হিমাদ্রী
: ঝুমকোলতার স্নানের দৃশ্য ও লম্বোদরের ঘাটখরচ: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ভূষণ একটু দূর থেকে তার বউ ঝুমকোলতাকে দেখছিল। ঝুমকো কুয়ো থেকে জল তুলছে। মাত্র পাঁচ দিনের পুরনো বউ। কত কী দেখার আছে নতুন-নতুন। ভূষণ কি কালও জানত যে, তার বউয়ের মাথার গড়নটা অনেকটা মাদ্রাজী নারকেলের মতো? এরকমের গড়নের মাথা ভাল না মন্দ তা ভুষণ জানে না। সে ঝুমকোলতার যা দেখছে তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই একটা মেয়েমানুষের মধ্যে যে নিত্যি নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করছে, পেয়ে যাচ্ছে গুপ্তধন, লাভ করছে কত না জ্ঞান। মাত্র পাঁচ দিনে। ঝুমকো এই যে সাতসকালে বালতি-বালতি জল তুলে চান করবে বলে, এ ভূষণের ভালো লাগছে না। তার ইচ্ছে করছে হাত থেকে বালতি কেড়ে নিয়ে নিজেই জল তুলে দেয়। কিন্তু তা হওয়ার নয়। বাড়িভরতি গুরুজন, আত্মীয়কুটুম, হাজার জোড়া চোখ নজর রাখছে তাদের দিকে। রাখবেই। নতুন বিয়ের বর-বউ। তো নজর দেওয়ারই জিনিস। তবু তার মধ্যেই ভূষণ নানা কায়দা কৌশল করে লুকিয়ে চুরিয়ে ঝুমকোলতাকে একটু আধটু দেখে নেয়। এই যে এখন উত্তর দিককার ঘরে ভূষণের কোনও কাজ নেই, তবু সে এসে ঢুকে পড়েছে। এ-ঘর তুলসীজ্যাঠার। বুড়োমানুষ। দেশের কাছে গান্ধীবাবার অনুগত হয়ে জীবন উৎসর্গ করবেন বলে নাছোড়বান্ধা হয়ে লেগে গিয়েছিলেন, তাই আর সংসারধর্ম করেননি। উড়ণচণ্ডী হয়ে গাঁ-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন, তকলি চরকা কাটতেন। বুড়ো বয়সে এসে আবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু ততদিনে গুষ্টি বেড়েছে, ভালো-ভালো ঘরগুলো বেহাত হয়েছে। উত্তরের এই ঘরে থাকে জ্বালানি কাঠ, খোলভুসির বস্তা, বীজধান, তারই একধার দিয়ে কোনওরকমে বুড়ো মানুষটার জন্য একটা চৌকি পাতা হয়েছে। আগে গুটিকয় ছাগলও থাকত। আজকাল থাকে না, তবু ঘরটায় কেমন ছাগল-ছাগল গন্ধ। কস্মিনকালেও ভূষণ এই ঘরে আসে না। কিন্তু ঝুমকোলতা চান করতে যাচ্ছে আঁচ পেয়েই ভূষণ হঠাৎ এ ঘরে এসে সেঁধিয়েছে। কারণ, এ ঘরের জানালার ফোকর দিয়ে কুয়োতলাটা ভারী পরিষ্কার দেখা যায়। একটা লেবুগাছের আবডালও আছে, তাকে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তো আর জানালায় হামলে পড়া যায় না। জ্যাঠা কী বা মনে করবে। যদিও গান্ধীবাবার শিষ্য, চিরকুমার এবং বুড়ো, তবু সাবধানের মার নেই। ভূষণ ঘরে ঢুকেই চৌকির একধারটায় চেপে বসে বলল, জ্যাঠামশাই, শরীর-গতিক কেমন? তুলসীজ্যাঠা বুড়ো হলেও মজবুত গড়নের লোক। মাঠে ঘাটে ঘুরে-ঘুরে শরীর পোক্তই হয়েছে। তার ওপর খাওয়া-দাওয়ায় খুব সংযমী। নেশা ভাঙ নেই। এখনও নিজের কাপড় নিজে কাচেন, নিজের ঘর নিজে সাফ করেন, স্নানের জলও নিজেও তোলেন। কারও তোয়াক্কা রাখেন না। বসে একখানা বই পড়ছিলেন। হিন্দি বই। মুখ তুলে বললেন, খারাপ থাকব কেন রে? ভালোই আছি। তোর খবর-টবর কী? মাথা চুলকে ভূষণ বলে, এই আর কী, ঘাড়ে আবার বোঝা চাপল, বুঝতেই পারেন। বোঝা বলে বোঝা? এ একেবারে গন্ধমাদন। বলে তুলসীজ্যাঠা একটু হাসলেন। তারপর বললেন, বউ তো আনলি, তা মেয়েটা লেখাপড়া জানে তো? ভূষণের নজর কুয়োতলায়। বলল, ওই আর কী। গাঁয়ের স্কুলে অজ আম পড়েছে। এঃ, স্ত্রী শিক্ষাটাই আমাদের দেশে হল না। তা একখানা বই দেবোখন ভারতীয় নারীর ঐতিহ্য। বইখানা বউমাকে পড়াস। ও বাবা, ওসব খটোমটো বই কি আর পড়বে। পড়বে। জোর করে পড়াস। পড়াটা অভ্যাসের ব্যাপার। প্রথম-প্রথম পড়তে চাইবে না। তারপর রস পেলে হামলে পড়বে। বুড়োমানুষরা এমনিতেই একটু ভ্যাজর ভ্যাজর করে, তার ওপর এ মানুষ আবার আদর্শবাদী, ভূষণ জানালাটার দিকে একটু চেপে বসে বাইরের দিকে চেয়ে উদ্বেগের সঙ্গে বলল, এঃ, লেবুগাছটায় দেখি পোকা লেগেছে। তুলসীজ্যাঠা তাঁর হিন্দি বইখানা সাবধানে মুড়ে রাখলেন। তারপর বললেন, যাই, হোমিওপ্যাথির বাক্সটা নিয়ে একটু মাঠেঘাটে পাক দিয়ে আসি। সেই ভালো। বলে ভূষণ এ ঘরে থাকার ছুতো খুঁজতে হিন্দিবইখানাই খুলে বসল। বলল, ইঃ, বাবা এ যে দেখছি তুলসীদাসের রামচরিতমানস। অ্য্যাঁ! কতকাল ধরে বইখানা পড়ার ইচ্ছে। তা পড় না, বসে-বসে পড়। তুলসীজ্যাঠা বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভূষণ অপলক নয়নে ঝুমকোলতাকে দেখছে। হাতে রামচরিতমানস এলিয়ে আছে। আচ্ছা, এই যে ভূষণ ঝুমকোলতাকে দেখছে, ঝুমকো কি তা টের পাচ্ছে? মোটেই না। ভূষণের তো মনে হয় এই পাঁচ দিনে একটা অচেনা মেয়েকে সে যেমন অষ্টেপৃষ্টে ভালোবেসে ফেলেছে, তার সিকির সিকি ভাগও ঝুমকোলতা পারেনি। ভূষণের যেমন আনচান অবস্থা, চোখে হারাই হারাই ভাব, তেমনটা ঝুমকোলতার কই? দিব্যি ঘুমোচ্ছে, শ্বশুরবাড়ির নতুন সব চেনাদের সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারছে, ভূষণ বলে যে কেউ আছে তাই বোধহয় সারাদিন মনে পড়ে না। এসব কথা নিয়ে কাল রাতেও হয়ে গেছে একচোট। কিন্তু যা কথায়-কথায় কাঁদতে পারে মেয়েটা। ভূষণ শেষে পা অবধি ধরেছে। কে একজন ছোকরা মতো ঝুমকোর খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল? অ্যাঁ! সাহস তো কম নয়। পিছন থেকে মুখটা দেখা যাচ্ছে না বটে। কে ও? ভূষণ একটু খর চোখেই তাকিয়ে রইল। নাঃ, পল্টু। ভূষণের ভাইপো। কাকিমার জল তুলতে কষ্ট হচ্ছে দেখে এগিয়ে এসেছে। ছেলেটা বড় ভালো। খুব হেসে-হেসে গল্প করছে কাকিমার সঙ্গে। ভূষণ মুখটা একটু আড়াল করল। পল্টুটা না আবার তাকে দেখে ফেলে। আবার সন্তর্পণে মুখ বার করে দেখতে পেল, আরও দুচারজন এসে জুটেছে কুয়োতলাআয়। পল্টু জল তুলছে। ঝুমকো গুলতানি মারছে। মুখটা আড়াল করতেই হয়। নইলে দেখে ফেলবে। রামচরিতমানসখানা খুলে দু-চার লাইন পড়ার চেষ্টা করল ভূষণ। হিন্দিটা তার ভালো আসে না। তা ছাড়া রামচরিত পড়ার মতো মনের অবস্থাও নয়। মন এখন উটাচন। বই রেখে বালিশের পাশে ডাঁই করে রাখা বইপত্র একটা খাতামতো জিনিস তুলে নেয়, খুলে দেখে মুক্তোর মতো পরিষ্কার অক্ষরে ঝরঝরে বাংলা লেখা। ‘তিনি চলিয়াছেন, গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে, দেশ হইতে দেশান্তরে। পরণে সেই দরিদ্র ভারতবাসীর লজ্জা নিবারণের পক্ষে যৎসামান্য দুটি বস্ত্রখণ্ড। ভুলিলে চলিবে না। তাঁহার এই পোশাকও বড় উপযুক্ত, বড় দেশজ, বড় প্রতীকী। হাতে দীর্ঘ শীর্ণ যষ্টি। তাঁহার সহিত আকারে প্রকারে ওই যষ্টিটারও যেন সুদূর মিল রহিয়াছে। রস মরিয়া ওই যষ্টি যেমন ঋজু ও কঠিন হইয়াছে, জীবনের সমস্ত উপভোগ, আমোদ, আনন্দ ইত্যাদিকে ত্যাগ ও তপস্যার অনলে শুকাইয়া তিনিও ঋজু, রিক্ত, কঠিন। সেই কাঠিন্য কাহাকেও আঘাত করে না, কিন্তু সব আঘাতকেই অনমনীয়ভাবে প্রতিরোধ করে।’ ‘বাবুরা, ধনিকেরা, গৃহীরা তাঁহাকে চিনে না। তাহারা শুধু মহাত্মা গান্ধীর জয় জোকার দিয়া ক্ষণিক আবেগ অনুভব করে মাত্র। মহাত্মাজি দেশের কাজ করিতেছেন, তিনিই দেশোদ্ধার করিবেন, আমাদের কিছু করিবার নাই, এইরূপ ধারণা লইয়া তাহারা বেশ নিশ্চিন্তে ইংরেজের গোলামি করিতেছে বা কালোবাজারিতে মুনাফা লুটিতেছে, ঘুস লইতেছে বা অন্যবিধ অপকর্ম করিয়া যাইতেছে। গান্ধীবাবা আছেন, ভালো কাজ তিনিই করিবেন।’ ‘মাঝে-মাঝে ভাবি, তিনি এই দেশে জন্মগ্রহণ করিলেন, তবু কই দেশের তো কলঙ্ক ঘুচিল না। ইহাও কি সম্ভব যে তিনি এই দেশের বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করিলেন, তবু এই দেশের বায়ু পবিত্র হইল না? তাঁহার চরণরেণু মাখিয়াও এই দেশের মাটি ধন্য হই;ল না।‘ ঝুমকোলতা বেড়া দিয়ে ঘেরা চানের জায়গাটায় ঢুকে আড়াল হল, কিন্তু তাতে কি? ঝুমকোর টুকটুকে লাল শাড়ি, রাঙা গামছা আর ধপধপে শায়া যে বেড়ার ওপর। তারও কি শোভা কম? তাতেই নেশা লেগে যায় যে। উঁকি মেরে মুখটা আবার চট করে সরিয়ে নেয় ভূষণ। তার মেজ কাকিমা চাল ধুতে এসে এদিকপানে চেয়ে কী যেন দেখছে। দেওয়ালের দিকে সরে বসল ভূষণ, এ বাড়িটা একেবারে হাট। এত লোক যে কেন যেখানে সেখানে হুটহাট আনাগোনা করে তা বোঝা মুশকিল। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ভূষণ ঘরখানা দেখছিল। লকড়ির মাচানের নিচে কুঁইকুঁই শব্দ শুনে ভূষণ উঁকি মেরে দেখল, গোটাচারেক কুকুরছানা দলা পাকিয়ে আছে। বাড়িতে কুকুরের অভাব নেই, তারই একটা এসে এ-ঘরে বাচ্চা দিয়েছে। বাস্তবিক গান্ধীবাবার শিষ্য ছাড়া বোধহয় কারও পক্ষেই এ-ঘরে বাস করা সম্ভব নয়। বস্তা-বস্তা বীজধান, ভূসি, খোল আর রাজ্যের লকড়িতে ঘর পনেরোয়ানা বোঝাই। একটা বিটকেল গন্ধও থানা গেড়ে আছে। মাটির ভিতে নানা মাপের অজস্র ফুটো। লেপাপোঁছার বালাই নেই। এমন বুকচাপা দম আটকানো ঘরে তুলসীজ্যাঠাই থাকতে পারে, যার জন্য লড়ার কেউ নেই। একটু কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়েছিল ভুষণ, সেই ফাঁকে কখন চানটি সেরে বেরিয়ে পড়েছে ঝুমকোলতা। বেরিয়ে সোজা সেজোকাকির ঘরের ভিতর দিয়ে অন্দরমহল। তবে ভূষণ একেবারে বঞ্চিত হল না। উঠোনের তারে ভেজা শাড়ি মেলার জন্য মিনিটদুই দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ভালো করে দেখে নিল। এ-বাড়ির অন্দরমহল হল রাক্ষসপুরী। একবার যাকে গ্রাস করে নেয় তাকে আর সহজে ছাড়ে না। এই যে ঝুমকোলতা অন্দরে ঢুকল এর মানে হল, সে সংসারে সামগ্রী হয়ে গেল। আর ভূষণের জিনিস রইল না। ফের সেই রাত দশটার পর ঝুমকোলতা আবার ভূষণের হবে। রাক্ষসপুরীর কথা কি আর সাধে মনে হয় ভূষণের। আর তুলসীজ্যাঠার ঘরে বসে লাভ নেই। ভূষণ বেরিয়ে এসে দরজার শিকল তুলে দিল। বিয়ের মধ্যে যে আনন্দ আর রোমহর্ষ ছিল, তা বিয়ের আগে জানত কোন আহাম্মক? ভূষণ ভাবত, বিয়েটা একটা ব্যাপারই হবে বটে, কিন্তু তা যে এ-রকম ভালো, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। যারা বিয়ে না করে থাকে, তাদের জীবনটাই বৃথা। এই যে তুলসীজ্যাঠা, কী নিয়ে যে বেঁচে আছে ভগবান জানে। মাঠেঘাটে ঘুরছে, হোমিওপ্যাথি করে বেড়াচ্ছে, আর দিনান্তে রামচরিতমানস বা গান্ধীর বই খুলে মুখ গুঁজে বসে আছে। অসুখ-বিসুখ হলে জলটুকু এগিয়ে দেওয়ারও লোক নেই। অসুখের কথায় ভুষণ হঠাৎ নিজেই চমকায়, তাই তো। কথাটা তো জব্বর মনে পড়েছে। অ্যাঁ! এখন যদি তার অসুখ হয়, তাহলে ঝুমকোসুন্দরী কী করে? অ্যাঁ! ধরো জ্বর উঠে গেল পাঁচ-সাত ডিগ্রী, ভুষণ চোখ উলটে গোঁ-গোঁ করছে, ডাক্তার নাড়ি ধরে গম্ভীর মুখে বসে আছে আর ঘড়ি দেখছে, অ্যাঁ। তখন কী করবে ঝুমকো? বুকের অপর পড়ে, ‘ওগো, পায়ে পড়...’ এই সব বলবে না? অ্যাঁ! কাণ্ডটা কী হবে তখন! বেজায় শীত পড়েছে এবার। সকালে রোদটাও বড্ড ঢিমে। একটা মোটা খদ্দরের চাদর জড়িয়ে ভুষণ বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। বন্ধুবান্ধবেরা আজকাল তাকে দেখলেই মুখ বেজার করছে। সেদিন ফণী তো বলেই ফেলল, উরে বাব্বা, তোর ঝুমকোলতার গল্প শুনতে-শুনতে যে আঁত শুকিয়ে গেল বাপ। তা ভুষণই বা করে কী? ঝুমকোলতার কথা ছাড়া তার যে আর কথা আসছে না গত তিন-চার দিন। এখনও মেলা কথা বলার বাকি। ছোলাখেত বাঁয়ে রেখে হনহন করে হাঁটছে ভুষণ। পাশের গাঁ হল মুনসির চক। গোকুল থাকে। এমনিতে গোকলেটা যাকে বলে গর্ভাস্রাব। ধান বলতে কান বোঝে। কিন্তু তার কাছে কথা বলে সুখ আছে। যাই বল না কেন, হাসি-হাসি মুখ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনবে, ফোড়ন কাটবে না, বিরক্ত হবে না, উঠি-উঠি করবে না, কাজ দেখবে না। আজ গোকলেকে পাকড়াও করতে হবে। পেটে ঝুমকোলতকার গপ্প ভুড়ভুড়ি কাটছে। না বললেই নয়। এ গাঁয়ের বন্ধুগুলো বড্ড সেয়ানা হয়ে গেছে। মনসাতলায় অশ্বত্থ গাছে নীচে বাঁধানো জায়গাটায় কয়েকজন বসে আছে গোমড়া মুখে। একজঅন তুলসীজ্যাঠা। তিনি ওষুধের বাক্স খুলে শিশি তুলে-তুলে নাম দেখছেন ওষুধের। ওরে ও ভুষণ, কোথা যাস? ভূষণ জ্যাঠার ডাক শুনে একটু থমকায়। তারপর বলে, এই যাচ্ছিলাম একটু, কাজেই। এদিকে যে লম্বোদর প্রামানিকের হয়ে গেল। ঘাটখরচের যোগাড় নেই। একটু দেখবি বাবা? ভূষণ একটু নরম হল। লম্বোদরের কী হল, বৃকোদরের কী হবে, দামোদরের কী হচ্ছে, এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারটাই বা কী আছে, তাই সে বোঝে না। যে যার মতো বেঁচে থাকছে, মরে যাচ্ছে, খাবি খাচ্ছে, দুনিয়ার তাই নিয়ম। থাক, যাক, খাক, তাতে তার কী? তবু ভূষণ দাঁড়িয়ে গেল। যত যাই হোক, এই পাগোল লোকটার তো কেউ নেই, জীবনের স্বাদই পায়নি, মায়া হল ভূষণের। --কী করতে হবে জ্যাঠা? করার অনেক আছে। চারটে ছেলেপুলে, একটা মুখ্যু বউ, ঘরে দানাপানির জোগাড় নেই। তা সে না হয় পরে ভাবা যাবে। আগে ঘাটখরচা তো তোলা লাগে। এই এরা সব বসে আছে ওষুধের জন্যে, আমি নড়তে পারছি না। একটু গাইয়ের ঘরে-ঘরে ঘুরে খরচটা তুলে দিবি বাবা? সে কী কথা? ঘুরব কেন? ঘাটখরচ নয় পকেট থেকেই দিয়ে দিচ্ছি! তুলসীজ্যাঠা একগাল হাসলেন, দূর পাগল। ও বাহাদুরী ক’দিন? আজ লম্বোদর গেছে, কাল বিধু নস্কর যাবে, পরশু বিনোদ হাতি মরবে, কারোর ঘরে মামলোত নেই। ক’জনেরটা দিতে পারবি? তার চেয়ে ঘরে-ঘরে ঘোরা ভালো। পাঁচজনকে সমাজ-সচেতনও করা যায়, দশের কাজে নামানো যায়। যাবি বাবা? ভূষণ তত্ত্বটা বুঝল না। তবে একটু আঁচ করল। কথাটা মন্দ নয়। একটু মাথা চুলকোল সে। তারপর বলল, আচ্ছা দেখছি। যা বাবা, তুই পারবি। দোনামোনা করে ভূষণ গাঁয়ের দিকে ফিরল। কাজটা খুব শক্ত নয়। সবাই তাকে চেনে। চাইলে দেবে। দিলও। বেলা দশটা নাগাদ শুরু করেছিল ভূষণ। সাড়ে এগারোটার মধ্যে শ’আড়াই টাকা উঠে গেল। পাঁচ টাকা কম ছিল, সেটা নিজে পুরণ করে দিল। লম্বোদর যখন মাচানে চেপে শ্মশানে রওনা করল, তখন পড়ন্ত বেলা। চারটে ছেলেমেয়ে আর বউ—কিছুটা শোকে, কিছুটা খিদেয় আর কিছুটা ভবিষ্যতের ভয়ে কাঁদছে লুটোপুটি খেয়ে। দৃশ্যটা বেশিক্ষণ দেখতে পারল না ভূষণ। ঘরদোরের যা চেহারা, তাতে বোঝা যায়, এদের নুন আনতে পান্তা জুটলে সেদিন ভোজ। ফেরার সময় তুলসীজ্যাঠা ছাতাটা মেলে ধরে বলল, আয়, ছাতার নিচে আয়। মুখটা রাঙা হয়ে গেছে তোর। জ্যাঠার এত কাছাকাছি কখনও হয়নি ভূষণ। আজ তার বড় জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল, কীসের আনন্দে বেঁচে আছেন আপনি? কী সুখ পেয়েছেন জীবনে? কিন্তু কথাটা সরল না মুখে। আনন্দেরও তো কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কে যে কী থেকে আনন্দ পায়! কখনও ঝুমকোলতার স্নানের দৃষ্যে, কখনও লম্বোদরের ঘাটখরচ জোগাড়ে।
শিবাংশু
বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো, তাঁকে নিয়ে একটা বড়ো লেখা তৈরি করার কথা ভাবছিলুম। ওঁর বইগুলো পড়া, সব গানগুলো শোনা, এইসব প্রাথমিক কাজকম্মো শুরুও করেছিলুম। আবার আমার পুরোনো অভ্যেস অনুযায়ী প্রয়াসটি বারবার বেলাইনও হয়ে গেছে। নিতান্ত বালক ছিলুম, যখন ওঁর গান প্রথম কানে এসেছিলো। "কে যেন আমার কানে কানে বলে গেল, কোকিলের মাস এলো...।" তখন থেকেই যখন সুযোগ ঘটেছে ওঁর সৃষ্টির স্পর্শে থাকার অবসর অপচয় করিনি। আমরা বাইরের লোক, কখনও চাক্ষুষ সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু ওঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতি মুগ্ধতা সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছিলো। যখন ইউটিউব ছিলোনা, তখন কলকাতায় এলেই ওঁর রেকর্ড বা ক্যাসেট খুঁজে বেড়াতুম। একসময় একটি লেখায় ওঁকে সলিল এবং সুমনের জমিদারির মাঝখানে থাকা এক স্বাধীন নৃপতি বলে মন্তব্য করেছিলুম। কিন্তু পরে ভেবেছি ওঁর সাম্রাজ্যের জাঁকজমক হয়তো ততো চমকায় না, কিন্তু তাঁর রাজত্বের সীমানা বহুদূর গেছে মুগ্ধ শ্রোতার হৃদয়ের ভিতর। সুরযোজনা, লিরিকরচনা এবং গায়ন তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর সামর্থ্য বাংলাগানের চিরাচরিত কমপ্লিট কম্পোজারদের সোনালি ঐতিহ্যে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। শাদা শার্ট, ধুতি, সাইকেল আর হারমোনিয়ম দিয়ে ঘেরা বাংলাগানের কালজয়ী হিরোদের লিস্টিতে তিনি সম্ভবত ছিলেন শেষ নাম। যে নাম শুনলে শ্রোতাদের মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো নতুন প্রত্যাশার। বিশদে তাঁকে নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা রয়েছে পুরো মাত্রায়। জানিনা কবে সময়ের প্রশ্রয় পাবো। এই মূহুর্তে তাঁর গাওয়া আমার অতি প্রিয় সময়জয়ী একটি গান মনে পড়ছে। আমার অদীক্ষিত গায়নে তাকে ধরার চেষ্টা করেছিলুম একবার। মন্ত্রী নই তো। বাণী দেবার এলেম নেই। সেই অপটু গানটিই রেখে দিলুম তাঁর পায়ের কাছে। তিনি হয়তো প্রত্যাখ্যান করবেন না অধম ভক্তের এই স্পর্ধা।আশা তো করতেই পারি। তিনিই তো বলেছিলেন, "আমার স্বপন কিনতে পারে, এমন আমির কই?"
শিবাংশু
যাঁরা কলিকাতা শহরে মেট্রোতে যাতায়াত করেন, তাঁরা গত বেশ কিছুদিন ধরে একটি ছবির প্রচার শুনতে পাচ্ছেন প্রতিটি ইসটেশনে। কিছু নাট্যমূহুর্তের ছবি, সঙ্গে ওঝার মন্ত্রের সুরে গাওয়া টাইটল সং। তার পর হল থেকে বেরিয়ে আসা দর্শকদের মুগ্ধ প্রতিক্রিয়ার সারি। গতকাল গিয়েছিলুম আকাদেমিতে গৌতম হালদারের 'মেঘনাদবধকাব্যে'র অধুনাতম সংস্করণটি দেখতে। পথে নন্দন আসতে ব্রাহ্মণী ইচ্ছা প্রকাশ করলেন তিনি 'চল কুন্তল' দেখতে ইচ্ছুক। মনোজ মিত্র এবং সৌমিত্রকে দেখা যাচ্ছে। তো পরদিনের টিকিট নেওয়া গেলো। পৌনে দুটোয় শো। দুপুরের খাওয়াটা তেমন মন দিয়ে করা গেলোনা। বর্ষার দিনে খিচুড়ি দুচার রকমের ভাজাভুজি দিয়ে সেরে বেরিয়ে পড়া গেলো । এবার মেট্রো ইসটেশনে গিয়ে ক্লিপিংগুলো আবার দেখলুম। বোঝা যাচ্ছে মেট্রো ইসটেশনে যাঁরা বিজ্ঞাপন ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করেন, ছবিটি তাঁদেরই প্রযোজিত। যথেষ্ট আগে পৌঁছে দেখি নন্দনের সামনে লম্বা লাইন। মানে বাংলাছবির সুদিন এসেছে। কয়েকদিন হয়ে যাবার পরেও ভিতরে বেশ জনসমাগম। ভালো লাগলো। বাংলাছবির সঙ্গে যোগাযোগ তো কম। চিনিও না সবাইকে। বাংলাছবির সবলতা বা দুর্বলতা সবই স্টোরিলাইনকেন্দ্রিক। সেখানে কোনও বদল আসেনি আমার জ্ঞান বয়স থেকে। সমস্যাটা সেখানেই। মৌলিক গল্প বলে তো কিছু নেই। দশ জায়গা থেকে যা যা লোকে খায়, একপাতে আনার একটা ব্যাপার থাকে। দর্শকরা যে সব 'যুগযন্ত্রণা'র সঙ্গে স্বচ্ছন্দ, সেসবের জোগান দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। কয়েকটি বিষয়, ১. মধ্যবিত্ত বাঙালির বৃদ্ধ বয়সের যাপনসংকট ২. সংবেদনশীলতা আর দায়িত্বজ্ঞানহীন সন্তান ৩.রাজনীতিক আর অপরাধীদের গাঁটছড়া ৪.খুচরো প্রতিবাদ ইত্যাদি এসবই আছে এই ছবিতে। মনে রাখতে তপন সিংহ এবং গোবিন্দ নিহালানি নামের দুই পরিচালক দুটি ছবি বানিয়েছিলেন। মাদার অফ হান্ড্রেড মুভিজ। আপনজন আর অর্ধসত্য। এই ছবিতে ছায়াদেবীর জায়গায় আছেন সৌমিত্র, মনোজ মিত্র এবং সমীর বিশ্বাস। স্বরূপ দত্ত ও শমিত ভঞ্জের জায়গায় প্রতীক সেন ও রাজা দত্ত। নাহ, রাজা দত্ত পিওর ভিলেন, শমিত ন'ন। পীড়িত মা অনুরাধা রায়, প্রায় নায়িকা দেবলীনা। এছাড়া মাফিয়াপুলিশ, এম এল এ দীপংকর দে, সদাশিব অমরাপুরকরের প্রক্সি। এছাড়া আছেন দহিবড়ামার্কা এনারাই পুত্র, লাতখোর কলকাত্তাই পুত্র, তাদের ততোধিক ভিলেন বৌয়েরা। তিনটি বাঁশের ছড়ি। শেষদৃশ্যে ভিলেনের ঝাড়পিট থেকে 'বাবু, বাবু' করতে করতে প্রাণ দেওয়া বাঙালিমাতা সবই রয়েছে। শেষ দৃশ্যে 'আকাশ জুড়ে শুনিনু' সৌমিত্রের থামস আপ, স্যুইসিডাল।পরিচালক রাজ মুখার্জি কোনও রিস্ক নেননি। যেহেতু বাঙালি দর্শক সিনেমার থেকে সিরিয়ালকে বেশি ভালোবাসেন, তাই বাজার ধরতে বাংলা সিনেমা ক্রমশ বড়োপর্দার সিরিয়াল হয়ে গেছে। শট, সিক্যুএন্স, মন্তাজ, ট্রিটমেন্ট, সব কিছুর মধ্যেই সিরিয়ালের গেরস্তপোষা মাত্রাকে পেরোনোর কোনও প্রয়াস নেই। আর রয়েছে চিৎপুরি ড্রামাছাপের নাট্যমূহুর্ত। তার মধ্যেই মনোজ মিত্র, সৌমিত্র, দীপংকর জানিয়ে যান 'আছি, আছি'.... তবে বহুমানুষ দেখছেন ছবিটি। এই ব্যাপারটা ভালো লাগলো। কী দেখছেন, সেটা তেমন জরুরি নয়।
সুকান্ত ঘোষ
১। সেলিব্রিটি পাবলিকদের মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেবার সময় গুগলি প্রশ্ন দেবার চেষ্টা করে। তেমনি এক অখাদ্য গুগলি টাইপের প্রশ্ন হল, আপনি জীবনে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট কি পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে। বলাই বাহুল্য আমি বিখ্যাত কেউ নেই, তাই আমাকে এই প্রশ্ন কেউ করে নি। কিন্তু আমি নিজে নিজেকে অনেক করেছি সেই জিজ্ঞাসা। প্রচন্ড ভেবে ভেবে দেখা গেল - লাইফে কমপ্লিমেন্ট পাবার মতন তেমন কিছু তো করি নি! অবশ্য ক্লাস সেভেন থেকে প্রায় টুয়েলভ পর্যন্ত কার্তিক, চঞ্চল সহ অনেক জনতাকে দায়িত্ব নিয়ে ইংরাজী পরীক্ষার পাস মার্ক সরাবরাহ করার ব্যাপারটা যদি না ধরা হয়। অবশ্য তখন জানতাম না কমপ্লিমেন্ট কি জিনিস! কোন কমপ্লিমেন্টই জীবনে পাই নি বলে যখন প্রায় স্থির করে ফেলেছি, তখনি মনে পড়ে গেল ক্রিকেট খেলার কথা! সে কি সময় ছিল তখন - টেনিস বল ক্রিকেটই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। হেলমেট পড়ে আন্তর্জাতিক উইকেট কীপাররা স্টাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে ফাষ্ট বোলারদের কীপ করা ব্যাপক ভাবে চালু হবার অনেক আগে থেকেই আমি সেই জিনিস করে এসেছি দীর্ঘকাল। আমাদের দিকে তখন একদিনের টুর্ণামেন্ট ছয়-আট ওভার এবং রানিং টুর্ণামেন্ট ১৪-১৬ ওভার করে হত। একদিনের টুর্ণামেন্টে শীতের দিনে বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওভারের সংখ্যাও কমে আসত। অনেক অনেক ফাইনাল ম্যাচ খেলেই দুই ওভারের। ব্যাটসম্যান বল দেখতে পাচ্ছে না, আম্পায়ার দেখতে পাচ্ছে না, আমি উইকেটকীপার দেখতে পাচ্ছি না - বোলার আলো আঁধারীতে বল ছুঁড়ছে, এই জিনিস চলে এসেছে বছরের পর বছর। আর কম ওভারের খেলা হবার জন্যই ক্রীজের বাইরে বেরিয়ে ব্যাট হাঁকাবার একটা ডিম্যান্ড ছিল। তা যাই হোক, আমাদের নিমো গ্রামের সাথে রাই- ভ্যালারি ছিল পাশের গ্রাম বিষ্ণুপুরের। তবে আমাদের অবস্থা সেই আশি-নব্বই দশকের ভারতীয় দলের মত হলে, বিষ্ণুপুর ছিল পাকিস্তান। কি সব প্লেয়ার! তবে ছয় ওভারের খেলায় বেশী ভালো খেলোয়ারের দরকার হত না - চারজন ভালো প্লেয়ার থাকলেই হত - বাকিরা দুধেভাতে। বিষ্ণুপুরের পিঙ্কি আর গোপাল এই দু জনেই বেশীর ভাগ খেলা শেষ করে দিত। পরের দিকে গোপালের ভাই এসে 'চাক' বোলিং শুরু করার পর বিষ্ণুপুর প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ল। তেমনি এক সময়ে, কাঁঠালগাছির মাঠে নিমো গ্রামের সাথে সেমি-ফাইন্যাল খেলা হচ্ছে বিষ্ণুপুরের। বিষ্ণুপুর বেশীর ভাগ সময় নিজেদের প্লেয়ায় নিয়েই খেলত - মানে 'হায়ার' তেমন কেঊ খেলত না ওদের হয়ে। তবে সেই বার কেন জানি না এক বাইরের ব্যাটসম্যান ওদের দলে খেলতে এল। ফুতুদা বল করছে, সেই ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে নামল ওয়ান ডাউনে। প্রথমে রানার্স এন্ডে ছিল। উইকেটের পিছনে আমি। এক রান হলে পড়ে এবার সেই ব্যাটসম্যান ক্রীজে এল ফেস করতে ফুতুদাকে। হঠ করে মাঠের বাইরে থেকে বিষ্ণুপুরের খোকনদার নির্দেশ এল নতুন ব্যাটসম্যানের কাছে। খোকনদা ছিল বিষ্ণুপুরের ক্রীকেট টিমের মেন্টর কাম কর্মকর্তা কাম প্রধান উৎসাহী সমর্থক। আমি স্ট্যাম্পের কাছে থাকার জন্য শুনতে পেলাম, সেই নির্দেশ হল, ক্রীজ ছেড়ে সে যেন না বেরিয়ে খেলে। আসলে চেনাশুনা প্লেয়ার হলে তাকে বলতে হত না, আমি কীপিং করলে সবাই ক্রীজেই প্রোথিত থাকত, কিন্তু এ হল নতুন প্লেয়ার আমাদের এলাকায়, তাই সেই নির্দেশ। পরের গল্প সোজা, ফুতুদা বল করল, সেই ব্যাটা এগিয়ে গিয়ে মারতে গেল এবং ফলত বল মিস করে স্ট্যাম্প। এবার সেই ছেলে ব্যাট বগলে করে মাঠ থেকে বেরুচ্ছে - ভেসে এল খোকনদার চিৎকার - "বোকাচোদাকে হাজার বার বললাম ক্রীজ থেকে বেরুস না, বেরুস না! নাই সেই বেরুবে! তুমি বাঁড়া জানো না, কে আছে উইকেটের পিছনে!" এই এতোদিন পরে আমি খোকনদার সেই বক্তব্যকে কমপ্লিমেন্ট হিসাবেই নিলাম! বাই দি ওয়ে, গল্পে কোন জল নেই। উত্তর খেলোড়ারী জীবনে ফুতুদা এখন সফল ব্যবসায়ী - মেমারী নিমতলা মার্কেটে 'নিউ লাইট কর্ণার' নামক বিশাল চালু ইলেক্ট্রিক্যাল এর দোকান। সুকান্ত ঘোষের লেজেন্ডারী উইকেট কিপিং-র গল্প তার কাছ থেকে এখনো যাচাই করে নেওয়া যাবে। খোকন-দার ডায়লগ এখনো আমায় হন্ট করে - "তুই কিপিং ছেড়ে বাঁড়া কেন যে বালের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলি!" ২। তেমনি এক শীতের দিনে পড়ন্ত বেলায় নিমো স্টেশনের পাশে কুমারদের জমির আলে লুঙ্গিটা ঠিক করে উবু হয়ে বসে আলম আমাদের বলল, “বুঝলি টনি আর মকসুদকে তুলতে হবে খুব শিগগিরি। ওরা যা শুরু করেছে আজকাল তোরা ভাবতে পারবি না”। টনি আর মকসুদ হল আমাদের পাশের গ্রাম কেজার ছেলে। আলমের প্রস্তাব শুনে আমাদের হালকা টেনশন এসে গেল। বিশেষ করে যখন পাশের গ্রাম থেকে তোলার কোন হিষ্ট্রি তখনো আমাদের ছিল না। আলম আমার সেই ন্যাংটো বেলার বন্ধু – বাবা মারা যাবার আগের দিন পর্যন্ত মনে এই ধারণা পুষে রেখেছিল যে মাধ্যমিকে আমার নাম্বার আশানুরূপ না হবার মূল কারণ ছিল আলম। তবে বাবার মতে ড্যামেজিং জিনিসটি ছিল আমাদের নিমো গ্রামের শিবতলায় ভ্যাঁটা খেলা। ভ্যাঁটা (বা গুলি খেলা) খেলে খেলে নাকি আমার নাম্বার সেই ক্লাস সিক্স থেকে কমতে শুরু করেছে, মাধ্যমিকে গিয়ে দ্যাট টাচড্ দ্যা রক বটম। আলমকে আমি ভ্যাঁটা খেলায় হারাতে পারি নি – সেই প্রশ্নই ওঠে না, শুধু আমি না, নিমো গ্রামেই আলমকে বীট দেবার মত কেউ ছিল না। আলমের আরেক পরিচয় হল সে পচা মোড়লের নাতি, যে পচা মোড়ল ছিল গিয়ে আমাদের গ্রামে চাল পোড়া, হাঁড়ি চালা, জল পোড়া, বাণ মারা – এই সব ব্যাপারে সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট। বি ই কলেজ জনিত আমার এক ক্ষতেও আলম প্রলেপ দিয়েছিল পরোক্ষ ভাবে – তবে তেল পোড়া, জল পোড়া বা তাবিজ দিয়ে নয়। বি ই কলেজ আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক ব্যবহার করতে পারে নি – এ ছাড়া আর বিশেষ লার্জ স্কেলের কিছু অভিযোগ কলেজের প্রতি আছে বলে আমি তো এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। অনেকে কারপেন্ট্রী ক্লাস, মেসে রান্না হওয়া ৫ দিনের পুরানো মাছ, বা নাকুর গান, চাকুরী না পাওয়া এই সব জিনিস নিয়েও টালাবাহানা করে, কিন্তু আমি সেই সব ক্ষুদ্র জাগতিক জিনিস নিয়ে নাড়াঘঁটা করে নিজের স্ট্যান্ডার্ড নীচে নামাতে পারলাম না। আসলে বি ই কলেজ জানত না সে কি হারাচ্ছে। আর তা ছাড়া আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক মত ব্যবহার না করতে পারার মূল কারণ তো আর কলেজ নিজে ছিল না, ছিল ন্যাংটো (বিশেষ্য)। ন্যাংটোকে দিয়েই কলেজ কাজ চালালো সেই কত বছর। মানলাম না হয় যে ন্যাংটো বাকি অনেক কিছু আমার থেকে ভালো পারত, কিন্তু তা বলে এটা? বি ই কলেজ ব্যবহার না করতে পারলেও, আমার বাল্যবন্ধু আলম আমার পোতিভাকে শুষে নিয়ে ব্যবহার করেছিল ক্রিকেট টুর্ণামেন্টে। আলম ক্রিকেটও খেলত ভালোই – ক্লাশ ইলেভেন পর্যন্ত আমাদের সাথে বেশ খেলল – তার ন্যাচার্যাল বোলিং অ্যাকশন ছিল অফ কাটার। এটা কেউই জানত না, কেবল আমিই জানতাম উইকেট কিপিং করার দারুণ। তা সেই আলম হট করে ১৬ বছর বয়েসে কম্পিটিটিভ ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি ক্রিকেট কর্মকর্তা বনে গেল। এর পর থেকে তার প্রধান কাজই হয়ে দাঁড়ালো ক্রিকেট টিম তৈরী করা এবং টুর্ণামেন্ট ধরা। এবার আমরা এই সব ব্যাপারে আলমকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতাম না – কারণ কে কোথায় ভালো খেলছে, সেটা তার থেকে কেউ আর ভালো জানত না। কারণ ক্রিকেট প্লেয়ার স্কাউটিং আলম শুরু করেছিল সেই হিরো সাইকেলের আমলে (অবশ্য অনেকে অ্যাভন ব্যবহার করত), হিরো হোন্ডা গ্রামের ঘরে ঘরে তখনো ঢোকে নি। ভাঙাচোরা সাইকেল নিয়ে মেমারী ব্লক পুরো চষে ফেলে প্লেয়ারদের ডাটাবেস তৈরী করা সে কাজ চাট্টীখানি ছিল না। আলম সেই কাজ করেছিল বছরের পর বছর প্রধানত সুতপা বিড়ির সাহায্য নিয়ে। তার সেকেন্ডারী সাহায্যে ছিল আমাদের সমবয়সী বা জুনিয়ার কেউ, আলমের সাইকেল চালক হিসাবে। মোটামুটি আমাদের ‘তোলা’ প্লেয়ার ৩ থেকে ৪ জন থাকত ম্যাক্সিমাম, তবে বেশীর ভাগ সমইয়েই মাত্র ২ জন। যদি আমার স্মৃতি ভুল না করে, তা হলে নিমো গ্রামের হয়ে হায়ার খেলার সূচনা করেছিল আমাদের সময়ে মেমারীর কাত্তিক পোল্লে (কালীতলা পাড়া) এবং ক্রিষ্টির তনুপ। তবে সেই সব ছিল ৫ ফুট ২ এর খেলা। সিনিয়র খেলায় এন্ট্রি পেয়ে এরা আমাদের হয়ে আর কোনদিন খেলে নি, যদিও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে সিনিয়ার হয়েও তনুপ কোনদিন ৫ ফুট ২ পেরিয়েছিল কিনা! কাত্তিক পোল্লের সাথে আমার সম্পর্ক আবার অন্য রকম, আমাদের হয়ে ফ্রীতে খেলেছিল। ওই ইংরাজী পরীক্ষা আর ক্রিকেট - মিথোজীবিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের মধ্যে। তা যা বলছিলাম, সিনিয়র লাইফে নিমো ভারত ক্রিকেট সমাজের টিমে আমাদের ব্যাচে প্রথম ‘তোলা’ (যাকে হায়ার করা বলে আর কি) ওই টনি আর মকসুদ। এবং বলতে নেই, মোহনপুর মাঠে তারা দুই জনেই মান রেখেছিল। মকসুদ দারুণ বল করেছিল, আমি একটা ম্যাচে চারটে স্টাম্প। গোটা একদিনের টুর্নামেন্ট মোট স্ট্যাম্পিং মনে হয় দশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম সেমিফাইন্যাল পর্যন্ত যেতে পারব না – তাই কেউ বাড়ি থেকে তৈরী হয়ে যাই নি (মানে চান করে, মুড়ি খেয়ে)। সেই ফাইন্যালে ওঠার পর গ্রামের সাপোর্টাররা গামছা বেঁধে মুড়ি নিয়ে গেল বাড়ি থেকে – মোহনপুর মাঠ যাকে বলে একবারে মিডিল অভ নো-হ্যোয়ার। ফাইন্যাল খেলতে গিয়ে আমার কেষ্ট স্যারের কাছে প্রাইভেট মিস – কোন বোকাচোদা আমার ভালোর জন্য সেই খবর আবার আমার বাপের কানে তুলে দেয় – ফলতঃ বাপের হাতে উদুম ক্যালানী – ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কাপ জিতে ফেরার ফলে নিমোর সিনিয়ররা বাড়ি ঢোকার আগে নিমো বটতলায় কোচোর দোকানে সিঙ্গারা, এবং বাসি দানাদার খাইয়ে বাড়িতে ছেড়ে ছিল। ফলতঃ বাপের ক্যালানী তত বেশী মনে এফেক্ট ফ্যালে নি, পেট ভরা থাকার জন্য। আলম আমাদের নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেন ছিল না ঠিকই – কিন্তু আমাদের হয়ে টস করতে ওই যেত। কেন না পচা মোড়লের নাতি আলম যে টসে জিতবে প্রতিবার এমনি আমাদের বিশ্বাস ছিল এবং আলম তার মর্যাদা রেখেছিল ৯৫% ক্ষেত্রে। আমরা জোর জবরদস্তি করে আলমকে ওর দাদুর কাছ থেকে টসে জেতার ডার্ক আর্টটা শিখে নিতে চাপ দিয়েছিলাম। শীতকালে আলমের ফুলটাইম জব ছিল ক্রিকেট কর্মকর্তা, গ্রীষ্মের সময় তখনও ফুটবল খেলা হত, ফলতঃ ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত, বর্ষা আর শরতের মাঝের সময়টায় সে ব্যস্ত থাকত মাছ ধরা নিয়ে – আর বছরের বাকি সময়টায় সে বড় ভাইয়ের আন্ডারে জামা কাপড়ের টেলারিং কাজ করত। এবং সমস্ত সময়েই আলমের কনস্ট্যান্ট সাথী ছিল লটারী এবং জুয়া। তবে সেই লটারী এবং জুয়া খেলার গল্প অন্য সময়। ওই বিষয় গুলি জটিল, অনেক গবেষণা এবং অনেক উত্থান-পতন তার মধ্যে জড়িয়ে আছে। শুধু কর্মকর্তা হিসাবে নয় – আলম আর হাবা, এই দুই পাবলিকের জন্য নিমো ক্রিকেট মাঠে ড্রেস কোড চালু হয়। ড্রেস কোড মানে, লুঙ্গি পরে ব্যাট করতে নামা যাবে না। একে তো টেনিস বলের খেলায় এল বি ডব্লু ছিল না, তার পর এরা দুজন লুঙ্গি ছড়িয়ে ব্যাট করতে নামা চালু করলে, বোল্ড করে প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল। বল যতই জোরে যাক, ব্যাট বীট হলে বল গিয়ে জড়াবে সেই দুই পায়ের মাঝে ছড়িয়ে থাকা লুঙ্গির ভাঁজে। তা হলে বাকি রইল ক্যাচ এবং স্টাম্পিং-রান আউট। সে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াতে, নিমো ভারত সেবক সমাজের কার্যকরী সমিতির মিটিং ঠিক হল – নো লুঙ্গি। আলম আমাদের অনেক টুর্নামেন্ট দিয়েছিল – আমরা হেরেছিলাম বেশী, জিতেছিলাম ও অনেক। তবে আলম কিন্তু আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সফল হায়ারড প্লেয়ার ফুতুদাকে স্কাউট করে আনে নি – সে এসেছিল সঞ্জুর বন্ধু হিসাবে। সঞ্জু ছিল আমাদের গ্রামের বাই ফার দ্যা গ্রেটেষ্ট প্লেয়ার অব অলটাইম। এমনও শুনেছিলাম যে লোকে নিমোর খেলা দেখতে এসেছিল সঞ্জুর ব্যাটিং-বোলিং এবং আমার কিপিং দেখবে বলে। নিমো গ্রামের বুকে ফাষ্ট বোলিং এবং এগিয়ে গিয়ে বুক চিতিয়ে ছয় মারা সঞ্জুই শিখিয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত ফুতুদা প্রায় আমাদের গ্রামের ছেলে হয়ে উঠেছিল – সময় এগুতে এগুতে এক সময় বন্ধু বিচ্ছেদ হয়, পাবলিকেরা স্বাভাবিক ভাবেই ত্রিকোণ প্রেমের ব্যাপার টেনে আনে, তবে সেই সব গল্প এবং একবার টুর্নামেন্ট ফাইন্যালে জেতার জন্য ২৬ না করতে পারার গল্প পরের বার। অনেক দিন হল শীতকালে বাড়ি যাই না – নিমোর হয়ে ক্রিকেটও অনেকদিন খেলি নি। আগের বার বাড়ি গিয়ে ফুতুদার ইলেকট্রিকের দোকানে একটা ইস্ত্রী কিনতে গেছি। ফুতুদা বলল, কিরে সুকান্ত একবার শীতকালে আয়, একবার বুড়ো হাড়ে একবার নামা যাক – আর আলমকে না হয় টিম বানাতে বলা যাবে। ফুতুদাকে বললাম ক্রিকেট ছাড়ো, “আলম এখন মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত। এই তো দু-দিন আগে দেবীপুর থেকে মাছ ধরে এলাম”। [ক্রমশঃ] বিঃ দঃ লেখাটি পূর্বে 'গুরুচণ্ডালি' ব্লগে পোষ্ট করেছিলাম।
জল
ছোটমামা এসে গেছিলো বলেই ম্যাক্সির ওপর একটা ওড়না চাপিয়ে চলে এসেছিলাম| বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে| পাশের গাছটা কি গাছ ঠিক জানিনা| কিংবা জানতাম‚ এখন মনে পড়ছে না| ঘন হয়ে আসা ছায়ায় রাত গভীরের ইঙ্গিত| চারিদিকের হলুদ আলোতেই কেমন একটা ঝিমধরা ভাব| কালীবাড়ির ভিতরেও হলুদ আলো-আঁধারি| ওপরে চলে আসি| সবাই ঘরে চলে এসেছে| তিনটে তক্তাপোশের ওপর বসে খানিক আড্ডা চলল| এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরার অভ্যাস তো কলকাতাতে আমাদের নেই| আমি অবশ্য একা‚ তিনি গেছেন তার জায়গায়| আর তেঁনাকে নিয়েই হি হি হা হা থেকে এদিক ওদিকে হয়ে শাখাপ্রশাখায় আড্ডা| কনকনানি বাড়ছে‚ বাড়ছে মশাও| জানলাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হল| ব্যাগ থেকে বেড়িয়ে পড়ল অল আউট| মোবাইলগুলো চার্জেও বসাতে হবে| ঘরে সেই ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়| আগে-পরে করে দিয়ে নিতে হবে| এবার সবাই গড়িয়ে নিতে চায়| চোখ খুলেই নিজামুদ্দিনে ছুটতে হবে| তার আগে আছে প্রাত্যহিক কর্ম| সকালের অভিজ্ঞতা আমাদের অভিজ্ঞ করে তুলেছে| বড় তক্তাপোশের একটায় ছেলেরা মানে শ্যামলদা‚ নৃপেনদা‚ গোরাদা আর দীপঙ্কর| অন্যটায় মুন্নাবৌদি‚ কালুর পিসি‚ সোমা‚ সোমার ছেলে আর ছোটটায় আমি‚ পুচুন আর পুচুনের মেয়ে| দীপঙ্কর তৈরি হচ্ছে‚ অন্যরা তখন বডি ফেলে দিয়েছে| জানে না তো এই লোকটাকে| পরিপাটি করে মুখে বোরোলীন ঘষা হল‚ এবার ঠোঁটের ওপর পুরু করে বোরোলীন দিয়ে ঠোঁটদুটোকে এক্দম এঁটে দিল| ও খিল আজ রাতে আর খুলবে না| এবার যা কথা হবে ইশারায়| আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি| ইশারা-মিশারা বুঝি না| বাকিরা চোখ মেলে দেখছে আর হি হি হা হা| সোমা ক্লান্ত‚ মাঝে মাঝে আচমকা হি হি শুনে মাথা তুলে দেখে হেসেই আবার ঘুম| এক্দম লাস্টে নৃপেনদার পাশে শুল দীপঙ্কর| তক্তাপোশের ওপর পাতা কম্বলগুলো মা যদি দেখত‚ তাহলে অবধারিতভাবেই বলত‚ এগুলো মরাফেলা কম্বল| তার ওপরে আমাদের চাদরগুলো পেতে শোয়া হয়েছে| তবু যে কেন কুটকুট করছে কে জানে!! মনের ভিতরেই যে খুতখুতানি‚ তাই হয়ত ঘুম আসতে চায় না| তা না হলে শরীর যে পরিমাণ ক্লান্ত তাতে অন্য যেকোন লোক নাক ডাকিয়ে ঘুমোতো| তারওপর আবার কোনদিন চৌকিতে শোবার অভ্যাসটাও তো নেই| ওদিকে সোমার নাক বজ্রনাদের মত নিশুতিরাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিচ্ছে| যোগ্য সঙ্গতে গোরাদা| পুচুন সতর্ক মেয়ের ঘুম না ভেঙ্গে যায়| আমিও তাই| একপাশ হয়ে কোনোরকমে গুটিয়ে শুটিয়ে শুয়েছি| পাশ ফেরার উপায় নেই| মেয়েটার ঘাড়ে গিয়ে পড়ব| কখন ঘুমিয়েছি কে জানে? তবে বেশিক্ষণ যে ঘুমায়নি সেটা বুঝতেই পারছি| নিস্তব্ধ ঘরে নাসিকার ফিসফাস‚ শ্বাসের ওঠাপড়া| বন্ধ জানলার ফুটো দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে একটা কৌনিক আলোর রেখা| ঘুম ভাঙলেই একবার টয়লেট যেতেই হয়| কিন্তু এখানে চেপে থাকি| অন্ধকারে বুঝতে পারছি না রাত কটা? কেউ কি জেগে আছে? পাশ ফিরতে পারছি না বলে ঘাড়ে ব্যাথা করছে| এককাৎ-এ শুয়ে থাকা বেশিক্ষণ যায় না| আস্তে আস্তে উঠি| আমাদের তক্তপোশের পাশেই একটা টেবলে আমার মোবাইলটা রাখা| তুলে দেখি রাত আড়াইটে| কোথায় কি? মাথা ব্যাথা করতে থাকে সাথে চোখ জ্বালা| উসখুশ‚ উঠি বসি| ওপাশের তক্তাপোশেও কেউ উঠেছে| মনে হল গোরাদা| সবাই মোটামুটি উঠেই পরেছে| অন্ধকারেই আমরা একটা বিশেষ ব্যাপার নিয়ে হাসাহাসি করি| সোমা তখনও গভীর ঘুমে| ধেবরা হয়ে থাকা কাজল যেন চোখের তলায় পলি ফেলেছে| সোমা যাই সাজুক না সাজুক সারাটাদিন চোখে মোটা করে কাজল লাগিয়ে থাকে| মনে হয় ঘুমোতে যাবার আগেও তোলে না| আর তুললেও ওঠে না| স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে| দীপঙ্কর বেচারা আর উঠতে পারে না| নৃপেনদা এমন চেপে ধরে তাকে ঘুমোচ্ছে‚ তার ওপর ঠোঁটে আঁটা খিল‚ আমাদের ঘর কাঁপানো হাসি শুনে নৃপেনদা উঠে পড়ে| এই নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ চলে আমাদের হাসাহাসি| ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে| আমরা ভোর থাকতেই তৈরি হয়ে নিতে থাকি| এইসময় কলে ভালো জলও ছিল| বেশিরভাগই ঘুমোচ্ছে| চান করি না‚ পরে করব‚ এত সকালে গরম জল কোথায় পাব| লাগেজ নিয়ে আমরা নীচে নেমে আসি| শ্যামলদা সবাইকে চা খাওয়ায়| অফিসিয়াল কাজ সেরে আমরা বেরিয়ে পরি পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে| দিল্লীকালীবাড়ির অনেককিছু ভালো লাগেনি যেমন ‚ তেমন একটা রাতকে স্মরণীয় করে রেখেছে| ঐ রাতটা আমারা খুব এনজয় করে কাটিয়েছিলাম| তার সবটাই এখানে খুলে লেখা গেল না| গতদিনের সব অভিযোগ‚ বিরক্তি কেটে গিয়েছিল| মনে হয়েছিল‚ সব অভিজ্ঞতাই জীবনে থাকা ভালো|
মনোজ ভট্টাচার্য
বাওয়ালির রাজবাড়িতে ! আমাদের আশেপাশে কত না জানা অজানা জায়গা আছে – কিছু দেখা কিছু বা অদেখা ! তারই মধ্যে আমরা ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পৌঁছে গেলাম – বজবজের বাওয়ালি রাজবাড়িতে ! আগে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিতে হয় ! কারন ভেতরে ঢুকতে হলে লাঞ্চ করতে হবে ! যারা জঙ্গলে মধু আহরন ও কাঠ আনতে যায় - তাদেরি সাধারনত বাওয়ালি বলে । এই বাওয়ালি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এই অঞ্চলে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বসবাস করছে ! প্রায় সতের শতকে সম্রাট আকবর তার এক বিশ্বস্ত কর্মচারী বাসুদেব রায়কে বাওয়ালীর আঞ্চলিক শাসনকর্তা করে পাঠিয়েছিল । পরবর্তীকালে তারই এক উত্তরাধিকার হরনন্দ মণ্ডল এখানে বাওয়ালী সম্প্রদায়ের ওপর কর্তৃত্ব করে ও জমিদারী পত্তন করে । ব্রিটিশ ভারত দখলের পর এই জমিদারেরা ব্রিটিশদের অধিনতা স্বীকার করে নিয়ে জমিদারি বজায় রাখে ! আমরা বাওয়ালী রাজবাড়িতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তি রঙের শাড়ী পরিহিতা কয়েকটি মেয়ে দোর-গোড়াতেই আমাদের চন্দনের টিপ পড়িয়ে বরন করে নিল ! – উজ্জয়নীতেও একটা হোটেলে – মালা টিপ পড়িয়ে বরন করেছিল বাসশুদ্ধু সবাইকে ! – সে যাইহোক, রাজবাড়ি বলে কথা ! ব্যাপার-স্যাপার একটু রাজকীয় তো হতেই পারে ! লক্ষ্য করলাম – একটু বেশিই খাতির করা হচ্ছে আমাদের ! মানে - অন্তত ছ সাতজন বাসন্তী শাড়ী, পাঁচ-ছ জন টাই-সুট পড়া কম বয়েসী কর্মচারী সমানে আমাদের তত্ত্বাবধান করছে । দুজন আমাদের নিয়ে গেল ওপর তলায়, বাইরে বাগানে । সেখানে আছে বিরাট প্যাভেলিয়ান – প্রায় দু-আড়াই শো জন লোককে বসিয়ে খাওয়ান যেতে পারে । ওদিকে একটা সুইমিং পুল, তার পাশেই আছে রৌদ্র স্নান করার ফ্ল্যাট সোফা । তার পেছনে মনে হল রান্না ঘর ! আমাদের সঙ্গে গোটা চারেক রাজ হাঁস সমানে ঘুরছে ! আর এদিক ওদিক বেশ কিছু দেশী ও বিদেশী অতিথি বসে আছে রোদ্দুরে ! একতলায় একদিকে ওদের অফিশ । বলল – আগে নাকি এখানে কারাগার ছিল ! জায়গাটা বেশ অন্ধকার । আর দেওয়ালগুলো যে কী পুরু ! – এখন সেখানে প্রচুর সোফা ও কিছু ফ্যান্সি আসবাব রাখা আছে ! – অফিশ ঘরে রয়েছে কম্পিউটারের সরঞ্জাম । আর গোটা আস্টেক টেবিলে কম্পিউটার রানিং অবস্থায় ! – সি সি টিভি ! – কেন জানিনা – ব্যাপার স্যাপার দেখে জেমস বন্ডের সিনেমার কথা মনে পড়ে যায় ! প্রায় দেড়টা নাগাদ আমাদের খাবার টেবিলে ডেকে নিয়ে যাওয়া হল । - বিরাট দর-দালান । সেটা ভাগ করে দুদিকে ডাইনিং স্পেস করা হয়েছে ! দুদিকে পঁচিশ পঁচিশ করে চার সিটের টেবিল । - এককালে এখানে নিশ্চয় দুর্গা-পুজো হত ! আজ আমাদের পেট পুজো হচ্ছে ! সিটে বসতেই চোখে পড়ল জানলার বাইরে একটা মন্দিরের চুড়া – ভাঙ্গা-চোরা ! এখানে নাকি অনেকগুলো মন্দির আছে – রাজবাড়িকে ঘিরে ! কিন্তু যেগুলো চোখে পড়ল – সবই ভাঙ্গা – গাছ গজিয়ে গেছে ! দেখে মনে হল না – কেউ পুজো-টুজো দেয় ! – শুনলাম সন্ধ্যে বেলায় নাকি আরতি হয় ! কোন ঠাকুরের – কেউ জানেনা ! আগে যেহেতু এখানে পুজো হত – তাই আরতি হয় ! এখানে দ্রষ্টব্য আছে অনেক কিছু – যদিও আমাদের রাজবাড়ির আদর খেতে খেতে সময় চলে গেছে – দেখা কিছুই হয় নি ! স্বামী বিবেকানন্দ চিকাগো থেকে ফিরে আসার পরেই ১৮৯৭ সালে বজবজে তাঁকে সম্বর্ধনা জানানো হয় ! তারপর তিনি বজবজের ফেরিঘাট থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন ! এখানেই আবার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কিছু ইতিহাসও আছে ! যেমন কোমাগাতা মারু জাহাজের ঘটনা উল্লেখযোগ্য ! ১৯১৪ সালে - শিখ নেতা গুরদিথ সিংএর নেতৃত্বে ১৯ জন সহযোদ্ধাকে ব্রিটিশরা গুলি করে হত্যা করে ! এখানে হুগলী নদীর ধারে তার একটি স্মারক আছে ! এখানকার জমিদাররা বেশ কিছু রাধাকৃষ্ণ জিউর মন্দির তৈরি করেছে ! – এছাড়াও অছিপুরে ১৭১৮ সালে তৈরি একটা চীনা মন্দিরও আছে । রাজাদের শেষ সলতে আমাদের সঙ্গে দেখা করে অনেক গল্প করলেন ! ওদের একটি মেয়ে খুব কম বয়েসে মারা গেছে । তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দের জন্মোৎসব উপলক্ষে সাতদিন ধরে একটি সঞ্চারি মেলা হয় ! নানারকম একাডেমীক কর্মশালা হয় ! খুব লোকসমাগম হয় ! – সেই সুত্রে – আমাদেরও নিমন্ত্রন হয়ে গেল ! শেষ কথাটা যাই বলে – লাঞ্চের ডিশে সতেরোটা পদ ! এবং জন প্রতি দাম মাত্র - বারো শো পঞ্চাশ টাকা ! – রাত্তিরে থাকলে সাত হাজার টাকা প্রতি ঘর ! – টাকার জন্যে চিন্তা নেই – রাজবাড়ি ক্রেডিট কার্ড নেয় ! মনোজ
মনোজ ভট্টাচার্য
সুন্দরবনে দেড় দিন ! বনবিবি বা বনদেবী – সুন্দরবন জল জঙ্গলের একচ্ছত্র দেবী – যার কাছে মুসলমান হিন্দু সবাই মাথা নত করে – পুজো দেয় ! বনবিবি সমস্ত জঙ্গলকে শাসন করে ! যারা মধু আনতে যায় বা কাঠ আনতে যায় তারা প্রার্থনা যাতে দক্ষিণ রায়ের এলাকা থেকে নির্বিঘ্নে প্রত্যাবর্তন করতে পারে ! কথিত আছে মক্কা থেকে আগত বেরহিম ( ইব্রাহিম ) নামে এক ফকিরের অপুত্রক প্রথমা স্ত্রী ফুলবিবির কাছে দ্বিতীয় বিয়ের জন্যে অনুমতি চাইলে – ফুলবিবি একটা সর্ত দেয় । কি সেই সর্ত ! – গোলাববিবির কোন সন্তান হলে তাকে জঙ্গলে নির্বাসন দিতে হবে ! সেই মতো গোলাববিবি সন্তানসম্ভবা হলে তাকে জঙ্গলে রেখে আসা হয় । তার দুই সন্তান হয় – কন্যা বনবিবি ও পুত্র শা-জংলি ! – পরবর্তী কালে বেরাহিম অনুতাপবশত বনবিবিদের ফিরিয়ে আনতে গেলেও – তারা কেউই বন ছেড়ে ফিরতে রাজি হয় নি ! জঙ্গলের মানুষদের ওপর দক্ষিণ রায়ের অত্যাচারে ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বনবিবি – এমনকি তার মা গুলাববিবির সঙ্গেও ফিরতে চায় নি ! তার ভাইও দিদির সঙ্গে থেকে যায় ! মানুষদের সংগ্রামে সামিল হয় ! দক্ষিণ রায়ের মধু ও কাঠ আহরণকারী মানুষের ওপর ক্রমশ বাড়তে থাকায় – তারা মা-বনবিবির পুজা করতে থাকে ! এতে দক্ষিণ রায়ের আরও ক্রোধ হয় ও বনবিবির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্যত হয় ! কিন্তু তার মা নারায়নী দেবী তাকে নিরস্ত করে এই বলে যে - কেবলমাত্র মেয়েরাই মেয়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে ! বনবিবির সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত করতে না পেরে নারায়নী দেবী শেষ পর্যন্ত সন্ধি করে ও বনবিবিকে সই বলে সম্বোধন করে ! তারপর থেকে বনবিবি ও দক্ষিণ রায় – দুজনেই পুজা পেতে থাকে ! কিন্তু দক্ষিণ রায় খুব খুসী হয় নি এই সমঝোতায় । সুযোগ পেলেই বনবিবির অনুগামীদের ওপর অত্যাচার করত ! এই সময়ে দুখী বলে মাওলিদের একজন তার মায়ের সঙ্গে বাস করত এখানে । দুখীর বাবা মারা গেছিল বাঘের থাবায় । দুখীর ধনি-চাচা নামে এক কাকা এসে জঙ্গলে তাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইল !- মায়ের অশ্রুজলসিক্ত বাধা স্বত্বেও দুখী ধনী চাচার সঙ্গে বেরিয়ে যায় । পথে কোন জায়গায় যথারীতি দক্ষিণ রায়ের ফাঁদে পড়ে ওদের দল । দক্ষিণ রায় বাঘের রূপ ধরে এসে ধনী চাচাকে বলে দুখীকে কেদোখালি বলে গভীর জঙ্গলে রেখে চলে যেতে – তাহলে ওরা যথেষ্ট মধু ও কাঠ নিয়ে আসতে পারবে । - দুখী কিন্তু ঘুমের মধ্যেও এই কথা শুনতে পায় ! ভয়ের চোটে দুখী মায়ের নাম করে কাঁদতে থাকে ! তখন তার মনে পড়ে যায় – তার মা তাকে বিপদে পড়লে বনবিবি দেবীকে ডাকতে বলেছিল । ধনি চাচা তার লোকজনকে নিয়ে মধু ও কাঠ নিয়ে আসার সময়ে ঐ দ্বীপে মধু ভর্তি নদী দেখেছিলো । তাই ঐ জায়গার আরেক নাম মধু-পানী ! এদিকে বনবিবি তো তার ভক্তের আহ্বান শুনতে পেয়ে তার ভাই শা-জংলিকে নিয়ে দক্ষিণ রায়কে আক্রমন করতে এলো । অনেকদিন ধরে এই যুদ্ধ চলার পর অবশেষে দক্ষিণ রায় আত্মসমর্পণ করে ! এই গল্পের ভিন্ন রূপ ও ব্যাখ্যাও আছে !তবে এই পালাটাই বেশ জনপ্রিয় ! কেন এই ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলোর ব্যাখ্যান ! কারন এবার আমাদের যাত্রা হল সুন্দরবনে ! তাও মাত্র দেড় দিন ! পশ্চিমবঙ্গ সরকারী লঞ্চে চিত্ররেখায় শনিবার বেলা বারোটা নাগাদ শুরু ! চিত্ররেখাকে দেখে তো আমাদের দারুন লাগলো ! লঞ্চ বা ক্রুজের ছোট জাহাজও অবশ্য এর চেয়ে অনেক গুন বড় ও আরামপ্রদ ! – কিন্তু এখানে এই পরিসরে এরও অনেক আকর্ষণ আছে বৈকি ! আমাদের কেবিন বুক করা । ভেবেছিলাম কেবিন ভাল – একদম আলাদা ! আলাদাই বটে ! একতলার ডেক পেরিয়ে জলের পাশ দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ! প্রায় লঞ্চের বাইরে – ঠেলে বাইরে জলে ফেলে দেওয়া আর কি ! কিন্তু আজকের ট্রিপে চল্লিশ জনের স্থানে মাত্র চোদ্দ জন ! – অঢেল জায়গা ! নিচে ওপরে – বিশেষ করে ডেকে আমাদের সবার বসার বদলে ফুটবল খেলতেও পারতাম ! কিন্তু ডেকে বসে বসে সময় কাটানো – আহা ! কোথাও দৌড়নো নেই – কোথাও হেঁটে গিয়ে কোন কিছু দেখা নেই ! শুধু বিশ্রাম – বাংলায় যাকে বলে রিল্যাক্স ! – আমরা চারজন – ওরা চারজন – তারা চারজন – আর একটি দম্পতি ! – সামনে অনন্ত জলরাশি – বিরাট বিস্তৃত নদী - ! একটা নদী থেকে আরেকটা নদী ! কয়েকটা নদী ছাড়া বেশ কয়েকটা নদীর নামই জানিনা ! – আর দূরে দূরে শুধু বন – বনানি – বনান্তর ! সোনাখালি থেকে লঞ্চ ছাড়ল দুপুরে । তার আগে বাসে আসতে আসতে আমাদের ব্রেক ফাস্ট ইতিমধ্যেই সারা ! – লঞ্চে উঠেই আবার লাঞ্চ – সেও বেশ উপাদেয় ! ঘণ্টা খানেক গিয়ে সজনেখালি ও সুধন্যখালি । খুব সম্ভবত নদীর নাম – খালি ! কারন বেশিরভাগ নদীর পদবীই খালি ! খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে ঝাপিয়ে এলো নদীর বুকে ! – আমরা তখন ওপরে ডেকে বসে স্ন্যাক্স খাচ্ছি । আমরা যেমন চিত্ররেখা লঞ্চে চরেছি - তেমনি আরও একটা লঞ্চ সর্বজয়া । আগের দিন ছেড়েছে – কোনভাবে সেও আমাদের প্রায় সাথে-সাথে আগেপিছে চলেছে ! রাতের অন্ধকারে ঐ লঞ্চের আলো নদীর বুকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে ! লঞ্চে যখন অত জায়গা – তখন আমরা ঐ কেবিনে বন্দীত্ব যাপন করি কেন ! সোজা চলে এলাম ডেকে ! সবার সঙ্গে – সবার মাঝে ! এখানেই রাত কাটাই ! পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল – বিশ্বাস করুন – বেড-টিএর ডাকে ! আহা কি মধুর সে ডাক – মুখের কাছে গরম চা ! সকালে যারা নিজেরা চা করে খায় – তাদের কাছে – বেড-টিয়ের ডাক ! সকালে ভরা জোয়ার । ওদিকে লঞ্চ তখন চলতে আরম্ভ করেছে ! একটু পরেই এলো ব্রেক ফাস্ট ! সে এক আই ঢাই ব্যাপার ! ফুলকো লুচি আলুর দম মিষ্টি ফ্রুট স্যালাড – ইত্যাদি ইত্যাদি ! এবার এসে গেল – দো-বাঁকি ! এখানে ব্যঘ্র প্রকল্প ! ও, হ্যাঁ ! সুন্দরবনে নাকি একশ চল্লিশটা বাঘও আছে ! রোজই টিভিতে কাগজে দেখি – বাঘে ধরেছে ! শুনি বটে – বাঘে-কুমিরে লড়াই ! – আমরা তো হাঁটতে হাঁটতে ওপরের ওয়াকওয়ে ধরে একদম শেষ পর্যন্ত গেছি ! গাইডের কথা অনুযায়ী গতকালই নাকি বাঘে হরিন ধরেছিল ! – একথা তো আমরা আগে যেবার এসেছি – তখনও শুনেছি – মানে চল্লিশ বছর আগেকার কথা ! আমাদের আগে আগে সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায় কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে সুন্দরি নামে একটা সুদৃশ্য লঞ্চে ঘুরছেন ! – একদম নামার সময়ে আমাদের কাঁধে হাত দিয়ে ছবিও তুললেন ! প্রকৃতপক্ষে অন্য একটা গ্রুপের এক মহিলা ছবিটা তুলেছে ! লঞ্চে ফিরেই খাবারের তাড়া – তখন সাড়ে এগারোটা ! লঞ্চ ফিরবে সোনাখালি দেড়টায় – তাই - ! অগত্যা - ! সোনাখালিতে ফিরে আমাদের জলের সঙ্গে বনের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল ! নাম না জানা কত নদী – মাতলা, কালি, বিদ্যা, ইত্যাদি ! - তারপর আবার আমাদের বাস ! আমরা বাঘ বা কুমীর দেখতে পাইনি ঠিক কথা – কিন্তু তার জন্যে আমাদের কোন আফসোস নেই ! এই যে কলকাতার জীবন থেকে হঠাৎ দুটো দিন ছিটকে এলাম – সেই মুক্তির স্বাদ পাবো কোথায় ! মনোজ
সুকান্ত ঘোষ
ইস্কুলের সেক্রেটারীর কি মাহাত্ম্য সে বোঝার বয়স তখনো হয় নি, কিন্তু পটল বিষয়ীর মহিমা বোঝার মত বয়স হয়ে গিয়েছিল। সবে আনন্দমার্গ ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মেমারী বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে ক্লাস ফাইভে ঢুকেছি – সেক্রেটারী কি জিনিস জানা নেই – পটল বিষয়ীকে চিনি না। এমন অবস্থায় দুরদার করে চলে এল হাইস্কুলে আমার প্রথম সরস্বতী পুজো আর তখনি একদিন দুম্ করে সেক্রেটারী পটল বিষয়ীর ব্যাপারটা ক্লীয়ার হয়ে গেল। এক সিনিয়ার দাদা ফিসফাস করে আমাদের জানালো পটল বিষয়ীর সেক্রেটারী রয়ে যাবার পিছনে মূল কারণ হচ্ছে তেল। আমরা জানতে চাইলাম ‘রয়ে’ যাওয়া মানে কি? দাদা বলল, আরে বোকা, গাব গাছের আঠা দেখেছিস? কোনদিন জামায় লাগিয়েছিস? ওই গাব আঠা যেমন জামায় লেগে থাকে, বারবার কাচলেও যায় না, তাকেই বলে ‘রয়ে’ যাওয়া। দাদা আরো জানালো যে তার দাদার আমলেও নাকি ইস্কুলের সেক্রেটারী ছিল পটল বিষয়ী – এমনকি সে তার বাবাকে জিঞ্জেস করলে বাবা জানায়, ঠিক মনে করতে পারছি না, তবে মনে হয় আমাদের সময়েও পটল বিষয়ীয় ছিল। এতো প্রশ্নের পর আর আমরা তেল কি ভাবে, কোথায় পটল বিষয়ী কাজে লাগায় জানার সাহস পেলাম না। অতঃপর আমাদের মন ছুঁক ছুঁক – অন্য দাদাদের কাছে ঘুর ঘুর করছি। একদিন সাহস করে আমরা জিঞ্জেস করে ফেললাম – দাদা, ওই পটল বিষয়ী আর তেলের ব্যাপারটা যদি আমাদের শিখিয়ে দাও। যা জানা গেল তা হল এই – প্রতি বার ইস্কুলের সরস্বতী পুজোর সময় লুচি ভাজার তেলটা পটল বিষয়ী দান করে। তখনো আমাদের দিকে ডোনেশন ব্যাপারটা তেমন চালু হয় নি – সবাই দান করত। আমাদের ক্লাসমেট (বাই দি ওয়ে আমাদের তখন ক্লাসমেটও ছিল না – বন্ধু ছিল। তবে সেই বিষয়ক আঁতেল মার্কা লেখা পরে হবে) দেবুর বাবার মেমারী স্টেশন বাজারে মনোহারী দোকান ছিল। তাই তেল, গুড়, চাল এই সব ম্যাসিভ স্কেলের জিনিস সম্পর্কে দেবুর হালকা ধারণা ছিল। দেবু প্রশ্ন করল – সব লুচি ভাজতে যা তেল লাগবে সব পটল দেবে? সে তো অনেক লুচি গো! প্রশ্ন শুনে সিনিয়র ঘাবড়ে গেল – সে তার সিনিয়র ডেকে আনলো। ঠিক সমাধান পাওয়া গেল না প্রশ্নের – কেউ বলল পটল মাত্র এক টিন তেল দেয়, কেউ বলল দু-টিন। সব লুচি ভাজতে মোট কয় টিন তেল লাগে তার আইডিয়া না থাকার জন্য এই প্রশ্ন অমিমাংসিত থেকে গেল। কিন্তু দেবু মেমারীর ছেলে – আমি তো আর ঠিক মেমারীর নয়, মেমারীর পাশের গ্রাম নিমোর। তেল নিয়ে খটকা লাগার আগে, আমার আরো বেসিক খটকা ছিল – সরস্বতী পুজোর সাথে লুচির কি সম্পর্ক! তার পর এল বিষ্ময় – পুজোতে নাকি স্কুলের সব ছেলেকে লুচি খাওয়ানো হয়! ভাবা যায়! আশে পাশের ইস্কুলের কোন কোনটায় খিচুড়ি খাওয়ায় শুনেছি – যেমন রসুলপুর স্কুল। তা বলে লুচি! জাষ্ট ভাবতে পারছিলাম না আমার সেই ক্ষুদ্র ব্রেন দিয়ে। আরো পরে জেনেছি যে মেমারী স্কুলের এই লুচি খাওয়া ব্যাপারটায় একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব লুকিয়ে আছে – সেই গর্ব রসুলপুর স্কুলকে টেক্কা দেবার আবেশ। মাধ্যমিকের রেজাল্টে মেমারী সব সময় রসুলপুরকে টেক্কা দিতে পারত না বলে আমরা রিভেঞ্জ নিতাম এই বলে যে, আমাদের সরস্বতী পুজোয় লুচি হয়, তোদের হয়! মেনু খুবই সিম্পল – লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম, বোঁদে, চাটনী এবং দুটো করে রসগোল্লা। সে এক আলাদা স্বর্গীয় স্বাদ – লুচি ঠান্ডা হয়ে জুতোর সুকতলা হয়ে গেছে, কোই পরোয়া নেই – আলুর দমে আলুর থেকে খোসা বেশী ভাসছে, তাই সই – বোঁদে আগের দিন থেকে ক্লাস সিক্স সেকশন ‘এ’ মেঝেতে পড়ে থেকে গন্ধ হয়ে গেছে, তাতে যেন স্বাদ আরো খুলেছে। তবে পটল বিষয়ী শুধুই একা দান করত বললে ভুল বলা হবে – পটল বাবুর দেখাদেখি মেমারির আরো বিজনেস ম্যানেরা এগিয়ে এল – নারান কুন্ডুর আলুর গদি থেকে আওয়াজ এল, ওরে দু বস্তা আলু নিয়ে যাস। সোমেশ্বর তলার পাশে কাঁচাবাজারে যে ফুল কপি বিক্রী হল না, সেগুলি ফেলে দেবার বদলে বলা হল – নিয়ে যাস রে। অবশ্য সেই বাতিল ফুলকপির ঝুড়ির উপরে ছড়ান থাকতো কিছু পুষ্ট ফুলকপি – ঠিক যেমন ফুলসজ্জার বিছানায় ছড়ানো থাকে প্রথাগত ভাবে গোপালের পাপড়ি – সবই সিম্বলিক ব্যাপার। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত শুধুই খেয়ে চলে আসা – ক্লাস নাইন থেকে যুক্ত হল ফেরার পথে মেমারী রসিকলাল স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়ের পথে উঁকি ঝুঁকি। তবে সেই কৈশোরের প্রেম অঙ্কুরদগমের থেকেও বেশী চার্মিং ছিল স্কুলে সরস্বতী পূজোর দায়িত্ব সামিল হওয়া, বিশেষ করে ভাঁড়ারে ঢোকার অধিকার। ক্লাশের মনিটর এবং ‘ফার্ষ্ট’ বয় হবার জন্য স্যারদের দেওয়া রোল গুলির মধ্যে কোনটা আমি চুজ্ করব সেই নিয়ে চ্যালেঞ্জ আসে নি কোনদিন। তা আমার ভোজ এবং পুজোর কম্বিনেশানের মধ্যে ভোজ-পুজোর অর্ডার অব্ প্রেফারেন্সটাই সহি মনে হয়েছিল সেই বয়েস থেকেই পুজো-ভোজ এই অর্ডারের থেকে। ফলতঃ রোল নাম্বার ওয়ান আমি গেলাম ভাঁড়ারের দিকে, আর রাম-শ্যাম-যদু-মধু সহ নানা রোল নাম্বার গেল পুজার সাজ সরঞ্জাম সহ কদমা, তিলে প্যাটালি, মুড়কি ইত্যাদি ইত্যাদি কেনার দিকে। পুজোর দিকে সকাল সকাল স্কুলে গিয়ে দেখলাম অলরেডি অ্যাসেম্বলি লাইন চালু হয়ে গ্যাছে – সবাই কেমন তেল দেওয়া মেশিনের মত খাবার তৈরীতে লেগে গেছে। তখনই প্রায় ক্লাশ সিক্সের ‘বি’ সেকশনের ঘরের অর্ধেক খবরের কাগজ বিছানো আর প্রায় জানালা পর্যন্ত লুচি ভেজে ভরিয়ে তোলা হয়েছে। আমার তো সেই দেখে প্রায় ইয়ে ট্যাঁকে উঠে যাবার অবস্থা। আমি বাসুদেব স্যারকে বললাম – ইহা কি হইয়াছে? বাসুদেব স্যার বলল, ইহা হইয়াছে কারণ কোন এক জ্ঞানী এবং সমাজসংস্করক ব্যক্তি বিদ্যালয়ে পুজোরে খাবারের লুচি বিতরণের পলিসিতে চেঞ্জ আনেন। আগে নাকি জন প্রতি আটটা মত লুচিতে সীমাবদ্ধ থাকত ব্যাপার – কিন্তু তিনি বলিলেন যে সবাইকে ভর-পেট লুচি খাওয়ানো হবে, অর্থাৎ ঢালাও লুচি পরিবেশিত হবে। এর ফলে নাকি ওই আটটা লুচির সসীম পরিসীমা ইলাষ্টিক ব্যান্ডের মত বাড়তে থাকে। আমি সন্দেহের চোখে বললাম স্যারকে, কত আর বাড়বে স্যার! বাসুদেব স্যার আমার অজ্ঞানতা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখে জানালেন রবি হেমব্রম চল্লিশ, সজল ক্ষেত্রপাল সাঁইত্রিশ এমন সব স্ট্যাটিস্টিক্স। বললা, ওরা তো স্যার খাবেই। স্যার বললেন, ওরে শুধু ওরা নয়, গড়ে প্রায় কুড়িটা করে লুচি ধরতে হবে পার হেড। তোর কাকার ছেলে কটা লুচি খায় তুই জানিস না? আবার ওদের দোষ দিচ্ছিস? তবে কিনা আগে থেকে যতই বানিয়ে রাখিস, ঠিক সময়ে দেখবি লুচি দিয়ে যোগান দিতে পারছিস না। স্যারের কথা সঠিক প্রমাণিত হল – সেই পাহাড় প্রমাণ লুচি কয়েক ব্যাচের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। তারপর পুরো বলিুডি-হলিউডি সিনেমার জেলের মধ্যে পাবলিকের থালা বাজানোর মতন দৃশ্য। লুচির ঝুড়ি নিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্রই, দাদা এই দিকে, দাদা এই দিকে – বলে টেবিল বাজিয়ে চিৎকার। সে এক রণক্ষেত্র প্রায়। যাই হোক বাকি তেমন কিছু গল্প নেই – প্রতি বছর সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। রসিকলাল বালিকা বিদ্যালয় আমাদের টেক্কা দিয়েছিল এই মর্মে যে, ওদের পুজোতে লুচির সাথে ফ্রায়েড রাইস পরিবেশন করে। কিন্তু রসিকলালে তো আর ছিল না রবি হেমব্রম, সজল ক্ষেত্রপাল বা আমার কাকার ছেলেরা। ওই সব পালক পালক মেয়েরা কতটা খেতে পারে সেই সম্পর্কে নিজেদের মনে একটা ধারণা তৈরী করে নিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে খাওয়া-দাওয়া বিষয়ে রসিকলালের সাথে কম্পিটিশনে ঢোকা মানে নিজেদের লেভেল নিচে নামানো। তা ফ্রায়েড রাইসের অন্তর্ভুক্তি আমাদের কনফিডেন্সে কোন টাল খাওয়াতে পারে নি। এতো গেল সরস্বতী পুজোর নিরামিষ খাওয়া – এর প্রায় উল্টোদিকে আমাদের ছোটবেলা জুড়ে ছিল আমাদের পাশের গ্রাম ‘কেজা’-র ঝাপান। কেজার ঝাপান হত জৈষ্ঠ মাসে, কালী পুজা উপলক্ষ্যে। সে নাকি বিশাল জাগ্রত কালী ছিল বা এখনো আছে। ফলে মানত দেওয়া পাঁঠা বলির হিড়িক পড়ে যেত – কেজার কালিতলায় রক্তে বন্য বয়ে যেত লিট্যারেলি। সেই অনেক অনেক দিন আগে আমাদের বাচ্ছা বেলায় প্রায় ১২০০ থেকে ১৪০০ মত পাঁঠা বলি হত পুজোর দিন সকালে। আমাদের গ্রামের অনেক পরিবারও প্রতি বছর পাঁঠা বলি দিত নিয়ম করে। প্রবলেম ছিল একটাই – একই দিনে নানা বাড়িতে নিমন্ত্রণ। কি যে লস্ হত বলে বোঝানো যেত না। এমন দিন গ্যাছে যে তিন বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়েছি এক রাতের বেলায় – প্রবলেম হয় নি, কারণ মেনু ছিল সাধারণ। ভাত, মাংস, একটা তরকারী, চাটনী আর হয়ত বা মিষ্টি। অ্যাডজাষ্ট করে খেয়ে নিলেই হত, কিন্তু কোনটা অ্যাডজাষ্ট করব সেটা ঠিক করাই ছিল মূল ব্যাপার। সাধারণত মাংস-ই থাকত মেন টারগেট, ব্যতিক্রম আমার আরেক জ্যাঠার ছেলে পিকুল। পরিবারের মধ্যে গ্রামের দিকে নিমন্ত্রণের ধরণ থাকে দুই ধরণের – খুব বেশী মেলামেশা পরিবারের মধ্যে না থাকলে নিমন্ত্রণ হয় পরিবার প্রতি একজনার। আর ক্লোজ ফ্যামিলিদের মধ্যে নিমন্ত্রণ হাঁড়ি-বাড়ন্ত বা কেবল বউ-দের, এমন ভাবেও হয়। পরিবার প্রতি একজনা নিমন্ত্রণ ক্যাটাগরী সামলাতাম আমরা তিন জন তিন ভাইয়ের ফ্যামিলি থাকে। বড় দাদুর পরিবার থেকে গোপালদা, ছোটদাদুর দিক থেকে পিকুল এবং মেজো অর্থাৎ আমার দাদুর পরিবার থেকে আমি। আমাদের এই তিনজনের টিমকে গ্রামের সবাই এমনকি পাশের গ্রামের অনেকেও চিনত। এমনভাবেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে যে- “গোপাল, পিকুল আর সুকানের নেমত্তন্ন রইল গো”। কেউ কিছু মনে করে নি – নিজেদের নাম দিয়ে নেমত্তন্ন পেয়ে কলার যতটা উঁচু হত, পরবর্তী জীবনে বেশ কিছু নামজাদা অ্যাকাডেমিক পুরষ্কার পেয়েও কলার ততটা ওঠে নি। তবে তার কারণ বুঝতে গেলে গ্রামের দিকে লোকেদের আগেকার দিনে নিমন্ত্রণ বিষয়ক সাইকোলজি কেমন ভাবে কাজ করত জেনে নিতে হবে। আপ্যায়ন ছিল খুবই এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার – আর কে আপ্যায়ণ করছে সেটা। হতে পারে তুমি প্রভুত বড়লোক – কিন্তু নেমন্তন্নের দিন এই এক্সপেক্টেশন থাকবে যে তুমি বা তোমার কোন ইমিডিয়েট ফ্যামিলির সিনিয়র মেম্বার আপ্যায়ণ করবে। কিছুই না – জাষ্ট এই বলা যে, আরে এসো এসো বা আয়, আয় বা কখন এলি, পরের ব্যাচেই তা হলে বসে পড়িস। এমনো হয়েছে যে আমার কাকা অনেক ক্ষণ নিমন্ত্রণ বাড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে আপ্যায়ণ না পেয়ে না খেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। আপ্যায়ন ছাড়া আরোও একটা ব্যাপার ছিল আমাদের দিকে তা হল, সামনা-সামনি নিমন্ত্রণ করা। মোবাইল ফোন তো তখন ছিল না, এমনি গ্রামে ঘরে টেলিফোনও তেমন বেশী কিছু চল ছিল না। ফলে নিমন্ত্রণ করার সহজ পথ ছিল চিঠি পাঠানো। কিন্তু শুধু চিঠি পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ খুব একটা উদার চোখে দেখা হত না। তবে সেই সব জটিল সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা অন্য কোন খানে করা যাবে ক্ষণ। এই পুজোর খাওয়ার সাথে যে সামাজিক অভ্যাস যুক্ত ছিল তা হল – ডাকতে যাওয়া। অর্থাৎ কখন খেতে যেতে হবে সেটা বলতে আসা। সেই কাজটা করত আমাদের গ্রামের চিঠি বিলি করার পিওন মিতা ময়রা (ছেলে)। এমনি দিন গেছে যে আমি, গোপালদা, আর পিকুল বিকেল থেকে না খেয়ে ড্রেস করে বসে আছে কখন মিতা ময়রা ডাকতে আসবে – আসে আসে করে রাত নটার সময় মিতা ময়রা এল – তার পর আমাদের খাওয়া যাওয়া। গোপালদার সাথে খেতে গিয়ে যতটাই আনন্দ, পিকুল ততটাই খামতি ডেকে আনত খাওয়া ব্যালেন্সে। আমার জানামতে পিকুল খুব বেশী দিন তরকারীর পরিসীমা ছাড়িয়ে মাংসে গন্ডীতে পৌঁছতে পারে নি। বেচারা তরকারী খেতে এত বেশী ভালোবসত যে মাংস পরিবেশীত হবার আগেই ডাল-তরকারী খেয়ে পিকুল পেট ভরিয়ে হাত তুলে ঢেঁকুর তুলত। গোপালদা ছিল নিঃশব্দের কারিগর – বেশি কথা বার্তা বলতে পছন্দ করত না, মন থাকত মূল বিষয়ে। আমাদের মধ্যে একমাত্র গোপালদাই তিনটি নিমন্ত্রণ বাড়ি খেত কোনটাতেই খাবার পরিমান না কমিয়ে! ফিজিক্সের লজিকে যে কিছু গোলামাল আছে তা আমি ‘ট্রাবল উইথ ফিজিক্স’ বই পড়ার আগে গোপালদার খাওয়া দেখেই শিখতে পেরেছিলাম। এমনকি এখন ভাবতে বসে দেখি হয়ত লিমিট থিওরীর লিমিটেশনের উদাহরনও ছিল গোপালদার খাওয়া। গোপালদার গোটা নিমো গ্রামে রিপিট নিমন্ত্রণ সাড়ার একমাত্র কম্পিটিশন ছিল মোড়লদের শৈলেন। শৈলেনের ছেলের পেটে বলির পাঁঠার মাংস ঠিক হজম না হবার জন্য ফ্যামিলির সব দাবাওয়াত সে নিজের সারত। কিন্তু পুজোর বলির মাংস রান্না এত সহজ নয় – খুব আধুনিক কালের বৌমারা অনেক ফাইট দিয়ে তাদের রেসপেকটিভ হেঁসেলে ‘মিট মশালা’ জাতীয় জিনিস ঢুকিয়েছে। বলির মাংস রান্না হবে ঝোল-ঝোল – কথায় বলে কচি পাঁঠার ঝোল। সেই ঝোলকে কনটামিনেটেড করা অনেক শ্বাশুরী ঠিক চোখে দেখে নি – নয় তুমি থাকবে হেঁসেলে, নয়ত আমি। এই বলে অনেক শ্বাশুরী সন্ধ্যের ভাঁটে বা টি ভি সিরিয়ালে মুখ ডোবালো। শ্বাশুড়ি-বৌমা ব্যাপার মিটলেও, যে জিনিস মেটার চান্স ছিল না, তা হলে একটা মাত্র পাঁঠা বলি দিয়ে নিমন্ত্রিত সবার পেট ভরানো। বলি দেবার জন্য পাঁঠা সিলেক্ট করা হত সাধারণত দশ কেজির নীচে – সাত থেকে আট কিলো অপ্টিমাম। মানে গিয়ে সলিড মাংস দাঁড়াতো পাঁচ থেকে সাত কেজি। পাঁঠার মাংসে প্রতি কেজিতে পাঁচ জন লোক খাবে সেই হিসাবে ২৫ থেকে ৩৫ জন লোকের মাংসের জোগান দিতে পারত সেই শহীদ হয়ে যাওয়া পাঁঠা। তাহলে কি হবে? আরে ফ্যামিলির লোকই তো ২০ জন! যারা গোঁড়া ধর্ম ভক্ত তারা বলি দিতে লাগল একাধিক পাঁঠা, আর বাকিরা চালু করল ‘কনটামিনেশন’। মানে হল গিয়ে বাজার থেকে পাঁঠার মাংস কিনে নিয়ে এসে মিশিয়ে দেওয়া। আমার বাড়িতেও তাই চালু হল – ঠাকুমা আপত্তি করলে বাবা বলল, প্রসাদ তো করে দিচ্ছি নাকি? মানে পুজোর বলির পাঁঠার মাংস মিশিয়ে দেওয়া হল কেনা মাংসের সাথে। ঠাকুমা কুঁই-কাঁই করে মেনে নিল শেষে। পুজোর পাঁঠা অনেকে বাড়িতে পালন করত – এতে পয়সার সাশ্রয় বেশী হত। কারণ বড় পাঁঠার দাম সাপ্লাই-ডিম্যান্ড এর উপর নির্ভর করে বাড়ত-কমত। আর তা ছাড়া আমাদের দিকে তেমন পাইকেরের চল ছিল না পুজোর পাঁঠা নিয়ে ডিল করার জন্য। নিজেদেরই খুঁজতে বেরুতে হত একখনি নিখুঁত পাঁঠা। নিখুঁত ব্যাপারটি কিন্তু এখানে লক্ষণীয় – পাঁঠা দাগি হয়ে গেলে কিন্তু তাকে আর বলি দেওয়া যায় না ঠাকুরের উদ্দেশ্যে। দাগী অর্থে চোট পাওয়া, গায়ে গরম জল ছুঁড়ে দেওয়া, সাপে কেটে বেঁচে যাওয়া, রেলে হালকা ধাক্কা খেয়ে প্রাণ টিকিয়ে রাখা – এই সব। তাই পাঁঠা কিনতে গিয়ে বারবার ক্লারিফাই করতে হত- হ্যাঁরে, মাল দাগী নয়ত? মানুষে মানুষে অবিশ্বাস দিন দিন বাড়তে থাকে – তাই অনেকেই নিজেরা পাঁঠা পালতে শুরু করে চোখে চোখে রাখা শুরু করল। বলির দিন যত এগিয়ে আসবে, টেনশন ততই বাড়বে। একবার স্টেশনের কালি পুজোর ঠিক আগের দিন পালিত পাঁঠা ট্রেনের তলায় চলে গেল – চারিদেকে হায় হায়। আমার বন্ধু হাবা ডিক্লেয়ার দিল যে পরের বার থেকে ব্যাক-আপ থাকবে পাঁঠার। সবাই ভেবে দেখে বলল, ঠিকই, ঠিকই – খুবই যুক্তিযুক্ত কথা। গাঁজাখোর বরুণ মাথা চুলকে বলল যে, ব্যাক-আপো যদি এক পালে থেকে মানুষ হয়, তাহলে সেই ব্যাক-আপও ফেল করতে পারে। আফটার অল পাঁঠা তো! এক জন গেলেই আরেকজন ফলো করবে দেখাদেখি। সবাই বলল এও ঠিক ঠিক। তার পর স্টেশনে পুজো কমিটি জরুরী মিটিং ডেকে ঠিক করল যে, দুই পাঁঠা পালিত হবে দুই আলাদা পালে – তাদের নিজেদের মধ্যে যেন কদাচিত সাক্ষাত না হয় এবং তারা যেন জানতে না পারে যে তারা একে অপরের ব্যাক-আপ। এক পাঁঠা গেল হাবার কাছে – অন্য পাঁঠা মানুষ হতে লাগল সুধীরের কাছে। ওই স্টেশনের কালী পুজোয় ব্যাক-আপ পাঁঠারা দুই জায়গায় মানুষ হতে থাকলেও গাঁজারু বরুণের রেকমেণ্ডশনে আরো একটা সতর্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বরুণ পরামর্শ দেয় যে, পাঁঠাদের সামনে কালী পূজো নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। পাঁঠারা নিজেরা যদি বুঝে ফেলে, তাহলে হয়ত বলির আগের দিন নিজেরা ইচ্ছে করে ইনজিওরড হয়ে যেতে পারে! প্রাণের ভয় কার আর না আছে! বরুণের কথা সবার যুক্তিযুক্ত মনে হল - এবং পুজো কমিটি ফরমান জারি করল যে পাঁঠা আশেপাশে থাকলে কালী পুজোর গল্প করা যাবে না। ফলে দেখা গেল বিকেলে স্টেশনে বসে পাবলিক পুজো নিয়ে আলোচনা সবে শুরু করেছে, এমন সময় চায়ের দোকান থেকে করিম-কা আওয়াজ দিল, অ্যাই চুপ, চুপ, পাঁঠা আসছে। দেখা গেল হাবা ছাগল চরিয়ে ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সবাই চুপ করে থাকল - অনেকে আবার এদিক ওদিক তাকাতে থাকল - পাঁঠাদের চোখের দিকে তাকাল না। ধীর লয়ে অনন্ত সময় নিয়ে পাঁঠা স্টেশন পার হলে আবার পুজোর গল্প শুরু। পাঁঠা বলি দেওয়া বেশ এক চমকপ্রদ ব্যাপার। কেজার ঝাপান ছাড়া আমাদের নিমো গ্রামের ঝাপানেও পাঁঠা বলি হত। কিন্তু আমাদের গ্রামের ঝাপান তেমন ইন-ক্লুসিভ ছিল না, অন্তত পুজো জিনিসটা। কারণ গ্রামে আরো অনেক কিছুর মতই এই ঝাপান এবং ঝাপানের জায়গা সবই ছিল আমাদের ঘোষ গুষ্টির অধিন। অর্থাৎ, পুজো করবে আমাদের বামুন, পুজো যাবে আমাদের বাড়ি থেকে, ঝাপানের তোলা তুলবে আমাদের বাড়ির লোকেরা ইত্যাদি ইত্যাদি। নিমোর ঝাপান হয় প্রতি বছরের পয়লা ভাদ্র মনসা পুজো উপলক্ষ্যে। সেই ঝাপানে অনেকে পুজো দিলেও পাঁঠা বলি হত খুব কম। পাঁঠা বলি করত কামারে – আর আন-রোমাণ্টিক ভাবে কামার আসত কামারপাড়া থেকে। এই এতো এতো বছর ধরে একই লোক আমাদের বাড়িতে বলি দিয়ে আসছে – কিন্তু আমরা প্রায় কেউই তার নাম জানি না। তাকে কামার বলেই ডাকতাম আমরা – সাকুল্যে বছরে দেখা হত দুই বার – বাড়ির দূর্গা পুজোয় সে আসত নবমীর দিন বলি দিতে। আর সেই পয়লা ভাদ্র ঝাপানে পাঁঠা বলি দিতে। তবে আমাদের বাড়ির দূর্গা নাকি নিরামিশাষী – তাই বাড়িতে নবমীর দিন বলি দেওয়া হত আখ, কলা, ছাঁচি-কুমড়ো ও শসা। সেই সবের সিম্বলিক অর্থ নিয়ে আলোচনা অন্য সময় – মূল ব্যাপার হল, বলি কিন্তু দিত কামার সেই একই রকম পেশী ফুলিয়ে। আমাদের এই ধরণা গড়ে উঠেছিল যে তিন গাছি আখ এবং একটি দশ কেজি পাঁঠা বলি দিতে সম পরিমান শারীরিক এবং মানসিক শক্তির দরকার হয়। চৈত্র মাসের শেষ চার দিন গ্রামে শিবের গাজন উপলক্ষ্যে ফল এবং ভোগ। এখানে ফল অর্থে শুধু ফল নয় – একটা দিনও বটে। গাজনের প্রথম দিনকে বলা হত মহা-হবিষ্যি, দ্বিতীয় দিন ফল, তৃতীয় দিন নীল এবং শেষ দিন ঝাঁপ সহ চরক। আমার ঘোষ বংশের পূর্বপুরুষেরা গ্রামের প্রায় সব জিনিসেই মাথা গলিয়েছেন – তাহলে এই ফল-ই বা বাকি থাকে কেন! গাজনে সন্ন্যাসীরা ফলের দিন নিজেদের বাড়িতে ফল খেতে যাবার আগে কাদের বাড়িতে ফল খাবে? অব্-কোর্স ঘোষ বাড়িতে। তবে সেই খাওয়া খুবই মনোহর লাগত আমার কাছে ছোট বেলায়। আমাদের ঠাকুর দালানে সার দিয়ে সাদা কাপড়, গলায় পৈতে এবং উত্তরীয় লাগানো সন্ন্যাসীরা বসে পড়েছে – তবে মাটিতে তো আর বসা যাবে না – আমাদের ছোটদের কাজ ছিল ছিল দুই গাছি করে খড় পেতে দেওয়া। খাবার দেওয়া হত কলাপাতায় – প্রথমে বেলের সরবত, পরে ডাল ভিজোনো সহ গুড় এবং তারপর নানা বিধ ফল। বাজারে ঐ চৈত্র মাসে যা যা ফল পাওয়া যায় সব সার্ভ করা হত। আখরোট, সবেদা, সহ সুগন্ধী জামরুল। অনেক দিন পর্যন্ত সেই সব ফল আসত আমাদের বাড়িতে ব্যাগ বা বস্তা করে কোলকাতা থেকে। বড় জ্যাঠা আমাদের দোকানের মাল বড়বাজারে কিনতে গিয়ে সেই ফলও আনত। গাজনে সন্ন্যাসীরা নিজেরা যে ভোগ রান্না করত সে আমার কাছে রহস্যই রয়ে গ্যাছে – প্রতি বার সেই ভোগ রান্না করতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলত। একবার থাকতে না পেরে ঠাকুমার কাছে অনুযোগ জানালাম – ঠাকুমা বলল, ধুর বোকা, ওটা তো ইচ্ছে করেই পুড়িয়ে ফেলা হয়। পুড়িয়ে ফেলা অর্থে এখানে সেই চালের পায়েসকে কাঠের আগুনে আঁচ দিয়ে ধরিয়ে ফেলা। সুখে থাকতে ভুতে কিলানোর মত সবাই হাঁড়ির চারিদিকে বসে অপেক্ষা করবে কখন মাল ধরে যাবে – সে এক আন-সলভেবল মিষ্ট্রি। গাজনের প্রথম তিন দিন বিকেলে সেই ভোগ রান্না হত – খেতে বেশ মিষ্টি মিষ্টি বলে আমিও বাটি হাতে লাইনে দাঁড়াতাম রন্ধন পদ্ধতি নিয়ে ডিফারেন্স অব্ ওপিনিয়ন থাকা সত্ত্বেও। গাজন শেষের পরের দিন, অর্থাৎ পয়লা বৈশাখের দিন, নিজেদের পৈতে খুলে ফেলার আগে সন্ন্যাসীরা আবার অনেক বাড়িত মুড়ি খেতে যেত। তবে ডাক পেলে তবেই যেত – আর যথারীতি আমাদের বাড়িতে সেই ডাক বরাদ্দ ছিল প্রতিবার। খুবই পাতি মেনু – মুড়ি, আলুর দম, বোঁদে এবং দুই খান রসগোল্লা। একবার আলুর দাম ভালো পাওয়ায় আলু পাইকের রায়েদের বাপি সন্ন্যাসীদের ডেকে খাওয়ালো মুড়ি এবং দুই-খান রসগোল্লার বদলে নিয়ম ভেঙে পেট ভর্তি মিষ্টী। বলল এতে করে নাকি সন্ন্যাসীদের আশীর্বাদ পাওয়া যাবে এবং ফলতঃ পরের বারে আরো বেশী লাভ আলুতে। যাদের বিশ্বাস করার তারা বিশ্বাস করল - আর বলতে নেই পরের বার থেকে সন্ন্যাসীরা এতো বেশী নিমন্ত্রণ পেতে লাগল যে মেজো জ্যাঠা বলতে বাধ্য হল, স্কাউন্ড্রেল সব – মিষ্টী খাইয়ে আশীর্বাদ কিনছে! আশীর্বাদ কেনা যেত কিনা বলতে পারব না – কিন্তু আশীর্বাদ ভিক্ষা করতে অনেক দূর দূর থেকে গাজনে সন্ন্যাসীদের কাছে আসতে দেখেছি। বিশেষ করে ‘ফল’ নিতে – ‘ফল’ নেওয়া অর্থে নিঃসন্তান মহিলারা জলে ডুব মেরে সে ভেজা কাপড়ে শিব দালানে দাঁড়িয়ে থাকত, আর সন্ন্যাসীরা ঝাঁপ মারতে মাচায় উঠার আগে নিজেদের কোঁচড় থেকে আলোচাল এবং কিছু ফল বের করে সেই সন্তান কামনায় প্রার্থনারত মহিলাদের দিত খেতে। আমাদের গ্রামের শিব নাকি বহুত জাগ্রত – দুনিয়া ট্রীটমেন্ট করে ফেল মহিলা আমাদের গ্রামে ফল নিয়ে সন্তানবতী হয়েছে এমন খবর বাজারে আছে। তাহলে আর রইল গিয়ে পীর বাবার সিন্নি – আমাদের গ্রামে হিন্দু মুসলমান সবার কাছেই সে এক আকর্ষনীয় অনুষ্টান ছিল। মাত্র এক বিকেলের ব্যাপার – পীর তলায় মালসার ছড়াছড়ি। পীর বাবার আশীর্বাদের থেকেও আমাদের কাছে ইন্টারেষ্টিং ছিল সোনা ময়রার তৈরী ছোলা-গুড় এবং গুড়-বাদাম। এতো ভুয়া ছোলা এবং বাদাম সোনা ময়রা কি ভাবে সংগ্রহ করত সে আমাদের কাছে এক বিষ্ময় ছিল। মানে সেই গুড়-বাদামের সমাহারে একটি, কেবল একটি ভালো, পুষ্ট, তেতো নয় এমন বাদাম খুঁজে পাওয়া আমাদের কাছে এক চ্যালেঞ্জ স্বরূপ ছিল। শুরু করেছিলাম সরস্বতী পুজার গল্প দিয়ে – প্রায় গল্পেই থেকে যায় নষ্টালজিয়া – আমি রোমন্থান করি আর ভাবি আমরা কেবল পিছিয়ে গেছি সময়ের সাথে – আগেকার দিন এই ছিল, এমন ছিল, কত ভালো ছিল, আন্তরিক ছিল। কিন্তু সব সময় এমন হয় না, অনেক সময় অবাক হয়ে দেখি, আমাদের গ্রাম এগিয়েও গ্যাছে। সেই বার আমষ্টারডাম থেকে এক সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে ফোন করেছি ডিউটি পালনের জন্য – কেউ ফোন ধরল না। পরের দিন জানলাম আমাদের ঘোষ পাড়ায় সেই বার থেকে ঠিক হয়েছে যে সরস্বতী পুজোর একদিন পাড়ায় কারো বাড়ি রান্না হবে না। পাড়ার সবাই একসাথে খাবে – পুজোর প্যান্ডেলের ধারে রান্না হবে, আর লম্বা রাস্তায় ত্রিপল পেতে খাওয়া দাওয়া। অনেকের মনে সন্দেহ ছিল সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, কারণ পাড়ায় একে অপরের সাথে গলায় গলায় ভাব – এমন অপবাদ শত্রুও দিতে পারবে না! কিন্তু বিষ্ময়ের সাথে ব্যাপারটা খুবই হিট করে যায় – এমনকি আমার বাবাও আজকালকার ছেলেদের মন খুলে প্রশংসা করে। আমি আমষ্টারডামের জানালা দিয়ে সামনের ক্যানেল দেখি, আর ভাবি আজ প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেল আমরা আমাদের ঘোষ পাড়ার পুরানো বাড়ি ছেড়ে পুকুরের অপরদিকের পাল পাড়ার বাসিন্দা হয়েছি, কিন্তু ঘোষ পাড়ার গন্ধ আজও আমাদের গা থেকে যায় নি! স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবি – ঠিক আছে, যা ভাবি, তার সাথে এই লেখার কোন সম্পর্ক নেই।
ঋক আর কিছুনা
মাটি জল রোদ দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়, শিকড়ের সমস্যা আছে মনে হয় বা আগের জন্মে শিওর গাছ ছিলাম। কোথাও কিছু নেই ফাঁকা গাছ তলায় একতা চা এর দোকান আর একটা আয়না টাঙানো সেলুন। শীতের এই হাওয়া, মিঠে রোদ গোলমাল করে দেয় বড়। ঘিজঘিজে ভীড়, এস্ক্যালেশন সব ফেলে পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া শেভিং ব্রাশ আর ফটকিরি ঘষে নিশ্চিন্ত হতে ইচ্ছে করে। একটা স্বচ্ছতোয়া নদীর বড় অভাব, এমনকি একটা নালাও নেই, বুকের ভিতরে বাইরে সব জলের ধারাই শেষ করে দিয়েছি, কুচকুচে কালো জল। গুরুদ্বোয়ারা, মসজিদ, মিশন সব পেরিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছি, দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ফ্লাইওভার এর নীচে ছেঁড়া টুপি বাবার পিঠে হাফপ্যান্টুল ছেলে বসে কি যেন বলছে, ওই আবার ফস করে সামনে চলে এলো, হাত নেড়ে চোখ বড় করে বোঝাচ্ছে....গুড়কাঠি চাইছে না স্মার্ট ফোন? কে জানে, জানতেও যে চাই খুব তাও না। বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় জনা ছয়েক স্কুল ড্রেস পরা কিশোরী, হাসছে, পা নাচাচ্ছে। সাইকেলে করে একটা দাদা, রডে ভাইকে বসিয়ে স্কুল নিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের এই সময়টা ভালো হত না খারাপ মনে পড়ছেনা, আচ্ছা হাফইয়ার্লির খাতা কি এসময়েই দিতো? তাহলে খুব খারাপ হতো। কোত্থাও কিছু নেই হঠাৎ গাছের নীচে চায়ের দোকান, আমার তাড়া আছে, অফিস ছুটি নেওয়া মহার্ঘ্য দিন তবু নিয়ম মেনে চলা যে আমার দস্তুর নয় তাই বোধহয় নেমে যায় আঘাটায়...বিচ্ছিরি চা আর বেকারি বিস্কুট খেয়ে হাঁ করে বসে থাকি....হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে বড় দেরী হয়ে গেলো না?
শিবাংশু
স্থির থাকো কবি পুরোনো আসবাব যেমন কীটদষ্ট না হয়ে বার্নিশ জড়িয়ে সুখে থাকে সুখে থাকো বিজড়িত শীতঘুমে ঘেরা রাতশয্যার লীলাময় আসঙ্গবিহীন কুয়োতলা নারীরাও ততোটা উষ্ণ নয় যেমন প্রত্যাশিত যতোটা তোমার ওম তাহাদের দেহাতুর সাবানের গন্ধ তাহাদের মৌন রূপটান হেমন্তপ্যাস্টেলে স্থির তপ্ত ত্বক তাহাদের বিলোল মলাটমূর্তি কটাক্ষে ডেকেছো শেষবার সর্ষেখেত কবে দেখেছিলে কবি কাজের বাড়িতে ভীত শিশু হয়ে লুকিয়ে রয়েছো এখনও কি দেখো চুপচাপ ধানে দুধ এলো হেমন্ত অসুখে কেমন কেঁপেছে ঝাঁপঘর
সুকান্ত ঘোষ
এত প্রশ্ন আমাকে আগে কেউ করেছে কিনা আমার ঠিক মনে পড়ল না। সেই প্রশ্ন কর্তাদের লিষ্টে অন্তর্ভুক্ত আছেঃ ১। অ্যালাপ্যাথি ডাক্তার। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার নয় কিন্তু – তাদের আবার বিরাট রেঞ্জের প্রশ্ন ক্ষেপণের স্বভাব আছে। আমাদের নিমো বাস স্ট্যান্ডের নারাণ ডাক্তার আমার লাইফ প্রশ্নবাণে যাকে বলে জর্জরিত করে দিয়েছিল একবার। সেবার ডান হাতের তর্জনীর তালুর দিকে একটা কি ফোঁড়ার মতন হল – মাল আর ফাটছে না, এদিকে উইকেট কিপিং করতে গিয়ে দেদার লাগছে। বেশ ভজকট অবস্থা। বাপকে বলতেও পারছি না যে কিপিং করতে অসুবিধা হচ্ছে, তা হলে বাপ জেনেশুনে সেই ফোঁড়া হয়ত আর ভালো করার পরামর্শ দেবে না। এমন অবস্থায় ঠাকুমা বলল, তুই আমাদের নবগ্রামের নারাণকে দেখিয়ে আয় না একবার। আমি গেলাম নিমো বটতলায় নারাণ ডাক্তারের চেম্বারে। আগে যেখানে খুকু ডাক্তার বসত, সেখানে হোমিওপ্যাথি ঐতিহ্য মেনে এখন বসত নারাণ ডাক্তার। কিন্তু ঔষুধ দেবার আগে নানা ফ্যাঁকড়া - আমাকে ছোটবেলায় বিড়ালে কামড়েছে কিনা, বা আমি ক্লাস সেভেনে ফেল করেছিলাম কিন্তু স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছি কেন – এই সব জটিল প্রশ্ন। তখন হাতের ফোঁড়া এমন জ্বালাচ্ছে যে পারলে ক্লাস সেভেনে ফিরে গিয়ে ফেল-ও করে আসতাম যদি নারাণ ডাক্তার ভালো হয়ে যাবার গ্যারান্টি দিত। সে অনেক নেড়ে ঘেঁটে ঔষুধ দিল যা কিনা আবার বাড়ি গিয়ে চালের বস্তায় ঢুকিয়ে রাখতে হত। প্রতি দিন সকালি বাসি মুখে চালের বস্তা থেকে এক পুরিয়া করে বের করে খাওয়া। বলতে নেই, একদিন ফোঁড়া ফেটে গেল – তা ক্রিকেট বলের ক্রমাগত আঘাতে নাকি নারান ডাক্তারের পুরিয়ায়, তা বলতে পারব না। ২। সেপ্টেম্বর ২০০১ ট্রেড সেন্টার ভেঙে পড়ার পর থেকে আমেরিকার ইমিগ্রেশন কাউন্টারের বেরসিক গম্ভীর অফিসার সকল। সেই অফিসারটা বাদে যে আমাকে ‘সিরামিক’ দিয়ে এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনের পার্টস বানাতে প্রবলেম কি সেটা ব্যাখ্যা করতে বলেছিল। ৩। চাকুরীর ইন্টারভিউ নেওয়া পাবলিক বা এইচ আর। অবশ্য মিসেস বোস আমাকে একবার অনেক ঘেঁটে দেবার চেষ্টা করেছিলেন, যখন আমি দাবী করেছিলাম যে অবসর সময়ে আমি একটা নাটক লিখেছি রেসেন্টলি। ৪। আমষ্টারডাম শহর থেকে বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাওয়া ‘স্ত্রুপ-ওয়াফেল’ নিয়ে টানাটানি করে প্রায় ফেলে দেওয়া বার্মিংহাম এয়ারপোর্টের সেই দুষ্টু কাষ্টমস অফিসারটা – সে আমি যতই বলি না যে ওই ‘স্ত্রুপ-ওয়াফেল’ গুলোতে গাঁজা ভরা নেই! অথচ আমি এদের খপ্পরে পরতে চাই নি – টুক করে ঢুকে, টুক করে কিনে নিয়ে চলে আসব ভেবেছিলেম। কিন্তু কপাল খারাপ থাকলে কি আর করা। লবঙ্গলতিকা – আপনি কি চাইছেন স্যার? আমি – ওই একটা আর কি। - তাহলে স্যার কি আপনার নিজের জন্য? - না, না – আমার বউয়ের জন্য - আপনার বউ কি রকম জিনিস ভালোবাসে? আমার দীর্ঘশ্বাস – এবার লবঙ্গলতিকার অ্যাটাক শুরু হল অন্য দিক দিয়ে - আপনার বউ কি ফ্লাওয়ারি, নাকি ফ্রুটি ভালোবাসে - ওই ধরে নাও গিয়ে মাঝামাঝি - আপনি তা হলে এই গুলো ট্রাই করুন একের পর এক শিশি বোতল খুলে ভিতরের ড্রপারের মতন জিনিসটা নাকের কাছে নিয়ে আসে। দুনিয়ার নাম-না জানা ফুল-ফলের নাম দেখলাম। চেনা বলতে গোলাপ, দুটো কাঠবাদাম, একটু চন্দন, একটা বেদানা, আর একটা জুঁই, একটু দারুচিনি। একটা অনেক কষ্টে পছন্দ করলাম। - স্যার, এটা কিন্তু ছেলেদের - শিশির গায়ে লেখা নেই তো! আমাকে করুণার দৃষ্টি দিয়ে মেপে নিলেও দয়া বশতঃ কিছু দাবকানি দিল না। - আসলে স্যার, গন্ধের ইনটেন্সিটি দেখে বুঝে নিতে হবে। এটা আপনি নিজের জন্য নিন বরং। আমি কি আর বলব, গন্ধের ইনটেন্সিটি শব্দ সমষ্টি শুনে নষ্টালজিক হয়ে পড়লাম। ক্লাস এলেভেন-টুয়েলভে আমাদের সায়েন্সের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস আমরা ছেলেরা নিজেরাই সামলাতাম। স্যার এবং দিদিমণিরা আমাদের থেকে দূরে থাকতেন সেই গন্ধের ইনটেন্সিটির জন্যই। টিফিন বেলায় ক্রিকেট বা ফুটবল পেঁদিয়ে আমাদের গা থেকে ঘামের যা গন্ধ বেরোত, তাতে করে পরবর্তি জীবনে সৌগতের কথা মত আমরা অ্যানাস্থেটিকসের বিকল্প হতে পারতাম। সৌগত বলত যে, কেবল মাঠের চারদিকে কয়েক পাক দৌড়ে রুগীর নাকের কাছে এসে নাকি বগল তুলে শোঁকালেই কেল্লা ফতে! অপারেশন করানোর আগে ক্লোরফোম অপচয়ের কোন দরকার হত না! তবে সেই নষ্টালজিয়ায় সু-গন্ধও জড়িয়ে ছিল বৈকী! আমাদের ছোটবেলায় বাপ-কাকাদের দেখতাম সেই এক ইঞ্চি শিশিতে জন্ডিসের সময় পেচ্ছাপের মতন রঙের ‘সেন্ট’ ঢালত রুমালে। পারফিউম বলা তখন দস্তুর ছিল না আর তা গায়ে মাখাও নয়। মাঝে মাঝে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকের কাছে নিয়ে যাওয়া বা বাতাসে একবার ঘুরিয়ে দেওয়া, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। আরো একটু বড় হলাম, লাইফে ‘গোল্ডি’ সেন্টের আগমণ ঘটল, ‘চার্লি’-কে টপকে। ‘চার্লি’ থেকে ‘গোল্ডি’ সে এক বিশাল ব্রেক-থ্রু। বেশ কয়েক রাত উত্তেজনায় ঘুমাতে পারি নি বাড়িতে প্রথম ‘গোল্ডি’ ঢোকার পর। আরো একটু বড় হলাম – নিজের সেন্ট নিজে খুঁজে বের করার ক্ষমতা অ্যাপ্রুভ হবার পর প্রথম স্টপ হল গিয়ে মধুর পানের দোকান। তবে মধুর কাছে আমরা সেন্ট কিনতাম না – কিনতাম তার ভাগনা আমাদেরই বয়সী বাপি-র কাছ থেকে। তার কাছ থেকেই প্রথম শেখা ‘ব্রুটস’ নামক এক জিনিস। তবে কিনা আমরা সবাই অলিখিত জানতাম বিদেশী নাম হলেও মাল সব তৈরী হত নবদ্বীপে। যা কিছু নাম করা সাবান, সেন্ট, পরের দিকে ডিও, তা সবই প্রায় নকল তৈরী হত নবদ্বীপে। কিন্তু মনে হচ্ছে মাঝে একটা স্টেপ বাদ চলে গেল যেই স্টেপে মেমারী পুরানো রেলগেটের কাছে বাদলের দোকানেও এমন নবদ্বীপ জাত বিদেশী জিনিস পত্র কেনা হয়েছিল। তার পর এল গিয়ে শিবপুর – কলকাতার কিছু আঁতেল (এবং শ্রীরামপুরের সৌগত) পাবলিকের কাছ থেকে সভ্য হবার শিক্ষা নেবার জন্য ট্রেনি হয়ে গেলাম অজান্তেই। ডিও স্প্রে এল – ডিও রোল এল, ফ্যান্সি মার্কেট এবং এসপ্ল্যানেড এল। এই করতে করতে একদিন ডিউটি ফ্রী ‘কুল-ওয়াটার’স। ততদিনে বেশ খানিক আঁতেল হয়েছি। দু চারটে নামও শুনেছি ‘পারফিউমের’ – ছেলেদের এবং মেয়েদের ‘ফারফিউম’ যে আলাদা, সেটা জানতে পেরেছি। কানে তুলোয় ভরা আতর গুঁজে বেরোনোর বয়স যে অনেক দিন পেরিয়ে এসেছি সেটাও মালুম হয়েছিল। এর পর থেকে মোটামুটি ডিউটি ফ্রী-ই আমাকে ঠ্যাকান দিয়ে রেখেছিল। বাহ্যিক জগতে আর পারফিউম তেমন কিনতে বের হতাম না। যাই হোক, অনেক দিন পর এবার এই ঘটনা হল – আমি সেই লবঙ্গলতিকাকে বললাম যে এই যাত্রায় আমার কেবল বৌয়ের জন্যই কেনার আছে। অনেক টালাবাহানার পর তিনটে শিশি শর্ট লিষ্ট হল। এবার তাদের মধ্যে থেকে ফাইন্যাল নির্বাচন – - স্যার, আপনার বউ কোথায় যাবে পারফিউম মেখে? - নানা জায়গায় যাবে - তা বললে তো হবে না, আরও স্পেসিফিক হতে হবে - এই উইকেন্ডে বা উইকের মধ্যে বাইরে বেরেনো - সঙ্গে কে থাকে আর কাদের সাথে দেখা করবেন - এই ধরো পার্টি, বা একসাথে গল্পগুজব - ও, তার মানে, আপনি রোমান্টিক ডিনার জাতীয় অকেশনের কথা ভাবছেন না – - না, মানে সব সময় তো ভাবা হয় না - তাহলে স্যার গোলাপের সুগন্ধটা নেবেন না। ওটা সাত রকমের গোলাপ দিয়ে বানানো রোমান্টিক গন্ধ - বেশ, নেবো না – তাহলে কোনটা নেব? - আপনি স্যার দারুচিনির সাথে মিনোসা ফুল মেশানো গন্ধ টা নিন - মিনোসা ফুল কি? বিরাট বোকামো করে বসলাম প্রশ্নটা করে! এদিকে আসুন বলে আমাকে সাইডে নিয়ে গিয়ে ইয়াব্বর ক্যাটালগ এবং ট্যাব ইত্যাদি খুলে বসল। আমাকে ওই দিকে ফোর্থ ফ্লোরের লেবানিজ রেষ্টুরেন্টটা প্রায় হাতছানি দিচ্ছে। অনেক কষ্টে মিনোসা ফুলের হাত থেকে মুক্তি পেলাম। তাহলে এবার কনফিউশন দাঁড়ালো দুটোর মধ্যে। - স্যার, আপনি এক কাজ করুন। দুই হাতে আপনার আমি দুই গন্ধ লাগিয়ে দিচ্ছি। আপনি সেই গন্ধ লাগিয়ে শপিং কমপ্লীট করে আসুন। কিছু ক্ষণ দেখবের এদের প্রকৃত গন্ধ আপনার কাছে প্রকট হবে - খুব ভালো প্রস্তাব। (স্বগতঃ আমাকে লেবানন ডাকছে), দাও লাগিয়ে দুই হাতে লাগিয়ে আমি শপিং মলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ক্রমাগত একবার এই হাত আর অন্যবার সেই হাত শুঁকচি – অনেকে আমার দিকে ট্যারাচোখে তাকাচ্ছে – তবে আমার লা-পরোয়া, গন্ধ বাছতেই হবে। খেতে গিয়ে ‘হামুস’ এর গন্ধের সাথে মিনোসা মিশে এক জটিল ব্যাপার। লেবানন আমার পেট ঠান্ডা করল – আমি পকেট থেকে একটা কয়েন বার করে টস করে ঠিক করলাম কোন হাতেরটা নেব। দোকানে ফিরে এসে সেই লবঙ্গলতিকাকে বাঁ হাতটা শুঁকিয়ে বললাম – এইটা দেও। এরপর শুরু হল প্যাকিং – প্যাকিং এর মাঝামাঝি আমার আবার খিদে পেয়ে গেলে আমি আইস্ক্রীম খেতে গেলাম। সেই খেয়ে ফিরে এসে আমি প্যাকিং-য়ের শেষটা দেখতে পেলাম। পয়সা মেটালেও আমাকে কাউন্টারে প্যাকেটটা হস্তান্তর করল না। লবঙ্গলতিকে দরজার কাছ পর্যন্ত এগিয়ে এসে আমাকে প্যাকেটা দিল – বলল, প্লিজ কাম এগেন। আমি আর ভয়ে পিছু ফিরে তাকালাম না। ঘটনা ‘পারফিউম’ সিনেমার থেকেও জটিল। এই ঘটনা আগে ঘটলে ছেলেটি কেন খুন করছে সেই মনস্তত্ত্ব বুঝতে কোনই প্রবলেম হত না!
সুকান্ত ঘোষ
অনেক বয়স হবার পর কোন এক কবির লেখায় যেন এমন কয়েকলাইন পড়েছিলাম – “ডাক্তার জানে না, আমার অসুখের নাম পিকনিক”। সেই কবি আবার অন্য এক কবির লেখা থেকে এই লাইন ধার করেছিলেন - সে এক কনফিউজিং ব্যাপার। যাই হোক, যে রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে শতকরা ৬০ ভাগ লোক পেটের রোগের চিকিৎসা করাতে আসেন সে রাজ্যেরই এক কবি যে এমন কথা লিখবেন সে আর আশ্চর্য কি! তবে ডাক্তারের না জানার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, অন্ততঃ আমাদের দিকের ডাক্তাররা আমাদের অসুখের উৎপত্তি ও নিরাময় দুইই জানত বেশ ভালো করে। আর পাঁচটা বালকের মত আমাদের ছোটবেলাটাও পিকনিকের সাথে বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে ছিল। পিকনিকের বাঙলা প্রতিশব্দ কি? কাছাকাছি রয়েছে চড়ুইভাতি ও বনভোজন। চড়ুইভাতি শব্দটির মধ্যে কেমন যেন একটা সখি সখি ভাব লেগে আছে। ম্যাচো ভাবটা কম, তাই একটা বয়সের পর আর চড়ুইভাতি করা যায় না যতক্ষন না আর একটা নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানো যাচ্ছে। আমাদের দিকে রেঞ্জটা ১০-৬০ বছরের মধ্যে ছিল। আর বনভোজন বাঙালী আতেঁল ও কলকাতাবাসী লোকেরা করে বলে আমাদের ধারণা ছিল। আমরা করতাম Feast – শব্দ ভেঙে ভেঙে ‘ফিষ্টি’ তে পৌঁছেছিল। আমাদের গ্রাম্য বাল্য জীবন যখন নিস্তরঙ্গ ও বর্ণহীন হয়ে আসত মাঝে মাঝে (আলু ও ধানের ফলন বা দাম ভালো না থাকলে) তখন এই ফিষ্টি নামক মোচ্ছবটি আমাদের এক্সট্রা প্রাণবায়ু ইনজেক্ট করত। ফিষ্টি বিবর্তন নিয়ে রীতিমত এক থিসিস ফেঁদে ফেলা যায় সোস্যাল সাইন্সে। যে কোন উপলক্ষেই ফিষ্টি হতে পারত – তবে বয়সের উপর নির্ভর করে স্থান ও কাল বদলেছে, পাত্র প্রায় একই থেকে গেছে। খুব ছোটবেলায় ফিষ্টির হাতেখড়ি হয়েছিল ঝুলন খেলার মধ্যে দিয়ে। আমরা ছোটরা নিজেদের খেলনা জড়ো করে ঝুলন পাততাম ও বড়দের কাছ থেকে পয়সা আদায় করতাম। ঝুলনের শেষে সেই টাকা দিয়ে ফিষ্টি হত। মেনু খুবই সিম্পল থাকত – কোন বছর লুচি-ঘুঘনি ও তৎসহ মিষ্টি। আবার কোন বছর ভাত-মাংস। বাড়ির পিসি ও মায়েদের দল সব কিছুর ভার নিত, আমরা শুধু খেয়েই খালাস। মনে আসে তখন বাড়ীতে মুরগীর মাংস রান্না হত না, ফলতঃ পাঁঠা বা খাসি খেয়েই আমরা বড় হয়েছি (দূর্জনেরা বলেন অনুরূপ চারিত্রিক বৈশিষ্ট লাভ করেছি)। ছোটবেলার ফিষ্টি সব অর্থেই নিরামিষ ছিল। পিকনিক তার প্রকৃত রূপ খুলতে শুরু করল ক্লাস নাইন-টেন উঠার পর থেকে। স্থান পরিবর্তিত হল – বাড়ি থেকে ফিষ্টির স্থান সরে গিয়ে গ্রামের ইস্কুলবাড়িতে। আমাদের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের স্থানমাহাত্ম আমাদের কাছে কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, তিরুপতি বা ইডেন গার্ডেনসের মতই ছিল। গ্রামের একপ্রান্তে এই স্কুলের চত্তরেই আমাদের বেশীর ভাগ ফিষ্টি সম্পন্ন হত। সামনেই ছিল এক প্রকাণ্ড পুকুর ও খালি মাঠ, আর স্কুলের ভিতর ছিল এক বকুল গাছ। তাই প্রাক বৈদ্যুতিক যুগে সন্ধ্যের পর সেই স্থান এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করত। আবার গ্রামের একধারে হবার জন্য জলীয় দ্রব্য পানেরও অসুবিধা হত না আমাদের। প্রত্যেক বড় পূজা সম্পন্ন হবার পর একটা ফিষ্টি বাঁধা ছিল – ভাবটা এই ছিল যে, পূজার আয়োজন (বাজনা ও মাইক ভারা করা এবং বিজয়ার দিন নাচা) সম্পন্ন করে পাবলিক খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং রিল্যাক্সের জন্য একটু খাওয়া-দাওয়া দরকার। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে এ সবই হত ব্যাচ সিষ্টেমে। যেমন আমাদের বাবা/কাকাদের একটা গ্রুপ ছিল, তার পরের জেনারেশনের একটা গ্রুপ, তার পরে আরো একটা এবং তার পরে আমরা। ওই ইস্কুল বাড়িতে সব গ্রুপই ফিষ্টি করত। খাদ্য বস্তু বা মেনু মূলতঃ এক থাকলেও, পার্থক্য থাকত পানীয় ও ধূমপান লিমিটে। আমাদের আগের গ্রুপটি ধেনো (দেশী মদ) ও গাঁজা প্রেফার করত। আমাদের ব্যাচে প্রথমে শুরুর দিকে (হাতেখড়ির সময়) চালু ছিল থ্রি-এক্স রাম ও অফিসার চয়েস। হুইস্কি তখন বুঝতাম না, তা সেই নিয়ে মাথাব্যাথাও তত ছিল না। অবশ্য বয়স বাড়ার সাথে সাথে পছন্দের এনভেলপ প্রসারিত হতে শুরু করে – রয়েল স্ট্যাগ দুরদার করে জীবনে অনুপ্রবেশ করে। আমাদের ব্যাচ আবার গাঁজা খুব একটা পচ্ছন্দ করত না – কোন এক বিশেষ কারণ বশতঃ পক্ষপাতিত্ব ছিল খৈনীর দিকে। আর তা ছাড়া রাতের দিকে ফিষ্টি শুরু হবার আগে অনেককেই দেখতাম ‘তাড়ি’ খেয়ে চূড় হয়ে আছে। আমরা যখন ক্লাশ ১০-১২ তে পড়ি তখন তাড়ির চল নিদারুণ বেড়ে গিয়েছিল। সুজনেরা বলে এর পিছনে আমাদের দুই বন্ধু আলম ও মনসার অবদান সবিশেষ। যাদের জানা নেই (অর্থাৎ দূর্ভাগার দল) তাদের অবগতির জন্য জানাই তাড়ি তৈরী হত তালরস গেঁজিয়ে। গরমের দিনে ভোরের দিকে তালরস সত্যই সুস্বাদু। তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরমে মাল গেঁজে উঠত। আর সেই জিনিস তূরীয় হত বেলা দুটো-তিনটের দিকে। গরম কালে ঘরের ভিতর দুপুরে আমরা এমনিই কেউ ঘুমুতে পারতাম না – আশ্রয় হত মূলতঃ বাগানগুলিতে। সেই সব আম বা গাব গাছের ছায়ায় বসে তালরস পানের মজাই আলাদা। কলকাতার আতেঁলরা বছরে একবার সেই তালরস শান্তিনিকেতনের দিকে খায়ে সারা বছর তার ঢেকুর তোলে আর সাহিত্য পয়দা করে। যাঁরা পার্কস্ট্রীটের পাবগুলিতে গিয়ে পরের দিন অফিসে ফাট্টাই মারেন তাঁদের জেনে রাখা ভালো যে নেশার জগতে খুব অল্পটাই তাঁরা ছুঁতে পেরেছেন – অন্ততঃ আবহের দিক থেকে। গোমড়া মুখো বারটেণ্ডারের বীয়ারের গ্লাস এগিয়ে দেওয়া আর শ্যামা বা বুধোর মায়ের মাটির ভাঁড়ে (বা গ্লাস) করে তাড়ি এগিয়ে দেওয়ার মধ্যে অনেকটাই পার্থক্য। এর সাথে যোগ করুন ফুরফুরে প্রাকৃতিক হাওয়ার অ্যাডভাণ্টেজ! তাড়ি ছিল গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা নেশার পানীয়। তাড়ি পান ঠিক আছে – কিন্তু তৈরী হত সেই সেবনের পর মাঠে ফুটবল খেলতে নামলে। তাড়ি খাবার পর যে ঘাম হয় তার দূর্গন্ধ অস্বাবাভিক। ড্রাগটেষ্টের ব্যাপার না থাকায় অনেক ফুটবল ম্যাচ আমরা তাড়ির জোরে জিতেছিলাম। তার যতটা না নেশাগ্রস্ত হয়ে অকুতভয় খেলার জন্য, তার থেকেও বেশী ঘামের দূর্গন্ধের জন্য। বিপক্ষ প্লেয়ার কাছে আসার সাহসই পেত না! আমাদের গ্রামের সব ব্যাচেরই ফিষ্টির মেনু ছিল প্রায় ওয়ান ডাইমেনশনাল। ভাত, একটা তরকারী, মাংস ও শেষ পাতে চাটনী-মিষ্টি। ফাণ্ডের অবস্থার উপর নির্ভর করে মাংসের রকমফের হত, খাসী নয়ত মুরগী। মুরগী আবার দুই প্রকার, দেশী ও পোলট্রী। ফাণ্ডের অবস্থা শোচনীয় হলে তবেই পোলট্রী মুরগী কেনা হত। আর সিজিন অনুযায়ী রকমফের ঘটত তরকারীর। শীতকালে জনপ্রিয় ছিল বাঁধাকপি। তবে তরকারী কেন যে করা হত আমি সেটা আজও বুঝতে পারি নি। ফিষ্টি সময় তরকারীর ভূমিকা কোন প্রতিযোগীতার তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচের মত – কোনই গুরুত্ব নেই, শুধু করতে হয় বলে করা। পোলট্রী মুরগীর দাম ৩৫ টাকা কেজি দিয়ে বহুযুগ আগে ফিষ্টি শুরু করার পর এখন তা ১৪০ টাকায় পৌঁছেছে। পোলট্রী মুরগী পাওয়া বা কেনা সহজ – ওরা প্রায় শহীদ হয়েই আছে মাংসের ভারে। সমস্যা হত দেশী মুরগী সংগ্রহ করা নিয়ে। ফিষ্টির দলে কতকগুলি সদস্য ছিল যারা বাড়িতে মুরগী পুষত, আর স্বাবাভিক ভাবেই তারাই প্রাইম টার্গেট থাকত মুরগী সাপ্লাই দেবার জন্য। মুরগী সংগ্রহ ব্যাপারটাই ছিল বেশ রোমাঞ্চকর, অনেক সময় খাওয়ার থেকেও বেশী। এমন সময় গেছে যখন সন্ধ্যাবেলা মুরগী খুঁজতে বেরিয়েছি রাতে ফিষ্টির জন্য। বাড়ি বাড়ি ঘুরছি – এ্যাই মুরগী বিক্রী করবে তোমারা? হয়ত কেউ বলল হ্যাঁ করব – তখন শুরু হল মুরগী ধরার পালা। সেই মুরগী আম গাছের ডগায় ঝিম মেরে বসে আছে। নিকষ অন্ধকারে আমগাছের ডাল বেয়ে চুপিসারে মুরগী ধরতে উঠছি এ দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক ছিল এককালে। আর আমরা যেহেতু গ্রামের ছেলে ছোকরার দল ছিলাম এবং সবাই নিজেদের গাছের/বাগানের ফল-মূল ইনট্যাক্ট রাখতে চাইত – তাই প্রায়শঃই জিনিস কিনতে গিয়ে আমাদের একটা কথা শুনতে হত, “যা, তোদের কেনা দামে দিয়ে দিলাম”। কেনা দামটা যে কি আর যে বাড়িতে পোষা মুরগী বিক্রী করছে তার কাছে কেনা দাম কি ভাবে প্রযোজ্য হয়, সেটা আন্দাজ লাগাবার বৃথাই একটা চেষ্টা দিতাম। মুরগী ধরার পর ছাড়ানাও এক হ্যাপার কাজ। সৌভাগ্য বশতঃ বেশ কিছু সুদক্ষ সার্জনও ছিল আমাদের দলে। মুরগী ছাড়ানোর মধ্যে কোন পৈশাচিক আনন্দ আছে কিনা বলতে পারব না, তবে আমাদের সার্জেনদের দেখতাম বেশ তারিয়ে তারিয়ে অথচ ক্ষিপ্রহস্তে মুরগী নিধন করছে। দলের ফিষ্টিতে বেশির ভাগ সময় রান্না আমিই করতাম। যৌথ পরিবারে মানুষ (!) হবার জন্য খাবার-দাবার ভাগ-বাটোয়ারা বিষয়ে আমার ধারণা বেশ স্বচ্ছ ছিল। ফলতঃ ছেলেরা সানন্দেই আমার হাতে রান্না ও মাংস ভাগের দায়িত্ব ছেড়ে দিত। মুরগী রান্না আদপেই সোজা কাজ, কারন মাংস প্রায় স্বয়ংসিদ্ধই বলা যেতে পারে – তাও আবার যদি মাতালদের উপযোগী রান্না করতে হয়। সবচেয়ে বেশী বিতর্ক অবশ্য মাংস ভাগ নিয়ে বা রান্না পদ্ধতি নিয়ে নয়, মাংস ধোয়া হবে কিনে সেই নিয়ে হত। অনেকের মতে মাংস ধুলে তার স্বাদ নাকি চলে যায় – এটা আবশ্য পরিক্ষীত সত্য নাকি মাতাল জিহ্বার ইলিউশন তা বলতে পারব না। গড়পড়তা হিসাবে জন প্রতি ২৫০ গ্রাম মুরগীর মাংস ধরা হত, খাসী হলে সেটা কমে দাঁড়াত ২০০ গ্রাম। মাংস মেখে নেওয়া হত তেল, নুন, মশলা, টক দই, আদা-রসুন বাটা ইত্যাদি দিয়ে। তারপর গরম তেলে পেঁয়াজ ছেঁকে আলাদা করার পর, সেই ছাঁকা তেলেই মাংস কষে নেওয়া হত। আলুর রকমফের অনুসারে তা আগে ছাঁকা হত বা ডাইরেক্ট ঝোলে দেওয়া হত। মাংস কষা হলে জল দিয়ে ফোটানো এবং প্রায় সিদ্ধ হয়ে এলে তাতে গরম মশালা দিয়ে ঘেঁটে দেওয়া। মাংস রান্না বা ফিষ্টি করতে গেলে উনুন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এখন আমাদের দিকে এই সব কাগের জন্য গ্যাস সিলিণ্ডার সহ ওভান ভাড়া পাওয়া যায়। তবে আগে আমরা উনুন নিজেরাই বানিয়ে ফিষ্টি করতাম। উনুন তৈরী ও তা ধরানোর দায়িত্বে থাকত ‘হাবা’ – সে একাজে অভূতপূর্ব পারদর্শিতা অর্জন করেছিল। জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হত মূলত কাঠ ও ঘুঁটে, শুরুতে কেরোশিনের সাহায্য। পরে যখন সমাজ এগোয়, তখন আমরা কাঠের উনুন থেকে কেরোসিনের স্টোভে সিফট করে গিয়েছিলাম। হাবা এতে হালকা দুঃখ পেয়েছিল, তবে এর পরেও কেরোসিনের স্টোভটি সেই নিয়ে আসত ও ধরাত। কাঠের অভাব খুব একটা আমরা অনুভব করি নি। আমাদের নিমো স্টেশনে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি রেল কাটতে শুরু করে কোন এক সময়। আমার মেজো জ্যাঠা তখন সদ্য চাকুরী থেকে রিটায়ার করে সারাদিন কি করবে ঠাওর করতে না পেরে পাগলের মত কাজ (বা অকাজ!) খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই জ্যেঠু গ্রামের বালক সম্প্রদায় কে নিয়ে গাছ বাঁচাও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরে। যে কয়টা গাছ কাটা হয়েছিল সেগুলি পড়ে রইল – রেল বাকি গাছ কাটা বন্ধ করল। এখন ঘটনা হচ্ছে ওই কাটা গাছগুলির কি হবে? আমাদেরই গ্রুপের রবি কাঠমিস্ত্রীকে ধরা হল সেগুলি কেনার জন্য। রবি বিজনেসের সময় বিজনেস বলে শুধু মোটা গুঁড়িগুলো কিনল – বাকি থাকল গুচ্ছের ডাল পালা। সেট কাঠ বিক্রির টাকায় ফিষ্টি হল এবং তার পরের অনেক ফিষ্টিরই জ্বালানি ওই পড়ে থাকা ডাল পালা সাপ্লাই করেছিল। অপ্রাসঙ্গিক, তবু জানিয়ে রাখা ভালো রবি সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের খাট বানিয়ে কাঠাঁল কাঠের খাট বলে এক স্বদেশীয় বিহারীকে বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিল। গ্রামে রেলের প্রতিনিধি ছিল স্টেশন মাষ্টার আমার সেজ জ্যাঠা যাকে বলা হইয়েছিল যে গাছ বিক্রির টাকা “নিমো ভারত সেবক সমাজ” (আমাদের গ্রামের ক্লাবের নাম) এর উন্নতিকল্পে লাগানো হবে। জ্যাঠা আমাদের ভাবগতিক সম্পর্কে অবহিত থাকার জন্য পরে আর উন্নতি বিষয়ক কোন খোঁজ নেয় নি। আগের পর্বে আমাদের ক্লাবে শোনপাপড়ী কারখানা খোলা ও তা উঠে যাবার কথা লিখেছিলাম। তা সেই কারখানা উঠে যাবার পর পড়ে থেকে একটা বাঁশের আটচালা যেখানে মাটির উনুনে রস জ্বাল দেওয়া হত। আর পড়ে ছিল একটা মাল বইবার তিন চাকার ভ্যান রিক্সা। একবার বর্ষাকালে ফিষ্টির স্থান পরিবর্তন করে স্কুল বাড়ি থেকে ক্লাবে নিয়ে আসা হয় ওই উনুনের সুবিধা নেবার জন্য। দ্বিতীয়বার সেই জায়গায় ফিষ্টি করতে গিয়ে রাত দশটা নাগাদ জ্বালানীতে টান পড়ল – পাবলিক তখন প্রায় মাতাল। তাই তারা আর কাঠের সন্ধানে অন্য কোথাও না গিয়ে সেই বাঁশের চালাটাই ভেঙে জ্বালানি করতে শুরু করে। সেই দিন মাংস পাঁঠার হবার জন্য পুরো চালাটাই লেগে যায় মাংস সিদ্ধ করতে। তাও সেই শোনপাপড়ী কারখানার স্মৃতি আরও কিছুদিন ছিল যখন আমরা সেই ভ্যান রিকশা নিয়ে ফিষ্টির বাজার করতে বেরোতাম। পরের একবার ফিষ্টিতে সেই রিস্কার কাঠের ফ্রেমও জ্বালানি হইয়ে যায়, ততসহ কারখানার শেষ স্মৃতি। একবার ঠিক হল মেনুতে বৈচিত্র আনতে হবে মাছের কোন একটা আইটেম করে। কেউ বিয়ে বাড়িতে তখন সদ্য বাটার ফ্রাই খেয়ে এসেছিল, সেই প্রস্তাব দিল যে বাটার ফ্রাই হোক তাহলে। আমাদের মধ্যে মৎস-সম্রাট শুভর কাছে অর্ডার হল টাটকা তোপসে জোগাড়ের জন্য। শুভ করিতকর্মা ছেলে, ১০০-১৫০ গ্রাম সাইজের মাছ সে জোগাড় করে ফেলে – তারপর সেই মাছ বেসনে (সোডা মেশানো) ডুবিয়ে ভাজা। সে এক দেখার মতন দৃশ্য – সবাই (ইনক্লুডিং মাতালেরা) উনুনের চারিদিকে গোল হয়ে বসে মাছ ভাজা দেখছে, আর আমি মাছ ভাজছি। টেষ্ট করতে করতেই মাছ প্রায় শেষ হয়ে যাবার জন্য খাবার পাত পর্যন্ত আর সেই বাটারফ্রাই পৌঁছয় নি। রান্নার সময় আর একটা প্রধান ঝামেলার সৃষ্টি হত ঝালের পরিমাণ নিয়ে। চারপাশে দাঁডিয়ে পড়ল সব – এ বলে আর একটু গুঁড়ো লঙ্কা দাও মাংসে, তো ও বলে একদম বেশী দিও না! প্রায়শই ব্যাপারটা ফ্রেণ্ডলি মারামারির পর্যায়ে চলে যেত। যে বেশী ঝাল খেতে পারত না তাকে বলা হত রসগোল্লার পড়ে থাকা রসটা তুই পাবি! গ্রামের বাইরে আমরা ফিষ্টি করতে যেতাম মূলত শীতকালে, মানে যখন আর সবাই যায় আর কি। আমাদের যাবার জায়গা একটাই ছিল – দামোদরের ধার। আমাদের গ্রামের থেকে দামোদর ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনে পাল্লা রোড বলে একটা স্টেশন আছে যেটা ফিষ্টির জায়গা বলে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেছিল। এর কারণ মূলত আশির দশকে সেখানে হওয়া একাধিক বাংলা সিনেমার শুটিং – পাল্লা রোডের ডাকবাংলোকে তাপস-শতাব্দী বিখ্যাত করে দিয়েছিল। তবে সত্যি কথা বলতে কি, জায়গাটা শীতকালে প্রকৃতই মনোরম হত। দামোদরের জল প্রায় শুকিয়ে আসা – ফুরফুরে বাতাস, মিঠে রোদ, আর নদীর চড়াতে ফিষ্টি। আমরা গ্রাম থেকে যেতাম ট্রাক্টরে করে, ক্লাবের সদস্য প্রায় জনা ৫০ ছিল। মাল পত্র তুলে নিয়ে সকাল সকাল রওনা – মাঝে মাংস এবং মদ কেনার জন্য স্টপ। তবে আমি এত্যো পাবলিকের রান্না করার সাহস পেতাম না, তাই গ্রামের গোপাল ঠাকুরকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হত। গোপাল ঠাকুর বা তার সহকারী বুধো কলুর সাথে আমাদের একটা দুষ্ট মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে এরা আমাদের ফিষ্টিতে রান্না করতে আসত কোন রকম ফিনান্সিয়াল লাভের আশা ছাড়াই। শীতাকাল হলেই ওরা জিজ্ঞাসা করতে শুরু করত, কি রে তোদের ফিষ্টি কবে? সেই বুঝে অন্যদের ডেট দেব। পাবার মধ্যে ভাগ্য ভালো হলে গোপাল ঠাকুর বেঁচে থাকা তেল, গরম মশলা, বা জিরে-ধনে গুঁড়ো একটু বাড়ি আনতে পারত। বুধো কলু কেবল একটু মাংসের ঝোল ছেলের জন্য নিয়ে যেত – মাতালরা বিশ্বভাতৃত্ববোধের ইউনেস্কো দূত হতে পারে সেটা আমাদের পিকনিক থেকে ভালো বোঝা যেত – পাবলিক যতই মাতাল হোক, বুধো তার ছেলের জন্য মাংস নিয়ে যেতে পারে নি কোনবার সেটা হয় নি। তবে একবার ফেরার পথে ওদের রান্নার হাতা-খুন্তি নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিল – সবাই এটা জানে যে হালুইকরেরা নিজেদের বড় বড় হাতা ও খুন্তি নিয়ে রান্না করতে আসে। আর আমাদের পিকনিকের থেকে ফেরার সময় একটা রুটিন ছিলে যে বাকি রান্নার জিনিসপত্র একেবারে ডেকরেটারের ঘরে নামিয়ে বিল মিটিয়ে ঘরে ফেরা। তা সেইবার ফেরার সময় কারো কাছে আর বিল মেটাবার টাকা ছিল না – ফলে গোপাল ঠাকুরের রান্নার ফেমাস খুন্তি-হাতা গুলি বন্ধক রাখার তোড়জোর করা হয় – এর ফলে গোপাল ঠাকুর খুবই রেগে গিয়েছিল – কিন্তু তা সত্ত্বেও পরের বছর পিকনিকে যথারীতি হাজির হয়। সারাদিন পিকনিকে গেলে একটা জলখাবারের ব্যবস্থাও করতে হয় সকালের দিকে – আমাদের সময় সেটার প্রায় ফিক্সড মেনু ছিল মুড়ি, ছোলা ছাঁকা, বেগুনী, ঘুঘনী। কেউ একবার লুচি চালু করতে চায়, তাকে যথারীতি আতেঁল বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে রুটি-ঘুঘনী হয়েছিল কোন কোন বার জলখাবার হিসাবে – কিন্তু শীতকালে ক্রিকেট টুর্ণামেণ্টগুলিতে ওটা পেটেণ্টেড মেনু থাকার জন্য আর কেউ রিপিট করতে চাইত না সেই একই খাবার। ক্রিকেট টুর্ণামেণ্ট ও ততসহ খাবার দাবার বিষয়ে একটা আলাদা পর্ব লিখব, না হলে আমাদের যৌবনের সাথে অন্যায় করা হবে। সেই ফিষ্টির মেনুও কিন্তু একই ছিল প্রায় – মাঝে মাঝে ফ্রায়েড রাইস মাংস মেনুতে উচ্ছাস বয়ে আনত। রান্না ছাড়াও আরো একটা বড় কাজ ছিল ওই ফিষ্টির সময় মাতাল সামলানো – জলে ডু্বে মারা যাবার ঘটনাও আছে – তাই সর্তক থাকতে হত যে পাবলিক যাতে কন্ট্রোলে থাকে। যারা মাল না খেয়ে ফিষ্টিতে স্যাক্রিফাইস দিত, তারাই মাতাল সামলাবার দায়িত্বটাও নিত। গোপাল ঠাকুর কিন্তু খুব কম সময়ে রান্না করতে পারত – সেই রান্না দেখার পর আজকাল টিভিতে একটা ডিস তৈরী করতে ৩ ঘন্টা সময় নেওয়া হয় দেখে রিলেটিভিটি জিনিসটা আরও হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে পারি। একবার তেমনই এক ফিষ্টিতে আমি সদ্য বিদেশ থেকে শেখা ‘সাংগ্রিয়া’ পানীয় প্রস্তুত করে সবাইকে খাওয়াই। সেই গল্প পরেরবার।
শিবাংশু
দিল্লিশরিফের পীরসাহেব বাবা চঞ্চুশাহ স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন। তা হলো বেশ কিছুদিন। তিনি মুকাম কলকত্তায় তশরিফ রাখতে যাচ্ছেন চন্দ পলোঁ কে লিয়ে। অপনা খ্যরিয়ত কা খ্যয়াল রখনেওয়ালোঁ জনতা যেন যথাস্থানে তাঁর কদম্বুশি করতে পৌঁছে যা'ন। পীরের লীলা কে বলতে পারে? কোনও মানে হয়? ঘোর হেমন্তের রোদোজ্জ্বল একটি দিন এভাবে মেঘের তাড়সে ডুবে যায়? পীরসাহেব পদধূলি দিচ্ছেন কলকাতার অফিসপাড়ার একটি ওয়েসিসে। অবশ্য এই ঠেকটির অসলি মালিক হলেন বাবু মনোজ ভট্টাচার্য। হাফসেঞ্চুরি হয়ে গেলো, তিনি এই ঠেকটির ঠেকা নিয়ে রেখেছেন। 'লাইমলাইট' নামের এই সরাইখানাটিতে পুরোনো কলকাতার কাফে টাইপ একটা আধোজাগা সুরভি রয়েছে। তাঁর দৌলতে আমরা এখানে জমায়ত করেছি আগেও। আমাদের টিপিক্যাল লেকম্যল বা সাউথসিটি ম্যলের নারকীয় শব্দপ্রদূষণের বিষ থেকে বহুদূর একটা আয়েসী ঠেক লাইমলাইট। যদিও আড্ডাধারীরা প্রায় সবাই দক্ষিণী জনতা, স্তুতি আর জল ছাড়া। অবশ্য মনোজদাও আছেন 'সিঁথি'র সিঁদুর সামলাবার জন্য। আমি তো প্রায় পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের লোক। দুটোর মধ্যে পৌঁছোতে হবে ডালহৌসি। দুপুর একটা থেকে তৈরি হয়ে বসে আছি গড়িয়া বাইপাসের প্রান্তে। আসলে আমার বাড়ি থেকে খুদিরাম মেট্রো দেড়েক কিমি। বাইকে মেরে দিই মিনিট পাঁচের মধ্যে। কিন্তু এরকম আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে ওটা নেওয়া যাবেনা। চারচাকায় মেরেই দেওয়া যায়। কিন্তু রাখবো কোথায়? ডালহৌসি মানে পুলিশমামাদের যৌবনের উপবন। যেখানেই পার্ক করিনা কেন, তাঁদের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবোনা। সে আর এক ঝামেলা। সেই মেট্রো'ই ভরসা। বাস চড়িনি বছর পঁচিশ। ভাড়ার টেসকিও সব গায়েব। ভাবি, পীরসাহেবকে গুস্তাখিমাফ বলে কেটে পড়ি। কিন্তু পরকালের চিন্তাও তো করতে হয়। দেড়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফোন মারলুম। শুনি তিনি ততক্ষণে ধুনি জ্বালিয়ে বসে পড়েছেন পঞ্চমুণ্ডিতে। তখন নিরুপায়, মহেন্দ্র দত্তের কালাছত্রি মাথায় দিয়ে সংসার পারাবারে ঝাঁপিয়েই পড়তে হলো। আধ কিমি এসে একটা রিকশা। ভাবা যায়? রিকশায় চড়লুম? চড়েই পড়লুম? পীরসাহেবের বদ দুয়া যেন না লাগে। মেট্রো তো এলো। কিন্তু তারও ভিতরে যত্তো ভেজা লোক, ভেজা ছাতা, ভেজা কাক রোগা রোগা ছেলেপুলের দল। এসপ্ল্যানেডে এসে দেখি জলের তোড় একটু কম। কিন্তু অবিশ্রান্ত ধারা। ছাতা থাকলে মাথা বেঁচে যাবে। ট্রামলাইনের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা নানা রঙের জলের আয়না। রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে যাই সোজা ডেকার্স লেন। ঐ অন্ধগলির দুদিকে তখন অনন্ত ভোজের রাজসূয় আয়োজন। কী নেই সেখানে? দেশের সব চেয়ে সুলভ আর ব্যাপক 'ভোজবাজি।' গলি পেরিয়ে গ্রেট ইস্টার্নের গলি। সেখান থেকে বড়োরাস্তা। ভিজতে ভিজতে কলকাতার গোঁয়ার গাড়ির স্রোত ও নাছোড় পাবলিকদের মিছিলে শামিল হয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেই গেলুম পীরবাবার আস্তানায়। ততক্ষণে ধুনি ঘিরে চক্রধারীরা মৌতাত জমাতে শুরু করে দিয়েছেন। পীরসাহেব নে গলে লগা লিয়েঁ। ধন্য ভাগ সেওয়া কা অবসর পায়া। সমঝদারেরা প্রথম দফা যীশুর রক্ত শেষ করে ফেলেছেন। বেরসিকেরা চিনিজল। অতঃপর রসগোল্লার উপর পিঁপড়ের মতো আড্ডার জমে ওঠা। দেখুন এখন সব কিছুতেই রসগোল্লা। জাগো বাঙালি। আমার মতো লোকেদেরই ভারি মুশকিল। পোশ্চিমবঙ্গে তো মাত্তর বছরখানেক। ওড়িশায় পাঁচ বছর। ইতোমধ্যে সাহেবশঙ্খের এন্ট্রি হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে স্তুতি জীবনের প্রথম মোবাইল ফোনটি হারিয়ে একটু কাহিল ছিলেন। কিন্তু যেই মনে পড়ে গেছে ছেলে একটা লতুন কিনে দেবে, তুরন্ত ফরেশ।আমারও মনে পড়ে যায়, আমার কন্যা আমার ফোন (তারই কিনে দেওয়া ও মাত্র এক বৎসরের পুরাতন) নিয়ে বিশেষ হীনমন্যতায় ভোগে । মা'কে দুবেলা বলে বাবাকে একটা লতুন ফোন পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু তার বাবার কাছে টিভি সিরিয়াল ও মোবাইল ফোন, দুটো'ই সমান ত্যাজ্য। কে বোঝাবে? আমার ফোন হারালে সেও বোধ হয় বিশেষ প্রীত হবে। জলের সঙ্গে পেরথম দেখা। যতোটা মনে হয়েছিলো, তার থেকেও বাচ্চা। সেই কবে কিকি আর জল আমার বাড়িতে খিচুড়ি আর বেগনি-কুমড়ি খেতে আসবে বলেছিলো। আমি বলেছিলুম দুজনে যেন হাত-ধরাধরি করে আসে। রাস্তায় কেউ লবেঞ্চুস দিলে যেন কখনও না নেয়। তা শেষ পর্যন্ত ওদের আসা হয়নি। কিন্তু আমার আশঙ্কাটি রয়েই গিয়েছিলো। এই মেয়েগুলোর লেখালেখি সুযোগ পেলেই পড়ি। অবশ্যই ভালো লাগে বলে পড়ি। তা জল'কে সামনে পেয়ে কিঞ্চিৎ জ্ঞানও দিলুম। কীভাবে আরো ভালো করা যাবে। দেখা যাক, কী করে...? কালকের একটা বড়ো ঘটনা হলো, মনোজদা একবারও মাঝখানে লাফিয়ে উঠে 'আমি চলি' বললেন না। খোঁজ নিতে জানা গেলো কাল নাকি বৌদি নিজে এসে ওঁকে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। তাই নির্ভয়। শঙ্কা জাগে, আমাদের কপালেও কী এই আছে। সাহেবশঙ্খের একটা কথা অনেকেই জানেনা। বলেই ফেলি। একসময় রতন টাটাকে দেখলেই আপনজনেরা জিগ্যেস করতো, বিয়েটা কবে করবে বাবা? শঙ্খের জন্মের পর থেকে রতনকে ছেড়ে প্রশ্নটা সবাই ওকেই করে। টাটাসাহেব নিশ্চিন্ত। তা আমরা ইতরজন কবের থেকে ধুতিপাঞ্জাবি ইস্ত্রি করে অপেক্ষা করছি। কিন্তু তিনি কিছুই বলেন না। তবে কাল তিনি আমাদের হৃদয় ভেঙে দিলেন। তাঁর মতে 'বিয়ে' করাটা নিতান্ত বাজে ব্যাপার। তিনি লিভিং টুগেদারের পক্ষে। ক্ষীণস্বরে বলতে চেষ্টা করলুম, বিয়ে করাটা তত খারাপ ব্যাপার নয়। এইতো আমি মহারাজ নবকৃষ্ণের আমলে বিয়ে করেছি। কোনও অফসোস নেই। তা বেশ শ্লেষের সঙ্গে যা বললো তা বাংলা করে বলতে গেলে হবে আমরা বুড়ো হয়েছি। তার মধ্যে ওকে ধরা যাবেনা। একটা পাক্কা নেমন্তো পুরো কেঁচিয়ে গেলো। বাবিদা'র সঙ্গে দেখা হলেই গানবাজনা নিয়ে দু'চার কথা হয়েই যায়। কালও হলো। আসলে বাবিদা আর খোদ চঞ্চুশাহ দুজনেই আমার কলেজতুতো আত্মীয়। আর জামশেদপুর ফ্যাক্টর তো কাঁঠালের আঠা। লাগলে পরে ছাড়েনা। গিরিজা দেবী আর বনারসি ঠুমরি নিয়ে দু'চার কথা। কয়েকজন মজলিশি আড্ডাধারীদের নিয়ে তিন'ছয় কথা। 'নুনেতে-ভাতেতে-৩' এর জন্য ওয়াইন নিয়ে একটা বড়ো লেখা লিখতে গিয়ে সম্রাট পিয়দস্সি অশোকের ওয়াইনপ্রীতির গপ্পো জেনে ফেলা। লালপোর্টের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বাঁধা ভোঁদড়বাবু। হায়দরাবাদে আমার বাড়িতে বিরিয়ানি দিয়ে যীশুর রক্তপান তাঁর প্রিয় ব্যসন। এসব কথাবাত্তা হতে হতে লালমদিরা ক্রমাগত শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাতেলা শীর্ষে পৌঁছোলো, যখন ছিপিবন্ধ বোতল থেকে সাহেবশঙ্খ আমার পাত্রে তরলটি ঢালার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লো। তার পর কী হইলো জানেন বাবিলাল। তবে খ্যাঁটনটি বেশ জমপেশ হয়েছিলো। মনোজদা পুরো সাহেব হয়ে গেছেন। সামান্য ইন্দোচিন খাবারদাবার তাঁকে যতো ঝালের চোট দেয়, সাহেবশঙ্খ তত ভুতজলোকিয়ার আচার খেয়ে সে কী সুখ পায় তা ফলাও করে শোনায়। এদেশে ছেলেপিলে সব উচ্ছন্নে গেছে। ঠেক থেকে বেরিয়ে কাস্টমারি ছবি তোলা তো বাদ দেওয়া যায়না। তবে কাল সব ছাতা মাথায় ছত্রপতির জলছবি। ডালহৌসির অফিসফেরত জনতার ফুটপাথ আটকে সমবেত কোরাসের ছবি রয়ে যাবে। বৃষ্টির ঝাপট রয়ে গেছে তখনও। জলের পাগলামিও কাটেনি। তার মধ্যে শরীরে পূর্ণ শিরাজের পানি এবং আরেকটা আড্ডার ভিটামিন। সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী.... জয় হোক।
দীপঙ্কর বসু
গতকাল রাতে আমাদের লাইম লাইটের আড্ডার গল্পটা লিখে ঠিক তৃপ্তি পাইনি | ধৈর্যের অভাবে লেখাটা অতি বাজে ধরনের হয়েছে |লেখাটা আড্ডার পাতা থেকে মুছে ফেলতে পারলে |কিন্তু সে কাজটা বোধ হয় ঠিক হবেনা |তাই লেখা মোছামুছির রাস্তায় না হেঁটে নতুন করে লিখে ব্লগে রেখেদিলাম| বাজে লেখার চেয়ে পুনরাবৃত্তি ভালো | ষড়যন্ত্রটা চলছিল অনেক দিন ধরে ই ।চঞ্চল দিল্লী থেকে ফোন করে জানিয়েছিল তার ইচ্ছে নভেমবর মাসে সে যখন তিনদিনের কড়ারে কলকাতায় আসবে তখন আড্ডাধারীদের নিয়ে একটা বৈঠকি আড্ডার আয়োজন করবে । অবশেষে গতকাল এলো সেই প্রতীক্ষিত দিনটি ।কিন্তু কে জানত অলক্ষ্যে বরুণদেব মুচকি হেসেছিলেন আমার ছেলে বেলার সেই ক্ষ্যাপাটে বন্ধুর মত । খেলা ধুলোয় তার আগ্রহ ছিলনা ,তার আনন্দ ছিল আমাদের খেলা ভন্ডুল করে দেওয়ায় ।কতযে অভিনব কায়দায় সে দুষ্কর্মটি করত তার ফিরিস্তি না হয় ভিন্ন লেখায় দেওয়া যাবে ।আপাতত ফিরে আসি গতকালকের কথায় । সকালে ঘুমচোখ খুলেই দেখেছিলাম আকাশ মেঘে ঢাকা ,চারিদিক বিবর্ণ নিরানন্দ আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে ।মনে মনে প্রমাদ গণেছিলাম -এই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে কেউ আসবে কিনা সন্দেহ হয়েছিল । আশা নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে তবু বেরিয়েছিলাম এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশন এ ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে বিবাদী বাগের দিকে হাঁটছিলাম আর তখনি যেন বৃষ্টির বেগটা আরও বেড়ে গেল । আরে বাবা রাধার অভিসারে তো যাচ্ছিনা ,যাচ্ছি প্লেন অ্যান্ড সিম্পুল আড্ডার টানে -তাতেও বাগড়া !! যাই হোক অনেক কষ্টে,মাথার ছাতা ,রাস্তার ইতিউতি জলভরা খানাখন্দ পেরিয়ে নাকালের একশেষ হয়ে অকুস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি টেলিফোন ভবনের উল্টো দিকের লাইম লাইট রেস্তোরার সামনে মনোজদা বেজায় ব্যাজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আর তার দু হাত দূরে স্তুতি কাঁচুমাচু মুখে কয়েকজনের সঙ্গে কি সব কথা বার্তা বলে চলেছে । হঠাৎ মনে হল আমার আশঙ্কাটাই বুঝি সত্যি হতে চলেছে ।বৃষ্টি বাদলা দেখে সবাই আড্ডার মোহ ত্যাগ করেছে । ব্যপারটা খোলসা হল ওদের কাছে গিয়ে ।জানতে পারলাম ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দেবার সময়ে কোনক্রমে স্তুতির হাত থেকে তার মোবাইল ফোনটি মাটিতে পড়ে গেছে । এবং সেটি স্তুতি টের পেয়ে খোঁজ খবর করার অবসরে ফোন বাবাজি ডানা মেলে উড়েগেছেন কোন এক অজানা ঠিকানায় । কিন্তু নানান জনের নানান পরামর্শ মত তত্ত্বতালাশ চালিয়ে যখন বোঝা গেল "তা আ আ রে এ এ ফেরান যাবেনা কিছুতেই " তখন উপায়ান্তর না দেখে আমি স্তুতি এবং মনোজদা রেস্তোরায় ঢুকে পড়াই সাব্যস্ত করলাম । সেখানে তখন আগ্রিম বুক করা আমাদের টেবিল আলো করে বসেছিলেন দুই আয়োজক - চঞ্চল এবং জল । ক্রিকেট খেলায় মাঠে নামার সময় ফিল্ডিং করা দলের খেলোয়াড় রা যেমন একটু অকারণ ছুটোছুটি করে গাটা ঘামিয়ে নেয় ,বলটাকে নিজেদের মধ্যে লোফালুফি করে পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয় ,আমরাও তেমনি এ কথা সেকথা বলাবলি করে নিজেদের মানিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ । তারপরে কে জানি প্রস্তাব দিল বাকি রা যতক্ষণ না এসে পড়ছে ততক্ষণ কিছু হাল্কাপুলকা কিছু অর্ডার দেওয়া যাক বসে বসে চিবনোর জন্য ।তারপর কিছুক্ষণ চলল মেনুকার্ড টা নিয়ে লোফালুফি - এ বলে তুমি অর্ডারটা দাও ,সে বলে আরে তুমিই দাওনা ।।চঞ্চল জিজ্ঞেস করে "বাসুদা কি খাবেন" আমিই বা ত্যাঁদড়ামিতে কম যাই নাকি ? ধ্যানী বুদ্ধের মত মুখ করে বললাম "আহা ,তোমরা যা খাবে আমিও তাই খাবো" অগত্যা চঞ্চলকেই রাশ ধরতে হল শেষ অবধি । স্থির হল আমরা হাল্কা কোন সুরাঘটিত পানীয় এবং বালিকাদের জন্য ফ্রেশ লাইম সোডা । মনোজদা কিন্তু কন্তু করছেন দেখে অর্ডার নিতে আসা স্টাফটি পরামর্শ দিল একটা ভাল করে বানান "মক টেল" ট্রাই করে দেখতে ।কিন্তু মকটেল আর ককটেল শব্দদুটোর মধ্যে এত মিল যে মনোজদা সকলের হাজার বোঝানো সত্বেও কোন ঝুঁকি নিলেননা । অরেঞ্জ জুস এই শেষে মেস ডোবালেন নিজেকে । ইতিমধ্যে সোমা "টাইগার ব্রিগেডের" দুই সদস্যের সন্দেশ নিয়ে এসে গেছেন । জানা গেছে তারা আসছেন । তাঁরা মানে নান আদার দ্যান শিবাজি ওরফে "শিবাংশুদা" এবং অবশ্যই শঙ্খ সায়েব । এই অবধি আমার স্পষ্ট মনে আছে । এর পরে কি গল্প হল কি খাওয়া হল সে সব বিবরণ জানতে চেয়ে লজ্জা দেবেননা । আমি কিছু দেখিনি ,কিচ্ছুটি শুনিনি । নাহ ,ভুল বললাম - কখন যেন একবার দেখলাম শঙ্খ সায়েব পরম ভক্তিভরে "শিবাংশুদার" পানপাত্রে ওয়াইনের বোতল থেকে ওয়াইন ঢালার চেষ্টা চালাচ্ছেন । কিন্তু যতই চেষ্টা করুন যতই বোতলকে ঝাঁকুনি দিন ওয়াইন আর বোতল থেকে পানপাত্রে যাবার নামটি করেনা । সে এক মহা বিপদ । ঠিক সেই সময়ে কে জানি আবিষ্কার করল সায়েব উৎসাহের আতিশয্যে বোতলের ছিপিটিই মুখ থেকে খুলতে ভুলে গেছেন ! ভুলেও কিন্তু ভাববেন্না যে আমি সায়েবের পিছনে তাকে নিয়ে খিল্লি করছি ।আমি কিন্তু সেইক্ষনেই বলে রেখেছিলাম যে এ সংবাদটি আজকের আবাপ তে হেডলাইন হবেই ।আমার তাই কোন দোষ নেই ভাই । Li
মনোজ ভট্টাচার্য
ঝাড়গ্রাম এবং - - ! অনেকদিন ধরেই মনস্থ করছিলাম – ঝাড়গ্রাম থেকে চিল্কিগড় হয়ে যে কনকদুর্গার মন্দির আছে – সেখানে একবার যাবো ! – অকস্মাৎ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের বিজ্ঞাপন দেখে মনস্থির করেই নিলাম – ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুক করলাম ! নির্দিষ্ট দিনে সকালে বি বা ডি বাগের অফিশের সামনে থেকে বাস ছাড়ে ! বাসটা আহা মরি নয় – সীটগুলো খুবই শুস্কং কাষ্ঠং – তিন ঘণ্টা সাড়ে তিন ঘণ্টা জার্নির পক্ষে একটু কষ্টকর বৈকি ! কিন্তু ব্রেক ফাস্ট ! আহা - অতি উত্তম ! যদিও বাস-ছাড়ার সময় ছিল আটটা – কিন্তু আগের দিন হঠাৎ ফোন করে দেড় ঘণ্টা এগিয়ে সাড়ে ছটা করে দিল । কারন হিসেবে মাওবাদী জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা ইত্যাদি বলে – বেশ গা-ছম ছমিয়ে দিল ! বিনা কারনেই ব্যাপারটা বেশ গম্ভীর হয়ে গেল ! দ্বিতীয় হুগলী সেতু দিয়ে বাস কলকাতা ছাড়তেই – মনের মধ্যে বেশ স্ফূর্তি – যাক অন্তত দুদিনের জন্যে বাইরে তো বেরনো গেল ! প্রকৃতপক্ষে কলকাতার বাইরে বের হলেই – স্বল্প দূরই হোক বা অনেকটা দূরই হোক – মনে হয় যেন বাইরে যাচ্ছি ! – একটু যেন হ্যাংলা হ্যাংলা শোনাচ্ছে ! – তা হোক ! হাতে যে ব্রেক-ফাস্টের প্যাকেট ছিল – তা তো কোলাঘাটের আগেই শেষ হয়ে গেছে – এবার তাহলে চায়ের পালা ! একটা দোকানে খুব ভালো চা খাওয়াল ম্যানেজার ! ব্যস এর পর থেকে সরকারী আতিথ্য শেষ ! এবার যার যার নিজস্ব ! এদিকে মেদিনীপুর জেলা পড়তেই রাস্তার চেহারাও ক্রমশ পাল্টে যেতে লাগল । বিরাট বিরাট শাল, ইত্যাদি গাছে রাস্তা ঢেকে যেতে লাগল ! গাড়ি ছাড়া পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা কমে যেতে লাগল ! ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্সে আমাদের ঘর দেওয়া হল ! বেশ সুন্দর সাজানো কোয়ার্টার । এক একটা বাড়িতে দুটো করে ইউনিট । - এখানে একটু মুখ হাত ধুয়ে খাওয়ার অর্ডার দেওয়া হল । আবার তো আমাদের বেরতে হবে ! ইতিমধ্যে বাঁদিকে তাকাতেই দেখি ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির গেট ! রাজা নরসিংহ মল্লদেব সরনী! বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢোকা নিষেধ – তাই আপাতত গেটের কাছেটাই দেখলাম ! লাঞ্চের পর রাজবাড়িতে গেলাম । মুল রাজবাড়িতে – ঢোকা বারন ! কিন্তু আমাদের তো অনুমতি নেওয়া হয়েছে । মানে যারা রাজবাড়ি ট্যুরিস্ট লজে থাকছে – তাদেরই অনুমতি হয়ে যায় ! – সেখানে একজন কেয়ারটেকার এক পা তুলে বসে আছে – মুখে শুধু ‘না’ শব্দ ! ব্যবহার অতি বাজে ! - আমরা যখন বললাম – আমরা কলকাতা থেকে আসছি – অনুমতি নেওয়া আছে – আপনি এরকম ব্যবহার করবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি – ততক্ষণে তার বোধগম্য হল ! – ‘তাহলে দেখুন’ – খুবই নিঃস্পৃহ গলায় যেন তেতো ওষুধ গিললেন আরে দেখব টা কি ! শুধু একটা ডাইনিং রুম ! গ্রে স্ট্রিটের মিত্র কাফের মতো ! – ভেতরে বা ওপরে যাবার সব দরজাই বন্ধ! তো আমরা বাইরের কিছু ছবি তুললাম ! এই রাজাদের কিছু ইতিহাস আছে – সেই গল্পের ধান্দাতেই তো আমরা এখানে ওখানে যাই! দিল্লির সম্রাট আকবরের নির্দেশে রাজস্থানের রাজা মান সিংহ - সুবেদার সর্বেশ্বর সিং চৌহান ও তার ভাইকে নিয়ে - তৎকালীন মল্ল রাজাদের পরাস্ত করে ঝাড়গ্রাম দখল করে ! আগে নাম ছিল ঝারি-গ্রাম । মান সিংহ ফিরে গেলে, - সর্বেশ্বর সিং চৌহান ও তার ভাই - আঞ্চলিক রাজাদের মতো - নাম পাল্টে মল্লদেব পদবী নিয়ে রাজত্ব করতে লাগলেন ! বর্তমানে তাদের ২১তম বংশধর শিবেন্দ্রবিজয় মল্লদেব রাজত্ব করছে – ও তৃণমুল সামলাচ্ছে ! এবার নাম পরিবর্তনের ওপর কিছু জ্ঞান ! – আদিবাসী অঞ্চলে বীরদের নাম হত উগাল ও সান্ডা । তাই সর্বেশ্বর সিং চৌহান আঞ্চলিক নাম নিয়ে হলেন রাজা সর্বেশ্বর সিং মল্ল উগাল সান্ডা দেব ! যেমন পরবর্তী বংশধর হলেন রাজা নরসিংহ মল্ল উগাল সান্ডা দেব ! পরবর্তীকালে অবশ্য আবার পরিবর্তন হয়ে শুধু মল্লদেব হয় ! নতুন রাজবাড়ির স্থাপত্যের দিকে তাকালে বোঝা যায় মোগল স্থাপত্যের সঙ্গে ব্রিটিশ স্থাপত্যের বেশ কিছু সহাবস্থান আছে ! যেমন প্রাসাদের সামনে প্রশস্থ সোপান-শ্রেনীর প্রাধান্য ব্রিটিশ ধাঁচের! আবার বিরাট গোলাকার গম্বুজ মনে পড়িয়ে দেবে মোগল স্থাপত্য রীতি ! – পাশে একটা অতিথি নিবাস ! ব্রিটেন থেকে কোন গন্যমান্য অতিথি এলে সেখানে নাকি স্থান পেত ! – এখন সেই অতিথি-নিবাস দেখে বিশেষ কোন অনুভুতি হল না ! মনে হল ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির নামটাই শুধু অবস্থান করছে ! কি দেখেছি তার ধারাবাহিক বিবরন দিলে স্মৃতির ওপর চাপ পড়বে ! তার চেয়ে ভালো - বিশেষ দ্রষ্টব্যগুলো বলে নিলে । লাল জল নামে এক যায়গায় বাস দাঁড়াল । ব্যাপারটা হল – সেখানে একটা পাহাড়ের গুহায় নাকি ভালুক বা গুহা-মানুষ ছিল । এখন অবশ্য নেই ! ভালুক নেই । কিন্তু আছেন একজনা - এক আদিবাসী মহিলা – বয়স পঞ্চাশ থেকে একশো পঞ্চাশেরই মধ্যে কিছু - একটা লালজল দেবীর আস্তানা গেড়ে একাই ওখানে থাকেন ! ঠিক একা নয় – ওনার ঘরের মধ্যে কিছু সাপও থাকে । তবে ওঁকে কিছু বলে না ! ওনার কাছ থেকে কলকাতা থেকে অনেকে আসে – জড়িবুটি কিনে নিয়ে যায় ! স্থানটা বেশ পরিস্কার ! আর ওখানে খাবার ইত্যাদি সরবরাহ করে – কেউ না কেউ ! – আমাদের অনেকেই দেখলাম – ভক্তি বা ভয়ে প্রনামী দিচ্ছে ! আমার আগে থেকে কনকদুর্গা মন্দিরের সম্বন্ধে একটা কৌতূহল ছিল ! বেশ মুখরোচক গুল্প ! চিলকিগড়ে চিলকিগড় রাজবাড়ি ও কনকদুর্গা মানে সোনার দুর্গার মন্দির ! রাজবাড়িগুলোর স্থাপত্য এমনিতেই বেশ দর্শনীয় – তার ওপর জড়িয়ে থাকে গল্প – মানে খানিকটা ইতিহাস ! চিল্কিগড়ের রাজবাড়িও বেশ দর্শনীয় ! বরং এটা দেখে তবু কিছু সম্ভ্রম বোধ হল ! এই রাজবাড়ি রাজা জগতদেও তৈরি করেছিল । এই রাজবাড়ির বৈশিষ্ট হল এর পরিচারক মহল ! সেটাই প্রায় একটা প্রাসাদপম ! খুবই জীর্ণ হয়ে গেছে ! এর পাশে একদিকে গায়ত্রী মন্দির ও আরেকদিকে মহাদেবের মন্দির ! আবার আসি কনকদুর্গা মন্দির ! এ মন্দিরটাও যথারীতি একই গুল্প-জাত ! প্রায় পাঁচশো বছর আগে মধ্যপ্রদেশ থেকে রাজা জগতদেও এখানে এসে রাজা ধবলদেও কে পরাস্ত করে একটি মন্দির তৈরি করে ! জগতদেওর কোন এক বংশধর গোপীনাথের স্বপ্নে কনকদুর্গা দেখা দেন ও মন্দিরে স্থাপনা করতে আদেশ দেন ! পরের দিন গোপীনাথের সঙ্গে যোগেন্দ্রনাথ কামিল্যা নামে এক শিল্পী ও রামচন্দ্র সারাঙ্গি নামে এক পুরোহিতের সাক্ষাত হল – তারাও নাকি দেবীর কাছ থেকে একই স্বপ্নাদেশ পেয়ে গোপীনাথের কাছে এসেছে । তিনজনের প্রচেষ্টায় তৈরি হল মন্দির ও ভেতরে অধিষ্ঠিত হল এক মূর্তি – যাকে অলঙ্কৃত করা হল সোনায় ! অতঃপর মন্দিরের প্রসিদ্ধি হল বড়ামহল নামে আর দেবীর নাম হল চণ্ডী – যে কিনা শক্তির প্রতিক ! – জঙ্গলাকীর্ণ এই মন্দিরে আগে মোষ বলি দেওয়া হত আকছারই । পরে অবশ্য ছাগ-বলি দেওয়া হয় ! – পুরনো ভেঙ্গে পড়া মন্দিরটা বা দিকে এখনো আছে একটু বিপজ্জনক ভাবে ! এরই পাশ দিয়ে ডুলুং নদীর রাস্তা ! মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ডুলুং নদী ! অনেকটা জায়গা জুড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই মন্দির প্রাঙ্গন – বেশ রোমাঞ্চকর ! গেট থেকে মন্দির পর্যন্ত দুধারে উঁচু উঁচু গাছের সারি – নাকি একশো আট রকম প্রজাতির গাছ আছে ! অনেক গাছের গায়ে নামও লেখা আছে ! – বেশ বোটানিক্যাল গার্ডেন ধরনের ! ঘাগরা ফলস ! বর্ষাকালে এর রূপ হয় ভয়ঙ্কর ! দু-কুল ছাপিয়ে যায় ! এখন একেবারে শুকনো পাথুরে ! কিছু ছেলে ওরই মধ্যে এক যায়গায় সাঁতার কেটে স্নান করছে ! পাথরের ওপর দিয়ে নামা ওঠাই সার ! তবু বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস ! এছাড়া সাবিত্রী মন্দির , মিনি চিড়িয়াখানা ইত্যাদিও আছে ! ঝাড়গ্রাম – প্রায় কলকাতার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে – খুবই মনমুগ্ধকর বেড়ানোর জায়গা ! মনোজ
সুকান্ত ঘোষ
ভারতবর্ষে যদি রেলে যাতায়াতকে কেবল পরিবহন বলে কেউ ভাবেন তা হলে তিনি নির্ঘাত বিশাল একটা ভুল করে বসেন না জেনেই। ভারতে রেলে যাতায়াতের দার্শনিক নাম হল – রেলযাত্রা। যে কোন তীর্থ যাত্রার মত গুঁতো গুঁতি, না বেঁচে ফিরে আসার ভয়, সব খুইয়ে বসার আশঙ্কা এই সব সারক্যাষ্টিক জিনিস পত্র যদি বাদও দিই, তাহলে আমাদের রেলকে ‘যাত্রা’য় উন্নীত করতে যাদের অবদান অনৈস্বীকার্য তারা হল ট্রেনের ‘হকার’ এবং তাদের প্রতি আমাদের সমাজিক স্নেহ। ভারত থেকে বিদেশে এসে যখন প্রথমদিকে কেউ কেউ ট্রেনে চাপেন তা হলে বিশাল একটা ঝটকা লাগে – টাইমে ট্রেন আসছে , বসার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে,পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ইত্যাদি । তা এই সবে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে এলে একটা অভাব অনুভূত হতে শুরু করে – কিছু যেন একটা মিস করছি । অনেক ভেবে আমি বার করলাম সেটা আর কিছুই নয়, ট্রেনে হকার দের অনুপস্থিতি ! ট্রেন অনুমোদিত কয়েকটা কফি ভেন্ডর ছাড়া বিদেশের ট্রেনে হকার কোথায় ! আমাদের দেশে ট্রেনে হকার দের উপস্থিতি যাত্রাকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়ে থাকে, নাহলে ওই নরক যন্ত্রণা সহ্য করা দায় ! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আমি এখানে ট্রেনে হকারদের আলোচনা মূলত সীমিত রাখব হাওড়া- বর্ধমান লাইনের মধ্যে কারণ এই লাইনের মধ্যেই আমার ফার্স্ট- হ্যান্ড অভিজ্ঞতা রয়েছে । তবে সমস্ত ট্রেন হকার প্রজাতির মধ্যে জীনগত পার্থক্য তাতটাই যতটা আমাদের আর শিম্পাঞ্জীর মধ্যে ! যাই হোক হাওড়া- বর্ধমান মেইন লাইন লোকালের হকারদের চার ভাগে ভাগ করতে হবেঃ এক) শুধু হাওড়া স্টেশন - এদের এক্তিয়ার ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত দুই) হাওড়া থেকে ট্রেন ছেড়ে ব্যান্ডেল দাঁড়ানো পর্যন্ত তিন) ব্যান্ডেল ছাড়ার পর ও বর্ধমানে থামার ঠিক আগে চার) বর্ধমান স্টেশন শুধু এদের মধ্যে তৃতীয় প্রজাতির সাথে আমার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল বহুদিন । অনেকে আবার বন্ধুস্থানীয় বলা যেতে পারে । এরা অনেকেই চমকপ্রদ খাবার বিক্রী করত । মানুষের মত খাবারেরও যে বিবর্তন হয় তা এই ট্রেন লাইনের হকারদের খাবার অনুসরণ করলেই বোঝা যায় । পার্থক্য একটাই, খাবারের বিবর্তনের টাইম স্কেল ডারইন স্কেলের থেকে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত । যখন ট্রেনের ভেন্ডর কম্পার্টমেন্টে ভাত বিক্রি শুরু হল তখন বেশ একটা চমক লেগেছিল । এই ভাত বিক্রি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল সকাল ১০টা থেকে ১২ টার মধ্যে ট্রেন গুলিতে । এই সময়ের ট্রেনে বর্ধমানের দিক থেকে কলকাতায় ছানা আসত ।এই ছানাওয়ালারা সকালে আশে পাশে গ্রামে গোরুর দুধ দুইয়ে, সেই দুধে ছানা কেটে তারপর কলকাতা। ফলত এরা সত্যিকারের টাইম প্রেসারে থাকত , কর্পোরেট জগতের মত ফলস টাইম প্রেসার নয়। তা ট্রেনে ভাতের ব্যাবস্থা শুরু হওয়ায় অনেকের সুবিধাই হল । একজন বৌদি প্রথম এটা শুরু করে এক হাঁড়ি ভাত ,ডাল ,সব্জি ,মাছ ও খোপ কাটা থালা বা কলাপাতা বিছানো থালা দিয়ে ব্যাবসা শুরু । সঙ্গে বালতিতে জল- দাম মনে হয় ১০ টাকার মত ছিল । অনেক খানবালার মতে রীতিমত হোমলি খাবার । ট্রেনে ভেন্ডর কামরা নিয়ে অনেকের ভুল ধরণা আছে – ভুল ভাঙানোর জন্য কিছুদিন যাতাযাত করতে অনুরোধ করব। ছানার গন্ধ, পচা সব্জির গন্ধ এই সব সহ্য এলে ভেন্ডরে যাতাযাত কিন্তু খুবই আরামপ্রদ। উপরি পাওনার মধ্যে রয়ে যায় হকারদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে জিনিস পত্র কেনা। ভাত ছাড়া পেট ভরানোর নিকটতম খাবার ট্রেনে যা পাওয়া যেত তা হল মশলামুড়ি । মশলা মুড়ি যারা বিক্রি করত তাদের অনেকেরই আমাদের আশে পাশের গ্রামে বাড়ি। আমাদের নিমো গ্রামে মশলা মুড়ি বিক্রেতা ছিল সাকুল্যে তিন জন – ময়রাদের তপন, তপনের ভাই বাঁকু আর বাউরিপাড়ার হারা। আর মশলামুড়ি পরিবেশনের যে কাগজের ঠোঙা তা তৈরী করত কলুদের বুধোর বউ, যে বুধো আমাদের পিকনিকে রান্না করত বলে অন্য পর্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি আগেই। তপন ছিল আদ্যান্ত সংসারী মানুষ, লাইফে তেমন ঘটনার ঘনঘটা নেই। আমাদের পরিবারের সাথে তপনের খুবই ভালো সম্পর্ক। পুজোর কদিন তপনদা হকারি করতে যায় না – আমাদের বাড়িতে রান্না করে। আমাদের বাড়িতে পারিবারিক দূর্গা পূজা হবার জন্য আত্মীয় সজনের সমাগমে বাড়ি গম গম করে ওই সময়ে। ইয়ং জেনারেশেনের বাড়ির বঊরা আজকাল জবাব দিয়েছে এই বলে যে সারা বছর হেঁসেল ঠেলে ওই কটা দিন তারা সাজুগুজু করে রিল্যাক্স করতে চায়। তাই শুধু হেল্পিং হ্যান্ড নয়, পুজোর কদিন সব রান্না-বান্নার ভারও তপনদা এবং তার সহকারীর উপর ন্যস্ত থাকে। বাঁকুর ব্যাপারটা একটু সাইকোলজিক্যাল – বিয়ের আগে পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু চাঁপাকে বিয়ে করে আনার পর ব্যালান্স চেঞ্জ হয়ে যায়। বাঁকুর হাইট খুবই শর্ট থাকার জন্যই সেই ব্যালেন্সের খেলা – চাঁপা সুন্দরী, বাপের ধারদেনা থাকার জন্য বাঁকু পয়সা দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চাঁপিকে (চাঁপাকে আদর করে আমাদের গ্রাম চাঁপি বলত) তুলে আনে। চাঁপি কিছুদিন বিয়ের পর ঠিক থাকে – কিন্তু বাপের বাড়ির গ্রামের তুলনায় নিমো গ্রাম মর্ডান হবার জন্য সেই সজীবতার রেশ চাঁপির মনেও লাগে। কুজনেরা বলে চাঁপির নাকি পরপুরুষের প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়। তো এমন অবস্থায় বাঁকুর জীবনের ইক্যুলিব্রিয়াম নষ্ট হয়ে গিয়ে ফ্রী এনার্জী কোলাহলে নষ্ট হতে শুরু করে। লাষ্ট ট্রেন পার করে বাড়ি ফিরে বাঁকু পাড়া জানিয়ে চাঁপিকে শাসন এবং ততসহ চাঁপির একজিজটেন্ট ও নন-একজিসট্যান্ট নাগর-দের প্রতি ‘দেখে-নেবার’ চেতাগ্নি শুরু হত। বাঁকুর চেতাগ্নি নিয়ে আমাদের চিন্তা ছিল না – চিন্তা ছিল এই নিয়ে যে এই সব সাত-পাঁচ ভেবে বাঁকুর মুড়িমশলার কোয়ালিটি না কমপ্রোমাইজড হয়ে যায়। মুড়ি মশলার লাইনের কম্পিটিশন সফটওয়্যার আউট সোর্সিং-এর থেকেও লগ্ স্কেলে বেশী। আমার চেনা সমস্ত মুড়ি মশলা বিক্রেতাদের মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার নিঃসন্দেহে ছিল হারা । আগে হারা আমাদের জমিতে কিষেনের কাজ করত। একদিন কোথা থেকে ট্রেনে করে ফেরার সময় দেখি গাংপুর স্টেশন থেকে হারা মুড়ি মশলা নিয়ে উঠছে প্যান্ট-জামা পড়ে এবং সব চেয়ে বড় কথা চোখে একটা চশমা পড়ে! আমার সঙ্গের জনতা এক ঐতিহাসিক ভুল করে ফেলে যা ভাবলে আমি এখনও লজ্জিত হই – জানলা দিয়ে পাবলিক হেঁকে উঠে, “এই হারা - *ড়া, চশমা পড়ে কি *রাচ্ছিস, আর গলায় ওটা কি”? গলায় মুড়ি মশলার ডাব্বা বুঝতে আরো যোগ করে, “তোর *লের মুড়ি কে খাবে রে”? হারা সেই পাবলিক দেখে ট্রেন কমপার্টমেন্টে থেকে অনেক রানিং অবস্থায় নেমে যায় – তখনো ওর বেশী প্র্যাক্টিস হয় নি চলন্ত অবস্থায় ডাব্বা নিয়ে ট্রেন থেকে নামা। হারা ট্রেনের তলায় ঢুকে গেলে আমরা শিওর খুব দুঃখ পেতাম তৎকালে। তবে হারাও শোধ নিতে চেয়েছিল। সে কোন সময় রাতের বেলা তন্ত্র প্র্যাকটিস করতে শুরু করে আমরা জানতে পারি নি। নিমো স্টেশন ও গ্রামের মধ্যে ১০০ মিটার মত জমির ফাঁক আছে। হারা রাতে বাড়ি ফিরত না – নিমো স্টেশনের ধারেই একটা গুমটিতে থাকত। আমাদের বন্ধু রাজু এক সময় ঠিক করে নিমো স্টেশনে একটা ইমিটেশনের দোকান করবে – তা রাত জেগে সেই দোকানের কাজ চলছে। তখন হারা অফার করে যে অত রাতে বাড়ি না ফিরে রাজু ওর গুমটিতে থাকতে পারে। রাজুর সরল মনে থেকে যেতে রাজী হয়। একদিন রাতে শুনি বিশাল চিৎকার আর দরজায় রাজুর ধাক্কা। কিনা স্টেশন থেকে রাজু গ্রামে ছুটে আসছে আর তার পিছনে পিছনে খাঁড়া হাতে তাড়া করেছে হারা। পরে জানা যায় হারার বিছানার তলায় একটা খাঁড়া রাখা থাকত এবং কোথা থেকে সে একটা মাথার খুলি ও একজোড়া টিবিয়া-ফেবুলা জোগাড় করেছিল । সেই খুলির ভেতর ঢেলে হারা নাকি মাল খেত । সেই দিন রাত্রে খুলিতে মাল খেয়ে হারা সিন্দুর দিয়ে খাঁড়া পুজা শুরু করতে শুরু করতে। রাজু নাকি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সব মজা দেখছিল – এর পরে কি হবে সেটা সে অনুমান করে নি। পুজা শেষে হারা নাকি মায়ের আদেশ পেল যে সেদিন নরবলি দিতে হবে! অতঃপর রাজুকে বলি হতে রিকোয়েষ্ট করে মহা পূণ্যের কাজ বলে, এবং রাজু রাজী না হলে খাঁড়া নিয়ে তাড়া করা মাঝরাতে ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে মিউচ্যুয়াল হয়ে যায় – ট্রেনের কমপার্টমেন্টে আমাদের দেখতে পেলে, হারা সেই খানটায় আর মুড়ি বিক্রী করত না। চশমা ঠিক করে সরে যেত। আগেই বলেছি মুড়ি মশলা লাইনে কম্পিটিশন একটু বেশি ছিল । এখনও দেখা যায় এক কামরায় চারজন মশলামুড়ি নিয়ে উঠে পড়ল ! কোনও নির্দিষ্ট টাইম না থাকলে যা হয় আর কি? মুল সারবস্তু সবারই প্রায় সমান ছিল- মেশিনে ভাজা মুরি,চানাচুর, পেঁয়াজকুচি, আলুর টুকরো, ছোলা ভেজানো, তাতে খাঁটি সরষের তেল খানিকটা –আর তাছাড়া ছিল একটা স্পেশাল মশলা । সেই স্পেশাল মশলা প্রায় সব হকারই একজায়গা থেকে কিনত ।এবং সেই মিশ্রণে যে কি আছে সেটা কেউ জানত না । আমি শুনেছিলাম ওই মশলায় নাকি কুলের বিচি গুঁড়ানো থাকে ! এত্য ফল থাকতে কুলের বিচি কেন সেই বিষয়ে আমি ধন্ধে ছিলাম ! সব মিশিয়ে স্টিলের কৌটোয় চামচ দিয়ে নাড়ানোর যে শব্দ তাতেই জিভে জল চলে আসার মত ব্যাপার । মাল ঠোঙায় ঢেলে সর্বোপরি একটা লম্বা নারকেলের টুকরো ।এই খাবার বহু ক্ষুধার্ত স্কুল ফেরত ছোকরা , অফিস ফেরত বাবু ,সিনেমা ফেরত গৃহবধূ ,সন্ধ্যেয় রেলাক্স করতে বেরানো যুবক যুবতী দের প্রাণে জোর সঞ্চার করেছে দিনের পর দিন । তবে কম্পিটিশন মার্কেট থাকায় কোনও কোনও হকার স্ট্যান্ডার্ড রেসিপি থেকে ডিভিয়েট করত একটু আধটু – যেমন একজন আমদানী করল আমতেল দিয়ে মুড়ি। আর কিছু নয় মুড়ি , আমতেল আর নারকেল ।বললে বিশ্বাস করবেন না এই ভাবে সে নিজের একটা মার্কেট গড়ে তুলেছিল নিজের চারদিকে । বর্ধমানে মেইন লাইন যে ট্রেন টা ৫।৪০ তে ছাড়ত সেই ট্রেনের পিছন দিক থেকে তৃতীয় কামড়ায় সে উঠত। দিনে ওই একটাই ট্রেন ও কভার করত –বর্ধমান থেকে ব্যান্ডেল ও ফেরত । প্রায় ১০০ ঠোঙা মত মাল সে বিক্রী করত । দুটাকা ঠোঙার যুগে আমতেল মুড়ি ছিল তিন টাকা ।আর বর্ধমান স্টেশনে দেখেছি সস দিয়ে মশলা মুড়ি বিক্রী করতে । স্পেশাল বলতে হত এবং তার দাম তখনি ছিল পাঁচ টাকা মত ।তবে সেই সস মেশানো মুড়িতে মুচমুচে ভাবটা থাকত না বরং মাখা মাখা কাদা কাদা একটা ভাব । কাগজের প্লেটে সেই জিনিস ঢেলে দিত এবং আইসক্রীম খাওয়ার চামচ দিয়ে তা খেতে হত । ট্রেনের খাবার বিষয়ে আলোচনা করতে হলে একটা তুলনা মূলক প্যারালাল না চাইলেও আনতে হবে যেটা হল ঘটি বনাম বাঙাল ।আমাদের দিকে এই ব্যাপারটা মাঝে মাঝে কলকাতা সুলভ ড্রয়িংরুম জাত টিক্কা-টিপ্পনীর মত সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজজীবনে প্রভাব ফেলত !দেখা গেছে যে ট্রেনের হকারদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ বা তার বেশী বাঙাল !এর সমাজতত্ব গত ব্যাখ্যা আমি জানি না তবে আপাত দৃষ্টিতে যা মনে হত তা হল বাঙাল ছেলে পুলেরা ঘটি কাউন্টার পার্ট গুলোর থেকে বেশি কর্মঠ ।ঘটি যুবক গন যখন আগের দিনের ক্রিকেট ম্যাচের আলোচনা করতে ও গ্রামের বাঁশের মাচায় বসে বিড়ি ফুঁকতে ব্যাস্ত , তাখন বাঙাল ছেলেদের দেখেছি বাড়ির গাছে হওয়া এক ঝুড়ি পেয়েয়ারা নিয়ে ট্রেনে বেচতে যেতে ।আর তাছাড়া আমাদের ওদিকের বাঙালদের ব্যাবসা বুদ্ধি প্রখর ছিল । ট্রেনে ইনিভেটিভ যা কিছু হকাররা বিক্রী করে সবই বাঙাল মস্তিষ্ক প্রসূত। ভাবুন – বিটনুন দিয়ে কাঁচা আমলকী , চালের পাঁপড় ,টম্যাটো দিয়ে ছিলা মটর সিদ্ধ (তেঁতুল গলা জল সমেত), ঘটি গরম ,গরম দিলখুশ, ঘুগনি ইত্যাদি । এখানে শুধু তাও আমি খাবার নিয়ে আলচনা করছি বাকি ট্রেনে বিক্রীত ষ্টেশনারী দ্রব্যের ইনভেশনের ম্যাগ্নিটিউড এডিসন ও স্টিভ জোবসের মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিল প্রায় । সেই প্রসঙ্গ অন্যসময় আসা যাবে । ইদানিং শুনলাম বিটনুন আমলকির এক নতুন ভারসান বের হয়েছে- সেটা হল বিটনুন – আমলকী ও তার সাথে ধনে পাতা । এই মালের চাহিদা আগের চেয়ে বেশি ছিল। এই মুহূর্তে আরও যা যা মনে পরছে তার মধ্যে ছিল আমসত্ব , গুড়বাদাম ।তবে এই দুই প্রোডাক্টের মধ্যে কিঞ্চিত মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজী মিশে আছে এবং এই দুই প্রডাক্টের কোয়ালিটি কন্ট্রোল খুবই নিম্নমানের । কস্মেটিক্স ইন্ডাস্ট্রির মত ইহাও শুধু মাত্র বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ওপর ভর করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে । আগে ১০০ বা ২০০ গ্রাম ওজনের আমসত্বের টুকরো বিক্রী হত । তারপর কোনও ধুরন্ধর (বাঙাল হাওয়ার চান্সই বেশি) মস্তিষ্ক প্রসূত হল এই আইডিয়া যে চকোলেটের মত করে পুরিয়ায় আমসত্ব বিক্রী হবে, ১ টাকা পিস । সেই যুগান্তকারী ভিউ চেঞ্চের পর এখন হই হই করে আমসত্ব পুরিয়া বিক্রী হচ্ছে ট্রেনে । আফসোস এই যে দেশটি ভারত হাওয়ায় আইডিয়াটি পেটেন্ট করা যায় নি ! না হলে ভদ্রলোক আমেরিকান গৃহবধুর মত যিনি স্লাইস পাউরুটির পেটেন্ট নিয়ে কোটিপতি হয়েছিলেন টার মত হতেই পারতেন । ভাবলে অবাক হতে হয় যে পাউরুটি স্লাইস করে বিক্রীর আইডিয়ার জন্যে আমাদের বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে । তাতে যদি ওই ভদ্রমহিলার পাঁচ ছটা ছেলে মেয়ে না থাকত, তাহলে হয়ত আমাদের অপেক্ষা আরও বাড়ত ! যাই হোক ওই আমসত্বের মধ্যে আমের ভাগ কিন্তু খুবই কম ছিল।আপনি নিশ্চিন্তে ওই আমসত্ব খেতে পারেন এই জেনে যে ওর সিংহ ভাগটাই কুমড়ো থেকে তৈরী – তার সাথে মিশেছে আম সেন্টেড কিছু কেমিক্যাল ।আর ওই গুড় বাদামের মধ্যে খারাপ কেমিক্যাল কিছু থাকত না, কেবল ভাল বাদাম-ভুয়ো বাদামের অনুপাত প্রায় ২০-৮০ হয়ে যেত । ট্রেনে ডাব বিক্রীও এক যুগান্তকারী প্রচলন ।প্রথমদিকে সেই ডাব খাওয়ার পর ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলাই নিয়ম ছিল-কারন তাতে ট্রেন নোংরা কম হবে । চলন্ত ট্রেন থেকে ছোঁড়া ডাব হতে বেশ কিছু পাবলিক শহীদ বা হাসপাতাল জাত হওয়ার পর ডাব খেয়ে চেয়ারের নীচে রাখাটাই নিয়ম বলে চালু হল । ফলত ট্রেন বেশি নোংরা হতে শুরু করল । কোন পদ্ধতিটি সঠিক সেই বিষয়ে প্রথম দিকে ডেলি প্যাসেঞ্জার মহল আলোচনায় সরগরম থাকত । ট্রেনে আরও যে সব ফল পাওয়া যেত তার মধ্যে কমলালেবু ও পানিফলের খোসা পাবারই সম্ভাবনা বেশি ছিল ট্রেনের কামড়ায় । তবে সবচেয়ে বেশী ব্যাবহৃত ফল শসার খোসা কিন্তু ছড়ানো অবস্থায় খুব কম পাওয়া যেত। কারন বহুবিধ শসা মূলত হকারটি ছাড়িয়ে বিটনুন মাখিয়ে,কাগজে মুড়িয়ে প্যাসেঞ্জারের হাতে চালান করত । তাই খোসা থাকত হকারটির ঝুড়িতেই এবং সেই খোসার কুলিং এফেক্টটা হকার ব্যাবহার করত তার বাকী শসাকে ঠাণ্ডা রাখতে ।আর দিনের শেষে জমা হওয়া খোসা সযত্নে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হত পোষা গরুর জন্যে ।একেবারে ইকো ফ্রেন্ডলি –গ্রীন অবস্থা যাকে বলে । ট্রেনের ডাবের চলনের পেছনে কিন্তু খবরের কাগজের রূপচর্চা বা স্বাস্থ্য কলামগুলির অবদান অনেকখানি । কাগজ খুললেই দেখবেন কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া অস্বাস্থ্যকর। তার বদলে ডাবের জল খান এই সব । আর তা ছাড়া সকালে ঘুম থেকে উঠে ডাবের জল দিয়ে মুখ ধুন, চোখের পাতায় শসার টুকরো রাখুন – এই সব তো ছিলই ।তবে আমি আজ পর্যন্ত কাউকে ট্রেনের ভিতর ডাবের জল দিয়ে মুখ ধুতে দেখি নি । যদিও অনেককে ট্রেন থকে শসা কিনে বাড়ি নিয়ে যেতে দেখেছি , মনে হয় সে যতটা চোখের পাতায় দেবার জন্যে, তার ছেয়েও বেশী মুড়ি দিয়ে খাওয়ার জন্যে। এখন ডাবের পিস কত করে হয়েছে আমি জানি না-আমি এক কালে আমাদের গাছের ডাব পাইকারী দরে বিক্রী করতাম ১১০ টাকা ১০০ ডাবের জন্যে । এই কয়েক মাস আগে আমি বাড়িতে গাছের ডাব ৬০০ টাকা শয়ে বেচে এলাম। সেই ডাব ১৫ টাকা করে ট্রেনের কামড়ায় বিক্রী হত মনে হয়। তাহলেই বুঝতে পারছেন লাভের মার্জিনটা কেমন ছিল ! আর আগে যেমন উল্লেখ করলাম, ডাবের প্রচলন হঠ করে যেন বেড়ে গেল ট্রেনে কোল্ড ড্রিঙ্কস বিক্রী কমে যাওয়ার পর । আগে গরম কালে ট্রেনে আকছার বরফ ত্রিপলের ব্যাগের মধ্যে নিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস বিক্রেতাদের দেখা যেত ।এইসব কোল্ড ড্রিঙ্কস বর্ধমানের মেহেদীবাগানের দিকে তৈরী হত বলে আমার কাছে খবর ছিল । মানুষ যে ব্র্যান্ড দেখেই খাদ্য কেনে এবং মুল স্বাদ কেমন হাওয়া উচিৎ সে বিষয়ে প্রায়শই প্রত্যক্ষ কোনও জ্ঞান রাখে না , তা এই কোল্ড ড্রিঙ্কসের বিক্রী দেখেই বোঝা যেত। ওই সব প্রোডাক্টই যে নাকল তা বোধগম্য হতে হতে বহু লোক মাটির বাড়ি থেকে দোতলা পাকা বাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে ছিল । ডাব বিষয়ে আমার বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে –অন্যত্র বলা যাবে ডিটেইলসে তবে এখানে একটা ছোট্ট ব্যাপার বলে রাখি ।আমাদের সময়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দুই হাফে হত, দিনে দুটো পেপার ।তা মাঝের ব্রেকটায় গার্জেনরা টিফিন আনতেন – এবং এপ্রিল মাস নাগাদ পরীক্ষা হবার জন্যে পরীক্ষার্থীর মাথা ঠাণ্ডা করার জন্যে ডাব । বাবা মা ডাব ধরে আছে আর ছেলে স্ট্র দিয়ে ডাবের জল টানছে ,চোখ হাতের নোট বইয়ের দিকে ।এমন দৃশ্য তখন অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল । সবার দেখাদেখি আমার বাপও দ্বিতীয় দিন গাছের একটা ডাব নিয়ে টিফিনের সময় হাজির । তা দেখে আমি যা শক পেয়েছিলাম তাতে ইংরাজী দ্বিতীয় পত্রে আমার ১০ নম্বর মত কমে গিয়েছিল প্রায় । বাড়িতে প্রত্যহিক ব্যবহারের জন্য ডাব গাছ থেকে পেরে দিত আমাদের বাড়িতে কাজ করার কমলদা। তা সেই কমলদারো বয়স হতে থাকল – এক সময় বলল, আর নারকেল গাছে উঠতে পারব না বুঝলি। আমিও ততদিনে নারকেল গাছে ওঠা ছেড়ে দিয়েছি – নিজের এবং পরের নারকেল গাছ সাফ করে, বেশ কিছু বার নারকেল গাছ থেকে পড়ার পর জীবিত থাকার আনন্দ নিয়ে এবং বাপের রামপ্যাঁদানির হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য। একবার আমার গ্রামের বাড়িতে ইংল্যান্ড থেকে আমার বন্ধুরা বেড়াতে আসে – বেশির ভাগই মেয়ে। তো সেই মেম মেয়ে দেখে কমলদা বলল আবার গাছে উঠে ওদের ডাব খাওয়াবো। তার উপর আইরীন প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে কমলদাকে দেওয়াতে, ফেলে আসা যৌবন চেগে ওঠে তার। লুঙ্গি পড়ে কমলদা গাছে উঠেছে আর নীচে থেকে মেম মেয়েরা ছবি নিচ্ছে, সে এক জটিল দৃশ্য! এখন গরমকালে ট্রেনে যেটা সহজলভ্য তা হল বিমলের দই লস্যি (সলিড দণ্ডাকৃতি), তরল দইলস্যি (বাড়িতে বানানো),ও কাঁচা আমের সরবত(বাড়িতে বানানো),অনেকে আবাব কায়দা করে আম পোড়ার শরবতও বিক্রী করতেন । এই সব মালে প্রফিট মার্জিন খুবই বেশী- রঙ বা কেমিক্যাল প্রয়োগের কথা বলতে পারব না ,তবে স্বাদে সেই- তিনটাকার প্ল্যাস্টিক প্যাকেটের শরবত , OH CALCUTTA রেস্টুরেন্টের ১৩০ টাকা গ্লাসের শরবতের কাছা কাছি ছিল । দণ্ডাকৃতি দই-লস্যি একটি বিবর্তিত প্রডাক্ট- এবং যথারীতি বাঙাল মস্তিষ্ক প্রসূত । বিমলের বাড়ি বৈঁচির কাছাকাছি- সকাল ৮ টার ডাউন লোকালে মাল এসে ষ্টেশনে ষ্টেশনে নেমে যায় একটা বড় বাক্স করে । সেখানে তাবৎ হকার জড়ো হয় মাল কেনার জন্যে-সাদা শোলার পেটিতে । ১০০ পিস মাল বিক্রী করতে পারলে ৩০ টাকা কমিশন । দিনের শেষে গলে যাওয়া অবিকৃত মাল কারখানায় পুনরগমন সলিড হাওয়ার জন্যে । এই ভাবেই চক্রাকারে ঘুরতে থাকে দই-লস্যি ।আপনি যে দই-লস্যিটি কিনলেন সেটা কতদিনের পুরনো আপনি জানতে পারবেন না। লাকি হলে আপনি একটা পুরনো মাল পেতেও পারেন কারন দই-লস্যি যত পুরনো হবে , তত গেঁজবে ও তার স্বাদ খুলবে ।দই-লস্যির ব্যাবসা রম রম করে চলে গরম কালে – আমরা লোকাল ছেলে হবার জন্যে মাঝে মাঝে দু একটা গ্যাঁজানো দই- লস্যি ফ্রী পেতাম , যদিও এই বস্তুটি আমাদের তেমন আকর্ষণ করত না তার উৎপত্তি ও গমন পথ সম্পর্কে সম্যক ধারনা থাকা হেতু । আরও দুটি খাদ্য বস্তু যা আমাদের জীবনে খুব ভালো ভাবে জড়িয়ে ছিল এবং ট্রেনের কামরায় দাপটের সাথে বিচরন করত তা হল খেঁজুর ও শনপাপড়ি । ‘খেজুরে আলাপ’ কথাটার সারমর্ম আমরা খুব গভীর ভাবেই ছোটবেলায় অনুভব করে ফেলেছিলাম । নিমো ষ্টেশন মাস্টার আমার নিজের জ্যাঠা তাই সেই সুত্রে রেল টিকিট কাউন্টারে অবাধ বিচরণ । আমাদের গ্রামে তখন বিদ্যুত ছিল না এবং ওই টিকিটঘরই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে টিউব লাইট জ্বলত। ঘরের আয়তন বেশ বড় – অ্যাসবেসটস চাল, এক কোণে টিকিট রাখা দেওয়াল খাপ ও তার পাশে পাঞ্চ মেশিন। বাকি পুরো ঘর ফাঁকা – সেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহৃত হত ট্রেনের হকারদের ঝাঁকা রাখার কাজে। আমার জ্যাঠা সেই জায়গা ভাড়া দিয়ে টু-পাইস কামাত কিনা বলেতে পারব না, তবে জ্যাঠার ছেলেদের দেদার ফলমূল খেতে দেখেছি। সেই সব ফলই ঝাঁকা থেকে আসত – লেবু, আপেল, বেদানা সহ প্রচলিত সব ফলই প্রায়। তা সেই ঘরে খেজুরের প্রসেসিংও চলত। যাঁরা দোকান থেকে বা ট্রেন থেকে কোয়া কোয়া ইণ্ডিভিজুয়াল খেজুর খান তাঁদের সম্ভবত কোন ধারণা নেই যে ওই খেজুর বাংলায় কিভাবে আবির্ভূত হত! খেজুরের স্ল্যাব বস্তায় (আমরা বলতাম ‘চিকচিকি’ বস্তা, পরে জানলাম উহার নাম ‘নাইলন’) করে – ইনফিনিট নাম্বার অফ খেজুর চাপসৃষ্ট অবস্থায় জড়াজড়ি করে এক আয়তকার স্ল্যাব তৈরী করত। সেই বস্তা হাজির হত টিকিটরুমে আমরা ছোটরা ভলেয়েন্টারী সার্ভিস দিয়ে খেজুর সেপারেট করতাম। আমাদের মজুরী ছিল পেটভর্তি খেজুর খেতে পারা। এটা চাইল্ড লেবার এর আওতায় পড়ে কিনা বলতে পারব না, তবে সেই কাজ আমরা আনন্দের সাথেই করতাম। খেজুরের চাঙরগুলিকে বালতির জলে ডোবাও ও আলাদা কর – প্লেন এ্যণ্ড সিম্পিল! সেই আলাদা করা খেজুর খোলা বিক্রি বা প্যাকেট করে বিক্রী হত মধ্যপ্রাচ্য বা মরুদেশীয় বিভিন্ন দেশের নামাঙ্কিত হয়ে। এটা খুবই স্ববাভিক ছিল যে একই বস্তার খেজুর চারটে আলাদা দেশের নামে চিহ্নিত করা হল – সেই ক্ষেত্রে আমাদের ভোগলিক জ্ঞান কাজে লাগানো হত। তবে মানুষের জেনারেল নলেজ সীমিত বলে অনেক সময় নামকরণের হ্যাপার মধ্যে না গিয়ে, ‘আরব’ দেশের খেজুর বলেও চালানো হত। তাহলে বাকী রইল শোনপাপড়ীর গল্প – এই এমন এক ব্যাবসা যা বিগত ৩০ বছর ধরে স্থিতাবস্থায় রয়েছে – যাকে বলে only change is constant টাইপ আর কি! শোনপাপড়ী তৈরী এক খুবই আকর্ষনীয় ব্যাপার। ইন ফ্যাক্ট তৈরী দেখতে খুবই ভালো লাগে – যে জিনিসটা সব খাবারের ক্ষেত্রে বলা যায় না। ধরুণ মাখা সন্দশ তৈরী – এটা খুবই ক্লান্তিকর একটা ব্যাপার। আমাদের নিমো স্টেশন সংলগ্ন ক্লাবের একটা বড় ঘর তেমনই এক শোনপাপড়ী কারিগরকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। ‘দিলীপের’ শোনপাপড়ী নাকি কি যেন একটা নাম ছিল। ভাই বলব কি, সে ব্যাবসা বিশাল ফুলে উঠেছিল। আমি খুবই সিওর যে যাঁরা এই লেখা পড়বেন তাঁদের কারো কারো পেটে ওই শোনপাপড়ী চালান গেছে। প্যাকেটস্থ হবার পর সেই শোনপাপড়ী দেখতে খুবই ভালো, সোনালী রঙের। কিন্তু যে পাত্রে বা পরিবেশে মাল তৈরী হত তা প্রায় কহতব্য নয়। ওই শোনপাপড়ী খেয়ে যাদের পেটে কিছু হয় নি, তাঁরা নির্দ্ধিধায় অন্য যে কোন খাবার না ধুয়েই মুখে চালান করতে পারেন। আমাদের ক্লাবে পিকনিক হলে আমরা ওই শোনপাপড়ী তৈরীর পাত্রগুলো অনেক সময় ব্যবহার করতাম। পাঁচ টাকা প্যাকেট ছিল তখন শোনপাপড়ীর । উত্থান ও পতন যেহেতু জাগতিক নিয়ম, তাই প্রাকৃতিক নিয়মেই একদিন সেই শোনপাপড়ী কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। মালিকের ছিল জুয়া দোষ – একদিন প্রায় সব খুইয়ে সে উধাও। তার কর্মচারীরাও কিছুদিন অপেক্ষা করে বিদায় নিল – আমাদের গ্রামের কিছু মেয়ে প্রেমিক হারা হল। সে এক জটিল সমাজতাত্ত্বিক গল্প – ডেটেলসে অনত্র। আমাদের লাভ বলতে হয়েছিল সেই ফেলে যাওয়া বাসনপত্র ও মাল বইবার একটা তিনচাকা রিস্কা ভ্যান, সেই ঘটনা পরের কোন এক পর্বে।
ঝিনুক
“মাদার জান‚ আমাকে যেতেই হবে| ভয় পেয়ে ঘরের কোনে লুকিয়ে বসে থাকলে আমরা কোনদিনই আর পৌঁছতে পারব না|" -- সালেমের এই প্রো-লগ দিয়ে বইটার শুরু| তারপর গল্প শুরু হয় ফারেবার জবানীতে| কাহিনীর প্রথমাংশ ফারেবার পরিপ্রেক্ষণে‚ পরের অংশ বেশিটাই সালেমের| ফারেবার দুর্ভাগ্যজনক জন্মের মুহূর্ত দিয়ে সূচনা‚ যেখানে ধাই নাড়ি কাটার পরমুহূর্তে ফারেবার জন্মদাত্রী শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন| জন্মলগ্নেই মাতৃহারা‚ সৎমায়ের সংসারে বড় হয়ে ওঠা ফারেবার ছোটবেলার স্মৃতি মোটেই মধুর নয়| কিন্তু ছেলেবেলার সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে চুপচাপ লড়াই করার অসীম অধ্য়বসায়ের পাঠ শেখা হয়ে গিয়েছিল ফারেবার| মাহমুদের সঙ্গে বিয়ের পর জীবনটা বদলে গেল আজন্ম দু:খিনী ফারেবা জানের| ভালোবাসায়‚ সম্মানে‚ যত্নে‚ আদরে ভরে দিলেন ফারেবাকে স্বামী মাহমুদ আর শাশুড়ি মা খানুম জেবা| পড়াশোনা শেষ করে স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি শুরু করলেন ফারেবা| ছেলে সালেম এল জীবনে‚ তার চার বছর পরে মেয়ে সামেরা| স্বামী সরকারী ইঞ্জিনিয়ার‚ তাঁর নিজের শিক্ষকতার চাকরি‚ কাবুলে নিজেদের বাড়ি‚ বাগান‚ উঠোন….. বিশাল বৈভবশালী না হলেও অভাব কিছু ছিল না জীবনে| আর ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ধন‚ সন্তোষ| বন্ধু-বান্ধব‚ আত্মীয়-পরিজনে পরিবৃত নিশ্চিন্ত জীবন| কিন্তু আফগানিস্থানের আকাশে ঘিরে এল যুদ্ধের কালো ছায়া‚ বাতাসে বারুদের গন্ধ‚ রক্তে পিছল পাড়ার অলিগলি| আত্মীয়-স্বজন‚ প্রতিবেশী‚ চেনা-অচেনা সকলেই পালাতে শুরু করল দেশ ছেড়ে| যারা রয়ে গেল‚ তাদের অনেকের মতই মাহমুদও ভেবেছিলেন একদিন এই যুদ্ধ শেষ হবে‚ আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে| কিন্তু আদতে হল উল্টো| তালিবান শাসনের অন্ধকার যুগ শুরু হয়ে গেল| ফারেবাকে স্কুলের চাকরি ছাড়তে হল‚ মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল‚ বোরখার ভারি আড়াল ছাড়া মাথায় শুধু স্কার্ফ জড়িয়ে বাইরে বেরোন বন্ধ হয়ে গেল| আশেপাশের প্রতিবেশী বাচ্চা মেয়েদের ডেকে এনে ঘরে বসে অ‚ আ‚ ক‚ খ শেখাচ্ছিলেন আজন্ম শিক্ষার অনুরাগিণী ফারেবা‚ কিন্তু তালিবান আইনের প্রহরীরা এসে ভাঙচুর করে সমঝে দিয়ে গেল‚ ভয়ে প্রতিবেশীরা আর পাঠায় না মেয়েদের‚ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল পড়াশোনা| মাহমুদ ঠিক করলেন আর নয়‚ এবার যাবার সময় হয়েছে| নিজেদের না হোক ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের জন্যই কাবুল ছাড়তে হবে| গন্তব্য ইওরোপ‚ লণ্ডন| কিন্তু যাব বললেই যেতে দিচ্ছে কে? তাই গোপনে জাল নথিপত্র খরিদের ব্যবস্থা করতে হল মাহমুদকে‚ স্বামীস্ত্রী আর ছেলেমেয়ের জন্য জাল ইওরোপিয়ান পাসপোর্ট| কোনক্রমে একবার লণ্ডনে গিয়ে পৌঁছতে পারলে অ্যাসাইলামের আরজি জানাবেন রানীর চরণে| নীতি আঁকড়ে বসে থাকলে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত অন্ধকার| তালিবানি অনুশাসন যখন জীবনের টুঁটি চিপে ধরে‚ তখন অতি বড় নীতিবাগীশেরও নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে| তবে এই সব বেআইনী কাগজপত্র তো আর রাতারাতি পাওয়া যায় না‚ সময় লাগে‚ আর মূল্যের কথা না হয় বাদই থাক| প্রত্যেকটা দিন কাটে উৎকন্ঠায়‚ গাট্টাগোট্টা পুরুষ অভিভাবকের সাথে ছাড়া মেয়েদের বাইরে বেরোন বিলকুল মানা‚ তাই তেরো বছরের ছেলেকে নুন কিনতে দোকানে পাঠিয়ে অপলকে পথের পানে চেয়ে বসে থাকতে হয় ফারেবাকে| এর মধ্যেই আবার সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লেন ফারেবা জান| তবু তৈরী হতে থাকেন মাহমুদ আর ফারেবা দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য| দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল তখনই| তালিবান ষণ্ডাগুণ্ডারা এসে মাহমুদকে ধরে নিয়ে চলে গেল‚ তালিবান ঈশ্বরই একমাত্র জানেন কি তাঁর অপরাধ| “বাচ্চাদের খেয়াল রেখো‚ জানম"…… চলে যেতে যেতে মাহমুদের শেষ কথা ফারেবার উদ্দেশ্যে| আশায় আশায় পথ চেয়ে থাকে মা আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুটি‚ কিন্তু বাবা আর ফেরে না| খাতার পিছনে দাগ দিয়ে দিয়ে দিনের হিসেব রাখে সালেম বাবার চলে যাওয়ার| প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে বহু সূর্য ডুবল রক্তপাতে অকরুণ আফগান পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়‚ মাহমুদ আর ফিরলেন না| খবর এল তাঁর নৃশংস হত্যার| জানতেন ফারেবা‚ এই খবরই আসবে একদিন‚ অস্থিতে মজ্জায় অনুভব করতে পারছিলেন তিনি‚ কিন্তু তবু| যতক্ষণ না বলা থাকে‚ ততক্ষণ প্রতীক্ষাটা বেঁচে থাকে| সালেম ছুটে এসে জানতে চায়‚ “বাবা আর ফিরবে না?” সেই প্রশ্নের নিরুক্ত উত্তরের সামনে দাঁড়িয়ে এক লহমায় বাচ্চা ছেলের খোলস ছেড়ে বড় হয়ে যায় সালেম‚ নয় বছরের সামেরার মুখের বুলি হারিয়ে যায়| এক ছাদের নীচে তিনজন মানুষ‚ দুরন্ত শোকের সেই নিষ্ঠুর দিনেও শোকের প্রকাশ সামলে রাখে‚ ফারেবা শক্ত থাকতে চেষ্টা করেন ছেলেমেয়ের জন্য‚ সালেম মায়ের মুখ চেয়ে‚ সামেরা পাথর হয়ে| নিষ্ফল আক্রোশে গাছের গায়ে লাথি মাড়তে মাড়তে পায়ের পাতা ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে সালেম‚ নি:শব্দ ঘরে বাবার জিনিষপত্র ঘাঁটাঘাটি করে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে‚ বাবার ঘড়িটা নাড়াচাড়া করতে করতে হাতে পরে নেয়‚ বাবার শার্টে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নেয়‚ আড়াল থেকে দেখেও না দেখার ভান করেন ফারেবা| অনেক চেষ্টা করেন ফারেবা সামেরার মুখ থেকে একটাও অন্তত শব্দ বার করতে‚ কিন্তু নিশব্দে ঘাড় নেড়ে সায় দেওয়া বা না দেওয়া ছাড়া আর কোন কথা তার কাছ থেকে আদায় করতে পারেন না তিনি| সামান্য সঞ্চয় যা ছিল প্রায় শেষের মুখে| বাজার ঘাটে খাবার দাবারও অমিল‚ দুর্মূল্য‚ বিপদ‚ শুধু বিপদ চতুর্দিক ঘিরে| মাহমুদশূণ্য ঘর আঁকড়ে পড়ে থাকার কোন কারণও নেই| ছোট ছেলে আজিজের জম্মের তিনমাস পরে ফারেবা প্রস্তুত হলেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে কাবুল ছাড়ার জন্য| মাহমুদের অসম্পূর্ণ কাজটা তাঁকেই করতে হবে| মাহমুদ যে বাচ্চাদের সব দায় তাঁর হাতে সঁপে দিয়ে গেছেন সেই শেষদিনে‚ পিতৃহীন সন্তানদের ভালোমন্দের সব ভার এখন তাঁর একার| শান্তি আর সুরক্ষার জীবন ওদের ফিরিয়ে দিতেই হবে‚ যত বিপদই থাকুক সে পথে| মাহমুদের ব্যবস্থা করা সেই সব জাল পাসপোর্ট‚ টাকাপয়সা সব গুছিয়ে নিলেন| নিলেন যেটুকু খাবারদাবার ঘরে ছিল‚ তাও| আর নিলেন ছবির অ্যালবাম| বিয়ের ছবিটাতে মাহমুদ সোজা তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার দিকে‚ কিন্তু ফারেবার নিজের দৃষ্টি মাটির দিকে| তাঁর সব ভয়‚ সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মাহমুদ ভালোবাসা দিয়ে জয় করে নিয়েছিলেন‚ তাঁর সব অপ্রাপ্তি‚ অপূর্ণতা মাহমুদ ভরে দিয়েছিলেন পরম প্রেমে| মাহমুদ‚ তাঁর 'হামসার'….. প্রতিবেশী দম্পতি অনেক সাহায্য করলেন‚ চুপচাপ রাতের অন্ধকারে আফগান সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে পৌঁছে দেবার সব আয়োজন করে দিলেন তাঁরা| তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে আজিজকে বোরখার নীচে বুকে বেঁধে‚ সালেম আর সামেরার হাত ধরে বাসে উঠে বসলেন ফারেবা| বাস থেকে ভ্যান‚ তারপর তিনজনে হাত ধরাধরি করে রাতের অধকারে মাইলের পর মাইল দুরূহ পাহাড়ী পথ পেরিয়ে ইরানে| ইরান থেকে টার্কী‚ বোরখা খুলে নি:শ্বাস নিলেন ফারেবা| টার্কীতে এক সম্পূর্ণ অচেনা অজানা সহৃদয় সুধীজনের ঘরে মিলে গেল সাময়িক আশ্রয়| এইখান থেকে শুরু হয়ে গেল সালেমের পাল্টে যাওয়া জীবনের গল্প‚ রাতারাতি মায়ের কোলের সন্তান থেকে পরিবারের অভিভাবকের ভূমিকায় বদলে যাওয়া সালেমের গল্প‚ স্কুলের বইখাতা‚ মাঠের ফুটবল ফেলে যে সালেম স্থানীয় কৃষকের জমিতে উদয়াস্ত মজুর খেটে ক্ষুদকুড়ো রোজগার করবে মায়ের জন্য‚ ছোট ভাইবোনের জন্য| আজিজের স্বাস্থ্যের অবস্থা প্রথম থেকেই খুব একটা ভালো ছিল না‚ টার্কীতে এসে আরো অবনতি হল‚ বিপদ কখনো একা আসে না| ডাক্তার দেখানো হল‚ বিজাতীয় ভাষার দুস্তর অন্তরায় পেরিয়ে যেটুকু বোঝা গেল‚ আজিজকে শহরে বড় ডাক্তার দেখানো দরকার‚ তার হার্টের অবস্থা ভালো নয়| ছোট্ট শহরের ছোট ডাক্তারবাবু কোন পয়সা নিলেন না‚ প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন| আজিজ আপাতত সুস্থ হল| পরের স্টপ অ্যাথেন্স‚ গ্রীস| এইবার সেই সব বহুমূল্য জাল পাসপোর্ট বেরোল ব্যাগ থেকে ফেরি পার হতে| আফগান মরু থেকে আসা মা‚ ছেলে‚ মেয়ের জীবনে প্রথম সমুদ্র দর্শন| প্রথম দেখার বিস্ময়‚ আনন্দের দ্যুতি মিলে মিশে যেতে থাকল অজানিত ভবিষ্যতের অন্ধকার আশঙ্কার সাথে| প্রতি মুহূর্তে ভয় কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ার‚ পুলিশ দেখলেই এড়িয়ে যাওয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা| আশা নিরাশায় দুলতে দুলতেই নিরাপদে পৌঁছে গেল সালেম সপরিবারে অ্যাথেন্সে| এ পর্যন্ত যাহোক তবু মন্দের ভালো কেটে গেল যাত্রাপথ ওয়াজিরি পরিবারের| তবে পথ এখনও অনেক বাকি গন্তব্যে পৌঁছতে‚ গ্রীস থেকে ট্রেনে ফ্র্যান্স হয়ে লণ্ডন| কিন্তু সমস্যার শুরু হল এইখান থেকেই| সামান্য সঞ্চয় শেষের মুখে| ভাঙাচোরা হোটেলের ঘরের ভাড়া‚ চারজনের খাবারের ব্যবস্থা‚ প্রত্যেকটা ইউরো যেন সোনার থেকেও দামী বলে মনে হতে থাকে সালেমের| সে চুরি করতে শিখে যায়‚ মা-ভাইবোনের মুখে খাবার তুলে দিতে| অজস্র ঘটনা‚ দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে দিন পেরিয়ে যেতে থাকে| আলাপ হয় রোকসানার সাথে| তারই সাহায্যে ট্রেনের টিকেট কেটে মায়ের হাতে তুলে দেয় সালেম| আর একটা দিন‚ ভুয়ো বেলজিয়ান পাসপোর্ট আর ট্রেনের টিকেট --সব রেডি| একটা দিন পরেই তারা রওনা দেবে| একের পর এক সীমান্ত পেরিয়ে‚ অজানা সব ভাষার দুর্বোধ্য বাধা পেরিয়ে ঠিক পৌঁছে যাবে লণ্ডনে--- স্বাধীনতায়‚ স্বস্তিতে‚ শিক্ষায়| এত পরিশ্রম‚ এত বিপদের ঝুঁকি শেষ অবধি সার্থক হবে| কিন্তু হাত একেবারেই খালি হয়ে গেছে| শেষ অবলম্বনটুকু বার করে দেন ফারেবা‚ মায়ের হাতের দুটো বালা| বিয়ের দিন বাবা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন অনেক সাবধানে সৎমায়ের থেকে লুকিয়ে রাখা মায়ের শেষ এবং একমাত্র চিহ্ন সেই কঙ্কন জোড়া| তারপর থেকে কোনদিন ফারেবা হাতছাড়া করেন নি বালাজোড়া| মায়ের স্পর্শ আর মমতা হয়ে রিনিঠিনি করত ও দুটো তাঁর হাতে| কিন্তু ছেলেমেয়ের মঙ্গলের জন্য তিনি সব দিতে পারেন‚ বালাজোড়া তুলে দিলেন তিনি শ্রান্ত‚ ক্লান্ত সালেমের হাতে| মায়ের মন‚ কেন যেন হঠাৎ কু ডাকল| তিনি সালেমকে বললেন‚ "বাচেম‚ আজ থাক| কাল স্টেশনে যাবার পথেই নয় সবাই মিলে একসাথে যাব বন্ধকী দোকানে|" কিন্তু লায়েক সালেম জান‚ হঠাৎ করে বড় হয়ে যেতে বাধ্য হওয়া সালেম জান‚ মায়ের অভিভাবক হয়ে যাওয়া সালেম জান শুনতে চাইল না| মাকে বললো‚ "মাদার জান‚ আমাকে যেতেই হবে| ভয় পেয়ে ঘরের কোনে লুকিয়ে বসে থাকলে আমরা কোনদিনই আর পৌঁছতে পারব না লণ্ডনে|" সেই বালা বন্ধক দিয়ে দোকান থেকে বেরোতেই পুলিশ ধরলো সালেমকে সেদিন‚ হোটেলে আর ফেরা হল না তার পয়ের মোজায় লুকানো টাকা নিয়ে| তারপর সে এক অকথ্য অত্যাচারের কাহিনী‚ গ্রীস পুলিশ তাকে ফেরি করে পাঠিয়ে দিল আবার টার্কীতে| সেখান থেকে অনেক ঘাটের জল খেয়ে সালেম যখন ফের এসে অ্যাথেন্সে নামবে ফারেবা তখন সামেরা আর আজিজকে নিয়ে লণ্ডনে পৌঁছে গেছেন‚ অ্যাসাইলামের আরজি জমা করে দিয়েছেন| লণ্ডনে পৌঁছে আজিজের হার্টের অপারেশনও হয়ে গেছে| সালেম একা অ্যাথেন্সে‚ না আছে কোন কাগজপত্র‚ জাল বা সত্যি‚ কোনটাই নেই| এক রেফিউজি ক্যাম্প থেকে আর এক ক্যাম্প‚ পুলিশের তাড়া খেতে খেতে‚ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অ্যাথেন্স থেকে পালিয়ে রোম‚ রোম থেকে ফ্র্যান্স| অ্যাথেন্স ছড়ার আগে সেই বন্ধকী দোকান থেকে টাকা ফেরত দিয়ে মায়ের বালাজোড়া সে ছাড়িয়ে এনেছে| শত কষ্টতেও মায়ের বালা বাঁধা দেওয়া টাকার একটি নয়াও সে নিজের জন্য খরচ করে নি| চ্যানেলের ওপারে বসে বসে লণ্ডনের আলো দেখে আর মনে মনে মাকে ডাকে সালেম‚ মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দেয়| ফারেবা জানও কান খাড়া করে থাকেন তার বাচেমের পথ চেয়ে‚ মনে মনে স্পর্শ করেন এলোমেলো চুলগুলো| কিন্তু ফ্র্যান্সের ক্যালেই থেকে লণ্ডনে মায়ের কাছে সালেম কি পৌঁছতে পারবে? সেটুকু আর বলব না| নিজেরাই পড়ে নিন‚ খুঁজতে গিয়ে লিঙ্কও পেয়ে গেলাম…… http://1.droppdf.com/files/OHHUW/when-the-moon-is-low-nadia-hashimi.pdf একটা জীবন এক নিমেষে কিভাবে ছারখার হয়ে যায়‚ মুহূর্তের মধ্যে সব কিভাবে বদলে যেতে পারে নিশ্চয়তা থেকে চূড়ান্ত অনিশ্চিতে‚ ফারেবা জানের কাহিনী পড়তে পড়তে নতুন করে উপলব্ধি করলাম| কত সামান্য খুঁটিনাটি নিয়ে আমরা রোজ কত অভিযোগ‚ অনুযোগই না করি! অথচ কত ফারেবা জান‚ কত সালেম জান রোজ এইভাবে বাস্তুহারা হয়ে লড়াই করতে বাধ্য হয়| সব লড়াই কি জেতার লড়াই? জেতার থেকে হারার সংখ্যাই বোধ হয় বেশি| বইটা পড়তে শুরু করে আর থামতে পারি নি| প্রত্যেকটা পদক্ষেপে বাচ্চাদের কষ্ট দেখে ফারেবা জান নিজেকে প্রশ্ন করছেন‚ "ভুল করলাম না তো?" মাহমুদের ওপর রাগ করছেন‚ এই সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি কেন করলেন? বুক ভেঙে যাচ্ছিল আমার| সালেমকে ফেলেই লণ্ডনে চলে গেলেন ফারেবা‚ পারলেন? যেতে হল যে| আজিজের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল| তাকে বাঁচাতে হলে আর অন্য কোন পথ খোলা ছিল না ফারেবার সামনে সেদিন| ডান আর বাঁ হাতের মধ্যে একটা দিয়ে দিতে বললে মনস্থির করা বোধহয় ততটা শক্ত হবে না‚ যতটা কঠিন পরিস্থিতি হয় যখন কোন মাকে তাঁর দুই সন্তানের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হয়| ফারেবার দ্বন্দ্ব যেন আমার নিজের বলে মনে হচ্ছিল| একটা সম্ভ্রান্ত‚ স্বচ্ছল ঘরের বাচ্চা ছেলে যে কিভাবে পরিস্থিতির চাপে পড়ে চুরি করতে বাধ্য হয়‚ সেই হৃদয়বিদারক বর্ণনা পড়লে অতি বড় পাষণ্ডেরও চোখে জল আসবে| সব থেকে বড় কথা‚ একটা তেরো বছরের বাচ্চাকে যখন সাবালকের দায়িত্ব নিতে হয় আর মাকে তাই দেখতে হয়…..
মনোজ ভট্টাচার্য
হঠাৎ দেখছি – দেশ কী ! বা - মানে কি ইত্যাদি নিয়ে কথা উঠেছে ! মাঝে মাঝেই দেখেছি এই কথাগুলো ওঠে ! কেন ওঠে ? আসলে দেশের জন্যে ভাবাবেগ – এই প্রসঙ্গটা মনে করিয়ে দেয় ! – দেশ কি ? এই প্রশ্নটার উত্তরে আমি বলবো – দেশ থেকে বেশ কিছুদিন বাইরে না থাকলে বোধগম্য হবে না ! দেশের বা বিদেশের নানারকম সুবিধে অসুবিধে থাকেই ! – সুযোগ সুবিধে পেলেই দেশটা ভাল – আর অসুবিধে হলে দেশটা খারাপ হয়ে যায় না ! – এখানে কেউ একজন লিখেছেন – কুড়ি বছর দেশের বাইরে আছেন – দেশে নাকি আসেন নি ! – এটা সত্যিই কষ্টকর ! আমি বিদেশে ছিলাম ৩২ বছর ! ওখানকার সব রকম সুবিধে অসুবিধে ভোগ করেছি ! তার মানে সেই দেশটা আমার হতে পারে না ! – আমার দেশ আমারই ! – আমার দেশটা খারাপ – কত খারাপ ইত্যাদি – আমরা জন্ম থেকেই জানি ! আমরা কিছু স্বর্গে বাস করতাম না ! যে ভাবে – অন্য দেশটাও যে স্বর্গ – সেই ভাবনাটাই সঠিক নয়! আমরা কি জানতাম না – ব্যাঙ্কে বা সরকারি অফিশে গেলে কোন কাজ একদিনে হয় না ! সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে হলে হাজার হাজার লোকের পেছনে দাঁড়িয়ে কতটা সময় লাগে ! রাস্তা সব জায়গায় কতটা খোঁড়া ! – তাই এসব যুক্তিগুলো বড় ছেঁদো লাগে ! প্যান কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, গ্যাস কার্ড - ইত্যাদি ইত্যাদি সব ঝামেলার ! আমি কিছু রাজারহাটে থাকি না – থাকি মধ্যবিত্ত সিঁথি অঞ্চলে ! – অনেকেই বলেছিল এক বছরের মধ্যে পালিয়ে যাবো ! – আবার এ-কথাও ঠিক নয় – বিদেশের সরকার ইচ্ছে করলেই ক্যাঁৎ করে লাথি মেরে দেশ থেকে বার করে দেবে ! – এসব গসিপ – রাত্রে ডিনারের পর হাতে গেলাস নিয়ে অনেকে করে থাকে ! শেষ করি একটা অনুরোধ করে ! জীবিকার ধান্দায় যাদের বিশ বছর ত্রিশ বছর চল্লিশ বছর দেশের বাইরে থাকতে হচ্ছে – তাদেরও কিছু ভাবাবেগ আছে ! আমাদের এই আলোচনার মাধমে অনেক শব্দ ব্যবহার হচ্ছে – যেগুলো খুব একটা শোভন নয় ! – তাই অনুগ্রহ ওসব না ব্যবহার করলে – আমাদের ও সবার ভাবাবেগকেই সন্মান জানানো হবে ! মনোজ
মনোজ ভট্টাচার্য
অসুর জাতি আজও রয়েছি – সুষমা অসুর ! (দ্বিতীয় অংশ ) কিছু চমকপ্রদ উদ্ধৃতি দিচ্ছি ! পাণ্ডবেরা ময়দানবকে দিয়ে এমন বাড়ি তৈরি করেছিলেন, যার মেঝের ঝাঁ চকচকে রূপ দেখে – জলে পা দিচ্ছেন মনে করে দুর্যোধন কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন ! – শরৎচন্দ্র এই কাল্পনিক ঘটনার বাস্তব অস্তিত্ব পেয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের আজিমগড়ে । আজিমগড় থেকে ২৪ মাইল দূরে ঘাসিতে মাটি খুঁড়ে এমনই এক বিশাল মাটির দুর্গের সন্ধান পান । স্থানীয়রা এই দুর্গ অসুরদের বলে বিশ্বাস করে । এখানে খনন করে দেখা যায়, এককালে এই অঞ্চলের সঙ্গে কুনওয়ার ও মুঙ্গি নদীর সংযোগ ছিল । তাই আজও ‘অসুরীন’ রয়েছে । এবারে অসুর জাতির কথা । যুগ যুগ ধরে ছোটনাগপুরের পালামৌ জেলায় পাহাড়ি উপত্যকায় – বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের আমরা – অসুররা রয়েছি । আমাদের শাখা মুলত তিনটি – বীর অসুর, বীরজিয়া আর আগারিয়া । বিহারে রয়েছে বিরজীয়া গোষ্ঠী তফসিলি উপজাতি হিসেবে । আগারিয়া গোষ্ঠী আছে মধ্য প্রদেশে । আমরা কিন্তু বীর অসুরগোষ্ঠীর মানুষ ! রাচী আর পালামৌ জেলা জুড়ে ১০,৭১২ জন রয়েছি । আর পশ্চিমবঙ্গের পুরুল্যা জেলায় কাশীপুর থানার ঝালাগউরা ও উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জে আমাদের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলেও পরবর্তী কালে আমরা মুল স্রোতে মিশতে পারিনি বলে শিক্ষার হার মাত্র ১০‘৬৬%! অসুর জাতির আদি ইতিহাস যেমন ‘অসুর কাহিনিতে’ আছে, তেমন সারা বিশ্বে কাছে তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনজন বাঙ্গালীর অবদান আছে । রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ডক্টর অনন্ত প্রসাদ ব্যানার্জী-শাস্ত্রী ও শরৎচন্দ্র রায় । ভারতের আদি ইতিহাস লুকিয়ে আছে মুলত হরপ্পা সভ্যতার মধ্যে । বৈদিক সভ্যতা এসেছে তার অনেক পরে । ১৯২৪ সালে স্যার জন মার্শাল ‘ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ’ পত্রিকায় এই হরপ্পা সভ্যতার সচিত্র বিবরন বের করেন । হিন্দু ধর্মের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আজকে হিন্দুত্ব বলতে যা বোঝায় – বেদ উপনিষদের যুগে কিন্তু ভিন্নতর ছিল । কয়েক শতাব্দী ধরে নানান পরিবর্তনের মাধ্যমে হিন্দুত্বের উদ্ভব ! পূর্বে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা, যজ্ঞ, বলিদান ও স্তোত্রপানের ছন্দ আর ধ্বনিকেই প্রাধান্য দিত নিশ্চিত ফলাদায়ি মনে করে ! – পরবর্তী কালে অন্তর্মুখী, কল্পনাপ্রিয় চিন্তা – মানুষের চেহারায় মূর্তি, রহস্যময়তা, ঐশ্বরিক শক্তি ইত্যাদিকে বিশেষ গুরুত্ব পেল । ইন্দ্র, বরুন, মরুত ও অগ্নির বদলে এসে গেল মানুষিক চেহারার দেব-দেবী ! মন্দির । ভক্তির প্রাবল্যে দেশ ভাসতে লাগল । আর ঋক বেদের স্রস্টা অসুর কিল্লির (কুলের) বাইগারা (দৈবশক্তির অধীশ্বর) সংমিশ্রণের ফলে কুলপুরোহিত আখ্যায়িত হল ! জয় সাহার প্রতিবেদন (এই সময় ) - সারা দেশ যখন দুর্গোৎসবের আনন্দে মত্ত – ঠিক সেই সময়েই অন্ধকারের অবহেলিত এক আদিম জাতি – সারা দেবীপক্ষ নিজেদের বাসায় অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বসে শোক প্রকাশ করে ! কারন তারা মনে করে – মহিষাসুরের মৃত্যু আসলে একটা জঘন্য চক্রান্ত ! বিদেশ থেকে আগত তথাকথিত আর্যরা ভারত দখলের সময়ে প্রাচীন মগধ, বঙ্গ অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে অসুর রাজাদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না ! মহিষাসুরের মত এক পরাক্রমশালী রাজাকে ছল করে এক সুন্দরী রমণীকে বিয়ে করিয়ে – বিয়ের নবম রাতে তাকে হত্যা করে ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পরে দেবী দুর্গার বিজয় কাহিনী বলে প্রচার করে । কালক্রমে সেটাই একটা আরজদের উৎসবে পরিনত হয় ! – যদিও এই কাহিনীর কোন প্রামান্য পাঠ্য হিসেবে পাওয়া যায় না – পুরো ঘটনাটাই আদেবাসীদের নিজস্ব লোকগাথা ! পুরানবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর বক্তব্য ‘মহিষাসুর বোধ আসলে শুভ ও অশুভের মধ্যে লড়াই ।‘ - নৃতত্ত্ববিদ পশুপতি মাহাতো বক্তব্য –‘ বেদ পুরানে অসুরের ইতিহাস না থাকাটাই স্বাভাবিক। ব্রাহ্মন্যবাদীদের এই একমুখীতার বিরুদ্ধে দলিত মানুষেরা বহুদিন কোন কথা বলতে পারেন নি ‘! দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় অনেকদিন ধরেই আদিবাসী মানুষেরা অসুর উৎসব বা অসুর স্মরণসভা পালন করে আসছে ! ক্রমশ আরও আরও মানুষ এই স্মরনসভায় সামিল হচ্ছে ! এ বছর রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রায় সাড়ে আটশো থেকে ন-শো স্মরনসভা পালিত হবে ! এগুলো ফল করার জন্যে কো- অরডিনেশান কমিটি গড়ে তোলা হয়েছে ! ঠিক হয়েছে দলিত-প্রান্তিক, আদিবাসী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের সামিল করা হবে ! এই স্মরনসভাগুলোতে মুলত যুদ্ধবিরোধী শোভাযাত্রা, আদিবাসী নৃত্য, অসুর ও দুর্গাপুজা নিয়ে আলোচনা করা হবে ! সুমনা চক্রবর্তী ও সঞ্জিত গোস্বামির প্রতিবেদন (এই সময় ) মহিষাসুরকে অন্যায়ভাবে খুন করা হয়েছে – এই বিশ্বাসে অসুরকুলের নানা উপজাতি দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে ঘরে আলো জ্বালায় না । পুরুলিয়ার খেরোআলরা ‘হুদুরদুর্গা’ উৎসব নিয়ে । হুদুরদুর্গা কিন্তু দুর্গা নয় – নারীও নয় ! ওদের ভাষায় হুদুর মানে – পরাক্রমশালী বীর ! এই হুদুরদুর্গাকে ছল করে হত্যা করা হয় ! পুরুলিয়ার ভালাগোরা গ্রামে ২০১১ সাল থেকে হুদুরদুর্গার পুজো চালু হয়েছে । মহিষাসুরের মূর্তি গড়ে পুজো হয় । পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক চারিয়ান মাহাতো বলেন – ‘হুদুরদুর্গার পুজো হওয়ার পর দিল্লির জে এন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সম্পাদক জিতেন্দ্র যাদব ছবি এঁকে সমর্থন জানিয়েছিল ‘। - খেরোয়ালদের মুখে মুখে প্রচলিত গানে গানে বার বার ফিরে আসে পুরনো ইতিহাস ! চ্যাঁইচম্পা বা চম্পা ছিল ওদের বাসভূমি । আর্য দের দখলদারি শুরু হলে হুদুরদুর্গার সঙ্গে যুদ্ধে পেরে না ওঠায় ছলের আশ্রয় নেয় । মহিলার সঙ্গে লড়াইয়ে নীতিগত আপত্তি ছিল হুদুরদুর্গার ! তাই তাঁর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নবম রাতেই তাকে হত্যা করা হয় ! যেহেতু আর কোনও নেতা ছিল না ঐ উপজাতির – তাই ধর্মগুরুর নির্দেশে সবাই সরস্বতী নদীতে স্নান করে মহিলাদের পোশাক পরে নৃত্যরত ভাবে পূর্ব দিকে পালিয়ে যায় । এই নাচকে দাসাই নাচ বলে ! এর অর্থ অসহায় ! আশ্বিন মাষকেও দাসাই মাস বলে ! এই গানের অর্থ – ‘দুর্গা অন্যায় সমরে মহিষাসুরকে বধ করেছে । হে বীর, তোমার পরিণামে আমরা দুঃখিত । তুমি আমাদের পূর্বপুরুষ । প্রনাম নাও ‘! নবমীর দিন হুদুরদুর্গার স্মৃতিতর্পণের পর মহিষাসুরের উদ্দেশ্যে ছাতা উত্তোলন করে – ‘ছাতা ধরা’ উৎসব পালন করে । বীর বন্দনার এই উৎসব ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ! – দেশে এখন প্রায় ১৫০ এলাকায় হুদু্রদুর্গা উৎসব হচ্ছে ! – লোকসংস্কৃতি গবেষক দিলীপকুমার গোস্বামী বলেন – ‘পুরানের কোন কোন কাহিনীতে মহিষাসুর যুদ্ধের আগে দুর্গাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল । আবার এও ঠিক অসুর নামে একটি উপজাতি গোষ্ঠী ছিল । অদুরদের সঙ্গে দেবতাদের যুদ্ধের কাহিনীও পুরানে আছে !’ আমার স্বীকারোক্তি – মনে হচ্ছে – সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে চোরা স্রোতে অনেক দুর চলে এসেছি ! আর ভেসে উঠতে পারছি না ! এত বড় বড় পণ্ডিত সমাজতাত্ত্বিক প্রত্নতাত্ত্বিক এই ব্যাপার নিয়ে লিখেছেন যে তাদের সারাংশটুকু নিয়েও – আমার এই লেখা শেষ হবে না ! – তাই যত তাড়াতাড়ি পাড়ের কাছে আসা যায় – ততই মঙ্গল ! ইচ্ছে আছে – পরে কোনও সময়ে - অসুর জাতির সঙ্গে বেদ-পুরাণ ইত্যাদির সাদৃশ্য প্রত্নতত্ত্বে আবিষ্কৃত – সে সব নিয়ে আবার আলোচনা করব ! (আপাতত শেষ ) মনোজ
চঞ্চল
১০ বিয়ের রাতে কত কি যে সব হল| কত নিয়ম-কানুন| কিছু নিজের চোখে দেখলাম আর কিছু দাদাদের কাছ থেকে জানলাম| আসলে কি করব! বিয়ে দেখতে বসলে খাওয়ার ওখানে কি চলছে সেটা দেখা হচ্ছে না আবার খাওয়ার ওখানে থাকলে বিয়ে দেখা হচ্ছে না| বিয়ে শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল| শেষ দিকটায় বড়রাই দিদি-জামাইবাবুর সাথে ছিল| আমরা ছোটরা শুতে চলে গেলাম| আর চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না‚ চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল| আমি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম| শুয়ে শুয়েই আমার জেঠুর আর বাবার সব কথা মনে পড়ে গেল| মা কি সত্যি সত্যি বাবার সাথে চলে যাবে? নাহ‚ মা আমাকে একলা ফেলে নিশ্চয় যাবে না‚ যেতেই পারে না| কিছু মাস পরেই তো ফাইনাল এক্সাম| মা ‚ না পড়ালে তো লাড্ডু পাব| এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি| এদিকে একটা ব্যাপার আমার একদম ভালো লাগছে না‚ শুনলাম দিদির নাম পালটে যাবে| দিদি যেমন এখন শ্রেয়শী সেন আছে বিয়ের পর দিদি শ্রেয়শী দাশগুপ্ত হয়ে যাবে| কেন হবে? নামটা পালটে গেলে কি আমার দিদি আর আমার দিদি থাকবে না আর? তা কি করে হয়? আমি বিয়ে করলে ‚ আমার বৌকে একদম নাম বদলাতে দেব না| যা নাম আগে ছিল‚ বিয়ের পর সেই নামই থাকবে| ভাবছি আগের থেকেই মা-বাবাকে বলে দেব| বিয়ে তো করতেই হবে‚ কত যে গিফট পাওয়া যায়‚ উফ একটা ঘর তো পুরো ভরে গেছে গিফটে| কোনটাই খোলা হয়নি‚ দিদি বলল‚ আবার যখন আসবে তখন আমার সাথে বসে এগুলো খুলবে| বেশ মজা হবে‚ আমরা প্যাকেট না খুলেই গেস করব প্যাকেটের মধ্যে কি আছে‚ যে জিতবে তার পয়েন্ট| সকাল থেকেই দিদি‚ জামাইবাবু আর জামাইবাবুর বাড়ির লোকেরা রেডি হয়ে গেছে বেরোবার জন্য| সবাই বলল‚ এখান থেকে বরযাত্রীরা বেলা এগারোটার মধ্যে বেড়িয়ে যাবে| ওঁনাদের গুরুজী বলেছেন‚ বেলা একটার মধ্যে বর-কনেকে বাড়িতে ঢুকে যেতে হবে| না হলে তারপর আর আর বাড়িতে ঢুকতে পারবে না| এই নিয়ে বাড়িতে সবাই আস্তে আস্তে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেছে‚ যাতে বরযাত্রীদের কেউ শুনতে না পায়| দিদির বিদাইয়ের সব নিয়ম-কানুন চলছে| আমরা বসে আছি দিদি কখন কাঁদা শুরু করবে বলে| বাবলুদা বলল‚ - দেখিস‚ ঠিক আর্শীবাদের সময় কাঁদবে| - মনে হয় না‚ খোকনদা বিঞ্জভাবে বলল| আমারও কেন জানি মনে হচ্ছিল‚ দিদি কাঁদবে না| আমি জানি তো দিদির কান্না শুরুর আগের লক্ষণগুলো| আগে পাঁচবার গুনে গুনে নাক টানবে| তারপর তিনবার আলতো করে হাঁচি| এগুলোর কোনটাই এখনো হয়নি‚ তার মানে চান্স নেই‚ পক্কা| - এই শ্রী একটু কাঁদ| লোকে কি বলবে? মনে হয় ছোটমা আস্তে করে দিদির কানে কানে বলল| আমি শুনতে পেলাম| - কেন কাঁদবো ? দিদি বেশ জোরেই বলে ফেলল| ছোটমা দিদির এই কথা শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বড়মার পিছনে চলে এল| - আমি কাঁদব কেন? ও তো কাঁদছে না| বলে দিদি ইশারা করে জামাইবাবুকে দেখালো| সবাই দিদির কথায় হেসে উঠল| বড়মা অবশ্য অনেকক্ষণ থেকেই ফোঁপাচ্ছিল| কিন্তু দিদির বকা খেয়ে এখন চুপ করে গেছে| আস্তে করে বলল‚ কাঁদবে কেন? দজ্জাল মেয়ে কি আর সাধে বলি? দেখলাম জামাইবাবুও হেসে ফেলেছে বড়মার কথা শুনে | একটু পরে আশীর্বাদ সারা হলে দিদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল| বাড়িটা বড্ড ফাঁকা লাগছে| বাইরে পার্কে গিয়ে দেখলাম পন্ডাল খোলা হচ্ছে| চারিদিকে কেমন যেন একটা গন্ধ ছড়িয়ে আছে| কিসের গন্ধ জানি না| বাসি ফুল‚ বাসি খাবার সব মিলিয়ে একটা গন্ধ মনে হল| তবে গন্ধটা যে মনখারাপ করে দেবার সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে| কথা না বলে কোথাও চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করছে| কিছুই ভালো লাগছে না| আজ অনেকেই চলে যাবে‚ শুধু পিসিরা থাকছে| আর বাকি কয়েকজন মানে‚ মামারা‚ দাদারা কাল বিকেলের গাড়িতেই কলকাতা চলে যাবে| বিকেল হতে হতে বাড়ি একদম খালি হয়ে গেল| বাড়ি খালি হতেই বোঝা গেল বাড়ির হালত একদম বিগড়ে গেছে| চারিদিক আগোছালো হয়ে আছে| বাবা‚ জেঠু‚ ছোটকা বসার ঘরে টেন্টওয়ালা আর কাদের কাদের যেন টাকা মেটাচ্ছে| সাথে সব কাজের লোককেই জাম-কাপড় দিচ্ছে| আমি জেঠুর পাশে বসে অনেকক্ষণ ধরেই এইসব দেখছি| মাথাটা কিরকম খালি খালি লাগছে| এবার মনে পড়ল ‚ আরে মায়ের তো বাবার সাথে চলে যাবার কথা| মাকে নিয়ে বাবা চলে যাবে নাকি মা এখানেই থাকবে এসব নিয়ে আলোচনা করতেই তো বাবা জেঠুর সাথে মিনা অঙ্কলের বাড়ি গেছিল| কি হল? দৌড়ে ঘরে গিয়ে দেখি মা খাটের ওপর হাতের ওপর হাত রেখে চুপ করে বসে আছে| আমি যে ঘরে ঢুকলাম মা বুঝতেই পারল না| - মা কি করছ? বলে আমি মায়ের গা ঘেঁষে বসে পড়লাম| - হুম এতক্ষণে মায়ের কথা মনে পড়ল তাই না? মা আলতো করে পিঠে চাপড় মেরে বলল| - কি করব? কত কাজ ছিল না আমার! এখন তো চান্স পেলাম| - ওহহ‚ আমার বুড়ো .. - ছাড় না মা‚ আচ্ছা বলো না‚ তুমি কি সত্যি বাবার সাথে যাচ্ছো? - হ্যাঁ রে যাচ্ছিই তো| মিনা ভাইসাবও তাই বলেছেন| কি যে হবে জানি না| তোমার বাবা কি ফ্রি হয়েছে নিচে? একটু ডেকে নিয়ে এসো তো| তারপর তোমাকে বলছি সব| আমি দৌড়ে নিচে গেলাম| ওখানে তখন সব কাজ হয়ে গিয়েছে| বাড়ির বাকি সবাই ঘরেই বসে আছে| কি যেন কথা নিজেদের মধ্যে চলছে| আমি ঘরে ঢুকতেই জেঠু বলল‚ - যাও তো বেটা একবার মাকে নিচে ডেকে নিয়ে এসো তো| আমি কোন কথা না বলে নিজের বাইকটা আবার ঘুরিয়ে নিলাম ওপরের ঘরে যাওয়ার জন্য| এই বাইকটা আমি মনে মনে চালাই| এটা চালালে আমি দেখেছি সিঁড়ি দিয়ে উপর-নিচ করতে আমার অসুবিধা হয় না| তাড়া থাকলেই আমি বাইকটা ব্যবহার করি| - মা তোমাকে নিচে ডাকছে| সবাই বসে আছে| বলেই আমি আবার টার্ণ নিলাম‚ সোজা নিচে‚ জেঠুর পাশে গিয়ে বাইকটা পার্ক করে দিলাম| - এখানে সবাই এখন আছে‚ তাই সবারই জানা দরকার ব্যাপারটা| বলে জেঠু শুরু করল| সংক্ষেপে এ পর্যন্ত যা যা ঘটেছে‚ যা যা কথা হয়েছে সেইসব জেঠু সবাইকে জানালো| সেই সঙ্গে মা'কে যে বাবার সাথে চলে যেতে হবে সেটাও জানালো| - আজ আমি আর জগু মিনার কাছে গেছিলাম| মিনাও মনে করে আপাততঃ কুনুকে‚ জগুর সাথে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো| অন্তত পরিস্থিতি যতদিন না আয়ত্তে আসছে ততদিন কুনুর এখানে থাকা নিরাপদ নয়| অন্য স্টেট হলে এই ধরে নিয়ে যাওয়া বা জেলে পুরে দেওয়ার ব্যাপারটা এড়ানো যাবে| কারণ এটা তো কোনো ক্রিমিনাল কেস নয় যে অন্য স্টেটের পুলিশ হেল্প করবে| পরে সব ঠিক হয়ে গেলে না হয়‚ কুনু এখানে চলে আসবে| তবে একটাই চিন্তা কবে সব ঠিক হবে? বড়মা তো কেঁদেই ফেলল| - এ সব আবার কি শুরু হল এই বাড়িতে? সব তো ঠিকই ছিল‚ কার নজর লাগল কে জানে? - তুমি চুপ করবে একটু!! জেঠু ধমকে উঠল| - আমি তো চুপই থাকি| আমার কথা কে আর শোনে? ইত্যাদি ইত্যাদি বড়মা বলেই চলল| কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে বাবা বলল‚ - বৌদি তেমন কিছুই হয়নি‚ তুমি ঘাবড়ে যেও না তো| সব ঠিক হয়ে যাবে| এবার শোন যা বলছি‚ যে কাল সকালের কালকা মেলে আমি কুনুকে নিয়ে যাচ্ছি| ওখানে আমরা রাতেই পৌঁছে যাব| এখন যেটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার সেটা হল গোরাকে নিয়ে| গোরা বেটা‚ তুমি জেঠু-বড়মা‚ ছোটকা-ছোটমা'র সাথে থাকতে পারবে তো? কি বল আমার ব্রেভ বয়? - হ্যাঁ পারব তো| মা'কে নিয়ে যাও| আমি একদম ঠিক থাকব| মুখে বললাম বটে কিন্তু মন তো ঠিক মানছে না! মা'কে ছেড়ে তো কখনও থাকিনি| কিন্তু এখন যখন বাড়িতে অসুবিধা আছে তখন তো মা'কে ছেড়ে থাকতেই হবে| কাল ছোটকার সাথে বসে মন দিয়ে একবার হনুমান চালিশা পড়ে নেব| মনে সাহস আসবে তা হলে| ঘরের মধ্যে তখনও কথা হচ্ছে‚ কিন্তু কারও কথাই আমার কানে আর আসছে না| একটা মিলাজুলা ভাষা কানে আসছে শুধু যেটার কোন মানেই ধরতে পারছি না| আমি বরং বাইরে যাই‚ এখানে আর ভালো লাগছে না| বাইরে এসে দাঁড়াতেই টের পেলাম আকাশে অনেক মেঘ করেছে| বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে ঘন ঘন| চুপচাপ একটা থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম| বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগে| একটু পরেই বৃষ্টি নামবে‚ এখন ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে| কি আরাম! নিজের থেকেই বারান্দা থেকে নেমে আস্তে আস্তে সামনের পার্কে চলে এলাম| পার্কের কোনায় সিমেন্ট দিয়ে একটা ছাতা মত বানানো আছে আর তার নিচে সিমেন্টের গোল করে বাঁধান চাতাল| এটাও আমার খুব প্রিয় জায়গা| ধুলো জমে আছে অনেক‚ জোরে ফুঁ দিয়ে ধুলো সরিয়ে বসে পড়লাম| টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল| খুব মশা এখানে‚ মা জানলে খুব বকবে| ওখান থেকেই দেখলাম সবাই এখনো কথা বলে যাচ্ছে| আকাশের দিকে আবার দেখতে লাগলাম| হঠাৎ কাঁধে কার একটা হাত‚ পিছন ফিরে দেখি প্রিতি| - তু য়ঁহা? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম| - হ্যাঁ তো‚ মম্মি উপর থেকে দেখল‚ তুই এখানে বসে আছিস| ঝড় - বৃষ্টি আসছে| আমকে বলল তোকে ডেকে নিয়ে আসতে‚ তাই এলাম| চল বাড়িতে| আমার হাত ধরে বলল| - না রে ‚ বাড়িতে ভালো লাগছিল না‚ তাই এখানে এসে বসেছি| তুইও বস না| - দাঁড়া মম্মিকে বলে আসছি| বলে দৌড়ে পার্কের বাইরে চলে গেল আর রাস্তা থেকেই চেঁচিয়ে বলে দিল| তারপর ফিরে এসে আমার পাশে বসল|ততক্ষণে বৃষ্টি আরও জোরে শুরু হয়ে গেছে| ও আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল‚ - কি হয়েছে রে তোর? দিদির জন্য মনখারাপ লাগছে? - একটু তো লাগছে‚ তবে বেশি মনখারাপ লাগছে মায়ের জন্য| তুই জানিস‚ মা না বাবার সাথে চলে যাচ্ছে‚ যেখানে বাবা থাকে| - কিঁউ? ও তো অবাক| নিশ্চয় ঘুরতে যাচ্ছে| আবার চলে আসবে| - হয়ত তাই! জানিনা‚ আমার কিছু ঠিক লাগছে না| মনে হচ্ছে কুছ হোনেওয়ালা হ্যায়| প্রিতি আমার হাতটা আরও জোরে চেপে ধরল| - তু য়ে সব কিঁউ শোচ রহা হ্যায়? তোর হালত দেখে মনে হচ্ছে অনেক কিছু ঘটেছে| বল না আমায় কি হয়েছে? এই কদিনে আমি অনুভব করেছি প্রিতি আমার অনেক কাছের হয়ে গেছে| ও‚ মা যেভাবে আমাকে নজরে রাখে ও ঠিক সেইভাবেই আমার সব কিছু নোটিশ করে| মনে হয় একে সব বলতে পারা যাবে| - এক প্রমিস কর‚ কাউকে বলবি না| - পক্কা‚ তেরি কসম| কাউকে বলব না| আমি যতটা জানি‚ যতটা বুঝেছি ওকে সবই বললাম| আমি তো আমার অভ্যাসমত মাথা নিচু করে সব বলে যাচ্ছিলাম| তাই খেয়ালই করিনি‚ ও কখন উঠে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে| আমার কথা শেষ হতেই ও আমার দুটো গাল ওর ছোট দুহাতের মধ্যে ধরে ঠিক মায়ের মত| - তু ইতনা পরেশান থা!! আমাকে আগে বলিস নি কেন বচ্চু? আমি কিছু বললাম না‚ চুপ করেই থাকলাম| কি আর বলব? একটাই চিন্তা হচ্ছে আরও কি হতে পারে| - গোরা বাড়ি এসো| বৃষ্টিতে বেশি ভিজো না| প্রিতি আজা বেটা| মা জানালা থেকেই আমাদের ডাক দিল| - আই অ্যান্টি| চল অন্দর চলতে হ্যায়| আমরা দৌড়ে পার্কের গেট পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় উঠে পড়লাম| কিন্তু বৃষ্টির ছাঁট থেকে খুব বেশি বাঁচা গেল না| মা একটা টাওয়েল নিয়ে এসে আমার আর প্রিতির মাথা মুছে দিল যত্ন করে| - ভেতরে চল| তোমাদের গরম দুধ দিচ্ছি আর সাথে পকোড়াও আছে| দুধের নাম শুনেই প্রিতি উলটা পা! - অ্যান্টি মুঝে ঘর যানা হ্যয়| মা চিন্তা করবে না হলে| বলেই একলাফে বারান্দা পেরিয়ে রাস্তায়| প্রিতি একদম দুধ খেতে চায় না| এই নিয়ে রোজ স্কুলে যাবার সময় ওর সাথে ওর মায়ের লড়াই রাস্তা থেকেই শোনা যায়| ঘরে সবাই বসে আছে‚ কিন্তু কিরকম একটা থমথমে আবহাওয়া| কেউ কেউ দু-একটা কথা বলছে বটে‚ কিন্তু অন্যান্য দিন যেটা হয় হইচই ‚ সেই ব্যাপারটা একদমই নেই| - আমার মতে কিন্তু গোরারও যাওয়া উচিত| হঠাৎ করেও ছোটকা ঘরের মধ্যে যেন একটা বোমা ফেলল| - কেন রে? সবাই প্রায় একসাথেই বলে উঠল| - না মানে বলছি‚ ছোটকা আমতা আমতা করে বলল| - না‚ তুই কিছু একটা ভেবেই বলছিস নিশ্চয়| জেঠু উত্তেজিত হয় উঠল আবার| কি ভেবে কথাটা বললি বল? ছোটকা সবার ছোট বলেই জেঠু ঐভাবেই ছোটকার সাথে কথা বলে| খুব ভালো মানুষ ছোটকা| কথা কম বলে‚ কোন বিষয়ে তর্কেও যায় না| এবারেও জবাব দিল না| আমার এবার অবাক হবার পালা| মা চলে যাবে শুনে মনটা খারাপ ঠিকই কিন্তু তাই বলে আমি একবারও মায়ের সাথে চলে যাব ভাবিনি| আমি এখান থেকে চলে যাব? সেটা কি আদৌ সম্ভব? আমি তো এখানেই থাকব সবার সাথে‚ জেঠু‚ বড়মা‚ ছোটকা‚ ছোটমা'র সাথে| হ্যাঁ মাঝখান থেকে মা থাকবে না‚ সেটাই একটা খারাপ লাগা| কিন্তু মা নিশ্চয় কিছুদিন বাদেই ফিরে আসবে| - মা তো ফিরেই আসবে‚ তাহলে আমি যাব কেন? এতক্ষণ চুপ ছিলাম| কথাটা মনে হয় বেশ জোরেই বলে ফেলেছি|ঘরের ভিতর সবাই চমকে উঠল| - আমার কাছে আয় সোনা| বলে বড়মা আমাকে নিজের কাছে টেনে নিল| কে বলেছে তুমি যাবে? তুমি তো আমার সোনা বেটা‚ তুমি যাবে না‚ এই আমি বলে দিলাম| বড়মা আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল| কিন্তু সবাই চুপ কেন? কেউ কেন বলল না যে আমাকে যেতে হবে না| আমি বড়মার কাছ থেকে সরে মায়ের কাছে গেলাম| - মা আমার খুব ঘুম পেয়েছে| খেতে দিয়ে দাও আমায়| কাল স্কুল আছে না? - সে কি এই তো কতগুলো পকোড়া খেলে| এখনি কি তুমি খেতে পারবে? আচ্ছা চল তুমি খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়| আমি একটু পরে আসছি| মা সোফা থেকে উঠতে উঠতে বলল| - না না‚ তুই এখানে থাক কুনু‚ আমি নিয়ে যাচ্ছি ওকে| তুই বরং এখানে কথা শেষ করে ওপরে গিয়ে গোছগাছ সেরে নে| কাল অনেক ভোরে তোদের ট্রেন| বলেই বড়মা তাড়াতাড়ি করে আমাকে খাওয়ার জায়গায় নিয়ে গেল| আমার তো খুব একটা খাবার ইচ্ছা ছিল না| আর ঘুম পাওয়াটাও একটা বাহানা| যাতে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া নিয়ে কোন কথা না হয় তাই তো এমনটা করলাম আমি| কোনরকমে একটু খেলাম| বড়মা সামনে বসে আমাকে খাওয়াচ্ছে আর নিজের মনেই বকে যাচ্ছে| - কি যে হল এই বাড়িতে‚ কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না| সাজানো-গোছানো সংসারে যেন আগুন লেগে গেছে| নিশ্চয় কারও নজর লেগেছে| একবার কমল পুরুতকে ডেকে বাড়িতে একটা শান্তি পাঠ করাতে হবে| তাও ভালো মেয়েটার ভালোয় ভালোয় বিয়েটা হয়ে গেল| এই বাপ-বেটার চক্করে পড়ে জীবনটা আমার কালি হয়ে গেল| আমিও চলে যাবে মেজো ঠাকুরপোর সাথে| তখন বুঝবে আমার দাম‚ ইত্যাদি কত কিছু বড়মা বলেই চলেছে আর মাঝে মাঝেই শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে| - বড়মা তুমি চিন্তা করো না| আমি আর একটু বড় হয় যাই‚ তারপর তোমাকে আমার কাছেই রাখবো| বললাম তো‚ কিন্তু আমি নিজেই কোথায় থাকব তারই তো ঠিক নেই| বড়মা আমার মাথায় হাত রেখে হাঁউ হাঁউ করে কেঁদে উঠল| এই সেরেছে‚ আমি কি কিছু ভুল বললাম? একটু পরেই বড়মা কাঁদা বন্ধ করতে আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম| - যাও বাবা হাত-মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়| অনেক সকালে উঠতে হবে| কাল সকালে মায়ের ট্রেন ধরা আছে না? আবার তোমার স্কুলও আছে| স্কুল ড্রেস আমি বার করে রেখেছি| তুমি শুধু ব্যাগটা গুছিয়ে নিও| -হ্যাঁ হ্যাঁ বড়মা‚ এই যাচ্ছি বলে‚ উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নিজেদের ঘরে চলে এলাম| বৃষ্টি থেমে গেছে‚ কিন্তু বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছে বাইরে| জানালাটা খুলে দিতেই হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া এসে ঘরটা ভরিয়ে দিল| বিছানায় শুয়ে চাদরটা টেনে নিলাম| ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শে চোখ আর খুলে রাখা যাচ্ছে না| ঘুমের মধ্যে মনে হল‚ মা আমাকে অনেক অনেক আদর করছে আর সেই ছোট্টবেলার ঘুমপাড়ানী গানটা গাইছে.| 'খোকা ঘুমোলো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে‚ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে‚ খাজনা দেব কিসে'| ........ ......... পর্ব - ইতি, গোরা ধান ফুরোলো, পান ফুরোলো খাজনার উপায় কি? আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি !! হটাৎ তন্দ্রাটা কেটে গেলো আমার |মাথার মধ্যে এখনো যেন গানের সুরটা গুনগুন করে ঘুরছে | একবার মাথাটা তুলে চারপাশটা দেখে নিলাম | সামনের বড় কাঁচের প্যানেল দিয়ে সামনের পার্কটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে | চোখটা যেন ঝাপসা মত লাগছে? তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে চোখটা একবার মুছে নিলাম | কেউ দেখে ফেলেনি তো ? নাহ, এখনো লোকজন তেমন আসে নি | ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু দেশি বিদেশী গেস্ট, টেবিল ঘিরে বসে ড্রিঙ্কস নিচ্ছে | মোবাইলের ঘড়িতে দেখলাম মাত্র আটটা বাজে | ঠিক মত হিসেবে করলে বোধহয় চল্লিশ বছর হয়ে গেলো এই বাড়িটা আমরা ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম | ঠিক মনে নেই, তবে তারপর হয়তো দু একবার আমরা এসেছিলাম | এখন এই বাড়ি আর সেই বাড়ি নেই , এখন এর নাম বদলে হয়ে গিয়েছে ...... ৫১, শাহ্জহানাবাদ, হেরিটেজ রেস্টুরেন্ট কাম বার........ | নিচের উঠোনটা এখন একটা ছোটোখাটো থিয়েটারের রূপ নিয়েছে | একেক দিন একেক রকমের প্রোগ্রাম হয়ে | কোনোদিন কত্থক. কোনোদিন কাওয়ালি, কোনোদিন মুসায়ীরা ইত্যাদি হতেই থাকে পর্যটকদের জন্য | এই হোটেলের মালিক মিস্টার জগৎ মিত্তল একজন নামকরা আর্কিটেক্ট এন্ড ইন্টেরিয়র ডিজাইনার |হেরিটেজ বিল্ডিং বা হভেলি কিনে তাকে নানা রূপে পেশ করা ওনার পেশা | ইতিহাসকে পণ্য করে বিজনেস কি করে করতে হয় উনি সেটা খুব ভালো করেই জানেন | দেয়ালে বড় বড় পেইন্টিংস , বেশিরভাগই সিপাহী বিদ্রোহের সময়কার ছবি | তার সাথে প্রতি ছবির নিচে লেখা এ বাড়ির ইতিহাস , সেই আমার দাদির দাদুর গল্প | একটু রং চড়িয়েছেন গল্পে, তবে বেশি বাড়াবাড়ি করেননি, এই যা | বাইরের পার্কটাও অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছে | আমার সেই পুরানো চিলেকোঠা আর নেই , সেই জায়গায় পুরো ছাদ নিয়ে একটা রুফটপ বার, চারপাশটা গ্লাস প্যানেল দিয়ে ঘেরা | এখান থেকে ঝলমলে পার্কটা কিন্তু খুব সুন্দর লাগছে দেখতে | সেই ছত্রীটা এখনো আছে, কিন্তু রং বদলে গিয়েছে | উপর থেকে দেখলে মনে হয় পার্কটা এই রেস্টুরেন্টেরই অঙ্গ | জগৎ মিত্তল এমন আর্কিটেক্ট যে ছোটোখাটো রদ-বদল করে উনি জায়গার চেহারায় পাল্টে দিতে পারেন, এইটা নিঃসন্দেহে বলা যায় | বাবার কাছে শুনেছিলাম যে সবাই, মানে বাবা , জেঠু , কাকা অনেক খুঁজে এমন একজন বায়ার পেয়েছিলেন যে এ বাড়ির আর্কিটেকচার কে পুরোপুরি বদলাবে না | এইটা জেঠুর একমাত্র কন্ডিশন ছিল আর কপাল গুনে পেয়েও গিয়েছিলেন এই জগৎ মিত্তল এন্ড সন্স কে | সম্ভবতঃ জেঠুর কোনো বন্ধুই এই যোগাযোগটা করিয়ে দিয়েছিল| স্কচের গ্লাসটা শেষ হয়ে গিয়েছিলো, বারের দিকে তাকাতেই ওয়েটার বুঝে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে এসে রিফিল করে দিয়ে গেল | আমি জানি এখানকার ম্যানেজার সুজাতা সরকারের চোখ ঠিক আমার দিকে রয়েছে, সেই মতই নির্দেশ আছে এখানকার মালিকের | কেনই বা হবে না, এই বাড়ির সূত্রে জগৎজি বলতে গেলে আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড হয় গিয়েছেন | উনি এখন অবসর নিয়েছেন , বিজনেস এখন দুই ছেলে দেখে | দুজনই বাপের উপযুক্ত ছেলে | তিন বছর আগে আমার রেকমেন্ডেশনে আমাদের মুম্বই অফিসের ইন্টেরিয়র ওরাই করেছিল , বলতে গেলে আমার মুখ রক্ষা করেছিল দুজনে | গ্লাসে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম, উঠোনের দিকটা গিয়ে রেলিং থেকে ঝুঁকে দেখলাম , নিচের আসরে এখন ধীরে ধীরে গেস্টরা আসা শুরু করে দিয়েছে , মনে হয় আরও ঘন্টা খানেক পর এ প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে | তার মানে ততক্ষন আমি এখানে থাকতে পারি| এরপর ওই গান বাজনা শুরু হয় গেলে আর থাকা যাবে না | আমার ফ্লাইট অনেক সকালে | এখান থেকে দশটা নাগাদ বেরিয়ে হোটেল এ গিয়ে কিছু অফিসের কাজ সেরে নেবো, তারপর ফ্লাইট আরামসে ধরা যাবে | শরীরটা আবার সোফায় এলিয়ে দিলাম | মনটা আবার ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল | এটাই হয় এখানে আসলে | বিয়ের পর পর দিন গুলো যে কি ভাবে কেটেছে সেটা আজও ভোলা যায়নি বা ভুলতে পারবোও না কোনোদিন | ছোড়দির বৌভাত তো কলকাতাতেই হয়েছিল, তাই এখন থেকে কেউ যেতে পারেনি , যাবার অবস্থাতেও কেউ ছিল না তখন |তবে মামারা আর কিছু আত্মীয় স্বজন হয়তো গিয়েছিলো| চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকলে সেই সব ঘটনাগুলো চোখের পর্দায় ভাসতে থাকে| কি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই না বাড়ির সবাই গিয়েছে সেই সময় | তখন সব কিছু বুঝতাম না কিন্তু এখন বুঝতে পারি সে সব | আজ অনুভব করি, মা সেদিন কি সত্যি সত্যি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ওই ঘুমপাড়ানি গান, কান্নাভেজা গলায় গাইছিলো? কোনোদিন জিজ্ঞেস করতে পারিনি মাকে , হয়তো কষ্ট পাবে বলেই জিজ্ঞেস করতে পারি নি | মা ,বাবার কাছে যাবার ঠিক তিনদিন পর পুলিশ এসে তুলে নিয়ে গেল ছোড়দা কে | বড়মা কত কান্নাকাটি করল, কত কাকুতি মিনতি করলো পুলিশগুলোর কাছে, কিন্তু কিছুতেই ওদের মন ভিজলো না | টানতে টানতে তুলে নিয়েছিল পুলিশ ভ্যানে | বাবার কাছে শুনেছিলাম মিনা আঙ্কল এর এক জুনিয়র খবরটা দিয়েছিলো যে ছোড়দা বাড়িতেই লুকিয়ে আছে | মিনা আঙ্কলের অজান্তেই পুলিশ ছোড়দা কে তুলে নিয়ে যায় | এক ধরনের সাবোটাজ আর কি | প্রোমোশনের ব্যাপার তো ছিলই এখানে | ওই সব ঘটনা যখন হচ্ছিলো তখন আমি স্কুলে ছিলাম | বাড়িতে রয়েছে বড়মা আর ছোটমা | জেঠু আর ছোটকা গিয়েছিলো মিনা আঙ্কলের কাছে | ঘরে ঢুকে দেখি বড়মা বিছানায় শুয়ে রয়েছে | আমি স্কুল ব্যাগটা নিজেদের ঘরে রেখে এসে ছোটমার কাছে গিয়ে বসলাম | বড়মা একবার চোখ খুলে আমাকে দেখে ছোটমাকে বললো , - ওকে খেতে দাও তুমি , তেতেপুড়ে এসেছে বাচ্চাটা | আমার দিকে তাকিয়ে বললো , বাবুসোনা, তুমি বরং খেয়ে একটু বিশ্রাম করে নাও দেখি | বলে আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো | বাস, ওই টুকুনই বলল বড়মা | খেতে বসে ছোটমা আমাকে বললো সব কথা | সব শোনার পর আমার খাবার ইচ্ছে একদম চলে গেল | এবার কি হবে ? এই চিন্তা আমার মাথায় ঘুরতে লাগলো | ইতিমধ্যে চার পাঁচদিনের মাথায় বাবাও চলে এলো দিল্লিতে | উদ্দেশ্য এক , সেই ছোড়দাকে খুঁজে পাওয়া | পাড়ার সবাই এ ব্যাপার আমাদের অনেক সাহায্য করেছিল | যে যার নিজের সোর্স থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছিলো | কিন্তু আশ্চর্য ভাবে ছোড়দা একদম উধাও হয়ে গেল | দিল্লি তো ছিলই, হরিয়ানা , উত্তরপ্রদেশের লাগোয়া কোনো থানা বাদ যায়নি খোঁজ নেওয়া থেকে | মিনা আঙ্কলের যত খবরি ছিল তারাও কোনো খবর দিতে পারলো না | বাবা আর জেঠু সন্তোষজির সাথেও দেখা করে খোঁজ নেবার চেষ্টা করে , কিন্তু উনিও কিছু করতে পারলেন না | বাবার কিন্তু সন্দেহ ছিল যে সন্তোষজি ঠিক জানতো যে কোথায় আছে ছোড়দা , কিন্তু বলে নি | এ কথাটা বাবা আজও বলে| হাতের কাছে সাইলেন্ট মোড এ রাখা ফোনটা কেঁপে উঠলো | কি জ্বালা, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট এসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি মিস্টার মেহেতার ফোন | অনিচ্ছা সত্বেও ফোনটা তুলতে হলো - হ্যালো , - স্যার, অসময়ে বিরক্ত করলাম না তো ? এক্সট্রিমলি সরি স্যার , - না না ঠিক আছে বলুন | বিরক্তিকর বিনয় আমার অপছন্দ | - স্যার আজকের অরেঞ্জমেন্টে কোনো কমি তো ছিল না ? - না, সে রকম কিছু তো নজরে আসেনি, তবে বাউন্ডারির বাইরে নিয়ন আর এল.ই.ডি ডিসপ্লেগুলোর কিছু কিছু জায়গায় ব্রোকেন ছিল | - সরি স্যার, আমিও সেটা নোটিশ করেছি, ওগুলো লাস্ট মোমেন্টে গন্ডগোল করলো, শুরুতে কিন্তু ঠিকই চলছিল | - কোনো ব্যাপার না | ওরকম হয়েই থাকে , নেভার মাইন্ড | - থ্যাংক্যু স্যার , আসলে স্যার সেমি ফাইনাল তো, তার উপর ইন্ডিয়া পাকিস্তান ম্যাচ, কিছু গন্ডগোল যাতে না হয় তার দিকেই আমাদের বেশি নজর ছিল , তাও ভালো যে ইন্ডিয়া জিতে গিয়েছিলো না হলে এই মব সামলানো খুব মুশকিল হয়ে যেত | মনে মনে ভাবছি ইনি কখন মোদ্দা কোথায় আসবেন | - সরি মেহ্তাজি আমি একটু ব্যস্ত আছি এখন , আমরা কি কাল কথা বলতে পারি ? - নিশ্চই স্যার , কাল তো কথা বলবোই , আসলে স্যার আমার উপর প্রেশার আছে একটু , আপনি যদি আমাদের থার্টি পার্সেন্ট পেমেন্টটা একটু তাড়াতাড়ি করিয়ে দেন তাহলে খুব ভালো হয় স্যার , তাছাড়া এটাও জানবার ছিল যে ফাইনালে আপনিই আসছেন তো ? - দেখুন, আমি চেষ্টা করব যত তাড়াতাড়ি হয় আমি করিয়ে দেব | আর ফাইনালে মনে হয় কোরিয়া থেকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর আসবেন | সে আপনাদের আগে থেকেই জানিয়ে দেব , সে চিন্তা করবেন না | বিরক্তিকর আলোচনা থেকে পাস কাটানোর জন্য কথা শেষ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি , কিন্তু বিধি বাম| - কিন্তু স্যার আরেকটা ব্যাপার ছিল তার জন্য আমরা খুবই দুঃখিত | ওই সন্তোষ উপাধ্যায় স্যার , ওকে যে কে ইনভাইট করেছিল জানি না , ট্রফি তিনি নিজের হাতে দেবে বলে হাঙ্গামা শুরু করে দিলেন , অনেক কষ্টে ওকে আটকাতে পেরেছি | - হুম , নেক্সট টাইম থেকে আপনারা যদি এটা খেয়াল রাখেন তাহলে ভালো হয়| একটু কঠিন ভাবেই বললাম কথাটা | ঠিক আছে আজ রাখছি, বাই | বলে ফোনটা ডিসকানেক্ট করে দিলাম| এই ধরনের বত্তমিজি আমি সাধারণতঃ করি না | কিন্তু কি করব, মাথাটা গরম হয় গেল ওই বাস্টার্ডটার নাম শুনে |সুজাতা আমার কাছে এগিয়ে এলো , - কিছু চাই স্যার? আমরা আজ একটা স্পেশাল মুঘলাই ডিশ করেছি , একবার টেস্ট করবেন ? আরেকটা কথা স্যার , আপনি চাইলে আপনার ফোনটা আমার কাছে দিতে পারেন , আপনার বাড়ির ফোন ছাড়া আর কারো ফোন এলে বলে দেব যে আপনি বিজি আছেন এখন ? ওর কথায় আমি হেসে ফেললাম , - থ্যাঙ্কস সুজাতা, তার দরকার নেই , মনে হয় না আর কেও ফোন করবে | তা একটু দাও তোমাদের নতুন ডিশ| বেচারির খারাপ লাগবে তাই বললাম ওকে , খাবার ইচ্ছে এখন একদম নেই আমার | - ওকে স্যার , এক্ষুনি পাঠাচ্ছি| প্লিজ এনজয় ইওর ড্রিঙ্কস স্যার| বলে ওয়েটারকে নির্দেশ দিলো কিছু | যতদূর মনে পরে বাবা বোধহয় আট - দশদিন ছিল দিল্লিতে | বড়মা তো পুরো শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিল | দিনরাত শুধু কান্না আর কান্না | ঘুমের মধ্যেও আমি অনেক সময় কাঁদতে দেখেছি | আমি তো স্কুল থেকে ফিরেই বড়মার কাছে গিয়ে বসতাম | নিজের সাধ্য মত সান্ত্বনা দিতাম | ওষুধ , জল খাইয়ে দিতাম | মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতাম | নিজেকে যেন অনেক বড় ভাবতে লাগলাম | গ্যাস জ্বালিয়ে খাবার দাবার গরম করতেও শিখে গেলাম | ছোটমা তো বাড়ির অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতো | যদিও একজন কাজের বাঈ ছিল | কিন্তু কিছু কাজ তো নিজেদের ও করতে হয় | একদিন দেখলাম নিচে জেঠু, বাবা আর ছোটকা কিছু জরুরি কথা বলছে | আমি তিনজনের জন্য চা বানিয়ে ঠিক মার মতো টি পটে চা ঢেলে, ট্রেতে করে সাজিয়ে ওদের সামনে টেবিলের উপর রাখলাম , মাথা নিচু করে বললাম , - আমি চা বানিয়েছি জেঠু | বাবা অবাক হয় আমার দিকে তাকালো, তারপর উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো আর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বোলাতে লাগলো |জেঠু কি রকম ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ , - বাচ্চা ছেলেটাকে আমরা টেনে বড় করে দিলাম রে জগু, বলে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো | আমি জেঠুর কাছে গিয়ে চেয়ারের হাতলে বসে বললাম, - জেঠু আমি তো এমনিই বড় হয়ে গিয়েছি , তুমি এমনি করে কেঁদোনা তো , শরীর খারাপ করবে এবার | বলে জেঠুর পিঠে হাত বোলাতে লাগলাম | জেঠু আমার হাতটা টেনে নিজের বুকের কাছে ধরে নিয়ে চুপ করে বসে রইলো | বাবা আর ছোটকা কি রকম ঝিম মেরে বসে রইল | ছোটো ছোটো ঘটনা, কিন্তু মনে হয় যেন কালই ঘটেছে সব | মনে গেঁথে রয়েছে প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা মুহূর্ত | মা তো সতেরো বছর হলো আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে | কিই বা বয়েস হয়ে ছিল মার | দিল্লি ছেড়ে আসার পর যতদিন বেঁচে ছিল মা শুধু নিজেকেই সব কিছুর জন্য দোষী মনে করে গেল | বেচারা বাবাকেই তো সব সামলাতে হয়েছিল | আমি তো পড়াশুনো আর কাজ নিয়ে অনেকটা সময় বাইরেই কাটিয়েছি | ওদিকে জেঠু বড়মা, এদিকে মা, তার উপর নিজের কাজ , কি না করেছে বাবা একা হাতে | তবে বৌমা, মানে আমার বৌ সুরেখা আর আমার দুই যমজ ছেলে মেয়ে কুশ আর লিপিকে পেয়ে বাবা মা নিজেদের অনেকটা সামলে নিয়ে ছিল | কিন্তু মা তো ভিতর থেকেই ক্ষয়ে গিয়েছিল | আর মন ভেঙে গেলে যে শরীরও ভেঙে যায়, সেটা মা কে দেখেই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম | দিল্লিতে সেই সময় একমাত্র সাথী প্রিতিই ছিল | খেলতে যাওয়া তো প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলাম | বাড়িতেই এতো কাজ থাকতো | তাছাড়া ছোড়দার ব্যাপারে সবাই জিজ্ঞেস করতো বলে আমিও বন্ধুদের এড়িয়েই চলতাম , যদিও কোনো কারণ ছিল না | স্কুল থেকে ফিরেই প্রিতিই বাড়িতে চলে আসতো | আমার সাথে বসেই হোম ওয়ার্ক গুলো শেষ করতো | শুধু আমার সাথেই না, বাড়িতে সবার জন্য ও সময় দিতো | ও কাকিমা, বড়মা, জেঠু সবার সাথে বসেই কথা বলতো, স্কুলের গল্প, পাড়ার গল্প | এখন ভাবি, প্রিতিই তো আমার বয়েসিই ছিল , কিন্তু কত পরিণত ছিল আমার থেকে | বেশির ভাগ দিনই প্রিতির মা মানে সিং আন্টি প্রিতির সাথে আমার স্কুলের টিফিন পাঠিয়ে দিতেন | বাড়িতে তো রান্নার লোক রাখা হয়েছিল ওই সময়, কিন্তু তাও উনি পাঠাতেন | ছোটকার কথাই শেষ মত ঠিক বেরোলো | আমাকেও বাবা নিজের কর্মস্থানে নিয়ে এলো | নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে সময় তো লেগেই ছিল | একে বিহার, তার উপর ভাষা | কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি আমার সেই অসুবিধার কথা | কাকেই বা বলবো | এদিকে কয়েক মাস পর ইমার্জেন্সি শেষ হলো, দেশের অবস্থা অনেকটা ঠিক হয়ে এলো | সেই সময়কার রুলিং পার্টি আর নেই | নতুন করে ইলেকশন আবার হবে | সেই সময় সবাই আশা করে ছিল যে ছোড়দাকে এবার পাওয়া যাবে | কিছু মাস পর পাওয়াও গেল, কিন্তু কি অবস্থায় ? হরিয়ানার এক ছোট শহরের এক নাম না জানা হাসপাতালে | এক মুখ দাড়ি গোঁফ, বড় বড় চুল রোগা, চেনার কোনো উপায় ছিল না | জানা গেল কিছুদিন আগে রাস্তায় বেহুঁশ অবস্থায় পেয়ে লোকেরা হাসপাতালে দাখিল করে দিয়েছিল, এই ভেবে যে রাস্তায় মরে পরে থাকবে তাই | অবশ্য মিনা আঙ্কলই শেষ অবধি উদ্ধার করতে পারে ছোড়দাকে | আর কেউ হলে খুঁজেই পেতোনা | সেদিন ও একটা দিন ছিল আমার জীবনে | আমি স্কুল থেকে ফিরে দেখি মা কি রকম একটা জবুথবু হয়ে ঘরের এক কোণায় বসে আছে | কি হলো মার ? আমি কিছু না বলে স্কুল ব্যাগ রেখে হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে রাখা খাবার খেতে বসলাম | কিন্তু মা তো এলো না ? আমি খেতে বসলেই তো মা এসে কাছে বসে ? আমি খাওয়া ছেড়ে মার্ কাছে গেলাম, - মা , কি হয়েছে তোমার ? শরীর ঠিক লাগছে না ? বাবা কে ডাকবো ? মা অঝোর ধারায় কেঁদে যাচ্ছে , আর আস্তে আস্তে কি যেন বলছে | আমি ভালো করে কাছে গিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম , - আমার জন্যেই সব হলো, আমি দোষী সবার কাছে , ভগবান আমায় যেন ক্ষমা না করেন | আরও কি সব যেন বলে যাচ্ছিলো মা | আমি সত্যি এবার ঘাবড়ে গেলাম , জোরে জোরে মার কাঁধ ধরে ঝাঁকালাম | - মা, মা কি হয়েছে মা তোমার ? হটাৎ মা যেন সম্বিত ফিরে পেল | - ওহ, তুমি এসে গিয়েছো ? আমায় ডাকোনি কেন আগে ? চলো খেতে চলো | বলে যেন কিছুই হয়নি সে ভাবে উঠে কিচেনের দিকে চলে গেল আমাকে খেতে দেবে বলে | কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল বাড়ির কাজের মেয়ে, সেই সব বললো , - সাবজি আজ জলদি চলে এসেছিলো অফিস থেকে , দিল্লি সে ফুঁনওয়া আইল রহে না ! কি যেন একটা হয়েছে দিল্লি মে | - গোরা , খেতে এস তাড়াতাড়ি, খাবার ঠান্ডা হয় যাচ্ছে যে , - হা মা , এই আসছি | খেতে খেতে মার দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম , এখন স্বাভাবিকই আছে মনে হলো, - মা , দিল্লি তে কি হয়েছে ? বাবা কেন দিল্লি চলে গেল তাড়াহুড়ো করে? মা ই আমাকে সব বললো যে ছোড়দাকে পাওয়া গিয়েছে আর কি অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে ইত্যাদি | বাবা তাই দিল্লি গিয়েছে | সব ঠিকঠাক করে শিগগিরই ফিরে আসবে | - মা, এ তো ভালোই হলো , ছোড়দাকে পাওয়া গিয়েছে | আর কিছুদিন হাসপাতালে থাকলে এমনিই ভালো হয় যাবে ছোড়দা, তাই না মা ? আমার সত্যি ভীষণ আনন্দ হলো , যাক এবার সব কিছুই ঠিক হয় যাবে | আমরা আবার সবাই বাড়ি ফিরে যাবো | মা অবশ্য আমার কথার কোনো উত্তর দিলো না | মা আবার কি রকম চুপ করে গেল | আমার মনে হয়তো একটা ক্ষীণ আশা ছিল, কিন্তু না, তা আর হয়নি | বড়মা একটু ঠিক হতেই, বড়োরা সবাই ঠিক করে নিলো যে এ বাড়ি তারা বিক্রি করে দেবে | একটু চিন্তা ছিল যে, এই বাড়ি ক্লেইম করার আরও কেউ ওয়ারিস আছে কি না , কিন্তু অনেক খুঁজেও কাউকে পাওয়া গেল না | অনেক পুরোনো বাড়ি তো, হতেই পারতো কেউ না কেউ | একবার কেস ঠুকে দিলেই তো হয় গেল | তাছাড়া এতো বড় বাড়ি, কেনার লোকও তো চাই | ব্যাপারটা যত সহজ ভাবা হয়েছিল, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো বেশ ঝামেলা আছে | বাবা তো প্রতি মাসেই একবার করে দিল্লি যেত | একে তো বাড়ি বিক্রি, তার উপর ছোড়দার ট্রিটমেন্ট | এদিকে ছোড়দা প্রাণে তো বেঁচে গেলেও , কোমর থেকে নিচে পুরো অসার হয়ে গিয়েছিলো | ডাক্তার ও এ ব্যাপারে কোনো আশা দিতে পারলো না | মানে এ ভাবেই হুইল চেয়ার নিয়েই সারা জীবন কাটাতে হবে | সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে নি | সুরেখার সাথে আমার ম্যানেজমেন্ট কোর্স করার সময়ে আলাপ, তারপর বিয়ে | ও মারাঠি, কিন্তু আমাদের ফ্যামিলিতে খুব সুন্দর ভাবে মানিয়ে নিয়েছিল | ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছোড়দা | বড়মা তো আমার বিয়ের আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন | বাড়ি বিক্রি হবার পর তো জেঠু আর ছোটকারা ভাড়া বাড়িতে চলে গিয়েছিলো | বড়মা মারা যাবার পর সত্যি এবার জেঠুদের অসুবিধা হতে লাগলো, বিশেষ করে ছোড়দাকে নিয়ে , ওর দেখাশুনোটাও একটা বড় কাজ | কাজের লোক রাখা সত্ত্বেও বাড়ির কেউ না থাকলে খুব অসুবিধা | অনেক কষ্টে জেঠু কে বোঝানো গেল এই অসুবিধার কথা | সেই মত ঠিক হলো যে জেঠু ছোড়দির কাছে আর ছোড়দা আর বাবা আমার কাছে থাকবে | কিন্তু বাবা বেশিরভাগ ছোড়দির কাছেই থাকতো | দিল্লি ছাড়া বাবা পক্ষে সম্ভব ছিল না | আমিও জোর দেয়নি কখনো বাবা কে | আবার ফোনটা বেজে উঠলো, বিরক্ত হয়ে ফোনটা তুলতে গিয়ে দেখলাম সুরেখার ফোন | - হা বোলো সুরেখা .... - ও হো মামুজান, কি আদর করে কথা বোলো মামীজান কে সাথে ? - আরে নন্দিনী তুই ? কবে এলি রে ? আগে খবর দিলি না কেন রে যে তুই আসবি ? - আমরা তো সবাই ........ - আরে চুপ চুপ...... , আরও অনেকের গলা পেলাম মনে হলো ? বাবার আওয়াজও পেলাম মনে হলো ? - ছোড়ো না মামুজান, টিভি তে ট্রফি দেবার সময় কি ধানসু লাগছিলো তোমায় | চশমে বদদুর মামু | আমরা সবাই তাই বলছিলাম | - আমরা সবাই কে ? - আমরা মানে ......আরে ছাড়ো না | তোমার ফ্লাইট কখন ? - সকালেই, মুম্বাইতে নাইন থার্টি তে পৌঁছে যাবো | - ঠিক আছে ব্রেকফাস্ট এক সাথে করবো ওকে ? - নিশ্চই, বাই ‚ - বাই ফোনটা হাতে ধরেই ভাবতে লাগলাম, কি ব্যাপার সবাই কেন এসেছে ? কিন্তু যাই হোক কিছু একটা মজা তো হবে পক্কা | ফোনটা আবার গোঁ গোঁ করে উঠলো, রিমাইন্ডার, আসলে আমি ভুলে যাই বলে সুরেখা দুনিয়ার সব আত্মীয় বন্ধুদের এনিভার্সারি, বার্থডের ডেট গুলো ফিড করে রাখে, আমিও সেই দেখে সবাই কে উইশ করে মেসেজ করে দি | এবার আমি নিজেই হো হো করে হেসে উঠলাম | আরে এতো আমারি ফিফটিয়েথ বার্থডে | এবার বুঝেছি সবাই কেন এসেছে | সত্যি মনটা খুব ভালো হয় গেল | ম্যানেজার সুজাতা কে ইশারা করলাম আমার পেমেন্টটা রেডি করার জন্য | ড্রাইভার আমাকে আসতে দেখে দরজা খুলে দাঁড়ালো | আমি গাড়িতে উঠতে গিয়েও আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম | পুরোনো অভ্যেস মতো দুটো বাড়ি ছাড়িয়ে তৃতীয় বাড়ির দিকে নজর চলে গেল | প্রিতিরা তো এখন আর ওখানে থাকে না | কোথায় আছে তাও জানা নেই | তবুও হাত তুলে বাই করলাম প্রিতিকে, যেমন আগে স্কুল থেকে একসাথে ফেরার পর করতাম | ছোটবেলায় মা বলতো যারা মারা যায় তারা আকাশের তারা হয়ে যায়, আমি আজও তাই বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করতে মন চায় | রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাথার উপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে জেঠু, বড়মা আর মাকে মনে মনে প্রণাম করে গাড়িতে গিয়ে বসলাম গাড়ির কাঁচ নামিয়ে আরেকবার হাত নাড়লাম, ....বাই ৫১, শাহ্জহানাবাদ ....ফির মিলেঙ্গে, ওয়াদা রহা !!!! .....শেষ
James
আড্ডা চালিশা-পরিবর্দ্ধিত সংস্করণ হে মহামহিম অ্যাডমিনদ্বয়‚ অধীনের একটি নিরতিশয় ক্ষুদ্র আবেদন আছে| আড্ডাঘরের আবহাওয়া সংস্কৃত শ্লোকাচ্চরণে ভুরভুর করিতেছে| একটি টোল খুলিবার প্রস্তাব বিবেচনা করিয়া দেখিতে আজ্ঞা হয়| সেথায় বঙ্গীয় সমাজের রীতিনীতি‚ রেওয়াজ সম্পর্কিত গুরু গম্ভীর আলোচনা হইবেক| আচার্য্য হিসাবে আমি আদি অকৃত্রিম ঋষিমহাশয়ের নাম প্রস্তাব করিতেছি‚ তৎসহ অধ্যাপক পদে আলরেডি অধ্যাপক নবকুমারের নাম পেশ করিতেছি| মার্কেট রিসার্চ অনুযায়ী ভাবী ছাত্রছাত্রীর মধ্যে আশা উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হইতেছে| ইহারা সকলেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দিকপাল (পালিকা)‚ সেইহেতু সান্ধ্যাকালীন পাঠদানের ব্যবস্থা হউক| Adult learning এর নিমিত্ত সরকার বাহাদুরের নিকট কিছু অনুদান মিলিবে আশা করি| তবে পন্ডিতমহোদয় দ্বয় উভয়েই প্রচুর ধন সম্পদের অধিকারী ‚ শিক্ষাদান তাহাদের বিলাস মাত্র‚ অর্থাৎ বিনাপয়সায় রাজী আছেন! সম্ভাব্য ছাত্রছাত্রীদের তালিকা: শ্রীমতী মুনিয়া অফ ক্যালিফোর্নিয়া শ্রী হিমুভাই দিল্লীওয়ালা শ্রী মনোজদা অফ বিনায়ক আবাসন শ্রী চঞ্চল ব্যারিটোন শ্রীমতী শ্রী... শ্রীমতী ঝিনুকরাণী শ্রী মান জাজ্বল্যমান অ্যাডমিন এবং শ্রী শ্রী ১০৮ দেশদ্রোহী -- ডি: কাহারও আপত্তি জানিবামাত্র ডিলিটং মারন্তি|
ঝিনুক
শ্রাবণের কোন সাঁঝে যদি ব্যথার বাঁশিটি বাজে তুমি একবার শুধু মনে মনে ডেকো ভুলে যাওয়া মোর নাম...... গুণগুণ করতে করতে এসে উদয় হল পাগলিটা। মাথার চুলে, মুখে জলের কুচি চিকচিক করছে, জিনসের শার্টটাও আধা ভেজা। একটু হিংসে হল দেখে, ইসস, কি মজা, কেমন বৃষ্টিতে ভিজে এল...... আবার একটু ভালও লাগল। বহুদিন পরে এল পাগলিটা, আগে তো কথায় নাতায় এসে হাজির হত আর অজস্র আনকথায় কান ঝালাপালা করে দিত। অনেক দুচ্ছাই করেছি তখন, কবে থেকে যে আসা বন্ধ করে দিয়েছে..... আজ এই মেঘে ঢাকা, ঝুম বৃষ্টিতে মুখর সন্ধ্যায় হঠাৎ উপলব্ধি করলাম নিজের অজান্তেই খুব মিস করছিলাম পাগলিটাকে। ডাকবাক্স থেকে একগোছা খাম নিয়ে সবে ঘরে ঢুকেছি। অকেজো চিঠি ডাকে আর আসে না, সবই কেজো খাম, জীবন এখন শুধুই বিলময়, গাদা গাদা বিল, ক্রেডিট কার্ডের বিল, ইলেকট্রিক বিল, জলের বিল, গ্যাসের বিল, আউটপোস্ট আর অয়েল অ্যাণ্ড গ্যাস ম্যাগাজিন, সাথে খানকয়েক জাঙ্ক মেইল- রকমারি ডিসকাউন্টের মনোরম হাতছানিতে ভরা, কোনটারই উত্তর দেবার প্রয়োজন বা অপ্রয়োজন কোনটাই নেই। খামগুলো কর্তার জন্য ট্রেতে গুছিয়ে রাখতে রাখতে আড়চোখে দেখি পাগলিকে । ……কি হল, মুখভার কেন? ……কিছু না..... ……মন খারাপ? ……না, বলছি তো কিছু না। বেশ, চুপ করে হাতের কাজ সারতে থাকি। বলতে ইচ্ছে হলে বলবে। অকারণ খুঁচিয়ে লাভ নেই। আজকাল তো আসেই না আর, এসেছে যখন হয়তো কথা আছে। বলতে চাইলে বলবে, নয়তো অমনিই বসুক একটু কাছে। আমারও তো কথা সব ফুরিয়েছে, পাশে এসে বসারও কেউ নেই আর। চুপচাপ ওর গুণগুণানি শুনি। সত্যি বলতে কি, বেশ ভাল লাগতে থাকে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হল, আজকের মত সব কাজ ফুরাল। গত রবিবারে গেছিলাম দেশী বাজারে, পান এনেছিলাম কটা, শেষ পানটা সাজি বেশ গুছিয়ে সুপুরি-জর্দা-মৌরি দিয়ে। পানটা মুখে দিয়ে আলো নিভিয়ে রিক্লাইনারে টান হই। পাগলি এসে কাঁধে মাথা রেখে পাশে বসলো। ……গান চালাবে না? ……তুই শুনবি? ……কেন তুমি গান শোন না আজকাল আর? ……নাহ, ইচ্ছে করে না রে। ……আজ একটু শুনবে? ……হুমমম.... পাগলিই পছন্দ করলো ..... মৃণাল চক্রবর্তী "এ হৃদয় যখন আমার মুখর হল সে কেন কাছে এসে হারিয়ে গেল সে স্মৃতি ধুপের মত অবিরত আকুল করে কেন জানি না যে শুধু তোমার কথাই মনে পড়ে ......" চুপচাপ গান শুনি দুজনে। বৃষ্টির তোড় আরো বেড়েছে, ত্যারছা হয়ে জানালার কাচের গায়ে এসে পড়া জলের ফোঁটাগুলো রাস্তার আলোয় হীরের ফুলের মত জ্বলতে থাকে। গানও শেষ হয় একসময়, পাগলি আর আমি বসে থাকি কাঁধে কাঁধ ছুয়ে অন্ধকারে। ……তোকে এমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন? ……তোমাকেও তো ক্লান্ত লাগছে, মনে হচ্ছে যেন বয়স কত্ত বেড়ে গেছে! ……গেছেই তো, মেঘে মেঘে বেলা কি কম হল নাকি? ……হি হি, তুমিও বুড়ো হয়ে গেলে? আমি কিন্তু কোনদিন বুড়ো হব না, দেখে নিও। ……হুমমম.... কিছুক্ষণ চুপচাপ, শুধু বৃষ্টির পায়েল বাজে একটানা। তারপর পাগলি আবার শুরু করে- ……একটা কথা বলব? বকবে না তো, প্রমিস? একটু ঝিমুনি আসছিল। পাগলির এই কথায় সজাগ হয়ে নড়েচড়ে বসলাম। ……বকুনি খাবার মত কথা? তাহলে বলিস না। ……না না, শোনই না। কারো সাথে কথা বলতে গিয়ে তোমার এমন কখনো মনে হয়েছে যে কোথায় যেন তাল কেটে যাচ্ছে? ……কি যে বলিস, তাল আবার কাটবে কি রে, শুরু থেকেই যা বেতালা তার আবার তাল কাটে কি করে? ……কেন বল তো মানুষ সহজ কথাটা সোজা ভাবে বলতে পারে না? ……ধুর, সাধে কি আর তোকে পাগলি বলে ডাকে লোকে! সহজ কথাটা সোজা করে বলাই তো দুনিয়ায় সবচেয়ে কঠিন কাজ রে। ……নাহ, তুমি বুঝছো না। কারো সাথে কথা কইতে ইচ্ছে না হলে তাকে সোজাসুজি বলে দিলেই তো হয়। অকারণ কিছু প্রসঙ্গবিহীন বাক্য খরচ করে কেন খামোখা বিভ্রান্তি ছড়ানো? ……হুমমমম.... তা এমন বিভ্রান্তিটা কে ছড়ালো? ……নাহ, কেউ না। দোষ আসলে আমারই। সে এড়িয়ে যেতেই চেয়েছে। আমিই বুঝেও বুঝতে চাই নি। ……তা, এবার তো বুঝেছিস। একই ভুল আবার করিস না। ……না, করব না। ……প্রমিস? ……প্রমিস….. কিন্তু তুমি উত্তর দিলে না, এড়িয়ে গেলে আমার প্রশ্নটা। ……দিলাম তো, ‘সহজ’ শব্দটার কোন অস্তিত্ব মানুষের জীবনে নেই। আর কেউ যদি এড়িয়ে যেতে চাইছে, বুঝতেই পারিস, তার পরেও তাকে উত্যক্ত করিস কেন? ……বললাম তো, আর করব না। আসলে অনেক দিন কথা হয় না, বুঝি নি বন্ধুত্বের খাতা থেকে আমার নাম মুছে গেছে কোন ফাঁকে...... সে যাক, আমার মত পাগলির সাথে বন্ধুত্ব রেখে লাভ তো কিছু নেই। কিন্তু আশকথা, পাশকথায় না ঘুলিয়ে সেইটুকু সোজাসুজি বলে দিতে কিসের অসুবিধা? ……না, ওসব কেউ সোজা, বাঁকা কোনভাবেই বলে না। বুঝে নিতে হয়। কেউ একটু তাড়াতাড়ি বোঝে, আর তোর মত পাগলিদের বুঝতে বুঝতে হয়ত অনেক দেরি হয়ে যায়। কিন্তু একদিন ঠিক বোঝে সবাই। এই যে তুই বুঝে গেলি আজ। মন খারাপ করিস না, নে, শোন একটা কবিতা শোন যাবার আগে, সম্রাজ্ঞী বন্দোপাধ্যায়ের লেখা। কবিতাটার নাম কি বল তো? ……কি? …… “সহজ”..... "সহজ কথা সহজ করে বলো জটিল আমার পছন্দ নয় মোটে সহজ স্রোতে গা ভাসিয়ে আছি উল্টে গেলে পাল্টা জবাব জোটে এসব খেলা চলতে থাকে রোজই অন্ধকার আঁকড়ে বসে বুকে কথার প্যাঁচে ফেলতে চাও যদি জীবন তোমার আটকে যাবে মুখে সহজ খেলা সহজ করে খেলো কঠিন খেলা মুলতুবিতে থাক হাত বাড়ালে সহজ করে পাব? নয়ত জটিল.... তোমাকে জ্বালাক।"……..
শিবাংশু
ছোটোবেলায় প্রতি রথযাত্রায় নতুন পালার নতুন চমক সিরিজে 'সিঁদুর দিওনা লেপে', টাইপ নামের ছড়াছড়ি থাকতো। ‘নামভূমিকা’য় লাস্যময়ী নায়িকা। অন্যদিকে কোনও মিহিগুম্ফ নায়ক। তৎসহ কিশোরকুমার, "...হাটবাজারে শাঁখাসিঁদুর অনেক পাওয়া যায়/ কপালে থাকলে পরে তবেই পরা যায়...." শাঁখা ও সিঁদুরের এই দ্বৈত বাদ্যবাদন থেকেই মেয়েদের প্রোফাইল নির্ধারিত হয়ে যেতো সেকালে। এখনও হয় অনেক জায়গায়। আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশের সংস্কৃতিতে প্রকৃতির তিনটি মৌলিক রং, যাদের earth coloures বলা হয়,, তার বিশেষ তাৎপর্য আছে। হলুদ, লাল ও দুটির মিশ্রণে, গৈরিক। সিন্ধুসভ্যতার সময় থেকে আমাদের 'ধর্ম'সংস্কৃতিতে এই রংগুলি 'পবিত্রতা'র চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হরিদ্রা ও সিন্দূর, এই দুটি ভেষজ রঞ্জক ব্যতিরেকে কোনও 'ধর্মীয়' অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হতোনা সেকালে। একালেও সেই ট্র্যাডিশন অচল হয়ে যায়নি। 'বিবাহ' নামক অনুষ্ঠানটিতে হলুদ ও সিঁদুরের ব্যবহার অন্য সমস্ত সনাতন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো'ই সুলভ। এদেশে লাল রংটি আবহমান কাল ধরেই প্রেয় ও পবিত্র মনে করা হয়। লক্ষ্য করার বিষয়, টোটেমভিত্তিক যেসব প্রধান দেবতা আমাদের দেশের সর্বত্র বিশেষভাবে পূজিত হ'ন, যেমন গণপতি বিনায়ক বা পবনপুত্র মারুতি, তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে সিঁদুরে আলিপ্ত থাকেন। অন্যপক্ষে শাক্ত সাধনপদ্ধতি ও দেবীপূজার যাবতীয় অনুষ্ঠানে সিঁদুরের ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। বৈদিক ঐতিহ্যে লাল রঙের সমূহ ব্যবহার থেকে স্বতন্ত্র হবার জন্য শাক্যমুনি শুদ্ধ লাল ছেড়ে ভিক্ষুদের হলুদ বা কাষায় রঙের উর্দি ব্যবহার করতে বলেছিলেন। কারণ তাঁর কালে যোগী বা যাজকরা রক্তিম চীবর পরিধান করতেন। কিন্তু তাঁর ভক্তরাও শেষ পর্যন্ত হলুদ রঙে টিকে থাকতে পারেননি। হলুদের সঙ্গে লাল মিশিয়ে গৈরিক বা জাফরানি রঙে নিজেদের রাঙিয়েছিলেন মহাযান পদ্ধতি বিকশিত হবার পর। অতএব বিবাহ অনুষ্ঠানের সঙ্গে রক্তিম রঞ্জক বা সিঁদুরের যোগাযোগ মানেই বিজয়ী ধর্ষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্ত্রীধনকে রাঙিয়ে দেওয়ার প্রচলিত মিথটির সত্যতা বিশেষভাবেই প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে । এই মিথটির উল্লেখ অনেকেই করে থাকেন। সিঁদুর আসলে , বিজয়ী পুরুষের অধিকৃত নারীর শরীরে এঁকে দেওয়া রক্তনিশান। সিলমোহর। এই তত্ত্ব একথাও বলে যে নারীর যাবতীয় অলঙ্কারও তাকে বেঁধে রাখার জন্য পুরুষের আবিষ্কৃত বেড়িশৃঙ্খলের নব্যরূপ। এই তত্ত্বটির উৎস প্রাগৈতিহাসিক কিছু সামাজিক নিয়ম। বৈদিক যুগে আটরকম বিবাহপদ্ধতির কথা আমরা জানতে পারি। এইসব বিচিত্র বিবাহপদ্ধতিকে যখন সামাজিক স্বীকৃতি দেবার কাজ শুরু হয়, তখন বলপূর্বক নারীহরণ ও বিবাহকে 'রাক্ষস' বিবাহের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিলো। এই বিবাহ সচরাচর অনার্য-আর্য, অনার্য-অনার্য বা কোনও স্থলে আর্য-আর্য বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হতো। অর্জুনের সুভদ্রাহরণ এর মধ্যে পড়ে। কিন্তু রাক্ষসবিবাহের নথিভুক্ত সারণীতে যদিও আর্যসভ্যতা সিঁদুর বা পরাজিতের রক্ত ব্যবহারের কোনও উল্লেখ করেনি তবুও ধরা যেতে পারে এই প্রথা আর্যসভ্যতার বাইরের লোকসমাজে হয়তো প্রচলিত ছিলো । উত্তর-পশ্চিম থেকে গাঙ্গেয় উপত্যকা বেয়ে আর্যাবর্তের যে সভ্যতা মগধ পর্যন্ত আসে সেখানে মূলত গান্ধর্ববিবাহেরই প্রচলন ছিলো । আজকের গাঙ্গেয় অববাহিকা, অর্থাৎ পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, বাংলা, ওড়িশা এবং অসমসহ সমগ্র অঞ্চলে মূলত গান্ধর্ববিবাহেরই প্রচলন আছে। তৎসহ এই অঞ্চলের বিবাহিতা নারীদের মধ্যেই সিঁদুরের ব্যবহার সর্বাধিক দেখা যায়। অন্যপক্ষে দ্রাবিড় ও পৈশাচ অঞ্চল, অর্থাৎ আজকের দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত, যেখানে রাক্ষসবিবাহের প্রচলন গান্ধর্ববিবাহের থেকে অনেক বেশি ছিলো সেকালে, সেখানে কিন্তু সিঁদুরের কোনও ব্যবহার নেই। যৎসামান্য কুমকুমের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তাই এতো সহজ সমীকরণে সিঁদুরকে খলনায়ক বানানোর প্রক্রিয়াটি আজকের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়না। বস্তুত এই বিজিতের রক্ত নিশান তত্ত্বটি ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে য়ুরোপীয় মিশনারি পণ্ডিতদের প্রচারিত ব্যাখ্যা। অথচ যে পাশ্চাত্য সভ্যতা বিভিন্ন ভারতীয় কুপ্রথা নিয়ে সর্বাধিক সরব, তাদের সমাজেই chastity বা heresy নিয়ে তুমুল হিংস্রতা লক্ষ্য করা যায়। তবে একথা অনস্বীকার্য সিঁদুরপ্রথার প্রাথমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের পিছনে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের যোগদান ছিলো। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হচ্ছে নারীর 'সতীত্ব' এবং সেই অনিবার্যতায় ভার্যাকে শুধুমাত্র পুত্রার্থে ব্যবহার করাই গরিমান্বিত প্রথা মনে করা হতো। তাই দেশজাতি নির্বিচার, নারীর প্রতি মনোভাব নিয়ে গর্ব করার মতো ইতিহাস পৃথিবীর কোনও দেশেই নেই। অনূঢ়া বা পুরুষসংসর্গরহিত কুমারী নারীর জন্য বৈদিকসমাজে কিছু অন্যধরণের নিয়মকানুন ছিলো। তা শুধু আমাদের দেশে নয়। তৎকালীন প্রতীচীতেও তার ব্যাপক সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু বিবাহসংস্কারের ( লক্ষ্যনীয় 'সংস্কার' শব্দটি। যেমন বিপ্রের উপবীতসংস্কার) পর নারীর সামাজিক পরিচয়টি আমূল পরিবর্তিত হয়ে যেতো। শুধু গোত্রান্তর নয়, প্রায় জন্মান্তরের সমান তার অভিঘাত। গ্রহনক্ষত্রের প্রভাব ও ফলিত জ্যোতিষচর্চার প্রতি অতিবিশ্বস্ত এদেশী জনতা সিঁদুরের লালরং'কে মঙ্গলগ্রহের প্রতি আনুগত্য হিসেবেও প্রচার করে থাকতো। পুরুষত্বের সঙ্গে রক্তিমবর্ণ মঙ্গলগ্রহের যোগাযোগ সারা বিশ্বে চিরকাল আছে। পশ্য, এন অরে ফ্রোম অর্স' জাতীয় পশ্চিমি পণ্য আজকেও মানুষ নির্বিকার ভোজন করে থাকে। কুমারীকন্যার যৌনজীবনে প্রবেশ করার সময় মঙ্গলগ্রহের আশীর্বাদ প্রয়োজন। তাই এই রক্তিম চিহ্ন ধারণ করলে ঐ গ্রহটি নারীকে প্রয়োজনীয় প্রজনন শক্তি দেবে এমত বিশ্বাস ব্যাপকভাবেই প্রচলিত ছিলো। যেসব লোকজন সিঁদুরের প্রতি 'বৈজ্ঞানিক' বা 'ঐতিহাসিক' কারণে বিমুখ, তাঁরা হয়তো বহু সময়েই কুপিত মঙ্গলকে তুষ্ট করতে আঙুলে রক্তবর্ণ প্রবাল ধারণ করে থাকেন। আজও। আমাদের শক্তিদেবীপূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে বিজড়িত যতো ডিসকোর্স রয়েছে, সেখানে দুজন মূলদেবী রয়েছেন। এই দুই দেবী পরে মিলেমিশে একজন মহাদেবী হয়ে গিয়েছিলেন। এঁরা হলেন পার্বতী ও সতী। পরবর্তীকালের দুর্গা বা আরো পরের কালী নামের মহাদেবীর সঙ্গে সিঁদুর নামক রঞ্জকটি অতিমাত্রায় জড়িত। কারণ আগম বা তন্ত্র অনুযায়ী পার্বতী এবং সতীর শক্তির উৎস এই রক্তবর্ণ প্রতীকটি। এর পিছনে রয়েছে প্রজননতত্ত্ব বা fertility cult, যার উৎস আবার নারীর প্রজনন ক্ষমতার দর্প । মনে করা হয় রক্তবর্ণ স্ত্রীরজ বিশ্বের সকল সৃষ্টির আকর। পুরুষের পেশীশক্তির অহংকার থাকতে পারে। কিন্তু নারীর প্রজননশক্তির গরিমা জীবনধারা তথা প্রকৃতিকে ধরে রাখতে অনেক বেশি প্রয়োজন। তাই স্ত্রীরজের অনুকারক রক্তবর্ণ সিঁদুর নারীর প্রজনন ক্ষমতার সূচক। নারীর শিরোদেশের ঠিক মধ্যবিন্দুতে সিঁদুর প্রয়োগের কিছু আয়ুর্বেদিক বা যৌগিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। সিঁদুর তৈরি হতো কিছু ভেষজ পদার্থের সংমিশ্রণে। যেমন হলুদ, চুন, নানা পুষ্পনির্যাস ও প্রকৃতিজ রঞ্জকসমূহ। এগুলির নিজস্ব ভেষজ নিরাময় বা শক্তিবর্ধক ক্ষমতা আছে বলে মনে করা হতো। সম্মুখশিরোদেশে, যেখানে আজ্ঞাচক্রের উপস্থিতি রয়েছে এমত ধারণায়, এই দ্রব্যগুণ আজ্ঞাচক্রকে উদ্দীপ্ত করে নারীর যৌন ও প্রজননক্ষমতাকে নাকি সমৃদ্ধ করতে পারে। এই বিশ্বাসের কথা নানা স্থানে দেখা যায়। ভর্তৃহারা নারীর যেহেতু 'বৈধ' সন্তান ধারণের সম্ভাবনা নেই, তাই তাঁর জন্য এই চিহ্ন অপ্রাসঙ্গিক। স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর সিঁদুর মুছে দেওয়ার যে প্রথাটি সারা দেশে দেখতে পাওয়া যায় তার পিছনে আপাতকারণ হয়তো পতিশোক। কিন্তু নিহিত কারণটি হলো পিতৃতন্ত্রের ভেটোতে সেই নারীর সন্তানধারণের সামাজিক অধিকারটি কেড়ে নেওয়া। Female powerয়ের এই অবমাননাই নারীর মৌলিক অধিকারকে বিপর্যস্ত করে দেয়। বালুচিস্তানের মেহরগড়ে সিন্ধুসভ্যতার কিছু অবশেষ থেকে জানা গিয়েছে যে তৎকালে সেদেশে নারীদের মধ্যে সিঁদুরজাতীয় রঞ্জক ব্যবহারের রীতি ছিলো। সেক্ষেত্রে আমাদের সভ্যতায় অন্তত তিন-চার হাজার বছর ধরে এই দ্রব্যটির প্রচলন রয়েছে। আমাদের সব মহাকাব্যেই সিঁদুরকুংকুমের উল্লেখ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতীকী ব্যঞ্জনাও রয়েছে পুরোমাত্রায়। যেমন শ্রীরাধা, শ্রীকৃষ্ণের বিবাহিতা স্ত্রী ন'ন। কিন্তু তাঁর শক্তি হিসেবে রাধা সিঁদুরকুংকুম ধারণ করেন। আবার পাণ্ডবদের নপুংসকতায় ক্ষিপ্ত যাজ্ঞসেনী তাঁর সিঁদুর মুছে ফেলেন প্রতিবাদে। বিভিন্ন অন্য পুরাণেও বারম্বার সিঁদুর সংক্রান্ত উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষত শক্তিদেবী বিজড়িত আখ্যানগুলিতে। খোদ আদিশংকর 'সৌন্দর্যলহরী'তে সিঁদুরের মাহাত্ম্য নিয়ে লম্বা শ্লোকও লিখে ফেলেছিলেন। হয়তো অনেকেই মনে রাখেন না, সারাদেশে বহু পুরুষরাও নানা 'ধর্মীয়' ও অন্যান্য কারণে সারাজীবন সিঁদুরের টিপ পরে থাকেন। বেশ কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহের সময় পুরুষকেও সিঁদুর ধারণ করতে হয়। ওয়াহাবি ইসলামে শুনেছি টিপ পরা অধর্মীয়। কিন্তু সুফি ইসলামে সিঁদুরের টিপ একসময় প্রচলিত ছিলো। এবার একটু অন্যদিক থেকে দেখা যাক। সিঁদুর নামক একটি নিরীহ প্রসাধন সামগ্রী নিয়ে সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতি বেশ পুরোনো ব্যাপার।এই প্রসাধনটির যাথার্থ্য নন্দনতত্ত্বের এলাকার মধ্যেই বিচার করলে ভালো হয়। কারণ দ্রব্যটির এর থেকে অধিক কোনও মাহাত্ম্য নেই। বঙ্গীয় হিন্দু বিবাহ আচার, যা আর্য, অনার্য ও লৌকিক পদ্ধতির এক মিশ্র রূপ, সেখানে ধর্ম ও জিরাফের বেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখা যায়। এই সব মধ্যযুগীয় লৌকিক অনুষ্ঠানকে সকৌতুকে উপভোগ করাই শ্রেয়। তার প্রতি অকারণ মাহাত্ম্য আরোপ নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়। প্রশ্ন হলো, সব রকম 'ধর্মবাদী', 'নারীবাদী', 'প্রতিবাদী', 'নীতিবাদী', 'স্বাস্থ্যবাদী', 'হিন্দুত্ববাদী' ইত্যাদি দৃষ্টিকোণকে আমল না দিয়ে যদি আমরা শুধু সৌন্দর্যবাদী চোখে দেখতে চাই তবে হয়তো এর চেয়ে বড়ো 'রাজনৈতিক ভুল' আর কিছুই হতে পারেনা। কারণ ইতিহাস কিছু জেনে, অনেকটাই হয়তো না জেনে সিঁদুরবিরোধী জনতা এই মূহুর্তে বেশ জঙ্গি মুডে থাকেন। যেহেতু এই অধমের শৃংখল ছাড়া কিছুই হারাবার নেই, তাই সে নির্ভয়। সিঁদুর রাজনীতি আরও অনেক অকর্মক মূঢ়তার মতই স্বাধীনচিত্ততার বিরোধী বলে অনেকে প্রচার করেন। সমাজতত্ত্ব বা ধর্মতত্ত্বের কূটকচালের সঙ্গে যদি একে নাই মেলাই, তবে খুব একটা অপরাধ হবে না হয়তো। বিদেশপ্রবাসী মেয়েরা, যারা বাঙালি জীবনের মূল স্রোত থেকে অসম্ভব দূরত্বে বসবাস করে, তাদের দৈনন্দিন জীবনে সিঁদুরের কোনও তাৎপর্যই নেই। কিন্তু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের দেখেছি প্রসাধন হিসেবে সিঁদুরের সৌন্দর্যের প্রতি আন্তরিক থাকতে চায়। তখন মনে হয় যে রূপতত্ত্বের ফল্গুধারা বিজ্ঞাপনে ঢাকা পরিচয়হীন কোটি কোটি মুখের ভিড়ে কোথাও অন্তসলিলা হয়ে থেকে গেছে ঠিক। 'ঠোঁটের সিঁদুর' যদি এতো গ্ল্যামারদ্যোতক হয় তবে কপালের সিঁদুরকে কেন এতো 'গেঁয়ো' বলে ভাবা হবে? সত্যিকথা বলতে কি, সম্প্রতি কিছু সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দেখলুম মহানগরগুলিতে শুধু বিবাহিতা ন'ন, অবিবাহিত মেয়েরাও পার্লারে সাজার সময় সিঁদুরটিপের নানা বৈচিত্র্য নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে চাইছেন। সিঁদুরের কোনও ধর্মীয় তাৎপর্য নেই। যা আছে তা নিতান্ত লোকাচার ও সামাজিক অভ্যেস। নারীর বিপন্নতাবোধকে নিরাপত্তাবোধের উষ্ণতায় উত্তীর্ণ করার জন্য পুরুষ অভিভাবকের থেকে ধার করা সিলমোহর। আজকের নারী নিজেই অর্জন করেছে ঐ সিলমোহর, তাকে আর ওটা কারুর থেকে ধার করতে হয়না। মেয়েরা নিজেদের শক্তি সম্ভবত এখনও পুরো ঠাওর করে উঠতে পারেনি এবং এ ব্যাপারে দিশি-বিলিতি কোনও ভেদাভেদ নেই। বিবাহিতা মেয়েদের অবশ্যপালনীয় চিহ্ন হিসেবে সিঁদুরের ব্যবহার বিষয়ক ফতোয়া এই মূহুর্তে সময়ের ঘড়িকে উল্টোদিকে টেনে নিয়ে যাবার অপপ্রয়াস ছাড়া কিছু নয়। দিনের শেষে সিঁদুর একটি প্রসাধন সামগ্রী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি বিষাক্ত সীসক যৌগ। কিন্তু কোনও 'ধর্মীয়' চিহ্ন নয়। তার মাহাত্ম্য বাঙালি মেয়ের সামগ্রিক সাজের সঙ্গে সমানুপাতিক হলে চোখে ভালো লাগে। একজন বাঙালি মেয়ে যখন পাশ্চাত্য বা অন্যতর 'অ-বাঙালি' পোষাকে সজ্জিত হবে, তখন তার সঙ্গে একটি সিঁদুর টিপ নিশ্চয় মানাবে না। সাজসজ্জা বা পোষাক তো একটা স্টেটমেন্ট এবং প্রসাধনও তার অঙ্গ। সিঁদুরও তার বাইরে নয়। বাংলায় বলতে গেলে 'টেক ইট ইজি'। দাস ফার, নো ফার্দার। আমার জন্য কিন্তু প্রিয় নারীর ( সে যেই হোকনা কেন, স্ত্রী বা বান্ধবী, বিবাহিতা-অবিবাহিতা) সিঁদুর টিপ একটি নান্দনিক প্রসাধন। সিঁদুর টিপ মেয়েদের মুখশ্রীতে একটা 'অলৌকিক' আভা এনে দেয়। তা সে মেয়ে গৌরী হোক বা শ্যামা। আমরা যখন ছবি আঁকতুম একটা ব্যাপার শিখতে হতো, পটের কেন্দ্রটা কোথায় থাকবে। চোখটা প্রথম পড়বে কোথায়? সেখানের রংটা যদি লাল হয়, তবে তার পরিমাপ নিয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে । কারণ লাল সব থেকে উজ্জ্বল আর দৃষ্টিআকর্ষক earth colour। কম হলেও অসম্পূর্ণ আর বেশি হলে জবরজং। একালে যাঁরা 'বাঙালি' মেয়ের ছবি এঁকে খ্যাতি পেয়েছেন, বিকাশ বা সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অথবা প্রকাশ কর্মকার বা যোগেন চৌধুরি,আরও অনেকে, সবাই বাঙালি মেয়ের কপালের সিঁদুর টিপটিকে সযত্নে সম্মান জানিয়েছেন। এই 'সম্মান' আজকের বহু মেয়েরাও জানান দেন সব পুজোকেন্দ্রিক মোচ্ছবে অবিরল সিঁদুর মাখামাখির চঞ্চল উদ্দামতায়। কিছুদিন আগেও এই প্রদর্শনকামী প্রবণতাটি এতো প্রকট ছিলোনা। আমার এক বন্ধু ,বেশ বিষয়ী মানুষ, আমার মতো পাগল নয়। পদ্য-টদ্যের ধার ধারেনা , নিরীহ টাইপ। কদাপি সুকুমারী ভট্টাচার্য পড়ে স্ত্রীর সামাজিক অবস্থান বিষয়ে কোনও ধারণা তৈরি করেনি। কী ভেবে না জানি, তার স্ত্রীকে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলো। যেদিন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে সে তার স্ত্রীকে শাড়ি ও সিঁদুরে দেখবে সেদিন তাঁর জন্য কুড়ি টাকা নগদ বিদায়, পাক্কা ( এ গল্প বছর পঁচিশ আগের এবং এই কুড়ি টাকার সাম্মানিক পাঁচ টাকা থেকে দরদাম করতে করতে বেড়েছিলো)। মিথ্যে বলবো না, তার স্ত্রী কয়েকদিন চেষ্টা করে ঐ রূপে পতিদেবকে দর্শনও দিয়েছিলেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরে প্রচেষ্টা ভঙ্গ করে তিনি বললেন, কুড়ি টাকার জন্য এতো ঝামেলা পোষায় না। ব্যাক টু সলওয়ার বা বাংলার জাতীয় পোষাক, ম্যাক্সি। হরিপদ কেরানির স্বপ্নেই থেকে যায় সেই মেয়ে, যার পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে..... (ঋতবাক-পুনঃপ্রকাশিত)
James
যাত্রার দ্বিতীয় পাদ| ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে আবার যাত্রার জন্য আয়োজন| আয়োজন আর কি‚ সবই তো গাড়ীর বুটে বন্দী‚ কেবল রাত্রিবাস আর ক্লান্তি দূর করবার জন্য বিরতি| পরের স্টপ Coffs harbour| সাধারণত: যারা ব্রিসবেন যায় তারা এখানেই থেমে পরদিন গন্তব্যে পৌঁছায়; আমাদের তো কোন তাড়া নেই‚ নেই ছুটির টানাটানি| গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে ড্রাইভিং‚ ভ্রমণের আনন্দ| কিছুটা অবশ্য আমার নবীন বন্ধুদের মিষ্টি খোঁটাও দায়ী; আমি নাকি নতুন গাড়ী চালাচ্ছি না| কিন্তু সমস্যা হলো বিবিজান এই গাড়ী ছুঁয়েও দেখতে নারাজ‚ নাকি হাজার রকম কন্ট্রোল এতে! বুঝুন কান্ড‚ তাঁর আদ্যিকালের টয়োটা নাকি অতি বিশ্বস্ত এবং তিনি তাতেই স্বচ্ছন্দ| (বটকেষ্টর কথা মনে পড়ে?) যার ফলে চেঞ্জ অফ ড্রাইভারের বালিতে গুড়| Operations Research এ stage carriage এর গল্প মনে পড়লো‚ সেখানে কিছু দূর অন্তর অন্তর ঘোড়া বদলানো হতো‚ সেই ডাকহরকরাদের মতো| ডাকহরকরা? এই সেদিনও ডাকের বস্তা পিঠে করে আনতো‚ আমাদের গ্রামে‚ প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টার তাঁদের মাইনের মনিঅর্ডারের জন্য বা আমার মতো প্রাপক যারা শহুরে প্রেমিকার (নিছক কল্পনা মাত্র) চিঠির অপেক্ষা করতো তারা স্কুলঘরের মাঠে ভিড় জমাতো| কোন পোষ্টাফিস ভবন তো ছিল না‚ স্কুলঘরই ভোল বদলে সেকেন্ড শিফটে পোষ্টাফিস বনে যেত| হোয়াই ব্রাহ্ম মুহূর্ত? কারণ আমি মর্নিং পার্সন‚ বেলা চড়ে গেলে আমার মেজাজও চড়ে যায়| আর খুব ভোরে বা সকালে আমিই রাস্তার মালিক! চলছি তো চলছি‚ বাঙলা গান আর ফাঁকা রাস্তা কম্বিনেশন মন্দ নয়! যত উত্তরে যাচ্ছি মানে কর্কট ক্রান্তি পানে‚ আবহাওয়া দেশের মতো হতে চলেছে‚ রাস্তার ধারে গাছেরাও লম্বা হতে লেগেছে| কারণ কি? ব্রিসবেনে তো একই Gum tree মানে ইউক্যালিপটাস তো ছোটনাগপুরের শাল গাছের মতো লম্বায়| যতই ইনিয়ে বিনিয়ে প্রশংসা করি না কেন‚ ইট ইজ এ ড্যাম বোরিং ড্রাইভিং| জিপিএস এ শুধুই সোজা এক ডিগ্রী এদিক ওদিক না বেঁকে রাস্তার ম্যাপ| টেক এ রাইট টার্ন অ্যান্ড কীপ ড্রাইভিং ফর নেক্সট ১৩২ কিলোমিটার টাইপের ইনস্ট্রাকশন খুবই কমন| জিপিএস এ বাঙলাতে ইনস্ট্রাকশন শুনেছেন কেউ? দয়া করে সোজা একশো বত্রিশ কিলোমিটার চলুন| বাঁ দিকের মোড় নিন| কিন্তু সমস্যা হলো round about বা আমেরিকান rotary তে গিয়ে দ্বিতীয় মোড় নিন‚ কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঐ এক সেকেন্ডএর মধ্যে আলাদা বোঝা যায় না‚ অতএব আদি অকৃত্রিম ইংরেজী| আসলে মোটে ২০০ বছরের পুরানো দেশ‚ বিশাল মহাদেশ কোন 'দত্তাবাদ' নেই অতএব র্যাটক্লিফের (thank you উদভ্রান্ত) মতো লাইন টেনে দেওয়া- তফাৎ কেবল সোজা লাইন‚ এর রান্নাঘর তার উঠোনের মাঝ দিয়ে নয়| বিশ তিরিশ কিলোমিটার একদম নাক বরাবর সোজা রাস্তা খুবই কমন| অ্যাডিলেড থেকে পার্থ অবধি রাস্তায় তো ১০০ কিমি সোজা কোন ব্যাপারই নয়‚ প্রায় ৪০০০ কিমি সেই রাস্তা| অন্তর্জলী যাত্রার মতো বেরোনোর আগে‚ স্যাটেলাইট ফোন‚ ওষুধপত্র‚অন্তত:দু তিনটে গাড়ীর কনভয় এবং বেশ কিছু এক্সট্রা ড্রাইভার অবশ্যই কাম্য| উপদেশ হলো‚ বাড়ীতে কোথায় কখন থামবে সেটা বলে যাও| যেতে এক সপ্তাহের ব্যাপার‚ গাড়ী বিকল হলে সারাবার কোন পথ নেই‚ জাষ্ট লীভ ইট ফর এ রিলিফ রোড সাইড অ্যাসিস্ট্যান্সের কার! ১০০ কিমির মধ্যে কোন গাছপালা‚ সরাইখানা নেই| আমি যাইনি‚ পড়েছি মাত্র| তবে লোকে বলে জীবনে একবার ঐ রাস্তায় না গেলে জীবন অসম্পূর্ণ রয়ে যায়| আমি আদার ব্যাপারী‚ ৫৫ নম্বর বাসে করে হাওড়া স্টেশন থেকে সাড়ে তিন কিমি বি গার্ডেন যাওয়া পার্টি| তবে হ্যাঁ সাধ আছে‚ সব রাস্তা বারবার Nullarbor একবার| অবশেষে শ'চারেক কিমি পাড়ি দিয়ে Coffs harbour পৌঁছানো গেল| রাত্রিবাস মোটেলে| এটা ছোট শহর‚ ব্যানানা ক্যাপিটাল বলে বিখ্যাত| কলা আর ব্লুবেরী উৎপাদনের দেশ| কাছেই ২০ কিমি দূরে Woolgoolga নামে সেই সাবার্ব‚ যেখানে ৪০% অধিবাসী শিখ| এবং এখানকার গুরুদ্বার বিখ্যাত‚ রীতিমত ট্যুরিষ্ট আকর্ষন| এই নামগুলো অ্যাবরিজিনাল নাম‚ Wollongong, Wagga Wagga, Wangarattaa, Woy Woy কি সুন্দর ধন্যাত্মক নামগুলো‚ তাই না? Evonne Goolagong মনে পড়ে‚ সেই বিখ্যাত টেনিস প্লেয়ার? আমার পাঞ্জাবী হিন্দু বন্ধুটি বারবার করে বলে দিয়েছিল ভোজন যেন সেখানে লঙ্গরে সারি| কিন্তু লঙ্গরের টাইমিং জানা নেই‚ গুগলে পাওয়া গেল না অতএব চলো রে ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টের খোঁজে| কি খাই‚ কি খাই? প:ব: বাঙালী তায় আরসালান‚ আমিনিয়া আমার প্রতিবেশী অতএব বিরিয়ানিই সেফ বেট| বিশেষজ্ঞ শ্রীমান ভুবনেশ্বরের রেকো অনুযায়ী কুঁকড়োর বিরিয়ানি পরিত্যাজ্য‚ সৎ সঙ্গে কি না হয়! দু থালা মটন বিরিয়ানির অর্ডারং দিয়ন্তি| এখন মনটা খাই খাই করছে‚ রেষ্টুরেন্টে খাওয়া তেমন অভ্যাস নেই‚ আজকাল en tray না হলে নব্য অতিথিদের মন ওঠে না‚ অথচ তাতে ক্ষুধার গুষ্টিনাশ‚ সোমরসের সাথে অন্যকথা জিভ যে নোনতা স্বাদ চায়| যাও তবে এক রেকাবি লয়ে এসো| সেটাই কাল হলো‚ দু দুটো ঢাউস সিঙ্গাড়া‚ দু দুটো পেঁয়াজের চপ‚ দু দুটো কিসের যেন বড়া| যা লিখেছি তাই‚ তাতেই পেট ভরে গেল| আসলে সারাটা পথ তো তিনি চানাচুর‚আলুভাজা বাড়িয়ে দিচ্ছেন আর আমিও মুখে পুরে এসেছি| ওয়েটারিনিকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম‚ Die কি cast করা হয়ে গেছে‚ কেন জানি না তিনি দয়াপরবশ হয়ে অর্ডার ক্যানসেল করতে রাজী হলেন| ডিনার সমাপ্ত| মোটেলে প্রত্যাগমন অ্যান্ড রেডি ফর দ্য লাষ্ট লেগ অফ জার্নি| আমেন|
শিবাংশু
'আটাকলের ছেলে' ব্যাপারটা খুব মনে ধরলো। নিজের জন্য এমন একটা নাম অনেকদিন ধরে খুঁজছিলুম। সময়ে পাওয়া যায়নি বলে কপালে আর মন্দিরবাড়ির মেয়ের 'অ্যাপো' জুটলোনি। যাকগে, গুরুদেবের লেখা 'হাস্যকৌতুকে'র 'গুরুবাক্য' নাটিকাটি তো বাল্যে সবাই পড়েছেন। সেখানে গুরুদেবের উদ্দেশ্যে করা এক ভক্তের সেই প্রশ্নটি, মানে, আমার জ্যাঠার নাম 'কাত্তিক', তাই আমার মা কাত্তিকঠাকুরকে 'নাত্তিক' বলে ডাকেন। এর ফলে কাত্তিকঠাকুর বা তাঁর মাতাঠাকুরানি কী রুষ্ট হ'ন? মনে পড়লো। মনে রাখতে হবে এই নাটিকাটি যখন লেখা হয়েছিলো, তখন দেশে আর এস এস জাতীয় জন্তুরা জন্মায়নি। নাটের গুরু মরাঠি দেসস্থ, করহড়ে, চিতপবন ব্রাহ্মণরা তখনও মায়েদের মনে ইচ্ছে হয়েই বিরাজ করছিলো। কিন্তু তাদের গৌড়ীয় অবতাররা, যথা গুড়গুড়ে ভশ্চাজ, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ সারা বাংলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। গুরুদেবের এই জাতীয় সূক্ষ্ম আক্রমণ তাদের মস্তিষ্কের নাগালের বাইরে ছিলো হয়তো। এতোদিন পর আজ কুষ্মাণ্ডাপ্রকরণ দেখে নাত্তিকবাবুর গপ্পোটা মনে পড়ে গেলো। সব সভ্যতায় 'স্মৃতিশাস্ত্র' ব্যাপারটাই চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল অংশ। তা মনুস্মৃতিই হোক বা হাদিসশরীফ। নারী, অন্ত্যজ বা বিধর্মীদের অন্তহীন অবমাননা করা ছাড়া তাদের আরেকটা মূল কাজ পূর্ণ উদ্যমে ব্রাহ্মণ বা শেখসৈয়দদের স্বার্থরক্ষা করা। ধর্মীয়দর্শনগুলিকে শিখণ্ডী খাড়া করে 'ধর্ম'বিশ্বাসকে পুরোপুরি লৌকিকতার পানাজলে বদ্ধ রাখার 'কৃতিত্ব' এইসব স্মৃতিশাস্ত্রের। শাস্ত্রের নামে যাবতীয় বর্বরতাকে বিধিসম্মত করার কূটপাপটি ব্রাহ্মণরা স্মৃতিশাস্ত্রের দোহাই দিয়েই করে এসেছেন চিরকাল। আজ ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মদিনে কথাটা আরও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। দেবদেবীদের কিছু নাম থাকে উৎসজাত। কিছু বিশেষণজাত। আগম বা তন্ত্রে, যেখানে প্রকৃতিকে দেবী বা শক্তিরূপে ভাবা হয়, সেখানে সঙ্গতভাবেই যাবতীয় প্রাণকে স্ত্রীঅণ্ডজাত বলে নির্দেশ করা হয়ে থাকে। কুষ্মাণ্ড ফলটির সঙ্গে সারা পৃথিবীতেই অকাল্ট বা জাদুটোনার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে যেসব অনার্য বা উপজাতিক লৌকিকতা পরবর্তীকালের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচারের অংশ হয়ে গেছে তাতে কুষ্মাণ্ডজাতীয় ফলের একটা যোগদান রয়েছে। সেটি সাহেবদের ভূতদিবস হ্যালোয়িনের জ্যাক-লণ্ঠন হোক বা দক্ষিনভারতে ভূতচতুর্দশীর দিন প্রতি বাড়িতে কুমড়ো ফাটিয়ে ভূত তাড়ানো'ই হোক, শিকড়টি একই জায়গায়। সঙ্গে রয়েছে তন্ত্রসম্মত আচার হিসেবে পশুবলির বিকল্প কুমড়োবলি দেওয়া। নানা পুরাণ ও তন্ত্রভিত্তিক দেবীপূজা পদ্ধতি, বিশেষত মার্কেণ্ডেয়পুরাণ ও শ্রীশ্রীচণ্ডীকেন্দ্রিক, 'শাস্ত্রসম্মত' পূজার ঊনকোটি স্থির করে থাকে। এই 'শাস্ত্র'গুলি যখন লেখা হয়েছে, তখন এদেশে 'আলু' নামক ফলটি পৌঁছোয়ইনি। অতএব সে নেই। আর স্মৃতিশাস্ত্রের ব্যাখ্যা বিষয়ে গুরু 'হিংটিংছট' কবিতায়, যা প্রকৃতপক্ষে তান্ত্রিক বীজমন্ত্রের প্যারডি, গৌড়ীয় ব্রাহ্মণের মুখ দিয়ে বলেছেন " ব্যাখ্যায় করিতে পারি ওলটপালট।" অতএব সেসব 'শাস্ত্রীয়' ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গভীরে যাওয়া নিরর্থক। গতবার কলকাতায় 'দুগ্গি' দেখার হ্যাপা হজম না করতে পেরে এবার চাচা প্রাণ বাঁচাতে স্থানত্যাগ করে পুরোনো গ্রামে শান্তিতে রয়েছে। হায়দরাবাদে। এখনও পুজো দেখতে বেরোয়নি। মেয়েজামাইদের নিয়ে আসল 'দুগ্গিপুজো' করছে আরাম করে। ভারি সুন্দর আবহাওয়া এখানে। পাখা চালাতে হচ্ছেনা। মজলিশি আড্ডার সব বন্ধু-প্রিয়জনদের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভালোবাসা রইলো।
মানব
অবশেষে পিতৃপক্ষের অবসান। হল দেবীপক্ষের সূচনা। কৈলাশ পর্বতের মাথার উপরের পোর্টালটা এবার খুলে যাবে। একটু একটু করে তার পরিধি বাড়তে থাকবে। ষষ্ঠীর দিন সেদিক দিয়ে আরামসে পার হয়ে যাবে মায়ের গাড়ি। সঙ্গে ছেলেপুলেও। সেই নিয়ে বেশ তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে স্বর্গ ও মর্ত্যলোকে। স্বর্গলোকের প্রস্তুতি তো এতদিন ধরে আমরা সবাই শুনে আসছি বীরেনবাবুর গলায়। সেই যেসব অস্ত্র মা-কে দিয়েছিলেন তা প্রত্যেকবার তাঁরা ফিরিয়ে নেন আর এই সময়টায় আবার সেগুলো দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়। আগে মহালয়ার দিন একটু দুপুরের দিকে উঠে এগুলো করলেই হত, কিন্তু ব্যাটা বীরু যবে থেকে চালু করেছে ভোর চারটেয় উঠে চণ্ডীপাঠ করতে, লাখে লাখে রেডিওর আওয়াজে তাদের কান ঝালাপালা হয়ে যায়। তাই ভোরবেলাতেই উঠে তারা এই কাজটা সেরে নেয় আবার ঘুমোতে যাবে বলে। সবথেকে সমস্যা হয়েছে ইন্দ্রের। সারারাত ধরে বজ্র দিয়ে একে ওকে ঘুমের ঘোরে খোঁচা মেরে ভোরবেলায় সেটা চার্জে লাগিয়ে ঘুমোতে যায় সে। আর যুদ্ধের কাজ হলে তো দুদিন আগে থেকে সেটাকে বেশ ভালো করে চার্জ করতে হয়। এই কয়দিন তার এই কাঠি-টি হাতছাড়া হয়ে যায়। এর মধ্যে যদি অসুররা কিম্বা মানুষেরা স্বর্গলোক আক্রমণ করে তাহলে যে তাকে আবার পোকা হয়ে পদ্মবনে লুকিয়ে থাকতে হবে। হিমালয় বাবু এখন কোম্পানি হিসাবে বেশ নামডাক করেছেন। শুধু সমস্যা ওই বুড়ো সিংহটাকে নিয়ে। ব্যাটা মোটেই নিরামিষ খাবার খাবেনা। বলি নিরামিষ না খেলে পেটে গ্যাস হবে, তারপর অম্বল, চোঁয়া ঢেকুর... এই বয়সে তোর এসব সহ্য হবেনা। মিনমিন করে সিংহ বলে, ‘কিন্তু আমি তো মানুষ নই!’ হিমালয় এবার ধমকের সুরে বলে, ‘বেশ বড় বড় বাতেলা শিখেছিস! যাহ, তোকে অভিশাপ দিলাম, এক পক্ষকাল তুই আমার কাছছাড়া হয়ে থাকবি’। অমনি সটান দৈববাণী... ‘হিমালয় দিলেন সিংহ’। অতএব সিংহের জীবনে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনা। এদিকে শাপে বর হল সিংহের। অসুরের রক্তের মত একটা উপাদেয় ননভেজ স্যুপ খেয়ে বেশ খোশমেজাজেই কাটে তার এই কটা দিন। এই কটা দিন বলতে মহালয়ার পর থেকে পরের পূর্ণিমা পর্যন্ত। এবার আসি মর্ত্যলোকের প্রস্তুতির কথায়। মর্ত্যলোকে নবরাত্রির পর থেকে যে কয়দিন নিরামিষ খেয়ে থাকে মানুষ, সেটাও এই প্রস্তুতির মধ্যেই পরে। কারণ, যে পোর্টাল টা স্বর্গ থেকে কৈলাশ হয়ে মর্ত্যে আসার পথ উন্মুক্ত করে সে দিক দিয়ে দুষিত বাতাস স্বর্গলোকে প্রবেশ করে। মিথেন জাতীয় গ্যাস ইত্যাদির জন্য দেবতারা কোন ফিল্টার বসাতে পারেননি এখনও। এখন দেবতাদের রাগ বড়ই ভয়ঙ্কর এবং সেই রাগ বিন্দুমাত্র স্ফুলিঙ্গের সঞ্চার করলে এই মিথেন গ্যাস জাতীয় দাহ্য পদার্থ তাকে আরও বড় আকার দেয় এবং তাতে প্রবল ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে দেবলোকে। আবার, নন ভেজ খেয়ে যে চোঁয়া ঢেকুর এবং অন্যান্য যা যা উপসর্গের কথা হিমালয় বাবু বর্ণনা করেছেন, তাতে গন্ধে নাক ঝালাপালা হবারও সম্ভাবনা থাকে দেবী এবং তাঁর সন্তানদের। তাদের রথ যে এখনও এয়ারপ্রুফ হতে পারেনি। সেই রথ এসে তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী নৌকা, দোলা, গজ বা ঘোটকে চড়িয়ে দিয়ে ফিরে যায়। এদিকে যে রাস্তা দিয়ে তাঁরা যাবেন সেই রাস্তা বাহনের প্রকার অনুযায়ী মডিফাই করে নেওয়া হয়। যেমন নৌকা বাহন হলে রাস্তা জলে ভরিয়ে দেওয়া হবে... ইত্যাদি। এই রাস্তা তৈরীর জন্য দীর্ঘদিন ধরে মর্তের মানুষদের মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করতে হয় কুশলীদের। দেশের এবং রাজ্যের সরকার নির্বাচন, তাদের কর্মলিপি, বিদেশনীতি, জলবণ্টন, ব্যাঙ্কের সুদের হার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনেক মাথা খাটিয়ে এবং মগজ ধোলাই করে তবে তাঁরা মা এবং তাঁর সন্তানদের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন।
Ranjan Roy
দিল্লি শহর যাবার রাস্তা =============== বোম্বা্ই মেলে চড়ে বসেছি। গন্তব্য–– পুণে শহরের কলেজ অফ এগ্রিকালচারাল ব্যাংকিং। মাথায় নানান চিন্তা; অচেনা জায়গার অস্বস্তি, ঘরে ছেড়ে আসা বৌ–বাচ্চার ভাবনা, চিন্তার কি আর শেষ আছে? হাতের পেপারব্যাকে মন বসছে না।হঠাৎ চোখ গেল কয় জোড়া বিদেশি দম্পতির দিকে,– কটা রং, বেড়ালচোখো, নীলচোখো,তামাটেচুলো, কিন্তু সবাই খুব ফরসা। লালচে, ফ্যাটফেটে, হলদেটে–– নানান কিসিমের। আমেরিকান? ইংরেজ? –– না, না, রাশিয়ান।সবাই ভিলাই ইস্পাত কারখানার স্টাফ।বর্ষশেষের ছুটিতে চলেছে গোয়ার সমুদ্রতীর, সপরিবারে। বই মুখে ধরে আড়ে আড়ে ওদের দেখতে থাকি। বেশ খেতে পারে ওরা। সন্ধে পেরিয়ে গেলে সবা্ই একজায়গায় গোল হয়ে খেতে বসলো। দু'একজন দাঁড়িয়ে। দু– হাতে ধরে গাঁউ গাঁউ করে চিকেন খেল, পাকা পাকা টম্যাটো গোটা গোটা খেয়ে ফেলল।শেষপাতে দ্ইমিষ্টি খাওয়ার মত ছোট ছোট লালচে প্লাস্টিকের থিম্বলে করে ওয়াইন খেল সবাই। তারপর মেয়েমদ্দ সবাই মিলে গান জুড়ল। সে কি গান! ভাষা বুঝিনে, কিন্তু এসি কোচের জানালার বন্ধ কাঁচে ধাক্কা খেয়ে সে গান ফিরে এসে আমার বুকের কোন ঘুমিয়ে থাকা অজানা ব্যথায় হাত রাখল। দু–তিনটে গানের পরে সুর–তাল যেন একটু বদলে গেল। গান যেন একটু চটুল,একটু লচকদার। দুয়েকজনের শরীরে নাচের দোলা। ভাব করলাম স্মিতমুখে একপাশে বসে থাকা দলের নেতা রুপোলি চুলের কিরিলেংকোর সঙ্গে।পাশে বসে পেপারব্যাকের পাতা ওলটাতে থাকা শ্রীমতী কিরিলেংকো এগিয়ে দিলেন গরম চায়ের কাপ। গল্প জমে উঠল। বললাম–– রুশসাহিত্যে গাঁয়ের বাড়িতে আগুনের পাশে বসে গোটা পরিবারের একসংগে গান গাওয়ার সেই ট্র্যাডিশন দেখছি আজও বেঁচে আছে! –– আছে আবার নেইও।সুর ও ভাষা বদলেছে। নতুন প্রজন্ম ডিস্কোয় যায়।ওদের পছন্দ পপ,জ্যাজ, রকব্যানড। আগের মত ব্যালাড গাইতে চায় না। –– তাহলে রাজকুমারী ভাসিলিসা, আলিউস্কা দিদি ও ইভানুস্কা ভাই, বোকা ্ইভান, শিসে ডাকাত সলভে্ই––্এরা সব হারিয়ে গেছে বলছেন? –– প্রায়; আসলে পাশ্চাত্য জীবনশৈলীর প্রভাব ইদানীং খুব বেড়ে গেছে।আমি জর্জিয়ার লোক, এশিয়ান।স্তালিনের দেশের।আজকের শব্দাবলীতে আমি কনজারভেটিভ।ছাড়ুন ওসব কথা। আপনার কথা বলুন।সবাই মিলে গোল হয়ে গান গাওয়া তো এশিয়াটিক ট্র্যাডিশন।গ্রামজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।আপনারাও হয়তো বাড়িতে গেয়ে থাকেন? বাড়িতে গান গাওয়া? সবাই মিলে?–– ও ভাই কানাই, কারে জানাই? আর সবাই মিলে গান? শহর কোলকাতায়? অসম্ভব।পাড়ার লোকে ভিড় করে জানতে চাইবে কী হয়েছে।কোলকাতাকেই বা কেন দোষ দিই? ছত্তিশগড়ের ভিলাই বা বিলাসপুর হলেও একই ব্যাপার। গলা ছেড়ে গান গাইতে চান, তো বাথরুমে যান।বাঙালির মাথায় জল পড়লেই গলা দিয়ে গান বেরয়।যদি সবাইকে শোনাতে চান তো একগাদা গানের ফরমাইশি চ্যানেল আছে,সিডি–এমপিথ্রি প্লেয়ার আছে, নিদেনপক্ষে এফ এম ব্যান্ড আছে।খামোকা বাড়িশুদ্দু মেয়েমর্দ মিলে চেঁচিয়ে গান গাইতে হবে কেন? অআমরা যে শহুরে! মেপেজুকে বেশ হিসেব করে কথা বলি।কোন ইমোশনকে্ই উঁচু গ্রামে খেলাতে পছন্দ করি না। চেঁচিয়ে গান গাওয়াটা যে নেহাৎ গেঁয়ো ব্যাপার। কিন্তু যখন গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলাম? আমি,মানে আমরা? অর্থাৎ আমাদের বাপদাদারা? মনে মনে পুরনো এ্যালবামের পাতা উল্টে যাই। (চলবে) ________________________________________ (২) পঞ্চাশের দশক। কোলকাতার পার্কসার্কাস এলাকায় ধাঙড় বাজারের সামনে দোতলায় তিনকামরার ভাড়া বাড়ি। ঘর, ছাদে চিলেকোঠা আর সিঁড়ির বাঁকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা বাইশজনের সংযুক্ত পরিবার। দেশভাগের ধাক্কায় পালিয়ে এসেছে বটে কিন্তু ভাগাভাগিটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। এক চিলতে আশা এখনো মনের কোণায় টিমটিমিয়ে আছে যে রাজনীতির উলটো ঢেউয়ে হয়তো কখনো ফেরা যাবে পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার মানিকখালি রেলস্টেশনে নেমে আঠারবাড়িয়া বা বাজিতপুর গাঁয়ে। সেখানে আটচালা বাড়ির উঠোনে নাটমন্দিরের সামনে ভোরবেলায় বাবর আলি মুন্সির লালঝুঁটি মোরগের গর্বিত বাং দেওয়া বন্ধ হবে; সন্ধ্যেবেলা আবার শোনা যাবে গোবিন্দদাসের পদ-- ভজহুঁ রে মন, শ্রীনন্দনন্দন অভয়্চরণারবিন্দ রে। ঠাকুমার চোখে ঘোর লেগেছে, মনে মনে পৌঁছে গেছেন গোবিন্দজীউয়ের সন্ধ্যারতির সময়ে। ত্রিপুরার পত্তনের গোস্বামীদের বংশপরম্পরায় দীক্ষিত যজমানবাড়ির বৌ। কারা যেন খোল-করতাল বাজিয়ে গান ধরেছে --' কেন হে মুরারি, এ মায়া বিস্তারি, জীবের সুখের তরি, কর নিমগন?' গলাটা যেন চেনা চেনা লাগে! মেজজামাই যতীন দত্তের গলা কি? ঘোমটা দিয়ে সরে যাবার চেষ্টা করতেই সম্বিত ফিরল। পার্কসার্কাসের বাড়িতে সন্ধ্যে নেমেছে। বড়ছেলে ফৌজি আদমি, ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ডিউটি করে ফিরেছে। আছে খোশমেজাজে, কারণ আজই মাসপয়লা। মাইনে পেয়ে বাবার হাতে তুলে দিতে পেরেছে মাসের সংসার খরচের লেভি। ফলে গলায় খেলছে--'কেন হে মুরারি---' সঙ্গে মেজজামাইয়ের দোয়ারকি--' দিলে অনল জল, রসাল ধরাতল, দিলে না মোক্ষফল বিপুল ধরায়!' সরযূবালা অফিসফেরতা বড়ছেলে ও জামাইয়ের জন্যে চা নিয়ে এলেন। মনটা খুশি খুশি। কালকে মাসের বাজার হবে, ফর্দ বানাতে হবে। দু'মাস পরেই দুর্গাপূজো। বাকি ছেলেরা বোনাস পেলে পূজোর কাপড় কেনার কথা ভাবা যাবে। সরযূবালার আটছেলে, চারমেয়ে। ছোটছেলে এ বছর কলেজে গেছে। পাঁচছেলে চাকরি করছে, দু'জন বাংলার বাইরে। পূজোতে ঘরে ফিরবে। কিন্তু গানটি ওনার পছন্দ নয়। উনি গুনগুনিয়ে ধরলেন অতুলপ্রসাদ,--'চোখ বেঁধে ভবের খেলায় বলছ হরি আমায় ধর'। বড়লোক মামাতো ভাইয়ের বাড়িতে শোনা কলের গান। ওনার গলায় সুর আছে, কিন্তু একটু নাকী নাকী, একটু চাপামত। তবু রেণুকা দাশগুপ্তের নকল মন্দ হয় নি। (চলবে) ________________________________________ হঠাৎ গান থেমে গেল।দরজা ঠেলে হাসিমুখে ভেতরে ঢুকছেন মেজছেলে বিজন, হাতে ঝোলানো মস্ত এক ইলিশমাছ।ব্যারাকপুর থেকে সপ্তাহ শেষে বাড়ি ফেরার সময় শেয়ালদা’ স্টেশনের পাশ থেকে কেনা। অতবড় মাছ দেখে বাঙালবাড়িতে এমন হৈচৈ শুরু হল যেন ইস্টবেঙ্গল জিতেছে। স্কটিশে বাংলার ছাত্র ছোটছেলের কবি কবি ভাব। সে আওড়াতে লাগল বুদ্ধদেব বসু–‘ইলিশ, ইলিশ! আজ ইলিশ উৎসব’। কিন্তু এ’ধরনের ‘এই গরু সরোনা’ ঢংয়ে ইলিশবন্দনা বাঙালবাড়িতে একেবারে বেমানান।কাজেই চতুর্থভাই শৈবাল দরাজ মেঠো গলায় গেয়ে উঠলেন––‘আরে ইলশা রে, ছাওয়াল কান্দাইলা মাছ, অতিথ খাওয়াইলা মাছ, শাশুড়ি ভুলাইলা মাছ, ইলশা রে’! চা’ দিতে এসে বড়বৌদি ঘোমটার ফাঁক দিয়ে ফরমাশ করে গেলেন–– সেজঠাকুরপো’ যেন সদ্য মুক্তিপাওয়া ছবিটিতে আব্বাসউদ্দিন সায়েবের গাওয়া পূববাংলার লোকগীতিটি শোনাতে না ভোলেন! ওই যে ‘কচুর শাক উইঠ্যা বলে আমার চিরা পাতা, আমারে খাইতে লাইগে ইলশামাছের মাথা’। ইতিমধ্যে সেজছেলে বিনয়কুমার উষা সেলাইমেশিনের কারখানার থেকে ডিউটি করে ফিরেছেন। সদ্য যাদবপুর থেকে পাশ করে চাকরি পেয়েছেন, কিন্তু এখনও কোলকাতার রং পুরোপুরি ধরেনি; দোমাটির কাজ চলছে। জুলাই মাসের গুমোট।একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ডিসি পাখা বাড়ির বিশ্বস্ত বুড়ো চাকরের মত ধীরে ধীরে চলছে। ফলে উনি এসেই ধড়াচুড়ো ছেড়ে লুঙ্গি পরে ঘরের মেজেতে, বাঙালভাষায় যাকে বলে ‘ল্যাডা মাইরা’, বসে পড়েছেন।চেহারায় ফুটে উঠছে ঘামের বিন্দু। হাতে হাতে ঘুরছে তালপাতার পাখা। এবার বিনয়ের চোখ পড়ল দুধের গেলাস নিয়ে ‘কুয়ারা’ করতে থাকা আদরের ভাইপোর দিকে।কোলে টেনে নিয়ে বললেন–– ‘ই’ কে দেখ ইলিশমাছের পাশে, ইলিশমাছের গন্ধ পেলে ––? –‘জিভেতে জল আসে’; প্রত্যাশিত পাদপূরণ করল আদরে–বাঁদর–হওয়া চারবছুরে ভাইপোটি। ঠাকুরপো’র ইশারা ধরতে বৌদির দেরি হয় নি।তাই চায়ের সঙ্গে একপ্লেট মাছভাজা এল।বাইরে গুমোট থাক, ঘরের গুমোট কেটে গেছে।বিনয় মুডে এসে গেলেন।সকলের অনুরোধে গেয়ে দেখাতে লাগলেন যে একবার আকাশবাণীর স্টাফের ভুলে পংকজ মল্লিক মশাইকে পল্লীগীতি গাইতে বাধ্য হওয়ায় কিভাবে ‘নিশীথে জাইও ফুলবনে ও ভ্রমরা’ কে ‘নিশীথৈ যেও ফুলবোনে ও ভোমরা’ করে গেয়েছিলেন। হঠাৎ রসভংগ হল। খুদে ভাইপোটি বেগ সামলাতে পারেনি, ভিজিয়ে দিয়েছে মেজকাকার লুঙ্গি; অপ্রস্তুত কাঁদো কাঁদো চেহারা। কিন্তু ওকে বকাঝকা চলবে না। বদলে ছোটকাকা হাসিমুখে গেয়ে উঠল আব্বাসউদ্দিনের ভাটিয়ালি––‘ আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে; অকূলদরিয়ায় বুঝি কূল নাই রে!’ ________________________________________ ভাটিয়ালির নদীপথ ধরে ওরা ফিরে গেলেন ধনু আর মেঘনা নদীর নৌকোবাইচের দিনগুলিতে।– বাইচের জন্যে বিশেষ ভাবে তৈরি নৌকো, গাবের আঠা আর গলুইয়ের নকশা এবং পরিবারের ম্যানফ্রাইডে মোম আলি ওরফে লাউয়া মিঞার কথায়।বাড়ির পুরনো চাকর লাউয়া আবার সরযূবালার ছেলেদের কানমলে দেওয়া সেল্ফস্টাইলড্ অভিভাবক ও ছিলেন। নিরক্ষর মিঞার রসবোধ অসাধারণ। কোলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠরত বিনয় ছুটিতে দ্যাশের বাড়ি গেলে মিঞা ওঁকে একটি চিঠি পড়ে দিতে বললে বিনয় লম্প নিয়ে আসতে বলেছিলেন, সাঁঝের সময়। মিঞার চোখ কপালে,––এইডা কি কইল্যা? লম্প ছাড়া চিঠি পড়তে পার না? কইলকাতায় গিয়া পয়সা দিয়া পড়, নাকি ধান দিয়া? পুরনো স্মূতি মনে করে বিনয়কুমারের চোখ ভিজে যায়। অন্যভাইয়েরা শুরু করে। নৌকোর গলুইয়ে চড়ে কূষ্ঞলীলার গানের সঙ্গে মিঞার দু’হাতে করতাল বাজিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচ ছিল দেখার মতন। বাইচের শুরুতে গান লীড করতেন মিঞা: ‘ যাত্রা করিয়া মোরে বিদায় দে! ও মা যশোদা, মাগো যশোদারাণী, কালীদহে যাব আমি’। ‘কালীদহে’ শব্দে সমে আসার সাথে সাথে দশজোড়া বৈঠা একসাথে উঠতো আর পড়ত। (কাকাদের সম্মিলিত বর্ণনায় খুদে ভাইপোটির চোখে ঘোর লাগে।সে শুনতে থাকে গান, দেখতে পায় উত্তাল মেঘনার বুকে নৌকোদৌড়ের চলচিত্র।বহুবছর পরে টিভির পর্দায় মৈমনসিংহের দিনেন্দ্র চৌধুরির গানের দলের সাজগোজ করা গুডবয় গায়কদের কোরাসে ওই গান শুনে সে উদ্দীপনা হল কই?) পা’ টিপে টিপে বাড়িতে ঢুকেছে ভাগ্নে তপন; সসংকোচে পেরিয়ে যাচ্ছে সরু বারান্দা। সংকোচের যথেষ্ট কারণ আছে, ক্লাস এইটের ছেলের বাড়ি ফেরার পক্ষে রাত একটু বেশি বটে।সামলে দিলেন চতুর্থ ভাই, তপনের মামামণি। উঁচু গলায় হাঁক পাড়লেন––বৌদি, তপন আইছে, আর একবার মাছভাজা! তারপর বড়দের তর্জন–গর্জন শুরু হওয়ার আগেই গান ধরলেন: ‘আইবা নি গো, বইবা নি? দাওয়াত কবুল করবা নি? আমার বিবি রাইন্ধা থইছে মস্ত খাসির বিরিয়ানি’। গরম বড্ড বেশি, সবার গায়ে প্যাচপেচে ঘাম; হাতপাখাদের দ্রুত হাতবদল হছে।খুদেটা ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে, ওর চাই ‘ পত্রিকা বাতাস’।সবাই একমত হলেন যে তাড়াতাড়ি বূষ্টি না নামলে রক্ষে নেই।এই সম্মতি প্রকাশ পেল সরু মোটা নানান গলার কোরাসে–– ‘ চাচি গো,আমি মৈলাম গো, বড় দায়ে ঠেকাইছে আল্লা! ম্যাঘে দেয় না পানি, কি করি গো নানি, ক্ষ্যাত হইলো ফুটিফাটা গো, বড় দায়ে ঠেকাইছে আল্লা’! বড়ছেলে শংকরের খিদে আর বাগ মানছে না। ইলিশমাছ বলে কথা, তায় রান্নাঘর থেকে সিগন্যাল এসে গেছে।–সভাভংগ হোক, সবাই খেতে চল। বাদ সাধলেন বড়দি– না, না। আগে বাচ্চারা খাবে, তারপর বড়রা।সবার একসংগে বসে খাবার মত জায়গা কই? একি দ্যাশের বাড়ি যে ঢালা পাত পড়ব? ফলে খিদে ভুলতে মোক্ষম দাওয়াই–– আবার একদফা গান, গাজনের সন্ন্যাসীদেরম মত। আজকের শেষ গান, একটু আধ্যাত্মিক। এবার লীড করবেন সরযূবালা ও বকুল, মা ও মেয়ে একসংগে; ছেলেরা দোহার ধরবে। ‘সে কি তোমার মত, আমার মত, রামার মত, শ্যামার মত? ডালাকুলো ধামার মত পথে ঘাটে দেখতে পাবে! হাটবাজারে বিকোয় না সে, থাকে নাকো গাছে ফলে, সে যে দিল্লিশহর নয় যে রাস্তা করিমচাচা দেবে বলে!’ গান চলতে থাকে, সরযুবালার খুদে নাতিটি তন্ময় হয়ে শোনে। তার মগ্নচৈতন্যে ঢুকে যায় ––এক যে আছে দিল্লি শহর যার রাস্তা শুধু করিমচাচাই জানে। এতদিনেও দিল্লিশহর পৌঁছুতে পারিনি, করিমচাচার ঠিকানাই যে পাইনি।আজও খুঁজে চলেছি। ট্রেন মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাসে ঢুকছে। <br/>্্্্্্্্্্্*******্্্্্্্্্্্্্্্্্্
শিবাংশু
সেই কোন ত্রেতাযুগে ঠাকুর ব্যাকুলভাবে 'ধর্মপ্রাণ', অতি উৎসাহী কিছু দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, " দন্ত দিয়ে তুলছে টেনে হিন্দু শাস্ত্রের মূল/ মেলাই কচুর আমদানিতে বাজার হুলুস্থূল।" সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে। 'হিন্দু'ধর্মের যাবতীয় লৌকিক আচরণকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, নান্দনিক তত্ত্ব, সমাজতত্ত্বের 'জমপেশ' যুক্তির বন্যা বইয়ে মহীয়ান করার লক্ষ্যে এক বিপুল জনতার আজও রাত্রিদিন ঘুম নেই। এত প্রাচীন একটি ধর্মীয় দর্শনের অনুগামীদের এ পর্যায়ের অসহায় নিরাপত্তাহীনতা অবাক করে। অবশ্য যাঁরা এই প্রয়াসে মত্ত, তাঁদের 'ভারতীয়ত্ব' বা সনাতন ধর্ম, উভয় বিষয়েই কতটুকু ধারণা আছে, সন্দেহ জাগায়। আমার পিতৃদেবের আদেশে আমরা তাঁরা প্রয়াণের পর কোনও রকম লৌকিক ধর্মীয় আচরণ পালন করিনি। সে সময় প্রভূত কটাক্ষ, কটূক্তি বর্ষিত হয়েছিলো আমাদের উপর। একান্তভাবে পারিবারিক সিদ্ধান্তটি কারো কারো কাছে সনাতনধর্মের অবমাননা হিসেবেও গণ্য হয়েছিলো। এই প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে এক বন্ধু জানতে চেয়েছিলেন সনাতনধর্মীয় পারলৌকিক কৃত্যসমূহের উৎস, যাথার্থ্য কীভাবে জানা যেতে পারে? বিশেষত পিতৃপক্ষ, মহালয়া,তর্পণ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কৌতুহলী ছিলেন। আমার প্রাসঙ্গিক তুচ্ছ জ্ঞানের সংক্ষিপ্তসার তাঁকে লিখে জানিয়েছিলুম। পরে এই লেখাটি বিশদে অন্যত্র প্রকাশিতও হয়েছিলো। তাও বহুদিন হলো। যেসব আগ্রহীজন সে লেখাটি পড়েননি, তাঁদের জন্য সংক্ষিপ্তসারটি এখানেও থাক। বিভিন্ন পূর্ণিমার যেমন নামপদ রয়েছে, ( গুরুপূর্ণিমা, বৈশাখীপূর্ণিমা, বসন্তপূর্ণিমা, কোজাগরীপূর্ণিমা ইত্যাদি) তেমনই বিভিন্ন অমাবস্যা তিথিকেও নানা নামে ডাকা হয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি মহালয়া অমাবস্যা। অমাবস্যা তিথিটি সচরাচর যাঁরা তন্ত্র বা শাক্তমতে উপাসনা করেন, তাঁদের জন্য প্রশস্ত বলে কথিত আছে। তাই অমাবস্যার নামের সঙ্গে দেবীপ্রসঙ্গটিই সুলভ। কিন্তু মহালয়া অমাবস্যাটি নিবেদিত 'পিতৃপুরুষে'র উদ্দেশ্যে। সূর্য যখন কন্যারাশিতে প্রবেশ করে তখন যমরাজ তাঁর প্রজাদের, অর্থাৎ মৃতমানুষের আত্মাদের পক্ষকালব্যপী সাময়িক ছুটি মঞ্জুর করেন, 'বাড়ি' যাবার জন্য। 'বাড়ি' অর্থে সেই সব আত্মাদের (যাঁদের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি 'প্রেত' নাম দিয়েছে)উত্তরপুরুষদের ভদ্রাসন। এই সময়কালটি ( সূর্যের কন্যারাশি থেকে বৃশ্চিক রাশিতে সরে যাওয়া) , যার পোষাকি নাম 'পিতৃপক্ষ', পরলোকবাসী আত্মারা অতিথি হয়ে উত্তরপুরুষদের গৃহে আসেন। এই উপলক্ষ্যে বংশধরকুলকে পক্ষকালব্যপী প্রতীকী শোক পালন করার নির্দেশও শাস্ত্রীয় মতে বলবৎ। উদ্দেশ্য, প্রয়াত আত্মাদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করা। সারা পৃথিবীর নানা দেশে এই জাতীয় বিভিন্ন লৌকিক আচার পালন করা হয়। সনাতনধর্মীয়দের মধ্যে এই পক্ষকালে পরলোকগত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে জল ও ফলদান করার বিধি রয়েছে। ব্রাহ্মণরা বলেছেন, এই আচারটি পালিত না হলে পিতৃপুরুষ ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে অভিশাপ দিতে দিতে মহালয়া অমাবস্যার দিন আবার যমলোকে ফিরে যাবেন। সেটা উত্তরপুরুষদের জন্য অকল্যাণকর। তাই মহালয়া অমাবস্যায় পিন্ডদান ও গঙ্গাস্নানের বিধান 'শাস্ত্রের' অঙ্গ । যমলোক'কে 'মহালয়' মনে করা হয় । কারণ এই আলয়ে সমস্ত জীবিত প্রাণীকে একদিন গিয়ে বসবাস করতে হবে।যেহেতু এই অমাবস্যার দিন পিতৃপুরুষদের সাময়িক মর্ত্যবাসের পর আবার মহালয়ে ফিরে যেতে হয়, তাই এর নাম 'মহালয়া অমাবস্যা'। পিতৃপুরুষদের স্মরণ করা অবশ্যই পুণ্যকর্ম এবং সেহেতু এই দিনটি একটি পবিত্র উপলক্ষ্য । কিন্তু এর সঙ্গে শোকের মাত্রা যোগ করাটি পুরাণযুগের অবদান। বৈদিকযুগে মৃত্যুঞ্জয় হবার সাধনা করা হতো, পশ্য, মৈত্রেয়ী, নচিকেতা ইত্যাদি । যেহেতু মৃত্যু জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি, তাই বেদ-উপনিষদের কালে তার মাহাত্ম্য স্বীকার করা হলেও ততো প্রাধান্য দেওয়া হতোনা। কিন্তু পুরাণযুগে মানুষ চারিত্র্যে অল্পপ্রাণ হয়ে যাবার ফলে 'মৃত্যু' মানুষের মনে এক চরম ভীতিকর মাত্রা নিয়ে আসে। এই ভীতির বাণিজ্যিকরণ করে পুরোহিতকুল বহু লোকাচারের সৃষ্টি করেছে। তার মধ্যে মহালয়ার দিন পিন্ডদান ইত্যাদি আচরনীয় কৃত্য। এর মধ্যে অবশ্য আরেকটি স্মার্ত মাত্রাও দেখা যায়। পরবর্তী শুক্লপক্ষ যেহেতু 'দেবী'পক্ষ, তাই তার আগে একটি 'পুরুষ'পক্ষ উদযাপনকেও ব্রাহ্মণ্যব্যবস্থার সিলমোহর দেওয়া হয়েছে। যদি পিতৃপুরুষকে 'স্মরণ' করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে মহালয়া অমাবস্যা নিশ্চয় একটি শুভদিন এবং এইদিন শুভেচ্ছা বিনিময় করাই যায়। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যমাত্রায় অভিঘাতটি নেতিবাচক। বস্তুতঃ, এইদিন এপার বাংলার সনাতনধর্মীয় মানুষদের শুভেচ্ছাবিনিময়ের নিহিত উদ্দেশ্য এটি দেবীপক্ষের প্রথম দিন । গত তিন-চারশো বছরের বিবর্তনে শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতনধর্মীয় বাঙালির প্রধান উৎসব হয়ে উঠেছে। এর তাৎপর্য এখন খ্রিস্টিয়দের বড়োদিন বা মুসলিমদের ঈদপালনের মতো সর্বব্যপী । সভ্যমানুষের শুভেচ্ছা আদানপ্রদানের জন্য কোনও প্রাতিষ্ঠানিক তিথি বা সামাজিক পর্বের অপেক্ষা থাকা উচিত নয় হয়তো, কিন্তু আদতে মানুষ অভ্যাসের দাস। আকাশবাণীর 'মহিষাসুর মর্দিনী' অনুষ্ঠানটি ব্যাকরণের অর্থসম্প্রসারন নামক বিধি অনুযায়ী 'মহালয়া' হয়ে গেছে। যদিও এই অনুষ্ঠানটি একান্তভাবে দেবীপক্ষের স্বাগত সম্পুট, পিতৃপক্ষের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্করহিত । মনে হয় এই 'নাম'পদের মূল রয়েছে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মহালয়া অমাবস্যার মধ্যরাত্রে গঙ্গাস্নান করে সিক্তবসন, ঘোরগ্রস্ত চন্ডীপাঠে অনুষ্ঠানটিকে গ্রন্থিত রাখার অনুষঙ্গে। অথবা শ্রোতারা হয়তো 'মহিষাসুরমর্দিনী' জাতীয় ভারি শীর্ষকের চাইতে সহজ 'মহালয়া' নামপদের মধ্যেই স্বস্তি খুঁজে পায়। এহ বাহ্য, সেই কোনকালে আমাদের কবি বলেছিলেন জীবৎকালে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করলেও মৃত্যুর পর দেশবাসী অবশ্যই তাঁর চিতায় মঠ স্থাপন করবে। আমাদের দৈনন্দিন যাপনেও তার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। জীবৎকালে পিতৃপুরুষকে অভুক্ত, অতৃপ্ত রেখে তাঁদের মৃত্যুর পর বৃষোৎসর্গ করার ঐতিহ্য এখনও চলে আসছে। জানিনা এই জাতীয় পিতৃতর্পণ আমাদের কোন পুণ্যের ভাগী করে?
দীপঙ্কর বসু
<অফিস থেকে দুমাসের ছুটি নিয়েছিলাম আমি এদেশে আসব বলে । কাজেই আমি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি ইচ্ছা মত ,কিন্তু বাদ বাকি সকলেরই অফিস ,ল্যাব ,ইউনিভার্সিটি যাওয়া আছে ,কাজেই সপ্তাহান্তের দুটো দিন ছাড়া মাঝের পাঁচটা দিনের অনেকটা করে সময় আমাদের কাটাতে হয় একলা।অবশ্য শ্রীমতীর তাতে খুব একটা যায় আসেনা ,তিনি রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন – অনেকদিন পরে ছেলেকে কাছে পাওয়া গেছে ,ছেলে অনেকদিন ঘরের খাবারের আস্বাদ পায়নি ।তার সে অভাব সুদে আসলে পুষিয়ে দেবার জন শ্রীমতী একেবারে উঠে পড়ে লেগেছেন ।নিত্যই নানাবিধ খানা রান্না হচ্ছে –ঘর ময় তার খুশবাই ছড়াচ্ছে ,আমি ছেলের লিভিং রুমে বসে ছেলের ল্যাপটপে খুটখাট করে মজলিশে অথবা বাংলা লাইভের চ্যাট রুমে মজে আছি, আর তারই মাঝে রান্নার খুশবাই নাকে এসে আমাকে আনমনা করে দিচ্ছে । আবার মাঝে মাঝে দৌড়তে হচ্ছে –“একটা ফুলকপি নিয়ে এস ,অথবা একবান্ডিল ধনে পাতা আনতে হবে” - এই সব ফাই ফরমায়েশ খাটতে ।তবে তাতে আমার বিশেষ আপত্তি ছিলনা , বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে হাডসন নদীর দিকে কয়েক পা হাঁটলেই মস্ত এক বাজারে আলপিন টু এলিফ্যান্ট সব কিছুই মেলে । তাছাড়া ছেলের দৌলতে দুবেলা আমার রসনাও তৃপ্ত হচ্ছে । কাজেই আপত্তি বা বিরক্তি প্রকাশ করাটা এক্ষেত্রে আহাম্মকিরই নামান্তর । এই রকম একটা দিনে হঠাৎ বেজে উঠল ফায়ার এলার্ম । ইন্টার কমে ঘোষণা শুনে যে টুকু বুঝলাম তাতে যেন শুনলাম বিল্ডিং এ ফায়ার এমারজেন্সির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । সমস্ত এপার্টমেন্ট বাসীকে জানান হচ্ছে যে …… আতঙ্কের চোটে এনাউন্সমেন্টের বাকিটা আর শোনার জন্য অপেক্ষা করিনি ।এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের করিডরে একটা চক্কর মারতে গিয়ে দেখি লাল আলোয় বিপদ সঙ্কেত জ্বলছে , বড়বড় হরফে লেখা FIRE ALERT .DONOT USE ELEVATOR . ঘরে ফিরে এসে শ্রীমতী কে বললাম এখনি আমাদের ঘর ছেড়ে নিচে নেমে যেতে হবে ।কিন্তু তিনি তখন রান্নায় ব্যস্ত ,কিছুতেই রান্নাঘর ছেড়ে নিচে নেমে যেতে রাজি নন । শেষ অবধি একরম জোর করেই তাকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা শুরু করলাম । কুড়ি তলা নামতে নামতে মনে হচ্ছিল সিঁড়ি যেন আর শেষই হতে চায়না । শ্রীমতী একবার বোধ হয় ক্ষীণ প্রতিবাদ করেছিলেন সিঁড়িতে আর কাউকে না দেখতে পেয়ে ।কিন্তু ভয় এমনই জিনিষ যে যুক্তি তর্কের পরোয়া করলে তার চলেনা । লবিতে নেমে দেখা গেল বেশ কিছু লোকজন সেখানে জড়ো হয়েছে ইতিমধ্যেই । সেদিকে শ্রীমতীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি –“ দেখ ,এরা সবাই আমাদের আগেই নেমে এসেছে” । একেবারে অকাট্য প্রমাণ চোখের সামনে দেখে তখনকার মত তিনি আর কোন বাদ বিবাদের পথে গেলেননা । লবিতে অপেক্ষমাণ জনতার সঙ্গে আমরাও অপেক্ষায় রইলাম । মিনিট দশেকের মধ্যেই অবশ্য নিচের লবিতে ঘোষণায় জানা গেল সমস্যা চিহ্নিত করা গেছে ,আর ভয়ের কোন কারণ নেই । কিছু সময়ের জন্য এলিভেটর গুলি বন্ধ ছিল । সেগুলি চালু হতেই ধীরে ধীরে লবির জমায়েত পাতলা হতে থাকল ।আমরাও বাকি জনতার পিছু পিছু ফিরে এলাম নিজ নিকেতনে । পরে, সন্ধ্যাবেলায় ছেলে অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তার জননীর মুখে ঘটনার বিবরণ শুনে হেসেই খুন । -“তোমরা এনাউন্সমেন্টের পুরোটা শোননি । এনাউন্সমেন্ট এর সময়ে নিশ্চয়ই বলেছিল standby for further instructions . তোমরা সবটা ভাল করে না শুনেই তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে গেছ” । -“দেখেছিস ? দেখেছিস তো “তোর বাবার সব তাতেই বাড়াবাড়ি । কিছুই হয়নি খামোখা আমাকে টেনে নিয়ে নিচে গেল ...” ইত্যাদি ইত্যাদি । “ এই জন্যেই কোথাও গিয়ে আমার শান্তি নেই । সব সময় কেবল হড়বড় করবে…” উপায় নেই । হাতি গাড্ডায় পড়েছে, এখন বাক্যবাণের হাত থেকে আমার নিস্তার নেই ।আরও কি কি অভিযোগ এরপরে আমার বিরুদ্ধে আনা চার্জ শীটে থাকবে তা আমার অজানা নয় । এমতাবস্থায় শাস্ত্রে বলে যঃ পলায়তি সঃ জীবতি । অতয়েব শাস্ত্রের বিধি মেনে সময় থাকতেই এ বান্দা অকুস্থল থেকে হাওয়া । ওয়াশিংটন বুলেভার্ডের রাস্তা ধরে হন হন করে মেট্রোর নিউপোর্ট স্টেশন অবধি হেঁটে ,বাঁয়ে ঘুরে ওয়াশিংটন মল কে পিছনে রেখে হাডসন নদীর দিকে চলে যাই । নদীর ধার বরাবর একপাশে লোহার রেলিং আর অন্য পাশে গোলাপ গাছের হেজ দিয়ে কেয়ারি করা পথ দিয়ে শ্লথ পায়ে হাঁটতে থাকি । নদীর ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে গোটা ব্যপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল । ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখলাম সত্যি ই এনাউন্সমেন্টের ওই standby for further instructions অংশটুকু আমি কানে তুলিনি অযথা আতঙ্কে । আর লবিতে জমা হয়ে থাকা লোকজনের ব্যপারটাও বুঝলাম । সারাদিন ধরেই বিল্ডিং এর বিভিন্ন তলায় লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে । এলিভেটর বন্ধ থাকায় তারাই ওপরে উঠতে না পেরে লবিতেই অপেক্ষা করছিল এলিভেটর চালু হওয়ার জন্য । মাঝখান থেকে আমিই কেবল বেকুব বনে গেলাম । এক এক সময়ে একলা অথবা শ্রীমতীকে সঙ্গে নিয়ে গোটা এলাকাটি ঘুরে দেখতে বেরই । আমার নেশা ছবি তোলা । হাডসন নদীর ওপারে নিউইয়র্ক মহানগরের বিশাল বিশাল গগনচুম্বী বাড়ির সার দেখে তাক লেগে যায় । খুব ভোরের বেলায় পুবের লাল আকাশের পটে সে বাড়িগুলির শেল্যুট যেমন মনোহারি আবার বিকেলের দিকে পড়ন্ত বেলার আলোয় ক্ষণে ক্ষণে বাড়িগুলির দেওয়ালে দেখি রঙের বাহার । বৈভবের জৌলুষে চোখে ধাঁধা লেগে যায় ।আমার মফস্বলী চোখ ধাঁধিয়ে যায় ওয়াশিংটন মলের পণ্য সামগ্রীর বাহারে । ছেলের বদান্যতায় শ্রীমতীর হাতে কিছু ডলার তাঁকে সর্বদাই খোঁচা মারতে থাকে । বেড়াতে বেরোলে তাঁর চরণ যুগল কেবলই মলের দরজায় হাজির করে তাঁকে । কিন্তু পকেট খালি থাকলে এবং এ জগতে সবই অনিত্য ,একমাত্র ব্রহ্ম সত্য গোছের মন নিয়ে শপিং মলে ঢুকলে দেখেছি সময় কাটানর মত এর চেয়ে ভালো জায়গা আর দ্বিতীয়টি নেই । রকমারি সাজ পোশাক , গয়নাগাটি ,জুতো ,খেলনা আর কসমেটিক্স ,খাবারের দোকানে নানা স্বাদের কেক পেস্ট্রি ,কফি ইত্যাদি কত কিছুরই যে দেখা মেলে তা বলে শেষ করা যাবেনা । বস্তুত ওজন দরে যে রান্না করা খাবার কিনে খাওয়া যায় তাও জানতে পারতুমনা ওয়াশিংটন মলে না ঢুকলে । এই মলেরই একটি খাবারের দোকানে দেখেছিলাম থরে থরে রান্না করা খাবার সাজান আছে । মাছ মাংস এর বিভিন্ন পদ যেমন আছে তেমনি নিরামিষাশীদের জন্যে ঘাস পাতার ও ঢালাও ব্যবস্থা রয়েছে । খদ্দেরকে শুধু নিজের পছন্দ ও পরিমাণ মত খাবার একটি প্লেটে তুলে কাউন্টারে নিয়ে গিয়ে দেখালে সেখানে ডিউটিতে থাকা ব্যক্তিটি খাবারের ওজন দাঁড়িপাল্লায় মেপে জানিয়ে দেবে তার দাম ।অতঃপর দাম মিটিয়ে দিয়ে সাজিয়ে রাখা চেয়ার টেবিলের কোন একটি বেছে নিয়ে বসে পড়লেই হল ।