শিবাংশু

এক জন ফেরারি ও পুরিয়াকল্যান

সরস্বতী ছিলো একটি নদীর নাম। তার পর নামটি ঘিরে একজন দেবীকে কল্পনা করা হলো। তারও পরে কোনও একদিন বৌদ্ধ তন্ত্রের দুর্গম দেবতা। শেষে বাঙালির বসন্ত পঞ্চমীতে সন্ত ভালেন্তিনের নারী অবতার। আধুনিকতম ভিজ্যুয়ালটি শুক্লা, শুভ্রা, মহাশ্বেতা, বীণাবাদিকা এক কোমল তরুণী। বটতলার ক্যালেন্ডারে শাদা শাড়ি, শাদা ব্লাউজ, ক্ষীণতটী, গোলাপি পদ্মাসনা। শিবাকাশির ক্যালেন্ডারে সবুজ শাড়ি, মেরুন ব্লাউজ, পূর্ণ দেহিনী, গুরু নিতম্বিনী এক দ্রাবিড় সুন্দরী। কিন্তু শ্যামলা মেয়েদের দেশে য়্যাপারথেইডের প্রতীক হয়ে এই দেবীমূর্তির কল্পনাটি পৌরাণিক যুগ থেকে পাব্লিক বেশ খেলো। শাদা নাকি জ্ঞানের রং, শান্তির প্রতীক, স্বস্তির ধারক। যাদের গায়ের চামড়া শাদা, তাদের নাকি এসব থাকে, যেমন আমাদের গৌরী দেবীটি। এহেন দেবীমূর্তির কল্পনা যাঁরা করেছিলেন, ধরে নিই প্রাক পৌরাণিক যুগের 'আর্য'রা, তাঁরা কিন্তু দেবতাদের পোষাক আশাক বিষয়ে বেশ সাম্যবাদী ছিলেন। পুরুষ বা নারী দেবতার আবরণ কিন্তু অধোবাসেই সীমাবদ্ধ থাকতো। উত্তরীয়ের কল্পনা পরবর্তী কালের নাগরিক রাষ্ট্রের সময় এলেও, দেবতামূর্তির কল্পনায় তার কোনও ভূমিকা ছিলোনা। আর যদি সমান্তরাল ভাবে চলা প্রকৃতিপূজা ও সেই ধারার কল্পিত দেবীদের কথা ভাবি, তবে তো দেখবো, 'বিশ্বে মায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগ্বসন', এই তত্ত্ব দু-তিন হাজার বছর ধরে চলেছে। তাই যখন সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে দেবীর য়্যানাটমির নিবিড় প্রশংসা আবৃত্তি করে ছাত্রছাত্রীরা অঞ্জলি দেয়, তখন জ্ঞানের দেবী ( যদি কেউ থেকে থাকেন, মিনার্ভা?) হয়তো নিভৃতে পুলকিত হন। এ জীবনে এখনও পর্যন্ত যতো সরস্বতীর রূপকল্প দেখেছি, ক্ষীণ, প্রায় অপ্রকাশ্য নীবিবন্ধে প্রতীকী বসন ব্যতিরেকে কোনও আবরণ কখনও দেখিনি। সেদিন থাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর মন্দিরে ( একাদশ শতক) আর মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে (পঞ্চদশ শতক ) সরস্বতীর মূর্তি খুব যত্ন সহকারে দেখলুম। রক্ষণশীল দ্রাবিড় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ তীর্থেও আর্য সভ্যতার নন্দনতত্ত্বকে অবিকল অনুসরন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এই প্রসঙ্গ কেন? প্রসঙ্গটি, আমি ও আমার মতো অসংখ্য ভারতীয়ের কাছে বহুদিন ধরেই অবসন্ন পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনে। আচ্ছা, ব্রাহ্মণ মানে কি 'হিন্দু' জাতির অংশ একটি গোষ্ঠী? হয়তো না, অন্তত যখন 'ব্রাহ্মণ' শব্দ বা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিলো, তখন 'হিন্দু' নামে ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠী তো ছিলোনা। তখন 'সারস্বত' সাধনা যে সব মানুষের জীবনচর্যা ছিলো তারা সবাই ছিলো ব্রাহ্মণ। সেভাবে কি পান্ধারপুরের জন্ম নেওয়া সেই মুসলমান সারস্বত সাধকটিকে 'ব্রাহ্মণ' বলা যায়? জানি, এই প্রশ্নের উত্তরে এদেশে স্বল্প হলেও কয়েকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত এগিয়ে বলবে 'না'। এই সব হাতের মালিক ভান্ডারকরের জাদুঘর ভাঙ্চুর করে, মিরা নায়ারের সিনেমা সেটে আগুন লাগায়, হুসেনের ছবি ছিঁড়ে ফেলে। মেরুদন্ডহীন সরকারের সঙ্গে আমাদের মতো নপুংশক দেশবাসী শুধু খবর কাগজ পড়ি, টিভিতে দেখি আর মকবুল ফিদা হুসেন কাতারের নাগরিক হয়ে যান সাতাশি বছর বয়েসে। ছবির জগতে হুসেনের সঙ্গে তুলনা করা যায় গানের জগতে ভীমসেনের। হুসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জে জে আর্ট স্কুলে, কিন্তু তা নিতান্তই প্রারম্ভিক। আসল শিক্ষা প্রতি বর্গফুটে চার আনা পারিশ্রমিক হিসেবে সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে শুরু হয়। জীবনের এই পর্বেই তিনি বুঝতে পারেন ছবি মানে ভিজ্যুয়াল, ছবি মানে আগের চোখের পরীক্ষায় পাস করা , ছবি মানে আমি যা দেখতে চাই কিন্তু দেখতে পাইনা, ছবি মানে কল্পনার শেষ ঘোড়া যাতে আমি বাজি ধরতে চাই , ছবি মানে এক ধরনের ইল্যুশন যাকে বেদান্ত খুঁজেছিলো। এই সব অধরা মাধুরীকে (লিটারালি!!) ধরতে লাগে অসম্ভব প্যাশন, অন্তর্লীন আকুলতা। এই প্যাশন পুথিপত্রে নেই, স্কুল কলেজে নেই, সভাপর্বে, স্ফটিকস্তম্ভে নেই , আছে শুধু নিজের শিল্পের প্রতি তীব্র আকর্ষণের মধ্যে, জৈব লিবিডোর সীমা বিচূর্ণ করে, সর্বনাশের শেষ দেখতে চাওয়ার মধ্যে। যাকে কোনও মধ্যবিত্ত মননে বাঁধা যায়না, একেবারে তৃণমূলস্তরে প্রকৃতিসঞ্জাত আবেগের ফলশ্রুতি এইসব সিদ্ধি। একালে যা আমরা পেয়েছি হুসেন ও ভীমসেনের দাক্ষিণ্যে। এই সব সৃষ্টির মৌল লক্ষণ হচ্ছে এর সারল্য, ভনিতাবিহীন সৃজনশীল শ্রমের কারুকার্য, যা চোখের কাছে, কানের কাছে, সহস্রার মূলাধারের কাছে আমাদের পার্থিব অস্তিত্বকে আঘাত করে সেই সব অশ্রুত অব্যক্ত সার্থকতার কাছে পৌঁছে দেবে, যখন কোনও মধ্যবিত্ত বুজরুকি না করেও বলতে পারবো, ' রূপসাগরে ডুব দিয়েছি, অরূপরতন আশা করি'। উৎকেন্দ্রিকতার বিচারে হুসেন সালভাদোর দালিকেও মাৎ করে দেবেন। নিজের উৎপাদিত ফসল, শ্রমের মূল্যের নিরিখ তিনি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, যেখানে সব চেয়ে সেয়ানা বেনিয়াও মাথা ঝুঁকিয়ে সেই দাম চুকিয়ে দেবে। তিনি আগে শ্রমিক, পরে শিল্পী। প্রথমে আর্টিজান, পরে আর্টিস্ট। বাংলা ঘরানার মার্জনা, লালিত্য তাঁর জন্য নয়। পি এ জির বাঁধনও তিনি অস্বীকার করেন। মাটিতে ক্যানভাস ফেলে নীচের দিকে তাকিয়ে ছবি আঁকেন। কীভাবে ঐ সব বিশাল পটে স্থানিকতা, বর্ণিকতা, আলোছায়ার ফ্ল্যাট বিভঙ্গকে লম্বা তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে নথিবদ্ধ করেন, বিস্ময়ে মাথা নত করা ছাড়া কিছু করার নেই। তাঁর তুলি যেন ভীনসেনের গমক তান, হলক উৎসার, চাবুকের মতো কানে, ক্যানভাসে আছড়ে পড়ে। মানুষের ছবি আঁকার আদি প্রয়াস রেখাভিত্তিক ড্রইং থেকে শুরু হয়েছিলো, তাই হুসেন মানেন ড্রইংই ছবির মেরুদন্ড। তাঁর সমসাময়িক সব বড়ো শিল্পীরা রেখার ড্রইং আঁকতে দ্বিধাবোধ করতেন। হয়তো ভাবতেন রেখাভিত্তিক তেলরঙের ছবির মধ্যে যথেষ্ট সফিস্টিকেশন আনা যাবেনা। কিন্তু শ্রমজীবী শিল্পী হুসেন মনে করতেন ইতরযানী রেখার ছবিই মানুষের কাছে সব থেকে সহজে পৌঁছোয়। যেমন ভীমসেন চিরদিন অপ্রয়োজনীয় তানকারি থেকে নিজেকে নিরস্ত রেখেছিলেন। প্রচুর নিরেস ছবি এঁকেছেন, ছবি নিয়ে অকারণ বাণিজ্য করেছেন। যা কিছু করেছেন তার মধ্যে সতত অল্পবিস্তর 'শক ভ্যালু' আরোপ করেছেন। মানুষকে চমকে দিয়ে শিশুর মতো উপভোগ করেছেন। যাবতীয় ভারতীয় দর্শন ও পুরাণশাস্ত্রে অগাধ বিদ্যা অর্জন করেছিলেন। বস্তুত তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি সব ভারতীয় পুরাণের মিথস্ক্রিয়ার ফসল। কিন্তু তিনি জন্মসূত্রে মুসলিম। সরস্বতীর 'লজ্জা নিবারণের দায়িত্ব তাঁর জন্মগত কর্তব্য। তিনি কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মতো স্বপ্নে দিগম্বরী দেবীমূর্তি দর্শন করার অধিকারী নন। তাঁর জন্য এরকম কল্পনা করাও পাপ। তিনি তো ব্রাহ্মণ নন, 'হিন্দু'ও নন। এই সব ধৃষ্টতা যদি করে ফেলেন তবে তাঁর বিচার করবে কয়েকজন দুর্বৃত্ত, যাদের 'শিল্প' শব্দটি বানান করার যোগ্যতা নেই। তারা চোখ পাকিয়ে, কোমরে হাত দিয়ে বলবে, আঁকো তো দেখি পয়গম্বরের ছবি, আঁকো দেখি মা ফতিমাকে নির্বসন করে। হেঁ হেঁ বাবা , আমরা অত্যন্ত সহিষ্ণু, অহিংস্র সভ্য জনতা। শুধু ছবিগুলো ছিঁড়েই ছেড়ে দিলাম। নয়তো.... তিনি স্বেচ্ছায় ফেরারি হন। কিন্তু বুকের ভিতর রাত্রিদিন জেগে থাকে ভারতবর্ষ। কখনও অভিযোগ করেননা তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। সতত বলেন তিনি স্বেচ্ছায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে দেশ থেকে দূরে রয়েছেন। চলে যাবার আগের দিন বোম্বাইয়ের কুলফি ফালুদা খেতে চান। মহার্ঘ সাহেবি আইসক্রিম প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের সৃষ্টির পঙ্কিল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কোনও জবাবদিহি করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ তিনি জানতেন এই সব নির্বোধের সংখ্যা তাঁর গুণগ্রাহীদের তুলনায় নগণ্য। হুসেন এবং ভীমসেন চিরকালীন ভারতীয় সাব অল্টার্ন সংস্কৃতিচেতনার এ যুগের পুরোধা। ব্রাহ্মণ্য ছুঁতমার্গের বিরুদ্ধে প্রাংশু প্রতিবাদ। এই লেখাটি লেখার সময় ভীমসেনের পুরিয়া কল্যান শুনছিলাম ক্রমাগত, ' বহুত দিন বিতে, অজহুঁ ন আয়ো... ' ফেরারি আর ফিরবে না। বহুকাল আগে একটা পদ্য লিখেছিলুম। কেউ কেউ হয়তো বা অন্যত্র দেখেছেন এই অকিঞ্চিৎকর রচনাটি। মার্জনা চেয়ে পুনরাবৃত্তি করলাম, হুসেন ও ভীমসেন ------------------------------ হুসেন ও ভীমসেন ছবি আঁকে তেলরঙে গারায় পঞ্চমে সামনে অনেক গ্রাহী, অনেক ফরাসি স্বেদ, ঠোঁটের উজ্জ্বল লাল জরি, জড়িমায় ধৃত চিত্তকোষ ছবি চলে জ্বলন্ত স্ট্রোভ কোটালের স্রোত বেয়ে তারা তো ছবিই চেয়েছিলো শুদ্ধ, কোমল, মৌল রঙের দাপট সুরের লপক তুলি যেই ছন্দে ক্যানভাসে, কানে, কর্ণপটে চোখের অমলভ্রান্তি, জোড় থেকে সমে হুসেন ও ভীমসেন ছবি আঁকে তেলরঙে গারায় , পঞ্চমে....

9

1

Ranjan Roy

ফেরারি ফৌজ

আগের সেই টিনের চাল আর চাটাইয়ের বেড়া নেই, থাকার কথাও নয়। প্রায় আটচল্লিশ বছর , কম কথা নয়। পিচের রাস্তা আর তার পাশে কালো হলুদের বর্ডার। অধিকাংশ বাড়ি পাকা। বিজনদার বাড়ি শেষ কবে এসেছিলাম? ওর ছোড়দির বিয়েতে। আমরা প্রায় পনের জন, পনের অশ্বারোহী। তার মধ্যে দুজন মেয়ে। একজন বিবাহিত। আমার সেলের কম্যান্ডার ও তার বৌ। আমার সেলের প্রশান্তর আলগা মুখ। একবার সেল মিটিংয়ে কম্যান্ডারকে বলে দিল-- নিজে তো পার্টনার পটিয়ে নিলে, আমাদের খালি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছ? আমাদের কী হবে? --- বিপ্লবে প্রেম করা মানা নাকি? আমরা কি আনন্দমঠের সন্ন্যাসীর দল! -- তা কই? পার্টি কই? -- রিক্রুট কর। আমার বউ তো আমার রিক্রুট। --উঁহু, মেয়েদের রিক্রুট করা বহুত ঝামেলি। সুশান্তকে জিগাও। সেদিন লাজুক মুখচোরা সুশান্ত মুখ খোলেনি। কিন্তু বিয়েবাড়িতে সবার পেড়াপেড়িতে একরকম নিমরাজি হল। -- আমি কিছু বলব না। প্রশান্তই বলুক।ওই আমাকে ডুবিয়েছিল। সে কী? -- বলছি বলছি। সুশান্ত প্রেমে পড়ছিল, পাড়ারই মেয়ে। পাঁড় কংগ্রেসি বাড়ি। আমার কাছে এসে কিন্তু কিন্তু করে বলে ফেলল। ব্যস্, আমি ওকে গাইড করতে লাগলাম। বললাম-- প্রেমে পড়ে বিপ্লবকে ভোলা চলবে না। সলিউশন? কংগ্রেসি বাড়ির মেয়েকে রিক্রুট করে কমিউনিস্ট বানাতে হবে। মায়াকোভস্কি বলেছেন-- প্রিয়ার গোলাপি ঠোঁটে চুমু খাওয়ার সময়েও যেন রিপাব্লিকের লাল পতাকা পতপত করে উড়ছে দেখতে পাই। প্রশান্ত আমার কথা মত কাজ করতে লাগল। বিপ্লব বোঝাল, শ্রেণীসংগ্রাম বোঝাল, কৃষিবিপ্লবও বুঝিয়ে ফেলল। শেষে যখন ওকে দলে আসতে বলল তখন মেয়েটি বলল যে তোমরা ছেলেরা কত স্বাধীন,সন্ধ্যের পরে দেরি করে ফিরলেও বাড়িতে কিছু বলে না। আমরা মেয়েরা কী আর করতে পারি বল? সেদিন ওই মুখচোরা সুশান্তের জিভে দুষ্টু সরস্বতী ভর করেছিলেন। তারপর কানে আমার ফুসমন্তর! ও অনায়াসে বলল-- বেশি না, একটা কাজ তো করতে পারিস! কিছু না হোক আমার মত গোটা কয়েক বিপ্লবী তো পয়দা করতে পারিস। তারপর কী হইল জানে শ্যামলাল। তখন খাসির মাংস পাতে পড়েছে। ৭) আগের সেই টিনের চাল আর চাটাইয়ের বেড়া নেই, থাকার কথাও নয়। প্রায় আটচল্লিশ বছর , কম কথা নয়। পিচের রাস্তা আর তার পাশে কালো হলুদের বর্ডার। অধিকাংশ বাড়ি পাকা। বিজনদার বাড়ি শেষ কবে এসেছিলাম? ওর ছোড়দির বিয়েতে। আমরা প্রায় পনের জন, পনের অশ্বারোহী। তার মধ্যে দুজন মেয়ে। একজন বিবাহিত। আমার সেলের কম্যান্ডার ও তার বৌ। আমার সেলের প্রশান্তর আলগা মুখ। একবার সেল মিটিংয়ে কম্যান্ডারকে বলে দিল-- নিজে তো পার্টনার পটিয়ে নিলে, আমাদের খালি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছ? আমাদের কী হবে? --- বিপ্লবে প্রেম করা মানা নাকি? আমরা কি আনন্দমঠের সন্ন্যাসীর দল! -- তা কই? পার্টি কই? -- রিক্রুট কর। আমার বউ তো আমার রিক্রুট। --উঁহু, মেয়েদের রিক্রুট করা বহুত ঝামেলি। সুশান্তকে জিগাও। সেদিন লাজুক মুখচোরা সুশান্ত মুখ খোলেনি। কিন্তু বিয়েবাড়িতে সবার পেড়াপেড়িতে একরকম নিমরাজি হল। -- আমি কিছু বলব না। প্রশান্তই বলুক।ওই আমাকে ডুবিয়েছিল। সে কী? -- বলছি বলছি। সুশান্ত প্রেমে পড়ছিল, পাড়ারই মেয়ে। পাঁড় কংগ্রেসি বাড়ি। আমার কাছে এসে কিন্তু কিন্তু করে বলে ফেলল। ব্যস্, আমি ওকে গাইড করতে লাগলাম। বললাম-- প্রেমে পড়ে বিপ্লবকে ভোলা চলবে না। সলিউশন? কংগ্রেসি বাড়ির মেয়েকে রিক্রুট করে কমিউনিস্ট বানাতে হবে। মায়াকোভস্কি বলেছেন-- প্রিয়ার গোলাপি ঠোঁটে চুমু খাওয়ার সময়েও যেন রিপাব্লিকের লাল পতাকা পতপত করে উড়ছে দেখতে পাই। প্রশান্ত আমার কথা মত কাজ করতে লাগল। বিপ্লব বোঝাল, শ্রেণীসংগ্রাম বোঝাল, কৃষিবিপ্লবও বুঝিয়ে ফেলল। শেষে যখন ওকে দলে আসতে বলল তখন মেয়েটি বলল যে তোমরা ছেলেরা কত স্বাধীন,সন্ধ্যের পরে দেরি করে ফিরলেও বাড়িতে কিছু বলে না। আমরা মেয়েরা কী আর করতে পারি বল? সেদিন ওই মুখচোরা সুশান্তের জিভে দুষ্টু সরস্বতী ভর করেছিলেন। তারপর কানে আমার ফুসমন্তর! ও অনায়াসে বলল-- বেশি না, একটা কাজ তো করতে পারিস! কিছু না হোক আমার মত গোটা কয়েক বিপ্লবী তো পয়দা করতে পারিস। তারপর কী হইল জানে শ্যামলাল। তখন খাসির মাংস পাতে পড়েছে। বিজনদাকে চিনতে একটু কষ্ট হল। ছ'ফিট লম্বা একটু মঙ্গোলীয় ধাঁচের মুখে এক্ধরণের একরোখা ভাবটা এখন অনেক নরম, কারণ সামান্য মেদ জমেছে। একমাথা কোঁকড়ানো চুলের জায়গা দখল করেছে এক মরুভূমি। সেই ছিপছিপে ছিলেটানা ধনুক ভাব উধাও, সকাল-সন্ধে মুখবুজে টিউশন করতে করতে একটু নুয়ে পড়েছে পিঠ। কিন্তু হাসিটা আগের মতই প্রাণখোলা। তবে ঝক্ঝকে দাঁতে আগের মত নিকোটিনের ছাপ নেই। চারমিনার কি বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে? নিদেনপক্ষে পানামা? বিজনদা কি আজকাল নিয়মিত ডেন্টিস্টের কাছে যায়? আগে তো ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত চক্চকে করা, বিউটি পার্লারে গিয়ে রূপটান-- এসব তো বুর্জোয়া অবক্ষয়ের লক্ষণ ধরা হত। খেটে খাওয়া মানুষদের লড়াইয়ের রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের নার্সিসিজমে বেঁধে ফেলার ডেকাডেন্ট কালচারাল কনস্পিরেসি! সবাই কেমন বিশ্বাস করত যে যারা বিউটি পার্লারে কাজ করে বা সেখানে ক্লায়েন্ট হয়ে যায় তাদের চরিত্র সন্দেহজনক। তবে বিজনদা ছিল ওদের মধ্যে সবচেয়ে পিউরিটান। কোন আঁশটে চুটকি বা কমেন্ট, অভিধান-বহির্ভূত শব্দের ব্যবহার একেবারে সহ্য করতে পারত না। রেগে গেলেও কারও মা-বাপ তুলত না।মেয়েদের মাল বা গুল্লি বলা মানে প্রচন্ড ধমক খাওয়া। আর মাগী শব্দ মুখ থেকে বেরোলে হাতাহাতি হবার সম্ভাবনা। আঠেরো বছর বয়সের রমেন একবার পথে একজন গর্ভবতী মহিলাকে দেখে বলে উঠেছিল-- দেখেছেন, ওর না নিচের তলায় ভাড়াটে এসেছে। দুজন সঙ্গী হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠতে গিয়ে দেখল বিজনদাওর কলার মুচড়ে ধরে ঝাঁকাচ্ছে-- শালা! তোর লজ্জা করে না? অপদার্থ! তুই ওদের থেকে আলাদা কিসে? বিজনদা এগিয়ে এসে দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে রমেনকে। --- কী রে! আমাদের ভুলে গেছলি? আর আমরও তো--। রমেন কোন কথা বলে না, শুধু হাসতে থাকে। শংকর এগিয়ে এসে বলে --- ওঃ, আবেগের দুধ উথলে উঠেছে। ওকে ছেড়ে দাও , অনেক কথা আছে। আগে তোমার ছাত্রছাত্রীদের ছুটি দাও। গোটাদশেক ছেলেমেয়ে চটপট খাতাবই ঢাউস ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে। বিজনদা রোববারের দিন এটা পুষিয়ে দেবে বলে অশ্বাস দেয়। শংকর বিজনদার থেকে একটা সিগ্রেট চেয়ে নিয়ে ধরিয়ে ফেলে। আমি আপত্তি জানাই; ওর বারণ আছে। ধোঁয়া গিলে কার কি উবগার হবে শুনি? --কার বারণ, বৌয়ের? সেটা ঘরের মধ্যে। ঘরের বাইরে একটু অবাধ্য না হলে চলে? ---হ্যাঁ, হ্যাঁ; ঘরের মধ্যে অসভ্য আর ঘরের বাইরে অবাধ্য। আমি চমকে উঠি। এই রে, বিজনদা ঝাড় দিল বলে। কিন্তু বিজনদার ঝকঝকে দাঁতে অমলিন হাসি। শংকরের দিকে তাকাই। ও চোখ টিপে একটা ভঙ্গী করে বলল--চাপ নিস না, বিজনদাও লাইনে এসে গেছে। একটু অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করি-- তো তুমি ঘরের মধ্যেই অবাধ্য কেন? বৌদি সিগ্রেট খাওয়া প্যাসিভ স্মোকিং নিয়ে কিছু বলে না? বিজনদা উত্তর না দিয়ে জোরে হেসে ওঠে। আমি ভ্যাবাচাকা। পালা করে দুজনের মুখের দিকে তাকাই। --- না রহেগা বাঁশ, ন বজেগী বাঁসুরী! --বুঝলি না ভ্যাবাগঙ্গারাম! বিজনদা বিয়েই করে নি। --ও! --মানে করে নি বললে ঠিক হবে না, বলা উচিত দ্বিতীয়বার করে নি। --আচ্ছা, প্রথমবারটা কবে? --- সেই যে রে! বিজনদার প্রথম রিক্রুট? ---রীনাদি! উনি এখন কোথায়? বিজনদা বাইরের দিকে তাকায়, আবার একটা সিগ্রেট ধরায়। ঘরের ঘুলঘুলিতে দুটো চড়াই পাখি ঘর বাঁধছে। কিচিরমিচির। গোটা কয়েক খড়কুটো এসে আমার গায়ে মাথায় পড়ে। বিজনদা পরম মমতায় সেগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। ওর হাত আমাকে ছোঁয়, খানিকক্ষণ ছুঁয়ে থাকে। ভাবি, কোলকাতায় এখনও চড়ুইদের দেখা পাওয়া যায়! আমি জল চাইলাম , বিজনদা উঠে ভেতরে গেল। -- এই শালা! চটপট বলে ফ্যাল দিকি কি কেলো? --- বিজনদা তখন বাঁকুড়া থেকে পুরুলিয়ার জেলে এসেছে। পার্টির শেলটার-ফেলটার ভেঙে ছত্রখান। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। আগের সমর্থকরা কেউ আর আমাদের মাথা গোঁজার জায়গা দিচ্ছে না। কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। বেলেঘাটায় পুলিশের ঢোকানো মোলগুলো মুখোস পরে অ্যাকশন স্কোয়াডের ছেলেদের ধরিয়ে দিল। রীনাদি অন্য একটা উপদলে যোগ দিয়ে আমেরিকান লাইব্রেরিতে বোম ফাটিয়ে কাঁচ ভাঙল। একবার ধরা পড়ে বেইল জাম্প করল। -- বেইল পেয়ে গেছল? কী করে? --তখন পেটে ছ'মাসের বাচ্চা।তাই কোন বুড়ো সি জে এম--! আমি ছটফট করি, উল্টোপাল্টা বকবক করতে থাকি। -- আচ্ছা, পেটে বাচ্চা এল কেন? একটু সতর্ক হলে--। --তুই কি বুঝবি রে আবাল! তুই তখন শান্ত ছত্তিশগড়ে বসে বাপের হোটেলে খাচ্ছিস দাচ্ছিস আর ইডিওলজিক্যাল কনফিউশন মারাচ্ছিস। আমি হাসি। সে তো এখনও মারাচ্ছি। কিন্তু ওদের কি তখন "চার আনায় তিনটে" কেনারও পয়সা ছিল না? -- এটা একেবারে বোকা-দার মত বললি। আরে তখন তো আমরা ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ে বিশ্বাস করতাম না। মাও নিজে লং মার্চের সময় ফ্যামিলি প্ল্যানিং করেন নি। আর ভাবতাম এসব গরীবদের মূল সমস্যার থেকে চোখ সরিয়ে দেওয়ার সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। তর্ক করতাম--মানুষ শুধু পেট নিয়ে জন্মায় না, হাত-পা ও মাথা নিয়ে জন্মায়। -- তখন যদি কোন শালা বলত যে খোদ মাওয়ের চীনে সত্তরের দশকে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাইয়ের নির্দেশে একাধিক বাচ্চা হলে প্রমোশন ইনক্রিমেন্ট আটকে দেওয়া হচ্ছে তো--। --সে শালার গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়তাম। সে ঠিক আছে, তারপর কী হল? -- রীনাদি এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে এমনকি নিজের মা-ভাইদের থেকেও রূঢ় ব্যবহার পেয়ে বদলে গেল।বিধবা সেজে উত্তরবঙ্গে একটা মাস্টারি যোগাড় করে চলে গেল। বিজনদার সঙ্গে কোন সম্পর্ক স্বীকার করে নি। আমি কী বলব বুঝতে পারি না। ঠিক এইসময় বিজনদা একটা থালার ওপর তিনকাপ চা দুটো লেড়ো বিস্কুট আর একগ্লাস জল নিয়ে ঢুকল। কী টাইমিং! আচ্ছা, আড়াল থেকে আমাদের কথাবার্তা শুনছিল নাকি! আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে পুরনো দিনে ফিরে যাই। বিজনদার সঙ্গে প্রথম পরিচয় কবে যেন? হ্যাঁ, ১৯৬৭ সালের মে দিবস। বিজয়গড়ের থেকে মিছিল বেরোবে শুনে জুটে গেছি। তখন হায়ার সেকেন্ডারির ফল বেরোতে মাস দেড়েক বাকি। পুরোদমে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর চারমিনার ফোঁকা চলছে। দুটো পায়জামা আর দুটো পাঞ্জাবী বানিয়েছি-- একটা গেরুয়া আর একটা কচি আমপাতা রঙের। পরে বেরোলে এখানে ওখানে আড্ডা দেওয়া উদ্বাস্তু কলোনীর দুরন্ত মেয়েরা আওয়াজ দেয়- দেখ দেখ, একজন নতুন কমরেড যাচ্ছে। কেউ কেউ পেছন থেকে কমরেড বলে চেঁচিয়ে ভালোমানুষ মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকত।ভালো যে লাগত এ নিয়ে কোন কথা হবে না। সেই মিছিল। বিজয়গড় এর একটি সাংস্কৃতিক চক্রের ছেলেরা মোড়ে মোড়ে ভ্যানরিকশায় চড়ানো মাইক নিয়ে সলিল চৌধুরির গান গাইছে -- আয় রে পরাণ ভাই, আয় রে রহিম ভাই।' গানটা প্রথম শুনলাম। তাতে কালো-নদীর-বান রোখার আহ্বানে বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল। ছোটবেলায় পার্কসার্কাস পাড়ায় দেখা দাঙ্গার পরিবেশের ছবি ভেসে উঠল যেন। সেখানে তানুদা পরিচয় করিয়ে দিল পায়জামা ও সবুজ পাঞ্জাবী পরা অসম্ভব ফরসা বিজয়দার সঙ্গে। তারপর ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখেছি কিরকম ঘোর সংসারী বিজয়দা। তখন চাল দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য। তখনও গলি গলিতে হাতরুটি বেলে বেলে মহিলারা বিক্কিরি করতেন না। আসলে বাঙালী তখনও রুটিকে শুধু জলখাবারের যোগ্য মনে করত। চালের কর্ডন জেলায় জেলায়। র্যাশনের চাল মুখে তোলা কঠিন। বিজয়দা সাইকেল করে গড়িয়া-নরেন্দ্রপুর পেরিয়ে রাজপুরের বাজার থেকে প্রতিকিলোয় কুড়ি নয়া পয়সা কম দরে চাল কিনে আনত। সেই বিজয়দা একদিন মা-বাবা-ভাই-দিদিকে ফেলে কিভাবে বিপ্লবের স্বপ্নে নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে অনন্ত সিংয়ের ডাকাতির দলে ভিড়ে গেল সেটা এক রহস্য। নিজে গেল তো গেল, আমাদের কয়েকজনকে ও নিয়ে গেল যে! -- অ্যাই বিজনদা, এ শালাকে একটু বোঝাও তো! চল্লিশবছর দন্ডকারণ্যে বনবাস করে ওর ঘিলু কেমন ভসকিয়ে গেছে, সোজা কথাও বুঝতে পারছে না। বিজনদার মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। --কী, হয়েছেটা কী? -- প্রথমতঃ আমি কোন বনবাসে ছিলাম না,ছত্তিশগড়ের স্টিল সিটি ভিলাই কি বন ? দ্বিতীয়তঃ-- -- চোপ্ শালা! দন্ডকারণ্য কি ছত্তিশগড়ে নয়? দ্বিতীয়তঃ আমাদের ইংরিজির মাস্টারমশায় দীনেনস্যার যে গণ-আদালত বসিয়ে চারটে ছেলেকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন, সেই যে পদ্মপুকুর মাঠে গো, আর আমাদের অনেকের নামে খেলার মাঠের মারপিট নিয়ে মিথ্যে এফ আই আর করেছিলেন--সেটা ও কিছুতেই বিশ্বাস করছে না। -- কেন? --- ব্যাপারটা মেলে না, মানে ওঁর মাইন্ডসেটের সঙ্গে খাপ খায় না। -- ওরে আমার সাইকোলজিস্ট রে! হুঁ, মাইন্ডসেট! সব ব্যাপারে বাতেলার অভ্যেসটা এখনো যায় নি। --- সে তো তুই, বিজনদা সবাই। --- কোথায় খাপ খুলছিস ? বিজনদা দশবছর আগে সাইকোলজিতে মাস্টার্স করেছে, ইগনু থেকে। আবার ডিজার্টেশনের বিষয় নিয়েছিল-প্যাসিভ অ্যাগ্রেসন সিনড্রোম। বুঝলি? তুমি বল বিজনদা। --- হ্যাঁ, তোর খুব খারাপ লাগছে রমেন, কিন্তু কথাটা সত্যি। আমি তখন এদিকেই ছিলাম। -- হল তো! আমরা সবাই ছিলাম, উনি ছিলেন না, তবু এঁড়ে তক্কো। আমার ঠাকুমা বলতেন-- রেখে দে তোর দেখা কথা, আমি শুনে এলাম। ---কিন্তু বিজনদা, এটা কী করে হয় ?ওঁর মত শান্ত ব্যক্তিত্বের একজন নিরীহ মানুষ--। উনি সিপিএম ক্ষমতায় আসায় কী খরগোস থেকে সিংহ হয়ে যাবেন? -- আদ্দেকটা ধরেছিস। খরগোসের ক্ষমতায় আসা। ক্ষমতার সিপিএম-নকশাল-কংগ্রেস হয় না।সত্তরে যখন মানুবাবুরা যুব কংগ্রেসের পতাকার নীচে মাস্তানদের জড়ো করে কোলকাতাকে দুঃস্বপ্নের নগরী করে তুলেছিলেন তখন তোদের পাড়ার দত্ত বাড়ির ছ্যাবলা নিরীহ ছোটকা রাইফেল দিয়ে তোদের গাছ থেকে নারকোল টিপ করে পুকুরে ফেলে নি? পাড়ার চক্কোত্তি বামুনের ছেলে গামছায় শ্রাদ্ধবাড়ির চালকলা বাঁধা ছেড়ে বোমা বাঁধতে শুরু করেনি? "সিরাজদ্দৌল্লা" নাটকে দানশা ফকির চরিত্রটা দেখেছিস? যে ছোটবেলা থেকে খোঁড়া, ব্যঙ্গবিদ্রূপ সয়ে বড় হয়েছে , সে কেমন সুযোগ পেয়ে মহা ভিলেন হয়ে উঠল। সেই যে রে , সেই বিখ্যাত ডায়লগ--যেমন তেমন দানশা পাইছ! অবশ্য তোরা বোধহয় এসব পড়িস নি। --পড়েছি, কিন্তু গুলিয়ে গেছে-- কে যে লিখেছিল? গিরিশ ঘোষ, নাকি শচীন সেনগুপ্ত? --- ডি এল রায়ও হতে পারে, কি বল বিজনদা? --আঃ, ফালতু কথা ছেড়ে বল, কী বুঝলি? -- রমেন যে কিস্যু বোঝেনি, সে তো মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। আমি বুঝলাম যে তোমার দুটো উপপাদ্য। এক, ক্ষমতার সিপিএম -নকশাল হয় না। মানে যে যায় লংকায় , সেই হয় রাবণ। দুই, ক্ষমতা পেয়ে খরগোসের সিংহ হওয়া। অর্থাৎ, ক্ষমতা নামক বায়বীয় শক্তি বেড়ালকে পোঁদে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে বাঘ বানায়। কিন্তু মাস্টারমশায়, আমরা ছাত্র হিসেবে ব্যাকবেঞ্চার। একটু কষ্ট কইরা উদাহরণ সহকারে বুঝাইয়া দেন। মাস্টারমশায়ের গম্ভীর মুদ্রা । নীচুগলায় বললেন--এসব কথায় অনেক সময় লাগে। ভাতে ভাত হয়ে গিয়েছে, ডাল করাই আছে। যখন খেতে বসব তখন তিনটে হাঁসের ডিমের বড়া ভেজে দেব। আর আছে লংকার আচার। চলবে তো? সেই আদি অকৃত্রিম বিজনদা, ঘোর সংসারী, পরিবারের সবার দিকে নজর, আমরা আড়ালে বলতাম-- বড়পিসিমা। --শোন, এবার অন্য শিবিরের এইরকম অকারণ হিংস্রতার একটা গল্প বলি? মানে নকশালদের? সেখানেও একজন মাস্টারমশায়, তবে স্কুলের না, কলেজের। -- কে বলত? আমরা চিনি? --খুব চিনিস, কিন্তু নাম বলব না। এখন শান্ত ভদ্র বুদ্ধিজীবি, কাগজে প্রবন্ধ-টবন্ধ বেরোয়।অ্যাকাডেমিক লাইনে ব্রিলিয়ান্ট। তবে--। বিজনদা আর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ে, তারপর ব্যোম মেরে যায়। --আরে কী হল? --দাঁড়া, ভাবছি কোত্থেকে শুরু করি। আচ্ছা রমেন, তুই তখন স্কটিশে ইকনমিক্স পড়তি না? রঘুবীর সেন তখন তোদের দু'ব্ছরের সিনিয়র ছিল, মনে আছে? -- খুব মনে আছে। হেব্বি আঁতেল। "অনীক" পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। "এস আর " লাইন মারাতো। ওর বাপবুড়ো ভাল বেহালা বাজাত। -- "এস আর" আবার কী? -- তুই শালা গড়িয়া কলেজের মাল, তুই কোত্থেকে জানবি? আমরা হলাম প্রেসিডেন্সি কনসোলিডেশনের, বল্লে হবে? "এস আর" হল সোশ্যালিস্ট রেভোলুশ্যন গ্রুপ। যারা মনে করত ভারতে কৃষিতে পুঁজিবাদ এসে গেছে, সামন্ততন্ত্র পিছু হটছে। তাই এদেশে চীনের মত পিডিআর বা পিপলস ডেমোক্র্যটিক রেভোল্যুশন হবে না। তখন সিপিএম ও সরকারী নকশালদের একই মত ছিল, ভারতে বিপ্লবের স্তর হল পিডিআর বা কৃষি বিপ্লব। রঘুবীর পরে বড় ইকনমিক্সের অধ্যাপক হল, বিদেশে রিসার্চ করল। ইদানীং রিটায়র করেছে শুনছি। এবার তুমি বল, বিজনদা। --- তখন রঘুবীর মাস্টার্স করতে সাউথ সিঁথির ইকনমিক্স বিল্ডিংয়ে গেছে। ওরা আটটা ছেলে চারটে মেয়ে; দুজন আজকের লব্জতে বেশ ঝিংকু। ওখানে তখন নকশালদের ইউনিট, মেয়েগুলিও তাই। রঘুবীরের একটু ইন্টুমিন্টু করার ইচ্ছে হল। ওর ব্যক্তিত্বের একটা আকর্ষণ তো ছিলই। কিন্তু ও বাবা! কোথায় কি! যেন গোখরো সাপের বিলে এসেছে। মেয়েগুলো ওকে খালি রাগী রাগী চোখে দেখে, ভাল করে জবাব দেয় না। শেষে ওর কাছে খবর এল যে ওকে "এস আর" গ্রুপের তাত্ত্বিক প্রবক্তা হিসেবে শ্রেণীশত্রু ঘোষণা করা হয়েছে। ওর বেঁচে থাকার অধিকার নেই। খতমের তালিকায় নাম উঠে গেছে। মেয়েদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে গেছে, তাই ওদের অমন সাপের মত হিস হিস্। রঘুবীর বিশ্বাস করেনি যে ওকে মেরে ফেলা হবে। তবু সতর্ক হল। ভীড়ের বাসে বাড়ি ফিরতে লাগল। একা কোন গলিতে ঢুকত না। কিন্তু ওপর থেকে যে অধ্যাপক নেতাটি ওর অজান্তে বিচারসভা বসিয়ে ওকে মেরে ফেলার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, তিনি অধৈর্য্য হয়ে উঠলেন। শেষে বেলেঘাটা ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হল। ওদের অ্যাকশন স্কোয়াড খুব দক্ষ। একদিন রঘুবীর কিডন্যাপ হয়ে গেল। ওকে মুখ বেঁধে ট্যাক্সির ডিকিতে হাত-পা শেকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রাত্তিরে শেয়ালদা -ক্যানিং রেললাইনে ফেলে দিয়ে গেল। পুরো হিন্দি ফিল্ম। ঠিক সেভাবেই খবরটা পেয়ে ওর এক পুরনো বন্ধু একজনকে বোঝাল যে এস-আর হোক, যাই হোক --নকশাল তো বটেক। ওকে বাঁচাতে হবে। সেই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। তখনও কোন মালগাড়ি আসেনি। নইলে-। ওই অধ্যাপকটিও খুব ভদ্র, নরম স্বভাবের। কখনও কাউকে চড় মারেন নি। এখনও এদিকে দু'একটা টালির ছাদওলা বাড়ি রয়ে গেছে। ফুটপাথ সিমেন্টের, তাতে একপাশে কালো হলুদ দিয়ে সোঁদরবনের বাঘের মত ডোরাকাটা। আঙিনার ভেতর থেকে কখনও উঁকিঝুকি মারে দোলনচাঁপা, জবা বা টগরফুলের গাছ। আর কোথাও ফুটপাথের গায়েই পুরনো মাস্তানের মত মাথা তুলে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটা নারকোল গাছ। বয়সের ভারে হেলে গেছে। সন্ধ্যে নেমেছে অনেকক্ষণ। কিছু জিন্স ও লেগিংস পরা কিশোরী চলে যায় কলকল করতে করতে, পিঠে ঢাউস ব্যাগ, গন্তব্য সম্ভবতঃ কোন কোচিং ক্লাস। পাড়ার ভিতরে ত্রিফলাবাতি নেই।কিন্তু ল্যাম্পপোস্ট অগুনতি। বেশিরভাগের মাথায় আলো জ্বলছে। আমরা ফিরছি। অনেক অনেক আড্ডা হল। চলে আসার সময় বিজনদার বিষণ্ণ মুখ। আবার আসিস কিন্তু। তুই তো এখন কোলকাতাবাসী হয়ে গেছিস। অসুবিধে কী? -- হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসবে না মানে? ওর ঘাড় আসবে।তুমি এমন রেঁধে বেড়ে খাওয়াবে আর ও আসবে না। --ধ্যাৎ, আমি কি খেতে পাই নে? নাকি হ্যাংলা? --দুটোই। তোর মত যেচে একা থাকার লোকেরা নিজেরা কত রেঁধে খায় আমার জানা আছে। তোদের দর্শন হল-- ভোজনং যত্র তত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে। --- ভাগ শালা! তোর মত ফ্ল্যাটের মালিক নই, কিন্তু মাথার ওপর একটা ছাদ ঠিকই আছে। এজমালি তো কি? বিজনদা হাসে। বাগানের কাঠের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে আসে। মনে হয় গলির মুখটা অবদি এগিয়ে দেবে। --কিছু মনে করিস না রমেন, ও তোকে হিংসে করছে। মানে তোর স্বাধীনতা, সে ওর কপালে নেই। --- ভুল বুঝছ বিজনদা! তোমরা দুজনই উমাহারা মহেশ্বর। শ্মশানে মশানে বাস। পুরনো দিনের গাঁজার ধোয়ার মৌতাতে তোমাদের জমবে ভাল। --- কাল আসতে পারবি? --না, না। কাল নয়। পরে আরেকদিন। ওর মিশন ফেরারি ফৌজ চলছে যে! খুঁজে বেড়াচ্ছে পুরনোদিনের সাত ঘোড়সওয়ারকে। --- ক'জনকে পেল? --- বিমলেন্দু, আমি আর তুমি। এখনও চারজন বাকি। -- তো কালকে কার ইন্টারভিউ নিবি? --- না, বিজনদা, ইন্টারভিউ-টিউ নয়। আমি দেখতে চাই তোমরা কেমন আছ? কী ভাবছ? প্রায় আদ্দেক শতাব্দী পেরিয়ে গেল যে! এই বদলে যাওয়া সময়টাকে বুঝতে চাইছি, ধরতে চাইছি। -- বেশ তো, কাল কার বাড়ি যাবি বল? --বুঝতে পারছি না। ভাবছি আমাদের চে গুয়েভারা সজলের খোঁজ নেব। সেই যে ছোটবেলা থেকেই হাঁপানীতে খুব ভুগত আর নিজেই দরকার মত ডেরিফাইলিন, অ্যামিনোফাইলিন ইঞ্জেকশন ঠুঁসে দিত। এর পরে প্রিয়ব্রতর বাড়ি। শংকর হটাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বিজনদা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। এদিকে আজকাল গাছে গাছে ঝোপেঝাড়ে জোনাকিরা জ্বলে- নেভে করে না। কোথাও টিভিতে পুরনো ফিল্মি গান বাজছে-- রমাইয়া বস্তাবইয়া! রমাইয়া বস্তাবইয়া! তেলেভাজার দোকানের সামনে কিছু লোকজনের গজল্লা। --কী হল? অমন চুপ মেরে গেলে যে? -- কেন তুই জানতিস না? --কী জানব? --- ওরা দুজনেই নেই। --কোলকাতার বাইরে? আমার মত প্রবাসী বাঙালী? --- না, ওরা দুজনেই মারা গেছে। সেই সত্তরের প্রথম দিকে। --- সে কী? কী করে? কী হয়েছিল? -- ওসব শংকরের থেকে পরে শুনে নিস। তোরা এখন যা! ভালো লাগছে না। ৮) দুদিন পরে শংকর এসে হাজির হল আমার অস্থায়ী ডেরায়। আমার হাতের তৈরি কালো চা খেয়ে মুখ ভেটকে বলল -- সামান্য চা টাও ঠিক করে বানাতে পারিস না। তোকে নন্দিতাবৌদি আশকারা দিয়ে মাথায় তুলেছিল। পরে বুঝেছে যে এমন অপদার্থ লোককে মাথায় রাখলে বোঝা বাড়ে, তাই নামিয়ে দিয়েছে। আমি মুচকি হাসি। কিন্তু কোথায় যেন খচ্ করে লাগে। হয়ত আমার মুখের ভাবে সেটা কিছু ফুটে উঠেছে। শংকর অপ্রস্তুত। --সরি! অ্যাদ্দিন বাদে দেখা। এমন ইয়ার্কি করা ঠিক হয় নি। আগের দিন হলে তো--। --ঠিক আছে। আমি কিছু মনে করিনি। ওর সঙ্গে সব চুকে বুকে গেছে, বললাম তো! কাটিয়ে দে। ও চুপ মেরে যায়। এদিক ওদিক তাকায়। কোথায় যেন তাল কেটে গেছে। তারপর আমি বাধা দেবার আগেই ফস করে একটা সিগ্রেট ধরায়। -- এটা কি ঠিক করলি? ডাক্তারের বারণ আছে না? --ছাড় তো! ডাক্তার? তিনকুড়ি পেরিয়ে গেছি, তুই আমি সব্বাই। এখন যা হবার তা হবে। দীর্ঘজীবন লাভ? তাহাতে কাহার কয় গাছি কেশ উৎপাটিত হইবে? --- তা বলে তুই ডাক্তারের কথা শুনবি না? বৌদির সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবি? বা তোর দুই মেয়ের সামনে? -- ডাক্তারের সুপরামর্শ? নচিকেতা যমকে বলিলেন--ইহা কি অমৃত? যম নিরুত্তর। তখন নচিকেতা ঘোষণা করিলেন- যেনাহংমৃতস্যাম্, তেনাহং কিমকুর্য্যাম্? যাহা অমৃত নয়, তাহা লইয়া আমি কী করিব? --- টীকা করুন নীলকন্ঠবাবু! আমি মহামহোপাধ্যায়ের কথার পাঠোদ্ধার করিতে অপারগ। --- অর্থাৎ যে পথে গেলে বিপ্লব হইবে না তাহা শুনিয়া আমি কী করিব? তেরে অঙ্গনে মেঁ মেরা ক্যা কাম হ্যায়? --- তো কোন পথে গেলে বিপ্লব হইবে তাহা আপনি জানেন? -- আমি? বকরূপী ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে জিগাইলেন কঃ পন্থা? যুধিষ্ঠির বলিলেন-মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা। কিন্তু আজকে এই একুশ শতকে আমার মনে হয়-- কোন মহাজন পারে বলিতে? কাউকে বিশ্বাস করি না। তোকেও না। শালা সাতটা ঘোড়সওয়ার খুঁজে বেড়াচ্ছেন! যেন বিষ্ণু দে পড়ে ঘুম থেকে উঠেছেন। --- যাক, তাহলে তোর এখনও বিপ্লব হওয়ায় বিশ্বাস আছে, বাঁচালি! -- অ্যাই, অ্যাই বানচোত্! আমার মুখে কথা বসাবি না। --- আমি বসাই নি। যদি বিশ্বাসই না থাকে তো খুঁজে বেড়াচ্ছিস কেন? --- আচ্ছা, তোর কেসটা কী বলত? তোর কোথায় খুজলি হচ্ছে? --- মানে? --- মানে খামোকা পুরনো ঘায়ের ওপর থেকে পাপড়ি টেনে তুলছিস কেন? ধান্দাটা কী? ---- ফের ভাট বকছিস! তার চেয়ে সজল আর প্রিয়ব্রত কী করে মারা গেল সেটা বল। বিজনদা বলল না তোর থেকে শুনে নিতে? ---- শুনে কী হবে রে গুষ্ঠির পিন্ডি?আচ্ছা, তুই কী বাঙালী? --- তবে না তো কি ছত্তিশগড়ি? -- হতেও পারিস, শালা দো-আঁশলা কোথাকার। -- এবার মার খাবি, তোর কি হল বলত? -- হবে আর কি? কোন শালা বাঙালীর চারদিকে যা ঘটছে তা নিয়ে কোন হেলদোল আছে? সবার শালা একই ফান্ডা-- শাকভাত খাই, পকপক দেই! আমি হেসে ফেলি। --- তুই মাইরি একই রকম রয়ে গেলি! কোন পরিবত্তোন নেই। গর্জে ওঠে বিজন-- না! পরিবত্তোন হয়েছে। সবার হয়েছে। তোর আমার সবার। এই বঙ্গে সবার নুনু গুটিয়ে দুপায়ের ফাঁকে সেঁদিয়ে গেছে। নইলে আজ এদিন দেখতে হয়! --হ্যাঁ, বিজনদা বলেছে বটে। কিন্তু নিজে শালা মুখ ফুটে বলতে পারল না। ঘাটকাজের দায়টা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সটকে গেল। শালা বুড়ো ভাম! শংকর বিড়বিড় করতে করতে দুহাতের বুড়ো আঙুলের নখ ঘষতে থাকে। -- তোর কী হয়েছে বলত? বাবা রামদেবের চ্যালা হয়েছিস? এভাবে নখ ঘষলে টাকে দুগাছি চুল গজায় না কি যেন! --শোন রমেন। আজ যে প্রিয়ব্রত বেঁচে নেই এর জন্যে দুজন প্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী। আমি আর বিজনদা। -- কী আটভাট বকছিস? -- না রে! আমরা দুজন প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। --অংক কঠিন লাগছে। ওর মুখ চোখের অবস্থা দেখে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে দিই। ঢকঢক করে খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ও মুখ খোলে। মনে পড়ে রমেন? ১৯৬৮র শেষের দিকে এক শীতের সন্ধ্যায় তুই আমাকে অনন্ত সিংয়ের ওই এমএমজি বা ম্যান-মানি-গান নামক দলের সদস্য বানালি। আর ছ'মাস পরে আমি রিক্রুট করলাম প্রিয়ব্রতকে। --খুব মনে আছে। ওটা একটা ডাকাতের দল ছিল, মানে সেই অনুশীলন-যুগান্তর দলের স্বদেশী ডাকাতদের মত। আসলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের রোমান্টিক খোঁয়াড়ি অনন্ত সিংয়ের বুড়ো বয়্সেও কাটেনি। কিন্তু দলটার ফর্ম্যাল নাম ছিল সি সি সি আর আই।সেন্ট্রাল কোঅর্ডিনেশন অফ কম্যুনিস্ট রেভোলুশনারিজ অফ ইন্ডিয়া না কি যেন! আর অনন্ত সিংয়ের নিক ছিল ওল্ড গার্ড, তাই না? একটু একটু মনে পড়ছে। --ধুস্! অনন্ত সিং একটি মানসিক রোগী ছিল। বড় বড় কথার আড়ালে শুধু অস্ত্র জোগাড় কর আর তার ট্রেনিং নাও। কোন রাজনৈতিক লাইনের ধার দিয়ে যেত না। ওর চোস্ত ইংরেজিতে লেখা সার্কুলারগুলো মনে আছে? সেই যে রে ওল্ড গার্ড নাম দিয়ে সাইন করে পাঠাত? তাতে শুধু গোপন আড্ডা আর সিক্রেসির কথা, যেন বিপ্লবী নয়, স্পাইদের সংগঠন! --ওসব থাক, প্রিয়ব্রতর কথা বল। --বলছি, দাঁড়া না। তোকে, আমাকে আর, প্রিয়ব্রতকে আলাদা ইউনিটে দেওয়া হল। প্রিয়ব্রতর ইউনিটের লিডার বিজনদা। অনন্ত সিং জানতে পারল যে প্রিয়ব্রত বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে। মা ভালই পেনশন পেতেন আর ব্যাংকে ওর বাবার কিছু জমানো টাকা ছিল। বিজনদাকে দিয়ে ওকে বলানো হল যে ব্যাংক থেকে দশহাজার টাকা তুলে আনতে। অস্ত্র কিনতে লাগবে। ওর আর মায়ের জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। মাকে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে চ্কে সই করিয়ে টাকাটা তুলতে হবে, মা তো আর ব্যাংকে যাবে না। উনিশ বছর বয়স। প্রিয়ব্রত ডিসিপ্লিন ভেঙে আমার সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইল কাজটা উচিত হবে কি? ততদিনে পার্ক স্ট্রীট পোস্ট অফিস ও রাসেল স্ট্রীটের স্টেট ব্যাংক ডাকাতি দুটো সফল। বুড়োর হাতে লাখদশেক টাকা এসেছে। তবে আবার এই টাকার খাঁই কেন? আমি গিয়ে বিজনদার সঙ্গে দেখা করলাম। সিক্রেসি ভঙ্গ করায় বিজনদা খুব রেগে গিয়ে প্রিয়ব্রতকে খুব বকল। বলল অবিনাশের নির্দেশ সংগঠনে কেউ কোশ্চেন করে না। উনি অগ্নিযুগের পোড়খাওয়া বিপ্লবী। এ টাকাটা চাওয়া হচ্ছে প্রিয়ব্রতর বিপ্লবী কর্মকান্ডের প্রতি ডেডিকেশন কতটা বোঝার জন্যে। কোন চাপ নেই। প্রিয়ব্রত ফিরে যেতে পারে। প্রিয় আমার মত জানতে চাওয়ায় তখন বলেছিলাম যে সংগঠনের আদেশের বাইরে আমার আলাদা করে কিছু বলার নেই। বিপ্লব থেকে বাদ পড়ে যাবে, দুধভাত হয়ে যাবে? উনিশ বছরের ছেলেটা নিজের সতীত্বের পরীক্ষা দিতে পরের দিন সন্ধেবেলা দশহাজার টাকা এনে বিজনদার হাতে তুলে দিল। অনন্ত সিং খুশি। সংগঠনে বিজনদার ধক বেড়ে গেল। কিন্তু এর ঠিক তিন মাস পরে তুই আমি বিজনদা সব্বাই ওই ডাকাতের দল ছেড়ে এম-এল পার্টিতে যোগ দিলাম। সেখানেও প্রিয় বিজনদার সঙ্গে সেঁটে রইল। ইতিমধ্যে চারু মজুমদারের "গেরিলা অ্যাকশন সম্পর্কে কয়েকটি কথা" দলিল বের হয়ে চারদিকে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। বিজনদা আর প্রিয় ওই লেখাটা পড়ে বার খেয়ে চলে গেল সুন্দরবনের গোসাবা এলাকার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে একটা বাঘা জোতদারকে টার্গেট করল। কৃষ্ণপক্ষের রাত। ওরা ছ'জন। বিজনদা, প্রিয় আর চারজন ভূমিহীন ক্ষেতমজুর। পরে জেনেছিলাম যে আসলে ওরা হল তাড়িখেকো লুম্পেন প্রলেতারিয়েত। বিজনদা ও আর একটা ক্ষেতমজুর জোতদারের বাড়িতে দুদিন ধরে বাগানের ঘাস আর আগাছা সাফ করার অছিলায় ভাল করে রেকি করল। তারপর রাত্তিরে দুটো গুপ্তি আর ছুরি ও কাটারি নিয়ে হামলা করে বুড়ো জোতদারকে মাটিতে শুইয়ে দিল। কিন্তু বিজনদার তদন্তে ভুল ছিল। ওরা জানতে পারে নি যে জোতদারের ঘরে বন্দুক আছে। দোতলার বারান্দা থেকে বুড়োর মাঝবয়েসি ছেলে গাদা বন্দুক থেকে ফায়ার করতেই একজন তাড়িখোর লুটিয়ে পড়ল। বাকিরা পালাল। কিন্তু শহুরে ছেলে প্রিয়ব্রত পারল না। অন্ধকারে আলপথে দৌড়তে গিয়ে খেজুর কাঁটা বিঁধে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। এদিকে ওদের বাড়ি থেকে 'ডাকাত পড়েছে ডাকাত পড়েছে' শোর উঠেছে। একটু একটু করে জ্বলে উঠছে কুপি আর লন্ঠন। জ্বলে উঠছে মশাল। ঘর ঘর থেকে লাঠি সোঁটা কুড়ুল নিয়ে লোক বেরিয়ে আসছে দলে দলে। প্রিয়ব্রতরা তিন জন ধরা পড়ে গেল। বিজনদা ও বাকি দুজন পালিয়ে গেল। ওদের ধরে এনে জোতদারের আঙিনায় থামের সঙ্গে বেঁধে শুরু হল গণধোলাই, একেবারে হাটুরে মার। এর মধ্যেই প্রিয়ব্রত চেঁচিয়ে বলতে লাগল-- ভাইসব, ভুল করছ। আমরা ডাকাত নই। আমরা তোমাদের বন্ধু। তাই জোতদারের শত্রু। এই পরিবারটি বছরের পর বছর তোমাদের ঠকিয়েছে। মিথ্যে কাগজ বানিয়ে জমি জিরেত দখল করেছে। তোমাদের ভিটেমাটি ছাড়া করেছে, তোমদের মা-বোনেদের দিকে কুনজর দিয়েছে। তাই ওকে শাস্তি দিতে এসেছিলাম। মার কমতে কমতে বন্ধ হল। দুজন ওদের বাঁধন খুলে দিতে গেল। কিন্তু এর মধ্যে বুড়ো জোতদারটা মুখে রক্ত তুলতে তুলতে নিথর হয়ে গেল আর ওর ছেলেটা প্রিয়র গায়ে গাদা বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ঘোড়া টিপল। ওর বডি যখন পুলিশের গাড়িতে করে ওদের বাড়িতে পৌঁচে গেল তখন সেখানে বিজনদা বা আমি কেউ ছিলাম না। পরেও মাসিমা আমকে বারবার খবর পাঠিয়েছেন। হিম্মত হয় নি ওঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে, ওঁর চোখের দিকে তাকাতে। ভাবতে ভাল লাগে যে এতদিনে উনিও বোধহয় ওর ছেলের কাছে চলে গিয়েছেন। ৯) আমি আবার চা বানাই। শংকর পর পর চারটে সিগ্রেট খেয়ে প্যাকেট শেষ করে ফেলে। আমি চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিই যে এই শেষ, আজ আর নতুন প্যাকেট খোলা হবে না। ওর গলার স্বর ভাঙা ভাঙা। --- আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি রে। বিজনদা নিজেকে দোষ দেয়, কিন্তু ও তো সব সময় আমার মত জানতে চাইতো। আমি কখনই চারু মজুমদারের ওই দলিলের লাইনটা মানতে পারিনি। সমানে তর্ক করেছি। তুই ভাব তো-- যে শ্রেণীশত্রুর রক্তে হাত রাঙায় নি, সে কম্যুনিস্ট নয় -- এটা কোন কথা হল? তাহলে তো মার্ক্স থেকে হো চি-মিন সবার হাত ধুয়ে ধুয়ে ল্যাব টেস্ট করে দেখতে হবে কার হাতে কতটা কিসের রক্ত লেগে আছে! এটা সায়েন্টিফিক লাইন? এ তো সেই কালীপূজো করা বাঙালীর কথা! বিপ্লবের নামে তন্ত্রসাধনা! ----চারু মজুমদারের পাগলামির প্রায়শ্চিত্ত ভদ্রলোক নিজের জীবন দিয়ে করে গেছেন। তার দায় তুই নিজের ঘাড়ে নিয়ে ফালতু অপরাধবোধে ভুগছিস কেন? বাকি লোকজন কী ছিঁড়ছিল? কানু-খোকন- কেশব --কদম? আর জংগল সাঁওতাল? পুলিশের কোডে ফোর কে অ্যান্ড ওয়ান জে! চীন ঘুরে আসা সৌরীন বসু? কাং শেং আর চৌ এন-লাইয়ের কাছ থেকে ঝাড় খেয়েও দেশে ফিরে সেসব সাধারণ কমরেডদের থেকে গোপন করে সিএম এর বন্দনায় নোট্স্ লিখলেন? ---- সে কথা বললে অনেকটা দায় তো চীনা পার্টির ওপরেও বর্তায়। রেডিও পিকিং আর পিপলস্ ডেইলি তো সমানে ভারতের আকাশে 'বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ' বলে চেঁচিয়ে আমাদের মাথা খারাপ করে দিল। কিন্তু আজ আমি করে খাচ্ছি। বৌ-মেয়েদের নিয়ে সংসার করছি। অথচ প্রিয়ব্রত নেই। বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আর আমার সাহস নেই ওঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াবার। নে, এই তো হাল তোর এক ঘোড়সওয়ারের। ভাল করে দেখে নে-- ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে। শংকর হাসল না মুখ ভ্যাংচাল বোঝা গেল না। -- এবার সজলের কথা বলবি? আমাদের নিজে নিজে হাঁপানির ইঞ্জেকশন নেওয়া গুয়েভারার কথা? --- কিছু বলার নেই। ওর গল্পে "মোটরসাইকেল ডায়েরি"র মত কোন রোম্যান্টিক স্বাদ নেই, নাটকীয়তা নেই। বর্ধমানের গলসি না কাঁকসা কোথা থেকে যেন ধরা পড়ে। জেলে মার খায়, ভূখ হরতাল করে। হাঁপানির রোগী। রাত্তিরে টান ওঠে। ভোরবেলায় জেলের হাসপাতালে পাঠানো হয়। ততক্ষণে অক্সিজেনে কম হয়ে যাওয়ায় টেঁসে গেছল। -- ওর বাবা-মাতো আগেই বাংলাদেশে মারা গেছলেন। এখানে জ্যাঠার বাড়িতে থেকে পড়াশুনো করত। আর জ্যাঠার ছিল সুদের আর বন্ধকীর কারবার। সেই নিয়ে একবার চোপা করায় উনি সজলকে বাড়ি থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করেছিলেন। --- হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে ওই বোধহয় সবচেয়ে আগে ঘরের মায়া ছেড়ে পথে নেমেছিল। তোর ফেরারি ফৌজের তিনজন অশ্বারোহীকে তো দেখলি। লিস্টির দুজন মৃত। এবার কাকে কাকে দেখতে যাবি? --- সৌম্যদাকে। --যাস না, গিয়ে লাভ নেই। --কেন? --ভুল দরজায় কড়া নাড়া হবে। -- মানে? --- ও রেনেগেড; বেইমান দলত্যাগী। -- এই তো তোদের দোষ। মতে না মিললেই রেনেগেড! ছাড় তো এসব! বড় হ! সৌম্যদা কি মিদনাপুর জেলে দুবছর কাটিয়ে আসে নি? ও কি তোদের মত ঘর ছেড়ে গাঁয়ে যায় নি? কৃষকের ঘরে একবেলা পান্তা খেয়ে অন্য বেলা জল খেয়ে পেট ভরায় নি? তবে? শংকর আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। -- ওসব ঠিকই বলছিস। কিন্তু ওটাই সবটা নয়। বলছি, শোন তা'লে। সৌম্য বানচোত হচ্ছে একটা ইঁদুর! ধাড়ি ও নয়, নেংটি ইঁদুর। -- কী যা তা বলছিস? -- ঠিকই বলছি রে! দেখ, জাহাজ ডোবার সংকেত সবার আগে কারা টের পায়?--ইঁদুরেরা। সৌম্য হল সেই জাত। ও আগেই টের পেয়েছিল যে আমাদের জাহাজ ডুবছে। আমরা কিছুই বুঝিনি। তখন চাকুলিয়া আর মাগুরজানে মিলিটারি পুলিশ ক্যাম্পে সফল অ্যাকশনের আনন্দে রায়বেঁশে নাচছি। ও বাড়িতে খবর পাঠাল। বাবা-কাকারা পুরনো কংগ্রেসি। সেখান থেকে পলিটিক্যাল প্রেশার এল। নিজে জেলারের সঙ্গে লাইন করল। একদিন দেখলাম ও আমাদের সেল থেকে সরে গেছে। তখনও বুঝতে পারিনি। ওর কী হবে ভেবে ভয় পেয়েছিলাম। পরে দেখলাম ও জেলের রাইটার না কি যেন হয়ে গেছে, গ্র্যাজুয়েট ছিল তো! হাতখরচা পেল, ভাল খাওয়াদাওয়া। -- সে কি রে! সৌম্যদা রাইটার? -- আশ্চর্য্যের কি আছে? আসলে বয়সে বড় বলে দাদা বলতাম, সম্মান দিতাম। কিন্তু ও ছিল হামবড়া কথার ফুলঝুরি। চটকদার ও হাসির কথা বলে আমাদের মত কমবয়েসিদের ইয়ার হয়ে যেত, কিন্তু মানুষটা ছিল ভেতরে ভেতরে ছ্যাবলা। আমি হেসে ফেলি। -- ঠিক বলেছিস , ও ছিল মহা বাতেলাবাজ।। সেটা মনে আছে? সেই যে ওদের পোড়ো বাগানে আর ক্ষেতে কাজ করতে কিছু সাঁওতাল লেবার এসেছিল আর ও ইউনিটের আড্ডায় বলল-- সাঁওতালদের বলেছি দিনের বেলায় ঠেসে ঘুমোতে আর রাত্তিরে আমাদের মোমবাতির আলোয় তির চালানো শেখাতে। মজুরি পুরো পাবে। এবার দুটো মাস অপেক্ষা করুন কমরেড্স্। মাত্র দুটো মাস। তারপর একদিন সকালবেলায় কোলকাতার ভদ্রজনেরা চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে খবরের কাগজ খুলে চমকে উঠবেন। লুঙ্গিতে গরম চা ছলকে পড়বে। সমস্ত কাগজের প্রথম পাতায় ব্যানার হেডলাইন--" নকশালবাড়ির তির নাকতলায়"। ও আমাকে টিউশন পাইয়ে দিয়েছিল বাতেলা মেরে। আমাকে গুরুমন্ত্র দিল-- বেশি পড়াবে না। ঘন ঘন টেস্ট নেবে। সেই সময়টা ছাত্রের মার সঙ্গে গল্প করে কাটাবে। ব্যস্, কেল্লা ফতে। টেস্টের ভয়ে ছাত্র নিজেই কষে পড়বে আর নাম হবে তোমার। এদিকে বাচ্চার মা খুশি হলে পাবে মুখরোচক সব জলখাবার। আর মনে আছে --প্রেসি ও যদুপুরের কমরেডরা রিসার্চ করে এমন বোম বানিয়েছে যে তুমি আমি পোঁদ চেপে বসলেও কিছু হবে না। কিন্তু সিপিএম এর দীপু বসল কি---। কিন্তু সেবার বেলেঘাটায় খুব মার খেল না সিপিএম এর হাতে! সেই যে রে ---সিপিএম এর জাঁদরেল নেতা কে জি বসুর শালা খোকন নকশাল হয়ে নিজের জামাইবাবুকেই সব জায়গায় বেয়াড়া সব কোশ্চেন করে কাঠি করতে লাগল--- তখন বেলেঘাটার সিপিএম ক্যাডারা দুজনকেই পেঁদিয়ে বিন্দাবন দেখিয়েছিল। তখন সৌম্যদারও দুটো দাঁত পড়ে গেছল চ্যালাকাঠের বাড়ি খেয়ে। --- আর বামপন্থী নাটক করার সময়েও নিজেই পরিচালক আবার নিজেই হিরো। --- ও হো! তোর সেই খার অ্যাদ্দিনেও যায় নি? সেই চালের ব্ল্যাক ধরা নিয়ে পথনাটিকা! বাসভাড়া ও প্রত্যেক দিন পাঁচটাকার কড়ারে পেশাদার নায়িকা এলেন। রিহার্সাল চলছিল। মেয়েটার ইচ্ছে ছিল বিপ্লবী হিরোর রোল তুই করবি, কিন্তু শেষ সময়ে--। --ছাড় ওসব কথা। মোদ্দা ব্যাপার হল সৌম্য আদৌ অশ্বারোহী নয়। ও হল খচ্চরবাহন। ছোটবেলার প্রেমিকাকে বিয়ে করে 'সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন' গোছের সংসার করছে। আমার পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার কোন ইচ্ছে নেই। --- তা বেশ। কিন্তু একটা ব্যাপারে ধন্দ মিটছে না। --কোন ব্যাপারে? -- আমার ইংরেজির মাস্টারমশায় দীনেন স্যার! তুই বলছিস, বিজনদাও বললো, মানে ঘটনাটা সত্যি। কিন্তু কেন ঘটলো তার একটা ব্যাখ্যা থাকবে তো? অমন সাদামাটা নিরীহ গোছের ভ্দ্রলোক কেন দলত্যাগী বলে চারটে ছেলেকে মৃত্যুদন্ড দিলেন? কেন নিজের প্রাক্তন ছাত্রের নামে মিথ্যে ডায়েরি করলেন? এটার কোন ব্যাখ্যা তোদের কাছে আছে? ওই বেড়ালের পোঁদে ফুঁ দিয়ে বাঘ বানানো ঠিক যুক্তি হল না। --- আছে, ব্যাখ্যা আছে। কাকোল্ড কথাটার মানে জানিস তো? -- জানি, যার স্ত্রী অন্যের প্রেমিকা। ওই খানিকটা কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়া গোছের সিনড্রোম। -- উনি ছিলেন কাকোল্ড। -- সে একটা কোলকাতা ছাড়ার আগে শুনেছিলাম বটে! ওঁর অল্পবয়েসী স্ত্রীকে নিয়ে অনেকে রসালো মন্তব্য করত, ছেলেরাও। আমার রুচিতে বাঁধত। হয় প্রতিবাদ করেছি, নয় স্থানত্যাগ করেছি। কিন্তু একজন ক্রিশ্চান স্যার ছিলেন, গ্রামার পড়াতেন। জ্যাকব সার। উনি বৌদিকে নিয়ে কবিতা লিখতেন শুনেছি। ও'রম একটু আধটু ফ্লার্ট! -- ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়েছিল। রোজ ঘরে এসে সময়ে অসময়ে সহকর্মী বৌকে লাইন দিচ্ছে, সবার সামনে। আর স্ত্রীও প্রশ্রয় দিচ্ছেন --কাঁহাতক সহ্য করা যায়। কিন্তু বৌদি বেশ টেঁটিয়া। একদিন স্বামী-স্ত্রীর তিক্ত তর্কাতর্কির পর উনি টিক-২০ খেলেন। এমন মেপে খেয়েছিলেন যে মরবেন না, কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হবেন। খবর শুনে গিয়ে দেখি স্যার ময়লা গেঞ্জি আর ধুতি পরে তালপাতার পাখা নেড়ে উনুন ধরাচ্ছেন আর ছোট ছোট দুটো বাচ্চা খিদেয় কাঁদছে। খুব খারাপ লাগল। গিয়ে আমার গার্লফ্রেন্ডকে পাঠালাম। ও গিয়ে স্যারকে সরিয়ে ভাতে ভাত, ডাল আর দুটো তরকারি রান্না করে দিল। এই ঘটনার পর স্যার গুম মেরে গেলেন। বৌদি হাসপাতাল থেকে ফিরে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। জ্যাকব স্যারের সঙ্গে এখানে ওখানে গিয়ে আলাদা করে দেখা করতে লাগলেন। আর দীনেনস্যারের ঘর-গেরস্তি সবার কাছে হাসির বস্তু হয়ে দাঁড়াল। এই হিউমিলিয়েশন দুর্বল ব্যক্তিত্বহীন পুরুষের অপবাদ বা ইঙ্গিত ওঁর ভেতরে বারুদ পুরে দিল। ফলে রাজনৈতিক হিংস্রতার দিনে যখন ওঁর কাছে ডিসিশন চাওয়া হল উনি একেবারে নির্মম এক অবতারের রূপ ধরলেন। নৃসিংহ অবতার। না, উনি নিজের কাজের জন্যে এতটুকু অনুতপ্ত ছিলেন না। কিন্তু ভায়োলেন্স এক দুধারি তলোয়ার--সেটা বুঝতে পারেন নি। তাই সিদ্ধার্থ রায়ের যুব কংগ্রেসের হামলার দিনে চুপচাপ সপরিবারে পাড়া ছেড়ে যাওয়ার সময় ওঁর চোখের মধ্যে ঠিক আতংক নয়, কেমন হতাশার ছাপ ছিল। ১০) হাতে রইল পেনসিল ---------------------- হারাধনের ছিল দশটি ছেলে। নয়জন গেল কালের কবলে-- এক এক করে। শেষ ছেলেটি বোধহয় যমের অরুচি, তাই বেঁচেবর্তে রইল হারাধনের বংশের কুলপ্রদীপ হয়ে। কিন্তু সে পিদিমেরও তেল ফুরিয়ে গেছে। তাই যা হবার তা হল। প্রথমে ভেউ ভেউ করে খানিক কেঁদে নিল। তারপর ?--' মনের দুঃখে বনে গেল রইল না আর কেউ'। সে না হয় হল। কিন্তু আমরা ছিলাম আটজন, আট অশ্বারোহী। আমাকে বাদ দিয়ে ওরা সাতজন। না, মনের দুঃখে বনে যাই নি। এখনও ব্যাট করছি। কিন্তু সে তো টেল-এন্ডারের ব্যাটিং! একে নাইট -ওয়াচম্যান।তায় ফলো অন বাঁচানোর চাপ।তাই অন্যদিকে কে কে টিঁকে আছে খোঁজ নিতে বেরিয়েছি। কেন? উত্তর নিজেরও জানা নেই। শুধু ফলো অন নয়, একেবারে ইনিংস ডিফিটের ভয়। স্ট্র্যাটেজি যে ভুল ছিল সে তো বহু আগেই বুঝে গেছি। আসলে ক্যাপ্টেন টস জেতায় আমরা ভেবেছিলাম যে খেলাটাই জিতে গেছি। তো সাতজনের খোঁজ পেয়েছি। আসলে তিনজন। বিজনদা, শংকর আর বিমলে। দুজন বীরগতি প্রাপ্ত হইয়াছেন-- সজল ও প্রিয়ব্রত। একজন রেনেগেড আখ্যা লাভ করিয়াছেন--সৌম্যদা। রইলাম শুধু আমি। আমি মুক্তপুরুষ।বৌ ও দুইসন্তান আমার সম্বন্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ করিয়াছে। ফলে মন-বলে-আর-কেন-সংসারে-থাকি কেস! কিন্তু একী হইল! ব্যাংকে কর্ম করিয়াও আমি পাটিগণিতে কাঁচা! যাদববাবু বা কে সি নাগ-- উভয়েরই স্নেহ হইতে বঞ্চিত। দুই আর দুইয়ে কত হয় জানিতেও ক্যালকুলেটরের বোতাম টিপিতে হয়! তাই খেয়াল করি নাই যে সাকুল্যে সাতজন হইয়াছে। একজন এখনও বাকি। অলকেশ। আমাদের সর্বকনিষ্ঠ ঘোড়সওয়ার। সে আজ কোথায়? শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। এতদিনে। এবার তো নভেম্বরের বিকেলেও সোয়েটার চড়াতে হয় নি। এখন ক্রিসমাস হাতছানি দিচ্ছে। একটা চোরাগোপ্তা উৎসব উৎসব ভাব। সূর্যডোবার আগেই আমার দু'কামরার আস্তানার দরজায় তালা ঝোলাই। হেঁটেই চলে যাবো মেট্রো স্টেশন গীতাঞ্জলি।হাজরায় একবন্ধুর ঠেকে ডানহাতের ব্যাপার ও কিছু কাজের কথা সেরে ফিরতে হবে বিজনদার ঘরে। একটা প্যাকেট নিয়ে আসতে হবে। কিসের প্যাকেট খোলসা করে বলে নি। মরুক গে! কিছু একটা হবে। তবে আমার মতলব আলাদা। আমি খোঁজ চাই অলকেশের। বিজনবুড়োকে খোঁচালে কোন সুলুক সন্ধান নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। পকেটে চাবি, মোবাইল আর এটিএম কার্ড আছে তো! হাত ঢুকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। সিঁড়ি দিয়ে নামছি কি রামবিরিজের সঙ্গে দেখা। এই সাদামাটা ফ্ল্যাটবাড়ির একমাত্র সিকিউরিটি গার্ড ও ম্যানফ্রাইডে। আমাকে দেখলেই ওর মুখে কেমন একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। ছোটবেলায় যুগান্তর পত্রিকায় কাফি খাঁর কার্টুনে এমনি এক মুখভঙ্গী দেখেছিলাম --নাপিতের চেহারায়। তার সঙ্গে ছিল দু'লাইন ছড়া। "ক্ষুর ঘষন্তি ক্ষুর ঘষন্তি চিড়িক চিড়িক পানি, তোমার যা মনের কথা সে তো আমি জানি"। হতভাগা! ও কী জানে? আমার মনের কথা ও কী জানে!! --চললেন রমেনবাবু? এগারটার মধ্যে ফিরবেন তো? -- মানে? -- জাড়া বহোত হ্যায়। আমি এগারটার পরে গেটে তালা লাগিয়ে শুয়ে পড়ি। বুড়ো হয়েছি। ঠান্ডা সয় না। তবিয়ত খারাপ হয়ে যায়। -- চিন্তা কর না। তুমি তোমার হিসেবে শুয়ে পড়। আমি এগারটা বাজলে অন্য বাড়িতে থেকে যাবো। -- রাগ করলেন বাবু? আসলে--। আমি উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে যাই। এসব ওর ভড়ং। সোসাইটির প্রেসিডেন্টের আশকারা পেয়ে মাথায় চড়েছে। ও অন্যদের গাড়ি ধুয়ে দেয়। বাজার করে দেয়।বকশিশ পায়। আমার ওসব বালাই নেই। ফলে ওর চোখে আমি মহাফালতু লোক। আদ্দেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছি সামনেই শ্রীগুরু আশ্রমের গেট। আর একটু এগোতেই থমকে দাঁড়াই। ওই ছোট্টমত ক্লাবের সামনে এই ভিড় কিসের? বর্তমান সরকারের বদান্যতায় ক্লাবে ক্লাবে ছয়লাপ। গলিতে গলিতে ক্লাব। সবাই সগর্বে ঘোষণা করে যে ওরা সরকারের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের সৌজন্যে দু'লাখ টাকা করে পেয়েছে। ভিড়টা অমনি এক ক্লাবের বিপরীতে বাঁধানো চাতালের সামনে।কিছু চ্যাংড়া ছোঁড়া কাউকে ঘিরে হো-হো করে হাসছে। সঙ্গে স্ট্যান্ডের জনাচারেক রিকশাওয়ালা। আমি পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করি। তবু দাঁড়িয়ে পড়তে হল। কানে এসেছে এক মহিলার কন্ঠস্বর। উনি কাউকে অনুনয়- বিনয় করছেন। কিন্তু ওই গলার স্বর যে আমার চেনা! ভিড়ের মাঝে উঁকি মারি। হ্যাঁ, অনুনয়মাখা গলার স্বরের মালকিনকে আমি চিনি। আমার ফ্লোরে একটা ফ্ল্যাট বাদ দিয়ে দ্বিতীয় দরজাটি। দরজায় কার্সিভ হস্তাক্ষরে লেখাঃ কৃষ্ণা মাইতি, এম এ ; সুধীর মাইতি, পি এইচ ডি। উঠতে নামতে চোখাচোখি হয়েছে, আলাপ হয় নি। কোন স্কুলে পড়াতে যান। একবার আমার দরজায় বেল টিপে আমার ইস্ত্রি করা কাপড় দিয়ে গেছিলেন, আর একবার ডাকে আসা কিছু কাগজপত্র। সেদিন এসেছিলেন জানতে যে ফ্রিজ সারাইয়ের কোন দোকানের ফোন নম্বর জানা আছে কি না। রামবিরিজের সূত্রে খবর পেয়েছি যে সুধীরবাবু হটাৎ একদিনের জ্বর ও মাথাব্যথায় গত হয়েছেন। বছর দুই হল। উনি এখন একাই থাকেন। ছেলে মুম্বাইয়ে। কিন্তু ওঁর গলার স্বর! নারীকন্ঠের হিসেবে একটু মোটা ,তবে জোয়ারিটা বড্ড মিঠে। তাই ভিড়ের মধ্যে ওঁর অনুনয়ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু উনি বারবার রিকোয়েস্ট করছেন কাকে? ওই ছোকরাগুলোকে? কেন? ওরা কি ওঁকে ভরা বিকেলে খোলা রাস্তায় বিরক্ত করছে? কালে কালে হল কী! প্রতিবেশিনীর প্রতি কর্তব্যবোধে সচেতন হয়ে এগিয়ে গেলাম। কী হয়েছে, ভাই? যা হয়েছে তার মাথামুন্ডু বুঝতে বেশ সময় লাগল। শানবাঁধানো রকে বসে এক থুড়থুড়ে বুড়ি। ধপধপে সাদা চুল ছোট করে ছাঁটা। পরনে সাদা থান, গায়ে একটা হাল্কা উলের ব্লাউজ। পাশে একটা থলি মত, আর আধখালি জলের বোতল। একে চলতে ফিরতে কয়েকবার দেখেছি। সকাল বেলা হাঁটি হাঁটি পা পা করে রোয়াকে এসে বসেন আর সূর্য ডুবলে পরে উঠে কোথায় যেন চলে যান। কারো সঙ্গে কথা না বলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন। চারপাশের লোকজন দোকানপাটের বিষয়ে যেন উদাসীন ।কখনও হাসতে দেখিনি। এতদিন পাগল ভেবে এড়িয়ে গেছি। তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছেন আমার প্রতিবেশিনী। সামনে নামিয়ে রেখেছেন এক বোতল দুধ, কিছু ফল আর প্লাস্টিকের টিফিন কৌটোয় কিছু রুটিতরকারি। কিন্তু বৃদ্ধা নির্বিকার পাথরপ্রতিমা। --মাসিমা, কিছু মনে করবেন না। রোজ দেখি শীতের মধ্যে একা একা এমনি খোলা জায়গায় বসে থাকেন। এই উলের ব্লাউজটা নিন, বেশ গরম। আর এই প্যাকেটে দুটো শাড়ি। বৃদ্ধা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। --- মাসিমা, আমি আপনার মেয়ের মত। প্লীজ, এগুলো নিন। আর এই এক প্যাকেট বিস্কুট, সামান্য ফল, আর এই টাকাটা রাখুন। টাকার কথা কানে যেতেই বৃদ্ধা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আধবোজা উনুনে যেন আবার আঁচ বেড়ে উঠছে। জোড়া হাত কপালে উঠলো। --ধন্যবাদ! আপনি কে জানি না। কিন্তু এসব কিছুই আমি নিতে পারবো না। দয়া কইরা ফেরত নিয়া যান। --কী বলছেন মাসিমা? -- ঠিকই শুনেছেন। আপনার দয়া দেখানোর কুনো দরকার নেই। আমি খুব ভালো আছি। আপনে যান। আমার প্রতিবেশিনী কৃষ্ণা ম্যাডাম এই রূঢ় প্রত্যাখানে অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক দেখছেন। আমাকে যেন দেখেও দেখলেন না। শেষে তামাশা দেখা ছেলের দলকে ধরলেন। -- ভাই, আপনারা একটু বোঝান না! উনি কেন অমন করছেন? --- কাকিমা, কোন লাভ নেই। অমন আড়বুঝ বুড়ি এ তল্লাটে নেই। নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। উনি বোঝেন না। -- উনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি কি অন্যায্য কিছু বলেছি? আজ আমার স্বামীর বার্ষিকী। এই সময় প্রতি বছর এসব করে থাকি। এমন অভিজ্ঞতা কখনও হয় নি। --- আরে উনি ওইরকমই। এবার আমি একটু নাক গলাই। -- শুনুন মাসিমা। আপনি থাকেন কোথায়? বাড়িতে কে কে আছে? রোজ ঠান্ডায় এমনি করে খোলা জায়গায় বসে থাকলে নিমোনিয়া হতে পারে। চলুন,আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি। -- ধন্যবাদ! আমার কারো সাহায্যের দরকার নেই। এসব হইল জুতা মাইরা গরু দান। এবার আমার হতভম্ব হওয়ার পালা। --মানে? -- আপনেরা কিছুই জানেন না। এই ছোকরাগুলান জানে। ওই যে রাস্তার অইপারে যেখানে অগো নতুন ক্লাব ঘর উঠতাছে--সেইটা ছিল আমার জমি। সোয়ামি নাই, ছেলে এখানে থাকে না। কিন্তু অরা আমার ঘর ভাইঙ্গা দিছে, জমিন কাইড়া নিসে। আমারে নিঃস্ব করছে। এখন আপনেরা আইছেন দয়া দেখাইতে? কুনো দরকার নেই। আমি মরলে ওই ফলমূল ট্যাহা দিয়া আমার ছেরাদ্দ কইরেন, এখন যান। আমি শ্বাস টানি। একনজর ছেলেগুলোকে দেখি। ওরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে জরিপ করছে। আমি মাপা পায়ে ওঁর কাছে গিয়ে কৃষ্ণাকে সরিয়ে উবু হয়ে বসি। --মাসিমা, আপনার কাছে ওই জমির কোন কাগজ বা দলিল আছে? ধরেন কর্পোরেশনে ট্যাক্সের রসিদ? যা দেইখ্যা সবার বিশ্বাস হইব যে জমিনটা আপানর ছিল। বলামাত্র ক্লাবের ছেলেগুলো হা-হা করে হেসে উঠল। -- আপনে কি উকিল নাকি মেসোমশায়? ওসব আগেই অনেকে চেষ্টা করেছে। ওঁর গল্পটা সত্যি নয়। এসব বুড়ো বয়সের ভীমরতি। আমি মুচকি হাসি। ওদের দলটাকে স্ক্যান করে চশমা পরা ছেলেটিকে বলি-- না, উকিল-টুকিল নই। জানতে চাইছি ব্যাপারটা কী? তোমাদের সঙ্গে এনার কিসের ঝগড়া? ওদের চোখের সম্মিলিত চাউনি নরম হয়। চশমা পরা ছেলেটি বলে --এবার লাইনে এসেছেন কাকু। আমাদের দিকটা শুনে নিন। আমরা অত খারাপ লোক নই। -- না কাকু! এই দিদার জমি বা এক ইঁটের খুপরি ঘরটি ছিল সরকারি জমির উপর জবরদখল করে। তাই ওঁর কাছে কোন কাগজ বা পাট্টা নেই। থাকতে পারে না।সে দিক দিয়ে দেখলে ওই জমির উপর ওঁর কোন আইনি হক নেই। -- আপনিই বলুন কাকু, যখন করপোরেশন রাস্তার উপর জবরদখলি দোকান ভেঙে দেয় তখন কিসের জোরে ভাঙে। বে-আইনী বলেই তো! আমি গলা খাঁকরি দেই। -- এটা কি সত্যি যে তোমাদের নতুন ক্লাবঘর ওই মহিলার ভিটের ওপর তৈরি হচ্ছে? যদি তাই হয় সেটাও তো একরকম সরকারি জমিতে দখল, বেআইনি ভাবে। তাই তো? -- না কাকু! আমাদের পাট্টা আছে। ওই জমির টুকরোটি আমাদের ক্লাব সরকারের থেকে লীজ নিয়েছে, রেজিস্ট্রি করে। পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে। হ্যাঁ, এই সরকারের থেকে যে দু'লক্ষ টাকা অনুদান পেয়েছি তার থেকেই, বাকিটা ক্লাবঘর তৈরিতে লাগছে। -- কিন্তু জবরদখল জমিবাড়ি ভেঙে দিলেও আইনি ক্ষতিপূরণ দেবার বা বা পুনর্বাসনের ব্যব্স্থা আছে না? আর এই দিদার বয়েসটা দেখ! -- বলেছি না আমরা অমানুষ নই। আসুন, ওই দেখুন, পেছনের জমিতে অ্যাসবেস্টসের ছাদ আর এক ইঁটের দেওয়াল দিয়ে দিদার জন্যে আমরা একটা থাকার জায়গা করে দিয়েছি। ক্লাব থেকে তার টেনে একটা বাল্ব ও লাগিয়ে দিয়েছি। দেখবেন আসুন। ওরা খুব একটা বাড়িয়ে বলেনি। ঘরের মধ্যে একটি নেয়ারের খাটিয়ায় বিছানা করে কম্বল পেতে মশারি টাঙিয়ে দেওয়া আছে, কোণে একটি জলের কুঁজো ও গেলাস। কিন্তু দিদা যে ওই ঘরে যেতে চায় না! ফিরে যাই ওই বৃদ্ধার কাছে। -- মাসিমা, ছেলেগুলো আপনার নাতির মত। আপনাকে ভালবেসে ভাল ব্যবস্থা করেছে। কেন অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে আছেন। আমার হাত ধরুন। সন্ধ্যে হয়ে এল। ঠান্ডা বাড়ছে, চলুন-- আপনার ঘরে নিয়ে যাই। উনি আমার দিকে এক অদ্ভূত চোখে তাকিয়ে রয়েছেন, পলক পড়ছে না; এক মিনিট । শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-- তোমারে বুঝাইতে পারি না। আমার ভিতরটা জ্বইল্যা যায়। ওরা ভাল ঘর ভাল বিছানা দিছে। কিন্তু সেই ঘরে আমার সোয়ামির গায়ের গন্ধ কই? আমার ছেলের ছোটবেলার মুতের কাঁথার ঝাঁঝ কই? কইলাম তো, কারো দয়া চাই না। এই বুড়া হাড় কয়খান জুড়াইতে আর বেশি দিন নাই। পারলে আমারে আগের জায়গাতেই মরতে দাও। আর না পারলে দূর হইয়া যাও, মাগনা কুয়ারা কইরো না! ১১) নীল সাদা শাড়ি, নীল রঙা ডায়েরি ----------------------------------- সেদিনের সন্ধ্যেতে এক অচেনা বুড়ির বেয়াড়া জিদের কাছে হার মেনে ঘরে ফিরে এসেছিলাম। রাত্তিরে খেতে ইচ্ছে করছিল না।মুখের ভেতরে লংকাবাটার স্বাদ। কেন যে মানুষকে সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়! বুড়ি বৈতরণী পেরোবে বলে এক পা বাড়িয়েই রয়েছে , তবু জমি নিয়ে জিদ গেল না। খামোকা কষ্ট পাচ্ছে। শুধু বেয়াড়া জিদের জন্যে। ফালতু ইমোশনাল অত্যাচার। একটুকরো জমি মানে একটুকরো জমিই, তার বেশি কিছু নয়। তবু তার মধ্যে ও সোয়ামির গায়ের গন্ধ, খোকার ছোটবেলার পেচ্ছাপের ভিজে কাঁথার ঝাঁঝালো গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছে। যত্তসব পাতি সেন্টু। ঠিক যেন নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরের চাষী। ওদেরও সেই পাতি সেন্টিমেন্ট। আরে বাবা, তখন যদি টাটকে ওরা হাসিমুখে জমি দিয়ে দিত তো আজকে সিঙ্গুর আর অজ পাড়াগাঁ না থেকে একটি চিত্তরঞ্জন বা দূর্গাপুর, নিদেনপক্ষে একটা বেলঘরিয়া -টিটাগড় হয়ে যেত। পাতি সেন্টিতে সুড়সুড়ি দিয়ে বিরোধীরা ওদের হাতে তামাক খেয়ে গেছে, দোষ দেবে কাকে! ওরা তো আর পোঁছেও না। এখন মরগে যা! 'ভালো রে ভালো করে গেলাম কেলোর মার কাছে, কেলোর মা বললে আমার ছেলের সঙ্গে আছে। যখন তোরা এত বছরের পুরনো দল ছেড়ে মা-মাটি-মানুষের নামে নেচে উঠেছিলি তখনই বলেছিলাম --আজ বুঝবি নে, বুঝবি কাল, পোঁদ চাপড়াবি পাড়বি গাল'। এসবই হল কালীদার কথা। আমাদের বাঙালপাড়ায় একজন খাস ঘটি। মোহনবাগানের সাপোর্টার।ও নাকি এ পাড়ার আদি বাসিন্দা কোন খানদানি জোতদার পরিবারের ছেলে। মাথাটা গেছে। কিন্তু আমরা ভালবাসি, কালীদা বলি। কেউ ওকে পাগল বলে খোঁচালে তাকে মারতে বাকি রাখি। কষে গাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিই। সে যুগে কাকদ্বীপ না কোথাকার সম্পন্ন বাড়িতে ওর বিয়ে ঠিক হয়। তখন ওর বয়েস বাইশ, বিয়ের আসরে ও চেঁচিয়ে ওঠে-- এ বিয়ে করবুনি, লিচ্চয় করবুনি। এরা ঠকিয়েছে। আমাকে অন্য মেয়ের ফটু দেখিয়েছিল। মেয়ের বাবা দিব্যি গেলে বললেন-- আমার একটিই মেয়ে। ওর ফটুই দেখেছিলে বাবা। হ্যাঁ, সে ফটু কোলকেতার পার্ক স্ট্রিটের সায়েবি দোকানে তোলা, সেটা মানছি। সবার পেড়াপিড়িতে কালীদা বিয়ে করে ফিরে এল বটে, কিন্তু গুম মেরে রইল। তারপর মাথায় ছিট দেখা দিল। বৌ বলল এসব আমাকে লুকনো হয়েছে। আমিই ঠকেছি। তারপর গয়নাগাটি কাপড়জামা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। বরাবরের মত। এবার মাথার ছিট বিঘৎখানেক থেকে গজখানিক হল। পাবলিক মেনে নিল যে কালী হল মহাপাগল। কারণ ও ছিল ছোটদের খিস্তিমাস্টার। পয়সা নিয়ে খিস্তি করতে শেখাত। আমি ছিলাম এক মনোযোগী ছাত্র। আমতলার ঠেকে আসত কালীদা। এসেই হাত পাতত-- দে না চার আনা। এক প্লেট ঘুগনি খাব, অধীরের দোকানের। বড় ভালো বানায়। কেউ প্রথমে গা করল না দেখে বলল, --রমেন কোথায়? ও তোদের মত না, ঠিক পয়সা দেবে। সবাই হেসে উঠত। -এই যে কালীদা তোমার রমেন। তোমাকে দেখে মুখ লুকোচ্ছে। অগত্যা আমাকে এসে কালীদার হাতে চার আনা বা পঁচিশ নয়া পয়সা গুঁজে দিতে হত। একগাল হাসি নিয়ে কালীদা শুরু করল। --এই ধাঁধাটা বল দেখিঃ হেসে হেসে গেল মেয়ে পরপুরুষের পাশে, দেয়ার সময় উহু-উহু, দেয়া হলে হাসে। আমাদের বাকরুদ্ধ অবস্থা দেখে মিটিমিটি চোখে বলল--যা ভাবছিস তা নয়, এ হল শাঁখারির শাঁখা পরানো। মেয়েরা হাসি মুখে শাঁখা পরিয়ে দিতে বলে। কিন্তু হাত মুচড়ে একটু একটু করে চাপ দিয়ে পরানোর সময় লাগে বই কি, হয়ে গেলে খুশ। --রাখো তো কালীদা! ওসব মা-ঠাকুমার যুগের গপ্পো। আজকাল কোন মেয়ে শাঁখা পরতে শাঁখারির কাছে যায়? কালীদা দমে না। --বেশ, এটা বল। দেখেছি মায়ের, দেখেছি বোনের, শালীরও হয়েছে দেখা, কিন্তু বৌয়ের দেখতে যে পাব কপালে নেইকো লেখা! --কী আজেবাজে ঘটি জোক্! -- পারলি না তো! শোন। উত্তরটা হল -বিধবার নিরাভরণ হাত। আমরা মায়ের বোনের বা শালীর বৈধব্যও দেখতে পারি। কিন্তু বৌয়ের বৈধব্য? দেখতে হলে তো আগে আমাকেই পটল তুলতে হবে। কী যে ভাবছি! কোন মাথামুন্ডু নেই। রোদ্দূর উঠেছে, ঘুলঘুলি দিয়ে উঁকি মারছে। খিদে টের পাচ্ছি। কাল রাত থেকে খাইনি যে! এবেলা মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিলেই হয়। রাত্তিরে মোড়ের থেকে রুটি আলুরদম আনিয়ে নেবখন। \দরজায় মৃদু খটখট। সাতসকালে কে এল রে বাবা! লুঙি ঠিক করে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে পড়েছি। প্রতিবেশিনী কৃষ্ণা মাইতি পি এইচ ডির বাঁ হাতে টি পট, ডান হাতে একটি ব্রাউন প্যাকেট। আচ্ছা, ফরসা মেয়েদের নাম কেন কৃষ্ণা হয়, আর কালোদের গৌরী? আর মাথায় ঘুরপাক দিয়ে বেজে উঠল ছেলেবেলার রেডিওতে শোনা অনুরোধের আসরের গান-- নীল শাড়ি তার অঙ্গে যেন আকাশ গঙ্গা ঝরা! উনি বেশ সপ্রতিভ ভাবে প্রায় আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। -- আচ্ছা লোক তো মশাই। দরজায় কলিং বেল লাগান নি। সকালে একটি ছেলে, সম্ভবতঃ ক্যুরিয়র, ঠক ঠক করে হার মেনে এই প্যাকেটটা আমার ফ্ল্যাটে ছেড়ে গেছে। আর দুটো কাপ নিয়ে আসুন তো। এই শীতের সকালে একাসঙ্গে একটু চা খাই। আমার আবার একা একা চা খেতে ভালো লাগে না। সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারি না, বুঝতেই পারছেন। কিন্তু কাল থেকে তো আমরা বন্ধু হয়ে গেছি তাই না? আমি বিনা বাক্যব্যয়ে আদেশ পালন করি। (কে আবার বাজায় বাঁশি, এ ভাঙা কুঞ্জবনে!) কিন্তু প্যাকেটের মোড়ক খুলে চমকে উঠি। একটি নীল রেক্সিনে বাঁধানো ডায়েরি, সঙ্গে বিজনদার হাতে লেখা চিরকুট। রমেন, তোর শেষ অশ্বারোহীর ডায়েরি। এতদিন আমার কাছে রাখা ছিল। তোকে দিয়ে হালকা হলাম। বিজনদা। ডায়েরির প্রথম পাতাতেই একটা আড়াআড়ি করে লেখা নোটঃ "এই ডায়েরি যেন আমার মৃত্যুর পরে কমরেডরা পড়ে। " অলকেশ রায়চৌধুরি, ১৭/১২/১৯৮৫ ----- প্রথম ভাগ সমাপ্ত---

45

8

Ranjan Roy

জনৈক কাপুরুষের কিস্সা

জনৈক কাপুরুষের কিস্সা ---------------------------- ১) শনিবারের বারবেলা। দেবাংশু এসব মানে না। কিন্তু বৌ-মেয়ে মানে। তাই ঘর থেকে বেরোনোর সময় চেপে গেল। এই দক্ষিণ দিল্লির আস্তানা থেকে কোথাও একচক্কর ঘুরে আসতে গেলে শত বাধানিষেধ। মেয়ে আর বৌয়ের রে-রে করে যুগলবন্দী শুরু হয়ে যাবে। --তুমি একা বেরোবে না। তুমি অন্যমনস্ক থাক। রাস্তা পেরোনোর সময় তোমার মাথায় ভাবের ঘুঘু ডাকতে থাকে। কোন দিন অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।একা একা কোত্থাও ঘুরবে না। এটা তোমার কোলকাতা না। --শনিবার বেরোবে। আমাদের সঙ্গে, ড্রাইভার নিয়ে। অটো বা মেট্রো নয়। হাঁটু নিয়ে সমস্যা হতে কতক্ষণ? বয়েসের হিসেবে চল। বিরক্ত হয়ে ও চুপ করে যায়। -- দেখ বাবা, আমরা তোমার ভালর জন্যেই বলছি। -- বটেই তো! -- সারাজীবন নিজের ইচ্ছেমত চলে আমাদের অনেক জ্বালিয়েছ, এখন মেয়ের অফিসে টেনশন চলছে। তুমি আর নতুন করে কিছু--। --না না; ঠিক আছে। শনিবার রোববার ছাড়া বেরোব না আর তোদের সঙ্গেই বেরোব। ঠিক আছে? -- বাবা , মনখারাপ কর না। তোমার জন্যে অ্যামাজন এ নতুন দুটো বই আনতে দিয়েছি। আর শনিবার একটা মলে যাব। ওখানে তোমার জন্যে এইচ অ্যান্ড এম থেকে তোমার কিছু জামাকাপড় কিনে দেব। এগুলো সব পুরনো আর জ্যালজেলে হয়ে গিয়েছে। আর বিগ চিল বলে একটা রেস্তোরাঁয় দারুণ লাঞ্চ খাইয়ে দেব। খুব এনজয় করবে, দেখে নিও। বেরোতে বেরোতে দেরি হয়ে গেল। দেবাংশু অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়ে মেয়ের ঘরে বইয়ের তাক হাটকাচ্ছিল। হটাৎ চোখে পড়ল বেণীমাধব শীলের হাফ পঞ্জিকা, নতুন এডিশন। --এ আবার কী? তোকে এইবয়সেই এসব রোগে ধরেছে? --বাজে বোকো না তো! ঠাম্মি এইটা খুব মানত। অসুস্থ অবস্থায়ও আমাকে বলেগেছে যে আমি যেন প্রতিবছর এটা কিনে ঘরে রাখি। আর বাড়ি-টাড়ি কেনার সময় যেন দিনক্ষণ দেখে নেই। তাই গাড়িটা কেনার সময় দেখে নিয়েছিলাম। তিনবছর হল একবারও অ্যাকসিডেন্ট হয় নি, গাড়িতে একটা মাইনর স্ক্র্যাচও লাগে নি। আর ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির সময়ও দিন দেখেই গেছলাম। ঠাম্মির সবকথা হালকা ভাবে উড়িয়ে দিও না। তখনই কৌতুহলের বশে আজকের দিনের সময় দেখতে গিয়ে দেখল দ্বিপ্রহর আড়াই ঘটিকা হইতে সাড়ে চার ঘটিকা পর্য্যন্ত বারবেলা। শনিগ্রহের অবস্থান হেতু এই সময় বিদেশ যাত্রা নববস্ত্রপরিধান , মৎস্য, মাংস ,অলাবু, বার্তাকু ও স্ত্রীসম্ভোগ নিষিদ্ধ। খেয়েছে! ও তো কোলকাতার বাসিন্দে। ওর কাছে তো গোটা দিল্লিই বিদেশ। আর মেয়েটা এত মাছ-মাংস খেতে ভালবাসে, এখন এইসব পঞ্জিকা থেকে পড়ে শোনালে ওর আনন্দ মাটি হবে ,। চাই কি, দেবাংশুর ঘর থেকে বেরোনো রদ হয়ে যেতে পারে। একেবারে হাতে হ্যারিকেন কেস। ড্রাইভার নামিয়ে দিয়ে পার্কিং প্লেসে চলে গেছে। দেবাংশুর চোখ আটকে যায় বড় একটি রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে-- লেবানীজ অ্যান্ড অ্যারবিয়ান কুইজিন। -- আঃ বাবা! অমন হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না। পেছনে অটো হর্ন দিচ্ছে। চল, আমার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাটা পেরোও। আচ্ছা, আমি ব্যাগ চেক করিয়ে আসছি। তুমি মেল চেকিং এর দিক দিয়ে ঢুকে যাও। এবার ওরা কোস্টা কফির সুন্দর খাবার জায়গা পেরিয়ে চলমান সিঁড়ির কাছে যায়। এখনও দেবাংশু প্রথম স্টেপ ফেলার আগে একটু ইতস্ততঃ করে। মেয়ে-বৌ দু'ধাপ ওপরে উঠে যাচ্ছে। ওপরে গিয়ে দেবাংশুর মনে হল যেন কোন অচেনা দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে। চারদিকে এত আকর্ষক পণ্যসম্ভার। পোষাক, জুয়েলারি, জুতো, ঘর সাজানোর জিনিস, ইলেক্ট্রনিক্স-- খুব চমৎকার সাজানো। আর খাবার জিনিস কতরকম। -- বাবা, তোমার কি পছন্দ বল? আজ মা'র কথা শুনবো না। উইক এন্ডে আমার কথামত চলবে তোমরা। এখন বিগ চিল এ নম্বর লাগিয়ে আমরা জামাকাপড় কিনতে এইচ এন্ড এম এ ঢুকবো। তারপর খেয়েদেয়ে বাকি মার্কেটিং করে নীচে কফি খেয়ে তবে বাড়ি ফিরবো। কী পছন্দ হল? -- আরে একদম পয়সা উশুল! ওর স্ত্রী মুখ বাঁকায়, মেয়ে হেসে ওঠে। জামাকাপড়ের দোকানে ও হতভম্ব হয়ে যায়। কার সঙ্গে কী ম্যাচিং হবে সেটা নিয়ে এত কথা? ওর নীরস লাগে। মেয়ে যা ওকে ট্রায়াল দিতে বলে সেটাকেই ও হ্যাঁ করে। কিন্তু ট্রায়াল রুমে গিয়ে দেখে ট্রাউজারগুলো বড় ঢলঢলে। একটু কাটিয়ে নিতে হবে। এমন সময় মেয়ের মোবাইল বেজে ওঠে। একটু কথা বলেই ও বলে-- চল, চল। টেবিল খালি হয়ে গেছে। খেয়ে দেয়ে এসে তারপর এই কেনাকাটা গুলো ফাইনাল করব। ওরা বেরিয়ে আবার চলমান সিঁড়ি ধরে আর একটা ফ্লোরে ওঠে। দেবাংশুর একটু হাঁফ ধরেছে। মা মেয়ে এগিয়ে গেছে টেবিল দখল করতে । ও ধীরে সুস্থে হাঁটতে থাকে। ওর চোখ যায় এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনী ও তার সঙ্গীর দিকে। হাঁটুর নীচে অবধি ঢোলা প্যান্ট ও চোখে চশমা পুরুষটির মাথায় টাক। কিন্তু স্বর্ণকেশীকে দেখতে একেবারে মোনিকা বেলুচ্চি। ওর পাশ দিয়ে একটি অল্পবয়েসি মেয়ে মোবাইলে চোখ রেখে আঙ্গুল চালাতে চালাতে হাঁটছে। ও সরে গিয়ে মেয়েটিকে এগিয়ে যেতে দিল। ওর মেয়ে বিগ চিলের দরজায় পৌঁছে গেছে, স্ত্রী ওকে ইশারায় তাড়াতাড়ি করতে বলে মেয়ের পেছন পেছন ঢুকে গেল। ও আবার দেখছে মোনিকা বেলুচ্চিকে। ওরা ব্যালকনির রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে পরে নিজেদের মধ্যে হাত-পা নেড়ে কথা বলছে। দেবাংশু দাঁড়িয়ে পরে। কী ভাষায় বলছে ওরা? ইতালিয়ান ? ও কান পাতে। না, ও ইতালিয়ান জানে না। তবু দেখতে চায় ওরা ইংরেজি না বলে অন্য কিছু বলছে কি না। মনে মনে বাজি ধরে। এরা নিশ্চয়ই ইংরেজ বা আমেরিকান হবে না। ও একটু ওদের দিকে এগিয়ে যায়। এমন সময় ওর পেছন থেকে কেউ ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে। ভয়ানক চমকে উঠে পেছন ফিরতেই দেখে সেই মোবাইলে চোখ রেখে চলা অল্পবয়েসি মেয়েটি। -- ইডিয়েট! হাউ ডেয়ার ইউ? ও যারপরনাই অবাক হয়। --হোয়াট? -- আর য়ু ড্রাংক অর হোয়াট? হাউ কুড য়ু? -- এইসা কিঁউ বোল রহে আপ? ম্যায়নে ক্যা কিয়া? --- শর্ম আনা চাহিয়ে আপ কো! উম্র কো দেখিয়ে। আমি আপনার মেয়ের বয়েসি হব। আপনার একটুও লজ্জা করেনি? কী রকম নোংরা বুড়ো আপনি? দেখতে দেখতে ভিড় জমে যায়। -- ক্যা হুয়া রে রেশমি? হোয়াট হ্যাপেন্ড? -- সী! দিস ওল্ড হ্যাগার্ড! দিস স্টাফড মাংকি অফ অ ম্যান টাচড্ মি! টাচড্ মি ইন অ্যান অফুল ওয়ে! দেবাংশুর হাত পায়ে জোর নেই। ও ব্যালকনির রেলিং ধরে ফেলে। এক লহমায় দেখে যে মোনিকা বেলুচ্চিরা ওর দিকে কৌতুহলের চোখে তাকিয়ে আছে। ও ভাঙা ভাঙা আওয়াজে বলার চেষ্টা করে যে এরকম কিছুই হয় নি। একটি যুবক তেড়ে ওঠে! -- ক্যা রেশমি ঝুঠ বোল রহীঁ হ্যাঁয়? তরিকে সে বাত কর বুডঢে! নহীঁ তো দুঁ ক্যা--? একজন সিকিউরিটির লোক এগিয়ে আসে। মেয়েটির উত্তেজিত কথা শুনে ও শান্ত নির্বিকার মুখে দেবাংশুর কাঁধের কাছটা খিমচে ধরে। এবার মরিয়া দেবাংশু উঁচু গলায় বলে--শুনিয়ে! জরুর কুছ গলতি হুই। ম্যায় তো আপকে আগে আগে জা রহা থা। আপ তো মোবাইল দেখতে দেখতে চল রহী থী। সবাই মেয়েটার বয়ান শুনতে চায়। মেয়েটি জানায় যে ও মোবাইলে ওর বন্ধুকে টেক্স্ট করতে করতে হাঁটছিল। সেই সময়ে হটাৎ ও ওর ডানদিকে বাম এ একটা পিঞ্চিং টের পায়। চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। ওর পাশে এই বুড়োটা ভালমানুষের মত মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। --দেখুন, ও নিজেই বলল যে আমাকে মোবাইলে টেক্স্ট করতে ও খেয়াল করেছে। তার মানে ও অনেকক্ষণ ধরে আমাকে স্টক করছিল। তারপরে কাছে এসে সুযোগ নিয়েছে। ও বোধহয় হ্যাবিচুয়াল স্টকার না ভিড়ের মধ্যে হাত চালানো পাবলিক। দেবাংশু শুধু ছানাবড়া চোখে এর ওর ও মেয়েটির মুখের দিকে পালা করে দেখতে থাকে। এবার ওর কাঁধের উপর সিকিউরিটির চাপ বাড়ে। --চলিয়ে আংকল। নীচে ম্যানেজমেন্টকে অফিস মেঁ। আপ ভী আইয়ে ম্যাডাম। আপকো কম্প্লেইন মেঁ সাইন করনা হোগা। ভীড় থেকে একটা সমর্থনসূচক চাপা উল্লাস বেরিয়ে আসে। --এক মিনিট।ম্যাডাম, আপ জব ইন কো দেখে তব ইয়ে আপ কে কিস তরফ খড়ে থে? টু ইয়োর লেফ্ট অর রাইট? একটা মেয়েলি কিন্তু ভারী আওয়াজ শুনে সবাই ঘুরে তাকায়। -- টু মাই রাইট, ইয়েস। --আর য়ু শিওর? --ইয়েস, আ অ্যাম। নো ডাউট অ্যাবাউট ইট। -- দিদ ওল্ড ম্যান ইজ ক্যারিয়িং ওয়ান আমব্রেলা -- এ ফোল্ডেড ওয়ান ইন হিজ লেফ্ট হ্যান্ড। -- ইয়েস , হি ইজ। --ওয়জ হি হোল্ডিং দ্য সেম আমব্রেলা অ্যাট দ্যাট টাইম? ডু ইউ রিমেম্বার? অর ওয়জ হি সাম আদার পারসন? -- নো নো; দ্য সেম, স্টিল হোল্ডিং দ্য সেম পিংক রিডিকুলাস লেডিস আমব্রেলা। -- প্লীজ ম্যডাম, যদি ও বাঁহাতে ছাতা ধরে ছিল তো কী করে আপনার ডান বামে হাত দিল। -- কেন? ডান হাত দিয়ে! -- ভেবে দেখুন; ও আপনার ডান দিকে ছিল। তাহলে ওর বাঁ হাত আপনার দিকে ছিল। সেখানে আপনার ডান বামে ও কী করে ডান হাত দিয়ে ছোঁবে? একটা চাপা গুজগুজ ফুসফুস আওয়াজ ভিড় থেকে শোনা গেল। এবার প্রশ্নকর্ত্রী মেয়েটি নিজের ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে মেয়েটিকে বলে-- আমি প্রফেশনাল অ্যাডভোকেট। এতে আমার ফোন নম্বর আছে। বলছি-- আপনার কোন মিস্টেক হচ্ছে। যে হাত চালিয়েছে। সে সম্ভবতঃ বাঁ দিক থেকে ডান হাত চালিয়ে কেটে পড়েছে। এইসব লোকগুলো খুব ধূর্ত হয়। এই বুড়ো ভদ্রলোক আমার পড়শি। ইনি একটু ভ্যাবলা গোছের। কিন্তু এসব করতেই পারেন না। আমি এঁকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। আপনি যদি এর বিরুদ্ধে পুলিশে কপ্লেইন করতে চান তবে একবার আমাকে ফোনে কন্ট্যাক্ট করে নেবেন। আগে আমার কথাগুলো ভাল করে ভেবে দেখুন। তারপর মেয়েটি সিকিউরিটির কবল থেকে দেবাংশুকে ছাড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় বলে-- বাবা, আমরা এখন সোজা বাড়ি যাচ্ছি। ২) সারা রাস্তা কেউ কোন কথা বলছিল না। দেবাংশু ড্রাইভারের পাশে উসখুশ করছিল। ড্রাইভার একবার আড়চোখে দেখে বাঁহাত বাড়িয়ে সীটবেল্টটা ঠিক করে লাগিয়ে দিল। তখন ও মুখ খুলল-- মিনু, ভাগ্যিস তুই সাথে ছিলি। আমাদের কোলকাতা হলে এরকম হত না। কী করে যে আমার নামে এমন--। ওর কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই পেছনের সীট থেকে সী-শার্পে মেয়ের গলা-- প্লীজ, এ নিয়ে গাড়িতে আলোচনা না করাই ভাল। দেবাংশু যেন আচমকা একটা থাবড়া খেল। বাড়ি ফিরে ও ঘরে ঢুকে সোফায় বসে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল। মেয়ে একটু পরে ড্রাইভারের থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দরজা লক করল। দেবাংশু একটু অবাক। এখন তো মাত্র বিকেল গড়িয়েছে। আর লাঞ্চ হয় নি। যা ঝক্কি গেল! এখন এই অ্যাপার্টমেন্টের চার দেওয়ালের মধ্যে অনেক নিশ্চিন্ত লাগছে। তাই খিদেটাও অনেকটা চাগিয়ে উঠেছে। --বিগ চিলে খাওয়া তো হল না। ঘরে ওবেলার জন্যে যা আছে তাই এখন খেয়ে নিই? অবেলায় বেশি খাওয়া যাবে না। রাত্তিরে হালকা খেলেই হবে। কী বলিস মিনু? মিনু উত্তর না দিয়ে এই ডুপ্লে অ্যাপার্টমেন্টের দোতলায় নিজের কামরায় যেতে যেতে মায়ের উদ্দেশে বলে-- তোমরা খেয়ে নাও মা; আমি খাব না। ইচ্ছে করছে না। --সে কী রে! শরীর খারাপ লাগছে? ডঃ জ্বর জ্বর করছে নাকি? মেয়ে কোন উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। স্ত্রী চুপচাপ কিচেন থেকে দুটো প্লেট নিয়ে এসে ঢাকা খাবার খুলে বেড়ে দেয়। দেবাংশু টিভি চালু করে রিমোট নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে চ্যানেল পাল্টাতে থাকে। স্ত্রী ঘন্টাদুই পরে এসে বলে -- আজ আর আমার কিছু রাঁধতে ইচ্ছে করছে না। রান্নার মেয়েটি অনেকটা মাশরুম স্যুপ বানিয়ে গেছে। তাই খানিকটা করে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পর। --মিনু যে দুপুর থেকে না খেয়ে রয়েছে? -- সে তোমায় ভাবতে হবে না। বৌয়ের গলার আওয়াজটা কি একটু বেশি চড়া? না কানের ভুল? ঘুম ভেঙে গেছে। তলপেটে প্রস্রাবের তীব্র চাপ। দেবাংশু তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকল। ইদানীং এই হয়েছে এক জ্বালা! সব পরীক্ষা-টরিক্ষা করে ডাক্তার বলেছেন এটা নাকি প্রস্ট্রেট গ্রন্থি বেড়ে যাবার সমস্যা। এই বয়সে অনেকেরই হয়। দেবাংশু ঘাবড়ে গেছল। ও প্রস্ট্রেটের ব্যাপার্রটা জেনেছিল তসলিমার নাসরিনের লেখা পড়ে।উনি তো ডাক্তার।বলেছেন এটা বেড়ে গেলে পুরুষাঙ্গের আপাত দৃঢ়তা ও উৎত্থান নাকি অনেকের মত কিছু বুড়ো মৌলবীদের মনেও দ্বিতীয় যৌবনের ভ্রান্তি এনে দেয়। অনেকে এই অকালযৌবন বেদনায় অস্থির হয়ে নাতনীসমা মেয়েদের বিয়ে করে বসেন। তারপর এই বসন্তের মরীচিকা অল্পদিনেই হটাৎ বিনা নোটিসে পাতা না ঝরিয়েই গায়েব হয়ে যায়। তখন নবপরিণীতাটির দুর্দশার একশেষ। ওর মনে পড়ে যেত স্কুলবয়েসে ওদের নেতাজীনগর পাড়ায় এক পন্ডিতমশাইয়ের ওই ভাবে নকল কোকিলের কুহুডাকে উতলা হয়ে বিড়ম্বনা ডেকে আনার ছ্যাবলা গল্পটি। না;, ও জানে যে ওর অমনটি হবে না। ও মরীচিকার পেছনে ছুটে বেড়ানোয় বিশ্বাস করে না। তাই বিএসসি পাশ করে একটি ব্যাংকের পরীক্ষা দিয়ে ক্যাশিয়ার হয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিল। ইঞ্জিনিয়ারি`ডাক্তারি এসব পড়ার কথা ভাবেই নি। কোন টিউটোরিয়ালে ভর্তি হয় নি। আলাদা করে কোথাও কম্পিউটারও শেখার চেষ্টা করে নি। ইউনিয়নে চাঁদা দিয়েছে। স্ট্রাইকের সময় সবাই যোগ দিলে নিজেও যোগ দিয়েছে, কিন্তু মিছিলে না হেঁটে বাড়ি চলে গেছে। কোনদিন বদলি হওয়া নিয়ে কোথাও আবেদন নিবেদন করেনি। বিয়ে হলে বৌকে একবার পুরী নিয়ে গেছল। ব্যাংকের হলিডে হোম এ ছিল, ব্যস্। ভালভাবেই জীবন কেটেছে, মেয়ে হওয়ার বছরে প্রমোশন পেয়ে হেড ক্যাশিয়ার হয়েছিল। পয়মন্ত মেয়ে। তবে মায়ের ধাত পেয়েছে। জেদী, অ্যামবিশাস। মেয়েটার পাঁচবছর ন্যাশনাল ল' ইউনিভার্সিটিতে পড়ার খরচা শুনে ও আঁতকে উঠে বলেছিল --কী করে হবে? মেয়ে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল,-- ড্যাড্, এত ভয় পাও কেন? এডুকেশন লোন নেবে? -- লোন সাত লাখ? আমায় কে দেবে? বৌ ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল,-- তোমার ব্যাংক দেবে! সবাইকে দিচ্ছে তোমায় দেবে না? কী লোক তুমি? ---- কে শোধ দেবে? --- আমি শোধ দেব বাবা। কোন চিন্তা কর না। পাশ করার একবছরের মধ্যে একটা ঝিনচ্যাক চাকরি জোগাড় করব, কোন বড় ল' ফার্মে। দিল্লি-মুম্বাই বা লুরুতে। ---কেন কোলকাতা কী দোষ করল? এখানে বাড়িভাড়া যাতায়াত কত শস্তা। -- উঃ বাবা! কোলকাতায় সব শস্তা কারণ এখানে খুব কম লোকের হাতে পয়সা আছে। এখানে মাইনেও কম, কাজও কম। বৌ খুব রেগে গেছল। রাগলে ওকে বেশ সুন্দর লাগে দেবাংশুর। তাই ও বৌকে শান্ত করার খুব একটা চেষ্টা করে না। --শোন, কোলকাতা হল রিটায়ার্ড লোকেদের জন্যে আদর্শ শহর। কারও কোন তাড়া নেই। সব ব্যাটাছেলে দুপুরে মাছভাত খেয়ে দোকান বন্ধ করে ঘুমোয়। তুমি তখন কোলকাতায় থেকো। মেয়ে আমার আজকালকার , ওকে দিল্লি-পুণে- মুম্বাই যেতে দিও। পাছু ডেক না। ওর জীবন, ও ঠিক করবে। দেবাংশু পেছনে হটে । ও ঠিকই জানে আসলে কে ঠিক করবে। ঘরে ফিরে আলো নেভাতে যাবার আগে ও জলের বোতল আনতে খাবার ঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। অবাক কান্ড! ওপরে মেয়ের ঘরে কথা বলার আওয়াজ। প্রায় ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর আভাস। ভাবল, বোধহয় কোন বন্ধু বা কলিগের সঙ্গে ফোনালাপ চলছে। এদের কখন যে দিন হয় আর কখন রাত, তা ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু অন্য স্বরটি যে ওর স্ত্রীর। আজকে তো মিতালি ঘুমোতেই আসেনি। এত রাত অব্দি ওরা জেগে? মেয়েটা খেয়েছে তো? বোধহয় ওকে ওর মা ওর বিছানাতেই খাইয়ে দিচ্ছে। এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। কিন্তু ঘরে ফিরে আসতে গিয়ে ওর পা মাটিতে সেঁটে যাচ্ছে যে! মা-মেয়ের চাপাগলায় উত্তেজিত কথা বার্তা শান্ত রাতে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। -তুই বিশ্বাস করিস না যে মেয়েটি মিথ্যে কথা বলছে? তোর বাবা অমন লোক নয়। এতদিন ধরে তো দেখছি। -- মা, ও বাবাকে চেনে না। ওর বাবার সঙ্গে কোন ইস্যু নেই, কেন মিথ্যে কথা বলবে? ওর কী লাভ? -- হয়ত অন্য কারও লাভ। কেউ হয়ত ওকে লাগিয়েছে, হয়ত পয়সা দিয়েছে। মেয়েটাকে দেখেছিস্? কেমন বেহায়ার মত একটা ছেঁড়া জিনের হাফ বা কোয়ার্টার প্যান্ট পরে হাজারো লোকজনের সামনে মলে ঘুরে বেড়াচ্ছে! -- মা, তুমি থামবে? কী সব বলছ? এক, এই দিল্লিতে বাবাকে কেউ চেনে না। বাবা একজন সাধারণ লোক। ভীড়ের মধ্যে একজন।পেছনে লাগতে কার বয়ে গেছে? আর ওটা ছেঁড়া খাটো প্যান্ট নয়, ওটাকে বলে-- --তুই আর ওসব ফ্যাশনের ব্যাপার শেখাতে আসিস না। প্যান্ট ইচ্ছে করে ছিঁড়ে ফ্যাশন হচ্ছে! --- আমাকে বলতে দাও। দুই, মেয়েটা মিথ্যে কথা বলেনি। -- সেকি? তুই যে তখন বললি? -- মা , ও ভুল বলেছে। মিস্টেক। তিন, মিথ্যে আর ভুলের মধ্যে তফাৎ আছে। একটা হল জেনে শুনে অসত্য স্টেটমেন্ট দেওয়া--অ্যাক্ট অফ ইনটেনশন অ্যান্ড ভলিশন। এখানে মেয়েটা যা বলেছে সেটা ও সত্যি বলে বিশ্বাস করে, তাই বলেছে। ---- তাঁর মানে তুই মনে করিস ওর অভিযোগটা ফ্যাক্ট। -- ওইটুকু , অর্থা`ৎ কেউ ওর বাটকে পিঞ্চ করেছে। কোন ভিড়ের মধ্যে হাত চালানো পাবলিক। মিতালির গলা উত্তেজনায় চড়ে যায়। --- আর তুই এটাও বিশ্বাস করিস যে ঐ ভিড়ের -মধ্যে -হাত-- চালানো পাবলিকটি তোর বাবা? --- মা, আমি বিশ্বাস করতে চাই যে ওই পারভার্ট লোকটি আমার বাবা নয়, অন্য কেউ। -- বিশ্বাস করতে চাই? এটা আবার কী বললি? এক মিনিট কেউ কিছু বলে না। তারপর মিনু বলে-- মা, টেকনিক্যালি দেখলে সেখানে ওই মেয়েটির কাছে আর কাউকে দেখা যায় নি তো! ---- তবে তুই যে তখন বললি? ওইসব কোন হাতে ছাতা না কি যেন ছাতার মাথা যুক্তি? সেগুলো সত্যি নয়! --- আমি তা বলছি না। আসল সত্যিটা কী সেতো আমরা কেউ জানিনা। আর দেখ, বাটক পিঞ্চিং এমন ব্যাপার যে তখনি মেয়েটি চমকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর বাবা ছাড়া কাউকে দেখতে পায় নি। সারকামস্ট্যান্শিয়াল এভিডেন্স দেখলে-- আদালত কিন্তু মেয়েটির অভিযোগকেই সত্যি বলে মেনে নেবে। আমি যা বলেছি সেটা কোর্টরুম প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞ্তা থেকে। দরকার হলে কোর্টেও তাই বলব। -- বলছিস কী মিনু? এটা কোর্টে উঠতে পারে? --কেন নয়? ওই মেয়েটি আমি হলে আমিই কোর্টে যেতাম, বুড়ো মানুষ বলে রেয়াৎ করতাম না। আগেকার দিন গেছে। মিতালির গলার স্বর বদলে যায়। --তুই মেয়ে হয়ে বাবাকে কাঠগড়ায় তুলবি? এই তোর বুদ্ধি? এই তোর শিক্ষা? তাই মেয়েটাকে কার্ড দিয়ে এলি? ওর হয়ে বাবার বিরুদ্ধে তুই--! --- আঃ মা! এবার থাম। ভয়ের চোটে মাথাটা গেছে। আমি তো ওকে ধমকে এলাম। চাইবে এ নিয়েআর কোথাও যেন কোন কথা না ওঠে। আমার একটা সম্মান একটা পরিচিতি আছে না? বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। --তোর ক্ষতি ? আর তোর বাবার? --ছাড় তো! তুমি আমার মুখে কথা বসাচ্ছ। --- শোন, একটা আইডিয়া এসেছে। ওখানে সিসিটিভি আছে। ওর ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে তোর বাবা নির্দোষ। এও দেখা যাবে কে দোষী বা আদৌ কিছু হয়েছিল কি না। হতে পারে সবটা মেয়েটার কল্পনা, তুই তো বড় ফার্মের অ্যাডভোকেট। চেনাজানা আছে। একটু চেষ্টা করে দেখ না , যদি সেই সময়ের প্রিন্ট পাওয়া যায়! --মা, এটা আমাকে হ্যান্ডল করতে দাও। প্রিণ্টে কী দেখা যাবে আমরা কেউই জানি না। তাই এসব দোধারি তলওয়ার নিয়ে নাড়াচাড়া না করাই ভাল। দেবাংশুর হাত থেকে জলের বোতল শব্দ করে পড়ে যায়। --- কে? কে ওখানে? মিতালি সিঁড়ির বাঁকে এসে দাঁড়ায়, তারপর চমকে ওঠে। --তুমি? কেন উঠে এসেছ? রাত একটা বাজে। যাও জল খেয়ে শুয়ে পড়। মিনুর ঘরের বাতি নিভে যায়। ৩) কয়েক দিন গড়িয়ে গেছে। দেবাংশু অনেকটা নিশ্চিন্ত। রোজ তন্ন তন্ন করে স্থানীয় পত্রিকার পাতা উল্টেছে। কোথাও কোন মলে কোন মেয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের খবর নেই। কিন্তু মেয়ের ব্যবহারে কোন পরিবর্তন নেই। কেন নেই? একটা ঘটনা ঘটেছিল, বড় জোর দুর্ঘটনা। তাতে ওর কোন হাত নেই। তবু মেয়ের রাগ পড়েনি। এটা কি বাড়াবাড়ি না? মায়ের আশকারায় মেয়েটা মাথায় চড়েছে। তক্ষুণি ওর মনে পড়ল । আরে সেদিন মলে এইচ অ্যান্ড এম এ'র শপে ওর গোটা তিনেক প্যান্ট পছন্দ করে ফিটিং এর জন্যে ছেড়ে আসা হয়েছিল। কথা ছিল বিগ চিল এ লাঞ্চ করে তুলে নেবে। তারপর যা ঘটেছিল! ওরা তো সোজা বাড়ি ফিরে এল। প্যান্টগুলো? নতুন আর বেশ পছন্দের । শিনো না কি যেন ! অন্য রকম কাটিং, অন্য রকম কাপড়ের টেক্সচার। কিন্তু সেগুলোর কী হল? আজ মেয়ে অফিসে যাওয়ার সময় ও জিগ্যেস করেই ফেললঃ হ্যাঁরে মিনু! সেদিনের প্যান্টগুলো ? নিতে যাবি না? মেয়ে জবাব না দিয়ে ল্যাপটপের ব্যাগ তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। এবার সত্যি অপমান লাগছে। কেন মরতে বলতে গেল? ও নেবে না ওইসব কেতাদুরস্ত পোষাক। কোলকাতায় ফিরে গিয়ে পাড়ার দর্জিকে দিয়ে বানিয়ে নেবে মাপমত। কিনে নেবে কাটপিস, যেমন এতদিন করেছে। ও বেরিয়ে যেতেই মিতালী চায়ের কাপ এনে সোফায় বসল। খবরের কাগজ খুলে মুখের সামনে মেলে ধরে বিড়বিড় করে বলল-- ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। মেয়ে ফোন করে ওগুলো ক্যানসেল করে দিয়েছে। যাচ্চলে! যতই রাগ হোক, বেশ পছন্দ হয়েছিল তো! তারপর ভাবল আপদ গেছে। ওই মলে আর কোনদিন পা রাখবে না। আর দিল্লির মেয়েগুলো যেন কি! সত্যি সেদিন কী হয়েছিল? দেবাংশু নিজের মনে ঘটনাটি রি-ওয়াইন্ড করে স্লো -মোশনে চালিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। প্যান্ট পছন্দ করে ট্রায়াল দিয়ে লেংথ দেড় ইঞ্চি কম করতে দিয়েছে কি খাবার জায়গা থেকে টেবিল খালি হওয়ার খবর এল। ওরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে চলমান সিঁড়ি ধরে একটা তলা উঠল। দেবাংশু পিছিয়ে পড়েছিল। বৌ-মেয়ে প্রায় রেস্তোরাঁর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু ও হাঁ করে এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনি ও তার সঙ্গীকে দেখছিল। অনেকটা মোনিকা বেলুচ্চির মত দেখতে। কিন্তু মেয়েটা তখন কোথায় ছিল? ওর খেয়াল নেই। শুধু এইটুকু মনে পড়ছে যে একটু আগে মোবাইল চোখ এবং কানে হেডফোন মেয়েটিকে ও সাইড ছেড়ে এগুতে দিয়েছিল। তাহলে কি মেয়েটি এগিয়ে যায় নি? কথা বলতে বা টেক্স্ট করতে করতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল? তা নাহলে ওর সঙ্গে বডি-কনট্যাক্ট হল কী করে? বডি-কনট্যাক্ট? কন্যাসম মেয়েটির সঙ্গে? কী বিচ্ছিরি শব্দ? ওর মনে এল কেন? না, আসতেই পারে। এটাই তো অভিযোগ। বাটক পিঞ্চিং! একরকমের বডি কনট্যাক্ট তো বটেই, তবে স্বেচ্ছাকৃত। উঁহু; সেসব কিছু হয় নি। কোন ধাক্কা বা বডি কনট্যাক্টই হয় নি। হলে ওর মনে পড়ত। আর চিমটি কাটা? জীবনে কোন মেয়েকে করেনি, নিজের বৌকেও না; আর আজ! মনে পড়ে গেল; ও করে নি। কিন্তু বৌয়ের খেমচানো চিমটি কাটা এসব অভ্যেস ছিল। বিয়ের প্রথম দিকে, মানে মিতালি সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়েছে তখন। কোন কিছু জোর দিয়ে বলতে গেলেই ও দেবাংশুকে চিমটি কাটত। জবলপুরে বড় হওয়া প্রবাসী বাঙালী মেয়ে, হিন্দি শব্দটাই বলত, চিকোটি কাটনা। শব্দ করে হেসে ফেলল দেবাংশু। হাসির শব্দে সামনে থেকে কাগজ সরিয়ে বিরক্ত মুখে তাকাল মিতালি-- এত হাসির কী হল? -- না, মানে এমনিই। --এমনিই? সব কিছু তোমার এমনিই হয়ে যায়? -- কী বলতে চাইছ? -- ঠিকই বুঝেছ কী বলছি। মলে কয়েকশ' লোক। তার মধ্যে মেয়েটি বেছে বেছে এমনিই তোমার নামে কম্প্লেন করল? -- আমি কি করে জানব কেন করল? -- এমনিই। তোমাকে টাইটেলও দিয়ে দিল-- "ভীড়ের মধ্যে-হাত-চালানো-পাবলিক"! এমনিই। --- উঃ! সব কিছুরই একটা সীমা আছে। ওটা একটা দুর্ঘটনা। রাস্তায় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগার মত। অন্যের দোষেও হয়। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না যে কেন এমন হল। সেদিন মেয়ে নিজেই ওকে বলেছিল যে ওর ভুল হচ্ছে।আসল অপরাধী ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছে। মানছি; ও তখন স্ট্যান্ড না নিলে আমাকে হয়ত থানায় যেতে হত। তারপরও তোমরা মা মেয়ে আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছ যেন--! আর আমিও একটা মানুষ। সব কিছুরই একটা সীমা আছে। প্লীজ, ওই টাইটেল-ফাইটেল আর বলবে না। ভাল লাগছে না। --আমাদের ভাল লাগছে? ওই মুখরোচক টাইটেলটি যে এখন অনেকের ছ্যাবলা কমেন্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। --- মানে? -- শোন। সেদিনের ঘটনাটা সেদিন কেউ মোবাইলে তুলে নিয়েছিল। তারপর ফেসবুকে আপলোড করে দেয়। দেবাংশুর হাত থেকে খানিকটা চা চলকে টেবিলে পড়ে । মিতালি বলতে থাকে। ---- ওই ক্লিপটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। প্রথমে যে পোস্ট করেছিল তাতে বলেছিল কেমন করে আজকের প্রজন্মের একটি মেয়ে এক বুড়ো ভদ্রলোককে গ্রেফতার হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।আ ব্রেভ গার্ল , আ মডার্ন পোর্শিয়া! একগাদা লাইক পড়ে। অনেকেই বলে আজকালকার বুড়ো শকুন উকিলেরা যখন গরীব ক্লায়েন্টের পচামাংসে ঠোকরায় তখন এই ব্যতিক্রমী অ্যাডভোকেট মেয়েটি আমাদের ভরসা । কিন্তু এর পরে অনেকের সুর বদলায়। কথা ওঠে --ওই কানে হেডফোন মেয়েটি তিলকে তাল করছে। একটু ছোঁয়া লাগলেই কম্প্লেইন? অমন ছুঁতমার্গ তো ঘরে বসে থাকলেই পারে। কেউ বললে অনেক মেয়ে আজকাল বড্ড অ্যাটেনশন সিকিং, আর আইনগুলো একতরফা, মেয়ে ঘেঁষা। ব্যস্, জেন্ডার-ইস্যু শুরু হয়ে গেল। মোবাইল আর হেডফোনের অতি-ব্যবহারের ফলে কত অ্যাকসিডেন্ট হয় তার ডেটা আর লিংক এসে গেল। কিছু মেয়ে বলল-- ভদ্রলোক কে আদৌ ধোয়া তুলসীপাতা মনে হচ্ছে না। কারও মোবাইলে ধরা পড়েছে এমন ছবি যাতে মনে হয় বুড়োটা স্টকার। একাগ্র হয়ে এক বিদেশিনি জোড়াকে হ্যাংলার মত দেখছে। কেউ কেউ বলল--মেয়েটির উচিত মহিলা থানায় কম্প্লেইন করা। তাহলে পুলিশি তদন্তে সত্যিটা ঠিক বেরিয়ে পরবে। পাল্টা এল-- সেই জন্যেই তো করছে না, করলে শেষে মিথ্যে অভিযোগের জন্যে ভদ্রলোকের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দিতে হবে, তাই। দেবাংশু উত্তেজিত। -- একদম ঠিক।করুক, কম্প্লেইন। আমি তৈরি। ও না করলে আমিই করব। তুমি মেয়ের সঙ্গে কথা বল। ডিফেমেশন ফাইল করে মোটা টাকার কমপেন্সেশন চাইব। আজকে রাত্তিরে ফিরে আসুক, আজকেই কথা বল। আমি রাজি। কোথায় যেতে হবে? তিসহাজারি কোর্টে? ---ছটফট কর না তো! মেয়ে রাজি নয়। হয়েছে কি, ওর অফিসে কেউ কেউ ক্লিপিং এর মধ্যে তোমাকে চিনে ফেলেছে। ওর বন্ধুরা! বলেছে-- আরে, ইয়ে তো আংকল জ্যায়সা দিখ রহা হ্যায়। ওরা প্রশ্ন তুলেছে যে তাহলে মিনু কেন বলছে ভদ্রলোক আমার চেনা, প্রতিবেশী? কেন পিতৃপরিচয় গোপন করল? তবে কি ও অভিযোগটি নিয়ে নিঃসন্দেহ নয়? কাজের জায়গায় দলাদলি, জেলাসি থাকেই। কেউ কেউ ওই "'ভীড়ের মধ্য হাতচালানো পাবলিক" টাইটেল নিয়ে ন্যাকা সেজে নানান অছিলায় ওর কানের পাশে কথা ছুঁড়ে দিচ্ছে। ওর এখানে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, মাথার ঠিক নেই। তুমি এটা যে কী করলে? --- আমি করলাম? এ'কথা তুমি বলতে পারলে? এত বছর একসঙ্গে থেকে আমাকে এই চিনেছ? পঁয়তিরিশ বছর! কোনদিন এতটুকু বাজে কথা উঠেছে? সুযোগ দিয়েছি? এমনকি তোমার দুইবোনকে নিয়েও কখনও কোন শালী-জামাইবাবু গোছের ইয়ার্কি করিনি। সুবোধদার বৌ আমার সমবয়সী; একই ব্যাচে এইচ এস পাশ করেছি। এত ঘনিষ্ঠতা, দু-বাড়িতেই। তবু বৌদি বলেই ডেকেছি। আর সম্পর্কের সম্মান বজায় রেখেই মেলামেশা করেছি। সব তুমি দেখেছ, তবু বলছ-- হাত চালানো পাবলিক? একদমে এতগুলি কথা বলে দেবাংশু হাঁফাতে থাকে। মিতালি তীক্ষ্ণ চোখে ওকে দেখতে থাকে। ফুলে উঠছে নাকের পাটা, চোখের তারা বড় বড়, চোখের কোণায় লালচে ভাব। ও উঠে যায়, ভেতর থেকে একটা প্রেশারের ট্যাব্লেট ও একগ্লাস জল এনে দিয়ে বলে-- মাথাগরম করে লাভ নেই।আমি যা সবাই বলছে তাই বলেছি, নতুন কিছু বলিনি। তারপর ভেতরে চলে যায়। দেবাংশু বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বেরিয়ে এসে অন্যমনস্ক ভাবে আগের দিনের গেঞ্জি ও পাজামা পরে ফেলে। খেতে বসে চুপচাপ খায় আর ভাবে --এর শেষ কোথায়? মিতালির চোখে ধরা পরে গেছে ওর বাসিকাপড়। একসেট ধোয়া কাপড় বিছানায় রেখে দিয়ে প্রায় আদেশের সুরে বলে-- খেয়ে উঠে কাপড় বদলে নিও। আর ছাড়া কাপড়গুলো বাস্কেটে ফেলে দিও। দেবাংশু জানে যে আজ ও কী করবে। খাবার পর ও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে । তারপর জামাকাপড় না বদলে একটি পূজোসংখ্যা হাতে নিয়ে বিছানায় লম্বা হয়। পাতা উল্টে যায়, কিন্তু কোন লেখাই মনে ধরে না। এভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়ে সেটা ও নিজেও জানে না। ৪) আজ মাসের প্রথম রোববার। দুপুরের খাবার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে মা-মেয়ে মাসের বাজার করতে রিল্যান্সের একটি দোকানে যাবে। ফিরতে বেশ দেরি হবে। এই কয়েক ঘন্টা দেবাংশু বাড়িতে একাই থাকবে। তাতে কোন অসুবিধে নেই। পূজো সংখ্যা আছে গোটা তিন। এছাড়া রিও অলিম্পিকের কিছু খেলা। সময় টের পাওয়া যাবে না। আর বিকেলে রান্নার মেয়েটি এসে রাত্তিরের রুটি-তরকারি করার আগে আংকলকে চা করে দেবে, নিজেও খেয়ে নেবে। কিন্তু বেরোনোর সময় মিতালি বলল-- দুকাপ চা করে ফ্লাস্কে রেখে গেলাম। সময়মত খেয়ে নিও। দরকার হলে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিও। -- খামোকা কষ্ট করলে কেন? বিকেলে সন্ধ্যা আসবে তো, ওই বানিয়ে দিত। --না, ও আজ আর ওবেলায় আসবে না। মিনু বলে দিয়েছে আজ বিকেলে না আসতে। আমরা বেরোচ্ছি তো! -- তোমরা বেরোচ্ছ, আমি তো থাকছি। কথাটা এবার দেবাংশুর কানেই কেমন বেখাপ্পা লাগল। মিতালি কিছু না বলে বাজারের লিস্ট আর পার্স তুলে নিল। সন্ধ্যের মুখে মিতালির ফোন এল যে ওরা আসছে , আর পনের মিনিটের দূরত্বে আছে। জোরে বেল বেজে উঠল। কে এল আবার? কাজের মেয়ে তো এত জোরে কখনও বাজায় না। আর মিতালি কখনো এমন করে না। দরজা খুলে দেখল অনামিকা। মিনুর কলিগ ও বন্ধু। ও একগাল হেসে বলল--গুড ইভনিং, অন্দর আও বেটি। কিন্তু বরাবরের হাসিখুশি মেয়েটির আজ কী হল? অন্যান্য দিনের মত হেসে 'নমস্তে আংকল' না বলে সোজা জিগ্যেস করল মিনু ঘরে আছে কি না! ফেরেনি? এক্ষুণি আসবে? ঠিক আছে , আমি ফোন করে একটু পরে আসছি। এত কিসের তাড়াহুড়ো? আজ আবার অফিসে নতুন কিছু হল নাকি? খানিকক্ষণ পরে দরজা ঠেলে ঢুকল মিনু, অনামিকা । ওরা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা মিনুর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। একটু পরে হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে এল মিতালি, পেছনে বাজারের তিনটে ভারি ব্যাগ নিয়ে ড্রাইভার ছেলেটি। মিতালি সব দরজা জানলার কবাট টানা আছে কি না দেখে নিয়ে এসি অন করল। -- বড্ড হিউমিড ক্লাইমেট। গরম কমেছে, কিন্তু উমস্ বেড়ে গেছে। দেবাংশু এক গ্লাস জল এনে দেয়। মিতালি বাজারের জিনিসপত্র নামিয়ে লিস্টির সঙ্গে মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। --- চা খাবে? ফ্লাস্কে কিছুটা আছে, গরম করে দিই? --ব্যস্ত হয়ো না। সে আমি করে নেব। একটু জিরিয়ে নিই আগে। একটু সময় কেউ কোন কথা বলে না। শেষে দেবাংশু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে-- কী হয়েছে বল দেখি? অনামিকা ঘরে না ঢুকে চলে গেল। তারপর মিনুর সঙ্গে এসে হুড়মুড়িয়ে সোজা ওপরে। আগে কখনও হয় নি। সিরিয়াস কিছু? তুমি টের পেলে? মিতালি খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর রিলায়েন্সের দোকান থেকে আনা একটা সুগন্ধি মুখশুদ্ধির শিশি খুলে গোটা কয়েক দানা মুখে পোরে। --- ও দিল্লি ছাড়ছে। --কে? --আমাদের মেয়ে, মিনু। --অ্যাঁ? কী ব্যাপার? --আর ব্যাপার! সেই ভাইরাল মোবাইল ক্লিপিং! এ নিয়ে অফিসে একজন সিনিয়রের সঙ্গে মিনুর জোর একরাউন্ড হয়ে গেছে। শেষে ও রাগের মাথায় রেজিগনেশন লিখে দেয়। ল' ফার্মের পার্টনার ওকে অনেক বোঝান, কিন্তু ও গোঁ ধরে থাকে। ওকে তো জান। শেষে একটা রফা হয়েছে। আপাততঃ ওকে ওদের পুণে অফিসে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। দু'বছরের জন্যে। ফার্ম চাইছে ওকে ধরে রাখতে। আশা করছে দিল্লি থেকে কিছুদিন সরে থাকলে ওর মন পাল্টাবে। অনামিকা মেয়েটি সেই জন্যেই এসেছে। -- কী জন্যে? -- মিনুকে দশদিনের মধ্যে পুণে অফিস জয়েন করতে হবে। ততদিন ছুটিতে থাকতে পারে। সেই সব দরকারি চিঠিপত্র, প্লেনের টিকিট--ও নিয়ে এসেছে। -- আমরাও পুণে যাচ্ছি? --- না, আমরা পরশু সকালের ফ্লাইটে কোলকাতা যাচ্ছি। --ঠিক কথা; আগে ও পুণেতে গিয়ে থিতু হয়ে বসুক, তারপর আমরা যাব। দিল্লি পচে গেছে। এখানে আর কিছু দেখার নেই। পুণে গেলে লোনাবালা, খান্ডালা, পঞ্চগনি, মহাবালেশ্বর --সব ঘুরে দেখব। -- না। মেয়ে বলে দিয়েছে একবছর যেন আমরা পুণে না যাই। ওর একটু সময় চাই-- এতবড় ধাক্কাটা সামলে উঠতে হবে তো, অন্ততঃ একটা বছর। -- অনামিকা কি আমাদের টিকিটও নিয়ে এসেছে? --হ্যাঁ; অফিস থেকেই করে দিয়েছে। -- তাহলে আমি যখন দরজা খুললাম কিছু বল না তো? --বলবে না। ওই ক্লিপিংটা ও দেখেছে যে! দেবাংশুর মাথা ঘুরে ওঠে। গোটা ঘর দুলতে থাকে। ও সোফা থেকে উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ে। --আরে কী হল? --কিছু না; মাথাটা একটু ঘুরছিল। এখন ঠিক হয়ে গেছে। না, কোন ওষুধের দরকার নেই বৌ হ্যান্ডব্যাগ থেকে ওকে একটা ক্যপসুল বের করে দেয়। ও হাত নেড়ে বারণ করে। ওর ভেতরে একটা চন্ডাল রাগ গরম কালের আঁধির মত পাক খেয়ে উঠছে। -- কী হল? -- মেয়েকে বল টিকিটি ক্যানসেল করতে। আমি ওদের অফিসের টিকিটে যাব না। নিজের পয়সায় রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকিট কাটব, নয়াদিল্লি-শেয়ালদা। --- এ আবার কি? --শোন, আমি কবে যাব, কোথায় যাব, কীভাবে যাব--এটা অন্য কেউ ডিক্টেট করতে পারে না। --- আচ্ছা পাগল! কে ডিক্টেট করছে? ওকে এখান থেকে সব গুছিয়ে গাছিয়ে পুণে যেতে হবে, বাড়ি খুঁজতে হবে। তার সাত-সতের নানান ফ্যাকড়া। আমাদের আগে কোলকাতায় শিফ্ট না করে ও এসব কাজ--! -- একটা কথা জিগ্যেস করি? তুমিও কি আমাকে দোষী ভাব? বা একটু-আধটু সন্দেহ? মিতালি চুপ করে থাকে। দেবাংশু এগিয়ে গিয়ে ওর দু'কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকে। -- স্পষ্ট করে বল? হ্যাঁ কি না? আমায় অবিশ্বাস কর--হ্যাঁ কি না! -- হ্যাঁ, তোমায় বিশ্বাস করি। জানি তুমি নির্দোষ। -- তাহলে কোলকাতা যাবার আগে একটা কাজ করতে হবে। কাল তুমি আমার সঙ্গে চল। --কোথায়? --ওই মলে। তুমি আর আমি। কাউকে বলার দরকার নেই। কারও অনুমতি চাই না। গিয়ে সেই এইচ অ্যান্ড এম শপে যাব। পছন্দের তিনটে প্যান্ট কিনব। আমার ডেবিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করব। সেদিনের সেই সিকিউরিটির লোক বা ম্যানেজমেন্টের লোক যদি কিছু বলে তো ডিমান্ড করব সিসিটিভি'র প্রিন্ট আউট বের করে দেখে তবে কথা বলুক। অনেক সহ্য করেছি, আর চুপ করে থাকব না। কী হল? চুপ করে আছ যে? -- শুনছি। একটু চা গরম করে নিয়ে আসি। যা আছে দুজনে ভাগ করে নেব। চা খেতে খেতে মিনিট পাঁচ ওরা চুপ করে থাকে। দেবাংশু ব্যগ্র হয়ে বৌয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। একজন ওকে বিশ্বাস করে। একজন অন্ততঃ ওর সঙ্গে আছে। -- এবার বল? কাল যাবে আমার সঙ্গে? প্যান্ট কিনতে? -- বলছি; তোমার হয়ত ভাল লাগবে না। বললাম না যে তোমাকে বিশ্বাস করি। কারণ আমি জানি অমন কাজ তুমি করতে পার না। (দেবাংশুর মুখে হাজার ওয়াটের হ্যলোজেন।) কেন? তুমি হচ্ছ ভীতুর ডিম। আসলে ওইরকম অসভ্যতা করতেও একধরণের সাহস লাগে। ধরা পড়ার, মার খাওয়ার, অপদস্থ হওয়ার। ওইরকম জোখিম নেওয়ার লোক তুমি নও। তুমি সারাজীবন সেফ সাইডে খেলেছ। ( দেবাংশুর ফিউজ উড়ে গেছে!) কাজেই আর হিরো হতে যেও না। ইউ আর নট কাট ফর দ্যাট। তুমি নিজে কখনও কোন ডিসিশন নাও নি। ভর্তি হতে চাইতে গভর্মেন্ট আর্ট কলেজে, বাবার ধ্যাতানি খেয়ে গেলে পাড়ার কলেজে বিএসসি পড়তে। পাশের বাড়ির মন্দিরা চেয়েছিল তুমি যেন ওর বাবাকে গিয়ে বল। তুমি পারলে না। বিয়ের পর শ্বাশুড়ির অন্যায় সব হুকুম ও নজরদারি দেখেও দেখ নি। বললে এড়িয়ে গেছ, বলেছ নিজেরা মিটিয়ে নাও। এখন শেষ বয়সে আর নতুন করে নিজেকে বদলাতে পারবে না। তাই মেয়ের কথা মেনে কোলকাতা ফিরে চল। সেখানে আমরা নিজেদের চেনা সার্কেলে নিরাপদে থাকব। (৫) পরদিন সকালে চা খাবার পর দেবাংশু বাথরুমে যায়। দুদিন দাড়ি কামানো হয়নি। কাঁচাপাকা খোঁচাখোঁচা দাড়ি এখন কামিয়ে না ফেললে চেহারাটা অসুস্থ অসুস্থ দেখাবে। গালে সাবান লাগিয়ে রেজার হাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মিতালি ডাকল একবার সম্ভবত। ব্রেকফাস্ট রেডি বা ঐধরণের কিছু বলছে, ঠিকমতো শুনতে পায়নি দেবাংশু কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পায়। দাড়ি কামিয়ে বেরিয়ে উঁকি মেরে দেখে টোস্টেড ব্রাউন ব্রেড, ফল, রোজকার ওষুধ রাখা রয়েছে খাবার টেবিলে। মিতালি মনে হয় আবার ঢুকে গেছে কিচেনে। মিনুর কোনো সাড়াশব্দ পায় না। বেডরুমে গিয়ে সে বাইরের পোশাক পরে নেয়, রিস্টওয়াচ গলিয়ে নেয় হাতে, চুল আঁচড়ানো হয়না, যদিও আঁচড়ানোর মতো তেমন চুল অবশিষ্ট নেই মাথায়। বেডরুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফের ফিরে যায় সেখানে। ওয়ালেটটা ভুলে গেছল নিতে। এবার পায়ে জুতো গলিয়ে মোবাইলটা নেবে কি নেবেনা দুবার ভেবে নিয়েই নেয় সঙ্গে। দরজা খুলে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। ঘন্টাখানেক পরে তাকে দেখা যায় শপিং মলটার বাইরে। মল সবে খুলছে। চেকিং পেরিয়ে সে ঢুকে যায় ভেতরে। না। কেউ তাকে কিছু বলেনি। কেউ বাধা দেয়নি। চিনেও ফেলেনি। এইচ অ্যান্ড এমের দোকানে ঢুকে সে খুঁজতে থাকে সেদিনের পছন্দ করা ট্রাউজার্সগুলো। একটা ছিলো কালো রঙের, আরেকটা খাকি। তিননম্বরটা গ্রে রঙের কিন্তু ওর সাইজেরটা পাওয়া যায় না। আজ আর ট্রায়ালরুমে গিয়ে পরে দেখবার দরকার নেই। একটা কটনের কালো টিশার্ট পছন্দ হয় কলারওয়ালা। মাপ দেখে মনে হচ্ছে গায়ে হয়ে যাবে। ক্যাশে গিয়ে ডেবিট কার্ড দিয়ে দুটো প্যান্ট আর একটা টিশার্টের দাম মিটিয়ে দেয় সে। একটু ঘোরে মলের ভেতরে। সকাল সকাল বলে এখনো সেরকম ভিড় নেই। একটা কাফেটেরিয়াতে বসে এক কাপ কাপুচিনো খায় সে। চিনি দিয়ে। আজ সকালে শুগারের ওষুধ প্রেশারের ওষুধ আরো গোচা দুয়েক ওষুধ খাওয়া হয় নি। নতুন কেনা শার্টপ্যান্টের প্যাকেট সঙ্গে করে মল থেকে বেরোনোর পরে সে বাইরে একদণ্ড দাঁড়ায়। এবার খেয়াল হয় পকেটে মোবাইলটা বাজল যেন। বের করে দেখে চারটে মিসড কল। চারটেই মিতালির। মোবাইলের ভলিউম কমানো ছিল তাই শুনতে পায় নি সে। এই কলটাও সে রিসিভ করবার আগেই কেটে গেছে। ফোনে চার্জ খুব কম। চব্বিশ পার্সেন্ট। কাল রাতে চার্জে বসিয়ে রাখতে ভুলে গেছল কি? ফোনে দেখাচ্ছে কিছু ভয়েস মেসেজ রয়েছে। মিতালিকে কল ব্যাক করে দেবাংশু। -- কী ব্যাপার? তুমি ব্রেকফাস্ট না খেয়ে কোথায় বেরিয়ে গেছো? আমরা বারবার কল করছি, ধরছিলে না কেন ফোন? -- শুনতে পাই নি, ভলিউম কমানো ছিল। --কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তোমার? অত ইম্পালসিভ হলে চলে? চলে এলো বাড়ি। মিনু এমনিতেই টেনশনে রয়েছে। আর টেনশন বাড়িও না। দেবাংশু চুপ করে থাকে। কোনো কথা বলে না। মিতালির সবকটা কথা তার কানে গেছে বলেও মনে হয় না। --কী হলো? হ্যালো, হ্যালো। তুমি কোথায় এখন? শুনতে পাচ্ছ? --হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। --তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো। দেবাংশু ফোন কেটে দেয়। সে এখন ফিরবে না। অটো হোক কি ট্যাক্সি, সে এখন নিউদিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাবে। সেখান থেকে ট্রেনের টিকিট কেটে যাবে কোথাও একটা কাছে পিঠে হোক কি দূরে। মোবাইলের চার্জার তার সঙ্গে নেই। আস্তে আস্তে মোবাইলটা বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়িতে জানাতে পারে না, গুছিয়ে বলবার মত ভাষা তার নেই। দুটো প্যান্ট একটা টিশার্ট এবং ওয়ালেট সঙ্গে করে কাপুরুষ দেবাংশু রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যেতে থাকে। (শেষ)

63

7

Ranjan Roy

ছত্তিশ্গড়ের কিসসা--১

প্রথম লাইনেই হোঁচট! বাবলুভাই! ঠিক আছে‚ মুসলমান সমাজে অমন সবাইকেই ভাই প্রেফিক্স দিয়ে সম্বোধন করা হয়| বাঙালীদের যেমন '--দা'| তাতে কি প্রেম হওয়া আটকায়! হৈমন্তী পড়তে লাগলেন| 'বাবলুভাই‚ তোমাকে বাধ্য হইয়া এই পত্র লিখিতেছি| রাগ করিও না| সকল কথা সামনাসামনি বলা সম্ভব হইয়া উঠে না| তুমি এখন আর ছোটটি নও‚ আর 'দাউ' বা 'নানহে' ( ছত্তিশগড়িতে 'খোকা' বা 'পুঁচকু') বলিয়া ডাকিতে পারি না| কিন্তু তুমি আমার কাছে সেই ছোট্ট আদরের নান্হীই আছ‚ নিশ্চিত জানিবে| বাবলুভাই‚ আমরা গরীব‚ আমাদের কোন নিজস্ব বাড়ি নাই‚ কোন দোকান নাই| আমাদের চাকুরিই সম্বল| সাহেবদের অনুকম্পা সত্ত্বেও একটু লিখো গে ‚ পড়ো গে- তব তো কুছ বাত বনেগী| আমি তোমার খেলকুদ লইয়া কিছু বলি নাই| আব্বার চাকুরিও খেলার জন্যই হইয়াছিল| তোমারও হইবে| তুমি তো শুনিয়াছ যে আব্বার মৌত কে বাদ আমাদের তাউজি দিলবার হোসেন সাহাব আমাদের আম্মি সহ সবাইকে ঘর হইতে একপ্রকার খেদাইয়া দিয়াছিলেন| ওয়ালিদসাহেবের পিএফ গ্র্যচুইটির টাকাও নানান অছিলায় আম্মিকে কিছু কাগজে দস্তখত করাইয়া হড়প করিয়াছেন| বেওয়ার পেনশন ও দুই বৎ্সর পর আমার নার্সের চাকুরি এই মাত্র সম্বল করিয়া এই সংসার দরিয়া পার করিতেছিলাম| তোমার খেলায় চশকা ও লিখাপড়ায় দিল না লাগা দেখিয়া তাউজির ছেলেমেয়েরা আল্লাতালাহ উহাদের খেরিয়তে রাখুন‚ ঠেন্গা ( বুড়ো আঙুল) দেখাইয়া ছড়া কাটিত: লিখো গে‚ পড়ো গে বনো গে নবাব‚ খেলো গে‚ কুদো গে‚ বনো গে খরাব| তুমি কান্দিয়া ঘরে আসিলে আমি তোমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিয়াছিলাম--রোনা নহীঁ‚ রোনা নহীঁ| দুশমন হসেন্গে| তাহার পর তোমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিয়াছিলাম--আমাকে ‚ তোমার বড়ী আপাকে ছুঁইয়া কসম খাও যে একদিন তুমি লিখাপড় শিখিয়া ইহার জবাব দিবে| মনে পড়ে? আজ উহারা কেহ কলেজে দাখিলা লইয়াছে‚ কেহ কালো কোট পরিয়া টিকিট বাবু হইয়াছে| আমাদের রাস্তাঘাটে দেখিলেও চিনে না| বাবলুভাই‚ তুমি কি চাও যে দুশমন আমাদের উপর জিন্দগীভর হাসিবে? তোমার এমন মতি কেন হইল বাবলুভাই? আমার মনে হয় তোমার উপর কেহ কালা জাদু করিয়ছে বা ইবলিশের নজর পড়িয়াছে| আগামী সপ্তাহে আমি তোমাকে তারবাহারের মৌলবীর নিকট লইয়া যাইব| তিনি দোয়া করিলে ও তোমার মাথায় পাক পানি ছিটাইয়া দিলে কুনজর কাটিয়া যাইবে| আর একটি কথা| আম্মিকে বলিও ন| আমার শৌহর তোমার জীজাজি ইদানীং গুসসা করিতেছেন| বলিতেছেন বাবলু কবে মরদ হইবে? চিঠির বাকি অংশটি ছেঁড়া| সকালবেলায় বাবলু এল| উনি ওকে বই ফেরত দিয়ে কোথায় কোথায় দাগ দিয়েছেন দেখিয়ে দিলেন আর বললেন মন দিয়ে মুখস্থ কর| পাশ করে যাবি| বাবলু চলে গেল| ও পাশ তো করবেই| যে পঞ্চাশটি সাজেশন দিয়েছেন তার মধ্যে অন্তত: তিরিশটা তো আসবেই| এবার তো ক্লাস টেনে তো বোর্ড নেই| হোম এগজাম| আর কোশ্চেন পেপার হৈমন্তীই সেট করেছেন‚ ছাত্ররা কেউ না জানুক| মনটা অস্থির অস্থির লাগছে| হৈমন্তী স্নান করে ঠাকুরের আসনের সামনে বসলেন| (শেষ)

172

50

m

ফুলকুমারী - যাঁরা কোমল মনের তাঁরা পড়বেন না (Not for over sensitive people)

আজ শোনাই সত্যি গল্প, ফুলকুমারীর l এরকম ঘটনা হয়তো অনেকই হয়, তবে কাছ থেকে দেখা ঘটনার অভিঘাত অনেক বেশি l তার নাম আমি রেখেছিলাম ফুলকুমারী, মনে মনে ! আজ জানি না সে কোথায় আছে, কেমন আছে l এই বিষাক্ত দুনিয়ায় ফুলকুমারীরা কি ভালো থাকতে পারবে ? অনেক দিন আগের কথা, তখন আমি জুনিয়ার রেসিডেন্সি করি মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে l সে সময় আমাদের হাসপাতালে সব ডিপার্টমেন্টে শুধুই মহিলা পেশেন্ট ভর্তি হতো l ওয়ার্ড ডিউটি থাকলে সকালে গিয়ে ভর্তি হওয়া সব রুগীদের দেখে নোটস লিখে রাখতে হতো চার্টে, সিনিয়ররা রাউন্ডে আসার আগে l সেদিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি একটা বেডে ফ্রক পরা ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে বসে আছে, দেখে মনে হলো বেশ ভাল ঘরের (সরকারি হাসপাতালের রুগীদের তুলনায়) তবে বয়স বছর দশেকের বেশি মনে হলো না l আমি অবাক হয়ে ভাবলাম এই বাচ্চা মেয়েটা এখানে কেন, ওর তো পিডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে থাকার কথা l কার ভুল হল ! আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, তোমার কি হয়েছে? ও তার সারল্য মাখা চোখ তুলে জবাব দিলো 'আমি জানি না' l ওর পাশে এক মহিলা দাঁড়ানো ছিল, ভাবলাম মেয়েটির মা, তাকে জিজ্ঞেস করলাম তোমার মেয়ের কি হয়েছে, এখানে কেন? সেই মহিলা বললো 'আমি ওর চাচী হই, আমিও জানিনা না ওর কি হয়েছে, বোধহয় পেটে ব্যাথা, ওর কাগজে লেখা আছে' l আমার একটু রাগ ই হয়ে গেলো, মহিলাকে বললাম তুমি কেমন চাচী, বাচ্চাটাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছো, আর জান না ওর কি হয়েছে l আসে পাশের বেডের রোগিনীরাও আমাদের কথা শুনছে, মাথা নাড়ছে l মেয়েটার চার্ট ওর বেড এ ছিল না, মহা বিরক্ত হয়ে আমি নার্সিং স্টেশন এ সিস্টারদের বলতে গেছি চার্ট বেডে নেই কেন - সিস্টার আমাকে ওর চার্ট টা দিয়ে বললো, কারণ আছে l চার্টের প্রথম পাতায় নাম, বয়স, ভর্তির তারিখ, ইত্যাদির সাথে একটা ডায়াগনসিস ও লেখা থাকে, কিন্তু এর চার্টে দেখলাম নাম, বয়স ১৩ বছর, কোন ডায়াগনসিস নেই.. একটু কনফিউসড হয়ে পাতা উল্টে দেখবো, তখন সেই চাচী এসে দাঁড়ালো, বললো 'আমি সবার সামনে আপনাকে বলতে চাই নি, ওর পেটে বাচ্চা আছে' l আমি মহা অপ্রস্তুত! ভাবতেই পারি নি এরকম কিছু l চাচী পুরো কাহিনী বলে গেলো, শুনতে শুনতে আমার মনে হলো এ তো ফুলকুমারী ! ফুলের মতো নিষ্পাপ, সরল একটা বাচ্চার সাথে এরকম যারা করে তারা পশু বলার ও যোগ্য নয় l শুনুন ওর গল্প: ফুলকুমারী জন্মাবার সময় কোন কারণে ওর ব্রেইনে অক্সিজেন কম গিয়েছিলো, তাই ওর মানসিক বৃদ্ধি অসম্পূর্ণ l তিন বছর পর তার ভাই জন্মালে মা পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে যায়, ঘর সংসার কিছুই দেখতে পারতো না l চাচা চাচী ও এক বাড়িতে থাকে, তাদের এক ছেলে সবার ছোট l চাচী স্কুলে পড়ায় l ফুলকুমারীর বাবা ব্যবসায়ী, বাবার কারখানা আছে বাড়ির নীচতলায় - সেখানে লোকজনের আসা যাওয়া চলে অবিরাম l দিনের বেলা ভাইরা স্কুলে যায়, ফুলকুমারী পড়ে চাচির কাছে সন্ধ্যের পর, দিনে সে থাকে আপন মনে l ফুলকুমারীর বয়স বাড়ে, মনের বিকাশ হয় না, মা থেকেও নেই, কার কু নজরে পড়ে ফুলের মতো মেয়েটি l কিছু দিন আগে চাচী খেয়াল করে ফুলকুমারীর দৈহিক পরিবর্তন - জেরা করতে থাকে কে করলো তার এই সর্বনাশ l সরলা বালিকা বলে 'সে (কারখানার কোন কর্মী) আমায় গলা টিপে মেরে ফেলবে বলেছে যদি আমি কাউকে কিছু বলি, আমার এতো ব্যাথা লাগে, তবুও আমি কাউকে কিছু বলিনি' l বাবা সেই জানার পর থেকে উন্মাদ প্রায় l সংসারে কলঙ্কের ভয়ে, কথা জানাজানি যাতে না হয়, তাই চাচা চাচী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছে চুপিচুপি, পাপ মুক্ত করাতে l ফুলকুমারী সত্যিই জানে না তার কি হয়েছে, কেন সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে l ওরা তাকে সেটা বলতেও চায় না পাছে ও লোকের সামনে বলে ফ্যালে l আমি চার্ট খুলে দেখলাম ও গাইনি ডিপার্টমেন্ট এর পেশেন্ট, ওদের অনুরোধে এখানে রাখা হয়েছে, তবে যেটা আরো খারাপ ব্যাপার তা হল ওর এমটিপির সময় সীমা অনেক দিন পার হয়ে গেছে, ওকে ইন্ডিউস করতে হবে, অর্থাৎ ড্রিপ চালিয়ে ডেলিভারি করাতে হবে, মনটা খুব ই খারাপ হয়ে গেলো l দুপুরের দিকে ওকে গাইনি ওয়ার্ডে পাঠাতে হলো প্রিপারেশনের জন্য l আমার এক বন্ধু ছিল সেখানে, তাকে বলে দিলাম বাচ্চা মেয়েটাকে খেয়াল রাখতে l আমার বন্ধুর ও খুব খারাপ লেগেছিলো, সেও চেষ্টা করেছিল মেয়েটাকে কিছু বুঝতে না দিতে, কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না l ইন্ডিউস করার পর ব্যাথা শুরু হয়, ওকে লেবার রুমে পাঠাতে হয় l আমরা পরদিন গিয়ে জানতে পারি রাত্রে ওর ডেলিভারি হয়েছিল, ফিটাস টা আয়ারা ওকে নাকি দেখিয়েছিলো, বলেছিলো 'দেখ তোর বাচ্চা' (মানুষের না বুঝে করা নিষ্ঠুরতা অনেক সময় সীমা হীন) l আমার আর দেখা হয় নি ফুলকুমারীর সাথে, আমার বন্ধু বলেছিলো সে ওয়ার্ডে ফেরার পর নিজেই বলছিলো 'পেট মে বাচ্চা থা, মর গিয়া' l

69

0

Sarita Ahmed

বাঘবন্দী খেলা ও টিকটিকি তত্ত্ব

হাল্লারানীর রাজত্বে নাকি সেদিন কে 'ম্যাও' ডেকেছে । এই নিয়ে রানী তার উদোমুখো, হুঁকোমুখো ও ল্যাদারু দের সভায় এনকোয়ারি কমিশন বসালেন । কি ব্যাপার ? না, হাল্লা সাম্রাজ্যের বিশ্বাস 'টিকটিকি গায়ে হাগলে / পড়লে তা বেজায় অলুক্ষুণে ।' এতে কারু কোনো দ্বিমত নেই । দিব্যি সবাই টিকটিকিকে ভয়ভক্তি করে, মান্যিগন্যি করে চলে । এরই মাঝে 'ম্যাও' ডাক -- " টিকটিকি গায়ে পড়লে যদি এতই অকল্যাণ হয় , তবে দেশ থেকে টিকটিকি সরিয়ে ফেললেই হয় ।" ব্যাস ! হাল্লারানীসহ সব্বাই চটে গেল । 'উদোমুখো কোতোয়াল' খবর নিল ওটা 'ম্যাও' ছিল না , ছিল 'হালুম' । একদল বাঘের বাচ্চা 'টিকটিকি তত্ত্বে' বিশ্বাস রাখে না তাই বেজায় মাথা খাটিয়ে প্রচলিত 'কেতাব' কে প্রশ্নটশ্ন করে তারা আজব আজব তত্ত্বের অবতারণা করেছে এবং দেখিয়েছে , টিকটিকি না থাকলে প্রজাদের ভাত-কাপড়ের অভাব তো হবেই না, উলটে সব্বাই নির্ভয়ে জীবন কাটাতে পারবে । এত তো ভারি আজব কথা ! এদ্দিন দেশে কেউ এভাবে ভাবেনি । সব্বাই ধূপ ধুনো দেখিয়ে টিকটিকি র প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি দেখিয়ে এসেছে আর এখন এরা এমন 'হালুম' ডাকল , যে না শুনে পারাও যাচ্ছে না। ফলে দলে দলে কিছুজন সাহস দেখিয়ে বাঘ নাকি বিড়ালের সভায় যেতে টেতে লাগল , বুঝতে লাগল। হাল্লারাজ্যে অলক্ষ্যেই একটা ঢেউ উঠল , মাথা খাটানোর ঢেউ । সত্যিই তো , অমঙ্গল যদি টিকটিকির কারণে হয় তাহলে গা বাঁচিয়ে না থেকে টিকটিকি তাড়ালেই মিটে যায় । কিন্তু এমনভাবে মাথার ব্যায়ামের চর্চা দেখ, হুঁকোমুখো জল্লাদরা কি বসে থাকবে ? এদ্দিনের মান্যিগন্যির ব্যবসা সামান্য ম্যাও ডাকে লাটে উঠতে দেওয়া তো যায় না । ব্যাস, 'ল্যাদারু-দপ্তরে' খবর গেল ম্যাও না হালুম যাই হোক তাদের সভায় যোগ দিয়ে গোপন খবর নিয়ে এস । এরা দলে দলে হুকুম তামিল করতে ছুটল এবং অনলাইনরাজ্য নামক আজবদেশ থেকে খবর আনল চশমা আঁটা পণ্ডিত পণ্ডিত বাঘের বাচ্চারা প্রমান করে টিকটিকি তত্ত্বের বারোটা বাজাচ্ছে । দেশে আর টিকটিকি মেলাই দুস্কর হবে যদি ম্যাও ডাক ছড়িয়ে পড়ে । এই শুনে জল্লাদের দল চিল্লে উঠল "যারা যারা টিকটিকিতে বিশ্বাস করবে না তাদের গর্দান যাবে ।" হাল্লারানীও সায় দিয়ে বললে , 'হতে পারে ওরা বাঘের বাচ্চা , তাই বলে টিকটিকি কি ফেলনা নাকি ! রাজ্যে যখন 'টিকটিকি তত্ত্ব' আছে, তখন সবাইকে মানতে হবে ।' এই রায়কে সায় দিয়ে 'হুক্কাহুয়া-কাজী'র দলও বলল, ' টিকটিকিকে রাজ্যে খুবই প্রয়োজন । রাজ্যে বাঘ না থাকলেও চলবে , কিন্তু টিকটিকি না থাকলে রাজ্য রসাতলে যাবে । জল্লাদদের আমরা ঠেকাতে পারব না । কারণ জল্লাদরা মনপ্রাণ দিয়ে টিকটিকির রক্ষা করে এসেছে এতকাল , তাই তো আমাদের কারু গায়ে টিকটিকি হাগে নি ও অমঙ্গল হয় নি । সুতরাং সমাজে জল্লাদ আর টিকটিকি থাকা খুবই দরকার ।বাঘ না বিড়াল নিজের রাস্তা নিজেরা মাপুক ।' হালুম বাহিনী পাত্তাই দিল না; ফলে দলের বেশ কিছুজনের গর্দান গেল । এই নিয়ে পাশের রাজ্য ও তার পাশের রাজ্য সবেতেই একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হল , সত্যি তো , দেশে কার বেশি প্রয়োজন ? টিকটিকি , জল্লাদ, ল্যাদারু নাকি বাঘ ! ব্যাপার হল, কেউই বুঝে উঠতে পারল না , যাকে নিয়ে এত হৈচৈ , যার সুরক্ষার জন্য এত হুকুম তামিল সেই টিকটিকি স্বয়ং কই ? টিকটিকি তত্ত্বের জনক রক্তচোষাকে পাওয়া গেছে । কিন্তু... রক্তচোষার বিচার তো হতে দেওয়া যায় না । 'হুঁকোমুখো জল্লাদ' বাহীনি 'রক্তচোষা' -ব্রাঞ্চের হুকুম তামিল করে মাত্র , তাদের হুকুম তামিল করে 'উদোমুখো কোতোয়াল' , তার হুকুম তামিল করে 'হুক্কাহুয়া কাজী'র দল তারা আবার পরামর্শ দেয় মহান 'হাল্লারানী'কে । সেইজন্য এদের সবার কথা মেনে তবে রাজ্যপাট চালাতে হয় রানীকে । এটা একটা 'চুইঁয়ে পড়া নীতি' মানা সাম্রাজ্য । যেখানে টিকটিকি কে কেউ না দেখলেও তার জনক রক্তচোষাকে আলবাত দেখেছে । তার ক্ষমতা নিয়ে কারু কোনো প্রশ্ন নেই । আরো বড় ব্যাপার হল রক্তচোষা ব্রাঞ্চের সাথে জল্লাদ বাহীনি ও সাঙ্গপাঙ্গদের আঁতাত সেই পুরাকাল থেকে । শুধু তাই না , এরা দলগত ভাবে ভীষন বলিষ্ঠ ও সঙ্ঘবদ্ধ । ফলে কেউ যদি এদের না মেনে একলা স্বাধীন শিকারি বাঘ নাকি বেড়াল কে মান্যি করে তবে মূর্খ্যটা কে ? আশপাশের রাজ্যগুলোতেও তাই হুক্কাহুয়া কাজীর থেকে নোটিশ গেল , --- " 'টিকটিকি তত্ত্বে'র গ্রহণযোগ্যতা কতদূর অটুট আছে তা সরজমিনে দেখতে 'হুঁকোমুখোজল্লাদ' রা ইনভেস্টিগেশনে যাচ্ছে । তাদের আটকাতে যেহেতু আমরা পারিনি ও আপনারাও পারবেন না তাই এতদ্বারা ম্যাও-ডাকা বাহীনির মুখে সেলোটেপ বা কন্ডোম পরাতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে । যদিও ম্যাও বাহীনির প্রসব রেট রক্তচোষার রেটের চেয়ে বেশি নয়, তবু যাতে তাদের গর্দান সালামত থাকে তাই এই কন্ডোম তত্বের নোটিশ । আপনারা এরম 'ম্যাও' ডাক শুনলেই জল্লাদ বাহীনিকে খবর দিন , নয়তো নিজ হাতে বেড়ালডাকা বাঘ বন্দী করুন ও টিকটিকি রক্ষা করুন ।" নোটিশে সই করলেন স্বয়ং হাল্লারানী এবং তার উদোমুখো -হুঁকোমুখো -ল্যাদারু সামন্তরা । এই ভাল ... হয় , স্বাধীনচেতা বাঘের একলা বাঁচার সুযোগ নিয়ে জল্লাদবাহীনি একযোগে ঝাঁপিয়ে গর্দান নিক , অথবা , বাঘ স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় বিদেশে পাচার হোক । যাই হোক না কেন টিকটিকিকে বাঁচাতে হবে ম্যাও বাহীনির থেকে । আর কে না জানে, রাজতন্ত্রে সকলের তরে সকলে আমরা ... সুতরাং 'টিকটিকির জয়' গাইতেই হবে । নোটিশ ছড়াতেই আশপাশ থেকে তুমুল রবে হাল্লারাজ্যের জাতীয় সঙ্গীত শোনা গেল ... 'ক্যায়া হুয়া ... হুক্কা হুয়া ...' বহিরাগত আমি ল্যালাকান্ত এতক্ষণ এই রাজসভায় আড়ি পেতেছিলাম । কে জানে দেওয়ালের কান আছে বলেই হয়তো, এদের বিজাতীয় সঙ্গীতকে একবার শুনলাম ' নারায়ে তকবির ...' তো পরক্ষণেই " জয় শ্রী রাম !" এসব পাঁচমেশালি ধ্বনির সাথে আমার কর্নপটহে খুব জোরে ভেসে এল টিকটিকির হাঁচি ... ঠিক ঠিক ঠিক ! ল্যালাকান্তের কানের আর কি বা দোষ ! পুনশ্চ : -- তারপর নাকি কেটে গেছে বছর দশেক। অত:পর জানা গেল, হাল্লারাজ্য এখন টিকটিকির রক্ষাকর্তাতে ভরে গেছে, বাঘসুমারি এখন বন্ধ তাই ম্যাও ডাক শোনা যায় কিনা কেউ জানে না। আর টিকটিকি? সে আদৌ কারু গায়ে এখনো অবধি হাগল কিনা সেটাও কেউ স্বীকার করে না। সবাই এখন সেদেশে ফিসফিস স্বরে টিকটিকির নাকি সাপের ভাষায় কথা বলে। ------------------------------------------------- ( বিধিমত সতর্কিকরণ : উক্ত ঘটনার সাথে হালফিলের 'সিক্কুলারিজমে'র কোনো আঁতাত নেই । সুতরাং বাদুরিয়া, বসিরহাট, বাংলাদেশ অথবা আশেপাশের অধিবাসীগণ চিন্তামুক্ত থাকুন । মেলা ব্রেন খাটিয়ে ম্যাও ডাকবেন না যেন ! টিকটিকির জয় হোউক । )

70

11

শিবাংশু

আলোতে-ছায়াতে

<একশো বছরের উপর হয়ে গেলো। ১৯০৫ সাল। জাজপুরের এসডিও চক্রবর্তীসাহেব বেরিয়েছিলেন জঙ্গলমহাল সরজমিন ঘুরে দেখতে। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে গভীর বনের মধ্যে কিছু ভাঙাচোরা পাথরের ভাস্কর্য। সঙ্গীদের কাছে জানতে চা'ন এই জায়গাটার নাম কী? তারা বলে নালতিগিরি। ঘন গাছ-বনস্পতির আলোছায়ার মধ্যে দেখা যাচ্ছে উঁচুনিচু টিলা আর লালমাটির রং। জাজপুরে ফিরে এসে তিনি ব্যাপারটা একেওকে জানান। কিন্তু তা নিয়ে কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেননি।শেষে ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাদুঘরের পণ্ডিত রমাপ্রসাদ চন্দ মশাই এখানে এসে নিদর্শনগুলি পরীক্ষা করেন। তার ফলশ্রুতি হিসেবে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের দলিলে নালতিগিরি জায়গা পেয়ে যায়। ক্রমাগত খোঁজাখুঁজির সুবাদে ১৯৩৭ সালে সরকার স্থির করেন এই পুরাবশেষটিকে সংরক্ষিত তকমা দেওয়া দরকার। কিন্তু তার পরেও কোনও ব্যবস্থা হলোনা। কেটে গেলো আরো চল্লিশ বছর। ১৯৭৭ সালে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় আর পুরাতত্ত্ব বিভাগের আয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ির কাজে কিছুমাত্রায় গতি দেখা গেলো। তাও যথেষ্ট নয়। অবশেষে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ মধ্যে পাওয়া নানা নিদর্শন দেখে পণ্ডিতেরা বুঝতে পারলেন এই নালতিগিরিই প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখিত ললিতগিরি'র গরিমাময় বৌদ্ধবিহার। ললিতগিরি ছিলো প্রবাদপ্রতিম পুষ্পগিরি বিহারের একটা অংশ। পৃথিবীতে প্রাচীনতম বৌদ্ধসংস্কৃতির নিদর্শনগুলির মধ্যে একটি প্রধান পীঠ। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টিয় দশম শতক পর্যন্ত এখানে ছেদহীনভাবে বৌদ্ধসভ্যতার বৈজয়ন্তী উড়েছিলো। অনেকে বলেন ললিতগিরি উত্তরমৌর্যযুগ থেকে তেরোশতক পর্যন্ত পূর্বভারতে বৌদ্ধধর্মের নিরন্তর তীর্থভূমি হয়ে থেকেছে। ------------------------- খননকাজের পর এখানে ছোটো পাহাড়ের চূড়ায় একটি বিশাল স্তূপ আত্মপ্রকাশ করে। এই স্তূপটির গভীর থেকে একটি খোণ্ডালাইট পাথরের বাক্স পাওয়া যায়। প্রথম বাক্সটির ভিতরে আরেকটি স্টিয়াটাইট পাথরের কৌটো। তার ভিতর প্রথমে রুপোর ও তারও ভিতরে একটি সোনার কৌটো। এই সোনার কৌটোর ভিতরে ছিলো শাক্যমুনি বুদ্ধের দেহাস্থি। ------------------------- এই স্তূপটি ছাড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরানিদর্শন রয়েছে ললিতগিরিতে। পূর্বমুখী উপবৃত্তাকার চৈত্যগৃহ। ৩৩X১১ মিটারের ইঁটের নির্মাণ। যার দেওয়ালগুলি ১১ ফিট চওড়া। এর কেন্দ্রে আছে একটি বৃত্তাকার স্তূপ। তার উপর কুশান ব্রাহ্মী লিপিতে খোদিত শিলালেখ। এটি এবং আনুষঙ্গিক পুরা নিদর্শনগুলি দেখে মনে করা হয় এগুলি পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে, অর্থাৎ গুপ্তযুগের নির্মাণ। -------------------------- ললিতগিরি গড়ে উঠেছিলো বিভিন্নপর্বে তৈরি হওয়া চারটি বৌদ্ধবিহারকে কেন্দ্রে রেখে। প্রথম বিহারটি বৃহত্তম ও দশম-একাদশ শতক নাগাদ নির্মিত হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিহারটি পরবর্তীকালে, যখন বৌদ্ধধর্মের দিন ফুরিয়ে আসছিলো এদেশে। তৃতীয় ও চতুর্থ বিহারগুলি আগে পরে তৈরি হওয়া। এখানেই একটি নবম-দশম শতকের পোড়ামাটির সিলমোহর পাওয়া যায়। তার উপর উৎকীর্ণ ছিলো "শ্রী চন্দ্রাদিত্যবিহার সমগ্র আর্য ভিক্ষু সঙ্ঘস্য।" এই উল্লেখটি থেকেই ললিতগিরির পরিচয়টি পণ্ডিতেরা জানতে পারেন। ------------------ ওড়িশার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বহুকথিত স্বর্ণিম'ত্রিভুজের প্রাচীনতম বিন্দুটি এই ললিতগিরি। কটক থেকে পারাদিপের পথে জগৎসিংপুর জেলায় রাজপথ থেকে একটু ভিতরদিকে এই পুরাবশেষটি দেখতে পাওয়া যাবে। মূলস্রোত থেকে একটু দূরবর্তী হওয়ার জন্য রত্নগিরি বা উদয়গিরির মতো জনসমাগম এখানে দেখতে পাওয়া যায়না। কিন্তু ললিতগিরির গুরুত্ব অবিসম্বাদী এর প্রাচীনত্বের কারণে। এখানে মহাযানী সংস্কৃতির নানা পুরা নিদর্শন পাওয়া গেছে। সোনারুপোর অলংকার, শিলাপট্ট, নানা শিলমোহর ছাড়াও অবলোকিতেশ্বর, তারা, হারীতি, অমিতাভ, মহিষমর্দিনী, গণেশ, বুদ্ধ, বোধিসত্ব, জম্ভলা ইত্যাদি মূর্তি প্রধান। এইসব ভাস্কর্যে গান্ধার ও মথুরা শৈলির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। শেষ পর্যায়ে এখানে বজ্রযানী তন্ত্রসাধনার কেন্দ্রও গড়ে উঠেছিলো। -------------------------- মহাস্তূপের উপর থেকে নিচে তাকালে আদিগন্ত সবুজের সমারোহে উজ্জ্বল উৎকলের সমভূমি। রোমাঞ্চ লাগে, যখন ভাবি হাজার হাজার বছর আগে আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষারা নিজেদের কর্মভূমি, তপোভূমি হিসেবে এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণ করাই আমাদের তর্পণ। আলোয় ছায়ায় নিরন্তর আসাযাওয়া। আমার ভারতবর্ষ।>

78

12

চঞ্চল

আশিয়ানা ঢুন্ডতা হ্যায়!!

(৬) দু এক দিনের মধ্যে গেস্টদের আসা শুরু হবে| আমি একটু আগে জেঠুর সাথে গিয়ে সবাই যেখানে থাকবে তার ব্যবস্থা দেখে এসেছি| যারা খুব কাছের‚ মানে ঐ পিসিরা‚ আরও দু-একটা ফ্যামিলি এই বাড়িতেই থাকবে| বাকিরা সব‚ যেসব বাড়ি গেস্টদের জন্য নেওয়া হয়েছে‚ সেখানে থাকবে| টেন্টওয়ালারা বিছানা‚ কুশন সব লাগিয়ে দিয়েছে| সব দেখাশোনা করে এইমাত্র আমি আর জেঠু বসার ঘরে এসে বসেছি| বাবা ‚ নতুন মেক্যানো সেট এনে দিয়েছে এবার| এর আগেও ঐ সেটের চারটে এনে দিয়েছিল| এটা পাঁচ নম্বরের‚ তাই এর সাথে ব্যাটারী দিয়ে চলে এমন একটা মোটরও আছে| অনেক কিছু বানানো যাবে এই সেটটা দিয়ে| এখন এটা খুলব না| দিদির বিয়ের পর এগুলো নিয়ে পরা যাবে| আপাতত ম্যানুয়ালটা দেখেই সাধ মেটাই| জেঠু এখন আরাম সে বসে নিউজ পেপার পড়ছে| আমি জানি জেঠু এখন অনেকক্ষণ ধরেই পেপার পড়বে| সাথে চাও খাবে| ভাবছি একটা কথা জিজ্ঞেস করব কিনা!| না‚ জিজ্ঞেস করেই ফেলি| - ও জেঠু তুমি বলেছিলে না‚ আমি বড় হলে তুমি আমাকে দাদু আর দাদির গল্প বলবে? আমি আর কিছুদিন পর বড়ই হয়ে যাব| বল না গল্পটা| - তাই তো, তাই তো, তুই তো বেশ বড় হয়ে গিয়েছিস মনে হয় ?দেখি পাশে আয় তো , বাহ্ , তুই তো দেখছি আমার কাঁধের কাছে পৌঁছে যাবি কিছু দিন পর ! জেঠু হেসে বলল| পেপারটা গুটিয়ে টেবিল এ রেখে যেই পা গুটিয়েছে চেয়ারের উপর, বুঝলাম আজ গল্পটা বলবে | এটা জেঠুর অভ্যেস | - তবে শোন‚ তোর দাদির দাদু‚ মানে আমাদের মায়ের দাদু তো রাজস্থানের কুলধারা গ্রামের পলওয়াল ব্রাহ্মণ| এই গ্রাম তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে| সবাই বলে ‚ ঐ গ্রাম এখন ভুতেদের আড্ডা| লোকে ওখানে বেড়াতে যায়‚ কিন্তু রাতে ওখানে থাকা নিষেধ| যাই হোক‚ যেকোন কারণেই হোক‚ ওখানকার সব লোক বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে | ঐ গ্রাম এখন আর কেউ থাকে না| আমার পরদাদা মানে তোমার দাদির দাদু রোজগারের আশায় দিল্লী চলে আসেন| নানা ঘাটের জল খেয়ে শেষ-মেশ লালা ছুন্নামলের গদীতে চাকরি পায়| প্রথমে ঘোড়াশালায়‚ পরে দপ্তরের কাজে লেগে যায়| মাথা খুব পরিস্কার ছিল| খুব সহজেই নিজের চেষ্টায় কাজ-কর্ম শিখে নেয়| কাজের প্রতি এই একনিষ্ঠতায় সহজেই লালা ছুন্নামলের নজরে পড়ে যায়| আচ্ছা তুই লালা ছুন্নামলের হওয়েলী তো দেখেছিস চান্দ্ণী চৌকে? - হা‚ দেখেছি তো‚ আগে বল ন! বলছি তো‚ দাঁড়া না‚ মনে করতে হবে তো একটু‚ উনি তো খুব তাড়াতাড়িই লালাজীর ভরোসা অর্জন করে নেন| লালাজীর কারোবারের অনেক লেনদেনই ওঁনার হাত দিয়ে করাতে থাকেন| এর কিছুদিন পরই সিপাহি বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে মীরাট থেকে কলকাতা হয়ে সমস্ত শহরে| তোরা বলিস সিপাহি মিউটিনি| সে আর এক গল্প| তোরা বইতে পড়েছিস তো এসব? - হ্যাঁ পড়েছি তো| আমি জেঠুর আরও কাছ ঘেষে বসি| প্রায় কোলেই চড়ে পরি| অন্য সময় হলে লজ্জা করত‚ কিন্তু এখন গল্পের গন্ধে সেই খেয়াল আর ছিল না| - তারপর শোন‚ ইংরেজদের তো টাকাপয়সার খুব টান| তারা লালা ছুন্নামলের কাছ থেকে টাকা ধার করতে লাগল সিপাহিদের খরচ চালানোর জন্য| এদিকে দিল্লীর বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরেরও টাকার খুব দরকার| উনি তো নাম-কা-ওয়াস্তে বাদশাহ ছিলেন‚ কিন্তু বাদশাহী তামঝাম সামলানোর জন্যও তো টাকা দরকার| তাই তিনি লালাজীর সাহায্য চাইলেন| কিন্তু লালাজী‚ ইংরেজদের চাপে পড়ে টাকা ধার দিতে অস্বীকার করলেন| এদিকে সিপাহীরা তো সব লালকেল্লায় এসে জমা হয়েছে , তাদের খাওয়া দাওয়ারও খরচা অনেক , সেটার জন্যও অনেক টাকা দরকার | তারাও তাই বাদশাহের ওপর টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল| লালাজীর অবস্থা ক্রমশ খুব খারাপ হয়ে গেল| তিনি কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না| লুটপাটের আশঙ্কায় উনি প্রায় আধমরা হয়ে গেল| অনেক ভেবে আর বাড়ীর সবার সাথে মশওয়ারা নিয়ে লালাজী ঠিক করল যে‚ ধনসম্পত্তি যতটা পারে দিল্লীর বাইরে পাঠিয়ে দেবেন| কারণ কখন যে ওরা এসে লুটপাট করবে তার তো ঠিক নেই| আর সত্যি বলতে কি‚ সিপাহীরাই যে লুটপাট করবে তা নয়| সেইসময় যে অব্যবস্থা চলছিল তাতে দিল্লী ঠগ‚ জোচ্চোর‚ বাঁটপারে ভরে গেছিল| সব আশপাশের রাজ্য থেকে এসে দিল্লীতে ঘাঁটি গেড়েছিল‚ মৌকার ফায়দা ওঠাবার জন্য| একদিন অনেক রাত দেখে সেই ব্যবস্থাই নেওয়া হল| তাদের মধ্যে তোর দাদির বাবাও ছিলেন| উনি অনেক টাকাপয়সা নিয়ে রাজস্থানে নিজের বাড়ির পথে পাড়ি দিলেন| - তারপর? আমি প্রায় শ্বাস বন্ধ করে গল্প গিলছিলাম| - দাঁড়া দাঁড়া ‚ গলা শুকিয়ে গেছে আমার| যা গিয়ে বড়মাকে বলে আয় এক কাপ চা দিয়ে যেতে| গলাটা ভিজিয়ে নি‚ তারপর বলছি| জেঠু পাছে আবার পাল্টি না খেয়ে যায় তাই দৌঁড়োলাম বড়মার কাছে চায়ের ফরমাইশ নিয়ে| ফিরে যেই এসেছি‚ দরজায় বেল বাজার আওয়াজ| দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখি জেঠুর স্কুলের বন্ধু‚ থানার বড়সাহেব‚ মিনা আঙ্কল‚ পুরো নাম সুরিন্দর মিনা‚ দরজার ওপাড়ে দাঁড়িয়ে| - ওয়ে ছোটা চেতন‚ তেরা তাউজি ঘর পে হ্যায়? উনি আমাকে ছোটা চেতন বলেই ডাকেন| - হ্যাঁ আঙ্কল‚ নমস্তে! আইয়ে না| জেঠু‚ মিনা আঙ্কল এসেছেন| হয়ে গেল আজকের মত আমার গল্পের সত্যানাশ| - আ যা ওয়ে থানেদার| জেঠু উঠে এসেছিল‚ আমার পেছন থেকেই আওয়াজ দিলেন| - সালে‚ ভো... আমার দিকে তাকিয়ে মিনা আঙ্কল জিভ কেটে চুপ করে গেলেন| বুঝলাম ওটা একটা গালি‚ আর আমি তো জানি ওটা কি গালি| মিনা আঙ্কল এসেছে যখন‚ তখন তো আজ আর গল্পটা শেষ হবে না বোঝাই যাচ্ছে| তাই আমি আবার আমার মেকানো সেটটা নিয়ে মেঝেতে গুছিয়ে বসলাম| - আরে ভাইসাব‚ কখন এলেন? বলতে বলতে বড়মা জেঠুর চা নিয়ে ঘরে ঢুকল| - নমস্তে ভাবিজী| সব খৈরিয়ত? এই সালের ... আবার জিভ কাটলেন মিনা আঙ্কল| রুদ্রার সাথে একটু দরকার ছিল| - নমস্তে‚ চা নেবেন তো? - না না ভাবিজী| হো সকে তো একটু নিম্বুপানি দিয়ে দিন‚ যা গরম পড়েছে| সারাদিন দৌড়ভাগের পর আর শরীর দিচ্ছে না| আঙ্কল ধপাস করে সোফায় বসতে বসতে বললেন| - এক্ষুনি দিচ্ছি| বড়মা কিন্তু একদম হিন্দি বলে না| সামনের লোক যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন‚ বড়মা কিন্তু সপাটে বাংলাই চালিয়ে যায়| সে সব্জিওয়ালাই হোক বা জেঠুর বন্ধু‚ বড়মার কাছে সবাই সমান| এত বছর হয়ে গেল‚ দিল্লীতে আছে‚ কিন্তু হিন্দিটা কেন জানি রপ্ত করতে পারেনি| আমার মনে হয় রপ্ত করতে চায়নি| এর মাঝে তো একবার বছর পাঁচেকের জন্য জেঠুর সাথে সবাইকে নিয়ে ব্যাঙ্ককে ছিল| ওখানেও শুনেছি বড়মা সবকিছু বাংলাতেই চালাতেন| নতুন এই মেকানো সেটে একটা ইন্টারেস্টিং অ্যাডিশন আছে যে‚ মোটর দিয়ে ক্রেন বানানো যাবে| আজ দেখি যদি বানাতে পারি‚ তাহলে বাবাকে বেশ অবাক করে দিতে পারব| - আর বল কি খবর? তোর কাজকর্ম কিরকম চলছে? জেঠু মিনা আঙ্কলকে জিজ্ঞেস করল| - আর কাজকর্ম !! এই গভর্মেন্ট যা শুরু করেছে ‚ তাতে চাকরী বাঁচানো মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে| রোজই নতুন কোন ফরমান আসছে তো আসছেই| মন্ত্রীর ছেলে তো সবার উপরে| নতুন আদেশ আসবে শুনছি‚ ড্রেনপাইপ প্যান্ট চলবে না| তাই কোকাকোলার বোতল প্যান্টে ঢুকিয়ে দেখ‚ যদি পা দিয়ে সোজা না বের হয়‚ তাহলে ব্লেড দিয়ে প্যান্ট চিরে দাও| তুই বল‚ এসব কি পুলিশের কাজ? - হাঃ হাঃ হাঃ!! আরও বয়স ভাড়া‚ আমি তো দুবছর আগেই রিটায়ার করেছি| তুই যদি বয়স না কমাতিস‚ তাহলে এই হ্যাপা তোকে পোশাতে হত না| - ছোড় য়ার‚ তখন কি করে জানব যে‚ এই অবস্থা হবে| ও তো পাঠক স্যরের কথায় এসে বয়স কম করলাম| উনি তো বললেন যে‚ সরকারী নৌকরিমে ফায়দা হোগা তুঝে| বাদ মে মুঝে ইয়াদ করে গা| আজ সালে কো সত্যি ইয়াদ করছি| - আমি মাথা নিচু করে চুপচাপ শুনে গেলাম| ভাবটা এমন যেন কিছুই শুনিনি| ক্রেন বানানোর পেছন পড়ে রইলাম‚ কিন্তু কান তো ওদের কথার মধ্যে| এই ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেছি| কেউ বুঝতেই পারে না| - ভাই শুন‚ যিস কাম কে লিয়ে আয়া থা‚ তেরে ছোটে বেটা কা নাম কি যেন? - কুশু মানে কৌশিক| কেন কি হয়েছে? জেঠু হঠাৎ উদগ্রীব হয়ে উঠলেন| - আরে সেরম কিছু না‚ তবে ওপর থেকে অর্ডার হয়েছে‚ ওর ওপর নজর রাখার| আসলে এই গভর্মেন্টের ওপর প্রচুর চাপ এসেছে আপৎকালীন অবস্থাতে| কোথাও কিছু অ্যান্টি - গভর্মেন্ট অ্যাকটিভিটি হলে আমাদের ওপর চাপ আসছে| সেন টাইটেল আর ঘরকা পতা দেখেই মনে হল‚ ও এবাড়ির ছেলে| য়ার‚ ওকে একটু সমঝে দে‚ আমি যতদিন আছি সেভ করে যাবো| কিন্তু দুমাস পরেই আমি রিটায়ার করব‚ তখন কিন্তু আমার এক্তিয়ারের বাইরে চলে যাবে| - এই যে আপনার নিম্বুপানি| বড়মা একটা ট্রেতে নিম্বুপানি আর নিমকি নিয়ে ঘরে ঢুকল| আমার মন কিন্তু অন্যদিকে চলে গেছে| এটা আবার কি? ছোড়দাও কি আজ থানাতে যেভাবে দেখলাম‚ সেইভাবে জেলে যাবে!!! মাথা ফাটা‚ জামাকাপড় ছেঁড়া!! খুব খারাপ‚ খুবই খারাপ| - থ্যাঙ্কস ভাবিজী‚ উফ বড্ড তেষ্টা পেয়েছিল| বলে আঙ্কল এক নিঃশ্বাসে লেবুজলটা ঢক ঢক করে খেয়ে নিল| জেঠু হঠাৎ কি রকম যেন থম মেরে গেল| - ওয়ে রুদ্রা‚ কেয়া হুয়া? আমি যতদিন আছি‚ ওর ওপর আঁচ আসতে দেব না| কিন্তু দুমাস পরই রিটায়ার করাব| তখন কি হবে জানি না| এটা ভেবেই তোকে আজ বলতে এলাম| অবশ্য এই কথাগুলো আঙ্কল বড়মা চলে যাবার পরই বলল| না হলে‚ বড়মা তো বাড়ি মাথায় করত‚ এটা মিনা আঙ্কল ভালোমতই জানেন| - না রে তা নিয়ে ভাবছি না| তুই তো জানিস কুশুটার পড়ালেখায় ভালো মাথা ছিল কিন্তু এই MNU তে ঢোকার পরই কেমন যেন বদলে গেছে| আমার সাথে তো কথাই হয় না আজকাল| ইন ফ্যাক্ট আমাকে একটু এড়িয়েই চলে| মানে কি করছে‚ কি করবে এসব প্রশ্ন করব তাই.. -হুম ‚ কম উমর ক্যা হ্যায়| এক - দুবার ধাক্কা খেলেই শুধতে যাবে| লেকিন এটাই দেখতে হবে‚ বেশি দেরি না হয়ে যায়| দিনকাল ভালো না| তা মঝলি বহু‚ কুন্তলা ভি তো MNU মে হ্যায়? ও তো বুদ্ধিমতী মেয়ে| ঐ বা এই পার্টিতে আছে কেন? ওদের ঐ সন্তোষ উপাধ্যায় ধুরন্ধর লোক‚ শালাকে একদিন বাগে পাই‚ অ্যায়সা ডন্ডা করুনগা কি জিন্দেগী ভর ইয়াদ রখেগা| - জেঠু কিছু বলল না‚ চুপ করেই রইল| বুঝতেই পারছি খুব চিন্তায় পড়েছে| জেঠু তো খুব বড় পোস্টে ছিলে‚ সরকারি নৌকরিতে| দাদু মারা যাবার পর‚ একলাই পুরো সংসার চালিয়েছে| ভাইদের পড়াশোনা‚ বোনেদের বিয়ে সব একা হাতে করেছে| মা‚ আমায় সব বলেছে| সবাই তাই জেঠুকে ভীষন ভালোবাসে‚ শ্রদ্ধা করে | জেঠু যখনি বিদেশ যেত‚ সবার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসত| আমার জন্যও এনেছিল একটা কোডাকের ৬ এম এম মুভি ক্যামেরা আর তার প্রোজেক্টার| পাঁচ-ছটা চার্লি চ্যাপলিনের মুভিও আছে| তবে এখনও আমাকে চালাতে দেয়নি| আএকটু বড় হলে আমাকে চালাতে দেবে| এরপর জেঠু আর মিনা আঙ্কল যে কিসব আলোচনা করতে লাগল‚তার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না| তবে‚ পলিটিক্স নিয়ে আলোচনা চলছে এটা বুঝলাম| এত আনন্দের মধ্যে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল| কি যে হবে কে জানে!!! ..ক্রমশঃ

656

75

Stuti Biswas

পেরেম্বানান ......... হিন্দু মন্দির

গাড়ী পারকিং করে টিকিট ঘরের কাছে যেতেই দেখি লম্বা লাইন । মনটা দমে গেল । তুফান জানাল আমরা এসেছি রামাদান (ইদ )ছুটীর মরসুমে । এখন এখানে সাত দিন ধরে ছুটি চলছে তাই এত ভীড় । তবে বিদেশীদের জন্য আলাদা গেট । ফাঁকা । টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম । চোখ জুড়িয়ে গেল । আগ্নেয়গিরির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারই পদতলে সবুজের ভাসাভাসি । নিকটেই মাউন্ট মেরাপি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি &nbsp;। শেষ ২০১০ এ জ্বলন্ত লাভা উগড়ে দিয়েছিল । সবুজের বাগানে নীল আকাশের নীচে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর মন্দির । ভাবতে অবাক লাগে সেই প্রাচীন কালে ঝড়ঝঞ্জা জয় করে সাতসমুদ্র তেরো নদী অতিক্রম করে হিন্দুধর্ম পৌছেগেছিল ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ পুঞ্জে । আর আজ আমরা হিন্দুধর্মের উৎস তেই তাকে বজায় রাখার জন্য নানা ছলছুতো করতে থাকি । ইন্দোনেশিয়ায হিসাব করা মহা ঝকমারী ।মুদ্রার নাম রুপয়া । শুরু ১০০০ নোট থেকে । হোটেল থেকে মালিবু রোড রিক্সা ভাড়া চাইল ৩৫০০০ রুপয়া । আকাশ থেকে পড়লাম ।একিরে ভাই …কোন দেশে এলাম রিক্সাওলাও হাজার ছাড়া কথা বলে না । ডাব খেলাম । এত জল ,এত জল যে পেট ফুলে জয়ঢাক হবার জোগাড় &nbsp;। দাম চাইল ১৫০০০ রুপয়া ।কোন কিছু হিসাব করতে গেলেই শূন্যরা মাথার মধ্যে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিচ্ছিল। শূন্যের আধিক্যে মাঝে মাঝে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলাম । আচ্ছা এই লক্ষ ,কোটিপতি রিক্সাওলা, ডাবওলা এরপর এরা কি পতি হবে!!!!!!!!!!!! এই দেশের জন্যই মনে হয় ক্যাল্কুলেটর এখনো বেঁচে আছে কমপ্লেক্সে ঢুকতেই আমাদের স্বাগত জানাল বল্লমধারী সান্ত্রীরা ।এগোতে গিয়েও পিছিয়ে এলাম দেখি রাক্ষস খোক্কস ঘোরাফেরা করছে । ক্যামেরা হাতে নিতেই তারা পাশে এসে দাঁড়াল ।চললো নানা ভঙ্গিমায় ফটো সেসন । পেরেম্বানানে ছয়টি মূল মন্দির ছাড়াও আরো ছোট ছোট ২৩৫ টি মন্দির ছিল । বেশীরভাগই ধবংস হয়ে গেছে &nbsp;।স্থানীয় লোকেরা পরিতক্ত পাথর নিয়ে কাজে লাগিয়েছে । এখন অবশ্য সবই সংরক্ষিত ।মন্দিরগুলি ধূসর কালচে রঙের আগ্নেয়গিরির পাথর দিয়ে তৈরি &nbsp;। সংস্কারের পর কয়েকটি মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে । তারমধ্যে সবচেয়ে বড় শিবগৃহ । তার দুইপাশে অপেক্ষাকৃত ছোট ব্রহ্মা ও বিষ্ণু মন্দির । এই তিন মন্দিরের সামনে বাহন নন্দী, গারুদা ও হংস মন্দির । এ ছাড়া দুর্গা ও গনেশের আলাদা মন্দির । ব্রহ্মা ও শিব মন্দিরের গায়ে পাথরের ব্লকে খোদাই করা রামায়ন গাথা &nbsp;। বিষ্ণু মন্দিরের গায়ে খচিত শ্রীকৃষ্ণের জীবনের নানা কাহিনী । অন্যান্য মন্দিরে র গায়ে ভগবত পুরাণের কাহিনী বর্ননা করা আছে । প্রত্যেক মন্দিরে উঠতে হল পাথরের উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে । মন্দিরের কারুকার্য সত্যি দেখার মত । সংরক্ষণের এত বন্দোবস্ত করলেও আশ্চর্য লাগল দেখে যে মন্দিরের ভিতরে কোন আলোর বন্দোবস্ত নেই । ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভিড়ে দম বন্ধ হবার যোগার । আলো না থাকায় পাথরের মুর্তির ভাল করে ফটো তোলা গেল না । পাথরের গায়ে খোদাই করা কারুকার্য দেখতে দেখতে পৌঁছেগেছিলাম সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে &nbsp;।খেয়াল করিনি কখন সূর্য পশিম গগনে হেলে গেছে ।।কমপ্লেক্সটি বিরাট বড় । ভাল করে দেখতে হলে পুরোদিন হাতে করে যেতে হবে । ছুটির মরসুম হওয়ায় বেশ ভীড় ছিল । তবে প্রায় সবই লোকাল লোকজন । বিদেশী খুব একটা নজরে এল না । ফিরতে মন চায় না। দেখার তৃষ্ণা মেটেনা ।কিন্তু ফিরতে হবেই । ফেরার পথে কমপ্লেক্স সংলগ্ন মার্কেট থেকে কিছু কাঠের জিনিষ কেনা হল । ভালই দরাদরি চলে । যখন গাড়ীতে চড়লাম তখন চারিদিকে গোধূলির কমলা আলোর মায়াময়তা ।পাখিরা ডানায় ক্লান্তি মেখে ফিরছে । কমপ্লেক্স পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরলাম &nbsp;। ম্লান আলোয় দূরের গ্রামগুলি ছায়াছায়া হয়ে জেগে উঠছে । পেরেম্বানান রহস্যের সীমা নেই । খননের ফলে এখনো বেড়িয়ে আসছে অনেক মন্দিরের নির্দশন &nbsp;। সম্প্রতি ১৩ মিটার আগ্নেয়গিরির ছাইর নীচে চাপা পরা মন্দির আবিস্কৃত হয়েছে । সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রচুর মূল্যবান নির্দশন লুকিয়ে আছে এখানে । বিদায় পেরেম্বানান …। আর কোনদিন হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে না । এই ভাবেই শতাব্দী ধরে ইতিহাসের পাতায় তুমি বেঁচে থাকবে ।

81

21

Srijita

ধন্যবাদ বাংলাআড্ডা

ছোটবেলায় গল্প লেখার চেষ্টা করতাম যদিও সেগুলো খুবই শিশুসুলভ ছিল‚ তবুও লিখ্তাম| সব খাতার পিছনের পাতা খুলে দেখলেই আমার কীর্তি নজরে পড়ত| একটু বড়ো হওয়ার পর অবশ্য সেসব ইচ্ছা চলে গেল‚ কেন? তা বলতে পারব না| তবে এরই মধ্যে স্কুল-ম্যাগাজিনে দুটো লেখা বেড়িয়ে ছিল| তারপর সব বন্ধ| অনেক বছর পর বাংলাআড্ডার খোঁজ পেলাম|এখানে ভূতের গল্প প্রতিযোগীতা দেখে মনে হল একবার চেষ্টা করেই দেখি| কিন্তু লিখতে বসে সব গুলিয়ে যেত‚ অনেক কিছুই মনে আসতো কিন্তু ঠিক করে লিখতে পারতাম না‚ একটু লিখেই আবার সব মুছে দিতাম‚ অবশেষে অতি কষ্টে একটা ছোট গল্প লিখলাম‚ তাও শেষটা ঠিক মনের মতো হল না| তবু অনেকদিন পরে লিখে বেশ ভালোলাগল| দুদিন আগে আবার হঠাৎ লিখতে ইচ্ছা হল‚ লিখতে বসলাম| দেখলাম এবারে বেশ লিখতে পারছি‚ আগের বারের মতো গুলিয়ে যাচ্ছেনা| যাই হোক মনে যা এল লিখলাম| কেউ কেউ লাইক দিল‚ কম্যান্ট করল| ইচ্ছাটা ডেলিপ্যাসাঞ্জার হয়ে যাক এমন wish পেয়েছি| ইচ্ছা তো ডেলি না হলেও প্রায়ই জেগে উঠছে| প্যাসাঞ্জার নিয়ে ট্রেন কতদূর যাবে জানি না‚ তবে ষ্টেশনে রোজই আসা হয় এটা বলতে পারি| <img class="emojione" alt="☺" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/263A.png?v=1.2.4"/> সবই বাংলাআড্ডার দৌলতে| ধন্যবাদ|

76

6

Aratrik

হংসচঞ্চু

মেঘদূত দ্বিতীয় পর্ব —তুই এত ঢপ দিচ্ছিস কেন? —ঢপ? আর ইউ ক্রেজি? তবে তুই বোকা পাঁঠা। সব কথা বুঝবি না। —পাঁঠাদের বোকা বলা হয় কেন রে? —বোকা বোকা দেখতে বলে মনে হয়। তারপরে জন্মায় কোতল হবে বলে, এটাই বোকামি বলে ধরা হয়। তুই বুঝবি না, এটা দর্শনের খুব বড় তত্ত্ব। লিভ টু সারভাইভ ইজ নট ওয়র্থ টু লিভ বাট টু লিভ ইউ নিড টু সারভাইভ। তোর বরকে জিজ্ঞাসা কর। বুঝিয়ে দেবে। —ধুর! আমার বর আমাকে কিছু বোঝায় না। —দোষও দেওয়া যায় না। তোর মতো বোকা পাঁঠা ধরনের বৌ পেলে, কেউ কিছু বোঝানোর পরিশ্রম করে না। বরং তোকে হিরে জহরৎ কিনে দিলে তোর কাছ থেকে পাল্টা কিছু পাওয়া যেতে পারে। —কী পাবে রে আমার কাছ থেকে? —সংসারটা দেখবি। ছেলেপুলে বড় করবি। খাবার দাবার করে দিবি। রাতে মশারি গুঁজে দিবি। সেজেগুজে সামনে ঘুরে বেড়াবি। আবার হেভি গাউন পরে পার্টিতে যাবি, সবাই তোকে দেখে ট্যারা হয়ে যাবে, আর তাতে তোর বরের বুক গর্বে ফুলে উঠবে। এটা খুব বড় পাওয়া। —গাউনটা কোথা থেকে পেলি? —স্বপ্নে। —তুই আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিস?? —সত্যি রে। কয়েকদিন ধরে তোর কথা খুব মনে হচ্ছে। তারপরে এক রাতে তোকে স্বপ্ন দেখলাম। —কী দেখলি? —দেখলাম একটা আয়না মোড়া বড় ঘর। তার মধ্যে সকলে ঘুরে ঘুরে গ্লাসে মদ নিয়ে খাচ্ছে। আর তুই একটা নীল গাউন পরে নাচছিস। টার্কি ট্রট। —ঈ ঈ। তুই এত শয়তান হয়ে গেলি কবে থেকে!! —হ্যা হ্যা। তুই-ই তো আমাকে জিজ্ঞাসা করলি। —তুই কিন্তু এমন একটা স্বরে বললি যে আমাকে স্বপ্নে দেখেছিস, তাতে খুব বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল। —কী সে বিশ্বাস হয়েছিল? স্বপ্নে? —তুই স্বপ্ন বিশ্বাস করিস? —করব না? স্বপ্ন, ভূত সব বিশ্বাস করি। না হলে শেক্সপিয়র পড়াই যায় না। —শেক্সপিয়রে স্বপ্নও আছে? —ধুর গাধা। এই কথাটাই তুই ওকে যদি একবার বলতিস, এতক্ষণে কোতল হয়ে যেতিস। তারপরে রান্না করে গাবুর ঝোল খাওয়াতো লোকজনকে দাওয়াত দিয়ে। শোন, সিজারের বৌ স্বপ্ন দেখেছিল, সিজারকে কোতল করা হচ্ছে। সে এক দুর্দান্ত স্বপ্ন। আর সিজার তো দেখ সত্যিই মরল। —আমিও স্বপ্ন দেখি। —আঁক। কী স্বপ্ন দেখিস? নদীর ধারে অনেক কচি ঘাস? ধারেকাছে ধোবাটা নেই? —মার খাবি কিন্তু। —তা হলে দেখিস, তোর টেকো বরের সাদা অডিটা দোরের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তা হলে সাবধান। —আরে দূর। বরকে নিয়ে না। —যাক। তোর বুদ্ধি হয়েছে। —আচ্ছা, আমাদের বাড়িটা তোর মনে রয়েছে? —কেন থাকবে না? —বড় লাল আর একটা বাড়ি মনে রয়েছে? —রাজশেখর বসু সরণীতেই? —না। ওদের ঠিকানা রমেশ মিত্র রো়ড। —কোন বাড়িটা? —বাঃ। লাফিয়ে লাফিয়ে দেবদারু পাতা তুলে দিতিস ওকে। —রাইট। মনে পড়েছে রে। সরি। ভেরি সরি। —আমার আজকাল ওই বাড়িটার কথা খুব মনে পড়ে। —ওই বাড়িটায় তো একজন আঁতেল থাকত। তোকে বলত, ‘গাছটায় একটু লাথি মেরে দেবে? বাঁ পা দিয়ে? দাও না!’ কী ন্যাকা! —একদম বাজে কথা বলবি না। মেরে দাঁত ভেঙে দেব। —আঁতেলটা বাজে কথা হবে কেন? —তুই যে ভাবে বললি, তাতে খুব একটা অচ্ছেদ্দা ছিল। —যেন যুক্তাক্ষর হলেই খুব কিছু বলা হল। আঁতেল ইজ আঁতেল। খেঁকুটে মার্কা চেহারা। সব সময় হাতে বই। ইনিয়ে বিনিয়ে হাঁটত। কুকুরের লেজে ইচ্ছে করে পা দিত। নামটা যেন মেয়ে মেয়ে, ওঃ মনে পড়েছে অজন্তা স্যার। সাউদ কলকাতার কোনও একটা কলেজে পড়াত। আচ্ছা মালটার নাম অজন্তা ছিল কেন রে? ওর বাপ-মায়ের তো অনেক টাকা। ছেলের একটা ভাল দেখে নাম রাখতে পারেনি? আর তোকে বাঁ পা দিয়ে গাছে লাথি মারতে বলত কেন? —কুকুরের লেজে ইচ্ছে করে পা দিত? তোকে বলেছে? —বলবে আবার কেন? আমি নিজেই তো দেখেছি। তোর আমার সামনেই তো ল্যাংব্যাং করে হাঁটতে হাঁটতে কুকুরটার লেজে পা দিল। তারপরে আমি না বাঁচালে ওই রোগাভোগা শরীরে ১৪টা ইঞ্জেকশন। মালটা দিনদুপুরে বাংলা খেত না কি? —ওকে নিয়েই স্বপ্ন দেখি। —বুঝেছি। —ছাই বুঝেছিস। —বুঝেছি রে। আগেকার দিনের রানিদের এমন স্বপ্নদোষ হত। —মেরে তোর মুখ ফাটিয়ে দেবো। —আরে, শব্দটা তো আর খারাপ নয়। তার একটা খারাপ ব্যাখ্যা আছে, এইমাত্র। তুই ব্যাকরণার্থ ধর। স্বপ্নের দোষ। দেখ, তোর আসলে আজীবন বিরাট বিলাসে কাটিয়ে সম্পদে অরুচি ধরে গিয়েছে। —এটা কি তোর ঠিক হচ্ছে বল? তোর এতদিনের বন্ধু তোকে একটা গোপন কথা বলতে চায়, আর তুই সেখানে এমন শয়তানি করছিস? —আরে না। তুই সম্পদের কোলে কাটিয়েছিস সারা জীবন। কাঞ্চন ও বিদ্যা দুইই অফুরন্ত পেয়েছিস। তাই এখন তোর একটু দুঃখ বিলাস হচ্ছে। তুই একটু কম টাকাওলা লোক, কম পড়াশোনা জানা লোকের প্রেমে পড়তে চাইছিস। রানিদের এমন হত। —আমি রানী নই। কিন্তু রানীর মতোই মনে হয়েছিল একদিন। সে দিন খুব মেঘ করেছে। আমাদের রাস্তাটা ফাঁকা। আমি ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ দেখতে পেলাম, অজন্তা আপনমনে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘কী করছেন?’’ প্রথমে শুনতেই পেল না জানিস। তারপরে হঠাৎ আমাকে দেখে বলল, ‘‘তোমার বয়স কত?’’ আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ষোলো। তখন বললেন, ‘‘এই বয়সে এক কিশোরীর কী করে অমন শরীর হয় বলো তে?’’ —কোন কিশোরী? —আরে সেটাই তো বলছি। আমিও ঘাবড়ে গিয়ে একই কথা শুধোলাম। উত্তর দিল, ‘তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষামা চকিত হরিণী প্রেক্ষণা নিম্ন নাভিঃ। শ্রোণীভারাদলস-গমনা স্তোক নম্রা স্তানাভ্যাং যা তত্র স্যাদযুবতি বিষয়ে সৃষ্টিরাদ্যেব ধাতুঃ।।’ —বলিস কী? —হ্যাঁ রে। সেটাই তো বলছি। তুই যে ঢপটা ব্লগে লিখেছিস যে আমি সংস্কৃতে গাধা, সেটা ঠিক নয়। আমি সংস্কৃত জানি। তাই লোকটার কথা বুঝতে পেরেছিলাম। সব থেকে বড় কথা, লোকটাও জানত, আমি সংস্কৃত জানি। আমি অ্যাডাল্ট। কিন্তু তখন আমার বয়স মাত্র ষোলো। —পাশের বাড়িতেই তো থাকতিস। তোকে চিনত তো। ওই সব লোক খুব ডেঞ্জারাস হয়। —বাজে কথা বলিস না তো। শুধু পড়াশোনা করত। দোতলার কোণের ঘরটাতে থাকত। পাড়ার কাউকে চিনত না। আমরা অবশ্য সবাই চিনতাম। একদিন স্কুল থেকে ফিরছি, হঠাৎ দেখতে পেলাম। তখনই ওই সব বলল। —আর কী বলল? —বলল, ‘‘তুমিই বলো, একটি ষোলো বছরের কিশোরীর পক্ষে সম্ভব, এমন চেহারা ‘মধ্যে ক্ষামা চকিত হরিণী প্রেক্ষণা নিম্ন নাভিঃ। শ্রোণীভারাদলস-গমনা স্তোক নম্রা স্তানাভ্যাং’? আসলে কী জানো, এই গোটা ঘটনাটাই চিন্তাসূত্র। যক্ষ, যদি ধরে নিই যে মাঝবয়সী এক লোক, আর তার যথেষ্ট পয়সা কড়ি রয়েছে, কেননা সে কথা তো সে বলেই দিচ্ছে, যে তার এক পদ্ম ও এক শঙ্খ সম্পদ রয়েছে, তার বাড়িতে একটি সোনার যষ্ঠি পোঁতা রয়েছে, সে যক্ষ তাই ধরে নিতে পারি, সে ভাল গাইতে-নাচতে পারে, তার যে কল্পনাশক্তি রয়েছে, তা তো বুঝতেই পারি মেঘদূত থেকেই, তাই ধরে নিতে পারি, তার আকর্ষণের ক্ষমতাও রয়েছে, তাই সে এমন একটি নারীরত্ন পেয়েছে, কিন্তু তারপরেও সে এমন কোনও কিশোরীকে কী করে বিয়ে করতে পারে? আমি মেনে নিতে পারি না জান? তাই আমার মনে হয়, পুরোটাই চিন্তাসূত্র। কিন্তু সেটা-ও পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না যে। তার মধ্যে একটা দ্বন্দ্বও যে রয়েছে। দেখ পরপর কতগুলো কথা কালিদাস বলছেন। চিন্তাসূত্র আছে বলেই মনে করে নেওয়া যেতে পারে, কোনও রমণী, যদি সুলক্ষণা হন, তা হলে তার বাঁ পায়ের আঘাতে অকালে ফুল ফুটবে। ফুল ফোটা, সে তো একটা সত্যি ঘটনা। তা তো চিন্তা দিয়ে হয় না। কিন্তু কালিদাস চিন্তাসূত্র দিয়ে বাধ্য করেছেন সেই সত্যি ঘটনাটা হয়ে উঠতে। কিন্তু তিনি বললেই তো আর সত্যি হতে পারে না। পারে বলো? কিন্তু হয়। সুলক্ষণা নারীকে এই যে সম্মান, তা একই সঙ্গে চিন্তাসূত্রের উদযাপন। কেননা, যা হয় না, যা প্রকৃতির সূত্রে নেই, তাকেই চিন্তার শর্তে ‘হয়’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন কালিদাস। তাঁর লেখার যে আশ্চর্য ক্ষমতা, তাই দিয়ে তিনি প্রাণ দিয়ে দিচ্ছেন একটি শর্তকে। তাঁর লেখক সত্তা দিয়ে তিনি যে একটি বিশ্ব তৈরি করেন, সেখানে তাঁর যে ঈশ্বরপ্রতিম ক্ষমতা, তাই দিয়ে তিনি জাগিয়ে দিচ্ছেন একটি ঘুমন্ত বৃক্ষকে। তাকে বাধ্য করছেন ফুল ধারণে। সবই করছেন তাঁর চিন্তার ক্ষমতায়। কেননা, তিনি অতি লাবণ্যময় একটি শর্ত যে আরোপ করেছেন। এই যে অতি লাবণ্যময় শর্ত—এইটিই তাঁর ক্ষমতা। এই কারণেই তিনি কাব্যে লিটারারি ডিভাইসগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। আর তারপরে তাঁর তৈরি সেই শর্তটি হল একটি সুলক্ষ্মণা নারী। সুলক্ষ্মণা নারীকে কে না ভালবাসে বলো? তার উপরে কালিদাস যদি তাকে আকার দেন, তা হলে সে আরও কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে? সে যে রমনীরত্ন হয়ে ওঠে। আর এই সুলক্ষণা নারীকে সম্মান জানানোর সময়, লক্ষ করো, নারীর মধ্যেও সুলক্ষণগুলিকেও সম্মান জানানো হচ্ছে। কিন্তু এ কথা তো সত্যি, যে এই যে লক্ষণগুলোকে সুলক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো সবই খুব করেই পিতৃতান্ত্রিক। খুবই সামন্ততান্ত্রিক। তাতে নাভী গভীর হতে হয়। তাতে স্তন ভারী হতে হয়। তাতে জঘন গুরু হতে হয়। তাতে কি নারীদেরও খুব করে কোনও আপত্তির কারণ আছে? যদি আমি নারী হতাম, তা হলে আমি তাতে আপত্তি করতাম? এমন একটি শরীর কি আমার বাঞ্ছনীয় হত না? যদি হত, তা হলেও, সেই হল গিয়ে রূপের মাপকাঠি। সেই স্থির হয়ে গিয়েছে। শুধু সেটাই তো আপত্তির কারণ হতে পারে। তাই দেখো, ওই ষোলো বছরের কিশোরীকে কালিদাসের হাতে পড়ে কেমন হতে হয়েছে। আমি শিউরে উঠি, জানো, যখন দেখি, তার শরীরটি বিশাল হয়ে উঠেছে। বিশাল বিশাল হয়ে উঠছে। তার সুকুমার শরীরটিকে হত্যা করা হয়েছে। তার বদলে সেখানে সেই রক্ত মাংস হাড় অধিকার করে নিয়েছে এই অপরূপা রাক্ষসী। রাক্ষসী? রাক্ষসী নয় তো কী? একবার দেখো, সেই যে নারীদেহ, তাতে লেখকের মনের প্রতিফলন কেবল রয়েছে। আমি, পুরুষ বলে, কেবল তার শরীর এমন হোক চেয়েছি। তাই সে অমন হয়েছে। যেমন বৃক্ষ ফল ধারণ করে, তেমন ভাবেই। কিন্তু তাতে সে কোথায় হারিয়ে যায়? একটি ষোলো বছরের কিশোরী? আমি আমার চিন্তাসূত্র দিয়ে তার কৈশোর বদলে দিয়েছি। কালিদাস আমি নিতে পারি না জানো। আমি তো শেক্সপিয়র পড়েছি। আমি এ ভাবে চিন্তাসূত্র দিয়ে কোনও মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারি না। সেই চিন্তা মেনে নিতে পারি না। তাই আমার চোখে কালিদাসের নায়িকারা ক্রমশ রাক্ষসী হয়ে ওঠে। তারা মনের প্রতিফলন কেবল ধরে। তারা কেবল এক পুরুষের মনের দর্পণ মাত্র। এমন করে বলবেন না। কালিদাস আমার খুব ভালো লাগে। তুমি কি তা হলে স্বীকার করে নেবে, বিরহে মলিন এক নারীকেও, অতুলনীয়া হয়ে থাকতে হয়? তার পোশাক মলিন, সে অনেক দিন ঘুমোয়নি, সে খায় কি খায় না, তবু সে সুন্দরী, তবু তাকে সুন্দরী হয়ে থেকে রয়ে যেতে হয়—এ কি খুব বড়ো করে করা কোনও রাক্ষসবৃত্তির অনুশীলন নয়? যক্ষও কি তাহলে রাক্ষস নয়? শুধু তাই নয়, রাক্ষসবৃত্তি সে আরোপ করে, সে আরও অনেককে, তার সংসর্গে এলে, সবাইকে সে রাক্ষসে পরিণত করে। আপনি রাক্ষস। না। আমি ব্রাহ্মণ। দেখো, আমি রাক্ষস যদি হতাম, তা হলে কালিদাসের মায়াজালে ফেঁসে যেতাম। মেনে নিতাম। আমি মানছি না। এ কথা কি তুমি বুঝতে পারছো না? তুমি কি বুঝতে পারছো না, আমি নতুন একটি চিন্তাসূত্র যে তৈরি করতে চাইছি? তা হলে আমি কি রাক্ষস সংসর্গকে প্রতিনিবৃত্ত করছি না? তা হলে কি আমি আর্বান ডিসেপশনের যে জাল কালিদাস বুনেছিলেন তাঁর লিটারারি ডিভাইসগুলোর অনুপম ব্যবহার দিয়ে, তা ভাঙতে চাইছি না? তা হলে আমি ডিসেপশনের বিরোধিতা করছি। আমি দর্পণ মাত্র হয়ে থাকতে চাইছি না। সব শ্রোতা বা পাঠক যে পাঠক বা শ্রোতা হয়েই থাকতে চায়, আমি তার প্রতিবাদ করছি। আমি তা হলে কী করে রাক্ষস হব? কেননা, আপনি তাই করতে গিয়ে মূল লেখাটিকে অস্বীকার করছেন। লেখকের ইচ্ছার বিরোধিতা করছেন। আপনি যেমন মনে করছেন, কালিদাস জোর করে ষোলো বছরের এক কিশোরীকে গুরু জঘন স্তনের এক নারীতে পরিণত করেছেন, আপনিও তেমন কালিদাসকে আক্রমণ করে তাঁকে রাক্ষসে পরিণত করছেন। আপনি আপনার মনের ভাব কালিদাসের উপরে চাপিয়ে দিতে পারেন না। আপনার শেক্সপিয়র জ্ঞান কালিদাসের উপরে চাপিয়ে দিতে পারেন না। কেননা, সেই সোর্স অফ নলেজ পৃথিবীতে পরে তৈরি হয়েছিল। তাকে আপনি অ্যাকসেস করতে পারেন। কালিদাস পারেননি। কথা তা নয়। কথা হল পরিচয় বদলে নেওয়া। আইডেন্টিটি বদলে ফেলার বা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। লেখক কি, কারও আইডেন্টিটি বদলে দিতে পারেন? ওই শ্লোকটা দেখ, নীবীবন্ধোচ্ছ্বসিতশিথিলং যত্র বিম্বাধরাণাং ক্ষৌম‌ং রাগদনিভৃতকরেষ্বাক্ষিপৎসু প্রিয়েষু অর্চিস্তুঙ্গানভিমুখমপি প্রাপ্য রত্ন-প্রদীপান্ হ্রীমূঢ়ানাং ভবতি বিফল প্রেরণা চূর্ণমুষ্টিঃ অনেক জায়গাতেই কোমরে গেরো দিয়ে কাপড় পরবার রীতি পাওয়া যায়। অলকার সুন্দরীরাও একই ভাবে গেরো দিয়ে কাপড় পরতেন। তাঁদের পাকা তেলাকুচোর মতো অধর টসটস করত। আর প্রিয়তমরা অধীর হৃদয়ে তাঁদের পরিহিত ক্ষৌম বসনের গেরো খুলে বস্ত্রহরণের পালা আরম্ভ করত। বসন নিয়ে টানাটানি করত। সামনে উজ্জ্বল শিখায় প্রদীপ জ্বলছে, হাজার হোক স্ত্রীলোক তো, লজ্জায় যক্ষ সুন্দরীরা মরে যেতেন। নাছোড় রাগান্ধ প্রণয়ীদের হাত থেকে মুক্তি নেই ভেবে লজ্জায় দিশেহারা হয়ে কামিনারা সামনে যা কিছু চূর্ণ পদার্থ পেতেন, প্রদীপের উপরে ছুড়ে মারতেন। তবু লজ্জার হাত কতটা যদি এড়াতে পারেন এই ভেবে। কিন্তু তাতে সে প্রদীপ নিভত না। সে তো তেলের প্রদীপ নয়। সে যে স্থিরজ্যোতি রত্নের প্রদীপ। কাজেই রূপসীদের পরাজয় ঘটত। তাতে কী হল? হল তো। অনেক কিছু হল। অনেক কিছু। আলোর মধ্যে প্রেম। যে প্রেমে আলো নেভাবার দরকার থাকে, সেই প্রেমেও আলো নিভছে না। বেশ। বুঝলাম। তা হলে ধরে নেওয়া যাক, তখন ঘরে আর কেউ ছিলেন না। হা হা হা। তুমি তো বেশ পিউরিটান আছো। তবে আমার কথা তা নয়। আমার কথা হল, কথাটা হল প্রিয়েষু। প্রিয় কি শুধুই বর হতে হবে? দু’টি শ্লোক তোমায় বলি। তেষাং দিক্ষু প্রথিত-বিদিশা-লক্ষণাং রাজধানীং গত্বা সদ্যঃ ফলমবিকল‌ং কামূকত্বস্য লব্ধ। তীরোপান্তস্তনিত-সুভগং পাস্যসি স্বাদু যস্মাৎ সভ্রূভঙ্গং মুখমিব পয়ো বেত্রবত্যাশ্চলোর্মি।। নীচৈরাখ্যাং গিরিমধিব বিশ্রামহেতোস্ত্বৎসম্পর্কাৎ পুলকিতমিব প্রঢ়ৌ পুষ্পৈ কদম্বৈঃ। যঃ পুণ্য-স্ত্রী-রতিপরিমলোদ্‌গারিবির্ন্নাগরাণামুদ্দামানি প্রথয়তি শিলাবেশ্মাভির্যৌবনানি। অর্থাৎ, কালিদাস বলছেন, মেঘ, বিদিশায় গিয়ে বেত্রবতী নামে গিরিনদীতে নেমে জল পান কোরো। কালিদাস তো, তাই বিদিশা, বেত্রবতী, তার জল এ সবই খুব অলঙ্কৃত। সে সব বিবরণে আর যাচ্ছি না। কিন্তু এটুকু বলতেই হবে যে, কালিদাস এ বার একটি পাহাড়ি নদী বেত্রবতীকে প্রাণ দিচ্ছেন। তাঁকে তিনি নারী করে দিচ্ছেন। মেঘকে বলছেন, ‘তুমি যখন নীচু হয়ে জল পান করতে যাবে, তখন ভ্রূ কাঁপিয়ে সেই নদীরূপী নারী তোমায় বারণ করবে।’ তুমি বল, এর মধ্যে কি একটু চুমু খাওয়ার কথা নেই? এর মধ্যে কি ওই যক্ষর একটি নদীকে বা নদীর আইডেন্টিটিতে এক নারীকে, যাকে তিনি চেনেন পর্যন্ত না, তাঁকে একটু চুম্বনের ইচ্ছা তাঁর জাগছে না? সেই জাগাটা প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে না? কেননা, তারপরেই কালিদাসের বর্ণনাতেই সেই নারী, বা নদীরূপী নারী, সেই আইডেন্টিটি বদলে দেওয়া নারী, অনুরাগে যে লাল হয়ে যাচ্ছে। সে কলকল স্বরে কী সব বলছে পুলকিত হয়ে। তুমি বলো, এই যে নারী, এই যে পথে তার সঙ্গে প্রেম, যে প্রেমে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যখন মনে রাখতে হয়, নারীরা শারীরিক সম্পর্কর ক্ষেত্রে আলো নিভিয়ে ফেলতে চায়, সে প্রদীপের উপরে চূর্ণ পদার্থ ছুড়ে ফেলে, সে ওই নীচৈঃ নামের পাহাড়টির নীচে অতি প্রকাশ্যে আপনমনে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে একটি পুরুষের সঙ্গে। আর আমরা তো এতক্ষণে জেনেই গিয়েছি, মেঘটি হল যক্ষই। সেই তো চিন্তাসূত্র দিয়ে সর্বত্র মেঘ হয়ে বয়ে বয়ে যায়। তারপরে দেখ, কালিদাসের যক্ষ বলছেন, অথবা কালিদাসও যক্ষ হয়ে বলছেন মেঘকে, অর্থাৎ, কালিদাসই কালিদাসকে বলছেন, নীচৈঃ-এর কাছে বসে জিরিয়ে নাও। সেখানে কদম্ব ফুল ফুটে আছে। এটি একটি প্রেমের আবহ তৈরি করে। কালিদাস যতই শৈব হোন, এটি নিশ্চিত ভাবে প্রেমের আবহ। আর তারপরে তিনি বলছেন, ওই পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গুহা রয়েছে। সেই গুহায় বিলাসিনী নগরাঙ্গনারা যান তাঁদের প্রিয়দের সঙ্গে। এরপর কালিদাস কালিদাসকেই শোনাচ্ছেন, তাদের সুবাসিত অঙ্গের এবং মর্দিত বিকশিত পুষ্পমালার গন্ধে ওই গুহাগুলো ভরে থাকে। এক একবার দমকা বাতাসে সে সৌরভ বাইরে চলে আসে—বিদিশা ও সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দেয়, যৌবন বর বেগবতী, তাকে আটকে রাখা যায় না। কালিদাস তাই রাক্ষস। তিনি তাঁর সংসর্গে যারা আসছে তাদেরও রাক্ষসে পরিণত করে দিচ্ছেন। এ কি রাক্ষুসে প্রেম!! —তুই কী বললি? —কিছু বলতে পারছিলাম না রে। হঠাৎ শুনলাম বলছেন, ‘তা হলে তুমি আমায় একবার বলো, যক্ষের নির্বাসনে কেন যৌবনবঞ্চিত হবে তার স্ত্রী? তা হলে তুমি একবার বলো, যক্ষ যে আট মাস পাহাড়ে নির্বাসনে, সেই সময় কেন মলিন থাকবে তার প্রেমিকা? লিভ টু সারভাইভ ইজ নট ওয়র্থ টু লিভ বাট টু লিভ ইউ নিড টু সারভাইভ—এটা তো রাক্কেষসদের তত্ত্ব। টু লিভ ইজ টু কনট্রিবিউট। কনট্রিবিউট। তাই সেই যক্ষের প্রমেমিকা, সে অন্য কারও সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবে না? কেন তার ঘরে অন্য কেউ আসবে না? কেন তাকে মলিন হয়ে পড়ে থাকবে হবে অতি সুন্দর হয়ে রয়ে? রাক্ষসী থেকে ব্রাহ্মণী হবে না কেন সে?’

1664

273

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

একটি চরিত্রের সন্ধানে

(প্রকাশিত লেখা) ================== বঙ্কিমচন্দ্র ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন – ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দে আর প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ তে । “ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনী কান্ত দাসের সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসের যে সংস্করণ প্রকাশ করে তাতে ‘ঐতিহাসিক ভূমিকা’ লেখেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার । ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘দেবী চৌধুরানী’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই লিখেছেন:- ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সুতরাং ঐতিহাসিকতার ভাণ করি নাই । ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসটিরও ‘আনন্দমঠের’ ন্যায় ঐতিহাসিক মূল্য আছে । যদিও এই উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা না করিলে বাধিত হইবো ।” দেবী চৌধুরাণীর আসল নাম ছিল শ্রী দুর্গা দেবী চৌধুরাণী । ব্রাহ্মণ জমিদারের বংশ। পরে, তিনি পারিবারিক কারণেই সরে দাঁড়ান আর তাঁর বজরা ভেঙে ফেলা হয় । প্রায় দুশো উনত্রিশ বছর আগে এই বাংলা ও বিহারে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলে বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র গেরিলা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল বাংলার ফকির, সন্ন্যাসী, তাঁতী, কৃষক ও জেলেদের মধ্যে। এক পর্যায়ে বর্তমান বাংলাদেশের রঙপুরে কৃষকদের এক বিদ্রোহ হয়। এই সংগ্রামের সময়ের এক কিংবদন্তীর নায়িকা ছিলেন রংপুরের দেবী চৌধুরাণী, যাঁর সত্য কাহিনীর উপর ভিত্তি করে বঙ্কিম তাঁর “দেবী চৌধুরাণী’’ উপন্যাস রচনা করেছিলেন। দেবী চৌধুরাণী ছিলেন এই সংগ্রামের এক পুরোধা ভবাণী পাঠকের সহযোগী। এরা দুজনই আবার ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিখ্যাত মহানায়ক মজনু শাহের সাথী। বৃটিশ সেনাবাহিনীর লেফটেনান্ট ব্রেনান (লেফটেনান্ট ব্রেনানের কথা স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রও লিখেছিলেন উপন্যাসে ।) ডায়েরীতে- তাঁর কাছে ১৭৮৭ এ লেখা রুংপুরের কলেক্টরের চিঠিতে দেবী চৌধুরাণীর ঐতিহাসিক সত্য লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। দেবী চৌধুরাণীকে বৃটিশেরা দস্যু রাণী হিসেবে দেখলেও আসলে দেবী চৌধুরাণী বৃটিশদের অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিপীড়নমূলক নীতির দরুণ গরীব জনগণের দুঃখ কষ্টের প্রতিবাদেই মূলত তাঁর এই বৃটিশ বিরোধী আক্রমণ চালাতেন এটা পরিস্কার। ময়মনসিংহ ও রংপুর জেলায় ইংরেজ ও তাদের অনুগত বণিকদের পণ্য পাঠানোর নৌকাগুলোকে বার বার আক্রমণ করে লুঠ করতেন । (সেকালে অবশ্য জমিদারেরা লুঠপাঠ করতেন, রাজস্ব আদায়ের জন্য ।) অন্তত তিনটি আলাদা ঘটনাকে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে অভিহিত করা হয়। যার একটি মূলত সম্মিলিত হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম মাদারী এবং ধার্মিক ফকিরদের বৃহৎ গোষ্ঠী যারা পবিত্রস্থান দর্শনের উদ্দেশ্যে উত্তর ভারত থেকে বাংলার বিভিন্নস্থান ভ্রমণ করতেন। যাওয়ার পথে এসব সন্ন্যাসীগণ গোত্রপ্রধান,জমিদার অথবা ভূস্বামীদের কাছ থেকে ধর্মীয় অনুদান গ্রহণ করতেন যা তখন রেওয়াজ হিসেবে প্রচলিত ছিল। সমৃদ্ধির সময়ে গোত্রপ্রধান, জমিদারগণও এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার ও অনুগত ছিলেন কিন্তু যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দেওয়ানী ক্ষমতা লাভ করে তখন থেকে করের পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় ফলে স্থানীয় ভূস্বামী ও গোত্রপ্রধানগণ সন্ন্যাসী এবং ইংরেজ উভয়কেই কর প্রদানে অসমর্থ হয়ে পড়ে। উপরন্তু ফসলহানি,দুর্ভিক্ষ যাতে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রাণ হারায় যা তৎকালীন বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, সমস্যাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয় কারণ আবাদী জমির বেশিরভাগ থেকে যায় ফসলশুন্য । সেটা ছিল ১৭৬৯ -১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর । ১৭৭১ সালে, ১৫০ জন ফকিরকে হত্যা করা হয় দৃশ্যত বিনা কারণে। এটি ছিল অনেকগুলো কারণের একটি- যা ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং এ ক্ষোভ পরবর্তীকালে রূপ নেয় সংঘাতে বিশেষত নাটোরে, রংপুরে যা এখন আধুনিক বাংলাদেশের অন্তর্গত। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে – এই ভবানী পাঠক কে ছিলেন ? যদুনাথ বাবু লিখছেন – ভবানী পাঠক ভোজপুরী অর্থাৎ আরা জেলার ব্রাহ্মণ । এদিকে ঐতিহাসিক – অমলেন্দু দে বলছেন, ভবানী পাঠক সেই সিরাজের সেনাপতি মোহন লাল । আদতে যিনি কাশ্মিরি হিন্দু কায়স্থ । লালা থেকে লাল । তাই মোহনের পদবী ছিল লাল । এঁরা বংশানুক্রমে করণিক বা কেরাণীর কাজ করতেন । এই খানেই লাগে খটকা । কারণ আরেক ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় ভবানী পাঠককে ‘ বাংলার বিদ্রোহী নায়ক’ বললেও – তিনি যে মোহনলাল ছিলেন, সেটা লেখেন নি। আঠারো শতকে মোহনলাল কাশ্মীর থেকে মুর্শিদাবাদে আসেন। সঙ্গে ছিল বড়ছেলে শ্রীমন্ত লাল আর ছোটছেলে হুক্কালাল । আর ছিল বোন &nbsp;। স্ত্রীর উল্লেখ কোথাও নেই । আর তিনি কেন এই সুদূর বাংলাতে এসেছিলেন – তার কোনো কারণ পাওয়া যায় নি । হতে পারে, তিনি যুদ্ধতে পারদর্শী ছিলেন বলে – এই বাংলাতেই আসেন, হয়তো দিল্লির দরবারে সেরকম পাত্তা নাও পেতে পারেন ভেবে কারণ সেই সময়ে মোগল শাসন ভারতে দুর্বল হতে আরম্ভ করেছে । বাংলায় আলীবর্দী খান জাঁকিয়ে বসা, তাই একটা হিল্লে হতে পারে ভেবে আসা – তবে সবটাই অনুমান । মোহলালের বোনের প্রকৃত নাম ছিল মাধবী। তাকে আদর করে হীরা ডাকা হতো। মোহনলালের সঙ্গে সিরাজের সখ্যতা থাকায়, সেই সূত্রে হীরার সঙ্গে সিরাজের অন্তরঙ্গতা হয়। এর ফলে হীরার গর্ভে সিরাজের এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। আকিকার (নামকরণ অনুষ্ঠান) নাম জানা যায় না । সিরাজ, দাদুর ভয়ে ছয় বছরের এই সন্তানকে ঘোড়ার ওপর চাপিয়ে বেঁধে, ঘোড়ার পেছনে তির মারার ফলে – ঘোড়া ছুটতে থাকে । সিরাজের আশা ছিল – কেউ না কেউ ছেলেটিকে উদ্ধার করবে । হীরা জানতে পেরে দাদা মোহনলালকে সব বলেন । তিনি গিয়ে উদ্ধার করেন, কিন্তু সিরাজের ওপর রেগে গিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন । নবাব আলীবর্দি খাঁ জিজ্ঞেস করেন – কারণটা কি ? হীরার সঙ্গে সিরাজের অন্তরঙ্গতা ও সন্তানের খবর জানতে পেরে নবাব আলীবর্দি খাঁ খুবই বিচলিত হন। তিনি ঘটনাটি জানবার পর ইমামের সঙ্গে আলোচনা করে মীমাংসার সূত্র বের করেন, হীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যায়। হীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আর তার নতুন নাম করণ করা হয় আলেয়া (উচ্চবংশজাত) । মোহনলালের একমাত্র জামাই ছিলেন ধর্মে মুসলমান। নাম:- বাহাদুর আলী খান। এই খান সাহেবও সিরাজের বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন। “মোহনলালের বোন যে সিরাজের স্ত্রী ছিলেন সে কথা নিখিলনাথ রায় উল্লেখ করেন। তবে তার নাম বলেন নি।” সিরাজ হেরে যাবার পর – মোহনলাল মুর্শিদাবাদ গোপনে ছেড়ে চলে যান, ভাগ্নেকে নিয়ে, কিন্তু হীরার কি হলো, সেই ইতিহাস আর মেলে না । মোহনলালের সঙ্গে ছিলেন , তাঁরই দুজন বিশ্বস্ত অনুচর &nbsp;। নাম – বাসুদেব আর হরনন্দ । ক্লাইভ ও মিরজাফর গুপ্তচর পাঠিয়ে তাদের ধরবার চেষ্টা করছে, এই খবর পেয়ে মোহনলাল ময়মনসিংহের বোকাই নগরে চলে গেলেও- সেখানে নিরাপদ মনে করেন নি। বোকাই নগর আছে এখনও এবং এটুকু জানা যায় – বোকা নামের এক কোচ জাতীয় লোকের নামে এই বোকাই নগর । মোহনলাল যে পলাশীর যুদ্ধে মারা যান নি, সে কথা ঐতিহাসিক এবং অধ্যাপক অমলেন্দু দে জোরের সঙ্গে এবং যথেষ্ট প্রমাণ সহকারে এটা লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণার বই- “ সিরাজের পুত্র এবং বংশধরদের সন্ধানে” (পারুল প্রকাশনী) বইতে । মোহনলালের বিশ্বস্ত সঙ্গী বাসুদেবের কাকা বিনোদ রায় আমহাটি গ্রামে বাস করতেন। মোহনলাল সিরাজের পুত্রকে সেই বাড়িতে রেখে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। মোহনলাল সিরাজ পুত্রকে দত্তক রাখার জন্য ময়মনসিংহের জমিদার কৃষ্ণকিশোর চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সম্মতি দান করেন। কারণ তাঁর ছোটভাই কৃষ্ণগোপাল দুবার বিবাহ করেও নিঃসন্তান ছিলেন। কৃষ্ণকিশোর ও কৃষ্ণগোপাল কেউই জানতেন না যে তারা সিরাজ পুত্রকে দত্তক নিচ্ছেন। তারা জানতেন যে বাসুদেবের কাকা আমহাটির বিনোদ রায়ের দ্বিতীয় ছেলেকে তারা দত্তক নিচ্ছেন। যথারীতি অনুষ্ঠান করে কৃষ্ণগোপাল এই পুত্রকে দত্তক নেন এবং তার নামকরণ করা হয় যুগল কিশোর রায়চৌধুরী। এই দত্তক পুত্র কৃষ্ণ গোপালের পিণ্ডাধিকারী ও উত্তরাধীকারী হন। এই ভাবে সিরাজ ও আলেয়ার ছেলে ভিন্ন নামে পরিচিত হন। এই তথ্য মোহনলাল ও তাঁর দুই সঙ্গীছাড়া কারও জানা সম্ভব ছিলোনা। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর জীবন বৃত্তান্ত ও তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা পুত্র প্রাণকৃষ্ণনাথের কাছে ব্যক্ত করেন। যুগল কিশোর রায় ও নিজের প্রকৃত বংশ পরিচয় জানতে পেরে প্রাণকৃষ্ণ বিস্মিত হন। ব্রিটিশ শাসন কালে এই তথ্য গোপনীয়তা বজায় রাখা সর্ম্পকে তিনি বিশেষ ভাবে সচেতন ছিলেন। এটুকু পরিচয় দিয়ে – আসল বিষয়ে আসি । ১৭৯০ সালের পর সিরাজ পরিবারের ধারাবাহিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়নি। অর্থাৎ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী মারা যাবার পর সিরাজ পরিবারের ধারাবাহিক ইতিহাস সংরক্ষণ হয়নি। হয়ে থাকলেও ইংরেজরা, মীরজাফর, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, সিরাজ-উদ-দৌলাসহ সমকালীন ইতহাস বিনষ্ট করে দেয়। ১৭৯০ সালটা একটু অদ্ভূত ঠেকে আমার কাছে । এই সালেই ভবানী পাঠক মারা যান ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে । কেন এই সমাপতন ? কি উদ্দেশ্যে ! আমার মনে হয় – এই কারণেই মোহনলালের সাথে ভবানী পাঠকের সম্বন্ধ ঠাহর করতে পারেন নি পরবর্তী ঐতিহাসিকরা । মোহনলালের এই ছদ্মনাম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়, কারণ তিনি শাক্ত ছিলেন । অনেকেই বলেন – ভবানী পাঠক, ভোজপুরী ব্রাহ্মণ ছিলেন । কিন্তু সমকালীন ইতিহাস যদি আমরা ভালো ভাবে দেখি – তা হলে এটা সত্যি নয় , ওপরে বলা একই কারণে । এবারে বঙ্কিমচন্দ্র – দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসটি রচনা করার উপকরণ কোথা থেকে পেলেন ? প্রাণকৃষ্ণনাথ রায় চৌধুরীর প্রথম পুত্র কাজল ১২ বছর বয়সে মারা যায়। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হলো শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। শৌরীন্দ্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলেন নিজেকে সম্পৃক্ত করায় ব্রিটিশ প্রশাসকদের কাছে তিনি সন্দেহভাজন ছিলেন। কৃষ্ণনাথ রায় তাঁর পিতার ও বংশ পরিচয় শৌরীন্দ্র কে খুলে বলেন। এই কারণে এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে সমস্ত পরিবার বিপন্ন হয়ে পড়বে। গোপনীয়তা রক্ষা করে তারা দীর্ঘদিন ধরে চলছেন। শৌরীন্দ্র পারিবারিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি দুবার নাম পরিবর্তন করে এই অবস্থা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন এবং পড়াশোনায় নিমগ্ন হন। শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী প্রথমে হন প্রসন্ন চন্দ্র রায় চৌধুরী পরে নাম পরিবর্তন করে হন প্রসন্ন কুমরা দে। শৌরীন্দ্র প্রসন্ন রায় চৌধুরী নামে কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জুনিয়র স্কলারশিপ লাভ করেন। এই কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এই হিন্দু কলেজ পরবর্তিতে প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয়। উল্লেখ্য, শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, প্রসন্নচন্দ্র রায়চৌধুরী ও প্রসন্ন কুমার দে একই ব্যক্তি ছিলেন। প্রসন্ন কুমার দে হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সী) পড়েন আর বঙ্কিম সেই কলেজেরই ছাত্র । সিরাজের বংশধর বলে 'পরিচিত' প্রসন্ন কুমার দে হিন্দু কলেজের (পরে প্রেসিডেন্সি) ছাত্র ছিলেন, বঙ্কিমও তাই। যদিও, প্রসন্ন বাবুর সঙ্গে বঙ্কিমের সরাসরি পরিচয় ছিল বলে, প্রমাণিত নয়। প্রসন্ন বাবু বঙ্কিম প্রয়াত হবার পর তাঁকে নিয়ে ইংরেজিতে কবিতা লিখেছিলেন। এটাতেও কিছুই প্রমাণ হয় না। কল্পনা করছি, প্রসন্ন বাবু বঙ্কিমকে তথ্য দিলেও, নানা কারণে, সেটা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন, তখন ইংরেজ শাসন চলার ফলে। ঔপনিবাসিক শাসনের কারণেই এই গোপনীয়তা । মোহনলালকে ভবানী পাঠক বানানোর পেছনে, বঙ্কিমবাবু কি শুধুই, মিথের সাথে কল্পনা মিশিয়েছেন? যদিও বঙ্কিমবাবু, মোহনলালের নাম কোথাও লেখেন নি। কিন্তু ভবানী পাঠকের চরিত্রের সাথে মোহনলালের মিল প্রচুর । হয়তো – সেই সময়ে বাংলার গ্রামেগঞ্জে মোহনলাল আর মীরমদনের বীর্যগাথা গানের আকারে প্রচলিত ছিল – কিন্তু ইংরেজদের ভয়ে সেগুলোর চর্চা হতো না, ফলে সব হারিয়ে যায় কালক্রমে । বঙ্কিমচন্দ্র এই সব শুনে থাকলেও , শুনে থাকতে পারেন । এটা তো ঠিক - জলপাইগুড়ি থেকে রংপুর যাওয়া যেতো, তিস্তা নদী দিয়ে । জলপাইগুড়ি থেকে রংপুর, তিস্তা নদী দিয়ে দেবী চৌধুরানীর ক্ষিপ্র গতির বজরা যেতো। মানুষ তখনই একজনকে দেবতা হিসেবে মানে, যখন তারা অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচে কারও হাত থেকে । বাংলাদেশের রংপুর জেলার- পীরগাছা উপজেলা কার্যালয় ও পীরগাছা রেলওয়ে স্টেশনের অনতিদূরে এ জমিদার বাড়ি এখনও আছে। পীরগাছার স্থানীয় লোকজন মন্থনার জমিদার বাড়িকে রাজবাড়ি বলে ডাকে। রাজবাড়ির চারি দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দৃষ্টি নন্দিত ছোট বড় অনেক পুকুর । বাড়ির পিছনে ইতিহাসের কালের সাক্ষী হয়ে কোনমতে বেঁচে আছে দেবী চৌধুরানীর খনন করা ঢুসমারা খাল অর্থাৎ হঠাৎ বা অকষ্মাৎসৃষ্টি খাল। দেবী চৌধুরানী এ খাল দিয়ে নৌকাযোগে নদী পথে বিভিন্ন গোপন অবস্থায় যাতায়াত করতেন । বিশাল এলাকা নিয়ে ছড়ানো ছিটানো এ রাজবাড়ির অসংখ্য দালান আজ ধ্বংসপ্রায়। দালানের ইট,পাথর ও সুড়কি খুলে পড়েছে । দেয়ালের জীর্ণতা ও শেওলার আঁচড়ে পরগাছার রমরমা । ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজবাড়ির নাট্য মন্দির ও কাচারী ঘরটি বর্তমানে বাংলাদেশের পীরগাছা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজবাড়ির ভিতরে নির্মিত প্রাচীন মন্দিরগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে। জমিদার জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ রায় বানিয়েছিলেন অপূর্ব কারুকার্য মন্ডিত দেড় শতাধিক বছরের পুরানো দৃষ্টি নন্দিত ত্রিবিগ্রহ মন্দির । এখন ধ্বংসের অপেক্ষায় দিন গুনছে । না হলে, আজও দেবী চৌধুরাণী এবং ভবানী পাঠক পূজিত হতেন না জলপাইগুড়ির শিকরপুর চা বাগানে । মন্দির থেকে এটা অন্তত বোঝা যায়, বঙ্কিমের উপন্যাস দেবী চৌধুরানী গল্প নয়, হতে পারে কল্পনার মিশেল আছে। সে ভবানী পাঠক – মোহনলাল হন চাই নাই হন । নিজামতের ( সরকারী দপ্তর) প্রায় সব দলিলই ইংরেজরা নিয়ে গেছিল, বিলেতে আর সেগুলোর পাঠোদ্ধার একরকম দুঃসাধ্য , কারণ এতই জরাজীর্ণ অবস্থা ছিল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে । ইংরেজরা ইচ্ছে করেই এসব মূল্যবান দলিলের এই অবস্থা করে। The Office of Indian Records being unfortunately in a damp situation, the ink is daily fading, and the paper moldering into dust- Preface to Stewart’s History of Bengal, 1813. ১৮১৩ সালেই যদি এই অবস্থা হয়ে থাকে, তবে ২০১৭ তে কী অবস্থা হয়ে আছে, দুর্ভাগ্যবশত সেটা কেউ জানে না । তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস মোহনলালই ভবানী পাঠক &nbsp;। প্রমাণ করা এখন অসম্ভব । ================================ তথ্যঋণ :- প্রয়াত ঐতিহাসিক অমলেন্দু দের লেখা, 'সিরাজের পুত্র এবং বংশধরদের সন্ধানে' এবং নেটের বিভিন্ন সাইট ।

66

20

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

বঙ্গ সম্মেলন এবং এই শুক্রবার, ৭/৭/১৭ তে সন্ধ্যা ছয় ঘটিকায় কাল্পনিক ঢাক কুড়কুড়, উলুধ্বনী, শঙ্খধ্বনী দিয়ে শুরু হয়েছিল সাঁইত্রিশতম নর্থ বেঙ্গল বেঙ্গলি কনফারেন্স। মঙ্গলদীপ জ্বেলে মঞ্চ আলোকিত করছিলেন আশেপাশের কাউন্টির মেয়ররা। সঙ্গীকে ( শিবাংশুদা স্টাইল), বাড়ি থেকে বেরোবার সময় পইপই করে সাবধান করে দিয়েছিলাম, চারিপাশে বাঙালি থাকবে, এবং বাঙালি খুবই ইমোশ্যনাল জাতি, দয়া করে ভুলভাল মন্তব্য কোরোনা। এমনকি মতের আদানপ্রদানে আমাদের মধ্যেকার রোজকার ভাষা বাঙালিমার্কা হিন্দিও চলবে না, ছোটবেলা থেকে দূরদর্শনের হিন্দি সিনেমার দৌলতে সব বাঙালি হিন্দিতে রীতিমত পি.এইচ.ডি, তখন তিনি হয়ত খুশিমনে থাকায় বুঝদারের মত ঢকঢকিয়ে মাথা নাড়িয়েছিলেন। মঞ্চে কুপারটিনোর দেশী মহিলা মেয়রকে দেখে উনি স্বত:স্ফূর্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠলেন, পরেরবার কুপারটিনোর মেয়র হিসেবে আমিই প্রদীপ জ্বালাব। সামনের রো এর পাঁচটি মাথা একসাথে ঘুরে দশটি চোখ আমাদের সাথে চোখাচোখি করল। আমি ফটো তোলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তিনি তাদের দিকে তাঁর আত্মবিশ্বাসী হাসিটি উপহার দিলেন। দশটি চোখের মধ্যে একজোড়ার মালিক পরিহাসমুখর স্বরে বলে উঠলেন, দেখে নিই আমাদের ভবিষ্যত মেয়রকে, পরে কি আর এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হবে? সূচনার আগে লেডি উপেনের প্রস্তুতি - শুক্কুরবার মানে কাজের দিন। কাজের দিনে সন্ধ্যে আসে চুপিসারে। কিন্তু এই শুক্রবারের প্রতিটি ঘন্টা লেডি উপেনের মাপা ছিল। সকালে হাঁটতে যাওয়া, বাচ্চাকে সামার ক্লাসে নামিয়ে নিজের যোগা ক্লাস। যোগা ক্লাস সেরে চাষীদের বাজার, বাজার আবার একার জন্য নয়, আরো একজনের ফর্দধরে জিনিস কিনে হোম ডেলিভারি। বাড়ি ফিরে রান্না। বাচ্চাকে তোলা। খাওয়া এবং খাওয়ানো। শাড়ি ব্লাউজ ইত্যাদি বের করে হাতের কাছে রাখা যাতে গিটার ক্লাস সেরে বাড়ি ফিরেই গলিয়ে নেওয়া যায়। বাগানের দরজা খুলে রাখা যাতে মার্টিন এবং কোং এসে কাজ করে যেতে পারে। সঙ্গীর পাঁচটায় গৃহপ্রবেশ এবং জলযোগে পেট ভরিয়ে সাড়ে পাঁচটায় সঙ্গীসহ বঙ্গ সম্মেলনের উদ্দেশ্যে গমন। চমৎকার প্ল্যান। একটি ঘন্টারও হাত ফসকে পালাবার উপায় নেই। ভারী খুশি ছিল লেডি উপেন। গিটার ক্লাসের আগে অব্দি প্রতিটি ঘন্টাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিনও চলছিল তিরতিরিয়ে পালতুলে। দিনের শেষে বেগড়বাই করল গিটারখানি! হঠাৎ সে রবিঠাকুরের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে দেহ রেখে বসলো! তার ভাবখানা তখন- তার ছিঁড়ে গেছে কবে, একদিন কোন হাহারবে সুর হারায়ে গেল পেল পলে। হায়! যতক্ষণে তাকে ধরেবেঁধে জীবনমুখী করা হল হাত ফস্কে দৌঁড় মেরেছে অমূল্য কিছু সময়! মার্টিন, লেডি উপেনের বাগান বাগান খেলার প্রধান সহায়ক। তার একটি প্রধান দোষ ও গুণ আছে। দোষটি হল, তাকে যখনই কোনো বিশেষ কাজের কথা বলা হয়, তখনই তার ধরাবাঁধা উত্তর হল প্রবল মাথা উত্তোলন করে- নেক্সট টাইম, নেক্সট টাইম। তাকে বাগানবন্দী করে কাজটি করতে বাধ্য না করলে তার সেই নেক্সট টাইম কোনোদিনই আসেনা। আর তার মস্ত গুণ হল, যতই বাধা বিপত্তি আসুক না কেন, বারণ না করলে সপ্তাহে সপ্তাহে এসে সে তার সাপ্তাহিক কাজগুলি করবেই করবে। সেগুলি হল, লনের ঘাস ছাঁটা, পাতা পরিস্কার এবং উইড ওপড়ানো। লেডি উপেনের সাধের করলা গাছ, মার্টিনের উইড মনে হয়েছে, তাই তাকে তুলে ফেলে দেওয়া হয়েছে, একই ভাবে মার্টিনের নজরে উইড মর্যাদায় অকালে স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটেছে কুমড়ো, সীম এবং লাউগাছের! কিন্তু সাপ্তাহিক কাজের ব্যাপারে মার্টিনের অদ্ভুত একাগ্রতা অর্জুনকেও হার মানায়! একবার কোনো কারণে লেডি উপেন তাকে কোনো এক সপ্তাহে কাজ মানা করতে ভুলে গেছিল। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে সে দেখে, মার্টিন তার আসুরিক বলপ্রয়োগ করে বাগানের দরজা খুলতে না পেরে ছিটকিনিসুদ্ধু উপড়ে দরজা খুলে তার কাজ ঠি কই করে গেছে। তাই কোনো ভুতের ভয়ে নয়, মার্টিনের ভয়ে লেডি উপেন প্রায় উড়ে বাড়ি পৌঁছলো! বাকি কাজ সেরে, ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের ঠাঁ ঠাঁ রোদ্দুরে শাড়ি জামা গলিয়ে ঘামতে ঘামতে লেডি উপেন ও তার সঙ্গী যখন অবশেষে গন্তব্যস্থানে পৌঁছেছিল, মেন হলে তখন তিলধারনের জায়গা নেই! পরের কথা- উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল, বাংলা সিনেমার ১০০ বছর। বাংলা সিনেমার বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসের দৃশ্যকল্প নৃত্য এবং গীতির মাধ্যমে আমাদের সামনে উপস্থাপনা করা হল। পরিচালনায় ছিলেন শ্রী দেবজ্যোতি মিশ্র এবং শ্রীমতি তনুশ্রীশঙ্কর। নকল দাড়ি, গোঁফ, পাঞ্জাবি-পাতলুনে শোভিত রূপঙ্কর অনুষ্ঠানটির সূত্রধর ছিলেন। তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে এনে আমাদের মোলাকাত করালেন বাংলা সিনেমার প্রাণপ্রতিষ্ঠাতা হিরালাল সেন এর সাথে। শুনতে পেলাম তাঁর সৃষ্ট অনেক মুভির প্রিন্ট পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল। আর আমরা চিরতরে হারিয়েছিলাম সেই সব অমূল্য সম্পদ । অনুষ্ঠানের নামে বাংলা সিনেমা থাকলেও শরীরী রূপ ধারন করে মঞ্চে এলেন গ্রানড কাফেতে বসে সিনেমা দেখাবার পরিকল্পনার স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দেওয়া লুমিয়েঁ ব্রাদার্স দ্বয়। দেখলাম এবং শুনলাম টকি সিনেমার সূচনার কথা। সিনেমায় পালাবদলের পাশাপাশি তখন তখন দেশেরও পালাবদলও শুরু হয়েছে। আমাদের সিনেমা তার প্রভাবমুক্ত ছিলনা। মঞ্চের পর্দায় তখন 'বন্দেমাতরম' গানের চিত্ররূপ। ভিন্নধারার ছবির কথা রূপঙকরের মুখে শুনছি, পর্দায় সিনেমার তার অংশবিশেষ দেখছি আর আমাদের লোকাল শিল্পীদের গলায় সেই সিনেমার গান শুনছি। পর্দায় যখন রোম্যানটিক ধারার সিনেমা, তখন সেই অমর গান- "আরো দূরে চল যাই" এ দূর্দান্ত গলা দিলেন আমাদের পাড়ার অর্পিতা চট্টপাধ্যায় আর স্যান হোজের মহুয়া ধর বোধহয় গাইলেন- " আমার দিন কাটে না, আমার রাত কাটে না"। এক কথায় অপূর্ব! বাংলা সিনেমায় কমেডিধারার বাহকেরা কায়াধারী হয়ে মঞ্চে এলেন ভানু, জহর এবং তুলসী রূপে। লুমিয়েঁ ব্রাদার্সদের সাথে বাংলায় তাঁদের কথপোকথনও হল। একদম শেষে পর্দায় দেখানো হল হাসপাতালের বেডে সত্যজিৎ রায়ের অস্কার গ্রহন। ওপেনিং সেরিমানি হচ্ছিল রবীন্দ্রসদনে, যেটি মেন স্টেজ। এছাড়াও কলামন্দির, অ্যাকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, এবং বেশ কিছু ঘরে একই সময়ে নানা অনুষ্ঠান সমতালে চলছিল। যে যার রুচি অনুযায়ী অনুষ্ঠান বেছে নিয়ে দেখবেন। কিন্তু এই কারণে অনেক ভালো ভালো অনুষ্ঠান দেখা হয়ে উঠলেনা। দেখা হলনা, ফেলুদা গল্পের পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যের অনুষ্ঠান। আসলে নাচ, গান আর নাটকের বাইরে বেরিয়ে সিনেমা দেখা আর পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের সাথে প্রশ্ন উত্তরের পর্বে যোগদান করার সুযোগ আর হয়ে উঠলো না। বারেবারে পাশ কাটিয়ে এলাম গেলাম রনজিত মল্লিক, সব্যসাচী চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অপর্ণা সেন, সন্দীপ রায় প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের, তাঁদের পায়ে পা জড়িয়ে মানুষজন তাঁদের ছেঁকে ধরে আছে, একটা সই, একটা ছবির অভিলাসে। সব্যসাচীকে একবার একসাথে ফটো তোলার অনুরোধে মরিয়া হয়ে বলতে শুনলাম, গত আধঘন্টা ধরে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে থামেন আড়াল থেকে তাঁর একটা ফটো নিলাম। কিশোরবেলার প্রথম দেখা বাংলা সিরিয়ালের হিরো বলে কথা! লেডি উপেনের দুই পয়সা- মহিলাদের শাড়ি কাপড়ের সম্পর্কে দু'কথা না বললে বঙ্গ সম্মেলনের স্পিরিট অধরা থেকে যাবে। হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন যেমন, বঙ্গ ললনাদের লকারেও রতনের ছড়াছড়ি। তার নমুনা তারা বয়ে বেরালেন সর্বাঙ্গে। দামী দামী আলো ঝলকানো শাড়ি ( নাম জিজ্ঞেস করে লেডি উপেনকে লজ্জা দেবেন না) তেমনই তার সাথে পাল্লা দিয়ে গলায় গোটা দশেক হারের সাথে জড়াজড়ি করা সীতাহার, কোমর বিছে, টি কলি, নথ, নূপুর। দ্বিতীয় এবং তৃতীয়দিনের অনুষ্ঠান চলছিল সকাল এগারোটা থেকে গভীর রাত অব্দি। বারো তেরো ঘন্টা একই শাড়ি, গয়না পরে থাকলে বাকি শাড়ি, গয়নাগুলোর তো দিনের আলো দেখাই হবেনা। তাই অনেকে সাথে করে, যেমন করে আমরা এয়ারপোর্টে চলাফেরা করি, সেরকম এক একটা পুল অন ছোট সুটকেস নিয়ে ঘুরছিলেন। সময়, সুযোগ বুঝে নতুন নতুন শাড়ি, গয়নায় নিজেদের শোভিত করে আসার অভিপ্রায়ে। একজন পরিচিতা সখেদে বললেন, লোপামুদ্রার গান তো শেষই হচ্ছে না, এরপরে নাটক শুরু হয়ে যাবে। শাড়ি পাল্টানোর সময় কখন পাব! এক বন্ধুর মুখে শুনলাম, রনজিত মল্লিক যখন স্টেজ থেকে নামছিলেন এক ভদ্রমহিলা অমন বাহারি সাজে শোভিতা হয়ে ভারতনাট্যমের স্টাইলে নাকি তাঁকে প্রণাম জানান। সেই না দেখে ঘাবড়ে গিয়ে মল্লিকবাবু সিঁড়ি ব্যবহারের বদলে ভুল করে স্টেজ থেকে সটাং নেমে পড়ছিলেন! কোনরকমে তাঁর হাত ধরে রক্ষা করা হয়। তাঁর হাড়গোড় জখম হলে আমাদের জন্য ভারী দু:খজনক ব্যাপার হত! দু:খজনক ব্যাপার এড়ানো গেলেও লজ্জাজনক ব্যাপার বোধহয় এড়ানো যায়নি। শান এর কনসার্টের দুই ঘন্টা আগে থেকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। সেই লাইনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরনে, জ্ঞানে বিদ্যায় অনেকের থেকে এগিয়ে থাকা দুজন মানুষ দেখলাম হাতাহাতি শুরু করেছেন। সাথে ইংরাজিতে তিন অক্ষরের বি শব্দের গালাগালি। পাশ থেকে মানুষজন হাঁ করে দেখছে, যাদের মধ্যে আমাদের পরবর্তী জেনারেশনও আছে, তাদের অবশ্য কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলনা। আবার সুরে ফিরি- খুব ভালো লাগল জয়তি চক্রবর্তীর রবীন্দ্রসঙ্গীত। আরো ভালো লাগল মানুষটিকে। ছোট্ট করে একটু বলি কারণটা। রাত তখন এগারোটা। একনাগাড়ে বেশ কিছুক্ষণ গাইবার পরে একটুক্ষণ জলপানের বিরতি নিচ্ছিলেন তিনি। এই সুযোগে মঞ্চের দখল নিলেন এক মহিলা শ্রোতা। গায়িকার দিকে পেছন ফিরে মুষ্টিবদ্ধ রাগী হাত আকাশে ছুঁড়ে তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন- "এরা কি ইয়ার্কি পেয়েছে? দুই ঘন্টা ধরে খাবার লাইনে দাঁড়িয়েও খেতে পেলাম না!" খাবার ব্যবস্থা সত্যিই সম্মেলনে পীড়াদায়ক ছিল। মাইলজোড়া মানুষের লাইন এঁকেবেঁকে চলে গেছে হল ওয়ে দিয়ে। ওই লাইনে দাঁড়িয়ে খাবারের আশায় যারা ছিল তারা অর্ধেক প্রোগ্রাম নি:সন্দেহে মিস করেছে। মহিলার রাগ ন্যায্য ছিল কিন্তু রাগ দেখাবার স্থান নির্বাচনে ভুল করেছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকের দল তাকে নামিয়ে নিয়ে গেল। জয়তি বিরতি সেরে খুব মমতামাখা গলায় বললেন, জানি রাগ হয়, কিন্তু এতবড় অনুষ্ঠানে ভুল ত্রুটি তো হতেই পারে। ক্ষমা করে দেওয়া যায়, কি বলেন? দেখুন না, আমি ও আমার সহ শিল্পীরাও এখনো খেয়ে উঠতে পারিনি, এক আধদিন, মেনে নেওয়া যায়, তাইনা? স্মৃতিতে অনেকদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে তনুশ্রীশঙকর আর তাঁর দলের Theatrical manner এ নৃত্যকলা। রাঘব চ্যাটার্জির নজরুলগীতি, জয়তি চক্রবর্তী এবং দুই ভাই, সৌরেন্দ্র ও সৌম্যজিত এর মিলিত প্রয়াস- টেগর অ্যান্ড উই, লোকাল শিল্পীদের গাওয়া- গানের নকসিকথা, লোকাল ক্ষুদেদের পারফরমেন্স- রবিঠাকুরের বীরপুরুষ। একটা জিনিস বড় দু:খ দিয়েছে। লোকাল অনুষ্ঠানের সময় হল প্রায় ফাঁকা থাকছিল। এই সম্ভাবনাময় শিল্পীসকল কতদিন ধরে এই দিন তিনটেতে মানুষজনের সামনে তাঁদের শিল্পকলা দেখাবার তাগিদে বিগত কয়েক মাস ধরে কত সময়, পরিশ্রম, মেধা দিয়েছে। যখন অবশেষে তাদের প্রার্থীত সে সময় এল, তাদেরকে উৎসাহিত করার বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলনা। ডিমের ডালনা দিয়ে মাখা ভাত খেতে খেতে আমরা যেমন ডিমের কুসুমটাকে বাঁচিয়ে রেখে সবার শেষে তারিয়ে তারিয়ে খাই, শেষপাতে মানুষ যেমন মিষ্টি খায়। আমিও আমার সবচেয়ে অমূল্য স্মৃতিটি সযত্নে সংগ্রহ করে রেখেছি শেষে বলব বলে। তিনদিনের অনুষ্ঠানে হাইলাইট হয়ে থাকবে দেবশঙকর হালদারের 'যদিদং'। উনি একটি একক নাটকও করেছিলেন, 'বর্ণপরিচয়'। নানা কারণে দেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু 'যদিদং' দেখে মন ভরে গেছে। নাটকটি দমফাটা হাসির আড়ালে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের অনেক গভীরতাকে ছুঁয়ে যায়। দেবশঙকর বাবুর প্রতিভার সাক্ষী হয়ে থাকলো শত শত মানুষ। সারা হল জুড়ে হাসির তরঙ্গ উঠছিল থেকে থেকে। বিশেষ করে তাঁর ওই মাথা দোলানো গানের সাথে কোমর দোলানো নাচ দেখে- মেঘের মেয়ে মেঘের চুল মেঘ সেজেছে বিউটিফুল মেঘের গায়ে লাল ডুরে সারি ( শাড়ি) আ আ আ আ মানুর মা করেছ কেন আড়ি। মেঘের মেয়ে মেঘের চুল তুমি ঠিক আমি ভুল এনে দেব বালুচরি সারি ( শাড়ি) আ আ আ আ তুমি আমার ভালোবাসার নারী।। রবিবার, মানে শেষদিন রাত দশটায় শানের কনসার্টের লাইনে বিরক্ত মনে দাঁড়িয়ে দেরী করার জন্য সকলে মিলে যখন গজগজ করছি, হঠাৎ এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন, উমা না? মাথা নাড়াতেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে গেছিলাম, সামলে নিয়ে দেখি ক্যানসাসের বন্ধু, জয়িতা। তেরো বছর পরে দেখা হল। আজকাল, যখন সাগরপাড়ের বন্ধুরা কোনবেলা কি খাচ্ছেন, পরছেন সে খবর এক নিমেষে পেয়ে যাই, তখন এমন সারপ্রাইজ সত্যি বিরল। সবমিলিয়ে ভারী সুন্দর স্মৃতিমাখা হয়ে থাকবে উইক এন্ডের এই তিনটে দিন।

1224

108

ইয়ু লিন

আড্ডা চালিশা

সোমাশ্রী: ইনি মজলিশের রেসিডেন্ট চিত্রকার‚ বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদ বিনা পারিশ্রমিকে অঙ্কন করিয়া থাকেন| উপস্থিতি অনিয়মিত- কারণ ইনি রাঁধেন বাড়েনই অধিক ‚ কেশবিন্যাসে অমনোযোগী| আড্ডাঘরের মজলিশের ঋত্বিক‚ সাউথ সিটি মলের কতৃপক্ষ শীঘ্রই উনাকে পার্মানেন্ট ডিসকাউন্ট দিবেন মনস্থ করিয়াছেন তাহার পৃষ্ঠপোষকতার সম্মানার্থে| (কি‚ আমি আগেই বলি নাই‚ চিত্রকারের পক্ষপাতিত্বের ডাল'মে কুছ কালা হ্যায়?)| এতই কম লিখেন যে তাহার কোন প্যাটার্ন অনুধাবন করিতে এযাবৎ সক্ষম হই নাই‚ মানে কোন স্ট্যাটিস্টিকাল কো-রিলেশান| অধ্যাপক স্যার সম্যক বলিতে পারিবেন- শুনিতে পাই‚ তাঁহার (অধ্যাপকের) বিষয়বস্তু এমনই চীজ যে সূর্য্যকলঙ্কের প্রাদুর্ভাবের সহিত মুসুর ডালের দামের উঠানামা বিষয়ে তাঁহার একটি সুচিন্তিত প্রবন্ধ আছে! অতএব চিত্রকার এ যাত্রা ছুটকারা পাইয়া গেলেন| ইয়ু লিন aka মোহিতলাল aka ইলতুৎমিস aka জেমস (অথবা হিজ হাইনেস এই অধম): কেন এত নামের বাহার? তাহার প্রিয় ঠাকুরমা প্রদত্ত পুরাকালের নাম যে ঝলমলে নামের ভিড়ে বড়ই ম্রিয়মান দেখায়| ঝড়বাবু কয়েক অনুচ্ছেদ আগড়োম বাগড়োম পূর্বেই পেশ করিয়াছেন- তাহাতে বিদ্যমান একটি অন্তত: জাজ্বল্যমান ত্রুটি প্রথমেই কারেক্ট করিয়া দিই| আমি নাকি‚ 'বিবিজানের ছায়াসঙ্গী'| হায় রে ইহার অধিক অনৃতভাষণ ইভাঙ্কাও করেন না| বিবিজান পূর্বদিকে তো আমি পশ্চিমপানে- গত কয়েক দশক ধরিয়া এই হারজিতের খেলা চলিতেছে| বিচ্ছেদ হয় নাই কারণ নান্য পন্থা: কে রাঁধিবে আলু মরিচ‚ হোমমেড নান পেঁয়াজি/ শাকের বড়া ঝিঙে পোস্ত মুগের ডাল উইথ মাছের মাথা এবং অতি অবশ্য ছাতুভরা রুটি‚ রাধাবল্লভী ইত্যাদি????????? আইস সবে‚ ইয়ু লিন ইন ইয়ু লিন'স আইজ - পেশ কিয়া যায়: সর্বপ্রথমে গ্রাম্য‚ অশিক্ষিত ভূত- বকলমে গেঁয়ো ভূত‚ 'সামাজিক নিম্নস্তরের' মানুষ‚ বয়সের গাছ পাথর নাই| সুন্দরী মহিলাদেরকে ছুরিকা প্রদান করিয়া থাকেন এবং তাহারা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ প্রত্যহ ঢ্যাঁড়শের বৃন্ত কর্তনের সময় প্রকারান্তরে ইয়ু লিনের গলা কাটার পুণ্যলাভ করেন (as in কুমড়ো বলি in lieu of রিয়াল থিং)! পৃথিবী যত শীঘ্র পাপ ও পাপিষ্ঠমুক্ত হয়‚ ততই মঙ্গল| ইনি পেশায় মিস্ত্রী- কিন্তু তেল কালির সংস্পর্শরহিত সোনার পাথরবাটি| আড্ডাঘরে নিয়মিত হাজিরা দেন কিন্তু তাহার লাইক-ভাগ্য মন্দ| তিনি এতই বন্ধুবৎসল যে তাহার ফ্রেন্ডলিষ্ট কোরা কাগজ হি रह गया। ব্যতিক্রম মিষ্টার কাউব্যান অফ সিডনী- কিন্তু সন্দেহ হয় তাহা শিশিভর্তি হাওয়াইয়ান লাইমের আচার বিনামূল্যে প্রাপ্তির লোভে কিনা| প্রায় এক দশক পূর্বে একটি রগরগে শ্লেষকাহিনী রচনায় তাহার বঙস-নেট দুনিয়ায় আত্মপ্রকাশ| বকখালি‚ ঘন্টাভাড়ায় হোটেল কক্ষ তাহার .wmv ফাইল তো পাঠক(ঠিকা)দের মহলে জনপ্রিয় হইবে এ আর নতুন কি কথা| তখনও ইয়ু টিউব বাজারে আসে নাই নতুবা ইয়ু লিনের woম্যান বুকার প্রাইজ ঠেকায় কে! অলমতি বিস্তরেণ:

312

102

জল

গল্প

পাঁচ টাকার পেয়ারা ... 'মিস্টি পেয়ারা খান দিদি| কেটে কেটে নুন দিয়ে খান| একদম মিস্টি পেয়ারা| বারুইপুরের পেয়ারা দিদিরা| জ্যান্ত পেয়ারা দিদিরা| পাঁচ টাকা‚ পাঁচটাকা|' অনেকক্ষণ ধরেই পেয়ারাওয়ালা ডাক দিয়ে ওধারে পেয়ারা বিক্রি করছিল| ডাকটা ক্রমশ এগিয়ে আসে| এক ঝাঁকা পেয়ারা এনে পাশের খালি সিটের ওপর রাখে পেয়ারাওয়ালা| বর্ষার জল পড়ে যেন গা থেকে যৌবন পিছলে পড়ছে| তরতাজা‚ গোল-গাল যুবক যেন এক-একটা পেয়ারা| চোখ থেকে লোভ যেন মনে থাবা বসায়| হাত নিশপিশ করে বাতাসীর| ইস কি ভালো পেয়ারাগুলো| দুটাকা হলে না হয় কেনা যেত| বিড়বিড়িয়ে ওঠে| এদিক -ওদিকের সিট থেকে পেয়ারাওয়ালার ডাক পরে| কেউ কেউ নিঁখুত দক্ষতায় বেছে নেয় পেয়ারা| তারপর কেউ কেউ কেটে দিতে বলে| ভাগাভাগি হয়ে যায় বন্ধুদের মধ্যে| কেউ কেউ কিনে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিতে নিতে বলে‚ 'একটু কাগজে নুন মুড়ে দিয়ে গো'| বাতাসীর সামনের সিটে বসে থাকা একটা অল্পবয়সী মেয়ে একটা তেলতেলে চকমকে দেখতে পেয়ারা বেছে নিয়ে পেয়ারাওয়ালাকে বলে‚ ' এটা কেটে দিন তো'| গ্রামের মেয়ে বাতাসী| ফল-পাকুড় খুব চেনে| এর গাছ‚ ওর গাছের থেকে পেয়ারাটা‚ আমটা কম পেড়ে খেয়েছে| সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলে‚ ' এই পেয়ারাটা নেন‚ বেশি মিস্টি হবে| এগুলো পাতার দাগ‚ আর কিছু নয়|' অযাচিত উপদেশ কে বা নেয়| তার ওপর বাতাসীর কাপড়-চোপড় দিয়ে দারিদ্রতা কথা বলে| কতদিন যে কাচা পড়েনি কাপড়ে‚ তা কাছে বসলেই লোকে টের পাবে| ভাগ্যিস ট্রেন বলে তার ঠাঁই জুটেছে| এখানে যে সবাই রাজা| অর্থের মাপদন্ডে এখানে বসার সিটের বা যাতায়াতের বিচার হয় না| ক্ষমা - ঘেন্না করে দীর্ঘ পথ অতিক্রান্ত করার জন্য গা-কাপড় বাঁচিয়ে লোকে বসে| বাসে উঠলে গেলে 'নাম‚ নাম' বলে নামিয়ে দিত| পেয়ারাওয়ালা পেয়ারা কেটে মেয়েটির হাতে দেয়| পাঁচটাকা হাতে ধরিয়ে দেয় মেয়েটি বিনিময়ে| বাতাসীর জিভের ডগায় লালারস ঘন হয়ে আসে| একটা কিনলে তিনজনে খেত| কিন্তু পাঁচটাকা বড্ড বেশি বলছে| গ্রামে কত পেয়ারা এমনি বিনিপয়সায় মেলে| পয়সা দিয়ে কিনতে বাপু গায়ে লাগে| তবু লোভ বাঁধ মানে না| একটা পেয়ারা কিনে দেবে মা? চমকে তাকায় বাতাসী| ছোট মেয়েটা লোভী চোখে তাকিয়ে আছে সামনের মেয়েটার দিকে| মেয়েটা ধীর হাতে নুন মাখাচ্ছে পেয়ারাতে| তারপর একটা টুকরো তুলে দেয় মেয়েটি তার মায়ের হাতে| দুজনে দুটো করে টুকরো খাবে| ঠিক এই মুহুর্তে একটা ফালতু পাঁচটাকার অভাব অনুভব করে বাতাসী| হাঁ নিত্যদিনের অভাবের সংসারের হিসেবে ধরে ফেললে যে হবে না| ওটাকে ফালতু হতেই হবে‚ তবেই না মেয়েদের আব্দার মেটাতে ব্যবহার করতে পারবে| তার মেয়ে দুটো ভারী লক্ষী| এই বয়সেই বুঝে গেছে পান্তাভাত আর বাসী তরকারীর বেশি কিছু চাইতে নেই| রোগা‚ কালো শরীরটা থেকে নেমে আসা ছেঁড়া জামাটা আর একমাথা মিশকালো ছাঁটা চুলে বড় মায়াময় এক্জোড়া লোভী চোখের আর্তি অস্বীকার করতে পারে না বাতাসী| বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখা চিলতে ব্যাগটা বের করে দেখে| বিড়বিড়িয়ে বলে হবে না রে মা‚ ফালতু টাকা একটাও নেই| সামনের সিটের ভদ্রমহিলাও বোধ হয় এড়িয়ে যেতে পারেন না ঐ বাচ্চা মেয়েটির দৃষ্টি| একটা পেয়ারার টুকরো নুন মাখিয়ে তুলে দেন মেয়েটির হাতে| লোভী চোখে খেলে যায় প্রাপ্তির হাসি| একটুকরো তাই কম কোথায়| বাতাসীর মুখে-চোখে লজ্জা‚ ভালো লাগা‚ কষ্ট মিলে মিশে যায়| নুনটা আরও ভালো করে মাখিয়ে মেয়ের মুখের কছে তুলে ধরে| কুট কুট করে মিস্টি পেয়ারায় কামড় বসায় মেয়েটা| গঙ্গার জল কোনদিন দেখেনি বড় মেয়েটি| বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কুট কুট শব্দে মুখ ফেরায়| পাছে লোকে দেখতে পায় ইশারায় মাকে বলে‚ আমায় দেবে না? অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে বাতাসী| ছোট বোনটি আরও একটা কামড় বসিয়ে এগিয়ে দেয় আধ খাওয়া পেয়ার টুকরো দিদির দিকে| বড় মেয়েটি কামড় বসায়| একটা টুকরো ‚ একটু একটু করে খায় ভাগাভাগি করে দুজনে| মুখে তাদের যেন বিশ্বজয়ের হাসি| কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে থাকে বাতাসী|

968

91

দীপঙ্কর বসু

এক পিস গরু রচনা

বাই উঠলেই বাঙালির কটক যাবার একটা চালু রেওয়াজ আছে &nbsp;। আমাদের ও হল তাই । তবে কটক এখান থেকে মেলাই দূর । আর যাতায়াতের হাঙ্গামও কম নয় । কাজেই হাতে রইল পেন্সিল । অর্থাৎ কিনা ডায়মন্ডহারবার । তাই বা মন্দ কি ? মনোজদা ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন “রবিবার ফ্রী আছেন? আমরা ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছি – যাবেন? ভাইব্যা দ্যাহেন”। দলে টানবার ইনসেন্টিভ হিসেবে যাবার পথে আমাকে তুলে নেবার প্রস্তাব ও দিয়ে রাখলেন । ভাববার অবশ্য বিশেষ কিছু ছিলনা । বিশুদ্ধ বেকার একটি লোকের আবার অত ভাবার কি আছে । কাজ বলতে তো শুধু সারাটা দিন হয় , ইন্টারনেট নিয়ে খুটুর খুটুর করে কী বোর্ড ঠ্যাঙান ,নয় গানের গুঁতোয় পাড়ার লোকজনের কান ঝালাপালা করে দেওয়া । তার চেয়ে মুখ বদলের খাতিরে একটা দিন নিছক ছুটে চলার আনন্দে বেরিয়ে পড়লে দোষ কি । হালের এই ডিজিটাল জমানায় বোধ হয় এরেই কয় লঙ ড্রাইভে যাওয়া। মনোজদা একটা লাল টুকটুকে গাড়ি ভাড়া করে ফেললেন ,আমিও সাত সকালে গিয়ে হাজির হলাম একাডেমী অফ ফাইন আর্টস এর সামনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছুটা আগেই। ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছি শুনে এক পড়শি প্রশ্ন করেছিলেন “ডায়মন্ডহারবারে আবার দেখার কি আছে ? একাডেমী অফ ফাইন আর্টসের সামনে একটা ভাঙ্গা চাতালে বসে এক ভাঁড় চা সহযোগে পড়শির প্রশ্নের একটা জুতসই পদ্যের ছন্দে গাঁথা জবাবের খসড়া মনে মনে তৈরি করছিলাম । নিবেদন করি – পড়শি ক’ন মুচকি হেসে “ বেড়াতে যাবার জায়গা পেলেন শেষে কিই বা দেখার আছে এমন ডায়মন্ডহারবারে” আমি বলি “আরে ! বিশাল একটা নদী আছে ,কূল নাই তার কিনারা নাই সামনে আছে অকুল পাথার ,আরও বেশি চাই ? আবছায়াতে মিশে গেছে অপর পারের গ্রাম হলদিয়া তার নাম ডাইনে বাঁয়ে আর কিছু নেই, নেইকো কোনও শেষ শেষের শেষে আছে জানি অজানা এক দেশ …”।। নাহ । শেষ করা গেলনা । আমাকে তুলে নিতে পৌঁছে গেছেন মনোজদাদের দল । শিকেয় উঠল আমার পদ্যের খসড়া । একদিক দিয়ে ভালোই হল । আমার এই অনাচারের কথা যদি কবিদের ,বিশেষ করে শিবাজি বা দৃষ্টি ম্যাডাম - এঁদের কানে যায় তা হলে আর দেখতে হবেনা । কবিদের আমি বেজায় ডরাই । কোত্থেকে কোন চুন খসে পড়ে তা কে বলতে পারে !! ---------------------------------------------------------- কিন্তু , কি রাস্তা রে ভাই এই ডায়মন্ডহারবার রোড !! ধানক্ষেতও বোধ হয় হার মানবে খানাখন্দে ভরা ডায়মন্ডহারবার রোডের কাছে । নাচতে নাচতে ,দুলতে দুলতে চলেছে গাড়ি আর তার ভেতরে আমরা থেকে থেকেই একে অপরের ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি । “লালমোহনবাবু” সে গাড়িতে থাকলে হয়ত “বেহাল বেহালা” নামে একটা রহস্য উপন্যাসের প্লট ছকে ফেলতেন । তার ওপরে মাথার ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছেমেট্রো রেলের নির্নিয়মান ফ্লাইওভার । ঠিক সরল রৈখিক নয় তার গতিপথটি । বরং অনেকটা বিসর্পিল গতি তার । গাড়ির কোটরে বসে ভারি সুন্দর দেখতে লাগছিল ফ্লাইওভারটাকে । মনে মনে তারিফ করছিলাম যে পরিকল্পনাকার এর গড়নটির রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির । সাপের উল্লেখ যাদের মনে বিবমিষা উদ্রেক করে তাদের জন্য না হয় এঁকেবেঁকে তিরতির করে বয়ে চলা একটি ছোট্ট নদীর উপমা দিই ,অথবা নৃত্যপরা কোন তন্বীর দেহবল্লরীর ! গাড়ির সামনের আসনে চালকের পাশে বসে এই সব কাব্যকথা মাথায় খেলে যাচ্ছে তখনি একটা কাপুরুষজনোচিত ভাবনাও যে মনের কোনে উঁকি মেরে যায়নি তা নয় । দুই একবার মনে হয়েছিল যদি এই ফ্লাইওভারের একটা অংশ হঠাৎ করে ভেঙ্গে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ে …তা হলেই চিত্তির। দুপুরের মধ্যেই ব্রেকিং নিউজ হয়ে যাব। আমার এই “পান্তাফ্যাচাং মার্কা” থোবড়াখানা(মনোজদার ভোকাবুলারি থেকে ধার করা বিশেষণ) ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কাছে মূল্যহীন হলেও চ্যাপটান দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ির মধ্যে থেকে বের করে আনা দেহখানা বেহদ দামি বিবেচিত হবে নিশ্চিত । তাও এই পলিটিক্সের ডামাডোলের বাজারে !! ------------------------------------------------------------------- আলতু ফালতু কথা ছেড়ে এবার “পতে কি বাত কিয়া যায়” মনোজদা কে বলেই রেখেছিলাম যাবার পথে জোকায় স্বামীনারায়ন মন্দির এ মিনিট পনেরোর জন্যে হলেও একবার থামব । এর আগে দুই একবার এই পথে যেতে মন্দিরটা আমার নজর কেড়ে ছিল । সময় ও সুযোগের অভাবে মন্দিরটা ভালো করে দেখা হয়ে ওঠেনি । এবার সেই সাধ পূর্ণ করে নেব । আসলে মন্দির দেখাটা একটা আছিলা মাত্র । দুর থেকে দেখে আমার চোখ বলেছিল এই মন্দিরের ছবি বেশ ভালো উঠবে । আমার মতলবটাই ছিল ছবি তোলা । আর বীথি বৌদি এবং তস্য বান্ধবী শিপ্রাদিদির পেয়েছিল চায়ের তৃষ্ণা । দেবালয় গমনের বিচিত্র কারণ বটে । Ladies first । অতয়েব পার্কিং লট এ গাড়ি থেকে নেমে আমরা গুটিগুটি পায়ে মন্দিরটাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখে নিয়ে রওয়ানা দিলাম খাবার ঘরের দিকে । পেল্লায় সাইজের একটা হলঘরে নানাবিধ খাবার মেলে ১৭টাকা পিস বেসন কা লাড্ডু , ১৮ টাকা প্রতি পিস আর একটা বেসন আর ঘি এর চটকানো পিণ্ডি সাজান সেখানে শো কেস এ । বৌদিদের সখ হল ধকলা খাবেন চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে । কিন্তু তাদের সে জ্যাগারিতে পড়ল স্যান্ড ।মানে , ধোকলা নেই । পরিবর্তে একটু অপেক্ষা করলে মিলবে স্বামীনারায়নের ভোগ । নানান সবজী দিয়ে বানানো খিচুড়ি । চা খেতে খেতে মনোজদা চুপি চুপি জানালেন তিনি নাকি গাড়ি থেকে নেমেই মন্দিরের ছবি তুলতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন গার্ডের কাছে । এই মন্দির প্রাঙ্গণে নাকি ছবি তোলা নিষিদ্ধ । প্রথম ধাক্কায় একটু দমে গেলেও মনের মধ্যে নিষেধ নামানা সত্বাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল । মনে মনে নিজেই দুবার জপলাম “শ্লা । ইয়ার্কি পায়া হ্যাঁয় ? (কোনও কারণে রাগ হলেই দেখেছি আমার হিন্দিতে কথা বলতে ইচ্ছে করে) এখানে ছবি আমি তুলবই”। চা এবং খিচুড়িভোগ খেয়ে এবার নামলাম আসরে । গুটিগুটি পায়ে হেঁটে একটা পাথরে বাঁধান চাতালে গিয়ে দাঁড়ালাম মন্দিরের ঠিক সামনে । বিশাল আয়তনের মন্দিরটা সত্যিই সুন্দর দেখতে । আবছা মনে হচ্ছিল ঠিক এই রকম আর একটা কোন বিখ্যাত মন্দির যেন কোথাও দেখেছিলাম – অক্ষয়ধাম মন্দির কি ? কি জানি । আবার একটু খুটিয়ে দেখতে গিয়ে মিল খুঁজে পেলাম খাজুরাহোর মন্দির নির্মান শৈলীর সঙ্গে । সেই অসংখ্য চুড়া , কোনটা গম্বুজাকার কোনটা বা সুচাগ্র বর্শার ফলার মত ।আয়তাকার থামগুলো একে অপরের সঙ্গে শৃঙ্খলে বাঁধা । সেই সেকলের চেহারা দেখে মনে পড়ে যায় খাজুরাহো মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের কথা । মন্দিরের চত্বরের চার পাশে অনেকগুলি বারান্দা – থাম দিয়ে সাজান । খেয়াল করে দেখলাম থামগুলি বেশ সুন্দর পরিকপনা করে বসান ।কোন একটি দালানের সামনে দাঁড়ালে দুপাশের থামের সারির মাঝে লম্বা দালানগুলি বেশ রোমাঞ্চকর লাগল দেখতে । ইতি মধ্যে ক্যামেরায় বেশ কিছু ছবি তুলে ফেলেছি বিনা বাধায় । এবারে একটি বিশেষ কোন থেকে মূল মন্দিরের ছবিটা তুলতে গিয়ে প্রথম আপত্তির মুখে পড়লাম । মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী জানালেন মন্দিরের ছবি তোলায় নিষেধ আছে । হিন্দিতে সে যা বলল তার মর্মার্থ হল আমি যেন ক্যামেরাটা ব্যাগে রেখে মোবাইলে ছবি তুলি । মন্দিরে নাকি ক্যামেরায় ছবি তোলা বারণ থাকলেও সে নিষেধাজ্ঞায় মোবাইলের কোন উল্লেখ নেই । নিয়মের বহর দেখে আমার সত্যিই হাসি পেল । তবে সুখের কথা ,কর্মীটির দায়িত্ব যেন আমাকে নিষেধাজ্ঞার কথাটি জানিয়ে দিয়েই সারা হয়ে গেল । কারণ সে নিষেধাজ্ঞাটা বলবত করায় তার বিশেষ আগ্রহ দেখলামনা । আমি মুচকি হেসে তাকে বললাম খুড় একটু ওদিক পানে চাও দেখি – আমি সেই ফাকে গোটা কয় ছবি তুলে নিই । আপাতত সেই ছবি কিছু আপনাদের দেখতে দিয়ে আমি অন্য কাজে যাই । ফিরে এসে যদি দেখি আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি আমার বকবাকানিতে তা হলে না হয় ডায়মন্ডহারবারের কিসসার কথা পাড়া যাবে পরের পর্বে

84

11

stuti..

ছাইপাঁশ

ভোজন ২ -------------- ইন্দোনেশিয়া বেড়াতে গিয়ে যেমন ঐতিহাসিক বরোবুদুর , পেরাম্বানেন আকর্ষণ নিয়ে গেছে সুদূর অতীতে &nbsp;। তেমনি আগ্নেয়গিরি ও সমুদ্রের মেলবন্ধন বালি দেখে রোমাঞ্চিত হয়েছি । সে গল্প পড়ে লিখছি । ভোজন দিয়ে শুরু করেছি তাই ভোজনের দুই চার কথা লিখি । যোজিয়াকরতা পৌঁছে হোটেলে চেকইন করে বেড়িয়ে পড়লাম পেরেম্বানেনের হিন্দু মন্দির দেখতে । সূর্য তখন মধ্য গগনে । পেটের মধ্যে ইঁদুররা নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে । গাইড নিয়ে গেল গ্রামের মধ্যে এক রেষ্টুরেন্টে । যাবার পথটি বেশ । দুইদিকে দিগন্তব্যাপী সবুজ ধানের ক্ষেত তারি মাঝে মাঝে নারকেল গাছের সারি । মনে হচ্ছিল গ্রামবাঙ্গলায় কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছি । রেষ্টূরেন্টটি ছোট্ট একটী নদীরধারে পাশে বাঁশের ঝাড় । একপাশে ট্রেডিশনাল যন্ত্রসংগীত সহকারে একজন বাহাসা ( ইন্দোনেশিয়ার ভাষা ) গান গেয়ে চলেছে &nbsp;।মনোরম গ্রাম্য পরিবেশ । ভেতরে গিয়ে দেখলাম অতিথিরা সকলেই বিদেশি । মেনু কার্ড খুলে আবার আমরা হালে পানি পেলাম না । অনেক খাবার কিন্তু ভয় একটাই গন্ধ লাগবে না তো ? দেশের চাইনিজ খাবার দেশওয়লী প্রথায় বানান । তার সাথে মালয়েশিয়া ,সিঙ্গাপুর , ইন্দোনেশিয়া এসব দেশের চাইনিজ খাবার বর্ণে এক হলেও গন্ধে অনেক সময়ই অন্নপ্রাশনের কথা মনে করিয়ে দেয় ।এপাতা ওপাতা সেপাতা উল্টে যখন আমরা দিশেহারা তখন পাতার নিচের দিকে লেখা দেখলাম মিক্সড ভেজিটেবল । অন্ধের যষ্ঠির মত সেটাই আকড়ে ধরলাম । সাথে গ্রিলড ফিস আর প্লেন রাইস আর সুপ। সব চেয়ে বেশী ভরসা ছিল মিক্স ভেজিটেবিলের ওপর । অন্যগুলো বিট্রে করলেও ওটা করবে না । মাছ , ভাত আর সুপ যথা সময়েই এল কিন্তু মিক্সড ভেজিটেবিলের দেখা নেই। খিদের তারনায় আর অপেক্ষা করতে পারলাম না । খাওয়া যখন মাঝপথে তখন এক সুন্দরীর হাতে নাচতে নাচতে মিক্সড ভেজিটেবিল আমাদের টেবিলে এলেন । তার রুপ দেখে চক্ষু চড়কগাছ । মিক্সড ভেজিটেবিলের সংগাটাই পাল্টে গেল । একটি বড় প্লেটে রঙবেরঙের বেশ কয়েকটি সবজি ও ২/৩ রকম শাক সব সিদ্ধ করা ।সাথে একটি বাটিতে সস । কি আর করি । যস্মিন দেশে যদাচার । ওরা কিভাবে খায় জানি না । আমি তো সবজির মধ্যে সস ঢেলে খিচুড়ি বানিয়ে পেটে চালান করে দিলাম । এব্যপারে অনেক দিন আগে দেখা এক হিন্দী সিরিয়ালের কথা মনে পড়ে গেল । একজন অত্যাধুনিকা বউ নতুন শ্বশুড়বাড়ী গিয়ে পরের দিন ঘোষনা করল সে সকলকে চাইনিজ বানিয়ে খাওয়াবে । নববধুর ব্যবহারে সকলেই খুশি । টেবিলে অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছে &nbsp;। না জানি কি সুস্বাদু খাবার আসছে ।কিন্তু রান্নাঘরের দিক থেকে কোন আওয়াজ বা গন্ধ কেউ পাচ্ছিল না । অনেকক্ষন পরে বধূটি এক ট্রে নুডুলস সিদ্ধ করে এনে বললো আমি কারো পছন্দতে হস্তক্ষেপ করতে চাই না । তোমরা তোমাদের পছন্দ মত সস মিশিয়ে নুডুলস খেয়ে নাও । ব্যাজার মুখে সবাইকে সেটাই গলধকরন করতে হল ।

492

73

ঝিনুক

যে শিশু জন্ম নেবে না

ভূতের গল্পের প্রতিযোগিতায় উমা থুড়ি মুনিয়া একটা দারুণ গল্প লিখেছিল| অল্প কথায় গল্পটার সারমর্ম হল...... একটা বাচ্চা মেয়ে‚ গর্ভপাতের বেশ কয়েক বছর পরেও মেন্ট্যাল ট্র্যমা থেকে মুক্তি পেতে পারে নি| তার অবচেতনে অপরাধবোধ কুড়ে কুড়ে খায় তাকে আর তার থেকেই তৈরী হয় এক সাংঘাতিক ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা| উমার সেই গল্পে শ্রীর কমেন্ট পড়ে সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারি নি| তার পরিপ্রেক্ষিতেই লিখেছিলাম এই পোস্টটা‚ আজ m-এর অনুরোধে আলোচনার সুবিধার জন্য ব্লগে নিয়ে এলাম পোস্টটা| আশা করি সবাই অংশ নেবে/ন এই আলোচনায়| অ্যাবরশনের বিপক্ষে অনেকেই খুব সরব জানি‚ I’m not a fan either…. কিন্তু আবেগ দিয়ে ফ্যাক্টস গুলিয়ে ফেলা বোধ হয় খুব একটা কাজের কথা নয়| গুজবে কান না দিয়ে তথ্য একটু যাচিয়ে দেখলে কেমন হয়? নিজের শরীরে ধারণ করা আর একটা শরীরকে স্বেচ্ছায় উপড়ে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া কি এত সোজা? কেউই সখ ক'রে করে না সে কাজ| দায়ে না পড়লে কে আর সেধে এই পথে হাঁটতে চায়? উমার গল্পেও শ্রেয়সীর অবচেতনে অপরাধবোধ‚ অজাত ভ্রূণের প্রতি মমতা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে এতগুলো দিন পরেও তাকে সেই ভূত তাড়া করে ফেরে| অনেকদিন এই ফিল্ড মানে ফিসিওলজির থেকে অনেক দূরে‚ কোনরকম কোন পড়াশোনাই প্রায় নেই| ইন্টারনেট ঘাটলেই অনেক তথ্য পাওয়া যাবে‚ যায়| কিন্তু ইন্টারনেটে চোখ বন্ধ করে সব বিশ্বাস করার মত naivety আর নেই| তাই নেটের সাথে সাথে একটু পড়াশোনাও করতে হল| বহু যুগ বাদে ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে কয়েকটা সন্ধ্যে কাটালাম (ভূতেদের সাথে‚ আগেই তো বলেছি লাইব্রেরিতে ভূত থাকেই থাকে) নির্ভেজাল পড়াশোনা করে| এখানে ইউনিভার্সিটিতে গেলে আমার আর ফিরতে ইচ্ছা করে না| ইচ্ছে হয় আবার ফিরে যেতে সেই দিনগুলোতে‚ নতুন করে লেখাপড়া শুরু করতে| এত আয়োজন‚ এত ব্যবস্থা যে শুধু পড়াশোনার জন্য সম্ভব ….. চোখে না দেখলে কোনদিন জানতেই পারতাম না| যাগ্গে‚ এসব ই-বই আমাদের কালে ছিল না| স্পেশ্যাল রিক্যুইসিশন ভরে কিছু ই-পুস্তক চেক আউট করলাম এক সপ্তাহের জন্য| নেশা ধরে গেছে| সন্তানধারণ একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া| আর সেই খোদার উপরে খোদকারির নাম হল অ্যাবরশন| মানুষের gestation period কমবেশি ২৮০ দিন‚ মনে ৪০ সপ্তাহ| স্ট্যাস্টিস্টিকসের হিসাবে বেশির ভাগ স্বেচ্ছাকৃত অ্যাবরশনই ঘটে থাকে গর্ভধারণের ১২ থেকে ১৩ সপ্তাহের মধ্যে| প্রেগন্যান্সি কনফার্ম হয়ে ডিসিশন নিয়ে‚ মানসিক ভাবে তৈরী হতে হতে এই টাইম ল্যাপ্সটা খুবই স্বাভাবিক| প্রথম সাত সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ খেয়ে গর্ভপাত সম্ভব| তার পরে ক্লিনিক ছাড়া গতি নেই| রিসার্চ বলছে‚ ২৪ সপ্তাহ পার হয়ে গেলে সেই ভ্রূণ মাতৃগর্ভের বাইরেও survive করতে পারে‚ provided the same environment as the mother’s womb …. কাজেই ২৪ সপ্তাহের পরে অ্যাবরশন বিলকুল বেআইনী and is considered ‘intent to murder’‚ যদি না অন্য কোন গুরুতর কারণ থাকে| এবার আসি শ্রীর ঐ বিশেষ কমেন্ট যার পরিপ্রেক্ষিতে এই গরুখোঁজা শুরু হল| ভ্রূণের কি বেদনাবোধ থাকে? বিজ্ঞান বলছে‚ ৫ সপ্তাহের পরে হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করতে শুরু করে‚ ১৩ থেকে ২০ সপ্তাহের মাথায় নড়াচড়া‚ হাত-পা ছোঁড়া শুরু হয়‚ কিন্তু বেদনা বা ব্যাথা অনুভব করার জন্য মস্তিষ্কের যে বিকাশ প্রয়োজন তা ভ্রূণের গড়ে ওঠে না third trimester-এর আগে| এই third trimester শুরু হয় ২৭ সপ্তাহ থেকে| মোটামুটি ৩০ সপ্তাহ লাগে গর্ভস্থ শিশুর সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম নিয়ে প্রথম জেগে উঠতে| তবে বেদনাবোধ বা মস্তিষ্ক তৈরী না হলেও রিফ্লেক্স কাজ করতে পারে| একটা উদাহরণ দিই‚ যেমন আমাদের হাঁটু‚ ডাক্তারবাবু রাবারের হাতুড়ি দিয়ে হাঁটুর মালাইচাকিতে এক ঘা দিলে ব্যাথা লাগে না তেমন কিন্তু পাটা তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে‚ ওটা রিফ্লেক্স| ১৯ সপ্তাহের আশেপাশে‚ যখন স্পাইন্যাল নার্ভ টিস্যু তৈরী হতে শুরু করে তখন থেকে ভ্রূণের মধ্যে এই রিফ্লেক্স দেখা যায়‚ ছুঁতে গেলে সরে যাওয়া সেটারই প্রমাণ| কিন্তু তার মনে এই নয় যে তার কোন ব্যথা (চলিত বাংলায় যার নাম কষ্টবোধ) আছে| প্রচুর জ্ঞান দিয়ে ফেললাম‚ অনেক ডাগদারবাবু/নী আছেন এখানে‚ কিছু ভুল হলে মাথা কাটবেন না যেন‚ দয়া করে মাপ করে শুধরে দেবেন| এবার সবশেষে একটা প্রশ্ন ছিল| এই বিষাক্ত পৃথিবীতে কোত্থাও আর একটা শিশুও জন্মানো উচিত বলে আমার মনে হয় না| আমাদের কপালপোড়া দেশমাতৃকার কথা আর নাই বা তুললাম| সেসব বড় বড় ব্যাপারও নয় বাদ থাক| যখন কোন মেয়েকে এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিতে হয় (আমি রিতাদের ধরছি না এই হিসাবে) কোন কারণে বাধ্য হয়ে‚ কেন আমরা তার পাশে থাকতে পারি না? সব রিসার্চ‚ সব বিজ্ঞান নস্যাত করে দিয়ে যদি ধরেও নিই যে অ্যাবরশনের সময় ভ্রূণের কষ্ট হয়‚ তাহলেও এক অবাঞ্ছিত জীবনের লম্বা যন্ত্রনার চেয়ে কয়েক মুহূর্তের কষ্টই অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত নয় কি? আমি হলে তো দ্বিতীয়টাই বেছে নেব আমার অজাত সন্তানের জন্য| আড্ডা কি বলে? উঠুক না‚ আজ একটু ঝড় উঠুক এই নিয়ে| চুপচাপ পালিয়ে তো অনেক বাঁচলাম সারা জীবন আমরা সব্বাই (হ্যাঁ‚ সব্বাই)| আজ একটু শুনি না সব মায়েদের কাছ থেকে‚ সব মেয়েদের কাছ থেকে‚ পক্ষেই হোক বা বিপক্ষে|

83

7

Sarita Ahmed

বর্তমান চালচিত্র : উচ্চ শিক্ষিত মুসলিম নারী ও ভারতের মুসলিম বিবাহ প্রতিষ্ঠান ।

ছোটবেলায় 'বাপুরাম সাপুড়ে ' নামের একটা কবিতা ছিল ,খুব আউড়াতাম আর খিল খিল কাটাতাম মেয়েবেলা । বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখলাম, তখন খেয়াল করে দেখলাম বাপুরামের নিতান্ত নির্বিষ 'ভালো মানুষ' সাপেদের মতই আমাদের সমাজ মেয়েদের দেখতে চায় , পেতে চায় , ছুঁতে চায় । বর্তমান ইঁদুর দৌড় সমাজে বেশীর ভাগ মধ্যবিত্তের নিউক্লিয়ার পরিবার । একটা বা দুটো সন্তান । তাদের বাবা মা কিন্তু মোটামুটি সমতা রেখেই ছেলে বা মেয়ে 'মানুষ' করেন । মেয়েকে ভাল স্কুলে ভর্তির লাইন দিতে রোদে পুড়ে জলে ভিজে চাতকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন পিতামাতা । এটা খুব স্বাভাবিক ছবি । শিক্ষা, যে কোনো জাতির উন্নতির প্রধান ও একমাত্র চাবিকাঠি , যার কোনো ব্যতিক্রমী রাস্তা বা শর্টকাট হয় না । একটা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে যেমন কঠোর পরিশ্রম করে , মেধার পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতায় চাকরি পায় , জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় ; একটা মেয়েও ঠিক তেমনিভাবেই জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে নিজের পরিচয় বানায় । বরং মেয়েদের চলার , হাঁটার বা দৌড়ানোর পথটা কাঁটায় মোড়া থাকে বেশী করে । হয়তো তাকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে অত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় না , কিন্তু মূল বাধাগুলো পেরোতে হয় বাড়ির বাইরে । কর্মভূমিতে । শিক্ষার্থির ক্ষেত্রে শিক্ষালয়ে , চাকুরিরতার ক্ষেত্রে চাকুরিস্থলে । কখনো তা অসাধু ফাঁদের হাতছানি হিসেবে আবার কখনো প্রতারণা বা শারিরীক হেনস্তা হিসেবে একটা কর্মঠ মেয়ের জীবনে আসে । এ পর্যন্ত সবই চেনা ছক প্রায় সব শ্রেনীর, সব ধর্মজাতির ক্ষেত্রে। কিন্তু ছকটা একটু বদলায় , মুসলিম সমাজে । মেয়ের ২৩+ বয়েসের পরে । উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর শিক্ষায় একের পর এক যোগ্যতা প্রমান দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে, নিজের পায়ের তলার জমি পেতে একটা ছেলের ঠিক যতগুলো বছর সময় লাগে , একটা মেয়েরও ঠিক ততগুলো বছরই লাগে । এতগুলো পথ পেরিয়ে সমাজে উভয়ই সমানপদের পরিচিতি পায় সম্পূর্ণ নিজ মেধা-শ্রম ও কর্মের যোগ্যতায় । আজকের তারিখে দুজন এডাল্ট সহাবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলে তাতে উভয়েরই সমান অবদান ( contribution) লাগে , মানসিকভাবে, শারিরীকভাবে এবং আর্থিকভাবে । শেষেরটা কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অঙ্গ , একে অস্বীকার করা যাবে না । কিন্তু ভারতের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় দেখা যাচ্ছে মুসলিম পরিবারে উচ্চশিক্ষায় যত মেয়েদের অংশ বাড়ছে তত কমছে তাদের ভবিষ্যৎ ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর আশা । কেন ? কারণ , আজও ভারতের শিক্ষিত 'মডারেট' মুসলিম পরিবার, ছেলের বৌ হিসেবে পাত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নামাজ শিক্ষা- কোরান জ্ঞান- রোজা রাখার অভ্যাস - ইসলামিক রীতিনীতি ইত্যাদিকে । সম্প্রতি হায়দ্রাবাদে এক ঘটক ( city match maker ) শাহিদ ফারুকি-র অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে ২৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে বয়েস এমন উচ্চশিক্ষিত ( M.A, B.Ed , M.Ed, M.Com, B.Tech , M.Tech ) পাত্রীদের জন্য যোগ্য সুপাত্র মিলছে না । তাঁর কথায় , " it's become a herculean task to find these educated women, equally qualified grooms. Seven out of 10 women seeking alliances these days are well educated. Given that several men aren't still particularly interested in a girl's education (many aren't qualified themselves) and pay more attention to her looks and financial status, it's getting difficult to find these prospective brides an appropriate match." আর এজন্য এই সব মেয়েদের একটা "compromise" করতে হচ্ছে । কি সেটা ? তা হল, উচ্চশিক্ষিত এইসব মেয়েদের বিয়ে করতে হচ্ছে স্কুল ড্রপ আউট , ১২ ক্লাশ ফেল , আন্ডার গ্রাজুয়েট ছেলেদের । যাদের হয়তো পরিচিতি এলাকার ছোটখাট ব্যবসাদার হিসেবে। এক ডাক্তার মেয়ে নানা বিবাহ সংক্রান্ত ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে সন্ধান চালাচ্ছেন যোগ্য পাত্রের এবং হতাশ হচ্ছেন । ভারতের বিখ্যাত ম্যারেজ সাইট Shaadi.com এর একজন আধিকারিক যোগীতা তাঁর অভিজ্ঞতায় বলছেন , ""If a man earns well, families overlook his qualification. Mostly, it's the women who end up compromising." Osmania University র অধ্যপক এবং নানা শিক্ষাবিদরা এটাকে মেয়েদের উত্থান বা একটা 'সাইলেন্ট রেভ্যুলিউশন' নামে ডাকছেন । এ বিষয়ে একদল তদন্তকারী জানাচ্ছেন এটা এমন একটা দ্বন্দ্ব যাকে বলা যায় "transitional issue" ! তাদের ভাষায় ""Thanks to schemes like free education and fee reimbursement, there are an increased number of girls who are enrolling for higher studies now. Even the drop-out rate among them has lowered. While this has narrowed the educational gap between boys and girls, such issues (related to marriage) have cropped up." জালিশা সুলতানা ইয়াসিন , member of the Muslim Women Intellectual Forum বলেন : "There was a lot of insecurity among women until a few years ago and they took to education to support themselves. But that brought along a lot of practical problems which we need address to correct this imbalance. Parents need to push male children to study to resolve this " অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না । যেখানে ভারতে পুরুষ এবং নারীর লিঙ্গানুপাত = পুরুষ : নারী > ১০০০ : ৯৪০ ( ২০১১ আদমসুমারী অনুযায়ী ) আর শিক্ষাক্ষেত্রে যেখানে মাত্র ৭৪% ভারতবাসী শিক্ষিত , তার ৬৫.৫% হল নারী এবং ৮.৫% হল পুরুষ । ( ২০১১ রিপোর্ট ) এ যেন এক উলোট পুরাণ !! মুসলিম সমাজের হাল আরও খারাপ , বলাই বাহুল্য । কিন্তু সবই কি শুধুমাত্র 'পিছিয়ে পড়া জাতি' বলেই ? নাকি পিছিয়ে পড়া মানসিকতার জন্যও অনেকটা । বস্তুতই মুসলিম সমাজ প্রতিদিন ১০০ বছর করে পেছোচ্ছে দাড়ি- টুপি, হিজাব, বোরখা আর জেহাদের কট্টরতায় । একটা গোটা সমাজ মূলধারার শিক্ষার আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নানা রাজনৈতিক ধার্মিক নিম্নগামীতার কারণে । কাগজের বিজ্ঞাপণে দেখা যায়, শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত চাকুরিজীবি মুসলিম যুবাদের একটা বড় অংশ স্ত্রী হিসেবে আজও কামনা করে ১৮- ২৩ এর পুতুল পুতুল শো-কেস বেবি ,যার জীবন কাঠি থাকবে অন্তত ১০ বছরের বেশী বড় স্বামী নামক কর্তার হাতে । সেই জীবন চাবি ঘুরিয়ে যখন খুশী দম দিয়ে স্ত্রীটিকে উঠানো -বসানো -শোয়ানো -বাচ্চা বিয়ানো ইত্যাদি নানা জৈবিক কাজ করানো যাবে , ইসলাম সম্মত ভাবে। অথবা, আরেকদল শিক্ষির 'মডারেট' শ্রেনীর চাহিদা অনুযায়ী এমন পাত্রী চাই যে হবে, চাকরীওয়ালা -নামাজি -চটপটে ইংলিশ বলা-হিজাবী এক আজব 'অল-রাউন্ডার' ! যার টাকা উপার্জনের ক্ষমতা থাকবে নিজ যোগ্যতায় ; কিন্তু খরচের অধিকার থাকবে স্বামীর আয়ত্বে । ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হবে জয়েন্ট; কিন্তু ATM , Pin থাকবে স্বামীর জিম্মায় । এক অদ্ভূত মিথোজীবিয় পরজীবিতা ! বাবুরাম সাপুড়ে-র কাছে ঠিক যেমন এক নির্বিবাদি সাপের আশায় ছড়া লেখা হয়েছিল , এও যেন ঠিক তেমনি চাওয়া । মেয়ে ছাড়া যেহেতু বাচ্চা হবে না , তাই বংশবিস্তারও সম্ভব না । সেহেতু বিয়ের জন্য পাত্রী চাই । কিন্তু ওই... যে পাত্রীর চোখ-কান খোলা নেই , কোথাও সে ছোটে না , ইচ্ছেমত হাঁটে না , সাত চড়ে রা-কাটে না , সেই মেয়ে জ্যান্ত ... গোটা চার আনত । ( মুমিন গনের চারবিবাহ ইসলাম সম্মত তাই !) ব্যতীক্রম কিছু নিশ্চয় আছে । এইসব শিক্ষিত 'মডারেট' মুসলিম 'ব্যতীক্রমী'রা, উদারমনা মেয়েদের চক্ষুলজ্জা ও সামাজিকতার খাতিরে ফেলতেও পারে না , গিলতেও পারে না । তাই একটা সেফ দুরত্ব বজায় রেখে উপর উপর বাহ বাহ , প্রশংসা করে । কিন্তু জীবন সঙ্গী বানানোর ক্ষেত্রে ঢোক গিলে ক্ষমা চায় । এদিকে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে যুক্ত প্রত্যেকেই জানে বছর বছর সমীক্ষাগুলোও বলছে এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই সিরিয়াসলি পড়াশুনাটা করছে । খানিকটা স্বভাবগত বাধ্য সন্তান হওয়ার কারণে , আর খানিকটা বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের পরিচিতি খোঁজার তাগিদে । রেজাল্ট মাধ্যমিক হোক বা উচ্চমাধ্যমিক পাতা খুললেই ডেটা হাজির । অস্বীকার করার উপায় নেই । কিন্তু বিয়ের জন্য এইসব উচ্চ শিক্ষিত মেয়েদের জুড়িদার পেতে 'ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়' দশা । এখন অনেকেই বলতে পারেন , এত প্যাঁচাল পেড়ে লাভ কি ! বিয়ে না করলে কি মেয়েদের চলে না ? আজীবন অবিবাহিত থেকে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানকে কাঁচকলা দেখাও , ল্যাঠা চুকে যায় । নিশ্চয় যায় , আলবাত চুকে যায় । কিন্তু কথা হল , তাহলে কি ধরে নেওয়া হবে , যেহেতু তুমি আত্মসম্মানী মেয়ে এবং উচ্চশিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত চোখ কান খোলা সুতরাং তোমার জন্য বিয়ে-সংসার নিষীদ্ধ । এতে শিক্ষিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গর্বের শতকরা হার কি বেড়ে যাবে ? দেখুন, একটা সরল উদাহরণ দিই । একটা পথ কঠিন , কাঁটা বিছানো বলে সেটাকে এড়িয়ে চলে যাওয়া তো সবচেয়ে সোজা কাজ । সবচেয়ে সরল পথ । এর মধ্যে মহত্ত্ব নেই । বরং সেই কাঁটা পথকে নির্মল করে সবার জন্য যাতায়াতের উন্মুক্ত ব্যবস্থা করাটাই উন্নতির পরিচায়ক । সব শিক্ষিত নারীই যে অবিবাহিত হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এমন তো কোনো মানে নেই । ছেলেরাও যেমন একটা সুন্দর সুস্থ বিবাহিত জীবনের বাসনা রেখে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঠিক সেই একই কথা কি মেয়েদের বেলায় খাটে না ? নাকি , মেয়ে বলেই তার জন্য সর্বদা আলাদা নিয়ম হবে ? যদি নিয়ম না মেনে স্বাধীনচেতা হয় তবে সুস্থ সুন্দর সমাজ তার আশাতীত হবে ? তার জন্য রুদ্ধ হবে সব স্বাভাবিক দ্বার ? এটা কি কোনো উন্নত দেশের একটা জাতির সামাজিক মানচিত্র হতে পারে ?

100

12

শিবাংশু

শ্রীধর কথকের সরজমিন

হুগলি বাঁশবেড়িয়ার শ্রীধর ভট্টাচার্য জন্মে ছিলেন ১৮১৬ সালে। বিখ্যাত কথক লালচাঁদ বিদ্যাভূষণ ছিলেন তাঁর পিতামহ। পিতা পণ্ডিত রতনকৃষ্ণ শিরোমণি। বাড়ির শিক্ষা ছিলো উচ্চকোটীর। তার উপর ভাগবতের পাঠ নিয়েছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে। তরুণ বয়সে সঙ্গীসাথিদের নিয়ে পাঁচালি আর কবিগান গেয়ে বেড়াতেন। বহরমপুরে সেকালের বিশিষ্ট কথক কালীচরণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা হবার পর তিনি কথকতার প্রতি নতুন করে আকৃষ্ট হ'ন। এই শিল্পটিতে তাঁর লোকপ্রিয়তা সেকালে আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছিলো। নামকরা কথক হয়ে উঠেছিলেন অল্প বয়সেই। লোকে শেষ পর্য্ন্ত তাঁকে ডাকতো শ্রীধর কথক নামেই। তাঁর রচিত মাতৃসঙ্গীত জনপ্রিয়তায় রামপ্রসাদের সঙ্গে এবং টপ্পা স্বয়ং নিধুবাবুর সঙ্গে পাল্লা দিতো। শ্রীধরের বহু গান এখনও নিধুবাবুর নামে চলে। অতি সমাদৃত "ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে" গানটি তাঁরই রচনা, যা অনেকে নিধুবাবুর গান বলে জানেন। শুধু বাংলা নয়। তাঁর গভীর সারস্বতচর্চার ছাপ তাঁর হিন্দি, ফারসি, এমন কি আরবি ভাষায় রচিত টপ্পার মধ্যেও পাওয়া যায়। এখনও পর্যন্ত তাঁর ১৬৯টি গান উদ্ধার করা গেছে। এছাড়া তাঁর রচিত বেশ কিছু পদাবলী কীর্তনেরও সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর রচিত টপ্পার চালটি নিধুবাবুর থেকে কিছু আলাদা। আরো সাবলাইম আর প্রেমসংলাপকেন্দ্রিক। উল্লেখিত দুরূহ টপ্পাটি গাওয়ার প্ররোচনা এড়িয়ে যেতে পারিনি। যদিও তার প্রতি সুবিচার করা সঙ্গতভাবেই আমার আয়ত্বের বাইরে। ১৯০৩ সালে গওহর জান এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু টপ্পা হিসেবে গা'ননি। এহেন একটি গান গাওয়ার ধৃষ্টতাকে বামনের চন্দ্রাভিলাষ অবশ্যই বলা যায়। দেড়শো বছরেরও অধিক পুরোনো একটি হারিয়ে যাওয়া বাংলা গান আগ্রহীদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার লোভ এড়ানো দুষ্কর বোধ হলো।

87

19

Sarita Ahmed

‘ সবটাই অলৌকিক ' ( #ভূতের_গল্প )

সে অনেককাল আগের কথা । ন’ঘরিয়া গ্রামে ছিল আমার দাদুর বাড়ি । দাদুরা ছিলেন চারভাই। সেটা বৃটিশ আমল । বেশ অবস্থাপন্ন জমিদারবাড়ি সেটি ,যদিও জমিদারি ছিল না তখন তবু কেতা ছিল ষোল আনা । আশেপাশে জ্ঞাতিজনদের নিয়ে বিশাল এক যৌথ পরিবারের বাস ছিল সেই গ্রামে। শোনা যায়, গোলাপ খাঁ নামের এক জমিদারের বাড়ির উনুন কোনও সময় নেভানো হত না , এত বড় ছিল সেই উনুন এবং তার উপর চাপানো হাঁড়ি যে গোটা গ্রামের মানুষ একসাথে পাত পেড়ে খেতে পারতেন । সেই গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মির্জা মোহাম্মদ খাঁ ছিলেন একজন জাঁদরেল সাহেব । ‘সাহেব’ উপাধি পাওয়ার কারণ ওনার চামড়ার রং আর সাহেবী মেজাজ – ঘোড়ার পিঠে চড়ে হান্টার ঘুরিয়ে পথচলতি জনতাকে ভীত সন্ত্রস্ত করা ছিল ওনার এক উগ্র রসিকতা । সেই বৃটিশ আমলে বেশ কিছু জমিদার গজিয়ে ওঠে গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে ।তাদের মধ্যে যারা ইংরেজদের বদান্যতায় নানা দপ্তরে অথবা জমিদারিতে চাকরি পান, তাদের জীবনযাত্রা এবং মেজাজেও সেই ধার–করা-সাহেবী-কায়দার ছাপ পড়ে । কতকটা সেরকমই ছিল এই পরিবার । আমাদের দাদুর পরিবার ছিল এই গোলাপ খাঁয়ের জ্ঞাতি । সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি তার উপর যৌথ পরিবার ; সুতরাং আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি খানদানি চটক ছিল দেখার মত – গোলাভরা ধান, প্রচুর গরু, ছাগল, মুরগী, লোকলস্কর, চাকর বাকর ইত্যাদিতে ভরা । অন্দরমহল গমগম করত স্ত্রীলোক এবং পুত্রকন্যাদের উচ্চকিত হর্ষে । তবে পর্দাপ্রথার চল থাকায় সেসব শব্দ বাইরে খুব একটা যেত না । এহেন বনেদি খান বাড়ির সামনেই ছিল একটা মসজিদ আর তার পাশেই ছিল একটা খানদানি কবরস্থান । তাঁদের চার ভাইয়ের মধ্যে আমার দাদু ছিলেন একটু আলাভোলা গোছের মানুষ । চাষবাস করে সংসার প্রতিপালন করতেন আর রাত কাটাতেন মসজিদ চত্ত্বরে । নিরীহ ধার্মিক মুসলমান বলতে যা বোঝায় ইনি ছিলেন ঠিক সেরকম একজন । স্বাধীনতার ক’বছর পরের কথা । সেদিন ছিল জানুয়ারির এক শীতের রাত । তখনকার দিনে গ্রামের মানুষেরা বেশি রাত জাগত না । সন্ধ্যে ৭ টার পরেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমের আয়োজন শেষে লম্ফ নিভিয়ে দেওয়াই ছিল রেওয়াজ । তখন কত রাত খেয়াল নেই, মেজ দিদিমার ঘুম ভেঙ্গে গেল । পাশে হাত পড়তে টের পেলেন মেজদাদু বিছানায় নেই । বাইরে কোথাও শৌচে গেছেন হয়তো ভেবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন । কিন্তু তিনি ফিরলেন না । দিদিমা বাইরে এলেন। পাশাপাশি সব ভাইয়ের ঘর । এত রাতে কার ঘরে টোকা মেরে জাগাবেন ঠাহর করতে না পেরে তিনি হ্যারিকেনের শিখা বাড়িয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে বাইরের মসজিদের দিকে চললেন । বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়েই আমার দাদুকে ঘুম থেকে তুলে মেজদাদুর হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার কথা বলতেই , দাদু স্মিত হাসলেন । -“ মেজ ভাই ঠিক আছে, আপনি ঘরে যান । ঘুমিয়ে পড়েন ভাবি, দেখবেন ভাই ভোরের দিকে ঠিক চলে আসবে।” ছোট দেওয়ারের এমন হেঁয়ালিতে কিছু বুঝতে না পারলেও এটুকু ধরা গেল যে মেজভাইয়ের উধাও রহস্যটা উনি জানেন । সে রাতে তাঁর ঘুম এল না। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিল , কিন্তু পাশ ফিরতেই উনি টের পেলেন কত্তা শুয়ে আছেন পাশে । ধড়মড় করে উঠে বসে তিনি ধাক্কা দিয়ে জাগালেন ওনাকে তারপর শুনলেন সবটা । -“ আহা, অত চিন্তা কেন কর ? আজ ওদের ডাক এসেছিল যে ! সন্ধ্যে থেকেই পোলাও মাংসের সুবাস পেয়েই বুঝেছি রাতে যাওয়া লাগবে।” -“মানে ? কাদের কাছে গিয়েছিলেন ? কারা ডেকেছিল ?” -“শশহহ ... সবটা বলা বারণ । তবু তুমি স্ত্রী । তাই বলছি । মসজিদের পেছনে পীরপুকুরে যেতে হয়েছিল । জ্বিন পরিদের বে’ ছিল যে ! আমার না গেলে চলবে কেমনে , বিয়ে পরাতে হবে না! সারারাত ভোজ চলল, ভোরবেলা ওরা দিয়ে গেল বাড়িতে ।” মেজদিদিমা এ কথার কোনো মানে বুঝতে পারেন নি । তবে যখন দেখলেন প্রতি মাসেই দু একদিন করে এমনভাবে মেজদাদু রাত্রে উধাও হয়ে যান আর ভোরবেলা ফিরে আসেন – তখন ব্যাপারটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিলেন । কারণ এ ঘটনার প্রধান সাক্ষী ছিলেন আমার দাদু । জ্বিনপরিদের নিয়ে বেশ কিছু গল্প ওই অঞ্চলে চালু আছে , বেশিরভাগ মানুষ তাতে বিশ্বাসও করেন । আর দাদুদের বংশে জ্বিনদের নাকি বরকত ছিল । এই নিয়ে বহু ঘটনা ঘটেছে , সেগুলো অলৌকিক কিনা বলতে পারব না, তবে লৌকিক তো মোটেই না । মেজদাদু মানুষ হিসেবে সৎ ছিলেন । মূলত মেজদাদুই ছিলেন আমার দাদুর প্রধান সহচর ও বন্ধু । তা সেই মেজদাদু যখন মারা গেলেন তখন বাড়ির অবস্থা খানিক করুণ – জমিদারি তো অনেকদিন আগেই গেছে, এখন গৃহস্থ বাড়ির সেই জৌলুসও অস্তগামী হতে চলল । তবু বিপদ আপদে বেশ কিছু অদ্ভুত সুরাহা মিলতে লাগল । এক বর্ষার সন্ধ্যেবেলা মেজদাদুর আদরের নাতি মানে আমার মামাতো ভাই – আনিস, হারিয়ে গেল। বাচ্চাটি উঠোনে বসে খেলছিল , আশেপাশে তাকে ঘিরে ছিল মামারা এবং অন্যান্য সদস্যরা । বাড়ির মহিলারা তখন রাতের খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত , হঠাৎ ছোট মামির খেয়াল হল আনিস নেই । নেই তো নেই । আমার ছোট মামা বরাবরই ডাকাবুকো ধরণের । তিনি তখন গ্রামের কিছু লোক জড়ো করে লাঠি সোঁটা নিয়ে গেলেন খুঁজতে । রাত বাড়তে লাগল কিন্তু নাহ, কোনও খোঁজ মিলল না। ছাদ, চেনা পরিচিতের বাড়ি, মসজিদ, পুকুর তলা, কোত্থাও তার চিহ্ন নেই । রাত দশ’টা নাগাদ সবাই বিফল হয়ে ফিরে এল । বাড়িতে তখন কান্নাকাটি, শোরগোল। অত শান্ত ছেলে যে কিনা রাতের খাবার খেয়েই ঘুমে ঢলে পড়ে, সে হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে যাবে ?আর কেনই বা! এইসব চিন্তায় যখন সবাই উদ্বিগ্ন, তখন আচমকা এক কান্ড ঘটল । মাঝ উঠোনে এক্কেবারে আকাশ থেকে একটা চক পড়ল আর তারপর গোটা উঠন জুড়ে সেই চক আপন মনে ঘুরে ঘুরে উর্দূতে লিখতে থাকল “ কী করিস তোরা ! একটা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে পারিস না ! আজ আমি ছিলাম বলে জানতে পারছিস নইলে এ জন্মে ছেলেকে আস্ত পেতিস না । যা, গ্রামের শেষে বাঁশঝাড়ে গিয়ে খোঁজ । ঠিক মাঝখানে একটা শিশুগাছের পাশে যে জোড়া বাঁশ গজিয়েছে তার ফাঁকে দেখ – ছেলে বসে আছে । যাহ তোরা এক্ষুনি।” লেখা শেষ হতেই বিদ্যুৎ চমকালো সাথে কড়কড় করে বাজ পড়ার শব্দ । বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ার সাথে সাথেই সেই লেখা যেন ভোজবাজির মত উবে গেল । ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই যেন থম মেরে গেলেন । মামারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন , মামিরা ভয়ে আশঙ্কায় গুমরাতে লাগলেন – কিন্তু এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল সেই ব্যাপার যে কেউ চিৎকার করারও সাহস পেলেন না । শেষমেশ ছোট মামা সাহস করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন । সেজ মামা এবং সেজদাদুর এক পাইট-কে ( যারা কৃষিকাজে গৃহস্থের ফাইফরমাশ খাটে) সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গেলেন । কি আশ্চর্য – সত্যি সত্যিই ছেলে দুই বাঁশগাছের মাঝে বসে বসে ভিজছে -দুই হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুঁজে । টর্চের আলো পড়তেই ছেলে একটু নড়ে উঠল , কিন্তু উঠল না। ছোট মামা তার গায়ে হাত দিয়ে “কিরে , এখানে বসে আছিস যে বড় । চল বাড়ি চল।” যেইনা বলেছে অমনি ছেলে মুখ তুলল । ঘন ঘন বিদ্যুৎ আর টর্চের জোরালো আলোতে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে সবাই এক পা পিছু হটল - তার দুই চোখ যেন ভাঁটার মত জ্বলছে । লাল গনগনে চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় চোস্ত উর্দূতে সে বলেই চলেছে “ দায়িত্ব নেই, বাচ্চার দায়িত্ব নেই কোনো ! আমি না থাকলে কে বাঁচাত?” কোনো রকমে তাকে বাঁশঝাড় থেকে বের করতেই সে ছেলে মূর্ছা গেল । টানা সাতদিন সে বিছানায় ছিল , জ্বরের ঘোরে মাঝেমাঝেই ভুল বকত । ডাক্তার বদ্যি করেও যখন জ্বর ছাড়ল না তখন মামি তাকে নিয়ে গেল এক গুনীনের কাছে । সমস্তটা শুনে সে বলল ‘বাড়িতে কোনো ইবাদতওয়ালা বুজুর্গের ইন্তেকাল ঘটেছে ?’ মামি তখন মেজদাদুর মৃত্যুর কথা বললেন । সবটা শুনে গুনীন জানালো ‘কোনও ভয় নেই । এই বাচ্চার মধ্যে ওনার আত্মা ভর করেছিল সেদিন । আপনারা বড় ভাগ্যবান ,এমন ভালামানুষের ইবাদত ছিল বলেই ওকে ফিরে পেয়েছেন । নইলে সে রাতে শেয়াল কুকুরের পেটে যেত ছেলে । বাড়ি যান আর আপনাদের মেজবাবার নামে মসজিদে দোয়া করুন ।সব ভাল হবে।” তারপর বেশ কিছুকাল সব ভালোই কাটল । তবে একবছর বাদে আবার নতুন উপদ্রব শুরু হল । বাড়ির সর্বক্ষণের চাকর মনি উঠোন ঝাঁট দিতে গিয়ে কী যেন দেখে হঠাৎ ঝাড়ু ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে মসজিদে দাদুর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল । ‘কিরে, কি হয়েছে? কি হয়েছে ? অমন করছিস কেন?’ – উত্তরে সে সবাইকে উঠোনের ধারে নিয়ে গিয়ে যা দেখালো তাতে কারু মুখে কোনো কথা সরল না । উঠোনের ওপাশে যেখান থেকে কলতলা শুরু হয়েছে সেখানে চাপ চাপ রক্ত ! সেই রক্তের ধারা কোথাও সরু, কোথাও মোটা হয়ে পড়েছে । রক্তের ধারা অনুসরণ করে পৌঁছানো গেল পুরোনো রান্নাঘরের দিকে । সেখানে দাওয়ায় রক্ত, দেওয়ালে রক্তের ছিটে । এমন এমন জায়গায় রক্তের দাগ যেখানে কোনও কাটা স্থান থেকে রক্তপাত হতেই পারে না । এই পুরোনো রান্না ঘরটা বহুকাল থেকে বন্ধ । রান্নাবান্না সেই গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকেই চুকে গেছে । পরে চাকর পাইটদের থাকার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত। তবে গৃহস্থের অবস্থা পড়তির দিকে হওয়ার পর সেই ঘর পুরোপুরি তালা বন্ধই ছিল এতদিন । আজ সেখানে এমন রক্তের দাগ ! ছোটমামা ভেতরে ঢুকে দেখার পরামর্শ দিলেও কেউ সাহস করল না , এদিকে এতদিনের ব্যবধানে এঘরের তালায় জং ধরেছে, চাবিও গেছে খোয়া ! শেষমেশ দরজা ভেঙ্গে ঢুকে দেখা গেল ঘরের ভেতর কিচ্ছু নেই ! দরজার সামনে চৌকাঠ অবধিই দাগ , ভেতরে মাকড়সার জাল, ভাঙা আসবাব, ক’টা তুলো বের হওয়া তোষক আর ইঁদুর ছুঁচোর বিষ্ঠার গন্ধ ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই । সেদিনের ঘটনাকে সত্য প্রমান করে ক’দিন বাদে আবারও একই ঘটনা ঘটল । এবার সবাই নড়েচড়ে উঠল। কিন্তু গুনীনের কথায় সবার বিশ্বাসও হল না । শেষে গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন মানুষ সাইদুল ডাক্তারের কাছে শোনা গেল আসল খবর। নামের সাথে ‘ডাক্তার’ জুড়ে থাকলেও ১০১ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ ছিলেন গোলাপ খাঁয়ের খাস হাকিম । গাছ গাছড়া থেকে কবিরাজি পথ্য তৈরি করে বহুবছর সেবা করে এসেছেন খান পরিবারের । তাঁর কাছেই জানা গেল আসল তথ্য । সেইসময় প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের জন্য খাজাঞ্চী নিয়োগ হত । গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মির্জা ছিলেন সেই ব্যক্তি যার উপর ন’ঘরিয়া গ্রামের খাজনার দায় বর্তায় । এমনিতেই তিনি ঘোড়ায় চড়া হান্টারবাজ দামাল লোক, তার উপর সাহেবী মেজাজ এবং অজস্র বদঅভ্যাস ও কুকীর্তির জন্য বিখ্যাত । প্রজারা আক্ষরিকই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত । এক দুপুরে গ্রামের পথ দিয়ে আসার পথে তার নজর গেল এক বেদেনীর মেয়ের উপর । সে এবং তার এক প্রেমিক সাইকেল ঠেলে যাচ্ছিল । এদিকে মির্জার মনে কামনার আগুন । জোরপূর্বক সে মেয়েটিকে ঘোড়ায় তোলে এবং জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় । কিশোর প্রেমিক ভয়ে দ্বিধায় খানিক দোলাচলে থাকলেও পরে ছুটে যায় প্রেয়সীকে বাঁচাতে । কিন্তু নিয়তি তাদের জন্য অন্যকিছু লিখেছিল । মির্জার হাতে খুন হয় দুইজন । তাদের দেহ কেটে এই জমিতে পুঁতে দেওয়া হয় । তখন এখানে পতিত জমি, দাদুরা সবাই ছোট ছোট । কেউই সেই লাশদুটোর হদিস পেল না। এদিকে সেই কিশোরীর বেদেনী মা, যার উপর মাঝে মাঝে ওলাই-পীর ভর করত, তার নিঁখোজ মেয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে দোরে দোরে ঘুরেও কিন্তু শেষমেশ ব্যর্থ হয় । তবে মরার আগে সে অভিশাপ দিয়ে যায় ‘যে লোক তার মেয়ের সর্বনাশ করেছে, যার জন্য তার মেয়ে বেপাত্তা হয়ে গেল সে নির্বংশ হবে এবং যদি কেউ বেঁচেও যায় তো তার জ্ঞাতিপুরুষের ভিটায় রক্তস্রোত বইবে, সাপ নাচবে’ ইত্যাদি । কাকতালীয় ভাবে তার মৃত্যুর মাস কয়েকের মধ্যেই মির্জা খাঁ ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান । তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪২ বছর । বৃদ্ধ সাইদুল কাশতে কাশতে যখন পুরো বৃত্তান্ত শেষ করলেন তখন আকাশে চাঁদ উঠেছে ,প্রতিপদের পরের চাঁদ । সবাই ফিরবে বলে উঠতে যাচ্ছে তখনই আবার ঘড়ঘড়ে গলায় সাইদুল বলে উঠলেন, ‘তোদের সবাই ঝাড়ে বংশে শেষ হয়ে যাবি। খুব শিজ্ঞির।পাপ ঢুকেছে, পাপ।’ পাপ সত্যি ঢুকেছিল । মাস ছয়েক বাদে আচমকা বড় দাদু মারা গেলে তার ছেলেরা জমিবাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি আরম্ভ করল । সেজদাদু যদিও ছিলেন নিঃসন্তান তবু জমির ভাগ নিয়ে লড়াই ছাড়লেন না। শেষে বাপারটা এমন গড়াল যে জ্ঞাতি ভাইরা আপন ভাইদের মিথ্যে অপবাদ দিতে, এমনকি মারামারি করতে অবধি পিছপা হল না । মেজদাদুর ছেলেরাও পিছিয়ে রইল না, নকল কাগজপত্র বানিয়ে জমিদখল করতে তারাও উঠে পড়ে লাগল । এইসব শরিকি বিবাদে যখন ন’ঘরিয়ার বিখ্যাত খানদান ছারখার হয়ে যেতে লাগল তখন ঘটল এক অভুতপূর্ব ঘটনা । আমাদের দাদুবাড়িরটা ছিল দেড়তলা । পেছনে ছিল বাগান আর পুকুর পাড় । উপরের ছোট ঘরটা ছিল ছোটদিদার । তবে মেজদাদু মারা যাওয়ার পর থেকে মেজদিদা ছোটদিদার সাথেই সেঘরে শুতেন । কিন্তু যেটুকু সময় তাঁরা থাকতেন না ,ওই ঘর থাকত তালাচাবি বন্ধ । দাদু তো বারোমাস মসজিদবাসী , ঘরে শুধু স্নান-আহার আর দরকারি কাজের জন্য থাকা । বাকিটুকু সময় হয় জমিতে, নয় মসজিদে । সেইরাতেও সবাই রাতের খাবার খেয়ে শুতে যাওয়ার পরে দাদুও মাদুর বালিশ নিয়ে গেলেন মসজিদে । নামাজ শেষে ওখানেই ঘুমাবেন নিয়মমত । তবে সেইদিন মেজদিদার শরীর খারাপ থাকায় ছোটদিদাও আর উপরে গেলেন না, নিচের একটা ঘরেই সেই রাত কাটাবেন বলে ঠিক করলেন যাতে জল , বাথরুম ইত্যাদি হাতের কাছে থাকে । এদিকে মসজিদে গিয়ে দাদুর নামাজ তো শেষ হল , কিন্তু ঘুম হল না, মনের ভেতরটা সমানে আনচান করছে যেন। মসজিদের বারান্দায় মাদুর পেতে গায়ের জোব্বাখানা খুলে মাথার কাছে রেখে ‘আল্লাহ মালিক’ এর নাম নিয়ে সবে শুয়েছেন , কিন্তু কী যেন একটা শিরশিরে অনুভূতি তাকে স্থির থাকতে দিল না । রাত তখন বেশ গভীর । হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানিতে তিনি চোখ খুলতে বাধ্য হলেন । মসজিদের বারান্দা থেকে দেড়তলার ঘর স্পষ্ট দেখা যায় । সেদিক থেকেই যেন আলোটা আসছে ! চাঁদনী রাতের ফকফকে জ্যোৎস্নায় চোখ মেলে তিনি যা দেখলেন তাতে বিস্ময়ে ,ভয়ে বোবা হয়ে গেলেন । একটা সোনার রথে চড়ে প্রায় দশ বারোটা জ্বিন পরি একসাথে সেই ছাদে নামল । তাদের রথ এবং গায়ের রং থেকে ঠিকরে পড়ছে সফেদ আলোর ঝলকানি । চাঁদনী রাতে সেদিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না , চোখে ধাঁধা লাগে । দাদু কোনোরকমে দেখলেন, তারা সবাই দেড়তলার ওই ঘরের ছাদে নামল আর তারপর সোনার ঘড়া থেকে রাশি রাশি মোহর ঢেলে দিতে লাগল ছাদের উপরে । সেগুলোর ঝনঝন শব্দ দাদুও শুনতে পেলেন যেন । ভয়ের চোটে তিনি কলমা পড়তে শুরু করলেন , কিন্তু তাকে হতবাক করে দিয়ে এক জ্বিন উড়ে এল যেন তার সামনে । হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তার দিকে একমুঠো মোহর দেখালো আর হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল ‘আয় , নিবি ? আয় আয়...’ দাদু চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাস উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন , ‘তোমরা যেই হও, ফিরে যাও। আমার এসব লাগবে না কিছু। আমার যা আছে তাই দিয়ে ভাল আছি । তোমরা যেখান থেকে এসেছ সেখানেই ফিরে যাও, আমাদের ক্ষতি কর না, বাবারা । ফিরে যাও, আমার এসব চাই না... কিছু চাই না ...’ কতক্ষণ তিনি ওভাবে চোখ বুঝে বিড়বিড় করেছিলেন জানা নেই, তবে একটা বিকট শব্দে তার চোখ খুলল আবার । দেখলেন জ্বিন নয়, রথ নয়, মোহর নয়- রাশি রাশি মৌমাছির ঝাঁক আকাশ কালো করে উড়ে যাচ্ছে ‘বোঁওওও’ শব্দে । দেড়তলার ওই ঘরের চালে চারটে বড় বড় চাক ছিল ডাঁশ মৌমাছির । সেইসবক’টা চাক থেকে মৌমাছির দল উড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ঘটল আরেক কাণ্ড । দেড়তলার ওইপাশটা পুরোটা একসাথে ধ্বসে পড়ল । তার শব্দ অবশ্য শুধু দাদু নয় সবাই পেল । শেষরাতের ঘুম ভাঙতে দেরি হল যাদের তাদের আর ঘুম ভাঙল না । বড়দাদুর পরিবার যেদিকটায় থাকতেন সেটা একেবারে চাপা পড়ে গেল । চিৎকার, কান্না, গোঁঙানির শব্দে সেইরাতের বাতাস ভারি হয়ে জানান দিল অশরীরিদের দাপট কেমন হয় । ভোরের আলো ফুটলে আশপাশের গ্রাম থেকে সবাই ছুটে এসে দেখল খানবাড়ির ধ্বংসস্তুপ । শুধু এক পাশে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের দাদুর বাড়িটাই, ছাদহীন অবস্থায় । অবিশ্বাস্যভাবে সে বাড়ির কারুর গায়ে আঁচড়টিও লাগে নি । এরপর কিছু জ্ঞাতিভাইয়েরা পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশ চলে যায় । কিছুজন রয়ে যায় সেই গ্রামেই তবে বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্যত্র বাসা বেঁধে। কিন্তু আমার দাদু এবং মামারা কেউ ওই ভিটা ছাড়তে পারেন নি । নাহ, তারপর থেকে অলৌকিক এমন ঘটনা না ঘটলেও দিদা মাঝে মাঝে টের পেতেন ঝুমঝুম আওয়াজে সে যাচ্ছে । জ্বালানীর স্তুপ থেকে পাটকাঠি হাতে ঠকঠক করতে দেখেছি আমরা তাকে । যদিও আমাদের বয়স তখন খুবই কম, তবু মনে আছে । -‘কি করছ দিদা , কি তাড়াচ্ছ ?’ -‘শশহহ... ও যাচ্ছে । হেই হেই, যেখানে যাচ্ছিস যা। এদিকে আসিস না।’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে বলতেন ‘বেদেনীর অভিশাপ বিফলে যায় নি বেটা । বাস্তুসাপ হয়ে সে এখনো এই ভিটায় ঘুরে বেড়ায়। ক্ষতি করে না, আগলে রাখে -সে আমি খুব জানি ।’ আমরা আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেতাম না ।

82

4

ইয়ু লিন

আজকের আপডেট

আজকের আপডেট| আসলে গতকালের এটা| আজকাল বার‚ তারিখ‚ উইকেন্ড সব গুলিয়ে যাচ্ছে তার উপর এই অগা মারা শীত| তাকিয়ে আছি আর কটা দিন তারপর শর্ট ট্রিপে সোনার ঝাড়খন্ড এবং ফিরে আসতে আসতে শীতের প্রকোপ কমে আসবে এবং তার পর পরই দুর্গা পুজো| বসন্ত‚ গ্রীষ্মের শুরু| আহা‚ দিবা স্বপ্ন দেখতেই এত ভাল লাগে! আগে গতকালের লাঞ্চ ও ডিনারের মেনু জানাই| আজকাল যে কোন খবরেই তো দেখি মেনুর ফিরিস্তি‚ সে প্রধানমন্ত্রীর হোক বা মুখ্যমন্ত্রীর হোক; তাছাড়া‚ 'বাঙালীর পাতে' র বর্ণনা তো আছেই নামে দামী বাঙলা কাগজে| খাওয়া দাওয়ার বিবরণ পাবলিকে বেশ 'খায়'| অনেকদিন পর ফ্রেশ কচুর মুখী- মানে রিয়াল স্টাফ‚ হিমায়িত নয়| বোধহয় ফিজি থেকে আসে| আসল কচু তো 'Taro' বলে বিকোয়| দুটো ই মহার্ঘ্য| আলু ৫০ প:‚ পেঁয়াজ ১ ডলার (ঝাঁঝালো)‚ দু ডলার লাল গুলো| সেই তুলনায় সাত আট ডলারে কচুর মুখী! ডাউন আন্ডারে সবই উলটো| আহা কচুর মুখী‚ বড়ি দিয়ে মাছের বাঙলা ঝোল| অবশ্যই সঙ্গে বাসি রুটির সঙ্গত| আমরা সর্বদা আগের দিনের বা তার আগের রান্না‚ রুটি আজ খাই; আজকেরটা কালকে| এইবার কিন্তু ভুরিভোজ- আর ছিল গুজরাতী ঢ্যাঁড়স ও করলা ভাজা| এইবার সক্কলে বলবেন‚ আহা কি কম্বিনেশন! জনগণ‚ ওরকম বলতে নেই| মিথ ভাঙ্গতে আমার বড় ভাল লাগে| কালকে তো স্পেশ্যাল খানা‚ সেই কবে‚ কত যুগ আগে‚ 'পথ বেঁধে দিয়েছিল‚ বন্ধনহীন গ্রন্থি'| ভাল মন্দ আহামরি কিছুই নয়‚ সব দিনই সমান| ওসব বার্ষিকী বড় মানুষদের জন্য| শহীদ ইত্যাদি humblebragging করতে মন চায় না| কেবল দুজনের যৌথ জীবনযাত্রা| -- এখানে টিভিতে গত তিনদিন ধরে একটা ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছে| এসব দেশেও আশ্রয়হীন লোকের সংখ্যা কম নয়‚ অনুর্ধ ২৪০ লক্ষ নাগরিকের মধ্যে ১ লাখের মত| কম নয়| সাতজন পুরুষ ও মহিলা‚ বিভিন্ন বয়সের তবে তারা সবাই filthy rich পরিবারের‚ কারুর মা বাপ‚ কেউ কেউ নিজেই মাল্টি মিলিওনেয়ার| তাদেরকে টাকা পয়সা ফোন সব কিছু জমা নিয়ে শীতের মেলবোর্নে দশ দিনের জন্য ছেড়ে দিয়েছে| সকলেই অবশ্য ভলান্টিয়ার| কি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হলো তাদের| কার্ডবোর্ড বাক্সে‚ পাবলিক পার্কিং এ‚ বা শুধুমাত্র দেওয়ালের ধারে| খাবার নেই তো অন্য এক রাস্তার অনাথের সাথে ডাস্টবিন থেকে খাবার‚ ভিক্ষা সবই তারা করে| রীতিমত শিউরে উঠতে হয়| চলতে ফিরতে তাদেরকে আমরা দেখেও দেখি না| ওহ‚ এই সাতজন এক সাথে নয়‚ আলাদা করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের ছেড়ে দেয়| -- গৃহকর্ত্রীর ফেরবার সময় হয়ে এলো| আমার সব কাজ কমপ্লিট| বাসন পত্র মাজা (কড়াই ইত্যাদি বড় আইটেম)‚ রান্নাঘর পরিষ্কার করা‚ মেলে দেয়া কামাকাপড় তোলা সবই D O N E| কিন্তু তবু তিনি এসে একটা না একটা খুঁত বের করবেনই| বুধবার লাঞ্চ মীট ছিল‚ ঘরোয়া তবে অফিসের চার কলীগ| এটা আমাদের মাসিক পিয়েনপিসির আড্ডা| অফিস পলিটিক্স ইত্যাদি প্লাস খোশগল্প| এবার কথায় কথায় বলে উঠলাম‚ আপাতত: আমার ড্রাইভিং বারণ‚ মিসেস পৌঁছে দিল| এবং কি বিশ্রী ভাবে যখন তখন unbroken লাইন ক্রস করা থেকে‚ লেন চেঞ্জ করার পর ঘাড় ঘুরিয়ে ব্লাইন্ড স্পট দেখা| তড়াক করে একজন বলে উঠলো‚ কিছু বলতে যাও অমনি তেড়ে আসবে-'তুমি যখন চালাও?' দেখলাম সব হাজব্যান্ডই নিপীড়িত! জয়রামজীকী|

1239

137

মনোজ ভট্টাচার্য

ভূতুরে বিজনেস !

ভুতুড়ে বিজনেস ! আমাদের বাড়িটা হল সাড়ে তিনতলা । মানে তিনতলা প্লাস চার তলার ছাদে একটা ঘর । দোতলা তিনতলায় আমাদের হোল গুষ্ঠি থাকে ! আর এই ঘরটা – আমার আর বিভুর । – আমাদের নিজস্ব ঘর – কি অপার শান্তি – কোন ঝামেলা নেই । বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কয়েকজন আসে ঘুড়ি ওড়াতে – পাশের বাড়ি থেকেও ঘন্টুদা আসে ঘুড়ি ওড়ায় – কেটে যাওয়া ঘুড়ি নিয়ে যায় । এই বাড়ির দুদিকে দুটো বাড়িই তিনতলা । কিন্তু তাদের ছাদটা – আমাদের পাঁচিলের পাশেই । মাঝে একটা আড়াই ফুটের গ্যাপ – ওখান দিয়ে মেথর-ধাঙ্গড়রা নাকি যাতায়াত করত ! এখন তো বন্ধ থাকে । পাঁচিল টপকে এ বাড়ি ওবাড়ি করা কোনও ব্যাপারই নয় ! এই বাড়িটা যখন কেনা হল – শুনেছিলাম – কে একটা মেয়ে নাকি মারা পড়েছিল ওই পাঁচিল থেকে পড়ে গিয়ে । সে কিভাবে পড়ে গেলো কে জানে ! তাই তো এই ছাদে বিশেষ কেউ আসে না ! কলকাতার গণ্ডগোলের সময়ে বাবা আর জ্যেঠু আমাকে দিল্লিতে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিল ! তখন প্রায়ই দেখতুম কেউ না কেউ খুন হছে এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ! আমি তো কোনোদিন ওসবের মধ্যে ছিলুম না ! বিভু নীচে বাবা-মার ঘরে শুতো । ফলে এই ঘরটা প্রায় বন্ধই থাকতো ! কিন্তু ছাদে ঘন্টুদা নাকি রোজই আসতো ! ঘন্টুদাকে তো চিনিস – পাশের বাড়িতে থাকতো – মাস্তানি করে পাড়ায় । সবাই বলে – ঘন্টুদা নাকি ওয়াগন-ব্রেকার । বাবা কিছু বলত না । তবে ছাদের দরজাটা বন্ধ রাখত ! ঘন্টুদা এই ছাদে কেন আসতো জানিস ? – হুঁ হুঁ ! পাশের বাড়ির টুম্পাদিও আসতো । দুজনে প্রেম করত । - ঘন্টুদা তো আর কোথাও যেতে পারত না ! ওদের নাকি হিস্যার গণ্ডগোল হত । দলের লোকেরাই ঘন্টুদাকে মেরে দিত । ঘন্টুদা তো পকেটে এই বড় একটা স্প্রিঙ্গের ছোরা রাখত ! বিভু নাকি নিজের চোখে দেখেছে ! আরে - সে তো হল – এ সবের সঙ্গে ভুতের কি সম্পর্ক ! – অনেকক্ষণ পরে আমি না জিজ্ঞেস করে আর থাকতে পারলাম না ! বলছি ! শোন মন দিয়ে । - প্রায় ফিশ ফিশ করে একটু অন্য সুরে বলল ! ভুতের গল্প লেখার ব্যাপারে আমি খুব একটা পারদর্শী নই ! নিজে তো ভুত দেখতেই পাই না – শুধু আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে মাঝে মাঝে একটু ভয় পাই ঠিকই ! তবে কত লোকে কত রকম অশরীরি ঘটনার কথা বলে বটে ! এই রকম একজন ছিল – শিবেন – আমার বন্ধু ! ও আগেও খুব রহস্য করে বাতেল্লা মারত । আজও যে কি বলবে – কে জানে ! ও-ই আমাকে একদিন ওর সাথে দেখা করতে বলেছিল । কি একটা রহস্যময় ব্যাপার আছে! এই পুরো ঘটনাটা তারই বলা একটা কাহিনী ! গণ্ডগোলের কলকাতা থেকে ওকে সুদুর দিল্লিতে মামার বাড়িতে রেখে পড়াশুনো করাচ্ছে ওর বাবা মামা । সম্প্রতি কিছুদিন এখানে এসেছে । আবার দিল্লিতেই চলে যাবে ! এরই মধ্যে একদিন দিল্লিতে বসে শুনতে পেলাম – টুম্পা নাকি আমাদের বাড়ির পাঁচিল থেকে পড়ে মারা গেছে ! তুই তো জানবিই ! – সেই নিয়ে জ্যেঠুকে খুব হুজ্জৎ পোয়াতে হল ! – জ্যেঠু বলল – আমাদের কেউ ছাদে আসে না । আর ছাদের দরজায় তালা দেওয়া থাকে ! কিন্তু আমার এতদিন ধারনা ছিল – ঘন্টুদাই টুম্পাদিকে মেরেছে ! এখানে এসে অনেকেই সেই কথা বলল ! – টুম্পাদি নাকি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছিল ! আমি শিবেনকে থামালাম । - দাঁড়া দাঁড়া! কই আমরা তো এসব শুনিনি ! আর হাসপাতালেও তো পোষ্ট মর্টেম রিপোর্ট দিয়েছে । তাতে তো প্রেগনান্সির কথা নেই ! ও । বিভুও অবশ্য সেই কথা বলল ! কিন্তু সবাই এরকম রটালো কেন তাহলে ! শিবেন বেশ আশ্চর্য ভাবে বলল ! – তাহলে তো পুলিশ ঘন্টুদাকে অ্যারেস্ট করত ! তাই না ! তাহলে কে এসব কথা রটায় – কে জানে ! এবার তোকে একটা খুব সিরিয়াস কথা বলবো – কাউক্কে বলবি না ! ঘন্টুদা আমার কাছে পরশুদিন রাত্তিরে এসেছিল । শিবেন গলাটা খুব চেপে বলল । সে কী ! কেন ? ঘন্টুদা বলল – ও মেরেছে ? না-না ! তা নয় ! তবে ঘন্টুদা খুব কাঁদল ! কাঁদল কি রে ! – আমি তো অবাক ! ঘন্টুদা কি সত্যি মার্ডার করেছে নাকি ! তা জানিনা – তবে ঘন্টুদা একটা আশ্চর্য কথা কথা বলল ! শোন ! ইন্টারাপ্ট করবি না ! পরশুদিন রাতে – বিভু তখন ঘুমিয়ে পরেছে – ঘরে আলো জ্বলছে দেখে ঘন্টুদা পাঁচিল টপকে এসেছে । আমি তো খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি ! – সত্যি কথা বলতে কি একটু ভয়ও পেয়েছি । অনেকদিন কথা বার্তা নেই ! – ঘন্টুদা আমার হাতদুটো ধরে বেশ খানিকক্ষণ কাঁদল । তারপর বলে কিনা – শিবু, টুম্পাকে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরেছে কে জানিস ? ওই মাঙ্কু ! মাঙ্কু ! মাঙ্কু কে ? মাঙ্কু – আগে এই বাড়িতে থাকতো ! সুইসাইড করেছিল । ওর ইচ্ছে ছিল – ধ্রুবদাকে বিয়ে করবে । কিন্তু ধ্রুবদা ওর হাত থেকে বাঁচতে জার্মানি চলে গেছিল ! – সেই রাগে মাঙ্কু এখানে পাঁচিল থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল ! সুইসাইড নোটও লিখেছিল ! ধ্রুবদাদের বাড়িতে সবাই অবাক ! কেউ কিছুই জানে না ! আর ধ্রুবদা তো তার আগেই জার্মানি চলে গেছে ! সে তো কিছুই জানেনা ! ও কেস টেঁকে নাকি ! আমি আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম – কিন্তু সেই মাঙ্কু তো আগেই মরে গেছে ! সে আবার মারবে কি করে ? – ভুত হয়ে এসেছিল ? হ্যাঁ – ঠিক তাই ! – ওর মধ্যে একটা প্রতিহিংসার ইচ্ছে ছিল ! এই বাড়িতেই ও থাকতো কিনা ! – ঘন্টুদা কিরকম অবলীলাক্রমে বলে যাচ্ছে আমাকে । - আমি আগেও খেয়াল করেছি – আমি আর টুম্পা একসঙ্গে হলেই মাঙ্কু তোদের এই দরজার পাশে এসে দাঁড়াত । একদৃষ্টে দেখত আমাদের ! তখন কিছু বল নি মাঙ্কুকে ? সে কেন এভাবে এসে দাঁড়ায় ? না ! বলিনি কারন টুম্পা যদি ভয় পেয়ে যায় ! – জানিস তো মেয়েদের মধ্যে একবার ভুতের ভয় ঢুকলে – কি রকম শকড হয়ে যায় ! – আর টুম্পা চলে গেলেই মাঙ্কুকেও আর দেখতে পেতাম না ! কি হিংসুটে ছিল না ! কিন্তু তুমি কি করে শিওর হলে যে মাঙ্কুই টুম্পাদিকে ধাক্কা মেরেছে ? শোন – টুম্পাকে আমি পাঁচিলের ওপর বসিয়ে কথা বলছি – হঠাৎ টুম্পা চেঁচালো – ঘন্টুদা আমাকে ফেলে দিচ্ছ কেন ? – আমি তো ওকে দুহাতে শক্ত করে ধরে রেখেছি – কিন্তু মাঙ্কুই ওকে জোর করে টানছিল ! – তারপর চোখের সামনে দেখলাম টুম্পা গলিতে পড়ে গেল – মাথাটা নীচের দিকে ! – ও শিবু – আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে টুম্পাকে ফেলে দিল ! – আমি কিছুই করতে পারলাম না ! – ঘন্টুদা আবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ! তারপর ? আমি তো হতভম্ব হয়ে গেছি ! তারপর আমি পাঁচিল ডিঙিয়ে বাড়িতে গিয়ে নীচে গিয়ে দেখি লোকে চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করে দিয়েছে ! – চেচামেচির চোটে জ্যেঠু ও কাকু নীচে গিয়ে পেছনের দরজা খুলে দিতে লোকে টুম্পাকে বার করে রিক্সয় করে – টুম্পার বাবাকে ডেকে নিয়ে আর জি কর হাসপাতালে নিয়ে গেল ! – তখনই তো টুম্পা অলরেডি ডেড ! তারপর পুলিশ আসে নি ? হ্যাঁ – পুলিশ এসেছিল । আমাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করলো । আমি সত্যি কথা বললেও তো ওরা বিশ্বাস করত না ! তাই আমি বলে দিলাম – আমি ছিলাম না ! চিতপুরে গেছিলাম ! - পুলিশ তো জানে আমি কি করি ! - শিবু - তুই অন্তত বিশ্বাস কর – মাইরী বলছি - আমি টুম্পাকে ধাক্কা মারি নি ! বিরাট নিঃশ্বাস ছেড়ে শিবেন আমাকে জিজ্ঞেস করলো – কিরে – কিছু বুঝতে পারলি! আমার তো মনে হয় - এ ক্লিয়ার কেস অব - - ! শিবেন কদিন বাদেই আমেরিকা বিলেত জার্মানি কোথাও চলে যাবে ! – ঘন্টুদাকেও আজকাল দেখছি – কিরকম পাগলা পাগলা ভাব ! – লোকে বলে টুম্পার দুঃখে নাকি ওর মাথাটা গেছে ! আজকাল পাড়াতেই বেশি থাকে – চিতপুর ইয়ার্ডের দিকে যায় না ! – এখন আর এসব কথা বলে লাভ কি ! এর তো কোনও সঠিক প্রমানও নেই ! তার চেয়ে বলা ভালো – এ ক্লিয়ার কেস অব মিষ্টিরিয়াস – ভুতুড়ে বিজনেস ! মনোজ #ভুতের_গল্প

121

12

Swadesh Manna

দেওয়াল লিখন # ভুতের গল্প

#দেওয়াল_লিখন ©স্বদেশ মান্না ************* সুমন্ত লাহিড়ীর সঙ্গে আমার আলাপ ডাক্তারি পড়তে গিয়েই। ইনফ্যাক্ট সুবিশাল মেডিক্যাল কলেজটায় প্রথম দিন অন্যদের তুলনায় একটু আগেই চলে গিয়েছিলাম। কেউই প্রায় এসে পৌঁছায়নি। একা একা অপেক্ষা করছি। এমন সময় মাঝারি হাইটের, চশমা চোখে জিন্স আর টি শার্ট পরে খুব সাধারণ চেহারার আমারই মত একজন এগিয়ে এসেছিলো আমার দিকে। ইতস্তত করতে করতে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম। হাত বাড়িয়ে বলেছিলাম হাই আমি সুরেশ। ফার্স্ট ইয়ার। আমি সুমন্ত, সেম। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল। প্রথম আলাপেই বুঝিয়ে দিয়েছিল ছেলেটা খুব অন্তর্মুখী ধরনের। আমিও খুব বেশি ঘাঁটাইনি। তারপর আস্তে আস্তে একসাথে ক্লাস করা, হোস্টেলের ছাদে আড্ডা মারা, আরসালানে বিরিয়ানি খেতে যাওয়া হতে হতেই কখন দুজনে কাছাকাছি এসে পড়ছিলাম। পড়াশোনায় দুজনেই মাঝারি মানের ছিলাম। পাশ করে যেতাম। থার্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে সুমন্ত একটু একটু পাল্টে যেতে লাগলো। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকতো। জিগ্যেস করলে উত্তর পেতামনা। ওর নাকি রাতে ঘুম হয়না। করা নাকি ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে! আমি অনেক বুঝিয়েও ওকে স্বাভাবিক করতে পারিনি। আসলে গ্রাউন্ড ফ্লোরের যে রুমটাতে ও থাকে সেই রুমটার একটু বদনাম আছে। সচরাচর কেউ বেশিদিন থাকতে পারেনা ওখানে। কারনটাও সবার জানা। পাশেই মর্গ। গন্ধ তো আছেই। কিন্তু কেউ কেউ বলে রাত্তির হলেই মাঝে মাঝে অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসে, যেগুলো ঠিক জাগতিক নয়। অস্বাভাবিক ধরনের। শুরুতে সুমন্ত এসব পাত্তা দেয়নি। আমরাও না। একা একাই ওই রুমে ও থাকতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। ছেলেটা চোখের সামনে কেমন যেন একটা হয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়েই আমিও পরীক্ষার কিছুদিন আগে ওই রুমে শিফট করলাম। দুই বন্ধু এখন দুই রুমমেট। আর চিন্তা নেই। আমি সুমন্তকে আশ্বস্ত করেছিলাম। ও কিন্তু খুব একটা ভরসা পায়নি। ভয়টা কাটছিলোনা ওর। বরং আরো বেড়ে যাচ্ছিল। আমি অবশ্য নতুন কিছু ব্যাপার দেখিনি এখানে আসার পর। সবটাই ওর মনের অসুখ বলে ধরে বেঁধে সাইকিয়াট্রিস্ট ও দেখলাম একবার। কিন্তু নিয়মিত ওষুধ খেয়েও ওর মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন এলোনা। বরং মাঝে মধ্যেই বলতো দেখিস একদিন তুইও প্রমান পাবি ওদের। ওরা আছে, আশেপাশেই। ওরা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারেনা অতো সহজে। যথারীতি ওর কথাগুলো আমি বা আমরা হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ওকে বোঝানো যেতনা। সেদিন ছিল শুক্রবার। পরীক্ষা শেষ। সবাই বাইরে খেতে যাওয়ার প্ল্যান হলো। সুমন্ত গেলোনা।বেরোনোর সময় বললো ভীষন মাথা ধরেছে। ঘুমাবে।জোর করলামনা। বরং একটু ঘুম দিলে যদি সুস্থ হয় ছেলেটা। ফিরতে ফিরতে একটু রাতই হয়েছিল সেদিন। রুমে ঢুকে দেখি আলো নেভানো। সুমন্ত ঘুমাচ্ছে। আমিও আর বিরক্ত করিনি ওকে। অন্ধকারের মধ্যে আমার বিছানাটা খুঁজে নিয়ে শরীরটা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। গত পনেরদিনের রাতজেগে পড়া, আর পরীক্ষার ধকলে নিমেষে ঘুমের জগতে তলিয়ে গিয়েছিলাম। খুব গাঢ়ই ঘুম হয়েছিল সেরাতে। ভেঙেছিল একটু বেলা করেই। ঘুমের ঘোর কাটতেই চোখ গিয়েছিলো ওর বিছানার মাথার দিকের সাদা দেওয়ালটায়। রক্ত দিয়ে এলোমেলো ভাবে সেখানে লেখা ছিল -'ভাগ্যিস রাতে আলোটা জ্বালিসনি'। দেওয়ালের কাছে মেঝের উপর সুমন্তর রক্তাক্ত দেহটা পড়েছিল। আর হ্যাঁ হাতের লেখাটা সুমন্তর নয়! ©স্বদেশ মান্না (সব চরিত্র কাল্পনিক) #ভুতের_গল্প

125

15

মুনিয়া

Tell me something good

প্রায় পাঁচমাস ধরে মেয়ের মৃত্যুর শোকযাপনের পরে বিল কনারের মনে হয়েছিল তাঁর কুড়ি বছরের মৃতা কন্যা, অ্যাবির ছোট্ট জীবনের স্মৃতিকে তরতাজা রাখতে কিছু করতে হবে। তাই এই বাইশে মে, তাঁর ছেলে, অষ্টিনের কলেজ গ্র্যাজুয়েশনের ঠিক একদিন পরে তিনি সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। অ্যাবি নিশ্চিতভাবে চাইত আমি এটাই করি, বিল বলছিলেন সি বি এস সংবাদদাতাকে। অ্যাবির বাবা তাঁর শহর ম্যাডিসন, উইসকনসিন থেকে সাইকেল চালিয়ে সুদীর্ঘ চোদ্দসো মাইল পথ অতিক্রম করেন। তাঁর গন্তব্য ছিল ফোর্ট ল্যডারডেল, ফ্লোরিডার Broward Health Medical Center| কিন্তু কেন? সেটা জানতে হলে আমাদের স্মৃতিতে ফিরে যেতে হবে। এদেশে ড্রাইভার লাইসেন্স পাওয়ার সময় অর্গান ডোনার হতে চাইলে ফর্ম ভরতে হয়। ষোলো বছর বয়সে অ্যাবি যখন তার ড্রাইভিং লাইসেন্স পায় তখন সে অর্গান ডোনার হতে মনস্থ করে। এত অল্প বয়সেই অ্যাবির মধ্যে একটা সুন্দর পরোপকারী মন ছিল। মানুষের দরকারে, বন্ধুদের প্রয়োজনে সে সদাসর্বদা ঝাঁপিয়ে পড়ত। এইরকম মনোবৃত্তি নিয়ে সে যে মৃত্যুর পরেও মানুষের কাজে আসতে চাইবে, সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল। তাই তার এই সিদ্ধান্তে কেউ অবাক হয়নি। পাঁচমাস আগে, শীতের ছুটির এক কালো করাল দিনে অ্যাবি এবং তার ভাই অষ্টিনকে ক্যাঙকুনের এক রিজর্টের সুইমিং পুল থেকে অচৈতন্য উপুড় অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকর্মীরা যতক্ষণে ওদের উদ্ধার করতে পেরেছিলেন ততক্ষণে অ্যাবির মস্তিস্কের চরম ক্ষতি হয়ে গেছে! অ্যাবিকে তাড়াতাড়ি উড়িয়ে আনা হয় ফোর্ট ল্যডারডেল এর মেডিকেল সেন্টারে, যতক্ষণে না নিরাপদে ওর সমস্ত অঙ্গ সংরক্ষণ করা হয়। বিল যখন তাঁর আদরের কন্যাকে চিরবিদায় জানাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময়ে কয়েক প্রদেশ দক্ষিণে আরেকটি পরিবার অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। লাফায়েৎ, লুইজিয়ানার একটি হাসপাতালে একুশ বছরের ল্যুমথ জ্যাক জুনিয়ারকে ডাক্তাররা বলে দিয়েছিল যে তার দিন প্রায় সমাগত। খুব বেশি হল আর মাত্র দিনদশেক বাঁচবে সে। হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হবার পরে তার হার্ট আর সেরে উঠছিলনা, দিনে দিনে বরং তা অবনতির দিকে যাচ্ছিল। জ্যাকের জীবনে একটা মিরাক্যাল দরকার ছিল। জ্যাকের জীবনে ম্যাজিক হয়ে এল অ্যাবি। অ্যাবির জন্য আজ শুধু জ্যাক জীবিত নয়, অ্যাবির চারটে অঙ্গ কুড়ি থেকে ষাট বয়সের চারজন মানুষকে প্রাণ দিয়েছে। অ্যাবির চোখ একজনকে দৃষ্টিদান করেছে। অ্যাবির শরীরের কোষ অন্য মানুষদের জীবনদায়ী কাজে লাগবে। যারা যারা অ্যাবির অঙ্গ পেয়েছে বিলের ইচ্ছে ছিল তাদের সবার সাথে দেখা করার। সেই মর্মে ডোনেশন সেন্টার থেকে সকলকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। উত্তর শুধু এসেছিল জ্যাকের থেকে। তাই এইবছরের ফাদার্স ডে তে বিল চোদ্দোস মাইল সাইকেল চালিয়ে জ্যাকের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। -জ্যাক খুবই ভালো বাচ্চা। ওর বাবা মা ওকে খুব সুন্দর করে মানুষ করেছে। ও অত্যন্ত সাহসী আর শ্রদ্ধাশীল। বিল বলছিলেন। বিল আর জ্যাক ফাদার্স ডে এর রবিবারের দুপুরে পরস্পরের সাথে এক মিনিট ধরে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হওয়ার পরে আচমকা জ্যাক বিলের হাতে একটি টেথিসস্কোপ ধরিয়ে দিল। অ্যাবির মৃত্যুর দীর্ঘ পাঁচমাস পরে বিল আবার মেয়ের বুকের ধুকধুকানি শুনলেন। ক্রন্দনরত দুটি মানুষের মনে হল, এই প্রথম নয়, পরস্পরকে যেন তারা অনেক অনেকদিন ধরে চেনেন। আদ্র গলায় জ্যাক বললো, আমি যদি কোনো উপায় আমার কৃতজ্ঞতা অ্যাবির কাছে পৌঁছে দিতে পারতাম! তা তো হবার নয়, কিন্তু অ্যাবির পরিবারকে নিজের পরিবার করে নিতে তো বাধা নেই। চোদ্দসো মাইল সাইকেল চালিয়ে বিল যখন বাড়ি যাওয়ার ফিরতি পথ ধরেছিলেন, তখন তাঁর সাথে ছিল জ্যাকের দেওয়া এক অমূল্য উপহার। রেকর্ড করা অ্যাবির হার্টবিট!

714

88

দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

এই গানটা থাক এখানে।আমার নিজের ভীষণ প্রিয় একটা গান এটাঃ মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে সেদিন ভরা সাঁঝে , যেতে যেতে দুয়ার হতে কী ভেবে ফিরালে মুখখানি কী কথা ছিল যে মনে মনে

939

101

m

ভূতের গল্প

এই সাইট টি খুব ভাল লাগলো| কিছুদিন ধরে এ পাতায় আসছিলাম‚ নীরবে| ভূতের গপ্প লেখার আমন্ত্রন দেখে কিছু লিখতে ইচ্ছে হল| এবারে শোনাই সেই ভূতের গল্প: সময়্টা ১৯৯০র সামার| আমরা ইংল্যান্ড বেড়াতে গেছি| লন্ডন থেকে ভাসুরের বাড়ি এডিনবরা যাবো গাড়িতে‚ নানা জায়্গায় থামতে থামতে‚ আর রাত্তিরে থাকবো পথে পড়ে দাদার বন্ধু কুশলদার বাড়ি ব্র্যাড্ফর্ড নামে একটা ছোট শহরে| সেই সময় সেল ফোন ছিল না‚ লন্ডন থেকে বেরোবার আগে কুশলদাকে ফোন করে জানানো হল আমাদের প্ল্যান‚ কুশলদাও খুব সোৎসাহে রাজি| যা হোক‚ সকালে লন্ডন থেকে বেড়িয়ে কেমব্রিজ ইত্যাদি ঘুরে সন্ধ্যের পর আমরা পৌঁছুলাম সেই শহরে| এটি একটি পুরোনো ছোটো শহর‚ রাত্তিরে আর বিশেষ কিছু দেখা গেল না| কুশলদার বাড়ি গিয়ে শুনি ওঁর বৌ ও ছেলে দেশে গেছে গরমের ছুটিতে‚ আর আমাদের সেটা জানান নি‚ পাছে শুনে আমরা না আসি| উনি নিজেই রান্না করে রেখেছেন আমাদের জন্য‚ তবে আমাদের দেরি দেখে একাই পান পর্ব শুরু করে দিয়েছেন এবং সেটা মোটামুটি মনে হোল অনেক ক্ষন ধরেই চলছে| আমাদের বলে দিলেন ওপরে আমাদের জন্য বেড রুম রেডি করা আছে| আমার জায়ের কাছে আগেই শুনেছিলাম বৌদি মানে কুশলদার স্ত্রী সুগৃহিনী‚ এবার তার পরিচয় পেলাম| বাড়িটি পুরোনো কিন্তু খুবই রুচি সম্মত সুসজ্জিত| কুশলদাও অত্যন্ত সুদর্শন‚ আলাপী‚ বন্ধু বত্সল এবং রোমান্টিক| আমার নাম জিগেস করে আমার বর কে বললেন 'এর তো নাম শুনেই বুকে ধাক্কা লেগে যায়'| আমি আমার বর কে ইশারায় ওঁর পানীয় গ্লাস দেখালাম| যাই হোক‚ আমরা ওপরে গেলাম‚ আমাদের ঘরে ফ্রেশ হয়ে এসে ডিনার করবো| দেখি ও পাশের একটি ঘর থেকে সালোয়ার কামিজ পরা এক মহিলা বের হয়ে এসে আমাদের 'নমস্তে' বললেন| মহিলাকে দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত‚ চল্লিশোর্ধ পাঞ্জাবি মহিলা মনে হল| আমাদের হতভম্ব ভাব দেখে মহিলা বললেন 'ও তোমাদের কুশল বলে নি বুঝি আমার কথা! ড্রিংক করতে শুরু করলে ও সব ভুলে যায়| আমার নাম কবিতা অরোরা‚ আমি ওদের বন্ধু হই| সুনিতা (কুশলদার স্ত্রী) দেশে তো‚ তাই আমি কুশলের খবর নিতে আসি মাঝে মাঝে‚ আর আজ তোমরা আসবে বলে ওকে একটু সাহায্য করছিলাম| যাও তোমরা চেঞ্জ করে খেতে এস‚ আমি সব রেডি করছি' বলে মহিলা নীচে চলে গেলেন| আমদের একটু অবাক লাগলেও মহিলার ভদ্র ব্যবহার ও কথা বার্তা শুনে খুব ভাল লাগলো| পরে নীচে খেতে গিয়ে দেখলাম পরিপাটি করে টেবিল সেট করা‚ খাবার গরম করা সব হয়ে গেছে| কবিতাজী খুব যত্ন করে খাওয়ালেন আমাদের‚ তবে কুশলদা অলমোস্ট ড্রান্ক থাকায় বিশেষ কিছু খেলেন না| উনিও দেখলাম কিছু বললেন না কুশলদা কে| ডিনারের পর কবিতাজী বললেন 'তোমরা তো এবারে বাঙলায় আড্ডা দেবে‚ আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি‚ রাত জাগতে পারি না একদম' বলে আমাদের গুড নাইট জানিয়ে ওপরে চলে গেলেন| আমাদের আড্ডা চলেছিল রাত তিনটে অব্দি‚ কুশলদা আড্ডাবাজ‚ আমুদে লোক‚ গল্প করতে করতে নেশার ঘোর ও কেটে গেছিল ওঁর| কত রকম গল্প শোনালেন আমাদের| আড্ডার শেষে হঠাৎ আমার বর কে জিগেস করলেন 'এই বাড়িটার বয়স কত বল তো? দেয়াল টা ধরে দেখ'| আমরা ধরে দেখলাম দেয়াল গুলো পাথরের‚ ঠান্ডা - আমি বাহাদুরি করে বললাম‚ মনে হয় একশো বছরের পুরোনো বাড়ি| কুশলদা হেসে বললেন 'আর ও পঞ্চাশ যোগ কর| কত ভূত থাকতে পারে ভাব এই পুরোনো বাড়িতে!' শুনেই তো আমাদের গা শিরশির করতে লাগলো| রাত তিনটে তে দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ির ভূতের গল্প শোনার চাইতে ঘুমিয়ে পড়াই ভাল মনে হলো| কুশলদা সত্যিই ভালো হোস্ট‚ এত রাতে ঘুমিয়েও সকালে আমরা তৈরী হয়ে নীচে নামতে নামতে চা‚ জলখাবার সব রেডি করে ফেলেছিলেন| কবিতাজী কে নীচে না দেখে কুশলদা কে জিগেস করলাম উনি চা খাবেন না? কুশলদা খুব অবাক হয়ে বললেন 'কার কথা বলছো?' এবারে আমাদের অবাক হবার পালা‚ সে কি? কবিতাজী কাল আমাদের এত যত্ন করলেন ডিনারের সময়‚ আর সকালে কি উনি চলে গেলেন আমরা নামার আগেই? কুশলদা খানিক্ক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে রইলেন‚ তারপর বললেন 'কবিতার উপস্থিতি আমিও মাঝে মাঝেই টের পাই‚ বিশেষত সুনিতা বাড়িতে না থাকলে'| তারপর শোনালেন তাঁদের কথা| কুশলদা দিল্লিতে পড়াশোনা করেছিলেন ইকোনমিক্স নিয়ে‚ সেখানে তাঁর সহপাঠিনি ছিলেন কবিতা অরোরা| দুজনের ভালবাসার সম্পর্ক হয়েছিল গভীর| এরপর লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ দুজন মাস্টার্স করে এবং বাড়িতে জানায় তারা বিয়ে করে সেটল করতে চায়| গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের এক মাত্র ছেলে পাঞ্জাবি মেয়ে বিয়ে করবে শুনে মায়ের হার্ট এটাক হয়ে যায়‚ মৃত্যু শয্যায় মাকে কথা দিতে হয় কবিতাকে বিয়ে করবে না| দু জনে সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে না করার| কবিতা দিল্লির কলেজে পড়ানোর চাকরী পেয়ে চলে যায়‚ কুশল থেকে যায় ইংল্যান্ডে| দুজনের যোগাযোগ কমে আসছিল| ইতিমধ্যে বাবা পীড়াপীড়ি শুরু করলেন তাঁর বন্ধুর মেয়ে সুনিতা কে পুত্রবধূ করে আনতে চান‚ কুশলকে রাজি হতে হয়| বিয়ের পর আর যোগাযোগ ছিল না কবিতার সাথে| ঘটনা চক্রে কয়েক বছর বাদে কবিতার সাথে দেখা হয় একটা কনফারেন্সে| কুশল তাকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে| কুশলের স্ত্রী‚ পুত্র‚ সংসার দেখে কবিতা বলে ‚ 'ভালই করেছ আমাকে বিয়ে না করে‚ সুনিতার মত এত ভাল গৃহিণী আমি কখনো হতে পারতাম না'| সুনিতা সব ই জানতো‚ কবিতাকে ওর ও ভালো লেগে যায়| এর পর কয়েক বছর কবিতা ইংল্যান্ডে আসলেই কুশল সুনিতার সাথে কয়েক দিন কাটিয়ে যেত| কখনো সুনিতা যদি নাও থাকতো তবুও আসতো‚ তাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছিল কবিতা| বছর দুই আগে কুশলরা খবর পায় কবিতার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে‚ তাও বেশ এড্ভান্সড স্টেজ| ওরা দিল্লি গিয়েছিল‚ কিন্তু কবিতা অনুমতি দেয় নি হাসপাতালে ওদের দেখা করতে দিতে‚ নিজের ক্যান্সার ক্লিষ্ট চেহারা ওদের দেখতে দিতে চায় নি| কবিতার চলে যাবার খবর জানিয়েছিল তার এক কলীগ| কুশলদা বললেন গত দেড় বছরে ওঁর মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে কবিতা এসেছে‚ কিন্তু স্বপ্নের মত অস্পষ্ট| আমরা যেরকম দেখলাম‚ কথা বললাম‚ সেরকম কিছু হয় নি| আমদের তখন মানসিক অবস্থা অভিভূত ...কিন্তু নাহ ভয় করে নি| এটি স্বপ্ন ও ভূতের মিলিত গল্প‚ ভূতকে সব সময় ভয় পেতে হবে এরকম কোন কথা নেই| অনেক সময় ত্ঁারা মনুষের চাইতেও বেশি ভদ্র সভ্য হন| #ভুতের_গল্প #ভুতের_গল্প

148

18

Dalia2017

বৃদ্ধাশ্রম

আবার বসেছি বৃদ্ধাশ্রমের ওপরে লিখতে। বড্ড গরম, তার ওপরে গত সপ্তাহে দুদিন হাসপাতালে ছুটি কাটাতে গেছিলুম। বুড়ো বয়সের অনেক ঝামেলা। সে যাই হোক, তবু মানুষ বাঁচতে চায়। আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে একজন সুরেনামের মহিলা আছেন, তাঁর কিছুদিন আগে ৯৭ বছর বয়স হল। তিনি বলেন, " আমি ১০০ বছর বাঁচতে চাই। আমার ১০০ বছর বয়স হলে আমি তোমাদের বড় রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে ডিনার খাওয়াব। " আমরা তাঁকে বলি," তুমি ১০০ বছর নিশ্চই বাঁচবে। কি মজা! আমরা বড় রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার খাব। " খুব খুশী হন ভদ্রমহিলা। কত অল্পেতে এই বৃদ্ধা বৃদ্ধারা খুশী হন। এঁরা চাননা কোন পয়সা, যেটুকু জীবন ধারণের জন্যে দরকার , সেই টুকুই। কিন্তু একটু ভালবাসা , একটু স্নেহের কথাবার্তা। সে যাই হোক, বৃদ্ধাশ্রমে যোগ দেবার পরে অনেক কিছুই শিখেছি। শিখেছি, আমরা যাকে পাগল বলি , তাঁরা পাগল নন, ডিমেন্ট। সেটা আমি জানতুমনা। বৃদ্ধাশ্রমে যোগ দেবার পরে আমাদের হাতে একটা নামের লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হোত। তাঁদের ওপর থেকে নীচে নামাতে হবে।কেউ বা হুইল চেয়ারে, কেউ বা চার চাকার গাড়িতে, কারুকে বা ঝরিয়ে ধরে নামাতে হত। তা সেদিন আমার হাতেও ১০ জনের একটা লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি ওপর থেকে একে একে সব নামাচ্ছি। একজনের ঘরে গিয়ে বললুম," ম্যাডাম, তোমাকে আমি নিতে এসেছি, নীচে আমাদের এ্যক্টিভিটি আছে, চল সেখানে। ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললেন," আমি এখন কি করে যাব? আমার স্বামী আসবেন কাজ থেকে, ছেলেরা আসবে, আমাকে রান্না করতে হবে, আমি তো এখন যেতে পারবনা।" অবাক বিস্ময়ে মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলুম। ঠিক সেই সময় একজন নার্স যাচ্ছিলেন। ভদ্রমহিলাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর ঘরে সোফায় বসিয়ে দিলেন। তারপরে আমার কাছে এসে বললেন," খুব অবাক লাগছে তাই না! " বললুম, "তা তো লাগছেই।মহিলা কি পাগল?" নার্স একটু রাগত ভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, " এঁদের কখনো পাগল বলবেনা, এঁরা ডিমেন্ট। এঁদের আগের জীবনের কথা মনে থাকে, কিন্তু একটু আগে কি হয়েছে, তা মনে করতে পারেননা।" একটু পরে মহিলা এসে আমাকে বললেন," তুমি আমাকে নীচে নিয়ে যেতে এসেছ না? চল, আমি প্রস্তুত।" তখন মহিলাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে নীচে নামিয়ে আনলুম। সেদিন থেকে শিখলুম, দেশে আমরা যাঁদের পাগল বলি, তাঁদের পাগল বলা ঠিক নয়, তাঁরা ডিমেন্ট। আমাদের আমলে আমি এইরকম বহু মানুষ দেখেছি, যাঁদের এইরকম কথাবার্তার জন্যে পাগল বলা হত, এখন জানিনা এঁদের পাগল বলা হয় কিনা? আমি একজনকে জানি, ভদ্রমহিলা খুব সুন্দর রামায়ন, মহাভারত বলে যেতেন, সব তাঁর কন্ঠস্থ ছিল। কিন্তু তাঁকে পাগল বলে একটা ঘরে আটকে রাখা হোত। কি তফাত দুই দেশের মধ্যে, তাইনা! কিন্তু এখানের বৃদ্ধাশ্রম সেদিন আমার চখ খুলে দিল, বুঝতে পারলুম, ডিমেন্টদের কখনো পাগল বলতে নেই। আর এইভাবেই শিখতে লাগ্লুম বৃদ্ধাশ্রমে নানান ঘটনার মাধ্যমে নানা জিনিস, শিখলুম অনেক কিছুই। এর পরে বলব আলজাইমার ওপরে। আজ থামি।

223

21

ইয়ু লিন

চুপ চাপ- একা একা

পর্ব-২২ এর পর| ভাবিতে উচিত ছিল‚ প্রতিজ্ঞা যখন! বিয়ে ঊনত্রিশে আর তার একমাস পরের পয়লায় নতুন চাকরীতে জয়েন করবার তারিখ| একমাসের নতুন বউকে বাপের বাড়ীতে রেখে নিরুদ্দেশ যাত্রা| প্রায় তাই| যে শহরে যাচ্ছি‚ সেখানে কেবল বম্বেতে পড়াকালীন এক সহপাঠী ভিন্ন আর সবই অচেনা| বিধাতার লিখন‚ অদৃষ্ট নাকি কোয়েন্সিডেন্স‚ কে জানে| দরখাস্ত শুরু হয়েছিল ফ্রী ফার্ষ্ট ক্লাশ ভাড়ায় ভ্রমণ আর যেহেতু বন্ধু থাকে সেখানে| ইন্টারভিউ উপলক্ষ মাত্র| কিন্তু শহরটাকে ভাল লেগে গেল‚ চাকরীটার শিকেও ছিঁড়লো| আগেই লিখেছি বেশ ভাল মতন মাইনে বাড়লো| সবই আপেক্ষিক| মাইনে তো বাড়লো কিন্তু সুদূর দক্ষিণের শহরে‚ বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন থেকে দূরে‚ ভিন্ন সংস্কৃতির সমাজে অনির্দিষ্ট যাত্রা? সত্যিই কি বাড়লো? (২) আরও‚ আরও আরও ভাল'র পিছনে তো ছুটেই চলেছি| আবার এই ভাল চাকরীর জন্যই বিয়ের কথা মনে হয়েছিলো‚ নতুবা একারই দিন আনা দিন খাওয়া| মা ভাইবোনেদের বরাদ্দ মাসিক টাকা তেমনি রেখে নিজের ও আর একজনের চলে যাবে এই অলীক স্বপ্নে জীবনের সবচেয়ে বড় ডিসিশান নিয়ে ফেললাম| কিন্তু খেয়ে পরেই যে দুজনের সংসার চলে তা তো নয়| আছে বাড়ীভাড়া‚ আছে আসবাবপত্র‚ রেলভাড়া‚ পুজোতে সবার জামাকাপড়‚ ঔষধপত্র‚ সিঙ্গাড়া জিলিপি! ইন hindsight‚ হঠকারিতাই হয়ে গিয়েছিল| বাট দ্য গ্যাম্বল ওয়ার্কড! (৩) রাঁচী তখন ঝাড়খন্ডের রাজধানী হয়নি‚ দূর মেট্রো শহরের সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল না| ঘন্টা আড়াই লোক্যাল ট্রেনে গিয়ে তারপর মুরী স্টেশন| গ্রীষ্মের শেষ বিকাল‚ দূরপাল্লার গাড়ী যখন এলো তখন দিনের আলো মরে এসেছে| অনেকক্ষণ গাড়ী থামে তবু সেই অনেকক্ষণ যেন নিমেষে শেষ হয়ে গেল| গার্ডের বাঁশী আর দূরে রেলব্রীজের ওপর সে ও তার এক কাকা‚ তাদের বাড়ীতেই আশ্রিত‚ অবিবাহিত; এদেরকে কোলে পিঠে মানুষ করেছেন| মিসেস দত্ত'র উপহার দেয়া ছাপা সিন্থেটিক শাড়ীর মালকীন দূরে আর আমি ট্রেনের ভিতর বিজাতীয় ভাষার কিচিরমিচির যাত্রীদের মাঝে‚ সামান ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত| তামিল‚ তেলুগু ভাষার সঙ্গে তখন তো যৎসামান্যই পরিচয়| অতএব আবার যাত্রা হলো শুরু| নিজের গ্রাম‚ নিজের প্রদেশের শহর ছেড়েছি‚ তাও এক রাতের রেল দূরত্বে ছিলাম‚ এবার বলতে গেলে দেশান্তরে! (৪) আবার সেই ট্রাঙ্ক ও হোল্ড অল মোড়া বিছানা পত্র| উঠলাম তো বন্ধুর বাড়ী‚ তার ভাড়া বাড়ী| বেশ ছিমছাম‚ ভাল রাস্তার উপর এবং ভাড়াও মোটামুটি সাধ্যের মধ্যে| কিন্তু আমার বাড়ীভাগ্য বরাবরই খারাপ‚ সে ভাড়ার বাড়ী‚ কোম্পানী কোয়ার্টার অথবা নিজের বাড়ীই হোক না কেন| খোঁজা শুরু হলো বাড়ী| সংসার পাততে হবে| কিন্তু এইবার রূঢ় বাস্তব চোখে খুললো| এতদিন তো হোস্টেল‚ মেসে কাটিয়ে এসেছি‚ ভাড়া বাড়ী যে কি বস্তু কোন অভিজ্ঞতাই নেই| বাড়ীর দালাল এটা সেটা বলে এমন জায়্গায় বাড়ী দেখায় যে নিজের উপর রাগ হয়; এই ছিল কপালে? আসলে বাড়ীর দোষ কি‚ বাড়ী ছিল কিন্তু ভাড়া ও তার অ্যাডভান্স সাধ্যের বাইরে| কতদিনই বা অন্যের বাড়ীতে থাকা যায়‚ বন্ধুটির মা বেড়াতে আসছেন তখন‚ শেষে কাছেই একজনের বাড়ীর চিলেকোঠা মিললো| চিলে কোঠা তাই সই‚ অন্তত: আলোবাতাস আর উন্মুক্ত ছাদ; পাড়াটাও ভাল‚ কোম্পানীর বাসও আসে পাশের রাস্তায়| শুরু হলো ভাড়াটের জীবন| কি কুক্ষণে যে নতুন চাকরীর জন্য জিভ লকলক করে উঠেছিল‚ বেশ তো ছিল তাঁতী‚ রাঁচীতে; বিয়ে করলেই কোয়ার্টার মিলতো| (৫) তখন না ছিল মোবাইল না ছিল কালো ফোন| নতুন বরবধূর যোগাযোগ আদি অকৃত্রিম ইনল্যান্ড লেটারে| চিঠি আসতো অফিসের ঠিকানায় কারণ আমার যে বাঁধা কোন ঠিকানাই হয়নি তখন| আর সেই অফিসের নিয়মে সব চিঠিই খোলা হতো সেন্ট্রাল রেজিষ্ট্রিতে‚ কনফিডেন্সিয়াল বাদ দিয়ে| তাঁকে কে বোঝাবে ঠিকানার উপর সেটা লিখতে! এসব অফিস কেতার সাথে তাঁর কোন পরিচয়ই ছিল না| ফল? মাঝে মাঝে চিঠি আসতো খোলা| ঈশ্বরের অশেষ দয়া‚ তখন ঐ সুদূর শহরে বাঙলা পড়বার লোক কমই আর আমাদের ফ্যাক্টরীতে তো গোনাগুণতি চার কি ছ'জন! সেন্ট্রাল রেজিষ্ট্রিতে সবই অমুক আপ্পা তো অমুক আইয়া‚ আপ্পা ও আইয়া অথবা স্বামী সম্মনসূচক সাফিক্স‚ গুজরাতে যেমন ভাই| নামের শেষে জুড়েই দেয় পাছে কেউ অসম্মান না করতে পারে| মেয়েদের নামে আম্মা| আমার এক সহকর্মী ছিল তার নাম বিজয়াম্মা‚ আমরা আড়ালে হাসাহাসি করতাম‚ তার হাবি তাকে কি বলে ডাকে! Small mercies! (৬) Cometh September‚ সেবার পুজো আশ্বিনেই ছিল| -- (চলবে‚ তবে আজ এই পর্য্যন্ত ভূতের কাহিনী| ভুতের গল্প লিখতে হবে যে| জয়রামজীকী|)

1148

157

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

নীল সমুদ্র‚ নীল আকাশ| সে কোন সত্যযুগের কাহিনী| মাসটা ছিল এপ্রিল‚ তারিখও মনে আছে‚ কি আশ্চর্য্য! তার মানে প্রখর বৈশাখ| মফ:স্বল শহরে কলেজের সামনের বাস স্টপ| সময় সকাল দশটা‚ এগারোটা হবে বোধহয়| সুদূর হাওড়া থেকে অত সকালে পৌঁছোতে ছেলেটি বেরিয়েছে সেই সাত সকালে| প্রথম দেখা- প্রথম ডেট‚ ইয়াঙ্কী ভাষায়| (২) ছেলেটি পরে এসেছে হোস্টেলের বন্ধুর শার্ট‚ ডেট বলে কথা| বিনা অনুমতিতে ধার করা| কিন্তু অমোঘ প্রবাদবাক্য অনুযায়ী ‚ এসবে পাপ নেই| উত্তেজনায় বুক দুরু‚ দুরু| দেখা নাহয় হলো‚ কি বলবে‚ কোথায় গিয়ে দুদন্ড বসবে সবই ধোঁয়াশা| তো মেয়েটি এলো‚ যথারীতি ছেলেটিকে বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করিয়ে| নীল ছাপা সূতীর শাড়ী‚ কপালে নীল টিপ| ছাপার প্যাটার্ন- জয়পুরী বাঁধনী শাড়ীর মতো তবে ডায়মন্ড শেপের ছাপ আর সেই বড় ডায়মন্ডের মধ্যে ছোট ছোট ডায়মন্ড| অতি পরিচিত‚ অতি সাধারণ ডিজাইন; এখনও বোধ হয় সেই ডিজাইন সমানে চলে| শাড়ী জামার ছাপার ডিজাইন তো কয়েকটা বেসিক‚ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে| ডায়মন্ড‚ জ্যামিতিক আকার‚ ফুল‚ লতাপাতা (a la Taj) অথবা বাঙ্গালীর নিজস্ব কল্কা| এবার একটু ভূমিকা| প্রথম দর্শনেই প্রেম টাইপের কিছুই নয়| আলাপ করিয়ে দিয়েছিল মেয়েটিরই পাশের বাড়ীতে থাকে আমার সহপাঠী| প্রাণের বন্ধু‚ সেই হাই স্কুল থেকে| বন্ধুর ভাই এর পৈতের উৎসবে| তখন তো এখনকার মতো বিয়েফ‚ জিয়েফের চল ছিল না| প্রেম থাক আর নাই থাক প্রেমিক‚ প্রেমিকাই চলতো| ডেমোগ্রাফির হিসাবে ৫০:৫০ হলেও ছেলে ও মেয়ের অনুপাত হাজারে বা খুব বেশী হলে শ'য়ে এক; অন্তত: বাইরের জগতে| কারুর ভাগ্যে প্রেমিকা জুটেছে মানে লোকে তাকে আলেকজান্ডার ভাবতো| (৩) সংক্ষেপে সারি| আলাপের পর‚ অবধারিত প্রলাপ| সেই কয়েক মিনিটের আলাপের পর যেন‚'মন প্রাণ যা ছিল'- এই ২১ শতাব্দীতে অবাক কান্ড মনে হয়‚ তাই না| কিন্তু ভো‚ ভো জনগণ‚ ডিমান্ড সাপ্লাই এর ইকোয়েশন যদি মানেন তবে আশ্চর্য হবার কিছু নেই| তার উপর প্রায় নারী বর্জিত সমাজ| দেখা সাক্ষাত হবে তবেই না গাইতে গাইতে গান? সে সুযোগ কই| কিছু করিতকর্মা ছেলে বোটানিক্যাল গার্ডেনে জীববিজ্ঞানের ক্লাশ করতে যেত আর তাদের জন্যে আসতো হাওড়া গার্লসের পরীর ঝাঁক| বীরভোগ্যা বসুন্ধরা‚ অতএব‚ হাম য্যায়সা বাচ্চে লোগ অঙ্গুলি চুষতে রহো! নীল রঙের খাম; একেবারে কপিবুক মেনেই| দিন দুই তো সপ্তম স্বর্গে অবস্থান- দিবাস্বপ্নও কপিবুক মেনে| সেই সব প্রলাপচারিতার ফলশ্রুতি এই আঠারো তারিখের ডেট| (৪) টিনের বাস‚ কাঠের চেয়ারে নারকেলের ছোবড়ার গদি‚ একদম পিছনের লম্বা সীটের সামনে ডানদিকের 'কাটা' সীট| সে বসে আমি দাঁড়িয়ে| কি কনট্রাস্ট| কোথায় লেদার অ্যাডজাস্টেবল‚ এর্গোনমিক‚ শীতে যা হীটেড করবারও ব্যবস্থাওয়ালা সীট আর কোথায় নারকেলের শক্ত ছোবড়া| একেবারে আনরোম্যান্টিক| আধঘন্টাটাক দূরে গিয়ে নেমে পড়া গেল এক গঞ্জ মতন স্টপে| তারপর? একটু হেঁটে কোন এক বিশাল দীঘির পাড়ে‚ চটকা গাছের গুঁড়ির উপর বসা| (চটকা= শিরীষ?)| একটি ছেলে আর একটি মেয়ে ছাড়া সবই কেমন বেখাপ্পা‚ নয় কি? কথাবার্তা? দূর মশায়‚ সেসব কি কেউ মনে রাখে‚ না মনে থাকে? তবে‚ না থাক! (৫) পরিণতি? ঠিকই ধরেছেন| অবধারিত ল্যাং| আসলে আমি ছিলাম তার টেষ্টিং দ্য ওয়াটারস| তার প্রেমের মানুষটি আমার সেই বন্ধুটি| তবে আমার পা মাটিতেই ছিল‚ প্রাথমিক শক কাটিয়ে উঠবার পর| তারা সাত বোন‚ বাবার বিড়ির পাতা‚ তামাকের ব্যবসা| পাশের বাড়ীর বন্ধুটির প্রতিষ্ঠিত পরিবার| মেয়েটির সহজাত নিরাপত্তাবোধ তাকে শিখিয়েছে‚ খুঁটে খাবার| 'টুটা ফুটা' ইঞ্জিনীয়ার ( আমার সহধর্মিণী প্রদত্ত অভিধা) উইথ বিশাল সংসারের জোয়াল কাঁধে‚ সেই ঘোড়া যে আদৌ দৌড়োবে না‚ বরং গাধার সমান‚ এটা বুঝবার বুদ্ধি মেয়েটির ছিল| অতএব সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেষ্ট| রাখাল ছেলে আর রাজার মেয়ে হ্যানস অ্যান্ডারসেনের গল্পেই মানায়| (৬) তারপর? জীবন সংগ্রামে সকলেই নিজের নিজের ফ্রন্টে| বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ কখনই বিচ্ছিন্ন হয়নি‚ শত্রু মিত্র সকলের খবর রাখা আমার বদভ্যাস| বন্ধুটি যথারীতি ইনকাম ট্যাক্সের চাকুরে বাপের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে মনের সুখে সংসার করছে| পুত্র কন্যা‚ নাতি নাতনি পরিবৃত| বছরে একবার ভ্রমণ‚ কলিকাতায় ফ্ল্যাট‚ একেবারে কপিবুকের প্রতিষ্ঠিত সুখী মানুষ| মেয়েটি? বড্ড বেশী আমার বন্ধুটির প্রেমে পড়েছিল‚ সেই ঘোর তার কখনই কাটেনি| লেখাপড়া করে‚ ইংরেজীতে এম এ| বিয়ে থা করে অন্য জেলার এক সদরের স্কুলে শিক্ষিকা| ঐ যে বলেছি‚ আমি সকলেরই খবরাখবর রাখি‚ চেষ্টা করি| সমুদ্রে তারা দেখে বিয়ারিং রাখার মতো| ছোট্ট এই নগণ্য জীবনে কতই বা মানুষের সাথে পরিচয় হয়‚ দুশো? আর কাছ থেকে দেখা মানুষের সংখ্যা বোধহয় পঞ্চাশও নয়; এই বিশাল পৃথিবীতে ৬০০ কোটি লোকের মধ্যে মাত্র ২০০! সবই খবর ঐ বন্ধুরই মারফত‚ তাও অনেক জেরা করে তবেই| ছাড়াছাড়ি(?) হবার বছর পনেরো বাদে একবার দেখা হয়েছিল‚ চান্স মীট‚ এবং সেই কলেজের সামনে| আমি চিনতেই পারিনি| ঠিকানাও দিয়েছিল‚ ব্যস| না‚ আমি মনে ক্ষোভ পুষে রাখিনি‚ আমি জানতাম হোয়ার আই স্ট্যান্ড| আর তেমন তো আকুলি বিকুলি ছিল না‚ ঐ সাধারণ বয়সের ব্যাপার সাপার| বরং নিজের অদৃষ্টকে ধন্যবাদ দিই‚ সম্পর্ক আর এগোয়নি বলে| আমার নুন আনতে পান্তা ফুরানো জীবনে উচ্চাকাঙ্ক্ষীর আগমণ কখনই সুখের বা শান্তির হতো না| বিশেষ করে তার ব্যথা ছিল অন্যখানে| ঠিকানার কোন ব্যবহারই হয়নি‚ মুখস্থই ছিল‚ অমুক জেলাসদরের সরকারী গার্লস কুল এবং সেখানে টীচার; এটুকু ভুলে যাওয়া শক্ত| তার জন্মদিনে একবার কেন জানি না একবার শুভেচ্ছা পাঠাতেই ফেরৎ ডাকে এলো একটা কবিতা| "আমার যা শ্রেষ্ঠধন‚ সে শুধু........" আর শেষে‚ 'আমি বোধহয় ভুল করেছি!' থার্টি ইয়ার্স টু লেট! ওহ‚ কোন অনুচ্ছেদে বলি: নতুন বয়স আমার‚ ইংরেজী উপন্যাসে হাতেখড়ি হয়েছিল এক নীরস জেন অষ্টেনে- ভিক্টোরিয়ান প্যাচপ্যাচানি! তা থেকেই সে আমার কাছে হয়ে গিয়েছিল ‚ "Cynthia" | এবং ম্যাচিং ইঞ্জিরী নামের প্রয়োজনে আমি হয়ে গেলাম- জানেন তো সবাই| সিন্থিয়া গন কিন্তু আমি সেই নাম বহন করে চলেছি‚ বিচ্ছেদের পর পদবী বয়ে বেড়াবার মতো‚ ম্যাডেলিন অলব্রাইট যেমন বয়ে বেড়িয়েছেন বা মিসেস মার্কেল| (৭) বন্ধুটির পৈতৃক বাড়ীতে জ্ঞাতি গুষ্ঠি মিলিয়ে অনেক কাকা‚ জ্যাঠা| যাতায়াতের ফলে আমার সাথে তাদের অনেকের সাথেই যোগাযোগ রয়েছে| সেই সেদিন ডাক্তার কাকিমার সাথে ফোনে কথা বলছিলাম| এই কাকিমা আমাদের চেয়ে বয়সে সামান্য বড়‚ তিনি সবই জানতেন| 'একটা খারাপ খবর আছে‚ সুমি মারা গেছে'! সুমি অর্থাৎ সুমিতা‚ নীল শাড়ী পরিহিতা| তারপর কয়েকবার বন্ধুটিকে ফোন করেছি‚ অনেক কথা হয়েছে‚ তার ছেলের বিয়ে‚ মেয়ে হায়দারাবাদে স্বামীর কাছে চলে গেছে‚ কোথায় কোন চা বাগানের বাংলোতে বেড়াতে গিয়ে কাটিয়ে এসেছে‚ সবই| কেবল তার নাম একবারও উচ্চারণ করেনি| আমিও চুপ করে থেকেছি| বন্ধুটির সাথে সুমির ফোনে যোগাযোগ ছিল‚ আসলে সুমি তাকে ভুলতেই পারেনি| আমি পার্শ্বচরিত্র তবু ফর ওল্ড টাইমস সেক‚ বন্ধুটিকে কতবার যে অনুরোধ করেছি‚ এই চার দশক বাদে সে কেমন দেখতে হয়েছে রে? ছবি দেখাতে পারিস‚ আজকাল তো ছবি ফটো তো জলভাত| এড়িয়ে গেছে| (৮) যেদিন খবরটা পাই‚ তখন ছিল শুক্লপক্ষ‚ পিছনের ব্যাকইয়ার্ডে লাইট পল্যুশন নেই বলে সেই নীল শাড়ী পরা মেয়েটিকে যেন দেখতে পেলাম| নাহ‚ দু:খ হা হুতাশ নয়| শুধু সেই চটকা গাছের কথা মনে পড়লো‚ তার আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল‚ পরিষ্কার রোদ সেদিন| সুমি‚ তোমার obituary তো The Statesman এ বেরোবে না‚ আমিই না হয় লিখলাম| নীল শাড়ীটা সঙ্গে নিয়ে গেছো তো? নীল আকাশের সাথে ম্যাচ করবে| https://www.youtube.com/watch?v=h2Z0dRI9CFg

877

77