Somen dey

প্রদীপের নীচে শাশ্বত অন্ধকার

প্রদীপের নীচে শাশ্বত অন্ধকার **************************** রাজা আসে যায় ,আসে আর যায় । নীল জামা গায় , লাল জামা গায়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার সেই ন্যাংটো ছেলেটা যেমন বদলায় না ।তেমনি সময় বদলায় , মণ্ডপ বদলায় , আলোকসজ্জা বদলায় , থীম বদলায় , বাজেট বদলায় , স্পন্সর বদলায় , বদলায় না এই বনমালী সরকার স্ট্রিটের হালচাল । সূর্যের আলো ঠিক তেমনি করেই এই সরু সরু গলি গুলোতে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পায় না । একটু বৃষ্টিতে তেমনই এক হাঁটু জল জমে । এখানকার খেটে খাওয়া মানুষ গুলোর খেটো ধুতি তেমনি মলিন ,গেঞ্জি তেমনি শতছিন্ন । গামছায় সেই রকমই ঘামের গন্ধ । অথচ এই আঁকা বাঁকা এক দেড়শ মিটার গলিটার পরিসরে কি বিরাট সৃষ্টি কান্ডই না চলে বছরের এই সময়টায় । এখানকার ম্যানুফ্যাকচার করা ফিনিসড প্রোডাক্ট এরোপ্লেনে চেপে চলে যায় এমন সব দেশে যেখানে এ দেশের কোনো আর কোনো ভারতীয় পণ্যই যাবার সুযোগ পায় না ।এখানকার সেই ফিনিসড প্রোডাক্ট দেখার জন্যে বছরে চারদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ সারা রাত জাগে ,এক কোশ দু কোশ রাস্তা হাঁটে, ঘন্টার পর ঘন্টার লাইন দেয় । গঙ্গার এঁটেল মাটি , বেলে মাটি , তর্পা খড় , কাঁচা বাঁশ , নারকেল দড়ি , পেরেক , এলা মাটি ,চুন, রঙ তূলি এই সব হল এখানের র মেটিরিরাল ।এই চরম অটোমাইজেশনের যুগেও এখানে যন্ত্র বলতে কয়েকজন মানুষের দু হাতের দশটা আঙ্গুল । এখানকার ফিনিসড প্রোডাক্ট এমনিতে হল মাটির পুতুল , বোধন হলেই যা হয়ে যায় আরাধ্য প্রতিমা । পলাশীর যুদ্ধের পর সেই যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোবিন্দপুর গ্রামে তাদের কেল্লা বানাবার সিদ্ধান্ত নেয় তখন গোবিন্দপুরের বাসিন্দাদের থাকার জায়গা করে দেওয়া হয় পাশের সুতানটি গ্রামে । সাহেবদের প্ল্যান মাফিক সুতানটি ধীরে ধীরে শহরের রুপ নিতে থাকে । ব্যাবসা পত্তর করতে নানা রকমের লোকেদের আনাগোনা হতে থাকে । বাড়ি ঘর তৈরি হতে থাকে ।জীবিকার সন্ধানে আসতে থাকে নানা ধরণের শ্রমিকরা । কোম্পানি তখন ঠিক করে এক এক বৃত্তির মজুরদের জন্যে একটা জায়গা বরাদ্দ করে দেবার । তেমনি ভাবেই গড়ে ওঠে কলু টোলা , আহেরী টোলা , শুঁড়িপাড়া , ছুতোরপাড়া। এই সব বসতির মত গঙ্গা মাটি দিয়ে মাটির জিনিশ পত্র বানাবার জন্যে গঙ্গার ধারেই এক ফালি জমি দেওয়া হল কুমোরদের ।তখন তারা বানাতো মাটির হাঁড়ি কুড়ি ,মালসা, ঘট, প্রদী্প‌, সর্‌ ভাঁড় এই সব । সেই জায়গাটার নাম কালক্রমে হয়ে দাঁড়াল কুমোরটুলি । কালের যাত্রায় মাটির জিনিশ পত্রের ব্যাবহার কমেছে । কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়ে গেছে বাঙ্গালির বারোয়ারি পুজোর সংখ্যা । সব বদলালেও , কিছু বিদেশে পাঠানোর জন্য ফাইবার গ্লাসের মুর্তি ছাড়া , সব মুর্তিই হয় আদি অকৃত্তিম মাটি দিয়ে তৈরি । আর সে মুর্তি তৈরির কোনো যন্ত্র এখনো বাজারে আসেনি ।যানিনা চীন দেশে এই বাজার টা ধরবার জন্যে কোনো যন্ত্র বানাবার চেষ্টা করছে কিনা । এখন পর্যন্ত এখানে সেই একটু আঙ্গুলের আলতো চাপে , তুলির সাবধানী টানে, ফুটে ওঠে এক একটি অপরুপ মুর্তি । হাজার হাজার মুর্তি গড়া হয় , কিন্তু সে সব মুর্তির মুখ চোখ একটি আর একটি থেকে আলাদা । গঙ্গার পাড় থেকে ঠেলায় করে মাটির তাল নিয়ে সরু সরু গলি পেরিয়ে বিহারি শ্রমিকেরা মাল খালাস করে বনমালী সরকার স্ট্রিটে । সেখানে রাখা আছে আগে থেকে বানানো সারি সারি খড়ের তৈরি কাঠামো । তার উপরে মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি হয় দেব দেবীর আশ্চর্য সব প্রতিমা ।নাদুস নুদুস গণেশের ভুঁড়ির নিখুত ভাঁজ , কার্তিকের টিয়া পাখির ঠোঁটের মত নাক , লক্ষীর আয়ত নয়নের গভীর শান্ততা , সরস্বতীর মুখে আলোকিত রুপের বিভা , মা দুর্গার চোখে ক্রোধের বিচ্ছুরন সত্বেও মুখে জগৎজননীর বরাভয় , এ সবেই ফুটে ওঠে এই গলির শিল্পীদের আঙ্গুলের একটু নাড়াচাড়ায় আর তুলির সতর্ক টানে । মায়ের মুখ দেখে ভক্তদের ভক্তি না এলে খদ্দেরদের মন উঠবে না । ভালো দাম পাওয়া যাবে না । শ চারেক মানুষ জড়িত এই যথার্থ অর্থে মা-মাটি-মানুষের শিল্পের সঙ্গে ।যে গলিটিকে চল্লিশ হাজার কোটি টাকা ব্যাবসার উৎসবের আঁতুড়ঘর বলা যায় সেই গলিটি যেন আজও থমকে আছে হুতোমের যুগে। এখানে কাজ করার মানুষ গুলোর বাঁধা মাইনে নেই ,মাগ্যি ভাতা নেই প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই ,স্বাস্থ বীমা নেই । একটু গুছিয়ে কাজ করার ঠিক ঠাক জায়গা পর্যন্ত নেই ।ছেঁড়া পলিথিন আর তারপোলিন দিয়ে কোনো রকমে ঢাকা ছোটো ছোটো জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্ষার খামখেয়ালির সঙ্গে লড়াই করতে করতে কাজ করে যাওয়া ।হটাৎ নিম্নচাপের বৃষ্টিতে শহর যদি কাবু হয়ে যায়, ভরা কোটালের বানে ডুবে যায় ফুটপাথ, মাল ডেলিভারি তো আর পিছিয়ে দেওয়া যাবে না ।বছরের শুরুতেই পাঁজী আর ক্যালেন্ডারে ডেড লাইন ঘোষিত হয়ে গেছে । তার একটুও নড় চড় হবেনা । সব শিল্পেই God’s Act , মানে বন্যা , ভুমিকম্প এই সব কারনে মাল তৈরি না করা গেলে রেহাই পাওয়া যায় Force Majeure clause এ । এই শিল্পে সে সব নেই । একটু ভিজে থাকলেই প্রতিমাতে রঙ রঙ ধরবে না । তাই রাত জেগে নাওয়া খাওয়া ভুলে ব্লোয়ার চালিয়ে বাহন টাহন সহ মা দুর্গার ভর ভরন্ত সংসার এবং মোষ সমেত অসুর মশাই কে ময়শ্চার মুক্ত করতে নেমে পড়তে হয় । আগেকার সরকারের আমলে একটি স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল । এখানে ওদের জন্যে একটু ভদ্রস্থ থাকার জায়গা হবে , কাজ করার সুযোগ সুবিধে করে দেওয়া হবে , এমন কি কাজ সাজিয়ে গুছিয়ে প্রদর্শন করার জন্যে গ্যালারি পর্যন্ত হবে । সে কাজ শুরুও হয়েছিল ঢিলে তেতালায় । তার পর পট পরিবর্ত্তন হয়ে গেছে । সে প্রজেক্ট চলে গেছে বিশ বাঁও জলে । বছরের এই বর্ষা-গিয়ে-শরৎ-আসি-আসি সময়টায় আমরা যখন দিন গুনতে শুরু করেছি ঠিক আর কদিন বাকি দুর্গা পূজোর ,ঠিক তখনই মাথায় উপর অপরিবর্ত্তনীয় ডেডলাইনের খাঁড়া নিয়ে আশা নিরাশার হাওয়ায় দুলছে বনমালী সরকার স্ট্রিটের শ চারেক মানুষ – এ বছর ঠিক সময়ে সব ‘মাল’ ডেলিভারি দেওয়া যাবে তো ?

881

4

শিবাংশু

অন্য মেয়েটা-৫

...ইশারা তোমার বাতাসে বাতাসে ভেসে ঘুরে ঘুরে যেত মোর বাতায়নে এসে, কখনো আমের নবমুকুলের বেশে, কভু নবমেঘভারে। ------------------ জানতুম আসবে, এলো শেষ পর্যন্ত। পরদিনই অনু'র ফোন। সেদিন আবার শনিবার। বিকেলে গানের রিহার্সাল। -তুমি আজ কখন বেরোতে পারবে? -দেখছি, কেন? -আমি তোমার দেওয়া বইগুলো সব পড়েছি। কয়েকটা কবিতা নিয়ে একটু কথা বলবো। তোমার একটু সময় হবে? -হুমম... তবে কাল তুমি আমাদের দেখে পালিয়ে গেলে কেন? -পালিয়ে যাবো কেন? তোমরা ব্যস্ত ছিলে... বিরক্ত করলাম না...একটা কথা, বৌদি'কে দেখতে খুব মিষ্টি... -'বৌদি'?? আমাকে কি তুমি 'দাদা' বলতে শুরু করেছো? গুড, পজিটিভ ডেভলপমেন্ট... কাকা'ও বলতে পারো... -নাহ, ওসব কিচ্ছু বলবো না... -তবে ? -আমার যা ইচ্ছে বলবো, যেভাবে ইচ্ছে বলবো, যখন ইচ্ছে বলবো... -হাঁপিয়ে যাবে যে, আস্তে ... -তুমি কখন আসবে ? -দেখছি, জানাবো.... ------------------------------ ....অযাত্রা-পথে যাত্রী যাহারা চলে নিষ্ফল আয়োজনে? কাজ ভোলাবারে ফেরো বারে বারে কাজের কক্ষ-কোণে। জানতে চাইনি, কিন্তু নন্দিনীদি অনু'র সম্বন্ধে কিছু কথা আমাকে বলেছিলেন। দিল্লির একটি অবাঙালি ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছিলো, নিজের ইচ্ছেয়। ছেলেটি সম্বন্ধে নেতিবাচী কিছু কথা সে বলেনি খোলাখুলি। ওর সহজাত সম্ভ্রমবোধটা তীব্র ।দু'জনের পরস্পর কল্পনার অঙ্কগুলো মেলেনি নিশ্চয়। কিন্তু ওরা এখনও বিবাহিত। তিনি অনুমান করেন সম্পর্কের মধ্যে হয়তো কোনও তৃতীয় ব্যক্তির ছায়াও এসেছিলো কখনও। ভাবি, যদি তাই হয়, তবে তো অনু ব্যতিক্রম নয়। সেও কি 'অন্য' মেয়েটিকে নিজের অসম্মান মনে করে? অথচ একবার আমাকে তর্কের খাতিরে বলেছিলো অন্য মেয়েটার সম্পর্কের টান অনেক বেশি ইনটেন্স, অনেক বেশি ঝুঁকি নেয় সে। সে কেন ভিলেন হবে? সে তো দেয়ও অনেক কিছু। তবু তার স্বীকৃতিটা অধরা কেন থেকে যাবে চিরকাল? তার মূল্যটা নীরবে বুঝলেও কেউ সোচ্চার হয়না কোনওদিন? জীবনে তার স্পেসটা ব্যতিক্রম নয়, ন্যায়তঃ প্রাপ্য। সেটা কি অনুর শুধু কলেজ ডিবেট ছিলো? বুঝতে পারিনা।আসলে বাইরে থেকে যেমনই লাগুক না কেন, অনু পুরোপুরি বাঙালি মেয়ে। কতোগুলো মডেলে বিশ্বাস করে, যেটা অন্য মানসিকতায়, অন্য আবহে বেমানান। কিন্তু সে অসম্ভব জেদি, তাই ভালনারেবল। স্ট্র্যাটেজিক আপোসে বিশ্বাস করেনা। ভালো চাকরি ছেড়ে সে বিদেশ থেকে ফিরে এলো, ছেলেটি এলোনা। বোঝা যায়না, এই মূহুর্তে তাদের সম্পর্কটি ঠিক কী? ওর বাবা-মা দিল্লিতেই থাকেন। তাঁরা চা'ন অনু সেখানেই থাকুক। কিন্তু তার কাছে দিল্লি শ্বাসরোধী লাগে। সহ্য করতে পারেনা। এতোদূরে প্রায় পালিয়ে এসেছে। হয়তো আবার পালিয়ে যাবে। নিজের থেকে। ------------------------------- নন্দিনীদি বলেছিলেন, -জানিনা তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তোমায় অসুবিধেয় ফেললাম কি না.... তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছো আমি কী বলতে চাইছি....? -হুমম... -আমি লক্ষ্য করছি অনু তোমার উপর ইমোশন্যালি ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়ছে...ব্যাপারটা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে... -আমি বাড়িতে বলেছি... ঐ জায়গাটা আমার খুব স্ট্রং... আপনি তো জানেন... -জানি, তবে একটা অনুরোধ... বিরক্ত হওয়া হয়তো স্বাভাবিক... তুমি অনু'র প্রতি কখনও খুব রুড হয়োনা... মেয়েটা খুব গুণী, কষ্টে থাকে... -চেষ্টা করবো নন্দিনীদি... -------------------------- বস'কে বলি, একটু তাড়াতাড়ি বেরোবো । ভদ্রলোক জানেন আমার এই সব ব্যস্ততার কথা। বিকেল নামার আগেই ফোন করি অনু'কে। ইউনি শপিং সেন্টারের পিছনে যে দুটো বিশাল অর্জুন গাছ, তার নীচে সবুজ বেঞ্চি, আর ঝরাপাতার কার্পেট, সেইখানে চলে আসতে বলি। জায়গাটা আমার খুব ভালো লাগে। নেভা রোদের আলোর মতো সে আসে...বিষন্ন, নির্লিপ্ত তার পা ফেলা, পা তোলা। -কী ব্যাপার... সায়ন্তনের ক্লান্ত ফুলের গন্ধ হাওয়ার পরে... - আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত... অসম্ভব ক্লান্ত... -'আট বছর আগের একদিন' মুখস্ত করেছো নাকি? -ঐ কবিতাটা আমার বহুদিন ধরেই মুখস্ত... -কও কী মক্কেল? তয় যে লোকে কয় তুমি কবিতা পড়োনা... -আমাকে নিয়ে সবাই নিজের নিজের মতো ভাবে... আমার কথা... যাকগে, বোর হয়ে যাবে.... -কোন কোন কবিতা নিয়ে ভাবছো...? -সত্যি কথা বলি? -নিশ্চয়... -তোমার দেওয়া সব বইগুলো'ই আমার নিজের কাছে আছে...সব কবিতা.... পড়েছি বহুবার... কিছু বলিনা.... চুপ করে থাকি... -শুধু তোমার সঙ্গে আড্ডা দেবো বলে আমি তোমাকে কিছু আগে বলিনি....অনেক ভেবেছি.... আমার এরকম করা উচিত কি না। তোমার সাজানো সাম্রাজ্যে যদি এক চিলতে জায়গা পাই কোথাও... না, আমি তোমার ...ধ্যুৎ, কী সব বলছি...পাগল ভাবছো... তাই না? -না, ভাবছি না... -সত্যি? -সত্যি... -আমাকে ছুঁয়ে বলো... হাতটা বাড়িয়ে দেয় । আমি তার হাতের দিকে চেয়ে থাকি। গৌরী, মসৃণ ত্বক, নিটোল আঙুল, নির্ভর, নির্ভার, নিঃশর্ত... তাকিয়েই থাকি অপলকে। এই হাত ছুঁয়ে আমি কি কোনও পাপ করতে পারি...? দু'তিনটি অনিঃশেষ মূহুর্ত এভাবেই নিস্পন্দ, নিস্পলক। বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি আবার একা একা তার নিজের কাছে ফিরে যায়... ধীরে.... -তোমার আঙুলগুলো সুন্দর, খুব সুন্দর... এইবার অনু হেসে ওঠে। ঝর্ণার মতো, বোন'চায়না বাসন ভেঙে পড়ার মতো, ওফেলিয়া'র কান্নার মতো শব্দ পাই আমি, পেতে থাকি, জানিনা কতোক্ষণ.... ------------------------- সন্ধেবেলা একটা মেসেজ পেলুম, ফোনে। -তোমাকে আর এমব্যারাস করবো না, সরি। হায়দরাবাদে আর থাকতে ভালো লাগছে না। কোথায় যাবো ঠিক করিনি। ভালো থেকো... (শেষ)

1055

8

শিবাংশু

অন্য মেয়েটা-৪

বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেলো সেদিন। মহলা দিতে প্রায় পুরো ব্রিগেড হাজির। তবু নিশ্চিন্ত, হাইটেক সিটি যাবার চড়নদার পাওয়া গেলো একজন। অনু'কে তাদের সঙ্গেই পাঠিয়ে দিলুম। বাড়ি এসে দেখি সঙ্গিনী অপেক্ষা করছেন, না খেয়ে। খেতে বসে তিনি জিগালেন, -কেমন চলছে রিহার্সাল? -দেশের অবস্থা খুব খারাপ... -জানি, শর্মিলা ফোন করেছিলো... শর্মিলা আমাদের গানের দলের অধিকারী মশাই। খুব ভালো গান গায়। আর আমার চরিত্ররক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় দিদিমণির দায়িত্ব নিয়েছে। -কী বললো...? -তোমার নতুন মিউজের খবর কী? -বললুম তো, দেশের অবস্থা খুব খারাপ... -সাবধানে থেকো, বিজয়া'কে সামলানো সব কা বস কি বাত নহিঁ.... -হুমম, ঠিকই বলেছো... হয়তো কাল সকালে ঘুম ভেঙে দেখলুম সান ইসিদ্রো পৌঁছে গেছি... -শর্মিলা খুব কনসার্নড, বললো, তুমি কী করে ছেড়ে দাও শিবাংশুদা'কে এভাবে...? বয়সটা ভালো নয়... -তুমি কী বললে? -একই কথা, কোথায় আর যাবে...? ------------------------------ নন্দিনীদি কবি'কে নিবেদিত একটা মেগা কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এপার আর ওপার বাংলার অন্ততঃ কুড়ি জন কবি আসছেন। সঙ্গে কিছু স্থানীয় কবিও থাকবেন নিয়ম মতো। আমাকে বললেন, তুমি সভা পরিচালনা করো। আমি রাজি নই। অতোজন অতিথি আসবেন। সেজেগুজে স্টেজে উঠে ঘুরে বেড়ালে গদ্যময় কাজগুলো কে করবে। নন্দিনীদিকে আরো বলি, কবিরা একটু সুন্দরী সান্নিধ্য পছন্দ করেন। অনু'কে লাগিয়ে দিন। সভার শোভা বর্ধন করবে, কবিরাও 'অনু'প্রেরিত হয়ে থাকবে। -কেন, তুমিও তো পদ্য করো। তোমার কি সান্নিধ্যের প্রয়োজন নেই? -আমার? জানেনই তো ওটাই আমার অক্সিজেন... ওরকম এক আধ ঘন্টায় আমার কী হবে? -বেশ, তবে বাংলা কবিতা সম্বন্ধে অনু খুব একটা ওয়াকিফ নয় বোধ হয়... একটু তৈরি করে নিও... -কোথা থেকে শুরু করি...কে জানে? --------------------------- বাংলা কবিতার আবহে জন্ম, কম্মো, বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই মাধ্যমটি এখনও আমার কাছে তার রহস্য উন্মোচন করেনি। কীভাবে কবিতা পড়তে হয়, তার ক্র্যাফট, তার আত্মা, ত্বক, হাওয়ায় ভাসা চুল, দিনশেষের পোড়া রুটি, কোনও কিছুই এখনও আমার মুঠোর মধ্যে আসেনি। পড়তেই শিখিনি, আবার লেখা। চালাকিটা কিন্তু খুব শিখেছি। লাগসই কোটেশন দেওয়া, জিজ্ঞাসু জনতাকে চমকে দেওয়ার কালাবাজি, সবই কিন্তু মুঠোর মধ্যে। উনি 'কবিতা' করেন জাতীয় মন্তব্য বা কটাক্ষ শুনতে পাই মাঝেমাঝেই। কিন্তু কোনও সৎ মানুষের কাছে কবিতাকে স্তরে স্তরে উন্মোচন করার ধৃষ্টতা করার সময় বেশ গ্লানি অনুভব করি। কিন্তু লোকে তো জানে.... -আজ বিকেলের দিকে ক্লাস শেষ হলে একটা মিসড কল দিও। কথা আছে.... ত্বরিত উত্তর এলো, -হোয়াই মিসড, কথা বলা বারণ হয়েছে কি? -নাহ, তবে ফোন কোরো... ঠিক পাঁচটার সময় ফোন এলো... -আমি বাসস্ট্যান্ডের শেডে দাঁড়িয়ে আছি, আসতে পারবে? -আসছি, পাঁচ মিনিট... কয়েকটা কবিতার বই গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আমার কয়েকটি প্রিয়তম কবিতার বই। ভালোমন্দ জানিনা। যে পড়ে সে স্থির করে, ভালো লাগলো না অন্য কিছু। দূর থেকে দেখি শেডের বেঞ্চিতে একা বসে আছে। নাহ, স্মোক করছে না। -দেরি হলো কি? -নাহ, ঠিক আছে... -একা একা বসে আছো... ধোঁয়া নেই কেন? এবার মুখ ঘুরিয়ে তাকায় সোজা চোখের দিকে, -খোঁচাচ্ছো... তুমি কী জানো কিছু...? কিসের আগুন, কেন ধোঁয়া...? -নাহ জানিনা, কী দরকার? শুধু এইটুকু জানি ভিতরের আগুন নিভে গেলেই বাইরের আগুন ধার করতে হয়... -তোমার দুনিয়াটা খুব থিওরিটিক্যাল, লেসড উইথ মিস্টিক রোম্যান্টিসিজম, টূ জাজমেন্টাল... -ঝগড়া করবে...? -এই বইগুলো কী? -তোমার জন্য, মানে তোমার পড়ার জন্য... বাংলা কবিতার বই.... -সত্যি... -হমম... -আমরা কোথায় বসবো? -এখানে অবশ্যই নয়... -তবে চলো... -আরে, আমার মেলা কাজ আছে। এখন বসতে পারবো না.... তুমি নিয়ে যাও, পড়ো, তারপর কথা হবে... -তবে বইগুলো তুমিই নিয়ে যাও... যখন সময় পাবে তখনই কথা হবে.. -আরে না... তুমি পড়ো আগে... -আমি একা একা কবিতা পড়িনা... - তোমার দুনিয়াটা খুব থিওরিটিক্যাল, লেসড উইথ স্টুপিড রোম্যান্টিসিজম... রিল্যাক্স ...হ্যাঁ, এই বইগুলো আমার কাছে হোলি স্ক্রিপচারের মতো... প্লিজ বী রেসপেক্টফুল... এর থেকে রূঢ় হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা। - সরি, রাগ কোরোনা... আমার যে কী হয়ে যায়.. বুঝতে পারিনা.... আমি আজ সারা রাত পড়বো মন দিয়ে... সব কবিতা... কবে আবার আসবে? -দেখি... আগে পড়ো তো, তারপর.... -------------------------------- একজন বড়ো লেখকের বই প্রোমো আছে, তাজ কৃষ্ণা'য়। কেউ একটা আমন্ত্রণপত্র দিয়ে গেলো। সঙ্গিনীকে বলি , যাবে নাকি? তিনি রাজি। সন্ধেবেলা গিয়ে দেখি হায়দরাবাদের পেজ-থ্রি সব হাজির। বেশ কিছু চেনা মুখ এদিক ওদিক। জমিয়ে বসি। নানা আলিম লোকজন নানা উমদা কথাবাত্তা পেশ করে যাচ্ছেন। লেখক নিজেও কিছু বললেন। তার পর বইটি থেকে কিছু গদ্যপাঠ করবেন টাবু। তিনি এলেন, পড়লেনও ভালো। তবে তারকার জ্যোতি তো ভক্তের চোখে। পলকের মধ্যে শ্রোতার দল ভক্ত হয়ে গেলেন। সঙ্গিনী জনান্তিকে শুধোলেন, নাগার্জুন এসেছে নাকি? বলি, -তাকে দেখতে পেলে পায়ের ধুলো নিয়ে আসবো একটু... -হুমম, তোমার স্বপ্নের পৃথিবী... -আলবাৎ, একদিকে অমলা, অন্যদিকে টাবু... কী শান্তিপূর্ণ প্রেমময় সহাবস্থান... আহা... -দেখছি তো, জিভে জল এসে গেছে একেবারে... -ছিঃ, এরকম একটা সড়কছাপ উপমা দিওনা... বলো, হৃদয়ের একূল ওকূল দুকূল ভেসে যায়.... হায়.... -বুঝিনা কী করে টাবু'র মতো একজন মানুষ, যার জীবনে যা কিছু চাওয়ার, সব আছে... সে কী করে এমন আদার উওম্যান হয়ে মানিয়ে নিতে পারে...? -হোরেশিও, এমন বহু কিছু আছে, যা তুমি জানোনা...জানতে চেয়ো না... -হুমম, না জানাই ভালো। আরো ভালো যদি সেটা তুমি আমাকে না জানাও... -তওবা তওবা, মেরা কো'ই মজাল হ্যাঁয়... অনুষ্ঠান শেষ হলো। বেরোবার সময় দেখি হলের পিছনের দরজার পাশে, একটু দূরে, অনু এদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। দেখতে পেয়ে হাত নাড়ার আগেই সে ত্বরিত দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে তাকে আর দেখতে পাইনা। মনে পড়লো, ফোন করেছিলো দুপুরদিকে, সন্ধেবেলা ফ্রি আছি কি না। ------------------------------ (ক্রমশঃ)

949

7

শিবাংশু

অন্য মেয়েটা-৩

এখানে এপ্রিলের মধ্যে বেশ গরম পড়ে যায়। কিন্তু সূর্য ডুবলেই এক আধ বার দমকা হাওয়া। সন্ধে নামলে হলকাফুলকা হাওয়াবাজি, জুড়িয়ে দেওয়া। আমাদের দেশঘরে এখন ফুটপাথে সারিসারি কলাপাতায় বেলফুল আর জুঁইয়ের গোড়েমালায় জল ছড়ানো । দিনশেষের সৌরভসফর, বাড়ি ফেরার পথে। বাঙালিনীর অলকে ঝরে পড়া ফুলের একটি দল আর চোখে পড়েনা। তারা আজ অতীত, অপরিচিত। কিন্তু দক্ষিণে অলককুসুম বালিকা থেকে বৃদ্ধা সবার অলংকার। বসন্তমুখারি যেন,পুষ্পপ্যাশনের বহতা রুটমার্চ। ----------------------------- নন্দিনীদির মস্তো প্ল্যান। স্বয়ং সি এম বলেছেন অর্থাভাব হবেনা। এগিয়ে যাও। তেলুগু মানুষের কাছে কবি'কে নিয়ে আসতে হবে। তিনি নিজে উদ্বোধন করবেন সেই উদযাপন। উনকোটি খবর নিয়ে অনু দুবেলা ফোন করে। যতোটা ফোনে হয়ে যায়, ভালো কথা। কিন্তু দিন দিন শেষ হয়ে হইলো না শেষ গোছের সংলাপ বেড়ে চলে। অস্বস্তি? তা একটু হয় তো। সব সপ্তাহান্তে নন্দিনীদির বাড়ি যাবার ফুরসত পাইনা। গানের অনুষ্ঠানের মহলা শুরু হয়ে গেছে। সেই লিঙ্গমপল্লি থেকে সন্ধে সাড়ে সাতটায় অফিস থেকে বাড়ি পৌঁছোতে একঘন্টা। তৎক্ষণাৎ স্নান করে, গাড়ির ডিকিতে হারমোনি চড়িয়ে শহরের একেবারে অন্যপ্রান্তে সেকন্দ্রাবাদে পৌঁছোতে ন'টা বেজে যায়। তার পর মহলা, আড্ডা, গুলতানি। সবগুলো'ই জরুরি। এর মধ্যে ফোন এলো অনু'র। -তোমাদের অনুষ্ঠানে আমাকে কবিতা রেসিটেশন করতে হবে। নন্দিনী'দি বলছে তোমার কাছে ট্রেনিং নিতে। কখন সময় পাবে? -বোঝো? তুমি বাংলা কবিতা পড়ো? -না, না, আমাদের কি আর সেই রাইট আছে? -আরে না, দিল্লির লোক... বল্লে বল্লে টাইপ ব্যাপার স্যাপার...তার পর আবার বিলিতি কানেকশনও আছে ... -বেশ, আমি বলে দেবো... আমার দ্বারা হবেনা... -দাঁড়াও দেখি... -না, না কোনও দরকার নেই...বুঝতে পেরেছি... -ওফ... এতো দেখি মুলায়ম সিংয়ের মতো সেন্স অফ হিউমার হয়ে গেছে... -বাই ফোন কেটে দেয়। ------------------ ঘন্টা দুয়েক পরে মোবাইলে নন্দিনী'দির নম্বর। -বলুন.. - তোমাদের অনুষ্ঠানে গ্রন্থনার একটা দায়িত্ব অনু'কে দিয়েছি। ওকে একটু ট্রেনিং দিতে হবে তোমাকে... -হুমম, আমাকে ফোন করেছিলো ... -তাই !! আমাকে এখুনি বললো ওর দ্বারা হবেনা। হাফ পঞ্জাবি, বাংলা জানেনা, এসব হাবিজাবি...কী বললো তোমাকে? -ও রকমই কিছু একটা? - না, না, ওকে একটু ট্রেন করে দাও। মেয়েটা কিন্তু খুব শার্প... আর নিজেই আমাকে বারবার বলে পার্টিসিপেট করতে চাইছিলো... এখন আবার উল্টোপাল্টা বলছে... -ঠিক আছে দেখছি... বাবুজি ধীরে চলনা, এতো বাড়াবাড়ি ভালো নয়। নিজেকেই বলি। যাকগে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিলুম। ---------------------------- উত্তর নেই। আবার একটা। তারও উত্তর নেই। এবার একটা ফোন করতেই হয়। তা ফোন ধরিলেন, - হ্যালো... - জব উস জুলফ কি বাত চলি... -মানে?? - ঢলতে ঢলতে রাত ঢলি... -হোয়াট আ স্টুপিডিটি... - কোন কবিতা? -কবিতা? কার কবিতা? -খাতির ঘজনভি... -হু ইজ হি? -এই ঘজলটার শ্যায়র... -তো... -আমি এখন শুনছি, গানটা... ঈশ্বরের গলায়... -কী শুরু করেছো? -মেহদি হাসান...প্রায় পাগল হয়ে গেছি... -তা আমি কী করতে পারি? -কিস্যু না, একটু বাংলা কবিতা শুনিয়ে আমাকে সুস্থ করে তোলো.. -দ্যাটস দ্য পয়েন্ট.... সরি, আই কান্ট হেল্প -দেশবাসী কৃতজ্ঞ থাকবে মোহতির্মা ... আপকি শান লোগোঁ কে জুবান পে হোগি... -ওসব বাঙালিদের গিয়ে বলো... -বলছি তো, এখন তো বলছিই... -নো, মেরি সির্ফ বল্লে বল্লে বিজনেস... -রহুয়া, তনি মুলায়জা ফরমায়া জায়.. -এটা কোন ভাষা? - মাথাটা ভোজপুরি, ল্যাজটা উর্দু... -ওফফ.... -শম্মা কা অঞ্জাম ন পুছ, পরওয়ানে কে সাথ জলি... -মানে? -ঢলতে ঢলতে রাত ঢলি... -মা-আ-আ-নে-এ-এ? -সরি... ------------------------------- সন্ধেবেলার এসি গার্ডের মোড়। আটটা বাজে। ওয়ান ওয়ে দিয়ে লকড়ি কা পুল। ফ্লাই ওভার পেরিয়ে মেহদি ফাংশন হলের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এতো দূর তো ঠিক আছে। কিন্তু পরিধানে শাড়ি ? অ্যায় হুস্ন বেপরওহা তুঝে...! এটুকুই মনে এলো। -ইশে, দেখো বলা উচিত না, আগমার্কা প্রৌঢ় বিবাহিত বাঙালি আমি... তোমাকে ফাস কেলাস লাগছে দেখতে... -আমিও বিবাহিত... ওহ আচ্ছা, তবে আমার রিস্কটা একটু কম হয়ে গেলো কী...? এসব তোমাদের বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপার তো... ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারিনা.. -আমি বাচ্চা নই, কমপ্লিটেড থার্টি ফাইভ... -বাহ, ব্রেশ... -তোমার কৌতুহল এতো কম কেন? -মানে? -কখনও আমার সম্বন্ধে কিছু জানতে চাওনি... -কী দরকার... সব কিছু জানতে নেই। পৃথিবীটা খুব ছোটো হয়ে যায়। হারিয়ে যাবার সব জায়গা ফুরিয়ে যায়...মুদ্দতেঁ গুজরি , ফির উওহ ঠিকানা ইয়াদ হ্যাঁয় । জীবনটা এরকমই থাক...শুনেছো শ্যেয়রটা? -হুমম, হসরত মোহানি... -প্রশ্নটার উত্তরে প্রথম এই নামটা কেউ বললো। সবাই বলে ঘুলাম আলি...যাকগে, তোমাকে কয়েকটা কবিতা বেছে দেবো। পুরো কবিতাগুলো পড়া হবেনা, দু'চার স্তবক, গানের মাঝে মাঝে, যেমন হয়... - ঠিক আছে, একটু দেখিয়ে দেবে.. -তুমি একটা গাড়ি কিনে নাও, হায়দরাবাদে সোমস্কৃতি করতে গেলে নিজের বাহন লাগে, নয়তো বহুত পরেশানি... -আমার গাড়ি আছে তো... -কোথায়? -এখানেই... -তবে?? -ইচ্ছে করেই আনিনি। তোমার লিফট দিতে কি খুব অসুবিধে হচ্ছে? -অবকে ভি উওহ দূর রহেঁ অবকে ভি বরসাত চলি... -বুঝলাম না.. -ঢলতে ঢলতে রাত ঢলি... -এই গানটায় পেয়েছে নাকি তোমাকে আজ... -গান থেকে গান্ধর্বী, সব্বাই আজ পেয়ে বসেছে... জায়েঁ তো জায়েঁ কঁহা? -আর ইউ ফিলিং আনকম্ফর্টেবল...? -কেন? -ফর মী... গাড়ি চালাবার সময় শুধু সামনের দিকেই তাকাতে হয়। - এই কবিতাটা তোমাকে দেবো, পড়ার জন্য ... বড়ো প্রিয় হে আমার... -কোন কবিতাটা? -কেন অবেলায়, ডেকেছো খেলায়, সারা হয়ে এলো দিন... (ক্রমশঃ)

901

11

মনোজ ভট্টাচার্য

মুর্গীর খামারবাড়ি !

মুর্গির খামারবাড়ি ! আচ্ছা – এটা কি ভাবা যেতে পারে ! – সোনাগাছিতে সোনামনিদের কাছে রসিক নাগররা আসছে – পকেটে পয়সা নেই বলে – বগলে একটা করে মুর্গি নিয়ে আসছে ও মাসীকে জমা দিচ্ছে ! – ক্রমে সেই মুর্গি বেড়ে বেড়ে মুর্গিহাটা হয়ে গেল ! – ধ্যেৎ !- মুর্গিহাটা তো আছে – সেখানে কি সোনাগাছি আছে ? কিন্তু সোনাগাছিতে মুর্গিহাঁটা নেই – এ ব্যাপারে নিশ্চিত । এখানে মুর্গি চলে না – চলে খাঁটি চব্বিশ ক্যারেট ! ফ্যালো সোনা – পাও সোনামণি ! লুইজিয়ানা রাজ্যের নিউ অরলিয়েন্সএ ১৮৪৪ সালে মিস সোয়াইন নামে এক বিধবা মহিলা এক হোটেলে তিনজন মহিলাকে নিয়ে ব্রথেল শুরু করে । এরা হোটেলের লবিতে নাচ গান করে রসিকদের আনন্দ দিত । পরে হোটেলের উপরতলায় ভাড়া ঘরে নিয়ে যেত । – যেমন – ‘নীচে পান কি দুকান - উপর মাসী কা মুকান’ ! চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে - শহরাঞ্চলে তখন মানুষের হাতে পয়সা বিশেষ ছিল না । তাই বগলে একটা দুটো মুরগী নিয়ে এসে মাসীকে ভেট দিত । একজনের কাছে একবারের জন্যে একটি মুর্গি ! - সেই মুরগি বেড়ে বেড়ে ক্রমে খামারে রূপান্তরিত হল । আবার কেউ কেউ এও বলে – নিকৃষ্ট মানের ব্রথেল বলেই হয়ত চিকেন র‍্যাঞ্চ নাম হয়েছিলো ! এই চিকেন র‍্যাঞ্চ মোটামুটি চলেছিল গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত ! তারপর ইয়াঙ্কীদের আগমনে এইসব ব্রথেল বন্ধ করতে বাধ্য হয় । যদিও কোনও প্রামাণ্য নথি নেই – তবু যুদ্ধের পরেও – লোকাল সেলুনগুলোতেই ব্রথেলের কাজ চলত । ১৯০৫ সালে এক বাড়িউলি মাসী নাম জেসী – জেসী যেইসী কোই নেহি – কলোরাডো নদীর অববাহিকায় একটা বাড়ি কিনে পতিতালয় হিসেবে চালাতে আরম্ভ করল। - যথারীতি লোকাল থানার কর্তাদের সঙ্গে ভালোই সম্পর্ক রেখে চলল । জেসী এই বলে বিজ্ঞাপন দিত – তার ব্রথেলে কোনও পাঁড় মাতালকে ঢুকতে দেওয়া হয় না ! তার মানে – এটা একটা ভদ্র ব্রথেল – আর সেখানে শুধু পাড়ার রাজনীতিক দাদারা যাতায়াত করে ! তারপরে কোনও পুলিশ কর্তার গোপন নির্দেশে জেসী সেই বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে হিউস্টনের কাছাকাছি - লা গ্রাঁজের কাছে প্রায় দশ একর জমি কিনে সেখানে ব্রথেল বা চিকেন র‍্যাঞ্চ চালাতে লাগল ! বাইরে থেকে সেটা একটা সাধারন খামারবাড়িই মনে হত । সেখান থেকে বিজ্ঞাপন দেওয়া হত – প্রথম বিশ্ব-যুদ্ধের আহত সৈন্যদের জন্যে ত্রান-সামগ্রী ঐ র্যা ঞ্চ থেকে পাঠানো হয়েছিলো । আবার এই র্যা ঞ্চ থেকে অনেক গোপন তথ্য সরকারের দপ্তরে পাঠানো হত ! – প্রতি সন্ধ্যেবেলায় শেরিফ নিজে আসত মুর্গির খামারবাড়ি দেখতে বা দেখভাল করতে ! ১৯৪৬ সালে লা-গ্রাঁজের নতুন শেরিফ এসে তার অফিশ থেকে সরাসরি টেলিফোন লাইন বসালো যাতে তাকে রোজ যেতে না হয় খবরাখবর নিতে ! এইভাবেই ব্রথেল শ্রেনীর আড্ডাখানাগুলো গোপন খবরের উৎস হয়ে উঠল ! – অবশ্য থানাগুলোর আশেপাশে কিছু চা-চপের দোকান রাখা হয়েই থাকে ! সিক্রেট সার্ভিস ! মজার কথা হল – ব্রথেল বা চিকেন র‍্যাঞ্চ - অনেকবার বন্ধ এবং খোলা – খোলা এবং বন্ধ – শেষপর্যন্ত ১৯৭৮ সালে সত্যিই বন্ধ হয়ে যাবার দু বছর পরে – সেখানে আইনজীবীদের অফিশ হয়ে যাবার পরেও – লোকে গাড়ি চেপে আসত খামারের মুর্গি (!) ধরতে ! ব্রথেল বন্ধ হল । তার আসবাব বিক্রি হয়ে চলে গেল ডালাসে ও সেখানে একটা রেস্টুরেন্ট খোলা হল ! – সেটা চলেনি । তারও পরে একটা বার খোলা হল লেমন এভিনিউতে । তার নাম হল চিকেন র‍্যাঞ্চ ! কিন্তু ঐ নাম – সে আর টিকিয়ে রাখা গেল না । ১৯৮০ সালে ঐ নাম শেষ হয়ে গেল ! না – শেষ কি হয় কিছু ! – ‘দ্য বেস্ট লিটিল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ নামে ব্রডওয়ের খুব জনপ্রিয় এক সংগীতমুখর থিয়েটার ও ‘এ লিটিল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ নামে একটা সিনেমা হল ! – এ দুটোই এত সুন্দর ও জনপ্রিয় হয়েছিল – যারা দেখেছেন তারাই জানেন ! মনোজ

971

4

শিবাংশু

অন্য মেয়েটা...

অন্য মেয়েটা-২ ------------------------- মিটিংটা শেষ হতে হতে আড়াইটা বেজে গেলো। ফাইলপত্র গুছিয়ে নিজের কেবিনে যাচ্ছি, ফোনটা বাজছে। অচেনা নম্বর। -আমি ইউনিভার্সিটি এক নম্বর গেটের দিকে যাচ্ছি। ওখান থেকেই পিক আপ করে নেবে... -আমার মিনিট পনেরো লাগবে। আরাম সে আসুন... কাগজপত্র গুছিয়ে, সিস্টেমস বন্ধ করে, পার্কিং থেকে গাড়ি বার করে, পৌঁছোতে একটু সময় লাগলো। দূর থেকে দেখি যথাস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক ওদিক দেখছে, একটু অস্থির ভাবসাব। পাশে গিয়ে গাড়িটা থামাই। ভিতরে উঁকি মেরে ভিতরে এসে বসে। -দেরি হলো কিন্তু... -বললুম তো, একটু দেরি হবে -আমি একটু স্মোক করবো, আপত্তি নেই তো... আমি জানালার কাচগুলো নামিয়ে দিলুম, -একটা প্রশ্ন করেছি... -উত্তর দিলুম তো... -শুনতে পাইনি... -না শোনাই ভালো... আর কিছু না বলে সে ধোঁয়ায় ডুবতে চায়। গাছি'বাওলি ক্রসিং পেরিয়েছি, ফোনটা আবার বেজে উঠলো। নন্দিনীদির ফোন। -শিবাংশু, একটা আর্জেন্ট মিটিঙে ফেঁসে গেছি। ঘন্টা দুয়েক লাগবে। তোমরা কী আসছো? তবে বাড়িতে বোসো... আমি বলে দিচ্ছি... -নন্দিনীদি, রিল্যাক্স। আপনি মিটিং সেরে আসুন। আমরা ছটা নাগাদ পৌঁছে যাবো... -ওকে... অনু'কে বলি, নন্দিনীদি ছটার আগে আসতে পারবেন না। ওঁর বাড়িতে বসবেন কি? - অ্যাজ ইউ লাইক... গাড়ি ততোক্ষণে দর্গাহের মোড় পৌঁছে গেছে। বাঁদিকে ঘুরিয়ে নিই। এখান থেকে জুবিলি হিলস পাহাড়ের মতো চড়াই রাস্তা। ডানদিকটায় হুইস্পার ভ্যালি ক্লাব। ভারি সুন্দর জায়গাটা। সন্ধের পর ওটার পুলসাইড আবহ প্রাণ জুড়োনো। প্রায় নিস্তব্ধ আলো আঁধার। কখনও গরম লাগেনা। চুপ করে বসে শুধু শীতল জিন এন লাইম। হায়দরাবাদের তাবৎ বৃহৎ রুইকাৎলারা এখন এই জায়গাটায় থাকেন। বঞ্জারা হিলসের গ্ল্যামার হাইজ্যাক করে নিয়েছে জুবিলি হিলস। পাহাড়ে উঠে যাবার পর ডানদিকের ছবির মতো উপত্যকাটির নাম সাইলেন্ট ভ্যালি। ------------------------------- -টাবু'র বাড়ি দেখেছেন? -না তো, এখানেই থাকে নাকি? -হুমম, চলুন দেখি ওখানে নাগার্জুন'কে দেখতে পাওয়া যায় নাকি... -আচ্ছা, তুমি আমাকে এখনও আপনি করে কথা বলছো মনে হচ্ছে... -ঠিকই মনে হচ্ছে.. -কেন? -একজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাকে আপনি বলতেই আমি স্বস্তি বোধ করি.. -নন্দিনীদি ঠিকই বলেছিলো। সে স্বগতোক্তি করে.... জানতে চাইনা নন্দিনীদি কী বলেছিলেন। দুজনেই চুপ করে থাকি। একটু পরে বলে, -ইউ আর রিয়ালি ডিসেপটিভ... নট অ্যান ইজিগো'ইং পার্সন... বেশ হার্ড নাট... -ইজ ইট আ কমপ্লিমেন্ট ? দেন আই অ্যাকসেপ্ট.... দু'জনেই হেসে উঠি। অনু'র ভিতরের ধোঁয়াটা মনে হচ্ছে একটু কেটেছে। -দ্যাখো আমি কাউকেই আপনি বলতে পারিনা। আর তুমি যদি আপনি আজ্ঞে চালিয়ে যাও, তবে তো মুশকিল... -বিধান রায় কি তোমার আত্মীয় হ'ন.. -হু ইজ হি? -পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, -ইউ মীন বি সি রয় -আজ্ঞে... -কেন? তিনি শুনেছি কখনও কাউকে 'আপনি' করে কথা বলেননি। ইনক্লুডিং জবাহরলাল নেহরু... -ডোন্ট বি সার্কাস্টিক... -ওকে, আপনি বন্ধ করছি... --------------------------------- রোড নম্বর ছত্রিশ ধরে জুবিলি হিলস চেক গেট পেরিয়ে যাই। -এদিকে কোথায় যাচ্ছো? -ব্যারিস্টা, যাবে? -হুমম, যাওয়া যায়... ততোক্ষণে বন্জারা হিলস একনমবর রোডে শনিবার বিকেলের ভিড় শুরু হয়ে গেছে। সিটি সেন্টারে গাড়ি রেখে ব্যারিস্টায় গিয়ে বসি। প্রথম কফিটা আসে। অনু আবার একটা সিগারেট ধরায়। আমি বলি, তুমি শীর্ষেন্দু পড়েছো? -হ্যাঁ, সব লেখা...কেন? -কেন পড়েছো? কী ভালো লাগে ওঁর লেখার... -চরিত্রগুলো... দারুণ -ছেলে না মেয়ে... -বলা মুশকিল... -আমি বলি? -নিশ্চয়... -শীর্ষেন্দু শুধু মেয়েদের চরিত্রই সৃষ্টি করেছেন, ছেলেরা সব প্রপের রোলে... -এইভাবে ভাবিনি তো... -ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো... আরেকটা ব্যাপারও বলি শীর্ষেন্দুকে কি তোমার কাকুমণি মনে হয়েছে? -না তো, কেন? -ওঁর লেখায় সবাই কেন পাল্টিঘর দেখেই প্রেমে পড়ে? এইবার উচ্ছল হাসিতে ঝরে পড়ে সে। -ঠিকই তো... -এবার একটা কথা বলি? -হুমম... -আমি বয়সে তোমার কাকুমণি'র বরাবর হবো হয়তো। কিন্তু মানসিকতায় তা নই। তবু বলি যদি এই নেশাটা একটু কমাতে... জানি প্রথমদিনই কারুর সঙ্গে এসব কথা বলতে নেই... তবু মনে হলো। কিছু মনে কোরোনা... সরি ... -আমি জানি। জানো এতোটা ডিপেনডেন্ট ছিলাম না। ওদেশ থেকে ফেরার পর এমন হয়ে গেছি... -ওদেশ আবার কী দোষ করলো? -না ওদেশের কোনও দোষ নেই , ইটস মাই প্রবলেম... চুপ করে যায়, একেবারে। ----------------------------------- হঠাৎ দেখি নীলা আর সঞ্জয় এগিয়ে আসছে আমাদের টেবিলের দিকে। নীলা গান গায় আমাদের সঙ্গে। সঞ্জয়ও আমাদের বন্ধু। -আরে এখানে কী করছেন? -দেখতেই পাচ্ছেন, ফক্সট্রট নাচছি... সঞ্জয় হাসিতে ফেটে পড়ে, -তোমায় বলেছি না, শিবাংশু'র সঙ্গে ভেবে কথা বলবে... -আহা, সব সময় শুধু লেগপুল করতেই আছেন আপনি... নীলার চোখ অনু'র দিকে... -এ হলো অনু, আর এঁরা নীলা, সঞ্জয়, আমার বন্ধু... -হাই... সঞ্জয়ের সপ্রশ্ন চোখ। ইশারা করি, পরে হবে...বুঝে যায়। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যে অন্ততঃ বিশ-তিরিশ জন লোক জেনে যাবে।নিউ রিলিজ, ব্যারিস্টায় বাড়াবাড়ি...... ------------------------------------------- (ক্রমশঃ)

937

21

শ্রী

রান্নাবান্না

এই ব্লগটা খুললাম সবার সব রেসিপি জমা করার জন্য| আমি শুচিদিকে FB তে রিকো পাঠাচ্ছি কোন একটা বা একাধিক recipe দিয়ে ব্লগটার ফিতে কাটার জন্য| আশা করি উনি ফেরাবেন না| তারপরে সবাই দারুণ‚ দারুণ রেসিপি জমা দিয়ো pls.

1033

0

দীপঙ্কর বসু

বিয়ের ফাঁদে

অনেকদিন পরে ভোর বেলা বেরিয়েছিলাম রোঁদে । ফেরার পথে ভুতোর চায়ের দোকান এর সামনে দিয়ে আসতে গিয়ে মনে হল একটু যেন চা তেষ্টা পেয়েছে । ব্যস – গিয়ে ঝুপড়ির সামনে পেতে রাখা বেঞ্চি গুলোর একটাতে বসে পড়লাম । ভুতোর দোকানের দুটো বৈশিষ্ট আছে । প্রথমত এই দোকানে চায়ের তেষ্টা মেটাতে আসে রিক্সাচালক ,রাজমিস্তিরি থেকে আরম্ভ করে ছাত্র,অধ্যাপক –ইত্যাদি সকল শ্রেণীর মানুষ । তাই চায়ের আসরটা সরগরম থাকে বহুবিচিত্র গাল গল্পে ।আর দ্বিতীয় সুবিধে হল এই যে দোকানে ঢুকে কিছু বলার প্রয়োজন হয়না । গিয়ে বসলেই হল – প্রোগ্রাম করে রাখা যন্ত্রের মত ভুতো এগিয়ে দেবে চায়ের গ্লাস ,পছন্দের সিগারেট ও দেশলাই । কে প্লাস্টিকের গ্লাসে “ছোট চা” খাবে কাকে গরম জলে বার পাঁচেক ধোয়া কাচের গ্লাসে “বড়চা” দিতে হবে তা ভুতোর মগজে পাকাপাকিভাবে প্রোগ্রাম করা আছে । চায়ে দুটো চুমুক দিয়ে সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে বেশ তৃপ্তিভরে অনেকটা ধোঁয়া ছেড়ে দিল ও দিমাগ দুইই খুশ হয়ে গেল এক লহমায় । এই বারে চোখ পড়ল দোকানে বসা অন্য চাতালদের দিকে । নজরে পড়ল একজন মিশকালো বেঁটে গাঁট্টা গোট্টা লোক ফুটবল খেলার গল্প করছে আর বাকি সবাই তার মুখের দিকে হাঁ করে এমনভাবে চেয়ে বসে আছে ,যেন গল্পের একটি ফোঁটাও তাদের কর্ণকুহর ছাড়া বাইরে কোথাও না পড়ে । গল্প হচ্ছিল পাড়ার ফুটবল খেলা নিয়ে । এ তল্লাটে কে কে ভালো ফুটবল খেলত তাদের নামগুলো এবং খেলার কৌশল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছিল । মাঝে একটা অন্যভাবনা মনের মধ্যে ঢুকে পড়ায় গল্পের খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম । আবার কান পাততে শুনতে পেলাম কথাকার তখন নিজের ফুটবল কীর্তির কথায় চলে গেছে । গল্প চলছে –“ আমি তখন হেব্বি খেলতাম বুঝেছিস । আর তখনকার দিনে ভালো ফুটবলার দেখলেই লোকে ধরে বেঁধে কোন না কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিত । একবার হয়েছে কি সোনারতরী ক্লাবের হয়ে খেলতে গেছি গড়িয়ায় । আমি একাই তিনটে গোল করেছিলাম সেই খেলায় । ব্যাস আর যায় কোথায় –গড়িয়ার ক্লাবের এক কত্তা আমায় ধরে বসল তার এলাকার কোন একটি মেয়েকে আমায় বিয়ে করতেই হবে ! সে কি কান্ড রে ভাই ! সবাই মিলে ধরে বেঁধে বলির পাঁঠার মত আমাকে নিয়ে চলল একটার পর একটা মেয়ের বাড়িতে । যে মেয়েকে আমার পছন্দ হবে তার সঙ্গেই আমার বিয়ে দিয়ে দিয়ে দেবে ওরা । বললে বিশ্বাস করবিনি সি এক দিনে একুশটা মেয়েকে নাকচ করার পর বাইশ নম্বর মেয়েটিকে দেখে মনে ধরল আমার । আর যায় কোথায় । ক্লাবের সবাই হৈহৈ করে উঠল –বাজারে চল বিয়ের সব জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। এর আজকেই বিয়ে হবে । আমি তো প্রায় তাদের হাতে পায়ে পড়ে বলি আরে, আমার বাড়ির লোকজনদের একটা খবর তো দিতে হবে ।আজ নয় ,বরং কাল হোক বিয়েটা । নিম রাজি হল গড়িয়ার ক্লাবের ছেলেরা – বললে ঠিক আছে , কালকেই হবে বিয়ে ,কিন্তু ততক্ষন তোমাকে থাকতে হবে এই ক্লাব ঘরে ।বাড়ি যাওয়া চলবেনা । এই না বলে আমাকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা পালা করে পাহারায় রইল ,বাড়িটাকে ঘিরে । তার পর সন্ধ্যের অন্ধকার একটু ঘন হবার পর পা টিপে টিপে বাইরে এসে দেখি পাহারাদার ছেলে গুলো একটু বেসামাল । আমি মনে মনে ভাবলাম এই সূযোগ ।অমনি প্রানপনে দিলাম দৌড়। ওমা দেখি পাহারায় থাকা ছেলেগুলো ধর ধর করে আমারি পিছনে দৌড়ে আসছে । আর ঠিক সেই সময়েই দেখি একটা ট্রেন আসছে ।আমি মরিয়া হয়ে এক লাফে চলন্ত ট্রেনেই চেপে বসলাম । ড্রাইভারদাকে বললাম আপাতত কোথাও দাঁড়িও না । সোজা গিয়ে বারুইপুরে ট্রেন থামাবে । নৈলে ছেলে গুলো আমাকে ধরে ফেলবে... ড্রাইভারদা লোক ভালো বারুইপুরে নয় আমি একেবারে চম্পাহাটিতে গিয়ে থামব ...” আমি আর থাকতে পারলামনা । চা শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই । দেখলাম ভুতো গল্পে মজে আছে । তাকে বিরক্ত না করে তার সামনের টেবিলে আটটা টাকা নিঃশব্দে রেখে বেরিয়ে এলাম দোকান থেকে ।

985

9

মনোজ ভট্টাচার্য

প্রেম ও পাগল !

প্রেম ও পাগল ! অনেকক্ষণ চলার পর বাস থামল এক যায়গায় । সমস্ত যাত্রীরাই নামল – কেউ তাড়াহুড়ো করে – কেউ ধীরে ধীরে । সবাই চা বা অন্য পানীয় নেবে । নিদেনপক্ষে পা-টা তো ছাড়াবে ! আমরা ঘুরছি ব্যানারজী স্পেশালে করে দক্ষিণ ভারত । বাসে করে একের পর এক তীর্থস্থানগুলো ঘোরাচ্ছে । বেশিরভাগই মন্দির । আমরা কেউ বা মন্দিরের ভেতর যাচ্ছি – আবার কেউ যাচ্ছি না । - বাইরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে যাচ্ছি । পান্ডারা কোথাও বাধা দিচ্ছে । আবার কোথাও কোন বাধা নেই । দিব্যি ছবি তুলছি । এক দম্পতিও ছিল আমাদের বাসে – বেশ বয়স্ক । বয়েসের কারনে দুজনেরই আর্থরাইটিশ । সোজা হয়ে চলতে পারেন না । বাসের পাদানিতে পা তুলতে একটা ছোটো টুল দিতে হচ্ছে । - সে টুল অবশ্য অনেকেই ব্যবহার করছে । আমাদের সঙ্গে সবারই বেশ আলাপ সালাপ হয়ে গেল স্বভাবতই । একেবারে ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়াও হয়ে গেল । পরে হোটেলে গিয়ে - কখনও বা আমরা কারুর ঘরে – কখনও বা ওনারা আমাদের ঘরে – আড্ডা মারছি তো মারছিই । খেয়াল নেই যে পরের দিন আবার যেতে হবে বাসে করে ! – একমাত্র সেই প্রবীণ দম্পতি – তারা কারুর সঙ্গেই বিশেষ কথা বার্তা বলেন না । আমিও নানান ভাবে চেষ্টা করেছি ওনাদের সঙ্গে মেশার – কিন্তু বেশি পাত্তা পাই নি ! প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু গল্প থাকতে পারে । - সুখের এবং দুঃখের ! হয়ত ওনাদেরও এরকম কিছু গল্প আছে – যা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে চান না ! - তাই নিজেদের মধ্যেও বেশি কথা বার্তা বলেন না ! একটু স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই চলেন। - যেটুকু জানা গেল – ভদ্রলোক কাজ থেকে অবসর করেছেন প্রায় পনের ষোল বছর হয়ে গেল । মনে হয় সেই কারনে একটু বেশি স্থবিরতা এসেছে । আর তার স্ত্রী তো ঐ বাত-ব্যধি নিয়েও বেশ চলা ফেরা করছেন ! উনিই বরং পাশের সীটের মহিলার সঙ্গে কথা টথা বলছেন । বাস যেখানে থেমেছে – সেখানে চায়ের দোকান মোটে একটাই – এক মহিলা চা করছে আর এক জন লোক চা দিচ্ছে । ও পয়সা নিচ্ছে । - চা নিতে লাইনও হয়েছে তো! আমরা চা নিয়ে একটু পাশে এদিক ওদিক সরে গিয়ে চা খাচ্ছি ও আলাপ করতে করতে এদিক ওদিক দেখছি । - দোকানের সামনে একটু ফাঁকা দেখাচ্ছে । হঠাৎ আমার চোখে পড়ল । পাশের সহযাত্রীকেও ইশারা করলাম দেখতে । - ইশ ! ক্যামেরাটা কেন সঙ্গে নেই ! - বাসের মধ্যে রয়ে গেল ! সহযাত্রীরও সেই অবস্থা ! এমন একটা অনির্বচনীয় দৃশ্য ! সেই বয়স্ক ভদ্রলোক কাগজের দুটো চায়ের গরম কাপ নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর কাছে গিয়ে – তাকে একটা কাপ দিলেন ! – আর মহিলা বিমোহিত হয়ে সেই কাপ নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন ! উনিও মৃদু হেসে সেই দৃষ্টি-সুধা গ্রহন করলেন। হয়ত কখনও আশা করেন নি এভাবে তার বুড়ো স্বামী চা এনে মুখের সামনে ধরবে ! এটা অবশ্য এখানে সবার মধ্যে ঘটছে । অঘটন কিছু না ! কিন্তু তার চোখের মুগ্ধ দৃষ্টি আমাদের একটা অনির্বচনীয় মুগ্ধতার সৃষ্টি করল ! – তাহলে কি – সূর্য অস্ত যায়নি এখনো ! - সময় রয়েছে বাকি ! কেউ কি ফুট কাটল – এরই নাম প্রেম ! )( )( )( )( )( )( )( )( )( )( )( )( জানি এই প্রশ্নটায় কুড়ি নম্বর থাকলে – আট নম্বরের বেশি পাবো কিনা সন্দেহ ! কারন এই প্রশ্নটার আরও একটা অংশ আছে ! – আর সেইটাই খুব মুস্কিল ! গৃহস্থের গরুকে কত আর শ্মশানে নিয়ে যাওয়া যায় ! প্রেম ও পাগল ! প্রেমে পাগল নাকি প্রেমের জন্যে পাগল ! – প্রেম ও পরিণয় জানি – তারপর প্রায়শ্চিত্তও জানি ! প্রেম ও আত্মহত্যা – সেও দেখেছি ! তা একটা কাহিনী বলি । - এক প্রবাসী পরিবার থাকত নিউ জার্সিতে । তাদের একটি মাত্র মেয়ে । তার বিয়ের চেষ্টা করা আরম্ভ হল । আমাদের মতো পিতা মাতা সুবোধ ভারতীয় বাঙ্গালীদের মতো দেশে গিয়ে দেশের ছেলে মেয়ে খোঁজে । তেমনি রায় পরিবারও দেশে এসে একটা খুব জানা শোনা পরিবারের একটি ছেলেকে পছন্দ করল । ছেলেটি শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ার । এখানে কি একটা চাকরি করত । - তার এক পা বাড়ানই ছিল বিদেশের পথে । - তাই বেশি দেরি হল না বিয়ে হতে । - রীতারও খুব পছন্দ হয়ে গেল । ওর তো সেরকম অর্থে কোন ছেলে-বন্ধু ছিল না ! - ছেলেটি শিক্ষিত সৎ চরিত্রবান ইত্যাদি ইত্যাদি – এবং যাকে বলে – স্মার্ট – তাই ! - রীতা তো দেবুর প্রেমেই পড়ে গেল ! যে সময়ের কথা হচ্ছে – তখন বিয়ে হওয়ার পর স্পাউস ভিসা পেতে খুব দেরি হত না ! মাস ছয়েকের মধ্যেই দেবু আমেরিকা পৌঁছে গেল ! রায় পরিবারে খুসীর ঢেউ ! - মেয়ে জামাই ঐ বাড়িতেই রইল আপাতত ! গ্রীনকার্ড পেয়ে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত দেবু ও রীতার মধু চন্দ্রিমার মধ্যেই কাটল । চাকরি পেতে খুব দেরি হল না – মাইনেটা কমই ছিল । জামাই ও মেয়েকে ব্রুকলিনে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে দিল – রায় মশাই । মধুতে বিষ ছিল নাকি চন্দ্রিমাতে কালো মেঘ ছিল ! কদিন পর থেকেই রীতার কান্না ভেসে আসতে লাগল ফোন মারফত । কলকাতার ব্যঘ্র প্রতিম পুরুষ বনাম বাঙ্গালি বধু ! মারধোর চলত নাকি ! অভিযোগ – পাগল মেয়ে গছানো হয়েছে ছেলেকে ! আর রীতার অভিযোগ – রোজ রাত্তির বেলায় কলকাতায় নাকি দেবু ফোন করে কোন বান্ধবীকে । - গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল । ঘটনা খুব গভীরে চলে গেছে । এটা কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় ! প্রায়শই ঘটছে ! ছেলেরা বিদেশে এসে গ্রীনকার্ড পেয়েই স্ত্রীকে পাগল বলে ডিভোর্স করে ও দেশ থেকে তার প্রেমিকাকে আনে ! - প্রবাসী সন্তানদের দেশী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিই আমরা ! তাদের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করি না ! সে যাই হোক - আমি সংক্ষিপ্ত করে বলি । মেয়েকে নিজের বাড়ি এনে চিকিৎসা – শারীরিক ও মানসিক – করাতে লাগল রায় মশাই । ওখানকার খুব নিকট বন্ধু ছাড়া কাউকেই কিছু বলতে পারে নি । এদিকে সত্যি সত্যিই মানসিক ভারসাম্য স্থির রাখতে পারল না রীতা ! বেচারি একেবারে ভেঙ্গে পড়ল – যখন দেবুর ডিভোর্সের চিঠি এলো । - রীতা অতি মধ্যবিত্ত মানসিকতার মেয়ে । একটু অন্তর্মুখী ! গভীরভাবে একমাত্র দেবুর সঙ্গেই মিশত । - ধীরে ধীরে কলেজ যাওয়া বন্ধও করে দিল । এমনকি বন্ধুদের সঙ্গেও বিশেষ ফোন-টোন আর করে না । দেবুকে মাঝে মাঝে ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করে – কিন্তু দেবু হয় ফোন ধরে না অথবা বাজে উত্তর দেয় । দেখতে দেখতে রায়দের পারিবারিক পরিস্থিতি খুব ঘোরালো হয়ে উঠল । মেয়ের ব্যর্থ বিয়ের জন্যে সর্বদা নিজেদের দোষী ভাবত বাবা-মা ! – তারাও পার্টিতে বা কারুর বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিল । কেউ ফোন করলে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে কাটিয়ে দিত । এও বলি – এটাই কিন্তু একমাত্র ছবি নয় ! অন্য সুখী-সুখী ছবিও আছে ! মনোজ

1125

5

দীপঙ্কর বসু

মৈত্র মশায়

আজ বহুকাল বাদে হঠাৎ ই মনে পড়ে গেল মৈত্র মশাই এর কথা । মৈত্র মশাই ছিলেন টেলকো র (বর্তমানে টাটা মোটরস) ফাউন্ড্রী ডিভিশনের কেমিক্যাল ল্যাবরেটরির এক অত্যন্ত কুশলী কেমিস্ট । যে সময়ের কথা লিখতে বসেছি সে সময়ে গোটা মেটালার্জি ডিপার্টমেন্টের আধুনিকিকরণ সবে শুরু হয়েছে – ফার্নেসের গলান লোহার গুনমান পরীক্ষার জন্য বসেছে নতুন স্পেক্ট্রোগ্রাফ যন্ত্র – সে ফার্নেস থেকে পাঠান কাস্ট আয়রনের নমুনাই হোক বা ইস্পাতের নমুনা পরীক্ষা করে কয়েক মিনিটের মধ্যে জানিয়ে দিতে পারে ধাতুর পুরো কম্পোজিশন ।কিন্তু ব্যপারটা তখনও পরীক্ষামূলক স্তরেই ছিল বলে আধুনিক যান্ত্রিক রাসায়নিক বিশ্লেষনের পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতিতে রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও সমান ভাবে গুরুত্ব পেত । এবং এই সনাতন পদ্ধতিতে রাসায়নিক বিশ্লেষণের কাজে মৈত্র মশায়ের দক্ষতা ছিল অসাধারণ । কিন্তু নিজের কাজে অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর রাখলে কি হয় , দানবীয় চেহারার মৈত্র মশায় লোকটি ছিলেন বেজায় বদমেজাজী ,দুর্মুখ এবং আদ্যন্ত ক্ষ্যাপা । গায়ে তাঁর মত্ত হাতির বল । কাজেই ল্যাবরেটরির কেউই নেহাৎ দরকার না পড়লে তাঁকে ঘাঁটান দূরে থাক পারতপক্ষে কাছাকাছিও ঘেষত না । ব্যতিক্রম ছিলেন ধনঞ্জয় ওঝা নামে নাদুসনুদুস ,ছোটখাট চেহারার এক কেমিস্ট । তিনিই একমাত্র মৈত্র মশায়ের সঙ্গে শুধু কথা বার্তাই বলতেন তাই নয় সময়ে অসময়ে একটু আধটু রঙ্গ তামাসাও করতেন । ডিউটি শুরু সকাল সাতটায় ,কিন্তু মৈত্র মশায়কে সাতটায় বা তার আগে ল্যাবরেটরিতে ঢুকতে কেউ দেখেনি । সময় মত কাজে আসা মৈত্র মশায়ের ধাতে ছিলনা । ওই সকাল সাতটা দশ পনেরো নাগাদ একটা লরঝরে ল্যম্ব্রেটা স্কুটার এসে দাঁড়াত ল্যাবরেটরির পিছনের দরজায় ল্যাবরেটরির কর্মী দের সাইকেল স্কুটার মোটর সাইকেল প্রভৃতির পার্কিং স্পেসে । স্কুটার দাঁড়াত বললে সঠিক কথা বলা হয়না – কারণ স্কুটারের ব্রেকগুলি ছিল সম্পূর্ণ অকেজো । চলন্ত স্কুটার থামাতে মৈত্র মশাই নিজের দুই পা মাটিতে চেপে ধরে চলন্ত স্কুটার থামাতেন । স্কুটারের হেড লাইট জ্বলতনা । কারণ হেডলাইটের বাল্বটি ফিউজ হয়ে যাবার পরে মৈত্র মশায় সেটিকে বদলানর প্রয়োজন বোধ করেননি । ব্যপারটা লক্ষ্য করে ওঝাদা কে আড়ালে জিজ্ঞেস করেছিলাম “ সন্ধ্যেবেলা বিনা হেড লাইটে উনি কি করে গাড়ি চালান বলুন ত। এক্সিডেন্টের ভয় নেই”? ওঝাদা ফুঁ দিয়ে আমার প্রশ্নটাকে উড়িয়ে দেন । “রাতকানার আবার হেড লাইটে কি কাজ? তাছাড়া রাতকানা বলে অন্ধকার নামার পর মৈত্র মশায় বাড়ি থেকে বেরই হননা” একটু বেলাইনে চলে গেছি ফিরে আসি সকাল সাতটার এপিসোডে । সাতটা পনেরো নাগাদ স্কুটারটাকে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে , ডান হাতে একটা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ দোলাতে দোলাতে বীর দর্পে মৈত্র মশাই রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হতেন । সাদা সিধে নরম স্বভাবের মানুষ এসিস্ট্যান্ট চিফ কেমিস্ট চৌধুরীবাবু চিফ কেমিস্ট মিত্তির সায়েবের অনুগত বন্ধু এবং বহুদিনের সহকর্মী মৈত্র মশায়ের এই নিত্যদিনের দেরি করে আসা নিয়ে পারতপক্ষে কিছু বলতেননা , তবু মাঝে মাঝে তাঁর কর্তব্যবোধের খাতিরে বিরক্তি মিশিয়ে বলেই ফেলতেন “কি মৈত্র মশায় , রোজ এমন দেরি করে এলে চলে”? ব্যাস চৌধুরীবাবুর নরম বক্তব্য শেষে হবার আগেই শুরু হয়ে যেত ধুন্দুমার কান্ড । অতঃপর এক সময়ে ঝড় থামলে – সচরাচর তা ঘটত চৌধুরী বাবুর রণে ভঙ্গ দেবার পরে ,মৈত্র মশায় ব্যাঙ্গের স্বরে হাঁক পাড়তেন “ওই ওঝা । দেখেছিস গেদোটার আক্কেল ? আমায় কিনা লেটলতিফ বলে গাল পাড়ে !! গোটা ল্যাবরেটরি স্তব্ধ – ওঝাদার মুখে ফুটে ওঠে বিচিত্র মুচকি হাসি । এই সূযোগে বলে রাখি গেদো হলেন চৌধুরী বাবু । শুধু চৌধুরী বাবুই নয় ল্যাবরেটরির সবারই একটা করে এই ধরণের নাম দিয়েছিলেন মৈত্র মশাই এবং সেই সব নামেই মানুষগুলিকে উল্লেখ করতেন । যেমন চিফকেমিস্ট মিত্তির সায়েব ছিলেন ধেড়ে মিত্তির , অপর এক জুনিয়ার কেমিস্ট জনৈক মিত্র নামকরণ হয়েছিল নেংটি মিত্তির,মৈত্র মশাই আর এক সিনিয়ার কেমিস্ট গাঙ্গুলীদার নামকরণ করেছিলেন কেলে গাঙ্গুলী । বলা বাহুল্য ভদ্রলোকের গাত্রবর্ণ ই এ হেন নাম করণের কারণ । যাহোক ,কথা হচ্ছিল মৈত্র মশায়ের দেরি করে কাজে আসা নিয়ে । সেই কথাতেই ফিরে যাই । দশ পনের মিনিট দেরি করে এসে মৈত্র মশায়ের প্রথম কাজ ছিল হাতের প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে একে একে বেরিয়ে আসত একটা স্লাইসড ব্রেডের প্যাকেট ,এক জোড়া ডিম , জেলির শিশি এবং একটা হরলিক্সের শিশি ভর্তি মোষের দুধ । ল্যাবের হট প্লেটে যতক্ষনে ডিম সেদ্ধ হবে , গরম হবে দুধ – ততক্ষনে মৈত্র মশায় পাঁউরুটির ওপরে মোটা করে জেলি লাগিয়ে কামড় দিতেন । সঙ্গে আনা ভোজ্যগুলি নিঃশেষিত হবার পর গরম দুধ খেতেন – গোটা প্রাতঃরাশের ব্যপারটা মিটতে লাগত প্রায় আধঘন্টা । অতঃপর হাত পড়ত কাজে । মৈত্র মশায়ের আর দুটি কীর্তি র কথা আসবে এই লেখার দ্বিতীয় পর্বে । মৈত্র মশায় – দ্বিতীয় পর্ব টেলকোর ফাউন্ড্রিতে ব্যবহার্য যাবতীয় কাঁচামালের গুনমান পরীক্ষা করা হত মেটালার্জি বিভাগের দুটি ল্যাবরেটরিতে । মেল্টিং এ ব্যবহার্য কাঁচামাল গুলি পরীক্ষার দায়িত্ব ছিল কেমিক্যাল ল্যাবের এবং মোল্ডিং এর যাবতীয় কাঁচামাল সামলাত স্যান্ড ল্যাবরেটরি । ওয়াগন বোঝাই করে আসত কোক কয়লা , লাইম স্টোন ,ইলাহাবাদ থেকে বালি । এই সব কাঁচামালের গুনমান নির্ধারণের ব্যপারের একটা অন্ধকার দিক ছিল – এমন একটা কানাঘুষো কানে আসত। মাঝে মাঝে সিনিয়ারদের কানাকানি চোখে পড়ত বটে কিন্তু আমি কান পাতলেই সে সব আলোচনা বন্ধ হয়ে যেত । আর তখনই মৈত্র মশাই মেহের আলির মত হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন । - “ওরে ,ওঝা ওই দেখ , ধেড়ে মিত্তিরের ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে । একটু আগে আমি কয়লা ওয়ালাটাকে ওদিকে যেতে দেখেছি” । যার কথা মৈত্র মশায় বললেন ,সেই “কয়লা ওয়ালা”কে কয়েকবার আমি দেখেছি ল্যাবের বাইরে করিডরে ,পরণে অত্যন্ত ময়লা একটা হাঁটু অবধি ঝোলান পাঞ্জাবী আর সমান ময়লা একটা খাটো পায়জামা ,পায়ে হাওয়াই চপ্পল । তার চোখ দুটো মেল্টিং ফারনেসের মতই টকটকে লাল । একদিন হঠাৎ ই এই কয়লা ওয়ালার সঙ্গে মূঠভেড় হয়ে গেল মৈত্র মশায়ের । ঘটনাটা এই রকম – মৈত্র মশায় বাথরুমে যাবেন বলে বেরিয়েছেন ল্যাব থেকে । দেখি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একেবারে ভয়ার্ত মুখে দৌড়ে ফিরে এলেন । সামনেই পেয়ে গেলেন ওঝাদা কে –“ঐ ওঝা , লোকটা কি ভয়ানক রে! বাথরুমে যেতে গিয়ে ওকে দেখে ইয়ার্কি করে বললুম “তেরা পুরা কে পুরা কন্সাইন্মেন্ট রিজেক্ট হো গয়া” আর যেই না এই কথা বলেছি ,ওমনি লোকটা কি করল জানিস ! ওর পাজামার পকেট থেকে এই এত গুলো একশোটাকার নোট বের করে আমার দিকে এগিয়ে ধরল ! আমি তো শালা তাই দেখে একেবারে দঃে দৌড়! কি ভয়ানক লোক মাইরি” ওঝাদা তারস্বভাবসিদ্ধ মুচকি হাসি হেসে বললেন “খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন মৈত্র মশায় । আর ওসব ইয়ার্কি করতে যাবেননা । ফেঁসে যাবেন তখন চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে” । তবে মৈত্র মশায়ের ক্ষ্যাপামির পরিচয় সম্পূর্ণ হবে না তাঁর সানডে মার্কেটের গল্প বিনা । গল্পটির প্রত্যক্ষদর্শী আমি নই । ওঝাদার মুখে শোনা গল্পটি দিয়ে লেখাটা শেষ করব । প্রতি রবিবার আমবাগান নামে একটা মাঝারি মাপের মাঠে সব্জীপাতির হাট বসত । ছুটির দিনে সবাই সেই হাট থেকে তাজা শাক সব্জী কিনে আনতেন সপ্তাহভরের জন্যে ।হাটে যেমন অগুন্তি মানুষের ভীড় হত ,তেমনি দুই একটা ষাঁড় ও ঘুরে বেড়াত।তারা কখনও এ দোকান থেকে আলুটা ,অন্য কোন দোকান থেকে শাকের আঁটি টা ধরে টান মারত । তাই দেখে দোকানি হাতের কাছে রাখা কঞ্ছি দিয়ে তাড়ণা করা মাত্র ষাঁড় বাবাজি অন্যত্র চলে যেত ভাগ্যান্বেষনে । ঘটনার দিন মৈত্রমশায় ব্যাগ ভরতি সব্জী কিনে সব শেষে এসেছে আলু ওয়ালার কাছে । পাশে তাঁর প্লাস্টিকের জালি ব্যাগটা রেখে আলু বাছাই করছেন । প্রায় উপচে পড়া জালি ব্যাগের একেবারে ওপরেই রয়েছে গোটা কয়েক নধর মূলো।বাজারের মধ্যে এমনি একটি ভ্রাম্যমান ষাঁড় এর গোচরে আসে তা । নিজের অভ্যাস মত ব্যাগ থেকে একটি মূলো তুলে নেয় ষাড়টি । কাছাকাছি যে সব লোকজন ছিল তাদের অনেকেই সমস্বরে হৈ হৈ করে ওঠে , হুস ফেরে মৈত্র মশায়ের । চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে পলায়মান ষাঁড়টির ল্যাজ ধরে ফেলেন । ল্যাজে টান পড়া মাত্র ষাঁড় বাবাজি দঃে দৌড় । কিন্তু দৌড় মারলে কি হবে মৈত্রমশায় ল্যাজ ছাড়বেননা । ফলে গোটা মাঠ জুড়ে ষাঁড় ডৌড়োতে থাকে মৈত্র মশায়ে বজ্র মুঠি থেকে নিজের ল্যাজ ছাড়িয়ে নিতে আর মৈত্র মশায় ওঃ ছাড়নে ওয়ালা নন । মূলো তিনি উদ্ধার করেই ছাড়বেন । সে এক হুলুস্থুলু কান্ড । এইটুকু বলে ওঝাদা একটু দম নেন । কিন্তু আমার তখন নেশা ধরে গেছে । আমি বলি “তারপর...” ? “তার পর আর কি , দৌড়তে দৌড়তে এক সময় ক্লান্ত হয়ে ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে পড়ল । আর পিছন দিকে মুখটা ঘুরিয়ে মূলোটা মাটিতে ফেলে দিল । যেন মৈত্র মশায়কে বলতে চাইল ঢের হয়েছে বাপু । এই নে তোর মূলো । এবার আমার ল্যাজটা ছাড় দিকিনি । এই বলে ষাঁড়টা উদাসী বাউলের মত ধীর পায়ে হাটের ময়দান ছেড়ে বেরিয়ে গেল ।

990

4

Somen dey

সেলুলয়েডে শেষের কবিতার নাগাল খোঁজা – কিছু অগ্রীম প্রশ্ন

বাইশে শ্রাবণের আগের দিন মুক্তি পাচ্ছে ‘শেষের কবিতা’ সিনেমা ।এর আগেও একবার শেষের কবিতা নিয়ে সিনেমা করার চেষ্টা হয়েছিল । ১৯৫৩ সালে । সে ছবি দেখেছিলেন এমন মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া মুস্কিল । আর আমাদের বিখ্যাত সংরক্ষনশীলতার গুণে সে ছবির প্রিন্ট সম্ভবত নষ্টই হয়ে গেছে ।তাই সে ছবির সঙ্গে এখনকার ছবিটির কোনো তূলনার উঠে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। সে ছবির পরিচালক ছিলেন মধু বসু , নির্মল কুমার, দিপ্তী রায়্‌ সাধনা বসু যথাক্রমে অমিত ,লাবন্য , কেটি । এ ছাড়া ছবি বিশ্বাস অবিনাশ এবং চন্দ্রাবতী দেবী যোগমায়া হয়ে ছিলেন । স্টারকাস্টিং সেকালের প্রেক্ষিতে একেবারে খাপে খাপ । মধু বসু সেই সময়ের সব চেয়ে সংস্কৃতিবান , শিক্ষিত , গুণী পরিচালক ছিলেন । তবু যতদুর জানা যায় ছবিটি তেমন উতরায় নি । মাঝের ৬৩ বছর আর কোনো সিনেমা পরিচালক আর হাত দেননি শেষের কবিতায় । সত্যজিৎ রায় , তপন সিনহা এঁরা রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে একাধিক ছবি করে থাকলেও কেউ ভাবেন নি শেষের কবিতা নিয়ে ছবি করার কথা ।রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে হিন্দি বাংলা মিলিয়ে অন্তত গোটা পঁচিশ ছবি হলেও শেষের কবিতা নিয়ে আর ছবি হয় নি । বাংলা ছবির তথাকথিত স্বর্ন যুগের প্রথম সারির পরিচালকরাও কেও এই উপন্যাসে কোনো সিনেম্যাটিক সম্ভাবনা খুঁজে পাননি ।কিন্তু শেষের কবিতা একটি বহুপঠিত, বহু আলোচিত , বহু বিতর্কিত প্রেমের গল্প । বহুবার শ্রুতিনাটকের আকারে মঞ্চে পঠিত হয়েছে । কিন্তু অভিনীত হয়নি । বিশেষ করে শ্রী বিকাশ রায়ের পরিচালনায় শেষের কবিতা পাঠ একসময় অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছে । তা সত্বেও কেও শেষের কবিতা নিয়ে ছবি করার কথা ভাবেন নি , তার কিছু কারণ নিশ্চয় আছে । হয়ত সবাই ভেবেছেন শেষের কবিতার মধ্যে যতটা ভালো শ্রাব্যকাব্য হবার উপাদান আছে , ততটা দৃশ্যকাব্য হবার উপাদান নেই ।কারণ শুধু শেষেই নয় , শেষের কবিতার ভাঁজে ভাঁজে ছড়ানো কবিতাই আসলে গল্পের হাত ধরে আছে নিবীড় করে । সুমন মুখোপাধায় সেই jinx ভেঙ্গে শেষের কবিতাকে মুক্ত করার সাহস দেখিয়েছেন , যেমন করে শম্ভু মিত্র তেতাল্লিশ বছর পর রক্তকরবীকে মঞ্চস্থ করার সাহস দেখিয়েছিলেন ।ছবি দেখার আগে এই জন্যে একটি অগ্রীম ধন্যবাদ তাকে জানিয়ে রাখা যাক । আমরা যারা আমাদের আকৈশোর এই বইটি বার বার পড়েছি , আর বার বার ভেবেছি , বিশ্লেষন করেছি , তর্ক করেছি এবং বিভিন্ন বয়েসে নতুন করে আবিস্কার করেছি অনেক কিছু তাদের কাছে শেষের কবিতা তো আর পাঁচটা প্রেমের গল্পের মত নয় ।শেষের কবিতার কিছু অন্তর্নিহিত বিষয় নিয়ে বাঙালি অনেক দিন ধরে অনেক তর্ক করেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি , প্রশ্ন তুলেও উত্তর খুঁজে পায়নি । তবুও আজও বার বার আমাদের কথায় ও কাহিনিতে এসে পড়ে লাবণ্য-অমিতের প্রেম প্রসঙ্গ । যে কোনো আবৃত্তির আসরে – ‘হে বন্ধু বিদায়’ এখনো হিট হয়ে যায় । আমাদের কখনো এও মনে হয়েছে অমিত লাবণ্যের মধ্যে সত্যিই কি প্রেম গড়ে উঠেছিল , নাকি তারা আসলে প্রেম নামক একটি ‘আইডিয়া’র পিছনে ছুটেছিল ? তারা কি প্রেমকে সত্যি উদযাপন করেছিল, নাকি তাদের মেধা , ঋদ্ধি , মনন দিয়ে প্রেমের ব্যাবচ্ছেদ করবার চেষ্টা করেছিল ?যেমন একটা ফুল ফোটাকে আতস কাঁচ দিয়ে লক্ষ করতে থাকলে কারো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা মিটতে পারে হয়ত , কিন্তু ফুলটিকে অলক্ষে ফুটতে দিলে তবেই তার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় ।কখনো মনে হয়েছে অমিত লাবণ্য প্রেমে যেন সেই ‘ভাঙ্গিলে দ্বার কোন সে ক্ষন অপরাজিত ওহে ’ হয়ে আসেইনি, বরং তাদের সুনিপুন নির্মানের চেষ্টায় প্রেম যেন একটা ‘একাডেমিক’ বিষয় হয়ে উঠেছে । আবার কখনো মনে হয় এই যে ভালোবাসার কোনো বাধা না থাকলেও দু জন মিলে মিলনের বদলে স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত বেছে নিতে পারেন , এমন ভাবনা আছে বলেই শেষের কবিতা না পড়লে আমাদের কাছে প্রেমের ক্যানভাসটা এতটা বড় হয়ে উঠতো না । এই সব দ্বিধা দন্দ্ব নিয়েই ‘শেষের কবিতা’ এই ২০১৫তেও কোণঠাসা হয়ে পড়েনি । এ গল্পের তিনটি প্রধাণ চরিত্র কে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেন এই ভাবে - অমিত রায় - ‘পাঁচজনের মধ্যে ও যে-কোনো একজন মাত্র নয়, ও হল একেবারে পঞ্চম। অন্যকে বাদ দিয়ে চোখে পড়ে। দাড়িগোঁফ-কামানো চাঁচা মাজা চিকন শ্যামবর্ণ পরিপুষ্ট মুখ, স্ফূর্তিভরা ভাবটা, চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না; মনটা এমন এক রকমের চকমকি যে, ঠুন করে একটু ঠুকলেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে।‘ লাবণ্য – ‘লাবন্যর সৌন্দর্য সকাল-বেলার মতো, তাতে অস্পষ্টতার মোহ নেই, তার সমস্তটা বুদ্ধিতে পরিব্যাপ্ত। তাকে মেয়ে করে গড়বার সময় বিধাতা তার মধ্যে পুরুষের একটা ভাগ মিশিয়ে দিয়েছেন; তাকে দেখলেই বোঝা যায়, তার মধ্যে কেবল বেদনার শক্তি নয়, সেই সঙ্গে আছে মননের শক্তি।’ কেটি মিটার – ‘মুখের স্বাভাবিক গৌরিমা বর্ণপ্রলেপের দ্বারা এনামেল-করা। জীবনের আদ্যলীলায় কেটির কালো চোখের ভাবটি ছিল স্নিগ্ধ; এখন মনে হয়, সে যেন যাকে-তাকে দেখতেই পায় না। যদি-বা দেখে তো লক্ষই করে না, যদি-বা লক্ষ করে তাতে যেন আধ খোলা একটা ছুরির ঝলক থাকে। প্রথম-বয়সে ঠোঁটদুটিতে সরল মাধুর্য ছিল এখন বারবার বেঁকে বেঁকে তার মধ্যে বাঁকা অঙ্কুশের মতো ভাব স্থায়ী হয়ে গেছে।‘ এই রকম দুর্দান্ত স্কেচের মধ্যে তিনজন সম্মন্ধে বলা আছে অনেকটাই আবার না-বলাও আছে অনেক কিছু । সেই না-বলা জায়গাটা নিয়ে আমাদের কল্পনা ডানা মেলেছে আর এদের তিনজনের একটা করে ছবি আমরা এঁকে রেখেছি আমাদের মানসলোকে । আমরা বোধহয় শেষের কবিতা দেখতে গিয়ে চাইব সেই মানসছবির সঙ্গে সিনেমার লাবন্য অমিত কেটির কতটা মিল আছে । পরিচালকের কাছে , এবং অভিনেতাদের কাছে সেটি একটি চ্যালেঞ্জ । শেষের কবিতার মধ্যে প্রথমের ঐ দুটি গাড়ির সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে অমিত লাবন্য্যের দেখা হওয়া ছাড়া কোথাও আপাতভাবে কোনো মেলোড্রামা নেই ।এবং শেষের দিকে কেটির আবির্ভাবের আগে অবধি সে রকম কোনো গল্পের উত্থান পতন নেই । কিন্তু পাতায় পাতায় এক জন পাঠকের জন্যে ছড়ানো আছে অসংখ্য মণিমুক্তা । সে মণিমুক্তা কথামালার । যে চরিত্রই কথা বলুক আসলে কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ । প্রায় প্রতিটি প্যারাগ্রাফের আছে এমন কিছু বাক্য যা আমাদের চিরকালের ভাবনার খোরাক । কিন্তু এই সব শানিত উক্তিগুলি সংলাপ হিসেবে প্রয়োগ করা হলে তা কি খুব সিনেম্যাটিক হবে ? আর তা একেবারেই না করা হলে , শেষের কবিতা কি তার ট্রেড মার্ক ‘কমল হীরের দ্যুতি’ টা হারিয়ে ফেলবে না ? শুধু একটা প্রেমের গল্প লিখব বলে রবীন্দ্রনাথ সাতষট্টি বছর বয়সে শেষের কবিতা লিখতে বসেননি । সেই সময়টায় কবি বুঝতে পারছেন সময়টা দ্রুত পাল্টাচ্ছে । বাংলা সাহিত্যে অন্যদের কবিতার ধাঁচ আরো আধুনিক হচ্ছে , গল্প আরো বাস্তব হচ্ছে, গদ্য আরো সাবলীল হচ্ছে । এমন কি তাঁর কাছেও একটা চ্যালেঞ্জ আসছে আধুনিকতর হয়ে ওঠার । কিছু সমালোচনা উঠে আসছে রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করেও । ।নিবারণ চক্রবর্তী আসলে এক প্রতীকী নব্য যুগের কবি যার উপস্থিতি দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ দূরে কোথাও দেখতে পাচ্ছেন । এই সময় শেষের কবিতা লেখা হয়তো সেই আগামী কালের প্রতি রবীন্দ্রনাথের একটি পালটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া । যে উপন্যাস কবিতার চেয়েও বেশি কাব্যিক , অথবা যা আসলে একটি কবিতাই শুধু বিস্তার উপন্যাসের মত, তাকে নিয়ে সিনেমা করতে গেলে এর মধ্যে যে টুকু গল্প-উপাদান আছে , পরিচালককে তা interpret করতে হবে অনেকটা নিজের মত করে । সুমন সেটা কতটা পারবে সেটা সময় বলবে । গতকাল টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে অমিত রায় এবং লাবণ্য চরিত্রের অভিনেতারা দুজনেই স্বীকার করে নিলেন – তারা মূল ‘শেষের কবিতা’ পড়েন নি । অভিনয় করবার আগে সরাসরি সুমনের script পড়েছেন । শুনে প্রথমে চমকে গেলাম । পরে ভাবলাম পরিচালকের পক্ষে এটাই হয়ত সুবিধেজনক ।কোনো রকম inhibition ছাড়া তারা সুমনের চিত্রনাট্যের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারবেন । দ্বিতীয় বার চমকালাম এই শুনে যে অমিত রায়ের নিজস্ব কণ্ঠে কোনো কবিতা উচ্চারিত হয়নি এই ছবিতে ।কথায় কথায় কবিতা ছাড়া অমিত রায়- ব্যাপারটা সেই Hamlet without prince of Denmark হয়ে যাবেনাতো ? তবে ইউ টিউবে এ ছবির টিজার দেখে বোঝা গেল শিলং-চেরাপুঞ্জীর অনবদ্য ভিসুয়াল এ ছবিতে অনেক ফাঁক বুজিয়ে দিতে পারবে । আর দেবজ্যোতির আবহ সঙ্গীতে একটা Western classical music এর aura পাওয়া যাচ্ছে । সেটাও এ ছবিকে সম্বৃদ্ধ করবে । সব মিলে সাগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম ।

1167

2

অর্ণব(অরিন্দম রায়)

অবশেষে

অপনজেঠু অনেকদিন থেকেই বলছিলেন আর দেরী নয়| আমি আর একটু‚ একটু করে আটকে রাখছিলাম কিন্তু মনে হল এবার সময় হয়েছে সবাইকে জানানর| প্রথমেই বলি কে এই ওয়েব্সাইট তৈরী করেছে‚ কি তার উদ্দেশ্য ইত্যাদি যে প্রশ্নগুলো এসেছে - সেগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই আমার মনে হয়েছে| আজকাল spam, hacking ইত্যাদি এমন ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে internet এর সাথে এই প্রশ্ণগুলো আসবেই| নিজেও কোন অজানা ওয়েবসাইটে সন্স্তার জিনিস পেলে সেই ওয়েবসাইটের দশটা review না পড়ে ধারে কাছে যাই না| আমার প্রথম এবং সর্বপ্রধান সমস্যা ছিল নিজের কাজের উপর confidence এর অভাব| এর আগে কোনদিন website এর এক লাইন coding ও করিনি‚ নিজে serious coding করেছি তাও বোধহয় ১২-১৩ বছর আগে| এই সাইটটা technically দাঁড়াবে কিনা তা নিয়ে প্রবল সন্দেহ ছিল| আগে থেকেই নাম ধাম জানিয়ে প্রচার করে দিলাম আর তারপর সাইটটা মুখ থুবরে পড়ল - এইটা চাইছিলাম না| আরো একটা কারণ ছিল - সেটা হল এই সাইটটা নিয়ে আমার স্বপ্ন‚ এটা তৈরী হবে বা পরিবর্তিত হবে সবার ইচ্ছেকে মর্যাদা জানিয়ে| একটা প্রতিবাদ‚ একটা অসন্তোষ‚ বয়কট থেকে যে সাইটের জন্ম তার founding principle এটা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না| এর মধ্যে এটা অমুকের সাইট ব্যপারটা চলে আসলে collective ownership টা একটু ঘেঁটে যাওয়ার ভয় থাকে| তাই একটু সময় চেয়ে নেওয়া ‚ যাতে কাজ করে বোঝাতে পারি এই সাইটে কোন কিছুই আমার ইচ্ছেতে হবে না‚ হবে সকলের সহমতে বা majority decision এ| এই আস্থাটা অর্জন করে নেওয়ার জন্য একটু সময় চেয়ে নিয়েছি আমি| যাই হোক আমি মজলিশের অর্ণব| জানি কেউ বিশেষ অবাক হবেন না‚ কারণ লেখার style বা ডাকগুলো আমি পাল্টায় নি - অনেকেই প্রথমদিন থেকেই বুঝেছিলেন| মজলিশের অর্ণব কথাটা লিখলাম কারণ এই নামে আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমাকে কেউ ডাকে নি| সেই যে আমার ঠাকুমা বাবা মায়ের সাথে যুদ্ধ জয় করে আমার নামটা পাল্টে ফেললেন স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে‚ সেই থেকেই ঠাকুমার উপর আমার বেশ রাগ| যেখানেই গিয়েছি আমার আর ২-৩ টে namesake থেকেছে ‚ আর প্রায় সবাই আমরা একটা অন্য নামে পরিচিত হয়ে যেতাম বন্ধুদের কাছে| যখন এই মজলিশে এলাম তখনো আমার দুই জন namesake ছিলেন‚ তাই অর্ণব নামেই লেখা লেখি শুরু| হয়ত এই ভাবেই চলে যেত কিন্তু এখন যারা আসবেন এই ওয়েবসাইটে তাদের অধিকার রয়েছে আমার আসল পরিচয় জানার‚ তাই লেখার শেষে নিজের নাম‚ facebook profile টা দিলাম| কিছু মজলিশী বন্ধু আছেন যার অন্য পরিচয়ে আমার পরিচিত‚ তারা আগে থেকেই জানেন আমাকে| যখন এই সাইটটা নিয়ে কাজ করার কথা ভাবলাম‚ তখন কোন প্রত্যাশা ছিল না| অপনজেঠু লিখেছিলেন মজলিশে এরকম কিছু করা যায় কিনা আর আমিও আমার Style এ লিখে দিয়েছিলাম একমাসে বানিয়ে দিব কিন্তু চলবে না| পরে মনে হল দেখি না চেষ্টা করে| চলা না চলা জেঠুর হাতে ছেড়ে দেব‚ আমার কাজটা আমি করি| এতজন আসবেন‚ ভালোবেসে এই website তা ব্যবহার করবেন এটা সত্যি ভাবতে পারে নি| আমি সকলে কাছে grateful| যখন শুরু হয়েছিল তখন এটা শুধু একটা খাঁচা ছিল| মণিদির বানান শুধরে দেওয়া‚ হিমাদ্রীর লালা সবুজ আলোর suggestion‚ উমার ধরিয়ে দেওয়া button গুলোর বাজে layout বা অরিন্দমের suggestion গুলো যেগুলো অনেক রাত জাগিয়েছে‚ অপনজেঠুর encouragement আরো সবাই যারা লিখে এই সাইটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন প্রত্যেককে ধন্যবাদ| তবে এই সাইটের অপ্রাপ্তির list টাও দীর্ঘ| অনেক বন্ধু এখনো আসেন নি| সবার নাম নিতে গিয়ে আবার যদি কাউকে মিস করি‚ তাই আলাদা করে নাম নিলাম না| শুধু একটা কথা না বলে পারছি না| আমার স্ত্রী মাঝে মাঝেই জিগ্যাসা করেন আচ্ছা সেই যে যিনি পাড়ার গল্প লিখেছিলেন তিনি এলেন না? বলি অপেক্ষা কর‚ আসবেন নিশ্চয়‚ সেই অপেক্ষাতেই রইলাম সকলের জন্য| আমার বিশ্বাস এই সাইটটা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে আর বিশেষ কিছু করার নেই| performance এর উপর নজর রাখতে হবে কিন্তু সেটা সবসময় একটা ongoing process| তাই যে বন্ধুদের অত্যন্ত valid শংকা ছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা সাইটের দেখাশুনা করবে কে‚ সেই শংকার জায়গাটা বোধহয় আর নেই| আমি বিশ্বাস করি এই site এখন সবালক হয়ে নিজেই চলতে পারবে আমি সময় দিতে না পারলেও| আরো একটা কথা যেটা আগেও বলেছি‚ এই সাইটে আমি নিজেকে কোন special privilege দেই নি‚ ভবিষ্যতেও দেব না| আগামীদিনে কি ভাবে চলবে‚ কোন conflicting situation এলে তার সমাধান কি হবে - এসবি হবে collective decision এ| বিশ্বাস করলে ঠকবেন না‚ কথা রইল| এবার শেষ করার পালা| আমার নাম আর facebook link টা নীচে রইল| তবে একটা অনুরোধ‚ এই নামটা শুধু পরিচিতির জন্যই তোলা থাক‚ এখানে ব্যবহার করার দরকার নেই| অরিন্দম রায় https://www.facebook.com/arindam.ray.754

718

6

অরিন্দম

মনের খেয়ালে

আয় আরও হাতে হাত রেখে... ---------------------- ভারী ও হাল্কা বৃষ্টি। মাঝেমাঝে। ঈদ আর রথ যাত্রা ক্যালেন্ডারে একই দিনে। হিন্দু মুসলমান ভাই-ভাই। বইয়ের পাতায়। এই এত বছর পরেও। কেন? বলছি। এই যেমন রথ-ঈদের দিন বাসে। মানিকতলা থেকে সল্টলেক ঝাড়া দুই-আড়াই ঘন্টা। যাত্রীরা বিরক্ত, রাস্তায় কোলকুলি, কাকুঁড়গাছি কবরস্থানের সামনে জন সমুদ্র। একজন তো বলেই ফেলল, মনে হচ্ছে শালা পাকিস্তানে আছি... (ব্যাপারটা কী স্ট্রাইকিং যদি ২২শে জুলাই আবাপ-তে শিলাদিত্য সেনের লেখা পড়েন তা'হলে বুঝবেন। উত্তর থেকে দক্ষিণে এই একই কথা শোনা গেছে। তার মানে কথাটা কতখানি মনের কথা, বুঝুন) যাকগে, সেতো জীবনে এরকম টুকটাক কথা থাকে, দুর্গা পুজায় রাস্তায় বেরিয়ে ভীড় দেখলে অনেকে বলে- পাবলিকের মাইরি বহুৎ পুড়কি, শালা দলবেধে রাস্তায় নেমে পড়েছে(নিজেও যে নেমেছে সে কথা ভুলে যায়) তা সবকথা মনে থাকেনা, কিছু থাকে। তাই ছিল। অনেকদিন বাদে সিটি সেন্টারে দাদার সঙ্গে দেখা। ঘষাদা। - আরে কী খবর! ঘেঁটে ছিলাম। ফস্‌ করে বলে দিলাম- মাইরি দেশটা পুরো পাকিস্তান হয়ে গেছে... এই যদি নেতাজী থাকত... দাদা পিঠে হাত রাখলেন। হেসে, চল বসি একটু... তা বসলাম। এমনিতে এই একটা ঝিরঝিরে বৃষ্টি বেশ বোরিং কী করে যে লোকের কাব্য আসে কে জানে। তাই খুশির ঈদ-রথ হলেও, খুশির বৃষ্টি বলতে পারলামনা। দাদা সিগারেট ধরালেন, আমাকেও দিলেন। অনেকদিন চারমিনার টানিনা, মৌজ করে টানছি। দাদা শুর করল- - হ্যাঁরে সুভাষ বোস সম্পর্কে কী বলছিলি? - বলছিলাম, নেতাজী থাকলে এরকম হ'তনা.. - এরকম মানে? - এই, ওদের এত বাড়-বাড়ন্ত। কী রঙ দেখেছেন! শালা দেশটা যেন ওদের। - কাদের? -আরে ধুর বাবা কাটুয়াদের কথা বলছি। -সুভাষচন্দ্র থাকলে কী হ'ত? - দেশভাগ হ'ত না। আর হলেই এইরকম তোষন চলতনা। সংখ্যালঘুর নামে যা চলে... দাদা দুটো রিং ছাড়ল। তারপর আস্তেধীরে বললেন, দেশভাগ হতই কারণ দেশ মানুষ দিয়ে গড়া। আর মানুষের লোভ থাকবেই। ক্ষমতার লোভ। জিন্না-সুভাষ আলোচনায় দেখবি একটা অবিশ্বাসের সুর। অবিশ্বাস একে অপরের প্রতি। আমি একটু উত্তেজিত হয়ে, আরে দাদা অবিশ্বাস ওদের রক্তে। ওরা বাপকে মেরে সিংহাসনে চড়ে... - নারে। অবিশ্বাস ও তদ্‌জনিত রাগই বল বা ক্রোধ, তৈরী হয়েছে সামাজিক অসমকক্ষতা থেকে। - কীরকম একটু গুছিয়ে বলুন... - এমনিতে লক্ষ্য করলে দেখবি অবিভক্ত বাংলা বল বা বিভক্ত পঃবঙ্গ, সেখানে হিন্দু জমিদারের সংখ্যা বেশী। মুসলমানরা মূলতঃ গরীব চাষী। কাছারিতে মুসলমান গেলে জাজিমের একপ্রান্ত তুলে বসতে দেওয়া হ'ত। হুঁকোর জল ফেলে তামাক দেওয়া হ'ত... এগুলো কেন? -কেন? - নিছক ধর্মের কারণ নয়। ধর্ম তো আড়াল করার কৌশল। ধামা। আসলে সামাজিক অসমকক্ষতা। অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা। দুটো জিনিস লক্ষ্য করবি, এক, মুসলমানদের অধ্কাংশ দারিদ্র সীমার নীচে। দুই, Bengal divided: Hindu Communalism ana Partition 1932-1947 গ্রন্থে জয়া চ্যাটার্জী বলছেন, সাম্প্রদায়িকতা ও বঙ্গ ভঙ্গ অবধারিত করে তোলার পিছনে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ব বাংলার রাজনীতিতে সমার্থক হয়ে পড়া। - উরিব্বাস! তখনও এরকম ছিল! - বিবেকানন্দ-অরবিন্দ হিন্দু, তাই ওরা বিজেপি... - হে হে , তা যা বলেছিস। চিরকালই দলে টানার ইচ্ছে বেশী কোলে টনার চেয়ে। নইলে বিবেকানন্দ আর অরবিন্দের হিন্দুত্ব ভাবনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব ভাবনার কয়েক আলোকবর্ষ তফাৎ রয়েছে। আমি একটা গুগুলি দিলাম। ঠিক গুগলি নয় খোঁচা বলা যায়... বললাম, তা ওসব মোদী-টোদী থাক। আপনি আবার ট্রাক চেঞ্জ করলে মুশকিল। উন্নয়ন, প্রকৃত উন্নয়ন, গড় আয় সেখান থেকে আর্থিক ব্যবস্স্থার উন্নতি কিন্তু পুষ্টি বৃদ্ধির হার কম, এইসব বিভ্রম ছাড়ানো টপিকে চলে যাবেন। সুতরাং থামুন ঐ নেতাজীতেই থাকুন। দাদা, আমাদের মতন নয়। কথার মাঝে থাবা। আমরা হলে ইগোটিগো চাপিয়ে। ধুস্‌ আর বলবই না, বলে, গোঁসা ঘরে খিল। সে ঘোরেল। মৃদু হেসে, - হ্যাঁ যেটা বলছিলাম বুঝলি। অবিশ্বাস ও রাগের কারণ ছিল তা সেই অবিশ্বাস ও রাগ কমানোর জন্য সুভাষচন্দ্র ও তাঁর অনুগামীরা কিন্তু অন্যরকম ভেবেছিলেন। - কোলে টানার কেস? - হ্যাঁ। -কীরকম? -হ্যাঁ প্রথমে সুভাষ জোর দিলেন ওয়ান-টু-ওয়ান সংযোগ স্থাপনের দিকে। ধর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালীন ভারত সফরে গেলে সুভাষ কোন হিন্দু বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ না করে মুসলিম কংগ্রেস কর্মীর বাড়িতেই রত্রিযাপন করতেন। এর কিন্তু একটাই কারণ গল্পের ছলে, অন্তরঙ্গ হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছন এবং তাদের সমস্যাগুলো বুঝতে চাওয়া। চিনতে শেখা। -বলে যান। বেশ ইন্টারেস্টিং... - হ্যাঁ ঐ যে ওয়ান-টু-ওয়ান সম্পর্ক স্থাপন তার থেকেই তৈরী হতে থাকল ওয়ান-টু-মেনি... একটু একটু করে সামাজিক সংস্কারের দিকে ঝুকলেন। সুভাষ বোসের দুটো জিনিস খুব জোরালো। এক, ইংরেজ বিদ্বেষ। দুই, কম্যুনিজমের প্রতি অনুরাগ। কম্যুনিস্ট হিসেবে হয়ত দ্বন্দ্ব আছে, স্ববিরোধীতা আছে কিন্তু ইংরেজ বিদ্বেষ ষোল আনা খাঁটি। -আমি'ত অধৈর্য্য বলেই বসলাম, কিন্তু এখনও তো কোন মুসলমান তোষন দেখছিনা। বা বেশি বেশি আলগা পীড়িত। সেই প্রসঙ্গেই তো কথা উঠল। -আমি'ত তোষন শব্দটাকে আনিনি। ওটা তোর। কোন বিষয়ে সংরক্ষণ বা অনুদান কতখানি প্রয়োজনীয় এবং তা কীভাবে এসেছে সেটাই দেখার বিষয়। হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম, সুভাষ বুঝেছিলেন অর্থনৈতিক সমস্বার্থের চেতনা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়িক বিভেদ দূর করবে। একজন গরীব চাষী যে-কোন ধর্মেরই হোক সে হ'ল গরীব। তারসঙ্গে একজন বড়লোক হিন্দু-মুসলমান জমিদারের মিল হতে পারেনা। এই বিভাজন রেখা দূর করতে হবে। দুই, মানুষের মনে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সেই অস্থা ফেরানোর জন্য তেলে জলে মিশ খাওয়ালে হবেনা। -সেটা আবার কী? -মানে। ধর্মাচরণ ও ধর্মীয় বিশ্বাস থাকুক ব্যক্তিগত কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার ভূমিকা থাকবেনা। অসহযোগ আন্দোলনের সময় রাজনীতিতে খিলাফতের মতন আচরন দুর্ভাগ্যজনক হয়েছিল বলে মনে করতেন সুভাষ। ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে স্থান দেবেন না বলেই, সুভাষ আজাদ-হিন্দ-ফৌজের চরম অর্থ সংকটের সময়েও সিঙ্গাপুরের চেট্টিয়া সম্প্রদায়ের থেকে অর্থ সাহাজ্য নেননি। -কেন নিলেন না কেন? - চেট্টিয়ারা ধর্মান্ধ ছিল। ওদের মন্দিরে অন্য ধর্মাবলম্বী ও হরিজনদের প্রবেশ ছিলনা। অর্থাৎ ধর্ম দিয়ে এই ভেদাভেদ মানুষে মানুষে, সুভাষের কাছে অসহ্য।তাই। এতে কী লাভ হ'ল বল। -আপনি বলুন না। বেশ ফ্লো আছে এখন। - দুটো জিনিস। এক সুভাষ নিজে জন্মসূত্রে হিন্দু কিন্তু প্রয়োজনে হিন্দুদের বজ্জাতি প্রশ্রয় দেবেননা, এই বার্তাটি গেল। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হ'ল। যার জন্য ভিন্ন ধর্মের মানুষদের নিয়ে খুব সফল ভাবে আজাদ-হিন্দ-ফৌজ চলাতে পেরেছিলেন। -তা'হলে দেখুন। আমি যা বলছিলাম কোন ফালতু সংরক্ষণ তোষামোদ নেই। - তোষণ নেই কিন্তু তার মানে সংরক্ষণ নেই বা এনিয়ে ভাবনা চিন্তা তোকে কে বলেছে? -ছিল নাকী! - প্রয়োজনীয় সংরক্ষণতো ছিলই। বললাম না সেই সময় রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দুত্ব মিশে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী নেতাদের অধিকাংশই হিন্দু। সরকারি চাকরিতে হিন্দুদের প্রাধান্য, তাই সুভাষ বেঙ্গল প্যাক্টের পরিকল্পনা ও রূপায়নের জন্য এগিয়ে এলেন। - বেঙ্গল প্যাক্ট, সে আবার কী! - বেঙ্গল প্যক্ট ছিল সুভাষের রাজনৈতিক গুরু সি আর দাশের পছন্দের মডেল। সুভাষ সেই মডেলকেই এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ঠিক হ'ল লোকসংখার ভিত্তিতে আইনসভা ও জেলাবোর্ডে হিন্দু ও মুসলমানের প্রতিনিধি নির্চান করা হবে। একইরকমভাবে সরকারি চাকুরি ক্ষেত্রে ৫২ ও ৪৮ ভাগ বন্টন হবে। উভয় ধর্মের মধ্যে। এতে দারুণ সাড়া মিলেছিল। স্বাভাবিক। উন্নতির সুযোগ পেলে মানুষ তাকে স্বাদরে গ্রহণ করে। সেইসময় ইংরেজ সরকার ও তার পেটুয়া মুসলিম নেতারা অনেক চেষ্টা করে ভাঙন ধরাতে কিন্তু সফল হয়নি। ১৯৪২ কলকাতা করপোরেশানের চিফ একজিকিউটিভ অফিসার হন সুভাষ, তখনও এই বেঙ্গল প্যাক্ট বহাল রেখেছিলেন। পরে অবশ্য কংগ্রেস বেঙ্গল প্যাক্ট প্রত্যাখ্যান করে। ফলত জানা, দেশভাগ। -হুম্ম সবই তো বুঝলাম কিন্তু আপনি ঐ দরিদ্র চাষীদের নিয়ে ভূমি ইত্যাদি নিয়ে কী যেন বলছিলেন। কম্যুনিস্ট মানসিকতার ব্যাপার.. - তা যেটা বলেছিলাম সুভাষের চোখে দরিদ্র মুসলিম চাষীর সঙ্গে গরীব হিন্দু চষীর পার্থক্য ছিলনা। পার্থক্য যদি থেকে থাকে সেটা চাষী ও জমিদারের মধ্যে। শ্রেণী পার্থক্য বা বৈষম্য। সুভাষ কী করল একদিকে "সিরাজ স্মৃতি দিবস" পালন করলেন। - বাবা! হঠাৎ সিরাজ স্মৃতি দিবস কেন? - ঐ যে বলেছি, আর যাই হোক সুভাষ আদ্যন্ত ইংরেজ বিরোধী মানুষ। সিরাজ শেষ লড়াইটা লড়েছিল। ইংরেজরা সিরাজের নাম কলঙ্কিত করে হলওয়েল মনুমেন্ট স্থাপন করে। সিরাজ স্মৃতি দিবস ঘোষনা করে সুভাষ হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙার দাবী তোলেন। যে কাজ করতে ফজলুল হকএর মুসলিম লিগ সরকার ব্যর্থ হয়েছিল, সেটাই সুভাষ করলেন এবং জিতে নিলেন সাধারণ মুসলমানের মন। সেইসময় কৃষক প্রজা দলের উত্থান হ'ল সুভাষেরই জন্য। ওদের দাবী ছিল প্রজাসত্ব আইনের সংশোধন,কৃষি ঋণ মুকুব ইত্যাদি।ব্যাপারটা বুঝলি? -কী? - এই দাবী দাওয়াগুলো কিন্তু অর্থনৈতিক/সামাজিক বৈষম্য কমানোর জন্য। সাধারণ লোক বলা ভাল মুসলিমরাও বুঝেছিল তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে নির্বাচনের আগে যখ্ন জিন্না সাহেব কলকাতায় এলেন এবং কৃষক প্রজা দলের সঙ্গে জোট বাধতে চাইল, তখন ওরা জিন্নাকে প্রত্যাখ্যান করল। তোরা বলিসনা ওরা ধর্মের ক্রিতদাস। ধর্ম সামনে এলে ওরা অন্ধ। কই সেরকমতো করেনি। ইতিহাস সেকথা বলছেনা। এর থেকে একটা জিনিস বোঝা গেল, সঠিক উন্নয়নের পথ দেখালে মানুষ ধর্মকে মনে রাখবেনা। -তা দাদা এই উদ্যোগ কী সফল হল? - না। শেষ পর্যন্ত হয়নি। এইখানে একটু দ্বন্দ্ব। আসলে সুভাষের বরাবরের লক্ষ্য ভারতের স্বাধীনতা। তাই সেইসময় সুভাষ আবার কিছুদিন অন্তরীনে চলে যান। যাদের ওপর দায়িত্ব ছিল তারা অধিকাংশ জমিদার বা ক্ষমতাবান। সুভাষের সামনে একরকম আড়ালে অন্যরূপ। প্রজাসত্ব আইন পাশ হল না। তখন থেকেই আবার সম্পর্কে ফাঁটল দেখা দিল। - মানতেই হবে দাদা নেতাজী আলাদা লেবেল। দাদা হাসে। মৃদু বা মুচকি। বলে, হ্যাঁ সত্যিই নেতাজী। "নেতাজী" বলেই সকলে ডাকত, কোনদিন কেউ তো তাকে "কাইদ-ই-আকবর" এই জাতীয় দুরূহ আরবী খেতাব দেয়নি। আর একটা জিনিস বুঝলি, ভারতে ভাষা সমস্যা বড় সমস্যা। একের ভাষা অন্যে বোঝেনা। আবার ইগো আছে। সকলেই ভাবে নিজের ভাষা শ্রেষ্ঠ। সেইসময় হিন্দী-উর্দু সমস্যা কংগ্রেসকে বিচলিত করেছিল কিন্তু নেতাজী ব্যতিক্রমী। সৈয়্দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, বেতারে আমি সুভাষচন্দ্রের সব ব্ক্তৃতা শুনেছি এবং বিস্মিত হয়েছি হিন্দী-উর্দুর অতীত এ ভাষা নেতাজী শিখলেন কী করে! নেতাজী শব্দতাত্বিক নয়, ভাষা কলাকৌশল আয়ত্তের জন্য অজস্র সময় পাননি তাও সে ভাষা শুদ্ধ হিন্দী অপেক্ষা বিশুদ্ধ হিন্দী, শুদ্ধ উর্দু অপেক্ষা বিশুদ্ধ উর্দু, একেবারে নেতাজীর নিজস্ব ভাষা। -দাদা বলেছিলাম না নেতাজী থাকলে দেশটা অন্যরকম হ'ত। এই নেহেরু ছক করে নেতাজীকে পটকে দিল। দাদা কী একটু বিরক্ত হলেন। বিরক্ত নয় তবে একটু ক্লান্তি দেখলাম যেন, বললেন উফ কত সহজে তোরা সীদ্ধন্তে পৌঁছে যাস...নেতাজী-নেহেরু-গান্ধী এইসব গ্রেট লিডার দের চুটকি মেরে বোঝা যায়না, এক চীনা গুণি ভদ্রলোক মুজতবা আলীকে বলেছিলেন "সরোবরে জল বিস্তর কিন্তু আমার পাত্র ক্ষুদ্র। জল তাতে ওঠে অতি সামান্য। কিন্তু আমার শোক নেই,- মাই কাপ্‌ ইজ্‌ স্মল- বাট আই দ্রিঙ্ক অফতেনার(My cup is small but I drink oftener) সুভাষ সরোবর থেকে মাঝেমাঝে তুলে গন্ডুস পান কর ওতেই এই মানবজীবন ধন্য হবে। তা বুঝলি ,একখানা বই পড়ছি মারাঠি ভদ্রলোকের লেখা বিশ্বাস পাটিল। অনুবাদ করেছে দীপেন চক্রবর্তী। "মহানায়্ক"। খাসা বই পড়ে দেখতে পারিস। শালা পড়ার কথায় গায়ে জ্বর আসে(মনে মনে) তবে দাদার কাছে লজ্জা নেই বললাম অত পড়ার সময় নেই, আপনি আছেন, আপনি মাঝে মাঝে বলবেন ওতেই হবে। চলুন আপনাকে একটা এগ-চিকেন রোল খাওয়াই, উঠলাম দুজনে। এতক্ষণ দাদা অনেক ফান্ডা দিল কিন্তু দাদাকে অবাক করে দিলাম। কী হতে পারে বলুন? আরে বাইপাসের ওপর নেতাজী নগর কলোনীর সামনে একটা রোলের দোকান করেছে "নেতাজী রোল সেন্টার" তলায় লেখা তোমরা আমাকে অর্ডার দাও আমি তোমাদের সাপ্লাই দেব... সে দেখে দাদার সেকী হাসি। বলে মালিকের হেড মাথা আছে মাইরি। ওদিকে মোবাইলে মিস কল, বললাম দাদা অসি হোমফ্রন্ট থেকে কল এসেছে। দাদা বললেন, আয়, নেতাজী ঘরে ফেরে নাই কিন্তু আমাদেরতো ফিরতেই হবে... পরে একদিন বসা যাবে নেহেরু-নেতাজী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও উত্তরণের গল্প নিয়ে... আমি হাঁট্ছি। সামনের দিকে। পিছন থেকে ভেসে আসতে লাগল দাদার গলা- "আয় আরও হাতে হাত রেখে... আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি"

860

10

দীপঙ্কর বসু

অরিন্দম কে

অরিন্দম , আমি লিখেছিলাম অনেক গানে সুরের কারুকার্য পরিস্কার ভাবে সব গায়ক বা গায়িকার কন্ঠে আসেনা । যেমন রবীন্দ্রনাথের টপ-খেয়াল অঙ্গের গান গুলি ,যেমন ধরুন “একি করুণা করুণাময়” ,”এ মোহ আবরণ খুলে দাও” , “অনন্ত সাগর মাঝে দাও তরী ভাসাইয়া” ইত্যাদি গান দেবব্রত বিশ্বাস এর কন্ঠে কখনও শুনিনি । এই সব গানে সুরের অলঙ্করণে যে সব তান ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলির সার্থক রূপায়ণের জন্য কন্ঠের যে প্রস্তুতি লাগে ,আমার মনে হয়না দেবব্রত বিশ্বাসের তা ছিল । দেবব্রত বিশ্বাস নিজেই বলতেন গান জিনিষটা হল আমার পড়ে পাওয়া ধন । এই জাতীয় একটি বিখ্যাত গান – “কোথা যে উধাও হল মন প্রাণ” দেবব্রতবিশ্বাসের কন্ঠে শুনেছি বটে – কিন্তু সে গান অন্তত আমার ভালো লাগেনি – খুব আড়ষ্ট লেগেছে । এই সব গান শোনার জন্য আমি সুবিনয় রায় ,রাজেশ্বরী দত্ত বা মায়া সেন প্রমুখের কাছে অঞ্জলি পাতব । কারণ এই গায়ক গায়িকাদের কন্ঠে ওই সব গানে সুরের তান গুলি শুধু যে সাবলীল ভাবে আসে তাই নয় সুরের লাবণ্যটুকুও পুরোপুরি বজায় থাকে এঁদের কন্ঠে । প্রসঙ্গত উল্লেখ করব যে, শান্তিনিকেতনের ছাত্রী সাবিত্রী কৃষ্ণানের কন্ঠে “মীণাক্ষী মে মুদম” এই কর্ণাটী গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে মূলগানের সুরটিকে অবিকৃত রেখে সেই সুরে বাংলা কথা বসিয়ে রচনা করেছিলেন বিখ্যাত গান “বাসন্তি হে ভূবন মোহিনী” । রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় বাসন্তি হে ভূবনমোহিনী গানটি গাইবার প্রয়োজন হলেই ডাক পড়ত সাবিত্রী দেবীর । একমাত্র তাঁর কন্ঠ ভিন্ন আর কারো কন্ঠে এ গান শুনতে রবীন্দ্রনাথ প্রস্তুত ছিলেননা । কিন্তু কেন এই তারতম্য ঘটে । হয়ত দীর্ঘ দিনের প্রণালীবদ্ধ শিক্ষা ও অনুশীলন দিয়ে এই দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব । “হয়ত” শব্দটি সচেতন ভাবেই লিখলাম ,কারণ কন্ঠস্বরের গুনাবগুন আবার অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তি বিশেষের স্বরোৎপাদনের অঙ্গ গুলি ,যথা ল্যারিংস এবং ভোকাল কর্ডের ধর্মের ওপরে । খেয়াল করে থাকবেন কাঁসর ও ঘন্টা দুটি একই ধাতুতে নির্মিত এবং একই কায়দায় বাজান হলেও তাদের ধ্বনিমাধুর্যে আকাশপাতাল পার্থক্য হয় । এ বিষয়ে গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে হলে আমাদের ধ্বণিতত্বের(acoustic science) এর শরণাপন্ন হতে হবে । আপাততঃ সে জটিল আলোচনায় প্রবেশ করছিনা । আপনি আরো যে দু জন বিখ্যাত শিল্পীর নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন কারণে আমার অত্যন্ত প্রিয় শিল্পী – অর্থাৎ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং মান্না দে । দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আমার কাছে অধিকতর প্রিয় ,যদিও বিশুদ্ধ সাঙ্গীতিক বিচারে মান্নাদে কে সম্ভবত কিছুটা হলেও এগিয়ে রাখতেই হবে । অন্ততঃ মান্নাদের গাওয়া গানগুলির সুর এবং আঙ্গিকগত বৈচিত্রের বিচারে তো বটেই । বাঙ্গালী শ্রোতাদের এক বিশাল অংশকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর রোমান্টিক কন্ঠের যাদুতে মজিয়েছিলেন । তাঁর গাওয়া শ্রেষ্ঠ গানগুলিতে কি সুরের খুব জটিল মারপ্যাঁচ ছিল কি ? আমার তো মনে পড়েনা । তবু কি এক আশ্চর্য দৈবী ক্ষমতা তাঁর কন্ঠে ছিল যা দিয়ে তিনি শ্রোতার মনে স্বপ্ন বুনতে পারতেন । অন্যদিকে মান্নাদের ছিল উচ্চাঙ্গের সাঙ্গিতিক তালিম ও উত্তরাধিকার । সপ্তস্বরকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চালনা করতে পারতেন অবলীলায় । কিন্তু আমার বরাবরই মনে হয়েছে মান্নাদের গাওয়া অনেক গান ,যেমন “ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতই খেলা” , “তীর ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড় ভাঙ্গা ঝড়” “কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল” ইত্যাদি বেশ কিছু রোমান্টিক গান হয়ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সমান সাফল্যের সঙ্গে গাইতে পারতেন কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠের “ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলোনা” “আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে”র মত আরো বহু গান মান্নাদের কন্ঠে কি একই মায়াজাল সৃষতি করতে পারত শ্রোতার হৃদয়ে ? কিম্বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি” –সহজ সরল সুরের এই গান মান্নাদের কন্ঠে কি সমান নিপুনতার সঙ্গে অপূর্ব এক নিসর্গ চিত্রের জন্ম দিতে পারত ? কিম্বা হয়ত পারত ,হয়ত ভিন্নতর কোন চিত্রলোকে উত্তীর্ণ হত গানটি । এমন তো হতে দেখেছি । যেমন শ্যমল মিত্রর গাওয়া “যদি কিছু আমারে শুধাও” গানটির দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে এক নবতর রূপান্তরণে । সুরের পরিবর্তন না করেও নিজস্ব গায়নশৈলীর প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি গানকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায় সে ত দেখেছি । এমন কি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া একটি বিখ্যাত গান “রানার” এই ত সেদিন সুমন চট্টোপাধ্যায় তাঁর বর্তমান প্রায় ভাঙ্গা কন্ঠে গেয়ে শোনালেন – শুধু শোনালেনই না – একেবারে মাতিয়ে দিলেন ।

1135

6

অপন

আমার গল্প

পর্ব ১০ এ দিকে অফিসে মোটা মুটি সেটল করে গেছি| কিছু দিনের ভেতর সিরাকিউসের একটা হসপিটালের ৫০০ বেড অ্যাডিশন হবে সেই কাজে আমি HVAC Designer| এই বাড়ীর কাজে প্রথম আমার পরিচয় হল ইনজিনীয়ারা কি ভাবে কাজ করে| প্রথমে ভাবা হল ফ্লোর হিটিং হবে| তখন দেখা গেল গরম হাওয়া মাটি থেকে উঠবে আর পায়ে চলার জন্য মাটির যত ধুলো ডিসটার্বড হবে| রোগীদের বিছানা মাটি থেকে ৩০ থেকে ৩৬ ইনচির ভেতর সুতরাং ঐ ধুলো রোগীদের নিশ্বাসের এলাকার মধ্যে পড়বে| তা ছাড়া এই ধুলো জানলার পর্দায় আটকাবে এবং তার জন্য পর্দা গুলো তাড়াতাড়ী কাচতে হবে| কোড অনুজায়ী সাধারন রোগী দের ঘরের হাওয়া ৬০% Recycle করা যায়| বাকি ৪০% হাওয়া বাইরে থেকে আসবে| তার মানে হচ্ছে ঘরের যা বিজানু তারাও Recycle হচ্ছে| এতে হাওয়াতে Bactreological Count বেড়ে যাচ্ছে| এখন বাইরের হাওয়া কে ঠান্ডা গরম করতে প্রচুর এনার্জি খরচ| কথা হল যদি সব হাওয়াটা বাইরে থেকে আসে তবে এই Bacteriological Countটা বাড়বেনা| কিন্তু অত খানি হাওয়াকে ঠান্ডা গরম করতে অনেক খরছ| একটা Heat Exchanger পাওয়া গেল যেটা সব চেয়ে বেশী হিট রিকভারির ক্ষমতা ৭৫%এর মত| যদি যে হাওয়াটা বাইরে বার করা হচ্ছে তার ৭৫% তাপ রিকভার হয় তবে ১০০% বাইরের হাওয়ার সিস্টেমে ২৫% হাওয়ার তাপ দিতে হবে| প্রথম ৪০% হাওয়ার জন্য যে তাপ লাগত সেটা ২৫% হল| অন্য দিকে Insurance Company বলল এই ১০০% হাওয়ার সিস্টেম হলে কন্ট্যামিনেশন কমবে আর আমাদের Liability কমবে| সুতরাং Insurance premium কমল| তদানীন্তন কালে Chlorophorm ব্যবহার হত অপারেসনে Anesthesia করতে| Chlorophorm বাতাসের থেকে ভারী| তাই অপারেশন ঘরে হাওয়া মাটির কাছাকাছি থেকে বার করা হয়| কিন্তু সেই সময় ঘরে হাওয়াটা দেওয়া হত সিলিং থেকে সারা ঘরে| এতে Operating টেবিলের ওপর ভালভাবে হাওয়া যেত না| তার কারন চার পাসে ডাক্তার নার্সের ভীড়| তখন কথা হল এই হাওয়া ঐ টেবিলের ওপর দেওয়া হবে আর হাওয়াটা আসবে Laminar Flow হয়ে অর্থাৎ জলের মত সোজা নাববে| টেবিলের চার দিকে একটা হাওয়র দেওয়াল করা হবে| এতে খোলা উন্ডটা সবচেয়ে স্টেরাইল কন্ডিশনে থাকবে| হওয়াটা সোজা নেবে মাটিতে ঘুরে দেওয়ালের দিকে চলে যাবে| এই হাওয়া আবার হেপা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে আসে| সুতরাং উন্ডের কন্টামিনেশন হবার সম্ভাবনা কম| সারজাররির সময় যে আলো ব্যবহার করে সেই গুলো প্রচন্ড তাপ দেয়| তার ফলে সারজনরা ঘামে| এখন ঐ হাওয় সোজা সারজেনদের মাথায় পড়ে বলে ওদের ঘামটা কমে যায়| তার সংগে ঘরের টেম্পারেছর খুব কম রাখে| শেখা শেখা আর শেখা| ১৯৭০ সালে আমি প্রথম কম্পিউটারে exposed হই| তখন IBM মেন ফ্রেম মেসিন বোধহয় মডেল ৭০৯ কিংবা ৭০৯০| ঐ কম্পিউটারে কোন প্রোগ্রাম চালাতে গেলে ১৬ ইনচি ডায়ামিটারের টেপ লাগাতে হত| ইনপুট সব পানচ কার্ডে| মেসিনের সময়টা IBM থেকে ভাড়া নিতে হত| যে কাগজে ছাপা হত সে গুলোর ধারে গর্ত্ত ছিল| কাগজ গুলো ফোল্ডেড হয়ে বেরোত| প্রিন্টারের মডেল নাম্বারটা বোধ হয় ১৪৬০ ছিল| এখন মনে করতে পারছিনা| একটা বাড়ীর কি কুলিং লোড হবে সেটা সুর্য্যের অবস্থান আর বাড়ীর বাইরের দেওয়ালের ওপর নির্ভর করে| সূর্য্য পুবে ওঠে দক্ষিন ঘেঁশে পশ্চিমে ডোবে| আবার বাড়ীর দেওয়ালে থিকনেসের ওপর নির্ভর করে কত খানি সময় লাগবে বাইরের ঐ তাপ ভেতরে আসতে| সেই সময় মোটা মুটি অভিজ্ঞতা থেকে ধরে নেওয়া হত দিনের কোন সময় এই লোডটা সব চেয়ে বেশী হবে| বেশির ভাগ সময়ে অনেক সেফটি ফ্যক্টর দিয়ে ইকুইপমেন্ট সিলেক্ট করা হত| এই ক্যালকুলেশনটা ২৪ ঘন্টার করা দরকার| এই প্রথম একটা সফটোয়ার তৈরী হলো এই ক্যাল্কুলেশন করার| এ দেশের জন দশ বারো ইন্গিনিয়ারিং ফার্ম সকলে পয়্সা দিয়ে এই সফটওয়ার করে| আমরা যখন এই Design করি তখন Drawing এর সংগে Specification দিয়| Specification ৩০০/৪০০ পাতর একটা বই| সব সময় সেটা টাইপ করা হত| এই বার সেইটে কমপিউটারে নিয়ে আসা হল| ওয়ার্ড প্রোসেসিংএর প্রথম ব্যবহার| এই সফটোয়ার ও টেপে থাকত| এডিটিং হত বিভিন্ন ctrl আর Alt সংগে অন্য কি টিপে| অফিসে ঐটে আমার ভার ছিল অন্য কাজের সংগে| তখন সব কিছু বেসিক আর ফোরট্র্যান ল্যানগুয়েজে হত| ঐ অফিসে আমাকে বলত Officilal Bailer তার কারন কোন কাজ আটকে গেলে আমাকে ডাকা হত Bell out করার জন্য| একবার একটা কাজ ছিল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির লাইব্ররির অ্যাডিশনে| এই কাজের প্রজেক্ট ম্যানেজার ছিল একটি তাইওয়ানিজ ছেলে| যে সোমবার কাজট বেরোবে তার আগের বেস্পতিবার দেখা গেল কাজটা অর্ধেকো হয় নি| আমার ডাক পড়ল| তখন ড্রাফটিং হত পেন্সিল দিয়ে| আমার মোটা মুটি ধারনা হয়ে গেছে অন্য সকলে কি ভাবে এই Design টা ভাবে| একজন লেয়াউট করছে আমি তার ঘারের ওপর দেখে সেকসন করছি| আমরা ঐ বেস্পতিবর রাত একটা অব্দি কাজ করলাম| শুক্রবার তাই শনিবার ও তাই| যে দু ভাই মালিক তাদের ছোটো ভাই অ্যালান এই কাজের Principle-in-charge| সে এই ক দিন এরান্ড বয় হিসাবে কাজ করেছে| আমাদের এক্জন খানিকটা ড্রইং করার পর Alan প্রিন্ত করে অন্য জন কে দিচ্ছে co –ordinationএর জন্য| দেখছে কফি তৈরী আছে কিনা| আমাদের কাছে অর্ডার নিয়ে লানচ/ ডিনার কিনে এনে আমাদের টেবিলে দিয়ে যাচ্ছে| কাজটা সোমবার ভোর সাতটায় প্লেনে উঠবে| কাজটা শেষ হল রবিবার প্রায় ভোর তিনটের সময়| একটা কথা মনে আছে| অ্যালান ফাইনাল প্রিন্ট করছে তখন আমাকে জিজ্ঞেশ করল এই ভাবে একটা কাজ কেন আমি করেছি| আমি ওকে বলেছিলাম Alan where have you been so long? একটু মুচকি হেসে চুপ করে গেল| আমার মনে হয়না পৃথিবীর কোন দেশে এই কথা কম্পানির মালিক শুনবে| এই কোম্পানি তখনকার অনেক নামী Architecturer সংগে কাজ করছে| ওরা Cembridge, MA তে একটা অফিস খুলল| ঐ অফিসে প্রথম কাজ ছিল W. R. Grace Companyর US Corporate H.Q. Waltham, MAএ করার| কিছুদিন বাদে কেম্ব্রিজে অফিস পিছিয়ে পড়েছে| কে বেল আউট করবে? অধমের ডাক| আমি সোমবার সকালে বস্টন যেতাম শুক্রবার ফিরতাম| এটা তিন মাস ধরে চলল| আর একটা কাজ এল| সিরাকিউস ইউমিভার্সিটিতে একটা বাড়ী হবে William B. Heroy Geolagy Building এই বাড়ীটা মোটা মুটি উত্তর দক্ষিন exposure| Norther hemisphere সাধারন ভাবে July/augustএ পিক কুলিং লোড হয়| এই বাড়ীটার পিক কুলিং লোড হল সেপেটেম্বর মাসে| তার কারন দক্ষিন মুখো বাড়ী| আমি অন্য ডিটেলে বোর করবনা| একটা ঘটনা বলি| বাড়ী তৈরী হয়ে গেছে ক্লাস শুরু হয়েছে| কমপ্লেন এল দক্ষিন মুখি একটা ঘরে শীত কালে কিছুতেই গরম হচ্ছেনা| ফোনে যত কিছু চেক করার করলাম| কোন গন্ড্গোল নেই| তা একদিন গেলাম দুপুরে| ঘরে ঢুকতেই চোখ ধাঁদিয়ে গেল| সূর্য্যের আলো সোজা আমার চোখে| প্রথমেই আমার চোখ গেল থার্মস্ট্যাটের ওপর| সাধারন ভাবে থার্মস্ট্যাট থাকে দোহ্কার দর্জার পাসে| ওর ওপর সোজা রোদ পরছে| থার্মস্ট্যাট খুশী মনে হিটিং বন্ধ করে দিয়েছে| তার গায়ে তো অনেক তাপ| ঠিক এই ধরনের একটা ঘটনা শুনে ছিলাম টরন্টো তে কাজ করার সময়| একটি হাই রাইজ অফিস বাড়ী লেক অন্টারিওর ধারে| সেই বাড়ীর ছতালায় এক অফিসের অধিকারি কমপ্লেন করেছে দিনের কিছু সময় তার পিঠ পুড়ে যায়| দেখা গেল রোদের আলো লেকের জলে রিফ্লেকট করে ঐ ভদলোকের পিট পুড়াছে| ইতি মধ্যে আমার স্ত্রী সকালে বেরোয় মেয়েকে একজন সোমালি ভদ্র মহিলার কাছে নাবিয়ে দিয়ে বাস ধরে কলেজে যায়| দিনের শেষে লাইব্রেরীতে কাজ করে| রাত নটায় বাস ধরে বাড়ী ফেরে| ও তখন আমাদের একটা গাড়ী হয়েছে| ক্রাইসলারের গাড়ী মডেল ছিল কমেট| সিরাকিউসে বরফের জন্য রাস্তায় নুন ছড়াত| ঐ নুন গাড়ীর বডিতে বড় বড় গর্ত্ত করত| আমি গাড়ীটা কিনে ছিলাম তিনশ ডলারে| সামনে একটা মস্ত গর্ত্ত ছিল| সেটাকে ফইবার গ্লাস দিয়ে ভর্ত্তি করলাম| বছর দুএক চালিয়ে ঐ তিনশ দলারে বিক্রি করলাম ম্যারেড স্টুদেন্ট থাকা একজনকে| কিনলাম একটা ঢাউস স্টেশন ওয়াগন| মডেল ছিল kingswood| বছর খানেক যাবার পর সিরাকিউস ইউনিভার্সিটি বলল ওরা ফাইনানসিয়াল এড দেবেনা| আমার মাইনে নাকি অনেক| আমি তখন বোধ হয় ১১/ ১২ হাজার ডলার মাইনে পাই বছরে| তা আমি ওকে বললাম যখন এতদুর এগিয়েছ পড়াটা শেষ করো| আমরা স্টুদেন্ট লোন নিলাম| তখন পার সেমিস্টার ঘন্টা ৬৫ ডলার| কোর্স ওয়ার্ক যতদুর মনে পড়ে মাস্টার প্রগ্রামে ৬০ ঘন্টা| ওর অ্যাডভাইসর ছিলেন Dr. Burton Blatt| ভদ্রলোক সেই সময় Special EDএ যথেস্ট বিখ্যাত ছিলেন| উনি রবার্ট কেনেডীর সংগে কাজ করে এদেশের অ্যাসাইলামে কি অবস্থা সেটা প্রকাশ করেছিলেন| ঐ ডিপার্টমেন্টের চেয়ার আর এক জন ছিলেন| তিনি Dr. Blatt কে পছন্দ করতেন না| ১৯৭৪ সালে ও সব কোর্স ওয়ার্ক শেষ করে| সব শেষে ভাইবাতে তিনজন ছিলেন Dr. Blatt‚ ঐ চেয়ার আর একজন অন্য ইউনিভার্সিটি থেকে| দুবার ও ভাইবা নিল| দু বারই Dr. Blatt এবং অন্য জন ওকে পাস করাল| চেয়ার দুবারই না করল| সমস্ত পয়্সা গেল| চেয়ার পরে ওকে জিজ্ঞেশ করেছিলেন তুমি কেন ব্ল্যাট কে অ্যাডভাইসর করেছ আমাকে না করে? ও বলেছে আমি কাউকে চিনতাম না| Dr. Blatt আমার সংগে প্রথম কথা বলেন এব্ং উনি বলেন যে উনি অ্যাডভাইসর হবেন| আমি কিছুই জানিনা একানে কি প্রসেস| চেয়ার বললেন তুমি গ্র্যাজুএট করতে পারবেনা এখান থেকে| তার চেয়ে তুমি গোটা দুয়েক এজুকেশনের কোর্স নিয়ে টিচার হয়ে যাও| ঐ ভদ্রলোক কিন্তু পরে ওকে সাহার্য্য করেছেন কাজ পেতে| ঐ সময় থেকে ওর Special ED এ টিচারের কাজ আরাম্ভ হল| ১৯৭৩ সালে Oil embargo হয়| নিক্সন তখন প্রেসিদেন্ট| সেই সময় সারা ইউ এস এতে ৫% বেশী কাউকে মাইনে বাড়াতে পারবেনা বলে ডিক্রি দেওয়া হয়েছিল| আমাদের সবাইকার ঐ ৫% মাইনে বেড়েছে| বছারের মাজামাঝি আমাকে ঐ Alan ডাকল ওর অফিসে| আমার অনেক কাজের প্রশংসা করল| বলল এই রেকগনিশনটা শুধু মাত্র পয়সা দিয়ে হয়না| আমি ওকে বললাম এক কাজ করোনা তুমি তোমার মাইনের ২০/৩০% কমিয়ে সেই টাকাটা অন্য দের মধ্যে দিয়ে দাও যদি পয়্সাট কিছু না হয়| তখন সে অন্য কথায় চলে গেল| যাই হোক বলল তুমি জান এখন আমর ৫%এর বেশী মাইনে বাড়াতে পারবনা তবে আমরা একটা পথ পেয়েছি তাতে তোমার মাইনে কিছুটা বাড়াতে পারব| আমি থ্যান্কস জানিয়ে নিজের চেয়ারে ফিরে এলাম| আমাদের ডিপার্টমেন্টের যে হেড সে তখন আমায় ডাকল| জিজ্ঞেশ করল Are you haapy? আমি বললম হ্যাঁ কিন্তু হটাৎ এইটের কারন বুজছিনা| বলল ডিপার্টমেন্টে একতা রিউমার চলছে কেউ অন্য জায়গায় কাজ নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে| তা আমরা ভেবে দেখলাম তুমি ছাড়া অন্য কেউ এই বাজারে কাজ পাবে না| আমরা চাইনা তুমি কোথাও যাও| আমি বললাম আমি কোন কাজের চেষ্টা করছিনা অন্য একজন করছে| তখন সে বলল ও Second Hand গাড়ী বিক্রির করার কাজ পাবে না| যাই হোক‚ যে হেতু ওর কলেজ জীবন শেষ হয়েছে আমরা একটা বাড়ীর একতলায় ভাড়া নিয়ে উঠে এলাম| রাস্তা থেকে বাড়ীটা বেশ উঁচু| ড্রাইভওয়ে টা খাড়াই| শীত কালে ঐ ড্রাইভ ওয়েতে ওঠা খুব শক্ত আর যদি বরফ পড়ে তবে রাস্তা পরিস্কার করতে এসে সেই বরফ দ্রাইভ ওয়ের সামনে স্তুপ হয়ে যায়| তাকে না ভেংগে গাড়ী তোলা যায়না| শীত কালে রাস্তার একদিক থেকে খুব জোরে এসে ড্রাইভ ওয়ে তে উঠতে হত| এই বাড়ীটা এক ৯০ বছর বয়সের এক ভদ্রমহিলার ছিল| উনি আমাদের পরিচয় দিতেন এরা আমার টেনান্ট| আর আমাদের ছেলে মেয়েদে বলতেন এরা আমার Grand Children. ১৯৭৩/৭৪ সালে আমার মনে নেই ঠিক কোন সালে কলকাতায় গেলাম| তখন কলকাতায় একটি Consulting Engineering Farm ছিল নাম Development Consultants| ঐখানে আমার এক কাকা বোধ হয় Chief Financial Officer ছিলেন তঁকে ধরে ঐ ওফিসে গেলাম জানতে আমার কি ভবিষ্যৎ| ঐ অফিস প্রথম কলকাতয় সারা বাড়ী A/C করে সেই সময়| বাড়ী টা হচ্ছে Indian Oil Companyর অফিস| আমি ওদের Mechanical Dept. এর হেডের সংগে কথা বললাম| ভদ্রলোক সব শুনে বললেন আপনি ফিরবেন না| আমাদের এই অভিজ্ঞতার কোন দরকার নেই| এখন আমরা ফ্রেস গ্র্যজুএট কে মাসে ৫০০ টাকা মাইনে দিয়| তারা বলে দেয় বাড়ীর কি লোড| কন্ট্র্যাকটর ডিজাইন আর ইন্স্টল করে| আর আপনি এই মাইনেতে মনে হয়না আসবেন| তখন দিল্লিতে Under Seretary রা মাসে ২৫০০ টাকা মাইনে পেত| তারা Window A/C পেত| আমার ভারতে আসার সম্ভাবনা শেষ হল| ১৯৭৬ সালে ফের্ব্রুয়ারী মাসে আমাদের ছেলে হয়েছে| যেদিন ছেলে হয়েছে সেই দিনে আমার স্ত্রী ঐ ড্রাইভ ওয়ে শোভেল করে দুটো টায়ার ট্র্যাক করেছে| আমি যে কম্পানিতে কাজ করতাম সেখানে স্ত্রাকচারটা এমন ছিল কোথাও ওপরে যাবার পথ ছিল না| মোট মুটি একই যায়্গায় আছি| মাইনে হয়্ত বারছে বছর বছর কিন্তু কোন চ্যালেন্জ নেই| আমি একটু অসহিষ্ঞু হয়ে উঠেছি| সিরাকিউসে থাকাকালীন বহু ছেলে মেয়ে আমাদের বাড়ীর দিয়ে গেছে| ঐখানেই প্রথম একজন আমাদের মেয়ে হয়| মেয়েটি সিরাকিউস উনিভর্সিটিতে পড়াত| মেয়েটি বংগালী| আর বিয়ে করল একটি সাউথ ইন্ডিয়ান ছেলে কে| আমি বিয়েতে তাকে সম্প্রদান করলাম| ঐ সময় একটি বাংগালী ময়ে সিরাকিউসে পড়তে আসে Photo Journalism| কয়েক মাস পড়ে সে তার বয় ফ্রেন্ড এর বিরহ সহ্য করতে পারলনা| পড়া শুন ছেড়ে দিল| ঐ মেয়েটি আমদের বাড়ীতে মাস দুয়েক ছিল| ঐ সময় কিছু দোকানে কিছু কিনলে Green Stamp দিত| ঐ স্ট্যাম্প গুলো বইতে আটকে রেখে তারপর বিভিন্ন জিনিশ কেনার জন্য ব্যবহার করা যেত| তা আমদের গোট পনেরর মত বই হয়েছিল| মেয়ের কিছু ভাললাগার জিনিশ কেনার জন্য ঐগুলো জমান হচ্ছিল| বাড়ীতে আবার একটা খামে কিছু টাকা Emerhencyর জন্য রাখা থাকত| মেয়েটি যাবার আগে ঐ আমাদের নতুন পাওয়া মেয়েকে ব্ললল ও কিছু জিনিশ পত্র কিনতে চায়| আমাদের মেয়ে যদি ওকে রাইড দেয়| সে জিনিশ পত্র কিনে দেশে চলে গেল| আমাদের মেয়ে একদিন আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেশ করল তুমি কেন তোমার Green Stampএর বই গুলো ওকে দিয়েছ? ওদের যথেশ্ট পয়সা| আমার স্ত্রী বলল আমি ওকে কিছু দিয়নি| খালি দেখেছিল আমকে ঐ Stamp গুলো লাগাতে আর জিজ্ঞেশ করেছিল কি করি ঐ Stamp এ| ও দ্রয়ার খুলে দেখে সব বই ঐ মেয়েটি নিয়েছে| তার সংগে আমাদের emergency টাকা নিয়েছে| আমার একটা ফোলডিং ছাতা ছিল জার্মানি থেকে আনা| ঐ মেয়েটি চেয়েছিল ঐ ছাতা ওর বয় ফ্রেন্ডের জন্য কিনবে| তখন ঐ ধরনের ছাতা এ দেশে পাওয়া যেত না| ছাতাতে একটি গর্ত্ত ছিল| সেই ছাতাটাও ও নিয়ে গেছে| তবে বলব খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে ভাল অভিজ্ঞতা বেশী| ১৯৭৭ সালে লোকাল একটা কাগজে বিজ্ঞাপন| Wilson, NC তে একটা কোম্পানি লোক খুঁজছে| অ্যাপ্লাই করলাম| বলল তুমি তোমার সব পরিবার নিয়ে এস ইন্টার্ভিএউ দেবার জন্য| উইলসন একটা ছোটো সহর| হাজার দশেকের মত লোক থাকে| উইলসন তখন বিখ্যাত ছিল তার কারন পৃথিবীর সব চেয়ে বড় টোব্যাকো অকসন হত| ইনটারভিউ দিতে এলাম ফেব্রুআরি মাসে| সিরাকিউস তখন বরফে ঢাকা| উইলসনে তখন ফুল ফুটছে| ওখানে নেবেই গিন্নি বলল যদি মাইনে পত্তর ঠিক থাকে এখানে কাজ নিয়ে নাও| ভাল করে গাছ করা যাবে| কাজ হয়ে গেল| আমি যখন সিরাকিউসের অফিসের বড় ভাইকে বললাম আমার কাজ বদলানর কথা| ও বলল সাউথে যাবার আগে একটু ভেবে নাও| আমি World War IIর সময় সাউথে ছিলাম| আমি দেখেছি সাদা কালর বিভাদ| আমরা দিন কয়ক ওখানে ছিলাম কিন্তু কিছু বোধ করিনি বা দেখিনি| কিন্তু এই সাউথে আসাটা আমাদের ছেলে মেয়ের ওপর খুব খারাপ ভাবে এসেছে| এই না জেনে এখানে আসাটা ওদের প্রতি খুব অন্যায় হয়েছে| আমরা কোন দিন Discrimineshan বোধ করিনি টরন্টো বা সিরাকিউসে থাকার সময়| আমি যদি আমার ছেলে মেয়ের প্রতি কোন অন্যায় করে থাকি তবে এই সাউথে আসা| না জানার দোষ| ঐ সময় এই discrimineshan ছিল জলের তলায়| যতক্ষন না জলে নাবছি ততক্ষন পাঁকের স্পর্শ পাবনা|

972

14

মনোজ ভট্টাচার্য

এক পরিবর্তিত শরীর !

এক পরিবর্তিত শরীর ! তামানি চিত্র প্রদর্শনীর আজ জোর কদমে এগিয়ে চলেছে । ঘরের মধ্যে খুব মৃদু আলো জ্বলছে । কেবলমাত্র রিয়েলিস্টিক ছবিগুলোর ওপরেই উজ্জল আলো রাখা হয়েছে । নানান ধরনের দর্শক ও বোদ্ধা গ্যালারীর চারদিকে ঘুরে ঘুরে চিত্রগুলো দেখছে। কেউ বা হাতের কার্যসুচিতে কোনও নতুন শিল্পীর কাজের বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছে । চুমকি লাহিড়ী তার প্রোগ্রামটা হাতে ধরে আছে । হল ঘরের ঠিক মধ্যিখানে একটা ক্রোমের ফ্রেমের কাচের মধ্যে রাখা তারই একটা মোমের মতো মানুষের মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি রাখা আছে । অনেকেই সেই প্রতিকৃতির প্রশংসা করছে । চুমকি লাহিড়ী কিন্তু দেখতে পাচ্ছে সেই ক্রোমের ফ্রেমের মধ্যে থেকে - মুকুলের বিবর্ণ চোখ দুটো তার দিকেই নিবদ্ধ । ওর ঢেউ খেলানো স্বর্ণাভ চুলের কুচি সাদা চুলের সঙ্গে মিশে মৃদু মৃদু হাওয়ায় যেন উড়ছে । ওর মুখের নিচের পাতলা ঠোঁট এমন ভঙ্গিতে বেঁকে রয়েছে যেন চুমকি লাহিড়ীর শৈল্পিক প্রতিভাকে বিদ্রুপ করছে । - এটা ভাবলেই তার এখন মাথায় আগুন জ্বলছে ও নিজের প্রতি ঘেন্না করছে - এই ধরনের একটা অনুগৃহীত ও দায়িত্বহীন মানুষের সঙ্গে – দু সপ্তাহ আগে পর্যন্ত সে কাটিয়েছে । একদিন রাতে নৈশ আহারের পর – টি ভিতে সিরিয়াল দেখার পরেই মুকুল চাপে পড়ে স্বীকার করলো – সে - চুমকির প্রিয় বান্ধবী ভানুপ্রিয়ার সঙ্গে প্রেম করছে ! এত স্পর্ধা ওর ! - আমার কথা ভুলেই গেল ! ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে এও শুনেছে ভানুর সঙ্গে কোথায় কোথায় বাইরে গেছেও । সে তো ভেবেছিল মুকুল অফিশের কাজেই বাইরে গেছে । এইরকম একটা মেরুদণ্ডহীন কীটকে খুন করতে খুব একটা বিবেক দংশন হয় না। তার জন্যে মাংস কাটার ছুরিটাই যথেষ্ট ছিল । ঠিক হৃদপিণ্ডের উল্টোদিকে পিঠেই ছুরিটা গেঁথে বসিয়েছিল । - তারপর গরম ইস্ত্রী দিয়ে ক্ষতস্থানের ওপর সমান করে – তার ওপর সংরক্ষণ–লোশন দিয়ে দেওয়া ।- ব্যস ! একেবারে মধ্যযুগীয় মুখোশের প্রতিচ্ছবি ও দেহাবশেষের পুনর্ব্যবহার - এই প্রদর্শনীতে বেশ ভালভাবেই মানিয়ে গেছে ! এখন তো সবাই মূর্তিটার প্রশংসাও করছে ! ( এই গল্পটা এডগার এলান পোএর লেখা কিনা ঠিক বলতে পারবো না । আমি যেসব গল্প পড়েছি – তার মধ্যে এটা নেই । কিন্তু গল্পটার মধ্যে পোএর প্রভাব স্পষ্ট !) মনোজ

772

2

মনোজ ভট্টাচার্য

সপ্ত ডিঙা মধুকর !

সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর অরিন্দম সান্যাল আজ ভোরবেলায় একটা স্বপ্ন দেখলেন ! আর স্বপ্নের বিষয়টাও তার এখনো মনে আছে । পঁচিশ বছর আগেকার বেশ কিছু অনুজ বন্ধু তার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে । কেউ এসেছে লন্ডন থেকে, কেউ এসেছে ঢাকা থেকে, কেউ কানাডা থেকে আবার কেউ এসেছে টেক্সাস থেকে ! এরা সবাই বাংলাদেশের ছেলে । স্বাধীন বাংলাদেশের ডামাডোলের জেরে - জার্মানি থেকে এখানে এসেছিল স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে । তারপর অনেকদিন বেআইনি ভাবে এখানে থেকেছে ! তারপর একসময় গ্রীন কার্ড পেয়ে দেশে গিয়ে বিয়ে করে - বউ নিয়ে এসেছে ! ক্রমশ সন্তানাদি হয়ে - সংসারের আবর্তে ঢুকে গেছে । স্বাভাবিক কারনেই পরস্পরের থেকে দুরে চলে গেছে । দেখা-সাক্ষাত হয় না - মাঝে মাঝে অবশ্য ফোনা -ফুনি হয় ! সে সময় যখন একসাথে হত - তখন সাহিত্য-সঙ্গীত রাজনীতি নিয়ে আলোচনা সভা হত । রাজনীতি বেশির ভাগ বাংলাদেশের - কারণ ওরা সবাই বাংলাদেশের ছেলে । কিন্তু সাহিত্য হত কলকাতার - কারণ ওদের কাছে কলকাতাই হচ্ছে - বাংলা সংস্কৃতির স্বপ্ন ! আর অরিন্দম যেহেতু আধুনিক কবিতা লিখত , তাই ওদের কাছে একটু সম্ভ্রম পেত ! - তা সেসব অনেকদিন আগেকার কথা ! আজ ভোরের স্বপ্নের মধ্যে ওরা এসেছে ওর বাড়ি - আর ওকে কেন্দ্রীভূত করে আলোচনা হচ্ছে ! যদিও এখন কেউই আর সাহিত্য করেনা - তবু আলোচনা চলতে বাধা কোথায় ! তার সঙ্গে আগেকার দিনের কথা ! সভা হয়ে যাবার পর অরিন্দমের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো : ওরা হয়ত ধরেই নিয়েছে - তুমি সত্যি সত্যি 'সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর' লিখছ ! 'সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর ' - খুব অবাক হয়ে অরিন্দম বলল : - সেটা কী ?' সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর - স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবার পরও অনেক ক্ষন ধরে ভাবলো - কথাটা শুনেছে সে শ্যামল মিত্রের গানে ! সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর দিযাটি ভাসায়ে - ! কিন্তু সাতটা ডিঙ্গায় ভেসে ভেসে মধু আনতে যাবে নাকি সে ! তার মানেটাই কি ! সাতটা ডিঙ্গা - নাকি সাতটা সমুদ্র ! উত্তর মেলে না ! (এই লেখাটা অনেকদিন আগে একবার দিয়েছিলাম মজলিশে ! ) মনোজ

2149

6

দীপঙ্কর বসু

অধ্যাপক ও পাগল

অবশেষে ১৮৯৬ সালের এক হিমশীতল কুয়াশাচ্ছন্ন দুপুরে স্বয়ং ডঃ জেমস মারে কেই আসতে হল বার্কশায়ারের ক্রোথর্ণ গ্রামে আসতে । জনৈক ডঃ ডবলিউ সি মাইনরের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে । বড়ই বিচিত্র চরিত্রের মানুষ এই ডঃ মাইনর । প্রায় বিশবছর যাবত ডঃ মারের সঙ্গে পত্রবিনিময় মাধ্যমে Oxford English Dictionary , ইংরেজি ভাষার একটি আধুনিক নির্ভরযোগ্য অভিধান রচনার নানান খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন । এই বিশাল কর্ম যজ্ঞে আরো কয়েক হাজার বিশিষ্ট ভাষাবিদদের সহায়তা ছাড়াও বিভিন্ন ইংরেজি শব্দের অর্থ ,তার উচ্চারণভঙ্গী ,বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন জায়গায় সেই শব্দে্র প্রয়োগরীতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে ডঃ মাইনরের অভিমতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন Oxford English Dictionary র সম্পাদক ডঃ মারে এবং সেই কারণেই বহুবার পত্রবন্ধু ডঃ মাইনরের সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছেন মাইনরকে ,একবারের জন্য অক্সফোর্ডে আসতে । কিন্তু কিছুতেই রাজি করান যায়নি ডঃ মাইনরকে । বার্কশায়ারের ক্রোথর্ণ ছেড়ে এক আধ দিনের জন্য অক্সফোর্ডে আসতে ডঃ মাইনরের অনীহা বা অপারগতার পিছনে কি কারণ থাকতে পারে বোঝা অসাধ্য ছিল ডঃ মারের । বস্তুত ডঃ মাইনরও অক্সফোর্ডে যেতে এবং ডঃ মারের সঙ্গে সাক্ষাতে তাঁর অনীহা অথবা অপারগতার জন্য কোন কারণ দর্শানর প্রয়োজন বোধ করেননি কখনই । কাজেই পর্বতকেই শেষে আসতে হল মোহম্মদের কাছে । ডঃ মারে অক্সফোর্ডে তাঁর গুরুদায়িত্বের বোঝা সাময়িক ভাবে নামিয়ে রেখে ট্রেনে চেপে অক্সফোর্ড থেকে ক্রোথর্ণ স্টেশন ,যেটি সেকালে ওয়েলিংটন কলেজ স্টেশন নামেই পরিচিত ছিল ,এসে নামলেন । অক্সফোর্ড থেকে রওয়ানা হবার আগে তার মারফৎ সাক্ষাতের দিনক্ষণ সবই ঠিক করে নিয়েছিলেন । স্টেশনে ডঃ মারের জন্য অপেক্ষা করছিল কোচয়ান সহ ঝকঝকে একটি ল্যান্ডো গাড়ি । অতিথীকে নিয়ে বার্কশায়ারের গ্রাম্য পথ দিয়ে ল্যান্ডো মিনিট কুড়ি চলার পর পপলার গাছের ছায়া ঢাকা পথ মাড়িয়ে এসে পৌঁছল একটি সুবিশাল লাল রঙের প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে। ডঃ মারেকে নিয়ে ল্যান্ডো গাড়ি দ্বারে এসে থামার সঙ্গে সঙ্গেই এক ভৃত্য অত্যন্ত গম্ভীর মুখে অতিথীকে নিয়ে হাজির করল দোতলার ঘরে । ঘরটির দেওয়াল জোড়া আলমারি ভর্তি বই তার মাঝে এক বিশাল মেহগনী কাঠের টেবিলের ওপাশে এক প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পুরুষে উঠে দাঁড়িয়ে ডঃ মারেকে অভ্যর্থনা জানালেন । প্রত্যুত্তরে ডঃ মারে ও সামনের দিকে ঝুঁকে অভিবাদন জানিয়ে দীর্ঘদিনের সহযোগী - না দেখা বন্ধুর সঙ্গে প্রাথমিক আলাপন এর যে বয়ান আসার পথে সযত্নে মুখস্ত করতে করতে এসেছেন তাই আবৃতি করতে শুরু করলেন – “ গূড আফটারনুন মহাশয় । আমি লন্ডনের ফিলোলজিক্যাল সোসাইটি ও অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির সম্পাদক ডঃ জেমস মারে। আপনি নিশ্চয় আমার দীর্ঘদিনের সহযোগী বন্ধু ডঃ ডবলিউ সি মাইনর”। ডঃ মারের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাতই ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত অস্বোয়াস্তিকর নিস্তব্ধতা নেমে এল । দেওয়াল ঘড়িটার টিক টিক শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই । কিছুক্ষণ পরেই কোথাও একটা দরজা খোলার আওয়াজ হল – মণে হল কেউ যেন অত্যন্ত ধীর পদে হেঁটে আসছে এদিকেই । বেশ কিছুক্ষণ থমকে থাকার পর নীরবতা ভঙ্গ করলেন টেবিলের ও প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি । বিব্রত ভাবটা কাটাতে গলাটা পরিস্কার করে নিয়ে গম্ভীর গলায় তিনি জবাব দেন –“আপনাকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমি জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে এই ভবনটি Broadmoor Criminal Lunatic asylum এর । আমি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ । ডঃ মাইনর অবশ্যই এখানে থাকেন কিন্তু তিনি মানসিক অসুস্থতার কারণে বিগত কুড়ি বছরেরও অধিক সময় ধরে এখানে অন্তরীন রয়েছেন”। । জর্জ মেরেট্ট এর হত্যা আর পাঁচটা দিনের মত জর্জ মেরেট্ট যখন সেদিন রাত থাকতেই বেরিয়ে পড়েছিল রেড লায়ন ব্রিউয়ারিজ এ মর্নিং শিফটের কাজে যোগ দেবার জন্য । ঘুমজড়ানো চোখে স্বামীকে বিদায় জানাবার সময়ে শ্রীমতী মেরেট্ট স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে তার স্বামী শেষ বারের মত বাড়ি থেকে বের হলেন - কাজের শেষে ক্লান্ত দেহটাকে টানতে টানতে আর বাড়ি ফিরবেননা কোনদিনই। স্বল্পালোকিত নির্জন রাস্তা দিয়ে ধীর পদে কর্মস্থলের দিকে চলতে চলতে এক সময়ে জর্জের মনে হল কেউ যেন পিছন থেকে তাকে অনুসরণ করছে । একটা অজানা আশঙ্কায় জর্জের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল – নিজের অজান্তেই তার চলার গতি বেড়ে গেল আর তখনই তার কানে এল পিছন থেকে কেউ যেন চেঁচিয়ে তাকে থামতে বলছে । হাঁটার গতি না কমিয়েই একবার পিছন দিকে ফিরে আধো অন্ধকারে দেখতে পেল একটা ছায়া মূর্তি তার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে । তার হাতে উদ্যত পিস্তল । আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে করতে এবার জর্জ দৌড়তে আরম্ভ করল । আর ঠিক সেই সময়ে পিছন থেকে ছুটে এল গুলি । প্রথম গুলিটি কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল ।তার পর উপর্যুপরি আরও দুটি গুলি তাকে লক্ষ্য করে ছুটে এল ,তার একটি এসে লাগল জর্জের মাথার পিছনে । রাস্তার ওপরে লুটিয়ে পড়ল জর্জ। গুলির শব্দে চমকে উঠেছিল রাতের টহলদারি ডিউটিতে থাকা হেনরি ট্যারেন্ট । ওয়েস্টমিনিস্টারের বিপরিতে টেমস নদীর অপর পারের ল্যাম্বেথ মার্স এলাকাটির য়াইনশৃঙ্খলার ব্যপারের খুব একটা সুনাম যদিও ছিলনা কোনকালেই । খুন রাহাজানি র মত ঘটনা খুব একটা অপরিচীত ঘটনা ছিলনা । তবু এই এলাকায় মানুষ খুন করার জন্য কে কবে বন্দুকের ব্যবহার করেছে কেউ তা মনে করতে পারেনা। খুনের জন্যে বন্দুকের ব্যবহার তৎকালীন ব্রিটেনে এক রকম বর্জিত অস্ত্র বলেই গন্য হত । কারণটা আর কিছুই না – একে তো বন্দুক মহার্ঘ বস্তু ,ব্যবহার করাও ঝামেলার আর সব চেয়ে বড় অসুবিধে হল বন্দুককে লুকিয়ে রাখা সহজ হয়না । বোধ হয় এই সব কারণেই বহুদিন যাবত বন্দুক নামক অস্ত্রের ব্যবহার ব্রিটেনের অপরাধী মহলে “অব্রিটিশ সুলভ আচরণ” বলেই গণ্য হত । গুলির শব্দে চমকে উঠলেও ট্যারেন্ট প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাছেপিঠে আরো যে সব রাতের টহলদারি পুলিশ কর্মী ছিল তাদের সতর্ক করে দেবার উদ্দেশ্যে তার হুইসিল জোরে বাজিয়ে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল ঘটনাস্থলের দিকে । গুলির শব্দ কানে গিয়েছিল অপর এক পুলিশ কর্মী বার্টনের ও । সে ট্যারেন্টের আগেই পৌঁছে যায় ঘটনাস্থলে । হুইসিলের আওয়াজে সচকিত হয়ে ছুটে আসে উইলিয়াম ওয়ার্ড ও । রাস্তার ওপরে যেখানে জর্জ পড়েছিল সে জায়গাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল । ট্যারেন্ট ও বার্টন যতক্ষনে একটা ট্যাক্সি ডেকে জর্জের দেহটাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাবার উদ্যোগ করছিল ততক্ষণে ওয়ার্ড আততায়ীকে বন্দী করে ফেলে । অবশ্য আততায়ীকে ধরতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি ওয়ার্ডকে । লম্বা সুবেশ ,কিছুটা গোঁয়ার ধরণের লোকটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল অকুস্থলেই ।তার হাতে ধরা পিস্তলের নল দিয়ে তখনও ধোঁয়া বের হচ্ছিল । “এই লোকটিকে কে গুলি করল”? মাটিতে পড়ে থাকা জর্জকে দেখিয়ে ওয়ার্ড প্রশ্ন করে লোকটিকে । লোকটির সংক্ষিপ্ত জবাব আসে – “আমি” । ওয়ার্ড এবার প্রশ্ন করে “তুমি জান কাকে তুমি গুলি করলে”? আততায়ী এবার খেঁকিয়ে ওঠে “দেখতে পাচ্ছনা ওটা একটা মদ্দ! তুমি কি ভাব আমি কাপুরুষের মত কোন মেয়েমানুষকে গুলি করব”? ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে একটু একটু করে কৌতূহলী জনতার ভীড় হয়ে যাচ্ছে দেখে ওয়ার্ড দ্রুত আততায়ীকে নিয়ে কাছাকাছি টাওয়ার স্ট্রীট থানায় নিয়ে চলল । থানার দিকে যেতে যেতে কিছুটা অন্তরঙ্গভাবে ওয়ার্ড আততায়ীর কাঁধে একটা হাত রেখে বলে চলে “তুমি বোধহয় অন্যকারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে এই লোকটিকে গুলি করেছ । কিম্বা হয়তো এই লোকটি তোমার ঘরে অনধিকার প্রবেশ করেছিল কোন বদমতলব নিয়ে আর তুমি নিতান্ত আত্মরক্ষার তাগিদেই লোকটিকে তাড়া করে গুলি করে মেরেছ! সেটা অবশ্য অন্যায় কিছু নয়”। “ওহে বাপু ,আমাকে ওসব বুঝিয়ে লাভ নেই। তুমি কিন্তু এখনও আমাকে সার্চ করনি । তুমি কি করে নিশ্চিত হলে যে আমার কাছে আর একটা বন্দুক নেই ,তা দিয়ে আমি তোমাকেও গুলি করে খুন করতে পারি”। ওয়ার্ড সহাস্যে জবাব দেয় “আপাততঃ তোমার কাছে যদি আর একটা বন্দুক থেকেও থাকে তবে সেটাকে তুমি পকেটেই রেখে দাও । পকেট থেকে বের করাও চেষ্টা কোরনা ভুলেও । আর সার্চ টার্চ যা করার সে সব থানাতে গিয়েই হবে । আপততঃ লক্ষীছেলের মত থানায় চল দেখি” < ৩।থানায় জেরার পর্ব জর্জের আততায়ীর দেহ তল্লাসীতে অবশ্য কোন বন্দুক পাওয়া গেল না । যা পাওয়া গেল তা হল চামড়ার খাপে বন্ধ একটা শিকার ছুরি । “ওটা একটা সারজিক্যাল ছুরি । ছুরিটাকে অবশ্য সব সময়ে কাছে রাখিনা...” প্রাথমিক জেরায় জানা গেল বন্দী আততায়ীর নাম উইলিয়াম চেস্টার মাইনর । সাঁইতিরিশ বছর বয়স - পেশায় চিকিৎসক এবং জেরার সময় ওয়ার্ডের প্রাথমিক অনুমানি সঠিক বলে প্রমানিত হল । ডঃ মাইনর আমেরিকার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার – বছর খানেক আগে সে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে প্রথমে লন্ডন তার পর ইউরোপের নানান শহর ঘুরে , ল্যাম্বেথ অঞ্চলে এসে ৪১ নম্বর টেনিসন স্ট্রীটের একটি ঘর ভাড়া করে অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করছে । জেরার সময় পুলিশের তরফ থেকে প্রশ্ন করা হয় - “আপনাকে দেখে তো আর্থিক দিক দিয়ে মোটা্মুটি স্বচ্ছল বলেই মনে হচ্ছে ,তবে আপনি এই রকম একটা বস্তিতে পড়ে আছেন কেন ?” ডঃ মাইনরের সংক্ষিপ্ত জবাব –“ আমার এখানে থাকা বা কৃচ্ছসাধনের সঙ্গে আমার আর্থিক অবস্থার কোন যোগ নেই”। প্রশ্নঃ “তবে কি কারণে আপনি এই রকম অতি সাধারণ লোকের মত বসবাস করেন”? ডঃ মাইনর নীরব । বস্তুত পুলিশি জেরায় ডঃ মাইনরের কাছ থেকে আর কোন তথ্যই উদ্ধার করা সম্ভব হয়না থানায় । অগত্যা ডঃ মাইনরকে একজন শান্তিপ্রিয় সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিককে খুনের অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে নিয়ে যাওয়া হল হর্সমঙ্গার লেনের জেল এ। এবার তদন্তে নামল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ।যদিও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারাও কোন রকম সহযোগিতা পেলেননা ডঃ মাইনরের কাছ থেকে । তাদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তরে আগের মতই নীরব থেকেছেন । শুধু একবারই গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন যে মৃত ব্যক্তিটিকে তিনি চেনেন না ,তাকে তিনি নিতান্ত ভুলক্রমে গুলি করে হত্যা করেছেন । অগত্যা গোয়েন্দারা অন্যান্য সূত্র ধরে আসামীর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন । আর তখনই একটু একটু করে প্রকাশিত হল এক করুণ জীবনকথা । বছরখানেক আগে উইলিয়াম চেস্টার মাইনর এসেছিলেন ইংল্যান্ডে –মানসিক শান্তির সন্ধানে । উঠেছিলেন ওয়েস্ট এন্ড এর র্যাডলে হোটেল এ । ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বন্ধুর কাছ থেকে সুপারিশ পত্র সহ লন্ডনে দেখা করেছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী তথা আর্ট ক্রিটিক জন রাস্কিনের সঙ্গে । রাস্কিন তাঁকে পরামর্শ দেন ছবি আঁকার সরঞ্জাম যা আছে সব বাঁধা ছাঁদা করে ইউরোপের বড়বড় শহরগুলিতে ঘুরেও আসতে এবং মন দিয়ে জলরঙে ছবি এঁকে যেতে । জলরঙের চিত্রকলায় মাইনরের সহজাত দক্ষতা ছিল । কাজেই পোঁটলা পুঁটলি বেঁধে ট্রেনে চেপে মাইনর বেরিয়ে পড়েন ইউরোপ ভ্রমনে । গোয়েন্দাদের ধারণা ডঃ মাইনর ১৮৭১ সালের খৃষ্টমাসের পর পরই ইউরোপ ভ্রমনান্তে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে ডেরা গাড়েন ল্যাম্বেথ এ । তার মত এক সম্ভান্ত স্বচ্ছল ঘরের মানুষের পক্ষে বাসস্থান নির্বাচনটা সত্যিই বিষ্ময়কর । তবে পরবর্তী সময়ে ডঃ মাইনর গোয়েন্দাদের জেরার মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে ল্যাম্বেথ এর মত অপরাধপ্রবণ এবং সমাজের অত্যন্ত নীচু তলার মানুষ অধ্যুষিত এলাকায় বাসা বাঁধার পিছনে একটিই কারণ ছিল ,তা হল এখানে সহজে এবং সস্তায় মেয়েমানুষ মেলে ভোগের জন্য । আমেরিকার সামরিক বাহিনীর তরফ থেকেও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড কে ইতি মধ্যেই জানান হয়েছিল যে ডঃ মাইনরের যৌন লালসা ছিল দুর্দমনীয় এবং সেই কারণেই নিষিদ্ধপল্লীতে যাতায়াতের অভ্যাসটি বহুদিনের পুরনো । বিশেষত “গভর্নর্স আইল্যান্ডে” পোস্টিং এ থাকা কালে ছুটির দিন পেলেই ডঃ মাইনর ছুটতেন ম্যানহাটান অঞ্চলের কুখ্যাত পানশালা এবং নারীসংসর্গলিপ্সা চরিতার্থ করতে । সম্ভবতঃ এই সময়েই কোন এক যৌনকর্মী মহিলার সংসর্গে এসে গনোরিয়ার মত যৌন রোগ বাধিয়ে বসেন । ক্রমশঃ মাইনরের ঘরের তল্লাসী চালিয়ে কিন্তু এমন কিছু পাওয়া গেলনা যা তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলির দিকে কোন রকম আলোকপাত করতে পারে । মাইনরের ঘরে পাওয়া গেল একটি পোর্টম্যান্টো ,তার মধ্যে প্রচুর ক্যাশ টাকা , একটি সোনার ঘড়ি ও চেন ,কিছু পিস্তলের গুলি তার ডাক্তারি সার্টিফিকেট,আমেরিকান সৈন্যবাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োগপত্র ,এবং জলরঙে মাইনরের আঁকা কিছু ছবি ,যা দেখে বহু বিশেষজ্ঞদের মতে অতি উচ্চশ্রেণীর চিত্রকলা হিসেবে মান্যতা পাবার যোগ্য । মাইনরের ল্যান্ডলেডি ,শ্রীমতী ফিশারের কথায় ডঃ মাইনর ভাড়াটে হিসেবে খুবই ভালো লোক – যদিও মাঝে মাঝে তার কিছু কিছু আচরণ ছিল বিচিত্র রকমের – মাঝে মাঝে বেশ কয়েকদিনের জন্য হঠাত কোথায় চলে যেতেন । আবার তেমনি হঠাত ফিরে আসতেন আর বিভিন্ন হোটেলের বিল চতুর্দিকে এমনভাবে ছড়িয়ে রাখতেন যাতে সবাই সেগুলি দেখতে পায় ।” স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দাদের প্রশ্নের জবাবে শ্রীমতী ফিশার আরো বলেন “ ডঃ মাইনরকে সব সময়েই কেমন যেন অস্বাভাবিক রকমের চিন্তিত দেখাত- চাইতেন তার ঘরের সব আসবাব পত্র ঘর থেকে বার করে নিতে কারণ তার ভয় ছিল কেউ হয়ত সবার অজান্তে ঘরের মধ্যে ঢুকে আসবাবপত্রের পিছনে লুকিয়ে থাকতে পারে । বিশেষত ডঃ মাইনর আইরিশদের সম্পর্কে আতঙ্কিত হয়ে থাকতেন ,প্রায়ই তাঁর কাছে জানতে চাইতেন যে শ্রীমতী ফিশারের কোন আইরিশ কাজের লোক আছে কিনা – থাকলে অবিলম্বে তিনি যেন তাদের বরখাস্ত করেন । এমনকি ডঃ মাইনরের দাবি ছিল যে শ্রীমতী ফিশারের কাছে যদি কোন আইরিশ অতিথী আসেন অথবা কোন আইরিশ ব্যক্তিকে তিনি ঘর ভাড়া দেন তবে তা যেন ডঃ মাইনরকে অবশ্যই জানান হয় । যথা সময়ে জর্জ মেরেট্টের হত্যার মামলাটি আদালতে বিচারের জন্য তোলা হল । বহু লোকের সাক্ষ্য নেওয়া হল ,যেমন প্রথম সাক্ষী স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ই এক গোয়েন্দা,উইলিয়ামসন, আদালতকে জানান , মাস তিনেক আগে আসামী লন্ডনে তার দপ্তরে এসে অভিযোগ জানান যে ফেনিয়ান ব্রাদারহুড নামে আয়ারল্যান্ডের একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠনের কিছু লোকজন তাঁর ঘরের মধ্যে চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনেকদিন যাবত। তাদের উদ্দেশ্য মাইনরকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা। একবার তো খুব উত্তেজিত ভাবে মাইনর উইলিয়ামসনকে জানান কেউ তাঁকে বিষাক্ত কোন ওষুধ খাইয়ে হত্যা করে ঘটনাটাকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রমান করতে চায় !! ডঃ মাইনরের এই সব মনগড়া অভিযোগকে অবশ্য বিশেষ পাত্তাদেননি উইলিয়ামসন । নিছক ছিটগ্রস্থের ক্ষ্যাপামি বলেই উপেক্ষাই করে গেছেন । মামলার পরবর্তী সাক্ষী হয়ে এলেন লন্ডনের বেথেলহেম হাসপাতালের কর্মী , উইলিয়াম ডেনেস । বেথেলহেম হাসপাতালে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। আর পাঁচটা কাজের সঙ্গে ডেনেসের দায়িত্ব ছিল রাত্রে রোগীদের ওপরে কড়া নজর রাখা ,যাতে তারা কোন রকম বেয়াড়াপনা না করে আর কোন ভাবেই আত্মহত্যা না করে বসে । হর্সমঙ্গার লেন কারাগারে বন্দী ডঃ মাইনরের ওপরে বিশেষ নজরদারির জন্য এই ডেনেসকে আনা হয়েছিল বেথেলহেম হাসপাতাল থেকে । আদালতে সাক্ষী দিতে উঠে ডেনেস বলেন – “ধর্মাবতার ,ভারি আজব লোক এই আসামী । আমার গোটা চাকরি জীবনে ঢের ঢের পাগল দেখেছি ,তাদের ওপরে নজরদারি করেছি ,কিন্তু এই রকম উন্মাদ আর দুটি দেখিনি । প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইনি আমার ওপরে এই বলে চড়াও হতেন যে কেউ নাকি আমাকে ভাড়া করে এনেছে ওনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করার জন্য ! তার পর সেলের মধ্যেই এমন ভাবে থু থু করে ,যেন মুখের ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ফেলে দিতে চাইছে । আবার তার পর পরই খাট থেকে তড়াক করে লাফিয়ে নেমে এসে হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায় ঢুকে কাদের যেন খুঁজতে থাকে”!! ---------------------------- জর্জ মেরেট্টের হত্যাকান্ডের মামলায় শেষ সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির করা হল ডঃ মাইনরের সৎ ভাই জর্জ মাইনরকে । জর্জ মাইনরের বক্তব্য পেশ করার আগে বলে রাখা ভালো যে মানসিক অসুস্থতার কারণে ডঃ মাইনরকে আমেরিকার সৈন্য বাহিনী থেকে উপযুক্ত পেনশন ও আনুসঙ্গিক আরো অনেক সুবিধা সহ অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিল । সেনাবাহিনীর থেকে অবসর নিয়ে মাইনর ফিরে গিয়েছিলেন নিউ হ্যাভেনে তাঁর পারিবারিক বাসগৃহে । কিন্তু সেখানেও খুব শান্তিতে বসবাস করা হয়ে ওঠেনি মাইনরের । জর্জ মাইনরের সাক্ষ্যে সেই অশান্তির কথা বেরিয়ে আসে –“ নিউ হ্যাভেনের বাড়িতে উইলিয়ামের সঙ্গে বাস করাটা আমাদের কাছে একটা দুঃস্বপ্নের মত ছিল ধর্মাবতার । উইলিয়াম প্রতিদিন সকালে উঠে অশান্তি বাধাতেন । ওর ধারণা আমরা বাড়ির সকলে কিছু বদ লোকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাত্রে ওঁর ঘুমের সময়ে ওনাকে শারীরিক নিগ্রহ করার মতলব আঁটছি ,আর ওঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওঁকে বিষ মাখানো বিস্কুট খাইয়ে হত্যা করার চেষ্টা করছি !! মাঝে মাঝে আবার বিড়বিড় করে নিজের মনেই কি সব পাপ টাপের কথা বলে । নিজেকেই শুনিয়ে বলতে থাকে এই অশান্তি ,এই তীব্র মানসিক যন্ত্রনা, সবই তার কৃতকর্মের ফল। সেনাবাহিনীতে কাজ করার কালে নাকি তাকে ভয়ঙ্কর এক পাপকর্ম করতে বাধ্য করা হয়েছিল যার প্রতিফল হিসেবে তাকে এই রকম মানসিক চাপ নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে” । জর্জ মাইনরের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে উইলিয়াম মাইনর প্রায়শই বলতেন একমাত্র ইউরোপে চলে গিয়ে তার পেছনে লেগে থাকা শ্ত্রুদের হাত থেকে তিনি নিস্তার পাবেন এবং সেখানে গিয়ে তিনি নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াবেন , আর ছবি আঁকবেন এবং এই ভাবেই তিনি সংস্কৃতিবান ভদ্রলোক হিসেবে সমাজে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন । সেই তীব্র বাঁচার ইচ্ছে নিয়ে নিজের বলতে যা ছিল সে সব কিছু সঙ্গে নিয়ে উইলিয়াম চলে এসেছিলেন ইংল্যান্ডে । কিন্তু সুস্থ জীবন তাঁর ভাগ্যে ছিল না । তাই তো সেই অভিশপ্ত রাতে হঠাতই ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল উইলিয়াম মাইনরের । তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় তার মনে হয়েছিল যেন অন্ধকারের মধ্যে এক ছায়া মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে তার পায়ের দিকে বিছানার খুব কাছে । বালিশের তলায় হাত চলে যায় উইলিয়াম মাইনরের , অতি সন্তর্পণে বালিশের তলা থেকে বের করে আনেন পিস্তল । মাইনর কে পিস্তল বার করতে দেখে ছায়ামূর্তি পিছন ফিরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে ।তার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে দৌড়তে থাকে। লোকটিকে অনুসরণ করতে করতে মাইনর ও পিস্তল হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে দেখে একটি লোক দৌড়ে পালাচ্ছে । মাইনরের সন্দেহ থাকেনা যে এই সেই অনুপ্রবেশকারি ছায়ামূর্তি । সে সঙ্গে সঙ্গে হাঁক দিয়ে থামতে বলে এবং তার পরই মাইনর পিস্তল থেকে গুলি চালাতে শুরু করেন । প্রথম তিনটি গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও চতুর্থটি গিয়ে লাগে লোকটির মাথায় । রাস্তার ওপরে লুটিয়ে পড়ে লোকটি । কাছে গিয়ে মাইনর রাস্তার ওপরে পড়ে থাকা রক্তে ভেসে যাওয়া নিথর দেহটা দেখতে দেখতে যেন আস্বস্ত বোধ করে । লোকটি তারা আর কোন ক্ষতি করতে পারবেনা !! আমেরিকান কনসাল এর তরফ থেকে মাইনরের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল তিনি মক্কেলের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে আদালতের কাছে এই মর্মে আর্জি পেশ করেন যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা তাঁর মক্কেলের বাসা ভালো করে পরীক্ষা করে ইতিমধ্যেই আদালত কে জানিয়েছেন যে রাত্রে বাইরের কোন লোকের পক্ষে মাইনরের ঘরে কোনভাবেই প্রবেশ করা অসম্ভব । ঘুমের ঘোরে তাঁর মক্কেল তার শয্যাপার্শে যে ছায়ামূর্তি দেখেছেন তা নিতান্তই তার দুঃস্বপ্নেরই অন্তর্গত ।তাঁর মক্কেল ডঃ মাইনর বস্তুত উন্মাদ । যা বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দীতেই পরিস্কার বোঝা গেছে । অতয়েব জুরি র সদস্যবৃন্দ এবং মহামান্য বিচারপতি যেন তাঁর মক্কেলের মানসিক বিকারের কথাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিচার করেন । মামলার শুনানি যতই এগিয়েছে আদালত কক্ষে উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তির মন ততই বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল – আদালত কক্ষের আবহাওয়া ক্রমশই ভারি হয়ে এসেছিল এক কর্তব্যপরায়ণ ,দেশ প্রেমিক , বহু গুনের অধিকারী আমেরিকার অভিজাত পরিবারের এই সংবেদনশীল সন্তানকে এই করুণ পরিনতির দিকে এগিয়ে যেতে দেখে । মামলায় উপস্থিত জুরিরা অবশ্য সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যেহেতু ডঃ মাইনর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং হত্যাকান্ডটি ঘটার কালে তিনি কোন ভাবেই নিজের নিয়ন্ত্রনে ছিলেননা তাই তৎকালীন ব্রিটিশ আইন মোতাবেক তাকে আইনত নিরপরাধ ঘোষণা করলেও জর্জ মেরেট্টের মৃত্যুর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া গেলনা । মহামান্য বিচারক কাঠগড়ায় নির্বিকার চিত্তে বসে থাকা ডঃ মাইনরকে উদ্দেশ্য করে বিধান দেন – আপনাকে একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত জায়গায় রাখা হবে । এই রায়ের পর ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র দপ্তর স্থির করে যে ডঃ মাইনরের মানসিক অসুখের যে অবস্থা তাতে তাকে আজীবন বন্দীদশায় রাখাই মঙ্গল । সেই মত ডঃ মাইনরের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেল Broadmoor criminal lunatic asylam – ৭৪২ নম্বর আবাসিক হিসেবে ।

884

1

মনোজ ভট্টাচার্য

সাউথ সিটি মলের জমায়েত !

কিছু একটা লিখতে হবে ! সেই যে সাউথ সিটি মলে যাওয়া খাওয়া ছবি তোলা ইত্যাদি ইত্যাদি হল – তার একটা অভিব্যক্তি তো দেওয়া উচিৎ ! স্বতঃপ্রণোদিত কৃতজ্ঞতা না কি সব বলে যেন ! – খাবার তো সব হজম হয়ে গেছে ! তারপর ক্রমাগত বৃষ্টিতে শত ধৌত হয়ে গেছে ! সবার লেখা – ছবি দেওয়া শেষ ! স্মৃতি প্রায় ফেড আউট ! – আমারই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে লিখতে দেরি হয়ে গেল ! – সব কথা হল বলা – বাকি রয়ে কিছু বলিতে ! থাকি একদম উত্তরোত্তর কলকাতায় । আর ধেয়ে এলাম দক্ষিণ প্রান্তে । কি না - উমা আসবে । প্রায় হিমালয় থেকেই বলা যায় ! জেমস আসবেন – ক্যাঙ্গারুর দেশ থেকে। - আবার কানে এলো ফিসফিসানি – শিবাংশুবাবুও আসবেন ! এই তারকা সমন্বয় অবহেলা করি কি করে ! কিন্তু তার পরেও যে বিস্ময় ছিল – তা কিন্তু সত্যি জানতাম না ! সেটা আসছে পরে । আমি থাকতাম এক মফস্বল শহরে । মজলিশের দু-একজনের বেশি কাউকেই চিনি না! সোমাকে চিনেছি – একাডেমীতে গিয়ে , শঙ্খ ও রিনিকে চিনেছি কদিন আগে এখানে এসেই । আর মাঝে মাঝেই এনারা আড্ডা বসান – এখানে ওখানে সেখানে ! আমি শুধু পড়েই যেতাম মজলিশে – পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে ! আর মনে মনে আশা ছিল – একদিন আমিও এখানে হাজির হবই ! – একদিন আমিও আকাশে উড়তে শিখব – টাইপের ! অবশেষে একদিন সত্যিই এদের সঙ্গে একাসনে বসার সুযোগ এসে গেল । - তখনও কি জানি - মফঃস্বলের কুয়ো আর দক্ষিণ সিটি সেন্টারের এই পার্থক্য ! – দূরে থাকি বলেই সাত সকালে এখানে এসে গেছি । তখন থেকে মলের নীচের তলায় এক রান্নার বাসনওলাদের এত বিজ্ঞাপনের দাপট ! বাপ রে – সে কি বিজ্ঞাপনের প্রতিযোগিতা ! সবাইকেই প্রায় কিছু না কিছু জিতিয়ে বাড়ি পাঠাচ্ছে ! তার কি আওয়াজ ! আর এখন দিদির স্টাইলে মাইক হাতে ঘুরে ঘুরে চিৎকার ! – অনেককাল আগে প্রেমেন মিত্তির বলেছিলেন বটে – যে যত জোরে মিথ্যে কথা বলতে পারবে – সে তত বড় সেলসম্যান ! প্রিন্স আনোয়ার শাহ্‌ রোড বার কয়েক ঘুরে আসার পর সোমার দেখা । - এসেই বলল – উমা তো এসে গেছে ! – সে কী ! কোথায় ! হঠাৎ দেখি এক পাশ দিয়ে সাদা হাঁসের পিঠে একজন প্রায় ভেসে যাচ্ছে । সোমাই ল্যান্ড করালো তাকে । তবে যে ও লেখে উমা লক্ষ্মী – ওর তো হওয়া উচিৎ উমা সরস্বতী ! মানে সেই রকমই পোশাক । পুরা শ্বেতবসনা ! আমি তখন পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি – মফঃস্বলের গাঁইয়া – দেখি মুনমুনও উদিত হল । রিণিও এসে গেছে । ওনাকে চিনেছি আগের দিন – আমাকে ট্যাক্সি করে টালিগঞ্জ ষ্টেশনে নামিয়ে দিয়েছিলেন – পাছে রাস্তা হারিয়ে যাই ! হঠাৎ চোখে পড়ল – এক দাড়ি-মুখ রামকৃষ্ণ সস্ত্রীক – দেখেই চিনেছি চিনেছি তোমায় ! বুঝলাম এখন এখানে এই দাড়িই স্টাইল ! – একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি অপেক্ষায় –খাদ্য সচিবের আশায় । - গেটে খুব বেছে বেছে কাস্টম চেক হচ্ছে !- তারই মধ্যে সন্দেহভাজন ভেবে ব্যাগ চেক করল সিকিউরিটি । - শঙ্খের আবির্ভাব ! – ক্রমশ মালয়েশিয়া ফেরত সুদীপবাবু এলেন ! ওপরে চারতলায় এসে আমরা একবার বামে তো আবার ডাইনে গিয়ে চেয়ার জুড়ে জুড়ে যায়গা বাগানো হল ! সবার মধ্যে একটা চনমনে ভাব দেখে দেখি ক্যানবেরা থেকে ক্যাঙ্গারু ছাড়াই সস্ত্রীক-জেমস স্যর – কারন মাথায় টুপি – এসে হাজির । কি সব দন্তরুচি কৌমুদীকর ঘটনা ! – তারপরই আরম্ভ হল ক্যামেরার শট নেওয়া ! শিবাংশুবাবুর দেখলাম বেশ কামান কামান চেহারার ক্যামেরা ! বেশির ভাগই আই প্যাড - স্লেটের মতো – যাতে কেউ না বাদ পড়ে ! – আমারও অবশ্য ছোটো মতন একটা – লুকিয়েও নেওয়া যায় – ছবি ওঠে কি না ওঠে ! – তাও তো আমাদের ক্যামেরাম্যান দীপঙ্করবাবু – আদরের বাবিদা – নিউ জার্সি থেকে যাত্রা করে উঠতে পারেন নি ! তাহলে ফেশবুকে যায়গা হত না আমাদের ! একটা সত্যি কথা কনফেশ করছি ! - শঙ্খ বারবার মাংস বিরিয়ানি দিয়ে যাচ্ছে – সবাই কেউ কাউকে কিছু বলেই যাচ্ছে - ! আর – আর কেউ কেউ আবার উমার বিদেশী গাল টিপেই যাচ্ছে ! এই সব চমকপ্রদ ঘটমান পরিস্থিতির মধ্যেও - গাঁইয়া আমি কিন্তু নীচের ঐ বিজ্ঞাপনী চিৎকার শুনতে শুনতে দিশেহারা – বধির ! – এক পক্ষে ভালই হয়েছে – কে বা কারা দরদাম করছে বা দাম দিচ্ছে – এসব শুনতে হয়নি । - আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজে দরকার কি ! - খেয়েছি অনেক কিছুই – ছ রকম রেসিপির মাংস প্লাস বিরিয়ানি ! সে সব – শব্দকল্পদ্রুম সহযোগে পেটে চলে গেছে ! – খাওয়া যখন শেষ – ঠিক তখনই আবির্ভাব হল গালিভার ইন দ্য ল্যান্ড অব মজলিশ – অধীশজী – সস্ত্রীক ! – ওনার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিলো বটে – তখন কি এত লম্বা ছিলেন ! সেটা কাল্টিভেট করা উচিৎ ! – আমার ক্যামেরার ফ্রেমে ওনার মাথা থেকে পা পর্যন্ত এলই না ! অগত্যা ওপরের দিকটাই তুলি ! খাওয়া দাওয়ার পরেও আবার ফটো তোলার সীজন থ্রী চলতে লাগল ! – এভাবেই আমার বোধ হল – আমরা পরস্পরের অদেখা সম্পর্ককে ধরে রাখার জন্যেই পড়ি মরি করে - এত ছবি তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ! – শেষ পর্যন্ত কম্পিউটারে এই ছবিগুলিই তো স্মৃতি হয়ে থাকবে ! কলকাতার এই আড্ডাটাই আমি মিস করি – মলের বাইরে দাঁড়িয়ে – পানের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে - উমার এই মন্তব্য – আমিও যে কত অনুভব করতে পারি ! রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দিতে ভাঁড়ে চা খাওয়া বা ফুচকা-চাট ইত্যাদি খাওয়া – মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থেকে ভিড়, মানুষজন – কথা বলতে বলতে চলা ও এখন এক হাতে সেল-ফোন কানে চেপে রাস্তা চলা – ধাক্কা ! সব কিছু নিয়ে কলকাতার এই ব্যাপ্তি – এর কোন বিকল্প হতে পারে কি ! সিটি মলের এই জমায়েত – নামেই মজলিশের – আসলে এটা তো আমাদের আত্মার আত্মিকতার মিলন ! আমাদের হারানো কলকাতার স্মৃতির পুনরুদ্ধার ! বড্ড বেশি বলে ফেললাম নাকি ! মনোজ

924

7

জল

আমার কথা যা আগে বলিনি

আজ যে লেখাটা আমি দিচ্ছি তার আগে নিচের ভুমিকাটা আবশ্যক| মজলিশের পাতায় একবার কার প্রথম চাকুরী কি তাই নিয়ে অনেকেই লিখেছিলেন| কারও কারও বেশ মজাদার‚ কারও কার বেশ সুখকর| আমি তখন ঐ ব্লগে লিখব লিখব করেও মত স্থির করতে পারিনি| তাই শুধু পড়েছিলাম| কারণ আমার প্রথম চাকুরীর অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিলো না| তাই লিখব লিখব করেও এতদিন লেখা হয়নি| স্মৃতিপথে হাঁটতে হাঁটতে এই অংশটা বিস্মৃত করেই রেখে দিতে চেয়েছি বরাবর| কিন্তু এটাও তো জীবনের অঙ্গ আর আমার সাথেই এসব ঘটনা প্রথম ঘটেছে এমনটাও নয়| তবু ঘটনার শিকার আমি ছিলাম‚ তাই এটা আমার জীবনের একটা ডার্ক অংশ| সেই অতীতটা পেরিয়ে আমি অনেকটা পথ হেঁটে ফেলেছি‚ তাই আজ আর লিখতে তেমন একটা অসোয়াস্তি হচ্ছে না| মাঝে একবার ভেবেছিলাম অন্য কারও জবনীতে লিখব‚ তারপর মনে হল তাতে সত্যের অপালাপ হয়| তাই আমার নিজের জবানীতে নিজের কথা| জানি না মজলিশী বন্ধুরা কিভাবে নেবেন| ****************** তখন ক্লাইভ রোতে সবে একটা ছোট কোম্পানীতে টাইপিস্টের কাজ করি| কাজটা নিজের দক্ষতায় পাইনি আমি| আমার সেজোমামার শালাবাবু কাজটা করে দিয়েছিলেন| উপরোধে তো মানুষ ঢেঁকিও গেলে| তিনিও তাই তার বোনাইবাবুর কথা ফেলতে পারেনেনি| নাহ তেনার কোন দোষ আমি দিচ্ছি না| উনি করে দিয়েছিলেন বলেই আজ পেশার পথে একা হাঁটাটা আয়ত্ত করতে পেরেছি| কোম্পানীর মালিকটাকে পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও আমি কাজটা নি| কারণ পেপার দেখে যেখানেই walk in interview দিতে গেছি সেখানেই বলেছে আপনার তো এক্সপিরিয়েন্স নেই| আমাদের কাজ জানা লোক চাই| কাজ না দিলে কাজের অভিজ্ঞতা কি করে আসবে সেটা আমার মাথায় ঢুকতো না| সেটা একটা কারাণ তো ছিল কাজটা নেবার| দ্বিতীয় কারণটা অবশ্যই আমার সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা| মাসের ২২ তারিখ হলেই বাপির হাত ফাঁকা| কি করে চলবে সংসার আমি যদি না বাপির পাশে দাঁড়াই| বাপি‚ মা আমায় কোনদিন কোন কাজে প্রেসার করেননি| কিন্তু নিজের দায়বদ্ধতা আর একটু ভালো থাকার জন্য নিলাম কাজ শেষ অবধি অনেক দোনামোনা সত্ত্বেও| | এত বোরিং এই টাইপ করা যে বিরক্ত লাগে| তার চেয়েও বিরক্তিকর ঐ কোম্পানীর মালিক| আমার যে সিটটা ছিল সেটা ছিল ঐ লোকটার ঠিক সামনাসামনি | মেয়েদের একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে‚ আর তাই দিয়েই লোকটাকে আমার আরও অসহ্য লাগে| তখন আমি ভীষন রোগা| সাজগোজ বলতে যেটা বোঝায় সেটা আমার তখন ছিলই না| কারন ওসবের পিছনে নষ্ট করার মত যথেষ্ট অর্থ আমার ছিল না| একটা ভদ্রস্থ চুরিদার‚ মুখে পাওডার‚ বাঁহাতে রিস্টওয়াচ ব্যস| মাঝে-সাঝে একটু আধতু যে টিপ পড়তাম সেটাও এই কোম্পানীতে জয়েন করার পর ছেড়ে দিয়েছিলম| ওড়নাটা আমি তখন সবসময় বড় করে পিন আপ করতাম ঐ কোম্পানীর মালিকের জন্য| আসলে নিজেকে যতোটা ঢেকেঢুকে রাখা যায় আর কি| দৃষ্টি দিয়ে যে কাউকে কতটা ইনসিকিওর করা যায়‚ আমি সেই প্রথম অনুভব করি| ঐ কোম্পানীর মালিকের খাস ছিলেন এক দিদি| বলা যায় তিনিই সর্বেসর্বা কিছু কিছু ব্যাপারে| এত লম্বা যে শরীরটা কুঁজো মনে হত| খুব কালো‚ দেখতেও ভালো ছিলেন না| ঐ কোম্পানী তৈরী হবার পর থেকেই উনি নাকি কোম্পানীর সাথে আছেন| কানাঘুষোয় শুনেছিলাম উনি নাকি কোম্পানীর পাঁচ শতাংশের অংশীদার| প্রথমে আমাকে ঐ লোকটির আন্ডারে কাজ করতে হলেও উনিশদিনের মাথায় আমাকে ঐ দিদির আন্ডারে রাখা হয়েছিল| কেন সেটা নিচে বলছি| সরাসরি মালিকের সাথে আমার দরকার ছাড়া দেখা হত না| আর দেখা হোক সেটা আমি চাইতামও না| আমি আরও একটু নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম আমার বসবার জয়গা অন্য ঘরে সরিয়ে দেবার ফলে| নতুন আমি‚ ভীতুও বটে‚ রক্ষণশীল পরিবারের খুব আদুরে মেয়ে‚ মা বাদে কেউ কোনদিন বকতেন না‚ আমি ছিলাম ‚ ছিলাম কেন এখনও আছি খুব সেন্টিমেন্টাল‚ সেই আমি যেন এক অকূল সমুদ্রে গিয়ে পড়লাম| একটু ভুল হলেই মালিক লোকটি এত চিৎকার করতেন‚ এত বকতেন যে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত স্থান-কাল-পাত্র ভুলে| উনিশদিনের মাথায় ঠিকই করেছিলাম আর যাবো না| বাপি-মা ও আর যেতে দিতে চাননি| কিন্তু দিদি অনেক বুঝিয়ে আমায় ছাড়তে দিলেন না‚ বললেন কাজটা শিখে নাও‚ তোমার বয়স কম| কাজটা জানলে তোমার সুবিধা হবে| আমার তো আর বয়স নেই যে অন্য কোথাও চেষ্টা করব| সেই প্রথম দিদিকে আমার ভালো লাগল‚ এতদিন যিনি আমাকে তার রাইভ্যাল ভেবে এসেছেন| রয়ে গেলাম| বুঝে গেলাম নিজের স্বার্থেই দিদি আমাকে রক্ষা করবেন| ঐ কোম্পানীর মালিক লোকটির সাথে দিদির রসায়ন আমার অদ্ভুত লাগত| লোকটার বাড়ি থেকে ওদের দুজনের জন্য খাবার আসত| বাপি‚ গৌতম‚ দীপকদা আর আমি এই চারজন বাকি স্টাফেদের সামনেই ওরা চেম্বারে খেতে চলে যেত| বাপি বা গৌতম সার্ভ করে দিয়ে চলে আসত‚ যখন ওদের দরকার পড়ত তখন বেল বাজতো| কোনদিন খাওয়ার পর বাতবরণ দিব্যি খোশমেজাজী থাকত আবার কোন কোন দিন দেখতাম দিদি রেগে মেগে ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে আর পিছন পিছন ঐ লোকটা চেঁচাতে চেঁচাতে আসত| রেগে গেলেই লোকটা তোতলা হয়ে যেত| ঐ সময় আমরা অন্য ঘরে থাকতাম| দিদি আর ঐ লোকটার মধ্যে ঝগড়া যতক্ষণ না কমত আমাদের মুখ বাড়িয়ে দেখাও ছিল বিষম বিপদের| ঝগড়া শেষ হলে বেল বাজলে তবেই বাপি বা গৌতম গিয়ে সামনে দাঁড়াত হুকুম তামিলের জন্য| তখন লোকটা দিদির মন রাখার জন্য কি করবে ভেবে পেত না| কোনদিন বলত চায়ে পিলা কোনদিন বলত জুস লেকে আ‚ আবার কোনদিন শুনতাম লোকটা প্ল্যান করছে দিদিকে শাড়ী কিনতে বা মিশন রোতে খেতে নিয়ে যাবে| এসব ঘটনা অনেকদিন ধরেই ঘটছে | তাই সবাই হাসত| আমি প্রথম প্রথম অবাক হয়ে থাকতাম| সম্পর্কটা আবছা বুঝতাম আবার বুঝতামও না| রোববার বাদে কোন ছুটি ছিল না| যেদিন দিদি আসত না সেদিন আমার মাথায় বাজ পড়ত| সাড়ে দশটা মানে ডট সাড়ে দশটায় আমাকে অফিসে পৌঁছে চাবি খুলতে হত| চাবি খুলতে এক মিনিট দেরি হলে আর লোকটার ফোন যদি বেজে যেত তো আমার সেদিন শ্রাদ্ধ হবে আমি নিশ্চিত| দিদি খুব নিয়মিত ছিলেন‚ খুব কমের ভাগ আসতেন না| দিদি না আসলে আমার দিনগুলো বকুনি খেতে খেতে খুব খারাপ যেত যদি লোকটা অফিসে আসত| অনেকবার এমন হয়েছে লোকটা বারবার অফিসে ফোন করে বলেছে আভি মে আতা হু‚ আমরা সবাই সতর্ক হয়ে বসে আছি এই আসে এই আসে কিন্তু এলো না| আসল না বটে কিন্তু ফোনের পর ফোন করে আমাদের হৃপিন্ডটা গলার কাছে নিয়ে চলে আসত| ক্লাইভ রোয়ের ঐ বিল্ডিং-এ একাধিক অফিস ছিল| সেইরমকই একটা অফিসে কাজ করতেন আমার টাইপ স্যার| একদিন দিদিও আসেনি‚ লোকটাও না‚ আমাকে ডেকে বললেন‚ কেন এলে এই কোম্পানীতে‚ জান লোকটা কত বাজে| একবার বিয়ে হয়েছিল‚ একটা মেয়ে আছে‚ তাদের ছেড়ে দিয়েছে দিদির জন্য | জান না দিদি ওর কেপ্ট| আমি এসব জানতাম না| লোকটা কারও সাথে কথা বলতে দিত না‚ দিদিও না| আর আমি বরাবর খুব চুপচাপ‚ তাই সেভাবে কোনদিন কিছু জানতে চাইনি| আমার বুকের ভিতর গুড়গুড়ানিটা বেড়ে গেল| বুঝেই বুঝি শুভাশিসদা মানে আমার স্যার বললেন যাই হোক এসে যখন পড়েছ‚ আমরা আছি চিন্তা কোরো না| কখনও কোন বিপদে পরলে আমাদের ডাকবে| একটু সাহস পেলাম| সেবছর পুজোতে আমাদের সবাইকে নতুন পোষাক কিনে দিলেন| না নেওয়ার কোন কারণ ছিল না‚ কারণ ওটা ঐ কোম্পানীর নিয়ম| দিয়ালীতে অনেক ফল ‚ ড্রাইফুট এইসব নিয়মানুয়ায়ী দিলেন| সেবছর জানুয়ারীতে না ফেব্রুয়ারীতে আমাদের পরপর দুটো ট্রেড এক্সজিবিসনে স্টল দেওয়া হয় বম্বেতে| একটায় ঠিক হয়েছিল দিদি আর দীপকদা যাবে আর একটায় লোকটা যাবে| আগেরদিন দিদি আর দীপকদা চলে যেতেই আমার বুকের ভিতর একটা ভয় দানা পাকিয়ে উঠল| পরেরদিন ছিল শনিবার‚ সিঁড়িতে উঠছি শুভাশিসদা আমাকে সাবধান করলেন যে ময়দান খালি‚ খুব সাবধান‚ তুমি কিন্তু এতদিন দিদি ছিল বলে বেঁচে গেছ| আমিও সেটা মানি‚ দিদি আছেন বলেই আমি সেফ| আমি মনে মনেই ভাবলাম আমি আর আসব না| অফিসে পৌঁছে দেখলাম আমার প্রতি বাপি‚ শেঠী (পুরোনো কর্মী‚ আবার এসে জয়েন করেছিল) এদের ব্যবহার কেমন যেন পাল্টে গেছে| ওদের চাহনিতে ছিল এমন এক তির্যকতা‚ ব্যঙ্গ যেন বলতে চাইছে মেয়ে হিসাবে তোমার ওপরে ওঠার এই তো চমৎকার রাস্তা| নিজের প্রতি এত ঘৃণা কোনদিন আসেনি| মনে হচ্ছিল মেয়ে হয়ে কেন জন্মালাম| ঠিক বোঝাতে পারব না আমার সেদিনের পরিস্থিতি| শনিবার ৪ টে ছুটি| লোকটা সারাদিন আমায় তার সামনে বসিয়ে কাজ করালো| এটা তখনি লোকটা করত যখন দিদি থাকত না| কিন্তু প্রতিবার বাপি বা গৌতম বা শেঠী থাকত আশেপাশে‚ কিন্তু সেদিন কেউ ছিলো না| সবাইকে কাজ দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল| দুপুর দুটো বেজে গেল‚ খিদেও খুব পেয়েছে কিন্তু উনি অনুমতি না দিলে খেতে যেতেও পাবো না| তখন বুঝি সাড়ে তিনটে‚ লোকটা বলল কেয়া টিফিন লায়া হ্যায় ও লেকে চেম্বার মে আজা‚ এমন নয় যে আমি আগে চেম্বারে যায়নি‚ এমন নয় যে আগে আমরা এক টেবলে খায়নি‚ কিন্তু তখন দিদি থাকত‚ বাপি থাকত| আজ পুরো একলা| ভয়ে ভয়ে গুটি গুটি টিফিন নিয়ে গেলাম| যাবার পথে দেখলাম শুভাশিসদা ইশারা করে বললেন যাও আমি আছি| শেটী লোকটার খাবার সার্ভ করে দিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল| আমি টিফিন কৌটো তো খুলেছি‚ কিন্তু খাবো কি গলা দিয়ে নামলে তো| লোকটা হঠাৎ দেখলাম উঠে চেম্বারটা জোরে বন্ধ করে দিল| আমি জানতামও না যে জোরে বন্ধ করলে ওটা লক হয়ে যায়| কোনোরকমে সময় নিয়ে খেলাম| ঘরির কাঁটা তখন চারটের ঘর পেরোচ্ছে| লাগোয়া কলে হাত ধুয়ে বেরোতে যাবো‚ লোকটা বলে আরে বেঠ না| আমি বললাম টিফিন কৌটোটা রেখে আসি| বেঠ| বসি না| দরজাটা খোলার চেস্টা করে দেখি সেটা বন্ধ| লোকটা হাসে| দরজা লক করা আছে| আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে| কান্না পায় না| মাথা খালি হয়ে যেতে থাকে| বলে তেরি দিদি তো কভি বুরা নেই মানতা‚ সমঝা ? আমার তখন মাথা ফাঁকা| কি বুঝব? আর বোঝবার আছে কি? দরজার কাছ ঘেষে দাঁড়িয়ে আমি তখন ভাবছি শুভাশিসদা বললেন আছেন কিন্তু ডাকব কি করে? তখন মোবাইল ও এত আম হয়ে যায়নি| মনে মনে বলছি ওরে কেউ একটা আয়| কিন্তু কেউ আসে না| আমার মনে হচ্ছে এখুনি পরে যাবো| হঠাৎ হাতের ঘড়ির দিকে তাকাই‚ সাড়ে চারটে| লোকটার চোখ এড়ায় না| বলে ঘড়ি কিঁউ দেখ রহি হ্যায়? কৈ তেরা ইয়ার রা দেখ রহা হ্যায়? বলার ধরণে ঘৃণা আসে| নেতিবাচক ঘাড় নাড়ি‚ বলি বাড়িতে মা চিন্তা করছে‚ সাড়ে চারটে বেজে গেছে তো মা না বাপিকে নিয়ে আমায় খুঁজতে বেরিয়ে পরে| আমি জানি মা চিন্তা করলেও এখনি আমায় খুঁজতে আসবে না| তবু আমি বলাম কথাটা| লোকটা বলল সচ তেরা ঘর সে লোগ আ যায়েগা| আমি বলাম হ্যাঁ| লোকটা কি ভয় পেলো? জানি না| দরজাটা খুলে দিল আমিও একছুটে আমার ঘরে এসে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি| সেই শেষ আমার অফিস যাওয়া| সেদিনের পর থেকে খালি মনে হতে লাগলো ঐ কথাটা যদি শুনে লোকটা বিশ্বস না করত‚ তাহলে কি হত? অদ্ভুত একটা ট্রমা আমাকে গ্রাস করল| হাসি না‚ কথা বলি না‚ কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না| রাগী হয়ে যেতে শুরু করলাম| মনে হত সবকিছু থেকে পালিয়ে যাই| সবকিছু থেকে| কোথাও ইন্টারভ্যিউ এর ডাক এলেই আমি যেতাম না| কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় হত| সেসব এক দিন গেছে| বাপি‚মা সারাক্ষণ আমার পাশে থেকে আমাকে সাহস যুগিয়েছে| আস্তে আস্তে ভয় কাটলো| আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলাম|

1031

5

মুনিয়া

রমাদি

(১) আজকে আমার রমাদির গল্প বলি। প্রত্যেক মানুষের জীবনে আলো দেখায় এমন একজন অন্ততঃ থাকা দরকার। আমার জীবনে রমাদি তেমন একটা মানুষ। আমরা তথাকথিত শিক্ষিত, রুচিসম্পন্ন, অনুভূতিশীল মানুষ। সাধারণত জীবনের সব সিদ্ধান্তগুলি আমরা খুব বিবেচনার সাথে নিয়ে থাকি। কিন্তু কখনো কখনো এমন হয় যে নিজের বিবেচনায় কারুর পক্ষপাতিত্বহীন মতামত দরকার হয় এমন কারুর থেকে যে তোমাকে খুব ভালোবাসে আর ভালো চায় তাই তোমার বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থাকলেও সত্য বলতে দ্বিধা করেনা। রমাদি ঠিক তাই। কি করে আলাপ হল বলি! বছর আটেক আগে এক পার্টিতে গেছি এবং যথারীতি ভেতরে ভেতরে একটু একটু করে দমে যাচ্ছি আমায় একটুও প্রভাবিত করেনা সেরকম সব আলোচনায়। অন্যকে হেয় করতে নয় মনের সৎ চিন্তা প্রকট করছি মাত্র। আমারই অপারগতায় বিযুক্ত হয়ে যাই বারেবারে। এমন সময় এক ভদ্রমহিলার দিকে চোখ পড়ল। ছোট্টখাট্টো, মাখনে গায়ের রং, কালো চুলে রগের পাশ দিয়ে রুপোলি ঝিকিমিকি। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল একমুখ হাসি। সাধারণত অপরিচিত দেখলে আমারা একচিলতে হাসি দিই, কিন্তু ওনার মুখভরা হাসি, চোখ হাসি দেখে মনে হল আমার বহুদিনের পরিচিত। আর হাসিই আমার একমাত্র ধন সবাই জানে। প্রসঙ্গতঃ বলি আমাদের বাড়িতে সকলে গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। আমার মনে হয় এরা সকালে উঠেই ঠিক করে নেয় দিনে কবার হাসবে। সোনুকে গতসপ্তাহে বলছিলাম, মনেহয় তোমার একটু বেশী হাসা দরকার। বড্ড কম কম হাসো! উত্তরে সোনু বলল, আমার বেশী হাসতে ভালো লাগেনা, বেশী হাসে বোকারা। তাই সই, বোকাই হই।তাই ভদ্রমহিলার উপচে পরা নিঃশব্দ হাসি আমাকে ওনার দিকে কুড়ি পা হাঁটিয়ে নিয়ে গেল।আর সেই যে শুরু এখনো সেই মুগ্ধতা অক্ষুন্ন। সম্পর্কে দুটি মানুষের অবস্থান কেবল দেওয়ার অথবা নেওয়ার হয়না, হওয়া উচিৎ নয়। আমার সাথে রমাদির সম্পর্কটা সম্পূর্ণ বৃত্ত। নয়মাসে ছয়মাসে হয়ত দেখা হয়, কথা হয় অনেক ঘনঘন, ওনার স্বামীকে এড়িয়ে। কিছুদিন কথা না হলেও অভিমান- অভিযোগ ফণা তোলেনা। ঠিক যেখানে আগেরবার শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই শুরু করি।আমি ওনার থেকে খানিকটা ছোট হলেও আমার সাথে কথার মধ্যে কখনো বয়োসচিত সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা দেখিনি।মানুষ দোষগুনমুক্ত হয়না, কিন্তু আমাদের দোষগুনগুলো আমাদের বিনা চেষ্টাতেই একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। (২) রমাদির জন্ম চন্দননগরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, মামারবাড়িতে, ১৯৫৪ সাল নাগাদ। মামারবাড়িতে জন্ম হওয়া তখনকার দিনে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। একটু বড় হতেই শ্যাঁওড়াফুলির গঙ্গার ধার ঘেঁষে মস্ত দালানওয়ালা নিজের বাড়িতে ফিরে এলেন । পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সেজো। মাথার ওপরে দুই দাদা দিদি নীচে এক বোন আর ভাই। তা ছাড়াও বাবা – মা -ঠাকুমা। বাবার রকমারী ব্যবসায় লক্ষ্মীর দাক্ষিণ্য ছিল তারসাথে ছিল শাসনের প্রাচুর্য্য। বিশেষ করে রমাদির প্রতি।কোন একদিন আমাকে বলেছিলেন, চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে ঘুমনো ছোটবেলা থেকে রুটিন হয়ে গেছিল। অবশ্য তর্জন গর্জনের কারণ যে ছিলনা তা নয়। সব ভাইবোনেরা যেখানে স্কলার সেখানে রমাদি কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাশ। ক্লাস এইটের একটি ঘটনা পিছেনের সারির মেয়েটাকে হটাৎ লাইম লাইটে এনে ফেললো। জিওমেট্রি ক্লাসে ঠিকমত আঁক কষতে পারলে রঙিন চক মিলত আর তার আকর্ষণ ছিল দুর্নিবার। তারে পাওয়ার দুর্দমনীয় ইচ্ছায় অংক ক্লাসে প্রচন্ড মন দিয়ে বসেছিল আর যখন বোর্ডে ডাক এল সেবার কিভাবে যেন কালো বোর্ডে নির্ভুল আঁক কষে ফেলল মেয়েটি। সেই একপয়সা দুইপয়সার আরাধ্য লাল-নীল চক আর প্রচন্ড রাগী শিক্ষকের মুখনিসৃতঃ দুটি উদ্বুদ্ধ করা বাক্য মেয়েটিকে যেন মাসব্যাপী শীতঘুম থেকে তুলে আনলো। পড়াশোনা হঠাৎ ভারী চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠল। কোথাউ আর এতটুকু অস্পস্টতার স্থান রইলো না। জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে রমাদি আমাকে শিখিয়েছেন- “উম, কখোনো কাউকে সাহস যোগাতে না পার, পেছেনে ঠেলে দিওনা।তুমি হয়ত জানবেও না, তোমার কোন কথা কারুর জীবনে সহস্র প্রদীপ জ্বালতে পারে অথবা কাউকে চিরতরে অন্ধকারে নির্বাসিত করতে পারে।” এরপরে কোনদিনও সে ইস্কুল কলেজে এক-দুই-অথবা তিনের নীচে যাননি। তাইবলে কি বাবা স্নেহসিক্ত রসের ধারা হয়ে উঠলেন? মোটেই নয়।বাবা মেয়ের সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন ঘটলো না, রাতের বালিশও শুকোবার মত সুদিন এলো না। একবার ক্লাসে থার্ড হয়ে বাবার হাতে গর্বিত হয়ে ফলাফলপত্রখানি তুলে দিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটি। প্রত্যুত্তরে বাবা সেটিকে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে বলেছিলেন, এমন রেজাল্ট সামনে এনে দেখাতে লজ্জ্বা হোলো না!! সেই শেষ। আর কখনো ভালো কিছুর প্রত্যাশায় বাবার মুখমুখি হয়নি সে। না ভুল হল, বাবার স্নেহের স্পর্শ সে পেয়েছিল একদিন। কিন্তু ততোদিন জীবন বয়ে গেছে শ্যাঁওড়াফুলি ওই গঙ্গার ধার থেকে প্যাসিফিক ওশানের তীরে। (৩) তুই আমায় পাগল করলি রে, মনেতে খুশীর বাহার চোখেতে জল ঝরে, বঁধুরে এ এ এ…. নন্দ ফকিরের দরাজ গলা, গঙ্গার পাড়ে জল ভাঙ্গার ছপাৎ ছপাৎ শব্দ, তুলোর মায়ের বড় বড় ভারী ভারী কাঁসার বাসন, রেকাবি মাজার ঘষঘষে ছন্দ রোজ দুপুরে মেয়েটিকে কেমন বেদনা বিধুর করে দেয়। কিসের বেদনা, কেন বেদনা সে জানেনা। মনের মধ্যে একটানা এই ঘুঘু ডাক অস্থির রাখে তখনো যখন মা বিকেলের গা ধোয়া সেরে ফর্সা কাপড় পরে মেয়ের মাথায় তেল ঘষে মোটা দাঁড়ার চিরুণী দিয়ে পাতা পেড়ে জোড়া বিনুনি বেঁধে দেয় আর তার ভবিষ্যতের হাজারো রঙিন স্বপ্ন আঁকে। মুখচোরা মেয়ে মুখ ফুটে বিয়ের অনিচ্ছা জাহির করে উঠতে পারে না মা ঠাকুমায়ের স্বপ্ন-সজীব মুখপানে চেয়ে। বিয়ে করতে তার আপত্তি নেই, বরং মাঝে মাঝেই তার বেশ কয়েকজন সহপাঠিনীর মত রাঙানো সিঁথিরেখা আর গর্বিত পদক্ষেপ অচেনা এক মানুষের ইশারা বয়ে আনে কিন্ত পড়াশোনা করতে যে তার খুব ভালো লাগে! অন্তত কলেজ পাশটা যদি সে দিতে পারত। ঠাকুমায়ের পিঠে মুখ গুঁজে একবার আভাস দিয়েছিল তার অনিচ্ছের। ঠাকুমা তার বিনুনি খুব করে টেনে দিয়ে বলেছিল- আম’র ছুঁড়ি, দিনে দিনে লকলকিয়ে মাথা চাড়া দিয়া উঠছস,তর জন্যে বাপের চোহে ঘুম নাই। ছেমড়ির সখ দ্যাহো! নন্দ ফকির ঠাকুমায়ের প্রিয় পাত্র। ফকির গাঁয়ে গাঁয়ে গান শুনিয়ে বেড়ায়, অনেক ভালো পরিবারের সাথে জানাশোনা তার। কোন পরিবার মেয়ের খোঁজে আছে, কোন পরিবারের বিয়ের উপযুক্ত ছেলে রয়েছে সেসব ফকিরের নখদর্পনে।দিদির বরও তারই দৌলতে। মা-ঠাকুমা নন্দ ফকিরকে বাবা বাছা করে চলে। দুচারটে গান আর খবরের বিনিময়ে মাসান্তে কিছু টাকা হাতে ধরে দেওয়া বাঁধা। আর দর্শন দিলেই কলাটা-মূলোটা, ধামাভরা মুড়ি-চাল। আজ নন্দর খাতির তুঙ্গে। দুপুরে এবাড়িতেই খাবে সে।আগেই সে খবর দিয়ে গেছিল তাই বাবাও উপস্থিত। সোনার টুকরো ছেলের সন্ধান এনেছে, জিরাগ্রামের নামকরা চ্যাটার্জী পরিবার, সেই পরিবারের ছোটছেলে। “উম, তিন তিনবার নানা এদিক ওদিক করে কুষ্ঠি মিলাবার চেষ্টা চলেছিল, একবারও মেলেনি।” মা নাকি বলেছিলেন বাবাকে, কেন জবরদস্তি করছ! মেয়ের আমার আরো ভালো ভালো সম্বন্ধ আসবে। বাবা খিঁচিয়ে উঠে বলেছিলেন, যা বোঝেনা তা নিয়া কথা কয়োনাতো, ছেলের বিদেশে পড়াশোনা-চাকরী, জীবনে কোনদিন প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয় নাই, তোমার মেয়ে বর্তে যাবে অমন ঘরে পড়লে! তাছাড়াও তোমার বিদ্যেবতীকে এঁরা পড়াবেন কইসেন। ছেলের পরিবারের পছন্দ হয়নি তাকে, ছেলের পাশে বড্ড বেঁটে, কিন্ত দেখতে এসে ছেলের মনে ধরে গেল আর কুষ্ঠির অমিলতা সেখানে পেছনে পড়ে গেল। ছেলের পরিবারও খানিক গাঁইগুই করে মেনে নিতে বাধ্য হল, সোনার ডিমপাড়া ছেলে বলে কথা, আশে পাশের দু’দশ গাঁয়ে অমন নেই। এই ছেলের জন্য লোকসমাজে কত মান্যতা! অসহযোগীতায় সত্বেও ছেলে অবাধ্য হলে ডেঙডেঙিয়ে বিয়ে করে আসলে লোকের কাছে মাথা হেঁট হবে, হয়ত মাসে মাসে বিদেশের খাম আসাও বন্ধ হবে। আরে আর কিছু না হোক বউয়ের রঙটা খাঁটি, নাতি নাতনিগুলো অন্তত হতকুচ্ছিত হবেনা। মেয়ের পছন্দ হয়েছিল কিনা সেইকথা কি কেউ জানতে চেয়েছিল? না চায়নি, ওইসব মেমসাহেবিপনার চল ছিলনা গ্রামগঞ্জে। আর এমন ছেলেকে পছন্দ হবেনা কেবল মাথায় ব্যামো আছ তেমন মেয়ের! রোজগেরে টগবগে ছেলে, উপরন্তু এইয়্যা লম্বা আর গায়ের রঙটিও নজরকাড়া! মেয়েটিরও মুগ্ধতা আকাশ ছুঁয়েছিল। গোপনে তার সবচেয়ে প্রিয় সই, সরলার সুদর্শন বরের সাথে তুলনা করে অক্লেশে নিজেকে জিতিয়ে দিয়ে আনন্দে-লজ্জ্বায় বিভোর হয়েছিল। অবশেষে, লাখ কথার পরে, শ্যাঁওড়াফুলির কুমারীদের এবং তাদের বাপ-মায়ের বুকে শেল বিঁধিয়ে, ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে তিন তারিখে গঙ্গোঁপাধ্যায় পরিবারের মেজো কন্যার বিদায় সমারোহ সুসম্পন্ন হল। (৪) হৃদয়ে হৃদয়ে আধো পরিচয়, আধখানি কথা সাঙ্গ নাহি হয়, লাজে ভয়ে ত্রাসে আধো-বিশ্বাসে শুধু আধখানি ভালোবাসা ॥- শৈবাল রক্ষিত বাসর রাতে এমন অনুভূতিই হৃদয় জুড়ে ছিল খাটের ওপর জড়সড় প্রতীক্ষারত মেয়েটির মনে। নতুন পরিবারে ইতিমধ্যে চব্বিশ ঘন্টারও বেশী কেটে গেছে। দুই ভাসুর, শ্বশুরের সাথে দুই একখানি কুশল বিনিময়ও ঘটেছে, তিন ননদ খুবই আত্মীয়তা দেখিয়েছে, দুই ননদ অবশ্য অনেকদিনের বিবাহিতা, ছোট ননদটি স্বামীর পিঠোপিঠি, খুব ‘বৌদি’ ‘বৌদি’ করছে। বড় জায়ের স্বভাবটা কেমন যেন ঠেকলো! দুপুরে চান করে ঠাকুমায়ের দেওয়া পদ্ম হারটা গলায় দিয়েছিল। কাছে এসে নাড়াচাড়া করে বললো, এতো ভরি তিনেকও হবেনা, তবে যে শুনেছিলাম বাপ বেশ মালদার! চোখে প্রায় জল ভরে এসেছিল কিন্ত মুখে মুখে কথা কওয়ার শিক্ষা সে পায়নি জন্মকাল হতে। মেজো দেওর অকৃতদার। নিজের কারবার নিয়ে ব্যস্ত, বেশী ঘনিষ্টতা বাড়ির কারুর সাথেই নেই। শুধু শাশুড়ি সেই যে বরণ করে ঘরে তুলেছিলেন তারপরে আর এমুখো হননি, খাওয়ালো- দাওয়ালো- সাজালো ননদেরা মিলে, জা কেবল টিপ্পনী কেটে গেলেন। তবে এসব আর গায়ে মাখবেনা সে ঠিক করেছে, বাপের বাড়িতেও তো কথা কম শোনেনি! বাপের বাড়ি মনে করতেই চোখের সামনে দিয়ে একসারি মুখ ভেসে গেল…মাগো এইসময় তুমি রান্নাঘরের দাওয়া নিকোচ্ছ হয়ত, তুলসিতলায় বসে ঠাকুমা হয়ত একমনে জপ করে চলেছে, আমার বোঝা নামিয়ে বাবা কি শান্তিতে আজকাল ঘুমোচ্ছে, মাগো? না: পোড়া চোখ ভরে ভরে কেবলই জল ভরে আসে। বাড়ি এতোক্ষণে শান্ত হয়েছে। একভাবে বসে থেকে থেকে কোমর ধরে গেছে। ঘোমটা ফাঁকা করে ভীরু চোখ বাড়ালো সে। ঘি এর প্রদীপ একই ভাবে সুগন্ধিত আলো ছড়াচ্ছে। অসহ্য এক পুলকে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কারুর ভালোলাগার, পছন্দের অংশ হয়ে এ বাড়ির একজন সে এখন। মন কানের কাছে এসে গুঞ্জন ছড়ায় – একে একে বানিয়ে তুলব সব, তুমি দেখে নিয়ো। বাড়িঘর, খেতখামার, উঠোনে লাউয়ের মাচা, জানলার পাশে লতানে জুঁইয়ের ঝাড় – একে একে সমস্ত বানাবো, তুমি দেখে নিয়ো …………………. ………… যা চাও সমস্ত হবে, একই সঙ্গে হয়ত হবে না, কিন্তু একে-একে হবে। ভালবাসা থাকলে সব হয়। দেখো, সব হবে। যা-কিছু বানানো যায়, আমি সব দুই হাতে দিনে-দিনে বানিয়ে তুলব, তুমি দেখে নিয়ো (নীরেনদ্রনাথ চক্রবর্ত্তী) গরজনি কান্নার আওয়াজ রাতের নি:স্তব্ধতাকে পলকে চুরমার করে দিয়ে যায়। তবে কি কারুর কিছু হল। ধরফরিয়ে খাট থেকে নামতে গিয়ে মনে পড়ে এখন সে আর শুধু মেয়ে নয়, বউও বটে। ধীরে ধীরে ভেজানো দরজা খুলে মন্ত্রমুগদ্ধের মত কান্নার উৎসমুখের সন্ধানে সে চলতে থাকে, পায়ে পায়ে শাশুড়ির দরজায় এসে থমকায়, ভেতর থেকে তখন বিলাপ ভেসে আসছে – “মায়ের হয়ে আর রইলি না, চাঁদ আমার। ওই একফোঁটা মেয়ের মধ্যে কি এমন দেখলি যে মায়ের কথা বিষ হল!” লজ্জায় আরষ্ঠ হয়ে পেছন ফিরতেই শুনলো জন্ম জন্মান্তরের চেনা গলার কাতর আশ্বাস, তোমার থেকে কাড়তে আমায় কেউ পারবেনা, মা, অহেতুক কষ্ট পেওনা এমন। লজ্জায় ঘামতে ঘামতে কোনমতে ঘরে পৌঁছায় মেয়েটি। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন জীবনে হয়নি সে! কি করা উচিত সব যেন কেমন গুলিয়ে যায়। তার আবির্ভাবই তবে শাশুড়ির মনোবেদনার কারণ। কি করে সে এখন? বিয়ে যে হয়ে গেছে, এতো আর মুছে দেবার নয়। এই অজানা পরিস্থিতিতে এতদিন যা করে নিজেকে শান্ত রেখেছে তেমনটাই করে সে, চোখের জলে বালিশ ভেজিয়ে নিজেকে ঘুম পাড়ায়। শেষ প্রহরে অচেনা হাতের প্রবল আকর্ষণে ঘুম ভাঙে, সাথে গম্ভীর কন্ঠ, এসো। তারও খানিক বাদে ক্লান্ত-তৃপ্ত স্বামী নিদ্রামগ্ন স্বরে যখন বলে চলেছেন, এখন থেকে এইই তোমার বাড়ি। এই পরিবারের মান মর্যাদা সব তোমার হাতে। নিজেকে ভুলে পরিবারের একজন হয়ে উঠবে। মায়ের দু:খ-বেদনার দিকে সদা-সতর্ক দৃষ্টি রেখো। তোমার জন্য যেন কারুর থেকে কথা শুনতে না হয়। আমি পৌঁছে তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করবো… তখনো মেয়েটির মনের গহনে বোবা কান্নায় অবিশ্বাসের উথোল পাথাল, এমনটাইকি হওয়ার কথা ছিল? শরীর মন কেন তবে একই সুরে বেজে উঠলো না! সরলার বলা গল্পের সাথে কোথাউ যে মিল হলনা…এতদিনের অপেক্ষার এমনিকি পরিণাম হওয়ার কথা ছিল? শরীর মনন জুড়ে তবে কেন এমন তালভঙ্গের বেদনা অপমান- “যে কথাটি বলব তোমায় ব’লে কাটল জীবন নীরব চোখের জলে সেই কথাটি সুরের হোমানলে উঠল জ্বলে একটি আঁধার ক্ষণে– তখন তুমি ছিলে না মোর সনে॥” ************ এই পর্বটি লেখা আমার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হচ্ছে। কিভাবে লিখব, কতটুকু লিখব, এই চিন্তা মনকে অহরহ আচ্ছন্ন রেখেছে। এই পর্ব একদমে লেখা একেবারেই সম্ভবপর নয় বারে বারে থামতে মুছতে হচ্ছে। প্রথমত: আমি কথাশিল্পী নই, লেখা আমার সহজাত নয়, দ্বিতীয়ত: যাঁর কথা লিখছি তিনি হয়ত, হয়ত কেন মনের গভীর থেকে জানি, একমাত্র আমাকেই তাঁর হৃদয় উন্মুক্ত করে দেখিয়েছেন। যদিও নাম-ধাম সব পরিবর্তিত তবুও সবার মাঝে সেই গভীর-গোপন কথা প্রকাশ কি বিশ্বাসঘাতকতা নয়? বার্তা পাঠালাম, অবসরে কথা বলুন। বেশ কয়েক ঘন্টা পরে প্রার্থিত ফোন এল। -আপনার কথা লিখছি বন্ধুদের। – আমার কথা!! – আপনার জীবনের কথা, সব কথা। যা আমাকে উদ্ভুদ্ধ করেছে হয়ত অন্যদেরও নিজের জীবনটাকে ভালোবাসতে শেখাবে। – স অ ব কথা? – যদি আপনি অনুমতি দেন, তবেই। -ভেবে দেখি! দুইদিন পরে ছোট্ট বার্তা,” লেখ, তবে কেউ চিনে নেয় যদি!” ************************************* পরিণত বয়সে পোঁছে এত মানুষ সারাজীবন ধরে দেখেও আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে শুধু অন্ধকার থাকে। ভরা ভরা জমাট কালো অন্ধকার। আমি আলোর প্রত্যাশী, মানুষের মধ্যে আলো খুঁজে বেড়াই। কিন্তু এ আমার গল্প নয়, আমি অনুলেখক মাত্র। *********************************************************************************************************************** (৫) কে যেন বলেছিল- জানো প্রিয়া, চেতনা অসাড় করে দেওয়া, একটা তীব্র সুন্দর দু:খ পেতে, বড় ইচ্ছে করে…. কেউ কি বলেছিল? নাকি শুধু মনন বলে মননের কানে কানে। তিনদিন হল স্বামী উড়ে গেছেন বিদেশে।তিনি আড়াল হতেই এই পরিবারের বস্তাবন্ধ পচাগলা জটিলতাগুলো মুখোশখুলে বেরিয়ে এসেছে। নিত্যদিনের বস্তিবাড়ির ঝগড়াঝাটি বাপের বাড়ির দিনগুলোকে মনে পড়ায়। সে জীবনও মধুর ছিলনা, স্বার্থের সংঘাত, কুকথা সেই জীবনেরও সঙ্গী ছিল কিন্তু সবই ছিল এক শালীনতার আবরণে। স্বামী পাঁচশো টাকা হাতে ধরে দিয়েছিলেন যাওয়ার আগে, বালিশের তলায় সযত্নে রাখা টাকাক’টা তিনি যাওয়ার সাথে সাথেই অদৃশ্য হল। শাশুড়ি- ছোটননদকে সে কথা বলতেই তেড়ে মারতে আসে প্রায়, ছোটলোকের মেয়ে, আমাদের চোর ঠাউরেছিস? তারপর ঘন্টারব্যাপী অশ্রুত-অশ্রাব্য গালাগালি। কয়েকদিন পরে শাশুড়ি তার গয়নাগুলি চেয়ে বসেন, ছোটননদ যাবে বন্ধুর বিয়েতে, উপযুক্ত গয়নায় সেজে তবেই সে বেরোবে বাড়ি থেকে। বিনা দ্বিধায় শ্বশুরবাড়ি থেকে যে দুই চারখানি গয়না পেয়েছিল বের করে দেয়। সেই গয়না আর ফেরত আসেনা তারকাছে। গয়নাগাটি কবেই বা ঈপ্সিত ছিল, শুধু দুটি মিষ্ট কথার আকাঙ্খা জীবনভর…. -তোমার বাপের দেওয়া গয়না? -মায়ের কাছে রেখে এসেছি দ্বিরাগমনে গিয়ে আরো একপ্রসথ গালাগালির সম্মুখীন হয় সে। বুঝে পায়না কি বললে, কেমন করে চললে এ বাড়ির মানুষগুলোর মন পাবে। ঠাকুমা-মায়ের পাখিপড়া করে শিখিয়ে দেওয়া সমস্ত আচরণ তো ধর্মপরায়ণতার সাথে পালন করে, তবুও কেমন করে যে অপ্রিয় হয়ে ওঠ! শাশুড়ি আর জা মিলে যখন তুমুল হয়ে ওঠে, বাড়ির পুরুষমানুষগুলো আশ্চর্যভাবে বদ্ধ কালা হওয়ার অভিনয় করে। বাবার কটূক্তি যে আরো অনেক সহনীয় ছিল মা, ঠাকুমা আর ছোট্ট ভাইটার স্নেহ ভালোবাসার স্পর্শে। দেওয়া খাবারে কোনদিন পেট ভরেনা, চেয়ে খাওয়ার অভ্যাস নেই জীবনে। শুধু কলেজে যাওয়াটা এরা বন্ধ করেনি, হয়ত ছেলে বিশেষ করে বলে গেছিল বলে। কলেজ যাওয়ার আগে কোন কোনদিন ঠাঁস করে শাশুড়ি একমুঠো পান্তাভাত নামিয়ে দেন, গজগজ করেন, এই তো পোড়াকপাল, ছেলের বউয়ের দাসীবৃত্তি করতেই যেন জন্মেছিলাম। কোন কোনদিন ঘরে দোর দিয়ে শুয়ে থাকেন, খানিক অপেক্ষা করে সে রওনা দেয়। খুঁজে নিয়ে খাবে? ছি: এমন বেহায়াপনার কথা সে ভাবতেও পারেনা! একদিন কলেজ থেকে ফিরে দুয়ার নেড়ে নেড়ে ছোটননদকে ডাকাডাকি করে সারা হয় সে! তৃষিত- ক্ষুদিত-হাক্লান্ত হয়ে সদরের সামনে পথের ধূলায় বসে পড়ে। রাস্তা দিয়ে যেতে আসতে কৌতূহলি চোখগুলি চেটে যায় সর্বাঙ্গ। হে ত্রিভুবনেশ্বর, এমন লজ্জায় ফেলার আগে তুলে নাওনা কেন! এ কেমন নিষ্ঠুরতা তোমার! চরাচর অন্ধকার করে দিনমণি ঘরে যান, পাখিরা কুলায় ফেরে। ভয়ে কাঁদার শক্তি হারিয়ে ফেলে সে। শেষে পাশের বাড়ির দত্তবাবু সদরে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে উচ্চস্বরে বলে ওঠেন, চ্যাটার্জীবাবু, পরের বাড়ির মেয়ে এনে এমন তামাশা করবেন না। গাঁয়ের মুখ ডুববে।…নি:শব্দে দরজা খুলে যায়। “আমি আঁধার বিছায়ে আছি রাতের আকাশে তোমারি আশ্বাসে।” বিয়ের বছর পূর্তি হওয়ার আগেই সুস্থ সবল বিপুল প্রাণরাশি নিয়েও মেয়েটি স্তব্ধ হতে শিখে যায়! স্তব্ধতার বাড়া শান্তি নেই! অন্তরেতে অবশ্য কোলাহলের বিরাম নেই। কিন্তু তার আভাস বাইরে কেউ পায়না।স্বামী বাড়িতে চিঠি দেন, টাকা পাঠান, না সেই চিঠিতে তার অধিকার, না টাকাতে। বাপের বাড়িও বিদায় করে হাত ধুয়ে নিয়েছে। নন্দ ফকিরের সামনে আসেনা সে। বাপ-মা তো ভালোই চেয়েছিল, সুখী হওয়া না হওয়া তার কপাল। আর চাপ দেবেনা বাপের ওপরে। এখনো ছোট ছোট দুটি ভাইবোন। সে ফিরে গেলে বোনের বিয়েতে অসুবিধে হয়ে যাবে। -এইরকম কোনো দিনে ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে এক ভারী বিদেশী জুতোর বাস্ক ঠেকলো হাতে। খুলে দেখি অজস্র বর্ণময় প্রেমপত্র। -কার লেখা? কাকে? -ক্যেরেন নামের কেউ লিখেছে আমার স্বামীকে। রমাদি হাসছিলেন। -আপনার দু:খ হল? -তেমন নয়, সবচেয়ে হল ভয়। -ভয়?? -আমাকে যদি নিয়ে না যান, সেই ভয়। যদি এদের মাঝেই জীবন কাটাতে হয়, সেই ভয়। যদি বাপের বোঝা হয়ে উঠতে হয় আবার, সেই ভয়। -কিন্তু হিংসে? রাগ? দু:খ? -ওসব আসে ভালোবাসার সম্পর্কে। এই সম্পর্ক নিছক প্রয়োজনের, আর প্রয়োজনটা আমারই বেশী। ****************************************** “মনে মনে কত এতোলবেতোল চাওয়া নির্ঘুম চোখে ঘুম আসবেই জানি একলা শরীর পুড়ছে আগুনতাপে মন শুয়ে আছে এক কোণে, অভিমানী।” (ঈশানী রায়চৌধুরী) এক শীতে গোত্র পরিবর্তন, গড়িয়ে গড়িয়ে অন্য শীত এসেছে। সেই কালো রাতে জমিয়ে শীত পড়েছে। লেপের বাইরে মুখটা ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। এক একবার জাগ্রত অবস্থায় লেপ তুলে তুলে মুখ ঢাকছে কিন্তু নিদ্রায় তলিয়ে যাবার ফাঁকে লেপও স্থান বদলাচ্ছে। গভীরঘুমে দরজায় খুট করে শব্দ কিছুই অর্থ বয়ে আনেনা কিন্তু পরক্ষণেই মুখে চাপা দেওয়া লোমশ হাত, আর কানের কাছে শ্লেষ্মা জড়ানো কামার্ত স্বর, “আমি তোমার কষ্ট বুঝি।” ভয়ে নীল হয়ে সেই বিষাক্ত হাতে মরণকামড় দেয় সে আর সেই হাত অস্ফুট আর্তনাদ করে তাকে ছিটকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। এতদিনের স্তব্ধতা প্রাণঘাতী চিৎকার হয়ে বেরিয়ে পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। শ্বশুর- শাশুড়ি, বড়ভাসুর-জা,ছোটননদ সকলে ছুটে আসে, কেবল এত চ্যাঁচামেচিতেও মেজ ভাসুরের ঘুম ভাঙেনা। সে তখন হেঁচকি তুলে কাঁদছে আর ভয়ে ঠকঠকিয়ে কাঁপছে। অনেক চেষ্টায় ব্যক্ত করে সে ঘটনাটির কথা। ছেলেরা বধির সেজে তক্ষুণি ঘর ত্যাগ করে। শাশুড়ি অসন্তুষ্ট স্বরে বলে ওঠেন, রাতদুপুরে ভূতের স্বপ্ন দেখে লোক জ্বালাবে! এ কি রকম ধিঙ্গিপনা! বলেন বটে, ছোটননদকে রেখেও যান তার সাথে শুতে, ভেতর থেকে শিকল তুলে দিতে নির্দেশও দিয়ে যান। পরেরদিন কোনো দূর্ঘটনার কবলে পড়ে মেজভাসুরের কব্জি কাটে, ওনাকে হাতে কাপড় বেঁধে ঘুরতে দেখা যায়। “হৃদয় রক্তাক্ত তবু… সেই পথে হেঁটে যাই একা ছায়ামুখে তির্যক আলো… ভালোনামে চিনি,’মরিচিকা'” ( ঈশানী রায়চৌধুরী) এর কিছুদিন পরেই স্বামীর থেকে ডাক আসে। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয় মেয়েটি। ততোদিনে কেমিস্ট্রি নিয়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে সে কলেজের শেষ পরীক্ষায়। দেশ ছাড়ার আগে বাপের বাড়ি যায় দিনকতকের জন্য। তার চেহারা দেখে বাপের চোখও হোঁচট খায়। মায়ের চোখ দিয়ে ধারাস্রোত বইতে থাকে, ঠাকুমা তার শাশুড়ির নামে শাপ শাপান্ত হাহাকার করে- সোনার মাইয়্যাডারে শ্যাষ করে দিসে হা….। তারপর একদিন দুরুদুরু বক্ষে, দ্বিধাগ্রস্থ পায়ে নতুন জীবনের দিকে তার ওড়া শুরু হয়, গন্তব্য সানফ্রানসিসকো (৬) ” Life is a series of natural and spontaneous changes. Don’t resist them- that only creates sorrow. Let reality be reality. Let things flow naturally forward in whatever way they like.” – Lao Tzu এখন তার নিজস্ব একটি সংসার। দুটি থালা, তিনটি বাটি, দুটি ডেচকি,একটা কড়াই আর হাতা খুন্তি। এই নিয়েই পরিপূর্ণ সে। মাঝে মাঝে নিজেকে চিমটি কেটে দেখে, এইসব সত্যিই হচ্ছে তার সাথে, সত্যি! সে কোন ডাল রাঁধবে, কোন মাছ, সব নিজেই ঠিক করবে! এমনটাই তো স্বপ্ন দেখত সে। থালায় খাবার সাজিয়ে স্বামীর সামনে ধরে দিচ্ছে আর স্বামী তৃপ্তমুখে চেটেপুটে খেয়ে যাচ্ছেন। স্বামীর মুখ দেখে অবশ্য কিছুই বোঝেনা। জিজ্ঞেস করলে উত্তর পায়, নুনটা কম দিও, অথবা মাছটা আরো কড়া ভাজা হত। ভাপের মাছ আবার কবে কড়া ভাজা হয়! সে কথা বলতে গেলেই, তর্ক করবেনা, বলে থামিয়ে দেন। তাকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছেন ইউ.সি.বার্কলিতে। তার যে কপালে এত সুখ ছিল কদিন আগেও কি সে জানতো। মনে মনে কান ধরে, দাঁতে জিভ কাটে ক্ষণেক্ষণে, হে ঠাকুর, অনেক অভাব অভিযোগ করেছি, অনেক দুষেছি তোমায়। মাপ করে দিও, পরমেশ্বর। বার্কলিতে গিয়ে দিশেহারা অজপাড়াগাঁয়ের কিশোরীসম লাগে নিজেকে। এদের ভাষা চলনবলন কিছুরই তাল খুঁজে পায়না। সেদিন ক্লাসের মাঝে পাশে নজর পড়তেই বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল, একটি ছাত্র সামনের ডেস্কে প্রোফেসরের দিকে পা প্রসারিত করে বসে একাগ্র চিত্তে লেকচার শুনছে। বাকি ক্লাসে সে আর মন বসাতে পারলো না। খালি মনে হচ্ছে এই বুঝি প্রফেসার ধমক দিয়ে ওঠেন ছেলেটিকে! কিন্তু প্রফেসরের কোন হেলদোল দেখল না, পড়ত তাদের হেডস্যার মহাবীরবাবুর পাল্লায়, পায়ের ওপর দু’দশ ঘা দিয়ে ডেস্কে পা তোলা ঘুচিয়ে দিতেন জন্মের মত! আর কি সব জামা আর চুলের বাহার! তার ডানদিকে বসে স্টিফেন, যার সাথে অল্পস্বপ্ল কথা হয় ভাষার বেড়াজাল পেরিয়ে, মুখের সামনে পর্দার মত তার চুলের ঝালর! সেই পর্দার আড়ালে, ঘুমোচ্ছে না জেগে আছে বোঝা শক্ত। অন্যদিকে কিরা, মেয়ে হয়েও তারদিকে তাকাতে লজ্জা লাগে এমনিই স্বল্পবাস! কিন্তু মানুষ মন্দ নয় এরা কেউই। প্রথম প্রথম যখন সিভিল স্ট্রাকচ্যারাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের এর আগামাথা কিছুই বুঝতে পারতনা সে, স্টিফেন তাকে সাথে করে ট্যিউটোরিয়্যাল ক্লাস চিনিয়ে দিয়েছিল, যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরাই অন্য ছাত্রছাত্রীদের পড়া বুঝতে সাহায্য করে। খুব সাহায্য হয়েছে তাতে। স্টিফেনকে ধন্যবাদ জানাতেই বললো, একদিন তা’লে কফি খাইয়ে দিও! স্বামীকে সেই কথা বলতেই ঠান্ডা গলায় বললেন, কলেজে পড়াশোনা করতে যাও, বন্ধু বানাতে নয়, সে কথা মনে রাখবে। মানুষটা মন্দ নয়, শুধু কেমন যেন ঠাকুর্দাসুলভ হাবভাব! পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু জীবনের খুঁটিনাটি কোনো কথায় কোনো আগ্রহ নেই। এমনও মানুষ হয়! অফিসে যাওয়া আসার বাইরে আগ্রহ বলতে কেবল রেডিয় চালিয়ে সংবাদ শোনা বা নিজস্ব পড়াশোনায় ডুবে থাকা। গান শোনা, গল্পের বই, গাছপালা,সিনেমা থিয়েটার, খেলাধূলা, নিদেনপক্ষে গল্প গুজব করা, কিছুতো শখ থাকে মানুষের! দুই একবার সিনেমা দেখতে বা রেষ্টোরেন্টে খেতে যাবার ইচ্ছে জাহির করেছিল, বলেছেন, ফালতু সময় নষ্টের কথা না ভেবে পড়াশোনাটায় মন দাও। পাড়ার এরিকা এসেছিল একদিন তার বাগানের একঝুরি ফল নিয়ে। খুবই প্রাণবন্ত মেয়েটি। এককথা- দুইকথা থেকে হাজারো কথা। স্বামী অফিস ফেরত ঢুকে এমন অসৌজন্যতা করলেন,শক্ত মুখে একচিলতে হাসি দেখালেন কি দেখালেন না, সোজা ভেতরে ঢুকে গেলেন! এরিকা দিব্যি বুঝল। সাথে সাথে তুমুল গল্প থামিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। কোন মুখে তাকে বসতে বলে সে। এরিকাকে বিদায় জানিয়ে ভেতরে আসতেই প্রবল ধমক, সারাদিন মুখে রক্ত তুলে খেটে বাড়ি আসি, গল্পে গল্পে তোমার রাতের খাবার বানিয়ে রাখার ফুরসৎ হয়না! মনে মনে লজ্জিত হয়ে চটপট রান্নায় লেগে যায় সে। কাজ শেষ করে স্বামীকে ডাকতে গিয়ে দেখে দরজা বন্ধ করে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তারও সে রাত কাটে লজ্জ্বিত অভুক্ত। এইসবেরই মাঝে জীবন একদিন একটু বর্ণময়। সামনের শুক্রবার স্বামীর বন্ধু আসবে অ্যারিজোনা থেকে কাজ নিয়ে, কাজের শেষে বিকেলে তাদের বাড়ি আসবে, থাকবে শনিবার। রবিবারে চলে যাবে। মহা উৎসাহে বাড়ি গোছাতে লাগে সে। বাড়ির বাড়তি ঘরে দেশ থেকে আনা কাঁথাসেলাইয়ের কাজ করা হাল্কা সবুজ চাদর বিছায়, কাঁচের গ্লাসে বাগান থেকে এনে ফুল সাজায়, স্বামীর কথামত ঝালছাড়া রান্না করে বিদেশী মানুষটির জন্য, কাঁটাছাড়া মাছ। এই প্রথম তার সংসারে কোনো অতিথী, যত্নে-সেবায় কোনো ত্রুটি রাখবে না, স্বামীকে এবারে মুগ্ধ করেই ছাড়বে! শুক্রবার দিন যেন থেমে থেমে এগোয়। দুপুর থেকে ঘরবার করে। চাদরের কল্পিত কুঞ্চন বারে বারে সমান করে, ভাতের উষ্ণতা যেন যথাযথ থাকে পরিবেশনের সময় সেই অভিলাষে ডেকচির গরম জলে ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে রাখে। দুই একটা দরকারী ইংরাজি বাক্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নানাভাবে বলা অভ্যেস করে। সন্ধ্যে পার করে স্বামী দরজা খুলে ঢোকেন তার বন্ধুকে নিয়ে -রমা, প্লিজ মিট মাই ফ্রেন্ড, ক্যেরেন। ক্যেরেন, দিস ইজ, রমা, মাই ওয়াইফ। এতক্ষণ ধরে মুখস্থ করা সৌজন্যবাক্য প্রাণপনে মনে করার চেষ্টা করে সে। কিছুই মনে আসেনা। ক্যেরেন এগিয়ে এসে তাকে জাপটে ধরে দুইগালে গাল ছোঁয়ায়। সম্বিত ফিরে পেয়ে ক্যেরেনের দুইগালে সশব্দে চুমু খায় সে। কি সুন্দর মেয়েটি! পিঠভরা থাকে থাকে সোনালী চুল, সাগরনীল চোখের মনি, দুধে আলতা গায়ের রং, লম্বায় তার স্বামীর সমান সমান। না করতে চেয়েও নিজের সাথে তুলনা করে বসে আর প্রবল হীনমন্যতায় আক্রান্ত হয়। কি করে পাল্লা দেবে সে এই বিদেশী রাজকন্যার সাথে! চোখের জল চেপে যত্ন করে খাবার পরিবেশন করে। ক্যেরেন যত না খায়, প্রশংসা করে তার দ্বিগুন। স্বামীর মুখেও মৃদু নরম হাসি, ঠিক যেমনটি সে ভেবেছিল। কিন্তু সেই খুশীর উৎস সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে সে। ছোটখাট কিছুই নজর এড়ায় না। স্বামী কেমন যত্নে জলের গ্লাস এগিয়ে দেন বান্ধবীকে অথবা খাবার তুলে দেন পাতে! তাদের প্রতিদিনের রাতের খাওয়ার সময়ের নি:স্তব্ধ রুটিন মনে আসে। সে প্রবল ঈর্ষার দ্বারা আক্রান্ত হয়, এই প্রথম। প্রয়োজন কবে যেন অধিকারকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে গেছে। আর অধিকার প্রতিদিন ভালোবাসার দিকে একপা দুইপা করে দূরত্ব কমাচ্ছে। পরের চব্বিশ ঘন্টা স্বামীর অন্যরূপ দেখে সে। সহনশীল, হাস্যোদ্দীপক এক নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয়। এমন রূপ দেখার সৌভাগ্য এতদিনে তার কখনো হলনা তো! নীরবে হাতের কাজ সারে বসার ঘরের দিকে পেতে, সব বোঝেনা কিন্তু দুটি মানুষের হৃদয়ের গভীরতা গোপন রাখা যায়না। রাজকন্যার তার স্বামীর প্রতি আলোঝলমল গভীর দৃষ্টি অথবা বিদায় নেবার আগে রাঙা দুইচোখ তার ব্যথিত হৃদয়ের কথা উন্মুক্ত করে দিয়ে যায়। রবিবার রাতে খেতে বসে আবার সেই অসহ নীরবতা। কিছু বলার চেষ্টায় বারদুয়েক ঠোঁট ফাঁক করে তৃতীয়বারে মরিয়া হয়ে বলেই ফেলে। -ওকে বিয়ে করলেনা কেন? -ক্কিই!! -ক্যেরেনকে কেন বিয়ে করলেনা? অপর মুখে আকাট বিস্ময় দেখে হাত ধুয়ে সুটকেসের তলায় রাখা জুতোর বাস্ক এনে পাশে রাখে। -বাড়িতে মেনে নিতোনা। -ওকে আর এখানে এনোনা। (অন্যপক্ষ চুপ) -তোমার ইচ্ছে হয় তো অন্য কোথাউ দেখা করতে পারো। -আমার সেরকম কোনো ইচ্ছে নেই, রমা, বিশ্বাস করতে পারো। অনেক অনেকদিনের ব্যর্থ নিদ্রাহীন রজনী এই প্রথমবার মদিরতা ছড়ালো। হয়ত শুধু একটি নিশিই! “মন জানে আর কেউ জানে না। সোনা বন্ধুরে মন জানে আর কেউ জানে না ও বন্ধুরে তোমায় পাইবো পাইবো পাইবো আশে ইহজীবন জীবন গেল্ বিফলে প্রেমের রশি দিয়া গলায় হইলো কী লাঞ্ছনা আমার হইলো কী লাঞ্ছনা কলিজা হইয়াছে অঙ্গারে কলিজা হইয়াছে ছিদ্ররে বন্ধু ধরলো ঘূণে ছাড়ালো নারে ছাড়ালো নারে ছাড়ালো নারে মন জানে আর কেউ জানে না। সোনা বন্ধুরে মন জানে আর কেউ জানে না” (৭) ভবিষ্যত গড়িয়ে আসে বর্তমানে আর বর্তমান জলছাপ ফেলে অতীতে নির্বাসিত হয়। জীবনের গতি অব্যাহত থাকে শ্বাস গ্রহণ আর শ্বাস ত্যাগের ছন্দে। যথাসময়ে দুটি নতুন মানুষ যুক্ত হয় তাদের জীবনের প্রাত্যহিকতায়। ততোদিনে মেয়েটি উপার্জন করছে, দুইহাতে সংসার সামলাচ্ছে। স্বামীর উদাসীনতা- অবহেলা-নিষ্ঠুরতাকে জীবনের অঙ্গ করে নিতে নিজের সাথে যুঝে যাচ্ছে প্রাণপনে। তার গর্ভজদের প্রতি দ্বিধাহীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জোর সে অর্জন করেনি এখনো। সেদিন যেমন, শিশুদুটি বাইরে খেলছিল। স্বামী কাজ থেকে ফিরে ওদের ভেতরে ডাকতে বললেন। দোষের মধ্যে সে আপত্তি করেছিল, বলেছিল, সদ্য গেছে খেলুক খানিকক্ষন। সামান্য কথাকাটাকাটি, তার জেরে প্রথম উপার্জনের পয়সায় কেনা কাটগ্লাসের ফুলদানিটা আছড়ে পড়ল বসার ঘরের দেওয়ালে। তীব্র আওয়াজে বাচ্চাদুটি ছুট্টে ঘরে, তাদের চোখে ভয় প্রত্যক্ষ করে কান্না গিলে নেয় সে। মা হলে স্বকীয়তা বিসর্জন দিতে হয় সে জানে, স্বতন্ত্রতা তার চরিত্রে তো ছিল না কখনো! একদিন ফোন বাজে। ফোনের অন্যপ্রান্তে মা, হাউমাউ করে কাঁদছে, যৌথ উদ্যোগের ব্যবসায় তার পিতার সমস্ত টাকা পয়সা অপর ব্যক্তিটি ঠকিয়ে নিয়েছে, বাড়ি বন্ধক দিতে হয়েছে, নিজ গৃহে পরবাসী হয়েছেন তাঁরা। পিতা হৃদরোগে শয্যাশায়ী। দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে, সাথে নেয় মাতা-পিতার দেওয়া রাশিকৃত গহনা। বিনা আপত্তিতে সন্তানসহ স্বামীও চলেন সাথে, এমনকি গহনা দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে কঠোর আপত্তি করেন না। করলেও অবশ্য সে শুনতো না। এ সব যাদের থেকে পাওয়া, তাদেরই ফিরিয়ে দেবে।কাউকে ঠকিয়েতো কিছু করছে না, তাই মনে কোনো দ্বিধা, কোনো গ্লানি নেই। আটবছর পরে দেশের মাটিতে পা দিতেই পুরোনো তিক্ত স্মৃতির স্বচ্ছ আবরণ খসে যায়। কোনো এক দূর্বল মুহূর্তে স্বামীর কাছে উজার করেছিল সেই কালো রাতের কথা, আরো অনেক দু:সহ দিনের কথা। এতটুকু অন্তত আশা ছিল, তার অপমান স্বামীরও অপমান হবে। তার সেই চিন্তার অযৌক্তিকতা স্বামীর কথায় প্রকট হয়, আমি আমার বাপ-মা, পরিবারের জন্য ক’টা টাকা পাঠানো ছাড়া আর কিছুই করে উঠতে পারি না। তোমার কথায় তাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে পারব না।… ঠিকই তো, এমন আশাও সে করেছিল কোন মূর্খামির বশে। অলিখিত কিন্তু অভেদ্য কারণবশত আগে সে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখে। বাড়ির মানুষগুলির পা ছুঁতেই মাথায় স্নেহের স্পর্শ কেমন ঘিনঘিনে অনুভূতি ছড়ায়। তাদের মোলায়েম হাসির পেছনে ক্রুর রূপ ঝলক দিয়ে যায় তার চোখের সামনে। একদিন যায়, দুইদিন যায়, তাকে বাপের বাড়ি নিয়ে যাবার নামও করেন না স্বামী। চারদিন পরে ধৈর্য বাঁধ ভাঙে- -কালকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে চল। -কালকেই কেন? -কালকে আমি মায়ের কাছে যাব। -যেও। -তুমি? -আমি বাচ্চাদের নিয়ে বড়মার বাড়ি যাব। তোমাকেও যেতে বলেছে। -আমি কাল মায়ের কাছে যাব। -তোমার গয়নাগুলি সব দিয়ে আসবে? -ওইসব আমার মা-বাবার দেওয়া। -তোমার বাবাকে রাজী করিও বসতবাড়িটা তোমার নামে লিখে দিতে তারবদলে। আরো একবার স্বামীর নীচতার পরিচয়ে মূক হয়ে যায়। এতো নতুন কিছু নয় তবুও কেন যে বারেবারে আহত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনা নিজেকে! দরজার পাশের অস্পষ্ট খসখসানিতে উদগত কান্না ঘষে মুছে ফেলে। কিছুতেই নিজের দূর্বলতা কাউকে দেখাবেনা। পরেরদিন দিনের আলো ফুটতে একলাই রওনা দেয়। এখন আর সে কুড়ি একুশের ভীরু যুবতী নয়। তিরিশে পৌঁছনোর আগেই মননে সে প্রৌঢ়াপ্রায়! ….এই পাড়েতে দরদী নাই ওই পাড়েতে যাই চল যাই হয়না আমার পাড়ে যাওয়া, হয়না আমার তোমায় পাওয়া চঞ্চলিয়া বহিয়া যাও কোন ঘাটে লাগাইবা তোমার নাও সুজন মাঝি রে কোন ঘাটে লাগাইবা তোমার নাও আমি পাড়ের আশায় বইস্যা আছি আমায় লইয়্যা যাও…. মায়ের সোনার সংসারের দৈন্যদশায় তার চোখে জল আসে। বড়দা নিজের আখের গুছিয়ে পৃথক হয়ে গেছে। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাইটা একটা কাপড়ের দোকান দিয়েছে, যেটা টিমটিম করে চলছে। খুব পরিশ্রম করছে ভাইটা ব্যবসাটাকে দাঁড় করাতে। ঠাকুমায়ের তুলসিমঞ্চে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। মায়ের অবস্থা সবচেয়ে করুণ,একদিকে বাবা একদিকে ঠাকুমা, দিনরাত তাঁদের সেবায় নিয়োজিত থেকে হাতের শিরা, কন্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে। আজন্ম দেখে আসা মায়ের গলার মোটা বিছেহার, হাতের জোড়া কঙ্গন দরিদ্রতার গ্রাসে অন্তর্হিত। বাবার হাতে এক সন্ধ্যেতে গয়নার বাস্ক তুলে দেয় সে। -বাড়িটা ছাড়িয়ে নাও বাবা। প্রৌঢ়ের চোখের পাশ দিয়ে জল গড়ায়। নীরবে তার মাথায় কাঁপা হাত রাখেন। দশদিন মায়ের হাতে হাতে কাজ করে, বসিরহাট থেকে ভাইয়ের পাইকারী দরে কেনা বাবাস্যুট, সায়া, ব্লাউজ নির্দিষ্ট প্যাকেটে প্যাকেটে দক্ষতার সাথে ঢোকায়, ঝুল ঝাড়ে, তুলসিতলায় সন্ধ্যা দেখায়। বাবাকে যত্ন করে বসিয়ে খাওয়ায়, হাঁটতে নিয়ে যায়।বাবার মধ্যে সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপের ছায়াটুকু খুঁজে পায়না, বুকভরে মায়া আসে, বাবাকে বুধনের মত ভেবেই খুব যত্ন করে। ঠাকুমাকে রামায়ণ পড়ে শোনায়। সবকিছু করে শুধু নিজ জীবন সম্পর্কে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। মা যখন একবার কথা তোলে, নাতি-নাতনীদুটোকে চোখের দেখা দেখলাম না এখনো, মৃদু গলায় সে থামিয়ে দেয়, ওদের নিয়ে এলে তোমাদের সাহায্যে লাগতে পারতাম না। ওদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হত। ভাইটা খুব খুশী সে আসাতে, বলে, ছোড়দি, বাড়িটায় যেন প্রাণ এসেছে! শব্দহীন হাসি হেসে ভাইয়ের চুলগুলো ঘেটে দেয়। দিনদশেক বাদে শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ মারাতেই ছানাদুটো এসে বুকে ঝাপিয়ে পড়ে। কি ছিরি হয়েছে তাদের! শাশুড়ি উচ্চস্বরে গজগজ করেন, লাটসাহেবের নাতি-নাতনি বানিয়েছে, গরীব ঠাকুমার রান্না মুখে রোচেনা। স্বামী গলা তোলেন, -আক্কেলটা কেমন তোমার? মায়ের ঘাড়ে ছেলে মেয়েদুটোকে ফেলে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে এলে। এরপরে আর কোনোদিনও বাপের বাড়ি গিয়ে থাকার তাল কোরোনা। সকালে গেলে বিকেলে ফিরে আসবে। অনর্থক বিবাদে বিবিমিষা জাগে। অহেতুক একটাও শব্দ খরচ করেনা। মুখবুজে বাকী ক’টাদিন কর্তব্যগুলো যান্ত্রিক নিয়মে করে যায়। খুব অসহ্য লাগলে কল্পনায় কল্পনায় বিদেশে তার বাগানের দোলনাটায় বসে দুলুনি খায়। একা হওয়ার জো নেই এই বাড়িতে কিন্তু ভাগ্যিস তার মনের কলকাঠির নাড়ার মালকিন সে নিজেই! -সেই শেষ, আজ অব্দি আর দেশে যাইনি। -ঠাকুমা, বাবা, মায়ের মৃত্যুতেও নয়? -না, বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকার অনুমতি ছিলনা। একেবেলার জন্য মুখ দেখাতে কোন লজ্জায় যাব? -কষ্ট হয়না? হাসিমুখ মেঘের আড়ালে চলে যায়। ছলকে ছলকে জল আসে, তারপর দমকে দমকে। নীরবে মাথাটা বুকে চেপে রেখে কাঁদতে দিই। দেববাবু রণেনদাকে গাড়ি দেখাতে নিয়ে গেছেন। মুনু-সোনু নিজের নিজের ঘরে ব্যস্ত। খানিকবাদে অপ্রস্তুত মুখ তোলেন। -আমাকে কোনো লজ্জা করবেন না, রমাদি, আমাদের সবারই একটা নিশ্চিন্তে কাঁদার জায়গা চাই। -মৃত্যুশয্যায় শুয়েও মা বলেছিল, তোকে আসতে হবেনা। আমি তোর সাথে সবসময় থাকবো। আবার জল উপচিয়ে আসে। আমি রমাদিকে জড়িয়ে চুপ করে বসে থাকি। আমাদের মাঝখান দিয়ে সময় বয়ে যায় ক্রমাগত। “মরোনা, মরোনা মাগো, ধরি তোমার শ্রীচরণে মা ম’লে মা মেলেনা মা, খুঁজিলে মা ত্রিভুবনে।” (৮) পাঠক, তুমি কখনো সুস্থ সতেজ সবুজ ঘাসকে প্রখর রোদের হাত থেকে বাঁচাতে আচ্ছাদিত করে রেখে দেখেছ কি হয়? আমি দেখেছি। ক্যালিফোর্নিয়াতে ক্ষরার প্রকোপে জল ব্যবহারের সাত সতেরো বিধিনিষেধ। একদিন আমাদের লনের যে অংশে সবচেয়ে বেশী রৌদ্রদহন হয় সে অংশটা আমরা ঢেকে দিলাম। রাত্রিতে নিয়ম করে পরিমাপমত জল দিতাম, সময়মত খাবার…তারপর একদিন আবিষ্কার করলাম ঢাকা অংশটা পুড়েছে সবচেয়ে বেশী! কেন বলতো? সূর্য যখন মধ্যগগনে ক্রমাগত তাকে জ্বালাচ্ছে পোড়াচ্ছে অবিরত, আপাদমস্তক ঢাকা থাকায় সে তাপ নিষ্কাশন করতে পারেনি আঢাকা ঘাসেদের মতন। তাই তার এ দূরাবস্থা! রমাদির সাথে আলাপ হওয়ার পরে আমার তাঁকে ঠিক অমন আচ্ছাদিত পোড়া ঘাসের মত লেগেছিল। আগের পর্বে তিরিশের যে মেয়েটিকে ছেড়ে এসেছিলাম সে তখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে। এক ছেলে, এক মেয়ের মা। জীবনে অনেক কিছু ততোদিনে অর্জন করেছেন। নিজে নামকরা আর্কিটেক্ট, ছেলে ডাক্তার হওয়ার পথে, মেয়ে বিদ্যালয়ের শেষ ধাপে, পাহাড়ের ওপর রাজপ্রাসাদসম বিশাল বাড়ি। লোকের হিংসাউদ্রেককারী একটি পরিপূর্ণ পরিবার। তাহলে কিসের অভাব? কিছুর অভাব অনুভব করতে গেলে আগে তা পেয়ে পরে হারাতে হয়। আর যা ছিলনা কোনোদিনও? তার অভাব কি অনুভব করে মানুষ কখোনো? ছোট থেকেই বাবার অমন বেহুঁশ রাগের স্বাভাবিক পরিণতিতে ছেলে-মেয়ে দুটোই মাঅন্তপ্রাণ! বাবাকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। আর ঠিক ধরেছেন, ছেলেমেয়েরা যে বাবাকে অপছন্দ করে সেটাও রমাদিরই দোষ। আরো ছোটবয়সে মেয়েটি নাকি মাকে বলত, তুমি কেন বাবাকে ছেড়ে নাইস কাউকে বিয়ে করনা? -সেরকম সম্ভাবনার কথা কখনো ভেবেছিলেন? -একা থাকার কথা বহুবার ভেবেছি ডিভোর্সের কথা নয়। -কেন? -হয়ত সংস্কার, হয়ত অভ্যাস, অজানাকে ভয় অথবা বাধ্য ভালোবাসা। -ভালোবাসা! -আমার মত মানসিকতার মহিলাদের পক্ষে স্বামীকে ভালোবাসাটা খুব কষ্টকর নয়। -মানে? -মানে জন্ম থেকে যেমন বাবা-মা-ভাই-বোনকে ভালোবাসি, তেমনি বুদ্ধি পাকার আগে থেকেই মা ঠাকুমাকে দেখে শিখে যাই স্বামী মানেই ভালোবাসা- শ্রদ্ধার পাত্র। -তেমন সত্যি হয় নাকি? মানুষ তার ব্যবহার দিয়ে ভালোবাসা-শ্রদ্ধা অর্জন করে না কি? -আমার ক্ষেত্রে মুশকিলটা কি হয়েছে জানো? আমি যদি শ্যাঁওড়াফুলি বা জিরাগ্রামেই আজন্মকাল রয়ে যেতাম তবে নি:শর্ত ভালোবাসতে শিখতাম, ঠিক আমার মা ঠাকুমার মত। আমার দুনিয়াটা বড় হল, নানা মানুষ, নানা সম্পর্ক দেখার পরে, তোমার রণেনদাকে ভালোবাসার মধ্যে শ্রদ্ধার পরিবর্তে কখনো কৃপা, কখনো ভয় মিশে যায়। পাঠক, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার সম্পর্কে অনিশ্চেয়তা-ভয় থাকলে সে সম্পর্ককে স্বাভাবিক বলতে পারি না। কিন্তু কিরকম ভয়? রমাদির কথা অনেকদিন অব্দি শুনে যা বুঝেছি উনি ভয় পান ওনার কোনো কাজ বা আচরণ ওনার স্বামীকে না রাগিয়ে দেয়। আর সেই চেষ্টায় উনি প্রাণপাত করেও কোনো ফল পাননা। কিছুদিন খুব স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকে বাড়ির তারপর কোনো একদিন তুচ্ছ কোনো কারণে জিনিসপত্র চুরমার হয়, ঘরে ঝড় ওঠে। -কৃপা করেন কি ভেবে? -আমি আগে মরলে একে ছেলে মেয়ে কেউ দেখবেনা। তারপর বলেন, -মানুষটার সব ভালো, শুধু রাগটা যদি কম হত। -একে রাগ বলেনা, অ্যাবিউজ করা বলে। -ও কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি। -রমাদি, জিনিসপত্র ভাঙচুর করা, গালাগালি, তান্ডব করা গায়ে হাত তোলার থেকে কম কিছু নয়। স্পষ্ট বুঝতে পারি রমাদি মুখে চুপ থাকলেও আমার কথা মানতে পারছেন না। -আচ্ছা একটা কথা বলুন। সত্যিকারের রাগী যারা তারা পান থেকে চুন খসলেই রাগ করে, যে কোনো জায়গায়, যে কারুর সামনে, যে কোনো পরিস্থিতিতে। আমি রণেনদাকে এত বছরে একবারও কেন রাগ করতে দেখলাম না আমাদের সামনে? রমাদি চুপ। -রমাদি, যারা পরিবেশ বুঝে, নির্দিষ্ট কারুর ওপর কেবল মেজাজ দেখায় তারা রাগী নয়, তারা অ্যাবিউসিভ চরিত্র। রণেনদা যদি রাগী হতেন তবে হাটে-বাজারে-অফিসে একই রকম ব্যবহার করতেন। আমার প্রথম পাঠ ওখানেই শেষ হয়। ********************************* আরো একদিন ফোনে শুনছি রণেনদার নতুন কাহিনী। বলা শেষ হয়ে অপরপক্ষ শান্ত হল, আমার দ্বিতীয় পাঠ শুরু করলাম। -আপনি যদি ঠিক করেছেন রণেনদার সাথে থাকবেন তবে এইসব প্রতিদিনের তিক্ততার ওপরে উঠতে হবে। -কি করে? -নিজের সুখের ভার অন্যের ওপরে ছাড়া বন্ধ করুন। কতদিন আর অন্যের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে অসুখী হয়ে বাঁচবেন? -কি করব? -যা যা নিজের ভালোলাগে সব করবেন। ফোনটা কুট করে কেটে যায়। নিজের কঠোর ব্যবহারে লজ্জিত হই। দু:খপ্রকাশ করে বার্তা পাঠাই। কোনো সাড়া নেই। ইতিমধ্যে ডিসেম্বরে বেড়াতে চলে যাই দিন দশেক। ফিরে আসার ক’দিন পরে রমাদির ফোন, -সেদিন রণেন বুঝতে পেরে গেছিল যে তোমাকে ওর কথা বলছি, সে কি অশান্তি! এবার থেকে আমি তোমাকে সময় বুঝে ফোন করব, যখন ও থাকবে না। ************************************* দিন যায়। অনেক অনেক কথা হয়। রমাদির থেকে আমিও অনেক শিখি। একবার মুনুকে নিয়ে খুব অশান্তিতে রয়েছি। বন্ধুদের সাথে স্যান্টাক্রুজে যাবে ষোলোর দল, গাড়ি চালাবে আঠারো। রুট সতেরোর সেই আঁকাবাঁকা পথ। চিন্তা ভাবনায় অস্থির আমি। -একটা সময়ে ছাড়তেই হবে, উম, সারাজীবন বুকে করে রাখতে পারবেনা। যেতে দাও ওকে। তোমার চিন্তাটাকে সম্মান করতে শেখাও। আরো একবার- মুনু চুলের নীচগুলো বেগুনী করবে। আমার প্রবল আপত্তি। মুনুর কান্না। -উম, সবকিছুতেই ‘না না’ করলে সেই ‘না’ গুরুত্ব হারাবে। চুল বেগুনী করলে কার কি ক্ষতি? অন্যদিকে রমাদিকে অল্প বিস্তর বোঝাতে সক্ষম হই অন্যের ক্ষতি না করে নিজেকে যত্ন করা, ভালোবাসা অপরাধ নয়। এখন রমাদি সাঁতার শিখতে যান, ইন্টারনেট এর মাধ্যমে দেশের এক গায়িকার থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখেন, যা ওনার ছোট্ট থেকে স্বপ্ন ছিল। রণেনদা সীমা ছাড়ালে সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সেসব না সয়ে অন্য ঘরে গিয়ে জোরে জোরে গান শোনেন। বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝেই কফি খেতে যান, রণেনদাকে লুকিয়ে। খুব ছোট্ট ছোট্ট চাওয়া, কিন্তু তা পাওয়ার পথ পেরোতে পেরোতে চুল পেকে গেল সেই সেদিনের মেয়েটির। ছেলে মেয়ে দুজনেই প্রতিষ্ঠিত, মাঝে মাঝে তাদের কাছে গিয়ে ক’দিন কাটিয়ে আসেন। হয়ত সুখী নন কিন্তু জীবনটা অনেক সহনীয় এখন। ************************************** পাঠক,নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখ, অনেক ‘রমাদি’ দেখবে। শুধু আমেরিকাতেই দুই থেকে চার মিলিয়ান মহিলারা অ্যাবিউজড হন প্রতি বছর যাদের কেস নথিভুক্ত। দলিলপত্র ছাড়া এমন কেস আরো কত যে আছে! তুমি যদি রমাদির মত কারুর দেখা পাও, তাকে রাস্তা দেখিয়ো, সাথে থেকো, কিন্তু তার সিদ্ধান্তকে সম্মান দিও। আর কিছু না পারো, সহানুভূতির সাথে তার কথাগুলো শুনো। কারণ অনেকসময় শুধু দুটি দরদী কান, দু:খী মানুষের অনেকটা দু:খহরণ করতে পারে। আর এমন সুখ-দু:খ ভাগাভাগি করেই আমাদের জীবন চলতে থাকুক! আমেন! ———————–

1202

9

stuti..

নতুন জায়্গা

এই নিয়ে দ্বিতীয় বার চাপলাম চলমান ব্লগে | প্রথমবার তো ট্র্যকে কি গণ্ডোগোল হল যান গেল উলটে |ঠিকঠাক চালিও বাপু ..| বোঝইতো এ বয়্সে একবার ডিগবজি খেলে হাড়গোড় আর আস্ত থাকবে না |উল্টে কিছু গালমন্দ জুটবে |

922

0

দীপঙ্কর বসু

এলাম

আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে

913

1