দীপঙ্কর বসু

যে ফুল ঝরে সেই তো ঝরে

সম্প্রতি একটি ঘরোয়া গানের আসরে এক মাহিলাশিল্পী গাইছিলেন যে ফুল ঝরে সেই তো ঝরে ফুল তো থাকে ফুটিতে - বাতাস তারে উড়িয়ে নে’ যায়, মাটি মেশায় মাটিতে।। মানব জীবনের একটা অমোঘ সত্য মিশ্রপুরবী রাগাশ্রয়ী সুরের ছোঁয়ায় বেশ একটা বৈরাগি-মেজাজ পাচ্ছিলাম গায়িকার সুমধুর পরিশীলিত কন্ঠে। আবার দুই স্তবকের ছোট্ট গানটির দ্বিতীয় স্তবকে যেন একটু করুণ রসের আভাষ পেলাম – গন্ধ দিলে, হাসি দি্লে,ফুরিয়ে গেল খেলা ভালবাসা দিয়ে গেল, তাই কি অবহেলা সুগীত গানটি শেষ হওয়া মাত্র এক বিশিষ্ট সঙ্গীতপ্রেমী শ্রোতা তাঁর তৃপ্তিলাভের কথা জানাতে গিয়ে বললেন গানের সুরে একটা চমক তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।যদিও তিনি সুরের চমক ,যেটা তাঁকে বিশেষভাবে আনন্দ দিয়েছে সেটাকে নির্দিষ্ট করে বলেননি, তবে আমার অনুমান “গন্ধ দিলে হাসি দিলে ফুরিয়ে গেল বেলা” গানের এই অংশের শেষভাগে “বেলা” শুব্দটি্র সুরের মোচড় তাঁকে মাতিয়ে দিয়েছিল । বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে শ্রোতা বন্ধুটি আমাকে কিছুটা খাতির করেন বলেই বোধহয় আমাকে অনুরোধ করেছিলেন গানের সুরের চমৎকারিত্বটুকু উপস্থিত অন্যান্য শ্রোতাদের কাছে ব্যখ্যা করতে ।কিন্তু গান শুনতে বসে বাগবিস্তার করাটা আমার বরাবরই না-পসন্দ ,উপরন্তু এ ধরণের মাস্টারি করায় আমার সঙ্কোচ হয় ।কেননা গানবাজনার রস সমুদ্রের কতটুকুই বা আমি জানি বা বুঝি যে অন্যকে আমার সেই খন্ডিত বোধ দিয়ে কিই বা বোঝাব ? গান যদি শ্রোতার অনুভবের তারে ঝঙ্কার না তোলে তবে কি নিছক বুদ্ধিগ্রাহ্য ভাষা দিয়ে গানের রস গ্রহনে তাদের সাহায্য করা যাবে? তবে একথা অনস্বীকার্য যে কোনও কোনও রসিক সঙ্গীতবিদ পারেন এই কর্মটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে ।গান নিয়ে তাঁদের বিশ্লেষনে এমন কিছু উপাদান থাকে যা সঙ্গীততত্বের আলোচনাকে নিছক “মাস্টারির” স্তর থেকে তুলে রসলোকের দরজাটি আমাদের মত গড়পড়তা শ্রোতাদের কাছে খুলে দিতে ।কিন্তু অধিকাংশ সময়েই গানের আলোচনা সেই প্রার্থিত স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারেনা ।তাই সেদিন অনুজপ্রতীম বন্ধুটির প্রস্তাব এড়িয়ে গিয়েছিলাম । কিন্তু এখন কয়েকটা দিন অতিক্রান্ত হবার পর নিভৃতে বসে স্মৃতিরোমন্থনের ছলে গানটি নিয়ে নিজের দুচার কথা লেখা যেতেই পারে । আলোচ্য গানটি্র রচনাকাল ১৮৮৫(বাংলা ১২৯১)সাল ।অল্পদিন পূর্বে ১৮৮৪ সালের ১৯শে এপ্রিল রবীন্দ্রনাথের পরমাত্মীয় ,যিনি শিশুকাল থেকে কবির “জীবনে পূর্ণ নির্ভর” ছিলেন, কবির সেই নতুনবৌঠান কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গেছে।এই মৃত্যুবিচ্ছেদ বেদনা রবীন্দ্রনাথের মানসিক জগতে যে প্রবল বিপর্যয় ঘটিয়েছিল তার প্রকাশ বিভিন্ন সমকালীন রচনায় ছায়াপাত করেছে।যেমনটা ঘটেছে “পুস্পাঞ্জলি” শীর্ষক গদ্য কবিতাগুচ্ছের অন্তর্গত আলোচ্য গানটিতে । গানের দ্বিতীয় স্তবকে সেই বেদনার প্রকাশ সুস্পষ্ট ।যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়েছে গানটিতে সুরের সংযমী অলঙ্করণ মৃত্যুশোক থেকে কবির মানসিক উত্তরণের একটা সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করার মত বিষয় । সাধারণভাবে বাংলা গানে একটা সময়ে করুণ রসের প্রকাশে পুরবীর সুর বিশেষ উপযোগী বলে গণ্য হত । সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের আলোচ্য গানটি প্রচলিত ধারার থেকে স্বাতন্ত্রের দাবীদার নয় ।কিন্তু প্রচলিত ধারার মধ্যে থেকেও সুরের চলনে ,ছন্দের বৈচিত্রে কিছু কিছু রাবীন্দ্রিক কৌশল যেন উঁকি ঝুকি মারে । যেমন একটানা সুরের চলনে মাঝে মাঝে আড়ছন্দের প্রয়োগ সুরে চলনে একঘেয়েমি বাসা বাধতে দেয়না ।শ্রোতার কানকে থেকে থেকেই সজাগ করে দেয় ।যেমন গানের দ্বিতীয় লাইন “বাতাস তারে উড়িয়ে নে’ যায়”এর বাতাস শব্দটি উচ্চারিত হয় তালের প্রথম দুটি মাত্রা ছেড়ে তৃতীয় মাত্রা থেকে । এ যেন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে শ্রোতার মনযোগকে জাগিয়ে রাখার কৌশলী প্রয়াস । একই কৌশল দেখি গানের দ্বিতীয় স্তবকের শুরুতেও ।সেখানেও দেখি “গন্ধ দিলে হাসি দিলে ফুরিয়ে গেল খেলা” অংশে গন্ধ শব্দটি শুরু হয় তালাবর্তনের তৃতীয় মাত্রা থেকে । এ হয়ত বিশাল ভারতীয় সংগীত জগতে অজানা অচেনা কোন নতুন কৌশল নয় কিন্তু সংযমী অনুচ্চকিত প্রয়োগ এই গানে কৌশলটি এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছে বলেই আমার ধারণা। গানটিতে সুরের অলঙ্করণের আর একটি নিদর্শনের উল্লেখ না করলে আলোচনাটা সম্পূর্ণতা পাবেনা । তা হল “ফুরিয়ে গেল খেলা” অংশটিতে খেলা শব্দটির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত তিনমাত্রার তান - পধা নর্সন র্ঋর্সনা – এর প্রয়োগ গানের সুরের বাঁধা লয়ের চলনে আকস্মিক গতি সঞ্চার করেই পর মুহূর্তেই আবার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া গানটিকে নাটকীয়তা প্রদান করেছে । আমার চোখে এই ভাবেই একটি ব্যক্তিগত শোক বেদনার প্রকাশ গান হয়ে উঠেছে - স্রষ্টার অন্তর থেকে সঞ্চরিত হয়েছে শ্রোতাদের হৃদয়ে

8

2

মনোজ ভট্টাচার্য

বুদ্ধু কারে কয় !

বুদ্ধু কারে কয় ! পৃথিবীতে কাদের বুদ্ধু বলে বা কত রকম বুদ্ধু আছে তার একটা নমুনা মাঝে মাঝে আয়নায় দেখতে পাই বটে ! আমাদের কমপ্লেক্সের পাশেই একটা চায়ের দোকানের পাশে এক জনকে দেখতে পাই । হত কুচ্ছিত একটা ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে আর ততোধিক ময়লা একটা লুঙ্গি পরে – ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মেক আপ নিয়ে বসে থাকে । বাজার করে ফেরার পথে চোখাচোখি হলেই একটা আকুতি নিয়ে তাকায় – যেন কিছু বলতে চায় ! কিছু বলবে ? – যদিও বুঝতে পারি কি বলবে – তবু জিজ্ঞেস করি । খিদে পেয়েছে ! – এমন করুণ ভাবে বলে - শুনে খুবই খারাপ লাগে । পকেট থেকে কিছু দিয়ে দিই । - যদি চা বিস্কুট খায় ! সে তো হাত পেতে নেয় ! মাঝে মাঝেই এইরকম চা খাওয়ার জন্যে দিয়ে থাকি ! – কেউ কিছুই মন্তব্য করে না । হয়ত খেয়ালও করে না । কারই বা এত সময় থাকে সকালে ! গতকাল কিন্তু মাল কট ! – যথারীতি বাজার সেরে ফিরছি । লোকটি একই যায়গায় বসে একই ভাবে তাকায় ! – কি চাই ? আমি জিজ্ঞেস করি । খিদে পেয়েছে ! – সেই মুখে আর্তি ভাব এনে বলে । আমি পকেটের সব খুচরো টাকা দিয়ে বলি – যাও দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে নাও ! ব্যাপারটা খুবই সাধারন । একটা দুঃস্থ লোককে আমি চায়ের পয়সা দিয়েছি । সেও নিয়েছে – ব্যস । মিটে গেল ! – কিন্তু না ! এবারে ঠিক অত সহজ হল না ! বাড়ির গেটের পাশেই এক একটু বয়স্ক লোক বাইক থামিয়ে অপেক্ষা করছিলো । আমার জন্যে ! – দাদা একটু শুনবেন ! আমি দাঁড়ালাম – এবার ঠিকানা জিজ্ঞেস করবে – কিম্বা পথনির্দেশ । কিম্বা হয়ত আমাকে চেনে – কিছু বলতে চায় ! – বলুন । আপনি ঐ লোকটাকে চেনেন ? পেছন দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাল সেই ভিখিরিকে । আমি বুঝতেই পারলাম ! – ঠিক চিনি না । ওখানেই তো বসে থাকে! কেন বলুন তো ? আপনি ওকে পয়সা দিলেন ? – ও বাবা ! এ যে একেবারে তদন্ত ! হ্যাঁ – চা খেতে দিলাম । ও কি আপনার কাছে পয়সা চাইল ? না ও চায় নি ! কিন্তু বলল খ্যিধে পেয়েছে ! – আমি সাফাই গাইবার চেষ্টা করি ! আপনি জানেন না – ও লোকটা পেনশান পায় ! সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের কর্মচারী ছিল ! এখন রিটায়ার্ড ! উল্টোদিকের বাড়িটা ওদের ! কেন্দ্রীয় কর্মচারী ! তবে তো পেনশান পায় – প্রতি বছরই বাড়ে ? আমি প্রায় থ ! হ্যাঁ । - আপনি ভুল যায়গায় পয়সা দিচ্ছেন ! অন্য যে ডিজার্ভ করে তাকে দিলে - সে খেয়ে বাঁচবে ! আমি এতটাই ব্যোমকে গেছি যে জিগ্যেস করতেও ভুলে গেলাম – তিনিই বা কে ! আমি তাকে চিনি না – অথচ আমাকে ঠিক লক্ষ্য রাখে ! – সারাদিন মাথার মধ্যে কথাটা ঘুরতেই লাগলো – যে ডিজার্ভ করে – তাকে দিলে - - ! আজ সকালে বাজারে যাবার সময়ে দোকানের একজন চেনা-জানা লোককে ব্যাপারটা খুলে বলতেই – সে স্বীকার করল – যদিও আমি তাকে চিনি না – কিন্তু অনেকেই আমাকে চেনে আর খেয়াল রাখে ! – আর সেই ভিখিরি-দর্শন লোকটি সত্যিই কেন্দ্রীয় কর্মচারী ছিল – এখন পেনশান পায় ! উল্টোদিকের বাড়িটা ওরই ! – আরও একটা অযাচিত তথ্য দিল ! কোন এক প্রাক্তন মন্ত্রীর পরিবারের জামাই ছিল ! উপদেশও দিল – ওকে আর পয়সা দেবেন না ! আমার গালে কে যেন সপাটে এক থাপ্পড় কষালো ! এক বিত্তবান লোককে আমি চা খাবার পয়সা ভিক্ষা দিই ! আর সেও দিব্যি হাত পেতে নেয় ! নিজের ওপর একটা রাগ হচ্ছিল । কেউ যেন পকেট কেটে মানিব্যাগটা নিয়ে গেছে ! একটা ঠকে যাওয়া অপরাধের মতো – চিনচিনে যন্ত্রণা ! ফেরার পথে দেখি সেই দুর্ভিক্ষের প্রতিনিধি একই যায়গায় বসে আছে । আপনি তো পেনশান পান ? – আমি সামনে এসে প্রশ্ন করি । হ্যাঁ – পেনশান পাই তো ! – অকপটে স্বীকার করে লোকটা । তবে এভাবে ভিক্ষা করেন কেন ? – নিজের ঠকে যাওয়ার জ্বালা ওর ওপরেই ঢালি । আপনাকে পয়সা দিয়েছি বলে আমাকে ধমকাচ্ছে লোকে ! লোকটা অসহায়ের মতো একইভাবে বলল – খিদে পায় যে ! কেন ! বাড়িতে খেতে দেয় না ? – আমার অসহিষ্ণু গলার স্বর নিজের কানেই ঠেকল ! সে আর কোন উত্তর দিল না ! এখানেই শেষ হতে পারে ঘটনাটা । কিন্তু আমার প্রবীণদের সঙ্গে মেশার জন্যে – অন্য কথাও মনে হল । তাহলে কি বাড়িতে উনি খুব অবহেলিত ! হয়ত বা নির্যাতিতও ! কোনও কারনে ওর হাতে পয়সা দেওয়া হয় না ! বাড়িতে চা কি দেওয়া হয় না ? তাহলে কি আমি চায়ের পয়সা দিয়ে অন্যায় করেছি ! নাকি এবার থেকে পয়সা না দিয়ে ভুল করবো ! – কে জানে ! মনোজ

33

3

ঝিনুক

ভোরের খুব কাছে‚ কিন্তু যেখানে ভোর হয় না …..

মোমবাতিদের মন....... এক সপ্তাহ ফুরাতে আর কতক্ষণ? বিশেষ করে যখন ইচ্ছে করে না সপ্তাহটা ফুরিয়ে দিতে| সময় একটা অদ্ভুত প্রপঞ্চ‚ যখন মনে হবে একটু থমকে দাঁড়ালে ভালো হয়‚ তখন দৌড়োতে থাকে সুপারসনিক স্পীডে আর ঠিক যখন দৌড়োলে উপকার হয় তখনই জমে বরফের মত চাক বেঁধে যেতে চায় যে কেন? ফুরিয়ে গেল এক সপ্তাহ চোখের নিমেষে| আবার সব ঘরদুয়ার বন্ধ করে‚ তালার উপর তালা লাগিয়ে বাড়িটাকে একলা ফেলে গাড়িতে উঠি| এই দরজা থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়াটা চিরকালই বেদনাবিধুর| বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পিছু ফিরে চাওয়া‚ যতক্ষণ দেখা যায়| আগে দু'জন দাঁড়িয়ে থাকত অপলকে চেয়ে বিদায়বেলায় এই বারান্দায়| তারপর একজন‚ আজ শূণ্য বারান্দাটা দাঁড়িয়ে রইল কি ভীষণ একা একা| আগে ফেলে চলে যাওয়ার যে কষ্ট তার সাথে মিশে থাকত মস্ত সেই বটগাছের কাছে আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা‚ আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি| আজ যাবার বেলায় মাথার উপরে খর রোদ্দুর আর এই একলা বাড়িটাকে হায়েনা‚ শকুনের লোলুপ থাবার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব| কি দ্রুত যে বদলে গেল জীবনটা….. পরের দিন গয়া যাত্রা| বেরোবার আগে সোনার দুল‚ চুড়ি‚ হার‚ আংটি‚ সব খুলে রাখতে হল| অনেক টানাটানি করেও গোটা দুয়েক আংটি কিছুতেই খোলা গেল না আঙুল থেকে| মনের মধ্যে সাপটা ফণা তোলে‚ ফুঁসতে থাকে‚ তবু খুলে ফেলি| আমার জন্য অন্যদের বিপদে পড়তে হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না| বিকেল পাঁচটায় রাজধানী‚ আমরা দুই বোন আর আমাদের দুই মাণিক| অনেকদিন পরে দূরপাল্লার ট্রেনে চড়তে পেরে খুব খুশি আমার গাণুশ| ও ব্যাটারও আমার মত ভ্রমণরাশিতে জন্ম| বেড়াতে আমরা মাব্যাটা দুজনেই দারুণ ভালোবাসি‚ চিরকালই- সেই ছোট্ট থেকেই| আমার এক মাসতুতো বোনের বর ভারতীয় রেলের গণ্যমান্য পদাধিকারী| গয়া যাব শুনে সে যেচেই দায়িত্ব ঘাড়ে নিল‚ "আমি বলে রাখব দিদি"| বলে রাখার বিশেষ কোন প্রয়োজন ছিল না| মাত্রই তো পাঁচ-ছ ঘন্টার জার্নি| রাজধানীর ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট ভালো‚ সার্ভিস নিয়ে অনুযোগ করার বিশেষ জায়গা নেই (যদিও আমার একটু ভয় ছিল খাবার নিয়ে‚ আগের বছরের সেই দুরন্তের অভিজ্ঞতার দরুণ| কিন্তু দেখলাম খাবার ট্রেতে রুটিই দিয়েছে‚ শুকনো চটির পচা চামড়া নয়)| তবু একটু বাদে বাদেই একজন‚ দু'জন করে এসে জানতে চায় "কিছু লাগবে কিনা‚ কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো"? বাথরুমে একটা স্পেশ্যাল ধোলাই হল এক্সট্রা ধানবাদে| যদিও আমি একবারের জন্যেও যাই নি বাথরুমে| লজ্জা করতে থাকে আমার| পাশের সীটের বর্ষীয়ান প্যাসেঞ্জার আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন‚ "আরে এতবার করে জানতে চাইছে‚ কুছ তো মাঙ্গো| কুছ নহি তো এক কাপ চায় তো পি লো মুফত সে| ইক বোতল পানি লে লো এক্সট্রা"| যা খেতে দিল তাই সবটা খেয়ে ওঠার ক্ষমতা নেই‚ আবার ফ্রি চা! না বলাতে ভারি মন:ক্ষুন্ন হলেন ভদ্রলোক| আসলে যেখানকার যা দস্তুর‚ শুনলাম আমার সেই ভগ্নিপতি ফ্যামিলি নিয়ে ভেকেশনে বেরোলে নতুন কোচ দিয়ে দেওয়া হয় সেদিনের ট্রেনে ওদের জন্য| কিন্তু আমার অস্বস্তি হতে থাকে এই অকারণ অ্যাটেনশনে| না‚ 'বলে রাখা'টা বিশেষ আর প্রয়োজন সেদিন হয় নি| কিন্তু সেই বলে রাখা কাজে দিল ফেরার দিন| বোনের বর স্টেশনে ছিল গয়াতে আমাদের রিসিভ করতে| ও-ই আগে গিয়ে হোটেলের ঘর বুক করে রেখেছিল| একদম স্টেশনের গায়েই হোটেল| ব্যবস্থা কিছু মন্দ ছিল না‚ তবু ঘুম হল না সারা রাত| আসলে ঘুম তো আমার আর জম্মের সতীন এমনিতেই‚ সহসা কাছে ঘেঁষতে চায় না| তায় পরের দিন রাত না পোহাতেই বিশাল গুরুদায়িত্বের কাজ| বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয়‚ ভালোবাসায় কতটা পাক ধরেছে জানি না‚ তবে রাত জেগে হৃদয়ের পায়চারি করাটা মিথ্যে নয় আর আজকাল সব কিছুতেই বড় টেনশন হয়| সারা রাত বালিশ ঠিক করতে করতে‚ কাল্পনিক মশা খুঁজে খুঁজে‚ স্টেশনের ঘোষণা শুনে আর এসি বাড়িয়ে কমিয়েই কেটে গেল| ভোর হতে না হতেই স্নান সেরে তৈরী হয়ে পথে| বহু পুরাতন শহর গয়া‚ তায় তীর্থক্ষেত্র| কলুষ আর পারুষ্যে জরোজরো‚ শহরের বেশির ভাগ অধিবাসীই মনে হল কোন না কোনভাবে মৃত্যুর কারবারি| প্রতিদিন কয় লক্ষ লোক যে এই শহরে আসে শুধু পিতৃপুরুষের ঋণমুক্ত হতে কে জানে? সব ট্রেনে গোটা দু'চার করে কম্পার্টমেন্ট থাকে শুধু গয়া স্পেশ্যাল‚ উজাড় করে প্ল্যাটফর্ম উপচে লোক নামে‚ ওঠেও| সারা রাত খোলা আকাশের নীচে পুতিগন্ধময় রাস্তাঘাটে‚ স্টেশনচত্বরে‚ প্ল্যাটফর্মে অকাতরে ঘুমিয়ে থাকে মানুষজন ভয়ঙ্কর মশার কামড় অগ্রাহ্য করে| ঘুমন্ত মানুষ ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে রাস্তা পেরোতে হয়| সকাল হতে না হতেই চোখ মেলে চাওয়া যায় না এমনি গনগনে সূর্যের তেজ| সারা শহর জুড়ে ঘুঁটের আলপনা| কোন দেওয়াল‚ কোন গাছ কোথাও খালি নেই| পশুপাখি‚ মানুষজন নির্বিশেষে সকল কৃষ্ণের জীবই রাস্তাঘাটে যত্রতত্র পটি এবং পিপি করে বেড়ায় মনের সুখে নাগরিক অধিকারে| দোকানপাট‚ বাজারঘাট আর পাঁচটা ছোট শহরের মতই| আর আছে দলে দলে গরু‚ মোষ‚ ছাগল‚ শুয়োর আর পাণ্ডা| জিনসপরিহিত‚ মোবাইলখচিত‚ গুটখারঞ্জিত‚ মোটরবাইক্শোভিত‚ টিকিওয়ালা পাণ্ডার দল‚ শুনলাম সবাই নাকি গয়াসুরের বংশধর| সেই সব অসুরদের দাবিদাওয়া না মিটিয়ে গয়াতে এক পাও কোথাও যাওয়া সম্ভব না| তবু ভালোভাবেই মিটে গেল বাবামায়ের শেষ কাজ‚ সেই সব মহাপণ্ডিতদের একজন কাজ করালেন‚ তার কাছেই জানলাম পিতৃঋন চুকিয়ে ফেলা যায় পিণ্ডদানান্তে ফল্গুর জলে কনুই অবধি হাত ধুয়ে ফেলে‚ কিন্তু গর্ভধারিণীর ঋণ শোধ হয় না| আরো যা বুঝলাম‚ যত বেশি টাকা ধুলোর মত ছড়ানো যায়‚ বাপমায়ের মুক্তির মাপও ততটাই বড় থেকে আরো বড়তর হয়| জানি না কতটা ঋণমুক্ত হতে পারলাম‚ তবে মনটা যেন আরো ভারি হয়ে গেল| এগারোটার মধ্যেই কাজকর্ম সব চুকে গেল| ঐসব ধম্মোকম্মো‚ পুণ্যির কাজ তো জুতো পায়ে দিয়ে হয় না‚ ঐ বীভৎস নোংরা রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে সারা শরীরের মধ্যে ঘিনঘিন করতে থাকে| হোটেলে ফিরেই আবার ঘষে মেজে স্নান| তারপর ভোজনপর্ব সেরে যাই কি না যাই করতে করতে শেষ অবধি রওনা হয়েই গেলাম বোধগয়ার পথে| অটোর সাথে চুক্তি হল‚ যাওয়া-আসা| অটো তো নয়‚ ভটো‚ কর্ণবিদারী আওয়াজ করে রাস্তা কাঁপিয়ে‚ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে নিয়ে চললো আমাদের| ঝাঁকুনির চোটে শরীরের হাড়ক'খানা সব আলগা হয়ে যাবার উপক্রম| পাশে পাশে চললো ফল্গু‚ জল দেখা যায় না‚ এপার থেকে ওপার জুড়ে শুধু বিস্তীর্ণ বালুকার রাশি| সে এক অদ্ভুত নদী| "এ নদী এমন নদী-ই-ই-ই‚ এ প্রিয়ার চোখের পাতা ছায়াতে হয় না কালো‚ কখনো নয়ন তারায় ঝড়েনা স্নিগ্ধ আলো"….. ইচ্ছে ছিল নদীটার সাথে একটু সময় কাটানোর| কিন্তু সময় হল না| ফল্গুর ধার দিয়ে দিয়ে মকাইয়ের ক্ষেত‚ ঘরবাড়ি‚ দীঘল ঘোমটা ঢাকা বউ‚ ন্যাংটো খোকা‚ ছাগল‚ গরু‚ শুয়োর‚ মুরগি আর মুহুর্মুহু রাস্তা কাঁপিয়ে ধাবমান ভটো আর মোটরবাইক| যেতে যেতে পথে বেশ কয়েকটা বৌদ্ধমন্দির পড়লো| গরম বাতাসের হলকায় ততক্ষণে মুখচোখ জ্বলছে| মাটি তেতে পুরো তপ্ত খইয়ের খোলা‚ হেঁটে যেতে পায়ে ফোস্কা পড়ার উপক্রম| তার ওপর অসম্ভব ক্লান্ত‚ শরীরে এবং মনে| তাই বেশির ভাগ মন্দিরই পেরিয়ে যাই| একেবারে সোজা বোধগয়াতে চলে যাওয়াই মনস্থ করেছিলাম| কিন্তু থামতে হল‚ অগ্নিবর্ষী সেই সূর্যের নীচে ধ্যানস্থ সুবিশাল বুদ্ধমূর্তিটির পদতলে না থেমে পারা গেল না| বসে রইলাম কিছুক্ষণ সেই মহাপুরুষের ছায়ায়| পাশেই থাইল্যাণ্ডের বুদ্ধমন্দির| আবার রওনা দেবার আগে পায়ে পায়ে সেই মন্দিরে একটু উঁকি দিলাম| সোনালি বুদ্ধমূর্তি‚ ভিতরটা ঠাণ্ডা‚ সুবিশাল দরজায় ততোধিক বিশাল কড়া| সেই দুয়ারে দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রণাম ক'রে বলি‚ "এসেছিলাম‚ দেখে গেলাম‚ ওগো মহামানব তোমার দুয়ারে কড়া নেড়ে গেলাম‚ তুমি কি শুনতে পেলে"? পরের স্টপ বুদ্ধগয়া| পাঁচজনের সাতখানা ফোন‚ ট্যাব‚ চার্জার‚ পাওয়ারপ্যাক‚ সব জমা করতে হল প্রবেশদ্বারে| ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা যায় পয়সা দিয়ে টিকেট করে| কিন্তু এযাত্রায় ক্যামেরা আনার কথা কারোরই মনে হয় নি| তারা হয় কানাডায় নয় কলকাতাতেই রয়ে গেছে| সে থাক‚ ছবি নাই বা তুললাম‚ মনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে তো আর বাধা নেই| প্রচুর পুলিশ‚ সান্ত্রী‚ তল্লাসি‚ পাহারা পেরিয়ে লাইন দিয়ে মূল মন্দিরে| অনন্ত ধ্যানে সমাহিত গৌতম বুদ্ধ‚ এই পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র মানব যিনি শান্তির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিলেন| সুন্দর বললে কম বলা হয়‚ ছবির মত সাজানো বাগান মন্দির ঘিরে‚ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তকতকে‚ মনে পড়ল সেই কোটেশন‚ কোন চার্চে পড়েছিলাম …. "Cleanliness is next to Godliness"…… শান্তি যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে প্রতিটি ডালপালা‚ প্রতিটি পত্রপুষ্প থেকে| মাথা আপনিই নত হয়ে আসে এই পরম প্রশান্তির সামনে দাঁড়িয়ে| বাগানে একান্তে উপাসনা করার আয়োজন করা রয়েছে আগ্রহী ভক্তদের জন্য| বিশাল একটি বাঁধানো পুকুরে মাছেদের বৈকালিক যোগব্যায়াম দেখলাম বসে কিছুক্ষণ| মন্দিরের কোলে সেই বোধিবৃক্ষ‚ বিশালকায় অক্ষয় অশ্বত্থ‚ যার চরণোপান্তে সিদ্ধার্থ বুদ্ধ হয়েছিলেন| গাছের গোড়া ঘিরে রাখা পোক্ত বেষ্টনী দিয়ে‚ মানুষের লোলুপ স্পর্শ থেকে বাঁচাতে| কিন্তু সেই মহীরুহের ঊর্দ্ধে প্রসারিত ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে ছাতার মত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে| জায়গায় জায়্গায় ঠেকা দিয়ে রাখা মোটা মোটা ডালে| একটি পাতাও বৃথা যায় না সেই মহাবৃক্ষের‚ পড়ামাত্রই কেউ না কেউ কুড়িয়ে নেয়| আমিও পেলাম একটি পাতা| কোলের মধ্যেই এসে পড়ল| কৃতজ্ঞচিত্তে অঞ্জলিভরে গ্রহণ করলাম‚ সাথে করে নিয়ে যাব এই শান্তির প্রসাদ| উপাসনার মন্ত্র আমার অজানা‚ যে মন্ত্র জানি‚ খুব নীচু গলায় প্রায় অস্ফুটে সেই মন্ত্রই গুণগুণ করি….. "বাসনা সব বাঁধন যেন কুঁড়ির গায়ে - ফেটে যাবে, ঝরে যাবে দখিন বায়ে, একটি চাওয়া ভিতর হতে ফুটবে তোমার ভোর-আলোতে, প্রাণের স্রোতে- অন্তরে সেই গভীর আশা বয়ে বেড়াই"…..আর সেই পুণ্যতরুর ছায়ায় নিঝুম হয়ে বসে ভাবি‚ সত্যি সত্যিই এইখানে‚ এই মাটিতে সেই যুগপুরুষের পায়ের ছোঁয়া পড়েছিল কখনো‚ কোনদিন ….. চেয়ে চেয়ে দেখি ভক্তের দল যে যার মত নিশ্চুপে উপাসনায় মগ্ন| ধর্ম যে এত নি:শব্দ হতে পারে‚ সাধনা যে এমন নিরুচ্চারে করা যায়‚ তাও ভারতবর্ষে‚ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল| ইচ্ছে হচ্ছিল বসেই থাকি‚ থেকে যাই ঐ শান্তির পদতলে কপাল ছুঁয়ে‚ কিন্তু ইচ্ছের ডানা ছেঁটে ফেলার পোশাকি নামই তো জীবন| কাজেই ফিরতে হয়| আবার ভটো‚ হোটেলে ফিরে স্নান খাওয়া সেরে তৈরী হওয়া| রাত সোয়া ন'টায় ট্রেন‚ ক'টায় আসবে সেই খবর নেওয়া| তা সেজন্য অবশ্য বেশি অপেক্ষা করতে হল না| হোটেলে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সেই বোনাইয়ের ফোন‚ ট্রেন আপাতত সাড়ে চার ঘন্টা লেট‚ মানে রাত পৌনে দু'টোয় গয়া‚ তবে ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হবে এই লেটের ধামাকা‚ এখুনি বলা যাচ্ছে না| ট্রেনে ডিউটিরত একজনের নাম‚ ফোন নাম্বার দিয়ে দিল‚ বললো‚ "চিন্তা করবেন না‚ ওকে বলা আছে‚ মোগলসরাই ছাড়লে ফোন করে দেবে‚ ঘুমিয়ে নিন একটু ততক্ষণ"| বুঝলাম আজকের রাত গয়াতেই কাটাতে হবে| ঘরের বুকিং ছিল রাত বারোটা অবধি| মাঝরাতে টোলটুপলা নিয়ে স্টেশনে গিয়ে মশার কামড় খেতে পারব না‚ অন্ততপক্ষে সকাল ন'টা অবধি তো বুকিং বাড়ানো যাক‚ আধবেলার পয়সা আরো দেব| খুব কম লোকই বোধহ্য় গয়ায় গিয়ে হোটেলে থাকে| কাজেই ঘরের যে খুব আকাল‚ বুকিং একেবারে ভরাভর্তি‚ তা নয়| কিন্তু সুযোগ পেলে কে আর মাথা মুড়োতে ছাড়ে? অগত্যা আবার পুরো দিনের পয়সাই দিতে হল| খেয়েদেয়ে এসে ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে আবার ঘুমের মহড়া| আজ তো আরো বৃহত্তর ক্যাচাল‚ পুরো ত্রিশঙ্কু কেস| কথা ছিল ট্রেনের বিছানায় ঘুমানোর‚ সে বিছানা রইলো কোথায়‚ কতদূরে‚ কোন পুকুরের পারে‚ কোন স্টেশনের ধারে কে জানে? আমি শুধু এপাশ ওপাশ করি আর ঘড়ি দেখি| ট্রেনের সেই ভদ্রলোককে ফোন করা হল বার তিনেক| দু'টো থেকে গড়িয়ে সময় চারটে পেরিয়ে গেল| তবু ট্রেনের দেখা নাই রে ট্রেনের দেখা নাই| অবশেষে সুখবর এল‚ ট্রেন ডেহরি অন শোন ছেড়েছে‚ ঘড়িতে সাড়ে চারটে| আমরাও গাত্রোত্থান করে বাঁচলাম| রুম সার্ভিসের অভিজ্ঞতা সুবিধার হয় নি আগের দিন‚ বিশেষ করে দুধ-চিনি ছাড়া কালো চা এক দুষ্প্রাপ্য বস্তু| তাই জামাকাপড় পরে সোজা স্টেশনে গিয়েই চা খাওয়া মনস্থ হল| আকাশে তখনও আলো ফোটে নি| অগণিত ঘুমন্ত মানুষ‚ এর পা‚ তার হাতের ওপর দিয়ে ডিঙি মেরে মেরে স্টেশনচত্বরে পৌঁছানো গেল| দোকানদাদাকে নির্দেশ দিয়ে কালো চা বানিয়ে খাওয়া হল| গাঁক গাঁক করে মাইকে ঘোষণা চলছে একটু পরে পরেই‚ আপ এক চার শূণ্যি দো ছে মুম্বাই মেল দো নম্বর প্ল্যাটফরম মে‚ ডাউন অমুক এক্সপ্রেস পাঞ্চ নম্বর প্ল্যাটফরম সে…. ট্রেন আসে‚ যায়‚ ব্যস্তসমস্ত লোকজন বাক্সপ্যাঁটরা সামলে ওঠে‚ নামে‚ দৌড়াদোড়ি করে‚ একের পর এক কয়লা ভর্তি মালগাড়ি চলে যায়| তার মধ্যেই পরম সুখে ঘুমাচ্ছে কত লোক‚ রকমারি নাসিকাধ্বনিতে সরগরম শেষরাতের স্টেশন| দেখে হিংসে হয় আমার‚ কত সুখী হলে এমন নিশ্চিন্ত ঘুম ঘুমানো যায় পথেঘাটে! কেউ কেউ আবার ঘুম ভেঙে উঠে প্ল্যাটফরমের ধারেই দাঁড়িয়ে জলবিয়োগ করে হাল্কা হয়ে নেয় নির্দ্বিধায়‚ লোটা ভরে জল নিয়ে বিকট শব্দে কুলকুচি করে মুখ ধোয় কেউ| ঐসব ন্যক্কারজনক কীর্তিকলাপ দেখেশুনে আমার বাবুজী তো নিদারুণ বিরক্ত| চোখ কড়কড় করছে‚ পালে পালে মশা ছেঁকে ধরে‚ এক মুহূর্ত সুস্থির হয়ে বসার উপায় নেই| ভালো করে পায়চারি করার উপায়ও নেই| প্ল্যাটফর্মে বেশির ভাগ আলো নেভানো‚ সেই আধো-আলোতে‚ স্বল্প পরিসরেই এদিক থেকে ওদিক হেঁটে বেড়াই আমি আর গাণুশ| হঠাৎ গাণুশ জানতে চাইল‚ "দিদুনের মত তুমিও কি এগুলো বিশ্বাস করো মা? তুমি মরে গেলে কি আমায় আবার আসতে হবে এখানে এইসব করতে"? বললাম‚ "কক্ষনো না‚ তোমাকে তো বলেই দিয়েছি‚ ক্রেমেটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়ার সময়ে সেই শেষ পথটুকু শুধু আমার সাথে থেকো‚ যদি সম্ভব হয়| আর পারলে ছাইটা ভাসিয়ে দিও ক্যানানাস্কিস নদীর জলে| কোন শ্রাদ্ধশান্তি‚ পুজোআচ্চা কিচ্ছু করবে না‚ যে যতই বলুক| এমনকি মেমোরিয়াল সার্ভিসও করবে না আমার জন্য"| এইসব গুলতানি করতে করতেই আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটল| শেষমেশ সাড়ে ছটা নাগাদ তিনি এলেন ভোঁ বাজিয়ে| আহা ধড়ে প্রাণ এল| কিন্তু জানার তখনও আরো বাকি ছিল| ট্রেনে উঠে দেখি আমাদের সীট বেদখল‚ গুছিয়ে কম্বল-চাদর মুড়ি দিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন দু'জন দু'পাশে| বাধ্য হয়ে তাদের সুখের নিদ্রা ভঙ্গ করতে হল| এক দেহাতী দম্পতি‚ প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে উঠে বসল| উপরে নীচে চারটে সীটই আমাদের| সীট ছেড়ে দিতে বলায় খেঁকিয়ে উঠল পায়ের দিকটা দেখিয়ে‚ "ব্যাইঠিয়ে না"| তারপর আরো কি কি যেন বকবক করে গেল এক বিচিত্র ভাষায়| কিছুই প্রায় বুঝলাম না| যা বুঝলাম তার মর্মার্থ হচ্ছে‚ ওরা দু'জন দু'টো জানালার ধারে বসে যাবে‚ আমরা ইচ্ছে হলে পাশে বসতে পারি| মগের মুলুকের আইনকানুনেরও বোধহয় এতটা হাঁড়ির হাল ছিল না| যাগ্গে‚ সেই 'বলে রাখা' কাজে দিল এইবার| সেই ভদ্রলোক এলেন‚ আরো জনাদুই কর্মচারীও এসে পড়েছেন ততক্ষণে আমাদের স্বাগত জানাতে| তাদেরকেও প্রায় নস্যাত করে দিচ্ছিল তালেবর স্বামীটি‚ কোন এক হোমরাচোমড়া আমলা তাদের নাকি এই সীটে বসিয়ে দিয়ে গেছে| কাজেই এই সীটের সত্ত্বাধিকার এযাত্রায় তাদেরই| ওসব টিকেট ফিকেটের তোয়াক্কা তারা করে না| এভাবেই তারা নিত্য যাতায়াত করে থাকে‚ এমনধারা বদতমিজি তাদের সাথে কেউ করে না| কিন্তু কার মুখ দেখে যে বেরিয়েছিল বেচারীরা এযাত্রায়‚ কে জানে? টিটিও এসে পড়লেন আমাদের খোঁজ নিতে| ব্যস ছবিটা পালটে গেল মুহূর্তের মধ্যে| ভেবেছিলাম বোধহয় কোন আপার বার্থের টিকেট‚ খালি দেখে এসে নীচের বার্থে শুয়ে পড়েছে| উঠিয়ে দিলে চলে যাবে নিজের জায়গায়| বুঝি নি যে কোনরকম রিসার্ভেশন তো দূরের কথা‚ কোন টিকেট ছাড়াই উঠে পড়েছে ট্রেনে| ঘাড় ধরেই একরকম নামিয়ে দিলেন সবাই মিলে দু'জনকে ট্রেন থেকে‚ সাথে বোধহয় ডজনখানেক ধুমসো ধুমসো ব্যাগ| বৌটার সে কি প্রাণান্তকর পরিস্থিতি‚ সাড়ে তিনহাত বহরের ঘোমটা সামলাবে না বোঁচকা টানবে| সাতসকালে সে এক বিচিত্র নৌটঙ্কি| অবশেষে ট্রেন ছাড়লো‚ চাদর‚ কম্বল‚ বালিশ সব পাল্টে দিয়ে গেল‚ ঝাড়ু দিয়ে গেল| আমরা গুছিয়ে বসলাম| ছেলে আর মেয়ে ওপরে উঠে শুয়ে পড়ল সটান| বোনের বরও টান টান হয়ে নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মন দিল| পরের স্টেশনে চায়ে গরম উঠতেই নুন লেবু দিয়ে কড়া মিষ্টি চা খেলাম দু'কাপ| তারপর গুছিয়ে একটা পান খেয়ে আমরা দুই বোনেও গা এলিয়ে দিলাম| এ তো রাজধানী নয়| ধীর কদমে‚ দোদুল চালে চলে আর থামে‚ থামে আর চলে| গোমো‚ কোডারমা‚ হাজারিবাগ‚ একের পর এক সেই সব স্টেশন‚ যার গায়ে আরণ্যকের জাঙ্গলিক সীলমোহর‚ আগে বাঙালী যেখানে স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে‚ অবসর কাটাতে যেত আর 'শুন বরনারী'র মত উপন্যাস লেখা হত| আমার এক অদ্ভুত রোগ‚ অসময়ে‚ অজায়গায় গান পায় আমার‚ কোন একটা গান মাথা খেতে থাকে হঠাৎ করে‚ তখুনি না শুনলে প্রাণ যায় যেন| সেই রোগ মাথা চাড়া দেয় ভীমবেগে‚ ফোন বার করে কানে গান গুঁজে বসি‚ বোন বলে‚ "স্পিকারেই বাজা না‚ এখানে তো শুধু আমরাই‚ আমিও একটু শুনি"| হেডফোন খুলে দিই‚ ফোন গান শোনায়….. "শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছো রাধে ঘুমাইয়া‚ হায় কলঙ্কের ভয় কি তোমার নাই ওগো রাধে‚ জাগো শ্যামের মনমোহিনী‚ বিনোদিনী রাই‚ রাই জাগো গো‚ জাগো শ্যামের মনমোহিনী‚ বিনোদিনী রাই"….. আধশোয়া হয়ে ঝিকিঝিকি ঝিকিঝিকি দোল খেতে খেতে‚ গান শুনতে শুনতে আর বাইরের দৃশ্যপট দেখতে দেখতে ধানবাদ এসে গেল| খাবার অর্ডার নিয়ে গিয়েছিল আগেই| ট্রেন থামতেই দুপুরের খাবার চলে এল| তখনও একটু আগেই খাওয়া ঝালমুড়ি হজম হয় নি পেটে| ওদিকে প্রত্যেকটা স্টেশনে থামলেই কিছু না কিছু উঠছে‚ ঝাল লজেন্স‚ বাদামভাজা‚ পুরি সবজি (বোন কিছুতেই খেতে দিল না)‚ ঝাড়খন্ডের সীমানা পেরিয়ে বাংলায় ঢুকতেই শুরু হয়ে গেল চপ-সিঙারা| হাওড়া যত কাছে আসতে থাকে‚ ট্রেনের গতিও ততই মন্থরতরো হতে থাকে| বেশ কিছুক্ষণ হালুয়ায় (হাওড়া ও লিলুয়ার মধ্যবর্তী যে অনির্ধারিত হল্টে প্রায় সব ট্রেনই নিয়মিত থেমে থাকে আর কি) দাঁড়িয়ে থাকার পর ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছালো প্রায় বারো ঘন্টা লেটে‚ ততক্ষণে সন্ধ্যে ছটা বেজে গেছে বেআক্কেলে ঘড়িতে| একটা গোটা দিন গঙ্গার ঘোলা জলে ভেসে গেল অকারণে| বন্ধুবান্ধব কারো সাথেই এবার আর দেখা হল না| না না হয়েছে‚ শঙ্খর সাথে দেখা হয়েছে এক ঝলক একটুখানি| মায়ের কাজের দিন সন্ধ্যাবেলা সব মিটে যাবার পর সবে গা ধুয়ে রাজবেশখানি পরে বেরিয়েছি‚ শুনি বাইরে একটা গাড়ি ব্যাক করতে চেষ্টা করছে জানালা ঘেঁষে প্রায় আমাদের সিঁড়ির উপর দিয়ে আর কে যেন বলছে "লেগে যাবে‚ লেগে যাবে"| কেডা রে? পর্দা সরিয়ে কটমটিয়ে দেখতে চেষ্টা করি সোফার উপর হুমড়ি খেয়ে‚ ওম্মা‚ এ তো দেখি শঙ্খ‚ মাথা নেড়ে নেড়ে শুধাচ্ছে‚ "কবে এসেছো"? অঝোর বৃষ্টি পড়ছে তখন| অনেক দূর থেকে ফিরছে বেচারা ড্রাইভ ক'রে| আমার অনুরোধ রাখতে দাদার হাতে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে জুতো খুলে ভিতরে এল‚ সামান্য কয়েক মিনিট‚ কুশল বিনিময়টুকু শুধু হল| মায়ের কাজের দিনও গিয়েছিল শঙ্খ‚ আজ বর্ষপূর্তিতেও ওর পায়ের ধুলো পড়ল বাড়িতে| ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই আমার| মুনমুন খবর নিয়েছে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই| ফোনেই কথা হল ওর সাথে বার কয়েক| সোমাকে ফোন করলাম| ওরও তো হাবিডুবি অবস্থা| আর এক বন্ধু আসবে বলে কথা দিয়েও অ্যাস ইউসুয়াল কথা রাখে নি| অথবা হয়তো আমারই শোনার ভুল‚ বোঝার ভুল‚ ভেবেছিলাম দেখা হবে‚ হল না| রইল বাকি স্কুলের বন্ধুরা| সকলেই ব্যস্ত‚ সবারই এক অনুযোগ - "আগে জানালি না"? দুন এক্সপ্রেসের নাম শুনে এক বন্ধু নাক কুঁচকে (আমার নটখটে হাঁটুর দিব্যি‚ ফোনেই পরিষ্কার শুনতে পেলাম ওর নাক কুঁচকানো) বললো‚ "ইসস‚ ওটা তো মার্কামারা‚ ঐ ট্রেনে কেউ চড়ে"? ভাবলাম বলি "তখনও কলকাতা আসার টিকেটও বুক করি নি রে‚ চারমাস আগে এই টিকেট করা হয়েছিল‚ তাতেই এই হাল‚ আর কোন ট্রেনে এসি থ্রী টায়ারও পাই নি"| কিন্তু আর বললাম না| আমাকে ধুর ভাবতে পেরে ওর যদি একটু শান্তি হয়‚ হোক না| শুধু মনের কোণে কোথাও একটা কাঁটা ফোটে খচ করে‚ এরা আমার ছোটবেলার বন্ধু‚ বেড়ে ওঠার সাথী‚ একসাথে টিফিন ভাগ করে খেয়েছি একদিন‚ দুষ্টুমি করে একসাথে শাস্তি পেয়েছি| অথচ দু'দিনের পরিচয় যার সাথে হাইকের দলে‚ আক্ষরিক অর্থেই পথের দেখা‚ সেও আসার আগের রবিবারের হাইক শেষে জড়িয়ে ধরে আমাকে বলেছিল‚ "Have a wonderful trip, don’t get raped and come back safely".... শুধুই মৌখিক? হলই বা‚ তবু তো শুভেচ্ছা| এই আকালের বাজারে সেইটুকুই কি কম পাওয়া? আমায় মারবেন না গো বাবুবিবিরা‚ আমি তো স্রেফ গল্পবলিয়ে‚ ভারতবর্ষের ছবিখানাই এমনতরো চমৎকার এখন বিশ্বের দরবারে| গল্প হবে অথচ ভোজনের ঘ্রাণ থাকবে না‚ তাও কখনো হয়? কথায় বলে বাসনার সেরা বাসা নাকি রসনায় ….. তা নয় নয় করে মন্দ হল না একেবারে| পাড়ার মোড়ের ফুচকা‚ ঘুগনি‚ চুরমুর‚ সিঙারা‚ আলুর চপ‚ ডিমের চপ‚ ভেজিটেবল চপ‚ বেগুনি‚ পেঁয়াজি‚ রোল‚ চাওমিন‚ মোগলাই পরোটা‚ মোমো‚ নন্দনচত্বরে আমন্ত্রনের ফিসফ্রাই‚ ডিমের ডেভিল‚ রবীন্দ্রসদনের ঝালমুড়ি ইত্যাদি তো হলই| তাছাড়াও ১৬ বালিগঞ্জ প্লেস‚ ষোল আনা বাঙালী‚ ফ্লেইম অ্যাণ্ড গ্রিল‚ আমিনিয়া‚ কলাপাতা‚ অওধের বিরিয়ানি আর লাজবাব কাবাব‚ এমনকি একদিন কোলাঘাট অবধি ধেয়ে গিয়ে শের-ই-পাঞ্জাবেও কবজি‚ না না‚ কনুই অবধি ডুবিয়ে খাওয়া হল| আর বোনের রাঁধা তেলকই‚ খাসির মাংস‚ চিকেন কষা‚ মোরলা মাছের বাটিচচ্চড়ি‚ ভেটকি পাতুরি‚ চিংড়ি ভাপা‚ এন্তার পার্শে ভাজা‚ এঁচোর‚ মোচা‚ পটল‚ সজনে ডাটা পোস্ত দিয়ে‚ কচুর লতি‚ লাল শাক‚ কলমি শাক‚ পুঁই শাক‚ লাউ শাক ইত্যাকার নিত্যনৈমিত্তিক পঞ্চব্যাঞ্জন তো এহ বাহ্য| নিজের ভোজনক্ষমতায় নিজেই আবাক্যি মেরে গেলাম| শুধু থোড়টা আর খাওয়া হল না বেতালা দৌড়াদৌড়ির গোলেমালে| বাদ রয়ে গেল অনাদির মোগলাই আর গোলবাড়ির কষা মাংস| গড়িয়াহাটের বেদুইনের রোলও প্রায় বাদের খাতাতেই যাচ্ছিল‚ কিন্তু ঐ রোল একটাও না খেয়ে ফিরে গেলে পাপ হবে মারাত্মক‚ তাই একরকম জোরজুলুম করেই যাওয়া হল এক বিকেলে| বাপরে‚ চৈত্র সেলের বাজারে লোকে আমাকেই প্রায় ২০০% ছাড়ে বেচে দেয়‚ এমন অবস্থা! পুলিশে দড়ি ধ'রে ধ'রে লোকজনের ভিড় নিয়ন্ত্রন করছে রাস্তার মোড়ে| আমি আর আমার বীরপুরুষ দু'জনেই রয়ে গেলাম পুলিশের রশির এপারে‚ বোন আর মেয়ে পেরিয়ে চলে গেল| ওরা হেসে বাঁচে না| আবার ফিরে এসে আমাদের ধরে ধরে রাস্তা পার করায় দু'জনে| রাস্তা তো পেরনো গেল‚ কিন্তু বাজারের মধ্যে সেঁধোবার উপায় নেই‚ এমন ভিড়ে ভিড়াক্কার| গরুর মত দু'টো না হলেও অন্তত একটা শিঙও যদি থাকত মাথায়! তবে দেখলাম শিঙ বিনাই লোকজন দিব্যি গুঁতোতে পারে| আমি চিরকালের কেবলি‚ সেই গুঁতো খেয়ে ধপাস করে সোজা ভূমিশয্যায় কেতরে পড়লাম‚ বোন এসে তাড়াতাড়ি হাত ধ'রে তুলতে চেষ্টা করে| বিন্দুমাত্র দৃকপাত না করে গুঁতোদেনেওয়ালা আমায় ডিঙিয়ে‚ আমার ভাঙা চরণখানা পাড়িয়ে চলে যাবার তালে ছিল| আশেপাশে লোকজন যথারীতি নির্বিকার‚ ব্যাগ নিয়ে দরাদরি চলছে‚ চুলের ক্লিপ নিয়ে তর্কাতর্কি‚ কেউ নাইটি হাতড়াচ্ছে‚ যে যার মত পাশ কাটিয়ে‚ ডিঙিয়ে চলে যাচ্ছে| কিন্তু মায়ের হেনস্থা চুপচাপ মেনে নেবার বাছা আমার গাণুশ নয়| লোহার মত শক্ত মুঠিতে লোকটার হাত ধরে এক হ্যাঁচকায় দাঁড় করালো‚ চোয়াল শক্ত‚ চোখে আগুন| আমি পড়ি কি মরি করে হ্যাঁচোড় প্যাচোড় করতে করতে উঠে দাঁড়াই‚ সেরেছে রে‚ আমাশাক্লিষ্ট সেই বাংলার ষাঁড়ের দেশলাই কাঠির মত পোক্ত বাহু‚ পট করে না দুখণ্ড হয়ে যায় বাবির কুড়ি পাউণ্ডের মুষল সাধা হাতের চাপে| "ছেড়ে দে বাবা"‚ বোন আর আমি দুজনে মিলে ছাড়াই সেই বজ্রমুষ্টি‚ লোকটা হাত ডলতে ডলতে চলে যায় বিড়বিড় করতে করতে| এদিকে বাবিও ফুঁসতে থাকে| "হে মা দুগ্গি‚ এবারটার মত পার করে দে মা এই জনসমুদ্দুর‚ নাকে খত‚ কান মুলছি‚ আর কক্ষনো ভুলেও আসব না কো হেথায় চত্তির মাসে"| ইচ্ছে ছিল কলিগদের গিফট দেবার জন্য টুকটাক কেনাকাটা করার| সে সব ইচ্ছে চট করে শিকেয় তুলে কয়েক কদম এগিয়ে রোল কিনেই কোনক্রমে আবার সেই সার্কাসের ট্র্যাপিসের খেলার স্টাইলে রাস্তা পেরিয়ে গাড়িতে| যাওয়া হল না আমার পরম তীর্থ দক্ষিণাপণেও‚ মানে আর সাহসে কুলালো না| তৃষাতুর চোখে চেয়ে থাকি জানালা দিয়ে‚ গাড়ি ব্রিজ পেরিয়ে দক্ষিণাপণকে ডাইনে রেখে এগিয়ে যায় ….. না গো না, দেয় নি ধরা- না গো না, দেয় নি ধরা, হাসির ভরা দীর্ঘশ্বাসে যায় ভেসে, মিছে এই হেলা-দোলায় মনকে ভোলায় - মিছে এই হেলা-দোলায় মনকে ভোলায়, ঢেউ দিয়ে যায় স্বপ্নে সে, সে বুঝি লুকিয়ে আসে বিচ্ছেদেরই রিক্ত রাতে, নয়নের আড়ালে তার নিত্য-জাগার আসন পাতে - ধেয়ানের বর্ণছটায় ব্যথার রঙে মনকে সে রয় রঙ্গিতে, রয় রঙ্গিতে- যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে…. হয়ে গেল‚ বিহঙ্গের যাবার সময় হল| আবার বাক্স নামিয়ে গোছাতে বসা ….. "শুধু দেখা পাওয়া‚ শুধু ছুঁয়ে যাওয়া‚ শুধু দূরে যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া‚ শুধু নব দুরাশায় আগে চলে যায়‚ নব নব দুরাশায় আগে চলে যায়‚ পিছে ফেলে যায় মিছে আশা‚ শুধু যাওয়া আসা‚ শুধু স্রোতে ভাসা"……. মনে হয় গানগুলো সব ঠাকুর আমার জন্যই লিখেছিলেন যেন| ফাইন্যাল এক রাউণ্ড বাজার --- আমসত্ত্ব‚ বড়ি‚ মুখরোচক চানাচুর‚ সর্ষেগুঁড়ো‚ সর্ষের তেল‚ চালের গুঁড়ো‚ গোবিন্দভোগ চাল‚ সোনামুগের ডাল‚ পানমশলা‚ জর্দা---মাথা খুঁড়ে মরে গেলেও যে জিনিষগুলো আমি ওখানে পাবো না কিছুতেই| দীর্ঘ দুই দশক ধরে যাচ্ছি‚ আসছি| আগে আগে ভয় পেতাম‚ আইন ভাঙতে সঙ্কোচ হত| তার সাথে ছিল এক যুধিষ্ঠিরের তালিবানি শাসন| কিন্তু দেখলাম "লজ্জা‚ ঘৃণা‚ ভয়‚ তিন থাকতে নয়"| লোকে সারা বছরের চাল‚ ডালও কিনে নিয়ে যায় এখান থেকে সামান্য দুটো পয়সা বাঁচাতে‚ বাক্স ভরে শাড়ি কিনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে| আমি তো নেব আমার খাবার জন্য‚ তাও যদি ওখানে পেতাম‚ নিতাম না| এই শেষের দু'তিনটে বছর ধরে তাই চুপচাপ কাউকে কিছু না বলেই নিয়ে যাচ্ছি কয়েকটা জিনিষ| "জীনা তো হ্যায় চার হি দিন‚ জিয়েঙ্গে মস্তি মে" ...... অনেক দিন তো বাঁচলাম বড় ভয়ে ভয়ে‚ অতি সাবধানে‚ নাহয় দেখাই যাক কি লেখা আছে অন্য দিকটাতে| বোন পাটালি গুড়‚ খেজুর রস জ্বাল দিয়ে বানানো গুড়‚ তিলতক্তি গুছিয়ে রেখেছে‚ কুলের আচার বানিয়ে রেখেছে মস্ত এক বয়াম| তার সাথে যোগ হল পেড়ে আনা কাঁচা আম আর ডাগর কিছু কাঁচালঙ্কা| সব পরিপাটি করে গোছাই‚ এই দীর্ঘ পথ পার করে এসব নিয়ে যাওয়া‚ সে যে কি গোছানো‚ যে না গুছিয়েছে‚ সে কল্পনাও করতে পারবে না| বাক্সসর্বস্ব জীবন‚ পৃথিবীর দুইপারে দুই পা‚ কোথায় আমার সুখের বসত আর কোনটা যে পরবাস‚ বুঝতে পারি না| গোছানো শেষ| আজকের দিন পুরো বিশ্রাম‚ শুধু ঘরে বসে পর্বে পর্বে ভোজন আর নির্ভেজাল আলস্য| দু'একটা ফোন‚ যাবার আগে শেষবার একবার প্রিয় কন্ঠস্বর শুনতে চাওয়া….. "আধোখানি কথা সাঙ্গ নাহি হয়‚ লাজে ভয়ে ত্রাসে‚ আধো বিশ্বাসে শুধু আধোখানি ভালোবাসা"…… নাহ যাই এবারে - "হাত ধরেছি অন্ধকারে ছাড়তে কতক্ষণ হয়তো আমার আঙুল জানে মোমবাতিদের মন পর্দা ওড়ায় বৃষ্টি হাওয়া ছাদে মাদুর পাতি দূরে কোথাও আশার গলায় " কাঁচেরই ঝাড়বাতি ".... সঙ্গে মুড়ি , জোছনামাখা কাঁচা লঙ্কা, ঘ্রাণে মোমবাতিদের মন কিছুটা আমার আঙুল জানে । বেশীর ভাগই স্পর্শকাতর কিছু স্মৃতিহীনা রইল ছাদে মাদুর পাতা ..... আমি তো বসছি না ।" ......শ্রীজাত

174

19

জল

গল্প

উর্বশী .... অনেকটা সময় ধরেই ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে| একদম নট নড়ন চড়ন| যেন ভুলেই গেছে সিগন্যাল দিতে| লেডিস কামরার মধ্যে উসখুশ করছে দু একজন| ওদিকের একটা মেয়ে হাতের ঘড়িটা বারবার দেখে নিচ্ছে| দু-একজন নিশ্চিন্তের ঝিমুনি থেকে উঠে একবার দেখে নিয়ে আবার একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছে| কামরায় ভিড় প্রায় নেই| আপ ট্রেনের উপচে পড়া ভিড় এইসময় ডাউন ট্রেনে তেমন একটা থাকে না| জানলার পাশে বসে থাকা মেয়েটা বারবার মোবাইলের স্কিনে সময়টা দেখছে| এই সময়ই ট্রেনটা দুলে ওঠে| মেয়েটাও সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেটের কাছটায় এসে দাঁড়ায়|কত নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটা দিচ্ছে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করে মেয়েটা| প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে যেন দিন কাবার করে দিচ্ছে| রোজকার এক নাটক| প্ল্যাটফর্মে ঢোকার আগে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়তেই হবে| এদিকে যে তার ভীষন দেরী হয়ে যাচ্ছে| তাদের প্রফেশনে সময়টা খুব গুরুত্বপুর্ণ| পেশাদারিত্ব ব্যাপারটা না থাকলে জীবনে উন্নতি করা যায় না| আর এদিকে দেরী হওয়া মানেই ওদিকেও দেরী হওয়া| অবশেষে ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই এক লাফে নেমে ছুটতে থাকে সে| অনেকটা দেরী হয়ে গেছে| রোজ যেন স্টেশনে ভিড় বেড়েই চলেছে| অফিসফেরত ‚ ব্যবসাফেরত ‚ নানা ধরনের জীবিকাফেরত যাত্রীদের ভিড় যেন সুনামির মত আছড়ে পড়ছে স্টেশনে| চারিদিকে শুধু কালো কালো মাথা| এদের পেরিয়ে সে উর্দ্ধঃশ্বাসে ছুটতে থাকে| এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের লেডিস টয়লেটের সামনে আসতেই হাতের মোবাইল সেটটা ভাইব্রেট হতে থাকে| কলটা রিসিভ করে খুব নিচু স্বরে বলে‚ 'এখুনি রেডি হয়ে যাব| প্লিজ একটু ওয়েট কর|' টয়লেটে তখন ভিড় অনেকটাই পাতলা| সন্ধ্যে পেরিয়ে রাতের দিকে ঢলে পড়া দিনের এই সময় বেশিরভাগ মেয়েরাই বাড়ি ফিরে গেছে| কেউ কেউ অবশ্য তখনও ফেরেনি | আকূল হয়ে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ট্রেনের খবরের জন্য অপেক্ষা করছে| কেউ কেউ হন্ত দন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে| কয়েকজন মাসী বসে গুলতানি করতে করতে পয়সা নিচ্ছে| এখানে টয়লেটে যাবার জন্য কতৃপক্ষ কোন পয়সা ধার্য্য না করলেও অলিখিতভাবেই মাথাপিছু দু টাকা দিয়েই ঢুকতে হয়| মাসীগুলোর মুখ তো মুখ নয় যেন নর্দমা| কেউ তর্ক করতে চাইলে এদের মুখের ভাষা যেভাবে ছোটে তাতে কানে হাতচাপা দিয়ে পালাবার পথ পায় না ভদ্রসভ্য বাড়ির মেয়ে-বউ রা| তার চেয়ে দুটাকা করে দিয়ে দেওয়াই শ্রেয়| এদের পরিস্কার যুক্তি‚ 'এই যে তোমরা টয়লেট নোংরা করছ আর আমরা পরিস্কার করছি‚ তার জন্য তো রেলের কর্তারা আমাদের পয়সা দেয় না‚ তাহলে আমাদের চলে কি করে? ' এই মাসীদের এখানে কতৃপক্ষই রেখেছে কিনা সে প্রশ্ন অবান্তর| ঠেকায় পড়ে যাচ্ছ যখন দুটাকা দিতেই হবে| লোকের অত সময় নেই এদের নিয়ে রিসার্চ করার| ' কি রে উরবী তোর আজ এত দেরী?' একজন মাসী কথা বলতে বলতেই তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়| এই মাসীদের উপেক্ষা করার কোন উপায় নেই| এরাই এখানকার অল ইন অল বলা যেতে পারে| এদের হাতে রাখতে পারলে এই টয়লেটের ভিতরে আসা-যাওয়া-সময় কাটানো অবাধ| অবশ্য পুরোটাই অবাধ নয়| দু-দশ টাকা হাতে ঠেকাতে হয়| তবে সেটা ধরলে চলে না| তার ওপর এদের ওপরেই তো দায়িত্ব থাকে তাদের জিনিসপত্র দেখে-বুঝে রাখার| তাই পিঠের ব্যাগটা নামাতে নামাতে উর্বী বলে‚' আর বলো না মাসী‚ রোজ লেটে ট্রেন ঢোকাচ্ছে আর রোজ আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে|' বলেই সে টয়লেটে ছোটে| এক বালতি জল ওদিকের ড্রাম থেকে তুলে এনে ঢেলে দিয়ে ঢোকে| হাইজিন ব্যাপারটা সে খুব ভালো বোঝে| টয়লেটেই মুখটা ভালো করে ফেসওয়াশ দিয়ে ঢুয়ে নেয়| ভেতরেই একটা মাসী প্রায় আর্ধেক উদোম হয়ে শাড়ি ঠিক করছে| আগে আগে অস্বস্তি লাগত| এখন আর লাগে না| চোখ সয়ে গেছে| এখানে লজ্জা নামক জিনিসটার অস্বিত্ব নেই প্রায়| ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বার করে থুপে থুপে মুখটা মুছে নেয়| একটা ছোট কাপড় পেতে তার ওপর বসে পড়ে সে| ব্যাগ থেকে টেনে মেকাপ বক্সটা বার করে| একটা পোর্টেবল মেকাপ বক্স তাকে ব্যাগে সবসময়ের জন্য রাখতেই হয়| শুধু মেকাপ বক্স নয়‚ সাথে পোশাক‚ জুতো এসবও থাকে পেশার খাতিরে| এবার সে নিখুঁতভাবে নিজেকে সাজিয়ে তুলবে| আশে-পাশে আরও দু একজন তখন সেইভাবেই মেকাপ করছে| 'উরবী তোর আই লাইনারটা দে তো?' পাশের থেকে মেকাপরতা একটি মেয়ে হাতটা বাড়ায়| 'চল ফোট‚ রোজ রোজ তোর সেই এক ভ্যানতারা| ফোকটে আমার আই লাইনারটা ইউজ করিস| শোন তোদের মত সস্তার জিনিস আমি ইউজ করি না| একটা আই লাইনারের দাম জানিস?' 'বড় গুমোড় হয়েছে তোর| সেই তো আমাদের মতই রেন্ডিগিরি করিস| না হয়ে বয়স আছে আর দেখতেও মস্ত আছিস আর পেটে দুটো বিদ্যে আছে ‚ তাই বলে আমাদের এইভাবে হেয় করিস না| তোতে আর আমাতে কি তফাৎ রে? ' 'অনেক তফাৎ| বেশি বকিস না‚ আমার দেরী হয়ে গেছে এমনিতেই| কাস্টমার রেডি হয়ে আছে|' বলেই উরবী নিজেকে একটু একটু করে উর্বশীর মত সাজিয়ে তুলতে থাকে যত্ন করে| এদের সাথে বেকার কথা বলে লাভ নেই| এমনিতেই বেশ দেরী হয়ে গেছে| সব সড়কছাপ এরা| এখানেই থাকে| এদের সাথে মিশতে চায় না সে| তবু এখানে আসে‚ তৈরী হয় সেই খাতিরেই দুটো কথা বলতে বাধ্য হয়| না হলে এদের পায়ের নখেরও যোগ্যতা নেই তার সাথে কথা বলে| প্রথম যখন এখানে এসেছিল রম্ভাদির সাথে তখন বমি করে ফেলেছিল| এই নোংরা টয়লেট ‚ গন্ধ‚ নোংরা জল ‚ কান- মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠা খিস্তি খেউড় আর তার মধ্যেই কিভাবে একটার পর একটা ব্যাচ সেজেগুজে বেড়িয়ে পড়ছে দেখে অবাকও কম হয়নি| রম্ভাদিও এখানে সাজত| বলেছিল‚ 'এটা বেস্ট জায়গা বুঝলি‚ অন্য কোথাও সাজতে গেলে তো একটা ভাড়া বেয়ার করতে হবে‚ এখানে ওসবের ঝক্কি নেই| আর তুই যদি কোনদিন একটা পজিশনে চলে যেতে পারিস তখন না হয় একটা ডেরা কোথাও খুঁজে নিবি| ততদিন না হয়ে এইসব সয়েই রইলি| ' রম্ভাদি এখন আর আসে না এখানে| অন্য কোথাও একটা স্থায়ী আস্তানা পেয়ে গেছে নির্ঘাৎ| রম্ভাদির এই পেশায় আসাটা চাপে পড়ে| বাড়িতে অসুস্থ স্বামী‚ একটা মেয়ের সমস্ত দায়িত্ব ছিল রম্ভাদির| এই পথটাই কেন রম্ভাদি বেছে নিয়েছিল সেসব নিয়ে কথা হয়নি কখন| আর এত পার্সোনাল লেভেলে কথা বলা তার পছন্দের নয়| সে পার্সোনাল জীবন নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে না| অন্য কারও পার্সোনাল জীবন নিয়ে অহেতুক কৌতুহল দেখানোটাও অপছন্দের| সে যাই হোক রম্ভাদি হয়ত অন্য পেশায় সুবিধে করতে পারেনি‚ তাই আদিম এই পেশাকেই বেছে নিয়েছিল| মনের দিক থেকে কোনরকম ভার ছিল না রম্ভাদির| আর পাঁচটা পেশার মত এটাকে পেশা হিসাবেই নিয়েছিল| মনের ওপর কোন ভার তার নিজেরও নেই| কোন চাপে পড়ে যে সে এই পেশায় এসেছে তাও নয়| বস্তুত কাজ করার খুব একটা আর্থিক প্রয়োজনও তার ছিল না| ক্লাস ইলেভেনে প্রথম রোমশ শরীরের আস্বাদন পেয়েছিল সে| আর সেইসময় নিজেকে আবিস্কার করেছিল সে| বুঝেছিল তার শরীর ভীষনভাবে এইসব ব্যাপারকে এনজয় করে| একের পর এক পার্টনার সে পাল্টেছিল| কোনো পাপবোধ ছিল না| থাকবেই বা কেন| ব্যাপারটা তো খুব সিম্পল| কেউ যেমন বেশি খায় তেমন কারও কারও শরীর বেশি উপভোগ করে| তারপর তো কলেজ আসা-যাবার পথে একদিন রম্ভাদির সাথে আলাপ হয়েছিল| তারপর নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই পথে আসার| যেদিন বিরক্তি আসবে কেটে পড়বে| জীবন সম্পর্কে সোজাসাপ্টা দৃষ্টি নিয়ে চলতেই তার ভালো লাগে| অকারণ জটিলতা‚ আবেগ এসবের মূল্য তার কাছে বিন্দুমাত্র নেই| আর নেই বলেই সে পুরোপুরি একা থাকার সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেনি| বাবা-মাকে বলেছিল যে কাজে সে জয়েন করেছে সে কাজে লেগে থাকতে গেলে রোজ রোজ ফিরতে পারবে না| তাই সে একাই থাকবে| অশান্তি হয়েছিল‚ কান্নাকাটি| কিন্তু সিদ্ধান্ত থেকে তাকে টলানো যায়নি| একা একটা বাড়িতে ভাড়া সে পাবে না জানত‚ তাই ওয়াকিং হোস্টেলে জায়গা খুঁজে নিয়েছিল| একগাদা ইনফর্মেশন দিতে হয়েছে| নিজের কাজের জায়গার বিবরণ দেওয়াটা চাপের ছিল| কিন্তু ম্যানেজ করে নিয়েছে| টাকা ফেললেই অনেককিছুই সম্ভব| একটু একটু করে নিজেকে উবর্শীর মত সুন্দরী করে তোলে সে মেকাপের ছোঁয়ায়| এই যে এখানে তার পাশে আর দুটো মেয়ে সাজছে‚ এরা সেজে গিয়ে কোন সিনেমা হলের সামনে ‚ নয়ত অন্ধকার কোন কোণে গিয়ে দাঁড়াবে| এদের সাজগোজ এদের পেশাকে নির্দেশ করে দেয় অবলীলায়| কিন্তু এইরকম উগ্র সাজ তার পছন্দ নয়| সে মনে করে সোবারনেস হল যেকোন সাজের মূল মন্ত্র| উগ্র সাজ‚ অহেতুক শরীর প্রদর্শন‚ ওসবের মধ্যে সে নেই| আর ঐ সেজেগুজে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো তার দ্বারা সম্ভব নয়| রম্ভাদির মত তারও এজেন্ট আছে| তারাই কাস্টমার ধরে নিয়ে আসে একটা কমিশনের ভিত্তিতে| ভালো পয়সাওয়ালা কাস্টমার| উর্বশী এত সস্তা নয় যে‚ যে কেউ পেতে পারে তাকে| পেতে গেলে ভালোমত কড়ি ফেলতে হবে| নিজেকে রুচিশীল পোশাকে মুড়ে ফেলে| তারপর মেকাপের যাবতীয় সরঞ্জাম‚ ছাড়া জামা-কাপাড়গুলোকে গুছিয়ে পিঠের ব্যাগটাতে তুলে ব্যাগটাকে দোয়ালের একটা গোপন খাঁজে ঢুকিয়ে দেয়| তারপর রোজকার মত 'মাসীরা চললাম গো| ব্যাগটা দেখ‚ ' বলে বেড়িয়ে পড়ে| হাতের মোবাইলটা ভাইব্রেট করে ওঠে| কাস্টমার রেডি| একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে সে মিলিয়ে যায় স্টেশনের বাইরের ভিড়টার মধ্যে|

1750

168

Ranjan Roy

গল্পঃ এক ও দুই রঞ্জন রায়

গল্প ১ গন্ধ: সাদত হসন মন্টো মূল ভাষা থেকে বাংলাঃ রঞ্জন রায় [ এটি মন্টোর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর অন্যতম না হলেও প্রতিনিধিমূলক তো, তাই অক্ষম অনুবাদে পেশ করলাম।] সেদিনও এমনি বূষ্টি পড়ছিল। জানলার বাইরে অশ্বত্থের পাতাগুলো এমনি করে ভিজছিল। ।স্প্রিংয়ের গদিওলা সেগুনের খাটে একটি পাহাড়ি মেয়ে রণধীরের সঙ্গে লেপটে শুয়েছিল। খাটটি জানলার পাশ থেকে সরিয়ে ঘরের ভেতরের দিকে টেনে আনা আর জানলার বাইরে দুধসাদা অন্ধকারে অশ্বত্থের পাতাগুলো ঝুমকোর মত থরথরিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নাইতে লেগেছিল। এদিকে খাটের উপর থরথর পাহাড়ি মেয়েটি রণধীরের গায়ে লেপটে শুয়ে। সারাদিন ধরে একটা ইংরেজি কাগজের সমস্ত খবর মায় বিজ্ঞাপন শুদ্দু পড়তে পড়তে বিকেল গড়িয়ে গেলে ও একটু পায়চারি করবে বলে সবে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে , চোখে পড়ল বূষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে তেঁতুল গাছের নীচে দাঁড়ানো পাহাড়ি মেয়েটি; বোধহয় কাছের দড়িপাকানোর কারখানায় কাজ করে। একটু কাশি আর গলাখাঁকারির শব্দে চোখ তুলে তাকাতেই ও মেয়েটাকে হাত নেড়ে ওপরে ডেকে নিল। কিছুদিন ধরে ওর বড্ড একলা একলা লাগছিল। যুদ্ধ লাগতেই বেশির ভাগ ক্রিশ্চান ছুঁড়িগুলো, যাদের আগে নামমাত্র টাকায় পাওয়া যেত, মেয়েদের অক্সিলিয়ারি ফোর্সে ভর্তি হয়ে গেল। কয়েকজন ফোর্টের পাশে ডান্সিং স্কুল খুলে দিল যেখানে শুধু গোরা সৈনিকরা যেতে পারবে। রণধীরের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক।রণধীর জানে যে ওই গোরা সেপাইদের চেয়ে ও অনেক বেশি ভদ্র, শিক্ষিত আর দেখতেও ভাল। শুধু রঙটা ফর্সা নয় বলে ও ক্লাবগুলোতে ঢুকতে পারবে না!যুদ্ধের আগে নাগপাড়া ও তাজ হোটেলের এলাকায় বেশ নামকরা কিছু ক্রিশ্চান মেয়ের সঙ্গে ওর শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল। যে ক্রিশ্চান ছোঁড়াগুলো ওই মেয়েগুলোর পেছনে ঘুর ঘুর করে শেষে কোন একটাকে বিয়ে করে ফেলত, ও জানত, ওরা ওর পাশে দাঁড়ানোর যুগ্যি নয়। ওই পাহাড়ি মেয়েটিকে ইশারায় ওপরে ডেকে নেওয়ার সময় রণধীরের মনে শুধু হেজেল বলে ক্রিশ্চান মেয়েটির ওপর খার তোলার ইচ্ছে ছিল। হেজেল বলে মেয়েটা থাকে ওর নীচের তলার ফ্ল্যাটে। রোজ সকালে উর্দি পরে খাকি রঙের তেরচা টুপিতে ববকাট চুল ঢেকে এমন কায়দা করে চলে যেন গোটা রাস্তার লোক ওর পায়ে লুটিয়ে পড়বে। রণধীরকে ও একদম পাত্তা দেয় না। রণধীর ভেবে পায় না কেন ওই ক্রিশ্চান ছুঁড়িগুলোকে নিয়ে ও এত মাথা ঘামায়! কোন সন্দেহ নেই যে ওরা শরীরের যা যা দেখানোর জিনিস সব বেশ কায়দা করে দেখায়। নি:সংকোচে নিজের সব কিছু শোনয়, এমনকি পুরানো প্রেমিকদের নিয়ে গল্প শোনাতেও ছাড়ে না। আর নাচের সুর বেজে ওঠা মাত্তর তালে তালে পা’ কাঁপাতে থাকে। সে না হয় হল, তবে এসব গুণ তো অনেক মেয়ের মধ্যেই দেখা যায়। মেয়েটাকে ওপরে নিয়ে যাওয়ার সময় রণধীরের একটুও বিশ্বাস হয় নি যে ওর সঙ্গে শুতে পারবে। কিন্তু একটু পরে ওর চোখ পড়ল ওর জবজবে ভিজে কাপড়ের দিকে। ভাবল–– আহা, বেচারির নিমোনিয়া না হয়ে যায়! বলল––‘ কাপড়চোপড় ছেড়ে ফেল, ঠান্ডা লেগে যাবে’। মেয়েটা সব বুঝতে পারছিল, তাই চোখে লজ্জার লালিমা। কিন্তু রণধীর একটা শুকনো ধুতি বের করে দিলে ও একটু ভেবে ওর ঘাঘরা খুলে ফেলল–– ভিজে গিয়ে ওটার ময়লা ময়লা ভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।ভিজে কাপড় একপাসে রেখে ও ধুতি দিয়ে গোটা শরীর ঢেকে নিল। তারপর তাড়াহুড়ো করে দুটো কোনা আঁটো করে বাঁধা চোলির গিঁট খোলার চেষ্টা করতে লাগল। ওটা ওর উদ্ধত বুকের খাঁজে বেশ কেটে বসেছে। বেশ খানিকক্ষণ গিঁট খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে হার মেনে ও মারাঠি ভাষায় রণধীরকে যা বলল তার নিগলিতার্থ––– কী করি? খুলছে না যে! আসলে ভিজে গিয়ে ওর চোলি খুব কড়া হয়ে গেছল। রণধীর ওর পাশে বসে টানাটানি করে খুলতে না পেরে দু’হাতে চোলির দু’পাশ ধরে মারল এক হ্যাঁচকা টান।গিঁট খুলল, ওর হাত ছিটকে সরে গেল আর ওর মুঠোয় এল ধুকপুক দুই নরম বুক। পাহাড়ি মেয়েটার বুকের নরম নরম মাটির তাল ওর কুমোরের মত পাকা হাতে দুটো পেয়ালার রূপ ধরেছে।ও ই ভরা বুক যেন কুমোরের চাক থেকে সদ্য বেরনো বাসন; তেমনি সুডোল,কোমল, উষ্ণ ও শীতল। মেটে রঙের নির্মল দুই বুকে এক অদ্ভুত চকচকে ভাব। ধোঁয়া ধোঁয়া আলোর আভা। যেন দীঘির কালো জলের তলে কেউ জলটুঙ্গিতে প্রদীপ জ্বেলেছে। হ্যাঁ, সেটা ছিল এমনি এক বূষ্টিঝরা দিন। জানলার বাইরে বূষ্টির ফোঁটায় থিরথিরিয়ে কাঁপে বটের পাতা। পাহাড়ি মেয়েটার ওই দু’টুকরো জবজবে ভিজে পোষাক ঘরের এককোণে মাটিতে লুটোয় আর ও নিজে রণধীরকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে। ওর নগ্ন ময়লা শরীরের উষ্ণতা রণধীরের শরীরে শীতের দিনে নোংরা বাথরুমে গরম জলের ফোয়ারায় স্নান করার আরাম ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সারারাত্তির ও রণধীরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে শুয়ে রইল। কথা হল মাত্র দু’একটা । কারণ গরম নি:শ্বাস, ঠোঁট ও হাতের ছোঁয়ার পরে বাকি সব ফালতু হয়ে যায়। রণধীরের হাত সারারাত ওর বুকে মাঠের ওপর বয়ে যাওয়া হাওয়ার মত খেলে বেড়ায়। ছোট ছোট স্তন, বোঁটার চারপাশে কালো বূত্ত–– ওই পাগল হাওয়ায় জেগে উঠে পাহাড়ি নারীর শরীরে এমন কাঁপন ধরায় যে রণধীরের শরীরও দপ করে জ্বলে ওঠে। এমন কাঁপন–জাগানো অনুভূতির সঙ্গে রণধীরের অনেক পুরনো পরিচয়। বহু মেয়ের নরম ও উদ্ধত বুকে বুক লাগিয়ে এমন অনেক রাত ও কাটিয়েছে। এমন খোলামেলা মেয়েও জুটেছে যে রাতভোর ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের ঘরের সেসব কেচ্ছা শুনিয়েছে যা কেউ অপরিচিতকে বলে না। ওর সেরকম কিছু মেয়ের সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল যারা সবকিছু নিজে এগিয়ে এসে করে দিত, ওকে কিস্যু করতে হত না। কিন্তু ওই পাহাড়ি মেয়েটা! তেঁতুলগাছের নীচে দাঁড়িয়ে ভিজছিল আর ওর এক ইশারায় উপরে চলে এল, কিন্তু কেমন যেন আলগা আলগা উদাস ভাবভঙ্গি। ওর শরীর থেকে এক অদ্ভূত গন্ধ রণধীরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সারারাত।সে’ গন্ধ যেমন অসহ্য তেমনি মাদক। গন্ধ ভেসে আসছিল ওর বগল থেকে, চুল থেকে, বুকের ভাঁজ থেকে, পেট থেকে, বোধহয় ওর গোটা শরীর থেকে আর ছড়িয়ে পড়ছিল ওর প্রত্যেক শ্বাস–প্রশ্বাসে। সমস্ত রাত ওর মনে হচ্ছিল যদি ওই পাহাড়ি মেয়েটি এত কাছাকাছি না শুতো বা ওর গা’ থেকে অমন তীব্র গন্ধ না ছড়াত। অমন গন্ধ যা রণধীরের হূদয়মনের পরতে পরতে বাসা বাঁধছে, ওর সমস্ত পুরনো ও নতুন ভাবনাচিন্তাকে দখল করে ফেলছে। ওই গন্ধ রণধীর আর ওই মেয়েটাকে একরাতের বাঁধনে এমন করে বাঁধল যে ওরা একে অন্যের গহনে প্রবেশ করে মানবীয় অনুভূতির, কামনার অতল গভীরে ডুবে গেল। সে কামনা যেন সাময়িক হয়েও চিরন্তন। ওরা দু’জন যেন এক জোড়া পাখি যারা আকাশের নীলিমায় উড়তে উড়তে এক পলকের জন্যে দেখা দেয়। পাহাড়ি মেয়ের শরীরের সমস্ত রোমকূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া ওই গন্ধকে রণধীর বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু তার ব্যাখ্যা করা ওর সাধ্যের বাইরে। খানিকটা যেন রুক্ষ মাটিতে কয় ফোঁটা জল পড়লে যেমন সোঁদা গন্ধ বেরোয় – সে’রকম; না:, ঠিক তা’ও না। এই গন্ধটা যেন একটু অন্যরকম। এতে ল্যাভেন্ডার ও আতরের নকলভাবটা নেই। এ হল খাঁটি জিনিস–– পুরুষ ও নারীর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মত আসল ও খাঁটি। ঘামের গন্ধে রণধীরের বড্ড ঘেন্না। স্নানের পর ও নিজের বগলে সুগন্ধ পাউডার লাগায়, নইলে এমন কোন জিনিস লাগায় যাতে ঘামের গন্ধ চাপা পড়ে।আর কি আশ্চর্য! ও কতবার পাহাড়ি মেয়েটার লোমে ভরা বগলে চুমু খেল কিন্তু একটুও ঘেন্না হল না!বরং ও নিজের ভেতরে এক অদ্ভূত কামনার জোয়ার টের পেল। বগলে নরম নরম লোম ঘামে ভিজে একশা’। ওখান থেকেও তাড়া করছে সেই চেনা–চেনা তবু–অচেনা গন্ধটা। রণধীরের মনে হল গন্ধটাকে ও ভাল করে জানে, চেনে, ওর মানেও বোঝে– কিন্তু অন্য কাউকে বোঝাতে পারে না। সেদিনটাও এমনিই ছিল; এমনি এক বূষ্টি–ঝরঝর দিন। এই জানলাটা দি্য়েই বাইরে তাকালে চোখে পড়ছিল বটের পাতার জলধারায় স্নানের আনন্দে মেতে ওঠা। হাওয়ায় সরসর–ফরফর মিলেমিশে যায়। অন্ধকার, কিন্তু তারমধ্যেই ঘোলাটে আলোর রেখা।ঠিক যেন বূষ্টিধারায় ঠিকরে পড়া তারার ফিকে আলো। সত্যি, সেদিনও ছিল এমনি এক বর্ষার দিন। তখন রণধীরের এই ঘরটায় শুধু একটাই সেগুনের পালংক দেখা যেত,আজ কিন্তু দু্টো পালংক,পাশাপাশি,–– কোণে আবার একটা নতুন ড্রেসিং টেবিল। আজকের দিনটা অমনি বর্ষামুখর, আবহাওয়াও ঠিক তাই। বূষ্টিধারায় ঠিকরে পড়া তারার ফিকে আলোও চোখে পড়ছে। খালি বাতাস ভারি হয়ে আছে হেনার আতরের তীব্র গন্ধে। অন্য খাটটা খালি।রণধীর নিজের খাটে উপুড় হয়ে জানলার বাইরের আলো–আঁধারিতে বূষ্টিভেজা বটের পাতার নাচন দেখছিল, এক ফর্সা মেয়ে ওর পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে কাদা। মেয়েটা ওর নগ্ন শরীর ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিছানার চাদর টেনে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর লাল রেশমী সালোয়ার পাশের খাটে লুটোচ্ছে।তার গাঢ় লালরঙা একটা ফিতে খাটের পাশ থেকে নীচে ঝুলছে। অন্য খাটে ওর বাকি কাপড়চোপড় ঢিপ হয়ে পড়ে আছে---ওর সোনালি ফুলকাটা কামিজ, ব্রেসিয়ার, প্যান্টি আর ওড়না,–– সব লালরঙের, খুনখারাপি লাল। সমস্ত কাপড়ে হেনার আতরের তীব্র গন্ধ। মেয়েটির কালো চুলে জরির ফিতের বিনুনি কেমন জমে থাকা ময়লার মত দেখাচ্ছিল। গালের রুজ, লাল লিপস্টিক ও চুলের জরি মিলেমিশে অদ্ভুত এক রঙের আবহ তৈরি করেছে। প্রাণহীন,উদাস। ওর ফরসা বুকে লালরঙা আঁটোসাঁটো বক্ষবন্ধনী লাল লাল ছোপ লাগিয়েছে। সাদা দুধেল স্তন, তাতে অল্প নীলচে আভা। পাঁশুটে রঙা কামানো বগল। রণধীর বেশ কয়েকবার মেয়েটিকে দেখে আর ভাবে––মনে হচ্ছে, ওকে যেন প্যাকিং বাক্সের পেরেক খুলে মাত্র বের করেছি--বই বা চিনেমাটির বাসনের মতন। বইযের গায়েও ঠেসে ভরার দাগ থাকে, চিনেমাটির বাসনেও নাড়াচাড়ার ফলে চুলফাটা দাগ ধরে। মেয়েটার শরীরেও যেন তেমনি কিছু দাগ আছে। রণধীর যখন ওর কড়া আঁটোসাঁটো ব্রেসিয়ার খুলেছিল তখন ওর পিঠে এবং বুকের নরম নরম মাংসের তালে ডোরাডোরা দাগ দেখতে পেয়েছিল। আরো ছিল–– কষি আলগা করায় কোমরের চারপাশে ও ভারি চোখা জড়োয়া নেকলেস সরানোয় গলায় ও বুকে নোখ দিয়ে জোরে খিমচানোর মত লালচে দাগ। সেদিনটাও এমনিই ছিল; এমনি এক বূষ্টি–ঝরঝর দিন। বটের কোমল পাতায় বূষ্টির ফোঁটা পড়ে তেমনি আওয়াজ হচ্ছিল, যেমনটি রণধীর সেদিন রাতভোর শুনতে পেয়েছিল। দারুণ আবহাওয়া। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা আসছে, কিন্তু তাতে যে মিশে আছে হেনা–আতরের তীব্র গন্ধ! রণধীরের হাত ঘুরে বেড়ায় দুধসাদা মেয়েটির কাঁচাদুধের মত বুকে, ঝোড়ো হাওয়ার মত, অনেকক্ষণ। ওর আঙুল ওই শ্বেতশুভ্র নারীদেহের ভেতর নানা তরঙ্গের খোঁজ পেয়ে যায়। টের পায় ওই নরম নরম শরীরের অনেক অংশ জেগে উঠছে, ছুটে বেড়াচ্ছে আবেগ। এবার ও বুকে বুক লাগায় আর ওর প্রতিটি রোমকূপে ছড়িয়ে পড়ে নারীদেহটির বীণার তারের ঝংকারের অনুরণন। কিন্তু কোথায় সেই আহ্বান? কোথায় সে’ ডাক? যে ডাক ও শুনতে পেয়েছিল পাহাড়ি মেয়েটির শরীরের মাদক গন্ধে!যে ডাক দুধের জন্যে শিশুর কান্নার চেয়ে স্পষ্ট। আজ সে’ডাক কোথায় হারিয়ে গেল? রণধীর জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। জানালার পাশে বটের পাতা নেচে বেড়ায; কিন্তু ওর দূষ্টি পেরিয়ে যায় বটের পাতার নাচনকোঁদন, দেখতে চায় দূরে, অনেক দূরে, যেখানে ময়লাছোপ ধরা মেঘের ভেতর চোখে পড়ে এক ঘোলাটে আলো; এমন আলো যা দেখেছিল পাহাড়ি মেয়েটির বুকে, যা গোপনকথার মত গোপন থেকেও নিজেকে জানান দেয়। রণধীরের পাশে শুয়ে এক দুধসাদা নারী, যার শরীর দুধ–ঘি দিয়ে মাখা আটার তালের মত নরম, যার নেতিয়ে পড়া শরীরে হেনা–আতরের সুবাসের ক্লান্তি। রণধীরের দম আটকে আসে, অসহ্য লাগে এই মরুটে গন্ধ। এতে এখন টকটক গন্ধ, এক বেয়াড়া টোকো গন্ধ যা চোঁয়া ঢেকুরের মত। এবার ও পাশে শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকায়। দুধ কেটে গেলে যেমন সাদা সাদা গুঁড়ো ট্যালটেলে জলের মধ্যে চ্যাপচেপে হয়ে থেকে যায় তেমনি মেয়েটির নারীত্ব ওর চেতনায় বসত করে––চ্যাপচেপে সাদা সাদা গুঁড়ো হয়ে। আসলে রণধীরের চেতনে–অবচেতনে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই গন্ধ যা পাহাড়ি মেয়েটির শরীর থেকে অনায়াসে পেয়েছিল;যা হেনা– আতরের চেয়ে বেশ নরম কিন্তু ছড়িয়ে পরে অনেক দূরে; যাকে কষ্ট করে শুঁকতে হয় না, যা নিজে–নিজেই সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে যায়। রণধীর এবার শেষ চেষ্টা করল। মেয়েটার ফর্সা শরীরে হাত বোলাল; না, কোন স্পন্দন নেই, কোন অনুরণন জাগল না। ওর সদ্য বিয়ে করা বৌ-- ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে, বিএ পাশ, কলেজের একশ’ ছেলের বুকের ধুকধুকি-- রণধীরের বুকে কোন ঢেউ তুলতে পারল না। হেনার মিলিয়ে যাওয়া গন্ধের মধ্যে ও আতুর হয়ে খুঁজতে লাগল সেই অদ্ভূত এক গন্ধ যা ও পেয়েছিল এমনি এক বাদলঝরা দিনে, যখন জানলার পাশে বটের পাতা বূষ্টিধারায় স্নান করছিল আর ও ডুবেছিল এক পাহাড়ি মেয়ের আধময়লা শরীরে।<br/>্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্ গল্প-২ কোলকাতা , তুমি কার? Ranjan Roy বাঙাল থেকে বং: কোলকাতার এক সঙ ======================== আদৌ রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা নয়, এ যেন আকাশগঙ্গা নেমেছে। কোলকাতা জলমগ্ন, বাইপাসের ধারে কালিকাপুরে নৌকো চলছে।আমরা গূহবন্দী। কাজেই আড্ডা, চা, তেলেভাজা, মুড়ি, ফের চা, ফের তক্কাতক্কি, ফের লাল সবুজ। হাতজোড় করি, এমনদিনে রাজনীতি ছেড়ে অন্য কিছু নিয়ে কথা হোক। কিল্তু ইলিশ নাকি হাজার টাকা? চিংড়িও আটশ৹ ছাড়িয়েছে ?কোলকাতার এই হাল? কে দায়ী? লাল হলুদ, নাকি মেরুন সবুজ? সত্তর পেরোনো নন্দীকাকিমার খ্যানখেনে গলা: যেদিন থেকে এই জার্মানগুলো হাঁড়িকুড়ি, ক্যাঁতা নিয়ে পিলপিল করে শ্যালদায় নেমেছে সেদিনই চিত্রগুপ্তের খাতায় আমাদের কোলকাতার নাম উঠে গেছে। ঃ আজাইরা তর্ক কইরেন না বৌদি! খেঁকিয়ে উঠলেন মজুমদারকাকু,ঃ আমাদের কোলকাতা? ক্যান, কইলকাতা আমাগো না? চৌত্রিশ বছর ধইরা বঙ্গদেশরে চালাইল কেডা?বঙ্গের গৌরব জ্যোতিবসু ঢাকার বারদি গ্রামের পোলা না?কুন হালার ঘটি লীডারের নাম দ্যাশের প্রধানমন্ত্রী পদের লাইগ্যা শুনছেন কুনো দিন? ঃ সেই কতাই তো হচ্চে! রেফুজিগুলোকে মাতায় তুলে বামদলগুলো অ্যাদ্দিন গদি আঁকড়ে থেকে কোলকাতার ভুষ্টিনাশ করে ছেড়েছে। তাই সাবর্ণ চৌধুরিদের লতায় পাতায় আত্মীয় ভবানীপুরের দিদি ঝ্যঁটা ধরেছেন। কোলকাতাকে সাফসুতরো করবেন। ঃ হ:, লন্ডন বানাইবেন! আইজ ত ঢাকুরিয়া লেক। আবার হাতজোড় করি, নো পলিটিক্স প্লীজ! নো আমরা ওরা! আজকের নতুন বিষয়: কোলকাতা তুমি কার? দুপক্ষের থেকে একজন করে বলবেন; কেউ ফোড়ন কাটবেন না, শুধু আমি মাঝেমধ্যে ক্ল্যারিফিকেশন চাইতে পারি। কেউ কেউ মুখ বেঁকালেন। কিন্তু কথায় কাজ হল।প্রথমে মজুমদারকাকু। জবাব দেবেন নন্দীকাকিমা। বাঙালের আমরা ওরা: :ওরা কখনো আমাগো একই দ্যাশের মানুষ মনে করে নাই। স্যাম্পল দ্যাখেন: বাঙাল মনুষ্য নয় ওড়ে এক জন্তু, লম্ফ দিয়ে গাছে ওঠে লেজ নাই কিন্তু। অথবা, এই কমিক গানটা: বাঙালো, ভাত খাইলো, ভাঁড় ভাঙিলো, পয়সা দিল না। : আপনারা ছেড়ে দিতেন? : হ:, কুন হালায় ছাইড়া দিব? আমরা কইতাম: বাঙ্গাল বাঙ্গাল করিস না, বাঙ্গাল তোর পিতা, পূজার সময় কিনে দিবে একজোড়া জুতা। অথবা, বাঙ্গাল বাঙ্গাল করস ক্যান, বাঙ্গাল তোর কেডা? আমরা থাকি মাছেভাতে, পান্তা খায় তর জ্যাডা! ( এরপর উনি যা যা বললেন সে সব আমি খানিকটা সম্পাদনা করে তার সুবোধ সংস্করণ নীচে দিয়ে দিলাম।) ঃ ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে পা টিপে টিপে ঢুকে গেছে একধরণের হীনমন্যতা, সংখ্যা লঘু হওয়ার ভয়। পাড়ায়, স্কুলে, ফুটবল মাঠে জানতে পেরেছি আমরা বাঙাল,আমরা উদ্বাস্তু। আমরা এসেছি, তাই কোলকাতা শহর কল্লোলিনী তিলোত্তমা হয়ে উঠতে পারল না।আমাদের জন্য বরাদ্দ শেয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আর আমেরিকা থেকে পাঠানো গুঁড়ো দুধ। আমাদের নিয়ে ওদের কবি ছাপার অক্ষরে ছড়া লেখে, সেগুলো অনায়াসে শিশুপাঠ্য বইয়ে ছাপা হয়। : আমরা ভাল লক্ষ্মীছেলে, তোমরা ভারি বিশ্রী, তোমরা খাবে নিমের পাঁচন, আমরা খাবো মিশ্রী। ভীড়ের মধ্যে নিজেকে লুকোতে পারিনে। জিভের আড় পুরোপুরি ছাড়েনি, আমার প্রাকূত ভাষা, ধরা পড়ে যাই।দুই বিনুনি করা সুন্দরীরা আমার কথা শুনে হেসে ফেলে; মনের কথা মনেই থেকে যায়। বাংলা নাটকে সিনেমায় বাঙাল হল কমিক চরিত্র। সিওর সাকসেস। মুখ খুললেই দর্শকের হাসি।ভানু বন্দোপাধ্যায়েরা কখনই নায়ক হতে পারেন না, মাসিসা মালপোয়া খামু বলাটাই আমাদের নিয়তি। ধীরে ধীরে আমি থেকে আমরা হই; তারপর আমরা আর ওরা। ভয় সংকোচ সব কখন যেন রাগের চেহারা নিতে থাকে। শেকড় হাতড়ে বেড়াই। মৈমনসিংহ সম্মিলনী, বরিশাল সম্মিলনী করি। ঘেট্টো বানাই। হালতু, বাপুজিনগর, নেতাজিনগর, আজাদগড়, বিজয়গড়, বিদ্যাসাগর; তালিকা বেড়েই চলে। ঢাকুরিয়া ব্রিজের উত্তরপাড় থেকে কোলকাতা, আর দক্ষিণপাড় থেকে ৸নেই কোলকাতা৸, মানে আমাদের রাজত্বি।আমরা দরমা, কাঠের ফ্রেম, টিন আর খাপরা দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকি, হ্যারিকেনের আলোয় লেখাপড়া করি, প্রায় লাংগল চষা মাঠে ফুটবল খেলি, আর অমুকের ব্যাটা হয়ে তমুকের মাইয়ার লগে প্র্যাম করি। এরমধ্যে একটা ব্যাপার ঘটে যায়। ফুটবল মাঠে মোহনবাগানকে চিরশত্রু আখ্যা দিই। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হয় যে ওদের হয়ে পায়ের জাদু দেখিয়ে গোল করলেন যে চুনী গোস্বামী তিনি মৈমনসিংহের লোক।পরিশীলিত গলায় রাবীন্দ্রিক উচ্চারণে গান গেয়ে কয়েক দশক মাতিয়ে রাখা জর্জ বিশ্বাস বা আবোলতাবোল ও ফেলুদার সুকুমার সত্যজিৎ ও তাই। ৸সুনন্দর জার্নালের নারাণ গাঙ্গুলি বা নীরার জন্যে অপেক্ষায় থাকা সুনীল গাঙ্গুলি? খুশি হই যে এরাও বাঙাল।আর সুচিত্রা সেন ? অর্ধশতক আগে ঘটিদের লা ফেম ফ্যাতালে? আরে,উনি তো পাবনার রমা সেন! কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না। একজন আবুল কালাম রাষ্ট্রপতি হলে, বা একজন ইউসুফ ভাই মুম্বাইয়ের শেরিফ হলেই কি মুসলমানদের বর্ডারের ওপারে পাঠাও বলতে মুখে আটকায়? আমরা বুঝে গেছি যে মহামানবেরা কারোরই নন; ওঁরা নিজেরাই একটা আলাদা জাত। তবু আমরা গর্বে ফুলে উঠি, আইকন বেছে নিই। মানচিত্র ধরে শিলাইদহ কোথায় আবিষ্কার করি, ধানসিঁড়ি নদীর উৎস খুঁজতে থাকি। এইভাবেই কেটে যায় স্বাধীনতা পরবর্তী দুটো দশক।সত্তরের দশকে পালটে গেল অনেক কিছু। অনেক খনার বচন মিথ্যে হয়ে গেল। অনেকেই কথা রাখল না।কিন্তু এইপর্বেই ইস্টবেঙ্গল আমাগো চিরশত্রু হালার মোহনবাগানকে পাঁচবার হারিয়ে দিল, একবার তো পাঁচশূণ্য! সেই ধাক্কা ওরা আজও সামলে উঠতে পারেনি। প্রথমে ভেবেছিলাম বাংলাদেশ মানে বাঙালদের দেশ। শিগ্গিরই ভুল ভেঙে গেল। টের পেলাম ওপার আর এপারের মাঝখানে অনেকখানি চর জেগে উঠেছে। ওটা আমাদের পাশের বাড়ি, বাপের বাড়ি নয়।ফলে কোলকাতাকে আমরা আরো আঁকড়ে ধরলাম। এদিকে গঙ্গা দিয়েও অনেক জল গড়িয়ে গেছে। কোলকাতা গায়েগতরে অনেকখানি ছড়িয়ে গেছে। একদিকে কেষ্টপুর রাজারহাট, অন্যদিকে সোনারপুর নরেন্দ্রপুর। যাদবপুর নাকতলা টালিগঞ্জ এখন আর যাযাবর রিফিউজিদের গজিয়ে ওঠা কলোনি নয়, বরং কোলকাতার নতুন বর্দ্ধিষ্ঞু পাড়া। একাত্তর থেকে আসা শরণার্থীর ঢলে কোলকাতার পথেঘাটে বাঙাল কথার অসংকোচ ফুলঝুরি আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগে সহমর্মিতাবশে নিকষঘটিদের বাঙাল শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের চেষ্টায় ধীরে ধীরে বাঙালদের এথনিক ভাষা কৌলিন্য পেল।পূববাংলার পল্লীগীতি এখন ইন থিং।হুসেনশাহি পরগণার লোকগাথা নিয়ে লেখা ৸মাধব মালঞ্চি কইন্যা৸ সুপারহিট নাটক।পূববাংলার কথ্যভাষায় তৈরি সিরিয়াল বা টেলিফিল্ম দেখে কেউ আর আশ্চর্য হয় না।গড়িয়াহাটের মোড়ে হন্ডা সিটি থেকে নামা এক ওষ্ঠরঞ্জিতা, ভ্রুপল্লবঅংকিতা মধ্যবয়সিনী অনায়াসে কোন পরিচিতকে খাস শ্রীহট্টের উপভাষায় ডেকে ওঠেন, : সোমেেশ নী রে বা? অর্থাৎ, আজকে আর ৸সধবার একাদশী৸র বাংগাল ৸বাগ্যদরির বাগ্যদর৸ কে কোলকাতার ঘটি না হতে পারার কষ্টে আত্মবিলাপ করতে হবে না: সাহেববারির বিস্কুট খাইছি,মাগীবারি গেছি, বৌ ব্যইগ্যদরি দিয়া আমার রক্ষিতার পায়ে হাত দিয়া দিদি ডাকাইছি তবু কলকাত্তাই হইতে পারলাম না। আজকে রাঢ়বাংলার তিলোত্তমারা অনায়াসে পূববাংলার গলায় বরমালা পরিয়ে দেন।আমরা আর তোমরা কখন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, এখন আমরাই কোলকাতা! ঘটির চোখে আমরা ওরা: ঃতেলে জলে মিশ খায়না, বাঙাল ঘটি একসঙ্গে থাকতে পারে না। ঃ কিন্তু কাকিমা, আজকাল যে বিয়ে হচ্ছে? ঃ হ্যাঁ, খোঁজ নিয়ে দ্যাকো, বেশিরভাগের ডিভোর্স হয়ে গ্যাচে। ক্যানো? ক্যালোর ব্যালোর বন্দ কোরে একটু আমার কতা শোন্। এদের সম্বন্ধে ভাটপাড়ার বাচষ্পতিমশাই বাঙ্গালজাতির ইতিহাস গ্রন্থে কী লিখেছেন পড়ে শোনাচ্ছি। : বাঙাল এক স্বতন্ত্র জাতি। ইহারা মুখ্যত: তিনপ্রকার। বাস্তবাঙাল, ভ্যাদভেদে বাঙাল ও কাষ্ঠবাঙাল। (তাই শিলাইদহে ইহাদের পর্য্যবেক্ষণ করিয়া রবিবাবু লিখিয়াছিলেন: ত্রম্ব্যকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ, শক্তিভেদে ব্যক্রিভেদে দ্বিগুণ বিগুণ।) এখন ইহাদের গুণাগুণ সম্যকরূপে অবহিত হউন। প্রথম, বাস্তুবাঙাল। ইহারা সকলেই নাকি প্রাচীন পূর্বপাকিস্তানে, অধুনা বাংলাদেশে জমিদার ছিল। তাই আজ বাস্তুচ্যুত হইয়া হা বাস্তু! যো বাস্তু! করিয়া গরিলার ন্যায় বুক চাপড়াইয়া কাঁদে। লক্ষ্যণীয়, ইহারা উদ্যোগী পুরুষসিংহ বটে! তাই কলিকাতা মহানগরীর উপান্তে অনায়াসে জমি জবরদখল করিয়া উদ্বাস্তু উপনিবেশ গড়িয়া তুলে এবং অতি অল্পদিনে স্থানীয় রাজনেতার পিএ পদপ্রাপ্ত হয়। ইহারাই বর্তমান ঠিকাদার মাফিয়া জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ। দ্বিতীয়, ভ্যাদভেদে বাঙাল। ইহারা সর্বদা নিজেদের বাঙাল পরিচয় লুকাইয়া রাখিতে সচেষ্ট, কেবল ঘটিদের সহিত বিবাহাদি সম্পর্কস্থাপনের প্রয়াসে ধরা পড়িয়া যায়। ইহাদের ময়ূরপুচ্ছ দাঁড়কাক বলিলে কম বলা হয়। তূতীয়, কাষ্ঠবাঙাল। ইহারা তামসিক স্বভাবের, অত্যন্ত কোপন ও দাংগাবাজ। একবার এক ঘটি উহাকে দূর ব্যাটা বাঙাল! বলায় সেই কাষ্ঠবাঙাল সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে গলা টিপিয়া হত্যা করে এবং মূতদেহ মাটির পনের ফুট নীচে পুঁতিয়া ফেলে।তাহাতেও ক্রোধ শান্ত না হওয়ায় পনের দিন পরে গর্ত খুঁড়িয়া কংকালের বুকের উপর বসিয়া গলা টিপিয়া বলে: আর কখনো বাঙ্গাল বলিবি? বুঝলি, ওরা হল মোচলমানদের কাছাকাছি।ওদের রান্নাবান্নাগুলো দ্যাখ।সব তেলমশলা রসুনপেঁয়াজ দেওয়া মাছের পদ। আমাদের সুক্তনি, আমাদের বাটিচচ্চড়ি, বাটনাচচ্চড়ির ধারেকাছে আসে? আর পোস্তবাটার কথা ছেড়েই দিলাম। আমরা একটু খ্রীষ্টানদের কাছাকাছি।দ্যাখ না, কোলকাতার আর্মানি গির্জে, সেন্ট পিটার্স, সেন্ট পলসের মত পূববাংলায় কিছু আছে? আর ব্রাহ্মদের যত উপাসনা মন্দির, বালিকা বিদ্যালয় সব কোলকাতায়।রবি ঠাকুর খ্রীষ্টানদের প্রেয়ারেরও অনুবাদ করেছেন। শুনবি? তুমি আমাদের পিতা, তোমায় পিতা বলে যেন জানি, তোমায় নত হয়ে যেন মানি, তুমি কোর না কোর না রোষ। ঃ কিন্তু কাকিমা, রবীন্দ্রনাথ তো বাঙাল জমিদার। পদ্মাপাড়ে নৌকোয় বসে কত ০০০। ওখানে পতিসরে সমবায় ব্যাংক০০০। ঃ ছাড় তো!টিঁকতে পারলেন ওদেশে? সেই শিয়ালদহ থেকে শ্যালদা হয়ে আমাদের রাঢ়বাংলার বোলপুরে এসে থিতু হতে হল। আর পদ্মাপাড়ে ?শোন, যত অশ্লীল গান সব বাঙালদের দেশে বসে লিকেচেন। শুনবি? ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো, আমার বুকের কাপড়খানি। ঃ কাকিমা! ওটা বুকের নয়, মুখের কাপড়খানি। ঃ লেখাপড়া তো কল্লি নে! মুজতবা আলী পড়, প্রথমে বুকের ছিল, পরে আমাদের দেশে এসে বেম্মদের শাসন মেনে মুখের হল। আর আমার মুখ খোলাস নি! সিনথেসিস: অং বং ডং ইতিমধ্যে হৈ হৈ করতে করতে ঘরে ঢুকেছে জনাকয় ওয়াই জেন ছেলেমেয়ে। ওদের মধ্যে রয়েছে মজুমদারকাকুর নাতনি, নন্দীকাকিমার নাতি ও আমার ভাইপো। ঃ কী ব্যাপক বূষ্টি হয়েছে , মাক্কালী! ঃ তবে কোন চাপ নেই, জল নেমে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। ঃ তোরা ভিজিসনি তো? ছিলি কোথায়? ঃ আইনক্সে ভাগ্ মিলখা ভাগ্ দেখতে গেছলাম। সিনেমাটা যা হয়েছে না, ফ্যান্টাবুলাস্! আমার মাথায় টিউবলাইট জ্বলে ওঠে। ঃ একটা কথা বল তো! এই কোলকাতাটা কাদের? ওরা গোলগোল চোখ করে আমার দিকে তাকায়। কাদের আবার? আমাদের। ঃ তোরা কী? বাঙাল না ঘটি? ঃ এত চাপ নিচ্ছ কেন, ওসব কিচ্ছু না; আমরা হলাম বং। এসব অংবংচং আবার কী? সত্যজিত রায়ের ছড়ায় এক ডং এর কথা ছিল যে সবুজচুলো পাপাঙ্গুলের মেয়ের জন্যে কাঁদতে কাঁদতে বঙ্গীবনে সেঁধিয়ে ছিল।এদের কোন রোগে ধরল? ঃ তোরা বোধহয় ফেলুদা সিরিজ ইংরিজিতে পড়িস?রবীন্দ্রসংগীতকে টেগোর্স সং বলিস! ঠিক করে বলত বং এর ইউ এস পি কী? ঃ আমাদের ইউ এস পি হল বিশ্বায়ন। ইংরেজি হল বিশ্বভাষা। তাই বাঙালীর সংক্ষিপ্ত রূপ হল বং। কেন, বং কানেকশন দেখনি? যেমন, গুজরাতিরা গুজ্জু, মালয়ালিরা মাল্লু, সর্দার হল স্যাড্; ব্যস্, এই হল গল্প। এতক্ষণ স্পিকটি নট্ মজুমদারকাকু মুখ খুল্লেন: বিশ্বায়ন ঘন্টা ওই বাজে ঢং ঢং, গুজ্জু নাচে, মাল্লু নাচে, সঙ্গে নাচে বং। নন্দীকাকিমা মুচকি হেসে বল্লেন: আমেন! ৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹

54

7

দীপ

কবিতার কোলাজ_দীপ

ক্লান্তির খোঁজে ------------------- বিকেল ভেঙে পড়লো বাগমারীর জঙ্গলে ডমরুর আর্তনাদ শুনতে পেলাম সাঁওতালী রঙে। পিদিম প্রেমে ব্যাস্ত নারী হেঁটে চললো ভাটিয়ালি সুরে। তোমায় প্রথম দেখলাম গেরুয়ার গাম্ভীর্যে। ভেজা আবছা স্টেশনটা ছুটে চলল নিজ গন্তব্যে। ঝিকঝিক শব্দে ট্রেনকে সঙ্গে নিলে তুমি, আমিও চললাম! চললাম মৃদু স্বরে, ক্লান্তির খোঁজে।। .........

75

7

চঞ্চল

পধারো মাহরো দেশ

৮ দেখতে দেখতে তিনটে দিন কেটে গেল| আজ দুপুরেই সলিম পুস্কর থেকে বাপের তিয়া করে ফিরে এসেছে সে খবর রুকমণি আগেই পেয়ে গিয়েছে| মৃত্যুর তিনদিন পর পুস্করে অস্থি বিসর্জন করার রীতিই হল তিয়া| এরপর বারোদিন পর হবে মৌসর‚ মানে সবাইকে ভোজন করানো বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে| সলিম তো রহিসজাদা‚ নিশ্চয় পুরো জয়সলমেরের লোককে মৌসরে ডাকবে| রুকমণির বেশ মনে পড়ে‚ যখন তার মা মারা গিয়েছিল তখন বেশ ছোট ছিল সে‚ ঐ সাত-আট বছর বয়স হবে‚ পুরা গ্রামকে খাওয়াতে গিয়ে বাপুসাকে দুটো উট বেচে দিতে হয়েছিল| ঐ দুটো উটের মধ্যে একটা উট তো খুব প্রিয় ছিল তার| খুব কেঁদেছিল সে সেইদিন| পুরো দুদিন কিছু খায় নি সে| ভাই তখন খুব ছোট‚ দুব্ছর বয়স হবে| আজকাল ভাই-এর কথা খুব মনে পড়ে| হবে নাই বা কেন‚ সেই তো কোলে-পিঠে করে ভাইকে মানুষ করেছে| হাভেলীর চারতলার ছাদে বসে এইসব কথাই ভাবছিল রুকমণি| আজকাল বাপুসা আর ভাইয়ের কথা বড্ড বেশি করে মনে পড়ে| সবটাই হয়ত বয়সের ধর্ম| একটা সময় এই হাভেলীর জাঁকজমক তাকে টানত‚ এখন বয়স হবার সাথে সাথে ফেলে আসা দিনগুলো বড্ড পিছু ডাকে| বিয়ে হলে তো এতদিনে তার চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা ভরা সংসার হত| সংসার যে সে করেনি তা তো না‚ এই হাভেলীর সেই তো কত্রী ছিল এতদিন| যাক গে নিজের না হোক‚ ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে‚ ভাইয়ের কাচ্চা-বাচ্চাদের দিয়ে নিজের সে শখ পূর্ণ করবে| বুড়ো স্বরূপ সিং যতদিন ছিল ততদিন এই হাভেলীতে সে বলতে গেলে মালকিনের মতই ছিল | কিন্তু এবার হাভেলী ছাড়বার সময় হয়ে এসেছে| ঐ সলিম তো তাকে নিশ্চিত এখানে থাকতে দেবে না| তার নিজেরও তেমন একটা ইচ্ছে নেই এই হাভেলীতে থাকার| রুকমণি চালাক-চতুর মেয়ে| একদিন না একদিন তো এই দিন আসবেই হিসেব কষেই সে এতবছর হাত গুটিয়ে বসে ছিল না| নিজের আখের সে গুছিয়ে নিয়েছে| যা টাকাকড়ি আর সোনার গয়না জমিয়েছে তাতে ওর চার পুস্ত কিছু না কামিয়েও ঠাঁটের সাথে থাকতে পারবে | সলিমের বাপুসা থাকলে নিজের জিনিস নিয়ে যেতে অসুবিধা হতো না | কিন্তু সলিম তো জানে না যে ওর বাপুসা কি কি দিয়েছে রুকমণিকে, ভাববে চুরি করেছে | তাই লুকিয়ে সব জিনিস সরানোই ভালো | আর তাই করে আসছে কিছুদিন ধরে| বাপুসাকে সুবিধে মতো ডেকে ওর হাত দিয়ে নিজের জিনিসগুলো বাড়িতে পাঠানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে হয়েছিল রুকমণির| তা একটা কথা মানতেই হবে যে বুড়োর হাত বেশ খোলা ছিল‚ সময় সময় অনেক উপহারই দিয়েছে রুকমণির হাতে| এসবই তার হক কি কমাই| এ ব্যাপারে ওর কোন অপরাধবোধ নেই| আর হবেই বা কেন‚ সে তো নিজের ইচ্ছায় এই জীবন বেছে নিয়েছিল| হঠাৎ নিচের হট্টগোলে ওর চিন্তায় ছেদ পড়ে |কিসের হট্টগোল এত? উপর থেকে ঝুঁকে নিচে দেখার চেষ্টা করে| সলিমের পালতু কুত্তারা এসেছে‚ প্রায় তেরহ-চৌদহ হবে| কিন্তু হল্লা কিসের? ওরা কি জানে না এটা শোকের বাড়ি? নিশ্চয় জানে‚ নিচে গিয়ে একবার দেখতে হচ্ছে ব্যাপারটা কি? দূর দূর পর্যন্ত তো এই পরিবারের কোন সগা-সম্বন্ধি নেই|যদিও বা কেউ থাকে, তারা এদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না | তাই কে শেখাবে এদের রীতি-রেওয়াজ? রুকমণি আর দাঁড়ায় না‚ তরতর করে নিচে নেমে আসে| নিচে অনেকগুলো কামরার একটায় ওরা জমায়েত করেছে| ঠিক তার পাশের কামরাতে এসে চুপিচুপি ঢুকে পরে সে| এই ঘরের ঝরোখা আর পাশের ঘরের ঝরোখা একদম পাশাপাশি| তাই ভেতরের সবকথাই স্পষ্ট শোনা যায়| 'লে আয়া?' সলিমের গলা শোনা যায়| 'হাঁ ভাই| | এই দেখ আজ কি এনেছি?' একজন উৎসাহের সাথে বলে| রুকমণি প্রথমে বুঝতে পারে না কি আনার কথা এরা বলছে| 'আরে ইয়ে তো অংগ্রেজি দারু| তাও পাঁচ বোতল ? তুই তো খুব কাজের রে ? নিশ্চয় ঐ অংগ্রেজ সেনাদের থেকে যোগাড় করেছিস? সাবাস!' সলিম খুশি হয়ে পিঠ চাপড়ে দেয় বন্ধুর | | সলিমকে দেখতে না পেলেও এখান থেকেই ওর হাওভাও আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না রুকমণির| আর কি‚ এবার সারারাত চলবে এদের হুল্লোড়| রুকমণি চলে যাবার জন্য পা বাড়ায়| 'সলিমজী‚ আজ তোমার তরক্কির জন্য আমরা জশন মানাবো' কেউ একজন বলল| 'একদম একদম‚ তুমি তো এখন প্রধান দিয়ানজীর পদে বসেছো | আজ তো জশন হবেই|' আরও একজন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল| ঘর ছেড়ে বের হতে গিয়েও রুকমণি দাঁড়িয়ে পড়ল| তার মানে মহারাওল আজ সভায় সলিমের দিওয়ান হবার কথা ঘোষনা করেছেন| এটা তো হবারই ছিল| রুকমণির কি মনে হল‚ জানালার পাশে গিয়ে বসে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করল| 'ভাইলোগ একটা কথা বলি তোমাদের‚ এই দারু কি কসম‚ আমি একদিন নিশ্চয় জয়সলমেরের মহারাওল হব, তোরা দেখে নিস|' সলিম কথাগুলো নিচুগলায় বললেও রুকমণি কথাগুলো স্পষ্ট শুনল| ' তারপর তোদের মধ্যে কেউ একজন আমার প্রধান দিওয়ান হবে|' আবার হইহই করে সবাই এই কথার সমর্থন করল| আজ কেন জানি তার মনে হচ্ছে এদের কোন পরিকল্পনা আছে‚ ধৈর্য ধরে বসে থাকলে সেই পরিকল্পনার অনেক কিছুই জানা যাবে| রুকমণি চুপ করে বসে রইল| সময় বয়ে চলেছে‚ও ঘরে কথাবার্তা শুনে বেশ বোঝা যাচ্ছে অংগ্রেজি দারু তার অসর দেখাতে শুরু করে দিয়েছে | আলোচনা এখন মহারাওল সলিম সিংকে নিয়ে চলেছে| মোটামুটি এখানে সবাই ধরেই নিয়েছে সলিম মহারাওল হয়ে গেছে| ভাবা যায় না যে এই হাভেলীতে চারদিন আগেই ছেলের বাপ মারা গেছে| আর আজ সেখানে জশন মানানো হচ্ছে| তা অনেকক্ষন ধরেই চলছে ওদের হাসি, আনন্দ আর অশ্লীল ঠাট্টা ইয়ার্কি| রুকমণিও ভাবছিলো আর দাঁড়াবে কি না | এদের প্রলাপ শোনার সময় নেই ওর কিন্তু হঠাৎ সলিমের গলা শুনে রুকে গেল সে | 'শ শ শ‚ সবাই চুপ‚ আমার একটা কথা বলার আছে|' বেশ জড়ানো গলায় সলিম সবাইকে চুপ করাল| যদিও আওয়াজ বেশ নেশায় জড়ানো | 'হাঁ সলিম বল বল‚ আমরা শুনছি' 'বলছিলাম কি‚ তোরা তো জানিস আমি ঐ পালিওয়াল ছোরিটাকে বিয়ে করতে চাই|' 'সে তো আমরা জানি‚ ওকে তুমি তোমার ঘরওয়ালি করতে চাও| এ তো নতুন কিছু না‚ এর আগেও তো তুমি অনেক মেয়েকেই শাদি করব বলে এখানে নিয়ে এসেছ| তারা এখন আমাদের কোঠিতে আছে|' বলে হা হা করে হেসে উঠল সলিমের পালতু কুত্তাদের একজন| 'আরে না‚ একে আমি তোদের রানীসা করব‚ আমি হব মহারাওল আর ও হবে আমার রানী|' জড়ানো গলায় বলে সলিম| 'কিন্তু সলিমজী ঐ পালিওয়ালরা খুব কট্টর জাত| ওরা তোমার সাথে ওদের মেয়ের বিয়ে দেবে না| এটা তো তুমিও বোঝো|' কেউ একজন সলিমকে বোঝাবার চেষ্টা করে| রুকমণির কান সজাগ হয়ে ওঠে| আলোচনা এখন অন্য খাতে বইছে| এরা তো এখন কোন ছোরির কথা বলছে| কে এই ছোরি? ‘ওদের দিতেই হবে আমার সাথে বিয়ে | কাল সকালে তোমাদের মধ্যে দুজন চলে যাবে কুলধারার মহাপ্রধানের কাছে মানে ওই ভগওয়ান দাশের কাছে | তাকে গিয়ে বলবে‚ তার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই| বলবে মহারাওল সলিম ‚ না না এখন ওসব বলার দরকার নেই| বলবে যে এই সামনের পূর্ণিমা তে আমাদের বিয়ে হবে | আমি বারাত নিয়ে ঠিক দুপুর বেলায় পৌছুবো | কি, মনে থাকবে তোদের ?’ 'লেকিন সলিমজী, ওই দিন তো রক্ষাবন্ধন, তুমি কি রাখি পড়াতে যাবে নাকি ?' ফাজিল হাসি দিয়ে এক বন্ধু মজাক করতে চাইল | 'খামোশ|! একদম মজাক না, আবার বলছি‚ আমার নির্দেশ মতই কাজ হবে , এতে কোনো গাফিলতি বা ভুল হলে কিন্তু তোদের লাত মেরে বার করে দেব| ওদের বুঝিয়ে বলবে‚ যদি ভালোভাবে বিয়ে দাও ‚ তাহলে তোমাদের কর কিছুটা মাফ করে দেব| হতে পারে এ বছর আর কর দিতেই হবে না| কিন্তু যদি আমার কথামত রাজি না হও‚ তাহলে ভয়ঙ্কর পরিণামের জন্য তৈরী থেক| তখন কিন্তু করও দিতে হবে আর তোমাদের মেয়েও হাতছাড়া হয়ে যাবে| কি মনে থাকবে তো তোদের কি বলতে হবে?' 'হাঁ হাঁ এক্দম মনে থাকবে| তুমি বেফিক্র থাক|' তখনও পর্যন্ত আকন্ঠ দারুতে ডোবার পরও যে কজন কথা বলার মত পরিস্থিতিতে ছিল‚ তারা সমস্বরে সলিমকে আশ্বাস দিয়ে বলল| তবে এটা মানতেই হবে যে সলিমের এই বন্ধুগুলো ওর কথায় ওঠে বসে| যতই দারু খেয়ে থাকুক , সলিমের নির্দেশ এরা অমান্য করবে না| এ বিষয় রুকমণির কোনো সন্দেহ নেই | কাল কুত্তাগুলো নিশ্চয় যাবে কুলধারাতে | রুকমণি বেশ চিন্তায় পড়ে যায়| রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে| আর একটু অপেক্ষা করলে হয়ত আরও অনেককিছু জানা যাবে| এদের অভিসন্ধি কিছুটা হলেও পরিস্কার এখন তার কাছে| পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে শয়তানটা পালিওয়াল প্রধানের মেয়েকে বিয়ে করবে নয়ত অপহরণ করবে| আর বিয়েই করুক বা অপহরণ‚ শেষে গিয়ে সলিমের এই কুত্তাদের ভোগের বস্তু হবে ঐ মেয়ে| কুলধারা তার নিজের গ্রাম| আর সে হিসাবে ঐ মেয়েটি তো তার গ্রামেরই মেয়ে| মনটা যেন কি রকম হয়ে যাচ্ছে| ওখানকার লোকগুলো কিন্তু খুব ভালো| রুকমণি যখন নিজের ইচ্ছেতেই এই হভেলীর জীবন বেছে নিয়েছিল‚ তখন তো বাপুসার অনেক বদনামী হয়েছিল| কিন্তু গ্রামের লোকেরা বাপুসা আর ভাইয়ের হুক্কাপাণি বন্ধ করে দেয়নি| বাপুসা তো নিজেই এই কথা জানিয়েছিল| আসলে ঐ পন্ডিতজীই সেটা হতে দেয়নি| যদিও দু-চারজন তো চেয়েছিল বাপুসা আর ভাইকে গ্রাম থেকে বের করে দিতে| কিন্তু সেটা হতে পারেনি ঐ পন্ডিতজীর জন্যই| একটু একটু করে পন্ডিতজীর ঝাপসা হয়ে যাওয়া চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে রুকমণির মনে| বাচ্চাদের তো খুব ভালোবাসতেন | ডেকে ডেকে আগে বাচ্চাদের প্রসাদ দিতেন ‚ তারপর পেত বড়রা| হঠাৎ করেই ও ঘর থেকে মেয়েদের পায়েল আর চুড়ির আওয়াজ পেয়ে কান খাড়া করে রুকমণি| আরে এরা তো সব হাভেলীরই কাজের মেয়েরা | গলা শুনে বেশ বোঝা যাচ্ছে ওদের ‚যদিও খুব আস্তে কথা বলছে ওরা| এবার শুরু হবে এদের মৌজ-মস্তির উৎসব| নাহ‚ আর এখানে থাকার কোন মানে হ্য় না| কিছু জানা যাবে না এখন আর| সবে তো রাত শুরু হলো‚ এদের মৌজ-মস্তির খেলা শেষ হতে অনেক সময় লাগবে| রুকমণি আস্তে করে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে| ধীর পায়ে সোজা নিজের কামরায় চলে আসে| ভালো করে দরজাটা লাগিয়ে নেয় ভিতর থেকে| অনেক কাজ বাকি আছে এখন| কাল একদম সকালেই একবার বাপুসার সাথে দেখা করতে গ্রামে যেতে হবে| হাতে একদম সময় নেই| নিচে তখন পৈশাচিক খেলায় মেতে থাকা সলিম আর তার ইয়ারদের শোরগোল বন্ধ দরজার এপাড়েও ধাক্কা মারছে| কাল সকালে ঐ কুত্তাগুলো গ্রামে পৌঁছানোর আগেই তাকে গ্রামে গিয়ে আবার এখানে ফিরে আসতে হবে| কত বছর হয়ে গেছে গ্রামে যায়নি| একলা যেতে হবে| একবার কি গ্রামটা ঘুরে দেখে নেবে না সে? যদি কেউ চিনে ফেলে তাকে তড়িয়ে দেবে না তো? বাপুসা তো বলেছিল‚ গ্রামের লোকেরা তাদের ঘেন্না করে না| তবু একটা আশঙ্কা তো থেকেই যায়| যাই হোক না কেন‚ কাল একবার যেতেই হবে গ্রামে| সে নিজের কাজে মন দেয়| যাবেই যখন তখন নিজের জমানো পুঁজির আরও যতটা পারে সে বাপুসার কাছে রেখে আসবে| এখান থেকে যেদিন পাকাপাকি ভাবে যাবে সেদিন আর সাথে নেবার মতো কিছু থাকবে না| মনে মনে এটাও ঠিক করে রেখেছে যে সে নিজের জিনিস ছাড়া আর কোনো জিনিসে হাত দেবে না | রুকমণি হিসেবে করে দেখে পূর্ণিমা আসতে আরও সাত দিন বাকি | ... ক্রমশ..

704

68

উদাসী হাওয়া

বাৎসরিক উল্কাপাত ও নিপাত যাক!

ফরসা হয়ে বেলা অনেক বয়েচে, গঙ্গাজল গড়িয়ে নেবুতলা অবদি এসে গ্যাচে, টিম টিম দোকান খুলে বাবুদের কুকুরের হাগাপনা মুকের দিকে তাকিয়ে, ১টা ২টা বিস্কুট বিক্কিরি হয়! ভাবের সাগরে নামি (২) আশি বচ্চরের শাকালিমাসির পিচনে রগুড়ে তারকাটা লাগবে কি লাগবেনা মনে কচ্চে আর মোবাইলে ব্যাটারির রসদ নেই দেকে দুর @# বলেচে কি বলেনি... পস্টো শুনে রাস্তার ওপারের পাতাচাটা ভাব্লে ওকে বলেচে আর খিস্তি করতে বসলে। হেতায় সহরের পাড়ার শেষটুকু অঞ্চলে যেটুকু ভদ্দবাবুদের মনে রবি ঠাকুরের জন্মদিন মনে রাকার কথা --- জমিদার, বুরজোয়া, বেওসায়ি, ইংরাজ তবিলদার, সখি বানানো বাত্তেলাবাজ, রোবিন্দোরবাবু থেকে ড়ৌবিন্দ্রনাঠ ট্যগ্যৌর ভুলে কলকেতে সহরের পবিত্র কর্ম্ম নিমকি জিলিপি যোগে গান-কবিতার শেষ মঞ্চ, (গত ৪-৫ বচ্চরে একই কতা শুনেচে), গতকাল দুপুর থেকে বানানোর চেস্টায় রত, যাতে কোন ক্রিয়ে কর্ম ফাক্ না যায় চিৎকারে পাড়ার সব কুকুরদের জড়ো করে ফেলেচে। এ দিকে আমাদের এই আমুদে বাবুদের আরেক তরফের, যারা রবিঠাকুর কিসের ঠাকুর, বা কি এমন লোক, বা জ্বালালে এট্টু ঘুমাতে দিলে না, বা যত্তসব ধ্যাস্টেমো, বা ওই সুরু হল, বা ওসোব অভি চলে না, বা ওই এক দেড়েল বুড়ো ভেবে রেগে ঘুম থেকে উটে ঝিমমাথায় যে যার পাইখানার দিকে যাচ্চে। আরেক দল, বাবুদের কাজের মাসিরা সক্কালবেলায় রেল লেট করে মঞ্চের বাশে হোচঁট খেয়ে ওই মিনসে বুড়ো আবার এসে গ্যাচে কোরে গজগজ কত্তে (২) কাগোজওলার সাইকেলের পিচোনে (২) যেতে লাগ্ লো। মঞ্চে ঠাকুরকে তুলে আমাদের নতুনবাবু দুই বার বল বল বল সবে গেয়ে উটতেই, রগুড়ে তারকাটা আর পাতাচাটা একসাতে হাততালি আর দুয়ো দিল। ধুপকাঠি আর বেলফুলের গন্ধ ততক্ষণে সহরের এই এলাকায় বোদয় হুজুকে মেজাজ এনে দিয়েছে। দুটো চারটে ডেঁপো বাচ্চা মা'দের আঁচল টেনে মাটের দিকে দেকাচ্চে -- ওকেনে দজ্জাল বিবি বাবুকে ধমকাচ্চে। বাবু ভয়ে পেয়ে হোঁচট খেয়েচেন। সহরের নতুন তেঢ্যাঙা বাড়ির খোপে (২) লম্বু জকি আজ সবাই ক্যাঁতাফোঁড় পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত, একুনে আজ সারাদিন রেডিয়োতে বিজ্ঞাপনের মাঝে রবিঠাকুরের গান গুজে দিতে হবে, বিজ্ঞাপনের মাঝে চিল্লিয়ে শোনাতে হবে রবিঠাকুরের কতা, নাটা ফাজিল জকিকে বুজিয়ে দিচ্চে, কোনও গন্দি বাত আজ বলা চলবে না বলে শাসিয়েও দিলে। চ্যানেলে (২) রবিঠাকুরের গান বাজতে শুরু করলে জকিরা ঝিম মেরে ফেসবুকে নিজেদের ছবি বদল করতে ব্যাস্ত হল। ন'পাড়ায় বৈশাখি সক্কালবেলায় শরত তোমার অরুণ আলো লাগিয়ে আমোদের সহর, ছ'পাড়ায় আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার বাজিয়ে প্রমোদের সহরে বাৎসরিক উল্কাপাতের সুত্রপাত হল। যে দল বাবুদের আজও আপিস আচে ছাতারমাতা, যে দলের কানে গান গুজে বারে বারে চ্যানেল বদলে ব্যাস্ত হয়ে কোতাও অন্য গান শুনতে না পেয়ে চটে গেলে, কন্ডাকটরের সাতে ঝকড়া কত্তে (২) ক্লান্ত হল। যে দল বাবুদের ওলায়, উবারে, বন্দ কর, বন্দ কর বলে মোবাইল টিপতে লাগলে, যে বাবুদের আমারে না যেন করি প্রচার না কল্লে বিক্কিরি হবে না তারা বাতকর্ম্ম কত্তে (২) যাত্রা শুরু করলে। এদিকের মঞ্চের উপর ঠাকুরও ধাক্কাধাক্কিতে কান্নিক মেরে গ্যাচে আর বাঁশেরগাঁট ঠিক ওনার মুকের ওপর এমন ভাব মেরে পড়েছে, কাচের মাঝে নম্বা চিড় ধরিয়ে দিল, গ্যালো, গ্যালো করে ভট্চাজ্জি চুড়িদারের নাড়ায় মঞ্চের বাশ আটকে সটান পড়ল। রবিঠাকুরের জন্মদিন কলকেতেয় হবে আর দালাল থাকবে না ভেবে মনে গন্ডগোল না বাধে, সেইজন্ন বাবুদের কারবারে এই সক্কালবেলায় উপস্থিত হয়েচেন। মাইক, সাউন্ড, লাইট, রাংতা, তবলা, হারমনি, ঘোষক, মেয়েদের সারি, বিবিদের গোরের মালা, বাবুদের মাল, নাচের তাল নিয়ে এয়েচেন। প্রভাত ফেরি শুরু করিয়ে দিয়ে বসবেন। সৎকর্ম্মে বাঙ্গালিদের চোক্ ফুটে উঠবে আজ।

75

5

Aloka

গণ্ডীর বাইরে

পূর্বাচলের পানে.... ঘুম ভেঙে গেল..আলসেমি ঝেড়ে উঠে পড়ি | বের হই| গন্তব্য পূর্ব দিক| এসে হাজির হই চৌমাথায়| রাস্তা পেরোব.|কিছুদিন আগে তৈরী হওয়া আণ্ডারপাস এখনো খোলে নি ভীম বেগে ট্রাক ‚ লরি চলছে.ফাঁক বুঝে রাস্তা পার হই | আগে রাস্তার এ পাশটায় ছিল মস্ত বড় বড় বাগান | গরমের দিনে ঝুড়ি ভর্তি আম ‚সারা বছরের তেঁতুল ‚ শীতে আচারের কুল সব এদিক থেকেই যেত আমাদের বাড়ীতে |যথা নিয়মে বেশির ভাগ বাগান ই উধাও | বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছি....অবশেষে পাওয়া গেল একটা বাগানের ভগ্নাংশ..পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটায় ঢুকে পড়ি.. এ.দিকটায় আগে আসিনি কোন দিন |ডান দিক বাঁ দিক দু দিকেই রয়েছে পাঁচিল ঘেরা বাগান পুরোনো দিনের সব গাছ ‚ কিছু কিছু গাছের ডালপালা পাঁচিল ছাড়িয়ে রাস্তায় চলে এসেছে ফলে রাস্তাটা বেশ ছায়াছন্ন |চলেছি পুব মুখো | বহুকাল অশ্রুত পাখীর কিচিরমিচির শুনতে পাচ্ছি ‚ হঠাৎ ই গাছ পালার ফাঁক দিয়ে দেখি " পূর্ব গগন ভালে সূর্য ওঠে প্রাত্ঃকালে" ঠিক মুখোমুখি সূর্যটা. .. একদম জবাকুসুম সঙ্কাশ্ং .....মনে করতে চেস্টা করি শেষ কবে এই দৃশ্য দেখেছি.. রাস্তাটা ডান দিকে মোড় ঘুরেছে...কোনায় দেখি অমনি আর একটা উঁচু পাঁচিল ঘেরা বাগান দোতলা‚ তিনতলা কতগুলো বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে | কাছে এসে দেখি ফলকে লেখা Sisters of Charity /Oasis Capitanio,OasisGerosa একদম নতুন না হলেও খুব পুরোনো বলেও ত মনে হচ্ছে না..কি জানি এঁরা কারা ‚ কি এঁদের কাজ জানতামই না এখানে এমন একটা কিছু আছে .... এগো ই.....জনবিরল রাস্তায় মাঝে মাঝে দু এক্জন সাইকেল বাহিত লোক বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছে... বেশ লাগছে .. একটা পাড়ার শুরু..ডানদিকে দেখছি দোতলা একটা বাড়ী. ফলকে লেখা. এলেম বক্স ভবন...আশে পাশে ছোট ছোট কতগুলো বাড়ী‚ উঠোনে মুরগী ঘুরে বেড়াচ্ছে....ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ জন নিত্য নৈমিত্তিক কাজে লেগে পড়েছে..কি এদের জীবিকা কি জানি.. এ গিয়ে চলি....রাস্তাটা সরু হলেও পাকা | দু পাশে বাঁশ ঝাড়..ইতঃস্তত বেশ কিছু প্রাচীন বৃক্ষ যাকে বলে..একটা আম গাছ কে ই শুধু চিনতে পারলাম.আম হয় বলে তো মনে হল না....তা না হোক মনে পড়িয়ে দিল আমাদের দেশের কথা...ঠিক এই রকম ছিল |বাঃ দিব্ব্যি একটা পুকুর ও রয়েছে দেখছি..পরিষ্কার ই বলতে হবে..দু পাশ থেকে বড় বড় গাছ্পালা ঝুঁকে ..পড়েছে..অদ্ভুত লাগল.একটা জিনিস দেখে...পুকুরের একটা অংশে একটা জাল দেখছি জলের লেভেল এর বেশ কিছুটা ওপর দিয়ে এ পাড় থেকে ও পাড় অবধি টানা রয়েছে.|ত্রিসীমানায় কাউকে দেখছি না যে জিজ্ঞাসা করব কারণ টা কি..যাক গে .অনেক টা ভিতরে চলে এসেছি.|এবার ফিরি 'যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল‚ সে পথ দিয়ে ফিরল না কো তারা'..আমিও আসা-পথে ফিরব না দেখি কোন না কোন রাস্তা নিশ্চয় ই আছে..এগো ই..|দু চারটে ঘর বাড়ী দেখা যাচ্ছে.| বাঃ সামনে দেখি একটা পাকা মণ্ডপ....লেখা সেণ্ট্রাল গভ্ঃ এমপ্ল্য়ীস কো অপারেটিভ হাউসিং এস্টেট.. ছোট ছোট প্লটে সিঙ্গল ইউনিট বাড়ী. পরিকল্পিত ভাবে তৈরী কাজেই বেশ ছিম ছাম পরিষ্কার পরিচ্ছ্ন্ন একটা পাড়া...বড় রাস্তা থেকে অনেকটাই ভেতরে এরকম একটা হাউসিং আছে ....অভাবিত ব্যাপার.বিশেষ করে এই দিকটা আগে অতটা উন্নত ছিল না |খানিকটা এগোতেই দেখি অনেকটা জায়্গা সাদা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা...এতটা জায়্গা...কি হতে পারে...ভাবতে ভাবতে দেখি একটা গেট..আধখোলা ..|ঢুকব কি ঢুকব না করতে করতে ঢুকেইপড়ি..ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল...বি--রা----ট এলাকা জুড়ে সৎ্সন্গ ভবন তৈরী হচ্ছে‚ এটা তার পেছন দিক | কতগুলো আমবাগান ধ্বংস হয়েছে জানি না তবে বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে | পুরো এলাকাটা পরিষ্কার..কোথাও কোথাও ছোট ছোট মাচা করে কিছু লাগানো হয়েছে...কোথাও টমেটো ‚ ফুল কপি‚ বাঁধা কপির ও চাষ হয়েছে | ধব ধবে সাদা কতগুলো বিল্ডিং ....গেষ্ট হাউস ‚ মন্দির‚ থাকার জায়্গা ইত্যাদি তৈরী হয়েছে আরো কাজ চলছে | দু একটা আম গাছ অবশিষ্ট আছে....কোকিল রা বোধ হয় সেখানে আশ্রয় নিয়েছে..ডাক তো শুনতে পাচ্ছি....সব মিলিয়ে বেশ একটা ভালো লাগা তৈরী হল | সামনের গেট পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে উঠি | একটু এগিয়েই চৌমাথায় পৌঁছ ই| বৃত্ত সম্পূর্ণ হল | বেশ সুন্দর একটা ভোর কাটল রাস্তা পার হবার অপেক্ষা.... ভালো লাগার রেশটুকু নিয়ে এবার মন চল নিজ নিকেতনে..

139

13

উদাসী হাওয়া

কানু কহে রাই...

বড়ই বিড়ম্বনায় আছি। ক্ষমাপ্রার্থনা করে বলি এখনও সড়গড় হইনি এইস্থানে; তার উপর আমার বাচাল মুঠোফোনটি যখনই সুইচ্ এডিট্যরে আসে তার যববন্ধ হয়। সরাসরি কাউকে, [দীপংকরদা] লিখতে পারছিনা। আপনারা বহুদিনের বাসিন্দা, আশাকরি এই এক হপ্তা বয়সীকে, (অর্বাচীনের আবার ফেসবুক ইত্যাদিস্থানীয় কোনও অভিজ্ঞান নেই), বুঝবেন। অধম জিন-আঠালো, চ্যাটচ্যাটে, চর্যাপদী, চ্চু চ্চু কুত্তা-প্রেরক, সর্বগুণাধারী বাঙালী। বাকিটা ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে অধমের একমাত্র গুণ "আঁকা-লেখা-লুকিয়ে রাখা" মনের কথা, চৈত্রদিনের ঝরাপাতা। আপনাদের লেখা পড়া শুরু করেই আমার দাদার উপদেশে এইদেশে আসা। মনুষ্যত্ব লয়ে ভাসা ভাসা ভাষার কিছু চিন্তা, 'আপন হতে বাহির হয়ে...' ট্যু 'imagine' এ টুকি মারা। আর সাথে আমার শ্রী চৈতন্য, নিত্যানন্দ, গৌর ভক্তবৃন্দ, আমার শ্রী তুলসী, ভানু, জহর, চিন্ময় নবদ্বীপ, ওই দেশের হুলো - জ্যাঁক তাতি, ইত্যাদি। উমা বসু, সাহানা দেবী, কনক বিশ্বাস শুনে আজও গায়ে লাগে কাঁটা, চক্ষে আসে জল, বাকিরা বাচাল, বল সখী বল! (এইমাত্র কোশিকী বনাম কমলা ঝরিয়া)।

95

3

দীপঙ্কর বসু

হোক কলরব

চাই বা না চাই ,জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় যা আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয় আমার নিজের মুখোমুখি । যেমনটা ঘটেছে কলকাতার মেট্রো রেলের কামরায় ,এবং তার জেরে দমদম এর মেট্রো রেল স্টেশনে একজোড়া যুবক যুবতীর গণপ্রহারের ঘটনায় । প্রত্যক্ষদর্শী এক সাংবাদিকের বয়ান থেকে জানা গেল যে ভীড়ে ঠাসা চলন্ত মেট্রো রেলের কামরায় ঠেলাঠেলিতে পড়ে যাবার আশঙ্কায় ভীত হয়ে এক যুবতী তার সঙ্গী যুবক(হয়তো বা প্রেমিক) কে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। মেট্রো রেলের কামরার মত প্রকাশ্য জনবহুল জায়গায় এতটা যুবকযুবতীর এই শারীরিক ঘনিষ্ঠতা জনৈক প্রৌঢ়ের চোখে অশালীন মনে হওয়ায় তিনি যুবক যুবতীর উদ্দেশ্যে নানান কটুক্তি করতে থাকেন ।বয়সের স্বাভাবিক সাহসের জোরে যুবক গুটিয়ে না গিয়ে প্রৌঢ়ের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে । প্রশ্ন তোলে তাদের ঘনিষ্ঠতার দরুণ প্রৌঢ়ের কি সমস্যা হচ্ছে । যুবকের এবম্বিধ ঔদ্ধত্য সহ্য করতে না পেরে উক্ত প্রৌঢ় এবং আরো জনা পনের কুড়ি পঞ্চাশোর্দ্ধ বয়স্ক মানুষ সমবেত ভাবে যুবককে প্রহার করতে শুরু করে । খাপ পঞ্চায়েতের স্টাইলে এই রকম কাজির বিচার আর হাতেনাতে শাস্তির দেওয়ার মত ন্যক্কারজনক ঘটনার দায় অত্যন্ত প্রত্যাশিত ভাবেই মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেনি । অজুহাত হিসেবে তারা জানিয়েছে যে তাদের সিসিটিভিতে এ জাতীয় কোন হিংসাত্মক ঘটনা ধরা পড়েনি !কোন অপ্রীতিকর ঘটনা বা দুর্ঘটনার দায় কবেই বা রেল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে ? তাই ও বিষয়টা নিয়ে আমি চিন্তিত নই । তবে,ন্যক্কারজনক ঘটনাটির নিন্দায় যে ভাবে সংবাদপত্রে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশাল সংখ্যক মানুষ সোচ্চার হয়েছে তাকে সাধুবাদ জানানর সঙ্গে সঙ্গে মনে এ প্রশ্নও জাগে যে ঘটনা স্থলে উপস্থিত মেট্রোরেল যাত্রীদের সমবেত প্রয়াসে কি এই অন্যায়কে রোখা যেত না ? দুজন মহিলা যে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে এসে যুবকটিকে মারমুখি জনতার হাত থেকে উদ্ধার করেছেন সে সাহস ট্রেনের বাকি যাত্রীরা কেউ দেখাতে পারলেননা ?এটাই আমার কাছে একটা বড় প্রশ্ন, আর মানসিক সঙ্কটও বটে । অকুস্থলে আমি নিজে উপস্থিত থাকলে কি করতাম ? একা হয়ে যাবার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতাম? এবং আর সবার মতই ফেসবুকের দেওয়ালে প্রেমের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে গরম গরম আপডেট লিখে নিজের বিবেকের কাছে পরিস্কার থাকার ভান করতাম – কে জানে । আমার দ্বিতীয় মানসিক সঙ্কটের উৎস স্থল হল নেট দুনিয়ায় আমার পরিচিত বন্ধুমহল । সঙ্গত কারণেই সে মহলেও জেগেছে প্রবল আলোড়ন । অনেকেই ঘটনার নিন্দায় নানাভাবে মুখর হয়েছেন তাদের পোস্ট মারফৎ । তারা হিংসাত্মক ঘটনার নিন্দা করার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটিকে দেখেছেন কেবলমাত্র নবীন হৃদয়ের প্রেমের প্রকাশের বিরুদ্ধে প্রবীনের সনাতন রক্ষনশীলতার সংঘাত হিসেবে । ঘটনাটাকে কি সত্যিই এমন একমাত্রিক দৃষ্টিতে বিচার করা যায় ? নিজের কাছে জানতে চাই আমার নিজের যৌবনবেদনা রসে উচ্ছ্বল দিনগুলিতে আমি বা আমার সমবয়সী বন্ধুবান্ধব মহলে কেউ কখনও প্রকাশ্যে প্রেমিকা বা বান্ধবীর সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা দর্শাতে আগ্রহ বোধ করেছি কি না । উত্তর পাই – না । মানি, এই অনাগ্রহের পিছনে একটা বড় কারণ অবশ্যই ছিল লোক নিন্দার ভয় । যদিও প্রকাশ্যে ভালোমানুষটি সেজে থাকা সত্বেও কপালে নিন্দামন্দ কিছু কম জোটেনি আমাদের। সাধে কি আর কবি গেয়েছেন – *গোপনে প্রেম রয়না ঘরে, আলোর মত ছড়িয়ে পড়ে* ,তবু যে ধুত্তেরিকা বলে সব দ্বিধা সঙ্কোচ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে *হোক চুম্বন* বা *হোক আলিঙ্গন* স্লোগান তুলে ময়দানে নেমে পড়িনি তার অন্যতম বড় কারণ ছিল এই বিশ্বাস যে নরনারীর প্রেম নামক বস্তুটা বড়ই ডেলিকেট ব্যক্তিগত অনুভবের বিষয় ।তাই হাটের মাঝে পাঁচ জনের মধ্যে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে সেই একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবকে বারোয়ারি মাল করে তোলায় আমাদের ছিল ,(এখনও আছে) প্রবল অনীহা । আমার ধারণা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং বাণী বসু উভয়েই এই বিশ্বাসের ওপরেই ভিত্তি করে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন । নিজেদের বিশ্বাস এর প্রতি বিশ্বস্ত থেকে তাঁরা উচিৎ কাজই করেছেন । তাতে এই দুই হৃদয়ের কারবারীদের পাঠক হৃদয়ের সিংহাসনচ্যুত করার কোন যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয়না । আপাতত এইটুকুই

84

5

উদাসী হাওয়া

ট্রেন

ট্রেন ১ ইছাপুরের আগের গোধূলিতে দেখা যেত আয়না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে চোখে মুখে কনেরোদ নিত মেখে। সাইকেল ঠিক সময় মেনে আসবেনা। রাগ হয় তবু, নানা বায়নায় রোদ গলে জল হবে এখনই। নৈহাটি ঘরে ঘরে শান্তি পৌছাতে যায়; ওপারের রেলগেট প্রায়, শ্রান্ত। পাশের মাঠে গোলপোস্ট গলে সন্ধে পড়ত ঢলে। রাত্রিও বসত গুছিয়ে। প্লিজ রাগিস না আর, তুহু বিনা প্রাণ মম ভেঙে চুরমার। আয়নায় মুখ ডুবিয়ে, ভারী চুলে হাত চুবিয়ে - অক্লান্ত। পড়াশুনার কথাও হত রোজ। খুনসুটি, হিংসুটি, গানখানা গীতা ঘটকে খোঁজ! ‘লুকিয়ে আস আধার রাতে’, অহেতুক কিছু ঝগড়াও ছিল শেষ পাতে আর এখন! শান্তি, সীমান্ত, কৃষ্ণ সরে যেতে যেতে ভাবে, লাইনের দুপারে আজকাল কী ছাতা হয়! আজ লিখে লিখেই সবাই মনের কথা কয়!

97

5

উদাসী হাওয়া

119

0

শিবাংশু

নমো তস্স .....

শুধু চুপচাপ বসে থাকার জন্য এই জায়গাটায় যাই আমরা। কেন যাই, লিখতে গেলে মহাভারত হবে। বলতে গেলে ফুরোবে না। ভোর পাঁচটা থেকে ঘুরেফিরে বসে থাকা এখান থেকে ওখানে সেই সন্ধে পেরিয়ে। বৈশাখের তপ্ত রুখু হাওয়ায় ওলটপালট অন্ধকার মন্দিরের শীর্ষে বাঁধা আলোর রশ্মি বেয়ে নেমে আসে । বোধিবৃক্ষ থেকে ঝরে পড়া একটি পাতা বুকে আঁকড়ে ফিরে যান শ্বেত, গৈরিক, কাষায় বস্ত্র দেশবিদেশের ভিক্ষু আর ভক্তের দল। চুপকথা ছাড়া বাতাসে আর কোনও শব্দ নেই। নমো তস্স ভগবতো অরহতো সমমা সম্বুদ্ধস্ত...

90

8

Aloka

মাঝে মাঝে

যত কিছু খাওয়া লেখে স্বদেশে ও বিদেশে (আজ) বিনা খোঁজে হাতের কাছে দেখ হাজির সবে সে রাজনীতির জগতে এত ঝগড়া ঝাঁটি হলে কি হবে আমি তো দেখছি খাবার দাবারের ক্ষেত্রে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম দিব্যি শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থান করতে পারে| বেশী দূরের কথা নয় আমাদের পাড়ার স্ট্রীট ফুড এর কথাই বলছি আর কি | রাস্তায় যেতে যেতে যেটুকু যা দেখি শুধু অস্থায়ী স্টল‚ স্থায়ী দোকান এর আওতা থেকে বাদ দিচ্ছি| বিকেল/স :ন্ধে থেকে এরা দৃশ্যমান হয় | তেলেভাজার দোকান দিয়ে শুরু করি | মস্ত কড়াইয়ে ভাজা হয়ে চলেছে আলুর চপ‚ বেগুনী ‚পেঁয়াজী ‚ভেজিটেবিল- চপ মোচা‚ আম এর চপ-- এই টুকু তো কমন কোন কোন জায়্গায় উপরন্তু ধনেপাতার বড়া‚ লঙ্কার বড়া‚পাঁউরুটি বেসনে চুবিয়ে‚ কি যেন একটা নাম আছে ‚ আরো কি কি সব | মাঝে মাঝে এক একটা ঠেলা গাড়ীতে দেখি শুধু মাত্র ছোট ছোট ডালের বড়া..সেখানে আবার অন্য কিছু থাকে না| বেশ কিছুদিন ই হল বাঙালী রসনায় ঠাঁই করে নিয়েছে মোমো | আদতে তিব্বতের হলেও অভিজাত রেস্তোঁরার দরজা পেরিয়ে রাস্তার ধারে সে নেমে এসেছে বহুদিন | গলির মোড়ে দিব্বি সাজ সরঞ্জাম নিয়ে গুছিয়ে চলছে বিক্রিবাটা | দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লোকে খাচ্ছে বাড়ী তেও নিয়ে যাচ্ছে | রোল জিনিসটা কবে এল ? বাদশা ‚ বেদুইন এর কথা জানি না তবে ৩৫/৪০ বছর আগেও আমাদের পাড়ার রাস্তায় রোল বিক্রি হতে দেখেছি এখন তার বাড় বাড়ন্ত অবস্থ| তখন অবশ্য শুধু এগ রোল ই ছিল‚‚‚‚চিকেন‚ মাটন অনেক পরে এসেছে |স্ট্রীট ফুডের সাম্রাজ্যে খান দানিত্বের দাবিদার হতেই পারে |রোলের দোকানের মস্ত বড় তাওয়ার মাল্টি পার্পাস ইউজ এর বেশীর ভাগটাই লাগে চাওমিন তৈরীতে..|রোল আর চাওমিন বোধ হয় হাত ধরাধরি করে ই বাজারে এসেছে | মনে হল মার্কেটের সিংহ্ভাগ এদের দখলে | যবে থেকে বাঙলী বিয়ে বাড়ীর মেনু পাল্টাতে শুরু করেছে লুচি‚ বেগুন ভাজা‚ ছোলার ডাল....এর জায়্গা নিয়েছে বাহারী নামের হরেক রকম ভিন প্রদেশীয় খাবার ফিশ ফ্রাই বোধ হয় তখন ই এন্ট্রি নিয়েছে রাস্তায় নেমে আসাটা অবশ্য তক্ষুণি হয় নি.লেটেস্ট না হলেও তা ও অনেকদিন ই হল রাস্তা তেই পাওয়া যাচ্ছে...স্ট্রীট ফুডের তালিকায় লেটেস্ট স্ংযোজন কি এটা নিয়ে একটু ধন্দে ছিলাম. দাবিদার দুই আইটেম ছিল উত্তরের মোমো আর দক্ষিণের দোসা.. ভোট টা মোমো কেই দিলাম..দোসা তার আগেই জায়্গা নিয়েছে.| পশ্চিমাঞ্চলের পাও ভাজি কবে কোন ফাঁকতালে ঢুকে পড়েছে এই বাজারে জানি না তবে বিক্রিবাটা তো বেশ ভাল ই দেখি যতই নতুন নতুন আইটেম আসুক সনাতন বাঙালী ঘুগনিকে কিন্তু কেউ হঠাতে পারে নি.| আপনি ৫০/৬০ /৭০ যে দশকেরই জাতক হোন না কেন স্কুলের সামনের বা পাড়ার মোড়ের ঘুগনি ওলার কথা নিশ্চয় ই ভুলে যান নি..সে কিন্তু এখনো আছে |সেই বাঁশের তৈরী একটা স্ট্যাণ্ড মত তার ওপর মস্ত বড় অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে গোল স্তূপ করে রাখা ঘুগনি...কখনো কখনো তার মাথায় ..শোভা পাচ্ছে এক ফালি নারকোল . সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে..ভুট্টাকে কি খাদ্য বলা যায় ? মালসা টাইপের আগুনের আঁচে পোড়ানো লেবু আর নুন দিয়ে ঘসা ভুট্টা চিবোতে চিবোতে অল্প বয়্সী ছেলেমেয়েরা যাচ্ছে..খুব পরিচিত দৃশ্য| শেষের রেশ.--- কয়েক দিন হল দেখছি আমাদের রাস্তার মোড়ে এক ভদ্রমহিলা একটা কাঠের টুলের ওপর রাখা কয়্লার উনুনে রুটি সেঁকে চলেছেন..কি যে তার সুঘ্রাণ...হ্যাঁ সিম্পল আটার রুটি...যেটা আমরা হরদম করে থাকি ... বাড়ীতে এই সুঘ্রাণটা আমি অন্তঃত পাই না. বোধ হয় গ্যাসের আঁচ আর কয়্লার উনুনের আঁচ তফাৎ গড়ে দেয় ফুচকা আর আচার কে হিসেবের বাইরে রেখেছি | আমাদের পাড়ার টা আমি বললাম ছবিটা বোধ হয় সব জায়্গায় অল্পবিস্তর এক | এত খেয়ে তবু যদি নাহি ওঠে মনটা খাও তবে কচুপোড়া খাও তবে ঘণ্টা

1355

100

Ferdous Kabir Tipu

অনুবাদ : একটি হস্তীহননের কাহিনি

একটি হস্তীহননের কাহিনি মূল গল্প : Shooting an Elephant : George Orwell অনুবাদ : ফেরদৌস কবির টি পু ( 'শুটিং আ্যান এলিফ্যান্ট' জর্জ ওরওয়েলের (১৯০৩ - ১৯৫০) বিখ্যাত একটি গল্প। জর্জ ওরওয়েল লেখকের ছদ্মনাম। তাঁর আসল নাম এরিক আর্থার ব্লেয়ার। পিতার কর্মসূত্রে ভারতের বিহারে জন্মগ্রহণকারী ইংরেজ লেখক ওরওয়েলকে বিংশ শতাব্দির অন্যতম প্রভাবশালী ওৌপন্যাসিক, লেখক, সাংবাদিক এবং সমালোচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ঊদ্ভাবিত 'বিগ ব্রাদার', 'থটক্রাইম', 'থটপুলিশ', 'ডাবলথিঙ্ক', শব্দসমূহ এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। 'শুটিং আ্যান এলিফ্যান্ট গল্পটি' তিনি ১৯৩৬ সালে রচনা করেন। তার আগে ১৯২২ -১৯২৭ তিনি ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল পুলিশের একজন কর্মকর্তা হিসেবে বার্মায় কর্মরত ছিলন। ১৯২৬ সালে তিনি গল্পে বর্ণিত মুলমেইন শহরের সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার ছিলেন। গল্পটির পটভূমি এই মুলমেইন এবং সেখানে সংঘটিত একটি ঘটনা।) 'মুলমেইন' - দক্ষিণ বার্মার একটি শহর। সেখানকার বিপুল সংখ্যক মানুষ আমাকে ঘৃণা করতো। এই সময়টা ছিল আমার জীবনের একমাত্র অধ্যায়, যখন আমি ঘৃণিত হবার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম। আমি ছিলাম শহরের সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার। শহরের নেটিভদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্ত্তহীন আর অনিষ্টপ্রসূত এক ধরনের হীনমনষ্ক ঘৃণ্য ইঊরোপ-বিরোধী অনুভূতি ছিল অত্যন্ত তিক্ত। অবশ্য আমাদের (শ্বেতাঙ্গদের) বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাঁধানোর মতো সাহস, সংকল্প বা চারিত্রিক দৃঢ়তার কোনোটাই নেটিভ বর্মিদের কারো মধ্যে ছিল না। কিন্ত্ত একজন ইঊরোপীয় মহিলা স্থানীয় বাজারে একা বের হলে কেঊ কেঊ হয়তো তার পোশাকে পানের পিক নিক্ষেপ করতো। পুলিশ অফিসার হিসেবে স্পষ্টতই আমি ছিলাম নেটিভদের ঘৃণার লক্ষ্যবস্ত্ত। এবং তারা যখনই নিরাপদ কোনো সুযোগ পেতো, তখনই সেটার সদ্ব্যবহার করতে তৎপর হয়ে ঊঠতো, যেমন আমাকে ইচ্ছে করেই খেপিয়ে তুলতো। আমরা ইঊরোপিয়ানরা এবং বর্মি নেটিভরা মিলে মাঝেমধ্যে ফুটবল খেলতাম। একবার মাঠে চটপটে এবং দ্রুতপদের এক বর্মি খেলোয়াড় আমাকে 'ল্যাং' মেরে ফেলে দেয়। সেই দৃশ্য দেখে নেটিভ দর্শকরা দৃষ্টিকটুভাবে হাস্যকলরোলসহযোগে হর্ষধ্বনি দেয়। এই ধরনের ঘটনা আমার সঙ্গে একাধিকবার ঘটেছে। বর্মি যুবকদের বিদ্রুপাত্মক হলুদ মুখাবয়ব আমাকে সর্বত্র তাড়া করে ফিরতো।নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে তারা আমার পশ্চাতে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছুঁড়ে চেঁচামেচি পাকাতো। এ সবই শেষ পর্যন্ত আমার মনের মধ্যে এক ধরনের ভীতিকর অনুভূতির সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে তরুণ বৌদ্ধ পুরোহিতরা ছিলো সবচেয়ে জঘন্য। শহরে তারা সংখ্যায় ছিল কয়েক হাজারের মতো। তাদের কারোর-ই যেনো, রাস্তার কোণে দাঁড়িয়ে ইঊরোপিয়ানদের অপদস্ত করা ছাড়া, আর কোনও কাজ ছিল না। এ সবই ছিল আমার জন্য বোধাতীত/অবোধগম্য এবং হতাশাজনক। কারণ আমি ইতিমধ্যেই সাম্রাজ্যবাদ যে একটা অশুভ শক্তি সে ব্যাপারে আমার মন স্থির করে ফেলেছি। এবং ভাবছি, যত দ্রুত সম্ভব চাকরি ছুড়ে ফেলে সেখান থেকে বেরোতে পারি ততই আমার জন্য স্বস্তিদায়ক। তাত্ত্বিকভাবে এবং সংগোপনে, অবশ্যই আমি পুরোটাই ছিলাম বর্মিদের পক্ষে এবং তাদের অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিপক্ষে। আর আমার চাকরি আমি যতটা ঘৃণা করছিলাম, সম্ভবত ততটা খোলাসা করে বোঝাতে পারব না। এই ধরনের চাকরিতে একজন মানুষ খুব কাছে থেকে সাম্রাজ্যবাদের নোংরা কীর্তিকলাপ দেখার সুযোগ পায়। আমি প্রত্যক্ষ করেছি, হতভাগা বর্মি বন্দিদের যারা কয়েদখানার ময়লা-দুর্গন্ধময় খাঁচার মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। আমি দেখেছি, দীর্ঘ-মেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের ধূসর-ভীতসন্ত্রস্ত মূর্তি আর বাঁশ দিয়ে পেটানো তাদের ক্ষতবিক্ষত কালশিটে নিতম্ব। এ সবই অপরাধবোধের এক অসহ্য যন্ত্রনায় আমাকে বিদ্ধ করেছে। কিন্ত্ত কোনও কিছুরই প্রেক্ষিত বা প্রসঙ্গ আমি ঠিকমতো ঊপলব্ধি করতে পারছিলাম না। আমি ছিলাম স্বল্পশিক্ষিত তরুণ। একদম নীরবে আমাকে আমার আপন সমস্যার নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। শুধু আমি নই, প্রাচ্যে অবস্থানরত সকল ইংরেজদের ঊপর এ ধরনের পরিস্থিতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি, এটাও আমার অজ্ঞাত ছিলো যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য তখন ডুবুডুবু। আমার জ্ঞানের পরিধি এবং মান তার চেয়েও খারাপ ছিল। আমার ধারণাই ছিল না, ঊদীয়মান যে নতুন সাম্রাজ্য (হয়তো আমেরিকান বোঝাতে - অনুবাদক) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শূন্যস্থান পূরণ করতে যাচ্ছিলো, তাদের কর্মকাণ্ড আরো বেশি খারাপ হবে।শুধু জানতাম, যে সাম্রাজ্যের সেবায় আমি নিয়োজিত তার প্রতি ঘৃণা এবং অশুভ আত্মার নেটিভ বর্মি চিড়িয়ারা যারা আমার জীবনকে অতিষ্ট করে তোলার চেষ্টায় রত তাদের বিরুদ্ধে ক্রোধ - এ দুয়ের জাঁতাকলে আমি ফেঁসে গেছি। মনের এক কোণে এই ভাবনার ঊদয় হতো, ব্রিটিশ-রাজ হলো নিষ্ঠুর স্বেচ্ছাচারি শাসন-শোষণের একটা অচ্ছেদ্য সিস্টেম। সেই সিস্টেম যেনো আবহমানকাল ধরে অসহায় নির্যাতিত, সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত এই জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার টুঁটি চেপে ধরে আছে। আবার, মনের অন্য কোণে ঠিক তার বিপরীত ভাবনাও খেলে যেতো। সেটা হলো, যদি কোনও বৌদ্ধ পুরোহিতের নাড়িভুঁড়ির মধ্যে আমার বন্দুকের বেয়নেটটা সেঁধিয়ে দিতে পারতাম ! মনে হতো, এর চাইতে মহাআনন্দের অন্য কোনো কিছু জগতে নাই ! এই ধরনের অনুভূতি আসলে সাম্রাজ্যবাদেরই সৃষ্ট অনিবার্য পরিণতি। যেকোনও আ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান কলোনিয়াল কর্তাকে যদি তার ডিঊটির বাইরে নির্জনে পাও, তবে তবে তাকে জিজ্ঞেস করে আমার এ মন্তব্যের সত্যাসত্য যাচাই করে দেখতে পারো। এরই মধ্যে একদিন একটা ঘটনা ঘটলো। আমার কাছে সেটি ছিলো অবোধ্য এবং পরোক্ষভাবে আলোকিত করার মতো এক কাহিনি। ঘটনাটি ছিল অতি তুচ্ছ। কিন্ত্ত সাম্রাজ্যবাদের সত্যিকারের চেহারা-চরিত্র, নিষ্ঠুর স্বেচ্ছাচারি সরকারের কর্মকাণ্ডের পশ্চাতে আসল হেতু ঊপলব্ধি করতে - সেই ঘটনা আমার পূর্বধারণকৃত অন্তর্দৃষ্টি বদলে দেয়। এর ফলে এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে আমি স্পষ্ট ধারণা লাভ করি। একদিন ভোরবেলা শহরের অন্য প্রান্তের থানা থেকে পুলিশের এক সাব-ইন্সপেক্টর আমাকে ফোন করে। সে জানায়, একটা পাগলা হাতি স্থানীয় বাজার তছনছ করে দিচ্ছে। আমি কী দয়া করে সেখানে যাব এবং এ ব্যাপারে কিছু করব? আমার জানা ছিল না আমি কী করতে পারব। কিন্ত্ত সেখানে কী ঘটছে সেটা দেখার আমার সাধ হলো। তাই দেরি না করে আমার ক্ষুদ্রাকৃতির অশ্বে চেপে ঘটনাস্থলের দিকে রওয়ানা হলাম। সঙ্গে নিলাম .৪৪ মডেলের পুরনো ঊইনচেস্টার রাইফেলটি। যদিও হাতি মারার জন্য সেটি অকার্যকর। তবু নিলাম এই ভেবে যে, সেটার আওয়াজ হাতিটির মনে অন্তত ভীতির সন্চার করতে পারে। নানা জাতের বর্মি লোক পথিমধ্যে আমাকে থামালো। তারা এ পর্যন্ত হাতিটির ঘটানো বিভিন্ন ঘটনার বিচিত্র বিবরণ দিচ্ছিলো। অবশ্য সেটা কোনও বন্য হাতি ছিল না। ছিলো একটা পোষা হাতি যেটা হঠাৎ করে পাগল (Must) হয়ে গিয়েছিল। মালিক হাতিটিকে শিকলে বেঁধে রেখেছিল বটে।পোষা হাতির একটা বৈশিষ্ট্য হলো সেটা প্রায়শই পাগল হয়ে যায়। এই পাগল হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে বা লক্ষণ দেখা দিলে মালিক সেটিকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। কিন্ত্ত এই হাতিটি আগের রাতে শিকল ভেঙ্গে পালিয়েছে। এ-রকম দশায় একমাত্র সংশ্লিষ্ট মাহুতই পারে হাতিটিকে পুন:বশ করতে। সমস্যা হলো হাতিটির মাহুত তার খোঁজে ভুল পথে চলে গেছে। এই মুহূর্তে সে হাতিটির প্রকৃত অবস্থান থেকে বারো ঘণ্টার দূরত্বে রয়েছে। আজ ভোরবেলা হাতিটি সহসাই শহরে পুন:আবির্ভূত হয়েছে। ব্রিটিশদের পদানত বর্মি জনতা বোধগম্য কারণেই ছিল নিরস্ত্র। এ-রকম আচমকা আক্রমণের মুখে তারা স্বভাবিকভাবেই অসহায় বোধ করছে। পাগলা হাতিটি ইতিমধ্যেই একজনের বেত-বাঁশের কুঁড়েঘর গুড়িয়ে দিয়েছে এবং একটা গাভী মেরে ফেলেছে। তারপর কয়েকটি ফলের দোকানে আক্রমণ চালিয়ে সেখানকার সমস্ত ফলমূল সাবাড় করে দিয়েছে। এক পর্যায়ে হাতিটির আক্রমণপথে পৌরসভার আবর্জনার গাড়ি পড়ে যায়। গাড়ির চালক ত্বরিৎ লাফিয়ে বের হয়ে, পালিয়ে বেঁচে গেছে। হাতিটি ক্রোধে গাড়িটি ঊল্টে দিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা করে। হাতিটিকে যে মহল্লায় দেখা গেছে, সেস্থলে বর্মি সাব-ইন্সপেক্টর কজন কন্সটেবলস সঙ্গে নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সে মহল্লটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। সেখানকার অগণিত গলি-ঘুপচি ছিলো পুঁতি-দুর্গন্ধময় বাঁশ-বেতের ঝুপড়িতে পূর্ণ। ঝুপড়িগুলোর ছাদ নারকেল পাতায় ছাওয়া। মহল্লাটি ছিল একটা খাড়া পাহাড়ের ঢালুতে। মনে আছে, বর্ষার শুরুর সেই দিনটি ছিল মেঘলা। সেদিন সকালবেলার পরিবেশ ছিল দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো গুমোট। আমরা লোকজনকে হাতিটি কোন্ দিকে গেছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে থাকি। এ-রকম ক্ষেত্রে সচরাচর যা ঘটে তাই হলো। কেঊ-ই হাতিটির সুনির্দিষ্ট হদিস দিতে পারলো না। প্রাচ্যের দেশগুলোতে সব সময় এরকম-ই হয়ে থাকে। একটা গল্প বা ঘটনা দূর থেকেই যথেষ্ট স্পষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্ত্ত যতই ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যাবেন, ততই ঘটনাটির বর্ণনা অস্পষ্ট হতে থাকে। কিছু লোক বললো, তারা হাতিটিকে একদিকে যেতে দেখেছে। অন্য একদল বললো, না, হাতিটি আরেক দিকে গেছে। আরেক দল বললো, তারা এই এলাকায় কোনও পাগলা হাতির আগমনের খবর শুনে-ই নি ! আমি প্রায় মনস্থির করে ফেলেছি, পুরো ঘটনাটিই হয়তো বিরাট একটা গুজব ছাড়া আর কিছু নয়। ঠিক তক্ষুনি একটু দূর থেকে কিছু লোকের চীৎকার-চেঁচামেচি শোনা গেল। একদল লোক আতঙ্কিত কণ্ঠে চীৎকার করছিল, 'বাচ্চারা, দূর হও। এই মুহূর্তে এখান থেকে দূর হও'। দেখলাম, গাছের একটা কচি ডাল হাতে একজন মহিলা একটা কুঁড়েঘরের কোণা থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি ঊত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে একদল ন্যাংটা শিশুদের ধমকে ঘটনাস্থল থেকে ভাগিয়ে দিচ্ছিলেন। আরো কিছু মহিলা তার সঙ্গে যোগ দিলেন। তারা বিস্ময়াবিভূত হয়ে জিভ দিয়ে এক ধরনের অদ্ভূত আওয়াজ করছিলেন। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিলো, সেখানে এমন কিছু ছিল বা ঘটেছে যা শিশুদের দেখা ঊচিত নয়। আমি একটু ঘুরে কুঁড়েঘরটির পেছনে গেলাম। দেখলাম, সেখানে একজন মানুষের নগ্ন মৃতদেহ কাদার মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। মৃতদেহটি একজন ভারতীয়ের। একজন কৃষ্ণাঙ্গ দ্রাবিড়িয়ান কুলির। মনে হলো, খুব বেশিক্ষণ আগে সে মারা যায় নি। লোকজন বললো, কুঁড়েঘরটির কোণে হাতিটি অতর্কিতে তার ঊপর হামলে পড়ে। তার শূঁড় দিয়ে লোকটিকে পেঁচিয়ে ধরে। তারপর পা দিয়ে লোকটির পিঠে চাপ মেরে তাকে মাটির মধ্যে পুঁতে দেয়। তখন ছিল বর্ষাকাল। মাটি নরম। লোকটির মুখ মাটির মধ্যে এক ফুট গভীর এবং কয়েক গজ লম্বা একটি খাদের সৃষ্টি করেছে। সে ছিল তার পেটের ঊপর ভর করে শোয়া। বাহু দুটো ক্রুশের মতো ছড়িয়ে আছে। তার মাথা একপার্শ্বে স্পষ্টতই ত্যাড়াবাঁকা হয়ে আছে। মুখমণ্ডল কাদায় লেপ্টে আছে। চক্ষুদ্বয় বিস্ফোরিত। দাঁতগুলো অসহ্য যন্ত্রণার চিহ্ন ধারণ করে বিশ্রীরকমভাবে বের হয়ে আছে। যাহোক, দয়া করে কেঊ আমাকে কখনো বলবেন না, মৃত মানুষের মূর্তি প্রশান্তিময়। আমি এ পর্যন্ত যতগুলো মৃতদেহ দেখেছি তাদের অধিকাংশই দেখতে ছিল অত্যন্ত অস্বস্তিকর এবং বিশ্রী। পশুটির বিশাল পায়ের ঘর্ষণের ফলে লোকটির পিঠের চামড়া সেরকম ছিলে গেছে, যেরকম কেঊ খরগোশের চামড়া ছিলে। মৃতদেহটি দেখামাত্রই আমার আর্দালিকে এক বন্ধুর বাড়িতে পাঠালাম তার হাতি-মারার ঊপযুক্ত রাইফেলটি নিয়ে আসার জন্য। ইতিমধ্যেই আমার অশ্বটিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। কারণ আমি চাই না হাতির ভয়ে অশ্বটি সন্ত্রস্ত হয়ে পিঠ থেকে আমাকে আছড়ে ফেলুক। কয়েক মিনিটের মধ্যে আর্দালি রাইফেল নিয়ে ফিরে এলো। সঙ্গে পাঁচ কার্তুজ গুলি। এরই মধ্যে কিছু বর্মি লোক হাজির হলো। তারা জানালো, সেই মুহূর্তে হাতিটি কয়েক শ গজ দূরে পাহাড়ের নিচে ধানক্ষেতে অবস্থান করছে। তৎক্ষণাৎ আমি সেদিকে রওয়ানা দিলাম। পেছনে চেয়ে দেখি, বাস্তবিক অর্থে, মহল্লার সমস্ত বাড়িঘর থেকে মানুষ দলে দলে বেরিয়ে আমার পিছু নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা রাইফেল দেখেছে। আমি হাতিটিকে গুলি করতে যাচ্ছি ভেবে তারা ঊত্তেজিত ভঙ্গিতে চীৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিলো। এই হাতিটাই যখন তাদের ঘরবাড়ি দোকানপাটে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন সেটিকে নিয়ে তারা খুব একটা আগ্রহ-ঊচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নি। কিন্ত্ত এখন রাইফেলের ঊপস্থিতিতে মুহূর্তেই দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। কারণ হাতিটিকে আমি গুলি করতে যাচ্ছি ! তাদের কাছে এটা এক ধরনের আনন্দ-বিনোদনের বিষয়, ঠিক যে-রকম চান্চল্য সৃষ্টি হতো কোনও একদল ইংরেজ জনতার মধ্যে। তাছাড়া তারা চায় হাতিটির গোশত! সেজন্যও তারা তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষা করছে ! এ কারণে আমি কিন্চিত অস্ফুট অস্বস্তি বোধ করছি। কারণ হাতিটিকে গুলি করার বাসনা আমার নেই। আমি রাইফেলটি আনিয়েছি প্রয়োজনে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য। এক দঙ্গল লোক কাঊকে অনুসরণ করলে সেটা সব সময় সবখানেই এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আমি দৃপ্তপদে মার্চ করে পাহাড়ের নিচে নেমে গেলাম। আমার কাঁধের ঊপর রাইফেল আর পায়ের কাছে ক্রমস্ফীতমান জনতার হৈ-হুল্লোড়। সত্যি বলতে কি, আমার কাছে নিজেকে দেখাচ্ছিল সঙের মতো। পাহাড়ের পাদদেশে, যেখানে ঝুপড়িগুলোর সীমানা শেষ, সেখান থেকে শুরু হয়েছে একটা মেটাল রোড। মেটাল রোডের পরেই রয়েছে হাজার গজ বিস্তৃত স্যাঁতস্যাঁতে এবং অব্যবহৃত ধানক্ষেত। সেখানে এখনও চাষাবাদ শুরু হয় নি। কিন্ত্ত মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিপাতের কারণে মাটি নরম হয়ে গেছে। এবং পুরো জায়গাটি অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা মোটা ঘাসে ছেয়ে আছে। ধানক্ষেতে দেখা যাচ্ছে হাতিটিকে। সে রাস্তা থেকে আট-দশ গজের মতো দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দেহের বাম পাশটা আমাদের দিকে মুখ করে আছে। জড়ো হওয়া জনতার ঊপস্থিতি সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তার আপনমনে জমিনের ঘাস ঊপড়াচ্ছে, তারপর সেগুলোকে তার হাঁটুতে বাড়ি দিয়ে পরিষ্কার করছে আর জঠরস্থ করছে। আমি পথের মাঝখানে থামলাম। হাতিটিকে দেখামাত্রই পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম, তাকে আমার গুলি করা ঊচিত নয়। নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে হরদম ব্যবহৃত হয় - এমন একটি হাতিকে হত্যা করা সাংঘাতিক একটা ব্যাপার। এটাকে বিশাল এবং অত্যন্ত মূল্যবান কোনো মেশিনারি ধ্বংস করার সঙ্গে তুলনা করা চলে। স্পষ্টত কারোর-ই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানো ঊচিত নয়, যদি সেটা কোনোভাবে এড়ানো সম্ভব হয়। হাতিটি সেই নিরাপদ দূরত্বে যখন আপনমনে ঘাস খেয়ে চলেছে, তখন তাকে আমার একটা গাভীর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক মনে হয় নি। আমার মনে হলো, এবং আজো তাই মনে হয়, হাতিটির 'পাগল হওয়ার পর্ব (Must)' ইতিমধ্যেই পার পার হয়ে যাচ্ছিলো। মনে হলো, সেই অবস্থায় সে কারো কোনো অনিষ্ট না ঘটিয়ে আশেপাশের এলাকায় ঘোরাঘুরি করবে, যতক্ষণ না তার মাহুত ফিরে এসে তার তত্ত্বাবধানে নিয়ে যায়। মোট কথা, আমি মোটেই চাই নি হাতিটিকে গুলি করতে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি তাকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখব; যাতে সে পুনরায় পাগলামো শুরু করে তাণ্ডব চালাতে না পারে।তারপর আমি বাড়ি চলে যাব। কিন্ত্ত পরক্ষণে, আমাকে যারা অনুসরণ করছিলো, সেই জনতার দিকে একনজর দৃষ্টি বুলিয়ে নিলাম। তারা ছিল সংখ্যায় বিশাল; কমপক্ষে দুই হাজার।তদুপরি মিনিটে মিনিটে সেই সংখ্যা বাড়ছে। ক্রমস্ফীতমান এই জনতা দীর্ঘ পথের দুই ধার বন্ধ করে দিয়েছে। জবরজং হরেক রকমের পোশাকের ঊপরে হলুদ্রাভ মুখাবয়বের জনসমুদ্রের দিকে আমি তাকালাম। তাদের চেহারা-সুরতে প্রশান্তির ভাব। তারা এই 'হাতি-সার্কাসের' একটুখানি বিনোদন লাভের জন্য অধীর, ঊন্মুখ, আর ভেতরে ভেতরে ঊত্তেজিত হয়ে আছে। সবাই নিশ্চিন্তমনে প্রতীক্ষা করছে, আমি হাতিটিকে কতো শিগগির গুলি করে মারতে যাচ্ছি, সেটা ঊপভোগ করার জন্য। তারা আমাকে এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলো; যেভাবে যাদু দেখানোর মুহূর্তে কোনও যাদুকরকে দর্শকরা পর্যবেক্ষণ করে। মজার বিষয় হলো, এই লোকগুলো আমাকে কখনো পছন্দ করতো না। কিন্ত্ত যাদুকরী ক্ষমতার রাইফেল হাতে, আমি ক্ষণকালের জন্য হলেও তাদের কৌতূহলী পর্যবেক্ষণের যোগ্যতা অর্জন করলাম ! আচমকাই আমি ঊপলব্ধি করতে পারলাম, শেষ পর্যন্ত হাতিটিকে আমার গুলি করাই ঊচিত হবে। জড়ো হওয়া জনতা এটাই আমার কাছ থেকে প্রত্যাশা করছিলো। আমাকে এই গর্হিত কাজটা করতেই হবে। আমি অনুভব করলাম, হাজার হাজার মানুষের এই বিশ্রী আনন্দ ঊপভোগের বাসনা আমাকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সেই দিকেই ধাবিত করছে। আমি যখন রাইফেল হাতে পাগলা হাতি এবং ঊন্মত্ত জনতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেই মুহূর্তে প্রথমবারের মতো প্রাচ্যে শ্বেতাঙ্গ মানুষের আধিপত্যবাদী সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অন্ত:সারশূন্যতা অনুধাবন করতে সক্ষম হলাম।আজ এখানে আমি বন্দুক হাতে একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ নিরস্ত্র বিশাল নেটিভ জনতার মুখোমুখী দণ্ডায়মান। অথচ মনে হচ্ছিলো এই হাতি-নাটিকার মন্চে তারাই মূল নায়ক। বাস্তব অর্থে, আমি ছিলাম তাদের হাতের ক্রীড়ণক, হাস্যকর পুতুলমাত্র। আমার পশ্চাতের অযুত হলুদ্রাভ মুখাবয়বের ইশারায় আমি একবার বামে হেলছি, পরক্ষণেই ডানে দুলছি। তাদের হাতেই এই নাটক নিয়ন্ত্রণের মূল কলকাঠি। সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, শ্বেতাঙ্গ মানুষ যখন অত্যাচারীরূপে আবির্ভূত হয়, তখন সে আসলে তার নিজেরই স্বাধীনতা ধ্বংস করে। সে এক ধরনের অসার ডামিতে (পুতুলে) পরিণত হয়। সে প্রচলিত অর্থে পরিচিত একজন 'সাহেবের' রূপ পরিগ্রহ করে। কারণ তার শাসনের পূর্বশর্তই হলো, নেটিভ জনতাকে তার কর্মকাণ্ড দিয়ে মুগ্ধ, বিমোহিত করার মধ্য দিয়েই তার জীবন অতিবাহিত করতে হবে। এবং যেকোন সংকটকালে তাকে তাই করতে হবে, যা নেটিভরা তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করে। (কথাটা সর্বাংশে সত্য বলে আমি মনে করি না। দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে নেটিভরা প্রত্যাশা করে ওৌপনিবেশিক শাসকরা তাদের খাদ্য সংকটের সমাধান করবে। কিন্ত্ত ঊপমহাদেশে ব্রিটিশ আমলে সংঘটিত সকল দুর্ভিক্ষের সময়ে ব্রিটিশরা নেটিভ ইণ্ডিয়ানদের প্রত্যাশা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। - অনুবাদক) । সে একটা মুখোশ পরে এবং তার মুখাবয়ব সেই ক্রমস্ফীতমান মুখোশ ধারণ করার জন্য ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। হ্যাঁ, আমাকে এই হাতিটিকে গুলি করতেই হবে। যখনই রাইফেলের জন্য আর্দালিকে পাঠিয়েছি, তখনই আমি এই কাজের জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে গেছি। একজন সাহেবকে সাহেবের মতই আচরণ করতে হবে। তাকে বাহ্যিকভাবে হলেও মেকি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, কঠোর অভিব্যক্তি প্রদর্শন করতে হবে। যাতে সে নিজেকে, নিজের মনকে ঊপলব্ধি করতে পারে এবং তার জন্য নির্ধারিত এবং তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারে। আজ এতটা পথ আসার পর, রাইফেল হাতে আর পশ্চাতে আমার পাদদেশে দুই হাজারের অধিক কৌতূহলী জনতার মার্চ - এ সব অগ্রাহ্য করে, কিছু একটা না করে লেজ গুটিয়ে পালাবো? না, সেটা এখন অসম্ভব। জনতা আমাকে নিয়ে ঠাট্রা-মস্করা করবে। শুধু আমার নয়, প্রাচ্যে অবস্থানরত প্রতিটি শ্বেতাঙ্গ মানুষের জীবন হলো নেটিভদের চোখে হাসির খোরাক না হওয়ার এক দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি। কিন্ত্ত আমি তো চাই নি হাতিটিকে গুলি করতে। আমি দেখলাম, সে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস তার হাঁটুতে পিটিয়ে দিয়ে সাফ করে তার বিশাল বপুতে চালান করছে। আর তার মধ্যে ছিল আপন মনে চিন্তায় এবং কর্মে ডুবে থাকার মাতামহীসুলভ একটা অভিব্যক্তি, যেটা সাধারণত হাতিদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। আরো মনে হলো, এ-রকম একটা হাতিকে গুলি করে মারা হবে খুন করার মতো একটা অপরাধ। অবশ্য সে বয়সে পশুহত্যার ব্যাপারে আমি কঠোর কোনো নৈতিক বিধিনেষেধের ধার ধারতাম না। কিন্ত্ত আমি কখনও কোনো হাতিকে গুলি করিনি বা কখনও তা চাই-ও নি। যে-কোনভাবেই হোক, সব সময় আমার মনে হতো, হাতির মতো বিশাল কোনও পশুকে হত্যা করা ততোধিক খারাপ একটা কাজ। তাছাড়া পশুটির মালিকের কথাটাও আমাদের বিবেচনায় নেওয়া ঊচিত।জীবিত অবস্থায় এই হাতিটির মূল্য হবে কমপক্ষে এক শ পাঊণ্ড। আর সেটির মৃতদেহের মূল্য হবে তার দাঁতের মূল্যের সমমানের যেটা হলো মাত্র পাঁচ পাঊণ্ড। কিন্ত্ত এখন আর এসব হিসাব-নিকাশ করে কোনো লাভ নেই। আমাকে যা করার খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর থেকে সেখানে অবস্থান করছেন এবং প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ বলে পরিচিত কিছু বর্মি লোকের কাছে হাতিটির ভাব-সাব, মেজাজ-মর্জি সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তারাও সবাই আমার মতো একই মতামত ব্যক্ত করলেন । তারা বললেন, এখন হাতিটি কারো দিকেই ভ্রুক্ষেপ করেছে না। তবে এ-রকম ততক্ষণ থাকবে যতক্ষণ তাকে তার মতো একা থাকতে দেওয়া হবে। কিন্ত্ত সে আবারও আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠতে পারে যদি কেঊ তার খুব নিকটবর্তী হয়। এখন কী করা ঊচিত সেটা আমার কাছে একদম স্পষ্ট হয়ে ওঠলো। আমার ঊচিত, হাতিটির কাছাকাছি পঁচিশ গজ অবধি এগুনো। এইভাবে আমি তার মেজাজ-মর্জি পরীক্ষা করে নিতে পারি। সে যদি আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে তেড়ে আসে, তবে আমি তাকে গুলি করতে পারি। আর সে যদি আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে, তাহলে মাহুত না ফেরা পর্যন্ত তাকে সেখানে থাকতে দেওয়া নিরাপদ। বন্দুক চালানোয়, বলা যায়, আমি খুব আনাড়ি। তদুপরি, সেখানকার মাটি ছিলো নরম। প্রতি পদে পদে যে কারো পা দেবে যাবে। হাতিটি যদি তেড়ে আসে আর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তাহলে আমার প্রাণে বাঁচার সম্ভাবনা ততটুকু , যতটুকু সম্ভাবনা স্টিমরোলারের নিচে থাকা একটা ব্যাঙের। কিন্ত্ত এরপরও আমি শুধু আমার নিজের চামড়া বাঁচানোর চিন্তা করছিলাম না। পশ্চাতে দণ্ডায়মান তীক্ষ্ন নজরে পর্যবেক্ষণরত হলুদ্রাভ জনতার কথাও ভাবছিলাম। কারণ সেই মুহূর্তে জনতার ঊপস্থিতিতে সাধারণ অর্থে সেরকম ভীত ছিলাম না, যতটা ভীত হতাম যদি আমি একা থাকতাম। একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের অবশ্যই নেটিভদের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া ঊচিত নয়। শুধু একটামাত্র চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটা হলো, যদি ব্যর্থ হই তবে তার পরিণতি কী হবে! ওই দুই হাজার নেটিভ বর্মি জনতা দেখবে, হাতিটি আমাকে তাড়া করে পাকড়াবে। তারপর পাহাড়ের ঊপরের সেই ভারতীয় কুলির মতো, তার পা দিয়ে পিষে দলিত-মথিত করে একখণ্ড বীভৎস মাংসপিণ্ডের কাবাব বানাবে! শেষ পর্যন্ত তাই যদি ঘটে তাহলে খুব সম্ভব এদের কেঊ কেঊ সেটা দেখে মজা করবে, হাসি-তামাশা করবে। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই সেটা ঘটতে দেওয়া যাবে না। এখন আমার সামনে কেবলমাত্র একটা বিকল্প। আমি ম্যাগিজনে কার্তুজ ঢুকালাম। তারপর পথের মধ্যে শুয়ে পড়লাম, সঠিকভাবে নিশানা স্থির করার জন্য। জনতা একদম খামোশ হয়ে গেল। নাট্যশালায় যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পর্দা ঊঠা শুরু হলে দর্শকরা গম্ভীর অথচ নিম্নস্বরে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে, অযুত জনতার মুখ থেকে সেরকম একটা নি:শ্বাস বেরিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের বিনোদনের হিস্যা লাভ করতে যাচ্ছ! রাইফেলটি ছিল চমৎকার একটি জার্মান অস্ত্র। নিশানার দৃষ্টিপাতের জন্য সেটার মধ্যে ক্রস-হেয়ারস ছিল ( ক্রস-হেয়ারস বন্দুকের নিশানার সঠিক ফোকাস নির্ধারণের জন্য যে মিহি তারের ক্রস থাকে, সেটা)। আমি তখন এ-ও জানতাম না, হাতি মারবার জন্য সর্বোত্তম পন্থা হলো, তার এক কর্ণকুহর থেকে আরেক কর্ণকুহরের কল্পিত লাইন বরাবর গুলি করা। সেজন্য আমার ঊচিত ছিল, যেহেতু হাতিটি আমার দিকে এক পাশ রেখে সমান্তরাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেহেতু ঠিক তার কর্ণকুহর লক্ষ্য করে গুলি করা। কিন্ত্ত আমি প্রকৃতপক্ষে তার কর্ণকুহরের কয়েক ইন্চি ঊপরে নিশানা তাক করি। কারণ আমি ভাবছিলাম, তার মস্তিষ্কের অবস্থান কানের খানিকটা সম্মুখভাগে হবে। অবশেষে আমি ট্রিগার চাপলাম। কিন্ত্ত লক্ষ্য করলাম চারদিকে সুনশান নীরবতা। কোনও বিকট আওয়াজ (ব্যাং) শুনলাম না। এমনকি হাতিটা একটা ঝাঁকুনি দিলো না। গুলি যখন লক্ষ্যভেদ করে, তখন সেটার আওয়াজ আসলে কেঊ শুনেনা। কিন্ত্ত জনতার মধ্য থেকে কুৎসিতরকমের আত্মতুষ্টির একটা গর্জন আমার কানে এলো।এ-রকম মুহূর্তে যে কারো মনে হবে, অন্তত গুলিবিদ্ধ হবার পর হাতিটির দেহাবয়বে এক ধরনের রহস্যময়, সাংঘাতিক রকমের একটা পরিবর্তন ঘটবে। কিন্ত্ত হাতিটি একটুও কেঁপে ওঠলো না, ভূপাতিতও হলো না।কিন্ত্ত আমি শুধু এটুকু বুঝতে পারলাম তার দেহের প্রতিটির রেখার (লাইন) কাঠামোতে যেন তুলনামূলক ক্ষুদ্র মাত্রায় তবে মোটের ঊপর বিরাট একটা পরিবর্তন ঘটেছে। হাতিটিকে সহসাই মনে হলো বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত এবং সংকুচিত। তাকে দেখাচ্ছিলো যেন সে হঠাৎ করেই অত্যন্ত বুড়িয়ে গেছে। বুলেটের ত্রাস-সন্চারি প্রভাব তাকে ধরাশায়ী না করে যেন অবশ করে দিয়েছে। অবশেষে, মনে হলো দীর্ঘক্ষণ, কিন্ত্ত আসলে মাত্র পাঁচ সেকেণ্ড পরে হাতিটি তার হাঁটুতে বিশাল এক দলা মাংসপিণ্ডের মতো ঝুলে পড়লো। তার মুখ দিয়ে প্রচুর পরিমাণে লালা নি:সৃত হচ্ছিলো। বার্ধক্যজনিত প্রচণ্ড শারীরিক-মানসিক দৌর্বল্য যেন তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। যে কেঊ তাকে হাজার বছর বয়ষ্ক বলে কল্পনা করতে পারতো। আবারও তার দেহের ঠিকক একই লক্ষ্যস্থলে গুলি চালালাম। দ্বিতীয় গুলি বিদ্ধ হবার পরও হাতিটি ধরাশায়ী হলো না। কিন্ত্ত সে মরিয়া হয়ে অত্যন্ত মন্থর গতিতে পায়ে ভর দিয়ে কোনোমতে ঊঠে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার পা দুটো তখন বিশাল শরীরটাকে নিচের দিকে টানছে। মাথাও অবসন্ন হয়ে ঝুলছে। এবার তৃতীয় গুলি ছুঁড়লাম। এ গুলিতেই কাজ হলো। আমরা দেখছিলাম, গুলির প্রতিক্রিয়ায় প্রচণ্ড শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা তার সমস্ত দেহকে কাঁপিয়ে দিলো। তারপর তার পায়ের শেষ শক্তিটুকু শুষে নিলো। কিন্ত্ত ভূপাতিত হবার মুহূর্তেও ক্ষণিকের জন্য মনে হলো সে মরিয়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্ত্ত পশ্চাতের পা দুটো শরীরের ভারে ভেঙ্গে পড়ছে। হাতিটির শূঁড় আকাশের পানে গাছের মতো খাড়া হয়ে গেছে। তাকে মনে হচ্ছিলো, ভারসাম্য হারিয়ে ঊপর থেকে গড়িয়ে পড়া বিশাল আকৃতির পাথরের মতো। সেই মুহূর্তে প্রথমবারের মতো এবং মাত্র একবার বিকট একটা আওয়াজ করলো। তারপর হলো ধরাশায়ী। তার ভুঁড়ি পতিত হলো আমাদের দিকে মুখ করে। পতনের পর ভূমিতে যে আওয়াজ অনুভূত হয়েছিল, তাতে মনে হলো, আমি যেখানটাতে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানকার মাটিও কাঁপছে। আমি ঊঠে দাঁড়ালাম। বর্মিরা ইতিমধ্যেই আমাকে মাড়িয়ে হাতিটির দিকে তীব্র বেগে দৌঁড়াচ্ছে। স্পষ্টতই হাতিটি আর কখনো দাঁড়াতে পারবে না। কিন্ত্ত তখনও সে মরেনি। অত্যন্ত নিয়মিত তালে তবে খুব কষ্টে সে দীর্ঘ তীক্ষ্ন নি:শ্বাস ফেলতে থাকে। তার বিশাল দেহের ঊধ্বাংশ প্রচণ্ড কষ্টে কাতর হয়ে ঊঠানামা করছে। তার মুখ হা করে আছে। আমি তার মুখগহবরের গভীরে পিংক রংয়ের বিবর্ণ কণ্ঠনালী দেখতে পাচ্ছিলাম। তার মৃত্যুর জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্ত্ত তার শ্বাসপ্রশ্বাস দুর্বল বা ক্ষীণ হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাকি দুই রাঊণ্ড গুলি খরচ করলাম ঠিকক সেখানে, যেখানে আমার মনে হলো, অবশ্যই তার হৃদযন্ত্রের অবস্থান। লাল ভেলভেটের মতো গাঢ় রক্ত গলগলিয়ে বেরিয়ে এলো। তারপরও সে মরল না। এমনকি, যখন গুলিবর্ষিত হলো তখন তার দেহ একটুও কাঁপলো না। হাতিটি বিরতিহীনভাবে প্রচণ্ড কষ্টে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া অব্যাহত রাখলো। সে মারা যাচ্ছিল বটে, তবে খুব ধীরলয়ে এবং মারা যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটা ছিলো অত্যন্ত কষ্টকর, অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্ত্ত এই বিষয়টা আমার নাগালের বাইরে ! সেটা আমার কাছ থেকে দূরবর্তী কোনও জগতে, যেখানে এমনকি একটা বুলেটও তাকে এর চেয়ে বেশি কাবু করতে পারছে না। আমি অনুভব করলাম, আমাকে তার এই বিভীষিকাময় মরণযন্ত্রণার অব্যাহত কাতরধ্বনির পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। হাতিটার এমন পরিণতি আমার কাছে মনে হলো অত্যন্ত ভয়াবহ। এই বিশাল পশু আমার সামনে শুয়ে আছে। তার নড়াচড়া করার কোনও শক্তি নেই অথচ মরে যাওয়ার জন্যও সে শক্তিহীন। নিজেকে নি:শেষ করার জন্যও সে আজ অক্ষম। আমার ছোট রাইফেলটা আনার জন্য বাড়িতে লোক পাঠালাম। তারপর সেটা দিয়ে একটার পর একটা গুলি চালাতে লাগলাম পশুটির হৃদযন্ত্রে এবং কণ্ঠনালীর ভেতরে। এতগুলো গুলি বর্ষণ করার পরও মনে হলো পশুটির কিছুই হয়নি।ভীষণ কষ্টে সে নি:শ্বাস ফেলা অব্যাহত রাখলো।আর সেই নি:শাসের গতি ছিলো ঘড়ির টিকটটিকক তালের মতোই নিয়মিত। শেষ পর্যন্ত সেই দৃশ্য আমার কাছে অসহ্য হয়ে ওঠলো। আমি দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করলাম। পরে লোকমুখে শুনলাম, পশুটির শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করতে আরো আধা ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল। বর্মিরা দা এবং ঝুড়ি আগে থেকেই প্রস্ত্তত রেখেছিল, এমনকি আমার ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পূর্বেই। পরে জানতে পারি, অপরাহ্নের পূর্বেই তারা হাতিটির শুধু কঙ্কাল ছাড়া বাদবাকি সবকিছু ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। শহরে পরবর্তী কদিন, অবশ্যই, হাতিটিকে গুলি করে মারা নিয়ে নিরন্তর গল্পগুজব চলতে থাকে। খবর পেয়ে হাতির মালিক ক্ষিপ্ত হয়ে ঊঠেছিল। কিন্ত্ত সে আর কী-ই বা করবে ! সে একজন ভারতীয়মাত্র! এবং এ ব্যাপারে সে কিছুই করতে পারে নি। তাছাড়া আইনানুগভাবে আমি সঠিক কাজটিই করেছে। কারণ একটা পাগলা হাতিকে বধ করাই ঊচিত, যেভাবে বধ করা হয় পাগলা কুকুরকে, যদি না তার মালিক সেটাকে সামলে রাখতে পারে। ইঊরোপিয়ানদের মধ্যে এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। বুড়োরা বলছিল, আমি ঠিক কাজটিই করেছি। তরুণ ইঊরোপিয়ানরা বললো, একজন ইণ্ডিয়ান করিংগি কুলিকে মারার কারণে একটা হাতিকে বধ করা নিতান্তই লজ্জ্বার ব্যাপার। কারণ একটা হাতি যেকোনও ইণ্ডিয়ান কুলির চেয়ে অধিক মূল্যবান। আরো পরে, আমি ভেবে প্রীত হয়েছি, কুলিটি মারা গিয়েছিল। কারণ তার মৃত্যু আমাকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল এবং হাতিটিকে গুলি করবার যথেষ্ট ওজুহাতের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। আমি প্রায়শই অবাক হয়ে ভাবি, কেঊ কী ধরতে পেরেছিল, শুধুমাত্র নিজেকে বর্মি নেটিভদের কাছে হাস্যস্পদ হিসেবে প্রতিপন্ন করা থেকে বাঁচাতে আমি হাতিটাকে বধ করেছিলাম !

105

10

মনোজ ভট্টাচার্য

শবজী-বিক্রেতার হাসপাতাল !

সবজি বিক্রেতার হাসপাতাল ! ওপরের শিরোনামটা খুবই নিচুমানের ! তবু দিচ্ছি – কারন এছাড়া তার আর কিই বা পরিচয় ! না পারেন পড়তে, না জানেন অঙ্ক ! ঘড়ি দেখতেও তো জানতেন না ! শুধু জানতেন পার্ক সার্কাসের চার নম্বর গেটের কাছে সবজি বিক্রি করে কটা পয়সা জমিয়ে ক্রমে একটা হাসপাতাল বানাবেন ! তাঁরই নাম সুভাষিণী মিস্ত্রি ! মাত্র ২৩ বছর বয়েসে যখন তার স্বামী বিনা চিকিৎসায় মারা যান – তখন তার চারটে শিশু সন্তান নিয়ে লোকের বাড়ি গিয়ে পরিচারিকার কাজ করেন, আয়ার কাজ করেন, পার্ক সার্কাসে গিয়ে সবজি বিক্রি করে রোজগার শুরু করেন ! আর মনে মনে শপথ নিতে থাকতেন রোজ – আর যেন কেউ পয়সার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায় ! আমার গুরু একটা উদাহরন দিতেন – বোকা বুড়ো পাহাড় হঠালো ! - বাস্তবে সেই বোকা পাগল বুড়ো - বিহারের গয়া জেলার দাশরথি মাঝি । – তার আসন্নপ্রসবা স্ত্রী ফাগুনী দেবী অনেক ঘুরপথে জল আনতে গিয়ে - পাহাড়ের রাস্তায় মারা যায় - ! আর কাউকে যেন এতটা ঘুরপথে কষ্ট করে যেতে না হয় - বলে পাহাড় কাটতে শুরু করে দিল । বাইশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ৩৬০ ফুট দীর্ঘ পথ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করতে সমর্থ হল । আমি যখন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম – আমি যদি বলি সবজি-উলির হাসপাতাল – খুব ভালো শোনাবে ! – উনি বললেন এ হাসপাতাল সবার জন্যে – আপনি যে নামে বলুন – এ তো আপনাদের জন্যে সম্ভব হয়েছে ! কথায় কথায় বললেন – উনি লেখাপড়া জানেন না, অঙ্ক জানেন না ! শুধু ভাবেন কি করে হাসপাতালটা করা যায় ! দু পয়সা বাঁচলে – সেটাই জমান হাসপাতালের জন্যে ! এই হাসপাতাল শুধু গরীবদের জন্যে – এখানে কারুর পয়সা লাগে না ! এক জমিদার কিছুটা জমি বিক্রি করছিলো – উনি গিয়ে তার পায়ে ধরে অল্প কিছু পয়সার বিনিময় কিনে নেন ! সেখানে এখন দুটো বাড়ি গড়ে উঠেছে – চারতলায় লিফটের বন্দোব্যস্ত হচ্ছে। - একটা এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে । চার সন্তানের মধ্যে ছোট ছেলে অজয় মিস্ত্রি ডাক্তার – কিন্তু সে হাসপাতাল সামলাচ্ছে ! দুঃখের কথা – বড় ছেলে মাত্র এক বছর আগে মারা গেছে ! এক মেয়েও মারা গেছে ! উনিই বললেন – বুকের মধ্যে সব শোক চেপে রেখে – হাসপাতালের কাজ করে যেতে হচ্ছে ! – বেশি লোক জন নেই ! অজয় বাবু নিজেই সব দেখা শুনা করছেন ! খুবই ব্যস্ত ! অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করতে হল – ওনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে ! আমি কোনও অলৌকিক দেব-দেবী দেখার জন্যে কোন মন্দিরের ভেতরে ঢুকি না ! অথবা তথাকথিত কোন মাদার, সিস্টার, বাবা কিম্বা মার কাছেও যাই না ! কারন এই অলৌকিক দেব-দেবীর আর যাই হোক – মানুষের সেবা করার কোন ক্ষমতা নেই ! শুধু পুজার নামে ভণ্ডামি করে মানুষদের ঠকানোর ধান্দা ! কিন্তু যখন এই মানুষদের দেখি – কোথায় শিক্ষিত তিন বোন শ্রমজীবী হাসপাতালের জন্যে সমস্ত জমি-জমা বিলিয়ে নিজেরা সেখানে স্রেফ দিন গুজরান করেন অতি সাধারন ভাবে – তাদের দেখে মাথা নুইয়ে যায় ! – এই যে মহিলা কি চরম নিঃস্ব অবস্থা থেকে শুধু দুঃস্থ মানুষদের জন্যে জীবনপাত করছেন – এদের সাহস ও ত্যাগ দেখলে – শ্রদ্ধায় ও বিস্ময় আপনা থেকে মাথা ঝুকে যায় বৈকি ! এদের কথা প্রথম জানতে পারি আমির খানের সত্যমেব জয়তে সিরিজে ! তারপর দেখি সৌরভ গাঙ্গুলির দাদাগিরিতে ! – আর অতি সম্প্রতি দেখেছি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী নিতে – দিল্লি থেকে ফিরে আসার পর ! হিউম্যানিটিজ হসপিটাল – ঠাকুরপুকুর – হাঁসপুকুর ! মনোজ ভট্টাচার্য

106

7

দেশদ্রোহী

ইয়ু লিন thoughts (বা অলস ভাবনা)

(১) লেট দ্য সিরিজ বিগিন..........| (ক) বেশী ভাবনাচিন্তা করে লাভ নেই‚ বেশী প্ল্যান করেও না| শর্ট টার্ম মানে এই এক বড়জোর দু বছরেরই কাজে আসে| লঙ টার্ম শুধু রিভাইজ করবার জন্য‚ কখনই achieve হয় না| (খ) Effiency'র চেয়ে Efficient অধিকতর কাজের| ১২০ কিমি বেগে গাড়ী ছোটালাম আর ঠিক মোড়ে এসে সামান্য ভুল দিকে গেলেই সিডনী না পৌঁছে মেলবোর্ন| তার চেয়ে ৬০ কিমি বেগে সিডনী পৌঁছানো শ্রেয়| আপাতত: বাণীই সই| উদাহরণ আসিতেছে|

107

2

দেশদ্রোহী

আজকের আপডেট

হ্যাঙ্গার ( @stuti..@স্তুতি ম্যাডামের অনুপ্রেরণায় লিখিত*) অতি সাধারণ নিত্যকার ব্যবহারের একটি নগণ্য বস্তু‚ নয় কি? বড় মেয়ে এসেছিল তার ত্রৈমাসিক সফরে বেচারী মা বাপকে দেখতে| মায়ের সাথে প্রতি রবিবারে সন্ধে সাতটায় নিয়ম করে কথা হয়‚ বাপের সাথে শুধু জরুরী ইমেল| তারাই ঘর দোর পরিস্কার করতে একটি পুরানো হ্যাঙ্গার খুঁজে পেয়েছে| (২) আর সপ্তাহ দুয়েক বাদেই আমেরিকা প্রবাসী আমার কলেজ সহপাঠী ও তাঁর স্ত্রী আসছেন এই ডাউন আন্ডারে| বলাই বাহুল্য একই বয়স আমাদের‚ সেই কবে পাঁচটা বছর একই ক্লাশে বসেছি‚ প্রথম বছরে সে তো আমার ঠিক ওপরে দোতলায় থাকতো| মাঝে কত দশক দেখা সাক্ষাৎ‚ যোগাযোগ নেই‚ আমরা আবার আলাদা গ্রুপে চলাফেরা করতাম| তবে বাকী সব একই| একই ক্যাম্পাসে সেই সদ্য বুনি ওঠা বয়সে ১৬ কিংবা ১৭'য় ফার্ষ্ট ইয়ার; এগারো ক্লাশের উচ্চ মাধ্যমিকের যুগে| মাঝে গঙ্গায়‚ ইছামতী‚ কাবেরী‚ মিসিসিপিতে অনেক জল গড়িয়ে গেছে| কোন যোগাযোগই নেই; না রি-ইউনিয়নে না কিছু| ভাবতে কেমন লাগে একই কলকাতা শহর আমরা এমনই কলেজের অনেক সহপাঠীরা একই সাথে শেয়ার করেছি মাঝেসাঝে কিন্তু কেউ কাউকে চিনিই না| একটু সংক্ষেপে সারি‚ ২০০৮ নাগাদ আবার ক্ষীণ যোগাযোগ হয়‚ ইন্টারনেটের সৌজন্যে বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে‚ এই সহপাঠীর সাথেও| যোগাযোগ মানে ঐ গ্রুপ ইমেল‚ ব্যস| কেউ কাউকে দেখে‚ না বলে দিলে‚ চিনতে না পারার কথা| (৩) সে থাকে আমেরিকায়‚ বিক্কলেজ ছাড়বার পর ম্যাথসে ডক্টরেট করে আইটিতে ‚ বেশ বড়সড় মনসবদার ভুবন বিখ্যাত কোম্পানীতে| আমিও বেলাইনে বম্বে'তে উচ্চ শিক্ষা করে‚ এদিক সেদিক ঘুরে এখানে| কিন্তু আসলী দোস্তি বিক্কলেজীয়‚ যেমনটা হয় আর কি‚ বিক্কলেজীয় বন্ধুত্ব‚ ভ্রাতৃত্ব একটু অন্য ধরণের‚ যারা জানে তারা জানে| তাঁর স্ত্রীর আবার পশুপ্রীতি আছে এবং তার নিজেরও আছে এই পান্ডববর্জিত মহাদেশ সম্বন্ধে আগ্রহ| 'আয় বেড়াতে' ইত্যাদি bon-homie‚ কিন্তু সে তো ছুটি-হীন দেশের চাকুরে| 'আসবো অমুক সালে তমুক সালে'ইত্যাদি| হয়েই ওঠে না তার| আমায় যেতে বলে কিন্তু আমি চাচার দেশ সম্পর্কে তেমন উৎসাহী ছিলাম না তখন পর্য্যন্ত| শিকাগো গিয়েই মত বদলায়| তো মেয়ে গ্রাজুয়েশনের পর কোথাও যেতে চাইতে মনে এলো হোয়াই নট ইউএস| এই দেশে আমেরিকা ও ইংল্যান্ড ভ্রমণের ওপর বেশ প্রিমিয়াম আছে‚ দেশে যেমন বিলাত ফেরৎ সম্পর্কে ছিল| শালা‚ আবাপ'তেই তো বিজ্ঞাপনই দিতো‚ উচ্চশিক্ষার্থে বিলাত যাত্রা! মাই ফুট| কথায় কথায় ঠিক হলো মা ও মেয়ে যাবেন আমেরিকা ভ্রমণে; গেলেনও| সে কি এখানে‚ ১৪+৫ ঘন্টার দীর্ঘ উড়ান‚ তার উপর সম্পূর্ণ নূতন দেশ এবং সর্বোপরি তারা তো বটেই আমিও কেউ কাউকে চিনবো না| কিন্তু ঐ যে বললাম‚ বিক্কলেজীয় ভ্রাতৃত্ব| তারা ফিরে এসে বন্ধুর ও তাঁর স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ; যেন জনম জনমের পরিচিত| তারপর অবশ্য দু একবার তাদের সাথে দেখা হয়েছে‚ কলকাতায় রি-ইউনিয়নে‚ আমাদের কূটীরেও অন্য কিছু বন্ধুর সাথে আড্ডা‚ পান ভোজনও হয়েছে| কিন্তু এতদিন বাদে অবসর নেবার পর তাদের সময় হয়েছে ফর এ ভিজিট টু ডাউন আন্ডার| (৪) হ্যাঙ্গারের গীত গাইতে এত কথা কেন? ধীরজ রাখিয়ে (ধরিয়ে!)| তাঁরা আসছেন‚ বাড়ী ঘরদোর সাফসুরত করা হচ্ছে আপতকালীন তৎপরতায়‚ বঙ্গদেশে পুজোর আগে যেমন ভাঙ্গা ইঁটের টুকরো দিয়ে রাস্তা সারানো হয় তেমনি| খুচ-খাচ এটা সেটা সব চেঞ্জ করার ধূম পড়ে গেছে| এন্ট্র্যানস থেকে প্ল্যানট পট সরানো- অনেকটা খোলা লাগছে‚ লেপ কাঁথা সব নতুন কেনা হচ্ছে; আসলে আমাদের নিরাড়ম্বর জীবনযাত্রায় একটু রঙের পোঁচ| 'পার্টনারও নতুন কিনে আনলে পারো তো'‚ মিন মিন করে জানান দিই| 'আরে অত ঝামেলার কি আছে‚ দেখো না মাণিকদার ইন্টারভিউ নিতে দেশ বিদেশ থেকে কত লোক আসে‚ তিনি তো ঐ বই খাতাপত্তর‚ স্তূপাকৃত ফাইলের মধ্যে ইজি চেয়ারে ঢোলা পাজামা পাঞ্জাবী পরে কথা বলেন!' 'শাট আপ‚ তিনি তিনিই‚ তোমার জগৎজোড়া খ্যাতি হোক‚ তব দিখা যায়েগা!' (৫) বড় মেয়ে উড়ে এসে হাত লাগিয়েছে মায়ের সাথে স্বচ্ছ কূটীর বানানোর প্রচেষ্টায়| এমন অপারেশনে অনেক কিছুই goes to the bin! হায় হায়‚ আমার এখানকার ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনীয়ার্স মেম্বারশিপের সাট্টিপিট (শংসাপত্র )‚ পুরানো op-shop (দু-নম্বরী দুকান) এর ফ্রেমে লটকানো ছিল গ্যারেজে‚ সেটাও| 'ঐ ঘোড়ার ডিমে আর কি প্রয়োজন?' রিটায়ার করে আমি কি উহা চর্বন করবো! দিশী সাট্টিপিট তো ফাইলেই আছে| আসলে মেম্বারশিপ ফী দিইনি বলে আমি বস্তুত: আর মেম্বার নই‚ ঐ সাট্টিপিট defunct; এখানে চাকরী পাওয়ার অব্যবহিত পরই মেম্বারশিপ কাট| (৬) আরে ওটা কি‚ সবুজ মতো? ওয়ার্ডরোব থেকে বেরিয়েছে সেই ছোট হয়ে যাওয়া কোট টাঙানো ছিল হ্যাঙ্গার| মুহূর্তে ফিরে গেলাম সেই প্রথম জীবনে‚ কত দশক আগে| সমীর বিয়ে করে ইঞ্জিনীয়ার্স হোষ্টেল ছেড়ে গেল‚ আমি তার ঘরে গিয়ে উঠলাম বেশী রোদ পাবো বলে| তখন কোয়ার্টার মিলতো শুধু বিয়ে করলেই| আমার তো তখন হয়নি‚ হবে বলে আশাও ইল্লা| কে জানে এমনিতে ব্যাচিলরদের কোয়ার্টার দিলে হয়তো ঐ কোম্পানীতে‚ শহরেই থেকে যেতাম এতদিন| আমাদের সামনা সামনি ঘর ছিল| সে ঐ হ্যাঙ্গারটি ফেলে যায়| এবং ওটি আমার সাথে সাথে সাত ঘাটের জল খেতে খেতে এই ডাউন আন্ডারে! কারুর কি মনে আছে‚ তখনকার দিনে extruded অ্যালুমিনিয়ামের রঙ বেরঙের তারের মাল বাজারে এলো‚ তার আগে তো লোহার তারের rubber clad অথবা কাঠের মালই পাওয়া যেত? (৭) একটু ছুঁয়ে দেখলাম‚ আমারই বয়স হয়ে গেছে‚ 'Gems the ঘাটের মড়া আখ্যায় ভূষিত হচ্ছি' লোকজন তাতে হাততালিও দিচ্ছে‚ কিন্তু সে রয়ে গেছে অবিকৃত‚ অবিকল‚ ঠিক যেমনটি তখন ছিল| (৮) এই বার লাইনে আসি‚ ঘুরে ফিরে সেই ইনোভেশনে| ইয়েস‚ মামুলী হ্যাঙ্গারেরও ইনোভেশন হয়| লোকে‚ কোম্পানীগুলো লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে পেটেন্ট নেয়| কত কত রকমের হ্যাঙ্গার দোকানে বিশেষ করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সে লক্ষ্য করে দেখবেন| কেন‚ বাড়ীতেও তো মেয়েদের অন্তর্বাস ঝোলানোর জন্য slit ওয়ালা‚ টাই ঝোলাবার অন্যরকম‚ দোকানে ১২‚ ১৪‚ ১৬ নম্বর লাগানো হ্যাঙ্গার নোটিশ করে থাকবেন| এখনও এই ২০১৮ তেও নিরন্তর ইনোভেশন চলেছেই| জনগণ‚ গুগল পেটেন্টস বলে কাকুর একটা আলাদা ইঞ্জিনই আছে @নব ভোঁদড় @ স্যার‚ শুনছেন?); কাকুও জানে বাজার ধরতে‚ শুধু শুধুই লিটল ম্যাগে কি স্কচ মেলে! যে কোন জিনিষ আশে পাশে‚ নিত্য ব্যবহার্য্য গুগলেই দেখবেন‚ লক্ষ লক্ষ এন্ট্রি| চুলের কাঁটা‚ হৃদয়ের stent‚ খোকাবাবু ঘুমিয়ে থাকেন তাকে ডাকবার জন্য বড়ি (V i a g r a)‚ কম ইলেকটারি খরচের LED বাতি‚ নগন্য সুইচ‚ সব পাবেন| শুধু শুধুই কি লোকে Anchor এর প্লাগ খোঁজে?‚ যদিও মালটি আদ্যিকালের‚ লোকজন বিনা দ্বিধায় কেনে‚ তাই চলছে| আপনারা কবিতা লিখুন প্রেমানন্দে‚ বিরহ যাতনা সয় না বলে হা হুতাশ করুন আমি চললাম ফ্রীজ খুলে বিজয়দার কিঙফিশারের ছিপি খুলতে| আরে বিজয়দা‚ তুসি গ্রেট হো‚ হামলোক ইধার বিড়ি ফুঁকতা হ্যায় আর আপনি তৃতীয় মধুচন্দ্রিমায়‚ এক্সপিরিয়েন্সড দাদা আমাদের! তার আগে একটা লিঙ্ক দিয়ে যাই‚ সময় পেলে দেখবেন এখনই ৯২৪‚৬১৩ এন্ট্রি‚ আপনি যখন খুলবেন তখন দেখবেন বেড়ে গেছে| জয়রামজীকী| * তিনিই ছোট খাটো‚ এটা সেটা নিয়ে রচনার সূত্রপাত করেন এই আড্ডায়| https://patents.google.com/?q=hanger&oq=hanger

1874

150

দেশদ্রোহী

তাসমান সাগর পেরিয়ে

তাসমান সাগর পেরিয়ে (২) Day-0 বহ্বারম্ভে লঘু ক্রিয়া| উপরোক্ত শব্দ বন্ধটির মানে কি? আবছা আবছা মনে পড়ছে- শুরুতেই গন্ডগোল বা সেইরকম কিছু? একটা যুতসই শিরোনাম না দিতে পারলে ঠিক‚ ঠিক লাগে না| এই শিরোনামের অভাবে কত কত চুটকী আর লেখাই হয়ে ওঠেনি| (২) আগামী কাল সমুদ্রযাত্রা| গতবারের যাত্রায় আমরা এক দঙ্গল পরিবার গিয়েছিলাম আস্ত একটা বাস ভাড়া করে ক্যানবেরা থেকে একেবারে সোজা সিডনীর জাহাজঘাটা অবধি| এবার তো আমরা একাই‚ অন্য পরিবার তো ব্রিসবেন থেকে| দশ এগারো দিনের মামলা‚ সাথে মালপত্র তো থাকবে‚ ওদিকে সিডনীতে তেমন যাতায়াত নেই| জাহাজঘাটার ওদিকে তো নয়ই‚ গেলেও গাড়ী চালিয়ে বিখ্যাত সিডনী ফিশ (আপ) মার্কেটে মাছ কিনতে একবারই মাত্র| মাছের দোকান না মিষ্টির দোকান বোঝাই যায় না‚ দামও তেমনি সেখানে| ঐ একবারই| (৩) খোঁজখবর করা গেল; এটা ঠিক অপেরা হাউসের পাশেই‚ সেটা জানতাম কিন্তু বাসে ট্রেনে ট্যাক্সি করে কিভাবে যাবো? এই যাতায়াতের ব্যাপারে আমি একটু অ্যাডভান্স প্ল্যানে বিশ্বাসী‚ নেমে হাতড়ানো না-পসন্দ| এসব কি শুচিবায়ু? কে জানে! আর এই জন্যেই কোথাও যাবার নাম শুনলে ভাল লাগে ঠিকই কিন্তু প্ল্যান করবে কে‚ কে কিনবে টিকিট‚ কে করবে হোটেল বুকিং| পূর্বাশ্রমে কোম্পানী বাহাদুরের কৃপায় এসব ভাবতে হতো না‚ অ্যাডমিনকে বলে দিলেই হতো| এখন তো আপনা হাত! গতবারের যাত্রায় আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম‚ ওরাই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল আমি শুধু টাকা দিয়ে খালাস| সুবিধা হলো এরা‚ আমরা মানে গ্রুপের সকলে একই শহরের এপাড়া ও পাড়ার বাসিন্দা‚ কাজকর্মও মোটামুটি একই লেভেলের ট্যাঁকের অবস্থাও তথৈবচ‚ সুতরাং - all done! এমনিতে এক্সপ্রেস বাস যায় সিডনী ইন্ট্যারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট হয়ে সিডনী সেন্ট্রাল স্টেশন অবধি| আবার এখান থেকে দিনে একবারই মাত্র যায় আসে সবেধন তিন ডিব্বার ট্রেন- সিডনী সেন্ট্রাল অবধি| কিন্তু সেই তো কে পৌঁছাবে স্টেশন অবধি‚ তারপর ট্রেন থেকে নেমে কতদূর‚ খোদায় মালুম| সিডনীর ভূমিপুত্র‚ বন্ধুবর শ্রীমান কৌস্তুভ তো ডা ডা ডা করে একপ্রস্থ বলেই খালাস| সেন্ট্রাল পেরিয়ে তারপর Circular Quay স্টেশন তারপর একটু হাঁটলেই! একটু? হাউ মাচ ইজ একটু? তিনি নিজে তো spring chicken আর আমরা থুত্থুড়ে বৃদ্ধ| (আবাপ তে আমাদের সমবয়সীদেরকে ঐ নামেই তো অভিধা দিয়ে থাকে)| ওহ‚ বলতে ভুলে গেছি‚ সবকিছু বিবেচনা করে সাব্যস্ত করা হলো‚ সোজা সেল্ফ-ড্রিভেন গাড়ী করে সিডনীতে অন্য এক বন্ধুর কাছের স্টেশন থেকে ট্রেনে চাপবো| গাড়ীটা তাদের বাড়ীর সামনে রাখা থাকবে কদিন| চারটে'য় চেক ইন আমরা বাড়ী থেকে সাতটা‚ আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লে সাড়ে এগারোটা বারোটা নাগাদ সিডনী| মালপত্র সমেত বিবিজানকে লোক্যাল স্টেশনে নামিয়ে আমি বন্ধুর বাড়ী থেকে হেঁটে ফ্লেমিংটন স্টেশন অবধি| আমি ভাই শিয়ালদা স্টেশন থেকে যাতায়াত করা পার্টি‚ লোক্যাল ট্রেন সম্বন্ধে একেবারে ঘরপোড়া গরু| এদিকে দু একবার সিডনীর ট্রেনে চেপেছি তাও দূরের গন্তব্যে| অবশ্য সে ১০০/২০০ কিমি দূরের‚ এদের কাছে লোক্যালই‚ ঘন্টা সওয়া ঘন্টা লাগে| শান্তিপুর‚ রানাঘাট? নাকি আসানসোল দুর্গাপুর| কিন্তু এটা আসলী লোক্যাল ভিড় তো হয় সকালের দিকে| (৪) হে নিপীড়িত পুং spouse গণ| এবার আপনাদের সহানুভূতি কামনা করি| সুটকেশ গোছানো| "বোতল বিছানা বাক্স‚ রাজ্যের বোঝাই" তাও মোটে দশদিনের যাত্রায়? কিন্তু হে সহৃদয় জনগণ‚ দশদিন কি প্লেন অ্যান্ড সিম্পল দশদিন মাত্র? সর্বাধুনিক Cruise ship‚ টাইটানিকের ঠাকুর্মা প্রমোদ তরণী| কি আছে কি নেই গুগলেই দেখতে পাবেন| দশদিন সকাল বিকেল কি একই পোশাক শোভা দেয়? Nope! বিভিন্ন ডেকের নাম ও বিস্তৃতিও তেমন| কোনটা এসপ্ল্যানেড‚ কোনটা promenade সেসব ডেক এ ফুর ফুর করে লোকে ঘুরবে আর তিনি কিনা একই জামাকাপড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে! কাভি নেহী| তার উপর লাঞ্চ‚ ডিনার এবং ফুটনোট হিসাবে বিভিন্ন বন্দরে ঘুম ঘাম! বন্দরে অবশ্য বুড়ি ছোঁয়াই হয়‚ মেরে কেটে সাত ঘন্টা তার দুঘন্টা বাদ যায় নামা ও ওঠাতে| ৪৮০০ জন যাত্রী কি কম কথা! (৫) উনাকে স্টেশনে নামিয়ে বন্ধুর বাড়ী| বন্ধুর স্ত্রী সহৃদয়া‚ তিনি ডাল ভাত রেঁধে বসে আছেন; ওদিকে আমি তো টেনশানে‚ ট্রেনে উঠতে হবে‚ টিকিট কি করে কিনতে হয় তাই জানি না| বড় ৪-৫ প্ল্যাটফর্মের স্টেশন হলেও কি‚ নো ম্যানস ল্যান্ড; কোথাও কেউ নেই; সবই মেশিন! একজন বলে নিউজ এজেন্টের দোকান থেকে অ্যাডভান্স টিকিট কিনতে হবে তো অন্যজন বলে স্টেশনেই নাকি ভেন্ডিং মেশিন রয়েছে| গ্রামের লোক শহরের স্টেশনে গিয়ে লেজে গোবরে হবো কিনা কে জানে| তায় মালপত্রের বোঝা| তিন তিনটে উড়োজাহাজের কেবিন ফ্রেন্ডলি সুট্কেশ‚ পিঠব্যাগ ও এক হাতে তাঁর হাতে জল ও খাবারের থলি| হোয়াই জল? এখানে অব্শ্য যে কোন ট্যাপের জলই পেয় কিন্তু কোথায় পাবো তারে? একবার তো মেলবোর্ন এয়ারপোর্টে গলাকাটা দামে জল কিনতে হলো‚ ব্যাটারা সব ফন্দি করে দাম বাড়িয়ে রাখে‚ NSCBI তে কাগজের ওষুধের গেলাস সাইজে কুড়ি টাকা হাঁকে‚ নেতানো সিঙ্গাড়াও তথৈবচ‚ দেশে বিদেশে সকলই সমান| (৬) নিউজ এজেন্ট বললেন দশ দশ কুড়ির টিকিট যাতায়াত; আমাদের তো একপিঠ| কিন্তু কুনো অপশান ইল্লা| এদেশে এসে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা‚ গাঁট কাটার ব্যাপারে সরকারও কম যায় না| তবে তিনি সহৃদয়‚ বললেন ভেন্ডিং মেশিনে একপিঠের টিকিট মেলে| চল‚ চল হোথা| বিবিজান ঠায় দাঁড়িয়ে‚ বাবু চললেন টিকিট কিনতে| একটা WT হয়ে যাবে নাকি! মন বললো‚ লালুজীর জমানা থেকে সে গুড়ে বালি; তিনি এই মহৎ কার্য্যটি সুসম্পন্ন করেছিলেন সুচারু ভাবে‚ নো টিকেট‚ নো ট্রেনে চাপা; ধরা পড়লেই মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট| আজীব‚ আনকা মেশিন; কোথায় কি ঢোকাতে হবে কে জানে! কোথায় পয়সা‚ কোথায় বা নোট| তার উপর বোতাম কোনটা টিপবো? ধারে কাছে তো এক্জনও দেখিনে| তা ছাড়া কোন লাইনের টিকিট কিনবো‚ কোন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াবো| আইটি ভায়েরা অবশ্য মোটামুটি ফুল-proof সব কল বানিয়ে রেখেছেন| সবই তো আন্দাজে‚ আন্দাজে| বিশ টাকার নোট দিলাম‚ দাম ১০.৪০‚ ন'টাকা ষাট ফেরৎ পাবো কিন্তু তখন কে জানতো! খুচরো গুলো আর টিকিট পেয়েই খুশী‚ পরে নেমে এসে (মেশিনটা ওপর তলায়) মিলিয়ে দেখি একটা ৫ টাকার নোট ফেরৎ পাবার কথা‚ ফিরে গিয়ে দেখি চেঞ্জ হাওয়া| স্বাভাবিক| আমি জানতাম না‚ নোট কোন slit দিয়ে বেরোয়; সিঙ্গাপুরে দেখেছি একই chute দিয়ে বোধ হয়| রাগ ও বিরক্তি হলো‚ এ কেমন মেশিন রে বাবা‚ ফুল-প্রুফ হওয়াই তো উচিত| এই এক কল হয়েছে আজকাল‚ দেশে এটিয়েমে কার্ড ঢুকিয়ে বের করে নিতে হয়‚ এখানে কিছুক্ষণের জন্য মেশিনের ভিতর; নতুন মেশিন বসিয়েছে তাতে এক জায়্গা থেকে কার্ড ফেরত‚ অন্যটা থেকে রিসিট এবং অন্য chute থেকে টাকা; একবার তো অন্যমনস্ক ছিলাম বলে কিছুটা এগিয়ে এসেছি‚ এক্জন পিছন থেকে ডাকছে; টাকাই ভুলে এসেছিলাম‚ ভাগ্যিস টাকা তুললে ঐ বিশ‚ চল্লিশ বড় জোর দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট| একশো টাকার নোট তো চোখেই দেখি না‚ এখনও দেশের ছোটবেলায় ঢাউস ঘুড়ি সাইজের একশো টাকার নোটের মতো মূল্যবান; সাইজে ছোট কিন্তু buying power এ ভারী| এক দেড় পারসেন্ট ইনফ্লেশনের দয়ায়‚ পে রিভিশান হলেও তেমনি‚ মেরে কেটে আড়াই‚ পাঁচ বৃদ্ধি| (৭) ট্রেন ধরতে হবে‚ ভাগ্যিস লিফ্ট আছে নতুবা নিউ দিল্লী স্টেশনের মতো হলে আর সমুদ্রযাত্রা হতো ই না‚ অত মালপত্র নিয়ে কে সিঁড়ি ভাঙবে| অবশ্য এই স্টেশনের লিফট বসানোয় আমার বন্ধুটির অবদান অনেকটাই| তিনি মিউনিসিপ্যালিটির কাউন্সিলর‚ তাঁর স্ত্রীর ঘ্যানঘ্যানানিতে এবং স্থানীয় লোকজনের মন ও ভোট জয় করতে এটির আগমণ ত্বরান্বিত হয়েছে কারণ ঠিক ওপারেই সপ্তাহে আড়াই দিন হাট বসে| যৎসামান্য অবদান আমারও‚ এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগের সমান| ঐ যাকে পিপিএম (parts per million) বলে কর্পোরেশনের জলে দূষিত পদার্থের অনুপাত বোঝাতে| তাঁর ভোটের দিনে আমি ও আমার সহধর্মিণী লাইনে প্রতীক্ষারত ভোটদাতাদের হাতে লীফলেট বিতরণ করেছি এবং আমি (lo and behold) এখানকার হাইস্কুলের ভোট কেন্দ্রে তাঁর এজেন্ট ছিলাম‚ ভোট গণনার| এখনও কাগজের ব্যালট পেপার‚ ভোট শেষে সেই কেন্দ্রেই গণনা| বিরল অভিজ্ঞতা| উভয় দলের লোক‚ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই‚ হাতাহাতি নয়! কিছু কিছু বাঞ্চ দুবার ‚ তিনবার গোণা হয়‚ হিসাব না মিললে| বাধ্যতামূলক ভোট‚ তাই কিছু কিছু লোক তাদের ক্ষোভ উগরে দেন ব্যালট পত্রে| (৮) নাহ‚ ট্রেন ফাঁকাই| সব অফিস কাছারী খুব বেশী হলে নটা বা সাড়ে নটায় খোলে‚ বেলা সাড়ে এগারোটায় হাজির হওয়া এক্কেবারে নো নো! বেশীর ভাগ যাত্রীই তো আমার মতো নন-অফিসী লোক আর সিনিয়র সিটিজেনগণ‚ অফ-পীক আওয়ারে স্বল্পমূল্যের ভ্রমণ| আবার স্মরণ করিয়ে দিই‚ আমরা আক্ষরিক অর্থে গ্রাম থেকে মেট্রো শহরে‚ রীতিনীতিই ভিন্ন| চোখ ও কান খোলা রাখতে হচ্ছে গন্তব্য না পেরিয়ে যাই! মিটিমিটি হাসতে দেখে বিবিজান জিজ্ঞাসা করলেন কি হেতু? প্ল্যাটফর্ম অন দ্য রাইট সাইড‚ প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে এবং প্ল্যাটফর্ম ডাহিনে তরফ শুনতে হচ্ছে না| এত এত ইঞ্জিরী চলে‚ ব্যাঙ্ক থেকে বাসের নম্বর‚ গন্তব্য অবধি সেখানে রাইট‚ ডান বা ডাহিনে তরফের কি যুক্তি কান ঝালাপালা করা ছাড়া; আছে হয়তো কোন গূঢ় কারণ‚ বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি| তবে 'দরওয়াজা পাস পাস খুলতা হয়' হলো ক্লাসিক! কারণটা আমি অল্পবিস্তর অনুধাবন করতে পারি| পূর্বাশ্রমে প্রায় বছরখানেক রেল কোচ বিল্ডিং কোম্পানীর ডিজাইন অফিসে ও ফ্যাক্টরিতে ট্রেনিং পিরিয়ডে কাজ করেছি| বাঙালী অফিস‚ টেন্ডার অনুযায়ী তিন ভাষায় লিখতে গিয়েই বোধহয় এই চিত্তির! (৯) অবশেষে রেলযাত্রার সমাপ্তি‚ জাহাজঘাটার অব্যবহিত পাশেই রেল স্টেশন‚ নোঙর করা বিশাল ১৪ তলা Ovation of the Seas| টিপটিপ করে বৃষ্টি‚ ভাগ্যিস একটা বহু পুরানো ভাঙ্গা ছাতা‚ একটা শিক থেকে সেলাই ছেঁড়া| যতই আপেল বা স্যামসঙ মারাও না কেন‚ ছাতার কোন ছিঁড়বেই‚ তা সে ফোল্ডিং হোক বা অন্যকিছু| আসলে যত লোড কমানো যায়‚ গতবার Vanuyatu ও Noumea দ্বীপে প্রথমটায় চড়া রোদ দ্বিতীয়টায় বৃষ্টিতে বেশ নাজেহাল হতে হয়েছিল| ট্রপিকস তায় দ্বীপ‚ সোনায় সোহাগা| এবার নো রিস্ক‚ সিঙ্গল ইউজ ছাতা‚ আসবার পথে goes to the bin! জাহাজঘাটা তো লোকে লোকারণ্য‚ জাহাজের যাত্রীদের ভিড় তার উপর এটা আবার লোক্যাল ফেরিঘাটও বটে‚ সিডনীর নর্থ আর সাউথ shore এর মধ্যে‚ দূরত্ব অনেকটাই কমে‚ বাগবাজারের গঙ্গার ঘাট থেকে হাওড়া স্টেশন অবধি যেমন| ৪৮০০ তো জাহাজেরই যাত্রী| তায় ইমিগ্রেশন‚ ধীরে ধীরে‚ ব্যাগ ড্রপ করা‚ তেলের শিশি ১০০ সিসির কম‚ সবই হ্যাপা| কেন জানি না বহু বছর আগের মনিহারী ঘাটের কথা মনে ভেসে এলো‚ তখনও ফরাক্কার ব্রীজ হয়নি‚ আর জীবন নদী দিয়ে এত এত জলও বয়ে যায়নি‚ সেই ক-অ-অ-অ-বে! এদেশে ও আমেরিকাতেও দেখেছি লাইন একটানা লম্বা হয়না‚ জিগ জ্যাগ; তাতে করে মনে হয় না যে অত লম্বা লাইন‚ সিটি সেন্টার-২ থেকে হলদিরাম অবধি এটিয়েমের লাইনের মতো| যে পিছনে আছে সেও psychologically ভাবে এই তো সামনেই কাউন্টার! তবে লাইন ছোট হলে কি হবে‚ লাটসাহেবের বাড়ীর সামনে এসপ্ল্যানেড ম্যানসনে দ:পূ রেলের টিকিট কাউন্টারের লাইনের কথা ভাবলে এখনও গায়ে জ্বর আসে; ইন ফ্যাক্ট মাঝে মধ্যে দু:স্বপ্নে দেখি| সেই ঢাউস লেজার‚ টিকিটের পশ্চাদ্দেশে বার্থ নম্বর‚ আর পাশ থেকে কাউন্টারে হাত ঢুকিয়ে জিজ্ঞাসা করার মাস্তান| কপালে কি লেখা আছে জানা নেই তবে এই জীবনে আর ঐ লাইনে দাঁড়াতে হবে না সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত| তাই কি? NSCBI তে ঢোকার মুখে সিআরপির গেটে তো লাইন দিতেই হয়| নাহ‚ কালীদা আর পারি না| (১১) এঁকা বেঁকা লাইন হয়ে‚ সিকিউরিটি পেরিয়ে ক্যারি অন লাগেজ টানতে টানতে‚ ramp বেয়ে বেয়ে কখন যে জাহাজের খোলে ঢুকে পড়েছি খেয়ালই নেই| সেই পরিচিত পরিবেশ এই গতবছর ফেব্রুয়ারীতেই তো‚ সবে ১২ মাস হয়েছে; যদিও অত্যাধুনিক জাহাজ তবে একই কোম্পানীর জাহাজ কিনা‚ তাই lay-out একই রকম‚ যেন কতকালের চেনা| আর ধাক্কাধাক্কি নেই‚ ঘর অবধি পৌঁছুতে পারলেই হয়| লিফটে করে সোজা ছ'তলা‚ ওহ ডেক বলতে হয়‚ ডেক-৬‚ তলা ফলা চলবেনি কো| ঘরে ঢুকে‚ " AT LAST"‚ অপু জাহাজের কেবিনে ফেরৎ আসিয়াছে‚ সরি কেবিন বলতে হয় না‚ Stateroom! বিগার্ডেন থেকে ৫৫ নম্বরে হা: স্টেশন‚ সেখান থেকে ১০ নম্বরে ১০ পয়সার টিকিটে শিয়ালদা‚ দেড়টার ট্রেনে ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে‚ আরও দেড় দু ঘন্টা পরে ট্রেন থেকে নেমেই দে ছুট‚ বাসে জায়গা নিতে হবে| বাসে ঘন্টাখানেক বাদে‚ ইছামতীর খেয়াঘাট‚ পেরিয়ে হেঁটে রিকশায় এক মাইল‚ আবার টাবুরে নৌকা (ডিঙি‚ flat bottom)‚ তাতে করে আরও আড়াই ঘন্টা বাদে নিজেদের বাড়ীর ঘাট| ততক্ষণে প্রায় রাত্রির প্রথম প্রহর‚ হেরিকেনের আলোয় ঘাট থে বাড়ী‚ টিউ কলে হাত পা ধুয়ে তবে শান্তি‚ প্রথমেই এক থালা ভাত| আজকাল অবশ্য যৎসামান্য উন্নতি হয়েছে| এখানে? লাগেজ রেখে সোজা ডেক-১৪ এ‚ বুফে ২৪ ঘন্টার ডাইনিং হলে‚ তবু মন ও চোখ খুঁজে চলে কোন কাউন্টারে‚ কোন ট্রেতে রাজমা আছে; মূলো ভাজা দিয়ে মুগের ডাল এ জন্মে দেখতে পাবো না‚ তাই কঢ়ী চাওল ই সই| এবার নিশ্চিন্ত আগামী দশ দিনের জন্য| তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিল‚ কখন যে Juggernaut চলতে শুরু করেছে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে অপেরা হাউসের কমলার খোসা‚ দেশদ্রোহী চললো দেশভ্রমণে| (ছবি আসিবে পরে)

168

14

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

ক্লাস ওয়ানের ভর্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি| পরের বছর ক্লাস টুয়ের ভর্তির পরীক্ষাতেও| বাইরে থেকে তিনজন মত ছাত্র-ছাত্রী নিচ্ছিল তারা| আশ্রিত এবং আপনজনে ভরা সংসারের হাঁ ভরতে বাবা সকাল সন্ধ্যা উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেন| কলকাতায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি‚ তারপর সামান্য দোকান চালাতেন বাজারে| সে দোকানে আমিও বসতাম মাঝে মাঝে| গামছা‚ জামা কাপড় দিব্যি বিক্রি করতে শিখেছিলাম| বেশিরভাগ বাঙালি ভদ্রলোকেরা বাকির খাতায় নাম লিখিয়ে কাপড় নিয়ে যেতেন| পয়সা উসুল করতে ঘাম ছুটে যেত| আর আসতেন সাঁওতাল সম্প্রদায়‚ তক্ষুণি না পারলেও সময় নিয়ে ঠিক ঠিক পয়সা দিয়ে যেতেন তাঁরা| মা তখন বি.এ এর পড়াশুনো আর সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়ে হিমশিম| শ্বশুর-শাশুড়ি‚ দেওররা‚ আশ্রিত কয়েকজন‚ বাংলাদেশ এবং দেশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে বিরাট পরিবারের না বলে কয়ে আসা প্রায়দিনের আগত অতিথি‚ তিনচারটে গরু-বাছুর নিয়ে ব্যস্ত| দাদা ঠিক নিজের পড়াশোনা করে যেত| আমি ছিলাম লাগামছাড়া বাঁধনছেঁড়া! ঠাকুমাকে পাত্তাও দিতাম না| সারাদিন খেলাধূলো করে কেটে যেত| ক্লাস টুতেও ভর্ত্তি হতে না পারার পরে বাবার টনক নড়ল| কোমরবেঁধে আমার পেছনে পড়লেন| সকালবেলায় বাবা কলকাতার ট্রেন ধরলে স্বমূর্তি ধরতাম| বিকেলে খেলার মাঠে বলের পেছনে দৌঁড়তে দৌঁড়তেও কানটা থাকত ট্রেনের হুইসিলে| ভোঁ দিয়ে ট্রেন স্টেশনে ঢুকলেই মাঠ ছেড়ে এক দৌড়ে বাড়ি ঢুকে বই খাতা খুলে বসতাম| বাবা মুখ হাত ধুতে ধুতে‚ জলখাবার খেতে খেতে মুখে মুখে শিখিয়ে চলতেন| -What is your name? -What is your father’s name? -Where do you live? অঙ্কও শিখেছি মুখে মুখে| বীজগণিত| পড়াশোনার পর্ব শেষ হলে আরেক আতঙ্ক অপেক্ষায় থাকত| ছোট মাছ খেতে বমি পেত| বাবা পাশে বসিয়ে মাছ বেছে ভাতের গ্রাস মুখে ভরে দিতেন| গল্প বলতেন তার সাথে| গল্পের টানে মাছ- ভাত না চিবিয়ে স্রেফ গলাধ:করণ করে ফেলতাম| ক্লাস থ্রিয়ের ভর্তির পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম| কিন্তু ছোট থেকে স্কুলে না গিয়ে‚ স্কুলের চৌহদ্দিতে আটকে থাকার অভ্যাস তৈরী হয়নি| মায়ের জন্য মন আকুল হয়ে থাকত| একদিন পাঁচিল ডিঙিয়ে স্কুল পালিয়েছিলাম| বাড়ির দুয়ারে বসে মায়ের জন্য অপেক্ষা চলত| মা কলেজ করে আসবে‚ তবে খাব| ঠাকুমা নাস্তানাবুদ হয়ে যেত আমাকে খাওয়াতে পরাতে| গজগজ করত সারাদিন| পরেরদিন স্কুলে ঢুকতেই বড়দিদিমণির এক চড়! ক্লাস ফোরের পরীক্ষায় বাবা প্রশ্নপত্র ধরে ধরে জিজ্ঞেস করছেন| এটা লিখেছ? এটা পেরেছ? -একটাই পারিনি‚ বাবা| ইংরাজীতে অনুবাদ- “ আমি আপেল খাই|“ আপেলের ইংরাজী জানিনাযে! -কি বোকা ছেলে! আর একদিন মা নেই| আমার পোষা টমি কুকুর কোথা থেকে একটা মস্তবড় হাড় এনে চিবোচ্ছে| আমি কাছে গিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে বলছি‚ না টমি‚ নোংরা জিনিস খায়না| বিরক্ত টমি এক কামড় দিল হাতের পাতায়| বাবা আমাকে কোলে তুলে টমির পেছন পেছন খালি পায়ে অনেকটা পথ দৌঁড়েছিলেন তাকে মারবেন বলে.......| ………………………………… অনেকবার করে শোনা গল্প সব| আবারও শুনছিলাম দেববাবুর থেকে| গতকাল তাঁর বাবা চলে গেলেন|

1771

140

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

সিটি বা উল্ফ হুইসল তখনো বেশ ছোট| একটু বড় দিদিদের সাথে রাস্তায় বেরোলে রকে বসা ছেলেরা সিটি বাজাতো| দিদিরা চোখ কড়া করে নাক কুঁচকে ঘুরে অব্জ্ঞা দেখিয়ে আমাদের নিয়ে রাস্তা পার হয়ে যেত| আমরা যতদিনে বড় হয়েছি সিটির চল উঠে গেছে| আমাকে দেখে কেউ কোনদিন সিটি মেরেছে মনে পড়ে না| বরং আমাদের গ্যাংটা একটু টমবয়িশ ছিল| আমি তো পুরো ই টমবয় ছিলাম| শিস দেওয়া রপ্ত করেছিলাম বেশ ছোটবেলাতেই| মা শাসন করতো বলে মায়ের আড়ালেই চলতো শিস দেওয়া| মায়ের লজিক ছিল মেয়েরা শিস দেয় না| এই লজিক টা চিরকাল ই বোগাস মনে হয় আমার| তাই টিপিক্যালি মেয়েরা যেগুলো করে না সব ই আমি করার চেষ্টা করতাম| জোর করে না| স্বত:স্ফূর্ত ভাবে আসতে বলেই| ৩/4 জন একসাথে আছি ‚ একটা ছেলে সামনে দিয়ে যাচ্ছে‚ আমরাই তাকে গান গেয়ে‚ আওয়াজ দিয়ে নাকাল করতাম‚ এরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে| সিটি না দিতে পারলেও শিস দেওয়া ভালো ই পারতাম| কিন্তু ছেলেদের সিটি বাজানো ৮০/ ৯০ এর দশকে শুনি নি কখনো| এমনকি সিনেমাতেও চোখে পড়তো না| ৬০ এর দশকের সিনেমায় দেখেছি - তনুজা রাস্তা পার হচ্ছে‚ রকে বসে সৌমিত্র ও ওনার সাথীরা সিটি দিচ্ছে‚ তনুজা রাগ রাগ চোখে তাকাচ্ছে| এরপরে সব আমাদের জেনের ছেলেদের দেখলাম কেউ সিটি তো দূর শিস ও দিতে পারে না| সবাই খুব অবাক আর অ্যাপ্রিসিয়েটিভ হত আমার স্কিল দেখে| আর আমি ভাবতাম ৭ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধা জননী <img class="emojione" alt="😋" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F60B.png?v=1.2.4"/> এসব ভুলেই গেছিলাম| আজ বিবিসিতে এডিটর্স পিক পড়ে আবার মনে পড়ে গেল| ফ্রান্সে ল মেকাররা ৯০ ইউরো (আমাদের টাকায় ৭০০০ এর কিছু বেশি) ফাইন করার কথা ভাবছেন উল্ফ হুইসল আর ক্যাট কলিং এর জন্য| উল্ফ হুইসল - ১৯৪৪ এর মুভি To have and have not| একসাথে বসে ট্রেডিং করতে করতে নায়িকা ব্যাকাল হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে চুমু খেয়ে ফেলে নায়ক বোগার্টকে| নায়ক কিংকর্তব্যবিমূঢ়| নায়িকা বেরিয়ে যেতে যেতে ছুঁড়ে যায় তির্য্যক মন্তব্য - আর কিছু না পারো ঠোঁট দুটো একসাথে জুড়ে উল্ফ হুইসল দেওয়ার চেষ্টা তো করতে পারো| তারপরে হিস্ট্রি| নায়্ক সাথে সাথে লম্বা হুইসল দেয়| সাংঘাতিক ছিল তাঁদের অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি| শ্যুটিং ফ্লোরেই শুরু তাঁদের রোম্যান্স| সিনেমা রিলিজ হতেই বিয়েও করে ফেলেন| ততদিনে উল্ফ হুইসল ফ্যাশনের তুঙ্গে| রাস্তায় ঘাটে মেয়ে দেখলেই উঠতি যুবকরা মুখে দু আঙুল পুরে সিটি দিতে ব্যস্ত| ইন ফ্যাক্ট সিটি দিতে কেউ না পারলে তা বেশ নট ম্যানলি বলেই গণ্য হত| কি এই উল্ফ হুইসল| অনেকে ভাবতেন নাবিকরা এই হুইসল নিজেদের মধ্যে ব্যবহার করতো অর্ডার দেওয়ার জন্য| কিন্তু অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় পার্বত্য অঞ্চলের রাখালদের মধ্যে এর ব্যবহার| নেকড়ে বাঘ দেখা দিলে পরস্পরকে আর নিজেদের পাহারাদার কুকুরদের সতর্ক করার জন্য রাখালরা মুখের মধ্যে দু আঙুল পুরে এই লম্বা সুউচ্চ আওয়াজের শিস দিত| কিন্তু লোক সমাজের এর ব্যবহার শুরু হল কি করে? ১৯৩৭ সালে রেড রাইডিং হুড কার্টুনে টেক্স অ্যাভেরি এর ব্যবহার করেন| গল্পের উল্ফ এই সিটি বাজাতে বাজাতে ছোট্ট রেড রাইডিং হুডকে তাড়া করে ফিরছিল| ইন ফ্যাক্ট সে এই টা করার জন্য একটা মেশিন ই বার করে ফেলে| শেষে মাথায় হাতুড়ি পড়তে সে নিরস্ত হয়| তবে উল্ফ হুইসল তুমুল জনপ্রিয় এর সিকুয়েলে| রেড হট রাইডিং হুড| রেড রাইডিং হুড তখন বার সিঙ্গার| উল্ফ হোটেলে গিয়ে তাকে দেখে পাগল হয়ে যায়| লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গড়াগড়ি দিয়ে হাস্যকর কান্ড করতে থাকে‚ তার সাথে অবশ্যই থাকে উল্ফ হুইসলের ঢল| তাজ্জব ব্যাপার‚ এই সিনেমাটা সেক্সুয়ালি এত প্রোভোকেটিভ ছিল যে কার্টুন হওয়া সত্ত্বেও সেন্সর বোর্ডের খাঁড়ার কোপে পড়ে| কিন্তু তখন দ্বিতীয় বিশ্বাযুদ্ধের সময়ে‚ তাই ইউএস গভর্নমেন্ট সেন্সরের আওতা থেকে বাঁচিয়ে এই সিনেমা চালু রাখেন| কারণ? এত সেক্সুয়ালি প্রোভোকেটিভ সিনেমা দেখে সৈন্যদের যৌন আকাংখ্শা বেড়ে যাবে আর তারা হতাশ হয়ে পড়বে| আর যত হতাশ হবে তত তারা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে| সেই সময়ে এমন কোন অ্যামেরিকান সৈন্য ছিল না যিনি রেড হট রাইডিং হুড দেখেননি| সমস্ত অল্প বয়সী ছেলেদের ও দেখা হয়ে গেছিল এই সিনেমা| ফল? যারা তখনো উল্ফ হুইসল করতো না‚ সিনেমা দেখার সাথে সাথেই তারাও শুরু করে দিতে হুইসলিং| তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলো হুইসলিং| উল্ফ হুইসলিং প্রথম ধাক্কা খায় অ্যাফ্রিকান অ্যামেরিকান টিলের মৃত্যুতে| ১৪ বছরের টিল বাজারে এক সাদা চামড়ার মেয়েকে দেখে সিটি বাজিয়েছিল| তাকে কিডন্যপ করে অমানুষিক মেরে‚ গুলি করে‚ গলায় প্লেনের পার্ট্স বেঁধে জলে ডুবিয়ে দেয় আততায়ীরা| টিলে মা জোর করে ওপেন কাস্কেট বেরিয়া করেছিলেন টিলের‚ পৃথিবী দেখানোর জন্য কি নারকীয় অত্যাচার করা হয়েছে ১৪ বছরের এক কিশোরের ওপর| সিভিল রাইট্স মুভমেন্টের স্লোগান হয়ে ওঠে টিলের মৃত্যু | উল্ফ হুইসলের জনপ্রিয়তার পতন ও শুরু সেই থেকে| এরপরে ফেমিনিজমের শুরু থেকে কফিনে পেরেক গাঁথা শুরু উল্ফ হুইসলের| ৫০/ ৬০ দশকের নির্ভেজাল মজা কয়েন্ড হয় নারী অবমাননার প্রতীক হিসেবে| আর একটা কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার‚ If you r in France, never wolf whistle, else you will find your pocket lighter by 90 Euros. ☺

1275

92

ঝিনুক

জাপানী প্রেমিক

গল্পের শুরু এক বৃদ্ধাবাস থেকে| শহরের অন্যতম নামী এবং দামী পরিবারের প্রবীণতমা সদস্যা অশীতিপর অলমা বেলাসকো| প্রাসাদোপম ঘরবাড়ি‚ আত্মীয়-পরিজন‚ নেশা-পেশা সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এসে সেই বৃদ্ধাবাসের বাসিন্দা হয়ে গেলেন একদিন হঠাৎ| লোকজনকে অবাক করে দিয়ে নিয়ম করে কে যেন চিঠি পাঠায় হলুদ খামে ভরে অলমার জন্য‚ সাথে একগোছা গন্ধরাজ ফুল| গোপন প্রেমিক? আশি পেরিয়ে!! সালটা ১৯৩৯‚ অলমার বয়স তখন মাত্র সাত ……যুদ্ধের দামামা বাজছে সারা বিশ্ব জুড়ে‚ তবে পোল্যাণ্ড তখনও পুরোপুরি হিটলারের দখলে চলে যায় নি‚ অসউইৎজের দু:স্বপ্ন সত্যি হতে তখনো কিছুদিন বাকি| আসন্ন সেই অশনিসঙ্কেত থেকে বাঁচাতে স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে এক দু:সম্পর্কের মাসি আর মেসোর কাছে মেয়েকে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলেন অলমার নিরুপায় বাবা-মা| ড্যানজিগ থেকে যখন জাহাজ ছাড়লো অলমা আর তার গভর্নেসকে নিয়ে‚ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন অলমার বাবা‚ পাশেই মায়ের কান্নায় ভেঙে পড়া চেহারা শেষবারের মত দেখতে দেখতে অলমা দাঁড়িয়েই থাকলো ডেকের রেলিঙ ধরে‚ এমনকি বাবামায়ের চেহারা ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাবার পরেও| তিন মাস আগে ঠিক এই জেটি থেকেই জাহাজ ছেড়েছিল তার দশ বছরের বড় দাদাকে নিয়ে‚ লণ্ডনের উদ্দেশ্যে‚ না নিরাপত্তার নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপের পানে নয়‚ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে চলে গেছিল অলমার দাদা স্যামুয়েল মেন্ডেল| এই সুদূরভ্রমণ এবং বিদেশবাসের ব্যবস্থা নিতান্তই সাময়িক‚ যুদ্ধ শেষ হলেই তারা সবাই আবার একসাথে হবে‚ জীবন আবার আগের মত নিশ্চিন্তে বয়ে যাবে…… যতই আশার বাণী শোনাক না কেন তার বাবা-মা‚ মুছে যাওয়া তটরেখার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে শরীরের প্রত্যেকটা কোষ অলমার চিৎকার করতে থাকে‚ এই শেষ‚ আর কোনদিন দেখা হবে না বাবা-মায়ের সাথে| মোট সতেরো দিনের যাত্রাপথ --- ড্যানজিগ থেকে লণ্ডন হয়ে সাউদাম্পটন‚ সেখান থেকে ট্র্যান্স-অ্যাটলান্টিক ফেরিতে স্যান ফ্র্যানসিসকো| প্রথম দুতিনদিন কাটলো সী-সিকনেসে‚ তারপর বিরক্তি আর ক্লান্তিতে| চিৎকার চেঁচামেচি করে কান্নাকাটি করা অলমার স্বভাবে বা শিক্ষায় নেই‚ মায়ের জন্য নীরবে লুকিয়ে কাঁদে অলমা| জাহাজ যখন স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে পৌঁছালো‚ মাসি লিলিয়ান‚ মেসো আইসাক‚ দুই মাসতুতো দিদি মার্থা আর সারা আর দাদা ন্যাথানিয়েল‚ অভিজাত বেলাসকো পরিবারের সব সদস্যই হাজির তখন জাহাজঘাটায় অলমাকে স্বাগত জানাতে| আইসাক বেলাসকো বিশাল ধনী‚ শুধু অর্থে আর প্রতিপত্তিতেই নয়‚ হৃদয়ে ও মানবিকতাতেও| মাতৃময়ী লিলিয়ানও আইসাকের যোগ্য সহধর্মিণী| ভাইবোনেরাও তিনজনেই ভারি ভালো| মস্ত প্রাসাদের একখানা সুবিশাল ঘর অলমার জন্য সাজিয়ে রেখেছেন মাসি আর মেসো| মা-বাবাকে কেউই প্রতিস্থাপন করতে পারে না‚ তবু আইসাক আর লিলিয়ান পরম মমতায় আর ভালোবাসায় অলমাকে ভরে দিতে চেষ্টা করলেন‚ গভীর স্নেহে তাকে কাছে টেনে নিলেন| প্রথম মাস কয়েক লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদলো অলমা আর ডায়রিতে লেখা হতে থাকলো মা-বাবার জন্য মনখারাপ| আস্তে আস্তে চোখের জলও ফুরিয়ে আসতে থাকলো‚ সেই সাথে বাবা-মায়ের সাথে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাও| ধীরে ধীরে অলমা বেলাসকো পরিবারের একজন হয়ে উঠলো| বিশেষ করে ন্যাথানিয়েলের সাথে অলমা একেবারে এঁটুলির মত লেগে থাকে| আসলে বয়সের দিক থেকে তেরো বছরের ন্যাটই অলমার সবচেয়ে কাছের| উঠতে ন্যাট‚ বসতে ন্যাট‚ ন্যাট ছাড়া অলমার দুনিয়া অন্ধকার| কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট‚ নরম স্বভাবের ন্যাটও বড় দাদার মতই অলমার সব আবদার আর উপরোধের কর্ণধার| অলমার সব দু:খসুখের একান্ত খবর শুধু ন্যাটের কর্ণকুহরের জন্যই| এতটাই নির্ভর ন্যাটের উপর যে প্রথম ঋতুদর্শনে আতঙ্কিত অলমা ন্যাটের শরণাপন্ন হয়‚ লিলিয়ানের নয়| এই ন্যাটের হাত ধরেই অলমার সঙ্গে পরিচয় হয় ইচিমেইয়ের‚ বাগানের জাপানী মালী টাকাও ফুকুদার ছোট ছেলে‚ আট বছর বয়স| শান্ত স্বভাবের ছোটখাটো চেহারার ইচিমেই‚ শিল্পীর যত্নে বাগানের পরিচর্যা করে‚ ছবি আঁকায় আর মার্শাল আর্টে তুখোড়‚ ন্যাটকে সে সেই সব কৌশল শেখায় আর আলমাকে শেখায় ফুল-লতা-পাতা| প্রথম দেখার মুহূর্ত থেকেই দু'জনায় তুমুল বন্ধুত্ব| বয়সে এক বছরের ছোট হলেও অলমার বাড়ন্ত গড়ন আর দাপুটে স্বভাবের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বিনয়ী‚ অনুগত ইচিমেইর বেশি সময় লাগে না| বাল্যপ্রণয় কুসুমিত হতে না হতে বিচ্ছেদের ঘন্টা বেজে গেল| সেই সর্বনাশা যুদ্ধ| ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাস‚ পার্ল হারবারে বোমা ফেললো জাপান| অ্যামেরিকা জুড়ে শুরু হয়ে গেল জাপানী বিদ্বেষ| পরের বছর অগাস্ট মসের মধ্যে নারী-পুরুষ‚ শিশু-বৃদ্ধ‚ সুস্থ-অসুস্থ নির্বিশেষে এক লাখ কুড়ি হাজারেরও বেশি জাপানীকে উদ্বাসন দিয়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অন্তরীণ করা হল| তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে এসে সে দেশটাকেই দেশ বলে মেনে নিয়েছে বহু বহু বছর আগে‚ ইচিমেইয়ের মত অনেকের জন্মই হয়েছে অ্যামেরিকাতে‚ তারা জন্মসূত্রে সে দেশের নাগরিক| তবু তারা জাপানী| হিংসা কোন যুক্তির ধার ধারে না| এমনকি আইসাকের টাকা বা প্রতিপত্তিও কোন কাজে দিল না| টাকাওকে পরিবার নিয়ে উদ্বাসনের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হল| যাবার আগে অলমার কাছে বিদায় নিতে এসে দাঁড়ালো ইচিমেই| পাগলির মত ইচিমেইকে ধরে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলো অলমা‚ কেন‚ কেন‚ কেন? কেন তারা চলে যাচ্ছে? কেন যে যাচ্ছে‚ কোথায় যাচ্ছে‚ আর কখনো দেখা হবে কিনা….. এর কোনটার উত্তরই ইচিমেইয়ের কাছে ছিল না সেদিন| 'চিঠি দিও'‚ 'চিঠি দিও'‚ দুজনার আর্তিটুকু শুধু পড়ে রইলো ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া বাসের পিছনে| অলমা স্বাধীন‚ চিঠি লেখায় কোন বাধা তার নেই‚ কিন্তু ইচিমেই? তার সব চিঠিকে তো ক্যাম্পের সেন্সর বোর্ড পার করে যেতে হয়| অকরুণ হাতে কাটাছাঁটা হয়ে সেই চিঠি যদি বা অলমার হাতে পৌঁছায়‚ পড়ে তার অর্থ খুঁজে পাওয়া ভার| তবু অলমা প্রত্যেকটা চিঠি জমিয়ে রাখে আর হাজারবার পড়ে| অনেক ভেবে ইচিমেই একটা উপায় বার করলো‚ লেখা ছেড়ে ছবি এঁকে পাঠাতে শুরু করলো সে| পেন্সিলের রেখায় তার বন্দী জীবনের টুকরো টাকরা গল্প‚ অলমার সঞ্চয় ভরে উঠতে থাকে সেই সব ছবিময় চিরকুটে| বছরখানেক কাটলো‚ ধীরে ধীরে ইচিমেইয়ের চিঠি লেখায় ভাটা পড়তে পড়তে একসময়ে বন্ধই হয়ে গেল| ওদিকে অলমা আশায় আশায় রইলো প্রায় বছরখানেক| তারপর আস্তে আস্তে একদিন সেই আশার প্রদীপ নিভে এল‚ যেভাবে এক এক করে নিভিয়েছে সে বাবা-মা-দাদার জন্য জ্বেলে রাখা প্রদীপগুলি| আপাতদৃষ্টিতে অভ্যাস হয়ে গেল বন্ধুর নীরবতায়‚ কিন্তু ভিতরে ভিতরে চলতে থাকলো এক অনি:শেষ কথোপকথন‚ ডায়রির পাতায় পাতায় ফুটে উঠতে থাকলো তার ছাপ| কেউ জানলো না সে কথা শুধু ন্যাট ছাড়া| এদিকে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সেই ন্যাট চললো হার্ভার্ডে ল পড়তে| অলমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো| শুধু কি প্রিয়বিচ্ছেদই লেখা আছে তার কপালে‚ প্রথমে দাদা‚ বাবা-মা‚ তারপরে ইচিমেই আর এবার ন্যাট? ন্যাট যতই সান্ত্বনা দেয়‚ 'চিঠি লিখব‚ ছুটিতে তো আসবই'‚ অলমা শুনতে চায় না| ইচিমেইও তো বলেছিল চিঠি দেবে…… ১৯৪৫-এর অগাস্ট মাসে জাপান আত্মসমর্পণ করার পরে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বন্দীদের ছেড়ে দেওয়া শুরু হল| দুই সন্তান হারিয়ে বহু দু:খদিনের শেষে আবার স্বাধীনতা‚ ফুকুদা পরিবারের নতুন জীবনযুদ্ধ শুরু হল আরিজোনায়| ইচিমইয়ের তখন চোদ্দ বছর বয়স| আঙুলের যাদুতে বাগানে ফুল ফোটাতে পারে সে অবলীলায়‚ সাবলীল ছবি আঁকতে পারে‚ কিন্তু পড়াশোনায় তেমন একটা দড় নয় ইচিমেই‚ দিদি সাথে করে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিল| শুরু হল পড়াশোনা‚ শুরু হল বড় হয়ে ওঠা‚ শুরু হল বাঁচার লড়াই| প্রাণপণ চেষ্টায় স্কুলের গণ্ডিটুকু পেরোল সে কোনক্রমে| ইচিমেইয়ের এক বছর আগেই অলমা স্কুল শেষ করল আর ন্যাটের পিছে পিছে হাজির হল বস্টনে| মাসির মোটেই ইচ্ছে ছিল না অলমাকে অতদূরে পড়তে পাঠানোয়‚ বরং উপযুক্ত ঘরেবরে সম্প্রদান করে দিতে পারলেই তিনি খুশি হতেন‚ চেষ্টারও কিছু কমতি ছিল না তাঁর পক্ষ থেকে| কিন্তু মেসো রইলেন অলমার পক্ষে‚ ওনার দাক্ষিন্যে অসুবিধে তেমন হল না‚ অলমা চলে গেল পড়তে বস্টনে| বস্টনে পৌঁছেই সে ন্যাটকে জানালো লিলিয়ানের পাত্র খোঁজার কথা‚ জানাল ইচিমেই ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করতে পারবে না| ন্যাট বোঝাতে চেষ্টা করলো যে ইচিমেইয়ের হয়তো মনেই নেই তাকে আর যদি বা থাকেও মনে‚ যদি কোনদিন সে ফিরেও আসে‚ তাহলেও এ বিয়ে সম্ভব নয়| শুধু যে দু'জনে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশীয়‚ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ তাই নয়‚ আর্থসামাজিক দিক থেকে তারা দুইজনে দুই পৃথিবীর বাসিন্দা| এ বিয়ে হলেও অলমা সুখী হবে না কক্ষণো| অলমা ঘোষণা করলো সে আজীবন অবিবাহিতাই থাকবে তাহলে| পাস করে ফিরে গেল ন্যাট স্যান-ফ্র্যানসিসকোতে পরের বছর| মাসি চেয়েছিল অলমাও ফিরে আসুক ন্যাটের সাথে| কিন্তু অলমা ততদিনে খুঁজে পেয়েছে তার পথের দিশা‚ Design and Painting…. পড়াশোনা শেষ করে সিল্ক স্ক্রীন পেইন্টিঙ নিয়ে কাজ করবে সে‚ অনেক স্বপ্ন তার‚ দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবে তার কাজ নিয়ে| আস্তে আস্তে স্বভাব চরিত্রেও বদল আসতে থাকে অলমার‚ আত্মবিশ্বাস বাড়ে‚ মাসির আদর আর বৈভব থেকে অনেক দূরে একা নিজের কাজ গুছিয়ে করার অভ্যাস তৈরী হয়| যৌবনের উপবনে ভ্রমরের গুঞ্জন চিরকালই অনিবার্য‚ একজন‚ দু'জন‚ তিনজন……. অলমার সদ্যযুবতী শয্যা উষ্ণ করতে সঙ্গীর অভাব হয় না‚ কিন্তু কেন যেন অলমার মনে হয় ইচিমেই যেভাবে বাজাতে পারত তার শরীরের তানপুরাটা‚ সেভাবে আর কেউ পারে না‚ পারবে না| শরীর পেরিয়ে সম্পর্ক আর মনের গভীরতায় পৌঁছোয় না কারো সাথেই| চার বছর পরে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এল অলমা‚ তার বয়স তখন একুশ| ন্যাট ততদিনে প্রতিষ্ঠিত উকিল‚ বাবার আইনের ব্যবসা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে‚ মাসি লিলিয়ানের চুল সব পেকে গেছে‚ কানেও প্রায় শোনেনই না বললে চলে‚ মেসো আইসাক হার্ট অ্যাটাক সামলে উঠে ভারি দুর্বল হয়ে পড়েছেন| অলমাকে দু'জনেই অসম্ভব স্নেহ করেন‚ তাকে ফিরে পেয়ে ভীষণ খুশি হলেন‚ বিশেষ করে আইসাক| বাগান করতে খুব ভালোবাসতেন তিনি‚ অলমার হাত ধরে নতুন উদ্যমে বাগানে গাছপালা নিয়ে মেতে উঠলেন| এমন সময়ে একদিন আরিজোনা থেকে ইচিমেইয়ের ফোন এল আইসাকের কাছে| প্রায়াত বাবার শেষ ইচ্ছে পূর্ণ করতে তাকে আসতে হবে আইসাকের সাথে দেখা করতে বিশেষ প্রয়োজনে| খবরটা শোনামাত্রই আনন্দে লাফিয়ে ওঠে অলমা| বারো বছর পরে আবার দেখা হল ইচিমেইয়ের সাথে| দরজা খুলে ইচিমেইকে স্বাগত জানল অলমাই‚ তাকে চমকে দিয়ে জাপটে ধরে উন্মাদের মত চুমু খায় অলমা| ইচিমেইয়ের জন্য একটা নার্সারির ব্যবস্থা করে দেন আইসাক| মা আর দিদিকে নিয়ে ইচিমেই আবার ফিরে আসে স্যান-ফ্র্যানসিসকোতে‚ সালটা ১৯৫৫| শুরু হয় অসমাপ্ত প্রণয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়‚ একটু একটু করে পুরাতন প্রেম নতুন শিখায় জ্বলে ওঠে| প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা দু'জনার গোপন অভিসার শুরু হয়| একটা সস্তার মোটেলে যেখানে অলমাকে কেউ চিনবে না‚ ঘর ভাড়া করে অলমা রোজ| ইচিমেই তার যাদুস্পর্শে অলমার শরীরের বীণায় ঝঙ্কার তোলে‚ অলমা দেবীর মত পূর্ণ করে ইচিমেইয়ের বাসনা| অলমা বাড়িতে দোহাই দেয় সান্ধ্য ক্লাসের‚ শুধু ন্যাট জানে অলমা আর ইচিমেইয়ের প্রণয়ের কথা| তবে জানে মানেই যে তার সমর্থন আছে এই সম্পর্কের ব্যাপারে তা নয়| ইচিমেইয়ের মত একজন সামান্য মালির মধ্যে যে অলমা কি দেখেছে সে বুঝে উঠতে পারে না| ধনে-মানে তো নয়ই এমনকি ইচিমেইয়ের নিতান্ত ছোটখাটো চেহারার মধ্যেও কোন পুরুষোচিত সৌন্দর্যের ছায়ামাত্রও নেই| অলমার বড়সড় সম্ভ্রান্ত চেহারার পাশে তাকে যে কি বেমানান দেখায়! স্বভাবে চরিত্রেও দুজনে একেবারে বিপরীত| মনে মনে সে শুধু আশা করতে থাকে‚ অলমা একদিন ঠিক বুঝতে পারবে তার ভুল‚ নিজেই সংশোধন করে নেবে নিজেকে| অঘটন অথবা বলা ভালো ঘটনা ঘটতে সময় বেশি লাগলো না| যে মুহূর্তে অলমা বুঝ্তে পারল সে গর্ভবতী‚ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো তার| বুদ্ধিমতী‚ আপাতদৃষ্টিতে বয়সের তুলনায় যেন একটু বেশীই পরিণত‚ কিন্তু অন্তরে অন্তরে আদতে ছেলেমানুষ অলমা কেন যেন এই সম্ভাবনাটা সব ইক্যুয়েশনের বাইরে রেখে প্রেমের খেয়া ভাসিয়েছিল| সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটে যাবার পরে তার বোধোদয় হল‚ কাজটা ঠিক হয় নি| ইচিমেইকে সে বলতে পারবে না‚ কিছুতেই না| কারণ ইচিমেই জানতে পারলে এই শিশুর দায়িত্ব নিতে এক মুহূর্তের দ্বিধাও করবে না‚ সে নিশ্চিত জানে যে এই খবর পেলেই ইচিমেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে| কিন্তু ইচিমেইকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়‚ এই ব্যাপারে ন্যাট একশোভাগ ঠিক| দুদিনও টিকবে না তাদের প্রেম এই বিয়ে হলে| অগত্যা সে গিয়ে তার অগতির গতি ন্যাটের বুকে আছড়ে পড়লো| ইচিমেইয়ের মত মানুষ পৃথিবীতে দুর্লভ‚ সে কারো ক্ষতি চায় না‚ নির্লোভ‚ অজাতশত্রু‚ অমিত পরিশ্রমী মানুষ সে কিন্তু তার কোন উচ্চাকাঙ্খা নেই‚ সে অল্পে সন্তুষ্ট‚ প্রায় সাধু-সন্তের মত জীবন তার‚ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছুতে তার কোন আগ্রহ নেই| 'ইচিমেইকে আমি বড্ড ভালোবাসি‚ ভালোবাসবো‚ যতদিন বাঁচবো‚ কিন্তু ওকে বিয়ে করে ঐ টিনের বাড়িতে গিয়ে মালির বউ হয়ে জীবন আমি কাটাতে পারবো না ন্যাট'‚ অলমার স্বীকারোক্তি| প্ল্যান-প্রোগ্র্যাম সব তার করা হয়ে গেছে| শুধু ন্যাটের সমর্থন আর সহায়তা দরকার তার এই বিপদ থেকে মুক্তি পেতে| অলমার জন্য ন্যাট যে কোন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে| কাজেই পছন্দ না হলেও অলমার বেআইনী পরিকল্পনা মেনে নিতে হয় তাকে| পনেরো ঘন্টা ড্রাইভ করে সে অলমাকে নিয়ে যায় মেক্সিকোতে অ্যাবরশন করাতে| কিন্তু মেক্সিকো পৌঁছে একশো ডলার হস্তান্তরিত করার পরে তারা বুঝতে পারলো হাতুড়ের পাল্লায় পড়েছে| বোঝামাত্র ন্যাট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল‚ সে বিয়ে করবে অলমাকে| 'না' বলার মত মনের জোর অলমা জোগাড় করে উঠতে পারল না| পার্থিব সুখসুবিধার ঊর্ধ্বে নিজের ভালোবাসাকে রাখতে না পারার লজ্জায়‚ ন্যাটকে এইভাবে জড়িয়ে ফেলার আত্মধিক্কারে মরমে মরে যেতে থাকে অলমা| কিন্তু মনের ভাব মনের বাইরে প্রকাশ করার চেয়ে লুকিয়ে রাখতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ‚ সেই ছোটবেলা থেকেই| মেক্সিকো থেকে ফিরে এসে ইচিমেইয়ের সাথে আবার দেখা হল| ইচিমেই অনুভব করতে পারলো কোথায় যেন তার ছিঁড়ে গেছে| প্রথম কয়েক দিন ইচিমেইয়ের সব প্রশ্ন এড়িয়ে গেল অলমা নানা ছলনায়| কিন্তু শেষে বলতেই হল‚ না না তার গর্ভস্থ সন্তানের কথা নয়| বলতে হল‚ সে আর দেখা করতে আসতে পারবে না‚ বাড়িতে সবাই সন্দেহ করছে‚ এভাবে আর চলবে না| সে লণ্ডনে চলে যাবে পড়তে| আর তাদের এই সম্পর্কের তো আর সত্যি সত্যি কোন সফল পরিণতি সম্ভব নয়‚ তার চেয়ে এখানেই পরস্পরের কাছে চিরতরে বিদায় নেওয়া ভালো| অসম্ভব দীর্ঘ এক নীরবতার পরে ইচিমেই জানালো সে বুঝেছে‚ শান্ত দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল‚ Forever is a long time, Alma. I think we’ll meet again in happier circumstances or other lives….. বিয়ে হয়ে গেল ন্যাট আর অলমার‚ কোনভাবেই দ্বিচারিণী হবে না সে‚ I won’t fail you, I’ll always be faithful…. প্রতিজ্ঞা করল অলমা ন্যাটের কাছে বিয়ের রাতে| স্থিতধী ন্যাট জবাব দিল‚ "Let’s not make promises we might not be able to keep. We’re going to travel this path together, step by step, day by day, with the best of intentions. That’s all we can promise tonight to one another..….." ইচিমেইয়ের বাচ্চাটা অবশ্য পৃথিবীর আলো দেখতে পেল না| অলমার উচ্চ রক্তচাপজনিতে অসুস্থতার কারণে মিসক্যারেইজ হয়ে গেল| ন্যাট আর অলমার দু'জনে দু'জনকে ভালোবাসায় কোন খাদ নেই| ন্যাটের চেয়ে বড় বন্ধু দুনিয়ায় কেউ নেই অলমার‚ উল্টোটাও সত্যি‚ অলমার মত করে ন্যাটকে কেউ বোঝে না| কিন্তু দু'জনার সম্পর্কে কোন স্ফুলিঙ্গ নেই‚ নেই পরস্পরের প্রতি দুর্নিবার শরীরি আকর্ষণ| জবরদস্তি দাম্পত্যের প্রচেষ্টায় একটি ছেলের জন্ম দেয় অলমা| আইসাক আর লিলিয়ানের নয়নের মণি অলমা আর ন্যাটের সেই ছেলে ল্যারি‚ বেলাসকো পরিবারের শিবরাত্রির সলতে‚ ঠাম্মির যত্নে‚ দাদুর আদরে আর ঠাকুর চাকরের সেবায় বড় হয়ে ওঠে| অলমাকে বিশেষ কোন পরিশ্রম করতে হয় না ছেলে মানুষ করতে| ধীরে ধীরে আবার বিবাহপূর্ব সম্পর্কে ফিরে যায় দু'জনে| ক্যুইন সাইজ শোবার ঘরের কিং সাইজ বিছানায় অলমা একাই ঘুমায় বেশির ভাগ দিন‚ ন্যাট পাশেই লাগোয়া স্টাডিতে| আস্তে আস্তে দুজনেই নিজের নিজের জগত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে‚ অলমা তার পেইন্টিং নিয়ে আর ন্যাট তার আইনী ব্যবসায়| অপরাধবোধে ভোগে অলমা‚ ন্যাটকে বলে বিয়েটা ভেঙে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিতে| কিন্তু ন্যাট রাজি হয় না| অলমা জানায় কাউকে যদি ন্যাট মন দেয় বা সম্পর্ক গড়ে তোলে কারো সাথে‚ তার কোন আপত্তি নেই‚ শুধু সমাজে জানাজানি যেন না হয়‚ ডিভোর্সে যখন সে রাজি নয়‚ তার স্ত্রীয়ের মর্যাদাটুকু যেন অক্ষুণ্ণ থাকে| সাত বছর কেটে গেল বিয়ের পর| আইসাক মারা গেলেন‚ সারা শহর ভেঙে লোক আসল তাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে আর সম্মান প্রদর্শন করতে পরোপকারী‚ দরাজ-হৃদয় আইসাকের অন্ত্যেষ্টিতে| এল ইচিমেইও‚ সাথে মা‚ দিদি আর বউ| ইচিমেইকে দেখামাত্র অলমা যেন তড়িতাহত‚ যেন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা রূপকথার রাজকুমারী| ইচিমেইয়ের তরফে কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না‚ বরং সে যেন একটু বেশীই ফর্ম্যাল‚ অলমাকে 'মিসেস বেলাসকো' বলে সম্বোধন করে সে তার শোকজ্ঞাপন করল বার বার বিদায় নেবার আগে| পরের কয়েকদিন অলমা চেষ্টা করল নার্সারিতে ফোন করে ইচিমেইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে‚ কিন্তু প্রতিবারই ফোনে ইচিমেইয়ের স্ত্রীর কন্ঠস্বর শুনে ফোন নামিয়ে রাখল সে| কিছুদিন এইভাবে চলার পরে ইচিমেইয়ের কাছ থেকে একটা চিঠি পেল অলমা| না প্রেমপত্র নয়‚ তার জীবনের আর নার্সারির বিবরণ দিয়ে‚ আইসাকের মৃত্যুর জন্য দু:খ করে চিঠি শেষ করেছে ইচিমেই‚ না তাতে অতীতের কোন আভাষ‚ না ফিরতি উত্তরের কোন প্রত্যাশা| আক্ষরিক অর্থেই একটি বিদায়ী চিঠি‚ অলমাকে জানিয়ে দিতে যে সে কোনরকম যোগাযোগে আর উৎসাহী নয়| সত্যিই তো‚ যে মহা অন্যায় সে করেছে ইচিমেইয়ের সাথে‚ তা তো একেবারেই ক্ষমার অযোগ্য| পেরিয়ে গেল আরো সাতটা বছর| আঁকাজোকায় নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেয় অলমা‚ তার সিল্ক স্ক্রীন প্রিন্টিঙের ব্যবসাও ফুলেফেঁপে ওঠে‚ তার সাথে নানা চ্যারিটি আর জনসেবা| কাজের জন্য দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে হয় অলমাকে‚ বাড়িতে সে থাকে না বললেই চলে| যখন থাকে তখনও ন্যাটের সাথে শরীরি সম্পর্কে কোন জোয়ার আসে না| অলমা নিজের মনে ভেবে নেয়‚ ন্যাট নিশ্চয়ই কারো দেখা পেয়েছে শরীরের চাহিদা মেটানোর জন্য| মনে মনে সে খুশিই হয়‚ কিন্তু মুখে কিছু জানতে চায় না| দুজনার দাম্পত্যে আর কোন কিছুই কথোপকথনের বাইরে নয়‚ কোথাও কোন আড়াল নেই‚ দুজনেই দুজনের আর সব সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল‚ বন্ধ শুধু মনের ভিতরকার একান্ত কোণের ঘরটি| তা নিয়ে দুজনের কেউ কাউকে কখনো কোন প্রশ্ন করে না| মেনে নিয়েছিল অলমা তার বিরহকে‚ আর সে চেষ্টা করে নি ইচিমেইয়ের সাথে কোনরকম যোগাযোগের| কিন্তু বারবার সেই একই মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে থাকে তাকে জীবন‚ যে মোড়ের নাম ইচিমেই| এক অর্কিড শোতে আবার দেখা হয়ে গেল তার ইচিমেইয়ের সাথে| অনেক বদলে গেছে অলমা‚ চেহারায় বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে‚ একটু যেন রোগাও হয়ে গেছে‚ কিন্তু ইচিমেই সেই একই রকম রয়ে গেছে| তার কথা বলার ধরণ‚ মাথা ঝুঁকিয়ে চলার ধরণ‚ তার স্মিত শান্ত হাসি…. যত দেখতে থাকে অলমা‚ তত তার মনের ভিতর ছটফটানি বাড়তে থাকে| তবে এবার আর অলমা একা নয়‚ ইচিমেইও যেন বেশ উৎসুক| পারস্পরিক কুশলবিনিময় থেকে শুরু করে ডিনার হয়ে একটি বিদায়ী চুম্বনের সঞ্চারীতে এসে ঘটে গেল বিস্ফোরণ যত জমে থাকা আবেগের‚ লুকিয়ে রাখা কামনা‚ বাসনা লাভাস্রোতের মত ছলকে বেরোল| আবার শুরু হল দু'জনের দেখাশোনা‚ চিঠি লেখা‚ বিনিময়| যৌবনের প্রেমোচ্ছ্বাস বয়সের সাথে সাথে পরিণত রূপ ধারণ করে| শরীরি বিনিময়কে ছাপিয়ে যায় অন্তরের দেওয়া-নেওয়া‚ মনে মনে ছুঁয়ে থাকাটুকু| সমাজ-সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সেরে দুজনে মিলিত হতে থাকে মাঝে মাঝেই‚ মধ্যের সময়টুকু চিঠিতে বা ফোনে যোগাযোগ| যে প্রেম পরিণতি পায় নি‚ সেই প্রেম গোপনে পুষ্পিত হয়ে ওঠে সবার চোখের আড়ালে| এইভাবে কাটে পরের চোদ্দটা বছর| Aids- এ আক্রান্ত ন্যাটের শরীর খারাপ হতে হতে একেবারে শেষ অবস্থায় এসে ঠেকে| পাগলের মত অলমা চেষ্টা করতে থাকে ন্যাটকে বাঁচানোর| কিন্তু কোন লাভ হয় না| রঙ-তুলি পড়ে থাকে‚ নিত্যভ্রমণ থমকে যায়‚ এমনকি ইচিমেইয়ের সাথেও সে আর দেখা করতে যায় না‚ ইচিমেই চিঠি লেখে‚ চিঠির সাথে পাঠায় একগোছা গন্ধরাজ ফুল| বেশির ভাগ চিঠিরই আর জবাব দেওয়া হয় না অলমার| চব্বিশ ঘন্টা সে ন্যাটের বিছানার পাশে| দুই চোখ ছাপিয়ে জলে ভেসে যায় অলমার গাল‚ চিবুক| কোনদিন প্রকাশ্যে কারো সামনে কাঁদে নি অলমা সেই ছোট্টটি থেকে‚ এমনকি ন্যাটের সামনেও নয়| কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী ন্যাটের শয্যার পাশে বসে সে আর নিজেক সংযত রাখতে পারে না‚ অকপটে কাঁদে| অবাক হয়ে যায় ন্যাট‚ বলে 'তুমি কাঁদছো! আমার জন্য কেঁদো না'| উত্তর অলমা বলে 'আমি তোমার জন্য কাঁদছি না‚ আমি আমার জন্য কাঁদছি‚ আমাদের জন্য কাঁদছি‚ যা কিছু তোমায় বলি নি‚ বলতে পারি নি‚ যা কিছু দিতে পারি নি‚ আমার যত ত্রুটি-বিচ্যুতি আর না-বলা রয়ে যাওয়া সব কথা‚ তার জন্য কাঁদছি'…"I’m not crying for you, but for me. And for us, for everything I’ve never told you, the omissions and lies, the betrayals and time I robbed you of"…. তাকে অবাক করে দিয়ে ন্যাট জানায় সে ইচিমেইয়ের সাথে অলমার যোগাযোগের কথা জানে| কিন্তু তাতে তার কোন ক্ষোভ বা রাগ নেই| সে তো জানেই ইচিমেই অলমার হৃদয়ের একচ্ছত্র অধিপতি| সে আরো বলে‚ 'আমি তো জানি আমার ভালো চাওয়ায়‚ আমার প্রতি ভালোবাসায় তোমার কোন খাদ নেই| তোমার মত বন্ধু আমার সত্যিই আর কেউ নেই অলমা| আর কাউকেই বিয়ে করে আমি এত সুখী হতে পারতাম না| তুমি তো জানো তোমাকে আমি কত ভালোবাসি‚ কত স্নেহ করি‚ তোমাকে আমি আমার হাতের তালুর মত চিনি অলমা‚ কিন্তু তুমি আমার সত্যি আমিটাকে পুরোপুরি জানো না'| সেই প্রহর শেষের অন্ধকারে অলমার বুকে মাথা রেখে ন্যাট তার গোপন জীবনের স্বীকারোক্তি শোনায় তাকে‚ সে সমকামী| জানায় লেনি‚ তার পার্টনারের কথা| সকাল হওয়া মাত্র ফোন বই থেকে লেনির নম্বর খুঁজে বার করে অলমা যোগাযোগ করল লেনির সাথে| আসলে দাঁতের ডাক্তার‚ গ্রীক দেবতার মত চেহারার লেনিকে বাড়ির লোকের কাছে নার্স পরিচয় দিয়ে ডেকে নিয়ে আসে অলমা‚ বড়ঘরের বড় বিছানা ন্যাট আর তার সাথীকে ছেড়ে দিয়ে মাঝের দরজা বন্ধ করে সে পাশের ছোট ঘরে আশ্রয় নেয়| শেষের কটা দিন লেনি আর অলমা দুজনে পাশাপাশি প্রাণপণে সেবা করল ন্যাটের| Aids… শব্দটা তখন অত্যন্ত ঘৃণার| কাজেই সকলকে জানানো হল ন্যাটের ক্যান্সার হয়েছে| ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে বিছানায় মিশে গেল ন্যাট| অসহ্য যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি দিতে মারণ ডোসে মরফিন ইঞ্জেকশন দিল লেনি ন্যাটকে‚ আর সেই চরম মুহূর্তে পাশে বসে পরম মমতায় হাত ধরে রইলো অলমা তার সারাজীবনের সাথী‚ তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়‚ তার একান্ত নির্ভরস্থল‚ তার পরম বান্ধব‚ তার তিরিশ বছরের বিয়ে হওয়া স্বামীর| ন্যাটের মৃত্যু আরো কাছাকাছি নিয়ে এল ইচিমেই আর অলমাকে| নিয়মিত দেখাশোনা হয় দুজনের‚ তবু চিঠি লেখা আর বন্ধ হতে দিল না অলমা| সেই হলুদ খামে চিঠি আর একগোছা গন্ধরাজ ফুল আলমার ঠিকানায় পৌঁছে যেতে থাকল নিয়মিত| চুক্তি মোতাবেক অলমার সব চিঠি পড়েই ছিঁড়ে ফেলে ইচিমেই বরাবর| কিন্তু অলমা জমিয়ে রাখে ইচিমেইয়ের প্রত্যেকটা চিঠি আবার পড়বে বলে| এইভাবে কেটে গেল পরের ছাব্বিশটা বছর| ছেলে বিয়ে করে সংসারী হল‚ পরিবারের আইনী ব্যবসা ঘাড়ে তুলে নিল‚ অলমাও আবার আগের মতই সমাজসেবা আর তার সিল্ক স্ক্রীন পেইন্টিঙে নিয়ে তুমুল ব্যস্ত| কিন্তু কি যে হল‚ হঠাতই ২০১০-এর এক সকালে অলমা ব্যবসা বাণিজ্য গুটিয়ে বাড়ি ছেড়ে এক বৃদ্ধাবাসে চলে গেল‚ নিয়ে গেল যৎসামান্য আসবাবপত্র‚ জামাকাপড়‚ ন্যাট আর ইচিমেইয়ের ছবি আর তার চিঠির ঝাঁপি| বাড়ির লোক ভেবে কূল করতে পারে না কি কারণে তার অতুল বৈভব ছেড়ে সে একা একা বৃদ্ধাবাসে থাকার সিদ্ধান্ত নিল| ছেলে‚ বৌমা‚ নাতি‚ নাতনি আসে যায়‚ আলমাও উৎসবে অনুষ্ঠানে বাড়িতে যায়‚ কিন্তু সবই কর্তব্যের খাতিরে| তার সবচেয়ে পছন্দের মানুষ হল নাতি সেঠ‚ ল্যারির ছেলে| এই সেঠকেই বলবে অলমা তার বর্ণময় জীবনের কাহিনী একদিন| সেঠ আবার জড়িয়ে পড়বে আইরিনার সাথে‚ বৃদ্ধাবাসের কর্মী‚ অলমার সেক্রেটারি একটি ইমিগ্র্যান্ট মেয়ের সাথে| মেয়েটি ভারি ভালো| এই একটা দারুণ ব্যাপার এই কাহিনীর‚ কুশীলবরা সকলেই ভারি ভালো এবং অতীব ধনী (শুধু আইরিনা ছাড়া‚ তবে তার সেই অভাব পোষাতে তো সেঠ হাজির)| জীবনের অন্ধকার অতীত পেরিয়ে আলোতে উত্তরণের একটা সমান্তরাল গল্প রয়েছে এই আইরিনাকে নিয়ে| ঘটনাচক্রে সেই বৃদ্ধাবাসে লেনিও এসে ওঠে| লেনির সাথে অলমার নিভৃত আলাপচারিতার কিছু কিছু কথা শুনে ফেলে আইরিনা‚ জানতে পারে ইচিমেইয়ের কথা| সেই সেঠকে ইচিমেইয়ের কথা জানায়| জানায় মাঝে মাঝেই একটা হলুদ খামে করে চিঠি আসে অলমার নামে‚ সাথে একগোছা গন্ধরাজ ফুল আর মাসে একবার কি দুবার আলমা সেজেগুজে ওভারনাইট ব্যাগে তার পছন্দের ভালো ভালো রাতপোশাক গুছিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যায় দু'তিনদিনের জন্য| কার কাছে যে যায়‚ কে সেই মনের মানুষ‚ দু'জনে মিলে অলমার গোপন প্রেমিককে নিয়ে নানারকম তত্ত্ব ফাঁদে| কিন্তু শেষমেশ ঠাম্মার প্রাইভেসি লঙ্ঘন করার রুচি আর হয় না সেঠের| তবে আইরিনা জানায় সে হোটেলের বিল দেখেছে কাগজপত্র গোছগাছ করতে গিয়ে| অলমার বয়স এখন ৮১‚ হাতপা কাঁপে‚ কদিন ধরে বুকে ব্যথা হচ্ছে‚ কোথাও বেরোতে পারছে না‚ প্রায় শয্যাশায়ী| সেই চিঠি আর ফুল আসাও বেশ কদিন ধরে বন্ধ| আইরিনার কাছে জানতে পেরে সেঠ একগোছা গন্ধরাজ ফুল নিয়ে আসে একদিন আর সরাসরি প্রশ্ন করে ঠাম্মাকে ইচিমেইয়ের ব্যাপারে| অলমা কপট রাগ দেখায়‚ জানতে চায় সেঠ তার ওপর গোয়েন্দাগিরি করছে কিনা…… তারপরে একটু একটু করে তার সুদীর্ঘ জীবনের ঘটনাবহুল গল্প শোনায় সেঠ আর আইরিনাকে| কিন্তু কোথায় তার ইচিমেই এখন? কোন অন্তরাল থেকে তার পাঠানো চিঠি আর ফুল আসে‚ কেন সে নিজে আসে না‚ সেই প্রশ্ন শুধানোর আগেই একদিন অলমা আবার কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যায় এবং এইযাত্রায় গাড়ি নিয়ে সোজা খাদে চলে যায়| তার দলামোচড়া শরীর যখন উদ্ধার হল‚ তখনো প্রাণটুকু ধুকপুক করছে| হসপিটালে দিন দুয়েক বাদে মারা যায় অলমা| অন্ত্যেষ্টিতে সবাই এল‚ এল না শুধু ইচিমেই‚ হয়ত খবর পায় নি‚ সেঠ ভাবে| কাগজে বড় বড় করে অলমার মৃত্যুসংবাদ ছাপা হল‚ পথ চেয়ে থাকে সেঠ‚ ইচিমেই একবার নিশ্চয়ই আসবে দয়িতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে‚ কিন্তু না| এ কেমন প্রেম? শেষে আর থাকতে না পেরে রীতিমত রাগ করে সেঠ একদিন ইচিমেইয়ের নার্সারিতে হাজির হয়‚ ইচিমেইয়ের খোঁজ করতে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে তার বিধবা স্ত্রী ডেলফাইন‚ প্রায় আভূমি নত হয়ে বাও করে‚ জানায় ইচিমেই তো মারা গেছে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে| ওদিকে বৃদ্ধাবাসে অলমার ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে আইরিনা আবিষ্কার করে অলমার সেই চিঠির ঝাঁপি| প্রত্যেকটা চিঠিই দুটো করে খামে জড়ানো‚ একটায় আলমার বাড়ির ঠিকানা লেখকের হাতের অক্ষরে‚ আর বাইরের খামের ঠিকানা বৃদ্ধাবাসের‚ অলমার হাতের লেখায়| প্রত্যেকটি চিঠির তারিখ অতীতের‚ শেষ চিঠি ২০১০-এর ৮-ই জানুয়ারি‚ তার পরে আর কোন চিঠি নেই| দুজনে মিলে পড়তে থাকে সেই সব চিঠি| পড়তে পড়তে শেষে রহস্যটুকু পরিষ্কার হয়ে যায় দু'জনের কাছে| ইচিমেই মারা যেতেই অলমা নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে চলে এসেছিল বৃদ্ধাবাসে‚ শুধু ইচিমেইয়ের স্মৃতি জড়িয়ে শেষের কটা দিন বাঁচতে| সেই পুরনো চিঠিগুলো সে নিজেই এক এক সপ্তাহে আবার নতুন খামে জড়িয়ে পোস্ট করত বৃদ্ধাবাসের ঠিকানায়‚ সাথে গন্ধরাজ ফুল‚ ঠিক যেমনটি ইচিমেই পাঠাতো‚ একা একাই যেত হোটেলে রাত কাটাতে যেখানে ইচিমেইয়ের সাথে গোপন অভিসারে মিলিত হত...... তার সুদীর্ঘ সত্তর বছরের প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখার এক অদ্ভুত রোম্যান্টিক প্রয়াসে| __________________________________________________________________________________ উপন্যাসের সারাংশ লেখা ভারি কঠিন কাজ‚ বুঝতে পারলাম| আর তার থেকেও কঠিন অন্যের লেখা নিজের ভাষায় নতুন করে লেখা| এনিওয়ে‚ ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে গেলাম লিখতে গিয়ে‚ আমার সেই প্রশ্নটার উত্তর কিন্তু চাই| গল্পটা ভালো না খারাপ? নিজের নিজের উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে লেখো/ লিখুন…….

177

8

শিবাংশু

শান-এ-হিন্দুস্তান

ভারতবর্ষ বলতে যাঁদের জানি, তাঁদের একজন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। অমন 'দেশি' মানুষ আর কজনকে খুঁজে পাওয়া যায়। উস্তাদজি'র কাছে বহুবার অনুরোধ এসেছে বিদেশে গিয়ে বসবাস করার জন্য। তিনি উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ, আমি যাবো। কিন্তু আমার জন্য সেখানে একটা গঙ্গার ঘাট, বালাজি মন্দির, বনারসি গলিঘুঁজি আর সুননেওয়ালোঁদের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। নয়তো সেখানে গিয়ে আমি কী করবো? এই সমস্ত নিয়েই তো বিসমিল্লাহ খান। একটা বাদ গেলেই আমি আর আমি থাকবো না। কী শুনবেন আমার কাছে? বালাজি মন্দিরের কথা যখন এসেই গেলো, তখন উস্তাদজির কাছে শোনা একটা কিস্যাও শোনা যাক। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের গুরু ছিলেন তাঁর মামুজান উস্তাদ আলি বখ্স। তাঁর নির্দেশে বাল্যকাল থেকে রাত ভোর হবার আগে থেকেই উস্তাদজি পঞ্চগঙ্গা বালাজি মন্দিরে বসে রিয়াজ করতেন। তাঁর মামুজান বলে দিয়েছিলেন সেখানে তাঁর যদি কোনও রকম অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা হয়, তবে সেকথা যেন কাউকে না বলেন। একদিন শেষরাতে ধ্যানের মধ্যে তিনি রিয়াজ করছিলেন মন্দিরের ভিতর বসে। দরজা বন্ধ ছিলো। হঠাৎ তিনি চন্দন আর জুঁইফুলের গন্ধ পান। ভাবলেন কেউ এসেছে বোধ হয়। চোখ খুলে দেখেন সামনে বালাজি দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক যেমন তাঁকে বিগ্রহে দেখা যায়। দেবতা তাঁকে যেন বললেন, 'বজাও বেটা' । কিন্তু তিনি তখন প্রায় আত্মজ্ঞান লুপ্ত হয়ে ঘেমে চলেছেন। থেমে গেলেন। পরে মামুজানকে এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে তাঁর গুরু তাঁকে সপাটে চপেটাঘাত করে বলেন নিষেধ করা সত্ত্বেও কেন তিনি একথা তাঁর কাছে প্রকাশ করলেন? উস্তাদজি সারাজীবন এই মন্দিরে ভোরবেলা শহনাই বাজিয়ে তাঁর পূজা সমাপন করতেন। তিনি জীবৎকালেই গন্ধর্ব থেকে সুরের দেবতা হয়ে গিয়েছিলেন। মন্দাকিনীর ধারা, ঊষার শুকতারা সবই নেমে এসেছে তাঁর যন্ত্রের শব্দ হয়ে। শুভ জন্মদিন হে দেবতা। গরিব ভিখিরিদেরও মনে রেখো.... https://www.youtube.com/watch?v=B28O1MhtAxM

103

4

Ranjan Roy

(বুড়ো বয়সের) বসন্তের কবিতাগুচ্ছ

ভালবাসার জামা ----------------- গড়িয়াহাটের মোড়ের থেকে রাসবেহারী, এ দোকান সে দোকান , আমি প্রাণপণে খুঁজে বেড়াই একটা জামা, ভালোবাসার জামা। দোহাই তোমাদের! আমায় অন্ততঃ একটা পিস জামা দাও, পুরনো স্টকের হলেও চলবে; মিনি মাগনা চাইছি নে, এটিএম আছে। ওরা হাসে -- বুড়ো,কোন ফায়দা নেই। তোর গায়ে ওসব বড্ড ঢলঢলে! ওদের বোঝাতে পারছি নে, আমার এমন জামা চাই যা গায়ে উঠলে আমার ভালবাসতে ইচ্ছে করবে সব্বাইকে, এমনকি তোমাকেও।। নুনের পুতুল সাগরে ------------------- ঠাকুরের মুখে বহুবার শোনা সেই গল্পটা সবাই জানে। সেই যে নুনের পুতুল সাগরে গিয়েছিল জল মাপতে। তারপর কী হয়েছিল? সবাই জানে। রাজাকে যে ন্যাংটো বলেছিল তার কী হয়ে ছিল? লোকে জানে কিন্তু বলে না। নাঃ, আমাকে মাপ করবেন। আমার আর কিছু জানা নেই। লাস্ট বেঞ্চে বসা ছেলেগুলো ---------------------------- লাস্ট বেঞ্চে বসা ছেলেগুলো মাথা নীচু করে অংকের খাতায় কাটাকুটি খেলে। কেউ গোল্লা কেউ ক্রশ দিয়ে যাচ্ছে একাগ্র, উৎসুক। ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা যত সাইন-কস-থিটা-গামা নিয়ে উহাদের হেলদোল নাই। অনায়াসে ভাগ করে লেবেঞ্চুস, হজমিগুলি আর যত নিষিদ্ধ বৈভব। স্যারের সন্ধানী আলো? এ ওকে সতর্ক করে চলে। বাকি ক্লাস টানটান সামনে চোখ, চাঁদমারি মাঠ। স্যারের হস্তমুদ্রা তাদের রেখেছে জাদু করে। ধ্যানমগ্ন ছেলেগুলো মনে মনে বিড় বিড় করে এবারের শেষ দৌড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আমি তো নতুন ছাত্র, একনজরে গোটা ক্লাস দেখি, তারপর পায়ে পায়ে লাস্ট বেঞ্চে জায়গা খুঁজে নেই।।

185

18

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

রচি মম ফাল্গুনী…… নদীয়া কা পানি ভি খামোশ বেহতা ইয়াহাঁ খিলি চান্দনি মে ছিপি লাখ খামোশিয়াঁ বারিষ কি বুঁদো কি হোতি কাহাঁ হ্যায় জুবাঁ সুলগতে দিলোঁ মে হ্যায় খামোশ উঠতা ধুয়াঁ….. বারিষ কি বুঁদো কি জুবান থাকে না-- সত্যি কথাই‚ কিন্তু মঞ্জীর তো থাকে চরণে| রিমঝিম গিরে শাওন অথবা রিমঝিম রিমঝিম‚ রুমঝুম রুমঝুম‚ টাপুর টুপুর সারা দুপুর…… বৃষ্টির নূপুর কত রকম বোলেই তো বাজে| খামোশিয়াঁ আকাশ হ্যায় তুম উড়নে তোহ আও জারা খামোশিয়াঁ এহ্সাস হ্যায় তুমহে মেহসুস হোতি হ্যায় ক্য় বেকারার হ্যায় বাত করনে কো কেহনে দো ইনকো জারা….. হা-আ-আ-আ-আ খামোশিয়াঁ…….. তেরি মেরি খামোশিয়াঁ খামোশিয়াঁ……… লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ...... গান শেষ হয়ে যায়| তার পরেও চুপ করে বসেই থাকি গাড়িতে কিছুক্ষণ‚ সঙ্গী শুধু লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ| নি:শব্দে ঝরে চলে বরফ‚ স্তব্ধ চরাচর জুড়ে| গানটা নতুন করে লেখা দরকার‚ বারিষ নয়‚ বরফ কি বুঁদো লেখা উচিত ছিল| বরফ পড়ার সত্যিই কোন শব্দ নেই‚ না জুবান‚ না পায়েলিয়া| যত তুমুল বরফই পড়ুক না কেন‚ তার পায়ের ঘুঙুরে কেবল একটি বোলই বাধা‚ নীরবতা‚ খামোশিয়াঁ‚ লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ| ভাবতে ভাবতে চাবি‚ ব্যাগ‚ কফির কাপ সব গুছিয়ে নিয়ে নামি| মাথায়‚ মুখে মিহিন তুহিন স্পর্শ বরফের নরম তুলোর‚ তাপমান প্রায় বসন্ত ছুঁই ছুঁই‚ মাত্রই মাইনাস সাত| চোখ বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কয়েক মিনিট| হলই না হয় আমার আজকের এই ফিরোজা রঙের সন্ধ্যা বরফঝরা খামোশিয়াঁয় লাজানো| তবু কোথাও তো ১৪-ই মার্চের টাইমটেবিলে কুহু কুহু হুইসেল বাজিয়ে ফাল্গুনের শেষ ট্রেন ছাড়ছে‚ তুলকালাম পলাশ পেছনে ফেলে মধুমাসের তুমুল লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে| হঠাৎ গুণগুণ করে ওঠে মন‚ "জানি না কাহার ভুল‚ তোমার পূজার ফুল আমি লইলাম….." না না‚ আজ কোনরকম মনখারাপের গান নয় একদম…... পাগলি এসে হাত ধরে| আজকের দিন শুধু সেলিব্রেশনের-- ফায়ার প্লেসের নীল উষ্ণ উত্তাপ‚ সাথে কোন ধ্রুপদী মাধ্বী‚ 'কবিতার চরণের মত যার নাম‚ সূর্যাস্তের আভার মত যার রঙ‚ যাতে মশলার‚ অন্ধকারের আর স্মৃতির সুগন্ধ'….. বাহ‚ মন্দ নয়‚ কিন্তু গান? ….. আহা‚ গান তো থাকতেই হবে‚ ভালোলাগা গান‚ ভালোবাসা সুর| কি শুনবে বলো? তোমার ঠাকুরের গান? বিক্রম হলে কেমন হয়? নাকি জর্জ বিশ্বাস? ….. উল্টেপাল্টে দেখে আবার জায়গামত রেখে দিই অ্যালবামগুলো| গুলজার শুনবে? ….. নাহ….. তাহলে বাংলা আধুনিক? মানবেন্দ্র না প্রতিমা? অনেকদিন গীতা দত্ত শোনা হয় নি ….. পাগলির বকম বকম শুনতে শুনতে ঠিক করে ফেলি---- কুড়ি বছরের ভিন্টেজ পোর্টের বোতলটা খোলা যাক আজ| বোতলটা তুলে ধরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাই পাগলির মুখের দিকে| থাম্বস আপ দেখায় আমাকে হতচ্ছাড়ি| "যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে‚ ধুয়ো লাশ আমার 'এই' লাল পানি দিয়ে….." বেজায় বেসুরে গাইতে গাইতে গ্লাসে ঢালি ওয়াইনটা‚ এবং তিন টুকরা লেবুর চাকা কাটিয়া সযত্নে শরাবে নিমজ্জিত করিয়া….. চিয়ার্স- আআহ...... পোর্টের tawny (বাংলা কি হবে?) স্বাদেই কি না‚ কি জানি‚ হঠাৎ মনে পড়ে গেলো‚ ছোটবেলায় রেডিয়োতে হারানো দিনের গান বলে একটা প্রোগ্র্যাম হত| হায়রে কবে হারিয়ে গেছে সেই রেডিয়োর কাল‚ আর ছোটবেলা তো কবেই ফুরিয়ে গেছে| কিন্তু হারানো দিনের সেই গানগুলো তো রয়ে গেছে সাথে আজও| সেই ভালো‚ আজকের সন্ধ্যাটা হারানো দিনের সেই সব গানেরই হোক বরং…… পাগলি তাল মেলায় আমার সাথে| "নিজেরে হারায়ে খুঁজি..... গান শুরু হয়ে যায়| আজকের অনুষ্ঠনের প্রথম শিল্পী মাধুরী চট্টোপাধ্যায়…… পাগলির ঘোষণা| আলোগুলো কমিয়ে প্রায় নিভু নিভু করে দিয়ে পা ছড়িয়ে বসি দুজনায় পাশাপাশি| ভিতরে পাগলি‚ আমি আর আমার গানভাসি ফাগুনের উষ্ণ সাঁঝবেলা‚ বাইরে নি:শব্দে ঝরে যেতে থাকে ঝুরো ঝুরো বরফের গুঁড়ো| একসময় গান ফুরায়| ঘিরে থাকে শুধু খামোশিয়াঁ‚ লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ| অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকে ফুরিয়ে যাওয়া সুরের রেশ‚ "মরণ পেরিয়ে যাব এমনি করে‚ কোন পিছু ডাকে আর থামবো না‚ একটু থেমে থাকি তোমার কাছে"……. পাগলি গুণগুণ করে ওঠে আমার কাঁধে মাথা রেখে‚ "তুমিও আমার সাথে চলো না"…… অনেকক্ষণ হল‚ পাগলিটা চলে গেছে| যাবার আগে একটা চিরকুট দিয়ে গেছে হাতে গুঁজে| উঠে আলোটা বাড়াই‚ কাগজের টুকরোটা খুলে দেখি‚ পাগলি লিখেছে----- নন্দিনী লিখেছিল…… "শুভঙ্কর‚ কী যে কৃতজ্ঞ আমি তোমার কাছে| অভ্যাসের বদ্ধ চিলে কুঠরী থেকে এই কিনারাহীন জলসমারোহের কিনারায় তোমারই হ্যাঁচকা টানে| মনে হচ্ছে বত্তিচেল্লীর ঝিনুক থেকে জন্মালাম আর একবার"…….

1164

90

দীপঙ্কর বসু

দক্ষিন রায়ের দেশে

অথৈ জলে পড়া – এই বাংলা প্রবাদটার প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করলাম “মামার বাড়ি” র আঙিনা হয়ে ফেরার পথে । যে খাঁড়ি তে লঞ্চে করে আমরা মামারবাড়ির আঙিনা দিয়ে এসেছিলাম ফেরার সময়ে লঞ্চ আমাদের ফেরত নিয়ে চলল আর এক পথ ধরে ।অবশ্য এ অঞ্চলে সমস্ত পথই আমাদের পক্ষে একই –কারন আমরা কোন পথই চিনিনা ।এ অঞ্চলের জল জঙ্গল – সবই আমাদের কাছে একই রকম লাগে ।তবে কিছুদূর চলার পর দেখলাম চোখের ওপর থেকে কে যেন অকস্মাৎ সবুজ পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছে । আমার চোখের সামনে এখন কুল কিনারাহীন অতল জলরাশি । ছোট ছোট ঢেউ গুলোর ওপরে মধ্যদিনের সূর্যালোক চিকচিক করছে ।এক অপার ভয়মিশ্রিত বিস্ময় বোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল । এই অতল জলরাশির মধ্যে আমাদের লঞ্চ চলেছে যেন একটা খেলনা ভেলা মাত্র!গাইড এর কাছে জানতে পারলাম আমরা মাতলা নদীর মোহনা দিয়ে চলেছি । এখানে মাতলা নদী এসে বঙ্গপোসাগরে মিশেছে । আমাদের মধ্যে থেকে গাইডকে প্রশ্ন করলেন এই রকম কূলকিনারাহীন জলের মধ্যে আপনারা সঠিক পথটাকে চিনে চলেন কি করে ? মৃদু হেসে গাইড জবাব দেন “এ সব জলপথ ,নদী জঙ্গল সবই আমরা নিজের হাতে তালুর মতই চিনি ।আমাদের দিক নির্দেশের জন্যে কম্পাসের সাহায্য ও দরকার হয়না । নিজের মনেই ভাবলুম ঠিক এই ভাবেই বোধ হয় সমুদ্রপথে ভারতবর্ষের সন্ধানে বেরিয়ে কলম্বাস আমেরিকার ভূখন্ডে পৌছে গিয়েছিলেন অতীতে । আমরাও যে ঠিক তেমনি ভাবে আমাদের অস্থায়ী আস্তানা ওয়াক্সপল ঘাটের বদলে অন্য কোন দ্বীপে গিয়ে ঠেকবনা তার নিশ্চয়তা কোথায় । কিন্তু আপাততঃ আমরা কটি ভ্রমন পিপাসু মানুষ নিরুপায় । সারেং এর ওপরে ভরসা রাখা ভিন্ন গতি নেই আমাদের । সকালবেলা লঞ্চে করে যেতে যেতে গহন বনের মধ্যে একটা ছোট মন্দির চোখে পড়েছিল । গাইডকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলাম বনের মধ্যে ওটি বনবিবির মন্দির । বনবিবির একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও জেনেছিলাম গাইডের কাছে । প্রাচীনকালে ইব্রাহিম নামে এক ফকিরের বাস ছিল এই অঞ্চলে ।স্থানীয় লোকেরা তাকে ডাকত বেরহিম নামে । ইব্রাহিমের প্রথমা স্ত্রী ফুলবিবি সন্তানধারণে অক্ষম হওয়ায় ফুলবিবির সম্মতিক্রমে ইব্রাহিম ওরফে বেরহিম গোলাবিবি নামে আর এক মহিলাকে বিয়ে করে । তবে কেন জানিনা সন্তান লাভের ইচ্ছায় ইব্রাহিমের দ্বিতিয় বিবাহে ফুল বিবি সম্মতি দিলেও একটি শর্তও জুড়ে দিয়েছিল সেই সঙ্গে ।শর্তটি হল সন্তান জন্মের পর ইব্রাহিম গোলাবিবিকে পরিত্যাগ করবে । শর্ত অনুযায়ী গোলাবিবি সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর ইব্রাহিম তাকে গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসে ।সেখানে গোলাবিবির গর্ভে স্বয়ং খোদাতালার আশীর্বাদ ধন্য বনবিবি আর শাহজংলী জন্মগ্রহন করে । এক সময়ে গোলাবিবি শাহজংলীকে সঙ্গে নিয়ে বন ছেড়ে চলে যায় ।বনবিবি একা পড়ে থাকে বনের মধ্যে । এর পরে বহুদিন বাদে ইব্রাহিম নিজের কাজে অনুতপ্ত হয়ে গোলাবিবিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং তাকে নিয়ে মক্কায় চলে যায় । গল্প করতে করতে এক সময়ে আমরা ফিরে আসি আমাদের রিসোর্টের ঘাটে । রিসোর্টে ফিরে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে গাইডের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি দয়াপুর গ্রামটা ঘুরে দেখতে । সুন্দর ছিমছাম সাজান গ্রামখানি । আমাদের কপালে বাঘমামার দর্শন ছিলনা ।তবে এ গ্রামে মাঝে মাঝেই তাঁর পদধুলি পড়ে । কংক্রিটের বাঁধান রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে গাইড একটি মাটির বাড়ি দেখিয়ে জানালেন কিছুদিন আগে এই বাড়িতেই রাতের বেলায় এক বাঘের আগমন ঘটেছিল । বাঘটির নজর সম্ভবত ছিল গোয়ালঘরটির দিকে ।কিন্তু কোনও ভাবে বাড়ির বাসিন্দারা বাঘের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রচুর হৈহল্লা জুড়ে দেওয়ায় বাঘটি ভয় পেয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বাড়ির হেঁসেলে । বাড়ির লোকেরা বুদ্ধি করে হেঁসেলের দরজায় শিকল লাগিয়ে বাঘটিকে বন্দী করে ফেলে ।খবর যায় বনদপ্তরে । সেখান থেকে কর্মীরা এসে বাঘটিকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় ।গাইডের মুখে বাঘের হানার কথা শুনে মনে পড়ল এই খবরটা সংবাদ পত্রে পড়েছিলাম সে সময়ে । অদ্যই আমাদের শেষ রজনী এই টাইগার ক্যাম্পে । সন্ধ্যেবেলায় রিসোর্টের কর্মীবৃন্দ বনদেবীর মহিমা বিষয়ক একটি যাত্রাপালার আয়োজন করেছিলেন ।যাত্রাপালার গল্প খুবই মামুলি ধরণের । সুন্দরবনে একদা ধনা ও মনা নামে দুই ভাই বাস করত । কোনও এক বছর ধনা সাতটি ডিঙি নৌকা নিয়ে বনের মধ্যে মধু আহরণে যাবার উদ্যোগ করে । কিন্তু মন্দ কপাল ধনার ।জঙ্গলের মধ্যে মধু ,মোম কিছুই জোটেনা তার ভাগ্যে । এক রাত্রে সে বনের রাজা দক্ষিনরায় স্বপ্নে ধনাকে দেখা দিয়ে বলেন যে ধনা যদি একটি বালককে তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে তবেই ধনা জঙ্গল থেকে মধু সংরহ করতে পারবে । বিফল মনোরথ ধনা ফিরে আসে নিজের গ্রামে ।পরের বার দুখে নামে গ্রামের এক গরীব ঘরের কিশোরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হয় জঙ্গলের উদ্দেশ্যে ।তার মতলব দুখে কে সে উৎসর্গ করবে দক্ষিনরায়কে তুষ্ট করতে । এবারে ধনা প্রচুর মধু আর মোম সংগ্রহ করে আনে ।জঙ্গলে একা পড়ে থাকে দুখে ।দক্ষিনরায় বাঘের বেশ ধারণ করে দুখেকে হত্যাকরতে উদ্যত হয় ।তাই দেখে মনে মনে বনবিবিকে ডাকতে থাকে দুখে । দুখের আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে বনবিবি আর তার সহোদর শাহ জংলী এগিয়ে আসে ।ঘোর যুদ্ধ বেধে যায় শাহজংলী আর দক্ষিনরায়ের মধ্যে । অবশেষে দক্ষিনরায় পরাজিত হয় ।প্রাণ রক্ষা পায় দুখের । বেশ মজা লাগল যাত্রাপালা সেরে অভিনেতারা আবার সাধারণ পোষাক আসাক পরে খাবার ঘরে আমাদের রাত্রের খাবার পরিবেশন করার কাজে লেগে পড়লেন । তাদের মুখে তখনও রংচং মাখা ।

206

25

শিবাংশু

চারতিরিশের চম্পূ

অনেকদিন হলো। তখন আমি জামশেদপুরের একটা ব্রাঞ্চে পোস্টেড। বিয়েথাওয়া হয়নি। শুধু কিছু বদনাম আছে। ঐ যা সব জোয়ান ছেলেদের থাকে। কবি যাকে বলেছেন, "উপেক্ষা করিতে চাই তারে;/ মড়ার খুলির মতো ধরে আছাড় মারিতে চাই তারে,/ জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে/ তবু সে মাথার চারিপাশে/তবু সে চোখের চারিপাশে....।" শুধু হর্মোনজাত আকুলিবিকুলি নয়। অন্য মাত্রাও থাকে, অন্য অনুভূতিও। একছত্র বিজয়ী হওয়াই লক্ষ্য নয়। বিনিময় করার প্ররোচনাও তো থাকে পুরো মাত্রায়। তখনও মানুষের জীবনে কিছু আলোছায়া ছিলো। 'রোমান্স' শব্দটা এরকম সপাটে ত্যক্ত হয়ে যায়নি। পরশুদিন ফেবু'তে এক বালকের ফতোয়া দেখলুম 'রোমান্স' নামক ধারণাটি নাকি নারীনিপীড়নের একটা অজুহাতমাত্র। সমানাধিকারের পরিপন্থী। নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় ও পরিত্যজ্য। আমি বলতে পারবো না। মেয়েরাই বলবে। যাকগে। আমাদের একজন গ্রাহক ছিলেন। নামটা একটু বিচিত্র, টমাস বক্স বিশ্বাস। বয়্স সত্তরের বেশ খানিকটা উপরে। তবে বয়স নয়, অকালজরা তাঁকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিলো প্রায়। শাদা চুল, শাদা শার্ট, শাদা ধুতি। ক্ষীণ কণ্ঠস্বর, ন্যুব্জদেহ। কটকের 'বাঙালি', তবে ওড়িশার টানটাই বেশি। চাকরি করতেন টাটা কোম্পানিতে একসময়। তবে তিনি ছিলেন স্থানীয় একটি গির্জার সর্বক্ষণের সেবক। থাকতেনও সেখানে। অবিবাহিত, দারাপুত্রহীন। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর কিছু টাকাপয়সা পেয়েছিলেন। সেগুলো'ই রাখা ছিলো ব্যাংকে। মাসে একবার সুদ তুলতে আসতেন। তখন এটিয়েমের জমানা নয়। নিজেকে আসতে হতো। এতোদূর পর্যন্ত ঠিক আছে। তাঁর সঙ্গে আসতেন এক ভ্দ্রমহিলা। বয়স পঞ্চাশের নীচে। শাদা শাড়ি, নীল পাড়। মাথায় ঘোমটা। ঘনশ্যাম এই নারীর দাঁতগুলি ছিলো উজ্জ্বলশ্বেত এবং তিনি যতিহীন কথা বলে যেতে পারতেন। আমাদের একজন অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন নড়বড়ে গ্রাহকদের জন্য অন্ধের যষ্টি। আমরা তাঁকে সম্মানসূচক বড়োবাবু বলতুম। এই ভদ্রমহিলা, নাম খ্রিস্টদাসী বিশ্বাস, ছিলেন তাঁর একান্ত অনুগত। মাসে একবার এসে সারামাসের গপ্পো সেরে যেতেন। তখনও আমরা মানুষের মুখের দিকে চেয়ে কথা বলতুম। কম্পুর মনিটরের দিকে তাকানো ছিলোনা। মুশকিল ছিলো সেই ভদ্রমহিলা একাই দখল করে রাখতেন বড়োবাবুকে। তাঁর অন্য গ্রাহকেরা আর নাগাল পেতেন না। এ অবস্থায় আমাদের আসতে হত। বড়োবাবুর আটকে থাকা কাজগুলো এগিয়ে দিতে। এই যুগল আমাদের অভিনিবেশে থাকতেন তাঁদের অভিনবত্বের জন্য। টম বক্সের জড়িত উচ্চারণ আমরা ঠিক বুঝতে পারতুম না। বড়োবাবু পারতেন। ভদ্রমহিলার উচ্চস্বরের আলাপ, যার মধ্যে ভাইঝির বিয়ের সমস্যা, রাতে রুটি খেতে না চাওয়ার দুঃখ, রিকশচালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, হোমোপাতিই আসল ওষুধ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান ছড়িয়ে দিতেন চারদিকে। মাঝে মাঝে বড়োবাবুর কানে কানে কীসব যেন বলতেন। এই 'কইবো কথা কানে কানে' পর্বটি নিয়ে আমাদের বিশেষ কৌতুহল থাকতো। বিকেলের দিকে ফাঁকা হলে আমাদের বড়োবাবুকে সটান প্রশ্ন। আজ 'কানে কানে'র বিষয় কী ছিলো? বড়োবাবু নীরসমুখে বলতেন , আর কী? একই গপ্পো। -মানে? -ও'ইই, বিশ্বাসবাবু যে বিশ্বাসযোগ্য ন'ন তাই নিয়ে নানা অনুযোগ... -ইয়ে, তিনি আবার কী বিশ্বাসভঙ্গ করলেন? -আর বোলোনা! ঘটনা হচ্ছে ভদ্রমহিলা বিশ্বাসবাবুর বিবাহিতা স্ত্রী ন'ন... -সে কী? অতো সিঁদুরের ঘনঘটা? -তাই তো। উনি বলেন পাদ্রিসাহেব ওঁদের বিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বাসবাবু ওসব মানেন না... -তব কেস ক্যা হুয়া? -পুরো গন কেস... -বিশ্বাসবাবুও তো আপনার কানে কানে কী সব বলেন... -ঐ কথাই বলেন। তিনি নিজেকে জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী মনে করেন। বিয়ে-টিয়ে ওসব পাপকাজে উনি নেই... -টমবাবুর অবস্থা যা দেখি, তাতে' জিতেন্দ্রিয়' ব্যাপারটা তো মানতেই হয়...তবে কী আনন্দময়ী? -ধ্যুস, ভদ্রমহিলা নাকি ওঁর প্রেমে পাগল... -বড়োবাবু, থোড়া রহম করেঁ... -আরে, আমি সত্যি বলছি... -হদ কর দিয়া রে ভাই... -তবে ট্যুইস্টটা অন্য জায়গায়। খ্রিস্টদাসী বিশ্বাসবাবুর চরিত্রে সন্দেহ করেন.... -অ্যাঁ... -অ্যাঁ না, হ্যাঁ। ভদ্রমহিলা আমাকে অনুরোধ করেন আমি যেন বিশ্বাসবাবুকে বোঝাই অন্য কোনও মেয়ে তাঁর থেকে বেশি ভালোবাসতে পারবেনা....উনি যেন অন্য কোনও মহিলাকে প্রশ্রয় না দেন... -বড়োবাবু, আপনি কমলকুমার মজুমদারকে চেনেন? -ক-ম-ল-কু-মা-র-, কোন ব্রাঞ্চে আছেন ভদ্রলোক? -ব্রাঞ্চে নেই। লেখক... -নাহ, আমি হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় আর শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা পড়ি। আর কোনও লেখককে চিনিনা.... কিন্তু কেন? -ওঁর 'অন্তর্জলীযাত্রা' নামে একটা লেখা আছে। অন্তর্জলীতে থেকেও প্রেম করার আইডিয়াটা টমবক্সবাবুর গপ্পো শুনে মনে পড়ে গেলো...ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান নিক্সন.... -অ্যায় অ্যায়, নিক্সন নয়... -আরে খুব বেশি স্ট্রেঞ্জ হয়ে গেলে নিক্সন হয়ে যায়.... ----------------------- সম্প্রতি এক দেশি ফিলমি তারকা যুগলকে নাকি বিদেশে প্রেম করতে দেখা গেছে। অবশ্যই 'বিবাহ'বহির্ভূত। কিন্তু তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ নেই। মানুষজন বলছেন, দুজনেই ষাটবছর পেরিয়েছেন। এখনও প্রাণে এতো প্রেম বাঁচে কী করে? অকাট্য যুক্তি। তবে যাঁরা প্রশ্নটি তুলছেন তাঁদের হয়তো ষাট পেরোতে অনেক দেরি। ষাটের পরের জীবনটা যে ঠিক কী রকম হতে পারে, সে বিষয়ে তাঁদের ধারণাটি নেহাতই কুয়াশা। এই বয়সের যাপন নিয়ে সব চেয়ে নিপুণভাবে লিখতেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র ও বিমল কর। অনেকেই হয়তো লিখেছেন, কিন্তু সেগুলি ছুঁয়ে যাওয়ামাত্র। এঁরা ছিলেন উস্তাদোঁ কি উস্তাদ। জানিনা এখনকার পাঠকেরা এঁদের লেখাপত্র কতটা কী পড়েন। জনতার সচেতনতা তৈরি হয় টিভি সিরিয়ালের সংস্কারী যুগলদের ক্রিয়াকলাপ দেখে। ছাপান্ন ইঞ্চিমার্কা বোধের দুনিয়ায় সবই অবোধের গোবধ। মার্কা দেওয়া আছে, কুড়ি বছরের মানুষের সেলফিযাপন, চল্লিশ বছরে পরকীয়া আর ষাট বছরে জয় মাতা দি। তাহার বাহিরে আর জীবন নাই, শ্যামাদা । ছোটবেলা থেকে জেনেছি, " সহজলোকের মতো কে চলিতে পারে। কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে সহজলোকের মতো।" 'সহজলোক' হতে পারার দুরাশা কখনও করিনি। তাদের মতন ভাষা কথা বলতে পারার নিশ্চয়তা অর্জন করা হয়নি কদাপি। কিন্তু তার পরেই আসে প্রশ্নটি। 'শরীরের স্বাদ আর প্রাণের আহ্লাদ' সকল লোকের মতো কীভাবে আয়ত্ব হবে। তার কোন শরীরী এক্সপায়রি তারিখ রয়েছে কী? শরীরে মাটির গন্ধমাখা, শরীরে জলের গন্ধমাখার পাঠ কী দেওয়া হয় কোনও চৈতন্যের ইশকুলে? হর্মোনের ঊর্ধে গিয়ে কী নিউরন কিছু কমাল দেখাতে পারে? আগে হয়তো বুঝতাম না। এখন জগৎটা অনেক স্পষ্ট, স্বচ্ছ হয়ে আসছে। চশমায় নতুন কাচ বদলালে অকস্মাৎ যেমন দুনিয়াটা চমক দিয়ে যায়, অনেকটা সেরকম। ষাট বছরের পরের যাপন কোন ফর্মুলায় চলে? আদৌ কোনও ফর্মুলা আছে কী? উত্তরটা কী এভাবে দেওয়া যায়? জীবনস্মৃতির কৈলাশ চাটুজ্যের অতিখ্যাত প্ল্যানচেটিয় উক্তিটি বারবার ঘুরে আসে। "আমি মরিয়া যাহা জানিয়াছি" ইত্যাদি। যা বুঝেছি, মানুষের বার্ধক্য বয়সে আসেনা, বোধে আসে। বিস্ময়বোধ ফুরিয়ে যাওয়া মানেই শেষের সেদিন কী ভয়ঙ্কর। ‘সহজ’লোকের স্বপ্ন আছে, শান্তি আছে, কিন্তু অকারণ বিস্ময়বোধের তাড়না নেই। উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে, চাষার মতন প্রাণ পেয়ে জেগে থাকার দায় তাকে বহন করতে হয়না। বিস্ময়বোধের তাড়না যাদের সতত ব্যস্ত রাখে তাদের মনেই থাকেনা শরীরের বল্কল কোনবেলা কুঁচকিয়ে যায়। পাতাঝরার ঋতু কবে এসে দুয়ারে কড়া নাড়ে। এই মানুষদের জন্যই কী গুরু'র বিখ্যাত বিশেষণ, 'জন্মরোমান্টিক।' আধুনিক বাঙালির সাংখ্যদর্শনে 'চৌত্রিশ' এক জলবিভাজক নম্বর। রোমান্টিকতায় তার কোনও ভূমিকা আছে কি না, জানা নেই। সহজলোকের মত 'চৌত্রিশ' বছরের যৌথখামার চাষ করে এসে মনে হয় নম্বরটা বেশ গূঢ়। ঠাকুর বলেছেন, রে বাঙালি 'চৌত্রিশ' পেরিয়েই অতো লাফালাফি করিসনে। বাতাসে অক্সিজেন কমে আসছে, মাটিতে আর্সেনিক। তার মধ্যে রোমান্টিকতা? শোনে কে? প্রতি বছর দশ মার্চ এসে নিঃশব্দে কোলে ল্যান্ড করে। লোকে বলে মূর্খ বড়ো, লোকে বলে সুধরেগা নহি। আমাকেও হাবিজাবি লিখতে হয়। বন্ধুরা অতিষ্ঠ হয়ে লাইক মারেন। আর কদ্দিন?

123

8

দেশদ্রোহী

ফেক Gems ফ্রম জেমস

BLUE PLANET II Why marine animals can't stop eating plastic By Josh Gabbatiss share Back to blog Plastic doesn’t just look like food, it smells, feels and even sounds like food. In a recent interview about Blue Planet II, David Attenborough describes a sequence in which an albatross arrives at its nest to feed its young. “And what comes out of the mouth?” he says. “Not fish, and not squid – which is what they mostly eat. Plastic.” It is, as Attenborough says, heartbreaking. It’s also strange. Albatrosses forage over thousands of kilometres in search of their preferred prey, which they pluck from the water with ease. How can such capable birds be so easily fooled, and come back from their long voyages with nothing but a mouthful of plastic? It’s small comfort to discover that albatrosses are not alone. At least 180 species of marine animals have been documented consuming plastic, from tiny plankton to gigantic whales. Plastic has been found inside the guts of a third of UK-caught fish, including species that we regularly consume as food. It has also been found in other mealtime favourites like mussels and lobsters. In short, animals of all shapes and sizes are eating plastic, and with 12.7 million tons of the stuff entering the oceans every year, there’s plenty to go around. Even in the most remote areas of the open ocean, plastic flotsam can be found, with far-reaching consequences for marine life (Credit: BBC 2017) Even in the most remote areas of the open ocean, plastic flotsam can be found, with far-reaching consequences for marine life (Credit: BBC 2017) The prevalence of plastic consumption is partly a consequence of this sheer quantity. In zooplankton, for example, it corresponds with the concentration of tiny plastic particles in the water because their feeding appendages are designed to handle particles of a certain size. “If the particle falls into this size range it must be food,” says Moira Galbraith, a plankton ecologist at the Institute of Ocean Sciences, Canada. Like zooplankton, the tentacled, cylindrical creatures known as sea cucumbers don’t seem too fussy about what they eat as they crawl around the ocean beds, scooping sediment into their mouths to extract edible matter. However, one analysis suggested that these bottom-dwellers can consume up to 138 times as much plastic as would be expected, given its distribution in the sediment. For sea cucumbers, plastic particles may simply be larger and easier to grab with their feeding tentacles than more conventional food items, but in other species there are indications that plastic consumption is more than just a passive process. Many animals appear to be choosing this diet. To understand why animals find plastic so appealing, we need to appreciate how they perceive the world. “Animals have very different sensory, perceptive abilities to us. In some cases they’re better and in some cases they’re worse, but in all cases they’re different,” says Matthew Savoca at the NOAA Southwest Fisheries Science Center in Monterey, California. One explanation is that animals simply mistake plastic for familiar food items – plastic pellets, for example, are thought to resemble tasty fish eggs. But as humans we are biased by our own senses. To appreciate animals’ love of plastic, scientists must try to view the world as they do. Many animals appear to be choosing a plastic diet (Credit: BBC 2017) Many animals appear to be choosing a plastic diet (Credit: BBC 2017) Humans are visual creatures, but when foraging many marine animals, including albatrosses, rely primarily on their sense of smell. Savoca and his colleagues have conducted experiments suggesting that some species of seabirds and fish are attracted to plastic by its odour. Specifically, they implicated dimethyl sulfide (DMS), a compound known to attract foraging birds, as the chemical cue emanating from plastic. Essentially, algae grows on floating plastic, and when that algae is eaten by krill – a major marine food source – it releases DMS, attracting birds and fish that then munch on the plastic instead of the krill they came for. Even for vision, we can’t jump to conclusions when considering the appeal of plastic. Like humans, marine turtles rely primarily on their vision to search for food. However, they are also thought to possess the capacity to see UV light, making their vision quite different from our own. Qamar Schuyler at The University of Queensland, Australia, has got into turtles’ heads by modelling their visual capabilities and then measuring the visual characteristics of plastics as turtles see them. She has also examined the stomach contents of deceased turtles to get a sense of their preferred plastics. Her conclusion is that while young turtles are relatively indiscriminate, older turtles preferentially target soft, translucent plastic. Schuyler thinks her results confirm a long-held idea that turtles mistake plastic bags for delicious jellyfish. Colour is also thought to factor into plastic consumption, although preference varies between species. Young turtles prefer white plastic, while Schuyler and her colleagues found that seabirds called shearwaters opt for red plastic. Every year, around 8 million metric tons of plastic waste enters the ocean (Credit: BBC 2017) Every year, around 8 million metric tons of plastic waste enters the ocean (Credit: BBC 2017) Besides sight and smell, there are other senses animals use to find food. Many marine animals hunt by echolocation, notably toothed whales and dolphins. Echolocation is known to be incredibly sensitive, and yet dozens of sperm whales and other toothed whales have been found dead with stomachs full of plastic bags, car parts and other human detritus. Savoca says it’s likely their echolocation misidentifies these objects as food. “There’s this misconception that these animals are dumb and just eat plastic because it is around them, but that is not true,” says Savoca. The tragedy is that all these animals are highly accomplished hunters and foragers, possessing senses honed by millennia of evolution to target what is often a very narrow range of prey items. “Plastics have really only been around for a tiny fraction of that time,” says Schuyler. In that time, they have somehow found themselves into the category marked ‘food’. Because plastic has something for everyone. It doesn’t just look like food, it smells, feels and even sounds like food. Our rubbish comes in such a range of shapes, sizes and colours that it appeals to a similarly diverse array of animals, and this is the problem. Schuyler recalls someone asking, “why don't we make all the plastics blue?”, seeing as experiments suggest this colour is less popular among turtles. But other studies have shown that for other species the opposite is true. So if there is no ‘one size fits all’ solution, no aspect of plastic that we can easily change to prevent animals from eating it, then what can we take from our foray into the minds of plastic-eaters? Savoca hopes that tragic stories like Attenborough’s albatross will help to turn the consumer tide against disposable plastics and encourage people to empathise with these animals. Ultimately this will help to cut off the supply of junk food pouring into the oceans. By Josh Gabbatis সংগৃহীত- BBC

459

61

Joy

অমানুষ হওয়ার জন্যে আর কতটা নীচে নামতে হবে আমাদের?

অমানুষ হওয়ার জন্যে আর কতটা নীচে নামতে হবে আমাদের? মানুষ মানে কি অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া‚ অন্যকে অপমান করা‚ আর কিছু মানুষ প্রতিবাদ করলে তাকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে মারা? আর সমবেত ভীড় লাইভ নাটক দেখতে ব্যস্ত থাকা? প্রশ্ন ভীড় করে আসে মনে| বড্ড ঘৃনা হয়‚ খুব ছোট লাগে নিজেকে| আরও টাইট মুখোশ লাগবে আমাদের| আরে বাবা সারাদিন অফিস‚ আদালতে খাটনি| বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত জীবনে কার সময় আছে বলুন তো ঐ উটকো ঝামেলায় নাক গলানোর| আমারা কিছু দেখি নি‚ দেখতে নেই আমাদের| কে মরল‚ কে মারল আমাদের কি যায় আসে? কোন মেয়েকে রাস্তায় ফেলে ধর্ষণ করা হল‚ আমাদের কি আসে যায়? খারাপ মেয়েদের সঙ্গে ঐ রকমই হয়| ভরা বাসে কোন মেয়ের শ্লীলতাহানি হলে আমরা মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকব| কোন পশু মেয়েটির শরীরে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে‚ মেয়েটি চিত্কার করেলও আমরা শুনতে পাবো না| কারন আমরা তো বধির হয়ে গেছি| আরে দাদা কি দরকার আপনার ঝামেলায় জড়ানোর| আপনি ভালভাবে বাড়ী যান| বাড়ীতে বৌ‚ বাচ্চা আপনার অপেক্ষা করছে| নাইট শোতে আজ নতুন মুভি দেখতে যাব আমার পরিবারকে নিয়ে| ছাড়ুন তো প্রতিবাদ করে কি হবে‚ সব কি অন্যায় বন্ধ হয়ে যাবে? নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুন‚ শপিং মলে যান‚ পার্কে যান| আনন্দ করুন| বাড়ীর আশে পাশে বখাটে ছেলেগুলো মদ খেয়ে হোলি খেলবে| মুখে গালাগালি থাকবে‚ পথচলতি মেয়েদের রং দেবার অছিলায় শরীরে হাত দেবে| আপনি বাজারের ব্যাগটা সাইড করে বাড়ী ফিরবেন| আরে ধুর মাংসে রং পরবে| মেয়েগুলো ও বা আজ রাস্তায় বেড়োয় কেনো? মেয়েটি লজ্জায়‚ ঘেন্নায় কুঁকড়ে যাবে| কেউ কেউ হেসে বলবে বুরা না মানো হোলি হ্যায়| আর কতটা নিচে নামলে পশু হওয়া যায়? না দেখলেও হল‚ সব ব্যাপারে আমরা কেন মাথা গলাতে যাবো? দশটা-পাঁচটা ডিউটি| পরিবার‚ পরিজন‚ ফেসবুক‚ টুইটার‚ ক্রিকেট‚ কেচ্ছার গল্প শুনে আমরা তো ভালই আছি| কিন্তু কতদিন ভাল থাকবো আমরা‚ আর কতদিন ভালো থাকবে আমাদের সন্তানরা? কি করে ও নি:শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে ওরা এই বিষ বাষ্পে? আর কতদিন আমরা নিজেকে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখব| আমারা সত্যিই কি সেফ সাইডে আছি| অফিস থেকে রাত্রির করে ফিরে আসা মেয়েটি না আসলে আপনার চিন্তা হবে না তো? আপনি সপরিবারে মুভি দেখে একটু রাত্রি করে ফেরার সময় ঐ বখাটে ছেলেগুলো মদ খেয়ে চুর হয়ে মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলে বলবেন না প্লিজ মেয়েগুলো কেন রাত্রিতে বাইরে বের হয়| সামাজিক অবক্ষয় অনেক হয়েছে| রাস্তা-ঘাটে নোংরামি বেড়েছে| তার জন্যে কি আমরা দায়ী নই? মুখোশের মোটা‚ পুরু আবরন ভেদ করেও কানে আর্তনাদ আসছে| ঐ আর্তনাদটা কার? ধুর ছাড়ুন তো| যত সব ঝামেলা| আরে আপনি বাঁচলে বাপের নাম| ছেলেরা একটু মদ খাবে না‚ জুয়া খেলবে না‚ মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে না তাই কি হয়| আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি| রাস্তায় একটা ছেলেকে দশ-বারোটা ছেলে কুপিয়ে মেরেছে| অফিস টাইমে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবতীর মুখে কেউ acid ছুড়ল| মেয়েটা যন্ত্রনায় রাস্তায় পরে থাকে| পুড়ে কুন্ডলী পাকানো শরীরটা একটু জল চায়| বাস আসে‚ বাস যায়| আমরা বাসে উঠে পরি| কানে হেডফোন দিয়ে চোখ বন্ধ করি| কেউ বলে দাদা কি হয়েছিল ওখানে এত ভিড় কেন? চোখ বন্ধ করে বলি রাস্তায় কত কি তো হচ্ছে‚ কার এত সময় আছে দাদা| অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে টিভিতে নিউজটা খুলতেও সেই আজ সকালের খবর| এক পাশে আগের সুন্দর মুখ‚ পাশে acidএ পোড়া ঝলসানো মুখ| আগের মুখটা দেখেই চমকে উঠলাম আরে এতো অপর্না| আমার স্টুডেন্ট ছিল| ক্লাস টেন পর্যন্ত আমার কাছেই পড়ত| বেশ গরীব ঘরের| খুব কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেয়েছিল কয়েক মাস আগেই| মেয়েটির চাকরির স্বপ্ন‚ বাঁচার স্বপ্ন পুড়ে শেষ হয়ে গেল| আজ আর পারিনি টিভির চ্যানেলটা পাল্টে দিতে| পাড়ার বখাটে ছেলেগুলোর কল্যানে কালী পুজোর সারা রাত চকলেট ব্যোম‚ পটকা‚ বাজির ভয়ানক আওয়াজ| সব কটাই ১৮ থেকে ২৫ এর মধ্যে| সারা রাত ঘুমাতে পারল না আমার বাচ্চাটা‚ ঘুমের ঘোরে ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরে মাকে| পাশের বাড়ির মিত্র কাকু শয্যাশায়ী| দুবছর ধরে প্যারালাইসিসে ভুগছেন| সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি| বারন করাতে ছেলেরা বাজি ফাটানো আরও বাড়িয়ে দিল| এবার আমাদের ঘর লক্ষ করে চকলেট ব্যোম এসে পড়ছে| নিউ টাউন থানায় ফোন করে সব বললাম| কোথা থেকে বলছেন‚ কি নাম‚ এটাই আপনার ফোন নাম্বার তো? দাঁড়ান লোক পাঠাচ্ছি| কিছুক্ষন পরে এক অফিসারের ফোন আপনি যে বললেন ব্যোম ফাটছে| ওর তো সব বাচ্চা| আপনকে একবার রাতে থানায় আসতে হবে| কেন জানতে চাইলে উত্তর এল আপনাকে দেখি একবার| ভুল ইনফর্মেশন দেন কেন? চুপ করে গেলাম| বাড়ির পাশ দিয়ে ঐ বাচ্চা ছেলেগুলো গালাগালি দিতে দিতে চলে গেল| কত দিন পুলিস থাকবে দেখবো‚ স্পষ্ট ওদের হাসি শুনলাম| আর কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলো না| কেউ কেউ বলল কালী পুজোতে একটু ব্যোম-পটকা তো ফাটবেই| আবার প্রতিদিনের মত বেঁচে থাকা| দাদা ছাড়ুন না কি হবে এসব ভেবে| বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হয়ে কি হবে? কদিন পর IPL শুরু হচ্ছে| কোন প্লেয়ারের দাম কত উঠল| শ্রীদেবীর মৃত্যুটা স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক আসুন এসব নিয়ে চর্চা করি| কেউ বা রাস্তায় প্রতিবাদ করে রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকে| আপনি কিছু দেখেন নি তো| একবার গিয়ে দেখবেন নাকি ঐ থ্যাঁথলানো মুখটা| চেনা চেনা লাগছে কি?

134

5