শিবাংশু

সুমনসিম্ফনি-১

গান ভালো লাগার যে আবেগ বা মনন তা মগজে গজাল মেরে আনা যায়না। সে তখনই 'সুখদা' যখন সে 'স্বয়মাগতা'। ------------------------------ যেমন আমি সুমনকে শুধু তাঁর নিজস্ব গানের মানদন্ডেই মূল্যায়ণ করার পক্ষে। রবীন্দ্রসঙ্গীত বা হিমাংশু দত্তের গান তাঁর শখের ব্যাপার, সেখানে তাঁর কিছু প্রমাণ করার নেই। তাঁর 'হয়ে ওঠা গান' বইটি নিশ্চয় অনেকেরই পড়া আছে। এই 'হয়ে ওঠা' ব্যাপারটি আমার মনে হয় শুধু তাঁর নিজের গানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি জানিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কিছু তালিম তিনিও নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ কৈশোর পেরিয়ে কঠিন হতে থাকে এবং নমনীয়তা হারায়। আমাদের চেনা গানে সঠিক সুরসংস্থান করতে গেলে কণ্ঠের নমনীয়তা অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি নিজের গানের মাঠটিই পাল্টে ফেলেন এবং গান পরিবেশনের সময় মূলত বিদেশি ছাঁচের স্ট্যাকাটো ধরনটি গ্রহণ করেন। এই পরীক্ষায় যে তিনি বেশ সফল হন, তার সাক্ষী ইতিহাস। ---------------------------- তিরানব্বই সালে একটি অনুষ্ঠানের সূত্রে তিনি আমাদের শহরে এসেছিলেন। তখন তাঁর সূর্য মধ্যগগন যাত্রী। একটা সারা দিন তাঁর সঙ্গে নানা আড্ডা, আলোচনায় কেটেছিলো। তখন বলেছিলেন তিনি একজন একটি বিশেষ সময় কালের গায়ক। হয়তো পাঁচ বছর পরেই তাঁর গান আর কেউ শুনবেনা। আমরা তো চমৎকৃত। তখন তাঁকে আমরা সলিল চৌধুরির পর বাংলা গানের মসিহা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি, তাঁর মুখে এমন কথা? কিন্তু তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে যে কতোটা ওয়াকিফ ছিলেন তা এভাবেই প্রমাণ হয়ে যায়। ---------------------------------- শিল্পী হিসেবে নিজের এই মূল্যায়ণ তিনি আত্মমর্যাদার অঙ্গ হিসেবেই করেছিলেন হয়তো। কিন্তু প্রায় বিশ বছর কেটে যাবার পরেও তাঁর গান মানুষ শুনছে আর এই সব গান থেকে অন্তত পঞ্চাশ ষাটটি গান বাংলা গানের মাইল ফলক হিসেবে আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবে। ------------------------------------ নচিকেতার সঙ্গে তাঁর গানের তুলমামূলক আলোচনা নিয়ে বহু শ্রোতা আগ্রহী হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, নচিকেতার সুর যোজনার বৈচিত্র্য নিয়ে আমার মতো ইতর লোকও অনেক কথা লিখতে পারে। অকৃপণভাবে ভাংড়া থেকে গজল, রক থেকে রেগি, ভাটিয়ালি থেকে গোয়ান সুর, হির থেকে ব্লুজ, বৈঠকি থেকে বাউল, সবই তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। কিন্তু তার মধ্যে কটা শেষ পর্যন্ত শিল্পমূল্য অর্জন করে উঠতে পেরেছে সেটাই জরুরি। 'সাফল্য' একটি ঘটনা তো বটেই। কিন্তু এক সময় " ক্যয়সে বনি সিলোরি কে বিনা চটনি", বাজারের ভাষায় 'ছপ্পর ফাড়কে' হিট হয়েছিলো। অতএব, শেষ কথা কে বলবে? ------------------------ আমাদের ছোটোবেলায় দেখতুম সত্যম্বর অপেরার একটি আসরে যতো উচ্ছ্বসিত দর্শকের ভিড় থাকে, বহুরূপীর সারা বছরে ততো দর্শক জোটেনা। তাই এভাবে কে সফল আর কে বিফল, তা বিচার করতে যাওয়াটা মূঢ়তা। দিনের শেষে "... ভালো আমার লেগেছে যে , রইলো সেই কথাই..." ------------------------- এখানে একটা গান শুনি আমরা। গানটি সম্পর্কে সুমনের কিছু স্মৃতিচারণ রয়েছে, সেটাও পড়ি। আর পড়ি এর লিরিকটি। কেন সুমনকে নিয়ে লিখতে প্রয়াস পাই, তার কিছুটা প্রমাণ এখান থেকে সংগ্রহ হয়ে যাবে। ------------------------ "সিলভার স্প্রিং এর বাসা। বোধহয় ১৯৮৩ সালের গরমকাল। রাতের ডিউটি সেরে বাসায় ফিরেছি। বসার ঘরটা নানান বাজনা আর যন্ত্রে ঠাসা। এর পাশে একটা ইলেকট্রিক পিয়ানো। সদ্য কিনেছি। নতুন প্রেমের মতো সারাদিন হাতছানি দিয়েছে পিয়ানোটা। ঘরে ঢুকেই আফিসের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে সটান গিয়ে বসলাম পিয়ানোয়। ঘরের আলো জ্বালাইনি। মস্ত কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরের আলো যেটুকু ঢুকছে তাতে ঘরটা আবছায়া। বাইরের আলো মানে রাস্তার স্থিমিত আলো। পিয়ানোয় একটা কর্ড বাজিয়ে জানলা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল দূরে একটা তারা। মুহূর্তের মধ্যে কি যে হয়ে গেল। এরকম আর কখনো হয়নি। পিয়ানো বাজিয়ে, ধীরে ধীরে আস্ত একটা গান বেঁধে ফেললাম - কথায় সুরে মিলিয়ে। কথাটা লিখতে হল না। লাইনগুলো গাইতে গাইতে আপনিই তৈরি হয়ে গেল সুর সমেত। আমার আর কোন গান আমি এভাবে বাঁধিনি। এর আগে বা পরে কখনও গোটা একটা গান কথা বা সুর একসঙ্গে বেরিয়ে আসেনি আমার ভিতর থেকে। কি করে যে এটা সম্ভব হয়েছিল আমি আজও জানিনা। এটুকুই শুধু জানি যে গানটা বাঁধার সময় বিশেষ ভাবতে হয়নি আমাকে।" ('সুমনের গান সুমনের ভাষ্য' ) "সারারাত জ্বলেছে নিবিড় ধূসর নীলাভ এক তারা তারই কিছু রং নাও তুমি শহরে জোনাকি জ্বলে না - নয়তো কুড়োতাম সে আগুন নীল - হয়তো, যা কিছু নেই নাইবা হল সব পাওয়া না পাওয়ার রং নাও তুমি। বড় বেরঙ্গিন আজকাল কাছাকাছি কোন রং পাই না, তাই দিতে পারি না কিছু কিছুই রাঙানো হল না - নয়তো আগামীর রঙে ছোপাতাম - হয়তো এই মলিন আর এ-ধূসর পথ চাওয়া এ চাওয়ার রং নাও তুমি।"

952

6

মানব

কাব্যি-কথা

ঘরের খেয়ে বনের মানুষ তাড়ানোই স্বভাব রেগে যেতে গিয়ে দেখি হরমোনের অভাব বইয়ের পোকা, খেলার ভক্ত কতই মানুষ হয় সব কিছুতেই হেরে আমার হারার নেইকো ভয় এমনি করেই একদিন মেট্রোরেলে চড়ে দিলাম পাড়ি, দিল্লি থেকে একটু আসবো ঘুরে রবিবারের দুপুর তাই ভিড়ে ভিড়ে ঠাসা এরই মাঝে পকেটমারের শুরু ঝেড়ে কাশা হাত ধরেছি হাতেনাতে ভয়েতে সে চুন বলে, ‘ছেড়ে দাওগো দাদা, ঘরেতে নেই নুন’ আমার আবার দয়ার শরীর ছেড়েই দিলাম তারে একটু দূরেই গোল বাঁধলো পাঁচটি মিনিট পরে তাকিয়ে দেখি সেই লোকটাই গণধোলাই খায় মনে মনে ভাবতে থাকি, ‘আমিই বোকা, হায়’।

948

6

Somen dey

শুনতে শুনতে -১

শুনতে শুনতে -১ *********** এক একটা গান এক এক টা দিনে না বলে কয়ে কেমন করে যেন ঢুকে পড়ে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে একেবারে অন্দর মহলে  । খোলা জানলা দিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকে পড়া একটা ভোমরার মত । নাছোড়বান্দা ভোমরা টা যেমন ঘরে ঢুকে গোত্তা মেরে ঘরের এদিক থেকে ও দিকে এলোমেলো জিক জ্যাক ফরম্যাশনে ঘুরে বেড়ায় । একটু ক্লান্ত হলে সোফার হ্যান্ডেলে , বইয়ের তাকে বা ফুলদানীর গায়ে বসে খানিক জিরিয়ে নেয় । তার পর আবার নুতন উৎসাহে আবার আরম্ভ করে উড়তে উড়তে গুন গুন করা ।ঠিক তেমনি তেমনি এ রকম হটাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা গানের একটা কলি সারাদিন ধরে অন্দরমহলে ঘুরে বেড়ায়, কাজের ফাঁকে ফাঁকে থেকে থেকে মনটাকে টেনে ধরে ।হয়ত বহুবার শোনা গান ।তবে একটা নতুন চেহারা নিয়ে আসে । সেদিন যেন গানটা জেদ ধরে বসে তার ভল্টে রাখা গয়না গাটি গুলো , সে আমাকে দেখাবেই দেখাবে । আজ সকাল থেকে তেমনি করে আমার ভিতরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে একটা গান  । আর থেকে থেকে উড়ে বেড়াচ্ছে । কবে কার সে গান ! বোধ হয় হাফ প্যান্ট পরে কোনো এক শীতের দুপুরে রেডিও তে অনুরোধের আসরে প্রথম শোনা । সেই কৈশোরের প্রায় সব কিছুই তো ঘসা কাঁচের ওপারে ধুসরতার হারিয়ে গেছে । তবে এ গান কোথা থেকে উঠে এলো । আসলে গানের কোনো বয়স হয় না । একটা জন্ম তারিখ থাকে ।তবে সেটার কোনো মানে নেই । এ গানের জন্মতারিখের হিসেবে এ গানের বয়স অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে । *** কোনো প্রিলিউড মিউজিক ছাড়াই শুরু হয় এ গানের মুখড়া - -মরি হায় গো হায় হায় এলে যখন আমার ভাঙ্গা / ঘরে শুন্য আঙ্গিনায় যে কোনো সৃষ্টিকে কান্নার রঙ যেমন করে সুন্দর করে দিতে পারে তেমন আর কিছু পারে না । সে রকম কান্না দিয়েই শুরু । এ গানের আদ্য প্রান্ত নির্ভেজাল সলিল চৌধুরির ঘরানা । খামাজ নিয়ে তাঁর প্রিয় খেলা । আবার ইমন দিয়ে মাঝে মাঝে একটু মোচড় দেওয়া । কিন্তু তাও এ গান শুনতে শুনতে কেন দেখা দিচ্ছে একটি আলখাল্লার প্রান্ত দেশ ? কোথাও কি কোনো মিল আছে আমার চেনা কোনো গানের সঙ্গে ? সে কি কথার ধরনে নাকি সুরের চলনে ? গান অন্তরাতে এগিয়ে যায় ‘তখন আমার ঝরা মালায় নিভু নিভু সুরভি পেতে জ্বালায় মৌ মাছিরা পরাগ দোলে চলে যায় যায় গো ... যায় এবারে যেন আলখাল্লাটা আরো একটু হাওয়ায় দুলে উঠলো , পাশা পাশি যে সুরটা আবছা সুরধুনীর মত বয়ে যাচ্ছিল সেটা কল কল স্বর শোনা গেল । ‘মৌমাছিরা পরাগ দোলে চলে যায়’ জায়গাটা খুব মিল লাগলো অন্য আর একটা গানের সঙ্গে । কিন্তু এ মিল ঠিক সে রকম মিল নয় যে শুনলেই চট করে ধরা যাবে । মনে পড়ল ‘বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী’ লাইন টা ।মানে সেই ‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী ’ গানটি । কিন্তু বাকিটা ? বাকি গানটায় মিল আর অমিলগুলো যেন মাঝে মাঝে আসে আর যায় । একটি শিশুর মুখে যেমন কখনো তার পিতার আবার কখনো তার মায়ের মুখের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় । আসলে পাশাপাশি শুনলে বা গাইলে মিলটা তেমন বোঝা যায় না । হারমোনিয়াম বা কী বোর্ডে সুরটা তুলতে গেলে হয়ত বোঝা যেতে পারে মিল গুলো । রবীন্দ্রনাথের ওই গানের ছোটো ছোটো স্বর বিন্যাস গুলো কে নিয়ে একটু আগে পরে করে সাজিয়ে একটা নুতন নির্মান । রামানন্দ বন্দোপাধ্যায়ের ছবিতে যেমন করে যামিনী রায় আসেন তেমনি করেই এসেছে এ গানে রবীন্দ্রনাথ । এ গানের শেষ অন্তরার শেষ লাইন ‘চৌদিকেতে বিদায় করুণ সুরে গায়’ আর ‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী’ গানের শেষ অন্তরার শেষ লাইন ‘চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি’ । ‘চৌদিকে’ শব্দটি কি খুব সচেতন ভাবে রেখেছিলেন সলিল চৌধুরি । এভাবেই রবীন্দ্রনাথের কাছে ঋণ স্বীকার করেছিলেন ? হয়ত হ্যাঁ , হয়ত না । সে যাই হোক গানটির শরীরে আজও মুগ্ধতা আদায় করে নেবার অনেক কিছু আছে । **** এ গানের আর একটি ঐতিহাসিক পটভুমি আছে । তখন সবিতা ব্যানার্জি সবে এসেছেন সলিল চৌধুরির জীবনে । প্রথম স্ত্রী কে হারিয়ে সলিল চৌধুরি ব্যাক্তিগত জীবনে তখনো সব কিছু সামলে সামলে উঠতে পারেন নি ।একজন সাধন সঙ্গিনীর প্রয়োজন ভীষন ভাবে অনুভব করছেন । সে একাকীত্ব গানের ছত্রে ছত্রে আছে । সুরের মিল ছাড়াও এ গানের কথাও যেন মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথকে ‘সকাল বেলা চেয়ে দেখি / দাঁড়িয়ে আছো তুমি একি / ঘর ভরা মোর শুন্যতারি বুকের পরে ’ এখান থেকেই হয়ত জন্ম নিয়েছে –‘এলে যখন আমার ভাঙ্গা ঘরে শুন্য আঙ্গিনায়’ । সেই সঙ্গে আবার সেই সঙ্গে এ গান সলিল চৌধুরির সুরে সবিতার ব্যানার্জীর প্রথম রেকর্ড ।দুজনেরই খুব আলাদা একটা ইমোশন্যাল এটাচমেন্ট ছিল এই গানটির সঙ্গে । সেই জন্যেই এ গানটির আর কোনো ভাষায় রুপান্তরিত করেন নি । যেটা সলিল চৌধুরি তাঁর অধিকাংশ হিট গানের ক্ষেত্রেই করেছিলেন এ গানের ক্ষেত্রে সেটা করেন নি  । https://www.youtube.com/watch?v=11Or3yjiIVQ

1044

6

শিবাংশু

প্রাণপণ গাছের শিকড়

বরাইবুরুর শালবন শেষ হয়ে আবার শালবন বসেছে। সামাজিক বনসৃজন। এই শীতের শেষে সেখানে পাতায় কতো রং। একটু গরম পড়লেই শিমুলের খোসা ফেটে তুলোবীজ উড়তে থাকে চারদিকে। হাওয়ার থেকে মাথায়, গায়ে, আস্তিন ছুঁয়ে ঘুড়ির টানে আবার আকাশে উড়ে চলে যায়। ------------------------------- একটা প্রশ্ন উড়ছে। কোন সন্তান প্রেয়? ছেলে না মেয়ে? কীভাবে আসে এ ভাবনা, জানিনা। আশীর্বাদের বাছাবাছি? সন্তান তো আশীর্বাদমাত্র। এই শরীর থেকে জন্ম নিয়েছে হয়তো। কিন্তু সে তো নিসর্গের অংশ। কিছুদিন সঙ্গে থাকে। আবার ঐ শিমুল বীজের মতো নিজের আকাশে উড়তে চলে যায়। হাজার হাত বাড়িয়ে তাকে ধরাছোঁয়া যাবেনা। তার কক্ষপথ আলাদা। চলার পথে হয়তো কখনও দুটো সমান্তরাল চলতে থাকা রেলকামরা থেকে পরস্পর উঁকি দিয়ে রুমাল নেড়ে চলে যাওয়া, যতোক্ষণ না ট্র্যাকের রেখা দুদিকে সরে যাচ্ছে। আঁকড়ে থাকা, বলা ভালো আঁকড়ানোর চেষ্টা, নিরাশা ছাড়া আর তো কিছুই দেবেনা। তবু বিহঙ্গ হে, পাখা বন্ধ করতে শেখোনা, কেন? -------------------------------- সকালে সঙ্গিনী একটা ফেবু বার্তা দেখালেন। তাঁর এক বন্ধুর পাঠানো, একজন মা তিনিও। " Our children are ultimately our showpieces, are'nt they"। দুজনে হেসে উঠি। আমাদের দীর্ঘ পথ চলা থেকে যে সব সার সত্য অনেক মূল্যে আহরণ করেছি, সে সব অলীক জগতের দৈববাণী হয়ে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসে। আমার ছেলে আই আই টি, আই আই এম। প্রত্যুত্তরে হয়তো ভেসে এলো আমার মেয়ে এম আই টি। এখন স্ট্যানফোর্ডে। তার পর? তার আর পর নেই। না, আছে। আমাদের ট্রেন তো নিজের ট্র্যাকেই, নিজের মতো চলে যাবে। তবে সন্তানস্নিগ্ধ ঐ শব্দগুলি, ঐ ব্যঞ্জনাগুলি 'আমাদের' জীবনে কেমন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসবে কোনোদিন? কন্যা বা পুত্রবধূ সন্তানসম্ভবা হলে ছ'মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা। বন্ধুহীন, সাহচর্যহীন দূর অচেনা বিদেশে ছ'মাসের কারাদন্ড। সন্তানের সাফল্য তার ব্যস্ততার পরিমাপে। সপ্তাহান্তে গাড়ি নিয়ে কোথাও গাছপালা, হ্রদ, পাহাড়, পার্ক দেখতে যাওয়া। সন্তানের শিকড় বদলে গেছে, বসে গেছে, স্থায়িত্বের স্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছে হয়তো। কিন্তু? ওঁহা হম অজনবি হ্যাঁয়। তবে সন্তানের প্রয়োজনে যদি বাপ-মা এগিয়ে না যায়, তবে কে যাবে? পরবর্তী প্রজন্মের অংকুরকে ছুঁয়ে দেখার সাধও তো থাকে কোথাও, মনের কোণে, অলক্ষ্যে। স্নেহ অতীব বিষম বস্তু। --------------------------------- কয়েকদিনের জন্য দেশে এলে, "দেখো, তোমার মা যেভাবে সানি'কে হ্যান্ডল করছেন, আমার রিজার্ভেশন আছে। কতো আননোন ইনফেকশন চারদিকে। ঐটুকু বাচ্চা ...উইল ডেফিনিটলি ফল সিক।" ঠিকই তো, নতুন শো'পিস। মিং রাজত্বের নীল পটারি। দেখো, মগর দূর সে..... ---------------------------------------------- সব গল্পই কি একরকম? হয়তো না। ব্যতিক্রম নিয়মকে প্রতিষ্ঠা দেয়। বাপ-মা অসুস্থ হলে, নিরাময় না হলে, সন্তান কাঁদে তো। নিজের মতো কাঁদে। কোনোটা দেখা যায়, কোনোটা যায়না। তারা সতত 'নিজের মতো'। সেটাই তো স্বাভাবিক, স্বাগত বিবর্তন। কিন্তু বারবার দেখি বাপ-মা আর 'নিজের মতো' হয়ে উঠতে পারেন না। হয়তো হতে চান না। জীবনের যে পর্যায়ে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা হঠকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়, সব জেনেও তাঁরা অনেকেই সে চেষ্টা করে যান। সন্তানকে জানতে দিতে চাননা, বাপ-মা'ও নিসর্গের অংশ। যেমন রোদ, বৃষ্টি, ক্লোরোফিল, ভিটামিন ডি। পূর্বগামিনী ছায়া, একদিন পশ্চিমগামিনী হবেই। তবু বাপ-মা'র জন্য শো'পিসের 'সম্মান', 'নিরাপত্তা', 'স্বাচ্ছন্দ্য' যেকোনও মূল্যে বজায় রাখতেই হবে। তারাই তো আমাদের 'সার্থকতার প্রতীক', সাফল্যের সাঁঝবাতি । ভালোবাসা মানে কি শুধু আলখাল্লা-পরা স্মৃতির মেঘ? ------------------------------------- " ......মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের সবই দরকার। আমরা ঘরবাড়ি গড়বো- সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো। রুপোলি মাছ, পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো।" (একবার তুমিঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

1837

9

জল

অবকাশ -১

বাড়ি মানে শুধু চার দেওয়াল আর একটা ছাদ নয়, বাড়ি মানে একটা সময়ের দলিল, ইঁটের পাঁজরে লেগে থাকা আবেগ, বাড়ির আত্মার সাথে একাত্নটা, আবেগঘন মুহুর্তে বাড়িকে আপন আত্মার অংশ করে নেওয়াই হল অবকাশ।

1273

73

মনোজ ভট্টাচার্য

বই মেলা - মেলা বই !

বই মেলা - মেলা বই ! কদিন আড্ডার সবাই যেমন হা-হুতাশ কান্নাকাটি – হায় হায় করছিলেন – তাতে আমার মনে হল – আমরা এখানে থাকলে তো কেউ তাকিয়েও দেখেন না ! আর ঠিক তখনই মনে পড়ল – আড্ডার মধ্য-মণি জামশেদপুরের বাবিদা গেছেন বই মেলায় ! তাই সবাই পিত্যেস করে বসে আছেন – কি রসদ উনি আনেন মেলা থেকে ! মেলায় আমরা পৌঁছেছি দুপুর দুপুর । - তখনই দেখি কিভাবে জন-সমাগম হতে আরম্ভ হয়েছে ! – তবে নিরাপত্তার কারনে – পুলিশী উপস্থিতি এবার বেশিই মনে হল। তবে সেটা উৎপাতের পর্যায় পড়েনি ! প্রতিবারের মতোই বিভিন্ন হলগুলো এক একজনের নামে হয়েছে । প্রথমটাই বিজয়া রায়ের নামে, পরেরটা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের নামে, তার পরেরটা বাদল বসুর নামে ইত্যাদি । - কিন্তু এই হলের মধ্যে বেশির ভাগ ইংরিজি বই বা উচ্চ শিক্ষা স্তরের বইয়ের স্টল ! একটু দমবন্ধকর পরিবেশ ! – বরং বাইরের স্টলগুলো আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের যায়গা বলা যায় ! স্টলের ভেতরের মানুষদেরও চেনা চেনা লাগলো ! আর ফুটপাথের ওপর বসে বিভিন্ন চিত্রশিল্পী, কারুশিল্পী ইত্যাদির দোকানগুলো – সত্যিই দেখবার মতো । - এখানেই তো বেশি ভিড় ! এইরকমই এক ফুটপাথের শিল্পদ্রব্যের সামনে ফটো নিতে গিয়ে বাধা পেলাম ।- তুলবেন না প্লীজ ! – ঠিক আছে – তুললামই না ! - খানিক পরেই দেখি – কেউ বা কারা ফটো নিচ্ছে । আবার ক্যামেরা বার করেছি । যথারীতি বারন । তাহলে ওনারা যে তুলছেন ! – ওনারা হল – মিডিয়ার লোক ! – আরে, আমিও তো মিডিয়ার লোক! – দোকানি-শিল্পী বুঝতেই পারলেন - আমার মিথ্যে কথা ! কি আর করা ! জস্মিন দেশে জদাচরেৎ ! আমাদের খুবই ইচ্ছে করে দোকানে দোকানে ঢুকে ঢুকে বইগুলো একটু হাত দিই বা সুচনাগুলো পড়ি ! কিন্তু দোকানদারদের মুখগুলো খুব খুসী খুসী দেখলাম না । গুরুচণ্ডালীতে উঁকি মেরে দেখলাম – এক ভদ্রলোক বসে আছেন বটে – কিন্তু আড্ডা মারার জন্যে খুব উৎসুক মনে হল না ! কিন্তু তার পরের দোকানেই – ভেতর থেকে ডাকাডাকি করে আমাদের দুজনকে বুকে টেনে নিল - মানে ভেতরে নিয়ে গেল আরকি ! - টেগোর রিসার্চ ইন্সটিটিউট । ওখানেই আবার একজন ছিলেন – রবীন্দ্র গবেষক! আলোচনা শুরু হয়ে গেল । এই প্রসঙ্গে আগে বলা দরকার – আমি শুভম নামে একটা শারদীয়া পত্রিকা – পড়তে পড়তে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ দেখলাম । রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবন । লিখেছেন নিত্যপ্রিয় ঘোষ ! এসব কেউ পড়ে কিনা জানি না ! অনেক তথ্য – যা বিশ্বভারতী কেন্দ্রিয় সরকার গ্রহন করবার পর – কিভাবে রথীন্দ্রনাথকে বহিস্কার করার চক্রান্ত ও তারই স্বজনেরা তাতে লিপ্ত থাকার কাহিনী বলা হয়েছে । এই আলোচনা প্রসঙ্গেই অবধারিতভাবে এসে গেল – রবীন্দ্রনাথের নামে কিশ্যা - বেশ কিছু তথাকথিত রবীন্দ্র-গবেষক নাটক-উপন্যাস লিখে টি ভিতে দেখিয়ে - ভালই টাকা কামাচ্ছে -! কোথা থেকে শুরু – কোন দিকে চলেছে – লেখার ধরন – এইসব আলচনান্তে – ফোন নম্বর দেওয়া ! ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম বলিভিয়ার স্টল, ও আরও অনেক স্টল । আর দেখলাম – একটা বোতল দাঁড়িয়ে আছে । বই কিনলে বোতল ফ্রী ! – হ্যাঁ – এইভাবেই নিজের বোতল-পুরান পত্রিকা বিক্রি করতেন – দাদাঠাকুর ! এখন করছে দোকানদার ! তবু তো কিছু মানুষ তাঁর নামটা জানতে পারছে ! বিদূষক শরচ্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ! কিন্তু বই মেলার সবচেয়ে বেশি যায়গা দখল করেছে – জাগো মা বাংলার মাটি ও মানুষ । খুব সম্প্রতি দেখা গেছে - মা-মাটি-মানুষের ১৬তম শতবার্ষিকী উপলক্ষে - শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে ! তা সেখানেও সেরকম ভিড় নেই ! – টয়লেটের পাশেই দেখলাম বি জে পির মুখ – মনে হল স্বচ্ছ ভারতের মুখ দেখিতেছি ! মেলার ভিড় বেড়েছে অনেক গুন ! চাটএর দোকানদার বলল – ষোল লাখ টাকা নাকি দিতে হয় ওদের ! তার মানে নিশ্চয় সে টাকা ওঠে ! কিন্তু সে টাকার কতটুকু যায় বইয়ের প্রকাশকদের পকেটে ! – যেমন আমাদের মতো কটা লোক অত দাম দিয়ে বই কিনবে – কটাই বা কিনবে ! - আমরা তো মাঝেমাঝে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথেও তো ঢুঁ মারি ! – তার ওপর অন লাইনে বই পড়ার অভ্যেসটাও তো গড়ে উঠেছে ! একটা কথা মনের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে দোলা খাচ্ছে । লেখাটা খুবই প্রতিক্রিয়াশীল হবে নিশ্চিত। - বিনা পয়সার মেলায় - এত মজা আছে যে বই কেনাটা আবশ্যিক নয় ! তার বদলে খাওয়া দাওয়া টি ভি উৎসব ! - আবার একটা জন মঞ্চ আছে – এসব ছেড়ে কার সময় আছে – পাঁচিল ডেঙ্গানো সুশীল লেখকদের দলীয় বার্তা শোনার ! বইমেলা নাম হলেও বইয়ের চেয়ে মেলা বেশি ! বেশ একটা জম্পেস হট্টমেলার দেশ ! মনোজ

897

8

সুভাষ

রূপান্তরী-৭ : উপসংহার ও ধন্যবাদজ্ঞাপন

আমাকে রূপান্তরী শীর্ষক ব্লগ রচনা করার প্রথম প্রেরণা দেন শ্রীমতী শ্রীপর্ণা পাল, পরে আরও অনেকে। কাজটা যতটা সহজ হবে ভেবেছিলাম, পরে টের পেলাম তা নয়, কারণ আমি দায়সারা ভাবে কোন কাজ করতে পারিনা। অকপটে জানাই, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পছন্দ করে এসেছি, রাতভর অনুষ্ঠান শুনেছি, কিছু রাগ চিনতে শিখেছি, কিন্তু গভীরে যাইনি, তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্লগ রচনা করার মত পাণ্ডিত্য অর্জন করিনি। প্রচুর পড়াশোনা করে ও আন্তর্জালের মাধ্যমে জ্ঞান সঞ্চয় করে বুঝলাম রাগের পরিচয়, চলন, পকড় ইত্যাদিতে কিছু মতভেদ আছে। অবশেষে পণ্ডিত ভাতখণ্ডের অনুসরণে রাগসঙ্গীতের পরিচয়পর্ব সারলাম। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের চর্চা থাকায় ঐ পর্বসকল অনায়াসে রচনা করতে সক্ষম হয়েছি। পাঁচ দশকের উপর সব জঁরের গান শোনার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থাকায় রূপান্তরিত গান চিহ্নিত করতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। দেড় মাস গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তর্জাল ভ্রমণের পর অবশেষে এটি শেষ করতে পারলাম। আমার ব্লগের সাথে অন্যান্য text ব্লগের একটি প্রধান পার্থক্য হ’লো এই যে আমি You Tube Video-র মাধ্যমে মূল ও রূপান্তরিত গানের উদাহরণ রেখেছি। তাই এটি সমগ্ররূপে অনুধাবন ক’রতে প্রচুর expenses on internet হয়, কিন্তু video examples বাদ দিলে এই ব্লগ নীরস হয়ে যায়। হয়তো এই জন্যই আমার ব্লগ আশানুরূপ hits পায়নি। *********************************************************** এবার ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পালা। (সুবিধার্থে নামের সম্ভাষণ বাদ দিচ্ছি)। প্রথমে ধন্যবাদ জানাই শ্রীপর্ণা পাল ও অরিন্দম রায় (admin) এই দুজনকে — আমাকে এই ব্লগ রচনার সু্যোগ দেওয়া এবং আমার জন্য special nested blog with lock/unlock feature incorporate করার জন্য। দীপঙ্কর বসু আমাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাপারে ব্যাপক সাহায্য করেছেন, তাঁকে জানাই আমার অপরিসীম ধন্যবাদ। অপন বসু, মুনিয়া ঘোষ, অরিন্দম সেনগুপ্ত, সোমেন দে, শিবাংশু দে, কৌশিক ঘোষ, অরিন্দম চক্রবর্তী, হিমাদ্রী চক্রবর্তী, সুতপা সেন, জলি চক্রবর্তী,‌ তৃপ্তি বেরা ও আরও অনেকে নানাভাবে আমাকে উৎসাহিত করেছেন, আমার আন্তরিক ধন্যবাদ এঁদের সবাইকে। যে সকল বন্ধুগণ নিজেদের অমূল্য সময় ব্যয় করে আমার ব্লগ দেখেছেন, তাদেরও আমার ধন্যবাদ জানাই। সলিল চৌধুরীর সকল গানের সংগ্রাহক নেদারল্যান্ড নিবাসী বন্ধু গৌতম চৌধুরী ও You Tube-এ প্রচুর দুষ্প্রাপ্য গানের উপস্থাপক বন্ধু পূজন দড়িপা আমাকে কিছু গানের সন্ধান দিয়েছেন, এঁদের জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আমার পুরোনো বন্ধু (৺মুকুল দাসের স্নেহধন্য ছাত্র) অভিজ্ঞ পিয়ানোবাদক জয়ন্ত মল্লিক “সকলি ফুরালো” scoresheet-এ আমার প্রস্তুত chord arrangement দেখে দিয়েছেন, তাকে স্কচের বদলে জানাই শুধুই ধন্যবাদ! পরিশেষে, বিলম্বিত ডিনার ও আমার বদমেজাজ সহ্য করে ব্লগ রচনায় মদদ দেওয়ার জন্য আমার স্ত্রী ইন্দিরাকে জানাই সপ্রেম ধন্যবাদ। রূপান্তরী ব্লগ রচনার জন্য প্রয়োজনীয় tools & resources একটি ছবিতে নিবদ্ধ করলাম, দেখুন।

1250

8

সুভাষ

রূপান্তরী-৬ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী ফিল্মী গান

হিন্দী ছবিতে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের বহুল পরিমানে রূপান্তর হয়েছে। সলিল চৌধুরী, রাহুল দেববর্মন, শঙ্কর জয়কিশেন ও আরো অনেকে বিদেশী গানের অনুসরণে হিন্দী গান রচনা করেছেন। সলিল চৌধুরী (১৯২৩-১৯৯৫) দিয়ে শুরু করছি। তাঁর পিতা আসামের এক চা বাগানে ডাক্তারের চাকরি করতেন, তাই তাঁর বাল্যকাল সেই মুক্ত প্রকৃতির মাঝে কেটেছে। তখন ভারত স্বাধীনতা লাভ করেনি, চা বাগানে ইংরেজ সাহেবদের দাপট ছিল। সেই রকম কোন এক সাহেব বাগান ছেড়ে দেশে যাওয়ার সময় তাঁর গ্রামোফোন ও প্রচুর রেকর্ড ডাক্তারবাবুকে দিয়ে যান। সঙ্গীতপিপাসু সলিল চৌধুরী সেইসব রেকর্ডের সঙ্গীতমাধুর্যে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর সঙ্গীতে প্রত্যক্ষে অথবা পরোক্ষে বিদেশী সঙ্গীতের প্রভাব পড়েছে। একটি Polish গানের সুর ও তালের মেলবন্ধনে উদ্বুদ্ধ হ’য়ে তিনি মধুমতী ছবির একটি গান রচনা করলেন। প্রথমে দেখুন ও শুনুন Polish song: “Szla dzieweczka do gajeczka”. তবে video-টি এই সাইটে দেখা যাবেনা, পর্দার link follow ক’রে You Tube-এই দেখতে হবে! অথবা নীচের link-টি copy করে browser-এর address bar-এ paste করলে সাথে সাথে খুলে যাবে।. https://youtu.be/o39o2ao-5eA

1188

1

সুভাষ

রূপান্তরী-৫ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা আধুনিক গান

রূপান্তরীর এই পর্বে আমি উদাহরণসহ শোনাবো পাশ্চাত্যসঙ্গীত প্রভাবিত কিছু বাংলা গান, তবে বক্তৃতা কম থাকবে, কারণ এখানে আমি বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাস লিখতে বসিনি। “ars longa, vita brevis” অর্থাৎ শিল্প দীর্ঘ, জীবন অল্প। প্রথমে থাকছে একটি পুরাতন American folk song, compose ক’রে গেয়েছেন এক কালো মানুষ, Lead Belly অথবা Leadbelly নামে পরিচিত, আসল নাম Huddie William Ledbetter. বারো তারের গীটারের সাথে ইনি নীল গান গাইতেন। উগ্রস্বভাবের এই মানুষ আইন মানতে চাইতেন না, প্রায়ই জেলে থাকতেন, কিন্তু তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে অনেকসময় ছাড়াও পেতেন... এই গানটির দুজনের গাওয়া শোনাব, প্রথমে শুনুন blues music-এর জন্মদাতা সীসেভরা কণ্ঠের গায়ক Lead Belly-র গান Irene Goodnight.

1240

3

দীপঙ্কর বসু

স্মৃতি-বিস্মৃতি ছায়ে -১

৫ সোনারপুরার গলি থেকে বড় রাস্তায় বেরিয়ে আমরা ঠিক করলাম খেতে যাবার আগে আমরা পঞ্চকোট কালিবাড়িটা দেখে নেব । এ মন্দিরের কথা আমার জানা ছিলনা । ইরা ভরসা দিল মন্দিরটা সুন্দর আর সেই সঙ্গে জুড়ে দিল ওয়ারেন হেস্টিংস এর সঙ্গে কাশীরাজের লড়াই এর কাহিনী । সেই রণস্থল পঞ্চকোট কালিবাড়ির কাছেই । জানত খবরটা আমার মনযোগ আকর্ষণ করবেই । কাশীরাজ চৈৎ সিং কে বশে আনতে ওয়ারেন হেস্টিংস সৈন্যসামন্ত নিয়ে ঘিরে ফেলেছিলেন গঙ্গা তীরের চৈৎ সিং এর দুর্গ ।১৭৮১ সালের ১৭ই অগাস্ট বেধেছিল লড়াই । কিন্তু পরম পরাক্রমশালী হেস্টিংস বাহিনীর সঙ্গে এটে ওঠা চৈৎ সিং এর ক্ষমতায় কুলায়নি সেদিন । নিজের কেল্লার মধ্যেই বন্দী হন চৈৎ সিং । কেল্লা ঘিরে রাখে হেস্টিংস এর ফৌজ । কিন্তু বেশিদিন বন্দীদশায় কাটাতে হয়নি চৈৎ সিং কে । গঙ্গা মুখো কেল্লার একটি জানালা দিয়ে চৈৎ সিং পালিয়েছিলেন । খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা অসি ঘাট থেকে পদযাত্রা শুরু করে চৈৎ সিং ঘাটে সে কেল্লা এবং কেল্লার সেই জানালাটা আমরা দেখেছি – অতটা উঁচু থেকে নিচে নামার কোন অবলম্বনহীন সেই জানালা দিয়ে কি করে পালালেন চৈৎ সিং ভাবতে অবাক লাগে। ইরার তার শোনা কথা জানালো – কেউ বলে ওই জানালা দিয়ে বন্দী চৈৎ সিং লাফিয়ে পড়েছিলেন গঙ্গার জলে এবং সাঁতরে গঙ্গা পেরিয়ে রামনগরে আশ্রয় নিয়েছিলেন । আবার অন্য কেউ কেউ বলে বর্ষার ভরা গঙ্গায় ওই জানালার নীচেই বাঁধা ছিল একটি নৌকো । নিজের পাগড়ি খুলে দড়ির মত পাকিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন নিচের দিকে আর সেই পাকানো কাপড় বেয়ে নিচে নেমে এসে নৌকোতে চেপে গঙ্গা পার হয়ে রামনগরে চলে গিয়েছিলেন । সোনারপুরা থেকে রিক্সা চেপে আমরা অকুস্থলে পৌছলাম বটে ,কিন্তু সেখানে গিয়ে জানাগেল পঞ্চকোট মন্দিরে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে । অগত্যা ফিরতি পথে কিছুক্ষনের জন্য দাঁড়ালাম ওয়ারেন হেস্টিংস এবং চৈৎ সিং এর যুদ্ধক্ষেত্রের সামনে । একটা ঘিঞ্জি অপরিচ্ছন্ন অঞ্চলে রেলিং ঘেরা একফালি সমাধিক্ষেত্র – পুরাতত্ত্ববিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য বলে খ্যাত হলে কি হয় , পুরাতত্ত্ববিভাগ শুধু রেলিং দিয়ে জায়গাটাকে ঘিরে রাখা ছাড়া আর কোন দায়িত্ব স্বীকার করেনি । একটা পাথরের ফলকের লেখা পড়ে অবগত হলাম যে চৈৎ সিং এর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ইংরেজ পক্ষের যে কয়জন প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের ওই জায়গাতেই সমাধিস্থ করা হয়েছে । কিছুটা হতাশ মনেই অবশেষে একটা অটো চেপে আমরা হাজির হলাম রবীন্দ্রপুরী নামে একটা অপেক্ষাকৃত ঝকঝকে অঞ্চলে । ইরার অতি পরিচিত একটি চিনে রেস্তোরাঁয় ঢোকা হল । কেতাদুরুস্ত ভাবে আহারকক্ষটি স্বল্পালোকিত ,মৃদু বাজনা বাজছে । পছন্দ মত একটা বসার জায়গা খুজে বের করতে গিয়ে ইরা বোধহয় খেয়াল করেনি গোটা আহারকক্ষের মেঝে সমতল নয় – বসার আয়োজনে বৈচিত্রের খাতিরে সেটি কয়েকটি ধাপে বিভক্ত । ফলে আনমনে চলতে গিয়ে সেই উচ্চতার হেরফেরটা লক্ষ্য না করেই পা বাড়ান মাত্র ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে প্রায় প্রপাত চ ...। কিন্তু কোন মন্ত্রে যে অমন বিশ্রী রকমের পদস্খলন সত্বেও নিজের ভূপতনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করল তা বাবা বিশ্বনাথই জানেন । আমি শুধু অবাক হয়ে দেখলাম এই আকস্মিক দুর্ঘটনার মধ্যেও ইরা প্রচুর হাস্য রসের উপাদান খুজে পেল । আমি তাকে দেখে শুনে চলার সদুপোদেশ দিতে যাচ্ছিলুম কিন্তু হাসির তোড়ে সে সব কথায় উড়েই গেল । পুরনো দিনের গল্প করতে করতে খাবারের অর্ডার দেওয়া হল – স্টারটার হিসেবে এল বেবী কর্ণ ,বেশ মুচমুচে খেতে । সেটি খেতে গিয়ে আমার সাধজাগল পানীয়ের –কিন্তু সে বস্তু ওই রেস্তরাঁয় অমিল ,কাজেই একটা ঢোঁক গিলে মনোবাসনাটা চেপে গেলাম আমি । অতঃপর সেজুইন রাইস আর চিলি পনীর এল মেইন কোর্স হিসেবে । খাওয়া যত না হল ফেলা গেল তার প্রায় দ্বিগুন । তবে দিনটা হিসেব করে চলার ছিলনা কাজেই অপচয়টা গায়ে না মেখে বেরিয়ে এলাম রেস্তোরাঁ থেকে । খাবার আগে না পরে সঠিক মনে পড়ছেনা , সেদিন দুর্গাবাড়ির কাছে আর একটি পার্ক দেখেছিলাম এবং সেখানে কিছু ছবিও তুলেছিলাম পরে জেনেছি যে সেটি আসলে সুন্দর বাগান ঘেরা ভাস্করানন্দের সমাধি মন্দির । সুন্দর কারুকাজ করা মন্দিরটি রাস্তা থেকেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল ।সাদা প্তহের তৈরী মন্দিরের মধ্যে ভাস্করানন্দের সমাধি ।উঁচু বেদীর উপরে যেন একটি গোলাকার শিবলিঙ্গ । পরে একটু খোজখবর নিয়ে জানতে পেরেছিলাম এই ভাস্করানন্দের পরিচয় । ১৮৩৩ সালে কানপুরের কাছে মিথেলপুর গ্রামে এক বিদ্বান ব্রাহ্মন মিশ্রলালের ঘড়ে জন্ম হয়েছিল এক শিশুর । তার নাম দেওয়া হয়েছিল মতিলাল ।অজ্ঞাতপরিচয় এক সন্ন্যাসী নবজাতক মতিলালকে আশীর্বাদ করে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে এ শিশু কালে এক মহাপুরুষ হবেন । অত্যন্ত মেধাবী ও উদার ও সংসারউদাসীন স্বভাবের মতিলালকে সংসারী করার জন্যে পিতা মিশ্রলাল অল্প বয়েসে তার বিবাহ দেন এক পরমাসুন্দরী কন্যার সঙ্গে । মতিলালের একটি পুত্রেরও জন্ম হয় ,কিন্তু তা সত্বেও মাত্র আঠেরো বছর বয়েসে মতিলাল গৃহত্যাগ করলেন । বারাণসীতে মতিলাল শাস্ত্রপাঠ করেছিলেন ।গৃহত্যাগ করার পরে তিনি গেলেন উজ্জয়িনিতে তপস্যার জন্য । সেখান থেকে দ্বারকায় গিয়ে শঙ্করাচার্যের সারদা মঠে বেদান্তের পাঠ নিয়ে এলেন এবং সাতাশ বছর বয়েসে সন্ন্যাসী পূর্ণানন্দ সরস্বতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহন করেন । মতিলালের নবজন্ম হল ভাস্করানন্দ সরস্বতী নামে । নানান অলৌকিক ক্রিয়াকর্ম এবং সরল নির্লোভ জীবন যাপন তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল । বারাণসীতেই ভাস্করানন্দ তাঁর গোটা জীবন অতিবাহিত করেছিলেন ,শুধু ১৮৯৯ সালে দেহত্যাগের পূর্বে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে নিজের জন্মভূমি দেখতে গিয়েছিলেন ।

1257

52

Somen dey

টুসু পরব –একটি যথার্থ হৃদয়ের উৎসব

পশ্চিম বাংলা এখন উৎসবময় । নানা ছুতোয় নানান রকমের উৎসব হচ্ছে সরকারী উদ্যমে । হটাৎ করে যেন আমাদের শিকড় বড়বেশি করে টানতে আরম্ভ করেছে । বর্ষা বসন্ত জল মাটি , নবান্ন ,অমুক ষষ্টি , তমুক সক্ক্রান্তি এ সব কে আরবানাইসড করে এক ধরণের উৎসবের হুজুগ লেগে গেছে  । গতকাল যে পৌষ সঙ্ক্রান্তি গেল সেটা আমরা পিঠে পরব বলেই জানি । বাড়িতে পিঠে হোক না হোক মিষ্টির দোকানে কিছু বিশেষ পিঠের চুটিয়ে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু শহুরে মানুষদের কজনই বা খোঁজ রাখেন এ দিনটি টুসু পরব বলে রাড় বাংলার মাটর সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষদের একটি হৃদয়ের উৎসব । ‘আমাদের’ বলতে এই আমরা যারা নিজেদের ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে পড়ি বলে মনে করি তাদের ‘টুসু ’ নামে কোনো আরাধ্য দেবী নেই । এক মাস ধরে এই রাঢ় বাংলার, বিশেষ করে মানভুম অঞ্চলে পূজিত হবার পরে মকর সংক্রান্তির দিন যে টুসু প্রতিমাকে কে খড়কাই , সুবর্নরেখা , কাঁসাই , গেঁদাই , শীলাই নদীতে বিসর্জন দেওয়া হবে তার সঙ্গে আমাদের তথাকথিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক আমরা তেমন করে স্বীকার করি না । সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য মহাশয় রচিত সাম , যজু ও ঋক বেদের থেকে সংগৃহীত সর্ব প্রকার পূজাপাঠের যে একমাত্র ম্যানুয়ালটি পাওয়া যায় তাতে এই টুসু পূজার জন্যে কোনো মন্ত্র নির্দিষ্ট করা নেই । কারন টুসু উৎসব এক অবৈদিক, অস্মার্ত, অপৌরাণিক এবং অব্রাহ্মণ্য উৎসব। আমাদের পাঁজীতে এ উৎসবের নির্ঘন্ট দেওয়া থাকে না  । টুসু এক কুমারী কন্যা । এর পূজাও করেন কুমারী কন্যারা ।আমরা যাদের নিম্নবর্গের মানুষ বলি সেই তাদের বাড়ির কুমারী কন্যারা । কিন্তু এ পূজার কোনো মন্ত্র তন্ত্র , নেই নির্ধারিত ক্রিয়া-কর্ম , কোনো বিশেষ উপাচারও নেই । অঘ্রান মাসের শেষ দিন থেকে পৌষ মাসের শেষ দিন অবধি রাঢ় বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে এই টুসু পুজিত হন  ।যে হেতু মন্ত্র তন্ত্র নেই , তাই এ পূজায় কোনো ব্রাহ্মনের প্রয়োজন হয় না । সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের ‘অশিক্ষিত’ মেয়েরা নিজেদের সাজানো রঙিন কাগজের চৌদলের উপর প্রতিষ্ঠিতা পোড়ামাটির টুসুর মূর্তির সামনে বসে নানা রকমের গান বাঁধেন আর সেই গান করেন কখনো সম্মিলিত কখনো একক কণ্ঠে । সে গানে টুসুর মহিমা কীর্তন শুধু নয় , থাকে তাদের যাপিত জীবনের সাধ আহ্লাদ , আশা নিরাশা , ঠাট্টা তামাশার কথা । এবং তাতে ছায়া ফেলে তাদের ঘিরে থাকা আধুনিক সময় , এবং তাদের গাঁ-ঘরের পারিপার্শ্বিক । কখনো থাকে ক্ষোভ প্রতিবাদ , কখনো থাকে দুঃখ বিষাদ ।এক মাস ধরে এই মন্ত্রহীন পুজার শেষে মকর সংক্রান্তির দিন ব্যাথিত হৃদয়ে তাদের ঘরের মেয়ের প্রাণের প্রতিমা কে তারা বিসর্জন দিয়ে আসে তাদের কাছের কোনো এক নদী অথবা পুকুরে । ফুল বেলপাতা নয় , ধানের তুষ দিয়ে এ পূজার ডালি সাজানো হয় বলে সম্ভবত এই দেবীর নাম টুসু হয়েছে  । কোল, মুন্ডা, ওরাওঁ, সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, ভুঁইয়া, কুর্মি, মাহাতো ,বাউরী বাগদী মহিলারা এই পূজো করেন । কিন্তু আশ্চর্য লাগে এই ভেবে গোটা পূজার্চনার ব্যাপারটা পরিচালিত হয় এই শ্রেনীর মহিলাদের দ্বারা আর এই উৎসবের প্রধান আকর্ষন এই মেয়েদের তাৎক্ষনিক ভাবে রচিত রচিত গান । নতুন ফসল ঘরে আসার খুশি উদযাপনের এর চেয়ে সুন্দর রুপ য়ার কি বা হতে পারে । এ তাদের প্রাণের গানের ভাষা আর সে গানে কখনো তাদের টুসু একেবারে আটপৌরে মেয়ে , তাদেরই মতন - ‘টুসু সিনাচ্ছেন , গা দলাচ্ছেন হাতে তেলের বাটি নয়ে নয়ে চুল ঝাড়ছেন গলায় সোনার কাঠি...’ আবার কখনো তাকে নিয়ে গ্রাম্য কোন্দল - আমার টুসু মুড়ি ভাজে, চুড়ি ঝনঝন করে গো উয়ার টুসু হ্যাংলা মাগি, আঁচল পাইত্যে মাগে গো। গাঁয়ের মেয়ে যখন শহরে চলে যায় লেখা পড়া শিখতে তখন সে কিছুটা শহুরে হয়ে যায় , হয়তো তার গ্রামের প্রতি টান কমে যায় , তেমনি একটা অভিমানের জায়গা থেকে গান বেরিয়ে আসে - ‘না রহিবেন গাঁয়ে টুসু যাবেন ইবার শহরকে আলতা চরন জুতায় ঢেকে দিবে না পা ডহর কে গীত গাহিবেন অবাক কলে , পান কিনিবেন দোকান লে বছর বছর সাধ জাগিলে আসতে পারেন উখান লে গঙ্গা সিনান , সিনেমা টকি , গড়ের মাঠ আর কালিঘাট বতর পাইলে লেখাপড়ায় হরেক কিসিম লিবেন পাঠ ‘ আবার টুসু যেন তাদের প্রিয় সখী , তাকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার আহ্বান - ‘চল টুসু খেলতে যাবো রানীগঞ্জের বটতলা অমনি পথে দেখাই আইনব কয়লাখাদের জল তুলা উলোট পালট ফুলুট বাঁশিতে আমার মন মানে না ঘরেতে ...’ আবার এ গানেরই শেষের লাইনে সেই জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়ার ব্যাথা, টুসুর কাছে কিন্তু কোনো চাওয়া নেই ,রুপং দেহি , ধনং দেহি নেই , জমিতে ধান না হওয়ার জন্যে কোনো অভিযোগ নেই , বরং তাকে সঙ্গী করেই চলুক জীবন সংগ্রাম – ‘ চল টুসু চল টাটা যাবো ধান হইল না কি খাবো ’ আবার সেই টুসু কে, পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিন বিদায় দিতে হবে , এক মাস ধরে সে ঘরে ছিল । তার সঙ্গে মনের প্রাণের কথা হয়েছে , তাই তাকে বিদায় বেলার মালা খানি , গান দিয়েই পরিয়ে দেওয়া – আমার টুসু ধনে বিদায় দিব কেমনে মাসাবধি টুসুধন কে পুজ্যাছি যতনে । শাঁখা সাড়ি সিঁদুর দিলাম আলতা দিলাম চরনে । মনে দুঃখু হয় বড় ফিরে যেতে ভবনে দয়া কইরে আসবে আবার থাকে যেন মনে ভুইলনা ভুইলনা টুসু আসবে আমার সনে । আমরা নবমী নিশি শেষে দুর্গার বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ব্যাথা নিয়ে অনেক গান শুনেছি , কবিতা পড়েছি । সে গান বা কবিতা হয়তো অনেক পরিশীলিত । ছন্দের বাঁধুনী অনেক মজবুত , গান অনেক সুরেলা । তবে ভাবনায় এই টুসুর গানেরই সমগোত্রীয় । সেই একই আবেদন - পুনরাগমনায়চ-স্থাপিতাসী জলে ম্বয়া । মাঝে মাঝে ভাবি বিপুলা এ পৃথিবী তো দূরের কথা এই ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া – বাংলা দেশ টাকেই বা কতটুকু চিনলাম । পুরুলিয়া , বাঁকুড়া জেলার বাড়িতে বাড়িতে যে কতকাল ধরে টূসু পরব হয়ে আসছে , মকর সঙ্ক্রান্তির দিন মেলা বসে আসছে পরকুল, পরেশনাথ, কেচন্দা, লক্মীসাগর, বীরপাট ও সুইসা ও মানবাজার কাশীপুর, হুড়া, ঝালদা, বলরামপুর, তালতলায়, তার খবর আমরা ক জনই বা রাখি । আমাদের দৌড় তো ওই সৌখিন বইমেলা বা পৌষমেলা অবধি । যখন আমরা পাঁজী পুঁথি দেখে আমাদের চেনা দেব দেবীর পুজো করি , তখন ভয়ে হোক আর ভক্তিতে হোক আমাদের থাকে একশো ভাগ নিয়ম-নিষ্ঠা , আর চেষ্টা করি সেই হাজার হাজার বছর আগে রচিত বেদে যে মন্ত্র বলা আছে তা যেন যথাবিহিত উচ্চারিত হয় । যে মানুষ টি ভক্তি ভরে পুজায় অংশ নিচ্ছে তার কাছে সে মন্ত্র বোধ্যই হোক আর অবোধ্যই হোক , তার সঙ্গে আমাদের আজকের জীবনের যোগ থাক অথবা নাই থাক । কিন্তু এই যে টুসু পুজোর গান , এখানে ওরা নির্ভয়ে আজকের জীবনের সুখ দুঃখের কথা শোনান তাদের আরাধ্য দেবীর কাছে । আমাদের বোধহয় নতুন করে ভাবা দরকার কারা বেশি আধুনিক আমরা না ওরা ! এই মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা জীবনের দর্শন , এই সরলতায় সম্বৃদ্ধ গান , যা শুনে বার বার মনে হয় – ...সে গানে বিদ্ধ বুক রক্তে অশ্রু ছল ছল এ যদি আমার দেশ না হয় তো কার দেশ বল ? আর ভাবতে ভালো লাগে আর কেও না হোক রবীন্দ্রনাথ স্বীকৃতি দিয়েছেন এই আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির এই ‘নিম্ন- অংশ ’ টিকে - ‘গাছের শিকড়টা যেমন মাটির সঙ্গে জড়িত এবং তাহার অগ্রভাগ আকাশের দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তেমনি সর্বত্রই সাহিত্যের নিম্ন-অংশ স্বদেশের মাটির মধ্যেই অনেক পরিমাণে জড়িত হইয়া ঢাকা থাকে; তাহা বিশেষরূপে সংকীর্ণরূপে দেশীয়, স্থানীয়। তাহা কেবল দেশের জনসাধারণেরই উপভোগ্য ও আয়ত্তগম্য, সেখানে বাহিরের লোক প্রবেশের অধিকার পায় না। সাহিত্যের যে অংশ সার্বভৌমিক তাহা এই প্রাদেশিক নিম্নস্তরের থাক্‌'টার উপরে দাঁড়াইয়া আছে। ’ আচ্ছা, এই যে ওদের আরাধ্য দেবী কে ঘিরে, চলমান জীবন থেকে উপকরন নিয়ে নির্বিশেষ মানুষদের গান বাঁধার উৎসব, আর সেই সুযোগে আরো একটু সবাই মিলে বেঁধে বেঁধে থাকার চেষ্টা , এমন উৎসব আমাদের , মানে যারা তথাকথিত ‘উচ্চ বর্গ’র মানুষ , তাদের নেই কেন ?বোধহয় আমরা সেই অকৃত্তিম সরলতা টা হারিয়ে এসেছি সভ্যতার রাজপথ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ।

1208

9

সুভাষ

রূপান্তরী-৪ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত

প্রথম উদাহরণ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত (English air) “Drink To Me Only With Thine Eyes” – Johnny Cash Scale : B flat Major, Time : 3/4. (গলার আর্তি লক্ষণীয়।)

1667

0

সুভাষ

রূপান্তরী-৩ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী গান

হিন্দী গানের, বিশেষত ফিল্মী গানের ভাণ্ডারে সর্বপ্রকার সঙ্গীতের অফুরন্ত সম্ভার আছে —রাগসঙ্গীত অন্যতম। এই বিরাট ভাণ্ডার থেকে আমি শ্রেষ্ঠ গানের ঊদাহরণ চয়ন করেছি, তবে পূর্বে আলোচিত রাগ পুনরায় উল্লেখ করব না যাতে সকলে বিভিন্ন রাগের সমানভাবে পরিচয় পেতে পারেন। প্রথমে ভোরের রাগ ভৈরবী ধরা যাক। এই রাগ সাধারণত ঠুংরী গায়নে ব্যবহৃত হয়। প্রথম উদাহরণ ( শাস্ত্রীয় ) বাজুবন্দ খুল খুল যায় – ঠুংরী – জনাব গুলাম আলি রাগ ভৈরবী, ত্রিতাল (ষোল মাত্রা, বিভাজন ৪/৪/৪/৪) শাস্ত্রীয় পরিচয় এইরূপ : ঠাট - ভৈরবী, বাদী - ম, সম্বাদী - স, জাতি – সম্পূর্ণ সময় – প্রাতঃকাল আরোহণ – স ঋ জ্ঞ ম পদ ণ র্স অবরোহণ – র্স ণ দ পমজ্ঞ ঋ স পকড় – ম জ্ঞ স ঋ স দ্‌ ণ্‌স [Improvisation-হেতু গায়কেরা উপরের বিধি লঙ্ঘন ক’রতে পারেন] আসুন, উনার একটি live program উপস্থিত উচ্ছসিত দর্শক-শ্রোতাদের সাথে উপভোগ করি।

1175

2

মনোজ ভট্টাচার্য

ডালের নিমন্ত্রন !

ডালের নিমন্ত্রন ! কাল বেশ মজার ঘটনা ঘটলো ! আমি কমপ্লেক্সের গোল রকে বসে রুদ্রবাবুর সঙ্গে আলোচনা করছি কোনও ব্যাপার নিয়ে । এমন সময় একটি খুবই সুন্দর দেখতে মেয়ে ও তার স্বামী – তিরিশের কাছাকাছি বয়েস – রুদ্রবাবুর সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করলো । উদাসীন থেকেও যা বুঝলাম – মেয়েটি রামমোহন রায়ের ওপর কিছু নিয়ে একটা গবেষণা করছে ! বাঃ ! বেশ ইন্টারেস্টিং তো ! ছেলেটির নাম বিশাল ও মেয়েটির নম্রতা – এ ত’ একেবারে অবাঙ্গালি নাম ! বিশাল ভরদ্বাজ ও নম্রতা শিরোদকারের নাম জানি । বিশাল যেন চেষ্টা করছে আমার সঙ্গে কথা বলার । - নিজে থেকে কিছু না বললে আমি আর কি বলি ! সুযোগ এলো । আগের দিন নাকি রুদ্রবাবু ওদের কোনও খাওয়া দাওয়ার পার্টিতে গেছিল – সেই প্রসঙ্গেই কথা হচ্ছে । খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আমার আবার কোনো উৎসাহ জাগে না ! মানে কোন ফান্ডা নেই আরকি । এই আড্ডাতেই দেখি জলদেবী ও বাবিদা সকালের খাওয়া থেকে খিচুড়ি ইত্যাদি নিয়ে লাইনের পর লাইন লিখতে পারেন ! আমি শুধু অবাক হয়ে খাবারের গন্ধ শুঁকি ! – আর ভাবি - এনারা কত বড় সব খাইয়ে রে বাবা ! লাইনের পর লাইন খেয়েই যাচ্ছেন ! – সে যাই হোক – আমার কথায় ফিরে আসি ! ডাল-জাতীয় কিছু একটা খাওয়ানো হয়েছিল । সেটা কিসের ডাল ! মুশুর না মুগের ! – নম্রতা বলল – ওটা নাকি কোন ডালের নয় – ওটা হল কড়াইশুটির ডাল ! মশলা মিশিয়ে ওরকম খেতে হয়েছে ! পঞ্চাশ রকম মশলা দিতে হয়েছে ! কড়াই শুটির ডাল – এটা নতুন ! ঠাট্টা করে বলে ফেলি – এর পর থেকে যখুনি ওনাকে ডাল খাওয়াবেন – আমার নামেও কিছু পাতের পাশে ফেলবেন ! নাহলে - - ! কথাটা বোধয় বলার অপেক্ষায় ছিল । ঝপ করে লুফে নিল ওরা দুজনেই ! – আরে আপনি হলেন দাদুর বন্ধু – তো আমাদেরও দাদু হলেন ! – আপনি এখুনি চলেন – আমাদের এখনো অনেক ডাল আছে ! সর্বনাশ ! কালকের ওই ডালে আমাকে ঝোলাবে নাকি ! – যতই বলি – আরে আমি ডালের অত ভক্ত নই ! কে শোনে কার কথা ! বিশাল এক হাত ধরে আর নম্রতা আরেক হাত ধরে টেনে তুলল ! – সেই সময় রুদ্রবাবুও ধুনো দিলেন । আরে চলুন না – অতো করে বলছে ! – মনে হল ওনার ইচ্ছে আছে – আরেকবার সে ডাল সাঁটতে ! কি বিপদ বলুন দেখি ! মিষ্টি টিস্টি বা বিরিয়ানি জাতীয় কিছু হলেও বা কথা ছিল ! স্রেফ ডাল ! তাও নাকি কড়াইশুঁটির ! ক্রমশ জানতে পারলাম - বিশাল কি একটা ব্যাবসা করে । ওরা নাকি এখানকার তিনশো বছরের বাসিন্দা ! আমি ঠাট্টা করে জিজ্ঞাসা করলাম – তাহলে তো কলকাতাকে জন্মাতে দেখেছ ? – ঠিক বুঝতে না পেরে বলল – ওরা মুর্শিদাবাদের আদি বাসিন্দা ! তিন পুরুষ না চার পুরুষ আগে ওখানে এসেছে ! সে তুলনায় কিন্তু নম্রতারা কয়েক পুরুষ ধরে ভবানিপুরে থাকে । বাড়িতে নাকি সব বাঙ্গালি কালচার ! এখন এখানে আছে । কাজ করে একটা কলেজে – কি নাম বলল জায়গাটার – প্রায় সুন্দরবনের কাছে । রোজ সকালে পঞ্চাশ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যায় ! আর বিকেলে পঞ্চাশ কিলোমিটার চালিয়ে ফেরে । পথ হয়ত বেশি নয় । কিন্তু সময় ! – এই বিরাট ট্র্যাফিক জ্যামের রাস্তায় এতটা যাতায়াত ! খুব উৎসাহভরে তো ওদের ঘরে নিয়ে গেল ! ওদের ফ্ল্যাটে ঢুকে একটা নতুন জিনিস দেখলাম ! – দেওয়ালের মধ্যে বিছানা টাঙানো ! – এটা আমার অনেক দিনের ফ্যান্টাসি – কতটা স্পেস বাঁচানো যায় ! আমাকে দেখালো – কি করে বিছানা নামানো ও ওঠানো যায় ! – ওরা নিজেরা ডিজাইন করে – করিয়েছে ! দেওয়ালে কাঠের ফ্রেম করে – তার মধ্যে বিছানাসুধ্যু খাট ঢুকে যাচ্ছে ! - কত নিয়েছে – সে প্রশ্ন আর করিনি ! আন্দাজ করে নিয়েছি ! এখনো এখানে কারুর বাড়িতে দেখি নি ! – বিদেশেই দেখেছি । বিশাল যখন বিছানা দেখাচ্ছে – নম্রতা তখন সেই ডাল করছে ! – জ্যেঠু, চলে আসুন – ডাল হয়ে গেছে ! – আমরা ফিরে টেবিলে বসে ছোটো বাটি করে সেই ডাল খেলাম । - অনেক রকম মশলা দিয়ে একটা স্যুপ বানিয়েছে – একটু অন্য রকম খেতে হয়েছে ! – আমি কিন্তু এর চেয়ে ভালো মুশুর ডাল করতে পারতাম – সে আর কে জানে ! – বাঃ বাঃ বলতে বলতে উঠতে যাবো – বিশাল বলে উঠল – আরে আরে উঠছেন কেন ? এ তো শুধু এপিটাইজার হল । এখন তো খানা বাকি আছে ! কাম সারসে ! আমার তখন বেশ অস্বস্তি হতে লাগলো । এরা কি সত্যিই রাত্তিরের খাবার খাইয়ে ছাড়বে ! – ঘরে আছে বুড্ডি বৌ – কিচ্ছু জানে না ! – যতই আপত্তি জানাই – ততই জোর খাটাচ্ছে ! তারই মধ্যে আলাদা আলাদা প্লেটে করে খাবার এলো । একটু একটু করে অন্তত পাঁচ রকমের সবজির তরকারি ! একটা চিনতে পারলাম – কাঁচ কলার কোপ্তা ! – একটু করে সবই টেস্ট করতে হল ও বেশ বেশ বলতে হল ! তখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি – উঠে পড়ার । অবশেষে এলো মিষ্টি ! মিষ্টির চেয়ে মেঠাই বলাই ভালো ! কিন্তু দারুণ খেতে ! এখানকার মিষ্টির মতন অত মিষ্টি নয় । যদিও মিষ্টির পরিমান কম – কিন্তু বেশ সুস্বাদু ! আমরা তো বিদেশে – এই ধরনের মিষ্টি খেতে অভ্যস্ত ! ব্যস - বিশাল নম্রতাও মিষ্টি হয়ে গেল আমাদের কাছে ! ঢুকেছিলাম দাদু হয়ে – বের হলাম জ্যেঠু হয়ে ! মনোজ

1095

5

সুভাষ

রূপান্তরী-২ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা আধুনিক / রাগপ্রধান গান

প্রাচীন কাল থেকেই বাংলা গান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (এবং লোকসঙ্গীত) প্রভাবিত হয়েছে। অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল, রামপ্রসাদ ইত্যাদি মনীষীদের গানে এই প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমি এখানে প্রচলিত অর্থে আধুনিক গানে রাগসঙ্গীতের প্রভাব উদাহরণসহ উপস্থাপনা করবো। অনুসারী রাগের পরিচয়ও সাথে সাথে দেওয়া হবে। প্রথম উদাহরণ ( শাস্ত্রীয় ) বনাবন আয়ী – খয়াল (গৎ) - উস্তাদ সলামত আলি খান ও নজাকত আলি খান রাগ কলাবতী, ত্রিতাল (ষোল মাত্রা, বিভাজন ৪/৪/৪/৪) শাস্ত্রীয় পরিচয় এইরূপ : ঠাট - খাম্বাজ, বাদী - প, সম্বাদী - স, জাতি – ঔড়ব সময় – মধ্যরাত্রি আরোহণ – স গ প ধ ণ ধ প ধ র্স অবরোহণ – র্স ণ ধ প গ প গ স পকড় – প গ প, ধ ণ ধ, র্স ণ ধ, প গ প গ স

2395

3

সুভাষ

রূপান্তরী-১ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অ আ ক খ হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গোড়ার কথা সহজ ভাবে শুরু করছি, যদিও অধিকাংশই সকলের জানা। হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীতের সুর প্রয়োগের কিছু পদ্ধতি আছে যার দ্বারা বিভিন্ন রাগের পরিচয় পাওয়া যায়। সকলেই জানেন, সঙ্গীতে সাত স্বরের মাঝে চারটি কোমল (ঋ, জ্ঞ, দ, ণ) ও একটি তীব্র [হ্ম] স্বর আছে, সব সমেত এই বারোটি স্বর আছে : স (ঋ) র (জ্ঞ) গ ম [হ্ম] প (দ) ধ (ণ) ন এইসকল স্বর বিভিন্ন সমন্বয়ে সাজিয়ে, বিভিন্ন চলনে, অর্থাৎ স্বরের আরোহণ ও অবরোহণ নির্দিষ্ট পারম্পর্যে রেখে, কখনো বা কোন কোন স্বর বর্জন ক’রে, এক একটি রাগের সৃষ্টি হয়। কোন রাগে কি কি স্বর কি ভাবে ব্যবহৃত হবে তার স্বর সমন্বয় কেমন হবে, সে সবই নির্ধারিত হয়েছে প্রাচীনকালে। পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে জীবনব্যাপী সাধনার দ্বারা হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চার রূপরেখা তাঁর ছয় খণ্ডের ক্রমিক পুস্তকমালায় প্রস্তুত ক’রে গিয়েছেন। প্রথমত তিনি হিন্দুস্থানে প্রচলিত শাস্ত্রীয় রাগগুলির একটি সাধারণীকৃত রূপ, ক্ষেত্রবিশেষে তার বিভিন্নতা সহ, লিপিবদ্ধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি শাস্ত্রীয় রাগ-রাগিণীর উপরে আধারিত অসংখ্য বন্দীশ হিন্দুস্থানের বিভিন্ন ঘরানা ও অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং সংকলিত করেছেন। তৃতীয়ত, তিনি প্রাচীন সংগীত শাস্ত্রসমুদয়ে বিধৃত ভারতীয় সংগীততত্ত্ব এর আধুনিক যুক্তি সম্মত রূপরেখা প্রস্তুত করেছেন। এই প্রসঙ্গে জানাই এই সমগ্র রাগসঙ্গীতের প্রায় দুই হাজার বন্দীশের উদাহরণসহ CD প্রস্তুত করেছেন শ্রী ইন্দুধর নিরোদী, বিশদ বিবরণ আন্তর্জালের এই নিবন্ধে বিবৃত :- http://scroll.in/article/726180/2000-classical-compositions-from-musicologist-bhatkhandes-century-old-books-are-now-on-cd প্রতিটি রাগের নিজস্বতা এইভাবে প্রকাশিত হয়: ১) ‘বাদী’ অর্থাৎ সর্বাধিক ব্যবহৃত (মুখ্য) স্বর ২) ‘সম্বাদী’ অর্থাৎ দ্বিতীয় মুখ্য স্বর ৩) রাগের চলন অর্থাৎ স্বরসমুহের ওঠা (আরোহণ) ও নামা (অবরোহণ) ৩) ‘পকড়’ অর্থাৎ স্বরমালিকা বা কিছু নির্দিষ্ট স্বরের পারম্পর্য, যার থেকে রাগের চরিত্রটি বোঝা যায়। এবার রাগের পরিচিতি সম্বন্ধে আরও দু চার কথা বলি। আরোহণ অবরোহণে কয়টি স্বর থাকবে এই হিসাবে রাগের জাতির পরিচিতি হয়। সবকটি স্বর থাকলে বলা হয় সম্পূর্ণ, ছয়টি = ষাড়ব, পাঁচটি = ঔড়ব। ............................................................................................................................................. আরোহণ অবরোহণ দুটিতেই সবকটি স্বর থাকলে জাতি হয় সম্পূর্ণ, যথা কাফী। আরোহণ অবরোহণ দুটিতেই ছয়টি স্বর থাকলে জাতি হয় ষাড়ব, যথা সোহিনী। আরোহণে সাত, অবরোহণে ছয়টি স্বর থাকলে জাতি হয় সম্পূর্ণ-ষাড়ব, যথা পিলু। আরোহণে সাত, অবরোহণে পাঁচটি স্বর থাকলে জাতি হয় সম্পূর্ণ-ঔড়ব, যথা নট। আরোহণে ছয়, অবরোহণে সাতটি স্বর থাকলে জাতি হয় ষাড়ব-সম্পূর্ণ, যথা খমাজ অথবা খাম্বাজ। আরোহণে ছয়, অবরোহণে পাঁচটি স্বর থাকলে জাতি হয় ষাড়ব-ঔড়ব, যথা জনরঞ্জনী। আরোহণে পাঁচ, অবরোহণে সাতটি স্বর থাকলে জাতি হয় ঔড়ব-সম্পূর্ণ, যথা বিহাগ। আরোহণে পাঁচ, অবরোহণে ছয়টি স্বর থাকলে জাতি হয় ঔড়ব-ষাড়ব, যথা জোগিয়া। আরোহণ অবরোহণ দুটিতেই পাঁচটি স্বর থাকলে জাতি হয় ঔড়ব, যথা মালকোশ। ................................................................................................................................................ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে একই বৈশিষ্ট সম্পন্ন বিভিন্ন রাগের একটি শ্রেণীবিভাগ করেছেন, যার নাম ঠাট। রাগসঙ্গীতে এমন দশটি ঠাট নির্দ্ধারণ করা হয়েছে , যথা কল্যাণ, বিলাবল, ভৈরব, কাফী, খমাজ, ভৈরবী, পূরবী, আশাবরী, মারোয়া ও তোড়ী। কিন্তু একই রাগ ভিন্ন ঠাটে থাকতে পারে অথবা একই ঠাট ভিন্ন রাগের হতে পারে, তবে সে আলোচনা এখানে করতে চাই না, কারণ আমরা শুধু সহজ ভাবে রাগের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে অবহিত হতে চাই। এই প্রসঙ্গে জানাই রাগের নানারকম পরিবেশনা হতে পারে, যেমন ধ্রুপদ, ধামার, খয়াল, তারানা, টপ্পা, ঠুংরী প্রভৃতি। ঠুংরীতে রাগের কিছু নিয়ম ভাঙা যায়। বন্ধনমুক্তিতে ঠুংরীর মনোগ্রাহীতা বৃদ্ধি পায়, তবে কট্টর সঙ্গীতজ্ঞরা এটি প্পছন্দ করেন না। প্রায় সাড়ে তিনশ হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীতের বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া এখানে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যে যে গানগুলির উদাহরণ দেব, তার নিজস্বতার পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করবো। রাগসঙ্গীত অনুভুতির বিষয়, অধিক জ্ঞানে একজন রসিক শ্রোতার প্রয়োজন নাই। আমরা যখন একটি বর্ণময় ফুটন্ত ফুল দেখে বিমল আনন্দ পাই, তখন কি তার botanical নাম জানার কোন দরকার আছে? তেমনি যদি একটি ময়ুরের পেখম তোলা নাচ দেখি, কত সুন্দর অনুভুতি হয়, ornithology জানলে কি সেই অনুভুতির কোন তারতম্য হবে? রবীন্দ্রনাথের উপর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কতখানি প্রভাব ফেলেছিল, সে আলোচনার পূর্বে শ্রীমতি কৌশিকী চক্রবর্তীর একটি ঠুংরী শোনাই, এটি রাগ ভিন্ন ষড়জ আধারিত, তবে মতান্তর আছে। এই রাগের পরিচয় জানাই : ঠাট বিলাবল, জাতি ঔড়ব, বাদী ম, সম্বাদী স, মতান্তরে ধ ও গ, বর্জিত র, প, পকড় মগ মধনস। একটি গান যে কত আনন্দের ও প্রত্যয়ের সাথে গেয়ে শ্রোতার মনোরঞ্জন করা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি। **********************************************************************

3388

5

অরিন্দম

আমাদের চারপাশে কণাদের কথা

আমাদের চারপাশে কণাদের কথা ------------ প্রিয় হিমু তা সেদিন আমি-তুই-প্রবুদ্ধ আলোচনা করছিলাম ঈশ্বর কণা না হিগস্-বোসন। ঈশ্বর এল কেন? আমি ও প্রবুদ্ধ তোকে বলেছি ঘটনাটি ঠিক কী হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে, কণার ইতিহাস জানা দরকার। বিজ্ঞানে কল্পনার স্থান আছে কিন্তু সেটা একেবারে প্রথমিক স্তর।কল্পনা বা চিন্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই'ত প্রশ্ন করতে শেখায়। কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ ভাবছে কেমন করে তৈরি হয়েছে বিশ্বব্রহ্মান্ড। কেমন করেই বা পৃথিবী ও জীবজগৎ। বহু প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান খুঁজে পেয়েছে, বহুর পায়নি। যা পেয়েছি, পেয়েছি। যা পায়নি তা থাক, সেসবই প্রচলিত ঈশ্বরের দান বা হাত এটা বিজ্ঞানীরা মেনে নেয়নি শুধু। কোন রক্তচক্ষু তাঁদের অনুসন্ধান থামাতে পারেনি। তাঁরা গবেষণা করে গেছেন। অনুসন্ধানের অপর নাম গবেষণা। দুটি জগত। একটি জড়, অন্যটি জীব। জড়ের জন্ম আগে। জীব পরে। জড়জগতের কথাই এখন আমরা ভাবি। এই যে চারপাশে যা কিছু দেখছি তা আসলে কী দিয়ে তৈরী? কী দিয়ে তৈরি বললে এককথায় উত্তর দেওয়া যায় কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাকে ভেঙে দেখতে চেয়েছেন। প্রথমেই যাঁর কথা মনে আসে, সে কণাদ। একজন ভারতীয়। সেই প্রথম বলে আমাদের চারপাশের সকল জিনিস একক কণা দিয়ে তৈরী। নাম পরমাণু। এখন কণাদ কী করে পরমাণুর ধারনা করলেন? খুবই সংগত প্রশ্ন। আমাদের কাছে কিছু জ্ঞাত কিছু অজ্ঞাত। জ্ঞাত জিনিসকে কাজে লাগিয়ে অজ্ঞাতকে জানার চেষ্টা করা হয়। কণাদও তাই করেছিলেন। জ্ঞাত জিনিসকে ছ'ভাগে ভাগ করলেন। দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ ও সমবায়। এরমধ্যে দ্রব্য কে বাছলেন প্রথমে। তাকে ন ভাগে ভাগ করলেন পৃথ্বী, অপ, তেজস, বায়ু, আকাশ, দিশ, কাল, আত্মা ও মানস। আত্মা দেখে চিত্ত চঞ্চল হওয়ার কোন কারণ নেই। পৃথ্বী, অপ, তেজস, বায়ু র মধ্যে বস্তুধর্ম আছে। আকাশ, দিশা ও কাল জায়গা জুড়ে আছে, তাই বললেন ওদের মধ্যে বস্তুধর্ম নেই এবং আত্মা ও মানসের মধ্যেই বস্তুধর্ম নেই। যা আছে তা হলো চেতনা ধর্ম। এদের মধ্যে হয়ত সম্পর্ক আছে কিন্তু কণাদ সেই নিয়ে ভাবতে বসেননি। বরং বস্তুধর্ম যাদের আছে তাদের নিয়েই তাঁর চিন্তা শুরু হলো। এরপর কণাদ বললেন, এই দ্রব্যদের ভাঙতে থাকলে যেখানে এসে থামতে হবে, অর্থাৎ হাতে থাকবে শুধুই পরমাণু। এও বললেন পরমাণুকে ভাঙা যায়না, এতো ছোট যে পরিমাপও অসম্ভব। আবার একথাও বললেন একেক দ্রব্যের পরমাণু এক এক রকম। মানে ধর, মাটির রয়েছে গন্ধগু। জলের স্বাদগুণ। আগুনের বর্নগুণ। বাতাসের স্পর্শ। এবং এরা সকলেই গতিশীল। আবার একইরকম পরমাণু যোগ করলে দ্বিপরমাণুক, ত্রিপরমাণুক বা চতুর্পরমাণুক ধারনাও দিলেন কণাদ। একটা ঘটনা জানবি, যে কোন সৃষ্টিশীল মানুষেরাই এক পরিবারের সদস্য। কেউ উত্তরসূরী কেউ বা পূর্ব। একজন কিছুটা দেখে, ভাবে ও বলে, পরেরজন সেখান থেকে শুরু করে পথ চলা। সে আবার কিছু মত রাখে, কিছু বাতিল করে। এভাবেই এগিয়ে চলে সভ্যতা। সত্যি জানিস, এরকমটাই হলো। কণাদের বহু বছর পর অন্য দেশের অন্য একজন কণাদের কথা নিয়ে ভাবতে বসলেন। গ্রিক দার্শনিক, চিকিৎসক ও পদার্থবিদ এমপেডোক্লেস ও দার্শনিক পদার্থবিদ লিউসিপ্পাস। কণাদকে মানলেন ওঁরা। তবে খুব বেশিদূর এগোতে পারেননি। লিউসিপ্পাসের ছাত্র ছিল ডেমোক্রিটাস। গুরুর থেকে শিষ্য এগোল একধাপ। শিষ্য বললো, এই বিশ্ব দুরকমের জিনিস দিয়ে তৈরী, মাহাশূন্য ও পরমাণু। পরমাণু সত্যি সুতরাং স্বাদ, গন্ধ, শব্দ, আগুন আর মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করা যাবে। মৌচাকে ঢিল। বলে কী লোকটা! এই যাবতীয় সবকিছুর মালিক হলো ঈশ্বর। সেই শেষকথা আর এ ব্যাটা বলে কীনা পরমাণু সার কথা! দেশে বিদেশে চিত্র এক। শঙ্করাচার্য থেকে মনু কেউ কনাদের কথা মনেননি ছ্যা ছ্যা করতেন, ঠিক সেরকমি মানেননি প্লেটো, অ্যারিস্টটল ডেমোক্রিটাসকে। এও বিরোধীতা সত্যি আবার এও সত্যি এদেশে একজন কবি যেমন বারেবারে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ঠিক সেরকমই অন্যদেশেও। "আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ" আসার অনেক আগেই চেতনার রঙে রোমান কবি লুক্রোসিয়াস ডেমোক্রিটাসের ভাবনার ওপর ভিত্তি করে লিখে ফেললেন "দেয়ার আর মেনি ওয়ার্ল্ডস"। নানা পঙ্ক্তিতে ছাড়ানো ছেটানো রইল পরমাণুর কথা। এরপর ১৭৭৬ সাল খুব গুরুত্বপূর্ণ বছর কণাদের ভবিষ্যতের জন্য। জন্ম নিলেন, জন ডালটন। রোজকার আবহাওয়া লেখা আর টিউশনি করে দিন চালাতেন পাশাপাশি ছিল ওই খোঁজার পাগলামি। বর্ণান্ধ ছিলেন কিন্তু আমাদের চিনিয়ে দিলেন অনেককিছু। ১৮০১ সালে প্রকশিত হলো আংশিক চাপ সূত্র। তার দু'বছর পর গ্যাসের দ্রাব্যতা নিয়ে গবেষণাপত্র লিখলেন।। আমরা দেখতে পেলাম পরমাণুর আপেক্ষিক ভর নিয়ে কথা বলছে কেউ। লিখলেন বই, "এ নিউ সিস্টেম অফ কেমিক্যাল ফিলোজফি'। পরমানু বিষয়ে হাজারো কথা। কণাদ ও ডেমোক্রিটাসের কথা মানলেন। কোন মৌলের পরমাণু একসাথে মিশে কোন যৌগ তৈরী করলে তারমধ্যে সবকটা মৌল সরল সংখ্যা অনুপাতে যুক্ত হবে। সরল গুণানুপাত সূত্র এসে গেল। পরমাণু কি অবিভাজ্য থেকে গেল? তখনকার মতন "কী" এখন বলে "কি" লিখলাম। উত্তর- না। ময়দানে চলে এলেন নিউটন, বোলৎজমান ও টমসন... আজ এইটুকু থাক। আবার লিখব সামনের সপ্তাহে। শুভেচ্ছা সহ অরিন্দম পু- দেখ হিমু, ঠাকুরদা চিঠি দিয়ে শুরু করেছিলেন বিশ্বপরিচয়। লিখেছিলেন বোসবাবুকে। তাতে কী? গুরু "অর্ধেক জীবন" লেখার সময় বলেছিলেন শুধু মহাপুরুষ, মহাকবি, মহাবিজ্ঞানীরাই আত্মজীবনী লিখবে এমন কথা নেই, যুদ্ধ ফেরত সেনা, অফিস ফেরত কেরানীও লিখতে পারে। সেইকথা মাথায় রেখেই, তোকে লেখা আমার চিঠি। সকলেরই জানা আছে, নতুন বা মৌলিক কিছু নয় তবু আগে পড়া, নতুন করে পড়া হয় কিছু। সেও তো কম কথা নয়। ------------------------------------------------------------ আমাদের চারপাশে কণাদের কথা (২) --------------- প্রিয় হিমু এ বড় সুখের সময়। এই সকালবেলা। সেরকম শীত পড়েনি আবার গরম নেই। একটা মনোরম আবহাওয়া। আমাদের পাশের বাড়িতে এক সংগীত রসিক ভদ্রলোক থাকেন। প্রতিদিন নানারকম গান শোনা যায়। রবীন্দ্র সংগীতই বেশি, তবে আজ সুমন চালিয়েছেন। কাকতলীয় অথবা তুই হয়তো বলবি এর পিছনে ভগবানের হাত, সে যাকগে। কানে ভেসে আসছে, প্রথম সবকিছু। হ্যাঁরে, প্রথম সবকিছু। সবকিছুরই একটা প্রথম থাকে। আবিষ্কারেরও। ডালটন সাহেবতো বলেইছিলেন এবার বিজ্ঞানের জগতে অন্যতম বিস্ময়কর প্রতিভা আইজাক নিউটনও সেইকথা মানলেন। এবং বললেন, গ্যাসের আয়তন বাড়া মানেই তো পরমাণুগুলো আরও বেশি বেশি করে ফাঁকা জায়গা দখল করছে। বিজ্ঞানীরা একে অপরের কাজ ও কথাকে মন দিয়ে শোনে, যাচাই করে তারপর গ্রহণ বা বর্জন। এইসময় ইংলন্ড ও জার্মানী বিজ্ঞান গবেষণায় দুই দৈত্য। ডালটন ও নিউটনকে ঘিরে ইংল্যান্ডের বিজ্ঞান মহল আবার জার্মানীতে আর্নস্ট ম্যাককে ঘিরে তাঁর অনুরাগীরা। তাঁরা বলে পরমাণু কি দেখা যায়? যদি নাই দেখা গেল তাহলে তানিয়ে মাথা ঘামাবো কেন! কথাটা ফেলে দেওয়ার মতন নয়। তত্ত্বীয় বিজ্ঞানচর্চা না পরীক্ষানির্ভর, এই নিয়ে ভাবনা শুরু হয় বিজ্ঞান মহলে। এই ভাবনা ও তার ফলের মধ্যবর্তী সময় খুব কম নয়। এই সময়ে নিউটনের ভাবনাকে স্মরণে রেখেই দুজন বিজ্ঞানী কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এক্জন, লাডভিগ বোলৎ্সম্যান অন্যজন ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কয়েকটি মৌলিক অঙ্গীকারের(Assumptions) ভিত্তিতে পদার্থের গতীয় তত্ত্ব(Kinetic Theory of Matter)। আবার গ্যাসের গতীয় তত্ত্ব হচ্ছে আণবিক বিশৃঙ্খলা নীতি(Principle of Molecular Chaos)কে মান্যতা দেন(লক্ষ্য করছিস নিউটন সাহেব যা বলেছিলেন বা ভেবেছিলেন সেই পথ ধরেই এগোলেন ওঁরা)। এইভাবেই আগের প্রজন্মের বিজ্ঞানী পরের প্রজন্মকে ভাবনার রসদ দিয়ে যায় একদিন রিচার্ড ফেইনম্যানও দিয়েছিলেন ন্যানো পার্টিকেলের ভাবনা। যাকগে যেটা বলছিলাম, এরপর ম্যাক্সওয়েল ও বোলৎজম্যান অণুগুলির গতিবেগ বিতরণ সূত্র(Law of Distribution of Molecular Velocities) উদ্ভাবিত করেন এবং তার ভিত্তিতেই গ্যাসের নানা ধর্মাবলী- উষ্ণতা, চাপ, তাপ-পরিবাহিতা(Thermal Conductivity), সান্দ্রতা(Viscosity) সামনে আসে। কিন্তু ওঁদের গবেষণা মূলত তত্ত্বীয়, পরীক্ষানির্ভর ছিলনা। আর সবচেয়ে দুঃখের কথা জানিস এই দুই বিজ্ঞানীর জীবনের পরিনতি সুখের ছিলনা। ম্যাক্সওয়েল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আর ম্যাক ও তাঁর শিষ্যদের আক্রমণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যা করেন লাডভিগ বোলৎজম্যান। তুই হয়ত পড়তে পড়তে ভাবছিস, কণাদের কথা বলতে বলতে গ্যাসে নিয়ে এল ব্যাটা। আগের দিন বলেছি তড়বড় করবিনা। সব আসবে আস্তে ধীরে। তা যে কথা বলেছিলাম আগে, নিউটনকে কেন্দ্র করে তত্ত্বীয় গবেষণা খুব জাঁকিয়ে বসেছিল কিন্তু পরীক্ষানির্ভর গবেষণা সেরকম উল্লেখযোগ্য ছিলনা। খাতা-কলমে গবেষণায় মূলধন অনেক কম লাগে, হাতে-কলমে অনেক বেশী। গৌরী সেন থেকে সুদীপ্ত সেন মোচ্ছবে টাকা দেয়, মন্দির নির্মাণ করে কিন্তু শিক্ষায় ঢালেনা। কথায় আছে টাকা, টাকা আনে, ঠিক সেরকমই একজন শিক্ষিত মানুষই বোঝে শিক্ষার মর্ম। গবেষণার প্রয়োজনীয়তা। এমনিতে শুনেছি লক্ষ্মীর সঙ্গে সরস্বতীর বনিবনা নেই। বেশ কিছুক্ষেত্রে তার প্রমাণও মেলে কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। লক্ষ্মী আর সরস্বতী একসঙ্গেও থাকে। মার্ক জুকেরবার্গ বা বিল গেটস নয়। আমি যাঁর কথা বলবো তিনি হলেন হেনরি ক্যাভেনডিশ। অকৃতদার ক্যাভেনডিশ তাঁর জীবনের অর্জিত অর্থ ও সম্পত্তি দান করে দেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে। স্থাপিত হয় ক্যাভেনডিশ গবেষণাগার। এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ম্যাক্সওয়্লে। তবে গবেষণাগারকে সেভাবে সাজিয়ে তুলেতে পারেনননি। * ক্যাভেনডিশ গব্ষণাগারকে সাজাতে প্রথমে লর্ড কেলভিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রত্যাখ্যান করেন কেলভিন। এমনকী ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যুর পরও তাঁকে অনুরোধ করা হয়, তখনও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। এরমাঝে কিছুদিনের জন্য এসেছিলেন লর্ড র্যালে কিন্তু থাকেননি বেশিদিন, অবশেষে আঠাশ বছরের যুবক জে জে টমসনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ক্যাভেনডিশ অধ্যাপক পদে যোগ দেন তিনি। টমসনের কথায় আসার আগে আরো দু একজনের কথা। বিজ্ঞানী হক্সবী।। কী দেখলেন হক্সবী? দেখলেন কাচের পাত্র থেকে বায়ু বের করে দিলে পাত্রে বায়ুর চাপ বাইরের চাপের চেয়ে ষাটভাগের এক ভাগ হয়। আর এক যদি কোন তড়িত উৎসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে কাচের নলের ভিতর আলোর ফুলকি দেখা যাবে। যেন আকাশের বিদ্যুতকে ঘরে নিয়ে আসা। (অবশ্য বিবাহিত পুরুষ তো আদিকাল থেকেই ঘরে বিদুৎলতা দেখে আসছে। যাকগে) এইসময় অনেকেই মেতেছিল এই কাজে কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন, মাইকেল ফ্যারাডে। মাইকেল ফ্যারাডে আমাদের কাছে খুব পরিচিত নাম। সারা জীবনে অনেক অনেক উল্লেখযোগ্য করেছেন তবে তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজটি হলো তড়িৎবিশ্লেষণ(electrolysis) সূত্র। সাল ১৮৩৩। টমসন তখনও জন্মগ্রহণ করেননি। ফ্যারাডের সঙ্গে আর তিনজনের কথা বলতে হবে। প্রযুক্তিবিদ ও পদার্থবিদ। এক হাইনরিখ গেইজলার, দুই, ড্যানিয়েল রুহমকর্ফ এবং তৃতীয়্জন টমসন রীজ উইলসন। গেইজলার সারাজীবন মেতেছিলেন ভ্যাকুয়াম পাম্প নিয়ে। আগের তুলনায় কত বেশি কাচের নল থেকে বায়ু বের করা যায় এই ছিল তাঁর লক্ষ্য। রুহমকর্ফ লেগেছিলেন তারের কুন্ডলী পাকিয়ে অল্পমানের বিদ্যুৎবিভবকে, উচ্চমানের বিদ্যুৎবিভবে পরিণত করার লক্ষ্যে। আর উইলসন বানিয়েছেন ক্লাউড চেম্বার। এই কাজটি নোবেল পুরস্কার পায়। এইসময়ে অন্যত্র অনেকে এই কাজ নিয়ে মেতে আছে। যেমন ধর জুলিয়াস প্ল্যাকার, ইউজেন গোল্ডস্টেইন ও প্ল্যাকারের ছাত্র স্যার উইলিয়াম ক্রুকস। প্ল্যাকার কাচের নলের দুদিকে ধাতবপাতে বিদ্যুৎ সংযোগ করলেন এবং গেইজলার নির্মিত পাম্প দিয়ে পাত্রের ভিতরের বাতাস বের করতে লাগলেন। দেখলেন, যখন পাত্র প্রায় শূন্য তখন ক্যাথোড পাতের কাছাকাছি জায়গা থেকে সবুজ আলো তৈরী হলো। এবং এও বললেন ক্যাথোড পাতের উপর ক্যাথোড রশ্মির চরিত্র নির্ভর করবে। প্ল্যাকার অবশ্য রশ্মির নাম ক্যাথোড দেননি। ক্যাথোড নামটি দেন ইউজেন গোল্ডস্টেইন। গোল্ডস্টেইন অনেককিছু মানলেন প্ল্যাকারের কিন্তু মানলেন না, ক্যাথোড পাতের উপাদান ও রশ্মির চরিত্র সম্পর্কতি ব্যাখ্যাটি। এদিকে ক্রুকস্ বললেন, এই রশ্মি আসলে নলের মধ্যে আয়নিত গ্যাস অণুর যাত্রাপথ। যেমন খুশি ঘুরে বেড়ায় নলের মধ্যে। গোল্ডস্টেইন ও ক্রুকসের মধ্যে তর্ক লাগলো। ওদিকে জার্মানিতে হাইনরিখ হারৎজ বললেন, এই ক্যাথোড রশ্মি আলোর মতই এক অস্তিত্ব। তরঙ্গায়িত। বুঝতেই পারছিস কী ধুন্দুমার কান্ড চলছে। বিজ্ঞানীরা কোনদিন একে অপরকে এক ইঞ্চি জায়গা দেয়নি। বিস্তর চাটাচাটি, কটুক্তি... (আমাদের চাটাচাটি সেখানে শিশু) এইসময় জনস্টোন স্টোনি এগিয়ে এলেন। ফ্যারাডের সূত্র ধরে তড়িতের একেক খুঁজছিলেন(অর্থাৎ (F=N.e) e কী হবে? স্টোনি যে মানটি দিলেন পরে জানা গেল সেটা সঠিক নয় কিন্তু সেইসময় সেই কাজটি প্রশংসিত হয়েছিল। (* এই প্রসঙ্গে রিচার্ড ফেইনম্যানের কথা মনে এল, একবার একজন সাংবাদিক ফেইনম্যানকে বলেছিলেন, কী মশাই আপনার আজ এই বলছেন তো কালকেই অন্যকথা। কোনটা ঠিক? রসিক ফেইনম্যান হেসে বলেছিলেন যার মানে, দুটোই ঠিক তবে সময় নির্ভর। এখন যতদূর অবধি দেখছি হাতে যা যা পেয়েছি তারমধ্যে থেকেই কার্য-কারণ সম্পর্ক স্থাপন, পরে অন্যকিছু সামনে এলে হয়ত সেই সম্পর্ক বদলে যাবে।) যাকগে তবে স্টোনি আর একটি কাজ করেছিলেন, রাম না জন্মাতেই রামায়ণ বলতে পারিস। তড়িতের এককের একটি শব্দ বা নাম দিলেন। ইলেকট্রন। * এইবার টমসন। ক্যাভেনডিশ গবেষণাগারে যোগ দিয়ে ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে মেতে উঠলেন। তার লক্ষ্য ছিল ক্যাথোড রশ্মিকণার আধান(e) ও ভর(m) এর অনুপাত বের করা। তিনি "ডিসচার্য টিউব"(তড়িৎদ্বার লাগানো পাত্র যার থেকে ক্যাথোড রশ্মি তৈরী হয়)। নানারকম গ্যাস ব্যবহার করলেন। অধান ও ভরের অনুপাত মাপলেন, এবং সীদ্ধান্তে এলেন, ক্যাথোড রশ্মি যে কণা দিয়ে তৈরী, সেই কণা সকল মৌলরেই উপাদান। ওঁর সঙ্গী ছিলেন টাউনসেল্ড ও উইলসন। টমসনের সঙ্গে আরও দুজনের নাম আসবে। এক কাউফম্যান, দুই মিলিকান(এই প্রথম একজন মার্কিন পদার্থবিদ সামনে এল)। মিলিকান বিখ্যাত তাঁর তৈলবিন্দু পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। এসে গেল ইলেকট্রণ। এরই সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীদের একটি চরিত্র না তুলে ধরলে অন্যায় হবে। বিজ্ঞানীরা মানুষ, তাঁদের ভয়ঙ্কর ইগো থাকে, অন্যকে কটাক্ষ করে কিন্তু যখ্ন প্রমাণ নিয়ে কেউ হাজির হয় তখন তাকে স্বাদরে গ্রহণ করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে। একদিন যে ম্যাক ও উইলহেম ওসওয়াল্ডের জন্য বোলৎজম্যান আত্মহত্যা করেছিলেন, সেই ওসওয়াল্ড তাঁর বিখ্যাত বই "আউটলাইনস অফ জেনারেল কেমিস্ট্রিতে" পরমাণু চিন্তা ও ইলেকট্রণকে স্বীকৃতি দেন। ইলেকট্রণ এসে গেল, তাহলে কী হাত পা গুটিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকা! উঁহু বসে থাকা বলে কোন কথা নেই বিজ্ঞানীদের অভিধানে। শুরু হলো। খেলা। ভাঙার খেলা.... এতক্ষণ কোথাও ঈশ্বরের দেখা পাইনি। মনে আসেনি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মনে এল- হে ঈশ্বর তুলে নাও, কাকে ছেড়ে কার কথা বলবো!!! চলি রে, আজকের মত। হয়ত সামনের সপ্তাহে আবার আসবো, দেখি কতদূর কী হয়। ভালো থাকিস। শুভেচ্ছা সহ অরিন্দম --------------------------------------------------- আমাদের চারপাশে কণাদের কথা(৩) ********************* প্রিয় হিমু তা একসময় পরমাণু ছিল পরমাণুতেই। এরপর তাতে ইলেকট্রন পাওয়া গেল। ইলেকট্রনের ভর খুব কম, আধান ঋণাত্মক। সেই থেকে বিজ্ঞানীদের মনে চিন্তা ও প্রশ্ন এল তাহলে ধনাত্মক আধান থাকবে এবং পরমাণুর গঠন ঠিক কী হবে। টমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করার পর সেই নিয়ে ভাবতে লাগলেন ওদিকে সেইসময় ইউজেন গোলড্স্টেইন ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে গবেষণা করতে করতে অ্যানোড পাতটাকে চায়ের ছাকনির মতন ফুটো করে দিলেন, সেই ফুটোর মধ্য দিয়ে একদল ধনাত্মক কণা বেরিয়ে এল। এই শুনে টমসন বললেন, বাহ এটা তো বেশ কেকের মডেলের মতন। কেকে যেমন ছড়িয়ে থাকে পেস্তা সেরকমই পরমাণুতে ছড়িয়ে আছে ইলেকট্রন। বড় কেক হলে বেশি পেস্তা, ছোট হলে কম, সেই নিয়মেই ইলেকট্রনের সংখ্যা বাড়ে, কমে। সেই সময় জাপানি বিজ্ঞানী হান্তারো নাগাওকা বললেন শনির বলয় বা সৌরজগতের কথা ভাবতে। মডেল হিসেবে চমৎকার কিন্তু সে শুধুই কল্পনায় ছিল। প্রমান তখনও হাতে আসেনি। এবার মঞ্চে এলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড। মানুষ্টি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। হা`্র্তজ রেডিও তরঙ্গ আবিষ্কার করছেন আবার রেডিও তরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র বানিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ১৮৯৫ সালে রাদারফোর্ড ক্যাভেনডিশ গবেষণাগারে টমসনের অধীনে কাজে যোগ দিলেন। আর সেই ১৮৯৫ সালে উইলহেম কনরাড রন্টজেন এক্স-রশ্মি আবিষ্কার করলেন। ১৯০১ সালে নোবেল লাভ। ঠিক এইসময়ের আশেপাশে হেনরি বেকারেল তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছেন। রাদারফোর্ড এক্স-রশ্মি ও তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেখতে লাগলেন তেজস্ক্রিয় রশ্মির দস্যুকণাগুলো গ্যাসের অণু পরমাণুতে ঠোক্কর মেরে কীভাবে ইলেকট্রন বের করে আনে। বেরিয়ে আসা ইলেকট্রন গুলো কী হয় ইত্যাদি। এরপর রাদারফোর্ডের সহযোগী হলেন উইলহেম গাইগার ও আর্নেস্ট মার্সডেন। খুব পাতলা সোনার পাতের পর্দা ঝুলিয়ে রেডিয়াম থেকে আলফা রশ্মি পাঠালেন... কয়েকদিন পর গাইগার এসে বললেন কয়েকটা আলফা কণা ফেরত আসছে...স্পার্ক খেলে গেল রাদারফোর্ডের মাথায়। একটি লম্বা গবেষণাপত্র লিখলেন, "দি স্ক্যাটারিং অফ আলফা অ্যান্ড বিটা পার্টিকলস বাই ম্যাটার অ্যান্ড দ্য স্ট্রাকচার অফ দি অ্যাটম"। একটি পরমাণুতে নিউক্লিয়াস কোথায় থাকে, ইলেকট্রণ কোথায় থাকে পরিষ্কার করে বোঝালেন। আলফা কণা নিয়ে একটু বেশি পসেসিভ ছিলেন রাদারফোর্ড তাই তাকে মাঝেমাঝে "মাই পার্টিকেল" বলতেন কিন্তু "গড পার্টিকেল" বলেননি। যাই হোক নিউক্লিয়াসকে ঘিরে বনবন করে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রন তো তার ওপর গিয়ে পড়ছেনা, পড়লে কোন অস্তিত্ব থাকতনা, তাই তিনি সৌরজগতের নিয়মের কথা ভেবে বললেন, অপকেন্দ্রিক(Centrifugal) বল ও বৌদ্যুতিক আকর্ষণী বল পরস্পরকে বাতিল করছে।কিন্তু এখানে একটু ত্রুটি ছিল, কারণ তড়িতচুম্বকীয় তত্ত্ব থেকে জানা যায় যে যদি আহিত কণিকা ত্বরণশীল(Accelerated) বা মন্দনশীল(Decelerated) হয় তাহলে তা থেকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিঃসৃত হয়। শক্তি কমে। বেগও। তাহলে এইভাবে শক্তি ও বেগ কমতে কমতে একদিন ওরা নিউক্লিয়াসে এসে পড়বে। কিন্তু সেরকম হচ্ছেনা, সুতরাং নিশ্চয়ই কিছু আছে। এবার মঞ্চে এলেন নীলস বোর। নীলস বোর সংশোধন করেছিলেন রাদারফোর্ডের মডেলটি। এইটুকু বললে একটা বড় অংশ বাদ থাকে। নীলস বোর সংশোধন করতেই পারতেন না যদি না প্রবাদ প্রতিম বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক কোয়ান্টাম সূত্র আবিষ্কার করতেন। আবার বেশকিছুদিন বাদে সেই সূত্রের ওপর কাজ করে তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আলোর দিশা দেখালেন আর এক ভারতীয় নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাজটি মাথায় রেখেই এগিয়ে গিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তাঁর ফর্মূলা অনেক বড়, অনেক ব্যাপক। এই প্রসঙ্গে বলি বোসন কণার আবিষ্কর্তা সত্যেন্দ্রনাথ নন, আইনস্টাইন। বোসন আসলে কোন কণাই নয়, সে একটি কণাগোষ্ঠী। দেখলি বলতে বলতে কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম। নিশ্চয়ই ভাবছিস সবেত প্রোটন এল, নিউক্লিয়াসের গঠন এল সামনে এরমধ্যেই বোসন... এই এক মুশকিল জানিস। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও কাজকর্ম সমসাময়িক না হলেও, প্রজন্মে প্রজন্মে এত জড়িয়ে থাকে যে কান টানলে মাথা আসার মতন হয়। যে কোন একজনকে নিয়ে পড়তে শুরু কর, নালা-নদী পেরিয়ে সাগরে এসে পৌঁছবি। কিন্তু এইখানে আর একটা কথা বলতে হবে, আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে যত প্রচার পেয়েছেন এবং প্রায়শই কথায় কথায় আমরা আপেক্ষিক তত্ত্বটি লাগিয়ে দিই তার থেকে অনেক কম প্রচার পেয়েছেন সাধারণ জন-মানসে এই উল্লিখিত কাজটির জন্য। এই কাজটির জন্যই ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার পান আইনস্টাইন। যাই হোক ফিরে যাই ১৯১৩ সালে। নীলস বোরের একটা কথা অনেকের মনে ধরলো। তিনি বললেন যে কোন মৌলের রাসায়নিক ধর্ম তার পরমাণুর নানা কক্ষপথে ইলেকট্রন বিন্যাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এও দেখা গেছে কোন মৌলের নানা আইসোটোপ থেকে যখন বিটা রশ্মি বেরোয় তখন এদের গতিবেগ ভিন্ন হয়। কেউ আস্তে, কেউ জোরে। সঙ্গে সঙ্গে মনে প্রশ্ন আসে অনেকের কেন এরকম হয়? বিজ্ঞানে কল্পনা/চিন্তার উল্টোপিঠে প্রশ্ন কী ও কেন। সবসময়। রাদারফোর্ড অনুমান করেছিলেন নিউক্লিয়াসে এমন কণা থাকতে পারে যার ভর প্রোটনের সমান কিন্তু অধান বলতে কিছু নেই। নামও দিয়েছিলেন নিউট্রন। তাঁর ধারনা ছিল একটা প্রোটন আর একটা ইলেকট্রন যোগ হলে একটা নিউট্রন পাওয়া যাবে। রাদারফোর্ড বিগ বস। হাতে তেমন প্রমাণ নেই, সকলে চুপচাপ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা একটু এঁড়ে টাইপ। ভাল কাজ করেছো, প্রশংসা পেয়েছো তা বলে যা বলবে তাই মানবো না, পরখ করে দেখবো। এমনকী প্রিয় শিষ্য হলেও। জেমস স্যাডউইক সেই শিষ্য রাদারফোর্ডের। ফ্রান্সে এইসময় দাপটের সঙ্গে কজ করছে, ফ্রেডরিক জোলিও আর আইরিন জোলিও কুরি। বেরিলিয়াম থেকে নিঃসৃত রশ্মিকে একটি পাতলা মোমের তৈরি দেয়ালের দিকে পাঠিয়েছিলেন ওঁরা। ওঁরা কিন্তু নতুন কণার উল্লেখ করলেন না। কিন্তু ওদের কাজ মন দিয়ে দেখে স্যাডউইক উইলসন ক্লউড চেম্বার নাইট্রোজেনে ভর্তি করে পরীক্ষা শুরু করলেন। বিশদে যাচ্ছিনা। ১৯৩২ সালে নিউট্রন আবিষ্কার হলো। ১৯৩৫ সালে স্যাডউইক নোবেল পেলেন। বিজ্ঞানীরা কেউ কাউকে পাত্তা দেয়না বা কী লেভেলের চাটে সেটা বুঝতে গেলে একটা নমুনা দিই- এতরো ম্যজারানা জোলিও দম্পতি উদ্দেশ্য করে বললেন- "Oh, look at the idiots; they have discovered the neutral proton, and they don't even recognise it" আবার জোলিও দম্পতি মুক্ত মনে অভিনন্দন জানালেন স্যাডউইককে। এইরকম মম্তব্য, নানারকম বাদানুবাদ, প্রমাণ ছাড়া মানবো না বা বিগ বস হলেও মুখের ওপর অন্য কথা বলবো কিন্তু প্রমান পেলে সঙ্গে সঙ্গে বুকে টেনে নেবো, এসবই হলো প্রকৃত যুক্তিবাদীর চরিত্র। বিজ্ঞানীদের চরিত্র। ধর্মীয় পান্ডাদের মধ্যে বা ধর্মীয় গুরুদের অনুগামীদের মধ্যে এরকম দেখিনা। কেন কে জানে!!! বিস্ময় আছে কিন্তু প্রশ্ন নেই কারন প্রচলিত ধর্ম ও ঈশ্বর ভাবনার মধ্যে যা আছে তা শুধুই বিশ্বাস। জাস্ট বিশ্বাস। যাকে আমি অন্ধ বিশ্বাস বলি। শেষের কথাগুলো হয়ত শেষেই বলতাম কিন্তু কী জানিস এটাতো চিঠি, তাই লিখতে লিখতে কোথায় একটা রাগ জন্মায়। মনে হয় এই জিনিয়াস লোকগুলোর দিনরাত পরিশ্রম করে আবিষ্কার করাকে কত সহজে আমরা ইশ্বরের লীলাখেলা বলে চালিয়ে দিই। যাকগে আরও কিছু বলার আছে যেরকম ধর কোন কণা কে জোরে ধাক্কা মারতে চাইছি তা সেতো হাত দিয়ে মারা যাবেনা(ঈশ্বরের হাত কোথায় কে জানে!) তাই অ্যাকসেলারেটর যন্ত্রের কথা বলতে হবে। বলবো পরের সপ্তাহে। আজ আসি। ভালো থাকিস অরিন্দম -------------------------------------------------- আমাদের চারপাশে কণাদের কথা(৪) ----------- প্রিয় হিমু ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর দেখা দিয়েছেন সে সম্পর্কে কোন প্রমাণিত তথ্য হাতে নেই কিন্তু ১৯৩২ সালের মধ্যে আমাদের সামনে বিজ্ঞানীরা নিয়ে এলেন ইলেকট্রন-প্রোটন- নিউট্রন কে। পরমাণুর গঠনের চিত্রও সামনে এল। পল ডিরাক একজন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে এক মালায় গাঁথার কাজ করছিলেন, করতে করতে তিনি ধারনা করলেন এমন একটি কণা আছে যার ভর ইলেকট্রনের মতনই কিন্তু আধান ধনাত্মক। অ্যান্টি ইলেকট্রন। শুনতে কেমন লাগল, বদলে বললে পজিট্রন। কিন্তু শুধু বললেই হবেনা, দেখাতো পেতে হবে। এগিয়ে এলেন কার্ল অ্যান্ডারসন। মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করছিলেন। এই রশ্মিকে ক্লাউড চেম্বারে পাঠিয়ে আয়নিত কণার আলোকচিত্র গ্রহণ করলেন। পরীক্ষার জন্য চেম্বারের মাঝামাঝি সীসার টুকরো বসিয়ে দিয়েছিলেন। এখান থেকে যে কণা পাওয়া গেল তারা আধানে ধনাত্মক এবং ভর ইলেকট্রনের সমান। প্রথমে ভেবেছিলেন নাম দেবেন পজিটিভ ইলেকট্রন কিন্তু সেটা ভাল শোনাল না। খুবই স্বাভাবিক সুনীলের পাশে এক অ-কবি থাকতেই পারে কিন্তু তাকে কুনীল বলাটা সঙ্গত নয়। সুতরাং নাম রইল পজিট্রন। তবে এই কণা সচারচর দেখা যায়না, মহাজাগতিক রশ্মিতে ধরা পড়ে, সুপারনোভাতে দেখা যায়। পুন্ডরীকাক্ষ পুরকায়স্থ কে মনে আছে? ছদ্মবেশে এসেছিলেন, এবং ছদ্মবেশেই নিজের বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম করতে করতে গাড়িতে বসা এক শিশু কন্যাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ক্ষুদ্র বলিয়া উহাকে অবহেলা করিবেন না... কণাদের মধ্যে এইরকম একজন ফোটন, আইনস্টাইন যাকে ক্ষুদ্র বলে অবহেলা করেননি। অল্প কথায় বলতে গেলে বলবো, তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস যদি কালে ভদ্রে বিটা কণা নিঃসরণ করে এবং পজিট্রন আর ইলেকট্রন একে অপরের গায়ে গিয়ে পড়লে ,ফোটন কে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বারেবারে একই ঘটনা ঘটেছে, যেরকম ধর জোলিও দম্পতি চিনতেই পারেনি নিউট্রনকে ঠিক সেইরকম চিনেও ঠিক সময়ে পজিট্রনের কথা সামনে আনতে পারেননি, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট। সেইকথা "কেমব্রিজ ফিজিক্স ইন থার্টিস"-এ বলেছিলেন অ্যান্ডার্সন নিজেই। তবে জোলিও দম্পতির সঙ্গে একটু অমিল ওঁরা খেলায় করেনি আর ব্ল্যাকেট একদম সিওর হতে একটু(!!) বেশি সময় নিয়ে নিলেন। সময় বয়ে যায়, সে অপেক্ষা করবেনা কারুর জন্য... সহজ করে বললে পজিট্রন(অ্যান্টিইলেকট্রন) পেলাম তাহলে অ্যান্টিপ্রোটন ও থাকবে নিশ্চয়ই? সাপ থাকলে বেজি থাকবে এবং এদের চোখে দেখা যায় কিন্তু কণাদের তো খালি চোখে দেখা যাবেনা। এইখানে দরকার পড়ল, কণিকা ত্বরণ যন্ত্র(কেউ কেউ ত্বরক যন্ত্র বলে) বা অ্যাকসেলারেটরের। এ্মনিতে আমারা খালি চোখে যা দেখি, তাতে দেখি রসায়নবিদরা নানা রঙের তরল এতে ওতে মিশিয়ে একটা নতুন কিছু তৈরী করছে। রাসায়নিক বিক্রিয়া বলি, কিন্তু কণা পদার্থবিদরা যখন পরীক্ষানিরীক্ষা করে তখন তাঁদের নজর নিউক্লিয়াসের দিকে। নিউক্লিয়াসকে ধাক্কা মেরে ভাঙতে হবে সুতরাং শক্তির প্রয়োজন। গতিবেগ বাড়াতে হবে কণাদের সুতরাং তৈরী হলো অ্যাকসেলারেটর। প্রথম অ্যাকসেলারেটর যন্ত্র তৈরি করেছিলেন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট লরেন্স। ওঁর সঙ্গে ছিলেন মিলটন স্ট্যানলি ও লিভিংস্টোন। অ্যাকসেলারেটরকে মূলত তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, এবং ভাগটা মূলত নির্ধারিত হয় কীভাবে কণারা শক্তি অর্জন করবে এবং কোন পথে , তার সঙ্গেই যুক্ত অ্যাকসেলারেটরের গঠন বৈশিষ্ট্য... ১) এক ধাপে শক্তি অর্জন ও সরলরেখায় গমন করে এমন যন্ত্র- কক্রফ্ট-ওয়াল-টন বিভব পরিবর্ধক(Voltage multiplier) যন্ত্র বা ভ্যান-ডে-গ্রাফ উৎপাদক(Van de Graaff generator) শ্রেণীর অন্তর্গত। ২) ধাপে ধাপে শক্তি অর্জন করে কিন্তু সরলরেখায় চলে রৈখিক ত্বরণযন্ত্র(Linear accelerator) ৩) ধাপে ধাপে শক্তি অর্জন করে হয় সর্পিল(Spiral) বা বৃত্তাকার(Circular)। সাইক্লোট্রন, বীটাট্রন, সিংক্রোট্রন প্রভৃতি যন্ত্র এই শ্রেণীর অন্তর্গত। অ্যাকসেলারেটর নিয়ে খুব বিশদে বলে লাভ নেই। লাভ লোকসান অবশ্য অন্য কথা, আমার পক্ষে বলা অসম্ভব। শুধু বলতে পারি ১৯৩১ সালে বার্কলে থেকে শুরু হয়ে, গতিশক্তি ১.০ MeV থেকে ২০০৮ অবধি সার্নে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারের গতিশক্তি ২.৭৬ TeV (* একদম নীচে একটা লিংক দেব, সেখান থেকে eV, MeV, GeV, TeVর সম্পর্ক গুলো খুঁজে পাবি) বিশুদ্ধ ও ফলিত বিজ্ঞান কীরকম হাত ধরাধরি করে এগোচ্ছে দেখছিস। যাকগে, আবার ফিরে যাই অ্যান্টিপ্রোটন আবিষ্কারের কথায়। বিভাট্রন নামক অ্যাকসেলারেটর নিয়ে কাজ শুরু হলো। প্রোটোন কণাকে ৬.২ GeV দিয়ে উত্তেজিত করে লক্ষ্যবস্তু তামার নিউক্লিয়াসে ছুঁড়ে মারা হলো। সেই উত্তেজিত প্রোটন তামার নিউক্লিয়াসের কোনো এক নিউট্রনকে ছিঁড়ে দুটুকরো করে দিল। একটা চেনা প্রোট্ন অন্যটি অ্যান্টিপ্রোটন। অ্যান্টিপ্রোটনের আবিষ্কর্তা এমিলিও সেগ্রে। ওঁর সঙ্গে ছিলেন ওয়েন চেম্বারলেন, ১৯৫৯ সালে এই কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার পান দুজনেই। বাড়িতে দেখবি অধিকাংশ সময় মেয়েরা কেস খায়। অন্যদের রাগ-তেজ ঝড়-ঝাপটা তাদের ওপর দিয়ে যায়, মেয়েরা সংসারের নিউক্লিয়াস। ঠিক সেরকমই পরমাণু যখন তেজস্ক্রিয়তা দেখায় সব চোটপাট নিউক্লিয়াসের ওপর দিয়ে যায়। নিউক্লিয়াসে প্রোটন নিউট্রন থাকে কিন্তু মাঝে মাঝে বেরোয় ইলেকট্রন। আসলে বেরোয় নিউট্রন ভেঙে। নিউট্রন ভেঙে একটা ইলেকট্রন ও একটা প্রোটন। কিন্তু যা বলবে বা ভাববে তাই মেনে নেবেনা বিজ্ঞানীরা। একটা ইলেকট্রন ও একটা প্রোটন বেরোল সুতরাং আধানের পরিবর্তন হলোনা কিন্তু দেখা গেল ভরবেগের পরিবর্তন হচ্ছে, সুতরাং আর কেই আছে। পাউলি বললেন আর একটি কণা অ্যান্টি ইলেকট্রন নিউট্রিনো বা নিউট্রিনো। আবার সেই রাম না জন্মাতেই রামায়্ণ (মনে পড়ছে পর্ব ২তে ইলেকট্রন নামকরণ প্রসঙ্গে বলেছিলাম কথাটা)। অবশেষে অপেক্ষা করতে হলো ১৯৫৬ সাল অবধি। বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক রেইনস্স আর ক্লাউড কাউয়ানের পরিশ্রম সমফল হলো। পাউলিং-এর অনুমান ও তাত্ত্বিক গবেষণা সঠিক প্রমানিত হলো। আর নিউট্রিনো না থাকলে এনরিক ফার্মি বিটা নিঃসরণের তত্ত্বই তৈরি করতে পারতেন না। বিজ্ঞানে অনুমান/ কল্পনা প্রথমে আসে কিন্তু প্রমান না হাতে এল সেই নিয়ে স্পষ্ট মত কেউ দেয়না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গ্রেভিটন কণার কথা। এর দেখা এখনো পাওয়া যায়নি। কথায় বলে, যদি হয় সুজন তেঁতুল পাতায় ন-জন... তা মানুষের ক্ষেত্রে এই কথা খাটে কিন্তু পরমাণুর জন্য? ছোট্ট নিউক্লিয়াসে একগাদা প্রোটন আর নিউট্রন কী করে থাকে? কী সেই আকর্ষণ? বিজ্ঞানী হিদেকি য়ুকাওয়া এই নিয়ে ভাবতে শুর করলেন। মহাকর্ষ বল না তড়িৎজনিত বিকর্ষণ বল কে বেশি? তা গননা করে এক তীব্র বলের সন্ধান পেলেন। অতীতে আমরা দেখেছি তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের কিছু আচার আচরনের জন্য আইনস্টাইন ফোটন কণাকে কাজে লাগিয়েছিলেন, এবারো প্রাথমিকভাবে তাই হলো য়ুকাওয়া একটি কণার সংযোজন করলেন, নাম দিলেন মেসন। মেসন কথার অর্থ মাঝারি। এই নতুন কণার ভর ইলেকট্রনের চেয়ে বেশি কিন্তু প্রোটনের চেয়ে কম। হিসেব কষে দেখা গেল ইলেকট্রনের চেয়ে ২৭৬ গুণ ভারী এই মেসন। জীবনকাল ১/১০০০০০০ সেকেন্ড। বললেন কিন্তু হাতেনাতে প্রমাণ? লেগে গেল প্রায় ১০ বছর। এগিয়ে এলেন বিজ্ঞানী সেসিল ফ্র্যাঙ্ক পাওয়েল। পাওয়েলের গবেষণা গুরু ছিলেন উইলসন। তাঁর অধীনে কাজ করতে করতে ক্লাউড চেম্বারে কণা সনাক্তকরনে আলোকচিত্রের সার্থ্ক ব্যবহার উদ্ভাবন করেন। আর তা থেকেই পাওয়েল যে কণা পেলেন তা ইলেকট্রনের চেয়ে ২৭৬ গুণ ভারী। সুতরাং য়ুকাওয়ার অনুমান সত্যি বলে প্রমাণিত হলো। ভারী মেসন কণার নাম দিলেন পাই-মেসন আর হালকার নাম দিলেন মিউ-মেসন। এদেরকে যথাক্রমে পাইয়ন ও মিউয়ন বলে ডাকা হয়। ১৯৫০ সালে পাওয়েল নোবেল পুরস্কার পান। তাহলে এখন আমাদের হাতে এসে গেল অনেকগুলো কণা এবং চারটি বল, যথাক্রমে- মহাকর্ষীয় বল, তড়িৎচুম্বকীয় বল, তীব্র বল আর দুর্বল বল। এই তীব্র বলের জন্যই প্রোটন ও নিউট্রন ১/১০০০০০০০০০০০০০ সেমি সাইজের মধ্যে আটকে থাকে। এই যে এতখানি পথ পরিক্রমা কোন মিরাকেল চোখে পড়লো? কোথাও ঈশ্বরের হাত? উঁহু। তাহলে আর একটু এগিয়ে দেখতে হবে। দেখবো পরের সপ্তাহে। আজ আসি। ভালো থাকিস। আরিন্দম পুঃ- ও যে লিংকটার কথা বলেছিলাম, সেটা এখানে থাকল- http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/electric/ev.html --------------------------------------------------------------------------------------- আমাদের চারপাশে কণাদের কথা(৫) ----------- প্রিয় হিমু আমাদের চারপাশে চার রকম বল আর অনেকগুলো কণা। এ যেন এক হট্টগোলের মেলা। নতুন ক্ণা হাতে এলে নতুন নামও দিতে হবে। সেইরকম আসতে লাগল হ্যাড্রন, লেপ্টন, কোয়ার্ক। কণা সামনে এল। নাম দিলাম। এবার নাম যত বাড়বে গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিস্তর, তখন কণাদের মধ্যে পরিবার বা গোষ্ঠী নিয়ে ভাবনার সূত্রপাত হলো। এখন বৈশিষ্ট্য কিছু থাকতে হবে যা দেখে কোন কণা কোন গোষ্ঠীর বা পরিবারের অন্তর্গত তা বোঝা যায়। হ্যাড্রন এখন যারা তীব্র বলের কথা শুনে চলে, অর্থাৎ নিয়্ন্ত্রাধীন হয় তারাই হ্যাড্রন। যেরকম, নিউট্রন, প্রোটন। ইলেকট্রন শোনেনা। নিউট্রোনো ও না। সুতরাং ওরা হ্যাড্রন নয়। দিনে দিনে নানারকম হ্যাড্রনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। নামকরনের জন্য গ্রীক বর্ণের সাহায্য নিতে হচ্ছে। পাইয়ন, ক্যায়ন, প্রোটন, নিউট্রন, ল্যামডা, সিগমা, জাই ও ওমেগা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। লেপ্টন ১৯৭৫ সালে রৈখিক ত্বরণযন্ত্র (Linear accelerator) মার্টিন পল ও কয়েকজন বিজ্ঞানী একটা নতুন কণার খোঁজ পেলেন। মিউয়নের চেয়ে সতেরোগুণ ভারী। এর নাম হল টাওয়ন। ইলেকট্রন, মিউয়ন, টাওয়ন এবং প্রত্যেকের সঙ্গে যুক্ত হলো নিউট্রিনো। অর্থাৎ ইলেকট্রন-নিউট্রিনো, মিউয়ন-নিউট্রিনো ও টাওয়ন-নিউট্রিনো। মোট ছয় জন মিলে লেপ্টন পরিবার। কোয়ার্ক ১৯৬১ সালের কথা, জর্জ জোয়াইগ ও মুরে গেলম্যান হ্যাড্রনদের গঠন নিয়ে গবেষণাপত্র লিখলেন। ওরা বললেন সব হ্যাড্রনই যে জিনিস দিয়ে তৈরি তা হলো কোয়ার্ক। কোয়ার্ক নামটা কেন দিয়েছিলেন গেলম্যান? কথিত আছে তিনি ছিলেন একজন পাখি প্রেমিক(বিজ্ঞানীরা মানুষ সুতরাং গবেষণার বাইরেও তাঁদের নানারকম শখ থাকে)। কোয়ার্ক হলো একরকমের পাখির ডাক। তাত্ত্বিক প্রমাণের পাশাপাশি পরীক্ষালব্দ্ধ প্রমাণের প্রয়োজন হয়। সেকথা মাথায় রেখেই স্ট্যানফোর্ডের কণা ত্বরণযন্ত্রের তৈরী হলো। সেই যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ হলো এ "মানস-কণা" নয়। সত্যি সত্যিই সে হ্যাড্রনে আছে। এরপর চললো কোয়ার্ক নিয়ে আরো কাজ। এবং কোয়ার্কের রঙের সঙ্গে রঙ বদলের কারণও এলও সামনে। এবং ইলেকট্রণের ঠিকাণা শুধু কক্ষপথের নম্বর দিলে সম্পূর্ণ হবেনা তার সঙ্গে কোয়ান্টাম সংখ্যা বা (n,l,m o s) ও দিতে হবে। মেলাবেন তিনি মেলাবেন, এই সব ধারণা নিয়ে বিজ্ঞানী মহল বসে থাকেনা, থাকেনি কোনদিন, আবার পাশাপাশি এও সত্যি একদম উদাসীন ছিলেন না বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানে পসিবিলিটি বা সম্ভাবনা খুব দামী কথা। বিজ্ঞানীরা প্রথমে মহাকর্ষীয় বলকে সরিয়ে রাখলেন। হাতে রইল তিন বল, তড়িতচুম্বকীয়, তীব্র ও দুর্বল। কণা ত্বরণযন্ত্রের জোর বাড়াতে হবে। সুতরাং চলল সেই নিয়ে কাজ। যত সহজে বাড়ানোর কথা লিখছি বা পড়তে পড়তে ভাবছিস, বিষয়টি ঠিক তার উল্টো। অ্যাকসেলারেটর নিয়ে একটু পড়লেই বুঝতে পারবি। এখন এই বলদের মেলানোর জন্য বিজ্ঞানীরা যে তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছেন তার নাম সুপার্স্ট্রিং থিওরি। একে অনেক থিওরি অফ এভরিথিং ও বলে। আবার কণাবিজ্ঞানীরা কোয়ার্ক আবিষ্কারের পর থেকই মত্ত একটি স্ট্যান্ডার্ড মডেল খুঁজে পেতে। বিজ্ঞানীরা বললেন মৌলকণাদের রয়েছে দুই ভাগ। বোসন ও ফার্মিয়ন। মোটামুটি ভাবে বোস-আইনস্টাইন থিওরি মেনে চললে তাদের বোসন বলবো আর যারা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান থিওরি মেনে চলের তাদের ফার্মিয়ান। ব্যতিক্রম আছে, সেতো থাকেই। যাকগে, এবার এগিয়ে এলেন পিটার হিগস। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এক জায়গায় তিনি এক বিচিত্র বোসন কণার সন্ধান দিলেন। সেই ১৯৬৪ সালে আর দুজন বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউট আর ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ট ও লিখলেন গবেষণাপত্র। মজার কথা আমরা যাকে আজ হিগস-বোসন বলি পিটার হিগস তাকে বারবার "স্কেলার বোসন" বলে অভিহিত করতে চেয়েছিলেন। মিতভাষী বিজ্ঞানী নিজের নামটি জড়াতে চাননি কোনদিন। এদিকে অ্যাকসেলারেটারের উন্নতি চলছে অবশেষে ২০০৮ সালে সার্ন(ইউরোপীয়ান অর্গানাইজেশান ফর নিউক্লিয়ার রি্সার্চ) একটি যন্ত্র খাড়া করল, নাম লার্জ হ্যান্ড্রন কলাইডার। এই যন্ত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় কণাদের মধ্যে। তবে কয়েকলক্ষ পাঠালে হয়ত দু-চারটে সেই দুর্ঘটনায় পড়ে। এই যন্ত্রের জন্য পৃথিবীতে সাতভাগে ভাগ হয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন এবং এখনও করছেন। সুতরাং এর কথা কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ শব্দে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যাপক কর্ম-কান্ডটি একটু খুঁজলেই বুঝতে পারবি। এরপর ২০১১ সালের ২৪মে বিজ্ঞানীরা জানালেন, "কোয়ার্ক-গ্লুয়ন-প্লাজমার" অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কৃষ্ণ গহ্বরের মতোই তার খুব বেশি ঘনত্ব। বিগ ব্যাং থিওরির স্বপক্ষে একটি যুৎসই প্রমাণ হাতে এল। তরপর ২০১২, ৪ঠা জুলাই, ঘোষণা করা হলো ১২৫-১২৬ MeV ভরের হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব। তবে এই পরীক্ষা যেরকম সময় সাপেক্ষ ঠিক সেইরকম ব্যয় সাপেক্ষ তাই আর পাঁচটা পরীক্ষার মতন কয়েকবার করে ফেলা সম্ভব নয়, সুতরাং কাজ চলছে, একেবারে নিশ্চিত হয়ে বলবার মতন অবস্থায় যেতে। এইভাবে হয়ত একদিন ধীরে ধীরে পৃথিবীর উৎস সৃষ্টির রহস্যের উন্মোচন করবেন বিজ্ঞানীরা। একটি বিন্দুতে মিলবেন। যবে করবেন তখন তাঁরা সামনে নিয়ে আসবেন কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যা সামনে নিয়ে এসেছেন তাও কিছু কম নয়। বিজ্ঞানীরাই পেরেছেন আর কাউকে(কোন ধর্মীয় গুরুকে) তো দেখলাম না। বিজ্ঞান আছে বিজ্ঞানের জগতে কিন্তু ঈশ্বর ও মানুষ ? বিজ্ঞানের জগত, যুক্তিবাদের, তার ভাষা অঙ্ক কিন্তু ঈশ্বরের জগত? সে বড় গোলমেলে, তারচেয়ে মানুষের জগত আপাত দৃষ্টিতে সহজ হলেও নিহিতার্থে জটিল, না হলে দশচক্রে ঈশ্বর কণা হয়!!! হয়েছিল যে ভাবে- বিজ্ঞানী লিও লেডারম্যান। নোবেলজয়ী। ১৯৯৩ সালে একটি বইয়ের পান্ডুলিপি নিয়ে জান প্রকাশকের কাছে। বইয়ের নাম দিয়েছিলেন- দি গড পার্টিকেলঃ ইফ দি ইউনিভার্স ইজ দি আন্সার, হোয়াট ইজ দ্য কোশ্চেন?" প্রকাশকের সায় নেই। কারণ এটি একটি তির্যক মন্তব্য, "ঈশ্বরকণা বুঝতে যদি গোটা বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের দরকার হয়, তাহলে হে ঈশ্বর তোমার প্রয়োজন কোথায়?" প্রকাশক নাছোড়। বললেন "দি গড পার্টিকেল" দিলে মন্দ হয়না, লোকে বুঝবে(পড় খাবে)। রেগে গিয়ে লেডারম্যান বললেন, তাহলে "গডড্যাম পার্টিকেল" দিন। মা-কালী লজ্জায় আবার জিভ কেটেছিলেন কিনা জানা নেই(অবশ্য সারা পৃথিবীতে ঈশ্বর বিশ্বাসীরা এতবার তাকে লজ্জায় ফেলেছে হয়ত জিভটাই নেই আর) তবে বিপদ বুঝে প্রকাশক জিভ কেটে বলেছিলেন, এহেন নাম রাখা যাবেনা। বিজ্ঞানী পিটার হিগসকে এই প্রশ্ন করা হলে, বিনয়ী হিগস বলেছিলেন- অস্বস্তিকর। বড় অস্বস্তিকর এইসব নাম। আমি নিরশ্বরবাদী, আমার কথা ছেড়ে দিন। যারা বিশ্বাস রাখেন ঈশ্বরে, তারা নামের অপব্যবহার দেখে কেমন দুঃখ পাবেন সে কথাটাই ভাবছি।" হকিং সাহেব বলেছেন- ধর্ম আর বিজ্ঞানে একটা স্পষ্ট ভাগ রয়েছে। ধর্মে রয়েছে একজন সর্বময় কর্তা। বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণের উপর দাঁড়িয়ে আছে। সবাই হকিং সাহেব হয়না, ওরকম মনের জোর কম লোকের হয় নইলে এইরকম শরীর নিয়েও একজন বলতে পারে- সায়েন্স মেক গড আননেসেসারি... প্রয়োজন অপ্রয়োজন সরিয়ে রেখে একটু যুক্তি দিয়ে কি ভাববো না আমরা? এখনও কী সময় আসেনি, মুক্ত কন্ঠে উচ্চারণ করার- জয় বিজ্ঞান(নিছক স্লোগান নয়)। --- যাকগে এবার অন্যকথা- ১। এটা কোন লেখা নয়, মানে মৌলিক লেখা নয়। বিভিন্ন বই থেকে ন্যানোতম অংশ তুলে নেওয়া। একটা আউটলাইন। যে কোন নাম, সে কণা হউক বা বিজ্ঞানী, খুঁজে নাও আন্তর্জালে। এগিয়ে চলো। বিস্ময় ও ভালবাসাধনায় খুঁজতে থাক মনের মধ্যে আসা প্রশ্নের উত্তর। তবে সেই প্রশ্ন-উত্তর যেন এরকম না হয়- কে বলেছে ঈশ্বরকে দেখা যায়না? -মহাভারত ও ব্যামাক্ষ্যাপা সিরিয়ালে কোটি কোটি ভারতবাসী দেখেছে(সৌজন্যে সৈকত বন্দোপাধ্যায় রবিবাসরীয় আবাপ) চলিরে। ভালো থাকিস। অরিন্দম ------------- ঋণস্বীকার - শরদীয়া প্রতিদিন- পলাশ বরন পাল, অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তীর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ ও না ঈশ্বরকণা নির্বাচিত রচনা সংকলন, অভী দত্ত মজুমদার তথ্য সংগ্রহ- পরমাণু ও কেন্দ্রক গঠন পরিচয়- ডঃ সমরেন্দ্র নাথ ঘোষাল পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষা / দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী Atomic physics and human knowledge/ Niels Bohr Thirty years that shook physics: story of quantum theory/ George Gamow

2351

13

প্রবুদ্ধ

তাত্ত্বিক ব্লগ

দীপঙ্করদা /মনোজদা‚ একটা সরল প্রশ্ন| চীনকে নিয়ে সমালোচনা করা যাবে এটা নিয়ে আশাকরি তোমাদের কোনো আপত্তি নেই| যদি সমালোচনা করতেই হয়‚ তাতে আমেরিকাকে আনা কি বাধ্যতামূলক? যেমন হিউম্যান রাইটস ইস্যু| এখানে চীন যদি ইউঘুরদের ওপর এথনিক ক্লেনজিং চালায়‚ চালাচ্ছে এটা তো অস্বীকার করা জাবে না‚ সেটা একটা standalone ঘটনা| নিন্দনীয় ঘটনা| ফোকাসটা সেখানে| ফ্রান্স কেন সিরিয়াতে বোমা ফেলছে সেটার সাথে কি এর সম্পর্ক আছে? মনে হয় না| এর মধ্যে কোনটা বেশী ধংসাত্মক‚ সেটাও তুলনা করা অর্থহীন| এটা কিন্তু আমার যুক্তি নয়‚ সেন সাহেবেরই যুক্তি| উনি যখন আলোচনা করছেন ভারত কোথায় কোথায় চীন থেকে শিক্ষা নিতে পারে‚ এবং কোথায় কোথায় চীন থেকে পিছিয়ে আছে (ওঁর দুটো বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম এই রকমই)| সেখানে উনি সেই stats গুলো ব্যবহার করেছেন যেটা ওঁর লেখার সাথে সাযুজ্য রেখে চলবে| তাই উনি চীনের authoritarian সরকাররের সমালোচনায় যাননি‚ গেলে লেখার ফোকাসটা নড়ে যেতো| দুই| চীন কোথায় কোথায় এগিয়েছে সেটা সেন সাহেবের লেখা থেকে ইন্টারনেট‚ সর্বত্র প্রতিফলিত| দীপঙ্করদা এখানে কিন্তু যে যে ডেটা দিচ্ছো সেগুলো সবই প্রথম বিশ্বের ওয়েবসাইট থেকেই নেওয়া(ধরে নেওয়া জায় আমেরিকা-নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইটও তার মধ্যে আছে)| সে ডেটার sanctity আছে‚ কারণ ওয়েবসাইটগুলোর চালক সবই দাইয়িত্বশীল সংস্থান| কিন্তু চীনের ভেতর কোথায় কোথায় সমস্যা হচ্ছে‚ সেটা তো চীন-সরকার-নিয়ন্ত্রিত CCTV-4 দেখাবে না| আমেরিকা কিন্তু তার দেশের ভেতর কোনো ঘাপলা হলে সেটা প্রকাশ করে‚ চীনের মতো লুকিয়ে রাখে না| এক্জন সাংবাদিক আমেরিকা গিয়ে জেভাবে তথ্য সংগ্র করতে পারে‚ চীনে পারবে কি? কেন এই লুকোচুরি? আয়রন কার্টেন থিওরী কেন কম্যুনিস্ট সরকারের সাথে সমার্থক? তিন| যেহেতু আমি নিজেই লেবার মার্কেটের সাথে সরাসরি জড়িয়ে আছি‚ চীনের লেবার মার্কেটের খবর নেওয়াটা খুব কঠিন কাজ নয়‚ আর অ্যানালিসিস করাও সহজ| তোমাদের মন:পুত হচ্ছে না ঠিকই‚ কিন্তু গ্রাম থেকে শহরে আসা "মাইগ্র্যান্ট".লেবার ও তাদের জন্য হুকৌ সিস্টেম‚ এর ভয়াবহতা অস্বীকার কোরো না| আরো খোঁজখবর নাও| মিনিমাম ওয়েজ দিয়ে যদি বিচার করতে চাও তো দেখো‚ প্রতি ঘন্টার মিনিমাম ওয়েজের তুলনা (এটা ২০১১-এর হিসেব‚ মিনিমাম ওয়েজ বছরে ১০-১৫% করে বাড়ে সব দেশেই| আর ভারতের মতো চীনেও অঞ্চলভিত্তিক মিনিমাম ওয়েজ হয়‚ আমি গড়টা নিয়েছি):. (In USD) চীন-2.12 চীনের প্রতিযোগী দেশগুলির হিসেব: জাপান 6.54 দ: কোরিয়া 5.1 গাল্ফ দেশ 4.5 ইওরোপ (ENG/GER) দশ ডলারের বেশী আমেরিকা 7.25 ভারতের ক্ষেত্রে এটা এতো কম (এক ডলারেরও কম) যে বলতে লজ্জা হয়| প্রতি মাসে ওয়ার্কারদের স্যালারি রিলিজ করার সময় আরো লজ্জা হয়| কব-ডগলাস ফর্মুলা ধরলে আয় = technology * sqroot (capital) * sqroot (labour)| এখানে সস্তা লেবার দিয়ে চীনের আয় কতো বাড়ছে আনুপাতিক হিসেব কোরো| দেশটার জনসংখ্যা দেখো‚ লেবার কেন সস্তা এক কথায় উত্তর বেরিয়ে আসবে| তার উপর গোটা দেশে একতাই ত্রেড ইউনিয়ন‚ সেটাও সরকার-নিয়ন্ত্রিত| এটা কি খুব হেল্দি একটা তত্ত্ব‚ মনোজ দা? সস্তা ও লো-কোয়ালিটি প্রোডাক্টের প্রধান কারন যদি এই undervalued labor হয় তো বাকী কারণগুলো হলো: ১| অতি নিকৃষ্ট কোয়ালিটি কন্ট্রোল পলিসি ২| কোনো after-sales service নেই| কেনো আর ফেলে দাও| এই সার্ভিস দিতে ভালো কোম্পানীগুলো কতো পয়সা খরচ করে আমরা জানি ৩| কোনো ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট নেই| চীন সারা পৃথিবীর যেকোনো ডিজাইন কপি করতে পারে| কেউ সেদেশে ঢুকে তার মাথার একটা চুলও ছিঁড়তে পারবে না|উদাহরণ হন্ডা বাইকের হুবহু চীনা কপি| পেটেন্টের খরচটা কতটা বেঁচে গেলো ৪| ৫০‚০০০ ইউনিট বানিয়ে ২০‚০০০ দেখানো| দেদার ট্যাক্স ফাঁকি| যেহেতু বাকী ৩০‚০০০০ ইউনিট পুরোটাই বিক্রী হয়ে যাচ্ছে‚ সেই ট্যাক্স থেকেই সরকারের পুষিয়ে যাচ্ছে| তার উপর ওদেশে শুধু VAT আছে‚ মানে কোনো ভ্যালু অ্যাড না হলে ট্যাক্স দিতে হয় না| এটা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার বিশাল একটা লুপহোল| ৫| মার্কেটিং-এর পেছনে কোনো খরচ নেই| ৬| ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো importer চাইনীজ মাল রিজেক্ট করলেও চীনা সাপ্লায়ারকে কিস্যু করতে পারবে না| ৭| কোনো HSE রেগুলেশন নেই| চীনা মোবাইলে SAR value কোনোদিন দেখতে পাবে না| ৮| ডলারের তুলনায় ইউয়ানের আন্ডারভাল্যু‚ যাকে কারেন্সী ম্যানিপুলেশন বলে| ইউয়ান ডলারের তুলনায় ৩০-৪০% undervalued| অর্থাৎ সিধা সিধা ৩০-৪০% কম খরচ| ৯| ডাম্পিং| ধরা জাক ভারতে চীন তালা এক্সপোর্ট করবে| আগে দেখে নেবে আলিগড়ে কতো তালা তৈরী হয় ও তার দাম কতো| এবার তার দ্বিগুণ সংখ্যক তালা অর্ধেক দামে ভারতে ডাম্প করবে| এই ডাম্পিং পলিসির বিপজ্জনক ট্রেন্ড তো আমরা ভারতীয় মার্কেটে দেখতেই পাচ্ছি| অথচ‚ তোমাদের ঐ আমেরিকা-নিয়ন্ত্রিত WTO কিন্তু ডাম্পিং নিয়ে কিছু বলে না‚ ভারতের মতো গরীব দেশে করলই বা ডাম্পিং| আমেরিকা ৫০ টার মতো প্রোডাক্ট anti-dumping policy দিয়ে চীনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে| একটু খোঁজ নিও এই প্রোডাক্টগুলো নিয়ে কিভাবে ভরতের মার্কেটে চীন ঝাঁপিয়ে পড়েছে: Steel fence posts, iron pipe fittings, aluminum extrusions, tires, hand trucks, ironing tables, wooden bedroom furniture, and paper products. এর কিছু counter-logic-ও আছে| সেটা পরে বলবো|

1223

6

সুভাষ

রূপান্তরী -- মুখবন্ধ

আমি চিরকালই গান-বাজনার ভক্ত। ১৯৬২ সালের উচ্চ মাধ্যমিকে পেলাম National Scholarship, তার প্রথম কিস্তি পেয়েই চুপিচুপি একটি (4-speed) record player কিনলাম, সাথে দুটি 78 rpm গালার রেকর্ড – Billy Vaughn-এর “Come September / Berlin Melody” ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “তারা ঝিলমিল / মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা”। অমতে কেনার জন্য বাড়িতে সবাই বকাঝকা করল কিন্তু একমাত্র সন্তান হওয়ার সুবাদে রেহাই পেলাম। সেই থেকে আমার গান/বাজনার নেশা। শিবপুরে ভর্তি হলাম, দ্বিতীয় বর্ষে আমার রুমমেট স্প্যানিশ গীটার কিনে তখনকার একজন প্রথম শ্রেণীর শিল্পীর (৺খোকন মুখার্জী) কাছে বাজনা শিখতো; ও practise করতো, আমি সতৃষ্ণ নয়নে দেখতাম — আমাকে ছুঁতে দিত না। আমি কিন্তু ওর অনুপস্থিতিতে ওর গীটারে টুং টাং করতাম, ওর lessons তুলে ফেলতাম। বই পড়ে নিজে নিজেই বিভিন্ন প্রকারের chords ও তার প্রয়োগ শিখে শেষ পর্যন্ত college orchestra-য় যোগ দিয়েছিলাম। আমাদের college reunion-এ প্রতি বছর হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হতো —বছরের পর বছর রাতভর দেশের সকল বড় বড় শিল্পীদের গান ও বাজনা শুনেছি, শুনেছি আর মজেছি, পরে বইপত্তর পড়ে আর আলোচনা করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করেছি। এছাড়া আমি American / British / Jamaican / African folk song এবং Negro Spiritual / Blues / Jazz / Western Classical প্রভৃতি গভীর আগ্রহভরে শুনে নিজের কানটাকে উপযুক্ত করেছি। বাংলা লোক / আধুনিক / রবীন্দ্রনাথ / সলিল চৌধুরী / দ্বিজেন্দ্রলাল / অতুলপ্রসাদ / রজনীকান্ত- সঙ্গীতাবলী, পুরাতনী, প্রাদেশিক লোকসঙ্গীত, হিন্দী বেসিক/ফিল্মের গান, হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বাংলা ব্যান্ড — শ্রোতা হিসেবে প্রায় কিছুই বাদ রাখিনি। ইদানীং Vinyl / Cassette-এর গান digitize করছি ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনেক স্বরলিপি staff notation-এ রূপান্তর করছি। এইভাবে অবসর জীবন কাটাই। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে vinyl, reel ও cassette tape, audio CD, iTunes download দিয়ে নিজের গানের ডালি সাজিয়েছি। আমার ‘retiring room’ এখন গানে গানে ভরে গেছে! Sorry, ঝোঁকের মাথায় আড্ডার বন্ধুদের কাছে নিজের ঢাকটা একটু বেশী পিটিয়ে ফেললাম! বন্ধুগণ, যদিও আমি একজন সফল শিল্পী হওয়ার সুযোগ ও সময় পাইনি, তবু সব জঁরের গানের এক রসিক ও সমঝদার শ্রোতা হতে পেরে আমি গর্বিত। তাই আমার চর্চা, পঠন ও অভিজ্ঞতা-প্রসূত এই “রূপান্তরী” ব্লগের উপস্থাপনা। পছন্দ/অপছন্দ/উপেক্ষা আপনাদের অধিকার, মন্তব্যের অপেক্ষা আমার। .............................................................................................................................. আমার ব্লগসকল এই ভাবে সাজাচ্ছি রূপান্তরী : মুখবন্ধ : ধান ভানতে শিবের গীত রূপান্তরী-১ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত (উদাহরণ সহ) রূপান্তরী-২ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা গান...........ঐ রূপান্তরী-৩ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী গান……... ঐ রূপান্তরী-৪ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত…………… ঐ রূপান্তরী-৫ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা আধুনিক গান……. ঐ রূপান্তরী-৬ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী ফিল্মী গান………. ঐ রূপান্তরী-৭ : উপসংহার ও ধন্যবাদজ্ঞাপন ............................................................................................................................... এই ব্লগ রচনাহেতু কিছু গ্রন্থ থেকে প্রয়োজনানুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করেছি, যথা – ১) হিন্দুস্থানী সঙ্গীত পদ্ধতি (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে ২) রাগপঞ্জী – রবি গুহ মজুমদার ৩) রবীন্দ্র রচনাবলী— জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ (বিভিন্ন খণ্ড) ৪) রবীন্দ্রসঙ্গীত : রাগ–সুর নির্দেশিকা — সুধীর চন্দ ৫) ত্রি–নিবন্ধে রবীন্দ্রসঙ্গীত — অমিয়মুকুল দে ৬) A Hundred Devotional Songs of Tagore – Mohit Chakrabarti ৭) বিলাতী গান-ভাঙা রবীন্দ্রসঙ্গীত – অনুরাধা পালচৌধুরী ৮) ছয় তারের গান – অরুণেন্দু দাস (‘মহীনের ঘোড়া’-র প্রবাসী সদস্য) ৯) A Book on Orchestra / Orchestra on Ten Indian Ragas – V. Balsara ১০) Rudiments and Theory of Music – Associated Board of The Royal Schools of Music, London ১১) Teach Yourself Music – King Palmer (Associate of The Royal Academy of Music) ....................................................................................................................................................................... সকল উদাহরণ ইচ্ছাপূর্বক কপিরাইট না ভেঙে অবাণিজ্যিক শোনার জন্য ‘You Tube’ থেকে নেওয়া হয়েছে। (All examples taken from ‘You Tube’ for non-commercial private listening, without intentionally infringing or violating any copyright) ........................................................................................................................................................................ ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’– ‘মল্লার’ সুর প্রভাবিত এই রবীন্দ্রসঙ্গীতের আমার রূপান্তরিত Staff Notation এই ব্লগের সাথে সংযোজন করলাম। “হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু, রাগ: মল্লার ঘন মেঘের ভুরু কুটিল কুঞ্চিত, তাল: তেওরা হল রোমাঞ্চিত বন বনান্তর-- রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৯৩৩ দুলিল চঞ্চল বক্ষোহিন্দোলে স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলনস্বপ্নে সে কোন্‌ অতিথি রে। সঘনবর্ষণশব্দমুখরিত বজ্রসচকিত ত্রস্ত শর্বরী, [রূপান্তর: সুভাষ চট্টোপাধ্যায়] মালতীবল্লরী কাঁপায় পল্লব করুণ কল্লোলে-- কানন শঙ্কিত ঝিল্লিঝঙ্কৃত॥“ শ্রীমতী ইমন চক্রবর্তী গীত ’হৃদয় মন্দ্রিল’ গানটির একটি মনোরম You Tube video উপস্থাপনা করলাম

1048

5

নব ভোঁদড়

আমিও লিখবো‚ আমিও লিখবো

ফরবিডেন সিটি‚ নিষিদ্ধ শহর| আমাদের ভারতীয়দের কাছে লাল কেল্লা যেমন ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক‚ ফরবিডেন সিটি চীনেদের কাছেও তেমন| বরং হয়তো তুলনায় আরো বেশী| গ্রেট মুঘলদের মধ্যে মাত্র দুজন লালকেল্লায় কখনো না কখনো থেকেছেন| শাজাহান অল্প কয়েক বছর লালকেল্লা থেকে শাসন করে আবার আগ্রা কেল্লায় ফেরৎ যান| একমাত্র ঔরংজেব কখনো আগ্রা কেল্লা থেকে শাসন করেন নি| কিন্তু তিনিও অনেকটা সময় ঔরঙ্গাবাদে কাটিয়েছেন| মোট সময়ের হিসাবে হয়তো লালকেল্লার প্রায় সমান সমান সময়ই| অন্যদিকে মিং এবং চিং দুটি রাজবংশ প্রায় পাঁচশো বছর ধরে ফরবিডেন সিটি থেকে চীন শাসন করেছে| শেষ চিং সম্রাট পুই এখান থেকেই বিতাড়িত হয়েছেন| আবার চীন বিপ্লবের সাফল্যের পর মাও এই ফরবিডেন সিটির দেয়ালের ওপর থেকেই চীন গনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষনা করেছেন| এখনো চীনের স্বাধীনতা দিবসে চীনের রাষ্ট্রপ্রধান এই ফরবিডেন সিটির দেয়ালের ওপর থেকে সেনাবাহিনীর অভিবাদন গ্রহন করেন| ফরবিডেন সিটির সামনে দাঁড়িয়ে একবার বইতে পড়া পুরোনো বেইজিংএর সিটি প্ল্যান মনে মনে ঝালিয়ে নিলাম| ফরবিডেন সিটি ছিল সম্রাটের বাসভবন এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র| তার সামনে তিয়েন-আন-মেন ছিল উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের বাসস্থান - অর্থাৎ রাজকীয় শহর| ফরবিডেন সিটি এবং তিয়েন-আন-মেনের ইম্পিরিয়াল সিটি - দুটিই ছিল দেয়াল ঘেরা| ইম্পিরিয়াল সিটির দেয়াল বহুদিন হল আর নেই| তবে মাও মৌসলিয়ামের পেছনে যে সুন্দর গেটটি এখনো আছে সেটিকে বলা হয় স্বর্গীয় শান্তির দরজা| এইটিই ছিল সেই দেয়াল ঘেরা ইম্পিরিয়াল সিটির প্রবেশদ্বার| ফরবিডেন সিটির প্ল্যান আয়তাকার| বাইরের দেয়াল‚ তার ভিতরে আরো অনেকগুলি দেয়াল| সবচেয়ে ভেতরে অন্ত:পুর| চীনে প্রাসাদের এই প্ল্যানকে বলা হয় মণিমঞ্জুষা বা জুয়েল বক্স প্ল্যান| দামী গয়নার বাক্স যেমন একটির ভেতর আর একটি রাখা হয়‚ সবচেয়ে ভেতরে থাকে কোহিনূর মনি‚ এই প্রাসাদের গঠনও তেমনি| মণিমঞ্জুষা শুনে অবাক হন নি নিশ্চয়ই| মহাযান ও তন্ত্রযান বৌদ্ধধর্মের সুবাদে চীনের পন্ডিত ও অভিজাত সমাজ সংস্কৃতভাষার সাথে পরিচিত ছিলেন| এখনো চীনে ইতিহাসের আলোচনায় কিছু কিছু সংস্কৃত শব্দ দেখা দেয়| আমরা দাঁড়িয়ে আছি মেরিডিয়ান গেটের সামনে| এই গেটটি পেরিয়ে ফরবিডেন সিটিতে ঢুকতে হয়| মেরিডিয়ান গেটে পাঁচটি প্রবেশদ্বার| মাঝের দরজাটি মোটামুটি সম্রাটের জন্য সংরক্ষিত| মোটামুটি বলছি‚ কেন না কিছুকিছু সময়ে সম্রাট বাদে আরো কেউকেউ মাঝের দরজা ব্যবহার করতে পারত| যেমন প্রধানা সম্রাজ্ঞী বিয়ের জন্য ফরবিডেন সিটিতে ঢুকতেন এই মাঝের দরজা দিয়ে| কিন্তু একবার ঢোকার পর সম্রাটের স্ত্রীরা কেউ আর কখনো ফরবিডেন সিটি থেকে বেরোতেন না| রাজকীয় সিভিল সার্ভিসের প্রবেশিকা পরীক্ষার শেষ মৌখিক পরীক্ষা হত ফরবিডেন সিটিতে| পরীক্ষকমন্ডলীতে স্বয়ং সম্রাট বসতেন| এই পরীক্ষায় প্রথম তিন স্থানাধিকারী জীবনে এই একবার মাঝের দরজা দিয়ে বেরোনোর সম্মান পেতেন| মাঝের দরজার দুপাশের দুটি দরজা রাজবংশীয় পুরুষ ও রাজপুরুষদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল| সব শেষের দুটি দরজা শুধু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার দিন খোলা হত‚ পরীক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য| মাসে তিনদিন সম্রাট প্রকাশ্য দরবারে বসতেন| তখন যে সব মন্ত্রীরা দরবারে ডাক পেতেন না‚ তারা এই মেরিডিয়ান গেটের সামনে অপেক্ষা করতেন‚ যদি সম্রাটের তাদের প্রয়োজন হয়| অবশ্য সম্রাট কোন মন্ত্রীর ওপর রুষ্ট হলে তার বেত্রদন্ড ও প্রাণদন্ডও এই মেরিডিয়ান গেটের সামনেই হত| এছাড়া মেরিডিয়ান গেটের ওপর যে ঘর আছে সেখান থেকে সম্রাট যুদ্ধজয় করে ফিরে আসা সৈন্যদল ও তাদের লুটের বোঝা পরিদর্শন করতেন| গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় ঘোষণা এখানেই জনগনকে পড়ে শোনানো হত| নীচের ছবিগুলোর ক্যাপশন দিতে পারছি না| তাই এখান থেকেই বলে দি কোনটা কি| মাওয়ের ছবিওলা যে গেটটা দেখছেন সেটি হল মেরিডিয়ান গেট| গেটে পাঁচটা দরজার তিনটে দেখা যাচ্ছে| বাকী দুটো এই তিনটের থেকে খানিকটা দূরে| মেরিডিয়ান গেটের দুটি উইং আছে‚ সে দুটিও এই ছবিতে আসে নি| শেষ দুটি দরজা এই দুই উইংএ| লাল রঙের ওপরে রিলিফে করা যে সিংহের মুখ‚ সেটা মেরিডিয়ান গেটের মাঝের দরজার গায়ে নকার বা কড়া| মার্বেলের সিংহী মূর্তি হল চীনে বাড়িতে দরজার সামনে যে সিংহ-সিংহী মূর্তি থাকে তার একটি| ওরা ইংরাজীতে বলে ফু-ডগ| কি করে বোঝা গেল এটা সিংহী? দরজার সামনে এই মূর্তি দুটির মধ্যে যেটি সিংহের মূর্তি তার থাবার নীচে থাকে একটি বল (পৃথিবীর প্রতীক)| সিংহীর থাবার নীচে থাকে বাচ্চা সিংহ| এই ছবিটি ফরবিডেন সিটির সামনে রাখা সিংহ-সিংহী জোড়ার সিংহী| আমার এক চীনে ছাত্রকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এই সিংহীকে কি ইংরাজীতে ফু-বিচ বলা উচিৎ হবে? সে আমাকে উত্তর দিয়েছিল - চীনেরা তত ভাল ইংরাজী জানে না| এই থাপ্পরটি খাবার পর চীনেদের সাথে ওদের সংস্কৃতি নিয়ে আর কখনো রসিকতা করার চেষ্টা করি নি|

1233

37

মানব

কিংকর্তব্য

ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ, কি হয় কি হয়। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল সেই ঘরে যেখান থেকে আমার খারাপ সময়ের শুরু হয়েছিল। সেই অন্ধকার ঘর যেখানে লাথির পর লাথি খেয়ে আর কাতুকুতু দিয়ে কোনরকমে বেঁচে বেরিয়ে এসে করেছিলাম সেই কান্ড, যার জন্য এখন আমার এই অবস্থা। এতক্ষণে আলোয় আসাতে অন্ধকারে রাজীবদার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে চিনলাম। আমাদেরই ব্যাচমেট রূপম ছিল তাহলে ওটা। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাটা মজা নিচ্ছিল! একটু যদি সতর্ক করে দিত তাহলে এতবড় অঘটনটা হয়ত আমি নাও করতে পারতাম। “আমাকে কষ্ট দেওয়ার কি শাস্তি কি হতে পারে তোরা কিছু বলবি নাকি আমিই ঠিক করব?” সবাই চুপ। তখন বেশ অভিমান নিয়ে রাজীবদা বলল, “তুই এইভাবে আমার উপর অত্যাচার করলি, এটা কিন্তু ঠিক নয়। এখন আমিও তোকে একটু কষ্ট দিই কি বলিস? চল বেশী বাড়াবাড়ি না করে প্যান্টটা খুলে ফেল তো দেখি।” সবাই খুব কষ্ট করে হাসি চেপে বসে আছে দুপাশের খাটের উপর। হস্টেলের এক একটা রুমে দুটো করে সিঙ্গল খাট, প্রতিটা খাটে একটা করে ম্যাট্রেস, আর তার উপর সাদা চাদর পাতা। এবার একটু জোরে হুঙ্কার শোনা গেল, তুই কোন কোম্পানির আন্ডারওয়ার পরিস সেটা দেখতে চাইনি। যা বলেছি তাই কর। নাহলে আজ তোর কপালে অনেক কষ্ট আছে। দুদিকের সহপাঠিদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি ভয়ে এবং অনেক্ষণ ইতস্ততঃ করে শেষপর্যন্ত দাদার কথামত কাজ সেরে ফেললাম। ঘরের মধ্যে এক রাজীবদা বাদে সবাই ফার্স্ট ইয়ার। না পারে তারা প্রতিবাদ করতে, না পারে প্রাণ খুলে হাসতে। শুধু মুখ চাপা কতকগুলো ফিকফিক শব্দ আর আমার চোখমুখ লাল। এমন সময়ে বাইরে থেকে দরজা ঠকঠক। বলা বাহুল্য, এইধরণের কাণ্ডকারখানার সময় দরজা বন্ধ করাই থাকত। কখন কে এসে পড়ে, কিচ্ছু তো বলা যায় না। যাইহোক দরজা খোলা হল। আর সারা ঘরের ফিচফিচ শব্দ তুমুল হাসিতে পরিণত হল। ঘটনা এই যে, বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে সুবু এবং অনেকটা আজকেরই মতন কাণ্ড গতকাল এই রাজীবদার সাথেই করে ফেলেছে সে। কাল দুপুরে অনেকেই ভাতঘুম দিচ্ছিল ওদের রুমে। দুটো সিঙ্গল খাটকে জুড়ে দিলে ৬-৭ জনের শোবার ব্যবস্থা হয়ে যায়। সঙ্গে হাল্কা সুরে চলছে, ‘কেন করলে এরকম...বল’। এমন সময় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে হাজির রাজীবদা। যেইনা সে সুবুকে খোঁচা মেরেছে, ঘুমন্ত অবস্থায় সুবু রাজীবদাকে এমনভাবে ধরে রাখল, যাতে সে না পারছে পালাতে, আর লজ্জায় না পারছে কাউকে ডেকে তুলতে। এমন সময় কেউ একজন দুম করে দরজাটা খুলে ওই অবস্থায় ওদের দেখে ফেলে। তারপরই ঘটনাটা আমাদের মধ্যে জানাজানি হয়। আজ এই সময়ে সুবুর আগমনটা নিছক কাকতালীয় কি? এই অবস্থায় আমাকে দেখে বেচারা তো বুঝতেই পারল না কি হয়েছে।। আমাকে বলা হল ঘটনা ব্যাখ্যা করতে। আমি কোনরকমে হাসি চেপে রেখে হাত নেড়ে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। মুখ খুললেই গল্প বলার আগেই হাসিতে ভাসিয়ে দিতাম, বিপিনের মত। অবশেষে যা হওয়ার তাই হল। সুবুকেও একই অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল আমার পাশে। রাজীবদা একজনকে পাঠালো রসগোল্লা আনতে। এরপর আবার রসগোল্লা দিয়ে কি হয়ে ভাবতেই আমার কেমন ভয় ভয় করতে শুরু করল। দুজনের মুখ দিয়েই তখন অল্প অল্প খিক খিক, ফ্যাচ ফ্যাচ। একবার করে সমবেত জনতার মাঝে হাসির রোল উঠছে আর ওদের চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই বলে যে হাসলে ওদেরও এই অবস্থা হবে। রসগোল্লা এসে গেল। সবাই একটা করে পেল আর আমরা দুজন স্পেশাল ক্যাটাগরি তাই আমরা দুটো করে পেলাম। রসগোল্লা খাওয়া হলে এবার সিগারেট। সুবু তো আরামসে সিগারেট খেতে শুরু করল। আমি আপত্তি রাজীবদা বলে উঠল, সিগারেট তোকে খাওয়ানো হবেই। মুখ দিয়ে খাবি না তো কি হয়েছে... (চলবে)

1113

33

প্রবুদ্ধ

সাহিত্যের আলোচনা

আলোচনাটা শুরু হয়েছিলো শিবাংশুদার "প্রতিবাদ ও প্রতিফলন" লেখাটা দিয়ে| মূল সুত্রটা অবশ্যই উমা-র লেখা গল্প অঙ্গীকার| তারপর গত কয়েকদিনের আলোচনাটা খুব ইন্টারেস্টিং হওয়ায় সেটাকে আমার নিজেরই স্বার্থে ব্লগে তুলে রাখলাম| অনুমতি না নিয়ে লেখাগুলো তুলে দেওয়ার জন্য কেউ আশাকরি খ্চ‚ মানে রেগে যাবেন না| ---------------------------------------------------------------------------------------------- প্রতিবাদ ও প্রতিফলন শিবাংশুদা‚ ০২|১২|২০১৫ এ পাতায় ও পাতায় নানা আলোচনা হচ্ছে 'প্রতিবাদ' ও তার প্রতিফলন নিয়ে। এ পাতায় অরিন্দম যা বলেছে তা নিয়ে কিছু কথা রেখে দিই এখানে। 'প্রতিবাদ' একটা মানসিকতা। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তার নানা প্রয়োজন, নানা প্রেক্ষিত, নানা প্রকাশ। আমি সব পরিপ্রেক্ষিতগুলিকে আমার বক্তব্যে ধরিনি। আমার উপজীব্য ছিলো শুধুমাত্র মানুষের দাম্পত্যজীবনে অবিচার, অবিশ্বাস ও তার প্রতিবাদ, প্রতিফলন কী ধরণের ছন্দপতন আনে এবং কেন? ---------------------------------- দর্শক, কথক বা পাঠক; লেখক কোনোটাই নয়। সে এক চতুর্থ মাত্রা। তাই লেখক যখন পাঠকের কাছে জানতে চায়, কেমন লাগলো আমার লেখাটা? পাঠকের কাছে তিনটি বিকল্প। ভালো লাগলো, ততো ভালো লাগলো না অথবা ঠিক বলতে পারবো না। এর কোনোটাই লেখকের সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করেনা। কারণ লেখকের মাত্রাটি যে আসলে কী, তা পাঠকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। 'ভালো লাগলো' শুনলে অহম কিছু পরিতৃপ্ত নিশ্চয় হবে। কিন্তু তাতে তার লেখকসত্ত্বায় কোনও ভিন্ন সার্থকতা যোগ হবেনা। লেখক নিজেকে ভালো লাগানোর জন্য লেখে। যদি অন্য কারো তা ভালো লেগে যায় তবে তাকে বলা যায় পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। আমি যে গান গাই, জানিনে সে কার উদ্দেশ্যে..... ----------------------- যে লেখক বিশেষ গোত্রীয় পাঠকের জন্য শব্দবাণিজ্যে তল্লীন, তাঁর নাম হতে পারে চেতন ভগত বা শোভা দে। পাঠক হিসেবে তাঁরা আমার লেখক ন'ন। ---------------------- তথাকথিত আন্ডার'ডিফাইনড ( শব্দটির সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ জানিনা) চরিত্রের প্রতি বাংলা লেখক বা পাঠকদের দুর্বলতা চিরকালের। তবে এই রকম চরিত্র হলেই যে মৌনতার ভাষা বা স্তব্ধতার গান তার আয়ত্বের মধ্যে থাকবে, তা নয়। শীর্ষেন্দু প্রথম থেকেই এই ধরণের চরিত্রকে তাঁর লেখায় বড়ো পরিসর দিয়েছেন এবং তা পাঠকের আনুকূল্য পেয়েছে। সহনশীলতা ও মৌনপীড়ন এক অনুভূতি নয়। সহনশীল মানুষের প্রতিক্রিয়া সচরাচর ইতিবাচী হয়। কারণ এমন একজন মানুষ সমস্ত ঘটনাক্রমকে সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করেন। কারো কোনো একটি বিশেষ সংলাপ শুনে বা আচরণ দেখে, তার প্রতি নিজস্ব অবস্থান তাঁরা বদলান না। কারণ তাঁদের পরিপ্রেক্ষিত যুক্তি আধারিত। কিন্তু পীড়িত মানুষের মৌনতা'র মধ্যে ইতিবাচী কিছু থাকেনা। পুরোটাই দাঁত চেপে সহ্য করার নিরুপায় অবমাননা ছাড়া কিছু নয়। বাইরের পৃথিবীতে তার অনেক মাত্রা আছে। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্কে তার একটিই মাত্রা, তা নিয়েই লেখকের কারিকুরি। হ্যামলেট জিতবে না হারবে, সেটা লেখক ঠিক করেন।তিনি কোনো অর্থেই 'সমাজসংস্কারক ' ন'ন। লেখক, সমাজসংস্কারক হতে চাইলে তার থেকে বড়ো বিপর্যয় আর কিছু নেই। সহজ উদাহরণ, স্তালিনের আগের রুশ সাহিত্য এবং তার পরবর্তী পর্ব। ---------------------------------------------- দাম্পত্য অবিচারের প্রতি সহমর্মী লেখকের যে প্রতিবাদ আমাকে প্রথম চমকে দিয়েছিলো সেটি হেনরিক ইবসেনের Et dukkehjem(1879) । ইংরিজিতে The Doll's House। প্রায় দেড়শো বছর আগে এক পুরুষ লেখকের লেখা এক নারীর প্রতিবাদের ইতিবৃত্ত। বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে অনেক লেখা যায়, কিন্তু সেটা ভিন্ন প্রবন্ধ হয়ে যাবে। সে চেষ্টা থাক। একটা কথা বলি, লেখার মধ্যে লেখকের নিজের জীবন থেকে উঠে আসা নানা অভিজ্ঞতা, ধ্যানধারণা, অভ্যেস, ব্যক্তিগত ব্যসন এসেই যায়। কিন্তু সেই সব ব্যক্তিগত চাপ যদি তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, তবে লেখক আর লেখক থাকতে পারবেন না। তিনি হয় দর্শক, নয় পাঠক হয়ে যাবেন। লেখকের অগ্নিপরীক্ষা সেখানেই। সচেতন বার্তা দেবার জন্য অনেক লোক আছেন। তার জন্য 'লেখক' হবার প্রয়োজন নেই।কিন্তু একজন সফল লেখকের বার্তাটি একান্তভাবে অবচেতনগামী হবে। পাঠকের দাঁড়াবার জায়গাটিকে, স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে সে। নয়তো লেখার কী দরকার? দেশে নবকল্লোল, মনোহর কহানিয়াঁ কি কম পড়িয়াছে? -------------------------------- অবশ্য এসব কথাবার্তা কিছুই 'প্রতিমা'কে উদ্দেশ্য করে নয়।:-) তার নিরুপায়ত্ব আমি বুঝি। কিন্তু তার 'প্রতিবাদ' আমাকে ধন্দে ফেলে। পৃথিবীতে সবাই তাকে মাড়িয়ে যাবে। কিন্তু, লেখক তো তা পারেন না। প্রতিমাকে প্রেরণা আর কে দেবে? "..... গম্ভীর স্থির প্রতিজ্ঞাগুলি সারি দিয়ে দাঁড়ায় ত্রস্ত মনের সামনে প্রহরীর মতোঃ আমাদের প্রত্যেকের ইঁদুরের মতো মরাই শেষ নয়, তারপরেও মহত্তম ভবিষ্যৎ ...." ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম‚ ০২|১২|২০১৫ শিবাংশুদা যদি দাম্পত্যজীবনের কথা মাথায় রেখেই এইসব বলে থাকেন তাহলে তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়‚ কুমু থেকে চারু হয়ে তৃষা এবং আরো অনেকে আসবে| বিদেশী সাহিত্যও আসবে| সে বিষয় আপাতত থাক| কিন্তু‚ আপনার ঝিনুককে লেখা মন্তব্য পড়ে আপনার মনের কথা বোঝার ক্ষমতা আমার হয়নি যে উহা দাম্পত্যনির্ভর বক্তব্য| কেন্দ্রীয় চরিত্র‚ পার্শ্বচরিত্র‚ প্রতিবাদী সত্ত্বা‚ গান্ধীর উপমা ইত্যাদি প্রভৃতি যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর| আর সেই কারণেই শীর্ষেন্দুর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রর কথা উল্লেখ করেছিলাম| দেখলাম সে বিষয়ে আপনি খুব একটা কিছু বলেননি| এবং স্বাভাবিকভাবেই শীর্ষেন্দুর প্রীতির উল্লেখ করেছেন| হ্যাঁ সত্যি শীর্ষেন্দু ওর কাহিনী এইসব চরিত্রকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে| আর একটা ব্যাপারে একদম ঠিক বলেছেন এরমধ্যে(এই আলোচনার) প্রতিমা নেই| প্রতিমাকে দেখার চোখ হয়তো ভিন্ন‚ হয়তো বা এক হবে কিন্তু প্রতিমা শুধুই স্ত্রী নয় তাই যখন লিখব তার সব সম্পর্কের ওপর আলো ফেলেই লিখব| ভালো থাকবেন| অরিন্দম ------------------------------------------------------------------------------------------- প্রবুদ্ধ‚ ০২|১২|২০১৫ "প্রতিমা"কে প্রেরণা দেওয়ার কাজ যদি লেখকেরই থাকে‚ তাহলে তো শিবাংশুদা কাফকা কাম্যু মার্কেজ হেস এরা তো কেউ পাঠকই পাবে না| নিরুপায় অবমাননা নিয়ে কোনো লেখা তৈরী হবে না তাহলে? হ্যামলেট জিতলো কি হারলো.... হ্যামলেট জিতলো কোথায়? সবাই প্রতিমাকে মাড়িয়ে যাবে‚ কিন্তু লেখক তা পারেন না? না শিবাংশুদা‚ এই জাস্টিফিকেশনটা আমার ঠিক কনভিন্সিং লাগলো না| এভাবে ফর্মুলেট করা যায় না| -------------------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০২|১২|২০১৫ প্রবুদ্ধ, পাঠককে অনুপ্রেরিত না করতে পারলে লেখককে কে মনে রাখবে? পাঠক 'পাওয়া না পাওয়া'র অঙ্কটা অতো সরল নয়। যাঁদের নাম লিখেছো, নিছক সংখ্যাবিচার করতে গেলে তাঁদের থেকে পালপ ফিকশন লেখকদের প্রতি আনুগত্য মানুষের অনেক অনেক বেশি। নিরুপায় অবমাননার গল্প দিয়ে জমি তৈরি হয়। চরিত্ররা তার উপর চলাফেরা করে। সেটা তো ভিত্তি, থাকবেই।কিন্তু যে চরিত্রের প্রতি লেখকের মায়া নেই, সে চরিত্র কখনও দাঁড়াতে পারবে না। আর যে চরিত্রের প্রতি লেখকের প্রেরণা নেই, সে কখনই কালের বিচারে টিকবে না। --------------------------------------------------------------------------------------------------- প্রবুদ্ধ‚ ০২|১২|২০১৫ তাও পুরোটা মানতে পারলাম না শিবাংশুদা| এক‚ কথাটা হচ্ছিলো লেখক চরিত্রকে অনুপ্রেরণা দেবে কিনা তাই নিয়ে| তুমি পাঠককে অনুপ্রেরণা দেওয়ার কথা বলছো| বেশ‚ কিন্তু পাঠককে অনুপ্রেরণা দেবে লেখক‚ নইলে লেখককে কেউ মনে রাখবে না? ঐ নামগুলোর একটা আবার করছি| কাফকা| অনুপ্রেরণা তো দূর‚ মনে ডিপ্রেশন নিয়ে কাফকা পড়তে বসলে যেকোনো অঘটন ঘটতে পারে| তবু ঐরকম মনের অবস্থা নিয়েই কাফকা পড়া উচিত| এখানে অনুপ্রেরণার কোনো প্রশ্নই নেই| আর সংখ্যাতত্বের বিচারের তো কোনো অর্থই নেই| একজন পাঠকও যদি কাফকা পড়ে‚ তাকে দিয়েই লেখক-পাঠক সম্পর্ক establish হতে পারে| দুই‚ চরিত্রের প্রতি লেখকের মায়া না থাকলে সে চরিত্র দঁড়াতে পারবে না? হুড়মুড় করে দশটা উদাহরণ এসে গেলো‚ তবু ইচ্ছা করেই ভিস্যুয়াল মিডিয়মের থেকে উদাহরণ নিচ্ছি‚ বুনুয়েল? He loved to hate his characters. That obscure object of desire-এ প্রৌঢ় মাতিউ‚ বা নাজারিন-এর ধর্মযাজক নাজারিও‚ বুনুয়েলের মনে একটু মায়াদয়া থাকলে ঐরকম নির্দয়ভাবে একটা চরিত্র আঁকতে পারতেন না| চরিত্রের প্রতি লেখকের মায়া বা প্রেরণা থাকতেই হবে? চরিত্রের প্রতি ঘৃণা নিয়ে লেখক হওয়া যাবে না? যা: শিবাংশুদা‚ লেখার জগতটা বড়ো বেশী সীমাবদ্ধ হয়ে গেলো যে! ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম‚ ০২|১২|২০১৫ The Hitchhiking Game অনুবাদটি পান্থবালিকার চলন্ত গাড়ি থামিয়ে প্রেম প্রেম খেলা| মিলান কুন্দেরা| যা দেখেছে‚ দেখছে তাই যেন লিখে যাচ্ছে| চরিত্রকে ফেলে দিচ্ছে পাঠকের সামনে| লেখকের কোন বিশেষ পক্ষপাতিত্ব চোখে পড়েনি| অতিরিক্ত বিধি-নিষেধ সৃষ্টির পরিসরকে ক্ষুদ্র করে| ------------------------------------------------------------------------------------------------ শিবাংশুদা‚ ০২|১২|২০১৫ প্রবুদ্ধ, অরিন্দম, 'মানসিক অবসাদ' নিয়ে কাফকা পড়া উচিত? এ রকম কিছু বলতে চাইছো কি? নিজে পণ্ডিতি না করে এক আধটা লেখা'র নাম করছি। যদি সম্ভব হয়, দেখো। হয়তো কাফকা সম্বন্ধে টিপিক্যাল পশ্চিম য়ুরোপীয় সরলরেখায় নড়াচড়ার বাইরে অন্য রকম খোঁজ পেতেও পারো। ১. Franz Kafka: A dialectical Approach : Stephan Bird-pollan ২. Reading Kafkaa: Elizabeth Boa ৩. Labyrinth of Pure Reflection : Franz Kafka ----------------------- বুনুয়েল সম্পর্কে বলছো, "He loved to hate his characters"। এখানে "Love" শব্দটা কেন আসছে? অনেকভাবেই তো ঘৃণাকে সরাসরি প্রকাশ করা যেতো। তা না করে এভাবে লেখা কেন? কারণটি অতি সরল। ভালোবেসে বা ঘৃণা করে, নিজের সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে লেখক প্যাশনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন। গ্যোথে 'ফাউস্ট'কে কি ভালোবাসতেন? যদি ভালো না বেসে থাকেন, তবে তো ঘৃণাই করতেন। সেটাই তাঁর প্যাশন। সে জন্যই লেখাটি দেশকালের সীমাবদ্ধতা থেকে উপরে চলে গেছে। --------------------------- কোনও লেখকই চরিত্র বাছার সময় তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না। তবে তো লেখাটা হয়েই উঠবে না। ভঙ্গি নানা রকম থাকবে। সরল পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন লেখকের কলমটাই শুধু চলছে এখানে। মন'টা অন্য কোথাও। সেটাই লেখকের মায়া বা ছলনা। 'মায়া' মানে অন্ধ স্নেহ নয়। ইল্যুশন সৃষ্টি করা লেখকের সৃষ্টিশীলতার অংশ। পশ্য, গিওর্গি লুকাচ বা টেরি ইগলটন। অনেক কিছুই পাবে সেখানে। ------------------------ যদি কোনও চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত প্রত্যক্ষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে, তবে তার মানে লেখক এখনও পরিপক্ক হয়ে উঠতে পারেননি। অথবা সেমত লেখকের দ্বারা দাদের মলমের বিজ্ঞাপন ব্যতীত আর কিছু লেখা সম্ভব নয়। লেখালেখি একধরণের আচরণীয় ধর্ম। তার গতিপথ প্রহ্লাদের হাত ধরতে পারে, আবার হিরণকশিপুকেও আশ্রয় করতে পারে। তবে কোনও ভঙ্গিই লেখাকে লেখকের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। ------------------------------------------------------------------------------------------ প্রবুদ্ধ ০২|১২|২০১৫ আমি ভেবেই রেখেছিলাম এইবার শিবাংশুদা যে উত্তর দেবেন সেটা ট্যান যাবে| প্রায় যাচ্ছিলো-ও‚ হাত তুলে ধরতে পারলাম| কাফকা কি করে পড়তে হয় সে নিয়ে পড়াশুনা করা আমার লেভেলের বাইরে| তাও তিন তিনটে বই| তবে আমি তো আর উইকি নই যে সব কথা রেফারেন্স দিয়েই বলবো| নিজে যেটুকু পড়ে বুঝেছি সেটাই আমার নিজের কাছে সৎ বিশ্লেষণ| তাতে দেখেছি উৎফুল্ল হয়ে কাফকা নিয়ে বসলে পড়াটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়| মনে কিছু চাপ থাকলে‚ অবসাদ থাকলে‚ কাফকা পড়াটা‚ যাকে বলে‚ তাগড়া হয়| লাভ টু হেট একটা চালু কথা‚ তাই বল্লাম| লাভ মানে এখানে সেই লাভ নয়| বুনুয়েলের ইউএসপি-ই হলো চরিত্রগুলির প্রতি চরম নির্লিপ্ততা| এমনকি সেগুলো নিয়ে ব্যাখ্যা করাতেও স্পৃহা নেই| লাটাই ওঁর চেয়ারের পাশে পড়ে থাকে অনাদরে‚ চরিত্রগুলি আলগা সুতোয় জমিতে চলাফেরা করে| চরিত্রের প্রতি মায়া? কুরোসাওয়া বা চ্যাপলিনের মতো? নেই‚ বুনুয়েলের নেই| তবে আগে বলেছিলে চরিত্রের প্রতি মায়া‚ এখন দেখছি মায়া মানে ইল্যুশন বলছো| চরিত্রের প্রতি ইল্যুশন? ঠিক বুঝলাম না| আর শেষে গিয়ে কি কষ্ট হলো‚ ইসসস‚ কোন্যান ডয়েল থেকে বিভুতিভুষণ‚ সব্বাই দাদের মলমের বিজ্ঞাপন লিখছেন! চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত একেবারে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে কিনা‚ তাই এই শাস্তি| ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম ০২|১২|২০১৫ শিবাংশুদা বইয়ের নামগুলো দিয়েছেন খুব ভালো লাগলো। কিন্তু কুন্দেরার গল্প পড়তে পড়তে চরিত্রের প্রতি কোনরকম বিশেষ মনোযোগের চিহ্ন দেখলাম না। পরিবেশনায় একটা নির্লিপ্ততা আছে। এখন সত্যি সত্যি যদি সেটা নাও থাকে, মনেমনে যদি কোন চরিত্রকে ভালোবাসেন বা ঘৃণা করেন তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। মনের মধ্যে ঢুকবো কী করে! সেটা মার্কেসের কিছু লেখা পড়েও মনে হয়েছে। অন্যদিকে চরিত্রের প্রতি লেখকের প্রত্যক্ষ পক্ষপাত প্রকট হয়ে উঠলে সে দাদের মলমের বিজ্ঞাপন লিখবে, এ বড় কঠিন সীদ্ধান্ত, তার আগে একটু দেখতে হবে/বুঝতে হবে প্রত্যক্ষ পক্ষপাত বলতে আপনি কাকে বলছেন। বরং একটা সরল প্রশ্ন করি, নিখিলেশের প্রতি দাদুর পক্ষপাত প্রত্যক্ষ বা অপুর প্রতি বিভূতিভূষণের? ----------------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০২|১২|২০১৫ আরে ফাগোল, তিনটেই বই নয়। প্রথমটা বই আর পরের দুটো প্রবন্ধ। তিন নম্বরটা কাফকার নিজের লেখা। কোন্যান ডয়াল থেকে বিভূতিভূষণ, কোন চরিত্রের প্রতি তাঁদের 'প্রকট পক্ষপাত' রয়েছে বাবু। একটু শুনি নাহয়। ------------------------------------------------------------------------------------------- প্রবুদ্ধ ০২|১২|২০১৫ উহুঁ উহুঁ শিবাংশুদা, আগের প্রশ্ন আগে। যেটা তোমায় অরিন্দমবাবু আগেই করেছে। ------------------------------------------------------------------------------------------ বৃষ্টিম্যাম ০২|১২|২০১৫ শিউলি পর্ব আমার বলতে গেলে কিছুই পড়া হয়নি এখনও | পুরো বইটায় চোখ বোলানো আছে | নানান ব্যক্তিগত সমস্যায় সময় করে উঠতে পারিনি | উমার গল্পের সমালোচনা পড়তে পড়তে আজ ওর গল্পটাই আগে পড়েই ফেললাম | প্রতিমার চরিত্রকে আমার কখনও দুর্বল মনে হয়নি | প্রতিবাদ করার ভাষা সবার এক নয় | কেউ সোচ্চারে করে‚ কেউ মৌন হয়ে আবার কেউ হয়্তো উদাসীনতা অবলম্বন করে | শিবাংশুদাকে এই অধমের একটা প্রশ্ন ছিল ... সব সময় কি সংসারে সোচ্চারে প্রতিবাদ করা যায় ? প্রতিবাদ না করার বিভিন্ন কারণ থাকে | সেইসব কারণগুলো মোটেই তুচ্ছ নয় | সন্তান‚ সমাজ‚ আর্থিক অবস্থা আরো অনেক কিছুর কথা ভেবে কম্প্রোমাইস করতে হয় | আজও আমাদের সমাজে একজন মেয়ের একা থাকার সুযোগ নেয় পুরুষমানুষ | আড়ালে‚ আবডালে কুকথা‚ নিন্দা এসবের কথা তো ছেড়েই দিলাম | তবুও কিন্তু প্রতিমা ভেবেছিল‚ একদিন তার ফ্ল্যাটে সে চলে যাবে | স্বামীর প্রতি যাবতীয় কর্তব্য পালন করে একান্ত মুহূর্তে তাকে প্রত্যাখান করাও এক ধরনের প্রতিবাদ | আমি এইটুকুই বলতে চাই ‚ সব পরিস্থিতিতে তীব্র প্রতিবাদ করা বা ছেড়ে চলে যাওয়া হয়তো বাস্তবে সম্ভব হয়্না অনেকেরই | কিছু মানুষ যেমন প্রতিবাদ করে বেরিয়ে আসে আবার কিছু মানুষ অনেক অপ্রাপ্তি ‚ কষ্ট নিয়ে বেরিয়ে না এসে রয়ে যায় নানান কারনে | তাই বলে কি কোনো লেখক এই দ্বিতীয় শ্রেনীর মানুষদের কথা লিখবেন না ? ------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০২|১২|২০১৫ প্রবুদ্ধ, অরিন্দমের প্রশ্ন বলতে কি পক্ষপাতের ইশারা? যদি তাই হয়, তবে আমার ধারণাটি বলি। বাংলাভাষায় দু'টো শব্দ আছে, একেবারে পৃথক ভাব তাদের, কিন্তু অনেকেই সেগুলিকে এক ভাবে দেখেন। 'পক্ষপাত' ও 'সহমর্মিতা', এই দু'টি শব্দ। 'পক্ষপাত' স্পেসিফিক ভাব আর 'সহমর্মিতা' জেনেরিক ভাব। 'পক্ষপাত' মানে অন্ধ আনুকূল্য। 'সহমর্মিতা' মানে যৌক্তিক মানবিক অবস্থান। আরেকটু ব্যাখ্যা করি। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে যখন একজন পাকিস্তানি সৈনিক নিহত হ'ন, তখন তাঁর পরিবারের প্রতি আমি সহমর্মিতা বোধ করি। কিন্তু তা বলে আমি একজন ভারতীয় হিসেবে কখনও পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি কোনও রকম পক্ষপাত বোধ করিনা। --------------------------------------------- কবি নিখিলেশের প্রতি পক্ষপাত দোষদুষ্ট ন'ন। তিনি নিখিলেশের সহমর্মী। কারণ নিখিলেশ বস্তুতঃ ব্যক্তি কবির মাউথপিস মাত্র। সত্যি কথা বলতে কবি'র আরো অনেক চরিত্রের মতো নিখিলেশ চরিত্রটি ঠিক রক্তমাংসের মানুষ নয়। একটা আদর্শবিশেষ'কে মানুষের রূপ দিতে গেলে শিল্পের বাস্তবতার সঙ্গে ছলনা করতে হয়। রম্যাঁ রল্যাঁর জাঁ ক্রিস্তফ ধরণের সমস্যা। এই রকম একটি চরিত্রের প্রতি পক্ষপাতী হলে লেখক বাস্তবতার থেকে বিযুক্ত হয়ে যা'ন। কবি তা হ'ননি। ----------------------------------------------------- একই ভাবে বিভূতিভূষণের সঙ্গে অপু'র সম্পর্ক বিচার করা যায়। অপু পথের পাঁচালির মূল চরিত্র নয়। সজনীকান্তের প্রশ্নের জবাবে লেখক নিজে বলেছেন এই উপন্যাসটির নায়ক শুধুমাত্র 'পথ'। অন্য উপন্যাসগুলিতেও একই রকম সম্পর্ক উভয়ের মধ্যে। অপু চরিত্রটির সঙ্গে বিভূতিভূষণের কিছু লৌকিক মিল রয়েছে। কিন্তু তাছাড়া লেখক ও অপু চরিত্রটির মধ্যে সমান্তরাল টানা যায়না। বিভূতিভূষণ অপুর সহমর্মী। চরিত্রটি নিজের মতো খেলে যায়। লেখক তার মানসলোকের ওঠাপড়া নিজের মধ্যে বোধ করছেন। কোনও পক্ষপাত নেই। পক্ষপাতী লেখক তাঁর কল্পিত চরিত্রটিকে নিজের হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেননা। এই সমস্যাটি অপটু লেখকদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। --------------------------------------- দক্ষ লেখকেরা কখনও নিজস্ব পক্ষপাত'কে সৃজিত চরিত্রের উপর আরোপ করেননা। ভালো লেখার এটাও একটা শর্ত। ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম‚ ০৩|১২|২০১৫ শিবাংশুদা পক্ষপাত ও সহমর্মিতার প্রসঙ্গে আপনি নিখিলেশের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অবস্থানটি বলেছেন। হককথা, বহুবার পড়তে পড়তে এ বিশ্বাস আমারও হয়েছে নিখিলেশ রক্তমাংসের নয়। আপাত শক্তির সঙ্গে নিহিত শক্তিত দ্বন্দ্ব ও উত্তরনের প্রসঙ্গে লেখকের নিজস্ব মতটি প্রকাশ করার জন্য নিখিলেশের সৃষ্টি। আপনার প্রদত্ত সংজ্ঞা মাথায় রেখেই বলছি, সাহিত্যে তাহলে পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নেই। অথচ জীবনে আছে। কোন বিশেষ ঘটনায় কখনও কখনও মানুষ পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয়। আমার গদ্যের গুরু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ওপর পক্ষপাতের অভিযোগ আছে। অসবর্ণ বিবাহে তাঁর আপত্তি কিন্তু আমার নিজের অবস্থান সেক্ষেত্রে অন্য। শীর্ষেন্দু যেসব চরিত্র একেঁছেন হতেই পারে তারা ওরকমই। যা দেখেছেন তাই দেখিয়েছেন। এমনতো নয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই শীর্ষেন্দুর চরিত্রদের প্রবল যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ হতে হবে। তাহলে কিন্তু বলতেই হয় সাহিত্যে পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র নেই। আর যা নেই তা নিয়ে অহেতুক চিন্তা করার দরকার কী! গদ্য পাঠের সময় যে জিনিসটা আমার কাছে প্রধান লক্ষ্যের বিষয় তা'হল চরিত্ররা কতটা বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য আর সময়ের চালচিত্রে যে তথ্য ও পারিপার্শ্বিক চিত্র দেখানো হয়েছে তা কতটা নির্ভরযোগ্য। সেখানে আপোষ চলেনা। অরিন্দম * যদি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র আপনার জানা থাকে জানাবেন| সেইক্ষেত্রে পক্ষপাত সহমর্মিতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হবে| -------------------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০৩|১২|২০১৫ অরিন্দম, ১. "আপনার প্রদত্ত সংজ্ঞা মাথায় রেখেই বলছি, সাহিত্যে তাহলে পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নেই। অথচ জীবনে আছে। কোন বিশেষ ঘটনায় কখনও কখনও মানুষ পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয়।" স্পষ্ট হওয়া দরকার 'সাহিত্য' বলতে তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাইছো। 'পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নেই' এ কথা আমি বলিনি। আমার বক্তব্য, 'পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র'কে কেন্দ্র করে যে আখ্যান রচিত হয়, তা টিকে থাকে না। ২."এমনতো নয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই শীর্ষেন্দুর চরিত্রদের প্রবল যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ হতে হবে।" এমন শর্ত কে দিয়েছে? আমি তো নই নিশ্চয়ই? 'যুক্তিবাদ' বা 'নিরপেক্ষতা' দিয়ে আখ্যানের চরিত্রদের বিচার করা হয়না। ৩. "তাহলে কিন্তু বলতেই হয় সাহিত্যে পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র নেই। আর যা নেই তা নিয়ে অহেতুক চিন্তা করার দরকার কী!" পুনরায় একই উপপাদ্য। উত্তর একই। ৪. " যদি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র আপনার জানা থাকে জানাবেন়" লেখকের 'প্রতিষ্ঠা'র কোনও সার্বভৌম পরিভাষা নেই। যাঁদের অনেক বই বিক্রি হয়, তাঁরা কি 'প্রতিষ্ঠিত'? অথবা যাঁরা সরকারি পুরস্কারে ধন্য, তাঁরা? সে যাই হোক, লেখকের 'প্রতিষ্ঠা'র সঙ্গে লেখার প্রতিষ্ঠা সমান্তরাল নয়। আশি-নব্বইয়ের শীর্ষেন্দুর সঙ্গে দু হাজারদশের শীর্ষেন্দু মেলেন না। পাঠক হিসেবে শীর্ষেন্দুর লেখায় 'পক্ষপাত' দুষ্ট অংশটা এড়িয়ে চলি। একটা সুন্দর আপেলের গায়ে একটু থ্যাঁতলানো দাগের মতো। ------------------------------------------------------------------------------------------ প্রবুদ্ধ ০৩|১২|২০১৫ শিবাংশুদা‚ বুঝলাম যে লেখক চরিত্রের (কেন্দ্রীয় চরিত্রই ধরে নিচ্ছি কারণ তুমি বারবার সেখানেই ফোকাস করছো) প্রতি সহমর্মী হতে পারেন‚ কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন না| পক্ষপাতী লেখক তাঁর কল্পিত চরিত্রটিকে নিজের হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেননা। তবে লেখার জগতটা এতো বড়ো ও খোলা যে লেখক এটা করবেন ওটা করবেন না এমনটা দাগানো যায় না| আমি একটা উপন্যাসের কথা বলছি যেখানে বিষয়ের প্রতি‚ ও কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত রয়েছে| সহমর্মিতার তো কোনো প্রশ্নই নেই কারণ চরিত্রটি লেখকের নিজের ভাষাতেই "a vain and cruel wretch" ও "a hateful person." অন্য কেন্দ্রীয় চরিত্র‚ একটি নাবালিকা মেয়ে‚ তাকে লেখক দেখিয়েছেন শুধু ঐ হেটফুল পার্সনের চোখ দিয়েই| ফলে মেয়েটির চরিত্রটা একটা সেক্স ফ্যান্টাসির মোড়কেই বন্দী হয়ে আছে‚ কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েও তার নিজের কোনো বক্তব্যই নেই| বোধ হয় বুঝতে পারছো আমি লোলিটা-র কথা বলছি| পঞ্চাশের দশকে তো বটেই‚ এখনো‚ আমার তো মনে হয় ভবিষ্যতেও‚ মধ্যবয়সী কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের (নায়ক বলছি না) এক নাবালিকার সাথে যৌন সম্পর্কের মতো বিষয় পাঠককে এথিক্যালি বিব্রত করবে| লেখক সমাজ সংস্কারক নন‚ এথিকসের মতো ঘোলাটে জিনিস নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা থাকার কথাও নয়| তবু এমন একটা NSFW বিষয়‚ সেটা নিয়ে নবোকোভের রীতিমত পক্ষপাত ছিলো| কারণ এই একই বিষয়‚ যাকে হেবেফিলিয়া বলে‚ নিয়ে উনি আরো তিনটে উপন্যাস লিখেছিলেন (Laughter in the dark, Volshevnik, Origin of Laura)‚ কবিতা লিখেছেন (Lilith)‚ গল্প লিখেছেন (Nursery tale)‚ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লিখেছেন (Kingdom by the sea)| এমন একটা abhorring বিষয়ের ওপর এমন ফেটিশ‚ তোমার ডেফিনিশন অনুযায়ী অন্ধ আনুকূল্য‚ এটা নবোকোভের এক নম্বর পক্ষপাতিত্ব| দুই নম্বর পক্ষপাতিত্ব‚ বিষয়টাকে সচেতনভাবে গ্লোরিফাই ও মোর‌্যালাইজ করা| লোলিটা বইয়ের মধ্যে বই‚ ফরাসী সাহিত্যের পন্ডিত হুমবার্টের জবানীতে লেখা একটি কাল্পনিক বই "Lolita, or the Confession of a White Widowed Male" হুমবার্টের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে| এই কাল্পনিক বইয়ের শুরু থেকেই‚ এমনকি ড: রে নামে একজন চরিত্রের লেখা কাল্পনিক মুখবন্ধে কিভাবে হুমবার্টের হেবোফিলিয়াকে জাস্টিফাই করা হয়েছে দেখাই‚ "আমি হুমবার্টকে মহিমান্বিত করছি না..হুমবার্ট is horrible, he is abject, he is a shining example of moral leprosy...‚ কিন্তু how magically his singing violin can conjure up ...... a compassion for Lolita that makes us entranced with the book while abhorring its author!.... এই বই একটা poignant personal study‚ যার একটা মোরাল (নীতিকথা) আছে‚ to warn us of dangerous trends; to point out potent evils.." তেরো-চোদ্দ বছরের লোলিটাকে নিয়ে সারা উপন্যাস জুড়ে হুমবার্ট যা করে‚ সেটা রে-র নাম করে তো নোবোকভই magical singing violin বলে গ্লোরিফাই করলেন| আর হুমবার্টের সমস্ত কার্যকলাপকে তো বুনুয়েলের মতো নির্লিপ্তি বা গোদারের মতো ঘৃণা দিয়েই আঁকা যেতো‚ নীতিকথা কেন আনলেন নোবোকোভ? সেটা কি হুমবার্টকে পাঠক যাতে একটু সহানুভুতির সাথে দেখে তার জন্য? লেখক অবশ্যই হুমবার্টের সহমর্মী নন‚ কিন্তু পক্ষপাত? পুরো বইটা জুড়ে পাতায় পাতায় স্পষ্ট যে হুমবার্টের হেবোফিলিয়া থাকলেও সে মানুষ‚ আর ডোলোরেস (লোলিটা)-এর পরিচয় সে শুধু একটা সেক্স ফ্যান্টাসি| এর চেয়ে বেশী পক্ষপাত‚ এমন পৈশাচিক বিকৃত চরিত্রের ওপর‚ আমি অন্তত দেখিনি শিবাংশুদা| এক এক জায়গায় তো নোবোকোভ রীতিমত পাঠককে ম্যানিপুলেট করছেন যাতে সেও হুমবার্টের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেই বিষয়টাকে দেখে| তিন নম্বর পক্ষপাত| নোবোকোভের অনেক গুলি ব্যক্তিগত পছন্দ বা ফেভারিট জিনিস তিনি হুমবার্টের ওপর ন্যস্ত করেছেন| এটা একরকম আনুকুল্য| ছোটো করে সেগুলো বলছি| ১| নোবোকোভের খুব প্রিয় কবি ছিলেন পো| গল্পে হুমবার্টের প্রথম প্রেমিকার নাম অ্যানাবেল লী‚ পো-এর কবিতা অবলম্বনে| এই নামটা নিয়ে হুমবার্ট অবসেসড| হুমবার্ট লেখকের চোখে তত ঘৃণিত নন যতটা পাঠকের চোখে‚ তাই প্রিয় কবির কবিতার নাম জড়ালেন হুমবার্টের নামের সংগে| ২| নোবোকোভের আর এক প্রিয় লেখক লুই ক্যারোল‚ যাঁকে নোবোকোভ বলতেন The first Humbert| এটা যখন প্রথম জানতে পারি‚ সত্যি বলছি শিউড়ে উঠেছিলাম| লুই ক্যারোল আর হুমবার্ট একই ধরণের লোক‚ নোবোকোভ কি এই বলতে চেয়েছিলেন? ৩| হুমবার্টের চরিত্র কার ওপর ভিত্তি করে আঁকা? উত্তর হলো চার্লস চ্যাপলিন‚ যাঁর চার ক্রমানুক্রমিক স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের তফাত যথাক্রমে ১২‚১৯‚২১ ও ৩৬ বছরের! এখন কেউ যদি চ্যাপলিনের আদলে কোনো চরিত্রের জন্ম দেয়‚ সে কি শুধু চ্যাপলিনের হেবোফিলিয়াকেই ফোকাসে রাখবে‚ না কি সচেতনে‚ বা অবচেতনে‚ চ্যাপলিনের মহৎ মানবিকতাকে ঐ চরিত্রে বসিয়ে দেবে না? আর যে মুহুর্তে হুমবার্টকে মানবিক রংএ আঁকা হলো‚ এসে গেলো চরিত্রটির প্রতি পক্ষপাত| তাই সতেরো বছরের গর্ভবতী লোলিটাকে অর্থসাহাজ্য করার বর্ণণায় হুমবার্ট লেখকের সহানুভুতি পায়| ---------------------------------------------------------------------------------------------------

1024

1

শিবাংশু

পাঠক ও প্রতিস্বর

আজ সারাদিন আমি কিস্যু লিখবো না বলে ঠিক করেছি। এবার 'শিউলি পর্ব' নিয়ে একটু পড়তে হবে। মানে 'পড়তে' হবে। আদেশ হয়েছে 'শেষ থেকে শুরু' করার। কিন্তু বহুদিন হয়ে গেলো আমি আর 'শুদ্ধ পাঠক' নেই। যে কোনও লেখাই হোক, যে কোন লেখকই হোক, শুধু পড়ে যেতে পারিনা। ভিতর ভিতর নানা সলভেন্ট, রিএজেন্ট, ক্যাটালিস্টের ক্ষরণ চলতেই থাকে। লেখার চেয়ে র‌্যাডিক্যালের খোঁজখবর বেশি হয়ে যায়। অনেকটাই বেশি। সফল পাঠক হতে গেলে ভিতরে অনেকটা শাদা পাতা প্রয়োজন হয়। যেখানে ভালো লাগা, না লাগা'গুলি অগোছালো লিখে রাখা যায়। সেই পাতার অভাব বোধ করি এখন। তাই সৎ ভাবে কোনও লেখা সম্বন্ধে মতামত দিতে গেলে সময় আর শ্রম দুইই লাগে। দু'টোরই অভাব এই মূহুর্তে, আরো অনেক অভাবের মতো'ই খিন্ন করে। ------------------------------- রচনাবিচার করার নানা মাপদন্ড হয়। তবে 'শিউলিপর্বে'র লেখা নিয়ে কোনও অবস্থানে আসার আগে মনে রাখতে হয় এখানে সবাই ভিতরে ভিতরে লেখক। যতোটা বুকের ভিতর সৃজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন, ততোটা মুখের মানচিত্রে থাকেননা। লেখালেখি করে 'বিশিষ্ট' বা 'বড়ো' হতে গেলে যতোটা পার্থিব যুদ্ধবিগ্রহ করে নিজেকে কঠোর করে তুলতে হয়, ততোটা আগুনের জ্বালা এঁরা কেউ পেরিয়ে আসেননি। ঐ জ্বালাটা লেখার শরীরটিকে উজ্জ্বল করে। নয়তো আমি মনে করি একজন তথাকথিত 'অপরিচিত' লেখক আর 'লোকপ্রিয়' লেখকের সততার সোনায় খাদের পরিমাণ একই থাকে। একজন লোকপ্রিয় কথাকার অনেক বেশি অবহেলা, অপমান,ঘাম-অশ্রুর প্রস্তুতিপর্ব পেরিয়ে আসেন। তথাকথিত 'শৌখিন' লেখকদের সেই কৃষ্ণপক্ষটি সচরাচর পেরিয়ে আসতে হয়না। তাঁদের অন্য বিকল্প থাকে। যে লেখকের 'বিকল্প' যতো কম, তিনি ততো পরিণত কথাকার হয়ে উঠতে পারেন। ----------------------------- অতি পরিচিত মানুষজনের লেখালেখি নিয়ে মন্তব্য করার কিছু গোধূলিপর্যায় থাকে। সবটা আলো নয়, সবটা আলোহীনতাও নয়। যে দেখতে জানে, তার জন্য এই আলো 'কনে দেখা'র মূহুর্ত, যে জানেনা সে শুধু আঁধার দেখে। 'বাহ, খুব ভালো' জাতীয় এড়িয়ে যাওয়া উৎসাহ দেওয়াটা সহজতম। আবার 'ভালো লাগলো না' গোছের ঈষৎ রূঢ় প্রকাশভঙ্গিটিও বস্তুত 'এড়িয়ে যাওয়া'। ঐ গোধূলির বালাই বলা যায় একে। সব লেখকই নিজের সৃষ্টির প্রতি খুব স্পর্শকাতর হ'ন। সন্তানের মতো মায়া থাকে। তবে মনে রাখতে হবে যখনই কোনও লেখা পাঠকসাধারণের দরবারে পৌঁছে যায়, তখন তা 'সবার' হয়ে যায়। লেখকও সেই 'সবার' অংশমাত্র। তাঁকেও যথাসম্ভব নির্লিপ্ত, নির্বিকার স্থিতিশীলতা অবলম্বন করতে হবে। নয়তো যেকোন লেখার প্রতি 'বিরূপ' মন্তব্যকে লেখকের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ বোধ হতে পারে। এটা একান্ত অনভিপ্রেত। এভাবেই অনেক কমরেড ইন আর্মস দূরে চলে যায়। হয়তো সেটা ভালো'ই হয়। কারণ একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড়ো অবলম্বন তার আত্মবিশ্বাস। কলাত্মক গুণগুলি ম্লান হয়ে যাবে, যদি শিল্পী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। 'শিল্পী' হয়ে ওঠার চাপ সবার সয়না। সে চেষ্টা না করাই উত্তম। ----------------------- 'শিউলি পর্বে'র লেখাগুলিকে নিজের মতো করে বিভিন্ন ভাগে বেছে নিয়েছি। পর্যায়ক্রমে অতি সংক্ষিপ্ত কিছু একা'দোকা শব্দ ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা থাকবে হয়তো। সব লেখা নিয়েই যে লিখতে পারবো, এমন নয়। যদি এই সব এলোমেলো মন্তব্য কারো কাছে 'জ্ঞানদান' করার স্পর্ধা বোধ হয়, তবে নিরঙ্কুশ বর্জন স্বাগত। পাঠক হিসেবে যথাসম্ভব সৎ থাকাটা জরুরি। সে প্রয়াস থাকবে নিশ্চয়। আশা করি যাঁদের লেখা নিয়ে আলোচনা করবো তাঁরা পাঠকের প্রতিক্রিয়াটি উদার মনে গ্রহণ করবেন। ------------------------------------------------------------------------- মেয়েদের নিয়ে মেয়েদের লেখা --------------------------------- প্রচ্ছদচিত্রটিকে দিয়েই শুরু করি। এটিও তো একজন মেয়ের আঁকা এক মেয়ের ছবি। সোমা বিশিষ্ট শিল্পী। যতোদূর জানি স্বশিক্ষিত, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত। এই প্রতিষ্ঠার পিছনে যে প্রস্তুতি আছে সেটি স্বতঃসিদ্ধ। আমরা এ ধরণের প্রচ্ছদ প্রথম আঁকতে দেখি শ্রদ্ধেয় গণেশ পাইনকে, বহুকাল হলো। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর শারদ সংখ্যাগুলিতে। সোমা সেই ধারাটিকেই গ্রহণ করেছেন। এটি বিকাশ বা সঞ্জয় ভট্টাচার্য, এমন কি সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের থেকেও আলাদা। বর্ণাঢ্য, সাবলীল। তবে শরৎঋতু কি শুধু অসুরনাশিনীর মৌরসিপট্টা? বাঙালির দুর্গা সোমার তুলিতে আসার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছেন পরবর্তী সংখ্যার অবকাশে। ---------------------------- 'দুর্গেশনন্দিনী' যদি প্রথম বাংলা 'উপন্যাস' হয়, তবে বাংলা পাঠকের অভ্যেস তৈরি করেছে এই জঁরের লেখালেখিই। বঙ্কিম ছাঁচটি নিয়েছিলেন ওয়াল্টার স্কটের থেকে। সেখানে ইতিহাস গৌণ, রোমান্সটি মুখ্য। আধারটি পাঠকের পোষকতা লাভ করে নিশ্চিত। এই মূহুর্তের বাংলা উপন্যাসের জগতে 'ঐতিহাসিক' রচনার যে মডেলগুলি রয়েছে, সেখানে শরদিন্দুর মডেলটি সব চেয়ে লোকপ্রিয়। তাঁর সাধুভাষা, তৎসম শব্দের অফুরান ব্যবহার, বিশেষতঃ স্তরে স্তরে কাহিনী বুনে যাবার ক্ল্যাসিসিস্ট গঠন বাংলা পাঠককে টেনে রাখে। এটি একান্তভাবে বঙ্কিমী স্টাইল। পরীক্ষিত ও সফল। মিলনান্তিক ও সুখদায়িনী। গত পাঁচ দশকে জনপ্রিয় 'ঐতিহাসিক' উপন্যাস যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে প্রধান বিমল মিত্র ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। রচনার স্বল্প সংখ্যা স্বীকার করেও যাঁদের লেখা উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন, অমিয়ভূষণ মজুমদার, অসীম রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, বাণী বসু, প্রমুখ। এঁরা কেউ বঙ্কিমী ঢংটির অনুসরণ করেননি। তাই এই মূহুর্তে বাংলায় 'ইতিহাস'কে ভিত্তি করে লিখতে গেলে একটা নির্দিষ্ট অবস্থান নিতে হবে। ------------------------- 'শিউলি পর্বে' শেষ থেকে শুরু করতে গেলে যা প্রথমে আসবে তা শ্রী'র লেখা ' বাবুল মোরা'। এ প্রসঙ্গে বলি অবধের সাম্প্রতিক, অর্থাৎ গত দুশো বছরের ইতিহাস নিয়ে কিছু নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু হজরত মহল'কে নিয়ে পৃথক কোনও লেখা চোখে পড়েনি। সেদিক দিয়ে শ্রী একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় বেছেছেন। হজরত মহল'কে নিয়ে নানারকম মিথ রয়েছে। তবে বেশিটাই সাহেবদের লেখায়। যেখানে তাঁকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, অহংকারী, অপরিণামদর্শী হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস রয়েছে। শ্রী অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছেন। স্বাগত প্রয়াস। যেখানে খুব বেশি ঘটনার ঘনঘটা নথিবদ্ধ নেই, সেখান থেকে 'গল্প' গড়ে তুলতে মুন্সিয়ানা লাগে। নতুন চরিত্র, পটভূমি, ঘটনাক্রম কল্পনা করতে হয়, তবে প্রামাণ্য ইতিহাসকে বাঁচিয়ে। এক্ষেত্রে শ্রী সফল। হজরত মহল চরিত্রটিকে নিয়ে তিনি যা করতে চেয়েছেন, অনেকটাই সফল হয়েছেন। বিশেষ করে একজন প্রশিক্ষু কথাকার হিসেবে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে কয়েকটি লক্ষণ নিয়ে তাঁকে একটু চিন্তা করতে অনুরোধ করবো। আমার মনে হয়েছে পাঠক হিসেবে তাঁর শরদিন্দু আচ্ছন্নতা লেখক হিসেবে নিজস্ব স্ফূর্তিকে একটু ব্যহত করেছে। ইতিহাসভিত্তিক হতে গেলে সাধু ও তৎসম শব্দের প্রয়োগ সব সময় খুব একটা জরুরি নয়। নাট্যমূহুর্ত তৈরি করার সময় সংক্ষিপ্ততম শব্দ সংযোজন করতে হয়। নয়তো টেনশনটা ধরে রাখা যায়না। প্রতিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। শুধু রেখাচিত্রটিই থাকবে। অধিক বিশদ হবার প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'আমিই সে' বা অমিয়ভূষণের ' গড় শ্রীখন্ড' উল্লেখ করা যায়। এহ বাহ্য, সনিষ্ঠ প্রয়াস হিসেবে শ্রী'র এই লেখাটি নিশ্চয় অভিনন্দনযোগ্য। আমি এই সুযোগে তাঁকে সেটাই জানাচ্ছি। ----------------------------------- ইতিহাসের একটি পর্ব নিয়ে সুচেতনার 'ময়নামতী'ও একটি সংযোজন। সুচেতনাকেও একটা কঠিন কাজ করতে হয়েছে। যতোটুকু লেখা আছে, সন্ন্যাসী ও নর্তকীর গল্প, সেখানে গল্পের উপকরণ কিছু নেই বললেই চলে। কল্পনাকে অনেকটা স্বাধীনতা দিতে হবে। সুচেতনা নিয়মিত লেখক। অনেকদিন ধরেই লেখেন, ফলে লেখার ক্র্যাফটটিতে নিজস্ব ভাবনাচিন্তা থাকে। এই লেখাটিতে নর্তকী ও সন্ন্যাসীকে কেন্দ্রে রাখার চাপে অন্য চরিত্র সৃষ্টি করার অবকাশ পাওয়া যায়নি।লেখাটির একটি মেসেজ আছে। তার উপর গুরুত্ব বেশ স্পষ্ট। সুচেতনার গদ্য সর্বদাই সুললিত হয়। তবে এই লেখাটিতে বিষয়বিচারে ভাষার লালিত্য একটু প্রত্যক্ষ হয়ে গেছে। অনেকসময় এই লক্ষণটি গদ্যের গতিকে ঈষৎ ব্যহত করে। ------------------------------------------ আমরা যখন থেকে লেখালেখি শুরু করেছি, কয়েকজন গদ্যকারকে কোনও বাছবিচার না করে শুধু পড়ে গিয়েছি। উদ্দেশ্য থাকতো, তাঁদের বাংলালেখার কারিগরিটিকে বুঝে ফেলা। এই সব লেখকদের মধ্যে আছেন, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী এবং অবশ্যই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন আবহ, ভিন্ন সম্পর্ক, ভিন্ন মানসিকতা, সব ক্ষেত্রেই তাঁরা কীভাবে গদ্য গড়ে তুলছেন সেটা শেখার চেষ্টা করেছি। এঁরা ছাড়াও অনেক শ্রদ্ধেয় গদ্যকার আছেন বাংলায়। তাঁরাও শেখান। খুব সযত্নে কার্যকরীভাবে শেখান। কিন্তু উল্লেখিত লেখকদের লিখনকৌশল থেকেই বিংশশতকের দ্বিতীয় অর্ধে বাংলা আখ্যানগদ্যের নির্দেশিকাটি রচিত হয়েছে। এই সময় যাঁরা গদ্য লিখতে ইচ্ছা করেন, আমি তাঁদের এই সব লেখকদের লেখা অভিনিবেশ সহকারে পড়তে বলি। লিখতে বসে বা পাঠক হিসেবে আমিও তাঁদের দিকনির্দেশগুলি মেনে চলি। ------------------------------ জল হলেন এই পাতার সব চেয়ে অনুচ্চস্বরের কথাকার। নিয়মিত লেখেন, অনেক লেখেন। সব যে পড়ার সুযোগ হয়, তা নয়। কিন্তু তিনি কখনও উচ্চকিত হ'ননা। এই সংযমটি পাঠক হিসেবে আমার ভালো লাগে। তাঁর 'স্রোতে বয়ে যাওয়া' লেখাটি আমার বেশ ভালো লাগলো। শুধু নামটির সঙ্গতি পেলুম না। গল্প বলার শিল্প তাঁর বেশ আয়ত্ব। কথকের কাজটিতেও তিনি নিপুণ। যে মেয়েটিকে কেন্দ্রে রেখে গল্পটি বোনা হয়েছে তাকে আমি চিনতে পারছি। এখানেই লেখকের বড়ো সাফল্য। তবে শব্দব্যবহার ও বাক্যসন্দর্ভ রচনায় দু'চার ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হওয়া যেতো। সংলাপে কয়েক স্থানে আবেগকে একটু শিকল দেওয়া যেতো হয়তো। যেহেতু তিনি নিয়মিত লেখালেখির শ্রমস্বীকার করেন, তাই আমি নিশ্চিত তাঁর গদ্য আগামীদিনে আরো ধারালো হবে। তাঁকে ও তাঁর লেখাকে স্বাগত। ---------------------------------------------- উমালক্ষ্মীর লেখা 'অঙ্গীকার' বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে তিন প্রজন্মের মেয়েদের রোজনামচা। দ্বিতীয় মাত্রা হিসেবে তাঁদের পুরুষদের উপাখ্যানও রয়েছে। চরিত্রগুলি পরিচিত, তাদের যাপনভূমিও পরিচিত, তাই চ্যালেঞ্জটিও অধিক। মুখপাতের প্রথম স্তবকটি যেন 'ভূমিকা'। ছোটোগল্পের জন্য অধিকন্তু। তার পরেই চরিত্ররা আসতে শুরু করছে। তারা আমাদের দৈনন্দিন চেনা জীবনের অংশ। তবু তাদের নিয়ে গল্প কেন হয়? এই জন্যই হয়, এতো চেনা হওয়া সত্ত্বেও তাদের আচারব্যবহারের কয়েকটা দিক চিরকাল 'অচেনা' থেকে যায়। আপাতভাবে যুক্তিবদ্ধ জীবনে কিছু প্রবৃত্তি, কিছু দুর্বলতা জীবনের অঙ্কটিকে গরমিল করে দেয়। নারীপুরুষের পারস্স্পরিক আদানপ্রদানের ছন্দটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। বদলে যাওয়াটাই সত্য। কেন বদলাচ্ছে, সেটা গৌণ। আশাপূর্ণা দেবীর লেখায় আমরা এই টানাপড়েনের দীর্ঘ ইতিবৃত্ত দেখে থাকি। এই গল্পে প্রতিমা'র চরিত্রটি কেন্দ্রীয়। এই চরিত্রটির সঙ্গে বাকিদের সম্পর্করচনাটিই লেখকের উপজীব্য। তিনি সেটা করেছেন বিশ্বস্তভাবে। সেখানে তিনি সফল। তবে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির উজ্জ্বলতাটি কখনও একমাত্রিক লাগতে পারে। সংসারে কেউই দেবদূত নয়। সবাইকেই মাটির তৈরি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাকিদের স্বভাবের আলোছায়া নিয়ে অল্পবিস্তর উল্লেখ থাকলেও প্রতিমা'র জন্য শুধুই 'আলো'। শেষ পরিচ্ছেদে তিয়াসকে লেখা রিনোর চিঠিটিই যদি 'অঙ্গীকার' হয়, তবে মনে হয় তা নিয়ে আরেকবার ভাবা দরকার। ভবিষ্যতের অনিশ্চিত দোলাচলে নয়, এই মূহুর্তের কঠিন বাস্তবটিই অঙ্গীকারের ভিত্তিভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পেলে লেখকের উদ্দেশ্য অধিক সফল হতো। সমস্ত ঐহিক প্রতিকূলতা থেকে প্রিয় নারীকে বাঁচিয়ে রাখার যে সাধ পুরুষ সতত পোষণ করে, বাস্তবে তা সম্ভবপর হয়না অধিকাংশ সময়েই। কারণ পরিস্থিতিটিই সচরাচর বিপরীত হয়। নারীর কাছেই পুরুষ আশ্রয় খোঁজে। প্রকৃতির ইচ্ছেটাই সেরকম। কিছু শব্দ বাক্যগঠনের সঙ্গে হয়তো পুরো মেলেনি। তবে তা নগণ্য। বর্ণনায় ডিটেলসের কাজ খুব ভালো। উমাকে স্বাগত। --------------------------- বৃষ্টি লিখেছেন 'সময়-অসময়'। প্রেম ও বিপন্নতার গল্প। আশ্বাস ও নির্ভরতার মানচিত্র। এই গল্পের ভাষাশৈলিটি কাব্যিক। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন কবিতার ঊদ্ধৃতিও রয়েছে। রয়েছে কৈশোর প্রেমের গড়ে তোলা নানা মূহুর্ত। লেখকের তৎপর শ্রম ও যত্নের ছাপ রয়েছে পুরো লেখাতেই। তবে সংকটের আখ্যানটি প্রেডিক্টেবল। কারণ মূল চরিত্রগুলির যে বিকাশ লেখক দেখিয়েছেন সেখানে মানুষিক দ্বিধা, স্ববিরোধের কোনও মাত্রা নেই। একমাত্রিক প্রেমসম্পর্কে নিশ্চিন্ত আশ্বাস অবশ্যই থাকে, কিন্তু জীবন বোধ হয় আরেকটু জটিল। লেখক আশাবাদের যে বার্তাটি দিতে চেয়েছেন, সেখানে তিনি সফল। কিন্তু পাঠক হয়তো ঘটনাক্রমে আরো একটু মোচড় আশা করবে। যেকোনও প্রেম সম্পর্কই নিরঙ্কুশ হয়না। সংকোচ, সংশয়ের দোলাচল না থাকলে সম্পর্কের রক্তস্রোতে উষ্ণতার সঞ্চার হয়না। বৃষ্টি যখন এর পরের গল্পটি লিখবেন তখন অনিশ্চিতির মাত্রাটিকেও যদি বিবেচনার মধ্যে রাখেন, তবে খুশি হবো। দীর্ঘ লেখাটির জন্য তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই। -------------------------- আজ এতোটাই থাক.....

1098

10

অপন

বাংলা আধুনিক গান

শিমুল জামান আমার এখানে পাওয়া মেয়ে| শিমুল বাংলা দেশী তবে থাকে এদেশে|

3639

6

Somen dey

প্রিলিউড ইন্টারলিউডে লুকিয়ে থাকা সেই সব বিস্ময়ের নাম সলিল চৌধুরি

আমাদের সনাতন গানে তেমন ভাবে কোনো prelude বা interlude থাকত না । শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আলাপ দিয়ে শুরু করা আর আর গানের মাঝে গায়ক গায়িকার দম নেবার জন্যে কিছু ক্ষন একই রাগের চলন বাজিয়ে দিতেন , এরকমই রেয়াজ ছিল । অন্য গানে আলাপ নেই তবে গানের মাঝে ঐ গানের একটি কলি বাজিয়ে দেওয়ারই রীতি ছিল । এ দেশে সবাক সিনেমা আসার পর সিনেমায় গান দেওয়ার প্রচলন হল । সিনেমার পর্দায় নায়ক নায়িকাদের গানে লিপ দিতে দিতে কিছু সময় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল খানিকটা ব্যাতিক্রম আনার জন্যে । সেই সময়টুকু ভরিয়ে দেওয়ার জন্যে প্রয়োজন হল prelude , interlude এ কিছু মিউজিক পিস জুড়ে দেওয়ার । কিন্তু ক্রমশ সব আধুনিক গানেই prelude , interlude দেওয়া রীতি হয়ে দাঁড়ালো । যে সব কম্পোজাররা এই prelude , interlude কে শুধু filler হিসেবে না দেখে , গান কে সম্পুর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে যাবার বাহন বলে ভাবতেন তাদের মধ্যে অন্যতম সলিল চৌধুরি । তাঁর গানে prelude , interlude র ব্যাবহার রীতিমত গবেষনার বিষয় হতে পারে ।আমার সে এক্তিয়ার নেই । একজন সাধারণ শ্রোতা হিসেবে আমি আমার মত করে একটু আধটু বিস্ময়ের সন্ধান করতে পারি । বাঁশির সঙ্গে সলিল চৌধুরির সম্পর্ক প্রায় তার অক্ষর পরিচয়ের বয়স থেকে ।বালক সলিল আসামের চা বাগানের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াবার সময় হাতে থাকত একটা আড়বাঁশি । সে বাঁশি্র মায়া ছাড়তে পারেন নি সারা জীবনে । কিন্তু একেবারে ছোট বয়স থেকে প্রচুর Western classical শোনার সুযোগ ঘটে ছিল ,তার পিতৃদেবের এক সাহেবের কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রচুর রেকর্ড সমেত একটি গ্রামাফোন পেয়ে যাওয়ার সুবাদে । সব জিনিয়াসদেরই বাল্যকালের দেখা আর শোনার মধ্যে , তাদের ভবিষ্যতে মহীরুহ হবার বীজ লুকিয়ে থাকে । সলিল চৌধুরিরও তাই হেয়েছে । সারা জীবন তাকে হন্ট করেছে সরল সহজ আড়বাঁশির সুর আর Western classical এ অনেকরকমের যন্ত্রসঙ্গীতের জটিল সিম্ফনি । তার গানের ভাঁজে ভাঁজে এই দুয়ের মিলে যাওয়ার অনেক নমুনা লুকিয়ে আছে । আমরা তাঁর গান শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যাই যে এই সব অনবদ্য prelude , interlude গুলো কে লক্ষ করিনা । দু একটা উদাহরন দিলে হয়ত বোঝা যাবে prelude , interlude কি কান্ডটা করতে পারে । মনে পড়ছে লতাজীর একটি গান – ‘যদি বারণ কর তবে গাবো না গাবো না ’ গানটি সবাই অনেকবার শুনেছেন । আর একবার শুনুন এ গানে বাঁশির ব্যাবহার শোনার জন্যে । আড়বাঁশি থেকে ট্রেবল ফ্লুট , সোপার্নো ফ্লুট , ইংলিশ ফ্লুট কত রকমের বাঁশি যে ছিল এ গানের ইন্টারলুড বাজনায় ।কিন্তু শেষ পর্যন্ত আড় বাঁশি বাজি মাত করেছে , গানটির ফাঁকে ফাঁকে লতার গলায় ‘কুহু কুহু’ গাওয়ার সঙ্গে কি ভাবে বাঁশির কুহু তান মিশে যাচ্ছে , শুনে দেখুন । https://www.youtube.com/watch?v=eUgz1P-pUjc এ রকম আরো একটি উদাহরণ, সবিতা চৌধুরির গাওয়া – ‘ও আমার পদ্ম পাতার দিন ঝরে গেল / টলমল টলমল করে মুকুতার মত ছদ্মবেশে ছিল’ যেমন অনবদ্য কম্পোজিশন তেমনি অসাধারণ গাওয়া । একেই বলে সার্থক যুগলবন্দী । কিন্তু গান নয় আমরা আজ শুনব বাজনা । গান শুরু হচ্ছে আড়বাঁশির ইন্টালিউড দিয়ে । কিন্তু প্রিলিউডে চেলো ট্রাম্ফেটের মত পাশ্চাত্য বাজনা চুটিয়ে বাজান হচ্ছে , কিন্তু গানটিকে বার বার খেই ধরিয়ে দিচ্ছে সেই বাঁশি । যদিও গানের সুরে আপাত-চটুলতা আছে কিন্তু গানের কথায় আছে লুকানো বিষন্নতা , সেই ফাঁকটুকু কে ভরিয়ে দিচ্ছে বাঁশি । https://www.youtube.com/watch?v=ZbQ8bcKU8Oc পাশ্চাত্য ধ্রুপদ সঙ্গীতে খুব প্রচলিত obbligato র ব্যাবহার ।বাখ-বেটভেন রা আকছার এর ব্যাবহার করেছে তাদের সিম্ফনিতে । obbligato সম্মন্ধে খুব অল্প কথায় বলতে গেলে বলতে হয় মূল সুরের একটা সমান্তরাল অন্য সুর সৃষ্টি করা । এবং point এবং counter point বাজনা কে অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দেওয়া ।মানে কমপোজার নিজেই একটা সঙ্কট তৈরি করবেন আবার সেই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসবেন তাঁর সৃষ্টি দিয়ে । এ দেশে সলিল চৌধুরিই প্রথম এনেছেন prelude , interlude এ obbligato র ব্যাবহার । একটা গানের ইন্টারলিউড শুনলে হয়ত বোঝা যাবে অরুন্ধুতির হোমচৌধুরির গাওয়া গান – চঞ্চল সোনালি পাখনায় উড়ে গেল সেই সব দিন -  ।গানে মন না দিয়ে একটু কান পেতে শুনুন ইন্টারলিউডের বাজনায় । গানের কথায় প্রায় একই রকম ভাবনা । বিষন্নতাকে সুরে বাঁধা । কিন্তু চলমান জীবনের ছন্দ যেন ধরা পড়ছে obbligato র ব্যাবহারে । https://www.youtube.com/watch?v=qHk0cp7wfKY আর একটা গান । হাজার বার শোনা  । তবু প্রতিবার শোনায় যেন নতুন কিছু আবিস্কার করা যায় । একবার গান থেকে কান সরিয়ে ইন্টারলিউডের কি ঘটছে বুঝবার চেষ্টা করা যাক । অন্তরার আগে যখন স্যাক্সোফোন বেজে উঠছে , তখন অন্য একটা সুর যেন তাকে বাধা দেবার চেষ্টা করছে , সমুদ্রের ঢেউয়ের উলটো দিকে যেমন একটা চোরা স্রোত তাকে আটকাতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না শেষ পর্যন্ত  । আর বাঁশি তো ঠিক তার আসল কাজ টি করে যাচ্ছে । https://www.youtube.com/watch?v=SpynPBaOiJo পাশ্চাত্য সঙ্গীতে আর এক ধরনের orchestration আছে যাকে বলে Chamber music . । অন্য concert এর সঙ্গে এর তফাৎ এখানে প্রতিটি বাদ্য যন্ত্রের আলাদা আলাদা ভাবে ভুমিকা আছে । তারা সব মিলে একটা আওয়াজ সৃষ্টি করে পালা করে আলাদা আলাদা ভাবে বেজে এক অসাধারন ঐক্যতান সৃষ্টিকরে । এমন একটি উদাহরণ পাওয়া যাবে ‘এমন সঘন বরষায় তুমি কেন এলে না’ গানটিতে ।এও এক যুগলবন্দী , তবে বাপ-বেটির । ভায়োলিন , চেলো , বাঁশির সঙ্গে কি ভাবে পাল্লা দিচ্ছে সেতার এবং তার পরে আমাদের ঘরের তবলা এসে গানটির হাত ধরে ফেলছে । https://www.youtube.com/watch?v=dMwzhS_Qwhw সলিল চৌধুরি এমন বহু বিস্ময়ের মণিমুক্ত ছড়িয়ে রেখেছেন তাঁর সৃষ্টির আড়ালে আবডালে । তাকে আবিস্কার করতে করতে দিব্যি একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায় । শারীরিক ভাবে বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত নব্বই । তিনি দীর্ঘজীবি হন ।

1017

8

প্রবুদ্ধ

কবিতার দেশে ‚ ছবির দেশে

ফিয়ারফুল সিমেট্রী| সিমেট্রীর খোঁজেই তো একজন শিল্পী সারাজীবন ঘুরে মরে| তাজমহলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় সামনে একটা জিওমেট্রীর খাতা খোলা আছে| মূল সৌধটা তো ছেড়েই দিলাম‚ চার দিকের চারটে মিনার দেখে মনে হয় একটার সামনে আয়না রেখে তাতেই উল্টোদিকের মিনারটাকে দেখছি| সিকান্দ্রার গ্যালারীতে সেই পর পর সাজানো আর্চগুলো‚ একটার উপর একটাকে বসিয়ে দিলে একটাই আর্চ হয়ে যাবে‚ আক্ষরিক অর্থেই এক চুলের ফারাকও নেই| যামিনী রায়ের রাধাকৃষ্ণ যাঁরা দেখেছেন‚ একটা জিনিস খেয়াল করবেন‚ মিরর ইমেজের ব্যবহার ত্রিমাত্রিক আর্কিটেকচারে জনপ্রিয় হলেও কিন্তু দ্বিমাত্রিক ছবিতে বিশেষ ব্যবহৃত হয় না‚ বোধ হয় একটা প্লেনে একই অবজেক্ট দুই দিক থেকে দেখতে একঘেয়ে লাগে| কিন্তু রাধাকৃষ্ণে সেই একঘেয়েমি নেই‚ কারণটা হলো রঙের বৈচিত্র| একই সিমেট্রী দেখি ঘজলে| প্রতি দুই লাইন বা মতলা-র শেষে একটা শব্দ ঘুরেফিরে আসবে‚ তাকে বলে রদীফ| এই রদীফের ঠিক আগের শব্দটাকে বলে কাফিয়া‚ প্রতি দুই লাইনের কাফিয়াগুলোতে থাকবে ছন্দমিল| ও আকে খাব মেঁ তসকীন-এ-ইজতিরাব তো দে ওয়ালে মুঝে তপিশ-এ-দিল‚ মজাল-এ-খাব তো দে করে হ্যাঁয় কত্ল লগাবত মেঁ তেরা রো দেনা তেরী তরহ কোঈ তেঘ-এ-নিগহ কো আব তো দে.... দেখুন‚ তো দে এই দুটো শব্দবন্ধ হলো রদীফ‚ বারে বারে আসবে| আর মজাল-এ-খাব‚ আব এই শব্দগুলো হলো কাফিয়া‚ যাতে ছন্দমিল থাকবে| এই রদীফ আর কাফিয়ার খেলায় ঘজলে যে সিমেট্রী আসে সেটাই ঘজলের আসল মজা| তো এই সিমেট্রীকে উইলিয়াম ব্লেক কেন ফিয়ারফুল বলেছেন সেটা দেখা যাক| ব্লেকের কবিতা টাইগার (The Tyger) : Tyger Tyger, burning bright, In the forests of the night; What immortal hand or eye, Could frame thy fearful symmetry? In what distant deeps or skies. Burnt the fire of thine eyes? On what wings dare he aspire? What the hand, dare seize the fire? And what shoulder, & what art, Could twist the sinews of thy heart? And when thy heart began to beat, What dread hand? & what dread feet? What the hammer? what the chain, In what furnace was thy brain? What the anvil? what dread grasp, Dare its deadly terrors clasp! When the stars threw down their spears And water'd heaven with their tears: Did he smile his work to see? Did he who made the Lamb make thee? Tyger Tyger burning bright, In the forests of the night: What immortal hand or eye, Dare frame thy fearful symmetry? ব্লেক অনেকটা জেকিল-হাইড চরিত্র‚ ওঁর সৃষ্টিগুলো প্রথমবার দেখলে মনে হবে কোনো বিস্মিত বালকের দৃষ্টি দিয়ে উনি দুনিয়াটাকে দেখছেন‚ একটা রহস্য‚ একটা মিথের কুয়াশা ঘিরে আছে ওঁর ছবি বা কবিতায়| কিন্তু আর একটু গভীরে তিনি একজন র‌্যাডিক্যাল দার্শনিক যাঁকে বুঝতে গেলে মাথা ঘামাতে হয়| জেরুজালেমের মতই টাইগারেও অসংখ্য প্রশ্ন তুলেছেন| কে তোমায় (বাঘকে) তৈরী করলো? সে কি একই লোক যে ভেড়া তৈরী করেছে? (ভেড়া বলতে এখানে Lamb of God‚ সেই প্রবাদটা মনে পড়ে যায়‚ The hands that rocked the cradle are the hands that rule the world)| কোন শিল্প পারে তোমার পেশীর কম্পনকে ধরতে? কোন পাথরে তৈরী তোমার শরীর‚ কোন কামারের চুল্লীতে তৈরী হয়েছে তোমার মস্তিষ্ক? সবচেয়ে বড়ো দুটো প্রশ্ন‚ তোমাকে বানানোর সাহস (দু:সাহস) কার হলো? আর‚ তোমাকে দেখে কি সেই শিল্পী তৃপ্তির হাসি হেসেছিলো? জেরুজালেমের মতই ছটফটানি‚ প্রশ্নের পর প্রশ্ন| বাইবেলের প্রসঙ্গ তো এসেছেই অবধারিত (জেরুজালেমের জেসাস এখানেও ল্যাম্ব অফ গড)| বাইবেলের বুক অফ জোব-এ জোব ঈশ্বরকে নানা প্রশ্ন করে‚ কিন্তু উত্তর পায় না‚ শুধু এটা বোঝে যে ঈশ্বরকে বোঝা মানুষের সাধ্য নয়‚ ঈশ্বর প্রসঙ্গে কে কি কেন এসব প্রশ্ন উত্তরহীন| কিন্তু ঈশ্বরের অসীমত্বের কাছে এই সহজ সমর্পণের বাইরে ব্লেকের এক নাস্তিক দর্শন ছিলো| ওঁর মিথোলোজিক্যাল লেখায় একজন প্যারালাল ঈশ্বর আছেন‚ তিনি এক স্বর্গচ্যুত eternal prophet‚ নাম Los. এই লোস পৃথিবীতে থাকেন‚ একজন কামারের মতো হাতুড়ি আর চুল্লী দিয়ে সৃষ্টি করেন প্রাণ‚ কামারের হাপর ফুসফুসের মতই ওঠানামা করে| এবার ঐ চতুর্থ প্যারাটা আবার পড়ুন| ব্লেক ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ করছেন‚ তুমি নও‚ প্রাণের সৃষ্টি লোসের হাতে‚ তোমার স্বর্গে নয়‚ আমাদের পৃথিবীতে| ব্লেক আরো বলছেন‚ সৃষ্টিকর্তার দায় শুধু মনের খেয়ালে সৃষ্টি করেই শেষ হয়না‚ সে সৃষ্টিকে সহ্য করার মতো দমও থাকা চাই স্রষ্টার| এখানে ব্লেক রোমান্টিক পিরিয়ডের প্রবল ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনকে সতর্ক করছেন‚ জেরুজালেম-এর Satanic mills-এর মতো| আর তার চেয়েও বড়ো ভবিষ্যতবাণী করে গেলেন‚ শেলীর ফ্রাংকেনস্টাইনের দৈত্য থেকে আজকের IS‚ সব সৃষ্টিই তো স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে| সৃষ্টির সুন্দরতার (সিমেট্রী) পেছনে এই ভয়‚ ফিয়ারটাই বাস্তব সত্য| এটাই ব্লেকের ফিয়ারফুল সিমেট্রী| তাই সিকান্দ্রার ঐ পরপর আর্চগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে একবার বুক কাঁপবেই‚ এই সিমেট্রী আমায় গ্রাস করবে না তো? আজকে মানুষও তো সেই একই ছকে বাঁধা‚ সিমেট্রিক্যাল এক ব্ল্যাক হোলের সামনে দাঁড়িয়ে‚ যে ব্ল্যাক হোল তার নিজেরই সৃষ্টি| (চলবে)

1001

17

Somen dey

অন্য-গান এর সন্ধানে

অন্য-গান এর সন্ধানে ************* ‘সরাসরি আমি জানতে চেয়েছি দু মুঠো অন্ন কিনা কেও যদি ক্রোধে চীৎকার করে মানবধিকার কিনা কান পেতে কোনো কান্নার ধ্বনি তুমি কি শুনতে পাও মৌনতা কোনো জবাব না বন্ধু তুমি উত্তর দাও ...... ।’ --- এককালে বাংলা গান সম্মন্ধে প্রবাদ ছিল ‘কানু বিনা গীত নাই’ । আসলে তখন সমাজে অনাত্নীয় নরনারীর মধ্যে প্রেম হওয়াটা চালুই ছিল না । কারণ মেয়েদেরতো বিয়েই হয়ে যেত বয়স বারো তেরো ছুঁলেই । তাই জীবনে দাম্পত্য প্রেমের বাইরে আর কোনো প্রেম ছিল না, কিন্তু প্রেমের ক্ষিদে তো ছিল  ।তাই বঙ্কিমচন্দ্র অবধি গল্প লিখিয়েদের প্রেমের কথা বলতে ইতিহাসের কাল অথবা পরকীয়া আশ্রয় করতে হয়েছে । আর গান লিখিয়েরা গানের মধ্যে দিয়ে সেই প্রেমের যাবতীয় কথা বলা হত রাধা কৃষ্ণের নাম দিয়ে । তার পর মোটামুটি বিশ-তিরিশের দশকে যখন বাঙালি মেয়েরাও অবিবাহিত অবস্থায় কালেজে যেতে শুরু করল , তখনি বাঙ্গালির জীবনে যুবক যুবতীদের মধ্যে প্রেমের অঙ্কুরোদগম ঘটলো । আর তখনই কানু বিনেও প্রেমের গান লেখা হতে লাগলো । এর আগে অষ্টাদশ শতকেই রামনিধি গুপ্ত অবশ্য ‘কানু বিনে’ ব্যাক্তি প্রেমের গান লিখেছিলেন । কিন্তু তার তার জন্যে তাকে নাকি প্রচুর হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয়ে ছিল । বাংলা ‘আধুনিক গান’ এর জন্ম এবং প্রসার আসলে এ দেশে রেকর্ড ব্যাবস্থা চালু হবার পরেই ।আসলে ‘আধুনিক’ তকমাটি বাংলা গানের হটাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন  । রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে লিখিত একটি চিঠিতে লিখেছিলেন ‘আমার আধুনিক গানে রাগ-তালের উল্লেখ নেই বলে আফসোস করেছিস’ ।কিন্তু ঐ একবারই তার পর আর কোনো লেখায় তিনি আধুনিক গান শব্দবন্ধটি ব্যাবহার করেন নি । তাই এই আধুনিক গান নামটি ঠিক এখান থেকে নেওয়া হয়নি নয় । ‘আধুনিক গান’ তকমাটি খুব সম্ভবত ব্যবসার সুবিধার্থে রেকর্ড কোম্পানিদেরই দেওয়া । আধুনিক বাংলা গানের কথা কি হতে চাইবে , কি বলতে চাইবে ,কি ধরতে চাইবে , কি ছুঁতে চাইবে, কি গ্রহন করতে চাইবে , কি বর্জন করতে চাইবে এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে অনেকবার । মীমাংসা হয়নি । তাই গানের বিষয় কতটা আধুনিক হলে সে গান আধুনিক গান বলা যাবে তা নিয়ে কোথাও কোনো ব্যাখ্যা নেই । তেমনি কতটা রাগের প্রভাব থাকলে সে গান কে আধুনিক না বলে রাগাশ্রয়ী বলা হবে , বা গানের বিষয় কতটা গ্রামীন হলে তাকে লোকগীতি বলা যাবে এ রকম কোনো ব্যাখ্যাও কোথাও পাওয়া যাবে না । ইদানীং খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠা গান ‘তু লাল পাহাড়ীর দ্যাশে যা , রাঙ্গা মাটির দ্যাশে যা ’ গানটিকে সবাই লোকগান বলে উল্লেখ করে থাকেন । কিন্তু এটি বছর চল্লিশ আগে একজন নাগরিক কবি অরুণ চক্রবর্তীর রচনা । সেই হিসেবে এটিকে আধুনিক গান বলাই উচিত । তেমনি অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গান শচীনদেব বর্মনের গাওয়া ‘আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে’ এই গানের ভাষা সে সময়ের তূলনায় যথেষ্ট আধুনিক হওয়া সত্বেও এই গান কে অনেকেই রাগাশ্রয়ী গানে তকমা দেন । আপাতত শ্রেণী বিভাগের চুল চেরা বিশ্লেশনে না গিয়ে আমরা আধুনিক বাংলা গানের প্রচলিত ধারণাটিকে আশ্রয় করি ।এবং আপাতত আধুনিক গানের সুরের কথা ভুলে গানের কথা নিয়ে দু কথা বলার চেষ্টা করি । একটা বিশাল অংশের বাংলা গানের শ্রোতাদের এমন একটা ধারণা প্রায় বদ্ধমূল হয়ে আছে যে সেই স্বর্ণযুগের গানে গানের ভাষা যেমন সম্বৃদ্ধ ছিল এখনকার গানের ভাষা সেই তূলনায় বড়ই দুর্বল । সত্যিই কি তাই ? গ্রামাফোন ডিস্কে আধুনিক গানের রেকর্ড যখন থেকে শুরু হল সেই বিশের দশক থেকে আশির দশক অবধি এই বিরাট সময় টায় কয়েক হাজার বাংলা গান লেখা হয়েছে । যাঁরা গান লিখেছেন তাঁরা অনেকেই খুব উচ্চস্তরের গীতিকাব্য রচনা করেছেন ।কিন্তু সবাই নয় ।অনেক গানেরই কথা ঘুরপাক খেয়েছে একটা চেনা বৃত্তের চারিদিকে । কিন্তু খুব ভালো সুর তাকে উৎরে দিয়েছে । যুদ্ধ ,মন্বন্তর ,দেশভাগ থেকে নকশাল আন্দোলনের মত আলোড়ন তোলা ঘটনা , যা বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিটি ধারায় গভীর ভাবে ছাপ ফেলেছিল , বাংলা গান কিন্তু এ সবের থেকে উদাসীন থেকেছে অদ্ভুত ভাবে । প্রায় সব গীতিকাররাই ব্যাক্তি প্রেমের আকূলতার বাইরে গিয়ে কোনো কথা বলবার চেষ্টা করেননি ।তাই বাংলায় ‘অন্যগান’ এর সংখ্যা খুব অল্প । পিট সিগার বলেছিলেন – Right song at the right time can change history । যেমন করে David Hasselhoff এর Looking for freedom গান বার্লিনের প্রাচীর ভাঙতে উৎসাহিত করেছিল হাজার হাজার মানুষকে , যেমন করে Stevie Wonder এর গান Happy Birthday , মার্টিন লুথার কিং এর জন্মদিন কে জাতীয় ছুটি ঘোষনা করার জন্যে আমেরিকায় একটি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল , যেমন করে John Lennon এর গান Imagine there’s no heaven সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে শান্তির প্রতি সমর্থন জাগিয়ে তুলেছিল ,যেমন করে Louis Armstrong এর What a Wonderful world সারা পৃথিবীর মানুষ কে প্রকৃতি প্রেমিক হতে উৎসাহী করেছে , যেমন করে Bob Dylan এর ‘Any day now, any day now I shall be released’ সিভিল রাইটস আন্দোলন কে উজ্জীবিত করেছিল সে রকম ভাবে আমাদের সামাজিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবার মত আমাদের কোনো গান নেই । কিন্তু আমরা আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে বাংলা আধুনিক গানের উৎসমুখে আমরা পেয়েছি দুজন বিরাট মাপের সঙ্গীত স্রষ্টা কে, যাঁরা গানের ভাষা এবং সুর এই দুই জগতেই অসীম ধন রেখে গেছেন ।বলা বাহুল্য তাঁদের নাম রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল । আজ অবধি আমাদের আধুনিক গানের ভাষা এই দুজনের দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত । কিন্তু তার পর তো সমাজ বদলেছে অনেক ভাবে । গানের ভাষার কি কোনো দায় নেই বদলে যাবার ? যেহেতু রেকর্ডের গানের সঙ্গে একটা বানিজ্যের সম্পর্ক আছে , তাই রেকর্ডে গাওয়া আধুনিক গানের জন্ম লগ্ন থেকেই গানের ভাষার উপর কোথাও একটা বানিজ্যিক নিয়ন্ত্রন পরোক্ষ ভাবে কাজ করতে লাগল ।আধুনিক কবিতার যেহেতু production cost নেই বললেই চলে ,এবং তাকে বিপনন করতে হয় না তেমন ভাবে ,তার ওপর কোনো বানিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ কেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল না। কবিতা একেবারে স্বাধীন ভাবেই চলতে লাগলো কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ।আধুনিক বাংলা গান কিন্তু সে ছাড়পত্র পেলো না ।তাকে পণ্য হয়ে থাকতে হল। সেই থেকে আধুনিক কবিতা আর আধুনিক গানের - দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেছে বেঁকে ।আর যত দিন গেছে দুটি পথের দুরত্ব বাড়তে বাড়তেই থেকেছে  । রবীন্দ্র-নজরুল যুগ শেষ হবার পরে , শুধু প্রেমেন্দ্র মিত্র যেহেতু সিনেমা জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন , তিনি একজন প্রথম সারির কবি হওয়া সত্বেও কিছু আধুনিক গান ও লিখেছিলেন । অন্য আধুনিক কবিরা সে পথ মাড়ান নি বললেই চলে । যেন যাঁরা গান লেখেন তাঁরা গীতিকার , কবি নন , এবং যাঁরা আধুনিক কবিতা লেখেন তাঁরা কবি গীতিকার হতে পারে না , এ রকমই একটা অঘোষিত ভাগাভাগি হয়ে গেল । এর ফলে যা ঘটলো , তার একটা দিক হচ্ছে আধুনিক গানে প্রেমই হয়ে উঠল নিরাপদ আশ্রয় ।সমাজ যতই বদলাক প্রেমের আবেগ বিশেষ বদলায় না । তাই প্রেমের গান বিষয় হিসেবে চিরকালীন এবং প্রেম শুধু নিরাপদই নয় , নিরপেক্ষ বিষয়ও বটে ।কারোর দিকে বা কিছুর দিকে আঙ্গুল তোলা নেই ।তর্ক ঝগড়া রাগারাগির সম্ভাবনা নেই । গান মস্তিস্কের বিষয় নয় শুধু হৃদয়ের বিষয় এ রকম একটা ভুল ধারণা কি করে যেন আম জনতার মনের মধ্যে বসে গেল । তাই সেই প্রণব রায়-অজয় ভট্টাচার্য-সুবোধ পুরোকায়স্থ এর যুগ থেকে শ্যমল গুপ্ত-গৌরীপ্রসন্ন- পুলক বন্দোপাধ্যের যুগ অবধি গানের কথায়, কয়েকটি উজ্বল ব্যাতিক্রম ছাড়া , প্রেমের গন্ডীর বাইরে গিয়ে কিছু অন্বেষণের কথা তেমন করে ভাবেন নি ।সুরকারদের মধ্যেও comfort zone হয়ে উঠল প্রেম । একদা আই পিটিএর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারনে জোতিরীন্দ্র মৈত্র , পরেশ ধর , হেমাঙ্গ বিশ্বাস , সলিল চৌধুরি এবং তার পরে অভিজিৎ , প্রবীর মজুমদার , অনল চট্টোপাধায়রা অন্য গানের ধারা কে মাঝে মাঝে সঞ্জীবিত করেছেন । কিন্তু বাংলা আধুনিক গান একটু মাথা নেড়ে চেড়ে আবার ফিরে গেছে নিরাপদ প্রেমের চেনা আশ্রয়ে , বকুল বিছানো পথের ছায়াচ্ছন্ন রোমান্টিকতায় ।কিন্তু গৌরীপ্রসন্ন-পুলক বন্দোপাধ্যায়–মুকুল দত্ত দের পরে একটা সময় গানের কথা ক্রমশ দুর্বলতর হতে থাকল ।নতুন করে তেমন গুণী গীতিকারদের দেখা পাওয়া গেল না । আর সেই সব মেলোডির যাদুকররা একে একে চলে যাওয়ায় , দুর্বল কথাকে সুরের জোরে উৎরে দেওয়াও যাচ্ছিল না আর । এর ফলে বাংলা গানের জগতে একটা সার্বিক দৈন্যতা নেমে এল । ঠিক সেই সময়টায় সুমন এলেন এবং বাংলা আধুনিক গানের জগত অন্য-গানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো ।গানের বিষয় আবার অনেক দিনের পর প্রেমের গন্ডি ছাড়িয়ে অনেক দিকে ছড়িয়ে গেল । আধুনিক গান সত্যিই আধুনিকতার হাত ধরল ।কবিতা এবং গান আবার কাছাকাছি এল । নচিকেতা-অঞ্জন দত্ত রাও লিখলেন কিছু অন্য-গান । এই অধ্যায় নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে তাই এই নিবন্ধে এই বিষয়টাকে সরিয়ে রাখছি । কিন্তু তার পর কি হল ? বাংলা গানের বিষয় কি তার অভিমুখ বদলাল নাকি ফিরে গেল তার চিরচেনা আমি-তুমি-চাঁদ-তারা-ফুলের জগতে । এর মধ্যে বাংলা-ব্যান্ড এর জন্ম হল । তাদের সুযোগ ছিল গানের কথায় নতুন কিছু বলার চেষ্টা করার । কিন্তু ‘চন্দ্রবিন্দু’ ছাড়া অন্য দল গুলি তাদের গানের মিউজিক্যাল এরঞ্জমেন্ট বদলানো নিয়ে যতটা ভাবনা চিন্তা করল , গানের কথা নিয়ে তেমন নতুন কিছু ভাবনা দেখা গেল না । *** সুমন ভবিষ্যত গানের কাছে আবেদন রেখেছিলেন যুগান্তরের খবরটা যেন গানই বয়ে আনে  । একুশ শতক এসেছে । যুগান্তরের সন্ধান গান এখনো দিতে পারেনি । তবু কোথাও কিছু বদলাচ্ছে হয়ত ।এই আকালেও কেও গান কে অস্ত্র করতে চাইছে । যে কটি পংত্তি দিয়ে এই লেখা শুরু করেছি তা একটি গানের অংশ বিশেষ । গীতিকারের নাম সৈকত কুন্ডু । সৈকত এই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী গীতিকার বলে আমার মনে হয় । ব্যাক্তি প্রেমের গন্ডি ছাড়িয়ে সে যাবার চেষ্টা করছে অন্য গানের ভোরে । সৈকতের লেখা আর একটি সাম্প্রতিক সময়ের আধুনিক গান আমাকে চমকে দিয়েছে । তার কথা গুলি এই রকম । ‘সিঁদুর-কৌটো উলটে গেছে নীল আকাশের গায় মেঘ ছুঁয়ে মন রঙের চেয়ে রঙ্গীন হতে চায় কোন বধু-সাজে গোধূলি-তরণী উঠলে হটাৎ হেসে... একটা মেয়ে আকাশ দেখছে গণধর্ষন শেষে । ভাঙ্গা চাঁদ পড়ে আছে বহুদুরে , চুড়িগুলো আশেপাশে ছিটে ফোটা লাল রক্তের দাগ লাজুক সবুজ ঘাসে ... ছিঁড়ে যাওয়া সাড়ি উড়ছিল তার একটি প্রান্তে হাওয়া এখনও কাঁপছে , বজায় রাখছে দু চোখে শুকিয়ে যাওয়া ; চিত হয়ে স্থির পাথরের মত , সব পেয়েছির দেশে একটি মেয়ে আকাশ দেখছে গণধর্ষন শেষে ।...’ এই দুটি গান যে এলবামে আছে সেটির নাম ‘কিছু রোদ্দুর পড়ে রইল’ । কণ্ঠ দিয়েছেন তপোলব্ধা ভটাচার্য । সুর করেছেন রত্নদীপ আর সৌগত । এরা সবাই কৃষ্ণনগরের ছেলেমেয়ে । কৃষ্ণনগর শহরের বয়স কোলকাতার চেয়ে বেশি । তাই ভাবনায় হয়ত কোলকাতার চেয়ে এগিয়ে থাকে । আর একটি সৈকত কুন্ডুর লেখা গান শুভমিতার গাওয়া ,যেন সুমনের ছলাৎ ছল নদীর জলের গল্প বলা যেখানে শেষ হয়েছে , তার রেশ ধরে উঠে আসে - শোনো সুজন বন্ধু শোনো শোনো নদীর হাওয়া শোনো গাছের পাতায় পাতায় রোদের আসা যাওয়া শোনো ঘর ভেঙ্গে যে দাঁড়ায় এসে একলা নদীর ধারে তার দুচোখে তোমার দু চোখ ছলকে উঠতে পারে চলকে ওঠে বুকের কথা ঢেউয়ের ফনা ছুঁয়ে কারণ আমি সেই নদীটার জলের ওপর শুয়ে রোজ ধুয়ে যায় জীবন আমার পার ভাঙ্গে দুই ধারে ছলাৎ ছলাৎ গল্প নদীর কান্না হতেও পারে ... সৈকতের লেখা শ্রীকান্ত আচার্যর গাওয়া একটি গান ইতি মধ্যেই জনপ্রিয় হয়েছে । সে গানের ভাষায় এক আশ্চর্য টান আছে সোঁদা মাটির ।এ গান শুনলে খুব নিরাসক্ত থাকা যায় না , এক লাইন শুনলে পরের লাইনটার জন্যে কান পাততে ইচ্ছে করে । এই নড়বড়ে সময়ে যদি একটা গান সেটা পারে তাহলে সেটাই আর কম কি ! ‘তুমি ঠিক যেমন আছো তার থেকে ঠিক দুই পা দূরে আমাদের ছোট্টো নদী বাঁকছে মেঠো বাঁশীর সুরে, গেঁয়ো পথ গাইছে বাউল বট ঝুরিটার দোলনা ফাঁকা, ছায়া রোদ শিরায় শিরায় মৌরি ফুলের গন্ধ মাখা, যা ছিল তেমনি আছে প্রশ্ন তুমি যাচ্ছো কিনা আমি সেই নদীর বাতাস আমার কোনো নাম দিয়ো না’ ****

1124

4

অপন

ভারতীয় বাজনা

সরোদ আলি আখবর খান

1101

7

দীপঙ্কর বসু

রাগরাগিনীর পরিবেশন কাল ও তার কিছু রহস্য

একটি দিনের ২৪ ঘন্টায় প্রকৃতির রূপ এর বৈচিত্র্য ,আলোর ঔজ্জ্বল্যের তারতম্য সবই যে মানব মনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে বোধ হয় কোন সংশয়ের অবকাশ নেই, যদিও তার সঙ্গে সঙ্গীতের কোন সরাসরি সম্পর্ক খুঁজতে যাওয়াটা রসিক জনোচিত হবেনা ,কেননা সঙ্গীত জিনিষটাই একটা Abstract ধারণা ,যার সঙ্গে বস্তুজগতের সম্পর্কটা নিছক রসের সম্পর্ক । প্রশ্ন উঠতে পারে রস জিনিষটা কি ? শাস্ত্র বলে,রস হল আস্বাদন মাত্র । প্রসঙ্গত একটি রবীন্দ্রগানের কথা মনে পড়ে – “ ওগো আমার চির অচেনা পরদেশী , ক্ষণতরে এসেছিলে নির্জন নিকুঞ্জ হতে কিসের আহ্বানে ।। যে কথা বলেছিলে ,ভাষা বুঝি নাই তার , আভাষ তারি হৃদয়ে বাজিছে সদা যেন কাহার বাঁশির মন মোহন সুরে …” ফিরে আসি আবার পুরণো কথায় । ভোরের আবহ যখন তার অন্তরের বার্তা বয়ে আনে মানুষের অন্তরে-তার আবেগকে উদ্দীপ্ত করে তোলে , মানুষের অন্তরে আনন্দরসের সঞ্চার ঘটে , সেই উদ্দীপ্ত আবেগজনিত বিদেহী আনন্দের প্রকাশমাধ্যম হিসেবে মানুষ তখনই সঙ্গীতের হাওয়ামহল গড়ে তোলে। কাজেই ভৈরব রাগে ভোরবেলাকার চিত্রের প্রতিলিপি খুঁজতে চাওয়া বা পুরবীতে দিনান্তের চিত্ররূপ দেখতে চাওয়া বৃথা । বিশ্বপ্রকৃতির কোন অজানা নিকুঞ্জ থেকে ,কোন অচেনা পরদেশী কি বার্তা যে রেখে যায় তা বুঝি বা নাই বুঝি ,সেই বার্তার আভাষটুকু পেয়েই মানবহৃদয় তার জবাব দেয় সুরের বিচিত্র আঁকিবুঁকি কেটে সঙ্গীতের ভাষায় । “ তোমার সুরেরই প্রতিধবণি তোমারে দিই ফিরায়ে…” এখানেই মানুষ বিশ্বস্রষ্টার সমকক্ষ । যুগযুগান্তর ধরে মানুষের এই সৃষ্টি রহস্যের দিকে শ্রদ্ধাবনত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি কি অসাধারণ কল্পনাশক্তি ও কলানৈপুন্যের সংমিশ্রনে গড়ে উঠেছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাঠামোটি । দিন ও রাত মিলিয়ে চব্বিশ ঘন্টার কালসীমায় আসে দুটি সন্ধিক্ষণ । প্রথমটি আসে ঊষালগ্নে ,যখন রাতের আঁধার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে দিনের আলোর প্রকাশ ঘটে ,এবং অপরটি দেখা দেয় সন্ধ্যা হবার মুখে ,যখন দিনের আলো স্তিমিত হতে হতে এক সময়ে অন্ধকারের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় । এই দুটি বিশেষ সময়ে পরিবেশন যোগ্য রাগগুলি,যা সন্ধিপ্রকাশ রাগ নামে পরিচিত - ব্যবহৃত স্বরসমষ্টির দিকে সতর্ক দৃষ্টি দিলে কয়েকটি বিশেষ রাগলক্ষণ চোখে পড়বে। যথা উভয় শ্রেণীর সন্ধিপ্রকাশ রাগে ঋষভ (ঋ)ও ধৈবত(দ) স্বর দুটি কোমল , এবং একই সঙ্গে গান্ধার(গ) এবং নিষাদ(ন) স্বরগুলি শুদ্ধ । কেবল প্রাতকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগে মধ্যম (ম)স্বরটি শুদ্ধ এবং সান্ধ্যকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগে মধ্যমের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় –অর্থাৎ সান্ধ্যকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগে তীব্র মধ্যম (হ্ম) ব্যবহার করা হয় । বিষয়টি ভালভাবে বোঝার জন্য একটি তালিকা পেশ করা যাক – তালিকায় কিছু পরিচীত রাগের স্বরসমষ্টির দিকে নজর দিলে সন্ধিপ্রকাশ রাগের যে লক্ষনগুলির উল্লেখ করলাম তার একটি রূপরেখা পাওয়া যাবে নিচের তালিকায় দেওয়া কিছু পরিচীত রাগের স্বরসমষ্টির দিকে নজর দিলে । হিন্দুস্থানী পদ্ধতিতে স্বরগুলিকে যে ভাবে লেখা হয় কম্পিউটারে ঠিক সেই ভাবে লেখার কিছু অসুবিধা হওয়াতে আমি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত আকার মাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে স্বরগুলিকে চিহ্নিত করেছি – যেমন ষড়জ=স ,কোমল রিষভ=ঋ ,শুদ্ধ রিষভ= র ,কোমল গান্ধার= জ্ঞ শুদ্ধ গান্ধার-গ, মধ্যম=ম।তীব্রবা কড়িমধ্যম=হ্ম,কোমল ধৈবত=দ ,শুদ্ধ ধৈবত=ধ কোমলনিষাদ=ণ এবং শুদ্ধনিষাদ=ন দিবা প্রথম প্রহর ( সূর্যোদয় থেকে সকাল ১০টা আনুমানিক) রাগের নাম ব্যবহার্য স্বর ঠাট বাদী –সম্বাদী স্বর --------------------------------------------------------------------------------- ভৈরব স ঋ গ ম প দ ন ভৈরব বাদী – দ ,সম্বাদী ঋ যোগিয়া স ঋ – ম প দ ন ভৈরব বাদী – ম ,সম্বাদী -স গুনকেলী স ঋ – ম প দ – ভৈরব বাদী –দ, সম্বাদী - ম ভৈরবী স ঋ জ্ঞ ম প দ ণ ভৈরবী বাদী – ম ,সম্বাদী - স রামকেলী স ঋ গ ম হ্ম প দ ণ ন ভৈরব বাদী – দ ,সম্বাদী – ঋ -------------------------------------------------------------------------------------- তালিকাটিতে উল্লিখিত দুটি রাগের স্বরসমষ্টিতে কিছু বৈচিত্র লক্ষনীয় ।যেমন নিয়ম অনুযায়ী ভৈরবীতে গান্ধার ও নিষাদ স্বর দুটিই শুদ্ধ হবার কথা। এবং রামকেলীতে শুদ্ধ ও তীব্র – এই দুই মধ্যমএর প্রয়োগ তথা ভৈরবী রাগে কোমল গান্ধার এবং নিষাদ স্বরের ব্যবহার ব্যতিক্রমী । সম্ভবতঃ এই রাগ গুলির ব্যতিক্রমী স্বরের প্রয়োগ তোড়ি রাগের আঙিনায় সচ্ছন্দে প্রবেশ করার উপায় হিসেবে দেখা যেতে পারে । পরমেল প্রবেশক রাগ হিসেবে এগুলিকে চিহ্নিত করাটা ঠিক কতটা শাস্ত্র সম্মত হবে জানিনা তবে এই রাগগুলির উল্লিখিত স্বরবিকৃতি সেই দিকেই ঈঙ্গিত করে বলে আমার বিশ্বাস । তোড়ি ঠাটের স্বরগুলি হল স ঋ জ্ঞ হ্ম প দ ন । ভোরের আবহ তার বর্ণ ,গন্ধ সবকিছু মিলিয়ে আনন্দরসের বার্তা পাঠায় সংবেদনশীল মানুষের হৃদয় তন্ত্রীতে তা আন্দোলন জাগায় সেখানে জেগে ওঠে সুর । এ জিনিষ পদার্থ বিদ্যায় বর্ণিত sympathetic Vibration এর কথা স্মরণে আনে । ক্রমশঃ

6022

8

ঝড়

রূপকথা - উপকথা - পুরাণ

কালী সৃষ্টি ,স্থিতি এবং বিনাশ দেবী , মহাবিদ্যা , মাতৃকা মন্ত্র ওঁ ক্রীং কাল্যই নমঃ, ওঁ কপালিন্যই নমঃ, ওঁ হ্রিং শ্রিং ক্রিং পরমেশ্বরি কালিকে স্বাহা গায়ত্রীːকালিকায়ৈ বিদ্মহে শ্মশানবাসিন্যৈ ধীমহি। তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ। অস্ত্র খড়্গ সঙ্গী শিব Mount শৃগাল (শিবা) কালী বা কালিকা হলেন একজন হিন্দু দেবী। তাঁর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। প্রধানত শাক্ত ধর্মাবলম্বীরা কালীর পূজা করেন। তন্ত্রশাস্ত্রের মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশ জন দেবীর মধ্যে প্রথম দেবী। শাক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদিকারণ মনে করে। বাঙালি হিন্দু সমাজে দেবী কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। পুরাণ ও তন্ত্র গ্রন্থগুলিতে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে তাঁর মূর্তিতে চারটি হাতে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড, বর ও অভয়মুদ্রা; গলায় মানুষের মুণ্ড দিয়ে গাঁথা মালা; বিরাট জিভ, কালো গায়ের রং, এলোকেশ দেখা যায় এবং তাঁকে তাঁর স্বামী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ব্রহ্মযামল মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।[১] কালীর বিভিন্ন রূপভেদ আছে। যেমন – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন মন্দিরে "ব্রহ্মময়ী", "ভবতারিণী", "আনন্দময়ী", "করুণাময়ী" ইত্যাদি নামে কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা ও পূজা করা হয়।[২] আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। এছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা ও জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় প্রতি অমাবস্যা এবং প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবারে কালীপূজা হয়ে থাকে। কালী দেবীর উপাসকরা হিন্দু বাঙালি সমাজে বিশেষ সম্মান পেয়ে থাকেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। কালীকে বিষয়বস্তু করে রচিত "শ্যামাসংগীত" বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কালী সাধকেরা এবং কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বিশিষ্ট কবিরা অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত লিখেছেন। "মৃত্যুরূপা কালী" হল দেবী কালীকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত দীর্ঘকবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামে একটি কালী-বিষয়ক বইও রচনা করেছিলেন। ব্যুৎপত্তি ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ, যার অর্থ “কৃষ্ণ, ঘোর বর্ণ” (পাণিনি ৪।১।৪২)। মহাভারত অনুসারে, এটি দুর্গার একটি রূপ (মহাভারত, ৪।১৯৫)। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী একটি দানবীর নাম (হরিবংশ, ১১৫৫২)। ‘কাল’, যার অর্থ ‘নির্ধারিত সময়’, তা প্রসঙ্গক্রমে ‘মৃত্যু’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এর সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু লৌকিক ব্যুৎপত্তির দৌলতে এরা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে গেছে। মহাভারত-এ এক দেবীর উল্লেখ আছে যিনি হত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন। তাঁর নাম কালরাত্রি বা কালী। সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, এই শব্দটি নাম হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে আবার ‘কৃষ্ণবর্ণা’ বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। [] রূপভেদ তন্ত্র ও পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের কথা পাওয়া যায়। তোড়ল তন্ত্র মতে কালী অষ্টধা বা অষ্টবিধ। যথা – দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালী। মহাকাল সংহিতা অনুসারে আবার কালী নববিধা। এই তালিকা থেকেই পাওয়া যায় কালকালী, কামকলাকালী, ধনদাকালী ও চণ্ডিকাকালীর নাম। অষ্টধা কালী মূল নিবন্ধ: দক্ষিণাকালী দক্ষিণাকালীর কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামে আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়। সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বুকে ও বামপদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত। মূল নিবন্ধ: গুহ্যকালী গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের। মূল নিবন্ধ: মহাকালী তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ,চক্র,গদা,ধনুক,বাণ,পরিঘ,শূল,ভূসুণ্ডি,নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর প্রথম চরিত্র শ্রী শ্রী মহাকালীর ধ্যানমন্ত্র এইরূপ ওঁ খড়্গং চক্রগদেষুচাপপরিঘান শূলং ভুসূণ্ডিং শিরঃ| শঙ্খং সন্দধতীং করৈস্ত্রিনয়নাং সর্বাঙ্গভূষাবৃতাম্ || নীলাশ্মদ্যুতিমাস্যপাদদশকাং সেবে মহাকালিকাম্ | যামস্তৌচ্ছয়িতে হরৌ কমলজো হন্তুং মধুং কৈটভম্ || মূল নিবন্ধ: ভদ্রকালী, ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।[] মূল নিবন্ধ: চামুণ্ডা চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে। মূল নিবন্ধ: শ্মশানকালী কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়। শ্রীকালী গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।

1288

28