মনোজ ভট্টাচার্য

চুল ফেলতে পশুপতিনাথ !

চুল ফেলতে পশুপতিনাথ ! আপনি নাকি নাতির মাথার চুল ফেলতে তারকেশ্বরের বদলে পশুপতিনাথ চলে গিয়েছিলেন ? আপনাকে কে বলল ? বিধুবাবুর সামনের ফোগলা মুখে হাসি দেখা দিল । আমি আর নাম বললাম না । - শুনেছি কোথাও ! – আপনার স্বভাব তো দেখছি আমারই মতো ! – এখন অবশ্য আমি আর কোথাও দুম করে যাই না ! বিধুবাবুর ছোট একটা মুদিখানার দোকান । - খুবই ছোট । দোকানে সব জিনিসই খুব কম রাখা হয় । অনেক দামি জিনিশই একটার বেশি দোকানে নেই । ভীষণ জরাজীর্ণ অবস্থা । এমন কি মোড়ের দোকানেও অনেক জিনিস থাকে । মধ্যবিত্ত পাড়ার টিপিকাল মুদিখানার দোকান যাকে বলে ! অথচ এই বিধুবাবুই হঠাৎ হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে ধাঁ হয়ে যান ! ধাঁ মানে একেবারে দেশের বাইরে পর্যন্ত ! আবার কিছুদিন পরেই ফিরেও আসেন ! তখনই জানা যায় কোথায় গেছিলেন ! ট্রেকিঙের ব্যাপারে খুব ইন্টারেস্টেড ! সব সময়ে – দোকানের সামনে কেউ না কেউ ভ্রমণের ব্যাপার নিয়ে কথা বলছেই ! অথচ এই দোকানের ওপর নির্ভর করে পুরো সংসার । স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-ছেলের বউ, একটি বিধবা মেয়ে ও নাতি ! বাড়িভাড়া দোকানভাড়া, বাড়ি থেকে যাতায়াত, সাপ্লায়ারের পাওনা ইত্যাদি ইত্যাদি । দামি জিনিশ দোকানে রাখতে সাহস পায় না । এখানে ঐ জিনিশ বিক্রি হবে কিনা । হয় অবশ্য মাঝে মধ্যে ! – কেউ হয়ত চাইল কলগেটের পেস্ট কিংবা জেনিথের শেভিংস সেট ! তাকে তো ফিরিয়ে দেওয়া যায় না ! একটা সুবিধে হল – ছেলে মন্টু এখন দোকানে বসে । ও অনেক কিছু সামলাতে পারে । কোম্পানির যোগানদারদের সঙ্গে দরাদরিও করে ! তাই কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যায় ! কদিন আগে নাতি – চিকুর মাথা ন্যাড়া হল – ষষ্ঠী পুজোর দরুন । সেই চুল রাখা আছে – পশুপতিনাথের পায়ে দিতে হবে । বিধুবাবু স্ত্রীকে বললেন – সবাই মিলে পশুপতিনাথে গিয়ে পুজো দিয়ে – ঘুরে আসি । - চুল ফেলাও হবে - সঙ্গে তোমাদের একটু বেরনো হবে । কিন্তু তার স্ত্রী এড়িয়ে গিয়ে বলল – তোমার মতো তো আমার হিল্লি-দিল্লি যাওয়ার উপায় নেই ! চিকুর মোটে ছ-মাস হল ! অতটুকু বাচ্চাকে নিয়ে ওর মা হিমশিম খাচ্ছে ! মন্টুর দোকান আছে ! কে সামলাবে সংসার ! – তোমার তো যখন তখন বেরুনর অভ্যেস । তুমি বরং তারকেশ্বরে গিয়ে চুলটা দিয়ে এসো ! – চিকু একটু বড় হয়ে গেলে তখন আমরা সবাই মিলে পশুপতিনাথে যাবো ! অগত্যা বিধুবাবুকেই তারকেশ্বরে আসতে হল । সকাল ছটায় বের হয়ে সাড়ে ছটার ট্রেন ধরে তারকেশ্বর পৌঁছতে লাগে দেড় ঘণ্টা । সকালে পুজো দিয়ে সেখানে ঘুরে-টুরে বেরিয়ে ফেরার ট্রেন ধরতে স্টেশানে এলো ! প্ল্যাটফর্মে পৌঁছোবার আগেই ডাউন হাওড়া ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গেল। কি আর করা যায় -! অবশ্য এক ঘন্টা পরেই ট্রেন আছে । বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হবে এই যা ! উল্টো দিকে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে । ওটাই কি ফেরার ট্রেন নাকি ! – বিধুবাবু একটু তাড়াতাড়ি করে ওভারব্রীজ ডিঙ্গিয়ে এসে ওই ট্রেনেই উঠে পড়ল ! বেশ ভিড় ট্রেন । খানিক পরেই ছেড়ে দিল । কিন্তু সেটা তো হাওড়ার দিকে যাচ্ছে না ! – এই রে – এটা তো উল্টো দিকে – মানে আসানসোলের দিকে ! পাশের যাত্রীকে জিগ্যেস করতে – জানা গেল – আসানসোলই বটে ! বিধুবাবুর মনে বিশেষ উৎকণ্ঠা হল না ! যেন – সোজা না গিয়ে একটু ঘুরেই বাড়ি ফেরা ! দেখা যাক না ! ওনার নাকি এরকম দুম দাম উল্টো পাল্টা ট্রেনে উঠে পড়ার অভ্যেস আছে ! দিব্যি পাশের সঙ্গীর সাথে আলাপ করতে করতে পৌঁছে গেলেন আসানসোল । ওনার মনে হল – বাবা টানছে ! তাই কোত্থেকে যে রকসৌলে যাবার ট্রেন সেখানে দাঁড়িয়ে – উনি জানতেন না । কিন্তু উনি সেই ট্রেনে চড়েছিলেন ! এবং সাড়া রাত্তির ট্রেনে ভ্রমণ করে উনি যখন রকসৌল নেমে বীরগঞ্জে এসেছিলেন । একটা খাবার দোকানে নেমে জিজ্ঞেস করতে সেই দোকানের লোকই তাকে একটা বড় জীপ গাড়িতে চড়িয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে বলে দিয়েছিলেন – একেবারে পশুপতিনাথ পৌঁছে দিতে । - ঠিক এই পর্যায়ের কথাগুলোতে কিছু গোলমাল আছে । হয় আমি বুঝতে পারিনি অথবা কিছু একটা ভুল আছে ! উনি ভাড়ার কথাগুলো এড়িয়েই গেলেন ! সে যাইহোক, বাগমতি নদীতে স্নান করে উনি মন্দিরে পুজো দিলেন । তারপর খুঁজে পেতে একটা ফোনের দোকানে গিয়ে বাড়িতে ফোন করে জানালেন – উনি তখন পশুপতিনাথে । -মন্দিরে পুজো দেওয়া হয়ে গেছে ! সেদিন ছিল ২৫শে এপ্রিল । কাছেই খাবার দোকানে ঢুকে ভাতের অর্ডার দিলেন । - ভাত মুখে তুলেছেন - ! হঠাৎ ভাতের ওপর ধুলো বালি পড়তে লাগল ! ঠিক সেই মুহূর্তে - বাইরে খুব হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল ! ভু-কম্প – ভু-কম্প ! মন্টুর বক্তব্য – বাবা তো যখন তখন হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে – কাউকে কিছু বলে না । মাকেও কিছু জানায় না ! – চার-পাঁচ দিন পর ফিরে এসে বলে দেওঘরে গেছিলাম বা গুরুদেবের আশ্রমে গেছিলাম ! সংসারে মন নেই । দোকানটা আমাকেই চালাতে হয় । সমস্ত পাওনা দেনা আমাকেই সামলাতে হয় ! এইবারে হল কি – আমার ছেলে চিকুর ষষ্ঠীর চুল ফেলার কথা ছিল তারকেশ্বরে । বাবা চলে গেল চুল ফেলতে । তারপর আর কোন খবর নেই । আমরা ভেবেছি গুরুদেবের আশ্রমে গেছে । - এদিকে চিকু ঐটুকু বাচ্চা, মা-র এত বয়েস হয়েছে । খুঁজতে যেতেও পারছি না এরই মধ্যে হঠাৎ - একদিন ফোন এলো – বাবা নেপালে – পশুপতিনাথ মন্দিরে গেছে ! - আচ্ছা বলে যাবে তো ! কি অশান্তি বলুন তো ! – তারপরই চারদিকে হৈ হৈ পরে গেল – নেপালে নাকি ভুমিকম্প হচ্ছে । টি ভিতে খবর দিচ্ছে । অথচ বাবা ওখান থেকেই ফোন করেছে ! - কি করি ! বাবার কাছে মোবাইল ফোন নেই যে আমরা ফোন করবো । আমরা ফোন করলুম – যেখান থেকে ফোন এসেছিল – সেখানে । - কেউ ফোন ধরল না ! – হয়ত কেউ বেঁচে নেই । পরের দিন একজন ফোন ধরল । ওকে হিন্দিতে বুঝিয়ে বলতে – ও বলতে পারলো । বলল – দুদিন আগে নাকি একজন বুড্ডা আদমি কলকাতায় ফোন করেছিল । কিন্তু সে কোথায় গেছে – তা বলতে পারলো না ! - সাড়ে তিন হাজার লোক মারা গেছে ! তখন ওখানে মিলিটারি নেমে গেছে । বাবার না কোন ফোন না কোন খবর ! আমরা ধরেই নিলাম – বাবা আর নেই ! এত বড় ভুমিকম্প ! মনোজ

1010

10

James

আড্ডার আড্ডাবাজরা- ২য় খন্ড

আড্ডাবাজ নং-৮ ফার্ষ্টোবয় ‚ নিউ লন্ডন-৭০০ ০৫৪ প্রতিভাসম্পন্ন কবি‚ লেখক‚ সমালোচক অ্যান্ড হোয়াট নট! একটু লাল‚ একটু নীল-সাদা তবে পিঙ্কের প্রতি (নট গেরুয়া বা saffron) অধিক আগ্রহ এবং উনারাই এনাকে তোল্লাই দিয়ে বৃক্ষের মগডালে প্রতিস্থাপন করিয়াছেন| ফলস্বরূপ তাহার মস্তক সর্বদাই উচ্চমার্গে বিচরণ করে; দীনহীন‚ অকবি‚ অলেখক‚ পাতি বন্ধুদের থোড়াই তোয়াক্কা করেন| তাহার কবিতাপ্রীতি অবিসম্বাদিত‚ নাহ তদ নাম্নী কোন কল্পনালতা নহে‚ নির্ভেজাল শব্দ গুচ্ছের বিন্যাসের কথা বলিতেছি‚ যথা ক্যালিডোস্কোপে রঙের খেলা| (ইয়াঙ্কী ভাষায় ক্যালাইডো‚ কেমন যেন ক্যালানো ক্যালানো ছবি চক্ষুর সম্মুখে ভাসে <sic>) অন্ধ তাহার গুরুভক্তি| পতিপ্রাণা‚ লালপাড়‚ গলে চাবিগুচ্ছশোভিত অঞ্চল‚ বঙ্গবালাকে (উইথ আমার্বর ইনডেক্স=৯.৯৯) হার মানায়| কবিতা‚ কবিতা‚ কবিতা‚ নেম এনি পঙক্তি‚ ঝটাকসে সঠিক উত্তর মিলিবে| কবিতা কুইজের প্রতিযোগিতা থাকিলে? আহা‚ সারি সারি‚'এই গরু' উপবিষ্ট‚ শালোয়ার‚ শাটিকা‚ লেহেঙ্গা‚ জীনস-টপে সজ্জিত| (নো মোর সজ্জিতা- উহা সেক্সিষ্ট বিভক্তি| উফ বিভক্তি কিঁউ? বাঙ্গালা ভাষার শব্দ ভান্ডার অতি দীন!)| ইনোভেশন‚ দুর্বোধ্য ড্রয়িং‚ মেশিন টুলের বেড‚ কলাম‚ স্কার্ট‚ লিপ‚ ক্লীট‚ হ্যান্ড‚ লেগ সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি নিরর্থক‚ কবিতা ইজ দ্য থিং| একমাত্র কবিতাই পারে মগডালে পৌঁছাইতে-যমুনা পুলিনের চিত্র স্মরণ কিয়া যায়| (চাহে তো রেসিডেন্ট চিত্রকার একটি আঁকিয়া দিতে পারেন‚ আড্ডাঘরের তরফে উনাকে কমিশন দেয়া হোক) তো তিনি সম্প্রতি আড্ডাঘরে নিয়মিত‚ ফার্ষ্টোবয়ের বেটন আর কেহ লইতে প্রস্তুত নহে‚ তোমার বেটন যাহারে দাও তাহারে দিবে গুপ্তমন্ত্র‚ কি করিয়া লভিতে হয় এত ভক্ত (স্ত্রীলিং)|

1155

49

Somen dey

গানের ঝর্নাতলায়

ভিন্ন অর্থে হলেও গানের ঝর্না এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে সর্বসাধারনের জন্য । যে খুশি যখন খুশি মাটির কলস নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেই পাওয়া যাবে যেমন ইচ্ছে গান । গানের এই জলের মতন সহজলভ্যতা কি নুতন প্রজন্মকে আরো একটু বেশি সঙ্গীতপ্রেমী করে তুলেছে ? রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ালে সদাসর্বদা কানে ইয়ারপ্লাগ গোঁজা তরুণতরুণীদের দেখে সে রকম মনে হতেই পারে  । আবার সেই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে সত্যি কি ওরা গান শুনছে নাকি একটা পছন্দ মত শব্দ শুনছে , সেই শব্দ, যা দিয়ে নিজের কানকে ইনসুলেট করে রাখছে আশপাশ থেকে । যাই ঘটে যাক , আমাকে আমার মত থাকতে দাও , এই চাওয়াটাই কি কাজ করছে এই গান শোনার নেপথ্যে ? বেশি সহজলভ্য হলে যে কোনো জিনিষের দাম কমে যায় । অর্থনীতির পুরোনো তত্ব । তাই সে দিক দেখলে গানের দাম হয়ত কমে যাচ্ছে । কিন্তু দাম কমে গেলেই গানের মূল্য বা value কমে যাবে এমনটা সব সময় নাও হতে পারে । এখন আমি সুবিনয় রায়ের সারা জীবনের সাধনার ধন কয়েক মিনিটের চেষ্টায় আমার গান শোনার যন্ত্রে ধরে রাখতে পারি ।প্রায় নিখরচায় । তাতে কি আমার কাছে সুবিনয় রায়ের গানের মূল্য কমে গেল ? গানের মুল্য কমছে কিনা সেটা নির্ভর করবে শ্রোতার উপর ।শ্রোতা কি ভাবে শুনবে কোন গান , তার কানের ভিতর দিয়ে কতটা মরমে প্রবেশ করবে সেই গান , কতটা সে ধারণ করতে পারবে , কতটা সে আত্নস্থ করতে পারবে !কোনো গান একজন শ্রোতার কাছে যতক্ষন এই সব কাজগুলো কোনো গান করতে পারছে ততক্ষন তার কাছে সেই গানের মুল্য কমছে না , সে গানের রেকর্ডেড ভারসন যতই সহজলভ্য হোক । নিজেকে শুধু ইনসুলেট করার জন্যে গান শুনলে অবশ্য এ সবের বালাই নেই । তখন রাশি রাশি গান সত্যিই শৈবালের দল হয়ে যায়। বন্যাধারায় পথ হারায় । **** রবীন্দ্রনাথের অনেক কথাই বুঝতে বুঝতে আমাদের বয়স বেড়ে যায় অনেকটা। যেমন এই কথাটা - ‘আমাদের নির্জন এককের গান, য়ুরোপের সজন লোকালয়ের গান। আমাদের গানে শ্রোতাকে মনুষ্যের প্রতিদিনের সুখদুঃখের সীমা থেকে বের করে নিয়ে নিখিলের মূলে যে-একটি সঙ্গীহীন বৈরাগ্যের দেশ আছে সেইখানে নিয়ে যায়, আর য়ুরোপের সংগীত মনুষ্যের সুখ-দুঃখের অনন্ত উত্থানপতনের মধ্যে বিচিত্রভাবে নৃত্য করিয়ে নিয়ে চলে।‘ আমাদের গানের সঙ্গে পাশ্চাত্য গানের এই বেসিক তফাৎটা আমরা কোনোদিন বুঝতে পারলাম না বলেই যত গন্ডগোল । আমরা ভাবি পাশ্চাত্যের গানের থেকে সব কিছু আহরন করার নামই হল আধুনিকতা । নিজেদের সম্পদের উপর আমাদের বিশ্বাস আমরা অনেক কাল আগেই হারিয়েছি । যে গানে প্রচন্ড গতি নেই সেটা ‘প্যানপ্যানানি’ গান এ রকম একটা ধারণা নুতন প্রজন্মের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে । গতি অবশ্যই প্রাণের লক্ষন ।পাশ্চাত্য গান থেকে আহরণ করা , সে রাস্তাও তো রবীন্দ্রনাথই দেখিয়েছেন । অতয়েব কোনোটাতে আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই । কিন্তু আমাদের দেশীয় গান যে আমাদের প্রকৃতি , আমাদের স্বভাব , আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই এ কথাটা কেউ বুঝতে চায়না আজকাল । এই সময়ে দাঁড়িয়ে নির্জন এককের গান বলতে কি বোঝায় সেটা ঠিকঠাক বোঝাও বোধহয় বেশ কঠিন ।সময়টা আরো বেশি করে reach out করার যুগ ।বিজ্ঞাপনের কৌশল , বৈদ্যুতীন মাধ্যমের দাপট আর আমাদের নাগালের মধ্যে আসতে থাকা নিত্য নতুন টেকনলজির আবহে আমাদের গান শোনার শৈলীটাও পালটে গেছে ।এই সময়ের একজন গায়ক বলতেই পারে আমি যে এত কষ্ট করে স্বরলিপি বুঝতে শিখলাম ,সুর ফাঁক তাল বুঝলাম , ভোরবেলা উঠে উঠে গলা সাধলাম , স্বরক্ষেপনের কায়দা শিখলাম , আমার গান কি ‘নির্জন এককের’ হয়ে থেকে যাবে ? অনেক অনেক শ্রোতার কাছে আমার গান না পৌঁছাতে না পারলে গান গেয়ে কি লাভ ? তার চাওয়া মোটেই অমূলক নয় । অনেক শ্রোতার কাছে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে । কিন্তু সেটাই গানের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে গেলে গানে প্রাণের পরশটা আর থাকে না । আসলে গানের কাজ হল শ্রোতা আর গায়কের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন করা । শ্রোতার অন্তর্লোকের দরজা খুলে সেখানে ঢুকে পড়া । এই কাজটা কিন্তু ওয়ান টু ওয়ান । সমষ্টিগতভাবে হয় না । যখন আমার হৃদয় কোনো একটা গানে সাড়া দিচ্ছে অমনি আমি কিন্তু একক হয়ে যাচ্ছি , আর গায়ক যখন একজন শ্রোতার মানসলোকে একটি গান কে প্রোথিত করার চেষ্টা করছে সেও হয়ে উঠছে একক ।আমাদের সঙ্গীতবিদ্যা এই কাজটা করতে শেখায় । স্বরলিপি তার একটি অংশমাত্র । বেশিটাই কিন্তু ভাবের জগত । যারা শুধু কিছু কম্বিনেশন অফ নোটস দিয়ে রাগ চিনতে চাইবে , তাদের শেখাটা অসম্পুর্ন থেকে যাবে যদি সে রাগের মধ্যে যে ভাবের দিক আছে সেটা না অনুভব করে । বিভিন্ন রাগের ভাবগত তফাৎ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখছেন – ‘পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্ললতা , কানাড়া যেন ঘন অন্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি , ভৈরবী যেন অসীমের চিরবিরহবেদনা ,মুলতান যেন রৌদ্র দীপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিঃশ্বাস ; পূরবী যেন শুন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধার অশ্রূমোচন ।’ আজকাল যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গানে রাগের প্রভাব নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান , যখন তখন রেফারেন্স টানেন মূল রাগের , কেও কেও গাইবার সময় মূল রাগের কোনো হিন্দুস্থানী গান গেয়ে তার পর রবীন্দ্রনাথের গান্ গেয়ে শোনান (ইদানীং অনেকেই এই কান্ডটা করছেন) , জানিনা তাঁরা এই কথাটা বোঝেন কিনা যে রবীন্দ্রনাথ রাগ থেকে শুধু ওই ভাবের অংশটা ব্যাবহার করেছেন আর তাঁর গানটিকে এক নির্জন এককের গান হয়ে উঠতে দেবার প্রয়োজনে সুর রচনা করেছেন । তাই গীতবিতানে গানের রাগ উল্লেখ করাতে তাঁর সায় ছিল না । রাগ রাগিনীর কাজ হল গানের জন্যে আবহটি তৈরি করে দেওয়া । কিন্তু আবহটাই তো সব নয় । রবীন্দ্রনাথ ওস্তাদের জন্যে গান রচনা করেন নি । বিশাল মেলার জন্যে গান রচনা করেন নি , ট্রাফিক সিগন্যাল , জনসভার জন্যে গান রচনা করেন নি ।খুব সোজাসুজি বলেছেন তাঁর গান - ‘ঘরের মধ্যে মাধুরী পাওয়ার জন্যে, বাইরের মধ্যে হাততালি পাবার জন্যে নয়।’ তাঁর সংশয় ছিল - তাঁর গান ‘তোমাদের টি-পার্টি যাকে বলে, সেখানে যারা সাহেবী মেজাজের লোক তাদের কানে কি ভালো লাগবে?’ সেই সময় তিনি যাঁদের ‘সাহেবী মেজাজের লোক’ বলে উল্লেখ করে ছিলেন তাঁরা আজও আছেন, তবে তাঁরা এই যুগে আর নির্জলা টি-পার্টি করেন না ।তবু তাঁদের অনেকেরই ভালো লাগে তাঁর গান । সিঙ্গল মল্টের গ্লাস হাতে তাঁরা মগ্ন হয়ে যান ‘সখী আঁধারে একেলা’ শুনে । সেটা সবসময় লোক দেখানো নয় । আসলে তিনি তাঁর গানের যে পরিধির মধ্যে থাকার কথা ভেবে ছিলেন সে পরিধি দিনে দিনে অনেক বেড়ে গেছে ।এক বিশাল বানিজ্যের জগত তৈরি হয়েছে তাঁর গান নিয়ে । তাঁর গান সব বাঙ্গালির প্রাত্যহিকতায় সামিল হয়ে গেছে । তবু কিন্তু তাঁর গানের মূল লক্ষটা পাল্টায় নি ।তিনি এক অংশের বাঙালি শ্রোতার কথা ভেবে গান সৃষ্টি করেছিলেন । সেই বাঙালি মানসিকতার মধ্যে যে অনুভবের গভীরতা ছিল , ভাবনায় যে সরলতা ছিল তা আজ হয়ত অনেকটাই নেই ।এখন সময় অনেক জটিল , ততধিক জটিল আমাদের জীবনের ছক । তবু আজও কেন শুনি আমরা রবীন্দ্রনাথের গান ? সুরের আবেদনের জন্যে ? বাণীর সুষমার জন্যে ? নাকি শুধুই অভ্যেস । বোধহয় কোনোটাই নয় । শঙ্খ ঘোষ মশাই বলেছেন রবীন্দ্রনাথের গানের সামনে দাঁড়ালে বস্তুর সব ভার আলগা হয়ে যায় হটাৎ ,সরে যায় আমাদের সমস্ত মিথ্যে ,সরে যায় সাজিয়ে কথা বলার সংসার । আমাদের প্রত্যেকেরই রবীন্দ্রনাথের গান শোনার এমনিই কোনো আলাদা আলাদা কারণ হয়ত আছে ।আমরা সেটা ধরতে পারিনা বা ধরতে পারলেও গুছিয়ে বলতে পারিনা । কিন্তু এটুকু বোধহয় সকলেই বুঝি যে তাঁর গান আজও আমাদের এক অনির্বচনীয় নির্জনতায় নিয়ে যায় - ‘জানবে না কেউ কোন্‌ তুফানে তরঙ্গদল নাচবে প্রাণে, চাঁদের মতো অলখ টানে জোয়ারে ঢেউ তোলাব’ এই যে সুদুর আকাশের চাঁদ কোনো এক গূঢ় প্রক্রিয়ায় অলখ টান দিয়ে আমাদের কাছের নদীর জলে জোয়ার নিয়ে আসে , রবীন্দ্রনাথের গান তেমন করেই আমাদের মত সামান্য মানুষের অন্তরমহলে জোয়ারের ঢেউ তোলাবার কাজটাই করে যায় । দুনিয়া যতই বদলে যাক ।রবীন্দ্রনাথের গান এই কাজটাই করে যাবে চিরদিন । *****

1005

5

শ্রী

যেখানে শুরুর কথা বলার আগেই শেষ

হেমকষা ফ্লার্টিং এই ব্লগে লেখাটা ঠি উপযুক্ত হবে কিনা জানি না| ব্লগ-মালকীন ই বলতে পারবেন| দুপুরে বেরিয়েছিলাম একটু হাঁটাচলা ও বাজার করতে| মানে ঠিক বাজার নয়‚ বৃহ্ষ্পতিবার এশিয়ান দোকানে exotic তরকারী আসে‚ লাউ‚ লম্বা বেগুন‚ কাঁচা পেপে‚ ঢ্যাঁড়স ইত্যাদি| আর অতি অবশ্যই কাঁচা লঙ্কা| ছোট্ট দোকান‚ যেমনটি হয় এইসব দোকান| থরে থরে জিনিষপত্র rack এ‚ নাও আর এক জায়গায় দাম মেটাও| আজকাল সিডনীতে দেখেছি‚ কিছু কিছু বাংলাদেশী দোকানে আবার ধারেও লোকে কেনে! এই সব মালিকরা কিভাবে মাইগ্রেট করেন আমার কাছে ধাঁধা‚ কেউ একবর্ণ ইংরেজী বলতে পারেন না| আমাদেরকে তো জান কয়লা করে ফর্ম ভরতে হয়েছিল‚ কোয়ালিফিকেশন অ্যাপ্রুভ করাতে হয়েছিল‚ হাজারো ফ্যাঁকড়া‚ অভিজ্ঞতা কিসে সব কিছু‚ সেই লাইনে লোক লাগবে কিনা‚ ট্যাঁকে নগদ আছে কিনা| মরুকগে| তো এই দোকানটি ইন্দোনেশীয় চাইনীজ‚ মালয়েশিয়ান‚ ইন্দোনেশীয়‚ ভিয়েতনামী‚ থাই ইত্যাদি মালপত্রই বেশী| এরা আবার লেবুর গ্রাহকও বটে| কাউন্টারের মহিলাকে চিনি‚ নামও| আজ দেখি লম্বা চুল রামধনু রঙ করেছে| বলি‚ বলি‚ বলবো কি বলবো না ইতস্তত: করছি| ক্লিক করেই দিলাম‚'বাহ‚ নিউ লুক'| আমার মন্তব্য পটাক করে ধাক্কা খেয়ে উত্তর এলো‚ ' ইয়েস‚ হোয়াই নট‚ সো লঙ দেয়ার ইজ টাইম'| আমি? ইয়েস‚ ইয়েস‚ লুকস নাইস‚ ইন ফ্যাক্ট ভেরি ভেরি নাইস! ইউ হাভ প্লেন্টি অফ ইট- লঙ হেয়ার অ্যান্ড টাইম টু! (মনে মনে বলছি‚ আমার যে আর বাকী নেই!) == বহু শীত আগে‚ মেস ম্যানেজার হয়ে ইঞ্জিনীয়ার্স হোষ্টেলের বাজার করতে সাপ্তাহিক হাটে‚ মাছ কিনে কেটে নেবার সময় বুঝিয়ে দিতে হছিল‚ কত পীস‚ কিরকম হবে| মাছওয়ালী এবং মধ্যবয়সী‚ তখন আমার বাইশ তেইশ! তিনি বলে উঠলেন‚ অত বোঝানোর কি আছে‚' মাছ কাটাতে কাটতে বুড়ী হয়ে গেলাম‚ আর তুই এসেছিস আমায় শেখাতে!' বুড়ী? তোকে কে বলবে‚ বুড়ী‚ অ্যাঁ!

2265

160

শিবাংশু

আমি শ্রাবণ আকাশে ঐ……

গিয়েছিলুম নিজের গাঁয়ে। ঘড়ির হিসেবে যখন তারিখ বদলালো তখন আমি রাতের রেলগাড়ি। পরে দেখলুম রাতজাগা পাখিদের বার্তা যথাসময়ে পৌঁছে গিয়েছিলো নিজের নিজের বাক্সে। ভোররাতে বাড়ি পৌঁছে একটু ঝিমুচ্ছিলুম; তখনই সাগরপার থেকে সেই ঘুমভাঙানিয়া ডাকটি এলো দূরভাষে। এই বন্ধুটি গত বেশ কয়েক বছর ধরে জন্মদিনে আমার ঘুম ভাঙিয়ে থাকেন । বিস্ময়কর টান ! তার পর একে একে নানা মাধ্যমে আত্মীয়-বন্ধুরা শুভেচ্ছা জানিয়ে গেছেন সারাদিন, বিকেল, সন্ধে গড়িয়ে রাত, এমন কি মাঝরাতেও। ---------------------------- বাদলাদিনের ভেজা প্রহরে জন্ম হয়েছিলো। আমার তা'তে কোনো হাত নেই । তবু আজন্ম রবিকবির ছায়ায় থেকে মনে একটা বিশ্বাস আজ দৃঢ়মূল । বর্ষণমন্দ্রিত চরাচরই মানুষের স্বপ্ন-আশ্রয় । গীতবিতানের বর্ষা-পর্যায় সম্ভবত রচনাকার হিসেবে কবির শ্রেষ্ঠ ফসল । এই পর্যায়ের বাইরে গ্রন্থিত অন্য বহু রচনাতেও বর্ষার প্রসঙ্গ এলেই কবি প্রকৃত সিকন্দর । তাই এখন মনে হয় নিজের ইচ্ছে-কলম থাকলে অলীক পরজন্মেও বর্ষাকালেই জন্মাবার জন্য নামটা লিখিয়ে রাখতুম । -------------------------- আমাদের ছোটোবেলায় জন্মদিনপালন একটু সাহেবি কেতা মনে করা হতো। তা সত্ত্বেও মা সীমাবদ্ধ সাধ্যের মধ্যে আমাদের জন্মদিন পালন করতেন। আমার জন্মদিন মানেই বৃষ্টিবাদলা । লক্ষ্য করেছি আমার বাবা-মা'ও এই ঋতুটির প্রতি নিবেদিত প্রাণ । তাঁদের বিবাহও হয়েছিলো আরেক শ্রাবণদিনে । আর বর্ষা-পর্যায়ের গান শোনার একটি শেষ কথা ছিলো আমার মা'য়ের কণ্ঠে সেই সব গান শোনা। তাঁর গাওয়া কবি'র বর্ষার গানের মধ্যে একটা অতীন্দ্রিয় ভালোবাসা ছেয়ে থাকতো । আশ্চর্য সুরবিহার। অতো নিবিড়ভাবে 'বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে' নারীকণ্ঠে আমি আর শুনিনি। অথবা 'যখন বৃষ্টি নামলো' র মায়াবী লয় আর ঝংকৃত তালের অলঙ্কার, 'তিমিরনিবিড়রাতে'। ------------------------------------ কিছু আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুজনেরা আসতেন জন্মদিনের সন্ধ্যার উদযাপনে। হাতে করে নিয়ে আসতেন লাল ঘুড়ির কাগজে বাঁধা বিশ্বভারতী বা দেব সাহিত্য কুটির । নাহ, আমাকে 'স্বপনকুমার' উপহার দেয়নি কেউ। অথচ পড়তে দেখেছে সবাই । আপ্যায়ন বলতে ময়দার লুচি, আলুর দম, ঘুগনি, মিহিদানা, রসগোল্লা । একটু গল্পগাছা, একটু গানবাজনা । বাইরে কখনও ঝিরঝির, কখনও ঝমঝম । তখন তো আমাদের গাড়িঘোড়া থাকতো না। বাঁশের হাতল, দাদুছাতা হাতেই লোকের বৃষ্টি সামলানোর খেলা। তখনও লোকে টিভি নামক 'নিষিদ্ধ ফল'টি ভক্ষণ করেনি। । তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ভালোবাসতো । যেকোনও বিষয়, যেকোনও বিষয়ান্তর, কিছুই ব্রাত্য নয় । অন্তহীন 'সিরিয়াল-কিলার'দের দাপটে পাতি মানুষদের নিজস্বতা শহীদ হয়ে যায়নি। ভাবা যায়, সে রকম একটা সময়ে আমরা বড়ো হয়েছি, এখনও বেঁচে আছি । 'তিনি' কি আমাদের জন্য 'বঙ্গভূষন্ডী' জাতীয় কোনও সম্মান ছুঁড়ে দেবেন, তাঁর ঝুলি থেকে ? --------------------------------- ক্যালেন্ডারের পাতা নিয়ম করে উল্টে যায় । না চাইলেও যায় । কিন্তু মা'য়ের জন্য এই শ্রাবণদিনটি, কালক্রমে ঘোর সংসারী পুত্রের পাতা উল্টে যাওয়া জীবনেও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। মা যখন রাঁচি'তে পড়াশোনার সূত্রে যাতায়াত করতেন, তখন সেখানকার একটি অবাঙালি মিষ্টির দোকান থেকে পটলমুরব্বা নিয়ে আসতেন আমার জন্য। তখন জামশেদপুরে ঐ মিষ্টিটি পাওয়া যেতোনা। তারপর ঐ পদার্থটি যখন আমাদের গ্রামেও সুলভ হয়ে উঠলো, আমার জন্মদিনে অবশ্যই সে'টি পৌঁছে যেতো মায়ের হাত ধরে। সেবার আমি জামশেদপুরের একেবারে পূর্বপ্রান্তে একটি ব্রাঞ্চের দায়িত্বে ছিলুম, থাকতে হতো দফতরের উপরতলায় সপরিবারে । আমাদের বাড়িটি ছিলো শহরের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে, ষোলো-সতেরো কিমি দূর । বাবা-মা-ভাই সেখানেই থাকতেন । ঐ বড়ো, অতিব্যস্ত ব্রাঞ্চ'টি সামলে প্রতি সপ্তাহেও একবার বাড়ি যেতে পারতুম না। ছুটির দিনেও ভরপুর কাজ। মা'য়ের শরীরটা কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছিলো না। ------------------------------ সে সময় জন্মদিনটি হয়ে গিয়েছিলো পঞ্জিকার একটি মামুলি দিনমাত্র, নেহাৎ তাৎপর্যহীন । সেদিন দেরিসন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছে দেখি খাবার টেবিলের উপর একবাক্সো সেই মিষ্টি রাখা আছে । গৃহিণী বলেন, মা এসেছিলেন । তোমার জন্মদিনে মিষ্টি দিয়ে গেছেন । আমি বলি, সে কী, আমাকে ডাকলে না কেন? তিনি বলেন, নাহ, মা'য়ের শরীরটা ভালো নয় একেবারে । উপরে উঠতে পারেননি। নিচে গাড়িতে বসেছিলেন। বৃষ্টিও হচ্ছিলো । ড্রাইভার উপরে এসে দিয়ে গেলো। ছুটে নিচে গিয়ে দেখি মা গাড়িতে অবসন্ন হয়ে বসে আছেন । বললেন, পরে দেখা করতে আসবেন, আজ শরীরটা ঠিক জুত লাগছে না। ঘড়িতে দেখি প্রায় ন'টা বাজে । বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। আমার তখন চারচাকা ছিলোনা। সঙ্গিনীকে বললুম, যাবে? তারও তো জন্মদিন আজকেই । সে বলে, সকাল থেকেই তো ভাবছি । তোমার এতো দেরি হলো, ক্লান্ত আছো, সমানে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। তাই ভাবছিলাম....নাহ, চলো। ওদের রেনকোট মুড়ি দিয়ে নাও । 'ওদের' মানে আমার দুই শিশু কন্যাকে। রাত ন'টা বেজে গিয়েছে । বৃষ্টির মধ্যে ষোলো কিমি রাস্তা, দুচাকায়। ------------------------------ চশমায় জল পড়লে খুব অস্বস্তি হয়। খুলে দিলে দেখতে অসুবিধে। গোটা শহর পেরিয়ে যাওয়া। সামান্য ভুল হলেই সপরিবার মুছে যাওয়ার আশংকা । কিন্তু ওসব কিছুই মনে পড়ছিলো না। শুধু কতোক্ষণে মা'য়ের কাছে পৌঁছোবো, একটাই চিন্তা । অতো অসুস্থ শরীরে এতোদূর এসে জন্মদিনের মিষ্টি দিয়ে যাওয়া । ছেলে চুলোর ছাই চাকরি নিয়ে অতি ব্যস্ত। নিজে যেতে পারবে না, তাই। যুক্তিহীনতার অপর নাম বাঙালি মা। পথে একজায়গায় হাঁটুজল। পেরোতে গিয়ে গাড়ি বন্ধ। তাদের মা'য়ের কোলে কন্যাযুগল, আমি গাড়ি ঠেলছি জলের মধ্যে। জল পেরিয়ে এসে কয়েকবার কিক করতে গাড়ি চালু হয়ে গেলো । যাক, মা'য়ের সঙ্গে আজ দেখা হবেই। বাড়ি পৌঁছোলুম রাত দশটা। দরজা খুলে আমাদের ঐ অবস্থায় দেখে বাবা-মা-ভাইয়ের চক্ষুস্থির । কিন্তু আমি রীতিমতো স্ফূর্তি বোধ করছিলুম। জন্মদিনে মা'য়ের সঙ্গে দেখা তো হয়ে গেলো। মা'য়ের শরীরটা দেখলুম খুব কাহিল । দু'তিনদিনের মধ্যে আমার বন্ধুস্থানীয় নামী কয়েকজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলুম। আমার বন্ধু রেডিওলজিস্ট ডঃ সাহু সোনোগ্রাফি করার মাঝখানে বেরিয়ে এসে বললেন, আমি প্রার্থনা করছি আমার যেন ভুল হয় । আমি বলি, কী হলো ? তিনি বলেন, আমি কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি, অ্যাট দ্য টেল অফ প্যানক্রিয়স । তার পর মা ছিলেন ঠিক দু'মাস। আমাদের পৃথিবী পাল্টে গেলো চিরদিনের জন্য । জন্মদিনের সঙ্গে সঙ্গে এই সব ছবি ভেসে আসতে থাকে ম্যাজিকলণ্ঠনের মায়াবী লেন্স থেকে। ------------------------------ এখন প্রতিটি জন্মদিনের একটা অলীক উদযাপন ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্ব ছড়িয়ে । কাছে-দূরে যতো মানুষ রয়েছেন, চেনা-অচেনা-আধচেনা, দেখা-না'দেখা, সবাই যোগ দেন শুভেচ্ছা সম্ভাষণে । ভালো লাগে নিশ্চয় । প্রতিটি শুভেচ্ছাই তো নব জন্মদিন । হয়তো কিছুটা যান্ত্রিক, কিছুটা কৃত্রিম, কিন্তু শুভেচ্ছার রং তা'তে ফিকে হয়না। এই জন্মদিনে যাঁদের শুভেচ্ছা পেয়েছি, তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। চেনা বন্ধুরা তো ধরাছোঁয়ার মধ্যেই থাকেন। কিন্তু অদেখা, প্রায় অজানা বন্ধুরা ছড়িয়ে আছেন দূর-দূরান্তরে। সকলেই কি আর যান্ত্রিকতা, লৌকিকতায় বাঁধা থাকেন ? কোথাও তো এক রত্তি ভালোবাসাও থাকে, মুখ লুকিয়ে । সদ্যোকিশোরীর অকারণ হাসির মতন। তাঁদের সবার জন্য রইলো আমাদের অপার শুভেচ্ছা, ভালোবাসা। "... যে গিয়েছে দেখার বাহিরে আছি তারি উদ্দেশে চাহিরে। স্বপ্নে উড়িছে তারি কেশরাশি পুরব-পবন-বেগে মেঘে মেঘে....

1018

8

মানব

গালভরা গল্প

১. আসন্ন অশান্তি ******************************************************************************************* “সময়টা বৈশাখ মাস। যে অদ্ভুত রকমের চাপ আমার উপর দিয়ে যাচ্ছে সেটা আমি ছাড়া আর কেউ বোধহয় আন্দাজ করতে পারবেন না। না পারছি নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে, আর না পাড়ছি সব ছেড়ে দিয়ে কেটে পড়তে। এইতো কয়েকদিন আগেও সবকিছু কেমন আনন্দে হাসিখুশীতে ভরে ছিল। আর কয়েকটা মাসের ব্যাবধানেই সব ওলট পালট হয়ে গেল। মানুষকে নিয়ে এরকম গেম খেলে ভগবান যে কি আনন্দ পান জানিনা। এক মাস ধরে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে আজ আমি ক্লান্ত, অবসন্ন। আর আজই ঘোষণা করা হল যে, আমাকে যে বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হবে সেই বাড়ির বিরুদ্ধে কঠিন ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। বাড়ির সবাইকে ছেড়ে গত একমাস ধরে আমি পালিয়ে বেড়ান আসামি ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এইরকম একটা কঠিন পরিস্থিতিতে বন্ধুর বাড়িতে কতদিন ই বা থাকা যায়। ওনারা আমাকে থাকতে দিয়ে নিজেরা বিপদের মুখে পড়বেন, এটা তো আর হতে দেওয়া যায়না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ধরা আমাকে দিতেই হবে। জানিনা জেলের ভিতরে বাবার সাথে ওরা কিরকম ব্যাবহার করছে। আমার মত ছেলে যেন কোন বাবার না হয় যে বাবাকে জেলের অন্ধকারে ফেলে নিজে পালিয়ে বেড়ায়।” ২. পুরনো কাসুন্দি ******************************************************************************************* দেবজিৎ কুন্ডু ওরফে দেবুদা ছোটবেলা থেকেই আমাদের অত্যন্ত প্রিয় একজন দাদা। পাঁচফুট আট ইঞ্চি ছিমছাম মানুষটা আমাদের থেকে বছর সাতেকের বড় হলেও স্বভাবটা ছিল একদম বেপরোয়া আর মিশুক। আমদের যেমন তিনি শাসন করতেন, তেমনি ভালবেসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াতে তার জুড়ি মেলা ভার। সেই দেবুদা আজ বিনা অপরাধে জেলের ঘানি টানছেন। এই তো মাসখানেক আগের কথা। অশোকমূলে তখন বসন্তের রাজধানী। ‘কল কোকিল অলিকুল বকুল ফুলে।’ বাড়িতে বাড়িতে শিবের গাজনের তোড়জোড়। দুপুরবেলায় খাওয়ার পরে ভাতঘুমটা না হলে কি আর চলে! তবে তার চেয়েও বেশি জরুরি কাজ বাবাকে ঘুম পারিয়ে দুপুর রোদে ঘুরে বেরানো(মা যেটাকে বলে টো টো করে ঘুরে বেরানো)। সেদিনও ওইরকম বদ ইচ্ছা নিয়ে বাবার পাশে চুপটি করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি। বাবার নাক ডাকার শব্দ শুরু হতেই জানলা দিয়ে ফিসফিস শব্দ। ভুতোর গলা শুনতে পেলাম। আজ নাকি ভীষন মজার কিছু হচ্ছে পাকুরপুকুরের জলে। গ্রামের প্রায় বাইরের দিকে পাকুরপুকুর। প্রায় শুনশান এই পুকুরের পাড়ে আসতে দিনের বেলাতেই কেমন যেন গা ছমছম করে। সবার মুখে মুখে কথিত আছে এই পুকুরে নাকি জটাধারীর বাস। অনেকে আবার সেই জটাধারীকে নিজের চোখে দেখেছে বলেও শোনা যায়। তবে সবাই আলাদা আলাদা ভাবে জটাধারীর যে বিবরণ দেয় তাদের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও এ থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পারি যে ওই প্রাণী নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী রূপ বদল করতে পারেন। বেশ কিছুদিন এই গল্প চলার পর একদিন এক সুরাপায়ী জলে ডুবে মারা যান ওই পুকুরের জলে। অনেকে বলে ওই পুকুরে স্নান করতে নামলে জটাধারী তার জটা দিয়ে পা টেনে মানুষকে ডুবিয়ে দেন। তাই একটু রিস্ক হলেও মজার জিনিস তো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমি আর ভুতো পৌঁছানোর আগেই দেখি ভনা, কালু, ভগা, টেরা সবাই আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত। আমাদের দলের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা কম হলেও আমাদের দলনেত্রী হিসাবে খেঁদি ছাড়া আর কাউকে আমরা ভাবতেই পারি না। ওর সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত আমাদের অনেকবার অনেক বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আজ খেঁদি একটু কিতকিত এর ম্যাচ এ ব্যাস্ত বলে আস্তে পারেনি। তাই সে দায়িত্ব আপাতত তার ভাই ভনা’র হাতে। আর ক্ষমতার অপব্যাবহার বলতে যা বোঝায়, ভনা আজ তাই করছে। আমি নিশ্চিত যে খেঁদি আমাদের এই মজাটাকে মেনে নিতে পারত না। কারন সে অনেক সাবধানী, আর এই মজার সাথে যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে সেইটাই এই পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত। তবে ব্যাপারটা একটু খোলসা করেই বলা যাক। দুপুরবেলায় টেরার সাথে নাকি ‘কিলবিল ক্লাব’ এর একটা ছেলের খুব মারপিট হয়েছিল। তাও আবার পাকুরপুকুর এর পাড়ে। সেই সময় হঠাৎই টেরা পা পিছলে একদম পুকুরে পড়ে যায়। সে দেখে ওই ছেলেটি দৌড়ে পালায়। টেরা নিজের বেঁচে থাকাটাকে অসম্ভব বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু ‘কপালের নাম টেরা’। টেরা সোজা গিয়ে পড়ল শুকনো কচুরিপানার স্তুপের উপর। আর সেই স্তুপ ভেসে রইল জলের উপর। সেই সময় সে আবিষ্কার করল এই মজার জিনিসটা, যার নাম কচুরীপানার ভেলা। অতএব শুকনো কচুরীপানার স্তুপের উপর আরও কচুরীপানা ডাঁই করে তৈরী হল আমাদের প্রথম ভেলা যার আবিষ্কর্তা শ্রীমান টেরা। আমাদের কোন ধারনা ছিল না কতজন যাত্রী বহনে সক্ষম ভেলাটা। ভয়ে ভয়ে যখন ভাবছি উঠব কি উঠবনা, এমন সময় দেখি গাদাগাদি করে ১০-১২ জন উঠে বসে গেল। অতএব আমিও লোভ সামলাতে না পেরে উঠেই পরলাম। ভেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দাঁড় হিসাবে একটা শক্তপোক্ত পেয়ারা পাড়ার লগা(লম্বা লাঠি) ঠিক করা হল। বাকিরা হাত দিয়ে জল কেটে কেটে এগিয়ে নিয়ে চললাম আমাদের ভেলাটিকে। ঠিক মাঝপুকুরে এসে গেছি, এমন সময় বাবার গলা শুনতে পেলাম। পুকুরের অন্য পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে বাবা, হাতে একটা বেশ চকচকে লাঠি। আরে, এই লাঠিটা তো আমিই কয়েকদিন ধরে তেল মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরী করেছি। এখন নাও ঠেলা। বাবাকে আমি ছাড়া অন্যরাও বেশ ভয় পেত। ভেলা কখন ধীরে ধীরে পাড়ে এসে পৌঁছাবে, আর বাবা আমাদের ধরে দেবে দু-চার ঘা, সেই ভয়ে সবাই সাঁতরে যে যেদিকে পারল পালাল। বাকী রইলাম শুধু আমি। সাঁতার তো জানতাম ই না, তার উপর আবার বাবার ভয়ে বুদ্ধি গেল হারিয়ে, নেমেই পরলাম পাকুরপুকুরের জলে। ইচ্ছে ছিল ছুটে পালানোর। কিন্তু জল আর ডাঙা যে এক নয় সেই জ্ঞান আমার ছিল না। যতই চেষ্টা করছি চলার, ততই নিচে থেকে কিসে যেন পা জড়িয়ে ক্রমশ আমাকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এইভাবে ক্রমশ নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছি আমি। তবে কি বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য এটাই আমার শাস্তি? গলা, থুতনি, ঠোঁট, নাক সব আস্তে আস্তে জলের নিচে চলে যাচ্ছে আমার। জল খেতে খেতে বুঝতে পারলাম আমার চোখ দুটো ডুবে যাচ্ছে জলের নিচে। এই কি আমার শেষ সূর্যাস্ত দেখা শেষ হল? ***** দেবুদা সেদিন না বাঁচালে আমি এই ঘটনার কথা হয়ত কাউকে বলে যেতে পারতাম না। বাবার কাছে শুনেছি দেবুদা ওই সময়ে প্রাইভেট টিউশান সেরে ফিরছিল পাশের গ্রাম থেকে। তখনই বাবার চিৎকার শুনে(বলা বাহুল্য, বাবাও সাঁতার জানেন না) দেবুদা আমাকে উদ্ধার করে আনে জটাধারীর কবল থেকে। যদিও আমার মনে হয়না যে জটাধারীই আমাকে ধরেছিলেন। তাহলে কি আর আমায় তিনি এইভাবে ছেড়ে দিতেন? ৩. বৃহত্তর বাস্তব ******************************************************************************************* আমরা সবাই বসে আছি পাড়ার ক্লাবে। আটজন ছেলে, আর একটাই ক্যারাম-বোর্ড। তাই চারজন খেলছিল আর বাকিরা অপেক্ষা করছিলাম কখন শেষ হবে আর আমাদের পালা আসবে, তার জন্য। দেবুদা আর প্রদীপদা বসে পিকনিকে কোথায় যাওয়া হবে তার প্ল্যান করছিল। হঠাৎ বাইরে একটা গোলমাল শোনা গেল। জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম ভনাদের খামারবাড়িতে প্রচুর মানুষের ভিড়। এমনিই অপেক্ষা করেছিলাম, তাই দৌড়ে বাইরে গোলমালের কাছে এসে দেখলাম পাড়ার নান্টুকাকাকে অনেকে মিলে মেরে চলেছে। আর উনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করছেন। কিন্তু গণধোলাই যেখানে চলে, সেখানে কেউ ওনাকে বাঁচাতে যাবে এমন ভাবনাই তো ভুল। ডুবন্ত মানুষ যেমন খরকুটোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, তেমনি উনি সাহায্য চাইছেন প্রাণপনে। এখানে নান্টুকাকার প্রসঙ্গে একটু বলে রাখা ভাল। উনি আমাদের পাড়ার ই একজন সাধারণ মানুষ। চাষবাসের পাশাপাশি একটা বীমা কোম্পানীতে চাকরী করেন। গত কয়েকদিন ধরেই ওনার বাড়ির আশেপাশে গ্রামের অনেককে ঘুরঘুর করতে দেখছিলাম। আর আমাদের বাড়ির উঠোনে বিকেলে মহিলাদের যে আলোচনা হয় তার থেকে জানতে পেরেছিলাম নান্টুকাকা সুদে টাকা নিচ্ছেন মাসিক শতকরা কুড়ি টাকা হারে। বন্দনা কাকিমার পরিবার সচ্ছল। উনি লাখখানেক টাকা রেখেছেন এবং গত দুমাসে সুদ বাবদ চল্লিশ হাজার টাকা উঠিয়ে ফেলেছেন। আর তিন মাস হলেই ওনার আসল টাকার সমান সুদ উঠে যাবে। তারপর আসল টাকাটা তো আছেই। কল্পনাদিদির স্বামী বহুদিন ঘরছাড়া। উনি জনৈক সুদের কারবারির কাছ থেকে মাসিক দশ শতাংশ হারে দশ হাজার টাকা নিয়ে নান্টুকাকার কাছে রেখেছেন এক সপ্তাহ আগে। এরকমই আরও অনেকের অনেক গল্প। গতকাল ছিল সবাইকে সুদের টাকা দেবার দিন। কিন্তু নান্টুকাকা সবার কাছে টাকা নিয়ে যে অফিসে জমা করতেন, কাল হঠাৎ গিয়ে দেখেন সেই অফিস নেই। পড়ে আছে কিছু ভগ্নাবশেষ, ভাঙচুর এর চিহ্ন। ফিরে এসে তিনি সবাইকে বলে দেন যে সুদ বা আসল কোনটাই কাউকে দেওয়া তার পক্ষে এর সম্ভব নয়। সবাই যেন তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু ক্ষমা করলেই তো আর টাকা ফেরৎ আসবে না। তাই আজ ওনারা ঠিক করলেন পিটিয়েই টাকা উশুল করে নেবেন। এদিকে চিৎকার ক্রমে আর্তনাদে রুপান্তরিত হচ্ছে। ভয়ের মুখোশধারী আমরা কেউ না গেলেও দেবুদা কিন্তু ঠিকই বাঁচাতে গেছিল মানুষটাকে। না, দেবুদা পারেনি। নান্টুকাকা মারা যায় শেষ পর্যন্ত। *********** গণধোলাই এ কেউ মারা গেলে কারও তো কোন লাভ হয় না, শুধু লোকসান হয় সেই গৃহিণীর যিনি পনেরটি বছর ধরে নিজে হাতে সংসারটিকে গড়ে তুলেছিলেন; লোকসান হয় বাচ্চা ছেলেটির, যে রোজ বিকেলে বাবার ব্যাগ থেকে মজার কি বেরোবে, সেই আশাতে সারাদিন জানলার দিকে চেয়ে থাকে, আর সেই বৃদ্ধা জননীর যিনি দিনে মাত্র একবার ছেলেকে দেখতে পেয়ে খুশী হন। কিন্তু শুধু লোকসানেই তো জীবনের অঙ্ক থেমে থাকেনা। তাই কঠিন বাস্তবের মতই কিছু মানুষকে জেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, সিদ্ধান্ত নিলেন সেই ‘মাথা’রা যারা জেলখানাকে নিজের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করেন। আর কিছুদিন আগে দেবুদার সঙ্গে ওনাদের কি এক বিরোধীতার সুবাদে দেবুদাও এই খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হল। এর পরের ঘটনা দেবুদার ডায়েরির পাতা থেকে তুলে দেওয়া হল। ৪. অবশেষে ******************************************************************************************* “...আমার বাড়ি থেকে পালানোর কোন ইচ্ছা ছিল না। জানিনা বাবা কোথা থেকে খবর পেয়েছে যে আমাকে আর বাবাকে দুজনকেই আজ রাতে ধরে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমি তো কোন দোষ করিনি। তবে কেন পালাব? বাবার হার্টের সমস্যা। বাবাকে একা ধরে নিয়ে গেলে বাবার যত্ন নেবে কে? কিন্তু বাবা-মা নিজের মাথার দিব্যি দিয়ে আমাকে পালাতে বাধ্য করলেন। ওনাদের দাবি, আমি যদি ধরা দিই, তাহলে আর কখনও সরকারী পরীক্ষায় বসতেই পারবনা। হাঃ হাঃ এমন মজার কথা আমি কখনও শুনিনি। ধরা না দিয়ে পালিয়ে আর কতদিন থাকব? আর পরে যখন ধরা দেব, তখন হয়ত শাস্তি আরও ভয়ঙ্কর কিছু হবে। যাইহোক দিব্যি দিলে তো আর না পালিয়ে উপায় নেই। তবে আজকের এই খবরটা পাওয়ার পর আমি আর কারও বাড়িতে আশ্রয় পাব না। তাছাড়া কাউকে বিপদে ঠেলে দিতেও আমি চাইনা। কাল সকালেই আমি ধরা দেব।” ***** এইখানেই গল্পটা শেষ করে দিতে হত যদি না দেবুদার লেখা একটা মেল আমার কাছে এসে পৌঁছাত। অনেক বছর কেটে গেছে, আমিও কাজের সুত্রে এখন বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। আর দেবুদার মেল দেখে পুরোটাই পড়ে ফেললাম। ই-মেলটা এইরকমঃ “ভাই, ............................ বাবার মৃত্যুটা আমার কাছে যতটা না কষ্টের তার চেয়েও বেশী কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে বাবা সারাটা জীবন একটা মিথ্যে অপমানের বোঝা বয়ে বেরালেন। আমার সাথে কয়েকজনের ঝগড়ার জন্য বাবাকে জেল খাটতে হল। তিনমাস পর আমরা ছাড়া পেতাম না যদি না আমি তখনই দলবদল করে যাদের সাথে ঝগড়া হয়েছিল, তাদেরকেই মাথায় তুলে নাচতাম। বাবা যদি জেলে না থাকতেন তাহলে আমি কখনওই ওদের সাথে হাত মেলাতাম না। তবে কোর্ট এ এখনও কেসটা চলছে, মাঝে মাঝেই যেতে হয়। যেতে হয় আক্রম, আনন্দ ওদেরকেও যারা সারাদিন শহরে মিষ্টি বিক্রী করে সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে শুনেছিল ওরা নাকি খুনের আসামি, তারপর তিনমাসের জেল, এবং অবশেষে আমারই মত বেরিয়ে আসা। তবে একটা কথা ভেবে বেশ ভাল লাগে যে মিমি আমাকে ভুল বোঝেনি। ওর বাবার অনেক আপত্তি সত্ত্বেও ও আমাকেই বিয়ে করেছিল। আজও মাঝে মাঝে ওর সাথে তোর সেই ছোট্টবেলার গল্পগুলো করতে করতে পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যাই। আপাতত শেষ করছি। ভালো থাকিস। ইতি, দেবু” ******************************************************************************************* পুনঃ- তোর মেল আই. ডি. টা ঝুম্পার কাছে পেলাম। তোর নাম করতেই ও কেমন যেন লজ্জা লজ্জা ভাব করছিল। কি ব্যাপার রে? উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।

1079

8

মনোজ ভট্টাচার্য

ক্রিপ্টোম্যানিয়া কারে কয় !

ক্রিপ্টোম্যানিয়া কারে কয় ! অভিরূপ ও স্বাতীর বিয়ের পঁচিশতম বার্ষিকী মানে সিলভার জুবিলি পালন হয়েছে দু সপ্তাহ আগে । বেশ কিছু বন্ধু বান্ধবকে বলা হয়েছিল । দুজনেরই অফিশ-স্টাফও কিছু এসেছিল । ওদের কমন বন্ধু হিরক কলকাতায় ছিল না তখন । ও থাকে পুনেতে - তাই ও আসতে পারেনি । আজ সকালেই এসেছে – উঠেছে অভিরূপের বাড়িতে । হিরকের একটা দোষ আছে । এই নিয়ে বন্ধু মহলে বেশ বদনামও আছে । হাতটান-দোষ - একে নাকি ইংরিজিতে ক্রিপ্টোম্যানিয়া বলে । সে যাই বলুক – হাতটানকে যা ই বলা হোক – সে তো চুরিই ! মানে কারুর বাড়িতে কোন একটা শৌখিন জিনিশ টেবিলে বা শো-কেসে সাজিয়ে রাখা হয়েছে – হিরকের চলে যাবার পরই সেটা উধাও হয়ে যায় ! কেউ যদিও সরাসরি কিছুই বলে নি । কিন্তু সবাই – বিশেষ করে বন্ধুর স্ত্রীরা সন্দেহ করে ! এখন তাই সবাই বেশ চোখে চোখে রাখে ! কয়েক মাস আগেই শমিকের বাড়িতে একটা শৌখিন পেপার-ওয়েট হিরক যেই হাতে নিয়ে দেখছে – অমনি ওর বৌ রীনা বলে উঠল – হিরক দা – ওটা গড়িয়াহাট থেকে কেনা। টেবিলে রেখে দিন ! – বেশ সুন্দর জিনিশটা– তাই দেখছি – বলে হীরক টেবিলে রেখে দিল ! সেই হেন হিরক এখন অভির বাড়িতে রয়েছে ! এবার ঋতা আসেনি সঙ্গে ! কাল সকালেই অবশ্য ওর শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে ! স্বাতির মনের মধ্যে একটা দ্বিধা কাজ করছে । থেকে থেকেই – মোবাইল ফোন নিয়ে রান্নাঘরের ভেতর গিয়ে কাকে যেন গজর গজর করছে ! দুপুরে খাওয়ার পর স্বাতী ও অভিরূপ গল্প করতে বসে – ওদের বিবাহ-বার্ষিকীতে কি কি পেয়েছে তাই দেখাতে লাগল হিরককে । নানান উপহারের মধ্যে - একটা কাঁচের সুন্দর আইফেল টাওয়ার – একই মাপের দুটো পেয়েছে ! স্বাতি মৃদু একটা ক্ষোভ প্রকাশ করে ! – দেখানো হয়ে গেলে - সব জিনিসগুলো আবার শো কেসে সাজিয়ে রেখে দিল । নে – একটু গড়িয়ে নে । সন্ধ্যেবেলায় একবার ঘুরে আসবো শমিকের বাড়ি থেকে ! অভিরূপের ছুটির দিনে দুপুরে একটু গড়িয়ে নেওয়ার অভ্যেস । বিকেলে চা দেবার সময়েই স্বাতির নজরে পড়ল – শো কেসে একটামাত্র আইফেল টাওয়ার আছে । ওর মাথাটা ঝন ঝন করে উঠল । - অভিরূপকে ইশারা করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বলল । - দেখলে তো, এইজন্যেই রীনা সেদিন বলেছিল । - দাঁড়াও দাঁড়াও ! এ নিয়ে এখনই কিছু বোলো না ! – আগে নিশ্চিত হই – অন্য কোথাও রেখেছি কিনা ! - অন্য কোথায় রাখবো ! তোমার সামনেই তো ওখানে রাখলাম ! স্বাতি বেশ রেগে গেল ! ঠিক আছে দেখছি ! কিন্তু দেখবে আর কোথায় ! এই তো ওদের মাত্র দুঘরের ফ্ল্যাট – একটা জিনিশ তো উড়ে যেতে পারেনা ! কি আর করে – মনের মধ্যে রাগ নিয়ে – চা খাবার দিয়ে নিজের ঘরে এসে গুম মেরে বসে রইল । সন্ধ্যেবেলায় স্বাতি ইচ্ছে করেই ওদের সঙ্গে বেরল না ! – একে ওকে তাকে ফোন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ সবিস্তারে ও বর্ধিত দাম-সহযোগে কাঁদুনি গাইতে লাগল । সত্যি তো অতো সুন্দর একটা জিনিস – হোক না আরেকটা ডুপ্লিকেট আছে – প্রায় চোখের সামনে নিজের বাড়ি থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল ! ওঘরে গিয়ে দেখল – হিরকের সুটকেশে তালা দেওয়া । রাতে খাওয়া দাওয়ার পর – হিরক গেছে বাথরুমে স্নান করে নেবার জন্যে । এই সময়ের মধ্যে অভিরূপ আর স্বাতি ওঘরে গিয়ে দেখে হিরকের সুটকেস খোলা । তাড়াতাড়ি ওর সুটকেস ঘেঁটে দেখল । এই তো ! একটা লম্বাটে ধরনের প্যাকেট ! অল্প একটু খুলতেই দেখে সুদৃশ্য একটা কাঁচের আইফেল টাওয়ার – ওদের চুরি যাওয়া আইফেল টাওয়ারের মতোই ! আর কোনও দ্বিধা না করেই অভিরূপ ও স্বাতি সেটা তুলে নিয়ে নিজেদের ঘরে চলে গেল । সেটি ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিল ! বাব্বা ! চোরের ওপর বাটপাড়ি ! ওটা যে হিরকের নয় – সে তো জানা কথাই ! তবে আর চিন্তা কিসের ! পরের দিন সকালে কাজের মাসী তখন বাসনগুলো ধুচ্ছে । এইসময় স্বাতি চা-খাবার দিয়ে বসলো এদের সঙ্গে ! সব কিছুই স্বাভাবিক ! একটু পরেই হিরক বেরিয়ে যাবে ! কাজের মাসী – যাচ্ছি গো বৌদি – বলে দরজা টেনে দিয়ে চলে গেল ! অভি, - হিরক বলল – একটা কথা বলছি – কিছু মনে করিস না ! তোদের ওই কাজের মাসীর মনে হয় একটু হাত-টান আছে ! চুরি টুরি করে ! কেন – কি হয়েছে রে ! অভিরূপ বলে উঠল । না – মানে আমার সুটকেশ থেকে একটা জিনিস হাওয়া হয়ে গেছে ! সে কী ! কি হাওয়া হল তোর সুটকেস থেকে ? অভিরূপ ছদ্ম উদ্বেগ দেখাল । আরে - ঋতু একটা আইফেল টাওয়ার গিফট কিনে দিয়েছিল তোদের দেওয়ার জন্যে ! কিন্তু দেখলুম তোদের অলরেডি দুটো একই গিফট হয়ে গেছে । তাই আমি আর বার করিনি সুটকেশ থেকে ! অন্য কিছু কিনে পাঠিয়ে দেবো ভেবেছিলাম । এখন গোছাবার সময়ে সেটা দেখতে পেলাম না ! – তাই বলছিলাম – একটু সাবধানে থাকিস ! – যাক গে ! এবার আমি আসি ! – বলে হিরক উঠে পড়ল ! অভি ও স্বাতি কেউ কোন কথা না বলে - বসেই রইল ! মনোজ উপসংহার ; একটা ছোট্ট গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না ! ল্যারি কিং নামে একজন সি এন এনের অ্যাঙ্করম্যান একবার জেরি সাইনফিল্ডকে ইন্টারভিউতে আমন্ত্রন করেছে ।- টেবিলের ওপর একটা সুন্দর দেখতে টাইমপিস ! জেরি বারবার ওটা হাতে তুলে নিচ্ছে ও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে । খানিকক্ষণ পরে ল্যারি ইন্টারভিউয়ের মধ্যেই বলে উঠল – জেরি, ওটা নেবার মতলব করো না ! ওটা আমি ডেভের বাড়ি থেকে ঝেড়ে এনেছি ! তাহলে তো এটা তোমার নয় – বলেই জেরি সেই ছোট্ট টাইমপিসটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল ! দুজনেই জুইশ ও প্রচন্ড ধনী !

1076

9

শিবাংশু

নদীর কূল পাইলাম না

শহরের মাঝখান দিয়ে নদী সারা পৃথিবীতে অনেক রয়েছে। সত্যিকথা বলতে কি সমস্ত বড়ো আর প্রধান শহরই নির্মাণ হয়েছে নদীর কোল ঘেঁষে। সভ্যতার আদি থেকে আমরা দেখতে পাই নদীর চরিত্র স্থির করে দেয় শহরের ভাঙাগড়া। তাই একটা শহরকে চিনতে আমি আগে নদীর কাছে যাই। জামশেদপুরকে চিনতে চাইলে আগে যাও সুবর্ণরেখার কাছে। অথবা গোদাবরীকে না জানলে রাজমহেন্দ্রীকে চেনা যাবেনা। দিল্লি, কলকাতা, লন্ডন, মস্কো, পারী, বুডাপেস্ট। এতো বড়ো বড়ো নামের কাছে যাচ্ছিনা। কিন্তু এই শহরটি গড়ে উঠেছে নদী নয়, দেশের একমাত্র নদের পারে। হ্যাঁ, ব্রহ্মপুত্র। আর ঘাটের নামটা? খুব রোমান্টিক, উজানবাজার। ------------------------ শহরের ব্যস্ত কেন্দ্রবিন্দু থেকে অদূরে, রাস্তার ধার দিয়ে জালের বেড়া আর গাছের সারি। পিছনে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে জলস্রোত। বেড়া পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেই লাল মাটির পথ, সাহেবি ভাষায় স্ট্র্যান্ড। চারদিকে গাছগাছালি ঘেরা কুঞ্জছায়া। কোথাও অগোছালো, কোথাও বা গোছানো পার্কের মতো। একদিকে মাছবাজার, অন্যদিকে ভেজা ঝোপঝাড়, ঘাসজমি। বিশাল চওড়া ব্রহ্মপুত্র ঝমঝম করে বয়ে চলেছে পূর্ব থেকে পশ্চিম। পশ্চিমে তাকালে উমানন্দের দ্বীপ আর মন্দির। আর সোজা দূরে স্বপ্নের মতো ছমছমে সরাইঘাট রেলব্রিজ। দেশের উত্তর পূর্বের সঙ্গে মূলভূমির একমাত্র স্থল যোগাযোগ। ----------------------- ঐ লালমাটির পথে খানিক হাঁটা, খানিক বসা এদিকওদিক পাতা বেঞ্চিতে। তার পর তীরে বাঁধা হরেক রকম নৌকোগুলো দেখে একটু মন খারাপ করা। কোনোটা লঞ্চ, কোনোটা গাদাবোট, কোনোটা বা ছইনৌকো। অমন নদীতে বাঁধা জলযান। একটু অলৌকিক, একটু মায়াবী। একটু দুলছে ঢেউয়ে, একটু ডাকছে, চুপচাপ। চলুন না, একটু ঘুরে আসি....

976

9

Somen dey

ক্ষণকালের সম্পর্ক : চিরকালের গান

আমরা যে সময়টাকে সিনেমার গানের স্বর্নযুগ বলি , মানে সেই ষাট সত্তরের দশক, যে সময় সৃষ্টি হত প্রচুর হিরন্ময় গান ,সেই সময়ের সব কিছুই কিন্তু ঠিক এই সব গানের মত অতটা নিখাদ হিরন্ময় ছিল না । সে সময়েও আমাদের চোখে কিম্বদন্তী হয়ে ওঠা গানের জগতের মানুষগুলি অনেক সময় আক্রান্ত হতেন আমাদেরই মত ঈর্ষা , দ্বেষ , রেষারেষি , স্বার্থপরতা অহংবোধের মত মানুষী ক্ষুদ্রতায় । অনেক সময় তাঁরা এতটাই বাড়াবাড়ি রকমের ভাবপ্রবণ এবং জেদী হয়ে যেতেন যে তাদের ব্যাক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন গুলো ভীষণ ভাবে চলে আসতো তাদের কাজের জগতে ।হয়ত তাঁরা ঠিক এখনকার সেলিব্রিটিদের মত এতটা প্রফেশন্যাল professional ছিলেন না বলেই profession এর খাতিরে ব্যাক্তিগত সংঘাত গুলো বেমালুম হজম করে নিতে পারতেন না । তাই তাদের মধ্যে বেড়ে যেত দুরত্ব , জমে যেত বরফ । তাঁদের এই সব ব্যাক্তিগত দিক গুলো নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলত ।শুধু তাঁদের অনবদ্য সৃষ্টি নিয়েই আমরা ভুলে থাকতে পারতাম, মজে থাকতে পারতাম । কিন্তু যখন দেখি কোনো একটা ইতিহাসের গুরুত্বপুর্ণ পর্বকে অস্বীকার করা হচ্ছে ,মুছে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে , তখন কিছু বলার দায় অনুভব করি ।সেখান থেকেই এই লেখা । আশা ভোঁসলে যে কি স্তরের শিল্পী তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করার বোধহয় কোনো প্রয়োজন নেই । তাঁর কণ্ঠে দেবী সরস্বতী এবং দেবী মিউজ একসঙ্গে বসবাস করেন । তবে অনেকেই , বিশেষ করে যাঁরা বয়সে তরুন , এ রকম একটা ধারণা পোষন করে যে আর ডি বর্মনই হচ্ছে সেই মানুষ যিনি যিনি আশাজীর আসল কণ্ঠ সম্পদ কে আবিস্কার করেছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন ।পঞ্চম-আশা জুটির সমস্ত ঐন্দ্রজালিক গানের কথা মাথায় রেখেও তাঁদের সঙ্গে আমি একমত হতে পারবো না । আশাজীর গানের ভান্ডার অনেকটা গুগলসার্চের মত । যা খোঁজা হবে সবই পাওয়া যাবে ।তাঁর সহোদরা দিদি ছাড়া আর কেউ কোনোদিন তাঁর ধারেপাশের জায়গাটাতে পৌঁছতে পারবে না । এই দেশের মানুষকে যতদিন সঙ্গীত প্রাণিত করার ভুমিকাটি পালন করবে ততদিন আশাজী থাকবেন অলঙ্ঘনীয় হয়ে । কিন্তু আশা ভোঁসলের কথা বলতে গেলে , প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর পর্বটির কথা ভুলে গেলে চলবে না । এই নিবন্ধ লেখার দরকার হত না যদি আশাজী সেই মানুষটিকে বেমালুম অস্বীকার করতেন , যিনি প্রায় শুন্য থেকে তাঁকে উঠিয়ে এনে তাঁর দিদির পাশের সিংহাসনটিতে বসিয়ে দিয়েছিলেন , যথাযোগ্য সন্মানের সাথে । তাঁর নাম ওমকার প্রকাশ নাইয়ার । সবাই ডাকত ওপীজী । এমন কি এই কান্ডটি করতে গিয়ে প্রভুত ঝুঁকি নিয়ে তিনি লতা মঙ্গেশকর নামক ভারতীয় সিনেমাসঙ্গীতের অনিবার্যতাকেও অস্বীকার করেছিলেন । এ ব্যাপারে তিনি একমাত্র পরমবীরচক্র পাবার মত সঙ্গীতপরিচালক যিনি সারা জীবনে একটিও গান লতাজীকে দিয়ে না গাইয়েও , একটার পর একটা ছবির গান কে সুপারহিট করিয়েছিলেন ।এমনকি এক সময় বলিউডের সব চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া সঙ্গীত পরিচালক হতে পেরেছিলেন । যদিও আশাজী প্রথম গান রেকর্ড করেন ১৯৪৮ সালে , কিন্তু তিনি সে সময় যা কাজ পাচ্ছিলেন তা সবই তথাকথিত বি-ক্লাস সিনেমায় । বড় সিনেমায় নায়িকার গান কেও গাওয়াতে চাইতেন না তাঁকে দিয়ে । তখন লতাজী ছাড়া গীতা দত্ত , সামসাদ বেগম চুটিয়ে গান করছেন । কিন্তু আশাজী সঙ্গীত পরিচালকদের দরজায় ঘুরে ঘুরে সুবিধা করতে পাচ্ছিলেন না ।কেমন একটা ধারনা বদ্ধমূল হয়ে গেছল , আশা ভোঁসলের কন্ঠ নায়িকার কন্ঠ হতে পারে না । নায়িকার সখী, বাইজী অথবা ভ্যাম্প এর কণ্ঠ অবধি হতে পারে , কিন্তু নায়িকার কণ্ঠ নৈব নৈব চ । এ রকম একটা সময়ে সিনেমা পরিচালক পি এল সন্তোষি আশাজী কে নিয়ে আসেন ওপি নাইয়ার সাহেবের কাছে ।তিনি লক্ষ করলেন আশার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এক ধরণের কমপ্লেক্সে এ ভুগছে মেয়েটি।একদিকে তাঁর মনে হচ্ছে তাঁকে দিদির কণ্ঠ থেকে আলাদা হতে হবে কারণ আর একজন ‘লতার মত’ গায়িকাকে ইন্ডাস্ট্রি পাত্তা দেবে না । তাই চেষ্টা করছেন গীতা দত্তের timbre টিকে অনুসরন করতে । এটা করতে গিয়ে তাঁর কিছুতেই আত্নবিশ্বাস আসছিলনা ।নিজস্বতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না । ও পি নাইয়ার তাঁকে সাহাজ্য করলেন তাঁকে একটা নিজস্ব কণ্ঠস্বরের মালকিন হয়ে উঠতে, লতাও নয় গীতাও নয় , একজন আশা ভোঁসলে হয়ে উঠতে । ১৯৫২ সাল থেকেই তাঁর সঙ্গীত পরিচালিত সিনেমায় টুক টাক গান গাওয়াতে লাগলেন আশা ভোঁসলে কে দিয়ে । কিন্তু সেই ছবি এবং গান কোনোটাই তেমন হিট করছিল না । তাই আশা ভোঁশলে তখনো পিছনের সারিতেই রয়ে গেছলেন । সেই সময় প্রথম বড় নায়িকার কণ্ঠ হবার সম্মান তাঁকে দেন সেই ও পি নাইয়ার ১৯৫৭ সালে । তাও যে সে নায়িকা নয় , বৈজন্তীমালার কণ্ঠ । ‘নয়া দৌর’ ছবিতে রফি সাহেবের সঙ্গে ডুয়েট- মাংগ কে সাথ তুমহারা ম্যায়নে মাংগ লিয়া সনসার । https://www.youtube.com/watch?v=BBUBPElquj4 তাঁর সেই তাঁর সেই সিগনেচর করা বিখ্যাত টঙ্গা বিট শুরু হল এখান থেকে।গানটি হোলো সুপার হিট । এবং আশা ভোসলে পিছনের সারি থেকে উঠে এসে জায়গা পেলেন প্রথম সারির এক কোনায় । পরের বছরেই আরো এক ধাপ এগিয়ে, ও পি নাইয়ার তাঁকে করলেন সে সময়ের সব চেয়ে নামী নায়িকা মধুবালার কণ্ঠ ।তাও সোলো । হাওড়া ব্রীজ ছবিতে - আইয়ে মেহেরবান । আমার মনে হয় এই গানটির মধ্যে দিয়েই versatile আশা ভোঁসলের জন্ম হল । এই প্রথম ভারতীয় গানে কণ্ঠের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারূকাজ এবং সেই সঙ্গে স্বরক্ষেপনের ওঠাপড়া দিয়ে মোহময় যৌন আবেদন সৃষ্টি করার একটা সফল চেষ্টা দেখা গেল । falsetto বা vibrato পাশ্চাত্য সঙ্গীতের এ সব শৈলী কি ভাবে হিন্দি গানে প্রয়োগ করা যেতে পারে তার ঝলকও দেখা গেল এই গানে । পরবর্তী কালে আর ডি বর্মন আশা ভোঁসলের কণ্ঠের এই দিকটাকেই আরো অনেক সফল ভাবে প্রয়োগ করেছিলেন । কিন্তু শুরু এখানেই । গানটি একবার শুনে নেওয়া দেখা যেতে পারে । https://www.youtube.com/watch?v=LjZ0DCaPSP0 এর পর একটার পর একটা অবিস্মরনীয় গান হতে থাকলো এই জুটির ।ফাগুন ছবিতে ‘পিয়া পিয়া না লাগে মোরা জিয়া’ । ফির ওহি দিল লায়া হূঁ ছবিতে ‘আঁখো সে উতরি হ্যায় দিল মে’  । কাস্মীর কি কলি ছবিতে ‘বলমা খুলি হাওয়া ’ । মেরে সনম ছবিতে ‘ইয়ে হ্যায় রেশ্মী জুলফোঁ কি অন্ধেরো মে ’ । ইয়ে রাত ফির না আয়েগী ছবিতে ‘ইয়েহি ওহ জগাহ হ্যায় ’ । শাওন কি ঘটা ছবিতে ‘জরা হাওলে হাওলে চলো মেরা সাজনা’ । কিসমত ছবিতে ‘আও হুজুর তুমকো সিতারো মে লে চলে ’ ।হমসায়া ছবিতে ‘ওহ হসীন দর্দ দে দো’ এবং এ রকম আরো অনেক । ইয়ে হ্যায় রেশমি জুলফে গানটিতে পাওয়া গেল অসাধারন সব ‘হরকত’এবং ‘নখড়া’, যা এ পর্যন্ত কোনো হিন্দি গানে শোনা যায় নি । https://www.youtube.com/watch?v=mAf82TGMQ9c ঠিক এ সময়ে ওপীজী, আশা ছাড়া আর অন্য নারী কণ্ঠকে ব্যাবহার করা প্রায় বন্ধই করেদিলেন । গীতা দত্ত অনেকবার ফোন করেছেন – তাঁকে নেওয়া হচ্ছে না কেন জানতে চেয়ে । কিন্তু ওপী জী তাঁকে জানিয়েই দিয়েছিলেন অন্য কাউকে দিয়ে গাওয়ালে আশা জী ক্ষেপে যাবে । এই সময় দিদির সঙ্গে আশাজী সম্পর্কের দুরত্বও অনেকটা বেড়ে গেছল । সে সময় তাঁরা দুজনে বোম্বাইয়ের একই রাস্তার এ পারে ও পারে থাকতেন । শোনা যায় তাদের দুজনের বাড়িতে একই ‘বাই’ কাজ করতো । দুজনেই নাকি তার কাছে খবর নিতেন কে কোন গান রিহার্স করছেন বাড়িতে । ওপীজীর সুরে রফি সাহেবের সঙ্গে আশাজীর ডুয়েট গুলো তো আজও ঠিক ততটাই আধুনিক কম্পোজিশন লাগে যতটা এই সব গানের জন্ম লগ্নে ছিল । ডুয়েট গান এর কয়েকটি ‘ইশারো ইশারো মে দিল দেনে ওয়ালে’ , ‘এক পরদেশি মোরা দিল লে গয়া’ , ‘বহুত শুক্রিয়া বড়ি মেহেরবানি’ , ‘দিয়ানা হুয়া বাদল’ এ রকম আরো অনেক অনেক। ও পি নাইয়ার সাহেব নিজে বলতেন আমি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এবিসিডি জানিনা । আসলে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রথাগত তেমন কোনো শিক্ষা তাঁর ছিল না । তিনি একেবারেই কানসেন ছিলেন ।কিন্তু তাঁর কিছু গানে রাগ সঙ্গীতের কিছু অনবদ্য এবং সাহসী প্রয়োগ দেখে আজও মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় য । সে সব গানের তালিকা দিয়ে এই লেখা দীর্ঘায়ত করবো না । শুধু চারটি গানের উল্লেখ করবো, যার প্রথমটি হল রফি সাহেবের সঙ্গে ডুয়েট এবং বাকি তিনটি আশা ভোঁশলের সোলো । ডুয়েট গানটি হল ‘আপ ইঁউহি অগর হমসে মিলতে রহে দেখিয়ে একদিন প্যার হো জায়েগা ’ গানটি কেদার রাগের উপর । কেদার একটি গম্ভীর ধরণের রাগ । সাধারনত ভক্তি সঙ্গীতে প্রয়োগ হত । এ রকম হৃদয় মথিত করা রোমান্টিক গানে কেদার রাগের প্রয়োগ এর আগে বা পরে কোনো সময়েই দেখা যায় নি । https://www.youtube.com/watch?v=QqDzcD-UCeE ১৯৫৮ তে রাগিনী ছবিতে , একটি গানে প্রয়োগ করেছিলেন তিলং রাগের । এটিও হিন্দি সিনেমায় খুব কমই ব্যাবহার করা হয়েছে । সেই গান হল –ছোটা সা বালমা আখিয়ন নীদ চুরা লে গয়ো । https://www.youtube.com/watch?v=DlpJZs0YuK8 পিলু ছিল নাইয়ার সাহেবের প্রিয় রাগ । তাঁর অন্তত ২০/২২ টি হিট গান পিলুতে আধারিত  ।কিন্তু ১৯৬৬ সালে ‘মহব্বত জীন্দগী হ্যায়’ বলে একটি ছবিতে আশাজীকে দিয়ে যে গান টি গাইয়েছিলেন সেটি একেবারে হৃদয় মথিত করা কম্পোজিশন । আমার মনে হয় এ গানটি এই নশ্বর দুনিয়ায় একমাত্র তিনিই গাইতে পারতেন । রাতো কো চোরি চোরি বোলে মোরা কংগনা । https://www.youtube.com/watch?v=PjgTj5xQkF0 পরের গানটি নইয়ার সাহেবের নিজের প্রিয় কম্পোজিশন ।এখানেও আরো একটি সিনেমা সঙ্গীতে অপ্রচলিত রাগ ‘সারং’ । এ গানের জন্যে আশাজী ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন । আরো একটি কারণে উল্লেখযোগ্য । সেটা হল আশাজীর সঙ্গে এইটিই তাঁর শেষ গান । ১৯৭৩ সালে প্রাণ যায়ে পর বচন না জায়ে ছবিতে – চ্যায়ন সে হমকো কভি আপ নে জীনে ন দিয়া । ছবিটি রিলিজ করার আগেই তাদের দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছলো চুড়ান্ত ভাবে ।সুরের সম্মোহন তো আছেই এই swan song এর কথাটি মাথায় রেখে গানটি শুনলে হয়ত শ্রোতা আরো অনেক কিছু আবিস্কার করে নিতে পারবেন । https://www.youtube.com/watch?v=tVO7x_MRGpI ওপিজি্র আশাজীর সঙ্গে ১৯৫২ সালে যে মেলডির স্নিগ্ধছায়াচ্ছন্ন সুহানা সঙ্গীতসফরটি শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালে তা থেমে গেল । তার ঠিক কারণটি ওঁদের দুজনের কেউ স্পষ্ট করে বলেন নি । তবে এটি নেহাতই একটি ব্যাক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপার । সৃষ্টিশীলতার চুড়ায় বসেও সেই কান্ডটিই হয় - ‘তুমি কোলে নিয়েছিলে সেতার, মীড় দিলে নিষ্ঠুর করে ছিন্ন যবে হল তার ফেলে গেলে ভুমি পরে ‘ এই জুটি ভেঙ্গে যাওয়াতে আশাজীর সঙ্গীত যাত্রায় পরের চুড়া গুলো ডিঙ্গিয়ে যেতে তেমন কোনো পিছুটান বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি  । কারণ ততদিনের তিনি জগৎ বিখ্যাত হয়ে গেছেন । তাঁর নতুন ইনিংস শুরু হয়ে গেছে রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে । তিসরি মঞ্জীল ছবিতে এক নতুন আশা কে গোটা দেশ শুনতে পেইয়েছে এবং সেই নুতন আশাজী একটার পর একটা ম্যাজিক দেখাতে থাকলেন রাহুল দেব বর্মন এর সুরে । কিন্তু ওপি নাইয়ার সাহেব যেহেতু জিদ করে তিনি লতাজীর সঙ্গে কাজ করেন নি ,আর ততদিনে গীতা দত্ত , তাঁর একটা সময়ের সবচেয়ে প্রিয় গায়িকা , এলকোহলিক হয়ে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলেন , তাঁর কাছে গান গাওয়াবার মত তেমন কোনো লিড ফিমেল ভয়েস ছিল না  । এ দিকে আবার তিনি সে সময় একদিন তার রেকর্ডিং এ দেরি করে আসার জন্যে রফি সাহেবের সঙ্গেও ঝগড়া করে বসে আছেন । ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত তিনি প্রায় কোনো কাজই পেলেন না । তার পর অবশ্য কিছু কাজ করেছেন ।১৯৯৪ অবধি টুক টাক কাজ করেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে । কিন্তু আর দাপট নিয়ে ফিরতে পারেন নি কোনোদিন। এর পর তিনি সিনেমা জগত থেকে অবসর নিয়ে নেন । তাঁর জীবনের সব কিছু এলো মেলো হয়ে যায় । মেরিন ড্রাইভের নিজের বাড়ি ছেড়ে , তাঁর নিজের পরিবার ছেড়ে , সব সখ শৌখিনতা ছেড়ে ,তিনি চলে যান মুম্বাইয়ের শহরতলী থানেতে । সেখানে এক নাখয়া পরিবার তাকে তাঁদের পরিবারে বাবুজী করে রেখে দেয় তাদের তত্বাবধানে, পরম আদরের সঙ্গে ।চুড়ান্ত বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে তিনি বাস করতে থাকেন দু কামরার ছোটো বাড়িতে । আমৃত্যু সেখানে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারি করতেন ।ওষুধ নাকি ভালোই দিতেন । এই রকম একটা সময়ে সেখানে অনেক কষ্ট করে সন্ধান জোগাড় করে এক সাংবাদিক তাঁর একটি ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলেন ।ওপিজী তাঁকে বলেছিলেন আমি জীবনের সব ভালোগুলো পেয়ে গেছি ,সেরা সম্মান ,সেরা সফলতা , সেরা গাড়ি ,সেরা বাড়ি, সেরা পোষাক, , সেরা নারী , সেরা পানীয় সব পেয়েছি। কিন্তু আমি নিজেই বেছে নিয়েছি আমার এই সঙ্গীতবিহীন স্বেচ্ছা নির্বাসন । আমি এখানেই বেশ ভালো আছি ।তিনি এও বলেছিলেন আমার জীবনের সব চেয়ে ভালো সময় কেটেছে আশার সঙ্গে । সেই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ । তিনি সেই ইন্টারভিউয়ের শেষ করেছিলেন একটি শায়েরী বলে - আশিয়ান অপনা লূটা গয়া আপনি নজর কে সামনে হোকে বেঘর ম্যায় খড়া অপনে ঘর কে সামনে *** আমরা আর একবার আমরা সেই ওপিজী-আশাজী জুটির শেষ গানটির কাছে ফিরে আসি । চ্যায়েন সে হম কো কভি আপ নে জিনে ন দিয়া জহর ভী চাহে অগর পিনা তো পিনে ন দিয়া । যিনি লিখেছিলেন গানটি (এস এচ বিহারি তাঁর বেশির ভাগ গানের গীতিকার) তিনি কি ভেবে লিখেছিলেন জানিনা  ।সিনেমার সিচুয়েশন নাকি সে সময়ের জীবনের সিচুয়েশন । আগেই বলেছি গানটির জন্যে ১৯৭৩ সালে আশাজী ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পান । কিন্তু আশাজী সেই অনুষ্ঠানে ইচ্ছে করেই আসেন নি । ।কারণ ততদিনে ওপিজীর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়ে এসেছেন। ওপিজী কিন্তু এসেছিলেন সে অনুষ্ঠানে ।আশাজীর হয়ে পুরস্কার নেবার জন্যে ওপিজীকে অনুরোধ করা হয় । তিনি তা নেন । কিন্তু গাড়িতে বাড়ি ফিরবার সময় একটা ফাঁকা জায়গা দেখে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে কালো রঙের অপ্সরা মুর্তিটিকে ছুঁড়ে ফেলে দেন । মাটিতে পড়ার সময় সেটি ভেঙ্গে যাওয়ার যে শব্দটি হয়েছিল ,সেটা তিনি মন দিয়ে শুনেছিলেন , তাঁর দিক থেকে সেটাই হয়ত ছিল একটি সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার শেষ শব্দ  । ওপিজী সেই শব্দ ভালো করে শোনার পর একবার শুধু ম্লান হেসেছিলেন । **** ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই লেখাটি যখন লিখছি সেই সময় অবধি আশাজী একবারের জন্যেও ‘ও পি নাইয়ার’ এই নামটি উচ্চারন করেন নি । অনেকে অনেক ভাবে সে প্রসঙ্গে যাবার চেষ্টা করেও সফল হননি । টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক ইন্টারভিউ তে তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় , তাঁর সাফল্যের প্রথম ধাপে , সে নয়া দৌর এর গানটি তাঁকে দিয়ে গাওয়ানোর জন্যে তিনি কাউকে ধন্যবাদ দেবেন কিনা । তিনি বলেন ধন্যবাদ দিতে হলে তা দিতে হয় বি আর চোপড়া সাহেব কে , মানে এই ছবির প্রযোজক কে ।আর আমাকে যারা গান গাইয়েছেন তারা এই কারণেই গাইছেন , যে তাঁদের গান আমাকে ছাড়া হতনা বলে । অর্থাৎ তিনি সোজাসুজি অস্বীকার কললেন তাঁর সেই সলতে পাকানোর দিন গুলি কে । **** কিন্তু আশাজী , আপনার কয়েক কোটি ভক্তদের একজন হওয়ার সুবাদে বলতে ইচ্ছে করছে , অন্তত ২০০৭ এর ২৮ সে জানুয়ারী , যখন এই মানুষটি ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন অমৃতলোকে , আপনি যদি এক কলম শোক বার্তা পাঠিয়ে দিতেন , খুব কি কিছু ক্ষতি হয়ে যেত আপনার ? আপনার দিদি কিন্তু এই ভুলটি করেন নি । যে মানুষটি তাঁকে দিয়ে একটিও গান না গাওয়াবার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলেন , যে মানুষটি তাঁর নামের পুরস্কার বলে মধ্যপ্রদেশ সরকারের দেওয়া মহার্ঘ পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেছিলেন , তাঁর জন্যে , হয়ত একেবারেই প্রথামাফিক , তবুও দু কলম শোক বার্তা জানিয়েছিলেন  ।কিন্ত আপনি তাও জানান নি ।আমরা জানি আপনার জীবনে একটার পর একটা শোক নেমে এসেছে বার বার ।তবু আপনি স্থির থেকেছেন ।সে ক্ষমতা আপনার আছে । তাহলে কেন এই একটা নফরৎ-রাগ-অভিমান-দুঃখ-ক্ষোভ-হতাশা বা যা কিছুই ছিল আপনাদের মধ্যে সেটা, পুষে রেখে দেবেন আপনার মনের এক অন্ধকার কোনায় ?সে মানুষটি তো চলেই গেছেন , আপনিও তো ৮২ পেরোলেন  । কোনো এক সুন্দর সকালে উঠে একদিন মেডিয়াকে সাক্ষী রেখে বলেই ফেলুন না – Thank you Opee , for that twenty years of melodious journey , for the sake of music, let’s forgive and forget everything else . দেখবেন বুকের ভিতর খানিকটা হাল্কা লাগছে । আপনারও আর আমাদেরও । ***

1198

5

James

আমার কলেজবেলা

আজি হতে অর্ধশত বর্ষ পূর্বে সবে হাফ থেকে ফুলপ্যান্টে প্রমোশন পাওয়া‚ তখনকার কোচিংহীন জয়েন্ট পাশ করা শ'পাঁচেক ছেলের ব্যাচ তেসরা জুলাই এর পুণ্যলগ্নে শিবপুরে পদার্পণ করলো| পটাপট কালো হলুদ ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করার ঝপ ঝপ শব্দ| ‚হ্যাঁ ছেলেই দুই আঙ্গুলে গোণা যায় কয়েকটি মেয়ে মাত্র সে ব্যাচে; তখনকার সব ব্যাচেই| পাঁচ বছরের হাজার দুয়েক ছেলের মধ্যে সর্ব সাকুল্যে বিশটা মেয়ে! এমনিতেই সেই 'কড়ি দিয়ে কিনলাম' এর অব্যবহিত পরের দশকে ছেলেরাই মেয়েদের পেছনে দৌড়তো‚ ডিমান্ড ও সাপ্লাই সূত্র মেনে| রাস্তাঘাটে বাসে ট্রামে রঙ্গীন শাড়ী খুবই কম দেখা যেত| শিবপুর মানে তখন একটা aura‚ একবাক্যে কুইজ কম্পিটিশানে‚ দাদা দিদি নং ওয়ানে‚ এখনও উত্তরটা তাইই| (যথা যাদবপুর= এইটবি বাসস্ট্যান্ড)| আর ছাত্রদের ডেমোগ্রাফি তখন কলকাতা কেন্দ্রিক ছিল না‚ সুদূর গ্রাম ‚ শহর‚ আধাশহর থেকেও ছাত্ররা আসতে পেত‚ কোচিং‚ লাখ বেলাখ ফী ছিল না‚ মোটে কুড়ি টাকা মাইনে তাও আটমাসের‚ বাকী চারমাস ছুটি- নো ক্লাশ‚ নো মাইনে| নতুন পরিবেশ‚ নতুন হোস্টেল; অনেকের কাছে প্রথম হোস্টেল বাস| আমাদের ছিল অধুনা মধুসূদন স্মৃতি বিজড়িত কি যেন মিউজিয়াম‚ দত্তকবি খ্রীশ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে সে সময়ের বিশপ কলেজে- অধুনা ডাউনিং হল| লাল রঙের অট্টালিকা‚ পেল্লায় খড়খড়ি দেওয়া জানালা‚ বিশাল দু মানুষ সমান দরজা‚ লোহার ফ্রেমে দশ ফুট চওড়া কাঠের সিঁড়ি‚ এলাহি ব্যাপার| আমি ও আমার চার বন্ধুর জন্যে একস্ট্রা লাক‚ ১০ নম্বর ঘর| একটা আস্ত বছর দশ নম্বর ডাউনিং আমার ঠিকানা ছিল| বিকেল বা সন্ধ্যের দিকেই ছাত্ররা এক এক করে আসতে থাকে‚ প্রসপেক্টাসে সেরকম ইনস্ট্রাকশানই ছিল| হায়রে‚ সেটি বোধহয় আজি হতে শতবর্ষ পূর্বের মাল চোথা হতে হতে আমাদের সময়ে এসেছিল‚ কি কি সঙ্গে আনতে হবে তার মধ্যে শর্টস ও ছিল আর তোয়ালে| শর্টস? ছাত্রীদের জন্যেও- আরে সেই জমানায় শালোয়ার কামিজ পরিধানও blasphemy পরিগণিত হতো‚ সেখানে শর্টস‚ আ মরি তেনারা কেন ইনস্ট্রাকশন ফলো করেন নাই! আমার সমস্যা ছিল ভিন্ন‚ তোয়ালে- সারাটা জীবন গামছায় গা মুছে এলাম এখন কি এমন লাক্স সুন্দরীর ত্বক হয়ে গেল যে তোয়ালেতে গা মুছতে হবে? পরিচয় পর্ব শুরু হলো| সে জমানায় ভর্তি হবার জন্য পিতামাতার আর্থিক সঙ্গতির কোন weightage না থাকার হেতু‚ মেরিটই একমাত্র মাপকাঠি‚ তাই যেদিকে দেখো চাহি সকলেই কোন না কোন স্কুলের ফার্ষ্টবয়‚ ধীরে ধীরে মাল থিতোলে সেরার সেরা গণ আত্মপ্রকাশ করবেন‚ কেউ বেপথু হয়ে যাবে‚ কেউ দায়সারা কোনমতে পাশ করবেন| জাগতিক নিয়মে যা হয়‚ সকলেই কি ক্যাটরিনা হতে পারে‚ শুধু রূপ থাকলে যেমন হয় না‚ শুধুমাত্র মেরিটও কাজে আসে না‚ যদি না গ্রাইন্ডিং‚ পলিশিং করা হয় নিয়মিত! প্রথমদিনের আর এক চমক‚ ডাইনিং হল| সাদা ডিনার প্লেটে সাজানো| আর ডিম বাটিতে‚ তরকারী ডাল গামলাতে যেমন থাকে| তো পরের দিকে ডিমের বাটিটি কেউ কেউ টেবিলের তলায় চালান করে‚ 'আমার ডিম কই'‚ বটঠাকুরের তরিৎ জবাম‚ 'বাবু আপনার ডিম টেবিলের নীচে'! শিবপুরে বিভিন্ন হোস্টেলের বিভিন্ন ট্রাডিশন‚ অপেক্ষাকৃত নতুন হোস্টেল গুলোতে স্টীলের খোপ ওয়ালা থালা ছিল‚ রান্নার স্বাদও বিভিন্ন হোস্টেলে বিভিন্ন রকম! অবশ্য প্রত্যেক বছরই হোস্টেল বদলাতে হতো‚ গণতন্ত্র‚ আর কি| আমার অসুবিধে ঐ ছোট্ট ডিনার প্লেটে খাবার ম্যানেজ করা‚ বড় থালায় খেয়ে অভ্যস্ত‚ স্কুল হোস্টেলে তো কলাই করা থালায়| সেখানে আবার যার থালা তার চিহ্নিত করতে প্রথম দিনই এক কানা ভেঙ্গে মার্ক করে দেওয়া হতো‚ সিনিয়ররাই সাহায্য করতেন| একটা metaphor জিভে আসছে‚ কিন্তু না থাক| এই গেল ৫০ বছর আগে শিবপুরে প্রথম দিনের কিসসা!

1108

7

শিবাংশু

ষঙ্গুমুগমে সন্ধ্যা

এককথায় একটা শীতল সমুদ্রতট। আরবসমুদ্রের এই অংশটিকে লোকে বলে লাক্ষাদ্বীপ সাগর। এর আরেক নাম আরাট্টুকোডাভু। কারণ ত্রিবাংকুরের অধিষ্ঠাতা দেবতা অনন্তপদ্মনাভন এই সমুদ্রে স্নান করতে আসেন। দেবতার সঙ্গে থাকেন ত্রিবাংকুরের নিধিরাম সর্দার রাজা, হাতে খোলা তলওয়ার। পিছনে পিছনে পাইক-বরকন্দাজ, রাজপুরোহিত, নাগস্বরম, মৃদঙ্গম আর শিঙ্গাহাতে বাজনদারের দল। মূলদেবতার সঙ্গে আরো দু'জন দেবতা, নৃসিংহ আর কৃষ্ণ। প্রচুর ভক্তের সমাবেশ এসে জড়ো হয় একটা পাথরের মণ্ডপে, নাম আরাট্টুমণ্ডপম। নিরাভরণ, কিন্তু গম্ভীর তার নির্মাণ। ----------------------------- সেখানে রয়েছে একটা বিশাল কফিহাউস। লাল ঢালু ছাদ আর লাতিন স্থাপত্য। কাছে গেলেই চারদিক ভুরভুর করছে তাজা কফির সুবাস। সঙ্গে নানা অখাদ্যের সমারোহ। ভাবা যায়। এরকম একটা শান্ত বেলাভূমিতে বসে ধীরে ধীরে কফির চুমুকে সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখা। ভিড়ভাড় নেই। নিবিড় সৈকত। যাঁরা আছেন, তাঁরা সমুদ্রের প্রতি উদাসিন ন'ন। জলের কাছে, ঢেউয়ের কাছে, বালুর কাছে, সব কিছু স্পর্শ করে অপেক্ষা করছেন কখন সাঁঝ ঢলে। বালুবেলায় রয়েছে টাট্টুঘোড়া, ছড়ানো ছাতা আর তুলে রাখা জেলে নৌকো। ভাসাভাসি হাওয়া, নোনা গন্ধ আর যাই যাই আলোর জাদু সারা চরাচর জুড়ে। মনে থাকে, মনে থেকে যায়.....

982

1

ইরা চৌধুরী

অজানা

এক জায়গায় একটি ঘটনা পড়লাম।ভাল লাগল।ভাবছি এখানে তার উল্লেখ করলে অনেকেই চমতকৃত হবেন।সবার ভাল লাগবে।শুনুন তাহলে ১৯৫৮ সাল। আমেরিকার সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেস শহরের একটি ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের দোকান। সেই সময় গোটা আমেরিকাতে এই একটি দোকানেই অথেনটিক ভারতীয় সাঙ্গীতিক বাদ্যযন্ত্র পাওয়া যেত। দোকানের মালিকের নাম ডেভিড বার্নার্ড। সেখানে একদিন বছর পঁয়তিরিশের এক ভারতীয় যুবক এলেন। পরণে অত্যন্ত সাধারণ পোষাক। বিক্রেতাদের তরফ থেকে কেউই বিশেষ আগ্রহ দেখালেন না তার প্রতি। নেহাৎ ভদ্রতার খাতিরে ক্রিস্টিনা নামের এক সেলসগার্ল এগিয়ে এলেন যুবকটির কাছে। যুবকটি সেতার দেখতে চাইলেন। ক্রিস্টিনা তাকে বহু সেতার দেখালেন। দেখতে দেখতে যুবকটি উঁচু তাকের ওপরে যত্নে সাজানো একটি সেতার দেখিয়ে বললেন, “ঐ সেতারটা যদি একটু দেখান” একে তো অনেক উঁচু শেলফের ওপর রাখা, নামানো ঝামেলা, তার ওপর অত্যন্ত দামী সেতার। ক্রিস্টিনা খুব একটা রাজী হলেন না। কিন্তু যুবকটির তখন শুধুমাত্র ঐ সেতারটির দিকেই নজর। তার শুধু ঐ সেতারটিই চাই। মালিক ডেভিড বার্নার্ড এগিয়ে এলেন। তার নির্দেশে সেতার নামানো হল। ক্রিস্টিনা অবহেলাভরে জানালেন, এই সেতারের নাম BOSS সেতার। যে কোন সেতারবাদকের পক্ষে এ সেতার বাজানো সম্ভব নয়। খুব বড় বড় সঙ্গীতানুষ্ঠানেই এই ধরণের সেতার ব্যবহার করা হয়। যুবকটি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, “আপনারা একে BOSS নামে জানতে পারেন, ভারতে এই সেতারকে সুরবাহার বলা হয়। আচ্ছা, আমি কি এটা একবার বাজিয়ে দেখতে পারি?” ডেভিড যুবকটির অনুরোধ রাখলেন। অনুমতি মিলল। সেতারের তার বাঁধা হল। টিউন করা হল। যুবকটি সেতার বাজাতে বসলেন। একে একে দোকানের সব কাজ ফেলে জড়ো হতে লাগলেন সবাই। ক্রেতারা সব ভুলে ঘিরে ধরলেন যুবকটিকে। আলাপ, জোড়, ঝালার শেষে একটা সময় যুবকটি তাকিয়ে দেখলেন সম্মীলিত স্তম্ভিত জনতা নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন তার দিকে। তারা নড়তে ভুলে গেছেন। ধীরে ধীরে হাততালিতে ভরে উঠল জায়গাটা। যুবকটিও পরিতৃপ্ত। তিনি সেতারটি কিনতে চাইলে স্বয়ং ডেভিড এগিয়ে এলেন তার কাছে। এসে বললেন, ‘তুমি কে ভাই? আমি রবিশঙ্করের সেতার শুনেছি। ওনার মতো সেতার কেউ বাজাতে পারেন না। কিন্তু তুমি রবিশঙ্করের চেয়ে কোন অংশে কম নও। আমি তোমাকে বিক্রি করতে পারব না। এই সেতার আমি তোমাকে উপহার দিলাম’। সেতার নিয়ে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে পথ আগলে দাঁড়ালেন ক্রিস্টিনা। তিনি বাষ্পরুদ্ধ গলায় বললেন, ‘আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু তুমি সত্যিই এই সেতারের যোগ্য শিল্পী। তুমি তোমার দেশে ফিরে যাবে, জানি। এটাও জানি, আর কোনোদিন আমাদের দেখা হবে না। তাই এই শেষ মুহূর্তে আমার একটা অনুরোধ রাখো। এই এক ডলারের নোটের ওপর তুমি নিজের নাম লিখে দিয়ে যাও, যাতে সেটা সারাজীবন আমার সাথে রাখতে পারি’। যুবকটি অল্প হেসে ক্রিস্টিনার এক ডলারের নোটের ওপর নিজের নাম লিখে দিলেন... সলিল চৌধুরী। আগ্রহীদের জন্য অতিরিক্তঃ সলিল ভারতে ফিরে এসে একটি গান রচনা করেন যার কথা ছিল- না, যেও না, রজনী এখনও বাকী... সেখানে সেতারের যে সুর আপনারা শোনেন, সেটি ঐ Boss সেতারের। পরে এই গানের হিন্দি অনুবাদ ‘ও সজনা, বরখা বাহার আয়ি’তেও এই সেতার ব্যবহার করেছিলেন সলিল চৌধুরী।

1065

13

শিবাংশু

মেঘের খেলা আকাশপারে

গুয়াহাটি আমার একটা প্রিয় শহর। এই প্রিয়ত্বের কারণ খুঁজতে গেলে তা বেশ কয়েকটি পাওয়া যাবে অবশ্যই। কিন্তু দু'টি কারণ তার মধ্যেও মুখ্য। শিমলা, কোহিমা, ইম্ফল, ইটানগর, শিলং জাতীয় ছোট্টো পাহাড়ি রাজধানী জনপদগুলিকে ছেড়ে দিলে, গুয়াহাটিই প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে লালিত সুন্দরতম রাজধানী শহর। পাহাড়, নদী আর সবুজের আশীর্বাদ তার সৌন্দর্যকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। লোকালয় আর প্রকৃতি এখানে পরস্পরকে জড়িয়ে আছে খাজুরাহোর ভাস্কর্যের মতো। -------------------------------- এটা যদি প্রথম কারণ হয় তবে দ্বিতীয়টি, ইতিহাস সাক্ষী, এই জনপদটিই দেশের আদি নারীশক্তির বৈজয়ন্তী কেন্দ্র। সারাদেশে যখন পুরুষতান্ত্রিকতার আতিশয্যকে কেউ কখনও চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি সেই উত্তরবৈদিক যুগ থেকে, একমাত্র কামরূপসভ্যতাই চিরকাল নারীশক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে শিরোপা দিয়ে এসেছে। দেশের এইপ্রান্তে কৌমসংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্যকে ধর্মীয় স্বীকৃতি দিয়ে অধ্যাত্মচর্চার অঙ্গও করে ফেলা হয়েছে। সমাজ বিবর্তনের এই শুভ উপক্রম এখানের মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী করেছে। তাঁরা রূপসী তো ছিলেনই, তার উপর এই মাত্রাটি তাঁদের আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। প্রবাদের পরদেশীরা এখানে এসে যে মেষজন্ম পেয়ে যায় তার প্রভূত কারণ আছে। --------------------- আমি সুযোগ পেলেই এই শহরে আসি। এখানে মেঘলাদিনে নবগ্রহ পাহাড়ের উপর বসে সারাদিন অলসমায়ায় নদীর উপর মেঘের খেলা দেখার নেশা কে ছাড়তে পারে? আমরা তো পারিনা। ছবিগুলো দেখলে বোধ হয় কেউই পারবে না....

1007

6

মনোজ ভট্টাচার্য

কলকাতায় একদিন !

কলকাতায় একদিন ! আমাদের ধারনা – আমরা কলকাতাকে খুবই চিনি ! আমারও মাঝেমাঝে এইরকম মনে হয় – কলকাতা তো আমার হাতের পাতায় ! এটা তো একটা বিরাট ভুল ! – একটা শহরের কি একটা রূপ হয় ! কতরকম রূপ হয় তার – প্রেমিকের যেমন শতেক রূপ – কবির কল্পনায় আসে ! ওই যে গান আছে না – তোমার দেহের ভঙ্গিমাটি যেন বাঁকা শাপ – ইত্যাদি ! – কখনো বা ডার্লিং – কভু তুমি জননী – কখনো বা স্নেহময়ী সিস্টার! – ও কলকাতা ! এক একটা দিন আসে - যখন সময় - শারীরিক হাজার ক্লান্তির মধ্যেও - নিজের স্বাক্ষর রেখে যায় ! - কাল দিনটা সেইরকম ছিল ! কত মোহময় – কত মায়াময় ! বেলা দুটো থেকে বিকেল ছটা পর্যন্ত - সেই চার ঘণ্টা যে কোথা দিয়ে উড়ে গেল ! - হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি - স্বীকার করতে বাধ্য ! কিন্তু তার মধ্যেও - নতুন নতুন অজানা রাস্তা - যা সর্বত্রই এক - আমাকে কত ভুলিয়ে রাখল ! ভুলিয়ে রাখল - রোদের দাপট - যানবাহনের দাপট অথবা রাস্তা পারাপারের ভুল-ভুলাইয়া ! শুধু চোখ দিয়ে দেখা – মানুষের সঙ্গে মেশা – পরিস্থিতিকে আলিঙ্গন করা ! - সৌরভদ্বয় ও সায়নদের কৌতূহলী প্রশ্ন – ছবি তুলছ কেন দাদু ! – ছবি কেন তুলছি ! তা কি আমিই জানি ! ভালো লাগছে কলকাতাকে ছোট্ট ক্যামেরায় ধরে রাখতে – তাই চেষ্টা করছি ! আমার মনে হয় - বেশ কয়েকদিন কিছু রুটিনবদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে - অকারনে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা - কেমন একটা বেপরোয়া ভাব ! তাই কি ? - খাওয়া নেই, এমন কি চা-ও নয়! - হয়ত ইচ্ছে করলে আগে চা খেয়েও নিতে পারা যেত ! কিন্তু সেই সময় ! সে তো ছেড়ে চলে যেত – অভিমানভরে ! প্রসঙ্গত, প্লেনে যাবার সময়ে - যদিও শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়িই - তবুও ঘুমিয়ে সময় কাটাতে চাই না ! যদি জীবনের অন্তিম মুহূর্তটা দেখতে না পাই ! সেটা তো আর বারবার দেখা যাবে না ! - তাই প্রানপনে জেগে থাকার চেষ্টা করি ! এইরকমই একটা দিন ছিল - গতকালের দিনটা ! মধুসুদন মঞ্চ বা দখিনাপণ বা অবনমহল - আমি ভেতর থেকে দেখিনি কখনো - সেটাই কি কারন! - না, সে তো কত কি দেখিনি ! তার জন্যে নয় ! তবে ! বছর কুড়ি আগেও যার রূপ জৌলুশ দেখে কলকাতার তাক লাগত – তারই যৌবন গত-প্রায় ! তবু তারও মধ্যে কোন দোকানে প্রস্তরীভূত স্থাপত্য – সেই সময়ের কথা বলে ! ইচ্ছে করে - সত্যিই - কোন একটা দিন কোথাও হারিয়ে যাই - চেনা পরিবেশ থেকে দূরে দূরে ! দৈনন্দিনতা যেখানে রোষ-কষায়িত নেত্রে শাসন করবে না ! - জীবনে যেমন - প্রতিদিনের পাতে ফুল ফল পাখি হাজির থাকে - তেমনি প্রতিদিনের বাইরেও তো এসবের উপস্থিতি থাকবে ! – সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়ে – খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায় ! মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর - - সেই তো সখি স্বপ্ন আমার সেই বনানী স্বর্গপুর ! মনোজ

1144

10

শিবাংশু

ঈশ্বর থাকেন জলে

ঈশ্বর সেখানে থাকেন কি না, জানিনা। তবে লোকে বলে তাঁর ঘরবাড়ি আছে সেখানে। আমি সেখানে খুব ঘুরেছি, কিন্তু তিনি আমায় দেখা দেননি। না দিলেন, বয়েই গেলো। তবে আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ একটা কারণে। অতো সুন্দর করে নিজের বাড়ি আর কেউ তো সাজিয়ে রাখতে পারেন না। বিশেষতঃ তিনি যখন জলে থাকেন। কবি কী আর এমনি এমনি গাহিয়াছেন, " ঈশ্বর থাকেন জলে!!"। --------------------- আমার অনেক ওদেশী বন্ধু আছে। একবার একটা সাহেবদের কাগজে আথিরাপল্লি জলপ্রপাতের ছবি দেখে দিল তরর হয়ে গিয়েছিলো। খুঁজে বার করলুম সেটি ঈশ্বরের নিজের দেশে আছে। এক থ্রিসুরের মূল বাসিন্দা বন্ধুর কাছে তার হালহকিকত জানা গেলো। তবে আমার সব মালয়ালি বন্ধুরাই বলেন কেরালা যেতে গেলে শেষ বর্ষায় যেতে হয়। অন্যান্য ঋতুতে বহুবার গিয়েছি।কিন্তু সেবার গেলুম শেষ বর্ষায়, শাওন পেরিয়ে ভাদরে। কোচি আমার প্রিয় জায়গা। সেখান থেকে বিশেষ দূর নয়। আসলে কেরালা আর গোয়ায় কিছুই 'দূর' নয়। তাই এই দু'টো জায়গা উপরনীচে বহুবার খেপ মেরেছি। কোচির উত্তরে থ্রিসুর, সেখান থেকে ষাট-সত্তর কিমি। ছবির মতো গ্রাম, গঞ্জ, কলাবাগান, নারকেল-সুপুরি'র বন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো টাকায় গড়ে তোলা অনন্যসুন্দর সব ঘরবাড়ি। সবুজ, ঘন সবুজ, লেবুসবুজ গাছগাছালির ভিতর থেকে বারবার উঁকি দিয়ে যায় লাল, গোলাপি টালি ছাদের বাংলোবাড়ি। লোকজন বিশেষ থাকেনা। ছেলেপিলেরা গালফে টাকা কামাচ্ছে। বুড়ো বাপ-মা যক্ষের মতো সেই সব ইন্দ্রপুরীর মতো বাড়ি সামলাচ্ছেন। থাকার মধ্যে শুধু নারকেল আর রবার ব্যারনদের মস্তো মস্তো হিংসেজাগানো প্রাসাদ। ---------------- টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি নামিয়ে দেয় আথিরাপল্লি বনবিভাগের সদর দরজায়। কখনও ঝমঝম, কখনও ঝিরঝির, বৃষ্টি সঙ্গেই থাকে। পাশের ছোটো দরজা দিয়ে ঢুকে পাথরবাঁধানো পথ, হলুদ রেলিং এবং চড়াই। কিছুক্ষণ পর উৎরাই শুরু , চারদিকে সবুজ, সবুজ এবং সবুজ। তার সঙ্গে ছোটোবেলায় পুরী গেলে রিকশায় স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে একটু এগোলেই যেমন জলের গর্জন শোনা যেতো, সেরকম জলের শব্দ। তবে সমুদ্রের মতো নয়। নানা স্কেলের জলরাশির সিম্ফনি যেন। অরণ্যের ভিতর দিয়ে ভেজা সিঁড়ি। রেলিং ধরে পায়ে পায়ে। একেবারে নীচে নেমে দেখি প্রায় গায়ের উপর একটা বিশাল জলপ্রপাত গর্জন করতে করতে নেমে আসছে। বৃষ্টি ধরেছে, কিন্তু প্রপাতের জলের ঝিরঝিরে ছিটে অবিশ্রাম। ক্যামেরা বার করতে পারিনা। লেনসে জলের ফোঁটা। একটু কাছে যাবার চেষ্টা পরিত্যাগ করলুম। মাথার উপর জল, পায়ের নীচে জল, সারা চরাচরে জল.... বুঝলুম ঈশ্বর কীভাবে জলে থাকেন। ----------------------- এবার আবার উঠে যাওয়া। চালাকুড়ি নদীর কাছে। খরস্রোতা ধারা আশি ফুট উপর থেকে নদীতে ঝরে পড়ছে। কী তার দাপট, কী তার রোয়াব। সেসব কথা শব্দে ধরা যাবেনা। ছবিতে দেখতে হবে। কয়েকটি ছবি রইলো এখানে। বুঝ লোক যে জানো সন্ধান....

1145

12

Somen dey

ঘজলের আঙ্গিনায়

ঘজলের আঙ্গিনায় ********* সকলকে ঈদ মুবারক । খুশির ঈদ খুশি বয়ে আনুক সবার মনে । কারণ খুশি বড় দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন । বিষন্নতা মহামারির মত ছড়িয়ে পড়ছে । তাকে যেমন করেই হোক আটকাতে হবে । বিষন্নতা ঠেকিয়ে রাখার একটা উপায় গান শোনা । একটা ঘজল শুনলে কেমন হয় ? অনেকের ধারনা ঘজলের লিরিক্সে এতটাই শক্ত শক্ত উর্দু কথা থাকে যে এক জন আম বাঙ্গালির পক্ষে বোঝাটা খুব মুসকিল হয়ে যায় । তাই অনেক বাঙ্গালিই ঘজল শোনাতে বিশেষ আগ্রহ দেখান না । ব্যাপারটা কিন্তু সে রকম নয় । একটু কষ্ট করে বুঝবার চেষ্টা করলে ঘজলের মধ্যে এক সঙ্গে পাওয়া যায় উঁচু দরের কবিতা এবং সঙ্গীতরসের মিলিত মাধুরী । একবার মজে গেলে খুলে যাবে পাওয়া হাজার মজার খাজানা । এই যেমন এই গানটি ।আজকের দিনে হয়ত খুব প্রাসঙ্গিক । শায়েরের নাম নিদা ফজলি । নিদা ফজলিকে একজন সেকুলার মনোভাবসম্পন্ন কবি বলা হয়ে থাকে ।দেশভাগের সময় তাঁর মা বাবা পাকিস্থানে চলে গেলেও তিনি এই হিন্দুস্থানেই থেকে যান। তিনি একসঙ্গে তিনি মীর , ঘালিব, মীরা, কবিরের ভক্ত । ভক্ত শুধু নামেই নন , এঁদের দর্শনের প্রভাব নীদা ফজলির রচনায় খুব স্পষ্ট । এঁর অনেক ঘজল এ দেশে খুব জনপ্রিয় । এবং এনার সব রচনায় তাঁর একটি সাক্ষর চেনা যায় । তূলনামূলক ভাবে কঠিন উর্দু শব্দের ব্যাবহার কম করেন । এই গানটি শুনবার আগে বা গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে গানটির একটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ দেখে নিতে পারেন । অনুবাদটি ভাবানুবাদের চেষ্টা , শব্দানুবাদের নয় । গানের spirit টি বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে । রাখা গেছে কিনা জানিনা । - খুব কষে গর্জাও তোমার রক্ত চোখে দেখাও ভ্রুকুটি বার বার তারপর, রুখা শুখা মাটিকে এক ফোঁটা সুখ দিও বৃষ্টি-ভেজার । পাখির ঠোঁটকে দিও কিছু শষ্যদানা আর শৈশবের হাতে দিও অমল খেলনা । কে বলেছে ধ্রুব সত্য দুয়ে দুয়ে চার সাবধানী লোকটাকে একবার দিও খুশি হারিয়ে যাবার । নীলাভ বিষের রঙ্গে চমকাক ঝিক মিক পেয়ালার কাঁচ হাজার মিথ্যার ভিড়ে চেনা যাবে, সত্যকে দিও তুমি এমন পোষাক। বিগ্রহের বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে তুমি সাথী হও সহস্র জনতার তারপর তোমার মন্দিরেতে, গান হোক শুধুই মীরার । তুমি আছো তাও, মানুষের অন্ধ ঘৃণা নিতে চায় মানুষের প্রাণ হে ঈশ্বর , জীবন কে শিখিয়ে দিও কি ভাবে মৃত্যু হয় শ্যাম-সমান । https://www.youtube.com/watch?v=4HRKN7LgbJk

1103

6

শিবাংশু

কয়েকটি কন্যা ও পাথরের মায়া

প্রায় চারদশক হলো, প্রথম যখন চাইবাসায় যাই, এক বন্ধু বলে, একটু কষ্ট করলে তোকে একটা দারুণ জিনিস দেখাবো। ও আমার পুরাতত্ত্বের নেশাটেশাগুলোর খবর রাখতো। তা একদিন চাইবাসা থেকে রতনলাল কোম্পানির বাসে চাইবাসা থেকে কেঁওঝড়ের দিকে রওনা দিই। সেই বাসযাত্রা নিয়ে একটা আলাদা ইতিকথা লিখে ফেলা যায়। এখন তা থাক। প্রায় সাত-আট ঘন্টা ধরে পাহাড়-জঙ্গল-গ্রাম-প্রান্তর-নদী-জলা পেরিয়ে কেঁওঝড় থেকে আবার করঞ্জিয়া'র দিকে অনেকটা গিয়ে তারপর নদী। নদীর সোঁতা বলাই ভালো। আর বাস যাবেনা। কখনও নদীর পাড়, কখনও নদীর সোঁতা, হাঁটতে থাকি। মাইলের পর মাইল। গ্রাম আসে, কুঁড়েঘর, মহান বট-অশথ, পুকুরপাড়ের শ্মশান আর সঙ্গে যায় একটা আধা সুখা নদী, নামটা চমৎকার। খয়রাবাঁধা। ---------------------- হঠাৎ দূর থেকে চোখে পড়ে একটা মস্তো কালোপাথরের মন্দির। চমকে যাই। বন্ধু হাসে, এবার বল, কেমন চমক লুকিয়ে আছে এখানে? সেই আমার প্রথম খিচিঙের মন্দির দেখা। ময়ূরভঞ্জের রাজাদের কুলদেবী কীচকেশ্বরীর মন্দির। দশম শতক থেকে ক্রমাগত ভেঙেছে, গড়েছে, কিন্তু তাকে শেষ করা যায়নি। পশ্চিম ওড়িশার প্রাচীন তন্ত্রপীঠ। এসব নিয়ে পরে লিখবো। এখন মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ শুধু কয়েকটি নারীর মূর্তির ছবি থাক এখানে। এরা কেউ নায়িকা, কেউ যক্ষী, কেউ রসিকা, কেউ বা শালভঞ্জিকা বা প্রোষিতভর্তৃকা বা নাগকন্যা। চিরাচরিত কলিঙ্গভাস্কর্যের প্রস্তরমাধ্যম বালিপাথর, গ্র্যানাইট বা রাজারানি পাথর দিয়ে তৈরি হয়নি এরা। ধূসর কালচে কঠিন ক্লোরাইট পাথরে খোদাই করা এসব কীর্তি। স্বপনে-জাগরণে এরাই তাড়িয়ে বেড়ায় কবিতায়, গানে। দেবীর গাথা নয়, মানুষীর কথা। নিষ্ঠুর মানুষের বিনাশপ্রবৃত্তি তাদের বিকৃত করেছে, কিন্তু বিনষ্ট করতে পারেনি।

1080

8

জল

বারোয়ারী গল্প|

ফ্লাইট লেট আছে| আগে থাকতে খবর নিলে একটু দেরী করেই বের হত| তবে ঝকঝকে এয়ারপোর্টে বসে থাকতে মন্দ লাগছে না| মনটা একটু আর্দ্র হয়ে আছে| এতবড় শহরে একা থাকবে রিনি এই চিন্তাটা মন থেকে যাচ্ছে না| আলাদা সমাজ‚ আলাদা শহর সবকিছুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে| জানে রিনি পারবে| তবু কোনদিন তো এভাবে ছেড়ে থাকেনি বোনটাকে| মা-বাবা যাবার পর থেকে সেই যে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল তা যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করে গেছে| একদিনের জন্যও বোনটাকে বাবা-মায়ের অভাব বুঝতে দিতে চায়নি| তবু জানে অভাব আছে‚ থাকে| কেউ কারও শূণ্যস্থান পূরণ করতে পারে না| তবু সে‚ সেই চেষ্টা করে গেছে| কোথাও না কোথাও গিয়ে তো ছাড়তেই হয়| না হলে আকাশে ডানা মেলে উড়তে শিখবে কি করে| রিনির একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত হোক সেটাই সমস্ত অন্তঃকরণ থেকে চায় সে| একটা সুস্থ‚ সুন্দর জীবন রিনির জন্য যেন অপেক্ষা করে থাকে| মেয়েটা এই বয়সেই একটা বড় আঘাত পেয়ে গেছে| দেখেছে বিশ্বাসঘাতকতার রুপ| সেসব পেরিয়ে আজকের রিনি যেন স্বয়ংসম্পুর্ণ হয়ে উঠতে পারে| কি ভাবছ? কফিটা হাতে ধরাতে ধরাতে কাপুর জানতে চায়| হুঁ‚ না কিছু না| অন্যমনস্কভাবে জবাব দেয়| কাপুর গতরাতে এসে হাজির হয়েছে| কিসব কনফারেন্স আছে| হোটেলে উঠেছে লোকটা| মিনি বলতে চেষ্টা করেছিল নিজের ফ্ল্যাট থাকতে কেন হোটেলে উঠলেন? লোকটা হেসে এড়িয়ে গেছে| রিনি না থাকলে হয়ত ফ্ল্যাটেই উঠত| একদিকে ভালো হয়েছে| মিনি নিশ্চিত যে আগামীদিনেও কাপুর এলে এই ফ্ল্যাটে উঠবে না‚ অন্তত যতদিন রিনি থাকবে| আসলে সম্পর্কটা আজ আর শুধু মাত্র ক্লায়েন্ট আর ভেন্ডারের নেই| লোকটার চোখে-মুখে মনের প্রতিফলন স্পষ্টত দেখতে পায় মিনি| এই লোকটাকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে| মাঝে মাঝে মনের কোণে একটা সুখ উঁকি দিয়ে যাচ্ছে| সেই সুখটা যেন তাসের ঘর না হয়‚ মনে মনে সে প্রার্থনা জানায়| আজকের দিনটা থাকতে পারতে মিনি| থাকলাম তো কটা দিন| আজকের দিনটা না হয় থাকতে| শহরটা দেখাতাম| তারপরে কোথাও লাঞ্চ করতাম| আবার কোথাও তোমায় নিয়ে ঘুরে আসতাম| শহরটা তো তোমার দেখাই হল না| বাস্তবিকই দেখা হয় নি তেমন করে কিছু| রিনির কলেরজে সবকিছু করতে করতেই সময়টা চলে গেল| যেটুকু সময় হাতে ছিল তাতে কয়েকটা ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরেছে মাত্র| আরও অনেককিছুই বাকি থেকে গেছে| হাসে মিনি‚ আর রিনি ও কি করত? ও যেত আমাদের সাথে| আমি কি ওকে রেখে যেতাম? হাসে মিনি| উপরোধে ঢেঁকি গেলা একে বলে জানেন| উহু না‚ তুমি আমায় আন্ডার এস্টিমেট করছ| আসলে মিনি‚ আমার রুখা-সুখা জীবনে তুমি না এলে বুঝতামই না জীবনে রুপ-রসের কত গুরুত্ব| সেই সতেরো বছর বয়স থেকে বিজনেস‚ পরিবার সব সামলাচ্ছি| দিদিদের বিয়ে দিলাম‚ বাবার বাজারে দেনা মেটালাম‚ বিজনেসটাকে একটু একটু করে বাড়ালাম| ভাইদের বিজেনেসে ঢুকিয়ে দিলাম| আজ আমার একাধিক বিজনেস| স্বাচ্ছন্দ্য কদম চুমছে| এসব করতে করতেই কখন যেন বয়সটা ঢলে পড়ল| আমায় দেখে হয়ত মনে হয় না‚ কিন্তু আমি নিজেই তো জানি অনেকটা রাস্তা সফর করা হয়ে গেছে| মা‚ দিদিরা যে সংসার করে দিতে চায়নি তা নয়‚ কিন্তু তখন আমি প্রয়োজন মনে করিনি| বিয়ে করার কি দরকার| এই তো বেশ আছি| পয়সা আছে‚ দুটো -চারটে রাত আমি অনায়াসে কিনতে পারি| কিন্তু কোনদিন ইমোশনালি কারও সাথে জড়িয়ে পড়িনি| কিন্তু তোমার সাথে জড়িয়ে পড়লাম| তুমি জানো না মিনি আমি প্রতি মুহুর্ত তোমার অভাব অনুভব করি| আমি জানি তোমার পেশায় ভালোবাসা শব্দটা রাখতে নেই| হয়ত আমি তোমার একজন ক্লায়েন্ট মাত্র| কিন্তু তুমি আমার জন্য অনেক বেশি কিছু| তোমার জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগে আমার| এইসব ব্যক্তিগত কথাবার্তা সে জানতে চাইতে পারে না| কিন্তু অনেক সময়েই অনেক ক্লায়েন্ট বলে| মিনির কাজ শুধু শুনে যাওয়া| আজ যেমন কাপুর বলছে| কিন্তু এই ক্ষেত্রটা আলাদা| কাপুরের জন্য নিজের মনের গভীরে সে একটা অন্যরকম অনুভুতি সে রাখে| খুব ভেসে যেতে ইচ্ছে করে মিনির| কিন্তু নিজেকে সামলে নেয়| মেঘলা আকাশের বুক চিরে বেড়িয়ে আসা আলোটাকে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে| মনের ইচ্ছেটাকে বুকের কোটরে চেপে রাখে সে|প্রকাশ হতে দেয় না| ডঃ রজতকে খুব ভালোবাসতে মিনি? একটু চমকে যায় মিনি| কিন্তু উত্তর দেয় না| রজত বলেছিল প্রথম ভালোবাসা কেউ বিস্মৃত হয় না| সেদিন রিনিকে ডঃ কে দেখিয়ে ফেরার পথেই বুঝেছিলাম| আর জানো আমি সেদিন থেকে খুব খুব ঈর্ষা করি রজতকে| রজতকে আমি ভালোবাসতাম| সেটা সেই অনেককাল আগে মিঃ কাপুর| ওটা আমার অতীত| আর আমি অতীত নিয়ে বাঁচি না| থেমে থেমে কথাগুলো উচ্চারণ করে মিনি| তুমি রাগ করলে মিনি? না| আলতো করে মিনির হাতের ওপর হাত রাখে কাপুর| স্পর্শে বোঝে মিনি‚ রজতের প্রসঙ্গ তুলে একটু যেন মিইয়ে গেছে কাপুর| হয়ত ভেবেছে মিনি ঠিক এতটা ব্যক্তিগত কথাবার্তা পছন্দ করছে না| মিনি সত্যিই পছন্দ করছে না এইসব কথাবার্তা| কিছুটা ব্যাক্তিগত থাকা দরকার| মুখের রেখায় হয়ত সেটাই ফুটে উঠেছে| কিছুটা সময় নিঃশব্দে বয়ে যায়| মিনির কেমন যেন অস্থির লাগে| এই নিঃস্তব্ধতাকে কেন যেন সে সহ্য করতে পারছে না| মনে হচ্ছে কাপুর কে যেন কোথাও সে আঘাত দিয়ে ফেলেছে| একটা ভয় যেন ওত পেতে বসে মনের গভীরে| এই ভালোবাসাটা সে হারাতে পারবে না| ভেতরটা আবার আর্দ্র হয়ে যাচ্ছে| চুপ করে গেলেন যে? নাহ এমনি| আমার কিন্তু সময় হয়ে এল মিস্টার কাপুর| অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে এবার তো উঠতে হয়| মিনি একটা কথা বলব তোমায়? বলুন| আমার কাছে থাকতে পার না তুমি? তোমাকে ছেড়ে থাকাটা বেশ টাফ হয়ে যাচ্ছে| আমি খুব মিস করি আজকাল তোমায়| গলাটা কেমন যেন বুঁজে আসছে| উঠে পড়ে মিনি| গলাটা পরিস্কার করে নিয়ে বলে‚ না মিঃ কাপুর আপনার কাছে আমি থাকতে পারি না| কেন? আমি তো তোমায় ভালোবাসি| জানি| আর এই জানাটাকে আমি বড় করে দেখতে চাই মিঃ কাপুর| কেউ তো আছে যে আমায় ভালোবাসে‚ যার কাছে আমি অনায়াসে কিছু চাইতে পারি‚ যাকে বন্ধু মনে করতে পারি| সেই জায়গাটাই থাক| রোজকার জীবনের মালিন্য দিয়ে সেটাকে নষ্ট করে দেবেন না| চলি| এগিয়ে যায় মিনি| চোখের কোণে বাষ্প জমা হয়| দেখানো যাবে না| দুর্বল সে হবে না| দুর থেকে হাত নেড়ে আসি বলে লাউঞ্জে ঢুকে যায়| একটা কষ্ট ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে উঠছে| এই কষ্টটা সে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চায়| বাঁচিয়ে রাখতে চায়| পিছন ফিরে আর তাকায় না| জানে এক জোড়া ব্যথাতুর চোখ তাকিয়ে আছে তার চলে যাবার দিকে| ঐ চোখের দৃষ্টি সে সহ্য করতে পারবে না| এগিয়ে চলে সে সামনের দিকে| (শেষ)

2584

106

Joy

চল বন্ধু হারিয়ে যাই...

চল বন্ধু হারিয়ে যাই... ঠিক সময়েই চলে এলাম আমাদের গন্তব্যস্থলে| আশীষ আগেই চলে এসেছিল| আমাকে দেখেই ও হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল| whatsappএ ওর ছবিটা আগে দেখেছি| তাই ওকে চিনতে সময় লাগেনা| চল ঐ চায়ের দোকানে আশীষ আমাকে টেনে নিয়ে গেল| ওখানে শ্যামল ও আছে| দেখি দোকানে দু-চারজন লোক বসে আছে| আশীষ আমার দিকে তাকিয়ে বলল দ্যাখতো শ্যামল কে চিনতে পারিস কিনা| ঐ লোকগুলোর দিকে ভাল করে বার বার চেয়ে দেখলাম| না কেউ তো চেনা চেনা মনে হচ্ছে না| আরে ধুর| কেউ নেই তুই ইয়ার্কি মারছিস না তো? আছে‚ ভালো করে দ্যাখ| না পারলাম না| দেখি দোকান থেকে একটি লোক বের হল| আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি শ্যামল| তোকে আমি ঠিক চিনতে পেরেছি| তোর হাসিটা একই রকম আছে| ওকে চেনার কোন কারনও ছিল না| প্রথমত এতদিন পরে দেখা| দ্বিতীয়ত ওর আগের সঙ্গে এখনকার চেহারার বা মুখের মিল নেই| মাথায় টাক পরেছে| চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে| আস্তে আস্তে এসে জড়ো হল পঙ্কজ আর মাইতি| আমাকে দেখেই মাইতি জড়িয়ে ধরল| ওর চেহারায় একটু ভারিক্কি ভাব এসেছে| বলল তুই একই আছিস| এসেই বলল তোর মনে আছে তোকে একবার আমার জন্যে মুখার্জী বাবু স্যারের কাছে শাস্তি পেতে হয়েছিল? হ্যাঁ‚ মনে আছে| তখন আমরা ক্লাস সিক্সে| একদিন মুখার্জী বাবু স্যার ক্লাসে এলেন| আমাদের পড়া দিয়ে উনি চোখ বন্ধ করে হাল্কা নিদ্রায় চলে যেতেন| উনি ক্লাসে এসে তার চশমাটা খুলে বেঞ্চিতে রেখেছেন| আমাদের খুনসুটি চলছে| হঠাৎ মাইতি আমাকে এক ধাক্কা দিল| আমি আচমকা ধাক্কা সামলাতে না পেরে হাত লেগে এল স্যারের চশমায়| চশমা নীচে পরে যাওয়াতে স্যারের ঘুম ভেঙ্গে গেল| আমাকে দেখেই স্যারের রাগ গিয়ে পড়ল আমার উপর| স্যারকে অনেক বার বললাম আমার কোন দোষ নেই| কিন্তু আমার কোনো কথায় স্যার কান দিলেন না| শাস্তি নীল ডাউন| অনেকদিন আগেকার ঘটনার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম| আজ অনেক দিন পরে সেই কথাটা মনে করে বেশ হাসি পেল| মাইতিকে রাগ করে বললাম তোর জন্যেই আমি সেদিন শাস্তি পেয়েছিলাম| একপ্রস্থ চা পর্ব হল| কথা বলতে বলতে বার বার ফিরে আসে আমাদের শৈশবের সেই ফেলে আসা দিনগুলো| শ্যামল আমাকে জিজ্ঞেস করে মাসিমা‚ মেশোমশায় কেমন আছেন রে? প্রশ্নটা শুনে থমকে গেলাম| বাবা বছর পাঁচেক আগে‚ মা বছর খানেক আগে মারা গেছেন| আমাদের বাড়িতে সব বন্ধুদেরই আসা যাওয়া ছিল| আমার মা-বাবা খুব অনায়াসেই আমার বন্ধুদেরকে আপন করে নিতেন| তখন প্রত্যেক বন্ধুরাই সবারই বাড়িতে চেনা| আজ তাদের অনেকেরই মা-বাবা চলে গেছেন অনেক দুরে| আশীষের বাবা আগেই মারা গেছেন‚ ওর মা ক্যানসারে ভুগছেন| পঙ্কজ আর আমার একই দশা| বললাম চল একবার সাউ এর দোকানে যায়| ওখানের তেলেভাজা অনেক দিন খাওয়া হয়নি| আমাদের এখানে থাকার সময় লক্ষী নারায়ন সাউএর তেলেভাজার সঙ্গে আমাদের খুব অন্তরঙ্গতা ছিল| অপুর্ব স্বাদ| সবসময় তেলেভাজার দোকানে লম্বা লাইন| আজও সেই একই রকম লাইন| স্বাদ এখনো একই আছে| খেতে খেতে মাইতি আমাকে বলল তোর সুদীপ্তকে মনে আছে? সুদীপ্ত মানে লক্ষী ঠাকুর? হ্যাঁ হ্যাঁ | ওকে মনে আছে একটা অদ্ভুত এক ঘটনার জন্যে| তখন আমরা ক্লাস সেভেনে| আমাদের ক্লাস নিচ্ছেন নীলু বাবু স্যার| আমি‚ সুদীপ্ত‚ মাইতি তিনজনে একই বেঞ্চে বসতাম| হঠাৎ দেখি সুদীপ্ত আমাদের ক্লাসের খোলা জানালারটার দিকে তাকিয়ে হাউ-হাউ করে কাঁদছে| আমরা সবাই বেশ হতবাক| নীলু বাবু স্যারও পড়া থামিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করল‚ কি হয়েছে তুমি কাঁদছ কেন? সুদীপ্ত জানালাটার দিকে তাকিয়ে বলে আমি লক্ষী ঠাকুর দেখেছি| ঠাকুর এসেছিল| ক্লাসে সবাই ওর কথা শুনে হেসে উঠল| স্যারও অপ্রস্তুত| কি বলবে| বললেন তোমার শরীর ঠিক আছে তো? ও বলে হা স্যার| যাইহোক সেদিন ও কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল|সে থেকে ওর নামই হয়ে গেল লক্ষী ঠাকুর| খুব সরল‚ সাদামাটা ছেলে ছিল| ওর সরলতার জন্যে অনেকে ওর সঙ্গে মজা করত| ক্লাস এইটের পর ও অন্য স্কুলে ভর্তি হল| ওর বাড়ি ছিল মসজিদ বাড়ি স্ট্রীট এলাকায়| ওর বাবার একটা লেদের কারখানা ছিল| মাইতি বলল বেশ কিছুদিন আগে ওর বাড়ি গিয়েছিলাম সুদীপ্তর সঙ্গে দেখা করতে| কিন্তু ওর বাড়িতে গিয়ে জানলাম| ও আর নেই|ও accidentএ মারা গেছে| মনটা খারাপ হয়ে গেল| আমরা সত্যিই ওকে কোনদিন বুঝিনি| ঠাকুর দেখা নিয়ে মজা করেছি| সে সত্যিই আমাদের ছেড়ে খুব তাড়াতাড়ি চলে গেছে ঠাকুরের দেশে| মনে মনে বললাম যেখানেই থাকিস‚ ভাল থাকিস বন্ধু| অনেকদিন পর হাঁটতে হাঁটতে অলি গলি পেরিয়ে যাচ্ছি| পুর্ণশ্রী সিনেমা হলটার পাশ দিয়ে যাবার সময় শ্যামল বলে মনে আছে তোদের আমরা এই পূর্ণশ্রী তে অমিতাভ বচ্চনের হম সিনেমাটা দেখতে এসেছিলাম| ফার্স্ট ডে‚ ফার্স্ট শো| ফিসফিসিয়ে বললাম মনে আছে| আরও মনে আছে টকীশো হাউসে ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া দেখার জন্যে আমাদের পাগলামো| স্কুল ছুট| বাবার কাছে বকুনি| সিনেমা দেখে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম এগরোল খাওয়ার আনন্দ| পুর্ণশ্রী‚ সারকরিনা‚ বিজন‚ রংমহল এইসব থিয়েটার আর সিনেমা হলগুলো আজ পরিত্যক্ত| কেমন চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে| ছোটবেলায় এই অঞ্চলটা ছুটির দিন‚ শনি‚ রবিবার ভীড়ে ঠাসা থাকত| টিকিটের লম্বা লাইন| শ্রী‚ উত্তরা হলগুলো অনেকদিন আগেই শপিং মল হয়ে গেছে| তখন এই সব হলগুলোর সামনে টিকিট ব্ল্যাকারদের জটলা| সামনে হাউসফুল বোর্ড ঝুলছে| কত বিখ্যাত সব অভিনেতা-অভিনেত্রী আসতেন এই থিয়েটার হলে অভিনয় করতে| আজ এখানে সেই জৌলুস আর নেই| ভূতুড়ে বাড়ির মত পরে আছে এরা একগাদা স্মৃতি নিয়ে| হয়ত একদিন এই সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে| এখানেই গড়ে উঠবে বহুতল আবাসন বা শপিং মল| পঙ্কজ কে বললাম তুই মাঝখানে দেশের বাড়ি চলে গিয়ে অনেক কিছু মিস করেছিস| ও হেসে বলল এবার সব পুষিয়ে নেব| আমরা সবাই হেসে উঠলাম| মনে মনে বললাম আর আমরা তো সেই ছোটবেলার সোনালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে পারব না| যা আমরা সযত্নে আগলে রেখেছি আমাদের স্মৃতিতে|

1150

18

James

বারোয়ারী ব্লগ: ভোটরঙ্গ- দেশে দেশে

বারোয়ারী ব্লগ| ভোট- ডাউন আন্ডার আজ ছিল ভোটপূজার দিন| এখানে শনিবারে ছুটির দিনেই হয় যার ফলে পড়ে পাওয়া ছুটি ইল্লা| ক্যাজুয়াল লীভ বলে কোন বস্তুই নেই| ছুটি মাহাত্ম্য অন্য কোন সময় লেখা যাবে| কমপালসারি ভোটিং| না দিলে ৫০ টাকা ফাইন এবং তাতে কোন ভুল নেই| ডাক্তারের সার্টিফিকেট বা উপযুক্ত প্রমাণ না দিতে পারলে মাফ নেই| এই বাধ্যতা না থাকলে দশ প্রতিশত ভোট লোকে ভোট দিতো কিনা সন্দেহ| ১০০% ইগালিটারিয়ন সোসাইটি‚ প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কেউ হোক ইন্টারভিউয়ে কোন ছাড় নেই‚ এমনকি সরকারী টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক যখন তাদের চেয়ারমানকেও ইন্টারভিউ নেয়| সাধারণ লোকেও তাই‚ মন্ত্রী সান্ত্রী কুছ পরোয়া নেই| নিউ সাউথ ওয়েলসের এক মন্ত্রী তার কোন আত্মীয়কে প্রাইম লোক্যালিটিতে একটা দোকান বা কফিশপ জাতীয় কিছু পাইয়ে দিয়েছে‚ তাতেই গিল্টি সাবিদ হয়েছে‚ ১৪ বছর জেল হতে পারে| ওয়েষ্ট অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার (=CM) একবার ট্যুরে ১৬০০০ ডলার ভুল বিল দিয়েছিল‚ বেচারী ৬ মাস জেল খেটেছে| বাতাবরণ দেওয়া হলো| এবার ভোট পদ্ধতি| অল্প লোক হোনেকে নাতে‚ প্রদেশের যে কোন কেন্দ্রে ভোট দেওয়া যায় (তাইতো দেখেছি‚ নিজেও দিয়েছি)‚ পোষ্টাল ব্যালটও আছে আর আছে pre-poll‚ মহালয়ার দিন থেকেই ঠাকুর দেখা শুরু হয় মানে‚ আগে থেকেই কিছু নির্ধারিত সেন্টারে ভোট দেয়া যায়| আমি দিনের দিন ভোট দেওয়াতেই (এই দেয়া ‚ দেওয়া নিয়ে কেউ কি বলবেন- কোনটা কারেক্ট? দেয়া নেয়া ইঁয়াদ হ্যায় তবু! সে অবশ্য তনুজার জন্যে‚ তখনকার| এখনকার বুড়ীমাসীর জন্যে নয়) স্বচ্ছন্দ বোধ করি‚ একটু মেলা মেলা ভাব| ওহ এবার সংক্ষেপে সারি| কারণ গতকালের চিকেনহীন রাইস নুডল স্যুপ রিপেয়ার করবার জন্য চিকেন পীস কিনে এনেছি| তাছাড়া কেউ পড়েও না এত কষ্ট করে টাইপ করা‚ বিফলে যাঞিনু! একটু ক্লিক মেরে লাইকও দিতে জনগণের আলস্য‚ আমিই শালা খেটে মরি কেন? আমার তো সুনীলদা বলে ১৬-৬১ কেউ ডাকবে না| ওকে‚ ওটা ২৬ টু ৬২ করে দিলাম| ৩৬ টু ৬৩ ভি চলেগা| ভোট্পত্র দুটো-সবুজ লোয়ার হাউস‚ সাদা সেনেট (আপার হাউস)| লোয়ারে সকলকে ১‚ ২‚ ৩ ক্রমানুযায়ী বক্সে লিখতে হবে কারন প্রেফারেন্স ভোটিং বলে কাউন্ট হয়| ম্যাক্সিমাম ভোট পেলেই হলো না‚ টু পার্টি প্রেফারড‚ সে গভীর ক্যালকুলেশন| আমি যে পার্টিকে দিতে চাই তারাই কেন্দ্রের মুখে হাতে চোতা ধরিয়ে দেয়‚ তাই দেখে দেখে টুকলিফাই| সেনেট ভীষণ গোলমেলে; এবারে যেমন লাইনের ওপরে ৬ জনকে ১‚ ২‚ ৩‚ . .৬ অব্ধি ভরতে হলো| আর লাইনের নীচে হলে ১‚ ২‚ ৩‚ ৪‚ ৫‚ ... ১২ অবধি লিখতে হবে| কারণ জানি না‚ যেমন জানিনা সুপার অ্যানুয়েশনের ফর্মুলা বা পে রিভিশনের (আমাদের) কি কি অফার; ওসব ভাবার লোক আছে| সকলের সাথে আমার ভাগ্যও নির্ধারিত হবে তবে কিঁউ ঝামেলা লেনেকা? বরং দিদি নং ওয়ান দেখাও লাভের‚ মিষ্টি হাসি; ঝড়বাবু শুনছেন‚ কাঠ-কাঠ নাকি কাঠি-কাঠি? আহা জিভ কাটা! সেনেটের ব্যালট এক মিটারের চেয়ে বেশী লম্বা| ছবি দ্রষ্টব্য| জয়রামজীকী| বি: দ্র: ভোট দিলাম কাকে? বরাবরের মতো লেবার পার্টিকে‚ ওয়ান্স এ বাম অলওয়েজ এ বাম (নট বামা!) তাই বলে সিপিয়েম নই‚ তিনো ও নই| আমার মনোমত একটা পার্টিও আছে‚ Australian Sex Party‚ তবে ঠিক জানিনা তাদের ম্যানিফেস্টো কি! যেখানে দেখিবে সেক্স‚ মারিবে টিক! (a la Khushwant. RIP)

1076

2

মনোজ ভট্টাচার্য

গচ্ছিত কী আছে !

গচ্ছিত কী আছে ! 'ব্যাঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়' । সাইন বোর্ডে বড় বড় করে লেখা বিজ্ঞাপন দেওয়া থাকে । এক বয়স্ক আদিবাসী আমেরিকান কৌতূহলবসে একটা ব্যাঙ্কে ঢুকলো । একজন স্মার্ট দেখতে এজেন্ট এগিয়ে এসে তাকে বসালো । - কি করতে পারি স্যর আপনার জন্যে ! সেই আদিবাসী কাচু মাচু হয়ে বলল – পাঁচ হাজার ডলার ধার পাওয়া যাবে ? - নিশ্চয়ই যাবে । - সেই এজেন্ট তাড়াতাড়ি একটা ঋণের দরখাস্ত এনে নিজেই ভর্তি করতে লাগল । - টাকা নিয়ে আপনি কি করবেন স্যর ? রুপো কিনবো - গয়না তৈরি করে বিক্রি করবো । কোলাটেরাল কি আছে আপনার ? সেটা আবার কী ! আমি তো কোলাটেরাল মানেই জানি না ! কোলাটেরাল মানে হল স্যর – এই আপনার ঋণের সমপরিমাণ মুল্যবান কি কি জিনিস আছে – যাতে আপনার ঋণের খরচ শোধ হতে পারে । - আপনার কি কোনও গাড়ি আছে স্যর ? হ্যা – একটা ১৯৪৯ মডেলের শেবী পিক আপ ট্রাক আছে । - গ্রহিতা উত্তর দিল। আচ্ছা – আপনার পোষা জীবজন্তু কিরকম আছে ! – ব্যাঙ্কের এজেন্ট প্রশ্ন করছে । হ্যাঁ – একটা ঘোড়া আছে । তার বয়স কত হবে ? বয়স তো ঠিক জানিনা । তবে তার কোনও দাঁত নেই । এইরকম প্রশ্নের পর প্রশ্ন হতে হতে অবশেষে ঋণ মঞ্জুর হল । আদিবাসী ভদ্রলোক টাকা নিয়ে বাড়ি চলে গেল । কয়েক সপ্তাহ পরে – সেই বয়স্ক ভদ্রলোক ব্যাঙ্কে এলেন । এক বান্ডিল টাকা বার করে বলল – আপনাদের ঋণ শোধ করতে এলাম । এই নিন টাকা । ব্যাঙ্কার তার প্রাপ্য টাকা নিয়ে – দেখলেন আরও অনেক টাকা তার কাছে আছে । এত টাকা নিয়ে আপনি কি করবেন স্যর ! কি আর করবো – বাড়িতে রেখে দেবো । এখন তো - বারে যাবো – মাল খাবো – জুয়া খেলব - ফুর্তি করবো । আমাদের ব্যাঙ্কে জমা করে দিন না স্যর ! ব্যাঙ্কার তাকে অনুরোধ করলো । - এতে আপনার টাকার অনেক সুদও হবে ! ব্যাঙ্কে রাখবো । আমি তো জানিই না ব্যাঙ্কে কি করে টাকা রাখে ! কোনও অসুবিধে নেই - আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি স্যর – আপনি টাকাগুলো আমাদের ব্যাঙ্কে জমা করে দিন । ব্যাঙ্ক আপনার টাকার দেখাশোনা করবে । যখনই আপনার টাকার প্রয়োজন হবে – তখনই টাকা তুলতে পারবেন ! – বলে এজেন্ট একটা ডিপোজিট শ্লিপ দিল । সেই আদিবাসী ভদ্রলোক খানিক চুপ করে থেকে - টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন – তা তোমাদের কি কি কোলাটেরাল আছে – বল দেখি ! মনোজ

979

10

জল

আবার পুরী

সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা| আকাশ সাজছে যেন রণাঙ্গনের তরে| সমুদ্র থেকে অনেকটা দূরে আজ চেয়ারগুলো পাতা| ভিজে ভিজে লবণাক্ত বাতাসে মিহি ঠান্ডার পরশ চোখের পাতা ভারী করে তুলছ| কাল সারারাত ঘুমের মধ্যে বৃষ্টির জলতরঙ্গ বেজেছে| চা পর্ব শেষ| সমুদ্র যেন আজ নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসছে| চলে যাব বলে বুঝি এত রাগ! ফেনায় ফেনায় চারিদিকে যেন দাঁতের নিষ্পেষন| আহা এত রাগ ভালো না জানো তো? আরও উচ্ছ্বাস আসে| দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক না ছুঁই পানি ভাবতে ভাবতেই সমুদ্রের প্রবল উচ্ছ্বাসে তাল সমলাতে না পেরে পড়ে যান| পৈশাচিক হাসি ছড়িয়ে পড়ে ফেনা ফেনা হয়ে| তুম নেহি তো কোহি ওর সেহী| হাসি| ঐ দেখ আবার রেগে যাচ্ছ| আচ্ছা এই যে বারবার ছুটে আসা তোমার টানেই তো? তবে‚ আবার হবে গো দেখা‚ এ দেখাই শেষ দেখা নয় গো| তবে আবার কবে আসব আমি জানি না| জেলে নৌকাগুলো আজ পরপর খুব দ্রুত পাড়ে আসার চেষ্টা করছে| প্রকৃতির সন্তান ওরা তাই হাওয়ার গতি বোঝে| সমুদ্রের ওপর যেন কালো চাঁদোয়া কে টাঙ্গিয়ে দিয়েছে| টপটপ করে দুটো ফোঁটা এসে গায়ে পড়ে| চা ওয়ালা বলে শ্যামলদাকে‚ বাবু বসতে পারবেন না| আমি চেয়ার তুলে নেব| বৃষ্টি আসবে| উঠে পরি| চা ওয়ালা একটা চেয়ারকে বালিতে গেঁথে দিয়ে তার ওপর পরপর চেয়ারগুলো চাপিয়ে দিয়ে শিকল দিয়ে বালিতে গাঁথা একটা খুঁটিতে বেঁধে দেয়| আজ সকালে ওর বিক্রি মার খেল| হলিডেহোমে ফিরতে না ফিরতেই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামে| সবকটা ঘরের লাগোয়া একটা ছাদ আছে যেখানে বেশ কটা ফুল গাছ| বৃষ্টির তালে তালে হাওয়ায় দোলে ওরা| এই ছাদটার ঠিক নীচে একটা জগন্নাথ দেবের মন্দির| হলিডেহোমের ভদ্রলোকের পরিবার অত্যন্ত ভক্তশীল| জগুদাদার ঘরে এসি লাগিয়ে রেখেছে| তাদের নিজেদের ঘর দোর গুলো খুব সুন্দর করে সাজানো| দামী আসবাবপত্র‚ দামী পর্দা| সবেতেই বেশ রুচি আছে ভদ্রলোকের| টালির বাড়ি থেকে উত্তরণ| বৃষ্টি আর থামে না| সামনের রাস্তায় জল দাঁড়িয়ে গেছে| সামনের বাড়িগুলো ঝাপসা| আজ একদম খিচুড়ি খাওয়ার দিন| বৃষ্টি ধরতে ধরতে নটা বেজে যায়| সমুদ্র সামনে বলেই আর জায়গাটা ঢালু বলেই বুঝি জমা জল বৃষ্টি থামতেই পাস হয়ে যায়| শ্যামলদা আর দীপঙ্কর বাজার চলে যায়| আজ পাঁঠার মাংস‚ আলুর চোকা আর আমের চাটনি হবে| একটু পরেই ফিরে আসে| জলখাবারের আজকের অয়োজন আরও বেশি| পাউরুটি‚ কলা‚ জিলিপি আর আম| বেশ ভালো কম্বো| বাড়িতে হলে পাউরুটির সাথে আমের এই কম্বিনেশনটা হারগিস মানতাম না| আয়োজন শেষে রান্না করতে করতে বেলা বারোটা বেজে গেল| সবার গজা মানে আর কি খাজা কেনা হয়ে গেছে আমাদের হয়নি| শ্যামলদা লাস্টে রান্নার অবশিষ্ট ভার নিলেন| মুন্নাবৌদিরও কিছু কেনার আছে‚ সোমা এমনিই যাবে| অতএব বেরোনো হল| আর কিনতে যাওয়া মানেই আদেখলী হয়ে যাওয়া| এটা দেখছি‚ ওটা দর করছি‚ কিনি আর না কিনি‚ বাঙালী বলে কথা| ওরা ফিরে গেল| আমরা গেলাম কাকাতুয়ার দোকানে| ভাবছিলাম এই লোকটাকে কিডন্যাপ করলে বেশ ভালো মুক্তিপণ আদায় করা যাবে| গলার মোটা চেনটায় তো কুকুর বাঁধা যাবে| হাতের রিস্টলেটটাতে ক ভরি আছে হিসাব করার চেষ্টা করি| কেনা সাঙ্গ হল| এবার ফেরা| খেতে বসে আহা উহু করতে করতেই খেয়ে ফেলি গোটা কয়েক মাংসের টুকরো| হেভি ঝাল দিয়েছে‚ ওদের অব্শ্য ঝাল লাগছে না| কিন্তু ছাড়াও যাচ্ছে না| একে ফেবারিটা তায় আবার রেঁধেছেও হেভি| দুপুরবেলা বাকি গোছগাছ সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে শেষবারের জন্য সমুদ্র তীরে গিয়ে বসি| আজ স্বর্গদ্বারের একদম সামনের সী বীচটার বাঁদিকে| ফিরতে সুবিধা হবে| এখানটায় যত দোকান‚ তত লোক| একজন স্যান্ড আর্ট বানিয়েছে| মহাদেব| বেশ সুন্দর| দশ টাকা ফটো তুলতে| ওটাই ওর বৃত্তি| দীপঙ্কর ফটো তোলে দশ টাকা দিয়ে| এদিকে গত পরশুর খাওয়া বাকি আছে‚ সেই যে সানগ্লাসটা নুপুর খুঁজে পেতে নিয়ে এসেছিল| আজ সবাইকে মদনোমোহোনো খাওয়াবো| একটু পরেই দেখি আরে স্বর্গদ্বারের সামনের বীচটার চারিদিকে দড়ি দিয়ে ঘিরে দিয়েছে| মাঝে একখানা কাঠের চারধার ঘেরা পাটাতন| শুনলাম সমুদ্র পুজো হবে| সে আবার কি? এতবার এসেছি দেখিনি তো কোনদিন| দেখতে ভিড়ও জমেছে| অনেকগুলি ছেলে‚ সবাই মনে হয় কোন আশ্রমের শিক্ষার্থী| আরতির সামগ্রী নিয়ে এসে জড় হন| তাদের গুরুরাও আসেন| সব গোছগাছ করে শুরু হয় পুজো| তিনজন শিক্ষার্থী সমুদ্রের দিকে এগিয়ে পিছিয়ে কৃষ্ণনাম করতে থাকে| জল আসলেই তারা পিছিয়ে আসে| এই মুহুর্তে তারা জলে পা দেবে না| বন্দনা শেষ হলে শুরু হয় আরতি আর তার সাথে বন্দনা| বেশ আধ ঘন্টা চলার পর শেষ হয়| এবার সবার সামনে নিয়ে আসে আরতির প্রদীপ| সবাই তাত নেয়| প্রসাদ নিয়ে আসে নুপুর| কিসমিস| দেখতে দেখতে সাতটা| কিনি মদোনোমোহোনো| এবার ফেরার পালা| একটু একটু মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে ঐ নিকষ কালো শুভ্রতার জন্য| প্রতিবার হয়| ঘরে ফিরে শেষ পর্যায়ের একবার দেখে নেওয়া কিছু ফেলে গেলাম নাতো| রুটি আর মাংস অল্প করে খেয়ে নিয়ে সবাই জিনিসপত্র নিয়ে বারান্দায় এসে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম| ট্রেন ধরতে যাবার সময় একটা অস্থিরতা বারবার টের পাই| মিস না হয়ে যায়| মিস হবে না জানি‚ তবু একটা অস্থিরতা চলে| অটোর আসার কথা নটায়‚ আসে সাড়ে নটায়| দুটো অটোতে সব জিনিসপত্র চাপিয়ে আমরাও চেপে বসি| মনটা বেশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে| রোডে পড়তেই সামনের বিস্তীর্ণ জলরাশি অন্ধকার ফুঁড়ে হাতছানি দেয়| যেও না‚ থাক| এসো আমার কাছে| আরও বেশি যেন মনখারাপ হতে থাকে| ফাঁকা রাস্তা দিয়ে অটো ছোটে| পুলিশ ফাঁড়ি পেরিয়ে যেতেই মনটা আর্দ্র হয়ে ওঠে| ইস আর একটা দিন থাকলে বেশ হত| প্রতিবার এমনটাই হয়| গাড়ির মধ্যে সবারই মনখারাপ| শুধু সমুদ্র নয়‚ এই যে বাঁধনহীন কয়েকটা দিন‚ এই যে একসাথে পরিবার হয়ে থাকা সবকিছু মিলিয়ে একটা মনখারাপ| স্টেশন এসে যায়| মালপত্র নেমে গেছে| এগিয়ে চলি| ট্রেন দিয়ে দিয়েছে| মনখারাপটা একটু একটু করে যেন সরে যাচ্ছে| জানি ট্রেনটা চলতে শুরু করলে মনখারাপটা আর থাকবে না| আর সকালবেলা টিকিয়াপাড়া ক্রশ করলেই মনে হবে কতক্ষণে বাড়িতে ঢুকব| আহা আমার সেই ঘর‚ ঘরের আসবাবপত্র‚ মা‚ কাই সবাই আমার পথ চেয়ে বসে আছে| নাহ বিদায় পুরী| বিদায়|

1821

98

শিবাংশু

চিরমধু নিষ্যন্দ

লাতিন নামটার মধ্যেই একটা ধর্মীয় অনুষঙ্গ আছে। তাকে বলে Ficus religiosa। বাংলায় নাম অশ্বত্থ, হিন্দি'তে পিপল। ঐতিহ্যগতভাবে পবিত্র এক বৃক্ষ। কিন্তু খ্রিস্টের জন্মের চার-সাড়ে চারশো বছর আগে কপিলাবাস্তুর রাজকুমারের দৌলতে এই বৃক্ষ হয়ে দাঁড়ায় এক পবিত্রতম প্রতীক। নৈরঞ্জনা নদীর তীরে এই রকম একটি বৃক্ষের ছায়ার নীচে আসন নিয়ে রাজকুমার সিদ্ধার্থ ধ্যানে বসেছিলেন। সাতদিন একাসনে সাধনার পর তাঁর বোধিলাভ হলো। বৃক্ষটিও চিরকালের জন্য বোধিফলের পুণ্যার্থী হয়ে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধি লাভ করলো। ক্যাথোলিকদের জন্য যেমন সন্ত পিটারের ব্যাসিলিকা, ইসলামে যেমন কাবা, তেমনি সদ্ধর্মে এই বৃক্ষ যাবতীয় আরাধনার নাভিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। --------------------------- স্বীকার করতেই হবে তার পুণ্যফল কালজয়ী। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুষ্যমিত্র সুঙ্গ, সপ্তম শতকে শশাঙ্ক এবং ১৮৭৬ সালের বিধ্বংসী ঝড় এই বৃক্ষকে বিনাশ করেছিলো। কিন্তু ফিনিক্সের মতো সে জেগে উঠেছিলো বারবার নিজেরই নব অংকুরের গৌরবে। খ্রিস্টপূর্ব ২৮৮ সালে সম্রাট পিয়দস্সি অশোক, কন্যা সঙ্ঘমিত্তার হাতে পাঠিয়েছিলেন এই বৃক্ষের কিশলয় সিংহলের অনুরাধাপুরায়। সেখানে বোধিবৃক্ষকে 'বো' বলা হয়ে থাকে। ঝড়ে উৎপাটিত হয়ে যাবার পর ১৮৮১ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম সাহেব অনুরাধাপুরার বো'বৃক্ষের অংকুর নিয়ে এসে বোধিবৃক্ষের মূলভূমিতে তাকে আবার আরোপিত করেন। এই বৃক্ষের অধিষ্ঠানভূমির নাম 'পল্লংক'। সারাবিশ্বের সমস্ত বৌদ্ধবিশ্বাসীদের কাছে তা হলো পবিত্রতম তীর্থস্থান। মাহাত্ম্যের ক্রমে তার পরেই আসে শ্রীলংকায় অনুরাধাপুরার 'বো'বৃক্ষ ও শ্রাবস্তীর আনন্দবোধি। ---------------------------- আমরা তো বিহারের সন্তান। বোধিবৃক্ষের সঙ্গে আজন্ম আত্মীয়তায় বাঁধা। অধিকন্তু অনুরাধাপুরার 'বো'বৃক্ষের সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্যও হয়েছে। এই সব বৃক্ষরাজি শুধুমাত্র উদ্ভিদ নয়, তা মানুষের শাশ্বত বোধির প্রতীক হয়ে সর্বজনমান্য আস্থার ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে আবহমান কাল জুড়ে। তাদের ছায়া আমাদের গ্লানির থেকে রক্ষা করুক। হে করুণাঘন মহাপ্রাণ, তোমার বৃক্ষের আশ্রয় ধরণীতলকে কলংকশূন্য করে তুলুক।

1061

8

stuti..

অবশেষে ভ্রমণ

ছোট্ট লাসা ____________ বাস থেকে নামতেই হিমেল হাওয়া জড়িয়ে ধরলো । এক নিমেষে দিল্লির গরমে ক্লান্ত বিধবস্ত শরীর মন তরতাজা হয়ে উঠল । ঘুম চোখে সামনে দিকে তাকাতেই দেখি বিরাট পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ।আমরা পৌঁছে গেছি হিমালয়ের কোলে ধরমশালায় । আগামী কয়েকদিন পাহাড়ের আনাচেকানাচে প্রকৃতিকে দুচোখ ভরে উপভোগ করবো । আই এস বি টি থেকে বাসে ওঠার সময় বরের এক পুরানো কলিগের সাথে দেখা হয়ে গেল । সে এখন মিলিটারী সার্ভিসে , ধরমশালায় পোস্টিং । অচেনা জায়গায় চেনা মুখ আর কি চাই ।আমাদের ধরমশালা থাকাকালীন সে বেশ খাতির যত্ন ও গাইড করেছিল ।। ১৯০৫ সালে প্রবল ভুমিকম্পে প্রাচীন ধরমশালা বিলীন হয়ে যায় । পরবর্তীকালে নতুন নগর গড়ে ওঠে ।ধরমশালা প্রধানত দুইভাগে বিভিক্ত ।আপার ও লোয়ার ধরমশালা । লোয়ার ধরমশালা বেশ খানিকটা সমতল । প্রধানত সরকারী অফিস ,হোটেল ,বাসস্ট্যাণ্ড ,দোকানপাট সব মিলিয়ে বেশ ব্যস্ত জীবন । পাহাড়ের ঊপর ছোট ছোট গ্রাম নিয়ে আপার ধরমশালা । তার মধ্যে দলাই লামার জন্য বিখ্যাত ম্যাকলয়েডগঞ্জ ।আমাদের হোটেল এক ছোট্ট গ্রাম নাড্ডি তে । বাস্ট্যাণ্ড থেকে নাড্ডি যাওয়ার পথে ক্যান্টনমেন্ট ।তাই কলিগটি আমাদের তার মিলিটারী ভ্যানে তুলে নিল । ড্রাইভার ছেলেটি পাহাড়েই বড় হয়েছে তাই পাহাড়ী রাস্তা তার কাছে জলবত তরলং  । রাস্তার বাঁকে সে যে স্পীডে গাড়ীকে ওপরে তুলছিল তাতে আমাদের হাঁড় হিম হয়ে যাচ্ছিল । ভয় দূর করতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখি ঝকঝকে সকাল ।দূরে পাহাড়ের মাথায় সদ্য নিদ্রাভঙ্গ করে সুয্যিমামা জেগেছে । চারিদিক সবুজ গাছে ছাওয়া ।অনেক নীচে পাথরের ফাঁক দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে নাম না যানা কোন পাহাড়ী নদী । ক্যান্টনমেন্ট ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙে ছেলেটি আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিল । হোটেলে বারোটায় চেকইন  । আমরা পৌছেগেছি সাতসকালে । হোটেলে মালপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম ছোট্ট নাড্ডিকে পায়ে হেঁটে দেখতে ।। এঁবড়োখেবড়ো রাস্তায় কিছুটা হাঁটতেই বেশ একটা সমতল জায়গায় এসে গেলাম । ওটাই গ্রামের বাজার মনে হল ।একপাশে কয়েকটা অটো, ভাড়ার গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে । অন্যদিকে কয়েকটা দোকান ঝাঁপ খুলে পসরা সাজাচ্ছে । চায়ের দোকানে গরম জল ফুটছে । দোকানী ঘন দুধ জাল দিচ্ছে । থাকতে না পেরে চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চে । সামনেই বরফের টুপি পড়ে দণ্ডায়মান ধৌলাধর রেঞ্জ  । তার ঊপর সকালের ঝলমলে রোদের ছটা সমস্ত উপত্যকাতে এক অনিন্দ সুন্দর দৃশ্য তৈরি করেছে । চা খেয়ে হোটেলে ফিরতেই দেখি ম্যানেজার ছেলেটি দরজায় দাঁড়িয়ে আছে । আমাদের দেখেই বললো তিনতলায় একটি ঘর এখুনি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে তৈরি হয়েছে ওটা নেবেন ।তিনতলায় চড়তে হবে শুনে একটু ইতস্তত করছিলাম  । কিন্তু ঘরটি দেখে আর না বলতে পারলাম না । সামনে খোলা ছাদ । জানলা খুলে দিলেই ঊঁকি মারছে ধৌলাধরের ছোট বড় শৃঙ্গগুলো পিছনে সবুজ লন । আহা আর কি চাই । রাজী হয়ে গেলাম । সারারাত বাসে ভাল ঘুম হয় নি ।স্নান ,ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা বিছানায় । প্রকৃতির নিজস্ব রঙে আঁকা এক সুন্দর ল্যাণ্ডস্কেপ দেখতে দেখতে কখন তলিয়ে গেছি ঘুমের দেশে ।

1557

51

মণিকুন্তলা

হল্যান্ড : তখন ও এখন

তখন মানে ৭০ দশকের মাঝামাঝি। এখন মানে গত কয়েক বছর। তখন কেউ ইংরিজি বলত না। যদিও অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় হল্যান্ডেই পথেঘাটে ডাচ না জানলেও চলে যেত, তবুও খুব কম লোক-ই ইংরিজি বলতে পারতো। মেয়ের স্কুলে হেডমাস্টারকে ইংরিজিতে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তার টাকে ফিনকি দিয়ে ঘাম ছুটত। সারা স্কুলে দু একজন টিচার ভাঙ্গা ইংরিজি বলত। তাতেই হত যোগাযোগ। আর এখন? পথে ঘাটে সবাই ইংরিজি বলে । সুপার মার্কেটের মেয়েগুলো, ডাক পিয়ন, ট্রাম কন্ডাক্টর কে নয়? তখন দোকান খোলা থাকত খুব কম সময়। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৫টা কি ৬টা। শনিবার বেলা চারটেয় বন্ধ।আনেক সুপার মার্কেট সোমবার ১২টার পরে খুলত।আর রবিবার ? মাথা খুঁড়লেও আধখানা রুটি কোথাও পাবে না।আর এখন? সুপার মার্কেট রোজ ৮টা থেকে ৮টা খোলা। শুক্রবার ৯টা বা ১০টা অবধি। রবিবার ১২টা থেকে ৬টা।অন্যান্য দোকানও তাই। এর একটা বড় সুফল হল কখনোই ভীষণ ভীড় হয়না সুপার মার্কেটে। তখন এই হল্যান্ডে মহিলারা মানে মায়েরা সাধারণতঃ বাইরে কাজ করতেন না। মানে চাকরি করতেন না। দুটো কারণ শুনেছি। এদেশে ছোট ছেলেমেয়েদের দেখাশোনাটাই মায়েদের প্রথম কাজ। তারা স্কুলে যাবে, দুপুরে খেতে আসবে, আবার বিকেলে বাড়ি আসবে তখন মাকে পাবেনা সেটা এদেশে চল ছিল না।আরেকটা কারণ শুনেছি সেটা সত্যি কিনা জানিনা। ডাচেরা সম্পন্ন কৃষক ছিল, তারা তাদের বাড়ির মহিলাদের বাইরে কাজ করতে পাঠাতো না, সেটাই তাদের প্রাইড ছিল।...।এখন সকলেই কিছু না কিছু কাজ করে রোজগার করে।আর আজকাল তো চাকরিও নানারকম পাওয়া যায়। তখন আমরা সকালে সাড়ে ৮টায় ছেলেমেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতাম, ১২টায় নিয়ে আসতাম, ১টায় আবার স্কুলে দিয়ে আসতাম, আবার সাড়ে তিনটেয় ফেরত আনতাম। ঝামেলার একশেষ। এখন মায়েরা কাজে বাইরে যায়। কোন বাচ্চা দুপুরে খেতে আসে না।স্কুলের পরেও যায় স্পেশাল ক্রেশে । মা বা বাবা কাজের পরে তাদের তুলে বাড়ি আসে। তখন , উপরে লেখা দুটি কারণেই , নানা বয়সের মায়েদেরই শুধু দেখা যেত প্র্যাম ঠেলে এধার ওধার যাচ্ছে, দোকান বাজার করছে বা পার্কে নিয়ে যাচ্ছে। বাবাদের বা দাদু দিদাদের দেখতাম না ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে।এখন দেখা যায় মা ৮টায় বেরিয়ে গেল, বাবা ৯টায় প্র্যাম ঠেলে বাচ্চাকে ক্রেশে দিতে যাচ্ছে। আর দাদু দিদিমারাও সীনে এসেছে। সপ্তাহে একদিন বা দুদিন তারা নাতিনাতনি সামলাচ্ছেন; পার্কে নিয়ে দিদিমা দোলনা ঠেলছেন বা দাদু ফুটবল খেলছেন নাতির সাথে। অনেকদিন আছি এদেশে তাই পরিবর্তনগুলো চোখে পড়ছে আজকাল। সেটাই স্বাভাবিক।

1044

10

মনোজ ভট্টাচার্য

ঘাশিরাম কোতোয়াল !

ঘাশিরাম কোতোয়াল – মারাঠি প্রহসন ! ভালো একটা সিনেমার মতো আমরা – ভালো নাটকেরও খোঁজ করি ও দেখি । সেইরকম একটি নাটক ঘাশিরাম কোতোয়াল ! - খানিকটা অপেরাধর্মী ! বিজয় তেন্দুলকারের ১৯৭২ সালের প্রহসন । কোনও এক রাজনৈতিক দলের উত্থান ও সরকারী সব কাজে খবরদারী করা ও তার পরিনাম । পুনের পেশোয়ার একজন মন্ত্রী নানা ফাড়নবিশের প্রশ্রয়-ভুক্ত কোনও কর্মচারী হাতে ক্ষমতা পেয়ে কিভাবে তার অসদ্ব্যবহার করে ও শেষপর্যন্ত ধবংশপ্রাপ্ত হয় – তাই নিয়েই খুব মজার নাটক । এই প্রহসন প্রথমে জব্বর প্যাটেলের পরিচালনায় অভিনীত হয় । মোহন অগাশি নানা ফাড়নবিশের চরিত্রে অভিনয় করে । প্রাসঙ্গিকভাবে খুবই রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে । কিন্তু এই নাটক এত জনপ্রিয় হয় যে ইউরোপের অনেক দেশে এর অভিনয়ের নিমন্ত্রন পায় ! একটা সারাংশ দিয়ে রাখি । - তৎকালীন মারাঠি সমাজে ব্রাহ্মণদের সামাজিক জীবন খুব উচ্ছৃঙ্খল ছিল – তারা রাত্রে বাড়িছাড়া থাকত ও সেই অবসরে ব্রাহ্মনীরাও শয্যাতে একা অতিবাহিত করত না । কিছু বাড়তি পুরস্কারের জন্যে নিজেদের মধ্যে ঝগড়াও করত । কোনও বহিরাগত ব্রাহ্মণকে চোর সাজাতে দ্বিধা করত না ! সমাজে কেবল ধর্মের ধ্বজা আর বিনোদনের আচ্ছাদন ছাড়া বিশেষ কোনও কাজ ছিলনা ব্রাহ্মণদের ! এই অবসরে ঘাশিরাম দাস নামে এক ব্রাহ্মন তার অপমানের প্রতিশোধ নিতে নিজের কন্যাকে নানার সামনে খুড়োর কল হিসেবে ব্যবহার করে – নিজেকে কোতোয়াল করে নেয় । ক্রমশ একের পর এক সরকারী কাজে হস্তক্ষেপ করে সব দখল করে নেয় ও প্রত্যেকের খুঁটিনাটি কাজে গুরুদণ্ড দিতে থাকে । এইভাবে সমস্ত সামাজিক কাজেও ঘাশিরামের বিনা-অনুমতিতে কিছু করার ক্ষমতা বন্ধ করে দেয় । অবশেষে যে নানা ফাড়নবিশের মদতে ঘাশিরামের এত বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল – তারই চালে তার পতন ও তার বিরুদ্ধে অভুত্থান হয় ! এবার চেতনা অভিনয় করলো সেই বিতর্কিত প্রহসনটা । সুজন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় । নানা ফাড়নবিশের চরিত্রে শঙ্কর চক্রবর্তী ও ঘাশিরামের চরিত্রে অধিকারি কৌশিক । নাটকের শুধু অভিনয় বললে ভুল হবে । এই নাটকের সঙ্গীতের দায়িত্ব নিয়েছেন – দেবজ্যোতি মিশ্র ! কোনও কোন নাটকের প্রযুক্তিতে সঙ্গীত যে কত প্রয়োজনীয় – এখানে তার প্রমান ! এত সুন্দর ছন্দময় গীত আর তার সঙ্গে নাচ ! এখানে জীবন্ত গনেশের নাচও আছে ! কখনো সবাই নাচছে – হঠাৎ স্টীল হয়ে যাওয়া । সেখানে একজনের গান গেয়ে ব্যাখ্যা করা ! এবং সেই অনুযায়ী দৃশ্য ঘটতে থাকা ! এটা বোধয় ষষ্ঠ অভিনয় । এর অভিনয় আরও হবে । জুলাইতে গিরিশ মঞ্চে ও জন্মাষ্টমীর দিন আবার একাডেমিতে ! যে কোনও কারনেই হোক, নাটক দেখতে দেখতে পি এল টির কথা মনে হচ্ছিল ! - এছাড়াও এ রাজ্যের অনেকেরই কথা মনে পড়বে ! মনোজ

1092

9

Somen dey

আমার হেমন্তকাল

বাঙ্গালির কাছ থেকে কি কি বা কাকে কাকে কেড়ে নিলে বাঙালির সংস্কৃতির জগতে বেশ বড় রকমের শুন্যতা সৃষ্টি হয়ে যাবে ,জনমত নিয়ে তার একটা তালিকা প্রস্তুত করার যদি চেষ্টা করা যায় তাহলে গড়পড়তা বাঙালির কাছে এক নম্বর নামটি খুব চটজলদি চলে আসবে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।কারণ ওই নামটি অবিতর্কিত, স্বতঃসিদ্ধ । কিন্তু পরের নামটি নিয়ে বাঙালি ভাবতে বসে যাবে ।অনেক নাম মনে আসবে  ।তার্কিক বাঙ্গালির তর্ক চলবে পুরোদমে । সংস্কৃতির সংজ্ঞা কি , বাঙালি মানে কোন শ্রেণী্র বাঙালি , শুন্যতা সৃষ্টি হওয়ার প্রকৃত অর্থ কি , এ রকম সব পাল্টা প্রশ্ন আসবে  ।সহজে হয়তো মীমাংসা হবে না । কিন্তু প্রশ্নটা যদি আমার কাছে আসে , আমি ও সব কূট তর্কে না গিয়ে দ্বিতীয় নামটিও চট করেই বলে দেব । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । কারণ নির্বিশেষ বাঙ্গালির কাছে তিনি অবারিত , অবাধ এবং অবধারিত ।আগামী পৃথিবীকে কান পেতে তার গান শুনতে বাধ্য করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন তা তিনি রেখেছেন অক্ষরে অক্ষরে। শুধু গানে নয় , তিনি বাঙালি জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে গেছেন । একদিন প্রতিদিনের বাঙ্গালি গেরোস্থালিতে হাতা খুন্তি ,পাঁচফোড়ন , পাঁজি , সিঁদুরকৌটো ,শাঁখ , শিলনোড়া , সঞ্চয়িতা এবং রবীন্দ্রনাথের একখান বাঁধানো ছবির সঙ্গে কিছু হেমন্তের রেকর্ড ,ক্যাসেট বা সিডি ও অনিবার্য । প্রেমে ,বিরহে, বিপ্লবে , বিদ্রোহে ,শোকে, শান্তিতে বাঙ্গালির আছে এবং থাকবে হেমন্তর গান ।তাঁর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হবার ছাব্বিশ বছর পেরিয়ে যাবার পরও আজ একজন প্রাজ্ঞ দাদু শীতল হতে চান –‘পথের ক্লান্তি ভুলে/ স্নেহ ভরা কোলে তব’ শুনে ... আর তাঁর স্মার্ট নাতি সমকালকে খুঁজে পান - শোনো কোনো এক দিন / আকাশ বাতাস জুড়ে রিমঝিম ...... শুনে ।এই পথটা বোধহয় কোনোদিন শেষ হবার নয় । কার সুর , কার লেখা এ সব গ্রাহ্যের মধ্যে আসেই না যদি কণ্ঠটি হয় হেমন্তর । আমাদের পাড়ার মুদীর দোকানীটির দোকানের এককোনে একটি এফ এম রেডিও বাজে সারাদিন । দোকানী অনেকটা অভ্যেস বসে ওটা দোকান খুলেই চালিয়ে দেয় । দোকান বন্ধ করার সময় ওটাও বন্ধ করে । ওর বোধহয় একটা শব্দ দরকার হয় । সেই শব্দের রাজ্যে কখন অরিজিৎ সিং আসেন কখনই বা জগজিৎ সিং আসেন , ওর কান সেটা রেজিস্টার করে না । কিন্তু তার মাঝে হটাৎ কখনো হেমন্ত-কন্ঠ কানে এলেই তাকে দেখি তার সুরহীনতার সঙ্কোচ ভুলে দু কলি গলা মিলিয়ে দেয় । কারণ সেই গানটির সঙ্গে কোথাও যেন তার একটা গাঁটছড়া বাঁধা আছে । হয়ত তার বিয়ের দিন কনের বাড়ির মাইকে এই গানটি বাজানো হয়েছিল , অথবা পুজো প্যান্ডেলে তার প্রথম প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদনের সময় এই গানটিই ছিল আবহ সঙ্গীত । এই মুদীর দোকানীর গল্পটি মিলে যেতে পারে কোনো এক প্রাইমারী স্কুলের সংস্কৃত টিচারের ক্ষেত্রে, কল সারানোর মিস্ত্রীর ক্ষেত্রে , বা সুতো কলের শ্রমিকের ক্ষেত্রে । অথবা সেই বড়-চাকুরে বাবুটি যিনি রোজ সকালে পাড়া কাঁপিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে বসে ইকোনমিক টাইমস কাগজ পড়তে পড়তে আপিস যান , অথবা সেই নাক উঁচু বিংলিশ ভাষী বাবুটি যাঁর ঘরে রোজ সন্ধায় দামী সাউন্ড সিস্টেমে বাজে বাখ মোৎজারট , অথবা সেই সদা-গম্ভীর ইতিহাসের অধ্যাপক টি যাকে পাড়ার লোক সমীহ করে চলে , এরা সবাই কিন্তু দিনের শেষে কোনো একটি সময়ে একটু জিরিয়ে নেন ওই একটি কণ্ঠস্বরের ছায়ায় বসে, যার নাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ।এমনি এক গ্রেট লেভেলার তিনি । *** আমি তখন হাফ প্যান্ট এবং হাফ টিকিট  ।বাড়িতে কল ঘোরানো গ্রামাফোনে হাত দেওয়া বারণ  । রেডিওর কাছে যাওয়া বারণ । তবে কান তো খোলা ।সেটা কে আটকাবে ! জ্ঞান কর্ন তখন খুলছে ধীরে ধীরে । দাদারা রেকর্ড কিনে আনেন মাঝে মাঝে ।দিদি রেডিওর নব ঘুরিয়ে খোঁজেন আকাশবাণী কোলকাতা অথবা রেডিও সিলোন। জামসেদপুর থেকে ও দুটি স্টেশনই খুব সহজে ধরা দিত না। যেদিন নতুন রেকর্ড আসত সেদিন বাড়িতে পরম উৎসব রাতি । আমরা দূর থেকে শুনতাম । পড়তে বসে পানিপথের তৃতীয় ও প্রথম যুদ্ধের তারিখ গুলিয়ে যেত। এমনি সময়ে একটি কালো চাকতিতে চেপে আমার দুনিয়াতে এলেন গ্রেট লেভেলার । ‘ছেলেবেলার গল্প শোনার দিনগুলি এখন কত দূরে / আর আসেনা রাজার কুমার পক্ষীরাজে উড়ে ‘। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে একেবারে ডাইরেক্ট কমিউনিকেশন হয়ে গেল বালকটির  । গলা নয় হয়তো গানের কথাই হয়তো টেনেছিল তাকে – ‘মনে আছে সন্ধাবেলায় সময় হল প্রদীপ জ্বালার /তারি আলোয় আমরা কজন শুনছি কথা মণিমালার ।’ এই ভাবেই পরিচয় হল ভদ্রলোকের সঙ্গে । তারপর একদিন মণিমালার গল্প শোনার দিন পেরিয়ে জ্যান্ত মণিমালারা স্বপ্নে আসতে শুরু করলো । ধীরে ধীরে আমার পেকে ওঠার পথের বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে গেল একটি করে হেমন্তের গান । অনুরোধের আসর আর নিষিদ্ধ নেই । আর রেডিও সিলোনেও কান পাতছি মাঝে মাঝেই । তখনো গ্রাম কেমন দেখতে হয় জানা হয়নি , তবু একটি গ্রামের প্রাথমিক ছবি মনে আঁকা হল - ‘...একটুখানি শ্যামল ঘেরা কুটিরে তার স্বপ্ন শত শত দেখা দিত ধানের শিষের ইশারাতে দিবা শেষে কিষাণ যখন আসতো ফিরে ঘি মউ-মউ আম কাঁঠালের পিঁড়িটিতে বসতো ......’ এই গান শুনে শুনে । শুধু তুলি নয় গান দিয়েও ছবি আঁকা যায় জানা হল – ‘শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি / একটু হাওয়া নাই /জলকে আয়না তাই / ঝিম ধরেছে ঝিম ধরেছে গাছের পাতায়...’ শুনে শুনে । তার পর আরো একটু পেকে ওঠা – গরম কালের রাত্রে উঠোনে খাট পেতে শুয়ে আকাশ দেখতে দেখতে মনে মনে গুন গুন –......জেগে জেগে যেন কথা বলে ঐ দূর আকাশের তারা , দুজনেই কাছে তবু যেন কত দূর ......’ প্রেমের সহজপাঠ যে প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয় তেমন প্রশ্নই যেন উঠে এল গানে- ‘আকাশ পারে ঐ অনেক দূরে /যেমন করে মেঘ যায় গো উড়ে/ যেমন করে সে হাওয়ায় ভাসে / কই তাহার মত তুমি আমার স্বপ্নে কভু ভাসো নাতো ? আমাদের কালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রেম তো সত্যিই মনের জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেত আর না ফোটা কামনার ফুল গুলি কবে যেন অকালে ঝুর ঝুর ঝরে যেত । অনেক দিনের পরে বৃষ্টি আসার মত করে সে ফিরে আসত কখনো কখনো, আবার কখনো বা তার বাতাসে ওড়ানো ভীরু অঞ্চল দূর হতে মুগ্ধ চোখে দেখে যাওয়াই সার হত । হয়তো খুব বোকা বোকা হয়তো লাগবে এখন , কিন্তু এ ভাবেই আমাদের দিন চলে গেছে হেমন্ত ছায়ায় । জীবনের এক একটা হেমন্ত -বাঁক , হেমন্ত-লেন , হেমন্ত-মোড়ের গল্প বলতে বসলে তো নটে গাছটি মুড়বেনা কোনো দিন  । পাঠকের হয়ত ধৈর্য থাকবে না । বরং একটা নিজস্ব অনুভুতির কথা বলি। হেমন্ত আমার এমন এক স্থাবর সম্পত্তি যা আমি ভুবন ডাঙ্গার মেঘলা আকাশ , বোতাম বিহীন ছেঁড়া শার্ট , ফুস ফুস ভরা হাসি , দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা , রাত্রির মাঠে চীৎ হয়ে শুয়ে থাকা – এ সব উত্তরাধিকারের মতই পরের প্রজন্ম কে দিয়ে যেতে চাইব  । হে আগামী পৃথিবী ,তোমার অস্থির সময়ে , যদি মনে হয়- কোই তো এইসা ঘর হোতা যঁহা সে প্যার মিল যাতা ,কোনো এক ঘুম-নেই থেমে যাওয়া রাতে , যখন ধরতী এবং চাঁদ সিতারা চুপ করে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে , যখন রিক্ত বৃক্ষের শাখায় ক্লান্ত চাঁদনী শুয়ে থাকবে , তখন পাহাড় নিষেধগুলো পেরিয়ে চলে যেও এই অফুরান হেমন্তকালের শান্ত উপত্যকার কাছে , হয়ত সেখানেই খুঁজে পাবে প্রানের আরাম । (চলবে )

1384

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার !

অথ কিন্নরী কথা ! ‘তয়ফাআলি, খেমটাআলি, ঢপআলি, মেয়ে পাঁচালি যাত্রা আলি গলি গলি তর বেতর খেয়ালি, টপ্পাআলি, মনমাতালি ঘর ঘর ।‘ নাট্য আন্দোলন – নাট্য গ্রুপ – নাট্যমঞ্চ ! বাকি রয়ে গেল আরও কিছু ! যাদের ছাড়া নাটকে স্ত্রী চরিত্র হত না । আগে আগে তো সীতা থেকে রাধা পর্যন্ত সব চরিত্রই পুরুষেরাই অভিনয় করত । ক্রমশ রুচির তারতম্য হতে খোঁজ পড়ল অভিনেত্রীর । তখন তো তথাকথিত ভদ্রঘর থেকে মহিলারা অভিনয় করতে বের হত না ! অতএব আশেপাশে গরানহাটা সোনাগাছি থেকে ‘সঙ-স্ট্রেস’ অর্থাৎ আঁধার-কিন্নরি আনা হতে থাকল । যাদের জীবন-গাথা হারিয়ে গেছে ঘোর অমানিশায় । উপেক্ষিত থেকেছে ইতিহাসে ! – তাদের কয়েকজনের কিছু কথা ! সদ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি শাসনভার নিয়ে নিল ব্রিটিশ-রাজ । শহরের অবস্থা তখন সাবেকি নবাব-জমিদারদের বিনোদনের স্থান হয়ে উঠল । ‘মনিয়া বুলবুল আখড়াই গান আর খোস পোশাকি যোশমি দান’এর শহর হয়ে উঠেছে কলকাতার । সে কলকাতার ছাদে ঝাড়বাতির রোশনাই – আর মাঝ চাতালে নুপুরের মূর্ছনা ! রাশিয়ান নাট্যকার জেরাসিম লেবেদফের ভারতে আসা ও নাটকের প্রতি তার আসক্তি – কিছুটা আগে লিখেছি । তিনি বাংলা ভাষা শেখেন গোলকনাথ দাসের কাছে । প্রথম নাটক ‘কাল্পনিক সংবদল’। সেই নাটকে মহিলা অভিনেত্রীদের দিয়ে অভিনয় করান । – সাধারন রঙ্গালয়ে ১৮৭৩ সালে প্রথম অভিনয় করেন চার অভিনেত্রী । জগত্তারিনী, এলোকেশী, শ্যামাসুন্দরী ও গোলাপসুন্দরী বা সুকুমারি দত্ত । এইভাবেই ক্রমশ মঞ্চে আসেন বিনোদিনী দাসী, সুশীলাবালা, তিনকড়ি, প্রভা, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা প্রমুখ । এই অভিনেত্রীরা পঙ্কিল সমাজ থেকে এলেও এদের গুনগরিমা বিদ্বৎ-সমাজে বরেণ্য । ললিতকলা মন্দিরে এদের আসন অনেক উঁচুতে ! ১৮৭৩ সালে বেঙ্গল থিয়েটারে এলেন গোলাপসুন্দরী – মুলত মধুসুদন দত্তের আগ্রহে । ১৬ই আগস্ট তাঁর ‘শর্মিষ্ঠা’ দিয়ে বেঙ্গল থিয়েটারের উদ্বোধন। দ্বিতীয় অভিনয়ে গোলাপসুন্দরী মঞ্চে আসেন । আবার বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ অভিনীত হয় , গোলাপসুন্দরী হলেন বিমলা – পার্সি অপেরার অনুকরনে চটুল খেমটা নাচ আর কীর্তন গেয়ে জয় করলেন দর্শকমন ! ১৮৭৪ সালের ১৪ই মার্চ – মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর রচিত ‘বিদ্যাসুন্দর’ । সেই নাটকে গোলাপসুন্দরী সাজলেন মালিনী – নাচে-গানে, কৌতুকে-লাস্যে মাতিয়ে দিলেন রঙ্গমঞ্চ ! ১৮৭৫ সালে চলে আসেন গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটারে । নাট্যকার উপেন্দ্রনাথ দাসের ‘শরত সরোজিনী’ নাটকে সুকুমারী চরিত্রে অভিনয় করেন । সেই অভিনয় এত জনপ্রিয় হয় যে তাঁর নামই হয়ে যায় ‘সুকুমারী’। আবার বেঙ্গল থিয়েটারে ফিরে এলেন ১৮৭৫ সালে ১৪ই আগস্ট – ‘সুরেন্দ্র-বিনোদিনী’ নাটকে । এই নাটকে ইংরেজ বিদ্বেষ ও স্বদেশীআনা থাকার ফলে বেশ আলোড়ন ফেলে বাংলা নাট্যজগতে ! এই নাটক চলাকালীন উপেন দাস মহাশয়ের মধ্যস্থতায় সুবর্ণ বনিক সমাজের গোষ্ঠবিহারী দত্তের সঙ্গে সুকুমারীর বিয়ে হয় । ফলত তার নাম হয় সুকুমারী দত্ত ! পতিতার বিয়ে ! ১৮৭৬ সালে ২৩শে ফেব্রুয়ারি - এই বিয়েকে কেন্দ্র করে তুমুল ঝড় উঠল সমাজে । - ‘সতী কি কলঙ্কিনী’, ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’, ‘গজনানন্দ ও যুবরাজ’ ও ‘দি পুলিশ অব পিগ এন্ড শিপ’ নাটকগুলোতে অভিনয়কে কেন্দ্র করে মামলা মকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন উপেন্দ্রনাথ দাস, অমৃতলাল বসুরা । সুকুমারী দত্তও বাদ পড়লেন না । - স্বামীকে নিয়ে ঘর বাঁধবার চেষ্টা করলেন । কিন্তু বারবনিতার কি সংসার হয় ! স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় জীবনকে নিয়ে মুখরোচক ছড়া বাঁধা হল – আমি সখের পরী সুকুমারী আমরা স্ত্রী-পুরুষে অ্যাক্টো করি দুনিয়ার লোক দেখে যারে । উপেন্দ্রনাথবাবু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আত্মীয়দের সাহায্যে অসুস্থ শরীরে বিলেত চলে যান । তারপরে সমাজের চাপে গোষ্ঠবিহারীও মেয়েসহ সুকুমারীকে ত্যাগ করেন । আবার নাট্যমঞ্চ ! স্বামী-সংসার-সমাজ যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় – তখন আবার আশ্রয় দেয় সেই শিল্প ! সুকুমারী হন নাট্যকার, দল পরিচালক ও অভিনেত্রী । নিজের জীবন কাহিনী নিয়ে লেখেন ‘অপূর্ব সতী’ । -ওদিকে বয়েসও পড়ে থাকেনা ! মানসিক ক্লান্তিতে, কণ্ঠের দ্বিধায়, শরীরের জড়তায় – যাবার সময় হল বিহঙ্গের ! নিজেকে নিঃশেষে দিতে দিতে – একদিন দেখলেন দীপ নিভে এসেছে । স্বাস্থ্যের অবনতির জন্যে থিয়েটার ত্যাগ করলেন – প্রথম মহিলা নাট্যকার-অভিনেতা সুকুমারী দত্ত ! বিনোদিনী দাসী । মাত্র ৯ বছর বয়েসে অগ্রজাদের অনুসরণ করে মঞ্চে আসেন ১৮৭৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর । ‘শশ্রুসংহার’ নাটকে দ্রৌপদীর সঙ্গী । মাত্র কয়েকটা লাইন পার্ট – তাতেই বাজিমাত ! ১৮৭৬ সালে – জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সরোজিনী’ অভিনয় – নামভুমিকায় বিনোদিনী । নাটক ইতিহাস তৈরি করলো । সবারই মুখে বিনোদিনীর নাম । গিরিশচন্দ্র ‘মনোরমা’ নাটক দেখতে এসে থিয়েটারের বিনোদিনীকে দেখে মুগ্ধ হলেন । - তার ডাকে বিনোদিনী বেঙ্গল থিয়েটার ছেড়ে ন্যাশানাল থিয়েটারে শুরু করলেন গিরিশচন্দ্রের নাটক করা ! সেই শুরু হল বিনোদিনীর জীবনে অ-বাবু, গুর্মুখ রায়, রাঙ্গাবাবুদের আনাগোনা । গুর্মুখ রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিলেন বিনোদিনীকে । শুধুমাত্র থিয়েটারকে বাঁচাতে নিজেকে বেচে দিলেন বিনোদিনী । যে গিরিশচন্দ্রের কথায় নিজেকে বেচলেন, সেই গিরিশচন্দ্র সমেত অনেকেই থিয়েটারের নাম তার নামে না করে স্টার থিয়েটার রাখলেন । এই বঞ্চনা বিনোদিনী মেনে নিতে পারে নি । তাই ‘বেল্লিক বাজার’ নাটকের পর তিনি আর মঞ্চে ফেরেন নি ! – ‘থিয়েটার ভালবাসতাম, তাই কার্য করিতাম, কিন্তু ছলনার আঘাত ভুলিতে পারি নাই । তাই অবসর বুঝিয়া অবসর লইলাম ‘! বিনোদিনী কখনো অস্বীকার করেন নি – তার জন্ম পতিতার ঘরে । অন্য সব নারীর মতোই বিনোদিনীও ঘর-সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন । - ‘পতিপ্রেম সাধ আমাদেরও আছে । কিন্তু কোথায় পাইব ? কে আমাদের হৃদয়ের পরিবর্তে হৃদয় দান করিবে ?’ শেষ জীবনে এক পুরুষের বধু হন । মেয়ে শকুন্তলা ও সেই পুরুষটিকে ঘিরেই ছিল তার জীবন । ১৯১২ সালে সেই উদার মানুষটি মারা যান । ‘ভালবাসায় ভাগ্য ফেরে না গো, ভাগ্য ফেরে না ‘ – এই হাহাকার নিয়ে লেখেন ‘আমার কথা’ ! মেয়ে শকুন্তলাও মারা যায় । তার উদ্দেশ্যে লেখেন ‘কনক ও নলিনী’ । ‘সারাদিন স্বপনের ছায়াপথে বসে সন্ধ্যার বিষাদমাখা । আধছায়া আধ ঢাকা আসিয়া ডুবিয়া তাতে ভাবি অবিরাম মরমের গ্রন্থি মাঝে গাঁথা সে নাম ।‘ মিস প্রভা । সুর আর অভিনয় নিয়ে ছোটবেলা থেকে অপূর্ব অভিনয় করে এলেন প্রভাবতী । বাবা কে – জানেন না! নটি বিনোদিনীর পরেই প্রভাবতী হলেন সেরা অভিনেত্রী । খুব ছোটবেলা থেকে মাকে সুর করে রামায়ন ও মহাভারত শোনাতেন । শিশিরকুমারের সীতা হলেন প্রভাবতী ! তারাকুমার ভাদুরীর পত্নী । তার মতো অভিনেত্রী ও গায়িকা বাংলার মঞ্চে আর আসেন নি । তিনি গান লিখতেন - মুক্ত তুমি নও তো আমার স্বপন কারায় বন্দি গো ! সেই স্বপনের কারাতে আজ তোমায় আমায় সন্ধি গো ! নাই বা যদি কও গো কথা - নাই কো ক্ষতি নাই কো ব্যথা ! স্বপনব্যাপী তুমিই হবে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী গো ! ইন্দুবালা ! উনিশ শতকের প্রথম সারির নাট্যকার মনোমোহন বসুর পৌত্র, ভারতের প্রথম সার্কাস কোম্পানির মালিক মতিলাল বসু । তার সঙ্গে প্রেম সার্কাসের ট্র্যাপীজ খেলোয়াড় - রাজবালার । তাঁদের সেই আঁধার প্রেমের আলোক সন্তান – ইন্দুবালা । জন্মেছিলেন ১৮৯৯ সালের নভেম্বর মাসে অমৃতসরে । রাজবালার প্রতি মতিলালের উৎসাহে ভাটা পড়ায় তাকে ফিরে আসতে হল জীবিকার তাড়নায় - সোনাগাছির পাশেই রুপোগাছি বা রামবাগানে । ইন্দুবালা গান ও নাচ শিখলেন গৌরীশঙ্কর মিশ্র জমিরুদ্দিন খান এলাহি বক্স ও গওহর খানের কাছে । প্রথম দিকে শুধু গানের জন্যেই তাকে অভিনয়ে নেওয়া হত । গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ওর অনেক গানই রেকর্ড করা হয়েছিল । মঞ্চের প্রয়োজনে ইন্দুবালাকে কাজী নজরুল ইসলাম নিয়ে আসেন – নাটকের নাম ‘রক্তকমল’ । গীতিকার ও সুরকার স্বয়ং নজরুল । দ্বিতীয় যুদ্ধকালীন শহর কলকাতায় – কারফিউ, সাইরেন ও পুলিশ-মার্চে ভরা আঁধার-ঘেরা সমাজ । তাকে নামালো ‘রক্তকমলের’ গানে । শ্রাবনমেঘে নাচে নটবর ঝমঝম ঝমরম রমরম মোর ঘুমঘোরে এলো মনোহর ! ১৯২৫ সালে মঞ্চস্থ হল ‘নসীরাম’ – নাম ভুমিকায় দানীবাবু । তারপর স্টার থিয়েটারে ‘বিল্বমঙ্গল’ । তারপর গেলেন মনোমোহন থিয়েটার – সেখানে বিষবৃক্ষ ।- গান ভালবাসিবে বলে ভালবাসিবে ! ১৯২৯ সালে ৩১শে ডিসেম্বর মঞ্চস্থ হল – মহুয়া । কাজী নজরুল আর শিস্যা ইন্দুবালা – গানে মাতিয়ে দিলেন । তিনি নিজের অতীতকে ভুলতে চান নি কখনো । সদর্পে বলেছিলেন – আমি রামবাগানের ইন্দু, এখান থেকে গান শিখেছি, প্রতিষ্ঠা পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি, সবাই আমাকে জানেন – আমি রামবাগানের ইন্দু । কিসের আশায় আমি রামবাগান ছেড়ে যাব ?’ ইন্দুবালা খুব সক্রিয় ভাবে রামবাগানের উন্নতিকল্পে কাজ করে গেছেন । সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালা দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ১৯৮৪ সালের নভেম্বর মাসে মারা যান ! মাত্র দু-তিনজনের কথা লিখলেই এই কিন্নরীদের কথা বলা হয় না ! এঁরা সমাজের নীচু শ্রেনী থেকে এলেও – অভিনয় বা সঙ্গীত প্রতিভা কারুর কম ছিল না ! নাট্যকার অমৃতলাল বসু বলেছিলেন – একটা ভুল ধারনা চালু আছে যে এই অভিনেতারা সমাজে যে স্তর থেকে আসে – তাঁদের শৃঙ্খলাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা নেই । কিন্তু কয়েকদিনের রিহার্সালের পরেই এঁরা প্রমান করে দেন – তারা কত দক্ষ ! এদের পারিশ্রমিক অতি অল্প – অথচ এদের সকল বিষয়েই শিক্ষালাভের পিপাসা ও যত্ন এবং কর্মস্থানে শ্লীলতারক্ষা দেখে ভদ্রলোকেদের নিজেদের চরিত্র সম্বন্ধে সন্দীহান হতে হয় ! ( শেষ এবং সমাপ্ত ) মনোজ

1453

28

শিবাংশু

কবি ও সন্ন্যাসী

তামিল সভ্যতা আমাদের দেশের প্রাচীনতম জীবিত সভ্যতা। ভাবি, কী ছিলো সেই চালিকা শক্তি যা প্রায় তিন-চার হাজার বছর ধরে দেশের এই প্রান্তটির সভ্যতা-সংস্কৃতিকে শুধু ধরে রেখেছে, তাই নয়, এগিয়ে নিয়ে গেছে নিরন্তরভাবে। একটা উত্তর তো পেয়ে গেছি এবং মনে হয় সেটাই মূল কথা। কন্যাকুমারীর শেষ তটবিন্দুতে দাঁড়িয়ে সেই কথাই মনে হচ্ছিলো আমার। বঙ্গোপসাগর, আরবসাগর আর ভারত মহাসাগরের সঙ্গমে একটি ছোট্টো পাথুরে দ্বীপে তাঁরা স্থাপন করেছেন একজন কবি'র মূর্তি। একশো তেত্রিশ ফুট উঁচু এই অবিশ্বাস্য স্থাপত্যকীর্তিটি কবি থিরুভল্লভরের (শ্রীবল্লভ) কল্পিত অবয়বকে মনে রেখে নির্মিত হয়েছিলো। রাজাগজা, যুদ্ধবাজ নৃপতিদের মহিমা নিয়ে সবাই উচ্চকিত। কিন্তু একজন কবি? যাঁর আটত্রিশটি অধ্যায়ে রচিত থিরুককুরাল কাব্য গ্রন্থটি খোদিত আছে মূর্তির পাদমূলে। সারা পৃথিবীতে কোথাও কেউ একজন কবির গরিমাকে এভাবে প্রতিষ্ঠা করেনি কখনও। তামিলসভ্যতার গর্বকে আমি স্বীকার করতে বাধ্য হই। -------------------------- সেই ছোটোবেলায় একদিন ইশকুলে মাস্টারমশাই এসে বললেন, " কাল কিছু চাঁদা নিয়ে আসিস, যা পারিস। কন্যাকুমারীতে স্বামীজির মন্দির হচ্ছে।" সে ছিলো চার আনা-আট আনার গৌরবের দিন। তাই ছিলো আমাদের যোগদান। আজ যখন সমুদ্রের বুকের উপর সেই মন্দিরটির চাতালে গিয়ে বসি, সম্পূর্ণ অন্য ধরণের একটা অনুভূতি হয়। ঐ পাথরটির উপর বসে সেই পরিব্রাজক সন্ন্যাসী ভারতাত্মার স্বরূপ উপলব্ধি করেছিলেন। আমরা পোকামাকড়ের মতো মানুষ। কিন্তু সেই পুণ্যের কিছু কণা যেন আমাদের মতো ঈশ্বরহীন, ভক্তিরহিত, নিরাবেগ মানুষের জন্যও সেখানে রাখা আছে, মনে হয়। একদিকে নীলাভ, অন্যদিকে সবুজাভ, দূরে ধূসর সমুদ্রের ঢেউ আর ঢেউ। নিজের চেনা দেশকে যেন নতুন করে চেনা হয়ে যায়। ----------------------- মন্দিরের দেবী টানেন না। কোনও প্ররোচনাই বোধ করিনা সেই প্রাচীন দেবীকে দেখে আসার। আমার পৃথিবী শুধু একজন কবি, এক সন্ন্যাসী আর নিরবধি জলের বিস্তার ভরে রেখে দেয়। আর কিছু তো চাওয়ার নেই।

1040

8

James

ঝড়ের ঝটিকা সফর

উপক্রমণিকা ঝড়ের কি হৈল অন্তরে ব্যথা গিলাস লইয়া পিবতে একলা না শুনে কাহারও কথা| কোডে নাহি মন‚ কেবলি আনমন কতদিন দেখি নাই তারে! সন্তানের চুম্বন‚ প্রিয়ার বদন হেরিতে বড়ই সাধ| যথা ইচ্ছা তথা কাজ ছুটি মাগি বসের পাশ চুলকাইয়া গন্ডদেশ‚ কহিলা অবশেষ বাঁধ আর বাঁধিতে নারি| হে মোর মহারাজ‚ করি দিব ডবল কাজ পক্ষকাল যদি দেহ ছুটি|

1051

4