মানব
কেদারাবিলাস ************************************** বয়েস হল দাঁত পড়ল হল বাঁধালেম আবার। এত অল্পেই সব কিছু করব কেন সাবাড়? চুল পাকলে কালো করি, সবুজ হল মন, ফু্লটুসিকে আবার মনে পড়ছে সারাক্ষণ। 'হরে কৃষ্ণ' ছেড়ে এবার ধরি 'ফিরে চলো'; অর্কুট তো উঠেই গেল, ফেসবুক টা এল। কান মলে দেওয়া সেই পণ্ডিত মশাই... জানেনই না তার ছেলেও খায় আমারই ধোলাই। চেয়ারই তো দেখি শুধু আজ ঘরে-বাইরে চাটাইগুলোর যায়গা হল মাচার উপরে মোবাইলটাও নতুন আজ, ভেগেছে ফুচকাওয়ালা তেঁতুল জল ছেড়ে আজ পিৎ্জা খাওয়ার পালা। লাল সবুজ গেরুয়াগুলো আজ অন্য লোকে পরে, নীল-সাদাকেও দেয়নিকো আজ বিতর্ক ছেড়ে। শুধু, রয়ে গেছে সেই পুরনো টিফিন বাক্সখানা... আর রয়েছে জমানো কিছু স্মৃতির আনাগোনা।
ঝড়
মানুষ স্বপ্ন দেখে| অহরহ‚ প্রতিনিয়ত| কিছু স্বপ্ন সত্যি হয়‚ কিছু হয় না| কিন্তু সত্যি না হলেও কিছু স্বপ্ন আবেশ রেখে যায়| তেমনই কিছু স্বপ্নের আবেশ ধরে রাখার প্রচেষ্টা|
দীপঙ্কর বসু
গতকাল মনোজদার কাছ থেকে শুভম নামে একটি পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা ধার করে এনেছি । বইটা হাতে পেয়ে কয়েকটা পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে "রথীন্দ্রনাথের শেষ জীবন"শীর্ষক একটি প্রবন্ধের ওপরে চোখ আটকে গেল । প্রবন্ধ লেখক নিত্যপ্রিয় ঘোষ । লেখাটি আগ্রহ জাগালো বিশেষত এই কারণে যে রথীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খুব সামান্যই জানি । তার একটা কারণ হয়তো ব্যক্তি রথীন্দ্রনাথ আজীবন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত পিতার খ্যাতির ছায়ায় নিঃশব্দে রবীন্দ্রনাথের বহু কাজের বোঝা টেনে গেছেন আজীবন - স্বয়ং বহু গুনের অধিকারী হওয়া সত্বেও নিজেকে তেমন ভাবে জনমানসে নিজেকে মেলে ধরেননি অথবা বিশ্ববিশ্রুত পিতার প্রতিভার দীপ্তির ঔজ্জ্বল্যে ঢাকা পড়ে গেছে তার নিজস্ব দীপ্তি । যেমনটা হয়েছে দ্বিজেন্দ্রনাথ ,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রমুখ রবীন্দ্রাগ্রজদের ক্ষেত্রে । প্রবন্ধের শীর্ষক দেখেই সহজে অনুমান করে নেওয়া যায় যে যে রথীন্দ্রনাথের প্রযুক্তিবিদ্যাগত প্রতিভা অথবা শিল্পকলায় তাঁর নিজস্ব অবদান এর ওপরে আলোকপাত করা প্রবন্ধের লক্ষ্য নয় - লক্ষ্য রথীন্দ্রনাথের জীবনের একটি কলঙ্কিত অধ্যায় এবং সেই কলঙ্কের বোঝা কাঁধে নিজের পিতার সৃষ্ট ( যার পিছনে স্বয়ং রথীন্দ্রনাথের অবদানও কম নয়) বিশ্বভারতির সঙ্গে যাবতীয় সংস্রব ত্যাগ করে সুদুর দেহরাদুনে চলে যেতে বাধ্য হবার কাহিনীকে তুলে ধরা । রবীন্দ্রনাথের প্রয়সণের পর রথীন্দ্রনাথের হাতেই ছিল উপাচার্য হিসেবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনভার । বিশ্বভারতীর আর্থিক অনটন মেটানর জন্য দীর্ঘকাল নানান সংগ্রামে পরিশ্রান্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই রথীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্বভারতীকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তন করতে । রথীন্দ্রনাথ অবশেষে সফলও হয়েছিলেন ।কিন্তু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যাল্যয় হিসেবে ্বিশ্বভারতীর রূপান্তর ব্যক্তিগত ভাবে রথীন্দ্রনাথের পক্ষে শুভফলদায়ী হয়নি । তিনি ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছিলেন যাদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকাল কর্মসচিব হিসেবে কাজ করে এসেছেন সরকারি শাসনে যাবার পর তারা রথীন্দ্রনাথকে আর ততটা মান্য করে চলতেননা । তারা প্রতি পদে কর্মসমিতির সভায় কাজে এবং কথায় যে ভাবে রথীন্দ্রনাথের বিরোধীতা করতেন তা রথীন্দ্রনাথকে বিমূঢ করে ছিল। একই সঙ্গে তারা রথীন্দ্রনাথের নৈতিক চরিত্র নিয়ে একটা প্রচারাভিযানে নেমে পড়েছিলেন । সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলও তারা তাদের প্রচারে ইন্দিরাদেবী , মীরাদেবী(ছোটো বোন) এমনকি খোদ স্ত্রী প্রতিমাদেবীর সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিলেন !! অভিযান চলেছিল শান্তিনিকেতন আশ্রমেরই এক বাসিন্দা কমলা বিশীর কন্যা মীরার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের মেলামেশাকে কেন্দ্র করে । পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে রথীন্দ্রনাথের মধ্যস্থতায় এক সময়ে মীরার বিয়ে হয় আশ্রমেরই এক প্রাক্তন ছাত্র নির্মল চ্যট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে । এক যোগে সতীর্থদের এবং পরিবারের ঘনিষ্ট জনেদের মিলিত আক্রমনে দিশাহারা হয়ে অবশেষে ১৯৫৩ সালে রথীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর উপাচার্যের পদে ইস্তফা দিয়ে শান্তিনিকেতন ত্যাগকরেন চিরদিনের এই ভাবেই দিনে দিনে শান্তিনিকেতন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে ।প্রবন্ধকার যেমন গোটা প্রবন্ধে কোথাও মীরা চট্টোপাধ্যায় ওঁ রথীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে সমাজবহির্ভূত সম্পর্কের কেচ্ছার সত্যাসত্য বিচারের চেষ্টা করননি তেমনি আমার পক্ষেও কোন সুনির্দিষ্ট মতামত দেওয়া অসম্ভব । শুধু দুঃখিত বোধ করি একটা মহান স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটতে দেখে ।
ঝরাপাতা
প্রতিটি মানুষের সহজাত স্বভাব, সে বন্ধন্মুক্ত হতে চায়। মুক্তি চাওয়াটা কোনরকম অলংকার চাওয়ার মত ব্যাপার নয়। এর প্রয়োজনীয়তা আছে জীবনের জন্য। শুধু মানুষ কেন, প্রানীরাও স্বাধীনতা চায়। বাচ্চারাও কোন বন্ধন চায়না। আমারা দেখে থাকব যদি একটি শিশুর গলায় একটি মালা পরিয়ে দেওয়া হয়, সে তার সহজাত স্বভাবে ওটাকে টেনে খুলে ফেলতে চাইবে কারন শিশুটি বন্ধন চায় না। মুক্তি আমাদের প্রকৃত স্বভাব। কিন্তু প্রতিদিনকার জটিলতায় আমরা যে একটু একটু করে সেটা হারিয়ে ফেলি আর অলঙ্কারের মত জড়িয়ে রাখি আমাদের অনাবশ্যক পরিস্থিতিগুলকে। এই ভার বহন করতে করতে একসময় আমরা পালিয়ে বাঁচতে চাই। ভাবি এরই নাম মুক্তি। মুক্তি হোল আমার নিজস্ব আবেগ(emotional garbage) থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এক জঙ্গল সমান দুশ্চিন্তা যা আমাকে কষ্ট দেয় সেই সব ভারকে দূরে সরিয়ে বাঁচার নাম মুক্তি। মুক্তি আমার ভেতরেই বিদ্যমান, তাকে খুঁজে নেওয়ার নামই মুক্তি। *** এই নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। আজ এই পর্যন্ত।
শিবাংশু
যদিও ইস্টার প্রাচীন পূর্ব সেমিটিক প্রজনন, প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইশতারের সঙ্গে জড়িত একটি উদযাপন, কিন্তু খ্রিস্টিয় ঐতিহ্যে তা একটা ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে এসেছিলো। নিউ টেস্টামেন্ট বলে, ইস্টার পর্বটিই সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ খ্রিস্টিয় উদযাপন। তাঁদের মতে এর মধ্যে দিয়েই মৃত্যুর উপর শাশ্বত জীবনের জয় ঘোষণা করা হয়। খ্রিস্টের নশ্বর পার্থিব অস্তিত্বের পুনরুত্থান তত্ত্বটি অনেকে স্বীকার করেন না। কিন্তু এর সঙ্গে বিজড়িত প্রাগৈতিহাসিক লোকাচার, যেমন পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি প্রার্থনা বা খ্রিস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সেমেটিক ইহুদি প্রথা পাসওভার ও সামূহিক শোকপর্ব লেন্টকে যদি যুক্তির বিচারে বাতিলও করা হয়, তবু "ব্যাপ্ত হোক জীবনের জয়...." আহ্বানটির মানবিক মূল্য স্বীকার করতেই হবে। ইস্টার হয়তো সেই জন্যই একটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য যাপন। --------------------------- দুঃখশোক, তৃষ্ণার উপর জীবনের জয়'কে যিনি মানুষের একমাত্র সার্থকতা হিসেবে স্বীকার করেছিলেন, ইস্টার উদযাপন করতে আজ সকালে তাঁর কাছে যাবার ইচ্ছে হলো। নাহ, খ্রিস্ট ন'ন, তাঁর দর্শনগুরু শাক্যমুনি গৌতমবুদ্ধকে স্মরণ করে যে 'শান্তিস্তূপ'টি নিপ্পনভক্তরা স্থাপন করেছিলেন ধবলগিরি বা ধৌলি'তে, সেখানেই রওনা দিলুম কিছুক্ষণ বসার জন্য। কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে দেখা করা, কথা বলা। শব্দহীন কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাওয়া সেই মানুষদের, যাঁদের দৌলতে পৃথিবী এতো হিংস্র অপহ্নবের শিকার হবার পরেও মানুষের বাসযোগ্য হয়ে রয়ে গেছে। ------------------------------------------ শহর থেকে একটু দূর, নদী পেরিয়ে অনুচ্চ পাহাড়টির কাছে যাওয়া। ভোরসকালে গাড়ির ভিড় থাকেনা। যতোটা উপরে যাওয়া যায়, ততোদূর গাড়ি পৌঁছে যায় অনায়াস। ভোরের আলোয় সেই শাদা বিরাট স্তূপটির পিছনে যখন সূর্য একটু একটু করে বেড়ে ওঠে, পশ্চিমমুখী মূল প্রবেশ থেকে তাকে খুব বিনম্র মনে হয়। এই টিলাটি এককালে পিয়দস্সি অশোকের প্রিয় ভূমি ছিলো। দয়ানদীর পারে এই পাহাড়টির ভিত্তিভূমিতে অশোক স্থাপন করেছিলেন তাঁর দণ্ডনীতির বিশদ শিলালিপি। কিংবদন্তি বলছে এই প্রান্তরেই কুখ্যাত কলিঙ্গযুদ্ধের রক্তস্নান দেখে চণ্ডাশোকের ধর্মাশোক হয়ে ওঠা। যদিও এসবের কতোটা কাহিনী, কতোটা ইতিহাস, বলা যায়না, তবু এর স্থানমাহাত্ম্য অস্বীকার করার মতো নয়। প্রামাণ্য বৌদ্ধ ইতিহাসে প্রাচীন ধৌলি রাজ্য ও তার প্রভাবের ইতিবৃত্ত অনেক সূত্রেই আমরা দেখতে পাই। ---------------------------------------------- ১৯৭২ সালে জাপান বুদ্ধ সঙ্ঘ এবং কলিঙ্গ-নিপ্পন বুদ্ধ সঙ্ঘের মিলিত প্রয়াসে, জাপানের নিচিরেন বৌদ্ধগোষ্ঠীর নিপ্পনজেন মিয়োহোজি মঠের প্রধান ভিক্ষুর তত্ত্বাবধানে এই স্তূপটির স্থাপনা হয়। নাম দেওয়া হয় 'শান্তিস্তূপ'। অগণ্য শ্রেষ্ঠ মন্দিরের দেশ, ওড়িশা ও ভুবনেশ্বরের গরিমা মনে রেখেও এই স্তূপটি বিশালত্ব ও গাম্ভীর্যে মানুষের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য স্বতোৎসার আকর্ষণ করে চলেছে। এর চারপ্রান্তে বুদ্ধের বাল্যমুদ্রা, ভূমিস্পর্শমুদ্রা, ধর্মচক্রপ্রবর্তনমুদ্রা এবং মহাপরিনির্বাণের অনুপম মূর্তিগুলি নির্মিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বাস রিলিফ প্যানেলে বুদ্ধের জীবনকালের ধারাবিবরণী এবং কলিঙ্গ ইতিহাসে বৌদ্ধ সভ্যতার ইতিবৃত্তও দেখা যায়। ওড়িশার দিগগজ ভাস্করদের যোগদানে এই সব কলাকৃতি যে আধুনিক ভারতের ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের একটা পর্যায় হয়ে উঠতে পেরেছে, সেটা নিশ্চিত। শৈলি বিচার করলে এই সব ভাস্কর্য দেশের দুই শ্রেষ্ঠ ঘরানা, কলিঙ্গ ও মথুরা'র মিশ্রণ। ------------------------------ সচরাচর পুরী যাবার পথে ব্যস্ত পর্যটকের দল ত্বরিত যাত্রাভঙ্গ করে এই স্তূপটি দেখতে আসেন। কিন্তু শুধুমাত্র পর্যটক আকর্ষণ নয়, এর কাছে চাইলে আরো অনেক কিছু পাওয়ার আছে। এই অর্বাচীন নির্মাণটির হয়তো অনুরাধাপুরা বা সারনাথের মতো কোনও গরিমাময় ইতিহাস নেই ; কিন্তু এই ঠিকানায় দুদণ্ড শান্তিতে বসে নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো মৌন অবকাশ দেশের খুব কম দেবস্থানেই পাওয়ার সুযোগ হয় । ঐ উঁচু পাহাড়ের শিখর থেকে দেখা দয়ানদী, আদিগন্ত সবুজ প্রান্তর, ভাসানো হাওয়ার প্লাবন, নীলাচলের দিকচিহ্ন ঘেরা অপার চরাচর , আমাদের দশ ফুট বাই দশফুট পৃথিবীর গারদখানার শিকল থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও, মুক্তি দেয়। সব সাধনই তো বাঁধন ছেঁড়ার। কালসমুদ্রে আলোর যাত্রী হওয়ার ক্ষণিক আনন্দ কখনও কখনও হরিপদ কেরানিরও নসিব হয়ে যায়, এইভাবে।
শিবাংশু
হোলির বাজারে একটাই স্লোগান। বুরা না মানো, হোলি হ্যাঁয়। হাজার বছর আগে রাজারা বছরের এই একটা দিন ভাঁড়েদের অনুমতি দিতেন তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা বটকেরা করার জন্য। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে। তা কেউ না মানলেও বিহারিদের জন্মগত ভাঁড়ামির অধিকারে হোলির দিন " সা রা রা রা রা" র জলে এসব শৌখিন মজদুরিকে রঙের বালতিতে চুবিয়ে দেওয়ার গপ্পো শেষ হওয়ার নয়। -------------------------------------- যেমতি আমরাও পাড়াগেঁয়ে লোক; এবং সেই অধিকারে হোলির রংবাজি করতে আটকায় কে? একটু চান্স নেওয়া যাক। আমাদের কচি বয়সে শহরের লোকেদের প্রতি মনোভাবটি ছিলো, " তোমাদের দিকে তাকাইয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই...."। ঠিক যেন রেঙ্গুনের শরৎ আর জোড়াসাঁকোর প্রিন্স। আমাদের সব চেয়ে কাছের কাছের শহর কলকেতা। তা, সেখানের লোকজন সম্পর্কে ভাগলপুরের ন্যাড়া একটাই পরিভাষা তৈরি করে দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, যার কর্তাপদ দর্জিপাড়ার নতুনদা। আর কর্ম মানে " ঠুন ঠুন পেয়ালা।" বাল্যকালে যখনই কলকেতায় যেতুম (আফটার অল আমরাও তো সাবেকি বিডন স্ট্রিট আর নতুনবাজার পার্টি । কিন্তু পূর্বপুরুষ প্রকৃষ্ট সময়ে স্বর্গ হইতে বিদায় নিয়েছিলেন), চোখে পড়তো সেই সব উজ্জ্বল বঙ্গবীরদের যাঁরা সেরেফ গামছা সম্বল হয়ে রাস্তার পাশের রকে জ্ঞানগর্ভ মণিমুক্তো ছড়িয়ে যেতেন। ঘনাদার হুতুমি এডিশন সব। আমরা বলতুম, হাওড়া ব্রিজের পশ্চিমের দুনিয়াটি সম্বন্ধে কিছু না জানলেও আইসল্যান্ডের বাজারে কোন বস্তুটি সস্তায় পাওয়া যাবে, সেটা তাঁদের নখদর্পণে। বিস্ময়ের আর কী দোষ? আমরা তো অভিভূত হয়ে থাকতুম। একটু বড়ো হবার পর, মানে হাই ইশকুল তক যেতে যেতে ছবিটি পাল্টে যখন পরিবত্তোন হলো, তখন কহানিতে ভিন্ন টুইস্ট। শ্রেণীশত্রু নিধনের সময়। স্টেনসিলকাটা চিনের চেয়ারম্যানকে আধ ময়লা নোনাধরা দেওয়ালে দেখলেই সাবধান হয়ে যাওয়া। অচেনা গলিতে, আধোচেনা পাড়ায় উঁকি দেওয়া একেবারে মানা। যতো অপ্রতিরোধ্যই হোক না কেন, রাইকিশোরির পিছু পিছু একটা সীমানা পর্যন্ত গিয়েই চুপচাপ টক করে ট্র্যামে উঠে যাওয়া। হাওয়ায় খানিকটা দীর্ঘশ্বাস....নিরেট কার্বন ডাই অক্সাইড.... ------------------------------------ আমাদের গ্রামে কিছু অরণ্যের প্রবাদ ছিলো। কলকেতার লোকদের 'সড়া অন্ধা' টেস্টটি কী? সুনিশ্চিত হবার ছাপটি কেমন ? কোনও মজ'বুড়ো তার খুব সোজা উত্তর দিয়েছিলেন। পাকা ছেলে আর ন্যাকা মেয়ে। কলোসাল রাজনৈতিক ভুল উক্তি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। আমার কলকাত্তাই সখিরা অবশ্য এসব 'অবিমৃষ্যকারিতা' ( মানেটা জানিনা, তবে বিরাট কিছু হবে মনে হয়। কী ওজন?) মাফ করে দেন। মজা হলো, ছেলেরা পাকা কি না তা নিয়ে আমাদের বিশেষ মাথাব্যথা ছিলোনা। কিন্তু আমাদের গ্রামের মেয়েরা কলকাতার মেয়েদের মতো শৈল্পিক ন্যাকামি এক্কেরে করতে পারতো না। পাঁচভাগ করতো ওভারডু আর পঁচানব্বই ভাগ আন্ডারডু। হ্যাঁ, আমাদের গাঁয়ের বান্ধবীরা আর একটি কাজ পারতো না। তা হলো কলকাতার মেয়েদের মতো প্রসাধন করতে। তা তাদের যখন এই কথাটি বলা হতো, তখন তারা একযোগে, প্রায় ইউনিয়ন বানিয়ে, সরব উচ্চকিত হয়ে উঠতো, 'আমাদের ওসব ন্যাকামি আসেনা। ' কী মুশকিল, আমরাও তো সেই কথাই বলছি। একমাত্র সান্ত্বনা ছিলেন দাদু, ' যে পারে সে আপনি পারে, পারে সে ফুল ফোটাতে।' সঠিকমাত্রায় ন্যাকামি করতে পারা সৃজনশীল উদ্যম, সবার আসেনা। --------------------------------------- কেউ কেউ বলেন, নিজস্ত্রীর ন্যাকামি কেউ ( পড়ুন হীনমন্য 'পুরুষ' জাতি) সহ্য করেনা, কিন্তু পরস্ত্রীর সামান্য ন্যাকামির ইঙ্গিত দেখলেই দন্তবিস্ফার করে স্ট্যান্ডিং ওভেশন আর হার্মোনি সহযোগে 'বন্দে মাতরম' গীত। এতো শাশ্বত সত্য। যদি কিছু ফারাকই না থাকলো তবে পরস্ত্রীর গরিমা কীভাবে ফুটে উঠবে? প্রতিটি রহস্যময়ী নারী দুর্বৃত্ত উকিলি নিয়মে মাত্র একজন 'অযোগ্য' পুং স্পেসিমেনের বিবাহিতা স্ত্রী। অথচ বাকি বিশ্বচরাচর তো বিনিদ্র অপেক্ষা করে আছে তার পায়ের কাছে সাম্রাজ্য পেতে দিতে। এমন একটা জন্মগত সুযোগ ঠাকুর তো পুরুষদের দেননি। 'মহানায়ক' জাতীয় দুয়েকজন মাত্র মর্যাদাপুরুষোত্তম এই প্রিভিলেজের অধিকারী। বাকিরা কোথায় যাবে? --------------------------------------- হে মহতী, মর্যাদাশালিনী, করুণাময়ী, জগজ্জননী, পাপনাশিনী, ললিতাবৃন্দ, কৃপাভরে অক্ষম পুরুষজাতির পাপ মার্জনা করুন। এই গ্রহের লীলাখেলা শেষ হলেই আপনারা সবাই পুণ্যবলে বৈকুণ্ঠলোকে পাড়ি দেবেন আর পাপী পুরুষজাতি ফিরে যাবে তাদের রৌরব নরকে । তব তক কে লিয়ে আজ্ঞা দিজিয়ে , আপাততঃ, বুরা না মানো..... চলুক....
ঝরাপাতা
আজ দখিন-বাতাসে নাম-না-জানা কোন্ বনফুল ফুটল বনের ঘাসে। 'ও মোর পথের সাথী,পথে পথে গোপনে যায় আসে।' কৃষ্ণচূড়া চূড়ায় সাজে, বকুল তোমার মালার মাঝে, শিরীষ তোমার ভরবে সাজি ফুটেছে সেই আশে। 'এ মোর পথের বাঁশির সুরে সুরে লুকিয়ে কাঁদে হাসে।' ওরে দেখ বা নাই দেখ, ওরে যাও বা না-যাও ভুলে। ওরে নাই-বা দিলে দোলা, ওরে নাই-বা নিলে তুলে। সভায় তোমার ও কেহ নয়, ওর সাথে নেই ঘরের প্রণয়, যাওয়া-আসার আভাস নিয়ে রয়েছে একপাশে। 'ওগো ওর সাথে মোর প্রাণের কথা নিশ্বাসে নিশ্বাসে।' https://youtu.be/z3A3y6OyDLU
dalia mukherjee
ওদিকে শুরু হয়ে গেছে ফুল বিতরণের পালা। ন্যাপলা একটু ভদ্রভাবে বসে গেল চক্ষুবুজে। বোসকর্তা বোসগিন্নিকে চুপি চুপি বললেন, " চুপ করে যাও গিন্নি, যা বলছে তাই কর। নইলে কে জানে, তোমার ও মুখে কালসিটে পড়ে যেতে পারে!।" গিন্নি আর কি করেন? অঞ্ছলীর ফুল হাতে ধরলেন, ততক্ষনে ক্যাসেটে মন্ত্র শুরু হয়েছে, " যা দেবী, সর্ব্বভুতেষূ, শক্তিরূপেন সংস্থিতা, নমস্তসৈ, নমস্তসৈ, নমস্তসৈ নমঃ নমা।" সবাই সমস্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন, কিন্তু বোসগিন্নি যেন বাকশক্তি রোহিত হয়ে গেছেন? গলা তাঁর শুখিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সেই সকাল থেকে তো এককাপ চা ও পেটে পড়েনি! মনে মনে বললেন," ক্ষমা কর মা, এই অবলাকে ক্ষমা কর। এই হতচ্ছাড়া পাড়ার ছেলেগুলোকে নরকেও ঠাঁই দিওনা, কিন্তু আমি নিরূপায়, আমাকে ক্ষমা কর মা গো।" কোন রকমে অঞ্ছলী পর্ব শেষ করে প্রসাদের থালা হাতে নিয়ে কর্তার সঙ্গে ফিরে এলেন বোসগিন্নি। কর্তা বললেন," গিন্নি, এই এখনকার যুগের পূজো। এই পূজোকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। নয়তো আমাদের ও ওই পুরুতদের মত হাল হবে। মুখে কালসিটে পড়বে। এখন তো তবু পুরুত পাওয়া যাচ্ছে, এরপরে তাও জুটবেনা। পুরুতরা সব বড় বড় চাকরী নিয়ে কোলকাতা ছাড়বে। অবস্থা তখন আর ও জটিল হয়ে যাবে।" বোসগিন্নি" হা কপাল," বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এই পূজোর জন্যে এত কান্ড, এত প্যান্ডেলের জৌলুস, ১৫০ টাকা চাঁদা দেওয়া?" না, সামনের বছরে অন্য ব্যাবস্থা করবে গো কর্তা , আর যাইহোক, এই কোলকাতায় আর নয়।" কর্তা নিঃশব্দে সায় দিলেন, এ ছাড়া আর উপায় ই বা কি?? (শেষ)
শিবাংশু
'প্রদ্যোতস্য সুতা বসন্তসময়স্তংচেতি নাম্রা ধৃতি কামঃ কামমুপৈত্বয়ং মম পুনর্মনৈ মহানুৎসবঃ ।।' ( শ্রীহর্ষের রত্নাবলী নাটকে কামউৎসবে রাজার উক্তিঃ সপ্তম শতক) --------------------------- 'প্রদ্যোতের কন্যা ( রতি দেবী), বসন্তসময় এবং তুমি বিদ্যমান। অতএব নাম দ্বারাই কাম পর্যাপ্ত সন্তোষ লাভ করুন। এই মহান উৎসবকে ( বসন্তকালীন কামমহোৎসবকে) নিজস্ব উৎসব মনে করছি। ' --------------------------------------- জীমূতবাহন লিখেছিলেন দায়ভাগ গ্রন্থ দ্বাদশ শতকে। তা'তে রয়েছে হোলাক বা হোলক উৎসবের কথা। সারা উত্তর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশেও এই উৎসবটির সম্যক প্রচলন ছিলো। সময়ের সঙ্গে এই পার্বণটির ক্রমবিবর্তন বেশ আকর্ষণীয় বিষয়। আদিযুগে এই উৎসবটি ছিলো কৃষিসমাজের পূজা অনুষ্ঠান। শস্যপূর্ণা চ বসুন্ধরার কামনায় নরবলি ও যৌনলীলাসম্পৃক্ত নৃত্যগীত উদযাপন ছিলো এর মুখ্য অঙ্গ। এই অনার্য ঐতিহ্যের সঙ্গে পরবর্তীকালের বৈদিক উপচার হোমযজ্ঞ মিলে যায়, নরবলির বদলে পশুবলি প্রচলিত হয়। সুশস্যকামনায় পূজা অর্চনার ক্ষেত্রে যেমন বলি ও যজ্ঞ গৃহীত হয়, একইভাবে হোলির শৃঙ্গাররসমুখর দিকটি কেন্দ্র করে বসন্ত, মদন ও কাম উৎসবের এবং রাধাকৃষ্ণের লীলাখেলার উৎপত্তি হলো। এর সঙ্গে কোন এক মূর্খ রাজাকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার জন-ইচ্ছাটিও প্রথা হিসেবে সামগ্রিকভাবে হোলি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলো। --------------------------- যেরকম নথিভুক্ত ইতিহাসে দেখা যায়, তৃতীয়-চতুর্থ শতকে, অর্থাৎ গুপ্তযুগের প্রাথমিক সময়কাল থেকেই ষোড়শ শতক পর্যন্ত সম্পূর্ণ পুরাণযুগে বসন্ত বা মদন বা কামমহোৎসব নামে একটি উৎসব উত্তরভারতের সর্বত্র অতিসমারোহে পালিত হতো। এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায় তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাৎসায়নের কামসূত্রে, সপ্তম শতকে শ্রীহর্ষের রত্নাবলীতে, অষ্টম শতকের মালতী-মাধব নাটকে, একাদশ শতকে অল-বিরুনির লেখায়, দ্বাদশ শতকে জীমূতবাহনের কালবিবেক গ্রন্থে এবং ষোড়শ শতকে রঘুনন্দনের বিবরণে। এই উৎসবে প্রচুর নৃত্যগীতবাদ্য, শৃঙ্গারসূচক সংলাপ ও যৌনতাব্যঞ্জক অঙ্গভঙ্গি মুখ্য স্থান নিয়ে থাকতো। পূজা অনুষ্ঠানের অভীষ্ট দেবতা ছিলেন মদন ও রতি দেবী এবং পুষ্পময় চৈত্রের অশোকবৃক্ষের ছায়ায় তার আয়োজন করা হতো। সপ্তম শতকে রচিত শ্রীহর্ষের রত্নাবলী নাটকে মদন মহোৎসবে ভিজ্যুয়ালটি এইভাবের বর্ণনা করা হচ্ছে, 'অহো, পৌরগণের আহ্লাদ অত্যন্ত উৎকর্ষ প্রাপ্ত হইতেছে, যেহেতু দিবস প্রারম্ভতুল্যকারী কুন্কুমচূর্ণবদ গৌর , বিক্ষিপ্ত পীত চূর্ণরাশি ও স্বর্ণালংকরণ দীপ্তি এবং কিণ্কিরাত পুষ্পশোভিত ভার অবনত পীত পরিচ্ছদশোভিত কৌশাম্বী নগর যেন স্বর্ণদ্রব মন্ডিত লোকযুক্ত হইয়া শোভা পাইতেছে'। (অর্থ, পীত বস্ত্রশোভিত পুরবাসীরা পীতচূর্ণরাশি ( আবির) প্রক্ষেপ করে অশোকবৃক্ষের ছায়ায় স্বর্ণমন্ডিত হয়ে কামউৎসব উদযাপন করছে।) যেরকম অনুমান করা হয়, ষোড়শ শতকের পরবর্তীকালে চৈত্রীয় কামমহোৎসব, ফাল্গুনী দোলপূর্ণিমায় প্রচলিত হোলি উৎসবের সঙ্গে মিলে যায় এবং মদন উৎসব উদযাপনের দিন শেষ হয়ে যায়। আসলে মুসলিম রাজাদের আমলে হোলি উৎসব রাজ অনুগ্রহে প্রচুর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং মদন উৎসবকে গ্রাস করে নেয়। তবে এর ধর্মীয় দিকটি বেঁচে থাকে যখন একাদশ শতক নাগাদ রাধাকৃষ্ণের ঝুলন উৎসব এই চৈত্রীয় পার্বনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। অল-বিরুনির বিবরণ ছাড়াও গরুড় ও পদ্মপুরাণে এমত পড়া যায়। তারও পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠান চৈত্র পূর্ণিমা থেকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় এগিয়ে আসে। এই উৎসবের প্রধান পালনীয় কৃত্য ছিলো ঝুলন আরোহী রাধা ও কৃষ্ণের প্রতি সখিসহচরীরা আবীর, কুমকুম ও পুষ্পবৃষ্টি করবে। বাংলায় এই জন্যই উৎসবটিকে 'দোলযাত্রা' বলা হয়, ঝুলনে দোলায়িত পুরুষ-প্রকৃতির যুগ্মসম্মিলনের দৈবী মাহাত্ম্য মুখর এর গরিমা। প্রাক বৈদিক আদিম কৃষিজীবী সমাজের ব্যাকানালিয়ার উদযাপন ব্রাহ্মণ্য প্রভাবে হোলির বর্তমান রূপে বিবর্তিত হয়েছে। এখনও এই উৎসব মূলত 'শূদ্রে'র উৎসব। হোলিকাদহন বা বাংলায় যার নাম চাঁচর, তার আগুন অস্পৃশ্য শূদ্রদের থেকে গ্রহণ করার বিধি রয়েছে। ----------------------------------- উত্তর ভারতে প্রচলিত হোলি উৎসবের যে সাধিত অমার্জিত উদযাপন রয়েছে তার থেকে ঊনবিংশ শতকের বাবুকালচারভিত্তিক নাগরিক বাঙালির 'দোলযাত্রা'র চোরাস্রোত আর অবক্ষয়ের ডাইনামিক্সের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য ছিলোনা। এই পর্যায় থেকে দোলউৎসব উদযাপনে ব্রাহ্ম রুচিবোধ ও য়ুরোপীয় সফিস্টিকেশন নিয়ে আসার কৃত্যটি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেকালের বাঙালির থেকে একালের বাঙালির রুচি ও মননবোধে আরো অসংখ্য পরিমার্জন সাধনের পথে কবির এই প্রয়াসটিও অল্পবিস্তর সফল হয়েছিলো। তবে শান্তিনিকেতনী দোলের পৌত্তলিকতা, কালিদাসের কুমারসম্ভব বা বিহার অওধের শারীরমাংসে তপ্ত "রং বরসে" জুনুন, সবই পরস্পর পৃথক নিগূঢ় রণিত সন্ধান। দিনের শেষে উৎস খুঁজতে গেলে হোলি একান্তভাবে মানুষের উৎসব। দৈবী মহিমা আরোপ করে তার প্রতি অবিচার করার কোনও হেতু নেই।
শিবাংশু
একটা গান হঠাৎ শুনতে শুনতে একজনের কথা মনে পড়ে গেলো। এই সব গানের স্মৃতিচারণে আমাদের শৈশব-কৈশোরের একটা মেদুর পর্যায় পায়ে পায়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। এইচ এম ভি'র শারদ-অর্ঘ নামক বইটি, যেটি হাফ-ক্রাউন সাইজে ছাপা হতো। শিল্পীদের প্রতিকৃতির পাশে দু'টি গানের লিরিকসহ গীতিকার-সুরকারের নাম। শাদাকালো ছবি, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের ছবি বদলাতো না। ভূপেনদার গুর্খা ক্যাপ, চোখে রেব্যান কালো কাঁচ, প্রতিবার একই রকম। যতোদিন ইশকুলে ছিলুম, বইয়ের দোকানে গিয়ে নাড়াচাড়া করতুম বইটি। কলেজে ওঠার পর কিছু পয়সা বাঁচিয়ে কিনে ফেলতুম। তার পর রোববার আড়াইটা বাজলেই রেডিওর সামনে বসে পুজো করার মতো নিষ্ঠায় পছন্দের গানগুলি গলায় তোলার চেষ্টা। প্রথমে মান্না'দা, তার পর মানবেন্দ্র বা শ্যামল, হেমন্তও। কলেজে শোনাতে হবে, সে কি চাপ। ------------------------------- যতোদূর মনে পড়ছে ১৯৬৫-৬৬তে আমার মামাশ্রী একটা জলসা শুনে এসে বাড়িতে উচ্ছ্বসিত ঘোষণা করলেন, তোদের মান্না দে'র অন্ন উঠলো এইবার। আমি তো তখন নেহাৎ বালক, প্রায় শিশুও বলা যায় গানের বিচারে। তাঁর দিদি, মানে আমার মা বলেন, কেন রে? মামা একেবারে ঘোরগ্রস্ত হয়ে বলতে থাকেন, কাল বুঝলি একটা ছেলের গান শুনলাম, কোথায় লাগে মান্না দে? শুরু করলো একটা গান দিয়ে , " শ্রীমতী যে কাঁদে" কী রেঞ্জ রে বাবা, আর তেমন মিষ্টি। এবার পুজোয় নাকি রেকর্ড করেছে। মা বলেন, বেশ অনুরোধের আসরে শোনা যাবে এখন। তাই হলো এই গানটি বেশ কিছু মাস ধরে অনুরোধের আসরে বাজবেই। অন্য গানটা, " কিছু নেই, তবু দিতে চাই", সেটাও হতো। আমি তো তখন থেকেই মান্না দে'র একান্ত পাখা। খুব অবোধভাবে মা'কে প্রশ্ন করি, মা, এর পর কি আর কেউ মান্না দে'র গান শুনবে না? মা হাসেন। ----------------------------------------- তার পরেই একদিন স্থানীয়সংবাদে খবর তরুণ গায়ক মলয় মুখোপাধ্যায় একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। পিছু পিছু আনন্দবাজার। আমার মামা তো তো প্রায় অন্নজল ত্যাগ করার মতো অবস্থা। বাবা বললেন এও তো দীপক মৈত্রের মতো-ই হলো। বহুদিন আগে এই গায়ক একটি সফল রেকর্ড করে গত হয়েছিলেন। --------------------------------- আরো বয়স হতে "শ্রীমতী যে কাঁদে" গলায় তুলতে পারলুম কি না জানিনা। সি-শার্পে তার সপ্তকে ধৈবত পর্যন্ত যায় প্রথম বিস্তারটি। এলেম লাগে। ঐ রেঞ্জটি তার পরে শুনেছি শুধু মান্নাদার গলায় "ও মেরি জোহরা জবিঁ" আর " যখন কেউ আমাকে পাগল বলে"র মুখড়ার বিস্তারে। গানের চলনটি একেবারে মান্নাদার স্টাইল, কিন্তু স্কেল আর সুর লাগানো মানবেন্দ্রের ঘরের। একটা মাত্র রেকর্ড করে ঐ পর্যায়ের খ্যাতি এবং তার পর ট্র্যাজিক নায়কের প্রতি ভালোবাসা, বাংলার শ্রোতাসমাজ মলয় মুখোপাধ্যায়ের প্রতি উজাড় করে দিয়েছিলো। অবশ্য আরেকটা কথা বলা হলোনা । এখন যখন মলয় মুখোপাধ্যায়ের গান'দুটি শুনি, তখন মনে হয় মলয় তাঁর সমসাময়িক জটিলেশ্বরের ধরণটাই নিয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে রেকর্ড হওয়া " কে যেন আমার কানে কানে বলে গেলো" বা "পাগল হাওয়া"য় জটিলেশ্বরের ছাঁদটি যেন অবিকল মলয়ের গানের মধ্যে পাচ্ছি। --------------------------- সব পলাশই শেষ পর্যন্ত ফোটেনা। তবু বসন্ত এসেই যায়। প্রিয় কবির কয়েকটা শব্দ ছড়ানো থাক এখানে, 'অমিল পয়ার ছন্দে রচিত বসন্তকাল শেষ হয়ে এলো। পথের উপর আজ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম চারিপাশে মাঠ কালো কালো ধান গাছে ঢাকা আছে, এই সব সুমুদ্রিত ধানগাছগুলি আমার এ জীবনের বসন্তের অভিজ্ঞতা। .... আমার ভরসা এই প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে স্বভাবত কিছু রস ঝরে যাবে মাঝে মাঝে বসন্তসন্ধ্যায়।' (বিনয়)
দীপঙ্কর বসু
এক একটি গান হঠাৎ করে কেমন জানি পেয়ে বসে আমাকে । গানের শ্রোতাই বল , আর গাইয়ে বাজিয়েই বল,কম বেশি সবার ই এমনটা হয় মাঝে মাঝেই । ঘুরি ফিরি –সারাদিন সেই গান মনের মধ্যে একটানা বেজেই চলে । অনেক সময়ে দীর্ঘ দিন ধরে মগজে সে গানের কথাগুলি ,সুরের নানান বাঁক চোর হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে কোন এক অজানা রহস্য লোকের পানে । যেমন ,এখনি একটি গানের কথা মনে পড়ছে - “এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়” – কিশোর বয়সে গানটি আমাকে যে কি গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল সেই স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে আছে । গানটির অর্থ বোঝার বয়স সেটা ছিলনা ,এমনকি সুরের কারিকুরি , অথবা অলঙ্করণের কোন বৈশিষ্ট সচেতনভাবে চিহ্নিত করে উঠতে পারার ক্ষমতাও ছিল অনায়ত্ব । তবু – “দেহ মনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে গানের সুরে আমার মুক্তি উর্দ্ধে ভাসে” গানের অন্তরার এই অংশটি যেন কোন যাদু মন্ত্রে এক অজানা মুক্তির আস্বাদ এনে দিত – আমাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিত এক বিশালত্বের সামনে । কথাটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের শোনালো কি ? একটি এগারো কি বারো বছর বয়সী বালকের কাছে “বন্ধন” , “মুক্তি” ইত্যাদি শব্দগুলোর কি কোন বিশেষ তাৎপর্য থাকে ? আরো কয়েক বছর পরে স্কুলে একটু উঁচু ক্লাসে পড়েছি - ”অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ” মানে বই মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লাইনটার ব্যখ্যা লিখেছি বটে ,কিন্তু সত্যিই কি সেই ব্যখ্যা লাইনটির কোনও ব্যঞ্জনা আমার হৃদয়তন্ত্রীতে সাড়া জাগিয়েছিল ? উত্তরটা খুবই সোজা – জাগায়নি । কিন্তু গানের সুরে সেই মুক্তির একটা অস্ফুট আনন্দরূপ অমোঘভাবে প্রতিধ্বণি জাগিয়ে তুলত আমার সেই এগারো বারো বছর বয়েসেই । আবার , সঞ্চারীতে – “ দুঃখ বিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে” পঙক্তিটি সুরে উচ্চারণের মধ্যদিয়ে যেরোমাঞ্চ জাগত ,তাও ভোলার নয় । তার ষড়জ থেকে ধাপে ধাপে মধ্য সপ্তকের মধ্যম স্বরে নেমে আসা এবং সেই একই স্বরে তেওড়া তালের সাত মাত্রা স্থিত হওয়ার মধ্যে যে শুধু সুরের নাটকীয়তাই প্রকাশ পেয়েছে তাই নয় ,সুরের ওই সাতমাত্রাকালব্যপী মধ্যম স্বরে স্থিতি জাগতিক সুখ দুঃখ, আপদ বিপদকে জয় করবার দৃঢ সঙ্কল্প বুঝি বা নিকষকালো অন্ধকারের মধ্যে স্থির অচঞ্চল দীপশিখার ছবি হয়ে ধরা দিয়েছে মানসচক্ষে । অণৃতভাষনের দায় এড়াতে বলে রাখা ভাল যে সে বয়সে নিছক অনভিজ্ঞতার কারণেই রবীন্দ্রগানের বাণীর এই চিত্রে রূপান্তরের রহস্য স্পষ্টভাবে ধরা দেয়নি । তবে সেদিনের সেই রোমাঞ্চ ,সেই নিবিড় আনন্দ-অনুভুতি যে মিথ্যা ছিলনা ,সে কথা প্রত্যয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করতে আমার দ্বিধা নেই । বস্তুত জীবনের অনেকগুলি বছর রবীন্দ্র গানের নিবিড় সান্নিধ্যে বসবাস করার ফাঁকে কখন জানিনা অতি সঙ্গোপনে এ গানের বানী-ব্যঞ্জনা সুরের পাখায় ভর করে আমার চেতনার ঘাটে এসে পৌঁছেছিল। তারই আলোতে রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় । তাই খুব অবাক হই ,কিছুটা বেদনা বোধ ও জাগে যখন কেউ নিছক শ্রুতিসুখের খাতিরে বা বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখচেয়ে অথবা শতাব্দী প্রাচীন রবীন্দ্র গানকে আধুনিক যুগের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার মহান ব্রতে ব্রতী হয়ে রবীন্দ্রগানের সুর নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় মাতেন ।
কিকি
লং জার্নী ! এই নামে একটা পত্রিকা দেখে কিনে ফেলি | পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখি আমাদের অদিতি ভট্টচার্যের লেখা - সিংহ সদনে কিছুক্ষন - গির জাতীয় উদ্যানে ও অভয়ারন্য নিয়ে লেখা | সব সিংহের ব্যাপার-স্যাপার ! - সিংহ পরিবারের একটা ছবি আছে - দেওয়ার ইচ্ছে ছিল ! এখন আর হলো না | নামটা থেকেই বোঝা যায় - পর্যটনের খবর বেশ কিছু আছে | স্বল্প সময়ের ও দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণের জন্যে ! - পড়তে ভালই লাগে ! মনোজ
dalia mukherjee
বোসবাবুদের পাড়ায় তিনটে দুর্গাপূজো হচ্ছে। তিন ক্লাবেব তরফ থেকেই পূজোর চাঁদা চাওয়ার হিড়িক, বোসবাবুর ওপর জোড় জুলুম সব ই হয়েছে। ২০০ টাকার নীচে ব্যাটারা চাঁদা নেবেনা, বোসবাবুও ১০০ টাকার বেশী দেবেননা। পাড়ার ছেলেদের চোখরাঙ্গানী, জুলুম, শেষে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হল। সেই থেকেই বোসবাবুর মেজাজ খিঁচড়ে আছে। " কি দিনকাল এল, এ্যাঁ! মায়ের নাম করে ইচ্ছেমত চাঁদা দেবার ক্ষমতাও নেই! জোড় জবরদস্তির ব্যাপার হয়ে গেছে??' তার ওপর গিন্নির বায়নাক্কার ও শেষ নেই। মেয়ের এই বছর প্রথম বিয়ের বছর, প্রথম পূজো , তাই ভাল করে বিয়ের তত্ব করতেই হবে। ১০০০০ টি টাকা তো পূজোর বোনাস পেয়েছেন। মেয়ে জামাই, তার গুষ্টি গোত্তরকে পূজোয় দিতেই ৮০০০ বেড়িয়ে গেছে, মাত্র ২০০০ টাকা, গিন্নির ঘ্যান ঘ্যান, প্যানপ্যান আর সহ্য হচ্ছেনা বোসবাবুর।" মেয়ের বড়লোক শ্বশুরবাড়ি, তাদের সঙ্গে তুমি কি ছাপোসা মানুষ পাল্লা দিতে পারবে?"কিন্তু কে বোঝাবে? বলেনা, স্ত্রী বুদ্ধি, ভয়ংকরম। ওঃ, কি যে করবেন বোসবাবু ভেবে পাননা। গিন্নির মুখের সঙ্গে তো কোনদিন ই পাল্লা দিতে পারেননি। মনে হয়, এই পূজো গেলে যেন বাঁচেন। কোনমতে নিজের জমানো কিছু টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনে গিন্নির হাতে দিয়ে একটু শান্ত করতে পেরেছেন। আজ সপ্তমী, সেই সাতসকাল থেকেই মাইকে হিন্দি গান বাজছে। বোসগিন্নি অন্ধকার থাকতে থাকতেই উঠে পড়েছেন। বাড়িতে গোপাল আছেন, তাঁকে জল দিয়ে তারপর প্যান্ডেলে যেতে হবে পূজোর অঞ্জলী দিতে। স্নান সেরে বাগানে গিয়েই মাথা গরম হয়ে গেল বোসগিন্নির। " আ মল যা! হতচ্ছাড়ারা গাছের একটা ফুল ও রাখেনি গা! গোপালের পায়ে যে একটা ফুল দেব, সব তুলে নিয়েছে গা!'বোসবাবু বাইরে এসে গিন্নিকে বললেন, ' চিৎকার করে লাভ নেই গিন্নি, ওদের অ তো ফুলের দরকার।" তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন গিন্নি," তা তুমি বুড়ো ওঠতো সেই সাত সকালে, তুমি এই সময় একটু বাগানে বসে পাহাড়া দিতে পারনা??" " ওরে বাবা গিন্নি! তাহলে আমাকে আর স্বশরীরে আমাকে এখানে দেখতে পেতেনা। এতক্ষনে স্বর্গে পৌঁছে গেছি দেখতে। আজকালকার এই ছোঁড়াদের কিছু না বললেই তারা আগে হাত পা দিয়ে কাজ সারবে, তারপর যা করার তুমি কর। " গিন্নি গজগজ করতে করতেই যা দু একটা ফুল বাগানে ছিল, তুলে নিয়ে ঠাকুর ঘরের দিকে রওনা দিলেন, কর্তাকে তাড়া দিয়ে গেলেন, স্নান করে তৈ্রি হবার জন্যে। সকাল ৮ টা থেকে মাইকে ঘোষণা শুরু হল, " মাসীমা, দিদিরা, আসুন তাড়াতাড়ি, অঞ্জলী শুরু হচ্ছে।" বোসগিন্নির মাথায় আবার জ্বলল আগুন, " পোড়ারমুখো পুরুতের কি ক্ষিদে পেয়েছে গা! বলি বেলা ১১ টার আগে তো কখনোই অঞ্জলী শুরু হয়না, এবারে ৮ টার মধ্যেই অঞ্জলীর জন্যে তাড়া পড়ে গেছে গা! " যাইহোক, গোপাল তো জলখাবার খেয়েছেন, নতুন কাপড়খানা পড়ে , পূজোর থালা হাতে নিয়ে কর্তা গিন্নি চললেন প্যান্ডেলের দিকে। সেখানে গিয়ে তো আর একপ্রস্থ খাবি খাওয়ার পালা বোসগিন্নির। " বলি পুরুতের আসনে বসে আছে ওটা আমাদের ন্যাপলা না!!" পাড়ার একটি ছেলে এসে থামাতে যায়," মাসীমা, বেশী চেঁচাবেন না, আমাদের পুরুত মশাইকে ও পাড়ার ছেলেরা মেরে ধরে নিজেদের পাড়ায় নিয়ে গেছে, অন্য পুরুত পাওয়া গেলনা, তাই ন্যাপলাকে এনে বসিয়েছি।" বোসগিন্নির ভির্মি খাবার জোগার, কোনমতে চেঁচিয়ে উঠলেন," তা বামুন পেলিনা হতচ্ছাড়ার দল? ন্যাপলা কোন কায়েতের ছেলে, তাকে বসালি পুরুতের আসনে? বলি কলি কি শেষ হতে চলেছে??আমিষ খাওয়া কায়েতকে বানালি বামুন? তা ও মন্ত্রর কি জানে শুনি?" " ও মাসীমা, ও তো আর মন্ত্র পড়বেনা, মন্ত্র পড়া হবে ক্যাসেটে। " " সেটা আবার কি জিনিস হতচ্ছাড়ার দল।" "আরে মাসীমা সেকালের লোক, ক্যাসেট বুঝবেননা, বল রেডিও।" ফোরণ কাটল ওপাশ থেকে আর একটি ছেলে। মাসীমার চেঁচানি আর থামেনা, " বলি রেডিওতে মন্ত্র পড়বে স্বয়ং মা দূর্গার, আর ন্যাপলা পূজোর আসনে বসে ছ্যাবলামি করবে? বলি পূজো নিয়ে ছেলেখেলা নাকি? তোদের যে নরকেও ঢুকতে দেবে না রে!" ওদিক থেকে ন্যাপলা বলে ওঠে," তা না দিক মাসীমা, এখনকার মত কাজ উদ্ধার তো হল। পুরুতটাকে জবরদস্ত পিটিয়েছে ও পাড়ার ছেলেরা, বেচারার মুখে কালসিটে পড়ে গেছে, আমিও বহুৎ জোড় বেঁচে গেছি মার খেতে খেতে। পালিয়ে তবে বেঁচেছি।
শিবাংশু
গত ঊনচল্লিশ বছর কোনও জায়গায় টানা তিন-চার বছরের বেশি থাকিনি। কোথাও আঠা শুকোতে পায়নি।সারা দেশই আমার বাড়ি। মাঝে মাঝে ফিরে এসেছি জামশেদপুর, আবার উড়ে গেছি অচিরেই অন্য কোনও ঠিকানায়। কাছে, দূরে। কিন্তু জামশেদপুরই তো আমাদের বারাণসী, সুবর্ণরেখাই আমাদের গঙ্গা। থাকি না থাকি, ফিরে যাওয়া মানেই তো জামশেদপুর। জন্ম, ধর্ম, বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধুবান্ধব, সংক্ষেপে ঈশ্বর-পৃথিবী-ভালোবাসা সবই তো টাটাবাবার শহর। আমার বেড়ে ওঠার সাতাশ বছর যে কোম্পানি কুঁড়েঘরে। যার প্রতিটা ইঁটের সঙ্গে আত্মীয়তা ছিলো সুগভীর। তা এখন ধূলিসাৎ হয়ে বড়ো রাস্তা। শুধু উঠোনের আমগাছটা এখনো দাঁড়িয়ে। ঐ কাঠা দুই তো উপেনের ছিলোনা কোনওদিন। তাই বাবুও কিছু বলার প্রয়োজন বোঝেননি। আজ শুনলুম টিনপ্লেট গলফ মাঠ থেকে শুরু হওয়া তারকোম্পানি পর্যন্ত যে নিলডি'র ছায়াবীথি। দুপাশে বনস্পতির টানা সানসেট ব্যুলেভার্ড। বট, অশথ, গামার, শাল, মহুয়া, কৃষ্ণচূড়া, কদম, সব গাছ। তাদের প্রাচীন বল্কলে বেড়ে ওঠা গরিব আত্মীয়দের মতো স্যাপ্রোফাইট, পরজীবী উদ্ভিদের সলজ্জ সংসার, সব কাটা গেছে। প্রাচীন মহীরুহদের মৃতদেহগুলি পিরামিডের মতো সাজানো রাস্তার দুদিকে। ভাবতে পারিনা। -------------------------------------------- রাস্তা হবে, উন্নয়ন? গাড়ির জন্য জায়গা করে দেওয়া? কতো বাস্তববাদী প্রশাসন আমাদের। একটু কম হলে কী ক্ষতি হতো? উপেনের বাড়ির রাস্তাটা এতো অচেনা হয়ে যেতোনা। আমাদের সাইকেলের শহর, চড়াই রাস্তায় হাঁপানো, নামো রাস্তায় গড়গড়িয়ে উড়ে যাওয়া। ঘুরে ঘুরে ওড়া বটফল, ম-ম কদমফুলের সোঁদা বিকেল। দূর থেকে দেখি মেঘ উড়ে আসছে নিলডি'র ওপার থেকে, গোলমুড়ি ক্লাবের আঙিনায় আকাশছোঁয়া শালবীথির মাথা ছুঁয়ে, গলফ মাঠ পেরিয়ে ঝুমুর ঝুমুর জল ঝরাতে ঝরাতে মেঘ উড়ে গেলো। নামডি বস্তির হাই টেনশন তারের গ্রিড ভিজিয়ে উড়ে গেলো দখিন গ্রামে বার্মা মাইনসের গুডস ইয়ার্ড। --------------------------- আমরা তো বিভূতিভূষণ নই। আমাদের মেশিনের শহর, মিস্ত্রির শহর। জন্ম থেকে দেখি মেশিনের মধ্যে মানুষ, মানুষের মধ্যে মেশিন। পুরোনো অভ্যেস। বয়লারশপের গ্রীষ্ম, ফাউন্ড্রির তপ্ত বৈশাখ, পৌষের শেষরাতে পথে পথে শীতকাঁপুনির এ-শিফট। আমরা তো জানতুম মেশিন কুসুমের থেকে ভালো। অনেক কাছের। তার মন আছে। তার কোনও ঝগড়া ছিলো না ঐ শাল, শিরিস, অশথ, কদমের সঙ্গে। তাদের ফুলের সঙ্গে, তাদের ফলের সঙ্গে, তাদের না ফোটা কুঁড়ির সঙ্গে, তার নীচে হেঁটে যাওয়া, আমাদের না বলা কথাগুলির সঙ্গে। -------------------------------- এটা কী নষ্টোলজি? পদ্যওয়ালার বাতিক? পরিবেশের রাজনীতি? না নিষ্কম্মার নিরর্থক জাবর কাটা। যে যাই বলুক, আমি তো একেই উপেনের শাশ্বত হাহাকার বলে জানি।
মনোজ ভট্টাচার্য
নাটক-সিনেমা তো বিনোদন মাত্র ! যাবেন দেখবেন এবং হলের বাইরে এসেই ভুলে যাবেন ! ব্যস ! – কিন্তু কই - কিছু কিছু থিয়েটার বা সিনেমা দেখে তো ভুলে যাওয়া যায় না ! – নিজে অনুধাবন করার চেষ্টা করি – অন্যকে বলার চেষ্টা করি ! - কেন? আসলে কিছু কিছু মানুষ আছেন – যারা বিনোদনের মাধ্যমকে মানুষের ভাবনাকে নাড়াতে ভালবাসেন ! মানুষকে কিছু দিতে চান – কিছু নতুন করে চিন্তা করার বস্তু ! মায়ামৃদঙ্গ – এমনই একটা সিনেমা ! সিনেমা বলতে আমার দ্বিধা হচ্ছে ! এটা যেন একটা নাটক – সেলুলয়েডের ওপর প্রান্তিক বাংলার একটা বাস্তবায়িত নাটক ! কিছু পোস্টার দেখে মনে হয় – আরেকটা সমকামী নাটক ! সচরাচর যা হয় আরকি ! দেখতে শুরু হওয়ার সময়েও তাই মনে হয় ! তা নয়ত আলকাপ গানের দলের এক সর্দারের দু দুটো বৌ থাকা সত্ত্বেও কেন তারই হাতে গড়া এক মেয়ে সাজা ছেলেকে কেন অন্তরঙ্গ দৃশ্যে দেখানো হয় ! কেনই বা তার সুন্দরী স্ত্রীর প্রশ্ন হয় – কি এই ছেলেটার মধ্যে আছে – যা তার মধ্যে নেই ! সেই প্রশ্নটাই – একটা গোটা সিনেমা জুড়ে বেজে চলেছে ! মায়া ! পৃথিবীতে শুধু মায়াই বোধয় দীর্ঘস্থায়ী ! মায়ার বাজন, মায়ার বাঁধন – সমস্ত প্রচলিত যৌনতা, ঘর সংসার ভেঙ্গে স্থায়ি হয়ে থাকে জীবনে ! আমার খুব প্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা সিরাজের উপন্যাস – বাংলার প্রান্তিক গানের দলের সর্দারের এক অদ্ভুত সম্পর্ক নিয়ে ! এক আলকাপ গানের দলের মালিক ঝাকসু সর্দার – একটি সুশ্রী ছেলেকে মেয়ের মতন করে বড় করেছে । দলের গানের দোহার বা নাচের মেয়ে হিসেবে উপযুক্ত । তার নাচ দেখে বা অঙ্গভঙ্গি দেখে সবাই তার প্রতি আকৃষ্ট হয় । অন্যের লোলুপতার হাত থেকে বাঁচিয়ে শান্তি নামের ছেলেটিকে সযত্নে নিজের কাছে দলের অন্যে সুশিক্ষিত করে তোলে । - সুন্দরী স্ত্রী পর্যন্ত ছেলেটিকে হিংসে করে । কি আছে এই ছেলেটির মধ্যে – যার জন্যে স্বামী শুধু এই ছেলেটির কাছেই পড়ে থাকে ও আগলে রাখে ! এই হিংসে নিয়েই – এক রাত্তিরে ছেলেটিকে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে জোর করে যৌন কামনা মেটাতে চায় । ঝাকসুর আগমনের ফলে – ছেলেটি লজ্জায় ও অপরাধবোধে পালিয়ে যায় । পালিয়ে যায় – ওদের জীবন থেকে । এইখানে শুরু হয় ঝাকসুর বিয়োগান্ত জীবন ! তার গান বন্ধ হয়, দলও বন্ধও করে দেয় ও সেই স্ত্রীও মারা যায় । - ঠিক এই পর্যায় এসে – মনে হল সেলুলয়েড থেকে ছাড়া পাওয়া - নাটকের দৃশ্য নেমে এসেছে ! যেমন দেব শঙ্কর তেমনি গৌতম হালদার ! এইখানে মনে হল – শেক্সপেরিয়ান ট্র্যাজেডি ! এরপরেও আরও একটা বিয়োগান্ত ঘটনা থেকে আরেকজন গানের মাস্টারের আবির্ভাব হয়েছে । এবং শেষ পর্যন্ত এই গানের ধারাটিও বজায় রাখা হয়েছে ! লক্ষণীয় হল – সমস্ত সিনেমাটা হয়েছে বাইরে বাইরে । শুধু গ্রামীন গানের আসর । খুব সুন্দরভাবে প্রকৃতিকে ব্যবহার করা হয়েছে ! - গান খুবই সুন্দর । যেটা আমার অবাক লেগেছে – সকালের উজ্জ্বল দৃশ্যের চেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে সন্ধ্যের আলো-আধারি পরিবেশ ! – এটা কি ট্র্যাজেডির রং ! তবে রাজা সেনের গাটস আছে বৈকি ! শুধু নাট্য-ব্যক্তিত্ব দিয়ে পুরো একটা সিনেমা করা ! - কোনও যৌনতা নেই – শুধু আভাষ ! বাংলা সিনেমা দেখতে হলে – এরকম সিনেমাই কাম্য ! মনোজ
Somen dey
শ্রীজাত ক্রমশ যে ভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বা ছড়িয়ে যাচ্ছেন তাতে অচিরেই তাঁর একজন বড় সড় কাল্ট ফিগার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ।বঙ্গদেশের এই গোলমেলে সময় একজন বাঙালি কবি যদি গিমিক চটক বা অন্য কোনো চাতুরীর আশ্রয় না করে শুধু কলম কে অস্ত্র করে এক জন কাল্ট ফিগার হয়ে উঠতে পারেন তা হলে সেটা তো একটা বড় স্বান্তনার জায়গা হওয়ার কথা ।মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে এই সময়ের জনপ্রিয়তার নিরিখে তিনি তার সমসাময়িকদের এবং অনেক অগ্রপথিকদেরও যে অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছেন এটা স্বীকার করে নিতেই হবে । খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং জয় গোস্বামী দুজনেই লেখালেখির জগতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন । কিন্তু ওঁদের দুজনেরই এই জায়গাটায় পৌঁছানোর পিছনে একটা দীর্ঘ চড়াই উতরাইয়ের যাত্রাপথ আছে । কয়েক হাজার পৃষ্ঠার পরিক্রমণ আছে। কল্পনাসুন্দরীর পদতলে অনেকটা আয়ুস্কাল বলিদান দেওয়া আছে । সৃজনপ্রতিভার বিশালত্বর সঙ্গে জনপ্রিয়তার সম্পর্ক যে সব সময় হাত আর দস্তানার মতই হয় না এ কথাটা বোধহয় নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই ।এই দুজনের প্রথম গুণটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই । সেই সঙ্গে এঁদের জনপ্রিয়তার মাত্রা বোঝাতে বলা যেতেই পারে এঁরাও রাস্তায় বেরোলে ভক্তদের দ্বারা মবডও হয়ে যেতেন ( জয় এখনও হয়ে যান কিনা জানা নেই )। এটাও নিশ্চয় যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের জন্যে অনেক বড় পাওয়া । শ্রীজাত এই সময়ের কবি । এই সময়ের স্নায়ুতন্ত্রকে সঠিক ভাবে বুঝতে পেরেছে ।পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্যে সাদা সাদা পাতার উপরে কালো কালো অক্ষর গুলোই যে একমাত্র অবলম্বন নয় এটা বুঝতে তার দেরি হয় নি ।একজন কবির পক্ষেও যে ইলেক্ট্রনিক মেডিয়াকে কি ভাবে কাজে লাগানো যায় সেটার একটা চমৎকার উদাহরণ সে হয়ে উঠেছে । তাই শ্রীজাত যা পাচ্ছে , তা বোধহয় এই বাংলার কোনো কবি বা লেখকের পাওয়া হয়ে ওঠেনি । ফেসবুকে তার প্রতিটি পোস্ট পড়বার সঙ্গে সঙ্গে দুই থেকে চার হাজার লাইক পড়ে যাচ্ছে।ফেসবুকে তার ছোটো ছোটো গদ্য গুলি অভূতপুর্ব সাড়া পাচ্ছে । আশে পাশে দেখা মানুষ বা ছোট খাটো কোনো ঘটনা একটু অন্যরকম ভাবে দেখা এবং তা নিয়ে ঝরঝরে ভাষায় লেখা গুলি সবাই আগ্রহ নিয়ে পড়ছে ।লেখা গুলো নীললোহিতের ‘চোখের সামনে’ সিরিজের লেখাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর তার ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ তো ফেনোমেনাল হয়ে উঠেছে । প্রত্যেক কবিতা এক একটা সনেট । কিন্তু সেটা বড় কথা না । এই কবিতা গুলো তে শেষের লাইনের এমন কিছু থাকছে , যা পাঠকের মনে একটা জোরালো অভিঘাত তৈরি করতে পারছে । হয়ত তাৎক্ষনিক । তবুও কখনো আলতো কখনো বা জোরে ঘা দিচ্ছে পাঠকের মননে এবং ঘুমন্ত বিবেকে । পাঠকের মধ্যে তারাও আছেন যারা সহজে অন্য কবিতার আশে পাশে যান না । কিছু পংত্তি যে গুলো এখানে সেখানে মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে , কিছু আবার সোশাল মেডিয়াতে ‘ভাইরাল’ হয়ে উঠছে , সে রকম কিছু ঝড় তোলা লাইন তুলে দিচ্ছি – যে এখনো ভেবে দেখছো পথে নামবে কি না আমি তার মনুষ্যত্ব স্বীকার করিনা মতে মিললে চিরসখা ,অন্যথায় ফাঁসি এ যদি বিশ্বাস হয় আমি অবিশ্বাসী আগে সেই বাড়ি থেকে নিয়ে এসো চাল যে বাড়িতে কোনো হত্যা হয়ন গতকাল অতও নির্লজ্জ নয় মাথার বাসনা কাটা গেলে যাবে । তবু নোয়াতে পারবো না আজও বেঁচে আছি কাল হয়ত লাশ আমি তবু লিখে যাবো আমার বিশ্বাস মানুষ থেকেই মানুষ আসে । বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায় আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় যারা ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ র সনেট গুলি এখনো পড়েন নি কিন্তু এই লাইন গুলি পড়ে সেগুলি পড়তে আগ্রহী হচ্ছেন তারা খুঁজে পেতে পরে নিতে পারেন । ***** এ পর্যন্ত যা লিখলাম তা একটি ভুমিকা মাত্র । এবার যা বলতে চাইছি , সেইটা আসল ভয়ের জায়গা আর সেই জন্যেই এই লেখা । এ সব লেখা পড়ে এবং ব্যাক্তিগত ভাবে তার কিছু আচরণ দেখে বা শুনে ,যেমন প্রবল চাপের মুখেও সরকারী পুরস্কার নিতে অস্বীকার করা , এ সব জেনে আমাদের আস্থা জন্মেছিল এই তরুণ কবির শিরদাঁড়ায় । মনে হয়েছিল তিনি শঙ্খ ঘোষের কাছ থেকে নিয়ে নেবেন ব্যাটন । কিন্তু কাল একটি ইংরেজী সংবাদ পত্রে প্রকাশিত খবরে জানলাম শ্রীজাত সরকারী দলের ভোটের প্রচারের জন্যে গান লিখে দিচ্ছে । গানটিতে ঠিক কি লেখা হয়েছে তা এখনো জানা হয় নি । শ্রীজাত কৈফিয়ৎ দিয়েছে এটা তার প্রোফেশনাল লিরিসিস্ট হিসেবে একটি কাজ মাত্র । অন্য কিছুই বলব না শুধু বলতে চাই - বাজারেও সন্ধে নামে... পসরা, খরিদ, সব সারা... বাড়ি ফিরে ভেবে দেখো, তোমাকে বিচার করে কারা ? এটি ১০ই মার্চ তারিখে শ্রীজাতরই লেখা একটি পোস্ট । আমি শুধু শেষে পুর্ণচ্ছেদ এর জায়গায় একটি জিজ্ঞাসার চীহ্ন জুড়ে দিলাম ।
শিবাংশু
বসন্ত কীভাবে আসে ? --------------------------------- তা বসন্ত নিয়ে তো অনেক কিছুই তো লিখেছি, বার বার। কবে লেখা 'বসন্তের ভিসা পাসপোর্ট' লেখাটি নিয়ে এখনও কোন কোনও বন্ধু তাঁদের ভালো লাগা জানিয়ে যান। এ সব দেখে বলা যায়, ভালোবেসে দেখিয়াছি বসন্তঋতুরে, দূরে গিয়ে দেখিয়াছি বসন্তঋতুরে, ঘৃণা করে.... না ঘৃণা করে দেখি নাই বসন্তঋতুরে, কোনওদিন। তবু সে মাথার চারিপাশে ..... -------------------------------------- যদিও আমার প্রিয় ঋতু বর্ষা, আমার জন্মঋতুও বটে, অনেক বেশি লেখা আদায় করেছে আমার থেকে, অনেক বেশি আনন্দ আর আত্মীয়তাও অনুভব করি তার সঙ্গে। কিন্তু বসন্তের প্রতি অন্য টান। বহুদিন আগে একটি বিবাহের আমন্ত্রণলিপি পাঠিয়েছিলুম বন্ধুদের। যার উপরে লেখা ছিলো শুধু, " ...সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি কোনও এক বসন্তের রাতে...." কেউ বুঝেছিলেন। কেউ জিগিয়েছিলেন, তোর উড বি বৌয়ের নাম কি 'সবিতা'। যখন বলি, 'না'। তখন কেউ কেউ সাবধান করে দেন, দেখিস, সব কিছু নিয়ে পাকামি করিস না। এসব সবিতাটবিতাদের নিয়ে কাব্য করতে গিয়ে হততড় সে ফেঁসে যাবি। বৌ জান কেরোসিন করে দেবে। ভাবি, 'সবিতা' থাকুক না থাকুক, বসন্ত আসুক না আসুক, আমাদের জীবনে কেরোসিনের বিপুল ভূমিকা, রেশনকার্ডের তোয়াক্কা করেনা। ---------------------------------------- সেই কোন কাল থেকে কবিশিল্পীরা বসন্তঋতুর গুণগান গেয়ে গেছেন। জানিনা এন্ডোক্রিনোলজিস্টরা এই নিয়ে কী বলেছেন, তবে হর্মোন তো নিশ্চয় তার ভূমিকা যথাযথ পালন করে যায়। প্রাণ উতল তো হয় সবারই, মনও ভাসে এপার ওপার। ফুল ফোটে অনন্ত উৎসাহে, আবির ওড়ে, আশ্লেষ জাগে, আসক্তি বেড়ে ওঠে রক্তমাংসে। বর্ষার আসার পদধ্বনি শোনা যায়। বসন্ত আসে শব্দহীন, মুখচোরা কিশোরীর মতো। ফিরে যায়, ফিরে ফিরে চায়। রুদ্রপলাশ, অর্ঘপলাশ, রক্তশিমুল, শুকনো পাতা ঝরে পড়ার শব্দভাসান। --------------------------------------- এক কুড়ি বারো.... খুব একটা অল্প সময় নয়। তবু তেমন লম্বা তো লাগেনা। জিন্দগি বড়ি হোনি চাহিয়ে.....ইত্যাদি। বহিরঙ্গে ব্যতিক্রম বলতে একজন সিঁদুর পরা শুরু করেছিলেন, অন্যজনের জন্য ছিলো পিলিয়নে একজন স্থায়ী সওয়ার। অর্থকে নিরর্থক মনে হওয়ার দিন ফুরিয়েছিলো। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সময় মানে শুধু বালিয়াড়ির উপর টায়ারের দাগ, রাতের জোয়ার এসে আবার নতুন জমি তৈরি করে দেয়, রোজ। ------------------------------------- দিনগুলো ঝরে পড়ে হলুদ পাতার মতন। আবার একটা ১০ই মার্চ, শেষ ফাল্গুনে সাজানো কচি পাতার চালচিত্র। আবার বসন্তে সেই নিরন্তর আকুলতার বাউল গান, -সেই ডালে ফুল ফুটলো কি গো, ওগো কও ফুটলো কতো? চলো, জিত হি লেঙ্গে বাজি হম তুম.....
James
এই কদিন আগের কথা‚ সঠিক বলতে হলে পনেরো ই ফেব্রুয়ারী তার জন্মদিন| ভ্যালেন্টাইন দিবসের ঠিক আগে| জন্মদিন নিয়ে অবশ্য কোনদিনই আদিখ্যেতা ছিল না‚ না আমাদের বাড়ীতে‚ না তাদের বাড়ীতে (এটা পরে জেনেছি)| আমাদের মানে গ্রামের বাড়ীতে‚ আসলে জন্মদিন হতো মহাত্মাদের‚ ইস্কুল ছুটি থাকতো‚ কি কারণে মহৎ কে জানে! এত গণ্ডা দশক পেরিয়েও আনতি পারলাম না সেই কার্য্য কারণ! আর জেনেও দরকার কি‚ শুধু শুধু অবশিষ্ট ব্রেন সেল গুলোকে ভারাক্রান্ত করা| তার ওপর অমুক তারিখ ই যে সঠিক দিন‚ কে বলেছে? বাপ‚ দাদা বা কাকা ইস্কুলে মাষ্টারের কাছে ভর্তি করবার সময় আন্দাজে একটা তারিখ দিয়ে দেন‚ ব্য়স সেটাই হয়ে গেল | তো‚ আজকাল অন্যদের দেখে শুনে একটু তো ভান করতেই হয়‚ বিশেষ করে তার অফিসে লোকজন মনে করে কেক আনে‚ সেটাই চালু প্রথা| সেদিন সকালে আমি দেরীতে উঠেছি‚ তার আবার আর্লি শিফ্ট‚ বেরিয়ে গেছেন; আমার তো ফ্লেক্সি টাইম‚ যখন খুশী গেলেই হলো‚ মানে সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্য়ে সাতটা এই স্লটে ৭:২১ মিনিট কাজ করলেই হলো| আসলে কাজের মাপ সময়ে নয় আউটপুটে| এইরকম শিফ্ট পড়লে আর আমি যদি দেরীতে ফিরি‚ তাহলে দিনের পর দিন যোগাযোগ ডাইনিং টেবিলে রাখা‚ চাপা দেওয়া চিট এর মাধ্যমে| নাহ‚ ফোনে বা ইমেল ক্যালেন্ডারে রিমাইন্ডার রাখিনা কারুর জন্মদিনের‚ বার্ষিকীর| এমনিতে যদি মনে না থাকলো তাহলে মনে না থাকলেই ভাল! আর একটা দিন অন্যদিনের থেকে কি এমন আলাদা? মানে আমার মতে পুরো ব্যাপারটাই আস্ত ঢপ| শুধু লোক দেখানো| হাসপাতালে অসুস্থ পরিজন বন্ধুকে দেখতে গিয়ে লোকে যেমন খোশগল্পে মাতে! প্রসঙ্গে ফিরে আসি| সন্ধ্যেবেলা ফেরবার সময় ভাবলাম কিছু একটা নিয়ে যাই| কিছু একটা‚ কিন্তু কি? পুষ্পস্তবক- ধ্যুস‚ পুষ্প ছাড়া আল ফাল পাতা নাতা ঘাস দিয়ে একটা কিম্ভুতকিমাকার মাল‚ একদিন বাদেই ঝরে পড়ে কার্পেট নষ্ট করবে| ইয়াহ‚ খাবার জিনিষ কিছু নিয়ে গেলে কেমন হয়? ইউরেকা| কিন্তু কি নিয়ে যাই‚ মিলিয়ন পাউন্ড কোশ্চেন| চিকেন টিক্কা- "ঘাসের বড়ায় বরঞ্চ বেশী স্বাদ |" এদিক সেদিক করতে গিয়ে শেষ অবধি ম্যাকডোনাল্ড থেকে এক পীস আপেল পাই‚ তিনি ওটা পছন্দ করেন| তাই সই‚ গচ্চা মাত্র এক পাউন্ড! ভাল করে ডবল ঠোঙ্গায় মুড়ে গাড়ীর পেছনে ডবল ওয়াল বাক্সে‚ যাতে করে বাড়ী পৌঁছুনো অবধি গরম থাকে| তিনি খুউব খুশী হলেন‚ 'দাদাগিরি'র সাথে গরম গরম আপেল পাই! আগে ছিল সামর্থ্যের অকুলান‚ এখন হজম শক্তির! (ফিরে পাওয়া লেখা-Courtesy: অ্যাডমিন | ভাবা যায়! বালা হলে সাতদিন হত্যে দিয়েও সম্পাদকের দেখা মিলতো না! তার ওপর‚ 'নেবেন নেবেন‚ না নেবেন attitude)
মনোজ ভট্টাচার্য
সেদিন উদয় সদনে ! যখন আমাদের ট্যাক্সিটা উদয়-সদনএ দাঁড়ালো – সেদিন এক ভদ্রলোক বললেন – এখানে বর-বউয়ের গাড়ি দাঁড়াবে – আপনারা পেছিয়ে নিন । আমার কিরকম মনে হল – বর তো সামনে দাঁড়িয়ে – তাহলে সরতে বলছে কেন ! গাড়ি রেখে যখন প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতে তিনিই আবার জিজ্ঞেস করলেন – আপনারা ! কিরকম ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে বললাম – সোমা - ! ও, আপনারা সোমার বন্ধু । - আমার নাম মনোজ - ! আরে হ্যাঁ হ্যাঁ – আপনাকে তো আমি চিনি ! এত আপনার নাম শুনেছি ! – আমি ওর স্বামী ! আপনারা ভেতরে বসুন । তখন আমি চিন্তায় – কোথায় দেখেছি এনাকে ! সিনেমায় নাকি সিরিয়ালে ! বরুন চন্দের মতো ! – এত সুন্দর কন্দর্পকান্তি সুপুরুষ ! আমজনতার ভীড়েও যাকে চিনে নেওয়া যায় ! ভেতরে গিয়ে দেখি সন্দর্পন-চন্দ্রিমার ফটো সেশান চলছে । বেশ একা একাই অন্তরঙ্গ-মুহূর্ত কাটাতে চাইছিল । আমরা কিরকম রসভঙ্গ করলাম । পকেট থেকে ছোটো ক্যামেরা বার করে ফটোগ্রাফার সেজে গেলাম । - আরও একজন ওখানে ছিল – আগেই আমার চেনা উচিৎ ছিল – সে হল অর্জমা । ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা যেন কোনও মন্দিরের গায়ে আঁকা কোন চরিত্র ! আমার মনে কিন্তু তখনো পুরনো চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছে । এত কন্দর্পকান্তি চেহারা নিয়েও সোমা-আনন্দ হয়ে আছেন ! ইশস ! এই চেহারার কাছাকাছি হলেও আমরা কিছু-মিছু করে দেখাতে পারতাম ! এক অনিচ্ছাকৃত ভুলের অপরাধে যাবজ্জীবন কয়েদ ! ইয়ে তো না-ইনসাফি ! - অথচ রাজা যযাতি – নিজের পুত্রের কাছ থেকে যৌবন ধার নিতে দ্বিধা করেন নি ! এই চিন্তাটা অবশ্য ভেঙ্গেছিল পরে – সোমা সুন্দরী যখন কক্ষে আবির্ভূত হলেন ! কক্ষটা কিরকম ঝলমল করে উঠল । তখন দেখলাম – না ! ঠিকই আছে ! সুন্দরের ঘরে সুন্দরীই মানায় ! – সেদিন পুরো সন্ধ্যেটাই হাইজ্যাক করে নিল সোমা ! ক্রমশ একে একে সবাই আসতে লাগলো । একটা কথা না লিখে পারা যায় না ! মহিলাদের সৌন্দর্য দেখতে হলে – বিয়েবাড়ি হচ্ছে আসল স্বর্গ ! – বর-বৌ তো সুন্দর বটেই ! তাদের মা-বাবা আরও সুন্দর ! কিন্তু আর যেসব মেয়েরা এসেছিলেন – শাড়ি-গয়নায় – হাস্য-কলরোলে - সুন্দরতর ! কেন জানি আমার মনে হয় মেয়েরা তাদের সৌন্দর্যের ডালি ওই একদিনই বোধয় উজাড় করে দেয় – দর্শন-পিয়াসীদের জন্যে ! আর ওই একদিনই মেয়েদের বয়েস স্থির হয়ে - সময়কে স্তব্ধ করে রাখে ! তখনই মনে হয় – আমরা বলি বটে – পুরুষরা সুন্দর প্রানীদের মধ্যে ! কিন্তু সত্যি কি তাই ! এত সুন্দর বৈভবের মাঝে নিজেদের অকিঞ্চিৎকর মনে হয় নাকি ! আসরে কে আগে এসেছে কে পরে এসেছে – সেসব আর মনে নেই । শুধু দেখেছি এক একজন ঢুকছেন – শাড়ি ঝলমল করিয়ে অলঙ্কার চমকিয়ে – হাসিতে মুক্ত ঝরিয়ে ! আমার গেঁয়ো অবাক করা ভাবটাকে দমন করে চেনার চেষ্টা করি ! আরে ! আমি তো চিনি উহারে – দেখিয়াছি গড়িয়াহাটার মোড়ে ! মনে পড়ে রুবি রায় ! - কেউ কেউ দেখলাম অভিযোগ করেছে – আমি নাকি স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দিই নি ! - হতেও পারে – সেই মুহূর্তে কি আমি সেস্থানে ছিলাম ! সবার কথাই বলা উচিৎ আমার ! খাবার-দাবার এপিটাইজার থেকে মেন কোর্স – মায় পান পর্যন্ত কিছু লেখা উচিৎ ! কিন্তু সেগুলো সবই মামুলি ! কি আর লিখবো ! দেখা হল এক আবির চ্যাটার্জির সঙ্গে ! হতেই পারে - শিল্পীর বাড়ি – আসতেই পারে আবির ! কিন্তু না – তিনি আবির নন । আমাদের চির মজলিশী-আড্ডাধারী – অরিন্দম চক্রবর্তী – এক নম্বর ! চিনতে পেরেই তো আগে অভিযোগ – আপনারা স্টেশনের ফ্ল্যাটফরমে রাত কাটিয়েছেন ! ভাবখানা যেন ফ্ল্যাটফরমের ভাড়া দেন নি কেন ! আমি তাড়াতাড়ি স্ত্রীর দিকে দেখিয়ে দিলাম ! তারপর আলাপ হল – নানান বিষয় নিয়ে । লেগে গেল দীপঙ্করবাবুর সঙ্গে তর্ক ! আমি এসবের মধ্যে নেই ! একে জানি কম – বুঝি আরও কম ! এদের সঙ্গে তর্ক করে ফাঁসি আরকি ! – ও, প্রায় ভুলেই মেরে দিচ্ছিলাম – আরেক বেচারা শিশিরবাবুর সঙ্গে দেখা হল । প্রায় আমার মতোই স্ত্রীর পাশে ভয়ে ভয়ে বসেই রইলেন ! বেশি কথাও বলা বারন – ডালিয়ার কড়া নির্দেশ ! অনেকে বয়স্ক লোকেদের সঙ্গে স্ত্রীদের পরিচয় করান না - নিশ্চয় কোনও কারন আছে । কিন্তু তার ছেলের সাথে আলাপ করিয়ে দেওয়ার কারণটা কি - ধরতে পারিনি । তবে ফিরবার সময়ে মনে হল - এই যা কিছু তো বলা হল না ! সন্ধ্যা যত সুন্দরই হোক – যত সুন্দরীদেরই সমাগম হোক - সময় তো ঢলে পরে রাতের কোলে ! দূরত্বও কম নয় ! এই দক্ষিণতর প্রদেশ থেকে একেবারে উত্তরোত্তর দেশে ! নব দম্পতির দিন ক্রমশ সুন্দর থেকে সুন্দরতর হবে ! – সোমা ও সোমা-আনন্দের স্মৃতি থেকে এদিন হয়ত ধূসর হয়ে যাবে । কিন্তু আমাদের কাছে এই দিনটার মানে থেকে যাবে একটা বিরাট অর্থবহ হয়ে ! সুখকর সন্ধ্যে তো আসে না ঘন ঘন ! মনোজ
জল
এখনো পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে :- ১ম পর্ব :- জল জনৈকা কলেজপড়ুয়া একটি মেয়েকে দেখে মনসুরের মন উতলা হয়| ঘটনাচক্রে সে মনসুরের দোকানেই বৃষ্টির দরুন আশ্রয় নেয় ও একই সাথে মনসুরের মনও নেয়| ২য় পর্ব :- ঝড় রিণি আর মিনি দুই বোন| মিনি বড়| মা-বাবার মৃত্যুর পর বোন রিণিকে বড় করা ও সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আদিমতম পেশা হিসাবে সে একজন উচ্চশ্রেণীর এসকর্ট গার্ল| রিণির জীবনটা সুন্দর আর সুস্থ হোক‚ তাই অঙ্কনের সাথে রিণির সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন সে‚ যদিও রিণি তার ব্যক্তিগত জীবনে কারও নাক গলানো পছ্ন্দ করে না| ৩য় পর্ব :- শ্রী মৌলালীর উঠতি মস্তান মুন্না‚ আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সন্দীপের কাছের মানুষ| মুন্নার জীবনে অনেক অপ্রাপ্তি আছে‚ আছে অনেক খেদ| ভদ্রলোকের মত একটা জীবনের বড় আকাঙ্খা ছিল তার‚ কিন্তু সোনাগাছিতে বড় হওয়া আর মায়ের স্নেহহীন মুন্নার গন্তব্যই যেন পূর্বেই স্থির হয়ে গিয়েছিল| একসময় সোনাগাছির দালাল ফটিকের সাগরেদ ছিল‚ তারপর তো সেখান থেকে বেড়িয়ে নিজের একটা আলাদা পরিচয় সে বানিয়েছে| একটা লোটোর দোকান যদিও আছে তার‚ তবে সেটা তার ব্যবসা নয়‚ লোকের চোখে ধুলো দেওয়া| আসল ব্যবসা অন্যকিছু| বিকাশের মত কিছু মুর্খই তার কাস্টমার| ৪র্থ পর্ব :- স্তুতি ছোট্ট ভোলার চোখে অনেক স্বপ্ন| আর সব স্বপ্নের কেন্দ্রেই আছে তার মা| বাবুদের বাড়িতে কাজ করতে যাওয়া মায়ের জন্য সে একটা চমৎকার বাগানঘেরা বাড়ি বানাতে চায়‚ যেমনটা বানায় টুনটুনি পাখি ঠোঁট দিয়ে পাতা বুনে বুনে‚ ঠিক তেমনটাই সে বানাবে বলে টিনের বক্সে পয়সা জমায়| ৫ম পর্ব :- ঝড় মেয়েটা আবার আসে তার দোকানে টপাপ ভরতে| টপাপ ভরতে গিয়ে নাম্বারটা মাথায় ঢুকিয়ে নেবার চেষ্টা করে মনসুর| মেয়েটা ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিলে খুচরো দিতে পারে না| মেয়েটাকে তো সে দিল দিয়েছে‚ একশ টাকা কি জিনিস‚ তাই নির্দ্ধিধায় পরে দিতে বলে নামটা কৌশলে জেনে নেয়| তার হুরী পরীর নামটা বারবার অনুরণিত হয় তার মনে| ৬ষ্ঠ পর্ব :- কিকি জীবন যেমনই হোক মিনি আদ্যন্ত গুনী মেয়ে| বাবার মত বই পড়তে‚ গান শুনতে‚ ঘর গোছাতে‚ সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে বড় ভালোবাসে| তার ভালোবাসার তলে কমলামাসিও যেন কবে থেকে বড় আপন হয়ে গেছে| যেদিন কোন অ্যাসাইনমেন্ট থাকে না সেদিন সে অন্য মানুষ| একঘেয়ে জীবনটাকে সে বদলে নিতে চায় ঘরের আসবাব অদলবদল করে‚ বোনের মনের মত রান্না করে| আসলে সে সবাইকেই ভালো রাখতে চায়| সবার ভালো থাকার মধ্যেই যে সে নিজে ভালোবাসতে চায়| ৭ম পর্ব :- উমা সন্দীপকে মাঝে মাঝেই বেশ নৃশংস মনে হয় মুন্নার| বিশেষ করে ভোলার মত একটা বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে যখন মাসাজ করায় তখন তার শৈশব বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়| ঐ শৈশবটাকে সে বেজায় ঘেন্না করে| আর এই ঘেন্নার প্রতিশোধ তুলতেই সে খুন করেছিল তার মায়ের নাগরকে| তারপর অনেক হাত ঘুরে এই সন্দীপের কাছে সে ঠেক নিয়েছে| মানুষ খুন করতে তার হাত কাঁপে না‚ তবুও কোথাও যেন তার দিলটা পাত্থরের মত হয়ে যায়নি| আর হয়ে যায়নি বলেই মিনির জন্য একটা দরদ সে অনুভব করে| ৮ম পর্ব :- ঝিনুক রিণির মনটা আজ বেজায় ভালো| সারাদিন আজ সে অঙ্কনের সাথে কাটিয়েছে| অঙ্কন আই আই এম এ সুযোগ পেয়েছে| শুধু একটু একটু মনটা খারাপ‚ কি করে থাকবে সে এতদিন অঙ্কনকে ছেড়ে| বাড়ি ফেরার পথেও ঘোরের মধ্যেই থাকে সে| দের্রেঅ কারণে মনসুরের দোকানে টাকা দিতে যাওয়াটা হয় না| ভোলার কাছ থেকে কিনে নিয়ে আসে দুটো জুঁইয়ের মালা| ৯ ম পর্ব :- জল ঘর গোছাতে গোছাতেই হাতে পড়া সেই চিঠিটা যেন মিনির অতীত খুঁড়ে তুলে আনে| মনে পড়ে কত কিছু| রজতের কথা‚ তার এসকর্ট হয়ে ওঠার কথা| সন্দীপের সাথে আলাপ| কিন্তু রিণিকে নিয়ে আজকাল সে বড্ড চিন্তা করে| মেয়েটা কি তার আদরে বড্ড বেড়ে উঠছে না| সারাক্ষন ফোনে কথা বলেই যায়| একদিন ওর খবর নেবে| ১০ম পর্ব :- হিমু হঠাৎ করেই পৃথাকে দেখে রোহিত| পৃথা‚ রোহিতের একসময়ের প্রেমিকা| কিন্তু আজ অন্য কারও বউ| কার বউ জানার খুব ইচ্ছেতেই সন্দীপকে ফোন করে‚ আর জানতে পারে কে এক অঙ্কনের বউ| আর এই অঙ্কন যে একটা বড় খেলোয়ার সেটাও সন্দীপের কাছ থেকে জানে সে| এসব কি তার হ্যালুসিনেশন নাকি বাস্তব? ১১শ পর্ব :- ভোঁদড় ক্যাফেতে বসে বসেই অতীতচারী হয় মিনি| মনে পড়ে সীমাকে| এই সীমাই তার এই জীবনের পথপ্রদশক| এমনি এমনি লাইনের মেয়ে হওয়া যায়| কিন্তু এসকর্ট গার্ল হত গেলে কিছু প্রশিক্ষন লাগে| যেগুলো খুব যত্ন করে তাকে শিখিয়েছ সীমাই| কিছুটা নিজের স্বার্থে| যাই হোক আজ সে সন্দীপের খুব কাছের মানুষ| তার বিজনেসে একটা কার্যকারী অংগ| ১২শ পর্ব :- প্রবুদ্ধ ক্যাফেতে আসে মুন্না| প্রথম দর্শনে একটু অচেনা ঠেকে মিনির কাছে| অতীত থেকে বর্তমানে ফিরতে সময় নেয়| আজকের দিনটা সন্দীপের জন্য| মুন্নার সাথে এগিয়ে যায়|
dalia mukherjee
বুড়ো স্যারকে নিয়ে শুরু করেছিলুম গল্প, কিন্তু কপালদোষে লেখাটা পুরোটা গেলনা। তাই আবার বসলুম বুড়োস্যারকে নিয়ে লিখতে। কিন্তু বয়স তো হয়েছে আমার , সব ভুলে যাই। কোথায় যেন শেষ করেছিলুম। ও হ্যাঁ, তা বুড়োস্যার ছিলেন প্রচন্ড গুলবাজ, বুড়োস্যার উনুনের কাছাকাছি থাকলে বোধহয় উনুনে গুল দিতে হোতনা। ওমা! গুল জানেননা! ওই তো, কয়লার গুঁড়ো থেকে গুল বানায়। তা দিয়েও তো কয়লার বদলে উনুন জ্বালানো যায়! তা জানবেন কি করে? এখনকার সময় তো আর উনুন চলেনা? ওই কি যেন বলে, গ্যাস, গ্যাস দিয়েই তো রান্নাবান্না হয়। আমাদের সময় বাপু ওই উনুন জ্বালিয়েই রান্না করতে হোত। তা কয়লা যখন বাড়ন্ত, কয়লাবালা আসছেনা, তখন ওই গুলগুলো খুব কাজে লাগত। সে যাক গে। যা বলছিলুম। একদিন ক্লাসে নাচন আর মনীন্দ্রের মধ্যে লেগেছে খুব ঝগড়া। কি নিয়ে , সেটা আর মনে নেই। আরে বাপু! ক্লাস সেভেনের কথা, অত কি মনে থাকে নাকি? তা সেই ঝগড়ার দৌলতে ক্লাসে হয়ে গেল দুটো ভাগ। এ ওকে মারে তো এ তার নাক ফাটায়। আমাদের শ্যামাপ্রসাদ স্কুল ছিল ছেলে মেয়ে মেশানো স্কুল। ওই যে কো এডুকেশান না কি যেন বলে! তা এর মধ্যে আবার পড়ল বুড়োস্যারের ক্লাস। দুদলের ছেলেদের ই মন বেজার হয়ে আছে। আমরা মেয়েরা মজা দেখছি। ক্লাসে বেশ গন্ডগোল। এইসময় বুড়ো স্যার ঢুকলেন ক্লাসে। একবার ক্লাসের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বসলেন তাঁর চেয়ারে। বার কয়েক হাই তুলে একটা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হঠাৎ বলে উঠলেন, "তরা আমার কাছ থিকা কিছু শিখবি। জানস, আমি স্বর্গের সিঁড়ি দ্যাখসি।" তা সেই ঝগড়ার গুণে ছেলেদের মেজাজ তো তিরিক্ষি হয়েই ছিল। আর স্যারের এই গুলমারা কাঁহাতক সহ্য করা যায়? পেছন থেকে একটি ছেলে বলে উঠল, " তা উঠে গেলেননা কেন স্যার?" ব্যাস! স্যারের মুখ হয়ে উঠল রক্তবর্ণ, কাঁপতে লাগলেন স্যার ঠক ঠক করে। ছেলেটির কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে নিজের টেবিলের কাছে নিয়ে এলেন। তারপরে যা হাতের কাছে পেলেন, ডাস্টার, বেত, সব দিয়ে ছেলেটিকে এমন রামধোলাই দিলেন, ছেলেটি তারপরে তিনদিন স্কুলে আসতে পারেনি। আর আমরা মেয়েরা বলতে লাগলুম, " তা তোর ই বা অমন করে বুড়ো স্যারকে রাগাবার দরকার কি ছিল।" ওই যে বলে না, ভিমরতি ধরা, তাইতেই ধরেছিল ছেলেটিকে। আমাদের ক্লাসে দুলু বলে একটি বিচ্ছু মেয়ে ছিল। সবসময় তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে বেড়াত। তা সেই দুলু আবার বুড়োস্যারকে দুচোখে দেখতে পারতনা। মার ও খেয়েছে বুড়োস্যারের কাছে জবরদস্ত। তা আমাদের যুগে এপ্রিল ফুলের খুব চলন ছিল। ১লা এপ্রিল এলেই সবাই সবাইকে এপ্রিল ফুল করত। এই যেমন , একটি ছেলেকে এপ্রিল ফুল করতে কেউ গিয়ে বলল, " এই তোকে অঙ্কের স্যার অফিসঘরে ডাকছেন।" ছেলেটি কাঁচুমাচু মুখে অফিস ঘরে গিয়ে অঙ্কের স্যারকে বলল," স্যার আমাকে ডেকেছেন?" ব্যাস! স্যার অমনি বলে উঠলেন" আ মল যা! তোকে ডাকতে যাব কেন রে! পেয়েছিস তো অঙ্কে তিন, তা তোকে দিয়ে আমার কম্মটা কি? " ব্যাস ছেলেটি শুখনো মুখে ক্লাসে এল, আমরাও এপ্রিল ফুল বলে উঠলুম। এইসব হোত আর কি! তা সেদিন ছিল এপ্রিল ফুল। দুলুর মাথায় জেগেছে দুষ্ট বুদ্ধি। বুড়োস্যারের ক্লাস, স্যার ক্লাসে আসার আগে দুলু স্যারের চেয়ারের চার পায়াতে চারটে পাথর রেখে দিল। বুড়ো স্যার এসে যেই বসতে গেছেন, ব্যাস। দড়াম করে পা দুটো ওপরের দিকে তুলে একেবারে চিৎপটাং। আমরা না পারছি হাসতে। দুজন ছেলে গিয়ে স্যারকে ধরে তোলে। তারপরে স্যার জানতে চাইলেন," কে করসে?" একটি ছেলে বলে দিলে দুলুর নাম। আর যায় কোথায়! বেধরক মার দুলুকে। তা দুলুর তাতে বয়েই গেছে। বাড়িতে মা/ বাবার কাছে, আর স্কুলে স্যারেদের কাছে মার খেয়ে খেয়ে তো দুলুর হাড়ে দুব্বো গজিয়ে গেছে। দুলু বুড়োস্যারের সে মারকে ডোন্ট তোয়াক্কা। এই বুড়োস্যার ছিলেন আবার পুরোহিত। লোকের বাড়ি বাড়ি পুজো করতেন। তা করবেন ই তো! ভটচার্য বামুন , সে তো পুজুরি বামুন। আমার মা বলতেন, " ভটচার্য রা তো চালকলাবাঁধা বামুন। তারা ব্যবসা বানিজ্যের জানবে কি? লোকের বাড়ি পুজো করেই তাদের দিন কাটে।"আমিও অবশ্য ভটচার্য, কপাল গুণে মুখুজ্জে কুটিলের হাতে পড়েছি। তা বুড়োস্যার আমাদের বাড়িতেও পুজো করতেন। আর চালকলা বাঁধার সময় নজর ও রাখতেন, সব দেওয়া হয়েছে কিনা? তা বাড়িতে পুজো হলে আমাকেই যেতে হোত বুড়োস্যারের বাড়িতে পুজো করার জন্যে বলতে।স্যার থাকতেন আমাদের ই দুটো বাড়ি পরে একজনের বাড়িতে ভাড়া। স্যারের যে কি দৈন্যের দশা ছিল, তা নিজের চোখে দেখেছি। তখনকার দিনে কতই বা মাইনে পেতেন স্কুলে? আর কিছু প্রাইভেট টিউশানি করে স্যারের দিন কাটত। বাড়িতে তখনো একটি ছেলে, চাকরী নেই, বেকার। আর মেয়ে আমাদের সঙ্গেই কলেজে পড়ত। তখন ই দেখেছি বুড়োস্যারের হুঁকো খাওয়া। এর আগে আমি কোনদিন হুঁকো দেখিনি। আবার বুড়োস্যারের সঙ্গে টেলকো স্যারের ছিল আদায় কাঁচকলায়। বুড়োস্যার পূবে যাবেন তো টেলকো স্যার পশ্চিমে। টেলকো স্যার আমাদের পড়াতেন ইতিহাস। তা ওই বুড়োস্যারের মতই। বোর্ডে কতগুলো প্রশ্ন লিখে দিয়ে বলতেন, " এর উত্তর খাতায় লেখ। আমাদের উত্তর লিখতে হোত। আর স্যার যথারীতি টেবিলের ওপরে পা তুলে ঘুমোতেন। হেডস্যার মাঝে মাঝে রাউন্ড দিতেন, এই স্যারেদের ঘুমোনোর কথা সবই জানতেন, তা হেডস্যার ও তো বোধহয় সেই একই দলে। তাই বিশেষ কিছু বলতেননা। তবে যদি এই স্যারেরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতেন আজ স্কুলে স্কুল পরিদর্শক আসবেন, এই স্যারেদের একেবারে অন্য মূর্তি। ক্লাসে এসে পড়ানোর কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে যেতেন। মন দিয়ে পড়াতেন। তা যা বলছিলুম। এই বুড়োস্যারের সঙ্গে একবার টেলকো স্যারের তুমুল ঝগড়া হোল, শেষে অন্য স্যারেরা এসে ছাড়ালেন। দুই স্যারে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আমরা বিকেল পাঁচটার সময় মাঠে কিৎকিৎখেলছি, আর দেখছি বুড়োস্যার পাহাড়ি থেকে পড়িয়ে আসছেন, আর টেলকো স্যার পাহাড়িতে যাচ্ছেন নিজের বাড়ি। গরমকালে বিকেল পাঁচটায় বেশ রোদ। দুজনের মাথায় ছাতা। দুজনে দুজনকে দেখে ছাতা দুটো হেলিয়ে দিলেন, যাতে কেউ কারুকে দেখতে না পায়। আমাদের খেলা বন্ধ হয়ে গেল, স্যারেদের দেখে হেসে মরি সবাই। এই ছিলেন আমাদের বুড়ো স্যার। তারপর আমার বিয়ে হয়ে গেল, চলে এলুম বিদেশে। একদিন মায়ের চিঠিতে খবর পেলুম বুড়ো স্যার আর নেই। সেদিন মনটা সত্যি খারাপ হয়ে গেছিল, বুড়ো স্যারের সঙ্গে আর আমার দেখা হবেনা? বড় খিটখিটে আর রাগী মানুষ ছিলেন এই বুড়ো স্যার, কিন্তু কত দারিদ্রের মধ্যেও তো নিজের কর্ম করে গেছেন। পারিবারিক ঝঞ্ছাট স্যারের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছিল, তাঁর ভেতরটা তো আমরা কোনদিন দেখতে চাইনি। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে একদিকে খুব কষ্ট হয়েছিল, অন্যদিকে ভেবেছিলুম, না ভালই হয়েছে, স্যার তাঁর কর্মফল থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
মনোজ ভট্টাচার্য
খোলা প্ল্যাটফর্মে রাত কাটালাম সবাই ! কিছুতেই বরহমপুর পর্যন্ত রিজার্ভেশান পাওয়া গেল না ! আগামী চার মাস পর্যন্ত নাকি ফেরার টিকিট নেই ! এসব তো এজেন্টের বুলি ! কতকাল ধরে শুনছি ! কিন্তু কিই বা করা যায় ! তা বলে তো গোপালপুর যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করা যায় না ! অগত্যা সবাই ঠিক করল আমরা পুরী যাব – জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে ! সেখান থেকে গোপালপুর । ওই ট্রেনে খুব ভালো খেতে দেয় ! আমরা তো কদিন আগেই পুরী ঘুরে এসেছি – ট্রেনে ভালো খাবার দিয়েছিল ! – আর চেয়ার-কারে উটকো কোনও ঝামেলাও নেই ! তাই হাওড়া থেকে পুরী যাওয়া হবে শতাব্দীতে । তারপর রাত্তিরে ওখানে কোথাও কাটিয়ে সকালে ট্যাক্সিতে গোপালপুর যাব । - ট্রেনে উঠে ওখানকার যাত্রীরাই বুদ্ধি দিল – পুরী পর্যন্তই বা যেতে হবে কেন ! ভুবনেশ্বরে নেমে ট্রেনে বা গাড়িতে গোপালপুর যাওয়ার ! ভুবনেশ্বরে ডরমিটারিতে থাকা যায় ! – আমরা রাজি হয়ে গেলাম । কটকে রাতের খাবার দেওয়া হয় - ওটা রেখে দেওয়া হল । তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার দরকার নেই । নামলাম ভুবনেশ্বর – প্রায় সাড়ে আটটা ! প্রথমেই খোঁজ করলাম কোথায় আছে ডরমিটারি । - আমাদের সচরাচর রাতে ডর্মএ থাকার দরকার পরে না বলে – সব নিয়ম কানুন জানি ও না ! এমন কি কোন স্টেশানে কোথায় যে ডরমিটারি – তাও বাইরের লোকজন বিশেষ জানে না । তাই অত বিরাট জনবহুল স্টেশানের গায়ে একটা ছোট্ট দরজা দিয়ে যখন পোর্টার আমাদের স্টেশানের ওপরে নিয়ে গেল – বেশ অবাক লাগলো । নীচে অত হট্টগোল – অথচ ওপরে বেশ নির্জন ! একজন বেশ বয়স্কা মহিলা দরজার সামনে বসে আছে । - আমরা থাকতে চাই – শুনেই বলে দিল – থাকার যায়গা নেই । তারপর বলে – নীচের অফিশ থেকে পারমিশন করাতে হবে । - তিনজনকে সেখানে থাকতে বলে আমি একা নীচে গিয়ে কাউন্টারে দেখা করে বললাম । রাত্তিরে থাকতে চাই ! অনেক কষ্টে বোঝাতে পেরেছি মনে হল । সেও আমাদের টিকিট দেখতে চাইল । দেখাতেই মাথা নাড়া । কেন ? কারন আমাদের টিকিট তো পুরী পর্যন্ত – এখানে তো ওরা ডর্ম দিতে পারবে না ! পুরীতে গিয়ে থাকতে হবে ! – ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলাম ওপরে । আবার অনুরোধ করলাম সেই মহিলাকে ! কা কস্য পরিবেদনা ! পোর্টারমশাই বুদ্ধি দিল – অন্তত বিশ্রামকক্ষে থাকতে । সেটা ভালো বুদ্ধি । সেই কক্ষের সামনে গিয়ে দেখি – ভেতরে মানুষজন থিক থিক করছে ! এখন কি রথযাত্রা নাকি সাগরস্নান ! – ঢুকতেই পারলাম না । আবার গেলাম – এ সি বিশ্রামকক্ষে । সেখানে পরিষ্কার বলে দিল – মেয়েদের থাকার যায়গা হবে না ! – বোঝো কান্ড ! এরা যে 'না' ছাড়া কিছুই জানে না ! বললাম – বাইরে বেড়িয়ে কোনও হোটেলে রাত কাটিয়ে ভোর পর্যন্ত কাটাই ! কেউ রাজি হল না । ওরা খোলা প্ল্যাটফর্মেই থাকতে চাইল । ওদের তো আবার কেন্দ্রিয় সরকারী পেনশান – রীতিমত বড়লোক বলা চলে ! আমরা তো প্রায় উঠাইকিরি আমজনতা ! তিনজন মহিলা যদি থাকতে চায় – আমি তো কোন ছার ! অগত্যা ! – খোলা প্ল্যাটফর্মে আগে যে রাত কাটাই নি – তা নয় । একাধিকবার রাত্তিরে থাকতে হয়েছে । কিন্তু তখন দিনকাল ছিল – অন্যরকম ! – তবু সাহস করে রয়েই গেলাম । একটা স্তম্ভের নীচে স্কোয়ার রকে বসার যায়গা । সেখানেই আমাদের ঠাই হল ! – খাবারগুলো খেয়ে নেওয়ার পরেই – অন্য দুজন মহিলা দিব্যি কুকুরকুণ্ডলী হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ! আমাদের তো ওভাবে ঘুম আসে না । আমি আবার পাহারাদার ! ঘুমের প্রশ্নই নেই ! একপাশে শুয়ে রইলাম ! রাত বাড়ে । ট্রেনের সংখ্যাও কমে আসতে লাগলো । ট্রেনের চেয়েও ভয়াবহ হল সারাক্ষণ ট্রেনের ঘোষণা – তিনবার করে ! ঘ্যান ঘ্যান খ্যান খ্যান করে ঘোষণা করেই যাচ্ছে ! এছাড়া মালগাড়ির সান্টিং তো হচ্ছেই ! – প্ল্যাটফর্ম যখন মোটামুটি খালি খালি – তখন আরম্ভ হল দু-তিনটে বাচ্ছা ছেলের কুকুর নিয়ে সারা প্ল্যাটফর্মে দৌড়ে দৌড়ে খেলে বেড়ানো ! – কি আর করা – এটা তো ওদেরই খেলার যায়গা ! পিকচার তো আভি ভি বাকি হায় জী ! রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ হঠাতই গায়ে ও চশমায় জল লাগতে দেখি – প্ল্যাটফর্ম ধোয়া শুরু হয়েছে ! বিরাট বিরাট হোশ পাইপ দিয়ে অত বড় প্ল্যাটফর্ম ধোয়া হচ্ছে । - আমরা তো রকের ওপর শুয়ে ছিলাম । কিন্তু অন্য যারা মেঝেতে শুয়েছিল – তাদের সব্বাইকে তুলে দিতে লাগলো । ওরে ব্বাস ! সে কী হুল্লোড় আরম্ভ হয়ে গেল ! – একদিকে হোশপাইপওলারা অন্যদিকে শয়নকারীরা – সে কী চেঁচামেচি – প্রায় হাতাহাতি হবার জোগাড় ! প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে স্টেশন ধৌত করা হল ! সূর্য উঠল কিনা বোঝা গেল না – কিন্তু সেই রাত্রিও কেটে ভোর হল । - আমরাও সেখান থেকে পাততাড়ি গোটালাম ! স্টেশনের বাইরে গিয়ে একটা ট্যাক্সির বন্দোবস্ত করা গেল ! শেষপর্যন্ত গোপালপুর অন সী ! ঘণ্টা তিনেক পরে পৌঁছলাম ! কলকাতার অফিশে যদিও বলেছিল – কোনও যায়গা নেই পান্থ-নিবাস এ – কিন্তু সরাসরি গিয়ে দিব্যি যায়গা পেয়ে গেলাম । এবং তুলনায় সস্তাও ! একেবারে সমুদ্রের ধারে । তার আগে একটা হোটেলে গেছি । দারুণ লাগলো । হোটেলের লবির সামনে সমুদ্রের ঢেউ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ! লবিতে চেয়ার পাতা ! শুধু এখানে বসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে পারে ! আমাদের তো ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল । - কিন্তু হোটেলের ম্যানেজার – নিজেই এ সি নেই, টি ভি নেই, ফ্রেশ জল নেই – বলে নাকচ করে দিল । ভাবা যায় ! ম্যানেজার খদ্দের ফেরাচ্ছে ! – একমাত্র এখানেই সম্ভব ! আমার গোপালপুর স্মৃতি চল্লিশ বছর আগেকার ! তাই কিছুই মেলে না । প্রথম যেটা আমাকে অবাক করলো – সেটা হল – গাঁয়ের মানুষজন বেলাভূমি নোংরা করছে না – সকালবেলায় ! বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ! এমন কি সমুদ্রের ধারে বেশ সাজানো গোছানো হয়েছে ! অনেক উন্নতি হয়েছে ! – শুনলাম গোপালপুরে মিলিটারি সেন্টার হবে । একটা এয়ারপোর্টও হবে ! – তখন কি আর এই নির্জনতা থাকবে ! এখানকার বেলাভূমি খুব প্রশস্ত নয় । আর খুব হাল্কা বালি ! ফলে বালির মধ্যে পা ডুবে যায় ! আর হাঁটতে বেশ অসুবিধে হয় ! কিন্তু বেশ নির্জন ধরনের ও ওলাদের ঝামেলাও তত নয় ! ফলে চুপচাপ বসে সমুদ্রের ঢেউ গোনা যায় ! মানে বেশ উপভোগ্য ! কাছেপিঠে মন্দির নেই ! একটা আছে – তারা-তারিনী – সে মন্দিরে যেতে হলে যেতে হবে গাড়িতে করে ! ফিরে আসার পর সব শুনে আমাদের কিছু শুভানুধ্যায়ী – আমাকে তো রীতিমত শাসিয়ে গেল – ভবিষ্যতে কোনোদিন যেন এভাবে না বেরই ! কোনদিন কোন বিপদে - - ! এরকম গ্যারান্টি কি দেওয়া যায় ! – কোনদিন আবার পায়ের তলায় শুরশুরানি লাগে ! আপাতত এ পর্যন্তই ! মনোজ
dalia mukherjee
হ্যাঁ, আমাদের বুড়ো স্যার। ইনি আমাদের স্কুলে ড্রইং করাতেন। এই ক্লাস সিক্স, সেভেনে। ক্লাসে আসতেন ফিটফাট ধুতি আর পাঞ্চাবী পড়ে, ড্রইং এঁকে দিতেন বোর্ডে। তারপরে টেবিলের ওপরে ঠ্যাং টা তুলে মারতেন ঘুম। আর আমাদের সেই বোর্ডের ড্রইং দেখে খাতায় আঁকতে হত। খানিক্ষন পরে ঘুম ভেঙ্গে জিগেস করতেন," হইসে তগো ড্রইং? খাতা লইয়া আয় আমার কাছে।" আমরা একে একে যেতাম বুড়ো স্যারের টেবিলের দিকে। কারুকে উনি দিতেন ১০ এ ১০, কারুকে বা ১০ এ ৩। আমি কোনদিন ও ওনার হাতে ৩ এর বেশী পাইনি। তা পাব কেন? ওনার দুই ভাইপো আছে না? তারা তো বেশী নম্বর পাবেই। তা এই বুড়ো স্যারের ওনেক গুণ ছিল। গুল মারতে বুড়োস্যার ওস্তাদ ছিলেন। উনি বোধহয় ভগবানের সব দেখেছেন। স্বর্গদ্বারের কাছ অবধি ওনার যাতায়াত ছিল। একদিন ক্লাসে এসে বললেন," জান, আমি লহ্মীনারায়ণের নাচ দেখসি।" >
Somen dey
‘ ….পৃথিবীতে নেই কোন বিশুদ্ধ চাকুরি। এ কেমন পরিবেশে রয়ে গেছি সবে --- বাকপতি জন্ম নিয়েছিল যেই কালে, অথবা সামান্য লোক হেঁটে যেতে চেয়েছিল স্বাভাবিকভাবে পথ দিয়ে, কী করে তা হলে তারা এ রকম ফিচেল পাতালে হৃদয়ের জন-পরিজন নিয়ে হারিয়ে গিয়েছে ? ’ ‘বিশুদ্ধ চাকুরি’ নেই জেনেও সেই চাকুরির সন্ধানে বরিশালের উদার আকাশ আর হিজল- কাঁঠাল-জামের আদ্র মাটি থেকে উৎপাটিত হয়ে আবার এই ইঁট-কাঠ-লোহার কোলকাতায় এসে পড়লেন কবি ।তার ওপরে সে তখন এক উত্তাল সময় - ১৯৪৭ এ যখন দেশভাগের আগুনে দুই বাংলা অশান্ত। উদ্বাস্তু সমস্যায় কলকাতা জর্জরিত । সেই সময়েই বরিশাল থেকে কলকাতায় এলেন জীবনানন্দ জীবিকার সন্ধানে। কোনো নির্দিষ্ট আয়ের নিরাপত্তা ছাড়াই । এই নুতন জীবনের শুরুটা মোটেই রমণীয় হলনা ।একদিকে কবি হিসেবে তাঁর তেমন কোনো পরিচিতি তখনো গড়ে ওঠেনি , অথচ তাঁর সমসাময়িক কবিরা বুদ্ধদেব বসু , প্রেমেন্দ্র মিত্র , অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত , অমিয় চক্রবর্তী , সুধীন দত্ত , বিষ্ণু দে এঁরা সবাই ব্যাক্তিগত জীবনে এবং সাহিত্যিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত । এই দুঃখ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে অনেক দিন । অশোক মিত্রের লেখায় জানতে পারি এ রকম সময়ে কবি তাঁকে একান্তে ডেকে নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুর পঞ্চাশ হাজার টাকা ফিক্সড আছে কিনা ।হয়ত এক ধরণের হীনমন্যতায় শিকার হয়ে পড়েছিলেন । অন্য দিকে জীবনানন্দের ব্যাক্তিগত জীবনও তেমন মসৃন নয় । দাম্পত্য জীবনে একটু একটু করে ফাটল ধরছে । থাকেন কোলকাতার এক মেসে । প্রায় উপার্জনহীন এবং কবি হিসেবে তিনি তখনো কলকাতার সাহিত্য জগতে কোনো ছাপ ফেলতে ব্যর্থ । তাঁর কবিতা তখনো পত্র পত্রিকার অফিস থেকে ফেরত আসে । কবিতা লিখে পয়সা পাওয়া যায় না । তাই শুধু অভাবের তাগিদেই গল্প উপন্যাস লেখার কথা ভেবেছেন , লিখেওছিলেন ।পরামর্শ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসুর সঙ্গে। দেশ পত্রিকার অফিসে গিয়ে সাগরময় ঘোষের কাছে গিয়ে অর্থের বিনিময়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তাব দেন । সাগরময় ঘোষ উপন্যাস প্রকাশে রাজিও হন । কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে উপন্যাস আর জমা দেন নি । সেই সময় কোলকাতার কবিতার জগৎ আন্দোলিত হচ্ছে কল্লোল , কালি কলমের কবিদের দ্বারা । আধুনিকতার সংজ্ঞা খুঁজছেন এই গোষ্ঠির সদস্যরা । সবাই রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করে যাবার বাসনায় যাচ্ছেন ইয়োরোপের কবিতায় আধুনিকতার অনুসন্ধানে ।এই কবিদের গোষ্ঠি একটা আন্দোলনের মুখ হবার চেষ্টা করছে । স্বভাবলাজুক , মিতবাক , অবগুণ্ঠিত জীবনানন্দ এই গোষ্ঠির একজন গৌণ সদস্য হয়েছেন মাত্র ।কারো কাছে বিশেষ কল্কে পান নি । তিনি এই কবিতার আন্দোলন কে মন থেকে মানেন নি । তাঁর একটা নিজস্ব সুস্পষ্ট মত ছিল । কখনো রবীন্দ্ররীতিকে অস্বীকার করার কথা বলেন নি । তিনি মনে করতেন নতুন ধারা আসতে পারে ভাষার নতুন ব্যাবহারে । রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে একটি প্রবন্ধে তিনি দ্বিধাহীন ভাষায় বললেন – অর্থহীন অসন্তোষে বা দুর্বল বিদ্রোহের অভিমানে আমি আমার পুর্ববর্তী বড় কবিকে ডিঙ্গিয়ে গেলাম অকাব্যের জঞ্জালের ভিতর – সাহিত্যের ইতিহাসে এ রকম আন্দোলনের কোন স্থান নেই । (রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা, কবিতার কথা) অথচ রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর নিজের কবিতার আঙ্গিক নিয়ে যে খুব উৎসাহ পেয়েছিলেন , তা নয় ।উত্তর কালের সবচেয়ে প্রতিভাবান কবি সম্মন্ধে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা পাই শুধু একটি দায়সারা মন্তব্য - "তোমার কবিতা চিত্ররূপময়, সেখানে তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।" এছাড়া আর কোনো মুল্যায়ন খুঁজে পাই না । রবীন্দ্রনাথের মতন আধুনিক এবং উদারচেতা মানুষের পক্ষে এই উদাসীনতা খুবই আশ্চর্য লাগে। বুদ্ধদেব বসুও প্রথমে তাঁকে রবীন্দ্রনাথের মত তাঁকে প্রকৃতির কবি বলেই চালিয়ে দিয়েছিলেন – "ছবি আঁকতে তার অসাধারণ নিপুণতা; তার ছবিগুলো শুধু দৃশ্যের নয়, বিশেষভাবে গন্ধের ও স্পর্শের।" অনেক পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলেন জীবনানন্দ একজন ‘খাঁটি আধুনিক কবি’ । সুধীন দত্ত তাঁর পত্রিকার জন্যে জীবনানন্দের পাঠানো একটি কবিতা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । তবে বিষ্ণু দে অবশ্য তাঁর ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি নিজে হাতে সংগ্রহ করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ছেপেছিলেন । আর সজনী কান্ত দাস শনি বারের চিঠি তে তো আক্রমণের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন । শত লাঞ্ছনার মধ্যে জীবনানন্দের একমাত্র সম্বল ছিল তাঁর আত্নবিশ্বাস । তাঁর ডায়রির পাতায় তিনি এক জায়গায় লিখছেন – I ought to just do that for what I stand and in which I excel and delight and which is my true vocation : কল্লোল , কালি কলমের কবি গোষ্ঠি যে ভাবে রবীন্দ্রনাথ কে অস্বীকার করার উদ্দেশ্য সে সময়ের ইয়োরোপের কবিতার আঙ্গিক কে আশ্রয় করার চেষ্টা করেছিলেন সেটাও জীবনানন্দের পছন্দের ছিল না । তিনি লিখেছিলেন ‘বর্তমান কবিদেরও অল্পবিস্তর পরষ্পরনিঃসক্ত বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী তেমনি বোদলেয়ার ও ফরাসী প্রতীকী কবিদের থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট ও পাউন্ড-এর কাছে গেলে খানিকটা হৃদয়ের সাহচর্য ও কিছুটা অভিনবত্বের গরিমা সে সব জায়গায় খুঁজে পেয়েছে বলে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার চর্চা আধুনিক বাঙালি কবির তেমন মন যোগাত না; অন্তত যারা আধুনিক বিশিষ্ট বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথকে তারা বিস্পষ্ট সম্ভ্রমে প্রণাম জানিয়ে মালার্মে ও পল ভেরলেন, রসাঁর, ইয়েটস ও এলিয়ট-এর সাদর্থক বা নঙর্থক মননবিচিত্রতার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।‘ রুপসী বাংলার একটি কবিতার একটি লাইন ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রুপ খুঁজিতে যাই না আর ‘ এ শুধু একটি কবিতার আবেগ তাড়িত উচ্চারণ নয় । এ তাঁর প্রত্যয়ী ঘোষনা । তাঁর যা কিছু আহরণ তা এই বাংলার আকাশ বাতাস নদী মাঠ থেকে । এ কবিতার শেষ কটি পংক্ততিতে তাই নিসর্গ মুগ্ধতার থেকে আমাদের তিনি নিয়ে যান এক কালহীনতার দিকে , বাংলার নিজস্ব লোকপুরাণে, মনসামঙ্গলে। বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে- কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়- সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়, শ্যামার নরম গান শুনেছিলো- একদিন অমরায় গিয়ে ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায় বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিলো পায় অসহায় বেহুলাকে স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবার সর্তে ইন্দ্রসভায় দেবতাদের মনোরঞ্জনের জন্য নাচতে হচ্ছে তীব্র যন্ত্রনা বুকে নিয়ে । সে যন্ত্রণার উপমা উঠে আসে সেই বাংলার প্রকৃতি থেকেই – ছিন্ন খঞ্জণার মত, এ যন্ত্রণার এর চেয়ে ভালো উপমা আর কি হতে পারে । আবার তিনি শুধু বাংলার মানচিত্রে সীমাবদ্ধ ররে গেছলেন তা নয় , তাঁর ইতিহাস ভুগোল এবং সমাজচেতনা চলে গেছে মেসিডোনিয়া, নীলনদ্ তাইগ্রিস, মিশর্ লিবিয়া, হংকং ,সাংহাই এমন কি সুদুর মেরু প্রদেশে । – ‘কোনো গ্লসিয়ার হিমস্তব্ধ কর্মোরান্ট পাল বুঝিবে আমার কথা ; জীবনের বিদ্যুৎ কম্পাস অবসানে ‘ এখানে ‘কর্মোরান্ট ‘ বাঙালি পাঠকের কাছে সম্পুর্ণ অচেনা শব্দ ।এখনকার আগ্রহী পাঠক উইকি খুঁজে পেতে পারেন এই নামের পাখির কিছু বিবরণ । একধরনের সামুদ্রিক পাখি । মাছ খায় ।বাসা বাঁধে সমুদ্রের উপকুলে । এ পাখি নাকি ডাইনোসরের সময়েও ছিল । অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে হাজার হাজার বছর । তবে তার মধ্যে অনেক পাখি হয়ত গ্লসিয়ারে হিমস্তব্ধ হয়ে গেছে । শ্যামা দোয়েল ফিঙ্গে পানকৌড়ি হাঁড়িচাচা পাখি যাঁর প্রিয় সেই কবি ঠিক কোন সংকেত দেবার জন্যে এ রকম অচেনা পাখির উপমা দিলেন তার সন্ধান আমরা করতে থাকবো । অভিযোগ অনেক উঠেছে । সাধারণ পাঠকের কাছে দুর্বোদ্ধতার অভিযোগ , বামপন্থীদের কাছে বুর্জোয়া পন্থার অভিযোগ , ছান্দসিকের কাছে ভুল ছন্দে কবিতা লেখার অভিযোগ , নীতিবাগীশের কাছে অশ্লীলতার অভিযোগ । কিন্তু জীবনানন্দ কখনো নিজের পথ পরিবর্তনের কথা ভাবেন নি । নিজের ডিকশন বদলান নি । তাঁর কথা ছিল – ‘মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময় চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো ; কবিতা লেখবার পথে কিছুদুর গিয়েই আমি বুঝেছি , গ্রহণ করেছি । এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে ।’ (কবিতার কথা ) আসলে সংকেত ছড়িয়ে আছে তাঁর সমস্ত কাব্য জগত জুড়ে । জীবনানন্দের চেতনা অবচেতনা অধিচেতনার জগতের সংকেত আমাদের জন্যে রেখে গেছেন । কিছু তার কিছু আবিস্কৃত কিছু এখনো অনাবিস্কৃত । তবু আবিস্কারের আগ্রহ বেঁচে থাকবে , যতদিন বাংলা কবিতা লেখা হবে । এমেরিকান কবি Archibald MacLeish একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে স্মরনীয় - A poem should not mean but be’ । জীবনানন্দের কবিতা তাই ।ভালো করে কিছু বোঝাবার আগেই তা কবিতা হয়ে ওঠে । **** মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি, না এলেই ভালো হত অনুভব করে; এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে; দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়– শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়। কবিতা থেকে আবার মানুষ জীবনানন্দে ফিরে যাই । ‘না এলেই ভালো হত’ এবং ‘এসে যে গভীরতর লাভ হল’ এই দোলাচলের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে তাঁর নানা বর্ণের সৃষ্টি , আশা এবং আশাহীনতার ।ব্যাক্তিগত জীবন তাঁর লেখাকে ঠিক কতখানি প্রভাবিত করেছে তা বলা মুস্কিল । কবিতায় যে ব্যাক্তিগত যন্ত্রণার বলতে পারেন নি তা কি বলতে চেয়েছেন উপন্যাসে ? তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস টি প্রকাশিত হয় উনিশ বছর পরে । তিনি নিজে তাঁর উপন্যাস প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন । তাঁর স্ত্রী ছিলেন অনিচ্ছুক । প্রধাণত তাঁর ভাই অশোকানন্দ দাশের আগ্রহেই এই প্রথম উপন্যাস টি প্রকাশিত হয় । উপন্যাসের মূল বিষয় একটি স্ত্রী শাসিত সংসারে দাম্পত্য জীবনের অসঙ্গতি । তাঁর মৃত্যুর পর আমরা জানতে পারি অসংখ্য কবিতার সঙ্গে তিনি নিভৃতে বসে চোদ্দটি উপন্যাস ও ১০৮ টি ছোট গল্পও লিখেছিলেন । মাল্যবান ছাড়া অন্য উপন্যাসেও কবির জীবনযন্ত্রণা খণ্ডিত অংশ উঠে এসে নানা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে । ‘কারূবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে । সব সময় শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ তৃষ্ণা .... কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে’ কারুবাসনা উপন্যাসের নায়কের এই কথা জীবনানন্দের স্বগতোক্তির মতন লাগে । এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়। যাপিত জীবনে রণ রক্ত সফলতা কোনো দিন আঁকড়ে ধরে থাকতে চাননি । তবু শেষ সত্যের অনুসন্ধান ছাড়েন নি । মৃত্যুর কথা এসেছে ঘুরে ঘুরেই । তাঁর স্ত্রীর কথায় - "...মৃত্যুর পরপার সম্বন্ধে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষন ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন আচ্ছা বলতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? ‘’ কবিতাতেও থেকে থেকে এ রকম এক প্রগাঢ় নিদ্রার কথা বলতেন – ‘যে ঘুম ভাঙ্গে নাকো কোনোদিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর শান্তি আছে তাতে ।‘ তাই তাঁর অন্তর্ধানও তাঁর কবিতার মতনই রহস্যে ঘেরা । কলকাতার ইতিহাসে ট্রাম চাপা পড়ে আজ পর্যন্ত অন্য কারো মৃত্যু ঘটেনি । তাই সন্দেহ জাগে কবি কি এতটাই আত্নবিস্মৃত হয়ে চলা ফেরা করতেন ! নাকি তাঁর মৃত্যু আসলে স্বেচ্ছামৃত্যু ছিল ।তাঁর দুই কাছের মানুষ সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং ভুমেন্দ্র গুহ দুজনেই সে রকম সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । কিন্তু সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিবরণ আমরা পাই তাঁর আর এক বন্ধু সুবোধ রায়ের লেখা থেকে - "জলখাবার" "জুয়েল হাউজের" সামনে দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শুধু অন্যমনস্ক নয়, কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে তখনো প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। যা অনিবার্য তাই ঘটলো। গাড়ি থামল তখন, প্রচন্ড এক ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই কবির দেহ যখন ক্যাচারের ভিতর ঢুকে গেছে। ক্যাচারের কঠিন কবল থেকে অতি কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করলেন সবাই কবির রক্তাপ্লুত, অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে সেখানে।।....... চুরমার হয়ে গেছে বুকের পাঁজরা, ডান দিকের কটা আর উরুর হাড়।" ( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায়) এই অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে । যেখানে তার আশে পাশে পুলিশ কেসের রোগীরা শুয়ে আছেন আর আবহ সঙ্গীতের মত শোনা যাচ্ছে খইনি টেপা দারোয়ানের গান । ‘সুখ আর শান্তি’ নয় অপরিসীম যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছেন ১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর থেকে ২২শে অক্টোবর দিনটি পর্যন্ত । তার পর অনন্ত শান্তিকল্যান । হাসপাতালে জীবনের শেষ কয়েকদিন তাঁর স্ত্রী তাঁকে দেখতে আসেন নি । তিনি নাকি ব্যাস্ত ছিলেন টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে । যখন তাঁর শবদাহ দাহ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে রাখা আছে , তখন কলকাতা কেন্দ্রিক অনেক কবি সাহিত্যিকরা এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যাচ্ছেন , সেই সময় লাবণ্য দেবী জীবনানন্দের বন্ধু ভুমেন্দ্র গুহর কাছে জানতে চেয়েছেন – ‘অচিন্ত্যবাবু এসেছেন , বুদ্ধবাবু এসেছেন , সজনীকান্ত এসেছেন , তাহলে তোমাদের দাদা নিশ্চয় বড় মাপের সাহিত্যিক ছিলেন ; বাংলা সাহিত্যের জন্য তিনি অনেক কিছু রেখে গেলেন হয়তো , আমার জন্যে কি রেখে গেলেন বলো তো ? ’ প্রশ্ন টি লাবণ্য দেবীর দিক দিয়ে খুব অসঙ্গত ছিল , এমন কথা বোধহয় বলা যায় না । কবির শ্রাদ্ধ বাসরে রাখবার জন্যে একটি ছবি অনেক সন্ধান করেও আয়োজকরা যোগাড় করতে পারেন নি । এমন কি তাঁর স্ত্রী ও দিতে পারেন নি । উত্তরকালের কবিদের জন্যে তিনি কতটা আলোর সন্ধান দিয়ে গেছেন তার পরিমাপ তাঁরাই করবেন ।এ নিবন্ধ শেষ করা যাক এ কালের বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামীর একটি কবিতা দিয়ে – একটি পাখী ডাকছে তার কাকলী মাধবীলতা যতটা বাগান... আকাশে চক্কর মেরে মাথায় দু চারটি তারা ডুবে গেলে পর এককোনে আড়ামোড়া ভেঙ্গে উঠে সর্বনিম্ন ডালের ওপর হাফহাতা গেঞ্জীপরা কনুই লাগিয়ে সোজা দাঁড়ান মালকোঁচা টানটান কে উনি ? কে উনি ? ব্যাক্তি ? মহাশয় ? বাগানের মালি বা দেখাশোনার লোক ? দুটি পাখি ডাকছে , তিনটি, কাকলি মাধবীলতা কতটা বাগান পার হল ? দোর খোলো ,সারা মাথা তারা ডুবে সবাই যখন ঘুমচোখ চারজন ,পাঁচজ্ন ষষ্ট , সপ্তম , অষ্টম পাখি জড়ো হচ্ছে ভুলে যাচ্ছে কাকলি বা গান মাথায় চক্কর মেরে ভোর-অন্ধকার দেখছে , দূরে হাওড়া ব্রিজের মাথায় কুয়াশা সরিয়ে দিয়ে আবার অনেকদিন পর শ্রী দাশ , জীবনানন্দ , কী রকম সুর্যটিকে তুলে দিয়ে যান ।
Somen dey
তোমারি তুলনা তুমি -২ ********************** ‘কবিরে পাবেনা তার জীবন চরিতে’ এমন একটি সাবধান বাণী লিখে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবাইকে কোনো কবির ব্যাক্তিগত জীবনের প্রতি অতি ঔৎসুক্য থেকে সংযত থাকতে বলেছিলেন । কিন্তু আমাদের উৎসাহ তাতে বিন্দুমাত্র কমেনি । প্রিয় কবির জীবনযাপনের ব্যাক্তিগত খুটি নাটি জানবার ইচ্ছেতে কোনো দিন ভাটা পড়েনি । তার প্রমান ‘কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট’ নামে একটি বই বহুদিন ধরে বেস্ট সেলার হয়ে আছে । যারা পাঠ্য পুস্তকের বাইরে রবীন্দ্রনাথের কোনো বইই পড়েননি তারাও বোধহয় পড়ে ফেলেছেন এই বইটি । তার কারণটা আর নাই বা বললাম। বাঙালি শিলং এ বেড়াতে গিয়ে আজও খোঁজে লাবণ্যর সেই বাড়িটি । নীরা, যার মন খারাপ হলে কোলকাতায় ট্রাফিক জ্যাম হয়ে যায় , সে কোলকাতার কোন পাড়ায় বাস করতো এ নিয়ে তর্ক আজও চলে । আর একটি ছোট্টো মফস্বল শহর যে বাঙালি কাছে কি ভাবে চিরকালের আগ্রহের জায়গা হয়ে রয়ে যেতে পারে তা তো আমরা জানি । শহরের নাম নাটোর । যেখানে বনলতা সেন থাকতেন । হাজার বছর পথ হাঁটার পর বাঙালি বোধহয় ভুলবেনা বনলতা সেন কে । অনেকে ভাবেন এই একটি কবিতা লিখলেই জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন । কিন্তু একটি সত্য আমরা এখন জানতে পেরেছি ( দেবী প্রসাদ বন্দোপাধ্যায়ের সৌজন্যে) হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে – এই লাইনটি কবিতার প্রথম খসড়াতে ছিলই না । কবিতাটি শুরু হয়েছিল এ ভাবে – জীবনের সব লেন দেন / বনলতা সেন । আর শেষ হয়েছিল – ‘কত যে ঘুমিয়ে রব বস্তির পাশে কত যে চমকে জেগে উঠিব বাতাসে হিজল জামের বনে থেমেছে স্টেশনে বুঝি রাত্রি নিশুথির বনলতা সেন ।’ নিঃসন্দেহে প্রথম খসড়ার চেয়ে যে কবিতা আমাদের মুখে মুখে ফেরে সেটি অনেক বেশি সুন্দর । কথা হচ্ছিল জীবন চরিত নিয়ে । মানুষ জীবনানন্দ কে যারা কাছ থেকে দেখেছেন তাদের খণ্ডিত স্মৃতি চারণ থেকে একটু বুঝে নেবার চেষ্টা করা যাক কবিকে । বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন একজন শিক্ষাব্রতী আর মা ছিলেন সেকালের একজন নামকরা কবি – কুসুমকুমারী দাশ । বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয় তাঁর প্রথম স্কুল । এখান থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন ব্রজমোহন কলেজে । সেখান থেকে প্রথম বিভাগে আই এ পাশ করে চলে আসেন প্রেসিডেসি কলেজে । ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাই সেকন্ড ডিভিশনে । পরীক্ষার আগে তিনি ব্যাসিলাস ডিসেন্ট্রিতে খুব ভুগেছিলেন । ইচ্ছে ছিল সে বছর পরীক্ষা ড্রপ দেওয়ার । কিন্তু মায়ের জোরাজুরিতে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন । মায়ের কথা তিনি কিছুতেই ফেলতে পারতেন না । বাবার সঙ্গে একটা সম্ভ্রমের দুরত্ব বজায় রাখতেন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে সব কথা হত । কোনো দিন মায়ের সঙ্গে কবিতা নিয়ে কোনো আলোচনা হত কিনা তা অবশ্য আমরা জানতে পারিনা । কুসুমকুমারীর কবিখ্যাতি কিন্তু সে সময় কিছু কম ছিল না । ‘প্রবাসী’ আর ‘মুকুল’ পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু কবিতা ছাপা হয়েছিল । আর একটি কবিতার তো আমাদের কাছে প্রায় প্রবাদ প্রতীম হয়ে গেছে – আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ? মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন মানুষ হইতে হবে এই তার পণ --- জীবনানন্দ অবশ্য প্রথম থেকেই এই জাতীয় কবিতা থেকে অনেক দুরের যাত্রী । এম এ পাশ করে চাকরী পান সিটি কলেজে ।সে কলেজে ব্রাহ্মদের রমরমা ।ছাত্রদের সরস্বতী পুজো করা নিয়ে পরিচালন সমিতির একটি বিরোধ বাধে এবং তাতে ছাত্রদের সমর্থন করার অপরাধে জীবনানন্দের চাকরী যায় । তার পরে চাকরী করতে যেতে হয় তাঁর সাধের রুপসী বাংলা ছেড়ে দিল্লী তে রামযশ কলেজে ।সুদুর দিল্লীতে হয়ত খুব একাকীত্ব বোধ করছিলেন । মাথায় উঁকি দিচ্ছিল সেই বিখ্যাত লাইন গুলি – ‘...সকল লোকের মাঝে বসে আমার নিজের মুদ্রা দোষে আমি একা হতেছি আলাদা আমার চোখেই শুধু ধাঁদা আমার পথেই শুধু বাধা...।’ অনুভব করেছিলেন বাস্তব জীবনে একজন জীবন সঙ্গিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা । তেমন কেও এলে কেটে যাবে একাকীত্ব ।এমনটাই ভেবেছিলেন হয়ত । সেই ভেবেই লাবণ্য গুপ্ত কে দেখতে এলেন জীবনানন্দ , লাবণ্যর জেঠামশাইয়ের ঢাকার বাড়িতে । লাবণ্য তখন ঢাকার ইডেন কলেজে হোস্টেলে থেকে আই এ পড়েন । সে কালের নিরিখে যথেষ্ট প্রগতীশীল । সুন্দরী এবং সপ্রতিভ । ব্রাহ্ম পরিবারের রীতিনীতি বেশ খোলা মেলা ছিল । জেঠামশাই জীবনানন্দ কে পাত্রী কে একান্তে প্রশ্ন করার সুযোগ দিলেন । গত তিন প্রজন্মের বাংলা ভাষাভাষী কবিযশপ্রার্থীরা যে জীবনানন্দের কবিতায় খুঁজে পান রোমান্টিকতার আশ্রয় , তিনি মানুষটি কি আদতে রোমান্টিক ছিলেন ? তাঁর জীবনে যে নারী প্রথম আসতে চলেছে তাকে তাঁর করা প্রশ্ন গুলি জেনে তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যেতে পারে । সেগুলি ছিল এ রকম - আপনার নাম কি ? আই এ তে আপনি কি কি সাবজেক্ট নিয়েছেন? কোন সাবজেক্টটি আপনার বেশি পছন্দ ? পাত্রী কোনো রকমে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েই উঠে চলে যায় অন্দরমহলে । প্রশ্নের উত্তর পেয়ে জীবনানন্দের কি ধারণা হয়েছিল তা আমরা জানতে পারি না । তবে এর পরেই জীবনানন্দ বিয়েতে মত দেন ।১৯৩০ সালের ২৬শে বৈশাখ , শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে ঢাকা শহরে খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামের রোহিনীকুমার গুপ্তর কন্যা লাবন্য গুপ্তর সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় কবি জীবনানন্দের । দেখতে এসে পাত্রীকে করা প্রশ্ন গুলি মধ্যে কোনো রোমান্টিকতার রেশ ছিল না এটা আমাদের মনে হতেই পারে । কিন্তু ফুলশয্যার রাতে ? আমাদের প্রিয় কবি কি কথা বলেছিলেন নবোঢ়া বধুকে ? সে রাত্রে সংলাপ ছিল এই রকম - আমি শুনেছি তুমি ভালো গান গাইতে পারো । আমায় একটা গান শোনাবে ? - কোন গান ? - জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে গানটা যদি জানো তবে সেটাই শোনাও সে রাত্রে পর পর দু বার গান টি গাইতে হয়েছিল লাবণ্য কে । অনেক দিন পরে কবিপত্নী কবি জিজ্ঞেস করেছিল ফুলশয্যার রাতে এই গানটি কেন শুনতে চেয়েছিলেন । উত্তরে কবি বলেন – এই লাইন দুটির মানে জানো ? আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া তোমার বীণা হতে এসেছে নামিয়া – জীবনের শুভ আরম্ভ তে তো এই গানই গাওয়া উচিত , শোনা উচিত । এ পর্যন্ত যা জানলাম তা জানতে পারলাম তার অনেকটাই কবি পত্নীর লেখা ‘মানুষ জীবনানন্দ’ থেকে । এ বই তে যা লিখেছেন , বোঝা যায় তিনি খুব সন্তর্পণে লিখেছেন । ইচ্ছে করেই লিখতে চান নি এমন কিছু যাতে মানুষ জীবনানন্দের বিচিত্র স্বভাবের থেকে সৃষ্টি হওয়া দাম্পত্য সম্পর্কের ফাঁক গুলো ধরা পড়ে । এ বইতে মানুষ জীবনানন্দ আর সম্মন্ধে যা যা জানতে পারি তা সার সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় – খুব সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন ।মিলের ধুতি পরতেন ।তাও একটু উঁচু করে পরতেন মানে ধুতি হাঁটুর নীচে বেশি দূর নামত না ।এবং তাঁর জামা কাপড়ের ব্যাপারে কারো মন্তব্য গ্রাহ্য করতেন না। ডিম খেতে খুব ভালো বাসতেন । লেখার খাতা প্রাণপণে আগলে রাখতেন । দুই সন্তান মঞ্জুশ্রী আর সমরানন্দ কে খুব ভালোবাসতেন , যে কোনো গৃহী মানুষের মত ।ছোট বেলায় মেয়ের একবার অসুখ করে তখন মেয়েকে কোলে নিয়ে সারারাত পায়চারী করতেন । মেয়েকে রান্না ঘরে যেতে বারন করতেন , পাছে আগুনে পুড়ে যায় । আশা ছিল মেয়ে তার মত কবিতা লিখবে একদিন। ছেলের সঙ্গে বন্ধুর মত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন । একটু নার্ভাস প্রকৃতির ছিলেন । বিয়ের পর লাবণ্য বি এ পরিক্ষা দিয়েছিলেন কবিরই উৎসাহে । রেজাল্ট বেরোবার সময় তিনি এতটাই নার্ভাস ছিলেন রেজাল্টের খাম হাতে পেয়েও অনেকক্ষন ধরে নিজে কিছুতেই খুলতে পারেন নি খাম । কারো কাছে কিছু নিতে কুণ্ঠিত বোধ করতেন । বিয়েতে শ্বশুর বাড়ি থেকে একটি আংটি পেয়ে বেশ বিড়ম্বিত বোধ করেছিলেন । তবে তাঁকে দেখে যতটা শান্ত নিরীহ মনে হত আসলে তিনি তেমন ছিলেন না । লাবণয়র কথায় ‘ছাই চাপা আগুন’ । শান্ত ভাবে অল্প কথায় নিজের ব্যাক্তিত্য প্রকাশ করতেন কখনো কখনো । লাবণ্য দাশের স্মৃতিচারন পড়লে মনে হতে পারে তাদের দাম্পত্য জীবন মসৃন ভাবেই কেটেছে । কিন্তু তেমনটা বোধহয় নয় । ভুমেন্দ্র গুহ এবং অশোক মিত্র মশাই যাঁরা দুজনেই কবির খুব কাছের মানুষ ছিলেন তাঁদের স্মৃতিচারণে আমরা একটা অন্য রকম ছবি পাই । ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে , যেটি কবির ভাই অশোকানন্দ দাশের মতে কবির ছদ্ম বেশে আত্নজৈবনিক উপন্যাস , সেখানেও দাম্পত্য সম্পর্কের অশান্তির দিকটি উঠে এসেছে । সে কথায় পরে আসছি । দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন বিয়ের পরে বছর খানেক; ১৯৩৫ সালে বরিশালে চলে এসে যোগ দেন ব্রজমোহন কলেজে, ছিলেন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৫১ থেকে '৫২ সাল পর্যন্ত পড়িয়েছেন খড়গপুর কলেজে, ১৯৫৩ সালে বারিষা কলেজে, পরের বছর হাওড়া গার্লস কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। খরগপুর কলেজে অধ্যাপনা করার সময় সপ্তাহান্তে কলকাতায় চলে আসতেন এবং প্রায়শই কলেজ কামাই করে আরো কয়েকদিন থেকে যেতেন । তাই এই চাকরীটি চলে যায় । পরে ডায়মন্ড হারবার কলেযে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তাঁর শুভনুধ্যায়ীরা । সে চাকরীতে তিনি যোগদান করেন নি যাতায়াতের অসুবিধার অজুহাতে । ঘন ঘন চাকরি হারানোর ফলে জীবনের অনেকটা সময় প্রচণ্ড অর্থকষ্টেই কেটেছে । গ্রাসাছাদনের জন্যে ইন্সিওরেন্সের দালালি পর্যন্ত করতে হয়েছে । তবু তার মধ্যে কিন্তু লেখা চালিয়ে গেছেন পুরো দমে । ওই এক জায়গায় তিনি কখনো হাল ছাড়েন নি । বোধহয় আগামী পৃথিবীর কথা ভেবে । সেটাই আমাদের পরম সৌভাগ্য । (শেষ হয় নি )
Somen dey
তোমারি তূলনা তুমি (১) আনন্দ যার জীবনে বিরলতম অনুভব সেই কবিরই নাম জীবনানন্দ । বিষন্নতার সঙ্গে নিত্য সহবাস করতে করতে এই পিতৃদত্ত নামটির ভার হয়তো কখনো কখনো তাঁর কাছে খুব অবহ মনে হয়েছে । অথবা এই নামটিই হয়তো সাহাজ্য করেছে বেদনা-বিধুর বিপন্নতায় নির্বাসিত জীবনে সতত সৃষ্টিশীল থাকতে । আমরা সে রহস্য কোনোদিন সমাধান করতে পারবো না । জীবনানন্দকে কেউ বলেছেন নির্জনতম কবি , কেও বলেছেন নিশ্চেতনার কবি , কেও বলেছেন অবচেতনার কবি । জীবনানন্দ এই সব মতগুলিকেই ‘ আংশিক ভাবে সত্য ‘ বলেছেন । যখন তিনি কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছেন রবীন্দ্র নাথ সুর্যের মত জ্বল জ্বল করছেন বাংলার সাহিত্যের আকাশে । বাংলা কবিতার যে আঙ্গিক, যে ভাব্ যে ভঙ্গীকে যে তিনি হিমালয়চিত উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন তার সামনে দাঁড়িয়ে সে সময়ের যে কোনো কবির অসাহায়বোধ অবশ্যম্ভাবী ছিল । আর কি কিছু লেখার বাকি আছে ? রবীন্দ্র নাথ কি আধুনিকতার শেষ ধাপে রেখে যাবেন কবিতাকে ? এ প্রশ্ন গুলো যখন নবীন কবিদের জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছে তখন কল্লোল , কালিকলম প্রভৃতি পত্রিকা চেস্টা করছে রবি ঠাকুরের হাত ছাড়িয়ে একটা নতুন পথে হাঁটবার | একটি অনুচ্চারিত বিদ্রোহকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেস্টা করছেন বুদ্ধদেব বোস , অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বিষ্ণু দে রা । তবে এরা যতই বিদ্রোহের ভাব দেখান আসলে এঁদের অন্তরে রবীন্দ্র নাথ শালগ্রাম শিলার মত অনড় । ছন্দের বন্ধন ভেঙ্গে বেরোতে পারলেও আঙ্গিকে রবি ঠাকুর ফিরে ফিরে আসছেন । ঠিক এই সময় জীবনানন্দ এ সব আন্দোলনের কথা মুখে না বললেও কবিতার আঙ্গিক একেবারে ভেঙ্গে তছনছ করে দিতে চাইলেন। কিন্তু সে সময় কেও তাকে বিশেষ পাত্তা দিলেন না । কল্লোল , কালি কলমের কবিরা সকলেই জীবনে কোনো না কোনো ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত । কবিতা তাদের বাঁচা মরার সংগ্রাম নয় । জীবনানন্দর তখন অপরিসীম অর্থ কষ্ট । কলেজে অধ্যাপনার চাকরি কোনোক্রমে জোটাতে পারলেও সে চাকরি শেষ পর্যন্ত রাখতে পারেননি ।এ দিকে তাঁর কবিতা সম্পাদকরা প্রত্যাখ্যান করছেন । নানা ভাবে অপমানিত হচ্ছেন । বিবাহ করেছেন কিন্তু সে বিবাহও সুখের হয় নি । মোটা মুটি এই রকম একটা ক্লিষ্ট জীবন যাপনের মধ্যেই তাঁর বেশির ভাগ কবিতার সৃষ্টি হয়েছে । এই সব দারিদ্র মালিন্য হীনমন্যতা তাঁর কবিতাকে কি প্রভাবিত করেছিল ? বোধহয় না । মুখচোরা অন্তর্মুখী নির্বিরোধী মানুষটি রবির আলোতে আলোকিত না হয়ে , রবীন্দ্রনাথ কে পাশ কাটিয়ে একা একাই চললেন অন্য একটা এবড়ো খেবড়ো অনালোকিত রাস্তায় । সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা দলছুট মানুষদের সমাজ হয় তাচ্ছিল্য করে নয় ছাপ মেরে দেয় পাগোল বলে । এ ক্ষেত্রেও তাই হল । কেউ বললো দুর্বোধ্য , কেউ বললো অশ্লীল। তবু তিনি লেখার আঙ্গিক পাল্টালেন না । প্রথম প্রকাশিত বই ‘ঝরা পালক’ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধুসর পান্ডুলিপি’ বেরোতে লেগেছিল ন বছর সময় । বোঝাই যায় তিনি পাঠকের কাছে সমাদৃত হন নি সেই সময়ে । তবু এই ন বছরে নিজেকে নিয়ে গেলেন আরো বেশি বিমুর্ততার দিকে।ডুব দিলেন নতুন অবচেতনায় জগতে ।
মনোজ ভট্টাচার্য
কিছু কিছু সুন্দর অভিব্যক্তি ! আমার একটা অভ্যেস আছে – এমন অনেক সাময়িক পত্রিকা পড়ি – যার নামই হয়ত অনেকে জানেই না ! তারা এখনও লিটিল ম্যাগাজিনের ছায়া থেকে বেরতেই পারে নি! যদিও অনেক বিদগ্ধ লেখক সেখানে লেখেন এবং বেশ ভালই লেখেন ! হয়ত বাজারী পত্রিকায় লেখা দেওয়া তাঁরা পছন্দ করেন না ! তারই মধ্যে একটা হল - শুভম -! লেখাগুলো – বিশেষ করে প্রবন্ধগুলো খুবই সুপাঠ্য – এবং চিন্তনীয় ! রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড প্রত্যাখ্যান বা রথীন্দ্রনাথের শেষ জীবন ইত্যাদি বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ লেখা আছে ! নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ! কিন্তু একটা লেখা পড়ছি এখন – নলিনী বেরার – জোন থার্টি । উনি ফ্রান্স যাচ্ছেন – তারই ওপর লেখা ! ভ্রমণ কাহিনী – আমরা তো অনেকই পড়ে থাকি । কিন্তু কিছু কিছু অভিব্যক্তির প্রকাশ এত সুন্দর – মনে হল এখানে শেয়ার করি । হয়ত নিনাবালি বা মুনিয়ার বা যারা দেশে আসা যাওয়া করতে হয় - তাঁদের ভালো লাগতেও পারে ! “ - - ভিসার জন্যে তোলা আমাদের সব ফটো বাতিল । অথচ পরিমান মতো কোথায় কোথায় না ছবি তুলিয়েছি । কলেজ স্ট্রিট ওয়েলিংটন ধর্মতলা । - - অগত্যা ‘নিউ বম্বে ফটো’, চার নম্বর হো চি মিন সরনি। সাদরে চা খাওয়াল । তদুপরি স্টুডিয়োর দেয়াল-গাত্রে উপর্যুপরি সাঁটা ছবি দেখে আমাদের রোমাঞ্চ হল । কে নেই ? সর্বশ্রী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, মনোজ মিত্র, স্রীমতী অপর্ণা সেন - -! ( ইয়ে, মনোজ ভট্টাচার্যের নামটা লিখতে ভুলে গেছে দেখছি !) এর ঠিক দুদিন পরে কুরিয়ার ‘ক্রোনোপোষ্ট ইন্টারন্যাশানাল’ এর হাত ঘুরে এসে গেল বহু আকাঙ্খিত সেই ‘আটেসটেশন ডি অ্যাকাউলি’। তর্জমা করলে যার মানে দাঁড়ায় ‘সার্টিফিকেট অব বোর্ডিং অ্যান্ড লজিং’! - - আর দেখে কে ! ‘মুস্করা কর ডাল দী রুখপর নকাব । মিল গায়া জো মিলনা থা জওয়াব ‘! সাধু শেঠের মুদিখানায় গদিতে ফর্দ ফেলে দিয়ে শশব্যস্ত বলি – ‘ফ্রান্স যাচ্ছি – জিনিস কটা একটু তাড়াতাড়ি দিন তো ।‘ - - ফর্দ টুকতে টুকতে সেরেস্তার বাবু এতক্ষণে আচমকা মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ অ্যাঁ, কোথায় যাচ্ছেন বললেন ? ফ্রান্স ? তারমানে ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস ?’ আইনি ছাড়পত্র দেখিয়ে অন্দরে ঢোকামাত্রই শিহরিত হলাম । কোথায় আমার জন্মের মাটি, দেশ-গাঁ ! কোথায় বড় হয়েছি ! কোথায় কাটিয়েছি এ যাবত জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই ! এক্ষণে আবার কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি ! অথচ – “ ছিটকিনি খুলে দাও এই দণ্ডে পিছল জোছনায় থুবড়ে মুখ শুয়ে রব ঘাসে ডোবাবো শিশিরে জিহ্বা যদি দাও খুলে দাও তবে চাঁদ এসে নুয়ে পড়ে গ্রিলে থ্যাবড়ায় নখরে ডাকে আয় চলে আয় কাকে ছেড়ে কোথায় জোড়াব কি আছে আমার বলো এইটুকু শেষ হয়ে গেলে খালি গা উদোম পায়ে ছিনছাতুর করে নদীজলে মিশে পাথর পাথর হয়ে গড়তে গড়াতে যাব যদি ছিটকে উঠে ভেঙ্গে পড়ি জলে তর্পণে তোলো ছিটকিনি খুলে দাও এই দণ্ডে পিছল জোছনায় থুবড়ে মুখ শুয়ে রব ঘাসে ডোবানো শিশির জিহ্বা “ “কুছ লোগোঁ সে জবতক ন মুলাকাত হুই থী ম্যায় ভী য়ে সমঝতা থা খুদা সবসে বড়া হ্যায় “! তর্জমা হল এই, জীবনে যদি কিছু লোকের সঙ্গে দৈবাৎ দেখা না হত, তবে ভাবতাম খোদাই সবচেয়ে বড় । তদন্তকারী অফিশারকে দেখে আমারও মনে হল তিনি বুঝি ঈশ্বরের থেকেও বড় ! অভিবাসন দপ্তরের বাগবিতণ্ডায় সামান্য দেরী হয়েছিল । তা স্বত্বেও, বলতে বাধা নেই –একমাত্র আড়াই ইঞ্চি দৈর্ঘের কাঁচিটি ছাড়া, কি পোস্ত, কি লঙ্কার গুঁড়ো, কোনও কিছুই আমাদের খোয়া যায়নি । “কুছ লোগো সে জবতক ন মুলাকাত হুঈ থী” – ইমিগ্রেশান কাউন্টারের খোদার চেয়ে বড় না হোক, ঈশ্বরপ্রতিম লোকটার সঙ্গে আমার এই প্রথম মুলাকাত হল । বলা বাহুল্যই, লোকটা পোস্তখেকো ভেতো বাঙ্গালিই ছিল । রাত ঠিক আটটা তিরিশে আমার জন্মের মাটি, দেশ-গাঁ, হাওড়া-কলকাতার সংযোগ রহিত হল । বলা যায় নাড়ি ছিঁড়ল । দমদম বিমানঘাঁটির রানওয়ে ছাড়িয়ে – “এই তো উড়ান দিল পাখি, ছেঁড়া ছেঁড়া ।“ কান্না-পালক ছুঁয়ে যায় বুক, আমার জন্মের মাটি, দেশ-গাঁ প্রসুতির ঘর জন্মলগ্ন আবহ সঙ্গীত”। কলকাতা ছাড়ল বটে, বাঙলা এখনও ছাড়েনি ! কি ভূগোল কি ভাষায় । মনে হয়, মেঘহীন আকাশে ফিং-ফোটা জ্যোৎস্না পড়েছে । জানলার ধারে বসে ‘মেঘপাতালের’এর তলায় চোখ রাখলে ‘বাঘঘুগনি’ পোকার মতো আলোর ফুড়গুনি । জোনাকি পোকা তো নয় – দেশে-ঘরে বলে ‘বাঘঘুগনি' পোকা । এক সময় ভূখণ্ডও সরে গেল – থাকল বাকি ভাষা ! আ মরি বাংলাভাষা ! ( অনেকদিন পর মনে পড়িয়ে দিল মুজতবা আলিকে !)
dalia mukherjee
সরস্বতী পুজো এলেই মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। কি আনন্দ ই না করেছি এই সরস্বতী পুজোয়। সরস্বতী পুজোর দিন আমাদের বাড়িতে হোত খিচুড়ি, সঙ্গে নানা রকমের ভাজা ভুজি, বাঁধাকপির তরকারি। সেদিন আমাদের খেতে হোত নিরামিষ। আর আমাদের বাড়ির নীচে এক বরিশালের পরিবার ভাড়া থাকতেন। তাঁদের মেয়ে মাধু ছিল আমার খুব বন্ধু। ওঁদের বাড়ি আসত জোড়া ইলিশ। সেই ইলিশ পুজো করে তারপরে রান্না করা হোত। একটা ইলিশের মাথায় সিন্দুর পড়িয়ে, ধান দুর্ব দিয়ে সাজিয়ে শাঁখ বাজিয়ে রান্নাঘরে তোলা হোত।মাধুর ঠাকুমা আমাদের ডাকতেন, " তোমরা এসো, আজ আমাদের বাড়ি ইলিশ খাইবা"। আমার মা, বাবা কোনদিন ই গোঁড়া ছিলেননা। মা বলতেনঃ "ডাকছেন যা, ওদের বাড়ি খেয়ে আয়।"আমি আর আমার ছোট ভাই মহানন্দে যেতুম নীচে মাধুদের বাড়ি ইলিশ খেতে। কত রকমের যে ইলিশের পদ মাধুর মা বানাতেন তার ইয়ত্বা নেই। ইলিশের ভাপা, ইলিশ ভাতে, ইলিশের পাতুরি, শেষপাতে ইলিশের অম্বল, আর কুলের অম্বল। রাতে আমাদের বাড়ি হোত লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম। মাধুরা কয় ভাইবোনে আসত রাতে আমাদের বাড়ি খেতে। পরের দিন শেতল ষষ্ঠি, আমরা খেতুম গোটাসেদ্ধ। মা অনেক গোটাসেদ্ধ বানাতেন, ভাতের বেশী গোটাসেদ্ধ ই আমরা খেতুম। তবে সরস্বতী পুজোর দিন দুপুরে ভোগ খাওয়া ছিল আমাদের স্কুলে। বাড়িতে রাতে লুচি খাওয়া হোত।সকাল থেকে পাড়ার পুজোতে মাইকে গান বাজত তারস্বরে, " সরস্বতী, বিদ্যেবতী, তোমায় দিলেম ছেঁড়া পুঁথি, একটু দয়া কর মাগো বিদ্যে যেন হয়।" আমিও মনে মনে বলতুম, " মাগো, কদিন বাদেই পরীক্ষা, ভালভাবে পাশ করি যেন মাগো" সবচেয়ে বেশী আনন্দ করেছি স্কুলের সরস্বতী পুজোতে। সেই ভোরে উঠে স্নান সেরে শাড়ি পড়ে স্কুলে যাওয়া,অঞ্জলী দেওয়া, প্রসাদ খাওয়া। এসব হোত স্কুলেই। রাতে প্রতি সরস্বতী পুজোতে একটা করে থিয়েটার হবেই। তার রিহার্সাল শুরু হোত দুমাস আগে থেকে। আমরা যখন এম,ই স্কুলে পড়ি, আমাদের স্কুল ছিল সকালে। আর আমাদের থিয়েটারের পার্ট দেওয়া হোত ছোট দেখে। যেমন একবার রামের সুমতি তে আমি হয়েছিলুম গোবিন্দ, অচলায়তনে হয়েছিলুম আশ্রম বালক। হাই স্কুলে ওঠার পরে আমাদের বড় পার্ট দেওয়া হোত। রিহার্সালের জন্যে দুপুরে আবার আমাদের স্কুলে যেতে হোত। কি উৎসাহ নিয়েই না সব করেছি। ক্লাস ইলেভেনে যখন উঠলুম , সরস্বতী পুজোর ভার পড়ল আমাদের ওপরে। ছেলেরা ঠাকুরের অর্ডার দেওয়া, ঠাকুর আনা, পুজোর সব ব্যবস্থা করা, এইসব কাজের ভার পেল। আর মেয়েরা ঠাকুর সাজানো,ফুলের ব্যবস্থা, নৈবেদ্য সাজানো , ফল কাটা এইসবের ভার পেল। সেবারে থিয়েটার হয়েছিল আরোগ্য নিকেতন। আমি হয়েছিলুম কবিরাজ। ওরে বাবা! ধুতি সামলাব , না পার্ট বলব। তবে জমেছিল খুব। সেদিন কোন পাড়াতেই কোন ফাংসান হোতনা, কেননা সকলের ই আগ্রহ স্কুলের থিয়েটার দেখতে যাবার। সেই আমার দেশে শেষ থিয়েটার করা। এদেশে আসার পরে কর্তাদের থিয়েটার ক্লাবের সঙ্গে বার তিনেক ডাচ থিয়েটার করেছি অবশ্য। য়ামাদের কলেজটা ছিল একটু দূরে, বাসে করে যেতে হোত। তাই কলেজের সরস্বতী পুজোতে সেরকম মাতামাতি করিনি বা করতে পারিনি। সরস্বতী মাতার আশীর্বাদ পাবার জন্যে অতি কষ্টে কুল না খেয়ে নিজের লোভ সংবরণ করতুম। কিন্তু যেই না সরস্বতী পুজোর প্রসাদ খাওয়া হোত, সঙ্গে কুল, ব্যাস! আর আমাদের পায় কে? সেনবাবুদের বাড়িতে নারকেল কুলের গাছ ভরে আছে কুলে, যারা এসব মানেনা সেই দুষ্টু ছেলেগুলো রোজ দুপুরে গাছ ঠেঙ্গিয়ে কুল পাড়ছে, আর খাচ্ছে। আর আমরা হাঁ করে দেখছি। পূজোর আগে কুল খাওয়া? নৈব, নৈব চ।কিন্তু পুজো হয়ে গেলেই সারা দুপুর চলত আমাদের কুল খাওয়া।সেনবাবু এত গালাগালি দিয়েও কিছু করতে পারলেননা। শেষে রাগের চোটে গাছটাই কেটে দিলেন। তাঁর দুপুরের ঘুমের আর কখনো ব্যাঘাত হয়নি। পাশের বাড়ির টুনুর দিদার বাড়িতে টোপাকুলের গাছটা কুলে ভরে থাকত। যখন কুলগুলো পাকত, গাছটা লাল হয়ে থাকত, অজস্র কুল পড়ত পাশের গলিটাতে। আমরা সেই গলি থেকে তুলে ই কুল খেতুম। তা টুনুর কি আর সহ্য হয়? সেও বাপ বাপান্ত করতে ছাড়তনা। আর আমরা টুনুকে আরও ক্ষেপাবার জন্যে গান গাইতে থাকতুম। এইভাবে চলত আমাদের সারাদুপুর কুল চুরি। অবশ্য সকালে যখন স্কুল ছিল, দুপুরে স্কুল হওয়াতে এসব বন্ধ ই হয়ে গেছিল । তখন ওই স্কুল যাবার পথে কারুর বাড়ি কুলগাছ দেখলে হয়তো দু চারটে কুল পেড়ে নিতুম। তবে কুলের অম্বল টা আমার কোনদিন ই প্রিয় ছিলনা। এইভাবে আমরা সরস্বতী পুজো, কুল খাওয়া উপভোগ করেছি। এখন বসে বসে ওই স্মৃতিচারণ করি, আর ভাবি কোথায় চলে গেল সেই দিনগুলি, কেন থাকলনা সে সোনার খাঁচায় বন্দী হয়ে. এখন সে আছে আমার মনের মণিকোঠায়, মাঝে মাঝে সেই মণিকোঠা যায় খুলে, আর বেরিয়ে পড়ে সে, জেগে ওঠে আমার স্মৃতি। তা এই সরস্বতী পুজো এলেই আমার ছেলেবেলার সরস্বতী পুজোর কথা বড্ড মনে পরে।
জল
তখন বেশ বড়‚ তবে গ্রাজুয়েশন করা হয়নি| মানে চলছে আর কি| তা আমাদের টাইপ স্কুলে স্যার বললেন এবার বেশ বড় করে পুজো হবে| সবাই আসবে কিন্তু| সেদিন আগল ছাড়া বাঁধন হারার দিন‚ স্বাধীনতার দিন কেউ না এসে পারে| আমি আর রুবি আমাদের পাড়া থেকে বেশ সেজেগুজে‚ শাড়ি সামলে সুমলে গেছি| শাড়ি তো নয় যেন অকূল পাথার| কুঁচি সামলাই তো আঁচল লুটোয়‚ আঁচল সামলাই তো কুঁচি খুলে যায়| তার ওপর রাস্তা যেন প্রমীলা কূলের অধীনে| নানান বয়সী রঙীন প্রজাপতির বশ সেদিন রাস্তা| আর ছেলেরা তো বরাবর বুভুক্ষুর দল (প্লিজ কেউ কিছু মনে করো না‚ জাস্ট মজা করে লিখলাম) তাকাতে তাকাতে চোখের পাতা ছিঁড়ে পড়ে গেলেও তাকাতে ছাড়ে না| তা যাই হোক‚ পৌঁছে তো গেলাম| পেটের মধ্যে নানান সাইজের ইঁদুর ডন-বৈঠক দিয়েই চলেছে| এই ইঁদুরগুলো মহাপাজি‚ যেদিন উপোস -তিরেস হবে সেদিনই ওদের বেশি বাড়াবাড়ি| তা গিয়ে দেখলাম পুরোহিত অমিল| স্যার ধুতি-চাদর গায়ে যাকে দেখছে তাকেই পাকড়াও করার ব্যর্থ চেষ্টা করেই চলেছেন ঘন্টাখানেকের ওপর হল| এদিকে ফলের থালায় কুলের আকূল আহ্বান| আমরা কি আজকের খোকাখুকুদের মত ছিলাম যে কুল খাবো‚ তখন অঞ্জলি না দিয়ে কুল খেতে নেই| অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি| তা অনেকটা সময় গত হয়েছে‚ সবার পেটেই চুহা ডাকছে| অবশেষে এসে হাজির হলে নতুন স্যার| কি ঘ্যামচ্যাক দেখতে| ফর্সা গায়ের রঙ| লম্বা আর কোঁকাড়ানো একমাথা চুল| পরণে পাজামা আর সিল্কের পাঞ্জাবী| নতুন স্যর ঢুকতেই আমাদের স্যর যেন হাতে চাঁদ পেলে| আরে তুমি ব্রাহ্মন তাই না? কি যেন পদবী তোমার? মুখার্জী না চ্যাটার্জী? আর পায় কে| নতুন স্যর কিছু বুঝে উঠে উত্তর দেবার আগেই স্যর বললেন নাও পাজামাটা খুলে ফেলো| একঘর ছাত্র-ছাত্রী‚ আর তিনি নতুন এসেছেন‚ তখনও সবার সাথে চেনাপরিচিতি নেই| তার ওপর কথা নেই বার্তা নেই বলে কিনা পাজামা খুলে ফেলো| বেচারা নতুন স্যর কেঁদে ফেলে আর কি| পাজামার দড়ি পেটের ওপর থেকে আন্দাজ করে জোরে ধরে থাকে| যেন স্যর এখুনি জোর করে খুলে দেবে| ততক্ষণে ঘর জুড়ে হাসি ফেটে বের হতে চাইছে| নতুন স্যার আরও যেন গুটিয়ে যেতে চাইছেন| মিনমিনে স্বরে বলে কি বলছেন স্যার? আরে তোমাকেই তো পুজোটা করতে হবে| ওরে আমার বিয়ের ধুতিটা নিয়ে এসো তো কেউ‚ আমার টেবলে রাখা আছে| এসব কাজে কেউ দেরী করে না| কে একটা ছুটে গিয়ে নিয়ে এল স্যারের বিয়ের ধুতি| কিন্তু কে পড়াবে সে ধুতি| স্যার তো পারেন না‚ ও স্যার বিয়েতে কে পড়িয়ে দিয়েছিল? কে যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়| তার সাথে হি হি হা হা| এবার স্যারও লজ্জা পেয়ে যান| এই চুপ কর সব বলে ধমকে ওঠেন মৃদু| তোমরা কেউ পার ধুতি পরাতে? স্যার জানতে চান ছেলেদের দিকে তাকিয়ে| কেউ উত্তর দেয় না| এর থেকেও শক্ত কাজ বোধহয় করতে পারে কিন্তু ধুতি পরাতে পারে না| কি কুক্ষণে যে আমি পাপিয়াকে বলছিলাম একিগো এরা কেউ ধুতি পড়তে জানে না‚ আর আমি মেয়ে হয়ে পারি| সেটা যে সে ওখানে ফাঁস করবে কে জানতো| চেঁচিয়ে বলে স্যার জলি পারে| স্যার আর নতুন স্যার দুজনেই থতমত খেয়ে যায়| আর আমর অবস্থা যে কি ‚ সে বলার না| আমি ভাবছি পাপিয়ার মাথায় কিছু একটা ছুঁড়ে মারি| এরা বন্ধু??? এদিকে তখন দুপ্রান্তের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে হাসির ফোয়ারা| আর আমাদের স্যার তো মুচকে মুচকে হাসছেন‚ কিন্তু নতুন স্যার লজ্জায় পুরো লাল| মনে মনে বলছেন নির্ঘাত ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি| অবশেষে স্যার সময় চলে যাচ্ছে দেখে নিদান দিলেন এক কাজ কর লুঙ্গির মত করে ধুতিটা পড়ে ফেলো| অগত্যা স্যার তাই করলেন| শুরু হল পুজো| নতুন স্যার গায়ত্রী মন্ত্রই জানে না| ওপাড়ের দশকর্মার দোকান থেকে কিনে আনা পাঁচালী থেকে পড়ে পড়ে পুজো করছেন| একে একে হল সব| এবার আরতি আর হোমযাগ বাকি| আরতি করছেন স্যার| ঘেমে নেয়ে একসা| পঞ্চপ্রদীপ শেষ‚ ধুপের আরতি শেষ‚ এবার পানশাঁখ| ব্যস পানশাঁখে আরতি চলছে আর ধুতি ফরর ফরর করে খুলে প্রপাত ধরণীতলে| আর কি‚ পুজো মাথায়| এক হাতে ঘন্টা‚ অন্য হাতে পানশাঁখ আর সামনে ধুতিবিহীন স্যার কল্পনা করে নাও সবাই| আমরা আর সেদিন অঞ্জলি দেব কি? হাসতে হাসতে নিজেদের হালত খারাপ| এদিকে স্যারও আর নতুন স্যারের দিকে তাকাচ্ছে না‚ নতুন স্যার কারও দিকেই তাকচ্ছে না| শেষে আমরা মেয়েরা সব বাইরে বেড়িয়ে গেলাম| খানিক পরে স্যার ডাকলেন| দেখলাম স্যার আসনে বসে ভোগ দিচ্ছেন| যজ্ঞ মুলতবী হয়ে গেল| আর আমরা হাস হাসতে সেদিন যে কি অঞ্জলি দিলাম বীনাপাণিই জানেন| (এবার কিন্তু তোমরা কেউ লেখ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা)
মনোজ ভট্টাচার্য
অহর্নিশের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ! সকালে বন্ধুর মেয়ে – সোমা মুখোপাধ্যায় চক্রবর্তী – ফোন করে জানালো বিকেলে জীবনানন্দ হল এ একটা আলোচনা সভা হবে – যেন যাই । ওর বা ওর স্বামীর সঙ্গে প্রায় দুবছর কথা নেই । হঠাৎ করে গিয়ে উঠতে পারবো কিনা – সে সব কোনও কথা নেই ! কি নিয়ে আলোচনা – তাও জানালো না । নির্দ্বিধায় বলল – খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয় ! অহর্নিশ পত্রিকার সঙ্গে বা ওর সম্পাদকের সঙ্গে আমার অনেকদিন ধরেই সম্পর্ক ! এর আগেও ওদের বাৎসরিক সভায় গেছি ! শুভাশিস চক্রবর্তী ছেলেটি খুবই সিরিয়াস ধরনের – বিশেষ করে সাহিত্যের বিষয় ! সেই অহর্নিশ পত্রিকার বিশতম বার্ষিকী ! কুড়িতে বুড়ি ছুঁল ! এবারের সংখ্যায় বিষয় লেখা আছে – ত্রিপুরার জন্য ! হলে পৌঁছতে মিনিট দশেক দেরি হয়ে গেছিল । ভেতরে ঢুকে দেখি শঙ্খ ঘোষ । চারজন ত্রিপুরার কবি সমাবৃত হয়ে সভা অলঙ্কার করে আছেন । একটা কথা লিখছি । ত্রিপুরা রাজ্য সম্পর্কে আমাদের মতো কলকাতাবাসীদের খুব বেশি আগ্রহ বা জ্ঞান আগে দেখিনি । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ বইটাতে ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার রাজাদের বাংলাপ্রীতি লেখা আছে ! রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটা লেখার মধ্যে ত্রিপুরার রাজাদের নামের উল্লেখ আছে – শুধু তাই নয় তাঁর মুল্যবান রচনার প্রেক্ষাপটে রয়ে গেছে এদের নাম ও ঐতিহাসিক পরম্পরা ! তাই শুধুমাত্র বাংলাভাষী রাজ্য বলেই আমি বারো সালে ওখানে গিয়ে অবাক হয়ে গেছিলাম ! ত্রিপুরা নাম এলো কথা হতে । ‘ককবরক’ হল ত্রিপুরার অন্যতম ভাষা । ককবরক ভাষায় ‘তৈ-প্রা’ মানে জলের নিকটবর্তী স্থান । ‘তৈ-প্রা’ থেকে তেপ্রা ও তিপ্রা – শেষে ত্রিপুরা । আবার মতান্তরে রাজা ত্রিপুর এর নাম থেকে ত্রিপুরা এসেছে । আবার এও হতে পারে – দশমহাবিদ্যার অন্যতম ত্রিপুরাসুন্দরী থেকেও ত্রিপুরা নাম এসে থাকতে পারে । – তবে এত সুন্দর একটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাজ্য আমাদের দেশেই আছে ! – বিমানবন্দর যেন একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ! আর আগরতলা শহরটা সত্যিই দেখবার মত ! সকালে উঠে দেখা যাবে – রাস্তা খুব পরিষ্কার । বেলা নটার পর থেকেই সারা রাস্তা জুড়ে ফিরিওলারা হাট বানিয়ে ফেলল ! কোন জিনিস বিক্রি হয়না সেখানে ! সারা দিন ধরে বিকিকিনি হলো । বিকেল ছটার সময় দেখা যাবে – সেই সকালের মতোই পরিষ্কার ! ম্যাজিকের মতো উধাও সব ক্রেতা-বিক্রেতা, সামগ্রী, ও সবার ব্যবহৃত জঞ্জাল ! সেই রাস্তা দিয়ে কি স্মুদলি গাড়ি চলাচল করছে ! – আমরা রাত্তিরেও দোকানে খেয়েদেয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফিরেছি ! কোনও সমস্যা নেই ! আমি হঠাৎ আগরতলার কথা লিখতে শুরু করলাম কেন ? – কারন এই সভায় অনেক দেখলাম ত্রিপুরার মানুষ এসেছেন ! সবাই বাংলায় কথা বলাবলি করছে । একটু অ-কারান্ত উচ্চারণ ! কিন্তু পরিষ্কার – কোনও জড়তা নেই ! চারজন ত্রিপুরার কবি প্রত্যেকেই তাঁদের কবিতার থেকে কিছু কিছু অংশ পড়ে শোনালেন ! ত্রিপুরার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সম্বন্ধে আমি সম্যক অভিহিত নই ! – তবে বুঝতে পারলাম – পশ্চিমবঙ্গের মতো অস্থির অবস্থা ওখানে নেই ! তবে একটা কবিতার এই লাইনটা না দিয়ে পারলাম না । ‘এত রক্ত কেন ?’ - “রাজারও হৃদয়ের মধ্যে ক্রমাগত এই প্রশ্ন উঠিতে লাগিল – ‘এত রক্ত কেন’ ?” অনেকের আলোচনার মধ্যে দিয়ে ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্য-ধারা প্রকাশিত হতে লাগলো! গোপা দত্ত ভৌমিকের সরস আলোচনাও খুব উপভোগ্য হয়ে উঠল ! তারও পরে একটা চমক ছিল । অহর্নিশের নিজস্ব একটা আলেখ্য – মেঘদুত পঠন ! একটু অন্য ধরনের ! পূর্ব মেঘ ও উত্তর মেঘ ! সংস্কৃত শ্লোক পাঠ করছেন রাজা ভট্টাচার্য ! ও - কি গুরুগম্ভীর কণ্ঠ ! ঠিক মেঘের মতোই গুরুগম্ভীর ! আর তারই সঙ্গে সঙ্গে সেটা বাংলায় সুনন্দিত গলায় আবৃতি করল সোমা মুখোপাধ্যায় চক্রবর্তী ! – এই পর্বটা মনে হল আমাদের অতিরিক্ত পাওয়া ! এত পরিশীলিত অনুষ্ঠান কি সুন্দরভাবে সন্ধ্যেটাকে নতুন দিনের দিশায় পৌঁছে দিল ! মনোজ