মোহিতলাল v2.0

পচা ডোবা টু প্যাসিফিক

পচা ডোবা টু সাউথ প্যাসিফিক -পর্ব ৩ (কালুয়া ও কালাপানি) Day-1 (ক) নির্দিষ্ট কেবিনের সামনে হাজির হয়ে দেখি আমাদের লাগেজ দরজার সামনে হাজির| সব কিছুই কাঁটায় কাঁটায়| যাত্রার বেশ কিছুদিন আগেই ব্যাগেজ ট্যাগ‚ গলার দড়ি (Lanyard) ও আইডি কার্ড পোষ্টে এসে গিয়েছিল| আইডি কার্ডে দরজা খুলবে‚ কোন কিছু একস্ট্রা কিনলে‚ ক্যাসিনোতে গুটি কিনলে কার্ড swipe করলেই হলো| যাবার আগে টাকা মিটিয়ে দিলেই হলো‚ নো ক্যাশ ! কেমন যেন দেশ দেশ লাগছে না? ক্যাশলেস সোসাইটি! আমাদের কলীগ চীনা মেয়েটি যে আগের ট্য উরে গেছে‚ পই পই করে মানা করে দিয়েছিল‚ জাহাজে উঠেই প্রথম কাজ হবে- ওদেরকে বলে দেয়া‚ টিপস ক্যাশে দেবে‚ নতুবা মাথা পিছু তেরো ডলার প্রতিদিন টিপস কেটে নেবে| ডলার তায় আবার ইউএস‚ আমেরিকান জাহাজ কিনা| সব কিছুতেই USD| এ এক মহা জ্বালা‚ সব কিছুকেই পয়েন্ট ৮ দিয়ে ভাগ করা| দশ ডলার দাম দেখেই ধেই ধেই করে নাচলে বিপদ‚ ১২ ডলার আমাদের টাকায়| এ হলো উলটো বাঁশ| দেশে (অবস্থান মাত্র‚ কোন বিশেষ দেশের নাম করা হচ্ছে না এখানে) গেলে ৫০ অথবা ৮০ দিয়ে ভাগ করে ডলারে দামের আইডিয়া হলো! (৫০ বা ৮০ দেশ অনুযায়ী!)| এইবার চাঁদু বোঝো‚ কত ধানে কত চাল! কেবিনে ঢুকেই তো চক্ষু ছানা বড়া‚ সেই ছই নৌকোর থেকে লক্ষ কোটি গুণ আলাদা| কি নেই| ভাল হোটেলে যা যা থাকে| পছন্দ হলো বাথরুমটা| এত সুন্দর ছোট্ট ডিজাইন‚ বিশেষ করে শাওয়ার কিউবিকল| না টাব নেই| মগটি তার নিজের যায়গায় প্রতিস্থাপন করা হলো‚ ঘট? এবং বলাই বাহুল্য‚ এতক্ষণ হিসি চেপে ছিলাম কিনা| আচ্ছা‚ এই যে রাজা রাণীদের coronation হয়‚ ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে‚ ওদের হিসি পায় না? অথবা ঐ যে flowing গাউন পরে বিয়ে থা‚ তখন হিসি পেয়ে গেলে? জনগণ‚ আমার কৌতূহল মাত্র‚ অন্য কিছু ভেবে বসবেন না| ওহ‚ এই প্রসঙ্গে বলি‚ পৃথিবীর কোন দেশে বাথরুমেই শাওয়ারের কল একরকম নয়| হার্ভার্ডের হস্টেলে গিয়ে তো কোন প্রকারে ফিগার আউট করতেই পারিনি‚ শেষমেশ ‚'বালতী লাও‚ মগ লাও'| (হার্ভার্ড? না আমি জ্ঞানার্জন হেতু যাই নাই‚ এক সপ্তাহের নিমিত্ত তথাকথিত Executive Development Prograamme ‚ মানে পাইয়ে দেয়া আর কি!)| ব্যাটাদের তো বহু পুরোনো বিল্ডিং‚ প্লাম্বিং ও সেই আদ্যিকালের‚ তায় আমেরিকা| বাই দ্য ওয়ে‚ সেখানে পাশবালিশও ছিল| এই বস্তুটি সাধারণত: কাঠের লতাপাতার কাজকরা‚ মশারীর ব্যাটাম ওয়ালা খাটে ‚ বাঙ্গালী* বাড়ীর (*অবস্থান মাত্র) শয়ন কক্ষে পরিলক্ষিত হয়! হার্ভার্ডে কিঁউ? ব্রহ্মচারী শিক্ষার্থীদের নিদ্রা আনয়নের সুবিধার নিমিত্ত? May be!! বালতী মগ দিয়েছিল‚ কোথা থেকে জানি না‚ ওরা সবাইকে ঘাড় ধরে ম্যানেজমেন্ট শেখায়‚ আমার মত পিটপিটে কাস্টোমারের সুখ সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখে| আপনি আচরি ধর্ম.| stay tuned ‚ মোগল সরাই পৌঁছুলে (খ) এর বগী জুড়ে দেয়া হবে! ---- (খ) এসে গেছে‚ ঢং ঢং করে গঙ্গা (ও হরি শোন) পেরিয়েছে| পৌঁছে গেছে মোগল সরাই| নামটা শুনলেই কেমন যেন 'পশ্চিমে বেড়াতে গেছে 'র বর্ণনা মনে আসে| যে কোন হোটেলে ঢুকেই মহতী কর্ম হলো- টয়লেটে গিয়ে হালকা হওয়া| ঐ যেমন বেড়ালরা নিজের টেরিটোরি মার্ক করে‚ মানে এই ঘরটি এখন আমার| আধো আধো তন্দ্রা এসে গিয়েছিল‚ চোখ মুছে দেখি জাহাজ চলতে শুরু করেছে‚ আস্ত একটা রাস্তা ও তার চারপাশের বাড়ী ঘরদোর সমেত| টাইটানিক (ছবিতে) কে গুণে গুণে গোল দিতে পারে| কেবল হায়াত রিজেন্সীর মত মারকানা মার্বেলের মেঝের অভাব‚ বাহারী সিঁড়ি আছে তবে balustrade কাঠের| চলছে তো গজেন্দ্র গমণে‚ রাজকীয় মহিমায়- অনেকটা হিন্দী সিরিয়ালের মতো‚ দশপা যেতে পুরো ফার্ষ্ট হাফ| আগেই বলেছি‚ মেরেকেটে ১৮ নট প্রতি ঘন্টায়| হালকা‚ খুবই হালকা দুলুনী| জানলা দিয়ে অন্তহীন আকাশ‚ ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নীল জলে সাদা ফেনা তুলে গন্ধমাদন এহিয়ে চলেছে| ভাগ্যিস ‚'য়ুরোপ যাত্রীর' সময় এতসব বিলাস উপকরণ ছিল না‚ নয়তো রচনাবলীর জন্য দু তাকও কাফি নয়‚ পুরো বুক কেস ইস্তেমাল করতে হতো| দরজায় নক‚ হাউসকীপিং| খুলতেই আমাদের মতই মুখের আড়া মানে কালুয়া আর কি‚অল্পবয়সী ছোকরা| শ্রীনিবাসন‚ তিনিই আমাদের মত ১৮টি রুমের তত্ত্বাবধায়ক| পরে জানা গেল‚ দেখা গেল কাজের লোক প্রায় সবই কালুয়া আর ফিলিপিনো(ওদেরকে কি কালুয়া বলা সঙ্গত হবে?)| রুম সার্ভিস‚ রেস্টুরেন্ট‚ ডাইনিং হল‚ সিকিউরিটি‚ সবেতেই কালুয়া- কালোয় কালোয় ধূল পরিমাণ! এত কম মাইনেতে আর কে কাজ করতে আসবে| তার ওপর আমেরিকান কোম্পানী‚ ১০০০/১২০০ মত দেয়‚ ওর চেয়ে বেশী পয়সা তো বেকার ভাতায় মেলে অতএব আমরা মোটামুটি হিন্দী বাঙলায় কাজ চালালাম| কেউ ফুলবাগানের‚ কেউ বেহালার‚ শিলিগুড়ির বা নাগেরকোয়েলের| খালাসীদের বেশী দেখতে পাইনি‚ সেখানেও আমাদের মুখের আড়া র প্রাধান্য‚ জানিনা সৈয়দ সাহেবের চট্টগ্রাম বা সিলেটের কিনা| বছরে আটমাস কনট্রাক্ট‚ সর্বদা অন ডিউটি‚ দুমাস ছুটি| মাইনে ছাড়াও ভালমত বকশিস মেলে‚ খাওয়া থাকা ফ্রী| তো হিসেব করে দেখা গেল‚ দেশী টঙ্কায় লাখ পাঁচেক তো হয়েই যায়| (ছবি আসিতেছে| আগামীকল্য জুড়ে দেয়া হবে)

97

11

মোহিতলাল v2.0

আজকের আপডেট

পর্ব-৯ কুইক আপডেট| আজকাল বেশ বাতিক হয়েছে‚ সিনেমা দেখার| রোজ অফিস থেকে ফিরে ইউটিউবে একটা সিনেমা বসিয়ে রেখে‚ তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে‚play বাটন টেপা| স্মার্ট টিভিতে কি মজা! না‚ বিপ্লব আসুক না আসুক অপটিকাল ফাইবারের কানেকশান নেয়া তরান্বিত করতে হবে| আজ দেখলাম‚ 'সাঁঝবাতির রূপকথারা'- দেশে গল্পটা পড়েছিলাম‚ অনেকদিন আগে| জয়ের উপন্যাসগুলো এক একটা লম্বা কবিতা যেন| সিনেমাটা দেখে গল্পটা পড়ার মতো অনুভূতি হয়নি তবে আলাদাভাবে সিনেমাটাও কবিতা হয়ে উঠেছে| কবিতা ঠিক আমার domain নয় তবু জয়ের " একদিন এক দেবী বৃক্ষে দিয়ে ঠেস বলে বসলো‚ মনখারাপ আমার অভ্যেস" বেশ লাগে|

463

29

দীপঙ্কর বসু

সে দিন দুজনে

তালা কাহিনী বেশ অনেকটা দেরি করে শয্যাত্যাগ করে উঠে সবে দিনের প্রথম কাপ চায়ে একটা চুমুক দিয়েছেন অরুণ বাবু , আর ঠিক তখনই দেওয়ালে লটকান কলিং বেলটা টুং টাং শব্দে বেজে উঠল । -“দুররর ,কে আবার এলো এই সাত সকালে” কিছুটা বিরক্তির সঙ্গেই মনে মনে স্বগতোক্তি করেন অরুণ বাবু । অভ্যাস বশে পরনের লুঙ্গিটা হঠাৎ খুলে যাবার কল্পিত সম্ভাবনা রুখতেই যেন খুঁটটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে আদুর গায়েই এগিয়ে যান দরজার দিকে । দরজাটা একটু ফাঁক করে গলাটাকে বাড়িয়ে দেখে নিতে চান আগন্তুককে । “ওহ আপনি !এত সকালে ! কি ব্যপার !” প্রশ্নটা বিপন্নমুখে দরজার বাইরে দন্ডায়মানা বুলবুলির দিকে ছুঁড়ে দেন অরুণ বাবু । সম্ভবত মনের বিরক্তির কিছুটা আঁচ রয়ে গিয়েছিল প্রশ্নটায় ।অরুণ বাবু লক্ষ্য করলেন বুলবুলির মুখের বিপন্নভাবটা যেন আরও বেড়ে গিয়ে মুখটা কুঁচকে আরও ছোট হয়ে গেল । কিছুটা সানুনাসিক কণ্ঠে বুলবুলি এবারে তার আগমনের হেতুটা ব্যক্ত করে । “দেখুন না দাদা ,সক্কাল সক্কাল কি বিপদেই না পড়েছি । ছুটকির বাবা অফিস যাবে ,তার একটু পরেই ছুটকির স্কুলের বাস আসবে ,তাকে নিয়ে আমি মোড়ের মাথায় যাব বাসে তুলে দিতে এদিকে গেটের তালাটা কিছুতেই খোলা যাচ্ছেনা ।আমি আর ছুটকির বাবা দুজনেই খেপে খেপে অনেক চেষ্টা করেও তালাটা খুলতে পারলামনা । আপনি একবারটি এসে দেখবেন,দাদা ?” রাগের চোটে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি গোটা শরীরটা জ্বলে ওঠে । এ এক যন্ত্রণা হয়েছে অরুণ বাবুর । আদতে শান্তি প্রিয় ,ঠাণ্ডা মাথার মানুষটি কারো সাতে পাঁচে থাকেননা ,চট করে গলা তুলে কথা বলেননা কারো সঙ্গে ,সারাদিন নিজের মনেই থাকেন । কিন্তু তাতেই হয়েছে বিপদ । তাঁর নির্বিবাদী স্বভাবের জন্য একদিকে যেমন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা কিছুটা মান্য করে চলে অরুনবাবুকে । তেমনি আবার তাদের বিশ্বাস ঠিক এমনি একজন সরল নির্বিবাদী মিষ্টভাষী মানুষ ই ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণকারী কমিটির সম্পাদক হিসেবে একেবারে খাপে খাপে ফিট মানুষ ।তিনিই পারবেন ফ্ল্যাটের আবাসিকদের সঙ্গে নিয়ে চলতে । ঘোর অনিচ্ছা সত্বেও উপরোধে ঢেঁকি গিলেছিলেন অরুণ বাবু সেদিন । আর ঝামেলাটা শুরু তখন থেকেই । ফ্ল্যাটের কমন স্পেস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কাজের মাসি আছে ,ড্রেনেজ লাইন ঠিক ঠাক রাখার জন্যে আছে জগদীশ ম্যাথর ,ছোটখাটো সারাই মেরামতির জন্যে কিছু মিস্তিরির তালিকা আছে কমিটির খাতায় । প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র করা ছাড়া এমনিতে সম্পাদকের কাজ বলতে বিশেষ কিছুই নেই । তবে , বড় মাপের কোনা ঝামেলা পোহাতে না হলেও খুচরো ঝামেলা লেগেই থাকে । যেমন আজ সকালের তালা বিভ্রাট । তালার লিভারগুলো কোন কারণে জ্যাম হয়ে যাওয়ায় চাবির মোচড়ে না খুললে সম্পাদকের কিই বা করার থাকে? তিনিতো আর বিশ্বকর্মা নন ।তবু তালা খুলছেনা – দাদাকে বল । এ বড় আজব কথা ! ওপর তলা থেকে কে বা কারা রোজ ময়লা ফেলে নিচের কমন স্পেস নোংরা করছে – দাদার কাছে নালিশ জানাও , তেতলার মুকুজ্জের পেয়ে রিঙ্কু এক পাল ছেলে নিয়ে এসে ঘরের মধ্যে আড্ডা জমাচ্ছে – আবদার কর থানায় নালিশ জানানর । অন্যান্য কেস গুলোতে টুকটাক মিঠে কথা দিয়ে লোকজনকে সমলে নেবার কায়দাটা অরুণ বাবুর কাছে জলভাত ।শুধু মুকুজ্জের মেয়ের হল্লাবাজির বিরুদ্ধে থানায় নালিশ জানানো নিয়ে ঘোর আপত্তি অরুণ বাবুর । ফরিয়াদি পক্ষের অভিযোগের পালটা প্রশ্ন তোলেন - রিঙ্কু বা তার বন্ধুরা কি রিঙ্কুদের ফ্ল্যাটের ভেতরেই হৈহুল্লোড় না করে তাদের ফ্ল্যাটে কোন রকম উৎপাত করে? জবাব আসে –“ন্না ।তা করেনা । ফরিয়াদিদের গলার স্বর নেমে আসে । অরুনবাবু এবারে কিছুটা গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করেন , “তা হলে থানায় রিঙ্কুর বিরুদ্ধে ঠিক কি অভিযোগ জানান হবে?কার ঘরে কে এলো গেল তাই নিয়ে কি কোন অভিযোগ পুলিশ নেবে?” ফরিয়াদি পক্ষ চুপ । এই ভাবেই টুকটাক ফুস মন্তরে দিন চলে যায় ।অরুণ বাবু প্রায়ই ভাবেন এবারে একদিন মিটিং ডেকে অব্যাহতি চাইবেন এই উদোর বোঝা বওয়ার হাত থেকে । কিন্তু মিটিং এ প্রতিবারই একই গল্প উঠে আসে। দেখা যায় সকলেরই অফিস আদালত আছে । কেউ বা অত্যন্ত রগ চটা ,কারো হার্টের ব্যামো ...। অগত্যা নিস্তার নেই অরুণ বাবুর । “আচ্ছা ,চলুন । দেখি কি হল আবার তালাটার” ভাবখানা এমন ,যেন তিনি গিয়ে তালাটার সামনে দাঁড়িয়ে “চিচিং ফাঁক” বললেই অমনি বেয়াড়া তালাটা আপনা হতেই খুলে যাবে ! গায়ে একটা শার্ট পরে নিয়ে বোতামগুলো লাগাতে লাগাতেই নিচে নেমে আসেন অরুণ বাবু । সেখানে তখন বুলবুলির কত্তামশাই অসহায়ের মত চাবির তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ,আর বুলবুলি সেই একই রকম বিপন্ন মুখে সানুনাসিক স্বরে ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছে –“তোমার আজ আর আটটা পাঁচের লোকালটা ধরা হয়ে উঠবেনা ।কি একটা মিটিং ছিল বলেছিলে, সেটার কি হবে তা কে জানে !” অকুস্থলে অরুণ বাবুকে দেখতে পেয়ে বুলবুলি আবার শুরু করে – “কি হবে বলুন তো দাদা ।তালাটা্তো কিছুতেই খুলছেনা ।এদিকে ছুটকির বাবার স্কুলে একটা জরুরী মিটিং আছে ,ছুটকির স্কুল বাস আসার সময় হয়ে আসছে ... কাজের মেয়েগুলোকে পই পই করে বলা হয় অমন হ্যাঁচকা মেরে তালা খোলা বন্ধ না করতে,কিন্তু কে শোনে কার কথা।... “অ্যাই ,তুমি একটু চুপ করবে ? তখন থেকে সেই ঘ্যানর ঘ্যানর করেই চলেছে...”। খেঁকিয়ে ওঠেন চ্যাটার্জি বাবু । স্বামীর ধমকে বুলবুলির নাকি কান্না এক্কেবারে বন্ধ । কাঁচুমাচু মুখে সে এক কোনে দাঁড়িয়ে থাকে । অরুণ বাবু এগিয়ে যান বন্ধ গেটের দিকে । “দেখি তো আমার চাবিটা দিয়ে খোলা যায় কিনা তালাটা” । অভিশপ্ত তালাটা বাঁহাতে ধরে ডান হাতে চাবি বাগিয়ে ঘোরান অরুণ বাবু । কিন্তু ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবাধ্য ছেলেটার মতই তালাটাও আর রা কাড়েনা । মহা ফাঁপরে পড়ে যান অরুণ বাবু। বুঝে উঠতে পারেননা কি করা যায়- “তালাটা কি ভাঙতে হবে দাদা”? কিছুটা দ্বিধা জড়িত কণ্ঠে বুলবুলি জানতে চায় । “ওনার আটটা পাঁচের লোকালটা তো গেলই ,ওদিকে ছুটকির স্কুল বাস ...” “আ বা র...।!” গর্জে ওঠেন চ্যাটার্জি বাবু ।স্বামীর রক্ত চক্ষুর দাপটে বাক্যটা অসম্পূর্ণই থেকে যায় বুলবুলির । “গোদরেজের তালা ভাঙ্গা কি চাট্টিখানি কাজ?” অরুণ বাবু র কথায় বুলবুলি একটু সাহস পায় । বলে – “কাছেই একটা ছেলে থাকে। সে মাঝে মাঝে খালি বাড়িতে তালা ভেঙ্গে ঢুকে চুরিচামারি করে । নিচের খোকনের দোকানে তাকে দেখি মঝে মাঝে । ছেলেটাকে একটা খবর দিলে হয়না”! হাসি চেপে রাখতে পারেননা অরুণ বাবু । ততক্ষনে আরও দুজন অফিসযাত্রী নেমে এসেছেন। উদবিগ্ন তারাও - এসেছেন মণিকা রায় । যদিও আপাতত তার বাইরে যাবার তাড়া নেই তবু ঝামেলার গন্ধ পেয়ে আসা । ভিড়ের পেছন থেকে ফোড়ন কাটে - “ভাল কথা বলেছ বুলবুলিদি । নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে চোরকে দিয়ে নিজের ঘরের তালা ভাঙ্গানো !! এ একটা রেকর্ড হবে বটে ” ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলে “আশিস বাবুর কাছে কি একটা তেল আছে ,যেটা লাগালে নাকি জ্যাম হয়ে যাওয়া তালা খুলে যায় ।চেয়ে আনব তেলটা?” পাখির মত উড়ে যায় মণিকা রায় । কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে প্লাস্টিকের ছোট একটা বোতল হাতে। ফোটা ফোটা করে ঢালা হয় সেই তেল চাবির গর্তে । একটু অপেক্ষা । তার পর আবার প্রত্যেকের আনা চাবি দিয়ে একবার করে তালাটাকে খোলার নিষ্ফল চেষ্টা । তালা নট নড়ন চড়ন । উপস্থিত জনতার মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ওঠে – “এক এক জনকে দেখি তালা খোলার সময়ে গায়ের পুরো জোরটা তালার ওপরে লাগিয়ে দেয় ।।কি দরকার বাপু ...” কে আবার চাপা স্বরে বলে মুস্তাফি বাড়িতে কাজ করতে আসে কাঞ্চন বলে যে বৌটা তারই দেখি খুব তাড়া ...” সেই গুঞ্জনের মাঝেই হঠাৎ সিঁড়িতে দেখা যায় মুকুজ্জের মেয়ে রিঙ্কু দুদ্দাড় করে নেমে আসছে । “কি হয়েছে গো ? কি হয়েছে ?তালাটা আবার আটকে গেছে?” বলতে বলতে রিঙ্কু পৌঁছে যায় গেটের সামনে ।নিজের দুহাতে তালাটাকে ধরে হ্যাঁচকা একটা টান মারে রিঙ্কু ।লোহার পাতে মড়া গেটের গায়ে তালাটা ধাক্কা খেয়ে ঘটাং করে আওয়াজ হয় আর তার পরেই খুট করে ছোট্ট আওয়াজ । তালাটা খোলা অবস্থায় ঝুলতে থাকে গেটের আংটায় । “খুলেছে ,খুলেছে” সশব্দে উল্লাস জাগে জনতার কণ্ঠে । জলের পাইপে আবর্জনা আটকে জল জমে থাকার পর আবর্জনা সাফ হওয়া মাত্র জমা জল যেমন হুড়মুড় করে বেরিয়ে যায় ,দরজা খোলা পেয়ে অফিস যাত্রীর দল ঠিক তেমনি ভাবে হুহু করে বেরিয়ে গেল । নাটকের ও যবনিকা পাত ঘটল ।

333

14

kishore karunik

’পাবার মতো চাইলে পাওয়া যায়‘

----কিশোর কারুণিক উপন্যাস-১১ পর্ব পড়ে? আর আমার যখন অর্ধেক পড়া হলো ঠিক তখনই শ্রাবস্তীও নিজের কথা বলল। শ্রাবস্তী অশররিী কিছু না তো। ভাবতেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল্ আমার পছন্দের বই ওর কাছে কেন? আমিই বা কিসের মোহে এখান থেকে সরে যেতে পারছি না। অদ্ভুত সব চিন্তা মাথার ভিতর দৌড় ঝাপ করতে শুরু করেছে। শ্রাবস্তী বললো, “কী হলো, এতো ভাবছেন ?” দিবা স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। “নাÑকি আর ভাববো।” বলে শ্রাবস্তীর দিকে তাকালাম। শ্রাবস্তীর চোখ দুটো খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। মনে হয় সব বুঝতে পারছে ও । আমিও এবার আগ্রহটা বাড়িয়ে দিই। ও যেন আসল ভাব বুঝতে না পারে। বইটা বন্ধ করে বললাম, “ভালোই তো হলো।” শ্রাবস্তী কৌত’হলী ভঙ্গিমায় বললো, “আবার কী হলো।” “আপনি শেষের অর্ধেকটা পড়েছেন আমি শেষের অর্ধেকটা পড়া শেষ করলাম।” “ও , আমি মনে করেছি কী না কী।” কী না কী মানে! শ্রাবস্তী কি অন্য কিছু ভাবছে? কী ভাবতে পারে? ইস ! যদি অন্তর্যামী হতে পারতামÑতাহলে বুঝতে পারতাম। মানুষের মন যে বুঝতে পারে, সেই নাকি মানুষের মধ্যে উত্তম। কয়টি মানুষ বুঝতে পােে অপর মানুষের মনের কথা! আমার বোধ গম্য হচ্ছে না। শ্রাবস্তী কি ভাবছে আমি উত্তম মানুষ না? আসলে আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। শ্রাবস্তীকে বইটা ফেতর দিয়ে দিই। বইটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বররাম, “ আপনার বইটা রাখুন।” শ্রাবস্তী মৃদু হাসি দিয়ে বললো, “ কেন ,আর পড়বেন না?” “না,এই মূহুর্তে আর ভাললাগছে না।” শ্রাবস্তী বইটা আমার হাত থেতে নিয়ে নিলো। ও তো আর একবার অনুরোধ করতে পারতো। কেন এমন মনে হলো বুঝতে পারছি না। “তিলেখাজা খাবেন।?” শ্রাবস্তী ব্যাগ থেকে তিলেখাজা বের করেছে। না বাবা কী মেশানো আছে কে জানে। এবার মনে হচ্ছে শ্রাবস্তী এত সুন্দর হলেও এর ভিতরের জগৎ অন্ধকার। শ্রাবস্তী নিশ্চয় কোন ছিনতাইকারী দলের সদস্য আমি তিলেখাজা যেমনি খাব, তেমনি অজ্ঞান হয়ে যাব। তারপর আমার সবকিছু নিয়ে ও উধাও হবে। “কী হলো, কী ভাবছেন এতো?” “কই।” শ্রাবস্তী বললো, “তিলেখাজা খাবেন?” “না, আমার ক্ষিধে নেই।” “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?” “কই না তো । আপনাকে সন্দেহ করার কিছু আছে নাকি?” শ্রাবস্তী একটু রেগে গিয়ে বললো, “ কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?” “কই কিছু না তো। আপনাকে কী বলব আমি?” শ্রাবস্তী ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একশো টাকার নোটটি বের করে বললো, “টাকাটা---

201

10

kishore karunik

রয়ে যাবে

মানুষের অন্তরে -কিশোর কারুণিক শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি হে বীর শহিদেরা ছালাম, রফিক, জব্বার, বরকত সহ অনেককে তোমাদের জানাই আমার অন্তরের রক্তিম অভিবাধন। যে দিন তোমাদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার পিচঢাকা রাজপথ যে ভাষার জন্যে- তোমাদের জীবন উৎস্বর্গ করা, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষা আজ বাংলাদেশের রাষ্টভাষা সারা বিশ্বের কাছে সেই দিনটি ২১ শে ফেব্রুয়ারি<br />্আজ মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তোমাদের আন্দোলন, তোমাদের শপথ তোমাদের শরীরের পবিত্র রক্ত স্বাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে মহান শহিদ মিনার স্বাক্ষি বাংলার মাটি নীল আকাশ চন্দ্র, সূর্য, বাতাস আর বিশ্ব বিবেক। তোমাদের চেতনা শেষ হয়ে যায় নি তোমাদের মহান চেতনা আজ ধারণ করেছে লক্ষকোটি তারুণ্য যুবক তোমাদের সুন্দর স্বপ্ন আজ বিশ্ব সম্প্রদায়ের আর বাঙালির মনিকোঠায়। তোমরা অমর হয়ে থাকবে সন্তান হারানো মায়ের কাছে, তোমরা অজেয় হয়ে থাকবে শোষিত মানুষের ন্যায্য হিস্যার কাছে। কে বলেছে তোমরা নাই তোমরা আছো থাকবে কবিতায়, গানে, ইতিহাসে ফুলের গন্ধে আলোয়, মানবিকতায় সংগ্রাম আন্দোলনের অগ্রদুত হয়ে আর মানুষের অন্তরে।

135

3

আড্ডা অ্যাডমিন

প্রেমতর্পণ

ভ্যালেন্টাইন ডে তে আড্ডাঘরের সদস্যরা লিখলেন একের পর এক মনমাতানো প্রেমের গল্প| সেই সব প্রেমের গল্পের একত্রিত সংকল্ন এই ব্লগে| শিবাংশু, মুনিয়া,প্রবুদ্ধ,কৌশিক,জল,ঝড়, হিমাদ্রী ও ঝিনুকের লেখা ৮ টি গল্প একসাথে। {s1} গণেশ পাইনের রানি {/s1} {s2} লেখক: শিবাংশু {/s2} {/x1} {x2} ".... তুমি ছেঁড়া জামা দিয়েছো ফেলে ভাঙা লন্ঠন, পুরোনো কাগজ, চিঠিপত্র, গাছের পাতা- সবই কুড়িয়ে নেবার জন্য আছে কেউ তোমাদের সেই হারানো দিনগুলি কুড়িয়ে পাবেনা তোমরা আর ।" সুকান্ত আমার অনেকদিনের বন্ধু । সেই হাফপ্যান্টের আগে থেকেই । ডাকনাম সুকু । আমাদের মতো জামশেদপুরেই ওদেরও সব কিছু । ওর কাকা থাকতেন কদমায়। সুকুর সঙ্গে ছোটোবেলা থেকেই যাতায়াত ওঁদের বাড়ি । রিমা, মানে মধুরিমা সুকুর খুড়তুতো বোন । বছর তিনেকের ছোটো হবে আমাদের থেকে । ওকে যে দেখতে কেমন বা ও যে একটা মেয়ে, এমন কোনও অনুভূতিই আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি কখনও। ছেলেরা বড়ো হই মাথায়, মেয়েরা বড়ো হয় মনে। যখন কলেজে পড়ি , তখন মনে হতো রিমা বোধ হয় একটু অন্যভাবে কথা বলে আজকাল । খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছিলো সে । পুজোর সময় তাকে যে অনেকে ঘুরে দেখছে, সেটা বোঝা যেতো । নিয়মিত দেখাশোনা, তবু ব্যক্তিগতভাবে সে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুর বোন, আমার কাছে সেটাই ছিলো তার পরিচয়। কলেজ ছেড়েই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাকরিতে ঢুকে পড়া । তার পর জামশেদপুর ছেড়ে বাইরে । নিত্য যোগাযোগ এভাবেই কম হয়ে যেতে থাকে । এর মধ্যে পর্ণা আসে মঞ্চে । আমি জামশেদপুরে ফিরে আসার পরেও বেশ কিছুদিন রিমার সঙ্গে দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন বিষ্টুপুর বাজারে মেঘানির দোকানের সামনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। চিনতে পারি, কিন্তু তাকে এখন দেখতে হয়েছে যেন সোয়ানলেকের হংসপরী। আমি দেখছিলুম তাকে। আমার সেই বিস্মিত চাওয়া দেখে মৃদুস্বরে বলেছিলো, শিবাজিদা, চিনতে পারছোনা নাকি? -পারছি তো, কিন্তু তুই তো দেখছি একেবারে হিরোয়িন হয়ে গেছিস....!! -বাজে কথা রাখো । তুমি ফিরে এসেছো খবর পেয়েছি, কিন্তু একবারও বাড়িতে আসোনি । মা জিগ্যেস করছিলো... - হ্যাঁরে, এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি ... সত্যি... -কাকে নিয়ে ব্যস্ত হলে, পর্ণা....? -আরে তুই এসব পাকা পাকা কথা শিখলি কবে ? -অনেকদিন... -তুই চিনিস ? পর্ণাকে... -চিনি তো, সাকচিতে থাকে । রবীন্দ্রভবনে গান শেখে... -হমম, অনেক কিছুই জানিস দেখছি...দাঁড়া আসবে একটু পরে ... পরিচয় করিয়ে দেবো... -থ্যাংক ইউ, পরিচয় করাতে হবেনা, আমিই করে নেবো... আজ আসি। বাড়িতে এসো , কথা হবে... -আয়.... এ যেন এক অন্য রিমা । এতোদিন ধরে যাকে চিনি, সে নয়... ------------------------ " প্লাতেরো আমারে ভালোবাসিয়াছে, আমি বাসিয়াছি আমাদের দিনগুলি রাত্রি নয়, রাত্রি নয় দিন যথাযথভাবে সূর্য পূর্ব হতে পশ্চিমে গড়ান তাঁর লাল বল হতে আলতা ও পায়ের মতো ঝরে আমাদের-প্লাতেরোর, আমার, নিঃশব্দ ভালোবাসা ।" মধুরিমার বাবা ছিলেন একটু অন্যধরনের মানুষ। টাটাবাবার স্মেলটারের আগুন আর পুড়িয়ে দেওয়া উত্তাপ তাঁর ভিতরের জলধারাকে শুকিয়ে দিতে পারেনি। গান-কবিতা-জীবনের গভীরতর সন্ধানের দিকে অমলিন টান রয়ে গিয়েছিলো । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'চতুর্দশপদী কবিতা' ছিলো তাঁর প্রিয় বিলাস । আমাদের বিভিন্ন আড্ডা-জমায়েতে অবাধ আসতেন। বয়সের ফারাক বা বোধের পরিণতি আলাপের মধ্যে কোনও অস্বস্তির কারণ হতো না কখনও। চাইবাসা থেকে ফিরে মাঝেমাঝেই তাঁর বৈঠকখানায় আড্ডা হতো আমাদের। শক্তি ও বিনয়'কে নিয়ে আমার পাগলামির প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা ছিলো। এই দুই কবির কবিতা নিয়ে কথাবাত্তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠতো প্রায়ই। সেই কথা চালাচালির চালচিত্রে শিবের মতন দাঁড়িয়ে থাকতেন জীবনানন্দ । রিমা আগের মতো ওদের বাড়ি গেলেই ঘরে এসে বসতো না । কখনও সখনও আসতো, কিন্তু মৌনতাই হয়ে যেতো তার অবয়ব। একদিন রাতে ওদের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় এগিয়ে দিতে এলো বাগান পেরিয়ে । সেদিন চাঁদ ছিলো, হাওয়া ছিলো, ভাসাভাসি হাস্নুহানার গন্ধও ছিলো চারদিকে। এ রকম একটা সময়ে সে আমায় বলে, শিবাজিদা, আমাকে কোনোদিন শক্তির কবিতা শোনাবে, বুঝিয়ে দেবে একটু? -সে কী রে? তুই বাংলা কবিতা শুনবি ? তাও আবার শক্তির,...? -কেন, কবিতা কি শুধু পর্ণার জন্য...? আমি.... -আরে শোন শোন... নিশ্চয় শোনাবো... সে আর অপেক্ষা করেনি, রুদ্ধশ্বাসে ছুটে ফিরে গিয়েছিলো । এতো অচেনা হয়ে গেলো মেয়েটা । ------------------------ ".....সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায় আকাশমনির । ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্লা হাওয়া নয় ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি চন্দ্রমল্লিকার ...." দেখা হলো বহুদিন পরে। তার সঙ্গে। অন্য চরাচর। অন্য চালচিত্রে। অন্য এক বসন্তদিনে I মেঘাতুবুরু'র অতিথশালায় আমায় নিতে এসেছে। তার পতিদেব কুন্তল আসতে পারেনি I যাবো থলকোবাদ। তখন সকাল। রোদ ক্রমে আসিতেছে। ঠিক সাতটা নাগাদ ফোন এলো রিসেপশন থেকে । গাড়ি এসে গেছে । নেমে আসি সামনের গাড়িবারান্দায় । কালো বন্ধ জীপ গাড়ি । খোলা জীপে ধুলোয় লাল হয়ে যেতে হয় । ড্রাইভার গাড়ির দরজাটা খুলে দেয় । উঠতে গিয়ে দেখি রিমা অন্যদিকের জানালার ধারে বসে। -গুড মর্নিং... সে ফিরে তাকাতেই চোখ পড়লো একটা টিপের দিকে, তার কপালে, লাল টুকটুকে । আমি রিমাকে সিঁদুরের টিপ পরে কখনও দেখিনি । সকালের আলো কি ধন্য হলো ঐ রংটাকে এতো বিশ্বস্তভাবে ধরতে পেয়ে । -দারুউউণ... -কী... -টিপ... -মানে..? -কিছু না .... গাড়ি ড্রাইভওয়ে ধরে রাস্তায় নেমে এলো । - শুনলাম তুমি নাকি আসতে চাইছিলে না.. -না না , ঠিক তা না ; সব চেয়ে উৎসাহী ব্যক্তিটি যদি আটকে যান, তবে .. মানে স্ফূর্তিটা একটু নিভে যায় তো... -ওহ, আমি ভাবলাম অন্য কোনও কারণ রয়েছে... -তুই খুব ভাবিস না..? -কেন ? আমাদের কি ভাবতেও মানা ? -ঝগড়া করার মতলব আছে নাকি রে? -নাহ, সেটাও তো মানা.... -বোঝো ...তবে বহুবচনটা, মানে 'আমাদের', ইহার ব্যাখ্যা বলহ... -'আমাদের' মানে, যাদের পর্ণার মতো এলেম নেই, লেসার মর্ট্যালস.... এবার আমি ওর চোখের দিকে তাকাই, রিমা মুখটা ঘুরিয়ে নেয়.. --------------------------- "যাবো না আর ঘরের মধ্যে অই কপালে কী পরেছো যাবো না আর ঘরে সব শেষের তারা মিলালো আকাশ খুঁজে তাকে পাবে না ধরে-বেঁধে নিতেও পারো তবু সে-মন ঘরে যাবে না বালক আজও বকুল কুড়ায় তুমি কপালে কী পরেছো কখন যেন পরে? সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন চতুর্দিক সহজ শান্ত হৃদয় কেন স্রোতসফেন মুখচ্ছবি সুশ্রী অমন, কপাল জুড়ে কী পরেছো অচেনা, কিছু চেনাও চিরতরে। " ---------------------------- স্তব্ধতা ভাঙি, - কী রে, অমন মুখ ব্যাজার করে বসে আছিস কেন ? ভালো লাগছে না ? -না তো, আমি ভাবলাম তুমি বিরক্ত হয়ে আছো বোধ হয়... -ওফ, শুধরাবি না আর... -আপেল খাবে ? -দে একটা...তোর ছেলেটা খুব মিষ্টি হয়েছে, ক'বার আসে বছরে ? এবার উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে যেকোনও মা'য়ের মতন । মসৃণ ঝর্ণায় অনর্গল আত্মজের গল্প ঝরে পড়ে । তার একেবারে ইচ্ছে নয়, ছেলেকে অতোদূরে রেখে পড়ায় । কিন্তু এ তল্লাটে তো কোনও ব্যবস্থা নেই। ভালো ইশকুল সেই জামশেদপুর । সে'ও খুব একটা কাছে নয় । আর সেখানে ভালো হস্টেল পাওয়া যায়না। কুন্তলের এক ভাই দার্জিলিঙে পড়তো । তার ছোটোবেলার স্বপ্ন ছিলো ঐ সব ইশকুল । নিজের হয়নি, ছেলেকে দিয়ে উপর সাধ মেটাচ্ছে । এতোক্ষণে সে যেন স্বাভাবিকতায় ফিরে এলো । যা'কে চিনতুম, সেই মেয়ে । স্পষ্ট বড়ো হয়েছে, শরীরে, মনে । কাঁঠালকাঠের চৌকি বদলে এসেছে খাট, কুঁড়েঘরের দরজা সরে জোড়া কপাট , এখন অনেক বড়ো হয়েছে... চুপ করে শুনি তার উচ্ছল জলতরঙ্গের শব্দভাষ । তাকে বলি, -একটা কথা বলবো ? -নিশ্চয়, বলো... -নাহ, থাক, আফটার অল, ইউ আর আ পরস্ত্রী... -ন্যাকামি করতে হবেনা, এসব কবে থেকে শুরু করলে... -তবে বলি? -না, বোলোনা... -তবে বলেই ফেলি, কী বল..? এবার সে ভেঙে পড়ে হাসির সেই শব্দে, পিয়ানো'র বাঁদিক থেকে ডানদিকে দ্রুত গড়িয়ে দেওয়া আঙুল থেকে যে ঝংকার বেজে ওঠে , শালপাতায় ঝরে পড়া বৃষ্টির প্রথম পশলার মতো ধ্বনি, শুনতে পাই, বলি, -তোকে দেখতে খুব সুন্দর হয়ে গেছে... একটু লজ্জা পায় হয়তো, কিন্তু স্পষ্টতঃ খুশি হয়, তোমার আজ কী হয়েছে ? -না রে, কিছু হয়নি আলাদা করে, ভাবি বলি, তোকে দেখতে গণেশ পাইনের রানির মতো লাগছে... -তোমার মতলবটা কী বলোতো ? -আমার তো ওটাই মুশকিল.. কখনও কোনও মতলব আঁটতেই পারলুম না .. -এবার আমি তোমায় একটা কথা বলি? -বল... -পর্ণা কোথায় আছে ? -ঠিক জানিনা রে, ও দেশেই কোথাও হবে ... -খোঁজোনি? -খুঁজবো কখনও, ইচ্ছে হলে... -আরো কুড়ি বছর পর ? -তার বেশিও হতে পারে .... -ধ্যুৎ... "ঝড়ে হঠাৎ ভেঙে পড়লো তোমার মুখের জলপ্রপাত স্মৃতি? নাকি স্মৃতির মতন নিরুদ্বিগ্ন বিষণ্ণতার একটি করুণ মূর্তি, নাকি ভেঙে পড়লো পূর্ণিমারাত ? বুকের খড়ে মুখটি গোঁজা আধবোজা কোন স্বর্ণলতার ভ্রূমধ্যে টিপ সন্ধ্যাপ্রদীপ যদি দেখাও দুয়ারপ্রান্তে অনেক দূরের একা পথিক-আজো আমায় ডেকে আনতে তোমার ছেলেবেলার পাশে আর কি আছে সেই তামাশা- বলো এবং বলো আমার জীবনমরণ ভালোবাসার ভাষার অধীন, বিপর্যস্ত-স্থাপন করি মুখটি হাতে ।।" --------------------------------------------------------------------------------------------------------------- {s1} হারানো সুর {/s1} {s2} লেখক: মুনিয়া {/s2} {/x2} {x3} সে এক অদ্ভুত কাল ছিল। সেই সময়ে তুখোড় রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত দিনে দমকা বসন্তের বাতাস খোলা চুলে ইলিবিলি কেটে যেত। ঝমঝমে বরষার মাঝে রুকমীদের বাড়ির শ্যাওলা ধরা দেওয়ালের বিবর্ণতা মুছে আকাশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত বিশাল ঝলমলে এক একটা নিখুঁত সাতরঙা রামধনু উঠতো। রুটিনমাফিক লোডশেডিং এ লন্ঠনের নরম আলোতে দুলেদুলে পড়া করতে করতে চোখ চলে যেত বুকাইদের বাড়ির নারকেল গাছের ফাঁকে আটকে থাকা মস্ত বড় গুরু পূর্ণিমার চাঁদটিতে। সেই বয়সে পৌঁছে চাঁদকে আর মামা বলে মনে হতনা। অপার্থিব তার ওই রূপ মনকে বেদনার্ত চিন্তাক্লিষ্ট করে তুলতো। সে যেন কোন সুদূর থেকে অচেনা এক অনুভূতির সংকেত পাঠাচ্ছে যা আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তখন আমাদের জীবনে গাভসকার আর গোগোলের সমান গুরুত্ব ছিল। অশরীরি প্রেতাত্মাদের প্রতি বিশ্বাস অটুট ছিল। টেপজামা গায়ে গামছা দিয়ে মস্ত হাতখোঁপা করে ইস্কুলের টিনের সুটকেস হাতে ঝুলিয়ে ডাক্তার ডাক্তার অতি প্রিয় খেলা ছিল। আবার কুলের আচার হাতের মুঠোয় ভরে লুকিয়ে লুকিয়ে 'সতেরো বছর বয়সে' পড়তে পড়তে তেরোর হৃদয়জুড়ে উথালপাথালি ঢেউ উঠত। মফস্বলের তেরো বছর! এযুগ হাসবে, এযুগ হাসে। কিন্তু আমাদের তেরো অমনই নবোন্মেষিত দোলাচলচিত্তে অস্থির ছিল সারাক্ষণ। মায়ের শাসন দিনে দিনে বাড়ছিল জীবনের সেই পর্যায়ে। সব কিছুতে না। প্রসেনজিৎ, সেই ছয় বছর বয়স থেকে খেলার সাথী। তার সাথে মাদুরে বসে তেতলার ছাদে দোকলা বসে অংক কষা হাবেভাবে মানা হয়ে গেল। গোপাল, পাগল পাগল খেলার মূল পান্ডা। খেলাটি এমন ছিল। গোপাল পাগল সাজবে। চুল এলোমেলো, জামা আলুথালু করে বারান্দায় এক কোণে বসে কাগজ কুচি করবে। আমরা যাব, উত্যক্ত করব। সে আমাদের তাড়া করবে, চুল টেনে ধরবে বা জামা। সহসা মায়ের চোখে বিসদৃশ্য লাগতে লাগল সে খেলা। অপূরিত আকাঙ্খার ক্ষোভাগ্নি বুকে পুরে মন প্রশ্ন করত, কেন? কি হঠাৎ হল যাতে বন্ধুদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল! প্রশ্ন উঠত, সেইসঙ্গে মন এও জানত উত্তর নিজেকে খুঁজে নিতে হবে। বড়দের জিজ্ঞেস করা অনুচিৎ হবে। একটু একটু করে ঔচিত্যানৌচিত্যের এক অচেনা পৃথিবী উন্মেষিত হচ্ছিল চোখের সামনে। কাগজ দেয় রেজাউল, ওর দৃষ্টিটা বাবার সামনে একরকম, বাবা না থাকলে কেমন যেন! পাড়ার রাজীব দা পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে কতবার চুল টেনেছে। এখন যেন কেমন সচেতন, চুল টানা, টিজ করা কবে থেকে বন্ধ করে দিল? পাশ দিয়ে গেলে এখন যেন চেনেই না অথচ বেপাড়ায় দেখা হলে কত কথা। রাজুকাকু ছোটবেলার মত আদর করে গাল টিপে দিলে মনটা কেমন বিরক্ত হয়ে ওঠে! মুখে হাসি অক্ষুণ্ণ রেখে সন্তর্পণে রাজুকাকুর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতাম। মনে আছে কাকু একদিন মাকে ডেকে বলেছিল, দেখো বউদি, মুনিয়াটাও কেমন বড় হয়ে গেল! কাকুর গলায় বেদনা ছিল কি? কিন্তু আমার অপরাধবোধ নিশ্চিতভাবে ছিল। কাকুর প্রতি ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন ছিলনা কিন্তু ভালোবাসা গ্রহণের প্রকাশ অস্বস্তি জাগাচ্ছিল। এইযে মুখে এবং মনের আচরণগত পার্থক্য, এই সচেষ্ট পরিবর্তনও তো নতুন সে সময়ে। সাবালক জীবনের প্রথম ধাপ। কেজি থেকে পড়ে আসা ছেলে বন্ধুরা সে সময় সহপাঠিনীদের ভিন্ন নজরে দেখতে শুরু করেছে। সোনা একদিন চোখের সামনে এক নীলরঙা কাগজ উত্তোলন করে গর্বিত মুখে ঘোষনা করল, অভি প্রোপোজ করেছে রে! -কোন অভি, আমাদের? - নয়ত আর ক'টা অভি আছে! রাগত বিস্ময় সোনার। চোখের সামনে ভেসে উঠলো কেজি ওয়ানের রোরুদ্যমান সহপাঠীর ভেজা মুখ। আর তার সাথে "মার কাছে যাব" গলাচেরা আর্তি।" প্রবল হাসি পেল যাহোক কিন্তু বন্ধুবিচ্ছেদের ভয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে চিঠির ওপরে ঝুঁকে পড়লাম। পুরোটা চিঠি মনে নেই খানিক খানিক অংশ ছাড়া। .....তোমায় রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গাওয়া গানটা খুব ভালো হয়েছে। গাইতে গাইতে তুমি আমার দিকে দেখছিলে বারবার। আমি জানি তুমি মনে মনে আমাকে চাও..... ....রাঙাদাদুর দেওয়া দশটাকা নিয়ে তুমি আর আমি দেবেনে গিয়ে সিঙারা খাব। আর কেউ যেন না জানে.... ....কালকে তুমি দুই বেণুনি কোরো, তবেই আমি সিওর হব যে তুমি আমার...। হাসি মিলিয়ে গিয়ে মনের গহনে তখন ছোট্ট ছোট্ট সবুজ দংশন। অভি লিখেছে সোনাকে! সোনা পুরুলিয়া থেকে এসেছে দুই ক্লাস আগে। তার কত আগে থেকে আমার আর অভির বন্ধুত্ব। চোখে জল এসে গেল। কিছু না বলে দুমদুম করে পা ফেলে চলে গেছিলাম। পুরো ছয়মাস লেগেছিল রাগ পড়তে। ততোদিনে অভি-সোনার সম্পর্ক মুখ থুবড়ে পড়েছে। অভি ভেবেছিল, আমার আড়ালে ওর কৃত কর্মের জন্য আমার এ অভিমান। পুরোটা হয়ত তা সত্য নয়। অভি যদি অমন নীল নীল রঙে ছাপানো চিঠির কাগজে লিখে প্রথমে আমাকে প্রোপোজ করত। ঠিক জানি আমি সটাং মানা করে দিতাম। তারপর ও যাকে খুশী চিঠি দিত, আমি কি খারাপ মানতাম? ঠাট্টার ভেক ধরে মনের গভীর গোপন ইচ্ছে প্রকাশ করে দিয়েছিলাম একদিন। বদলে একরাশ তাচ্ছিল্য জুটেছিল, তোকে কে চিঠি দেবে? যা রাগী তুই! আর তোর মাথার চুলতো নয় যেন শজারুর কাঁটা। হাত বোলালে যা লাগে! অপমান শেষ করে, খুব হাত চুলকাচ্ছে রে, বলে আমার আধ ইনচি কদমছাঁট চুলে খুব করে হাত ঘষেছিল সে। মনে আছে সেই বছরই শেষ নেড়া হয়েছিলাম। বছর দুয়েক পরের কথা। তালগাছের মত বেড়ে গেছি আচমকা। গামছা দিয়ে চুল বানানোর প্রয়োজনীয়তা মিটেছে। ডাক্তার ডাক্তার খেলা ঘুচেছে। লুকোচুরি, গাচ্ছারে গাচ্ছা খেলতে ভালো লাগলেও স্বীকার করিনা। যেন বন্ধুদের চাপে পড়ে খেলছি। খুব ভালোবাসি শীতের সন্ধ্যায় মাঠে আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন। মনে আছে? ঢল গ্যায়া দিন, হো গ্যয়ি শ্যাম, যানেদো, যানা হ্যায়.....। নতুন প্রেম তখন বরিস বেকার, রবি শাস্ত্রী। অমৃতার সাথে কি সম্পর্ক টিকবে? এমনতর ভাবনা চিত্ত আকুল করে। একা একা বই পড়তে ভালো লাগে। নীরা তখন স্বপ্নে জাগরণে। নীলুকে পথে ঘাটে দিকশূন্যপুরে যাওয়ার পথে ট্রেনের কামরায় খুঁজে পাব, এমনতর আশা রাখি। । বাঁ ঠোঁটের ওপরে কাজল দিয়ে তিল আঁকি, তারপরে তার ওপরে পাউডার বুলিয়ে দিয়ে তার ধেবড়ে না যাওয়া নিশ্চিত করি। বেশ কিছু 'লাভ লেটার' এর মালকিন তখন। চুল বেড়েছে, বা দিকে সিঁথি করে, ডানদিকে ইউ শেপ বানিয়ে আধা কপাল ঢাকি। রাগ কিন্তু কমেনি একরত্তি। কেউ প্রোপোজ করার চেষ্টা করলে দাঁত কিড়মিড় করে মুখ ভেঙিয়ে তাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করে প্রায় কাঁদিয়ে ছাড়ি। অথচ তাদের দেওয়া চিঠিগুলো সযত্নে রাখি। মাঝে মধ্যে উল্টোই পাল্টাই। পুলক জাগে কারণে অকারণে। আমাদের সময়ে চিঠিতে প্রোপোজ করার নিয়ম ছিল। হয়ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। মা পুরী থেকে পা ভেঙে এল। তার দুদিন পরে কল্যাণীতে আমার অচেনা এক বাড়িতে বিয়ের নেমন্তন্ন ছিল বাবা মায়ের। তাঁরা কল্যাণীতে নতুন এসেছেন। ভদ্রমহিলা তাঁর কলিগের অসম গোত্রের বিয়ে নিজের বাড়িতে, নিজের দায়িত্বে দিচ্ছেন। নেমন্তন্ন করেছেন চারিপাশের অল্প চেনা কতক পরিবারকে। মা যেতে পারবেনা। আমার ওপর হুকুম হল বাবাকে সঙ্গ দেওয়ার। ক্রিম রঙের কুচি দেওয়া স্কার্ট, ঘটিহাতা সাদা টপ তারসাথে আনুষঙ্গিক সাজ বাহার, যা ওপরের প্যারাতে বর্ণিত, সমাপ্ত করে আমি প্রস্তুত। বিয়েবাড়িতে গিয়ে বাবা জমে গেল তাঁর কাছাকাছি বয়সীদের সাথে। আমার বয়সী কেউ নেই। তুমুল বৃষ্টিতে লন্ঠনের আলোতে মুখবুজে খেয়ে নিলাম। একটি হাড়গিলে শ্যামলা ছেলে অন্যদের সাথে আমাদের পরিবেশন করছিল। কাকীমা বাবাকে ডেকে বললেন, ঘোষদা, এই আমার ছোট ছেলে। দিল্লী আই. আই. টি তে পড়ে। একপলক দেখলাম। সে ও তাকিয়েই ছিল। ঠোঁট বেঁকিয়ে খাবারে মন দিলাম। খাওয়া শেষ করে আধো অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনছি আর মিষ্টি পান চিবাচ্ছি। সে এসে পাশে দাঁড়ালো। কোনো কথা নেই। চুপচাপ দুজনে। দাঁড়িয়েই আছি। মা থাকলে মায়ের শ্যেনদৃষ্টি থাকতো আমার ওপরে। বাবা আমার আপনভোলা। মনের মত বিষয় পেয়ে গল্পে মেতে আছে। অনেকক্ষণ পরে সে বললো, তুমি তখন ভেঙালে কেন? স্বরে রাগ নেই, বিস্ময়। সাহস বেড়ে গেল, বললাম, আমার ভেঙাতে ভালো লাগে। বললো, তাই? আচ্ছা ভেঙাও দেখি আরো একবার। সামনে এসে দাঁড়ালো সে। বুকের ভেতর যেন হাঁপর পিটছে। মুখে রক্তস্রোত, কান গরম। চেষ্টাকৃত সাবলীল হওয়ার তাগিদে গলায় জোর এনে বললাম, এখন ভেঙাবো না। যখন ইচ্ছে তখন ভেঙাব। বলেই দে ছুট। সোজা বাবার কোলে গলা জড়িয়ে টানাটানি করে বাবাকে গল্পের আসর থেকে উঠিয়েই ছাড়লাম। তারপর রোজরোজ তাকে দেখি সর্বত্র। লাইব্রেরীতে বই খুঁজতে খুঁজতে পাশে দেখি সে। স্কুলে টিফিনে আলুকাবলির পাতা চাটতে চাটতে দেখি সে সামনের রাস্তা দিয়ে বন্ধুদের সাথে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। নাচের ক্লাস থেকে, টিউশ্যানির পর বন্ধুদের সাথে হল্লা করতে করতে বাড়ি ফেরার পথে তার সাথে মুখোমুখি দেখা হবেই। এতবার করে দেখতে লাগলাম প্রতিদিন, মনে হতে লাগল স্বপ্ন দেখছি হয়ত, সত্য নয়। কথা তো হয়না। কখনো আমাকে একা পেয়ে এগিয়ে এলেই আমি তড়িঘড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিই। কিন্তু বিনা দৃষ্টিপাতেও তার উপস্থিতির খোঁজ রাখি। বন্ধুদের থেকে সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখেছি নব্যলব্ধ এই অভিজ্ঞতা। তারপর একদিন, রিনির বাড়ি থেকে সন্ধ্যে পার করে সাইকেল চালিয়ে ফিরছি। পাড়ায় ঢোকার মুখেই হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। পড়ে যাওয়ার ভয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে সাইকেল থেকে নেমে ধীরে ধীরে হাঁটছি। পাশে এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো সে। স্পষ্ট কিছু দেখা যায়না, সাদা টিশার্ট আর হাল্কা কোলনের মাতাল করা গন্ধ পেলাম । হাতে একটা বই ধরিয়ে দিল আর একটা কাগজের ঠোঙা। বললো, কাল চলে যাচ্ছি। আমার ঠিকানা দিয়েছি। চিঠি দিও। ভালো থেকো। জানিনা কোন অচেনা হৃদয় নিঙরানো ভাবাবেগে চোখ থেকে তখন জল ঝরছে টপটপ। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে নাক টানতে পারছিনা, কথাও বলছিনা। হয়ত কিছু শোনার আশায় পাশাপাশি কয়েক পা হাঁটলো সে। তারপর বাড়ির কাছাকাছি এসে বিফল মনোরথে, বাই, বলে সাইকেলে উঠে চলে গেল। বাড়িতে ফিরে একছুটে বই,ঠোঙা, মোমবাতি নিয়ে তিনতলার ছাদে জলের ট্যাঙ্কের ওপরে আমার একান্ত জায়গায়। মলাট খুলে দেখি, ন হন্যতে। আর ঠোঙার ভেতরে একটা রক্ত গোলাপ। সাথে একটা চিঠি। যতবার পড়তে যাই চোখ উপচে জল আসে। শেষে হাল ছেড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কেন কাঁদছি বুঝে পাচ্ছিনা। শেষে নিজেকে সামলানো যখন অসম্ভব হয়ে পড়ল তখন গোপন কুঠুরিতে বই, চিঠি আর ফুল লুকিয়ে নীচে গিয়ে বাবার কোলে বসে কান্নার দ্বিতীয় পর্ব শুরু করলাম। মা ভীত, বাবা শঙ্কিত। তাঁদের জেরায় ফোঁপানির মাঝে ভেঙে ভেঙে বললাম, রিনি কত খারাপ ব্যবহার করেছে। কক্ষণো আর ওর সাথে কথা বলবনা। তারপর বাবার বুকে মুখ গুঁজে নিশ্চিন্তে কাঁদতে লাগলাম। বাবা সান্তনা দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, মায়েরও বুকের ভার নামল। পরের দিন থেকে আচমকা সব কেমন ফাঁকা ফাঁকা। এদিক ওদিক চোখ চলে যায়, সেই চেনা অবয়ব কোথাউ নেই। আপাত স্বাভাবিক সমস্তের মাঝে সে এক নিদারুণ শূন্যতা। বন্ধুদের সঙ্গ ভালো লাগেনা, পড়ার বই তো চিরকালই বিষবৎ। এমনকি গল্পের বইও অন্যমনস্ক হয়ে পাতা উল্টে যাই। টিভি দেখার জন্য জন্য যত আগ্রহ সব উধাও। শুধু চিত্রহারে বিরহের যত গান সব আমার জীবনের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। বুঝতে পারি মনে মনে অনেকখানি বয়স বেড়ে গেছে। ঠিক সাতদিন পরে গোলাপি খামে চিঠি আসে। খুলতেই একরাশ গোলাপের পাপড়ি কোলে ঝরে পড়ে। আর তার পরের ছয়টা বছর শনিবার আর ছুটির দিনগুলিতে পিওনের অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকা ভবিতব্য করে নিই। ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} কালিঝোরা {/s1} {s2} লেখক: প্রবুদ্ধ {/s2} {/x3} {x4} আছন্ন বিকেল ক্লান্তিতে ঢলে পড়ছিলো সন্ধ্যার কাঁধে‚ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে আকাশ তখন বিষন্ণ গেরুয়ায় মাখামাখি| ঠিক এই সময়েই জিপটা এসে দাঁড়ালো কালিঝোরা বাংলোর সামনে| খর্গবাহাদুর মরচে ধরা বিশাল গেটটা খুলে দেয়| নুড়িপাথরের ওপর জিপের চাকার খরখর থামতেই পাহাড়ী নদীর দুষ্টুমিভরা হাসির শব্দ| পাহাড় অনেক দিন ধরেই ডাকে| কালিঝোরা বাংলোর খবরটা এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া| শিলিগুড়ি থেকে খুব কাছে‚ বাংলা-সিক্কিম সীমান্তে কালিঝোরা নদীর ধারে জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট সরকারী বাংলো| কুইন্টেসেনশিয়াল পাহাড়ী আইকনগুলো আশেপাশে কুমারী কন্যার মতো সলজ্জে ছড়িয়ে| সবুজের চাদরে মোড়া পাহাড়ের ঢাল‚ শীর্ণ ঝোরা পাথরের শ্যাওলায় পিছলে নেমে পড়ছে আঁকাবাঁকা রাস্তায়| একটু হেঁটে গেলেই রংপো নামে একটা গ্রাম| খর্গবাহাদুর তার পরিবারের সাথে আলাপ করায়‚ এ'কদিন এদেরই খিদমতে থাকতে হবে কিনা| বৌ কমলা‚ মেয়ে বিনীতা আর ছেলে ছত্রবাহাদুর| শেষজনের বয়স দশ‚ দিদির সাথে স্কুলে যায়| আমার মতো কতো অতিথি আস যায়‚ পাহাড়ী মানুষজনকে এক্জোটিক কোনো স্পিসিস ভেবে পটাপট ছবি তোলে‚ দুটো বোকাবোকা প্রশ্ন করে‚ আরো বোকাবোকা স্বরে হয়তো কোনো নেপালী গান গাইতে বলে| ছত্রবাহাদুরের চোখে একটু অবজ্ঞার ছাপই দেখা গেলো যেন| বিনীতার ক্লাশ টেন‚ বয়সের তুলনায় একটু নীচু ক্লাশেই পড়ে বলে মনে হলো‚ গ্রামে অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক| খর্গবাবাদুর সন্ধ্যার ঝোঁকে একটু ঝিমন্ত‚ বাকী তিনজন‚ পাহাড়ী সব্জীর মত টাটকা তাজা| --------- রাত অনেক হয়| খর্গবাহাদুরকে দিয়ে ছাং আনিয়েছিলাম‚ মুরগীর ঝালঝাল ঝোল আর রুটি দিয়ে অনেকটা খাওয়া হয়ে গিয়েছিলো| কাঠের পাত্রে গরম ফেনাওয়ালা দ্রে-ছাং‚ পাহাড়ী ধেনো বলা যায়| শুধু এক চুমুক| ছাং হলো মদিগ্লিয়ানির সোফায় শায়িতা নির্লজ্জ ন্যুড‚ একবার ডাকলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে‚ ঘাড়ের ওপর উঠে কামড়ে ধরে গলা‚ সে কামড়ের থেকে মুক্তি প্রায় চব্বিশ ঘন্টা পরে| প্রায়ান্ধকার ঘরে একা লন্ঠনের আলোয় ছাংয়ের সেই প্রবল ভালোবাসার অত্যাচার ক্রমে অসহ্য হয়ে ওঠে| ঘুম পালিয়েছে কলকাতায়| সারা শরীর গরম হয়ে উঠেছে‚ মনে হচ্ছে সব জামাকাপড় খুলে কালিঝোরার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি| হয়তো সেটাও করেই ফেলতাম‚ ছাংয়ের এমনই মহিমা| বারান্দায় বেরিয়ে এসে একটু খোলা হাওয়ায় দম নিই| বাঁদিকে খানিকটা দূরে খর্গবাহাদুরের কোয়ার্টার| কাচের জানলার পর্দা সরানো‚ বিনীতা পড়েছে| আমার ঘরে লন্ঠনের আলোটা এতো ম্রিয়মান‚ কিন্তু বিনীতার মুখটা লন্ঠনের আলোয় এতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে| চুল খোলা| লাল ব্লাউজে সোনালী সুতোর কাজ| কোনো পোকার কিটকিট আওয়াজ আসে একেবারে কানের পাশ থেকে| কাঠের বারান্দা পায়ের চাপে মচ করে ওঠে| ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ি‚ ঘুমিয়েও| গরম ভাবটা হঠাৎই চলে গেছে| ---------- বাংলোর আশেপাশে পাহাড়ী নদী-জঙ্গলের গন্ধ নিতে নিতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো| এলোমেলো ঘোরার কোনো বিবরণ হয় না| দুপুরে কমলার রান্না ভরপেট খেয়ে ঘন্টাখানেক সশব্দ ঘুমিয়েও নিয়েছি| সন্ধের দিকে গেলাম রংপো-তে| ছোটো গ্রাম‚ উঁচুনীচু পথে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়িয়ে একটা ঝুপড়ি রেস্তোঁরায় চেয়ার টেনে বসি| এক বড়ো বাটিতে থুকপা‚ এক প্লেট গরম খাবজে আর অবশ্যই ছাং| এক দিনেই ছাংয়ের দিওয়ানা হয়ে গেছি| পাশে একটা ভিডিও পার্লার‚ বেশ রগরগে পোস্টার লাগানো‚ বিদেশী সুন্দরীর ছবিতে জায়গায় জায়গায় কালো কালির পোঁচ| ------- পার্লার থেকে বেরিয়ে দেখলাম পা টলছে| কানে লেগে তখনো বিদেশী সুন্দরীর কৃত্রিম শীৎকার| অন্ধকার রাস্তা‚ হেঁটে যেতে একেবারে কম সময় লাগবে না| কলকাতা নয় যে অটো বা রিক্সা নিয়ে নেবো| পাহাড়ে পুরুষদের প্রায় সবারই সন্ধের পর পা টলে‚ তাই কেউ আমার দিকে ফিরে দেখলো না| গ্যাংটকের দিকে ক্রমাগত গাড়ী ছুটে যাচ্ছে রংপোর বুক চিরে‚ তাদের হলুদ হেডলাইটে চোখ ঝাপসায়| একটা পান মুখে পুরে রাস্তার ডান ধার‚ মানে পাহাড়ের দিকটা ধরে ধরে নেমে আসি কালিঝোরায়| ------- কোয়ার্টারের দিকে চোখ চলে যায়| আজ জানলার ধারে বিনীতা নেই| এক গ্লাশ জল চাই‚ গলা শুকিয়ে কাঠ| দরজায় নক করি‚ ভেজানো দরজা আলতো করে খুলে যায়| খর্গবাহাদুরের নাক ডাকার আওয়াজ পাই একটা ঘর থেকে| কমলা চুল্লির ধারে বসে রান্না করছে| খোলা চুলে মুখের একপাশ ঢাকা| ড্র্যাগন আঁকা নীল-সাদা হাতকাটা জ্যাকেটে চুল্লীর আগুনের হলকা| ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আমার দিকে‚ পাহাড়ী হাসি ফুটে ওঠে আগুনরঙ্গা মুখে| জল দেয়| তারপর খাবারের থালি নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আমার ঘরে পৌঁছে দেবে বলে| পাশের ঘরের পর্দা সরিয়ে বিনীতা এসে দাঁড়ায় দরজা ধরে| চুল খোলা‚ লাল ব্লাউজে| ------ কমলার হাত থেকে থালিটা নিয়ে আমি তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ফিরে আসি| দরজাটা বন্ধ করি| জোরে| ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} কনভোকেশন {/s1} {s2} লেখক: কৌশিক {/s2} {/x4} {x5} অধ্যাপক| সকাল থেকে চলছে বটে! তবে শুধু সকাল থেকেই বা বলি কেন - গত এক সপ্তাহ ধরে যা চলছে! আজ কনভোকেশন| বেলা তিনটেতে শুরু‚ কিন্তু তার আগে ঊনকোটি চৌষট্টি কাজ রয়েছে| এডুকেশন মিনিস্টার আসছেন চিফ গেস্ট হয়ে| রাজ্যপাল তো রয়েইছেন| দুজনের সাথেই থাকবে গোটা পাঁচেক লেজুড়| আর এই সকলকে অভ্যর্থনার দায়িত্ব এই রামুর| এটা একটা চাকরি! শালা‚ এসেছিলাম ছাত্র পড়াতে আর করছিটা কি? লোকে শুনলে থুতু দেবে| দেয়ও| কিন্তু কিছু করার নেই| পনের বছর হতে চলল; এখন অন্য কোনো চাকরিও কেউ দেবে না| সারা বছর ধরে লেগেই রয়েছে এই সব ফালতু কাজ| পড়াশুনা সব চুলোয় গেছে| পেটের দায়ে বড় দায়| কিছু করার নেই| একটু আগেই কথা হল রাজ্যপালের ও এস অডি'র সাথে| এখনো এক ঘন্টা লাগবে আসতে| যাই‚ গেটের বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট খেয়ে আসি| -আরে দাদা‚ কহাঁ চলে ? নিউক্লিয়ারের হিতেশ| -চল‚ তুঝে সিগ্রেট পিলাকে লাঁউ| -চলিয়ে| রাজ্যপালের ঝামেলাটা একরকম মিটলো‚ এবার একবার শিক্ষামন্ত্রীর লেজুরটিকে ফোন লাগিয়ে দেখি| শিক্ষামন্ত্রী! "হিরক রাজার দেশে"র ডিভিডি টা আছে বাড়িতে‚ যাওয়ার সময় ম্যাডামকে গিফট করে দিই| রগড় হবে! - হাঁ সন্তোষ জী‚ ঘোষ বোল রহা থা লক্ষ্মণগড় সে| কঁহা তক পঁহুচে আপ লোগ? - ....... -কোই নহি জী‚ আরাম সে আইয়ে| ম্যাডাম কো মেরে তরফ সে প্রণাম বোলিয়েগা| শালা..... এখনো জয়পুরেই রয়েছে! কি করে শুরু হবে অনুষ্ঠান তিনটের সময়? কি যে দরকার এই সব নেতা-মন্ত্রীদের ডাকার‚ কে জানে! মূর্খের দল‚ তারা আবার অন্যকে ডিগ্রী দেবে! এবার ডীন কে দিই এই সুখবরটা! দেবদূতী| একবার পার্লারে যেতে হবে| বেশি কিছু না‚ হাল্কা টাচ আপ| উগ্র সাজ আমার কোনো দিনই ভালো লাগে না, আর তাছাড়া এটা কনভোকেশন - পার্টি নয়| গতকাল রাতে এসে পৌঁছেছি| বন্ধুরা আরো একদিন আগেই এসে গেছিলো| আমারো সেই দিনই আসার কথা ছিলো‚ কিন্তু অফিসে লাস্ট মোমেন্ট একটা কাজ এসে গেল| টিকিট ক্যান্সেল করাতে হলো শেষ মুহূর্তে | বম্বে শহরটা বেশ! ভীষণ প্রাণবন্ত| সারাটা দিন যেন লোকে ছুটছে| অনেকের হয়ত সেটা ভালো লাগে না‚ আমার কিন্তু দারুণ লাগে! সারা সপ্তাহ কাজ করার পর উইক এন্ডে সী বিচে চলে এসো| ওই হট্টমেলার মাঝে একটা ভেলপুরি নিয়ে একা একা চুপ চাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ লাগে| কি করে যে সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না! সত্যি‚ ভাবতেই অবাক লাগে! এই সেদিন বন্ধুদের সাথে রাত জেগে সেমিস্টারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম‚ স্যারের কাছে প্রজেক্ট‚ পেপার‚ কন্ফারেন্স - আর আজকে বম্বে| যোধপুর থেকে এই লক্ষ্মণগড় - কতই বা দূরত্ব! কিন্তু জন্মে থেকে ক্লাস টুয়েলভ অবধি যোধপুরের জীবনটা ছিলো একরকম - নি:শ্চিন্ত‚ ভাবনাহীন | তারপর চার বছর এখানকার জীবনটা আরেক রকম| দায়িত্ব আছে‚ কিন্তু স্বাধীনতা ও আছে| আর বম্বে তে থাকতে থাকতে তো সত্যি মনে হয় যেন বড় হয়ে গেছি! অফিসের প্রজেক্টের চাপ নিজেকে একাই সামলাতে হয়| ফাইন্যাল ইয়ারের প্রজেক্ট নয় যে স্যরের সাহায্য পাওয়া যাবে| রান্নাবান্না অবশ্য করতে হয়না‚ পেয়িঙ গেস্ট থাকার এই সুবিধে| রোজ পোয়াই থেকে মালাড ওয়েস্ট যাতায়াত| বারো কিলোমিটার রাস্তা যেতে সময় লাগে এক ঘন্টা| মারাত্মক ট্র্যাফিক! কিন্তু তবু যেন ভালো লাগে জীবনটা| এই যে বাড়ির থেকে একা একা এত বড় শহরে থেকে লড়াই করছি রোজ - এটা খুব উপভোগ করি! মাথার ওপর ছাতা ধরার কেউ নেই‚ পাপা‚ স্যর- কেউ না - এটা ভাবলে ভীষণ গর্ব হয়! তবে সত্যিই যেটা মিস করি‚ তা হলো এই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসটাকে| কত কিছুর সাক্ষী এই ক্যাম্পাস| গতকাল রাতে এসেছি| রেজিস্ট্রেশন কমিটি থেকে টুয়েলফথ স্ট্রীটের এই নতুন হস্টেলটায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে| আমি যে হস্টেলটায় থাকতাম‚ সেটায় এখন জুনিয়ররা থাকে| দেখতে গেছিলাম কালকেই| অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো| একই ঘর‚ কিন্তু অন্য মানুষ থাকার কারনে নিজেরই খুব অচেনা ঠেকছিলো| মনেই হচ্ছিলোনা যে এই ঘরেই আমি গত চারটে বছর কাটিয়েছি| মায়ের কথা মনে হচ্ছিলো| মা বলে‚ সজাওয়াট সে কমরা বদলতা হ্যায়; বদল যাতা হ্যায়| খুব সত্যি কথা| গতকাল রাতে সবাই মিলে ক্যাম্পাসের রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম| স্টুডেন্ট থাকার সময় রাত নটা বাজলেই দৌড়তে দৌড়তে ঢুকতে হতো হস্টেলে| এখন সে সব বাধা নিষেধ নেই! ভাবতেই অবাক লাগছিলো| ক্যাম্পাসের রাস্তার ধারের বেঞ্চ গুলোতে বসে গল্প করতে করতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম পুরোনো দিন গুলোতে| যারা অফিস থেকে ছুটি পায়নি‚ আসতে পারেনি কনভোকেশনে‚ তাদের জন্য চলছিলো হা-হুতাশ| কখনো বা এমনিই চুপচাপ বসে ছিলাম - স্ট্রীট লাইটের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছিলো আমাদের মুখে| পুরোনো দিন! মাত্র তো আট মাস আগে ছেড়ে গেছি যায়গাটাকে‚ কিন্তু তবু মনে হচ্ছে পুরোনো দিন| এই তো সেদিনের কথা সব‚ কিন্তু তবু যেন অনেক দূরের‚ ধরা ছোঁয়ার বাইরের| এসে থেকে স্যরকে একবারো ফোন করা হয়নি| ইচ্ছে করেই করিনি| আজ একেবারে কনভোকেশন গাউনটা পরেই দেখা করবো স্যরের সাথে| হি ইজ আ গ্রেট মোটিভেটর| ফাইন্যাল ইয়ারের প্রজেক্টটার ওপরে লেখা পেপারটা একসেপ্ট হয়ে গেছে একটা SCI জার্নালে| আমার কোনো ক্লাসমেটের এই এচিভমেন্ট নেই - বিটেক লেভেলে সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্সড পাব্লিকেশন| এ সবই স্যরের জন্য| তবে তার জন্য প্রচুর মেহনৎ করতে হয়েছে| ওহ‚ কি খাটনিটাই না খাটিয়েছিলেন স্যর শেষ এক বছর! এখনো একটা জয়েন্ট কাজ করছি স্যরের সাথে| এই কাজটা করতে করতে মনে মনে ফিরে আসা যায় এই কলেজে| পোয়াইতে নিজের ঘরটাতে বসে রাতের বেলায় যখন এই কাজটার জন্য কোড লিখি‚ তখন আমি যেন নিজের মনেই চলে আসি এই লক্ষ্মনগড়ে| আট মাস পরে আজ স্যরের সাথে দেখা হবে| কি বলবেন স্যর দেখা হলে? অধ্যাপক ও দেবদূতী বাঁচা গেছে! আপদ গুলো ক্যাম্পাস থেকে বিদেয় হয়েছে| ডিগ্রী দেওয়ার পালা শেষ হওয়ার আগেই মশাইরা কেটেছেন| অন্য কোথাও অন্য কারুর মাথা খেতে গেলো বোধহয়! এখন ভিসির ভাষণ | অডিটোরিয়ামের বাইরেটায় এসে ভালো লাগছে| ওহ‚ একটা ঢপের কাজ শেষ হলো! আরে বাবা‚ ডিগ্রী পাবে স্টুডেন্টরা - সেখানে এই গাধা গুলোকে ডাকার কোনো মানে হয়! এদের চক্করে সকাল থেকে পুরোনো ছাত্রদের সাথে দেখাই করা হলো না! এখনো সবাই ভেতরে| ভিসির জ্ঞানগর্ভ ভাষণ শুনে বোর হচ্ছে বোধহয়! ক্যাফেটেরিয়া গিয়ে একটা কফি খেয়ে আসি| ভারি সুন্দর বানিয়েছে নতুন এই ক্যাফেটেরিয়াটা| হাল্কা করে কেনি জি চালিয়েছে| বোসের স্পীকার গুলোতে খেলছে ভালো মিউজিকটা| এবার একটু কড়া কফি খেলে মাথাটা ছাড়বে| কটা দিন যা গেলো! ব্যাটারা তিনটের প্রোগ্র্যাম সাড়ে তিনটেয় শুরু করলো| তারপর হ্যানা ত্যানা করতে করতে পুরো প্রোগ্র্যামের সাইকেলটাই লেট চলতে লাগলো| ছ'টা বেজে গেলো| শীতের দিন| বাইরে অন্ধকার নেমে গেছে| ক্যাফেটেরিয়ার তিন দিকের দেওয়াল কাঁচের| আলো গুলো সব জ্বেলে দিয়েছে| এতক্ষণে বোধহয় সব মিটে গেছে| কার আবার ফোন এলো? -আরে‚ তুম! কঁহা হো? - আপ কঁহা হো স্যর? -ইন নিউ ক্যাফে - আইল বি দেয়ার ইন নো টাইম! প্লীজ ওয়েট ফর মি! সকাল থেকে মেয়েটাকে ফোনই করা হয়নি| যা যাচ্ছিলো! খুব ভালো কাজ করেছিলো প্রজেক্টে! তার পরেও একটা কাজ দিয়েছিলাম‚ অফিস সামলে সে কাজও করছে| নাহ‚ টেনাসিটি আছে মেয়েটার| কটা দিন চাকরি করে নিয়ে GREতে বসবে ঠিক করেছে| শী হ্যাজ রিসার্চ মেটিরিয়াল ইন হার| ওর হবে| এই ক'বছরে খুব ভালো একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে ওর সাথে| বোঝাপড়া ঠিক না হলে এক সাথে কাজ করা যায় না| -হ্যালো স্যার! -হো! ইউ লোক গ্রেট ইন দিস রোব| - থ্যাঙ্কস স্যর! - কনগ্রাটাস! স্যারের হাতের তালুটা গরম| -হোয়্যার হ্যাড ইউ বিন সিন্স মর্নিঙ? আই ওয়জ লুকিঙ ফর ইউ| - আই থট অফ মিটিঙ ইউ উইথ দিস রোব অন| -দ্যাটস গ্রেট! বাট গেট মি টু মোর রোবস| - আই উড স্যার! ডেফিনিটলি! -গুড! বতাও কিয়া লোগে| - যো আপ কহেঁ স্যর! -অরে‚ ইটস ইওর ডে! বতাও‚ বতাও! - আ স্ট্রবেরি শেক উড বি ওকে| স্যার একটা ক্রীম কালারের স্যুট পড়েছেন| ভেতরের চেকস আর পার্পল টাই| গায়ের রঙটা পুড়ে গেছে খানিকটা| কাউন্টারের লোকটার সাথে কি এত কথা বলছেন স্যর? এতক্ষণ লাগে অর্ডার দিতে! -অওর বতাও| কাটিঙ অওর বড়া পাও মাস্ট বি ইওর স্টেপল ফুড বাই নাও? -নাআআহ! উওহ ভি কোই খানে লায়েক চিজ হুই! হাউ আর ইউ স্যার? - একদম বড়িয়া! তুম সুনাও| মন লগ গয়া না বম্বে মে? - জী নহি| -ফিলিঙ হোম সিক? -নট রিয়েলি.. - দেন? -কুছ নহি| আই যাস্ট মিস দিস প্লেস| - ইউ নো সামথিঙ‚ পিপল রিয়েলি ডোন্ট মিস দ্য প্লেস| দে মাইট থিঙ্ক দ্যাট ওয়ে‚ বাট দে ডোন্ট| -ফির? -দে মিস দ্য পিপল| হোয়ট ইউ আর মিসিঙ ইন বোম্বে আর দ্য পিপল হিয়ার ইন লক্ষ্মণগড়| দ্যাটস হোয়াই হি ইজ আ গুড টিচার! হি নোজ ইট অল! বন্ধুদের চলে যেতে বলেছি হস্টেলে| আজ রাতের বাসেই যোধপুর ফিরবো| তার আগে স্যারের সাথে একবার কথা বলে যেতে চেয়েছিলাম| হি ইজ সাচ আ গুড কমিউনিকেটর! সামনের মানুষটার মন না বুঝলে ভালো কমিউনিকেটর হওয়া যায়না| স্যর সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন| গোঁফের ফাক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওঁনার ট্রেড মার্ক স্মিত হাসি| চোখ দুটো চশমার পেছনে ভীষন শান্ত| - ডু ইউ নো সামথিঙ? -কিয়া স্যর? - লাইফ ইজ বিউটিফুল এন্ড ইউ নীড টু মুভ অন| - জী স্যর| - হমে ভী অব চলনা চাহিয়ে| খুশ রেহনা| - স্যর, দিস ইজ ফর ইউ| অধ্যাপক| রাতের দিকে ব্যালকণিতে বসে থাকতে খুব ভালো লাগে| এই ছোট জনপদটা ঘুমিয়ে পরে তাড়াতাড়ি| শীতের দিন‚ তাই আরো শান্ত চারিদিক| একটা রাতচরা পাখি ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল| ছোটো একটা কার্ড| বলেছিলো‚ পরে দেখতে| এদের বয়সটাই এমনি| সর্দি-কাশির মতন কাফ লাভ হয়! একটা বহুল প্রচলিত গান‚ হাতে লেখা| আজকাল কার ছেলে মেয়েরা এই সব গান আজো শোনে? আমরা শুনেছিলাম কলেজ বেলায়| সিনেমাটা অবশ্য আরো পুরোনো| বারান্দার আলোয় লেখাগুলো স্পষ্ট| Those schoolgirl days of telling tales and biting nails are gone But in my mind I know they will still live on and on But how do you thank someone, who has taken you from crayons to perfume? It isn't easy, but I'll try If you wanted the sky I would write across the sky in letters, That would soar a thousand feet high, To Sir, with Love The time has come For closing books and long last looks must end And as I leave I know that I am leaving my best friend A friend who taught me right from wrong And weak from strong That's a lot to learn What, what can I give you in return? If you wanted the moon I would try to make a start But I, would rather you let me give my heart To Sir, with Love ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} একটুকু ভালোবাসা {/s1} {s2} লেখক: জল {/s2} {/x5} {x6} মেট্রো স্টেশনে বসে থাকতে থাকতেই হাত পাগুলো কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দিয়ালির| বুকের ভিতরে ক্রমাগত হাতুড়ি পিটছে | পেটের ভেতরে গুড়গুড় করেই চলেছে| প্রিয় আকাশি-সাদা চুরিদারটা পড়েছে সে| মাথার রেশমকালো চুলগুলোকে হাওয়ায় আজ উড়তে দিয়েছে সে| ফেব্রুয়ারি মাসের ঠান্ডাটা তেমন একটা নেই‚ তবু বেশ শীত শীত লাগছে তার| একটা ট্রেন চলে গেল| প্যাসেঞ্জার নামল-উঠল| উঁকি মেরে দেখে দিয়ালি‚ 'কই সে তো এলো না'| অপেক্ষার মুহুর্তগুলো যেন বড্ড দীর্ঘ| স্টেশনের দোদুল্যমান টিভিতে একটা প্রিয় গানের পিকচারাইজেশনে চোখ মাঝে মাখে আব্দ্ধ‚ মন নয়| চোখ আর মন দ্বৈতভাবে হাতঘড়ির কাঁটায় ঘুরে ঘুরে ফেরে| আরও একটা ট্রেন এসে দাঁড়ায়| চোখ খোঁজে উদ্বিগ্নভাবে| ওদিক থেকে ভেসে আসে 'সামনের কামরায় উঠে পড়'| দরজা বন্ধ হবার আগেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সে‚ বুকের ভিতরে ধুকপুকুনি স্পষ্টভাবে টের পায় সে| লাফ দিয়ে ওঠার জন্য নয়| তার আগমনে| ভিড় বেশ| উঁচু উঁচু মাথার ফাঁক দিয়ে পরিচিত মুখের সন্ধান করে সে| কোথায় গেল? দেখতে পেয়ে স্বস্তি| গায়ের রঙ ঈষৎ তামাটে‚ ব্যাকব্রাশ করা চুল‚ গভীর কালো দুটো চোখ আর চোখের সেই মুগ্ধ করা দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় তাকে| গাল কি রাঙা হয়ে উঠল? ট্রেনটা থেমে যায় পরের স্টেশন| হালকা ঝাঁকুনি তাল সামলাতে পারে না দিয়ালি| হাত ধরে সামাল দেয় তাকে সে| 'খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে' ঝিলিক দিয়ে যায় সাদা মুক্তোর দাঁতের সারিতে হালকা হাসির মুগ্ধ ছোঁয়া| 'তোমাকেও' | হাসে দিয়ালি| 'বাড়িতে কি বললে?' 'ঘুরতে যাব বন্ধুদের সাথে| তোমার জন্য এই প্রথমবার মিথ্যে কথা বললাম' মুখটা তেতো লাগে| 'খারাপ লাগছে?' 'হুম' 'তাহলে মিথ্যে বলতে গেলে কেন?' 'তবে কি বলতাম?' অবাক স্বরে জানতে চায় দিয়ালি| 'বলতে হিমেলের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি' দুষ্টুমি হাসি মুখে ছড়িয়ে যায় সিট খালি হয় পাশাপাশি দুটো| বসে দুজনে পাশাপাশি একটু দুরত্ব রেখে| কথা হয় না কিছু| মেট্রোতে দেখার কিছু নেই আশেপাশে| অস্বস্তি হয়‚ একটা দৃষ্টি মুখের ওপর ঘোরাফেরা করছে না তাকিয়েও বুঝতে পারে সে| গন্তব্য আসতে কত দেরী? নিজেকে অন্যমনস্ক করার আপ্রাণ চেষ্টায় চুল ঠিক করে| মোবাইলটা নিয়ে খুটখাট| একটা মিহি হাসি ছুঁড়ে দেয় হিমেল‚ 'বললাম তো ভালো লাগছে‚ আবার এত কি যে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছ?' 'বেশ করছি তাতে তোমার কি?' 'অনেককিছু|' আবার সেই দৃষ্টি হিমেলের চোখে‚ অবশ করে দেয় তাকে| আচ্ছা সে কি তলিয়ে যাচ্ছে ঐ দৃষ্টির গভীরতায়? গন্তব্য এসে যায়| নেমে পরে ওরা| দিয়ালির বুকের ভিতর পায়রার শিরশিরানি কাঁপুনি| এদিক সেদিক দুরত্ব রেখে খানিক ঘোরাঘুরি‚ টুকটাক কথা‚ হাসি একটু গভীর পরিচয়ের আশায়| 'খিদে পায় নি?' জানতে চায় হিমেল| কখন থেকেই তো পেয়েছে| কিন্তু বলে কি করে? ঘাড় ঈষৎ কাৎ করে জানায় পেয়েছে| 'চল কোথাও বসি'| ----- 'এবার ফিরব' জানায় দিয়ালি| 'এখুনি'? 'মা চিন্তা করবে|' 'আর একটু থাকবে না? তুমি চলে গেলে আমার ভালো লাগবে না|' 'কেন?' 'তোমার ভালো লাগবে?' হাসি হাসি মুখে জানতে চায় হিমেল| 'ওঠা যাক' প্রশ্নটা এড়িয়ে যায় দিয়ালি| নাহ তার একটুও ভালো লাগবে না| কিন্তু কেন? তবে কি... 'এখনো তোমার দ্বন্ধ মনেতে?' 'কিসের?' চমকে জানতে চায় দিয়ালি| পড়ন্ত সূর্যের আলো দিয়ালির চোখে-মুখে-উড়ন্ত চুলে| হিমেলের বুকের ভিতর একটা বেদনা ঘুরে বেড়ায় ইতি উতি| 'যে কথাটা শুনতে চাই‚ বলবে না?' হিমেলের স্বরের একটা মিনতি যেন ছুঁয়ে যায় দিয়ালিকে| উত্তর দেয় না সে| আবার মেট্রোস্টেশন‚ আবার ফিরে চলা‚ বুকের ভিতরে একটা কষ্ট দুমড়ে মুচড়ে দিতে চায় তাকে| চুপচাপ দুজনেই|দিয়ালির গন্তব্য আসছে‚ নেমে যাবার মুহুর্তখানেক আগে ফিসফিসিয়ে বলে যায়‚‚' আই লাভ য়্যু'| অটোমেটিক দরজাটা খুলে যায়| নেমে যায় দিয়ালি| বুকের ভিতরে অসীম সুখ| হ্যপি ভ্যালেন্টাইন ডে| ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} হয়ত কিছু বলার ছিল {/s1} {s2} লেখক: হিমাদ্রী {/s2} {/x6} {x7} হলঘরের সাউন্ড বক্সে আওয়াজটা কানে আসামাত্রই চোখটা অজান্তেই স্টেজের দিকে চলে গেল| চারটে মেয়ে স্টেজে দাঁড়িয়ে‚একটা টেবিল‚টেবিলের পিছনে দুটো লোক কথা বলছে‚সামনে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের কণিকা মেহেরেওয়াল দাঁড়িয়ে|খুব কৌতুহল হচ্ছে নবনীতার‚বিয়ের পরে এক বছর যেতে না যেতেই বাবাই এসে গেছিল‚ তারপরে তিনটা বছর যে কি ভাবে কেটেছিল -বাবাই কে যত্ন করা‚রিসার্চের পেপার তৈরী করা‚নম নম করে একটা দুটো ক্লাস করে নেওয়া-বাড়ি আসতে না আসতেই অয়নের কটাক্ষ-এবার চাকরি টা ছাড় তো-একটা কচি বাচ্চা কে ফেলে রেখে কি যে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াও‚পারও বটে! -হ্যা-একদম গেজিয়েই গেছিল নবনীতা‚সারাদিন ? বাইরে বাইরে ঘোরা?কতটুকু সময় দেয় অয়ন তার ছেলে কে? সন্তান কি তার ও নয়? দুচোখে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে নিস্পলক তাকিয়ে থাকতো সে অয়নের দিকে | হলঘরে প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেছে‚ গম্ভীর মুখে পেপার পড়ছে এক ভদ্রলোক‚ হলঘরে একবার চোখ বুলালো নবনীতা‚ চেনা অনেকেই রয়েছে-নন্দিতা‚চৈতী‚ অণামিকা‚ ধাওয়ান জী‚ ‚চেনা ‚আধচেনা অনেকেই-নন্দিতা তো কলেজ থেকে সাথে-এর মধ্যে প্রথম ভদ্রলোকের লেকচার শেষ -মাইকে অ্যান্যাউন্স হলো পরবর্তী বক্তার নাম--কুণাল গাঙ্গুলী--এত দিন পরে নামটা শোনার পরেই বুকটা ধক করে উঠলো নবনীতার‚ হ্যা--কুণালদাই তো‚ সেই এক ই ভঙ্গী তে হেঁটে মাইকের দিকে গেল‚ কলেজে একবছরের সিনিয়ার ছিল কুণাল গাঙ্গুলী|রোগা ‚লম্বা‚ দোহারা গায়ের রং‚ চোখে মোটা ফ্রেমের হাই পাওয়ারের চশমা| সত্যি বলতে কি সেই বয়সে মনটা একটু দুর্বল ই ছিল কুণাল গাঙ্গুলীর প্রতি‚সুপুরুষ ছিলনা কুণাল‚কিন্তু কমন রুমে বন্ধুরা বাজার চলতি হিন্দী গানের সুরে ওদের নিয়ে গান ধরতো‚ কেউ কেউ পাকা তবলচির মতো তাতে কাঠের টেবিল বাজিয়ে সঙ্গত ও দিত|বাকি বন্ধুরা হি হি হো হো করে তাতে সায় ও দিত|ভাল ছাত্রদের প্রতি মেয়েদের স্বাভাবিক আকর্ষণ যেমন থাকে তার ও হয়তো ছিল|বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলতো কুণালের ও নাকি তার প্রতি দুর্বলতা আছে-বন্ধুরাই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল-কয়েকবার সবাই মিলে সিনেমা দেখতেও গেছিল-বন্ধুরা মিলে সেবার যে পিকনিক টা করেছিল-তাতে নবনীতা গান ও গেয়েছিল‚ কুণাল পরে বলেছিল-ওর গানের গলাটা নাকি খুব সুন্দর-বন্ধুত্ত্বটা একটু গাঢ় হয়েছিল কি?এম.এ. পরীক্ষার নোট্স গুলো কুণাল ই ওকে দিয়ে দিয়েছিল ‚ আর রেজাল্ট ভালো যে হয়েছিল--তাতে কি কুণালের কি কোনো অবদান নেই? আছে| কুণাল স্টেসস এ চলে যাবার পরে বন্ধুরা রটিয়ে দিয়েছিল -নবনীতার থেকে ধোঁকা খেয়েই নাকি কুণাল বিবাগী হয়ে গেছে--শুনে নবনীতারাগ করলেও হেসে বলতো--বিবাগী হয়ে কেউ কি স্টেসসের এম আই টি তে পি এইচ ডি করতে যায়? ভাবতে গিয়ে এসব-একটু লজ্জা বোধ করছিল নবনীতা‚ কয়েকটা ফেলে আসা জীবনের ছেঁড়া ছবি দেখতে পেল সে চকিতে‚সম্বিত ফিরে পেল হাততালির আওয়াজে| কুণালদার ব্ক্তৃতা শেষ-ঠাসা হল উঠে দাঁড়িয়ে করতালিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে হলঘর‚ কি বললো কুণাল দা? কিছু ই শোনা হলো না-এখন লাঞ্চ ব্রেক-নন্দিতা ওকে দেখে হৈ হৈ করে এলো-লাঞ্চের প্যাকেট নিতে যাবার সময় দেখলো কুণাল দাকে ঐ পাশে বসা ভদ্রলোক কি যেন বোঝাচ্ছে আর কুণাল দা দুদিকে মাথা নেড়ে যাচ্ছে-কোনো গুরু গম্ভীর বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিলো বুঝি-ওর দিকে চোখ পড়তে-ভদ্রলোক কে ছেড়ে প্রায় ছুটে এলো কুণাল- নবনীতা! কেমন আছো তুমি? একটু থমকে যায় নবনীতা.তার কলেজ জীবনের প্রেমিকটি কে মন দিয়ে দেখে সে|- --এত দিন পরে আমাদের কথা মনে এলো? একটু অনুযোগের সুরে বলে নবনীতা| --তোমার কথা কি আমি ভুলতে পারি? সব সময়েই তোমার কথা মনে করেছি আমি-গম্ভীর মুখে টেনে টেনে বলে কুনাল| হয়তো ঠাট্টার ছলে বলে ফেলেছিল কুণাল-কিন্তু নবনীতার মনে হলো হয়তো সত্যি ই বলছে কুণাল|লাঞ্চ ব্রেক শেষ হলে কুণাল বলে-সেমিনার শেষ হলে একটু দাঁড়িও-একসাথে ফিরবো| সেকেন্ড সেশান শেষ হতেই নবনীতা গেটের সামনে দাঁড়ায়-কুণাল আসে নন্দিতাও আসে‚নন্দিতা কুণালের একটা হাত ধরে টেনে রেখেছে-নবনীতা কে দেখে বলে-এই শোন কুণাল দা কে ধরেছি--এখনো বিয়ে করেনি-বাইরে গিয়ে টাকায় পোকার বংশ বানাচ্ছে--আজকে আমাদের কে খাওয়াবে-এত সব অ্যাচিভমেন্টস-- অবাক হয়ে কুণাল কে দেখে নবনীতা--একটু ও বদলায়নি--শুধু ঐ কালো মোটা চশমাটা বদলেছে-মনে মনে খুশি হয় নবনীতা‚ মুখের হাসিটা কে ধরে রেখে একটু কেশে নিয়ে বক্তৃতা দেবার ঢং এ বলে ওঠে কুণাল-বধুগন-স্বীকার করতে লজ্জা নেই-আমি একদিন বিবাগী হয়ে দেশত্যাগ করেছিলাম‚এবং হ্যা‚ সেই কারনেই হয়তো আমার কিচু অর্থ ও প্রাপ্তী হয়েছে‚এখন বিচার-বিবেচনা করে তোমরাই বলো‚আমার ঐ চরম ব্যার্থতার দিনে যারা আমার পাশে এসে দাঁড়ায় নি-তাদের কি সত্যি কোনো খাওয়া পাওনা হয়?নাকি গুরুতর শাস্তি প্রাপ্য? বলে নবনীতার দিকে আড়চোখে তাকায় কুণাল‚হো হো করে হেসে ওঠে সকলে--অনেকদিন পরে প্রাণখুলে হাসে নবনীতা‚এক জমাট বাঁধা মেঘ কে ভেঙ্গে নেমে আসে বৃষ্টির জলধারা-তিন বন্ধু এগিয়ে চলে কোনো রেস্তোঁরায়-- হ্যাপী ভ্যালেন্টাইনস--প্রেমে থাকো বন্ধুতে থাকো--আড্ডাতে থাকো--মস্ত থাকো-- --------------------------------------------------------------------------------------------------- {s1} প্রথম প্রেম {/s1} {s2} লেখক: ঝড় {/s2} {/x7} {x8} প্রথ্ম প্রেমে পড়া ক্লাস নাইনে| পারমিতা| one sided যদিও (মানে আমার সব প্রেম কেসই মনে হয় one sided)| পারমিতা অর্জুনের গার্লফ্রেন্ড (মানে ওরা তেমনই বলত‚ কেমিস্ট্রি ল্যাবে চুমা চাটিও করেছে‚ দরজায় পাহারায় ছিল এই বান্দা - ফোঁসসস)| এ সব জেনেও কেন জানি না ধড়াম করে প্রেমে পড়ে গেলাম| আসলে ও খুব নটখট চুলবুলে টাইপস ছিল - আর ঐটা আমার খুব পছন্দের| কারণ স্কুলের অন্যান্য মেয়েরা কেমন একটা এলিয়েন ক্যাটেগরির - এত ভাও খেত যে মনে হত মার্স থেকে এসেছে| এইবার শুরু হল আসল দ্বুবিধা -- অর্জুন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড -- বিট্রে করব না করব না‚ করব না করব না -- এইসব ভাবতে ভাবতে একদিন দুরুম করে একটা গ্রিটিংস কার্ডে প্রেমপত্র লিখে সটান চালান করে দিয়েছি পারমিতার বায়োলজি কপির মধ্যে| আসলে বায়োলজির ছবি গুলো আমি বেশ ভালো ই আঁকাতাম‚ বুঝলেন| তাই কোনো শক্ত ছবি হলেই পারমিতা আমার দ্বারস্থ হত| আর সেটাও করেছি ওর বাড়িতে বসে ‚ কাকীমার (ওর মা) সামনে বসে| ভেবেছিলাম তখনই ওটা ওর হাতে পড়বে না‚ পরে হয়ত কপি খুলে দেখবে| ভাগ্য বিরূপ হলে যা হয় - কপিটা ওর হাতে দিতেই প্রেমপত্র সমেত কার্ডটা ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল| ও হ্যাঁ‚ বলা হয় নি‚ সেদিন ওর জন্মদিন ছিল‚ তাই গ্রিটিং কার্ড| তো ওটা মাটি থেকে কুড়িয়ে কাকীমার সামনেই পড়ল‚ দেখলাম কেমন মুখ চোখের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে| আমি তো মনে মনে প্রমাদ গুনছি - এই বুঝি কাকীমাকে বলে দিল| কিন্তু না - আমার ভয়কে ভুল প্রমানিত করে হঠাৎ করে মুচকি হেসে thank you বলল| সে রাতে এক ফোঁটা ঘুমোতে পারি নি জানেন? পরের দিন স্কুলে আমাকে আলাদা করে ডেকে বলল - "তুই একটা গাধা| Love Letter কি করে লিখতে হয় জানিসই না?" আমি কোনোরকমে তুতলিয়ে বল্লাম - "কিন্তু ওর উত্তরটা?" ও হেসে বলল "সন্ধেবেলায় বাড়িতে আয়‚ উত্তর পেয়ে যাবি|" বলে ফিরে চলে যাচ্ছিল‚ হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে বলল - "ভয় নেই‚ বাড়িতে কেউ থাকবে না‚ বিয়েবাড়ি যাবে| আমি একা থাকব|" এর পরে যা হল‚ তার জন্য একমাত্র আমিই দায়ী| আসলে একটা গিল্ট ফিলিং হচ্ছিল - তাই আমি অর্জুনের কাছে কনফেস করলাম| সন্ধেবেলা ওর বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারটা সমেত| অর্জুন প্রথমে শুনে কিছু বলল না| শুধু স্কুল ছুটির পরে আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল - "আমার মনে হয় না তোর যাওয়া উচিত| ও বলছে বটে ও একা থাকবে‚ কিন্তু যদি মিথ্যে বলে থাকে? গিয়ে হয়ত দেখলি বাড়িতে সব বলে দিয়েছে‚ লোকজন নিয়ে বসে আছে তোকে ক্যালাবে বলে! ভেবে দেখিস একটু|" আর আমিও শালা তখন একটু ভ্যাবলা‚ ডরপোক টাইপস ছিলাম| গেলাম না ওর বাড়ি| পরদিন স্কুলে আমাকে একা পেয়ে পারমিতা কেমন একটু কঠিন গলায় জিগালো - "কাল এলি না কেন?" আমি আমতা আমতা করে বল্লাম - "আসলে একটু কাজ পড়ে গেছিল‚ তাই মানে --" হীমশীতল গলায় ও কেটে কেটে জিগালো - "কাজ পড়ে গেছিল‚ না তোকে আসতে বারণ করা হয়েছিল?" বুঝলাম অর্জুন শালা ওকে সব বলে দিয়েছে| সেই শেষ কথা ওর সাথে স্কুলে থাককালীন| আর কোনোদিন ও আমার সঙ্গে কথা বলে নি‚ বায়োলজির ছবি নিয়েও আসে নি| ---------------------------------------- কি ভাবছেন এখানেই গল্প শেষ? নাহ - আরো কিছু বাকি আছে| বহু বছর কেটে গেছে তার পর| অনেক জল গড়িয়েছে| ওর সঙ্গে আবার দেখা স্কুলের রিইউনিয়নে| ভেবেছিলাম হয়ত কথা বলবে না| কিন্তু আবার আমাকে ভুল প্রমানিত করে নিজেই এগিয়ে এসে কথা বল্ল| "কেমন আছিস?" "ভালো‚ তুই" "আছি দিব্যি" ................... একথা সেকথা হল‚ ও বিয়ে করেছে‚ এক মেয়ে আছে‚ আসানসোলে থাকে| শেষে ফেসবুকে আছি কিনা জানতে চাইল| তারপর ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট| আমিও অ্যাক্সেপ্ট করলাম| মাঝে মধ্যে টুক টাক কথা‚ জন্মদিনে উইশ‚ ইত্যাদি চলছিল| হঠাৎ একদিন দেখি মেসেজ পাঠিয়েছে - "মনে আছে‚ স্কুলে থাকতে আমাকে প্রোপোজ করেছিলি? আমি তোকে আমার বাড়িতে আসতে বলেছিলাম সন্ধেবেলা? কিন্তু তুই আসিস নি| কেন আসিস নি‚ তোর ব্যাপার -- কিন্তু যদি আসতিস‚ হয়ত ভবিষ্যতটা অন্যরকম হতে পারত| এটা তোকে জানাবার ছিল‚ তাই জানালাম| এই নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো কথা আমরা বলব না‚ মাথায় রাখিস| আমরা অতীত ভুলে ভবিষ্যতে বাঁচি‚ তাই এই নিয়ে আর কথা বলতে চাই ন| ভুল বুঝিস না‚ ভালো থাকিস|" এর উত্তর আমি দিতে পারি নি‚ আজও পারি নি| তবে মেসেজটা পড়ার পরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম - সেটা মনে আছে| ------------------------------------------------------------------------------------------------- {s1} নিবিড় অমা-তিমির হতে…..{/s1} {s2} লেখক: ঝিনুক {/s2} {/x8} {x9} "আমি লিখেছিলাম চিঠিটা" …… প্রণতি বলে ওঠেন হঠাৎ| "কোন চিঠি?" …… সুপারি কুচানো থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন অবাক জয়তী| প্রণতি উত্তর দেবার আগেই কলকল করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে উঠে আসে চাঁদনি আর জিনিয়া‚ "মা‚ মা‚ মান্তুদিরাও কাল আসছে| কি মজাটাই না হবে এবার! তোমার পায়ে ব্যথার অজুহাত কিন্তু একদম চলবে না‚ আগে থেকেই বলে রাখছি‚ সামনের রবিবার সবাই মিলে পিকনিকে যাব হুড্রুতে‚ যাবই| চুটিয়ে মজা করবো এবার"….. এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে চাঁদনি জয়তীকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আদুরে বিড়ালের মত গাল ঘষতে থাকে মায়ের চুলে| সামনের মাসে একত্রিশ বছর বয়স হবে মেয়ের‚ কিন্তু চেহারায়‚ চলনে‚ বলনে কোথাও তার কোন চিহ্ন আছে? মনে হয় যেন এখনো কিশোরীটি| ওর বয়সে জয়তী দুই বাচ্চার মা‚ চাঁদনির পুরো পাঁচ বছর বয়স তখন| জয়তীর হয়ে প্রণতিই উত্তর দেন‚ "সত্যি‚ মান্তু আসছে? অনেকদিন পরে দেখা হবে‚ সেই টিপু হবার সময় শেষ দেখেছিলাম পাঁচ বছর আগে মেয়েটাকে"…… এবার জিনিয়ার পালা‚ "হ্যাঁ মা‚ শুধু মান্তুদি আর টিপু না‚ দিব্যদাও আসছে ওদের সাথে| সত্যিই‚ এবার একদম ফুল রি-ইউনিয়ন…… চাঁদনির থেকে বছর তিনেকের ছোট জিনিয়া‚ কিন্তু হাবে ভাবে যেন চাঁদনির বড় দিদিটি| গড়নে পেটনেও একটু ভারি‚ মাপা হাসি‚ চাপা কথা| "টিপুর জন্য একটা গিফট কিছু কিনে আনিস তাহলে আজই| তোরা তিনজন একসাথে হলে তো আর তোদের টিকিটিরও দেখা পাওয়া যাবে না কাল থেকে"…… মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন প্রণতি| "চাঁদনি‚ রবিবার যদি পিকনিকে যেতে হয়‚ তাহলে গরানকে আজই জানিয়ে পয়সাকড়ি দিয়ে আসিস বাজারঘাট করার জন্য| ও ঘর ছাইছে‚ খুব ব্যস্ত| একটু সময় হাতে রেখে না বললে অসুবিধা হতে পারে" …… তাড়া লাগান জয়তী‚ চিরকালই তিনি একটু গোছানে প্রকৃতির| পান সাজা আপাতত শেষ‚ একটা পান প্রণতিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা মুখে দিলেন জয়তী| যেভাবে এসেছিল‚ ঠিক সেইভাবেই আবার দুদ্দাড়িয়ে নীচে নেমে গেল দুই মেয়ে| ওদের যাবার দিকে চেয়ে রইলেন দুই পাকাচুলের বান্ধবী একসাথে| ওদের দেখে নিজেদের ছোটবেলা যেন ভিড় করে আসতে থাকে এই অবেলার ছাদে| বহুদিন বাদে এবারের শীতে আবার রাঁচিতে প্রণতি আর জয়তী‚ আবাল্যের দুই বান্ধবী| গার্জিয়ান দুই মেয়ে প্ল্যান করেই মায়েদের নিয়ে এসেছে ছুটি কাটাতে| এই শহরেই জন্ম দুজনেরই| পড়াশোনা‚ বড় হওয়া‚ বিয়ে সবই এই শহরে‚ পাশাপাশি বাড়িতে| প্রণতি অবশ্য অনেকদিনই অনাবাসী| বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই স্বামী শোভন বোস ট্র্যান্সফার হয়ে যান দিল্লীতে| কিন্তু প্রণতির সেখানেও থাকা হয় নি| সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন মিস্টার বোসের বদলির চাকরির সুবাদে| গত বছর মি: বোস হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবার পর অধুনা মেয়ের সাথে ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা‚ জিনিয়া সেখানে এক মাল্টিন্যাশন্যাল কম্প্যানির মার্কেটিং ম্যানেজার| জিনিয়া অবশ্য বড় হয়েছে এই রাঁচিতেই‚ কাকু-কাকীমার কাছে| ঐ একটিই সন্তান প্রণতির| জয়তী বছর তিনেক আগে অবধি রাঁচিতেই ছিলেন| স্বামী রজত সেন ছিলেন ব্যারেজের সর্বময় কর্তা‚ শুধু পদাধিকার বলেই নয়‚ সর্ব অর্থেই| ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই চলে গেলেন বিনা আড়ম্বরে| বাবার মৃত্যুর পর ছেলে মেয়ে কেউই রাজি হল না মাকে একা একা রাঁচিতে থাকতে দিতে| চাঁদনির সঙ্গে কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকেন আজকাল‚ মাঝে সাঝে ছুটিতে আসেন রাঁচির বাড়িতে‚ ঝাড়পোঁছ করিয়ে রেখে যান‚ কাঁথাকম্বল রোদে দেন| ইদানিং জর্দাপানের নেশাটা বড্ড বেড়েছে জয়তীর| চাঁদনি কলকাতার আইটি হাবের অসংখ্য কলাকুশলীদের একজন| জয়তীর ছেলে তমাল আই আই টিতে মেক্যানিক্যাল ফাইন্যাল ইয়ার| ওরও আসার কথা ছিল এবার‚ কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর হয়ে উঠলো না| দুই মেয়েতে ভাব সেই ছোট থেকেই| বরং মায়েদের যোগাযোগেই কিছুটা ভাটা পড়েছিল সংসারের চাপে| অবশ্য নেই নেই করেও টুকটাক ফোনাফুনি হত মাঝেসাঝে দুজনের বা ছুটিছাটাতে দেখাও হত| কিন্তু মুখোমুখি বসে এমন ঘনিষ্ঠ আড্ডা হয় নি অনেকদিন‚ সুতোটা কোথায় যেন একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল| অনেকদিন পরে আজ জয়তীদের ছাদে শেষ দুপুরের রোদের আমেজ মেখে দুই সখীতে একথা সেকথা--- মূলত মেয়েদের নিয়েই আলোচনা‚ তাদের ঘিরেই চিন্তা| স্মার্ট‚ শিক্ষিত‚ দেখতেও মন্দ নয় কাউকেই‚ সর্বদিক দিয়েই গুণান্বিতা‚ নয় নয় করে বয়সও কম হল না‚ তবু বিয়ে-থার ব্যাপারে কারো কোন উৎসাহই নেই| এক আধটা প্রেম ট্রেমও যদি করতো‚ কিন্তু তাতেও মন নেই| বন্ধুদের মধ্যে ছেলেবন্ধু অনেকই আছে‚ কিন্তু প্রেমিক কেউ নয়| তাই নিয়ে কিছু বলতে গেলেই‚ "তোমরা না বড্ড ব্যাকডেটেড" …. শুনতে হয়| হয়তো সত্যিই তাই‚ ব্যাকডেটেডই| এই প্রজন্ম অন্যভাবে ভাবতে শিখেছে| তাদের মত হুট বলতেই প্রেমে পড়ার বাতিক এদের নেই| চাঁদনি তো মোটামুটি জানিয়েই দিয়েছে যে বিয়ে সে করবে না| কথায় কথায় ফেলে আসা দিন এসে পড়ে গুটি গুটি পায়ে| স্কুল পেরিয়ে কলেজ‚ পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজো‚ দোলখেলার আবীর‚ ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠান‚ গুপ্ত প্রেম‚ ব্যক্ত প্রেম| রোদ পড়ে এসেছে প্রায়‚ উত্তর দিক থেকে হিমহিমে বাতাস দিচ্ছে| শালটা খুলে আলসের ওপরে রেখেছিলেন জয়তী| টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলেন ভালো করে| "কি যেন বলছিলি তুই‚ কি একটা চিঠির কথা"….. একটু প্রশ্নবোধক স্বরে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন জয়তী| "বলছিলাম যে চিঠিটা আমি লিখেছিলাম"….. "কোন চিঠিটা?"…..ভারি বিভ্রান্ত দেখায় জয়তীকে| "যে চিঠি পড়ে সেই রাতে জগন্নাথ মন্দিরের পেছনে ছুপাদহর মাঠে গিয়েছিলি তুই শুভর সাথে দেখা করতে"…… "কি বলছিস তুই?"……জয়তীর চোখে মুখে উৎকন্ঠা মিশ্রিত বিস্ময়| "হ্যাঁ‚ ঠিকই বলছি| কি করে পারলি তুই‚ জয়ী? আমার শুভ‚ আমার‚ আমার‚ শুভ আমার| তাকে মন দিতে তোর লজ্জা করলো না?"….. কেমন হিসহিসে শোনায় প্রতিমার গলাটা| "না না‚ আমি কোত্থাও যাই নি| কোন চিঠির কথা ব-বলছিস তুই‚ আ-আমি বুঝতে পারছি না"….. একটা কাঁপুনি যেন একেবারে নাভি থেকে শরীর বেয়ে উঠে আসতে থাকে জয়তীর| "মনে নেই বলছিস তোর চিঠিটার কথা? মনে করিয়ে দিই তাহলে ----ঠিক সাতটার সময় যখন আরতি শুরু হবে মন্দিরে তখন এসো ছুপাদহর মাঠে| আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়| ভয় পাচ্ছো নাকি? বোকাটা| কোন ভয় নেই| আমি থাকবো তো| দেখা হবে তাহলে| হবে তো? তোমারই শুভ|---- কি‚ মনে পড়ছে?" চোখ সরু করে শাণিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন প্রণতি| "কিন্তু আমি তো পড়েই পুড়িয়ে ফেলেছিলাম চিঠিটা"….. ভেঙে পড়া স্বরে অস্ফুটে বলেন জয়তী| "চিঠিটা শুভ লেখে নি জয়ী‚ আমি লিখেছিলাম"…… প্রত্যেকটা শব্দ কেটে কেটে বলেন প্রণতি| "কিন্তু কেন?"….. অদ্ভুত শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী বান্ধবীর চোখে চোখ রেখে| প্রণতিকে হঠৎ কেমন নিভন্ত‚ অসহায় দেখায়| একটু আগের সেই স্ফুরিতনাসা‚ অগ্নিবর্ষী প্রণতি ভেঙেচুরে এলিয়ে পড়েন চেয়ারে এই একটুখানি ছোট্ট হয়ে| "রাগে আর হিংসায় পাগল হয়ে জয়ী| মাথার ঠিক ছিল না আমার রাগের চোটে| তোর নিষ্পাপ সৌন্দর্য‚ নরমসরম স্বভাব‚ তোর ম্যাথ আর সায়েন্স স্কোর‚ তোর গানের গলা‚ কোনটার সাথেই পাল্লা দেবার ক্ষমতা তো আমার ছিল না রে| শুভ কিরকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তোর দিকে তাকাতো লুকিয়ে চুরিয়ে‚ আমার বুকের মধ্যে জ্বলে যেত জয়ী| তুইও| তুইও তো পাল্টা ফিরিয়ে দিতি সেই দৃষ্টি চুপি চুপি ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে| কোনদিন ভেবেছিস আমার কথা তোরা কেউ? আমি তখন প্রায় শুভর বাগদত্তা‚ শহরে সবাই জানে আমাদের কথা| সে যে কি ভীষণ পরাজয়‚ কি জ্বালা| তুই বুঝবি না জয়ী"….. প্রণতির গলার স্বরটা ভীষণ বিষণ্ণ শোনায়| "আমার কোন ধারণাই ছিল না যে আমার ওপর তোর এত রাগ ছিল রে ইতি| কিন্তু কি লাভ হয়েছিল তোর মিছিমিছি ঐ চিঠি লিখে?"….. অসম্ভব শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী| "হ্যাঁ‚ আজও মনে পড়লে আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে‚ কিছুতেই ক্ষমা করতে পারি না আমি তোদের| আর সেদিন তো রাগের চোটে দিগবিদিক ঠাহর হচ্ছিলো না আমার| প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম‚ ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ| তারপর পরের দিনই যখন শুনলাম তুই জ্বরে পড়েছিস‚ কি আনন্দ যে হয়েছিল‚ ভাবতে পারবি না| ভগবানকে ডেকেছিলাম তোর মৃত্যু চেয়ে| সবটা না হলেও কিছুটা পূরণ করেছিলেন ভগবান আমার প্রার্থনা| মনে আছে তারপর গোটা মাস ধরে তোর সেই নিউমোনিয়ায় ভোগার কথা?"…. প্রণতির গলার স্বরে তিক্ততা আবার ফিরে আসে| "আছে‚ কিন্তু আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুই লিখেছিলি চিঠিটা"…… অন্যমনস্কভাবে বলেন জয়তী| দপ করে জ্বলে ওঠেন প্রণতি আবার‚ "চিরকালের শান্ত‚ শীলিত‚ বুদ্ধিমতী জয়ী আমাদের| পুড়িয়ে না ফেলে যত্ন করে রেখে দিতে পারতিস তো চিঠিটা লুকিয়ে| মিলিয়ে নিতে পারতি আমার হাতের লেখার সাথে এখন"…. শ্লেষ ঝরে পড়তে থাকে প্রণতির স্বরে| কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠেন তিনি‚ "যাস নি সেদিন তুই সন্ধ্যেবেলা মন্দিরের পেছনের মাঠে চিঠি পেয়ে? সাহস থাকে তো স্বীকার কর আজ| আমি তো জোর গলাতেই বলছি যে চিঠিটা আমিই লিখেছিলাম| বল‚ যাসনি তুই সেদিন? বন্ধুর হবু বরের কাছে গোপন অভিসারে যেতে বাধে নি সেদিন‚ আজ অন্তত স্বীকার করে কিছুটা পাপমুক্ত হ"..... "হ্যাঁ গেছিলাম"…. শান্ত উত্তর জয়তীর| "একবারও মনে হল না তোর আমার কথা যাবার আগে?"….. গলার স্বরে লবণাক্ত অশ্রুর ছোঁয়া এবার প্রণতির| "হয়েছিল"….. "হয়েছিল!! মনে হয়েছিল আমার কথা? তবু পা উঠেছিল যেতে?"…. বিস্ময়ে কন্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে আসতে চায় প্রণতির| "হ্যাঁ‚ হয়েছিল‚ খুব গিলটি ফীল করেছিলাম| যাব কি যাব না দ্বিধায়‚ উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্বে‚ অন্যায়ের গ্লানিতে তিন তিনটে দিন জ্বলেছিলাম"….. "তবু গেলি?" ….. "হ্যাঁ যেতেই হল| সেই প্রথম‚ সেই শেষ চিঠি শুভদার| সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর শেষ অবধি আমি জোগাড় করে উঠতে পারি নি রে ইতি"….. "সে তো বটেই‚ সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর ছিল না‚ এত্ত প্রেম| অথচ তার দুমাসের মধ্যেই বাবামায়ের সুবোধ বালিকা হয়ে কেমন কনে সেজে রজতদার গলায় ঝুলে পড়লি! ইচ্ছে করছে সারা দুনিয়াকে ডেকে তোর আসল রূপটা দেখিয়ে দিতে‚ হিপোক্রিট একটা"….. সন্ধ্যার ডানায় ভর করে অন্ধকার নেমে আসে‚ সাথে ঠাসবুনোট স্তব্ধতা| বেশ কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই| তারপর প্রণতি খুব নীচু গলায়‚ প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেন‚ "I’m sorry”… "এতদিন ধরে চেপে রেখে আজ হঠাৎ কেন জানাতে চাইছিস? আমাকে শাস্তি দিতে?"….. জানতে চাইলেন জয়তী| "না না‚ অত শত ভেবে কিছু করি নি| জানিয়ে দেবার ইচ্ছে তো ছিল তখনই| অ্যাকচিউয়্যালি প্ল্যান তো ছিল সেটাই‚ তোকে টীস করা‚ তোকে বোকা বানিয়ে নাকে ঝামা ঘষে দেওয়া‚ হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডার মধ্যে একা একা ঐ ভূশণ্ডির মাঠে কেমন মজা করলি‚ সেটা জানতে চাইবো পরদিন দুপুরে| কিন্তু চিরকালের ল্যাদাডুস তুই তো সেই সন্ধ্যেতে বেকায়দা ঠাণ্ডা লাগিয়ে এসে নিউমোনিয়ায় অচৈতন্য হয়ে রইলি তার পরের গোটা মাস ধরে| জিজ্ঞাসা করার আর সুযোগ হল না| তারপর সেরে ওঠার পরেই বা আর সময় পেলাম কই? দুই সপ্তাহও তো পেরোল না পুরো‚ তোর বিয়ে হয়ে গেল রজতদার সাথে| নি:শ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিলাম অবশ্য সেদিন‚ ভেবেছিলাম পথের কাঁটা ঘুচলো" ….. ঝড়ের গতিতে একটানা এতগুলো কথা বলে দম নিতে থামেন প্রণতি| "বুঝলাম‚ কিন্তু এতদিন বাদে আজই বা তাহলে আবার টেনে বার করলি কেন সেই সাপ ঝুড়ি থেকে?" "কি জানি‚ রাগটা ভিতরে ভিতরে বোধহয় রয়েই গেছিলো কুণ্ডলী পাকিয়ে| আজ হঠাৎ পুরনো কথার পিঠে বেরিয়ে পড়লো"….. "কিন্তু আমি তো একা একা মজা করি নি সেরাতে ঐ ভূশণ্ডির মাঠে"…… মাত্রাতিরিক্ত শান্ত স্বরে বলেন জয়তী| "তার মানে? কে গেছিলো তোর সাথে?"…… অবাক প্রণতি জানতে চান| "শুভদা"….. সংক্ষিপ্ত উত্তর জয়তীর| "বুঝলাম না‚ ইয়ার্কি করছিস নাকি? ঐ চিঠি তো আমি লিখেছিলাম| শুভকে জানিয়ে লিখেছিলাম ভেবেছিস নাকি?"….. "না‚ শুভদার নামে ঐ চিঠি হয়তো তুই লিখেছিলি‚ ইতি| কিন্তু সেই চিঠির উত্তরটা আমি নিজে হাতেই লিখে দিয়েছিলাম শুভদাকে| আমি যখন পৌঁছেছিলাম ছুপাদহের মাঠে সেদিন সন্ধ্যেতে‚ শুভদা আমার অপেক্ষায় ছিল| কাজেই মজাটা একেবারে একা একা করতে হয় নি রে আমাকে"……. "মিথ্যে কথা‚ হতেই পরে না‚ মিথ্যে বলছিস তুই| লজ্জা করছে না তোর এত বড় মিথ্যেটা বানিয়ে বলতে শুভর নামে? একটু আগেই না ভালোবাসার বড়াই করছিলি? আর এখন মরা মানুষটার নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলছিস?……. "তোর যা প্রাণে চায়‚ বিশ্বাস করতে পারিস ইতি| মিথ্যে আমি বলছি না| ওতে তো তোরই একচেটিয়া অধিকার" ……. ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ান জয়তী পানের কৌটোখানা হাতে নিয়ে| "হুঁহ‚ সেই জয়ী‚ সবসময়ে ফার্স্ট‚ সবেতেই জিতে যাওয়া জয়ী| আমারই চালে আমাকেই হারিয়ে দিলি তাহলে"…… হো হো করে হেসে ওঠেন প্রণতি অন্ধকার সন্ধ্যেটাকে চমকে দিয়ে| "কিন্তু এত জিতেও লাভ কি হল জয়ী? কি পেলি শেষে? শুভকে তো পাওয়া হল না তোর| সেই আমার মত হেরো মেয়েই জিতে নিল শুভকে"…. চেয়ারের হাতলে চাঁদনির রেখে যাওয়া সোয়েটারটা ভাঁজ করে নিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন জয়তী‚ "শুরুটা সেদিনও তুইই করেছিলি ইতি‚ আজও তাই| কি পেয়েছি জানতে চাইছিস তো? শুনবি? সত্যিই শুনবি? সইতে পারবি তো? চাঁদনিকে পেয়েছি"….. আর ঠিক তক্ষুনি শুক্লা ত্রয়োদশীর চাঁদখানা রাজরানীর মত এসে দাঁড়ালো আকাশের পুব অলিন্দে| -------------------------------------------------------------------------------------------------- {/x9} {x1i}rsz_val1.jpg{/x1i} {x2i}val2.jpg{/x2i} {x3i}val3.jpg{/x3i} {x4i}val4.jpg{/x4i} {x5i}val5.jpg{/x5i} {x6i}rsz_val6.jpg{/x6i} {x7i}val7.jpg{/x7i} {x8i}val8.jpg{/x8i}

188

5

দীপঙ্কর বসু

জনৈক যাত্রী

প্রথমেই জানাই আজ পুরনো ফাইল পত্র ঘাঁটতে গিয়ে হাতে উঠে এলো আমার স্বর্গত পিতৃদেব পদ্মলোচন বসুর লেখা কিছু গল্পের খসড়ার ফাইল । সেই ফাইলের একটি গল্প কপি করে এখানে রেখে যাই ।আশাকরি বন্ধুরা উপভোগ করবেন ।ইচ্ছে আছে এই ফাইলে বন্দী আর কিছু গল্প ধীরে ধীরে এখানে নিয়ে আসার । এবারে গল্প পড়ুন -- &lt;শহরের চৌমাথা থেকে যে পথটা উত্তরমুখে চলে গেছে,সেটা শেষ হয়েছে রেলস্টেশনে ।সূর্য ডুবুডুবু হলেই ওই পথ মাড়িয়ে স্টেশনের দিকে পা বাড়ান ইদানীং নেশার মত দাঁড়িয়ে গেছে ।বয়স্ক স্টেশনমাষ্টার গিরিনবাবু লোকটি মন্দ নয় ।সন্ধ্যেটা ওঁর সঙ্গে গল্পগুজবে কেটে যায় ।ছোট স্টেশন। অধিকাংশ ট্রেনই একে বেশ কিছুটা তম্বী করে চলে যায় ।থামে কেবল কটা লোকাল আর দূরপাল্লার প্যাসেঞ্জারটা ।কাজের ব্যস্ততা নেই বিশেষ । ওভিজাত ট্রেনগুলিকে সবুজ পতাকা দেখান আর লোকাল এলে টিকিট বিলির ঘটঘটানি । টেলিগ্রাফের টরেটক্কা আর মাঝে মাঝে মঙ্গল সিং কে হাঁক পাড়া ছাড়া গিরিনবাবুর বিশেষ ন কাজ থাকেনা ।গল্পগাছায় ছেদ পড়ে কদাচিৎ ।ভেন্ডার মেজদার দোকান থেকে কয়েকক্ষেপ চাও এসে যায় ।দৈনিক বসুমতীটা পড়ে থাকে টেবিলের একপাশে । আমাদের আলোচনার বিশ্বপরিক্রমা চলে ওই কাগজটিকে ঘিরে। আটটা বারোর লোকাল পার হলে প্রত্যাগত ডেলিপ্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে গল্প করতে করতে গৃহমুখী হই । এই নতয়ও আসা যাওয়ায় আবাহন নেই বিসর্জনও নেই – তবু ছেদ পড়েনা বড় একটা । দিনটা ছিল শনিবার । এদিনে অপরাহ্নবেলায় স্টেশন বেশ নিরিবিলি থাকে ।ডেলিপ্যাসেঞ্জাররা ফেরে সকাল সকাল । কিন্তু আজ যেন কেমন কেমন লাগছে ।দূর থেকে মনে হচ্ছে স্টেশনে কারা যেন জটলা করছে ।কাছাকাছি এসে দেখা গেল একদল বন্দুকধারী পুলিশ । ব্যপার কি , হঠাৎ এত পুলিশ কেন ? সরকারের কোন কেষ্ট বিষ্টু আসছেন নাকি , নাকি কোন হাঙ্গামা বেধেছে ? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যাই স্টেশন ঘরের সামনে । কি চাই ? একটি কনস্টেবলের কর্কশ সম্ভাষণ । হঠাৎ কোন জবাব ই আসেনা মুখে । আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে এই সরকারি বীরপুঙ্গবদের সঙ্গে আলাপের বিশেষ সুযোগ নেই ,আকাঙ্ক্ষাও নেই । প্রশ্নটি সরল ও সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্বেও স্ফসা জবাব দিতে পারিনি ।সত্যিই ত চাইবার কিছুই নেই ।নিছক স্বাস্থান্বেষনে আসা, সে কথাটা শান্তিরক্ষকের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে ,কে জানে । আমার দ্বিধা লক্ষ্য করে এবার তির্যক কণ্ঠে মন্তব্য – কি দরকারে আসা সেটাই ভুলে গেলেন নাকি ? মরীয়া হয়ে বললাম - গিরীনবাবু আছেন ? সান্ত্রীটি এবারে খিঁচিয়ে উঠলেন – গিরীনবাবু ? কে গিরীনবাবু ?কেউ নেই এখানে ।তাড়াতাড়ি সরে পড়ুন ,নইলে ঝঞ্ঝাটে পড়ে যাবেন । মনে মনে বললাম বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা ,পুলিশের খপ্পরেপড়লে কত ঘা ,কে জানে ।এমত অবস্থায় য পলায়তি স জীবতি আপ্তবাক্য স্মরণ করে পিছন ফিরি ।স্টেশন ঘরের দরজাটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল ।কথপোকথনের অন্তিম পর্বে একটু ক্যাঁচ করে শব্দ ।দরজাটা সামান্য ফাঁক হল ।সেই ফাটলে গিরীনবাবুর নাকের অর্ধাংশ ও একটি চক্ষু দেখা গেল । তারপর বেশ কিছু খুলে স্বস্তিভরা সুরে বললেন – ও আপনি ! আরে আরে ভিতরে আসুন ,ওখানে দাঁড়িয়ে কি গজালি করছেন। -আরে গজালি কি করছি কি সাধে ? দরজা আটকে দুই সম্মুন্ধির পো দাঁড়িয়ে আছে যে । গিরীনবাবু পুলিশটিকে বললেন – ইনি বন্ধু লোক ,আসতে দিন । পুলিশটি একবার গিরীনবাবুর আর একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শেষে বললেন –যান । গিরীনবাবু বেশ পোক্ত করে দরজার হুড়কোটা টেনে বসলেন নিজস্ব আসনে ।আমার দিকে তাকিয়ে বললেন বসুন । পরিবেশটা বেশ রহস্যঘন হয়ে উঠেছে ।গিরীনবাবুর মুখে উদ্বেগের স্পষ্ট ছায়া ।উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জানতে চাইলাম – কি ব্যপার মশাই , এত পুলিশ কেন ? বসুন বসুন । বলছি সব কথা । যা অবস্থা, পুলিশ আসবে না, বরযাত্রী আসবে? ভয়ে আমার তো হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে । ভয়ের একটা কারণ যে ঘটেছে তা তো লাল পাগড়ীর মেলাতেই অনুমান করা যায় ।দিনকাল যে খারাপ,সেটা একটা বাচ্চাও আজকাল বোঝে। অন্যদিন হলে অরাজকতা নিয়ে একটা বিশদ আলোচনা করা যেত । এই ত্রস্ত পরিবেশে তার অবশ্য অবকাশ নেই । গিরীনবাবুর সংক্ষিপ্ত স্বীকারোক্তিতে রহস্যের বিন্দুমাত্র আভাষ পাওয়া গেলনা ।আসল কথাটি গল্পের মর‍্যালের মত টপাক করে বলে ফেলার মানুষ নন গিরীনবাবু । অতি তুচ্ছ ঘটনাকেও বেশ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ,রসিয়ে কষিয়ে না বললে যেন তৃপ্তি পাননা ভদ্রলোক। কোন এক নিমন্ত্রণে ভর পেটে খাবার পর এক হাঁড়ি রসগোল্লা খাওয়ার গল্পটি বলতে তিনি তিন কোয়ার্টার সময় নিয়েছিলেন। আগাত বিপদের মুখেও সে বাচনভঙ্গির কোন হেরফের হয়নি ।মুখটা গম্ভীর করে অতঃপর বললেন – কিছু বুঝলেন? এত স্বল্প তথ্যে কিছু বুঝে ফেলারও মত এলেম আমার নেই ,তাই কেবল বললাম – ব্যপারটা গোলমেলে ঠেকছে । গিরীনবাবু আমার মুখের কথাটা প্রায় থাবড়া মেরে ছিনিয়ে নিয়ে বলে উঠলেন – গোলমেলে? বিকেল থেকে আমার হাত পা পেটের মধ্যে সেধ্যে যাবার জোগাড় হয়েছে ।আর আপনি বলছেন গোলমেলে ব্যপার !! - আরে কি ঘটেছে বলবেন তো -আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। - ঘটেনি ,ঘটতে চলেছে ।ঘটলে কি এমন নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারতেন? দেখতেন এতক্ষণে আমার খুলিটা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে,নয়তো বোমার ঘায়ে চিৎপটাং হয়ে আছি । - বলেন কি মশাই ! গুলি বোমা ! আমার উৎকণ্ঠা চাপা থাকেনা। - তবে আর বলছি কি মশাই। সেই পাঁচটা থেকে এখানে বন্দী হয়ে আছি ।সকাল থেকে এক কাপ চা ও জোটেনি বরাতে । গোলমালের গন্ধ পেয়ে মেজদাও আজ স্টল খোলেনি ।স্টেশন ছেড়ে কোয়ার্টারেও যাবার সাহস হয়নি ।কিছু একটা ঘটে গেলে…… - বাক্যটা সম্পূর্ণ না করেই গিরীনবাবু জিজ্ঞেস করেন – আচ্ছা শশাঙ্কবাবু আজকাল চিঠি লিখে ডাকাতি হয় নাকি আগের দিনের মত ? - -চিঠি লিখে ডাকাতি !! সেকি ! কে দিল !! আমার বিস্মিত প্রশ্ন । - - কে আর দেবে ।আমার পত্নীর ভাই ।আপনিও বেশ লোক মশাই । সে চিঠিতে নাম ধামা ঠিকুজি কুষ্টি থাকে নাকি ? গলায় বিরক্তির সুর । - তবে শুনুন । কালই ডাকে এসেছে চিঠিটা ।কারা যেন আজ অর্থাৎ শনিবার স্টেশন লুঠ করবে চিঠি দিয়েছে । আমি হেসে ফেলি । বলি – ধ্যৎ মশাই । স্রেফ গাঁজা ।আগে ভাগে কেউ আপনায়ে এপ্রিলফুল করেছে । - আমিও গোরায় তাইই ভেবেছিলাম ।তবু সাবধানে মার নেই ।তাই মঙ্গল সিং কে দিয়ে থানায় খবর দি – সঙ্গে চিঠিটাও পাঠিয়ে দি । আর তাই থানা থেকে এই ফোর্স পাঠিয়ে দিয়েছে । গাঁজা হলে কি পুলিশ মৌতাত ছেড়ে পাহারা দিতে আসে! - তাও বটে ।অস্বস্তিটা বাড়ল । এ যেন সেই ভুতের গল্প হল ।বিশ্বাস হয়না ,আবার স্থান কাল বিশেষে গা ছওম ছওম করে ।কোন ছুতোয় এখন উঠে পড়তে পারলেই স্বস্তি । তবু মুখে হাসি বজায় রেখে বললাম আজকের আড্ডাটাই মাটি । - আর আড্ডা । সময় থাকতে আজ সরে পড়ুন ।আমার বরাতে যা আছে তা হোক ,আপনি কে এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়বেন । - গিরীনবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্যে প্ল্যাটফর্মে পা দিলাম । সোয়া ছটার ডাউন লোকাল এর সময় হয়েছে ।যাত্রীর ভিড় বেশি নেই । বেঞ্চিতে বস আছেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক,পাশে জড়সড় হয়ে বসে সম্ভবত তাঁরই কন্যা। মেয়েটির গা ভর্তি গহনা ।মনে হয় সদ্য বিবাহিতা ,চলেছে শ্বশুরঘর ।একে এই বিপদের গন্ধ তার ওপরে ওই সালাঙ্কারা কন্যা ! ভদ্রলোক নাপড়েন অই হুমকি দেওয়া ডাকাতের খপ্পরে । কিছুটা দ্রুত পায়েই ফিরে চললাম বাড়ির পথে । - রাতে শয্যায় অনেকটা সময় কাটল জেগে ।মাথা থেকে গিরীনবাবুর পাওয়া চিঠিটা আর নববধূর মুখটা বারে বারে ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। পরের দিন সকালে কোন রকমে চা-টা গলায় ঢেলেই রওয়ানা হলাম স্টেশনের পথে । সেখানে পৌছে দেখলাম অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক । মেজদার স্টল খোলা স্টেশন ঘরে গিরীনবাবু যথারীতি তাঁর কাষ্ঠাসনে । যাহোক সহাস্য গিরীনবাবুর সঙ্গে দিনের দ্বিতীয় কাপ কাপ চাটা সারা যাবে । গিরীনবাবুর মুখে তখনো যেন গতকালের ছায়া ।আমাকে দেখে উদাসীন কণ্ঠে শুধু বলেন – আসুন । - চার পাশে নিজর বুলিয়ে দেখলাম ঘরের সবকিছুই স্বস্থানে আছে ।ওলটপালটের কোন চিহ্ন নেই । টেলিগ্রাফের যন্ত্র ।লাইন ক্লিয়ারের মেমো বই ।যুগযুগান্তরের চিট ময়লা ধরা টাকার বাক্সটাও যেমন থাকে তেমনি আছে । - মন্তব্য একটা করতেই হয় – যাক সব নিরাপদ তো ? - বিরক্তি চাপা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা - গিরীনবাবু বললেন দেখতেই তো পাচ্ছেন । - একটু সন্তর্পণে বলি – আগেই জানতাম সব ধাপ্পা ।কোনও চ্যাংড়া ছোঁড়ার কীর্তি । - অপ্রত্যাশিত আক্রোশে গিরীনবাবু বলে ওঠেন - চ্যাংড়া ? ঘাটের মড়া মশাই । যম ওর জন্যে হা পিত্যসে করে বসে আছে ।কেও যে এখনও নেয়নি ! আর আপনি বলছেন চ্যাংড়া ! - গিরীনবাবু যে সরাসরি আসলে ঘটনায় আসবেন সে আশা বৃথা ।তাই নীরবে অপেক্ষায় থাকি । - - আচ্ছা শশাঙ্কবাবু ,কাল এখান থেকে যাবার সময় বেঞ্চে কাউকে বসে থাকতে দেখেছিলেন ? গিরীনবাবু জানতে চাইলেন । - হ্যাঁ হ্যাঁ সকন্যা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখেছিলাম তো ।কিন্তু... - আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই গিরীনবাবু চিৎকার করে ওঠেন ।ভদ্রলোক !! ফুঁঃ । একটা আস্ত শয়তান মশাই লোকটা। বুড়োটা ট্রেনে ওঠার আগে মঙ্গল সিং এর হাতে এই চিরকুটটা দেয় আমাকে দেবার জন্যে । চিরকুটটা আমার দিকে এগিয়ে গিরীন বাবু বলেন - পড়ে দেখুন ।কাগজটা হাতে নিয়ে পড়লাম । ছোট্ট চিঠি । - মাষ্টার মশাই, - এক গা গয়না সহ কন্যাকে নিয়ে যেতে হচ্ছে তার শ্বশুরবাড়ির জরুরী তলবে । আমরা চাইলে তো পুলিশ পাহারা পাবনা।তাই এই ছলনা টুকু করতে হল । মার্জনা করবেন । - নমস্কারান্তে - জনৈক যাত্রী

89

12

ঝিনুক

নিবিড় অমা-তিমির হতে…..

"আমি লিখেছিলাম চিঠিটা" …… প্রণতি বলে ওঠেন হঠাৎ| "কোন চিঠি?" …… সুপারি কুচানো থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন অবাক জয়তী| প্রণতি উত্তর দেবার আগেই কলকল করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে উঠে আসে চাঁদনি আর জিনিয়া‚ "মা‚ মা‚ মান্তুদিরাও কাল আসছে| কি মজাটাই না হবে এবার! তোমার পায়ে ব্যথার অজুহাত কিন্তু একদম চলবে না‚ আগে থেকেই বলে রাখছি‚ সামনের রবিবার সবাই মিলে পিকনিকে যাব হুড্রুতে‚ যাবই| চুটিয়ে মজা করবো এবার"….. এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে চাঁদনি জয়তীকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আদুরে বিড়ালের মত গাল ঘষতে থাকে মায়ের চুলে| সামনের মাসে একত্রিশ বছর বয়স হবে মেয়ের‚ কিন্তু চেহারায়‚ চলনে‚ বলনে কোথাও তার কোন চিহ্ন আছে? মনে হয় যেন এখনো কিশোরীটি| ওর বয়সে জয়তী দুই বাচ্চার মা‚ চাঁদনির পুরো পাঁচ বছর বয়স তখন| জয়তীর হয়ে প্রণতিই উত্তর দেন‚ "সত্যি‚ মান্তু আসছে? অনেকদিন পরে দেখা হবে‚ সেই টিপু হবার সময় শেষ দেখেছিলাম পাঁচ বছর আগে মেয়েটাকে"…… এবার জিনিয়ার পালা‚ "হ্যাঁ মা‚ শুধু মান্তুদি আর টিপু না‚ দিব্যদাও আসছে ওদের সাথে| সত্যিই‚ এবার একদম ফুল রি-ইউনিয়ন…… চাঁদনির থেকে বছর তিনেকের ছোট জিনিয়া‚ কিন্তু হাবে ভাবে যেন চাঁদনির বড় দিদিটি| গড়নে পেটনেও একটু ভারি‚ মাপা হাসি‚ চাপা কথা| "টিপুর জন্য একটা গিফট কিছু কিনে আনিস তাহলে আজই| তোরা তিনজন একসাথে হলে তো আর তোদের টিকিটিরও দেখা পাওয়া যাবে না কাল থেকে"…… মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন প্রণতি| "চাঁদনি‚ রবিবার যদি পিকনিকে যেতে হয়‚ তাহলে গরানকে আজই জানিয়ে পয়সাকড়ি দিয়ে আসিস বাজারঘাট করার জন্য| ও ঘর ছাইছে‚ খুব ব্যস্ত| একটু সময় হাতে রেখে না বললে অসুবিধা হতে পারে" …… তাড়া লাগান জয়তী‚ চিরকালই তিনি একটু গোছানে প্রকৃতির| পান সাজা আপাতত শেষ‚ একটা পান প্রণতিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা মুখে দিলেন জয়তী| যেভাবে এসেছিল‚ ঠিক সেইভাবেই আবার দুদ্দাড়িয়ে নীচে নেমে গেল দুই মেয়ে| ওদের যাবার দিকে চেয়ে রইলেন দুই পাকাচুলের বান্ধবী একসাথে| ওদের দেখে নিজেদের ছোটবেলা যেন ভিড় করে আসতে থাকে এই অবেলার ছাদে| বহুদিন বাদে এবারের শীতে আবার রাঁচিতে প্রণতি আর জয়তী‚ আবাল্যের দুই বান্ধবী| গার্জিয়ান দুই মেয়ে প্ল্যান করেই মায়েদের নিয়ে এসেছে ছুটি কাটাতে| এই শহরেই জন্ম দুজনেরই| পড়াশোনা‚ বড় হওয়া‚ বিয়ে সবই এই শহরে‚ পাশাপাশি বাড়িতে| প্রণতি অবশ্য অনেকদিনই অনাবাসী| বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই স্বামী শোভন বোস ট্র্যান্সফার হয়ে যান দিল্লীতে| কিন্তু প্রণতির সেখানেও থাকা হয় নি| সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন মিস্টার বোসের বদলির চাকরির সুবাদে| গত বছর মি: বোস হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবার পর অধুনা মেয়ের সাথে ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা‚ জিনিয়া সেখানে এক মাল্টিন্যাশন্যাল কম্প্যানির মার্কেটিং ম্যানেজার| জিনিয়া অবশ্য বড় হয়েছে এই রাঁচিতেই‚ কাকু-কাকীমার কাছে| ঐ একটিই সন্তান প্রণতির| জয়তী বছর তিনেক আগে অবধি রাঁচিতেই ছিলেন| স্বামী রজত সেন ছিলেন ব্যারেজের সর্বময় কর্তা‚ শুধু পদাধিকার বলেই নয়‚ সর্ব অর্থেই| ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই চলে গেলেন বিনা আড়ম্বরে| বাবার মৃত্যুর পর ছেলে মেয়ে কেউই রাজি হল না মাকে একা একা রাঁচিতে থাকতে দিতে| চাঁদনির সঙ্গে কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকেন আজকাল‚ মাঝে সাঝে ছুটিতে আসেন রাঁচির বাড়িতে‚ ঝাড়পোঁছ করিয়ে রেখে যান‚ কাঁথাকম্বল রোদে দেন| ইদানিং জর্দাপানের নেশাটা বড্ড বেড়েছে জয়তীর| চাঁদনি কলকাতার আইটি হাবের অসংখ্য কলাকুশলীদের একজন| জয়তীর ছেলে তমাল আই আই টিতে মেক্যানিক্যাল ফাইন্যাল ইয়ার| ওরও আসার কথা ছিল এবার‚ কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর হয়ে উঠলো না| দুই মেয়েতে ভাব সেই ছোট থেকেই| বরং মায়েদের যোগাযোগেই কিছুটা ভাটা পড়েছিল সংসারের চাপে| অবশ্য নেই নেই করেও টুকটাক ফোনাফুনি হত মাঝেসাঝে দুজনের বা ছুটিছাটাতে দেখাও হত| কিন্তু মুখোমুখি বসে এমন ঘনিষ্ঠ আড্ডা হয় নি অনেকদিন‚ সুতোটা কোথায় যেন একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল| অনেকদিন পরে আজ জয়তীদের ছাদে শেষ দুপুরের রোদের আমেজ মেখে দুই সখীতে একথা সেকথা--- মূলত মেয়েদের নিয়েই আলোচনা‚ তাদের ঘিরেই চিন্তা| স্মার্ট‚ শিক্ষিত‚ দেখতেও মন্দ নয় কাউকেই‚ সর্বদিক দিয়েই গুণান্বিতা‚ নয় নয় করে বয়সও কম হল না‚ তবু বিয়ে-থার ব্যাপারে কারো কোন উৎসাহই নেই| এক আধটা প্রেম ট্রেমও যদি করতো‚ কিন্তু তাতেও মন নেই| বন্ধুদের মধ্যে ছেলেবন্ধু অনেকই আছে‚ কিন্তু প্রেমিক কেউ নয়| তাই নিয়ে কিছু বলতে গেলেই‚ "তোমরা না বড্ড ব্যাকডেটেড" …. শুনতে হয়| হয়তো সত্যিই তাই‚ ব্যাকডেটেডই| এই প্রজন্ম অন্যভাবে ভাবতে শিখেছে| তাদের মত হুট বলতেই প্রেমে পড়ার বাতিক এদের নেই| চাঁদনি তো মোটামুটি জানিয়েই দিয়েছে যে বিয়ে সে করবে না| কথায় কথায় ফেলে আসা দিন এসে পড়ে গুটি গুটি পায়ে| স্কুল পেরিয়ে কলেজ‚ পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজো‚ দোলখেলার আবীর‚ ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠান‚ গুপ্ত প্রেম‚ ব্যক্ত প্রেম| রোদ পড়ে এসেছে প্রায়‚ উত্তর দিক থেকে হিমহিমে বাতাস দিচ্ছে| শালটা খুলে আলসের ওপরে রেখেছিলেন জয়তী| টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলেন ভালো করে| "কি যেন বলছিলি তুই‚ কি একটা চিঠির কথা"….. একটু প্রশ্নবোধক স্বরে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন জয়তী| "বলছিলাম যে চিঠিটা আমি লিখেছিলাম"….. "কোন চিঠিটা?"…..ভারি বিভ্রান্ত দেখায় জয়তীকে| "যে চিঠি পড়ে সেই রাতে জগন্নাথ মন্দিরের পেছনে ছুপাদহর মাঠে গিয়েছিলি তুই শুভর সাথে দেখা করতে"…… "কি বলছিস তুই?"……জয়তীর চোখে মুখে উৎকন্ঠা মিশ্রিত বিস্ময়| "হ্যাঁ‚ ঠিকই বলছি| কি করে পারলি তুই‚ জয়ী? আমার শুভ‚ আমার‚ আমার‚ শুভ আমার| তাকে মন দিতে তোর লজ্জা করলো না?"….. কেমন হিসহিসে শোনায় প্রতিমার গলাটা| "না না‚ আমি কোত্থাও যাই নি| কোন চিঠির কথা ব-বলছিস তুই‚ আ-আমি বুঝতে পারছি না"….. একটা কাঁপুনি যেন একেবারে নাভি থেকে শরীর বেয়ে উঠে আসতে থাকে জয়তীর| "মনে নেই বলছিস তোর চিঠিটার কথা? মনে করিয়ে দিই তাহলে ----ঠিক সাতটার সময় যখন আরতি শুরু হবে মন্দিরে তখন এসো ছুপাদহর মাঠে| আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়| ভয় পাচ্ছো নাকি? বোকাটা| কোন ভয় নেই| আমি থাকবো তো| দেখা হবে তাহলে| হবে তো? তোমারই শুভ|---- কি‚ মনে পড়ছে?" চোখ সরু করে শাণিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন প্রণতি| "কিন্তু আমি তো পড়েই পুড়িয়ে ফেলেছিলাম চিঠিটা"….. ভেঙে পড়া স্বরে অস্ফুটে বলেন জয়তী| "চিঠিটা শুভ লেখে নি জয়ী‚ আমি লিখেছিলাম"…… প্রত্যেকটা শব্দ কেটে কেটে বলেন প্রণতি| "কিন্তু কেন?"….. অদ্ভুত শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী বান্ধবীর চোখে চোখ রেখে| প্রণতিকে হঠৎ কেমন নিভন্ত‚ অসহায় দেখায়| একটু আগের সেই স্ফুরিতনাসা‚ অগ্নিবর্ষী প্রণতি ভেঙেচুরে এলিয়ে পড়েন চেয়ারে এই একটুখানি ছোট্ট হয়ে| "রাগে আর হিংসায় পাগল হয়ে জয়ী| মাথার ঠিক ছিল না আমার রাগের চোটে| তোর নিষ্পাপ সৌন্দর্য‚ নরমসরম স্বভাব‚ তোর ম্যাথ আর সায়েন্স স্কোর‚ তোর গানের গলা‚ কোনটার সাথেই পাল্লা দেবার ক্ষমতা তো আমার ছিল না রে| শুভ কিরকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তোর দিকে তাকাতো লুকিয়ে চুরিয়ে‚ আমার বুকের মধ্যে জ্বলে যেত জয়ী| তুইও| তুইও তো পাল্টা ফিরিয়ে দিতি সেই দৃষ্টি চুপি চুপি ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে| কোনদিন ভেবেছিস আমার কথা তোরা কেউ? আমি তখন প্রায় শুভর বাগদত্তা‚ শহরে সবাই জানে আমাদের কথা| সে যে কি ভীষণ পরাজয়‚ কি জ্বালা| তুই বুঝবি না জয়ী"….. প্রণতির গলার স্বরটা ভীষণ বিষণ্ণ শোনায়| "আমার কোন ধারণাই ছিল না যে আমার ওপর তোর এত রাগ ছিল রে ইতি| কিন্তু কি লাভ হয়েছিল তোর মিছিমিছি ঐ চিঠি লিখে?"….. অসম্ভব শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী| "হ্যাঁ‚ আজও মনে পড়লে আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে‚ কিছুতেই ক্ষমা করতে পারি না আমি তোদের| আর সেদিন তো রাগের চোটে দিগবিদিক ঠাহর হচ্ছিলো না আমার| প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম‚ ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ| তারপর পরের দিনই যখন শুনলাম তুই জ্বরে পড়েছিস‚ কি আনন্দ যে হয়েছিল‚ ভাবতে পারবি না| ভগবানকে ডেকেছিলাম তোর মৃত্যু চেয়ে| সবটা না হলেও কিছুটা পূরণ করেছিলেন ভগবান আমার প্রার্থনা| মনে আছে তারপর গোটা মাস ধরে তোর সেই নিউমোনিয়ায় ভোগার কথা?"…. প্রণতির গলার স্বরে তিক্ততা আবার ফিরে আসে| "আছে‚ কিন্তু আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুই লিখেছিলি চিঠিটা"…… অন্যমনস্কভাবে বলেন জয়তী| দপ করে জ্বলে ওঠেন প্রণতি আবার‚ "চিরকালের শান্ত‚ শীলিত‚ বুদ্ধিমতী জয়ী আমাদের| পুড়িয়ে না ফেলে যত্ন করে রেখে দিতে পারতিস তো চিঠিটা লুকিয়ে| মিলিয়ে নিতে পারতি আমার হাতের লেখার সাথে এখন"…. শ্লেষ ঝরে পড়তে থাকে প্রণতির স্বরে| কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠেন তিনি‚ "যাস নি সেদিন তুই সন্ধ্যেবেলা মন্দিরের পেছনের মাঠে চিঠি পেয়ে? সাহস থাকে তো স্বীকার কর আজ| আমি তো জোর গলাতেই বলছি যে চিঠিটা আমিই লিখেছিলাম| বল‚ যাসনি তুই সেদিন? বন্ধুর হবু বরের কাছে গোপন অভিসারে যেতে বাধে নি সেদিন‚ আজ অন্তত স্বীকার করে কিছুটা পাপমুক্ত হ"..... "হ্যাঁ গেছিলাম"…. শান্ত উত্তর জয়তীর| "একবারও মনে হল না তোর আমার কথা যাবার আগে?"….. গলার স্বরে লবণাক্ত অশ্রুর ছোঁয়া এবার প্রণতির| "হয়েছিল"….. "হয়েছিল!! মনে হয়েছিল আমার কথা? তবু পা উঠেছিল যেতে?"…. বিস্ময়ে কন্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে আসতে চায় প্রণতির| "হ্যাঁ‚ হয়েছিল‚ খুব গিলটি ফীল করেছিলাম| যাব কি যাব না দ্বিধায়‚ উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্বে‚ অন্যায়ের গ্লানিতে তিন তিনটে দিন জ্বলেছিলাম"….. "তবু গেলি?" ….. "হ্যাঁ যেতেই হল| সেই প্রথম‚ সেই শেষ চিঠি শুভদার| সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর শেষ অবধি আমি জোগাড় করে উঠতে পারি নি রে ইতি"….. "সে তো বটেই‚ সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর ছিল না‚ এত্ত প্রেম| অথচ তার দুমাসের মধ্যেই বাবামায়ের সুবোধ বালিকা হয়ে কেমন কনে সেজে রজতদার গলায় ঝুলে পড়লি! ইচ্ছে করছে সারা দুনিয়াকে ডেকে তোর আসল রূপটা দেখিয়ে দিতে‚ হিপোক্রিট একটা"….. সন্ধ্যার ডানায় ভর করে অন্ধকার নেমে আসে‚ সাথে ঠাসবুনোট স্তব্ধতা| বেশ কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই| তারপর প্রণতি খুব নীচু গলায়‚ প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেন‚ "I’m sorry”… "এতদিন ধরে চেপে রেখে আজ হঠাৎ কেন জানাতে চাইছিস? আমাকে শাস্তি দিতে?"….. জানতে চাইলেন জয়তী| "না না‚ অত শত ভেবে কিছু করি নি| জানিয়ে দেবার ইচ্ছে তো ছিল তখনই| অ্যাকচিউয়্যালি প্ল্যান তো ছিল সেটাই‚ তোকে টীস করা‚ তোকে বোকা বানিয়ে নাকে ঝামা ঘষে দেওয়া‚ হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডার মধ্যে একা একা ঐ ভূশণ্ডির মাঠে কেমন মজা করলি‚ সেটা জানতে চাইবো পরদিন দুপুরে| কিন্তু চিরকালের ল্যাদাডুস তুই তো সেই সন্ধ্যেতে বেকায়দা ঠাণ্ডা লাগিয়ে এসে নিউমোনিয়ায় অচৈতন্য হয়ে রইলি তার পরের গোটা মাস ধরে| জিজ্ঞাসা করার আর সুযোগ হল না| তারপর সেরে ওঠার পরেই বা আর সময় পেলাম কই? দুই সপ্তাহও তো পেরোল না পুরো‚ তোর বিয়ে হয়ে গেল রজতদার সাথে| নি:শ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিলাম অবশ্য সেদিন‚ ভেবেছিলাম পথের কাঁটা ঘুচলো" ….. ঝড়ের গতিতে একটানা এতগুলো কথা বলে দম নিতে থামেন প্রণতি| "বুঝলাম‚ কিন্তু এতদিন বাদে আজই বা তাহলে আবার টেনে বার করলি কেন সেই সাপ ঝুড়ি থেকে?" "কি জানি‚ রাগটা ভিতরে ভিতরে বোধহয় রয়েই গেছিলো কুণ্ডলী পাকিয়ে| আজ হঠাৎ পুরনো কথার পিঠে বেরিয়ে পড়লো"….. "কিন্তু আমি তো একা একা মজা করি নি সেরাতে ঐ ভূশণ্ডির মাঠে"…… মাত্রাতিরিক্ত শান্ত স্বরে বলেন জয়তী| "তার মানে? কে গেছিলো তোর সাথে?"…… অবাক প্রণতি জানতে চান| "শুভদা"….. সংক্ষিপ্ত উত্তর জয়তীর| "বুঝলাম না‚ ইয়ার্কি করছিস নাকি? ঐ চিঠি তো আমি লিখেছিলাম| শুভকে জানিয়ে লিখেছিলাম ভেবেছিস নাকি?"….. "না‚ শুভদার নামে ঐ চিঠি হয়তো তুই লিখেছিলি‚ ইতি| কিন্তু সেই চিঠির উত্তরটা আমি নিজে হাতেই লিখে দিয়েছিলাম শুভদাকে| আমি যখন পৌঁছেছিলাম ছুপাদহের মাঠে সেদিন সন্ধ্যেতে‚ শুভদা আমার অপেক্ষায় ছিল| কাজেই মজাটা একেবারে একা একা করতে হয় নি রে আমাকে"……. "মিথ্যে কথা‚ হতেই পরে না‚ মিথ্যে বলছিস তুই| লজ্জা করছে না তোর এত বড় মিথ্যেটা বানিয়ে বলতে শুভর নামে? একটু আগেই না ভালোবাসার বড়াই করছিলি? আর এখন মরা মানুষটার নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলছিস?……. "তোর যা প্রাণে চায়‚ বিশ্বাস করতে পারিস ইতি| মিথ্যে আমি বলছি না| ওতে তো তোরই একচেটিয়া অধিকার" ……. ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ান জয়তী পানের কৌটোখানা হাতে নিয়ে| "হুঁহ‚ সেই জয়ী‚ সবসময়ে ফার্স্ট‚ সবেতেই জিতে যাওয়া জয়ী| আমারই চালে আমাকেই হারিয়ে দিলি তাহলে"…… হো হো করে হেসে ওঠেন প্রণতি অন্ধকার সন্ধ্যেটাকে চমকে দিয়ে| "কিন্তু এত জিতেও লাভ কি হল জয়ী? কি পেলি শেষে? শুভকে তো পাওয়া হল না তোর| সেই আমার মত হেরো মেয়েই জিতে নিল শুভকে"…. চেয়ারের হাতলে চাঁদনির রেখে যাওয়া সোয়েটারটা ভাঁজ করে নিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন জয়তী‚ "শুরুটা সেদিনও তুইই করেছিলি ইতি‚ আজও তাই| কি পেয়েছি জানতে চাইছিস তো? শুনবি? সত্যিই শুনবি? সইতে পারবি তো? চাঁদনিকে পেয়েছি"….. আর ঠিক তক্ষুনি শুক্লা ত্রয়োদশীর চাঁদখানা রাজরানীর মত এসে দাঁড়ালো আকাশের পুব অলিন্দে|

188

7

মনোজ ভট্টাচার্য

ক্যালেন্ডার থেকে খসে পরা আরো একটা দিন !

ক্যালেন্ডার থেকে খসে পরা আরো একটা দিন ! কেউ কখনো শুনেছেন – ভোগের পাতায় মাছের কাঁটা ! না - ঠাট্টা নয় ! সত্যিই সেবাইতরা হয়ত রোজ রোজ নিরামিষ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে দুটো মাছের কাঁটা ছিটিয়ে দিয়েছেন – গঙ্গা জলের মতো ! – কোথায় ? বলছি – শুনুন তবে ! শরৎচন্দ্রের শেষকালের আবাস দেখেছি দেউলটিতে - । দেখতে গেছি জন্ম-আবাস । দেবানন্দপুর ! অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে – যখন পৌঁছলাম – তখন ভো-র দশটা । আবাস স্থলটা হল সরকারী দখলে ! রাজ্য-সরকারের কটায় সকাল হয় ? নিশ্চয় ভোর দশটায় নয় ! অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করেও সাড়ে এগারোটার সময় শরত বাবুর পৈত্রিক আবাস দেখে ফিরে আসার কথা ভাবলাম !- পাশেই সেই বাড়িটার মধ্যে ঢুকে খান কয়েক ছবি তুলে নিলাম ! – অথচ আশেপাশে অনেকেই বলল – একটু অপেক্ষা করুন – কেয়ার টেকার ঠিক এসে যাবে ! কিন্তু আমাদের মনে হল শুক্রবার হয়ত তিনি আসা পছন্দ করেন না ! তো আমরা ব্যান্ডেল চার্চের উদ্দেশ্যে চললাম ! সত্যি অতি সুন্দর চার্চ ! চারিদিকে প্রাচুর্য উপছে পড়ছে ! সমস্ত দেওয়াল জুড়ে যীশুর অলৌকিক মহিমা আঁকা ! ভিড় অল্প বিস্তর হয়েছে ! ঢোকার ও বেরুবার সময়ে চার্চের দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে শীর্ণ শীর্ণ ছোটো ছোটো হাত বেরিয়ে এসেছে – কোনও হাতে ধুপ – কোনও হাতে মোমবাতি ! বিক্রি করছে । আচমকা দেখলে চমকে যেতে হয় ভয়ে ! ইংরিজি সিনেমার দৃশ্যের মতো কবর থেকে হাত উঠে আসছে মনে হয় ! ল্যান্ড অব দ্য লিভিং ডেড ! কেন জানিনা চার্চের মধ্যে ঢুকলেই আমার খুব বারাব্বাসের কথা মনে পড়ে ! – দুজনেই মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত – অথচ মানুষে বেছে নিল বারাব্বাসের মুক্তি ! যীশুর ওপর মানুষের কোনও আস্থাই ছিল না নাকি ! যাকগে, এসব গভীর তত্ত্বকথা – যত জানার চেষ্টা করব তত গরল উঠবে ! শেষে এলাম হংসেশ্বরী মন্দিরে ! – খাবার দোকান ভাল ছিল ব্যান্ডেলে । তার কিছুক্ষণ আগেই ব্রেক ফাস্ট পর্ব সেঁটেছি ভাল মতই ! তাই ব্যান্ডেলে আর খেতে ইচ্ছে করল না ! চলে এলাম এই বাঁশবেরিয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে ! এই মন্দিরের কথা শুনেছি অনেকদিন – কিন্তু আসা হয় নি ! মন্দিরের কাঠামো দেখে খুব ভাল লেগে গেল ! কিছুটা মস্কো মস্কো ছোঁয়াচ ! হংসেশ্বরী বলতে আমাদের প্রথমেই মনে হল – হাঁসের ওপর সরস্বতী মূর্তির কথা ! কিন্তু কথা হল সরস্বতীর কি সেই ধরনের প্রভাব প্রতিপত্তি থাকতে পারে – হ্যাঁ, সব ঘরে তার পুজো হয় বটে - ! কিন্তু এত সুন্দর একটা মন্দির ! – আসলে তার পাশের মন্দিরের নাম – বাসুদেব মন্দির ! তার মানেই - হংসেশ্বরী মানে কালী ! বেচারী শিবের নাভীর থেকে প্রস্ফুটিত এক পদ্মের ওপর দন্ডায়মান কালী ! নীলবর্না, ত্রিনয়নী, চতুর্ভুজা, খড়্গধারিনী ও নরমুন্ডমালিনী ! যথারীতি এই মন্দিরের কাজ সম্পন্ন হওয়া নিয়েও বেশ কিছু কাহিনী আছে । রাজা নৃসিংহদেব ১৭৯৯ সালে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন । কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৮১৪ সালে ! তার স্ত্রী রানী শঙ্করী সম্পন্ন করেন ! মন্দিরের ছটা মিনার ও মূল মন্দিরের সুউচ্চ চুড়া – যদিও লেখায় আছে তেরটা – দারুণ কারুকাজ ! – আর তার পাশেই বাসুদেব মন্দির । সম্পূর্ণ টেরাকোটা কাজ করা ! কিছু কিছু কাজ খাজুরাহের মন্দিরের কথা স্মরণে আনে ! মন্দিরের প্রধান পুরোহিতই হবে – আমাদের বোঝালেন – হংস মানে কি ! সে এক দুরূহ তত্ত্ব ! মুখ্যত - জ্ঞান ! হিন্দিতে বলে না – দানে দানে পে লিখ্যা হায় খানেবালাকা নাম ! – প্রায় সেরকমই - আমাদের কল্পনাতেও ছিল না – এখানেও ভোগ হয় ! আমাদের চালককে দেখেই কেউ বলে উঠল – সাড়ে বারোটায় ভোগের কুপন দেওয়া শেষ হয়ে গেছে ! – যা আমাদের মনের মধ্যে ছিল না – তার জন্যে তো দুঃখ হয় না ! – তা প্রধান সেবাইত – আমার স্ত্রীকে দেখে দয়া পরবশ হয়ে বললেন – তোমরা ভোগের জায়গায় চলে যাও – ওখানে পেয়ে যেতে পারো ! – তখন আমরা ছবি তুলতে ব্যস্ত ! চালক এসে ডাকল । ভোগের জায়গায় আসতেই নগদ পয়তিরিশ টাকা করে দিতে হল ! ভোগ কারে কয় ! সে কি টল টল করছে খিচুড়ি ! – তারই ওপর ঝাল একটা লাবরা জাতীয় তরকারি, দুটো ছোট্ট ছোট্ট আলু-ভাজা, তারই একদিকে একটু লাল ও সাদা ! লাল ও সাদা দেখে বোঝা গেল – চাটনি ও পায়েস ! – ভোগ বলে কথা – হাসি হাসি মুখ করে খেতে হয় ! সবাই তো বেশ তৃপ্তি সহকারেই খেলো ! কিন্তু আমার স্ত্রী একটা কাঁটা দেখিয়ে বলল – একী – মাছের কাঁটা এলো কোত্থেকে ! - মাছের কাঁটা ! আমাদের চালকও রাঁধুনিকে জিজ্ঞেস করলো – এতে কি মাছ দেওয়া হয়েছে ? – সে কোনও উত্তরই দিল না ! – কিন্তু আরও একজন মাছের ছাল জাতীয় কিছু পেয়েছে ! – বাইরে কেউ কেউ বলল – ওখানে ভোগে নাকি মাছ দেয় ! মাছ কোথায় ! এ তো মাছের ছিটে ! – তাও – ভোগে যে মাছের ছিটে দেয় – তা তো কখনো শুনিনি ! এখনও আমাদের আরও কত কিছু শুনতে হবে ! বলে না - লার্নিং ফ্রম বার্নিং ঘাট ! মনোজ

62

4

শিবাংশু

গণেশ পাইনের রানি

".... তুমি ছেঁড়া জামা দিয়েছো ফেলে ভাঙা লন্ঠন, পুরোনো কাগজ, চিঠিপত্র, গাছের পাতা- সবই কুড়িয়ে নেবার জন্য আছে কেউ তোমাদের সেই হারানো দিনগুলি কুড়িয়ে পাবেনা তোমরা আর ।" সুকান্ত আমার অনেকদিনের বন্ধু । সেই হাফপ্যান্টের আগে থেকেই । ডাকনাম সুকু । আমাদের মতো জামশেদপুরেই ওদেরও সব কিছু । ওর কাকা থাকতেন কদমায়। সুকুর সঙ্গে ছোটোবেলা থেকেই যাতায়াত ওঁদের বাড়ি । রিমা, মানে মধুরিমা সুকুর খুড়তুতো বোন । বছর তিনেকের ছোটো হবে আমাদের থেকে । ওকে যে দেখতে কেমন বা ও যে একটা মেয়ে, এমন কোনও অনুভূতিই আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি কখনও। ছেলেরা বড়ো হই মাথায়, মেয়েরা বড়ো হয় মনে। যখন কলেজে পড়ি , তখন মনে হতো রিমা বোধ হয় একটু অন্যভাবে কথা বলে আজকাল । খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছিলো সে । পুজোর সময় তাকে যে অনেকে ঘুরে দেখছে, সেটা বোঝা যেতো । নিয়মিত দেখাশোনা, তবু ব্যক্তিগতভাবে সে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুর বোন, আমার কাছে সেটাই ছিলো তার পরিচয়। কলেজ ছেড়েই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাকরিতে ঢুকে পড়া । তার পর জামশেদপুর ছেড়ে বাইরে । নিত্য যোগাযোগ এভাবেই কম হয়ে যেতে থাকে । এর মধ্যে পর্ণা আসে মঞ্চে । আমি জামশেদপুরে ফিরে আসার পরেও বেশ কিছুদিন রিমার সঙ্গে দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন বিষ্টুপুর বাজারে মেঘানির দোকানের সামনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। চিনতে পারি, কিন্তু তাকে এখন দেখতে হয়েছে যেন সোয়ানলেকের হংসপরী। আমি দেখছিলুম তাকে। আমার সেই বিস্মিত চাওয়া দেখে মৃদুস্বরে বলেছিলো, শিবাজিদা, চিনতে পারছোনা নাকি? -পারছি তো, কিন্তু তুই তো দেখছি একেবারে হিরোয়িন হয়ে গেছিস....!! -বাজে কথা রাখো । তুমি ফিরে এসেছো খবর পেয়েছি, কিন্তু একবারও বাড়িতে আসোনি । মা জিগ্যেস করছিলো... - হ্যাঁরে, এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি ... সত্যি... -কাকে নিয়ে ব্যস্ত হলে, পর্ণা....? -আরে তুই এসব পাকা পাকা কথা শিখলি কবে ? -অনেকদিন... -তুই চিনিস ? পর্ণাকে... -চিনি তো, সাকচিতে থাকে । রবীন্দ্রভবনে গান শেখে... -হমম, অনেক কিছুই জানিস দেখছি...দাঁড়া আসবে একটু পরে ... পরিচয় করিয়ে দেবো... -থ্যাংক ইউ, পরিচয় করাতে হবেনা, আমিই করে নেবো... আজ আসি। বাড়িতে এসো , কথা হবে... -আয়.... এ যেন এক অন্য রিমা । এতোদিন ধরে যাকে চিনি, সে নয়... ------------------------ " প্লাতেরো আমারে ভালোবাসিয়াছে, আমি বাসিয়াছি আমাদের দিনগুলি রাত্রি নয়, রাত্রি নয় দিন যথাযথভাবে সূর্য পূর্ব হতে পশ্চিমে গড়ান তাঁর লাল বল হতে আলতা ও পায়ের মতো ঝরে আমাদের-প্লাতেরোর, আমার, নিঃশব্দ ভালোবাসা ।" মধুরিমার বাবা ছিলেন একটু অন্যধরনের মানুষ। টাটাবাবার স্মেলটারের আগুন আর পুড়িয়ে দেওয়া উত্তাপ তাঁর ভিতরের জলধারাকে শুকিয়ে দিতে পারেনি। গান-কবিতা-জীবনের গভীরতর সন্ধানের দিকে অমলিন টান রয়ে গিয়েছিলো । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'চতুর্দশপদী কবিতা' ছিলো তাঁর প্রিয় বিলাস । আমাদের বিভিন্ন আড্ডা-জমায়েতে অবাধ আসতেন। বয়সের ফারাক বা বোধের পরিণতি আলাপের মধ্যে কোনও অস্বস্তির কারণ হতো না কখনও। চাইবাসা থেকে ফিরে মাঝেমাঝেই তাঁর বৈঠকখানায় আড্ডা হতো আমাদের। শক্তি ও বিনয়'কে নিয়ে আমার পাগলামির প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা ছিলো। এই দুই কবির কবিতা নিয়ে কথাবাত্তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠতো প্রায়ই। সেই কথা চালাচালির চালচিত্রে শিবের মতন দাঁড়িয়ে থাকতেন জীবনানন্দ । রিমা আগের মতো ওদের বাড়ি গেলেই ঘরে এসে বসতো না । কখনও সখনও আসতো, কিন্তু মৌনতাই হয়ে যেতো তার অবয়ব। একদিন রাতে ওদের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় এগিয়ে দিতে এলো বাগান পেরিয়ে । সেদিন চাঁদ ছিলো, হাওয়া ছিলো, ভাসাভাসি হাস্নুহানার গন্ধও ছিলো চারদিকে। এ রকম একটা সময়ে সে আমায় বলে, শিবাজিদা, আমাকে কোনোদিন শক্তির কবিতা শোনাবে, বুঝিয়ে দেবে একটু? -সে কী রে? তুই বাংলা কবিতা শুনবি ? তাও আবার শক্তির,...? -কেন, কবিতা কি শুধু পর্ণার জন্য...? আমি.... -আরে শোন শোন... নিশ্চয় শোনাবো... সে আর অপেক্ষা করেনি, রুদ্ধশ্বাসে ছুটে ফিরে গিয়েছিলো । এতো অচেনা হয়ে গেলো মেয়েটা । ------------------------ ".....সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায় আকাশমনির । ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্লা হাওয়া নয় ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি চন্দ্রমল্লিকার ...." দেখা হলো বহুদিন পরে। তার সঙ্গে। অন্য চরাচর। অন্য চালচিত্রে। অন্য এক বসন্তদিনে I মেঘাতুবুরু'র অতিথশালায় আমায় নিতে এসেছে। তার পতিদেব কুন্তল আসতে পারেনি I যাবো থলকোবাদ। তখন সকাল। রোদ ক্রমে আসিতেছে। ঠিক সাতটা নাগাদ ফোন এলো রিসেপশন থেকে । গাড়ি এসে গেছে । নেমে আসি সামনের গাড়িবারান্দায় । কালো বন্ধ জীপ গাড়ি । খোলা জীপে ধুলোয় লাল হয়ে যেতে হয় । ড্রাইভার গাড়ির দরজাটা খুলে দেয় । উঠতে গিয়ে দেখি রিমা অন্যদিকের জানালার ধারে বসে। -গুড মর্নিং... সে ফিরে তাকাতেই চোখ পড়লো একটা টিপের দিকে, তার কপালে, লাল টুকটুকে । আমি রিমাকে সিঁদুরের টিপ পরে কখনও দেখিনি । সকালের আলো কি ধন্য হলো ঐ রংটাকে এতো বিশ্বস্তভাবে ধরতে পেয়ে । -দারুউউণ... -কী... -টিপ... -মানে..? -কিছু না .... গাড়ি ড্রাইভওয়ে ধরে রাস্তায় নেমে এলো । - শুনলাম তুমি নাকি আসতে চাইছিলে না.. -না না , ঠিক তা না ; সব চেয়ে উৎসাহী ব্যক্তিটি যদি আটকে যান, তবে .. মানে স্ফূর্তিটা একটু নিভে যায় তো... -ওহ, আমি ভাবলাম অন্য কোনও কারণ রয়েছে... -তুই খুব ভাবিস না..? -কেন ? আমাদের কি ভাবতেও মানা ? -ঝগড়া করার মতলব আছে নাকি রে? -নাহ, সেটাও তো মানা.... -বোঝো ...তবে বহুবচনটা, মানে 'আমাদের', ইহার ব্যাখ্যা বলহ... -'আমাদের' মানে, যাদের পর্ণার মতো এলেম নেই, লেসার মর্ট্যালস.... এবার আমি ওর চোখের দিকে তাকাই, রিমা মুখটা ঘুরিয়ে নেয়.. --------------------------- "যাবো না আর ঘরের মধ্যে অই কপালে কী পরেছো যাবো না আর ঘরে সব শেষের তারা মিলালো আকাশ খুঁজে তাকে পাবে না ধরে-বেঁধে নিতেও পারো তবু সে-মন ঘরে যাবে না বালক আজও বকুল কুড়ায় তুমি কপালে কী পরেছো কখন যেন পরে? সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন চতুর্দিক সহজ শান্ত হৃদয় কেন স্রোতসফেন মুখচ্ছবি সুশ্রী অমন, কপাল জুড়ে কী পরেছো অচেনা, কিছু চেনাও চিরতরে। " ---------------------------- স্তব্ধতা ভাঙি, - কী রে, অমন মুখ ব্যাজার করে বসে আছিস কেন ? ভালো লাগছে না ? -না তো, আমি ভাবলাম তুমি বিরক্ত হয়ে আছো বোধ হয়... -ওফ, শুধরাবি না আর... -আপেল খাবে ? -দে একটা...তোর ছেলেটা খুব মিষ্টি হয়েছে, ক'বার আসে বছরে ? এবার উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে যেকোনও মা'য়ের মতন । মসৃণ ঝর্ণায় অনর্গল আত্মজের গল্প ঝরে পড়ে । তার একেবারে ইচ্ছে নয়, ছেলেকে অতোদূরে রেখে পড়ায় । কিন্তু এ তল্লাটে তো কোনও ব্যবস্থা নেই। ভালো ইশকুল সেই জামশেদপুর । সে'ও খুব একটা কাছে নয় । আর সেখানে ভালো হস্টেল পাওয়া যায়না। কুন্তলের এক ভাই দার্জিলিঙে পড়তো । তার ছোটোবেলার স্বপ্ন ছিলো ঐ সব ইশকুল । নিজের হয়নি, ছেলেকে দিয়ে উপর সাধ মেটাচ্ছে । এতোক্ষণে সে যেন স্বাভাবিকতায় ফিরে এলো । যা'কে চিনতুম, সেই মেয়ে । স্পষ্ট বড়ো হয়েছে, শরীরে, মনে । কাঁঠালকাঠের চৌকি বদলে এসেছে খাট, কুঁড়েঘরের দরজা সরে জোড়া কপাট , এখন অনেক বড়ো হয়েছে... চুপ করে শুনি তার উচ্ছল জলতরঙ্গের শব্দভাষ । তাকে বলি, -একটা কথা বলবো ? -নিশ্চয়, বলো... -নাহ, থাক, আফটার অল, ইউ আর আ পরস্ত্রী... -ন্যাকামি করতে হবেনা, এসব কবে থেকে শুরু করলে... -তবে বলি? -না, বোলোনা... -তবে বলেই ফেলি, কী বল..? এবার সে ভেঙে পড়ে হাসির সেই শব্দে, পিয়ানো'র বাঁদিক থেকে ডানদিকে দ্রুত গড়িয়ে দেওয়া আঙুল থেকে যে ঝংকার বেজে ওঠে , শালপাতায় ঝরে পড়া বৃষ্টির প্রথম পশলার মতো ধ্বনি, শুনতে পাই, বলি, -তোকে দেখতে খুব সুন্দর হয়ে গেছে... একটু লজ্জা পায় হয়তো, কিন্তু স্পষ্টতঃ খুশি হয়, তোমার আজ কী হয়েছে ? -না রে, কিছু হয়নি আলাদা করে, ভাবি বলি, তোকে দেখতে গণেশ পাইনের রানির মতো লাগছে... -তোমার মতলবটা কী বলোতো ? -আমার তো ওটাই মুশকিল.. কখনও কোনও মতলব আঁটতেই পারলুম না .. -এবার আমি তোমায় একটা কথা বলি? -বল... -পর্ণা কোথায় আছে ? -ঠিক জানিনা রে, ও দেশেই কোথাও হবে ... -খোঁজোনি? -খুঁজবো কখনও, ইচ্ছে হলে... -আরো কুড়ি বছর পর ? -তার বেশিও হতে পারে .... -ধ্যুৎ... "ঝড়ে হঠাৎ ভেঙে পড়লো তোমার মুখের জলপ্রপাত স্মৃতি? নাকি স্মৃতির মতন নিরুদ্বিগ্ন বিষণ্ণতার একটি করুণ মূর্তি, নাকি ভেঙে পড়লো পূর্ণিমারাত ? বুকের খড়ে মুখটি গোঁজা আধবোজা কোন স্বর্ণলতার ভ্রূমধ্যে টিপ সন্ধ্যাপ্রদীপ যদি দেখাও দুয়ারপ্রান্তে অনেক দূরের একা পথিক-আজো আমায় ডেকে আনতে তোমার ছেলেবেলার পাশে আর কি আছে সেই তামাশা- বলো এবং বলো আমার জীবনমরণ ভালোবাসার ভাষার অধীন, বিপর্যস্ত-স্থাপন করি মুখটি হাতে ।।"

91

7

জল

অবসর আবার

ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল আধপোড়া‚ ছোট্টখাট্ট‚ খন্ডিত দেহটা পুরোপুরি পুড়ে যেতে| চুপচাপ শ্মশানের বাইরে একটা চায়ের দোকানে বসে বসে সবকিছু দেখছিল দয়াময়ী| একের পর এক দেহ আসছে‚ লাইনে রাখা হচ্ছে| তারপর প্রায়শ্চিত্ত আরও কিসব যেন| তারপর একবার বোল দিয়েই দেহ চলে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক চুল্লীর ভিতরে| শেষবারের জন্য চোখের জল‚ আর্তচিৎকার‚ অপেক্ষার অবসান| তিনটে চুল্লী খেপে খেপে চলছে| এখানে এলে মন আর মাথা পুরো শূন্য হয়ে যায়| দয়াময়ীরও মন-মাথা সব শূন্য| গঙ্গার ঘাটের গা ঘেঁষে কাঠের চুল্লীতে পুড়ছে কারও একান্ত প্রিয় কেউ| কুন্ডলী পাকিয়ে উঠে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল চলে আসে| বয়সের এই এক ধর্ম কারণ অকারণ আর্দ্র হয়ে ওঠা| 'মা সব তো শেষ‚ এবার ফিরি চল' বলে হরি| স্বরে ক্লান্তি আর বিষন্নতা| শূন্য দৃষ্টি মেলে চায় দয়াময়ী| 'সব শেষ' শব্দটা যেন বুকে ধাক্কা মারে| উঠে দাঁড়াতে চেয়েও দাঁড়াতে পারে না| পা দুটো হঠাৎ করেই যেন অবশ মনে হয়| বেঁচে থাকতে থাকতেই দুই সন্তানের মৃত্যু দেখতে হল| কপালে আরও কত কি আছে কে জানে? 'মা‚ শরীর খারাপ লাগছে?' হরি ঝুঁকে আসে| 'না‚ না‚ চলো'| উঠে দাঁড়ায় দয়াময়ী| সকাল থেকেই ত্রিদিব চড়িয়ে বসে আছে| এখন তো ছাড়া গরু| কেউ বাধা দেবার নেই‚ কেউ বলার নেই| দয়াময়ীর কাছে কাছে আসছে না‚ একটু দূরে বসে আছে| মেয়েটাকে খেয়ে এবার শান্তি হল| মনে মনেই ভাবে দয়াময়ী| কোন কৃত্যই করল না| সবটাই হরি করল| শুধু আইনত স্বামী তাই আনতে হয়েছে| টলমল করে হাঁটে দয়াময়ী| কদিন ধরে কিভাবে যে কেটেছে নিজেই জানে| দিনরাত প্রার্থনা করেছে কূলদেবতার কাছে 'ফিরিয়ে দাও‚ আমার সাবুকে'| কিন্তু জানত সাবু ফিরবে না| মন বলেছিল এ যাত্রাই সাবুর শেষ যাত্রা| হরিকে বলেছিল‚ অন্য মেয়েদের বলেছিল একবারটি হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য| কিন্তু কেউই নিয়ে যায়নি| অবশ্য গিয়েই বা কি দেখত! ডাক্তার কিন্তু বলেছিল বাহাত্তর ঘন্টা কেটে গেলে একটা আশা আছে| বাহাত্তর ঘন্টা কেটে যাবার পর একটা ক্ষীণ আশা জেগেছিল মনে| আশা জাগিয়েই গতকাল সকালে চলে গেল| জীবনে মৃত্যু তো কিছু কম দেখল না দয়াময়ী| মন বলেছিল এ ভালো আসলে ভালো না‚ ছলনা| শেষ বিদায়ের আগের শেষ অঙ্কের অভিনয়| 'মা ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?' চোখ তুলে তাকায় দয়াময়ী| শূন্য হয়ে যাওয়া মাথাটায় সাম্প্রতিক অতীত চিন্তা করতে করতেই অন্যদিকে পা বাড়িয়েছিল দয়াময়ী| হরি লক্ষ্য করেছে| এই একটা মানুষের কাছে বড় কৃতজ্ঞ দয়াময়ী| পেটের ছেলে নয়‚ পরের ঘরের ছেলে‚ জামাই ‚ কিন্তু আজ তাকে ছেলেরও বেশি কিছু মনে হয়| আজ তো আর অদিতি নেই| তবু এতটুকু ব্যবহারিক বিচ্যুতি আজও হরির ব্যবহারে পেল না| হরি না রাখলে কোথায় যেত সে| নিজের তো আস্তানা বলতে কিছুই নেই| এ বাড়ি ও বাড়ি ভাড়া থেকেছে সারাটা জীবন| নিজের বাড়ি ছিলও না‚ করবে এমনটা তো কষ্টকল্পনাতেও আনেনি| কপাল ভালো সাবু বাদে বাকি মেয়েগুলোর ঘর-বর দুই ভালো| তাই আজ এ মেয়ের বাড়ি কাল ও মেয়ের বাড়ি করে থাকতে থাকতেই অদিতির বিয়ের পর থিতু হয়েছিল| হরি বলেছিল‚' আমার বাড়িতেই থাক তুমি'| বড় শান্তি পেয়েছিল মনে মনে‚ যদিও লজ্জাও পেয়েছিল‚ জামাইবাড়ি বলে কথা| স্বস্তির কথা ছিল এই যে‚ জামাইয়ের মা-বাপ অনেক আগেই গত হয়েছিলেন| না হলে কি আর এখানে থাকতে পারত| 'মা দেখে বাসে ওঠো' হরি সতর্ক করে| কোণের দিকের জানালায় ফুটকি আর তার পাশে পুটকি বসে| ঠিক তার উল্টোদিকের সিটে বসে দয়াময়ী| ফুটকি এখনো তেমন কিছু তো বোঝে না| সাবুর কপালে চন্দন‚ নতুন লাল শাড়ি‚ সিঁথিতে উপচে পরা সিঁদুর ‚ গলায় মালা‚ যেন নববধুর সাজে সাজিয়েছিল ওরা| দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল দয়াময়ী| সহ্য করতে পারছিল না| ফুটকি দেখে বলেছিল‚'দিদা কাঁদছ কেন? মা দেখ কি সুন্দর সাজে সেজেছে| দিদা মাকে ঠিক নতুন কনে মনে হচ্ছে না| মায়ের কি বিয়ে হবে দিদা'| জল গড়িয়ে পড়ে চোখ বেয়ে| মেয়েদুটোর কি হবে? কে দেখবে ওদের? সাবুদের বাবা যখন মারা যায় অদিতি তখন দেড়বছর| সেখান থেকে গতরে খেটে মেয়েদের মানুষ করা‚ বিয়ে থা অবশ্য নিজেকে দিতে হয়নি‚ যে যার মত করে নিয়েছে‚ তবু কেউ তো বয়ে যায়নি| ত্রিদিব কি দেখবে মেয়েদের? পুটকি না হয় অনেকটা বড় হয়েছে‚ কিন্তু ফুটকি? এখনো মা না খাইয়ে দিলে খায় না| মায়ের আঁচল না ধরে ঘুমোয় না| এখনো ঘুমের মধ্যে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে নিপল খুঁজে ফেরে| একটা বোবা কান্না চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে| 'দিদা কাঁদছ কেন'? ফুটকি জিজ্ঞাসা করে| 'আয়‚ আমার কাছে আয়' কাঁপা কাঁপা হাত বাড়ায় দয়াময়ী| বাড়ানো হাতের আশ্রয় নিয়ে ফুটকি এসে দয়াময়ীর কোলে বসে| বুকে চেপে ধরে দয়ময়ী| মন হাহাকার করে ওঠে| ' কি করলি সাবু? একবারও ভাবলি না ফুটকির কি হবে? ওকে কে দেখবে? ভাবলি না বুড়ি মা টাকে কেন শাস্তি দেব? সন্তান না শত্রু তোরা| ' 'দিদা তুমি এত কাঁদছ কেন? ছোটোমণি বলল মা‚ মাসিমণির কাছে যাচ্ছে| মা সেজেগুজে মাসিমণির কাছে গেল কেন? আমায় নিয়ে গেল না কেন মা? আচ্ছা দিদা মা এত ঘুমোচ্ছে কেন বলোতো?' চুপ করে থাকে দয়াময়ী| ফুটকির মাথাটা বুকের মধ্যে আরও চেপে ধরে| দিন কয় ছোটমেয়ের বাড়িতে ছিল‚ তাই এসব প্রশ্নের সন্মুখীন তাকে হতে হয় নি| এসব অবোধ প্রশ্নের কি জবাব দেবে দয়াময়ী? বাসটা হু হু করে শীতের ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলে গন্তব্যে| (চলবে)

370

32

অলভ্য ঘোষ

অত্যন্ত ঘৃণা প্রকাশ করি ধর্মের নামে জাতের নামে বজ্জাতি নোংরা রাজনীতি কে

একটা সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক উসকানিতে দেখতে পাচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠছে। অত্যন্ত ঘৃণা প্রকাশ করি ধর্মের নামে জাতের নামে এ ধরনের বজ্জাতি নোংরা রাজনীতি কে।ইন্ডিয়া মানে কেবল হিন্দু নয়। আর কারাকি জানার দরকার নেই। যারা ভারতের সার্বভৌমত্বতে আঘাত হানছে তারা দেশের সবথেকে বড় শত্রু। হিন্দুস্তান নামটি এসেছে ফার্সি শব্দ "হিন্দু" থেকে। ফার্সি ভাষায় সিন্ধু নদকে বলা হত হিন্দু নদ।হিন্দুস্তানে স্তান অনুসর্গটি ও এসেছে ফার্সি থেকে ফার্সি ভাষায় যার অর্থ স্থান।আর হিন্দু সিন্ধু অববাহিকায় যারা থাকতো তাদের স্থান হিন্দুস্তান।হরপ্পা মহেঞ্জোদারো। আর এদেশের বাসিন্দারা দ্রাবিড় গোষ্ঠীর । আর্য এসেছে পারস্য থেকে। কেউ কেউ মনে করেন রাশিয়ার ইউরাল পর্বতের পাদদেশ থেকে ইন্দ্র ইরানি আর্য গোষ্ঠীর একটি শাখা দুই ভাগ হয়ে একটি ইরানে যায় ও অপরটি ভারতে আসে। তার পর গ্রিক, শক ,হূন ,মুঘল ,পাঠান, বিট্রিশ ,পর্তুগীজ এসেছে এ দেশে।প্রাচীন বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাক আর্য বা অনার্য জনগোষ্ঠী এবং আর্য জনগোষ্ঠী। আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠী মূলত চার ভাগে বিভক্ত- নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়। অস্ট্রিক গোষ্ঠী থেকে বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়। অস্ট্রিক জাতিকে নিষাদ জাতিগোষ্ঠী নামেও অভিহিত করা হয়। এই চার সম্প্রদায়ের রক্ত মিলে মিশে একাকার হয়ে ভারতের শিরা ধমনীতে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। মূলত বাইরে থেকে পুরুষেরা আসতো। নারী সঙ্গী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদেশ থেকে জুটাত কি লুট-করতো। ফলে শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি এটা আপনার আমার শরীরে প্রতিটি ভরতীয়ের অখণ্ড ভারতীয়ের শরীরে সংকর প্রজাতির রক্ত প্রবাহিত। তাই ভারতীয়দের মধ্যে চেহারার সাদৃশ্যে যে বিভিন্নতা বৈচিত্র্য দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আর দেশের শত্রু কেবল পাকিস্তান চায়না বর্ডারে নেই;যারা ভাই আর ভাইয়ে ভেদ গড়ে দেয়; যারা নিজের দেশ মাতৃকাকে টুকরো টুকরো করতে চায় ;মানুষকে লুট করতে চায়;তারা সমান শত্রু। হিন্দু ,মুসলমান, শিক, জৈন ,বৌদ্ধ, খৃষ্টান, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের মনে যখন প্রশ্ন-জাগতে শুরু করেছে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও কেন বেকারত্ব, গরিবি, নিরক্ষরতা, অস্বাস্থ্য ভারত ভূমিকে অভিশাপের মত তাড়া করে বেড়াচ্ছে ।ঠিক তখনই অস্ত্রের কুচকাওয়াজ ধর্মের আফিং খাইয়ে বোকা জনগণকে সীমান্তের ওপারে শত্রু দেখিয়ে দৃষ্টি ভ্রম ঘটানো হচ্ছে।তাদের সমস্যা গুলো থেকে দৃষ্টি এড়াতে। ধর্মের মহিমায় সাধারণ কে ঘুম পাড়িয়ে রাখছে ভারত ,পাকিস্তান ,বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দল ও নেতা নেত্রীরা। আর সংবাদ মাধ্যম গুলো ঢাক ঢোল পিটিয়ে সে খবর বেচে লালে লাল হচ্ছে। কেউ প্রশ্ন-করছেনা ভারত পাকিস্তানের নেতা নেত্রীদের;বাজেটের যত টাকায় আপনারা অস্ত্র কিনছেন;সে টাকায় কত গুলো জাতীয় সরক হতে পারতো?কত গুলো হসপিটাল হতে পারতো?কতগুলো স্কুল হতে পারতো?কতগুলো মানুষের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারতো? অস্ত্রের ঝনঝনানিতেতো পেট ভরবে না দাদা।একটা এমন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করুন দেখি অবৈধ কালো টাকা উদ্ধার হয়ে যাক। ভোটের আগের সুইস ব্যাঙ্ক থেকে কালো টাকা উদ্ধার কিহলো ?সিবিআই জুজু ? রোজভ্যালি, সারদা ,নারদা ?কেঁচো খুরতে গেলে কেউটে বের হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আসুন মজে থাকি মেলা, পর্বনে , যুদ্ধে।রাম রহিমে। এ যেন ধারাবাহিক টিভি সিরিয়াল এলাস্টিকের মত টেনে টেনে লম্বা করা হচ্ছে।

80

3

kishore karunik

’পাবার মতো চাইলে পাওয়া যায়‘

মুহূর্তে বিদ্যুৎ চমকে গেল। হয়তো শ্রাবস্তী নিজেকে সংযত করে বসতে গিয়ে ওর হাত আমার কোমড় স্পর্শ করে। এক ঝলক তাকালাম ওর দিকে। ও যেন লজ্জা পেল। সৌজন্য বোধ থেকেই ও বলে উঠলো “সরি”। কেন যেন মনে হলো, শ্রাবন্তী ভদ্রতা দেখানোর একটুও সুযোগ হাতছাড়া করছে না। ট্রেন পুরোপুরি থেমে গেছে। থেমে গেল। জানালা দিয়ে অনেকে উঁকি দিয়ে দেখছে। কেউ কেউ ট্রেন থেকে নিচে নামছে। আমি সিটে বসলাম। মনের অবস্থা ভাল না। বাড়ি থেকে চিঠি এসেছে যত তাড়াতাড়ি পারি বাড়িতে যেন চলে আসি; যতই কাজ থাকুক। এখন বিয়ে করব না মনোস্থির করেছিলাম। চিঠি পড়ে যা বুঝলাম, বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। চিঠি পাওয়া মাত্র চলে আসবে-মা চিঠিতে লিখেছে। দু’-তিন দিনের পোশাক ব্যাগে নিয়ে রওনা দিয়েছি। শেভ করার সময় পাইনি। মুখটা হয়তো খুবই বিষণœ আর মলিন দেখাচ্ছে! “এখানে ট্রেন তিন ঘন্টা অপেক্ষা করবে। তারপর ছাড়বে।” আমার বামপাশে বসা লোকটি কোথা থেকে যেন শুনে এসে আরেক জনকে বললো। “শ্রাবস্তী, ট্রেনতো আরো ২/৩ ঘন্টা এখানে দাঁড়াবে আমার বাড়ি তো আর বেশি দূরে নয় আমি বরং অন্য কিছুতে চড়ে চলে যাই। তুমি বাড়ি গিয়ে চিঠি দিও।” হয়তো সেই লোকটি। কী জানি শ্রাবস্তীর ঘনিষ্ট কেউ কি-না! শ্রাবস্তী ঘাড় নেড়ে বললো, “আপনি বাড়িতে পৌঁছে মোবাইল করবেন। অনুষ্ঠানে কিন্তু আপনাকে আসতে হবে!” “ঠিক আছে।মন খারাপ করো না। যা হবার তা-তো হবেই। তোমার মোবাইল নম্বর যেন কত?” শ্রাবস্তী নিজের মোবাইল নম্বর বললো। মোবাইল নম্বর লিখে নিয়ে লোকটি বিদায় নিলো। মোবাইল নম্বরটা একবার শুনেই আমার যেন মুখস্ত হয়ে গেল। দু’-এক জন করে ট্রেন থেকে নিচে নামছে। আমিও নামলাম। দু’-একটা হকারও দেখছি। ওরা কি জানত এখানে ট্রেন দ্ঁড়াবে? ট্রেনের ভেতর থাকা হকাররা নিচে নেমে জানালার পাশ দিয়ে ঘোরাফিরা করছে! “এই কলা।” খুবই ক্ষীন শব্দ বের হলো শ্রাবস্তীর কণ্ঠ থেকে। বোধ হয়কলাওয়ালা শুনতে পায়নি। আমি নিচে নেমে শ্রাবস্তীর সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। কেন যেন মনে হচ্ছে কলাওয়ালাকে ডেকে দিই। শ্রাবস্তী আমার দিকে তাকালো। দু’জনের চোখে চোখ পড়লো। কী যেন বললো, মায়াবী চোখের ইশারায়। মুখ ফিরিয়ে নিল, কী কারণে বুঝতে পারলাম না। এর আগে আমার দিকে তাকিয়েছে কি-না তাইবা কে জানে! মেয়েদের প্রতি আমার তেমন কৌত’হল ছিল না। তবু এখন শ্রাবস্তীর প্রতি কৌত’হল জাগছে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। (চলবে)

139

1

kishore karunik

হায় জীবন

-কিশোর কারুণিক এখানে কেউ থাকতে পারে না এখানে কেউ থাকতে পারবে না। তবে এই যদি হয় বিচিত্র বৈভবের জীবনের কী দরকার? কী দরকার মনের মতো করে সব কিছু সাজিয়ে বৈচিত্রের মাধুর্যে দিন যাপনে, কী দরকার আকাশ কুসুম স্বপ্নের পাল তোলা শরীরের মায়াজ্বালে মায়া বাড়ানো কী দরকার নিজেকে না খুঁজে অন্য কিছু অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হায় জীবন হায় জীবন !

63

1

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

আজি এয়স্যা মওকা ফির কাঁহা মিলেগা.... মনটা এখনো পড়ে আছে দেশে, তাই লিখতে বসে প্রথমেই দেশ এসেছিল অবধারিত আবেগে। অথচ এদেশে যাত্রা শুরু করে দেশে পৌঁছনোর প্রাক্কালে চারটে দিন কেটেছে অন্যত্র, স্মৃতি তাকে বেমালুম এড়িয়ে গেছে। বেড়ানোর গল্পে সেই স্থানের ভূমিকাও কিছু কম নয়। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বর্ষাস্নাত এক গম্ভীর দ্বিপ্রহরে। ক্রিসমাসের বড় ছুটির প্রস্তুতি তখন ঘরে ঘরে। আলোকমালায় শরীর জড়িয়ে, কেকের সুঘ্রাণ মেখে ঝকঝকে তকতকে বাড়িঘর কাছে দূরের আত্মীয় অতিথী অভ্যর্থনায় যখন সেজে উঠছে প্রতিনিয়ত, ঠিক সেই সময় তখন পরবাসী আমরা, প্রবাসী অনেক ভাই বন্ধুদের অংশ হয়ে ভীড় জমালাম এয়ারপোর্টের রাস্তায়। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস দশ ঘন্টায় পৌঁছে দিল আলোর শহরে। মালপত্র নিয়ে বেরোতে বেরোতে শিশু সকাল দেখি আড়মোড়া ভাঙছে। ছোট থেকে ভাসা ভাসা ছবি দেখা, টুকরো টাকরা গল্প শোনা জায়গাকে, কল্পনায় মোড়কে মুড়ে এক অপার্থিব স্বর্গসম কোনো জায়গা ভেবে নিয়েছিলাম। এয়ারপোর্টের কৃত্তিম আবহাওয়া থেকে বেরোতেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার সাথে গ্যাসোলিনের তীব্র গন্ধে নাক জ্বালা করে উঠলো। উবার নিয়ে হোটেলের পথে যেতে যেতে রাস্তার দুইপাশে দক্ষ হাতের প্রচুর গ্রাফিটি শিল্পকর্ম এড়িয়ে থাকার উপায় নেই। পথের ধারে থেকে থেকে স্তুপীকৃত জঞ্জাল। সব মিলিয়ে সূচনাতেই মনটা কেমন দমে গেল। কল্পস্বর্গীয় ভাবনাটি ছিল এইরকম। এয়ারপোর্টের দ্বারমুক্ত হয়ে বাইরে পা রাখতেই জগতবিখ্যাত ক্রেপের মনমোহক সুগন্ধ বাতাসে ভেসে আসবে। সুসজ্জিত মহিলারা শ্লথ পায়ে, রহস্যময় মোনালিসা হাসিতে চকিত দৃষ্টি হানবে। কোট টুপি পরিহিত পুরুষেরা মাথার টুপি অল্প তুলে মেঘনিন্দিত কন্ঠে বলবে, বিয়ভ্যেনিউ! কোথায় কি! আমাদের অক্লান্তভাষী ফ্রেনচ মোটরচালক কাজের কথা প্রচুর বলছিলেন কিন্তু যে কথা শুনতে কান উন্মুখ ছিল তা আর শোনা হলনা। জানালায় চোখ ঠেকিয়ে দেখছিলাম কর্মব্যস্ত দিনে বহুবর্ণ শীতের পোশাকে আপাদমস্তক ঢেকে নারী পুরুষের দ্রুত পদক্ষেপ। দুটো জিনিস এই ক'দিনে লক্ষ্য করেছি। এক, উভয়লিঙ্গের মানুষেরই ধুমপানের প্রতি প্রভূত আসক্তি। আর দুই, আমাদের দেশের মতই লোকে থুক থুক করে থুতু ফেলছে যত্রতত্র সাথে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। ভারী মন:ক্লেশে ভুগেছি তাদের এমন হীনকর্মে। স্বপ্নের শহরের মানুষদের স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছনোর কোনো দায়দায়িত্ব নেই নাকি! গাড়ি গড়গড়িয়ে মিনিট চল্লিশেক চলার পরে ততোক্ষণে আমরা প্যারিসের বুকের ওপর এসে পৌঁছেছি। লা ম্যাডলেন থেকে স্বপ্ল দূরত্বে আমাদের হোটেল হায়াত ম্যাডলেন। হোটেলের নাম এই কারণে নিলাম, কেউ যদি যান এই হোটেলে ওঠার কথা স্মরণে রাখতে পারেন। প্রথম কথা, হোটেলটি প্যারিসের বুকের ওপরে। হোটেল থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে ইতিহাস ছুঁয়ে বেড়াতে পারবেন। উবার ডাকতে হবেনা। দ্বিতীয়ত, হোটেল কর্মীরা অতিশয় দক্ষ এবং মিষ্টভাষী। পৌঁছতেই সুন্দর করে করে চায়-পানি সহযোগে অভ্যর্থনা করা হল আমাদের। হোটেলে ঘর দখল নিয়ে, তাজা হয়ে, পেটপূজো করে মনটা তখন ছুটে বেরোতে চাইছে। সিক্সটিনথ সেনচুরীর গ্যলো-রোমান স্থাপত্য আমাদের চতুর্দিক জুড়ে। ইতিহাসের মাঝে পড়ে মনটা আবার খুশি খুশি হয়ে উঠছে টের পাচ্ছি। পাঁচদিন আসলে বড়ই কম এমন শহরকে জানতে যেখানে ইতিহাস, স্থাপত্য আর আভিজাত্য হাত ধরাধরি করে আছে। প্রবল ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে দুইবেলা খুব ঘুরেছি। দ্যা ল্যুভ মিউজিয়াম একদিনে যতটা সম্ভব চোখ বুলিয়েছি। চোখ বুলানোই বটে, একমাসও কম সময় ইস্টার্ণ, ইজিপশিয়ান, গ্রিক, রোম্যান, ইটালিক, ইসলামিক, ইউরোপিয়ান, এশিয়ান, আফ্রিকান,আমেরিকান, ফ্রেনচ বিপুল চিত্রকলা এবং শিল্পকলা মন দিয়ে দেখার জন্য। তাই ছয় ঘন্টা ধরে জ্ঞানআরোহনকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা শুধু চোখ দিয়ে স্পর্শ করার আনন্দেই বুঁদ ছিলাম। জগত বিস্মৃত হয়ে কত মানুষ যে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে স্কেচের 'পরে স্কেচ এঁকে চলেছেন! স্কুলের ছোট ছোট ছেলেপুলেরা এসেছে তাদের আর্টের দিদিমণি বা মাষ্টারমশাইদের সাথে। খুদে খুদে হাতে গর্বিত মুখে মনের সুখে সাদা পাতায় আঁচড় কাটছে তারা। সোমার কথা বড্ড মনে পড়ছিল। এমন জায়গা তাঁরই উপযুক্ত! এ ঘর, সে ঘর, ওপর নীচ ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে পেলাম তাঁর দর্শন। অগণিত ফোটোতে তাঁকে আগে দেখে এসেছি, এবার সামনা সামনি দাঁড়িয়ে শরীর-মন এক অনাদ্যন্ত আবেগে পুলকিত হয়ে উঠলো। পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে শ্বাসরোধী জনসমাগমের মাঝেও সারা দুনিয়াকে উপেক্ষা করে তিনি আমার দিকে একচিলতে হাসি ছুঁড়ে দিলেন- মোনালিসা। মিউজিয়ামের যে কোনো অংশের তুলনায় এই অংশে মানুষের আদ্যোপান্ত ভীড় । ভাবতে অবাক লাগছিল মিউজিয়ামের এত হাজার হাজার মনোমুগ্ধকর দুষ্প্রাপ্য বিপুলাকৃতি রংবেরঙি চিত্রকলার মাঝে তাঁর তুলনামূলকভাবে ছোট ( ২১/৩০ ইনচি) প্রতিকৃত জগতব্যাপী খ্যাত, সমাদৃত এবং সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু কেন? তাঁর একচিলতে হাসি? নাকি তাঁর রহস্যাবৃত পরিমন্ডল? অথবা রেঁনেসাঁ বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দোর দ্বারা চিত্রাকৃত হওয়ার বিস্ময় মানুষকে সেই ষোলোশো শতাব্দী থেকে মোহিত করে রেখেছে! ওখানে দাঁড়িয়েই এক রোমাঞ্চকর গল্প শুনলাম। ১৯১১ তে লিওনার্দোর এই অমর সৃষ্টি মিউজিয়াম থেকে চুরি যায় এবং পরের দুই বছর তার কোনো হদিশ ছিলনা। বহু জিজ্ঞাসাবাদ, ধরপাকড় এবং তদন্তের পর চোরের হদিশ মেলে। ভিনচেনজো মিউজিয়ামেরই এক কর্মী ছিলেন। সকলের অলক্ষ্যে কিভাবে তিনি এই চৌর্যবৃত্তি সমপন্ন করেছিলেন সেই গল্প কোনো থ্রিলারের চেয়ে কম নয়। ভিনচেনজো হয়ত স্বপ্নেও কল্পনা করেননি মোনালিসার চিত্রটির নিরুদ্দেশ টেলিভিশন, খবরের কাগজে দুনিয়ায় পৃথিবীর সব প্রান্তে এমন প্রবল ঝড় তুলবে এবং ফ্রেনচ অথরিটি এমন স্বর্গ মর্ত পাতাল এক করে বদ্ধপরিকর হবে তাঁকে খুঁজে পেতে। মোনালিসার চিত্র এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে ভিনচেনজোরও হয়ত কিছুটা অবদানও রয়ে গেছে! মনে মনে ভিনচেনজোকে শত সহস্রবার ধন্যবাদ জানালাম। মোনালিসা তাঁর করায়ত্ব ছিল সুদীর্ঘ দুই বছর। ভাগ্যিস, তিনি চিত্রাঙ্কনটি সযত্নে রেখেছিলেন! ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে, আতঙ্কে ভাগ্যিস তিনি মোনালিসাকে বিনষ্ট করে ফেলেননি! পৃথিবীসুদ্ধু লক্ষ লক্ষ প্যারিস তীর্থ যাত্রীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ জানাই। মিউজিয়ামের ভেতরে জায়গায় জায়গায় সতর্কবাণী ছিল, পকেটমার হইতে সাবধান। একাগ্র দর্শনের মধ্যে সে ও এক অস্বস্তিকর এবং দু:খজনক ব্যাপার বটে! দোলাচলচিত্তে আর যা ই করা যাক, শিল্প উপভোগ করা কঠিন। মাইকেল এনজেলোর 'ডাইং স্লেভ' দেখতে দেখতে, অথবা ইজিপশিয়ান ' লিভিং ইমেজ' এ চোখ ডুবিয়ে যদি আপনার মনে হয় আপনার ডানদিকের স্বর্ণকেশী বারবার আপনার ঘা ঘেঁষে আসতে চাইছে তবে পুরুষ নারী বিশেষে ভিন্ন কারণবশত: ধ্যানভগ্ন হতে আপনার বেশি সময় লাগার কথা নয়! বিদেশ বিভুঁইয়ে পকেটমারি হলে খুব ঝামেলাঝাঁটির ব্যাপার হবে যাহোক। অবশ্য খোলাখুলি ডাকাতিতে খাবার রেঁস্তোরাগুলি কিছু কম যায়না। অন্নদাশঙ্কর রায় মহাশয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পারীতে গিয়ে সুলভে ব্যয়সাধ্য খানা খেয়ে অতিশয় উৎফুল্ল হয়েছিলেন। আমার কিন্তু প্যারিসের খাওয়া দাওয়া বেজায় ব্যয়বহুল লেগেছে, উনি অবশ্য পারীর সাথে ইংল্যান্ডের তুলনা টেনেছিলেন। আমার সে অভিজ্ঞতা নেই তবে এই কথা অনুমান করাই যায় ১৯২৬-১৯২৯ সালের পর থেকে আজকের প্যারিস আগ্রহী সুরসিক মানুষদের তীর্থস্থল হিসেবে বহু পথ পরিক্রমা করে এসেছে। লক্ষ্য করলাম শীতের তীব্র ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে মানুষজন বাইরে খেতে বেশ পছন্দ করে যে কোনো বড় শহরের মতই। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ঘন হয়ে এলেও কফির দোকানগুলো ভীড়ে টইটম্বুর হয়ে থাকছিল ঘনিষ্ঠ মানুষদের আড্ডায় কফির পেয়ালার টুংটাং আর ক্রেপের সুঘ্রাণে। এক রাতের বেলা আলোকোজ্জ্বল বিখ্যাত রাস্তা শাঁঙজেলিঁজের ( আল্লা,আমার গলত উচ্চারণ মাফ করো! প্যারিসের কোনো দুজন মানুষকে দেখলাম না একই জায়গার নাম একই রকম উচ্চারণ করতে) এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ালাম হাজার হাজার জনতার সঙ্গী হয়ে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে ওই রাস্তায় খ্রিসমাসের মেলা বসে। সে এক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা। কি না বেচাকেনা চলে সেখানে! কত না রকমারি ওয়াইন চিজ, মহামূল্যবাণ গাড়ি, প্যারিসের জগতবিখ্যাত সুগন্ধী, যা মনে আসে সব পাবেন একই রাস্তার ওপরে। শুধু পকেটে রেস্ত থাকাটা জরুরী। দুই চোখ কান দিয়ে গলাধ:করণ শেষ করার আগেই প্যারিসের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কড়াঘাত করল। জানিনা এ জন্মে আর হয়ে উঠবে কিনা, দুনিয়াতে দেখবার জানবার জায়গার তো অভাব নেই, কিন্তু সময় বড়ই অপ্রতুল। আর যাওবা অল্প সময় পাই শরীরের আগে মন ছুটে চলে একটিই প্রান্তে, আমার জন্মভূমি। তবে ইচ্ছে আছে, রোজকার এই ছোটাছুটি কর্তব্যের পালা সমাধা করে একদিন আরো বেশি সময়ের জন্য হয়ত ফিরে যাব আলোর শহরে। আবার সে ইচ্ছা যদি পূরণ নাও হয় তবুও দু:খ নেই। এই শীতে যা দেখে নিয়েছি এক জন্মের পক্ষে তা ই যথেষ্ট।

562

25

kishore karunik

ছি:

ছি: -কিশোর কারুণিক কান পাতলেই শুনতে পাই কান্নার আওয়াজ শিশুর কান্না, নারীর কান্না নির্যাতিত মানুষের কান্না। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি বাজারে পকেটে পাঁচটাকা কয়েন মন অশান্ত, শরীর অশান্ত অশান্ত সমাজ প্রিয়স্বদেশ। দেবতারা পূজা নেবার অভিপ্রায়ে পাঁচতারকা হোটেলে বিলাসি জীবন ছন্নছাড়া মানুষগুলো ভাসমান সীমানা কাঁটাতার অতিক্রম করে পরবাসী। মানুষ দেবতার পাটাতনে মানুষের স্বপ্নভঙ্গ দেবতার পৌষ মাস। জ্বলছে ঘর, পুড়ছে মন ঝলছে গেছে মাটি সভ্যতা নামক আধুনিক শব্দটা দেবতার পায়ে করে লুটোপুটি। শাসিত জীবন ব্যবস্থায় শোষিতরা যেন ললিপপ নিঃশেষের তরে যেন তাদের জীবন যাপন। চলছে এই ভাবেই চলছে সেই আদিম থেকে মধ্যযুগ এখন বর্তমান। পাপ বলে যদি কিছু থেকে থাকে দূর্বলতায় এক মহাপাপ। নির্বাণ জীবন যাপনে প্রতি মূহুর্তে প্রতি পদে পদে নিষ্টা, কষ্ট, কিঞ্চিত সুখ জীবনটা যেন তৃণসম দূর্বাঘাস। আমি দূর্বাঘাস হতে চাই না দেবতার অভিশাপ মাথায় পেতে নিলাম আর নয় দেবতার পায়ে অর্ঘ্য অন্তত মনে মনে মৃদু স্বরে বলে যায় ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ কেমন দেবতা তুমি ভক্তের কষ্টার্জিত ঘামে রক্তে- তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে? ছিঃ!

81

3

kishore karunik

যে কোন সময়

যে কোন সময় -কিশোর কারুণিক যে কোন সময় তুমি আমার প্রতিপক্ষ হয়ে যেত পার যে কোন সময় তুমি আমার শত্রু হয়ে যেত পার। এই যে কথা বলা এই যে একই পথে পথ চলা যে কোন সময় বন্ধ হতে পারে যে কোন সময় তোমার প্রতি আমার আমার প্রতি তোমার হিংসা জন্মাতে পারে দু’জনের পথ দু রকমের হতে পারে। এই যে হতে পারার দুরাচলে সময় অসময়ের ধার ঘেসে কতক্ষণ, কতদিন, কত বছর আর কতকাল! সবই সময়ের প্রভাব এখানে কারোর কিছু করার নেই তোমার আমার কারোর কিছু করার কি নেই!

78

4

মনোজ ভট্টাচার্য

ধান্যকুরিয়ার রাজবাড়ি !

ধান্যকুরিয়ার রাজবাড়ি ! অনেকদিন আগে শুনেছিলাম বটে জায়গাটার নাম – ধান্যকুরিয়া ! কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সময়-সুযোগ হয়ে ওঠেনি ! কদিন আগেই একটা প্রবন্ধ পড়ে ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে উঠল ! – আর পায়ের তলায় সুড়সুড়ি লাগলেই – চলো কটক যাই ! আমাদের আবার একজন নয় ! আটজন ! মানে কাছাকাছি বয়েসী চার দম্পতি ! আমাদের কোনও কর্ম নেই – এক অর্থে বিশ্ব বেকার ! – প্রায় - চলো যাই বেরিয়ে পড়ি দশা ! আমার একটা বৃদ্ধদের সাংগঠনিক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও – পালিয়ে গেলাম ! কি আছে – সেখানে ? সে অর্থে কিছুই নেই ! কটা প্রাসাদপম বাড়ি – শোনা যায় রাজবাড়ি ! গায়েনদের, বল্লভদের ও সাউদের ! – পত্রিকায় বা ওয়েবসাইটে যেরকম ছবি দিয়েছে – একেবারে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের মতো ! – তাহলে চলা যায় ! আমাদের মতো বাঙ্গালীদের কাছে আবার কোথাও যাবার নাম শুনলেই আগে মনে হয় – কি খাবো ! ভালো হোটেল – নিদেন পক্ষে একটা চলনসই ধাবা ! – আজকাল সবাই এই ধাবা শব্দটাই ব্যবহার করে দেখেছি ! – ভাত পাওয়া যায় কিনা, মাছ পাওয়া যায় কিনা, ইত্যাদি ! পত্রিকায় বা ওয়েবসাইটে সে সব কথা লেখা থাকে না! সিঁথি থেকে বেরিয়ে সোদপুর হয়ে – দুই বন্ধুকে তুলে সোজা মধ্যমগ্রাম হয়ে বারাসাত থেকে টাকি রোড ধরে বসিরহাট ইত্যাদি ! মধ্যে এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্রেক ফাস্ট সেরে নেওয়া গেল । খুবই এলাহি ব্যবস্থা – বন্ধুর বাড়ি থেকে এনেছে ! রাস্তা এত খারাপ ও তার জন্যেই জ্যাম-জমাট ! আগে শুনেছিলাম ঘণ্টা দুয়েক – কিন্তু দেখা গেল চার ঘণ্টা লেগে গেল ধান্যকুরিয়া আসতে ! গায়েন রাজবাড়ি খুঁজতে খুব বেশি অসুবিধে হল না ! যেরকম ধারনা হয়েছিল – প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখবো হয়ত ! আরে এ তো রীতিমত রুপকথার মতো ! সদ্য রং করানো হয়েছে । বিরাট পুরনো আমলের গেট – এক পাল্লা খোলা ! গাড়ি বাইরে রেখে আমরা ঢুকলাম ! ঢুকেই বাঁ দিকে মন্দির – শ্যামসুন্দরের ! আগামী তিন চার তারিখে পুজো ! তাই তার আয়োজন চলছে ! কয়েকজন শ্যামসুন্দরের অঙ্গ প্রক্ষালন করার জন্যে কলকাতার কুমারটুলি থেকে এসেছে । আমি বাড়ির মূল ফটকের ভেতর ঢুকি । বিরাট উঠানের চারদিকে চারটে দালান ! বাংলা সিনেমার স্যুটিংএর স্পট – ক্যামেরার জন্যে রেডি ! কেউ কোথাও নেই । এদিকে জানলার চিকগুলো সব বন্ধ ! তাও আমি চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – কেউ আছেন কিনা – কথা বলতে পারবেন কিনা ! – ওপরে দেখলাম কাপড় শুকচ্ছে ! তার মানে কেউ তো থাকেনই ! বেশ কয়েকবার হাঁকাহাঁকি করার পর ওপর থেকে মহিলা কণ্ঠ শোনা গেল – কেউ নেই – কেউ কথা বলতে পারবেন না ! – বোঝো কাণ্ড ! – বাবা বলছে – বাবা বাড়ি নেই ! - তাও দালানগুলোর কটা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম ! এবার ডানদিকে এগিয়ে দেখি একটা ছোটো মতন প্রবেশপথ । সেখানে একটা বেঞ্চিতে বসে এক মহিলা ফোনে কথা বলছেন ! একদম সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ! জানি তো মহিলাদের ফোন – ব্যাটারি শেষ না হলে কথা ফুরবে না ! – হঠাৎ তিনি উঠে ভেতর দিকে হাঁটা দিচ্ছেন ! – আরে আরে যাচ্ছেন কোথা ! আমি তো আপনার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি !- ওনার এতক্ষণে হুশ হল – সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ! বাকি কথা পরে হবে বলে ফোন বন্ধ করলেন ! আপনাদের কি কারুর সময় হবে আমাদের সঙ্গে একটু কথা বলার ? – আমি মহিলাকে বলতে উনি বললেন – আমার স্বামী এখন ফোনে আছেন । ওনার সঙ্গে কথা বলবেন । ইতিমধ্যে আমাদের সবাই এসে পড়েছে । এত জনকে দেখে বোধয় ওনার খানিকটা উৎসাহ ফিরে এলো । কথা আরম্ভ হয়ে গেল ! ইতিমধ্যে ওনার স্বামীও ভেতর থেকে এসে দাঁড়ালেন ! ওনার নাম আরতি গায়েন ও স্বামীর নাম দেবীপদ গায়েন ! উনি বলেই দিলেন – গাইন নয় কিন্তু – অনেকে আবার গাইন লিখে দেন । গুপী গাইনের মতো ! আমি জিজ্ঞেস করে জানলাম – ওদিকে মানে যেখানে আমি ডাকাডাকি করেছি – সেই দিকে এই পরিবারের এক সরিক থাকে । কিন্তু তারা উত্তর-টুত্তর দিতে পারে না । কোনও লোক এলে কোনও কথা-টথা বলে না ! এখানে তো প্রায়ই - রিপোর্টার বা বাইরের লোকজন আসে ! এইভাবে আমরা ক্রমশ একটা আড্ডার মধ্যে জমে গেলাম ! দেবুবাবুকে ওখানে অনেক কাজ করাতে হচ্ছিল – কেয়ার টেকারকে দিয়ে । যেহেতু সামনের সপ্তাহে উৎসব তাই খুবই ব্যস্ত ! উনিই নাকি প্রত্যেক মাসে এসে এখানে রক্ষণাবেক্ষণ করেন ! – খুব ব্যস্ততার মধ্যেও অনেক অনেক কথা বলে চলেছেন ওনারা ! ওরা যে আড্ডাবাজ তা কে জানতো ! তারই মধ্যে আবিস্কার হল ওদের বর্তমান বাড়ি শোভাবাজার – রাজবল্লভ পাড়ায় । অর্থাৎ বাগবাজারে ! – সেই বাগবাজার কানেকশান ! দেবুবাবুর কথাবার্তায় যা জানা গেল – এই রাজবাড়ি প্রায় দেড়শ বছর আগে তৈরি – উনি নাকি চতুর্থ প্রজন্ম । এই বাড়িতে ওনার জন্ম ! আপাতত সব সরিকের উত্তরাধিকাররাই নাকি সব ভারতের বাইরে কাজ করে । তবে এই উৎসব বা দুর্গা পুজা উপলক্ষে তাদের সমাবেশ হয় এখনও ! কথায় কথায় নহবতখানা দেখিয়ে বললেন – এই নহবতখানার গঠনশৈলী দেখুন । এর নীচের সেকশানটা হল হিন্দু স্থাপত্য ! দোতলায় দেখুন ক্রিশ্চান স্থাপত্য । আর ওপরটা দেখুন – মুসলমান স্থাপত্য ! এখানে সর্ব ধর্ম সমন্বয় ! – সত্যি মুল রাজবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে তৈরি করা ! – একটা কথা গ্রামের লোকেদের বলা আছে – এই বাড়ির মর্যাদা এই গ্রামের মর্যাদা ! তাই ওনার অবর্তমানেও যেন এই রাজবাড়ি একইরকম থাকে ! সেটা কতদিন সম্ভব বাস্তবে – তা বলা যায় না ! এই প্রাসাদ এখনও হেরিটেজ হয় নি ! রক্ষণাবেক্ষণ সব এখনও মালিকদের ! কিন্তু এত বড় বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা বিশাল ব্যয় সাপেক্ষ ! কে ভার নেবে ! বিরাট এল টাইপের বাড়ি ! - একদিকে শ্যামসুন্দরের মন্দির আগেই লিখেছি ! এখন উৎসবের সময় বলে বাড়ির ভেতরে আর যাওয়া হল না ! – কিন্তু আমরা আমন্ত্রিত হলাম তিন চার তারিখের পুজোয় ! যেহেতু আমাদের অন্য বাড়িগুলো দেখতে হবে – তাই বিদায় নিতেই হল ! দেবুবাবু একেবারে গেটের বাইরে এসে আমাদের বিদায় জানালেন ! আমাদের ফোন নম্বর আদান প্রদান হল ! তারপর আমরা গেলাম বল্লভবাড়ি ! বল্লভদের একটা বাড়ি গ্যালিফ স্ট্রিটে ছিল । সেখানে আমরা ছোটবেলায় খেলতাম ! তাই মনের মধ্যে একটা উচ্চ ধারনা পোষিত হচ্ছিল ! বল্লভবাড়ি দেখে সেই ভাবটা একটু দমে গেল । সব জানলা দরজাই বন্ধ ! আমি খুজতে খুজতে বাড়ির পেছনে চলে গিয়ে ছবি তুলে নিয়েছি । সেরকম উল্লেখযোগ্য নয় ! তবে সামনে গেটের কাজ গুলো বেশ চিত্তাকর্ষক ! মুস্কিল হল – একজন কেয়ারটেকার । তার নাকি জ্বর ! খুবই অনিচ্ছুক ! একটু কড়া হতেই হল ! আমি ধমকেই বললাম – কেউ যদি নাই থাকে তবে ওয়েবসাইটে দেওয়া কেন ! তখনই সে আমতা আমতা করে শুধু একতলাটা দেখে নিতে বলল ! বল্লভবাড়ির কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয় বলে মনে হয় না ! নানান অংশে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পরছে । - বাড়ির পেছনের দিকে একেবারে জঙ্গল ! শুধু শাপ-খোপ কেন বাঘ ভাল্লুকও অসম্ভব নয় ! এই বাড়ির খুবই জীর্ণ দশা ! - সমানে এত তাড়া দিচ্ছে যে কিছু হাতে দিয়ে আমাদের বেরিয়ে পড়তেই হল ! তারও পর ! যেতে হল সাউ বাড়ি ! জানিনা সত্যি রাজবাড়ি কিনা ! কিন্তু বাড়িটা খুবই ছোট ! – হয়ত এখন পেছনের অংশটা - অন্য বাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে ! চারিদিক বন্ধ জানলা দরজা – ছোটখাটো একটা ভুতুড়ে বাড়ির মতন ! ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে ! সামনে একটা রকে বসে একজন বলল – এখানে কেউ থাকে না । কেয়ার টেকার নেই ! – এটা কার বাড়ি – সে ঠিক করে বলতেও পারল না ! পাশের গলির নামটা দেখে বোঝা গেল এটা সাউদের বাড়ি ! কেউ হয়ত ছিল পতিত চরন সাউ নামে ! তারই নামে রাস্তা । তবে হ্যাঁ ! এ বাড়িটা দেখে বলা যেতে পারে ভৌতিক রাজবাড়ি ! গায়েনদের একটা রাসমঞ্চ আছে একেবারে খোলামেলা ! বেশ পুরনো ! একটা দিনের ঘোরার পক্ষে একেবারে পারফেক্ট ! মনোজ

113

7

মানব

হাঁড়ির হাল

ব্যাগটা নিয়ে নেমে যেতেই ড্রাইভার কান্নাকাটি শুরু করল। আমি দাবী করলাম যে আমি তো আগেই বলেছিলাম মিটার চালিয়ে আসতে, তাহলে তো টাইম নিয়ে এত ভাবতে হত না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। আরও পঞ্চাশ টাকা নিয়েই ছাড়ল। বিগত পাঁচ বছরে কোলকাতার জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ। আবার দিল্লী শহরে বিগত দুই বছরেই সেই সংখ্যাটা প্রায় দশ লক্ষ। জনগণনার বাইরে হয়ত সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। সে যাইহোক জীবনযাত্রার সুবিধা যত বাড়বে জনসংখ্যা ততই বাড়বে এ আর আশ্চর্য কি। কিন্তু সমস্যাটা হল ক্যাপাসিটি – ধারণক্ষমতা। আমাদের প্রিয় শহরগুলি আর কতদিন এভাবে আমাদের আশ্রয় দিতে পারবে? তিন বছর আগেও এতটা রাস্তাভর্ত্তি জনতা দেখতে পেতাম না। আর এখন অফিস যেতে মাত্র দশটি মিনিট লেট হলে পাক্কা এক ঘন্টা কাটিয়ে দিতে হয় দশ মিনিটের রাস্তায়। অফিস তো নাহয় সময়ে পৌঁছে গেলাম, কিন্তু ফেরার সময়? আট ঘণ্টার চাকরি, লাঞ্চ টাইম মিলিয়ে সাড়ে আট বা ধরুণ নয় ঘন্টা কাটিয়ে যেই বেরিয়েছি, ওব্বাবা! দেখতে পাবেন জনতা কারে কয়। তবে দশঘণ্টা অফিস করে বেরোলে কিন্তু আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি চলে যেতে পারবেন, ভিড় ছাড়াই। কিন্তু খামোকা দশ ঘন্টা করতে যাবেন কেন আপনি, যেখানে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে চলছে এত আলোড়ন! সেদিন বরাবরের মত অটোয় চেপে অফিস যাচ্ছি, রাস্তা মোটামুটি বন্ধ। পাঁচ মিনিটে দুপা দুপা করে এগোচ্ছে। সবার গা ঘামে ভিজে একাকার, হত কারও কারও মাথাও ঘেঁটে ঘন্ট। এরই মাঝে দুএকটা মোটরবাইক টেনেটুনে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগল। একজন তো ধরাশায়ীও হল একবার। স্পিড তেমন ছিল না তাই আঘাতও তেমন লাগেনি। কিন্তু সে চালক এমন এক হিরোসুলভ ভাব দেখিয়ে বাইকটাকে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল, দেখে যেন মনে হল কিছুই হয়নি। [এখানে একটা উদাহরণ না দিলেই নয়। শীতকালে নিশ্চয়ই সবার ঠাণ্ডা লাগে। কিন্তু সেই ঠাণ্ডায় কানে মাফলার বাঁধা বা টুপি পরাকে পৌরুষের অপমান বলে মনে করেন কেউ কেউ, এবং যথারীতি খালি মাথায় সমস্ত ঠাণ্ডাটা সহ্য করে পৌরুষ জাহির করে ঠাণ্ডা লাগিয়ে বসেন।] পাশের লেনটা খালি ছিল। আমার অটোচালক সেদিক দিয়ে ঘুরিয়ে গাড়িটা একটু এগিয়ে দিল। হঠাৎ পিছন থেকে একজন একাকী গাড়ির মালিক বেড়িয়ে এসে শুরু করল চরম অপমান। - এই তোমাদের মত অটোওয়ালারা আছে বলেই রাস্তায় জ্যাম লাগে। খালিই এদিক ওদিক করবে আর রাস্তা ব্লক করবে। বেচারা অটোওয়ালা নিজের কোন দোষ দেখতে না পেয়ে চুপ করে রইল। ভাবছিলাম, হ্যা ভাবছিলাম... কে বেশী দায়ী। পাশের লেন দিয়ে (যদিও রং সাইড নয়) একটু এগিয়ে নিতে চাওয়া অটোওয়ালা, নাকি একার জন্য ইয়াব্বড় একটা গাড়ি নিয়ে রাস্তা বুক করা গাড়িওয়ালা? প্রশ্নটা রয়েই যাবে, এবং জ্যামও। কারণঃ ১. পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ভিড়ে ঠাসা। ২. একা গাড়ি চালালে/ অড ইভেন লঙ্ঘন করলে ফাইন করবেন কাদের? যাদের ওইটুকু ফাইনে কিচ্ছুই যায় আসেনা তাদের? দেশে ভি. আই. পি. এর অভাব আছে কি? ৩. জনসংখ্যা কমাবেন কি করে? জন্মনিয়ন্ত্রণ? সে তো জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারকে কমানোর সামান্য প্রচেষ্টা মাত্র। ৪. ট্রাফিক সিগ্ন্যাল তো ভিড়কে থামায়। গতিকে আরও রোধ করে। এ দিয়ে সাকুল্যে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ তবুও হতে পারত। কিন্তু কজন মানে? আমি নিজেই তো ট্রাফিক লাইটে বিশ্বাস করে দু বার মরতে মরতে বেঁচেছি। ভাবনার জালের বিস্তার আজ এটুকু। বাকি গল্প কমেন্টে হোক।

226

11

অলভ্য ঘোষ

পাগলী

পাগলী বুকে দুধ ভর্তি স্তন দুটো ছেঁড়া ব্লাউজের ফাঁক ফুঁড়ে যেন বের হয়ে আসতে চাইছে। ফুটপাতের কোনায় কাটা মুরগির মতো লাল টুকটুকে নাড়ি ভুড়ি জড়ানো রক্ত স্রাব ভেসে যাওয়া ধুলায় ধুকপুক করছে মানবের ভ্রুণ। পথ চলতি লোকেরা যেন ভিড় করে সিনেমা দেখছে। দুই হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেও পড়ে যায় দুর্বল পাগলী টা। প্রসবের আবর্তে ক্ষরণ হয়েছে অনেকটা রক্ত। এতটা রক্ত ঝড়ে এ দেশের স্বাধীনতাও আসেনি। দূরে এক সাংবাদিক গল্পটাকে খবরের হেডলাইনে পরিবেশিত করতে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল খুঁজে চলেছে। ট্রাফিক পুলিশ ভিড় সরাতে ব্যস্ত। ভোটের প্রচারে লালবাতি সাইরেনওলা মন্ত্রী যাবেন এ পথ দিয়ে। প্রসূতি পাগলীর খবর পেয়ে কোন এক খ্রিস্টান মিশনারীর লোক এসে হাজির। ভ্যাটিক্যান সিটি থেকে তাদের নাকি কেউ আবার সন্ত উপাধি-ধারী। হাড়হাভাতে এদেশের সদ্যজাতের চাহিদা খুব বিদেশে। মোটা মোটা ডোনেশন দেয় তারা। এই তো কদিন আগে ইঁদুর ছানার মত বড়দির নার্সিং হোমে রেট করে মিলেছিল চালান হবার জন্য প্রস্তুত কলকাতার নবজাতক। মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস সমাজ সেবিকারা যেন এগিয়ে চলেছে গোয়েন্দাদের মত পাগলী টার দিকে। পাবলিকের চোখের পাতা পড়ছে না। -কে মা করেছে পাগলীটাকে? -অপজিশন। কখন যেন লাল বাতি সাইরেন বন্ধ করে গাড়ির সওয়ার ন্যাওটা পুলিশকে কানে কানে ফিসফিস করে বলে; -ভালো করে একটা ইনকয়েরি করে দেখো! এ দেশের রাজনীতির বেশ্যারা প্রচার পেতে নিজের মাকেও লাইনে দাঁড় করায়। বিরোধী ক্যাডারদের হাতে পাগলির ধর্ষণ! হট কেক।কোটে প্রমাণ হতে হতে ভোট ফুরাবে। বিরোধীরাও সদলবলে উপস্থিত হলো। একদল বিরোধী পাগলীর জাত খুঁজে পেল। পাগলী টাকে বলল সীতা মাইয়া; রাবণ নয় ধর্ষনের তীর মহম্মদের দিকে। আর এক দল বিরোধী; ধর্মের ভোট নয় মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদ্বিঘ্ন তারা গদি হারানোর পর থেকে। শাসকের ব্যর্থতা ঝান্ডা উড়িয়ে শ্লোগানে শ্লোগানে ময়দান কাঁপাচ্ছে যখন;র‌্যাব নামার আগে পাগলী টা হঠাৎ একগাদা থুতু ছুড়ে দিল সংবিধানের দালালদের মুখে। ঘৃণার সে বজ্র নিক্ষেপে বিন্দুমাত্র গরল ছিল না অ্যাসিডের মত । খসে পড়ল না দাঁত ,মুখ ,নাক-চোখ; পুড়ে ছাই হলো না এদেশের মেকি গণতন্ত্র; সার্বভৌমত্ব! কারো কারো ইচ্ছে করলো পাগলীটার তলপেটে ছুটে দিয়ে কেঁত কেঁত করে লাথি কষিয়ে দিতে। সাহসে কুলালো না। উৎসুখ মানুষের ভিড়ে কত মানব দরদী মোবাইলে বন্দি করে চলেছে গোটা দৃশ্যপট । নারীবাদী মানবতাবাদীরা মিডিয়ায় বসে সন্ধ্যাবেলায় গালভরা মানব অধিকারের বহু চর্চিত,চর্বিত বুলি কপচে বাড়ি ফিরে বিছানায় শরীর চায় স্ত্রীর। মাসিকের অসম্মতির ও বারণ মানে না। কারো আবার প্রিয় নারী কখনও কখনও স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে থানায় পৌঁছলে ছোটবেলার টিকার দাগের মত বুদ্ধিজীবীর প্রিয় ব্যান্ডের সিগারেটের ছ্যাঁকা মেলে শরীরের আনাচে কানাচে। টিপ্পনি নয়! বাসে, ট্রামে ,মিছিলের ভিড় ঠেলে ভারতবর্ষের নারী বাড়ি ফিরে গা আলগা করে গোণে তার স্তনের উপর নখের আদমশুমারি। পাগলীটা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো আবার; -"ভালবাসা না বাল! শুধু চোদার তাল।" কেউ কেউ ফিক ফিক করে হাসল। কেউ কেউ মুখ চাওয়া চাই করল । কুকুর ধরার মত ফাঁসকল করে পাগলী ধরা হলো। পাছায় ইনজেকশন ফুটতে ঘুমে ঢলে পড়ল সে। সভ্য সমাজের উদ্দেশ্যে তার অসভ্য কথাটির তাৎপর্য বুঝলো না কেউ! আজকের শিশু বাঁচবে কিনা জানি না; কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারিকা পর্যন্ত সমস্ত ভারতবর্ষের ভারত মাতা মনে হলো পাগলিটাকে। সে ছাড়া আমরা সকলেই অসুস্থ। © অলভ্য ঘোষ অনুলিখন: নিবেদিতা পাল

138

1

মনোজ ভট্টাচার্য

উধাও একটা দিন !

উধাও একটা দিন ! মনে পড়ে অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টি ডেজ ! যখন ফিলিয়াস ফগ ও জাঁ পামপর্তু - ফিরে এসে দিন গুনল – তখন দেখল আশি দিন হয়ে গেছে ! – মনেও ছিল না পুবদিক থেকে ঘুরলে একটা দিন ফেরত পাওয়া যায় ! আমারও কদিন ধরে খুব দিন ভুল হয়ে গেছে ! – এখন আর আমার দিন কি প্রয়োজনে লাগে ! দিনগুলি কিন্তু দেওয়ালে ঝোলে ! - তাই যখন কোথাও যেতে টেতে হয় – তখনি ক্যালেন্ডার দেখি ! অনেকটা আয়না দেখার মত ! আজকাল আমি আয়না দেখতেও ভয় পাই ! শুধু দাড়ি কাটার সময়ে আয়নার লোকটাকে দেখতে হয়! সাদা ফেনায় লাল ছোপ না পড়ে ! সে যাই হোক – বুধবার রাজা অয়দাপাউসকে দেখতে গেছিলাম বাগবাজার মঞ্চে । তখন দিনটাও মনে ছিল । তারপর গতকাল একটা বিশেষ কাজে যেতে হল ব্যারাকপুরে । শুধু যেতে আসতে এত সময় লাগে – ওখানেই বোধয় দিনের হিসেবটা গোলমাল হয়ে গেছে ! আমার দৃঢ় ধারনা জন্মে গেল – সেটা শনিবার ! অথচ ভিড় ভাট্টা অন্য দিনের মতোই ছিল ! রাত্তিরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নটা । পরের দিন রোববার যেহেতু একটা কাজ আছে – তাই মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম ! সকালে বাজারে গিয়ে সব কিনে কাগজ নিতে গিয়ে - দিল একটা ! রোববার তো দুটো নেওয়ার কথা ! আজ দুটো কাগজ না ?- কাগজওলা বলল – কেন জ্যেঠু ! শনিবার তো একটাই নেন ! শনিবার তো একটাই নিয়েছি ! আজ তো রোববার ! – আজ তো শনিবার ! – আপনার দিন ভুল হয়ে যাচ্ছে ! পাশ থেকে আরেকজন আমি বলে উঠল - আমাদের আবার শনিবার-রোববার কী ! সবই তো রোববার ! – সে তো ঠিক কথাই বটে ! চার্লস ল্যাম্বের সেই সুপার অ্যানুয়েশান – আমরা শনিবার রোববারগুলো হারিয়েছি ! হাতে কাগজখানা নিয়ে দেখি – শনিবারই বটে ! কাগজের খবর – সত্যি-মিথ্যে যাই লিখুক না কেন – দিনটা ওরা ঠিকই রাখে ! বেশ আজ শনিবার ! তাহলে গতকাল নিশ্চয় শুক্রবার ছিল ! – তাহলে বুধবারের পরের দিনটা কোথায় গেল ? বৃহস্পতিবার ! বৃহস্পতিবার কোথায় গেল ! আর এখানে বৃহস্পতিবার দিনটা তো নীরবে উবে যেতে পারে না ! সব বাড়িতেই বৃহস্পতিবারকে প্রায় বেঁধে রেখে দেয় – পাছে দিনটা ফুরুত করে পালিয়ে না যায় ! সকালে ফুলউলির কাছে দর কষাকষি করে ফুল কেনা ! শশা-কলা কেনা ! সেখানেও প্রায়ই দেখি ফলওলার কাছে বাপান্ত ঝগড়া ! – মিষ্টির দোকানে ভিড় – ওরে আমারটা আগে দে-রে ! বেস্পতিবারের সেসব ক্ল্যাসিকাল ঘটনা কোথায় গেল ! অনেককাল আগে বিমল করের একটা গল্প পড়েছিলাম – অনেকটা এরকম ! একটা লোক কোন এক মাইনিং অঞ্চলে গাড়ি চালিয়ে এক জায়গা থেকে দুরে আরেকটা জায়গায় যাবার সময় – ছোটো একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিল । - তারপর উল্টোদিক থেকে আসা কোনও গাড়ির চালকের সাহায্যে আবার গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছল সেইদিন অনেক রাতে । ক ঘটা পরই দিন পাল্টে গেল – স্বভাবতই বারও পাল্টে গেছে । - কিন্তু সেই লোকটি কিছুতেই দিনটা মেলাতে পারছে না ! একটা আস্ত দিন তার ক্যালেন্ডার থেকে হারিয়ে গেল ! ও, আরও একটা হিন্দি সিনেমাও দেখেছি । সেখানে নায়িকা কোন এক বারে পান করতে ঢুকেছিল &nbsp;। দু-তিনজন লোক তাকে বেহুশ অবস্থায় তুলে নিয়ে গেছিল – মজা লুটবে বলে । - কিন্তু সেখানে কিভাবে অজয় দেবগন এসে তাকে বাঁচাল । পরে সে বলল – রোববার সে একটা সিনেমা দেখে বারে ঢুকেছিল । কিন্তু অজয় যখন তাকে বাঁচাল – তখন মঙ্গলবার হয়ে গেছে ! – তাহলে সোমবারটা গেল কোথায় ! – সিনেমাটার নাম সানডে জাতীয় কিছু ! সিনেমা হিসেবে কিছু নয় – কিন্তু মিসিং দিনের ঘটনাটা দারুণ ইন্টারেস্টিং ছিল ! এত ধানাই পানাই করার পরেও আমার সাধের বেস্পতিবার দিনটা কোথায় গেল ? কিছুতেই মেলাতে পারছি না কেন ! – জীবনে আমরা কদিনই বাঁচি ! বিশেষ কোনও ঘটনা ছাড়া আমরা তো মনেই করতে পারিনা সেই অকেজো দিনগুলোর কথা ! তাহলে সেই দিনগুলো তো আমাদের বিস্মরণীয় হয়ে আছে নাকি ! সেগুলোর কে হিসেব রাখে ! কিন্তু তবু – আস্ত একটা দিন কি ভাবে উধাও হয়ে যাবে জীবন থেকে ! মনোজ

131

9

চঞ্চল

ভবঘুরের ডায়েরী

ফিরে দেখা - আমি বিকাশ বলছি ........................................................ হঠাৎ করেই গতকাল পিতাজি আমাকে তার ঘরে ডাকলেন| পারতপক্ষে বাবার সাথে আমাদের কথাবার্তা কমই হয়| আর পাঁচজন সাধারণ পিতা-পুত্রের মত সম্পর্ক আমাদের নয়| সবসময় একটা দুরত্ব বজায় থাকে| যে দুরত্বের সবটাই সন্মানের‚ শ্রদ্ধার আর পারিবারিক প্রথা মেনে| পিতাজি ডেকেছে কেন সেটা বেশ রহস্যের| খুব দরকার না থাকলে তো আমাদের ডাকেন না| কিন্তু সেই ডাককে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই| দাদারাই কোনদিন পারল না‚ আমি তো কোন ছার! - এসো আমার কাছে বসো| পিতাজি যে ডিভানে বসে হুক্কা খাচ্ছিলেন‚ আমি তার পাশে রাখা চেয়ারটায় বসতে গেলাম| - নাহ‚ ওখানে নয় আমার কাছে এসে বসো| এবার আমার চমকানোর পালা| বাবা তো কখনো এমনভাবে আমাকে কাছে ডাকেননি! মনেও পড়ে না কখনো এমন মুহুর্ত আমার জীবনে এসেছে| - আমাকে তোমরা খুব ভয় পাও তাই না? - হাঁ জি‚ না জি !! থতমত খেয়ে যাই‚ ঠিক কি বলতে হয় এমন পরিস্থিতিতে আমি তো জানি না| বাবা মুচকি হাসলেন একটু| এটাও বেশ দুর্লভ| আজ কেন জানি না সব কিছু ভীষন ভালো লাগছে| মনে হচ্ছে মা আর দাদিকে বাদ দিলে এমন আপন ব্যবহার বাবার কাছ থেকে কখনো পায়নি| এই প্রথম বাবাকে বড় আপনজন মনে হচ্ছে| বাবার খুব কাছ ঘেঁষে বসলাম আমি| - আমি জানি‚ আমি জানি‚ তোমরা সবাই আমাকে ভয় পাও| পিতাজি কথাগুলো বলতে বলতে মাথা নাড়লেন| একটু দুরে দাঁড়ানো বাবার খাস নৌকরকে হাতের ইশারা করতেই সে তাড়াতাড়ি এসে বাবার সামনের টেবিলে রাখা বাহারি গ্লাসে দারু ঢেলে দিল| বাবাকে কখনও দারু খেয়ে নেশা করতে দেখিনি| খাওয়ার পর একটু খান মাপ বুঝে| ভরা গ্লাসে চুমুক দিয়ে পাশে রাখা তোয়ালে দিয়ে মোচটা মুছলেন| তারপর বললেন‚ - যে জন্য তোমায় ডেকেছিলাম‚ সম্বন্ধীজি আজ এসেছিলেন ওঁনার একটা প্রস্তাব নিয়ে| উনি চান বিয়েটা তোমার পরীক্ষার আগেই হয়ে যাক| - কেন? বেশ জোরেই হয়ত শব্দটা বেরিয়েছে আমার মুখ থেকে| পিতাজি দেখলাম ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন| - আগে পুরো কথাটা শোন| ওঁনার মাতাজির শরীর খুব খারাপ| যেকোন সময় যা কিছু একটা হয়ে যেতে পারে| মাতাজির ইচ্ছে উনি ওঁনার প্রিয় নাতনীর বিয়ে দেখবেন| তুমি তো জানো সম্বন্ধীজির ইচ্ছে ছিল তুমি মাট্রিক পাশ করলে বিয়েটা দেবেন‚ কিন্তু ওঁনার মাতাজির জন্য উনি বিয়েটা এগিয়ে আনতে চেয়ে আমার হাত ধরে অনুরোধ করলেন| আমি ওঁনাকে কথা দিয়ে দিয়েছি| সেইমত আমরা তৈয়ারি শুরু করে দিয়েছি‚ তুমিও তৈরি হও| - লেকিন পিতাজি‚ আমি কিছু বলবার অক্ষম চেষ্টা করলাম কিন্তু বাবা থামিয়ে দিলেন‚ -তোমাকে জানিয়ে দিলাম মাত্র| এখন তুমি যেতে পারো| মাথা নিচু করে পিতাজির ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম| বাবার মুখের ওপর কথা বলার মত স্পর্ধা আর সাহস কোনটাই আমার নেই| এখন সেটা পরিস্কার হল| কিন্তু ঠিক এখনই তো আমি বিয়ে করার জন্য মনে মনে তৈরি নই| আমার তো কত কাজ বাকি আছে‚ অনেক কিছু করতে হবে| সেদিনের কথা খুব মনে পড়ছে| অন্তরাকে চিঠি দিয়েছিলাম খুব আশা নিয়ে| অন্তরা উত্তর দেয়নি| উল্টে ওদের পাশের বাড়ির সন্তোষ ভৈয়া এসে আমাকে ধমকে গেল| আমি চাইলে তখনই ওর কাম তমাম করে দিতে পারতাম‚ এত গুস্সা আমার হচ্ছিল| বিকাশ ঠাকুর সে পঙ্গা!! কিন্তু আমি চেপে গেছিলাম| এক তো চিঠিটা দিয়েছিলাম সেটা কেউ জানতই না| এই ব্যাপারে আমি জানি আমার বন্ধুরা আমাকে হেল্প করবেই না| এমনকি আমার সবসে করিবি দোস্ত চন্নুও আমাকে হেল্প করছে না| তাই চন্নুকেও চেপে গেছি ব্যাপারটা| তবে একমাত্র চন্নুটাই আমাকে একটু বোঝে‚ দিল খোলকে ওর সাথেই কথা বলা যায়| কিন্তু কেন জানি না এই ব্যাপারটায় ও একদম আমায় হেল্প করছে না|একবার তো ব্যাটা বচ্চা সিংয়ের কাছে অচ্ছাখাসা ধুলাই ভি করিয়ে দিল| বাইরের বাগানে চলে এলাম| মগরমছ তলাবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম| কাজের লোকেরা ওখানে ওদের খেতে দিচ্ছে| ওদের খেতে দিতে আমারও খুব ভালো লাগে| -ছোটেমালিক ইয়ে লো‚ ইনলোগো কো খিলাও| একজন এগিয়ে এসে কাঁচামাংসের বালতিটা আমার দিকে এগিয়ে দিল| - নাহ! তোরাই খাওয়া‚ বলে নিজের ঘরে চলে আসলাম| মনটা বেশ চঞ্চল হয়ে আছে| অন্তরার সাথে কি সন্তোষ ভৈয়ার কিছু চক্কর আছে? কোথায় অন্তরা আর কোথায় সন্তোষভৈয়া! বেতুকি সোচ‚ কিন্তু অসম্ভবও নয়| কাউকে লাগাতে হবে অসলি বাত জাননে কে লিয়ে| সন্তোষ ভৈয়া‚ লোক মোটেই ভালো না| শহরে একটা রেস্টোরেন্ট-কাম-বার আছে| খুব খারাপ লোগোকে সাথ উঠনা-বৈঠনা ওর| কি যেন নাম ওর বারটার.. মনে পড়েছে "শাকিবালা"| অনেক খারাপ মেয়েরা তো ওখানে যায়| হে ভগবান‚ অন্তরা যেন ঐ লোকের পাল্লায় না পড়ে| তবাহ হ যায়েগি ও লড়কি!! এখুনি কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হয়| বাইকটা বের করলাম| কপাল বটে আমার ‚ ঠিক এসে হাজির বাবার বিশ্বাসী লেঠেল সিপাহি| - ছোটামালিক মেঁ বৈঠটা হুঁ আপকে পিছে| বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে বসেই পড়ল বাইকের পিছনে বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে| যদিও জানি সিপাহী বাবার অনুগত তবু আমাকেও কিছুটা সমঝে চলে| - এক বাত য়াদ রখ‚ এখন কোথায় যাচ্ছি‚ কেউ যেন জানতে না পারে| মনে থাকবে? - হাঁ ছোটে মালিক| হাওয়াতে ভর করে বাইকটাকে উড়িয়ে একেবারে শাকিবালা বারের সামনে হাজির হলাম| বাইকটা আর সিপাহীকে বাইরে দাঁড় করিয়ে আমি ভেতরে ঢুকলাম| এই প্রথম আমি এখানে এলাম| জমজমাট বার| সিগারেটের ধোঁয়া আর দারুর উৎকট গন্ধে জায়গাটা একদম যেন নরক লাগছে| আমাকে লল্লন বলেছিলে ও এইখানে কাজ করে| একজন ওয়েটারকে জিজ্ঞাসা করালাম‚ - আপ এহি পে রুকে‚ মে উসে বুলা দেতা হুঁ| আমি বাইরে চলে এসে ওর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম| লল্লন আমাদের মুন্সির ছেলে| আমার খুব অনুগত| লেখাপড়া তেমন একটা ওর দ্বারা হবে না বুঝেই এই বারে কাজ নিয়েছে| বেশ চৌকস ছেলে| -আরে ছোটে মালিক‚ আপ য়হা? আমাকে ডেকে নিতেন| এখানে কি ব্যাপার| - না‚ একটা জরুরী দরকার আছে| একটু দুরে চল ‚ কথা আছে| বার থেকে বেশ একটু দূরে একটা চায়ের দোকানে চলে এলাম| -শুন তেরে কো এক কাম করনা হ্যায়‚ সন্তোষ ভৈয়া হ্যায় য়ঁহাপর? - হাঁ উপরে আছে‚ যেখানে ডান্স চলছে| ও বলে| - একটা কথা বল‚ সন্তোষ ভৈয়ার সাথে কি আমাদের স্কুলের বাসুস্যারের মেয়ের কোন চক্কর আছে?সচ সচ বোলিও| লল্লন একটু ঘাবড়ে গিয়ে আমার দিকে বোকার মত তাকিয়ে রইল| ওর হাবভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছিল ও অনেক কিছুই জানে‚ কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছে| - ডর মত‚ সচ বতা আমি ওকে আশ্বস্ত করে জানতে চাইলাম| -ছোটেমালিক আমার নৌকরি চলে যাবে ভৈয়া যদি জানতে পারেন| -নৌকরি যাবে না‚ তুই সব বল| আমি ওকে আবারও আশ্বস্ত করলাম| -মালিক চক্কর তো হ্যায়| ওর কাছ থেকে যা জানলাম সেটা হল‚ সন্তোষ ভৈয়া প্রায়ই বনারস যায়‚ অন্তরার সাথে দেখা করতে| ওদের মনে হয় কিছু প্ল্যান আছে‚ কিছুদিন আগে লল্লন শুনেছিল সন্তোষ ভৈয়া বেশ কিছুদিনের জন্য বনারস যাবে‚ তারপর সেখান থেকে অন্য কোথাও| কিন্তু ঠিক কোথায় যাবে সেটা শুনতে পায়নি| - ঠিক হ্যায়| অব যা‚আরও কিছু জানতে পারলে আমাকে জানাতে ভুলবি না‚ ঠিক হ্যায়| - অচ্ছা মালিক‚ লেকিন দেখনা মেরি নৌকরি না চলি যায়ে| ওর চোখের কাতর অনুনয় আমার চোখ এড়ায় না| আমি বাইকে উঠতে উঠতে ওকে হাত তুলে আশ্বস্ত করলাম শুধু| মাথাটা ঠিক কাজ করছে না| এবার কি করব আমি? সামনেই বিয়ে‚ অন্তরা বনারসে| জানি অন্তরা আমায় ভালোবাসে না| আচ্ছা ও কি সত্যি জানে না সন্তোষ ভৈয়া কিরম বাজে লোক| কি করে ওর সাথে জড়িয়ে পরল? বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে| কার কাছে যাব? কাকে জানাব এসব কথা? কে আমায় বুদ্ধি জোগাবে? চাইলে আমি নিজেই অনেক কিছু করতে পারি‚ কিন্তু সিচুয়েশন কুছ অলগ হ্যায়| শালা চুন্নুকে পাশ যাব? কিন্তু বেশ রাত হয়ে গেছে| এখন যদি চন্নুর কাছে যাই তাহলে ফিরতে দেরি হবে| বাড়িতে শোরগোল পড়ে যাবে আমাকে খোঁজার জন্য| এমনিতেই ফতোয়া আছে‚ বিয়ের আগে আগে বাড়ি থেকে বেরোনো চলবে না| কাল বরং চুন্নুর সাথে একবার দেখা করে নেবো| রাতে দাদির কাছে শুয়ে পড়লাম| বাবার কাছে বকুনি খেলে‚ মনখারাপ থাকলে আমি দাদির কাছেই শুই| দাদির পিঠে মুখ গুঁজে দিলেই আমার ঘুম চলে আসে| দাদির গায়ের গন্ধটা আমার খুব ভালো লাগে| দাদি জিজ্ঞেস করেছিল‚ - কেয়া রে আজ ফির পিতাজি সে ডাট খায়া কেয়া? -উঁহু বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম| দুদিন বাদেই বিয়ে| বাড়িতে নাতে-রিস্তেদার ভরে গেছে| আজ সত্যনারায়ণ কথা আছে সকালে‚ তারপর কুলদেওতার পুজো হবে| পুরো মহল লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে| বনারস থেকে সাহনাইও এসেছে| সুবহ সে পোঁ পোঁ করে দিমাগ কা চটনি করে দিয়েছে| আমাদের তো অনেক রসম| এরপর হলদি কুটাই‚ মাতৃপুজন‚ সিলপোহা‚ ইমলি ঘুটাই কত যে কান্ড| দিমাগ খরাব করে রেখে দিয়েছে| কখন যে চুন্নুওয়ার কাছে যাব জানি না| কিন্তু যেমন করেই হোক একবার দেখা করতেই হবে| বিকালে আবার পিতাজির কিছু পরিচিত মিনিস্টাররা আসবেন‚ তাদের জন্য জবরদস্ত খানাপিনার আয়োজন হয়েছে| তখনই একটু যা সময় পাওয়া যাবে| সিপাহিকে আগে থাকতেই বলে রাখি বরং‚ একা তো বেরোতে দেবে না| চাচাদের বাড়ি থেকে কেউ আসবে না| ওদের তো নেওতাই দেওয়া হয়নি| শাম হতে হতে আমার যে কি বুরা হালত হয়েছে কি বলব| সারা বদন টুট রহা থা| কিন্তু চুন্নুর কাছে একবার না গেলে তো নয়| এখন ঘড়িতে ৭-৩০ বাজে| গেস্টরা সব এসে গেছে| দারুর ফোয়ারা চলছে বাইরের বাগানে| এক্দম সহি সময়| সিপাহিকে ডেকে বাইকে করে সোজা চুন্নুর চাচার বাড়ি| - এ চুন্নুওয়া বাহার আ যা| - ওয়ে তু য়হা!! চুন্নু অবাক‚ আরে তোর শাদি দুদিন পর‚ তুই বেরোলি কেন এখন? তোর বাবা জানলে তোকে কুটে রেখে দেবে রে!!| - বকওয়াস বন্ধ কর‚ চল আমার সাথে| - কঁহা? -দরকার আছে তোর সাথে| চল রাজভোগ এ গিয়ে কেবিনে বসে কথা বলব| তুই সাইকেল নিয়ে আয়‚ আমি ওখানে গিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছি| এই মুসুন্ডটা সাথে আছে তাই‚ না হলে তোকে সাথে নিয়েই যেতাম| জলদি আ| বলে সোজা রাজভোগ রেস্টোরেন্টে চলে এলাম| সিপাহিকে বাইরে চা-পানি দিয়ে বসিয়ে আমি কেবিনের ভিতর চলে এলামা| কেবিনে পারতপক্ষে কেউ একটা বসে না‚ কেউ বসে গালগল্প করলেও কেউ ডিস্টার্ব করে না|চুন্নুর পসন্দের আইটেম সামোসা আর রসমালাই আর্ডার করে বসতে না বসতেই চুন্নু দেবা কে নিয়ে হাজির| -বৈঠ যা| - কি ব্যাপার কিছু গড়বড় করেছিস মনে হচ্ছে| চন্নু বসতে বসতে সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল| ইতিমধ্যে খাবার হাজির| আমি আর দেরি না করে আদ্যোপান্ত সব ওদের বললাম| খেতে খেতে ওদের খাওয়া প্রায় মাথায় ওঠার জোগাড়| গোল গোল চোখ করে ওরা আমার কথা শুনছিল| - সালে ইতনা ক্লুছ হো গয়া? - এবার বল কি করি? আমার অবস্থা তখন ডুবতে হুয়ে কো তিনকে কা সহারার মত| - কিন্তু তুই একটা কথা বল‚ তুই কেন অন্তরার ব্যাপারে এত খোঁজখবর করছিস? - দেখ ভাই আমি তো বিয়ে করেই নিচ্ছি| কিন্তু বাসুস্যার‚ অন্তরার কিছু উল্টা-সিধা হলে স্কুলে মুখ দেখাতে পারবে না| আর তোদের বঙ্গালী সমাজও ওঁনাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে|কুছ ভি হো‚ স্যার আমাকে পছন্দ করে না জানি‚ কিন্তু উঁনকি ইজ্জত পে আঁচ আয়ে এটা আমি চাই না| আখির হমারে স্কুলকা ইজ্জত কা সওয়াল ভি তো হ্যায় না| আমি সত্যিটা বলতে পারলাম না ওদের| বাসুস্যারের জন্য না‚ অন্তরার জন্য এসব কিছুই আমি করছি | এ সত্য ওদের বলতে পারলাম না| -সালে কো মরওয়া দে কেয়া? - তোর মাথা খারাপ হয়েছে| এক্দম এসব চিন্তা করবি না| যা মাল তুই‚ মাথাগরম করে ওসব করেও ফেলতে পারিস| বনারসে তোদের জানাশোনা কেউ আছে? চন্নু বলল| - হাঁ হ্যায় তো| - কে? - আমার বাবার বন্ধু এক মিনিস্টারের বেটা| বনারস গেলে আমরা ওদের বাড়িতেই উঠি তো| সহি বতায়া য়ার| ওকে বলি লোক লাগিয়ে ওদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে? -এক্দম তাই কর| সন্তোষ ভৈয়া মনে হয় না জলদবাজিতে কিছু করবে| ওর ঘর-বাড়ি‚ বার সব এখানে| জানাজানি হয়ে গেলে এখানে টেঁকা মুশকিল হয়ে যাবে| -লেকিন উস হরামির ওপর ভরসাও তো করা যায় না| আমি বললাম| -দেখ ভাই‚ এরপরও যদি কিছু হয় তবে আমি বলব অন্তরার নসিব| এত বুদ্ধিমতী মেয়ে ও| আমার মনে হয় না এমন কিছু করবে যাতে ওর ফ্যামিলির ইজ্জতের ফালুদা হো যায়ে| চন্নু বলল| - রহনে দে তু| অত যদি বুদ্ধিমতী‚ তাহলে ঐ হরামির সাথে ইস্ক করবে কেন? চন্নুর কথা শুনে আমি উত্তেজিত হয়ে পড়লাম| -ছোড় না য়ার| তুই কেন এত উতলা হচ্ছিস? এসব ছাড় আর মন দিয়ে বিয়েটা কর| হোনেওয়ালা বিবিকা ফটো লায়া হ্যায় কেয়া? হামে ভি দিখা| চন্নু আর দেবা দুজনেই বলল| -ভাগ সালো কাম কা না কাজ কা‚ ঢাই মণ অনাজ কা| আমার ভিতরে কি চলছে কি করে বোঝাই ওদের| ওরা হাসি-মজাক করছে| আরও বেশ কিছুক্ষণ চলল এসব| তারপর আমরা উঠে পরলাম বাড়ি ফেরার জন্য| - সালো‚ ঠিক সময়ে শাদি পে পৌঁছে যাস‚ দেরি করিস না|তোরা কেউ না থাকলে আমি কিন্তু বিয়েতে বসব না| - ফিকর নট| আমরা পৌঁছে যাব| আমি‚ সিপাহিকে বাইকের পিছনে বসিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন পার্টি একদম জমজমাট| দু একজন তো টল্লি হয়ে বাইরে বাগানেই উল্টে পরে আছে| হলের ভেতর যারা বসে অছে তাদের অবস্থাও টাইট| বাইরে কত যে পুলিশ আর হওয়ালদার এসেছে আর সেইমত তাদের পার্সোনাল বডিগার্ড| সালে কুত্তেলোগ যতই পয়সাওয়ালা হোক না কেন ফোকটে দারু পেলে‚ মাথার চোটি পর্যন্ত গিলবে| যানে দো! আমার কি? হলে ঢুকে দু একজন যারা তখনও হুঁশে ছিল তাদের গোর লাগি আর নমস্তে করে নিলাম| দু-একজন বিয়ে নিয়ে ভদ্দা মজাকও করল| আমিও মুচকি হেসে‚ সৌজন্য দেখিয়ে ওখান থেকে কেটে পরলাম| বচপন থেকে দেখে আসছি এসব‚ নতুন কিছু নয়| এসব নিয়ে এখন মাথা না ঘামিয়ে এখনই একবার বনারসে ফোন করা দরকার| কপাল ভালো ছিলা‚ ফোনটা ঠিকঠাকই কাজ করছে| নাম্বার মেলাতে পেয়েও গেলাম| - জগদিশভৈয়া আমি বিকাশ বলছি... একটু উদাস হয়ে যাচ্ছি আমি| রাত পোহালেই বিয়ে আমার| আজ সব মনের কথা খুলে বলতে চেয়েছিলাম চুন্নুকে| কিন্তু বলা হল না| কি বা বলতাম? ইস্ক কিসিসে শাদি কিসিসে| এই যে চন্দা‚ আমার হোনেওয়ালি বিবি‚ ওকে তো আমি চিনি অনেক আগে থাকতেই| ওকে বিয়ে করছি তাতে তো কই আমার কোন অপরাধবোধ জাগছে না| বরং বেশ একটা রোমাঞ্চ জাগছে| তাহলে অন্তরার জন্যই বা আমি এত উতলা হচ্ছি কেন? ও তো আমায় ভালোবাসে না| ভালোবাসা তো দুর কি বাত‚ আমায় পছ্ন্দই করে না| তবে কেন ওকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না? কেয়সা রিস্তা হ্যায় ইয়ে? ইস চাহত কো ম্যায় কেয়া নাম দুঁ? এর কোন নামই তো নেই| কেন পাশ কাটাতে পারছি না ইস চাহতকি?| ফিরভি দিল কি আধে হিস্সে তে ঘর করে বসে আছে? ইয়ে দর্দ কেয়সা? খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে| কিন্তু দাদি বলেন‚ মর্দরা কখনো কাঁদে না| ছোট থেকে তো তাই জেনে এসেছি| খুব খুব কষ্ট হচ্ছে| আমি বুঝতে পারছি অন্তরাকে আমি আমার জিন্দেগীতে জায়গা দিয়ে ফেলেছি‚ পারব না ওকে ভুলতে‚ কিছুতেই না| আমার সব কথা শুনে চুন্নু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল| বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ও| সবাই খেতে চলে গেছে‚ শুধু চুন্নু আর দেবা আমার কাছে| এবার ওরাও চলে গেল| মনটা বেশ হালকা লাগছে সব কথাগুলো বলে ফেলার পর| এমনিতেই বিয়েটা চন্দার সাথে আমার এখন হচ্ছে ঠিক কথা‚ কিন্তু চন্দা আরও দুবছর ওদের নিজেদের বাড়িতেই থাকবে| দুবছর পর গওনা হলে চন্দা আমাদের বাড়ির বউ হয়ে আসবে|এটাই আমাদের রসম| আমি কিন্তু বিয়েতে বসেও অন্তরার কথা ভাবছি| আচ্ছা অন্তরা যদি কাউকে ভালোবাসে‚ বিয়ে করে তাতে আমার কি? ওর ভালোমন্দের দায়িত্ব তো আমার নয়| তাহলে আমি জগদিশ ভৈয়ার জন্য অপেক্ষা করছি কেন? জগদিশ ভৈয়া আজ আসতে পারেনি‚ পাটির মিটিং আছে| কাল আসলে অন্তরার ব্যাপারে সব জানতে পারব| বিয়ের রসম শুরু হয়ে গেছে‚ চলবে রাত একটা অবধি| বৃষ্টি অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে| আমার বাড়ির লোকেরা এখন বিয়ের তৈয়ারি নিয়ে বেজায় ব্যস্ত| পিতাজি‚ মৌসাজি আর বাকি বড়রা লওন্ডা নাচ দেখতে বসেছে| ঘন ঘন বন্দুকের আওয়াজে বোঝাই যাচ্ছে যে ওখানে মেহফিল ভালো জমেছে| ঐ ছেলেরা মেয়ে সেজে যে নাচে‚ তাদের দেখতে এদের এত কি যে ভালো লাগে বুঝি না| কখনও কখনও তো এই মেয়ে সাজা ছেলেদের কে নিয়ে যাবে‚ তাই নিয়েও মারামারি লেগে যায়| এদিকে তো আমার কোমর ব্যথা হয়ে গেছে পন্ডিতজির কথায় একবার খাড়া হো যাও আর একবার বেয়ঠ যাও করতে করতে| চন্দাকে একটু পরে ওর বাড়ির লোকেরা মন্ডপে নিয়ে চলে এল| সাথে সেই মেয়েদের নাকি সুরে গানও চলছে‚ কি যে গাইছে তার কিছুই বুঝছি না| কিন্তু চন্দাকে দেখে আমার প্রচন্ড হাসি পেয়ে গেল| আমি নিজেকে ঠিক কন্ট্রোল না করে হেসেই ফেলেছিলাম| চন্দার চিমটি খেয়ে নিজেকে থামালাম| হলুদ রঙের শাড়ি পরে আর বিশাল ঘোমটার ভিতরে যে বসে আছে তাকে আমি ভালো করেই চিনি| কিন্তু এই সাজে তাকে বেশ অচেনা লাগছে| ছোটবেলায় এই চন্দার হাতের চড়-চাপড় যে কত খেয়েছি‚ কিন্তু বিয়ের পরও এসব চলবে নাকি! চিন্তার বিষয়| ও কলেজে পড়ে‚ আমি সবে স্কুল কমপ্লিট করব|ঠিক আছে আমি দুবার ফেল করেছি‚ তাও তো ও আমারে থেকে একটু ছোট| তাও একটু ইজ্জত সে পেশ এলে কি এমন ক্ষতি হবে ওর| আখিরকার আমি তো ওর পতি না কি!! চন্নু আমার পাশে এসে বসল| ওদের দিকে এতক্ষণে তাকাবার ফুরসৎ পেলাম| এতক্ষণ চন্দার দিকেই মনটা ছিল| কি আশ্চর্য্য মনের এই গতি প্রকৃতি! একটু আগেই আমি অন্তরার কথা ভাবছিলাম‚ চন্নুকে বলছিলাম‚ কত কি? আর এখন আমি চন্দাকে ছেড়ে বন্ধুদের দিকে তাকাবার ফুরসতই পাচ্ছি না| ধোতি আর চাদরের আমার সাত বন্ধুর যা রুপ খোলতাই হয়েছে যে কি বলব| হঠাৎ দেখলাম ঘোমটার ভিতর থেকে চন্দা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে| কি হল আবার? আমি চন্দাকে জিজ্ঞাসা করলাম‚ - তবিয়ত ঠিক আছে তো? -য়ে আপকে দোস্ত লোগ হ্যায়?চন্দা কাঁপতে কাঁপতেই জানতে চাইল| - হাঁ তো? - কেয়া শানদার দোস্ত হ্যায়| বলে আরও বেশি বেশি কাঁপতে লাগল| ওহ এবার বুঝলাম‚ চন্দা কাঁপছে না হাসছে আমার বন্ধুদের পোশাক দেখে| সত্যিই মনে হচ্ছে বিয়েবাড়ি নয় হোরি খেলতে এসেছে এরা| এই রে হাসি আমারও পাচ্ছে| চন্দার হাসি এত ছুঁয়া ছুঁত কেন? হাসি নয় আসলে চন্দা‚ চন্দাকে আমার কিন্তু বেশ লাগছে| ওর এই হাসি‚ আমার পাশে ওর এই হাজিরা আমি যেন আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছি| তবু কপট রাগ দেখিয়ে বললাম‚ আমার দোস্তদের নিয়ে মজাক আমার একদম পসন্দ না| এই চন্নু তোরা নিজেদের কপড়া বদল কিউ নেহি লেতা হ্যায়? -আগে কাপড়গুলো শুকিয়ে যাক তবে তো পরব| ওকে হাসতে দে‚ তবুজ্জু দিস না| এই চন্নুটাও একটা চিজ| ধোতি-চাদর পরে কেমন যেন স্বামীজির মত গম্ভীর হয়ে বসে আছে| বাকিরাও তাই| যেন আমার বিয়ে নয়‚ কোন ধরমসন্মেলনে এসেছে এরা| -কাল কখন বের হবি এখান থেকে? চন্নু জিজ্ঞাসা করল আমাকে| -য়ে তো পতা নহি‚ তবে শুনেছি বিকেল চারটে - পাঁচটা নাগাদ হবে| কেন? -না‚ আমরা ভাবছিলাম‚ তোর বিয়েটা শেষ হলে চলে যাব| কাল না হয় তোরা ফিরলে তোদের বাড়িতে গিয়ে তোদের সঙ্গে দেখা করে আসব| কি বলিস তুই? - চলে যাবি তোরা? রাত এক বজনে কো হ্যায়| তাই কর‚ তোরা বরং ফিরেই যা| শুধু শুধু এখানে বসে থেকে কি করবি| আমার মামেরে ভাইরা আছে ওরাই সব সামলে নিতে পারবে| তোদের যা হালত হয়েছে‚ চলেই যা| ওদের ঐ হালত দেখে আমারই খারাপ লাগছে‚ ওদের বসিয়ে রাখার কোন মানে হয় না| - ঠিক হ্যায়| আমরা যাই| কাল দেখা হবে| আর চন্দা ম্যাডাম‚ হাম য্যায়সে দিখ রহে হ্যায়‚ ওয়েসে তো হ্যায় নহি| আপনার পাশের ছেলেটিকে সামলাতে হলে আমাদের শরনে আপনাকে থাকতেই হবে‚ এইটা আগে থাকতেই বুঝে নিন| চুন্নু হাসতে হাসতে বলল| - মুঝে পতা হ্যায়| ঘোমটার ভেতর থেকে মিহি কন্ঠ ভেসে এলো| হো হো করে আমরা হেসে উঠলাম| বিয়ের রসম প্রায় শেষ হবার মুখে| একটু পরেই এখান থেকে উঠতে হবে| পিতাজি আর মামাজি‚ মৌসাজিরা সব এসে গিয়েছেন| ওঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছে| পিতাজি আমার কাছে এসে বললেন‚ -শোনো আমি বাড়ি ওয়াপস যাচ্ছি| তোমার বন্ধু আর স্যার লোগও চলে গেছে| এখানে তোমার ভাইরা রইল| ঠিক সময় খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নিয়ে নেবে|কাল দোপহর খানা খেয়েই তোমরা রওনা দেবে| সেইভাবেই সিপাহী আর মুনিমজিকে বলে দিয়েছি| আর সম্বন্ধীজিও তোমার কাছাকাছি থাকবেন| কিছু দরকার পড়লে ওঁনাকে বলবে| বলে পিতাজি আর দাঁড়ালেন না| দলবল নিয়ে রওনা দিলেন|চন্দার পিতাজিও দেখলাম বাবার পিছন পিছন হাত কচলাতে কচলাতে দৌড়লেন|উনিও কিছু একটা পলিটিক্যাল উল্লু সিধা করার ফিকরে আছেন|সবাই নিজের নিজের কাজ গোছানোতেই লেগে আছে| কুছ তো ডিল হুয়া ইস সাদিমে| ..... আবার আমি- ইয়ে দুনিয়া কে বদলতে রিস্তে ............................................................. বিকাশকে রিসিভ করে আনার পর বিকাশকে নিয়ে আমি আর দেবা চলে এলাম আমাদের আড্ডা রাজভোগ রেস্টোরেন্টে| আমি‚ দেবা আর বিকাশ ভিতরে বসে চুপচাপ চা খেতে লাগলাম| | - আজ জগদিশ ভৈয়ার সাথে কথা হল বুঝলি| বিকাশই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল| -কি বলল? - সন্তোষ ভৈয়া তো হফতে দো হফতে মে অন্তরাকে সাথ মুলাকাত করতে যায়| তাছাড়া ও বেটার সাথে বনারসের ফেমাস য়েলচিকো বারের মালিকের সাথে ভালো দোস্তি আছে| শুধু দোস্তি নয়‚ শেয়ারও আছে ঐ বারে আমার মনে হয়| অন্তরা হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সন্তোষ ভৈয়ার সাথে মাঝে মাঝে ঐ বারেও যায়| জগদিশ ভৈয়ার খাস জানপহচান আছে ঐ বারের মালিকের সাথে| তাই সব খবর পেতে সুবিধাই হয়েছে| তাছাড়া জগদিশ ভৈয়াকে বলে একটা লোক তো ওদের পিছনে লাগিয়ে রেখেছিলাম নজর রাখার জন্য| সবসে জরুরী বাত ইয়ে হ্যায় কে‚ ওরা বেশ কিছুদিন আগেই রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে নিয়েছে. অব বতা কেয়া করনা হ্যায়? জগদিশ ভৈয়া জানতে চেয়েছিল আমার কাছে| আর কি করার আছে বল| আমি তো ভাবছি কি মেয়ে য়ার? সাদি করনে কে লিয়ে দুসরা কৈ নহি মিলা থা কেয়া ? বল? কুছ দিন পহলে তক তো ও দিল মেঁ ছাই হুয়ি থি‚ অভি লগ রহা হ্যায় যো হুয়া হ্যায় অচ্ছা হি হুয়া হ্যায় মেরে লিয়ে| - একদম ঠিক| আমি বললাম| আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম| গতকাল বিকাশ যেভাবে বলছিল অন্তরাকে কোনদিন ভুলতে পারবে না‚ আমি বেশ চিন্তায় পড়ে গেছিলাম ছেলেটা না কোন গন্ডগোল করে| আরও বললাম‚ - তুই এখন বিয়ে করেছিস‚ আর চন্দাও এত ভালো মেয়ে‚ তোর জন্য অন্তরাকে দিল সে নিকাল দেনা হি সহি হোগা| ইসবার তো তু পাশ হো হি যায়েগা‚ কি বলিস? না হলে কিন্তু চন্দার সামনে তুই এক্দম ছোট হয়ে যাবি| - হাঁ ইসবার তো পাশ হোনে হোগা| আর সচ বতায়ে‚ আমার না চন্দাকে বেশ ভালো লাগছে| উসপে দিল আ গয়া য়ার| বেশ একটু লজ্জা লজা মুখে বলে বিকাশ| আমরা হাসি ওর এই লজ্জা দেখে| - লেকিন কালই তো ও নিজের বাড়ি ফিরে যাবে| ফির দো সাল বাদ গওনাকে বাদ মেঁ আয়েগী| তব তক আমি কি করি? বেশ কাতর প্রশ্ন বিকাশের| ওয়ে একবাত পতা হ্যায়? অফিসার ফ্ল্যাট নম্বর ৬৩‚ যেটা খালি হয়েছিল সেখানে একটা জৈন ফ্যামিলি এসেছে| ওঁদের দুটো মেয়ে‚ দোনো জুড়য়া বহন‚ দোনো কা নাম সোনিয়া অর মোনিয়া| এখানে গার্লস স্কুলে ক্লাস ১০ এ অ্যাডমিশন নিয়েছে| লেকিন কেয়া দিখতি হ্যায় দোনো‚ একদম পঠাকা হ্যায়| দেবা হৈ হৈ করে বলে উঠল| -কেয়া‚ বিকাশ প্রায় লাফিয়ে উঠল চেয়ার থেকে| -কব আই হ্যায়? আগে বলিস নি সালা‚ বেকার সময় নষ্ট করলাম আমরা| চল চল‚ এখুনি চল একবার দর্শন তো কর আতে হ্যায়| চল বে বেয়্ঠ যা পিছে দোনো| এই না হলে আমাদের বিকাশ!!! (শেষ)

959

84

অলভ্য ঘোষ

যৌনতা ও আধ্যাত্মিকতা

আমাদের ছোট বেলায় হাবে ভাবে নীতি মালায় বোঝান হয় যৌনতা গর্হিত কাজ। ফলে যৌনতা নিয়ে ভুল বোঝা থাকে দীর্ঘদিন।অথচ কাজটা সকলেই করে। আধ্যাত্মিকতা আর যৌনতা দুটোই প্রয়োজনীয়।পরস্পর বিরোধী আগে ভাবতাম। এখন মনে হয় একে অপরের পরিপূরক।নিয়ন্ত্রক বা নির্ণায়ক। In general Spirituality cannot be classified without Sexuality. হিন্দু ধর্মে কাম ,ক্রোধ ,লোভ, মোহ ,মাৎসর্য পরিত্যাজ্য।ষড়রিপু অর্থাৎ মানুষের চরম ও প্রধান এই ছ'টি শক্র হলো-কাম, ক্রোধ,লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। কাম শব্দের আভিধানিক প্রতিশব্দ হলো সম্ভোগেচ্ছা। কাম শব্দটির বহুবিধ ব্যবহার থাকলেও যৌনবিষয়ক সম্ভোগশক্তিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। যৌনতা বিষয়ে পাশ্চাত্য অভিমত বিশেষ করে সিগমুন্ড ফ্রয়েড এর অনুসরণ করলে বলা চলে;The Sexuality is not only physical appearance. It have more mental activity. Very complicated; involved with every human expression.বাৎসায়নের কামসূত্রের প্রথমেই লেখা আছে অর্থ অনর্থের মূল।কামের মানসিক ,শারীরিক, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সেখানেও মেলে। Certain characteristics are believed to be innate in humans; these characteristics may be modified by the physical and social environment in which people interact.Human sexuality is driven by genetics and mental activity. The sexual drive affects the development of personal identity and social activities. An individual's normative, social, cultural, educational, and environmental characteristics moderate the sexual drive. Sexuality may be experienced and expressed in a variety of ways; including thoughts, fantasies, desires, beliefs, attitudes, values, behaviors, practices, roles, and relationships. These may manifest themselves in biological, physical, emotional, social, or spiritual aspects.আবার অসভ্য পশুদের যৌনতা কেবল প্রজননের। সিংহী বারো বছর অন্তর সন্তান প্রসব করে। তাই তাদের সংযমী বলা হয়।পশুর প্রজননের একটি নির্দিষ্ট ঋতু আছে। উৎকৃষ্ট জীব মানুষের প্রজননের নির্দিষ্ট সময় নেই। মানুষের যৌন তা কেবল প্রজননের জন্য নয়।রামকৃষ্ণদেব বলতেন দুটি একটি বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাওয়ার পর স্বামী স্ত্রীকে ভাই বোনের মত সংসারে থাকা উচিৎ। এখন অনুভব করি মানুষ মাত্রই থাকা চাই নিয়ন্ত্রিত কামশক্তি। এ নিয়ন্ত্রিত কামশক্তি যখন অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া ও বেসামাল হয়ে যায় তখনই তা হয়ে যায় শত্রু।আধ্যাত্মিকতা নিয়ন্ত্রক বা নির্ণায়ক।যেমন ভক্ত না থাকলে ভগবানের প্রয়োজন নেই। তেমনি রিপু না থাকলে আধ্যাত্মিক চর্চার বা কি প্রয়োজন।চোর ডাকাত গুণ্ডা বদমাইশ যেমন না থাকলে পুলিশ কোট কাচারি জেল খানা উঠে যাবে। তেমনি রিপুর তাড়না না থাকলে আধ্যাত্মিকতা গুরুত্ব হারাবে। সত্য, রজ ও তম।সাধু সত্য গুণের। সংসারী লোকের হোল মধ্য অবস্হা। রজ গুণ।চোর গুন্ডা চরিত্রহীন লম্পট তম গুণের।সত্ত্ব-রজ-তম (সৃষ্টি, স্থিতি, লয়) এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ত্রিগুণের অধিন।ব্যক্তিগত ভাবে বলতে পারি এই তিনটি গুণের সমন্বয়ে আমাদের জীবন গঠিত।একি মানুষের মধ্যে এক এক সময় এক একটি গুণ কম বেশি প্রকটিত হয় বলে আমার ধারণা। অংক কষার সময় শিশু হাতের কড় গুনে তবে বলে দুই আর দুই এ চার।একটু বড় হলে তাকে আর কড় গুনতে লাগেনা।ঈশ্বর একটি চিহ্ন মাত্র। বীজগণিতের অঙ্কে যেমন এক্স। তেমনি আমাদের অনিত্য জীবনের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ মেলাতে এক্স এর মত ঈশ্বর ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। আধ্যাত্মিকতায় দেবতা থাকতে হবে এমনটা ভুল ধারণা।বিঞ্জান; দেশ মাতৃকার সেবা,শিল্প সাহিত্য এমনকি সিনেমা নির্মাণে ও খেলা ধুলায় ও আধ্যাত্মিক চর্চা সম্ভব । ঋষি অরবিন্দ , কাল মার্কস , লেনিন , আইনস্টাইন ,রবীন্দ্রনাথ ,গান্ধীজী ,রাশিয়ান চিত্রনির্মাতা তারকাভস্কি , ডা আবুল কালাম কত নাম বলবো।এরা সবাই জ্ঞানে অজ্ঞানে(consciously or unconsciously)আধ্যাত্মিকতাবাদ মতে আধ্যাত্মিক সাধনা করেছেন।সফল ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনির সফলতার পেছনে তার আড়ম্বরহীন অতি সাধারণ জীবন যাপন কৃচ্ছ সাধন আমাদের রাবণের তপস্যার কথা মনে করায় নাকি? সাধনা আর কিছুই নয় সংযম নিরন্তর অভ্যাস। সম্ভোগ মানে সমান ভোগ। ভোক্তা ও ভোগ্য যখন সমান ভোগ পেয়ে তৃপ্ত হয় সেটাই সম্ভোগ। সম্ভোগ একতরফা নয়। সুনিপুণ নিয়ন্ত্রিত ভোগেই সম্ভোগ সম্ভব হয়। শিশু ভোগের অন্ন ছিটিয়ে খায়।যত সে পরিণত হয়।সুচারু নিয়ন্ত্রিত হয় তার ভোগ। এই সুকুমার নিয়ন্ত্রিত চিরন্তন সত্য চেতনার প্রকাশয়ই আধ্যাত্মিকতা। গাড়ি চললে তবে তার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে নিয়ন্ত্রণ কিসের দরকার । তাই চালক ছাড়া গাড়ি নিষ্ক্রিয়। গাড়ি ছাড়া চালক কর্মহীন। পৃথিবীর মানবিক উন্নতি আধ্যাত্মিক উন্নতি না হলে কেবল বৈষয়িক উন্নতি তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব প্রজ্ঞার।সবচেয়ে বড় অসুখ বিভেদ বিভাজন।শিশুকে মা যেমন কেবল বুকের দুধ খাইয়ে বড় করে না ;স্নেহ মমতায় লালিত করে। স্নেহ বর্জিত শিশুর যেমন নমনীয়তা কোমলতা গড়ে ওঠেনা তেমনি আধ্যাত্মিকতা ছাড়াও মানবতা জন্মাবে না। সূক্ষ্ম বোধ বস্তু থেকে জন্মায় না।আত্মা থেকে জন্মায়।যতই দামি হোক বস্তু কেবল খেলনা স্থূল।প্রজ্ঞার স্পর্শ ছাড়া বস্তু বস্তু হীনতায় ভোগে।দুই টাকার কলম কার নেই।সকলে কিনতে পারেন।তবে তা সকলের হাতে সমান মূল্যবান হয় না।কেবল মূল্য পায় জ্ঞানীর হাতে। ঞ্জান মানবিক বিকাশের পথ।আধ্ম্যাতিকতার সোপান। আধ্যাত্মিকতায় চিরন্তন মুক্তি জড় বস্তু কেন্দ্রিকতা থেকে। ©অলভ্য ঘোষ

144

3

শিবাংশু

চিত্ররেখা

ভালো লাগা বদলায় না, ভালো লাগার বৃত্তটা শুধু বেড়ে যায় বয়েসের সঙ্গে। চিত্রতারাদের ভালো লাগার সহজ যুক্তি নিজের মধ্যে খুঁজলেই পাওয়া যায়। সিনেমা নামের ক্র্যাফটটাই তো দুই মেরুর মধ্যে বাঁধা। ইল্যুশন আর ফ্যান্টাসি। যে পাত্র বা পাত্রীর ইল্যুশন তোমার ফ্যান্টাসির যতো কাছে তুমি ততো বেশি তার পাখা। এটা বুঝবার জন্য সুধীর কক্কড়কে লাগেনা। চিত্রতারারা মানুষের সদা পরিবর্তনশীল ফ্যান্টাসি আর বাজার ভাওয়ের সঙ্গে বদলে যান। 'সৃষ্টিশীলতা' নামক যে বালাইটি আমরা বাজারের বিপক্ষে সিনেমার সঙ্গে জুড়তে চাই, সেও যদি জনগণেশের ফ্যান্টাসির খুব বেশি দূরে চলে যায়, তবে ছবি নিশ্চিত প্রত্যাখ্যাত হবে। চিত্রতারাদের আয়নায় আমরা আমাদের না পাওয়া ফ্যান্টাসিগুলোকে খুঁজে পেতে চাই। 'চিত্রতারা' তো একটা কোনও একক মানুষ নয়, একটা সমষ্টির ধারণা তাঁরা। একজন অমিতাভ বচ্চন মানে একজন নির্দেশক, সম্পাদক, আলোকচিত্রী, সজ্জাকার, সংলাপলেখক, শব্দযন্ত্রী, সঙ্গীত পরিচালক, নেপথ্যগায়ক, আরও কতো সৃজনশীল মানুষের সফল আয়োজন। অমিতাভ তো শুধু মিছিলের মুখ। আমরাও তো জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে শুধু 'মুখে'র দিকে তাকিয়েই দিন কাটিয়ে যাই। আমাদের ন্যায়-অন্যায়, শাদা-কালো, রুচি-অরুচি সব স্থির করে দেয় সেই সব মুখ, যাদের জন্য হাজার চাঁদবণিক জলে জাহাজ নামায়। আমাদের সমাজশরীরে চিত্রতারাদের মুখই সবচে প্রত্যক্ষ। আমাদের মতো লোকজন, যারা সমাজের পায়ের কড়ি আঙুলের ফেলে দেওয়া নখের মতো মূল্যহীন, তারাও যখন আয়নায় সামনে দাঁড়ায়, মাথায় চিরুনি চালাতে চালাতে নিজের কাঁধের উপর দেখতে চায় অমিতাভের 'মুখ'। হরিপদ কেরানি তার কোটরগত চোখ, নিষ্প্রাণ মুখশ্রী, পলকা খাঁচার সীমানা পেরিয়ে যখন চাঁদের আলোয় প্রেয়সীর মুখের দিকে তাকায়, তখন তার অবচেতন মনে মাধুরী দীক্ষিতের মুখচ্ছবি কোথাও তো উঁকি দিয়ে যায়ই। 'ভালো লাগা' এভাবেই আসে, এভাবেই 'ভালো লাগা'র বৃত্তও বেড়ে যায় প্রতিদিন। এককালে যেমন মোহিত ছিলুম রেখার নামে। যেন হুসেনের লম্বা তুলি থেকে ক্যানভাসে আছড়ে পড়া এক নারী। হ্যাঁ, আরো কোটি মানুষের মতো ঐ মহিলা একসময় আমার ফ্যান্টাসির জগতকে গ্রাস করে রেখেছিলেন। অফিসে কাঁচের নীচে তিনি, মেসে সারা দেওয়ালজোড়া তাঁর অগণন প্রতিকৃতি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় চিত্রতারাদের নিয়ে কালনেমির লঙ্কাভাগ। যাঃ, তোর রেখাকে নিয়ে তুই ফোট। অতিষ্ঠ বন্ধুর শুভকামনা !! ভাবা যায় 'তোর' রেখা.....??!! খালি হাঁথ শাম আই হ্যায় খালি হাঁথ জায়েগি আজ ভি ন আয়া কো ই খালি লৌট জায়েগি .......................

161

5

মানব

এখনও তাই...

হ্যাঁ মানুষটি অঞ্জন দত্ত। গায়ক, অভিনেতা, আবার পরিচালকও বটে। হয়ত অনেকেই বলবেন গানে সুর নেই, কিংবা হয়ত বলবেন সব গানের একই রকম সুর, হয়ত বা কথার প্রাধান্য বেশি। সে যে যাই বলুন আমারই মত অনেকের জীবনে এই মানুষটির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ একটাই - জীবনের সাথে, বাস্তবের সাথে যোগাযোগ। স্কুলের গেটের বাইরে – আজও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে স্কুলজীবনে ফিরে যেতে? সেই যেখানে স্কুল বাসের হর্ণ উপেক্ষা করে অপেক্ষা করছেন আপনি, অথবা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন অন্য কেউ। এক মুহূর্তের চোখে দেখা আর তারপর ছুট্টে গিয়ে বাস ধরা আর বাস ড্রাইভারের বকুনি খাওয়া। তারপর সিটে বসে খাতাটা বের করা, যেখানে রেখে দেওয়া ওর স্পর্শমাখা ‘চ্যাপ্টা গোলাপ ফুল’। শুনেই দেখুন না গান খানা। কথা দিচ্ছি হতাশ হবেন না। ২৪৪১১৩৯ – হ্যাঁ নম্বরটা পুরনো। অন্তত কোলকাতার বুকে এই নম্বরে কল করলে রঙ নাম্বারই বলবে। তবুও এই ফোন নাম্বারটা দশজন বাঙালীর মধ্যে সাতজনেরই মুখস্থ। কারণ একটাই... বেলা। বেলা বোস। মৌলালীর মালা, আদরের রমা, রঞ্জনার মত চরিত্রদের আমাদের জীবনে অবাধ যাতায়াত। স্যাক্সোফোন হাতে স্যামসন, কিম্বা ধরুন কাঞ্চন জানার সেই মন কেমন করা গল্পটা – “বেড়াতে যদি তুমি যাও কোনদিন আমার ক্যালিংপঙ জেনে রেখো শংকর হোটেলের ভাড়া টুরিস্ট লজের থেকে কম রাত্রির নেমে এলে আসবে তোমার ঘরে চুল্লিটা জ্বালিয়ে দিতে আর কেউ নয় সে যে আমার ফেলে আসা নীলচে পাহাড়ি মেয়ে বলো না তাকে আমি দারোয়ান শুধু বলো করছি ভালোই রোজগার ঐ বস্তির ড্রাইভার চিগমির সাথে যেন বেঁধে না ফেলে সংসার আর কিছু টাকা আমি জমাতে পারলে যাবো যাবো ফিরে পাহাড়ি রাস্তার ধারের বস্তির আমার নিজের ঘরে আর যদি দেখ তার কপালে সিঁদুর বলো না কিছু তাকে আর শুধু এই সত্তর টাকা তুমি যদি পারো গুজে দিও হাতে তার ট্রেনের টিকিটের ভাড়াটা সে দিয়েছিলো কানের মাকড়ী বেঁচে ভালোবাসার সেই দাম তুমি দিয়ে দিও আমার কাঞ্চনকে...” আর বেশি সময় নিয়ে জন্মদিনটা পার করে দিতে চাইনা। তাই অঞ্জন দত্তকে জন্মদিনের শুভকামনা জানিয়ে আজকের মত শেষ করি। বাকী কথা তোলা রইল। না বলে যাচ্ছিনা।

143

3

ইরা চৌধুরী

এলিফ্যান্টা এডভেন্চার

এলিফেন্টা যাবো ঠিক হল।আগের দিন ভোরে আমার এক বান্ধবী এল কলকাতার থেকে।আমাদের সাথে ননস্টপ ঘুরবে বলে।তাকে ভোরবেলা রিসিভ করলাম দাদর স্টেশনে।সেদিন বিকেলে ইস্কন মন্দির আর পৃথ্বী থিয়েটর দেখার ইচ্ছে ছিল।বেড়িয়েও পড়লাম।কিছুদূর যেতেই বর্ষা ঘিরে ফেলল।কি আর করা কোনোরকমে মন্দির দর্শন করা গেল।কিন্তু পৃথ্বী থিয়েটারে পৌঁছে কিছুই নসীব হলনা।ঘুরে দেখা তো দিল্লী দূর অস্ত এক কাপ চায়ের সাথেও দেখা হলনা।বাড়ি ফিরে গরম গরম চায়ের সাথে আবার প্লানিং শুরু।এলিফেন্টা চল। সকাল দশটায় শান্তাক্রুজ থেকে লোকালে চার্চগেট।চার্চগেট থেকে ট্য়াক্সিতে গেট ওয়ে অব ইন্ডিয়া।জানা গেল সকাল নটার থেকে দুফুর আড়াইটের মধ্য়ে প্রতি আধঘন্টা অন্তর লঞ্চ ছাড়ে এলিফেন্টার উদ্দেশ্য়ে।দূরত্ব ছয় মাইল।চড়ে পরলাম।উঠেই হালত পস্ত(ভগবান তখন মুচকি হাসছে)।একি লঞ্চ ঢেউয়ের তালে তালে মার নাচানাচি চালাচ্ছে।পা রাখতেই হাত পাখির ডানার মতন খুলে যাচ্ছে।মাথা মাথার জায়গায় নেই মনে হল।বডি কন্ট্রোল করবে কে?ছবি তোলা আর যাবেনা।হায়রে!কিছুদূর যাওয়ার পর লঞ্চ দেখি ধাত্সথ।হবে নাইবা কেন! সামনে দেখি বিশাল বিশাল দেশিবিদেশি তেলবাহি জাহাজ অত জলের মাঝে স্টেচু।নো হেলদোল।কাছেই বম্বেহাই।নজর সব ওদিকেই।পাড়ে এসে ভীড়ল তরি(লঞ্চ)।খালাশির হাত ধরে পা চলালাম মাটির উপর।জমিতে পা রেখেই বুঝলাম পায়ের নিচে মাটি কতবড় আশ্বাস।তো যা বলছিলাম।দেখি সামনেই টয়ট্রেন।টয়ট্রেন চেপে একেবারে মন্দিরের পাদদেশে।তবে অনেক সিঁড়ি আছে।সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠা গেল।দম শেষ।মনে পড়ল যখন কলেজের জোগ্রাফির ট্য়ুরে এসেছিলাম এই ধাপ গুলি হাসাহাসি ধাক্কাধাক্কি করতে করতে পার করে কখন মন্দিরে ঢুকে গেছি টেরও পাইনি।আর এখন ! এই দিল রুক যা জরা।ফির চলনা অহিস্তা অহিস্তা।বুঢ়াপা আ গয়া হ্য়ায় তেরা। মন্দিরে ঢুকে মহেশমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল এতদিন ধরে এরম শান্ত ভাবে আছে কি করে!মনে হয় যেন আমাদের সাথে সাথেই ও এসে দাঁড়িয়েছে।সবাই বলে এই কেভ থেকে কিছু দূরে পুলকেশিন দ্বিতীয় হর্ষবর্ধনকে হারিয়েছিল।এ ভাবে উত্তর ভারতের প্রভাব থেকে দক্ষিন ভারত রক্ষা পায়।কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ।স্থাপত্য়কলা আর মূর্তিকলায় উত্তরের প্রভাব।ইলোরার সাথে আছে সাদৃশ্য়।কলায় আছে গুপ্ত যুগের প্রভাব।মহেশমূর্তিতে শিব তিন রুপে হাজির।creator,preventer &destroyer. ইলোরার মতন এখানেও দেখলাম শিবের বিয়ে পাথরে খোদাই।অর্ধনারিশ্বর।গঙ্গার মর্ত্য়ে আগমন।বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা নিচে নামতে শুরু করলাম।কারণ লঞ্চের নির্দেশ সাড়ে চারটের মধ্য়ে রওণা দিতে হবে।এত তাড়া কেন।জিজ্ঞেস করাতে জানা গেল হাওয়া খারাপ হ্য়ায়।সে আবার কি! এতক্ষণ তো বারিশ হী খারাপ ছিল।আমরা একটু দেরি করে ফেলেছিলাম।সাড়ে চারটের জায়গায় পৌনে পাঁচটায়।লঞ্চ ছাড়ল পাঁচটায়।দিব্বি মুম্বইয়ের দিকে এগোতে লাগল।ক্রমশ গেট ওয়ে অব ইন্ডিয়া আর তাজ হোটেল হয়ে উঠল দৃশ্য়মান।একটা কথা বলি শুরু থেকেই কি যাওয়ার সময় কি আসার সময় সমুদ্র এক আধ আঁজলা জল লঞ্চের যাত্রিদের মুখে ছুঁড়ে মারছিল।কি জানি কি ধরনের রসিকতা!এমন কোনো যাত্রি নেই যে নোনা জলের স্বাদ পায়নি। এসব জল ছোঁড়াছুড়ি করতে করতে হঠাৎ সে ক্ষেপে উঠল।লঞ্চ তখন মোচার খোলা।একবার বাঁদিক জলের কাছে চলে যায় তো একবার ডান দিক।বাঁদিকের সব যাত্রি কিবা নর কিবা নারি সব বাঁদিকে।বাঁদিক গেল হেলে।এক মহিলা দেখি তার স্বামী আর পুত্র কে জড়িয়ে কাঁদছে।ছেলে মার কান্না দেখে কান্না জুড়ে দিল।যাত্রির মধ্য়ে কেউ বলে উঠল জয় শিব শংকর।আরেকজন জবাবে বলল এত দেরিতে মনে পড়ল! সামনের লঞ্চের অবস্থা দেখে এবারে একটু চিন্তা হল।সে পাড়ের কাছে যেতে চাইছে কিন্তু ঢেউ তাকে আবার এলিফেন্টায় ফিরে যেতে বলছে।আমাদের অবস্থাও হল তথৈবচ।ক্য়াপটেন উপায় না দেখে ইন্জিন বন্ধ করে দিল ।পাবলিক ভয়ে পেয়ে গেল।ভাবল ডিজেল শেষ।এবার মাঝ দরিয়ায় ডুবে মরতে হবে।তা কোনো মতে খালাশিরা আর ক্য়াপটেন মিলে লঞ্চকে বাগে এনে কিনারায় আনল। আবার খালাশির হাত ধরে ধরে দুলতে দুলতে পাড়ে উঠলাম। এবারে আমাদের তিন জনের কথা বলি।সারা লঞ্চে আমরাই স্থিতপ্রজ্ঞ।আমি সবার আগে লঞ্চের মুখের কাছে বসেছিলাম।ভালো ছবি তুলব বলে।আমি যতবার ভাইঝি কল্পনা আর বন্ধু সীমার দিকে তাকাই পিছন ফিরে দেখি ওরা নিশ্চিন্ত মনে বসে আছে।ভাবলেশহীন।আমি ছবি তোলাতে এত ব্য়াস্ত ভয় পাওয়ার সময় পেলাম না।কেবল একবার মাথায় এল মরনা হী হ্য়ায় তো থোড়ি সী জিন্দগী অওর জী লে। ইতিমধ্যে দেখি মাথার উপর হেলিকেপ্টার ।আর পারে সার দিয়ে লোক দাঁড়িয়।সবার চোখে মুখে কি হয় কি হয় ভাব।দুই স্টীমার তখন আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের সাথে।যাক!শেষরক্ষা হল।টলায়মান আমরা ডাঙ্গায় উঠলাম।ভাইঝি বললে এই বর্ষায় আমি তোমাদের নিয়ে এলিফেন্টায় আসি!তাও আবার আজ হাই টাইড।কিছু হলে সবাইকে কি জবাবদিহি করতাম!বললাম তুমি থাকলে ত সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে!সবার আয়ু আছে বলতে হবে!

159

8

মানব

সহ-জ’

বেশ সকাল সকাল ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আজ। পাড়ায় কেমন যেন হইচইএর শব্দ। দূর থেকে শব্দটা আসছে, তাই একবার কমছে আবার বেড়ে উঠছে হাওয়ার সাথে সাথে। কি নেই সে শব্দে মেশানো! মহিলাদের কান্নার শব্দ, পুরুষের বলিষ্ট গালাগালি থেকে শুরু করে ছেলেছোকরাদের হইচই সব পাওয়া যাবে সেখানে। ঘুম যখন ভেঙ্গেছে তখন তো একবার দেখতে হচ্ছে ব্যাপারটা কি। বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছে তাই দরজাটা খুলে বেরিয়ে পড়লাম। গোয়ালারা ছানা নিয়ে রওনা দিয়েছে ভোরের ট্রেন ধরার উদ্দেশ্যে, ছাত্রছাত্রীরা চলেছে পড়তে। দোকানদাররা হয়ত অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও আধঘন্টা শুয়ে নিচ্ছে, এত সকালে আর কেইবা জিনিস কিনতে আসবে। পাশের পাড়ার নান্টুকাকাকে দেখলাম স্টেশনের দিক থেকে সাইকেল চালিয়ে আসতে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও কাকা কি হয়েছে? এত হইহই চলছে কেন?’ বেশ রেগে আছে বলে মনে হল কাকা। সেইভাবেই সাইকেল থেকে একটা পা নামিয়ে জবাব দিল, “আর বলিস না, ওই সুকান্ত কে চিনিস তো- কুন্ডুদের? ওর হাত পুড়েছিল, তা ওরা অধীর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। পাশ করা ডাক্তার তো, ভালই দেখবে বলে মনে হয়, শুধু ফি টা একটু বেশী। তা কি করা যাবে... কিন্তু ডাক্তার বাবাজীবন কি করেছে জানিস?” বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি? ফি ছাড়াই দেখে দিয়েছে?” “এই হয়েছে তোদের... ছেলেছোকরাদের স্বভাব। কথার মাঝখানে কথা বলা স্বভাবটা গেল না।” কান থেকে বিড়ি টা বের করে সেই কানেই লুকিয়ে রাখা একটা দেশলাই কাঠি বের করল নান্টুকাকা। রাস্তার পাশের ইলেক্ট্রিক পোল-এ ঘষে কিকরে যেন আগুন জ্বালিয়ে ফেলল কাঠিটাতে, তারপর বিড়ির মোটা দিকটা মুখে নিয়ে ফু দিয়ে আবার সোজা করে মুখে নিল। অবশেষে বিড়িতে আগুন দিল। একবার মন ভরে টেনে নিয়ে হাল্কা আমেজে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “ওর হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিল! তা পোড়া হাতে ব্যান্ডেজ করলে পুঁজ তো হবেই, সে হাত একেবারে ফুলে ফেঁপে একাকার। তাই সকাল সকাল চিৎকার শুনে আমি ওদের বাড়ি যাই।” “আরে তুমি ওদের বাড়ির চিৎকার কিকরে শুনতে পেলে? থাক’ তো এ পাড়ায়... ওরা তো ওপাড়ায়...” মাথা চুলকে নিতান্ত ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেই বুঝলাম কি ভুলখানা করে ফেলেছি। ঘটনাটা মোটামুটি ঝাপসা ভাবে ফুটে উঠছে চোখের সামনে। সুকান্তদের বাড়ির থেকে একটা বাড়ি পরেই বাংলার ঠেক, সেই ঠেকে সারারাত কাটিয়ে নান্টুকাকার ঘুম ভাঙ্গে ওদের বাড়ির চিৎকারে। তারপর তিনি পরোপকারের জন্য পাড়াসুদ্ধ লোক জড়ো করে ডাক্তারের বাড়ি যান হামলা করতে। “বেশি পাকা! সকাল সকাল যতসব ফাজিলের সামনে পড়তে হল। সারাটা দিন আজ খারাপ কাটবে গো।” এই বলে বড়ই বিমর্ষ মনে নান্টুকাকা রওনা দিলেন বাড়ির পথে। আমিও আমার সাইকেলটা বের করে নিয়ে রওনা দিলাম ডাক্তারের বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রচণ্ড ভীড় আর গালিগালাজের দিকে এগিয়ে গেলাম ধীরে ধীরে। সে দৃশ্য দেখে তো চক্ষু চরকগাছ। ডাক্তারবাবুর বাড়ির সামনে বহু মানুষের জমায়েত। আর সবার সামনে বেচারা সুকান্তকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কোথায় তার হাতের ব্যান্ডেজ? তার যত না ক্ষতি হয়েছে ডাক্তারের ব্যান্ডেজে, তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে ব্যান্ডেজ খুলে দিয়ে, বোধহয় এই মহান কাজটি ওর বাড়ির লোকেদেরই। গলগল করে রস গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে কিন্তু কোন ওষুধ তো দূরের কথা, কিভাবে আরও বেশি ক্ষত দেখানো যায়, তারই চেষ্টা করা হচ্ছে। যেন তাদের আসল উদ্দেশ্যটা হল ডাক্তারকে অপদস্ত করা। ছেলেটা এদিকে মরল কি বাঁচল, সেদিকে কারও খেয়ালই নেই। এমনিতে আমি বড্ড ভীতু আর গোবেচারা গোছের মানুষ। এরা ডাক্তারকে গালাগালি করছে, গেটের দরজা উপড়ে ফেলছে, এসব বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই, কিন্তু সুকান্তের এই দুরবস্থা আমার সহ্য হল না। বাড়ির লোকেদের অবহেলায় অনেকটা এরকমভাবেই একবার আমার এক বন্ধুকে হারিয়েছি একেবারে বিনা চিকিৎসায়। কিন্তু এবারে আর নয়। সেই রাতটার কথা আজও ভুলতে পারিনি... কোনদিনও পারবনা। পাশের বাড়ি থেকে মাঝরাত্রে শুধুমাত্র একটা গোঙ্গানির আওয়াজ পেয়েছিলাম... ব্যাস, না আর কিচ্ছুই নেই সেই রাত্রের স্মৃতিতে। আর দেখেছিলাম সকালে নীল হয়ে যাওয়া গাবলুর মরামুখটা। বিভিন্ন জনের মুখ থেকে বিভিন্ন কথা শুনে যেটুকু মিল পেয়েছিলাম তা এইরকম – মাঝরাত্রে হঠাৎ গাবলু বেশ জোরে চিৎকার করে ওঠে। স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে ভেবে ওর মা জেগেও ঘুমিয়ে পরে। কিন্তু ছেলের ছটফটানি বেড়েই চলে, বুকেও নাকি প্রচণ্ড ব্যাথা শুরু হয়। তখন অনুমান করে নেওয়া হয় নিশ্চয়ই অম্বল জাতীয় কিছু... তাই তেল জল মালিশ করে দিয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয় তাকে। কে জানত, এই ঘুম পাড়ানোটাই ছিল তাকে অন্তিম শয্যায় শুইয়ে দেওয়া। কে জানত ছেলেটা সাপের কামড়ে চিৎকার করে উঠেছিল... শুধু সেই ভূলের সাক্ষী হয়ে পড়েছিল তার নীল দেহখানা। সেই সকালটাও ছিল এমনি একটা মনোমুগ্ধকর সকাল... শুধু ওই দেহটা ছাড়া। আর আজকের সকালটাও... শুধু ওই হাতটা... ওই পুড়ে যাওয়া রস গড়াতে থাকা হাতটা ছাড়া। এই হাত যাতে দেহ হয়ে উঠতে না পারে তার জন্য তো আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। ভীড়ের মধ্যে মোড়ল গোছের একজন মানুষ ছিলেন কুণালদা। ওনাকে পাশে ডেকে এনে সমস্ত ঘটনাটা বোঝালাম। পাশের গ্রামের একজন ভালো ডাক্তার আছেন রাজীববাবু। ওনার কাছেই নিয়ে যাওয়া ঠিক হল। এদিকে অধীর ডাক্তারের এখনও নাকি ঘুম ভাঙেনি, তাই ওনার বাবা মা এলেন ব্যাপারটা মেকআপ দিতে। আমরা রওনা দিলাম পাশের গ্রামের উদ্দেশ্যে। পিছনে পড়ে রইল যত আবেগ মাখা বক্রোক্তি, ঘৃণা, রাজনীতি। রাজীব ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছালাম। আমি সাইকেলে, আর বাকীরা রিক্সায় চড়ে। এত সকালেও এত মানুষের লাইন হবে ভাবতে পারিনি। “আরে এ তো মোটে কুড়ি টাকা, জানলে তো এখানেই নিয়ে আসতাম। শুধু শুধু ওখানে একশটা টাকা নিয়ে নিল গালে চড় মেরে।” সুকান্তর মা উত্তেজিত হয়ে বলল। এত টেনশনের মধ্যেও ইচ্ছা হচ্ছিল ওনার চরণে একখানি প্রণাম করতে। ছেলের সমস্যাটা নিয়ে না ভেবে, কিম্বা ডাক্তার কেমন চিকিৎসা করেন সেসব না ভেবে উনি দেখছেন কুড়ি টাকা... অপূর্ব... আমাদের লাইন এল তাড়াতাড়িই একটু ইমার্জেন্সি হিসাবে। ভিতরে ঢুকলাম, একখানি পুরনো দিনের কাঠের চেয়ারে বসে ডাক্তারবাবু দেখে চলেছেন রোগী। কিছু ওষুধ দিলেন আর একমাসের সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যাপারটাও ভাল করে বুঝিয়ে দিলেন। আমি জানি যে এক সপ্তাহের বেশি এ ছেলে বিশ্রাম পাবেনা, তাই একটু তাড়াতাড়ি ভাল হবার কথাটা বলতেই ডাক্তারবাবু আর একটা ভাল ওষুধ লিখে দিলেন। তবে বলে দিলেন, দামটা একটু বেশি। হ্যাঁ সুকান্তর বাবা এতক্ষণ সব চুপচাপ শুনছিলেন। তিনি আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলেন না। নানা, ও একমাসেরই রেস্ট পাবে। আগের ওষুধগুলোই থাক। বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে সুকান্তর মা জিজ্ঞেস করলেন, “আরে এ কি পাশকরা ডাক্তার নয় নাকি? লুঙ্গী পরা, ওইরকম একটা মাটির ঘর, তারপর আবার কুড়িটাকা নেয় মাত্র...” আমি একবার নেমপ্লেটটার দিকে তাকালাম। তার নামের নীচে লেখা এম. বি. বি. এস.(গোল্ড মেডেলিস্ট)। আরও অনেক কিছু অবশ্য লেখা ছিল, সবটা বুঝিনি, যেটুকু বুঝেছি তাই যথেষ্ট। সুকান্তর হাত দু-সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যায়। অধীর ডাক্তার এরপর থেকে গ্রামে আর রোগী দেখেন না, ভোরবেলায় বেরিয়ে যান আবার সন্ধ্যের পর বাড়ি ফেরেন। তিনি সম্ভত কোন সরকারী হাসপাতালে চাকরী করেন। শুধুমাত্র সস্তায় চিকিৎসার জন্যই গরীব লোকেরা পাঁচ মাইল পথ পেরিয়ে রাজীব ডাক্তারের কাছে যান। আর একটু ধনী যারা তারা এখন চিকিৎসা করান উজ্জ্বল ডাক্তারের কাছে যার নেমপ্লেট এ বড় বড় হরফে লেখা “আর. এম. পি.”। ফি মাত্র পঞ্চাশ টাকা।

112

1

শিবাংশু

লাল : দীঘি, বাজার ও সলাম

দুর্জনে বলেছিলো এই এনারাইয়ের ভারত-আগমন নিয়ে আবাপে সম্পাদকীয় লেখা হবে। হয়তো হয়েছে। আমার চোখে পড়েনি। তাঁর শুভাগমন ঘটলে সাধারনত কিছু দাওত-দস্তরখান প্রতিবারই। দু'চারজন পুরোনো মজলিশি পাপী তো একত্র হয়ে রাজাউজির না হলেও, মুখেন কেরানি-মজুর মারা তো হয়েই থাকে। তার ব্যত্যয় হলোনা এবারও। -------------------- এবারের মেহরবান বেপরওয়াহ ইয়ংম্যান মনোজদা। নিনা পাঁজিপুঁথি ঘেঁটে ভোরবেলা একটা সময় দিয়েছিলো। কারণ তার আইটিনেরারি পাল্লা দিতে পারে শুধু পল্টুদার সঙ্গে। আমরা পাতি সড়কছাপ জনতা তার মর্ম আর কী বুঝবো? যাকগে, ভোর আটটায় শয্যাত্যাগ করে বেরিয়ে পড়ি ন'টার মধ্যে। কারণ দশসকালের মধ্যে মদীয় গৃহ হইতে লালদীঘি পৌঁছোনো চ্যালেঞ্জ তো বটেই। মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে হাঁটা। তারপর পাতালরেল এবং আবার সকালবেলার অফিসপাড়া। পিচবাঁধানো রাস্তা আর পাথরবাঁধানো ফুটপাথ। লাটসাহেবের শাদা ধবধবে দেউড়ি পেরিয়ে ট্রামবাসের ছুটোছুটি তখনও যেন ঠিক দুরস্ত হয়নি। বহুদিন পরে ঐ রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হলো। ফুটপাথে আসর সাজিয়ে বসা দোকানিরা একটু একটু আড়মোড়া ভাঙছে। দেওয়ালের সঙ্গে দড়ি টাঙিয়ে ঝোলানো হয়ে গেছে কয়েক হাজার কালোকোট। মফস্সলের উকিল বাবুবিবিরা দরদাম করছেন ইতিউতি। কিছু নবীন বেচুবাবুরাও রয়েছেন সেখানে। এদেশে কোটপাৎলুনের মেয়াদ তো বছরে এক-আধ সপ্তাহ। থলিঝুলি থেকে জুতোমোজার পসার পেরোতে পেরোতে টেলিফোন ভবনের দিকে এগো'ই। সবাই তো 'লাইমলাইটে'ই থাকতে চায়। স্বীকার করুক বা না করুক। লালবাজারের মোড়ে এসে নিনাকে ফোন লাগাই। পৌঁছে গেছো? সে তো আকাশ থেকে পড়ে। অ্যাত্তো তাড়াতাড়ি? মানে? দশটা বলা হয়েছিলো তো? আরে নাহ, মনোজদা তো বললেন বারোটার আগে দোকানই খুলবে না। বোঝো? লাইমলাইট তো দশটাতেই খোলে রে বাবা। তাআই? আসছি, আসছি। আছো কোথায়? বাড়িতেই তো। সেরেছে। কোথায় মুদিয়ালি আর কোথায় ডালহৌসি? --------------------------- যাকগে। নিজেই গিয়ে ইঁটফিঁট পাতি না হয়। গুটিগুটি এগোতে গিয়ে দেখি সরাইখানার সামনে তিনজন জনতা অলরেডি গুলতানি করছেন। মনোজদা পুজোকমিটির সেক্রেটারির মতো অত্যন্ত অ্যাকটিভ হয়ে লাইন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন। মানে মনে হলো সে রকম। খুউব স্মার্ট বডি ল্যাঙ্গোয়েজ। আর মাথায় হাকিমউদ্দৌলাহ মেহসুদের টুপি। সে খুদা কা প্যারা হবার আগে উইল করে দিয়ে গেছে। কলকাতার হিসেবে সেদিন সকালে ঠাণ্ডাই ছিলো বলা যায়। সাহেবশঙ্খকে দেখে তা লাগছিলো'ও বটে। কিন্তু তৃতীয়জন যেন বসন্তসন্ধ্যায় গড়ের মাঠে মলয়ানিল উপভোগ করতে এসেছেন। বেশ বিস্ময় প্রকাশ করলেন তিনি। কলকাতার লোকজন এতো গরমজামা কেন যে পরে এই আবহাওয়ায়? হয়তো খরচা করে কিনেছে, তাই। বোঝা যায়, তিনি রাজধানীর চার ডিগ্রির গরিমা এখানেও বহন করে নিয়ে এনেছেন। ------------------------- বেশ কিছুদিন ধরেই যে কোনও আলোচনা ডিমনির দিকেই বাঁধা থাকে। এনারাইদের যে কতো ভোগাচ্ছে অনামুখো ব্যাংকগুলো তা নিয়ে সক্কাল সক্কাল সবাই সরব। ঊনচল্লিশ বছরের ব্যাংকার তো একটু ব্যথা পাবেই। তবে তাকে কখনও 'বঙ্গ আমার'এর দেশে ব্যাংক চালাতে হয়নি। বরং গ্রাহকের রূপে সে অনেক ঠোকাঠুকি করেছে এদেশের চিরবিপ্লবী ব্যাংকওয়ালাদের সঙ্গে। এমন কি দিল্লির ম্যাডামও যখন বলেন সেখানে ব্যাংকের লোকজন এখানের থেকে অনেক ভদ্রসভ্য, একটু ব্যথা লাগে বইকি। এসব জরুরি আলোচনা চলার ফাঁকে দেখা গেলো অজিতবাবুর গাড়ি দূরে দাঁড়িয়ে আর নিনা টেলিফোন ভবনের সিঁড়িতে কলম্বাসের দূরবীন হাতে। দের আই, দুরুস্ত আই। অমিতদার সঙ্গে এক বছর পরে দেখা। রাস্তার উপরেই কাবুলিওয়ালাদের মডেলে কোলাকুলি হলো জবরদস্ত। ততোক্ষণে 'লাইমলাইটে'র প্রস্তুতিও সারা। ইন্টিরিয়রটাতে বেশ একটা সাহেবি পুরোনো আবহ রয়েছে। টান সোফা পাতা। আয়নাঘেরা দেওয়াল। একটা পুরোনো ইংরিজি উষ্ণতা রয়েছে সেখানে। পছন্দ হয়ে গেলো বেশ। জানা গেলো মনোজদা নাকি সেখানের প্রাচীন দেবতা খদ্দের। আমাদের চিরাচরিত সাউথ সিটি'র তুলনায় স্বর্গ বলা যায়। স্বচ্ছন্দ, আরামদায়ক, নিভৃত। অতো সকালে আমরাই ছিলুম শুধু। মনার্ক অফ অল উই সার্ভে। অমন পরিবেশে আড্ডা জমে উঠতে সময় লাগেনা। এই কাগজ, সেই কাগজ, এই লেখা, সেই লেখা। এই লোক, সেই লোক। সঙ্গতভাবেই এটা একটু 'কন্ডিফেনসিয়াল'। অবাক হবেন না। দুজন ফেভারিট মজলিশি হিমু আর কৌস'কে নিয়ে কথা হলো। দুজনেরই পিলে চমকে দেবার অপার ক্ষমতা নিয়ে সবাই একমত। নতুন লোকেরা তো চমকাবেনই। পুরোনোরাও মাঝেমাঝে পিড়িং (কৌসের ট্রেডমার্ক) খেয়ে যায়। তবে ছেলেদুটো এ-ওয়ান। সেতো মুখেন মারিতং বদুচাচাও তাই। যাঁরা তাকে দেখেছেন তাঁরা তার ভদ্রতা নিয়ে পাঁচমুখ। যা কিছু পিড়িংবাজি, সব কীবোর্ডে। গায়েব লোকজনদের নিয়ে একটু পিএনপিসি তো হতেই হবে। সবার আগে তো বাবিদা। সেই কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন ভদ্রলোক। কিন্তু দর্শন নেই। ক্যামেরা হাতে কার পিছু পিছু ভিক্টোরিয়া না প্রিন্সেপ ঘাট পৌঁছে গেছেন সেই নিয়ে বেশ নিবিড় আলোচনা চললো। তার মধ্যেই তিনি বিড়িতে শেষ টানটা দিয়ে প্রবেশ করলেন ঘনাদার ইস্টাইলে। ইতোমধ্যে মনোজদার আতিথ্যের ফিতে কাটা হয়ে গেছে। স্যুপ আর ফিশ ফিঙ্গার দিয়ে গৌরচন্দ্রিকা। বেশ সাহেবি মেজাজ। আড্ডার বিষয় তো আকাশে বাতাসে। স্রেফ ধরে আসরে নামিয়ে দিতে হয়। গাড়ি দৌড়োতে থাকে। এটাই মজলিশি কালচার। কোথায় কোথায় সারা পৃথিবীতে লোকজন ছড়িয়ে রয়েছে। কোন অদৃশ্য টানে বরফের মতো জমে যায় তাদের হৃদ্য ভালোবাসা। অনেকে তো দেখেছি বাড়ির লোকেদের থেকে মজলিশি বন্ধুদের সঙ্গে বেশি বিনিময় করেন সারাদিনে। কিছু তো পা'ন তাঁরা নিশ্চয়। ব্যাপারটা একেবারেই ভার্চুয়াল থাকেনা। অজান্তে কেমন একটা টান তৈরি হয়ে যায়। বিপ্রতীপ স্বভাবের মানুষেরা নিজেদের ইতিবাচক প্রবণতাগুলি নিয়ে আন্তরিকতায় মুখর হয়ে ওঠেন কিছুক্ষণ। জিন্দগি মেঁ অওর ক্যা রকখা হ্যাঁয়? ------------------------------ এর মধ্যে পৌঁছে যান সুদীপদা। প্রবীণ এই মানুষটিকে রোগটোগ দমাতে পারেনা। সব সময় পৌঁছে যান আড্ডায়, যেখানেই হোক না কেন সেটা? নেই নেই করেও আমরা তখন সাতজন। কিকি'কে আমরা মিস করছিলুম। ফোনেই কথা হলো আমার সঙ্গে। উই আর সেভন। মুখ আর হাত একসঙ্গে ব্যস্ত। মনোজদা জিন্দাবাদ। মাঝখানে নিনা'কে উঠে যেতে হলো। রাজার বাড়ি নেমন্তো ছিলো তার। আমরা আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে গেলুম। রাস্তার মোড়ের ঝুপড়িতে চা না খেলে নাকি বাঙালির আড্ডা পুরো হয়না। সেটাও হলো বাস আড্ডার ধারে একটা মারাত্মক খানাখন্দঘেরা চায়ের ঠেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তার পর? অবশ্যই পর নেই। কেউ মিনি, কেউ ট্যাক্সি কেউ বা মেট্রো। আসছে বছর আবার? নিশ্চয় আবার। আমি আর এ পথ মাড়াবো না, এই আমার শেষ লেখা, যাবার আগে শেষ কথাটি যাই বলে, ইত্যাদি পার্টিং মনোলগ ছাপিয়ে জেগে থাকে মজলিশি স্পিরিট। স্পিরিট মানে একাধারে মদ ও ভূত। এ দুটো নেশা এড়িয়ে কে আর থাকতে পারে? তা'কে লাল সলাম। ------------------ কেউ কেউ বলছেন লোকে হাসেনা কেন? তাঁদের জন্য ক'টা ছবিও থাক...

139

6

অলভ্য ঘোষ

হয়তো আর একটা যুদ্ধ ধ্বংসই মানুষের শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটিয়ে আবার পিছিয়ে নিয়ে-যাবে আদিম রাষ্ট্রহীন সাম্যবাদী সমাজে

মানুষ বিভ্রান্ত ; শুধু এদেশে নয় সারা পৃথিবীতে। পশ্চিম ইউরোপ,উত্তর আমেরিকা,জাপান,অস্ট্রেলিয়া(কালোরা বাদে)পৃথিবীর বিভিন্ন বিত্তশালী অঞ্চলে সাধারণ মানুষের গড় আয় পনেরো\বিশ হাজার ডলার হলেও তারা সর্বহারা মানুষের দলেই রয়েগেছে । শ্রম ছাড়া কিছুইনেই বেচার মত । বাড়ি,গাড়ি,ফ্রিজ,ডিস্ ওয়াশার,টিভি,কম্পিউটার বিভিন্ন কোম্পানি থেকে কিস্তিতে কেনা বাবদ হাজারটা ঋণ থাকে মৃত্যু পর্যন্ত শোধ হয়না । ধনতন্ত্রী দেশগুলিতে মানুষের জীবনের গুন (কোয়ালিটি অফ লাইফ )বাড়েনি,বরং কমে গেছে । অনেক থেকেও তারা সুখী নয় । অসাম্যের দরুন সে সব দেশে সামাজিক সুস্থতা নেই; আত্মহনন, নেশাগ্রস্ততা, খুনখারাপি, বিবাহবিচ্ছেদ, ধর্ষণ, বেশ্যাবৃত্তি, গুণ্ডামি, ডাকাতি, রাহাজানি,চুরি,পাগলামি বেড়েই চলেছে । তাই তথাকথিত উন্নত দেশগুলির মানুষ চরম অসুখী ও মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত । তৃতীয়বিশ্বর মানুষের উভয় সংকট আর্থিক ও মানসিক দরিদ্রতা । মুষ্টিমেয় দেশি ও বিদেশি শোষকরা নানা শৃঙ্খলে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে । সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদ ,মাফিয়া চক্র,উগ্রপন্থা ,সামন্ততান্ত্রিক স্বৈরাচারী ক্ষমতা মানুষকে কেবল দাশ বানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ক্রমশ পণ্য সভ্যতার দিকে ঠেলেদিয়ে তাকে যন্ত্রমানবে পরিণত করেছে । বিপন্ন বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে । আত্মার সাথে ,বিবেকের সাথে শরীরের বিচ্ছিন্নতাবাদ নিজের মধ্যে নিজেকে টুকরো করতে করতে চেতনাকে স্থূল করে তুলেছে । সবই আজ ব্যবসার অংকে বিচার হয় । আজকের এই পণ্য বাস্তবতায় মানুষ কেবল ভোটার ;একটা পরিসংখ্যান । নিজেদের প্রকৃত অস্তিত্ব ভুলে লাল-নীল-সাদা-কাল-সবুজ-বেগুনিতে আপাত সম্মোহিত। উদার অর্থনীতির খোলা দরজা দিয়ে ডেংডেংকরে ঢুকে-পড়া অ্যামেরিকান কোম্পানিগুলো আসলে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানিরই রূপান্তর । ইংরেজ ও জমিদারেরা সামনের দরজা-দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রস্থান করলেও সাম্রাজ্যবাদী নয়া উপনিবেশিকতাবাদের দোসরেরা পিছনের ভেজান দরজা-দিয়ে ঢুকে পড়েছে চুপিসারে । সর্বত্রই বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের ছড়াছড়ি সাধারণের ধন প্রাণ যায় যায় অবস্থা । স্বাধীনতা আজো অধরা সাধারণের । সংরক্ষণ ,আরক্ষণ সমর্থন করবে নাকি বিরোধিতা করবে ? ব্যক্তিগত শরিয়তি আইন রক্ষা-করবে নাকি সকলের জন্য অভিন্ন বিধির বলবত হোক চাইবে ? ধর্মনিরপেক্ষতা (secularism) নাকি ছদ্মবেশী হিন্দুত্ব-বাদ ? আর এস এস নাকি এস এফ আই ? সব গুলিয়ে গ । মুক্ত বাজারে জাতীয়তাবাদের সারাৎসার জীবের জৈবিক প্রক্রিয়ায় নির্মিত মল বা বিষ্ঠার মতো পরিত্যাজ্য । সুবিধাবাদীর রাজনৈতিক বাতাবরণে কখনোই জন-দরদী গণতান্ত্রিক মতাদর্শের জন্ম হয়না । কারণ জনগণের চেতনার গলাটিপে ধরে আখের সিদ্ধি এধরনের রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য যা সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে । আবহমান কাল থেকেই শোষিত নিপীড়িত মানুষ জাতিধর্ম ভৌগলিক স্থানাঙ্ক নির্বিশেষে এই ভূধরায় একি আকাশের তলায় অবস্থান করছে । নৈতিক ,অর্থনৈতিক ,সামাজিক,রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে অনিশ্চিত জীবনে রোজ মরছে যারা তাদের সবকিছুকে গোল পাকিয়েদিয়ে তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে পৃথিবী ,দেশের মধ্যে দেশ ,গোষ্ঠীর মধ্যে গোষ্ঠী,ধর্মের মধ্যে ধর্ম ,বর্মের মধ্যে বর্ম ,ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তি । আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে দাস সমাজে ,দাস থেকে সামন্ত সমাজে,সামন্ত থেকে ধনতন্ত্রী সমাজে ধনতন্ত্রী পুঁজিবাদী সমাজ থেকে পণ্য সমাজে এবং পণ্য সমাজ থেকে দ্রুত যন্ত্র সমাজে ঢুকে পরেছি যেখানে মানুষের হাত পা মস্তিষ্ক সবি আছে তবে নিয়ন্ত্রিত রিমোট কন্ট্রোলে । হয়তো আর একটা যুদ্ধ ধ্বংসই মানুষের শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটিয়ে আবার পিছিয়ে নিয়ে-যাবে আদিম রাষ্ট্রহীন সাম্যবাদী সমাজে । কত কোটিবার যে নগর ধ্বংস হয়েছে । ইতিহাসও সঠিকভাবে জানেনা । যাই হোক এই সংকীর্ণ শ্রেণিসংঘাতের আগোল ছিঁড়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ;গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন করে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষে Albert Camus এর মতো বলতে হবে "Don't Walk behind me ; I may not lead . Don't walk in front of me ; I may not follow ; just walk beside me and be my friend . " বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন করতে হবে তাদের নিজেদের ।

125

3

মনোজ ভট্টাচার্য

আর এক সিনেমাওয়ালা !

আর এক সিনেমাওয়ালা ! এখনও দঙ্গল দেখা হয় নি ! সে কী ! – একটা হীনমন্যতায় ভুগছিলাম ! হঠাৎ সকালে উঠেই ঠিক হল – আজই যেতে হবে ! মিত্রায় নুন শোতে হচ্ছে ! - বিধান সরনিতে আমাদের আজকাল যাওয়া হয় না । তাই আরও দুটো কাজ সারতে পারলে ভাল ! – কিন্তু এ পাড়ায় মুস্কিল হচ্ছে – বারোটা না বাজলে সকাল হয় না ! সব দোকানপাট বন্ধ থাকে ! তাই অন্য কাজ আর হল না । অগত্যা মিত্রা সিনেমা হলে এক ঘণ্টা আগে পৌঁছে দাঁড়িয়ে থাকি ! টিকিট কাউন্টারের লোক ছাড়া আর কাউকে দেখা গেল না । যখন সিঁড়িতে বসবো কিনা চিন্তা করছি – ঠিক সেই সময় – সিনেমার টিকিট কাটা আছে ? তাকিয়ে দেখি এক সুদর্শন ধুতি পাঞ্জাবী পড়া – আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ! আমরা বলি – টিকিট আছে ! উনি গেট কিপারকে বলে গেট খুলিয়ে বেঞ্চিতে বসতে বললেন ! - এখন এখানেই বসুন ! - হলে এখন ঝাঁট দেওয়া হচ্ছে – তা নয়ত ভেতরে বসতে বলতাম – বলে চলে গেলেন ! ভদ্রলোকের আন্তরিক কিছু কথায় আমাদের বেশ ভাল লাগলো ! এখনও কি কেউ অপরিচিত লোকের সঙ্গে এত আন্তরিকভাবে খোলা মেলা কথা বলে ! নিজেরাই বলাবলি করছি – আমাদের পরিচিত কিনা ! এমন তো হতে পারে – পরিচিত কিন্তু আমরা চিনতে পারছি না ! সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে ! শো আরম্ভ হবার ঠিক আগেই তিনিই এসে – আমাদের দুটো বেশ সুবিধেজনক সীটে বসিয়ে দিলেন ! – আমাদের সঙ্গে কিছু অন্তরঙ্গ রসিকতাও করলেন ! - আমাদের কিন্তু বেশ অস্বস্তি হতে লাগলো ! এত লোকের সামনে আমাদের নিয়ে আলাপ করছেন ! – আমরা আবার সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে যেতে হবে না বলে নিচে কমদামী টিকিট কাটি । সিনেমা আরম্ভ হল ! – এবং আড়াইটা নাগাদ শেষও হল ! - লেকিন পিকচার তো আভি ভি বাকি হায় দোস্ত ! গেট দিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি সেই ভদ্রলোক মেন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে – ও তার সামনে দুজন – একজন তো জাপানি মনে হল - ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছেন ! – আমাদের দেখেই উনি প্রায় এগিয়ে এসে বলতে লাগলেন – এই যে আসুন ! - এরা কাজ করেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ! এখানে এসে আমার ইন্টার্ভিউ নিচ্ছে । এরা আমায় জিজ্ঞেস করছে – কেন আমি এখনও এই হল খুলে রেখেছি ! এখন তো সব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে । এখনও সিনেমা হল চালিয়ে যাচ্ছি কেন ! আমার মুখে এসে গেল – পিকচারওয়ালা ! – উনি লুফে নিলেন কথাটা । ওটা তো আমাকে নিয়েই করা ! আপনারা দেখেন নি কৃতজ্ঞতা স্বীকারে আগেই আমার নাম দেওয়া ! ও তো আমাকে বলেই করেছে ! এই ডিমনিটাইজেশানে আমার কি ক্ষতি হয়েছে ! – আমার আর কি ক্ষতি হবে ! আমি তো ক্ষতিতেই হল চালাচ্ছি ! হলে কটা লোক দেখতে পেলেন ! সরকার ক্ষতিপূরণের টাকা দিচ্ছে না ! – তবু কেন হল বিক্রি করে দিচ্ছি না ! এই যে ছেলেটা – রাস্তার ওপর দাঁড়ানো এক স্ন্যাক বিক্রেতার কাঁধে হাত রেখে উনি বলে যাচ্ছেন – এ আমার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার অসুবিধেই করছে । তবু এই হলটা বন্ধ করে দিলে এর কি হবে ! এই হলে কতগুলো লোক কাজ করে দেখেছেন ! ওই লোকগুলো কোথায় যাবে ! ওরা তো সিনেমার কাজ ছাড়া আর কিছুই জানে না ! ওরা কি করবে – বলুন দেখি ! আমরা বলি – শুধু ওরাই বা কেন ! আমরা যারা এখনও সিনেমা হলে এসে বাংলা সিনেমা দেখি – আমরাই বা কোথায় যাব ! এইভাবেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা পাড়া - তৎকালীন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ইতিহাস - নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা হতেই থাকল ! কত সিনেমা হল, কত থিয়েটার হল ছিল আর কিভাবে উধাও হয়ে গেল ! যদিও কমার্শিয়াল সিনেমার মান কত নীচে নেমে গেছে – তবুও সে সব সিনেমাও দেখাতে হয় ! অনেকক্ষণ আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ বোধয় জেগে উঠলেন । বললেন – চা খাবেন ? – আমি বললাম – উল্টোদিকে সাঙ্গুভ্যালী রেস্টুরেন্টে চলুন ! উনি বললেন – চলুন ওপরে ! ভালো চা খাবেন ! আবার হলে ঢুকে – যে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চাই না – সেই সিঁড়ি দিয়েই ওপরে উঠে একেবারে ওনার নিজস্ব চেম্বারে গেলাম ! ওখানে কয়েকজন কর্মচারী কাজ করছেন – তারা খুবই অবাক চোখে আমাদের দেখতে লাগল । হয়ত মালিকের আত্মীয়-স্বজন হবে ! যে লোকটি প্রথম থেকে আমাদের দেখছিল – সে তো খুবই খাতির দেখাল । ঘরে ঢুকে আমরা দেখতে পেলাম – টেবিলের ওপর একটা কম্পিউটার ! দেওয়ালে লাগানো রয়েছে একটা ‘দর্জিপাড়ার মিত্তির পরিবার’ বংশ-লতিকা ! দেখছি দেখে উনি বলে দিলেন – ওয়েবসাইটে দেখে নেবেন ! – উল্টোদিকে খুব সম্ভবত ওনার বাবার ছবি ! আর সি সি টি ভি তে বিভিন্ন জায়গার রানিং ছবি দেখা যাচ্ছে ! - না । ঘরে কিন্তু কোন উত্তমকুমার থেকে দেবকুমারের কোনও ছবিই নেই ! – আরম্ভ হয়ে গেল – গল্প ! আমরা কে কি করি – কোথায় থাকতাম – এখন কোথায় থাকি ! ইত্যাদি ! উনি হলেন দিপেন মিত্তির – মানে দর্জিপাড়ার মিত্তির ফ্যামিলি ! – এককালে তো খুব পয়সাওলা পরিবার ছিল ! এখন কি অবস্থা – জানি না ! নিজে বিয়ে করেন নি । কেন ? জিজ্ঞেস করাতে বললেন – অনেক মানুষের অনেক কিছু পায় না ! আমারও ছোটবেলা থেকেই প্রেম বা বিয়ে পায় নি ! খুবই লাজুক ছিলেন ! মা ছাড়া আর কারুর দিকে তাকাবার সাহস পান নি ! আর ওনার কথায় ‘ছোটবেলা থেকেই সিনেমা নিয়েই আছি’ ! – এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য কারন মনে হল না ! – সে যাই হোক ! তাতে তো আর আলাপচারিতা আটকায় না ! – আমার ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে তো খুব খোলামেলা আলোচনা করতে লাগলেন ! কোনও জড়তা বা দ্বিধা তো নেই ! যেটা দেখা গেল – সেই সিনেমাওয়ালার মতোই সারা দিন নাকি এই হলেই থাকেন । একবার খেতে যান দুপুরে ও রাতের শো তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে যান বাড়ি ! কথায় কথায় জানিয়ে দিলেন – ওনার কোথাও কোন বন্ধু বা আড্ডা নেই ! অর্থাৎ সোজা বাড়িই যান ! আমাদের তো মনে হল না – উনি খুব লাজবতি বা ইন্ট্রোভার্ট ধরনের মানুষ ! যিনি একেবারে অজানা দুজন মানুষের সঙ্গে প্রায় যেচে আলাপ করে মন কেড়ে নিতে পারেন – তিনি কি করে বন্ধু-হীন হতে পারেন ! – আমরা ইতিমধ্যে ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া করেছি ! কিন্তু আমাদের কাছে – দিনটা একেবারে উপরি পাওয়া ! সচরাচর এই বয়েসে কেউ যেচে বন্ধুতা করে না ! বিশেষ করে শহরে ! আর আচমকা এমন একজন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিল ! তবে এই একজন সিনেমাওয়ালার দর্শন পাওয়া, যে শুধু নিজের ছাড়া হলের সমস্ত কর্মচারী – এমনকি রাস্তার ফেরিওলার ভবিষ্যৎ পর্যন্ত ভাবে ! এইরকম সিনেমাওয়ালার সান্নিধ্যে আসা – সে তো আমাদের পরম প্রাপ্তি ! মনোজ

137

5