দীপঙ্কর বসু
বাই উঠলেই বাঙালির কটক যাবার একটা চালু রেওয়াজ আছে । আমাদের ও হল তাই । তবে কটক এখান থেকে মেলাই দূর । আর যাতায়াতের হাঙ্গামও কম নয় । কাজেই হাতে রইল পেন্সিল । অর্থাৎ কিনা ডায়মন্ডহারবার । তাই বা মন্দ কি ? মনোজদা ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন “রবিবার ফ্রী আছেন? আমরা ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছি – যাবেন? ভাইব্যা দ্যাহেন”। দলে টানবার ইনসেন্টিভ হিসেবে যাবার পথে আমাকে তুলে নেবার প্রস্তাব ও দিয়ে রাখলেন । ভাববার অবশ্য বিশেষ কিছু ছিলনা । বিশুদ্ধ বেকার একটি লোকের আবার অত ভাবার কি আছে । কাজ বলতে তো শুধু সারাটা দিন হয় , ইন্টারনেট নিয়ে খুটুর খুটুর করে কী বোর্ড ঠ্যাঙান ,নয় গানের গুঁতোয় পাড়ার লোকজনের কান ঝালাপালা করে দেওয়া । তার চেয়ে মুখ বদলের খাতিরে একটা দিন নিছক ছুটে চলার আনন্দে বেরিয়ে পড়লে দোষ কি । হালের এই ডিজিটাল জমানায় বোধ হয় এরেই কয় লঙ ড্রাইভে যাওয়া। মনোজদা একটা লাল টুকটুকে গাড়ি ভাড়া করে ফেললেন ,আমিও সাত সকালে গিয়ে হাজির হলাম একাডেমী অফ ফাইন আর্টস এর সামনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছুটা আগেই। ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছি শুনে এক পড়শি প্রশ্ন করেছিলেন “ডায়মন্ডহারবারে আবার দেখার কি আছে ? একাডেমী অফ ফাইন আর্টসের সামনে একটা ভাঙ্গা চাতালে বসে এক ভাঁড় চা সহযোগে পড়শির প্রশ্নের একটা জুতসই পদ্যের ছন্দে গাঁথা জবাবের খসড়া মনে মনে তৈরি করছিলাম । নিবেদন করি – পড়শি ক’ন মুচকি হেসে “ বেড়াতে যাবার জায়গা পেলেন শেষে কিই বা দেখার আছে এমন ডায়মন্ডহারবারে” আমি বলি “আরে ! বিশাল একটা নদী আছে ,কূল নাই তার কিনারা নাই সামনে আছে অকুল পাথার ,আরও বেশি চাই ? আবছায়াতে মিশে গেছে অপর পারের গ্রাম হলদিয়া তার নাম ডাইনে বাঁয়ে আর কিছু নেই, নেইকো কোনও শেষ শেষের শেষে আছে জানি অজানা এক দেশ …”।। নাহ । শেষ করা গেলনা । আমাকে তুলে নিতে পৌঁছে গেছেন মনোজদাদের দল । শিকেয় উঠল আমার পদ্যের খসড়া । একদিক দিয়ে ভালোই হল । আমার এই অনাচারের কথা যদি কবিদের ,বিশেষ করে শিবাজি বা দৃষ্টি ম্যাডাম - এঁদের কানে যায় তা হলে আর দেখতে হবেনা । কবিদের আমি বেজায় ডরাই । কোত্থেকে কোন চুন খসে পড়ে তা কে বলতে পারে !! ---------------------------------------------------------- কিন্তু , কি রাস্তা রে ভাই এই ডায়মন্ডহারবার রোড !! ধানক্ষেতও বোধ হয় হার মানবে খানাখন্দে ভরা ডায়মন্ডহারবার রোডের কাছে । নাচতে নাচতে ,দুলতে দুলতে চলেছে গাড়ি আর তার ভেতরে আমরা থেকে থেকেই একে অপরের ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি । “লালমোহনবাবু” সে গাড়িতে থাকলে হয়ত “বেহাল বেহালা” নামে একটা রহস্য উপন্যাসের প্লট ছকে ফেলতেন । তার ওপরে মাথার ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছেমেট্রো রেলের নির্নিয়মান ফ্লাইওভার । ঠিক সরল রৈখিক নয় তার গতিপথটি । বরং অনেকটা বিসর্পিল গতি তার । গাড়ির কোটরে বসে ভারি সুন্দর দেখতে লাগছিল ফ্লাইওভারটাকে । মনে মনে তারিফ করছিলাম যে পরিকল্পনাকার এর গড়নটির রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির । সাপের উল্লেখ যাদের মনে বিবমিষা উদ্রেক করে তাদের জন্য না হয় এঁকেবেঁকে তিরতির করে বয়ে চলা একটি ছোট্ট নদীর উপমা দিই ,অথবা নৃত্যপরা কোন তন্বীর দেহবল্লরীর ! গাড়ির সামনের আসনে চালকের পাশে বসে এই সব কাব্যকথা মাথায় খেলে যাচ্ছে তখনি একটা কাপুরুষজনোচিত ভাবনাও যে মনের কোনে উঁকি মেরে যায়নি তা নয় । দুই একবার মনে হয়েছিল যদি এই ফ্লাইওভারের একটা অংশ হঠাৎ করে ভেঙ্গে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ে …তা হলেই চিত্তির। দুপুরের মধ্যেই ব্রেকিং নিউজ হয়ে যাব। আমার এই “পান্তাফ্যাচাং মার্কা” থোবড়াখানা(মনোজদার ভোকাবুলারি থেকে ধার করা বিশেষণ) ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কাছে মূল্যহীন হলেও চ্যাপটান দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ির মধ্যে থেকে বের করে আনা দেহখানা বেহদ দামি বিবেচিত হবে নিশ্চিত । তাও এই পলিটিক্সের ডামাডোলের বাজারে !! ------------------------------------------------------------------- আলতু ফালতু কথা ছেড়ে এবার “পতে কি বাত কিয়া যায়” মনোজদা কে বলেই রেখেছিলাম যাবার পথে জোকায় স্বামীনারায়ন মন্দির এ মিনিট পনেরোর জন্যে হলেও একবার থামব । এর আগে দুই একবার এই পথে যেতে মন্দিরটা আমার নজর কেড়ে ছিল । সময় ও সুযোগের অভাবে মন্দিরটা ভালো করে দেখা হয়ে ওঠেনি । এবার সেই সাধ পূর্ণ করে নেব । আসলে মন্দির দেখাটা একটা আছিলা মাত্র । দুর থেকে দেখে আমার চোখ বলেছিল এই মন্দিরের ছবি বেশ ভালো উঠবে । আমার মতলবটাই ছিল ছবি তোলা । আর বীথি বৌদি এবং তস্য বান্ধবী শিপ্রাদিদির পেয়েছিল চায়ের তৃষ্ণা । দেবালয় গমনের বিচিত্র কারণ বটে । Ladies first । অতয়েব পার্কিং লট এ গাড়ি থেকে নেমে আমরা গুটিগুটি পায়ে মন্দিরটাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখে নিয়ে রওয়ানা দিলাম খাবার ঘরের দিকে । পেল্লায় সাইজের একটা হলঘরে নানাবিধ খাবার মেলে ১৭টাকা পিস বেসন কা লাড্ডু , ১৮ টাকা প্রতি পিস আর একটা বেসন আর ঘি এর চটকানো পিণ্ডি সাজান সেখানে শো কেস এ । বৌদিদের সখ হল ধকলা খাবেন চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে । কিন্তু তাদের সে জ্যাগারিতে পড়ল স্যান্ড ।মানে , ধোকলা নেই । পরিবর্তে একটু অপেক্ষা করলে মিলবে স্বামীনারায়নের ভোগ । নানান সবজী দিয়ে বানানো খিচুড়ি । চা খেতে খেতে মনোজদা চুপি চুপি জানালেন তিনি নাকি গাড়ি থেকে নেমেই মন্দিরের ছবি তুলতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন গার্ডের কাছে । এই মন্দির প্রাঙ্গণে নাকি ছবি তোলা নিষিদ্ধ । প্রথম ধাক্কায় একটু দমে গেলেও মনের মধ্যে নিষেধ নামানা সত্বাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল । মনে মনে নিজেই দুবার জপলাম “শ্লা । ইয়ার্কি পায়া হ্যাঁয় ? (কোনও কারণে রাগ হলেই দেখেছি আমার হিন্দিতে কথা বলতে ইচ্ছে করে) এখানে ছবি আমি তুলবই”। চা এবং খিচুড়িভোগ খেয়ে এবার নামলাম আসরে । গুটিগুটি পায়ে হেঁটে একটা পাথরে বাঁধান চাতালে গিয়ে দাঁড়ালাম মন্দিরের ঠিক সামনে । বিশাল আয়তনের মন্দিরটা সত্যিই সুন্দর দেখতে । আবছা মনে হচ্ছিল ঠিক এই রকম আর একটা কোন বিখ্যাত মন্দির যেন কোথাও দেখেছিলাম – অক্ষয়ধাম মন্দির কি ? কি জানি । আবার একটু খুটিয়ে দেখতে গিয়ে মিল খুঁজে পেলাম খাজুরাহোর মন্দির নির্মান শৈলীর সঙ্গে । সেই অসংখ্য চুড়া , কোনটা গম্বুজাকার কোনটা বা সুচাগ্র বর্শার ফলার মত ।আয়তাকার থামগুলো একে অপরের সঙ্গে শৃঙ্খলে বাঁধা । সেই সেকলের চেহারা দেখে মনে পড়ে যায় খাজুরাহো মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের কথা । মন্দিরের চত্বরের চার পাশে অনেকগুলি বারান্দা – থাম দিয়ে সাজান । খেয়াল করে দেখলাম থামগুলি বেশ সুন্দর পরিকপনা করে বসান ।কোন একটি দালানের সামনে দাঁড়ালে দুপাশের থামের সারির মাঝে লম্বা দালানগুলি বেশ রোমাঞ্চকর লাগল দেখতে । ইতি মধ্যে ক্যামেরায় বেশ কিছু ছবি তুলে ফেলেছি বিনা বাধায় । এবারে একটি বিশেষ কোন থেকে মূল মন্দিরের ছবিটা তুলতে গিয়ে প্রথম আপত্তির মুখে পড়লাম । মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী জানালেন মন্দিরের ছবি তোলায় নিষেধ আছে । হিন্দিতে সে যা বলল তার মর্মার্থ হল আমি যেন ক্যামেরাটা ব্যাগে রেখে মোবাইলে ছবি তুলি । মন্দিরে নাকি ক্যামেরায় ছবি তোলা বারণ থাকলেও সে নিষেধাজ্ঞায় মোবাইলের কোন উল্লেখ নেই । নিয়মের বহর দেখে আমার সত্যিই হাসি পেল । তবে সুখের কথা ,কর্মীটির দায়িত্ব যেন আমাকে নিষেধাজ্ঞার কথাটি জানিয়ে দিয়েই সারা হয়ে গেল । কারণ সে নিষেধাজ্ঞাটা বলবত করায় তার বিশেষ আগ্রহ দেখলামনা । আমি মুচকি হেসে তাকে বললাম খুড় একটু ওদিক পানে চাও দেখি – আমি সেই ফাকে গোটা কয় ছবি তুলে নিই । আপাতত সেই ছবি কিছু আপনাদের দেখতে দিয়ে আমি অন্য কাজে যাই । ফিরে এসে যদি দেখি আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি আমার বকবাকানিতে তা হলে না হয় ডায়মন্ডহারবারের কিসসার কথা পাড়া যাবে পরের পর্বে
ঝিনুক
ভূতের গল্পের প্রতিযোগিতায় উমা থুড়ি মুনিয়া একটা দারুণ গল্প লিখেছিল| অল্প কথায় গল্পটার সারমর্ম হল...... একটা বাচ্চা মেয়ে‚ গর্ভপাতের বেশ কয়েক বছর পরেও মেন্ট্যাল ট্র্যমা থেকে মুক্তি পেতে পারে নি| তার অবচেতনে অপরাধবোধ কুড়ে কুড়ে খায় তাকে আর তার থেকেই তৈরী হয় এক সাংঘাতিক ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা| উমার সেই গল্পে শ্রীর কমেন্ট পড়ে সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারি নি| তার পরিপ্রেক্ষিতেই লিখেছিলাম এই পোস্টটা‚ আজ m-এর অনুরোধে আলোচনার সুবিধার জন্য ব্লগে নিয়ে এলাম পোস্টটা| আশা করি সবাই অংশ নেবে/ন এই আলোচনায়| অ্যাবরশনের বিপক্ষে অনেকেই খুব সরব জানি‚ I’m not a fan either…. কিন্তু আবেগ দিয়ে ফ্যাক্টস গুলিয়ে ফেলা বোধ হয় খুব একটা কাজের কথা নয়| গুজবে কান না দিয়ে তথ্য একটু যাচিয়ে দেখলে কেমন হয়? নিজের শরীরে ধারণ করা আর একটা শরীরকে স্বেচ্ছায় উপড়ে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া কি এত সোজা? কেউই সখ ক'রে করে না সে কাজ| দায়ে না পড়লে কে আর সেধে এই পথে হাঁটতে চায়? উমার গল্পেও শ্রেয়সীর অবচেতনে অপরাধবোধ‚ অজাত ভ্রূণের প্রতি মমতা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে এতগুলো দিন পরেও তাকে সেই ভূত তাড়া করে ফেরে| অনেকদিন এই ফিল্ড মানে ফিসিওলজির থেকে অনেক দূরে‚ কোনরকম কোন পড়াশোনাই প্রায় নেই| ইন্টারনেট ঘাটলেই অনেক তথ্য পাওয়া যাবে‚ যায়| কিন্তু ইন্টারনেটে চোখ বন্ধ করে সব বিশ্বাস করার মত naivety আর নেই| তাই নেটের সাথে সাথে একটু পড়াশোনাও করতে হল| বহু যুগ বাদে ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে কয়েকটা সন্ধ্যে কাটালাম (ভূতেদের সাথে‚ আগেই তো বলেছি লাইব্রেরিতে ভূত থাকেই থাকে) নির্ভেজাল পড়াশোনা করে| এখানে ইউনিভার্সিটিতে গেলে আমার আর ফিরতে ইচ্ছা করে না| ইচ্ছে হয় আবার ফিরে যেতে সেই দিনগুলোতে‚ নতুন করে লেখাপড়া শুরু করতে| এত আয়োজন‚ এত ব্যবস্থা যে শুধু পড়াশোনার জন্য সম্ভব ….. চোখে না দেখলে কোনদিন জানতেই পারতাম না| যাগ্গে‚ এসব ই-বই আমাদের কালে ছিল না| স্পেশ্যাল রিক্যুইসিশন ভরে কিছু ই-পুস্তক চেক আউট করলাম এক সপ্তাহের জন্য| নেশা ধরে গেছে| সন্তানধারণ একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া| আর সেই খোদার উপরে খোদকারির নাম হল অ্যাবরশন| মানুষের gestation period কমবেশি ২৮০ দিন‚ মনে ৪০ সপ্তাহ| স্ট্যাস্টিস্টিকসের হিসাবে বেশির ভাগ স্বেচ্ছাকৃত অ্যাবরশনই ঘটে থাকে গর্ভধারণের ১২ থেকে ১৩ সপ্তাহের মধ্যে| প্রেগন্যান্সি কনফার্ম হয়ে ডিসিশন নিয়ে‚ মানসিক ভাবে তৈরী হতে হতে এই টাইম ল্যাপ্সটা খুবই স্বাভাবিক| প্রথম সাত সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ খেয়ে গর্ভপাত সম্ভব| তার পরে ক্লিনিক ছাড়া গতি নেই| রিসার্চ বলছে‚ ২৪ সপ্তাহ পার হয়ে গেলে সেই ভ্রূণ মাতৃগর্ভের বাইরেও survive করতে পারে‚ provided the same environment as the mother’s womb …. কাজেই ২৪ সপ্তাহের পরে অ্যাবরশন বিলকুল বেআইনী and is considered ‘intent to murder’‚ যদি না অন্য কোন গুরুতর কারণ থাকে| এবার আসি শ্রীর ঐ বিশেষ কমেন্ট যার পরিপ্রেক্ষিতে এই গরুখোঁজা শুরু হল| ভ্রূণের কি বেদনাবোধ থাকে? বিজ্ঞান বলছে‚ ৫ সপ্তাহের পরে হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করতে শুরু করে‚ ১৩ থেকে ২০ সপ্তাহের মাথায় নড়াচড়া‚ হাত-পা ছোঁড়া শুরু হয়‚ কিন্তু বেদনা বা ব্যাথা অনুভব করার জন্য মস্তিষ্কের যে বিকাশ প্রয়োজন তা ভ্রূণের গড়ে ওঠে না third trimester-এর আগে| এই third trimester শুরু হয় ২৭ সপ্তাহ থেকে| মোটামুটি ৩০ সপ্তাহ লাগে গর্ভস্থ শিশুর সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম নিয়ে প্রথম জেগে উঠতে| তবে বেদনাবোধ বা মস্তিষ্ক তৈরী না হলেও রিফ্লেক্স কাজ করতে পারে| একটা উদাহরণ দিই‚ যেমন আমাদের হাঁটু‚ ডাক্তারবাবু রাবারের হাতুড়ি দিয়ে হাঁটুর মালাইচাকিতে এক ঘা দিলে ব্যাথা লাগে না তেমন কিন্তু পাটা তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে‚ ওটা রিফ্লেক্স| ১৯ সপ্তাহের আশেপাশে‚ যখন স্পাইন্যাল নার্ভ টিস্যু তৈরী হতে শুরু করে তখন থেকে ভ্রূণের মধ্যে এই রিফ্লেক্স দেখা যায়‚ ছুঁতে গেলে সরে যাওয়া সেটারই প্রমাণ| কিন্তু তার মনে এই নয় যে তার কোন ব্যথা (চলিত বাংলায় যার নাম কষ্টবোধ) আছে| প্রচুর জ্ঞান দিয়ে ফেললাম‚ অনেক ডাগদারবাবু/নী আছেন এখানে‚ কিছু ভুল হলে মাথা কাটবেন না যেন‚ দয়া করে মাপ করে শুধরে দেবেন| এবার সবশেষে একটা প্রশ্ন ছিল| এই বিষাক্ত পৃথিবীতে কোত্থাও আর একটা শিশুও জন্মানো উচিত বলে আমার মনে হয় না| আমাদের কপালপোড়া দেশমাতৃকার কথা আর নাই বা তুললাম| সেসব বড় বড় ব্যাপারও নয় বাদ থাক| যখন কোন মেয়েকে এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিতে হয় (আমি রিতাদের ধরছি না এই হিসাবে) কোন কারণে বাধ্য হয়ে‚ কেন আমরা তার পাশে থাকতে পারি না? সব রিসার্চ‚ সব বিজ্ঞান নস্যাত করে দিয়ে যদি ধরেও নিই যে অ্যাবরশনের সময় ভ্রূণের কষ্ট হয়‚ তাহলেও এক অবাঞ্ছিত জীবনের লম্বা যন্ত্রনার চেয়ে কয়েক মুহূর্তের কষ্টই অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত নয় কি? আমি হলে তো দ্বিতীয়টাই বেছে নেব আমার অজাত সন্তানের জন্য| আড্ডা কি বলে? উঠুক না‚ আজ একটু ঝড় উঠুক এই নিয়ে| চুপচাপ পালিয়ে তো অনেক বাঁচলাম সারা জীবন আমরা সব্বাই (হ্যাঁ‚ সব্বাই)| আজ একটু শুনি না সব মায়েদের কাছ থেকে‚ সব মেয়েদের কাছ থেকে‚ পক্ষেই হোক বা বিপক্ষে|
Sarita Ahmed
ছোটবেলায় 'বাপুরাম সাপুড়ে ' নামের একটা কবিতা ছিল ,খুব আউড়াতাম আর খিল খিল কাটাতাম মেয়েবেলা । বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখলাম, তখন খেয়াল করে দেখলাম বাপুরামের নিতান্ত নির্বিষ 'ভালো মানুষ' সাপেদের মতই আমাদের সমাজ মেয়েদের দেখতে চায় , পেতে চায় , ছুঁতে চায় । বর্তমান ইঁদুর দৌড় সমাজে বেশীর ভাগ মধ্যবিত্তের নিউক্লিয়ার পরিবার । একটা বা দুটো সন্তান । তাদের বাবা মা কিন্তু মোটামুটি সমতা রেখেই ছেলে বা মেয়ে 'মানুষ' করেন । মেয়েকে ভাল স্কুলে ভর্তির লাইন দিতে রোদে পুড়ে জলে ভিজে চাতকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন পিতামাতা । এটা খুব স্বাভাবিক ছবি । শিক্ষা, যে কোনো জাতির উন্নতির প্রধান ও একমাত্র চাবিকাঠি , যার কোনো ব্যতিক্রমী রাস্তা বা শর্টকাট হয় না । একটা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে যেমন কঠোর পরিশ্রম করে , মেধার পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতায় চাকরি পায় , জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় ; একটা মেয়েও ঠিক তেমনিভাবেই জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে নিজের পরিচয় বানায় । বরং মেয়েদের চলার , হাঁটার বা দৌড়ানোর পথটা কাঁটায় মোড়া থাকে বেশী করে । হয়তো তাকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে অত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় না , কিন্তু মূল বাধাগুলো পেরোতে হয় বাড়ির বাইরে । কর্মভূমিতে । শিক্ষার্থির ক্ষেত্রে শিক্ষালয়ে , চাকুরিরতার ক্ষেত্রে চাকুরিস্থলে । কখনো তা অসাধু ফাঁদের হাতছানি হিসেবে আবার কখনো প্রতারণা বা শারিরীক হেনস্তা হিসেবে একটা কর্মঠ মেয়ের জীবনে আসে । এ পর্যন্ত সবই চেনা ছক প্রায় সব শ্রেনীর, সব ধর্মজাতির ক্ষেত্রে। কিন্তু ছকটা একটু বদলায় , মুসলিম সমাজে । মেয়ের ২৩+ বয়েসের পরে । উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর শিক্ষায় একের পর এক যোগ্যতা প্রমান দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে, নিজের পায়ের তলার জমি পেতে একটা ছেলের ঠিক যতগুলো বছর সময় লাগে , একটা মেয়েরও ঠিক ততগুলো বছরই লাগে । এতগুলো পথ পেরিয়ে সমাজে উভয়ই সমানপদের পরিচিতি পায় সম্পূর্ণ নিজ মেধা-শ্রম ও কর্মের যোগ্যতায় । আজকের তারিখে দুজন এডাল্ট সহাবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলে তাতে উভয়েরই সমান অবদান ( contribution) লাগে , মানসিকভাবে, শারিরীকভাবে এবং আর্থিকভাবে । শেষেরটা কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অঙ্গ , একে অস্বীকার করা যাবে না । কিন্তু ভারতের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় দেখা যাচ্ছে মুসলিম পরিবারে উচ্চশিক্ষায় যত মেয়েদের অংশ বাড়ছে তত কমছে তাদের ভবিষ্যৎ ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর আশা । কেন ? কারণ , আজও ভারতের শিক্ষিত 'মডারেট' মুসলিম পরিবার, ছেলের বৌ হিসেবে পাত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নামাজ শিক্ষা- কোরান জ্ঞান- রোজা রাখার অভ্যাস - ইসলামিক রীতিনীতি ইত্যাদিকে । সম্প্রতি হায়দ্রাবাদে এক ঘটক ( city match maker ) শাহিদ ফারুকি-র অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে ২৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে বয়েস এমন উচ্চশিক্ষিত ( M.A, B.Ed , M.Ed, M.Com, B.Tech , M.Tech ) পাত্রীদের জন্য যোগ্য সুপাত্র মিলছে না । তাঁর কথায় , " it's become a herculean task to find these educated women, equally qualified grooms. Seven out of 10 women seeking alliances these days are well educated. Given that several men aren't still particularly interested in a girl's education (many aren't qualified themselves) and pay more attention to her looks and financial status, it's getting difficult to find these prospective brides an appropriate match." আর এজন্য এই সব মেয়েদের একটা "compromise" করতে হচ্ছে । কি সেটা ? তা হল, উচ্চশিক্ষিত এইসব মেয়েদের বিয়ে করতে হচ্ছে স্কুল ড্রপ আউট , ১২ ক্লাশ ফেল , আন্ডার গ্রাজুয়েট ছেলেদের । যাদের হয়তো পরিচিতি এলাকার ছোটখাট ব্যবসাদার হিসেবে। এক ডাক্তার মেয়ে নানা বিবাহ সংক্রান্ত ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে সন্ধান চালাচ্ছেন যোগ্য পাত্রের এবং হতাশ হচ্ছেন । ভারতের বিখ্যাত ম্যারেজ সাইট Shaadi.com এর একজন আধিকারিক যোগীতা তাঁর অভিজ্ঞতায় বলছেন , ""If a man earns well, families overlook his qualification. Mostly, it's the women who end up compromising." Osmania University র অধ্যপক এবং নানা শিক্ষাবিদরা এটাকে মেয়েদের উত্থান বা একটা 'সাইলেন্ট রেভ্যুলিউশন' নামে ডাকছেন । এ বিষয়ে একদল তদন্তকারী জানাচ্ছেন এটা এমন একটা দ্বন্দ্ব যাকে বলা যায় "transitional issue" ! তাদের ভাষায় ""Thanks to schemes like free education and fee reimbursement, there are an increased number of girls who are enrolling for higher studies now. Even the drop-out rate among them has lowered. While this has narrowed the educational gap between boys and girls, such issues (related to marriage) have cropped up." জালিশা সুলতানা ইয়াসিন , member of the Muslim Women Intellectual Forum বলেন : "There was a lot of insecurity among women until a few years ago and they took to education to support themselves. But that brought along a lot of practical problems which we need address to correct this imbalance. Parents need to push male children to study to resolve this " অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না । যেখানে ভারতে পুরুষ এবং নারীর লিঙ্গানুপাত = পুরুষ : নারী > ১০০০ : ৯৪০ ( ২০১১ আদমসুমারী অনুযায়ী ) আর শিক্ষাক্ষেত্রে যেখানে মাত্র ৭৪% ভারতবাসী শিক্ষিত , তার ৬৫.৫% হল নারী এবং ৮.৫% হল পুরুষ । ( ২০১১ রিপোর্ট ) এ যেন এক উলোট পুরাণ !! মুসলিম সমাজের হাল আরও খারাপ , বলাই বাহুল্য । কিন্তু সবই কি শুধুমাত্র 'পিছিয়ে পড়া জাতি' বলেই ? নাকি পিছিয়ে পড়া মানসিকতার জন্যও অনেকটা । বস্তুতই মুসলিম সমাজ প্রতিদিন ১০০ বছর করে পেছোচ্ছে দাড়ি- টুপি, হিজাব, বোরখা আর জেহাদের কট্টরতায় । একটা গোটা সমাজ মূলধারার শিক্ষার আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নানা রাজনৈতিক ধার্মিক নিম্নগামীতার কারণে । কাগজের বিজ্ঞাপণে দেখা যায়, শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত চাকুরিজীবি মুসলিম যুবাদের একটা বড় অংশ স্ত্রী হিসেবে আজও কামনা করে ১৮- ২৩ এর পুতুল পুতুল শো-কেস বেবি ,যার জীবন কাঠি থাকবে অন্তত ১০ বছরের বেশী বড় স্বামী নামক কর্তার হাতে । সেই জীবন চাবি ঘুরিয়ে যখন খুশী দম দিয়ে স্ত্রীটিকে উঠানো -বসানো -শোয়ানো -বাচ্চা বিয়ানো ইত্যাদি নানা জৈবিক কাজ করানো যাবে , ইসলাম সম্মত ভাবে। অথবা, আরেকদল শিক্ষির 'মডারেট' শ্রেনীর চাহিদা অনুযায়ী এমন পাত্রী চাই যে হবে, চাকরীওয়ালা -নামাজি -চটপটে ইংলিশ বলা-হিজাবী এক আজব 'অল-রাউন্ডার' ! যার টাকা উপার্জনের ক্ষমতা থাকবে নিজ যোগ্যতায় ; কিন্তু খরচের অধিকার থাকবে স্বামীর আয়ত্বে । ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হবে জয়েন্ট; কিন্তু ATM , Pin থাকবে স্বামীর জিম্মায় । এক অদ্ভূত মিথোজীবিয় পরজীবিতা ! বাবুরাম সাপুড়ে-র কাছে ঠিক যেমন এক নির্বিবাদি সাপের আশায় ছড়া লেখা হয়েছিল , এও যেন ঠিক তেমনি চাওয়া । মেয়ে ছাড়া যেহেতু বাচ্চা হবে না , তাই বংশবিস্তারও সম্ভব না । সেহেতু বিয়ের জন্য পাত্রী চাই । কিন্তু ওই... যে পাত্রীর চোখ-কান খোলা নেই , কোথাও সে ছোটে না , ইচ্ছেমত হাঁটে না , সাত চড়ে রা-কাটে না , সেই মেয়ে জ্যান্ত ... গোটা চার আনত । ( মুমিন গনের চারবিবাহ ইসলাম সম্মত তাই !) ব্যতীক্রম কিছু নিশ্চয় আছে । এইসব শিক্ষিত 'মডারেট' মুসলিম 'ব্যতীক্রমী'রা, উদারমনা মেয়েদের চক্ষুলজ্জা ও সামাজিকতার খাতিরে ফেলতেও পারে না , গিলতেও পারে না । তাই একটা সেফ দুরত্ব বজায় রেখে উপর উপর বাহ বাহ , প্রশংসা করে । কিন্তু জীবন সঙ্গী বানানোর ক্ষেত্রে ঢোক গিলে ক্ষমা চায় । এদিকে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে যুক্ত প্রত্যেকেই জানে বছর বছর সমীক্ষাগুলোও বলছে এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই সিরিয়াসলি পড়াশুনাটা করছে । খানিকটা স্বভাবগত বাধ্য সন্তান হওয়ার কারণে , আর খানিকটা বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের পরিচিতি খোঁজার তাগিদে । রেজাল্ট মাধ্যমিক হোক বা উচ্চমাধ্যমিক পাতা খুললেই ডেটা হাজির । অস্বীকার করার উপায় নেই । কিন্তু বিয়ের জন্য এইসব উচ্চ শিক্ষিত মেয়েদের জুড়িদার পেতে 'ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়' দশা । এখন অনেকেই বলতে পারেন , এত প্যাঁচাল পেড়ে লাভ কি ! বিয়ে না করলে কি মেয়েদের চলে না ? আজীবন অবিবাহিত থেকে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানকে কাঁচকলা দেখাও , ল্যাঠা চুকে যায় । নিশ্চয় যায় , আলবাত চুকে যায় । কিন্তু কথা হল , তাহলে কি ধরে নেওয়া হবে , যেহেতু তুমি আত্মসম্মানী মেয়ে এবং উচ্চশিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত চোখ কান খোলা সুতরাং তোমার জন্য বিয়ে-সংসার নিষীদ্ধ । এতে শিক্ষিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গর্বের শতকরা হার কি বেড়ে যাবে ? দেখুন, একটা সরল উদাহরণ দিই । একটা পথ কঠিন , কাঁটা বিছানো বলে সেটাকে এড়িয়ে চলে যাওয়া তো সবচেয়ে সোজা কাজ । সবচেয়ে সরল পথ । এর মধ্যে মহত্ত্ব নেই । বরং সেই কাঁটা পথকে নির্মল করে সবার জন্য যাতায়াতের উন্মুক্ত ব্যবস্থা করাটাই উন্নতির পরিচায়ক । সব শিক্ষিত নারীই যে অবিবাহিত হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এমন তো কোনো মানে নেই । ছেলেরাও যেমন একটা সুন্দর সুস্থ বিবাহিত জীবনের বাসনা রেখে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঠিক সেই একই কথা কি মেয়েদের বেলায় খাটে না ? নাকি , মেয়ে বলেই তার জন্য সর্বদা আলাদা নিয়ম হবে ? যদি নিয়ম না মেনে স্বাধীনচেতা হয় তবে সুস্থ সুন্দর সমাজ তার আশাতীত হবে ? তার জন্য রুদ্ধ হবে সব স্বাভাবিক দ্বার ? এটা কি কোনো উন্নত দেশের একটা জাতির সামাজিক মানচিত্র হতে পারে ?
শিবাংশু
হুগলি বাঁশবেড়িয়ার শ্রীধর ভট্টাচার্য জন্মে ছিলেন ১৮১৬ সালে। বিখ্যাত কথক লালচাঁদ বিদ্যাভূষণ ছিলেন তাঁর পিতামহ। পিতা পণ্ডিত রতনকৃষ্ণ শিরোমণি। বাড়ির শিক্ষা ছিলো উচ্চকোটীর। তার উপর ভাগবতের পাঠ নিয়েছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে। তরুণ বয়সে সঙ্গীসাথিদের নিয়ে পাঁচালি আর কবিগান গেয়ে বেড়াতেন। বহরমপুরে সেকালের বিশিষ্ট কথক কালীচরণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা হবার পর তিনি কথকতার প্রতি নতুন করে আকৃষ্ট হ'ন। এই শিল্পটিতে তাঁর লোকপ্রিয়তা সেকালে আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছিলো। নামকরা কথক হয়ে উঠেছিলেন অল্প বয়সেই। লোকে শেষ পর্য্ন্ত তাঁকে ডাকতো শ্রীধর কথক নামেই। তাঁর রচিত মাতৃসঙ্গীত জনপ্রিয়তায় রামপ্রসাদের সঙ্গে এবং টপ্পা স্বয়ং নিধুবাবুর সঙ্গে পাল্লা দিতো। শ্রীধরের বহু গান এখনও নিধুবাবুর নামে চলে। অতি সমাদৃত "ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে" গানটি তাঁরই রচনা, যা অনেকে নিধুবাবুর গান বলে জানেন। শুধু বাংলা নয়। তাঁর গভীর সারস্বতচর্চার ছাপ তাঁর হিন্দি, ফারসি, এমন কি আরবি ভাষায় রচিত টপ্পার মধ্যেও পাওয়া যায়। এখনও পর্যন্ত তাঁর ১৬৯টি গান উদ্ধার করা গেছে। এছাড়া তাঁর রচিত বেশ কিছু পদাবলী কীর্তনেরও সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর রচিত টপ্পার চালটি নিধুবাবুর থেকে কিছু আলাদা। আরো সাবলাইম আর প্রেমসংলাপকেন্দ্রিক। উল্লেখিত দুরূহ টপ্পাটি গাওয়ার প্ররোচনা এড়িয়ে যেতে পারিনি। যদিও তার প্রতি সুবিচার করা সঙ্গতভাবেই আমার আয়ত্বের বাইরে। ১৯০৩ সালে গওহর জান এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু টপ্পা হিসেবে গা'ননি। এহেন একটি গান গাওয়ার ধৃষ্টতাকে বামনের চন্দ্রাভিলাষ অবশ্যই বলা যায়। দেড়শো বছরেরও অধিক পুরোনো একটি হারিয়ে যাওয়া বাংলা গান আগ্রহীদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার লোভ এড়ানো দুষ্কর বোধ হলো।
Sarita Ahmed
সে অনেককাল আগের কথা । ন’ঘরিয়া গ্রামে ছিল আমার দাদুর বাড়ি । দাদুরা ছিলেন চারভাই। সেটা বৃটিশ আমল । বেশ অবস্থাপন্ন জমিদারবাড়ি সেটি ,যদিও জমিদারি ছিল না তখন তবু কেতা ছিল ষোল আনা । আশেপাশে জ্ঞাতিজনদের নিয়ে বিশাল এক যৌথ পরিবারের বাস ছিল সেই গ্রামে। শোনা যায়, গোলাপ খাঁ নামের এক জমিদারের বাড়ির উনুন কোনও সময় নেভানো হত না , এত বড় ছিল সেই উনুন এবং তার উপর চাপানো হাঁড়ি যে গোটা গ্রামের মানুষ একসাথে পাত পেড়ে খেতে পারতেন । সেই গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মির্জা মোহাম্মদ খাঁ ছিলেন একজন জাঁদরেল সাহেব । ‘সাহেব’ উপাধি পাওয়ার কারণ ওনার চামড়ার রং আর সাহেবী মেজাজ – ঘোড়ার পিঠে চড়ে হান্টার ঘুরিয়ে পথচলতি জনতাকে ভীত সন্ত্রস্ত করা ছিল ওনার এক উগ্র রসিকতা । সেই বৃটিশ আমলে বেশ কিছু জমিদার গজিয়ে ওঠে গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে ।তাদের মধ্যে যারা ইংরেজদের বদান্যতায় নানা দপ্তরে অথবা জমিদারিতে চাকরি পান, তাদের জীবনযাত্রা এবং মেজাজেও সেই ধার–করা-সাহেবী-কায়দার ছাপ পড়ে । কতকটা সেরকমই ছিল এই পরিবার । আমাদের দাদুর পরিবার ছিল এই গোলাপ খাঁয়ের জ্ঞাতি । সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি তার উপর যৌথ পরিবার ; সুতরাং আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি খানদানি চটক ছিল দেখার মত – গোলাভরা ধান, প্রচুর গরু, ছাগল, মুরগী, লোকলস্কর, চাকর বাকর ইত্যাদিতে ভরা । অন্দরমহল গমগম করত স্ত্রীলোক এবং পুত্রকন্যাদের উচ্চকিত হর্ষে । তবে পর্দাপ্রথার চল থাকায় সেসব শব্দ বাইরে খুব একটা যেত না । এহেন বনেদি খান বাড়ির সামনেই ছিল একটা মসজিদ আর তার পাশেই ছিল একটা খানদানি কবরস্থান । তাঁদের চার ভাইয়ের মধ্যে আমার দাদু ছিলেন একটু আলাভোলা গোছের মানুষ । চাষবাস করে সংসার প্রতিপালন করতেন আর রাত কাটাতেন মসজিদ চত্ত্বরে । নিরীহ ধার্মিক মুসলমান বলতে যা বোঝায় ইনি ছিলেন ঠিক সেরকম একজন । স্বাধীনতার ক’বছর পরের কথা । সেদিন ছিল জানুয়ারির এক শীতের রাত । তখনকার দিনে গ্রামের মানুষেরা বেশি রাত জাগত না । সন্ধ্যে ৭ টার পরেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমের আয়োজন শেষে লম্ফ নিভিয়ে দেওয়াই ছিল রেওয়াজ । তখন কত রাত খেয়াল নেই, মেজ দিদিমার ঘুম ভেঙ্গে গেল । পাশে হাত পড়তে টের পেলেন মেজদাদু বিছানায় নেই । বাইরে কোথাও শৌচে গেছেন হয়তো ভেবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন । কিন্তু তিনি ফিরলেন না । দিদিমা বাইরে এলেন। পাশাপাশি সব ভাইয়ের ঘর । এত রাতে কার ঘরে টোকা মেরে জাগাবেন ঠাহর করতে না পেরে তিনি হ্যারিকেনের শিখা বাড়িয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে বাইরের মসজিদের দিকে চললেন । বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়েই আমার দাদুকে ঘুম থেকে তুলে মেজদাদুর হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার কথা বলতেই , দাদু স্মিত হাসলেন । -“ মেজ ভাই ঠিক আছে, আপনি ঘরে যান । ঘুমিয়ে পড়েন ভাবি, দেখবেন ভাই ভোরের দিকে ঠিক চলে আসবে।” ছোট দেওয়ারের এমন হেঁয়ালিতে কিছু বুঝতে না পারলেও এটুকু ধরা গেল যে মেজভাইয়ের উধাও রহস্যটা উনি জানেন । সে রাতে তাঁর ঘুম এল না। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিল , কিন্তু পাশ ফিরতেই উনি টের পেলেন কত্তা শুয়ে আছেন পাশে । ধড়মড় করে উঠে বসে তিনি ধাক্কা দিয়ে জাগালেন ওনাকে তারপর শুনলেন সবটা । -“ আহা, অত চিন্তা কেন কর ? আজ ওদের ডাক এসেছিল যে ! সন্ধ্যে থেকেই পোলাও মাংসের সুবাস পেয়েই বুঝেছি রাতে যাওয়া লাগবে।” -“মানে ? কাদের কাছে গিয়েছিলেন ? কারা ডেকেছিল ?” -“শশহহ ... সবটা বলা বারণ । তবু তুমি স্ত্রী । তাই বলছি । মসজিদের পেছনে পীরপুকুরে যেতে হয়েছিল । জ্বিন পরিদের বে’ ছিল যে ! আমার না গেলে চলবে কেমনে , বিয়ে পরাতে হবে না! সারারাত ভোজ চলল, ভোরবেলা ওরা দিয়ে গেল বাড়িতে ।” মেজদিদিমা এ কথার কোনো মানে বুঝতে পারেন নি । তবে যখন দেখলেন প্রতি মাসেই দু একদিন করে এমনভাবে মেজদাদু রাত্রে উধাও হয়ে যান আর ভোরবেলা ফিরে আসেন – তখন ব্যাপারটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিলেন । কারণ এ ঘটনার প্রধান সাক্ষী ছিলেন আমার দাদু । জ্বিনপরিদের নিয়ে বেশ কিছু গল্প ওই অঞ্চলে চালু আছে , বেশিরভাগ মানুষ তাতে বিশ্বাসও করেন । আর দাদুদের বংশে জ্বিনদের নাকি বরকত ছিল । এই নিয়ে বহু ঘটনা ঘটেছে , সেগুলো অলৌকিক কিনা বলতে পারব না, তবে লৌকিক তো মোটেই না । মেজদাদু মানুষ হিসেবে সৎ ছিলেন । মূলত মেজদাদুই ছিলেন আমার দাদুর প্রধান সহচর ও বন্ধু । তা সেই মেজদাদু যখন মারা গেলেন তখন বাড়ির অবস্থা খানিক করুণ – জমিদারি তো অনেকদিন আগেই গেছে, এখন গৃহস্থ বাড়ির সেই জৌলুসও অস্তগামী হতে চলল । তবু বিপদ আপদে বেশ কিছু অদ্ভুত সুরাহা মিলতে লাগল । এক বর্ষার সন্ধ্যেবেলা মেজদাদুর আদরের নাতি মানে আমার মামাতো ভাই – আনিস, হারিয়ে গেল। বাচ্চাটি উঠোনে বসে খেলছিল , আশেপাশে তাকে ঘিরে ছিল মামারা এবং অন্যান্য সদস্যরা । বাড়ির মহিলারা তখন রাতের খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত , হঠাৎ ছোট মামির খেয়াল হল আনিস নেই । নেই তো নেই । আমার ছোট মামা বরাবরই ডাকাবুকো ধরণের । তিনি তখন গ্রামের কিছু লোক জড়ো করে লাঠি সোঁটা নিয়ে গেলেন খুঁজতে । রাত বাড়তে লাগল কিন্তু নাহ, কোনও খোঁজ মিলল না। ছাদ, চেনা পরিচিতের বাড়ি, মসজিদ, পুকুর তলা, কোত্থাও তার চিহ্ন নেই । রাত দশ’টা নাগাদ সবাই বিফল হয়ে ফিরে এল । বাড়িতে তখন কান্নাকাটি, শোরগোল। অত শান্ত ছেলে যে কিনা রাতের খাবার খেয়েই ঘুমে ঢলে পড়ে, সে হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে যাবে ?আর কেনই বা! এইসব চিন্তায় যখন সবাই উদ্বিগ্ন, তখন আচমকা এক কান্ড ঘটল । মাঝ উঠোনে এক্কেবারে আকাশ থেকে একটা চক পড়ল আর তারপর গোটা উঠন জুড়ে সেই চক আপন মনে ঘুরে ঘুরে উর্দূতে লিখতে থাকল “ কী করিস তোরা ! একটা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে পারিস না ! আজ আমি ছিলাম বলে জানতে পারছিস নইলে এ জন্মে ছেলেকে আস্ত পেতিস না । যা, গ্রামের শেষে বাঁশঝাড়ে গিয়ে খোঁজ । ঠিক মাঝখানে একটা শিশুগাছের পাশে যে জোড়া বাঁশ গজিয়েছে তার ফাঁকে দেখ – ছেলে বসে আছে । যাহ তোরা এক্ষুনি।” লেখা শেষ হতেই বিদ্যুৎ চমকালো সাথে কড়কড় করে বাজ পড়ার শব্দ । বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ার সাথে সাথেই সেই লেখা যেন ভোজবাজির মত উবে গেল । ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই যেন থম মেরে গেলেন । মামারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন , মামিরা ভয়ে আশঙ্কায় গুমরাতে লাগলেন – কিন্তু এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল সেই ব্যাপার যে কেউ চিৎকার করারও সাহস পেলেন না । শেষমেশ ছোট মামা সাহস করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন । সেজ মামা এবং সেজদাদুর এক পাইট-কে ( যারা কৃষিকাজে গৃহস্থের ফাইফরমাশ খাটে) সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গেলেন । কি আশ্চর্য – সত্যি সত্যিই ছেলে দুই বাঁশগাছের মাঝে বসে বসে ভিজছে -দুই হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুঁজে । টর্চের আলো পড়তেই ছেলে একটু নড়ে উঠল , কিন্তু উঠল না। ছোট মামা তার গায়ে হাত দিয়ে “কিরে , এখানে বসে আছিস যে বড় । চল বাড়ি চল।” যেইনা বলেছে অমনি ছেলে মুখ তুলল । ঘন ঘন বিদ্যুৎ আর টর্চের জোরালো আলোতে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে সবাই এক পা পিছু হটল - তার দুই চোখ যেন ভাঁটার মত জ্বলছে । লাল গনগনে চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় চোস্ত উর্দূতে সে বলেই চলেছে “ দায়িত্ব নেই, বাচ্চার দায়িত্ব নেই কোনো ! আমি না থাকলে কে বাঁচাত?” কোনো রকমে তাকে বাঁশঝাড় থেকে বের করতেই সে ছেলে মূর্ছা গেল । টানা সাতদিন সে বিছানায় ছিল , জ্বরের ঘোরে মাঝেমাঝেই ভুল বকত । ডাক্তার বদ্যি করেও যখন জ্বর ছাড়ল না তখন মামি তাকে নিয়ে গেল এক গুনীনের কাছে । সমস্তটা শুনে সে বলল ‘বাড়িতে কোনো ইবাদতওয়ালা বুজুর্গের ইন্তেকাল ঘটেছে ?’ মামি তখন মেজদাদুর মৃত্যুর কথা বললেন । সবটা শুনে গুনীন জানালো ‘কোনও ভয় নেই । এই বাচ্চার মধ্যে ওনার আত্মা ভর করেছিল সেদিন । আপনারা বড় ভাগ্যবান ,এমন ভালামানুষের ইবাদত ছিল বলেই ওকে ফিরে পেয়েছেন । নইলে সে রাতে শেয়াল কুকুরের পেটে যেত ছেলে । বাড়ি যান আর আপনাদের মেজবাবার নামে মসজিদে দোয়া করুন ।সব ভাল হবে।” তারপর বেশ কিছুকাল সব ভালোই কাটল । তবে একবছর বাদে আবার নতুন উপদ্রব শুরু হল । বাড়ির সর্বক্ষণের চাকর মনি উঠোন ঝাঁট দিতে গিয়ে কী যেন দেখে হঠাৎ ঝাড়ু ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে মসজিদে দাদুর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল । ‘কিরে, কি হয়েছে? কি হয়েছে ? অমন করছিস কেন?’ – উত্তরে সে সবাইকে উঠোনের ধারে নিয়ে গিয়ে যা দেখালো তাতে কারু মুখে কোনো কথা সরল না । উঠোনের ওপাশে যেখান থেকে কলতলা শুরু হয়েছে সেখানে চাপ চাপ রক্ত ! সেই রক্তের ধারা কোথাও সরু, কোথাও মোটা হয়ে পড়েছে । রক্তের ধারা অনুসরণ করে পৌঁছানো গেল পুরোনো রান্নাঘরের দিকে । সেখানে দাওয়ায় রক্ত, দেওয়ালে রক্তের ছিটে । এমন এমন জায়গায় রক্তের দাগ যেখানে কোনও কাটা স্থান থেকে রক্তপাত হতেই পারে না । এই পুরোনো রান্না ঘরটা বহুকাল থেকে বন্ধ । রান্নাবান্না সেই গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকেই চুকে গেছে । পরে চাকর পাইটদের থাকার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত। তবে গৃহস্থের অবস্থা পড়তির দিকে হওয়ার পর সেই ঘর পুরোপুরি তালা বন্ধই ছিল এতদিন । আজ সেখানে এমন রক্তের দাগ ! ছোটমামা ভেতরে ঢুকে দেখার পরামর্শ দিলেও কেউ সাহস করল না , এদিকে এতদিনের ব্যবধানে এঘরের তালায় জং ধরেছে, চাবিও গেছে খোয়া ! শেষমেশ দরজা ভেঙ্গে ঢুকে দেখা গেল ঘরের ভেতর কিচ্ছু নেই ! দরজার সামনে চৌকাঠ অবধিই দাগ , ভেতরে মাকড়সার জাল, ভাঙা আসবাব, ক’টা তুলো বের হওয়া তোষক আর ইঁদুর ছুঁচোর বিষ্ঠার গন্ধ ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই । সেদিনের ঘটনাকে সত্য প্রমান করে ক’দিন বাদে আবারও একই ঘটনা ঘটল । এবার সবাই নড়েচড়ে উঠল। কিন্তু গুনীনের কথায় সবার বিশ্বাসও হল না । শেষে গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন মানুষ সাইদুল ডাক্তারের কাছে শোনা গেল আসল খবর। নামের সাথে ‘ডাক্তার’ জুড়ে থাকলেও ১০১ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ ছিলেন গোলাপ খাঁয়ের খাস হাকিম । গাছ গাছড়া থেকে কবিরাজি পথ্য তৈরি করে বহুবছর সেবা করে এসেছেন খান পরিবারের । তাঁর কাছেই জানা গেল আসল তথ্য । সেইসময় প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের জন্য খাজাঞ্চী নিয়োগ হত । গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মির্জা ছিলেন সেই ব্যক্তি যার উপর ন’ঘরিয়া গ্রামের খাজনার দায় বর্তায় । এমনিতেই তিনি ঘোড়ায় চড়া হান্টারবাজ দামাল লোক, তার উপর সাহেবী মেজাজ এবং অজস্র বদঅভ্যাস ও কুকীর্তির জন্য বিখ্যাত । প্রজারা আক্ষরিকই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত । এক দুপুরে গ্রামের পথ দিয়ে আসার পথে তার নজর গেল এক বেদেনীর মেয়ের উপর । সে এবং তার এক প্রেমিক সাইকেল ঠেলে যাচ্ছিল । এদিকে মির্জার মনে কামনার আগুন । জোরপূর্বক সে মেয়েটিকে ঘোড়ায় তোলে এবং জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় । কিশোর প্রেমিক ভয়ে দ্বিধায় খানিক দোলাচলে থাকলেও পরে ছুটে যায় প্রেয়সীকে বাঁচাতে । কিন্তু নিয়তি তাদের জন্য অন্যকিছু লিখেছিল । মির্জার হাতে খুন হয় দুইজন । তাদের দেহ কেটে এই জমিতে পুঁতে দেওয়া হয় । তখন এখানে পতিত জমি, দাদুরা সবাই ছোট ছোট । কেউই সেই লাশদুটোর হদিস পেল না। এদিকে সেই কিশোরীর বেদেনী মা, যার উপর মাঝে মাঝে ওলাই-পীর ভর করত, তার নিঁখোজ মেয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে দোরে দোরে ঘুরেও কিন্তু শেষমেশ ব্যর্থ হয় । তবে মরার আগে সে অভিশাপ দিয়ে যায় ‘যে লোক তার মেয়ের সর্বনাশ করেছে, যার জন্য তার মেয়ে বেপাত্তা হয়ে গেল সে নির্বংশ হবে এবং যদি কেউ বেঁচেও যায় তো তার জ্ঞাতিপুরুষের ভিটায় রক্তস্রোত বইবে, সাপ নাচবে’ ইত্যাদি । কাকতালীয় ভাবে তার মৃত্যুর মাস কয়েকের মধ্যেই মির্জা খাঁ ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান । তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪২ বছর । বৃদ্ধ সাইদুল কাশতে কাশতে যখন পুরো বৃত্তান্ত শেষ করলেন তখন আকাশে চাঁদ উঠেছে ,প্রতিপদের পরের চাঁদ । সবাই ফিরবে বলে উঠতে যাচ্ছে তখনই আবার ঘড়ঘড়ে গলায় সাইদুল বলে উঠলেন, ‘তোদের সবাই ঝাড়ে বংশে শেষ হয়ে যাবি। খুব শিজ্ঞির।পাপ ঢুকেছে, পাপ।’ পাপ সত্যি ঢুকেছিল । মাস ছয়েক বাদে আচমকা বড় দাদু মারা গেলে তার ছেলেরা জমিবাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি আরম্ভ করল । সেজদাদু যদিও ছিলেন নিঃসন্তান তবু জমির ভাগ নিয়ে লড়াই ছাড়লেন না। শেষে বাপারটা এমন গড়াল যে জ্ঞাতি ভাইরা আপন ভাইদের মিথ্যে অপবাদ দিতে, এমনকি মারামারি করতে অবধি পিছপা হল না । মেজদাদুর ছেলেরাও পিছিয়ে রইল না, নকল কাগজপত্র বানিয়ে জমিদখল করতে তারাও উঠে পড়ে লাগল । এইসব শরিকি বিবাদে যখন ন’ঘরিয়ার বিখ্যাত খানদান ছারখার হয়ে যেতে লাগল তখন ঘটল এক অভুতপূর্ব ঘটনা । আমাদের দাদুবাড়িরটা ছিল দেড়তলা । পেছনে ছিল বাগান আর পুকুর পাড় । উপরের ছোট ঘরটা ছিল ছোটদিদার । তবে মেজদাদু মারা যাওয়ার পর থেকে মেজদিদা ছোটদিদার সাথেই সেঘরে শুতেন । কিন্তু যেটুকু সময় তাঁরা থাকতেন না ,ওই ঘর থাকত তালাচাবি বন্ধ । দাদু তো বারোমাস মসজিদবাসী , ঘরে শুধু স্নান-আহার আর দরকারি কাজের জন্য থাকা । বাকিটুকু সময় হয় জমিতে, নয় মসজিদে । সেইরাতেও সবাই রাতের খাবার খেয়ে শুতে যাওয়ার পরে দাদুও মাদুর বালিশ নিয়ে গেলেন মসজিদে । নামাজ শেষে ওখানেই ঘুমাবেন নিয়মমত । তবে সেইদিন মেজদিদার শরীর খারাপ থাকায় ছোটদিদাও আর উপরে গেলেন না, নিচের একটা ঘরেই সেই রাত কাটাবেন বলে ঠিক করলেন যাতে জল , বাথরুম ইত্যাদি হাতের কাছে থাকে । এদিকে মসজিদে গিয়ে দাদুর নামাজ তো শেষ হল , কিন্তু ঘুম হল না, মনের ভেতরটা সমানে আনচান করছে যেন। মসজিদের বারান্দায় মাদুর পেতে গায়ের জোব্বাখানা খুলে মাথার কাছে রেখে ‘আল্লাহ মালিক’ এর নাম নিয়ে সবে শুয়েছেন , কিন্তু কী যেন একটা শিরশিরে অনুভূতি তাকে স্থির থাকতে দিল না । রাত তখন বেশ গভীর । হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানিতে তিনি চোখ খুলতে বাধ্য হলেন । মসজিদের বারান্দা থেকে দেড়তলার ঘর স্পষ্ট দেখা যায় । সেদিক থেকেই যেন আলোটা আসছে ! চাঁদনী রাতের ফকফকে জ্যোৎস্নায় চোখ মেলে তিনি যা দেখলেন তাতে বিস্ময়ে ,ভয়ে বোবা হয়ে গেলেন । একটা সোনার রথে চড়ে প্রায় দশ বারোটা জ্বিন পরি একসাথে সেই ছাদে নামল । তাদের রথ এবং গায়ের রং থেকে ঠিকরে পড়ছে সফেদ আলোর ঝলকানি । চাঁদনী রাতে সেদিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না , চোখে ধাঁধা লাগে । দাদু কোনোরকমে দেখলেন, তারা সবাই দেড়তলার ওই ঘরের ছাদে নামল আর তারপর সোনার ঘড়া থেকে রাশি রাশি মোহর ঢেলে দিতে লাগল ছাদের উপরে । সেগুলোর ঝনঝন শব্দ দাদুও শুনতে পেলেন যেন । ভয়ের চোটে তিনি কলমা পড়তে শুরু করলেন , কিন্তু তাকে হতবাক করে দিয়ে এক জ্বিন উড়ে এল যেন তার সামনে । হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তার দিকে একমুঠো মোহর দেখালো আর হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল ‘আয় , নিবি ? আয় আয়...’ দাদু চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাস উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন , ‘তোমরা যেই হও, ফিরে যাও। আমার এসব লাগবে না কিছু। আমার যা আছে তাই দিয়ে ভাল আছি । তোমরা যেখান থেকে এসেছ সেখানেই ফিরে যাও, আমাদের ক্ষতি কর না, বাবারা । ফিরে যাও, আমার এসব চাই না... কিছু চাই না ...’ কতক্ষণ তিনি ওভাবে চোখ বুঝে বিড়বিড় করেছিলেন জানা নেই, তবে একটা বিকট শব্দে তার চোখ খুলল আবার । দেখলেন জ্বিন নয়, রথ নয়, মোহর নয়- রাশি রাশি মৌমাছির ঝাঁক আকাশ কালো করে উড়ে যাচ্ছে ‘বোঁওওও’ শব্দে । দেড়তলার ওই ঘরের চালে চারটে বড় বড় চাক ছিল ডাঁশ মৌমাছির । সেইসবক’টা চাক থেকে মৌমাছির দল উড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ঘটল আরেক কাণ্ড । দেড়তলার ওইপাশটা পুরোটা একসাথে ধ্বসে পড়ল । তার শব্দ অবশ্য শুধু দাদু নয় সবাই পেল । শেষরাতের ঘুম ভাঙতে দেরি হল যাদের তাদের আর ঘুম ভাঙল না । বড়দাদুর পরিবার যেদিকটায় থাকতেন সেটা একেবারে চাপা পড়ে গেল । চিৎকার, কান্না, গোঁঙানির শব্দে সেইরাতের বাতাস ভারি হয়ে জানান দিল অশরীরিদের দাপট কেমন হয় । ভোরের আলো ফুটলে আশপাশের গ্রাম থেকে সবাই ছুটে এসে দেখল খানবাড়ির ধ্বংসস্তুপ । শুধু এক পাশে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের দাদুর বাড়িটাই, ছাদহীন অবস্থায় । অবিশ্বাস্যভাবে সে বাড়ির কারুর গায়ে আঁচড়টিও লাগে নি । এরপর কিছু জ্ঞাতিভাইয়েরা পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশ চলে যায় । কিছুজন রয়ে যায় সেই গ্রামেই তবে বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্যত্র বাসা বেঁধে। কিন্তু আমার দাদু এবং মামারা কেউ ওই ভিটা ছাড়তে পারেন নি । নাহ, তারপর থেকে অলৌকিক এমন ঘটনা না ঘটলেও দিদা মাঝে মাঝে টের পেতেন ঝুমঝুম আওয়াজে সে যাচ্ছে । জ্বালানীর স্তুপ থেকে পাটকাঠি হাতে ঠকঠক করতে দেখেছি আমরা তাকে । যদিও আমাদের বয়স তখন খুবই কম, তবু মনে আছে । -‘কি করছ দিদা , কি তাড়াচ্ছ ?’ -‘শশহহ... ও যাচ্ছে । হেই হেই, যেখানে যাচ্ছিস যা। এদিকে আসিস না।’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে বলতেন ‘বেদেনীর অভিশাপ বিফলে যায় নি বেটা । বাস্তুসাপ হয়ে সে এখনো এই ভিটায় ঘুরে বেড়ায়। ক্ষতি করে না, আগলে রাখে -সে আমি খুব জানি ।’ আমরা আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেতাম না ।
মনোজ ভট্টাচার্য
ভুতুড়ে বিজনেস ! আমাদের বাড়িটা হল সাড়ে তিনতলা । মানে তিনতলা প্লাস চার তলার ছাদে একটা ঘর । দোতলা তিনতলায় আমাদের হোল গুষ্ঠি থাকে ! আর এই ঘরটা – আমার আর বিভুর । – আমাদের নিজস্ব ঘর – কি অপার শান্তি – কোন ঝামেলা নেই । বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কয়েকজন আসে ঘুড়ি ওড়াতে – পাশের বাড়ি থেকেও ঘন্টুদা আসে ঘুড়ি ওড়ায় – কেটে যাওয়া ঘুড়ি নিয়ে যায় । এই বাড়ির দুদিকে দুটো বাড়িই তিনতলা । কিন্তু তাদের ছাদটা – আমাদের পাঁচিলের পাশেই । মাঝে একটা আড়াই ফুটের গ্যাপ – ওখান দিয়ে মেথর-ধাঙ্গড়রা নাকি যাতায়াত করত ! এখন তো বন্ধ থাকে । পাঁচিল টপকে এ বাড়ি ওবাড়ি করা কোনও ব্যাপারই নয় ! এই বাড়িটা যখন কেনা হল – শুনেছিলাম – কে একটা মেয়ে নাকি মারা পড়েছিল ওই পাঁচিল থেকে পড়ে গিয়ে । সে কিভাবে পড়ে গেলো কে জানে ! তাই তো এই ছাদে বিশেষ কেউ আসে না ! কলকাতার গণ্ডগোলের সময়ে বাবা আর জ্যেঠু আমাকে দিল্লিতে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিল ! তখন প্রায়ই দেখতুম কেউ না কেউ খুন হছে এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ! আমি তো কোনোদিন ওসবের মধ্যে ছিলুম না ! বিভু নীচে বাবা-মার ঘরে শুতো । ফলে এই ঘরটা প্রায় বন্ধই থাকতো ! কিন্তু ছাদে ঘন্টুদা নাকি রোজই আসতো ! ঘন্টুদাকে তো চিনিস – পাশের বাড়িতে থাকতো – মাস্তানি করে পাড়ায় । সবাই বলে – ঘন্টুদা নাকি ওয়াগন-ব্রেকার । বাবা কিছু বলত না । তবে ছাদের দরজাটা বন্ধ রাখত ! ঘন্টুদা এই ছাদে কেন আসতো জানিস ? – হুঁ হুঁ ! পাশের বাড়ির টুম্পাদিও আসতো । দুজনে প্রেম করত । - ঘন্টুদা তো আর কোথাও যেতে পারত না ! ওদের নাকি হিস্যার গণ্ডগোল হত । দলের লোকেরাই ঘন্টুদাকে মেরে দিত । ঘন্টুদা তো পকেটে এই বড় একটা স্প্রিঙ্গের ছোরা রাখত ! বিভু নাকি নিজের চোখে দেখেছে ! আরে - সে তো হল – এ সবের সঙ্গে ভুতের কি সম্পর্ক ! – অনেকক্ষণ পরে আমি না জিজ্ঞেস করে আর থাকতে পারলাম না ! বলছি ! শোন মন দিয়ে । - প্রায় ফিশ ফিশ করে একটু অন্য সুরে বলল ! ভুতের গল্প লেখার ব্যাপারে আমি খুব একটা পারদর্শী নই ! নিজে তো ভুত দেখতেই পাই না – শুধু আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে মাঝে মাঝে একটু ভয় পাই ঠিকই ! তবে কত লোকে কত রকম অশরীরি ঘটনার কথা বলে বটে ! এই রকম একজন ছিল – শিবেন – আমার বন্ধু ! ও আগেও খুব রহস্য করে বাতেল্লা মারত । আজও যে কি বলবে – কে জানে ! ও-ই আমাকে একদিন ওর সাথে দেখা করতে বলেছিল । কি একটা রহস্যময় ব্যাপার আছে! এই পুরো ঘটনাটা তারই বলা একটা কাহিনী ! গণ্ডগোলের কলকাতা থেকে ওকে সুদুর দিল্লিতে মামার বাড়িতে রেখে পড়াশুনো করাচ্ছে ওর বাবা মামা । সম্প্রতি কিছুদিন এখানে এসেছে । আবার দিল্লিতেই চলে যাবে ! এরই মধ্যে একদিন দিল্লিতে বসে শুনতে পেলাম – টুম্পা নাকি আমাদের বাড়ির পাঁচিল থেকে পড়ে মারা গেছে ! তুই তো জানবিই ! – সেই নিয়ে জ্যেঠুকে খুব হুজ্জৎ পোয়াতে হল ! – জ্যেঠু বলল – আমাদের কেউ ছাদে আসে না । আর ছাদের দরজায় তালা দেওয়া থাকে ! কিন্তু আমার এতদিন ধারনা ছিল – ঘন্টুদাই টুম্পাদিকে মেরেছে ! এখানে এসে অনেকেই সেই কথা বলল ! – টুম্পাদি নাকি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছিল ! আমি শিবেনকে থামালাম । - দাঁড়া দাঁড়া! কই আমরা তো এসব শুনিনি ! আর হাসপাতালেও তো পোষ্ট মর্টেম রিপোর্ট দিয়েছে । তাতে তো প্রেগনান্সির কথা নেই ! ও । বিভুও অবশ্য সেই কথা বলল ! কিন্তু সবাই এরকম রটালো কেন তাহলে ! শিবেন বেশ আশ্চর্য ভাবে বলল ! – তাহলে তো পুলিশ ঘন্টুদাকে অ্যারেস্ট করত ! তাই না ! তাহলে কে এসব কথা রটায় – কে জানে ! এবার তোকে একটা খুব সিরিয়াস কথা বলবো – কাউক্কে বলবি না ! ঘন্টুদা আমার কাছে পরশুদিন রাত্তিরে এসেছিল । শিবেন গলাটা খুব চেপে বলল । সে কী ! কেন ? ঘন্টুদা বলল – ও মেরেছে ? না-না ! তা নয় ! তবে ঘন্টুদা খুব কাঁদল ! কাঁদল কি রে ! – আমি তো অবাক ! ঘন্টুদা কি সত্যি মার্ডার করেছে নাকি ! তা জানিনা – তবে ঘন্টুদা একটা আশ্চর্য কথা কথা বলল ! শোন ! ইন্টারাপ্ট করবি না ! পরশুদিন রাতে – বিভু তখন ঘুমিয়ে পরেছে – ঘরে আলো জ্বলছে দেখে ঘন্টুদা পাঁচিল টপকে এসেছে । আমি তো খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি ! – সত্যি কথা বলতে কি একটু ভয়ও পেয়েছি । অনেকদিন কথা বার্তা নেই ! – ঘন্টুদা আমার হাতদুটো ধরে বেশ খানিকক্ষণ কাঁদল । তারপর বলে কিনা – শিবু, টুম্পাকে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরেছে কে জানিস ? ওই মাঙ্কু ! মাঙ্কু ! মাঙ্কু কে ? মাঙ্কু – আগে এই বাড়িতে থাকতো ! সুইসাইড করেছিল । ওর ইচ্ছে ছিল – ধ্রুবদাকে বিয়ে করবে । কিন্তু ধ্রুবদা ওর হাত থেকে বাঁচতে জার্মানি চলে গেছিল ! – সেই রাগে মাঙ্কু এখানে পাঁচিল থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল ! সুইসাইড নোটও লিখেছিল ! ধ্রুবদাদের বাড়িতে সবাই অবাক ! কেউ কিছুই জানে না ! আর ধ্রুবদা তো তার আগেই জার্মানি চলে গেছে ! সে তো কিছুই জানেনা ! ও কেস টেঁকে নাকি ! আমি আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম – কিন্তু সেই মাঙ্কু তো আগেই মরে গেছে ! সে আবার মারবে কি করে ? – ভুত হয়ে এসেছিল ? হ্যাঁ – ঠিক তাই ! – ওর মধ্যে একটা প্রতিহিংসার ইচ্ছে ছিল ! এই বাড়িতেই ও থাকতো কিনা ! – ঘন্টুদা কিরকম অবলীলাক্রমে বলে যাচ্ছে আমাকে । - আমি আগেও খেয়াল করেছি – আমি আর টুম্পা একসঙ্গে হলেই মাঙ্কু তোদের এই দরজার পাশে এসে দাঁড়াত । একদৃষ্টে দেখত আমাদের ! তখন কিছু বল নি মাঙ্কুকে ? সে কেন এভাবে এসে দাঁড়ায় ? না ! বলিনি কারন টুম্পা যদি ভয় পেয়ে যায় ! – জানিস তো মেয়েদের মধ্যে একবার ভুতের ভয় ঢুকলে – কি রকম শকড হয়ে যায় ! – আর টুম্পা চলে গেলেই মাঙ্কুকেও আর দেখতে পেতাম না ! কি হিংসুটে ছিল না ! কিন্তু তুমি কি করে শিওর হলে যে মাঙ্কুই টুম্পাদিকে ধাক্কা মেরেছে ? শোন – টুম্পাকে আমি পাঁচিলের ওপর বসিয়ে কথা বলছি – হঠাৎ টুম্পা চেঁচালো – ঘন্টুদা আমাকে ফেলে দিচ্ছ কেন ? – আমি তো ওকে দুহাতে শক্ত করে ধরে রেখেছি – কিন্তু মাঙ্কুই ওকে জোর করে টানছিল ! – তারপর চোখের সামনে দেখলাম টুম্পা গলিতে পড়ে গেল – মাথাটা নীচের দিকে ! – ও শিবু – আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে টুম্পাকে ফেলে দিল ! – আমি কিছুই করতে পারলাম না ! – ঘন্টুদা আবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ! তারপর ? আমি তো হতভম্ব হয়ে গেছি ! তারপর আমি পাঁচিল ডিঙিয়ে বাড়িতে গিয়ে নীচে গিয়ে দেখি লোকে চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করে দিয়েছে ! – চেচামেচির চোটে জ্যেঠু ও কাকু নীচে গিয়ে পেছনের দরজা খুলে দিতে লোকে টুম্পাকে বার করে রিক্সয় করে – টুম্পার বাবাকে ডেকে নিয়ে আর জি কর হাসপাতালে নিয়ে গেল ! – তখনই তো টুম্পা অলরেডি ডেড ! তারপর পুলিশ আসে নি ? হ্যাঁ – পুলিশ এসেছিল । আমাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করলো । আমি সত্যি কথা বললেও তো ওরা বিশ্বাস করত না ! তাই আমি বলে দিলাম – আমি ছিলাম না ! চিতপুরে গেছিলাম ! - পুলিশ তো জানে আমি কি করি ! - শিবু - তুই অন্তত বিশ্বাস কর – মাইরী বলছি - আমি টুম্পাকে ধাক্কা মারি নি ! বিরাট নিঃশ্বাস ছেড়ে শিবেন আমাকে জিজ্ঞেস করলো – কিরে – কিছু বুঝতে পারলি! আমার তো মনে হয় - এ ক্লিয়ার কেস অব - - ! শিবেন কদিন বাদেই আমেরিকা বিলেত জার্মানি কোথাও চলে যাবে ! – ঘন্টুদাকেও আজকাল দেখছি – কিরকম পাগলা পাগলা ভাব ! – লোকে বলে টুম্পার দুঃখে নাকি ওর মাথাটা গেছে ! আজকাল পাড়াতেই বেশি থাকে – চিতপুর ইয়ার্ডের দিকে যায় না ! – এখন আর এসব কথা বলে লাভ কি ! এর তো কোনও সঠিক প্রমানও নেই ! তার চেয়ে বলা ভালো – এ ক্লিয়ার কেস অব মিষ্টিরিয়াস – ভুতুড়ে বিজনেস ! মনোজ #ভুতের_গল্প
Swadesh Manna
#দেওয়াল_লিখন ©স্বদেশ মান্না ************* সুমন্ত লাহিড়ীর সঙ্গে আমার আলাপ ডাক্তারি পড়তে গিয়েই। ইনফ্যাক্ট সুবিশাল মেডিক্যাল কলেজটায় প্রথম দিন অন্যদের তুলনায় একটু আগেই চলে গিয়েছিলাম। কেউই প্রায় এসে পৌঁছায়নি। একা একা অপেক্ষা করছি। এমন সময় মাঝারি হাইটের, চশমা চোখে জিন্স আর টি শার্ট পরে খুব সাধারণ চেহারার আমারই মত একজন এগিয়ে এসেছিলো আমার দিকে। ইতস্তত করতে করতে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম। হাত বাড়িয়ে বলেছিলাম হাই আমি সুরেশ। ফার্স্ট ইয়ার। আমি সুমন্ত, সেম। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল। প্রথম আলাপেই বুঝিয়ে দিয়েছিল ছেলেটা খুব অন্তর্মুখী ধরনের। আমিও খুব বেশি ঘাঁটাইনি। তারপর আস্তে আস্তে একসাথে ক্লাস করা, হোস্টেলের ছাদে আড্ডা মারা, আরসালানে বিরিয়ানি খেতে যাওয়া হতে হতেই কখন দুজনে কাছাকাছি এসে পড়ছিলাম। পড়াশোনায় দুজনেই মাঝারি মানের ছিলাম। পাশ করে যেতাম। থার্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে সুমন্ত একটু একটু পাল্টে যেতে লাগলো। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকতো। জিগ্যেস করলে উত্তর পেতামনা। ওর নাকি রাতে ঘুম হয়না। করা নাকি ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে! আমি অনেক বুঝিয়েও ওকে স্বাভাবিক করতে পারিনি। আসলে গ্রাউন্ড ফ্লোরের যে রুমটাতে ও থাকে সেই রুমটার একটু বদনাম আছে। সচরাচর কেউ বেশিদিন থাকতে পারেনা ওখানে। কারনটাও সবার জানা। পাশেই মর্গ। গন্ধ তো আছেই। কিন্তু কেউ কেউ বলে রাত্তির হলেই মাঝে মাঝে অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসে, যেগুলো ঠিক জাগতিক নয়। অস্বাভাবিক ধরনের। শুরুতে সুমন্ত এসব পাত্তা দেয়নি। আমরাও না। একা একাই ওই রুমে ও থাকতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। ছেলেটা চোখের সামনে কেমন যেন একটা হয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়েই আমিও পরীক্ষার কিছুদিন আগে ওই রুমে শিফট করলাম। দুই বন্ধু এখন দুই রুমমেট। আর চিন্তা নেই। আমি সুমন্তকে আশ্বস্ত করেছিলাম। ও কিন্তু খুব একটা ভরসা পায়নি। ভয়টা কাটছিলোনা ওর। বরং আরো বেড়ে যাচ্ছিল। আমি অবশ্য নতুন কিছু ব্যাপার দেখিনি এখানে আসার পর। সবটাই ওর মনের অসুখ বলে ধরে বেঁধে সাইকিয়াট্রিস্ট ও দেখলাম একবার। কিন্তু নিয়মিত ওষুধ খেয়েও ওর মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন এলোনা। বরং মাঝে মধ্যেই বলতো দেখিস একদিন তুইও প্রমান পাবি ওদের। ওরা আছে, আশেপাশেই। ওরা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারেনা অতো সহজে। যথারীতি ওর কথাগুলো আমি বা আমরা হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ওকে বোঝানো যেতনা। সেদিন ছিল শুক্রবার। পরীক্ষা শেষ। সবাই বাইরে খেতে যাওয়ার প্ল্যান হলো। সুমন্ত গেলোনা।বেরোনোর সময় বললো ভীষন মাথা ধরেছে। ঘুমাবে।জোর করলামনা। বরং একটু ঘুম দিলে যদি সুস্থ হয় ছেলেটা। ফিরতে ফিরতে একটু রাতই হয়েছিল সেদিন। রুমে ঢুকে দেখি আলো নেভানো। সুমন্ত ঘুমাচ্ছে। আমিও আর বিরক্ত করিনি ওকে। অন্ধকারের মধ্যে আমার বিছানাটা খুঁজে নিয়ে শরীরটা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। গত পনেরদিনের রাতজেগে পড়া, আর পরীক্ষার ধকলে নিমেষে ঘুমের জগতে তলিয়ে গিয়েছিলাম। খুব গাঢ়ই ঘুম হয়েছিল সেরাতে। ভেঙেছিল একটু বেলা করেই। ঘুমের ঘোর কাটতেই চোখ গিয়েছিলো ওর বিছানার মাথার দিকের সাদা দেওয়ালটায়। রক্ত দিয়ে এলোমেলো ভাবে সেখানে লেখা ছিল -'ভাগ্যিস রাতে আলোটা জ্বালিসনি'। দেওয়ালের কাছে মেঝের উপর সুমন্তর রক্তাক্ত দেহটা পড়েছিল। আর হ্যাঁ হাতের লেখাটা সুমন্তর নয়! ©স্বদেশ মান্না (সব চরিত্র কাল্পনিক) #ভুতের_গল্প
মিতা
এই সাইট টি খুব ভাল লাগলো| কিছুদিন ধরে এ পাতায় আসছিলাম‚ নীরবে| ভূতের গপ্প লেখার আমন্ত্রন দেখে কিছু লিখতে ইচ্ছে হল| এবারে শোনাই সেই ভূতের গল্প: সময়্টা ১৯৯০র সামার| আমরা ইংল্যান্ড বেড়াতে গেছি| লন্ডন থেকে ভাসুরের বাড়ি এডিনবরা যাবো গাড়িতে‚ নানা জায়্গায় থামতে থামতে‚ আর রাত্তিরে থাকবো পথে পড়ে দাদার বন্ধু কুশলদার বাড়ি ব্র্যাড্ফর্ড নামে একটা ছোট শহরে| সেই সময় সেল ফোন ছিল না‚ লন্ডন থেকে বেরোবার আগে কুশলদাকে ফোন করে জানানো হল আমাদের প্ল্যান‚ কুশলদাও খুব সোৎসাহে রাজি| যা হোক‚ সকালে লন্ডন থেকে বেড়িয়ে কেমব্রিজ ইত্যাদি ঘুরে সন্ধ্যের পর আমরা পৌঁছুলাম সেই শহরে| এটি একটি পুরোনো ছোটো শহর‚ রাত্তিরে আর বিশেষ কিছু দেখা গেল না| কুশলদার বাড়ি গিয়ে শুনি ওঁর বৌ ও ছেলে দেশে গেছে গরমের ছুটিতে‚ আর আমাদের সেটা জানান নি‚ পাছে শুনে আমরা না আসি| উনি নিজেই রান্না করে রেখেছেন আমাদের জন্য‚ তবে আমাদের দেরি দেখে একাই পান পর্ব শুরু করে দিয়েছেন এবং সেটা মোটামুটি মনে হোল অনেক ক্ষন ধরেই চলছে| আমাদের বলে দিলেন ওপরে আমাদের জন্য বেড রুম রেডি করা আছে| আমার জায়ের কাছে আগেই শুনেছিলাম বৌদি মানে কুশলদার স্ত্রী সুগৃহিনী‚ এবার তার পরিচয় পেলাম| বাড়িটি পুরোনো কিন্তু খুবই রুচি সম্মত সুসজ্জিত| কুশলদাও অত্যন্ত সুদর্শন‚ আলাপী‚ বন্ধু বত্সল এবং রোমান্টিক| আমার নাম জিগেস করে আমার বর কে বললেন 'এর তো নাম শুনেই বুকে ধাক্কা লেগে যায়'| আমি আমার বর কে ইশারায় ওঁর পানীয় গ্লাস দেখালাম| যাই হোক‚ আমরা ওপরে গেলাম‚ আমাদের ঘরে ফ্রেশ হয়ে এসে ডিনার করবো| দেখি ও পাশের একটি ঘর থেকে সালোয়ার কামিজ পরা এক মহিলা বের হয়ে এসে আমাদের 'নমস্তে' বললেন| মহিলাকে দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত‚ চল্লিশোর্ধ পাঞ্জাবি মহিলা মনে হল| আমাদের হতভম্ব ভাব দেখে মহিলা বললেন 'ও তোমাদের কুশল বলে নি বুঝি আমার কথা! ড্রিংক করতে শুরু করলে ও সব ভুলে যায়| আমার নাম কবিতা অরোরা‚ আমি ওদের বন্ধু হই| সুনিতা (কুশলদার স্ত্রী) দেশে তো‚ তাই আমি কুশলের খবর নিতে আসি মাঝে মাঝে‚ আর আজ তোমরা আসবে বলে ওকে একটু সাহায্য করছিলাম| যাও তোমরা চেঞ্জ করে খেতে এস‚ আমি সব রেডি করছি' বলে মহিলা নীচে চলে গেলেন| আমদের একটু অবাক লাগলেও মহিলার ভদ্র ব্যবহার ও কথা বার্তা শুনে খুব ভাল লাগলো| পরে নীচে খেতে গিয়ে দেখলাম পরিপাটি করে টেবিল সেট করা‚ খাবার গরম করা সব হয়ে গেছে| কবিতাজী খুব যত্ন করে খাওয়ালেন আমাদের‚ তবে কুশলদা অলমোস্ট ড্রান্ক থাকায় বিশেষ কিছু খেলেন না| উনিও দেখলাম কিছু বললেন না কুশলদা কে| ডিনারের পর কবিতাজী বললেন 'তোমরা তো এবারে বাঙলায় আড্ডা দেবে‚ আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি‚ রাত জাগতে পারি না একদম' বলে আমাদের গুড নাইট জানিয়ে ওপরে চলে গেলেন| আমাদের আড্ডা চলেছিল রাত তিনটে অব্দি‚ কুশলদা আড্ডাবাজ‚ আমুদে লোক‚ গল্প করতে করতে নেশার ঘোর ও কেটে গেছিল ওঁর| কত রকম গল্প শোনালেন আমাদের| আড্ডার শেষে হঠাৎ আমার বর কে জিগেস করলেন 'এই বাড়িটার বয়স কত বল তো? দেয়াল টা ধরে দেখ'| আমরা ধরে দেখলাম দেয়াল গুলো পাথরের‚ ঠান্ডা - আমি বাহাদুরি করে বললাম‚ মনে হয় একশো বছরের পুরোনো বাড়ি| কুশলদা হেসে বললেন 'আর ও পঞ্চাশ যোগ কর| কত ভূত থাকতে পারে ভাব এই পুরোনো বাড়িতে!' শুনেই তো আমাদের গা শিরশির করতে লাগলো| রাত তিনটে তে দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ির ভূতের গল্প শোনার চাইতে ঘুমিয়ে পড়াই ভাল মনে হলো| কুশলদা সত্যিই ভালো হোস্ট‚ এত রাতে ঘুমিয়েও সকালে আমরা তৈরী হয়ে নীচে নামতে নামতে চা‚ জলখাবার সব রেডি করে ফেলেছিলেন| কবিতাজী কে নীচে না দেখে কুশলদা কে জিগেস করলাম উনি চা খাবেন না? কুশলদা খুব অবাক হয়ে বললেন 'কার কথা বলছো?' এবারে আমাদের অবাক হবার পালা‚ সে কি? কবিতাজী কাল আমাদের এত যত্ন করলেন ডিনারের সময়‚ আর সকালে কি উনি চলে গেলেন আমরা নামার আগেই? কুশলদা খানিক্ক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে রইলেন‚ তারপর বললেন 'কবিতার উপস্থিতি আমিও মাঝে মাঝেই টের পাই‚ বিশেষত সুনিতা বাড়িতে না থাকলে'| তারপর শোনালেন তাঁদের কথা| কুশলদা দিল্লিতে পড়াশোনা করেছিলেন ইকোনমিক্স নিয়ে‚ সেখানে তাঁর সহপাঠিনি ছিলেন কবিতা অরোরা| দুজনের ভালবাসার সম্পর্ক হয়েছিল গভীর| এরপর লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ দুজন মাস্টার্স করে এবং বাড়িতে জানায় তারা বিয়ে করে সেটল করতে চায়| গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের এক মাত্র ছেলে পাঞ্জাবি মেয়ে বিয়ে করবে শুনে মায়ের হার্ট এটাক হয়ে যায়‚ মৃত্যু শয্যায় মাকে কথা দিতে হয় কবিতাকে বিয়ে করবে না| দু জনে সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে না করার| কবিতা দিল্লির কলেজে পড়ানোর চাকরী পেয়ে চলে যায়‚ কুশল থেকে যায় ইংল্যান্ডে| দুজনের যোগাযোগ কমে আসছিল| ইতিমধ্যে বাবা পীড়াপীড়ি শুরু করলেন তাঁর বন্ধুর মেয়ে সুনিতা কে পুত্রবধূ করে আনতে চান‚ কুশলকে রাজি হতে হয়| বিয়ের পর আর যোগাযোগ ছিল না কবিতার সাথে| ঘটনা চক্রে কয়েক বছর বাদে কবিতার সাথে দেখা হয় একটা কনফারেন্সে| কুশল তাকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে| কুশলের স্ত্রী‚ পুত্র‚ সংসার দেখে কবিতা বলে ‚ 'ভালই করেছ আমাকে বিয়ে না করে‚ সুনিতার মত এত ভাল গৃহিণী আমি কখনো হতে পারতাম না'| সুনিতা সব ই জানতো‚ কবিতাকে ওর ও ভালো লেগে যায়| এর পর কয়েক বছর কবিতা ইংল্যান্ডে আসলেই কুশল সুনিতার সাথে কয়েক দিন কাটিয়ে যেত| কখনো সুনিতা যদি নাও থাকতো তবুও আসতো‚ তাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছিল কবিতা| বছর দুই আগে কুশলরা খবর পায় কবিতার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে‚ তাও বেশ এড্ভান্সড স্টেজ| ওরা দিল্লি গিয়েছিল‚ কিন্তু কবিতা অনুমতি দেয় নি হাসপাতালে ওদের দেখা করতে দিতে‚ নিজের ক্যান্সার ক্লিষ্ট চেহারা ওদের দেখতে দিতে চায় নি| কবিতার চলে যাবার খবর জানিয়েছিল তার এক কলীগ| কুশলদা বললেন গত দেড় বছরে ওঁর মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে কবিতা এসেছে‚ কিন্তু স্বপ্নের মত অস্পষ্ট| আমরা যেরকম দেখলাম‚ কথা বললাম‚ সেরকম কিছু হয় নি| আমদের তখন মানসিক অবস্থা অভিভূত ...কিন্তু নাহ ভয় করে নি| এটি স্বপ্ন ও ভূতের মিলিত গল্প‚ ভূতকে সব সময় ভয় পেতে হবে এরকম কোন কথা নেই| অনেক সময় ত্ঁারা মনুষের চাইতেও বেশি ভদ্র সভ্য হন| #ভুতের_গল্প #ভুতের_গল্প
শিবাংশু
বর্ধমানের বাঁধমুড়া গ্রামে ১৮০৬ সালে ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছিলেন এই ধীমান মানুষটি। পীরগ্রামে মামা'র কাছে বাংলা আর ইংরেজি শিখে অল্প বয়সেই নীলকুঠির কেরানি হয়েছিলেন তিনি। এতোদূর পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু যখন কবিগানের নেশায় আকা বাইয়ের দলে যোগ দিলেন, বাড়ির লোক তাঁকে ত্যাগ করলো। এ কী ব্রাহ্মণের যোগ্য কাজ? ব্রাত্যজনের নেশা এই সব। তাও ছাড়েননি কবিগান। কিন্তু যখন কবিয়াল রামপ্রসাদ স্বর্ণকার তাঁকে আসরের মধ্যে তিরস্কার করলেন, তখন তিনি কবিগান ছেড়ে পাঁচালিরচনা শুরু করলেন। সেও সেই ১৮৩৬ সালে। এ পাঁচালি সাবেক লক্ষ্মী বা মনসার পাঁচালি নয়। সম্পূর্ণ নতুন ধরণে সমাজসচেতন, 'লোকশিক্ষে'র মাধ্যম ছিলো সেই সব গান। নবদ্বীপের উন্নাসিক পণ্ডিতসমাজ সেই পাঁচালিগানের নতুনত্ব দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। স্বয়ং রাজা রাধাকান্ত দেব ও বর্ধমানরাজের মতো দিগগজরা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। ১৮৫৭ সালে তিনি গত হ'ন। পাঁচালিকার হিসেবে বিখ্যাত হলেও তাঁর বিভিন্ন রকম বাংলাগানে গভীর ব্যুৎপত্তি ছিলো। মাতৃসঙ্গীত, বৈঠকী গান বা কীর্তন, বাংলাগানের সব শাখাতেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। তাঁর একটি টপ্পাঙ্গের গান, অক্ষম প্রয়াস করেছিলুম, সহিষ্ণু বন্ধুদের জন্য এখানে রাখ্লুম। দাশরথির ট্রেডমার্ক উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাশ এতো ছোটো পরিসরেও শুনতে পাচ্ছি আমরা.... কৃষ্ণের আক্ষেপ, " লিখিতে শিখিলাম আমি কই...."
James
পর্ব-২ ভারত ভ্রমণ| তা প্রায় এগারো বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে| এই তো সেদিন ২০০৬ সালে‚ মধ্যেকার বৎসর‚ মাস যেন ঝড়ের বেগে চলিয়া গেল| এইসব পশ্চিমী দেশে সময় যেন বড় দ্রুতবেগে ধায়| প্রাণ রাখিতেই প্রাণান্ত| একে তো অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তদুপরি গৃহকর্ম| দেশের ঝি চাকর পরিবৃত পিতা কণ্বের সংসারে লালিত‚ ননীর পুতুলের ন্যায় ছিল তাহার শরীর| রবি বর্মার চিত্রের ন্যায় শকুন্তলার গোলগাল‚ চিকনি চামেলী শরীর আজি শুকাইয়া কাঠ| তার উপর লন্ডনের এই আবহাওয়া! এখানে নবজাতরা ক্যাঁ করিয়া উঠিতেই নার্স তাহাদের হাতে একটি করিয়া ছাতা ও এক বাক্স নাক ঝাড়িবার টিস্যু ধারাইয়া অভ্যর্থনা করেন| 'বাছা‚ এই তো শুরু| বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া| সারাজীবনের সঙ্গীর সহিত পরিচিতি লাভ করহ|' জিয়েফসির ধাক্কায় দুষ্যন্তের চাকরী নট| আয় নাই অথচ তাঁর সেই রহিসি মেজাজ রহিয়া গিয়াছে| পাবে যাতায়াত অব্যাহত| পাইঁট কে পাইঁট আইরিশ বীয়র আকন্ঠ পানের অভ্যাস তাহার; কে যোগাইবে তাহার খরচ| অগত্যা লন্ডনের রাস্তায় ট্যাক্সি চালকের আসনে উপবিষ্ট হইয়া তাহার দিন কাটে| হায় রে কোথায় গেল‚ সেইসব সোনালী দিন| কলিকাতায় বুনি উঠিতে না উঠিতে তাহার মোটরবাইকে শহর পরিক্রমা‚ ছিপলি দেখিলেই হিড়িক মারা‚ সকলই গন উইথ দ্য উইন্ড| রয়্যাল এনফিল্ডের ভট ভট ভট‚ ডুব ডুব শব্দে শকুন্তলার সদ্য যৌবনা মস্তক থাউজ্যান্ড আরপিয়েমে ঘুরিবার ফলশ্রুতিই তো বকখালিতে গমণ| হায়রে যৌবন বড় ক্ষণস্থায়ী‚ 'জীবন প্রবাহ বহি কালসিন্ধু পানে' অতীব তাড়াতাড়ি ধায়| কবি গাহিয়াছেন‚ মহা বিশ্বে সবকিছু ধায়িছে টাইপের কিছু| শকুন্তলা কি অতশত জানেন‚ পালিত পিতার গৃহে গৌতমী মাতা ও পিতা কণ্বের আদরের দুলালী‚ অতি কষ্টে বি.এ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন‚ ভাগ্যিস| সেই সাদা মাটা বিএ তাহার সাথ দিতেছে এখন| একটি খুচ খাচ বি এড ডিপ করিয়া তিনি এখন একটি কিন্ডারগার্টেনের টীচার| এদেশে অবশ্য মিস বলিয়া সম্বোধনের চল নাই‚ ম্যাডাম অথবা স্যারও অপ্রচলিত‚ শুধুই মিসেস বসু| পশ্চিমী দেশ‚ ফরেন দূর হইতেই অতীব সবুজ মনে হয়‚ হীথরো'র ইমিগ্রেশন কাউন্টার পার হইবার পরই বুঝা যায়‚ হাউ মেনি প্যাডি মেকস হাউ মেনি রাইস! দুইজনে রোজগার করেন‚ নতুবা সংসার আজি কোথায় ভাসিয়া যাইতো ! মিনসের তো কাজে মন নাই‚ তাহার ইচ্ছা ডোল এ বসিয়া খাইবেন‚ পাবে ফুটা মস্তানী করিবেন; কথায় বলে স্বভাব যায় না ম'লে| এদেশে আসিবর পর দুষ্যন্ত ট'বাবুর স্টীল মিলে বেশ কয়েক বৎসর আরামে কাটাইয়াছেন| মেকানাইজড মিল‚ তাহার তো কোন টেকনিক্যাল কোয়ালিফিকেশন কোন জন্মেই ছিল না‚ স্টোরস ক্লার্ক| স্টীল মিলের স্টোরস বলে কথা‚ আদতে একটি বিশাল ফ্যাকটরি বলিলে অত্যুক্তি হয় না| কিন্তু সুখ সহিলো না তাহার কপালে| ঐ চাইনীজ ব্যাটারা যে সুলভ মূল্যে ইস্পাত সারা বিশ্বে সাপ্লাই করিবে কে জানিত| তাহার কলিকাতাতুত ভ্রাতা পিত্তলের দুনিয়াও টলোমলো চৈনিক আগ্রাসনের মুখে| সবার দিন কি একই ভাবে যায়! দুষ্যন্ত'র মাঝে মধ্যেই দেয়ালে লিখিত চেয়ারম্যানের বাণীর কথা মনে পড়ে‚ ঐ লোকটির কি অমোঘ দূরদৃষ্টি; বলো বলো ‚ বলো সবে চিল চিৎকারে কি জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন মেলে? শুধু কথায় কবেই বা চিঁড়া ভিজিয়াছে| উন্নতির নিমিত্ত চাহি পরিশ্রম‚ নিয়মানুবর্তিতা| তো ট'বাবুর ইস্পাত কারখানা হইতে রিডান্ডান্সি বাবদ কিছু থোক টাকা হাতে আসিয়াছিল| তাহা লইয়া দুষ্যন্তের ফুটানি কে দেখে! অসৎসঙ্গ তাহার ভূষণ| কয়েক সপ্তাহ নিরুদ্দেশ- টাকা ফুরানো অবধি থাইল্যান্ডে এসকর্ট পরিবৃত হইয়া হলিডে বানাইয়া ফিরিলেন| শকুন্তলা প্রথমে আন্দাজ করিতে পারেন নাই| ভাবিয়াছিলেন‚ বেচারীর চাকুরী নাই‚ আশিয়ান টাইগারদের দেশে ফোকসওয়াগনের নতুন কারখানা খুলিয়াছে‚ তথায় তাহার পতিদেবতা নিজ ভাগ্য ফিরাইবেন আর তিনিও তল্পি তল্পা গুটাইয়া ট্রপিকসে প্রস্থান করিবেন| ভরতকে লইয়া চিন্তা নাই কোনও বোর্ডিং স্কুলে দিলেই হইলো| আহা ট্রপিকস| পাপায়া‚ আম কাঁঠাল গাছ এমনকি নিম গাছ দেখিতে যে এত নয়নাভিরাম‚ তাহা কে জানিতো| চারি ঘন্টার উড়ানে এনেসসিবিআই ইয়ানী দমদম এয়ারপোর্ট‚ এমন দিন কি কভূ আসিবে| কিন্তু হায় রে শকুন্তলার কপাল| দুষ্যন্ত সেখানে মৌজ মস্তির নিমিত্ত গিয়াছেন তাহা শকুন্তলা আন্দাজও করিতে পারেন নাই| ঐসকল দেশে‚ পাব এ ‚ ডান্স বার এ বসিতে না বসিতে‚ ' উইল য়ু বাই মি এ ড্রিঙ্ক?'| ওয়ান থিং লীডস টু অ্যানাদার| বারওয়ালারা সম্যক অবহিত‚ কে কাস্টোমার আর কে ছেলেধরা| তাহাদের ব্যবসায় তো এই| জল ভিজাবো না ব্যবসায়ে অচল| আসল মুনাফা তো ঘন্টাপ্রতি ঘর ভাড়ায়| এসবের পরিণতি যাহা হইয়া থাকে‚ বাহ্ট ফুরাইতেই ঘরের ছেলে ঘরে| এবং দিনরাত গঞ্জনা ও পাব এর খরচ জুটাইতে এই ট্যাক্সি চালনা| শকুন্তলা নীরবে অশ্রুপাত করেন| ওসমান সাহেবের গৃহে অবস্থানের দিনগুলির কথা মনে পড়ে| শেষ বয়সে তাঁহার সিলেটে যাইবার ইচ্ছা বলবৎ হয়‚ সেখানেই তাহার ইন্তেকাল হয়; বাপ দাদা চাচাদের পাশেই মাজারে তাহার শেষ শয্যা| মার্গারেট পতির সহিত যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে বিচক্ষণ ওসমান তাহাকে নিবৃত্ত করেন| সেখানে মার্গারেট কখনই মানাইতে পারিবেন না ইহা তিনি সম্যক জ্ঞাত ছিলেন; কোথায় রানিং ওয়াটার আর কোথায় বা বাথরুম শাওয়ার? টিউকল তলায় ঘ্যাটাং ঘাটাং করিয়া গোশলের পানি আর দীঘিতে স্নান‚ মার্গারেটের কভূ সহ্য হইবে না| বরং স্মৃতিটুকু থাকুক| মার্গারেট এখন এক বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক| রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ের সঞ্চয়ের কিছু পাউন্ড ওসমান সাহেব সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ডে নিয়মিত জমা করিতেন; তাহাই ফুলিয়া ফাঁপিয়া মার্গারেটের খরচে লাগে| তিনি দয়াশীলা‚ শকুন্তলাকে নিজের কন্যার নায় আশ্রয় দান করেন‚ ঈশ্বর তাহার প্রতি কৃপা বর্ষণ করিয়াছেন‚ তিনি কাহারও দয়ার প্রতি নির্ভর নন| (চলিবে) ৩৪২১৯৬১৭
দীপঙ্কর বসু
সান্থালিখোলা পরের দিন সকাল নটায় একটা টাটা সুমোয় চেপে আমরা রওয়ানা হলাম সামসিং সান্থালিখোলার পথে । অবাক কান্ড , গাড়ির চালককে প্রথম দর্শনে আমার পছন্দ হলনা । রোগা টিং টিঙে চেহারা,গালে কয়েকদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি ,আর নাকের নিচে ফুলঝাড়ুর মত ঝুলন্ত বিচ্ছির একজোড়া গোঁফ ! তবে চালকবাবুর চেহারা যতই আমার মনে বিরূপতার জন্ম দিক না কেন ক্রমশ প্রকাশ পেল রায়চৌধুরি লোকটি অত্যন্ত ভদ্র – কিছুটা বেআক্কেলে হয়ত বা ।কিন্তু সে কথা পরে হবে । আপাতত আমরা দ্রুতবেগে চলেছি ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে । আমাদের দুপাশে ঘন সবুজ বন ।বেশ কিছুদূর চলার পর ডাইনে বাঁয়ে কয়েকটা মোচড় মেরে আটকে গেলাম একটা লেভেল ক্রসিং এ । গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আর সৌম্য নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে । যদিও রায়চৌধুরি মৃদু আপত্তি জানিয়েছিল আইনের দোহাই দিয়ে । এই বনাঞ্চলে নাকি পায়ে হেটে চলাফেরা করায় নিষেধ আছে ! পথের দু পাশে লম্বা লম্বা গাছের সবুজ বন । গাছগুলোর কালচে বাদামি গুড়ির ফাঁকে সবুজ পাতার ফাঁকফোকর গলে এসে পড়ছিল সকালের নরম রোদ্দুর । ভারি মায়াময় আলোআঁধারির সৃষ্টি হয়েছিল ।সেই সঙ্গে সবুজ ক্যানভাসের এখানে ওখানে লাল ,বেগুনি আর হলুদ রঙের ছোঁয়া ! এমন অপার্থিব দৃশ্য দেখে স্থির থাকা যায় ? গাড়ির মধ্যে নিজেকে আটকে রাখা যায় ? ইতিমধ্যে প্রচুর হাঁকডাক সহকারে ঝমাঝম করে উপস্থিত হল একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন । ট্রেন পার হয়ে যাবার পর গেট খোলার উপক্রম হচ্ছে দেখে রায়চৌধুরি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছেন দেখে আমরাও ঝটপট ফিরে এলাম যে যার আসনে । রায়চৌধুরির কাছে সংবাদ পেলাম কিছু দিন আগেই এই লেভেল ক্রসিঙের কাছেই লাইন পার হতে গিয়ে কয়েকটি হাতি নাকি ট্রেনের ধাক্কায় মারা পড়েছিল । মনে পড়ে গেল ঘটনাটা খবরের কাগজে বেশ আলোড়ন জাগিয়েছিল । তারপর থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সমস্ত ট্রেন চলে ধীর গতিতে – প্রচুর শোরগোল তুলে । বেড়াতে বেরিয়ে সময় বা দূরত্বের হিসেব করতে যাওয়া বৃথা ।স এহিসেব আমি রাখিও না,তাই লেভেল ক্রসিং থেকে ছাড়া পাবার পর কতক্ষণ চলেছি বা কত দূর গিয়েছি মনে নেই।মনে আছে সমতল পথে চলতে চলতে গাড়ি সহসা একটা বাঁক নিয়ে চড়াই ভেঙ্গে উঠতে লাগল ওপরের দিকে । গাড়ি টিলার ওপরের দিকে যেমন যেমন উঠছে নিচের দিকে সমতলের ঘরবাড়ি ,রাস্তাঘাট ,গাছপালা সবই ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে । বেশ কিছুটা চড়াই পথ অতিক্রম করে গাড়িটাকে একটা পাঁচিল ঘেরা পার্কার গেটের সামনে দাঁড় করালেন ।সুন্দর করে গোছান পার্কটা একেবারে খাদের গায়ে । আমরা সটান চলে গেলাম খাদের ধার ঘেঁষা পার্কের রেলিং এর কাছে ।সেখান থেকে দেখলাম অনেকটা নিচে ফেলে আসা জনপদ যেন ওপরের দিকে মুখ তুলেয়ামাদের দিকে হাত নাড়ছে। এখান থেকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে জনপদটাকে । তার খানাখন্দ , নালানর্দমা – এক কথায় যা কিছু অসুন্দর তা যেন প্রকৃতি একটা সবুজ চাদরে মুড়ে দিয়েছে । সে চাদরের জায়গায় জায়গায় বেগুনি রঙের ছোপ । মিনিট পনেরো কুড়ির বিরতির পর আবার আমাদের চলা শুরু হল । রাস্তার দুপাশে এখন পরের পর চা বাগান ।কোনটা ডানকান ,কনটা বা গুডরিক বা টাটা টি । দুই একটি চা বাগানের মাঝে বাংলো , দুই একটা টি প্রসেসিং প্ল্যান্টও দেখা গেল ।যদিও তার কোনটিতেই কোন কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়লনা । প্রায়ই শোনা যায় উত্তরবঙ্গে চা শিল্পের সঙ্কটেতর কথা ।হয়তো সেই সঙ্কটের জেরেই প্রসেসিং প্ল্যান্টগুলোর এমন ভুতুড়ে দশা । সে সব পিছনে ফেলে আমরা একটা জনাকীর্ণ বাজারের বিকিকিনি ছাড়িয়ে একটা সঙ্কীর্ণ গলি পথে ঢুকলাম ।পথের দুপাশে টিনের চালের ছোট ছোট বাড়ির সার । প্রতি বাড়ির সামনে একচিলতে কাঠের রেলিং ঘেরা বারান্দা ।দুএকটা বাড়ির সামনে দেখলাম অল্পবয়সী যুবকরা জটলা করছে ,আবার কোন কোন বারান্দায় বসেছে মেয়েলি গল্পের আসর । খাঁদা নাক , খর্বাকৃতি এ মেয়েদের পরনের বেশবাস চোখে পড়ার মতই রংচঙে । আমার মনে হল যেন বেগুনি আর আকাশী নীল রঙের প্রতি বেশ কিছুটা পক্ষপাতিত্ব আছে এদের । প্রতি বাড়ির বারান্দায় ছোট ছোট টবে নানা রঙের ফুলের গাছ সাজান রয়েছে ।তবে পোশাক আষাকে কিম্বা গৃহসজ্জায় যতই রঙের বাহার থাকুক না কেন বাড়িগুলো বেজায় নোংরা আর পাড়াটার দশা তথৈবচ । আমার মনোভাব আঁচ করেই রায়চৌধুরি মন্তব্য করে “ব্যাটারা মাসে একদিন চান করে কিনা সন্দেহ । কাছে যায় কার সাধ্য ।গায়ের গন্ধে ভুত পালায়”। বেলা এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম সান্থালিখোলায় একটা মোটামুটি সমতল জায়গা দেখে গাড়ি থামালেন রায়চৌধুরি । এর আগে কোন টুরিস্ট গাড়ির ই যাবার অনুমতি নেই । গাড়ির ভিতর থেকে মাটিতে পাদিয়েই চোখে পড়ল একটা ঘন সবুজ পাহড়ি টিলার দিকে । টিলার গায়ে ঝাঁকে ঝাঁকে লম্বা লম্বা গাছ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে হঠাৎ আমার পিতামহ ভীষ্মের শরশয্যার কথা মনে পড়ল । গাছগুলো ঘন সবুজ পাতায় মোড়া আর তাদের মাথার ওপরে ঘন কুয়াশার ওড়না বিছান ।টিলার গায়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন উচ্চতায় কয়েকটা বেশ সুন্দর বাংলো টাইপের বাড়ি চোখে পড়ল । মনে মনে ভাবলাম ওই রকম একটা বাংলোতে কয়েকটা দিন কাটাতে পারলে বেশ হত। এমনি কতশত ইচ্ছাই ত অপূরণ রয়ে গেল এ জীবনে । অনেকক্ষণ সেদিক থেকে আর চোখ সরাতে পারিনা । কিন্তু শুধু ওই টিলার দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবেনা এই চত্বর থেকে একটা ঢালু রাস্তা সর্পিল পথে নেমে গেছে বেশ অনেকটা নিচুতে । সবাই দেখলাম সেই দিকেই চলেছে ।সে পথের প্রান্তে কি আছে তা না জেনেই আমিও চললাম সবার পিছু পিছু । নিচের দিকে নামতে নামতে ভাবছি ফেরার সময়ে এই পথেই আবার চড়াই ভেঙ্গে উঠতে হবে পায়ে হেঁটে ।কাজটা খুব সহজ হবে না জানি ,কিন্তু কেমন জানি মনে একটা রোখ চেপে গেল । যা থাকে কপালে বলে ভাবনা চিন্তা ছেড়ে নামতে লাগলাম সর্পিল পথ ধরে। তবে পথের কষ্ট ভোলানোর জন্যে প্রকৃতি দেবী তার রূপের পশরা সাজিয়ে বসেছেন পথের ধারে । পথের ধার ফিটে আছে অজস্র বনফুল ,কত যে লতা গুলম ,ফার্ন গাছ কোথাও আবার পাথরে ফাটল বেয়ে নেমে আসছে শীর্ণ জলধারা ।চলার পথটাই এত সুন্দর যে পথের ক্লান্তির কথা মাথায় থাকেনা । নামতে নামতে অবশেষে গিয়ে পৌঁছলাম দুপাশের পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা এক খরস্রোতা নদীর তীরে । নদীর নাম সান্তালি খোলা । খোলা নাকি স্থানীয় ভাষায় নদীর প্রতিশব্দ ।অপরের দিক থেকে নেমে আসা পথটা শেষ হয়েছে নড়বড়ে একটা কাঠের সেতুর মুখে ।আমরা সেই সেতু পেরিয়ে এসে দাঁড়ালাম নদীর ধারে । খরস্রোতা নদী গর্ভে পড়ে আছে অজস্র বোল্ডার । সে সব বোল্ডারে নদীর স্বচ্ছ হাল্কা নীলাভ জল বাধা পেয়ে জায়পগায় জায়গায় ফেনিল আবর্ত তৈরি করছে । বেড়াতে আসা লোকেদের মধ্যে অল্পবয়সীদের ভিড় ই বেশি । বিশেষ করে দুই এক জোড়া দম্পতির হাবভাব দেখে মনে হল তারা হয়তো সদ্য বিবাহিত । তারা নিজেদের মধ্যেই বিভোর হয়ে আছে । এক জোড়া দম্পতি দেখলাম নদীরও জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে পাশাপাশি খুব ঘন হয়ে ।তাদের ভাব দেখে মনে হল সমাজ সংসার মিছে সব ...। ফেরার ভাবনাটা মনকে পীড়া দিচ্ছিল বলে কিছুক্ষণ সেই নদীর ধারে কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম । জানি এবারেই কথন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে এই চড়াই ঠেলে ওঠার। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম আমার ভগিনীটি কি এক অদ্ভুত কৌশলে সিকিউরিটি সার্ভিসের এক জীপের চালককে কিছু অর্থের বিনিময়ে রাজি করিয়ে ফেলেছেন আমাদের মত বয়স্ক লোকেদের তার জীপে করে ওপরে যেখানে আমাদের গাড়ি আছে সেখান অবধি পৌঁছে দিতে । হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম । তবে এই পর্বের ওপরে যবনিকা টানার আগে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে নদীর খাত থেকে ওপরে উঠে এসে একটি দোকানে র টেরেস এ বসে মৌজ করে বীয়ার খাওয়া আর সঙ্গে অতি উপাদেয় চিকেন মোমোর চাট – সর্বক্লান্তি হরা । অমন স্বাদ আমি কলকাতায় কোথাও মোমো তে পাইনি । আর সঙ্গের ঝাল সস – সেও তুলনা রহিত ।
Kaushik
অল্প আঁকিবুকি| শব্দের| শিক্ষকের জীবন| দুজনারই| নেহাত মন্দ নয়| অল্প সম্মান‚ অল্প অর্থ‚ অল্প আরাম| এই সব অল্প‚ অল্প-অল্প করে মিলে - অ-নেকটা সুখ| তা অনেকটাই| লেখাপড়া-গবেষণার সময় চুরি করে অল্প লেখালিখি| অল্পই| বেশ লাগে| দশদিকে চিৎকৃত ভোগবাদের হাতছানি| কিন্তু অর্থের ভাঁড়ারে যে টুকু আছে‚ তা দিয়ে খেয়ালি পোলাও ভিন্ন অন্য রান্না চলে না! তবু আছি| বেশ আছি| দুটো ফুল| চারা গাছ বললেই হয়ত সঠিক উপমা হয়| যত্ন করতে হবে| লালন ও| পরিনত করতে হবে মহিরুহে যাতে কিনা অপরকে ছায়া দিতে পারে| ছায়া দিতে পারাটা জরুরি| বাবা একবার বলেছিলো - বট গাছের মতন হবি‚ তোদের ছায়ায় যেন অপরে আশ্রয় পায়| কিন্তু বাবা‚ আশ্রিত যদি আমারই দাড়ি ওপড়ায় - তখন? আমি তো অত মহান নই‚ বাবা! তবু চাইব‚ আমার সন্তানেরা যেন বট গাছের মতই হয়| শিক্ষিত হয়| তোমার মতন অঙ্কে দড় হয়| সংস্কৃত হয়‚ কৃতি হয়| এবং - সর্বোপরি‚ খুব খুব খুব ভালো মানুষ হয়! হয়ত অনেকটাই বেশি চাওয়া| তবু চাইব - মন থেকে চাইব - আমার সন্তানেরা যেন এরকমই হয়| লক্ষ্মণগড়‚ ৭/২/১৪ (কেবিনে আপন মনে| বেলা ১:১৫)
James
শ'টকে সংক্ষিপ্তসার| (১১) এই তো নয়| সে সব তো গত জন্মের কথা| প্রাইমারীতে কোনদিন দ্বিতীয় হইনি| ক্লাশ টু থেকে মনে আছে| ওয়ান থেকে মানে চাটাই থেকে বেঞ্চিতে টু'তে ওঠবার সময় কি বা কেন এখন আর মনে নেই| ফাইভ থেকে অন্য গ্রামে হাই স্কুলে| আমাদের ঐ একটাই হাই| সাত গ্রামের সব ছেলে মেয়ে ঐখানে| চাষীপ্রধান গ্রাম‚ অনেকেই ঝরে পড়তো| তবু সব নতুন‚ বিভিন্ন স্কুলের দিকপাল একত্র| কমপিটিশান তো ছিলই| কুঁয়া থেকে দীঘিতে| আমার আবার প্রতিদ্বন্দিনী! বুঝুন কান্ড| সেসব শটকে'তে লিখেছি| চললো ক্লাশ এইট অবধি‚ ইয়েস প্রতিবারই রোল নং ওয়ান| তবে স্বীকার করি‚ আমার বরাবরই গৃহশিক্ষক ছিলেন| হয়তো আধা কৃতিত্ব তাঁদের প্রাপ্য| তারপর দীঘি থেকে খরস্রোতা নদীতে মানে মহকুমার স্কুলে‚ হোস্টেলে| বলে নিই‚ সর্বদা পিতাশ্রীর উপদেশ কাম খাঁড়া মাথার উপর- কি না ফার্ষ্ট হতে হবে| মহকুমার স্কুলে ক্লাশ নাইনে| গিয়েছিলাম কমার্স পড়তে‚ আমার গৃহ্শিক্ষক রোল মডেল| তিনি বি কম| (পরে অবশ্য এম কম করে কে: স: চা: হন)| সাদা ধুতি জামা পরে বেলা দশটায় স্কুলে আসবো‚ হাটবারে রামপদ'র চায়ের দোকানে আড্ডা‚ এসবই লক্ষ্য| অবশ্য সুপ্ত ইচ্ছা ব্যবসায়ী হবো‚ বাপ দাদাদের ন্যায়| মুদীখানা‚ হার্ডওয়ার‚ কবিরাজী‚ অ্যালোপ্যাথিক সব মিলিয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর! ছিল‚ কাপড়ের দোকানও ছিল তবে বাজারের অন্যদিকে‚ ছিলেন মুহুরীমশায়‚ পাকিস্তান থেকে আসতেন| থিয়েটারে শাহজাহান‚ কি উদাত্ত কন্ঠ্স্বর! ব্যবসায়ী হবো‚ ক্যাশবাক্সের পেছনে টাকা গুনে রবার ব্যান্ড দিয়ে গোছা করার আনন্দই আলাদা; স্বর্গীয় প্রায়| এইসব ক্যাশ রেজিটারের টিং করা till? ধ্যুস‚ তুলনা হয় নাকি! হয়নি‚ কোন আশাই পূর্ণ হয়নি| কাজের কথায় ফিরি| শহরের স্কুলে হেডমাষ্টার ইন্টারভিউ নিলেন| একটু ধরা করা ছিল‚ স্কুলের প্রেসিডেন্ট উকিলবাবুর মক্কেল আমার পিতাশ্রী| হেডমাষ্টার স্যার খুশী হয়ে বললেন‚ ঠিক আছে| পাশেই অ্যাস হেড বলে উঠলেন‚ কমার্সে নয় একে সায়েন্সে ভর্তি করুন| ব্যাস‚হয়ে গেল| কোথায় যাবো দুর্গাপুর তার বদলে ভাইজ্যাগ| সারাটা জীবন কাঁধে জোয়াল চেপে বসলো| নাইন‚ টেন অমানুষিক পরিশ্রম করেছি‚ কি না ফার্ষ্ট হতে হবে| হলামও| কি সব কান্ড‚ সদ্য বুনি ওঠা হোস্টেলমেটরা যখন‚ লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যায়‚ সন্ধে হবো হবো টাইমে ফুটবল মাঠে চক্কর কাটে‚ বিশালাক্ষীরাও(নামটা মনে আছে‚ অক্ষমের আর কি থাকে?) ঘুরঘুর করতো‚ তখন আমি 'নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো' র ব্যাখ্যা আয়ত্ত করতে বাইনোমিয়াল সিরিজের চক্করে সর্ষের ফুল দেখতে ব্যস্ত| কালীদা‚ ডেবিট ক্রেডিট মিলিয়ে কি হলো? সুড়ুৎ করে ফাঁক দিয়ে জীবনটাই চলে গেল| এখন হাতে শুধুই হেরিকেন‚ সামনে অপার অন্ধকার! আছে‚ সেই ক্লাশ ফাইভ থেকে সব মার্কশীট এখনও এতযুগ বাদেও মাষ্টার অফ ইঞ্জিনীয়ারিং এর সার্টিফিকেটের ফাইলে গুছিয়ে রাখা| সেসব বিবর্ণ সবুজ কাগজের নম্বর গুলো কেবল আছে‚ হারিয়ে গেছে জীবনটা কোন ফাঁকে! বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা‚ এগারো'র টেষ্ট পরীক্ষা অবধি জয়েন্ট এনট্র্যান্স সম্বন্ধে অবহিত ছিলাম না| আমারই এক সহপাঠী তার কলকাতাস্থ কাকার এনে দেয়া ফর্মে হেডস্যারের কি সই টই বা তেমন কিছুর প্রসঙ্গে প্রথম জানকারী| আমি বরাবরই লেট লতিফ‚ অলস; বালিতে মুখ গোঁজা পার্টি| চল‚ চল চল| আরও দুই বন্ধু মিলে শিবপুরে ফর্ম নিতে| নাহ‚ ক্যাম্পাস দেখে লোভ হয়নি যে তা নয়| কিন্তু বড় শহর‚ কত কমপিটিশান- পাবো তো? পরীক্ষা দিতে কলকাতায় হেয়ার স্কুলে| সবই আঁখ ফাড়কে দেখার বস্তু| বড় বড় হোর্ডিং পাঁচমাথার মোড়ে; নিঝুম সন্ধ্যায় এর যুগ তখন| কোচিং বলে তখনকার দিনে কিছুই ছিল না; একখানা শ'দুই আড়াই পাতার বই কিনেছিলাম গত কয়েক বছরের প্রশ্নাবলী ও উত্তর| অঙ্ক ছাড়া বাকী উত্তর সব অখাদ্য| সেই কালে আবার আলাদা আলাদা কলেজে (প: ব: তে মোটে পাঁচটা ঐ জয়েন্টের আওতায়) এক পাতার ফর্ম উইথ ৫ টাকার পোষ্টাল অর্ডার দিয়ে ভরতে হতো| তখন বুঝিনি‚ কেবল শিবপুরেই ভরেছিলাম| সেটা বড় বেশী রিস্কি হয়েছিল| চোখ ফুটতে তো অভিজ্ঞতা লাগে‚ তাই না? আই আইটি'র তো প্রশ্নই আসে না‚ সময় পেরিয়ে গিয়েছিল বা কি একটা কারণে অ্যাপ্লাই করা হয়ে ওঠেনি| (না ‚ দাবী করছি না যে করলে পেতাম!) যাইহোক‚ পিঙ্ক ২৩ বাই ৫ খামে বার্তা এলো| একটু মশলা দিই‚ ভুলেই গিয়েছিলাম| পরীক্ষা বোধহয় ভালই হয়েছিল কারণ ভাইভা'তে ভূপাল কোথায় জিজ্ঞেস করাতে‚ বেশ মনে আছে‚ ' স্যার‚ নেপাল‚ ভূপাল!' ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল| বাকীটা পরে কোনদিন|
ঝিনুক
বলেছিলাম লিখব স্বপ্নশত্রুদের কথা| তারা কারা? এই ধরুন খুব একটা রোহমর্ষক‚ বা কনফিউসিং বা মন খারাপের স্বপ্ন দেখে শেয়ার করতে গেলেন কার সাথে আর সে বলা শুরু করল ঐ শুরু হল তোমার স্বপ্নের গল্প| মাথা নেই‚ মুণ্ডু নেই‚ নিশ্চয় পেট গরম| তাই না? এদের কাছে স্বপ্ন জিনিসটা একটা হাবিজাবি কিছু‚ অর্থহীন যাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই‚ আলোচনা করার কিছু নেই| সত্যি কি তাই? স্বপ্ন মানেই অর্থহীনতা না স্বপ্নের মধ্যে থাকে সম্ভাবনা? চলুন‚ আজকে দেখি কেন স্বপ্ন দেখি আমরা| বোঝার চেষ্টা করি স্বপ্নের বিজ্ঞান কে| কিন্তু তার আগে একটা গল্প হয়ে যাক‚ কেমন? এই গল্পের নায়ক আইনস্টাইন| কিশোর বয়্সে একদিন একটা স্বপ্ন দেখলেন| একটা মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর সেই মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে পালে পালে গরু| সামনেই একটা বিশাল বড় তার‚ যেমন থাকে কাঁটাতারের বেড়া সেইরকম| কিন্তু এই তার আবার বৈদ্যুতিক তার| গরুগুলো এগিয়ে আসছে তারের দিকে‚ একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আইনস্টাইন আর তারের ঐ পারে গরুদের মালিক‚ ফার্মার| হঠাৎ কি যে মাথায় আসল ফার্মারের‚ দুম করে টিপে দিল সুইচ‚ বিদ্যুত বয়ে গেল তারের মধ্যে দিয়ে আর সব গরু গুলো একই সাথে ঝটকা খেয়ে পিছিয়ে চলে এল| অনেকটা synchronised aerobatics যেমন হয়| কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেই আইনস্টানের মনে হল উনি যা দেখলেন ফার্মার সেটা দেখেন নি| ফার্মার এর চোখে একেকটা গরু একসাথে না‚ একের পর এক করে পরপর ঝটকা খেয়েছে| মানে একটা গরু উঠছে পড়ছে‚ তার পরে আর একটা এই রকম| সেই ফুটবল খেলাতে স্টেডিয়ামে লোকে যেমন ওয়েভ বানায় সেইরকম| আইনস্টাইনের মনে হল ঐ ওয়েভ ফর্মেশন দেখবে বলেই ফার্মার গরুগুলোকে শক দিল| এবারে তো স্বপ্ন ভেঙে গেল| অন্য কেউ হলে ধুরছাই কি দেখেছি বলে কাটিয়ে দিত‚ ফ্রয়েড হলে ভাবতে শুরু করত নিশ্চয় আমার মনে মনে প্রচুর গরুর মাংস খাওয়ার শখ তই এমন দেখেছি কিন্তু আইনস্টাইন তো আইনস্টাইন| উনি সবকিছুতেই ফিজিক্স দেখতেন‚ ভাবলেন এ স্বপ্ন যখন দেখেছি এরমধ্যে নিশ্চয় কোন ফিজিক্সের প্রবলেম আছে যেটা আমাকে সলভ করতে হবে আর এই ভাবেই তৈরী হয়ে গেল! কি ? ঠিক ধরেছেন "Theory of Relativity"‚ যেহুতু উনি আর ফার্মার object এর থেকে ভিন্ন দূরত্বে‚ তাই আলো এসে পৌঁছবে ভিন্ন সময়ে ‚ তাই হতেই পারে দুজনে একই জিনিস দেখবেন না| এবারে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে কি? মনে হচ্ছে কি শুধুই পেট গরম বলে স্বপ্নকে অগ্রাহ্য না করাটাও একটা অপশন| থাকতে পারে স্বপ্নের কোন মানে‚ খুলে দিতে পারে কোন সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি অথবা হয়ে উঠতে পারে কোন যুগান্তকারী আবিষ্কারের জনক? চলুন‚ দেখি আমরা স্বপ্ন দেখি কেন| আজকের এই পর্ব এই নিয়েই| স্বপ্ন দেখি কেন আমরা? {/x2} {x3} ১) আকাঙ্খা পূরণ এই থিয়োরি ফ্রয়েড সাহেবের| ওনার মতে যা কিছু অপূর্ণ আকাঙ্খা‚ সেগুলোকেই আমরা স্বপ্নে দেখি| খুব করে বিরিয়ানি খাচ্ছেন স্বপ্নে‚ বা গপাগপ রসগোল্লা মুখে পুরছেন? তার মানে আপনার অনেক্দিন থেকে ওগুলো খাওয়ার খুব সখ| হঠাৎ স্বপ্নে দেখলেন পাখির মত উড়ে চলেছেন? ওটাও মনের অপূর্ণ আকাঙ্খা আপনার যেটা কোনদিনই পূর্ণ হওয়ার না| কোন সুন্দরী মহিলা (বা পুরুষ) এর সাথে স্বপ্নে ঘুরছেন বা আরো কিছু দুষ্টুমি করছেন? ঐ একই ব্যপার| এতদূর অবধি তো ঠিক ছিল| কিন্তু লোকে ছাড়বে কেন? তেড়ে এল ফ্রয়েড সাহেবকে | তাহলে আমি স্বপ্নে কেন দেখলাম আমার মা মারা গিয়েছে? তুমি কি বলতে চাও আমার মনের ইচ্ছে আমার মা মরে যাক? কি ঠিক কিনা? এরকম স্বপ্ন তো আমরা অনেকেই দেখি‚ মন খারাপ করি‚ ফোন করে মায়ের খবর নেই সব ঠিক আছে কিনা| মা মরে যাক এতো কেউ চাই না? তবে? ফ্রয়েড সাহেব বললেন - আরে মরে যাক চাও না ঠিকই কিন্তু মায়ের অস্তিত্বের সাথে কোথাও তোমার কনফ্লিক্ট আছে| এমন কোন সমস্যা আছে তোমার যেটা তুমি ভাবছ মা না থাকলে সমাধান হয়ে যাবে ‚ তাই এই স্বপ্নটা দেখেছ| কিন্তু কে মানবে বলুন এটা? তো এবারে আসরে নামলেন আরো একজন‚ তার নাম কার্ল জাং| উনি একটু অন্যরকম বললেন| বললেন এই সব অম্পূর্ণ আশা আকাঙ্খার গল্প ভুল‚ আসলে প্রতিটা স্বপ্নই আমাদের একটা সমস্যা যার কোন সমাধান নেই তার দিকে ইঙ্গিত করে| স্বপ্ন গুলো বোঝায় আমাদের কি দুস্চিন্তা বা কি আবেগজনিত সমস্যা বা কি ভয়| যেমন ধরুন দেখলেন চাকরীটা চলে গিয়েছে তার মানে আপনার মনের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে আপনাকে ছাড়াও কাজটা হয়ে যেতে পারে‚ আপনি essential নন| এই যে আপনার মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ধারণা আছে‚ সেটাকে এবার জাগিয়ে তুলল স্বপ্ন| এবারে আপনি না বসে থেকে সেটা নিয়ে কাজ করুন| নিজের স্কিল আপডেট করুন বা বসকে তেল দিন বা নতুন চাকরী খুঁজুন| অথবা ধরুন স্বপ্নে দেখলেন আপনার বিবাহিত প্রেমিক চুটিয়ে বৌ এর সাথে প্রেম করছে| ওমনি তার উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে নিজেকে জিগ্যাসা করুন| কি এমন করেছেন আপনি যে ইনসিকিউরিটিতে ভুগছেন? হয়ত উত্তর পেয়ে যাবেন‚ শুধরে নেবেন নিজেকে| {/x3} {x4} ২) অ্যাক্টিভেশন - সিনথেসিস থিয়োরি এটা বোঝার আগে চলুন বুঝি আমরা ঘুমাই কি করে| আমরা সব সময় কিন্তু গভীর খুব ঘুমাই না| ঘুমের একটা ফেজ থাকে যাকে বলে REM স্টেজ অর্থাৎ কিনা rapid eye movement ফেজ| এইসময় চোখের পাতা পিটপিট করে| এই REM ফেজ আপনার পুরো ঘুমের প্রায় এক চতুর্থাংশ সময় জুড়ে চলে কিন্তু একটানা নয়| কখন আপনি গভীর ঘুমে ‚ তারপরে REM‚ আবার গভীর ঘুম‚ REM এই রকম| মোটামুটি ৪-৬ বার রাতের ঘুমে আপনি REM ফেজে থাকেন| এবারে দেখা গিয়েছে যে REM ঘুমের সময় কাউকে ডেকে তুললে প্রায় ৯৫% কেসে তারা বলে স্বপ্ন দেখছিল কিন্তু গভীর ঘুম থেকে ডেকে তুললে মাত্র ১০-১৫% কেসেই লোকে বলে স্বপ্ন দেখছিল| সেই থেকে ধারণা করা হয় যে আমরা স্বপ্ন দেখি REM এর সময়েই| কিন্তু কি হয় এই REM stage এ? এই সময় আমাদের ব্রেন কিন্তু ঘুমিয়ে থাকে না| সজাগ থাকে ব্রেনের কিছু অংশ যেগুলোর নাম amydala আর hippocampus| এদের কাজ আপনার অনুভূতি‚ আবেগ‚ স্মৃতি এগুলো নিয়ে| এবারে হচ্ছে কি আপনার সেই চোখ পিটপিট ঘুমের সময় এরা কাজ করে চলেছে‚ এরা যখন সিগন্যাল দিচ্ছে ব্রেন তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না‚ ব্রেন সিগন্যালগুলোকে বোঝার চেষ্টা করে‚ কিছু একটা মানে দেওয়ার চেষ্টা করে আর সেগুলই আপনার স্বপ্ন হয়ে আসে| কিন্তু পুরো ব্রেনটা তো কাজ করছে না‚ করছে দুই তিনটে পার্ট‚ বাকি পার্টগুলো ঘুমিয়ে‚ সুতরাং এই যে ব্রেন একটা গল্ম্প বানাচ্ছে সেটা কিরকম গল্প হবে? একদম ঠিক ধরেছেন‚ জগা খিচুড়ি গল্প| একের সাথে অন্যের সম্পর্ক নেই - উদ্ভুতুরে| হয়ত বাড়ির মধ্যে বাঘ চলে এল‚ কিংবা সাহরা মরুভুমিতে আমাজন বয়ে চলেছে এইরকম আর কি| অর্থাৎ কিনা এই থিয়োরি যদি মানেন তাহলে স্বপ্ন নিয়ে এক্দম ভাবনা চিন্তার দরকার নেই‚ all trash| কিন্তু কিন্তু পেট গরমের জন্য স্বপ্ন দেখছেন না কিন্তু| কি গরম হয়েছে বলুন তো? হু‚ ঠিক - amydala আর hippocampus| ৩) স্মৃতি থেকে আবর্জনা তাড়ান এই থিয়োরীতে যারা বিশ্বাস করেন তাঁরা ঐ স্বপ্নশত্রুদের দলভুক্ত| এদের মতে সারাদিন আমাদের ব্রেন অনেক কিছু পিক করে যার অনেকটাই আবর্জনা| অনেকটা কম্পিউটারের মত| যখন পিক টাইম নয় তখন যেমন কম্পিউটারের consolidation jobs গুলো চালান হয় ‚ যে তথ্যগুলো আর জরুরী নয় সেগুলোকে ঝেড়ে ফেলা হয়| এই থিয়োরীর মতে এই ভাবেই আমাদের স্বপ্নগুলো হচ্ছে সেইসব অপ্রয়োজনীয় তথ্য যেগুলো নিয়ে ব্রেনের আর কোন কাজ নেই| ব্রেন একের পর এক informaiton process করে‚ আর বাজে information গুলো discard করে‚ আর তারই এক ঝলক আমাদের স্বপ্ন| অর্থাৎ কিনা‚ স্বপ্ন মানেই বাজে ‚ আবর্জনা - ব্রেন যেগুলোকে মাথা থেকে বের করে দিচ্ছে - সেগুলো নিয়ে একটুও মাথা ঘামাবেন না| {/x4} {x5} ৪) মেমরি কনসোলিডেশন এই মতে যারা বিশ্বাসী‚ তাদের মতেও আমদের ব্রেন কম্পিউটারের মত কাজ করে এবং ঘুমিয়ে পড়লে শুরু হয় ব্রেনের consolidation এর কাজ| কিন্তু এরা বিশ্বাস করেন না‚ স্বপ্ন মানে অপ্রয়োজনীয় তথ্য| এনাদের মতে স্বপ্ন হল ব্রেনের সেই প্রসেস যখন ব্রেন সারাদিনের সংগৃহীত তথ্যগুলোকে consolidate করছে আর জমিয়ে রাখছে permanent storage এ| অর্থাৎ কিনা‚ সারাদিনে যে সমস্ত টুকরো টুকরো তথ্য আমাদের ব্রেনে জামা পড়েছিল‚ সেগুলৈ আরো প্রাসারিত হয়ে জমা পড়ছে আর তারই এক ঝলক আমাদের স্বপ্ন| যেমন ধরুন ট্রমার রোগীরা| এনারা ঘুমালেই ট্রমার স্বপ্ন দেখেন‚ আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন‚ তাই ট্রমার রোগীদের জোর করে জাগিয়ে রাখা হয়| ঘুমিয়ে পড়লেই ব্রেনের consolidation job শুরু হয়‚ ট্রমার টুকরো টুকরো ছবির ডট গুলো connected হয়ে তৈরী হতে থাকে পুরো ঘটনাটা‚ play করতে শুরু করে স্বপ্নে আর তাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন রোগীরা| এই থিয়োরী বলে‚ তাই স্বপ্ন আমাদের শেখায়‚ যা কিছু active stage এ আমরা বুঝতে পারি না বা সময় পাই না‚ REM stage এ সেই তথ্যগুলোর মানে বুঝি আমরা যাতে আগামী দিনে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ করতে পারি| {/x5} {x6} ৫) রিহার্সাল এবং সিমুলেশন একটু ডাইগ্রেস করি‚ কেমন? কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম ১৭ লাখ টাকা ক্যাশে বিছানার উপর রেখে‚ ঘর বন্ধ করে কোথায় যেন একটা গিয়েছি| ফিরে এসে দেখি‚ কি একটা কারণে সোসাইটির সেক্রেটারি ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল| আর টাকা? সে একটাও নেই| ভদ্রলোকের নাম নাকি সম্বিত পাত্র| এই নাম জীবনেও শুনি নি| তাকে গিয়ে বারে বারেই বলছি টাকাগুলো কি করলেন‚ ফেরত দিন আর সে বলছে সব স্টক মার্কেটে লাগিয়েছি - লস হয়ে গিয়েছে| ধনে প্রাণে শেষ ভেবে আতঙ্কে কেঁপে উঠতে উঠতে একটা সময় যখন বুঝলাম - এটা স্বপ্ন‚ তখন ওঠার সময় হয়ে এসেছে| উঠেই দেখি ফেসবুকে সম্বিত পাত্র নামে বিজেপির একটা লোককে নিয়ে খুব খবর| সে নাকি NDTV নিয়ে কিসব ফেক খবর দিয়েছে‚ তাই নিয়ে জোর আলোচনা| অদ্ভুত না? লোকটার নামও শুনিনি এর আগে| সে যাক গে‚ এই রকম টাকা চলে গেল বা কেউ আপনাকে মারতে আসছে আর অপনি ঊর্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছেন আর ওরা এগিয়েই আসছে কিংবা ট্রেন ধরতে ছুটছেন আর কিছুতেই ট্রেন ধরতে পারছেন না -এইরকম স্বপ্ন দেখেন তো? খুব কমন এই রকম স্বপ্ন| বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ১০০০ এর মধ্যে নাইটমেয়ার দেখি আমরা| এখান থেকেই এলো থ্রেট সিমুলেশন থিয়োরী| এই থিয়োরীর মতে আমরা সবসময়েই কিছু ভয়‚ আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাই| এই যদি আমাকে কেউ খুন করে ফেলে? বা কেউ যদি আমার টাকা পয়্সা হাতিয়ে নেয়? বা ট্রেন বা প্লেনটা যদি মিস করি? তা এইসব থ্রেট গুলো সত্যি যদি আমাদের সামনে এসে পড়ে কি করব? বাঁচার জন্য কি হবে স্ট্র্যাটেজি? সেগুলোর একটু practice চাই তো যাতে সত্যিকারের ঘটনার সামনে হতভম্ব না হয়ে পারি? আপনার দেখা স্বপ্ন গুলো আর কিছুই না‚ ব্রেনের সেই practice| যা যা কিছু আপনাকে ভীত করে‚ আতঙ্কিত করে - সেই গুলোর বিরূদ্ধে রক্ষা পাওয়ার স্ট্র্যাটেজি যখন ব্রেন প্র্যাকটিস করে‚ তাই নাইটমেয়ার হয়ে আসে| ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান হয়েছে‚ তাদেরকে REM stage এ ঘুমতে না দিয়ে| দেখা গিয়েছে এইসব ইঁদুরেরা আক্রান্ত হলে বেসিক প্রতিরক্ষা করারো চেষ্টা করে না‚ পুরো পাজলড হয়ে যায়| বুঝতে পারছেন তো এবার নাইটমেয়ারও ফেলনা জিনিস না? ৬) প্লেয়িং ডেড ছোটবেলায় আপনারা সবাই বোধহয় শুনেছেন| কি বলুন তো? হঠাৎ করে সামনে যদি ভালুক এসে পড়ে কি করবেন? হুম‚ একদম মরার মত শুয়ে থাকবেন তো? ভালুক এসে গন্ধ শুঁকে চলে যাবে? যদিও ভালুকের ব্যপারটা পুরোটাই গল্প animal world এ আত্মরক্ষার্থে এই মরা সাজার ব্যাপরটা চলে আর কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন অনেক অনেক বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদেরও এই টেকনিকটা ব্যবহার করতে হত| সেই থেকেই এটা আমাদের মজ্জাগত‚ তাই আজও ঘুমিয়ে পড়ে ব্রেন সেই মরা সাজার প্র্যাকটিস করে‚ যখন শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থির‚ শুধু কাজ করে চলেছে ব্রেন| {/x6} {x7} ৭) ইমোশনের সিম্বোলিক অ্যাশোসিয়েশন এটা দিয়েই শেষ করব| স্বপ্নের দার্শনিক ত্বত্ত এটা| এর মতে আমাদের সকলের জীবনের যে দু:খ‚ হতাশা চরমতম ব্যথার যে অনুভূতি সেগুলোকে আমরা একটা বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে‚ একটা দার্শনিক অর্থের সাথে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করি‚ যাতে আমাদের কষ্টের লাঘব হয়| যেমন ধরুন প্রেমিক খুব বড় ধোঁকা দিয়েছে‚ বুক ভেঙে যাচ্ছে‚ নিজেকে বোঝালেন একা এসেছি‚ একাই তো যেতে হবে‚ কে কার| এই যে দার্শনিক তথ্য আপনার মনের মধ্যে আসছে এর মাধ্যমে আপনি মানসিক যন্ত্রণার উপশম খুঁজছেন| রেপ ভিক্টিমদের একটা স্বপ্ন নাকি বারে বারে আসে| এক সমুদ্রের ধারে বসে আছেন‚ একটা বিশাল ঢেউ এসে তাকে ডুবিয়ে দিয়ে গেল| উনি কিন্তু ওনার ট্রমাটা দেখছেন নে‚ দেখছেন সেই দু:খ কষ্টের একটা সিম্বোলিক ছবি‚ একটা বৃহত্তর জীবন দর্শন যা তাঁকে ট্রমা ভুলে থাকতে সাহায্য করছে| সোজা কথায়‚ স্বপ্ন মানসিক যন্ত্রণায় থেরাপির কাজ করে| এবারে আর একটা বিখ্যাত স্বপ্নের গল্প বলে ছুটি নেব| ব্যাণ্ডের নাম - Beatles গান - Yesterday| লেখক - McCartney| উইম্পল স্ট্রীটে গার্লফ্রেণ্ডের বাড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন আর স্বপ্নেই এল এই গানের সুর| তাড়াতাড়ি বসে গেলেন পিয়ানো তে সুরটা তুলতে যাতে ভুলে না যান| তারপরও কিছুতেই বিশ্বাস হয় না| বারে বারেই মনে হচ্ছে নিশ্চয় এই সুর কোথাও শুনেছেন‚ তাই স্বপ্নে এসেছে - এখন এই সুর বাজারে ছাড়লে তো লোকে চোর বলবে| জনে জনে সেই সুর শুনিয়ে জিগ্যেস করেন কেউ শুনেছে কিনা‚ কেউ বলতে পারে না| তারপর মাসখানেক যাওয়ার পরও যখন কেউ এগিয়ে এল না‚ তৈরী হল গানের লিরিকস‚ তৈরী হল Yesterday| শুনুন তাহলে গানটা? {/x7} {x0i}dream0.jpg{/x0i} {x1i}dream1.jpg{/x1i} {x2i}dream2.jpg{/x2i} {x3i}dream3.jpg{/x3i} {x4i}dream4.jpg{/x4i} {x5i}dream5.jpg{/x5i} {x6i}dream6.jpg{/x6i} {x7v}https://www.youtube.com/watch?v=Ho2e0zvGEWE{/x7v}
Subarna
Bদেশ আমার কাছে আলুনি, Aদেশের তুলনায়। নেচারটুকু, আর সিস্টেমস, আর পরিচ্ছন্নতা বাদ দিলে পুরো মিয়ানো মুড়ি, ধুত্তেরি! সেখানে সবকিছুই কেমন খাপে খাপ! বেনিয়মের জায়গা নেই। ভালো লাগে? আর আমার দেশে? যেদিকে চোখ-কান যাবে, সেদিকেই কিছু না কিছু ছাই-চাপা পরশপাথর। তারপর আছে নাইটির সাথে গামছা, স্কিনটাইট প্লে-বয় টিশার্ট আর কেপ্রির সাথে খোঁপা অথবা টিপ, এবড়োখেবড়ো রাস্তায় স্টিলেটো। আরো কত কত বেনিয়ম! দুচোখ ভরে দেখি আর ধপাস ধপাস প্রেমে পড়ে যাই। তবে পরশপাথরের ব্যাপারই আলাদা! পেটে কেমন বুড়বুড়ি করছে। বলেই ফেলি। ** পরশপাথর ১ ** দুই বুড়ো। বয়স আনুমানিক সত্তরের উপরে। এক সুপারহিট সমুদ্রতীরের সৈকতসরণী ধরে খানিক এগোলেই দেখা পাবেন। অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় দুজনে ব্যস্ত হয়ে গুছাচ্ছেন। অপটু হাত। জিনিসপত্র সাজিয়ে গুছিয়ে হাজার এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে অসম যুদ্ধে নেমে পড়বেন একটু পরেই। একজন একটু দুর্বল বয়সের ভারে। আর একজন সতেজ। কিন্তু একটা ব্যাপার দুজনের এক। চোখে মুখে উৎসাহের হাসি। বাচ্চার নতুন খেলনা পেলে যেমন করে, পসরা নিয়ে তাঁরাও ঠিক তেমনই। নজর অন্য কোনদিকে নেই। একাগ্রচিত্ত। এনারা হকার। ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। জানি না, হয়ত সংসারে নিজেদের দায় এখনো নিজেরাই বইতে চান, হয়ত সাহায্য করতে চান, বা হয়ত নিছক বিনোদনের জন্য এনারা গর্বের সাথে হকারি করেন। ** পরশপাথর ২ ** সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউ দেখছি। অনুভব করছি, সব মানুষের উচিৎ মাঝেমাঝেই এরকম জায়গায় এসে চুপচাপ বসে থাকা। এই অসীম ব্যাপ্তির সাথে থাকতে থাকতে মনের ফ্ল্যাট কখন টুবেড থেকে থ্রিবেড হয়ে ফোরবেড হয়ে যাবে, টেরও পাওয়া যাবে না। বাসযোগ্য হয়ে যাবে ধরাধাম। পাশে এসে বসল এক বৃদ্ধা। সবুজ ডুরে সস্তা শাড়ি। পেতে আঁচড়ানো তেল দেওয়া চুল। আধখাওয়া সামনের দাঁত। হাতে পুঁতির সস্তা গয়নার অল্প আয়োজন। "নেবে মা?" কথা বলার মুডে ছিলাম না। মাথা নেড়ে না বললাম। মহিলা গেলেন না। হাতের ছোট ট্রে সামনে নামিয়ে রাখলেন। ওসবে উৎসাহ বিশেষ নেই, তবু কি মনে হল, নেড়েচেড়ে দেখে তিন-চারটে জিনিষ পছন্দ করলাম। মহিলা প্যাকেটে ভরে, দাম বললেন। এরপরেও বাঙ্গালী কথা বলবে না, হয়? একদম দরদাম করতে পারি না। বেশ লজ্জা লজ্জাই লাগে। তাই, একটু হেসে দশটাকা কম বললাম। যদিও পুরো টাকাটাই ব্যাগ থেকে বার করেছি। এরপরেই অপ্রত্যাশিতভাবে ঝটকাটা এলো। মহিলা আমার দুই গাল টিপে আধখাওয়া দাঁত বের করে হেসে বললেন, "ক'টাকা আর লাভ রে মা?" এই বুড়ো বয়সে তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর কমে ঝট করে কোন এক ভালোলাগার কৃষ্ণগহ্বরে চলে গেলাম নিমেষে, যেখানে গাল টিপে কেউ হয়ত আদর করত কখনো। চলে গেলেন পয়সা নিয়ে, আমাকে আজন্ম ঋণী রেখে। পিছনে। ** পরশপাথর ৩ ** বাসে যাচ্ছি। পিছনে বসে এক দম্পতি, কোলে বাচ্চা। সে বাচ্চা বকে বকে মাথা খেয়ে ফেলার জোগাড়। তখনই এক ঝলক ঝোড়ো হাওয়া। বাস লেকটাউনে। মহিলাঃ দ্যাখো! কি সুন্দর বানিয়েছে, না? পুরুষঃ হ্যাঁ, লন্ডনে আছে এরকম। আইফেল টাওয়ার। দম্পতির অলক্ষ্যে কপাল চাপড়ালাম। ইশ! এতো কম জানে! ওটা আইফেল টাওয়ার?!!! পরক্ষণেই ভাবলাম, আমি তো কত্ত জানি! কি লাভ হল? সেই তো একই বাসে চড়ে, সিট পাব কি পাব না-র লটারিতে যোগ দিচ্ছি। আইফেল টাওয়ার যে জার্মানিতে, আর লেকটাউনের মোড়ে ওটা যে লন্ডনের LTP, তা জেনে আমি কি তীর মারলাম জীবনে? (যারা LTP বুঝল না, তাদের জন্য - ওটা লিনিং টাওয়ার অফ পিসা রে বাবা!!) :P
দীপঙ্কর বসু
রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কিত আমার বর্তমান অলোচনার সূত্র ধরে উঠে এসেছে রবীন্দ্রোত্তর যুগের এক শক্তিমান গীতরচয়িতাসুরকার সলিল চৌধুরী রচিত এবং সুরারোপিত “মরি হায় গো হায়” গানের সুরের প্রসঙ্গ| সলিল চৌধুরীর এই গানএর সুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী গানের সুরের কিছুটা সাজুয্য খুঁজে পান কেউ কেউ ‚বিশেষত সলিইল চৌধুরীর তিন স্তবকে রচিত গানটির অন্তরা দুটির শেষ লাইন গুলিতে বরে বারেই রবীন্দ্রনাথের তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী গানের বহিয়া যায় বা চৌদিকে মোর প্রভৃতি অংশের সুরের সুস্প্ষ্ট আবির্ভাব ঘটতে দেখা যায়|সলিল চৌধুরীর আলোচ্য গানটির মৌমাছিরা পরাগ দলে দলে বা ছিন্ন পালে ভাঙা হালে অংশগুলির সুরে| কান পেতে শুনলে গানের আরো কিছু কিছু সুরের মিল পাওয়া যেতে পরে|নিশ্চিত ভাবে বলতে পারিনা তবু মনে হয় সলিল চৌধুরী অলোচ্য গানের সুরের প্রেরনা হয়ত পেয়েছিলেন পূর্বসুরির গানের সুর থেকে|যদিও‚ যে অসামান্য নৈপুণ্যে মরি হয় গো হায় গানটিকে সুরের জলে বেঁধেছেন এবং রবীন্দ্রনাথের সুরের আদলের সঙ্গে কিছুকিছু মিল সত্বেও নিজের গানের সুরে নিজস্বতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা সলিল চৌধুরীর সুরসৃজন ক্ষমতারই সাক্ষ্য বহন করে| গানদুটির সুরের বিশ্লেষন করার আগে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে‚ তুমি কেমন করে গান কর হে এবং মরি হায় গো হায় দুটি গানই মিশ্র খাম্বাজের সুরে নিবদ্ধ|কাজেই খাম্বাজ রাগের স্বর কাঠামোর( যাকে উল্লিখিত বন্ধু combination of notes বলে উল্লেখ করেছেন) আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা| আবার‚ যে কোন রাগেরই স্বরকাঠামোর মধ্যেই থাকে অসংখ্য স্বরগুচ্ছ বা combination of notes সম্ভাবনা|আর সেই সব স্বরগুচ্ছের কুশলী প্রয়োগের ফলেই একই রাগে নিবদ্ধ বিভিন্ন গানের সুর এ আসে বৈচিত্র| আলোচ্য গানদুটির সুরবৈচিত্রের মূলেও আছে এই প্রথমিক সংগীতত্বটিই| তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী আমি অবাক হয়ে শুনি ‚কেবল শুনি এগানে যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে সেই অনাহত সঙ্গীতের প্রতি গীতিকার রবীন্দ্রনাথের ভক্তি মিশ্রিত বিমুগ্ধতা মিশ্র খাম্বাজের সরলরৈখিক সুরে ধরা দিয়েছে|পক্ষান্তরে সলিল চৌধুরীর গানটিতে প্রেমাস্পদকে কাছে পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে তাকে নিজের সমস্ত ঐশ্বর্যের ডালি সাজিয়ে বরণ করে নিতে না পারার আর্তি | স্বভাবতই সে আর্তির সুরের মেজাজ আলাদা| মরি হয় গো হয় এলে যখন আমার ভাঙাঘরে শুন্য আঙিনায়. যেমন গানের প্রথম লাইনেই হায় শব্দটির দুই অক্ষরের মাঝে দীর্ঘ চোদ্দো মাত্রারব্যপী সুরের প্রবাহে গানের কোন কথা নেই |ফলে গনের সুরে অনেকটই স্পেস তৈরি হয়েছে যে স্পেসে মা ধা - ণা | সরসা ধা ণা পা |ধা - - -| স্বর গুলি যেন ভারহীন শরতের মেঘের মত সুরের আকাশে ভেসে চলেছে| সুরের এই পরিকল্পনার ছাপ গানটির অন্যত্রও পাওয়া যায় ‚যেমন অন্ত্রার ধরতাইটাকে লক্ষ্য করা যক| "যখন আমার ঝরা মালায়" অংশের সুরে ঝরা মালা শব্দ দুটিকে গাঁথা হয়েছে পা সা সা গা পা স্বরগুচ্ছে| শুধু গা ও পা স্বরদুটির মাঝে মধ্যম স্বরটির অনুপস্থিতি যেন ভিন্নতর কোন রাগের ছায়পাত মুহুর্তের জন্য ঘটিয়ে আবার মিলিয়ে যায় | এও এক অপূর্ব সৃষ্টিলীলা | এই রকম সুরের বৈচিত্রের সমাবেশে সুরটি নিজস্ব স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে | একই সুরের কাঠামোয় নতুন ধরনের চলন আমদানি করে সুরের প্রকৃতিতে নতুনত্বের সংযোজন করার কৌশলটি রাবীন্দ্রনাথের নিজের গানেও বহু বার ব্যবহার করেছেন |উদাহরন স্বরূপ তিনটি গানের উল্লেখ মাত্র করে এ পর্বে যবনিকাটানি| বিস্তারিত আলোচনা আবার কখনও হবে|যে তিনটি গানের কথা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে সেগুলি হল আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় ‚ গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ এবং বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা |
শিবাংশু
দুচার দিন আগের কথা। দুপুরবেলা, নিউ দিল্লি ইশটেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম। অরবিন্দ মার্গে জ্যামের ঠিক নেই তাই ছত্তরপুর থেকে সময়ে পৌঁছোবার তাড়ায় বেশ খানিকটা আগেই চলে আসা। তাপমাত্রা দেখাচ্ছে চুয়াল্লিশ। কিন্তু হাওয়া বইছে টাটার পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেস ছোঁয়া। বাতানুকূল অপেক্ষাশালার দোরগোড়ায় এক ভদ্রলোক বিপন্নমুখে খাতা নিয়ে বসে আছেন। পি এন আর নম্বর দিতে গেলে তিনি ম্লান হেসে বলেন, দরকার নেই। -কেন? -ভিতরে ঢুকতেই পারবেন না... উঁকি মেরে দেখি ভিতরে ১৯৪৭শের সেপ্টেম্বর মাসে শিয়ালদহ প্ল্যাটফর্ম। এতোজন মানুষ, তাদের লটবহর, ঘামক্লান্তিদীর্ঘশ্বাস কী করে ধরে রেখেছে ঐ ঘরটা? বিস্ময়। শ্বাসরোধী ভিড় আর অবর্ণনীয় আর্দ্র তাপে ফুটছে চারদেওয়াল। ঢুকিনা। প্ল্যাটফর্মেও কোথাও বসা দূরস্থান, দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। মেঝেতে কাগজ পেতে সপরিবার যাত্রীরা কুকুরকুণ্ডলী হয়ে পুড়ে যাচ্ছেন রোহিলাখণ্ডের তপ্ত বাতাসে। এদিকওদিক চোখ চালিয়ে দেখি একটি দেওয়াল সংলগ্ন সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটি পরিবার বসে আছেন। স্বামীস্ত্রী আর দুটি শিশু। মাঝখানে আরেকটি বসার জায়গা আছে। সেখানে কয়েকটি খালি জলের বোতল ফেলে রাখা আছে। ব্রাহ্মণী বলেন তিনি বোতলগুলি সরিয়ে সেখানেই একটু বসছেন। আমি গিয়ে কতো নম্বরে আমাদের গাড়ি আসবে ইত্যাদি, যেন দেখে আসি। আমি প্যাঁটরাগুলি সেখানে রেখে খোঁজ করতে বেরো'ই। মিনিট পনেরো পরে গাড়ির খোঁজখবর নিয়ে অকুস্থলে এসে দেখি সেই পরিবারের কর্তাটি আমার ব্রাহ্মণীর উপর প্রচণ্ড চেঁচামিচি করছেন এবং ঐ খালি জলের বোতল গুলো সরিয়ে বসতে চাওয়ায় তাঁকে প্রায় মারতে যান আর কী? তাঁর বক্তব্য হচ্ছে ঐ বোতলগুলো নিয়ে তাঁর 'বাচ্চারা খেলছে'। তাই তিনি জায়গা থাকা সত্ত্বেও কাউকে বসতে দেবেননা। জাতবিহারি হিসেবে এসব ছিঁচকে দাদাগিরি'র ওষুধ আমি জানি। কিন্তু সেই ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছিলেন বাংলাতে। হ্যাঁ, মোদের গরব, মোদের আশা। চারদিকে বাংলা শুনতে পাবো বলেই তো সারা দেশ ছেড়ে এই মূহুর্তে আমার বঙ্গদেশে থাকতে আসা। তখন কিন্তু সেই ভাষাই আমাকে রীতিমতো বিমর্ষ করে ফেললো। তবে বিশেষ অবাক হলুম না। সত্যি কথা বলতে কি, সারাদেশে অবিরত ঘুরে বেড়াবার অভিজ্ঞতা আমায় শিখিয়েছে ভালো করে বিচার না করে তথাকথিত 'বাঙালি'দের সঙ্গে তৎকাল বাংলায় কথা বলাটা অনেক সময়েই বিড়ম্বনা ডেকে আনে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আমার ব্রাহ্মণী তাঁকে বাংলাতেই বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন এবং তিনি ততোধিক উত্তপ্তভাবে তাঁকে প্রায় শারীরিকভাবে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন আমাকেও আসরে নামতে হলো। বাংলাতেই। তাঁর বক্তব্য হলো তিনি গত চারঘন্টা ধরে ঐ বেঞ্চিটিতে বসে আছেন। তাই তিনি আর কাউকে কিছুতেই বসতে দেবেননা। এই বলে নিজে অকারণ সম্প্রসারিত হয়ে যথাসম্ভব জায়গা অধিকারের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এসব ক্ষেত্রে আমরা মুখের থেকে হাতের ব্যবহারে অধিক বিশ্বাসী। নির্বাচিত ভোজপুরি খিস্তিসহ চতুর্দশ পুরুষের ঘুমভাঙানো যেসব ক্রিয়াকলাপে আমরা অভ্যস্ত, সেই মুষ্টিযোগ তো কদাপি কোনও 'বাঙালি'র প্রতি প্রয়োগ করিনি। জানিওনা কীভাবে করবো? ব্রাহ্মণী আমার সেই রূপ দেখেছেন অনেক। চোখের ইশারায় অনুরোধ করলেন রিয়্যাক্ট না করতে। সামলে নিলুম। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাঁদের সামনে লোকটিকে সমুচিত শিক্ষা দেবার ইচ্ছে বলপূর্বক সম্বরন করতে হলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের বইটিতেই মনোনিবেশ করলুম। আধঘন্টাটাক পরে তাঁদের গাড়ির সময় হলো। আমাদের প্রতি অগ্নিদৃষ্টি হানতে হানতে বিদায় হলেন তাঁরা। ঐ চত্বরে যতো বসার জায়গা ছিলো, সবগুলিতেই অগণিত মানুষ আসছেন, বসছেন, উঠে যাচ্ছেন। কোনও রকম গা'জোয়ারি, জবরদস্তির দৃশ্য নেই। সারাদেশের লোক রয়েছেন সেখানে। পঞ্জাবি, বিহারি, রাজস্থানি। তথাকথিত গোবলয়ের 'অসংস্কৃত', 'অমার্জিত' লোকজন সব। কিন্তু ন্যূনতম ভদ্রতার ব্যাঘাত নেই কোথাও। 'বাঙালি'য়ানার এই রূপটি প্রবাসী হিসেবে আমাদের খুব অচেনা নয়। এরকম একটি অবাঞ্ছিত, অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা আমার ব্রাহ্মণীকে বেশ অপ্রতিভ করেছিলো। আমাকে বললেন, -তুমি ঠিকই বলো! এই ভুল আর করবো না। -মানে? -বাঙালি দেখলেই আগ বাড়িয়ে বাংলা বলা....
মানব
ব্যাজার মুখ করে কত কাজ করিয়াছি, দুঃখের সাথে মাথার উপর থেকে ঘাম শুধু ঝরে পড়ে পায়ের উপরে পাত্তা দিইনা আমি, নিজেরেই কষিয়াছি সজোর সপাটে স্বামী থেকে আসামী, সই ও তো করিয়াছি ডিভোর্স পেপারে হয়ে গেছি নির্বোধ এক, ওনারা যে মজাই লোটেন বুঝতে পারিনি তাই ছুটে রোজ যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন সেখানেই গেলে ভাবি খুঁজে পাব পথের দিশা যাহা বলে শিরোধার্য, যেমতি বাপের চাকর পুরনো মনিবের হোক কেন যতই দুর্দশা পালাতে না পারে তবু বাবুদের করে দিয়ে পর তেমনি দেখি সেথা বারে বারে, বর্বরতা, ভাবি "বাবুরা তো এম'নি চলেন" পরদিন সব ভুলে তাই চলে সেই যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন। দিনশেষে সন্ধ্যা আসে ঘটেনাকো অঘটন কেন যে; ওনাদের মনোভাবে পড়েনাকো খিল রাত হয় বেড়ে চলে ঘ্যাঁটঘ্যেঁটে শরীরের ওজন খোলা চোখ হয়ে পড়ে বড়ই কাহিল সবাই ঘুমাতে যায়, আমাকেও যেতে হবে ছেড়ে, এই খাতা পেন শুধু পড়ে রবে, একা এই ভবে, বিধাতার হাঁদারাম লেন।
মনোজ ভট্টাচার্য
এক পেয়ালায় হাজার দিন ! তুং সান শহরে তি শী নামে এক শুঁড়ি ( মদ্য প্রস্তুত কারক ) নানা ধরনের মদ তৈরী করতে পারত ! তার মধ্যে থাকত নানারকম আয়ুর্বেদ মিশ্রিত এক ধরনের মদ - যেটা কিনা এক পেয়ালা খেলে এক হাজার দিন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে ! ওই অঞ্চলেই আরেকপ্রান্তে শুয়ান শী নামে এক পাঁড় মদ্যপ থাকত l সে তিএর তৈরী সেই বিশেষ মদ পান করার জন্যে দোকানে গেল l এক পেয়ালা চাইল পান করতে l ' - এই মদ তো এখনো জ্বাল দেওয়া হয় নি ! ' - দোকানদার তি বলল : ' এই অবস্থায় একটুও তোমায় দেওয়া উচিত হবে না !' ' – আরে - যা হয়েছে তারই অন্তত এক পেয়ালা দাও' - লিউ কাতর ভাবে অনুরোধ করলো l লিউএর ঐরকম বায়নায় - তি নিরুপায় হয়ে এক পেয়ালা সেই বিশেষ মদ দিল l ' - আহ ! দারুন হয়েছে ! আর একটু দাও !' ' - এখন দয়া করে কেটে পড়ো - বাড়ি যাও - আবার কোনো একদিন এস ' - তি খুব ধমক দিয়ে তাকে বারণ করলো l ' - যে এক পেয়ালা তুমি খেয়েছ - তারই জেরে এক হাজার দিন তুমি বুঁদ হয়ে থাকবে ' ! ধমক খেয়ে লিউ দোকান ছেড়ে চলে গেল l ও'র মুখের রং ইতিমধ্যেই বেশ ফ্যাকাশে মেরে গেছে l বেসামাল পায়ে টলতে টলতে - বাড়িতে গিয়েই লিউ প্রচন্ড মাদকতায় - মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়ল l ঘুম তো ঘুম ! - কদিন পরেও যখন ওর ঘুম ভাঙল না - পরিবারের লোকেরা ওকে মদ খেয়ে মরে গেছে ভেবে খুব কান্নাকাটি করলো ও যথা নিয়মে সমাধিস্ত করলো l আড়াই বছর পরে, দোকানদার তি'র মনে পড়ল লিউর কথা : - ' এবার তো লিউর জেগে ওঠার সময় হলো ! যাই, একবার ওর বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসি ! ' খোজ করে করে লিউএর বাড়ি এসে পৌছালো তি l -' লিউ কি বাড়ি আছে ?' লিউর বাড়ির লোকেরা খুব অবাক হয়ে গেল তি এর কথা শুনে l ‘ - লিউ তো অনেক দিন হলো মারা গেছে ! ওর অন্তেস্টিও হয়ে গেছে '! শুনে তি'র তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া ; ও বলে উঠলো -' আরে না না ! ও মরবে কি ! আমি যে মদ ওকে করে খাইয়েছি, সেটা খুবই কড়া - সেই এক পেয়ালার মৌতাতে ওর এক হাজার দিন ধরে ঘুমোবার কথা ! ও হয়ত আজ-কালই ঘুম ভেঙ্গে উঠবে !' তি তখন জোর করে লিউর পরিবারের সবাইকে নিয়ে কবরখানায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে কফিন ভাঙ্গতে বলল I ওই কবর থেকে সুমিষ্ট গন্ধ আসতে লাগলো l কফিন খুলতে দেখা গেল লিউ চোখ পিট পিট করে চেয়ে রয়েছে ও - ওকে যে সবাই ডাকছে তা শুনতে পারছে ! ' - নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকতে যে কি ভালো লাগে !’ লিউ বলে উঠলো ; আর তি কে জিজ্ঞেস করলো -' তুমি কি মিশিয়ে এই মদ তৈরী করেছ বাবা , যে খেয়ে একেবারে বুঁদ হয়ে গেছি ! - খুব কি বেলা হয়ে গেছে !' একথা শুনে সবাই খুব জোরে হেসে ফেলল l লিউর মুখ থেকে মদের ভীষণ মিষ্টি গন্ধ আসতে লাগলো - যা নাকি আড়াই বছর ধরে লিউকে বুঁদ করে রেখেছে ! মনোজ
শিবাংশু
পঁচিশে বৈশাখ সকালে খগেন ভাবলো অফিসে যাবেনা। কারণ ঐ দিন 'পঁচিশে বৈশাখ'। সরকারি পাব্লিক হলে একটা ছুটি পাওয়া যেতো, নিখরচায় I তার কপালে নাই। তার এও মনে হলো কোনও জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনে শনিপুজোর ভক্তদের মতো হাত জোড় করে বসে না থেকে কিছু অন্য কাজ করলে হয়তো বাবার আত্মা বেশি খুশি হবে। হ্যাঁ, খগেন অনেক বাঙালির মতো রবিবাবুর স্বঘোষিত সন্তান। তার এই স্বোপার্জিত পিতা সম্পর্কে আজকাল লোকজন কী ভাবছে সেটা নিয়ে একটা ওপিনিয়ন পোল করা যেতে পারে। সহজ কাজ অথচ বেশ স্টিমুলেটিং। গলির মোড়ের গাছতলাটা বেশ ছায়া... কিছুক্ষণ দাঁড়ানো যায় সেখানে। লোকজনেরও আসাযাওয়া আছে। -এইযে নমস্কার, আপনার নামটা একটু বলবেন... -ক্যানো... -এই একটা কথা জানার ছিলো... -আমার নামে কোনও কথা নেই, অমলেন্দু রঞ্জন হালদার...বলুন, - আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? -কে কোবি রবীন্দ্রনাথ? কিস্যু ভাবিনা। ভাবার কী আছে? কতো লোক ভাবছে... আর ভাবতে পারিনা... ওসব পদ্য টদ্য পড়ে হবেটা কী? তবে জানেন বিয়ের পরে একদিন বৌকে ইম্প্রেস করতে একটা কোবিতা বলতে গেসলুম, বাংলা অনার্স কি না.. তা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে... বুঝলুম ও লাইনে হবেনা। তার পর কোবিতা-টোবিতা মায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। - ইয়ে...ঠিক আছে, ধন্যবাদ... -আপনার নামটা একটু যদি বলেন... - রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের নাম জিগ্যেস করাটা বেশ ভালো কাজ, তবে একটু ডেঞ্জারাস ... - না, না আমি একটা প্রশ্ন করতুম শুধু... - কোথায় থাকি? বলবো না... আর কিছু.... - না না তা নয়, আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? - বাহ, আপনার টেকনিকটা বেশ ভালো... - না না আমি সত্যি শুধু এইটুকুই জানতে চাই... - সুদক্ষিণা মজুমদার, - দারুণ... - ঠিক ধরেছি , মতলবটা খারাপ... -আরে না না খারাপ নয়, মতলব মানে শুধু রবীন্দ্রনাথ... -বেশ, তবে বলি... -আজ্ঞে হ্যাঁ - দেখুন রোবীন্দ্রনাথ হলেন গিয়ে রোবীন্দ্রনাথ, মানে রোবীন্দ্রনাথই সেই রোবীন্দ্রনাথ, অর্থাৎ কি না যে রোবীন্দ্রনাথ আমাদের সব কিছু। মানে আমার নামটা দেখছেন এবং আর অন্য যা কিছু, সব কিছুই ঐ রোবীন্দ্রনাথ। বুজলেন... - হ্যাঁ জলের মতো, অনেক ধন্যবাদ... ছেলেটির চেহারা বেশ উজ্জ্বল। এরা কি রবীন্দ্রনাথ পড়ে? দেখা যাক, -এই যে ভাইটি, আপনার নামটা একটু বলবেন? -কোন নাম? আমার বহু নাম আছে... পদ্য লেখার নাম? গদ্য লেখার নাম? ফেসবুকের নাম? প্রেমিকার দেওয়া নাম? মাস্টারের দেওয়া নাম? আমারি নাম বলবো, আমি বলবো নানা ছলে....(সুরে) - আপনার বাবার দেওয়া কোনও নাম আছে কী? - আছে, তাও আছে, তবে সেটা তেমন ভালো নয়, চিন্ময় কর... - আপনি নিশ্চয় কবিতা লেখেন - অবশ্যই, দুহাতে লিখি, কেন? - এই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আপনি কী ভাবেন, এই একটু কৌতূহল আর কি? - (চোখ বুজে) ভরণী নক্ষত্র থেকে ঝরেছে দু এক বিন্দু জল, বিশাখায়, সে কোন তিয়াসায়, দিবাকর রশ্মি যেন, মার্গদর্শী রাজপথে লুপ্ত হলো বিভোর বিভাবরী.... - সাংঘাতিক... - সাংঘাতিক !!! মানে? - মানে ফাটিয়ে দিলেন আর কি... - তাই বলুন... কী যেন জানতে চাইছিলেন? - ঐ রবীন্দ্রনাথ... - ওনার সম্বন্ধে আমি বাংলায় তেমন কিছু বলতে পারিনা, ইংরিজি চলবে... - আমি আবার তেমন বুঝিনা ওটা.... - ধ্যুস মশায় , ওয়েস্টিং মাই টাইম... - নিশ্চয়, নিশ্চয়.... অনেক ধন্যবাদ... এই মেয়েটিকে খুব স্মার্ট লাগছে, কলেজ থেকে ফিরছে বোধ হয়... - নমস্কার, কলেজ ফেরত নাকি? - আপনি কে মশায়, বেশ অসভ্য তো... - আজ্ঞে না না আমি একটু রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা বোঝার চেষ্টা করছি... - ও, তাই বলুন। আমি কলেজ থেকে ফিরছি না , ছেলেকে স্কুল পৌঁছিয়ে আসছি, - সে কী আপনার এতো বড়ো ছেলে ? - হ্যাঁ যথেষ্ট ধেড়ে ছেলে আমার... - বাহ বাহ, এদিকেই থাকেন না কি? - দেখুন, এই তাপসী চ্যাটার্জির রাগ তারাতলা থেকে আমতলা সব লোক জানে... সমঝে চলে... - ওহ সরি, রাগবেন না প্লিজ, আমি ঐ রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দু চারটে কথা, মানে আপনার কথা জানতে চাইছিলাম... - দেখুন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে আমি একটু ভাবালু হয়ে পড়ি। চোখে-টোখে জল এসে যায়, একটু নিশ্বাসের কষ্টও হয়... - তবে থাক থাক... - তবে ওনার লেখা গল্প থেকে যতো সিন্মা হয়েছে সেগুলো আমি চান্স পেলেই দেখি। তবে ভাববেন না আমি কবিতা বুঝিনা, একবার কাম্পুচিয়াতে মানুষের হাড়ের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে "ভগবান তুমি যুগে যুগে" পড়েছিলাম... - বাহ বাহ শুনলেই কম্পো হয়.. তা আপনি ওদিকেও যান নাকি... -আরে মশাই আমি তো ওদিকেই থাকি... - আচ্ছা আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ... এছেলেটি মনে হয় কিছু ভাবছে, একটা ভাবুক ব্যাপার আছে চেহারায়... - নমস্কার, আমি খগেন ... আপনার নামটা জানতে পারি - পারেন। শত্রুদমন চক্রবর্তী। - এমন নাম বিশেষ শুনিনি... - কী জানেন আপনি পৃথিবীর? বহু কিছু জানা বাকি আছে... - ইয়ে তাতো বটেই।।এদিকেই থাকেন নাকি? - আমি স্থলপথে থাকি চুয়ান্ন নম্বরে, তবে বেশির ভাগই জলপথে থাকতে হয়... (উদাসিন) - ও বুঝেছি, নেভিতে আছেন নাকি? - না আমি সরকারি বৈজ্ঞানিক... - আচ্ছা আচ্ছা ... আসলে আমি একটু কৌতূহলী আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন, এই নিয়ে? আসলে আপনাকে একটু অন্যমনস্ক দেখছি .... বাড়িতে সবাই ভালো তো? - না ঠিক অন্যমনস্ক নই, মন্দাক্রান্তা এখন একটা পদ্য লিখছে ঘরে বসে আমি তার শব্দগুলো অনুমান করার চেষ্টা করছি... - ঘরে বসে পদ্য, শব্দ এখানে? আপনার বান্ধবী বুঝি? - ধুর মশাই.. আপনি একটি যন্ত্র... মন্দাক্রান্তা একজন কালজয়ী কবি , আমি তার ভক্ত... - তবে রবীন্দ্রনাথও আপনি পড়েছেন? - পড়েছি, কিন্তু ওনার পদ্যগুলো ফুরাতে চায়্না... ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কখনো দেখা হলে পরের জন্মে একটু ছোটো কবিতা লেখার রিক্যুয়েস্ট করবো। আসলে লেখার নেশায় এতো আজে বাজে লিখেছেন ... কে পড়বে এতো... তবে এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা হয়না.. সন্ধের পর নিম্তলাঘাটে আসবেন, তখন কথা হবে, জলপথে... - য়্যাঁ.. বেঁচে থেকে? - ইয়েস । কেলো আর পঞ্চা অনেক ক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলো খগেনকে। ওরা পেশায় প্রায় 'সমাজবিরোধী' আর নেশায় রাজনৈতিক কর্মী। - এই খগা। অনেক্ষণ থেকে দেকচি তুই এর পিছনে ওর পিছনে ঘুরচিস, ব্যাওড়াটা কী... - আরে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে লোকেদের কাছে জানতে চাইছি... - কোন রবি? ঐ পাংচারওয়ালা? - আরে না না , কবি রবীন্দ্রনাথ... - কোবি ড়োবিন্দনাত...!!! - হ্যাঁ ঠিক তাই.. - কোতায় থাকে সালা.. - আরে ছি ছি অমন বলিস না - তবে খুঁজচিস ক্যানো? - এমনিই.... - কাদের পাট্টি ছিলোরে? এবার পঞ্চা তার ক্ষুরধার বুদ্ধি জাহির করে, - বুয়েচি বুয়েচি, ঐ দাড়িওয়ালা বুড়োটা... ভোটের সময় ওর কোবতেগুলো বলেচিলো দেওয়ালে লিকতে...ওর পুজোয় অ্যাকন ছুট্টি দ্যায়.... দ্যাক খগা, ও বুড়ো আমাদের পাট্টি, তুই ভোটার ভাগাবার চক্কর কোরিস না, পাড়ার ছেলে তাই এবার ছেড়ে দিলাম... এখন ফোট, নয়তো বাবার নাম... যাহ তুই তো স্লা নিজেই খগেন, তোর বাপের আর নাম কী হবে.....?
Kaushik
- তুই তার মানে প্যান্ডেলের পারমিশন নিতে যাবি না? - কাম অন গীতু! সত্যি করে বল তো - এই সব হুজুগের কি কোনো দরকার আছে? - এতে হুজুগের কি দেখলি? আর দরকারটাই বা নেই কেন? - আরে‚ নতুন বছর নিয়ে এই আদিখ্যেতার মানে কি! সেই তো পৃথিবী সূর্যর চারিদিকে পাক খাবে আর লাট্টুর মতন ঘুরবে; দিন-রাত হবে আর তার থেকেই একটা দিনকে "নতুন বছর" বলে তোরা লাফাবি; কিছু লোক পার্ক স্ট্রীটে আর কিছু জোড়াসাঁকোতে গিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করবে| এই তো? - তাই নাকি! তবে তো রবীন্দ্র জয়ন্তীতেও কোনো অনুষ্ঠান না করলেই হয়| আর প্রতি বছর ৭ই নভেম্বরেই বা গলার শিরা ফুলিয়ে‚ হাত মুঠো করে কি প্রমাণ করতে চাস? - যে উদাহরণ দুটো দিলি‚ তার সাথে এই কেসটার পার্থক্য আছে - সেটা বুঝতে শেখ! দুটো কেস এক নয়| - নেচারটা অবশ্যই এক নয়‚ কিন্তু ডিগ্রীটা একই! - তোকে বলেছে! যা বুঝিস না‚ তা নিয়ে কথা বলতে আসিস না| - ঝগড়া করবি না| লজিকে আয়! - আবে‚ কিসের লজিক! যে ক্যালেন্ডার মেনে সারা বছর একটাও কাজ করিনা‚ সেই ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনে উদ্বাহু হয়ে নাচা আমার পোষাবে না! - সে তো ধ্রুপদি মার্ক্সিজিম মেনে দুনিয়াতে একটাও দেশ চলে না; তাতে কি ব্যাপারটা মিথ্যে হয়ে যায়‚ নাকি তার জন্য তোরা রাজনীতি করা ছেড়ে দিয়েছিস? - ধুর! এটা কোনো লজিকই নয়! ১লা বৈশাখ‚ ২৫ শে বৈশাখ‚ ২২শে শ্রাবণ - এই তো দৌড়! এর বাইরে একটা তারিখও কেউ মনে রাখে না| তাই বাংলা নতুন বছর নিয়ে আদিখ্যেতা আমার কাছে অন্তত ভাবের ঘরে চুরি! - তা নয় রে চাঁদু! গত বছর সেমিস্টারের পরে বাবার সাথে একটা সরকারি অনুষ্ঠানে গেছিলাম| অরুণাচলের লোহিত ডিস্ট্রিক্ট| ওখানকার মিশমি জনজাতীর মানুষদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ছিলো| ডায়াসে বসা সব ডেলিগেটরা মিশমিদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পড়েছিলো| তাই এই বাংলা নববর্ষ উদযাপনটাকেও একই ভাবে দেখতে কি তোর খুব অসুবিধে হচ্ছে? - বুঝলাম| মানে‚ একটা endangered ক্যালেন্ডারকে বাঁচানোর ঠেকা নিতে হবে| তাই তো? - ঠেকা নেওয়ার তুই-আমি কেউ নই রে চাদুঁ! প্রতি বছর নীলার সাথে যে ঢুলতে ঢুলতে ডোভার লেনে গিয়ে বসে থাকিস - কেন থাকিস? ওই ধরনের গান বাজনায় তো তোর কোনো উৎসাহ নেই‚ তবু কেন যাস? ওর ভালো লাগবে বলেই তো যাস|! সে ভাবেই ভাব না ব্যাপারটাকে| - মানে? কার ভালো লাগার জন্য নববর্ষ উদযাপন করতে যাবো? তোর? - আমার ভালো লাগা নয় রে গাধা! নববর্ষ উদযাপনের সাথে অনেক মানুষের ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে| আমরা পয়লা বৈশাখের একটা অনুষ্ঠান করলে কিছু মানুষ যদি খুশি হয় - সে টুকু বুঝবি না| - আরে‚ তার জন্য আমরা কেন? ইউনিভার্সিটি কেন? পাড়ায় পাড়ায় তো হচ্ছে ম্যারাপ বেঁধে অনুষ্ঠান| লোকে সেখানে গেলেই তো পারে! - বোকা বোকা লজিক দিস না! তা হলে তো সারা কলকাতার দূর্গা পুজো কমিয়ে একটাতে নামিয়ে আনলেই হয়! সকলে সেখানে গিয়েই ঠাকুর নমো করে আসবে না হয়! - প্রচন্ড বোকা বোকা ব্যাপার! ধুর শালা‚ এই জন্য তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না| - যাক! মেনে নিয়েছিস তা হলে| যা‚ এবার সোনা ছেলের মতন ভিসির কাছে পারমিশন নিতে যা| - ফোট‚ তোর ওই সব ঢপের লজিক কোনো লজিকই নয়! তোর ওপর দয়া করে যাচ্ছি কথা বলতে - বুঝলি! - তাড়াতাড়ি যা - ভিসি বেড়িয়ে যাবেন নইলে| আরে চাঁদু‚ শুনে যা! - কি? - শুভ নববর্ষ!
সুচেতনা
আমার ঘুম বড় অদ্ভুত। ঘুমের মধ্যে জ্ঞান থাকে। হিসেব করতে পারি। ঘুমের মধ্যেই নিজেকে বলি মনে মনে যখন এত কিছু পারছি, তখন নিশ্চয়ই আমি জেগে আছি, ঘুমিয়ে নেই। ঘুম থেকে ওঠার পরেও ঘুমের মধ্যে কী কী দেখেছি, কী কী ভেবেছি সব ছবির মত মনে থাকে। শুধু সময়জ্ঞানটা থাকে না। স্থানকাল খেয়াল থাকে না। সেদিন ভরসন্ধ্যেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না। ছেঁড়া ঘুম। যতবার আধোঘুমে চোখ মেললাম, সব অন্ধকার, নিশ্চুপ দেখে ঘুমের মধ্যেই ভাবছিলাম রাত দুটোতিনটে হবে। ছেলে যখন দরজায় চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকছিল, তখন সেই আওয়াজে ঘুমের মধ্যেই মনে হল - এত রাতে চোরই নিশ্চয়ই চাবি ঘুরিয়ে ঢুকছে ঘরে, ঘুমের মধ্যেই "কে কে" বলে এমন চেঁচালাম, ছেলে দরজা খুলে ভয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেল, প্রতিবেশিনী ছুটে এলেন। ঘড়িতে তখন মোটে সন্ধ্যে আটটা। আজকাল নতুন উপসর্গ হয়েছে। ঘুমের মধ্যে অতীতভ্রমণ। ফেলে আসা সময়গুলো ছবির মত দেখতে পাই। বড় জ্যান্ত ছবি, নিজেকে সেই ফেলে আসা মুহুর্তটাতেই দেখতে পাই। দুপুরবেলায় বড় ঘুম পায় আজকাল, ঘুমোতে তো আর পাই না দুপুরবেলায়। অথচ বছর তিরিশেক আগেও মা বৃহস্পতিবারের দুপুরে আর রবিবারের দুপুরে, তারপর গরমের ছুটির দুপুরে রোজ সাধ্যসাধনা করত, একটু ঘুমিয়ে নিতে। আমার সেই ঘুমটুকুরও সময় হত না তখন। সেই পাপেই মনে হয়, এখন দুপুরবেলা এত ঘুম পায়। বিয়াল্লিশবছরের ফেলে রাখা ঘুম শোধ তুলতে চায়। তাই হয়তো রাতের বেলায় আজকাল আমাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে তিরিশ-বত্রিশ বছর আগেকার দুপুরগুলোয়। তখন সুবিধেমতন দশবছরের বা বারোবছরের মেয়ে হয়ে যাই। বিয়াল্লিশবছরের বুড়িটা গালে হাত দিয়ে দেখে নেয় সেই উমনোঝুমনোটাকে। যেসব দুপুরবেলাগুলো আজকাল রাতেরবেলায় হানা দেয়, তেমন কয়েকটা লিখে রাখলাম। ভাগ্যিস ঘুমের মধ্যে ফেলে আসা দুপুরগুলো দেখতে পাচ্ছি, তা নয়তো স্মৃতিশক্তির যা অবস্থা হয়েছে আজকাল! কত কিছুই যে জমে থাকে ছাই! থাকুক তবে জমে। #জমানোদুপুর-১ আমার সেই পুরনো ঘরের সরু খাট। বালিশের উপর শিউলিবাড়ি। বইয়ের আদ্ধেক অব্দি পড়ে চোখ বন্ধ করে উপুড় হয়ে দেখছি - রুক্ষ পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বেয়ে একটা লোক উপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। চওড়া পিঠ, বড়সড় কাঠামো। উঁচু পাথর, ঝোপঝাড় কিচ্ছু মানছে না। ঝোপের গাছ মুঠো করে খাবলে ধরে দিব্যি টপাটপ পাথর চড়ছে, তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার পিঠের সাদা পিরাণটা খোঁচা লেগে ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। বহু দূর থেকে ঝপঝপ করে জল পড়ার আওয়াজ হয়েই চলেছে। আওয়াজটা থামছে না। কোথা থেকে জল পড়ছে, দেখাও যাচ্ছে না। আমিও দেখতে পাচ্ছি না, লোকটাও পাচ্ছে না। আমি জানি লোকটা কোথায় যাচ্ছে। একটা নদীর উৎসমুখ খুঁজতে। লোকটার কাছে ম্যাপ নেই, কম্পাস নেই, কিচ্ছুটি নেই। #জমানোদুপুর-২ এখন আসলে আর দুপুর নেই। কখন যেন দুপুর গড়িয়ে আলতো অন্ধকার আসি আসি করছে। মায়ের বড় খাটে মধ্যিখানে জোড়া হাতি আঁকা জয়পুরি চাদর। মা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু মায়ের হাতে এখনো আলগোছে ধরা 'ফাঁসির মঞ্চ থেকে'। আমার হাতে মোটা একটা বই - প্লাস্টিকের জ্যাকেট পরা অপু। প্লাস্টিকের জ্যাকেটের ধারগুলো ছিঁড়ে এসেছে। আমি বসে আছি সতুদের বাগানে। বসে বসে দেখছি - রাণুদি কাজলকে ভাত আর মাছ মেখে গরাস পাকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের শোওয়ার ঘরের কোনে কে ওটা দাঁড়িয়ে আছে? আমি তো বাগানে ছিলাম, আমাদের ঘরের ভিতরটা দেখতে পাচ্ছি কী করে? শাড়ি পরে টিপ পরে দাঁড়িয়ে আছে। গুনগুন করে কী যেন বলছে! আমাকে বর চাইতে বলল কি? কিন্তু আমি তো ভালো মেয়ে নই। তবে? #জমানোদুপুর-৩ শীতকাল। গায়ে হাল্কা গোলাপি রঙের উলের চাদর জড়িয়ে একটা কমলালেবু রঙের দুপুরে মায়ের পাশে মাদুরে বসে আছি। আমার হাতে গালিনা দেমিকিনার বনের গান। আর মায়ের হাতে দেশ। আমার হাল্কা গোলাপি রঙ বড় প্রিয় বলে দিদা নিজের হাতে এত বড় উলের চাদর বুনে দিয়েছে। বাবার ছাই রঙা শালটা বড় আরাম, ওটা গায়ে জড়ালে মনে হয় বাবার কোলে বসে আছি, তাই ওটা জড়িয়ে থাকতাম সবসময় শীতকালে। সোয়েটার পরলে আমার গা কুটকুট করে। তাই দিদা আমাকে উলের চাদর বুনে দিয়েছে। আমাদের বাড়িতে রোদ আসে না বলে মা শীতের দুপুরবেলায় বাড়ির সামনের মাঠে বসে রোদ পুইয়ে নেয়, আমিও মায়ের পাশে বসি তখন। বনের গান বইটা আমার বড় প্রিয়। তিনটে গল্প আছে। কিন্তু শেষের গল্পটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় - আমার কাপ্তেন। পেতিয়া নামের একটা ছেলে হাঁটতে পারে না, তার গল্প। হর্তাকর্তা মিনসে তাকে খবরের কাগজ কেটে হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দিয়েছিল। ওটা বনবনদি ফিরছে না কলেজ থেকে? ছোট্ট ছোট্ট হলুদ কল্কা বসানো বাদামি রঙের শাড়ি পরে! দৌড়ে গিয়ে বনবনদির হাত ধরি, বনের গান খুলে দেখাই, "বনবনদি আমাকে এরকম হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেবে?" বনবনদি কখনো কাউকে "না" বলে না। বলতেই জানে না। বনবনদির হাত ধরে জেঠিমার বাড়ি। জেঠু-জেঠিমাও খবরের কাগজের তাড়া নিয়ে আসে, বনবনদি হাসিমুখে বসে বসে আমাকে এত এত হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেয়। বাবাইদাদা দেখে মুচকি হেসে বলে, "দাঁড়া, আমিও তোকে একটা মালা বানিয়ে দিই।" বাবাইদাদাও খবরের কাগজ ভাঁজ করে করে তার উপর কী যেন আঁকে, দেখতে দেয় না। কাঁচি দিয়ে কেটে যখন মালা বানিয়ে দেয়, দেখি লেজে লেজে জোড়া লাগানো, বসে থাকা বাঁদরের মালা। আমি ঠোঁট ফোলাই, সবাই হাসে। জেঠিমা হাসিমুখে বাবাইদাদাকে চোখ পাকায়। বাবাইদাদা তখনো হাসতে থাকে। আমি রেগে গিয়ে বাবাইদাদাকে বলি "আর কক্ষনো তোমার সঙ্গে কথা বলব না।" বাবাইদাদার উপর শুধু ঘুমের মধ্যেই আজকাল রাগ করতে পারি। কখনো দেখা হয়ে গেলে সামনাসামনি ঝগড়া করার উপায় বাবাইদাদা আর কোনোদিনের জন্য রাখে নি। রাখে যে আর নি, সে খবর তো আমিই মাকে দিয়েছিলাম ফেসবুক থেকে জানতে পেরে। তার মানে আমি এখন ঘুমিয়ে আছি। বাবাইদাদা ঘুমের মধ্যেই থেকো তবে।
Ramkrishna Bhattacharya Sanyal
সমুদ্র মানেই এক অজানার হাতছানি। মানুষ এই অজানাকে জানার চেষ্টা করেছে বারবার, সেই প্রাচীন কাল থেকেই। আমাদের প্রাচীন ভারতেও সমুদ্র যাত্রা ছিল। এই যাত্রা মূলত হত ব্যবসার কারণে। পরে, আরও নানা কারণে এই যাত্রা হত। ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হয়েছে, বহু শতাব্দী ধরে। চিন, আরব, পারস্য আর ইউরোপের অনেক পরিব্রাজকের লেখাতেও এর উল্লেখ আছে। বেশ কিছুদিন আগে, গুজরাতের লোথাল অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার বছর আগের বানানো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ড্রাই ডকের (dry dock) আবিষ্কার হয়েছে। পূর্ব এবং পশ্চিমে, তিনটি মহাদেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে ভারতের বহু হাজার বছর ধরে কৃষ্টি আর বাণিজ্যের সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রমাণ ঐ মহাদেশগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার আগে তৈরি উর ( UR) এবং সম্রাট নেবুকাডনেজারের (Nebuchadnezzar) প্রাসাদে যে কাঠের তক্তা এবং থাম পাওয়া গেছে, তা হলো ভারতীয় টিক আর দেবদারু গাছের গুঁড়ি থেকে তৈরি। ঋগ্বেদে দেখি:- সমুদ্র দেবতা বরুণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা। বরুণদেবতার আশীর্বাদ ছাড়া, সেকালে এবং এখনও সমুদ্রযাত্রা যে নিরাপদ নয় , সেটা বারবার বলা আছে। মন্ত্রটি হল:-শম্ ন বরুণঃ! অর্থাৎ:- হে সমুদ্র দেবতা বরুণ, তোমার আশীর্বাদ যেন নিরন্তর পাই! এইটাই এখন ভারতীয় নৌবাহিনীর CREST বা ব্যাজ! ১৯৪৮ এ চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী এটা বেছে দেন। বৃক্ষ আয়ুর্বেদে আছে জাহাজ তৈরির বিশদ বিবরণ!!!! শ্রী রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় তাঁর- HISTORY OF INDIAN SHIPPING বইতে লিখেছেন:- ধারা রাজ্যের ভোজ, যাকে আমরা ভোজরাজা বা ভোজ নরপতি নামে জানি আর যিনি প্রাচীন ভারতে ম্যাজিকের স্রষ্টা( ভোজবাজী হচ্ছে- MAGIC এর কমন বাংলা), কৌটিল্য বা চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের মতই একটা বই লিখেছিলেন। নাম:- “যুক্তি কল্পতরু”। এতে রাজ্য শাসনের বিস্তৃত তথ্য আছে। এরই মধ্যে, একটা অংশ হলো বৃক্ষ আয়ুর্বেদ। এই খানে জাহাজ তৈরির জন্য কাঠের জাতি বিভাগ বা WOOD CLASSIFICATION আছে। আমাদের সামুদ্রিক ইতিহাসের আরও অনেক কথা, অনেক ঘটনা নানা জায়গায় আছে, যা হারিয়ে যাওয়া পুঁথি এবং তথ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরিব্রাজক মার্কো পোলো তাঁর ডায়রিতে লিখে গেছেন, তখন ভারতে তৈরি জাহাজে থাকতো চারটি মাস্তুল, চোদ্দটি ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্ট, ষাটটি কেবিন আর দশটি লাইফবোট আর ক্রেন। এবার ভাব, এইসব তো একদিনে তৈরি হয় নি! এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, সমুদ্রযাত্রার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং তার পর আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা। যখন মানুষের নানা বিষয়ে শ্রীবৃদ্ধি হয়, যখন বৈভব এবং ঐশ্বর্য তাদের কাছে সুখ বাড়াতে সাহায্য করে, তখন নিজের দেশ ছেড়ে দুর্গম স্থানে পাড়ি দিয়ে, ব্যবসা করে উত্তরোত্তর বৈভব এবং ঐশ্বর্য বাড়ানোর জন্য নিজের জান কবুল করতেও দ্বিধা করে না। তখনকার সময়ে রাস্তাঘাটে, হিংস্র জন্তু, ডাকাতকে মোকাবিলা করে, অপার সমুদ্র পাড়ি দিতেও দোনোমোনো করত না। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু কম্পাস ছিল না! তাহলে এরা দিকভ্রষ্ট হত না কেন? এখানেই খুব সহজ উত্তর আছে। ব্যবসার জন্যই জ্ঞান- বিজ্ঞানের চর্চা আর জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছিল। লিখতে যতখানি সময় লাগছে, তার চেয়েও ঢের বেশী সময় লেগেছে এই ব্যাপারে গবেষণা করতে। এই সমুদ্র যাত্রার বিপদও ছিল অনেক। জাহাজ ডুবিতে প্রচুর মানুষের প্রাণ গিয়েছে। তাও মানুষ এই নেশাটা ছাড়তে পারে নি। ফলে, আমাদের দেশে সমুদ্র যাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়। জাত- ধর্ম যাবে, এই দোহাই দিয়ে কালাপানি বা সমুদ্রযাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ তো গেল, প্রাচীন ভারত বা পৃথিবীর কথা। ফিরে আসি মাত্র একশ পাঁচ বছর আগের কথায়। ইংল্যাণ্ড থেকে আমেরিকায় যাতায়াতের জন্য দরকার পড়ত আটলান্টিক মহাসাগর পেরনোর। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিমান বা প্লেন ছিল না। জাহাজই ছিলো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার একমাত্র ভরসা। ইউরোপ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার জাহাজ ব্যবসা ছিল খুব লাভজনক। কম সময়ে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পার হবার জন্য, যাত্রীদের আকৃস্ট করতে জাহাজ কোম্পানী গুলোর মধ্যে চলত প্রতিযোগীতা। ঐ সময়ের ইংল্যান্ডের প্রধান দুই জাহাজ কোম্পানী হল হোয়াইট স্টার(White Star) এবং কুনার্ড( Cunard )। ১৯০৭ সালে কুনার্ড কোম্পানী যখন খুব কম সময়ে আমেরিকা পৌছানোর দ্রুতগতি সম্পন্ন জাহাজ লুইজিতানিয়া (Lusitania )এবং মৌরিতানিয়া ( Mauretania) তাদের বহরে যোগ করল , চিন্তায় পড়ে গেলেন হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর চেয়ারম্যান ইসমে ( J. Bruce Ismay )। বেলফাস্টের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) এর মালিক উইলিয়াম পিরি ( William Pirrie,) এর সাথে পরামর্শ করে তিনটা বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ অলিম্পিক( Olympic ) টাইটানিক (Titanic)এবং ব্রিটানিক(Britannic, এটাও ডুবে গেছিল। ) তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। এই কোম্পানীর সব জাহাজেরই নাম শেষ হতো “ইক” দিয়ে। এই নামকরণের আর একটু ইতিহাস বলে নিলে, সুবিধে হবে। গ্রিক পুরাণে জাইগান্টোস (Gigantos) হচ্ছে, ধরিত্রী দেবী গেয়া (Gaea) এবং আকাশ দেবতা ইউরেনাসের (Uranus) একশ সন্তান, দৈত্যাকার বন্য এক প্রজাতি। এরা দেখতে মানুষের মত, কিন্তু সুবিশাল আকার ও শক্তির জন্য খ্যাত। জাইগান্টোমেকি (gigantomachy) নামে এক যুদ্ধে অলিম্পিয়ানদের (Olympian) হাতে এরা ধ্বংস হয়ে যায়। জাইগান্টোসদের মতো টাইটানরাও গেয়া ও ইউরেনাসের সন্তান আরেকটি প্রজাতি। অলিম্পিয়ানদের সর্দার জিউস টাইটানোমেকি (titanomachy) যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার আগে এরা পৃথিবী শাসন করত। এদের নাম থেকে টাইটানিক শব্দটি পাওয়া যায়, যার মানে অত্যন্ত বৃহদাকার। ১৯০৯ সালে হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) কোম্পানির এনজিনিয়ার, টমাস এন্ড্রু (Thomas Andrews ) র নকশায় শুরু হল টাইটানিক জাহাজের নির্মাণ কাজ। সেই সময়ের সবচেয়ে বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে টাইটানিককে গড়ে তোলা হল। জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজকে ভাগ করা হয় ১৬টা আলাদা প্রকোষ্ঠে বা চেম্বারে। এক প্রকোষ্ঠ হতে অন্য প্রকোষ্ঠে জল ঢোকা ছিল অসম্ভব । ১৬ টার মধ্যে ৪ প্রকোষ্ঠে জল ঢুকলেও জাহাজ ভেসে থাকতে অসুবিধা হত না। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন টাইটানিক জাহাজ কোনদিন ও ডুববে না। ৩১শে মে ১৯১১ সালে ২২ টন সাবান দিয়ে মসৃণ করে তোলা রাস্তা বেয়ে জলে নামান হল টাইটানিককে। জলে নামানোর সময় কাঠের তক্তা পড়ে মারা যায় এক কর্মী। জানা নেই. তারই অভিশাপ লেগেছিল কিনা টাইটানিকের ওপর। তারপর শুরু হল যন্ত্রপাতি লাগানো, সাজশয্যা। ১৯১২ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে পরীক্ষামূলক সমুদ্র যাত্রা শেষ হওয়ার পর তাকে নিরাপদ এবং আরামদায়ক সমুদ্র ভ্রমন উপযোগী জাহাজ হিসেবে হস্তান্তর করা হল জাহাজ কোম্পানীর কাছে । জাহাজের পুরো নাম হল RMS Titanic (Royal Mail Ship = RMS)। ওজন-৪৬,৩২৮ টন। লম্বায়- ৮৮২ ফুট ৬ ইঞ্চি। গতিবেগ :-ঘন্টায় ২৩ নট বা ৪৪ কিলোমিটার। ধোঁয়া বোরোনোর জন্য ফানেল ছিল, ৪ টে। প্রত্যেকটার উচ্চতা ছিল- ৬২ ফুট। ২৯ টা বয়লার ছিল, বাষ্প তৈরি করার জন্য। যাত্রী বহন ক্ষমতা ছিল-৩৫০০। যদিও প্রথম ও শেষ যাত্রায় যাত্রী ছিলেন-২২২৪ জন। এদের মধ্যে বেঁচে ফিরেছিলেন মাত্র ৭১০ জন। জাহাজে, কুকুর ছিল ১০ টা। সব কটাই মারা গেছিল। এই জাহাজ কোনোদিন ডুববে না, এই ঘোষণা হয়, সেই সময়। তাই জাহাজে ৬৫ টি লাইফবোট নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ঐ দিন ছিল মাত্র ২০ টি । লাইফবোটের মোট ক্ষমতা ছিল ১১৭৮ জন। কিভাবে লাইফবোট ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে মহড়া অনুষ্ঠানের কথা ছিল ১৪ই এপ্রিল,১৯১২ র সকালে। অজ্ঞাতকারনে টাইটানিকের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ ঐ দিন মহড়া অনুষ্ঠান বাতিল করেন। মহড়া হলে আরো কিছু জীবন রক্ষা পেত এমন ধারনা করেন অনেকে। আটলান্টিক পেরুনোর ,২৬ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের। এইখানে একটা কথা বলা দরকার। সেইসময়, পাল তোলা জাহাজের আর বাস্পচালিত জাহাজের ছিল যুগসন্ধিক্ষণ। দুরকম ভাবে জাহাজের মুখ ঘোরানো হত। পাল তোলা জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে, ঠিক তার উল্টো দিকে হুইল/ টিলার ঘোরাতে হত। একে বলা হত, “টিলার অর্ডার”। বাস্পচালিত জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে সেইদিকেই হুইল/টিলার ঘোরালেই হত। একে বলা হত “ রাডার অর্ডার”। জাহাজের চালক, রবার্ট হিচিনস, এই দুটোই জানতেন। কারণ, তখন আটলান্টিক পেরুনোর জন্য এই দুটো পদ্ধতিই জানা আবশ্যিক ছিল। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, এই ষ্টিয়ারিং ভ্রান্তি। জাহাজ কম সময়ে পাড়ি দেবে, আর ডুবে যাবে না, এই ধারণাতেই ক্যাপ্টেন স্মিথ সমুদ্রে বড় বড় হিমশৈল থাকার প্রায় গোটা সাতেক সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছিলেন। পরে জানা গিয়েছিল, হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর অন্যতম মালিক ব্রুসের নির্দ্দেশ ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের ওপর, তিনি যেন কোনো অবস্থাতেই জাহাজের গতিবেগ না কমান। পরে, হিমশৈল থাকার বিপদ বুঝে, ফার্ষ্ট অফিসার উইলিয়াম মার্ডক যখন চালক হিচিনসকে পরামর্শ দেন, জাহাজের মুখ ঘোরানোর জন্য, তখন হিচিনস ভয়ে, “টিলার অর্ডার” আর “ রাডার অর্ডারের” মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। “টিলার অর্ডার” দিয়ে তিনি জাহাজের মুখ ঘোরানোর চেষ্টা করলেও জাহাজ কিন্তু আসলে, হিমশৈলের দিকে গিয়ে ধাক্কা মারে। তারপরেই ঘটে যায়, ঠিক শতাব্দী প্রাচীন সেই মারাত্মক দুর্ঘটনা। আমরা সবাই সেই আত্মাদের শান্তি কামনা করি, যারা মারা গিয়েছিল, সেই অভিশপ্ত রাতে। ১৫/০৪/১৯১২ র রাত ১.৩০ থেকে রাত ৩.৩০ এর মধ্যে।
সঞ্চিতা চ্যাটার্জী
তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি:। শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিবাদ্যেব ধাতু:।। (মহাকবি কালিদাস) তন্বী, শ্যামা, আর সুক্ষদন্তিনী নিম্ননাভি, ক্ষীণমধ্যা, জঘন গুরু বলে মন্দ লয়ে চলে,চকিত হরিণীর দৃষ্টি অধরে রক্তিমা পক্ক বিম্বের, যুগল স্তনভারে ঈষৎ-নতা, সেথায় আছে সে-ই, বিশ্বস্রষ্টার প্রথম যুবতীর প্রতিমা। (শ্রী বুদ্ধদেব বসু) দীপ্তর একবার শখ হয়েছিল কালিদাসের রচনা পড়বে| সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি না থাকায় উপযুক্ত বাংলা অনুবাদের সন্ধানে ছিল| সেই ভাবেই সন্ধান পায় বুদ্ধদেব বসুর মেঘদূত এর| পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যেত‚ যেভাবে কালিদাস যক্ষপ্রিয়ার রূপ বর্ণনা করেছেন‚ আধুনিক সাহিত্যে কখনো দেখতে পায় নি নারীর শারীরিক সৌন্দর্য্যর এরকম বর্ণনা| শরীর কে কি করে প্রেমের মন্দিরে স্থাপন করা যায় তার অপূর্ব আলেখ্য ফুটে ওঠে সেই আখ্যানে| তারপরে পড়ে কুমারসম্ভব| পার্বতীর রূপের বর্ণনা| অপরূপ ভাবে পার্বতীর শরীরের প্রতিটি অংশ উঠে এসেছিল সেই বর্ণনায়| কোমল বাহু‚ নীলকান্ত মণির আভাযুক্ত নিম্ন নাভি‚ কৃশ কটি‚ এমন কি নিতম্বের বর্ণনাও করেছেন মহাকবি| দীপ্তর কালিদাস পূর্ববর্তী কোন লেখকের লেখা পড়া হয় নি| তবে জেনেছে তাঁরা শুধু পার্বতীর স্তনযুগল বর্ণনা করতেই শ্লোক রচনা করেছেন অস্ংখ্য| সেই তুলনায় কালিদাস অনেক পরিমিত‚ অনেক সংযত| আশ্চর্য সেই বর্ণনা পড়ে সেই নারীর প্রতি কামনা জাগে| কিন্তু কখনো শ্লীলতা পরিহার হয়েছে বলে মনে হয় না| আধুনিক সাহিত্য অনেক পড়েছে দীপ্ত| কমপ্রিহেন্সিভ ক্লেইম করতে না পারলেও‚ অনেক | রবীন্দ্রনাথ‚ শরৎচন্দ্র‚ প্রভাত মুখোপাধ্যায়‚ প্রমথ বিশী‚ বুদ্ধদেব বসু‚ শরদিন্দু‚ সুনীল‚ শীর্ষেন্দু‚ বুদ্ধদেব গুহ‚ সমরেশ বসু‚ শঙ্কর| এই ভাবে নারী সৌন্দর্যর বর্ণনা কেউ করেছেন বলে মনে পড়ছে না| বেশিরভাগ ই নারী সৌন্দর্য মুক্তর মত হাসি‚ মরাল গ্রীবা‚ ধনুকের মত ভুরু আর আয়ত চোখে সীমাবদ্ধ রেখেছেন| শরদিন্দু তন্বী শ্যামা শিখরদশনা অবধি এগিয়েছেন আর বেশি ডিটেলে যান নি| ঘরে বাইরের বিমলার ছিল অন্যরকম সৌন্দর্য‚ তীব্র আকর্ষণ| তা যত না বর্ণিত হয়েছে শরীর ভাষায়‚ তার থেকে বেশি ফুটেছে তাঁর আচরণে‚ ব্যবহারে| বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টি‚ সমরেশ বসুর বিবরে যৌনতা আছে‚ খুব উগ্র ভাবে| নারী দেহর সম্যক কাব্য কোথায়! আর আজকের দিনে তো পার্বতীর শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য লিখলে আর দেখতে হবে না| সোজা গারদের পেছনে| ভাগ্যিস কালিদাস আজকের দিনে জন্মাননি| ক'টা যে এফ আই আর হত ওঁর নামে‚ কে জানে| আজকের হনুমান বাহিনীর বোধয় সংস্কৃত কাব্য পড়া নেই| নইলে আর কালিদাসের রক্ষা পাওয়ার উপায় ছিল না| ঘরে হিটিং চলছে‚ ঘর বেশ গরম| দীপ্ত লেপটা নামিয়ে দিয়েছে| স্বভাবতই প্রমার গা থেকেও কিছুটা সরে গেছে লেপটা| তার শোয়ার ভঙ্গী কিছু অদ্ভুত| গর্ভস্থ ভ্রূণের মত বুকের কাছে দুই পা জড়ো করে ঘুমায় সে| এই মুহূর্তে প্রমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না দীপ্ত| রতিশেষে শ্রান্ত পরিতৃপ্ত নিদ্রাভিভূতা তার প্রিয় নারী| কয়েকটা চুল লেপটে আছে মুখে ঘাড়ে| লম্বা গলা প্রমার| এইরকম গলাকেই বোধহয় কাব্যে মরাল গ্রীবার উপমা দেওয়া হয়| দীপ্ত মনে মনে কাব্য করার চেষ্টা করলো| মরাল গ্রীবা থেকে অনাবৃত কাঁধ বেয়ে লতিয়ে আছে ময়ূর পুচ্ছের মত উজ্জ্বল কেশভার| শ্যামমুখ পান্ডুবর্ণ স্তনদ্বয় এতটাই পুষ্ট যে আপন ভারে পরস্পরকে পীড়িত করছে| গুরু জঘন আজকের দিনে আউট অফ ফ্যাশন| প্রমার লম্বাটে গড়ন‚ সুন্দর লম্বা পা দুটি মুড়ে শুয়ে আছে| দীপ্ত আলতো করে পা দুটো নামিয়ে দিল| সম্মুখে বিকশিত কৃশ কটি‚ আধো ছায়াবৃত গভীর নাভি নীলকান্ত মণির মত দীপ্তি ছড়াচ্ছে| নিতম্ব এত সুন্দর যে মহাদেবের কোলে স্থাপিত হতে পারে‚ যা অন্য কোন রমণীর কল্পনাতীত| দীপ্তর চোখের সামনে পার্বতী ফুটে উঠছেন‚ সে হারিয়ে যাচ্ছে মহাদেবের প্রেমোঙ্মুখ পার্বতীর নব যৌবনের রূপমাধুরীধারায়| হঠাৎ প্রমার চোখ খুলে যায়| দেখে দীপ্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে‚ চোখে কিসের ঘোর| "কি গো‚ কটা বাজে?" চমকে ওঠে দীপ্ত| ঘড়ি দেখে| "আড়াইটে| দেখো তো কত দেরি হয়ে গেল! আজ বোধহয় আর স্প্যানিশ স্টেপস হবে না|" "আগেই হবে না ভাবছো কেন? আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি| ৩ টের সময়ে বেরিয়ে যাবো|" "ওকে প্রিয়তমা| দেখো যদি হয় খুব ভালো হবে|" সুন্দর দাঁতের সারি ঝলকিয়ে হাসে প্রমা| দীপ্তর মাথায় আবার পাক খেতে থাকে‚ "তন্বী শ্যামা শিখরদশনা ..." {/x2} {x1i}jantem8.jpeg{/x1i}
শিবাংশু
সারা বিশ্বে প্রতিটি মানুষগোষ্ঠীর দুরকম পরিচয় থাকে। একটি তার ঐতিহাসিক পরিচয়। কালখণ্ডের উদ্বর্তনের পথ ধরে, নথিবদ্ধ ধারাপাঠের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব অবস্থানকে চিনে নেওয়া। আর অন্যটি তার পরিচিত কাল্পনিক প্রতিমূর্তি বা প্রতিবিম্বভিত্তিক। কোনটাই সর্বৈব সত্য বা মিথ্যা নয়। দুই ধরণের পরিচয়ের ভিতরই কিছু সারবস্তু থাকে। ঐতিহাসিক বস্তুস্থিতি ছাড়াও প্রতিটি জাতির একেকটা স্বীকৃত প্রতিবিম্ব থাকে। বাঙালিরও আছে। এই প্রতিবিম্ব সৃষ্টির পিছনে নানা ধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজ করে। যে ভৌগলিক অবস্থানে আজকের বাঙালিদের বাস, মহাভারতের যুগে তাদের অন্ত্যেবাসী মনে করা হতো। সেকালের অঙ্গদেশ, অর্থাৎ আজকের ভাগলপুর, তার পূর্বের অংশকে হস্তিনাপুরের মানুষ অসভ্য ও অনার্যদেশ মনে করতো। সেখানে আর্যদের নামে মাত্র বসবাস ছিলো। সে জন্যই পরম চতুর দুর্যোধন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় কর্ণকে অঙ্গদেশের রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। বাংলায় যাকে বলে, উড়ো খই গোবিন্দায় নমো। কর্ণ কখনও ভুলেও তাঁর 'রাজ্য' দেখতে আসেননি। বাঙালির এই পরিচয়টি তার প্রতিবিম্বিত লোকশ্রুতির অংশ। উত্তরাপথের আর্যজাতি 'বাঙালি'দের সম্বন্ধে এই রকমই একটি ধারণা করে নিয়েছিলো। বলীরাজার পুত্রদের নিয়ে অঙ্গ, বঙ্গ বা কলিঙ্গের যে লোককথা, তা কিন্তু আর্যেতর মানুষদেরই উপাখ্যান। এই এলাকায় যে রাজ্যগুলো ছিলো, যেমন বঙ্গ, সুহ্ম থেকে প্রাগ জ্যোতিষপুর, সেখানের মানুষদের সম্বন্ধে আর্যাবর্তের দর্পিত অধিবাসীরা বেশ নিচু ধারণাই পোষণ করতো। তার রেশ আজও আছে। কারণ আর্য সভ্যতার সীমানা ছিলো মগধরাজ্যের সমৃদ্ধতম রাজপাট, যার সামনে কোসল থেকে গান্ধার, সবাই নিষ্প্রভ। বাঙালির আদিতম জাতিগত অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠে তার সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে যোগাযোগকে কেন্দ্র করে। কাশ্মিরের রাজকবি কল্হনের লেখায় একটা উল্লেখ পাই, সমতটের মানুষদের। যাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তারা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ এবং দেবভাষা সংস্কৃত জানেনা। তার বদলে তারা পাখির ভাষায় কথা বলে। এসময় থেকেই ন্যায় ও তর্কশাস্ত্রের প্রতি বাঙালির আগ্রহ বেশ প্রচারিত ছিলো। যাঁরা প্রমথনাথ বিশীর 'নিকৃষ্ট গল্প' পাঠ করেছেন ( জানিনা কজন এমন আছেন এখানে) , তাঁদের মনে পড়বে 'ধনেপাতা' নামক সেই বিখ্যাত গল্পটি। মুঘল যুগে জাহাঙ্গির বাদশা বলেছিলেন, 'হুনরে চিন, হুজ্জতে বঙ্গাল'। অর্থাৎ চিন দেশের মানুষের স্কিল অনন্য আর বাঙালি অতুলনীয় হুজ্জত বাধাবার কলায়। সবাই স্বীকার করবেন জাহাঙ্গির যতই আনারকলি-নূরজাহান করুন না কেন, ক্রান্তদর্শী পুরুষ ছিলেন। একদিকে ন্যায় ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগান্তকারী চর্চা, আবার তার সঙ্গেই নিমাই পন্ডিতের ভাসিয়ে দেওয়া প্রেমধর্ম। দিগ্বিজয়ী সমুদ্রযাত্রী বীরের দল, মঙ্গলকাব্যের লোকায়ত দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা, অপরপক্ষে ভীত সন্ত্রস্ত তৈলচিক্কন বাবু কালচারের প্রতিনিধিরা। আবার কী শরণ নিতে হবে সেই, 'মেলাবেন, তিনি মেলাবেন' মন্ত্রের। পশ্চিমে পরাক্রান্ত মগধ, দক্ষিণে সমান পরাক্রান্ত ওড্র, উৎকল ও কলিঙ্গদেশ উত্তরে অরণ্যবিকীর্ণ অঙ্গদেশ ও পূর্বে পর্বতারণ্যানীর সমারোহে অগম্য উপজাতি সভ্যতা, এই নিয়ে বাঙালির যে সভ্যতা গড়ে ওঠে তার মধ্যে আর্য, দ্রাবিড়, মোঙ্গল ও অস্ট্রিক, সবারই কিছু কিছু রক্তবীজ এসে পড়ে। বাঙালি সে অর্থে ভারতবর্ষের প্রথম প্রকৃত pot boiled জাতি। দেশবিদেশে মানুষের মনে বাঙালির যে প্রতিবিম্ব ( বাংলায় যাকে বলে ইমেজ) আছে, তা আমাদের এইসব স্ববিরোধী ঐতিহাসিক অবস্থান থেকেই এসেছে। এই গৌরচন্দ্রিকা থেকে হয়তো একটু আন্দাজ হয় 'বাঙালি'রা কীভাবে তাদের সন্তানসন্ততিদের আত্মপরিচয় সম্বন্ধে ওয়কিফহাল করতে পারে। বাঙালিরা তাদের কোন কোন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের প্রশ্নাতীত ভাবে আইডেন্টিফাই করে অথবা কেন করে, সেটাই বৃহৎ প্রশ্ন। যেমন বলা হয়, as much Bengali as rasogolla। শ্লেষার্থে গড়ে ওঠা এ জাতীয় ধারণাবলী থেকে নিজেদের বার করে আনতে যে পর্যায়ের উদ্যম প্রয়োজন, বাঙালিদের তা আছে বলে মনে হয়না। তাদের ভাবনার বাইনারি জগতে লাল-সবুজ দাদাদিদি, ইস্ট-মোহন, বাঙাল-ঘটি,চিংড়ি-ইলিশের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি যতোটা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়, তার ভগ্নাংশও একটা গৌরবজনক আত্মপরিচয় গড়ে তোলার শ্রমসংকুল উপক্রমের জন্য নিয়োজিত হয়না। মনে হয় অচিরকালেই আমাদের উত্তরসূরিরা গোপনে নিজেদের মধ্যে ' হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি' বলে পরিচয় বিনিময় করবে।
Joy
চৈত্র মাসের শেষ| গরমের দাপট শুরু হয়ে গেছে| আর দুদিন পরেই পয়লা বৈশাখ| পয়লা বৈশাখ মানেই সকালে উঠেই মা‚ বাবাকে প্রনাম করে দিন শুরু হত| আজ আর বকাঝকা নয়| আজকের দিনটি ভাল না হলে সারাবছরই খারাপ যায়| মা বাবার সঙ্গে মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়া হত| নতুন জামা‚ নতুন জুতো| দোকানে দোকানে হাল খাতার নিমন্ত্রন| বিকেলে বাবার হাত ধরে দোকানে যাওয়া‚ অনেক ক্যালেন্ডারের থেকে পছন্দ মত ক্যালেন্ডার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া| পয়লা বৈশাখ আমাদের ছোটবেলায় এখনকার মত এত কর্পোরেট‚ আধুনিক ছিল না| বাঙ্গালীদের এক নিজস্ব উৎসব| তার আগে মাকে দেখতাম নীল ষষ্ঠী‚ অশোক ষষ্ঠী এই সব করতে| সন্তানের মঙ্গল কামনায় মা সারাদিন উপোস করে বিকেলে বা সন্ধ্যেবেলায় শিবের মাথায় জল ঢালতে যেতেন| আমাদের নীল বা অশোক ষষ্ঠী নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না| আমাদের উৎসাহ ছিল গাজন দেখার| আমাদের দেশের বাড়ীতে খুব ধুমধাম করে গাজন ও চড়ক উৎসব হত| গাজনের একদিন আগেই আমরা চলে আসতাম কাঁদোয়া| ছোট্ট খুব সুন্দর গ্রাম| তার থেকেও সুন্দর ছিল মোড়াগাছা স্টেশন| একটু ফাঁকা ফাঁকা গ্রাম্য স্টেশন| প্ল্যাট্ফর্ম লাগোয়া প্রচুর গাছ| মনে হয় গাছের তলায় বসে একটু জিরিয়ে নিই| প্ল্যাট্ফর্ম থেকেই নেমেই শুরু হল আঁকা বাঁকা মেঠো রাস্তা| স্ট্শেনের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে কয়েকটি রিক্শা| রিক্শাওয়ালারা বেশীর ভাগই বাবার চেনা| বাবা ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করে দিতেন| কার বাড়ী বানানো হল‚ কারও ছেলের পড়া শোনা তো কারও মেয়ের বিয়ের খবর| ওরাও বাবাকে আমার জ্যেঠু‚ পিসি‚ কাকাদের কথা জানতে চাইতেন| বাবলু মানে আমার ছোট কাকা কেমন আছেন‚ লক্ষীদি কেমন আছে গো সেজদা? আমার মেজো পিসির নাম লক্ষী| গল্প করতে করতেই আমরা একটি রিক্শায় উঠে পরলাম| সেই মেঠো রাস্তা‚ দুপাশে ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমাদের রিক্শা চলতে শুরু করল| রাস্তাটা খুব সুন্দর ছিল| শুখনো পাতা রাস্তায় অবহেলায় পরে রয়েছে| দুপাশে বড় বড় আম গাছের বাগান| এত আম গাছে যেন মনে হয় গাছগুলো বোধহয় এখ্নই ভেঙ্গে পড়বে| গল্প আর শুখনো পাতার মচমচানি শব্দের মাঝে হঠাৎ করে রাস্তায় একটা-দুটো সাপ আমাদের রিক্শার আগেই রাস্তা অতিক্রম করে চলে গেল| আঁতকে উঠে আমরা চিৎকার করে কি সাপ ওগুলো? রিক্শাওয়ালা আমাদের আশ্বাস দেই ঐ সাপের বিষ নেই গো| আর বিষ নেই‚ সাপ দেখেই তো পা দুটো সিটের উপরে তুলে নিয়েছি| অনেকক্ষন লাগে কাঁদোয়া পৌঁছাতে| কিছুক্ষন পর আমাদের রিক্শা একটি মিষ্টির দোকানে থামল| ওখানে অনেক মিষ্টির দোকান| এখানে ছানার জিলিপি খুব জনপ্রিয়| আহা কি স্বাদ| মুখে দিলেই নরম সুস্বাদু বস্তুটি মিলিয়ে যেত| বেশ জমজমাট জায়গা| হাট বসেছে| লোকজন জিনিষপত্র কেনা-বেচা করছে| এই জায়গাটার নাম ধর্মদা| বাবা‚কাকারা এখানের স্কুলে মাধ্যামিকে পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন| কাঁদোয়া থেকে অনেকটা রাস্তা| বাবারা হেঁটে বা সাইকেলে আসতেন| বর্ষাকালে সে এক ভয়ানক অবস্থা| রাস্তা কাদাময়| পুকুর‚ ডোবা জলে ভর্তি| রাস্তায় জল-কাদার মধ্যে ছোট-ছোট মাছ দিব্যি ভেসে বেড়াচ্ছে| যেতে যেতেই বাবা আমাদের লাইব্রেরী দেখাতেন| এই লাইব্রেরীটা আমার বাবা-জ্যাঠারই দ্বায়িত্ব নিয়ে তৈরী করিয়েছিলেন| আমরা মিষ্টি খেয়ে ও হাঁড়ি ভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে আবার রিক্শায় উঠে বসি| আবার পথ চলা| এবার রিকশা এসে থামে আমাদের বাড়ির দোরগোড়ায়| আমাদের দেশের বাড়ি ও মামার বাড়ি দুটো-ই গ্রাম হওয়ার সুবাদে আমার প্রকৃতির সঙ্গে‚ গাছপালা‚ পুকুর‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেতের সঙ্গে নিবিড় এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল| আমার মামার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলায়| দেবী পারুলিয়া নামের সুন্দর এক গ্রামে| ওখানে সাধারনত আমাদের যাবার সময় ছিল শীতকালে| যখন আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত তখন| নদীয়া- মুর্শিদাবাদ দুটো পাশপাশি জেলা হলেও দুই জেলার মধ্যে ভাষাগত‚ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে অনেক ফারাক ছিল| কথার টানে অনেক তফাত‚ দেবী পারুলিয়ার মাটি লাল‚ এঁঠেল মাটি| আমার মামার বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই আবার বীরভূম জেলা| শীতকালে মাঠে ধান ভর্তি| চরিদিকে শুধু সোনালী রঙ্গের প্রলেপ| কোথাও আবার সরষে ক্ষেতের উপর রোদের মোলায়েম স্পর্শ| গরুর গাড়ির মাঠ থেকে ধান নিয়ে যাওয়া| আমরা ভাই-বোনেরা গরুর গাড়িতে ওঠার জন্যে দৌঁড় শুরু করতাম| অনেক দীঘি আর পুকুর| সবেতেই হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে| ওদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে| আবার কোথাও মাঠ ভর্তি আখের ক্ষেত| আমর লুকিয়ে আখের ক্ষেত থেকে আখ ভেঙ্গে খেতাম| এখানে আমরা স্কুল না খোলা পর্যন্ত থাকতাম| বাবা আমাদের রেখে চলে আসতেন কলকাতায়| অফিসের জন্যে বেশীদিন থাকতে পারতেন না| এর পর শুরু হত আমাদের খেলা‚ দুষ্টুমি| গরুর গাড়ি করে তারাপীঠ যাওয়া হত| মামা সব ব্যবস্থা করে দিতেন| খুব মজা হত| কিন্তু আমাদের দেশের বাড়ি কাঁদুয়া আবার একটু অন্য রকম| এখানে আমরা আসতাম এই গ্রীষ্মকালে| গাছ ভর্তি আম‚ জাম‚ কাঁঠাল| আমাদের দোতলা বাগান বাড়ি| কত বড় বাগান‚ আর কত রকমের গাছ| আমরা ঢিল মেরে আম পারতাম| আর ঝড়েও প্রচুর আম পড়ত| সেই আমের খোসা ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন‚ লঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে খেতে খুব ভাল লাগত| আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েও বয়ে চলেছে গঙ্গা| আর একটা বাঁধানো পুকুর ছিল আমাদের| বাড়ীর মেয়ে-বৌরা স্নান‚ কাপড় কাচার জন্যে আসত| এখানে বাবা থাকার জন্যে ও খুব অল্প দিন থাকায় মাত্রাতিরিক্ত দুষ্টুমি করা যেত না| তবে খুব ভালো লাগত গাজন দেখতে| সেটা আবার অন্য রকম আনন্দ| প্রায় ঘন্টা খানেক রিক্শা সফর করে আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাতাম| বাড়ীটিতে আমাদের কেউও থাকতেন না| বাবা‚ কাকা‚ জ্যেঠুরা সবাই কাজের জন্যে কলকাতা‚ বহরমপুরে চলে এসেছেন অনেকদিন হল| আমার ঠাকুর্দা ছিলেন ডাক্তার| ঠাকুমা মারা যাবার পর ঠাকুর্দাও পাকাপাকি ভাবে চলে এলেন কলকাতায়| ফলে বাড়িটি ফাঁকাই পরে থাকত| বাবার মুখে শোনা ৭১এর বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় প্রচুর লোক ওপার বাংলা থেকে এখানে চলে আসেন| তাদেরই কেউ আমার দাদুর কাছে এই বাড়িটিতে থাকার জন্যে অনুনয়-বিনয় করাতে ঠাকুর্দা ওদের এই বাড়িটিতে থাকতে দেন| শর্ত ছিল থাকার জন্যে কোন ভাড়া দিতে হবে না‚ কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এলে একটা-দুটো ঘর ছেড়ে দিতে হবে| আমাদের আসা বলতে বছরে একবারই এই গাজনের সময়| আমাদের বাড়ি সংলগ্ন বাগানে শিবের গাজন হত| কয়েকদিন ধরেই চলত তার প্রস্তুতি| বাগানের যে অংশটা রাস্তা ঘেঁষা তার পাশেই ছিল এক ব্ড় অশ্ব্ত্থ গাছ| অনেক প্রাচীন সেই গাছ| তার নিচেই বেদীতে রাখা হত শিবের লিঙ্গ| গাজনের কয়েকদিন আগে থেকেই অনেকেই সন্ন্যাসী হতেন| সারাদিন রোদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করে সন্ধ্যেবেলায় হবিষ্যি ভোজন| আর গাজনের আগের দিন ফলমূল খেয়েই কাটাতেন সন্ন্যাসীরা| আমার বাবা-মা সন্ন্যাসীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন| সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজন মূল সন্ন্যাসী থাকতেন| তার নির্দেশ সব সন্ন্যাসীরা মেনে চলতেন| সন্ন্যাসী ভাড়া নেওয়া হত| কারও কোন মানসিক থাকলে ফল‚ ফুল‚ মিষ্টি দিয়ে শিবের পুজোর ডালি নিয়ে আসতেন| শিবের মাথায় আকন্দ ফুল রাখা হত| শিবের মাথা থেকে ফুল তাড়াতাড়ি মাটিতে পড়া মানে মানসিক তাড়াতাড়ি পুর্ণ হবে| যদি ফুল পরতে দেরী হয় তার মানে তার মনস্কামনা পূর্ণ হতে দেরী হবে এমনই ধারনা ছিল স্থানীয়দের| এবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের নাচ-গান| ঢাক ঢোল আর কাঁসরের আওয়াজে গমগম করত| শিব তুষ্ট করার জন্যে সন্ন্যাসীরা নিজেদের উপর অত্যাচার শুরু করতেন| চাবুক দিয়ে মারা‚ জিভে সুঁচ ফোটানো‚ বঁটি উপর দিয়ে হাঁটা এই সব করা হত| আমার দেখতাম আর শিউড়ে উঠতাম| তার মধ্যে আবার দন্ডি কাটা হত‚ লোকে লোকারন্য হয়ে যেত| পাশেই বসত মেলা| আহামরি কিছু নয় গ্রাম্য মেলা যেমন হয়| বাদাম ভাজা‚ জিলিপির দোকান| নাগরদোলায় কিছু ভীড়| বেশ লাগত দেখতে| কালবৈশাখী ঝড়টা প্রতিবারই এই সময়ই এসে সব লন্ডভন্ড করে যেত| প্রথমে আচমকা থমথমে পরিবেশ‚ আস্তে আস্তে ঘন কালো মেঘ এসে সব ঢেকে যেত| কিছুক্ষন পর ধুলোর ঝড় সঙ্গে বৃষ্টি| আমরা দৌঁড়ে ঢুকে পরতাম বাড়িতে| বাতাসে সোঁদা গন্ধ| অনেক্ক্ষন ধরে চলত বৃষ্টি আর ঝড়ের তান্ডব| আর সঙ্গে ধুপ-ধাপ আওয়াজ| আম পরার শব্দ| ঝড়-বৃষ্টি একটু কমলে বাইরে গিয়ে দেখলেই মনে হয় একটু আগেই বেশ বড়্সড় একটা যুদ্ধ হয়েছে| চারিদিকে মাটি থেকে উৎখাত হওয়া ছোট-বড় অনেক গাছ| চার পাশে পরে রয়েছে অজস্র গাছের ভাঙ্গা ডালপালা| উড়ে আসা খড়ের আর টিনের চাল| সব সরিয়ে আবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের তান্ডব নৃত্য| প্রচুর আম পড়ত ঝড়ের সময়| মা-বাবার চোখ এড়িয়ে আমারাও ছুটতাম আম কুড়াতে| আবার চলত সেই শিবের মাথায় ফুল পরা আর গাজনের উৎসব| আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামে‚ গাজন উত্সব শেষ হয়| হাল্কা হয়ে যায় মানুষের ভিড়| কিছু বাচ্চা‚ বুড়ো এখনও আছে মেলায়| হ্যাজাক আর হ্যারিকেনের আলো গাঢ় অন্ধকারকে ফিকে করে দেয়| আমাদের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে| সারাদিনের হৈ-চৈ| একটু কিছু খেয়েই আমরা ঘুমের দেশে| পরের দিন সকালে দেখি বস্তা বস্তা ভর্তি আম| কাল বিকেলের ঝড়ের ফলাফল| পরেরদিন আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমতন্ন| মা‚কাকিমারা রান্না করতে ব্যস্ত| এই ফাঁকে বাবার সঙ্গে আমরা গঙ্গায় স্নান সেরে আসি| এখানে গঙ্গা বেশ চওড়া| তবে জল পরিষ্কার| বাবার মুখে গল্প শুনি‚ বাবা-কাকারা নাকি গঙ্গা পেরিয়ে যেতেন| বাবা এখনো সাঁতরে অনেকট দূর চলে যেতেন| ভয় হত আমাদের‚ বাবা যদি জলে ডুবে যান| না সেরকম কিছু হত না| একটু পরেই বাবা সাঁতরে পারে ফিরে আসতেন| বিকেলে বাবাদের বন্ধুদের আড্ডা বেশ জমে উঠত| দুদিন আনন্দে কাটাবার পর এবার ফেরার পালা| পরদিন ফিরে আসা| মনখারাপ করে আবার রিকশায় উঠে বসতাম| আবার চেনা পথ| ধর্মদায় দাঁড়ানো| আমাদের কলকাতার আত্মীয়রা সব ছানার জিলিপির ফর্দ দিয়ে রাখত| প্রচুর মিষ্টি নিয়ে আসা হত কলকাতায়| মোড়াগাছা স্টেশনে এসে একটু দাঁড়ালেই কু ঝিক-ঝিক কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন এসে হাজির| রিকশাওয়ালা আমাদের দেখে বলেন আবার সামনের বছর আসবে তো...মনে মনে বলি আবার আসব| প্রতি বছর আসব| বেশ কিছুদিন চালু ছিল আমাদের এই বেড়াতে আসা| পড়াশোনার চাপ বাড়ার ফলে কমে গেল এখনে আসা| একদিন শুনলাম আমাদের দেশের বাড়িটি ঐ ওপার বাংলার যারা আমাদের বাড়িটিতে থাকতেন ওরা বাড়িটি অধিকার করে নিয়েছে| বাবা-জ্যেঠুরা দৌঁড়াদৌড়িতে নামমাত্র কিছু টাকা পাওয়া গেল| বাবা-কাকারা দেশের বাড়ির গল্প বলতে শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না| সেই আম‚জাম বাগানের গল্প‚ গঙ্গায় সাঁতরে এপার ওপার হওয়ার গল্প| আরও কত কি| বাবা কিছুদিন আগে চলে গেলেন‚ কয়েক বছরের ব্যবধানে মা ও চলে গেলেন ঐ দূর আকাশ পানে| মামার বাড়ি ও দেশের বাড়ি যাওয়া কমে কমে একদম বন্ধই হয়ে গেল| কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনো ফিকে হয়ে যায়নি| মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ গাছ্পালা‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেত‚পুকুর‚ প্রকৃতি হাতছনি দিয়ে ডাকে| ফিস ফিস করে যেন আমাকে বলে তুমি আসবে বলেছিলে‚ কিন্তু তুমি তো এলে না| ওদের কিছু বলতে পারিনা| নীরবে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে| দিব্যেন্দু মজুমদার
Ramkrishna Bhattacharya Sanyal
শেষ পর্যন্ত এই উৎপীড়ন যখন আর সহ্য হলো না তখন সারা বাংলার রাষ্ট্র নায়কেরা একত্র হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে অধিরাজ বলে নির্বাচন করলেন এবং তাঁর সর্বময় আধিপত্য মেনে নিলেন। এই রাষ্ট্রনায়ক অধিরাজের নাম গোপাল দেব। কে এই গোপাল দেব? গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রলিপি তে বলা হয়েছে "গোপাল দেব ছিলেন দয়িতবিষ্ণুর পুত্র এবং বপ্যটের পৌত্র। মাৎস্যন্যায় দূর করিবার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল"। একটা ব্যাপার লক্ষণীয় পাল রাজাদের রাজ সভায় রচিত কোন গ্রন্থে নিজেদের বংশ কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয় নি। সাধারণ প্রজা দয়িতবিষ্ণুর পুত্র গোপাল দেবের জন্ম ভূমি বরেন্দ্র(রাজশাহী) অঞ্চলে। এবং সেখানে তিনি একজন সামন্ত নায়ক ছিলেন। এবং তিনি যে বাঙালি ছিলেন এতে সন্দেহের অবকাশ নাই। লিপিতে বলা সংস্কৃত প্রকৃতিপুঞ্জ শব্দের অর্থ যদিও জনসাধারণ, কিন্তু বাংলার সকল জনগণ সম্মিলিত হয়ে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এটা মনে হয় না। আসলে তখন দেশ জুড়ে অসংখ্য সামন্ত নায়কেরা ছিল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তারা যখন দেশকে বারবার বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণ থেকে আর রক্ষা করতে পারলেন না, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলেন না, তখন একজন রাজা ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছাড়া বাঁচার আর পথ ছিলনা। তাদের এই শুভ বুদ্ধির ফলে বাংলা- নৈরাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক শত্রুর কাছে বার বার অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেল। আনুমানিক ৭৫০ খৃস্টাব্দে গোপাল দেব(৭৫০ খ্রীঃ-৭৭৫ খ্রীঃ) পাল বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা হয়ে সমস্ত সামন্ত প্রভুদের দমন করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন, দেশ থেকে অরাজকতা দূর করেন, বহিঃ শত্রু আক্রমণ থেকে দেশ কে রক্ষা করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে গোবিন্দ পালের(১১৬১খ্রীঃ-৬৫খ্রীঃ) সঙ্গে সঙ্গে গোপাল প্রতিষ্ঠিত এই পাল বংশের অবসান ঘটে। সুদীর্ঘ চারশো বৎসর ধরে নিরবচ্ছিন্ন একটা রাজবংশের রাজত্ব খুব কম দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়। বৃহত্তর বাংলাকে সংহত ও শক্তিশালী করে গোপাল মারা যাবার পর হাল ধরেন পুত্র ধর্মপাল। তার নেতৃত্বে বাঙালির সামরিক শক্তি তৎকালীন ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি প্রায় সমগ্র পূর্ব ভারতের একের পর এক রাজ্য জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন। "কনৌজ জয় করার পর এক দরবারের আয়োজন করেন। ঐ দরবারে ভোজ, মৎস্য, মুদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, মালব, বেরাব, গান্ধার, পেশোয়ার, কীর প্রভৃতি প্রাচীন রাজ্যগুলির রাজাগন উপস্থিত হইয়া বাঙালি ধর্মপালকে অধিরাজ বলিয়া স্বীকার করেন" - (খালিমপুর তাম্র লিপি) পাঞ্জাব থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন রাজ্যসমূহ ধর্মপাল জয় করেছিলেন। ধর্মপাল মারা যাওয়ার পর রাজা হন পুত্র দেবপাল। দেবপাল পিতার সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করেন। হিমালয়ের সানু দেশ হতে আরম্ভ করে বিন্ধ্য পর্যন্ত এবং উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ থেকে আরম্ভ করে প্রাগজোতিষ পর্যন্ত তার আধিপত্য স্বীকৃত হতো। এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। আরবের বণিক পর্যটক সুলেমান তার বিবরণীতে বলেন:- "বঙ্গরাজ দেব পালের সৈন্যদলে ৫০,০০০ হাতি ছিল এবং সৈন্যদলের সাজসজ্জা ও পোশাক পরিচ্ছদ ধোওয়া, গুছানো ইত্যাদি কাজের জন্যই ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল"। একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন হতোদ্যম বাঙালি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে শৌর্য বীর্য ও দক্ষতার সাথে বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিল। যার যাদু মন্ত্র ছিল বৃহত্তর বাংলার ঐক্যবদ্ধ শক্তি। এই শক্তির ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলে প্রতিষ্ঠাতা গোপাল। বাংলার ইতিহাসে পালবংশের আধিপত্যের এই চারশো বৎসর নানাদিক থেকে গভীর ও ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। বর্তমানের বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয়েছে এই যুগে। শশাঙ্ক যদিও শুরু করেছিলেন কিন্তু পাল আমলেই বাঙালির রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ লাভ করে এই পাল যুগে। বাংলা ভাষা ও লিপির গোড়া খুঁজতে হলে এই চারশো বৎসরের মধ্যে খুঁজতে হবে। এই লিপি, ভাষা, ভৌগলিক সত্ত্বা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শকে আশ্রয় করে একটি স্থানীয় সত্ত্বাও গড়ে উঠে এই যুগে। সেই হাজার বছর আগে পাল রাজাগন ছিলে অসাম্প্রদায়িক। তারা নিজেরা বৌদ্ধ; অথচ বৈদিক হিন্দু ধর্মও তাদের আনুকূল্য ও পোষকতা লাভ করেছিল। এমনকি একাধিক পালরাজা হিন্দু ধর্মের পূজা এবং যজ্ঞে নিজেরা অংশ গ্রহণ করেছেন, পুরোহিত সিঞ্চিত শান্তি বারি নিজেদের মস্তকে ধারণ করেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মে ব্রাহ্মণের নিয়োজিত হতেন, মন্ত্রী সেনাপতি হতেন, আবার কৈবর্তরাও এই সব পদে স্থান পেত। এইভাবে পালবংশ কে কেন্দ্র করে বাংলায় প্রথম সামাজিক সমন্বয় সম্ভব হয়েছিল। পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, সারনাথের বৌদ্ধ সংঘ ও মহাবিহারগুলিকে আশ্রয় করে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ জগতেও বাংলা ও বাঙালির রাষ্ট্র এক গৌরবময় স্থান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এই সকলের সম্মিলিত ফলে বাঙলায় এই সময়েই অর্থাৎ এই চারশো বৎসর ধরে একটি সামগ্রিক ঐক্যবোধ গড়ে উঠে। এটাই বাঙালির স্বদেশ ও স্বজাত্য বোধের মূলে এবং এটাই বাঙালির একজাতীয়ত্বের ভিত্তি। পাল-যুগের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।” - এই পরম্পরা মেনে রাজা মহেন্দ্রপাল, কুড্ডলখটকা বৈশ্য ( জেলা ), এবং পুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তি ( ডিভিশন) প্রজ্ঞাপারমিতা এবং অন্যান্যদের পূজার জন্য বজ্রদেবকে দায়িত্ব দেন এই বৌদ্ধবিহার গড়ে তোলার জন্য ।একটা ইংরেজী সংবাদ পত্রের খবর দেই Statesman (India) | December 30, 2001 | STATESMAN NEWS SERVICE MALDA, Dec. 29. - The government's delay in developing a Buddhist pilgrimage site at Jagajibanpur in Habibpur block was due to the lack of infrastructure, the chief minister said. Speaking to The Statesman during his visit here on Thursday, the chief minister, Mr Buddhadev Bhattacharya, said: "Jagajibanpur is an important excavation site. But due to lack of infrastructure, we are unable to attract the Buddhist pilgrims, particularly the Japanese, to it. They (international Buddhist tourists) only flock to Bihar and return." He assured that the government was "trying to create the necessary infrastructure at the place". According to Mr Bhattacharya, the completion of excavation work at the site will take some more time. The Archaeological Survey of India is doing the excavation at the site which includes Tulavita, well known during Pala rule. A part of the site falls in Bangladesh. A Bangladeshi archaeologist, Mr Najmul Haque, is also engaged in the task, he pointed out. After the Jagajibanpur project is completed, Mr Bhattacharya, said the state would feature in the itinerary of the Buddhist pilgrims. The chief minister also assured that the Malda unit of the West Bengal Democratic Writers-Artists' Association will set up a museum in Jagajibanpur. The association, however, alleged that the then chief minister, Mr Jyoti Basu, too had promised the museum in March 1994, but no initiative has been taken. It has also demanded that Malda must be covered in the next issue of the West Bengal Magazine published by Information and Cultural Affairs ministry. If the demand is acceded to, it will be for the first time in 24 years of Left Front rule that Malda will feature in the magazine. এই বৌদ্ধ বিহারটির বিস্তৃতি বর্তমান বাংলাদেশ পর্যন্ত । অনুমান, এটা নালন্দার থেকেও বড় । +++++++++ দেখতে গেলে , প্রথমে মালদা শহরে পৌঁছে হোটেলে উঠুন । তারপর একটা ভাড়া করা গাড়ী নিয়ে বলুন :- আইহো- বুলবুলচণ্ডীর রাস্তায় কেন পুকুর, পুকুরিয়া হয়ে এই রাস্তায় জগজীবনপুরে তুলাভিটা যাবো । =================== তথ্যঋণ :- শ্রী কমল বসাকের বই, এবং নেটের বিভিন্ন সাইট চিত্র সৌজন্য:- Shampa Ghosh (মালদা)
Ramkrishna Bhattacharya Sanyal
দিনটা ছিল, ১৩ ই মার্চ ১৯৮৭ । স্থানীয় ভাষায় “ নেউ” খোঁড়া মানে, ভিত তৈরি করার জন্য মাটি কাটা । মাটি কিছুটা কাটার পরেই উঠে এলো বিশাল এক তামার পাত । জায়গার নাম, “তুলাভিটা” মালদা জেলার হবিবপুর থানায় পড়ে, (অঞ্চল: বৈদ্যপুর জগজীবনপুর)। শহর ইংলিশ বাজার থেকে দূরত্ব প্রায় ৪১ কি মি । বাংলাদেশ সীমান্ত কাছেই । এই তামার পাতের ওজন- ১১ কে জি ৯০০ গ্রাম, ১৮ ইঞ্চি লম্বা ও ২২ ইঞ্চি চওড়া। হিজিবিজি লেখা এই তামার পাতের মূল্য, স্বাভাবিক ভাবেই ওই ভদ্রলোকের জানার কথা নয় । এই মুহূর্তে সেই ভদ্রলোকের নামটা আমার মনে পড়ছে না ( দুঃখিত), তবে তিনি একটি স্থানীয় স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন বলেই মনে পড়ছে। প্রথমে, এক তামার ব্যবসায়ী এই তামার পাতটি কিনে নিতে চান । কিন্তু, ওই ভদ্রলোকের একটা কিছু মনে হওয়াতে , চলে আসেন ইংলিশ বাজার ( মালদা বলে যাকে আমরা জানি ) শহরে। সৌভাগ্য বশত মালদার অন্যতম ইতিহাসবিদ ও মালদা বিটি কলেজের অন্যতম অধ্যাপক শ্রী কমল বসাকের হাতে ওই তামার ফলকটি আসে । ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ সালে, মালদার সংবাদপত্র “ এই মালদা” তে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে জানান :- এই তাম্রফলকটিতে সিদ্ধার্থ মাত্রিকা লিপিতে লিখিত । ভাষা সংস্কৃত । গদ্য ও পদ্য দুই ধরণের ধাঁচেই এই লিপি উৎকীর্ণ আছে । রাজা মহেন্দ্র পালকে আমরা এযাবৎ জেনে এসেছিলাম গুর্জর প্রতিহার বংশের । কিন্তু এই ফলকে লেখায় সেই ভুল ভাঙে । এই মহেন্দ্র পাল হলেন বাংলার বিখ্যাত পাল বংশের ৪র্থ রাজা দেবপালের ছেলে । এই বংশ সম্বন্ধে আগে বলে নেই, তা হলে আরও সুবিধে হবে, ব্যাপারটা বুঝতে । - বাঙালি রাজা শশাঙ্কের গৌড়কে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গৌড়তন্ত্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা তার মৃত্যুর পর ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শশাঙ্কের ধনুকে গুণ টানার মত বীর অব্যবহিত পরে আর দেখা গেল না। ফলে এর পর সুদীর্ঘ একশো বৎসর(৬৫০ -৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সমগ্র বাংলার উপর নেমে আসে গভীর ও সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতা। প্রখ্যাত বৌদ্ধ ইতিহাস রচয়িতা তারানাথ এই সময় সম্পর্কে বলেন:- 'সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া অভূতপূর্ব নৈরাজ্যের সূত্রপাত হয়। গৌড়ে-বঙ্গে সমতটে তখন আর কোনও রাজার আধিপত্য নাই, সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব তো নাইই। রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্রাহ্মণ। নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, কাল তাহার মস্তক ধূলায় লুটাইতেছে।' এর চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কি হতে পারে! সমসাময়িক লিপি ও কাব্যে (রামচরিত) এ ধরনের নৈরাজ্যকে বলা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। বাহুবলই একমাত্র বল, সমস্ত দেশময় উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মত্ততা; দেশের এই অবস্থাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তাকেই বলে মাৎস্যন্যায়। অর্থাৎ বড় মাছের ছোট মাছকে গ্রাস করার যে ন্যায় বা যুক্তি সেই ন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব। শত বৎসরের এই মাৎস্যন্যায়ের নৈরাজ্যে বাংলায় আর্থ সামাজিক অবস্থা চরম বাজে অবস্থায় চলে আসে। এই নৈরাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে কি পরিমাণ ভোগান্তি ও দুর্দশা ছিল টা সহজেই অনুমেয়। সংস্কৃত গ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূলকল্প থেকে এই সময় ঘটা এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায়। চলবে
Ramkrishna Bhattacharya Sanyal
মালদায় থাকাকালীন, সরকারী ট্যুরিস্ট লজ থেকে ম্যানেজার সাহেব মাঝে মাঝে এত্তেলা দিতেন- গৌড় পাণ্ডুয়ায় বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকদের গাইড হতে। বিনিময়ে টাকাডা, কলাডা, মুলোডা জুটতো। টাকা পয়সা তো মিলতই তার ওপর খ্যাঁটন আর বিলেইতি কারণ বারি । তো, সেবার ডাক পড়লো। গিয়ে দেখলাম এক মধ্যবয়সী দম্পতী। ম্যানেজার বাবু সেই মুহূর্তে ছিলেন না। স্টাফেদের কাছে জানলাম, এঁরা ফ্রেঞ্চ। সব্বোনাশ। এদিকে তো আমি খালি মঁশিয়ে আর মাদামাজোয়েল, এই দুটো শব্দ জানি, তাও নার্ভাস হয়ে কোনটা পুংলিঙ্গ আর কোনটা স্ত্রীলিঙ্গ ভুলে মেরে দিয়েছি। বলির পাঁঠার মত ওনাদের কাছে গিয়ে কাঁপতে লাগলাম। খালি দাঁত বের করে হেসে যাচ্ছি। ম্যানেজারবাবু ততক্ষণে চলে এসেছেন। তাঁকে দেখে, ভদ্রলোকের বিরক্তি প্রকাশ। আমারই মতন টুটাফুটা ইংরেজিতে বললেন- আপনাদের এখানে মূক বধির গাইড দেওয়া হয় নাকি? সাহস পেয়ে আমার "ফ্রেঞ্চ" ইংরেজি বললাম ওনাদের সাথে । বাঙালি হেলায় করিল ফ্রাঁসোয়া জয় । ==== ম্যারিকান ইংরেজী বলা খুব সোজা ! নাকী সুরে বাংলা উচ্চারণে ইংরেজী বললেই হল। যদিও ওদের গুলো বোঝা যেত না সহজে । আরও একবার এই রকমই ডাক পড়লো । গিয়ে দেখি দুই সাহেব । আমার কাছে, সব সাহেবই এক লাগতো দেখতে । তবে, এদের উচ্চারণটা বোঝা যাচ্ছিল । একজন বয়স্ক, আরেকজন তুলনায় কম বয়েসী । রওয়ানা দিলাম । দেখাতে দেখাতে চলেছি । মাঝে দু একটা মুখস্ত করা সংস্কৃত শ্লোক । পরান্নং প্রাপ্যে মূঢ় মা প্রাণেষু দয়াং কুরু। পরান্নং দুর্লভং লোকে, প্রাণাঃ জন্মনি জন্মনি ।। (অস্যার্থঃ- পরের অন্ন ( কেউ কাউকে সহজে ডেকে খাওয়ায় না) এই পৃথিবীতে পাওয়া যায় না। অতএব, হে মূর্খ! যত পারো খাও! আর প্রাণ? সে তো জন্মজন্মান্তরেও পাওয়া যায়। - খাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় দর্শন শেখাচ্ছিলাম ওদের :p ) হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বয়স্ক সাহেবটা বলল :- ইট সিম্স্ ইউ নো সানস্ক্রিট !!! আম্মো ভাবলাম :- সায়েবরা আর সংস্কৃত কি বুঝবে ? তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আমার উত্তর :- ইয়া ইয়া ! সিওর ! তারপরই- বিনা মেঘে বজ্রপাত ! দেন লেট আস টক্ ইন সানস্ক্রিট্ , হোয়াই ইন ইংলিশ ? কিভাবে যে সামলেছিলাম------ ভগাই জানে ! ======= পরে জেনেছিলাম- বয়স্ক মুশকো সাহেবটি জার্মান এবং তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের ডিন্ আর ছোটটি অধ্যাপক সংস্কৃতের । সেই থেকে আর সংস্কৃত নিয়ে কথা বলি না ! মাত্থা খারাপ ?
মনোজ ভট্টাচার্য
স্বপ্নের মাধ্যমে কি গল্পের থিম পাওয়া যায় ? হয়ত যায় ! কাল সারা রাত স্বপ্নের মধ্যে বিচরন করল বেশ কয়েকটা চরিত্র ! তাদের মধ্যে মহিলা ছিল কিছু – পুরুষ চরিত্রও ছিল ! কিন্তু তাদের কারুকেই আমি চিনতে পারলাম না ! কেন তারা স্বপ্নের মধ্যে এলো ! – আমাকে কি তাদের কোন কথা বলতে চাইল ! যেমন নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র! পরিচালকের সন্ধানে জলজ্যন্ত ছটা চরিত্র তার পথ খুঁজে নিতে চায় ! – এখানেও তাদের চেয়ে একটু উচ্চতায় যেন তাদের দেখতে পাই – সবাইকেই যাতে দেখা যায় ! এরা তো অতীত নয় ! নাকি বর্তমান – টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে ! লিখেছি – চরিত্রগুলোর কজন নারী – কিছু পুরুষ ! ঠিক কজন – তা সঠিক বোঝা গেল না ! – স্বপ্নের আবছায়ার মধ্যে দিয়ে যেরকম দেখেছি সেরকম ভাবে আঁকার চেষ্টা করি । - মোটামুটি সবারই বয়স কম বেশি চল্লিশের কাছাকাছি । মেয়েদের বয়সও তিরিশ চল্লিশের আশেপাশে ! প্রথমে এক জন - বয়েস মনে হল চল্লিশেক । চোখে চশমা । নাম হওয়া উচিত প্রণব বা প্রনবেশ । একটু রাশভারী ধরনের ! কথায় বার্তায় বেশ একটা ভারিক্কি ভাব দেখাচ্ছে ! মুখে সিগারেট দেখা যাচ্ছে ! মনে হয় জমি জমা সংক্রান্ত ব্যবসায় যুক্ত ! – যদি একে এদের মধ্যে দলপতি বলি – তবু এর মুখে একটা চিন্তান্বিত ভাব রয়েছে ! – দলপতি বলেই কি ? নাকি অন্য কিছু ! দ্বিতীয় জনকে মনে হল – এক নারী । এর চোখে রোদ-চশমা । শ্ল্যাক্সের ওপর টপের ওপরেই তার বয়েস ফুটে উঠেছে ভালো ভাবেই ! সাবলীল অঙ্গভঙ্গি । সবার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ ভাবে মিশছে ! এর যুতসই নাম হবে মাধবী ! – আর এর কাছাকাছি একজনকে দেখা যাচ্ছে – এর চেয়ে বয়েস কম । পুরুষ । একটু বেশি বেশি প্রশ্রয় পাচ্ছে ! এর নাম দেওয়া যাক – কৌশিক ! খুব মিশুকে । সবার কাছেই যাতায়াত করছে । প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করে দিচ্ছে ! তবে মাধবীর কাছে একটু বেশি আবদারি ! কৌশিকের একজন সঙ্গী – মানে স্ত্রী হতেও পারে – আছে । সে কিন্তু ওর কাছ থেকে দূরে দূরে ! এই নিয়ে আবার আরও কিছু জনের মধ্যে রঙ্গ রসিকতা চলছে ! শ্রাবস্তী নাম তার । শ্রাবস্তীকে বেশ স্বাধীনচেতা মনে হয় ! খুব পতিপ্রাণা মনে হয় না ! চেহারার বাঁধুনি আছে ! হাব ভাবে মনে হয় কোনও অফিশে কাজ করে । অর্থাৎ স্বয়ং স্বচ্ছন্দ ! রুচিসম্মত পোশাক – শালোয়ার কামিজে – মানানসই ! আরও যেন কিছু মানুষকে দেখেছিলাম ! যেমন ওদের সঙ্গেই দেখেছি – বছর তিরিশের এক পুরুষ ও তার এক মহিলা সঙ্গী ! – ওরা ওদের বাবলু ও মানু বলেই ডাকছিল ! খুব সম্ভবত বেশিদিন বিয়ে হয় নি । কারন ওরা বেশীরভাগ সময়েই এক সাথেই কাটাচ্ছিল ! বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে – এই অসম্পূর্ণ লেখাটা – পরেই আছে । ওদের চরিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী লিখে রেখেছি – এতদিন । যদি না খবরের কাগজে এই খবরটা দেখতাম – তাহলে হয়ত ভুলেই মেরে দিতাম ! খবরটা আজ আলাদা আলাদা ছবি দিয়ে বের হয়েছে ! আলমবাজারের ঠাকুরবাড়ি অঞ্চল থেকে জনা দশেক বন্ধু-বান্ধব বকখালি বেড়াতে গেছিল ! সন্ধের সময়ে ফেরার পথে জোকায় খোঁড়া রাস্তায় ওদের গাড়ি উল্টে – তিনজন হাসপাতালে যাবার সময়েই - - । বাকিদের খুব বেশি ক্ষতি হয় নি ! – তাদের কাছেই শোনা গেল খাপছাড়া ভাবে - । এক প্রসিদ্ধ প্রমোটার তার স্ত্রী ও কয়েকজন বন্ধু ও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে বকখালিতে বেড়াতে গেছিল । সেখানেই বা ফেরার পথে তার সঙ্গে কয়েকজনের খুব কথা কাটাকাটি হয় তার স্ত্রীর সঙ্গে এক বন্ধুর সম্পর্ক নিয়ে ও প্রচুর টাকা পয়সার লেনদেন নিয়েও ! – কিন্তু তার সঙ্গে দুর্ঘটনার কি সম্পর্ক ! – আসলে কাগজে ধূসর বা অপরিস্কার ছবি দেখেও আমার স্বপ্নে দেখা সেই চরিত্রগুলোর একটা মিল খুঁজে পেয়েছি! সেটা যে ঠিক কি – তা বলা মুস্কিল ! আমি তো গাড়িতে ছিলাম না – বা স্বপ্নের চরিত্রগুলোকে কারুর সঙ্গে মেলাবার চেষ্টাও করিনি ! তবে – আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয় – প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল ! গাড়িতে বা গাড়ির বাইরে ধাবায় চা খেতে খেতে ! – আসলে ওই স্বপ্নের চরিত্রগুলো আমাকে যেন টানছিল ! অনেকদিন কোথাও আটকে থাকা পাখি যেমন বাইরে বেরতে চায় ! আজ আমি সেই চরিত্রগুলোকে আমার বদ্ধ কম্পিউটার থেকে মুক্তি দিলাম ! একটি কৈফিয়ত ! – অনেক অনেক দিন আমি কোনও গল্প লিখিনি ! অর্থাৎ পারিনি। আসলে আমার যা কিছু লেখা – সবই কবিতা-কেন্দ্রিক ! – পড়িই বেশি । ভালো লাগে – কবিতা বিষয়ক আলোচনা ! – সেই আমি কি করে গল্প লেখার চেষ্টা করলাম ! আসলে একটা ধারনা ছিল – স্বপ্নে যাই দেখা যাক না কেন – সেটা একটা ফ্রিজ শট! সেখানে গল্পের পরিণতি পাওয়া যায় না ! – আমিও তাই চরিত্রগুলো এঁকে রেখেছিলাম ! এবং অনেক অন্য লেখার মতোই পড়ে ছিল ! একটা গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে গল্পের সেই পরিণতি আমাকে ডেকে নিল । তবে এই পরিণতি আমার কাছে সুখকর নয় ! মনোজ