় । অপরজন ঈর্ষাতুর তাকিয়ে থাকতো, মা শুধু দিদির সঙ্গে গল্প করে । তার পর দু'জনেই যখন বাইরে গেলো, তখন সময় ভাগাভাগি নিয়ে তাদের কোন্দল । দু'জনে একবাড়িতে থাকে, বহুদূরে কোনও এক শহরে, কিন্তু মায়ের সঙ্গে কথা বলবে আলাদা করে, এক্স্ক্লুসিভ । মা'কে প্রায় স্টপওয়াচ নিয়ে কথা বলতে হবে । কারো সময় কমবেশি হওয়া চলবে না । যেদিন বাবা'র কানে যায় সেসব আলাপ প্রলাপ, বাবা বেশ বিস্মিত থাকে । নির্বিষয়, নির্গুণ, নির্নিমেষ কথা, শব্দবিনিময় । শব্দের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা সেই সব মেয়ের, শব্দই তাদের মায়ের আঁচল, গায়ের ঘ্রাণ । তার মধ্যে বাবা কোথায় ? একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে যায় । বাবা যেন একটা বিদ্যুত প্রকল্প, শহর থেকে সর্বদা একটু দূরে থাকে । কিন্তু শহরের সব বাতি ঝলমল জ্বালিয়ে রাখার জন্যই তার বেঁচে থাকা । --------------------------------------- মা'য়ের সঙ্গে আমার কথা, যার মধ্যে বিশ্বচরাচর ছেয়ে থাকে । সংসার, অসার, শুদ্ধসার, বিষয়ের কোনও অভাব নেই । কিন্তু মা আমার 'মা', বন্ধু নয় । বন্ধুর তো অভাব নেই কোনও। ভালোবাসতে জানলেই শত বন্ধু হাত বাড়িয়ে দেয় । কিন্তু বাবা-মা তো একটাই । তারা পায়ের তলার মাটি, মাথার উপর আকাশ । তারা নির্ভরতার শেষ দেবতা । অন্য কেউ কি সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারে ? না, পারেনা । তাই মায়ের কাছে বলে যাওয়া কথা, যেন নদীকে শুনিয়ে যাওয়া গান । বাবার কাছে দুদন্ড বসে থাকা, তপ্ত আগুনরোদের থেকে চুরি করে আনা একটুকরো ছায়ার বৃত্ত । -------------------------------- অনেক সময় দেখেছি, সন্তানের সঙ্গে অসম্ভব জড়িয়ে থাকা মায়েরা কেমন একা, অসহায় হয়ে যায় । পৃথিবীর কক্ষপথে সাবলীল নিজস্ব অবস্থান খুঁজে পাওয়া সন্তানেরা হয়তো জানতেই পারেনা তাদের মায়েদের নিতল নি:সঙ্গতা । পোস্ট পার্টাম সিনড্রোম ? একমাত্র সন্তান কন্যাটির বিয়ে হয়ে যাবার আমার এক আত্মীয়াকে বলতে শুনেছি, সব কাজ ফুরিয়ে গেলো । এবার গেলেই হয় । তখন তাঁর বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স । মানুষ কি একফলা গাছ । প্রসূত ফলটির নিজস্ব বীজবিস্তার করা হয়ে গেলেই কি গাছের শিকড় ঢিলে হয়ে যাবে ? একেবারে না । পৃথিবীর থেকে অনেক দেনাপাওনা তাঁর এখনও বাকি থেকে গেছে । এই নি:সীম আনন্দযজ্ঞে শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত অগ্নিহোত্রের কাজ করে যাওয়াই তো আমাদের ভবিতব্য । ------------------ ছেলেরা কি মা'কে কম চেনে ? মায়েদের সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্বটা কি ছেলেদের বেশি হয় ? মনে হয় , উত্তরটা নেতিবাচী । শারীরিক বৃত্তে হয়তো মেয়েরা মায়েদের বেশি কাছে থাকে, কিন্তু মানসিক বৃত্তে সেরকম কোনও বিচ্ছিন্নতা নেই । এই নৈকট্যের একমাত্র সূত্র বোধের সংবেদনশীলতা । দু'জন সংবেদনশীল মানুষ, মা ও তাঁর সন্তান, সহজ নিয়মেই পরস্পরকে স্পর্শ করে থাকতে পারে । শারীর দূরত্ব বা লিঙ্গভেদ তেমন কোনও তাৎপর্য রাখেনা । শুধু মানসিক দূরত্বই সম্পর্কের শেষ চন্দ্রবিন্দু । --------------------------- চড়ুই পাখিদের শুধু চাই অলিন্দের একটা কোণ । ঝড় থেকে, জল থেকে, বিপর্যয় থেকে আড়াল করে রাখবে যে । বাবার মতন । মা হলেন ভোরের প্রথম রোদ , যার ডাক পেয়ে তারা কথা বলতে শুরু করবে অনর্গল, অনিবার, অফুরন্ত ...... নির্জন প্রাণঝরণার অবিরাম ছাপিয়ে যাওয়া মাটির কলস আর তাদের নির্মল কলস্বর ... জিন্দগি ইসি কা নাম হ্যাঁয় ......

356

4

মনোজ ভট্টাচার্য

চলোনা দীঘার সৈকত - - !

চলোনা দীঘার সৈকত - - ! কী লিখি ! কিছু একটা লিখবো বলে চেষ্টা করে যাচ্ছি । কিন্তু স্মৃতির অ্যালবাম খুলে দেখি – ছবিগুলো শুধু ধুসরই হয়নি – স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের মতো চুন-বালি খসে খসে পড়ছে ! দুরছাই বলে চলেও যেতে পারিনা – আবার দেখতে দেখতে চোখ জ্বালাও করে ! এ এক নৈর্ব্যক্তিক যন্ত্রণা ! সবার আগে একটা বাংলা বা হিন্দি ছবির ক্লিপিং দিই । - ট্রেনে আমাদের সামনের সীটে বসা কয়েকজন লোকের আলাপ হচ্ছিলো । সাধারনত এসব আলোচনা ট্রেনের গতির কাছে হেরেই যায় । কিন্তু কান সচকিত হয়ে গেল । ওরা কেবলই বাগবাজার শ্যামবাজারের নাম করেই যাচ্ছে । - আরে এতদিন তো জানতাম - বাগবাজার কেবল আমাদেরই সম্পত্তি ছিল – তার মধ্যে অন্যেরা আসে কোত্থেকে ! সহ্য করি ধৈর্যের সঙ্গে । ট্রেনের শেষ স্টপ এসে গেল । - আমরা তো সবার শেষে নামবো – তাই নামার যাত্রীদের দেখি । আমাদের সামনের সীটের যাত্রীরা উঠে দাঁড়াতেই আমার স্ত্রীই জিগ্যেস করলো – আপনারা খুব বাগবাজার শ্যামবাজারের নাম করেই যাচ্ছেন ! আপনারা কি ওখানে থাকেন ? হ্যাঁ – আমরা তো বাগবাজারেরই বাসিন্দা । - সে কি বাগবাজারে কোথায় থাকেন ? তারপর যা বর্ণনা দিল – সেটা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের বাড়িটা – মিত্তিরদের বাড়ি ! – আর যার নাম বলল – সে আমার বন্ধু ভদ্রেশ্বর । অথচ আমাদের চেনে না ? যেন আমি ওখানে রোজই থাকি । তিরাশি সাল থেকে আমরা সেখানে থাকি না । আমরা উদ্বাস্তু হয়েছি আইনত ২০০০ সাল থেকে ! ঐ মিত্তিরবাড়িটা আমার ধারনা মতে আমার মাতামহের বাড়ি ছিল । কিন্তু আগেকার ব্যবসাদার মানুষ – বরং দেওঘর শিমুলতলায় বাড়ি কিনে রেখেছে – কিন্তু নিজেদের একটা বাড়ি করতে পারেনি -কলকাতায় । ঐ মিত্তিররা তাদের মামলায় হারিয়ে নিজের বাড়ি দখল করে নিয়েছে । আর দেওঘর শিমুলতলা – মালিদের গহ্বরে গেছে ! আর ঐ বাড়িতেই আমার জন্ম ! হ্যাঁ – ঐ বাড়িটাই আমার মামার বাড়ি ! তখন ঐ বাড়িটায় অনেক অনেক লোক থাকত । আত্মিয়-স্বজন – রঘুনাথ - কাঠের মিস্ত্রি – আনন্দ সিং - রান্নার ঠাকুর – ইত্যাদি ইত্যাদি ! তো এসব লিখতে গেলে আরেকটা সাহেব-বিবি-গোলাম হয়ে যাবে ! আপাতত থাক – পরের জন্মে চেষ্টা করা যাবেখন ! ক্ষিধে , হোটেলে ঢোকা, ইত্যাদি কারনে মিত্তিরদের সবাই এগিয়ে গেল । আমরা দুজন বের হলাম – দীঘার প্ল্যাটফর্ম যে অত বড় – কখনো খেয়াল করিনি – কিন্তু আমাদের জন্যে অন্তত একজন অটোওলা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল । সেই আমাদের যত্ন করে সৈকতাবাসে পৌঁছে দিল । আমাদের কোন অগ্রিম বুকিং নেই । জানি – দুজনের একটা ঘর হবেই । - না – সব ঘরই আগে থেকে বুক করা । তাবলে আমরা ছাড়বো কেন ? এখানেই তো বারবার উঠেছি – প্রচলন থেকেই তো অধিকার জন্মায় । একটু জানাশোনা তো হয়েছেই ! অগত্যা ম্যনেজার একটা ঘর দিতে বাধ্য হল । একটা তিন বেড ওলা ঘর দিল । আবার দোতলায় উঠতে কষ্ট হবে বলে একতলাতেই দিল । কে বলে ভদ্রতা সৌজন্য সব উঠে গেছে ! বাঙ্গালীদের তিনটে জায়গা - দীপুদা – দীঘা পুরী আর দার্জিলিং – বড্ড ক্লিশে হয়ে গিয়েছে । যতবার ভাবি এই জায়গা-গুলোতে আর আসবো না – ঠিক ঘুরে ফিরে এই তিনটে যায়গায়ই এসে পড়ি । আগে দীঘায় প্রায় মাসে দুমাসে আসতাম । তখন খড়গপুর থেকে বাসে করে আসতে হত । - এখন অবশ্য সরাসরি ট্রেনে আসা যায় ! – ট্রেনে রিজার্ভেশানও পাওয়া যায় । - এর আগে ছ-জন এসেছিলাম । আমরা দিন সাতেক ছিলাম । এবারই প্রথম আমরা দুজন এলাম । - কিন্তু দেখলাম আমরা একা নয় – প্রচুর লোকের সঙ্গে আলাপ হতে লাগলো । সবই অচেনা । প্রত্যেকেই জেচে পরে এসে আমাদের খোঁজ খবর করতে লাগলো । খুব সম্ভবত কলকাতায় খবর হয়ে গেছে – দুই বুড়ো-বুড়ি কলকাতা থেকে উধাও হয়ে গিয়ে দীঘাতে আশ্রয় নিয়েছে ! “চলনা দীঘার সৈকত ছেড়ে ঝাউবনের ছায়ায় ছায়ায়- - শুরু হোক পথ চলা- “ পিন্টু ভট্টাচার্যের এই গানটা এক সময়ে আমাদের প্রায় জাতীয় সঙ্গীত হয়ে গেছিলো । আর একটা গান “ - - ঐ ডাকছে - ঐ ডাকছে নীল সমুদ্র ডাকছে- চলো চলো চলো চলো - বেড়িয়ে পড়ি - “ বোধয় অমল মুখোপাধ্যায়ের । - ঝাউবনই বা কোথায় - কোথায়ই বা ঝাউবনের লুকোচুরি খেলা ! – যারা সম্প্রতি দীঘা যাননি – তাদের প্রতি সতর্কীকরণ – যাবেন না – নিজেদের ছেলেবেলার স্বপ্ন ভাঙ্গতে । - কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে – ! যতটা অঞ্চল ঝাউয়ের বন ছিল – সবটাই ভর্তি হয়েছে হোটেলে । এমন কি ‘ও-ওআই-ও’ মার্কা হোটেল ! - আর মল - ! সারা কলকাতায় যত দোকান আছে দীঘাতে বোধও তার চেয়ে বেশি স্টল - এমনকি অনেক অনেক স্টলে কোন বস্তু পর্যন্ত নেই – বন্ধ ! কিন্তু সব ছোট স্টলে ভরাট ! সেখানেও নানা দিদি-বৌদির রেস্টুরেন্ট । এখানেও এখন সেই ধর্ম সঙ্কট ! আগে তো এখানে কোথাও কোন বাবা-মা-বটঠাকুর ছোট-ঠাকুরের মন্দির দেখিনি ! এবার দেখলাম – কোন এক ভবা পাগলার মন্দির । আরও বেশ কতগুলো ছোটবড় মন্দির ব্যবসা ফেঁদে বসেছে । বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী ! কিন্তু লক্ষ্মীর বদলে – কালী ! – মানে বন্দুক অধিকারি ! একপক্ষে ভালোই হয়েছে – আমাদের যৌবনের দীঘা – আমাদের বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে প্রৌঢ় হয়ে যাচ্ছে । তবে আমরা যখন থাকবো না – দীঘা কিন্তু তখনো থাকবে ! দীঘার ওপর দিয়েও তো কম ঝড় ঝাপটা যায় নি ! সুনামি, আইলা – আরও কত কি ! শেষাশেষি যে আইলা দীঘাকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিল – তারপর তো দীঘা পুনর্গঠন করলো দীঘা উন্নয়ন বোর্ড – যার সর্বময় কর্তা হোল অধিকারীরা । প্রত্যেক স্টলের জন্য সর্বনিম্ন দুলাখ টাকা ধার্য হোল – এখনও অনেকেই সেই ইন্সটলমেন্ট দিয়ে যাচ্ছে । রাজ্য সরকারকে না – দীঘার সরকারকে । অনেকেই তাই দীঘা ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র । ও, আমাদেরও অবশ্য জিজিয়া কর দিতে হচ্ছে – মাথা-প্রতি দশ টাকা । তার কোন রসিদ বা প্রমাণ নেই । কিন্তু প্রত্যেক হোটেল-ওলাই নিচ্ছে । নেহাত দশ টাকা – তাই এব্যাপারে কেউ উচ্চ-বাচ্চ্য করে না । আগে জানতাম – সৈকতাবাস সরকারী ভবন । গতবার দেখেছিলাম সৈকতাবাসের পুনর্গঠন হচ্ছে । এবারে সেকাজ প্রায় শেষ । কিন্তু এবার শুনলাম – এটা সরকারী নয় – তবে কার মালিকানা – কেউই বলল না । মুল সৈকতাবাস এখন পেছনে অনেকটা বেড়েছে – মুখ্যমন্ত্রীর জন্যে ‘দিঘী’ হয়েছে । আবার রেস্টুরেন্টের আগেই ছোট্ট একটা সুন্দর দেখতে বাড়ি – অন্য রঙের – কেউ বলল না সেটা কার ! তবু বলবো – দীঘার সবটাই অন্ধকার নয় । অন্তত এক মাইল মতো রঙিন আলো । খুব সুন্দর রাস্তা । সমুদ্রতটের বিরাট বিরাট পাথরের স্ল্যাব । বসার জন্যে – কিন্তু খুব বেশি লোকে সেখানে বসছে না । তট বরাবর সুন্দর পাঁচিল দিয়ে বাঁধানো । - আর আছে চা, ঝালমুড়ি, খেলনা ইত্যাদির ফিরিওলারা । আগে আগে ঘোড়ায় চড়ার বদলে – ব্যাটারির টয় বাইক ও গাড়ির চালানোর ভিড় । বাচ্ছা বাচ্ছা ছেলেরা ঐ গাড়ি নিয়ে পর্যটকদের ভাড়া খাটাচ্ছে । পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী । নগরের উন্নয়ন তার সঙ্গেই জড়িয়ে । আমরাও কয়লার ইঞ্জিন থেকে ডিজেল – ইলেকট্রিক হয়ে এখন ম্যাগনেটিক ট্রেনে চরছি । কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধেই হয় মেনে নিতে । তবু তো মেনে নিতেই হয় ! কারন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি মাথা চারা দেয় বৈকি ! তাই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি ! কিছুদিন আগে ভার্জিনিয়া বীচে গেছিলাম । - দীঘা সে তুলনায় ছোট হলেও - খানিকটা তারই দেশী সংস্করণ ! মনোজ

493

4

Joy

ভালবাসার কোন দিন হয় না...

আজ কি শুধু প্রেমিক‚ প্রেমিকার ভালোবাসার দিন| ভালোবাসার কি কোন নির্দিষ্ট দিন হয়| হয়ত হয়| কার্ড‚ চকোলেট‚ গিফ্ট‚ আর ভালোবাসার মানুষের মিঠি স্পর্শ| আর যারা ভালোবাসার মানুষ বা নারীকে কাছে পেল না| তাদের কাছেও থাকে ভালোলাগার ও ভালোবাসার অনুভূতি| সব ভালো কিছুই কি পেতেই হয়| দূরেই থাক না তার না জানা গরিমা নিয়ে| কিছু কলুষিত না হয়েও তো কাছে থাকা যায়| ভালোবাসা তো অমর| এর মৃত্যু নেই‚ শেষ নেই| হয়ত বা কোন এক নতুন বেশে আসবে অন্য নাম নিয়ে| ভালোবাসার জন্যে সব ত্যাগ করা যায়| আমরা যারা ৮০-৯০ দশকের জীবাশ্মরা যারা পুরোনো আর নতুন দুটোর মেলবন্ধন| আমাদের সময় এত জাকিয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে পালন হত না| লুকিয়ে চিঠি দেওয়ার চল ছিল| রাস্তার পাশে‚ মেয়েদের স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলগোছে মেয়েটির দিকে তাকানো ছিল| অথবা কোন বিয়ে বাড়ি| বাসর জাগা‚ গানের লড়াই| আর ভালো লাগার জনকে কিছু না বলতে পারা| সে কি জানতে পারত আমাদের মনের কষ্ট| হয়ত পারত‚ কিন্তু বাড়ি‚ সমাজের ভয়ে আবার কোনো বিয়ে বাড়ির প্রতীক্ষা| দূর্গা পুজোর প্রতীক্ষা| প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিতে গিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা| স্কুল‚ কলেজ যাবার সয়ম বাস স্টপে আলতো হাসি| বাস মিস| কিছু কথার বর্ণমালা| ছিল খোলা খামের মধ্যে সুন্দর গন্ধ মাখা একটা ছোট্ট চিঠি| অথবা অনেক গল্প| হয়ত তার বিয়ে ঠিক হওয়ার গল্প| অব্যক্ত কান্না| কিছু তো করার ছিল না কারন ছেলেটি তখনও চাকরীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে| কি ভাবে সে আসবে তার ভালালাগার নারীটির কাছে| তার বাড়িতে হাত ধরার অঙ্গীকার নিয়ে| সানাইএর সুর আর ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| না ভ্যালেন্টাইন ছিল না| আর যারা প্রেমের জন্যে‚ মনের কাছের মানুষটির জন্যে বাড়ির সঙ্গে‚ সমাজের সঙ্গে লড়াই করেছেন তাদের সময় তো ভ্যালেন্টাইন ডে ছিল না| পরিবারে রক্ষনশীলতার বেড়া ভেঙ্গে যারা পাশে পেতে চেয়েছে তাদের পছন্দের নারী বা পুরুষটিকে| কেউ বা অনার কিলিং এ হারিয়ে গেছেন চিরতরে| না তখন ভ্যালেন্টাইন ডে ছিল না| প্রেমের কোন দিন হয় না| ভালোবাসার দিনটি কেন শুধু প্রেমিক‚ প্রেমিকার জন্যেই সংরক্ষিত থাকবে| বন্ধুত্বও তো এক অমলিন ভালবাসা| ভালোবাসা তো বন্ধুত্বের আর এক নাম| বিশ্বাসের নাম| এর কোন চাওয়া নেই‚ পাওয়ার চাহিদা নেই| আছে বিশ্বাস‚ পাশে থাকার অঙ্গীকার| মন খারাপ হলে বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে পারার মত বিশ্বস্ত জায়গা| যে পুরুষটি সারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার স্ত্রী-সন্তানের জন্যে‚ তাদের খুশি করার জন্যে| বাড়ি‚ সন্তান‚ স্বামীর সেবায় মুখ বুঝে‚ সব সুখ ভুলে সংসারে হাসি ফুটিয়ে তোলা সেই নারীটি তারা ভ্যালেন্টাইন ডে জানে না| হয়ত জানবার দরকারও পরে না| পরস্পরের সঙ্গে‚ দু:খ‚ কষ্ট‚ সুখ‚ কর্তব্য ভাগাভাগি করেই জীবনের সব ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পায়| আজ একটু তাড়াতাড়ি এসো| কাজের ফাঁকে ফোনে করে খাওয়া হয়েছে তোমার? জমানো টাকায় কোথায় দু দিনের বেড়াতে যাওয়া| ক্লান্ত শরীরটা বাড়িতে বয়ে নিয়ে গিয়ে একটু মৃদু বকুনি সাথে গরম চা আর পকোড়া| কত না বলা ভালো বাসা| ভালবাসা বিশ্বাস‚ সম্মান‚ আত্মমর্যাদার এক নাম| এর কোন দিন হয় না| প্রতিটি দিন ই হোক ভ্যালেন্টাইন ডে| থাকুক ভালোবাসা‚ বিশ্বাস‚ মর্যাদা| যেখানে থাকবে না কোন ঘৃনা বা অভিমান| কাউকে যাদি ভালো বাসতে না পারেন তাকে তার যোগ্য সন্মান না দিতে পারেন তবে এই দিনগুলোর কোন মূল্য নেই| তার থেকে অনেক ভালো দূর থেকেই ভালবাসা| যে কোন দিন আপনার কাছে হয়ত আসবে না‚ কিন্তু তার চোখে আপনি সম্মানের সঙ্গেই বেঁচে থাকবেন| সেই খোলা খাম‚ নীল ইনল্যান্ডের চিঠি| না বলা কথা| সেই বুকে তোলপাড় করা অন্তাক্ষরীর সুর| বাস স্ট্যান্ডের বাস মিস করা মেয়েটিকে এক ঝলক দেখা| রাস্তায় পাশের জানালায় খোলা চুলে কমলা লেবুর কোয়ার মত ঠোঁট দুটিতে স্মিত হাসি| বেঁচে থাকুক সেই ভাললাগা| ভালোবাসার তো কোন দিন হয় না|

359

4

মানব

নিভেছে কলম

নিভেছে কলম আজ, বোঝাপড়া সব শোধ, অধম সংসর্গে শুধু, পঙ্গু বিরোধ। বেনামী চিঠি আর রোজগারী নামচায় কলমের কালিই আজ পাথরের প্রায়। ঘুণধরা বইগুলো ঝরে ঝরে পড়ে, লাগোয়া বইগুলো ফের ঘুণে ধরে। বৎসর চান্দ্র হোক, অথবা সৌর – রেহাই পাবে না হোক বঙ্গ বা গৌড় ও। অষ্ট ও শতনামে আড্ডার সূচনা, শেষ হয় সেদিনের ইতিহাস রচনায়। কার কোল খালি হল, কার গুড়ে পড়ে বালি! জুটে যায় অপমান বারে বারে কার খালি! আলোচনা শুরু হয়, হয়ে যায় শেষ। ঘরে ফিরে কিছু তার রয়ে যায় রেশ। জৈবেরা বিকৃত হয় খনির অতলে, বহুদিন পার হলে উঠে অকুস্থলে বাতাসের সাথে মিশে অপেক্ষারত, একটু উষ্ণ ছোঁয়া যদি পাওয়া যেত - শীতল ভীত যত মুখ সারি সারি ধারালো গরম লাল হত তরবারি।

294

4

মনোজ ভট্টাচার্য

চলিতে চলিতে পথে - - !

চলিতে চলিতে পথে - - ! জর্ডন এয়ারলাইন্সেই আসা যাওয়া করি তখন । - এক তো ভাড়া তুলনা মুলক ভাবে কম । দ্বিতীয়ত, সহ-যাত্রীরা মোটামুটি নিউ-ইয়র্ক নিউ-জার্সি, কানেক্টিকাট অঞ্চলের । কথাবার্তা বলতে সুবিধে হয় । আমাদের বাড়ি জ্যাকসন হাইটসে হওয়ার ফলে ট্রাই-স্টেট অঞ্চলের লোকেদের খুবই পরিচিত । ফলে মাছের বাজার, প্যাটেল ব্রাদার্স ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে । তার ওপর জর্ডন এয়ারলাইনসে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করার ফলে পরিচিত হয়েছে আমাদের ধরন ধারন – যেন ফ্লাইটে গণ্ডগোল হলে আমরা হেঁটেই কলকাতায় চলে যেতে পারব । নিউ ইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্টের ভেতর চেক আউট, ইমিগ্রেসান আর বাড়ি থেকে বয়ে আনা খাবার – যা প্লেনে নিয়ে যাবার অনুমতি নেই – ইত্যাদি ফেলে দেওয়া - -! এইসব ইত্যাদি প্রভৃতির টেনশান কাটিয়ে যখন লাউঞ্জে বসার সময় পাই তখন আর কারুর দিকে তাকিয়ে খেজুরে করার মতো উৎসাহ থাকে না । - তার ওপর লাউঞ্জের ভেতর দিয়ে বিমানের চেহারা দেখে – এয়ারপোর্টেশ্বরির করুনা প্রার্থনা বা আটলান্টিকের শুভ মর্জির অনুরোধ করি । প্লেন আকাশে উঠে স্থিত হলে খাবার, গান বা ভিডিওর মধ্যে ডুবে যাই । তার পরের দিন হোটেল থেকে ফিরে আম্মান এয়ারপোর্টে বসে পরস্পরের আলাপচারিতায় মগ্ন হই । সেইরকমই একবার আম্মানে বসে নিজেরা গল্প করছি । সেখানে একজন কলকাতার গায়িকাও আছেন । শুনলাম তিনি নিউ-ইয়র্কে ও নিউ-জার্সিতে গান শেখাতে আসেন । নিউ-জার্সিতে তার এক আত্মিয় থাকেন । সেখানেই গান শেখান তিনি । এইরকম আলাপ-ঘন আলাপচারিতার মধ্যে সবাই মগ্ন । হঠাৎ দেখা গেল – দুজন সিকিউরিটি বা পুলিশ নিয়ে এক জাপানি মেয়ে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে কিছু খুঁজছে । মুখটা খুব কাঁদো-কাঁদো – ওদের মুখ তো এমনিই কাঁদো-কাঁদো ! - ওমা ! ওরা যে আমাদের দিকেই আসছে ! এই সেরেছে ! কে আবার কি করলো ! – পুলিশ এসে আমাদের বেঞ্চ থেকে সবাইকেই উঠে দাঁড়াতে বলল – অবশ্য খুবই ভদ্রভাবে । - সবাই উঠতেই চোখে পড়লো সবারই – বেঞ্চির একধারে একটা লেডিজ ওয়ালেট । তার ওপর বসাতে একটু বিকৃত হয়ে গেছে । জাপানি মেয়েটি একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওয়ালেটটা তুলে নিল । তারপর সবার সামনেই ওটা খুলে দেখল । সবাই দেখতে পেল – তার মধ্যে বেশ কিছু ডলার । না – আরও কিছু ইউরো ও জাপানি ইয়েন রয়েছে ! আমাদের তো বেশ বিভ্রান্তিকর অবস্থা ! যদিও আমাদের একেবারেই অজানা । তারই মধ্যে মেয়েটি ভাঙা ইংরিজিতে জানালো – ও ওর ওয়ালেটটা মাথায় রেখে ঘুমিয়েছিল । তারপর ভুলে উঠে টয়লেটে গেছে । ফিরে এসে আর দেখতে পাচ্ছে না – তাই পুলিশ ডেকে এনে দেখছে । - যাইহোক ওয়ালেটটা পেয়ে বেঁচে গেছে । এছাড়া ওর কাছে আর টাকা-পয়সা নেই । - আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে উনি সিকিউরিটি নিয়ে চলে গেলেন । আমাদের অবস্থা তো একেবারে কাঁচুমাচু । বিশেষ করে যে মহিলা ধারে বসেছিলেন – তিনি তো কিছু বুঝতেই পারেন নি । - ওয়ালেটটা অবশ্য খুব একটা ছোটও ছিল না ! – বাকিরা সবাই তাকে সেই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে – ঠাট্টা করে – স্বাভাবিক করা হোল । কারন উনিও কলকাতাতেই যাচ্ছেন তো ! মনোজ

501

7

Joy

NRC‚ CAA এবং নোংরা রাজনীতি...

আধার কার্ড‚ ভোটার কার্ড‚ প্যান কার্ড এইগুলো কোনটাই আর ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় নয়| হাজার‚ হাজার বছর ধরে যারা এই দেশে বসবাস করল‚ ভোট দিয়ে সরকার গঠন করল তাদের আজ প্রমান দিতে হবে সে এই দেশের নাগরিক কি না| যে সমস্ত কৃষক দিনের পর দিন নিজের শরীরের ঘাম‚ রক্ত দিয়ে দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন‚ তাদের আজ প্রমান দিতে হবে তারা ভারতীয় কি না| যে সমস্ত সৈনিক তাদের মুল্যবান জীবন দেশের জন্যে উৎসর্গ করেছেন‚ কেউ বা যুদ্ধে পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছেন‚ তাদের আজ প্রমান দিতে হবে তারা ভারতীয় কি না| প্রমান দিয়ে যাও আধার কার্ড কর হল| জীবনের সব কাজে আধার লিঙ্ক করা হল‚ এখন জানা যাচ্ছে সেই কার্ড নাগরিকত্বের বৈধ পরিচয় পত্র নয়| এর পর NRC এর জন্যে আমরা কি তথ্য জোগাড় করব| আরে বাবা এত উতলা হচ্ছেন কেন? সব জানতে পারবেন| সরকার আমাদের মা-বাবা| সব জানিয়ে দেবেন| তথ্য জোগড় করার জন্যে আপনি হন্যে হয়ে ঘুরবেন| কাজ-কর্ম লাটে উঠবে| যেমন নোট-বন্দীর সময় দেশবাসীর হয়েছিল| অনেক কালো টাকা উদ্ধার হয়েছিল| সেই টাকায় তো আমাদের দেশের অনেক উন্নয়ন হল| আপনি দেখতে পেলেন না? সে কি তাহলে আপনার নিশয়ই চোখ খারাপ| অর্থ্নীতি গোল্লায় যাক| GDP শূন্যে নেমে যাক কি হয়েছে আমারা তো আগে বাড়ছি| খুব বড় মন্দির হবে| সবাই দেখতে যাব| দেশের উন্নয়ন হচ্ছে তো| আরে বাবা কৃষক আত্মহত্যা করছে করুক| সব লাভ্দায়ক সরকারী কোম্পানি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে যাক| উন্নয়ন তো হচ্ছে| ধূর আপনারা কিছুই দেখেন না| পাকিস্তানের সঙ্গে মাঝে মাঝে যুদ্ধ যুদ্ধ নাটক হবে| কোটি টাকা খরচ হবে তাহলে উন্নয়ন তো হচ্ছে| এর আগে এত উন্নতি‚ সমৃদ্ধি আগে কোনো সময় ভারতবর্ষে হয়েছে? কোনো সরকার এত কাজ করেছে? নোট বন্দীর পর কোনো জঙ্গি আক্রমণ হয়েছে‚ হয়ই নি| কাশ্মীর তো আমাদের দেশেই ছিলনা| এখ্ন ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে আমাদের দেশের সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত হল| কিন্তু ওখানের স্থানীয় মানুষ এর ভালোটা বুঝল না| কত ভালো ভালো কাজ হচ্ছে| কত চোর-ছ্যাচড় দল বদল করে নিল বলে কোন কিছু তদন্ত হল না| দল বদলে তারা সাধু হয়ে গেল| তাহলে আপনি কোন ভালো কাজ দেখতে পেলেন না? প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়েছে| আমরা গরীব থেকে গরীবতর হয়েছি| এইটাও তো উন্নয়নের অঙ্গ| এত ভালো কাজ করেও সরকারের চোখে ঘুম আসে না‚ সরকার আমাদের জন্যে আরও অনেক কিছু ভালোকরতে চান| এবার ধর্ম নিয়ে খেলা করা যাক| ধর্ম‚ জাত নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মানুষ মানুষে বিভাজন করা যায়| কি ভাবছেন খেতে পান না বা না পান‚ শিল্প হোক বা না হোক মন্দির তো হবে| গাদা গাদা ভন্ড বাবা তো আছে| চূপ করুন তো উন্নয়ন তো চলছে| নতুন নতুন আইন আসছে| প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী‚ শরনার্থীদের আমরা আশ্রয় দেবো কিন্তু এক ধর্ম বাদে| সব ধর্ম নিলে ভোট বাক্সে ভোট পরবে? গাদা গাদা বাইরের লোক আসবে আমাদের দেশে আমাদের খাবার-দাবার‚ বাসস্থান‚ চাকরি‚ শিক্ষার উপর অনধিকার চাপ পড়বে| কি যায় আসে ভোট যে বড় বালাই| অন্য ধর্মের মানুষ এলে আমাদের অর্থনৈতিক‚ সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়বে না‚ শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষ এলেই সর্বনাশ| আর কতদিন এই সাম্প্রদায়িক খেলা চলবে| কেউ তোষমোদ করে মুসলিমদের‚ কেউ বা হিন্দুদের| আমাদের মনে রাগ‚ হিংসা‚ বিভেদ ঢুকিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে| যে রাজনৈতিক দল বা নেতা যে কোন ধর্ম বা জাত নিয়ে রাজনীতি করে তাদের ঘৃণা করতে শিখুন| তদের ভোট ব্যাঙ্ক সুরক্ষিত হয়‚ কিন্তু সেই জাতি বা ধর্মের মানুষদের কোন উপকার হয় না| তারা যে তিমিরে আছেন সেই তিমিরেই থাকেন| যদি সত্যিই তাদের কোন উপকার করতে হয় শিক্ষা‚ কু-স্ংস্কার মুক্ত করতে হবে| শুধু ধর্মের রাজনীতি তে কিছু লাভ হয় না| কি করে আলাদা করবেন ঐ চাষীদের যারা আমাদের জন্যে ফ্সল ফলায়‚ ওদের কি ধর্ম আমরা জানতেও চাই না| সৈনিকদের ধর্ম-জাত জানতে চাই না ওরা যুদ্ধ করে শহীদ হয় আমাদের জন্যে| যারা শিল্পী‚ যারা অভিনেতা তাদের জাত-ধর্ম আলাদা করা যায় কি| আমরা সব মিশে গেছি| আমরা সবাই ভারতীয়| তবে কেন এত ভেদাভেদ আজকে| কেন জাতের নামে‚ ধর্মের নামে দেশকে ভাগ করার চক্রান্ত চলছে? কার লাভ এতে? এই মুখোশধারী শয়তানদের কথায় কান দেবেন না| এরা অর্থলোভী‚ এরা দাঙ্গালোভী| এরা ক্ষমতালোভী| এদের ঘৃণা করুন| এখন ভারবর্ষের রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ খুব শক্তিশালী না‚ বা সেই ভাবে বিরোধীরা সরকারের ভূল ধরাতে ব্যর্থ| সেই জন্যে দেশের এই অরাজকতা| কিন্তু ভূল করেও আপনি শাসকশ্রেনীর ভূল ধরতে যাবেন না| ভূল ধরাতে গেলেই বা কিছু প্রতিবাদ করলেই এখন হয় মাওবাদী না হয় পাকিস্তানির তকমা দেওয়া হয়| শাসকশ্রেনী নিজেদের ভূল বুঝতে চায় না| তারা যেটা করছে সেটাই ঠিক| সবাইকে সেটাই মেনে চলতে হবে| না হলেই আমরা দেশদ্রোহী| কি অদ্ভূত এই দেশ| আমরা সরকারের সমলোচনা করি| বাসে‚ ট্রেনে‚ চায়ের দোকানে তর্কের তুফান তুলি| কিন্তু ভোট দিই না| ভোটের সময় এই ভন্ড‚ মিথ্যেবাদীদের মুখোশ খুলে দিই না| আমরা আমাদের প্রতিদিনের সমস্যার কথা ভুলে যায়| জাত-ধর্ম‚ মন্দির‚ মসজিদ‚ গির্জা নিয়ে তরজায় মেতে উঠি| আমাদের ধর্ম-জাত‚ মন্দির‚ মসজিদে যেন ব্যস্ত রাখা যায়‚ এই দল আর নেতাগুলো সেটাই চায়| যাতে আমাদের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়| আমরা তর্কের জন্যে তর্ক না করে সত্যি সত্যি প্রতিবাদ করিনা| আমরা টিভি‚ খবরের কাগজেই নিজেকে আবদ্ধ রাখতে ভালবাসি | দাঙ্গা লাগে‚ আগুন জ্বলে| হাজার হাজার মানুষ ঘর ছাড়া হয়| মেয়েদের সন্মান-ইজ্জত লুট হয়| মানুষ মারা যায়| আবার ভোট হয় ধর্মের নামে| জাত-পাতের নামে| ছাড়ুন তো এত চিন্তা করে কি হবে বলুন তো আগে আমি বাঁচি তার পর তো অন্যের চিন্তা করব‚ তাই নয় কি? কিন্তু কতদিন আমরা ভালো থাকব বলতে পারেন? দাঙ্গার আগুনে হাজার হাজার ঘর ছাড়া লোকগুলো| হিংসার আগুনে খুন হওয়া মানুষটা| মান-ইজ্জত হারানো মেয়েটার কোনো জাত বা ধর্ম হয় কি? সেটা যদি আপনার কোনও কাছের লোকের সঙ্গে হয় আপনার খারাপ লাগবে না| যন্ত্রনায় আপনি ছট্পট করবেন না| আপনি মানুষ বলে আপনার বিবেক দংশন হবে না? হবে নিশ্চয়ই হবে‚ কারন আপনি মানুষ| ঐ রাজনৈতিক দল বা নেতা-নেত্রীদের মত অমানুষ নন| যার হিংসা‚ দাঙ্গায় উস্কানি দেয় তারা দেখুন ভালো চাকরী করেন| অথবা ভাল ব্যবসা‚ অবস্থাপন্ন| তদের লড়াই করতে হয় না খাবারেরে জন্যে| লড়াই করতে হয় না প্রতিদিনের বাঁচার জন্যে| তাদের উস্কানিতে পা দেবেন না| লড়াই করুন অন্যায়ের বিপক্ষে| কালা আইনের বিপক্ষে| চূপ করে থাকাটাও অন্যায়| চুপ থাকতে থাকতে একদিন আমরা হারিয়ে যাব| প্রতিবাদ ছোট হোক‚ কিন্তু প্রতিবাদ করাটা খুব দরকার| যে যেভাবে পারেন প্রতিবাদ করুন‚ অন্যায়ের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ান| আমরা ধর্ম চাই না দুবেলা ভাত চাই| আমরা জাত চাই না চাকরি চাই| আমরা শিল্প চাই| মজবুত অর্থ্নীতি চাই| আমরা গগনচুম্বী মন্দির-মসজিদ-গীর্জা চাই না সম্প্রীতি চাই| দাঙ্গা চাই না‚ স্কুল‚ কলেজ চাই| হাসপাতাল চাই| মেয়েদের অসন্মান নয়‚ সুরক্ষা চাই| দেশের সৈনিকদের মৃত্যু চাই না‚ শান্তি চাই| দিতে পারেন এইসব| যদি না পারেন তহলে গদি ছেড়ে দিন| আমরা আবার যোগ্য মানুষ কে ভোট দিয়ে নতুন দেশ গড়ব| গান্ধীজী‚ নেতাজী সুভাষ‚ স্বামী বিবেকানন্দ‚ কবীর‚ গুরু নানক‚ রবীন্দ্রনাথ‚ শিবাজী‚ ড: আবুল কালাম‚ রানি লক্ষী বাই‚ মাদার টেরিজার দেশ আমাদের| যারা আমাদের সেবা‚ ভালোবাসা‚ মানবতার মন্ত্র দিয়েছেন| আমরা সব ধর্ম‚ সব জাতের মানুষ একসাথে যুগ যুগ ধরে আছি এবং থাকব| কোন দুষ্ট‚ চক্রান্তকারী আমাদের আলাদা করতে পারবে না| আমার প্রতিবাদের ছোট্ট প্রয়াস সবার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি| এই প্রতিবাদ আমার একার নয়| আমার‚ আপনার সবার| সবাই খুব ভালো থাকবেন| দিব্যেন্দু মজুমদার

378

5

মনোজ ভট্টাচার্য

গরবেতার গনগনি !

গরবেতার গণগনি ! গনগনি উপত্যকায় গেছিলাম ! হঠাতই কদিন আগে গনগনি নামটা শুনেছি ও পড়েছি । গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ফলসের মতো পশ্চিম মেদিনীপুরেও একটা জায়গা আছে । চারদিকে উঁচু সমতল থেকে শিলাবতি নদীর জল অনেক নীচুতে পড়ছে – প্রায় ৭০ ফুট । গুগুলে তো দারুন দারুন সব ছবি দিয়েছে । খেয়াল-পোকা এখনও মাথায় নাড়া দেয় ! একটা গাড়ি তো বুক করেই দিল আমার স্ত্রী । আমরা আর কাউকে কিছু জানাইনি । - এমনিতে দশই ডিসেম্বর আমাদের ছেলের মৃত্যুদিন – তাই কোথাও পালানো দরকার । তখনই মনে পড়লো গনগনির কথা । সকালে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে আজকাল । আটটার সময়ে বেড়িয়ে গাড়িতে যেতে মন্দ লাগে না ! যাচ্ছি একেবারে উল্টোদিকে – তাই ট্র্যাফিকের ভিড় নেই । রাজীব বলল – খড়গপুর হয়ে যাবে । - ঘণ্টা দুই পরে উলুবেড়িয়ার একটা রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেলাম । কিছুমিছু খেয়ে নিয়ে আবার যাত্রা । - আমার বাইরে যাওয়ার একটা আকর্ষণ হোল – সকালে বাইরে যে কোন রেস্টুরেন্ট বা ধাবায় বসে খাওয়া । কি খাচ্ছি – সেটা নয় । এই যে ব্যস্ত হাইওয়েতে বসে – দ্রুতগামী লরি-বাস-গাড়ি-টোটোর সমাহার ! এই দ্রুত-গতিই তো আমাদের জীবনের প্রতিফলন ! এই প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততার মধ্যে আমরা অলস বসে দেখছি ওদের । ঠিক যেন অনেক উঁচু থেকে দেখা নীচে কালো পিঁপড়ের সারি – খুব ব্যস্ত-সমস্ত চলা ! একটু জিরিয়ে নিয়ে আমরাও আবার সেই গাড়ির ভিড়ে মিশে গেলাম । যেতে যেতে কোলাঘাটের আগে সেই উঁচু প্রমোদ-বৃদ্ধাবাস । এখানে আগে এসেছিলাম । যাইহোক, প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পার করে এলাম গরবেতা । এই গরবেতার রাস্তা ধরেই যাওয়া । এই রাস্তাটা আবার শালগাছের আকাশ হয়ে আছে । আগে হয়ত শালের জঙ্গল ছিল । এখন তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা হয়েছে । তারই মধ্যে রাস্তার একপাশে একটা সাবধান-বানী – এখান দিয়ে হাতি চলাচল করে । - হাতি অবশ্য পাল বেঁধে যায় । - অনেকটা আসার পর একটা সাইন দেখা গেল – গনগনি যাবার রাস্তা ! সেই রাস্তার শেষ হোল – গনগনি উপত্যকা । বিরাট পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে একদম শুকনো – এখন আর জল নেই । কিন্তু চারদিক থেকে জল পড়ে সেই নীচে ! – নীচে বয়ে চলেছে শিলাবতি নদী ! শিলাবতি নদী – অথবা শিলাই নদী – পুরুলিয়ার চক-গোপালপুরে উৎপন্ন হয়ে এসেছে । তারপর ঘাটালে গিয়ে দ্বারকেশ্বর নদে গিয়ে মিশেছে রূপনারায়ণ ও তারও পরে হুগলী নদীতে মিশে – সমুদ্রে পড়েছে । ওপর থেকে সোজাসুজি অত নীচে দেখা যায় না । আবার ধারে যেতেও বারন । রাস্তা আছে নীচে যাওয়ার । বেশ কিছুটা সিঁড়ি – তারপর থেকে ভেঙ্গে একাকার হয়ে গেছে রাস্তার সঙ্গে । - আগে হলে নীচে নামার সাহস হত । এখন লাঠি হাতে আর ভরসা পাই না । নানান জায়গা থেকেই ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করি । অন্যান্য যায়গায় দেখেছি – ধ্বংসস্তূপকে সাজিয়েই কত পয়সা রোজগার করা হয় । সারা জায়গা জুড়ে কত দোকানপাট, কিয়স্ক – সাজানো থাকে । আর এই গনগনি দেখছি – একেবারেই দুয়োরানীর সাজে হেলায় পরে আছে । কয়েকটা আইসক্রিম ও ছোলা বিক্রি ছাড়া কোথাও কিচ্ছুটি নেই । এমনকি ন্যুনতম পরিষেবারও অভাব । অবশ্য বিস্তৃত উন্মুক্ত প্রান্তর ছেড়ে কে আর ছোট ঘরে ঢুকতে চায় ! – পাশেই আছে একটা পিকনিকের ঘেরা জায়গা । কেউ কেউ বলল বর্ষাকালে প্রচুর জল আসে নদীতে । তবে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কথা কেউই শোনেনি । ওখানে আবার মহাভারতের গল্পও হাজির ! কথায় আছে না – যা নেই মহাভারতে তা নেই সারা ভারতে ! বকাশুরের কথা তো আমরা শুনেছি । তার গুহায় এসে ভীম থেকেছিল । সেই নিয়ে ভীমের সঙ্গে বকাশুরের প্রচণ্ড লড়াই হয়েছিলো । ওদের পাথর ছোঁড়াছুড়ির ফলে এত গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছে ! – উপত্যকার ওপর এসে দাঁড়ালে – দেখা যাবে – চারিদিকে বড় বড় পাথরের চাই । আর নিচে দুদিকে যতদূর চোখ যায় – শিলাবতি নদী বয়ে চলেছে ! ঠিক একা নয় – দুদিকে শাল গাছের জঙ্গল পাহারা দিয়ে যাচ্ছে ! এখানেও যথারীতি মন্দির আছে – সর্বমঙ্গলা দেবীর মন্দির । পুরাকালে অনার্য মানুষেরা শিকার করতে যাবার আগে এনার পুজা দিয়ে যেত । - এই জায়গাটিকে বলে বগরী বা বক দ্বীপ । এই নামে আবার সেই বকাশুরের নামটা উঠে আসে ! অনুমান – আইচ বংশের প্রথম রাজা গজপতি সিংহ এই মন্দিরটি স্থাপনা করেন । ও, আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা – যদি মেট্রো রেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ফেল মারে – এখানে শিওর শট ! আছে একটা সুইসাইড স্পট – সব পাহাড়ে যেমন থাকে – এখানেও আছে তেমনি ! মনোজ

331

4

মানব

ছাই

কৃতজ্ঞতাঃ গুপ্ত সাধক শ্যামা ক্ষ্যাপা ১ - তো মানস কো হি ভেজ দেতে হ্যায়। ক্যা বোলতে হো পাণ্ডেজি? সর্দারজি প্রশ্ন করলেন সরাসরি অশোক পাণ্ডের দিকে তাকিয়ে। অশোক পাণ্ডে আমার ডিপার্ট্মেন্টাল ম্যানেজার। মিটিং চলছে, কয়লার ছাই নিয়ে। ছাইয়ের মধ্যে অদগ্ধ কার্বনের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, সম্পূর্ণ দহন না হওয়ার ফলে। এ বিষয়েই ডাকা হয়েছে মিটিং। আমি মানস সেনগুপ্ত, ‘খোপোলি ও এন্ড এম’ এর প্ল্যানিং ইঞ্জিনিয়ার। জীবনের প্রথম চাকরিতে জয়েন করার সবে দেড়বছর পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু কাজের চাপ বেড়েই চলেছে। ‘ও এণ্ড এম’ – অর্থাৎ অপারেশন এণ্ড মেইন্টেনেন্স। বিভিন্ন কোম্পানির ক্যাপটিভ প্ল্যাণ্ট চালানো এবং তার রক্ষণাবেক্ষণই আমাদের কোম্পানির কাজ। এখন যে প্ল্যান্টে আছি তার প্রায় সবটাই এককালে সরকারী শেয়ারে ছিল, যা এখন কমে কমে পনের শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। যাইহোক, কাস্টমারের তরফ থেকে টেবিলের ওপাশে প্ল্যান্ট হেড সর্দারজি, তাঁর পাশে মিঃ তিওয়ারী – অপারেশন হেড, মিঃ সরকার – মেইন্টেনেন্স হেড, এবং আরও দুজন ইঞ্জিনিয়ার। টেবিলের এপাশে আমাদের তরফ থেকে সবার প্রথমেই রয়েছেন মিঃ সিং – মানুষটির বয়েস প্রায় পঁচাত্তর, কিন্তু শখ ষোল আনা বজায় আছে। এই বয়েসে মাসে দেড় লাখের কাছাকাছি মাইনের লোভ ছাড়তে পারেননি, তাই বাচেলর অ্যাকোমডেশনেই রয়ে গেছেন। উনি অবশ্য বলেন, বাড়ি গেলেই ছেলে বউয়ের অধীনে থেকে যেতে হবে, সেই বন্দীদশা থেকে মুক্তির জন্যই এখানে থেকে যাওয়া। তারপর রয়েছেন মিঃ পাণ্ডে, আমার ম্যানেজার, সংসারী মানুষ, দুটি মেয়ে – বড়টির জন্য পাত্র খুঁজছেন। আমাকে এই নিয়ে তিনবার জাতি, গোত্র ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে ফেলেছেন। তারপর রয়েছেন মিঃ ত্রিপাঠি – একটু নাদুস নুদুস গড়ন, আরাম আয়েসে থাকতে ভালোবাসেন। চুপিচুপি বলে রাখি, এই ত্রিপাঠিবাবুর মেয়ে আমাকে একবার ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠিয়েছিল, রিজেক্ট করেছিলাম। তার পর রয়েছি আমি। আমার পর একটা ফাঁকা চেয়ার। সিংবাবু বরাবরই ক্লান্ত থাকেন – বয়স তো হয়েছে, তাছাড়া সবসময় প্ল্যান্টের ভালোর কথা চিন্তা করলে ক্লান্তি তো আসবেই। তাই উনি মাঝে মাঝেই ঢুলে পড়ছেন, আর সর্দারজির গলা একটু উঁচু হলেই চোখ খুলে চমকে উঠছেন। ত্রিপাঠিবাবু আরাম আয়েসের মানুষ, আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে – অথচ আপনি জানতেই পারবেন না, উনি আসলে ঘুমোচ্ছেন। পাণ্ডেজি ওনাদের মাঝখানে বসে সর্দারজি ও অন্যান্য দুইজন হেড এর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। উনি সাহিত্যিক মানুষ, অন্য এক দুনিয়ায় থাকেন। ভাবের ঘোরে প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুলে গিয়ে প্রায়ই তাকান আমার দিকে – এখন সর্বকনিষ্ঠ এই ছেলেটির উপর যদি এতবড় একটা কোম্পানি ভরসা করে থাকে, তাহলে আমাকেও ওনাদের ভরসার মর্যাদা রাখতে হয় বৈকি। পাণ্ডেজি আমার দিকে তাকালেন। আমিও ঘাড় নাড়লাম। পাণ্ডেজিও সর্দারজির দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন, - ঠিক হ্যায়, ভেজ দিজিয়ে। ২ এমনিতে আমার জেনারেল শিফট – আটটা থেকে পাঁচটার ডিউটি, অথচ পাঁচটায় বাড়ি গেলে কোম্পানির বাস আপনাকে ছাড়তে আসবেনা, কোম্পানির বাস টাইম হল বিকেল ৬ টায় – কেমন অরাজকতা বলুন দেখি। আপনি চান বা না চান, এক ঘন্টা এক্সট্রা আপনাকে ভিতরে থেকে যেতেই হয় - হেঁটে হেঁটে অতদূর যাওয়া পোষায় না। একদিনের অফিস না যাওয়ার আনন্দ, তার উপরে সকাল সকাল চিতোরগড়ের প্ল্যান্টে কয়লা আর ছাইয়ের স্যাম্পল পৌঁছে দিতে যাওয়ার নতুন অভিজ্ঞতা – সব মিলিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলাম। সময়মত ড্রাইভার চলে এল। ঠিক করা ছিল প্ল্যান্ট থেকে ফতেহনগর গিয়ে তারপর বাঁদিকে ঘুরে চিতোরের উদ্দেশ্যে যাওয়া হবে। লোকটার নাম সুলতান সিং, বেশ মিশুকে স্বভাব। কথায় কথায় অনেক কিছু আলোচনা হল। এই জায়গাটা আগে জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, গ্রামের মানুষের অর্থনীতিতে কিভাবে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে এই প্ল্যান্ট ইত্যাদি। প্রায় মিনিট দশ চলার পর হঠাৎ গাড়ি বাঁদিকে ঘোরালো সে। কেমন একটা খটকা লাগল, আমার দিকে তাকাতেই জিনিসটা টের পেয়ে সে বলল, - ইয়ে শর্টকাট হ্যায় সাব। - রাস্তা থাকলেই হল, চলো চলো। সেই একঘেয়ে পিচ রাস্তার থেকে কিছুটা নরম, কিছুটা পাথুরে রাস্তা পেরিয়ে যেতে বেশ ভালোই লাগছিল। এ এক অন্য রাজস্থান। যেন কোন সুদূর অতীত রাজ্যে পাড়ি দিয়েছি, যেখানে মানুষের মনে না ছিল কোনও টেনশন, না ছিল কোনও তাড়া। কেউ গাছতলায় খাটিয়া পেতে আড্ডায় মশগুল তো কেউ এক-গোরুর গাড়িতে মালপত্র বোঝাই করে চলেছে বাজারের উদ্দেশ্যে। হ্যাঁ, এটাই তো জীবন, বাড়ি ছেড়ে সুদূরে, মাথায় একরাশ চাপ নিয়ে, কাঁচবন্ধ গাড়িতে যেতে যেতে অজান্তেই বেশ কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লাম এই মানুষগুলোর প্রতি। এরপরের কথোপকথন যেহেতু কিছুটা চলতি হিন্দী, চলতি রাজস্থানী মিশিয়ে হয়েছিল, তাই সুবিধার জন্য সবটাই বাংলা করে বলি। - সাব, ওই যে পুকুরটা দেখছেন, ওটা আমাদের। ওই যে জমিটা, তারপর ওই যে শ্বেতপাথরের পাহাড়টা… - বলো কি! তাহলে এত বড়লোক হয়ে গাড়ি চালাতে এসেছ কেন? - সে আপনি ঠিকই বলেছেন, টাকাপয়সার খুব একটা অভাব নেই। কিন্তু বসে খেলে রাজার সম্পদও শেষ হয়ে যায়। কিছু তো একটা করতে হবে, না কি! রোজগারও খুব একটা কম হয়না এই গাড়ি চালিয়ে। - তা বেশ, তা বেশ। তা টাকাপয়সা কেমন পাও বলা যাবে কি? তারপর লোকটার মাসিক আয় শুনে আমার চোখ কপালে। এইরকম গ্রাম্য অঞ্চলে একটা গাড়িকে প্ল্যাণ্টে ভাড়া খাটিয়ে যা টাকা পায় তা আমার মাইনের প্রায় দ্বিগুণ। - সাব, পাঁচশো টাকা হবে? বাড়িটা পেরিয়ে এলাম, তখন আনতে ভুলে গেছি। ফেরার সময় এই পথেই ফিরব, তখন নিয়ে দিয়ে দেব। - তোমার বাড়ি এখানে? - হ্যাঁ, আবার পিছিয়ে যাব! আপনার লেট হয়ে যাবে। তাড়া আমার মোটেই ছিলনা। কিন্তু হাবভাব দেখাতে আমিও ছাড়লাম না। - ঠিক আছে, এই নাও। বলে পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলাম। রাস্তার ধারে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে সে দুখানা বোতল আনল – ঠাণ্ডা, ইংরাজীতে । - এই নিন, একটা আপনার, একটা আমার, একটা আপনার। - আরে নানা। ওসব আমি খাইনা। - তাহলে নেমে আসুন, কিছু খেয়ে যাবেন। - চলো দেখি, এমনিতেও সকালে কিছু খাওয়া হয়নি। ততক্ষণে প্রায় আধঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অবশেষে নেমে গিয়ে খাবার জন্য যেখানে ঢুকলাম, একটা তীব্র গন্ধ নাকে ঢুকতেই বুঝলাম, সেটা আসলে একটা মদের ঠেক। মদ্যাভ্যাস আমার নেই। একটা ডিমভাজা আর চা অর্ডার করতেই দোকানের মালিক রে রে করে তেড়ে এল। ভয় পেয়ে বেড়িয়ে এসে সুলতানকে জিজ্ঞেস করলাম, - এরকম হইচই করে উঠল কেন? - কী খেতে চেয়েছিলেন? - ডিমভাজা আর… - ওই তো, ঝামেলাটা এখানেই করে ফেলেছেন, এখানে নন ভেজ চলেনা। যান, অন্য কিছু অর্ডার করুন। অবশেষে, সামোসা আর চা খেয়ে উঠে পড়তে যাব এমন সময়, - সাব, মদ টদ তো খেলেন না। আমাদের অন্য কিছুরও কিন্তু ব্যবস্থা আছে, চাইলে রুমও ফ্রি হয়ে যাবে। একদম সেফ – কোনও ভিডিও ক্যামেরা নাই… - কত হয়েছে? টাকাটা নিন। দোকানের মালিকের এহেন কথায় কোনরকমে রাগ চেপে রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখি বাইরে খাটিয়ায় তখনও গ্লাসে মজেছে সুলতান। - আচ্ছা, এবার কি ওঠা যায়? অনেক তো দেরী হল। - হ্যাঁ সাব। চলুন, এই লাস্ট গেলাসটা শেষ করেই উঠছি। একটু ভয় ভয় করছিল বৈকি। সকাল সকাল এমন মদ গিলে গাড়ি চালালে কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তার তো কোনও ঠিকানা নাই। তাছাড়া যেখানে যাচ্ছে, গেটে যদি কেউ এর মুখের গন্ধ শুঁকে ফেলে তাহলে ঢুকতে তো দেবেইনা, উলটে আমাকেও অপমান করে তাড়াবে। রাগে গজগজ করতে করতে তাকে ওঠালাম। যদি গাড়ি চালাতে পারতাম, তাহলে হয়ত ওকে চালাতেই দিতামনা, কিন্তু আমি নিরুপায়। অবশেষে, গাড়ি এগিয়ে চলল পাথুরে রাস্তা ধরে, আরও আরও ঝাঁকুনিতে মুখ দিয়ে শুধুই বেরিয়ে এল রাগ আর হতাশার মেলবন্ধন। মিনিট দশেক পর গাড়ি আবার থামল। - এটা আমার প্রেমিকার বাড়ি। চলুন একটু জল টল খেয়ে আসবেন, আলাপ করবেন। এই বয়েসে প্রেম! অবাকই হলাম। অবশ্য প্রেমিকাটিকে দেখে বুঝলাম, এ এক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক। মহিলাটির কপালে চওড়া সিঁদুর। ততোধিক চওড়া টিকা নিয়ে পাগড়ি পরিহিত ভদ্রলোক যে তাঁর স্বামী, এ ব্যাপারে আগেই অনুমান করেছিলাম। ধীরে ধীরে কথাবার্তায় তার প্রমাণও পাওয়া গেল। - তা বাবু, এসেছেন যখন একটু চা জল খেয়ে যান। - আরে নানা, এইমাত্র খেয়ে এলাম। - তাহলে একটু ছাঁচ নিন। এতে না করবেন না। একটা পাত্রে জলসা টক স্বাদের এক গ্লাস সাদা তরল এল। সেটাকে মুখে নিয়ে না পারি ফেলে দিতে, না পারি গিলতে। অবশেষে নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরেই সবটুকু চোঁচোঁ করে গিলে ফেললাম। ছোটবেলায় ঘোল খেয়েছি, গুড় আর নুন মিশিয়ে, সে এক অপূর্ব স্বাদ। কিন্তু এই দুগ্ধজাত দ্রব্যটি যেন খানিকটা তার মত হয়েও অনেকটা আলাদা। ততক্ষণে সুলতান আর সেই ভদ্রলোকটি জুয়ার মত কিছু একটা খেলতে শুরু করেছে। দেখলাম, ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে বাজী রাখলেন, এবং হেরেও গেলেন। - আচ্ছা, ঠিক আছে, হিসেব রাত্রে হবে। এখন একটু তাড়া আছে, চলি কেমন? এই বলে সুলতান উঠে পড়ল, আমিও তার আগে আগে দরজার দিকে এগিয়ে এলাম, দরজার কাছে পৌঁছতেই পায়ে লেগে একটা ছোট্ট ধাতব কিছু ছিটকে গেল। সচেতনভাবেই সেদিকে না তাকিয়ে এগোতে যাচ্ছি, পিছন থেকে সুলতান বলে উঠল, - ও মশাই, আপনার আংটি পড়ে গেছে, এই দেখুন। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একটা জ্বলজ্বলে আংটি। এ জিনিস সোনা না হয়ে যায়না। একবার তো নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু এই লোকটার এতক্ষণের আচরণে চক্রান্তের আভাষ পাওয়ায় সে হাত ফিরিয়ে নিয়ে বললাম, - এ আমার নয়। দেখো ওদের বাড়ির কারও পড়ে গেছে হয়ত। - আরে নানা, এ তোমারই। আহা লজ্জা পাচ্ছ কেন নিয়েই নাও না। এই বলে প্রায় হাতে গুঁজে দিতে যাবে এমন সময়, এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিয়ে সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলাম। ৩ “এখনো সেই রাধারাণী বাঁশির সুরে পাগলিনী অষ্টসখী শিরমণি নব সাজে রে।। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।।” ফোনের রিংটোন বাজছে, খেয়ালই করিনি। নতুন রিংটোন লাগালে এই হয়। মাঝে মাঝেই গান বাজছে, নাকি ফোন এসেছে, গুলিয়ে ফেলি। - হ্যালো। - আরে সুলতান বলছি, কোথায় আপনি। এতক্ষণ ধরে গেস্ট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, সব ফাঁকা। এতক্ষণের দেখা জনবসতি, শ্বেতপাথরের সারি সারি ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়, মানুষজন – সব চোখের নিমেষে হাওয়া। ফাঁকা প্রান্তে ফণিমনসা, তেশিরামনসা, বাবলার সারিরা শুধু জানিয়ে দিচ্ছে যে এটা পৃথিবীই, কোনও ভিনগ্রহ নয়। - কিসব যা তা ইয়ার্কি মারছ! আমি তো তোমার সঙ্গেই এতদূর এলাম, তোমার বাড়ি ছিল, শ্বেতপাথরের পাহাড় – প্রেমিকা – তারপর সব হাওয়া – কি যে হচ্ছে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। - কি বলেন স্যার, আপনিও? - আমিও মানে? - সে অনেক কথা। সামনে মন্দির দেখতে পাচ্ছেন কোনও। তার দাবী অনুযায়ী অনেকক্ষণ ধরে আশেপাশে ঘুরে ঘুরে, অনেক খোঁজার পরে দেখলাম, বহু পুরনো একটা মন্দির। কালের কবলে স্থানে স্থানে তার দেওয়াল ধসে পড়েছে, কিন্তু মূল কাঠামোটা রয়ে গেছে। - হ্যাঁ, একটা ভাঙাচোরা – - ব্যাস আর বলতে হবেনা, দশ মিনিটে আসছি। দশ মিনিট পরে সুলতান সিং এল। গাড়ির দরজাটা খুলে বলল, - ভিতরে এসে বসুন। ওঃ না না, এই কালো ঘোড়াটা ওই মন্দিরে রেখে আসুন। ভালই হবে, খারাপ কিছু হবেনা। ততক্ষণে আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কি করছি, কি হচ্ছে আমার সঙ্গে, কিছুই বুঝতে পারছিনা। মাটির ঘোড়াটা প্রনাম করে মন্দিরে রেখে এসে গাড়িতে বসতেই রওনা দিল সুলতান। - কি হচ্ছে বলতো, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। - প্রথমে বলুন আপনার সাথে কী কী হল। সবকিছু আগাগোড়া তাকে বলতেই সে বলল, - খুব জোর বেঁচে গেছেন। এরকম আগে আরও দুজনের সঙ্গে হয়েছিল, তাদের একজন বউকে খুন করে জেলে আছে, আর একজন পাগল হয়ে গেছে। - কিন্তু কেন? কিছু আইডিয়া দিতে পারো? - যাকে আপনি দেখেছেন তিনি আর কেউ নন, সাক্ষাত কলি। আর যে যে জিনিসগুলোর প্রতি আপনাকে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল সে সবেই কলির অবস্থান। কলির মন্দির মূলত চারটি জায়গায়, মদের ঠেক, যেখানে শরীর কেনাবেচা হয়, জুয়া খেলার জায়গা, এবং সোনায়। এই চারটি জিনিসের একটিতেও আপনি প্রলুব্ধ হননি, তাই এই প্রাচীন মন্দিরের সামনে আপনার পূজা চেয়ে গেছেন কলিদেব। এই ঘোড়াটা পুজো দিয়ে ওনার কাছ থেকে আপনি ওনার প্রভাব কাটালেন। আগের দুটো ঘটনাই আমার দেখা, তাই মন্দিরের নাম শুনেই ঠিক চিনে চলে এসেছি। - আচ্ছা, কত দাম ঘোড়াটার। - সে ঠিক চেয়ে নেব। চলুন চিতোরে নেমে তো কিছু খাওয়াদাওয়াও করতে হবে। সেসব নাহয় আপনি করালেন। জানেন, যে ভদ্রলোকটি তাঁর স্ত্রীকে খুন করেছিলেন, তাঁর সাথে জেলে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বড্ড সরল মনের মানুষ। ওনাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। অবশ্য ওই চারটি জিনিসের কোনও একটিতে অতিরিক্ত লোভ যাদের হয়, তাদের উনি ছাড়েন না। আপনার মত সরল মনের মানুষ পেয়ে উনি খুব চেষ্টা করেছিলেন বাগে আনার, ভাগ্যিস আপনি ড্রিঙ্ক করেন না! প্ল্যান্টে পৌঁছে স্যাম্পল জমা দিতে গেলে কেমিস্ট ভদ্রলোকটি বললেন, - এটা দেওয়ার জন্য আপনার আসার আবার কী দরকার ছিল। ড্রাইভারকে দিয়ে দিলেই তো পারতেন। মনে মনে ভাবলাম, তাহলে কি আর এমন অভিজ্ঞতা হত! *** হ্যাঁ, দেখেছেন, ভুলেই যাচ্ছিলাম। কলির প্রভাবে উনি যে আমার পাঁচশ টাকাটা ফেরৎ দিয়েছিলেন সেটা বলতেই ভুলে গেছি। ঘরে ফেরার সময় ফাঁকা বুকপকেটে কিভাবে যেন ফিরে এসেছিল সেই পাঁচশ টাকা। বিশ্বাস করুন, কলির ফেরানো টাকা বলে নোটবন্দীর সময়েও সে টাকা ভাঙাইনি। #মানব_নারায়ণ_সেন

321

3

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

1913

90

মনোজ ভট্টাচার্য

দুনিয়ার নির্যাতিত স্বামীরা - এক হও !

দুনিয়ার নির্যাতিত স্বামীরা - এক হও ! বাঁচাও ! কে আছো ! মরেছি যে স্বামী হয়ে - -! গত দুদিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছে – পুরুষদের সম্বন্ধে কিছু লিখি । তা দেখলাম কাগজেই সেই লেখা বেরিয়েছে । - পুরুষদের ওপর নির্যাতন ! বিশেষ করে বিবাহিত পুরুষ নামক অসহায় জীবটির প্রতি অত্যাচার । শারীরিক তো বটেই – মানসিক অত্যাচারও ! সেই অত্যাচারের ভার সামলাতে না পেরে – আমাকেও পুরানো লেখা থেকে এই লেখাটি বের করতে হোল । স্বামী নির্যাতন নাকি ৩৪% বেড়ে গেছে ! এতদিনে আরও বেড়ে গেছে নিশ্চয় ! – এদেশে তো বটেই এবং – অবশ্যই - চীনদেশে ! বেচারি স্বামী মহিলা কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন । তার স্ত্রী তাকে খেঁটে বাঁশ দিয়ে মেরেছে । ফলে তার মাথা তো বটেই পিঠে অনেক ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে ! ঘটনাটা কী ! – এক ভদ্রলোক রোজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে – তাদের বাচ্চা মেয়েটির তত্ত্বাবধানের জন্যে । কারন তার শাশুড়ি নাকি সেই বাচ্চাটিকে কারনে অকারনে পেটায় । তাই বাচ্চাটির জন্যেই পিতাকে বাড়ি ফিরতে হয় । আর সেই কারনে তার শাশুড়ি তাকে নানানভাবে গালিগালাজ করে । আর স্ত্রী বাড়িতে ঢুকলেই তার নামে নালিশ করে চেঁচিয়ে গালাগাল দিয়ে । তার ফলে তার স্ত্রী রাগের চোটে বাঁশের খেঁটে নিয়ে তাকে প্রহার করে ! মহিলা কমিশন সারা দেশে তদন্ত করে দেখেছে – দেশে স্বামী নির্যাতন সত্যিই ৩৪% শতাংশ বেড়ে গেছে । এই স্বামী নির্যাতন নিয়ে তারাও খুব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ! তাই বলি – স্বামী সাবধান ! তখন নীচের গল্পটার কথা মনে পড়ল । আগেও একবার দিয়েছিলাম । এটা বিদেশি একটা রসিকতা থেকে নেওয়া ! তবে রসিকতা কেন – বোঝা যাচ্ছে ! এক শহরে এক বেচারি জন বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখে – বেশ বড় একটা মিছিল যাচ্ছে । মিছিলের একজনকে জিজ্ঞেস করলো – কিসের মিছিল ! শোক মিছিল । কে মারা গেছে ! মিস্টার থমসনের শাশুড়ি । - কিকরে ? থমসনের কুকুর কামড়েছে । তাই নাকি – সে কুকুর কোথায় ! – একদম সামনের গাড়িতে মাল্যভূষিত হয়ে বসে আছে । - ওই কুকুরটাকে কি ভাড়া পাওয়া যাবে ? – নিশ্চয় যাবে । লাইন দিন । জন লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে দেখে – লাইন প্রায় আধ মাইল দীর্ঘ ! জন ভাবতে থাকে এত লোক শাশুড়ির দ্বারা নির্যাতিত ! এখানেও অবশ্য একজন পুরুষপন্থী নারী নন্দিনী ভট্টাচার্য । তিনি সর্ব বঙ্গ পুরুষ সঙ্ঘের সভাপতি । পুরুষের ওপর অত্যাচার আগের চেয়ে কমেনি তো বটেই – বরং বেড়ে গিয়েছে । তিনি এটা বুঝতে পেরেই এগিয়ে এসেছেন ! - আগে তো পুরুষরা নারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতেও চাইত না লজ্জাবশত । - কারন নাকি পুরুষরা কাঁদে না ! একটা ইংরিজি সিনেমাও দেখেছিলাম - মেন ডোন্ট ক্রাই’ নামে – সেটা এখন থাক ! – এখন কিন্তু পুরুষরা নারীদের বিশেষ করে স্ত্রীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেন ! নিচে একটা ছবি দিলেই সন্দেহ নিরসন হবে ! – আমি কিন্তু একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ট ভদ্রলোক ! মনোজ

382

2

শিবাংশু

সাঁঝ ঢলি

লোকে মরতে আসে বারাণসিতে, বাঁচতেও আসে সমান মাত্রার আবেগ নিয়ে। আর কোথাও কি এমন চক্রধর তেহাই বাজে মহাকালের হাতে? জানিনা... যে সব পুরাণকথার মধ্যে ভারতধর্মের মূল ছাঁদটি ধরা আছে তার একটি হচ্ছে রাজা হরিশ্চন্দ্রের কিংবদন্তি । মূল্যবোধের যে স্তরে যাযাবর আর্য উপজাতিরা এদেশে নিজেদের উন্নীত করেছিলো, তার একটি নিখুঁত নমুনা এই লোককথা। গপ্পোটা সবার জানা, তাই পুনরুক্তি নয়। কিন্তু পটভূমি হিসেবে বারাণসিকেই কেন নির্বাচন করা হয়েছিলো সেখানে? ভারতধর্মের শ্রেষ্ঠ পরীক্ষাগার বলে কি? সেই রূপকথার রাজার নামে একটা ঘাট আছে এখানে। হরিশ্চন্দ্র ঘাট। অনেক অন্ত্যেষ্টি হয় এই ঘাটে আর হয় মণিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানরক্ষক অর্থাৎ ডোমসম্প্রদায়ের সদস্যদের শেষ কৃত্য। তাঁরা নাকি মণিকর্ণিকায় নিজেদের শবদাহ করেন না। বারাণসির এটাই প্রাচীনতম শ্মশানঘাট, তাই আদি মণিকর্ণিকাও বলা হয় একে। ১৭৪০ সালে পেশোয়াদের গুরু নারায়ণ দীক্ষিত এই ঘাটটি সংস্কার করে পাকা করে দিয়েছিলেন। আমার একটা তেমন সুলভ নয় ব্যসন রয়েছে। সেটা শ্মশানঘাটে 'বেড়াতে' যাওয়ার নেশা। না সেখানে গিয়ে কোনও ঐহিক নেশায় রুচি নেই, শুধু দেখতে যাওয়ার নেশা বলা যায়। আমাদের গ্রামে সুবর্ণরেখার ধারে যে সুন্দর সাজানো ঘাট রয়েছে, ছুটির দিনে সেখানে মাঝে মাঝে খেপ মেরে আসার অভ্যেস আমার বেশ পুরোনো। এ যাওয়া কিন্তু কোনও চেনা মানুষকে এগিয়ে দিয়ে আসার জন্য যাওয়া নয়, সেতো শতবার হয়ে গেছে, একে বলা যায় জীবনের শেষ স্টেশনের পথে ড্রাই রান। ভারতবর্ষে প্রাচীনতম যে দুটি শ্মশানঘাট রয়েছে, তার একটি পাটনার বিখ্যাত বাঁশঘাট। সেই বৌদ্ধযুগ থেকে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু জায়গা বদলেছে, কিন্তু ঘাটটি সগৌরবে রয়ে গেছে। তা পাটনা থাকাকালীন আমার দফতর আর বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায় ছিলো এই স্থানটি। আমার এক অগ্রজ সহকর্মী, তিনিও জামশেদপুরের লোক এবং এরকম একটি উদ্ভট নেশায় আমার সঙ্গী। প্রতি শনিবার বেলা থাকতে থাকতে যখন বাড়ি ফিরতুম, তখন বাঁশঘাটের পাশে গাড়িটি লাগিয়ে দুজন মিলে ও তল্লাটে একবার ঢুঁ মেরে আসার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। অনেকেই জানতো এই বিচিত্র নেশার কথা। কেউ অবাক হতো, কেউ পাগল ভাবতো, কেউ বা অন্যকিছু। তো বাঁশঘাট ছাড়া দেশের অন্য প্রাচীনতম আর ব্যস্ততম শ্মশানটি রয়েছে বারাণসিতে, সেটা একবার না দেখে তো ফেরা যায়না। কিন্তু যাবো রাতের দিকে, অন্ধকারে। সন্ধে হতেই দশাশ্বমেধে এসে আবার নৌকোয় চড়ে বসি। তরী এবার উত্তরবাহিনী। বাঁদিকে শ্মশানরাজ কালুডোমের বিশাল রাজপাট। ঘাট ছেড়ে নদীর দিকে উজানে বয় নৌকো। নদীর ঢেউয়ে দুলে যায় তীরের আলোকমালা। আসে মানমন্দির ঘাট, জয়পুরের রাজা নির্মিত অষ্টাদশ শতকের একটি মানমন্দির রয়েছে এখনও। তারপর ললিতা ঘাট বা নেপালি মন্দির ঘাট। নেপালি স্থাপত্যের একটি ভারি সুন্দর কাঠের মন্দির আছে সেখানে। মাঝির সঙ্গে গপ্পো জুড়ি, তার নাম দীপক মন্ডল। বলি দীপক নাম তো বাঙালিদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। সে বলে আমি তো কোলকাতার লোক। বাবুঘাটে নৌকো বাইতাম। বাবার তাড়নায় বনারস পালিয়ে আসি। ভোজপুরিতে সুখদুঃখের কথা হয়। প্রশ্ন করি, সব মাঝিই কেন শাড়ি মন্ডিতে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপিড়ি করে? সে জানায়, বনারসের সব ঘাটে যতো নৌকো আছে সবের মালিক মারওয়াড়ি শাড়ির ব্যবসায়ীরা। মাঝিরা ভাড়া খাটে দিনমজুরিতে। যা রোজগার হয় সব তুলে দিতে হয় মালিকের যে সব এজেন্টরা ঘাটে ঘুরে বেড়ায় তাদের হাতে। ভিড়ের মরশুমে বেশি কামাই হলেও মাঝির জন্য আলাদা কিছু নেই। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু গ্রাহককে রোজ মালিকের শাড়ির গদিতে নিয়ে যাবারও চাপ আছে। ব্যাংকারের মাথা কাজ করে। জিগাই, নিজে একটা নৌকো কেনোনা কেন? সে বলে এ রকম একটা নৌকোর দাম অন্তত নব্বই হাজার। কোথায় পাবো? আমাদের তো থাকারও একটা ঢঙের জায়গা নেই। বলি, ব্যাংক যদি দেয়? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সে নৌকো এখানে আমাকে কেউ বাইতে দেবেনা। নিরুত্তর, শূন্যপানে চাই। তখনই দূরে ভেসে ওঠে সারি সারি প্রজ্জ্বলিত চিতার আলো, সেই সব ভাগ্যবানের পঞ্চভূতে মিশে যাবার জাদু প্রতিবিম্ব, যারা অনেক পুণ্যে ঐ ঘাটে ঠাঁই পেয়েছে। এসে গেছে মণিকর্ণিকা। নৌকো একটু একটু করে ঘাটের কাছাকাছি যায়। একসঙ্গে ছ-সাতটি চিতা জ্বলছে পাশাপাশি। আবছা আলোয় দেখা যায় ঘিরে থাকা মানুষদের মুখ। প্রিয়তম স্বজনদের অগ্নিআহূতি দিতে জড়ো হয়েছে তারা। ডোমরা এসে চিতাকাঠ উল্টে দিয়ে যায়। সোনালি নীহারিকার মতো আগুনের ফুলকি সন্ধে হাওয়ায় উড়ে যায় কোন অজানার দেশে। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে প্রিয় কবির শব্দের সারি। আমার পিতৃদেব চলে যাবার কিছু দিন আগে এই কবিতাটি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করে ফিতেবন্দি করে গেছেন আমাদের জন্য। চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা তার ওপরে আমাদের পলকা নৌকোর নিঃশ্বাস মুখে এসে লাগে মণিকর্ণিকার আভা আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না হাতে শুধু ছুঁয়ে থাকি পাটাতন আর দু'এক ফোঁটা জলের তিলক লাগে কপালে দিনের বেলা যাকে দেখেছি চণ্ডাল আর রাত্রিবেলা এই আমাদের মাঝি কোনো ভেদ নেই এদের চোখের তারায় জলের ওপর উড়ে পড়ছে স্ফুলিঙ্গ বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে ভস্ম পাঁজরের মধ্যে ডুব দিচ্ছে শুশুক এবার আমরা ঘুরিয়ে নেবো নৌকো দক্ষিণে হরিশ্চন্দ্রের ঘাট দুদিকেই দেখা যায় কালু ডোমের ঘর চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা এক শ্মশান থেকে আরেক শ্মশানের মাঝখানে আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না । ( মণিকর্ণিকাঃ শঙ্খ ঘোষ) অনেকে দাবি করেন, কবিতা বুঝিনা। সত্যিই কি বোঝেন না? জানিনা.....

332

3

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের শেশ দৌড় !

(ছত্রিশ কোটি দেব-দেবীর – তারমধ্যে সর্বশ্রী অপনবাবু, অর্ণব, মুনিয়া, জলি ও খুশী ও আছেন – শ্রীচরনপদ্মে জলাঞ্জলি দিলাম । ভালো লাগিলে আমায় সাবাশ ও খারাপ লাগিলে উপরোক্ত দেবদেবীকে মন্দ বলিবেন ।) জীবনের শেষ দৌড় ! জীবন কাহিনীকে কয়েকটা পর্বে ভাগ করলে যা দাঁড়ায় সেটা হল শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য । আমার মতে এটা ঠিক নয় । শৈশবেরও দুটো পর্ব আছে - শৈশব ও এঁচোড়ে-পাকা শৈশব । সেটা ১৯৪০ সাল নাগাদ । আমার বাবা খুব কম বয়েসেই মেডিক্যাল পড়তে পড়তে বিয়ে করে ফেললেন – তাও আবার কায়স্থ বাড়ির মেয়েকে ! সেই নিয়ে দু-বাড়ির মধ্যে ভীষণ তোলপাড় হয়েছিল ! – দাদু তো ক্ষেপে গিয়ে বাবাকে ত্যাজ্যপুত্র করে দিলেন । আবার মায়েদের দিকেও ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে মেনে নিতে পারল না । বাবা নতুন রাস্তায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে গেলেন । আমার পিতামহ ছিলেন ভাটপাড়ার ভট্টপল্লির প্রথম মানুষ যিনি পৌরোহিত্য না করে ডাক্তার হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন । ওনার বিয়ে হয়েছিলো নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের ডাক্তার সুরেশ ভট্টাচার্যের কন্যার সঙ্গে । যেহেতু প্রপিতামহের নাম ছিল কৃষ্ণগোপাল ও ঠাকুরমার নাম ছিল রাধারানী – তাই বিয়ের পরে এক সপ্তাহ-ব্যাপি ঝুলন-যাত্রা ! এসব শোনা কথা । উনি পর পর দুবার কাউন্সিলার হয়েছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের । - এদেরই প্রযত্নে আট-নটি কন্যা ও একটি পুত্র হয়েছিলো । পুত্রটি পৃথিবীতে বেশিদিন যাপন করতে পারেন নি । মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে সংসারে চার পুত্র-কন্যা রেখে চলে গেলেন । এদেরই মধ্যে একজন হলেন শ্রীমান আমি । পরে কোন কারনে আবার নিজেদের বাড়িতে তিনতলায় আমরা ভাড়াটে হয়ে ছিলাম । বাবা ছিলেন প্লাম্বার । মাথায় টুপি পড়ে ওড়িয়া মিস্ত্রিদের দিয়ে কাজ করাতেন । সেই সময়ে রাস্তার ওপর কোন কাজ করতে হলে প্রথমে কর্পোরেশনের অনুমতি লাগত । সমস্ত কাজ রাত্তিরের মধ্যেই করে ফেলতে হত । যদিও ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেছে – কিন্তু সিস্টেমগুলো অটুট ছিল । সে যাইহোক, তিপান্ন সালে বাবা টালিগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন বলে টালিগঞ্জে ভাড়া বাড়িতে চলে গেলেন । বছর ঘুরতেই আমরা পিতৃহীন হয়ে সবাই ফিরে এলাম – সেই দাদুর বাড়িতেই ! আর সেই দশই জুন আমাকে দেখে দাদুর সেই ভবিষ্যতবাণী – হয় ভালো হবো – নয়ত চোর-জোচ্চোর-ডাকাত – কিছু হবো নিশ্চয় ! বাবা যখন চুয়ান্ন সালে মারা যান তখন আমার বয়েস ছিল এগারো । সেই বছরেই আমি সুদূর টালিগঞ্জ থেকে একা হেঁটে বাগবাজারে চলে এসেছিলাম । কেউই বিশ্বাস করেনি । পকেটে একটা চারআনি ছিল । ফেরবার জন্যে রেখে দিয়েছিলাম । তখন টালিগঞ্জের ভাড়া বাড়িতে ফোন না থাকায় – আমার দাদা-মশাই সেদিন সন্ধ্যেয় আমাকে নিয়ে টালিগঞ্জে ফেরত নিয়ে এলেন । - দাদা মশাইয়ের সেই শেষ টালিগঞ্জে আসা । কারন তারপরই উনি শয্যাশায়ী হলেন । সেই ভাবে উনি অনেকদিন ছিলেন ও পরে মারাও যান । টালিগঞ্জের ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওয় আমরা একটা সিনেমার ভিড়ের দৃশ্যে ছিলাম । রাজপথ জনপথ নামে ঐ সিনেমায় বসন্ত চৌধুরী, মিহির ভট্টাচার্য ইত্যাদি ছিলেন । কিন্তু সিনেমাটা রিলিজ হয়েছিলো কিনা জানি না । ওখানেই বাঙ্গুর স্কুলে মাইনে বেশি বলে আমরা একটা পাঠশালায় যেতাম । এখন সে যায়গাটার কি নাম তা মনে নেই । গল্ফ ক্লাব ডিঙ্গিয়ে যেতে হত । সেখানে নাকি একজন সাহেব গাড়ি করে টহল দিত । আর গলফের মাঠে কাউকে দেখলেই গুলি ছুঁড়ত । কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে – তা কে বলবে ! তবে কাঁটা তারের বেড়া ছিল । - তখন বেশ কটা গলফ স্টিক ও গলফ-বল ছিল আমাদের ! আর আমরা খেতে পেতাম না বটে – কিন্তু গলফ খেলতে শিখে গেছিলাম । এইখানে মাতামহের দিকে কিছুটা ফোকাস করি । প্রমাতামহ নাকি যশোর-জেলার সাব-জজ ছিলেন । এবং জমিদারি ইত্যাদি, প্রভৃতি । তারা কবে কলকাতায় এলেন জানা নেই । মাতামহের সঙ্গে হাটখোলা দত্ত-বাড়ির মেয়ের বিয়ে হয়েছিলো । - পরে যা দেখেছি – দিদিমার যথেষ্ট দাপট ছিল । - মাতামহের সেই সময় একটা ভালো ব্যবসা ছিল । ক্যানিং স্ট্রিটে অফিশ – বেঙ্গল মেরিন অ্যান্ড রেলওয়ে ইন্ডাস্ট্রি । গিলান্ডার ছাড়াও আরও অনেক কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা ছিল । রেল থেকে নৌকো বা লঞ্চের সমস্ত রকম সামগ্রী সাপ্লাই দিত । সেটা যুদ্ধের সময় ! পয়সার চেয়ে লোহা দামী ! তখনকার একটা দাম্ভিক উক্তি – পয়সার জোরে দুনিয়া ঘোরে ! এখানে বলি – সেকালের ধনি ব্যবসায়ীরা যত বাড়ি বিহারের শিমুলতলা মধুপুর দেওঘর এ বানিয়েছেন , তার কিয়দংশ যদি কলকাতায় নিজের বাড়ি বানাতেন – তবে তাদের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত হতে হত না। অনেককেই সেই সময়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে দেখেছি । যে বাড়িটা আমি জন্ম-ইস্তক জেনে এসেছিলাম মামার বাড়ি বলে, হঠাত একদিন দেখলাম – তাদের সব উৎখাত হতে হয়েছে ! – খাওয়া-দাওয়া ভোগ-বিলাস – মায়ে ল্যান্ডো ঘোড়ার গাড়ি প্রায় প্রতিদিন থিয়েটার-সিনেমা দেখা, সব সময়ে উৎসব উৎসব ভাব ! – কিন্তু নিজস্ব কোন বাড়ি ছিল না ! দেখেছি তখন সেই বাড়িতে কত আত্মীয়স্বজন । ধীরে ধীরে সেই ভিড় কমে গিয়ে রইল শুধু দাদু-দিদা আর দুই মামা । তার মধ্যে একজনের বৌ ত্যাগ করে চলে গেছে ও অন্যত্র বিয়েও করেছে । ফলত বড় মামার মাথা খারাপ হয়ে গেছে । আর একজনের লেখাপড়ার কোন ব্যাপারই নেই । পাড়ার বখাটে ছেলে । এই পর্বটিকে আমি এঁচোড়ে-পাকা শৈশব বলি । পাড়ার কিছু বখাটে ছেলের সঙ্গে মিশে যত উৎপটাং কাজ, রাতে থিয়েটার হলে গিয়ে কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢোকা অথবা ট্রামে টিকিট না কেটে ধর্মতলার সিনেমা হলে লাইন দিয়ে ইংরিজি সিনেমা দেখা । এই সময়ই রাস্তায় চাকা চালানো, ডাংগুলি খেলা , ইত্যাদি সব অপকর্মগুলো করার সুযোগ পেয়েছিলাম ! বৃন্দাবন পাল লেনের একটা বাড়িতে কয়েকজনে মিলে বোম বানানো ইত্যাদি ! কত দাদা-কাকা-জ্যাঠার কানমলা, গাট্টা খেয়েছি – তার ইয়ত্তা নেই । হয়ত সেটাই আমার যাযাবর মস্তিষ্কের শুরু । এর পর বেশ কয়েকবার পালাবার চেষ্টা করেছি, ও পালিয়েছিও বাড়ি থেকে ! বাবা মারা যাবার পর বাগবাজারে ফিরে এসেই আমাদের স্কুলে ঢোকানো হোল । তখন শৈলেন্দ্র সরকার ছিল প্রায় এক নম্বর। তখনকার জাতীয় শিক্ষক এই স্কুলেই ছিলেন । কিন্তু যেহেতু শৈলেন্দ্র সরকার স্কুল আমাদের পাড়ায় নয় – তাই বাগবাজার স্কুলেই যেতে হোল । কারন তার স্কুল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমার দাদু ! দাদুর টেবিলে একটা ইংরিজি বই – লন্ডনের ওপর – আমাদের পড়াতে বসালেই সেই বইটা থেকে পড়তে হত । লন্ডনের রাস্তা-ঘাট সম্বন্ধে আমি খুব ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছিলাম ! আমার পিসিদের মধ্যে একজন দীর্ঘদিন অবিবাহিতা ছিল, তার মাথায় ছিট ছিল । সে পরে খড়দহের এক স্কুলে মাস্টারি করত । মুলত তার অত্যাচারে মাকে দুই বোনকে নিয়ে মামার বাড়ি চলে যেতে হোল । মা একটা পেয়ারার জেলি তৈরি করত – তার বেশ চাহিদা ছিল । একই সঙ্গে মন্টেসরি স্কুলে চাকরি করত ও জেলির ব্যবসাটা চালিয়ে যেত । আমাদের কোন গৃহশিক্ষক বা কোচিং ছিল না । - সেই অবস্থায় কিভাবে যে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছিলাম – এমন কি গ্র্যাজুয়েট হলাম – কে জানে ! আবার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার প্রথম দিনে সেই পিসি একটা বঁটি নিয়ে মারতে এসেছিল । এই ঘটনার কথা এখানে আগেই লিখেছি । পরবর্তী কালে সেই স্কুলের এক কম বয়েসী শিক্ষককে বিয়ে করে এখান থেকে চলে গেছিলো । কিন্তু একজনের কথা না লিখলে খুব অন্যায় হয়ে যাবে । সে আমার বন্ধু, দিদি বা মেন্টর যাই লিখি না কেন – ঠিক মিলবে না । কেয়া চক্রবর্তী ! তাকে দিদি বলে ডাকতাম না বলে খুব অভিযোগ করত । অনেক ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করত । সত্যি কথা বলতে কি ও-ই আমাকে মেয়েদের সম্বন্ধে জানতে শিখিয়েছে ! ওর জন্যেই আমি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি – হয়ত কলেজে পড়াই হত না ! – আমি যেবার ক্লাশ এইটে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম – এবং ফিরেও এসেছিলাম সেই একই খাঁচায় – তখনো ও-ই একমাত্র আমার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল । আবার ও-ই আমাকে কফি হাউসের রাস্তা ও আড্ডা দেখিয়েছিল । ও-ই কোথায় ইংরিজি বই পাওয়া যায় কোন হলে ইংরিজি সিনেমা দেখানো হচ্ছে – জানান দিত তখন লাইট হাউসের ঠিক উল্টোদিকে ইংরিজি সাহিত্যের নতুন ও পুরনো বই পাওয়া যেত ও অন্যান্য বইও পাওয়া যেত । তখনকার দিনে খুব একটা সস্তাও ছিল না ইংরিজি বই । আর থিয়েটার সম্বন্ধে ধ্যান-ধারনা সবই প্রথমে কেয়া – তার পরে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় । - সেই সময়টায় আমি চুটিয়ে রাজনীতি, নাটক ইত্যাদি সব কিছু করার সুযোগ পেয়েছি । এই পর্যন্ত আমার শৈশব, এঁচোড়ে-পাকা শৈশব, কৈশোর কাল বলা যেতে পারে ! মনোজ ( ক্রমশ)

402

7

শিবাংশু

হেমন্তের দেবী

হেমন্তকালটার ঠিক কোনও নিশ্চিত লক্ষণ নেই। বৃষ্টি নেই, শীত নেই, রোদটাও নরম, ফুলও ফোটেনা। স্পষ্ট হয়ে কাছে আসেনা বলে তার আবেদনটা খুব রহস্যময়। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে যে ট্রেনটা তার একটা জানালায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকা একটি মেয়ের মুখ যেন। এক পলক মনে হয় তাকেই তো খুঁজছিলুম কতোদিন ধরে। দ্বিতীয়বার সে আর চোখে ধরা দেয়না। মনের মধ্যে রয়ে যায়। অস্পষ্ট, অধরা। শুধু টানটাই থেকে যাবে বহুদিন। একেই কি হেমন্তের পিছুটান বলে। পুরীতে তো সারাবছরই গ্রীষ্ম। কখনও জ্বলন্ত, কখনও ঘর্মান্ত। তার অন্ত নেই কখনও। কালীপুজোর সময় বারুদের হিমন্ত বাষ্পে ভারি হয়ে সন্ধে নেমে আসে বালুবেলায়। পুরী হোটেল থেকে স্বর্গদ্বার পর্যন্ত সারা রাস্তায় সরাইখানাগুলো নিজেদের সাজিয়ে রাখে ঝিকমিক জোনাকির ফোঁটা ফোঁটা আলোয়। কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা মধ্যবিত্ত বাঙালিরা দিনের বেলা বার্মুডা-নাইটি আর সন্ধে হলে পাঞ্জাবি-পাজামা , শলোয়ার-কামিজে ফুটপাথ ভরিয়ে রাজার মতো। মশলামুড়ি। দাদা-বৌদির দোকানে রুমালি রুটি দিয়ে চিলিচিকেনের অর্ডার দেয়। অদূরদর্শীরা স্বর্গদ্বার বাজারে চড়াইয়ের শেষে, খাজার দোকানের পিছনে সুরাসন্ধান করে। ঠিক পাশেই রয়েছে ওষুধের দোকান। লাইন দিয়ে হাঁপানি আর হজমের ওষুধ খোঁজা অবিরত চেনা মুখ।ঝলমলে শাড়ির দোকানে উপচে পড়া ওড়িশার ঐশ্বর্য। কাটাতেলের বিক্রম অটো ছিদ্রহীন ভিড়ের মধ্যে পথ করে ছুটে যাচ্ছে মন্দিরের রাস্তায়। বাজার সমিতির পুজোমণ্ডপে দেবী কালী পূজিত হবার অপেক্ষায় ঝলমলে সাজ পরে রেডি। বদনগঞ্জ-আরামবাগ থেকে আসা কম রেস্তোর রাতের পর্যটকেরা খাজা আর ছেনাপোড়ের সম্বল গুছিয়ে থানার কাছে পার্ক করা বাসের দিকে ধাবমান। এই অটো, কতো লেগা? দশ মিটার অন্তর ফুলঝুরি, তুবড়ি, রংমশাল নিয়ে বাচ্চারা, বাবারা, দাদারা বছরকার দিনে আলো দেখাচ্ছে অন্ধকার আকাশের তারাদলে। আমরা বেড়ুবেড়ু করতে করতে মহোদধির পার্কিঙে রাখা গাড়ি বার করে চলে যাই এক ও অদ্বিতীয় চাঙ-ওয়ায়। চক্রতীর্থের দিকে আলো জ্বলেনা ততো। রাতের বেলা রাস্তাও খালি। আজ আর দেবীর সঙ্গে নিশিজাগর নেই। ঢেউয়ের স্তিমিত শব্দের আবহে কার্তিক অমাবস্যার রাত ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে যায়।

394

6

Stuti Biswas

ঝটিকা সফরে আমেরিকা

কালকে লেখার সাথে ছবি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম হল না । আজ দেখি হয় নাকি

789

37

মনোজ ভট্টাচার্য

মিস মার্পলরা এখনো আছে !

মিস মার্পলরা এখনো আছে ! দিজ ইস প্রিলিমিনারি ওয়াটসন ! রুপা বলল – আত্মহত্যা করলে – মুখ-টুখ ফুলে যাবে না ? এটা কোন গোয়েন্দা কাহিনী নয় । অবশ্য নয়ই বা বলছি কেন ! খানিকটা মিস মার্পল ধরনের ঘটনা ! আমার স্ত্রী তো বলেই ফেলল – তুমি তো বেশ গোয়েন্দার মতো কাজ করেছো ! তোমার মাথায় এলো কি করে ! তবে পুরো ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক । জায়গার নাম বা চরিত্র গুলোর আসল নাম বলছি না – কারন এগুলো সত্যিকারের আদালতের ঘটনা । যদিও আগেই মীমাংসা হয়ে গেছে ! চন্দননগরের আশেপাশে কোন এক জায়গায় এক বৃদ্ধা তার দুই ছেলে হারান আর পরান কে- নিয়ে থাকতেন । রুপা – পরানের বৌ । পরানের মারা যাবার পর এক ছেলে কে নিয়ে কলকাতায় বাড়িভাড়া করে থাকে । কাজ করে বাড়ি বাড়ি । মাঝে মাঝে চন্দননগরে গিয়ে যায় । সেঝানে তো শাশুড়ি থাকে । একদিন রুপার ফোনে মেসেজ এলো – মা নাকি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে । রুপা কলকাতা থেকে চন্দননগরে চলে গেল । দেখে কিনা ওরা মার দেহ দাহ করতে যাচ্ছে – ওরই জন্যে অপেক্ষা করছিল । ওখানে একজন ডাক্তারও হাজির । রুপা মার কাছে গিয়ে খানিক দেখে সন্দেহ হওয়ায় বলে দিল - মা তো আত্মহত্যা করে নি । মাকে তো খুন করেছে ! - বজ্রপাতের মতন শোনালো রুপার এই কথা । ডাক্তার বলল – তোমার কি করে মনে হল – এটা আত্মহত্যা নয় - খুন ? আত্মহত্যা করলে মার গলায় দাগ নেই কেন ? আর জিভ তো বেরয় নি ? আরে তুমি দেখছি সব জানো ! এটা আত্মহত্যার কেশ ! আগেই পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে ! এবারে চেঁচিয়ে উঠল রুপার ভাশুর হারান । বেশ একটা সোরগোল উঠল ! যারা দেখতে এসেছিল তাদের কেউ কেউ রুপাকে সমর্থন করল । - রুপা আর কি করে, সোজা চলে গেল থানায় । সব খুলে বলতেই বড়বাবু বলে উঠল – পোস্টমর্টেম হয়েছে যখন – তখন সব ঠিক আছে । রুপা যতই চেষ্টা করছে বলতে – মা খুব মোটাসোটা ছিল । নিজে নিজে সিলিঙ্গে দড়ি টাঙাতেই পারবে না । কেউ তাকে পাত্তাই দেয় না । তবু রুপা জেদ ধরে রইল । অবশেষে বড়বাবু বলে উঠল – তুমি কি কোন প্রমাণ দ্যাখাতে পারবে ? বাড়ি চলে যাও – যদি কোন প্রমান আনতে পারো – তখন ইনভেস্টিগেট করবো আবার । রুপা আর কি করতে পারে – এতবড় একটা মার্ডার কেস – অথচ পুলিশ ওর কথা সিরিয়াসলি নিচ্ছেই না ! ও আর ওরই এক প্রতিবেশী বাড়ি থেকে শ্মশানে গেল । শ্মশানে গিয়ে দেখে – মার দেহ পুড়ছে আর হারান আর চার বন্ধু মিলে এক ধারে বসে – মদ গিলছে । আর টাকা পয়সা নিয়ে আলোচনা করছে । ওর প্রতিবেশির হাতে মোবাইল ফোন ছিল । তাড়াতাড়ি ভিডিও অন করে শুনতে লাগলো – কি কথা হচ্ছে । ওদের কথাবার্তা শুনে রুপা বুঝতে পারল – ওর মাকে কোমরে লাঠি দিয়ে মেরেছে – হারানের এক বন্ধু । আর ওর মা মরে যাবার পর আগে থেকে লেখা দলিলে সই করিয়েছে আরেক বন্ধু । এই দুই বন্ধু এখন বেশি হিস্যা চাইছে । আর ওর ভাশুর হারান ওদের পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে । তাই নিয়েই একটু গণ্ডগোল চলছে । রুপা খানিক বাদে ভিডিও বন্ধ করে দৌড়ল থানায় । গিয়েই বলল – প্রমাণ চেয়েছিলেন ! এই নিন প্রমাণ ! বড়বাবু দেখেই বুঝতে পারল – কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে সোজা শ্মশানে । দেহ ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। হারান আর ওর তিন বন্ধুকে পাকরাও করে নিয়ে এলো । আর যে বন্ধুটি দলিলে টিপছাপ নিয়ে ছিল – সে পালিয়েছে । পরে অবশ্য ধরা পড়েছিল । শেষপর্যন্ত বিচারে ওদের তিনজনের চোদ্দ বছর করে জেল হল – আর দুজনের কম সাজা হল । ছ বছর হয়ে গেছে । সেই বাড়িটায় এখন হারানের বৌ এক সন্তান নিয়ে থাকে । সেও বাড়ি বাড়ি কাজ করে খায় । তবে রুপাকে পাড়ার সবাই ওখানে যেতে বারন করেছে । কারন ওর নিজের লোককে জেল খাটাচ্ছে । এখানে প্রশ্ন জাগে অনেক ! কিন্তু আমি আর সেসব প্রশ্ন করিনি । আর এখানে রুপা অন্য নামে কাজ করছে । তবুও ওর সাহসের তারিফ করতেই হয় ! এই সংসারে এরকম কত রুপা আছে – যারা নীরবে সব সহ্য করে যায় ! মনোজ

430

6

শিবাংশু

দীন যে, দীনের বন্ধু…

তখন আমি তেরো। নয় ক্লাসে পড়ি। বিদ্যাসাগরের দেড়শোতম জন্মদিন পালনের আয়োজন শুরু হলো আমাদের শহরে। তখনও পর্যন্ত পড়ার বইয়ের বাইরে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষ চর্চা ছিলোনা। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক কিংবদন্তি, বাকিটা দেবতা। তেরো বছর বয়সে, বালকত্ব ও কৈশোরের মাঝামাঝি একটা সময়ে, বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষভাবে কৌতুহলী হওয়া আমাদের সময়েও বিরল ছিলো। এই সময়টিতে কলকাতার সাক্ষরতা সমিতি সুলভে বিদ্যাসাগর রচনাবলী প্রকাশ করেন। তিন খণ্ডে। অবিলম্বে সেগুলো ডাক মারফৎ আমার বাবার সংগ্রহের অংশ হয়ে যায়। ইতোমধ্যেই বাবার কাছে নানা সংস্থা, পত্রিকা থেকে অনুরোধ এসে গিয়েছিলো । বিদ্যাসাগরকে কেন্দ্র করে বহুমুখী লেখালেখি, ভাষণচর্চা ইত্যাদির প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে গেছে। বইগুলি আলমারিতে ওঠেনি। লেখার টেবিলেই রাখা থাকতো। তখনও ১৯৭০এর জুন আসতে কয়েকমাস বাকি। সকালের কাগজে কলেজ স্কোয়ারের ঘেরা জায়গাটায় তাঁর মুণ্ডহীন আবক্ষমূর্তির নিচে গড়িয়ে যাওয়া মাথাটির ছবি, বাবার শূন্যদৃষ্টিতে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকা,.... আরও কিছুদিন পরে। আমার বিদ্যাসাগরকে চেনা ঐ বয়স থেকে। 'শিশুপাঠ্য' বিদ্যাসাগরের জীবনী থেকে সোজা এসে পড়েছিলুম গোপাল হালদারে। ঐ রচনাবলীর সম্পাদনা করেছিলেন গোপাল হালদার। তিনটি খণ্ডেই তাঁর লেখা ভূমিকাগুলি বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বাংলায় লেখা সেরা আলোচনাগুলির মধ্যে পড়ে। তার পর খুঁজে পেতে বদরুদ্দিন উমর এবং বিনয় ঘোষ। অবশ্যই বিপিনবিহারী গুপ্তের 'বিবিধ প্রসঙ্গ'। ইশকুল ছাড়ার আগেই মোটামুটিভাবে 'ঈশ্বরলাভ' হয়ে গিয়েছিলো আমার। পরবর্তীকালে যথাসাধ্য সন্ধান চলেছে তাঁর পায়ের চিহ্ন খুঁজে। লেখালেখিও করেছি। সভাসমিতিতে আলোচনাও চলেছে এই অর্ধ শতক। একটাই লক্ষ নিয়ে এগোতুম। ভদ্রলোকের কিছু খুঁত বার করা বড্ডো প্রয়োজন। কিছুই পাওয়া যাচ্ছেনা। চারুবাবুর অনুগামীরা বলতেন সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে ইংরেজ সৈনিকদের থাকতে দিয়েছিলেন। তাই তিনি ইংরেজের দালাল। শুধু তাই নয়, বিদ্যাসাগর বাঙালি 'ভদ্রলোক' কালচারের প্রধান আইকন। যে মানুষকে এই প্রতিক্রিয়াশীল সমাজটি মান্য করে, তিনি ততোধিক প্রতিক্রিয়াশীল। আরও অনেক খুচরো অভিযোগ ছিলো। তর্ক-বিতর্ক-মতান্তর-মনান্তর ধারাবাহিক ভাবে চলেছে কতোশত লোকের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে জলের আল্পনার মতো মিলিয়ে গেছেন তাঁরা। তাঁর প্রতি আমার অবস্থানটি এখনও বদলাবার কারণ পাইনি। একটা জীবনের জন্য আধ শতক অনেক সময়। তবু অপেক্ষায় থাকি, কোনওদিন এমন কোনও তথ্য আবিষ্কার হবে, যখন বলতে পারবো, ঈশ্বরচন্দ্র, আমি তোমার মাটির পা দেখে ফেলেছি। যতদিন না সেসময় আসছে, তাঁর ছবির সামনে দাঁড়াতে গেলে নিজের তুচ্ছতা, হীনতাগুলো চোরা হেসে আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি চোখ ফিরিয়ে নিই। যদি বাকি দিনগুলোতেও তাই চলে, ক্ষতি কী? আমারও অন্বিষ্ট তাই....

442

7