Samya Dutta

পাঁচ এক্কে এক (শেষ পর্ব)

চা এল। দুধ-চিনি ছাড়া চা। খুড়ো তা'তে একটা তৃপ্তির চুমুক দিয়ে তাঁর এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বিড়ির একটা ধরালেন। কিন্তু গপ্প মাঝপথে থেমে গেলে কী আর শ্রোতাদের ভালো লাগে! তাই ভুলু একটু তাড়া দিল, "কী হল খুড়ো! শুরু করুন আবার!" "দাঁড়া, দাঁড়া!" খুড়ো বললেন, "সেই বেনেটোলা টু বালিগঞ্জ হেঁটে এইচি। একটু রেলিশ করে চা খেতে না পারলে কি আর গপ্প বলার মুড থাকে!" "আচ্ছা, ফেলু মিত্তির তো নামকরা ডিটেক্টিভ।" মাঝখান থেকে ন্যাপলা হঠাৎ ফোড়ন কাটল, "তাঁর সঙ্গে আপনার সত্যিই পরিচয় আছে, নাকি এটাও ওই আর্টের খাতিরে রঙ চড়াচ্ছেন?" সত্যি! খুড়োকে এরকম কথা বলার সাহস এক ন্যাপলারই আছে! খুড়ো কিন্তু ভুরুটা ওপরে তুলে বললেন, "বলিস কি! আমার ইস্কুল লাইফের বন্ধু ছিল সিদ্ধেশ্বর বোস। আমরা দুজনে ছিলাম, যাকে বলে হরিহর আত্মা! সেই সিধুকে তোদের ওই টিকটিকি জ্যাঠা বলে ডাকে, সেই সুবাদেই পরিচয়। কম করে বিশ বচ্ছর তো হবেই.... তা সে যাকগে....আমরা গিরিডি পৌঁছলাম পয়লা মে বিকেলের দিকে। ঠিক হল, রাত গভীর হলে শঙ্কুর ল্যাবরেটরিতেই বসা হবে। প্ল্যানচেটের অভিজ্ঞতা যে আমার আছে, সে কথা তোদের আগেও বলেছি। তবে শঙ্কুর এই যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তাই তাকে বলেছিলাম আগেভাগে যেন আমাকে একটা ডিমনস্ট্রেশান দিয়ে দেয়। নিওস্পেক্ট্রোস্কোপ। অ্যাসিড ব্যাটারি তোরা দেখেছিস তো? অনেকটা সেইরকম দেখতে একটা যন্তরের সঙ্গে দুটো বৈদ্যুতিক তার দিয়ে জোড়া একটা ধাতব হেলমেট। মনে মনে তারিফ করলাম। এরকম যন্তর থাকলে মিডিয়ামের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। রাত দুটোর পর বসা হল। যন্তরটাকে রাখা হয়েছে একটা গোল টেবিলের ওপর আর তা'কে ঘিরে পাঁচটা চেয়ার সাজিয়ে বসেছি আমরা পাঁচজন। আমার ডান দিকে লালমোহন, তার পাশে তপেশ। বাঁদিকে ফেলুচাঁদ আর শঙ্কু। আমি প্রথমেই বলে নিলাম, "তোমরা সবাই জানো আজ আমরা কোন প্রেতাত্মাকে আহ্বান করতে চলেছি। ঘটনাচক্রে ইনি আমাদেরণ প্রত্যেকেরই বিশেষ পরিচিত। এখন আমাদের কর্তব্য হল, এক মনে তাঁর স্মরণ করা। শেষবার তাঁকে যেভাবে দেখেছ, সেটুকুই হুবহু মনে করার চেষ্টা কর।" মিডিয়াম যেহেতু আমি, হেলমেট আমাকেই পড়তে হল।প্রথম আধঘন্টা চুপচাপ। তারপর হঠাৎ একটা তবলার বোলের মত শব্দ পেয়ে দেখি, লালমোহনের হাতদুটো কেঁপে উঠে টেবিলটাকে তবলার মত বাজিয়ে তুলেছে।ভাগ্যিস ছোকরা নিজেই ভুলটা টের পেয়েছিল, তাই জিভ কেটে "সরি!" বলে কোনমতে হাতদুটো স্টেডি করে নিলে। আরো আধঘন্টা কাটল। ভেতরে ভেতরে একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছি, এমন সময়! এখনো স্পষ্ট মনে আছে, বুঝলি! ল্যাবরেটরির ঘড়িতে ঢং-ঢং করে তিনটে বাজছে, আর পাঁচজোড়া চোখের সামনে যন্ত্রের ঠিক সেন্টারে একটা নীলচে ধোঁয়া ধীরে ধীরে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। আর তার ভেতরে ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে একটা কঙ্কালের অবয়ব। প্রথমে দেখা গেল গলা থেকে ওপরের দিকটা, তারপর ক্রমে ক্রমে শরীরের নীচের অংশ। ধারালো মুখ, ক্ষুরধার দৃষ্টি, ঠিক যেমনটি চিনতাম। থুতনির খাঁজটা? হ্যাঁ! সেটাও দেখা যাচ্ছে! আরো পনেরো মিনিট পর পুরো শরীরটা স্পষ্ট হল। আর চিনতে ভুল হবার কোনো কারণ নেই! "হ্যাল্লো, মাই চিলড্রেন! অনেকদিন পর তোমাদের একসাথে দেখে বড় ভালো লাগছে।" সেই গমগমে গলা, সেই নিখুঁত সাহেবি উচ্চারণ! কি বলবো তোদের, লাস্ট শুনেচি নাইন্টি টুতে। অ্যাদ্দিন পরও গায়ে কাঁটা দিল! আমাদের মধ্যে ফেলুই প্রথম কথা বলল,"আমরা খুব বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।" -হ্যাঁ, জানি।খোদ নিশ্চিহ্নাস্ত্রই নিশ্চিহ্ন।কি, তাই তো, মাই ডিয়ার প্রোফেসর? -"আজ্ঞে হ্যাঁ। আমরা অবিশ্যি প্রথমে মগনলালকে সন্দেহ করেছিলাম।" শঙ্কুর জবাব। -হা হা হা। মগনলাল! সেই যার একটি ভেঙে পাঁচটি হয়, সেই ভিলেন! না হে, এটা তার কীর্তি নয়। -তবে কে? -আই টুক ইট। -"আপনি!" এবার আমাদের হাঁ হবার পালা। -ওহ্ ইয়েস! আই হ্যাড টু পারফর্ম মাই লাস্ট ভ্যানিশিং অ্যাক্ট। আড়চোখে একবার ঘরের বাকি মুখগুলো দেখে নিলাম। অন্ধকারেও দিব্যি বুঝতে পারছি, আমি যে তিমিরে, অন্যরাও সেই তিমিরেই। তবুও সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু কি ভ্যানিশ করলেন স্যার? একটু বুঝিয়ে বলবেন কি!" -"ডেথ।" ঘর কাঁপিয়ে উত্তর এল। "মৃত্যু। অ্যানাইহিলিনের ট্রিগার টিপে মৃত্যুকেই নিশ্চিহ্ন করে দিলাম। সো দ্যাট আই কুড স্টে অ্যালাইভ, ফরেভার।" -"হ্যা....হ্যা....হ্যালাইভ!" জটায়ুর গলাটা বোধহয় ভয় আর বিস্ময়ের কম্বিনেশনেই একটু কেঁপে গেল। -ইয়েস লালমোহন, আয়্যাম অ্যালাইভ। তোমাদের মধ্যে দিয়েই তো আমি বেঁচে আছি। তুমি, তপেশ, ফেলু, তারিণী আর শঙ্কু। অনেকটা পাজলের পাঁচটা টুকরোর মত। এবার বুঝেছ? -"বুঝেছি।" শঙ্কুর উত্তর। -এবার টুকরো গুলো জুড়ে দাও। কি পাচ্ছ বল দেখি? মনে হল ধাঁধাটা ধরতে পেরেছি। মনে জোর এনে বললাম, "আমরা যাঁর বহুমুখী প্রতিভার পাঁচটি প্রজেকশন, সেই আপনাকে।" -রাইট এগেইন! সৃষ্টি আর স্রষ্টার মাঝে মৃত্যু বড় অস্বস্তিকর একটা পরদার মত, বুঝলে! তোমাদের রেখে গেলাম; যা'তে বড়, আরো বড় হবার নেশায় পেয়ে সবাইকে বেজায় বুড়ো হয়ে যেতে না হয়। অথচ যখন দেখি চারপাশে ঠিক সেইটাই হচ্ছে, তখন বুঝতে পারলাম, আমার কাজ এখনো ফুরোয়নি! তাই.... আচ্ছা, রহস্যের সমাধান তো হল, এবার বিদায়! জিতে রহো বচ্চো! ভালো থেকো, আর যারা আগামী কয়েকশো বছর তোমাদের মধ্যে দিয়ে আমায় খুঁজবে, তাদের খুব ভালো রেখো। টেক কেয়ার! নীল ধোঁয়ার কুণ্ডলী সমেত আত্মা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক মিনিট সব চুপ। তারপর ফেলু উঠে বাইরে গেল, বুঝলাম চারমিনার ধরাবে। শঙ্কুর দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখ বোজা, যেন ধ্যানস্থ। জানলা দিয়ে সকালের প্রথম আলো এসে পড়ছে। সূর্য উঠছে, দোসরা মে'র সূর্য। মনে মনে বললাম, "হ্যাপি বার্থডে, মানিকবাবু।"

923

5

Samya Dutta

পাঁচ এক্কে এক

29শে এপ্রিল -না, কাল আপনাকে দেখলাম উশ্রীর ধারে, মর্নিং ওয়াক কারছিলেন।তাই ভাবলাম একবার দেখা কোরে যাই, হে হে হে। -ওটা আমার নিত্যদিনের অভ্যাস, আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে করছি। -ভেরি গুড, ভেরি গুড! তা, গিরিডিতে আপনার কেতো দিন হল? -আমাদের কয়েকপুরুষের বাস এখানে। বাবা এখানকার নামী চিকিৎসক ছিলেন, দাদু... -অউর, আপকা হাতিয়ার? -হাতিয়ার? -দ্যা ভেনিশিং গান। হেসে বললাম, "আপনি বিজ্ঞানের জগতের খবরও রাখেন রাখেন তাহলে?" -উপায় আছে প্রোফেসর, খবর দিবার লোক আছে। -সে তো বুঝতেই পারছি। লোকটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ। বসার ঘরে আজ আমার ল্যুমিনিম্যাক্সটা জ্বালানো হয়নি, কিন্তু আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট বুঝতে পারছি লোকটার জ্বলজ্বলে, ধূর্ত দুটো চোখ একদৃষ্টে আমারই দিকে চেয়ে আছে। -একবার দিখাবেন? -ও জিনিস তো হাতের কাছে রাখিনা সবসময়। ওটা থাকে আমার ল্যাবরেটরিতে। আবার বিরতি, এবার আরো দীর্ঘ। তারপর আবার সেই বরফের মত ঠান্ডা, হিসহিসে কন্ঠস্বর, "আমি ফিফটি ল্যাকস অফার করছি প্রোফেসর। আপনি ইচ্ছা কোরেন তো আজহি দিতে পারি, কেশ।" মাথা নেড়ে বললাম, " টাকার আমার অভাব নেই। তাছাড়া, হঠাৎ করে বড়লোক হবার বাসনাও নেই। একা মানুষ, দিব্যি চলে যায়।সুতরাং...." -সেভেন্টি ফাইভ ল্যাকস, সোচিয়ে প্রোফেসর। লোকটার ধৃষ্টতা এবার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে একটু কড়া করেই বলতে হল, "আমার প্রতিটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আমার দীর্ঘদিনের সাধনার ফল। তাদের একটিকেও বেচে মুনাফা করার মানসিকতা আমার নেই।বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না।" -ওয়ান করোর প্রোফেসর, ফাইনাল অফার। সোবার কাছে আমি জিনিস চেয়ে নিই না, দরকার হোলে... -জানি। আমার আর কিছু বলার নেই। আপনি আসুন। -এটা আপনার শেস কোথা? -শেষ কথা। রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু বললেন, "আচ্ছা, এই অ্যানাইহিলিন যন্তরটা কি মশাই?" -"নিশ্চিহ্নাস্ত্র।" ফেলুদা বলল, "শত্রুকে জখম না করে, বিনা রক্তপাতে তাকে একেবারে গায়েব করে দেবার মোক্ষম হাতিয়ার। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে দুশমনের দিকে তাক করে ঘোড়া টিপে দিলেই কেল্লাফতে।" - আরেব্বাস! এর কাছে আপনার কোল্ট পয়েন্ট থ্রি টুও তো নস্যি মশাই! -সে তো বটেই! তবে শুধু অ্যানাইহিলিনই নয়, প্রোফেসর শঙ্কুর প্রত্যেকটি আবিষ্কারই এককথায় ইউনিক। আপনি মিরাকিউরল বড়ির নাম শুনেছেন? এর উত্তরে লালমোহনবাবু বললেন, তিনি প্রোফেসর শঙ্কুর নামই এই প্রথম শুনছেন। "কাগজে ছবি দেখলুম মশাই! বেঁটেখাটো, টাকমাথা, মুখে ছুঁচলো দাড়ি। এতবড় কনভেন্টর দেখে বোঝে কার সাধ্যি!" কনভেন্টর' অবিশ্যি 'ইনভেন্টর'-এর জটায়ু সংস্করণ।তবে ভদ্রলোক বললেন, গিরিডিতে তাঁর এক পরিচিত থাকেন। "অবিনাশ চাটুজ্জ্যে । এথিনিয়াম ইনস্টিটিউটে তিন ক্লাস ওপরে পড়ত। যদি যাবার মতলব করেন, তাহলে বলুন, এই বেলা লিখে দিই।" এখানে বলে রাখি, বিখ্যাত আবিষ্কারক প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর আবিষ্কার অ্যানাইহিলিন পিস্তল বা নিশ্চিহ্নাস্ত্র যে তাঁরই ল্যাবরেটরি থেকে থেকে চুরি গেছে, একথা কাগজে পড়েছিলাম। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই যে ভদ্রলোক ফেলুদাকে ফোন করে তার সাহায্য চাইবেন এই চুরির তদন্তে, সেটা আন্দাজ করতে পারিনি। শঙ্কু অবশ্য বলেছিলেন, তিনি ফেলুদার সুনামের সঙ্গে পরিচিত। "তোমার বাবা জয়কৃষ্ণ ছিলেন আমার সহপাঠী। তোমাদের বাড়ি গিয়েছি তাঁর সঙ্গে, তখন অবিশ্যি তুমি খুবই ছোট।" উত্তরে ফেলুদা জানিয়েছিল সেও প্রোফেসর শঙ্কুর গুণমুগ্ধ, এই বিপদে তাঁকে সাহায্য করতে পারলে তার ভালোই লাগবে। -তাহলে তোমাকে বলে রাখি, দু'দিন আগে বেনারসের এক ভদ্রলোক হঠাৎ বেয়াড়া এক আব্দার নিয়ে হাজির হন।তিনি অ্যানাইহিলিন কিনতে চান, এক কোটি পর্যন্ত অফার করেন। -এবং আপনি রাজি হননি, তাই তো? -সে আর বলতে! কি জানো ফেলুবাবু, বিজ্ঞানকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য কাজে লাগাব, তেমন ইচ্ছে তো হয়নি কখনো! -ভদ্রলোকের নাম? -তোমার পুরনো আলাপী।মগনলাল, মগনলাল মেঘরাজ। ফোনটা এসেছিল আধঘন্টা আগে।ইদানীং ফোন এলে ফেলুদা স্পিকারে দিয়েই কথা বলে। প্রোফেসরের কথা শেষ হওয়ামাত্র শুনতে পেলাম, আমার ঠিক পাশেই লালমোহনবাবুর হাঁটুদুটো পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খেয়ে বিশ্রী ঠকঠক আওয়াজ তুলেছে। ভদ্রলোকের মাথাটাও ক্রমশ যেন নীচের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে, ধরে না ফেললে হয়ত পড়েই যাবেন।ওঁকে দোষ দেওয়া যায় না। অতীতে যতবার এই দুর্ধর্ষ দুশমনের সঙ্গে ফেলুদার সংঘর্ষ হয়েছে, প্রত্যেকবার একটা বড় ঝড় বয়ে গেছে ওঁর ওপর দিয়ে। আমিও যেন বুকের ভেতরের ধুকপুকুনিটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আর কতবার? কতবার এই ভয়ানক শয়তানের মুখোমুখি হতে হবে? ফেলুদা কিন্তু দেখলাম বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলল, "ঠিকই বলেছেন, এঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার আমার মোলাকাত হয়েছে। নিঃসন্দেহে একটি অসামান্য বিচ্ছু। তবে ভাববেন না, এই বুনো ওলের জন্য বাঘা তেঁতুলের ব্যবস্থা আমিই করব।" ফেলুদাকে এত অস্বাভাবিকরকম গুম মেরে যেতে অনেকদিন দেখিনি। শঙ্কুর ফোনটা এসেছিল সকালে। বিকেল পাঁচটা নাগাদ প্রথমে বেনারসের ইনস্পেক্টর তেওয়ারি আর তারপর লালবাজারের ইনস্পেক্টর গড়গড়ি ফোন করে জানালেন, ফেলুদার কথামত কাশী এবং কলকাতায় মগনলালের দুই বাড়ি আর গদিতে একসাথে রেইড হয়েছে। কিছুই পাওয়া যায় নি, তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাশীতেই মগনলালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন বাজে ন'টা। এই চার ঘন্টা ফেলুদা একনাগাড়ে আমাদের বসার ঘরটাতে পায়চারি করেছে, তার ভুরুদুটো অসম্ভব কোঁচকানো, যদিও এখন ঠোঁটের কোণে একটা হাসির আভাস দেখে বুঝতে পারছি ও হয়ত একেবারে অন্ধকারে নেই। মাঝেমধ্যে থেমে ওর নীল ডায়রিতে হিজিবিজি কিসব লিখেছে আর একটার পর একটা চারমিনার ধ্বংস করেছে। জানি এইসময় ও কথা বলা পছন্দ করে না, তবু খেতে বসে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, "পিস্তলটা তো মগনলাল পায়নি, তাই না ফেলুদা!" উত্তরে গম্ভীর ভাবে মাথা নেড়ে বলল, "পেলে সে আর এ তল্লাটে থাকত না। দুনিয়াময় ও জিনিসের খদ্দেরের তো আর অভাব নেই।" -তাহলে এবার? -"এবার মাছ। তারপর দই, তারপর চাটনি। তারপর একটা পান খেয়ে গিরিডিতে একটা ফোন করব। তারপর ঘুম।"একটু থেমে বলল, "তবে, আমার মন কি বলছে জানিস, তোপসে! চেনা পথে এই রহস্যের সমাধান হবে না।দেখি, প্রোফেসর কি বলেন...." 30শে এপ্রিল আজ রাত দশটা নাগাদ ফেলুর ফোন পেলাম। মগনলালের বাড়িতে খানাতল্লাসি যে নিষ্ফল হয়েছে, সেটা জানিয়ে ও বলল, "প্রোফেসর,আমার ধারনা মগনলাল এই চুরির সঙ্গে জড়িত নয়। আপনার অস্ত্রের ওপর তার লোভ ষোলআনা, কিন্তু সেটা তার হাতে পৌঁছয়নি।" মনের মধ্যে একটা সন্দেহ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। বললাম, "ফেলু, আমি যা ভাবছি, তুমিও কি ঠিক তাই ভাবছ?" ফেলু একমুহুর্ত চুপ। তারপর বলল, "এছাড়া আর উপায় নেই প্রোফেসর। যিনি এসব কিছুর মূলে থেকেও এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তাঁর সাহায্য নেওয়া ছাড়া আর উপায় দেখছি না।" -তোমার ইঙ্গিত বুঝেছি ফেলুবাবু। বেশ, আমি আমার নিওস্পেক্ট্রোস্কোপ বের করে রাখব। তোমরা তিনজন বরং কালই এখানে চলে এস। তবে একটা কথা- -কি? -অ্যানাইহিলিন চুরি যাবার পর থেকে মানসিক চাপটা বেশ টের পাচ্ছি। এ অবস্থায় হয়ত আমার পক্ষে কনসেনট্রেট করার অসুবিধা হবে। সুতরাং, একজন ভালো মিডিয়ামের খোঁজ করতেই হচ্ছে! -সে আর ভাবনা কি? একজন তো হাতের কা ছেই আছেন। -কে? কার কথা বলছ? -নাম বললেই চিনবেন,তারিণীচরণ বাঁড়ুজ্যে। (ক্রমশ)

920

6

Samya Dutta

মণি

".....ঠিক এমনই এক বাদলার দিনে ফটকের পাশের আমগাছটা থেকে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে বেজায় চোট পেলেন গোপাল ভটচাজ। বাড়িতে তখন আর কেউ নেই। মা গেছেন হালদার পুকুরে নাইতে, আমি চিলেকোঠার ঘরে বসে কেশব নাগে হাবুডুবু খাচ্ছি। একটা হুড়মুড়-দুমদাম শব্দ পেয়ে জানলা দিয়ে দেখি দা'মশাই, দাদুকে ওই নামেই ডাকতাম, ফটকের পাশটায় পড়ে কাতরাচ্ছেন। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে আরেকবার উঠতে গেলেন..... বৃষ্টিতে বোধহয় জায়গাটা পিছল হয়ে গিছিল, পা হড়কে আবার পড়ে গেলেন। দু'বার আছাড় খেয়েছেন, কিন্তু আমকটা হাতছাড়া করেননি। মাথায় রইল ত্রৈরাশিক, আমি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখি, দা'মশাই ততক্ষণে দাওয়ার ওপরটায় উঠে এসেছেন। আমাকে দেখে বললেন, "দাদুর হেঁটো দুটো বোধহয় গেল রে! লক্ষী ভাই আমার..... ও ঘরে তাকের ওপর মালিশের তেলটা আছে, দিবি এট্টু? তোকে ঘুড়ি কিনতে পয়সা দেব।" ছুটির দিনে ভটচাজ কাকার বাড়িতে আড্ডা জমানোটা এখন একরকম রুটিন। বয়সটা ওই 'কাকা' সম্বোধনের মানানসই হলে কী হবে, মনে পাক ধরেনি! মানুষটা গপ্পের খনি, এককালে চাকরির দৌলতে সারা দেশ চষে বেরিয়েছেন, রসিয়ে রসিয়ে সেসব গল্প বলতেও এঁর জুড়ি মেলা ভার। লম্বা বারান্দার একটা দিকে আমরা আসর জমিয়েছি, ভেতর থেকে সবে তৃতীয় রাউন্ড চা এসে হাজির হয়েছে, এমন সময় একটা শব্দ পেয়ে মনযোগটা সেই দিকে চলে গেল। কাকার বছর চারেকের নাতনিটা এতক্ষণ পাশেই একটা বেতের চেয়ারে বসে তার কোলের পুতুলটাকে বকাঝকা করছিল। গল্পে মশগুল ছিলাম, তবুও থেকেথেকেই সেদিকে চোখ পড়ছিল। দিব্য টের পাচ্ছিলাম, মৌখিক শাসনে পুতুলের চিত্তশুদ্ধি না হলে, মাঝেমধ্যেই তার কপালে চড়টা-চাপড়টা জুটছে। এখন বুঝলাম, শাসনের মাত্রা কিঞ্চিৎ বেশি হয়ে যাওয়ায় পুতুলের দু'চোখে বান ডেকেছে, তাই ক্ষতে মলম লাগানোর পর্ব চলছে। "কেঁদোনা, কেঁদোনা মণি, কাঁদায়োনা আর....." বাচ্চাটা হঠাৎ সুর করে বলে উঠল। একবার, দু'বার, বারবার! ওই একটাই লাইন: "কেঁদোনা, কেঁদোনা মণি, কাঁদায়োনা আর....." বেশ মজা পেলাম ঠিকই, আবার অবাকও হলাম একটু। "ব্যাপার কী, কাকা? কী বলছে নাতনি?" কাকা যেন কী একটা বলতে গিয়েও আচমকাই থমকে গেলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে, একটু অন্যমনস্ক ভাবে একদৃষ্টে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইলেন জানলার দিকে। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, পিচ রাস্তার ধুলো মরে গিয়ে চারপাশে বেশ একটা নরম ভিজে ভিজে ভাব। রাস্তা শুনশান, কেবল দূরে বাসস্ট্যান্ডের ছাউনির তলায় গুটিকয় লোক ভিড় করেছে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। কিন্তু কাকার দৃষ্টি ঠিক সেদিকে নয়, যেন সেসব ছাড়িয়েও আরো দূরের পথ ধরেছে। যেন একটু আনমনা, কিছু একটা বলি বলি করেও যেন বলছেন না, হয়তো ভাবছেন বলাটা উচিত হবে কিনা। আর যতক্ষণ না মনের ভেতর গুছিয়ে উঠতে পারছেন, যেন জোর করেই আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছেন। এদিকে চা জুড়িয়ে জল হয়ে এসেছে, বাচ্চাটাও কখন জানি উঠে গেছে। পুতুলটা এখন তেরচা হয়ে পড়ে আছে বেতের চেয়ারে। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। হালকা একটা গলা খাঁকারি দিতেই, কাকা যেন চটকা ভেঙে চাইলেন আমার দিকে। তারপর একটা অপ্রস্তুত হাসি হেসে বললেন, "কী বলছে, জানতে চাও, কেমন? আচ্ছা! তাহলে বলি শোনো..... পলাশডাঙায় এখন যেখানে এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট হয়েছে, সেখান থেকে হুগলির দিকে বিশ কিলোমিটার গেলে পড়বে হিজল, আমাদের দেশগাঁ। বছর পঞ্চাশ আগে, আমার ঠাকুর্দা গোপাল ভটচাজই ছিলেন সেই গ্রামের একমাত্র ব্রাহ্মণ। আর শুধু হিজল নয়, এপাশে পলাশডাঙা থেকে ওদিকে নবীচর অবধি সেকালে দ্বিতীয় কোনো ব্রাহ্মণের বাস ছিল না। সুতরাং গোপাল ভটচাজের যজমান ছিল বিস্তর। পাকা বাড়ি ছিল, দুচার বিঘে খেতি, গোয়ালে দুধেল গাই.....রোজ নাহক দশ লিটার দুধ পেতাম..... আর ছিলেন আমার ঠাকুমা। মণিমালার বরাবরই একটু মাথার দোষ ছিল, শোনা যায় বাপের বাড়ি থেকে নাকি বিয়ের আগে সেকথা চেপে গিছিল। তার ওপর বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে পরপর তিনটি সন্তান নষ্ট হওয়ায় মানসিক ধাক্কাটাও পেয়েছিলেন তেমনি। আমার বাবা যখন বছর দুয়েকের, ঠাকুমা তখনই ঘোর উন্মাদ। হঠাৎ হঠাৎ মাথাটা বেড়ে গেলে খুব ভায়োলেন্ট হয়ে উঠতেন। মাকে কতবার উনুনের কাঠকয়লা ছুঁড়ে মারতে দেকিচি! আমার অবিশ্যি ঠাকুমার ধারেকাছে ঘেঁষা বারণ ছিল, ভয়ও পেতাম খুব। এমনকি বাবা-মাও একটু তফাতেই থাকতেন। ঠাকুমার ঘরে ঢোকার সাহস ছিল কেবল দা'মশায়ের। সাহস, আবার তাগিদও। ওই পাগল বউয়ের প্রতি বামুনের ভালোবাসা ছিল দেখবার মত। ভালোবাসাও বলতে পারো, আবার..... ঠিক কী যে ছিল বলা কঠিন! বাৎসল্য, সখ্য, প্রেম আর তার সঙ্গে কর্তব্যবোধ..... সব মিলিয়ে মিশিয়ে সে এক বিচিত্র অনুভূতি আমার দা'মশাইকে সর্বক্ষণ চালনা করত। নইলে ভাবো, ঠাকুমার খুব খারাপ অবস্থায়..... রাতের পর রাত জেগে ওই পাগল বউয়ের সেবা করতে দেকিচি মানুষটাকে! এমনকি বাড়াবাড়ির সময় দু'বেলা নাইয়ে-খাইয়ে দেওয়া, মায় গু-মুত পরিষ্কার করা অবধি! যেদিনের কথা বলছি, তার দিনকতক আগে সকাল থেকে ঠাকুমা বেপাত্তা। উনুন ধরিয়ে রেখে কোথায় গেছে কেউ জানেনা। খোঁজ, খোঁজ..... দা'মশাই মাথায় হাত দিয়ে দাওয়ায় বসে আছেন, বেলার দিকে মিত্তিরদের ছোট ছেলে এসে খবর দিলে ন'পাড়ার মাঠে যে যাত্রাপার্টি এসেছে, ঠাকুমা তাদের আস্তানায় ঢুকে তুমুল হল্লা করছে। দলের গায়েন গান ধরেছে, বাজনা বাজছে জোর, আর পাগলি দুলে দুলে নাচছে সবার সামনে। কোনমতে ধরেবেঁধে তো তাকে আনা হল। এদিকে ফিরে এসে পাগলের সে কী তম্বি! উনুন ধরানো দেখে মা রান্নাটা এগিয়ে রেখেছেন, বেলা গড়িয়ে দুপুর..... সবার খাওয়াদাওয়ার তো একটা ব্যাপার আছে, বিশেষ করে বাড়িতে বাচ্চা ছেলে রয়েছে যেখানে..... কিন্তু সেকথা ঠাকুমাকে বোঝায় কার সাধ্যি। 'উনুন যখন আমি ধরিয়ে গেছি, আমিই রাঁধব।' বোঝো ঠ্যালা ! এক লাথিতে ভাতের হাঁড়ি তো উল্টে দিলেই, মাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করলে! বৌমার লাঞ্ছনা দেখে দা'মশাই বোধহয় কিছু বলতে গেছিলেন, পাগলি একটা চ্যালাকাঠ কুড়িয়ে এনে তাঁকে লাগালে ঘা কতক। সেদিন বাড়িশুদ্ধু সবাই উপোস দিলে। গভীর রাতে, বোধহয় খিদের চোটেই আমার ঘুম ভেঙে গিছিল..... গুটিগুটি ভাঁড়ারঘরের দিকে যাচ্ছি, দেখি ঠাকুমার ঘরের দরজা আধখোলা, ভেতর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ আসছে। কী ব্যাপার! উঁকি দিয়ে দেখি, খাটের ওপর বসে ঠাকুমা হাপুস নয়নে কাঁদছে। দা'মশাই নিজে হাতে একবাটি দুধ নিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন বউকে আর থেকে থেকে সুর করে কিছু একটা বলছেন, অনেকটা বাচ্চাদের কান্না থামাতে যেমন ভোলায়! ভালো করে কান পাততে শুনি, কেঁদোনা, কেঁদোনা মণি, কাঁদায়োনা আর হাসিমুখে দেহ চুমো, কাঁদাবোনা আর..... বাবা, তোমরা তো প্রেমের কথা বড়াই করে বল। এক অশিক্ষিত, গেঁয়ো বামুন আর তার বদ্ধ উন্মাদ বৌয়ের যে দৃশ্য আমি সে রাতে দেখেছিলাম, তাকে কী বলব বলতে পারো? প্রেম নয়?" কাকা থামলেন একটুক্ষণ। হয়তো পুরনো স্মৃতি ঝালিয়ে নিলেন চোখ বুজে। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, "দা'মশায়ের পড়ে যাবার দিনও ঠাকুমা তেমনি সকালে উধাও হয়েছেন। কোথায়, কেউ জানেনা! মা স্নান সেরে ফিরতে কিন্তু দা'মশাই চোটের কথাটা বেমালুম চেপে গেলেন। "বৌমা, আজ আর ভাত চড়িয়ে কাজ নেই, তোমার শাউড়িকে তো জানোই..... আম পেড়ে রেখিচি, দই-চিঁড়ে দিয়ে মেখে খেয়ে নাও দিকিন! আর নাতরাটাকেও খাইয়ে দিও....." এভাবেই দিন কাটছিল। তাল কাটল বছর দুই বাদে, পুজোর সময়। বাবা বাড়ি ফিরেছেন, অন্যবার কত হাসি, কত গল্প..... এবার কিন্তু দেখলাম, বাবার মুখটা ভয়ঙ্কর গম্ভীর। দা'মশায়ের ঘরে বাবা খুব চাপা গলায় বাপকে ধমক দিচ্ছেন, আর আমি দরজার ফোঁকর দিয়ে চোখ রেখিচি, স্পষ্ট মনে আছে। প্রায় ছ'ফুট লম্বা আমার দা'মশাই, ঠাকুমার কথায় 'বেউড় বাঁশের মত চেহারা'টা যেন অপমানে, গ্লানিতে অ্যাত্তটুকু হয়ে গেছে! কী ব্যাপার, সে আমি আরো বড় হয়ে জেনেছি। গাঁয়ের ঘোষেদের অনেক বিষয়-সম্পত্তি ছিল। বড় তরফের ছেলেপুলে নেই, বৌটি বিধবা হলে, উত্তরাধিকার রইল না। শেয়াল-কুকুরেরা গন্ধ পেয়ে তলেতলে নড়েচড়ে বসল। ঘোষেদের বাড়ির পেছনে কয়েকঘর মুসলমানের বাস। একদিন তাদেরই একজন, বোধহয় ভোরবেলা বাহ্যে যাবে বলে বেরিয়েছিল, দেখে ঘোষবাড়ির খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে একটা খুব ঢ্যাঙা লোক আবছা অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রথমটা জিন-পিরেত ভেবে ভয় পেলেও, পরে ঠাহর হয়, এ তো দা'ঠাকুর! গাঁয়ের একমাত্র বাউনঠাকুর, সবাই তাঁকে চেনে, অন্ধকারেও ভুল হবার কথা নয়। গাঁময় ঢিঢি পড়ে গেল। খবরটা সদরে বাবার কান অবধি কে পৌঁছলো জানিনা, তবে দা'মশাইকে মুখের ওপর কেউ কিছু বলতে সাহস করেনি। কিন্তু গাঁদেশে এমন মুখরোচক কেচ্ছা চাপা থাকে না, মাকে ঠারেঠোরে অন্য বাড়ির মেয়ে-বউরা যে অনেক কথা শুনিয়েছিল, তা এখন বুঝতে পারি! অনেকদিন রান্নাঘরে চুপিচুপি বসে মাকে কাঁদতে দেখেছি। গাঁয়ের মাতব্বরদের সব আস্ফালন গিয়ে পড়ল ঘোষেদের বিধবাটির ওপর। সিদ্ধান্ত হল, তাঁকে বাপের বাড়ি ফেরত পাঠানো হবে, জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গে আর ঘোষবাড়ির কোনো সম্পর্ক থাকবে না। সম্পত্তিতে তাঁর অংশ, মেজ আর ছোট তরফের মধ্যে ভাগ হবে।" -তারপর? -তারপর আর কী? দা'মশাই আর বেশিদিন বাঁচেননি। শেষের দিকটা নিজেকে ভীষণ গুটিয়ে নিয়েছিলেন, নিজের ঘর ছেড়ে পারতপক্ষে বেরোতেন না। ঘরের সামনে দিয়ে যাতায়াতের সময় লক্ষ্য করতাম, প্রায় সবসময়ই খাটের কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। হাতদুটো কোলের ওপর জড়ো করা, কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে, মুখটা নীচু হয়ে প্রায় ঠেকে গেছে বুকের সঙ্গে। ভালো লাগত না। কেবল একটা জিনিস দেখে অবাক হতাম। -কী? -মাথা ঠান্ডা থাকলে, দেখতাম ঠাকুমা এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে, কখনো বা খাটের পাশে। দুই বুড়োবুড়ি, কেউ কিছু বলছে না, নিস্তব্ধ ঘর। অথচ মনে হত, কী ভীষণ এক ভাবের আদানপ্রদান হচ্ছে দুটো মানুষের মধ্যে। তবে দা'মশায়ের চলে যাবার দিন যা দেখলাম, তা কখনো ভুলব না। মানুষটার লম্বা কাঠামোটা খাটিয়ায় শোয়ানো, শ্মশানবন্ধুরা এসে পড়েছে, সবাই তৈরি..... এমন সময়, ঠাকুমা কোথা থেকে জানি হাঁপাতে হাঁপাতে এল। হাতে একটা বালিশ! ওমা! বালিশ কী হবে! ঠাকুমা দেখি আলতো করে বালিশটা দা'মশায়ের মাথার তলায় গুঁজে দিচ্ছে! তারপর কোঁচড় থেকে খানিকটা মুড়ি বের করে পাশে রেখে দিলে। সবাইকে হতবাক করে পাগলি গুটিগুটি পায়ে ফিরে যেতে যেতে বলল, "অতটা পথ যাবে, খিদে পাবে তো..... এমনিতে তো বালিশ ছাড়া ঘুম হত না, এখন দেকো কেমন শুয়ে আচে মিনসে...." ওঠার সময় হয়েছে। তবুও একটা প্রশ্ন অনেকক্ষণ খোঁচা দিচ্ছিল, এবার করেই ফেললাম, "ঘোষেদের বিধবার ব্যাপারটা..... মানে....." কাকা কিছু না বলে উঠে গেলেন। যখন ফিরে এলেন, হাতে দুটো ছবি। আদ্যিকালের সাদাকালো ছবি, তবু মুখ চেনা যায়। একটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, "এটা আমার ঠাকুমার মৃত্যুর ক'দিন আগে তোলা। আর এইটে..... এটা আমি তুলেছিলাম, এককালে ওদিকে ন্যাক ছিল..... ঘোষজেঠাইমার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাতের দিন, ওঁরও তখন বেশ বয়স হয়েছে....." ছবি দুটো হাতে নিয়েই চমকে উঠতে হল। কাকা বলে না দিলে কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না দুটো ছবি দু'জন ভিন্ন মানুষের। রঙ চটে গেছে, পুরনো ছবি আজকের দিনের মত স্পষ্ট নয়, কিন্তু দুই মহিলার কী আশ্চর্য মিল! মুখের গড়নে, বসার ভঙ্গিতে, এমনকি ক্যামেরার দিকে তাকানোতেও অদ্ভূত মিল। আমি কী বলব বুঝতে না পেরে, ফ্যালফ্যাল করে কাকার দিকে চাইলাম। "ঘোষজেঠাইমা সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন....." কাকার গলা একটু ভারী শোনায়, "দা'মশাই তাঁকে ভীষণ স্নেহ করতেন বরাবরই। তাঁর স্বামী জীবিত থাকাকালীনও..... কিন্তু, মানে..... ওই অবধিই, খুব দিয়ে বলেছিলেন..... অবিশ্যি গাঁয়েগঞ্জে কলঙ্কিনীর কথা আর কে শোনে..... বিধবা হবার পরেও গাছের ফলটা, গরুর দুধটা নিয়মিত দিয়ে আসতেন দা'মশাই, তবে দিনমানেই..... সেই রাতে.....তাঁর তখন প্রবল জ্বর, ওদিকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, শুনে থাকবে..... দা'মশাই সারারাত রোগীর শিয়রে জেগে ছিলেন...... জেঠাইমার কেবল মনে ছিল কপালে জলপটির ঠান্ডা স্পর্শ, আর হুঁশ ফিরতে যতবারই চোখ মেলে চেয়েছেন..... একটা লম্বা দোহারা চেহারা....." -এঁকে পেলেন কোথায়? -ওঁর বাপের বাড়িতে। ভায়েরা ভীষণ অচ্ছেদ্যা করত..... তবে, আরেকটা কথা সেদিন বলেছিলেন জেঠাইমা..... -কী কথা? -ওঁর আসল নাম ছিল কমলা। কিন্তু দা'মশাই কখনও সেই নাম ব্যবহার করতেন না। উনি শেষদিন অবধি অন্য নামে ডেকেছেন। -কী নাম? -মণি।

896

8

Samya Dutta

বিশ্বাসঘাতক

"...পরমুহুর্তেই অম্বিকাবাবুর বিশাল তালতলার চটির একটা পাটি গিয়ে সজোরে আছাড় খেল বিকাশবাবুর গালে। সব শেষে শুনলাম রুকুর রিনরিনে গলার চিৎকার: 'বিশ্বাসঘাতক! বিশ্বাসঘাতক! বিশ্বাসঘাতক! ' " -খোসবাগ পৌঁছে গেছি গো! নেমে আসেন স্যার, নেমে আসেন। গাইডের ডাক শুনে হুঁশ ফিরল। হাতের বইটা বন্ধ করে নেমে এলাম গাড়ি থেকে। ব্রাহ্মণ নই, উপনয়নের প্রশ্নই ওঠে না, তবে দূরদৃষ্টির অভাবে বাড়তি দুটো চোখ পাওনা হয়েছে। কিন্তু সে চোখ বড়ই শৌখিন, গাড়ির ঠান্ডাই যন্ত্রের আওতা থেকে বেরোতেই ঝাপসা। জামার খুঁটে চশমাটা মুছে চোখে দিতেই, চোখ পড়ল একটা সাইনবোর্ডে: 'সাধারনের দর্শনার্থে কোনো পয়সা লাগে না। প্রযত্নে: ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ' হে মোর কঞ্জুষ হৃদয়, খোসবাগে এসে এরপরেও কি তুমি খুশ হবে না? লাব-ডুব ছন্দ ছেড়ে আনন্দের তুড়িলাফ দেবে না একটা? নাহ্! সার্থক নাম। খোসবাগ। আনন্দ বাগিচা। বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস নিতে গিয়ে টের পেলাম, একটা সিগারেটের জন্য শ্বাসযন্ত্র জুড়ে শীৎকার উঠেছে। অন্তরাত্মাকে কষ্ট দিতে নেই, অনতিদূরেই এক হিন্দুস্থানী দোকানদার নানারকম নিকোটিনের পসরা নিয়ে বসেছে, গুটিগুটি পায়ে সেদিকেই যাচ্ছি, এমন সময়... আমাকে পেরিয়ে যে ভদ্রলোক এইমাত্র দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁর উচ্চতা কিছু নাহোক ছ'ফুট। লম্বা, ঋজু শরীরটার ততোধিক লম্বা ছায়া যাবার সময় আমাকে ছুঁয়ে গেছে। চোখ না তুলেও দিব্যি বুঝতে পেরেছি, ভদ্রলোকের পরনের কালো প্যান্টের ওপর শার্টটার রঙ নীল আর তিনি সোজা এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের আরেকটা লোকের দিকে। এই দ্বিতীয় লোকটা এতক্ষণ দোকানদারের সঙ্গে কথা বলছিল, তার চশমার কাঁচে রোদ পড়ে চকচক করছে। এইবার সে ঘাড় ঘোরাতেই প্রথম ভদ্রলোকটিকে দেখতে পেল, আর দেখামাত্র... -অবাক হলেন মনে হচ্ছে? -আপ...মানে, আপনি... এখানে... মানে, আপনাকে এখানে ঠিক... -আমি কিন্তু আপনাকে এক্সপেক্ট করেছিলাম। -আম... আমাকে... মানে ... -একটু কথা ছিল, জরুরী। এখানে তো বলা যাবে না, একটু নিরিবিলি চাই। -কিন্তু আমি তো এখন... -সিগারেট পরে হবে, এখন চলুন। হম লোগ ওয়াপস আয়েঙ্গে। শেষের কথাটা বলা দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে, সেও দেখলাম হাসিমুখে হাতজোড় করে ঘাড় নাড়ল, "আচ্ছা জি, আচ্ছা।" মনের ভেতর এতক্ষণ দিব্যি একটা ফুরফুরে ভাব ছিল। এবার বুঝতে পারলাম, সেটা উধাও হয়ে গিয়ে তার জায়গায় একটা উত্তেজনার শিরশিরানি দেখা দিয়েছে। বুকের ভেতর একটানা হাতুড়ি পেটার শব্দ, পা দুটো কাঁপছে, তবুও সেই কাঁপা কাঁপা পায়েই মন্ত্রমুগ্ধের মত পেছু নিলাম। হাতকয়েক তফাতে আছি, সেখান থেকে দুজনের কথোপকথন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। -আপনি কিছু বলার আগে আমি একটা প্রশ্ন করি। আপনার মিথ্যে বলার বদ অভ্যেসটা শুধরেছে কিনা বোঝা দরকার। আপনি মুর্শিদাবাদে কী করছেন? -কী করছি মানে... এমনি... জাস্ট এমনি... (এবার গলায় একটু অস্বাভাবিক জোর এনে) কেন? আসতে পারিনা নাকি? -আসতেই পারেন। একবার চুরির দায়ে জেল খাটলেই কারো মুর্শিদাবাদে ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয় না। কিন্তু, আপনি এমনি আসেননি। আপনার একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা কী? -মমমানে... কী বলতে চাইছেন? লম্বা ভদ্রলোক এবার হাঁটা থামিয়ে পাশের লোকটার চোখে চোখ রেখে সোজাসুজি তাকালেন। জ্বলজ্বলে চাহনি, ঠান্ডা অথচ ধারালো কন্ঠস্বর, "মিস্টার সিংহ, যে একবার শয়তানের খপ্পরে পড়ে, তার এত সহজে মুক্তি হয়না। আপনি জেল থেকে বেরিয়ে বেকার বসেছিলেন, হয়তো অনাহারেই মারা যেতেন যদি না..." -প্লিজ! আমি... আমি কিছু জানিনা। আমাকে যেতে দিন, প্লিজ! -এখান থেকে বর্ডার খুব কাছে। এই শহরকে ঘাঁটি করে সেই সাক্ষাৎ শয়তান চোরাকারবারের একটা পরিকল্পনা আঁটছে। আপনাকে আগেভাগে পাঠিয়েছে হাওয়া বুঝতে। ঠিক কিনা? -প্লিজ...প্লিজ... ভদ্রলোক এবার একটু চুপ করলেন। তারপর, দৃষ্টি না সরিয়েই আবার বলতে শুরু করলেন, "আপনি চুরি করেছিলেন নেহাৎ লোভে পড়ে। একটা নির্বাসন দশা থেকে মুক্তির তাড়নায়। খুন আপনি করেননি, যদিও আপনার আহাম্মকিই সেজন্য দায়ী। কিন্তু আপনার আসল অপরাধ কী জানেন? আপনি বিশ্বাসঘাতক।" -প্লিজ... -মিস্টার সিংহ, এটা মুর্শিদাবাদ শহর। এখানে বিশ্বাসঘাতকের কী পরিণতি হয় জানেন তো? -প্লিজ... -বিশ্বাসঘাতকের পরিণতি। জানা আছে, মিস্টার সিংহ? -দোহাই আপনার! ছেড়ে দিন আমায়... ভদ্রলোক আবার থামলেন। তারপর পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বের করে একটা নিজে ধরিয়ে অন্যটা বাড়িয়ে দিলেন দ্বিতীয় লোকটাকে। "নিন।" লোকটা মুখ নীচু করে ফেলেছিল। এবার চোখ তুলে তাকাল। এখনও তার চশমার কাঁচে রোদ, কিন্তু ভেতরের চোখজোড়ায় এখন একরাশ বিস্ময়। -নিন। ধরান। তারপর আসুন, আপনাকে একটা গল্প বলি। -গল্প! মানে... -আসুন। এঁরা যতক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমিও দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। এখন আবার চলতে শুরু করলাম। তবে খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাই ভদ্রলোকের পকেট থেকে যে সিগারেটের প্যাকেটটা বেরলো, তার ব্র্যান্ডটা আমার চোখ এড়ায়নি। চারমিনার। -আপনার বাঁহাতে খেয়াল করুন মিস্টার সিংহ। এই কবরে শুয়ে আছেন নবাব আলিবর্দির বড় মেয়ে, ঘসেটি বেগম। -অর্থাৎ... -অর্থাৎ সিরাজের বড়মাসি। যিনি বোনপোকে দু'চক্ষে দেখতে পারতেন না। -ও! -সিরাজকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ইনি ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। সিরাজ সেটা টের পেয়ে এঁর মোতিঝিলের প্রাসাদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। -ও! -সিরাজ তো ক্ষমতাচ্যুত হলেন। মাসির কী দশা হল বলুন তো? মীরজাফরের বড় ছেলে মীরন এঁকে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারলেন। -আচ্ছা। -এই মীরনেরই আরো গল্প বলি শুনুন। এই ডানদিকে একসারি কবর দেখছেন? গুনে দেখুন, সতেরোটা। এঁরা সকলেই সিরাজের আত্মীয়, সিরাজ বন্দি হয়েছেন খবর পেয়ে এঁরা ঢাকা থেকে নবাবকে মুক্ত করতে এসেছিলেন। মীরন এঁদের বিষ খাইয়ে মারলেন। -হুঁ! -ভেতরে দেখবেন সিরাজের পাশেই তাঁর নাবালক ভাইয়ের কবর আছে। মীরন তাকে হাতির পায়ের নীচে পিশে মেরেছিলেন। -(চুপ) -আচ্ছা, বলুন তো? মীরনের কী পরিণতি হল? -ঠিক... ঠিক জানিনা। -ব্রিটিশরা মীরনকে চিনতে ভুল করেনি। বিহারের শাহ আলমের সঙ্গে যুদ্ধের সময় জেনারেল ওয়ালসের নির্দেশে ব্রিটিশরাই মীরনের তাঁবু পুড়িয়ে দেয়। রটিয়ে দেওয়া হল, মীরন বজ্রাঘাতে মরেছেন। -হুঁ! -এইবার দেখুন, আপনার ডানদিকে, পাশাপাশি তিনটে কবর। মিস্টার সিংহ, দানসা ফকিরের নাম শুনেছেন? -হুঁ। -এই সেই দানসা ফকির, যে সিরাজকে ধরিয়ে দিয়েছিল মীরকাশেমের হাতে। ছদ্মবেশে সিরাজ পালাচ্ছিলেন রাজমহলের দিকে, সঙ্গে ছিলেন বেগম লুৎফা ও মেয়ে উম্মত জারা। পথে ভগবানগোলার কাছে সেই একরত্তি মেয়ে খিদে - তেষ্টায় অধীর হয়ে উঠলে, খানিকটা বাধ্য হয়েই নৌকো থামাতে হল। তারপর কী হল বলুন তো? -জুতো... সিরাজের নাগরা জুতো দেখে... -ঠিক! ওই জুতো দেখেই দানসা নবাবকে চিনে ফেলল। সিরাজ তো বন্দী হলেন। কিন্তু আগেই বলেছি, ব্রিটিশরা বেইমানের শেষ রাখা পছন্দ করত না...ওই তিনটে কবরে শুয়ে আছে দানসা ফকির, তার স্ত্রী ও ছেলে। আচ্ছা, এই প্রসঙ্গে অন্য দুজনের কথা বলে রাখি। মীরকাশেমের ভাগ্যে বাংলার মসনদ জুটেছিল বটে। কিন্তু তারপর বক্সার যুদ্ধে হেরে সেই যে পালিয়ে গেলেন, ইংরেজদের ভয়ে তাঁকে পালিয়েই বেড়াতে হল আমৃত্যু। মিস্টার সিংহ, শুনছেন তো? -(চুপ) -আরেকজনের কথা বলি তবে, মহম্মদী বেগ। সিরাজের হত্যাকারী। শেষে মাথার ব্যারামে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা। শুনছেন? -(চুপ) -জগৎ শেঠ। মীরকাশেম এঁকে এঁর প্রাসাদের চুড়ো থেকে গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দেন। নেক্সট, উমিচাঁদ। ক্লাইভ এঁর সঙ্গেও প্রতারণা করলেন। ফলে বদ্ধ উন্মাদ দশায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মর্মান্তিক মৃত্যু। ইয়ার লতিফ- যুদ্ধের পর নিখোঁজ। সম্ভবত গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত। -প্লিজ...চুপ করুন... -মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি হল। রায় দুর্লভ মরলেন কারাগারে। -চুপ করুন... আপনার পায়ে পড়ছি... -ব্রিটিশদের কথা শুনবেন না? ক্লাইভ? দেশে ফিরে প্রচুর সম্মান তো পেলেন, কিন্তু হঠাৎ কী অজ্ঞাত কারণে বাথরুমে ঢুকে নিজের গলায় ক্ষুর বসিয়ে দিলেন। -আমি আর পারছি না... চুপ করুন, প্লিজ! -আরো আছে। ওয়াটসন, স্ক্রাফটন... -কিন্তু... কিন্তু... আপনি আসল লোকটার কথা কেন বলছেন না? মীরজাফর? কেন এড়িয়ে যাচ্ছেন আপনি? -ঠিক বলেছেন মিস্টার সিংহ। মীরজাফর নবাব হয়েছিলেন। একবার নয়, দু'বার। কিন্তু তাঁকে সন্তানের মৃত্যু দেখতে হল, এত সাধের রাজ্যপাট হারালেন জামাইয়ের হাতে । শেষে কুষ্ঠ রোগের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শোচনীয় মৃত্যু। তাছাড়া... -তাছাড়া? -আপনি তো জাফরাগঞ্জেই নাম ভাঁড়িয়ে বাড়িভাড়া নিয়েছেন? ক্ষুদিরাম রক্ষিত, তাই তো? এই মীরজাফরের নাম থেকেই মহল্লার নাম জাফরাগঞ্জ। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, মীরজাফরের ভাঙাচোরা প্রাসাদ স্থানীয় লোকেই দেখিয়ে দেবে। এখানকার লোকের কাছে অবিশ্যি সে প্রাসাদের একটা চলতি নাম আছে। কী বলুন তো? -কককী? -'নমকহারাম দেউড়ি।' মনে রাখবেন মিস্টার সিংহ, আড়াইশো বছর পার করে এসেছি আমরা। এখনও সেই প্রাসাদের পরিচিতি এক বেইমানের বাড়ি হিসেবেই। -ওহ্! স্টপ ইট, স্টপ ইট! চুপ করুন বলছি, প্লিজ! চুপ করুন আপনি! -কাঁদছেন? কাঁদবেন না মিস্টার সিংহ, কেঁদে কোনো লাভ নেই! বিশ্বাসঘাতকতার পথ বড় পিচ্ছিল, আর এই শহরের ইতিহাস বলছে বেইমানের এখানে কোনো ক্ষমা নেই। লোভের বশেও একবার যখন সে পথে পা বাড়িয়েছেন, মুর্শিদাবাদ আপনার জন্য আর নিরাপদ নয়। -আমি... আমি তাহলে... মানে, এখন কী করব? -আমি বলি? সবার আগে মগনলালের চাকরিতে ইস্তফা দিন। তারপর ফিরে যান, বেনারস। -বেনারস! আপনি কি পাগল হলেন? সেখানে... না না, অসম্ভব! ভদ্রলোক এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে, থেমে থেমে বললেন, "মিস্টার সিংহ, উমানাথ ঘোষাল তাঁর বুড়ো বাপের সাথে আর যোগাযোগ রাখেন না। বাকি আত্মীয়েরাও একেএকে আসাযাওয়া বন্ধ করেছে। ওই প্রকান্ড ঘোষালবাড়িটায় অম্বিকা ঘোষাল এখন একা। বৃদ্ধ, অশক্ত। কেউ দেখার নেই... ফিরে যান মিস্টার সিংহ। র‍্যাক্সিটের আজ আপনাকে বড় প্রয়োজন।" -কিন্তু... তা কি আর হয়? অম্বিকাবাবু আমাকে আর... -মিস্টার সিংহ, অম্বিকা ঘোষালকে আপনি চেনেননি। আপনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু সেই ভুলটুকু ক্ষমা করে আপনাকে আরেকটা সুযোগ দেবার মত বড় মন অম্বিকাবাবুর আছে। ফিরে যান। অম্বিকাবাবুকে বলবেন, তাঁর দেওয়া পারিশ্রমিক আমার কাছে খুব যত্নে আছে... আচ্ছা, আমি এখন আসি। গুড বাই, মিস্টার সিংহ! ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন, পিছন থেকে একটা ডাক শুনে ফিরে তাকালেন। "শুনুন।" -কিছু বলবেন? -মিস্টার মিত্তির, থ্যাঙ্ক ইউ! -ইউ আর ওয়েলকাম বিকাশবাবু, ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।

994

8

মনোজ ভট্টাচার্য

কোন এক প্রশ্নের খোঁজে !

কোন এক প্রশ্নের খোঁজে ! আপনি তো শ্রাবস্তী মিত্র ? অনির্বাণ বসু জিজ্ঞেস করলেন মহিলাকে ! হ্যাঁ । - আপনার ? - অনির্বাণ বসু? - তবে জানিয়ে রাখি - এখন আমি রিটায়ার্ড ! একটু পশ্চাধাবন করি । অনির্বাণ বসু শ্রাবস্তী মিত্রকে গুগুলসের মাধ্যমে আলাপ করেছেন । - কিভাবে কিভাবে জানতে পেরেছেন – এই মহিলাই হয়ত তার প্রার্থিত উত্তরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে সক্ষম হবে ! – ইতিমধ্যেই ইমেলের মাধ্যমে পরস্পরের পরিচয় জানা হয়ে গিয়েছে ! তবু যাচাই করে নেওয়া আরকি ! আলাপচারিতা ! আমি আপনাকে আগেই জানিয়েছি – আমি একটা কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি ।- তাই আপনার আসার জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখছি ! - অনির্বাণ কিন্তু কিন্তু করে বলল । হ্যাঁ – সেটা আপনি আগেই বলেছেন ! শ্রাবস্তী বলল বিনা কৌতূহলে ! কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না – সেই কৌতূহলটা কি আমায় নিয়ে ! আপনি তো লিখেছেন – আপনি আমাকে চেনেনই না ! – আমার নামটাও তো জানতেন না ! তাহলে ! আমাকে ট্যাপ করলেন কিভাবে ! আপনার নামটা জানতাম না – সেটা ঠিক নয় ! এক ভদ্রলোকের লেখায় ও এক সাংবাদিকের লেখায় আপনার নামটা দেখেছি । আর সেই থেকে আমার কৌতূহলটা জেগে উঠেছে ! আপনিই বোধয় আমার সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন ! কোন ভদ্রলোকের লেখায় আমার নাম এসেছে ! কই আমি তো কোন কেওকেটা নই ! - শ্রাবস্তীকে একটু যেন বেসামাল লাগল ! না না চিন্তার কিছু নেই । সে ধরনের গুরুতর ব্যাপার কিছু নয় ! – আপনি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন ! তার মধ্যেই কটা কথা আমার কৌতূহল জাগিয়েছে ! আমি সব এক এক করে তুলে ধরব ! – আপনার ইচ্ছে হয় উত্তর দেবেন । নাহলে দেবেন না ! কোনও জোর জবরদস্তি নেই ! ব্যক্তিগত নয় তো ? শ্রাবস্তী প্রশ্ন করলো । হ্যাঁ ! প্রায় সবটাই ব্যক্তিগত ! অনির্বাণ হেসে বলল । - তবে আপনার সম্বন্ধে কিছুই নয় । শুধু আপনার পারিবারিক সম্বন্ধে ! পারিবারিক ? সে আবার কি ! আমার পারিবারিক কথা আপনি জানতেই বা চাইবেন কেন ? সেটাই তো আসল রহস্য ! সবটা জানার পর হয়ত আপনি আমাকে শত্রু ভাবতে পারেন ! আবার আপনারও কৌতূহল হতে পারে – আপনাদের পরিবার সম্বন্ধে ! আপনি কে বলুন তো ? আর আপনার মতলবটাই বা কী ? আমি একজন সাধারন মানুষ – যে কিনা নিজের পশ্চাৎপট সম্বন্ধে কিছু জানতে চায়! আর আমার মতলব তো আপনাকে আগেই জানিয়েছি – স্রেফ কৌতূহল ! আপনি কি আমার সঙ্গে ডেট করতে চাইছেন ? – আপনাকে দেখে তো যথেষ্ট বুড়ো মনে হচ্ছে ! আমারও এখন ডেট করার বয়েস নেই ! আপনি ঠিকই বলেছেন ! আমার এবং আপনারও এখন সে বয়েস নেই ! আর আমার আপনার সঙ্গে ডেট করার সম্পর্কও নয় ! তার মানে ? সব শুনলে বুঝতে পারবেন ! – নিন এবার নিশ্চিত হয়ে চা-টা খেয়ে নিন ! সাংবাদিকের প্রশ্নের এক উত্তরে আপনি বলেছিলেন – খেয়া দত্ত আপনার মাসতুতো দিদি হতেন ! – তাই তো ? হ্যাঁ ! খেয়াদি তো আমার দিদিই ! – তাহলে আপনি কার মেয়ে ? তরুলতা মিত্র ও প্রফেশর রণজয় মিত্রের মেয়ে ? আপনি জানলেন কিকরে – তরুলতা মিত্রের নাম ? শ্রাবস্তী বেশ অবাক হয়ে গেল ! আপাতত আমার প্রশ্নের উত্তর দিন । সবেরই উত্তর পাবেন ! – আগেই যদি বলে দিই – তাহলে হয়ত আর উত্তর দেবেনই না ! – তাই ধীরে ধীরে খোলস ছাড়াতে হবে ! – আপনি কি জামশেদপুরে জন্মেছিলেন ? রিং রোডে ! আপনি কে বলুন তো ? – আপনি তো দেখছি আমার সম্বন্ধে অনেক খবরই জেনে এসেছেন ! কোত্থেকে পেলেন বলুন তো ! আপনার জীবনী তো গুগুলসে নেই – ফেশবুকেও নেই ! বর্তমানে আপনার কোনও বন্ধুকেও আমি জানি না ! - অনির্বাণ বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলছেন ! – আপনার উত্তরগুলো শুনলে আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো ! – যেমন আপনারা অনেকদিন আগেই জামশেদপুর ছেড়ে বোম্বাই চলে গেছিলেন ! তাই তো ? হ্যাঁ – আমরা অনেকদিন হল মুম্বাইয়ের বাসিন্দা ! শ্রাবস্তী উত্তর দেয় ! খেয়া দির সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিল – মনে আছে কি ? অবশ্যই - খেয়াদির মারা যাওয়ার আগে ! সে তো বটেই – মারা যাওয়ার আগে তো হবেই ! – একটু হেসে অনির্বাণ বলে – মারা যাবার কত আগে ? ১৯৭৭ সালে খেয়া দত্ত দুর্ঘটনায় মারা গেছিলেন । তার আগে কোথায় আপনাদের দেখা হয়েছিল ? মানিকতলার বাড়িতে কি আপনি কখনো গেছিলেন ? না তো মানিকতলার বাড়িতে তো আমি যাই নি কখনো ! – ঠিক মনে পড়ছে না – কোথায় ! কোনও শোতে হতে পারে ! খেয়াদির তো সময়ই হত না কারুর সঙ্গে দেখা করার ! অথচ আপনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন – খেয়াদির মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে খেয়াদি নাকি সতৃষ্ণ নয়নে বারান্ডার কোন থেকে তাকিয়ে থাকতেন ! এই কথাটা আপনি কোত্থেকে শুনেছিলেন ? – অনির্বাণ প্রশ্ন করলো । সেটাই তো স্বাভাবিক নয় কি ! – মাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে হচ্ছে – খেয়াদির খারাপ লাগবে না ? – শ্রাবস্তী বেশ অসহিষ্ণু ভাবেই প্রতিঘাত করলো ! আপনি কি জানেন – খেয়াদির মা ও বাবা একসঙ্গে খেয়াদিকে স্কুল বোর্ডিংএ পৌঁছে দিয়ে নিজের নিজের বাড়ি যেত ! খেয়াদির মা বারো নম্বর ট্রামে করে গ্যালিফ স্ট্রিট যেত ! না সেরকম কিছু শুনিনি ! তবে সেজ-মাসী শ্যামবাজারে যেত ! ওখানে তো আমাদের মামার বাড়ি ছিল ! আপনি মামার বাড়ি গেছেন কখনো ? হ্যাঁ – গেছি তো ! শ্রাবস্তীর চোখ একটু জ্বলে উঠল ! আপনার মামার বাড়ি কারা থাকতেন – মনে পড়ে ? না । সে অনেকদিন আগের কথা । তাছাড়া আমি তখন খুবই ছোটো ! আর এখন তো সে বাড়ি বিক্রিই হয়ে গেছে ! আপনার দাদা যখন হয়েছিলেন – তখন ওখানে ছিলেন ! কিন্তু আপনি তো ওই বাড়িতে যানই নি ! – আপনারা কলকাতায় এলে বালিগঞ্জে সেজো মাসির বাড়ি থাকতেন ! ওখানে আপনার আরও দুই দাদা ছিলেন ! – ঠিক কি না ! বাব্বা ! আপনি তো একেবারে হোম ওয়ার্ক করেই এসেছেন দেখছি ! আপনি বালিগঞ্জের বাড়িও চেনেন ! আমি আপনাদের বাড়িও চিনি । উত্তরপাড়ার বাড়িও চিনি ! আপনার এক মাসীর মাথায় ছিট আছে – খড়দার এক স্কুলের হেড মিস্ট্রেস – তাদেরও চিনতাম ! আপনি যাদের নাম করলেন – ওনারা তো সব মরেই গেছে ! স্বাভাবিক ! এ সব কি আজকের কথা ! – অনির্বাণ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । তারপর আবার আরম্ভ করলেন । তাই তো বলছি – আমি যদি বলি – আমি আপনার কাকা বা মামা – তার তো কোনও প্রমান দেখানো যাবে না ! আপনারও কোনও প্রমান নেই মনে হচ্ছে ! তাই তো দেখছি ! কিন্তু আপনিই বা হঠাৎ করে আমার আত্মীয় সাজতে যাবেন কেন ! – আপনার কি আর কোনও মতলব আছে ? – আমার ক্ষতি টতি করবেন না তো ! আপনার ক্ষতি বা লাভ করার কোনও ক্ষমতাই আমার নেই ! – আমার শুধু কৌতূহল – খেয়াদির সম্বন্ধে কিছুই না জেনে – সাংবাদিকদের কাছে অমন রিমার্কস করলেন কেন ? শুধু সিনেমা করার জন্যে খেয়াদির বাবাকে ওরা ভিলেন বানাল ! কেউ কিছু বললেন না ! তাতে আপনার কি কোনও ক্ষতি হয়েছে ! আপনি কি খেয়াদির কাকাদের কেউ হন নাকি ? কেউ হলে বা এখানে থাকলে নিশ্চয় প্রতিবাদ করতাম । অ্যাকচুয়ালি আমি অনেক চেষ্টা করেছি পরিচালকের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করতে । ই-মেল করেছি । উনি উত্তর দেবার কোনও সৌজন্যই ধার ধারেন না ! উনি খুব ব্যস্ত মানুষ । সময় করে উঠতে পারেন নি ! সে তো হতেই পারে ! – তাহলে তার মেল অ্যাকাউন্ট করা উচিত হয় নি ! অনির্বাণ একটু অসহিষ্ণু হয়ে উঠল ! – আচ্ছা শ্রাবস্তীদেবী, আপনারা বোধয় জানেন – খেয়াদির দুজন দাদা ছিলেন – জ্যেঠতুতো ! – তারা কেউ কখনো আপনাদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করেন নি ! এসব কথা আমি জানিনা ! আমরা তো মুম্বাই থাকতাম ! সেই তো দেখছি ! – অনির্বাণ হতাশ ভঙ্গিতে গা এলিয়ে বসলো চেয়ারে ! – আপনার মন্তব্য শুনে আমার খুব আশা হয়েছিল – হয়ত আপনার কাছেই আমার উত্তরগুলো পাবো ! আপনি তো এখনও বলেই উঠতে পারলেন না – আপনি ঠিক কি জানতে চান ! আমি কিন্তু আমার উত্তর পেয়ে গেছি ! আপনি খেয়াদির সম্বন্ধে বিশেষ কিছু না জেনেই – ওনার ছোটবেলার ওপর মন্তব্য করলেন ! পরিচালক খেয়াদির সম্বন্ধে কিছু না জেনেই – ওর ওপর একটা সিনেমা করে ফেললেন ! – তার ওপর আমি একটা খেয়া স্মৃতি সভায় গেছিলাম । সেখানে খেয়াদির ওপর একটা শব্দ খরচ না করে সভা হয়ে গেল ! – আমি জিগ্যেস করাতে বলে দিল – এই সান্ধ্য সভার নাম খেয়াদির নামে ! – আমি বুঝতেই পারছি না এসব প্রহসনের মানেটা কী ! আপনি কিন্তু আমাদের ওপর অ্যালিগেশান আনছেন ! মনে হচ্ছে আপনি খেয়াদিকে চিনতেন – তাহলে তখন প্রতিবাদ করলেন না কেন ? এক নম্বর – আমি ওই সময় কলকাতায় ছিলাম না । দুই, অনেক চেষ্টা করেছি পরিচালকের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করার । অনেক ইমেল পাঠিয়েছি ! দুঃখের বিষয় কোনও সাড়া পাই নি ! – আর আমার মত অচেনা অজানা লোককে কেই বা পাত্তা দেবে ! আপনি সিনেমাটা দেখেছেন ? হ্যাঁ – সে দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে ! – আমি আসলে পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম। কিন্তু দেখা পাই নি ! – সবচেয়ে বড় কথা – সিনেমাটার থিমেই বলে দেওয়া হয়েছে – সিনেমার মতো ! অর্থাৎ কাল্পনিক ! কাল্পনিক তো বটেই ! – শধু কাল্পনিক নয় – পুরো ধাপ্পা ! একেবারে বাংলা সিরিয়াল ! তা আপনার এখন কি করার ইচ্ছে আছে ? আর আপনার সেই প্রশ্নগুলোই বা কি ? আপনি বোধয় বুঝতে পারেন নি ! প্রশ্নগুলো করা হয়ে গেছে – উত্তরও পেয়ে গেছি! তাই আর তো কিছু করার নেই ! – দুঃখের বিষয় – আপনার মা-বাবা অথবা মাসিরাও কেউ বেঁচে নেই ! এখন আর সে প্রশ্ন করে লাভ কী !- অনির্বাণ দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল – আর কি ! এবার ওঠা যাক ! আপনার প্রচুর সময় নষ্ট হল ! আমি খুবই দুঃখিত ! চলুন যাওয়া যাক ! একটা কথা ! শ্রাবস্তী কিছু চিন্তা করে জিজ্ঞেস করে উঠল – আচ্ছা – এটা কি হতে পারে – যে আপনি আমার কোনও আত্মীয় হন ? অনির্বাণ খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল শ্রাবস্তীর দিকে । তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল – হ্যাঁ – কিন্তু আর কোনও প্রশ্ন করবেন না প্লীজ! – সম্পর্কে আমরা ভাই-বোন হই ! অনির্বাণ উঠে পড়ল । অগত্যা বিস্মায়িত শ্রাবস্তীকেও উঠতে হল ! রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে – দুজনে ভিন্ন ভিন্ন পথে হাটা দিল ! অনেক প্রশ্ন আছে – যার কোনও উত্তর পাওয়া যায় না – হয়ত উত্তর হয় না ! মনোজ

845

3

মনোজ ভট্টাচার্য

যাদের ভরসায় ঘোরা !

যাদের ভরসায় ঘোরা ! আজকাল প্রচুর লোকে ট্র্যাভেলিং এজেন্টদের প্যাকেজ ট্যুরে ভ্রমন করে ! তারা নানা জায়গায় ভ্রমণার্থীদের নিয়ে যায় । ওদের ট্যুর প্রোগ্রামে লেখা থাকে – এখানে যাবে ওখানে যাবে এখানে রাত্তিরে থাকা হবে ইত্যাদি ! থাকা হবে মানেই সেখানে ওরা খাওয়ার বন্দ্যবস্ত করবে ! কখনো বাসে ব্রেকফাস্টের বা লাঞ্চের প্যাকেট দেওয়া হবে! – সেই খাবার তৈরির করার জন্যে সঙ্গে করে কয়েকজন রাঁধুনি ও জোগাড়ে নিয়ে যায় । কখনো তারা সঙ্গে যায় বা কখনো তাদের আগে ভাগে নিয়ে যায় – যাতে সব রসদ জোগাড় করে রাখে ও রান্নার ব্যবস্থা একদম পাক্কা রাখে ! পর্যটকদের যেন অসুবিধে না হয় ! আইনত - এখন তো ট্রেনে আর খাবার দিতে পারেনা কোনও ট্র্যাভেল কোম্পানি ! স্টেশনের খাবার তো উঠতে দেয় না ! ট্রেনের খাবার কিনতে হয় রেলওয়ে প্যান্ট্রি থেকে । সেই প্যন্ট্রি নামে একটা কামরার মধ্যে এক বীভৎস রান্নাঘর অথবা জঞ্জালের ভ্যাট থেকে যে খাবার আসে – তা মুখে দিলেই – একটা বমনোদ্ৰাক-কারী গন্ধের উদ্ভব হয় ! অনেকে কিছুক্ষণ পেটে রাখতে পারেন । আবার অনেকে খেতে খেতেই জানলা গলিয়ে বাইরে - - ! আরে সাইডট্র্যাক হয়ে যাচ্ছি যে ! যেটা বলতে চাচ্ছি – সেটাই লিখি ! স্টেশনে পৌঁছেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বাস ! বাসে চড়ার সঙ্গে সঙ্গে বা হোটেলে পৌঁছেই আমাদের সামনে এসে যায় জলখাবার ! লুচি আলুর তরকারি মিস্টি এবং চা ! অথবা অন্য কিছু ! আহা ! সে কি তৃপ্তির খাওয়া ! এই খাবারগুলো রান্না করে রেখেছে – কোম্পানির কুকেরা ! বমনোদ্ৰাকএরা খাবার দেবার সময়ে ছাড়া বিশেষ দেখা দেয় না । কারন সারাক্ষণ ওরা রসদ জোগাড় করে ও রান্না করে ! ও আমাদের সঙ্গেই হয়ত বাসে করে যায় ও বাস যেখানে থামে – সেখানে নেমেই খাবার তৈরি করে ! ও আমাদের সামনে প্লেটে করে দেয় ! ওদের সশরীরে আর একবার দেখা যাবে – ভ্রমনের শেষদিনে ! প্রতিজনের দরুন একটা বখশিশ ! – আমরা কেউ হাসিমুখে দিয়ে দিই । আবার কেউ কেউ অঢেল শপিং করার পরেও – বখশিস নিয়ে দর কষাকষি করি ! – শুনেছি দর কষাকষি করাও নাকি একটা আর্ট ! আচ্ছা – এই লোকগুলো হোটেলে থাকে কোথায় ? রান্নাঘরে । রান্নাঘরটাই বা কোথায় ! – কেন রান্নাঘর তো রান্নাঘরেই ! – বিভিন্ন হোটেলে রান্নাঘর বিভিন্ন জায়গায় ! – আর হোটেলের রান্নাঘর ট্র্যাভেলিং কম্পানিগুলো ব্যবহার করতে পারে না । ওদের আলাদা জায়গা দেওয়া হয় রান্নার জন্যে ! বাসন ধোয়ার জন্যে । রাতে শোয়ার জন্যে ! অসুস্থতার জন্যে হোটেলে রয়ে যাওয়ার ফলে – বেলার দিকে চা বা কফি খেতে ইচ্ছে করল ! তিনতলা থেকে গেলাম নিচে রান্না ঘরে ! এ কী ! একদম ফাঁকা ! কোথায় গেল সবাই ! শুনেছিলাম কয়েকজন পাচক থাকবে ! – দেখি রান্নাঘরের এক কোনায় ছোট্ট একটা নিচে যাবার সিঁড়ি ! কষ্ট করে একজন যেতে পারে । সেখান দিয়ে নিচে নেমে দেখি বিরাট ঘর ! মুল ফ্লোরের নিচে এগুলকে বেসমেন্ট বলে জানি । সেখানে বেশ কয়েকটা টিম কাজ করছে । সব আলাদা আলাদা । এক একটা টিম এক একটা ট্র্যাভেল কোম্পানির ! সবাই আমার দিকে তাকাল – কিন্তু দেখলই না ! – তাহলে আমাদের টিম কোথায় ! – আরও ভেতরে গিয়ে – একেবারে বিল্ডিঙের শেষ বোধয় – সেখানে একজন আমাকে চিনতে পেরে জিগ্যেস করল – আমার কি চাই ! চায়ের কথা বলতে বলল – এখুনি এনে দিচ্ছি ! আমি ফিরে আসার সময়ে লক্ষ্য করলাম – ডানদিকে একটা ঘরের ভেতর – চার পাঁচ জনের শোবার বিছানা ডাই করে রাখা ! – অর্থাৎ এই ঘরে আমাদের ক্রু-রা রাতে শোয় । কটায় শোয় – ওরাই জানে ! সক্কাল বেলায় উঠেই বেড টি দেয় ছটা নাগাদ ! আর ব্রেক ফাস্ট দেয় বেলা দশটা ! – আমরা যেহেতু বেরই নি – তাই আমাদের জন্যে একজন রাঁধুনি রয়ে গেছে । সে আমাদের লাঞ্চ দেবে । তাই একটু রিল্যাক্সড ! কিন্তু সন্ধ্যে থেকেই আবার ওকেই রাতের খাবার করতে হবে । যাতে সবাই ফিরে এলেই রাতের খাবার তৈরি থাকে ! বেসমেন্ট থেকে বাইরে আসার সময় একটু বেগ পেতে হল । খুবই গোলকধাঁধা নিচেটা ! ওদের কাছেই শুনেছিলাম – যাত্রার আগে ম্যানেজার বা কাউকে সেই জায়গায় গিয়ে সরেজমিন করতে হয় – ঠিক করতে হয় – কোথায় রাধুনীরা রান্না করবে ! জায়গাটা একটু প্রশস্ত হলে সুবিধে হয় ! খাবার সময়ে বারবার ওপরে নিচে ওঠা নামা করার জন্যে খাবার নিয়ে যাবার জন্যে যায়গা না থাকলে খুবই অসুবিধে হয় ! অথচ ম্যানেজার ছাড়া কাউকেই ওরা সেই অসুবিধের কথা বলে না ! এবার শুনবেন এই রাধুনীরা কারা ! – এরা সবাই হাওড়া হুগলী মেদিনীপুরের চাষি পরিবার ! শুনে আমি তো অবাক – এদের মধ্যে একজন সিঙ্গুরের চাষি ! বছরের পর বছর বিরাট ডোল রেশন আর কি জানি না – পাচ্ছে ! কিন্তু ওরা এখানে ওখানে রাধুনীর কাজও করে ! ফুটবলে যেমন খ্যেপ খাটা বলে ! আবার আমাদের এও জানিয়ে রাখল – যদি কখনো প্রয়োজন পড়ে – ওদের কাউকে খবর দিলেই হবে ! মনোজ

949

7

Shafiqul Islam

তবুও বৃষ্টি আসুক” …..শফিকুল ইসলাম

তবুও বৃষ্টি আসুক”/.শফিকুল ইসলাম গ্রন্থ পর্যালোচনায় – ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী। ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ কবি শফিকুল ইসলামের অনন্য কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। তার কবিতা আমি ইতিপূর্বে পড়েছি । ভাষা বর্ণনা প্রাঞ্জল এবং তীব্র নির্বাচনী। ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ গ্রন্থে মোট ৪১ টি কবিতা রচিত হয়েছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ গ্রন্থ পাঠ করে পূর্বেই বলেছি, মন অনাবিল তৃপ্তিতে ভরে যায়। বইটির প্রথম কবিতায় মানবতাহীন এই হিংস্র পৃথিবীতে কবির চাওয়া বিশ্ব মানবের সার্বজনীন আকাংখা হয়ে ধরা দিয়েছে। কবি বলেছেন– ‘তারও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে- সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক, আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা,হৃদয়ের গ্লানি… (কবিতা:তবুও বৃষ্টি আসুক’) প্রকৃতি, প্রেম, নারী, মুক্তিযোদ্ধা, মা এবং সুলতা নামের এক নারী তার হৃদয় ভরে রেখেছে। তাকে কিছুতেই ভোলা যায় না। মা তার কাছে অত্যন্ত আদরের ধন। মাকে তার বারবার মনে পড়ে। মনে পড়ে সুন্দরী সুলতাকে, যে তার হৃদয়ে দোলা দিয়েছিল। বেচারা তার জীবন, মৃত্যুহীন মৃত্যু  । তাই তিনি এখন ও সুলতাকে খুঁজেন । যার জন্য তিনি অনন্তকাল প্রতীক্ষায় আছেন। এই প্রিয়তমা তার হৃদয়-মন ভরে আছে। নদীর জল ও তীরের মত এক হয়ে মিশে আছে । এই প্রেম বড়ই স্বর্গীয়, বড়ই সুন্দর । একে ভোলা যায় না। প্রকৃতি আর সুলতা কখন একাকার হয়ে যায় হৃদয়ে। কাব্যগ্রন্থটি পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। বইটির ছাপা অত্যন্ত সুন্দর। ধ্রুব এষের প্রচছদ চিত্রটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। [গ্রন্থের নাম– তবুও বৃষ্টি আসুক, লেখক– শফিকুল ইসলাম। প্রচ্ছদ– ধ্রুব এষ। প্রকাশক– আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০। ফোন– ৭১১১৩৩২, ৭১১০০২১। মোবাইল– ০১৮১৯২১৯০২৪] তবুও বৃষ্টি আসুক…শফিকুল ইসলাম বহুদিন পর আজ বাতাসে বৃষ্টির আভাস, সোঁদা মাটির অমৃত গন্ধ- এখনই বুঝি বৃষ্টি আসবে সবারই মনে উদ্বেগ- তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। তবু আমার মনে নেই বৃষ্টি ভেজার উদ্বেগ আমার চলায় নেই কোনো লক্ষণীয় ব্যস্ততা। দীর্ঘ নিদাঘের পর আকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির সম্ভাবনা অলক্ষ্য আনন্দ ছড়ায় আমার তপ্ত মনে – আর আমি উন্মুখ হয়ে থাকি বৃষ্টির প্রতীক্ষায় – এখনই বৃষ্টি নামুক বহুদিন পর আজ বৃষ্টি আসুক। দীর্ঘ পথে না থাকে না থাকুক বর্ষাতি – বৃষ্টির জলে যদি ভিজে যায় আমার সর্বাঙ্গ পরিধেয় পোশাক-আশাক- তবুও বৃষ্টি আসুক – সমস্ত আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামুক বৃষ্টি নামুক মাঠ-প্রান্তর ডুবিয়ে। সে অমিতব্যয়ী বৃষ্টিজলের বন্যাধারায় তলিয়ে যায় যদি আমার ভিটেমাটি তলিয়ে যাই যদি আমি ক্ষতি নেই। তবুও বৃষ্টি নামুক ইথিওপিয়ায়, সুদানে খরা কবলিত, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত দুর্ভাগ্য জর্জরিত আফ্রিকায়- সবুজ ফসল সম্ভারে ছেয়ে যাক আফ্রিকার উদার বিরান প্রান্তর। তার ও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক, আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি। মানুষের জন্য মানুষের মমতা ঝর্ণাধারা হয়ে যাক বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে – সব পিপাসার্ত প্রাণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাক অনন্ত ধারাজল হয়ে। বহুদিন পর আজ অজস্র ধারায় অঝোরে বৃষ্টি নামুক আজ আমাদের ধূলি ধূসরিত মলিন হৃদয়ের মাঠ-প্রান্তর জুড়ে ॥

837

7

শিবাংশু

ইচ্ছেসুর

যতোক্ষণ জেগে থাকি, ঘরে, অফিসে নিজের চেয়ারে, গাড়িতে, সান্ধ্য পদচারণায়, সব অবস্থাতেই, কোনও না কোনও গানের সঙ্গে বা সুরের সঙ্গে থাকি। সুর নিয়ে কোনও অস্পৃশ্যতার ভারে পীড়িত হইনি কখনও। সবই শুনি। গুলাম আলির কথা মতো, ' ম্যাঁয় তো সুর কা গুলাম হুঁ। জো ভি সুর সে গাতে বজাতে হ্যাঁয়, ম্যাঁয় উনকা গুলামি করতা হুঁ।' বারোটা মাত্র স্বরের জগত কতোভাবে যে সতত ডুবিয়ে রাখে, পাইনে তাহার দিশা। যে কথাটা মাঝে মাঝেই মাথার ভিতর ঘোরাফেরা করে তা হলো গান শোনাটা কি একটা ইচ্ছে না অভ্যেস? ব্যসন না আবশ্যিক, অতিসচেতনতা না নিছক পাগলামি? শুনলে কী পাওয়া যায়? বা না শুনলেই বা কীই ক্ষতি বৃদ্ধি হয়? আবার চিন্তাটা এলো হঠাৎ সেদিন রাতে বাইরে থেকে ভেসে আসা 'নিশিরাত বাঁকা চাঁদ' শুনছিলুম। কে বাজাচ্ছিলেন, জানিনা। কিন্তু আমি সম্পন্ন হচ্ছিলুম। কোথায় বাজছিলো, তাও জানিনা। জাদুটা যে ঠিক কার, গীতা না নচিবাবু? নাহ, দুজনেই। একশোবার। পরপরই শুনলুম " কে তুমি আমারে ডাকো"। দুটিই লক্ষবার শোনা। কিন্তু অনুপম ঘটক যে কীভাবে কম্পোজ করলেন ফ্রেজের পর ফ্রেজ। অতি চেনা সুরের কাঠামো। তবু একবার শুরু করলে পুরো না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া যাচ্ছেনা। ঠিক তার আগেই ডরিস ডের 'কে সেরা সেরা' শুনলুম বার দশেক। ডরিস ডে এলে জুলি য়্যান্ড্রুজই বা বাকি থাকেন কেন? তার মধ্যে একজন বন্ধু জিম রিভসের 'আমাকে ভোলা কী এতো সহজ' পাঠিয়েছে। শতবার শোনা তবু তো শুনতে হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে এর মধ্যেই আর যা যা শুনলুম তার মধ্যে রাজস্থানের কচড়া খানের সুফি মান্ড, পন্ডিত উলহাস কশলকরের নট ভৈরব এবং আমাদের হেমন্তের 'মেঘ কালো, আঁধার কালো' এবং রামকুমারের 'লিখিতে শিখিলাম আমি কই'। এই সব সুরই তো বেঁচে থাকার অভ্যেসের সঙ্গে ওতপ্রোত। নিঃশ্বাসের সঙ্গে যখন অক্সিজেন গ্রহণ করি তখন তা নেহাত স্বাভাবিক। কিন্তু যদি কখনও কার্বন ডাই অক্সাইডে নিঃশ্বাস নিতে হয়, তখন হয়তো পার্থক্যটা বুঝতে পারবো। 'বেসুর' বেদর্দি আওয়াজ হয়তো এরকমই কোনও কষ্টে রাখে। এই তো ব্রাহ্মণীর সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিলো উস্তাদদের বংশধরেরা এখন কেমন তৈরি হচ্ছেন? গোয়ালিয়রের আয়ান-আমান আর বনারসের রীতেশ-রজনীশ তো দারুণ তৈরি হয়েছেন। পটিয়ালার কৌশিকী লাজওয়াব। কিন্তু রজা আলি যতোটা আশ্বাস জাগিয়েছিলেন, ততোটা হয়তো এখনও পৌঁছোতে পারেননি। পণ্ডিত উলহাস কশলকারের সুপুত্র সমীহন কিন্তু অনেক প্রতিশ্রুতি জাগিয়েছেন। পাঁচ-ছ বছর আগে তিনি তখন কিশোরই ছিলেন বলা যায়। সামনে বসে শুনেছিলুম রাগ মারওয়াহ। অবশ্যই দুঃসাহসিকই । কিন্তু নিষ্ঠা সম্বল করে লড়ে গেলেন। 'জীয়ো' ছাড়া কিছু বলার নেই। -------------------- বেশ কিছুদিন ধরে বুঝতে চেষ্টা করছি মানুষ যখন নিজের প্রিয় গানগুলির লিস্টি তৈরি করেন, তখন মানদণ্ড ঠিক কী থাকে? কেন তারা বেশি প্রিয়? গানগুলি কি হৃদয়ের অধিক কাছে? এই প্রিয়ত্ব কি শুধু পরিচয়ের স্বাচ্ছন্দ্য, অভ্যেসের আরাম, না নিছক আত্মপরতার ইশারা? উত্তরটি আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়। হয়তো আপনার কিছু বলতে পারেন,

816

5

শিবাংশু

হমীনস্ত

দেশের সব চেয়ে গরিব লোক কে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা কেউ জানতুম না। কী করে জানবো? খুঁজতে গেলে তো দেশ উজাড় হয়ে যাবে। কিন্তু পৃথিবীর সব থেকে ধনী ব্যক্তিটির নাম আমরা সবাই জানতুম। নিজাম-উল-মুল্ক, হায়দরাবাদ। অওরঙ্গজেবের হাতে কুলি কুতুব শাহী রাজপাট শেষ হয়ে যাবার পর মুঘল প্রতিনিধি মীর কমরুদ্দিন খান সিদ্দিকি দক্কনের শাসন ভার গ্রহণ করেন। আসফ জাহি রাজবংশ শুরু হয় তাঁকে দিয়ে। ১৭২৪ সাল থেকে দুশো চব্বিশ ব্ছরের রাজত্বকাল। ইংরেজদের পোষকতায় বিস্তৃত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়াদের মতো। যুদ্ধবিগ্রহ করতে হতোনা বলে ইংরেজদের দিয়েথুয়েও প্রচুর ধনসম্পত্তি জমিয়েছিলেন তাঁরা। নিজাম মীর উসমান আলির সময় তাঁরা ছিলেন সারা বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ধনী। ---------------------- গোলকোন্ডা ধ্বংস করার পর রাজধানী চলে আসে মুসিনদীর দক্ষিণে নতুন শহর ভাগ্যনগর বা হায়দরাবাদে। থাকার জায়গা ছিলো তাঁদের অনেক। কিন্তু পুরানা হাবেলি, কিং কোঠি, চৌমহল্লা, শেষে ফলকনুমাই ছিলো নিজামদের সরকারি বাসভবন। এই চারটির মধ্যে চৌমহল্লার শান ছিলো সব চেয়ে বেশি। তেহরানে ইরানের শাহ প্রাসাদের অনুকরণে নির্মাণ হয়েছিলো এর। প্রাসাদটির কাজ শুরু হয়েছিলো শ'দুয়েক বছর আগে, ১৭৫০ সালে। কিন্তু শেষ হয় ১৮৬৯ সালে। নামেই প্রকাশ, চারটে মহল ছিলো এখানে পাশাপাশি। অফজল, তহনিয়াত, অফতাব আর মহতাব। উত্তরে লাড়বজার থেকে দক্ষিণে অসপন রোড চওক পর্যন্ত পঁয়তাল্লিশ একর জমি নিয়ে ছিলো পৃথিবীর ধনীতম লোকটির বাসগৃহ। এখন তার বারো একর বেঁচেছে। -------------------------- রাজ্য যাবার পর নিজাম কোনও রকম সংস্কার করেননি। শেষে সরকারি উদ্যোগে পুরো নির্মাণটি সংস্কৃত হয়। এর স্থাপত্যে পারস্য আর ইসলামি ধরণ মুখ্য হলেও রাজস্থানি এবং য়ুরোপীয় শৈলিও দেখা যায়। প্রাসাদটির কেন্দ্রস্থলে খিলওয়ত মুবারকেই রয়েছে তখ্ত-এ-নিশান। নিজামের সিংহাসন। প্রচুর ঝাড়বাতি আর অন্যান্য জাঁকজমক নিয়ে তার রমরমা। এছাড়া খিলওয়ত ঘড়ি, শাহি দফতর, রওশন বাংলা, বড়া ইমাম, সব কিছু নিয়েই চৌমহল্লা প্রাসাদ। পর্যটকেরা এখানে আসেন দিনের বেলা। কিন্তু সাঁঝ নামলে এর রূপ হয়ে যায় আরব্যরজনীর মায়াপুরীর মতো। এ দৃশ্য খুব বেশি লোকের নসিব হয়না। আমার অসংখ্যবার এ তল্লাটে ঘোরাঘুরি করার সুবাদে ক্যামেরায় বন্দি করেছিলুম দৃশ্যগুলি। আগ্রহীদের জন্য রইলো এখানে কয়েকটি।

935

5

শিবাংশু

কোন আলোতে, প্রাণের

বাঙালির সেরিব্রালচর্চার একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। অন্যদের নেই, তা নয়। বাঙালির 'অন্দাজে-বয়াঁ অওর'। বাঙালি কথা বেশি বলে, কাজ কম। কিন্তু বাঙালির সাধারণভাবে কথার বাঁধুনি দেশের অন্যপ্রান্তের মানুষদের থেকে অনেক উন্নত। 'তর্কপ্রিয়তা'র প্রশ্নেও সে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই লক্ষণটি তার মহাভারতের যুগ থেকে আছে। পরবর্তীকালে আরো বিকশিত হয়েছে। কিন্তু চিরকালই কিছু বাঙালির মননবৃত্ত অসাধারণত্বের সীমানা স্পর্শ করে যায় অবলীলায়। শুধু কথার পাকে নয়, ক্রিয়াশীলতা'তেও। সবাই যে খুব মুখর তা নয়। মৌনপ্রতিভাগুলি সব সময় বিজ্ঞাপনে থাকেন না। কিন্তু তাঁরা বাঙালির মননপ্রতিমার চালচিত্র হয়ে থেকে যান। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, পরম্পরা ফুরোয় না। এমনই একজন ছিলেন প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য। বই লিখেছেন মাত্র চারটি। কলকাতারই কতোজন তাঁর সম্বন্ধে খবর রাখেন, জানা নেই। দীর্ঘ চুরাশি বছরের জীবন খুব হিসেব করে হয়তো খরচা করেননি। কিন্তু গুণগ্রাহীদের কাছে তাঁর স্বীকৃতি ছিলো প্রশ্নহীন। প্রদ্যুম্ন গত হয়েছেন গত ২রা অক্টোবর। বন্ধু শুভা চক্রবর্তী দাশগুপ্ত ও তাঁর দাদা তপন চক্রবর্তীর সুবাদে খবরটি পেয়েছিলুম। ----------------------- তাঁর নামটি সম্বন্ধে প্রথম অবহিত হই বাল্যকালে। আমার আট-দশ বছর বয়সে বাড়িতে যখন খণ্ডে খণ্ডে 'ভারতকোষ' আসতে শুরু করে। পিতৃদেবের উৎসাহে ঐ বয়সেও 'ভারতকোষ' ছিলো আমার প্রিয় পাঠ্য। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এই প্রকাশনাটি বাঙালির 'রেনেশাঁস' পরম্পরার শেষ বেলাকার নিদর্শন। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন আচার্য সুনীতিকুমার, সুকুমার সেন, নির্মলকুমার বসু, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী প্রমুখ বাঘেরা। আর তরুণতর প্রজন্মের মধ্যে ছিলেন প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য, সুবীর রায়চৌধুরী, শঙ্খ ঘোষের দল। ঐ মহাগ্রন্থটির সঙ্গে তুলনীয় প্রয়াস এতোদিনেও আর চোখে পড়েনি। জ্ঞানপিপাসা, অনুসন্ধিৎসা, বিশ্লেষণ। এই তিনটি প্রবণতাকে মূলধন করে ঔপনিবেশিক বাঙালি বেশ কিছুদিনের জন্য দেশের ইতিহাসে একটা উল্লেখযোগ্য পর্যায় রচনা করেছিলো। ক্ষয়িষ্ণু বাঙালি ক্রমাগত এই সব গুণ হারিয়েছে। সঙ্গে হারিয়েছে সেরিব্রাল উৎকর্ষের উত্তরাধিকার। প্রদ্যুম্ন ছিলেন এই গর্বিত প্রজন্মটির অন্তিম উত্তরসূরিদের একজন। ---------------------------- জীবনের গোধূলিপর্যায়ে তিনি জড়িত ছিলেন 'শামিল' নামে একটি দলছুট পাঠশালার অনুপ্রেরণা হয়ে। এই পাঠশালাটি ও তাঁদের নেত্রী অলকনন্দা গুহ'র প্রযত্নে গতকাল আয়োজিত হয়েছিলো একটি স্মরণসভা। তাঁদের ভবনপরিসরে। শাশ্বতী ও সুব্রত, আমার বোন-ভগ্নীপতি, উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ট। তাদের সঙ্গ নিয়ে আমিও পৌঁছে গিয়েছিলুম সেই সভায়। ছাদের উপর হেমন্তসন্ধ্যার শামিয়ানা। রেলিঙের উপর উপচে পড়ছে মালতীলতার সমৃদ্ধ গুচ্ছগুলি। তাদের ঈর্ষণীয় সৌরভ ছড়িয়ে যায় হাওয়ার সঙ্গে চারদিকে। নীচে সাজানো সারি সারি মাটির প্রদীপ। শিখাময়ী। ধূমায়িত ধূপ গন্ধ মাখা রজনীগন্ধা। সবই ছিলো। চারদিকে ঘিরে বসে আছেন নানা বয়সের, ভিন্ন প্রজন্মের গুণমুগ্ধরা। সভার কেন্দ্রে ছিলেন পরলোকগত ঘনিষ্ট বন্ধুর স্মৃতিবিধুর অনুষঙ্গ নিয়ে একজন। নাম, শঙ্খ ঘোষ। কোনও প্রতিকৃতি ছিলোনা সভায়। একটি ফ্রেমবন্দি কালিকলমের স্কেচ। রাঢ়বাংলা বা সাঁওতাল পরগনার ঢেউখেলানো প্রান্তর যেমন হয়। সঞ্চালক জানালেন, এই ছবিটি ছিলো তাঁর কাছে যেন বাইরের পৃথিবীর জানালা। রোগতপ্ত দেহে তিনি এর দিকে তাকিয়ে শুশ্রূষা পেতে ভালোবাসতেন। ------------------------- ভায়োলায় বেজে উঠলো একটি সুর। "ভালোবাসি, ভালোবাসি," ; বাজিয়েছিলেন তাঁর এক বিদেশবাসী ছাত্রী। আসতে পারেননি এমন মানুষদের চিঠি পড়ে শোনানো হলো। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমাদের দিল্লিপ্রবাসী বন্ধু শুভা। "তোমায় নতুন করে পাবো বলে" গাইলেন মৌসুমী ভৌমিক। তিনিই আবার পরে শোনালেন " ওগো কাঙাল।" আরো অনেকে শোনালেন তাঁদের সুরের তর্পণগাথা। লোকান্তরিত মানুষটিকে স্মরণ করলেন তাঁর নিকটজনেরা। নানাভাবে। নিতান্ত শিশু থেকে কিশোর, 'শামিলে'র ছাত্রছাত্রীরা এক এক করে শোনালো 'পোদুমদাদা'র প্রতি তাদের ভালোবাসা, বেদনার ইতিকথা। অনুষ্ঠানের এই পর্যায়টি ছিলো তুলনাহীন। পরিচর্যাকারিণী নসরিন তাঁর ভাঙা ভাঙা বাংলায় শোনালেন এক অন্য প্রদ্যুম্নের গল্প। যিনি অলীক শ্রেণী ভেঙে লঘু রহস্যালাপে উপভোগ করেন পরিচর্যার মূহুর্তগুলি। মাঝেমাঝেই গান । "নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে", "তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো","ধীরে বন্ধু ..."। তাঁর স্নেহধন্যা রুশতী সেন পাঠ করলেন "সে'র অংশ। একের পর এক মানুষ বিজড়িত হয়ে যাচ্ছিলেন সানসেট ব্যুলেভার্ডের ছায়াচ্ছ্ন্ন সরণীতে। সন্ধে গড়াচ্ছিলো। গল্পের সিলসিলা তো ফুরোতে চায়না। ---------------------- প্রদ্যুম্নকে নিয়ে একরাম আলি মশায়ের একটি লেখার লিংক থাকলো এখানে। আগ্রহীসুজনদের জন্য, http://arts.bdnews24.com/?p=8537

936

4

শিবাংশু

করুণধারার কলকলে,

সংখ্যাগুরু মানুষ ধর্মবোধ ও লোকাচারকে এক করে দেখেন। একই লোকাচার নানা রূপে বিভিন্ন ধর্মের অনুগামীদের মধ্যে আচরিত হয় প্রশ্নহীন আনুগত্যে। এর মধ্যে কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত সাধারণ সূত্র রয়েছে। তাদের মূল আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার না করলে ভুল হবে। বহু প্রাক-বৈদিক প্রকৃতিবাদী লোকাচার, যেমন অম্বুবাচী ইত্যাদি, যার শিকড়ে রয়েছে প্রকৃতিকে নারী হিসেবে কল্পনা করা । প্রাতিষ্ঠানিক সনাতন ধর্মে এই সমীকরণটি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এভাবেই। আদিতম mystic ধ্যানধারণা ( যাকে কোনমতেই আধ্যাত্মিক বলা যায়না) fertility cult থেকেই উদ্ভূত। আমাদের দেশে সতীর একান্ন পীঠ বা লিঙ্গপূজার ব্রাহ্মণীকরণ এসব লৌকিকতার পরবর্তী অধ্যায়। পুরুষ দেবতা বা নারী দেবীর কল্পনা তো মানুষেরই ছাঁচে করা হয়েছে। প্রস্তর বা ধাতুমূর্তির উপর দেবত্ব আরোপ তো মানুষেরই কীর্তি। তাতে কখনও কোনও 'দেবতা' হস্তক্ষেপ করেছেন বলে জানা নেই। অযোধ্যার রাজা রাম বা দ্বারকার রাজা কৃষ্ণ একসময় দেবতা হয়ে গিয়েছেন। একসময় মানুষ আরও ক্ষমতাশালী বিষ্ণুদেবতার কল্পনা করে এই দুজন দেবতাকে বিষ্ণুর অবতার করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটা একধরনের spiritual structural correction। এ পথেই লেনিন দেবতা বা গান্ধি দেবতা একদিন প্রকট হবেন। অন্তত ইতিহাস তো তাই বলে। -------------- ভারতবর্ষে মানুষের বিশ্বাসে একেশ্বরবাদী ধারণাটি অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন। তাই আধুনিককালেও ঈশ্বর ও দেবতা খুব সাবলীলভাবে পরস্পর জায়গা বদলে যা'ন। দেবতার পুজো লাগে, কারণ মানুষ দেবতাকে সৃষ্টিই করেছে পুজো করার জন্য। পুজো না করলে অভিশাপ লাগে বা পুজো করলে ঐহিক সাফল্য। এই বিশ্বাসটি একান্তভাবেই মানুষের সৃষ্ট এবং তাকে সতত দেবতার মঞ্চ থেকে মানুষই মার্কেটিং করে। দেবতাকে উৎকোচ দিতে মানুষ পাথরের মূর্তিতে সোনার অলংকার পরায় আর অধিকতর বুদ্ধিমান মানুষ তাকে হরণ করে নিজের কার্যসিদ্ধি করে। অসহায় দেবতা দুক্ষেত্রেই তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে পারেননা। ----------------- রক্তমাংসের অসহায় সাধারণ মানুষ, এলিট ধর্মবোধের গভীর অধ্যাত্ম জগতের নাগাল পায়না। লোকাচারের ক্ষুদ্র, পরিচিত, স্বচ্ছন্দ বৃত্ত তাঁদের স্বস্তি দেয়। বিপদাশঙ্কা বা মৃত্যুভীত সাধারণ মানুষ আপ্রাণ প্রচেষ্টায় নানা দেবতার শরণ নিয়ে 'দুধেভাতে' থাকার লড়াই চালিয়ে যা'ন। লোকাচার তাঁদের আশ্রয় দেয় এবং এভাবেই লোকাচারের প্রথাপ্রকরণ তাদের 'ধর্ম' হয়ে ওঠে। যে ধর্মবোধের চর্চা বিভিন্ন ধর্মীয় দর্শনের আধার, তা এই লোকাচারের বহুধাবিভক্ত প্রাকৃত অভ্যাস থেকে একেবারে ভিন্ন। লোকাচার ভিত্তিক 'ধর্ম' সান্ত্বনা জোগায় প্রসাদী ফুলে, মাদুলি-তাবিজে, গ্রহরত্নে বা আক্ষরিক অর্থে ছাই-ভষ্মের আবিল আশ্বাসে। জনতা জনার্দন তাকে বিশ্বাস করে স্বচ্ছন্দবোধ করে। কেন যাবে সে ধর্মবোধের গভীরে? যেখানে তার জন্য যুধিষ্ঠির-নহুষ সংবাদ বা যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীর জটিল জগত অপেক্ষা করে আছে। লোকাচার দেয় তাৎক্ষণিক আশ্বাস। দেয় 'বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ' জাতীয় আবহমান সমর্পণের ওয়ারান্টি। যে 'ধর্মবোধ' সাধকদের প্রতিশ্রুত অপরা শান্তি এনে দেয় তা চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ঈশ্বর এসবের থেকে সম্পূর্ণ অন্যতর ধারণা। তাঁর পুজোর প্রয়োজন নেই, তাই তিনি কাউকে ভয় দেখান না। তাঁকে হয়তো ভালোবাসা যায়, কিন্তু যদ্দূর জানি তা নিতান্ত একতরফা। তাঁকে 'অবিশ্বাস' করলেও তাঁর কিছু যায় আসে না। যাঁদের আকাশ মানুষই ভরিয়ে রাখে, তাঁদের ঈশ্বরের দ্বারস্থ হতে হয়না। সভ্যতার এই পর্যায়ে 'ঈশ্বর' একটা ধারণামাত্র। 'দেবতা' কিন্তু সামূহিক, জটিল প্রতিষ্ঠান। লুব্ধ, প্রতিহিংস্র, আনুগত্যকামী। ----------------------- যখন একজন 'ঈশ্বরবিশ্বাসী' নিজেকে God fearing বলেন, তখন তিনি শুধু ঈশ্বরকে নয়, নিজেকেও অসম্মান করেন। 'ঈশ্বর' ভয় দেখিয়ে শাসন করেন না, জয় দেখিয়ে করেন। যেমন নজরুল ভেবেছিলেন। অনেক সহজ God loving হওয়া। যদি ঈশ্বরকে আশ্রয় করতেই হয়, তবে ভালোবেসে করাই যাক নাহয়। সেক্ষেত্রে অন্তত তাঁর উদ্দেশে রাজনৈতিক নরবলি দেবার প্রথাটা রদ হয়ে যাবে। ----------------------- এই আকাশবিদারী ভক্তির কোলাহল, লোকাচারের বহ্বাড়ম্বর আর বণিকের মানদণ্ড কখন চুপে চুপে দেবদণ্ড হয়ে গেলো, দেখার পর কীই বা আর করার থাকে? "...আমি এই করুণধারার কলকলে, নীরবে কান পেতে রই আনমনে।

941

9

দীপঙ্কর বেরা

অন্তরতম

কেউ অচেনা নয় ভাবনায় কিছু বিষ ভাবনা এক থেকে আর এক গোলাপ থেকে গোলাপ ঝরে যায়। চেনা বৃত্তে আমাদের কত কিছু কালো কালো মোহর দাগ সবুজের পাতাঝরা দিশা মুহূর্তের অনামী অংশীদার সিন্দুরে মেঘে অচেনা, আমার আমি চিনে নিক তোমার তুমি অন্তরঙ্গ।

900

6

Debashis

ফেরারী মন

আপেল নেই ‚ তবু নাম তার পাইনাপেল | চিরুনী নেই ‚ তবু নাম কেনো হনিকম্ব ! দারু নেই‚ তবু আছে দেবদারু ! ভাবছ্টা কি ? লিখছি কবিতা ? আরে ভাই‚ বেকার সবই তা | দীর্ঘদিন শামুকের খোলের স্বেচ্ছাবন্দী থাকার পর‚ স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে‚ উপছে পড়া গরম পপকর্নের মত‚ বেখেয়ালী মন‚ অমন একটু-আধটু বাওয়ালী করতে চায়| শুভ বিজয়া দশমীর প্রীতি ‚ শুভেচ্ছা ‚ ভালোবাসা‚ স্নেহ‚ করমর্দনের এলাহি ব্যবস্থা| যার যেটা খুশী‚ যতখানি খুশী নিয়ে নিও | আজ এই পর্যন্ত| দাসবিদানিয়া | বেরেগি সিব্যা | দেবাশিস পাইন

1282

11

Adhish

ত্রিচি থেকে তাঞ্জোর

পঞ্চম পর্ব: তাঞ্জোর থেকে কাছেই প্রাচীন শহর কুম্বকোণাম। তামিল সংস্কৃতির এক পীঠস্থান। খুব পবিত্র তীর্থ। দুশোর কাছাকাছি মন্দির আছে শহর জুড়ে। কিছু শিব মন্দির আর কিছু বিষ্ণু মন্দির। সুব্রমনিয়াম অর্থাৎ কার্তিকের মন্দিরও আছে। শহরের মধ্যে আছে এক মাঝারি মাপের জলাধার। ১২ বছর পর পর এখানে মহামোহম উৎসব হয়। কিন্তু আমরা এসব দেখতে যাইনি। আমাদের উদ্দেশ্য অন্য। রামানুজনের বাড়ি যেতে হবে। তাতে গাড়ির ড্রাইভার বেশ অবাক। সে যত বলে “গো টু টেম্পল?”, আমরা বলি, “নো টেম্পল। রামানুজন মিউজিয়াম।” শুনে ড্রাইভার মাথা নাড়ে। সে চেনে না। গাড়ি থামিয়ে দু এক জন স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করা হল। বেশিরভাগই ঘাড় নেড়ে জানাল, চেনে না। একজন কি সব ডাইরেকশন দিল কিন্তু ড্রাইভার বুঝল না। সুতরাং চল সামনে। ছোটো শহর, একটাই বড় রাস্তা-তাঞ্জোর রোড। মহামোহম দিঘীর কাছে এক অটো স্ট্যান্ড। আবার জিজ্ঞেস করা হল। এবার দেখা গেল এক অটো ওয়ালা চেনে। “রামানুজন ভিটা?” আমরা লাফিয়ে উঠি, “ইয়েস ইয়েস। রামানুজন ভিটা।” ভিটা তো বাংলা শব্দ বলেই জানতাম, তামিলেও যে আছে জানতাম না। অটোওয়ালার নির্দেশ মত গাড়ি এগোল। শার্ঙ্গপাণি মন্দিরের বিশাল গোপুরমের উল্টোদিকে একটা সরু ধুলোময় রাস্তা- শার্ঙ্গপাণি সন্নিধি রোড। একটু এগিয়ে বাঁ দিকে অতি সাধারণ এক বাড়ি। তামিল রীতি অনুযায়ী বাইরের বারান্দায় কাঠের থাম, ছাদে ছোটো লাল টালি। এখানেই থাকতেন শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার রামানুজন। রবার্ট কানিগেলের “দা ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি”-তে এই বাড়ির অনেককাল আগের একটা ছবি আছে। তার থেকে এখন কিছু পরিবর্তন হয়েছে। বাড়ির দেখভাল করে স্থানীয় শাস্ত্র ইউনিভার্সিটি। বারান্দার দেওয়ালে একটা বোর্ডে লেখা আছে মাননীয় রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম এই বাড়ি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দিলেন। ছোটো, লম্বাটে ধাঁচের বাড়ি। সহজেই বোঝা যায় এই বাড়ির মালিকের আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। রাস্তার ধারের বারান্দার এক পাশে দরজা। পাথরের অসমান মেঝে। শাস্ত্র ইউনিভার্সিটির এক কর্মচারী বসে ছিলেন ভেতরে। একমনে কি একটা পড়ছিলেন, আমাদের পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকিয়ে ভিজিটর্স বুক ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। ভিজিটর্স বুকে নিজেদের নাম ধাম লেখা হল। খুব বেশি কেউ আসে না দেখলাম। আমরা ছাড়া সেদিন তখন পর্যন্ত আর কেউ যায়নি। আগের দিন মাত্র দুটো নাম, তার আগের দিন একটা নাম। ভেতরে ঢুকে আপনা থেকেই কথা বন্ধ হয়ে যায়। সুচরিতা অঙ্কের ছাত্রী। ও দেখলাম কেমন বিহ্বল হয়ে পড়েছে। পুরো বাড়িটা এমাথা থেকে ওমাথা বার তিনেক দেখলাম। জিনিসপত্র কিছুই নেই বাড়িটাতে। শুধু একটা খাট আছে রাস্তার দিকের বারান্দার পেছনের ঘরে। এই ঘরের জানলার পাশে বসেই রামানুজন ঘন্টার পর ঘন্টা বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এটাই ছিল শোওয়ার ঘর। তারপর একটা ছোটো হল মত জায়গা, তার সামনে কোন দেওয়াল নেই। এটা বসার ঘর হিসেবে ব্যবহার হত। তারপর একটা ছোটো ঘর। সেটা ঠাকুরঘর এবং একই সঙ্গে ভাঁড়ার ঘর। অনেক সময় এই ঘরে বসে খাওয়াও হত। একদম শেষে একটা রান্নাঘর। তার পেছনে কুয়ো আর বাথরুম। ব্যস, এইটুকুই। আলাদা পড়ার ঘরের প্রশ্নই নেই। খাতা কেনার পয়সা না থাকায় রামানুজন একটা স্লেটে অঙ্ক করতেন, সেটা পরে রামানুজনের ভাইয়ের কাছে যায়। এখনো সেখানেই আছে। অনেক সময় পাথরের মেঝেতেও অঙ্ক করতেন। বাড়িটা নির্জন, নিস্তব্ধ। একটা বিষণ্ণতা ছেয়ে আছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। রামানুজনের জীবন বড় কষ্টের। ফেরার পথে শার্ঙ্গপাণি মন্দিরে ঢুকলাম। মন্দিরের ভেতরে একটা খাটাল, তাতে ১২-১৪টা গরু। মন্দিরের অফিসের দেওয়ালেই এই সংখ্যা জানিয়ে নোটিস আছে। সেখানে আরও বলা আছে এই গরুদের দেখভাল হয় ভক্তদের দানের টাকায়। দানের জন্য আবেদনও আছে। এই মন্দিরে কষ্টিপাথরে খোদাই করা দশাবতারের মূর্তি আছে। দুপুর দুটো বেজে গেছে। একটা দোকানে ঢোকা হল দুপুরের খাবারের সন্ধানে। ভেজ থালি নেওয়া হল। কুম্বকোণামে বোধহয় নন ভেজ চলে না। ত্রিচিতে ব্যানানা লীফে নন ভেজ থালিতে ১৪-১৫টা পদ থাকে কিন্তু এখানে ভেজ থালিতে গুণে দেখলাম ২২টা পদ। খাওয়া শেষ হওয়ার পর আবার একটা করে পান আর ছোট একটা কলা দিয়ে গেল। পানটা সুবিধের নয় খেতে। এবারের পুরো ট্রিপে একমাত্র ওই পানটাই খারাপ লেগেছিল খেতে। খেয়ে ত্রিচির পথে ছুটল গাড়ি। সন্ধ্যের সময় হোটেলে পৌঁছলাম। রাতে খেতে যাওয়ার সময় ভিনসেন্ট’স বেকারির রঘুকে একবার ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম। ভদ্রলোক দৃশ্যতই খুশি হলেন। আবার এক গ্লাস করে ফলের রস খাওয়ালেন। ফেরার ট্রেন আর একদিন পরে। ত্রিচিতে খুব সুন্দর একটা চার্চ আছে। সেটায় গেলাম একবার। ত্রিচির স্থানীয় চুরুট বেশ বিখ্যাত। ত্রিচিনোপল্লী সিগারের ছাইয়ের কথা শার্লক হোমসের তদন্তে আছে। বিড়ি সিগারেটের দোকান বিড়া শপে সে জিনিস চোখে পড়ল। কিং সাইজ সিগারেটের মত আকার, একটু মোটা। ধোঁয়ার গন্ধটা ভাল লাগল না, তাই আর কিনিনি। ফেরার ট্রেন ছিল রাতে। একটু লেট করে এল। পরের দিন ভোর হওয়ার আগেই চেন্নাই এগমোর পৌঁছলাম। সেখান থেকে অটো করে চেন্নাই সেন্ট্রাল। করমন্ডল এক্সপ্রেস ছাড়ল ঠিক সময়ে। ঘটনাবহুল একটা সফর শেষ হল। (সমাপ্ত)

1236

38

শিবাংশু

আমাদের তৃতীয় পৃথিবী

বহুদিন আগের একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। বারো-তেরো বছর বয়স হবে তখন। বাবার সঙ্গে শরৎকালে যাচ্ছিলুম আমাদের দ্যাশের বাড়ি। থার্টি ডাউন নামক ট্রেনটি, এখন যার নাম কুর্লা এক্সপ্রেস, টাটানগর থেকে হাওড়া যেতে সব স্টেশনে দাঁড়াতো।প্যাসেঞ্জারের অধম। তখনও গীতাঞ্জলিই শুরু হয়নি। জ্ঞানেশ্বরী, আজাদ হিন্দ, দুরন্ত সব তখন স্বপ্নে। বম্বে যেতে আসতে টোয়েন্টি নাইন আপ বা রাতে বম্বে মেল। আমরা দিনের বেলা খড়গপুর যেতে গেলে থার্টি আপ ধরতুম টাটানগর থেকে। সকালবেলা 'ভাতেভাত' খেয়ে সেই যাত্রা। খড়গপুরে নেমে ধরতে হতো গোমো প্যাসেঞ্জার। বিকেল বিকেল পৌঁছে দিতো আমাদের দ্যাশের ইশটিশন। যাকগে..... ------------------------ ঠিক পুজোর আগে যাওয়া একবার। প্রতিবারের মতো। দাদু-দিদার সঙ্গে দিনদুয়েক দেখা করে আসা। মহালয়া থেকে ষষ্ঠীর মধ্যে। হলুদ রঙের কাঠের বেঞ্চি, পাটা পাতা। রেলকামরায় গদিটদি লোকে দেখেনি তখনও। সিংভূমের শাল-কেঁদ-বহড়ার বন ফুরোলেই খোলা জানালা দিয়ে নীল আকাশ, শাদা মেঘ, সবুজ থেকে সবুজে ভেসে যাওয়া দিকচক্রবালের অনিঃশেষ ধানের কচি ছোটোবেলা,, কাশবনের অনন্ত সফেদ, টেলিগ্রাফে তারে ফিঙে আর অসম্ভব হাওয়ার দাপট। আশ্বিনের চরাচর উড়ে যেতো, যেন শিমুলের তুলো। মাঝে মাঝে ভাসা ভাসা চোখে তাকিয়ে আছে। অপু আর দুর্গা। ধানখেত, কাশঝোপের আড়াল থেকে রেলগাড়ির ঝমঝম তাকিয়ে রয়েছে। বাতাসে অশ্রুত ঢাকের বাদ্যি আর লুকোনো ধুনোর গন্ধ। রেলগাড়ি ঝমঝম। রাঢ়বাংলার সজল নিমন্ত্রণ। কিছু টান। মিছু কি না জানিনা। কারণ তার নামটা জানিনি তখনও। ------------------------- ঝাড়গ্রাম ইশটিশনে গাড়ি দাঁড়াতেই হুড়মুড় ভিড়। অবশ্য সব ইশটিশনেই তাই। হঠাৎ একজন সুদর্শন ভদ্রলোক দেখি বাবার নাম ধরে ডাকছেন। "কেমন আছেন সত্যেনবাবু?" বাবা বলেন, আরে আসুন, আসুন.... কোথায় চললেন? ভদ্রলোক চারজনের বেঞ্চিতে সপ্তমজন হয়ে বসলেন। "যাচ্ছি একটু কোলকাতা।" কথাবাত্তায় বুঝতে পারলুম তিনি আমার বড়ো পিসেমশায়ের ভাই। পেশায় শিক্ষক।তিনি দেশের বাড়িতে থাকেন। তাঁর ছেলেমেয়েরা কলকাতায় পড়াশোনা করে। সে সূত্রেই তাঁকে যেতে হয়। একথা-সেকথার পর তিনি বাবা'র কাছে আমাদের গন্তব্য জানতে চাইলেন। উত্তর শুনে খুব সংক্ষেপে বললেন, " ওহ, বাড়ি যাচ্ছেন।" ---------------------------- শুনে আমার প্রতিক্রিয়াটি একটু ধন্দে। আমাদের বাড়ি তো জামশেদপুর। কেন তিনি বললেন, আমরা বাড়ি যাচ্ছি? সেখানে প্রাসাদের মতো বাড়ি আছে একটা । শুধু দাদু-দিদা থাকেন সেখানে। বাবা'রা দশ ভাইবোন কেউই তো থাকেন না সেই বাড়িতে। দাদু'র সঙ্গে গল্প শুরু হলেই তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পৌত্রকে বলেন, এটা তোমাদের বাড়ি। তোমরা এখানে এসে থাকবে যখন আমরা থাকবো না। তিনি জানতেন তাঁর ছেলেরা হয়তো এই মফস্সলে এসে থাকবেন না কখনও। তাঁরা সবাই খুব শহুরে লোক। মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিশ্চয় আসবেন। ঐ বিশাল দোমহলা প্রাসাদের মতো বাড়ি। সামনে পিছনে ছড়ানো বাগান। ঘরের সিলিং ষোলো ফুট উঁচু। দোতলার বারান্দা থেকে একটু দূরে সোজা দেখা যায় রেলট্র্যাক। খড়গপুর-আসানসোল লাইনের কতো ট্রেন ধোঁয়া উড়িয়ে, সিটি বাজিয়ে, সেখানে সারাদিন। চারদিকে খড়ের দোচালা, টিনছাদের পাশাপাশি দরমার বাড়ি। বাঁশবাগান আর আমকাঁঠালের অ্যাভেন্যু। সামনের কাঁচা পথটি চলে গেছে সোজা হাটতলা। বিশাল সব্জির হাট সেখানে। কাকাজ্যাঠারা যখন আসেন, স্রেফ সেই সবুজের সমারোহ দেখার জন্য বারবার একটা থলি হাতে যান সেই হাটে। একবার বেগুন, পরেরবার করলা। ওখানে লোকে বলে কল্লা। আশেপাশের পুকুর থেকে সদ্যো ধরা ছটপটে চুনো মাছ। সারি সারি জোয়াল নামানো গাড়ির পাশে বসে বলদেরা জাবর কাটছে। পাইকার আর চাষীদের ঝুড়ি নিয়ে দরাদরি। কোনোটাই বিরল ছবি নয় মফস্সলি বাংলায়। কিন্তু আমরা এসব ছবি দেখতে পাইনা জামশেদপুর বা কলকাতায়। দাদু তো ছিলেন বনেদি কলকাত্তাই। বিডন স্ট্রিট, নতুনবাজারের লোক পুরুষানুক্রমে। জামশেদপুরে ছিলেন কোম্পানির বড়ো সাহেব। তাঁদের থেকে উপহার পেয়েছিলেন বাড়ি বানানোর একটুকরো বসতজমি, শহরের কেন্দ্রে। কিন্তু সেই জমি দিয়ে দিয়েছিলেন এক বন্ধুকে। একটাই জেদ। সারাজীবন বেহারে থাকলুম। এবার বাড়ি ফিরে যাবো। তিনি তো ফিরে গিয়েছিলেন। শেষ বয়সে চিকিৎসার জন্য প্রায়ই আসতে হতো জামশেদপুর। কিন্তু গত হয়েছিলেন 'নিজের বাড়ি'তেই। ---------------------- তাঁর বড়ো পৌত্রের টাটার চাকরি পছন্দ ছিলোনা কোনোদিন। তাকে করতেও হলোনা সেই চাকরি। সরকারি মুলাজিম হয়ে ঊনচল্লিশ বছরে মোট সতেরোটা পোস্টিং সারা দেশে। দারাকন্যা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে সর্বদা। কখনও অন্য সহকর্মীদের মতো 'ফ্যামিলি'কে একজায়গায় 'স্টেশন' করে নিজে " আমি রবো পরিত্যক্ত বঞ্চিতের দলে" হয়ে জীবন কাটায়নি। কারণ আমাদের দেশে বলে "কল কিসনে দেখা?" অর্থাৎ, আজই আমার শেষদিন হতে পারে। তাই নো রিস্ক। মেয়েরা ভালোভাবেই পড়াশোনা করেছে। বৃত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঘুরে ঘুরে বেড়ানো তাদের স্মার্ট করেছে। বাবা'র মতো সাতঘাটের জল খেয়ে মানসিকভাবে পরিণত হয়েছে। বাবা'র মতো'ই তাদের কোনও একটা বাড়ি নেই। সারা দেশই বাড়ি। তার বাবার কোনো জায়গায় বড়োজোর বছর তিনেক হয়ে গেলেই আর থাকতে ভালো লাগেনা। ততোদিনে সে জায়গার সব রহস্যই ক্র্যাক হয়ে যায়। তাই বোর লাগাটা স্বাভাবিক। এবার যেতে হবে নতুন কোথাও। নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন নিসর্গ, নতুন ঐতিহ্য। 'সব ঠাঁই মোর ঘর আছে', গুরু'র এই কথাটা নিজের জীবনে অজান্তেই রূপ নিয়েছে এতোদিন ধরে। ------------------------ তার দ্যাশের বাড়ি আর 'নিজের' নেই। তার জামশেদপুরের বাড়িও তাই। অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে ভাবতে ভাবতে আবার পূর্বপুরুষের শহরে ডেরা বাঁধতে আসা। কখনও থাকেনি সেখানে সে। হায়দরাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, পনাজি, লিস্টের প্রথম তিনটে জায়গা, সবই বাদ গেলো। কেউ বলে, হোয়াই কলকাতা? কেউ বলে, বাহ, বেশ করেছো। হিসেব নয়, ইচ্ছে হয়েছে, সেটাই বড়ো কথা। দেখা যাক, তিলোত্তমার কল্লোল কতোদিন শিহরিত করে। " গাছ আর গাছের ছায়ার নিচে দড়ির খাটিয়া আমাদের তৃতীয় পৃথিবী " (স্থিরচিত্রঃ ভাস্কর চক্রবর্তী)

968

10

শিবাংশু

পিতামহদের উদ্দেশ্যে

রাত পোয়ালেই পিতৃপক্ষ শেষ হচ্ছে এবারের মতো। আমাদের সংস্কৃতিতে মহালয়া অমাবস্যা ও পিতৃপক্ষ একসঙ্গে চিরকালই ছিলো। পরবর্তীযুগে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ এবং পঙ্কজকুমার মিলে এই তিথিটির সঙ্গে একটি অন্যতর মাত্রা যোগ করেছিলেন। এই তিথিটি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাত্রাগুলি নিয়ে কৌতুহলী ছিলুম অনেকদিন ধরে। বন্ধুদের আদেশে এই বিষয়ে একটি লেখা পত্রস্থ করতে হয়েছিলো কিছুদিন আগে। যেসব বন্ধুরা এ বিষয়ে আগ্রহবোধ করেন এবং লেখাটি আগে পড়েননি, তাঁদের জন্য রেখে দিলুম, ---------------------------------- অহনি অহনি ভূতানি গঞ্চংতিয় যমালয়ম । শেষ স্থাবরম ইচ্ছন্তি কিম আশ্চর্যম অতহ পরম ।। (বনপর্বঃ মহাভারত) মৃত্যু না থাকলে কী কী হতো বলা যায়না। হয়তো অনেক কিছুই অন্যরকম হতো। তবে এটা ঠিক যে পৃথিবীতে কোনও ঈশ্বরের কল্পনাও থাকতো না। কোনও গোষ্ঠীবদ্ধ 'ধর্ম'ও থাকতো না নিশ্চিত। প্রনাবি ( প্রমথনাথ বিশী) একটি গল্প লিখেছিলেন, " ভগবান কি বাঙালি ?" সেখানে তিনি বলেছিলেন এই বিষয়টি নিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম থিসিসটি লেখা হবে। কারণ এটাই হবে মানুষের শেষ থিসিস। যেহেতু ভগবান বাঙালি প্রমাণ হয়ে গেলে পৃথিবীতে আর কোনও থিসিসের দরকারই হবেনা। সেরকমই মৃত্যু না থাকলে শুধু ভগবান কেন, মানুষের যাবতীয় মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ইচ্ছেই তো বাতিল হয়ে যাবে। মৃত্যু নিয়ে সারা পৃথিবীতেই মানুষের অনন্ত কৌতুহল, প্রশ্ন, উদ্বেগ এবং অনিঃশেষ ভয়। তবে আমাদের দেশে মৃত্যুশিল্প নিয়ে যতো গভীর চিন্তা বা দর্শন দেখা যায়, তার স্তরের চর্চা আর কোথাও হয়নি। বকরূপী ধর্ম যখন রাজা যুধিষ্ঠির'কে উপরের প্রশ্নটি করেছিলেন, তখন সেটি কোনও বিচ্ছিন্ন সন্ধান ছিলোনা। তার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য ও পরম্পরা বর্তমান। যাজ্ঞবল্ক্য-মৈত্রেয়ী সংবাদ বা উক্ত বক-যুধিষ্ঠির ডিসকোর্সটি আমাদের মৃত্যুশিল্পের দুটি মহৎ নিদর্শন। পরবর্তীকালের মদভাগবদ্গীতা নামক গ্রন্থটিতে তো শুধু এই নিয়েই আঠেরোটি অধ্যায় রচিত হয়ে গেলো। মৃত্যুভয় ও তদ্জনিত শোক কীভাবে বাগে আনতে হয় তা নিয়ে ভারতবর্ষে উপনিষদ বা বৌদ্ধবিদ্যায় সুদীর্ঘ চর্চাসমূহ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাগ ইতিহাসের অর্ধসভ্য মানুষজনের মৃত্যুকেন্দ্রিক উদ্বেগ ও আশংকার মাত্রা একুশ শতকের 'অতি'সভ্য জনসমাজেও কিছুই হ্রাস পায়নি। প্রশ্নটি এখনও সমান তাজা, কিমাশ্চর্যম? ------------------------------------- নিজেকে মানুষ অত্যন্ত ভালোবাসে। হয়তো শুধু নিজেকেই বাসে। বাকি এক্সপ্রেশনগুলি হয় সামাজিক দায়বদ্ধতা, নয় নিছক শরীরলিপ্সা। কখনও'ই সে স্বীকার করতে পারেনা যে 'আমি' নেই, অথচ সব কিছু একইরকম রয়েছে। 'আমার' থাকা না থাকাটা এতো'ই তুচ্ছ, তাৎপর্যহীন একটা নিয়মরক্ষা, যে আমার মৃত্যুতে গাছের একটা পাতাও ঝরে পড়েনা। এই সত্যটা কখনও কোনও মানুষ সহ্য করতে পারেনা। এই 'অসহ্য' সত্যটিকে জায়গা করে দিতে রচনা করা হয় অসংখ্য দর্শন, অগণিত দৈবী-ঐশী নির্মাণ। জন্মান্তরবাদ, অবতারবাদ, কর্মফলতত্ত্ব, পাপপুণ্য মাপা পুথির পর পুথি। তবুও মরণ আসে। নিয়ম করে।অতি স্বল্প কেউ কেউ অভিযোগহীন মসৃণতায় তাকে আলিঙ্গন করেন। কিন্তু বাকিদের কী হবে? এই শরীর শেষ হয়ে যাবার পরেও কীভাবে আরো কিছুদিন প্রাসঙ্গিক থাকা যায়? চিরন্তন প্রশ্ন। বড়ো মানুষেরা নিজেদের কীর্তির ভিতরে বেঁচে থাকবেন। কিন্তু যাঁরা ততো বড়ো ন'ন? তাঁদেরও তো আকাঙ্খা থাকে। নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রানি, নৈনং দহতি পাবক। সে তো আত্মা নয়। সে তো মানুষের অকৃত্রিম, অপরিসীম বেঁচে থাকার ইচ্ছা। কে বাঁচিয়ে রাখবে তাকে? উত্তরপুরুষ? ------------------------------------- পৃথিবীর সব 'সভ্য-অসভ্য' সংস্কৃতিতে প্রথম 'দেবতা' হলেন পিতৃপুরুষের প্রয়াত আত্মা'র কল্পনা। পিতৃপুরুষরা নিজেদের জীবৎকালে নিয়ম বেঁধে যা'ন, যেখানে শরীরের মৃত্যুর পরেও তাঁরা উত্তরপুরুষের অভিভাবক হয়ে রয়ে যাবেন। কিছু ভক্তিশ্রদ্ধা, কিছু কৃতজ্ঞ ভালোবাসা, বাকিটা আনুগত্য; সন্ততিরা এভাবেই পূর্বপুরুষদের বাঁচিয়ে রাখেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ক্রমে নানা বিশদ প্রথার জন্ম হয়। প্রথাগুলি 'শাস্ত্রায়িত' হয়ে 'ধর্মবিশ্বাসে'র অবিচ্ছেদ্য অঙ্গও হয়ে যায়। মানুষ ভরসা খোঁজে দিনে আর রাতে।।।। নানা গল্পকথা, অধিআদেশের লোহার খাঁচাও তৈরি করা হয়। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি উত্তরপুরুষদের বহন করতেই হবে। নয়তো পৃথিবী উৎসন্নে যাবে। শরীরকেন্দ্রিক অস্তিত্ত্ব ঘুচে যাবার পর স্মৃতিকেন্দ্রিক অস্তিত্ত্বের আশা মানুষের আত্মপ্রেমকে শুশ্রূষা যোগায়। স্বস্তি সান্ত্বনার আশ্বাস দেয়। নশ্বর মানুষের অলীক আশ্রয়ের একটা অছিলা তৈরি হয়ে যায় এইভাবে। ----------------------------------------------- পৃথিবীর সব প্রান্তেই পিতৃপুরুষদের স্মৃতির প্রতি সম্মানসূচক নানা লৌকিক প্রথা প্রচলিত আছে। প্রাচ্যের দেশগুলিতে তার প্রভাব গভীরগামী। ভারতবর্ষ, চিনসহ দূরপ্রাচ্যের সমস্ত দেশেই যেখানে যৌথপরিবারকেন্দ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থা দৃঢ়্মূল ছিলো, বহুবিচিত্র উপায়ে পূর্বজদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-আনুগত্য নিবেদন এখনও করা হয়ে থাকে। তবে ভারতবর্ষের সনাতনধর্মীয়দের মতো এতো বিশদ, স্ট্রাকচার্ড প্রথাপ্রণালী বোধহয় আর কোথাও তৈরি হয়নি । পুরো ব্যাপারটিকে আচরণীয় ধর্মীয় কৃত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার অবকাশ বিশেষ রাখা হয়নি। --------------------------------- উদাহরণ হিসেবে আমাদের সংস্কৃতিতে পিতৃপক্ষ পালনের যে প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে তার কথা ভাবা যেতে পারে। প্রাচ্যের সব ধর্মেই চান্দ্রতিথির প্রভাব খুব বেশি। আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রে আর্য অনুষ্ঠানগুলি, মানে বিষ্ণুকেন্দ্রিক অর্চনাসমূহ সাধারণতঃ পূর্ণিমাতিথিতে এবং মূলতঃ অনার্য উদযাপনগুলি, মানে শাক্ত উপাসনাভিত্তিক ধর্মাচারগুলির জন্য অমাবস্যা তিথিকে প্রশস্ত মনে করা হয়। বিভিন্ন ঋতুর সঙ্গে জড়িত পূর্ণিমার যেমন নামপদ রয়েছে, ( গুরুপূর্ণিমা, বৈশাখীপূর্ণিমা, বসন্তপূর্ণিমা, কোজাগরীপূর্ণিমা ইত্যাদি) তেমনই বিভিন্ন অমাবস্যা তিথিকেও নানা নামে ডাকা হয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি মহালয়া অমাবস্যা। অমাবস্যা তিথিটি সচরাচর যাঁরা তন্ত্র বা শাক্তমতে উপাসনা করেন, তাঁদের জন্য প্রশস্ত বলে কথিত আছে। তাই অমাবস্যার নামের সঙ্গে দেবীপ্রসঙ্গটিই সুলভ। কিন্তু মহালয়া অমাবস্যাটি নিবেদিত 'পিতৃপুরুষে'র উদ্দেশ্যে। সূর্য যখন কন্যারাশিতে প্রবেশ করে তখন যমরাজ তাঁর প্রজাদের, অর্থাৎ মৃতমানুষের আত্মাদের পক্ষকালব্যপী সাময়িক ছুটি মঞ্জুর করেন, 'বাড়ি' যাবার জন্য। 'বাড়ি' অর্থে সেই সব আত্মাদের (যাঁদের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি 'প্রেত' নাম দিয়েছে)উত্তরপুরুষদের ভদ্রাসন। এই সময়কালটি ( সূর্যের কন্যারাশি থেকে বৃশ্চিক রাশিতে সরে যাওয়া) , যার পোষাকি নাম 'পিতৃপক্ষ', পরলোকবাসী আত্মারা অতিথি হয়ে উত্তরপুরুষদের গৃহে আসেন। এই উপলক্ষ্যে বংশধরকুলকে পক্ষকালব্যপী প্রতীকী শোক পালন করার নির্দেশও শাস্ত্রীয় বিধান। উদ্দেশ্য, প্রয়াত আত্মাদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করা। সারা পৃথিবীর নানা দেশে এই জাতীয় বিভিন্ন লৌকিক আচার পালন করা হয়। সনাতনধর্মীয়দের মধ্যে এই পক্ষকালে পরলোকগত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে জল ও ফলদান করার বিধি রয়েছে। ব্রাহ্মণরা বলেছেন, এই আচারটি পালিত না হলে পিতৃপুরুষ ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে অভিশাপ দিতে দিতে মহালয়া অমাবস্যার দিন আবার যমলোকে ফিরে যাবেন। সেটা উত্তরপুরুষদের জন্য অকল্যাণকর। তাই মহালয়া অমাবস্যায় পিন্ডদান ও গঙ্গাস্নানের বিধান 'শাস্ত্রের' অঙ্গ । তবে একটা শর্ত আছে। ঔরসজাত 'পুত্র' ছাড়া কেউ পিন্ডদান করতে পারবে না। করলেও সে অন্ন পিতৃলোক পর্যন্ত পৌঁছোবে না। শুধুমাত্র কন্যার পিতারা অবহিত হউন। গরুড়পুরাণ বলছে, পুত্রহীন পিতারা কখনও মুক্তিলাভ করবেন না। পুত্রলাভের জন্য তাঁদের বারবার জন্ম নিতে হবে। মার্কন্ডেয়পুরাণ বলছে, পূর্বপুরুষের আত্মা যদি পুত্রের শ্রাদ্ধে সন্তুষ্ট হয় তবে প্রচুর সমৃদ্ধিলাভের ব্যবস্থা পাকা হয়ে যায়। মোক্ষও গ্যারান্টিড। -------------------------------- এই প্রসঙ্গে একটি পৌরাণিক আখ্যান উল্লেখ করা যায়। মহাভারতের কর্ণ মৃত্যুর পর যখন পরলোকবাসী হলেন, তখন ক্ষুধার্তবোধ করায় তাঁকে যমের নির্দেশে স্বর্ণসামগ্রী পরিবেশন করা হলো। কর্ণের প্রশ্নের উত্তরে যম জানালেন, যেহেতু কর্ণ আজীবন স্বর্ণদান করে এসেছেন তাই পরলোকে প্রতিদান হিসেবে তিনি শুধু স্বর্ণই পেতে পারেন। উপরন্তু তাঁর সব পুত্রই কুরুপান্ডবের যুদ্ধে বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছেন। অতএব মর্ত্যলোক থেকে তাঁকে পিন্ডদান করার কোনও অধিকারী আর জীবিত নেই। এই অবস্থায় পড়ে কর্ণ যমকে অনুরোধ করলেন তাঁকে যেন এক পক্ষকালের জন্য আবার জীবনদান করা হয়। সেক্ষেত্রে তিনি মর্ত্যে গিয়ে নিজের আত্মার উদ্দেশ্যে যথেষ্ট জল ও অন্নের পিন্ডদান করে আসবেন। পরলোকে অন্নকষ্ট দূর করার জন্য তাঁর কাছে আর কোনও উপায় নেই। যমরাজ রাজি হলে কর্ণের বরাতে একপক্ষকালের নরজন্মলাভ হলো। এই সময়টিতে তিনি মর্ত্যে এসে নিষ্ঠাসহকারে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে অন্নজলে তর্পণ করলেন। যদিও কর্ণের পিতৃপুরুষ যে আসলে কে, তা নিয়ে মতান্তর রয়েছে। যে পক্ষকাল কর্ণ মর্ত্যে থেকে পূর্বজদের উদ্দেশ্যে তর্পণ ও পিন্ডদান করেছিলেন, সেই সময়কালটিকেই 'পিতৃপক্ষ' বলা হয়ে থাকে। শাস্ত্রবিচারে যমলোক'কে 'মহালয়' মনে করা হয় । কারণ এই আলয়ে সমস্ত জীবিত প্রাণীকে একদিন গিয়ে বসবাস করতেই হবে। যেহেতু এই অমাবস্যার দিন পিতৃপুরুষদের সাময়িক মর্ত্যবাসের পর আবার মহালয়ে ফিরে যেতে হয়, তাই এর নাম 'মহালয়া অমাবস্যা'। ----------------------------- পিতৃপুরুষদের স্মরণ করা অবশ্যই পুণ্যকর্ম এবং সেহেতু এই দিনটি একটি পবিত্র উপলক্ষ্য । কিন্তু এর সঙ্গে শোকের মাত্রা যোগ করাটি পুরাণযুগের অবদান। বৈদিকযুগে মৃত্যুঞ্জয় হবার সাধনা করা হতো, পশ্য, মৈত্রেয়ী, নচিকেতা ইত্যাদি । যেহেতু মৃত্যু জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি, তাই বেদ-উপনিষদের কালে তার মাহাত্ম্য স্বীকার করা হলেও ততো প্রাধান্য দেওয়া হতোনা। কিন্তু পুরাণযুগে মানুষ চারিত্র্যে অল্পপ্রাণ হয়ে যাবার ফলে, 'মৃত্যু' মানুষের মনে এক চরম ভীতিকর মাত্রা নিয়ে আসতে শুরু করে। এই ভীতির বাণিজ্যীকরণ করে পুরোহিতকুল বহু লোকাচারের সৃষ্টি করেছে। তার মধ্যে মহালয়ার দিন পিন্ডদান ইত্যাদি অবশ্য আচরণীয় কৃত্য। এ ছাড়া আরেকটি স্মার্ত মাত্রাও দেখা যায়। পরবর্তী শুক্লপক্ষ যেহেতু 'দেবী'পক্ষ, তাই তার আগে একটি এক্সক্লুসিভ 'পুরুষ'পক্ষ উদযাপনকেও ব্রাহ্মণ্যব্যবস্থার পক্ষ থেকে সিলমোহর দেওয়া হয়েছে। পিতৃপুরুষকে 'স্মরণ' করাই যেহেতু উদ্দেশ্য , সেক্ষেত্রে মহালয়া অমাবস্যাকে একটি একটি শুভতিথি মনে করা যায়। কিন্তু তা করা হয়না। ব্রাহ্মণ্যমাত্রায় এইদিনের অভিঘাতটি নেতিবাচক। ---------------------- আধুনিক নাগরিক সভ্যতায় সদ্যোমৃত প্রিয়জনকে 'হারানো'র যে বেদনা, তার একটা শেলফ লাইফ রয়েছে । বেদনার প্লাবন চলে যায়, কিন্তু পলিমাটির মতো যা পড়ে থাকে, তার নাম শোক। শোক একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি। এর কোনও সামাজিক তাৎপর্য নেই, পূর্ণত গহনগামী এক উপলব্ধি। এই উপলব্ধি এক নিগূঢ় শিল্পের মতো। এ বিষয়ে আমার জানা শ্রেষ্ঠ শিল্পীর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। লোকাচারের 'শ্রাদ্ধ' ইত্যাদি অনুষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। লোকাচারের 'শ্রাদ্ধে' আমাকে এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত যখন বলে আমার প্রয়াত মাতৃদেবী ক্ষুধার্ত প্রেত হয়ে আমার পিন্ডদানের জন্য অশরীরী অপেক্ষা করে আছেন এবং 'পিন্ড' না পেলে তিনি আমার অমঙ্গল করবেন। আমি সেই ব্রাহ্মণকে বলি, যে 'লোকাচার' মনে করে ঐ চালকলার পিন্ড না পেলে আমার মা আমার অমঙ্গল করবেন, সেই মূর্খতাকে ধিক্কার জানাই এবং আমি কোনমতে সেই 'শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে'র অংশ থাকতে পারিনা। পুরোহিত বিড়ম্বিত বোধ করেন এবং আমি এরকম একটি মূঢ়তার অংশভাগী হয়ে নিজের প্রতি করুণা বোধ করি। এই লোকাচারটিকে যদি 'শ্রাদ্ধ' বলা হয়, তবে তা কোনমতে শুভবোধের অংশ নয়। সেক্ষেত্রে 'শুভবিবাহে'র মতো 'শুভশ্রাদ্ধ' বলাটা 'শুভত্বে'র অবমাননা হবে। গুজরাতে কচ্ছের রাজপরিবারে শ্রাদ্ধপালন নিষিদ্ধ, যেহেতু মৃত্যু একটা 'অশুভ' ঘটনা। কিন্তু শব্দার্থে যে 'শ্রাদ্ধ' মানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, সেখানে শুভ প্রত্যয় ব্যবহার করাই যায়। ---------------------------------------- এই লেখাটির শীর্ষক ধার করেছি আমাদের বাল্যকালে রতনকুমার ঘোষ রচিত একটি নাটক থেকে। যে পৃথিবীকে আমরা রেখে যাচ্ছি উত্তরপুরুষদের জন্য, আমি নিশ্চিত তারা ভাবীকালে আমাদের খুব একটা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে না। ধুলোকাদায় মিশে যাওয়ার ভবিতব্য, পিতা পুত্র সবার....কে কাকে বাঁচিয়ে রাখে? "আমি তার উপেক্ষার ভাষা আমি তার ঘৃণার আক্রোশ অবহেলা করে গেছি; যে নক্ষত্র- নক্ষত্রের দোষ আমার প্রেমের পথে বারবার দিয়ে গেছে বাধা আমি তা ভুলিয়া গেছি; তবু এই ভালোবাসা-ধুলো আর কাদা-.........."

1011

9

মনোজ ভট্টাচার্য

নো - মানে না ! - নয় কেন ?

নো মানে না ! – নয় কেন ! পিঙ্ক মানে যে সাম্য – আগে জানতাম না ! সাম্য মানে পুরুষ এবং স্ত্রী – উভয়ত ! সেই অধিকার মেয়েদের কতটা দেওয়া হয় প্রতি নিয়ত মেয়েদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় নাকি – কতদুর তার অধিকারের সীমা ! সেভাবে দেখলে – দেখা যাবে – আমরা বেশ কয়েকবার এই ধরনের গল্প দেখেছি । এমনকি ইংরিজিতেও জোডি ফস্টারের একটা সিনেমা – একটি উচ্ছৃঙ্খল মেয়ে – যে মিনি স্কারট পড়ে - গ্যাং-রেপড হয়েছিল – তার অস্বীকৃতি সত্ত্বেও । এই গল্পে - কয়েকজন মেয়ে অভিভাবকহীন (!) একটা ফ্ল্যাটে থাকবে আবার পার্টি করার জন্যে বন্ধু ডেকে আনবে ! তাহলে প্রতিবেশীদের কি মনে হবে ! মেয়েগুলো ছেলেদের চুমু খাচ্ছে ! – এবং এদের স্বভাব চরিত্র ভালো নয় ! এরা সহজলভ্য ! চুমু খেতে দেখেছে কি ! না । ভালো প্রতিবেশীরা কি অন্যের জানলা দিয়ে উঁকি মারে ! আমাদের এই দুঃসাহসিক গল্পটি পরিবেষণ করার জন্যে কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ ! কারন আমাদের মেয়েরাও রাত-বিরেতে চাকরি সেরে অথবা সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরে । তাদের ইচ্ছেমত পরিধান করে ! তাই বলে কি বারাসতের দাদাদের অধিকার জন্মে যায় – তাদের চড়চাপড় মারার ! অথবা তাদের জোর করে তুলে নিয়ে যাবার ! মিত্রার ফাঁকা হলে কাল একটি মদ্যপ দাদা চিৎকার করছিলো – হাততালি দিচ্ছিল ! পরে অবশ্য গেট কিপার তাকে সাবধান করে ! চিত্রনাট্য হিসেবে খুব বলিষ্ঠ না হলেও যে কোনও হিন্দি সিনেমার চেয়ে ভালো ! কিন্তু কোর্টের সিকোয়েন্সে যথেষ্ট ভুলভাল । অন্তত তিনবার কন্টেম্পট অব কোর্ট হয় – কিন্তু কিছুই হল না ! একবার মিনালের মুখে ফাউল ল্যাংগুয়েজ, আরেকবার – দুই উকিলের তুমুল ঝগড়া আর রাজবীরের প্রচণ্ড চিৎকার করে ওরই আইনজীবীকে ধমক দেওয়া ! এক সময়ে জয়া বচ্চন অমিতাভকে সতর্ক করে দিয়েছিল – এই বলে – দর্শক যখন আর দেখবে না – তখন বুঝতে হবে – আমাদের দেবার ক্ষমতা ফুরিয়েছে ! কথাটা খুব সত্যি ! তবু তো চালিয়ে যাচ্ছে ! কখনো ভুত সেজে আবার কখনো অদ্ভুত সেজে ! সত্যি কি সেসব অভিনয় ! ভালো পরিচালকরা যেটুকু বার করে নিতে পারে ! - আমার মতো অমিতাভ-ভক্তরা হয়ত চেঁচিয়ে উঠবে ! কিন্তু চিন্তা করুন – ধৃতিমানকেও বলতে হচ্ছে – জোরে কথা বলুন ! সামনের লোকটির সঙ্গে সোজা কথা বলতে পর্যন্ত অসুবিধে হচ্ছে ! এটা বুঝি – শুধু বাজার পাওয়ার জন্যে ওনার মতো একজন স্টারকে আনতে হয় ! সত্যি কি তাতে লাভ হয় ! অভিনয়ের কথা বলতে হয় – মিনাল বা মৃণালের অভিনয়ে তাপসী পানু, আর ফালকের অভিনয় কীর্তি কুলকারনি আর রাজবীরের ভুমিকায় অঙ্গদ বেদী – সবার মনে থাকবে অনেক কাল । আর ধৃতিমান – জজের ভুমিকায় – কী সংযত অভিনয় ! – সবচেয়ে অবাক লেগেছে – মমতা শঙ্করের চরিত্রটা কী ও কেন – তাই বোঝা গেল না ! আরও বেশ কিছু চরিত্র ছিল – তাদের দিয়ে কিছু বক্তব্য রাখানো যেত ! কিন্তু সব অমিতাভকেই করতে হবে ! একদম শেষে হরবন্স বচ্চনের সেই কবিতা – আর সেই সময়েই ক্রিটিকাল সিনগুলো দেখাচ্ছে ! মনোজ

912

2

Joy

আকাশে আজ ঘুড়ির খেলা...

আজ আকাশের দিকে তাকালেই শুধু নানান রঙের ঘুড়ি| হনে হয় হয় আকাশটাকে কেউ রঙিন সামিয়ানা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে| চারদিকে শুধু হৈ হল্লা‚ ভো-কাট্টা আওয়াজ| এই ছিল আমাদের ছোট বেলার দেখা বিশ্বকর্মা পুজো| উত্তর কলকাতায় আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম তাদের একটা ব্যাটারী তৈরীর কারখানা ছিল| তিনতলা বড় বাড়ি| সারা দিন শুধু মেশিনের কর্কশ আওয়াজ আর লোকজনের চেঁচামেচি| বড্ড বিরক্ত লাগত| বিডন স্ট্রীট‚ মসজিদবাড়ি স্ট্রীট‚ দর্জিপাড়া এই সব জায়গায় প্রচুর ছোট ছোট লেদ ও কাগজ প্রিন্টের কারখানা ছিল| সারাদিন ঘটাং ঘটাং একঘেয়ে আওয়াজ ছিল| বিশ্বকর্মা পুজোর একদিন আগে থেকেই ঐ সব কারখানা গুলো পরিষ্কার করা‚ রং করার কাজ শুরু হয়ে যেত| পুজোর দিন সকাল সকাল কারখানার গেটের সামনে বসত ঘট‚ কলাগাছের ঝাড়| আজ আর ঐ একঘেয়ে আওয়াজটা আর নেই| আমাদের অব্শ্য ব্যস্ত থাকতে হত ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার জন্যে| বিশ্বকর্মা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু হত এই জরুরি কাজটি| লাইট পোস্টের এমাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত সুতো বাঁধা হত| এবার ভাঙ্গা টিউব লাইটের গুঁড়ো‚ আঠা এইসব দিয়ে লেই তৈরী করে ঘুড়ির সুতোর মাঞ্জা দেওয়া হত| নতুন ঘুড়ি‚ নতুন লাটাই দিয়ে কয়েকদিন আগে থেকেই ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রাকটিস চলত| আজ খুব প্রেস্টিজের লড়াই| আমাদের ছোটদের একা একা ছাদে ওঠা বারন ছিল| আজ সব ছাড়| আশ-পাশের ছেলেরা ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে বাড়িওয়ালার কাছে ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানোর অনুমতি চাইতে আসত| অন্যদিন না করলেও আজ যেন বাড়ির কর্তা-গিন্নী একটু মৃদু ধমক দিয়ে বলত যা তবে ছাদের কার্নিশের কাছে যাবি না| কথা শেষ হবার আগেই ঐ অতি উৎসাহী ছেলে-মেয়েরা ছুট দিত ছাদের উপরে| আমাদের বাড়িতে পুজো হওয়ার জন্যে আমাদের সবারই নেমতন্ন থাকত| মা-বাবার কাছে আগেরদিন থেকেই নাকে কেঁদে কেঁদে স্কুল আজ ডুব দেওয়া যেত| তবে বাবার কড়া নির্দেশ আগে পড়া শেষ করো‚ তারপর ঘুড়ি-লাটাই হাত দেবে| অগত্যা কি করা যাবে| কিছুক্ষন পড়ার মধ্যে থেকে আমার ভাই-বোনেরা ছুট দিতাম ছাদের দিকে| বিকেল হতে না হতেই বাড়ির ছাদগুলো ভর্তি হয়ে উঠত বাচ্চা‚ বুড়ো সবাই এসে জুটত| মাদুর পেতে বসতেন মেয়েরা| আজ এক মোক্ষম সুযোগ পাশের বাড়ির কিশোরী মেয়েটার কাছে প্রমান দেওয়ার| ঘুড়ি কাটা পড়লেই ভো-.......কাট্টা আওয়াজ| কাসর ঘন্টাও বাজানও হত| আমাদের বাড়ির কারখানায় কাজ করত মনোহর নামে একটি ছেলে| আমরা মনোহরদা বলতাম| ওর বাড়ি ছিল উড়িষ্যাতে| খুব কর্মঠ আর সৎ| ও এই খানেই থাকত| কারখানেতেই রাত্রে ঘুমাত| খাওয়া-দাওয়া বাড়িওয়ালাদের সঙ্গেই করত| তিন -চারমাস পর পরে দেশের বাড়ি যেত| ও আর বাড়িওয়ালার ছেলেরা বিশ্বকর্মা পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই এই বিশাল ঘুড়ি বানাতে লেগে পড়ত| সঙ্গে হাত লাগাতাম আমরা ছোটরা| সেই হাতে বানানো ঘুড়ি বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ওড়ানো হত| খুব মজা হত| ঘন-সন্নিবিষ্ট বাড়ী গুলোর এমাথা ও মাথাকে স্পর্শ করেছে| ফলে দুরন্ত ছেলেমেয়েরা অনায়াসেই এ বাড়ি-সে বাড়ি করে বেড়াত| সন্ধ্যে হতে হতে অনেক কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাদে এসে পড়ত| আমরা সেই ঘুড়িগুলো যত্ন করে রেখে দিতাম পরের বছরের জন্যে| মনটা খারপ হয়ে যেত| আবার একটা বছরের প্রতীক্ষা| বিশ্বকর্মা পুজো মানেই তো দুর্গা পুজোর আগমন বার্তা| স্কুল ছুটি‚ নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ| এক অদ্ভূত ভাললাগা| অনেকদিন হল উত্তর কলকাতা ছেড়ে চলে এসেছি| কিন্তু ছেড়ে আসতে পারিনি সেই ভাললাগার অনুভূতি গুলো| এখন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রবনতাটা খুবই কমে গেছে| উত্তর কলকাতার সেই ঘন-সনিনিবিষ্ট বাড়ী গুলো ভেঙ্গে অনেক অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট হয়েছে| এখন বিশ্বকর্মা পুজোতে ঘুড়ি ওড়ানো‚ বিজয়া দশমীতে মিষ্টি ভর্ত্তি প্লেট নিয়ে পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দের প্রনাম আর করার করার রেওয়াজও উঠে গেছে| গত ২০-২৫ বছরে বাঙ্গালীর জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে| একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে ছোট স্মার্ট পরিবার| ঝামেলা নেই| উত্তর কলকাতায় কিছু রক এখনো আছে| রকে আড্ডা মারার লোক নেই| নতুন প্রজন্ম অত্যাধুনিক টেকনোলোজির সাহচর্য পেয়েছে| আমরা যারা আশির দশকে বড় হয়েছি| আমরা পুরোনো ও নতুন দুই টেকনোলজির ই সান্নিধ্য পেয়েছি| সাদা-কালো মোটা টিভি থেকে ফ্ল্যাট লেড রঙ্গীন টিভি দেখেছি‚ বড় বড় রেডিও দেখেছি| ক্যাসেট থেকে সিডি‚ ডিভিডি‚ পেন-ড্রাইভ দেখেছি| ল্যান্ড লাইন ফোন থেকে জিরো-ফিগারের মোবাইল ফোন দেখেছি| রেডিওতে শনিবারের বারবেলা আর কেয়ো-কার্পিন নাটকের দিন শোনার জন্যে অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম| এখন আর সেই রেডিও নেই| শ্রাব্ন্তী মজুমদারের সেই মোহময়ী সুরেলা কন্ঠ আর শোনা যায় না| শনি-রবিবারের সেই বহু প্রতীক্ষিত সিনেমা দেখার দিন আর নেই| এখন হাজার হাজার চ্যানেল‚রিমোটের নব ঘোরালেই নানান রকম সিনেমা| গান| আর কত কি মজাদার প্রোগ্রাম| আমরা অনেক আধুনিক টেকনোলজি পেয়েছি| কিন্তু আমরা হারিয়েছিও প্রচুর| সেই ভালবাসা-আন্তরিকতা‚ পাশাপাশি বাড়িগুলোর সুখ-দু:খ ভাগ করে নেওয়া| আরও কত কিছু| যেগুলো আর কোনদিনই ফিরে আসবে না| এখন কারও কাছে সময় নেই| আমরা এখন ভীষন ব্যস্ত| এখন এই বস্তা পচা আবেগ গুলোর কোনও দাম নেই| মনে মনে ভাবি সেই সব দিনগুলো| চোখ বন্ধ করে দেখি আমাদের সেই বাড়িটা থেকে অনেক ঘুড়ি উড়ছে| কত কত কাটা ঘুড়ি আমাদের ছাদে জড়ো হয়েছে| মনোহরদা এক বিশাল ঘুড়ি ওড়াচ্ছে| আকাশ ঢেকে গেছে রঙ্গীন কাগজে| আর সেই চেনা আওয়াজ ভো-কাট্টা..

928

11

মনোজ ভট্টাচার্য

নাইন ইলেভেন – এক বিভীষিকা !

নাইন ইলেভেন – এক বিভীষিকা ! এই লেখাটা কখনো লেখার ইচ্ছে ছিল না ! কখন লেখার চেষ্টাও করিনি ! কারন ঘটনাটা শুধু আমেরিকার দুটো শহরেই নয় – সমস্ত মানব সমাজে একটা ন্যক্কারজনক- ঘৃণ্য দিন ! ঠিক যেমন ছয়ই আগস্ট – এর চেয়েও জঘন্যতম দিন - হিরোশিমা নাগাসাকি ধ্বংস ! কিন্তু হিরোশিমা নাগাসাকি বা ভিয়েতনামের হত্যাকাণ্ড আমেরিকার গর্বিত মাটিতে ঘটেনি । তাই তার ইমপ্যাক্ট সরাসরি আমাদের জীবনে আসেনি ! এগারই সেপ্টেম্বর ২০০১ - সকালটা খুব সুন্দর ভাবে রৌদ্রকরোজ্বল হয়ে এসেছিল । সেদিন আবার ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিক পার্টির প্রাইমারি ভোট ! মেট্রোতে আসার আগে দেখে নিয়েছি – কিছু কিছু প্রার্থী রাস্তায় দাঁড়িয়ে লিফলেট দিচ্ছে । আটটা চল্লিশ নাগাদ - ম্যানহাটানে ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে অফিশ বিল্ডিঙে ঢুকে ৪০ তলায় এসেও কোনও অনুভুতি হয় নি । আমার আগে অফিশে আসেন পিটার – মনে হয় সে সকাল থেকেই অফিশে এসে টি ভি খুলে – স্টক মার্কেট চ্যানেল দেখে ! আটটা ছেল্লিশএর বোধয় কয়েক সেকেন্ড পরেই – আচমকা পিটার আমার নাম ধরে চিৎকার করে – শধু ‘ও মাই গড’ বলে যাচ্ছে ! – আমি আমার ঘর থেকে দৌড়ে এসেছি – ভেবেছি ওঁর কিছু হয়েছে ! ও তখন আমাকে ইশারা করে টি ভির দিকে দেখাচ্ছে । টি ভি-র পর্দায় তখন প্রথম প্লেনটার টুইন টাওয়ারের নর্থ বিল্ডিঙে ধাক্কা মারাটা দেখিয়েই যাচ্ছে ! – আমি দেখেও কিছু বুঝতে পারছি না । মনে হল একটা ইলিউশান । - টুইন টাওয়ারে এরোপ্লেন ধাক্কা মারবে ! হঠাৎ আমার ঘরে ফোন বাজতে লাগল । দৌড়ে ঘরে গিয়ে ফোন তুলতেই – আমার স্ত্রী বলে উঠল – দেখেছ –' টুইন টাওয়ারে প্লেন ধাক্কা মেরেছে ! ' ইতিমধ্যে অফিশে লোক আসতে আরম্ভ করেছে । - নটায় অফিশ আরম্ভ । আবার আমার নাম ধরে ডেকে উঠল পিট '– দে অ্যাটাকড আস !' – চোখের সামনে দেখলাম – কোত্থেকে আরেকটা প্লেন এসে সাউথ বিল্ডিঙে ঢুকে গেল ! ও আরেক পাশে দেওয়ালে আটকে রইল । - তারপরেই আগুন বের হতে লাগল – খুব সম্ভবত ব্লাস্ট করলো ! আমার ছোটো ছেলে কাজ করত ৫৫ ওয়াটার স্ট্রিট ! – নটার পরেই ওই রাস্তাটা ধুলোয় অন্ধকার হয়ে গেল । ওর মোবাইল ফোন পাওয়া যাচ্ছে না ! বাড়িতে সমানে ফোন আসছে ভার্জিনিয়া থেকে – ওঁর খবর জানতে চেয়ে ! নটা সাঁইতিরিশ – আরেকটা প্লেন গিয়ে মারল – পেন্টাগনের একপাশের পাঁচিলে ! তার কয়েক মিনিট পর দশটা নাগাদ আরও একটা প্লেন গিয়ে পড়ল পেন্সিল্ভানিয়ার মাটিতে । সবশুদ্ধু চারটে বিমান – হাইজ্যাক করা হয়েছিল বোস্টন থেকে – আর পর পর আক্রমন করতে লাগল আমেরিকার সাধারন নাগরিক কেন্দ্রগুলোর ওপর ! – আমেরিকার এয়ারপোর্ট, আমেরিকার প্লেন, আমেরিকার কেন্দ্রগুলো আক্রান্ত হচ্ছে ! তারই পর দারুণ তৎপরতার সঙ্গে এক এক করে সব বন্ধ করা আরম্ভ হল । প্রথমেই বন্ধ হল সাবওয়ে । তার সঙ্গেই বন্ধ হতে লাগল জলপথ স্টেশনগুলো । টানেলগুলো ! – তারপর উঁচুতলার বাড়িগুলোর লিফট বন্ধ করা হল ও বাড়ি খালি করা আরম্ভ হল ! – আমাদের চল্লিশ তলা থেকে হেঁটে হেঁটে নামতে হল । সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা হল বৃদ্ধলোকেদের ও হুইল চেয়ারের লোকেদের ! রাস্তায় সমস্ত দোকান থেকে কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল বিক্রি হতে লাগল বেশি দাম দিয়ে । ফোন করতে বেশি চার্জ করতে লাগল । এটা কিন্তু ম্যানহাটানে । আমি সাবওয়ের ষ্টেশনে ঢুকে দেখি – একেবারে খাঁ খাঁ করছে স্টেশন ! - সমস্ত মানুষ পায়ে হেঁটে ম্যানহাটান থেকে ফিরতে লাগল – কুইন্স ও কুইন্স হয়ে লং আইল্যান্ডে । ওদিকে ব্রুকলিন ব্রিজ পেরিয়ে ব্রুকলিনে যাচ্ছে । আবার উত্তরে ব্রঙ্কসে । না বাস – না ট্রেন – শুধু ট্যাক্সি ! কি ভীষণ ভাড়া ! আমেরিকার মানুষজনকে কখনো একটা জাতি হিসেবে দেখা যায় নি ! কিন্তু হঠাৎ এই দিন দেখলাম একটা জাতি হয়ে গেল । আমি কুইন্সে আসার পরেই দৃশ্যগুলোর পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম ! এখানে সব দোকান থেকে বোতলের জল বিনা পয়সায় ডেকে ডেকে লোকেদের দিচ্ছে । বিনামুল্যে বাড়িতে ফোন করার জন্যে বলছে ! – এমন কি ট্রাকের পেছনে লোক নিয়ে এগিয়ে দিচ্ছে ! এসব করছে বেশীরভাগ স্প্যানিশ লোকেরা ! এদের এই উদার চরিত্র কিন্তু আগে কখনো দেখি নি ! – হঠাৎ - ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড – হয়ে গেল ! ওদিকে আমার ছেলে গেল কোথায় ! – পরে শুনেছি – ব্রুকলিন ব্রিজ দিয়ে ও আর আরেক সহকর্মী ব্রুকলিন চলে যায় । তারপর সেখান থেকে কিভাবে লং আইল্যান্ডে চলে যায় । অনেক রাত্তির বেলায় বাড়িতে ফোন করে জানায় – আরেক জনের গাড়িতে করে আসছে ! – ওঁর শরীরটা ধুলোয় ঢেকে গেছে । আর একটা শার্ট – যেটা পড়েছিল সেটা যে কি অবস্থা হয়েছে ! সেই শার্ট ও আর কোনোদিন গায়ে দেয় নি ! – আর টি ভি তে খবর হলেই ও বন্ধ করে দিতো ! একটা সাংঘাতিক আতঙ্কের মধ্যে আমাদের দিন রাত কাটতে লাগল ! তখনো কেউ নিশ্চিত নয় যে আরও আক্রমন হতে পারে ! সেদিন শুধু টি ভিতে খবর দেখেছি । সেদিনই খানিক বাদে সাউথ টাওয়ারটা ভেঙ্গে পড়ল ! একপাশে পোষ্ট অফিশটা নড়বড় করতে লাগল ! ওপাশে ডয়েশ ব্যাঙ্ক নড়তে আরম্ভ করেছে ! দেখেছি সাংবাদিকরা পর্যন্ত রিপোর্টইং করতে করতে হাউ হাউ করে কাঁদছে । ওই ধুলোর জঞ্জালের মধ্যেই ফায়ার ডিপার্টমেন্টের লোকেরা কত লোককে উদ্ধার করে নিয়ে আসছে ! টুইন টাওয়ারের একদম ওপর তলায় এ বি সির একটা সেন্টার ছিল – সেটাও ভেঙ্গে পড়ল । ফলে ওই চ্যানেলে খবর দেখাতে পারলো না ! তখন একমাত্র সি বি এস ঠিকমত খবর দেখাতে লাগল ! – প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ – ইল্লিগ্যাল মানুষের কথা বাদ – স্রেফ বাড়ি দুটোর তলায় চলে গেল ! এ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার-ট্রাক, পুলিশের গাড়ি – ধুলার নীচে ঢাকা পরে গেল ! – তার মধ্যে খৃস্টান – হিন্দু – মুসলমান বৌদ্ধ ও জুইশ সব মানুষ ছিল ! টুইন টাওয়ারের নীচে তিনটে ট্রেন – নিউ জার্সি থেকে আসে ট্রেন, সবে খোলা-হচ্ছে দোকান ! আশেপাশে সব রাস্তা – চেম্বার স্ট্রিট, অয়াল স্ট্রিট, ওয়াটার স্ট্রিট দোকান পাত সব বন্ধ করে দেওয়া হল ! এসব হল সেদিনকার সন্ত্রাস ! তারপর আরম্ভ হল আসল সন্ত্রাস ! আমাদের পাড়ায় যেসব মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা থাকত – সব রাতারাতি কেমন অদৃশ্য হয়ে গেল । নানান জায়গা থেকে খবর আসতে লাগল – মাথায় পাগড়ি দেখলেই – তাদের মারধোর করা হচ্ছে । বেশ কিছু পাঞ্জাবি মানুষদের মারধোর করা হয়েছে । এমন কি গ্যাস স্টেশানে তেল ভরছে পাঞ্জাবি – তাকে স্রেফ গুলি করে মারা হল ! আর একদিকে কত হাজার মুসলমান লোকেদের যে থানায় নিয়ে আটকে রাখা হল – তার ইয়ত্তা নেই ! – তখন তো বিচার টিচার নেই । কোনক্রমে গুয়েনথামো বে তে নিয়ে তুলতে পারলেই হল ! ব্যস ! নাইন ইলেভেন – একটা দিন ছিল - সন্ত্রাশবাদীদের ! ওই একদিনই আমেরিকার সব মানুষ হতভম্ব হয়েছিল ! – তারপর – সারা বিশ্ব সাক্ষী আছে – সন্ত্রাস কার নাম ! সে কথা আর এখানে লিখে কি হবে ! মনোজ

1141

1

শিবাংশু

কালচক্রের কথোপকথন

কম্পুতে বসে বৈষয়িক কাজ করছিলুম। ব্রাহ্মণী তাঁর ফোনটি হাতে নিয়ে এলেন। -নাও, তোমার ছোটো মেয়ে কথা বলবে... ফোনটি নিই তাঁর হাত থেকে, -হ্যাঁ বাবা, বল... -বাবা, কাল তোমার কাছে দু'তিন ঘন্টা ফুরসত আছে? -কেন বলতো? -না, একটা কাজ আছে... -বল, কী কাজ? -না, মানে তোমার ফেভারিট দু'জন মিলে একটা মুভি বানিয়েছে... -কে? -ক্লিন্ট ইস্টউড আর টম হ্যাংকস... -হমম, সালি... -তুমি দেখেছো? -নাহ, রিভিউটা পড়েছি... -কাল দেখে এসো... -দেখি... -না, 'দেখি' না... কাল তুমি আর মা গিয়ে দেখে এসো...আমি টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিচ্ছি... টম হ্যাংকস তো মায়ের সব থেকে ফেভারিট... -আরে সেতো আমারও... কিন্তু সেই দিল্লি থেকে টিকিট কেন কাটতে যাবি? কোথায় দেখাচ্ছে? -সাউথ সিটি, আইনক্সে... -ওরে বাবা, সে তো মিনিমাম দুশো টাকার টিকিট... -দ্যাখো, আমি দিল্লিতে আর দিদি হায়দরাবাদে চারশো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেখেছি... -বেশ করেছিস... তোরা বড়োলোকের বেটি... আমি মাস্টারের ছেলে... -আমি জানি এসব কথাই বলবে তুমি... দিদি বলছে, টম হ্যাংকসের ক্যাপ্টেন ফিলিপ বেটার লেগেছিলো... তুমি দেখে বলো... -দ্যাখ টম হ্যাংকসের সব ডিভিডি তো বাড়িতে আছে... আমারও তো গ্রেট ফেভারিট.. কিন্তু তা বলে দুশো টাকা দিয়ে ফিলিমের টিকিট...? একটা জরুরি বই হয়ে যাবে ঐ পয়সায়... -এটা আমি দেবো...তুমি নিজের পয়সায় কখনও আইনক্সের টিকিট কাটবে না, তা আমি জানি। কিছু বললেই চাইবাসার যশোদা টকিজে আড়াই টাকার টিকিটের গপ্পো শুরু করে দেবে... -ঠিকই বলেছিস, সে সব এখন স্বপ্ন... মুকদ্দর কা সিকন্দর থেকে মিস্টার নটবরলাল... সব তো স্বপ্ন... ঠিক আছে, তোর মা আর কাকীর জন্য কেটে দে... -নাহ, তুমিও যাবে... -ওফ, ভাত খেয়ে ঐ অন্ধকারে এসিতে, বসলেই আমার ঘুম পেয়ে যায়... -সালি দেখলে তুমি কিছুতেই ঘুমোতে পারবে না... -কী যে করিস না, এতোগুলো টাকা.... -আই ক্যান অ্যাফর্ড দ্যাট নাউ... -হুমম, ধন্য করেছিস...তোর মা'কে বল... -মা তো অলরেডি সাজাগোজা শুরু করে দিয়েছে... আমি মায়ের মোবাইলে টিকিট এসেমেস করে দিচ্ছি... -যা পারিস কর... -টা টা বাবা... খরচা করে আমার প্রথম আইনক্সযাত্রা আজ। মেয়ের দৌলতে। কালচক্র এভাবেই ঘোরে....

899

13

ঝড়

কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য (নো বালখিল্য প্লীজ)

একটু আলাদা কিছু লিখতে চাই| ডার্ক লিটারেচারের মত কিছু| অনেক কষ্টে সাহস করে ওঠা গেছে‚ এবার লেখা নামানোর পালা| দেখা যাক জনতা কেমন খায়|

26941

19

Subarna

অণুগল্প

প্রতিদান ===== মিস অ্যান্ডারসন লেকচার শেষ করে সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে, "আরনোভ"কে কাছে ডাকলেন। সদ্য ডিগ্রী পাওয়া লিজ, অ্যারন, জোসেফরা উইশ করে গেল পাশ দিয়ে যেতে যেতে। অর্ণব মাথা নাড়ালো। গ্যালারি ঘরটা শান্ত হয়ে গেলে সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নেমে গেল যেখানে মা'র মতো একজন হাসিমুখে বিদায় জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে। এক একটা সিঁড়ি, এক এক ছায়াছবির মতো পেরিয়ে যাচ্ছে। এক সিঁড়িতে হাতে বাজারের থলি নিয়ে সাবেককালের বটগাছ, তাঁর প্রভিডেন্ড ফান্ড দিয়ে ছেলের প্লেনের টিকিট কেটে হাসতে হাসতে একইগোত্রের বন্ধুর সাথে গল্প করছে, - আমাদের সময় এইসব বিদেশী স্কলারশিপটিপ এতো কোথায় ছিল, বলুন বরুণবাবু! - তোমার ছেলে তোমার মুখ রাখবে হে অজিত, দেখে নিও। বটগাছ রোদ বাঁচাতে কপালে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল, না ভাগ্য দেখালো বোঝা গেল না। এক সিঁড়িতে মিস অ্যান্ডারসনের মতো মায়াময়ী এক মহিলা, সদাব্যস্ত। ঘামে কপালের গোল লাল টিপ ধেবড়ে যায়, তার হাতের দুগাছি চুড়িতে রিনরিন হলে উইন্ডচাইমের মতো টুংটাং করে কানে বাজে। আর কখনো কখনো রাতের বেলা সবার শেষে খেতে বসে "খিদে নেই" বলে সংসারের ফুটোচাল ঢাকতে জুড়ি নেই মহিলার। হাত বাড়িয়েছেন মিস অ্যান্ডারসন। অর্ণবের এখনো তিন সিঁড়ি বাকি। রূপক, অটো নিয়ে স্কুল, কোচিং, ডাক্তার, খেলার মাঠ - যেখানে হোক বললেই হাজির। হাত উল্টে কাঁধ ঝাঁকাত পয়সার কথা বললে। মুখে এক কথা, 'দোস্ত'। রূপকের মেয়েটার ইংলিশ মিডিয়মে পড়ার শখ, ততদিন রূপক অটো চালাবে ফুল স্পিডে, জামার বোতাম খুলে হাওয়া খেলাবে গায়, পিছনের সীটে তিনটে স্মার্ট ইংরেজি-বলা মেয়েদের পৌঁছে দেবে কনভেন্ট স্কুলে। শেষ দুই ধাপে বসে মঞ্জিরি। দুহাতের আঙ্গুলের ওপর থুতনি চেপে দূরে হারিয়ে যাওয়া মঞ্জিরি, একদিন বলেছিল, - তুমি আর আসবে না, অর্নবদা? - তুই কি পাগল? - ওরকম সবাই বলে, কেউ ফিরে আসে না। - না রে, ফিরে আসতে জানতে হয়। সেই চিচিং ফাঁকের মতো। - চার বছর অনেক সময়! - যদি দম আটকে আসে তোর জন্য খোলা হাওয়া, মন! - অর্নবদা! দশ তারিখের টিকিট অর্নবের। ঠিক সাতদিন আগে ফিরবে। সাতদিন অনেক সময়। মঞ্জিরি হেসেছিল। খোলা হাসি। বিয়েটা তবে গলার দড়ি হবে না। লুকিয়ে ম্যানেজ করেছে রূপকের সাথে, এয়ারপোর্টে যাবে। আর মাত্র কয়েকটা দিন, কয়েকটা ঘন্টা। মিস অ্যান্ডারসন হাত ঝাঁকিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন অর্নবকে। - অ্যাম সো প্রাউড অফ ইয়ু আরনোভ! গো অ্যান্ড উইন এভিরিথিং মাই বয়! নাউ, ইটস ইয়োর টার্ণ! মাথা নাড়ল অর্ণব। "হ্যাঁ, এবার আমার পালা।"

1316

52

শিবাংশু

.. যেন হেঁটে যেতে পারি.....

আজ একুশ বছর হলো। এ রকমই একটা বৃষ্টিকাতর নিভু নিভু আলোর ভোরবেলা বাবা ঘুমের মধ্যেই আরো বড়ো কোনও ঘুমের চরাচরে নিঃশব্দে ফিরে গিয়েছিলেন। যাবার বেলায় কোনো পিছুডাক শুনতে পেয়েছিলেন কি না, কেউ জানেনা। কোনও ভরসা তো নিশ্চয় ছিলো, নয়তো পারের খেয়ায় এমন নিশ্চিন্তে ভেসে যাওয়া !! এমনি আসেনা। ----------------- এতোদূর পর্যন্ত তো ঠিক আছে। গতবছর এই দিনে লিখে ফেলা আমার কয়েকটা লাইন, নেটের দৌলতে এখানে ওখানে কেউ কেউ পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ হয়তো আমাদের অনুভূতির সঙ্গে মিশেও যেতে পেরেছিলেন নিজস্ব সততায়। সবাইকে হয়তো আমি ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনি না। তবু তাঁরা আছেন, এটুকু বুঝতে পারি। ------------------------ কিছুদিন আগে আমার গ্রামে গিয়েছিলুম একটু সামাজিক অনুষ্ঠানে। সেখানে একজন প্রবীণ অগ্রজ, আধোচেনা, এসে আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। বললেন, তোমার লেখা আমি যখনই পাই, পড়ি। এর তো কোনও উত্তর হয়না। আমি সস্মিত কৃতজ্ঞতা জানাই। তার পর তিনি বলেন, জানো, সত্যেনদাকে নিয়ে তোমার লেখাটা পড়ে আমি দু'তিনদিন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। একটু বিস্মিত হই। কেন? তিনি আবার বলেন, আমি যে সত্যেনদাকে এতোটা শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম, সেটা তিনি কেন, আমিও জানতাম না। তোমার লেখাটা পড়ে সেটা আবার জানতে পারলাম। আমি শুধু বলি, ভালো থাকবেন, খুব ভালো থাকবেন। ---------------------------- তাঁর সঙ্গে আমার কোনও ব্যক্তিগত পরিচিতি বা যোগাযোগ ছিলোনা। তিনি কেমন আছেন তার খবরও ছিলোনা আমার কাছে। কয়েকদিন আগে একজন জামশেদপুরের বন্ধু অকস্মাৎ মৃত্যুর উদাহরণ দিতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর নাম করলেন। আমি স্তম্ভিত। তিনি কি আর 'নেই'? জানতে পারি কোনও এক অজ্ঞাত জ্বরে তিনি হঠাৎই ফিরে গেছেন ঘুমের দেশে। এভাবে তো যাবার কথা ছিলোনা তাঁর। অন্ততঃ আমার তো সেরকমই মনে হয়েছিলো। ---------------------- আমার পুরোনো, অকিঞ্চিৎকর লেখাটা তো কাউকে উৎসর্গ করিনি। কিন্তু আজ মনে হলো তাঁকে করি। কারণ তো নেই, কারণ তো, নেই......

924

7

দীপঙ্কর বসু

আমার বাউন্ডুলেপনার গপ্পো

অন্তর্জাল সূত্রে আলাপ হয়েছিল ভ্রাতৃপ্রতিম দিলীপ মিত্রর সঙ্গে । তার পর সে আলাপ পরিণত হয় বন্ধুত্বে । বছর পাঁচেক আগে একদিন দিলীপের আমন্ত্রণ এলো চন্দননগরে তার বাসভবনে একটা দিন কাটিয়ে আসার । হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল লোকাল এ বোধহয় সোয়া ঘন্টা মত সময় লেগেছিল ৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফরাসডাঙ্গায় – যার বর্তমান নাম চন্দননগর ।স্টেশনে হাজির ছিল দিলীপ – আমি ট্রেন থেকে নামতেই এগিয়ে এসে হাতে একটা রক্তগোলাপের কুঁড়ি তুলে দিয়ে রীতিমত ফরাসী কায়দায় আমাকে স্বাগত জানাল । স্টেশন থেকে আমাকে নিয়ে গেল তার ছোট্ট দুকামরার ফ্ল্যাটে ।আলাপ হল মিত্রজায়া এবং ওদের একমাত্র কন্যার সঙ্গে । অতঃপর হাল্কা জলযোগ সেরে দুজনে বেরলাম নগর পরিক্রমায় । চলে এলাম হুগলী নদীর তীরে । চন্দননগর এর অধিকাংশ দ্রষ্টব্যই এখানে । দূর থেকেই নজরে এলো নদীর তীর বরাবর ভুকৈলাসের রাণীর বদান্যতায় তৈরি বড়বড় গাছের ছায়ায় ঢাকা দীর্ঘ পাথর বাঁধান স্ট্র্যান্ড । স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের সকাল সন্ধ্যে হাওয়া খাওয়ার এবং তরুণতরুণীদের দুই দণ্ড কাছে বসিবার পক্ষে একেবারে আদর্শ স্থান । একটি সুন্দর ভাবে সাজান ঘাটও রয়েছে সে স্ট্র্যান্ডের মাঝ বরাবর । ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে রাস্তার অপর পারে সার দিয়ে সাবেক কালের ঐতিহ্য মণ্ডিত বাড়িগুলি । মুঘল বাদশা ঔরংজেবের সনদ পেয়ে ১৬৮৮ খৃষ্টাব্দে মঁসিয় দেলান্দ খলসানি বোড়ো এবং গোলন্দপাড়া এই তিনটি গ্রাম কিনে হুগলী নদীর কিনারে পত্তন করেন চন্দেরনগর । সম্ভবত নদীর বাঁকা চাঁদের মত বাঁক এর কিনারে অবস্থিত বলেই নগরের নাম হয়েছিল চন্দেরনগর । ঘাটে দাঁড়িয়ে সোজা তাকালেই নজরে পড়ে ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে স্থাপিত গথিক শৈলীতে তৈরি Sacred heart Roman Catholic Churc তার বামদিকে ১৭২০ খৃষ্টাব্দে স্থাপিত সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট আবার তার ঠিক উল্টো দিকে একেবারে নদীর কোল ঘেঁষে রয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর রবীন্দ্রনাথে স্মৃতি বিজড়িত “মোরাণ সায়েবের বাগানবাড়ি – যা এখন পাতাল ঘর নামে পরিচীত । ডানদিকে তাকালে দেখা যায় জেল ,রবীন্দ্রভবন ,শ্রী অরবিন্দর নামাঙ্কিত স্কুল , ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট মেরিজ ,যা পরবর্তী কালে নাম পালটে হয়েছিল দ্যুপ্লে কলেজ আর স্বাধীনতা র উত্তরকালে তারি নাম হয়েছে চন্দননগর কলেজ (১৯৪৮ এর ১৭ই মে) পাশেই আছে “ইন্সতিতিউত দে চন্দেরনগর মিউজিয়াম” দুর্ভাগ্য আমার দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার – মিউজিয়াম বন্ধ থাকার দিন । তাই ভিতরে আর যাওয়া হয়ে উঠলনা । বদলে রিক্সায় চেপে গেলাম দিলীপের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের জন্যে । পথেই পড়ল ১৭৪০ খৃষ্টাব্দে তৈরি বাংলার একচালা নন্দদুলাল মন্দির । এই প্রাচীন মন্দিরের বিগ্রহটি কিন্তু একেবারেই হাল আমলের । জনৈক প্রয়াত শঙ্কর সেবক বড়ালের স্মৃতিরক্ষার্থে শ্রীমতী দুর্গারাণী বড়াল ও তার পুত্রকন্যাদের দান করা বংশীধারী নন্দদুলালের মূর্তিটির প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৪১২ সনের ১০ই ভাদ্র তারিখে জন্মাষ্টমীর দিন । এ মন্দিরের আদি বিগ্রহটির বিষয়ে কেউই কিছু জানাতে পারলনা । মধ্যাহ্ণভোজনের জন্য বন্ধুর ফ্ল্যাটে ফেরৎ যাবার পথে পড়ল চমৎকার একটি ইউরোপিয়ায়ন স্টাইলের বাড়ি । বাড়ির মাথায় লেখা নিত্যগোপাল স্মৃতিমন্দির – চন্দননগরের পাঠাগার । <

2315

37

dalia mukherjee

আমার হল্যান্ডে আসার পরের কয়েকদিন

সান্তাক্লাসের পরে আসে ক্রিস্টমাস, এটাও এখানের একটা বড় পরব। আমাদের দেশে এত বড় বড়দিনের পরব আমি আগে কখনো দেখিনি। বাবার একজন বন্ধু ছিলেন, তাঁকে আমরা সবাই পাত্র সাহেব বলে ডাকতুম। তিনি ছিলেন বাঙ্গালী ক্রিশ্চান। প্রতি বছর ২৫ শে ডিসেম্বর তাঁর বাড়িতে বাবার সঙ্গে আমি আর আমার ছোট ভাই যেতুম। তাঁর বাড়িতেই দেখেছি, বসার ঘর বেশ সাজানো হোত, টেবিলে রাখা থাকত কেক, ঠান্ডা পানীয়, নানা ধরনের নোনতা খাবার দাবার। পাত্র সাহেব আমাদের বলতেন, " নাও, খাও"। কেকটা বেশ লাগত মুখে। সেই বচ্ছরকার একটি দিনেই তো কেক জুটত। সেই যুগে কার আর কত পয়সা ছিল যে কেক কিনে খাবে? তাই সারা বছর এই দিনটির জন্যে বসে থাকতুম। এখানে এসে দেখলুম অন্যভাবে ক্রিস্টমাসকে, পুরোণ , নতুন বছরকে। পুরোণো বছরে মায়েরা রান্নাঘরে নানারকমের ভাল মন্দ রান্নায় ব্যস্ত, বাবারাও সাহায্য করছেন। দোকানে বাজির অর্ডার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বিকেল পাঁচটার আগে সে বাজি তো দেবেনা। সব বাড়িতেই আগের বছরের কিছু বাজি জমিয়ে রেখেছে। সেইগুলোই সব ফুটফাট ফাটাচ্ছে। আর পুলিশের গাড়ি দেখলেই ছুটে বাড়ির ভেতরে চলে যাচ্ছে। কেননা পুলিশের বারণ, সন্ধ্যের আগে কেউ বাজি পোড়াতে পারবেনা। তবে পুলিশদের ও তো ছেলেপুলে আছে! তারা ওই চক্কর দিয়েই খালাস। বেশ মজা লাগত ফ্ল্যাটের বারান্দা দিয়ে দেখতে। চারিদিক বরফে সাদা হয়ে আছে, ছুটতে গিয়ে বাচ্ছারা পড়ছে বরফের ওপরেই। ঘরে ঘরে ক্রিস্তমাস ট্রি , আলো দিয়ে সাজানো। বাইরে থেকে দেখা যায়। জোস্ত আমাদের বলেছিল," ৩১ শে ডিসেম্বর তোমরা আমাদের বাড়িতে খাবে, আর সন্ধ্যেবেলাটা আমাদের সঙ্গে কাটাবে। আমি এসে তোমাদের নিয়ে যাব। " তা সেইমত জোস্ত বেলা ৪ টের সময় আমাদের এসে নিয়ে গেল ওর ফ্ল্যাটে। ওরা থাকত পাশের Enscede বলে একটা সহরে। ছোট্ট ৩ কামরার ফ্ল্যাট। ওর বউ বেটি অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। ওদের তখন একটি ৮ মাসের ছেলে, সে বসার ঘরে তার একটা ছোট্ট চেয়ারে শুয়ে খেলছে। বেটি বলল," আজ একটু আগে খেয়ে নেব, সন্ধ্যেবেলা টিভি প্রোগ্রাম দেখতে হবে।" সেইমত বিকেল সাড়েপাঁচটায় টেবিল রেডি করে খেতে বসা হোল। বেটি রেঁধেছিল, আস্ত একটা মুর্গি ওভেনে দিয়ে, আলুভাজা, আর কিছু তরকারী সেদ্ধ। শেষ্পাতে পুডিং। ক্ষিদেও পেয়েছিল, খেয়েওছি। তারপরে বেটি আর আমি রান্নাঘর গোছাতে গেলুম। সব হয়ে গেলে আমরা এসে বসলুম বসার ঘরে। জোস্ত ছিল একটু পাগলাটে ধরণের ছেলে। বসার ঘরে একটা পিয়ানো রাখা, লোক আসুক, তাতে তার কিছু যায় আসেনা। সে তার পিয়ানো বাজানোয় ব্যস্ত। তা সে যথারীতি পিয়ানোর পেছনে বসে গেল। বেটি ছেলেকে খাইয়ে, শুইয়ে, নিজে এসে টিভির সামনে বসল। নানান প্রোগ্রাম হচ্ছে, সবাই দেখছে টিভি, তার ভেতরে চলছে জোস্তের পিয়ানো। আমি দেখছি, কিন্তু বুঝছিনা কিছুই। ওঃ, কান তো ঝালাপালা। একদিনে জোস্তের পিয়ানো, ওদিকে টিভির আওয়াজ। বেটি এর মধ্যে উঠে কফি করে আনল, সঙ্গে কিছু কেক। খাচ্ছি, আর টিভি দেখছি। হঠাৎ কর্তা চেঁচিয়ে উঠলেন," "জোস্ত আমাদের বাড়ি পৌছে দাও।" জোস্ত তো অবাক, " কেন? এক্ষুনি বাড়ি যাবে কেন?" কর্তা বললেন," হয় তুমি পিয়ানো থামাও , নয় আমাদের বাড়ি পৌঁছে দাও।" তারপরে আর সারাসন্ধ্যে জোস্ত পিয়ানোতে বসেনি। বেটির দিকে তাকিয়ে বলল," জান, ওর বাবা দুটো আঙ্গুলে পিয়ানো বাজায়। " বেটির মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল, কিন্তু কিছু বললনা অশান্তির ভয়ে। জোস্তের এই স্বভাবের জন্যে বেটির সঙ্গে বোনতনা। পরে ওদের ডিভোর্স হয়ে যায়। বেটির সঙ্গে পরে দু একবার দেখা হয়েছে। সে আবার বিয়ে করেছে, ওর নিজের দুটো ছেলে, আর নতুন স্বামীর তিনটে ছেলে, এই পাঁচ ছেলে ও স্বামী নিয়ে বেশ ভালই আছে। আর জোস্তের খবর কিছু জানিনা। বেটিকে ডিভোর্স করার পরে আমার কর্তার সঙ্গে তার আর কোন সম্পর্ক ছিলনা। সময় এগিয়ে চলল, বাইরে তখন সুরু হয়েছে বাজি পোড়ানো। বসার ঘর থেকেও বেশ দেখা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। খুব সুন্দর লাগছে বাজি পোড়ানো দেখতে। রাত ১২ টা বাজল, টিভিতে সুরু হোল বাজির লড়াই। আমরা সকলে সকলকে শুভেচ্ছা , নতুন বছরের অভিনন্দন জানালুম। রাত তখন দেড়টা, জোস্ত আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল। ঘুমে আমার চোখ তখন ফেটে যাচ্ছে। তবু প্রথম নতুন , পুরোণো বছর জোস্ত বেটির সঙ্গে যে আনন্দ করেছি, তা আজ ও ভুলতে পারিনা। আর বাজি পোড়ানো দেখে মনে পড়ছি, জামশেদপুরে ৩রা মার্চে টাটাজীর জন্মদিনে ওইরকম বাজি পোড়ানো হোত, আমাদের বাড়ির বারান্দা থেকে সুন্দর দেখা যেত। পরের দিন সকালে উঠে এবাড়ি, যাওয়া। সকলকে তো নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে হবে? প্রথমেই মুদার, মানে কর্তার ল্যান্ডলেডির বাড়ি, সেখানের ওনার ছেলে র পরিবার বসে ছিলেন। কাজেই তাঁদের ওখানেই শুভেচ্ছা জানানো হয়ে গেল। এইভাবে কাটল আমার এদেশে প্রথম নতুন বছরের উৎসব। পড়ল ১৯৭০ সাল। আর একটা বছর। এইভাবে কাটিয়ে দিয়েছি ৪৭ বছরের ও বেশী এদেশে। আরো কত বছর কাটবে জানিনা। আমার কথাটি ফুরোল, এই ৪৭ বছরে কত কিছুই ঘটে গেছে, সব কি আর লেখা যায়?

1755

119

Somen dey

একেলা কোন্‌ পথিক তুমি

একেলা কোন্‌ পথিক তুমি পথিকহীন পথের 'পরে ......। *********************** একবার এক ভদ্রমহিলা এসেছেন জর্জদাকে গান শোনাতে । তিনি এক প্রভাবশালী এই এ এস অফিসারের কন্যা । বিখ্যাত কারুর কাছে গান শেখেন অনেকদিন ধরে। পরেরদিন তিনি আকাশবাণী কলকাতাতে গাইবেন । তার আগে তিনি একবার জর্জদাকে শুনিয়ে নিতে এসেছেন । যদি ছোটো খাটো কিছু বদল দরকার হয় । জর্জদা অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মত করেই রাজী হলেন । তিনি মন প্রাণ উজাড় করে গাইতে লাগলেন গান । প্রেম এসেছিল , নিঃশব্দ চরণে ...... । জর্জদা শুনছেন । শুনতে তিনি পানের ডিবা থেকে পান বার করে চুন মাখাচ্ছেন , খয়ের মাখাচ্ছেন । যেটা ছিল ওঁর কোনো কিছু অপছন্দ করার একটি সংকেত । গান শেষ হল । গায়িকা জর্জদার কাছ থেকে একটি প্রশংসা বাক্য শুনবেন আশা করে তাকালেন । জর্জদা খানিকক্ষন চুপ করে থেকে তাঁর সেই মেঘমন্দ্র স্বরে বলে উঠলেন – কে আইসিল ? আইসিল কেডা ? প্রেম আইসিল ? নাকি পুলিশ আইসিল খট খট কইরা ? অত জোরে কি প্রেম আসে ? আপনারে তো রবি ঠাকুর কইয়া দিসে ‘নিঃশব্দ চরণে’ , কইয়া দিসে – সে তখন স্বপ্ন কায়াবিহীন – তারে টাচ করা যায় না। এ সব তো বুঝাইয়া দিসে আপনারে – তবু আপনার সেডা খেয়াল নাই ।এতো জোরে জোরে কি প্রেম করেন আপনি ? ঠিক আছে আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন আপনার মত করে, তবে সেটা গান হইয়া উঠবে না  । *** রবীন্দ্রসঙ্গীতকেও কিন্তু গান হয়ে উঠতে হবে পরিবেষণের গুনে ।এমন কথা বলার মত সাহস আর কারই বা ছিল ।প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি গান হয়ে ওঠার সব ব্যাবস্থা রবীন্দ্রনাথ করে যান নি তাঁর স্বরলিপি মধ্যে দিয়ে ? একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুই জনে ।এই মিলাবার দায়িত্বটা অনেকটাই কন্ঠশিল্পীর । তার জন্যে জর্জদার কথাতেই ইমোশন এবং ইনটালেক্ট দুটোকেই ধরে ফেলতে হবে । রবীন্দ্রনাথ যত শক্তিশালীই হন , গায়ক যতই শুদ্ধতা বজায় রাখুন, গান হয়ে ওঠানোর গুরু দায়িত্ব থেকে কিন্তু গায়ক কিন্তু নিষ্কৃতি পেতে পারেন না। স্বরলিপির সঙ্গে সুরলিপির কথা মনে রাখতে হবে । ছাত্রদের কাছে একটা কথা বলতেন জর্জদা – রবীন্দ্রনাথ তো স্বরলিপি করেন নাই । করসেন অন্যলোকে । হয়তো সেটা করসেন গান যখন রবীন্দ্রনাথের মনে আইসিল তার দু দিন পরে । সেখানে যে একটুও বিচ্যুতি হয় নাই এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না ।তার মানে অবশ্য এটা কখনোই নয় যে স্বরলিপি আমরা সন্দেহের চোখে দেখবো । এক জায়গায় জর্জদা বলেছেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর কাছে গান যখন শিখতেন তিনি নাকি অনেক গান স্বরলিপি থেকে একটু বদলে দিয়ে বলতেন দেখোতো কেমন লাগছে । জর্জদা বলতেন রবীন্দ্রনাথের গানে তো অনেক রকমের টান আছে – নাড়ীতে মোর রক্তধারায় লেগেছে তার টান , আবার- যায় নিয়ে যায় আমায় নিয়ে যায় পথের পানের টানে , আবার - রবির কিরণ নেয় যে টানি ভোরের বুকের শিশির খানি ,আমি কোথা যাবো কাহারে শুধাবো নিয়ে যায় সবে টানিয়া ... এই যে এত রকমের টান আসে কোন টানটা বাইর হইতে আর কোন টানটা ভিতর হইতে আসবে তা যদি আপনি গানে বোঝাইতে না পারেন তাইলে আর কি হবে, যখন আপনি ফিল করতে পারবেন তখনই তো চার রকমের টান চার রকম ভাবে কইতে পারবেন । আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার – এই গানে তিনি সুদুর কইসেন গহন কইসেন আবার গভীর কইসেন – তিনটাই তো ডাইমেনশন অফ ডিস্টান্স । এই তিনটাকে তো গানের মধ্য দিয়াই আপনাকে ডিমারকেট করতে হইব । এই ছিল তাঁর রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার পিছনে তাঁর ভাবনার বিন্যাস।তাঁর ভাবনার সঙ্গে সকলকে একমত হতে হবে এমনটা তিনি জোর খাটাতেন না ।কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে ভাবনাটা জরুরী , এটা বোঝাতেন তাঁর ছাত্র ছাত্রীদের । কিন্তু এই ভাবতে শেখাটা কি কোনো গান শেখার স্কুলে শেখানো হয় আজকাল ? যেখান থেকে শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী রবীন্দ্রনাথের গানের ডিপ্লোমা নিয়ে বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ছেন দেশে বিদেশে সেখানে কি চিনিয়ে দেওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের গানের মর্মে পৌঁছাবার রাস্তা গুলো ? বোধহয় না । তাই চারিদিকে শোনা যায় এত যান্ত্রিক গান । বাঙালি স্বভাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী । তাই বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের লড়াইয়ের গল্পটা বাঙালির বড় প্রিয় । জর্জদাকে এই শহীদের মর্যাদা দিয়ে হয়তো তাঁর রেকর্ডের বিক্রীর সংখ্যা আমরা বাড়াতে পেরেছি কিছুটা ।কেমন যেন মনে হয় এই কাণ্ডটি না ঘটলে তিনি বোধহয় বাঙ্গালির এতটা কাছের মানুষ হতেন না তিনি । তিনি কিন্তু চাইতেন না এই ব্যাপারটাকে এতটা ড্রামাটাইজ করতে ।তাঁর চাওয়া এই টুকুই ছিল- তিনি এবং রবীন্দ্রনাথ , এই দুইয়ের মাঝে কারো মাথা গলানোর প্রয়োজন নেই । কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের এক একটি শব্দ , এক একটি শব্দবন্ধ , এক একটি পংক্তির মধ্যে তিনি আলোকরেখা খুঁজে গেছেন সারা জীবন ধরে ।এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন একক এবং একেলা  । এখনো তিনি সেই একাই । বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা । *** আজ সকালে উঠেই দেখি চারিদিক অন্ধকার । দুনিয়ার সব মেঘ যেন আকাশটাকে ব্রিগেডের মাঠ মনে করে জমা হয়েছে ।বিষন্নতার বৃষ্টিতে আবছা গাছপালা এলোমেলো হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে । মন খারাপের আদর্শ দিন । একটা লাইন কোথা থেকে যেন উঠে এলো – প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি / বাতাস বৃথা যেচেছে ডাকি ......। মনে একটা প্রশ্ন জাগলো -এ গান কার ? রবীন্দ্রনাথের নাকি দেবব্রত বিশ্বাসের ? (দেবব্রত বিশ্বাসের উক্তি গুলি শ্রী অরুণ গঙ্গোপাধ্যায় , যিনি দেবব্রত বিশ্বাসের সরাসরি শিষ্যদের একজন , তাঁর ২০১২ সালে রেডিও তে দেওয়া একটি সাক্ষাতকার থেকে শোনা ) https://www.youtube.com/watch?v=2KSEMHcrTlU

995

5

শিবাংশু

সমুদ্র : সজনে, নির্জনে

সে কী আজকের কথা? অন্ধ্র আর ওড়িশার তটরেখা যেখানে মিলেছে, সেখানে ছিলো প্রাচীন বন্দর। সেখান থেকে বর্মা আর ইন্দোনেসিয়ার দিকে জাহাজ চলতো। বিরাট ব্যবসাপাতি ছিলো এখানে সেদিন। তার পর পাল্টে গেলো দিন। গোপালপুর আবার হয়ে গেলো একটা নির্জন ধীবরদের গ্রাম। টানা বালুবেলা আর নীল সমুদ্রের ওঠাপড়া, দেখার লোক নেই। প্রায় দু'শো বছর আগে আবার সাহেবদের নজর পড়লো জায়গাটা। বর্মার সঙ্গে জাহাজ যোগাযোগ আবার শুরু হলো। সোজা গোপালপুর থেকে রঙ্গুন। গোপালপুরের সুদিন ফিরে এলো আবার। প্রচুর সাহেবসুবো আর তার সঙ্গে বাঙালি বড়োলোকেরা এসে বসতি করলো এখানে। বিরাট চালের গুদাম তৈরি হলো। ব্যস্ত বন্দর তখন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাততাড়ি গোটাবার পর গোপালপুর আবার পুনর্মূষিকোভব। তবে ততোদিনে এখানকার সমুদ্রতটের তটের খ্যাতি মোটামুটি ছড়িয়ে পড়েছে। পর্যটকেরা আসেন। যদিও সারাবছর ভিড়ভাড় থাকেনা। ছুটিছাটায় অনেক লোকজন । জানিনা কেন, তবে শুনেছি লোকে নাকি বলে জায়গাটার একটা রোমান্টিক মায়া আছে। হয়তো এই নির্জন সৈকতে কারো হাত ধরে নিঃশব্দ বহুদূর হেঁটে যাওয়া যায়। অনজানোঁ কে তরহ, বেগানোঁ কে তরহ..... ------------------------- গোপালপুরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তপন সিংহের ক্যামেরা থেকে। 'আদালত ও একটি মেয়ে' মনে আছে। গত বছর পাঁচেক আমি কতোবার এখানে এসেছি, ইয়ত্তা নেই। ভুবনেশ্বর থেকে চওড়া রাজপথ এগিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণে। আমার বাড়ি থেকে ঠিক একশো পঁয়ষট্টি কিমি। গাড়ি চালানোর এমন সুখ আমাদের দেশে খুব বেশি পাওয়া যায়না। সোয়া দু'ঘন্টার মধ্যেই ছত্রপুর থেকে এগিয়ে বাঁদিকে ঘুরে যাওয়া। ভাসাভাসি নোনা হাওয়ায় কাজু আর কেওড়ার বন রাস্তার দু'ধারে মাথা নেড়ে ডাকে। রাতের সমুদ্র, ভোরের সমুদ্র, অন্তহীন আকাশ, নৌকোর সারি, মাছধরা ট্রলার, দূরে কোস্টগার্ডদের শাদা জাহাজ, রাতের বেলা টিমটিম আলো দেখা যায় তাদের। আর গোপালপুরের বিখ্যাত বাতিঘর আর মেফেয়ার হোটেল। এদের টান ছাড়ানো যায়না। ছবিগুলো কিছুটা আভাস দেবে হয়তো.....বাকিটা নিজের চোখে....

1094

9

মনোজ ভট্টাচার্য

পাখিদের গান হলে সমাপন ! দিনাবসানে ফেরে তারা কোন ঠিকানায় !

‘দাঁড়াও পথিকবর - - জন্ম যদি তব বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল - - !’ দেখেই ওনার ঘরে ঢুকে পড়লাম । বিছানার ওপরেই দেওয়ালে টাঙানো মাইকেল মধুসুদন দত্তের ছবি । একটু বড় করে ওই বাণী লিখে সেঁটে দেওয়া হয়েছে ছবির নীচে ! কোন এক বৃদ্ধাবাসের দোতলায় হারান বাবুর ঘরে বসে তাঁর কথা শুনছিলাম ! শীর্ণকায় চেহারা । কিন্তু বেশ উচ্ছ্বাস প্রবণতা আছে ! ওনারই বিছানায় বসিয়ে শোনাতে লাগলেন ! পাশে আরও এক বোর্ডারের বিছানা – কিন্তু ওটা খালি - উনি পুরো ঘরটাই নিয়েছেন ! ওনার বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। উনিও কংগ্রেসি রাজনীতি করতেন । কিন্তু সেই দল ভাঙ্গিয়ে অনেকের মত গুছিয়ে নিতে পারেন নি ! না কোনও দপ্তরের মন্ত্রী, না কোনও উচ্চপদস্থ সচিব ! সারা জীবন মামুলি চাকরি-বাকরি খেলাধুলো আর আবৃতি করেই কাটিয়ে দিলেন । বিয়ে করার কথা মনেও আনেন নি ! দাদা -বৌদির প্রশ্রয়ের ছায়ায় ভাইপোকে নিয়েই কেটে গেল । তাকে ইস্কুলে, ক্লাবে বা এখানে ওখানে নিয়ে যাওয়া আসা – অর্থাৎ তাকে গড়ে পিঠে মানুষ করতেই সূর্যাস্ত । ভাইপোর বিয়ে দেওয়া – তাও তো হারানবাবুর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ত ! তারপর একে একে ভাইপোর ছেলে-মেয়ে হল । তারা ’ছোটো দাদু ছোটো দাদু’ বলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত । ক্রমে দাদা ও পরে বৌদি গত হওয়ার পরই সমস্যা আরম্ভ হল !- আধুনিক সন্তান-সচেতন মা-বাবা – ক্রমে অপছন্দ করতে আরম্ভ করলো বাচ্ছাদের নিয়ে হুট হাট করে যেখানে সেখানে নিয়ে যাওয়া । তার পুরনো চাল চলন , বাচ্চাকে পড়ানোর ধরন – কিছুই পছন্দের না ! – পুরনো সব স্বাধীনতাকামী নেতাদের নাম আউরালে কি চলে আজকালকার দিনে ! - ইংরিজি রাইমগুলো কি একেবারেই জানে না এই বুড়ো ! – বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে কি আর এই বাজারে কমপিট করা যায় । ভাইপো যদিও বাংলা স্কুল থেকেই বেরিয়ে কলেজে পড়েছে – চাকরীর বাজারে কমপিট করে সাফল্য পেয়েছে ! – কিন্তু সে সব দিন তো আর নেই কাকু ! ভাইপোর অজুহাত ! আগেই কোন সময়ে দোতলা থেকে একতলায় বৈঠকখানা ঘরে নেমে এসেছিলেন , এখন তো সে ঘরটাও ভাইপোর খুব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠল ! তাছাড়া এই ঘরে সন্ধ্যেবেলায় বুড়োদের আড্ডা বসে ! – বাচ্ছাদের পড়াশুনার অসুবিধে হয় ! ক্রমশ একটা মানসিক চাপ সৃষ্টি হতেও থাকল ! – যতই সংসার বিমুখ হন না কেন – অবহেলা ও অবজ্ঞা ঠিকই বোঝা যায় ! নাতি নাতনিও – এই বুড়োকে এড়িয়ে চলত ! একেবারে ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার আগেই – অনেক খোঁজ খবর করে চলে এলেন – এই বৃদ্ধাশ্রমের ঘরটাতে । ব্যাঙ্কের জমানো শেষ সম্বল দিয়ে এই আশ্রমের সিকিউরিটি দিতে হয়েছে ! এখন বেশ আছেন ! নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গ মনে করেন । এখানে অন্য সব প্রতিবেশীদের নিয়ে গল্প-গুজব, আড্ডা ও লাইব্রেরী চালানো ও মাঝে মাঝে সবাই মিলে রিজার্ভ বাসে করে কোথাও ঘুরতে যাওয়া ! মন্দ কি ! বাড়িতে তো দাদা বৌদি মারা যাবার পর কেউ খবরও নিত না ! এখানে সবাই সবার খোঁজ খবর করে ! কারন এরাই তো পরস্পরের পরম আত্মীয় ! সপ্তাহে একবার ডাক্তার আসে এখানে । চেক আপটাও হয়ে যায়! বড় ধরনের কিছু হলে !এম্বুলেন্স ডেকে এরাই পাঠাবে হাসপাতালে ! সে সব তো এখনও দরকার হয় নি ! বাড়ির কথা মনে পরে না ! – নিশ্চয়ই পড়ে ! কিন্তু কি জানেন – মানুষের আত্মসন্মান বড় আজব বস্তু ! – যখন পরম আত্মীয়দের কাছ থেকে অবহেলা অপমান আসে – তখনই বড় কষ্ট হয় ! এদেরই তো আমি জন্ম থেকে পালন করেছি ! – – আর কিছু না হোক, এখানে যারা আছে – প্রত্যেকেই কিন্তু তাদের একান্ত আপনার সংসার থেকে এসেছে! তাই প্রত্যেকেই প্রত্যেককে বুঝতে পারি ! আপনি যাই বলুন – এখানেই আমরা ভালই আছি - স্বস্তিতে আছি । পাখিদের গান হলে সমাপন – ফেরে তারা কোন ঠিকানায় ! মনোজ

1126

10

মানব

খুচরো গল্পেদের ভিড়ে

শক্তিপদবাবুর মনটা আজ সকাল থেকেই কেমন কেমন করছে। দুমাস হয়ে গেল মেয়েটা চাকরী নিয়ে বাড়ির বাইরে। সারাদিন কি খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে কিচ্ছু জানতে পারা যায়না। শুধু দিনের শেষে নৈশভোজের পরে একবার ফোনে কথা হয়। দু-এক মিনিটের মধ্যে যেটুকু কথা সেরে ফেলা যায় আর কি। মেয়ের মা ভেবে ভেবে শরীর খারাপ বাঁধিয়ে ফেলেছে। তার উপর আবার রয়েছে প্রতিবেশীদের গঞ্জনা। - জানো, নন্তুর মা আজ কিসব উল্টোপাল্টা বলছিল। বলছে নাকি বাইরে গেলে মেয়ে খারাপ হয়ে যায়। ওর মামাতো ভাইয়ের মেয়ে নাকি ব্যাঙ্গালোরে খুব ভাল একটা চাকরী পেয়েছিল, অনেক টাকা মাইনে। কিন্তু ওই জন্যই ওরা মেয়েকে কোথাও পাঠায়নি। বলছিলাম কি, মেয়েটার জন্যে একটা ভাল পাত্র দেখতে শুরু করলে হয়না? রান্নাঘরে হাঁড়িতে ভাত চাপাতে চাপাতে নমিতাদেবী কথাগুলো বলছিলেন তার স্বামী শক্তিপদবাবুকে। শক্তিপদবাবু মনের আনন্দে সবজি কাটছিলেন। এটা তাঁর একধরণের শখও বলা যায়, রান্নার কাজে তিনি স্ত্রীকে যথাসম্ভব সাহায্য করেন। মুখ না তুলেই তিনি বললেন, ‘ধুর, বাদ দাও তো ওদের কথা। যত্তসব উদ্ভট লোকজন। দেখো চাকরী পায়নি তাই যায়নি। মেয়েদেরকে ঘরে বসিয়ে বসিয়ে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে লোকজন। তারপর বিয়ে দিয়ে দিলেই শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব, এই ভেবে তড়িঘড়ি বিয়ে দিতে পারলেই যেন নিশ্চিন্ত। আরে ওর জীবন ওর মত করে নাহয় কদিন কাটাতে দিলে। আর হ্যাঁ। পাত্র দেখার আগে মেয়ের সঙ্গে একবার ভালো করে কথা বলে নিতে হবে যে ও সত্যিই তৈরী কিনা।’ - সে না হয় হল, কিন্তু বাইরে বাইরে মেয়েটা একা একা ঘুরছে। এত রাত হয়ে গেল, ফোনটা পর্যন্ত করলনা এখনো। - আরে, সবে তো সন্ধ্যেবেলা। রাত কোথায়? - হ্যাঁ, সন্ধ্যে থেকে চার কাপ চা খেয়েছ’ আর এখন বলছ সন্ধ্যেবেলা। ন’টা বাজে সে খেয়াল আছে? ফোনটা কর’ শিগগির। - দশটার দিকে করব নাহয়। এই ঝিঙেটা কেটে নি... আরে কি হল? কি হল? নমিতাদেবী ছুটে যান বেসিনের দিকে। বমি হতে থাকে ক্রমাগত। তারপর চোখমুখ ধুয়ে বসে পরেন। শক্তিপদবাবু জলের বোতল আর গামছা নিয়ে কাছে এগিয়ে যান, তারপর মুখটা মুছিয়ে দেন ভালো করে। - একটু জল খেয়ে নাও। কতবার বলেছি সারাদিন ধরে উপোষ করে থাকবে না। শরীর ভালো না থাকলে ভগবানের পুজো কে দেবে বল। সকাল সকাল ঠাকুরকে একটু জলবাতাসা দিয়ে, তারপর নাহয় খেয়েদেয়ে কাজকর্ম শুরু করলে, এতে ঠাকুরের কি বদহজম হবে? তা না করে সারাদিন ধরে ঘুরে ঘুরে দুপুর দুটোর সময় খাও সকালের খাবার। তারপর সপ্তাহে দুদিন তিনদিন বমি... এ পিত্ত বমিই, বুঝলে? কিন্তু তোমার ভগবান কি বুঝছে সেই জানে। - অ্যাই, ভগবান নিয়ে ইয়ার্কি নয় বলে দিচ্ছি!

1029

22

দীপঙ্কর বসু

মুর্শিদাবাদে ক'দিন

সুন্দরী রমণীদের প্রতি আসক্তি জিনিষটা নবাব বাদশাহ দের কাছে তেমন দোষাবহ কিছু ছিলনা বলেই মনে হয় । বরং শিকারের মত এও ছিল এক খেলা – একধরণের মনোরঞ্জনের উপায় বিশেষ । সাধারণ মানুষের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম , ক্ষেত্রবিশেষে আমীর ওমরাও বা অন্যান্য রাজপুরুষের অন্তঃপুরও রক্ষা পেতনা নবাবী লালসার লেলিহান শিখার হাত থেকে । এই ভাবে নবাবদের ভোগবিলাসের সামগ্রী হয়ে হারেমের অন্ধকারে কত শত নারীর নিষ্ফলা জীবন চরম অপচয়ের মধ্যে নিশ্যেষিত হয়েগেছে তার হিসেব কে রাখে । অবশ্য হারেমের অন্দরে সব অন্তপুরচারিণীই যে একেবারে উপোসী থাকতেন তাও নয় ।এদের অনেকেই পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবনের সর্ববিধ তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতেন সঙ্গোপনে । সে সব রসালো গল্পকাহিনী কিছুটা আড়াল আবডাল রেখে আজও লোকমুখে ফেরে । সিরাজউদ্দৌলা জননী আমিনা বেগম সম্পর্কেও তেমনি বহু দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প প্রচলিত আছে । সেদিক থেকে সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা কে যথেষ্ট ভাগ্যবতীই বলতে হবে । ক্রীতদাসী লুৎফুন্নেসা ছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁর পরিবারের মহিলাদের পরিচারিকা । হয়ত বাঁদি হয়েই জীবনটা কেটে যেত লুৎফুন্নেসার ,কিন্তু আলিবর্দি খাঁর আদরের নাতি সিরাজের দিনের অধিকাংশ সময়ই তখন কাটত হয় ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে আমোদ প্রমোদে মেতে অথবা চেহেল সুতুনের হারেমে নর্তকী ও সুন্দরী নারীদের সান্নিধ্যে । সেখানে অসাধারণ রূপসী লুৎফুন্নেসা নজরে পড়ে গেলেন সিরাজউদ্দৌলার ।ক্রীতদাসী থেকে হয়ে গেলেন হবু নবাবের প্রিয়তমা বেগম । তখন তাঁর খিদমতের জন্যেই নিযুক্ত হল আলেয়া নামে অপর এক দাসী । অবশ্য শুধু মাত্র রূপসী ই নয় ,লুৎফুন্নেসা ছিলেন অত্যন্ত সৎ স্বভাবের পরম মমতাময়ী নারী । ওমদাতুন্নেসা নামে অপর এক স্ত্রীও ছিলেন সিরাজের ,কিন্তু একমাত্র লুৎফুন্নেসাই জীবনের চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও ছায়া সঙ্গিনী হয়ে রয়ে গিয়েছিলেন সিরাজের । মতিঝিলের ধারে অনেকটা সময় কাটিয়ে এবারে চোখ ফেরালাম মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের আর এক বহুচর্চিত চরিত্র মেহেরুন্নেসা বা ঘসেটিবেগমের স্মৃতিসৌধের দিকে । সুরম্য মসজিদটিরও সামনেই এক ফালি ঘেরা জায়গায় অনন্ত শয়নে শায়িতা আছেন নবাব আলিবর্দি খাঁর জ্যেষ্ঠাকন্যা তথা সিরাজউদ্দৌলার মাসি মেহেরুন্নেসা, ইতিহাস যাকে স্মরণে রেখেছে ঘসেটি বেগম নামে । মসজিদটির ছাদের চার কোনে চারটি মিনারেট আর তিনটি নিটোল গম্বুজ মিলিয়ে বেশ একটা ছন্দময় আকার দিয়েছে মসজিদটিকে । এর পাশেই এককালে ছিল আলিবর্দি খাঁর জামাতা নৌজেস মহম্মদ নিজের স্ত্রীমেহেরুন্নেসার বসবাসের জন্যে মহল বানিয়েছিলেন যা সাংহী দালান নামে খ্যাত ছিল ।আমি অবশ্য সে মহলএর ধ্বংসাবশেষই কেবল দেখতেপেয়েছি  । অপুত্রক নবাব আলিবর্দি খাঁর জীবনের অন্তিম পর্বে তার উত্তরসূরি কে হবেন তা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তারও সৃষ্টি হয়েছিল । যদিও বৃদ্ধ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকেই তাঁর উত্তরসূরি বলে ঘোষণা করে রেখেছিলেন অনেক আগেই , কিন্তুপিতার এই সিদ্ধান্তে মোটেই খুশী হতে ভাল মনে মেনে নিতে পারেননি মেহেরুন্নেসা । তাঁর লক্ষ্য ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবী মসনদে আসীন হওয়া । তিনি সুযোগ খুঁজতে লাগলেন কি ভাবে সিরাজকে সরিয়ে নিজেই মসনদে বসবেন । এদিকে মসনদের অপর এক দাবীদার মীরজাফর ও । শুরু হল ক্ষমতা দখলের লড়াই – তিনটি পক্ষ সে লড়াইয়ে – সিরাজউদ্দৌলা , তস্য মাসি মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম আর বৃধ নবাবের ভগ্নীপতি মীরজাফর । ইতিপূর্বে মীরজাফর বৃদ্ধ নবাব আলিবর্দি খাঁ কে হত্যা করে মসনদের অধিকার কায়েম করার ষড়যত্র করেও অসফল হয়েছিলেন । সাধারণতঃ আলিবর্দি খাঁ শ্ত্রুর শেষ রাখতেননা । কিন্তু এক্ষেত্রে তার অন্যথা হল কেন তার কোন জবাব নেই । আলিবর্দি খাঁ মীরজাফরের অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে হত্যা করলেননা । বরং পবিত্র কোরানে হাত রেখে শপথ বাক্য উচ্চারণ করালেন যে মীরজাফর আজীবন মুর্শিদাবাদের মসনদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন এবং পরবর্তী নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে সর্বপ্রকার সাহায্য করবেন । সিরাজের নবাব হবার পথে আর এক কাঁটা জ্যেষ্ঠা কন্যা ঘসেটি বেগমকে প্রচুর ধনদৌলত উপঢৌকন হিসেবে দিয়ে সিরাজউদ্দৌলার পথকে নিষ্কণ্টক করতে চেয়েছিলেন আলিবর্দি খাঁ ।যদিও ফল হয়েছিল সম্পূর্ণ উলটো । সিরাজকে পথ থেকে সরাতে জোট বাঁধলেন ঘসেটি বেগম আর মীরজাফর । প্রতিশোধ স্পৃহায় অন্ধ ঘসেটি বেগম পিতার কাছথেকে পাওয়া ধন দৌলত দিয়ে সাহায্য করতে আরম্ভ করলেন মীরজাফরকে ।উদ্দেশ্য মীরজাফর সেই অর্থ দিয়ে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত একটি সৈন্য বাহিনী গড়ে তুলতে পারেন । কাঁচা কাজ করেছিলেন ঘসেটি বেগম । মীরজাফরকে দিয়ে সিরাজউদ্দৌলাকে গদিচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করার সময়ে মীরজাফরকে কি ভাবে স্ববশে রাখবেন তার কি পরিকল্পনা ছিল তার মনে কে জানে ! মীরজাফর সানন্দে ঘসেটি বেগমের ধনভাণ্ডারের ভার লাঘব করছিলেন আর অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে শলাপরামর্শ চালাচ্ছিলেন ইংরেজদের সহায়তায় মুর্শিদাবাদের গদি দখলের । যথা সময়ে গুপ্তচরের মুখে ঘসেটিবেগম আর মীরজাফরের গোপন আঁতাতের খবর পৌঁছল সিরাজের কানে । মাসি ঘসেটিবেগমকে গৃহবন্দী করলেন মতিঝিলে ঘসেটিবেগমের বাড়িতে । এযত্রায়ও রেহাই পেলেন মীরজাফর – কি কারণে তা বোঝা দায় । তবে কি সিরাজ ধরেই নিয়েছিলেন যেহেতু কোরানে হাত রেখে মীরজাফর মুর্শিদাবাদের মসনদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাতামহের উপস্থিতিতে তাই মীরজাফরের থেকে আর কোন ক্ষতির আশঙ্কা করেননি !! অবশ্য ইতিমধ্যে সিরাজ নিজের ভাগ্য তরীতে আর কয়েকটি বড় মাপের ছিদ্র তৈরি করে ফেলেছিলেন অবিবেচকের মত নবাব হবার সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রণাসভার বহু গুরুত্বপূর্ণ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নানাভাবে হেনস্থা করে অপসারিত করে নিজের পছন্দের লোকেদের দিয়ে সেই শূন্যস্থান ভরিয়ে তুলেছিলেন । মুশিদাবাদের বহু প্রভাশালী ব্যক্তিদের ক্রোধের কারণ ঘটিয়েছিলেন । এমনকি জগৎ শেঠও চরম অপমানিত হয়েছিলেন সিরাজের হাতে । সিরাজ নাকি কোন কারণে প্রকাশ্য সভায় জগৎশেঠকে চপেটাঘাত করেছিলেন !! “এবার এখান থেকে বেরতে হবে কত্তা । দেবীপুরের খেয়াঘাট এখান থেকে অনেকটা পথ” –তাড়ালাগায় আজান আলি । আমারও হুঁশ ফেরে ।।মনে পড়ে যায় হোটেল থেকে বেরনর সময় ঠিক করেছিলাম মতিঝিল হয়ে দেবীপুরের খেয়াঘাটে ভাগীরথী নদী পার হয়ে বড়নগরে যাব চারবাংলার মন্দির দেখতে । অতয়েব এখানে আর দেরি করলে চলবেনা । আমাকে নিয়ে এক্কা চলল জিয়াগঞ্জের জনবহুল রাস্তা দিয়ে খেয়াঘাটের উদ্দেশ্যে । পথের দুপাশে চোখে পড়ল দোকানপাট আর কিছু বনেদি বাড়ি । সেগুলি হয়ত সাবেক কালের কোন জমিদার বা রাজপুরুষের হবে । সকালে হোটেলের সেই বয়স্ক ভদ্রলোক বলেছিলেন গোটা মুর্শিদাবাদ শহরে এমন অজস্র বাড়ি ছড়িয়ে আছে যেগুলিকে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের আয়োজন চলছে । কতক্ষণ চলেছি ,কতদূর এসেছি হিসেব ছিলনা জিয়াগঞ্জের ব্যস্ততা এখন পিছনে পড়ে আছে ।প্রায় জনহীন রাজপথের দুপাশে কোথাও কোথাও জীর্ণ মলিন কুঁড়েঘর ছাড়া শুধুই মাইলের পর মাইল শষ্যহীন প্রান্তর । দৃশ্যটায় কোথাও কোন সজীবতার চিহ্নমাত্র নেই । তবে সব পথই কোন না কোন একটা জায়গায় পৌঁছে শেষ হয় । আমারও এই একঘেয়ে পথ চলা শেষ হল এক সময় । আমরা দেবীপুর এর খেয়াঘাটে এসে পৌঁছলাম । চারিদিকে গাছপালার ছায়া ঘেরা শান্ত নিরিবিলি খেয়া ঘাট । সামনেই বয়ে চলেছে ভাগীরথী নদী । আমার দুচোখ যেন জুড়িয়ে গেল এই শান্ত স্নিগ্ধ পল্লী প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে ।

1550

37