মনোজ ভট্টাচার্য

কিস্যা আটলান্টা কা !

কিস্যা আটলান্টা কা ! ১৯৯০ সালের পরে কয়েক মাস আটলান্টায় থাকতে হয়েছিল । সেই সময় আটলান্টায় অলিম্পিক’৯৬ হবে বলে শহরের ভাংচুর আরম্ভ হয়ে গেছে । পিচ ট্রি রোড এর ওপর রেড হুক ইন নামে একটা মোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম ! একেবারে শহরের মাঝখানে - আশেপাশে কোনো দোকান-পাট নেই । উল্টোদিকে একটা আটতলা পার্কিং বিল্ডিং ! সারাক্ষন আলোয় ঝলমল করছে ! এই মোটেলটাও ভাঙ্গার তালিকায় ! তবে এখনো দেরী আছে । মোটেলের মালিকও যতদিন পারে ভাড়া দিচ্ছে ! যেহেতু এই বাড়িটা ভাঙ্গা হবে - তাই এখানে বোর্ডার আর বিশেষ আসে না - বেশির ভাগ ঘরই খালি পরে আছে । সারা তিনতলায় একমাত্র আমি আছি । যদি আমাকেও যেতে বলে - তবে ওরাই অন্য মোটেলে ব্যবস্থা করে দেবে ! হোটেল ও মোটেলের তফাত আছে । আমি সে সবে কিছুর মধ্যে যাচ্ছি না ! মূল পার্থক্য হলো - নিরাপত্তা ! মোটেলের বাসিন্দাদের কোনো নিরাপত্তা নেই । যে কোনো সময় বাইরের যে কেউ ঘরের দরজায় হাজির হতে পারে ! – এমন কি বন্দুকধারিও হতে পারে – ওখানে ওটাই স্বাভাবিক ! বারান্দার দুটো সিঁড়ি সবসময় খোলা । কোনো দরজা নেই ! এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যে বেলায় ঘরে ফিরে জামা-কাপড় পাল্টে চা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়েছি । সামনে পীচ ট্রি স্ট্রিটে আপনা আপনি ট্র্যাফিক সিগন্যাল জ্বলছে নিভছে । চোখ গেল পাশের ঘরের দিকে ! একটি কালো মেয়ে দাড়িয়ে আছে দরজায় ! - সকালে দেখেছি বটে পাশের ঘরে বোর্ডার এসেছে ! সেই বোর্ডারই কি এই মেয়ে - হতে পারে ! রাস্তায় তখন ফিরতি গাড়ির জ্যাম - সবাই বাড়ি ফিরছে I ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল - মেয়েটি ওর দরজা থেকে আমার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে । আসলে আমাকে ডেকে কিছু বলতে চাইছে । ' - কিছু বলছ আমাকে ?' ' - তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে !' - শুনে ভালো করে দেখলাম মেয়েটিকে ।একটি দুঃস্থ মেয়ে - স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো । অনেকেই জানেন - আমেরিকায় দুটো জাতি থাকে - 'আছে' আর 'নেই '! - উত্তরে, পশ্চিমে বা টেক্সাসে - মোটামুটি 'আছে'দের প্রাধান্য । আর দক্ষিনে ও মধ্যে - 'নেই'দের প্রাধান্য ! আমেরিকাতে সাদা-কালো ছাড়াও অর্থনৈতিক ভাবে - আমাদের দেশের মতই অনেক গুলো শ্রেণী আছে । ধনী, উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দুঃস্থ ! - এই দুঃস্থ শ্রেনীর মধ্যে সাদা বা কালো - দুইই আছে । এরা সরকারি সব রকম সাহায্যই পায় - যেমন এস এস আই , ফুড স্ট্যাম্প ইত্যাদি – আরও কি কি - আমি সব জানিও না । কিন্তু এদের মধ্যে লেখা-পড়া বা চাকরি-বাকরি করার কোনো ব্যাপার নেই ! অপরাধ-প্রবনতা এদের যেন রক্তের মধ্যে ! ছেলে-মেয়েদের পোশাক-আশাকের মধ্যে দিয়েই সামাজিক অবস্থান প্রকট হয়ে ওঠে ! ' - কি কথা !' - আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি । ' - তুমি ভেতরে চলো - বলছি ' বলেই মেয়েটি আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে গেছে ! ' - আরে তুমি ভেতরে ঢুকছো কেন ? কি বলবে - এখানে বলো ' - আমার তখন বুঝতে আর বাকি নেই - মুরগী হতে চলেছি ! ' - আমায় দুটো টাকা (ডলার ) দেবে ? আজ সারাদিন খাই নি ! ' - ততক্ষনে আমার বিছানায় বসে পড়েছে ! আর বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে আমার টাকার ব্যাগ ! আমি অনন্যোপায় হয়ে বললাম : ' - তুমি উঠে বাইরে এসো - আমি টাকা দিচ্ছি '! ' - কেন - তুমি আমার পাশে বসো না ! আমরা গল্প করি !' - বলেই যে কাজ করলো - আমি অত তাড়াতাড়ি ভাবতেও পারিনি - কেউ এরকম করতে পারে ! টি-শার্টটা খুলে ফেলেছে ! একেবারে টপলেস ! কিছুদিন আগেই এখানে কোনো এক জায়গায় - এই কালো মেয়েকে নিয়েই একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছিল ! কালো-সাদা বিভাজন হয়ে গিয়ে - সে এক বিশ্রী ব্যাপার ! - পুলিশ এসে আগে অভিযুক্তকে হাতকড়ি পরিয়ে নিয়ে যায় ! কাগজে-টি ভি তে ছবি-টবি উঠে একাক্কার হয় ! আর সরকার অভিযুক্তকে দিয়ে প্লী ডীল করিয়ে নেয় ! - কালোদের চটাবে না - অনেকটা আমাদের দেশের মতই ! এক গাদা টাকা গুনাগার দিতে হবে - অথবা কারাবাস ! ' - তুমি শীগগির জামা পরে নাও আর উঠে বাইরে এসো - বলছি -' আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম - ভয়েতেই বোধয় ! - 'এখুনি আমি পুলিশে ফোন করব ।' ' - আমায় কুড়ি টাকা দাও - আমি চলে যাবো ! তা নাহলে আমিই পুলিশ ডাকবো !' - বলে ফোনটা তুলে নিল ক্র্যাডেল থেকে । আমি উত্তর কলকাতার মানুষ - আমায় টুপি পড়াবে ! - রাগের চোটে তেড়ে গিয়ে ও'র হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে জিরো ডায়াল ঘুরিয়ে দিলাম । রিসেপশানে এখন অরবিন্দ আছে - দেখেছি । ' - অরবিন্দ - এখুনি একবার আমার ঘরে আসবে ? আমার ঘরে একটা মেয়ে ঢুকে পড়েছে । জামা খুলে ফেলেছে আর আমাকে ভয় দেখাচ্ছে পুলিশের ! অরবিন্দ 'এখুনি আসছি' বলে ফোন নামিয়ে রাখলো । আমার এই তৎপরতায় মেয়েটা ঝিমিয়ে পরেছিল - তাড়াতাড়ি জামাটা পরে ফেলল - কিন্তু একভাবে বসেই রইল ! খানিক্ষনের মধ্যেই অরবিন্দ একজন স্প্যানীশ সঙ্গীকে নিয়ে ওপরে চলে এলো ! - মেয়েটাকে দেখেই অরবিন্দর সঙ্গী বোধয় চিনতে পেরেছে - এই মারে কি সেই মারে।- আমার কাছে সব শুনে নিয়ে মেয়েটাকে পুলিশের ভয় দেখালো । ও এখানে উঠে এলো কি করে ! পাশের ঘরের দরজা খোলা কেন ? পরের দিন শুনলাম - মেয়েটিকে কোনো একজন বোর্ডার ডেকেছিল - কিন্তু সে নেই ঘরে ! তাই মেয়েটি চেষ্টা করেছিল যদি কোনো খদ্দের পেয়ে যায় ! ঘটনার পরে আমার মনে হয়েছিল - আমি তো ওকে দুটো টাকা দিতেই পারতাম ! বলেছিল সারাদিন খাওয়া হয় নি ! যদিও সেটা সত্যি নয় - কারণ ওদের যাবতীয় খরচ আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই হয় ! - কিন্তু আমিও বৃহত্তর বিপদের ভয় পেয়ে গেছিলাম । কাগজ - টি ভি – পুলিশ-কারাবাস ! ওরে বাবা ! আমি ওসবে নেই ! - আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নী-নিষ্ট বাঙ্গালি ভদ্রলোক ! মনোজ অনেক দিনের পুরোনো একট লেখা দিচ্ছি ! ব্লগের দিকটা খুব খালি খালি দেখাচ্ছে !

39

3

Ranjan Roy

আহিরণ নদী সব জানেঃ রঞ্জন রায়

৫ ভূত –পেত্নী-দত্যি-দানো ভিলাইয়ে সিভিক সেন্টারের পাশের মাঠে সেবার রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ হচ্ছিল ইউ পি বনাম এম পি। কোনও টিকিটের বালাই নেই । এম পি দলের পক্ষে বিলাসপুরের থেকে সিলেক্ট হওয়া একটি নতুন ছেলে ভাল ব্যাট করছে । মন দিয়ে দেখছি এমন সময় পিঠে হাত, আমার লংগোটিয়া ইয়ার পানিগ্রাহী , খুব উত্তেজিত। এখনই বাড়িতে যেতে হবে, বড়ে ভাইয়া ডেকেছেন। বড়ে ভাইয়া স্টিল প্ল্যান্টে জেনারেল ফোরম্যান। আজ শনিবার বটে , কিন্তু এ’সময় বাড়িতে কেন? মার শরীর খারাপ হল নাকি? প্রেশারের রুগী। বন্ধু বলল সেসব কিছু না , ভালো খবর । তোর চাকরি হয়েছে গ্রামীণ ব্যাংকে। পোস্টিং বলোদা বলে একটা গেঁয়ো ব্লক হেড কোয়ার্টারে। তুই তো বাড়ির ঠিকানা না দিয়ে আমার ঠিকানা দিয়েছিলি। আজ চিঠি আসতেই আমি তোদের বাড়ি দিয়ে এসেছি। মা মুঁহ মিঠা করিয়েছেন, ফোন পেয়ে বড়ে ভাইয়া প্ল্যান্ট থেকে চলে এসে তোকে ডাকতে পাঠিয়েছেন। আমার মাথার ভেতরে দিওয়ালির হাজার লড়ি চড়বড় করে ফাটতে থাকে। অন্ধ রাগে আমি পানিগ্রাহীর কলার ধরে ঝাঁকাতে থাকি। কেন? কেন তুই চিঠি আমার বাড়িতে দিতে গেলি? কেন আমার হাতে দিলি না ? এইজন্যেই কি করেস্পন্ডেন্স এর জন্যে তোর ঠিকানা দিয়েছিলাম! ও ভয় পায়। অতিকষ্টে আমার হাত ছাড়ায়। আমার চারদিকে ভীড় জমতে থাকে। আমি লজ্জা পাই। পাবলিককে বলি সব ঠিক ঠাক হ্যাঁয়। তারপর ওর হাত ধরে একপাশে সরে আসি। ও হাঁপায়, তারপর বলে—দু’হাজার টাকা সিকিউরিটি দিতে হবে যে! তাই তোর বাড়িতে গেলাম। বড়ে ভাইয়া টাকা তুলে এনেছেন। আমার গা চিড়বিড় করে । ও বলে কুছ ভী হো ইয়ার, তেরে অপনে বাপ-মা, খুদ কে ভাইয়া, কোই গ্যর থোড়ি। পুরানী বাতে ভুল জা, গুসসা থুক দে। অব তেরী নয়ী জিন্দগী শুরু হোগী। যদি ভুলে যাওয়া যেত! বাড়িতে ঢুকতেই বড়ী ভাবী হৈ হৈ করে উঠল। এসেছেন এসেছেন; তিনি এসে গেছেন। বাইরের ঘরে সবাই হাজির। ভাবী ইশারা করছিল – প্যার ছুঁও; কম সে কম বাবুজি অউর মাজী কে। যন্ত্রের মত ভাবীর আদেশ পালন করলাম। ভাইয়া এসে একটা খাম দিয়ে বললেন—তিন হাজার আছে। সিকিউরিটি দু’হাজার আর তোর প্রথম মাসের খাইখরচা বাবদ আরও এক হাজার। কাল রোববার দিনের বেলা রওনা হয়ে বিকেল নাগাদ হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে যা। সোমবার থেকে ডিউটি জয়েন করবি; নতুন ব্যাংক, প্রথম ব্যাচ, সিনিয়রিটি মার না খায়! --আমি আপনার টাকা নেব না । ঘরের মধ্যে বাজ পড়ল। ভাইয়া যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না । - কী বললি? - ঠিকই শুনেছেন, নেব না । বাবা আস্তে আস্তে নীচু গলায় বললেন—সিকিউরিটি ডিপোজিটের টাকা কোথায় পাবে? --এখানে চেনাজানা লোকজনের থেকে ধার নেব। ভাইয়া এসে ঠাস করে এক চড় কষালেন। --ধার নিবি? আর চেনাজানা সবাই যখন আমাদের নামে ছি-ছি করবে? তাতে তোর কিছু আসে যায় না ? খালি নিজের জিদ! আমার আনন্দ হচ্ছে। চড়ের জ্বালা টের পাচ্ছি না । এই তো বদলা নেওয়ার শুরু! আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল—আর যেদিন চেনাজানা সবাই আমার নামে ছি-ছি করছিল সেদিন আপনারা কোথায় ছিলেন? ভুলে গেলেন! বড়ে ভাইয়া খামটা বাবার হাতে দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। বাবা আমাকে ডেকে বললেন –টাকাটা আমি দিচ্ছি। তোমার যখন এতই আপত্তি তো ধার হিসেবেই নাও। মাসে মাসে শোধ দিও, যেমন পার। যাহোক, পরের দিন রোববার। সকাল দশটায় একটা কালো চামড়ার স্যুটকেস, একটা এয়ারব্যাগ ও হোল্ডঅল নিয়ে ছত্রিশগড় এক্সপ্রেসে চড়ে বসলাম। বাকি জনতা স্টোভ মগ বালতি অকুস্থলে গিয়ে দেখা যাবে। জীবনে গাঁয়ে থাকি নি। কলেজে পড়ার সময় এন এস এস এর ক্যাম্পে গেছি বটে, তবে সেসব গ্রামসমাজের বাইরে ক’দিনের জন্যে পিকনিক। সঙ্গে বন্ধুবান্ধব , স্যারেরা। ট্রেন লেট ছিল , বিলাসপুরে নামলাম বিকেল সাড়ে তিনটে। তারপর সারদা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির বাস ছাড়ল চারটে আর কয়েক জায়গায় রোববারের বাজার হাটের সামনে গড়িমসি করে ঢিকিস ঢিকিস করে রওনা দিতে দিতে যখন শেষ স্টপ বলোদায় নামলাম। তখন শীতের কুয়াশা ঘন হয়েছে। বাস থেকে নামতেই ঝপ করে আলো নিভে গেল। দেখলাম এটা বলোদার শনিচরি বাজার। পাওয়ার কাট নিয়মিত হয়, আলো কখন আসবে , আজ রাতে আদৌ আসবে কি না কেউ জানে না। নতুন খুলেছে গ্রামীণ ব্যাংক, দেখা গেল অনেকেই চেনে না । শেষে জানা গেল ওটা এক কিলোমিটার দূরে বুধবারি বাজারে দুর্গাবাড়ির সামনে। একটাকা মেহনতানার বদলে একজন রাউত বাঁকে করে আমার লাগেজ বয়ে নিয়ে চলল, পেছন পেছন আমি। কিছু কিছু ঘরে টেমি জ্বলছে, কোথাও হ্যারিকেন, কোথাও মোমবাতি। অধিকাংশ ঘরে কিছু জ্বলছে না । তল্পিবাহক জানাল যে বেশির ভাগ লোক এই রুটিনে অভ্যস্ত, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। একটা একতলা পাকা বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল –এটাই ব্যাংক। ভেতরে গিয়ে একটু দমে গেলাম। ব্যাংক বলতে যেমন কাউন্টার, কাঁচের আড়াল, সফিস্টিকেটেড পোশাক আশাক মনে হয়। তেমন কিছুই নেই । গোটা কয়েক কাঠের র‍্যাক, দুটো স্টিলের আলমারি, একটা তেজারতি কারবারিদের সিন্দুকের মত, তার ওপরে একটা সোনার দোকানের মত ছোট্ট দাঁড়িপাল্লা। বুঝলাম , বতক বা হাঁস যেমন পাখি নয়, গ্রামীণ ব্যাংকও তেমনি ব্যাংক নয়। তিন জোড়া চেয়ার টেবিল। তাতে হ্যাজাক বাতির সামনে একজন গুরুজি বা স্থানীয় মাস্টারমশাই একটি বছর নয়ের ছেলেকে ১৫ কে পহাড়া রটা রহে থে। উলটো দিকে পাজামা ও গেঞ্জি পরা এক ভদ্রলোক কোলে একটি বাচ্চাকে নিয়ে আদর করছেন। আমি ম্যানেজার আগরওয়াল সা’বের খোঁজ করায় উনি নিজের পরিচয় দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বললেন আগেই আপনার পোস্টিং বিষয়ক চিঠি এসে গেছে। কাল সাড়ে দশটায় ব্যাংক খুলবে। এখন কিছু খেতে চাইলে পাশে মল্লু ভাঁচার (মল্লু ভাগনের) হোটেলে ভাত ডাল পেয়ে যাবেন। আমি বললাম আজ রাতের মত খাওয়া হয়ে গেছে। ওঁর ইশারায় একটি ছেলে এগিয়ে এল। এখানকার চাপরাশি গোরেলাল আদিত্য। বললেন ফিল্ড অফিসার অনিল উইক এন্ডে ওর ঘর রায়পুরে গেছে। গোরের কাছে চাবি। আপাততঃ ওখানে শুয়ে পড়ুন। কাল ঘরের ব্যবস্থা পাকাপাকি করব। আর হ্যাঁ, মোমবাতি ও দেশলাই নিয়ে যান। আমার কাছে টর্চ ছিল , তবু প্রথমদিনেই গুরুজনের অবাধ্য হব না ভেবে নিয়ে নিলাম। ঘর ছোট , দেয়ালের কুলুঙ্গিতে আধপোড়া মোমবাতি ও কোন দেবতার ছোট্ট ফটো। একটা নীচু তক্তপোষ, গোরে তাতে হোল্ড অল খুলে দিয়ে বলল –শুয়ে পড়ুন, সকাল সাতটায় আপনাকে ডেকে চা খাইয়ে পুকুরপাড়ে নিয়ে যাব, প্রাতঃকৃত্য মুখারি সব করে একেবারে স্নান সেরে ঘরে ফিরবেন। আর মাঝরাতে সু-সু পেলে দরজা খুলে বারান্দা থেকে নীচে নেমে রাস্তার ধূলোর ওপর সেরে নেবেন । এখানে সবাই তাই করে। দরজা বন্ধ করে আদপোড়া মোমবাতি জ্বালিয়ে ব্যাগ খুলে দেখি মার দেওয়া বেসনের লাড্ডু আর সুজির পুর দেওয়া গুজিয়া কিছু বেঁচে আছে। খেয়ে নিলাম। তারপর মোমবাতি নিভিয়ে রজাই মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। গাঢ় ঘুমের মধ্যে কোথাও একটা পেরেক ঠোকার মত আওয়াজ মাথার মধ্যে অনবরত ঠোকাঠুকি করোতে লাগল । চোখ যেন আঠা দিয়ে সাঁটা , কিন্তু আওয়াজ চলছে। ধীরে ধীরে চোখ খুললাম, এ কোথায় শুয়ে আছি? এইসা ঘুপ অন্ধেরা তো মেরে ঘর মেঁ কভি নহী হোতী? কিন্তু একটা আওয়াজ যে আসছিল? থেমে গেছে? না , ওই শুরু হল। ইঁদুর ? আরশোলা ? উঁহু, শব্দটা আসছে বাইরে থেকে কেউ যেন দরজায় টরে টক্কা গোছের একটা তালে তালে টোকা দিচ্ছে। আর ফিসফিস ফিসফিস ! শহরের ছেলে, ভূতের ভয় নেই , কিন্তু এই অচেনা জায়গায়? এমন রাতে? কে হতে পারে ? ঘুমের ঘোরে টর্চের কথা ভুলে গেলাম। বিছানা থেকে নেমে হালকা হাতে দরজা খুলতেই এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিল। আর একজোড়া কনকনে ঠান্ডা হাত আমার গলায় ফাঁস হয়ে জড়িয়ে গেল। একটা হিসহিসে স্বর কানের কাছে বলে চলেছেঃ উঃ, কতক্ষণ ধরে ডাকছি, ঘোড়া বেচে ঘুমুচ্ছিলে? আমি যে শীতে জমে গেলাম। ভয়ে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। কোনরকমে হাতের বাঁধন খুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম—কৌন, কৌন হো আপ? দু’সেকেন্ড; চমকে উঠে সেই স্বর বলে উঠলঃ হায় দাইয়া! আর আমি খালি ঘরে কাঁপতে কাঁপতে ভাবছিলাম? স্বপ্ন দেখছিলাম কি? কিন্তু দরজা বন্ধ করার পর অনেকক্ষণ ঘরের মধ্যে ভাসছিল এক গেঁয়ো নেবুতেলের গন্ধ। এক মিনিট সবাই চুপ। রূপেশ নিজের শূন্য গ্লাসের দিকে তাকিয়ে। রাজন ইশারায় বোঝাল আর নেই । তারপর শ্রীরাম মুচকি হেসে বলল – ক্যা কিসমত লেকর আয়ে হ্যাঁয় স্যার! নৌকরি কে পহেলা দিন হী ভূতনী সে মূলাকাত? পর আপ ছোড় দিয়ে কিউঁ? হম হোতে তো ভূতনী কো রঙ্গে হাত পকড় লেতে। টর্চ মারকে শকল সুরত দেখ লেতে! রূপেশ লজ্জা পেয়ে বলে ধ্যেৎ! রাজন বলে তারপর? অগরওয়াল সা’ব কো বতায়েথে? কহাঁ মরনে কে লিয়ে ভেজ দিয়ে থে আপ কো? আখির ও স্পিরিট কে হাত আপ কে গর্দন তক --! ও কথা শেষ করতে না পেরে দুদিকে মাথা নাড়তে থাকে। না , ম্যানেজার সা’বকে নয়; সকালে স্নানে যাবার সময় চাপরাশি গোরেলালকে বলেছিলাম । ও একচোট হেসে নিল। তারপর বলল যে কাউকে এ নিয়ে কিছু বলার দরকার নেই । আর আপনি তো আজ থেকে অন্য ঘর পেয়ে যাবেন। আজ অনিল এসে যাবে। ওটা ওর ব্যাপার, ও বুঝবে। খাসা গল্প; এবার জীবনে প্রথম মহুয়া খাওয়ার কিসসাটাও হয়ে যাক। রূপেশ মুচকি হেসে চুপ করে । এত কথা এদের বলে ফেলে কেমন ক্লান্ত লাগছে, আর একটু অস্বস্তি। শ্রীরাম চেঁচিয়ে ওঠে—আরে , আমাদের স্কাউটের দল ফিরে আসছে। বেওকুফলোগ নমক লানে কে লিয়ে ডান্ডি মার্চ করকে আ রহে শায়দ। তারপর নীচুগলায় বলে—দেখিয়ে সাব, এক ভূতনীকো ভী সাথ লা রহে হ্যাঁয়। সামনের দুটো কোসম গাছের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ডোঙ্গরে ও টুল্লু। হাতে ু একটা বড় ব্যাগ, কিন্তু সঙ্গে একটি মেয়ে, মুখে সলজ্জ হাসি। কাছে এলে চোখে পড়ল কপালে একটা তেরছা কাটা দাগ। সেভিংস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার ১/১০; দ্রুপতী বাঈ। দলটা এসে হাতের ঝোলা নামিয়ে ধপ করে ঘাসের উপর বসে পড়ে । সবার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ওদের দেখে ভুলে থাকা খিদে যেন নতুন করে চাগিয়ে উঠল। তোদের ব্যাপারটা কী? আজ কি চায় – নাস্তার পিকনিক? ডোঙ্গরে ঢক ঢক করে জল খায় , তারপর জানায় যে আচ্ছা চক্করে ফেঁসে গেছল। ওই পাড়াটা অত কাছে নয়; রাস্তাও তথৈবচ । তারচেয়ে বড় ব্যাপার হল গাঁয়ে কোন মুদি দোকান নেই । ওদের কিরানা সামান ছুরিকলাঁ গাঁ থেকেই আসে। আর কোন পরিবার ঘরের নুন বেচবে না ; বলে এমনি নিয়ে যাও। যত বলি আমাদের সা’ব মিনি মাগনা কিছু নেন না ওরা মাথা নাড়ে। কিন্তু নুন না নিয়ে ফেরত আসি কী করে ? শেষে জঙ্গলের পথে এই মেয়েছেলেটার সঙ্গে দেখা; ঠুল্লু চেনে, বলল ও নাকি আমাদের কাস্টমার। মেয়েটা সব শুনে নিজের ঘর থেকে নুন তেল আরও কিছু নিয়ে এল । বলল অনেক বেলা হয়ে গেছে আমাদের সঙ্গে এসে মাংস রেঁধে দেবে। রূপেশ অস্বস্তি বোধ করে । তারপর দ্রুপতীকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে যে রান্নাটা ডোঙ্গরে সাহাব করবে, আগে থেকে ঠিক হয়ে আছে। দ্রুপতী হার মানবার পাত্র নয়। গলা চড়িয়ে বলে –তা ডোঙ্গরে সা’ব এতক্ষণ কী করছিল? দুটো বেজে গেছে। শীতের দুপুর। চারটের পর সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেলে এখানে তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসবে। আপনারা ঘরে ফিরবেন না ? শ্রীরামের মাত্রাটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গেছল। একটা কৃত্রিম চেরা আওয়াজে বলে – না হয় নাই ফিরলাম, তোর ঘরে মেহমান হই যদি? থাকতে দিবি তো? রূপেশের চোয়াল শক্ত হয়। দ্রুপতী শ্রীরামের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে রূপেশকে বলে যদি ওর হাতে খেতে সাহাবের আপত্তি না থাকে তো জিদ না করে ওর কথাটা মেনে নেওয়া হোক। ওর অনেক গুরুজির বাড়িতে রান্না করে অভ্যেস আছে। এইসব নৌসিখিয়াদের উপর ভরসা করলে সারাদিন উপোস করে থাকতে হবে। রূপেশ সবার মুখের দিকে তাকায়। তারপর বলে –বেশ, তবে তোকেও আমার কথা মানতে হবে। আমাদের সঙ্গে এখানেই খেয়ে যাবি।

542

72

Ranjan Roy

< নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা—একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া>

< নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা—একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া [এটি সন্মাত্রানন্দ রচিত “ নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা- অতীশ দীপংকরের পৃথিবী” উপন্যাসটির পুস্তক সমালোচনা নয়, সে যোগ্যতা আমার নেই, -- বড়জোর এক মুগ্ধ পাঠকের প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। ] পাতা ওল্টাতেই বিস্ময়। দর্শনের গুঢ় এবং কূট প্রশ্ন ও কয়েক শতাব্দী আগে জন্মানো এক ক্ষণজন্মা বাঙালী মেধা অতীশ দীপংকরকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা ভেবেছেন প্রথম জীবনে রামকৃষ্ণ মিশনে সেবাব্রতী এক সন্ন্যাসী! এই পাঠকের মিশনের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক তাতে ওখানকার সন্ন্যাসীরা গৌতম বুদ্ধকে জয়দেব গোস্বামীকৃত দশাবতার স্তোত্রের বেঁধে দেয়া ভূমিকা অনুযায়ী বিষ্ণুর এক অবতার --‘নিন্দসি যজ্ঞবিধেয়রহযাতম, সদয়হৃদয়দর্শিতপশুঘাতম’ হিসেবে ভাবতেই অভ্যস্ত। কিন্তু ‘অনাত্মবাদীন’ ‘ক্ষণিকবাদীন’ বৌদ্ধদর্শনের অভিঘাত মিশনের জীবনে কোন অভিঘাত সৃষ্টি করে না । কারণ রামকৃষ্ণদেব ও বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক মানসভূমি বেদান্ত এবং ধর্মাচরণের বাহ্যিক দিকটি শাক্তমত ও তন্ত্র আশ্রিত। ঠাকুরের ভৈরবীসাধনা ও বেলুড়ে কালীপূজোর রাতে পশুবলি জনসাধারণের গোচরে। অথচ বইটি ইতিহাসের গবেষণাপত্র নয়, কোন দার্শনিক পাত্রাধার-কি-তৈল কিংবা তৈলাধার-কি-পাত্র বিচারে কণ্টকিত গ্রন্থ নয় । এটি আদ্যন্ত নিটোল একটি উপন্যাস। ইহাতে কল্পনার যাদুমিশ্রণ, প্রেম-প্রত্যাখ্যান-বিরহ-বলিদান-প্রতিহিংসা-জয়-পরাজয় সবই আছে। উপন্যাসটি লিখলেন সন্মাত্রানন্দ! প্রথমেই সংশয়। একজন গার্হস্থ্যজীবন পরিত্যাগী মানুষ কী করে ফুটিয়ে তুলবেন ষড়রিপুর তাড়নায় জ্বলেপুড়ে খাক হওয়া মানুষের ছবি? যিনি এই রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শের জগতকে অবিদ্যাজনিত মিথ্যাত্বের সাময়িক সৃষ্টি বলে মেনে নিয়েছেন তাঁর কলমে কী করে ফুটবে এর সৌন্দর্য ও কন্টকিত রূপ? এই পূর্বাগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। অবশ্য সন্ন্যাসীর সাহিত্যচর্চা একেবারে কালাপাহাড়ি কিছু নয়। স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছেন ‘সখার প্রতি’ ও ‘দি কাপ’ এর মত কবিতা। অতি আধুনিক বাংলায় ছোট ছোট বাক্যবন্ধে ‘প্রবাসে’র মত জার্নাল। পন্ডিচেরির নিশিকান্তের কবিতাও স্মরণীয়। তবে সেসব আধ্যাত্মিক স্টেটমেন্টের কাব্যরূপ। কবিতার শৈলীর আবশ্যকীয় অ্যাবস্ট্রাকশন সেই স্পেস দেয় । কিন্তু গদ্যরচনা? বিশেষ করে উপন্যাস? এখানে তো চরিত্ররা রক্তমাংসের, সময় অতীতচারী হয়েও ছুঁয়ে যাবে সমকালের যন্ত্রণাকে, নইলে তা পর্যবসিত হয় জাদুঘরের দ্রষ্টব্যে। উপন্যাস লেখার এ’সব ঝামেলার সঙ্গে সন্মাত্রানন্দ সম্যক অবহিত। তাই বইটির প্রস্তাবনায় তিনি অকপট—“ – অতীশ দীপংকরের জীবনেতিহাস এ উপন্যাসের আশ্রয়, কিন্তু বিষয় নয়।– শাশ্বত মানবীসত্তাই ‘নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু। কখনও সে-নারীসত্তার নাম কুন্তলা, কখনও স্বয়ংবিদা, কখনো –বা জাহ্নবী”। গজব রে গজব! এই সংশয় শুধু আমার নয়। বইটি পড়ে জানতে পারলাম যে মিশন কর্তৃপক্ষ ও একই দোলাচলে ভুগেছেন সন্মাত্রানন্দের সাহিত্যকৃতি নিয়ে, অবশ্য আমার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। তাই একদিন তাঁকে নিজের ঝোলা কাঁধে তুলে মিশন থেকে বেরিয়ে আসতে হল। শ্রেয় ও প্রেয়র দ্বন্দ্বে উনি কলমকেই বেছে নিলেন আর আমরা পেলাম এই উপন্যাসটি। এই ঘটনাটি, এই নির্ণয় তাঁর মানসে এক অমিট ছাপ ফেলেছে। তাই বইটির কথক হিসেবে নিজের জীবনের আদলে বর্ধমান থেকে কোলকাতায় এসে সোনারপুরের হোস্টেলে থেকে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে স্ট্যাটিস্টিক্সে এম এস সি করে সন্ন্যাসী হওয়া এবং সাহিত্যচর্চার তাগিদে মিশন থেকে বেরিয়ে এসে লেখক হওয়া শাওন বসু চরিত্রটির নির্মাণ। তাই ভিক্ষু মৈত্রীগুপ্ত বিক্রমশীলা বিহারে সঙ্ঘনির্দিষ্ট আচারবহির্ভূত আচরণের জন্যে অতীশ দীপংকরের আদেশে সঙ্ঘ থেকে বহিষ্কারের মুখোমুখি হয়েও অবিচলিত শান্ত ও নির্বিকার থেকে যান । এবার আসি মূল বইটির কথায়। এর ‘কথনশৈলী’ আদৌ একরৈখিক নয় । এতে সময় তিন খন্ডে বিভক্ত—দশমের শেষ থেকে একাদশ শতক,ত্রয়োদশ শতক ও একবিংশ শতক। কিন্তু এই ত্রিস্তর কালখন্ডগুলো বিচ্ছিন্ন (ডিস্ক্রিট) নয়; বরং ‘ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বস্তুত একই সমতলে অংকিত পরস্পরছেদী তিন বৃত্তের মতন। এর পর আরও জটিল গঠন চোখে পরে । যেমন, “ওই তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দুগুলোর মধ্য দিয়ে কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে এক যুগের চরিত্রগুলোর সঙ্গে অন্য যুগের চরিত্রদের’ দেখা হয়ে যায়, বিনিময়ও হয়। একে কী বলব? বাঙলাভাষায় লেখা প্রথম যাদু-বাস্তবতার উপন্যাস? জানি না । সেই নান্দনিক বিচারের ধৃষ্টতা আমার নেই । তবে আমি বলব যে এই প্রচেষ্টায় লেখার প্রসাদগুণ, কালোপযোগী ভাষার পরিবর্তন ও লেখার টান আমাকে বাধ্য করেছে সারারাত জেগে একটানা পড়ে উপন্যাসটি শেষ করে পরের দিন দুপুরে পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখে ফেলতে। কারণ, দেরি করলে সেটা হবে সুচিন্তিত এক সমীক্ষা; আতসকাঁচে ধরা পড়া অনেক ফাঁকি-ফোকর। কিন্তু উপে যাবে আমার তাৎক্ষণিক ভালো লাগা, পূর্বাগ্রহ কাটিয়ে মুগ্ধতায় ভেসে যাওয়া। কেন মুগ্ধতা? প্রথম কারণটি সন্ন্যাসীর কলমে প্রকৃতি ও নারীর রূপবর্ণনা, তাও একজন সাধারণ পঞ্চেন্দ্রিয়তাড়িত পুরুষের রূপমুগ্ধতার দৃষ্টিতে। কোথাও কোথাও দুই এক হয়ে গেছে। কাহিনীর আশ্রয় বাঙ্গালাদেশের ঢাকা- বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মানো রাজপুত্র চন্দ্রপ্রভ কেমন করে সুবর্ণদ্বীপে (ইন্দোনেশিয়া) আচার্য ধর্মকীর্তির কাছে পাঠশেষ করে বিক্রমশীলা মহাবিহারের আচার্য অতীশ দীপংকর হয়ে উঠলেন। কিন্তু মূল সুরটি হল প্রতিবেশী কিশোরী কুন্তলার বিফল কামনা, ও তন্ত্রসাধনার মধ্য দিয়ে কখনো স্বয়ংবিদা কখনও অন্যরূপে অতীশকে পাওয়ার প্রয়াস। এইভাবে এবং একবিংশ দশকে সেই বজ্রযোগিনী গ্রামে কৃষক অনঙ্গ দাসের কন্যা জাহ্নবীর মধ্যেও সেই চিরন্তন নারী হৃদয়ের আকুতির প্রকাশ। আর কালচক্রের পরস্পরছেদী তিন বৃত্তের ঘুর্ণনে চিরন্তন নারী কখনও ইয়ংচুয়া, কখনও স্বয়ংবিদা, কখনও বা জাহ্নবী। বাৎসল্য, প্রেম ও দাম্পত্যের মধ্যে নারীর তিন রূপের প্রকাশ। তাই তারাদেবীর ও তিনটি মূর্তি,--কাঠের, পাথরের ও ব্রোঞ্জের। এবার একটু তিব্বতী শ্রমণ চাগ লোচাবার চোখে স্বয়ংবিদার রূপ দর্শন করা যাক। ‘শ্বেত রাজহংসের মত দৃঢ়পিনদ্ধ শুভ্র কঞ্চুলিকা, সুনীল উত্তরী পীনোন্নত বক্ষদেশকে আবৃত করে স্কন্ধের উপর বিলম্বিত ও দীর্ঘিকার মন্দবাতাসে উড্ডীন। ----- ‘স্বয়ংবিদা প্রশ্ন করলেন, “কী দেখছ লামা? একে রূপ কহে। এই রূপসমুদ্র অতিক্রম করতে পারলে সন্ন্যাসী হবে। আর যদি অতিক্রম করতে অসমর্থ হও, যদি এতে নিমজ্জিত হও , তবে কবি হবে”। (পৃ- ১২৭) ‘অশ্রুর প্লাবনের ভিতর অপরূপা রমণীর দৃঢ় কুচাবরণ কঞ্চুলিকা শিথিল হ’ল। শিহরিত চাগ দেখলেন, সেই সুবিপুল কনককলসবৎ স্তনকুসুমের যুগ্ম কুচাগ্রচূড়া অনাবৃত বিস্ময়ে তাঁরই দিকে উন্মুখ হ’য়ে তাকিয়ে রয়েছে। --- আহ! এ কী জ্বালা! রমণীর চুম্বনে এত বিষ , এত ব্যথা! ‘(পৃ- ১৩৬) আর চুয়াল্লিশটি অধ্যায়ে বিবৃত ও প্রায় ৩৫০ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত এই উপন্যাসটিতে ধ্রুবপদের মত ঘুরেফিরে আসে একটি বৌদ্ধ তান্ত্রিক দোঁহা—‘ যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস/ নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধুলিকালীন মেঘ/ পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে/ আর পালতোলা নৌকো ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতোধারায়---/ সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে—আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালা;/ তখন –কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব ---‘। দ্বিতীয় মুগ্ধতা সন্ন্যাসী লেখকের সমকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের প্রতি সজগতা ও সংবেদনশীলতা। বিশ বছর পরে কলকাতায় ফিরে এসেছে স্বামী শুভব্রতানন্দ, পূর্বাশ্রমের শাওন বসু হয়ে। দেখছে এই কোলকাতাকে সে চিনতে পারছে না । ‘উড়াল পুলের ঘোমটা আর বাইপাসের ওড়না পরেছে কল্লোলিনী।--- কলকাতার নিজস্ব সম্মান ছিল তার কৃষ্টিতে, তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে, এখন ব্যবসায়ীদের হাতে বিকিয়ে গেছে। ক্রমশঃ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে মানুষ, কেমন খিঁচিয়ে কথা বলে আজকাল সবাই। কেউ কাউকে একটু সরে বসে জায়গা দিতে রাজি নয়’। আবার দেখুন রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘ আদর্শ কিছু নয় ক্ষমতাই সব। --- কেন্দ্রে সমাসীন এই ধর্মধ্বজীরা যাকে হিন্দুধর্ম বলে মানে, সেটা পৌরাণিক হিন্দুধর্মেরও একটা অবক্ষয়িত রূপ। এবং তারা নিজেদের সবথেকে বড়ো দেশপ্রেমিক বলে মনে করে। অহিন্দুরা কি ভারতীয় নয়?’ জে এন ইউয়ের কানহাইয়া কুমারের ঘটনায় বিচলিত প্রাক্তন শিক্ষক সন্মাত্রানন্দ লেখেন—‘ গ্রেপ্তার হয়ে গেল ছাত্রটি। বিচারের আগেই দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা ছেলেটির ওপর প্রচন্ড প্রহার চালাল। ---- ‘ছাত্ররা কি রাজনীতি করবে? নাকি, ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ? (আহা! কী অভিনব চিন্তা!)বিচারের আগেই আইনজীবীরা কি আইন নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারেন? তাঁদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে না কেন কেউ? এসব বহু তাত্ত্বিক আলোচনার অন্তে ছাত্রটি যখন ছাড়া পেল, তখন রাজনৈতিক দলগুলি এই যুবক ছাত্রটির মধ্যে তাদের মেসায়াকে খুঁজে পেতে লাগল’।(পৃ-১৪৩)। তৃতীয় কারণ, পৃ-১৫৬তে মতবাদ ও সত্যের আপেক্ষিকতা নিয়ে প্রাঞ্জল ব্যাখ্যাটিঃ ‘মানুষ সত্যের এক-একটি রূপ কল্পনা করে মাত্র। আর সত্যের উপর আরোপিত বা কল্পিত সেই সব রূপকেই ‘মতবাদ’ কহে। অধিকারীবিশেষে প্রতিটি মতবাদই প্রাথমিকভাবে উপকারী, কিন্তু কোনও মতবাদই সত্যকে সাক্ষাৎ দেখিয়ে দিতে পারে না । যুক্তি প্রয়োগ করলে সমস্ত মতই অন্তিমে খন্ডিত হয়ে যায়’। বিতর্কসভায় দীপংকরের মুখে এই বাক্যটিতে এক লহমায় ধরা পরে সমস্ত ‘বাদ’, --হিতবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, জাতীয়তাবাদ থেকে সমাজবাদ ও মার্ক্সবাদ—এর উপযোগিতা ও সীমাবদ্ধতা। জীবন চলমান আর সমস্ত ‘বাদ’ দেশ ও কালে আবদ্ধ। তাই স্থবির। মুগ্ধতার শেষ কারণটি একটু ব্যক্তিগত। পৃষ্ঠা ৮৬ থেকে পাচ্ছি অতীশ দীপংকরের ভাবনাবিশ্ব। এখানে পৌঁছে চমকে গেলাম। প্রাক্তন বৈদান্তিক সন্ন্যাসী কত সংক্ষেপে ও সহজ করে দীপংকরের অনুভবের মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করছেন বৌদ্ধদর্শনের সার। বিশেষ করে এই দুটো তত্ত্ব--তার ‘ল অফ কজালিটি’ বা কার্য-কারণ সম্পর্ এবং নির্বাণ বলতে কী বোঝায়। আর বৌদ্ধদের মধ্যেও সেই ধারণাগুলির বিবর্তন। প্রতি বিষয়ে প্রাচীন সর্বাস্তিবাদী ও সৌত্রান্তিক( মোটা দাগে হীনযানী) এবং শূন্যবাদী ও বিজ্ঞানবাদীদের ( মহাযানী) মধ্যে কোথায় তফাৎ ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে তুলে ধরেছেন মহাযান ও হীনযান নামের উদ্ভব ও সার্থকতা। উঠে এসেছে আদি বুদ্ধিজম ও পরবর্তী সংশোধনের যাথার্থ্য নিয়ে বিতর্ক। অনেকটা যেন ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট প্রভেদ, বা কম্যুনিস্ট শিবিরের গোঁড়া মার্ক্সবাদী ও সংশোধনবাদীদের বিতন্ডা। আমি কয়েকবছর আগে কাংড়ার ধর্মশালায় তিবেতান ইন্সটিট্যুট এর বারান্দায় এক তরুণ লামাকে চেপে ধরে বৌদ্ধদর্শনের কার্য-কারণ তত্ত্ব (পতীচ্চসমুৎপাদ) বোঝার চেষ্টা করি। এঁরা নাগার্জুনের মাধ্যমিক দর্শন বা শূন্যবাদের অনুগামী। তারপর দিল্লির টিবেট হাউসে অধ্যক্ষ লামার দর্শন ক্লাসে যাই ও ‘গতে গতে পারাগতে’র ব্যাখ্যা শুনি যা এই উপন্যাসে দীপংকরের ভারতে গুপ্তভাবে গ্রন্থ পাঠানোর প্রয়াসে কোড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তারপর মন না ভরায় কোলকাতায় থেরবাদীদের প্রধান ভিক্ষু সুমনপালের কাছে যাই। উনি মিলিন্দ-পঞহো অর্থাৎ রাজা মিনান্দার ও ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পড়তে বলেন। কিন্তু এখানে এই বারো নম্বর অধ্যায়ে সন্মাত্রানন্দ সংক্ষেপে সুন্দর বুঝিয়েছেন। “ ইতি ইমস্মিং সতি, ইদং হোতি। ইমসসুপ্পাদা, ইদং উপজ্জতি।–যদি এই কারণটি উপস্থিত থাকে, তবে এই ফল হবে। কারণ উৎপন্ন হলে কার্যও উৎপন্ন হবে। ইতি ইমস্মিং অসতি, ইদং ঞ হোতি। ইমস্ম নিরোধা, ইদং নিরুজ্ঝতি। -- যদি এই কারণ না থাকে তাহলে এই ফলও থাকবে না । কারণটির নিরোধ হলে কার্যটিও নিরুদ্ধ হয়ে যাবে”। (এখানে কি লেখক এই ধারণাটির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা ‘ডিপেন্ডেন্ট অরিজিনেশনে’র পক্ষে?) তারপর এসেছে এই কার্য-কারণ শৃংখলার বারোটি কড়া বা নিদান; যথাক্রমে অবিদ্যা, সংস্কার, বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভব, জাতি ও দুঃখ। এর একটি থাকলেই অপরটি থাকবে, একটি চলে গেলেই অপরটিও নির্বাপিত হবে। আর এই চক্রাকারে আবরতনের নাভি হল তৃষ্ণা। তাই নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যে জয় করতে হবে সমস্ত তৃষ্ণাকে, এমনকি নির্বাণের তৃষ্ণাকেও! কোথাও কি এলিয়টের নাটক ‘মার্ডার ইন ক্যাথিড্রাল’ এ রাজদন্ডে মৃত্যুর আগে বিশপ অফ ক্যান্টারবেরির কাছে শহীদ হওয়ার লোভ ত্যাগের প্রস্তাবের কথা মনে পড়ছে! তারপর এল পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মত করে এল এই নির্ণায়ক কথা যে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বা আত্মচেতনার প্রবাহ –এই পঞ্চস্কন্ধ মিলেই ‘আমি’। এর বাইরে আর কোন জ্ঞেয় বস্তু নেই । তারপর বিতর্কসভার মধ্য দিয়ে আমরা হীনযান ছেড়ে মহাযানে পৌঁছালাম, আরও বলতে গেলে অসঙ্গ –বসুবন্ধুর বিজ্ঞানবাদে। এখানে সন্মাত্রানন্দ কি মহাযানের পক্ষে একটু টেনে খেলিয়েছেন? কারণ আলয়বিজ্ঞান ও বিজ্ঞপ্তিমাত্রতার ধারণার সঙ্গে (জ্ঞাতা-জ্ঞেয় অভেদ) যে অদ্বৈত বেদান্তের (অহং ব্রহ্মোস্মি) বেশ মিল! আর উপন্যাসকারের সে স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু সতর্ক লেখক ধরিয়ে দেন যে বৌদ্ধমতে সকলই ক্ষণিক, নিয়ত পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে উপনিষদের কথিত ‘আত্মা’ জীবের অপরিবর্তনীয় সত্তা। আমার পরিচিত অনেকের কাছে এই অধ্যায়টি বাহুল্য এবং কাহিনীর গতিরোধক মনে হয়েছে। আমার তা মনে হয় নি। উপন্যাসে কাহিনীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশ-কাল-চরিত্রকে এবং তাদের মধ্যের সংঘাতকে তুলে ধরা। তাই ভাল উপন্যাসে একটি ডিসকোর্স থাকবেই। আর এই দার্শনিক অভিঘাতের মধ্যেই রয়েছে দীপংকর চরিত্রের অনীহার বীজ যা তাকে সংসার , ঐশ্বর্য এবং নারীর প্রেমের আহবানকে প্রত্যাখ্যান করতে প্রেরিত করে। আমার মুগ্ধতার চতুর্থ কারণ, আচার্য ধর্মকীর্তির চরিত্রচিত্রণ ও তাঁর সঙ্গে অতীশ (চন্দ্রগর্ভ) এর আলোচনায় বৌদ্ধদর্শনের নির্বাণ ও বোধিলাভের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনে অবিচার ও অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার অনুসন্ধান করা। ধীমান আচার্য ধর্মকীর্তি বুদ্ধিষ্ট লজিকের বিরাট ব্যক্তিত্ব, ‘প্রমাণবার্তিকে’র মত গ্রন্থ লিখেছেন। আর একদিকে সহজ সরল ও বালকের মত কৌতুক ও পরিহাসপ্রিয়। ছবিটি মিলে যায় পঞ্চাশ বছর আগে কোলকাতায় প্রকাশিত অবন্তীকুমার সান্যাল ও জয়ন্তী সান্যাল সম্পাদিত ‘হাজার বছরের প্রেমের কবিতা’সংকলনে ধর্মকীর্তির রচনা বলে প্রকাশিত একটি চার লাইনের কবিতায়। যার সারাংশ হচ্ছেঃ নারীকে দেখেই আমি বুঝেছি ভগবান বুদ্ধের কথাটি যথার্থ যে এই বিশ্বের স্রষ্টা কোন ঈশ্বর হতে পারে না। কারণ, তাহলে নারীকেও ঈশ্বরই সৃষ্টি করতেন। তারপর কি তিনি তাঁর এই অপরূপ সৃষ্টিকে ছেড়ে দিতেন! উপন্যাসের ১১০ পাতায় সংশয়দীর্ণ ধর্মকীর্তি শিষ্য অতীশ দীপংকরকে প্রশ্ন করেনঃ পীড়িত জনতা আনন্দময় জীবনের স্বপ্ন দেখে। তারা নির্বাণ চায় না, বাঁচতে চায় । তারা চায় দূঃখ-অতিক্রমী আনন্দময় জীবনযাপনের কৌশল। তাদের এই চলমানতার দর্শন যদিও কী বৈদিক, কী শ্রামণিক শাস্ত্রদ্বারা সমর্থিত নয়, তবু আস্তিক, নাস্তিক, লোকায়ত, উপাসনাকেন্দ্রিক সকল প্রকার চিন্তাকেই তা আত্মস্থ করে নিয়ে সমাজজীবনে স্থান দিয়েছে। ‘আমি তাই ভাবি, বস্তুত আমাদের ধর্মদেশনা কি লোকসাধারণের উপকার করে? অথবা, আমরাই লোকসাধারণের দ্বারা উপকৃত হই?’ এ সংশয় একেবারেই ঘটমান বর্তমানের সংশয়। আমাদের সবার মনেই অহরহ এ প্রশ্ন ওঠে, নানাভাবে। আবার তরুণ অতীশ বলেন— যে কোনও যুগেই পরপীড়ক রাজশক্তি লোকসাধারণের ওই দারিদ্র্যবিজয়ী দুঃখজয়ী জীবনীশক্তি শোষণ করে নিতে চায়, কিন্তু তা নিবিয়ে দিতে পৃথিবীর তাবৎ নৃপতিই অসমর্থ। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ওরা কাজ করে’ পড়ছি বা শুনছি ‘জরুরী অবস্থার’ দিনে ফক্কড় কবি বাবা নাগার্জুনের লেখা দুটি লাইনঃ ‘সুকখী ঠুট পর বৈঠ কর কোয়েলিয়া কর গই কুক, বাল বাঁকা না কর সকী শাসন কা বন্দুক।“ অস্যার্থঃ শুকনো ডালে বসেও কোয়েল দিচ্ছে কুক, ঠেকাতে পারল কই তাকে ক্ষমতার বন্দুকন তাহলে এই পরীক্ষামূলক আঙ্গিকে লেখা উপন্যাসটি কতদূর সার্থক? আমার কাছে এ প্রশ্ন অবান্তর। অনেক সমীক্ষকের মতে দার্শনিক বিতর্কের মধ্যে কোথাও মাঝখানে দাঁড়ি টেনে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ষড়দর্শনকে প্রতিযোগী করে না দেখিয়ে একই মননের বিভিন্ন ভাবের প্রকাশ হিসেবে দেখানো যেন একটু জোর করে হয়েছে। আর এক সমীক্ষকের মতে ভাষায় কোথাও কোথাও সমস্যা আছে। কিছু শব্দের তদ্ভবীকরণ যেন ঠিকমত দাঁড়ায় নি। এহ বাহ্য। চারদিকে সিরিয়াল-গন্ধী উপন্যাসের প্লাবনের মধ্যে এই আখ্যানটি এক আনন্দদায়ক ব্যতিক্রম। আজকের এই অসূয়া-হিংসা- অনাচার- মদগর্বী পশুতার দিনে ভারতে বুদ্ধের বাণী, মাত্র শান্তিজল ছিটানো নয়, হিংসার অসারতা, অনিত্যতা ও আত্মঘাতী প্রবণতাকে বোঝা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। চাইব, এই বইটি আরও লোকে পড়ুক, আলোচনা করুক। ==========================================>

91

3

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

সল্টলেকে অনেক কাঠচাঁপা ফুলের গাছ ছিল| সেই ফুল তুলে পাঁপড়ি গুলো মুড়ে বৃন্তের মধ্যে ঢুকিয়ে ছোট্ট একটা ফুল তৈরী করতাম| সিগারেটের প্যাকেট যোগাড় করে ‚ সেটাকে মুড়ে তৈরী করতাম ভ্যানিটি ব্যাগ‚ রাংতা টা সরু করে মুড়ে তৈরী হত ব্যাগের স্ট্র্যাপ| ব্যাগ বানাতাম রুমাল দিয়েও| দুদিক থেকে রুমালটাকে রোল করে এনে তারপরে গোল করে ঘুরিয়ে উল্টে দিলেই তৈরী হত চমৎকার পার্স‚ এখন যেন সেগুলো কি একটা কায়দার নাম হয়েছে‚ কিছুতেই মনে পড়ছে না|<img class="emojione" alt="😒" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F612.png?v=1.2.4"/> ওহো‚ ক্লাচ| শাহরুখ খানের বৌ নানারকমের দামী ক্লাচ ব্যবহার করে| এই জন্য বলি পোটেনশিয়াল চেনার চোখ থাকতে হয়| শাহরুখ খানকে যখন কেউ চিনতো না‚ গৌরী চিনেছিল| ফলে সারাজীব্ন গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেল| তখন সল্টলেকে কোন সিনেমা হল ছিল না| তখন কেন‚ সিনেমা হল তো হল এই হালে‚ সিটি সেন্টার হওয়ার পর| ঘরের কাছ বলতে জয়া‚ মিনিজয়া| আর প্রপার প্ল্যান হলে সাহেবপাড়া| ইংরেজি ছবি দেখতে হলে তো সাহেব পাড়া মাস্ট| অনেক বিদেশী ছবি দেখতাম যে তা নয়‚ কিন্তু কি করে যেন মণি মুক্তো গুলো চিনিয়ে দিয়েছিল আমার মা ‚ বাপি| সাউন্ড অফ মিউজিক‚ মডার্ন টাইমস‚ জাঙ্গল বুক| সারাজীবনের মত জমিয়ে রাখা সময় সেসব| সিনেমা হলে কোনকিছু খাওয়া বারণ ছিল| প্লাস্টিকের প্যাকেটে নন ব্র্যান্ডেড পপকর্ন পাওয়া যেত| ছোট ছোট বোতলে কোল্ডড্রিঙ্ক‚ চলতি উচ্চারণে হয়ে যেত কোলড্রিঙ্ক| তার গায়ে চাবির মত ওপেনার দিয়ে জলতরঙ্গ বাজিয়ে চলে যেত বিক্রেতা| সেসব ভালো খাবার নয় জানা ছিল‚ চাইতাম ও না আমরা| তবে সিনেমা শেষের ভোজটা হত দারুণ| বেন্টিঙ্ক স্ট্রীটে অ্যামবার (তখন নাম জানতাম অম্বর)‚ তার ই কাছে তার ছোট ভাই সাগর‚ পার্ক স্ট্রীটে পিটার ক্যাট| রক্সির কাছে রং মহল| ৮৫ সালের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে জোড়াসাঁকো ঘুরিয়ে রং মহলে খেতে নিয়ে গেছিল বাপি| গিয়ে দিদিভাই আবিষ্কার করলো শ্রাবণী রায় বসে আছে| কোন শ্রাবণী রায়? মনে নেই তো? এই জন্য বলি বেশি পড়াশোনা করে লাভ হয় না কোন| সেই বারে মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছিল শ্রাবণী রায়| দিদিভাই পরের বার মাধ্যমিক দেবে‚ খুব উৎসাহ নিয়ে গিয়ে আলাপ করলো| মেয়েটিও ভালো করে কথা বলেছিল| আরো ঝকঝকে হয়ে উঠেছিল সেই বৈশাখী উজ্জ্বল সকাল| কোথা থেকে কোথায় চলে গেলাম| যা বলছিলাম| ভোজ খেয়ে বেলুন কিনে বাড়ি ফিরতাম| বেলুনের নানা আকার‚ কোনটা আপেলের মত‚ কোনটা মাঝখানে বেঁধে চোখ‚ ঠোঁট লাগিয়ে লেজ সাজিয়ে সুন্দর পাখি বানানো| তাই খাটের স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখতাম| খেলতাম| আস্তে আস্তে হাওয়া বেরিয়ে শুকিয়ে যেত সেই বেলুন| এরকম করেই কখন যেন হাতের ফাঁক দিয়ে গলে গেল আমার সেই নিশ্চিন্ত ছেলেবেলা|

1524

105

সৃজিতা

ঐতিহাসিক শহর চুঁচুড়া

"হাঁসের প্রিয় গুগলি পর্তুগিজদের হুগলি গুণের প্রিয় তানপুরা ওলন্দাজদের চিনসুরা।" ইতিহাসের শহর চুঁচুড়া নিয়ে কবি অন্নদাশঙ্কর রায় এক সময় এই ছড়া লিখেছিলেন। গঙ্গাপাড়ের এই জেলা শহরের আনাচে কানাচে ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে। পর্তুগিজ, ওলন্দাজদের সময়কার নানা ইতিহাস যেমন এই শহরে রয়েছে তেমনিই রয়েছে ব্রিটিশ শাসনকালের নানা স্মারক। রয়েছে রাজা জমিদারের রোম খাড়া করা নানা কাহিনি। চুঁচুড়া শহরে পর্তুগিজদের এক সময় বন্দর ছিল। যা বক্স বন্দর হিসেবেই পরিচিত ছিল সেই সময়। ১৬৩২ সালে নাগাদ চুঁচুড়ার একাংশ কুলিহান্ডা নামে পরিচিত ছিল। সেখানে কায়িক পরিশ্রম করে যাঁরা রোজগার করতেন মূলত তাঁরাই বাস করতেন। সেই থেকেই জায়গাটি কুলিহান্ডা নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। চুঁচুড়ায় গঙ্গার পাড়ে মূলত জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতেন। ডাচেরা সেই আমলে ১৪টা প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করেছিলেন চুঁচুড়ায়। চিত্রকলার ক্ষেত্রেও তাঁদের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। যা সেই আমলে ডাচ বেঙ্গল চিত্রকলা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিল। স্থানীয় পটুয়াপাড়ার শিল্পীদের তাঁরা কাজে লাগিয়েছিলেন। ইতিহাসের পাশাপাশি সাহিত্যেও যথেষ্ট ঐতিহ্যশালী এই শহর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে দেবেন্দ্রনাথ এসেছিলেন চুঁচুড়ার দত্ত ভিলায়। তারপর থেকে বাবার সূত্রে এই শহরে বার বার পা রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবির লেখা গান, কবিতার নানা স্মৃতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে এই প্রাচীন শহরের। চাকরির সুবাদে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁঠালপাড়ার নিজের বাড়ি থেকে নৌকা পেরিয়ে এ শহরে আসতেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তারপর সাহিত্যে, আড্ডায় মজে এক সময় এই শহরের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিলেন। চুঁচুড়ার জোড়াঘাটের বন্দে-মা-তরম ভবন আজও তাঁর সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। সাহিত্যের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই শহরের জুড়ি মেলা ভার। শহরের কনকশালি এলাকায় বাস করতেন রামরাম বসু। তাঁর লেখা প্রতাপাদিত্য চরিত্র বাংলা সাহিত্যর ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রাচীনতম। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৬ সালে হাওড়া থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলি হয়ে আসেন চুঁচুড়া কালেক্টরেটে। পরে এটাই পাকাপাকি বাস হয়ে যায় তাঁর। বন্দেমাতরম ভবনের পরিদর্শক সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বঙ্কিমচন্দ্রের শহরে বাস করার সুবাদে রীতিমত মজলিশ বসত প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের।” সেইসব মজলিশে কে ছিলেন না? থাকতেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামগতি ন্যায়রত্ন, কবি অক্ষয়চন্দ্র সরকার, কবি দীননাথ ভড়দের মতো মানুষ। রামগতি ন্যায়রত্ন বাংলা ভাষার প্রথম ইতিহাস লেখেন। জেলা সদর চুঁচুড়ার বড়বাজার এলাকায় গঙ্গার ধারে রয়েছে ঐতিহাসিক দত্ত লজ। বাড়ির মালিক ছিলেন কলকাতার সেই সময়ের বড় ব্যবসায়ী মাধব দত্ত। তাঁর চুঁচুড়ার বাগান বাড়িটি ছিল গঙ্গার পাড়ে মনোরম পরিবেশে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বন্ধুত্বের সুবাদে ১৮৭৯ সালে ভগ্ন স্বাস্থ্য উদ্ধারে মহর্ষি পরিবার পরিজন নিয়ে এই বাগানবাড়িতে ওঠেন। সেই শুরু। পরে বাবার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও সেখানে এসেছিলেন বারে বারেই। বাড়িটি সেই সময় ঠাকুরবাড়ির বাগান বাড়ি হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছিল। যদিও তারই মাঝে বহুবারই বাড়ির মালিকানার হাতবদল হয়। আজও গঙ্গার পাড়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে দত্ত লজ। ● ‘বলিছে সোনার ঘড়ি.....’ছোটবেলার সেই ছড়ার মতো এই ঘড়ি অবশ্য টিক টিক টিক নয়, ঢং ঢং শব্দে জানান দিয়ে চলেছে তার অস্তিত্ব। শতবর্ষ পার করেও তার বিরাম নেই। সময় মেনে পথ চলা মানুষের কাছে এখনও বড় ভরসা। হুগলি জেলার চুঁচুড়া শহরের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ঘড়ির মোড়।হুগলির ইতিহাস প্রাচীন সদর শহর চুঁচুড়ার একেবারে প্রাণকেন্দ্রে এই ঘড়ি। ১৯০১ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ছিল বড়লাট সপ্তম এডওয়ার্ড-এর শাসনকাল। তারই স্মৃতিতে ১৯১৪ সালে এই ঘড়ি বসানো হয় এখানে। সেই সময় অবশ্য এই অঞ্চলের নাম ছিল টাউন গার্ড রোড ঝাউতলা। ঐতিহাসিক ঘড়ির সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে এক সময় মানুষের ভালবাসায় এলাকার নামই বদলে যায়। হয়ে যায় ঘড়ির মোড়। এখন যেখানে বাস, মিনিবাস, অটো, টোটো, রিকশা চলাচল করে তখন ঘড়িকে ঘিরে এই রাস্তায় চলত ফিটন। রাস্তার মোড়ে ১৬ স্কোয়ার ফুট জায়গায় ৩০ ফুট উচ্চতায় রয়েছে এই ঘড়ি। ঢালাই লোহার স্তম্ভের উপর চারদিকে ঘড়ির চারটি ডায়াল। ঘড়ির মূল যন্ত্রাংশ পিতল ও ইস্পাতের। প্রতি আধঘণ্টা অন্তর তার ঢং ঢং আওয়াজ শুনে আজও নিজের হাতের ঘড়ি মিলিয়ে নেন না এমন মানুষ মেলা ভার। এত বছর একটানা পেরিয়ে এলেও অবশ্য একবারই দিন পনেরোর জন্য থেমে গিয়েছিল ঐতিহাসিক এই ঘ়ড়ি। ২০০৯ সালে আয়লার সময়। ব্রিটিশ রাজত্বে ঘড়ি মেরামতির দায়িত্ব পালন করত ‘কুক অ্যান্ড কেলভি’ সংস্থা। ক্রমে দেশ স্বাধীন হল। মেরামতির দায়িত্ব পেল কলকাতার বিবি দত্ত কোম্পানি। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ঘড়ির স্বাস্থ্য রক্ষার ভার ছিল তাঁদের হাতে। পরবর্তীতে চুঁচুড়ার এম এস হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি পায় ঘড়ির দেখভালের দায়িত্ব। এখনও পর্যন্ত তাঁরাই ঘড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরসভার তত্ত্বাবধানে প্রতি চার বছর অন্তর ঘড়ির সার্বিক মেরামতি হয়। আনুমানিক খরচ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বর্তমান যুগে ব্যাটারি চালিত ঘড়িতে দম দিতে হয় না। কিন্তু প্রাচীন এই ঘড়িতে চারদিন অন্তর দম দিতে হয়। ঘড়ি দেখভালের দায়িত্বে থাকা এম এস হোসেন অ্যান্ড কোম্পানির তরফে সৈয়দ মহম্মদ হোসেন বলেন, ‘‘বংশানুক্রমে ১৯০৩ সাল থেকে চুঁচুড়া শহরে ঘড়ির ব্যবসা। ৪০ বছরেরও ওপর এই ঘড়ি পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছে আমাদের সংস্থা। প্রতি চার বছর অন্তর একবার মেরামতি করা হয়। তা ছাড়া ঘড়ির দম দেওয়া এবং সময় সংক্রান্ত কোনও ত্রুটি দেখা দিলে আমরাই সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। ঐতিহাসিক এই ঘড়ি সারানোর দায়িত্ব পাওয়াটা গর্বের তো বটেই। মনে হয় যেন ইতিহাসকে ছুঁয়ে আছি।’’ (তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩রা জানুয়ারি ২০১৭ সাল। এবং আনন্দবাজার পত্রিকা, ৭ই আগস্ট, ২০১৪ সাল।)

81

9

মনোজ ভট্টাচার্য

ক্লীন-মিট বা ল্যাব মিট !

বন্ধুগন, একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চাই – আশা করি আপনারা সাহায্য করবেন । মানেকা গান্ধী কয়েকদিন আগে হায়দ্রাবাদে একটা সভায় পশুবহনকারী মানুষদের গণপিটুনি ও গণ-হত্যার প্রতিষেধক হিসেবে – এক ‘ল্যাব-মিট’ বা ‘ক্লীন মিট’ এর নাম করেছেন । - আজ সেই বিষয় জানতে গিয়ে এই সময়ের এক প্রতিবেদন পড়ে খুব কৌতূহল জাগল । লিখেছেন - মৃন্ময় চন্দ । অবশ্য সমস্ত লেখাটাই নেওয়া হয়েছে পল শ্যপিরর --- Clean Meat: - বইটা থেকে ! এই প্রতিবেদনে এমন অনেক কিছু তথ্য আছে – যা আমার মত নিরেট মাথায় ঢুকতে পারছে না ! সোজা বুদ্ধিতে যেটা মনে হচ্ছে – এই প্রক্রিয়াও সেই ক্লোনিং পদ্ধতি ! গৃহপালিত বা খামারজাত পশুর স্রেফ একটি কোষ থেকেই উৎপন্ন অঢেল মাংস ! জৈব প্রযুক্তি ! আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনবিস্ফরিত বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্য সমস্যা মেটাবে ! আমেরিকার ‘ফনালিটিক্স’ নামে এক সংস্থার উদ্যোগে এক সমীক্ষা হয় । তাতে দেখা যায় – ৬৬% মানুষ চায় পরিচ্ছন্ন মাংস বা ক্লীন-মিট । যদিও মাত্র ২৫% মানুষ ক্লীন মিটের কথা শুনেছে ! এমন কি ৪০% মানুষ ক্লীন মিটের জন্যে ২৫% বেশি মুল্য দিতেও চায় ! এরা কিন্তু সবাই অবহিত – যে ক্লীন মিট বা ল্যাব মিট মানেই সয়াবিন জাতীয় কোন খাদ্য নয় । এটা প্রকৃত মাংসই । যার পুষ্টিগুন চিরাচরিত জবাই করা মাংসের চেয়ে অনেক বেশি । - মানেকা গান্ধী কতটা কি জানে- জানি না । - কিন্তু শ্যপিরো পশুপ্রেমী, কমপ্যাশন ওভার কিলিং এর প্রতিষ্ঠাতা, হিউমেন সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্টও বটেন ! তার মতে – মানুষ গৃহপালিত পশুকে খাদ্য বানিয়েছে । তবে এবার গরু বা মুরগির একটা কোষ থেকে অফুরন্ত মাংসের আমদানি হবে ! আমরা যদিও তত জ্ঞাত নই – কিন্তু পাশ্চাত্যে এই ক্লীন মিট প্রক্রিয়া বেশ পুরনো । একটা মুরগির ডানা বা একটা স্টেক খেতে – আস্ত পশুকে মারার দরকার নেই । সেই অঙ্গগুলো পৃথকভাবে ল্যাবে কালচার করে পাওয়া যাবে । যেসব পশুর চেরা খুর ও যারা জাবর কাটে – তাদের মাংসেই ক্লীন মিট বলা হয়েছে । ক্লীন মিট প্রস্তুতকারী সংস্থাও তাই ধরে নিয়েছে । সুতরাং গরু মোষ ষাঁড় ছাগল ভেড়া কৃষ্ণসার ও অনেক পশুই ক্লীন মিটের পর্যায়ভুক্ত । গবেষণাগারে ক্লিন মিট তৈরি করতে একটা মাত্র কোষ প্রয়োজন ! – কি প্রক্রিয়ায় কিরকম বা কিসের মাংস তৈরি হয় ইত্যাদি দেওয়া আছে ! ক্লিন মিট পরিবেশ-বান্ধব । উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চেয়ে – ডাল, সয়াবিন ইত্যাদির তুলনায় – গোমাংস ইত্যাদির প্রোটিন প্রায় কুড়ি গুন বেশি ! ২০১৩র আগস্টে নেদারল্যান্ডের মাস্ত্রিখটি ইউনিভার্সিটির ডক্টর মার্ক পোষ্ট লন্ডনের সাংবাদিক সন্মেলনে প্রথম ক্লিন মিটে তৈরি বিফ বার্গার ভক্ষণ করেন । ২০০০০ মাংসতন্তু থেকে তৈরি বার্গারের খরচ পরেছিল – তিন লাখ ডলার । সাড়ে তিন বছর পড়ে সেই বার্গারের খরচ পরেছে ১১.৩৬ ডলার । - এখন এই খরচ নেমে এসেছে সাধারন বার্গারের সমতুল ! বর্তমানে বানিজ্যিক ক্লিন মিট তৈরি করছে মেম্ফিস মিট, মডার্ন মিড, হ্যাম্পটন ক্রিক, ইত্যাদি । বিশ্ব খাদ্য সূচকে ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০ নম্বরে ! ভারত ও নেপালও ভারতের আগে ! তাই আমাদের ক্লীন-মিটের প্রয়োজন বৈকি ! এই সম্বন্ধে আমরা ওয়াকিবহাল হলে আগামি দিনে আমরা ক্লীন-গো-মিট খাবো কিনা – গো-সন্তানদের কাছে পারমিসান নিতে হবে কিনা – সব জানা জরুরী কি না ! - কিন্তু গো-মুত্র বা গো-ময় ক্লীন মিটের পর্যায় পড়ে কিনা – সেটাও তো জানা দরকার ! মনোজ

72

2

শিবাংশু

গোসাঁইজি কি মল্হার

কানে মর্চে ধরে গেলে যে দুয়েকজনের গান শুনে সেটা পরিষ্কার করে নিই। ইনি তাঁদের মধ্যে একজন। একটা লেখা নিয়ে বসেছিলুম। সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়। আমার মুদ্রাদোষবশত বিষয়টি বেশ জটিল। তিন চারটি রেফারেন্স যা পেলুম কেউ এক কথা বলছে না। আমিও রীতিমতো বিড়ম্বনায়। ধ্যুৎ, কিছুক্ষণের বিরতি লাগবে। ইতোমধ্যে আমার ডেস্কে অবিরাম বেজে চলা গানের স্রোতে কখন যে এঁর গান শুরু হয়ে গেছে, খেয়ালই করিনি। বাইরে কখনও বৃষ্টি পড়ছে, কখনও থামছে। ভাদুরে ভেজা তপ্ত কলকাত্তাই অসহ্য আবহাওয়া। আমাদের মতো বহিরাগতদের জন্য বড্ডো চাপ। কিছুক্ষণ আগে পালুসকর সাহেবের সুরদাসী মল্হার শুনছিলুম। একটু বাতাস লাগছিল প্রাণে। কিন্তু লেখা আটকে গেলে বড়ো বিরক্তি। মন'টা সমে পৌঁছোতেই চাইছে না। সেসময়ই কানের মর্চে ছাড়ানো এই গান। তাঁর নাম জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, প্রথম শুনেছিলুম আমার পিতামহের কাছে। তিনি মুক্তকণ্ঠে বলতেন তাঁর গানের দাপটের কথা। বিষ্ণুপুরের মানুষ বলে হয়তো দাদুর কিঞ্চিৎ শ্লাঘাও ছিল। বয়সে পাঁচ'ছ বছরের কনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু দাদু 'রাধিকা গোসাঁইয়ে'র ভাইপো ও শাগির্দ 'জ্ঞান গোসাঁইয়ের ফুরিয়ে যাওয়াটা কিছুতেই তিনি মেনে নিতে পারতেন না। জ্ঞান গোসাঁই মুক্তকণ্ঠ হয়ে গান গেয়েছেন বড়ো জোর চার-পাঁচ বছর। তার মধ্যেই অফুরন্ত মণিমুক্তো। বাবুদের বৈঠকখানায় গান শোনাতে তাঁর ছিল বিপুল অনীহা। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে "‘ওখানেই আমি থাকবো আর রাধামাধবের কাছে গান করবো" বলে যে কলকাতা ত্যাগ করে বিষ্ণুপুর চলে গেলেন, আর থাকতে ফিরে আসেননি। বছরে মাত্র একবার সরস্বতীপুজোর দিন গোকুল মিত্রের বাড়ি এসে তাঁদের বাড়িতে বিষ্ণুপুরের মদনমোহন বিগ্রহকে গান শুনিয়ে যেতেন। শালপ্রাংশু, সুদর্শন, শক্তিমান, দাপুটে, বাঙালির গর্ব এই শিল্পী চলে গেলেন মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে। কেন গেলেন, কোথায় গেলেন, কে জানে? যাঁরা এই লেখা পড়বেন, তাঁরা সবাই তাঁর গান প্রাণ ভরে শুনেছেন। আজ তাঁর গাওয়া ছোট্টো 'মিয়াঁ কি মল্হার' শুনতে শুনতে ভাবছিলুম মর্চেধরা স্নায়ুগুলোকে কীভাবে তিনি সুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে সাফ করে দিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই অনুপম বয়ানটি মনে পড়ে, "বেঁচে থাকার অনেক আশা, প্রিয়তমা বধূ আমার তোমাকে ভালোবাসার মত একান্ত বেঁচে থাকা ...." https://www.youtube.com/watch?v=h4-Qe88SqNY

68

4

মনোজ ভট্টাচার্য

সে দেশের কিছু কিছু কথা !

ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলাম না ! অনেকদিন পর্যন্ত আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না ! বিদেশে যাবার আগে তো শুনতাম – গাড়ি চালাতে না জানলে – ওখানে জীবন অচল ! দুধ কিনতে পর্যন্ত যেতে হয় গাড়ি চালিয়ে যোজনখানেক দূরে ! অমরনাথ যাবার আগে খুব শুনতাম – পহেলগামের পর থেকেই নাকি শুধু বরফ ! এপাশে ওপাশে বরফ ! সবাই গল্প শোনাত চন্দনবারি – থেকে – পিশু চড়াই – সব তুষারাচ্ছন্ন – রাস্তা দেখাই যায় না ! – এদিকে আমার তো স্নো-বুট পর্যন্ত নেই । আমি কি তাহলে যেতে পারব না ! একদিন ভয়ে ভয়ে অমরনাথ গেছে এমন একজনকে জিগ্যেসই করে ফেললাম – অমরনাথের রাস্তায় কি পাথর টাথরের রাস্তা নেই ? গাড়ি টারি চলে না! লোকে যায় কি করে ! – তাড়াতাড়ি সে বলে ফেলল – হ্যাঁ হ্যাঁ – রাস্তা থাকবে না কেন ! মাঝে মাঝে বরফ পড়ে রাস্তা ঢেকে যায় ! – যাক ! নিশ্চিন্ত হয়ে অমরনাথ ঘুরে এলাম ! বরফ টরফ আছে বটে – তবে রাস্তাও আছে ! আর সেটাই প্রধান ! ঠিক তেমনি – ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া ভিসা হয় - প্লেনে চড়তেও দেয় – এমন কি ওদেশে ঢুকতেও দেয় ! আমাদেরও দিল ! অস্বীকার করবো না – গাড়ি ছাড়া অসুবিধে হয় । বিশেষ করে শহরতলি অঞ্চলে । পাবলিক বাস টাস না থাকলে অসুবিধে হয়ই ! – তবে জীবন স্তব্ধ হয়ে যায় না ! – শহরে বাস ও মেট্রো রেল খুব সুবিধের । বরং গাড়ির বিপদ হল – পার্কিং ! পার্কিং এর এত অসুবিধে । পরে যাদের গাড়ি ছিল না – তাদের দেখে সুখী মনে হত ! এদিকে গাড়ি কেনার প্রথম ক্রাইটেরিয়া হল – ড্রাইভিং লাইসেন্স ! – ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েই প্রথম চান্সেই ফেল ! – দোষটা ঠিক আমার ছিল বলে মনে হয় না । জীবনে গাড়ি চালাই নি । গাড়ি যেমন সোজা চলে – তেমনি এদিক ওদিক ঘোরাতেও হয় ! – আমি তো বুঝতেই পারি নি – গাড়ি ডানদিকে না বাঁদিকে যাচ্ছে ! ট্রেনার থামাতে বলতে – যেই থামিয়েছি – দরজা খুলেই উল্টোদিকে দৌড় ! – বুঝলাম ট্রেনারের তাড়া আছে - গাড়ির আগে পৌছতে চায় ! – ফে-ই-ল ! – একগাদা টাকা নষ্ট ! কি করা যায় ! এদিকে কেউ কেউ বুদ্ধি দিল – মোটর ভেহিকল ডিপার্টমেন্টকে টাকা দেওয়ার মানে হয় না ! বাইরে থেকে লাইসেন্স বার করতে হবে ! বাইরে থেকে মানে ? সুপার মার্কেটে কি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় ? কাগজে টি ভিতে দেখি কত জায়গায় লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে ! মানে নকল লাইসেন্স ! তা আসল না পেলে নকলই সই ! – এই সময় বাংলাদেশী বন্ধুরা পথ দেখাল । সবাই বলল – এমন কিছু নেই যা বাংলাদেশে নকল হয় না ! লাইসেন্স তো কিছুই নয় ! দরকার হয় গ্রিন কার্ড পর্যন্ত – বার করে দেবে ! সবই হবে নিউ ইয়র্কে বসেই ! শুধু ডলার ফেলো ! – সেই সময়ে নাগাদ প্রচুর - ভিসার ডুপ্লিকেট – ট্রিপ্লিকেট বের হচ্ছিল । পাসপোর্টের ডুপ্লিকেট বের হচ্ছিল ! আমরা স্বচক্ষে দেখেছি – মাথা কাঁটা পাসপোর্ট ! – রাম খানের পাসপোর্ট – তাতে ভিসা সাঁটা আছে । রাম গিয়ে থানায় রিপোর্ট করলো – তার পাসপোর্ট হারিয়ে বা চুরি হয়ে গেছে ! থানা থেকে এফ আই আর এর রিপোর্ট নিয়ে – সেটা পাঠিয়ে দিল দেশে । দেশ থেকে আরেকটা পাসপোর্টের ডুপ্লিকেট বার হয়ে গেল – ছবিটা গলার থেকে পালটানো – অর্থাৎ রাম ভরোশার ! রাম ভরোশার নিউ ইয়র্কে পা রাখার এক দু সপ্তাহের মধ্যে যথারীতি দ্বিতীয় পাসপোর্টটাও চুরি হয়ে গেল এবং এফ আই আর হয়ে গেল । এইভাবে এবার আবির্ভাব হচ্ছে – রাম বাবার ! – এইভাবে এক ভিসার জোরে রাম খান ধরে রাখল – আসল পাসপোর্ট, দ্বিতীয় পাসপোর্ট রইল – রাম ভরসার আর তৃতীয় পাসপোর্ট রইল রাম বাবার ! নাম একটাই – রাম খান ! আবার এ তো সবাই জানে – রহিম খানের স্ত্রী রসিদা বানুর ভিসা হয়ে যাবার পর প্লেনে করে এসে পৌঁছল কাদের খানের স্ত্রী নাসিম বানু ! একদিন দাই-হাট-স্যু পড়ে বাংলাদেশ হাই কমিশনের অফিশে ঢুঁ মারলাম । - খুব ভিড় হয় সেখানে – লাইন দিয়ে অনেক পরে দেখা পেলাম জনাব জাফর আলি সাহেবের সঙ্গে ।বেশ বেঁটে মতন চেহারা । - জানিনা অফিশে আসার আগে তার স্ত্রী ফোন করেছিল কিনা – অথবা দেশের সরকার আবার পাল্টালো কিনা – ভদ্রলোকের মেজাজ একেবারে তিল-তিরিক্ষে হয়ে ছিল ! কি নাম? নাম বলার পরেই – আপনি কোথাকার বাসিন্দা ? ভারত না বলে আমি বললাম – কলকাতার ! – উনি প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন – আপনি ইন্ডিয়ার বাসিন্দা হয়ে বাংলাদেশের লাইসেন্স পাবেন কি করে ? – খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা ! আমি আরও মাখন গলায় বলি – আপনি তো বাঙালি – সবাই বলল – বাঙ্গালিদের সাহায্য করেন ! বাংগালি নয় বলুন বাংলাদেশী ! আমরা বাংলাদেশী ! আর আমরা একজন ইন্ডিয়ানের জন্যে বে-আইনি কাজ করবো কেন ? ওসব ইন্ডিয়াতে হয় – এখানে নয় ! – এমনভাবে দাঁত-মুখ খেঁচালো যে খোদ কিস্কিন্দার বাসিন্দারাও লজ্জা পাবে । আমারও জাত্যাভিমান এমন চেগে উঠল যে – যে কারনে এসেছি – সেইটাই উড়ে গেল ! বেশ দু-চার কথা শুনিয়ে বেরিয়ে এলাম ! বাড়ি ফেরার পর আমার প্রতিবেশীরা সব শুনে খুবই অবাক ! – এহ – দাদা ! এটাও পারলেন না ! – ওরা তো ফেক লাইসেন্স করে দেয় ! – আপনাকে কেন দিল না ! বোঝো কান্ড – আমাকে কেন দিল না – তাও আমাকে বলতে হবে ! – এ তো বলা যায় না যে আমি বাংলাদেশী নয় বলে দেয় নি ! – তবে এও ঠিক সেই প্রথম শুনলাম বাঙালি আর বাংলাদেশী আলাদা ! ওদের সেই জনাবের ব্যবহার সেদিন এত খারাপ লেগেছিল – যে মনে মনে ওকে অনেক শাপ দিয়েছিলাম ! কিন্তু ঐ ভদ্রলোকই আইনত ঠিক ! – সে যাইহোক, আর কখনও সেই অফিশে যাওয়ার সুযোগ হয় নি ! শেষ পর্যন্ত বার কয়েক পরীক্ষা দেবার পর লাইসেন্স পেয়েছিলাম ! মনোজ

264

35

শিবাংশু

প্যার মেঁ সওদা নহি...

শুধু আমি নই, গোয়া আমাদের সবার কাছেই অতি প্রিয় একটা ছোট্টো স্বর্গ। ভুলিয়ে দেওয়া, হারিয়ে যাবার অনন্ত ঠিকানা। বহুদিন ধরে সারাদেশ থেকে, সারা পৃথিবী থেকে কতশত মানুষ ভিড় জমিয়েছে এখানে। কতরকমের কালচার জড়াজড়ি করে রয়েছে এখানে। অবসরের পর ভেবেছিলুম কয়েকবছর এখানে থাকবই। পোস্টিঙের সুযোগ হয়নি বটে। কিন্তু তখন আর ছেড়ে দেওয়া যায়না। আগের মজলিশে আমাদের এক প্রিয়জন প্রিয় গোস্বামীর একটি ঠেক আছে ওখানে। বছরে একবার স্যামচাচার দেশ থেকে কয়েকমাসের জন্য আয়েশ করতে আসেন এখানে। প্রিয়দাকে বহুবার কথা দিয়েও রাখতে পারিনি। তাঁর উদার আমন্ত্রণ অকারণ উড়ে গেছে আরব সাগরের পাগলা হাওয়ায়। তা গোয়ার চ্যালাচামুণ্ডারা মাণ্ডবীর উত্তরে একটা দু'চার বছর থাকার মতো ঠেকও ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। কিন্তু ঐ যে... যাহা চাই, ইত্যাদি... গোয়ায় একটি নাচের ঘরানা আছে, 'দেখন্নি'। সব চেয়ে বিখ্যাত দেখন্নির গানটি কম্পোজ করেছিলেন কার্লোস ইউজেনিও ফেরেরা, ১৮৮৭ সালে। সাকিন, কর্জ্যুয়েম, আলডোনা। তাঁর ভাই এডুআর্ডো ছিলেন পিয়ানোবাদক। ১৮৯৫ সালে পারীতে 'কোঙ্কনী ব্যালাড' নামে এই সুরটি বাজিয়ে খ্যাত হয়েছিলেন। অনেক পরে, ১৯২৬ সালে তিপোগ্র্যাফিয়া র্যা ঞ্জেল গানটিকে আবার গোয়ায় ফিরিয়ে আনেন। দেখন্নি'কে নৃত্যপরা বালিকাদের গানও বলা হয়। একটি মেয়ে বন্ধুর বিয়েতে যাবে নদীর ঐ পারে। মাঝি কিন্তু রাজি নয়। খুব দরাদরি করছে। মেয়েটি তাকে ফুল দিলো, অলংকার দিলো, কিন্তু মাঝি রাজি নয়। সে মেয়েটির থেকে একটি চুম্বনের প্রার্থী। তা না নিয়ে সে আর ছাড়বে না। ফেরার পথে আবার একই দুর্যোগ। মাঝি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেনা। তার আরো বেশি কিছু চাই। মেয়েটি তার আরাধ্য দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করে। হামলাবাজ দুর্বৃত্তকে আঘাত করে নদীতে নিক্ষেপ করে। নিজেই নৌকো বেয়ে ঘাটে পৌঁছে যায়।ভোরবেলা ক্লান্তপায়ে বাড়ির পথে ফেরা। বিষন্ন একলা মেয়েটির আকুতি এই গানে.... লোককথাটির পিছনে ইতিহাসের একটা বিষাদ-অধ্যায়ও লুকিয়ে আছে। সেকথা থাক এখন। এই সুরটি অবিকল অনুসরণ করে লক্ষ্মী-প্যারে সেই অবিস্মরণীয় গানটি বেঁধেছিলেন আমাদের জোয়ান বয়সে। এই গানের সঙ্গে পা মেলায়নি এমন ছেলে-মেয়ে ছিলনা সেকালে। হঠাৎ সেদিন আবার গানটি শুনে মনে পড়ে গেলো পুরোনো কথা। মূল গানটিও শুনলুম গোনজাগা কুটিন্হোর কণ্ঠে। সিনেমার গানের জাঁকজমক নেই তাতে। কিন্তু সেই একলা মেয়েটির আকুতিটি সমান ভাবে বরকরার। ট্রাম্পেটেও তার সুর এখনও নেশা ধরায়। আর মান্না'দার গলায় আমাদের কিশোরবয়সের স্বপ্নের গানটা না শুনলে তো ঠাকুর অনিঃশেষ পাপ দেবেন। তা কী আর সহ্য হয়....? ভিভা লা গোয়া... https://www.youtube.com/watch?v=eC2O1RnnQ0g

103

6

জল

গল্প

নতুন নয়‚ অনেক লেখাই লিখেছিলাম‚ তাদের সব তো সেভ করিনি‚ পরের দিকের সেভ করে রাখা একটা লেখা এখানে রেখে দিলাম| সবাই আগেই পড়েছেন| ফোটোফ্রেম ****** ঠকাস করে আওয়াজটা হতেই ঝিমুনিটা টুটে গেল অংশুমানের| দেওয়ালের আদ্যিকালের ঘড়িটায় ঠিক তখনই দুপুর তিনটের ঘন্টা পড়ল| ঘন্টা শুনেই এখন সময় বোঝেন| কাঁটাগুলো আজকাল আর দেখা যায় না| কতকটা দৃষ্টি চলে না বলে আবার কতকটা ঘড়িটায় ময়লা জমেছে বলে| বয়সও তো কম হলো না| পড়ন্ত বেলার রোদ দরজায় লুটোপুটি খায়| তেজ নেই| যাই যাই ভাব‚ তবু যেন যেতে মন নাহি চায়| চেয়ার ছেড়ে উঠতেই অনেকটা সময় চলে গেল| দুপুরবেলাটা আজকাল আর বিছনায় শোন না| মেঝের পাতা বিছানাটায় একবারে রাতে পিঠ ঠেকান| নিচু হয়ে বিছানা থেকে বসতে - উঠতে বেশি কষ্ট| তার চেয়ে এই চেয়ারটায় বসে ঝিমোন| ঘুম তো আজকাল তেমন হয় না| না দিনে‚ না রাতে| বয়সের ধর্ম| হাঁটার গতিও আগের থেকে অনেক শ্লথ| সময় নিয়ে হাঁটেন| এ ঘর থেকে ও ঘরে গিয়ে দেখেন একটা ইঁদুর ছুটে পালালো| ঘাড় কাৎ করে পড়ে আছে ফোটো ফ্রেমটা| নিচু হয়ে তুলতে বড় কষ্ট| কিন্তু ওটা তার প্রানের চেয়েও দামী| তাদের বংশে যদি দামী কিছু এখনও তার কাছে থেকে থাকে তাহলে সেটা একমাত্র এই ফোটোফ্রেমটা| তার কাছে অমূল্য| দেওয়ালে ঠেস দিয়ে আর এক হাতে দেওয়াল ধরে শরীরটাকে ঘষটে ঘষটে মেঝের কাছে এনে থেবড়ে বসে পড়েন| খুব একটা যে পরিশ্রম তা নয়‚ তাও বুকের ভিতর যেন হাঁপর টানছে| হা করে বড় কটা শ্বাস ছেড়ে দুহাতে ফোটোফ্রেমটা তুলে নেন| বড় বিবর্ণ হয়ে গেছে ফ্রেমের কাঠ| ঘুন ধরে কোথাও কোথাও কাঠের নক্সা উধাও| ভিতরের ফোটোদুটো লালচে হয়ে গেছে আর ফোটোদুটোর মাঝখানের লেখাটাও মলিন| 'তবুও এ অমূল্য'‚ বিড়বিড় করে ওঠেন অংশুমান| --বাবা একি পড়লে কি করে? চিৎকারে সম্বিত ফেরে তার| -- পড়ি নি রে| এটা তুলতে গিয়ে বসে পড়েছি| -- বাবা তোমায় নিয়ে আর পারি না| এই ভাঙ্গা ফোটোফ্রেমটার জন্য কি যে তোমার প্রাণ হাঁকুপাঁকু বুঝি না | আজ পড়ে গেলে কি হত জানো? এখন আমি তোমায় তুলি কি করে? মেয়েমানুষের কম্ম নাকি তোমায় তোলা? -- তুই পারবি না কৌশল্যা| দেখ না ব্রজেনবাবু আছেন কিনা? কৌশল্যা দুড়দাড়িয়ে নেমে যায় ব্রজেনবাবুকে ডাকতে| ব্রজেনবাবু তাদের বাড়িওয়ালা| অতি সজ্জন লোক| দুবেলা এসে প্রণাম করে যান এই ফোটোফ্রেমটা| ফ্রেমটার গায়ে পরম শ্রদ্ধায় হাত বোলান| ব্রজেনবাবুরও তো বয়স কম হলো না| গয়নার কদর তো জুহুরীর কাছে| এরা কি বুঝবে? তার আত্মজও কি বোঝে? কতবার তো বলেছেন ফ্রেমটা বদলে আনতে| তাছাড়া আজকাল তো পুরোনা ফোটো নতুন করাও যায়| দেবো-করব- পরে করে দেবো এই পর্য্যন্ত| দুজোড়া পায়ের শব্দ এসে থামে দরজায়| মুখ তোলেন তিনি | ব্রজেনবাবু নেই বুঝি! কৌশল্যা তাই ভিকুকে ডেকে এনেছে| ভিকু কৌশল্যার আদমি| রিক্সা চালায়| ভিকু দুহাতে পাঁজকোলা করে তুলে তাঁকে বসিয়ে দেয় চেয়ারে| ভিকু বেশি কথার লোক না‚ চুপচাপ| দুপুরে খেতে এসেছিলো| দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবার সন্ধ্যায় বের হয় ভিখু রিক্সা নিয়ে| তাই কৌশল্যা ডেকে আনতে পেরেছে| হাতে ধরা ফোটোফ্রেমটা ভিকু নেমে যেতে ‚ আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ভাঙ্গা শোকেসটার ওপর রেখে দেন ঠেস দিয়ে| **** বৃষ্টিটা অনেকক্ষণ থেমে গেছে| পাশের মাঠ থেকে উঠে আসা নিমগাছটার পাতা বেয়ে এখনও টুপ টাপ করে জল পড়ছে টিনের চালে| একশ পাওয়ারের বাল্বের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়েছে ছাদে| এই টুকরো ছাদটাই এখন অংশুমানের একমাত্র বিচরণ ক্ষেত্র| বৃষ্টিটা থামতেই তাই ছাদে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি| এই বাড়িটা বাদ দিলে এই এলাকাব সব বাড়িতেই টালি-খোলার চালা| যেখানে সেখানে নোংরা| তাদের মানিকতলার থেকে একদম আলাদা পরিবেশ| মনিকতলার বাড়িটা এখনও স্মৃতিপটে উজ্জ্বল| মস্ত বাড়ির আনাচে কানাচে ইতিহাস কথা বলে| দেওয়ালে টাঙ্গানো তৈল চিত্রগুলোতে কলকাতার কত নামী-দামী মানুষের প্রতিকৃতি তাঁর পুর্বপুরুষের সাথে| -বাবা চাট্টি মুড়ি মেখে দি? -আজ আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না কৌশল্যা| তোর রান্না শেষ? - হ্যাঁ বাবা| আমি এবার বাড়ি যাই তাহলে? - আয়| কৌশল্যা চলে যায়| রোজ দুবেলা রান্না করা‚ বাসন মাজা আর সপ্তাহে দুদিন কাচাকাচি করে সে| মেয়েটা বড় ভালো| বস্তিতে থকে| বস্তি বলতেই অনেক বছর আগের কথা মনে পড়ল‚ মানিকতলার বাড়ি থেকে কপর্দক শূন্য হয়ে বেরিয়ে আসা| সাথে বৌ আর বাচ্চা| বরাবরি এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের মত ছিলেন অংশুমান| তেমন কোন বন্ধুও ছিল না| মুশকিল আসান করল ভগি| তাদের বাড়িতে কাজ করত| কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিল তাকে| বয়সে যে খুব বিশাল কিছু ফারাক তা নয়| কিন্তু গরীবের ছেলের কোন বয়স হয় না‚ শৈশব হয় না‚ সে খাটবার জন্যই জন্মায়| সেই ভগি এনে তাদের বস্তির এই বাড়িতে ব্রজেনবাবুকে বলে তাদের বাসা ভাড়া করে দিল| সেই থেকে এখানেই বাস| ভগি আর ফিরে যায়নি তাদের মানিকতলার বাড়িতে| তার সংসারেই সে ছিল বিনি পয়সার কাজের লোক| সুধা‚ তার স্ত্রীকে খুব ভালোবসত ভগি| হাতের কাজ টেনে টেনে করত| বড় কুন্ঠিত হত সুধা| মাঝে মাঝে বলতে গেলেই ভগি শুনিয়ে দিত‚ 'তোমরা হলে বড়বাড়ির মানুষ| আজ অবস্থার ফেরে আর শরিকদের জন্য তোমরা পথে| তাই বলে কি বাপু তোমাদের এইসব কাজ করা মানায়?'‚ সেই ভগির মেয়েই কৌশল্যা| দিন কারও এক যায় না| অংশুমানেরও যায় নি| সরকারি চাকুরী পেয়েছেন| যদিও মাইনে তখন কিছুই না| তবু তো সরকারী চাকুরী| ফিরে যেতে চেয়েছেন মানিকতলার বাড়িতে| কিন্তু পারেননি| ততদিনে শরীকি বিবাদ আরও তীব্র আকার নিয়েছে| নিজের ফেলে আসা জিনিসগুলোর অনেক কিছু তখন বেহাত| পাওয়ার মধ্যে ছিল ঐ একটা ফোটোফ্রেম‚ খান দুই তেপায়া টেবিল আর একটা আবলুশ কাঠের কাজ করা ছোটো আলমারি| ভাগের ঘরখানা তখন অন্যদের জিন্মায়| ইচ্ছে করলেই কেস-মর্ক্দমা করতেই পারতেন| কিন্তু সেসবে যেতে মন সায় দেয়নি| বছরের পর বছর কেটে যাবে‚ তবু আদৌ ফ্যাসলা হবে কি না তার কোন ঠিক নেই| আর নিজের জীবদশাতেই যদি না ভোগ করতে পারলেন তবে আর কেস করে লাভ কি? উঠানে পড়ে থাকা জিনিসগুলোর মধ্যে থেকে ওগুলোকে তুলে এনেছিলেন| ভাড়াবাড়ির ছাদের ওপরের দেড়খানা ঘর মনে হয়েছিলো যেন একটু পুর্ণ হল| তারপর নয় নয় করে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর| অন্য কোথাও উঠে যাওয়া আর হলো না| এত বছর এখানে আছেন তবু মন বসল কই? এর মধ্যেই নিঃসঙ্গ অংশুমানকে আরো নিঃসঙ্গ করে চলে গেল সুধা| একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়েন| ঘরের ঘড়িতে আটটার ঘন্টা পড়ল| অনেক রাত হল অবিনাশ তো ফিরল না| এত রাত তো করে না| চিন্তিত হন| একবার কি ব্রজেনবাবুর ঘরে যাবেন? ওখানে থেকে ওদের অফিসে ফোন করলে জানা যাবে| কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামাটাই তো মুশকিল| এবার একটা মোবাইল কিনতেই হবে| **** দুর থেকে কুকুরের ডাক নিশুত রাতে আরও স্পষ্ট শোনা যায়| অনেক রাতে ফিরেছে ছেলেটা| মেঝেতে পাতা বিছানায় ঘুমোচ্ছে অকাতরে| অংশুমানের চোখে ঘুম নেই| অনেককাল তো ঘুমোলেন এখন জেগে থাকার পালা| জেগে থাকলেই বরং ভাবনার অতলে তলিয়ে যাওয়া যায়| ফিরে যাওয়া যায় সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে| কত কিছু তো আজকাল ভুলে যান| কিন্তু সেই ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর‚ না সেসব হুবহু মনে থেকে গেছে| পাতার পর পাতা কি সুন্দর ছন্দে গাঁথা| একটা সময় এসে বুঝি এমনটাই সবার হয়| শুধু ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ‚ মনকে যেন এক অদ্ভুত শান্তি যোগায়| কেমন যেন এক মায়াবলয় মনকে‚ মস্তিষ্ককে ঘিরে থাকে| দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন ছাদে| ছাদের মেঝে এখনও স্যাঁতস্যাঁতে| চারিদিকের নিস্তব্ধটার মধ্যে একটানা ঝিঁ ঝিঁ'র ডাক| আকাশে একাদশীর চাঁদের মিহি আলো কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে| পুরো আকাশেই থোকা থোকা মেঘ| এবার নাকি বর্ষা সময়ের আগেই এসেছে| ব্রজেনবাবুই এইসব খবর বয়ে আনেন| এসব খবর আজকাল তেমন রাখতে ইচ্ছে করে না| সংসার থেকে কি আস্তে আস্তে সরে আসছেন তিনি? কিন্তু এখনও তো সময় হয়নি ছুটি নেবার| ছেলেটাকে থিতু করে দিয়ে যেতে হবে| শিবরাত্তির সলতে‚ সুধা প্রায় বলত| বেশিক্ষন আজকাল আর দাঁড়াতে পারেন না| ছাদের একপাশে একটা বিম বার করা‚ ওটার ওপরেই বসে পড়লেন| নিশুত রাতে প্রহরীর মত খাড়া এই সাদা বাড়ীটায় একমাত্র তিনি জেগে আছেন| সুধা চলে যাবার পর থেকেই তিনি রাতপ্রহরী যেন| জেগেই থাকেন| ঝিমুনি একটা আসে বটে তবে সেটাকে ঠিক ঘুম বলা যাব না| আর ঝিমুনির মধ্য দিয়েই মাঝে মাঝে ফিরে যান অতীতে‚ দেখতে পান দাদুকে‚ বাবাকে‚ মাকে‚ মনিকতলার বাড়ীর বড় উঠোন| ঠাকুরদালান ছিল না তাদের বাড়িতে| যদিও একটা ছোট ঠাকুরঘর ছিল ছাদে| দাদু পুজো-আর্চ্চার তীব্র বিরোধী ছিলেন| তাই আজও তার ঘরে ঠাকুরের কোন মূর্তি বা পট নেই| দাদু ছিলেন বিজ্ঞানের পুজারি| খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন জটিল তথ্যাবলী| কত নামী-দামী মানুষকে আসতে দেখেছেন বাড়িতে| সে সব সেই কোন কালের ঘটনা‚ সবই সত্যি কিন্তু আজ মনে হয় যেন গল্পকথা| **** সকাল থেকেই দিনটা একটু অন্যরকম| থেকে থেকেই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি| কৌশল্যাকে আজ সকাল সকাল রান্না করতে বলেছেন| আজ কয়েকজন আসবেন|ছেলেটার বেশ কিছুদিন ধরেই সম্বন্ধ করছেন| সবই ব্রজেনবাবুর জন্য সম্ভব হচ্ছে. তিনি আর ইদানীং রাস্তায় বেরোন না| চেনাজানা তেমন কোনকালেই ছিল না| তবু চারচোখে যাদের সাথে দেখা হত একটু হাসি‚ একটু কুশল বিনিময় এই যা| সেটাও এখন আর হয় না| কতকটা শরীরের জড়তা আর কতকটা মনের| আসলে এই সংসারটাকে তার মনে হয় একটা দুচাকার সাইকেল| ঠিকঠাক প্যাডেল করে নিয়ে যেতে হয় গন্তব্যে| কিন্তু একটা চাকা গড়িয়ে গেলে সাইকেলটাই নড়বড়ে হয়ে যাব| মাঝে মাঝেই ভাবেন সুধার বদলে তিনি যদি চলে যেতেন তাহলে কি সংসারটা এমন শ্রীহীন হয়ে পড়ত ? - বাবা এসো ভাত বেড়েছি - কৌশল্যার ডাকে ঘরে গেলেন| এই একটা রবিবার যেদিন বাপ-ছেলে দুপুরবেলা একসাথে খেতে বসেন| দু-একটা কথা যা হয় সবই মামুলি সাংসারিক কথাবার্তা| সুধা চলে যাবার পর ছেলেটাও কেমন একটু বদলে গেছে| বড় নিঃসঙ্গ| মাঝে মাঝে বড় অবুঝ - অবোধ মনে হয়| এই ছেলেকে পছন্দ হবে তো পাত্রীপক্ষের? আচার -ব্যাবহারেও মাঝে মাঝে কেমন এক অসঙ্গতি| এমনিতে ছেলে হিসাবে খুব ভালো কিন্তু ওগুলো-ও তো দরকার| - শোন কৌশল্যা তুই আজ বিকেল বেলা চলে আসিস| চা - টা করে দিতে হবে| কৌশল্যা ঘাড় নেড়ে সায় দেয়| -আবার বৃষ্টি এল বাবা| ওনাঁরা আসবেন তো? - ঘটক তো বলেছে আসবে| তুই ঠিকসময়ে চলে আসিস| না হলে ওঁদের ঠিকঠাক আতিথেয়তা করা যাবে না| -তুমি এখন একটু ঘুমিয়ে নাও | আমি ঠিকসময়ে চলে আসব| নেমে যায় কৌশল্য়া| *** সব যে ঠিকঠাক মিটে যাবে এমনটা কল্পনাও করেননি| কিন্তু সব ঠিকঠাকই মিটে গেছে| এই ক'মাস যেন একটা ঝড় বয়ে গেল| খালপাড়ের বস্তির তেতলা বাড়িটার কথা আজ বড় মনে পড়ছে| অথচ এতদিন ভাবতেন সেথায় মন বসেনি| অনেকগুলো বছর ওখানেই তো কেটে গেল| সেই আবাস ছেড়ে উঠে এসেছেন এই ভদ্রাপাড়ার দুঘরের ফ্ল্য়াট বাড়িটায়| বউমার দাদা করিতকর্মা মানুষ| উঠে - পড়ে এই আবাসনে ঠিক একটা ফ্ল্যাট জোগাড় করে ফেলেছে| মন্দ না| সামনের খোলা ছাদটা নেই তবু একচিলতে বারান্দা আছে| আকাশটাকে অত পরিপুর্ন দেখা যায় না‚ তা না যাক| সন্তানের সুখেই তো আসল সুখ| নদীর কিনারে এসে দাঁড়িয়েছেন| পার হওয়াটাই যা বাকি| খেয়া তো ঘাটে তৈরিই আছে| ব্রজেনবাবু আর কৌশল্যাই সব কিছু করেছে| ভিকু‚ রামখিলান সবাই পাশে দাঁড়িয়ে বিয়েটা তুলে দিল| আত্মীয়াস্বজন তো সেই কোনকালেই ছেড়ে এসেছেন| পরিচয় দিতে হয় তাই দেওয়া| নাহলে এঁরাই আজ তাঁর আত্মার আত্মীয়| অবিনাশের ঘরটা বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছেন| আসবাবপত্রে ভরে গেছে ঘর| ঘরে কত্রী না থাকলে কি আর ঘরকে ঘর মনে হয়? যতকাল সুধা ছিল ঘর যেন ভরে থাকত আলোতে| এবার নববধু এসে আলো করে বসুক তবেই না ঘর আবার করে পুর্ন হবে| ব্রজেনবাবু গেছেন বর-কনে আনতে| বৌমাকে আশীর্বাদ করেন এমন কিছুই নেই ঘরে| সুধার বাড়ি থেকে যা দিয়েছিল আর পারিবারিক সুত্রে যা পেয়েছিলেন কিছুই তাদের হাতে আসেনি| সবই বেহাত হয়ে গেছে| কিন্তু তার জন্য দুঃখ নেই| একটা সময় ঐ বিষয়ের জন্য অনেক দৌড়োদৌড়ি করেছেন| সবই ব্যর্থ| আজ তাই আর ওসব নিয়ে ভাবতে চান না| যা সম্বল ছিল‚ তাই দিয়েই এই দুকামরার ফ্ল্যাট| -বাবা এসে গেছে ওরা- কৌশল্যার ডাক শুনে ধড়ফড় করে ওঠেন তিনি| -শাঁখটা বাজা| বউ কে বরণ করে তুলতে হবে| বরণডালাটা নিয়ে আয়? -কে বরণ করবে বাবা ? তুমি? - নারে এসব স্ত্রীচার তুই কর| আমি বলে বলে দিচ্ছি| -বাবা আমি? কি বলছ তুমি? আশ্চর্য্য হয় কৌশল্যা| এমন কথা সত্যি তো সে শোনে নি কখনও| জাতে সে যে অনেক নিচু| বামুনের ছেলের বউ বরণ করে তুলবে সে? দ্বিধা-দ্বন্ধে সে ক্রমাগত কিন্তু কিন্তু করতে থাকে| কিন্তু তার কোন ওজর-আপত্তি কানেই তোলে না অংশুমান| শেষ পর্যন্ত কিন্তু কিন্তু করেই কৌশল্যাই নতুন বৌকে বরণ করে ঘরে তুলল| অংশুমান বললেন - 'এসো মা প্রনাম কর|' নতুন বউ প্রণাম করতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখে সদ্যকেনা ঠাকুরের সিংহাসনে রাখা একটা ফোটোফ্রেম| সদ্য বাঁধানো কাঠের ফ্রেম চকচক করলেও ভিতরের ফোটো অনেক পুরোন| দুপাশে একটি মহিলা ও একটি পুরুষের আবছা হয়ে যাওয়া ফোটো| মাঝে হাতে লেখা বিয়ের আমন্ত্রন পত্র| অবাক হয়ে চেয়ে থাকে সে| কি এটা? কাদের ফোটো? অংশুমান বলেন‚ ' মা ‚ এ আমার কাছে অতি পবিত্র| আমার মা-বাবার ছবি এই দুটি| আর এই যে লেখাটা দেখছো এটা আমার বাবা-মায়েঅর বিয়ের আমন্ত্রন লিখে দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| এটাই একমাত্র সম্পদ যা আমার কাছে আছে| এই আমার ঈশ্বর| ' নবপরিণীতার চোখে খেলে যায় অপার বিস্ময় আর অনেকখানি শ্রদ্ধা| এমন জিনিস কি সবার থাকে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়| মাথা নত করে প্রনাম জানায় ফোটো ফ্রেমে| অংশুমান নিশ্চিত হন‚ সঠিক জুহুরীর হাতে তুলে দিয়েছেন সঠিক জিনিসটিকে|

2048

181

"Gems the ঢপবাজ"

জেম'দার রাফ খাতা

জেমস বন গয়া রাঁধুনী| @ভোঁদড় @ স্যার| Monk fish এর নাম শুনেছেন? আমার সাম্প্রতিক আবিষ্কার- প্রোডাক্ট অফ নিউজিল্যান্ড| Costco তে পাবেন মনে হয়| ব্যাটারা যদি আপনাদের দেশের মাছ ‚ হ্যালিবাট (ডু নট কনফিউজ উইথ ডিক চেনীর কোম্পানী - হ্যালিবার্টন) রাখতে পারে এখানে বেচবার জন্যে তাহলে আপনাদের ওখানে মঙ্ক ফিশ কেন নয়| আপনার পুরাতন বাবুকে জিগিয়ে দেখুন‚ পুয়োর ম্যানস লবস্টার| এমনই তার সোয়াদ! কি প্রকারে রন্ধন করিলাম? এই নিয়ে মম তৃতীয় প্রয়াস| প্রথমবার নো রিস্ক কালিয়ার রেসিপি মোতাবেক| দেখুন: https://www.fishex.com/seafood/recipes/rinas-fish-kalia একটু কনফি পেতেই ইম্প্রোভাইজেশান; সেসব প্রচেষ্টা কি এখানে উল্লেখ করা শোভন অথবা সাহসিকতার পরিচয় হবে‚ নামী দামী সকল Chefনীর এর ভিড়ে? (১) নো মোর ভাজা ভাজি| অতি নরম এই মাছ| একটু গ্রিল করে নিলেই হবে‚ আট থেকে দশ মিনিট @ ১৮০ সেলসিয়াস| (আমার ওভেন এর মাপে)‚ একটু জল বেরোয়‚ অফ করে শুকোতে দেবেন‚ বেশী আঁচে শক্ত ও বাদামী হয়ে যায়‚ ঐ স্যামনের মতো ই| আপনি তো আবার সাহেব| তাহলে একটু গোলমরিচের গুঁড়ো‚ এ ড্যাশ অফ লাইম‚ একটু সী-সল্ট আর ঐ সাদা থকথকে সস কি যেন নাম‚ তার্তার দিয়ে টুং টাং‚ কাঁটা চামচে উইথ বেকড পোট্যাটো‚ পাম্পকিন‚ রাঙাআলু দিয়ে মেরে দিতে পারেন| সঙ্গতে যথাযোগ্য সোমরস| নো ফ্যাট‚ নো গিল্টি ফীলিং| (২) ফিশ ফ্রায়েড রাইস ও হতে পারে| হয়ে ও ছিল! বক চয়‚ ব্রকোলি‚ মাশরুম‚ হ্যানা তানা; সয় সস‚ অয়েস্টার সস দিয়ে ঘুঁটে ছোট ছোট পুন্নি রাইস (আন্ধ্রা রাইস) দিয়ে মন্দ হয়নি| পেঁয়াজের কথা আর বললাম না‚ সে তো থাকবেই| (৩) আর আজকেরটা? স্যার‚ এক্কেবারে যা তা! পিয়োর পরীক্ষা নিরীক্ষা| না উতরোতেও পারতাম| ইন ফ্যাক্ট কেঁচিয়ে ফেলেছিলাম| উপকরণ ও পদ্ধতি নিম্নরূপ: গ্রিলড মঙ্ক ফিশ| ও বলতেই ভুলে গেছি‚ ফিলেট (আমি ফিলে বলে আঁতলামি করতে অপারগ‚ প্যারিস ইজ নট প্যারী যেমন চন্দনগর ইজ নট চন্দা'র নাগর)| বাঙলা গাদা'র মতো করে টুকরো করে কেটে নেবেন| পেঁয়াজ আর অল্প লাল ক্যাপসিকাম ভেজে- অবশ্যই কুচি কুচি‚ কালো জিরে‚ একটু পাঁচফোড়নের ছিটে‚ লঙ্কার গুঁড়ো এবং? বলেই ফেলি| লাহোরি ফিশ মশলা আর কোফতা মশলা দিয়ে নাড়াবেন‚ সামান্য আদাবাটা ও রসুনও| (কেন এই মশলা? আমি রন্ধন সম্রাট‚ মশলার হারেমে সকল প্যাকেট সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে‚ এই দুটো দেখে মনে ধরলো‚ বেছে নিলাম)| প্যাকেট থেকে সোজা কড়াই তে| এটাই এখানেই কেলো করে ফেলেছি‚ বেশী ঢালা হয়ে গেছে| তার উপর বড় বড় শেফ লেবুর rind ঘষে ঘষে দেয় দেখেছি‚ ঐ কর্মটি করে আমি আরও কেঁচিয়ে ফেলিতং| বেশ একটু হালকা তেতো| (লেবু কচলানোর মেটাফর আমা পানে কতবার যে বর্ষিত হয়েছে| বাট হু কেয়ারস!) একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা তো করতেই হয়| এই ধরুন মহকুমা সদরের ইশকুলে গিয়েছিলাম কমার্স পড়তে‚ গ্রামের মাল বি এ বি কমই শুধু জানতাম‚ সায়েন্স কি বস্তু‚ ফিজিক্স‚ কেমিষ্ট্রির নামই শুনিনি| অঙ্ক- ইয়েস| তো হেডস্যার ইন্টারভিউ নিয়ে বললেন সায়েন্সে ভর্তি হতে| সেই শুরু হলো ইমপ্রোভাইজেশনের‚ সারাটা জীবন ঐ করেই কাটালাম| ওহ ভাজা ভাজা হয়ে গেলে‚ গরম জল ঢালুন আন্দাজ মতো| এই বার মনে পড়েছে‚ আজ দই দিতে ভুলে গেছি| ঐ তেতো ভাবটা কেটে যেত| আমি ম্যানেজ করতে চেষ্টা করেছি‚ ট্যোমাটো পেষ্ট দিয়ে‚ ভাঁড়ারে diced টিনও ছিল না| সব উলটো পাল্টা হয়ে যাচ্ছে| একটু ফুটে এলেই নামিয়ে গামলায় (যাকে আপনারা মিক্সিং বাউল বলেন) ফেলে ফুররররর; মানে stick grinder দিয়ে ঘুঁটে নিলাম| এইটে কিন্তু খুব কাজের| পুরো ফ্লেভারটা মিশে যায়‚ ডুমো ডুমো ট্যোমাটো‚ পেঁয়াজ ঝোলে ভাসে না| এমনি যে কোন ঝোলে‚ ঝালে ব্যবহার করে দেখতে পারেন‚ ব্রথ টা সমান কনসিস্টেন্সির হয়‚ আর রঙও খোলে| তারপর আবার কড়াইতে (কড়াই= নন স্টিক পাত্র)| আন্দাজ মতো জল ঢেলে দিন| নুন মিষ্টি ‚ এই একটু সামান্য‚ অতি সামান্য চিনি ছড়িয়ে দিলেই হবে| এইবার চেখে দেখা| মশলা একটু বেশীই দিয়ে ফেলেছি‚ বেশ কড়া হয়েছে মালটা| আলু সেদ্ধ থাকলে ডুমো ডুমো করে দিলে টেনে নিতো; স্লাইসড কচুর মুখী handy ছিল‚ তাইই সই| টেনে নিল| একা একাই খেলাম‚ গৃহিণীর আজ নিরামিষ আহার‚ শ্রাবণের সোমবার কিনা | তা ভাল‚ তিনি খেলে কপালে দু:খ ছিল| আর‚ নিজের রান্না কি কখনও বিস্বাদ লাগে? দেড়খানা রুটি দিয়ে মেরে দিলাম| ওহ‚ ইয়েস‚ পুরো এক কিলো ফিলেট‚ খুবই মেহঙ্গা মাছ এটা‚ ২৭ ডলার কিলো| বাকীটা ফ্রীজায়িত‚ ফির কাভি| যেদিন খুব ক্ষিধে পাবে (আপনারা কাব্য করে বলবেন‚ অতীতের তীর হতে বহিবে বাতাস ) ফ্রিজ ফাঁকা‚ সেদিনের জন্য তোলা রইলো| জয়রামজীকী| ডি: উপরোক্ত পদ্ধতি আদৌ কোন স্বীকৃত রন্ধন প্রণালী নহে| মালের (সরি মাছের) দায়িত্ব আরোহীর!

198

7

ঝিনুক

স্বপ্নের থেকেও সুন্দর ইয়োহো ভ্যালি.....

"দিন চলে যায়, সবই বদলায় শুধু যে আমার এ মন যা ছিল থাকে তেমন পুরনো হয় না কত কি শোনা কথা, কত সুখ কত ব্যথা, হারানোর দলে লেখে নাম শুধু তুমি যে নাম লিখেছো মোছা যায় না ……" গাড়ি গান শোনায়, শুনতে শুনতে পার হয়ে যাই ব্যানফ ন্যাশন্যাল পার্কের চেনা পাহাড়, চেনা জঙ্গলে ঘেরা অতিচেনা পথ। এযাত্রা গন্তব্য চেনা গণ্ডি ছড়িয়ে অচেনা Yoho Valley.... আমাদের রাজ্য আর পাশের রাজ্যের সীমানায় রকির Yoho National Park... ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের একটা। আমাদের স্পর্শ, গন্ধ, পদধ্বনি তো বোধ হয় মুখস্থ হয়ে গেছে এই পাড়ার রকি আর তার জঙ্গলের। সারা বছরে কতবার যে হানা দিই পাহাড়ে তার কোন লেখাজোখা নেই, বিশেষ করে সামারের প্রায় কোন উইকএণ্ডই বাদ যায় না সম্ভব হলে। ইয়োহো পার করে, পাহাড় ডিঙিয়ে কেলৌনা, কামলুপস, ভ্যাঙ্কিউভার, সেও গিয়েছি একাধিকবার। কিন্তু পাহাড়ের এই দিকটাতে অনেকদিন ধরেই যাই যাই করেও যাওয়া আর হয়ে ওঠে নি। অবশেষে সেই ইয়োহো- প্রায় ২৫০ কিলোমিটার আমাদের এই শহর থেকে, রওনা দিতে দিতে শুক্কুরবার বিকেল প্রায় সাতটা বেজে গেল। পৌঁছোতে পৌঁছোতে আলো কমে যাবে, তার ওপর যাত্রাপথের শেষটুকু খুবই খাড়াই আর অপ্রশস্ত, এক্কেবারে অপরিচিতও বটে। তাই সেই শুক্রবার রাতটা পথে একটা ছোট্ট ডিট্যুওর করে আইসফিল্ড পার্কওয়েতে mosquito creek-এর একটা লজে বুক করা ছিল। শহর ছাড়ার আগেই ডিনার তুলে নিলাম, আহ, সারাদিনের কাজের শেষে হীটেড সীটে আরাম করে পা মুড়ে বসে রিল্যাক্স করে খেতে খেতে পছন্দের গানের সাথে পাহাড়ের পথে, এমন কেন রোজ হয় না আহা!! কুচকুচে কালো মেঘ, অঝোর বৃষ্টি সারাটা পথে, পাহাড়ে বৃষ্টির প্যাশনই অন্যরকম, অন্যরকম তার ঝরার ধরণ। খুব poor visibility, হেডলাইট হাই বীমে দিয়েও সামনেটা প্রায় ঘষা কাঁচের মত, তার মধ্যে দিয়েই চলা। স্পীড লিমিটও কমিয়ে ৯০ করে দিয়েছে আজকাল পার্কের সীমানায় ঢুকতেই। যা হোক, ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা ঝরোঝরো বর্ষা নীচে ফেলে আরো ওপরে উঠে গেলাম, পরের আধা ঘন্টা গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘের মধ্যে দিয়ে চলা। জানালার কাচ নামিয়ে দিলাম, কৌতূহলী মেঘেরা ঢুকে পড়ল জানালা খোলা পেয়ে (যারা দার্জিলিঙের ঘুম স্টেশনে বা অন্য কোন শৈলশহরে মেঘে ভিজেছেন তারা বুঝবেন কি বলতে চাইছি)। গাড়ির ড্যাশে দেখাচ্ছে ৭ ডিগ্রী, তবু ভীষণ ভাল লাগে চোখে মুখে গলায় মেঘের ভেজা ঠোঁটের ছোঁয়া। এই লজে আগে কখনো থাকি নি। লজের সাইন মিস করে টার্নটা পার করে চলে গেলাম বেশ কিছুদূর। সাড়ে দশটা বাজে, অন্ধকার হয়ে যেতে শুরু করেছে ততক্ষণে। পাহাড়ে জঙ্গলে আঁধার একটু যেন আগেই ঘনায়, তার ওপর আকাশ ভরা মেঘ। এই সব পাহাড়ি হাইওয়েতে একবার কোন টার্ন মিস করে গেলে আবার ঘুরে আসার জন্য বেশ খানিকটা রাস্তার ধাক্কা। গাড়ি ঘুরিয়ে লজের পার্কিঙে যখন পৌঁছোলাম, তখন এমন ঝুপঝুপে নিকষ অন্ধকার যে নিজের হাতখানাও আর ঠাহর হচ্ছে না। গাড়ি থেকে নামতেই জঙ্গল যেন কথা বলে উঠল ঝিঁঝিগুঞ্জনে। খুব কাছেই কোথাও বয়ে যাওয়া কোন ঝোরা বা ক্রীকের মৃদু কিন্তু একদম নির্ভুল আওয়াজ ভেসে আসছে। ঝিকমিক জোনাকির লক্ষপ্রদীপ জ্বলছে স্বাগত জানাতে। পায়ের কাছে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই সরু পায়ে চলা পথটা ধরে। একটু দূরে ছায়ার মত একটা বাড়ির আদল। সামান্য আলোর রেখা চুঁইয়ে আসছে বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে। ঘনঘোর জঙ্গলের মধ্যে গাছ কেটে এক খাবলা জমি খালি করে এই কাঠের লজটা বানানো হয়েছে, মোট চারটে বাংলো, প্রত্যেকটায় দুদিকে দুটো করে ঘর। বিজলি আছে, মুঠিফোনও কাজ করছে, তবে নো রানিং ওয়াটার। ভুল বললাম, রানিং ওয়াটারও আছে, তবে সেটা কলের জল নয়, বাংলোর পাশ দিয়েই কুলুকুলু বয়ে যাওয়া ক্রীক, মসকিউইটো ক্রীক। কি যেন একটা তড়বড় করে সরে গেল পায়ের কাছ থেকে,ভাবি খরগোস হবে হয়তো। আলো ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি একটা শেয়াল, দুই চোখে হলুদ আলো জ্বেলে সন্তর্পণে আমাদের জরিপ করছে। 'স্যরি বেটা', ওকে ওর মত থাকতে দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। শুধু শেয়াল কেন? ভালুক, নেকড়ে, ক্যিউগার সবই আছে এই জঙ্গলে। শুধু এই অন্ধকারে আহ্লাদ করতে না এলেই কাফি। টুপটাপ জল ঝরছে আমাদের উপর বৃষ্টিভেজা গাছগুলো থেকে। লজের সামনে পৌঁছোতেই মোশন সেনসর অ্যাক্টিভেটেড বাইরের আলোটা জ্বলে উঠল। গোটা উঠোনটা ভরে গেল ফ্যাটফেটে সাদা প্রাণহীন আলোয়। শহুরে মনটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, অন্য মনটা গিলটি কনসেন্সে মাথা নীচু করে, কি অন্যায্য উপদ্রব এমন একটা মেঘমেদুর বৃষ্টিধোয়া রোম্যান্টিক জঙলা রাতে! এই অনধিকার চর্চার জন্য মনে মনে ক্ষমা চাই নিভৃতচারী অরণ্যের বাসিন্দাদের কাছে। চেক ইন করে রাতের মত থিতু হওয়া গেল। কেয়ারটেকার বারবার বলে দিয়েছেন, রাতে ওয়াশরুমে যেতে হলে একা একা না যেতে। ভালুকের খাসতালুকের আঙিনায় লজটা। কাজেই এই চেতাবনি খুবই স্বাভাবিক। ও, ভুলেই গেছি বলতে, ওয়াশরুমগুলো সব বাঙলোর পিছনদিকে আলাদা আউটহাউসে। গোটা উঠোনটা পেরিয়ে যেতে হবে। এমনিতেই ঘুমের সঙ্গে আমার ভাসুর-ভাদ্রবৌ সম্পর্ক, অনেক সাধ্যসাধনায় তেনার দেখা মেলে। তায় অচেনা বিছানা (সে যতই আরামের হোক না কেন), মেঘবাদল সজল এমন পাইনগন্ধী রাত, রিমঝিম সুরে বহতা ঝোরার নুপুর বাজছে সমানে মাথার দিকে জানালার ওপারে। ঘুম কি আর আসে? সে আজ তেপান্তর পার করেও আরো কয়েক যোজন দূরে। সমানে উসখুস করতে থাকি, অন্ধকারেই জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করি। উফফ, কি কালো যে হতে পারে অন্ধকার!! কিচ্ছু দেখা যায় না। ঝিল্লিমুখর, শুনশান বাইরেটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। খুব ইচ্ছে করতে থাকে ক্রীকটার পারে গিয়ে বসতে। কিন্তু শোয়ার আগে আজ প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে বাপ বেটা দুজনের কাছেই, কোন কারণেই আমি একা একা বেরোব না আজ রাতে অভিসারে। কাজেই একবার এপাশ, একবার ওপাশ। বিছানা থেকে নেমে ফায়ারপ্লেসে আগুনটা উসকে দিই, আর এক টুকরো কাঠও গুঁজে দিই। ঢকঢকিয়ে জল খাই বেশ কয়েকবার। একটা, দুটো, আড়াইটে, সময় আর এগোতে চায় না। এই ‘সময়’ ব্যাপারটাকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না, যখন তাড়া থাকে, সময় দৌড়োতে থাকে, শত চেষ্টাতেও তার সাথে তাল রেখে উঠতে পারি না। আর এই না-ঘুম রাতে সময়ও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে বাকি পৃথিবীটার সাথে! অবশেষে তিনটে প্রায় বাজে বাজে, কর্তা নড়ে চড়ে উঠলেন। আমিও তড়াক করে এক লাফে উঠে চেয়ারের উপর থেকে শালটা টেনে জড়িয়ে নিলাম ভালো করে। বাইরে পা দিতেই অবাক কাণ্ড, মেঘ-বৃষ্টি সব উধাও, চাঁদও পলাতক, কৃষ্ণা চতুর্দশীর নিবিড় রাত, আকাশটার নির্ভেজাল কালো বালুচরী আঁচলের প্রতি ইঞ্চিতে অযুত রুপালি তারার জরিন নক্সা আর একদম ঠিক মাঝ বরাবর থিরথিরে আলোর ঢেউয়ের মত ছায়াপথ, ঠিক যেন স্বর্গের সিঁড়িটি, মনে হচ্ছিল, ইচ্ছে হলেই বুঝি হাত বাড়িয়ে ছোঁওয়া যায়। রাতের আকাশের রূপ জঙ্গলে যেমনটি, তেমন আর কোত্থাও সম্ভব না। জঙ্গলের অনেক আকর্ষণের মধ্যে এটা একটা মূখ্য কারণ। জঙ্গলে জঙ্গলে বহু রাত মাটিতে চিত হয়ে আকাশ দেখেছি, তারা গুণেছি। আমার জন্য অন্য লোকজন ঘুমোতে যেতে পারে নি, কিন্তু আকাশগঙ্গাকে এমনভাবে এর আগে আর কখনো দেখি নি, so up, close and personal.... "পুবদিগন্ত দিল তব দেহে নীলিম রেখা", সকাল হল একরাশ মুগ্ধতায়। সত্যি সত্যিই "শ্যামল সঘন নববরষার কিশোর দূতের" মতই ঠেকতে লাগল সদ্যস্নানসারা ঝিলমিলে জঙ্গলটাকে। রাতের রহস্য যত, দিনের আলোয় সব ঢাকা পড়ে গেছে। এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ালাম জঙ্গলের মধ্যে কিছুক্ষণ। সেই নাম লিখলাম একটা গাছে যত্ন করে। ঝোরাটায় পা ডুবিয়ে জল ছপছপিয়ে একটা কাঠবিড়ালিকে বেজায় চমকে দিলাম। বেচারা হকচকিয়ে পালাতে গিয়ে মুঠোর বাদামটা হাতছাড়া করে ফেলল। ক্ষতি পোষাতে আমার এক কামড় দেওয়া আপেলের যেটুকু বাকি ছিল সেটা ছুঁড়ে দিলাম। জলটা যথারীতি কনকনে ঠাণ্ডা। একটু পরেই পায়ের পাতা অসাড়। গ্লেসিয়ারের বরফগলা জলের কারণেই এই তল্লাটের যত নদী, ঝরনা, লেক, সবই এমনতরো ঠাণ্ডা। ক্রীকটার অন্যপারে একটা ক্যাম্পগ্রাউণ্ড। ঘুম ভেঙে উঠে লোকজন দিন শুরু করছে। কিছুক্ষণ বসে বসে দেখলাম তাদের প্রাতঃকালীন আড়মোড়া ভাঙা, হাই তোলা, স্টোভ জ্বালানো, কফির জল বসানো। একদম সোজাসুজি উল্টোদিকের টেন্টটা থেকে অল্পবয়সী দুটো ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে আদর করল, তারপর হাত ধরাধরি করে চলে গেল, সম্ভবত ওয়াশরুমের অভিমুখে। একটা টলোমলো বাচ্চা ছেলের হাত ধরে উস্কোখুস্কো তরুণ বাবাটি এসে বসল উল্টোদিকের পারে, স্মিত হেসে আমায় সুপ্রভাত জানালো। আমিও প্রত্যভিবাদন জানালাম। বাচ্চাটার চোখে তখনও ঘুম, কেমন বোধিগ্রস্ত চোখে ঝুম হয়ে বসে রইল বাবার পাশে। একটু পরে মা এল, হাতে ব্রাশ-পেস্ট। আমি উঠে পড়লাম। চা খেয়ে রেডি হয়ে নিলাম। আবার যাত্রা। লেক লিউইসে গিয়ে একবারে ব্রাঞ্চ সেরে আবার হাইওয়েতে পড়ার পরিকল্পনা। পথে ক্রোফুট গ্লেসিয়ার দেখতে ভিউপয়েন্টে দাঁড়ানো হল। সীমিত ফোটোসেশন, গাণুশের সাথে একটু ছোঁয়াছুয়িও খেলে নিলাম এক ফাঁকে। কতদিন পরে ছেলেটা সাথে এসেছে এবার! বড় হয়ে যাওয়া গাণুশ আমার আজকাল তো আর আমাদের সাথে সাথে বেড়ায় না সর্বত্র। তাই যতটা পারি উপভোগ করে নিই প্রত্যেকটা মিনিট। খাওয়াদাওয়া সেরে প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ আবার শুরু হল চলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পেরিয়ে গেলাম রাজ্যের সীমানা। আধাঘন্টার মধ্যেই ইয়োহো পার্কের দুয়ারে। মধ্যে একটা স্টপ স্পাইর‌্যাল টানেল দিয়ে ট্রেন যাওয়া দেখতে। এই স্পাইর‌্যাল টানেল ব্যাপারটা শুধু কানাডাতেই নয়, সারা বিশ্বেই একটা ঐতিহাসিক পরিকাঠামো। কানাডার অ্যাটলান্টিক প্রান্ত থেকে প্যাসিফিক, কোস্ট ট্যু কোস্ট দূরত্ব ছ'হাজার কিলোমিটারেরও বেশি, আগাগোড়া ট্রেনলাইনে যুক্ত, যার নাম কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেইল। একটু আন্দাজ দিতে চেষ্টা করি, নিউ ইয়র্ক থেকে লণ্ডন সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার আর লণ্ডন থেকে কলকাতা প্রায় আট হাজার কিলোমিটার। বলাই বাহুল্য যে এই কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেল কানাডার ব্যাবসায়িক মানচিত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় দেশটা গোটা পার করে এসে এইখানে রকি পাহাড়ের মত একটা দুর্লঙ্ঘ্য বাধাকে ডিঙিয়ে যেতে হয় সেই ট্রেনকে। সে বড় সহজ কাজ নয়। এই রেলললাইন যখন প্রথম পাতা হয়েছিল, এই খাড়া পাহাড় পেরোন ছিল খুব ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ আর কষ্টসাধ্য যাত্রা। আগে পিছে এক্সট্রা ইঞ্জিন, শয়ে শয়ে অতিরিক্ত কর্মচারী লাগতো ট্রেনগুলোকে এই খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠাতে, ডিরেইলমেন্ট ঠেকাতে spur line লাগতো। ১৮৮৪ সালে প্রথম যে ট্রেনটা এই লাইনে রওনা দিয়েছিল, সেটা ডিরেইল হয়ে তিনজন কর্মচারী মারা গিয়েছিলো, তারপরে স্পার লাইন পাতা হয় ডিরেইলমেন্ট ঠেকাতে। সেই স্মৃতিতে স্মারক আছে ঐ স্পটে, যার নাম ছিল বিগ হিলস সেই যুগে, আছে পুরনো সেই স্পার লাইনগুলো আর ডিরেইল হয়ে যাওয়া একটা পুরনো লোকোমোটিভ। ১৯০৯ সালে ভ্দ্রস্থ গ্রেডের স্পাইর‌্যাল টানেল দুটো (লোয়ার টানেলটা ৮৯১ মিটার, গ্রেড ১৫ মিটার আর আপার টানেলটা ৯৯১ মিটার, গ্রেড ১৭ মিটার) তৈরী হয় এই খাড়াই পাহাড় নিরাপদে পেরনোর জন্য। It's an engineering marvel.... এই টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খুবই চ্যালেঞ্জিং, আজকের দিনেও। থেকে থেকেই পাহাড়ে পাথরের ধ্বস নামে, বৃষ্টি বেশি হলে মাডস্লাইড শুরু হয়, আর শীতে তুষারধ্বস তো আছেই। তবু সব বাধা অতিক্রম করেও মানুষ ঠিক পথ কেটে নেয়, ট্রেন যায়, ট্রেন আসে টানেল ধরে পাতা লাইন বেয়ে। টানেলের গল্প এখানেই শেষ করবো, যদি আরো জানার ইচ্ছে হয়, গুগলজ্যেঠুকে শুধালেই পাতাকে পাতা ইনফো পেয়ে যাবেন এই জোড়া টানেলের ব্যাপারে। জেট থেকে রকেটের গতিতে উত্তরিত হোক জীবন, চাই কি আলোর গতিতেই চলুক না, তবু ট্রেন ব্যাপারটা আদ্যন্ত রোম্যান্টিক হয়েই থেকে যাবে বলে আমার মনে হয়। কু-উ-উ-উ-উ-উ ঝিকঝিক করতে করতে ট্রেনটা টানেলে ঢুকে আবার বেরিয়ে চলে গেল পাহাড়ের অন্য পারে। যেতে যেতে প্রতিধ্বনি ফেলে গেল পিছনে পাহাড়ের দেওয়ালে দেওয়ালে। অজস্র স্বপ্ন ভিড় করে এল দুই চোখ ভরে আমার। সেই স্বপ্ন মেখে আবার রওনা দিলাম। ইয়োহো ন্যাশন্যাল পার্ক বলতে বেশির ভাগ দর্শনার্থীই এমারেল্ড লেক, ওয়াপ্টা ফলস বা বার্জেস শেল ফসিল বেড বোঝেন। কোনটাই ফেলনা নয়, কিন্তু ইয়োহো ভ্যালির সৌন্দর্য বা গরিমা কোন বর্ণনার অতীত। সাধারণত ক্যাম্পিং বা ব্যাকপ্যাকিঙের জন্যই লোকে ইয়োহো ভ্যালিতে হানা দেয়। চটজলদি ভেকেশনারদের ভিড় তাই বিশেষ নেই এই পথে। ভীষণ খাড়াই পাহাড়ি পথ ধরে একটার পর একটা switch back (hairpin bend) road বেয়ে আমরা এবার উঠে যেতে থাকি আমাদের Yoho Valley-র গন্তব্যে। এই সুইচ ব্যাকগুলোতে শুধু গাড়িটাই উঠতে পারে, গাড়ির লেজে বেঁধে ট্রেইলর নিয়ে যাওয়া যায় না, একচুল এদিক থেকে ওদিক হলেই পাশের খাদে ঠিকানা লেখা। শহুরে স্বাচ্ছন্দ্য বাদ দিয়ে একটি বেলাও বাস করা প্রায় অসম্ভব বলেই যাদের মনে হয়, আমরাও প্রায় সেই দলভুক্ত। কাজেই জঙ্গলে খোলা আকাশের নীচে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প করে ভালুক, হরিণ, ক্যিউগারের সাথে একটা রাতও কখনো ভাগ করে নেওয়া হয় নি। যতদূর অবধি গাড়ির চাকা গড়াতে পারে, দিনশেষে মোটামুটি চলনসই হোটেলের বিছানা একটা পাওয়া যায় গা এলিয়ে দিতে আর একটা পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, সেই পর্য্যন্তই অভিযান থমকে থেকেছে এতকাল। এই প্রথম জঙ্গল-পাহাড়ের এমন এক উপত্যকায় পৌঁছে গেলাম, যেখানে পথটা সত্যি সত্যি ফুরিয়ে গেল, কালো একটা সাপের মত আঁকাবাঁকা অ্যাসফল্টের রাস্তা শেষ হয়ে গেল একটা তকতকে পার্কিং লটে এসে। এর পরে যা কিছু সব পদব্রজে জঙ্গলের মাঝটি দিয়ে, পাহাড় ভেঙে। থাকার জন্য ক্যাম্পগ্রাউণ্ড রয়েছে গোটা চারেক, একটা লগকেবিন হস্টেল, আর আরো বেশ খানিকটা হাইক করে উপরে উঠে গেলে অ্যালপাইন ক্লাবের একটা ব্যাককানট্রি হাট। এই ভ্যালিতে সব থাকার ব্যবস্থাই সামার ওনলি। জুনমাসের মাঝামাঝি বা শেষ থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরু (ওয়েদার পারমিটিং), গ্রীষ্মের এই কটা দিনই খোলা থাকে ব্যকপ্যাকিঙের অতুলনীয় স্বর্গ, দুর্গম এই ভ্যালি। শীতের সময়ে নিত্য এভাল্যাঞ্চ থুড়ি তুষারধ্বস উপেক্ষা করেও কোন দুঃসাহসী যদি জমে যাওয়া ইয়োহো নদী বেয়ে স্কি করে উজিয়ে আসতে পারে তো বরফে ঢাকা এই গোটা ভ্যালি, পাহাড়্চূড়া, জঙ্গল, স-অ-অ-অ-ব একা তার। তণ্বী প্রপাতটির নাম Takakkaw falls... এটা বোধ হয় কানাডার সবচেয়ে উঁচু ফলসগুলোর একটা, প্রায় হাজার ফুট উঁচু থেকে উদ্দাম, উচ্ছ্বল কলহাসিতে মাতোয়ারা মরণপণ ঝাঁপ দিয়ে ঝরছে, সামার আর ফল-এর সমস্ত দিনরাত মুখর করে। দেখেই ছোটবেলার একটা ভুলে যাওয়া গান মনে পড়ে গেল..... "এখানে নেই কারো মুখে মুখোস কোন এখানে সবাই তো সহজ সরল, নেই তো মনে কারো গরল এসো-ও-ও, দূ-উ-রে কেন এসো পাশে, দূ-উ-রে কেন এসো পাশে, ঝর ঝর ঝরে ঝিলমিল ঝরনা, খিলখিল হাসি, ও খিলখিল হাসি...." Takakkaw.... শব্দটা আদতে ক্রী ভাষা থেকে এসেছে ('ক্রী' হল কানাডার সবচেয়ে বেশি কথিত বা প্রচলিত নেটিভ ভাষা) যার মানে হল magnificient ....... Yoho শব্দটাও ক্রী, মানে awesome, wonderful.... সার্থকনামা, কোন সন্দেহ নেই। পা ফেলা মাত্র সত্যি সত্যিই এই শব্দগুলোই মনে আসবে। Takakkaw falls-এর ঠিক পায়ের তলায় জঙ্গলের মধ্যে দুধারে ছড়ানো ক্যাম্পগ্রাউণ্ড, না বিজলিবাতি, না আছে কোন শহুরে আরামের আয়োজন। তবু কত মানুষ যে জঙ্গলের সঙ্গে সময় কাটাবার নেশায় তাঁবু খাটিয়েছে! পার ছুঁয়ে বয়ে চলেছে নিদারুণ খরস্রোতা হিমশীতল দুধসাদা ইয়োহো নদী। আক্ষরিক অর্থেই দুধের মত সাদা নদীটা, সুপারমিহি গ্লেসিয়াল পলির সাসপেনশন এত বেশি নদীর জলে। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় ইয়োহো গ্লেসিয়ার নীলচে সাদা স্তব্ধতায় থমকে রয়েছে। না তাঁবু খাটিয়ে থাকি নি আমরা, আমরা ছিলাম জঙ্গলের মধ্যে হস্টেলিং ইন্টারন্যাশন্যালের সেই লগ কেবিনে, বাহুল্যবর্জিত অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু ছিমছাম বন্দোবস্ত হাতে গোণা অল্প কয়েকজন লোকের জন্য, সারা দিন হাইকিঙের শেষে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে রাতের মত বিশ্রাম নেবার একটা ঠেক। এই প্রথম অনেক অপরিচিত মানুষের সাথে একসাথে থাকার অভিজ্ঞতা হল। নটা সাড়ে নটা নাগাদ সূর্যটা পাহাড়ের পিছনে চলে যেতেই সমস্ত ভ্যালিটা এক অদ্ভুত আলোয় ভরে গেল। এমন মায়াগোধুলি আগে দেখি নি কোনদিন। পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ঢেকে ফেলল গোটা উপত্যকা, রাত নামার বেশ খানিকটা আগেই। পাহাড়ের পিছন থেকে তখনও অস্তসূর্যের আভা ঠিকরাচ্ছে, চূড়াগুলোতে সব আগুন ধরে গেছে বলে মনে হতে থাকে। অন্ধকার হয়ে গেলে গ্যাসের বাতি জ্বালানো হল সব ঘরে, সামনের টানা বারান্দায়। রান্নাঘরে স্টোভও সেই গ্যাসেই জ্বলে, স্নানের জলও সেই গ্যাসেই গরম হয়। নো মাইক্রো-ওয়েভ, নো টিভি, নো নেট, নো ফোন। না, সেল থুড়ি মোবাইলও অকেজো, কোন সিগন্যাল নেই। শান্তি, অপার শান্তি, জলপ্রপাতের কলধ্বনি, আর আদিম, অকৃত্রিম জঙ্গলের একান্ত আপনার ভাষা। হিডেন লেক অবধি, খুব ছোট্ট করে একটা হাইকিংয়ে গিয়েছিলাম আমরা দুপুরবেলা পৌঁছেই, যাওয়া আসা মিলিয়ে ছয় কিলোমিটারের কিছু বেশি। মানুষের ভিড় কম, পশুপাখিই বেশি। হাইকিং ট্রেইলে পাশাপাশি দুজন হেঁটে যাওয়া যায় না, এত সঙ্কীর্ণ আর তেমনি খাড়াই। ঘোরতর জঙ্গল। সবুজ লেকটার পারে বন্যজন্তুদের পর্যাপ্ত পায়ের ছাপ, হ্যাঁ, এমনকি ভালুকেরও। বোঝা গেল, এই লেকের জল খুব প্রিয় তাদের সবার। হরেকরকমের কাঠবিড়ালিদের কথা বাদই দিলাম, সেই দিনেদুপুরে আমাদের পরোয়া না করেই হরিণ, এলক, মাউন্টেইন গোট, বিগহর্ণ ভেড়া দিব্যি পাশে পাশেই চরে বেড়ালো। একটা হেলানো গাছের গুঁড়ির ওপর বসে চানাচুর, ক্যাণ্ডি, কোলা দিয়ে উদযাপন করা হল। ইয়োহো গ্লেসিয়ার অবধি আর যাওয়া হবে না এই যাত্রা, কারণ সেটা গোটা একটা দিনের মামলা। আমরা তো দিন অর্ধেক খচ্চা করেই এসে পৌঁছেছি। কাজেই রয়ে সয়ে লেকটাকে প্রদক্ষিণ করে আবার ফেরার পথ ধরা। সেই প্রদক্ষিণের পথে আমি আমার রিচ্যুয়াল সেরে ফেলি গাছের গায়ে প্রিয়নামটি লিখে ফেলে একফাঁকে। হাঁসফাঁস করতে করতে পাহাড়ে চড়াটা অবতরণের চেয়ে সহজ বলেই আমার মনে হয় সবসময়। এত খাড়াই বেয়ে নামা ভারি কঠিন কাজ। আর আগের রাতের বৃষ্টিতে সমস্ত পথটাই পিছল, জায়গায় জায়গায় দিব্যি ক্ষীণকটি ক্ষণিকের ঝোরা বয়ে চলেছে পথের মধ্যে দিয়ে। আমার গাণুশের জন্য তেমন কিছু অন্তরায় নয়, সে তিড়িং তিড়িং করে লাফাতে লাফাতে অবলীলায় নেমে যেতে থাকে, কিন্তু আমার মত ভাঙাচোরা মানুষের জন্য সে বড় সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকবার পদস্খলন হল। আছাড় খেতে খেতে আমি যত না ভয় পাই, আমার মালিক তার চেয়ে দ্বিগুণ ত্রস্ত। এই বৃদ্ধ বয়সে এমন একটি নোকরানি বেঘোরে হারালে কি মনোমত আর একটি খুঁজে পাওয়া যাবে? কিন্তু সখা কোথায় পাই এই ঘোর অরণ্যে যে হাত ধরে নিয়ে যাবে আমায়? অগত্যা আমার গাণুশই ত্রাতার ভূমিকায় আমার হাত ধরে নামতে সাহায্য করে। হস্টেলে পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় ছ'টা বেজে গেল। স্নান সেরে কম্যিউন্যাল রান্নাঘরে সাপার বানালাম অন্য বোর্ডারদের সাথে স্টোভ শেয়ার করে, গল্প করতে করতে, চিকেন ন্যুডল স্যুপ আর সসেজ ভাজা। শেষ পাতে চীসকেক। বাইরে উঠোনে পাতা কাঠের টেবিল চেয়ারে বসে সাপার। ওয়াইন দিয়ে আচমন, স্কচ দিয়ে মুখশুদ্ধি, আমার গাণুশের জন্য ওর পছন্দের বিয়ার। জঙ্গলের মধ্যে বসে খাবার স্বাদই কুছ অলগ হ্যায়, সে যত সামান্য খাবারই হোক না কেন। ডিসপোসেবল প্লেট, গ্লাস, কাটলারি নিয়ে গিয়েছিলাম। খেয়ে উঠে বাসন ধুতে আমার বিস্তর অ্যালার্জি.... আজ এতগুলো বছর পরেও। গার্বেজ ডিসপোস করে স্কচের গ্লাস রিফিল করে গ্লেসিয়ারের দিকে মুখ করে আরাম করে এলিয়ে বসলাম, ডানদিকে রইলো পাগলির মত খিলখিল করে হাসতে থাকা টাকাক্ক ফলস। প্রাকসন্ধ্যের আলো আঁধারিতে একটা ক্যিউগার দেখা করতে এল। হেলো, হাই, এমনকি একটা মিনি ফোটোসেশনও হল। একটা সজারুও এল। কিন্তু ক্যিউগারটার মত অমন স্পোর্টসম্যানশিপ থুড়ি স্পোর্টসক্যিউগারশিপ তার নেই কো মোটেই, আমাদের দেখেই এক ছুট্টে পালিয়ে গেল। ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘিরে এল। এল জোনাকিরা। শুরু হল ঝিঙুরের মেহফিল। হুল্লাট একটা ক্যাম্পফায়ার জ্বেলে দিল হস্টেলের কেয়ারটেকার। আমরা কয়েকজন গিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসলাম। কোমরে বাঁধা হাল্কা জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে নিলাম, হুডটা মাথায় তুলে দিলাম। সূর্য ডুবতেই হিম পড়তে শুরু করেছে। মোট চারটে গ্রুপ আগুন ঘিরে আমাদের বাদ দিয়ে। কেয়ারটেকার আর তার বান্ধবী, আর একটা কাপল লোক্যাল। জনাপাঁচেকের দল স্টেটস থেকে, আর সবচেয়ে বড় দলটা ইউরোপ থেকে, মূলত ফ্র্যান্স, তিনজন বেলজিয়ামের আর একজন বোধ হয় জার্মানি থেকে এসেছে। বেশির ভাগই তরুণ তুর্কি। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে গল্প জমে উঠল। মারশমেলো আগুনে সেঁকে খাওয়া হল সবাই মিলে। মাথার উপর তারায় বোনা অমানিশার তীব্র কালো আকাশের চাঁদোয়া, পিঠে বাতাসের হিমেল স্পর্শ, পায়ের কাছে প্রথম প্রেমের মত উষ্ণ আগুন, সে এক সুররিয়্যাল রাত। সেই তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে, আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে আনমনা হয়ে যেতে থাকে মন, নিরুচ্চারে বার বার বলতে থাকি, "ভালোবাসি ভালোবাসি"। ফরাসী একটি মেয়ে গান গাইতে শুরু করলো। আমার ফ্রেঞ্চ হিন্দির চেয়েও করুণ। কথা কিছু বুঝলাম, বেশিটাই বুঝলাম না। কিন্তু সুরটা মন ছুঁয়ে গেল। এর পরে সেই কেয়ারটেকার ছেলেটি আর তার বান্ধবী, মেয়েটাই গাইছিল, ছেলেটাও মাঝে মাঝে গলা মেলাচ্ছিল। আমার খুব প্রিয় গানটা, তাই আমিও গুণগুণ করি সাথে সাথে...... The embers of a fire still burning as they die Stay bright to keep us side by side Baby, there's no better time No better time, baby, we can't find Oh-whoa-whoa, oh-whoa-whoa With eternal love, the stars above All there is and ever was I want it all, I want it all I want it all, I want it all A blade of grass, a grain of sand The moonlit sea, to hold your hand I want it all, I want it all I want it all, I want it all..... ব্যাকগ্রাউণ্ডে ফলসের কলকল মিউসিক, শণশণ হাওয়া আর গাছেদের ফিসফিস সঙ্গত, সবাই মিলে কোরাসে গলা মেলায়, বার বার ফিরে ফিরে একটাই লাইন I want it all, I want it all.... মনে হচ্ছিল যেন জঙ্গলের গাছগুলোও সেই একই গান গাইছে ফিসফিসিয়ে, I want it all, I want it all.... দেখতে দেখতে বারোটা বেজে গেল। সকলে সমস্বরে হ্যাপি বার্থডে গেয়ে উঠল, একইসাথে ইংরেজি আর ফ্রেঞ্চে। আমিও গলা মেলালাম। ওদের দলের একটি মেয়ের ২৫ বছর হল এই রাতে। মুখে অনেক শুভেচ্ছা জানালাম, জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘষে আদরও করলাম নিয়মমাফিক, কিন্তু মনে মনে অনেক ঈর্ষা দিলাম মেয়েটাকে, আমার যে পঁচিশ, আরো যত অভাগিনীর যত পঁচিশ ভেসে গেছে বা যাবে পচা পানাপুকুরে, তাদের তরফ থেকে। আগুন নিভিয়ে বিছানায় যাবার সময় হল। আমার জেন্টলম্যান বাবি সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে চলে গেল। সোজাসুজি বারান্দার পানে না গিয়ে আমি একটু ঘুরপথে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে রওনা দিই। মিত্তিরমশাই না পারেন ফেলতে, না পারেন গিলতে। শেষে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আর মধুবচন শোনাতে শোনাতে সেই পিছনে পিছনেই এলেন পৈতৃক প্রাণের মায়া ত্যাগ করে। বললাম, "একটু ফলসটার কাছ থেকে ঘুরে আসি, চলো না".... উত্তর কি হবে জানাই ছিল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে ওনার পিছু পিছু বাধ্য মেয়ের মত ঘরে গিয়ে দোর দিই। কেন যে মানুষ অকারণে এত ভয় পায় জঙ্গলকে! মানুষের থেকে ভয়ঙ্কর কোন জীব বিধাতা আজও গড়তে পেরেছেন কি? পরের দিনের সকাল তো বিদায়ী সকাল, মনখারাপের সকাল। পাহড়, জঙ্গল ছেড়ে ফিরে আসতে আদ্যন্ত জংলী আমার একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু তবু ফিরতে হয়। ব্রেকফাস্ট সেরে সব গুছিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিই। বাড়তি যা কিছু শুকনো খাবার সাথে ছিল, সব কাপবার্ডে রেখে দিলাম। এই ফেসিলিটি শুধুই গ্রীষ্মের অভিযাত্রীদের জন্য। কিন্তু এই রান্নাঘরটাতে কোন তালাচাবির ব্যবস্থা নেই। রান্নাঘরে যে কারো অ্যাকসেস সারা বছর যে কোন সময়ে। এক কাপ গরম জল কি দু'তিন প্যাকেট শুকনো স্ফ্যাগেটি বা ন্যুডলস, টিনের টুনা, সার্ডিন, হ্যাম, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, কফি, চাই কি খানকতক টি-ব্যাগ সারা বছরই মিলবে যে কোন সময়ে। যদি কেউ নিদারুণ অসময়ে এসে পড়ে সেইজন্য এইটুকু অতিথিসেবার ব্যবস্থা। পার্কিং লটে পৌঁছে দেখি, গাড়ির ডানদিকের পেছনের চাকা বসে গেছে। ভাগ্যি গাণুশ ছিল সেদিন সাথে। নাহলে যে কি হত ...... মিনিট পনেরোর মধ্যেই ফেঁসে যাওয়া চাকা পাল্টে স্পেয়ার লাগিয়ে ফেলল ও। জিনিষপত্র সব লোড করে ফলসের দিকে হাঁটা দিলাম কারো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই। দশ মিনিটের ছুটি মঞ্জুর হল যাবতীয় পাগলামি মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। এক ছুট্টে একদম তার পায়ের কাছটিতে গিয়ে দাঁড়াই। আর সব প্রপাতের মতই তুমুল অবতরণের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে ছিটকে আসা জলের ছিটে আর বাষ্পের সম্মিলিত সমাহারে ভালোমত স্নান হয়ে যাবার যোগাড়। ভিজতে আমার চিরকালই ভালো লাগে। তাই থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভিজি কয়েক মুহূর্ত, মনে মনে চোখ বন্ধ করে কারো বুকে মাথা রাখলাম কি অজস্র চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করেই? তারপর আরো দুই পা এগিয়ে যাই, বিশাল এক শতাব্দীপ্রাচীন স্প্রুস গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে আমি এক পাগলি আর এক পাগলির একদম মুখোমুখি চুপ করে দাঁড়াই। তারপর জিন্সের পকেট থেকে আমার ছোট্ট ছুরিটা বার করি। খুব যত্ন করে খোদাই করি আমার প্রিয়নাম গাছটার পুরু বাকল খোদাই করে। খুব মৃদু স্বরে বলি, "মনে রেখো".... মানুষের দরবারে আমার যে দাবি কোনদিন কখনো নেই, জঙ্গলের কাছে কেন যে সেটাই চেয়ে মরি প্রতিবার, জানি না। তারপর ফেরার পথ ধরি, একটিবারও পিছু না ফিরে.....

96

3

সিনথিয়া আফরিন

<img class="emojione" alt="👥" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F465.png?v=1.2.4"/>

66

0

"Gems the ঢপবাজ"

আজকের আপডেট

পার্ট ২/২| এই দোকানী নিজে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় নির্জন মরুভূমিসম স্থানে খনন করিতেন‚ মূল্যবান gemstone এর খোঁজে বিশেষত: ওপাল| ওপালের বাঙ্গালা কি তাহা জানি না তবে বড়ই সুন্দর‚ নীল‚ সাদা বিভিন্ন রঙের ঝিলিক মারে| কিছু কিছু আবার সবুজায়িত শ্লেষ্মার ন্যায় দেখিতে| জেম-প্রসপেক্টিং অতীব কষ্টদায়ক ও আনন্দদায়্কও বটে| সংক্ষেপে সারি| এবারে দোকানীর সনে যাইবার প্রয়োজন দুই| গৃহিনীকে কে যেন বলিয়াছেন‚ পান্না ধারণ করিলে সংসার সুখের হইবে‚ অগাধ ধনরত্নের অধিকারী হইবো‚ কোলেস্টেরল কমিবে এবং পা ঘামিবে না! অনেক কষ্টে পান্নার ইংরাজী খুঁজিয়া পাইয়াছি| পিটার অর্থাৎ দোকানী একটি শস্তা পান্নার কুচি খুঁজিয়া দিয়াছেন| নম্বর দুই| রাধানগর বীচে তোয়ালে পরিহিত স্বয়ং আমি যখন ভ্রমণ করিতেছিলাম| কিঁউ তোয়ালে? একটি মাত্র হাফ পেন্টলুন লইয়া মূল দ্বীপ পোর্ট ব্লেয়ার থিকা হ্যাভলকে| কাছের সমুদ্রে ভিজিতং এবং শীতের রোদে নো ড্রাই| সঙ্গী সাথী সমভিব্যহারে গাড়ীতে তোয়ালে পরিহিত অবস্থায় ভ্রমণ| হু কেয়ারস! যবতক হ্যায় ক্রেডিট কার্ড‚ তবতক নো প্রবলেম| এমতবস্থায় বীচে ঘুরিবার সময় একটি লকেট খুঁজিয়া পাই| উহা কি এতবধি সন্দেহ ছিল‚ তবে ইহা কাচ নয় তাহা আন্দাজ করিতে পারি| পিটার বলিল‚ ইয়া মুনস্টোন| বাঙ্গালায় কি বলে? জোতিষীকে জিগাইতে হবে‚ ইহাধারণ করিলে আমার প্রাত:কৃত্য সুসম্পন্ন করিতে সুবিধা হইবে কি না| ডি: এযাবৎ এই দেবকান্তি অঙ্গে কুনো প্রকার অলঙ্কার মায় বিবাহের অঙ্গুঠী ধারণ করি নাই‚ ঠাকুরের ন্যায় গা চিড়বিড়াইয়া উঠে| আভি এই emerald কা কেয়া হোগা| পূর্বে গ্রামাঞ্চলে ধীবর সম্প্রদায়ের নাদান বাচ্চাদের কোমরে ঘুনসি দিয়া ফুটা পয়সা বাঁধা থাকিত‚ সেইরূপ কোন উপায়? (১৯)

2130

155

মনোজ ভট্টাচার্য

এও এক একাকীত্ব !

এও এক একাকীত্ব ! আমার স্বামী কাজ থেকে এখনও ফিরল না কেন ? এত রাত হয়ে গেল ! – হাসিদির কথা শুনে প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে – এ ওর মুখের দিকে তাকায় । খানিক বাদেই আবার বললেন – ও, সে তো অনেকদিন হোল মারা গেছে – আসবে কি করে ! হিরুবাবু সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন । পড়ানো ছাড়া ওনার বেশ কতগুলো বাংলা ভাষার ওপর বই বাজারে প্রকাশ পেয়েছে । সেগুলো অধ্যাপক মহলে খুব আলোচ্য হয়েছে ! – তাছাড়া আশী ও নব্বইয়ের দশকের বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত ছোটগল্পের ওপর একটা সঙ্কলনও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল ! ওনার বত্রিশ পাতার সম্পাদকিয় লেখাটাও খুব ভালো হয়েছিল ! সেই হিরুবাবু কলেজ থেকে অবসর নিতে প্রায় বাধ্য হন । তার মাথার একটু গণ্ডগোল দেখা দিতে থাকল । মাথার গণ্ডগোল মানে যে পাগলামি তা নয় কিন্তু । স্নায়বিক দুর্বলতার জন্যে নানারকম সমস্যা দেখা দিতে থাকল । ক্রমশ ওনার একটা ধারনা হয়ে গেল – গাড়িগুলো যেন ওনাকে চাপা দিতে আসছে । প্রথমে ট্যাক্সিতে যাতায়াত করতেন কলেজে যেতে । ক্রমশ রাস্তায় বেরতেই ভয় পেতে লাগলেন । শেষপর্যন্ত রাস্তায় বেরনো বন্ধই করে দিলেন ! - তাই কমপ্লেক্সের মধ্যে পরিচারকের হাত ধরে একেবারে ধার ঘেঁসে চলা ফেরা করতেন ! তখন আমি বিদেশ থেকে প্রায়ই যাতায়াত করতাম ! আমার সঙ্গে খুব আলাপ হয়ে গেল । ওনার ফ্ল্যাটে বসে আমাদের খুব আলোচনা হতো । মজার কথা আমি নান্দিকার ও কয়েকটা নাট্য গোষ্ঠীর যাদের চিনতাম – তাদের সঙ্গে ওনারও আলাপ ছিল । এমন কি যাকে আমি চিত্তদা বলতাম – সেই চিত্তরঞ্জন ঘোষের সঙ্গে ওনারও আলাপ ছিল ! উনি যে সাহিত্য গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন – তাদের অনেকের সঙ্গে আমারও অল্প বিস্তর পরিচয় ছিল ! সেইসব আলোচনা খুব পরিস্কার ভাবেই হতো । গলায় কোন জড়তা ছিল না ! হিরুবাবুর সঙ্গে কথা হয়ে গেছিল – একদিন গাড়ি ভাড়া করে কলকাতায় কোথাও কোথাও ঘুরবো । - কিন্তু যেদিনই বলতাম – উনি বলতেন – আজ না ! আরেক দিন যাবো ! অর্থাৎ তার সেই স্নায়বিক দুর্বলতা কাটাতে পারছিলেন না ! তার পরের বছর – আমরা কলকাতায় এসে দেখলাম উনি খুবই অসুস্থ । শেষ পর্যন্ত – মারাই গেলেন ! – ওনার নিজস্ব কোন ছবি ছিল না বলে – আমার ফোনের কামেরায় তোলা ছবি এনলারজ করে শেষকৃত্যে ববহার করা হোল ! এসব চার বছর আগের কথা । তারপর হাসিদি আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছেন বা আমরাও ওনার ফ্ল্যাটে গেছি ! দিব্যি কথাবার্তা ! কখনও অস্বাভাবিক মনে হয় নি তার ব্যবহার ! কিছুদিন পরে শুনলাম হাসিদি দুজন আয়া রেখেছেন দিনে-রাতে । প্রতিদিন ওদের আলাদা করে বাজার করতে দেন – যাতে কেউ না অসন্তুষ্ট হয় ! – আমরা ভাবলাম – দারুন বুদ্ধিমতী তো ! দুজন আয়াকেই খুশি করছেন ! – কথায় বলে লোভের হাত লম্বা হয় ! শুনলাম – হিরুবাবুর অনেক বই ছিল নানারকমের – সেগুলো নাকি চুরি হচ্ছে ! আবার হাসিদি কার কাছে অভিযোগ করেছে – ওনার গয়নাও সরে যাচ্ছে । ক্রমশ একতলার প্রতিবেশীরা অভিযোগ করা শুরু করল – ওদের কাছে গিয়ে হাসিদি অভিযোগ করে – আয়ারা চুরি করছে । আবার আয়ারাও অভিযোগ করে – হাসিদি নাকি তাদের চোর বলে । প্রায় রোজই চেঁচামেচি হয় ! আমি ও আমার স্ত্রী মাঝে মাঝেই ওনাকে দেখতে যাই । ওনার ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক ছিল তখনো । এরপর একদিন আমাকে বোঝাতে লাগলেন – উনি যে ঘরে থাকেন – সেই ঘরে নাকি কোন নকশাল ছেলেকে ছুরি দিয়ে মারা হয়েছে ! যতই বলি – এখানে কোন ফ্ল্যাট ছিল না – একটা কাগজ কল ছিল । ততই উনি বোঝাতে থাকেন – ঠিক কিভাবে ছেলেটিকে মারা হয়েছিল ! শ্যামবাজারে উনি যেখানে থাকতেন – সেখানে বেশ নকশাল ছেলেদের কংশালরা মেরেছিল । –অথচ শ্যামবাজারের বাড়িতে সুনীলবাবু শক্তিবাবুরা এসে কিভাবে ঘর নোংরা করে দিত । বিশেষ করে শক্তিবাবু ! শ্যামবাজারের কথা সঠিক ভাবে মনে করতে পারেন। হাসিদিকে একবার বলেছিলাম কাছের বৃদ্ধাবাসে থাকতে চান কিনা । তাতে উনি প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী বৃদ্ধাবাসের ওপর অশ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন । - আমরা কিন্তু বুঝতে পারছিলাম – ওনার কাছে কোন আয়াই কাজ করতে চায় না ! – হাসিদির এক ভাইয়ের সাথে আমার আলাপ হয়ে গেছিলো । কত করে তার ফোন নাম্বার চেয়েছি । কিন্তু পাই নি। একদিন রাতে ফেরার সময়ে দেখি হাসিদি – হাতে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে সিকিউরিটির কাছে বলছে – একটু মুড়ি এনে দিতে । বাড়িতে খাবার কিছু নেই । শুনে খুবই খারাপ লাগে ! আপনার আয়া কোথায় ? ও তো মোড়ের মাথায় গেছে মেলা দেখতে ! আপনাকে বলে গেছে ? না । ওরা তো বলে যায় না । - আমি তো জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম ! সে কী ! আপনি জানলা দিয়ে অত দূরে দেখতে পেলেন ? হ্যাঁ – এখান থেকে দেখা যায় তো ! - আপনি বিশ্বাস করেন না ! আপনার ভাইরা কোথায় থাকে ? আমার সঙ্গে দেখা করে না কেন ? ওরা তো ছাদের ঘরে থাকে – নম্বর জানি না ! অসংলগ্ন কথাবার্তা সবাই বুঝতে পারছে – অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে । অথচ ওনার এক আত্মিয় নাকি এই কমপ্লেক্সেই থাকে । এখানে এলে কারুর সঙ্গে কোন কথাই বলেনা ! – আর আমি তো বুঝতেই পারিনা – কখন আসে ! ওপর থেকে আমার স্ত্রী এক বাটি মুড়ি আর মিষ্টি দিল – তাই দিয়ে এলাম ! কি জানি সত্যি রাতে কিছু খাবার ছিল কিনা ! পরের দিন – হঠাৎ সন্ধে বেলায় লিফটে উঠে এসে আমাদের ঘরের বেল টিপেছে । আমি দরজা খুলতে – বলে – আপনি বলেছিলেন আমার আয়াকে বলবেন ! এখন ও এসে আমাকে কি অপমান করছে । খুব চেঁচামেচি করছে – বলেছে আমার হার খুলে দিতে । কেন ? – আপনার কাছে টাকা পায় ? বোধয় পায় ! এখনো তো মাস শেষ হয় নি ! – আমার কাছে তো টাকা নেই এখন ! আপনি আসবেন একবার ? ওর সঙ্গে একটু কথা বলবেন ? আপনার কথা শুনবে ! আমি তাড়াতাড়ি ওনাকে নিয়ে লিফটে করে একতলায় এসে দেখি । ওনার ফ্ল্যাট খোলা । কিন্তু কেউ নেই । ভেতরেও কেউ নেই ! বললাম – কই – কোথায় আপনার আয়া ? ভেতরে নেই ? তাহলে আপনার ভয়ে পালিয়ে গেছে ! – আবার আসবে কাল ! এলেই আপনি আমাকে বা যাকে হোক ডাকবেন ! – আর গেট বন্ধ করে রাখবেন ! কদিন পরে শুনলাম হাসিদি নাকি খাটের কাছে পড়ে গিয়ে মাথায় কেটে গেছে - ফুলে গেছে – ডাক্তার বলেছে সিটিস্ক্যান করতে । গিয়ে দেখি – এসব সত্যি । পরিচারিকার ওপর রাগ করে মুড়ির কৌটো ছুড়েছেন । আর সেই সময়েই জলের গেলাশ পড়ে ভেঙ্গেছে । - দেখে খারাপ লাগলো । ওনাকে বলে এলাম – ওনার একজন ভাইজি নাকি আসে –দেখতে ও পরিচারিকাকে নির্দেশ দিয়ে যায় । এবার এলেই যেন আমাদের সঙ্গে দেখা করে । কিন্তু সে যে কখন আসে – আমরা টেরই পাই না ! অন্তত তার সঙ্গে কথা বলেও তো কিছু করা যায় ! – এভাবে অসহায় অবস্থায় – যে কোনোদিন কিছু হয়ে যেতে পারে ! মনোজ

111

6

শিবাংশু

কী ঘর বানাইব আমি

আমি ভারতবর্ষের মূল ভূখন্ডের বাইরে কখনও থাকিনি। আবার কলকাতা শহরেও বসবাস করার কোনও অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে আমি যেখানেই থাকিনা কেন, আমি একজন মূল স্রোতের ভারতীয় এবং শতকরা দুশো ভাগ বাঙালি। এই সত্ত্বাটিই আমাকে অন্য দেশবাসীর অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম করে। ---------------------- যে কোনো আলোচনার দুটি সমান্তরাল সমীকরণ থাকে। একটি আবেগসম্পৃক্ত আর অপরটি নিরাবেগ। আমাদের যাবতীয় জৈবিক বা আত্মিক সিদ্ধান্তগুলি আমরা এই দুটি পরিপ্রেক্ষিত থেকেই গ্রহণ করি। ------------------------- আবেগগ্রস্ত একটি অতিশয়োক্তি, যেমন, ' দেশের কুকুর ধরি, ফেলে বিদেশী ঠাকুর' আবার অপরপক্ষে ক্যাথেরিন মেয়োর চশমা পরে ভারতকে দেখা, যাকে গান্ধি বলেছিলেন 'Drain Inspector's Report', দুটো ই সমানভাবে ত্যজ্য। ------------------------------- আমার পিতৃকূলের পূর্বপুরুষ মোকাম কলকাতা থেকে পাশ দিয়ে ভারতের প্রথম শিল্পশহরে জীবিকাসন্ধানে এসেছিলেন। আবার মাতৃকূলের পূর্বসূরি তৎকালের সুদূর মাদারিপুর, ফরিদপুর থেকে এসে একই শহরে উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের যা শিক্ষাদীক্ষা ছিলো তাতে তাঁরা অনায়াসেই কলকাতা বা ঢাকায় সম্মানসূচক বৃত্তি গ্রহণ করে থাকতে পারতেন। কিন্তু প্রায় একশো বছর আগে তাঁরা যেহেতু সেকালের হিসেবে সুদূর 'প্রবাসে' এসেছিলেন, তাই তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম ভারতবর্ষকে অনেক বেশি সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে চিনতে পেরেছে। তবে 'বাড়ির' টান তাঁদের মধ্যে এতো প্রবল ছিলো যে তাঁরা চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ' বেহারে আর থাকবো না', এমত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের 'চোদ্দ পুরুষের ভিটে'তে প্রচুর অর্থব্যয় করে বিশাল অট্টালিকা ও ভূসম্পত্তি ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। এপার বাংলায় আমাদের যে বিপুল ভদ্রাসন ছিলো, সেখানে বসবাস করার মানুষ না থাকার জন্য তা এখন আর আমাদের নেই। আবার ওপার বাংলায় তাঁদের অর্জিত যেসব ভূসম্পত্তি ছিলো, একটি সুন্দর সকালে তা সব বেহাত হয়ে যাবার শোকে সন্ন্যাসরোগে আমার মাতামহ অকালে কালগতি প্রাপ্ত হন। -------------------------------- আমাদের অনেকেরই ইতিহাস প্রায় একরকম। মানুষের শিকড়টা যে কোথায়, সেটা খুঁজতে খুঁজতেই তো আমাদের খোঁজাটা ফুরিয়ে যায়। -------------------------------------- কলকাতা তো একটা ভুঁইফোড় জায়গা। একশো বছর আগেও কোনও কলকাতার নাগরিককে 'বাড়ি কোথায়' প্রশ্ন করলে উত্তর আসতো বাঁকুড়া বা বরিশাল। কলকাতাকে 'বাড়ি' হিসেবে সাবর্ণ রায়চৌধুরি বা বৈষ্ণব চরণ শেঠের বংশধর জাতীয় লোকজন ছাড়া আর কেউ স্বীকার করতো না। এভাবেই নিজের 'বাড়ি' আমার কাছে একটা এনিগমা হয়ে থেকে গেছে। --------------------------- কৌটীল্য বলেছিলেন 'অপ্রবাসী' ও অঋণী' মানুষই সুখী। এই 'প্রবাস' একটি আবেগমাত্রিক অনুভূতি আর 'ঋণ' হলো নিরাবেগ হিসেবনিকেশ। 'প্রবাস' একটি শারীরিক অবস্থানজনিত মানসিক অপূর্ণতার অনুভূতি। যখন মানুষের জন্ম বা সামাজিক পরিচয়, তার আত্মমর্যাদা বা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যকে মর্যাদা দেয়না, তখনই সে প্রবাসী। 'ঋণ' একটি ঐহিক অপূর্ণতা, যেখানে তার ভৌত সুখস্বাচ্ছন্দ্য ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা বা অবকাশ থাকে। আমাদের শারীর বা মানসিক বেঁচে থাকায় উভয়েরই অন্তহীন প্রভাব আছে। কোনটিকেই অস্বীকার করার প্রচেষ্টা মূর্খতা মাত্র। ------------------------------------ নিজস্ব অভিজ্ঞতাপ্রসূত আমার একটা তত্ত্ব আছে। যতোদিন কর্মজীবনে মানুষ ওতোপ্রোত থাকে ততোদিন তার মনে 'শিকড়' বা 'অবস্থান' নিয়ে প্রশ্নগুলি তেমন প্রবল থাকেনা। কিন্তু তার পরে যখন তার সত্যিই একলা হবার সময়, তখন এই সব প্রশ্নই অমোঘ হয়ে ওঠে। কিন্তু যেহেতু মানুষের বেঁচে থাকাটা চিণ্ময় জগতে, মৃণ্ময় জগতের মায়া কাটিয়ে ওঠাটাই শ্রেয়। মানুষ যতোক্ষণ বেঁচে আছে, মানুষের কাছেই আশ্রয় চায়, তার পর তো অনন্ত মাটিতে মিশে যাওয়া ছাড়া কোনও ব্যতিক্রম নেই। সেই মনের মানুষেরা যেখানে থাকবে সেটাই আমার সব পেয়েছির জগত। সেটা পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তেই হতে পারে। -------------------------- ছবির দোচালা বাড়িটি রাঢ়বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক-দেড়শো বছর আগে আমাদের ভদ্রাসন ছিল। আমার পিতামহ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গত শতকের প্রথম দশকে কলকাতা চলে যান। সেখান থেকে চাকরি নিয়ে প্রথমে উত্তরভারতে, তার পর জামশেদপুর। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে শিকড় ছিল বহুদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমার ভয়ে আমার পিতৃদেবের বাল্যকালে কিছু সময় এই বাড়িতে কেটেছিল। তার পর তিনি আর আসেননি। খুব বিচিত্রভাবে সম্প্রতি আমরা দু ভাই এবং আমার ছোটকাকা রীতিমতো স্বর্ণসন্ধানীদের মতো অভিযান করে এই বাড়িটি 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' করেছি। সে গল্পও লেখার মতো। ইতিহাস, ভূগোল, সমাজতত্ত্ব, স্মৃতিকথা আর অন্তঃস্রোত যাপনের ইতিকথা। শিকড়ের সন্ধানে মানুষের অনিঃশেষ আকুলতা যেন। যেখানে আমাকে হাসপাতাল বা শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য মানুষকে ডেকে আনতে হবেনা, যেখানে তারা নিজেরাই অনাহূত, রবাহূত হয়ে এগিয়ে আসবে, সেটাই তো 'আমার সাড়ে তিন হাত ভূমি'। হাসনরাজার ঘর।

102

7

"Gems the ঢপবাজ"

Gems ফ্রম আড্ডাবিল

(১) বিষয়- Bigotry “একটা জাতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে "কালুয়া" "বাঁধাকপি" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন তখন তা রেসিস্ট বিহেভিয়র ই হয় । এমন শব্দ ব্যবহার করার পিছনে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান দেওয়া দুরের কথা -মানুষ এর প্রতি বিদ্বেষ ই পোষণ করা হয় । “ --- “যাইহক দেখেশুনে এক বাঁধাকপির ( সর্দারজী ) দ্বারস্থ হলাম আমরা ।“ “ছো: - কে যাবে তেতুলদের আড্ডায়? “ --- “আমার মতে কোনো মানুষকে জাতি‚ ধর্ম এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে ফেলে তার চরিত্র বিচার করা অত্যন্ত অসহনুভূতিশীল কাজ|”” “লাখ কথার এক কথা । আরো অনেক অনেক লাইক দিতে পারলে তাই দিতাম ।“ --- “নাক চ্যাপ্টা‚ চোখ সরু‚ পীতবন্নো‚ মানুষের মত দেখতে‚ মানে দুটো হাত‚ দুটো পা| সি-কারান্ত‚ C- দিয়ে শুরু------ এর জন্য মানেবই যদি লাগে‚ বলতে হবে‚ তুই খুব লাকি যে এই ভয়ানক জীবগুলোর সঙ্গে তোকে কোথাও কখনো ডিল করতে হয় নি| কিপ ইট দ্যাট ওয়ে………..-“ --- “ওহ - বুঝেছি এইবার| আরে কি বলছ” --- “আমার একটাই জিজ্ঞাস্য - নিউ জার্সী প্রভৃতি জায়গায় কি বিহারী বা উত্তর প্রদেশের ঐ অসভ্য লোকগুলো পৌছেছে ! - পশ্চিম বঙ্গে যেরকমভাবে ভিন প্রদেশের অসভ্য মানুষের আগমন‚ ও অসংস্কৃত আচরন … ================================================" (২) বিষয়- দেশকর্তব্য ABP অমর্ত্য সেন| এদেশের হাল হকিকত, ভালমন্দ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এ দেশে এসে চব্বিশ ঘণ্টা অষ্টপ্রহর বসবাস করতে হবে। নব্য ভারতের নতুন ফরমান পেয়েছেন বস্টন নিবাসী ভারতচিন্তায় মগ্ন সেন মহাশয়। ………………………… তিনি নিয়মিত ছুটে যান গ্রাম-ভারতে। সম্যক বোঝার চেষ্টা করেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনের হালহকিকত, প্রতিনিয়ত আলাপ আলোচনা করেন সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষাবিদ, সবার সঙ্গে। মহাসাগরপ্রমেয় জ্ঞানের সঙ্গে প্রখর অন্তর্দৃষ্টি মিলিয়ে লেখেন, কথা বলেন, এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন। ……………………………………. অমর্ত্য সেনের এমনধারা আচরণ অনুচিত। অনুচিত, কারণ তিনি বিদেশে থাকেন! অর্থাৎ, জানা গেল, চিন্তার ভৌগোলিক গণ্ডি আছে, দর্শনেরও আছে কাঁটাতারের বেড়া! ………………….. Source: https://www.anandabazar.com/editorial/do-we-have-to-accept-this-stupid-intolerance-1.834584?ref=strydtl-state-topnav -------------------------------------------------------------------------------------- "এই রে দেশের প্রতি কোন কর্তব্য না করেই আপনি এমন লিখলেন যে? একেবারে একশো শতাংশ খাঁটি কথা । স্বাধীনতার পর থেকে আজ এই আবধি যেটুকু এগিয়েছে দেশ তা এ দেশের লোকেদের দ্বারাই সম্পাদিত হয়েছে । আমাদের এক এক জনের সমষ্টিই তো "দেশের লোক" সেখান থেকে আজ এই টেলিফোন জমানায় এসে পৌঁছনো গেছে‚ সে তো এমনি এমনি নয়| দেশের প্রতি সম্পাদিত কর্মের হাত ধরেই|" ---------------------------------------------------------------------------------- ডি: প্রফেসর সেনের পদরেণু যদি সমুদ্রের জলে মেশানো হয় তার এক বিন্দুরও যোগ্য নই|

109

1

চঞ্চল

পধারো মাহরো দেশ

(১৪) সুর্য অস্তাচলের দিকে| আর সময় নেই| রুকমণি তৈয়ারি হয়ে বেড়িয়ে পড়ে কিলার পিছনের টিলার উদ্দেশ্যে‚ হাতে একটা প্যাঁটরা আর একটা থলে| পালিওয়ালদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার খবর সলিমকে নিশ্চয় খবরীরা দেয় নি| কারণ ওরা জানতে পারেনি নিশ্চিত| তাহলে সলিম আজ এত সেজেগুজে বিয়ে করতে যেত না| তাও সাবধান হওয়া ভালো‚ যেমন করেই হোক বাপুসা আর ভাইকে নিয়ে আজই রাতের অন্ধকারে এই রাজ্য ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে হবে| সলিমকে সে খুব ভালো করে চেনে‚ সেই ছোট থেকে দেখছে| নিজের ঈপ্সিত জিনিস না পেলে যে সলিম কতখানি নৃশংস হতে পারে তা আর জানতে বাকি নেই তার| টিলার পাশে মেয়েটা একটা ছোট পুঁটলি বুকের কাছে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| মেয়েটাকে এই প্রথম দেখল রুকমণি| সত্যি সুন্দরী| মেয়েটার মুখে বিষাদের ছায়া দেখে রুকমণির কষ্ট হয়| কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটাকে আশ্বাস দেবার চেষ্টা করে ‚' কিছু ভাবিস না বহন‚ আমি তো আছি তোর সাথে| আমি বেঁচে থাকতে কেউ তোর বাল ভি বাঁকা নহি কর পায়েগা|' লিলা কোনদিন বাপুসা আর মাসাকে ছেড়ে একা কোথাও থাকেনি‚ রুকমণির আশ্বাস পেয়ে লিলার রুকমণিকে বড় কাছের মানুষ মনে হল | সেও আঁকড়ে ধরল রুকমণিকে| একটা উটের গাড়ি আগে থাকতেই তৈয়ার হয়ে অপেক্ষা করছিল| ওরা দুজনে উঠে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল গ্রামের দিকে| একটা চিন্তা রুকমণির মনকে নাড়া দিচ্ছে‚ ঐ শয়তানটা গ্রামে গিয়ে কাউকে না পেয়ে‚ না জানি কি উৎপাত করছে? গ্রামে তো বাপুসারা আর পন্ডিত ছাড়া কেউ নেই| কার ওপরেই বা অত্যাচার করবে? মনে মনে হঠাৎ বেশ একটা কৌতুক অনুভব করে সে| বাপুসারা তো সলিমের খবরী‚ তাই বাপুসাদের নিশ্চয় কিছু করবে না| রইল পন্ডিত‚ কিন্তু পন্ডিতজী যথেষ্ঠ বলিষ্ঠ মানুষ‚ সলিম তাকে বেশ ভয় করেই চলে| গাড়ি ছুটে চলেছে পাকা রাস্তা ধরে| আজ যেন নিজেকে হঠাৎ করেই বেশ স্বাধীন মনে হচ্ছে রুকমণির| অবশ্য হভেলীতেও সে স্বাধীনই ছিল| তবু কেন এমনটা মনে হচ্ছে? হয়ত মেয়্কাতে যখন মেয়েরা যায় এমনটাই সবারই মনে হয়| তারও যদি বিয়ে হয়ে যেত‚ তাহলে এই রক্ষাবন্ধনে সেও যেত ভাইকে রাখী বাঁধতে| আরে কালই তো রক্ষাবন্ধন ছিল| 'একবার রোকনা'‚ রুকমণি উটওয়ালাকে বলে গাড়ি থামিয়ে কাছেই কিছু খোলা দোকানের একটায় ঢুকে রাখি চাইল‚ 'ভাই এক রাখি দেনা?' 'রক্ষাবন্ধন তো কাল ছিল?'‚ দোকানী অবাক হয়েই প্রশ্নটা করে| গতদিনের বিক্রি না হওয়া রাখি থেকে কয়েকটা রুকমণির দিকে এগিয়ে দিল| রুকমণি তার মধ্য থেকে একটা ভালো রাখি বেছে নিল| 'হা ভৈয়া‚ কাল তো যেতে পারিনি ‚ তাই আজ যাচ্ছি'‚ পয়সা দিতে দিতে রুকমণি উত্তর দিল| দোকানী হাসিমুখে পয়সা নিয়ে গল্লাতে রাখল| রুকমণি গাড়িতে উঠে উটওয়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল‚'ভৈয়া‚ থোড়া জলদি চলাও না|' সারা রাস্তাতেই লিলা চুপচাপ বসেছিল গাড়িতে| এখনও রুকমণির রাখি কেনা দেখেও কিছু বলল না| অন্ধেরা হয়ে এসেছে‚ গাড়ি পাকা রাস্তা ছেড়ে এবার কাঁচা রাস্তা ধরে চলেছে| বালির ওপর উটের গাড়ির চাকার ঘসঘস আওয়াজ আর উটের গলার ঘন্টির আওয়াজ ছাড়া বাতাবরণে আর কোন আওয়াজ নেই| দুরে গ্রামটাকে আবছা দেখা যাচ্ছে বটে‚ কিন্তু কোন আলো দেখা যাচ্ছে না তো| আগেও রাতের দিকে গ্রামে এসেছে রুকমণি‚ দুর থেকেই গ্রামের আলো চোখে পড়ত‚ আজ কিন্তু কোন আলো দেখা যাচ্ছে না| গ্রামের দিকে তাকিয়ে লিলা ফুঁপিয়ে উঠল| রুকমণি লিলাকে কাছে টেনে নিল| 'কাঁদিস না রে বহন‚ কালই তো তুই তোর মাসা আর বাপুসাকে দেখতে পাবি| এখন চুপটি করে বোস| আমি চট করে আমার বাপুসা আর ভাইকে নিয়ে আসি| | ভয় পাবি না তো একলা থাকতে?' লিলা ঘাড় কাৎ করে জানালো যে সে ভয় পাবে না| গাড়িটা গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছুতেই সে দাঁড় করিয়ে দিল| এখানে থেকে হেঁটে গেলে একশো কদম মত লাগবে| তা লাগুক কিন্তু গাড়ি এখানে দাঁড় করিয়ে রাখাই ভালো| রক্ষীর তো এখানেই থাকার কথা| গেল কোথায় লোকটা? হঠাৎ করেই রুকমণিকে চমকে দিয়ে সামনে হাজির হল সেই রক্ষী| 'কি খবর?' রক্ষীর কাছে জানতে চাইল রুকমণি| 'এক গড়বড় হয়ে গেছে'‚ রক্ষী ইতঃস্তত করে বলল‚'সলিমজী এখনও নদীর পাড়ের খেমাতেই আছে|' 'সেকি‚ ও এখনও এখানে কি করছে?'‚ রুকমণি ঘাবড়ে যায়| 'ঐ মেয়েটিকে না পেয়ে পুরা পাগল হয়ে গেছে| আর তার উপর কে যেন বলেছে পালিওয়ালরা বাড়ির ভিতরে মাটির নীচে ধন-সম্পত্তি সব পুঁতে রাখে ‚ পালাবার সময় নিশ্চয় সব সম্পদ নিয়ে যেতে পারে নি| সেই শুনে‚ শহর থেকে কিছু লোক আনিয়ে সব বাড়ির ফর্শের খুদাই চলছে|' রুকমণি ভয় পেয়ে যায়‚ কিছু কিছু করে অনেক সঞ্চিত ধনই সে বাড়িতে সরিয়ে এনেছে| এই খুদাই করতে গিয়ে না‚ তার বাবার বাড়িতে নজর পড়ে| একটাই ভরসা যে তারা পালিওয়ালী না | সলিম শুধু পালিওয়ালীদের বাড়িগুলোতেই ধনের খোঁজ করবে | 'আমার বাপুসা আর ভাই কোথায়?' অধীর হয়ে জানতে চায় রুকমণি| রক্ষী কোন জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে রইল| রুকমণির মনটা কু ডাকল‚ দৌড়লো নিজের বাড়ির দিকে| বাড়িটা গ্রামের বাইরে‚ প্রায় নদীর কাছে| হাতে নিয়ে নিল কোমরে গোঁজা খ্ঞ্জরটা| বেসুধের মত দৌড়ে সে নিজের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালো| একটু শ্বাস নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজাটা দুহাট হয়ে গেল| মশাল নিয়ে সেই রক্ষীও রুকমণির পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে| খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে এসে মশালটা উঁচু করে ধরতেই আঙ্গনের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখল বাপুসা আর ভাইয়ের রক্তাক্ত দেহ| এই দৃশ্য দেখে রুকমণি মেঝেতে বসে পড়ল| হাঁ করে চেয়ে রইল দেহগুলোর দিকে| তার জীবনের শেষ আশা-ভরসা সব শেষ হয়ে গেল| বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে‚ চোখ জ্বালা করছে‚ তবু চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না সে| চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল তার| চিৎকার করে কাঁদতে পারলে হয় তো এই জ্বালা কিছুটা মিটতো| এবার কি করবে সে? কোথায় যাবে সে ? তার তো সব আশা স্বপ্ন শেষ হয় গেল ? 'কে খুন করেছে এদের ? সলিম না আরও কেউ ?' রুকমণিগলার আওয়াজ সাপের হিসহিসানির মতো শোনালো | ‘হ্যা জি , এ হত্যা সলিমই করিয়েছে | তোমার বাপুসা ওর পা ধরে ওর জুতি মাথায় নিয়ে অনেক বলেছিলো যে তোমার ভাই কে ছেড়ে দিতে কিন্তু শয়তানটা কোনো কথা শোনেনি ওর', মাথা নিচু করে পুরো ঘটনাটা শোনায় রক্ষী| নাহ‚ এইভাবে শোক করে বসে থাকলে হবে না এখন‚অনেক কিছু করা বাকি এখনো| ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে‚ তারপর ধীর পায়ে বাইরে বেড়িয়ে আসে| বাইরে বেড়িয়েই প্রথমে চোখ গেল মন্দিরের দিকে| কে যেন একটা মন্দিরে ঢুকছে না? কে ও? অন্ধকারে ঠাহর হয় না‚ তবু মনে হল লিলাই হবে| দৌড়ালো মন্দিরের দিকে| 'ওকে বলেছিলাম না গাড়ি থেকে না বের হতে‚ বেরলো কি করে ?' মেয়েটা ভারী অবাধ্য তো ! রুকমণি বার বার মানা করেছিল ওকে যে, উটের গাড়ি থেকে যেন না নামে| মনে মনে প্রশ্নগুলো করতে করতেই লিলার চিৎকার কানে ভেসে এল| পড়িমরি করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরের ভিতরে ঢুকল| রক্ষীও রুকমণিকে অনুসরণ করে মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়েছিল| আবার সেই একই দৃশ্য‚ পন্ডিতজী মেঝেতে পড়ে আছেন রক্তাক্ত শরীরে| রক্তে ভেসে গেছে ওঁনার চারপাশ| চোখটা বিগ্রহের দিকে‚ ঠোঁটে মৃদু হাসি লেগে রয়েছে| লিলা মেঝেতে বসে কাঁদছে‚ তার পাশেই রুকমণি ধপাস করে বসে পড়ে| শয়তানটা এঁনাকেও ছাড়েনি? কেন মারল পন্ডিতকে? কি দোষ ওঁনার? আর সহ্য করতে পারছে না রুকমণি| দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন| যতই শক্ত মেয়ে হোক রুকমণি, এতো মৃত্যু এক সাথে দেখে আর যেন সহ্য করতে পারছে না সে | এতো শয়তান ও কেউ হতে পারে? 'লিলাকে লে যাও গাড়ি মে| খেয়াল রেখো আমি ফিরে না আসা অব্দি ও গাড়ির থেকে কিসি ভি হালত মে যেন না নামে| আমি আসছি এখনি'‚ কঠিন ভাবে নির্দেশ দিলো সে রক্ষীকে| 'কিন্তু বাইসা আপনি একলা কি করবেন ? আমিও আসছি আপনার সাথে' রক্ষী কিছুতেই একলা ছাড়বে না রুকমণিকে. 'আমার জন্য ভেবো না | আমার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না, তুমি যাও ওকে নিয়ে| আমি ঠিক ফিরে আসবো, চিন্তা করো না |' রক্ষী রুকমণির দৃঢ় কঠিন স্বর কে উপেক্ষা করতে পারলো না | অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে লীলা কে নিয়ে গ্রামের বাইরে চলে গেল | ওদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো | ওরা গ্রামের রাস্তায় অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই সে ভাবতে শুরু করলো এবার সে কি করবে | কয়েক মুহূর্ত ভেবে সে দৌড়ালো সৈন্যদের খেমার দিকে| খেমার পঞ্চাশ গজ দুরে সে দাঁড়িয়ে পড়ল| ভেতরে তখন খুব হৈচৈ চলছে| খুদাই করে যা কিছু পাওয়া গেছে তার ভাগ-বাঁটোয়ারা চলছে কুত্তাদের মধ্যে| সলিমের গলার আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে| চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে| .... শালারা কুকুরের মত কামড়াকামড়ি করছে লুটের মাল ভাগ-বাঁটোয়ারা করার জন্য| লুট করে যা পাওয়া গিয়েছে তা সলিমের কাছে কিছুই না| এসব কোন কাজেই আসবে না| পালিওয়ালরা দামী কিছুই তেমন ছেড়ে যায়নি| তবুও খুদাই চলছে‚ দামী কিছু পাওয়া যাবে এই আশা করে| অনেক আগে থাকতেই খবর ছিল যে পালিওয়ালরা একটা যৌথ সঞ্চয় রাখে বিপদ-আপদে ব্যবহার করার জন্য| এখনও পর্যন্ত খুদাই করে তেমন বড় কোন গর্ত চোখে পড়েনি‚ সবই ছোটখাটো গর্ত বাড়ির মধ্যে| কোথাও না কোথাও তো হবেই সেই খজানা| যদি সেই খজানা ওরা নিয়ে গিয়েও থাকে তাও তো বড় গর্তটা পাওয়া তো যাবেই| এখনো যখন পাওয়া যায়নি‚ তাহলে পাওয়া যাবে আশা করতে ক্ষতি কি? এই ভরসাতেই য়ার-দোস্তরা মজুরদের দিয়ে খুদাই চালু রেখেছে| তা যা ইচ্ছে করুক ওরা‚ তার মনে শুধু একটাই কষ্ট আর অপমান যে লিলাকে সে পেল না| যেমন করেই হোক লিলাকে পেতেই হবে| সলিমের ইজ্জত দাঁও পে লেগে আছে| দুপুর থেকে অনেক দারু হয়ে গেছে| একটা অবসাদ যেন শরীর-মনকে কাবু করে রেখেছে| এদের চেঁচামিচিতে মাথা ধরে গেছে| একটু বাইরের তাজা হাওয়া লাগলে হয়ত ভালো লাগবে| নেশায় চুর সলিম টলমল পায়ে খেমার বাইরে বেড়িয়ে এল| নদীর ঠান্ডা হাওয়াটা ভালো লাগছে এখন| বুকভরে শ্বাস নিল সে| একটা চেনা ইত্ররের গন্ধ নাকে এসে লাগল‚ খুবই চেনা গন্ধটা| মনে করার চেষ্টা করল গন্ধটা কোথায় যেন পেয়েছে| গন্ধটা মনে হচ্ছে পিছনদিক দিয়েই আসছে| ঘুরে দাঁড়াতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠল সে| কে যেন দাঁড়িয়ে আছে| 'কৌন হ্যেয় রে তু?'‚ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল সে| ' আমি রুকমণি'‚ বলেই আর অপেক্ষা না করে| ঝাঁপিয়ে পড়ল খঞ্জরটা নিয়ে সলিমের ওপর| তারপর পাগলের মত এলোপাথাড়ি চালাতে থাকলে সলিমের পেটে‚ বুকে| রুকমণির এই আচমকা আক্রমণ সামলাতে পারে না সলিম‚ পড়ে যায় মাটিতে| কিন্তু রুকমণি থামে না‚ খঞ্জরের প্রতিটি বিষবিন্দু সলিমের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে চায় সে| প্রতিটা আঘাতের সাথে চেঁচাতে থাকে‚ ' বল বল কেন মেরেছিস আমার বাপুসা আর ভাইকে? কি ক্ষতি করেছিল ওরা তোর?' সলিম চিৎকার করে ওঠে আঘাত খেয়ে‚ তার চিৎকার শুনে খেমার থেকে কিছু সৈনিক বেড়িয়ে আসে| তারা সলিমের ঐ অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায়‚ বাকি সৈন্যদের চিৎকার করে ডাকতে থাকে| কিন্তু কেউই রুকমণির? ঐ ভয়ঙ্কয় রূপ দেখে এগোবার সাহস পেল না| 'বাইসা ‚ অব বস করো| উঠে এসো তুমি|' পিছনে কার একটা গলার আওয়াজ পেয়ে সম্বিত ফিরে পেল রুকমণি| হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়ালো| কেউই টের পায়নি‚ সেনাপতি হুকুম সিং তার সৈন্যদের নিয়ে কখন যেন রুকমণির পিছনে এসে নিঃস্তব্ধে দাঁড়িয়েছে| একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে‚ সেনাপতি নিজের সৈন্যদের আদেশ করল খেমার মধ্যে যে বাগি সৈন্যরা আছে তাদের বন্দী করতে| মহারাওলের এটাই আদেশ| মাটিতে পড়ে তখনও বিষের জ্বালায় ছটফট করছে সলিম আর রুকমণি পাথরের দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে| যেন সে সলিমের মৃত্যুটা উপভোগ করতে চাইছে | 'আপ যাইয়ে বাইসা| আমরা আছি এখানে| এই শয়তানের শেষ দেখেই আমরা যাব'‚ সেনাপতি হাতজোড় করে বললেন| দু-তিনবার অনুরোধ করার পর যেন সেনাপতির কথা রুকমনির কানে ঢুকলো | সম্বিত ফিরে পেয়ে সে এবার চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নিলো | নিজের আলুথালু পোশাকটা ঠিক করে, যেন কিছুই হয় নি সে ভাবে আস্তে আস্তে সে গ্রামের দিকে রওনা দিলো | এখনো তো অনেক কাজ বাকি | সেনাপতি এক রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন রুকমণিকে তার গাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য| রুকমনি হাত তুলে মানা করলো সৈন্য কে তার সাথে না আসতে | ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল | রুকমণি এসে দেখল লিলা চুপচাপ গাড়িতে বসে| এই বয়সেই মেয়েটা অনেক কিছু সে দেখে ফেলল| তার দদ্দুর এই নৃশংস মৃত্যু সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না| রুকমণিকে দেখে তার জন্যও চিন্তা হল| সে না হয় এই রুকমণি বাইসার সাহায্যে বাপুসা- মাসার কাছে পৌঁছে যাবে‚ কিন্তু ইনি কি করবেন ? 'এবার তুমি কি করবে বাইসা?' লিলা জানতে চায়| এই প্রথম সে কথা বলল| এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল রুকমণি| সত্যি তো এবার সে কি করবে? চমকে ওঠে লিলার প্রশ্নে| 'জানি না রে|' অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল সে| তারপর লিলার দিকে তাকিয়ে বলল‚ ' পন্ডিতজীকে কথা দিয়েছিলাম‚ তোকে তোর পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে দেব| সে কথা আমি রাখব| তুই চিন্তা করিস না|' বলে লিলার পিঠে আশ্বাসের হাত রাখল| তারপর উটওয়ালাকে আওয়াজ দিল‚ ' চলো ভৈয়া চলো‚ বহুত দের হয়ে হয়ে গেছে|' হঠাৎই চারপাশ থেকে একটা গুমগুম শব্দ উঠল| মাটি দুলে উঠল জোরে| উটটা বিকট চিৎকার করে উঠল| উটওয়ালা জোরে আওয়াজ দিল‚ 'আপলোগ গাড়িসে উতর যাইয়ে‚ জলদি|' রুকমণি আর লিলা নেমে পড়ল গাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি| মাটিতে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছেনা‚ এত জোরে নড়ছে| দুরে আর্ত চিৎকার আর পাথরের বাড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ যেন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে| একটু পরেই থেমে গেল সব| কিছু লোকের আওয়াজ বাদ দিয়ে আর কোন আওয়াজ নেই| আধো অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে গ্রামের একটা বাড়িও আর আস্ত নেই| শুধু মন্দিরের চুড়োটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে| ওটাই একমাত্র ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাইনি| 'চলো ভৈয়া চলতে হ্যেয়| এখানে আর কার জন্য দাঁড়াবো আমরা|' হতাশ হয়ে বলল রুকমণি| গাড়িওয়ালা আর অপেক্ষা করল না| চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে দিল| আস্তে আস্তে অদ্ধকারে হারিয়ে গেল ওদের গাড়ি| পিছনে পড়ে রইল ভুমিকম্পে ধংস হয়ে যাওয়া কুলধারা গ্রাম, অনেক রহস্য আর গল্প বুকে নিয়ে| ………………. ক্রিং! ক্রিং! অফিস পিয়ন কে ডাকার জন্য বেলটা বাজালেন অমিতেশ স্যার | অমিতেশ নন্দী, নামকরা এক পাবলিশিং হাউসের এডিটোরিয়াল ডিরেক্টর | পাবলিশিং হাউসের মালিকের অত্যন্ত প্রিয় লোক | হবেন নাই বা কেন ? বইয়ের জগতের একজন নামকরা লোক তিনি | নামী- অনামী লেখকেরা এঁনার আশেপাশে ঘুরঘুর করেন | এঁনার কৃপা দৃষ্টি যার উপর থাকবে সে লেখক বা লেখিকা এক আধটা অ্যাওয়ার্ড যে পেয়েই যাবে সে ব্যাপারে সবাই এক মত | এই হাউস তো এঁনার নামেই চলছে | 'একটু সান্যাল বাবুকে ডেকে দাও তো !' ম্যানুস্ক্রিপ্ট থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন | একটু পরেই দরজায় টোকা পড়লো | 'আসতে পারি স্যার ?' 'আসুন ভেতরে, বসুন' শান্ত গলায় বললেন অমিতেশ স্যার | ' এটা কি ? ' হাতের ফোল্ডারটা সান্যাল বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন | সামনের চেয়ারে বসতেই প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন সান্যাল বাবু, সিনিয়র এডিটর | 'মানে স্যার ?' 'এটা কোন দিক দিয়ে গল্প লেগেছে আপনার?' একটু রাগত গলায় বললেন অমিতেশ স্যার | 'দেখুন রেকমেন্ড করছেন সে ঠিক আছে| কিন্তু একটা গল্প তো হওয়া উচিত নাকি? এই বাজারে রাজা রানীর গল্প কে পড়ে মশাই? আর এই ধরনের গল্প ছাপতে গেলে তো এই পাবলিশিং হাউস লাটে উঠবে ?' 'হ্যাঁ স্যার ' মিনমিন করেই বললেন সান্যাল বাবু 'আসলে স্যার, আমার খুব পুরোনো বন্ধু, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে | গল্প লেখার খুব শখ ওর | খুব ইচ্ছে যে ওর নামে একটা বই বেরোক | তাই এনেছিলাম আপনার কাছে স্যার | যদি কিছু করে দেন |' 'আপনার কি মাথা খারাপ হয় গেল সান্যাল বাবু ? আমি এই বই ছাপাবো? তাও যদি একটু পদের হতো তাহলে না হয় আপনার কথা ভেবে দেখতাম | এ তো বাচ্চাদের বই, বড়োজোর টিভি সিরিয়াল হতে পারে এই গল্প থেকে, তার উপর না আছে, মানে ওই গরম করা কিছু ঘটনা, না আছে কথার খেলা, কোন দিক থেকে এইটাকে উপন্যাসের পর্যায় ফেলা যায় আপনিই বলুন না ? না না সান্যালবাবু আপনি বর্ষীয়ান স্টাফ এখানকার, আপনাকে অনেক সন্মান করি , কিন্তু সরি, আমি আপনার অনুরোধ রাখতে পারবো না | আমাকে তো এই হাউসের রেপুটেশনের কথা ভাবতে হবে না কি ?' বিরক্ত হয়েই বললেন | না না এ ছাপা যাবে না সান্যাল বাবু | আপনি বলে দিন ওঁনাকে, তবে ভবিষ্যতে যদি ভালো কিছু ওঁনার কলম থেকে বেরোয় তখন না হয় ভাবা যাবে |' 'ঠিক আছে স্যার, আমি বলে দেব ওঁনাকে, আমি যাই তাহলে ' একটু ক্ষুন্ন হয়েই বললেন সান্যাল বাবু | 'হ্যা, ঠিক আছে, আপনি বরং বিকেলে ছুটির পর ম্যানুস্ক্রিপ্টটা নিয়ে যাবেন আমার কাছ থেকে... আর হ্যাঁ, একটু পর সাগরদা আসবেন, ওঁনার জন্য ওঁনার পছন্দের নরম সন্দেশ আর ডাব আনিয়ে রাখতে ভুলবেন না যেন |' 'হ্যাঁ স্যার, আমি জানি উনি আসছেন, আমি আগের থেকেই আনিয়ে রেখেছি | কিন্তু স্যার এবারের উপন্যাসটা উনি আমাদের না দিয়ে সরস্বতী প্রেস কে দিয়ে দিলেন |এইটা কি উনি ঠিক করলেন?'কাজের কথায় এলেন সান্যাল বাবু | 'তা কি আর আমি ভাবি নি ভাবছেন? আসলে টাকা টাকা, বুঝলেন না? খাঁইটা ওনার বেড়েছে যে! আমি খোঁজ নিয়েছি, বেশ ভালোই টাকা দিচ্ছে ওরা | আমাদের ও কিছু ভাবতে হবে | আপনি বরং ওঁনার আগের বারের চেকটা তৈরী করিয়ে রাখুন | কিছু অ্যাডভান্স ও ওতে জুড়ে রাখবেন | দেখি কি করতে পারি' বেশ চিন্তাতেই আছেন যে স্যার বোঝা যাচ্ছে | 'ঠিক আছে, আমি রেডি করে রাখছি কিন্তু স্যার দেখবেন এবার পূজার লেখাটা যেন আমরাই পাই ' বলে কেবিনের দরজা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলেন উনি | মনটা খারাপ হয় গেল একটু, গল্পটা এমনিতে এতো খারাপও ছিল না | কিন্তু বড্ডো মুষড়ে পড়বে শেখর | অনেক আশা করেছিল ও, এবারেরটা ঠিক বেরোবে ছাপা বই হয়ে | ওকে বরং বলবো অন্য কোনো পাবলিশিং হাউসের সাথে কথা বলতে | 'নমস্কার সান্যালদা , কেমন আছেন?' একদম সামনেই দাঁড়িয়ে সাগর, মানে সাগর ভৌমিক. বাংলার সবচেয়ে নামী-দামী লেখক | শুধু বাংলা কেন, বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও ওঁর গল্প নিয়ে বেশ কয়েকটা সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে | দাম তো হবেই ওঁর | 'আরে সাগর এস এস , স্যার তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন, যাও ভেতরে যাও' বলে, স্যারের ঘরের দরজাটা খুলে এক পাশে সরে দাঁড়ালো সান্যাল বাবু | 'আপনিও না সান্যালদা, দরজা খোলার কি দরকার আমি তো যাচ্ছিলামই ওঁনার ঘরে ' সংকুচিত হয়েই বললো সাগর | এই সম্মানটা সবাই করে সান্যালবাবুকে, উনিও তো কম দিন হলো না এই ইন্ডাস্ট্রিতে | সান্যালবাবু আর প্রেসের দিকে গেলেন না| কি জানি কোনো কিছুর দরকার হতেই পারে | উনি অ্যাকাউন্টস সেক্শনে গিয়ে পেমেন্ট রেডি করার নির্দেশ দিয়ে ফিরে ওখানেই একটা চেয়ারে বসে পড়লেন | এখন থেকে অমিতেশ স্যারের ঘরের দরজা দেখা যায় | দরকার পড়লে যেতে অসুবিধা হবে না | কিছুক্ষণ পর স্যারের ঘরের বেল বেজে উঠলো | পিয়ন ভেতরে গিয়ে একটু পরে হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে এলো | 'কি রে, ওটা কি?' এমনিই অভ্যেসবশতঃ জিজ্ঞেস করলেন সান্যাল বাবু | 'স্যার বললেন ফটোকপি করিয়ে আনতে' পিয়ন কোনো রকমে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে বাইরের দরজার দিকে দৌড় লাগলো| 'বাইরে যাচ্ছিস কোথায়? ফটোকপি মেশিনে তো ওদিকে!' অবাক হয় বললেন উনি | ' না, স্যার যে বললেন বাইরে থেকে তাড়াতাড়ি করে করিয়ে আনতে, আমি তো বললুম যে এখানকার মেশিন থেকে করিয়ে দি? তাতে উনি বকা দিলেন আমায়, বললেন যা বলা হচ্ছে তাই করো, বেশি মাথা চালাতে হবে না তোমার !' সেও বোধহয় একটু অবাক হয়েই ছিল |নিজের মনে বকতে থাকে সে | প্যাকেটটা ওর হাত থেকে নিয়ে খুলে দেখলেন শেখরের হাতে লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট| কোনো কথা না বলে প্যাকেটটা পিয়নকে আবার দিয়ে দিলেন সান্যালবাবু |হাত নেড়ে ওকে যেতে বললেন | বুঝতে তো আর কিছু বাকি ছিল না তার | আস্তে আস্তে উঠে উনি প্রেসের দিকে এগোলেন | পা আর চলতে চাইছে না তার | বিকেলে গিয়ে উনি কি বলবেন শেখরকে? এই খেলা তো উনি সারাজীবনই দেখে এসেছেন কিন্তু আজ নিজের বন্ধুর সাথে হওয়াতে বোধহয় বুকে বেশি করে লাগলো | শেষ|

1167

109

শিবাংশু

দেবীপাট ও জলজঙ্গল

নীরবতাই ভাষা সেখানে।শব্দ মানে ট্রেসপাস। দেবীর রাজত্ব। যতোদূর চোখ যায়। শাল, সেগুন, গামার, সিসু, কেঁদ, কদম, পলাশ, শিমুল। দেবতারা সারি সারি বনস্পতি সেজে দাঁড়িয়ে আছেন। লালমাটির পথ ওঠে পড়ে। বের, করমের ডাল গায়ে এসে পড়বে এদিকওদিক করলেই। দেবরিগড় অভয়ারণ্যের পথ চলে গেছে চউরাসিমল পর্যন্ত। একুশ কিমি। বড়াখাণ্ডিয়া আর চউরাসিমলের মাঝেই দেখা যাবে জঙ্গলসংসারের ছোটো তরফ, বড়ো তরফ। বাইসন, সম্বর, বুনো শুয়োর, জংলি কুকুর। হয়তো চিতাও দেখা দিয়ে দেবে মর্জি হলে। জায়গাটা হিরাকুঁদ বাঁধের উল্টোদিক। সম্বলপুর হয়ে যেতে হয়। মহানদীকে বেঁধে রাখা জলসাম্রাজ্য দেশের প্রথম নদীবাঁধ। তার বিপুলতা আর তো কোথাও দেখিনি। মহানদী নিজেই তো এক মায়ার প্লাবন। নিজেকে বারবার নতুন করে সাজায়। তার জন্মপ্রপাত ছত্তিসগড়ের সিহাওয়া পাহাড় থেকে ধামতারি, দণ্ডকারণ্যের মাঝখান দিয়ে ঢুকে যায় ওড়িশার পশ্চিম সীমান্ত। সম্বলপুর শহরের ধাত্রী মহানদী। সেখান থেকে পূর্বদিকে সাগরে বিলীন হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘপথের দুধারে সাজিয়ে রেখেছে সবুজের সাম্রাজ্য, জলের রাজতরঙ্গিনী। দেবরিগড়ের বনবাংলো একটা রূপকথার দেশ। অনন্ত জলের পারে, অরণ্যঘেরা একটা নীরবতার চুপসাকিন।তাই তার নাম 'নির্বাণ'। দিনের বেলা নীলজলের দিকে তাকিয়ে চোখের তরী বাওয়া। সাঁঝ ঢললেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া নেইদেশের সীমাপার। দূর থেকে জলের শব্দ, বনের শব্দ, বনবাসীদের মেজাজে ডাকাডাকি। বাতি নিভিয়ে চুপ করে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চাঁদ নিজের বাড়ি ছেড়ে পথে নেমে আসে। রাতে বেরোনো সখত মনা। কিন্তু ভোরবেলা উঠতে পারলে দেবী উজাড় করে দেন তাঁর অক্সিজেন আর ক্লোরোফিলের ভাণ্ডার। এমন একটা দিকশূন্যপুরের বনবাংলো, কিন্তু সেখানে এসি আছে, গিজার আছে, আছে নিরামিষ পদের ভোজ্য। জঙ্গলে আমিষ খাওয়া মানা যে। খরচটা হয়তো একটু বেশিই লাগে। সরকার বলেন বনভোজনে আসা উদ্দণ্ড জনতাকে আটকাতে নাকি এই ব্যয়বাহুল্য। যে যাই বলুক দেবরিগড় না গেলে কিছু ছেড়ে যায়। আবার ঘুরে আসতেই হবে...

77

5

শিবাংশু

জগন্নাথের জাত যদি নাই... .

জগন্নাথের প্রচলিত রূপটি হয়তো আর্যদের বিশেষ পছন্দ ছিলোনা। তাই একটি গল্পের অবতারণা করতে হয় তাঁদের। ভেসে আসা নিমকাঠটি থেকে দেবমূর্তির রূপ দেবার জন্য পিতামহ ব্রহ্মা'র ইচ্ছায় স্বয়ং বিষ্ণু এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে অবতীর্ণ হ'ন। তাঁর শর্ত ছিলো যতোদিন না কার্যসমাধা হবে, কেউ তাঁকে বিরক্ত করবে না। বেশ কিছুদিন পরেও যখন কাজটি সম্পূর্ণ হলোনা, তখন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পত্নীর অনুরোধে মন্দির কক্ষের দরজা বলপূর্বক খুলে দেখেন সেই ব্রাহ্মণ কোথাও নেই আর কিছু 'অর্ধসমাপ্ত' দারুমূর্তি রাখা আছে। আর্য অহমের একটি প্রকাশ এখানে পাওয়া যাবে। অনার্যদের কল্পিত জগন্নাথবিগ্রহ তাঁদের বিচারে 'অর্ধসমাপ্ত'। কারণ সেটি নান্দনিক বিচারে আর্য উৎকর্ষের নির্দিষ্ট স্তর স্পর্শ করেনা। আসলে এখন বিস্ময় লাগে, কীভাবে জগন্নাথবিগ্রহ স্তরের একটি সার্থক পরাবাস্তব শিল্পবস্তু সেই পুরাকালের শিল্পীদের ধ্যানে রূপ পেয়েছিলো। নিজেদের ধ্যানধারণা থেকে বহুক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বাধ্য হয়েছিলো জগন্নাথদেবকে নিজেদের বিষ্ণুকেন্দ্রিক প্যান্থিয়নে সসম্মানে স্থান করে দিতে। তার মূল কারণ দেশের এই প্রান্তে জগন্নাথের প্রশ্নহীন বিপুল লোকপ্রিয়তা। যেভাবে পূর্বভারতে প্রচলিত নানা শিব ও শক্তিভিত্তিক দেবদেবীদের জন্য ব্রাহ্মণ্যধর্মকে দরজা খুলে দিতে হয়েছিলো, সেভাবেই জগন্নাথও বিষ্ণুদেবতার সমার্থক হয়ে আর্য-অনার্য নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন। এখনও জগন্নাথদেবের মূলপূজারী অব্রাহ্মণ, সাবর্ণ হিন্দুগোষ্ঠীর বাইরের মানুষ। সত্যিকথা বলতে কি সারা দেশে অন্ত্যজ, নিম্নবর্গীয় মানুষজনদের জন্য জগন্নাথমন্দিরের মতো এই পর্যায়ে 'শাস্ত্র'সম্মত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা আর কোথাও দেখিনি। কবি যখন বলেন, " জগন্নাথের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই...", একটি আর্ষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এহেন একজন ইতরের দেবতা, স্রেফ লোকপ্রিয়তার জোরে সর্বগ্রাসী ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্যকে জিতে নিয়ে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সমগ্র 'জগতের নাথ'। হয়তো একটু অন্য রকমভাবে ভাবার দাবি তিনি রাখতেই পারেন। ব্রাহ্মণ্য অধ্যাত্মজগতে সম্ভবত এটিই একমাত্র সাম্রাজ্য যেখানে মুখ্য পূজারী দৈতপতির দল অনার্য শবরদের বংশধর। জগন্নাথ সৃজনের স্বীকৃতি হিসেবে অনার্যদের রাণী গুন্ডিচা, যিনি লোককথা অনুসারে একাধারে রাজা 'ইন্দ্রদ্যুম্নে'র মহীষী ও জগন্নাথ রূপকল্পের মুখ্য ধাত্রী, তাঁর গৃহে জগন্নাথকে বছরে মাত্র সাতদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলো। সঙ্গে এলো কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের রথযাত্রার আয়োজন। যেহেতু 'ভগবানে'র মা কোনও মানবী হতে পারেন না, তাই তাঁকে মায়ের ভগ্নী মাসিমা হিসেবে সম্বোধন করা হয়। জগন্নাথ ধারণাকে ভ্রূণ থেকে সাবালকত্ব পর্যন্ত প্রতিপালন করার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান সমস্ত কৌম অনার্য মায়েদের গরিমান্বিত করে। 'গুন্ডিচা' শব্দটি মনে হয় দ্রাবিড়িয় ভাষা থেকে এসেছে। বীরত্বের সঙ্গে শব্দটির যোগাযোগ আছে। তিনি একজন অনার্য গ্রামদেবী। লোককথায় ইন্দ্রদ্যুম্নের রাণী । এভাবেই গুন্ডিচা'কে নিয়ে আর্য বৈষ্ণব দুনিয়াকে আপোস করতে হয়েছিলো। এই নারী বা দেবী জগন্নাথের কাছে যাননা, জগন্নাথ তাঁর কাছে আসেন রথে চড়ে। যাবতীয় ঐশী অহংকারকে তাকে রেখে। --------------------------------------- অনেকেই বিশ্বাস করেন জগন্নাথ আরাধনার ঐতিহ্য বৌদ্ধ মহাযানী পূজার্চনার বিবর্তন হিসেবে এসেছে। আগে উল্লেখ করেছি, বেশ কিছু পণ্ডিত জগন্নাথের নবকলেবরে 'ব্রহ্মস্থাপন'কে বৌদ্ধস্তূপের অন্দরে বুদ্ধের দেহাবশেষ রক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। চতুর্থশতকে ফাহিয়েন কলিঙ্গবাসকালে দন্তপুর নামক স্থানে বুদ্ধের দেহাবশেষ নিয়ে শোভাযাত্রা দেখেছিলেন। বর্তমানে এই আচারটি শ্রীলংকার ক্যাণ্ডিতে অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত যেমন উইলসন, ফার্গুসন বা কানিংহামসাহেব জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে বৌদ্ধ ত্রিরত্ন বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের সমতুল বলে মতপ্রকাশ করেছিলেন। বৈদিকধর্মে দেবালয় নির্মাণের কোনও প্রথা ছিলোনা। যাবতীয় জ্ঞান ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিলো মুনিঋষিদের আশ্রম বা অরণ্যকুটীরগুলি। বৌদ্ধধর্ম ও লোকাচারে উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে স্তূপ বা চৈত্যের নির্মাণ প্রথম শুরু হয়। পরবর্তীকালে এই পথ অনুসরণ করে তন্ত্রমতে শিব বা শক্তির নামে দেবমন্দির তৈরি হতে শুরু করে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে অনেকেই তন্ত্রমতে নির্মিত বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য রত্নসিংহাসনের ভৈরব বা শ্রীচক্রের উপস্থিতি ছাড়াও মন্দিরের গায়ে মিথুনমূর্তি বা প্রচলিত দেবদাসীপ্রথা তন্ত্রচর্চার সঙ্গে সম্বন্ধিত লোকাচার। জগন্নাথের রথযাত্রাও বস্তুত অনার্যসমাজের প্রাচীন প্রথা। সনাতনধর্মে এর অনুপ্রবেশ বৌদ্ধরীতির হাত ধরেই। নাস্তিক্যবাদও জগন্নাথ ও বুদ্ধের মধ্যে একটা প্রধান যোগসূত্র। সনাতনধর্মে শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে দেবতা জগন্নাথকে নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে গত হাজার বছর। প্রাথমিকভাবে পূর্বভারতে অনার্য ও নিম্নবর্গীয় জনতার দেবতা শিব বুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। পিয়দস্সি অশোক ও মৌর্যশাসনের পর বৌদ্ধসংস্কৃতির নাভিকেন্দ্র যখন সম্রাট কণিষ্কের রাজত্ব , অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে সরে যায় তখন দেশের এইপ্রান্তে অন্ত্যজ, অনার্য মানুষজনের কাছে শিব বা মহাদেব ও বুদ্ধদেবের ভাবমূর্তির মধ্যে ব্যবধান প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো। যুক্তিগতভাবে সেটাই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু কুমারিলভট্ট, মণ্ডন মিশ্র এবং আদিশংকরের ক্রমাগত প্রয়াসে ব্রাহ্মণ্য ভাবধারার পুনরুজ্জীবন ঘটে। বিষ্ণুপূজক, বর্ণাশ্রমবাদী শক্তিগুলি আবার মানুষের অধ্যাত্মিক স্পেসটি দখল করে নেয়। মধ্য গুপ্তযুগে রচিত হরিবংশ বা শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধের কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু পরবর্তী পুরাণযুগে, অর্থাৎ সনাতনবাদী পুনরুত্থান ঘটে যাবার পর সংকলিত পদ্মাপুরাণে লেখা হয় বিষ্ণু বুদ্ধশরীর গ্রহণ করেছিলেন। অগ্নিপুরাণেও বলছে বিষ্ণু শুদ্ধোদনপুত্র হয়ে জন্ম নিয়ে ছিলেন 'মায়ামোহ' নামক দানব প্রবৃত্তিগুলি নাশ করার জন্য। এছাড়া গরুড়পুরাণ, ভাগবতপুরান ইত্যাদি সংকলনে কোথাও বিষ্ণুকে জিনপুত্র (জৈনমতে) বা মোহনাশক বুদ্ধের অবতারে বর্ণনা করা হয়েছে। মোদ্দাকথা, বিষ্ণুপূজকরা পূর্ণ প্রয়াস করেছেন বুদ্ধকে নবম অবতার হিসেবে প্রতিপন্ন করতে। ওড়িশায় বিষ্ণুর নবম অবতার হয়ে এসেছেন জগন্নাথ। পুরীর মন্দিরে মূল প্রবেশদ্বার, সিংহদ্বারের শীর্ষে বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্তি রয়েছে। সেখানে হলধর ও কল্কি অবতারের মাঝে নবম অবতার হিসেবে জগন্নাথের প্রতিকৃতি দেখা যাবে। এছাড়া ভিতরে জগমোহনের সামনে গরুড়স্তম্ভের পাশের দেওয়ালেও দশাবতারের নবম সদস্য হিসেবে জগন্নাথকে দেখা যাচ্ছে। ওড়িশার সনাতনধর্মীয় ভক্তবৃন্দ বুদ্ধ ও জগন্নাথকে এক করেই দেখে এসেছেন পুরাণযুগ থেকে। ('নীলমাধব: একটি বিকল্প নিমপুরাণ' থেকে কিছু অংশ "দেবতার সন্ধানে-একটি অনার্য অডিসি")

128

10

শিবাংশু

তোমার মন নাই? কুসুম?

তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে মননশীলতা লাগে। তথ্য নিয়ে কাজ করতে সতর্কতা। গত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তির তুমুল উত্থান এবং মধ্যবিত্ত মানুষের একটা বৃহৎ অংশের পেশা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা, আমাদের অভিনিবেশের দুনিয়ায় বিরাট ফারাক এনে দিয়েছে। বিশ্বের কোনও কিছুই এখন কল্পনা করতে হয়না। নিরন্তর ঘটনার ঘনঘটা টিভি বা নেটের মাধ্যমে শোবার ঘরে ঢুকে পড়েছে। এই বিড়ম্বনা আমাদের অভিনিবেশকে কেন্দ্রিত হতে দেয়না। যা কিছু ঘটছে চারদিকে, তার সব কিছুই যে আমাকে জানতে হবে তার মানে নেই। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় না জানলে পিছিয়ে পড়বে। আত্মবিশ্বাসহীন মানুষের কাছে 'পিছিয়ে পড়ার' চেয়ে বড়ো অভিশাপ আর কিছু নেই। সর্বদা সতর্ক থাকতে থাকতে সার্ভাইভাল ইনস্টিংক্ট অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যায়। গুরু বলেছেন, সৃজনশীলতা উদ্বৃত্তের ফসল। যার জীবনে উদ্বৃত্ত সময় নেই, উদ্বৃত্ত প্রেম নেই, উদ্বৃত্ত আশা নেই, সে কিছু সৃষ্টিও করতে পারেনা। পড়াশোনা করা, গানবাজনায় রুচি রাখা, বাক্সের বাইরের জীবনকে ভালো বাসা, তার জন্য কিছু দিতে হয়। There is always a price tag। খুব কম মানুষই এখন পেশাগত জীবন আর আত্মগত জীবনের মধ্যে ছন্দটি বজায় রাখতে পারেন। সামাজিক জীবন বলতে সোশ্যাল মিডিয়া। জীবনের সার্থকতা-বিপন্নতা মাপা হয় লাইকের সংখ্যায়। সবাই 'আমাকে দেখুন' রোগে মুহ্যমান। Attention span শূন্য। শরীরটাই শুধু 'মানুষে'র রয়ে গেছে। এই জন্যই তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের একটা দারুণ পরিভাষা দিয়েছে, Body shopping। এর মধ্যে 'মননশীলতা' কোথায় ঢুকবে? 'মন'কে নিয়ে একটু ভাবার সময় কজনের কাছে আছে? নিজেদের সংস্কৃতিবান ভাবার বাঙালির একটা অহেতুক শ্লাঘা আছে। গভীর পড়াশোনা বা শিল্পচর্চা চিরকালই মুষ্টিমেয় কিছু লোকই করেন। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সেই সব লোকেদের সংখ্যা এখন বেড়েছে বই কমেনি। তাঁরা কদাপি লাইক সংস্কৃতির অংশ ছিলেন না, এখনও নেই। তাঁদের নিজস্ব সেরিব্রাল দুনিয়া চিরকালই ছিল, এখনও আছে। বুগু-স্মরণজিতের সূচক তাঁদের জন্য নয়। নীহাররঞ্জন রায়ের নাম আজ কজন জানে। আজ কেন? তাঁর নিজের সময়ও নীহাররঞ্জন বলতে লোকে 'গুপ্ত'কেই জানতো। তাতে হয়েছেটা কী? বাঙালিজাতি এখন সংখ্যায় অনেক বেড়েছে। তাঁদের বৃহদংশ বাংলা ভুলে গেছে। অস্তিত্বের যাবতীয় শিকড় উপড়ে ফেলে স্রোতের শ্যাওলা হয়ে গেছে। আর কী চাই? টিকে থাকার জন্য তাঁদের কাছে আর কোনও বিকল্প নেই। অবশ্য কেউ যেন মনে না করেন আমি তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের হেয় করছি। তাঁরা একটা সামাজিক পরিবর্তনের মুখ। তার মধ্যে ভালোমন্দ নেই। সেটা ঘটনা। একটু আগেই একটি সঙ্গীতবিষয়ক ওয়েবপত্রের কর্ণধার আমার কাছে জর্জদার উপর একটি লেখা চাইলেন। তাঁরা সুদূর বিদেশে থেকে সবরকম গানের সঙ্গে বাংলাগানেরও চর্চা চালিয়ে যান। আমি জানতে চাইলুম, কত শব্দের মধ্যে হতে হবে? তিনি জানালেন শব্দসংখ্যার সীমা নেই। আমার ধারণা থেকে বলি, কে পড়বে? এখন বাঙালি একাসনে বসে একশোশব্দের বেশি পড়তে পারেনা। তিনি জানান যাঁরা পড়তেন, তাঁরাই পড়েন এবং তাঁরাই পড়বেন। আমার লেখার উপর তাঁদের আগ্রহ আছে। বিশ্বাস করলুম। এখন যে বইটি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত আছি তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুপাক। প্রকাশককে বলেছি, কে পড়বে এসব বই?এতো খরচ করে তিনি আমার বই প্রকাশ করেন। ব্যবসায় লোকসান হয়ে যাবে। তিনি জানালেন এই কথা আমি আগের বইটি সম্বন্ধেও বলেছিলুম। কিন্তু সে বই নাকি বইমেলার দশদিনে একশো কপির বেশি বিক্রি হয়েছে। প্রবন্ধের বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা নাকি একটা রেকর্ড। হয়তো তার দ্বিতীয় মুদ্রণও হতে পারে। বিশ্বাস করতে হলো। একাধিক অন্য প্রকাশকও যোগাযোগ করেন বই প্রকাশের প্রস্তাব নিয়ে। এটাও তো ঘটনা। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি যাঁরা মননশীল পাঠক বা শ্রোতা, তাঁদের সংখ্যা কমেনি। কমেছে লেখকশিল্পীদের ধৈর্য। তাৎক্ষণিক ফল না পেলে তৎকাল হতাশ হয়ে পড়েন। সমস্যা আমাদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে। অন্য কোথাও নয়।

108

4

মানব

কল্প-গল্প

********** অনেক দিনের পর ********** আড্ডার আর একটা জন্মদিন পেরিয়ে গেল। দেখতে দেখতে দুবছর পেরিয়ে গেল আড্ডায় নিয়মিত না আসতে পারার। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়... তাই কি? সেসব আলোচনা থাক। বরং দুটো গল্প বলি আজ। ১। গরম বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসির সংখ্যা, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও। আমারো হাতে কিছু টাকাপয়সা এল। ভাবলাম একটা মোটরবাইক কিনি। কিন্তু সেদিন যা হল! সুজিতবাবু বছর তিনেক হল বিয়ে করেছেন। বৌ, মা এবং এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। মাইনে চল্লিশ হাজার, ওভার টাইম আছে। ঘরভাড়া আঠারো হাজার, ইলেক্ট্রিসিটি বিল চার হাজার, গরমকালে আরো হাজার দুয়েক বেড়েছে। মাস আনি মাস খাই করে কোনরকমে চলে যায়। সেদিন অফিসে গিয়ে মেলটা খুলেই চমকে উঠলাম। হিউম্যান রিসোর্স থেকে মেল এসেছে যে রাস্তায় মোটরবাইক থেকে রাস্তায় পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে সুজিতবাবুর। তার পরিবারের সাহায্যার্থে সবাই যে যা পারেন সাহায্য করবেন। না এম. এন. সি. এর তরফ থেকে সাহায্য পাওয়া গেলনা কোন। সবাই মিলে চাঁদা তুলে লাখ তিনেক এবং ইন্সিওরেন্স বাবদ লাখ দুয়েক। জমা পাঁচ লাখ। এইটুকু পরিবারে অনেকটাই... তাই কি? ২। দিল্লী মেট্রো। যাচ্ছিলাম জঁ দ্রেজ ও অমর্ত্য সেনের বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে। ভিড় মোটামুটি। মানে যে অনুপাতে দিনের পর দিন এই এলাকার জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে সেই তুলনায় কিছুই না। এক ভদ্রমহিলা উঠলেন। তার পিছু পিছু তার বান্ধবী। একজন অফিস ফেরত ভদ্রলোক বসেছিলেন FOR OLD AND PHYSICALLY CHALLENGED সংরক্ষিত সিটে। তার পাশে একজন বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক। প্রথম ভদ্রমহিলাকে ধরলাম শ্যামা, দ্বিতীয়কে রমা, দুজনেই বছর পঁচিশের হবে আশা করা যায়। কিম্বা তারও কম। শ্যামা উঠেই সিট না পেয়ে প্রচন্ড হতাশাসূচক দীর্ঘশ্বাসে ভরিয়ে তুললেন আশপাশ। তারপর তাঁর নজর গেল সেই বেচারা অফিস ফেরত ভদ্রলোকের দিকে। মহিলার দিকে তাকিয়ে মনে হল একজন বছর ত্রিশের ছেলে কিভাবে বসতে পারে, তাও আবার একজন বরিষ্ঠ নাগরিকের সিটে, যেখানে তাঁর মত একজন বছর পঁচিশের ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন, সেটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছেনা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাল্পনিক শ্যামা বলেই ফেললেন, 'আপ থোড়া উঠকে উধার খাড়াহো যাইয়ে না।' অর্থাৎ ভদ্রলোক উঠে ওনার সামনে দাঁড়াবেন, এতেও তাঁর আপত্তি, তাই সেই জায়গাটাও ঠিক করে দেওয়া হল। বেচারা ভদ্রলোক উঠে গিয়ে নির্ধারিত যায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। যুবক হঠাও এর পর শুরু হল প্রৌঢ় হঠাও আন্দোলন। পাশের ভদ্রলোককেও সেই একই কায়দায় উঠিয়ে দেবার চেষ্টা শুরু হল যাতে তাঁর বান্ধবীকে বসিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয় ভদ্রলোক উঠলেননা। নিতান্ত দোনামনা করে একটু চেপে বসে রমাকে বসার সুযোগ করে দিলেন। বসার পরেই শ্যামা রমার চুল ঠিক করে দিল। তারপর বিভিন্ন কায়দায় রমার রূপের এমন প্রশংসা শুরু করে দিল যে প্রৌঢ় ভদ্রলোক বাধ্য হলেন সেখান থেকে উঠে যেতে। ************************************************************************* আজ এটুকুই। ভালো থাকবেন সবাই।

101

6

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

অ্যালফ্রেড হিচককের ‘দ্যা বার্ডস’ (১৯৬৩) হরর মুভিটির কথা মনে আছে? অনেক ছোটবেলায় মুভিটি দেখার ফলে মনের মধ্যে যে সাংঘাতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ এত বছর পরেও রয়ে গেছে। জীবনে কখনো ভাবিনি যে সেই মুভির শ্যুটিং স্থল বোডেগা বে তে আমরা দুদিনের জন্য ক্যাম্প খাটিয়ে থাকার ভাগ্য হবে! কিন্তু ভাগ্যদেবতা উদার হয়ে সে সৌভাগ্য মঞ্জুর করলেন। তাই শুক্রবারে তল্পী তল্পা গুটিয়ে, আমরা চার পরিবার চললাম স্যান ফ্রান্সসিসকোর মোটামুটি ৬৫ মাইল উত্তরে। যাওয়া এবং ফেরার পথে গোল্ডেন গেট ব্রিজ পড়ল। ব্রিজটি এত বছর ধরে দেখে আসছি কিন্তু মুগ্ধতা একটি বিন্দুও কম হয়না। প্রতিবার অবাক বিস্ময়ে ভাবি, সত্যি! মানুষের কি অদ্ভুত সৃষ্টি! বিকেল বিকেল পৌঁছে তাঁবু খাটিয়ে, রান্নার সরঞ্জাম বের করে রাতের আহারের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। প্রথম আহারের দায়িত্ব ছিল আমাদের কাঁধে। কিমা বিরিয়ানি, রুটি, করলা মশালা আর ঘুঘনি।শেষে কেক। এই ছিল মেনু। যেহেতু প্রথমেই আমার পালা তাই বাড়ি থেকেই রান্না প্রায় করে নিয়ে গেছিলাম। মোটামুটি গরম করলেই কাজ সারা হয়ে যাবার কথা। কিন্তু পড়তে গিয়ে ব্যাপারটা যত সোজা মনে হচ্ছে ক্যাম্প গ্রাউন্ডে রাতের বেলা খাবার গরম করার পদ্ধতিটা এত সোজা নয়। প্রথম কথা ছোট্ট গ্যাসের দুই উনান যুক্ত বার্ণারে একপাশে ডেচকি চড়ালে, অন্যপাশে মিহি কোনো রান্নার পাত্র ছাড়া জায়গা হবেনা। আর আমাদের রান্নার পাত্র বাড়ন্ত। তার মানে হল, একটি পাত্রকেই বার কয়েক ব্যবহার করতে হবে। তাই কিমা বিরিয়ানি গরম করে, ঢেলে রেখে, সেই পাত্র নিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতে লন্ঠন নিয়ে কলতলায় গিয়ে বাসন মেজে আবার তাতে অন্য কিছু গরম করতে হবে। আর এই প্রক্রিয়াটি জলদি হওয়া আবশ্যক কারণ এই সময়ে বোডেগা বে এর তাপমাত্রা দিনে, রাতে প্রায় পনের ডিগ্রির ব্যবধান। তারওপরে সে কি পাগলা ঝোরো হাওয়া। কম্বল ভেদ করে অস্থি মজ্জা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তাই গরম করা খাদ্য, দুই মিনিটেই ঠান্ডা। আমাদের তাঁবু খাটাতে গিয়ে দেখা গেল, যেহেতু অপরাধী তন্ময় হয়ে খেলায় ডুবে ছিলেন, তাই তাঁবুর ওপরের rain-fly বাড়িতে ফেলে রেখে আসা হয়েছে। পরিস্থিতিটা কল্পনা করতে পারছেন? অর্থাৎ কিনা, তাঁবুর ভেতরে শুয়ে কনকনে ঠান্ডা রাতে আপনি চাঁদ-তারা দেখবেন, কুয়াশায় ভিজবেন, এমনকি ইন্দ্র দেবতার দয়া হলে বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়াও বাধাতে পারেন! চিন্তা ক্লিষ্ট মন যখন নানা সম্ভব অসম্ভব কল্পনায় ম্রিয়মান, তখন অপরাধী নিজেই পাপ খন্ডনের উপায় ঠাউরালেন। একটা এয়ার ম্যাটট্রেস আর বেড শিট দিয়ে তাঁবুর মাথায় জালের ছাউনির ওপর বিছিয়ে ভালোভাবেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা গেল। রাতের আহার শেষ করে আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসা হল। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। আগুনের আলোর চারিপাশে আমাদের ছায়ামাখা অবয়ব, তারপর থেকে আলকাতরার ন্য্যায় অন্ধকার শুরু হয়েছে। তাতে মনে হচ্ছে বৃক্ষগুলি যেন সুবৃহৎ ডাইনোসর, ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে। হাওয়ার টানে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলছে, এই এলাম বলে! বাতাসের প্রাবল্যে গাছে গাছে এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে। আর সেই বিশাল প্রকৃতির মধ্যেখানে আমরা, আর আমাদের ঘিরে শুদ্ধ সতেজ পরিবেশ, মুখ তুলে আকাশে চাইলে ঝকঝকে নক্ষত্রখচিত আকাশ। সকলে মিলে অন্তাক্ষরী খেলা শুরু হল। পুরোনো দিনের অনেক ভুলে যাওয়া গান উঠে আসছিল। আর ভেসে আসছিল নিজেদের জীবনের অনেক না বলা কথা। অন্যে কি ভাববে তার তোয়াক্কা না করেই। আমি চুপটি করে বসে ভাবছিলাম, এই আমরাই, শহুরে জীবনে, সামাজিক অবস্থান আর ঋতু কুমারের শাড়ি- জামার অন্তরালে কত অন্য মানুষ। পরের দিন দুই মাইল হাইক করে গেলাম সমুদ্রতটে। অপূর্ব আইস প্ল্যানটের পাশ কাটিয়ে, বালির ওপর দিয়ে সে হাইক কষ্টসাধ্য ছিল। পৌঁছে দেখি, আরে, এ তো এক অতি নি:সঙ্গ সমুদ্র! যেদিকেই দুচোখ যায় কোনো জনপ্রাণী নেই। শুধু তীরময় কঙ্কালসম কতগুলি কাঠের গুঁড়ি পড়ে আছে। আর রাগী সমুদ্র যেন তার ধ্যানভঙ্গের অপরাধে আমাদের গ্রাস করতে ইচ্ছুক! ফোঁস ফোঁস করে সে মৃত্যুশীতল নি:শ্বাস ফেলে আমাদের হাত বাড়িয়ে ডাকছে! দুই দিন আর কোনো কথা নেই শুধু অনুভব আর দুই চোখের দ্বারা রসাস্বাদন! https://youtu.be/19r7ctge2lI কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন- আ.দা

1139

44

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

আবিল প্রথম সাক্ষাতেই রেবা খুব স্পষ্ট করে বুঝে গেছিল। সুকুমারকে ছাড়া তার গতি নেই। তার থেকে কম করে চোদ্দ-পনের বছরের বড় সুকুমার। বাজারে যাদের তিনপুরুষের কাঁসার দোকান। গ্রামের প্রথম পাকাবাড়ি মালিক যারা। একবার ইস্কুলে যাবার পথে নীরবে যে তার সাইকেলের চেন লাগিয়ে দিয়েছিল। চৌরাস্তার মোড়ে দুইহাতে সাইকেলের দুই হ্যান্ডেল ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে অসহায় আবেগে ভিজছিল সে যেদিন। ত্রস্ত চোখে ভরসার কাউকে খুঁজছিল।পাশ দিয়ে রিক্সা, অটো, ছাতায় মুখ ঢেকে সাইকেল আরোহীগণ সাঁই সাঁই করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। টপ টপ করে জল পড়ছিল তার চোখ বেয়ে, তারপর তা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে ইস্কুলের সাদা ব্লাউজের বুক ভিজিয়ে দিয়ে তাকে নীলচে বর্ণে রূপান্তরিত করছিল। কোনো জায়গায় নীল বেশি পড়ায় সে জায়গাগুলোতে গাঢ় রং ধরছিল। অত দু:খের মধ্যেও সে তা লক্ষ্য না করে পারেনি। প্রথম পিরিয়ডে ভূগোল পরীক্ষা ছিল সেদিন। দ্রুত সময় বয়ে যাচ্ছিল। চেনে হাত দিলেও লাগাতে পারবে কিনা নিশ্চিত ছিলনা। সাইকেলটা গড়বড় করছে ক’দিন ধরে। তবে হাত লাগালেই যে নাছোড় কালিময় হয়ে যাবে তার দুই হাতের তালু, ব্যাপারটা সে জানত। তাই ইতস্তত করছিল। বিমল স্যারের তির্যক হাসি চোখে ভাসছিল। গত দুইদিন সেই হাসি ভুত হয়ে ওকে গুলে খাইয়েছে পরীক্ষার যাবতীয় পড়া। স্যার ভাববেন ফেল করার ভয়ে সে ডুব মারল। স্যারের হাসিটা ফিরে ফিরে আসছিল আর বাবার ওপর ভয়ঙ্কর রকমের রাগ বাড়ছিল। তাদের সংসারে কেবল নাই নাই রব। সবকিছুতে জোড়াতালি যতক্ষণনা তা ধ্বসে পড়ে। মায়ের তালিমারা শাড়ি, বাবার লড়ঝড়ে টেম্পো আর তার বারে বারে চেন পড়ে যাওয়া জংধরা সাইকেল। খুব লজ্জা লাগে ইস্কুলে নিয়ে যেতে। চোখের আড়ালে মাঠের কোণে জিগা গাছের গুঁড়ির আড়ালে চেন দিয়ে বেঁধে রাখে। না বাঁধলেও কেউ নিতনা নিশ্চিত। কে দায়ী তাদের এই অবস্থার জন্য? বাবাই তো। সরকারী অফিসের পিয়নের নিশ্চিন্ত চাকরি ছেড়ে কেন যে বাবা ব্যবসা করার মোহে মাতলো? আর হ্যাঁ, মাও দায়ী। কেন মা বাবাকে নিষেধ করল ন! মা মানা করলে বাবা কক্ষনো সর্বস্ব পণ করে প্রায় নি:স্ব হতনা। রেবারা এক পুরুষের গরীব। তাই গরিবিয়ানা তার রপ্ত হয়নি এখনো। মনে মনে কিছুতেই নিজেকে গরিব বলে ভাবতে পারেনা সে। খুব মনখারাপের দিনে ইঁট দিয়ে উঁচু করা তার আর মায়ের তক্তপোষের নীচে রাখা লোহার ট্রাঙ্কটা খুলে বসে। জং ধরা ডালা খুলতেই নিমপাতার চেনা কটু গন্ধটা নাকে ঝাপটা দেয় আর ভেতরে উঁকি দিলেই সুখের দিনের কোলাজ ছড়ানো দেখে। তার অন্নপ্রাশনের কুট্টি সিল্কের জামা, রূপোর থালা-বাটি-গ্লাস । মায়ের বিয়ের ভারী মেরুন বেনারসী, হাতের চূড়। বাবার গিলে করা মিহি ধুতি-পাঞ্জাবি, সোনার বোতাম। হলদে হয়ে যাওয়া অতীতের দুর্লভ কিছু মুহূর্ত। চরম দুর্দশার দিনেও মা যা বাঁচিয়ে রেখেছে। বাকি অনেক কিছু আবার তেমন হারিয়েও গেছে। যেমন চোখ বুজলেই সে আঘ্রাণ পায় টগবগ করে ফুটতে থাকা আতপ চালের ভাতের। শুনতে পায় মায়ের খিলখিলে হাসি, দেখতে পায় রোদের থেকেও চকমকে বাবার দুই চোখ। বাবা তাকে শূন্যে ছুঁড়ে আবার বুকে লুফে নিচ্ছে, তার ধুকপুকে বুক, দুরুদুরু দৃষ্টি শুধুই বাবার চোখের মনি দুটিতে নিবদ্ধ। একবার আকাশে থেকে আবার পরক্ষণেই বাবার দুইহাতের আবেষ্টনের মধ্যে থেকে। সেদিনের সেই একলা ভেজার দিনে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল রেবা। কিছু করেই হোক এই জীবন থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধুঁকে ধুঁকে, খুঁটে খেয়ে বেঁচে থাকার জীবন সে চায়না। তার অনেক আশা। অনেক স্বপ্ন। আর আশ্চর্যজনকভাবে ঠি ক সেই মুহূর্তেই বড় বড় পা ফেলে সুকুমার এগিয়ে এসেছিল। একটি শব্দও খরচা না করে একপলক দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে উবু হয়ে বসে অতীব দক্ষতায় সাইকেলের চেন তুলে দিয়ে বাঁ হাতে সাইকেলটাকে শূন্যে উঠিয়ে ডান হাতে প্যাডেলটাকে আগেপিছে করে চাকার ঘূর্ণন পরখ করে দেখেছিল একবার। তারপর সাইকেলটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাজারের দিকে চলে গেছিল। পুরো ব্যাপারটা এমন খণ্ড মুহূর্তের নিরিখে ঘটেছিল রেবা কিছু বলেকয়ে উঠতে পারেনি। ধ্যানভঙ্গ ঘটতেই অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে প্রাণপনে প্যাডেল করে ইস্কুলে পৌঁছেছিল সে। সকলে তখন মাথা গুঁজে লিখতে শুরু করে দিয়েছে। স্যারের থেকে সাদা কাগজ নিয়ে ঝড়ের গতিতে পাতার পর পাতা ভরিয়ে তুলেছিল। আশা ছিল ক্লাসের প্রথম হওয়া গীতাকে একবারের জন্য হলেও টপকে যাবে। খাতা বেরোতে দেখা গেল তবুও সে তিন নম্বর পিছিয়ে আছে। না, গীতার কাছে হেরে যাওয়া তাকে হতাশ করেনি। মনের মধ্যে ‌অন্য যুদ্ধে জেতার গভীর আকাঙ্খা জন্ম নিয়েছে ততদিনে। পরীক্ষা বা পরীক্ষার নম্বর সেখানে তুচ্ছ। বৃষ্টি স্নাত সেইদিনের মুহূর্তগুলিকে দিনের মধ্যে হাজারবার মনের পর্দায় ফুটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রোজ দেখে সে। অনায়াসে সাইকেলের ভার তুলে নেওয়া সুকুমারের ফুলে ওঠা সুঠাম বাহু তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। লোকটার কালিভরা হাতের খড়খড়ে তালু দুটি গালে ঘষতে মন চায়। কোনদিন একটিও কথা বলেনি তারা, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড়, বিবাহিত, এক মেয়ের বাবা সুকুমারকে সেদিনই সে মনপ্রাণ দিয়ে বসেছে। জীবন যুদ্ধে সে এমন মানুষই সঙ্গ কামনা করে, যে এক পলকে তার সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দেবে। তার সংসারেও সুগন্ধ ছড়াবে, আতপ চালের ভাত। (২) ব্যাপারটা অত সহজ ছিলনা। সন্ধ্যাকে সে চিনত। বাজারে মন্দিরে কখনো সখনও মুখোমুখে পড়ে গেলে দুই একটা আলগা কথার বিনিময় ঘটত। মা সঙ্গে থাকলে মায়ের সাথেই বেশি। হয়ত বয়সের তারতম্যের কারণে দুই পক্ষই ঘনিষ্ঠতার কোনো আগ্রহ দেখায়নি এতদিন। এবার মাকে দিয়ে সে বাড়ির শীতলা পুজোয় সন্ধ্যাকে আমন্ত্রণ জানাল। মায়ের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে খুব স্বাভাবিক মুখে আগে থেকে ভেবে রাখা গল্প শোনালো। -ভাবতাছি সিলাই পরীক্ষার কুরুশের কাজডি সন্ধ্যাদির থাইক্যা শিইখ্যা নিমু। আরো মাস তিনেক লেগেছিল প্রথমবারের মত সুকুমারের দোরগোড়ায় পৌঁছতে। সতৃষ্ণ নয়নে যতটুকু নজরে আসে, বাড়ির প্রতিটি কোণা ইতিউতি গিলে খাচ্ছিল সে। ফুলকাটা বিছানার চাদর, রান্নাঘরের তাকে ধুয়ে রাখা ঝকঝকে কাঁসার থালা, গ্লাস, আলনায় পরিপাটি করে ঝোলানো শাড়ি, ব্লাউজ, খানদুয়েক শার্ট, কোনোটাই অচেনা ছিলনা তার কাছে। এ তো তারই সংসার। বরং সন্ধ্যা একেবারে বেমানান এখানে। তার সংসারে জবরদস্তি ঢুকে পড়া কোনো আগন্তুক যেন। সন্ধ্যাদি খুব মন দিয়ে টেবিলের ঢাকনা বানানো শেখাচ্ছিল। শেখাতে শেখাতে একবার উঠে রান্নাঘরে গেল ডালে সম্বার দিতে। চকিতে সে আলনার নীচে ধোয়ার জন্য ফেলে রাখা জামা কাপড়ের ভেতর থেকে রুমালটা তুলে ব্যাগে ভরেছিল। তিন বছরের লাবু নানা অর্থহীন শব্দসহ একমনে পাশে বসে পুতুল খেলছিল। জ্যান্ত পুতুলের মত মেয়েটাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সারাজীবনের মত সে বধির এবং শব্দহীনা। মা একবার বলেছিল যে ওর জন্মের পর থেকেই নাকি সন্ধ্যাদির পুজোআর্চা ঈশ্বরপ্রীতি বেড়ে গেছে। শোবার ঘরে মাদুর পেতে পাশাপাশি বসেছিল ওরা। এত কাছে যে সন্ধ্যাদির গা থেকে লাইফবয় সাবান আর চুল থেকে রিঠা ঘষার বুনো গন্ধ খুব নিবিড়ভাবে পাচ্ছিল। ওর সিঁথির চওড়া করে টানা জ্বলজ্বলে সিঁদুর, ছোট্ট কপাল জুড়ে পূর্ণিমার রাতের মস্ত চাঁদ চোখে জ্বালা ধরাচ্ছিল। খুব সুন্দর একটা খলসে রঙের জমির ওপর চওড়া গোলাপি পাড় তাঁতের শাড়ি পরেছিল সন্ধ্যাদি। আয়নাতে পাশাপাশি তাদের প্রতিবিম্বের দিকে রেবার চোখ গেল। এ বাড়িতে আসছে বলে মায়ের সবচেয়ে সুন্দর ছাপা শাড়িটা পরে এসেছে সে। নারকেল তেল ঘষে ঘষে রুক্ষ চুলগুলিকে কলাবিনুনিতে বেঁধেছে। চানের পরে সর্ষের তেল ডলেছে সারা অঙ্গে। বিকেলের সূর্যের আলো তার মসৃণ ত্বকে পড়ে যেন পিছনে যাচ্ছে। তবুও ছোট্টখাট্ট সন্ধ্যাদির পাশে তাকে কত নীরস দেখাচ্ছ! -ওই মাইয়্যা, নিজেরেই দেখবি নাকি কিছু শিইখ্যা নিবি? সন্ধ্যাদি আলতো করে তার পিঠে থাবড়া দেয়। তর দাদায় আইল্যো বইলা। পাশের ঘর থেকে চির অসুস্থ দয়াময়ীর ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে, বৌমা, অ মা....। সন্ধ্যাদি ওঘরে যেতে সেলাই পত্র গুটিয়ে লাবুর পাশে থেবড়ে বসে রেবা। লাবু অবিশ্রাম বকে চলেছে, লা লা ক ল কলল...। দুই ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে তার জামার বুক ভিজিয়ে দিয়েছে। এক ঝটকায় পুতুলটা টেনে নেয় রেবা। মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে লাবু জান্তব স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে। আমূল কেঁপে উঠে পুতুলটা তাড়াতাড়ি তার হাতে ধরিয়ে চটপট নিজের জায়গায় ফিরে আসে সে। -কি হইছে, চাঁদ? সন্ধ্যাদি ছুটে আসে। -কিচ্ছু না সন্ধ্যাদি, পুতুলডা পইড়া গেছিল। -ওইটাই ওর জগত বুঝলি নাকি। ওর বাবায় আইন্যা দিছিল,অতটুকখানি ছিল তহন! -কে কান্দায় রে আমার মাইয়্যাডারে? তার মায়ে নাকি....বলতে বলতে ঘরে ঢোকে সুকুমার। তাকে দেখে থমকে যায়। বলে, প্রভাত কাকার মাইয়্যা না? কি নাম তর? -রেবা। -হুঁ, সুকুমার তার মেয়ের দিকে মন দেয়। বউকে বলে, কি দিবা চটপট দাও দেহি।দুকান ছাইড়্যা আইছি। রেবাকে বলে, কেমন আছেরে প্রভাত মেসো। অনেকদিন দেহা হয় নাই। রেবা কথা বলে আর দেখে। ঘন কালো চুল, মোটা গোঁফ, পুরু কালো ঠোঁট, বাঁ চোখের ওপরে কাটার দাগ। সারা শরীরে সে মাতন টের পায়! খুব ইচ্ছে করে ওই কাটা দাগটায় আঙুল ছোঁয়ায়। প্রচন্ড গরম লেগে হঠাৎ হাঁসফাস করে ওঠে সে। বলে, যাই এহন, সন্ধ্যাদি। পরে আসুমনে। -আইচ্ছা। দশডা চেইন দিয়া পাপড়ি বানাইয়্যা আনিছ। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে ঝটপট উঠে দাঁড়ায় রেবা। ভয় হয় তার বুকের ধুকধুক সন্ধ্যাদি শুনে ফেলবে। ঘরের বাইরে পা দিয়ে শুনতে পায় সুকুমার বলছে, খুশির বিয়াতে হ্যারে দেখছিলাম। কয় বছরে বেশ ডাঙ্গর হইছে তো। উত্তরে সন্ধ্যাদি কি বলে আর শোনা হয়না। সে সন্তর্পণে ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে মুঠোতে শক্ত করে চেপে নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেয় তারপর সেটাকে ব্লাউজের ভিতরে বুকে গুঁজে রাখে। (৩) এরপরে দেখা হওয়াটা হঠাৎই খুব ঘন ঘন ঘটতে লাগল। আর হবে নাই বা কেন বাজারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে রেবা। সুকুমারের দোকান পাকা বাজারে। সবজিপাতি কিনতে সেখানে যাওয়ার দরকার পড়েনা। তবুও রেবা যায়। মাকে বলে, পাকা বাজারে সবজি কত সতেজ। দামডাও সরস। চিন্তা কি তোমার? আমি সাইকেল লগে দুইমিনিটে নিইয়্যা আসুমনে। দুই মিনিটে যদিও হয়না। এটা ওটা দরাদরি করে দেখে বেড়াবার ফাঁকে সে সুকুমারের দোকানের আশেপাশে ঘুরঘুর করে যতক্ষণ না তাকে দেখা যায়। মুখোমুখি পড়ে গেলেই মিষ্টি হেসে আলাপ জমায়। দুদিন সুকুমার তাকে ডেকে দোকানে বসিয়েছিল। একদিন শালপাতায় মোড়া তার ভাগের মিষ্টি খাইয়েছিল জোর করে। আর একদিন বাজারে কার থেকে পাওনা পয়সা আনতে গেছিল তার ওপরে দোকানের ভার দিয়ে। সে দিন নিজের সৌভাগ্যে বিশ্বাস হচ্ছিল না তার! সুকুমারের গদিতে বসে মনে হচ্ছিল তার থেকে সুখী কেউ নেই এই ধরাধামে। সন্ধ্যাদির কোনোদিন এমন ভাগ্য হবেনা! সেদিন খুব দেরী হয়ে গেছিল। মা শুধু মারতে বাকি রেখেছিল। বাবাকে ডেকে বলছিল, মাইয়্যাডার পা বড় বাড়ছে। কাডনের দরকার। দিনরাত টো টো কইরা ঘুইরা বেড়ায়। বাবাও রেগে আগুন হয়ে তাকে দুদশ কথা শুনিয়ে দিল। মনে মনে রাগে ফুঁসছিল রেবা, মনে পড়ল ভাবার্থ লিখতে হয়েছিল ইস্কুলে, “ভাত দেবার মুরোদ নেই কিল দেবার গোঁসাই।” দুই একদিন সমঝে চললো সে, এক সপ্তাহ পার হল না পাকা বাজার তাকে নেশার মত ডাকতে লাগল। আজকে আর বাজার করতে নয় মাকে বললো বিনীর বাড়ি যাচ্ছে। কয়েকদিন মুখ গোমড়া করে বাড়িতে বসে ছিল তাই মা হয়ত একটু নরম পড়ে গেছিল। বললো, সন্ধ্যা লাগনের আগ দিয়া ঘরে ঢুকস। এদিক ওদিক না ঘুরে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে সোজা গিয়ে সুকুমারের দোকানে ঢুকলো সে। মুখ নিচু করে হিসাবের খাতায় কিছু লিখছিল সুকুমার মুখ তুলে তাকে দেখেই চেহারায় যেন লক্ষ প্রদীপ জ্বলে উঠল, কিরে, কই ছিলি? এতদিন আইছস না যে এদিকপানে? মাথা নামিয়ে বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে সিমেন্টের মেঝেতে আঁচড় কাটছিল রেবা। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। গদি থেকে নেমে কাছে এসে দাঁড়ালো সুকুমার। কিরে, হইলডা কি তর? তারপর অবাক বিস্মিয়ে গালে আঙুল ছুঁয়ে বললো, এই পাগলি, কান্দোস ক্যান? আর নিজেকে সামলাতে পারলনা রেবা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো, আমি আর পারতেছি না। আপনি আমারে দয়া করেন। সুকুমারের খসখসে হাত তার গাল, তারপর পিঠ ছুঁয়ে থমকে দাঁড়ালো। যেমনটা সে বহুবার কল্পনায় দেখেছে। এই পাগলি, ক্ষ্যাপার মত কথা কইছ না। মাথা ঠান্ডা কর। তর বয়স অনেক কম। তর সামনে জীবন পইরা আছে। আমার ঘরে বউ, মাইয়্যা। লোকে আমারে থুতু দিব। -আপনি কি চান হেইডা কন, লোকের কথায় আমার কাম নাই। -আমি কি চাই জানিনা রে। তরে ভালোলাগে, তর কথা মনে করতাছি গত আট দিন ধইরা। কিন্তু সন্ধ্যারে আমি ছাড়তে পারুম না। ওর তিনকুলে কেও নাই। -ছাড়তে কে কইছে। একসাথেও তো থাকন যায়। -দূর বোকা মাইয়্যা। ভুত চাপছে তর মাথায়। যা, বাড়ি যাইয়্যা মাথায় জল দিয়া থাবড় দে। রেবা মাথা তুলে চোখে চোখ রাখল এবার। অভিমানে গাল ফুলে উঠেছে। সুকুমার হাত ধরতে গেলে ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দিল। আর আসুম না আমি। থাকেন আপনের বউ বাচ্চা লইয়া। আড় পাড়া থাইক্যা সম্বন্ধ আইছে, বাবায় বিয়া দিয়া দিব অঘ্রাণে। সুকুমারের চোখ নিষ্প্রভ দেখায়। -আড়পাড়ার কেডা? সামন্তগো বাড়ি নাকি? -তাইলে আপনার কি? মিথ্যা কথা ধরা পড়ে যাবার ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে রেবা। সেই সঙ্গে খুশি হয় ভেবে ওষুধে কাজ হয়েছে। -না, আমার আর কি হইব? ম্রিয়মাণ হয়ে বলে সুকুমার। এবারে কাছ ঘেঁষে আসে রেবা। এতটাই কাছে যে দুজনের নি:শ্বাস দুজনকে ছুঁয়ে যায়। সুকুমার কেমন বিচলিত হয়ে পড়ে। ঝুঁকে পড়ে তার ওপরে। -এখন ক্যান? যান গিয়া। রেবা চোখ পাকায়। নির্ভুল ভাবে বুঝতে পারে মোম গলছে। দুই হাতে ঠেলে সরিয়ে দেয় সুকুমারকে। তারপর হাসতে হাসতে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, পালকি লইয়া আইবেন, তবেই নাগলে পাইবেন আমারে। (৪) পরের কয়েকটা দিন খুব খুশিমনে ইস্কুল আর বাড়ি করেই কাটায় রেবা। বলার আগেই মায়ের হাতে হাতে সংসারের কাজ করে। টেম্পোতে চালানের ভারী জেনারেটরগুলি ওঠাতে বাবাকে সাহায্য করে। বাজারে যাবার, কোনো বন্ধুর বাড়ি যাবার বা বাড়ির বাইরে বেরোবার কোনোরকম ফিকির খোঁজেনা। অবসর সময়ে বইখাতা খুলে গভীরভাবে কিছু ভাবে। মা খুব খুশি হয়। মেয়েটার পাড়াবেড়ানো স্বভাব বন্ধ হয়েছে। পড়াশোনায় মন লেগেছে। পরশু কালি মন্দিরে সন্ধ্যার সাথে দেখা হতে সেও বললো, কাকি, রেবার তো দেহা পাওয়াই ভার হইছে। সেলাই পরীক্ষা হইল কেমন? মেয়েকে সে কথা বলাতে হুঁ হা করে কাটিয়ে দিল। স্কুল ফাইনালটা দিলেই বিয়ে দিয়ে দেবে। যুগটা ভালো নয়। মেয়েটার শরীর বাড়ন্ত।গতরে সতেরো বছরের অনেক বেশি লাগে। চেনা অচেনা সকলে ডেকে জানতে চায়, মাইয়্যারে বিয়া দিবানা? কিছুদিন পরে রেবা একা বাড়িতে। বাবা মা জয়রাম ঘাটে মাসির বাড়ি গেছে। মাসতোতো দিদিকে দেখতে আসবে। রেবারও যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সকাল থেকে প্রচন্ড পেটব্যথা শুরু হয়ে গেল তার। মা তাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। সে জোর করে পাঠালো। শুইয়্যাই তো থাকুম, তুমি থাইক্যা কি করবা। বাবা-মা বেরিয়ে যাবার পরে আরো কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইলো। তারপর ভর দুপুরে তক্তপোষ ছেড়ে উঠলো। এতক্ষণে সুকুমার দোকানে ফিরে গিয়েছে। দয়াময়ী আর লাবুকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো শেষ করে সন্ধ্যাদি নিজের কাজে ব্যস্ত। একপা একপা করে উঠোনে বেরিয়ে এল সে। তার ভাবলেশহীন মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে সকাল থেকে সে কেমন বেদনায় কাতরাচ্ছিল। বাইরে বেরিয়ে সদরে শিকল তুলে আঁচল দিয়ে মাথা মুখ ভালো করে ঢেকে নিল। দুপুরের চিতাকাঠের মত খাঁ খাঁ আগুন রোদে চরাচরে ফেটে পড়েছে। জন-মনিষ্যি তো দূরস্থান একটা কাক-পক্ষীও দেখা যায়না। চারিদিক দেখে আলপথ নেওয়াই মনস্থ করে। একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছবে। প্রচন্ড গরমে মাথার তালু ফেটে যাচ্ছে, চোখে অন্ধকার দেখছে। পায়ের নীচে যেন জলন্ত অঙ্গার। তবুও কোন জেদের ভরে তার পা যেন তাকে টেনে নিয়ে চলেছে। মিনিট পাঁচেক পরে ভেজানো সদর দরজা ঠেলে উঠোনে পা দিল। কুয়োতলায় অ্যাসবেসটারের ছাউনির নীচে গলদঘর্ম হয়ে সন্ধ্যাদি বেডকাভার ধমাস ধমাস শব্দে কেচে চলেছে। সর্বাঙ্গ জলে সাবানে মাখামাখি। উঠোনে লাবু পুতুল নিয়ে খেলা করছে। তাকে দেখে সন্ধ্যাদির হাসি ফুটলো মুখে, অাইছস। লাবুরে একটু শুইয়া দিয়া আইবি, মনা? শোয়াইয়া চুষিকাঠিখান মুখে গুঁইজ্যা দিস। ঘুমাইয়্যা পরবোনে। আমার দেরী ‌হইব। শাউরি বিছানায় মুইত্যা থুইছে। চুপচাপ লাবুকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকলো রেবা। ওকে মেঝেতে পাতা মাদুরে শুইয়ে চুষিকাঠি মুখে ঢুকিয়ে দিল। তারপর আস্তে আস্তে ওর পিঠে চাপড় দিতে লাগল। মুখের কাছে মুখ নিয়ে রেবা ওকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছিল। ভুরুজোড়া আর চোখ একেবারে বাবার মত, ঠোঁটটা মায়ের মত পাতলা। লাবু কখনো কারুর চোখে চোখ রাখেনা। শুয়ে পুতুলটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। ধীরে ধীরে তার চোখ বুজে এল। পুতুলটা হাত থেকে খসে পড়ল। ওর পাশ থেকে উঠে বিছানায় ‌উঠে অল্পক্ষণ শুলো সে। তারপরে আলনা থেকে সুকুমারের জামাটা নিয়ে মুখে চেপে ধরল। মনমাতানো এক বন্য গন্ধ তাতে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো রেবার। জামাটা গুছিয়ে রেখে আয়নার সামনে এসে সুকুমারের ছোট্ট চিরুনিটা দিয়ে সিঁথির পাশদুটো আঁচড়ে নিল। সিঁদুরের কৌটো খুলে কপালে একটা টি প দিল। তারপর সন্ধ্যাদির সামনে কুয়োতলায় এসে দাঁড়ালো। সন্ধ্যায়দি মুখ তুলে কিছু বলতে গিয়ে থমকে গেল। কপালে কি লাগাইছস? -সিন্দুর। -ক্যান? কুয়োর চারিপাশের বাঁধানো চাতলে পা তুলে বসলো রেবা। -সুকুমারদা তোমারে কিছু বলে নাই? -কি বলবো? রেবা মুখ টিপে টিপে হাসতে থাকে। -আরে ছেমড়ি, বলনের আছেডা কি? কইবি তো। রেবা তবুও ফুলে ফুলে হাসতে থাকে। রাগে রক্তবর্ণ হয়ে উঠে দাঁড়ায় সন্ধ্যা। থাবা দিয়ে রেবার একটা বেণি টেনে নিজের কাছে আনে তারপর মুখঝামটা দিয়ে বলে, এক ঠেকনা দিয়া দাঁতকটি ফ্যালাইয়া দিমু। মাথায় রক্ত লাফিয়ে উঠলো রেবার। একলাফে চাতাল থেকে নেমে সজোরে পাশের দিকে এক ধাক্কা দিল সন্ধ্যাদিকে। পালকসম শীর্ণ শরীরে সেই বেগ প্রতিরোধ করতে পারল না। রেবা কিছু বোঝার আগেই সন্ধ্যাদি কুয়োর অন্ধকারে তলিয়ে গেল। ঝপাং করে শব্দ হতেই সম্বিত ফিরে পেল সে। কালো জলে প্রবল একটা আলোড়ন উঠলো কয়েক মুহূর্ত। ভিতরে মুখ বাড়িয়ে আকুলভাবে সে ডাকল, সন্ধ্যাদি। কোনো সাড়া নেই। মিনিটখানেক চুপ করে বুকের ধুকধুকি শান্ত হলে কুয়োর জলে ফেলে রাখা দড়ি বাঁধা বালতিটা টেনে চাতালে উঠিয়ে রাখল। আরো একবার চাপাগলায় ডাকলো, সন্ধ্যাদি…। কুয়োর গভীর কালো জল তখনো নি:স্তব্ধ। মৃদু হেসে বালতি থেকে সন্ধ্যাদির শাড়ির অংশ উঠিয়ে কপালের থেকে সিঁদুরের চিহ্নটা ঘষে মুছে ফেললো সে, তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ির পথ ধরল। কোণার ঘর থেকে তখন দয়াময়ী একঘেয়ে সুরে ডেকে চলেছেন, বৌমা, অ বৌমা, বৌমা, অ বৌমা…। ______________________________________________ কৃতজ্ঞতা স্বীকার: শাহিন সুলতানা

2003

151

সৃজিতা

জন্মদিনের উপহার

আজ আড্ডার জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে অভিনন্দন জানানো ছাড়াও কিছু তো লেখা উচিত; এই ভেবে কাল রাতে লিখতে বসলাম। বসলাম বললে ভুল হবে, কারণ লেখার কাজটা আমি শুয়ে শুয়ে করছিলাম। এমনিতেই খেলা দেখে শুতে দেরী হয়ে গেছে। শুয়ে শুয়ে ভাবছি কি লেখা যায়। গত বছরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত বছর এই সময় আমি আড্ডায় এসেছিলাম। জন্মদিন উপলক্ষে ভূতের গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। ফেসবুক মারফত সেই খবর জানতে পারি। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই এই পাতায় আসা। তার আগে কোনো আইডিয়া ছিল না আমার যে এরকম একটা পাতা আছে। গল্প ভালো লিখতে পারিনি কিন্তু এই পাতা আমার মন টেনেছিল। রয়ে গেলাম সদস্য হয়ে। একবছর কেটে গেল। তাই ভাবলাম একটা ভুতের গল্প লিখি, আগেরবার ভালো লিখতে পারিনি। কিন্তু লিখবো বললেই তো আর লেখা যায় না। গল্পের একটা বিষয়বস্তু থাকা চাই, যেটা গল্পের আকারে সাজাতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ কে যেন জোরে ধাক্কা দিল। ঘুম ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। খাটের সামনে বিশাল একটা পর্দার মত কিছু আছে, অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, কে! কে ওখানে? ----আমি আড্ডা। -----আড্ডা কারো নাম হয় নাকি! সবাই তো আড্ডা মারে। -----আমি বাংলা আড্ডা। আড্ডা ঘরের সদস্য হয়ে আমাকে চিনতে পারছো না! -----ও তুমি। কিন্তু তুমি এরকম আকার ধারণ করেছ কেন? ভূতের মতো! ------সদস্যরা যদি আমাকে ভুলে যায় তাহলে আমার মৃত্যু ঘটবে। আর আমি ভূত হয়ে যাব। তাই তো সদস্যদের কাছে আমার অনুরোধ আমাকে বাঁচাও। ------অ্যাডমিনদের কাছে যাও। পুরোনো সদস্যরা থাকতে আমার মতো নতুনের কাছে কেন! ------নতুন বলে কি কোন দায়িত্ব নেই! যখন আড্ডায় প্রথম এসেছিলে সবাই আপন করে নিয়ে ছিল। এখন অন্যদের সব দায় চাপিয়ে নিজে সরে যেতে চাইছো! পুরোনোদের সাথে নতুনরা দায়িত্ব না নিলে পাতা এগোবে না। ------এটা তো ভেবে দেখিনি! কথা দিচ্ছি সবাই মিলে বাংলা আড্ডা কে এগিয়ে নিয়ে যাব। ছায়াটা মিলিয়ে গেল। জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। একটা নতুন দিনের শুরু হল। আড্ডা তিন পেরিয়ে চারে পা রাখলো। এইভাবে এগিয়ে চলবে। আড্ডাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখবোই।।

111

12

দীপঙ্কর বসু

গো হারা

মকবুল মিয়াঁর গরু হারিয়েছে । শান্তশিষ্ট গরুটা ভারি আদরের ছিল মকবুল মিয়াঁর ।গরুর কপালে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি সাদা দাগ দেখে নাম রেখেছিল চাঁদকপালি ।আজ তিনদিন হতে চলল খোঁজ নেই চাঁদদকপালির । আর পাঁচটা দিনের মতই পরশুদিন খুকির মা অর্থাৎ মকবুলের বিবি ,সকালে গরুটাকে নিয়ে গিয়ে বাড়ির অদূরে খিড়কি পুকুরের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় খুঁটিতে বেঁধে রেখে এসেছিল ।ওখানেই গরুটা আপন মনে খুঁটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘাস পাতা খায় ,আবার মাঝে মাঝে গাছতলায় শুয়েবসে জাবর কাটে সারাটা দিন । তারপর বেলা পড়ে এলে খুকির মা ঘরের কাজকর্ম সেরে গরুটাকে ফিরিয়ে আনে ঘরে।কিন্তু পরশু বিকেলে গরু আনতে গিয়ে খুকির মা দেখে গরুটা গাছতলায় নেই ।কোথায় গেল সে ! আসেপাশে কোথাও তার চিহ্নমাত্র নেই ।ছুটতে ছুটতে বাড়ি এসে খুকির মা মকবুলকে খবরটা দেয় – চাঁদকপালিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা । পাড়াপড়শী কেউ বলতে পারলনা কিছুই ঘরের মাটির দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে আকাশপাতাল ভাবছিল মকবুল কি হল গরুটার কোথায় গেল সে !মকবুলের ভাবনায় বাধা পড়ল ।রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে গিয়ে মকবুলকে অমন অবস্থায় বসে থাকতে দেখে সাইকেল থামিয়ে মেহের আলি সামনে এসে দাঁড়ায় মকবুলের । “কি হল মিয়াঁ ,অমন হতভম্ব হয়ে বসে বসে কি অত ভাবছ ?” মকবুলএর মুখে গোটা বৃত্তান্ত শুনে গম্ভীর হয়ে যায় মেহের আলি । স্বগতোক্তি করার মত চাপা গলায় বলে ওঠে “হুমমম” তারপর একটু চিন্তা করে নিয়ে মকবুলের কাছে জানতে চায় “তা মিয়াঁ ,সব জায়গায় ত খুঁজে দেখলে কিন্তু একবারটি ইয়াকুব ভাই এর গদিতে খোঁজ নিয়েছ কি ? অই যে গ কালিতলার ইয়াকুব বালচাকা র গদিতে গ” ইয়াকুব বালাচাকা নামটা কানে যেতেই চমকে ওঠে মকবুল ।তাই তো ,ইয়াকুব বালাচাকার কথাটা তার মাথায় আসেনি তো !! অথচ গ্রামের আর সবার মতই মকবুলও জানে তেজারতি কারবার ছাড়াও ইয়াকুব বালাচাকার একটা চোরা কারবারের কথাও লোকের মুখে মুখে ফেরে ।কারবারটা আর কিছু নয় – সহজ কথায় গরুচুরি। তার চাঁদকপালির মতই গ্রামের এক আধটা গরু মাঠে ঘাটে চরতে চরতে হঠাৎ ই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়ে ঠাঁই পায় ইয়াকুবের কোনও এক গোপন খোঁয়াড়ে ।তারপর লোকমুখে কানাঘুষোয় সে খবর ঠিক পৌঁছে যায় গরুর মালিকের কাছে ।তার গরু ইয়াকুব ভাই এর হেপাজতে নিরাপদেই আছে ।অনতিবিলম্বে ইয়াকুব ভাইয়ের দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ বাবদ টাকা মিটিয়ে দিয়ে মালিক যেন নিজের গরু ফিরিয়ে নিয়ে আসে ।নচেৎ......। সে পরিণামের কথা মাথায় না আনাই ভাল । সেই হারিয়ে যাওয়া গরু হয় সুন্দরবনের খালবিল নদীনালা পেরিয়ে ভিন দেশে পাচার হবে নয় জবাই হবে । লোকে বলে মানুষ তো নয় ইয়াকুব বালাচাকা –সাক্ষাত নরপিশাচ একটা ।তা, লোকে যা বলে বলুক, তাতে ইয়াকুবের হবে কচু । মকবুলকে চুপ করে থাকতে দেখে মেহের আলি বলে “বলতো আমি খবর নিতে পারি ।আমি যাচ্ছি কালীতলাতেই। মনে হচ্ছে মন্দ কপাল তোমার ।এখন দেখ যদি কিছু খচ্চাপাতি করে গরু ছাড়িয়ে আনতে পার ।” বিকেলবেলাতেই খবর নিয়ে আসে মেহের আলি ।ঠিকই অনুমান করেছিল মেহের আলি ।মকবুলের গরু আছে ইয়াকুব ভাই এর খোঁয়াড়ে । মেহের এর অনুরোধে ইয়াকুব ভাই মকবুলের গরু ফেরৎ দিতে রাজি ,তবে তার জন্যে মকবুলকে দিতে হবে এক হাজার টাকা । “এক হাজার টাকা !!” মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মকবুলের । “কোথায় পাব ভাই এত টাকা” মেহের আলি সখেদে জবাব দেয় “কি আর করবে ভাই , গরু ফেরৎ পেতে হলে দুই একদিনের মধ্যে টাকাটা মিটিয়ে দিতে হবে ইয়াকুবের গদিতে” মকবুল হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে তার অল্প যে কটা টাকা সঞ্চিত আছে তা এবার বুঝি গেল গরুটার পেছনে ।কিন্তু ইয়াকুব যে ধরণের লোক তাতে তাকে কি বিশ্বাস করা যায়? ধর, টাকাটা পাবার পর ইয়াকুব যদি আবার নতুন কোন বায়নাক্কা ধরে তখন ?তখন কি হবে? তখন গরুতো গেলই আর টাকা কটাও মাঠে মারা গেল!” মকবুলের সন্দেহের কথাটা শুনে এবার মেহের আস্বস্ত করে ।“সে তুমি চিন্তা কোরনা গদিতে টাকা দিতে যাবার পথে বেদোখালির মাঠ পড়বে ,সে মাঠে যাতে তুমি তোমার গরুকে দেখতে পাও সে ব্যবস্থা নাহয় আমি করে দেব ইয়াকুব ভাই কে বলে । উপায়ান্তর না দেখে পরদিন মকবুল টাকাকড়ি নিয়ে হাজির হয় কালীতলায় ইয়াকুব বালাচাকার গদিতে ।পথে বেদোখালির মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখে পড়ে “ওই তো ,ওইতো তার আদরের চাঁদকপালি !কেমন নিশ্চিন্তে মাঠের মাঝখানে আপন মনে ঘাস খাচ্ছে ! বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে মকবুলের । মনে মনে কসম খায়,আজ চাঁদকপালিকে না নিয়ে বাড়ি ফিরবেনা । মকবুলকে ঘরে ঢুকতে দেখে ইয়াকুব বলে ওঠে “আরে মকবুল মিয়াঁ যে ,তা কি মনে করে ...? মকবুল মরীয়া ।সরাসরি কাজের কথায় আসে – “হুজুর আমার গরুটা কদিন হল হারিয়ে গেছে ।কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছিনি ,সেই অবস্থায় মেহের আলির কাছে শুনলুম আমার গরুটা নাকি হুজুরের হেপাজতে আছে ।মেহেরই বললে মকবুল শিগগির যা ইয়াকুব বাবুর পায়ে গিয়ে পড় । দয়ার শরীল বাবুর ।দেখবি ঠিক তিনি তোর দুঃখ ঘুচিয়ে দেবেন” । মকবুলের নিবেদন কানে যেতে ইয়াকুব এবার তার ছদ্মব্যস্ততা ছেড়ে টান টান হয়ে বসে ।নিজের নামের সঙ্গে বাবু ডাক শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে ইয়াকুব বালাচাকা । এত দিন ধরে জেনে এসেছে গাঁয়ের লোকে তাকে আড়ালে পিচাশ বলে ,সেই তাকেই কেউ মানী লোকদের মত বাবু বলবে এ তার স্বপ্নের অতীত । আগ্রহ চেপে রাখতে পারেনা ইয়াকুব । মকবুলকে জিজ্ঞাসা করে “কি বললে মেহের ? মেহের আমাকে বাবু বললে, বাবু ?তুই ঠিক শুনিচিস তো আমাকে ইয়াকুব বাবু বলেচে?” মকবুল মিনমিন করে অবাব দেয় “আজ্ঞে ,সেই কথাই ত বললে মেহের ।বললে বাবুর দয়ার শরীল । সামান্য কিছু টাকা বাবুকে নজরানা দিলেই ইয়াকুব বাবু তোর হারিয়ে যাওয়া গরু ফিরিয়ে দেবেন” “আরে থাক থাক ,তুই গরীব মানুষ ,তোকে আর টাকা দিতে হবেনা । বাবু বলেচে আমায় ! যা ওই বেদোখালির মাঠে তোর গরু চরছে ।আমার লোক আছে সেখানে ।তাকে গিয়ে বলবি ইয়াকুব বাবুর হুকুম হয়েছে তোকে গরুটা ফেরৎ দিয়ে দেবার।তা, হ্যাঁ রে তুই ঠিক শুনিচিস তো মেহের আমাকে বাবু বললে?” “আজ্ঞে আমি ঠিকই শুনেছি বাবু ,এবার তবে আমি আসি বাবু ? বেলা হয়ে এল ।এর পর গরুটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দিন কাবার হয়ে যাবে” ইয়াকুবের গলায় যেন মধু ঝরে পড়ে – “হ্যাঁ হ্যাঁ আর দেরি করিসনি ।জলদি যা ...। আমায় বাবু বললে !!”

90

7

মনোজ ভট্টাচার্য

ডন – তাকে ভালো লাগে ! চেতনা !

ডন – তাকে ভালো লাগে ! চেতনা ! একটি উপাখ্যান ! ডন ছি হতে - একটি ফ্যান্টাসি নাটক হতে পারে ! কিন্তু আমি যা লিখছি – সেটা সত্যি ! এমনকি একাডেমী চত্বরে পাথরের দিব্যি ! কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে অন লাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে আটকে গেলাম ! এখানে আমি এখনও ক্রেডিট কার্ডে রপ্ত হতে পারিনি ! – তা হাল ছেড়ে দিয়ে ভেবেছিলাম – একাডেমীতে গিয়ে টিকিট কাটবো ! দুপুরে ফোন এলো । একাডেমী থেকে – আমরা কি অন লাইনে টিকিট কাটতে চাইছি ? – বললাম কোথায় আটকাচ্ছে ! একজন আছেন চ্যাটার্জি – উনি বললেন আরেকবার চেষ্টা করতে । যথারীতি হল না ! তখন আমার স্ত্রী ফোন তুলে সেই চ্যাটার্জিকে অনুরোধ করলো – আমাদের জন্যে টিকিট রাখতে । প্রথমে গাইগুই করে রাজি হল ! স্ত্রীর বক্তব্য – অরুন মুখোপাধ্যায়ের থিয়েটার আমরা প্রথম থেকে দেখছি ! -সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার জন্যে ডিস্কাউন্ট দিচ্ছেন না ! একটা সুবিধে তো করবেন – টিকিট রেখে দিন ! আমরা গিয়ে নিয়ে নেবো । - যদিও অসুবিধে কি – ওদের - বুঝতে পারিনি – পরে দেখলাম রাজি হয়ে গেল ! – আধ ঘণ্টা পরে – টিকিটের নাম্বারও দিয়ে দিল ! পিকচার আভি ভি বাকি হায় ! একাডেমীতে আমরা আগেই পৌঁছে টিকিট পকেটে পুরে ঘুরতে লাগলাম ! থিয়েটারের কলা কুশলীদের মোটামুটি আমরা চিনি । এটা আগেও ওরা করেছে ! এখন চেতনা গোষ্ঠীর পরিচালনায় । এই শোটা এগারোতম । দেখলাম অনেক বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এসেছেন । অনেকে সিরিয়ালে করেন ! এবং ব্রেকের সময় দেখলাম সৌমিত্রবাবুকে । - দাঁড়িয়ে নমস্কার করলাম – উনিও যথারীতি তাই করলেন ! নাটক আরম্ভ হোল ! সুজন ও সুমন – দুজনেই আছে । গল্পটা আমাদের মনে ছিল না । - সেই ডন কুইক্সট বলতাম ছোটবেলায় ! স্পেনের লা মাঞ্চা অঞ্চলের এক মাঝ বয়েসী আদর্শবাদী মানুষ ! একজন সহকারী - সাংকো পাঞ্জাকে সঙ্গে করে পৃথিবীর জঞ্জাল সাফ করতে বেরিয়ে পড়ল । চোখে তার স্বপ্নের নায়িকা – মহীয়সী নারী আলডনসাঁ বা ডুলিসিনিয়া ! – প্রচুর কলাকুশলী ! এখনকার প্রত্যেকেই বেশ ভালো অভিনয় করে ! মঞ্চ আলো শব্দ ইত্যাদি খুব দক্ষতার সঙ্গেই ব্যবহার করে । নাটকে প্রধান যা দরকার – গতি – এই নাটকের সেই গতিই নাটককে দাঁড় করিয়েছে । জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ উন্মাদ - না - উন্মাদ শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী - মুল বক্তব্য অর্থাৎ ডনের আদর্শবাদী ভাবনা – তাও কিন্তু ক্রিয়াশীল ! কোনও অভিনেতাকে নিশ্চুপ দেখিনি ! বিশেষ করে ডন বা সাংকো পাঞ্জা ! সারাক্ষণই মঞ্চ জুড়ে নেচে যাচ্ছে ! আরও একজন ডনের সেই মহীয়সী নারী – ডুলিসিনিয়া ! – অপেরাধর্মী হওয়ার ফলে দর্শকদের একেবারে বোর হতে দেয় নি! নীলের কথায় জানা গেল – এরপরের অভিনয় হবে আগস্ট মাসে ! বেশ অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা নাটক দেখা হোল ! মনোজ

87

5

দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

আজ এই গানটা রেখে যাই এরা পরকে আপন করে আপনারে পর বাহিরে বাঁশির রবে ছেড়ে যায় ঘর https://youtu.be/F2CQo0msg9M

1562

136

শিবাংশু

জাতি অপমানা

বাবার অটোগ্র্যাফ খাতায় আচার্য সুনীতিকুমার লিখে দিয়েছিলেন তুলসীদাসের একটা দোঁহা| " যদ্যপি জগ দারুণ‚ দুখ নানা‚ সব তেঁ কঠিন জাতি অপমানা . প্রায় চুয়াত্তর বছর আগের কথা| লাটসাহেবের বাড়িতে তখনও ইউনিয়ন জ্যাক উড়তো| তাঁরা ভেবেছিলেন একদিন আমরা 'জাতি-অপমানা' জয় করবো| ব্যস‚ ইউনিয়ন জ্যাকটা নামিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা| জ্ঞান হবার সময় থেকে লেখাটি দেখেছি| 'জাতি-অপমানা যে কী ব্যাপার সেটা জানতে হাত ধরেছি কবির| সারা পরিবার আদ্যন্ত রবীন্দ্রনিমজ্জিত| সেই মানুষ যাঁর মননে আন্তর্জাতিকতা একটা ভিন্ন মাত্রা ছিল| তাঁর যা কিছু সিদ্ধি সব কিছুর মধ্যে দেশের উপরে জেগে থাকতো তাঁর আন্তর্জাতিক মানবতাবোধ| গান্ধিজির মতো মানুষও বুঝে উঠতে পারেননি কবির স্বভাবের এই দিকটি| 'Religion of Man' লিখে এদেশে ওদেশে সব মূঢ় জাতীয়তাবাদীদের থেকে নিন্দার ভাগী হয়েছিলেন| কিন্তু 'জাতি অপমানা'র বেদনা তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে| জালিয়াঁওয়ালাবাগ নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া তো সবাই জানে| 'প্রবাসী' হওয়া 'অপরাধ' নয়| তার জন্য কোনও যথার্থীকরণও নিষ্প্রয়োজন| কোনটা যে 'দেশ' সেটাই তো সবসময় বুঝে ওঠা যায়না| চামড়ার রং নিয়ে পক্ষপাত তো এদেশেও রয়েছে পুরো মাত্রায়| রয়েছে জন্মগত জাতি নিয়ে কটাক্ষ| সে তো ব্যক্তি আমি পারিবারিক ভাবে দেখতে গেলে নিজের দেশেই 'প্রবাসী' চার পুরুষ| আমার যে বিপুল পরিমাণ আত্মীয়-বন্ধু ছড়িয়ে আছেন য়ুরোপ বা আমেরিকায়‚ তাঁদের সঙ্গে যখনই সাক্ষাৎ হয়‚ জানতে চাই 'জাতি অপমানা' কেমন লাগে| নবীন প্রজন্মের মানুষেরা হয়তো ততোটা স্পর্শকাতর ন'ন| কিন্তু চল্লিশ পেরোনো আত্মীয়রা নিজেদের অস্বস্তি ঢাকেন না| একই স্তরের‚ হয়তো উচ্চ স্তরেরও যোগ্যতা‚ কুশলতা নিয়েও শুনেছি শাদা চামড়াদের থেকে অনেক অধস্তন থাকার বেদনা সইতে হয়| আমার এক ভাই‚ সে এম আই টি ও হার্ভার্ডে উচ্চ শিক্ষিত| দীর্ঘদিন বস্টনে থাকে| হঠাৎ সেদিন বললো কোথাও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল| হঠাৎ দু-চারজন শাদা চামড়া স্রেফ ধাক্কা দিয়ে তাকে লাইন থেকে বার করে নিজেরা দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানে| বললো‚ পিছনে গিয়ে দাঁড়াও| আমি বলি‚ কী করলি তখন? সে বললো‚ কী আর করবো? পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম| বলি‚ কেউ কিছু বললো না? না দাদা‚ কেউ কিছু বলেনা| আমার এক ভায়রাভাই আরো লক্ষ মানুষের মতো 'মূলধন' জমিয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিল| কারণ তখনও তার গায়ের চামড়াটা একটু মিহি থেকে গিয়েছিল| কিন্তু এখন সে আরো লক্ষ মানুষের মতো সব পেয়েছির দেশের অংশ হয়ে গিয়েছে| এগুলো হয়তো নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা| অন্যরকম উদাহরণও হয়তো রয়েছে ভূরি ভূরি| উপার্জনের মাত্রা‚ যাপনের স্থিরতা‚ সাহেবি অনুশাসনের স্বাচ্ছন্দ্য‚ এককালের 'সচেতন' ভারতীয়দের জাতি-অপমানা ভুলিয়ে দেয়| সেদেশে একটা সরকার পাল্টায় | কিছুদিন উদ্বেগে থাকে| আবার মানিয়ে নেয়| ভারতীয়দের মতো 'মানিয়ে' নেবার ক্ষমতা শুধু চিনদেশের মানুষদেরই থাকে| পুরোনো সভ্যতার পুণ্য| মানুষের রক্তে জাতিহিংসা রয়েছে| কেউ তাকে লালনপালন করে আনন্দ পায়| কেউ লুকিয়ে রাখে| কিন্তু বিষ থেকেই যায়| কী এদেশে‚ কী ওদেশে| কখনও মনে হয় তুলসী কি সুনীতিকুমার কী এক অলীক দেশের মানুষ? যাঁদের জন্য শুধু রাখা থাকে আমাদের ব্যর্থ নমস্কার|

115

4

উদাসী হাওয়া

সাতকাহন

সাতকাহন ১ অমল ধবল পাবেনা বৃষ্টি পাবে শ্যাওলা পরা ছাদ দুটো চ্যাংড়া চড়ুই তুড়ি মেরে আসে জড়সড় আরও দুটো কাঁধ। পাগল হুট করে ছলাত্ ছল গায়ে-পড়া ছিটবেই জল ভিজে শাড়ি ভিজে বি-ফ্ল্যাটে কিছু শুকনোর সাথে ইচ্ছেদের ভুলভাল মেলে ধরে রাতে। ছুঁড়ে দিলি উড়ো মস্তান বল হাত ধুলি নিঙাড়ি আঁচল তারপর ময়দানে, মনকথা, পুরাকথা, মাটিমুখ দাঁতচিপে যত্নে রাখিস উথলি অনর্গল। সেনরিটার বেসুরো বীণ কেঁদে ফেলে বর্ষার দিন ঝাঁপিয়ে আছড়ে বকা ‘তুম বিন যাউ কাঁহা’, বোকা, ফের ফোনে যদি বলে উঠিস, পাগল! চুপ-পায়ে চিলেকোঠা! বাঁধা ছিল অর্গল! ২ সাবেকী রঙ্গমঞ্চ পুরোটাই জানে প্লিজ, নিয়ে যাবি? প্রিয় নাটক টানে! ভাবিনি আসবিনা, বসবিনা, অনাম্নীই হাঁটু-মুড়ে পাশে, গা ঝেড়ে ভুলপথ ঠিক পথেই মোটামুটি উল্লাসিনীর অবজ্ঞার হুতাসে। এরপর ধুম জ্বর বিকেল নামে প্রলাপের আঁচে সন্ধে হল, কথা আঁকি ভুল ছিল, জলঘসা কাঁচে গুঁড়ো গুঁড়ো অস্বীকার আচমকার ইতিহাসে। ৩ অবিমৃষ্যকারি বিচ্যুতি প্রবেশিকা বৃষ্টিকে ভাল খবর ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিল। বাজপাখি নিঃশব্দে আরও ভাল ছিল! বুদ্ধিমতী ঠোঁট তোর আগুন ছুঁয়েছিল চুড়িদারে চক্রযানে তোর গজদন্ত হাসি কে আর দলামোচা সাতকাহন শেষ রেশ রাখে! ৪ বিদেশী ফিনকি হাওয়ায় হাওয়ায় আরও ভাল কৃতকার্য্য পাওয়ায়! বাজে, ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া খামচিঠিরা বৃষ্টিতে নৌকারা ছন্দবদ্ধ উল্টাতে থাকে। ৫ এখন আনন্দজালে রাতপোকা তোলে মাতোয়ারা সূর্য চাঁদ হইচই পৃথিবীরা ঝলমল দেয়ালে দেয়ালে ডুব দিলি পানকৌটি জল ঝেড়ে ডানা মেলিস হুল্লোড় আড়ালে ফেসবুকে ছশো মিতা তোর অন্তরীক্ষে নৌকা ভাসায়। ৬ শহরতলি কেঁদে যাবে, জমবেই জল সোনা রুপা খুঁজে যাবে জানে পাবেনা তল উৎসাহী জমকালো কত ভালোর ভিড়ে ‘অবগুন্ঠন যায় যে উড়ে’ তলে তলে নৌকা কাঠ শুকায় ডাঙায়। ৭ কি করিস! যত্নে থাকিস! সুন্দর মোবাইল হাতে যতই ফিরে থাকিস, সাকুল্যে পাড়ার বেঞ্চটা কাঁদে ‘অনেক হয়েছে লেনাদেনা’ যত্নে রাখি অসুখ আর গান লিখে যাবো কিছু প্রশ্নের জানাবো না কিসের আশায়।

136

5