James

আর্কাইভ থেকে পুরোনো লেখা- আরও একবার

অবশেষে সেই দিন সমাগত। ওসমান সাহেব বিষয়ী মানুষ, শকুন্তলার প্রথম জলসার যাহাতে সম্যক প্রচার হয় তাহার নিমিত্ত কার্পণ্য করেন নাই। যত ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট, এশিয়ান মুদীর দোকান, হাজারো ফ্যাকশনের বাঙালী, বাঙলাদেশী, ভারতীয়,পাকিস্তানী ক্লাব, অ্যাসোসিয়েশান, লোকাল বাঙলা, ভারতীয় রেডিও সবেতেই বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করিয়াছেন। শকুন্তলাও তিল তিল করিয়া এইদিনটির জন্য প্রস্তুতি লইয়াছেন গত তিন চারি বৎসর ধরিয়া। উফ, সেইসব দিনগুলির কথা ভাবিলে বুক ফাটিয়া যায়, অশ্রু সামাল দেয়া কষ্টকর হইয়া পড়ে; প্রায় একাকী এই পান্ডববর্জিত দেশে, পেটে বাচ্চা, একপ্রকার পরাশ্রিত তিনি। ওসমান ও মার্গারেট যতই সাহস দিন না কেন,হাজার হাজার বৎসরের সংস্কার- পিতৃপরিচয়হীন সন্তানের জননী হইবার যে লজ্জা, তাহা সর্বদা অন্তঃসলিলা ফল্গুর ন্যায় বিদ্যমান। নাই নাই করিয়াও তো তাহাকে কিছু পার্টিতে যাইতে হয়, ওসমান গৃহেও পার্টির বিরাম নাই, বন্ধুবৎসল মানুষ তাহারা দুইজনেই। "আমার বর অমুক, আমার বর তমুক", "জানো নীতা, আমার কর্তা না- একেবারে অপদার্থ, ডিম সিদ্ধ করিতেও জানে না, অথচ কত বড় ইঞ্জিনীয়ার সে!' এইসব সোহাগী কথাবার্তা, কূটকচালি শুনিতে শুনিতে শকুন্তলারও ইচ্ছা জাগে -আহা রে, তিনি যদি আজ পাশে থাকিতেন! সেই কন্দর্প্যকান্তিকে দেখিয়া এইসকল হেঁদিপেঁচিগণ হিংসায় খাক হইয়া যাইত। শকুন্তলা আন্দাজ করিতে পারেন নাই আজ সন্ধ্যায় যে পরীক্ষা দিতে যাইতেছেন, কয়েক পুরুষ পরে পুরুবংশের আর এক নারী প্রায় একই কারনে অগ্নি প্রবেশ করিবেন। সমাজ, সংস্কার বদলাইতে এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন! + + + ১৫ ই জুন,শনিবার, স্থান অ্যালবার্ট হল, সন্ধ্যা সাত ঘটিকা। লন্ডনের গ্রীষ্ম বড়ই মনোরম। দীর্ঘ শীতের অবসানে সকলেরই ফুরফুরে মেজাজ, শনিবার তায় বাঙলা জলসা, কলিকাতা হইতে গত বারের সফরে আনীত বমকাই বা গাদোয়াল অথবা বালুচরী শাড়ীটি দেখাইবার এবং পরনিন্দা পরচর্চা করিবার আবার একটি সুযোগ আগত। কানাঘুষা মারফত শকুন্তলা বৃত্তান্ত কাহারও অজ্ঞাত নহে। বিশেষতঃ বাঙলালাইভ ডটকম এর সৌজন্যে ভুবনময় বাঙালী diaspora, শকুন্তলা সম্পর্কে অবহিত, এই রসালো কাহিনী তো পড়িতেই পায় না! সামনের দিকের সারিতে মজলিশের চাঁইগণ উপবিষ্টা;বুখারেষ্টের যুথী, ম্যানচেষ্টারের ব্ল্যাকরোজ। হামবুর্গ হইতে দেবলীনা,ওদিকে হল্যান্ডের ডালিয়াদি নীল সিল্কে শোভাবর্ধন করিতেছেন। ভাইরাস শেল কোম্পানীর কাজের ফাঁকে হাজির। মজা দেখিবার সুযোগ কেহ ছাড়িতে চাহে! ইউ এস হইতে আটলান্টিক পাড়ি দিয়া মিনিয়াপোলিসের দোলা ওরফে রাঙাপিসি, ফিলাডেলফিয়ার নিনারায়-এক্কেবারে চাঁদের হাট বসিয়াছে যেন। হিমাদ্রী আসিতে পারে নাই, সে দিল্লী ছাড়িয়া স্বর্গে উর্বশীর নাচন কোঁদন দেখিতেও রাজী নহে। তবে হ্যাঁ, শ্রী শ্রী ১০৮ ভুতো এবং Earl অফ বারুইপুর কেদ্দানি করিয়া একটি ওয়েবক্যাম ফিট করিবার বন্দ্যোবস্ত করিয়াছে ষ্টেজের সামনে। বুনানের পকেট এখন ভারী, আটলান্টা হইতে উড়িয়া আসিয়াছে এই কারণে। উৎসাহী মজলিশীগণ কম্পুটারের সামনে অনিমেষ চক্ষু বসিয়া আছেন। ডিবাসু , বৈশাখী, অপর্ণা চ্যাটাইতেছেন বটে কিন্তু মন পড়িয়া আছে সেইখানে- কখন ঘন্টা বাজিবে। শ্রীমতি বৃষ্টি আকাশ গাঙ পরিত্যাগ করতঃ রুজভেল্ট নগরে ২১ ইঞ্চি স্ক্রীনের সামনে হুমড়াইয়া পড়িয়া আছেন। কিকি সম্প্রতি জেমসের প্রতি পুনঃপ্রসন্ন, তাহার সর্বদোষ ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন এবং শকুন্তলার মঙ্গল কামনার্থে সকাল হইতে উপবাসও পালন করিতেছেন। ট্রিপল A, অর্থাৎ অধীশ, অরিন্দম ও অমিত কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওয়েবক্যামের জানালায় উঁকি দিতেছেন, আর যে দেরী সয় না। বলিতে দ্বিধা নাই, মাননীয় সম্পাদকও তাহার সম্পাদকসুলভ গাম্ভীর্য্য পরিত্যাগ করিয়া আম মজলিশীদের ন্যায় কম্পুটারের স্ক্রীন খুলিয়া প্রতীক্ষারত। + + + অনুষ্ঠান শুরু। পাশের giant স্ক্রীনে কলিকাতার দৃশ্য দেখানো হইতেছে, ঠিকমত আবহ সৃষ্টির নিমিত্ত, আরে ব্যাকগ্রাউন্ডের মাহাত্ম্য কে না জানে; গঙ্গার উড়ু উড়ু বাতাসে কত কি না হয় মুহূর্তের অসাবধানতায়! হাওড়া ষ্টেশনের বড় ঘড়ি দেখা গেল, যাহার নীচে আদি অনন্তকাল ধরিয়া প্রেমিক প্রেমিকাগণ (থুড়ি, b/f, g/f গণ) অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেন। কত যে সুখদুঃখের সাক্ষী ঐ ঘড়ি। ও, আসল কথা বলিতেই ভুলিয়া গিয়াছি, দুষ্মন্ত বসু ও তাহার সাগরেদ মাধব হলের এক কোনে আসন গ্রহন করিয়াছেন। গুহ্য কথাটি অপ্রকাশিত কেনই বা থাকে। ওসমানের সহিত মাধবের বহুদিনের বন্ধুত্ব। মাধব দুষ্মন্তের সকল কাহিনী অবগত আছেন। যে কারণে উহাকে ভুজুং ভাজুং দিয়া এই জলসায় ধরিয়া আনিয়াছেন, ব্যাটাচ্ছেলেকে একটু শক ট্রিটমেন্ট না দিলে বুঝিবে না সে কি হারাইয়াছে। শুরুতেই যথারীতি বাচ্চাদের প্রোগ্রাম- আমাল সোনাল বানলা, আমি তোমায়ভালো বাছি। ধনধান্যে পুছপে ভলা আমাদেল এই বছুন্ধলা..... তারপর, এ কী! দেখা গেল, ছোট্ট খেলনা ধুতি পরিহিত একটি ক্ষুদে শিল্পী ধীর পায় রাজসিক ভঙ্গীতে স্টেজে আসিল। স্বর্গ হইতে দেবশিশুর আগমন যেন। কি রূপ, দর্শকদের মাঝ থেকে, " ও লে লে , ওলে বাবা লে, আয় একটু গাল টিপে দি" গুঞ্জন শোনা গেল।জনগণ বলিয়া দিতে হইবে কি, এই আমাদের প্রিয় ভরত? নমছ্কার, আমি শকুন্তলাপুত্র ভরত। " গোল্লা ছুতেল গোল্লা গুলো কোতায় যেন হালিয়ে গেল.. ........."। দর্শকগণ উচ্ছ্বসিত, তুমুল করতালি থামিতেই চাহে না আর। দুষ্মন্তের কেমন যেন মনে হইতে লাগলো, ইহাকে তিনি কোথায় যেন দেখিয়াছেন। কোথায়, কোথায়, কোথায় দেখিয়াছেন ? সামান্য বিরতি, এরপর মেন প্রোগ্রাম। চিচিং ফাঁক হইতেই দেখা গেল বিষাদময়ী এক অসামান্যা রূপসী কীবোর্ডের সামনে। টুঁ শব্দটি নেই,সারা হল নিস্তব্ধ; কেবল তিনি একের পর এক গান গাহিয়াই চলিয়াছেন। এমন বাদরে সখা তুমি কোথা...।। তুম মুঝে ইউঁ ভুলা না পাওগে....।। কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা....।। কত দিন দেখিনি তোমায়.......।। তুমি শুনিতে চেয়ো না আমার মনের কথা.......।। এবং ও যে মানে না মানা...।। আমার সকল নিয়ে বসে আছি....।। এসো এসো আমার ঘরে এসো....।। গান শেষ হব হব, এমন সময় স্ক্রীনে ভেসে উঠলো বকখালির হোটেলের সেই লবি, দূরে উচ্ছ্বলিত গঙ্গার দৃশ্য, একে একে। (প্রসঙ্গতঃ মজলিশীগণের কেহইকিন্তু নীতিঘটিত কারণে চোখ বুঁজেন নাই, ড্যাব ড্যাব করিয়া প্রতীক্ষা করিতেছেন, বকখালি. wmv আসিল বলিয়া; সরি, নো কিচ্ছু, ওসমান সাহেব ঘরের কেচ্ছা বাহির করিবার মত নির্বোধ নন।) এতক্ষণে দুষ্মন্তের টনক নড়িল, তিনি কি করিবেন , ইতস্তত করিতেছেন; ব্যাপার সাপার দেখিয়া মাধব উহাকে একটি রাম সাইড কিক মারিলেন সকলের অগোচরে। গুটি গুটি পায়ে মন্ত্র মুগ্ধের মত দুষ্মন্ত স্টেজের দিকে আগাইয়া গেলেন, সারা হল স্তব্ধ, সুযোগ দেখিয়া আলো ওয়ালা তাহাকে ফোকাস করিতে লাগিল ; স্টেজে উঠিয়া শকুন্তলা সমীপে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হইলেন। মার্গারেটের উপদেশ মনে পড়িতেই শকুন্তলা মনে মনে কহিলেন, বিড়াল মারিবার ইহা প্রশস্ত মুহূর্ত; ইঙ্গিত করিতেই দুষ্মন্ত সারা পৃথিবীকে সাক্ষী রাখিয়া কান ধরিয়া ওঠ বস করিতে লাগিলেন। শুরু করিবা মাত্রই শকুন্তলা তাহাকে জড়াইয়া ধরিলেন- অনেক হইয়াছে, আর কষ্ট দিয়ো না আমায়। আবহসঙ্গীতে," ওগো তুমি যে আমার" শকুন্তলা পরম আবেশে চক্ষু মুদিয়া ভাবিতেছেন, এবার আমিও বলিতে পারিব, " জানিলে সোমদত্তাদি, আমার বর এত সরল এবং অপদার্থ যে ..... খাইতেও শেখে নাই, বেচারা।' + + + আবহ সঙ্গীতে " বাজে বাজে রম্য বীণা' বাজিতেছে, শকুন্তলা, ভরতকে ক্রোড়ে লইয়া স্বামীসোহাগিনীর ভঙ্গীতে খিল খিল করিয়া হাসিতেছেন, আনন্দের চোটে তাহার নাক বন্ধ হইয়া গেল, তিনি দেশ কাল এবং গৌতমীর উপদেশ ভুলিয়া সিল্ক শাড়ীর আঁচলেই ভ্যাড় ভ্যাড় করিয়া নাক ঝাড়িলেন। হায়রে, আশ্রম বালিকে, এই সব বিশেষ বিশেষ কর্মে সূতীর রুমালই যে শ্রেয় তাহাও তিনি শিখেন নাই। ( যাত্রা সমাপ্ত)

1120

28

শিবাংশু

গোঁফের আমি

তা কথা হচ্ছিলো গোঁফ নিয়ে। খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। বহুকাল আগে একটা থিসিস লিখতে হয়েছিলো, ' দাড়ির রাজনীতি ও রাজনীতির দাড়ি।' পড়ুয়াদের মধ্যে স্পষ্ট দুটো ভাগ। পুং, স্ত্রীং নির্বিশেষে। যাকগে, অতো ভারি কথা এখানে থাক। ------------------------ আমাদের দেশগাঁয়ে গোঁফদাড়ি খুব প্রতীকী ব্যাপার। সেখানে মানুষ দূরে থাক, বাড়ির দুধেল গাইটাও পঞ্চত্ব পেলে লোকে সবার আগে মাথা কামিয়ে ফেলে। কিন্তু যে পুরুষের পিতাঠাকুর বর্তমান, সে কিছুতেই গোঁফটা কামাবে না। কোনও অবস্থাতেই। পিতার অবর্তমানে যদি গোঁফ ওড়াবার মন হয় (শহরের জনতারা) তাও কাকাজ্যাঠাদের পারমিশন নিতে হয়। মুঁছমুন্ডা হওয়া বিশেষ অগৌরবের বিষয়। বঙ্গসন্তানদের প্রতি তাদের কটাক্ষ থাকতো ঐ প্রসঙ্গে। গালাগাল দিতে গেলে মুঁছমুন্ডা বঙ্গালি, ভালোবেসে বললে, সফাচট দাদা। অর্থটা একই। বঙ্গীয় পুংদের মধ্যে যে গুম্ফধারণের প্রবণতাটি বিশেষ কম তার প্রতি কিঞ্চিৎ কটাক্ষ। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, শুধু গুম্ফ যথেষ্ট নয়। তার কিছু শ্মশ্রুর সেবাও লাগে। আমার ধারণাটির প্রয়োগ আমি নিজের জীবনে চারদশক ধরে নিরবচ্ছিন্ন করে চলেছি। --------------------------------- যাকগে একটা কিস্যা শোনাই। লখনউভি কিস্যা। এখানে লখনউয়ের কোন মেহরবান, কদ্রদান রয়েছেন কি না জানিনা। তাঁরা হয়তো আরো একটু জুড়তে পারেন। নবাবি লখনউতে 'বাঁকে' নামের এক ধরণের সংস্কৃতি ছিলো। এঁদের সঙ্গে আমাদের 'বাবু' সম্প্রদায়ের তুলনা করা যায়। মূলধন বলতে, পাহাড়প্রমাণ অহম। হিন্দিতে যাকে বলে 'তাও'। সারাবছর এক পোষাক। মলমলের চুড়িদার আর কুর্তা। পায়ে নাগরা। হাড়হিম করা শীতেও কোনও ব্যতিক্রম নেই। 'তাও' শব্দটির সঙ্গেও গুম্ফের নিবিড় যোগাযোগ। কেউ মাত্রা ছাড়ালে বলা হয়, " ক্যা জি? মুঁছ রকখেঁ হম, অওর তাও লগাব তুম?" ---------------------------- সেরকম একজন বাঁকের গল্প এটা। মনসুরনগর আর চওকের মাঝে একটা ব্রিজ আছে। তার নাম বাঁকে ঘুলাম হুসেন। এই ঘুলাম হুসেনের কথা রাখার খ্যাতি ছিলো। 'প্রাণ যায়ে পর বচন না যায়ে' গোছের ব্যাপার। একবার কিছু টাকার দরকার হতে তিনি এক মহাজনের কাছে ধার চাইতে চান। হাতে বন্ধক রাখার জন্য একটা ছোট্টো কৌটো। তা হুসেনসাহেবের বাজারে এমন সুনাম ছিলো যে মহাজন ঐ কৌটোটার মধ্যে কী আছে না দেখেই টাকাটা দিয়ে দিলেন। শোধ দেবার পর বাঁকেজি সবার সামনে কৌটোটি খুলে বললেন, সবাই দেখো আমি কী বন্ধক রেখেছিলাম। উপস্থিত জনতা সবিস্ময়ে দেখে কৌটোর ভিতরে আছে ঘুলাম হুসেনের গোঁফের একটা লোম। ----------------------------- সুকুমার রায় সম্ভবতঃ এই গপ্পোটি থেকেই প্রেরণা পেয়েছিলেন।

1044

6

মনোজ ভট্টাচার্য

সিনেমাওয়ালা !

সিনেমা-ওয়ালা ! “এ-টা সি-নে-মা ! বি-গ স্ক্রী-ন !” প্রনবেন্দুর আর্ত চিৎকার – সারা হলে হাহাকারের মতো শোনায় । একটা সিনেমা হল – অনেকদিন যাবত হল বন্ধ । অথচ হলের প্রজেকশান রুমে বসে মালিক এবং সহকারী প্রতিদিন ধরে উত্তমকুমারের রেকর্ড বাজাচ্ছে । আর মদ্যপান করতে করতে এক অসম্ভব স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে ! হলে আবার লোক আসবে । আবার হলে সিনেমা চলবে ! আবার একজন মহা-নায়কের আবির্ভাব হবে ! আয়রনি হচ্ছে - মিত্রা হলে কিন্তু মাত্র জনা পঞ্চাশেক দর্শক ! কিন্তু প্রগতির আগ্রাসনে আজ সারা পৃথিবীর পুরনো যা কিছু সব ভেঙ্গে পড়ছে । শুধু সেলুলয়েড থেকে ফেক ভিডিও নয় ! প্রজন্মের চিন্তাধারাও দ্রুত পালটে যাচ্ছে । পিতা রিকশায় চলেছে তো পুত্র মোটর বাইকে দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে ! – একদিকে সিনেমা হল ফাঁকা পড়ে আছে । অন্যদিকে ভিডিও পার্লারে নকল ভিডিও দেখছে মানুষ – হাউসফুল ! মাছ-ওলার ছেলে তার সামাজিক উত্তরনের জন্যে মাছের আড়তে যাওয়া বন্ধ করেছে ! গতকাল শঙ্কিতভাবে তাকিয়ে আছে আগামীকালের দিকে ! একটাই সান্ত্বনা – ছেলেও তো বাবা হচ্ছে ! ভবিষ্যৎও একদিন অতীত হবে ! কৌশিক গাঙ্গুলির এটা শুধুমাত্র একটা ভাব-বিলাসিতা নয় – বাস্তবের ভয়াবহতাও বটে ! কলকাতা ও আশেপাশে কতগুলো সিনেমা হলের মধ্যে আজ মাত্র গুটিকতক হল এখনও নাভিশ্বাস তুলছে ! সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল হয়ে যাওয়ার ফলে কত শত লোকের বে-রোজগারি ! – যদিও পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থাও দেখানো হয়েছে – সোজা আঙ্গুলে বা বাঁকা আঙ্গুলে ! যদিও পরিস্থিতি এক নয় – তবুও জলসাঘরের বিশ্বম্ভর রায়কে মনে পড়িয়ে দেয় ! – তাই বোধয় পরিণতিও এক ভাবে হয় ! মুখ্য অভিনেতা – পরান বন্দ্যোপাধ্যায় এক কথায় অপূর্ব ! সঙ্গে অরুন গুহঠাকুরতা – সহচরের ভুমিকায় ! বিশেষ করে প্রজেক্টার মেশিনটা ঝেরেঝুরে সাজিয়ে তুলে দিল – ক্রেতার হাতে ! মনে হল সিনেমা হলের হৃদপিণ্ডটা বুঝি খুলে নিয়ে গেল ! শবযাত্রার মতো নিয়ে গেল ! পরমব্রত তার চাহিদা মতো অভিনয় করেছে । কিন্তু ওর কাছেই যেন দর্শকের বেশি চাহিদা ছিল ! কিছু কিছু দৃশ্যের পরিবেষণ খুব মনোগ্রাহী । সঙ্গীতও – খুব অপরিচিত মনে হয় নি ! এত সুন্দরভাবে জীবিকার কাব্য – বাংলা ভাষায় করা বলে গর্ব হয় ! মনোজ

1098

8

দিব্যেন্দু

শ্রী পারাবতের লেখা নাদীর শাহ

বাংলা আড্ডার আসরে এসেছি অনেকদিন কিন্তু এই প্রথম সবার সাথে পরিচয় করতে এলাম | জীবনের নানা ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে আড্ডাই যে ক্লান্তিকে নিমেষে দূর করে সেকথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই বাংলা আড্ডার বন্ধুদের কিন্তু আমার কাছে বড় প্রশ্ন ছিল কি নিয়ে আড্ডা শুরু করব | কাল একটা উপন্যাস শেষ করলাম , তারপরে মনেহল এটা নিয়েই আপনাদের সাথে কিছু কথা বলা যাক | শ্রীপারাবতের লেখা বেশ কিছু বই কযেকদিন আগে কিনেছিলাম | সবই ঐতিহাসিক উপন্যাস | শ্রীপারাবত ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতা হিসাবে প্রথম সারিতে থাকবেন এমন নয় | সেক্ষেত্রে প্রথমে নাম আসবে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের| কি অসাধারণ সব উপন্যাস তুঙ্গভদ্রার তীরে , গৌর মল্লার , কালের মন্দিরা .. আহা !... | আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা জলদস্যু নামে একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস পরেছিলাম তারপর ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়ি সুচিত্রা ভট্টাচার্জ্যের লেখা ভাঙ্গা ডানার পাখি আর বাণী বসুর মৈত্রেয় জাতক | তিনটেই অসাধারণ | এভাবেই প্রথিতযশা লেখকদের লেখা পড়তে পড়তে লেখা সম্পর্কে আমার খুব স্থুল একটা ধারনা হয়েছিল | পাঠানুভুতির দিক দিয়ে বিচার করলে আমার কাছে উপন্যাস ছিল তিন প্রকার ১. এমন উপন্যাস যা শেষ করার পরেও বেশ কিছুদিন তার আবেশ থেকে যায়, ২. মোটামুটি ভালো উপন্যাস , ৩. একেবারেই জঘন্য উপন্যাস যেগুলো শেষ করার পর রীতিমত আফসোস হয় সময় অপচয়ের জন্য | তা শ্রীপারাবতের লেখা নিয়ে আমিও খুব আশাবাদী ছিলাম না | তুবুও অল্প দামে কিনে নেওয়া প্রায় নতুন বইগুলো থেকে নাদীর শাহ নামের একটা বই বেছে নিয়েছিলাম | সময়টা আঠেরো শতকের শুরুর দিকের | দিল্লিতে মোঘল সাম্রাজ্যর বাতি অনুজ্জল হযে পরেছে | সিংহাসন দখলের জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে খুনোখুনি করেও কেউ দীর্ঘদিন ধরে সিংহাসন আঁকড়ে বসতে পারছেন না | বাদশাহর থেকে প্রভাবে প্রতিপত্তিতে অনেক এগিয়ে গিয়েছেন তার অমাত্যরা আর তারাই ঠিক করছেন সিংহাসনে কে বসবে, বাদশাহ হয়ে পড়েছেন তাদের উপর নির্ভরশীল | ১৭০৭ থেকে ১৭১৯ এই বারো বছরে ৬ জন বাদশাহর পরিবর্তন হয়ে সিংহাসনে বসলেন মুহাম্মদ শাহ | মুঘলরা সেসময় ঘরোয়া শত্রু , অথবা বড়জোর মারাঠা বা রাজপুতদের নিয়ে ভাবিত | রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ সংগ্রাম করতে তারা অনভস্ত হয়ে পরেছে | বাদশাহ নিজে বিলাসী ও সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষ | আভিজাত্যের অহংকারে দূরদৃষ্টি হারিয়েছেন আর সে সুযোগ নিয়েই ভরতে আসেন পারস্য সম্রাট নাদীর শাহ | ধীরে ধীরে নিজেকে রাজার শুভাকাঙ্খী বন্ধু হিসাবে অভিনয় করে দিল্লির দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন তিনি | যতদিনে বাদশাহর বোধদয় হয় ততদিনে নাদীর শাহ দিল্লির খুব কাছে | শেষে দিল্লি থেকে ১১০ কিমি দুরে কারনাল নামক স্থানে ১৭৩৯ সালে মাত্র কয়েক ঘন্টার যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক সেনা থাকা সত্তেও মুঘলরা পরাজিত হয় | নাদীর শাহ ক্ষতিপূরণ নিতে দিল্লিতে আসেন তারপর বিপুল অর্থ, মনিমানিক্য ও ময়ুর সিংহাসন বগলদাবা করে ও দিল্লিকে প্রায় শ্বসানে পরিনত করে ফিরে যান | মোটের উপর এই হলো বিষয় | উপন্যাস যদি এভাবেই এগোয় তবে তাকে টেক্সট বুক ব্যতীত কিছু বলা যায়না আর এখানেই লেখক নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন | আমার এযাবত পড়া ঐতিহাসিক উপন্যাস গুলোতে কোনো এক কাল্পনিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে সময় এবং ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো আবর্তিত হয়েছে অথবা রোমহর্ষক ঐতিহাসিক ঘটনা ততোধিক রোমহর্ষক ভাবে বর্ণনা করে এবং ঐতিহাসিক চরিত্র গুলোর মুখে চোখা চোখা সংলাপ বসিয়ে সুখপাঠ্য করেছেন লেখকেরা | বলে রাখা ভালো এই উপন্যাস পরে তেমন অনুভুতি মোটেই হবেনা | কিন্তু লেখক তার নিপুন লেখনীতে দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির শাসকের মনস্তত্ত্ব কে ফুটিয়ে তুলেছেন | একজন বংশ পরম্পরায় সুবিশাল ঐতিহ্য বহন করে ক্লান্ত , বনেদিয়ানা তার রক্তে কিন্তু রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা আর সিধান্তহিনতায় ভুগে একে একে সব হারিয়েছেন | শেষে নিজের বিবি অবধি অপমানের শেষ রাখেননি | মুঘল রাজসভা হয়ে উঠেছে বাদশাহকে শ্রীখন্ডি খাড়া করে অমত্যদের একে অন্যকে ছাপিয়ে যাবার প্রদর্শনী মাত্র | তুবু যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরাস্ত, অপমানিত বাদশাহ নিজের নীতিতে সম্পূর্ণ অবিচল থেকেছেন | কথায় ফুটে উঠেছে দেশবাসীর প্রতি তার অপার স্নেহ এবং অসহায়তা | আরেকজন এসেছেন সুদুর পারস্য থেকে দেশ ও দেশবাসীর জন্য সম্পদ আহরণে | নীতিবোধ তারও আছে কিন্তু তিনি আপাত নিষ্ঠুর , যুদ্ধবাজ এক সুলতান যার কাছে আবেগ প্রায় গুরুত্বহীন | লেখকের কলমে উঠে এসেছে কিছু দেশভক্ত আঞ্চলিক শাসকের কথা যারা উপন্যাসে রক্ত গরম করা সংলাপ না বলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছেন আর ছিলেন কিছু সুবিধাবাদী অমত্য যারা তলায় তলায় নিজেদের আখের গোছাতে ও একে অন্যকে টপকে যাবার খেলায় ব্যস্ত| তারা দেশকেও জলাঞ্জলি দিয়েছেন | একজন বেক্তিত্বহীন অথচ ভালো মানুষের অসহায় অবস্থা , বংশপরম্পরায় চলতে থাকা এক বিরাট সাম্রাজ্যর অন্তিমকালের চরম দুরাবস্থা আর বেপরোয়া প্রায় কপর্দক শুন্য একজন শাসকের অগ্রাসী মনস্তত অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন শ্রীপারাবত | বাদ যায়নি দুদেশের সাধারণ মানুষের বৈপরিত্যর কথাও | একদিকে সাধারণ ভারতীয়রা যারা নিজেরা সম্মানিত নয় তায় বাদশাহের সম্মানই তাদের কাছে মুখ্য | সেজন্য তারা কেউ প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করেছে অথবা পরাজয়ে , বাদশাহের অপমানে আত্মহত্যা করেছে | অপরদিকে নাদীর শাহের সৈন্যরা যারা নিজের গন্ডিতে কারোর পুত্র , স্নেহশীল পিতা , প্রেমিক অথবা স্বামী কিন্তু গন্ডির বাইরে বেরোলেই চুরান্ত পেশাদার সৈনিক যারা অর্থের বিনিময়ে জান কবুল করতে পারে আর অর্থ না পেলেই বিদ্রোহ | উপন্যাসটা এজন্যই আমার বাঁধা গতের তিন ধরনের উপন্যাসের মধ্যে রাখা যায়না | এটা পড়ার পরে আবেশ থাকে না , আফসোসও হয়না আর মধ্যম মানের বলে খাটো করতেও খারাপ লাগে | এ এক অন্য মাপের , অন্য ধারার উপন্যাস | যায় হোক এর পর আমি শ্রীপারাবতকে নিয়ে অন্তর্জালে একটু খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি ওনার আসল নাম প্রবীর কুমার গোস্বামী , পুলিশে চাকরি করতেন এবং তার লেখা উপন্যাস ‘আমি সিরাজের বেগম’এর চলচিচত্রে রূপায়ণ হয় | নাদির শাহ উপন্যাস প্রকাশিত হয় দেজ থেকে দাম ১০০ টাকার মধ্যে | সব শেষে জল কে ধন্যবাদ জানায় আমায় বাংলা আড্ডায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য |

1226

8

কিকি

প্রলাপ

আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট, জলের ট্যাঙ্ক ইত্যাদিঃ 2. আমি আসার পর থেকে গুনে তিনটে কি চারটে মিটিং হয়েছিলো। সেই মিটিং এ কেবল দোষারোপ আর দোষারোপ। কাজের কিছুই হয় না। আর যেটা খেয়াল করতাম, অ্যাকাউন্টসে স্বচ্ছতার বেশ অভাব, যেটা লোকে ভালোভাবে নিতো না, আর কোন অজানা কারনে সে প্রসঙ্গ ও এড়িয়ে যেত, কেবল টাকা দিতে চাইতো না সহজে। একটা মিটিং এ আমি একটা খাতা নিয়ে গেছিলাম, মোটামুটি আমার গোদা বুদ্ধি অনুযায়ী ডেবিট ক্রেডিটের একটা ছক বানিয়ে সেভাবে হিসেব রাখতে বলি, আর মাসের শেষে পুরো হিসেবটা দিতে বলি, স্বভাবতঃই ছেলেদের সেটা ভালো লাগেনি, আমাদের ভারতীয় সমাজ এখন ও মেয়েদের বেশি বার হজম করতে পারে না। খুব ই দুঃখের। কাজেই দু তিন মাস কেবল বড় বড় করে কার কি টাকা বাকি আছে তার একটা ঢাক পেটানো হলো, কাজের কাজ কিছুই হলো না, মাঝখান থেকে আমার পয়সায় কেনা খাতাটা কোথায় গোল হয়ে গেলো। আরো বছর কয়েক কেটে গেল। এ বছরের শুরুতে হঠাৎ দেখা গেলো একটা ফ্যামিলি ছোট্ট একটা বাচ্চা নিয়ে আমাদের বেরোনোর প্যাসেজটাতে শুতে শুরু করেছে। প্রথমে ওরা গভীর রাতে আসতো আর ভোর বেলায় চলে যেত(এটা শোনা, দেখিনি), পরে সময় বাড়াতে শুরু করলো। প্রথমে রাত্রে ঋভু যখন কোচিং থেকে ফিরছে দেখি তারা শুয়ে পরেছে নিশ্চিন্তে, তাদের দয়া করে ছেড়ে রাখা এক ফালি জায়গা দিয়ে বেচারা ছেলেটা আমার ভয়ে ভয়ে আসছে, এমন ব্যাপারটা হলো যে তাদের ই বাড়ী, আমরা ট্রেসপাসারস । আর তারপর তারা ঐ প্যাসেজের মুখে প্ল্যাস্টিক আটকে ঘুমুতে শুরু করলো। প্রথমে একদিন খুলে দেবার কষ্টটা করেছিলো, তারপর ওটা আমাদের খুলে ঢোকার এবং লাগিয়ে দেবার দায়িত্ব এসে পরলো। এবার আমি চরম বিরক্ত হয়ে উঠলাম, বিশেষ করে যখন জানলাম ছেলেটি এবং মেয়েটি, দুটোর ই বাড়ী আছে, তারা রাস্তার মানুষ নয়, নিজের বাড়ী থাকতে এভাবে জ্বালাতন করার কি মানে কে জানে!! তার আগে ভাবছিলাম পাড়ার ক্লাবে জানালে, তারা যদি রাত্রে এদের ঘুমুতে দেয়। এরপর এমন হতে থাকলো যে ঋভু রাত্রে প্ল্যাস্টিক খুলে বাড়ী ঢোকে আর সকালে ঐ একই উপায়ে স্কুলে যায়। এরকম একদিন দেখি মেয়েটা দিব্যি সায়া ব্লাউজ পরছে, আর ঋভু এত হতভম্ব, সে তার কিশোর বয়স পর্যন্ত এরকম অভব্যতার সামনা করে নি। মেয়েটির বিকার নেই। ব্যাপারটা একটুও ভালো লাগেনি। এর আগেও আমাদের বিল্ডিং এর লোকজনকে ব্যাপারটা জানাই, কেউ গুরুত্ব দেয় নি। সবার কেমন সব কিছু মেনে নেওয়ার অভ্যেস হয়ে গেছে। তবে তারাই কিভাবে যেন এদের তাড়ালো। তখন ই মনে হলো, এবার মহিলারা একটা কমিটি করলে কেমন হয়!! সেটা বললাম। দেখা গেলো লোকজন রাজি হয়ে গেলো। আর আমরা এখানে সবসময় থাকি সাতটা পরিবার, বাকি তিনজন কাছেপিঠেই থাকে, যাতয়াত আছে। সবাইকে জানিয়ে এখানে থাকা পরিবারগুলোর একজন করে মহিলা সদস্য নিয়ে আমাদের কমিটি তৈরী হয়। ঠিক হয়, এই কমিটিতে কোন আলাদা পোষ্ট থাকবে না। সবাই এক সাথেই কাজ করবো। কেবল আমার বিগবস শুনে বললো, ঠিক আছে, এবার তোর ম্যান ম্যানেজমেন্ট ব্যাপারটা শেখা হবে। আমার বিগবসকে যেকটা কারনে ভালো লাগে, তার মধ্যে এটা একটা, আমার বাড়ীর লোকেদের মতন ভয় পেয়ে আমায় সবসময় আড়াল করার চেষ্টা করে না, অবস্থায় ছেড়ে দেয়। তাঁর নীতিই হলো জলে ফেলে সাঁতার শেখাও। আমাদের কমিটি তৈরী হলো দ্বিতীয় মিটিং এ, এটা ফেব্রুয়ারী। এতদিন আমাদের বিল্ডিং এর মেন্টেন্যান্স বলে কিছু ছিলো না, আমরা প্রথমেই কটা প্রজেক্ট নিয়ে নিলাম, তার মধ্যে সব থেকে প্রথমে জলের ট্যাঙ্ক সারানোর। কারন এই জলের ট্যাঙ্কটার মাথার ঠিক একফুট নীচ থেকে পুরো রাউন্ড করে ফেটে গেছে আর বেস থেকে ঠিক ঢালাইয়ের পর যেখান থেকে গাঁথনি উঠছে সেখান থেকে। প্রতিদিন অঝোরে জল ঝরে পরে যায়। অসম্ভব জলের অপচয়, যেখানে মিষ্টি জলের পরিমান কমে আসার সতর্কতা নিয়ে সবসময় কথা বলা হয়, সেখানে এখানকার লোক অসম্ভব নির্বিকার ছিলো। আর সেই জল পরে সেইদিকের ফ্ল্যাটগুলোর ও দেওয়াল, জানলার ক্ষতি ও হচ্ছিলো। আর যেহেতু আমাদের কোন লোক রাখার অবস্থা নেই, কাজেই পাম্প অফ অনের ও একটা ঝামেলা থেকেই যায়। অনেক সময় ই অন করাই থাকে, অফ করতে ভুলে যাওয়া হয়, তাই আমরা ঠিক করি ট্যাঙ্ক ঠিক করেই এটা ফুল অটোমেটিক করে দেওয়া হবে। এছাড়া সন্ধ্যে থেকে ফ্লোরের যেসব লাইট জ্বলতেই থাকে তাদের পাওয়ার সেভিং বাল্ব দিয়ে পাল্টে দেওয়া হবে। সিঁড়ি, চারপাশের কমন প্যাসেজের নিয়মিত পরিস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের সিঁড়ির নীচে সবকটা মিটার এত কাছাকাছি আর সেখানে দুটো বাইক রাখা হয়, পুরো জতুগৃহ, ঠিক করা হয় বাইরের প্যাসেজের একটা গেট করা হবে, সেখানে বাইক গুলোকে সরিয়ে দেওয়া হবে। ইত্যাদি। আর তার জন্য মাসে তিনশো টাকা করে নেওয়া হবে। এবং যেহেতু ট্যাংক সারানো একটা বড় অ্যামাউন্টের ব্যাপার, একেবারে দুহাজার করে টাকা নেওয়া হবে। এবং এও ঠিক করা হয়, মাসের দশ তারিখ পেরিয়ে গেলে ফাইনের ব্যবস্থা করা হবে। তবে আমরা আশা করিনি প্রথমে এটা কাজে পরিণত করা যাবে। লোকে একশ টাকাও দিতে চাইত না। আশ্চর্য ব্যাপার, আমাদের বিশ্বাস করে সবাই টাকা দিতে শুরু করে। এবং মেয়েরা যথেষ্ট সিরিয়াস তাদের কাজের ব্যাপারে, এককাট্টা। এটাও দেখা গেলো। আমরা প্রতিমাসে একটা করে মিটিং করতে লাগলাম। জমা, খরচের পরিস্কার হিসেব সবাইকে দিতে লাগলাম, কাজ নিয়ে পরিকল্পনা করতাম, এবং সবাই নিজের কাজ থাকা সত্ত্বেও ডাকার সাথে সাথে একসাথে হয়ে কথা বলা শুরু করলাম আমাদের কাজগুলোর বিষয়ে। এটা সত্যি যে ভাবনা গুলো প্রথমে আমি ভাবছিলাম, কিন্তু সবাই এগিয়ে না এলে কিছুই হওয়া সম্ভব ছিলো না। আর পরে সবাই ভাবনা গুলো নিয়ে ভেবে আরো অনেক পথ দেখাতে শুরু করে। আমাদের মিটিংগুলোতে অকারন দোষারোপ হত না। মজার ব্যাপার মেয়েদের সম্পর্কেই মিলে মিশে থাকতে পারে না, এসব কিসব বলা হয়, আমরা আরেকবার দেখালাম সেটা কত বড় মিথ্যে।

2595

66

শিবাংশু

মানালি'র মানে

মানবাজার কোথায়, প্রশ্ন করলে অধিকাংশ বাঙালিই একটু থমকে যাবেন। কিন্তু মানালি'র কথা জানতে চাইলে, 'ট্রু টু ফিশ' সমস্ত বঙ্গভাষী কলকল করে যাবতীয় জানকারি বিতরণ করে দিতে উদগ্রীব। যেহেতু মানালি দেখেননি এমন বাঙালি পাওয়া দুষ্কর, তাই মানালি'কে নতুন করে চিনতে চাইলে প্রত্যেকের নিজস্ব পূর্বাগ্রহ মাঝখানে এসে দাঁড়াবে। আসলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভ্রমণ একটা নিজস্ব অনুভূতি। সকল লোকের মাঝে বসেও নিজের মুদ্রাদোষে আলাদা হয়ে গিয়ে চরাচরকে দেখতে চাওয়াটাই আসল 'ভ্রমণ'। সেই ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি । বুঝতে চাওয়া প্রকৃতি বা মানুষের সেই সব অনন্ত রহস্যময় শব্দহীন আশ্লেষ, কীভাবে আমাদের যাপনকে আরো অর্থময় করে তোলে। আমরা কাদামাটি থেকে আরো একটু অন্তরীক্ষের দিকে উঠে যেতে পারি, অজান্তেই। --------------------------- কুলু উপত্যকার একটি ছোট্টো জনপদ, যার মোট জনসংখ্যা ছ'হাজারেরও কম, কতো সহস্র মানুষকে প্রত্যহ টেনে আনে তার রহস্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে, বোঝা ভার। আমাদের দেশের মাথার বালিশের উপর দিয়ে যে টানা পর্বতমালা তাওয়াং থেকে সোনমার্গ পর্যন্ত নানারূপে আমাদের অভিভূত করে রাখে, তার একটা অংশকে আমরা এখান থেকে স্পর্শ করতে পারি। আর পারি বিয়াসের বহতা শীতল স্রোতকে এক আঁজলায় ধরে চিনে নিতে। সেই বিয়াস। বাঙালিরা এই নদীকে দেখার আগেই মেয়ের নাম রাখে বিপাশা। আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের একটা অবিচ্ছেদ্য ধারণা এই নদী। তার ধারাস্রোতের দু তীরে বেড়ে ওঠা অসংখ্য অতিথশালার সমারোহ নিয়ে এই বসতি দু'দণ্ড কেন , অনেক মূহুর্তের অনুভব ধরে রাখতে পারে তার চিড়-পাইন-দেওদার-সাইপ্রেসের বারান্দায়, সেই অজানা পাহাড়ের নেশাতুর গন্ধের মতন, যা বাড়ি ফিরে আসার অনেক পরেও চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। --------------------------- যেকোনও পাহাড়ি শহরের মতো এখানেও আছে একটি টানা পাহাড়ি ওঠানামা করা রাস্তা। নাম চিরাচরিতভাবে 'ম্যল', তার নিজস্ব দোকানদানি নিয়ে। আছে নানারকম ভোজ্যের পশরা, পশম, হস্তশিল্প আর গৃহস্থালীর কুটুমকাটাম। এমন কী রয়েছে 'বাঙালি' পর্যটকদের শান্তি দিতে 'আলু-পোস্ত'র অঢেল আয়োজন। সূর্য ডোবার পর সুনসান বরফি হাওয়ায় আলোআঁধারিতে বয়ে যাওয়া ভেজা ভেজা রহস্যবাতাস। রয়েছে একদিকে সোলাং, অন্যদিকে রোহটাঙের দিকে উঠে যাওয়া বাঁধানো পাহাড়ি পাকদণ্ডি। পুরাণচরিত্রদের ঘরবাড়ি। হিড়িম্বা, ঘটোৎকচ, বশিষ্ঠমুনি। ইতিহাসের তোয়াক্কা না করে মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকা এই সব ছবির মানুষ। রয়েছে আদিগন্ত সবুজ পাহাড়সারির ভিতর গড়ে ওঠা লাল-নীল-সবুজ ঢালু ছাদের মোহময় ঘরবাড়ি। হাসনরাজা কী একেই ভেবেছিলেন, " কী ঘর বানাইবো আমি শূন্যের মাঝার।" সবার উপর জেগে আছে হিমালয়, তার শুভ্র জেল্লা আকীর্ণ করে, দিবসরজনী। কখনও রোদে, কখনও মেঘে, তার রূপ দেখে বিস্ময় ফুরোয় নাতো। পণ্ডিত রাজন-সাজন মিশ্রের গাওয়া বিখ্যাত ভজনটির একটি লাইন কানের কাছে বাজতে থাকে। " হরি অনন্ত, হরিরূপ অনন্তা..." । 'হরি'র জায়গায় হিমালয়'কে বসিয়ে দিলেই আমার কাজ ফুরোয়। চেনা, চেনা দৃশ্যের ছবিগুলি কী জাগিয়ে তোলেনা অনেক অচেনা স্মৃতির প্যাশন? আমরা আরো একটু মিশে যাই না কি অগাধ বিস্ময়ের ঘাসজমিতে। এ যাপন কি ফুরোবে কখনও?

1032

8

শিবাংশু

মালওয়ার পদ্মিনী

"....Thou art the whole life to me. And separation from thee death. Only the memory of thy face Keeps in me in breath...." (বাজবহাদুরের প্রতি নিবেদিত রূপমতী'র মুগ্ধতা :- ক্রাম্পসাহেবের অনুবাদে Lady of the Lotus গ্রন্থ থেকে) ------------------------------------ লোকে বলতো, এতো বড়ো হিন্দুস্তানে তিনটে জায়গার তুলনা নেই। বারাণসির ভোর, অওধের অপরাহ্ন আর মালওয়ার রাত। সে হেন মালওয়া শেরশাহ সুরি কেড়ে নিয়েছিলেন হুমায়ুঁর থেকে। সেখানকার সিংহাসনে বসিয়েছিলেন জাতভাই শুজাত খানকে। শুজাত খানের তিন ছেলে। মেজ ছেলে বায়জিদ খান। খুব গর্ব করার মতো বীরপুরুষ ছিলেন না তিনি। যদিও বাবা শুজাত খানের রাজত্ব পেয়েছিলেন তিন ভাই। কিন্তু ভাইদের মেরে, তাড়িয়ে বায়জিদ খান দখল করেছিলেন মালওয়ার মসনদ। কিন্তু সে রাজত্ব রক্ষা করার মতো এলেম ছিলোনা। রানি দুর্গাবতীর সঙ্গে লড়াইতে সর্বস্ব খুইয়ে শুধু প্রাণটা নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন মালওয়ায়। শরীরে, মনে একেবারে ঘায়েল সুলতান আশ্রয় খুঁজেছিলেন তাঁর প্রথম প্রেম সঙ্গীতের কাছে। যুদ্ধবিগ্রহ থেকে ইস্তফা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বনে-প্রান্তরে। এমন সময় খোঁজ পা'ন সেই নারীর, যাঁর সঙ্গে তিনি জড়িয়ে তিনি একদিন হয়ে যাবেন এক রূপকথার নায়ক। --------------------------------- সুলতান হিসেবে অনায়াসে দখল করতে পারতেন সেই নারীকে, গায়ের জোরে। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা'র জোর তুর্কিদের অস্ত্রের জোরের থেকে একটু আলাদা। তিনি বিবাহ করতে চাইলেন তাঁর দয়িতাকে। বাপ ঠাকুর থান সিং রাঠোর রাজপুত, রাজি ন'ন যবনের হাতে মেয়েকে সম্প্রদানে। লড়াই একটা হলো, কিন্তু এক তরফা। আসলে কন্যা নিজেই তো রাজি ঐ সুপুরুষ, সুরপাগল সুলতানের স্বয়ম্বরা হতে। ঐতিহাসিক ফিরিশতা ছিলেন এই কাহিনীর কথাকার। কিংবদন্তির ঊর্ধে আমরা যা জানতে পারি, তা ফিরিশতার পুথি থেকেই। নায়িকার নাম রূপমতী। রূপকথার নায়িকাদের সব কিছুই মাত্রাছাড়া। রূপমতীও তাই। পাগলকরা রূপ, মজিয়ে দেওয়া গান, ডুবিয়ে দেওয়া শায়রি। সে রকমই তো বলে সবাই। ভারতীয় শাস্ত্রমতে পদ্মিনী নারী ছিলেন তিনি। সর্ব অর্থে শ্রেষ্ঠ। তাঁর জীবনীকার ক্রাম্পসাহেব বইটির নাম দিয়েছিলেন Lady of the Lotus। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি এক হিন্দু মেয়ে আর আফঘান সুলতানের বিবাহ হয়েছিলো ব্রাহ্মণ্য ও ইসলামি রীতিতে। এখনও বিরল সে জাতীয় ঘটনা। -------------------------------- রাজধর্ম থেকে রুচি হারিয়েছিলেন তো আগেই, রূপমতীকে পেয়ে বাকিটাও গেলো। গান বাঁধা আর গান গাওয়া। দুজনে দুজনকে চোখে হারান। রাজত্ব উৎসন্নে যায়। আকবর বাদশা এসব দেখে পাঠালেন আধম খান ফৌজদারকে। মুঘল ফৌজের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা ছিলোনা বায়জিদ খান ওরফে বাজ বহাদুর খানের। রণে ভঙ্গ দেওয়াই সাব্যস্ত করলেন তিনি। পুরো অন্তঃপুরকে পিছনে ফেলে রেখে দেশান্তরে গেলেন। আধম খানের লক্ষ্য ছিলেন রূপমতী। কিন্তু আধম খানও বলপ্রয়োগ করেননি তাঁকে পেতে। শুধু পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন সভ্যভাবে। রূপমতীর তা মঞ্জুর ছিলোনা। বাজ বহাদুর ছাড়া আর কেউ নয় তাঁর হৃদয়েশ্বর। সাক্ষাৎপ্রার্থী আধম খান তাঁর বিষপানে মৃত শরীরটির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। তার আর পর নেই। একটা রূপকথার জন্ম এভাবেই। লাইলা-কয়েস, শিরিঁ-ফরহাদ, হীর-রানঝা, য়ুসুফ-জুলেখা জাতীয় উপকথার অংশ হয়ে গেলো দু'টি ঐতিহাসিক রক্তমাংসের মানুষের গল্প। তার আর জোড়া পাওয়া যায়না কোথাও। ------------------------------ মাণ্ডুতে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। কিন্তু রূপমতী-বাজবহাদুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চিরকালের সুরসৌরভ আর ভালোবাসার আঘ্রাণ সব ছাপিয়ে মনে বাজে। সুলতানের হারেমে থাকতেন না রূপমতী। তাঁর জন্য একটা ছোট্টো পাহাড়ের উপর মহল বানিয়ে দিয়েছিলেন বাজবহাদুর। সেই প্রাসাদের ছাদ থেকে নাকি কখনও নর্মদাকে দেখা যেতো। এটা জনশ্রুতি, সত্য নয়। সুলতান রূপমতীর জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন 'রেওয়া কুণ্ড'। সেই সরোবরটি থেকে জল এনে রূপমতী পুজোআচ্চা করতেন। বাজবহাদুরের প্রাসাদটি একটু নীচে। দূরত্ব খুব বেশি নয়। সেই প্রাসাদের অলিন্দ থেকে রূপমতীর মহল স্পষ্ট দেখা যায়। বাজবহাদুর ছোটো রাজা। মুঘলদের মতো জমকালো, বিপুল স্থাপত্য তাঁর সাধ্যাতীত ছিলো। কিন্তু সীমায়িত মাত্রায় ইসলামি স্থাপত্যকলা অনুসারী এই সব নির্মাণগুলি এখনও মুগ্ধ করে তাদের শৈল্পিক সংযমে। দূর দূর পর্যন্ত ঊষর, গৈরিক ঢেউখেলানো মাটি, উঁচুনীচু পাথুরে প্রান্তর আর সবুজ লতাগুল্মের সুতোবাঁধা মালওয়ার দিগন্তরেখা একটা অন্যধরণের উদাসসুরে মনের স্কেলটা বেঁধে দেয়। পিলু, কাফি না মুলতানি, ঠাহর করে ওঠা যায়না। ----------------------------- বাজবহাদুরের গানের গল্প, রূপমতীর ফারসি আর ব্রজভাষায় রচিত গীতিসম্ভার, সবার উপরে শ্রেণীনির্বিশেষ জনতাকে মজিয়ে রাখা ট্র্যাজিক প্রেমের কালজয়ী ফর্মুলা, এই সব নিয়ে মস্তো লেখা লিখে ফেলা যায়। কিন্তু এখন তা থাক। আমরা এই রাজারানির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন নির্মাণগুলির থেকেই না হয় খুঁজে নিই সেই সব লীলা অভিরাম ছবি।

1110

5

Joy

ভোটের ফলাফল ও জনগন

আগে একবার লিখতে গিয়ে সব উড়ে গেল| যাইহোক বহু আলোচিত ও চর্চিত বিষয় এবারে প:ব: এর বিধানসভা নির্বাচন ও তার ফলাফল| এবারে ভোটের ফলে তৃণমূলের বিপুল জয় ও মমতা ব্যানার্জী দ্বিতীয় বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন| উত্তরের এক-দুটি জেলা বাদ দিলে কলকাতা সহ দক্ষিন বঙ্গে সবুজ ঝড়| অধীর চৌধরীর দূর্গ মুর্শিদাবাদেও বেশ কয়েকটি ঘাসফুলের ছড়াছড়ি| ভোটের ঠিক আগেই নারদের স্টিং অপারেশন‚ উড়ালপুল ভেঙ্গে পড়া‚ তৃণমূলের গোষ্ঠী দ্বন্দ এই সব ইস্যুতে তৃণমূল তথা মমতা ব্যানার্জী বেশ চিন্তিত ছিলেন| সেই চিন্তার কথা তার নির্বাচনী প্রচারেও এসে পড়েছে| এবারে ভোটের ফলে CPM ও কংগ্রেস (জোট) খুবই আশাবাদী ছিলেন| মমতা ব্যানার্জীও মনে হয় এতটা ভাল ফলাফল আশা করেন নি| গত পাঁচ বছরে বাংলায় কোনো বড় শিল্প নেই| আইন শৃঙ্খলার অবনতি| নেতারা আর্থিক দুর্নীতিতে যুক্ত| সিন্ডিকেটের বাড়বাড়ন্ত এই সবের কোন প্রভাব ভোট বাক্সে পড়েনি| তবুও কেনো এত সাফল্য| এবার নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠ ও স্বাভাবিক ভোট প্রক্রিয়ার জন্যে সবরকম চেষ্টা করেছেন| অনেক দিন পর পশ্চিম বঙ্গে অবাধ ও শান্তিপূর্ন নির্বাচন হল| এই জন্যে তাদের সাধুবাদ দিতেই হয়| এবারের ভোটের ফলে মানুষের স্বাভাবিক ও স্বত:স্ফূর্ততা অস্বীকার করা যায়না| আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা গবেষক নই| তবু কয়েকটি বিষয় বলা দরকার| ১| CPM ও কংগ্রেস নামক চিরশত্রু দুটো দলের নেতাদের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হঠাৎ করে চল করি জোট বলে একটা কিছু খিচুড়ি বানিয়ে দিলেই লোকে গপাগপ গিলে ফেলবে এটা ভাবা বোধহয় ভুল ছিল| ২| জোট যদি বা হল এই জোটের মূল নীতি কি? কেউ জানে না| কোনো গন আন্দোলন নেই| শুধু তৃণমূলকে হটাতে হবে‚ এই স্লোগান যথেষ্ট নয়| ৩| ৫ বছর কোনো সরকারের জন্যে তাড়াতাড়ি| তাই মানুষ মনে হয় আর একটু সময় দিতে চেয়েছেন| ৪| ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট জমানার প্রথম কয়েক বছর বাদ দিয়ে অর্থ ও ব্যবহারে নেতাদের বাড়াবাড়ি‚ প্রতিটি জায়গায় দলতন্ত্র কায়েম করা| যারা দেখেছেন লক-আউট‚ শিল্প-ধর্মঘট‚ বনধ| শুনেছেনই বার বার কেন্দ্রীয় বন্ঞ্ছনার গল্প| ও তার সঙ্গে নন্দীগ্রাম‚ সিঙ্গুর‚ কেশপুর‚আরও অনেক রক্ত হিম করা ঘটনা বাংলার জনগন এত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়নি| ৫| মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতার আসার পর কন্যাশ্রী‚ সাইকেল প্রদান‚ ২ টাকা কিলো চাল‚ রাস্তাঘাট‚ নদী‚ বাঁধ‚ ইত্যাদি অনেক জনমুখী ও উন্নয়ন প্রকল্প করেছেন যার প্রভাব ভোটের ফলে মিলেছে| ৬| বাংলার রাজনীতিতে নবগতা দুই দিদি রূপা ও লকেটের দাপাদাপি হোক বা মোদী ম্যাজিক হোক বিজেপির ভোট কাটা আর একটি বড় কারন তৃণমূলের এই বিপুল জয়ে| ৭| বাংলায় এখন রাজনৈতিক বদল আনার জন্যে কোন নির্ভরযোগ্য দল বা নেতা নেই| এখানে মানুষ মমতা ব্যানার্জীকেই বিশ্বাস করেছেন| বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলায় একটা ট্রেন্ড এসেছে কোনো শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ না থাকা| তৃণমূলের এই বিপুল জয় তাদের অহমিকা নি:সন্দেহে অনেকটা বাড়িয়ে দেবে যেটা পশ্চিমবঙ্গের জন্যে সুখবর নয়| যেটা সিপিএম সরকারের সময় চলে এসেছিল| এখন দেখার তৃণমূলের এই বিশাল সাফল্য তাদের বেশি দ্বায়িত্বশীল করে তোলে না‚ দূর্নীতিগ্রস্থ করে তোলে| পরেরটা হলে তখন আবার পতন অনিবার্য|

1016

6

শিবাংশু

ঋষিপত্তন ও একজন ঋজু মানুষ

বৈশাখীপূর্ণিমা না বুদ্ধপূর্ণিমা। যাই নাম দিই না কেন দিনটি আমাদের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভারতীয় মানবপুত্রের জন্ম ও সিদ্ধিলাভের তিথি। আগামীকাল সেই উপলক্ষ্যে তাঁকে স্মরণ করবে সারা বিশ্ব। এই তুচ্ছ কলমচির প্রণাম রইলো তাঁর জন্য এখানে। https://www.facebook.com/notes/shibanshu-de/%E0%A6%8B%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%A8-%E0%A6%93-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9C%E0%A6%A8-%E0%A6%8B%E0%A6%9C%E0%A7%81-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7/1180691148616136

1016

0

জল

ছোট গল্প লেখার চেষ্টায়

ছোট গল্পের ব্লগ। পাবলিক ব্লগ, যার যার যখন যখন লিখতে ইচ্ছে করবে লিখে ফেলবে এখানে। পাঠক আর লেখক সবাই রাজা এখানে।

1408

18

শিবাংশু

সকল দেশের রানি

সব মানুষই তাদের স্বদেশ আর দুহিতাকে রানি বলে মনে করে। সেতো থাকবেই। কিন্তু আমার স্বদেশ, আমার ভারতবর্ষ যে কেমন, কোথায় সে থাকে, কীভাবে তাকে খুঁজে পাই নিশ্বাসে প্রশ্বাসে, সে গল্পের কী কোনও শেষ আছে? তাই তাকে আমার 'রানি' ভেবে নিঃসংশয় অবসর নিয়ে নিই, দিনের শেষে। তাকে তো চিনতে পেরেছি হাজার বছর পথ হেঁটে। কিন্তু যখন দেখি কিছু লোক বোঝাতে আসে, আসলে তোমার ভারতবর্ষ ঠিক এরকম হওয়া উচিত। তাদের হাতে থাকে ক্ষমতার খড়্গ আর মননে শূন্য করোটির অহংকার। আমার প্রত্যাখ্যান যেন তাদের তৃণসম দহে, গুরু'র কাছে আমাদের শুধু এই প্রার্থনা। ------------------------ কতোটুকু জানি, চিনি আমার ভারতবর্ষকে? কোন অধিকারবশে নিজেকে 'ভারতীয়' বলতে পারি? অধিকাংশ সময়েই আমাদের সে ধারণা নেই। যেমন এই মূহুর্তে ভাবছি, 'রত্নগিরি' সম্বন্ধে আমরা কতোটুকু জানি? বৌদ্ধধর্মের ধাত্রীভূমি বিহারের সন্তান হিসেবে আমার বৌদ্ধ সংস্কৃতি, উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর আগ্রহ, দীর্ঘদিনের টান। দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াই বৌদ্ধ ঐতিহ্যের পদচিহ্ন খুঁজে খুঁজে। ব্যক্তিগত পঠনপাঠন বেড়ে ওঠে, গৃহস্থের লাইব্রেরি উপচে পড়ে। দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সব প্রান্তে তো বটেই, বিদেশেও সে খোঁজ ফুরোয় না। গত আড়াই হাজার বছরের আমাদের যে ইতিহাস ওতোপ্রোত বুদ্ধের নামে, সেখান থেকে কী করে তাঁর নাম একেবারে লোপ পেয়ে গেলো চার-পাঁচশো বছর আগে। আবার তিনি ফিরে এলেন ইংরেজের হাত ধরে। ভারতবর্ষ আবার খুঁজে পেলো তার সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম সন্তানকে নতুন করে। এই বিশেষণটি বুদ্ধকে যিনি দিয়েছিলেন, তাঁকে লোকে 'বিশ্বকবি'ও বলে থাকে। তিনি কিন্তু শুধু বলেন, " মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।" এটাই তো ভারতবর্ষ। ------------------------------ গুপ্তযুগের মধ্যপথে, অর্থাৎ ষষ্ঠ শতকের শুরুতে রাজা নরসিংহ বালাদিত্যের সময় ব্রাহ্মণী আর বিরূপা নদীর ব-দ্বীপে গড়ে ওঠে এক অতি উন্নত বৌদ্ধ মেধার প্রতিষ্ঠান। আজকের যাজপুর, কেন্দ্রাপাড়া,জগৎসিংপুর জুড়ে গড়ে ওঠা পুষ্পগিরি মহাবিহার। যার অংশ ললিতগিরি, উদয়গিরি, রত্নগিরি, পুষ্পগিরি। যার বিপুলত্ব ও মহিমা চ্যালেঞ্জ করতো নালন্দা মহাবিহারকে। মহাযানী বৌদ্ধদর্শন ও তন্ত্রচর্চার প্রধানতম কেন্দ্র হয়ে, বিস্তৃত ভূগোল জুড়ে গড়ে ওঠা এই সব সারস্বত সংস্থান, আমাকে গর্বিত করে ভারতীয় হিসেবে। --------------------------------- আবিষ্কার হয়েছে এই সেদিন, ষাটের দশকে উৎখনন হবার পর। ষষ্ঠ শতকের শুরু থেকে দ্বাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত চলেছিলো তার জয়যাত্রা। ঐতিহাসিক, পণ্ডিত দেবলা মিত্র'র গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য আমাদের অবাক করে দেয়। খননে পাওয়া সিলমোহর থেকে জানা যায় জায়গাটার নাম ছিলো ' শ্রী রত্নগিরি মহাবিহারায় আর্য ভিক্ষু সঙ্ঘস' । ৬৩৯ সালে হিউ এন সাং এসে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন রত্নগিরির আকার, আয়তন, গরিমা দেখে। বারবার লিখে গেছেন পঞ্চমুখ হয়ে। আমরা খোঁজ পেলুম এই অর্ধশতক আগে। একটি মহাস্তূপ। তার সামনে দু'টি মহাবিহার, আর ছোটোবড়ো অসংখ্য স্তূপ, চৈত্য, নানারকম নির্মাণ। চমকে দেয়। এর বহুবিচিত্র স্থাপত্য, তার সূক্ষ্মতা, বিশালত্ব, সৌন্দর্য, দেশে-বিদেশে অনেক দেখার পরেও আমি দাবি করতে পারি অপরূপ, অনন্য। অসংখ্য বৌদ্ধ দেবদেবী, অবলোকিতেশ্বর, বজ্রপাণি বা পদ্মপাণি, তারা, লোকেশ্বর, অপরাজিতা, হারীতি, হেরুকা, সম্ভর অথবা গজলক্ষ্মী ছড়িয়ে আছে চারদিকে, নানা রকম শাক্যমুনির মূর্তির সঙ্গে সঙ্গে। বুদ্ধের এই সব মূর্তির সঙ্গে পণ্ডিতেরা সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন বরোবুদুর আর অনুরাধাপুরার ভাস্কর্যের নমুনাগুলির। সত্যি কথা বলতে কি, এই ভাবে শব্দ দিয়ে তাদের ঠিক বর্ণনা করা যায়না। চোখে দেখতে হয়। যাঁরা নিজে পৌঁছোতে পারবেন না বা পারলে এই মূহুর্তে হয়তো সম্ভব নয়, আসন্ন বুদ্ধপূর্ণিমার প্রাক্কালে কিছু ছবি রেখে দিই এখানে আগ্রহীদের জন্য। আমার স্বপ্নের ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে কয়েকটি প্রতিবিম্ব।

1014

6

জল

বাংলার ব্রতকথা

তিলফুলের কথা ...................... একদিন নারায়ন রথে চড়ে বার হতে যাবেন হঠাৎ লক্ষী এসে উপস্থিত হলেন| নারায়ণকে বের হতে দেখে তিনিও ধরে পড়লেন তাকেও নিয়ে যেতে হবে| নারায়ন বললেন ‚ আমি এক বিশেষ কাজে যাচ্ছি শ্রী‚ সেখানে তোমাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না| লক্ষী শুনলেন না| বললেন না‚ প্রভু আপনি যেখনে যাচ্ছেন সেখানে আমাকেও নিয়ে চলুন| অগত্যা লক্ষীর জেদের কাছে হার মেনে নারায়ন লক্ষীকে নিয়ে মর্তের দিকে প্রস্থাণ করলেন| মর্ত্যের একস্থানে রথ থামিয়ে নারায়ন বললেন লক্ষী আমি এখনি আসছি‚ তুমি এখানেই অপেক্ষা কর| আর ভুলেও দক্ষিণদিকে তাকিও না| লক্ষী বললেন বেশ প্রভু‚ আপনি ঘুরে আসুন| আমি এখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছি| নারায়ন রথ থেকে নেমে চলে গেলেন| লক্ষী বসে অপেক্ষা করতে করতে ভাবতে লাগলেন প্রভু দক্ষিণদিকে তাকাতে নিষেধ করলেন কেন? কি আছে দক্ষিণদিকে? যতই ভাবতে লাগলেন ততই তার কৌতুহল বৃদ্ধি পেতে লাগল| শেষে নিজেকে আর বিরত রাখতে না পেরে দক্ষিণদিকে তাকালেন| আর তাকাতেই চোখের সামনে সদ্যফোটা তিলফুলের ক্ষেত নজরে পড়ল| তিনি তৎক্ষণাৎ রথ থেকে নেমে ক্ষেতে প্রবেশ করলেন| তিলফুল তুলে নিজের কবরীতে সাজালেন| বাহুতে‚ হাতে সাজালেন‚ মালা করে গলায় পড়লেন| তারপর রথে এসে বসে রইলেন| কিছুক্ষণ পর নারায়ন ফিরে এসে লক্ষীকে দেখে বললেন‚ একি করেছ লক্ষী‚ তুমি কি জানো না কারও ক্ষেতের তিলফুল তুলতে নেই| এখন তোমাকে যার ক্ষেত তার বাড়িতে তিনসন বা চৌদ্দ মাস থাকতে হবে দাসী হয়ে| কি আর করেন| নিজে ব্রাহ্মনের বেশ ধারণ করে ও লক্ষীকে ব্রাহ্মণী সাজিয়ে ক্ষেতের নিকটবর্তী বাড়িতে এসে ডাক দিতেই বাড়ির গৃহকর্তা বেড়িয়ে এলেন| নারায়ন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন‚ এই ক্ষেত কি আপনার মহাশয়? ব্যক্তিটি উত্তর করলেন‚ হ্যাঁ মহাশয়| কেন জানতে চাইছেন? নারায়ন উত্তর করলেন‚ ইনি আমার পত্নী‚ আপনার ক্ষেত থেকে তিলফুল তুলে অন্যায় করেছেন‚ তাই একে আপনার গৃহে তিন সন বা চৌদ্দমাস দাসীবৃত্তি করতে হবে| চৌদ্দমাস পুরিত হলে আমি এসে আবার এঁকে নিয়ে যাব| একে কারও এঁটো খেতে দেবেন না‚ ছাড়া কাপড় কাচতে দেবেন না‚ ঝাঁট দিতে দেবেন না| বলে নারায়ন বিদায় নিলেন| লক্ষী আর কি করেন ‚ সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির সাথে তার বাড়িতে প্রবেশ করলেন| জীর্ণ কুটিরে তাদের বাস| ব্যক্তিটির পত্নী তাকে দেখে নিজ স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন‚ এ তুমি কাকে নিয়ে এলে? ব্যাক্তিটি সব বললেন| গিন্নী শুনে তেমন একটা প্রীত হলেন না| একটু বিরসবদনেই বললেন‚ আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়‚ আর একটা প্রাণী পালন করি কি করে? শুনে লক্ষী বললেন‚ বেলা তো ঢের হয়েছে‚ তা তোমাদের রান্না চড়েনি কেন মা? গিন্নী বললেন ছেলেরা সব কাজে বের হয়েছে‚ পয়সাকড়ি আনলে তবেই তো আসবে মা ব্যঞ্জনসামগ্রী‚ তবেই তো বসবে বাছা রান্না| লক্ষী বললেন‚ সেকি কথা মা‚ তারা সব তেতে পুড়ে আসবে‚ আর তারা এলে তবেই তোমরা রান্না চড়াবে‚ সে কেমন কথা‚ ঘরে যা আছে চড়িয়ে দাও| গিন্নী বললেন ঘরে তো কিছু নেই বাছা| লক্ষী বললেন‚ কিছু নেই বললেই হবে মা‚ দেখ দিকিনি একবার| গিন্নী তার বৌমাদের নিয়ে ভাঁড়ারে গিয়ে দেখে‚ সত্যি তো ঘরে জিনিসের অভাব নেই| তারা মনে মনে ভাবলেন ইনি নিশ্চয় কোন দেবী| সবাই কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম জানালে মনে মনে| বড় বৌ ভারী ভালো মানুষ| সে লক্ষীকে বড় ভালোবাসে| আর মেজবউ কুচক্রী| বাড়ির সবাই লক্ষীকে দেবী বলে‚ ভালোবাসে তার সহ্য হয় না| সে ছাড়া কাপড় লক্ষীকে কাচতে দেয়‚ এঁটোকাঁটা খেতে দেয়‚ কুকথা-অকথা বলে| লক্ষী খায় না‚ এঁটো খাবারগুলো নিয়ে গিয়ে ডালিম তলায় পুঁতে রেখে আসে| এইভাবে বেশ অনেকগুলো দিন কেটে গেল| সেদিন দশহরা| সবাই গঙ্গাস্নানে যাবে| লক্ষী পাঁচটি কড়ি দিয়ে গিন্নীকে বলে‚ মা গঙ্গার পুজো দিও| তারা গঙ্গাস্নান সেরে পুজো দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ মনে পড়ে‚ লক্ষীর কড়ি দিয়ে পুজোর দেওয়া হয়নি| তারা তখন ঐ পাঁচকড়া কড়ি দিয়ে প্রসাদ কিনবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়| তখন কি আর করবে‚ ঐ পাঁচকড়া কড়ি গঙ্গার জলে ছুঁড়ে দিতে মা গঙ্গা নিজে আবির্ভুত হয়ে কড়িগুলো লুফে নিয়ে অন্তর্ধান হন| এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে তারা যারপরনাই আশ্চর্য হয় এবং বুঝতে পারেন ইনি কোন দেবী‚ তাদের বাড়িতেই অধিষ্ঠান করছেন| তারা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে| এদিকে দেবতাদের তিন সন বা চৌদ্দমাস অতিক্রান্ত হয়েছে| নারায়ন দেবীকে নিতে হাজির হয়েছেন| বাড়ির লোকেরা কিছুতেই দেবীকে যেতে দেবেন না| তারা তার কাছে তাদের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে| লক্ষী নিজরুপে দর্শণ দিয়ে বলে‚ পৌষ‚ চৈত্র‚ ভাদ্র‚ কার্তিক মাসে আমার পুজোর কর‚ আর মেজো বউয়ের ঝাঁপিতে একটা হাড় রেখে গেলাম সেটা নিতে বল তাকে‚ আর বড় বৌয়ের জন্য ডালিম তলায় রেখে গেলাম কিছু জিনিস|বলে তিনি রাথে চড়ে নারায়নের সাথে বৈকুন্ঠাধামে যাত্রা করলেন| বড়বৌ ডালিমতলা খুঁড়তেই পেল অপার ধনরতন| সবাই বুঝলো‚ মা লক্ষীর দৃষ্টিতে মেজো বৌয়ের দেওয়া এঁটোকাঁটা রত্নে রুপান্তরিত হয়েছে| আর মেজবৌ যেমন ঝাঁপি খুলতে গেল কালো কেউটে এসে ছোবল মেরে চলে গেল| মেজবৌয়ের শাস্তি হল| মহা ধুমধাম করে লক্ষীরপুজো শুরু হল| ধীর ধীরে তা লোকমুখে দুর থেকে দুরে প্রচারিত হয়|

3294

6

দীপঙ্কর বসু

শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মৃতিচারণ থেকে ।।

ফেস বুকে জনৈক সঞ্জয় ভৌমিক রবীন্দ্রনাথের "সকল গানের ভান্ডারী" শৈলজারঞ্জন মজুমদারের লেখা স্মৃতিকথা থেকে কিছু নিরবাচিত অংশ পোষ্ট করেছেন । লেখাটি আমার মনযোগ আকর্ষণ করায় মনে হলও আড্ডাঘরের বন্ধুদের সাথে লেখাটি শেয়ার করি ---- "১৯৩৯ সন। বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল। গুরুদেবের জানার আগ্রহ ছিল গানের মহড়া কেমন চলছে। আমি উত্তরায়ণে গানের দল নিয়ে গিয়ে ছ'টি পুরনো গানের মহড়া গুরুদেবকে শোনালাম। খেতে যাবার ঘন্টা পড়ল, ছেলেমেয়েরা খেতে চলে গেল। এই সুযোগে আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরনো গানে আর ওরা বর্ষামঙ্গল করবে না। গুরুদেব বললেন, এই অল্প সময়ের মধ্যে কী করে আর নতুন গান লেখা যায়? অন্য অনেক কাজও তো আছে। সেদিন এই পর্যন্ত। পরদিন বেলা এগারোটায় গুরুদেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নতুন লেখা একটি গান হাতে দিলেন। গানটি - 'ওগো সাঁওতালি ছেলে।'... ... বর্ষামঙ্গলের জন্য দ্বিতীয় গান, 'বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল' পেলাম 'ওগো সাঁওতালি ছেলে' লেখার পরের দিনই। পাওয়ার পর আমার মনে হল, গুরুদেব তো বেহাগসিদ্ধ, বর্ষামঙ্গলের গান বেহাগ রাগিণীতে লিখতে অনুরোধ করলে কেমন হয়? পরদিন ভোরবেলা বনমালীর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি কাগজে 'বেহাগ' কথাটি লিখে গুরুদেবের লেখার টেবিলে চাপা দিয়ে রেখে চলে এলাম। সেটা চোখে পড়ামাত্রই বনমালীকে ডেকে বকতে আরম্ভ করলেন, তুই যাকে-তাকে এখানে আসতে দিস কেন? আমার অন্য কাজ বুঝি আর নেই? আমাকে কি ফরমাশি গান লিখতে হবে? বনমালি চাপা হাসি হেসে চলে গেল। সেই বেহাগে পেলাম এই গান - 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে'। এর পরদিন আবার কাগজে লিখে এলাম 'ইমন', পেলামও - 'এসো গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি' গানটি। এবার আবার কাগজে লিখে রেখে দিয়ে এলাম, 'তান দেওয়া গান'। পেয়ে গেলাম, 'আজ শ্রাবণের গগনের গায়'। সব সুদ্ধ হল পাঁচটি নতুন গান। ষষ্ঠ গানটি 'আজি ঝরঝর মুখর বাদল-দিনে' গুরুদেব নিজে থেকেই লিখলেন। ষষ্ঠী তালে কাফি ঠাটে মীড়ের ওপর মোলায়েম সুরে 'উদাসী মেঘ'-এর মধ্যলয়ে তৈরি। এই গানটি রচনা করে গুরুদেব যথারীতি শেখালেন। আমি স্বরলিপি করে নিলাম। ... ...ছ'টি নতুন গান লেখার পর গুরুদেব বললেন, তোমার কাজ তো হয়ে গেল, এবার তুমি থামো। আমি বললাম, এক ডিজিটের মূল্য কী? অন্তত দু'টি ডিজিট করে দিন, একের পাশে অন্তত শূন্য চাই। পরের গান যেটি পেলাম - 'স্বপ্নে আমার মনে হল'... ... পরের গানটি পেলাম - 'এসেছিলে তবু আস নাই'। এটি শ্রীমতি অমিতা ঠাকুরের উদ্দেশে লেখা। 'এসেছিনু দ্বারে তব', 'নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে' এই গান দু'টি পরপর পেয়ে গেলাম। এর পরেই কবি বললেন, একের পর শূন্য বসে গেল, এবার শেষ। আমি বললাম, শূন্যের কোনও মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন। পরের দিন আবার কাগজে 'কীর্তন', 'বাউল' কথা দু'টি লিখে চাপা দিয়ে রেখে এলাম লেখার টেবিলে। সেই সূত্রে পাওয়া গেল 'পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে' গানটি। তারপরের বারো নম্বর গানটি হল - 'শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে'।" শৈলজারঞ্জন মজুমদার।

1099

7

মনোজ ভট্টাচার্য

অন্য প্রমা - একটা স্বচ্ছ সুন্দর পত্রিকা !

অন্য প্রমা - একটা স্বচ্ছ সুন্দর পত্রিকা ! আমার অভ্যেস হলো পুরনো কোনো পত্রিকা পেলে পড়ে ফেলার চেষ্টা করি ! পুরনো উপন্যাসের চেয়ে সাময়িক পত্রিকার আকর্ষনই বেশি ! তাতে নানারকমের প্রবন্ধ থাকে। - মুস্কিল হচ্ছে বেশির ভাগ সাময়িক পত্রিকায় খুব ভারী ভারী প্রবন্ধ ! - সাহিত্য সংযুক্ত হয়ে থেকে প্রবন্ধের ভার নেওয়া এক জিনিস - আর সাধারণ পড়ুয়ার পক্ষে প্রবন্ধ নেওয়া সম্পুর্ন ভিন্ন ! - খুলেই বলি - অনেকে প্রবন্ধ লেখে - তাদের পান্ডিত্য দেখাবার জন্যে ! বেদ-উপনিষদ থেকে অহেতুক উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টিকে ভারী করে হয়ত ডি লিট্ প্রমান করা যায় - কিন্তু পাঠকের মনোযোগ নয় ! - আমার মত পাঠকও আছে - যারা প্রবন্ধ একটু সরস হলেই পড়ার চেষ্টা করি। আপাতত আমি একটা পুরনো অন্য প্রমা শারদ সংখ্যা ১৪১৭ পেয়েছি ও সময় নিয়ে পড়ছি ! এই প্রমা পত্রিকাতে কয়েকটা সেই ধরনের প্রবন্ধ আছে - পড়তে ভালো লাগে। বিষয়গুলো বেশ আকর্ষনীয় ! - অন্তত এই মুহুর্তে একটি প্রবন্ধের নাম মনে আসছে। যে বিষয় নিয়ে আমি অনেকদিন ধরে লিখে চলেছি ! গল্পকথার রামায়ণ ! রামায়নের সব চরিত্র নয় - কেবলমাত্র সীতার চরিত্র নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা । - ভারতীয় অত্যাচারিত ও অবহেলিত মহিলাদের প্রতিক - সীতা ! রামায়ণের কবিরাও নারীজাতির প্রতি অত্যাচার কতটা অনুধাবন করতেন - তারই কিছুটা প্রামান্য তুলে ধরা হয়েছে ! লেখক সোমব্রত সরকার - অনেক পরিশ্রম করে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে এই বিষয় নিয়ে লিখেছেন। সব সহৃদয় মানুষেরই এই প্রবন্ধটি পড়া দরকার - বলে আমি মনে করি ! বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলা আড্ডায় বাংলা বানানের ব্যাপারে থেকে থেকেই বিতর্ক চলছে । - বাংলা ভাষা একটা বিশাল সমুদ্রের মতো ! আশি হাজার শব্দ সমষ্টির - ব্যকরণ ও বানান মনে রেখে ভাষা লেখা সম্ভব বলে তো আমার মনে হয় না ! - ইংরিজি ভাষা সবাই সঠিক না জেনেও - বানান তো দূর অস্ত - দিব্যি জনপ্রিয় ! প্রফেসর হিগিন্স তো অশুদ্ধ বানান ধরেও ভাষার অগ্রগতি রোধ করতে পারে নি ! - এ প্রবন্ধও অবশ্য উচ্চারণের সঠিক সমাধানের চেষ্টা করা হয় নি ! - কিন্তু এখানে প্রবন্ধটা শুধু বাংলা ভাষারই ওপরে - এপার ও ওপার - দু বাংলাদেশের জন্যেই ! লেখক পবিত্র সরকার । জ্যোতি প্রকাশ রায়ের - বরেন বসুর ওপর লেখা পরে বেশ কিছু জানা যায়। তেমনি অমরেন্দ্র ঘোষের স্বপ্নের কথাও জানা যায় সুব্রত সেনগুপ্তের লেখায়। একটা দুর্দান্ত - কোলিয়ারির ওপর উপন্যাস আছে। যতদুর মনে হয় চিনাকুরী কোলিয়ারির কথা ! এত সুন্দর করে আজকের কোল মাফিয়াদের ওপর লেখা - ! - পাতালপর্ব - লেখক মানব চক্রবর্তী! সত্যি ঘটনা - নতুন করে লেখা ! কমলকুমার মজুমদারের স্ত্রী দয়াময়ী মজুমদারের নিজস্ব লেখনী প্রতিভা আগে কখনো প্রকাশিত হয় নি ! তার কয়েকখানি বই প্রকাশিত হয়েছে - মূলত রামকৃষ্ণ সারদাদেবী বিষয়ক ! তার একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাত্কার নিয়েছেন প্রশান্ত মাজী ! বাংলা নাটকের শুরু - ১৮৭৩ সালে রাশিয়ান নাট্যকার গেরাশিম লেবেদফের - কাল্পনিক সংবদল - মঞ্চস্থ হয়। সেই নাটকের চার নায়িকার সম্বন্ধে কিছু আলাপ আছে ! - তার পরবর্তী তিন নায়িকার বিষয় নিয়ে কিছু লেখা আছে ! - খুবই চিত্তাকর্ষক লেখা ! একটা পত্রিকায় যে সব কটা লেখাই উঁচু মানের হবে - তা হতে পারে না ! - কিছু লেখা - গল্পের আকারে - খুব নিচু মানের ! আবার এখানেই একটা কিম্ভূত লেখা আছে। ছাত্র হোস্টেলে যৌনার্থক শব্দের যথেচ্ছাচার ! - সম্পাদকের অনেক কাঁদুনি সত্ত্বেও বলবো - এত নোংরা - এত অরুচিকর লেখা এখানে প্রকাশ না পেলেই ভালো হত ! অশ্লীল বলব না - বরং কদর্য বলা যায় ! - যে ভাষা রাস্তায় অহরহ শুনি সেই ভাষাগুলো চটিবই গুলোতেই মানায় ! এই পত্রিকায় নিশ্চয় নয় ! তবুও লিখি - এত সাময়িক পত্রিকার ভীড়ে এমন একটা উন্নতমানের পত্রিকা - বাংলা ভাষার সম্পদ ! মনোজ

1299

6

Somen dey

রক্তকরবী কি আজও অনভিনেয় ?

আজ থেকে প্রায় তিরানব্বই বছর আগে লেখা একটি নাটক ।তবু আজও কি সময় থেকে একটু বেশি এগিয়ে ? আজও কি একজন সাধারণ দর্শককে নাটকের সঙ্গে একাত্ন হতে বাধা দেয় নানারকমের আইডিয়ার আনাগোনায়, নানা রকম সঙ্কেতের আধিক্য ? আমরা কি আজও তৈরি রক্তকরবীর জন্যে ? এই মুহুর্তে কলকাতায় একটি দল এ নাটক অভিনয় করছে । শুনতে পাচ্ছি প্রতিটি শো হাউসফুল হয়ে যাচ্ছে , অনেক দিন আগে থেকেই । সেটা নাটকের প্রযোজনার গুণে নাকি নাটকের বিজ্ঞাপনে আমজাদ আলি , রশিদ খান , অজয় চক্রবর্তী , আয়ান-আমন আলি কৌশিকী চক্রবর্তীর মত বড় বড় নাম জুড়ে দেওয়ার কারণে জানিনা । কারণ এই দলের এবং এই পরিচালকের পরিচালনায় প্রায় একই অভিনেতা অভিনেতৃ দের নিয়ে নাটকটি আমি দেখেছিলাম বছর তিনেক আগে । তখন বিজ্ঞাপনে এই বড় বড় নাম গুলি ছিল না । তাই শো গুলি হল ভর্তি হত না । তবে সব মিলিয়ে প্রযোজনাটি আমার ভালোই লেগেছিল । তবে নায়িকার ভুমিকায় যিনি অভিনয় করেন তিনি যদিও বহুরুপীর ঘরে লালিত হয়েছেন বলা যায় । ছোটবেলায় স্বয়ং শম্ভু মিত্রের সঙ্গে ‘ডাকঘর’ এ অভিনয় করেছেন । তৃপ্তি মিত্র কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন । অতয়েব তাঁর অভিনয়ে , বাচনে তৃপ্তি মিত্রের ছায়া আসবে এটা স্বাভাবিক । তবে বাধাটা হচ্ছে বয়স । যে নন্দিনী রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় যক্ষপুরীর আচমকা আলো , ফাঁকা সময়ের সন্ধাতারা , রাঙ্গা আলোর মশাল , বিশ্বের বাঁশিতে নাচের ছন্দ , তাকে তো নন্দিনী হয়ে উঠতে হবে সমস্ত শরীরের ছন্দ দিয়ে , প্রাণের গতি দিয়ে ।শুধু কণ্ঠ প্রক্ষেপন দিয়ে নয় । আর তা ছাড়া আরেকজন তৃপ্তি মিত্র হওয়া যখন কারো পক্ষে সম্ভব নয় , তখন একজন নতুন দর্শক কে দিতে হবে একজন নুতন রকমের নন্দিনী । সেটা যতদিন না সম্ভব হচ্ছে ততদিন রক্তকরবী মঞ্চস্থ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে । তবে হ্যাঁ , রক্তকরবী দৃশ্যকাব্য না হোক শুধু শ্রুতিকাব্য হিসেবেও কিছু কম আকর্ষনীয় নয় । একটু পিছন দিকে যাই । ১৯২৩ সালে এ নাটক লেখা শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ । প্রায় এক বছর লেগেছিল শেষ করতে । এর মধ্যে দশ-এগারো বার তিনি খসড়া পাল্টেছেন । সম্ভবত আর কোনো রচনাই এতবার করে খসড়া পাল্টান নি । প্রথমে নাম দিয়েছিলেন ‘যক্ষপুরী’ তার পরে নাম দেন ‘নন্দিনী’ । তার পর নাম হয়ে ওঠে ‘রক্তকরবী’ । কেন ‘রক্তকরবী’ তার একটা ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন  । ‘আমার ঘরের কাছে একটি লোহা লক্কড় জাতীয় আবর্জনার স্তুপ ছিল । তার নীচে একটা ছোট্টো করবী গাছ চাপা পড়েছিল । ওটা চাপা দেবার সময়ে দেখতে পাইনি , পরে লোহাগুলি সরিয়ে আর চারাটুকুর সন্ধান পাওয়া গেল না ।কিছুকাল পরে হটাৎ একদিন ঐ লোহার জাল-জঞ্জাল ভেদ করে একটি সুকুমার করবী শাখা উঠেছে একটি লাল ফুল বুকে করে । নিষ্ঠুর আঘাতে যেন তার বুকের রক্ত দেখিয়ে হেসে প্রীতির সম্ভাষণ জানাতে এলো । সে বললে ভাই মরিনি তো , আমাকে মারতে পারলে কই ? তখন আমার মনের মধ্যে এই বিষয়ের প্রকাশ বেদনা দিল । এই নাটকটাকেই তাই ‘যক্ষপুরী’ ‘নন্দিনী’ প্রভৃতি বলে তৃপ্তি হয় নি , তাই নাম দিলেম রক্তকরবী ।’ তাঁর ইচ্ছে ছিল নাটকটি অভিনয়ের আগে যেন ছাপা না হয় । ইচ্ছাপূরণ হয় নি । নন্দিনী চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে তিনি যাকে ভেবেছিলেন সেই রাণু অধিকারীর বিয়ে হয়ে যায় ১৯২৪ সালে । এর পরে আর তিনি নিজের পরিচালনায় রক্তকরবী অভিনয় করার চেষ্টা করেন নি । তার একটা কারণ তিনি জানিয়েছিলেন – ‘ আমি নিজে কখনও রক্তকরবী করিনি। কেন করিনি তাও বলি । আমার কলম থেকে যে নন্দিনী রূপ নিয়েছে বাস্তবে আমি তার সন্ধান পাইনি । ’ কিন্তু তিনি যে এ নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই । সম্ভবত তিনি এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়া জানবার জন্যে উন্মুখ ছিলেন । একদিকে যেমন সন্দেহ ছিল রক্তকরবী নাটক দর্শকদের কাছে সহজবোধ্য হবেনা , সেই সঙ্গে একটা প্রবল ঔৎসুক্য ছিল দর্শকরা কতটা এ নাটকের মর্মভেদ করতে পারবে । নাটকটি অভিনয়ের প্রস্তুতি পর্বের তিনি দর্শকদের জন্যে একটি প্রস্তাবনা লেখেন । সেটি আজ পড়লে বেশ অদ্ভুত লাগে ।রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা বলে মনে হয় না । ‘ ভয় হচ্ছে পালা সাঙ্গ হলে ভিখ মিলবেনা , কুত্তা লেলিয়ে দেবেন । তারা পালাটিকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করার চেষ্টা করবেন ’ প্রশ্ন উঠতে পারে এমন আশঙ্কা থাকা সত্বেও রবীন্দ্রনাথ কেন নাটকটিকে একটু সহজবোধ্য করার চেষ্টা করেন নি । তার একটা উত্তর সেই প্রস্তাবনাতেই ছিল – হৃৎপিণ্ড টা পাঁজরের আড়াল থেকেই কাজ করে । তাকে বের করে তার কার্যপ্রণালী তদারক করতে গেলে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে ।’ পরে সম্ভাব্য দর্শকদের জন্যে আরও নির্দিষ্ট করে বলেছেন - ‘ আপনারা প্রবীন। চশমা বাগিয়ে পালাটার ভিতর থেকে একটা গূঢ় অর্থ খুঁটিয়ে বার করবার চেষ্টা করবেন । আমার নিবেদন যে গূঢ় তাকে প্রকাশ্য করলেই তার সার্থকতা চলে যায় । ’ রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী মঞ্চস্থ করার চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর আর একটি চেষ্টা করে টেগোর ড্রামাটিক গ্রুপ নামের একটি দল । ১৯৩৪ সালে কলকাতায় । ভুমিকম্পে বিধ্বস্ত বিহাররের মানুষদের সাহাজ্যের উদ্দেশে এই উদ্যগটি নেওয়া হয় । সেটি সম্ভবত সফল হয়নি । অন্ততঃ রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি বলে জানা যায় । ১৯২৫ সালে রক্তকরবীর ইংরেজি অনুবাদ বার হয় ম্যাকমিলান প্রকাশনায় ‘রেড অলিয়েন্ডার্স’ নাম দিয়ে। সেই বছরেই এডিনবরা তে তে এনাটক টি মঞ্চস্থ করা হয় । কিন্তু সেখানেও বিরুপ সমালোচনা জোটে । এমনকি রবীন্দ্রনাথের পরম ভক্ত স্টার্জ মূর এই অনুবাদ পড়ে রবীন্দ্রনাথ কে চিঠি দিয়ে তাঁর অপছন্দের কথা জানিয়েছিলেন । এতেও রবীন্দ্রনাথ হাল ছাড়েন নি । তিনি সে সময়ের সবচেয়ে আধুনিক এবং সংস্কৃতিবান নাট্যপরিচালক শিশির ভাদুড়ি কে অনুরোধ করেন রক্তকরবী মঞ্চস্থ করার জন্যে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি । তার একটা কারণ সেই নন্দিনীর ভুমিকায় অভিনয় করার মত কাউকে না পাওয়া । এর পর রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু অবধি আর কেও চেষ্টা করেন নি রক্তকরবী কে দুর্বোদ্ধতা এবং অনভিনেয়তার বদনাম থেকে শাপমোচন করার । হয়ত যাবার দিনে তিনি এই অপুর্ণতার দুঃখ টুকু নিয়েই চলে গিয়েছিলেন । তার পর দেশ স্বাধীন হয়েছে ।শুধু রাজনৈতীক জগতে নয় দেশের সংস্কৃতি জগতে অনেক ওলোট পালোট হয়ে গেছে । আই পিটিয়ের আন্দোলন সারা দেশ জুড়ে সাড়া জাগিয়েছে । কলকাতার নাটকের জগতে ঘটে গেছে অনেক বদল । ‘নবান্ন’ নাটক অভিনীত হওয়ার পর একটা খোলা হাওয়া লেগে গেছে নাট্য ভাবনায় । কোলকাতায় প্রধাণত দুটি দল অন্য ধরণের নাটক নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে আরম্ভ করে । বহুরুপী এবং পি এল টি । দুইই দলের নেতৃত্বে দুই প্রবাদ প্রতীম নাট্য ব্যাক্তিত্ব – শম্ভু মিত্র এবং উৎপল দত্ত । দু জনের ভাবনার অভিমুখ ভিন্নমুখী । দুজনের ভাবনাতেই তখন রবীন্দ্রনাথের নাটক এসেছে । উৎপল দত্ত ‘অচলায়াতন’ নাটক প্রযোজনা করেও ফেলেন । কিন্তু ‘রক্তকরবী’ সম্বন্ধে তিনি উৎসাহিত হলেন না । তাঁর মতে রক্তকরবী দুর্বোধ্য এবং স্ববিরোধী । তাঁর সংশয় ছিল ‘ একবার পড়েও রাজার একাধিক অনুচ্ছেদের অর্থ বোঝা যায় না , আর দর্শক কি একবার শুনেই তার মর্মার্থ গ্রহণ করতে পারবে ? ’ তিনি মনে করেছিলেন ‘রক্তমাংসের মানুষ রক্তকরবীতে নেই – আছে নানা আইডিয়ার দেহ প্রাপ্ত মুর্তি । ’ কিন্তু শম্ভু মিত্র অন্য ভাবে ভাবলেন । এতদিন ধরে যাঁরা রক্তকরবীর মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে আবিস্কার করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন , শম্ভু মিত্র প্রথম তাই করতে পারলেন । তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে গেলেন । তিনি প্রথম বুঝতে পারলনে ‘এটি অভিনেতাদের বা নির্দেশকদের লুব্ধ করার মত একটি নাটক’। এবং এ নাটক করতে গিয়ে এই নাটকের গূঢ় সত্য নিয়ে যে কত ভাবে ভেবেছিলেন তা তিনি পরবর্তী কালে লিখে গেছেন । এমন কি এক জায়গায় বলেছেন - ‘রবীন্দ্রনাথের নাটককে বোধ দিয়ে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করতে না পারলে বোধহয় বাংলা নাটকের মান উন্নত হবে না।’ যে উৎপল দত্ত রক্তকরবী কে অনভিনেয় বলে ছিলেন শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী দেখার পরে এ নাটক কেমন লেগেছে তা জানতে চাওয়া হলে বলেন – “ আমি অত্যন্ত- কী বলবো, মানে অপূর্ব লাগলো যখন ‘রক্তকরবী’ হলো। হ্যাঁ, এই সংলাপের জন্যই শম্ভুবাবুর কণ্ঠস্বর তৈরি হয়েছে। তাই যে জালের আড়াল থেকে রাজা বলে যাচ্ছে, এ যেন ওইটে বলতো পারতো। তারপর তো রবীন্দ্রনাথকে ওরাই পপুলারাইজ করলেন। রবীন্দ্রনাথকেও তো বাদ দিয়ে রেখেছিল। গিরিশবাবু-টাবু তো বাদ বটেই। রবীন্দ্রনাথের নাটক নাটক নয়, এধরনের কথাও বলতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যাঁরা সত্যিই করতে পারেন, তাঁরা হচ্ছেন ‘বহুরূপী’। শম্ভু মিত্র। এবং তিনি তাঁর নিজের ক্ষমতা বুঝেছিলেন এবং তিনি একটা বিরাট কাজ করে দিয়ে গেছেন বাংলা নাটকে, সেটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ যে অভিনয়যোগ্য, রবীন্দ্রনাথ যে থিয়েটারে একটা অত্যন্ত চমকপ্রদ সংযোজন, সেইটে তিনি প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন এবং প্রধানত ব্যবহার করেছেন তিনি তাঁর কণ্ঠস্বরকে। ” রক্তকরবী প্রযোজনার কিছুদিনের মধ্যে এই নাটকের বক্তব্য এবং মঞ্চায়ন নিয়ে বহুরূপী ও শম্ভু মিত্রকে বহু তর্ক করতে হয়েছে।দীর্ঘদিন অনভিনেয় হয়ে থাকার পর যখন বিমুর্ত প্রতীক থেকে যখন বাস্তবভিত্তিক জনচেতনায় রক্তকরবী হয়ে উঠল অনন্য একটি মঞ্চনাটক, তখন স্বাভাবিক ভাবেই তা বুদ্ধিবাদী মহলকে প্রবলভাবে তা আলোড়িত করেছিল। এ-নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছিলেন অনেকেই। আমরা যারা শম্ভু মিত্রের ‘রক্তকরবী’ দেখতে পাইনি তাদের কাছে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবার একমাত্র উপায় এ নাটকটির অডিও টি শুনে বাকিটা সে সময়ে এবং যারা নাটকটি দেখে ছিলেন তাঁদের লেখা পড়ে সে নাটকটি কল্পনার চক্ষে দেখা । নাটকটি দিল্লির সপ্রু হাউসে অভিনীত হয়েছিল , সে নাটক দেখার পরে শ্রী অশোক মিত্র মশাই যা লিখেছিলেন তা এই রকম । ‘রক্তকরবী’ তার অন্তিমে পৌঁছলো, যবনিকা পড়লো, কিন্তু সেই সায়াহ্নকালে আমরা কয়েকজন মুখর যুবক কেমন নির্বাক হয়ে গেলাম। আমরা বিপর্যস্ত, অথচ সেই সঙ্গে এমনো বুঝতে পারছি আমরা সংস্কৃততর, উন্নততর। ‘রক্তকরবী’ থেকে আমরা আনন্দ ছেঁকে-ছেনে নিয়েছি, বিষণ্ণতার আনন্দ, তা-ও ছেঁকে-ছেনে নিয়েছি। কী প্রত্যাশা নিয়ে সপ্রু হাউসে সেই কনে দেখা আলো বিকেলে ‘বহুরূপী’ সম্প্রদায়ের অভিনয় দেখতে গিয়েছিলাম তা স্পষ্ট করে এখন আর ব্যক্ত করা সম্ভব নয়, তবে যবনিকা নেমে আসার পর, অভিনয়গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হবার মুহূর্তে, আমরা, হতচকিত, হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, ‘রক্তকরবী’র মন্ত্রবলে আমরা, ঐ যুবকদল, পরস্পরের আরো অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি, ‘রক্তকরবী’ আমাদের বিশুদ্ধতর করেছে, পবিত্রতর করেছে, জ্যোতিহীনতা থেকে ধাঁধানো উজ্জ্বলতায় উপনীত করেছে। কষাঘাতে আমাদের জর্জরিত করেছে ‘রক্তকরবী’, আমাদের প্লাবনে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ‘রক্তকরবী’, আমরা অভিভূত, কারণ আমরা এই প্রতীতির অভিজ্ঞানে উত্তীর্ণ হয়েছি যে, নাটক একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, আমাদের সবাইকে ভাবায়-হাসায়-কাঁদায়, এবং এই রহস্যঘন সাযুজ্যের মধ্যবর্তিতায় পাড়াপড়শীদের পরস্পরের নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।’ বেশ কয়েকটি দলের রক্তকরবী আমি দেখেছি । হয়ত ভবিষ্যতে আবার আগ্রহের সঙ্গে দেখবো ।দেখতে যতই ভালো লাগুক আমি জানি শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের সেই রক্তকরবীর কাছাকাছি আর কারোর পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয় । তবু চেষ্টা চলতে থাকুক । কারণ থেমে থাকাটা রবীন্দ্রনাথের একেবারে অপছন্দ ছিল ।

1535

2

Somen dey

এক যে আছে অপু

সেই কৈশোর কাল থেকে ছবি দেখা শুরু । কত ছবিই তো দেখা হল ।বানিজ্যিক সিনেমা আর্ট ফিল্ম , প্যারালাল সিনেমা , ন্যু ওয়েব সিনেমা ,আঁভা গারদে সিনেমা ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও আজও বুঝি না এদের মধ্যে সীমারেখা ঠিক কোন খানটায় । সিনেমার তত্বকথা যতটা পারি বুঝবার চেষ্টা করেছি ।পৃথিবী বিখ্যাত ছবি করিয়েদের ছবি দেখে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করেছি ।সেই সব পরিচালকেরা তাদের ছবির মাধ্যমে কেও ভাবিয়েছে , কেও রাগিয়েছে ,কেও কাঁদিয়েছে , কেও ভয় পাইয়েছে, কেও ঝাঁকুনি দিয়েছে ,কেও রূপে ভুলিয়েছে ,কেও জেল্লায় , কেও বা সরাসরি প্রাণিত করেছে  । কত বিচিত্র সব ছবির চরিত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছে । তারা অনেকেই হয়ত জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে প্রভাবিত করেছে আমাকে ।কেও সহ্য করতে শিখিয়েছে , কেও প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে , কেও ভালোবাসতে শিখিয়েছে । মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের অপু , সেও কি আমার কাছে শুধু সিনেমার সে রকম একটি চরিত্র ? নাকি আমার কাছে (হয়ত আমার মত অনেকের কাছেই) সে আমার নিজের alter ego । সে একটা magic reality যার উপস্থিতি বাস্তব থেকেও জোরালো । অপুর কাহিনিতো বিভুতিভূষনের আত্নজৈবনিক উপন্যাস ।আর আমরা তো সবাই বিভুতিভূষনের মত প্রকৃতিমগ্ন , দুঃখ-নির্বিকার , লোভহীন মানুষ নয় ।আর অপুতো আমাদের কাছে , এই কঠিন বাস্তবের যুগে তেমন অনুকরণযোগ্য চরিত্রও নয় ।তার সম্পর্ক যতটা ভাব-জগতের নক্ষত্রের সঙ্গে ততটা পায়ের তলার মাটির সঙ্গে নয় ।রণ রক্ত সফলতা তার কাছে শেষ সত্য নয় ।সে খুব আধুনিকমনস্ক নয় । উদ্যোগী নয় ।উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। তা স্বত্বেও আমরা যে অপুর সঙ্গে আমরা প্রাণের গাঁটছড়া অনুভব করি সে কতটা বিভুভূষনের কতটা সত্যজিতের জন্যে তা নিয়ে তর্ক করা বৃথা । শুধু জানি আমাদের রক্তের অন্তর্গত ধারায় মগ্ন মৈনাকের মত মাঝে মাঝে তার উপস্থিতি আমাদের জানান দেয় । আমরা কখনো সখনো বাঙ্গালিয়ানার কথাটা ব্যাবহার করি  । সেটাতো শুধু পোষাক আসাক , খাবার দাবার নয় । সে বাঙ্গালিয়ানার মধ্যে যেমন মঙ্গল কাব্য , চর্যাপদ আছে , রামপ্রসাদ আছে ,প্রভাতী গান আছে, আঁকা বাঁকা নদী আছে ,তার ধারে কাশ ফুল আছে , টেলিগ্রাফের তারে বসা ফিঙ্গে পাখী আছে , তেমনি আছে একজন অপু । আমাদের মধ্যে যারা কোনোদিন দেখেনি সত্যিকারের কচু পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা , দেখেনি হ্যাজাকের আলোর নিচে গ্রামীন যাত্রাপালা , দেখেনি কালো ধোঁয়া ওগরাতে ওগরাতে চলে যাওয়া কয়লার রেল , তারাও বোধহয় অপুর চোখে দেখে নিয়েছে বাংলার গ্রাম । সিনেমায় সেই বাংলাকে দেখিয়েছেন সত্যজিৎ যা জীবনানন্দ কবিতায় দেখাতে চেয়েছিলেন । আর সেই বাঙ্গলার সমাজচিত্রের পটভূমিতে অপু নামক এক সাধারণ বাঙ্গালির বেড়ে ওঠার লড়াই  ।অপুও এক protagonist যার নিরুচ্চার লড়াই জীবনটাকে মাথা উঁচু করে তার নিজের মত করে সাজিয়ে নেবার জন্যে ।সে লড়াই থেকে বার বার ছিটকে গিয়ে আবার তাতে ফিরে আসা । চারটি মৃত্যু তার জীবন কে চারবার বাঁক নিতে বাধ্য করে ।তবুও অপু শেষ অবধি অপরাজিত হয়ে ওঠে । বিভুতি ভূষনের অপুকে সিনেমার জন্যে বিনির্মাণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ তাকে যেমন কোনো এক বিশেষ সময় থেকে , বিশেষ আঞ্চলিকতা থেকে বের করে এনে বিশ্বজনীন করেছেন তেমনি আবার বাঙ্গালিয়ানার একটা যথার্থ documentation ও করেছেন ।ছবিতে আলাদা করে সেটাকে ধরা যাবে না । কীর্তনের সুরে যেমন করে বাংলার আকাশ মাটি গাছ পালা প্রচ্ছন্ন ভাবে থাকে, ঠিক তেমন ভাবে আছে সেই বাঙ্গালিয়ানা নিহিত হয়ে আছে Apu trilogy র মধ্যে  ।সে একটা আবহমান কালের বাঙ্গালিয়ানা । দারিদ্র যেখানে জীবন-মাধুর্যকে খাটো করেনা , অভাব যেখানে পথ চলার ছন্দকে বিঘ্নিত করে না , বিভুতিভূষনের সেই জীবনমানস কে সেলুলয়েডে ধরা পৃথিবীর আর কোনো পরিচালকের পক্ষে ধরা সম্ভব ছিল না । এখন সিনেমার ভাষা অনেক বদলে গেছে । সিনেমার দর্শকদের দেখার চোখ বদলে যাচ্ছে । পুরোনো ক্লাসিক সিনেমা গুলি বেঁচে থাকবে হয়ত শুধু শিক্ষার্থীদের রেফারেন্সে লাগবে বলে । অপুর তিন পর্বের পাঁচালী আগামী প্রজন্মের মনে আগ্রহ জাগাতে পারবে কিনা জানিনা । অথবা তাদের হাতে আবার নতুন করে আবিস্কৃত হবে কিনা অপুর কাহিনি তাও জানি না । সময় তা বলবে । অন্ততঃ আমরা চেষ্টা করতেই পারি আমাদের উত্তরাধিকারী দের –বোতামবিহীন ছেঁড়া সার্ট আর ফুসফুস ভরা হাসির সঙ্গে আমাদের অপুকেও কেও তাদের হাতে দিয়ে যেতে । পৃথ্বীরাজ চৌধুরীর লেখা কবিতা সৌমিত্র চ্যাটারজীর কণ্ঠে আবৃত্তি এখানে রইল ,যা আমি বলতে পারলাম না তা হয়ত বলা আছে এই কবিতায় । https://www.youtube.com/watch?v=g-QIstcMxvk

970

3

শিবাংশু

মান্নাম্যানিয়া অথবা অপূর্ব প্রেমের রাগ ভাটিয়ার

কোনও চর্চা-বিশ্লেষণ করবো না, আজ শুধু স্মরণটুকুই লিখে রাখি। ------------------------------------------------ ভার্সাটাইলের বাংলা 'বহুমুখী'। ব্যপ্তিটা ঠিক ধরা যায়না এই প্রতিশব্দে। ভারতীয় সঙ্গীত ও তার বৈচিত্র্যের ব্যপ্তিকে আকাশ বা সমুদ্র কোনও প্রতীকেই যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায়না। তিনি ছিলেন সেই নীহারিকাপ্রতিম ব্যাপ্তির অলখ নিরঞ্জন । কতো রকম গান, কতো ভিন্নমুখী, কতো ভিন্ন পারদর্শিতার মাইলফলক অর্জন করে গেছেন সারা জীবন। শুধু নিজের জন্য নয়, আমাদের মতো নির্গুণ শ্রোতাদের হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে। মুগ্ধতার কোনও যুক্তি হয়না। তাই মুগ্ধতা এতো আনন্দ দেয় মানুষ'কে। যুক্তি আমাদের সহজ'কে চেনায়। অনিবার্যকে গ্রহণ করতে প্রেরিত করে। যুক্তির তাড়না সহজসত্য'কে প্রতিষ্ঠিত করে দৈনন্দিন দেওয়া নেওয়ার নশ্বর জগতে। কিন্তু যেভাবে মানুষের মৃত্যু হলেও মানব থেকে যায়, সেভাবেই দাতা বা গ্রহীতার মৃত্যু হলেও মুগ্ধতাটি থেকে যায়। মানুষের সভ্যতায় বিস্ময়বোধ প্রধান চালিকাশক্তি আর মুগ্ধতাবোধ শেষ অর্জন। তিনি আমাদের মুগ্ধ করেছেন, করে চলেছেন কতোদিন ধরে। একজন শিল্পীর এর থেকে বড়ো সার্থকতা আর কী হতে পারে? এই অপূর্ব প্রেম বিধাতা যাঁদের নসিব করেছেন তাঁরা ধন্য। তাঁরা কেউ শিল্পী, কেউ শ্রোতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অলীক সীমারেখাটি অদৃশ্য হয়ে যায়। কে রাজা, কেই বা ভিখারি, কে তার খোঁজ রাখে ? আমি এমন একটা প্রজন্মের মানুষ যারা নসিব করে এই সব শিল্পীর অর্জিত পুণ্যের ছায়ায় বড়ো হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞ। --------------------------------------------------- কখনো সময় সুযোগ পেলে শুধু ওঁর গান নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে রইলো। আসলে অনেক কিছুই লেখার আছে, তাই সেই সব গান নিয়ে কোনও প্রস্তুতিহীন আলোচনায় যাবার ধৃষ্টতা করতে পারিনা। অজয় চক্রবর্তী একবার একটি আড্ডায় বলেছিলেন, তাঁর একটি অনুষ্ঠানে মান্না দে গান শুনতে এসেছিলেন। শেষ হবার পর তিনি অজয়বাবুর কাছে এসে বলেন, ' এ জন্মে তো গানটা শেখা হলোনা , পরের জন্মে আপনার মতো কারুর কাছে বসে গানটা একটু শিখতে হবে।' তখন অজয়বাবু তাঁর পা ছুঁয়ে বলেন, আজকের অজয় চক্রবর্তী গান শুরু করেছিলো মান্না দে'র অনুকরণ করতে করতেই। শ্যামনগর থেকে কলকাতা, তাঁর প্রাথমিক পরিচয় তৈরি হয়েছিলো, 'ঐ যে ছেলেটা, ভালো মান্না দে'র গান গায়' এই ভাবেই। সারা ভারতবর্ষে কতো লক্ষ গাইয়ে যে মান্নাদা'কে বিগ্রহ বানিয়ে সঙ্গীতচর্চা শুরু করেছেন বা সারা জীবন ধরে তাঁর প্রতি সেই একই মাত্রার শ্রদ্ধা নিয়ে মজে রয়েছেন, তার বোধ হয় কোনও ইয়ত্তা নেই। জগজিৎ সিং, সুরেশ ওয়াডকর, যীশুদাস, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, কীভাবে মান্নাদা'র গুণমুগ্ধ, তার কিছু পরিচয় ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি। --------------------------------------------------------------- মান্না দের গান অনেকের মতই, ব্যক্তি আমার সঙ্গীতচিন্তার অনেকটা জায়গা অধিকার করে রাখে। ওঁর গাওয়া বাংলা ও হিন্দি গান, যা বাজারে পাওয়া যায়, প্রায় সবই আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। এছাড়া রয়েছে ওঁর কয়েকটি অনুষ্ঠান, আমার নিজস্ব টেপ করা সংগ্রহ। কখনো সময় সুযোগ পেলে শুধু ওঁর গান নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে রইলো। আসলে অনেক কিছুই লেখার আছে, তাই সেই সব গান নিয়ে কোনও প্রস্তুতিহীন আলোচনায় যাবার ধৃষ্টতা করতে পারিনা। ------------------------------------------------------------------- শুধু কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। ছোটোবেলা থেকেই অনেকের মতো ওঁর গান নকল করার চেষ্টা করেছি। সে তো শিব গড়িতে বাঁদরই হতো। কিন্তু বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে একটা উৎসাহব্যঞ্জক পরিহাস কাজ করতো। এভাবেই একটা একটা প্র্যাক্টিক্যাল জোক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, মান্না দে, শিবাংশু দের সম্পর্কে জ্যাঠা। যে সব বন্ধু লেগ পুল করতে এই সব রটনা করেছিলো তারা আবিষ্কার করে গুজবটি বেশ গভীরে চলে গেছে। কলেজে পড়তে অবাঙালি বন্ধুরা একেবারে কনভিনস্ড ছিলো যে ব্যাপারটি সত্যি। এর ফলে যেকোনও অবকাশেই, যেখানে আমি উপস্থিত আছি, 'কানু ছাড়া গীত নাই' গোছের একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়। ----------------------------------------------------------- 'আমাদের দেশের সাধারন শ্রোতারা , অন্যান্য দেশের শ্রোতাদের মতই 'ন্যাচরাল' গায়কদের অধিক পক্ষপাতী। হেমন্ত, কিশোর, মুকেশ । কিন্তু এমন সফিস্টিকেটেড সাঙ্গীতিক ক্ষমতা আর তৈয়ারি নিয়ে সাধারন শ্রোতাকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা এদেশে মান্না ছাড়া আর কেউ দেখাতে পারেননি। এখনও তাঁর নাম মানুষের মনে কী ধরনের উন্মাদনা আনে তা আমি দেখেছি। হায়দরাবাদেও যেকোনও অনুষ্ঠানে আমার কাছে শুধু মান্না দের গান শোনানোর আদেশ আসতো। সে ফর্ম্যাল বা ইনফর্ম্যাল , সব রকম পরিস্থিতিতেই। গত বেশ কিছুদিন ধরে নববর্ষ, বিজয়া সম্মেলনী জাতীয় যেসব অনুষ্ঠানে গাইতে হয়েছে, সব জায়গাতেই শ্রোতারা সমস্বরে মান্না দের চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে গাওয়া গান শুনতে চেয়েছেন। কোনও কটাক্ষ না করে বলি, আজকের বাংলা গানে এমন কি কোনও পারফর্মার আছেন যাঁর গান দশ বছর পরেও কেউ শুনতে চাইবে? ------------------------------------------------------------ শেষ যে অভিজ্ঞতাটি হয়েছিলো হায়দরাবাদের বৃহত্তম বাঙালি প্রতিষ্ঠান , বঙ্গীয় সংস্কৃতি সঙ্ঘের বিজয়া সম্মেলনিতে। খুব ব্যস্ত ছিলুম অফিসে সেদিন। বাড়ি না ফিরেই অফিস থেকে সোজা পৌঁছেছিলুম সেখানে। কিন্তু পৌঁছোতেই সব্বাই মান্না দে শোনানোর জন্য যে রকম আদেশ করতে থাকলেন, আমি নেহাৎ অপ্রস্তুত। ওঁর গান গাওয়ার আগে একটা ন্যূনতম প্রস্তুতি লাগে। এভাবে হয়না। একটু বিরক্তই লাগছিলো। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো এঁরা তো আমাকে শুনতে চাইছেন না, এঁরা 'মান্না দে'র গান শুনতে চাইছেন। নববর্ষে, বিজয়া সম্মেলনীতে বাঙালিরা মান্না দে শুনবেন না তো কীই বা শুনবেন? খোদ পশ্চিমবঙ্গের হালহকিকৎ জানিনা, তবে প্রবাসের বাঙালিরা তো এখনও মান্না দে'র নামেই কসম খেয়ে থাকেন। ------------------------------------------ বিজাতীয় কামিজ পাৎলুনে, অফিসের পোষাকে স্টেজে। আমার একান্ত সঙ্গী 'পাকড়াশি বাবু কা পেটি ' সঙ্গে নেই। তবে গুরুকে স্মরণ করে প্রথম কলেজ জীবনের গানটি, 'ও কেন এতো সুন্দরী হলো'। কী গাইলুম আমি নিজেই ভালো জানি, কিন্তু শ্রোতারা রীতিমতো হর্ষিত। তার পর একজন প্রবীণ শ্রোতা এসে আদেশ করলেন, আমি যেন 'আমার না যদি থাকে সুর' শোনাই তাঁকে একবার। এই গানটির সঙ্গে একটু সজল অনুষঙ্গ রয়েছে আমার। আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর মা যখনই দেখা হতো, এই গানটি আমার থেকে শুনতে চাইতেন। অকালে দেহাবসান হয়েছে তাঁর। এই গানটি তাঁর স্মৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোত হয়ে আছে। গানটি খুব সহজ নয়। মন্দ্র থেকে তারায় সুরের প্রচুর যাতায়াত। কিন্তু তবু অক্ষম চেষ্টা ছিলো কিছু। এই অভিজ্ঞতা আবার আমাকে শেখালো, মানুষ শুনতে চাইছেন মান্না দের গান, আমার ভূমিকা শুধু তাঁদের স্মৃতিটিকে ট্রিগ্যার করা। আমার মূল্যহীন গান তাঁদের নিয়ে যাচ্ছে মান্না দে নামের একটা সুরের সমুদ্রের কাছে, এই টুকুই সন্তুষ্টি আমার। --------------------------------------------------------- বড্ডো বেশি ' আমি' প্রসঙ্গ এসে গেলো। বন্ধুরা মার্জনা করবেন। আসলে মান্না দে'কে নিজের অস্তিত্ত্বের থেকে আলাদা কোনও সন্দর্ভ হিসেবে ভাবিনি কখনও। তাই এই আত্মনাম বারবার, গর্হিত অভ্যেসটি লেখার মধ্যে চলে আসে। পঞ্জিকার একটা তারিখ তাঁর জন্মদিন। কিন্তু তিনি প্রতিদিনই আমার জন্য জন্ম নেন গান হয়ে, সুর হয়ে, আবহমান প্রতিশ্রুতি হয়ে। অন্তত আমার জন্য তিনি এক নৈসর্গিক স্নিগ্ধ মাত্রা। হয়তো তাঁর গান শোনার জন্যই আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয় । " মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা।"

990

4

Mahan Human

বৃষ্টি , কবিতা আর তুই

আমি তো তোমার নাম জানি না.. কথা শুরু করবো কি করো ? যেমন করে বৃষ্টি কথা বলে পাতার সাথে, টুপটাপ । ও'রকম তো অনেকেই বলে। তবে রোদের সাথে মেঘের যেমন হয় কথা, ওটা তো কথা নয়,ওটা তো লুকোচুরি .. তবে মন্দ নয়। তবে কি বাতাস যেমন পাখির ডানার সাথে কথা বলে ,না ওটা বড়ো একঘেয়েমি , সাঁতার কাটা .... তবে কি রাতের সাথে অরণ্য যেমন কথা বলে ? না ওটা বড়ো নিষিদ্ধ ,তবে আমার বেশ লাগে । আমি চাই অন্য কিছু, অন্য কথা ,অন্য ভাবে । আমি চাই নদীর ভেঙে যাওয়া পাড়ের সাথে নদীর যেমন কথা হয়,... বিধ্বংসী, ভয়ংকর। নাম টা কি বলবে এবার ?

971

2

মনোজ ভট্টাচার্য

একটি ব্যক্তিগত উপাখ্যান !

ব্যক্তিগত একটি উপাখ্যান ! অনেকেই আমার ছেলের অসুস্থ্যতার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানতে চেয়েছেন - তাই এই আখ্যানটি লিখলাম। আগেই জানাই - ছেলে এখন অনেক ভালো আছে ! ১০ই এপ্রিল রোববার সন্ধেবেলায় ! বিধান বৃদ্ধাবাসে যেতে হয়েছিল বিশেষ কারনে । গিয়ে অবশ্য আরেকটা ব্যাপারে ফেঁসে গেলাম। তারই মধ্যে স্ত্রীর ফোন ! মায়ামী থেকে পুত্রবধু ফোন করে খুব কান্নাকাটি করছে । ওরা গেছিলো ক্যারাবিয়ান ক্রুজে - অরল্যান্ডো থেকে। - সেখানে ছেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে শনিবার । নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কোনক্রমে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ক্রুজ কোম্পানি একটা হাসপাতালে তুলে দেয়। - সেখানে কোনো চিকিৎসা হয় নি। তাই ছেলে সেই অবস্থায় নিজের খরচে ছোট প্লেনে হপিং করে মায়ামী এয়ারপোর্টে নামে । মায়ামী এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনেই কথা বলতে বলতেই মাথা ঘুরে পরে যায়। - ব্যাস ! মায়ামীর তথা সারা আমেরিকার সরকারী স্বাস্থ্য দপ্তরগুলোর - ভীষণ চিন্তা আরম্ভ হয়ে গেল ! একে তো - ক্রুজ ফেরৎ যাত্রী - কি না কি অজানা রোগ নিয়ে এসেছে - কে জানে ! - তায় আবার - মায়ামীর মত যায়গায় ! কে জানে কিউবার থেকে কোনো 'কমি' রোগ আমদানী করছে কিনা ! - যাইহোক, ওরা একেবারে জরুরী ভিত্তিতে পাঠিয়ে দিল - মায়ামী ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে । কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটে । ছেলের তখন একশো চার জ্বর। প্রবল নিউমোনিয়া। লাংসে জল জমেছে । কোনো জনান নেই ! - আর বউ বেচারী মায়ামীতে কিছুই চেনে না - থাকবে কোথায় - কোনো ঠিক নেই। - মাল চলে গেছে অরল্যান্ডোতে। এক পোশাকে কাটাতে হচ্ছে - খাওয়া হচ্ছে হাসপাতালের নিচের ক্যাফেটেরিয়াতে - শুধু স্যান্ডুইচ ! আমাদের আর দ্বিতীয় চিন্তার অবকাশ কোথায় ! - সোমবার ফোন করলাম ট্র্যাভেল এজেন্টকে। এমিরেটসএ কোনো জায়গা নেই। মঙ্গলবার রাত তিনটের সময় শুধু কার্তার এয়ার লাইনে দুটো টিকিট পাওয়া গেল - দোহা হয়ে - সোজা মায়ামী আসার ! বুধবার বিকেলে মায়ামী নেমেই ট্যাক্সিতে করে একবারে হাসপাতালে। পাঁচ তলায় সি সি ইউতে গিয়ে দেখি নাকে মুখে বুকে হাতে ছুঁচ ও নলের আধিক্যে ছেলেকে আর দেখা যাচ্ছে না । রেস্পেটরি সিস্টেমে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। দেহ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে । আমাদের দেখে তো পুত্রবধুর ধড়ে প্রাণ এলো যেন ! - আমরাও খানিক নিশ্চিন্ত হলাম ! ডাক্তার বলল - নিজস্ব অক্সিজেন লেভেল খুব লো। একিউট রেসপেটোরি নিউমোনিয়া ! - প্রথম দিন নাকি মাথায় ঠিক মত অক্সিজেন যায় নি ! ক দিন না গেলে কিছুই বলা যাবে না ! - আমরা জানি - মাথায় ঠিকমত অক্সিজেন না গেলে কি হতে পারে ! আমরা তো তটস্থ হয়ে আছি ! - কি হয় ! এদিকে রাত দশটা নাগাদ - হাসপাতাল থেকে বের হতে হবে । এখানে শুধু ওর স্ত্রীকেই থাকতে দেবে ! শুনলাম এখানে একমাত্র থাকার জায়গা ম্যারিয়ট হোটেল । - ইতিমধ্যে ছেলেদের দুটো ঢাউস সুটকেস দিয়েও গেছে। সাকুল্যে চারটে সুটকেস নিয়ে হিমশিম খেতে খেতে হোটেলে আসতে - ঘর একটা পাওয়া গেল । ঘর ভাড়ার কথা আর নাই বা লিখলাম ! তারপর আছে ক্ষুন্নিবৃত্তি । নিচে ক্যাফেটেরিয়া - স্যান্ডুইচ খেয়ে রাত কাটানো ! পরের দিন দেখি - অঞ্চলটা হলো - হেলথ ডিস্ট্রিক্ট - চারদিকে অনেকগুলো হাসপাতাল । ইউনিভাসিটি হাসপাতাল ছাড়াও ক্যান্সার হাসপাতাল , চোখের , পাল্মানারী , ইত্যাদি কত নাম বলবো। কিন্তু না একটা দোকান , না কোনো রেস্তোরা। অনেক দুরে একটা গ্রোসারী ষ্টোর উইন-ডিক্সি আছে - ট্যাক্সিতে যেতে হয়। সে পরের কথা । - তবে হ্যা ! হোটেলে - ফ্রী ব্রেক ফাস্টে খাবার দেয় বটে ! কি নেই সেখানে ! সব রকমের ফলের রস থেকে কত রকম সিরিয়াল, বেগেল, টোস্ট , মাখন, চীজ জ্যাম জেলি, সেদ্ধ ডিম , স্ক্র্যাম্বল ডিম , সসেজ ! কত আর লিখবো ! সবার মতোই আমরাও ব্রেক ফাস্ট সেরে পুত্রবধুর জন্যে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম ! এদিকে একই ভাবে প্রায় আরো চার দিন কাটলো । ছেলে তো চোখ খোলেই না ! - ডাক্তাররাও কোনো আসার কথা শোনায় না। শুধু বলে ও নিজে থেকে যেদিন স্বাভাবিক নিঃশাস নেবে - সেদিনই বলতে পারবে ! - বোঝো কান্ড - ভালো হয়ে গেলে - ঠিক হয়ে যাবে - ধরনের কথা ! আজ এ কথা লিখছি ; কিন্তু সেই সময়ে চিন্তা ভাবনাও যেন থেমে গেছিল ! - অবশেষে সোমবার রাতে ছেলে চোখ খুললো। দেখল বটে - কিন্তু চিনতে পারল কিনা সন্দেহ ! জ্ঞান ফিরতেই আরম্ভ হলো অসহিষ্ণুতা ! সমানে নাকের নল সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ! নাকের ও মুখের টিউব দিয়ে লাংস দিয়ে জল বের করার জন্যে লাগানো । মানে একটু সরে গেলেই ভেতরে কিছু হয়ে যেতে পারে ! - নার্সরা হাতের সঙ্গে ভারী গ্লাভস পরিয়ে দিল। - আর হাত নাড়তে পারে না ! - মুখেও কোনো আওয়াজ বেরয় না ! - আরো দুদিন পরে সব খুলে দিয়ে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিল ! - তখন মুখ দিয়ে খাওয়ানো আরম্ভ হলো ! কারণ খাওয়ার ইচ্ছেটা চলে গেছে ! বুধবার হাঁটানোর চেষ্টা আরম্ভ হলো । - বেস্পতিবার হাঁটার টাল মাটাল কমল। - শুক্রবার সকালে খবর দিল - ওকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বিশ্রামের মধ্যে রাখতে হবে ! - তাই সই ! সন্ধে বেলায় হোটেলে আনলাম। হোটেলে একটা পুল ছিল। - রোববার দুপুরে ওকে একটু হাটাতে নিয়ে গেল - ওর স্ত্রী ! খানিক বাদেই ফোন ! কি না ও জলে নেমেছে ! আমি তো তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলাম। দেখি সে জলে নেমে - দিব্যি হাত পা ছুড়ছে। পুল বেশি বড় তো নয় ! শনিবার অন লাইনে অনেক চেষ্টা করেও দুটোর বেশি টিকিট নেই। সোজা এয়ারপোর্টে গিয়ে চেষ্টা চরিত্র করে চারটে টিকিট পাওয়া গেল সোমবারের । সোমবার আমেরিকান এয়ারলাইনের প্লেনে করে খুব সাবধানে আমরা ওয়াশিংটন ডালেস এয়ারপোর্টে পৌছলাম । প্লেন থেকে নেমে - ভেতরে আবার ট্রেন , তাতে চড়ে মাল নিতে যেতে হল। এয়ারপোর্টের নিচে যে অতবড় ট্রেন রাইড আছে - তা তো আগে জানতামই না ! - আর ঠিক ওই সময়েই ছেলে হুইল চেয়ার নিল না ! - তারপর হাটতে হাটতে কোমরে ব্যথা আরম্ভ হলো ! কি আর করা ! বসে থাকতে হলো অনেকক্ষণ ! মালপত্র নিয়ে একটা ট্যাক্সি নিলাম । - ট্যাক্সি ড্রাইভার - কে হতে পারে - অনুমান ! - বাংলাদেশী ! থাকে নাকি হেরন্ডন বলে নর্থ ভার্জিনিয়ার এক অঞ্চলে ! তার সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌছে গেলাম - ভিয়েনা ! এখানেই আমাদের আস্তানা ! ততটা ব্যক্তিগত নয় ! আগে তো এদেশেই থাকতাম ! তখন কিন্তু আমাদের চোখে ভালো-মন্দ মিশিয়ে - প্রতিদিনকার অভ্যেস থেকে ভালোর চেয়ে অন্য অভিজ্ঞতা বেশি। তখন তো আমি এখানকারই বাসিন্দা ! এখন অনেকদিন পরে এদেশে এসে - অনেকটা ঠিক পর্যটক নয় - কিন্তু বহিরাগত দর্শক হিসেবে - একেবারে অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে ! মায়ামীর রাস্তা ঘাট পরিস্কার - এ কথা কাউকে বলতে শুনিনি আগে ! - কিন্তু এখন দেখলাম - রাস্তা ঘাট সত্যিই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ! চিন-দেশে ঝকঝকে পরিস্কার রাস্তা দেখে এরকম লিখেছিলাম ! এখানেও দেখলাম বেশ পরিস্কার ! তবে গাছের পাতা পড়তে না পড়তেই কেউ তুলছে না ! রাস্তাগুলো সর্বত্র পাম গাছ দিয়ে ঘেরা । গাছগুলো শুধু যে ছায়া সৃষ্টি করছে তাই নয় - চোখের ওপর একটা শান্তির প্রলেপের কাজ করছে ! কোনো ময়লা কাগজ বা জঞ্জাল রাস্তায় পরে নেই ! - আর আগেকার গ্র্যফিটি করা ট্রেনের চেহারাও যেন আগের চেয়ে একটু পাল্টেছে ! - আর গাছ-পালার সৌন্দর্যও যেন নতুন করে চোখে পড়ল ! - বড় বড় বাড়ীগুলো যেন একটু নিঃশ্বাস নেবার জন্যে মাথা চাড়া দিয়ে আকাশের দিকে এগিয়েই যাচ্ছে ! আমার অভ্যেস মত দুপুরে রাস্তায় বেড়িয়ে একটু ঘোরাঘুরি করি। প্রচন্ড রোদ্দুরেও দু-চারটে লোক-জন যাতায়াত করছে ! - আমাকে দেখে প্রশ্নও ছুড়ে দিচ্ছে ! - মনে হলো একটু আন্তরিকতার ছোয়াচ ! - রাস্তার মধ্যিখান জুড়ে দোতলার সমান উচুঁতে মেট্রো ট্রেন চলছে। বড় বড় বাসও চলছে ! আর চলছে এক ধরনের হেরিটেজ ট্রেন - বিনা পয়সায় - অল্প দৈর্ঘ্যের দূরত্বে ! - হাসপাতাল-পর্ব না থাকলে বেশ উপভোগ করার কথা ! আমরা পাতি কলকাতার মানুষ ! নানান দেশের হরেক উন্নতি দেখে বুকের মধ্যে একটা সুক্ষ যন্ত্রণা বোধ হয় ! খানিকটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স কাজ করে বৈকি ! উপসংহার ! আর্তি ! সবাই উত্তর দিতে পারবেন কিনা জানিনা ! - তবু একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় ! কেউ কি জানেন মানুষ ঠিক কোন সময়ে - ভাবতে পারে - যাক এখন আমার ছুটি ! আজ আর কোনো স্কুল নেই, কোনো হোম-ওয়ার্ক নেই ! আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই ! আমি এখন মুক্ত ! যেদিকে ইচ্ছে যেতে পারি ! আমি যেহেতু অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসী নই, তাই একথাও বলতে পারিনা - এবার আমারে লহ করুণা করে ! আমরা বোধয় অনেকেই এই চিন্তায় মগ্ন ! - সবাই খুঁজে চলেছি এর উত্তর ! মনোজ

1061

7

stuti..

হাসতে মানা .........।

ভুতের সাথে কিছুক্ষণ ------------------------- এমনিতে কাজকর্মের ফাঁকে বিছানাটা কিরকম আকর্ষণ করে , ফাঁকতালে একটু গা এলিয়ে দিলেই নিদ্রাদেবী কোন অচিনপুরে টেনে নিয়ে চলে যায় । কিন্তু কয়েকদিন ধরে ICU র গদিমোরা বিছানায় শুয়ে আছি তবু স্বস্তি নেই । ঘুমের দেখা নেই । মালায়েলি নার্সরা দেশোয়ালি ভাষায় নিজেদের মধ্যে কি বলে যাচ্ছে । সেগুলো মাঝে মাঝে ব্রহ্মতালুতে গিয়ে টকাস টকাস করে লাগছে । দুই একটা শব্দ আমি আমার মত মানে করে নিয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে স্বপ্ন দেখছি ।হঠাত দেখি বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে ,পেটের ব্যাথাটাও হাওয়া । তাকিয়ে দেখি সাদা জামা পড়ে কে একজন হাওয়া দিচ্ছে / - কে.........। -আমি ভুত ভাবলাম ওর সাথে গল্প করে একটু সময় কাটাই । সহজেতো আর ভুতের দেখা পাওয়া যায় না -আচ্ছা ভুত হয়ে কেমন লাগছে ? -ভীষন ভাল । বেশ হালকা হালকা ভাব ।যখন যেখানে খুশি চলে যেতে পারি হুস করে । এই দেখনা কাল বিকেলে গোয়ার বীচে হাওয়া খাচ্ছিলাম । আজ সকালে নয়ডার ওই ৪০তলা বাড়ীটার মাথায় এসে বসলাম । ওখানে বোর হচ্ছিলাম । তোমায় দেখতে পেয়ে গল্প করতে চলে এলাম । ট্রেন ,বাস ট্যাক্সি কিছুরই প্রয়োজন হয় না । কোন বাঁধা নিষেধ নেই ।একদম ফ্রী । -আচ্ছা মানুষ অবস্থায় তোমায় কে বাঁধা দিত ? - কেন ,আমার বউ । সে ছিল বাঙ্গালী । হাজারটা তার বাঁধা নিষেধ । এ মেয়ের দিকে তাকাবে না । ঐ লোকটা পাজী ওর সাথে কথা বলবে না । শুধু কি তাই ।খাবারেও তার নানা নিষেধ । এটা খেলে পেট খারাপ হবে ,ওটা খেলে মাথা ধরবে ,সেটা খেলে হার্ট দুর্বল হবে । আমি আবার পাঞ্জাবী সর্দার দুধ ,ঘি ,মাছ ,মাংস খেতে ভালবাসি । বউর পাল্লায় পড়ে দাদখানি চালের ভাত খেয়ে আমার সিড়িংগের মত চেহারা হল। সাথে জাঁকিয়ে বসল পেটের ব্যামো । শেষে বউর ওপর বিরক্ত হয়ে একদিন ভুত হয়ে গেলাম । এখন বেশ আছি ।আমার টিকিটিও ধরতে পারে না বউ । -আচ্ছা তুমি সর্দার হয়ে বাঙ্গালী বিয়ে করলে কেন ? -প্রেম প্রেম............। পাসের বাড়ীতে থাকতো । রোজ সকালে সদ্য ফোঁটা ফুলের মত কলকলিয়ে আমার বেলকণির সামনে দিয়ে কলেজ যেত । সেই থেকে তাকাতাকি । বলাবলি । একদিন হাতেহাত ঠেকাঠেকি ।জ্যোৎস্না রাতে ছাদে বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে থালার মত চাঁদ দেখতে দেখতে আমার হৃদয় ফ্র্যাকচার হয়ে গেল ।সুযোগ বুঝে বউর হৃদয় সুরুত করে ঢুকে গেল তাতে ।আমিও ফিদা হয়ে গেলাম । কিছুদিনের মধ্যে ঘোড়ায় চেপে ঢোল পিটিয়ে বঊ নিয়ে এলাম ঘরে ।তিন বছর কাটতে না কাটতেই প্রেম পাতলা হতে শুরু হল ।বিধিনিষেধের পাল্লা ভাড়ী হতে লাগল । স্বাধীনতা কমতে লাগল ।দেশের স্বাধীনতার জন্য লোকে প্রাণ দেয়, আর নিজের স্বাধীনতা হারাবার জন্য নেচে নেচে বিয়ে করে । -তালে এখন স্বাধীনভাবে বেশ খুশীতেই তোমার দিন কাটছে ? -সে যদি বল তালে একটা সত্য কথা বলি ।ধরে নাও ভুতের স্বীকারোক্তি ।হৃদয় যতদিন ধুকপুক করে মানুষ পাত্তাই দেয় না ।যা তা খায় ,দুর্ব্যবহার করে । থেমে গেলে ভুত হয়ে বুঝতে পারে জীবনের অপর নাম হৃদয় ।স্ত্রী হল সেই হৃদয়ের অধিবাসী, হৃদয়েশ্বরী ।আজকাল হৃদয়টা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে ।ভাবছি বউটাও পেত্নী হয়ে আমার কাছে এলে বেশ হয় । দুটিতে মিলে বেশ হুসহাস করে এদিক সেদিক চলে যাব । হঠাত ঝাঁকুনি ।তন্দ্রা ছুটে গেল ।তাকিয়ে দেখি নার্স দাঁড়িয়ে আছে প্রেসার মাপার যন্ত্র নিয়ে । আবার অস্বস্তি শুরু............।।

1159

23

Joy

ভোট তুমি কার??

দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর অতিক্রান্ত তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের| এবার বিধানসভা ভোট| ভোটের কয়েক দফা হয়েও গেছে| শাসক বিরোধী দলগুলি বলছে এবারের ভোটটা খুব গুরুত্বপূর্ন| কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট একটা জোট তৈরী করেছে| বিজেপি ও খুব অক্রমনাত্মক| এর উপর উপরি পাওনা শাসক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংঘাত| বেশ জমে উঠেছে ভোট উৎসব| গত বারের বিধান সভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস দলটি বেশ চনমনে ছিল| বাংলার মানুষ দৃঢ় সংকল্প করেই নিয়েছিলেন বোধহয়‚ এবার আর বামফ্রন্ট নয়| এবার আসুক নতুন সুন্দর সকাল| অন্ধকার ভেদ করে এল সকাল‚ কিন্তু সেটা এত সুন্দর হল কি? তখন ৩৪ বছরের দলতন্ত্রের ফাঁসে মানুষ মৃতপ্রায়| গাদা গাদা কলকারখানা বন্ধ হয়েছে| সাধারন মানুষ নেতা নেত্রীদের রক্ত চক্ষু দেখেছে| পুলিশ-প্রশাসনকে দলদাসে পরিনত হতে দেখেছে| কৌটো নেড়ে চাঁদা তুলে ঝাঁ চকচকে পার্টি অফিস‚ নেতাদের অট্টালিকা বানাতে দেখেছে| পাড়ায় ঝামেলা থেকে সাধারন মানুষের পারিবারিক ঝামেলায় মধ্যে নাক গলানো‚ সালিশি করা দেখেছে| শিক্ষা‚ স্বাস্থ্যকে নিয়ে খেলা করা দেখেছে| নেতাদের দীর্ঘদিন ক্ষমতা দখল করার পর মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা দেখেছে| আর দেখেছে দীর্ঘদিনের অনুন্নয়ন| দেখেছে নেতাই‚ নন্দীগ্রাম‚ বানতলা‚ কেশপুর‚ বিজনসেতু‚ মরিচঝাঁপির মত আরও অনেক নৃশংস সরকার পরিচালিত হত্যালীলা| দেখেছে গ্রামে গঞ্জে বিরোধীদের একঘরে করা‚ ধর্ষন-হত্যা‚ মাঠের পর মাঠ ধান লুঠ করা| কিন্তু আর নয়| এবার বোধহয় পাপের বোঝা পূর্ণ হয়েছে| সমাজের সর্বস্তরের মানুষ গর্জে উঠল| গরীব‚ ধনী‚ মধ্যবিত্ত‚ শিল্পী‚ শিক্ষক‚ বুদ্ধিজীবি সবাই| বাংলার মানুষের অনেক আশা নিয়ে এল নতুন সরকার| মুখ্যমন্ত্রী হলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়| বহু দিনের লড়াই আজ সফল হল| এই ভদ্রমহিলাকে ছোট থেকেই দেখেছি বিপদে-আপদে মানুষের পাশে ছুটে যেতে| তার জন্য তাকে বারবার লাঞ্ছিত‚ অপমানিত হতে হয়েছে| একসময় কংগ্রেস ছেড়ে চলে এসে নতুন দল গঠন করলেন| প্রথম নির্বাচনেই পেলেন অভূতপূর্ব সাফল্য| বাংলার মানুষ ভাবলেন অনেকদিন পর এক সৎ‚ লড়াকু নেত্রীকে পাওয়া গেল| এই নেত্রীই পারে বামফন্ট্রের দলতন্ত্র‚ ইউনিয়ন বাজি‚ ভ্রান্ত নীতির থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে| বিগত পাঁচ বছরে রাস্তাঘাট‚ আলো‚ স্কুল‚ কলেজ‚ কন্যাশ্রী‚ সাইকেল বিতরন‚ দু টাকা কিলো চাল‚ পলিটেকনিক কলেজ‚ সুষ্ঠ স্বাস্থ্য পরিসেবা‚ নগর সৌন্দর্যয়ান এবং আরও অনেক মানুষের কল্যানকর কাজ হয়েছে| কিন্তু বার বার আর্থিক দূর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেল এই সরকারের নেতাদের নাম| সারদা থেকে নারদ| সিন্ডিকেট রাজ| যা বামফ্রন্ট আমল থেকেই শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছিল‚ এবার বৃক্ষের আকার নিল| সরকারী অফিসে বামফ্রন্টের আমলে কাজ হত না| এখন কাজ হলেও এত সরকারি ছুটির জন্যে কাজকর্ম দীর্ঘায়িত হয়েছে| পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে বারবার| তখনকার আমলের দলদাস পুলিশ এখন ক্রীতদাস| প্রচুর নায়ক‚ নায়িকা রাজনীতিতে এসেছেন| সেটা ভাল লক্ষন| সমাজের সর্বস্তরের প্রতিষ্ঠিত মানুষ রাজনীতিতে এলে‚ রাজনীতি নিরপেক্ষ‚ যুক্তিবাদী‚ সাবলীল হয়| কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন সবাই কি মানুষের সেবার জন্যে এসেছেন না নিজের লাভ ও প্রতিপত্তির জন্যে? যে দলে এক দলনেত্রীর কথা ছাড়া কারও কথা বলার জো নেই‚ মুখ ফস্কে কেউ কিছু বলে ফেললে জুটবে অপমান আর দল থেকে বহিষ্কার| যে দলের নেত্রী বলেন আমি সব কাজ শেষ করে ফেলেছি‚ আর কিছু বাকি নেই| বামফ্রণ্ট ৩৪ বছর ধরে বাংলার সাজানো শিল্পগুলো নষ্ট করেছে‚ এক সময় এরাই এখানে কম্পিউটার ব্যবহারের বিরোধীতা করেছিল| দলতন্ত্র আর ইউনিয়ন বাজির ফলে কোন বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি| কিন্তু পাঁচ বছরে দিদি আপনি কি করলেন‚ কেন আপনিও কোন শিল্প আনতে পারলেন না| সেখানে প্রশ্ন আসে বাংলায় শিল্প কবে আসবে‚ বেকার ছেলে-মেয়েরা কবে কাজ পাবে? কৃষি জমি‚ গ্রামের ভোটের চিন্তা করে জমি অধিগ্রহন করা যাচ্ছে না| কিন্তু কৃষির সঙ্গে তো শিল্পও আনতে হবে‚ নাহলে পশ্চিম বাংলা তো হতশ্রী হয়ে পরবে| এখ্ন অনেক কাজ বাকি আছে‚ দয়া করে সেগুলো সম্পূর্ণ করুন| বাংলার জনগন আপনাকে দু হাত তুলে আশীর্বাদ দেবেন| বিজেপি পশ্চিম বাংলায় খুব প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি| মোদী হাওয়া এখন অনেক ফিকে হয়ে গেছে| তবে কি মানুষ প্রচুর প্রতিশ্রুতির‚ ফেরিওয়ালার স্বপ্নের হাতছানি উপেক্ষা করছে| সবই ফাঁকা আওয়াজ| কত কিছুই তো পূরণ হয়নি স্বাধীনতার এতদিন পরেও| মানুষ ও সব আর ভাবে না বোধহয়| দেশের মানুষ জানে রাজনীতির নেতারা প্রতিশ্রুতি দেন‚ কিন্তু পালন করেন না| বিধায়ক‚ সাংসদ‚ কাউন্সিলার হয়ে কোটি কোটি টাকা কামান‚ প্রচুর সরকারী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন| আবার পরের নির্বাচনে মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন| মানুষ চোখ মেলে স্বপ্ন দেখেন| দুবেলায় পেট পুরে খাবার স্বপ্ন‚ বিশুদ্ধ পানীয় জলের স্বপ্ন‚ একটা কাজের স্বপ্ন‚ ভালো করে মানুষের মত বাঁচার স্বপ্ন‚ পড়ালেখা করে বড় হবার স্বপ্ন‚ বাড়ির মা-বোনদের নিরাপত্তার স্বপ্ন‚ ধর্ম-বর্ণ মিলে একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন| মানুষে মানুষে ভেদাভেদ হীন সমৃদ্ধ দেশের প্রজা হয়ে থাকার স্বপ্ন| ছোট ছোট স্বপ্ন গুলো বোধহয় বড্ড বেশিই হয়ে যায় নেতাদের কাছে|এই স্বপ্ন গুলো আছড়ে গুঁড়িয়ে ফেলতে বেশি দেরী হয় না| আবার ভোট নামক উৎসব আসে| ভোট যে বড় বালাই| আবার নেতারা চিরশত্রুর সঙ্গে জোট নামক ঘোঁট পাকিয়ে নিজের নিজের অস্তিত্ত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন| বলেন এ জোট মানুষের| ভিন্ন নীতি‚ উভয় উভয়ের সংহারকারী দলের জোট| ক্ষমতাসীন দলের প্রতিশ্রুতি| মারামারি‚ খুনোখুনি আর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচের খতিয়ান নিয়ে ভোট আসে| চলেও যায়| আমারা আবার বিশ্বাস করি ঐ ভালো মানুষের মুখোশধারী দল আর নেতাগুলিকে| আবার মিথ্যা স্বপ্ন দেখি আমরা‚ গর্জে উঠতে পারি না আমরা| কারন ঠকাটা তো আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে|

1055

4

Mahan Human

বৃষ্টি , কবিতা আর তুই

শেষ অঙ্ক ------------ নয় নয় করে কেটে গেল ৪৫ টা বছর‚ তবু হিসেবের খাতায় অঙ্ক এখনো মিলল না -- জীবনের যত ডেবিট ক্রেডিট সম্পর্কের দুরূহ ব্যালান্স শিট সব জমা আছে খেরো খাতায়| কিছু সম্পর্ক নামহীন কিছু আবার নিজস্ব ঘ্রাণে স্বকীয় কিছু কৃষ্ঞচূড়ার মত রক্তিম কিছু আবার ধূসর মলিন হারিয়ে গেছে কি কিছু? হারাবার কথা তো নয়? সম্পর্ক কি কখনো মরে? নয় নয় করে কেটে গেল ৪৫ টা বছর‚ তবু হিসেবের খাতায় অঙ্ক এখনো মিলল না -- অথচ জানি একদিন হিসেব মিলবেই শেষ অঙ্ক সর্বদাই নাল অ্যান্ড ভয়েড! (মহামানব তোমার ব্লগেই পোস্ট করলাম‚ যেহেতু এটা কবিতার বাসস্থান‚ কিছু মনে কোরো না <img class="emojione" alt="😊" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F60A.png?v=1.2.4"/>)

1606

12

Mahan Human

অলস চিঠি

কখনো কখনো মস্তিস্ক ১০ / ১০ ঘরে অলস হয়ে বসে থাকে , বিছানার এক কোন থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না, তখন তোমার মত মানুষগুলো যারা ইট ভাটায় কাজ করছে , যাদের পিঠ ভিজে জল হয়ে গেছে ,কোমর থেকে জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে তাদের কথা ভাবি আর একটু স্বস্তি পায় । আমি তো এইরকম পরিবারের সদস্য হলে ,আমাকেও গায়ে গতরে নিংড়ে নিতো ইট ভাঁটার মালিকেরা । ৬,৭,৮ বা তার চেয়েও ছোটো ছেলেরা বিড়ি কানে গুঁজে নিয়ে ইটের পাহাড় বয়ে নিয়ে যায় ভাটি থেকে , তাদের চুলগুলো রুক্ষ সুক্ষ , চোখ মুখ গুলো যেন কাঁচা খিস্তি শুনে শুনে অভ্যস্ত , আমি প্রতিদিন আমার আসা যাওয়ার পথে দেখি ,দুর্ভাগ্য ক্রমে গত কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি ,ওদেরকে নিয়ে । যদিও স্বপ্নটা বেশ সুন্দর ছিল ,আমি নদীর ধারে বসে বসে ইট গুনতাম ,ওটাই আমার কাজ ছিল , নদীর ধারে গোটা ছয়েক শিমুল গাছ ছিল , শিমুল গাছ গুলো তে কোনো পাতা ছিল না, শিমুল গাছ গুলো যেন লাল লাল রঙে রাঙা ছিল । আমাদের চারপাশে যেসব পায়রার খোপ গুলো আছে ,বা প্রস্তুত হচ্ছে , ইটের গায়ে এইসব নাবালক ছেলে মেয়েদের ঘাম লেগে আছে , সেই কারণেই কি সুন্দর সুন্দর পায়রার খোপ গুলো দারুন দারুন রং দিয়ে রাঙানো থাকে ,যাতে আমরা দুর্গন্ধ ঘাম এর গন্ধ না পায় । কালিদাসের যেমন মতিভ্রম হয়েছিল , যে গাছের ডাল টা কাটবে সেই ডালটার উপরেই বসে ছিল, আমরাও কি সেইরকম করছি না , মুখে যতই শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে কথা বলি না কেন , আদতে ওই শিশু গুলো না থাকলে আমাদের স্বপ্নের আশিয়ানা বানানো হতো না । ভারত বর্ষে যত গুলো ইট ভাঁটা আছে তার প্রায় সব গুলোতেই নাবালক ছেলে মেয়েগুলো দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় কাজ করে , এবং যেসব নাবালিকা তারা প্রায় প্রত্যেকেই কোনো বা কোনো ভাবে শারীরিক ভাবে নির্যাতিতা , আমার স্বপ্নেও তারা এসেছিল । তাই হয়তো সকাল টা এত অলস । স্বপ্নের আর কি বা দোষ , ঘরে আয়না নেই তো , স্বপ্ন দিয়ে মাঝে মাঝে মুখ টা দেখে ফেলি ।

995

12

শিবাংশু

আপনহারা, মাতোয়ারা

" ঘালিব ছুটি শরাব পর, অব ভী কভি কভি পীতা হুঁ রোজ-এ-অব্র, ও শব-এ-মহতাব মেঁ....।।" ইথাইল অ্যালকোহল নামে একটি তরল পদার্থ মানুষের সভ্যতার ব্যারোমিটার হয়ে রোয়াব দেখিয়ে বেড়ায় আদ্যিকাল থেকে। পক্ষে-বিপক্ষে, প্রেমে-অপ্রেমে, সোহাগে-ঘেন্নায়, তার মতো অ্যাটেনশন কখনও কোনও বস্তু পায়নি। এটা নিশ্চিত। কিন্তু কেন? ------------------------ শিব্রাম একবার বলেচিলেন নেশা করতে গেলে মদের নেশা কেন কোর্বো, বিশ্রী খেতে। তার চে রাবড়িমালাইয়ের নেশা অনেক ভালো। আমিও তাঁর সঙ্গে একমত। তবে রাবড়িমালাইয়ের নেশা করি জানলে ডাক্তার থেকে চিত্রগুপ্ত সবাই জীয়ন্তে ও মরণান্তে চাবুক মারবে। বরং পূর্বপুরুষদের মতো কিঞ্চিৎ সুরাপান করে বৈদিক মন্ত্র থেকে শুরু করে 'আমি স্বেচ্ছাচারী' যদি লিখে ফেলা যায়, তবে নরকবাসের সময় গায়ে দিতে চিত্রগুপ্ত একটা নতুন কম্বল স্যাংশনও করে দিতে পারেন। প্রশ্ন হচ্চে 'নেশা' নিয়ে তো মানুষ হাজার হাজার পাতা লিখে আসচে গত চার হাজার ধরে। চিরকালই অনেকে ভেবে সুখ পান, অনেক 'আধুনিক'মনস্ক মানুষও তো মদ্যপানবিরোধী হয়ে থাকেন। তবে কি 'আধুনিক' হতে গেলে মদ্যপান করতে হয় ? মডেলটা কী? ইয়ং বেঙ্গল না কলকাতার বাবু? কোহল রসায়ন দিয়ে মানুষের 'আধুনিকত্ব' কি যাচিয়ে নেওয়া যায়? প্রাগবৈদিক যুগ থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত যতো 'আধুনিক' মনস্ক মানুষ, অর্থাৎ যাজ্ঞবল্ক্য মুনি থেকে রামমোহন রায় সব্বাই অল্পবিস্তর মদ্য পান করতেন। তার পর রামমোহনের উত্তরসূরি এবং রাণীমাতা বিক্টোরিয়ার ছানাপোনারা ব্যাপক কোলাহল করে কিছুদিন বাঙালির মদ্যপানের অভ্যেসে ছেদ ঘটিয়েছিলো। আবার সে এসেছে ফিরিয়া। গত বছর কুড়ি, যতো বাঙালি মধ্যবিত্তের বাড়ি গৃহপ্রবেশে যাই, মোটামুটি সবাই তাঁদের সেলার ও বার আগে দেখান। আর যাঁরা আগে থেকেই রসে-বশে আছেন, তাঁদের তো কথাই নাই। ব্যাপারটা শুধু সাহেবদের দেশে নয়, আমরা দেশে বসেও তা আকচার দেখি। ------------------------------ আমাদের গ্রামে তেলেঙ্গি পিয়ক্কড় বলে একটা পরিভাষা ছিলো। শহরের বিভিন্ন কারখানাগুলিতে টিপিন বয়ে নিয়ে যাওয়া অন্ধ্রপ্রদেশের অসংখ্য গ্রামীণ সন্তান সাইকেলে করে বাবুদের দুপুরের খাবার দফতর কারখানাতে পৌঁছে দিতো। সেই মানুষগুলি সন্ধে ছটার পর একেবারে মার্টার টু দি কজ। রাস্তাঘাট, নালানর্দমা, বাজারহাট যেকোনও জায়গায় তাদের পরম নিশ্চিন্তে নির্বিকল্প সমাধি নিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যেতো। আর আমি তো ট্রাইবাল এলাকার লোক। কোহলসংহিতায় ডুবে থাকা জনগণের সঙ্গে আজীবন মিলেমিশে থাকা আমাদের। চাইবাসা বা জাদুগোড়া, মুসাবনি বা মেঘাতুবুরুতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে জরুরি কাজ করতে আসার আগে আকণ্ঠ সুরাপান করে 'শক্তি' সঞ্চয় করে আসতো। এই সব জনতাকে কেউই কখনো 'আধুনিক' বলে গাল দেয়নি। ------------------------- নৈতিকতার সঙ্গে মদ্যপানকে জড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা ইংরেজ আমল থেকে আমাদের দেশে খুব প্রবল। আমাদের নৈতিকতার নানা স্ববিরোধের মধ্যে এটাও একটা উদাহরণ। প্রশ্নটি রয়েছে সংযম ও পরিমিতিবোধের মধ্যে। সারাদিন মন্দিরে ঘন্টা নেড়েও মানুষ চূড়ান্ত অনৈতিক কাজ করতে পারে। আবার একজন নিয়মিত সুরাপায়ী মানুষ মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে অনায়াসে। ------------------------- হয়তো এসব কথা বাহুল্যমাত্র। তবে যখন দেখি অনেক মানুষ তুলির এক আঁচড়ে মদিরা ও মননকে জড়িয়ে ফেলেন, তাঁদের সঙ্গেই এইসব আবোলতাবোল কতাবাত্তা। এঁদের প্রতি মহামতি ঘালিব এবং অন্যান্যরা কী বলেছেন, একটু দেখা যাক, " জাহীদ শরাব পীনে দেঁ মসজিদ মেঁ বইঠকর ইয়া উয়োহ জগহ বতা জঁহা খুদা নহি..." (ঘালিব) উত্তরে 'ইকবাল' বলেন, " মসজিদ খুদা কে ঘর হ্যাঁয়, পীনে কে জগহ নহি, কাফির কে দিল মেঁ জা, উয়াঁহা খুদা নহি..." এসব শুনে 'ফরাজে'র মনে হয়, "কাফির কে দিল সে আয়া হুঁ, উওহ দেখ কর ফরাজ খুদা মৌজুদ হ্যাঁয় ওঁহা পর, উসে পতা নহি..." শেষ পর্যন্ত 'ওয়াসি' কনক্লুড করচেন এই বলে, ".... খুদা তো মৌজুদ দুনিয়া কে হর জগহ ওয়াসি, তু জন্নত মেঁ জা, ওঁহা পীনে সে মনা নহি..." --------------------------- আমি আছি আমির খুসরু'র সঙ্গে, " প্রেমভট্টি কা মদিরা পিলাইকে, মতওয়ারি কর দিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে, ছাপ তিলক সব ছিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে....."

1111

4

Romit Bose

উড়ে এসে জুড়ে বসলাম :)

সবাইকে hi! তোমরা কেমন আছো? আমি রোমিত, কলকাতার বাসিন্দা, এবং বাংলা-আড্ডার আসরে হঠাৎ উপস্থিত এক আগন্তুক। দাদার (অরিন্দম সেনগুপ্ত -- ঝ্ড়) সাথে কথায় কথায় জানতে পারলাম এই তোমাদের আড্ডার কথা, ভাবলাম আমিও ভিড়ে যাই। :) তোমাদের সাথে আলাপের অপেক্ষায় রইলাম। :) -রোমিত

1052

2

শিবাংশু

'আমার সকাল হয় তোমার সকাল হবার অনেক আগে ...'

আমি তখন পেথম পেথম জাদুগোড়ায় গেছি। তখনও বাড়ি নিইনি। এখনকার মতো তখন জামশেদ্পুর থেকে জাদুগোড়া যাবার অতো রাস্তাঘাট ছিলোনা। সকাল ছটার স্টিল এক্ষ ধরে ঘাটশিলা, সেখান থেকে পিছু এসে রাখা মাইন্স, আবার সেখান থেকে স্থলপথে জাদুগোড়া। সে এক জাড্যাপহ ব্যাপার। জানুয়ারি মাসের জামশেদ্পুরে ভোর পাঁচটায় বাড়ি ছাড়া , একে গত জন্মের পাপ ছাড়া কিছু বলা যায়না। পুরো অন্ধকার, ঘন কুয়াশা, তার মধ্যে হাড় কাঁপানি পাহাড়ি হাওয়া। বাইকে করে দশ মাইল ঠেঙ্গিয়ে আসা, টিশনে এসে ট্রেন ধরা। নেহাৎ বাঙালির চাকরি। প্রাণ যায় পর নোকরি ন যায়ে। তখন দেখতাম এক ভদ্রলোক ( ভক্ত টাইপ, কপালে ভস্মের টিপ), সরকারি কর্মচারী, স্রেফ খাদির পাজামা পাঞ্জাবি পরে চাকুলিয়া যেতেন। আমরা পুরো হাতা পুলোভার, চামড়ার জ্যাকেট পরে কম্পমান। সেই রাত পাঁচটায় তাঁর স্নান ইত্যাদি সারা। মাথার চুল থেকে জল ঝরছে। একদিন ভুল করে জিগ্যেস করে ফেলেছিলুম এতো রাতে স্নান করলে কেমন ঠান্ডা লাগে? তাতে তিনি ঘাটশিলা পর্যন্ত যে গপ্পো করলেন তাতে আক্ষরিক অর্থে হাড় হিম হয়ে যায়। তিনি দাবি করলেন মধ্যরাত্রি সাড়ে তিনটেতে কল খুলে তার নিচে তিনি বসে থাকেন। ছাতের ট্যাংকির জল, সারা রাত ধরে হিমায়িত হয়েছে, তার নিচে আধঘন্টা তিনি বসে স্নান করেন। তার পর আধ ঘন্টা পুজো করেন এবং তিন কিমি হেঁটে এসে ট্রেন ধরেন। উনকা কামিয়াবি কা রাজ হ্যাঁয়, 'আমার সকাল অনেক আগে' !!! এর পরের 'গপ্পো হলেও সত্যি' আমার এক প্রতিবেশীর। তিনি ভোরবেলায় ওঠাকে জীবনের পুণ্যতম কাজ বলে মনে করতেন। শীতগ্রীষ্ম বারোমাস যখন তাঁর মনে হতো ভোর হয়েছে ( ঘড়ি দেখার দরকার নেই) , তিনি শয্যা ত্যাগ করত প্রচুর হাঁকডাক করে, বাড়ির সব দরজা জানালা সশব্দে খুলে, যারা তখনও ঘুমোনোর চেষ্টায় আছে, তাদের শাপশাপান্ত করে জুবিলি পার্কের দিকে যাত্রা করতেন। একদিন জানা গেলো তিনি প্রায় ঘন্টা দেড়েক "প্রাতঃ' ভ্রমণ সেরে এসে যখন বৈঠকখানায় আলো জ্বেলে স্ত্রীর কাছে চা চাইতে যাচ্ছিলেন তখন হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর পড়ায় দেখা যায় তখন রাত তিনটে বাজে। যথারীতি সেই ঘড়িটিকে শাপশাপান্ত করে বাড়ির সব ঘড়ি গুলি পরীক্ষা করে দেখেন সবগুলিতেই তিনটে বাজে। তার মানে 'ভোর' একটা দেড়টাতেই তাঁর 'সকাল' শুরু হয়ে গেছে। গপ্পোটা এখানে শেষ হতে পারতো, কিন্তু শেষটা একটু ট্র্যাজিক। অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির লোক যখন ভদ্রলোককে এই 'আমার সকাল ....' ব্যাধি সারাতে পারলো না তখন নিস্তার এলো অন্যভাবে। একদিন এরকমই এক 'ভোর' বেলা জুবিলি পার্কে দলমা থেকে একটি দলছুট হাতি এসে অন্ধকারে এই ভদ্রলোকের এক প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গীকে তাঁর সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছে দিলো। তিনি দেখতেই পাননি সেই বিপুল প্যাকিডার্মটিও অন্ধকারে বাঘাকুদা লেকের চারদিকে প্রাতঃভ্রমণ করছিলো। এভাবেই 'আমার সকাল....' তাঁর 'বরবাদি কা রাজ' হয়ে এলো। তার পর থেকে তিনি মাঝরাতে উঠে পড়েন ঠিকই, কিন্তু আলো না ফোটা পর্যন্ত প্রাতঃভ্রমণে যাননা। তার বদলে ঘরে বসে রামদেবি ইশ্টাইলে ফোঁস ফোঁস করে আয়ু বাড়ান। আমার মতো পাপাত্মা লোকজন, যারা রাত দেড়টা-দুটোর আগে কোনদিন শয্যা গ্রহণ করেনি, তারা কোথা থেকে জানবে সূর্যোদয়ের আগে কখন ভৈরব বাজে, কখন ললিত। বৈকুণ্ঠলোকে ব্রাহ্ম মূহুর্তে মেনকা ঘৃতাচীদের পাণিপীড়ন করতে করতে ঈশ্বরের বাগানে ছোটাছুটি করার কোনও অভীপ্সা নেই। আর যেরকম শোনা যাচ্ছে পাশের বাগানেই হুরীপরিদের সঙ্গে সব সুইসাইড বম্বাররাও নাকি ঘুরে বেড়ায় এখন। আমাদের তো অনন্ত নরক এক্সপ্রেসে পার্মানেন্ট বুকিং। এখনও প্রচুর জায়গা খালি আছে। স্বাগত.... 'ধর্মতলা কর্মখালি'।

1085

6

Somen dey

একটি সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ

একটি সম্পর্কের ব্যাবচ্ছেদ *************** একটি সম্পর্ক যা রক্তের সম্পর্ক নয় তবু যার অবস্থান সেই মধ্যযুগ থেকে ভারতীয় পরিবারতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে &nbsp;।যে সম্পর্ক প্রকৃত অর্থে বহুমাত্রিক , কিন্তু সেটাকে হয় কালো নয় সাদা রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দিতে পারলেই এখনকার সিরিয়াল , সিনেমায় ,নাটকে , যাত্রায় ফ্যামিলি ড্রামা জমে ক্ষীর হয়ে যায় ।এ হল শাশুড়ি আর বৌমার সম্পর্ক । আমাদের ভারতীয় সমাজের বূনোটটি পুরোপুরি বুঝতে হলে আমাদের ঢুকে পড়তে হবে একেবারে ভারতীয় গৃহস্থালীর অন্দর মহলে ,যেখানে আবহসঙ্গীতে বেজে চলেছে শিল নোড়ার ঘষাঘষি বা খুন্তি কড়াইয়ের ঠোলাঠুকির শব্দ ধ্রুবপদের মত । সেটাই আসল ভারতীয় সমাজের স্থিরবিন্দু । আমাদের সমাজের এই বুনোটটি এতটাই বহুস্তরে নির্মিত যে দু একটা খণ্ডিত চিত্র দেখে, কিছু সমীক্ষার করে, কিছু সংখ্যাতত্বের নাড়াচাড়া করে ,কিছু সমাজবিজ্ঞানের থিওরি দিয়ে সেটা কে বুঝতে গেলে সে বোঝায় বিস্তর ফাঁক থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ।কারণ ডি এল রায়ের নাটকে আলেকজেন্ডার সিন্ধু নদের ধারে দাঁড়িয়ে যিশুর জন্মেরও শ তিনেক বছর আগে সেলুকাসের কাছে যে বিস্ময় প্রকাশ করে এই দেশ কে যে ‘বিচিত্র’ বলেছিলেন সে দেশ আজও বিচিত্রই আছে , হয়ত বা বিচিত্রতর হয়েছে &nbsp;। এ দেশে এখনো আমাদের জীবন যাপন অনেকটাই সম্পর্ক-নির্ভর ।বহু রকমের সম্পর্ক ।আত্নীয় অনাত্নীয় পাড়াতুতো , গ্রামতুতো , ফ্ল্যাট-তুতো , অফিসতুতো ইত্যাদি নানারকমের সম্পর্ক । কিছু সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া , কিছু পাতিয়ে তোলা , কিছু সম্পর্ক প্রথমে চাপিয়ে দেওয়া কিন্তু পরে নতুন ভাবে গড়ে ওঠা – এই সব নানা ধরনের সম্পর্ক নিয়ে আমরা প্রত্যেকে এখনো পরিবার নামক একটি কাঠামোর অংশ বিশেষ হয়ে এ দেশে বসবাস করি ।আমরা এখনো ঠিক শুধু একজন স্বাধীন একক ব্যাক্তিবিশেষ নই, আত্নীয়তা ও নানান সম্পর্কের জালে বাঁধা একজন ব্যাক্তি, যাকে সমাজ, আত্নীয় , বন্ধু , প্রতিবেশী এবং পরিবারের অস্তিত্ব কে ইচ্ছেই হোক আর অনিচ্ছেতেই হোক , বহন করে নিয়েই বেড়ে উঠতে হয় ।সময়ের সঙ্গে সমাজ এবং পরিবারের কাঠামোটা আগের তূলনায় নড়বড়ে হয়েছে , পরিবার মাপে খাটো হতে হতে অনু-পরিবার হয়েছে , তবু সম্পর্কের বন্ধন একেবারে উবে যায়নি &nbsp;। বৃহত্তর ভারতীয় সমাজ এখনো ভার্চুয়াল নয় সেই রিয়াল সম্পর্কের আন্তর্জালেই আবদ্ধ হয়ে আছে &nbsp;। এক ছাতের নিচে বসবাস করা হোক না হোক তবুও পরিবারের অস্তিত্ব এখনো প্রবল ভাবে উপস্থিত । এই পরিবার নামক রিয়াল সম্পর্কের জালে যে কটি সম্পর্ক নিয়ন্ত্রকের ভুমিকায় বিরাজ করে তার মধ্যে অবশ্যই অন্যতম একটি হল শাস-বহুর , মানে শাশুড়ি বউমার সম্পর্ক । এ এক এমন সম্পর্ক যাকে ঠিক খারাপ বা ভালোর কোনো একটি খাপে ঢুকিয়ে ফেলা যায় না ।হাসিকান্না-হীরাপান্না দিয়ে গাঁথা এই সম্পর্কের বর্ণময়তা। উপর থেকে একরকম , ভিতর থেকে আর এক রকম । এ সম্পর্কের জটিলতার জট একদিকে খোলে তো একদিকে পাকিয়ে যায় &nbsp;।তবু টিকে থাকে ।তবু বেঁধে বেঁধে থাকে । কিছুদিন আগে পর্যন্ত অনেক বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে কাপড়ের উপর নানা রকমের ছুঁচের কাজকরা করা ছবি বা লেখা , কাঠের ফ্রেমে বাঁধিয়ে বাড়ির বসবার ঘরের দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখার চল ছিল। এমন সুচিকর্মে একটি আপ্তবাক্য খুব দেখা যেত – ফুল লতা পাতার মাঝে লেখা ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে’ । নারীবাদীরা বলেন এ রকম আপ্তবাক্যের পিছনে ছিল রমনীদের ঘাড়ে সংসার সুখে রাখার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের ঝাড়া হাত পা থাকার পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র । হবে হয়ত । তবে সংসারকে সুখী করার পিছনে যে রমনীর ভুমিকাই বেশি সে কথাটা সর্বৈব মিথ্যা নয় । আর যে রমনীদের গুনে সংসার সুখের হওয়া না হওয়া নির্ভর করে তাঁরা হলেন বাড়ির দুই নারী ,শাশুড়ি এবং বৌমা ।কাল যিনি বৌমা ছিলে আজ তিনি শাশুড়ি , আজ যিনি বৌমা কাল তিনি শাশুড়ি হবেন । চক্রবৎ পরিবর্তন্তে এই বিবর্তন চলছে চলবে । ফার্স্ট ইয়ারে যারা কলেজে ঢুকে সিনিয়ার ছাত্রদের হাতে ragging এর শিকার হয় , তারাই যখন সিনিয়ার হয় , তারা নতুন দের ragging করে । এটা মনুষ্য মনস্তত্বের একটি দুর্বল দিক । শাশুড়ি বৌমার সম্পর্কের মধ্যে এই মনস্তত্বের দিকটি হয়ত কোথাও কাজ করে । তবে অনেক ক্ষেত্রেই উলটো রকমটাও হয় । একটি অল্প বয়সী মেয়ে যখন একটি সম্পুর্ন অজানা একটি সংসারে প্রবেশ করে এবং তাকে এই নুতন সংসারে নুনের পুতুল সাগরে মিশে যাবার দায়বদ্ধতা নিয়ে , তার দরকার নতুন বাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে কিছুটা নমনীয়তা, সহানুভুতি ও সহমর্মিতা । উল্টোদিকে সেই মেয়েটিরও নুতন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেবার মত সহিষ্ণুতা থাকা দরকার । এমনটাই এতদিন হয়ে এসেছে । নুতন শতাব্দীর আগমনের পর শ্রীমতী একতা কাপুর ‘কিঁউকি শাস ভী কভি বহু থী’ নামক সিরিয়ালের মধ্যে দিয়ে প্রায় একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন । যেন সব্বাই ঘুম ভেঙ্গে উঠে আবিস্কার করে ফেলেছে এই সম্পর্কের মধ্যেই আছে অতি উচ্চ ‘টি আর পি’ পাওয়ার যাবতীয় মালমশলা । তাই এখনকার বেশির ভাগ টেলিভিশান সিরিয়ালের কেন্দ্রে আছে শাস-বহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন । এই সব সিরিরালের যে কোনো একটির নাম যদি সুনীল গাঙ্গুলির লেখা থেকে ধার করে রাখা হয় ‘দুই নারী হাতে তরবারি’ তাহলে দিব্যি মানিয়ে যাবে। ভাবখানা যেন রাজায় রাজায় যুদ্ধের গল্প অনেক হোলো , এবার শাশুড়ি বউয়ের যুদ্ধের গল্প হোক । এসব গল্পে দখলদারি আছে , চক্রান্ত আছে , ষড়যন্ত্র আছে, রেষারেষি আছে , কভি শাস কভি বহুর হার জিৎ আছে আর হ্যাঁ কখনো সখনো মায়া মমতা ভালোবাসা ইত্যাদিও আছে । সাহিত্য কথাটা নাকি এসেছে সহিত থেকে মানে যা সমাজের সহিত চলে তাই সাহিত্য । টেলিভিশন সিরিয়াল সমাজের সহিত না চলুক, তার গল্পে কিছুটা সমাজের খিদে মেটানোর তাগিদ তো নিশ্চয় আছে । মানুষ সাধারণত দু ধরনের গল্পে আগ্রহ দেখায় – রুপকথার make-believe গল্প , অথবা এমন গল্প যার সঙ্গে সে নিজেকে যুক্ত করতে পারে ।এই ধারণা যদি সত্যি হয় তবে কি শাস –বহুর এই দীর্ঘ মেয়াদী লড়াইএর গল্পে দর্শকরা (যার সিংহ ভাগ মহিলারা) কি নিজেদের relate করতে পারছে ? যদি তা হয় তবে ব্যাপারটা বেশ ভয়ের &nbsp;। যে সময়টা পেরিয়ে আমরা এই সময়ে এসেছি তার মধ্যে দিয়ে ঘটে গেছে বহু রকমের ওলট পালোট ।এই সম্পর্কের বিবর্তন টা খুব গুরুত্বপুর্ন । আমাদের সাহিত্যে এই দিক তা নিয়ে বিশেষ কোনো লেখা চোখে পড়েনি । বোধহয় বিষয়টার মধ্যে এতটাই গেরস্থালীর গন্ধ মাখা যে আধুনিক লেখক লেখিকারা এটাকে এড়িয়েই চলেন । আর সেই সুযোগে সিরিয়াল স্রষ্টারা লেবু চটকিয়ে অলীক কুনাট্য রঙ্গের সিরিয়াল রচনা করে যান । এর একটা ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে কিছু সরলমতী বিবাহযোগ্যা মেয়েরা যদি এই সব সিরিয়াল দেখে ভবিষ্যত শাশুড়ি কে আগের থেকেই একজন প্রতিপক্ষ ভেবে বসে থাকে এবং নুতন সংসারে ঢোকার আগেই একটি লড়াইএর strategy ঠিক করে নেয় । আর ওদিকে বাড়িতে নুতন বৌ আসার আগে শাশুড়িও কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে , এই বুঝি বৌমা এসে আমাদের ছেলেকে একেবারে কব্জা করে নিয়ে আমাদের থেকে ‘পর’ করে নেবে ।অতয়েব সহজে ‘সুচাগ্র মেদিনী’ ছাড়া চলবে না । অতয়েব দু পক্ষই শুরু করে ‘প্রতিপক্ষ’ হয়ে । আমাদের সেনসর বোর্ড অবশ্য এ সব বিষয়ে মাথা ঘামান না । তাদের দেখার বিষয় শুধু সেক্স এবং ভয়োলেন্স । আধুনিক সাহিত্যিকরা এই সম্পর্ক বিশেষ কিছু লিখুন বা না লিখুন আমাদের প্রাচীন লোককথায় কিছু গল্প প্রচলিত আছে। তার একটি এই রকম। এক গ্রামের মেয়ে বিয়ের পর যখন স্বামীর বাড়িতে গেল, শাশুড়ির সাথে শুরু হলো তার নানা রকমের খিটিমিটি। শাশুড়ির আচার আচরণ কথাবার্তা , সব ব্যাপারে কতৃত্ব করা সে সহ্য করতে পারতো না। আর শাশুড়িও সারাক্ষণ শুধু বউয়ের সব আচরনের, সব কাজের সমালোচনা করতো। &nbsp;।এই রকম একটা তেতো সম্পর্ক থাকা সত্বেও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বৌমাকে প্রতিদিন সকালে উঠে তার শাশুড়িকে প্রণাম করতে হতো। এটা সেই মেয়েটি কিছুতেই মানতে পারছিল না । মেয়েটির স্বামী যথারীতি উভয়সঙ্কটে পড়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকত ।এতে মেয়েটির মাথা আরো গরম হয়ে যেত । শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক এমন তিক্ত পর্যায়ে পৌঁছালো যে মেয়েটি বাধ্য হয়ে তার বাবার এক বন্ধু পেশায় যিনি কবিরাজ তার কাছে গেল। সবকথা তাকে খুলে বলে তার কাছে এমন এক বিষ চাইলো যা খাইয়ে ঐ বুড়িকে সে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে পারবে। কবিরাজ মশাই কিছুক্ষন ভেবে বললেন, তোমার সমাধান আমি করে দেবো যদি তুমি আমার কথামতো চল। মেয়েটি রাজী হলো। কিছুক্ষণ পর কবিরাজ একটা পুঁটুলিতে কিছু ভেষজ লতাপাতা বেঁধে তাকে দিয়ে বললেন, এক্ষুনি কোনো বিষ দিয়ে যদি শাশুড়িকে মেরে ফেলো তাহলে মানুষ তোমাকে সন্দেহ করবে। সেজন্যে আমি এমনকিছু লতাপাতা দিয়েছি যা রোজ শাশুড়ি কে খাওয়ালে ধীরে ধীরে তার শরীরে বিষক্রিয়া ঘটবে এবং সে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে এবং মাস ছয়ে পরে দেহ রাখবে। কেও কিছু জানতে পারবে না। সপ্তাহে দু দিন করে খুব ভালো কোনো খাবার রান্না করে তার মধ্যে এই লতাপাতা মিশিয়ে তোমার শাশুড়িকে খেতে দেবে। আর লোকে যাতে তোমাকে কোনো সন্দেহ করতে না পারে সেজন্যে এসময়টায় শাশুড়ির সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করবে। কোনো ঝগড়াঝাঁটি করবে না এবং তার সবকথা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবে। পুঁটুলিটা কাপড়ের মাঝে লুকিয়ে সে বাড়ি ফিরে এলো। বহুদিন পর তার মনটা খুব হালকা হয়ে গেল। এতদিনে সে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। কবিরাজের কথামতো সে একদিন পর পর ঐ বিষমেশানো খাবার রান্না করে শাশুড়িকে খাওয়াতে লাগলো। সেইসাথে এই সময়টায় শাশুড়ির ওপর যত রাগই হোক আপ্রাণ চেষ্টায় তা দমন করে তার সব কথাকে মেনে চলতে লাগলো। শাশুড়িও বৌমার ব্যাবহারে এই পরিবর্তন লক্ষ করে মনে মনে খুব খুশি হল । এই করে করে পাঁচ মাস কেটে গেল ।ঝগড়া ঝাটি বন্ধ হয়ে গিয়ে ঘরের পরিবেশ হয়ে উঠলো অনেক শান্তিময়। ইতোমধ্যে বৌমাটি আবিষ্কার করলো তার রাগকে এখন অনেক সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আগে মুহূর্তে রেগে গিয়ে যে তুলকালাম বাধাতো এখন আর তা করে না। গত পাঁচ মাসে একবারও শাশুড়ির সাথে তার কোনো ঝগড়া হয় নি। ছোটখাটো বিষয়গুলোকে এখন খুব অনায়াসেই সে ক্ষমা করতে পারে, ছাড় দিতে পারে। ও দিকে শাশুড়ির পরিবর্তনও লক্ষণীয়। তিনি এখন বৌকে নিজের মেয়ের মতোই ভালবাসেন। আত্মীয়-পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে বলে বেড়ান, আমার বৌমার মতো ভালো মেয়ে আর হয় না। বৌ-শাশুড়ি থেকে তারা এখন মা-মেয়ের মতো মমতা-ভালবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ দুজন নারী। এমনটা কি করে ঘটলো তা না বুঝেই মেয়েটির স্বামী এটাকে রোজ সকালে উঠে যাকে ডাকে সেই পরমেশ্বরের কৃপা ভেবেই নিশিন্ত হল । ও দিকে আর একমাস পরে তার শাশুড়ি আর ইহজগতে থাকবেন না এই চিন্তায় সে আনন্দ পাওয়ার বদলে কেমন যেন বিষন্ন হয়ে যেতে লাগল । কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন সে আবার গেল সেই কবিরাজের কাছে।তার হাত ধরে বললো, দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। আমি আর আমার শাশুড়িকে মেরে ফেলতে চাই না। তিনি এখন অনেক বদলে গেছেন। মায়ের মতোই তাকে এখন ভালবাসি আমি। দয়া করে যে বিষ তার শরীরে ঢুকেছে তা বের করে আনার ব্যবস্থা করুন। কবিরাজ তখন হাসলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, চিন্তা করো না মা। তোমার শাশুড়ি মরবেন না। বিষের নামে আমি তোমাকে যে লতাপাতাগুলো দিয়েছি তা আসলে বিশেষ ধরনের এক ভেষজ ভিটামিন যা তার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে। বিষ আসলে ছিল তোমার মনে, তোমার দৃষ্টিভঙ্গিতে। কিন্তু সে বিষ এখন ভেসে গেছে তার প্রতি তোমার সব ভালবাসা আর শ্রদ্ধা দিয়ে। এই গল্প নিয়ে সিরিয়াল তৈরি করলে সে সিরিয়ালের আর টি আর পি বাড়বেনা । অতয়েব হে একতা কাপুরের উত্তরসুরী এবং সাঙ্গ পাঙ্গরা, তোমারা চুটিয়ে দেখিয়ে যাও শাস-বহুর ষড়যন্ত্রের নতুন নতুন কাহিনি। সন্ধার অবকাশে, সে কাহিনির কুনাট্য রঙ্গে , রাঢ়ে বঙ্গের সব শাশুড়িরা এবং হবু শাশুড়িরা ,সব বৌমা এবং হবু বৌমারা মজে থাক ।

1220

9

শিবাংশু

চলো চুনার

---------------------- একটা কথা বলা হয়, এই দুর্গটির প্রতিটি ইঁটে ইতিহাস গাঁথা আছে সেই আদিকাল থেকে। মানে সেই খ্রিস্টপূর্ব ছাপান্ন সাল। ------------- নদীর ধারে খাড়া পাহাড় চিরকালই রাজাদের কেল্লা বানাতে আকর্ষণ করে। গঙ্গার পারে নিচু পর্বতশ্রেণী কাইমুর থেকে চুনার, নদীস্রোতের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেছে এই প্রান্তটিতে, বারাণসীর দক্ষিণ-পশ্চিমে। পুরাণে বলে রাজা বলীকে বর দিতে দেবতা বিষ্ণু নাকি বামন অবতারের রূপে এসে এই পাহাড়টিতে পা রেখেছিলেন। সেই সূত্রে এর নাম হয় চরণাদ্রি। পরে তা চুনার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কিংবদন্তির বিখ্যাত রাজা উজ্জয়িনীর বিক্রমাদিত্যও নাকি তাঁর সংসারত্যাগী ভাই ভর্তৃহরির জন্য এই পাহাড়ের চূড়ায় একটি দেবালয়ও বানিয়ে দিয়েছিলেন। এই পাহাড়টি নাকি পৃথ্বীরাজ চৌহানের রাজত্বের শেষ সীমা ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর এটি সুবুক্তগিনের খাস তালুক হয়ে যায়। গল্পকথা যাই বলুক এই পাহাড়ে অতি প্রাচীন কাল থেকে মানুষের বসবাস রয়েছে, এটা প্রমাণিত। -------------------------- নথিবদ্ধ ইতিহাস বলে ১৫২৯ সালে জহিরুদ্দিন শাহ বাবরের সৈন্যবাহিনী এই পাহাড়টি ও তার উপরের দুর্গটি অধিকার করে ফেলে। কিন্তু ১৫৩২ সালে শের খান বা পরবর্তীকালের শেরশাহ সুরি মুঘলদের হাত থেকে এই দুর্গটি ছিনিয়ে নেন। এই পাহাড়টির নীচের দিকে সেই সময়ের কিছু মুঘল সৈন্যের সমাধিও দেখতে পাওয়া যায়। আফঘানি পঠান শের খান শুধু বিরাট যোদ্ধাই ছিলেন তাই নয়, রাজনৈতিক কৌশলেও বিশেষ দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি যুদ্ধে মৃত চুনারের কিলাদারের দুই বিধবা পত্নীকে বিবাহ করে দুর্গটি ও বিশাল নজারতের মালিকও হয়ে গেলেন। পরে হুমায়ুঁর চাপে অস্থায়ীভাবে দুর্গটি ছাড়লেও প্রথম সুযোগেই শেরশাহ এই দুর্গটি আবার অধিকার করে নে'ন এবং আমৃত্যু দখল করে রাখেন ১৫৭৫ সাল পর্যন্ত। মির্জা জলালুদ্দিন অকবর তার পরে এটির দখল নে'ন এবং আহমেদ শাহ দুর্রানির আক্রমণ পর্যন্ত চুনার দুর্গ মুঘলদেরই ছিলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেজর মুনরো ১৭৬৮ সালে চুনার দুর্গের মালিক হ'ন। কিছুদিনের জন্য বারাণসীর রাজা চেত সিংও দখল নিয়েছিলেন। তবে ১৭৯১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস স্থায়ীভাবে দুর্গটি অধিকার করেন। এখানে যুদ্ধে আহত ও অক্ষম সৈন্যদের আশ্রয় দেওয়া হতো। রাজা রণজিৎ সিংহের বিধবা রাণীকে এখানে বন্দী রাখা হয়েছিলো। সিপাহীবিদ্রোহের পর থেকে বহু যোদ্ধাদের এখানে বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছে। এমন কি আধুনিক কালেও কাইমুর অরণ্যের সন্ত্রাসবাদীরা এই দুর্গের বিশাল অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করার চেষ্টা করেছিলো। ---------------------------- এর ভৌগলিক অবস্থিতিটি এককথায় দুর্ভেদ্য। বহুদূর থেকে গঙ্গা বেয়ে আসা নৌবহরকে এখান থেকে নজর রাখা যেতো। পাহাড়ের খাড়া দিকটি থেকে দেখলে শিবাজীর সিংহগড় ও রায়গড়ের কিলা মনে পড়ে যাবে। মূলদুর্গটি উত্তরপূর্বে, যেখানে বহু কামান ও বারুদখানার অবশেষ দেখা যায়। মাঝখানে সোনওয়া মণ্ডপ একটি হিন্দু পূজাস্থল। চতুর্দশ শতকে নেপালের রাজকন্যা সোনওয়া নাকি এই মণ্ডপটির নীচে সুড়ঙ্গটি দিয়ে গঙ্গাস্নান করতে যেতেন। বৃটিশরা এখানে গভর্নরস হাউস, বেশ কিছু বাংলোবাড়ি, গারদখানা ও প্রশাসনিক দফতর তৈরি করেছিলো। --------------------------- এই দুর্গের কোনও একটা জায়গায় চুনারের রাজা নাকি বিপুল ধনরত্ন লুকিয়ে রেখেছিলেন। এখনও তাঁর পরেশান আত্মা ভূত হয়ে সেসব আগলে রাখে। আমরা পাতি লোক। অতো ধনরত্ন দিয়ে আর কী করবো? জানতে পারলে পুলিশ ধরবে। তার থেকে ভালো দুর্গের র‌্যামপার্টে বসে ডাইনে-বাঁয়ে শুধু গঙ্গাকে দেখে যাওয়া। আহা, চুনার কিলা থেকে নীচে গঙ্গার দৃশ্য অতি বড়ো বেরসিকেরও প্রাণের আরাম হয়ে উঠতে পারে।

1044

8

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের ঘাটে ঘাটে !

রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তায় ! সময়টা তখন রাজনৈতিক ভাবে খুব ভয়ংকর ছিল ! ভারতে তখন স্বৈরতন্ত্র মাথা চাড়া দিয়েছে । পশ্চিমবঙ্গে তার চরম নগ্ন রূপ প্রকাশ পাচ্ছে ! বাড়ি থেকে বের হলে ফেরার নিশ্চয়তা ছিল না ! কলকাতা থেকে অসংখ্য তরুণ এখানে ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ! ভারতের কোথাও কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়ি পেলেই সেখানে চলে যাচ্ছে । খুব সংগোপনে থাকছে কিছুদিন । সেই সময় আমার একটা অভ্যেস ছিল - মাসে অন্তত এক শনিবার-রোববার কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তাম যে কোনো জায়গায় । তখনও মাথায় ‘শ্রীকান্ত’ চলা-চল করত ! তখন অজ্ঞাত ‘খেয়াল-পোকা’ মাথার মধ্যে সাঁকো নাড়াত পায়ের তলায় শুরশুর করত ! এখন ভাবতে অবাক লাগে - কি করে এখনও ঠিক ঠাক বেঁচে রয়েছি ! সেই সব ফেলে আসা জীবনের কিছু কিছু অংশ অভিজ্ঞতা লিখে রাখছি - যদি কারুর উৎসাহ হয় ! যদি কেউ পড়তে চায় ! ভবিষ্যতের পাথেয় ভেবে ! ছিন্নমস্তার পাহাড়ে ! রাঁচি থেকে যে কি করে রাজরাপ্পা এসে পড়লাম তা আজ আর মনে পড়ছে না । কিন্তু ছিন্নমস্তা মন্দিরে গিয়ে পড়েছিলাম এই রকমই ঘুরতে ঘুরতে ! আগে জানতামই না - এখানে দুটো নদ নদীর সঙ্গমস্থল আছে ! - সকালে একটা বাস আসে আর বিকেলে ফিরে যায় - এখন ঠিক মনে করতে পারছি না কোত্থেকে ! অধুনা ঝাড়খন্ড এর রামগড় জেলায় রাজরাপ্পা বলে একটা সুন্দর জায়গা আছে - সেখানে ভৈরবী ( ভেরা ) নদী এসে দামোদর নদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে - প্রচন্ড গর্জন করে ! এখানেই মনে পরিয়ে দেয় – ‘ভয়ংকর সুন্দর’ কথাটা ! - একটা যেন কিছু ঘটবে-ঘটবে ভাব ! - নদী হেঁটে পার হওয়া যায় বড় পাথরের ওপর দিয়ে । ওপারে পাহাড়ের ওপর সুন্দর জঙ্গলে ঘেরা দুটো মন্দির আছে । একটা হলো ছিন্নমস্তা , আরেকটা কালী মন্দির । নদী পেরোলেই কতগুলো ছোটো ছোটো ঝুপড়ি গোছের পুজর ফুল ও চা-তেলেভাজার দোকান ! পিতা -দক্ষ রাজার শিব-হীন-যজ্ঞে যাবার জন্যে সতী যখন খুবই বায়নাক্কা করছিল ও শিব তাকে যেতে দিতে রাজি হচ্ছিল না । কারন শিব পৃথিবীর ধ্বংসের কথা জানত । তখন সতী শিবকে দশ মহাবিদ্যার রূপ দেখিয়ে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল ! – এই দশটি রূপের মধ্যে ষষ্ঠজন হল ছিন্নমস্তা ! - রতি-ক্রীড়ারত শিব-সতীর সৃষ্ঠি স্তব্ধ করার জন্যে কালী নিজের মুন্ড কেটে নিজেরই রক্ত পান করছে তাদেরই ওপর দন্ডায়মান হয়ে ! যারা এই মূর্তি দেখেছে - তারাই জানে - একটু ভয়াল ধরনের রূপ এই ছিন্নমস্তার ! আর যেহেতু নদ-নদীর সংগম স্থলে এই মন্দির - তাই রাজরাপ্পা খুবই প্রসিদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ ! মন্দিরের মধ্যে যে মূর্তি আছে - তা দেখে অবশ্য কিছুই বোঝা যায় না ! একটা দোকানে বসে আলাপ করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - ওপরে কোনো থাকবার জায়গা পাওয়া যাবে কিনা ! বলল - এখানে রাতে কেউ থাকে না - দিনে দিনে পুজো দিয়ে সবাই ওপারে চলে যায়। - কেন ? - না বাঘ আসে মন্দিরে ! - পুজো করতে নাকি ? - না - রক্ত খেতে। - মন্দিরে সকালে পশু বলি হয় - তার রক্ত নালী দিয়ে নদীতে পড়ে - সেই রক্তের লোভে নাকি বাঘ আসে ! তবে মানুষ মারে না ! ধার্মিক বলতে হবে ! তাহলে দোকানের লোকেরা কোথায় থাকে ? - তারা সব নদী পেরিয়ে ওপারে চলে যায় - ওপারে ওদের বাড়ি ঘর। আমার কিরকম জেদ চেপে গেল ! দেখি না কি হয় ! মুফতে যদি বাঘ দেখতেই পাওয়া যায় ! বলছে তো মানুষ পারে না ! - দোকানদারের সঙ্গে বলে কয়ে - রাতে এই খোলা ঝুপরিতেই থাকব ঠিক করলাম । ওখানেই চারপাশটা ঘোরাঘুরি করে - যা পাওয়া যায় তাই খেয়েই দিনটা কেটে গেল । দিন থাকতে থাকতে সব পুন্যার্থীরা ফিরে গেল । তারপর একে একে দোকানদাররাও সব ঝুপড়ির ঝাঁপ নামিয়ে আলো নিয়ে ওপারে চলে গেল । যাবার সময়ে আমাকে অবশ্য ওপারে চলে যাবার সৎ পরামর্শ দিয়ে গেল । আমি জেদ করে একা বসে রইলাম ওই ঝুপড়ি দোকানে । - দেখি তো - সত্যি বাঘ আসে কিনা ! এপাড়ে অন্ধকার ক্রমশ হামাগুড়ি দিয়ে আসছে ! - কিন্তু তবু গাছপালা - মানুষ দেখা যায় । ওপারের দোকানগুলোয় তখনো আলোর রেশ দেখা যাচ্ছে । একেবারে যে ভয় পাই নি - তা অস্বীকার করি কি করে ! প্রায় আধঘন্টা কেটে গেছে – নদীর পাশে বসে বসে - ঠিক করলাম না ভুল করলাম – ভাবছি আর অন্তিম পরিস্থিতিতে কি করবো চিন্তা করছি ! ঠিক সেই মুহূর্তেই দেখি - একটা টর্চের আলো এগিয়ে আসছে - আমার দিকেই । তখনই আমার গা টা ছম ছম করে উঠলো – এই রে ! আমি তো শুধু বাঘের কথাই ভেবেছি - কিন্তু মানুষের কথা তো চিন্তা করি নি ! - এ আবার কে রে ! - ডাকাত টাকাত নয় তো ! '- বাবুজি, আপনি এখনো বসে আছেন এখানে ? ওপাড়ে বাস তো ছেড়ে গেছে !' - মিশ্রিত ভাষাতে একজন কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো । '- আমি তো আজ এখানে থাকবো ! রাত্তিরেও এখানেই থাকবো ঠিক করেছি !' - সকাল থেকে ঘোরাঘুরির ফলে এখানকার লোকগুলোর সঙ্গে একটু-আধটু আলাপ মুখ-চেনা হয়ে গেছে । আর সবাই জেনে গেছে যে আমি কলকাতা থেকে এসেছি ! ' - আপনাকে বাবু ডাকতেছেন ! ' ' - কোন বাবু ?' আমি বেশ অবাক - এখানে আবার কোন বাবু আমায় ডাকবে ! ' - ওই মন্দিরে আছেন । আসেন আমার সঙ্গে - বাবু কথা বলবেন ।' - বলে পেছন ফিরে এগুতে লাগলো ! অগত্যা আমি আর কি করি - ওরই পিছু পিছু যেতে লাগলাম - রাজি না হলে যদি কিছু করে বসে ! জায়গাটা তো ওদেরই ! ' - নদীর ধারে বসে কি করছিলি রে ? নাম কি তোর্ ? কোত্থেকে এসেছিস ?' পরিস্কার বাংলায় প্রশ্ন শুনে চমকে উঠেছি - আবার তুই-তোকারি করছে ! দেখি ধুতি-পাঞ্জাবি গায়ে এক বয়স্ক ভদ্রলোক একটা চৌকিতে বসে - আরেক জন লোক তার পা টিপে দিচ্ছে। আমি নাম - ঠিকানা বলে জানালাম কেন দোকানে বসে আছি । ওনার নাম - সুকুমার বোস - উনি নাকি এই কালী মন্দির করিয়েছেন । কলকাতায় আমাদের পাড়ার কাছেই নিকাসী পাড়ায় থাকেন । আমার চিকিৎসক পিতামহর রুগী-যজমান - এদের বাড়ির সবাই । আমাদের সবার কুশল জানতে চাইলেন ! মজার খবর হলো - 'ছিন্নমস্তা' বলে একটা সিনেমা হয়েছিল - উনিই নাকি প্রযোজক ! যাইহোক, এই পরিচিতির ফলে - আমার আর বাইরে থাকা হলো না – আর এখানে ভোগ করার জন্যে এক গোবিন্দভোগ চাল আছে – ওটা নাকি ব্রাহ্মণদেরই খাওয়াতে হয় ! তা সেই চালের ঘী সহযোগে সদ্ব্যবহার আমাকেই করতে হলো - ভট্টাচার্য নামের খাতিরে ! আর আমার আধ্যাত্মিক চেতনা জাগরণের জন্যে মন্দিরে গিয়ে একাকী ধ্যান করতে হলো - যদি কোনো আত্ম-উপলব্ধি হয় ! ওনার হয়ত আমাকে ভবিষ্যতের স্বামী মনোজানন্দ বলে ধারনা হয়েছিল ! - তা হিরণ্যকশিপুর ভাগ্যে আর দিব্য লাভ হলো না ! কিন্তু রাত্রিবাস হলো মন্দিরের ভেতর স্টোর রুমে - দস্তুর মতন লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে ! পরের দিন সকালে ফিরছি যখন - তখন রামানুজ নামে ওই মন্দিরেরই একজন পুজারী কথায় কথায় জানালো - ওরা আমাকে নকশাল ভেবেছিল - তাই সুকুমার বাবু আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল ! দরকার পরলে পুলিশের হাতে তুলে দিত ! বলে কী ! যাক, সে যাত্রা খুব বেঁচেছি ! - বাঘ অথবা পুলিশের থাবা থেকে ! মনোজ

1218

38

কিকি

আনকা শব্দের ডিক্সোনারি

শব্দ কৃতজ্ঞতা- ইমদাদুল হক মিলন। পুস্তক- নূরজাহান। ১) পালান- আঙিনা ২) উকাল-বমি ৩) ছ্যাপ- থুতু ৪) য়োড়া- ঝুড়ি ৫) উদিস- টের ৬) ডাঙ্গর- ডাগর ৭) গুড়মুড়া- গোড়ালি ৮) বিনল- ফুটল ৯) মিহি- দিকে/ আমার মিহি নজর রেখ। ১০) সালুন/ সুরা- ঝোল ১১) কহি- চিচিঙ্গা ১২) জের-টিন/ মুড়ির জের। ১৩) খলিফা- দর্জি ১৪) খাদা- মাটির পাত্র, যেখানে ভাতের ফ্যান ঢালে। ১৫) আইচায়- মালা ১৬) অডু-অতটুকু ১৭) যেডু- যতটুকু ১৮) নিয়াস- দীর্ঘশ্বাস ১৯) ডোল- গোলা ২০) কুকুড়া- মুর্গি ২১) মেউন্না- মেনিমুখো ২২) রাড়ি- বিধবা ২৩) বউয়া- তেল, পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে বানানো এক ধরনের ভাত। ২৪) গাওয়ালি-ফেরি করা, ফেরিওয়ালা। ২৫) খুতি-টাকা পয়সার থলে। ২৬) হরি-শাশুড়ি ২৭) কাইজ্জাকিত্তন- ঝগড়াঝাঁটি ২৮) আমরুজ- জামরুল ২৯) জ্যাতা- জ্যান্ত ৩০) আঐলে- আড়ালে ৩১) ছনছায়- দাওয়া ৩২) কুয়ারা- ঢং ৩৩) বরকি- ছাগল ৩৪) কলুই- মটর ৩৫) পালান- বাগান ৩৬) হবিরে-তাড়াতাড়ি ৩৭) কোনাকানছি- আনাচ কানাচ ৩৮) আথাল- গোয়ালঘর ৩৯) দামড়ি- এঁড়ে বকনা ৪০) লুকা- নাড়িভুঁড়ি ৪১)ভুরা-ঢিবি ৪২)ফ্যারা- হাম (রোগ) ৪৩)শেলটাকি-শোল মাছের বাচ্চা ৪৪)আলাম- আস্ত ৪৫)পাথালি কুল-পাঁজাকোল ৪৬)বোগলে- সামনে ৪৭)হাকিহুকি-ফিসফাস ৪৮)কোনাইচ্চা- চৌকো ৪৯)ওস- শিশির ৫০)হরমাইল-পাটখড়ি ৫১)ম্যাড়া-রোগা ৫২)লউং-আঙুল ৫৩)ঢিপলা-দলা ৫৪)দইকুলি-দোয়েল পাখি ৫৫)ফাল-লাফ ৫৬)ঢোর-স্বরনালি ৫৭)মিষ্টাইয়া-মিটিমিটি ৫৮)দিগদারি-যন্ত্রণা ৫৯)কন্নি-কনুইয়ের গুঁতো ৬০)আসাম-আসনপিঁড়ি ৬১)ওদাইন্না-ন্যাতানো ৬২)আকাতলি-বগল ৬৩)কুইদদা-রেগে ওঠা ৬৪)হামতাম- আস্ফালন ৬৫)হামলাইয়া- লুকিয়ে ৬৬)কদু-লাউ ৬৭)উসসি-শিম ৬৮)সিং-সিঁধ

1612

11