শিবাংশু

জগন্নাথের জাত যদি নাই... .

জগন্নাথের প্রচলিত রূপটি হয়তো আর্যদের বিশেষ পছন্দ ছিলোনা। তাই একটি গল্পের অবতারণা করতে হয় তাঁদের। ভেসে আসা নিমকাঠটি থেকে দেবমূর্তির রূপ দেবার জন্য পিতামহ ব্রহ্মা'র ইচ্ছায় স্বয়ং বিষ্ণু এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে অবতীর্ণ হ'ন। তাঁর শর্ত ছিলো যতোদিন না কার্যসমাধা হবে, কেউ তাঁকে বিরক্ত করবে না। বেশ কিছুদিন পরেও যখন কাজটি সম্পূর্ণ হলোনা, তখন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পত্নীর অনুরোধে মন্দির কক্ষের দরজা বলপূর্বক খুলে দেখেন সেই ব্রাহ্মণ কোথাও নেই আর কিছু 'অর্ধসমাপ্ত' দারুমূর্তি রাখা আছে। আর্য অহমের একটি প্রকাশ এখানে পাওয়া যাবে। অনার্যদের কল্পিত জগন্নাথবিগ্রহ তাঁদের বিচারে 'অর্ধসমাপ্ত'। কারণ সেটি নান্দনিক বিচারে আর্য উৎকর্ষের নির্দিষ্ট স্তর স্পর্শ করেনা। আসলে এখন বিস্ময় লাগে, কীভাবে জগন্নাথবিগ্রহ স্তরের একটি সার্থক পরাবাস্তব শিল্পবস্তু সেই পুরাকালের শিল্পীদের ধ্যানে রূপ পেয়েছিলো। নিজেদের ধ্যানধারণা থেকে বহুক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বাধ্য হয়েছিলো জগন্নাথদেবকে নিজেদের বিষ্ণুকেন্দ্রিক প্যান্থিয়নে সসম্মানে স্থান করে দিতে। তার মূল কারণ দেশের এই প্রান্তে জগন্নাথের প্রশ্নহীন বিপুল লোকপ্রিয়তা। যেভাবে পূর্বভারতে প্রচলিত নানা শিব ও শক্তিভিত্তিক দেবদেবীদের জন্য ব্রাহ্মণ্যধর্মকে দরজা খুলে দিতে হয়েছিলো, সেভাবেই জগন্নাথও বিষ্ণুদেবতার সমার্থক হয়ে আর্য-অনার্য নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন। এখনও জগন্নাথদেবের মূলপূজারী অব্রাহ্মণ, সাবর্ণ হিন্দুগোষ্ঠীর বাইরের মানুষ। সত্যিকথা বলতে কি সারা দেশে অন্ত্যজ, নিম্নবর্গীয় মানুষজনদের জন্য জগন্নাথমন্দিরের মতো এই পর্যায়ে 'শাস্ত্র'সম্মত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা আর কোথাও দেখিনি। কবি যখন বলেন, " জগন্নাথের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই...", একটি আর্ষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এহেন একজন ইতরের দেবতা, স্রেফ লোকপ্রিয়তার জোরে সর্বগ্রাসী ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্যকে জিতে নিয়ে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সমগ্র 'জগতের নাথ'। হয়তো একটু অন্য রকমভাবে ভাবার দাবি তিনি রাখতেই পারেন। ব্রাহ্মণ্য অধ্যাত্মজগতে সম্ভবত এটিই একমাত্র সাম্রাজ্য যেখানে মুখ্য পূজারী দৈতপতির দল অনার্য শবরদের বংশধর। জগন্নাথ সৃজনের স্বীকৃতি হিসেবে অনার্যদের রাণী গুন্ডিচা, যিনি লোককথা অনুসারে একাধারে রাজা 'ইন্দ্রদ্যুম্নে'র মহীষী ও জগন্নাথ রূপকল্পের মুখ্য ধাত্রী, তাঁর গৃহে জগন্নাথকে বছরে মাত্র সাতদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলো। সঙ্গে এলো কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের রথযাত্রার আয়োজন। যেহেতু 'ভগবানে'র মা কোনও মানবী হতে পারেন না, তাই তাঁকে মায়ের ভগ্নী মাসিমা হিসেবে সম্বোধন করা হয়। জগন্নাথ ধারণাকে ভ্রূণ থেকে সাবালকত্ব পর্যন্ত প্রতিপালন করার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান সমস্ত কৌম অনার্য মায়েদের গরিমান্বিত করে। 'গুন্ডিচা' শব্দটি মনে হয় দ্রাবিড়িয় ভাষা থেকে এসেছে। বীরত্বের সঙ্গে শব্দটির যোগাযোগ আছে। তিনি একজন অনার্য গ্রামদেবী। লোককথায় ইন্দ্রদ্যুম্নের রাণী । এভাবেই গুন্ডিচা'কে নিয়ে আর্য বৈষ্ণব দুনিয়াকে আপোস করতে হয়েছিলো। এই নারী বা দেবী জগন্নাথের কাছে যাননা, জগন্নাথ তাঁর কাছে আসেন রথে চড়ে। যাবতীয় ঐশী অহংকারকে তাকে রেখে। --------------------------------------- অনেকেই বিশ্বাস করেন জগন্নাথ আরাধনার ঐতিহ্য বৌদ্ধ মহাযানী পূজার্চনার বিবর্তন হিসেবে এসেছে। আগে উল্লেখ করেছি, বেশ কিছু পণ্ডিত জগন্নাথের নবকলেবরে 'ব্রহ্মস্থাপন'কে বৌদ্ধস্তূপের অন্দরে বুদ্ধের দেহাবশেষ রক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। চতুর্থশতকে ফাহিয়েন কলিঙ্গবাসকালে দন্তপুর নামক স্থানে বুদ্ধের দেহাবশেষ নিয়ে শোভাযাত্রা দেখেছিলেন। বর্তমানে এই আচারটি শ্রীলংকার ক্যাণ্ডিতে অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত যেমন উইলসন, ফার্গুসন বা কানিংহামসাহেব জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে বৌদ্ধ ত্রিরত্ন বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের সমতুল বলে মতপ্রকাশ করেছিলেন। বৈদিকধর্মে দেবালয় নির্মাণের কোনও প্রথা ছিলোনা। যাবতীয় জ্ঞান ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিলো মুনিঋষিদের আশ্রম বা অরণ্যকুটীরগুলি। বৌদ্ধধর্ম ও লোকাচারে উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে স্তূপ বা চৈত্যের নির্মাণ প্রথম শুরু হয়। পরবর্তীকালে এই পথ অনুসরণ করে তন্ত্রমতে শিব বা শক্তির নামে দেবমন্দির তৈরি হতে শুরু করে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে অনেকেই তন্ত্রমতে নির্মিত বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য রত্নসিংহাসনের ভৈরব বা শ্রীচক্রের উপস্থিতি ছাড়াও মন্দিরের গায়ে মিথুনমূর্তি বা প্রচলিত দেবদাসীপ্রথা তন্ত্রচর্চার সঙ্গে সম্বন্ধিত লোকাচার। জগন্নাথের রথযাত্রাও বস্তুত অনার্যসমাজের প্রাচীন প্রথা। সনাতনধর্মে এর অনুপ্রবেশ বৌদ্ধরীতির হাত ধরেই। নাস্তিক্যবাদও জগন্নাথ ও বুদ্ধের মধ্যে একটা প্রধান যোগসূত্র। সনাতনধর্মে শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে দেবতা জগন্নাথকে নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে গত হাজার বছর। প্রাথমিকভাবে পূর্বভারতে অনার্য ও নিম্নবর্গীয় জনতার দেবতা শিব বুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। পিয়দস্সি অশোক ও মৌর্যশাসনের পর বৌদ্ধসংস্কৃতির নাভিকেন্দ্র যখন সম্রাট কণিষ্কের রাজত্ব , অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে সরে যায় তখন দেশের এইপ্রান্তে অন্ত্যজ, অনার্য মানুষজনের কাছে শিব বা মহাদেব ও বুদ্ধদেবের ভাবমূর্তির মধ্যে ব্যবধান প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো। যুক্তিগতভাবে সেটাই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু কুমারিলভট্ট, মণ্ডন মিশ্র এবং আদিশংকরের ক্রমাগত প্রয়াসে ব্রাহ্মণ্য ভাবধারার পুনরুজ্জীবন ঘটে। বিষ্ণুপূজক, বর্ণাশ্রমবাদী শক্তিগুলি আবার মানুষের অধ্যাত্মিক স্পেসটি দখল করে নেয়। মধ্য গুপ্তযুগে রচিত হরিবংশ বা শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধের কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু পরবর্তী পুরাণযুগে, অর্থাৎ সনাতনবাদী পুনরুত্থান ঘটে যাবার পর সংকলিত পদ্মাপুরাণে লেখা হয় বিষ্ণু বুদ্ধশরীর গ্রহণ করেছিলেন। অগ্নিপুরাণেও বলছে বিষ্ণু শুদ্ধোদনপুত্র হয়ে জন্ম নিয়ে ছিলেন 'মায়ামোহ' নামক দানব প্রবৃত্তিগুলি নাশ করার জন্য। এছাড়া গরুড়পুরাণ, ভাগবতপুরান ইত্যাদি সংকলনে কোথাও বিষ্ণুকে জিনপুত্র (জৈনমতে) বা মোহনাশক বুদ্ধের অবতারে বর্ণনা করা হয়েছে। মোদ্দাকথা, বিষ্ণুপূজকরা পূর্ণ প্রয়াস করেছেন বুদ্ধকে নবম অবতার হিসেবে প্রতিপন্ন করতে। ওড়িশায় বিষ্ণুর নবম অবতার হয়ে এসেছেন জগন্নাথ। পুরীর মন্দিরে মূল প্রবেশদ্বার, সিংহদ্বারের শীর্ষে বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্তি রয়েছে। সেখানে হলধর ও কল্কি অবতারের মাঝে নবম অবতার হিসেবে জগন্নাথের প্রতিকৃতি দেখা যাবে। এছাড়া ভিতরে জগমোহনের সামনে গরুড়স্তম্ভের পাশের দেওয়ালেও দশাবতারের নবম সদস্য হিসেবে জগন্নাথকে দেখা যাচ্ছে। ওড়িশার সনাতনধর্মীয় ভক্তবৃন্দ বুদ্ধ ও জগন্নাথকে এক করেই দেখে এসেছেন পুরাণযুগ থেকে। ('নীলমাধব: একটি বিকল্প নিমপুরাণ' থেকে কিছু অংশ "দেবতার সন্ধানে-একটি অনার্য অডিসি")

50

8

Ranjan Roy

আহিরণ নদী সব জানেঃ রঞ্জন রায়

৭) ছুরিকলাঁ হল মুখ্যতঃ তাঁতিদের গ্রাম, কিন্তু জাতপাতের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা পাড়া গড়ে উঠেছে। যেমন কোষ্টাপাড়া (তাঁতিপাড়া), রাউতপাড়া (গয়লা), লুহারপাড়া (কামার), কুমহারপাড়া( কুমোর), বড়ইপাড়া(ছুতোর)। এরপর ছোটখাট সম্প্রদায়গুলোর বস্তি হল মুহল্লা। যেমন পাঠান(মুসলমান) মুহল্লা, ছিপিয়া(যারা চুলের ফিতে আলতা এসব বিক্রি করে), সতনামী মুহল্লা ও সহিস (চামড়ার ঢোল তবলা মাদল বানায়) মুহল্লা। তবে মূলবস্তি শেষ হয় রাজওয়াড়া মানে রাজবাড়িতে গিয়ে। মেটে রঙের বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা রাজবাড়ি। প্রধান দ্বারের উপর রয়েছে এদের কোট অফ আর্মস, খোদাই করা। আজ চোখ কুঁচকে দেখলে অতিকষ্টে একটি ছোটখাট সিংহ ও ১৮৩৭ সাল চোখে পড়বে। ভেতরে যুবরাজ, মঝলা, সঝলা ও ছোটে কুমারদের আলাদা আলাদা মহল। এককোণে একটি জীর্ণ জীপগাড়ি ও ভ্যান বুড়ো কর্মচারির মত নম্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। এরা প্রত্যেকেই বেশ কালোকোলো এবং নিজেদের ক্ষত্রিয় বললেও চেহারায় স্থানীয় আদিবাসীদের ছাপ স্পষ্ট। রাজবাড়ির মূল অংশের বাইরে আর একটি ছোটখাট বাড়ি। সেটা বড়ে বাবুসাব ও ছোটে বাবুসাবএর ডেরা। এরা হলেন রাজার প্রাক্তন মন্ত্রী বা নায়েবের দুই ছেলে। আজ দুই জনেই কিছু করেন না , তবে পৈতৃক সূত্রে যা চাষের জমি ও আহিরণের দুই তীরে জঙ্গলের মধ্যে পড়ত জমি পেয়েছেন ,সেগুলোর ফসল ও জমির টুকরো বেচে বেচে এদের দিন চলে। এর পরেই পাকদন্ডী পথে নেমে গিয়েছে আহিরণের পাড় অবধি। তারপর নদীর ওপারে ঝরা-সিরকি জোড়া গ্রাম। এর জমিদারি অথবা মালগুজারি দুই বাবুসায়েবের নামে। গাঁয়ের আরএকপ্রান্তে নদীর ধার ঘেঁষে আছে বিঁঝওয়ার -মঝওয়ার মুহল্লা(ব্যাকওয়ার্ড ট্রাইব)। তারপরে গাঁড়ামুহল্লা। এরা অন্ত্যজ। এরা নগাড়া বাজায়, নাচে। অথচ এদের এই গাঁড়াবাজা না হলে সবর্ণ হিন্দুর বিয়ে, ছট্টী(নবজাতকের ছয়ষেটেরা) ও দাহসংস্কার পুরো হয় না । এরপরে ক্ষেতখার (মানে চাষের ও পড়ত জমি) পেরিয়ে নদীর আরেক পাশে রয়েছে কিছু নীচু নীচু মাটির ঘর, মাথা নীচু করে ঢুকতে হয়। এদের বলা হয় সুকবাসী। এরা যাযাবর অন্ত্যজ গরীব মানুষ। এদের মূল গাঁয়ের লোক সন্দেহের চোখে দেখে। এদের নাকি হাতটান খুব, আর মেয়েরা জড়িবুটি বিক্কিরি করে। এরা সবাই খুব খাটতে পারে । ধানকাটার সময় অথবা পঞ্চায়েতের টেন্ডারে ও ওয়ার্ক অর্ডারে রাস্তা বানানো, পুকুর কাটা এসবের জন্যে এদের ডাক পড়ে । এরা মাথা নীচু করে আসে। আটঘন্টার জায়গায় দশঘন্টা খাটে। যা বনিভূতি বা মজুরি দেওয়া হয় মুখবুজে কৃতজ্ঞ চোখে মেনে নেয়। মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট ও ডেইলি ওয়েজ পেমেন্ট অ্যাক্টের নাম এরা শোনে নি। তবু মালিকদের শিকায়ত ফুরোয় না । এদের গায়ে বুনো গন্ধ; এক একেকজন প্রায় দু’জনের মত ভাত খায় যে! তবে এরা ক্ষেতে পায়খানা করলে মাটি নাকি উর্বরা হয়। ওরা শীতকালে ধানকাটার পর ভিনগাঁয়ে সপরিবারে চলে যায়; মাঠে তাঁবু খাটিয়ে থাকে। খালি মাঠে চরতে আসা পাখিদের ফাঁদ পেতে ধরে বিক্রি করে। তবে এরা যে বেঁচে আছে এটাই গাঁয়ের লোকজনের চোখে পড়ে না । ছুরিগাঁয়ের জীবন বয়ে চলেছে আহিরণ নদীর মত –সেই একই খাতে। আদ্যিকাল থেকে যেমন চলে আসছে। কবে থেকে? তা রামনিবাস জানে না । খালি এটুকু বলতে পারে যে ওর ঠাকুমা বিয়ে হয়ে এসেছিল এই গাঁয়ে। ঠাকুর্দাকে ও দেখে নি। ঠাকুমা বলত যে ওরা আসলে সিঙ্ঘানিয়া। পদবি আগরওয়াল, রাজস্থানের মারওয়ার থেকে এসেছে। সেখানের কোন গ্রামে ওদের ঠাকুমার বাবার পেশা ছিল মীনার কাজ; নাম হয়েছিল । দশ গাঁয়ের লোকে চিনত । তারপর কিছু একটা ঘটে; কোন এক ঘটনা, যার ফলে ওর ঠাকুর্দা ঠাকুমাকে নিয়ে পালিয়ে আসে। মারওয়ার থেকে দিল্লি, সেখান থেকে ভোপাল। তারপর বছর খানেকের মাথায় ওই দম্পতিকে দক্ষিণ পূর্ব মধ্যপ্রদেশের ছত্তিশগড় এলাকার আহিরণ নদীর তীরে ছুরি গাঁয়ে নিয়ে আসে মনসুখনারায়ণ জোশী। জোশী হলেন মাড়োয়ারি সমাজের পূজারি ব্রাহ্মণ। ঠাকুর্দা ঠাকুমার বিয়ে দিয়েছিলেন আর ওদের প্রাণ বাঁচাতে গোপনে অন্য লোকের হাতে টাকাপয়সা দিয়ে ওদের ভোপালে পৌঁছে দেন। কিন্তু সেখানে দুশমন খবর পেয়ে যায়। রামনিবাসের বাবা বনওয়ারি তখন ওর ঠাকুমার পেটে। নিরুপায় হয়ে ওরা আবার জোশীজির কাছেই হাতজোড় করে। শেষে উনি বললেন তাহলে ছুরিকলাঁ গাঁয়ে চল, আহিরণ নদীর ধারে। রাজপরিবার সিধে সাদা। গ্রাম পঞ্চায়েত আমার কথায় মানা করবে না । আমি রেভিনিউ রেকর্ড দেখে তোদের আবাদী জমিন থেকে তোদের পাঁচ ডেসিমেল জমিন ঘরতোলার জন্যে পাইয়ে দেব। আগে ঘর তুলে নিবি, ইঁটের দেওয়াল ,চূণসুরকির গাঁথনি আর খাপরার ছাদ। তারপর ছ’মাস বাদে পাটোয়ারিকে দিইয়ে আমিই রেভিনিউ অফিসে তোদের বিরুদ্ধে বেজাকব্জা ও সরকারি আবাদী জমিনে বিনা পারমিশন ঘর তোলার নালিশ করে কেস খাওয়াব। দেওয়ানি মামলা। তহসিলদারের কোর্টে বিচার হবে। কোন উকিল লাগাবি না । হাতজোড় করে বলবি হজুর মাঈবাপ! ভুল হয়ে গেছে, মাপ করে দিন। মাথার উপরের ছাদ কেড়ে নেবেন না । ব্যস, সামান্য জরিমানা হবে; জমা করে দিবি। কেল্লা ফতে। দুমাস পরে তহসিল অফিস থেকে পাকা রেভেনিউ বুক ও রেজিস্ট্রির কাগজপত্তর এসে যাবে। সামান্য খাজনা ধার্য হবে, বাৎসরিক। তোরা ওই জমিনের মালিক হবি। সব একনম্বরের কাগজপত্তর। বুঝলি, যদি আগে থেকে অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে নকশা পাস করিয়ে ঘর তুলতে যেতি, তো ‘অনাপত্তি প্রমাণ পত্র, ডাইভার্সন সার্টিফিকেট এসব পেতে ছ’মাস লাগত। ততদিন থাকবি কোথায়! এইদুনিয়ায় আইন মেনে কাজ করলে সময় বেশি লাগে, গাঁটের কড়ি খসে বেশি। আইন না মেনে কাজ করে আইনের কাছে শরণাগত হও, কমপয়সায় তাড়াতাড়ি কাজ। এটাই ভগবানের বিধান। ঠাকুর্দা শুধিয়েছিলেন—মহারাজ, শেষ প্রসঙ্গটি বুঝি নি। আমি মুখ্যু মানুষ, যদি একটু খুলাসা করে বলেন। শোন তবে। বৈকুন্ঠে বিষ্ণুভগবান দুপুরে খেয়েদেয়ে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে একটু ভাতঘুম দিচ্ছিলেন। এমন সময় অষ্টাবক্র মুনি এসে হাজির। জরুরি কাজ। বিষ্ণু যেন একখুনি হাজির হন। দ্বারী জয়-বিজয় দুই ভাই কিছুতেই ঢুকতে দেবে না । অমন ভিখমাঙ্গা বৈরাগিঠাকুর ঢের ঢের দেখা আছে। অসময়ে ভগবানের ঘুম ভাঙানো যাবে না । কাঁচাখেকো মুনি অগ্নিশর্মা! শাপ দিলেন ওদের বৈকুন্ঠের চাকরি উনি খেয়ে নেবেন। ওদের মানুষের পৃথিবীতে যেতে হবে। বিষ্ণু ঘুম ভাঙলে উঠে এসে নিজের দারোয়ানদের জন্যে অনেক কাকুতিমিনতি করলেন। কিন্তু হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না । মুনিঋষির অপমান। কান ধরে ক্ষমা চেয়েও রেহাই নেই । জয়-বিজয় মালিককে বললে হজৌর, যা করেছি আপনার হুকুমে। এখন আপনি যদি না দেখেন! তখন অপ্রস্তুত বিষ্ণু আমতা আমতা করে বললেন যে তোরা বেছে নে ; যদি ধরতীতে গিয়ে আমার শত্রু রূপে থাকিস, তো তিন জন্মে খালাস। নতুন ট্রান্সফার অর্ডার নিয়ে বৈকুন্ঠে ফেরত, পুরনো ডিউটিতে জয়েন করবি। আর যদি ভক্ত হয়ে জন্ম নিতে চাস তবে ফিরে আসতে সাত জন্ম লাগবে। এখন তোরা যা চাইবি। ওরা বলল, --মালিক, আমরা চাই শত্রুরূপে জন্ম নিয়ে আপনার হাতে মরে তিনবারে সাজা কেটে মুক্ত হয়ে ফিরে আসব। উনি বললেন তথাস্তু! তাই ওরা দু’ভাই সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ- হিরণ্যকশিপু , ত্রেতাযুগে রাবণ-কুম্ভকর্ণ এবং দ্বাপরে শিশুপাল-দন্তাবক্র হয়ে জন্মাল। তারপর বিষ্ণূভগবানেরই তিন অবতাররূপ নরসিং ভগবান, রাম ভগবান ও কৃষ্ণভগবানের হাতে বধ হয়ে মুক্তি পেল। তাই বলছি এসব শাস্ত্রমতে ঈশ্বরের বিধান। এভাবেই ছুরি গাঁয়ে সাতঘর মারওয়ারি পরিবার গত আশি বছরে ঠাঁই পেল। এরা সবাই ধানচাল কেনা বেচা আর মুদি দোকান চালায়। ছুরিকলাঁ এখন বর্ধিষ্ণু গ্রাম, জনসংখ্যা দশহাজার ছাড়িয়েছে। আর তাদের উকিল, অভিভাবক, রক্ষাকর্তা হলে জোশী মহারাজ। সবাই দেখা হলে বলে প্যার লাগুঁ। পায়ে পড়ি গো মহারাজ। তবে রামনিবাসের ঠাকুমা নাতিকে বলত ওই বিটলে বামুন থেকে শতহস্ত দূরে থাকবি। কেন ঠাকুমা, উনিই তো তোমাদের এই গাঁয়ে এনে বসিয়েছেন। কত দয়ার শরীর! পরোপকারী। চুপ কর! তুই সেদিনের ছোঁড়া , কতটুকু দেখেছিস? আমার সোনার মাকড়ি আর রূপোর নাকছাবি ওকে দিতে হয়েছিল। এছাড়া ওর চলে সূদের কারবার। মাসে তিনটাকা হারে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসে আহিরণের পারে, ঘাসের উপর বসে অন্যমনস্ক ব্যাংক ম্যানেজার রূপেশ বর্মা একটা শিস ছিঁড়ে চিবুচ্ছিল। রামনিবাসকে বলল এবার উঠলে হয় না ? -বিলকুল সাহাব। এক আখরি সিজার পিলাইয়ে। রূপেশ পকেট থেকে প্নামা সিগ্রেটের প্যাকেট থেকে দুটো বের করে একটা রামনিবাসকে দিয়ে একটা নিজে ধরায়। রামনিবাস একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে খোসামুদে সুরে বলে—আপকে সংগ দিনভর ঘুম রহা হুঁ। তো সিজার পী রহা হুঁ, নহি তো বিড়ি ! রূপেশ গত ছ’মাসে বহুবার দেখেছে যে ছুরির কয়েকজন সিগ্রেটকে সিজার বলে কেমন গর্বিত ভাবে তাকায়। আর জুটে গেছে রামনিবাস। সকাল আটটা বাজলেই এসে বেল টিপবে। ভেতরে এসে দরজা বন্ধ করে মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়বে। ঠুল্লু এসে চা ও জলখাবার দিয়ে যাবে। নিঃসংকোচে সেগুলো সাঁটিয়ে ও সেদিনের চারপাশে কী কী ঘটছে এবং কী কী ঘটবে তার ফিরিস্তি ম্যানেজারকে শোনাবে। রূপেশ সেসব আদ্দেক কান দিয়ে শুনতে শুনতে আগের দিনের বকেয়া কাজ, যেমন ভাউচার চেকিং বা লেজার চেকিং করতে থাকবে। এরপর ও উঠবে স্নান করে ব্যাংক খোলার জন্যে। রামনিবাসও বাড়ি যাবে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার আগেই ও আবার ব্যাংকে হাজির। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে এককোণে বসে বসে সকালে পড়া খবরের কাগজ ওল্টাতে ওল্টাতে ও সবাইকে মন দিয়ে দেখে, সবার কথা কান পেতে শোনে। শেষে ব্যাংক বন্ধ হবার সময় ও ম্যানেজারকে ওর সামারি ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট দেয়। ধীরে ধীরে ও রূপেশের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। রূপেশের অধিকাংশ ‘দোউরা’ বা ফিল্ড ভিজিট/সার্ভের সময় সঙ্গে রামনিবাস। ওর দুটো গুণ—ভাল মোটরসাইকেল চালায়, বিশেষ করে পুকুরের পাড় এবং ক্ষেতের আল দিয়ে চালাতে হলে। তখন রূপেশ ওর পেছনে বসে , কখনও কখনও চোখ বুজে ফেলে। আর প্রায় প্রত্যেক গ্রামে রামনিবাসের কোন না কোন কুটুম রয়েছে। ফলে চায়-নাস্তা ও ভেতরের খবর সহজেই পাওয়া যায়। ভাবে সফল ভাবে রাজত্ব চালাতে কিংবা ব্যবসাবাণিজ্য করতে হলে গুপ্তচর খুব জরুরি। কৌটিল্য বলে গেছেন। এছাড়া এখানে ও কাউকে চেনে না, আবার হেড অফিস থেকে নির্দেশ এসেছে। দশটা গাঁয়ের প্রোফাইল তৈরি করতে । যাতে সেখানকার জমি, লোকজন, চাষ ও ব্যাংকের ডিপোজিট ও লোন বিজনেসের সম্ভাবনার স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে। আগামী মাসে যে কোন দিন হেড অফিসের অফিসার এসে ইন্সপেকশন করবেন । তখন যেন এই ডায়েরিটা কমপ্লিট থাকে; নইলে— ফলে ও রামনিবাসকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে। মনে মনে সংকল্প নেয়। অন্ততঃ একজন ক্লার্ক পোস্ট হলেই ও আর রামনিবাসকে নিয়ে ফিল্ড ভিজিটে যাবে না । আর রামনিবাস তো কোন কমিশন বা সার্ভিস চার্জ চাইছে না । ও শুধু ওদের আড্ডায় ব্যাংক সাহাব যে ওকে ছাড়া চলতে পারেন না , ও যে সে লোক নয়-এটা বলে ঘাম নেয়। সে যাকগে! আজকে ওরা ফিরছে ঝোরা –সিরকি গ্রাম থেকে। এখন শীতে আসি আসি করছে। তবু সারাদিনের হ্যাপা আর গাঁয়ের মধ্যে ঘরে ঘরে গিয়ে দরজায় টোকা দেওয়া। কেউ খুললে আলাপ পরিচয় করে তাকে খানিকটা ‘ইমোশনাল অত্যাচার’ করে সেভিংস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলানো—এসবের একটা ক্লান্তি আছে বইকি! পাঁচ টাকা দিয়ে খাতা খোলা। তবু অধিকাংশ লোক বলে ওদের কাছে এখন টাকা নেই । আস্তে আস্তে ও বুঝতে পারে এই সব নদীপারের গাঁয়ে নগদের কারবার কম। কাজেই ওদের কাছে পাঁচটাকা নগদ না থাকা অস্বাভাবিক নয়। কয়েকবার ও নিজের পকেট থেকে পাঁচটাকা বের করে দিয়েছে। বলেছে যেদিন ব্যাংকে আসবে সেদিন মনে করে আমাকে ফেরত দিও। রামনিবাস হাঁ-হাঁ করে উঠেছে। সাহেব, এমন ভুলটি করবেন না । নিজের পকেট থেকে টাকা না খসলে মানুষ ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে নিজের মনে করে না, সরকারি কারবার ভাবে। সরকার কা মাল , দরিয়া মেঁ ডাল। আর এভাবে দান-খয়রাত করতে থাকলে আপনার মাসের মাইনের পুরো টাকাটা ওদের পেটে যাবে। আমাকে কথা বলতে দিন। ফির আপ মেরা জাদু দেখনা। রামনিবাস সত্যিই ম্যাজিক দেখাল। যেই কেউ বলে টাকা নেই ও হো-হো করে হেসে ওঠে। বলে সে কী! এতবড় গৌটিয়া, দশগাঁয়ে নামডাক। তার ঘরে পাঁচটা টাকা নেই , লোকে শুনলে বলবে কী! আর এই কথা যদি অমুক গ্রামে তোর সমধি-সমধিনের (বেয়াই-বেয়ানের) কানে পৌঁছে যায় তাহলে ওরা কী ভাববে? হাভাতে পরিবারে বিয়ে দিয়েছি? শোন, চালের বাতায় হাতড়ে দেখ, ঠিক পেয়ে যাবি। নয় তো তোর গিন্নিকে শুধিয়ে দেখ। আর নইলে পাশের বাড়ি থেকে ধার নে । আরে আমরা খালি হাতে ফিরে যাব? ব্যাংক ম্যানেজারকে ফিরিয়ে দিবি? এ তো মালক্ষ্মী কে বিদেয় করা! দেখিস নি, শেঠেদের গদ্দিতে তিজৌরির (সিন্দুকের) পাশের দেয়ালে বড় বড় করে লেখা থাকে ‘কুবের মহারাজকে ভান্ডার সদা ভরা পুরা রহে!’ আর তুই স্বয়ং কুবেরমহারাজকে তোর দ্বার থেকে শূন্য হাতে বিদেয় করবি? ধর্মে সইবে? ভেবে দ্যাখ । এর পরে আর কাউকেই খুব বেশি ভাবতে হয় না । একদিনে জমাখাতা খোলা অভিযানের সাকসেস রেট খুব খারাপ নয়। কৃতজ্ঞ রূপেশ শীতের সন্ধ্যেয় ঘনিয়ে আসা বিষণ্ণ অন্ধকারে মোটর সাইকেল স্টার্ট করতে করতে রামনিবাসকে শুধোয় কালকে ও জোশী মহারাজের গদ্দিতে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে কি না ।

235

33

চঞ্চল

পধারো মাহরো দেশ

(১৩) এত অপমানিত কোনদিন হয়নি সলিম| কুলধারার ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে কেউ যেন উলঙ্গ করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সবার সামনে| সমস্ত শরীর জ্বলছে সেই চরম অপমানের জ্বালায়| এত সাহস এই পালিওয়ালদের? সলিমের আদেশ অমান্য করার সাহস কি করে হল এদের? আজ ঠিক সময়েই য়ার-দোস্তদের সাথে বেড়িয়েছিল সে হভেলি থেকে| আত্মীয়-স্বজন তো কেউ নেই ‚ যে সলিমের বিয়েতে বারাতী হয়ে যাবে| এই দোস্তরাই এখন তার সব পরম আত্মীয়| তারাই একটা উটের গাড়ি সাজিয়েছে যেরকম করে বিনণী আনার জন্য সাজায়| ফুল আর রঙীন কাপড় দিয়ে| সলিম নিজেও কম কিছু সাজেনি| বর বলে কথা‚ তারওপর সে এ রাজ্যের দিওয়ান‚ কিছুদিন পরেই মহারাওল হবে সে পথের কাঁটা সরিয়ে‚ না সাজলে মান থাকবে না| সাদা অচকনের সাথে মাথায় রঙীন পাগড়ি‚ গলাতে হায়দ্রাবাদের বড় বড় সাদা চারটে মোতির মালা| আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সেজেছে সলিম| সব শেষে সোনালী জরির কাজ করা উটের চামড়ার জুতিটা পরে বেশ লাগছিল নিজেকে আয়নায়| জুতির বাঁকানো মাথার দিকে আবার একটা বড় মোতিও লাগানো আছে | অনেক শখ করে কিনেছিলো এটা | সবার শেষে সবচেয়ে দামী ইত্র যা কিনা অজমেরের সরেস গোলাপ থেকে তৈরী হয়‚ তাই ভালো করে কানের পিছন‚ হাতের কব্জিতে লাগিয়ে নিল| আর একটু তুলোতে মাখিয়ে নিজের কানে গুঁজে নিল| আয়নায় নানান দিক দিয়ে ভালো করে নিজেকে দেখে নেয় সে | কোমরবন্ধে লালরঙের তরোয়ালের খাপটা বেশ ভালো মানিয়েছে| একবার তরোয়ালটা খাপ থেকে বের করে আবার খাপে গুঁজে নিল সে| না‚ এবার বেরোনো উচিত| দরজা দিয়ে বেরতে গিয়ে দেখে সেখানে রুকমণি দাঁড়িয়ে| গালে হাত দিয়ে, ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে | 'বাহ বেশ মানিয়েছে তোমায়| চশ্মে বদদুর‚ তাহলে চললে বিনণী আনতে ?' রুকমণির গলার স্বরে কোন ঠাট্টার সুর ছিল না| বরং কাছে এসে গলার মোতির মালাটা ঠিক করে দিল সে| 'মনে তো হচ্ছে‚ আমার নজরই লেগে যাবে'‚ বলে খিলখিল করে হেসে উঠল সে| ঠাট্টা গায়ে মাখল না সলিম| 'তুমি তো আজই যাবে? না‚ মানে বলছিলাম ওকে বাড়িতে প্রবেশের আগে আরতি করে যদি যেতে ‚ তাহলে ভালো হত|' সলিম বলল| 'না‚ সে আমি থাকব না তখন| তবে তুমি চিন্তা কোরো না‚ বন্দিদের বলে রেখেছি‚ ওরাই এখানকার সব রস্ম পুরো করে দেবে|' ঠাট্টা ছেড়ে গম্ভীরভাবেই কথাগুলো বলল রুকমণি| 'ঠিক আছে‚ যেমন তোমার ইচ্ছা‚ ' বলে সলিম আর দাঁড়ালো না| 'আর হ্যাঁ আমার দু-চারজন দোস্ত এখানেই থাকবে‚ ওদের বলে দিয়েছি ওরা তোমায় যাবার সময় সাহায্য করবে| দরকার পরলে ওদের ডেকে নিও ' কথাগুলো যেতে যেতে বলে বেড়িয়ে গেল| সূর্য এখন মাথার ওপর| বেলা অনেক হয়েছে| এরপর দেরী হয়ে যাবে| বাইরে কাড়া-নাকাড়াওয়ালারা যেন সলিমের জন্যই অপেক্ষা করছিল‚ ওকে দেখামাত্র বাজাতে শুরু করে দিল| বন্ধুরাও তার তালে নেচে উঠল| সলিমের মুখে এবার হাসি ফুটে উঠল‚ নাহ দোস্তরা বেশ ভালো বন্দোবস্ত করেছে| সে ধীর পায়ে নিজের পছন্দের সাদা ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল| ঘোড়াটাকে সাজানো হয়েছে আজ| এক বন্ধু হঠাৎ হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল ঘোড়ার পাশে| সলিম হাসিমুখে ওর পিঠে পা রেখে চড়ে বসল ঘোড়ার পিঠে| হাতের ইশারায় কাছে ডাকল বন্ধুকে| তারপর তাকে নির্দেশ দিল‚ 'সবকো বোলো জলদি করনে কে লিয়ে| দের হো রহা হ্যায়| বাজাওয়ালাদেরও উটের গাড়িতে চড়িয়ে নাও| তাড়াতাড়ি যেতে হবে'‚ বলে সে আর দাঁড়ায় না‚ ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়| মনটা তো ভালো হয়েই আছে কিন্তু যতক্ষণ না ওখানে পৌঁছে সব নিজের চোখে দেখে নিচ্ছে ততক্ষন শান্তি নেই সলিমের | কিন্তু একি? চারিদিক কেমন যেন নিস্তব্ধ‚ কেউ কোথাও নেই!! যা আশঙ্কা মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিলো তাই হলো কি? রাস্তার ওপর সবকটা বাড়ির সদর হাট করে খোলা‚ অথচ বাড়ির ভিতর কেউ নেই| সলিম গলির ভিতর পাগলের মত ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়‚ কিন্তু না, কেউ কোথাও নেই‚ সব ফাঁকা| প্রধানের বাড়ির সামনে এসে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে| খোলা দরজা দিয়ে আঙ্গনে এসে চারপাশ দেখে নেয়| না এখানেও কেউ কোথাও নেই| সব ফাঁকা| প্রতিটা ঘর সে ঘুরে ঘুরে দেখে| সব ঘরে তেলের বাতিগুলো জ্বলছে কিন্তু কেউ কোথাও নেই‚ পুরো গ্রাম যেন রাতারাতি ফাঁকা হয়ে গেছে| রাগে মাথার পগড়ী ছুঁড়ে ফেলে দেয় সে| সলিমের সাথে ধোঁকাদারি!!! বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে এসে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে| 'যে সৈনিকদের এখানে আগের থেকেই পাঠানো হয়েছিল তারা কোথায়? সবাই কে ডাক এখানে |' রাগ আর হতাশা তার প্রতিটা শব্দকে কর্কশ করে দেয়| নিস্তব্ধ গ্রামে গমগম করে শব্দগুলো দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফেরে|ইয়ার-দোস্তদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় যেন| সবাই দৌড়ালো নদীর পাড়ে যেখানে সৈনিকদের শিবির| বাজাওয়ালারা থতমত খেয়ে বাড়িগুলোর দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ে| বাকি বারাতীদেরও একই অবস্থা| হঠাৎই সলিমের খেয়াল হয় যে মন্দিরের সামনেই সে দাঁড়িয়ে আছে| ওপরে তাকিয়ে দেখল মন্দিরের দরজা বন্ধ| হোক না হোক পন্ডিত ওখানে আছেই| এসব নিশ্চয়ই ওর ষড়যন্ত্র| ভীরু পালিওয়ালদের এতবড় সাহস হবে না যে সলিমকে ফাঁকি দেবে| দৌড়ে এক একটা লাফে সিঁড়ির ধাপগুলো পেরিয়ে মন্দিরের দরজায় এক লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলল| যা আন্দাজ করেছে ঠিক তাই‚ পন্ডিত বিগ্রহের সামনে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে| সলিম দাঁড়িয়ে পরে একটু সময়, নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে সে | পণ্ডিত যে কঠিন জিনিস সে ভালো করেই জানে | এখানে যে মাথা ঠান্ডা রেখে কথা বলতে হবে সলিম কে | একটু দূরে রাখা বসার তখতটা টেনে নিয়ে পন্ডিতের পেছনে বসে পরে | পণ্ডিত অনেক আগেই ওর উপস্থিতি টের পেয়েছিলো | এবার উঠে দাঁড়ালো| নিজের আসনটা টেনে সলিমের মুখোমুখি বসলো সে | 'কি চাই এখানে তোমার?' প্রশ্ন করলো সে | ' কি চাই আমি, তুমি তো জানো পণ্ডিত? ওরা কোথায়? ' সলিম কিন্ত শান্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলো | ' ওরা তো চলে গিয়েছে এই গ্রাম ছেড়ে! কেন তোমার লোকেরা তোমাকে বলেনি?' পন্ডিতের কথায় শ্লেষের ছোঁয়া | অনেকক্ষন ধৈর্য ধরে কথা বলেছে সলিম কিন্তু আর পারলো না সে. ' পন্ডিত‚আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না, তোমায় সাবধান করে দিচ্ছি | ঠিক করে বলো কোথায় লুকিয়ে আছে ওরা ' চিৎকার করে বলল সলিম| কিন্তু পন্ডিত একচুলও নড়ল না নিজের আসন থেকে‚ যেমন বসেছিল‚ তেমনটাই বসে রইল| যেন জাগতিক কোনকিছুই পন্ডিতকে আর বিচলিত করছে না| ‘জানতে চাও কোথায় তারা? শোনো তাহলে, ওরা এতক্ষনে তোমাদের রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছে | তুমি চাইলেও ওদের নাগাল পাবে না | আর তুমি নিজে ভালো করেই জানো যে ঐ সব রাজ্যে তোমার যাওয়ার উপায় নেই | ওদের সাথে তোমাদের মহারাওলের সদ্ভাব নেই | আর বিশেষ করে তুমি তো যেতেই পারবে না কারণ তোমার শয়তানির খবর তাদের অজানা নেই | তাই শান্ত হও| আর এখান থেকে চলে যাও|’ পণ্ডিত খুব শান্ত স্বরেই সলিম কে বলল| কিন্তু আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলো না সলিম |সে কি করবে না করবে তা শেখাবে এই দো কৌড়ি কা পণ্ডিত ? 'উঠ শুওর কে অঔলাদ'‚ বলেই উঠে দাঁড়ালো সলিম, সজোরে পন্ডিতের বুকে এক লাথি কষালো | পন্ডিত হুমড়ি খেয়ে পড়ল বিগ্রহের পায়ের সামনে| আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো পন্ডিত| মুখে এক অদ্ভুত হাসি| অসহ্য লাগল সলিমের| মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলে উঠল| সহ্যের একটা সীমা আছে| গায়ের ভিতরটা জ্বলে যচ্ছে‚ সবচেয়ে রাগ হচ্ছে পন্ডিতের মুখেই ঐ বক্র হাসিটা দেখে| হাসিটা যেন সলিমকে ব্যঙ্গ করছে| কঠোর শাস্তি দিতে হবে| সলিম নিজের কোষ থেকে তলোয়ারটা বের করে আমূল বিঁধিয়ে দেয় পন্ডিতের বুকে| কয়েক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পন্ডিত| তা সত্ত্বেও পন্ডিতের ঠোঁটের কোণের সেই বক্র হাসিটা কিছুমাত্র কম হলো না| লোকটা যেন পাগল করে দেবে সলিমকে| তলোয়ারটা পন্ডিতের শরীর থেকে বের করে এনে আবার বসিয়ে দেয় পন্ডিতের বুকে‚ একবার‚ দুবার‚ তিনবার| সলিমের সাদা অচকন পন্ডিতের রক্তে লাল হয়ে যায়| এবার যেন কিছুটা জ্বালা কম হয়| তলোয়ারটা পন্ডিতের শরীর থেকে বের করে পন্ডিতের কাপড়েই মুছে আবার কোমড়ের খাপে পুরে আর দাঁড়ায় না সেখানে‚ মন্দির থেকে সোজা নিচে নেমে আসে সে| নীচে তখন য়ার-বন্ধুরা‚ সাথে আসা রক্ষীরা কেমন যেন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে| সারা অচকন রক্তে লাল হয়ে আছে মুখে হাতে রক্ত | সলিমের এই রূপ ওদের মধ্যে অনেকেই প্রথম দেখছে | একটু দূরে আগের পাঠানো সৈন্যরা বেসুধ হয়ে পড়ে আছে মাটিতে| এবার অবাক হবার পালা সলিমের| 'কি হয়েছে এদের ? এভাবে পড়ে আছে কেন?' জিজ্ঞেস করতেই‚ এক রক্ষী কাঁপা কাঁপা গলায় বলল‚ 'সবাই ঘুমেতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে| কাল দুপুরে এরা লঙ্গর প্রসাদ খেয়েছিলো এই মন্দিরে তারপরই বেসুধ হয় যায় , এদের মধ্যে একজন কোনোরকমে তাই বললো | নড়ার ক্ষমতাও নেই এদের কারও|' বলে রক্ষী কিছুটা পিছিয়ে গেল সলিমের রোষ থেকে বাঁচতে| সলিমের কাছে এবার পুরো ঘটনা পরিষ্কার হয় গেল | ‘এ নিশ্চয় ঐ বঙালী পন্ডিতের বুদ্ধি|'‚ এক লহমায় সে বুঝতে পারলো কার বুদ্ধিতে এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে | ‘তাড়াতাড়ি খোঁজ নাও আমাদের খবরিরা কোথায় আছে ‘ ক্রদ্ধ হয় আদেশ দিল সলিম| আন্দাজ করতে পারছে ঠিক কি ঘটেছে এখানে| সলিমের আদেশ পেয়ে কয়েকজন রক্ষী দৌড়লো খবরীদের বাড়িতে| এক এক করে পাঁচজনকে রক্ষীরা তুলে নিয়ে এল মন্দিরের সামনের চত্বরে| এদের মধ্যে রুকমণির ভাই আর বাপও আছে| কারও কথা বলার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা নেই| কেমন যেন ঘোলাটে শূন্য দৃষ্টি মেলে হাতজোড় করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সলিমের দিকে| অসহ্য লাগে সলিমের| চুলের মুঠি ধরে টেনে তোলে রুকমনির বাপুসা কে | 'অকর্মণ্য বুড়ো, টাকার লোভ তো খুব, গালগল্প শুনিয়ে আমার আর বাপুসার কাছ থেকে তো অনেক টাকা লুটেছিস হরামখোর! যখন সত্যিকারের দরকার পড়লো তখন সব নদারদ?’ রাগে চোয়াল শক্ত হয় যায় সলিমের | নেশাখোরের জাত এরা, দরকার মতো নেশা ঠিক উড়ে যায় এদের | কপালে যে কি আছে তা বোধহয় আন্দাজ করতে রুকমনির বাপুর একটুও সময় লাগল না | হুমড়ি খেয়ে পরে সলিমের পায়ের উপর, সলিমের জুতিটা খুলে নিজের মাথায় উপর রেখে বলে , 'আমাকে যা সজা দেবে দাও মালিক, আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও এবারের মতো | ও তোমার পায়ের জুতি হয়ে থাকবে মালিক', হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে সে | ওর হাত থেকে জুতিটা কেড়ে নিয়ে আবার পায়ে পরে নেয় সলিম | এদের এই কান্না অনেক দেখেছে সে, সব মতলববাজের জাত | 'খতম কর দো‚ ইন নমকহরামো কো, কোনো কাজের না এরা ' এক মুহুর্তও দেরী করে না সলিম রায় শোনাতে| সলিমের রোষ রুকমণির বাপ-ভাইকেও রেয়াত করল না | পেছন ফিরে না তাকিয়ে সে এগিয়ে গেল, সাজা পাওয়া লোকেদের আর্তচিৎকার সলিম কে একচুলও বিচলিত করে না| পন্ডিত কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্যের প্রাণ তখনো বের হতে বুঝি আরও কিছু সময় বাকি| শরীরের যন্ত্রণা তেমন আর বোধ করছেন না| ক্রমাগত রক্তক্ষরণে শরীর প্রায় অবশ| কিন্তু মনে আজ বড় শান্তি‚ বড় নিশ্চয়তা| ঘোলাটে চোখে বিগ্রহকে একবার মাথা তুলে দেখার শেষ চেষ্টা করলেন| সব বড় অস্পষ্ট| পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের অভিশাপ সত্যি হবে পন্ডিতের মৃত্যুর সাথে সাথে| কেউ এই গ্রামে থাকতে পারবে না‚ কেউ না‚ এমনকি তিনি নিজেও না| তাকেও বিদায় নিতে হবে| শেষবারের মত বিগ্রহকে নমন জানালেন পন্ডিত| বিগ্রহের মুখ ক্রমাগত ঝাপসা হতে হতে যেন মিলিয়ে যাচ্ছে| একটু একটু করে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন| সময় প্রায় আগত‚ পরম শান্তি| মনে মনে শেষবারের মত উচ্চারণ করলেন‚ ॐ द्यौः शान्तिरन्तरिक्षं शान्तिः पृथिवी शान्तिरापः शान्तिरोषधयः शान्तिः । वनस्पतयः शान्तिर्विश्वेदेवाः शान्तिर्ब्रह्म शान्तिः सर्वं शान्तिः शान्तिरेव शान्तिः सा मा शान्तिरेधि ॥ ॐ शान्तिः शान्तिः शान्तिः ॥ “সমগ্র ত্রিভুবন শান্তিময় হোক‚ শান্তিময় হোক জল‚ স্থল‚ আকাশ‚ অন্তরীক্ষ‚ শান্তিময় হোক অগ্নি‚ পবন‚ শান্তিময় হোক ঔষধি‚ বনস্পতি‚বন উপবন‚ সকল বিশ্বে জড় চেতনার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক শান্তি ‚ শান্তিময় হোক‚ সমগ্র চরাচরে মানুষ অনুভব করুক শান্তিকে‚ শান্তির মধ্যে খুঁজে পাক মুক্তি| ওঁম শান্তি‚ ওঁম শান্তি‚ ওঁম শান্তি|” ….. ক্রমশ

979

100

শিবাংশু

তোমার মন নাই? কুসুম?

তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে মননশীলতা লাগে। তথ্য নিয়ে কাজ করতে সতর্কতা। গত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তির তুমুল উত্থান এবং মধ্যবিত্ত মানুষের একটা বৃহৎ অংশের পেশা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা, আমাদের অভিনিবেশের দুনিয়ায় বিরাট ফারাক এনে দিয়েছে। বিশ্বের কোনও কিছুই এখন কল্পনা করতে হয়না। নিরন্তর ঘটনার ঘনঘটা টিভি বা নেটের মাধ্যমে শোবার ঘরে ঢুকে পড়েছে। এই বিড়ম্বনা আমাদের অভিনিবেশকে কেন্দ্রিত হতে দেয়না। যা কিছু ঘটছে চারদিকে, তার সব কিছুই যে আমাকে জানতে হবে তার মানে নেই। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় না জানলে পিছিয়ে পড়বে। আত্মবিশ্বাসহীন মানুষের কাছে 'পিছিয়ে পড়ার' চেয়ে বড়ো অভিশাপ আর কিছু নেই। সর্বদা সতর্ক থাকতে থাকতে সার্ভাইভাল ইনস্টিংক্ট অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যায়। গুরু বলেছেন, সৃজনশীলতা উদ্বৃত্তের ফসল। যার জীবনে উদ্বৃত্ত সময় নেই, উদ্বৃত্ত প্রেম নেই, উদ্বৃত্ত আশা নেই, সে কিছু সৃষ্টিও করতে পারেনা। পড়াশোনা করা, গানবাজনায় রুচি রাখা, বাক্সের বাইরের জীবনকে ভালো বাসা, তার জন্য কিছু দিতে হয়। There is always a price tag। খুব কম মানুষই এখন পেশাগত জীবন আর আত্মগত জীবনের মধ্যে ছন্দটি বজায় রাখতে পারেন। সামাজিক জীবন বলতে সোশ্যাল মিডিয়া। জীবনের সার্থকতা-বিপন্নতা মাপা হয় লাইকের সংখ্যায়। সবাই 'আমাকে দেখুন' রোগে মুহ্যমান। Attention span শূন্য। শরীরটাই শুধু 'মানুষে'র রয়ে গেছে। এই জন্যই তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের একটা দারুণ পরিভাষা দিয়েছে, Body shopping। এর মধ্যে 'মননশীলতা' কোথায় ঢুকবে? 'মন'কে নিয়ে একটু ভাবার সময় কজনের কাছে আছে? নিজেদের সংস্কৃতিবান ভাবার বাঙালির একটা অহেতুক শ্লাঘা আছে। গভীর পড়াশোনা বা শিল্পচর্চা চিরকালই মুষ্টিমেয় কিছু লোকই করেন। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সেই সব লোকেদের সংখ্যা এখন বেড়েছে বই কমেনি। তাঁরা কদাপি লাইক সংস্কৃতির অংশ ছিলেন না, এখনও নেই। তাঁদের নিজস্ব সেরিব্রাল দুনিয়া চিরকালই ছিল, এখনও আছে। বুগু-স্মরণজিতের সূচক তাঁদের জন্য নয়। নীহাররঞ্জন রায়ের নাম আজ কজন জানে। আজ কেন? তাঁর নিজের সময়ও নীহাররঞ্জন বলতে লোকে 'গুপ্ত'কেই জানতো। তাতে হয়েছেটা কী? বাঙালিজাতি এখন সংখ্যায় অনেক বেড়েছে। তাঁদের বৃহদংশ বাংলা ভুলে গেছে। অস্তিত্বের যাবতীয় শিকড় উপড়ে ফেলে স্রোতের শ্যাওলা হয়ে গেছে। আর কী চাই? টিকে থাকার জন্য তাঁদের কাছে আর কোনও বিকল্প নেই। অবশ্য কেউ যেন মনে না করেন আমি তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের হেয় করছি। তাঁরা একটা সামাজিক পরিবর্তনের মুখ। তার মধ্যে ভালোমন্দ নেই। সেটা ঘটনা। একটু আগেই একটি সঙ্গীতবিষয়ক ওয়েবপত্রের কর্ণধার আমার কাছে জর্জদার উপর একটি লেখা চাইলেন। তাঁরা সুদূর বিদেশে থেকে সবরকম গানের সঙ্গে বাংলাগানেরও চর্চা চালিয়ে যান। আমি জানতে চাইলুম, কত শব্দের মধ্যে হতে হবে? তিনি জানালেন শব্দসংখ্যার সীমা নেই। আমার ধারণা থেকে বলি, কে পড়বে? এখন বাঙালি একাসনে বসে একশোশব্দের বেশি পড়তে পারেনা। তিনি জানান যাঁরা পড়তেন, তাঁরাই পড়েন এবং তাঁরাই পড়বেন। আমার লেখার উপর তাঁদের আগ্রহ আছে। বিশ্বাস করলুম। এখন যে বইটি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত আছি তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুপাক। প্রকাশককে বলেছি, কে পড়বে এসব বই?এতো খরচ করে তিনি আমার বই প্রকাশ করেন। ব্যবসায় লোকসান হয়ে যাবে। তিনি জানালেন এই কথা আমি আগের বইটি সম্বন্ধেও বলেছিলুম। কিন্তু সে বই নাকি বইমেলার দশদিনে একশো কপির বেশি বিক্রি হয়েছে। প্রবন্ধের বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা নাকি একটা রেকর্ড। হয়তো তার দ্বিতীয় মুদ্রণও হতে পারে। বিশ্বাস করতে হলো। একাধিক অন্য প্রকাশকও যোগাযোগ করেন বই প্রকাশের প্রস্তাব নিয়ে। এটাও তো ঘটনা। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি যাঁরা মননশীল পাঠক বা শ্রোতা, তাঁদের সংখ্যা কমেনি। কমেছে লেখকশিল্পীদের ধৈর্য। তাৎক্ষণিক ফল না পেলে তৎকাল হতাশ হয়ে পড়েন। সমস্যা আমাদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে। অন্য কোথাও নয়।

70

4

মানব

কল্প-গল্প

********** অনেক দিনের পর ********** আড্ডার আর একটা জন্মদিন পেরিয়ে গেল। দেখতে দেখতে দুবছর পেরিয়ে গেল আড্ডায় নিয়মিত না আসতে পারার। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়... তাই কি? সেসব আলোচনা থাক। বরং দুটো গল্প বলি আজ। ১। গরম বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসির সংখ্যা, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও। আমারো হাতে কিছু টাকাপয়সা এল। ভাবলাম একটা মোটরবাইক কিনি। কিন্তু সেদিন যা হল! সুজিতবাবু বছর তিনেক হল বিয়ে করেছেন। বৌ, মা এবং এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। মাইনে চল্লিশ হাজার, ওভার টাইম আছে। ঘরভাড়া আঠারো হাজার, ইলেক্ট্রিসিটি বিল চার হাজার, গরমকালে আরো হাজার দুয়েক বেড়েছে। মাস আনি মাস খাই করে কোনরকমে চলে যায়। সেদিন অফিসে গিয়ে মেলটা খুলেই চমকে উঠলাম। হিউম্যান রিসোর্স থেকে মেল এসেছে যে রাস্তায় মোটরবাইক থেকে রাস্তায় পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে সুজিতবাবুর। তার পরিবারের সাহায্যার্থে সবাই যে যা পারেন সাহায্য করবেন। না এম. এন. সি. এর তরফ থেকে সাহায্য পাওয়া গেলনা কোন। সবাই মিলে চাঁদা তুলে লাখ তিনেক এবং ইন্সিওরেন্স বাবদ লাখ দুয়েক। জমা পাঁচ লাখ। এইটুকু পরিবারে অনেকটাই... তাই কি? ২। দিল্লী মেট্রো। যাচ্ছিলাম জঁ দ্রেজ ও অমর্ত্য সেনের বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে। ভিড় মোটামুটি। মানে যে অনুপাতে দিনের পর দিন এই এলাকার জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে সেই তুলনায় কিছুই না। এক ভদ্রমহিলা উঠলেন। তার পিছু পিছু তার বান্ধবী। একজন অফিস ফেরত ভদ্রলোক বসেছিলেন FOR OLD AND PHYSICALLY CHALLENGED সংরক্ষিত সিটে। তার পাশে একজন বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক। প্রথম ভদ্রমহিলাকে ধরলাম শ্যামা, দ্বিতীয়কে রমা, দুজনেই বছর পঁচিশের হবে আশা করা যায়। কিম্বা তারও কম। শ্যামা উঠেই সিট না পেয়ে প্রচন্ড হতাশাসূচক দীর্ঘশ্বাসে ভরিয়ে তুললেন আশপাশ। তারপর তাঁর নজর গেল সেই বেচারা অফিস ফেরত ভদ্রলোকের দিকে। মহিলার দিকে তাকিয়ে মনে হল একজন বছর ত্রিশের ছেলে কিভাবে বসতে পারে, তাও আবার একজন বরিষ্ঠ নাগরিকের সিটে, যেখানে তাঁর মত একজন বছর পঁচিশের ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন, সেটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছেনা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাল্পনিক শ্যামা বলেই ফেললেন, 'আপ থোড়া উঠকে উধার খাড়াহো যাইয়ে না।' অর্থাৎ ভদ্রলোক উঠে ওনার সামনে দাঁড়াবেন, এতেও তাঁর আপত্তি, তাই সেই জায়গাটাও ঠিক করে দেওয়া হল। বেচারা ভদ্রলোক উঠে গিয়ে নির্ধারিত যায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। যুবক হঠাও এর পর শুরু হল প্রৌঢ় হঠাও আন্দোলন। পাশের ভদ্রলোককেও সেই একই কায়দায় উঠিয়ে দেবার চেষ্টা শুরু হল যাতে তাঁর বান্ধবীকে বসিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয় ভদ্রলোক উঠলেননা। নিতান্ত দোনামনা করে একটু চেপে বসে রমাকে বসার সুযোগ করে দিলেন। বসার পরেই শ্যামা রমার চুল ঠিক করে দিল। তারপর বিভিন্ন কায়দায় রমার রূপের এমন প্রশংসা শুরু করে দিল যে প্রৌঢ় ভদ্রলোক বাধ্য হলেন সেখান থেকে উঠে যেতে। ************************************************************************* আজ এটুকুই। ভালো থাকবেন সবাই।

64

6

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

অ্যালফ্রেড হিচককের ‘দ্যা বার্ডস’ (১৯৬৩) হরর মুভিটির কথা মনে আছে? অনেক ছোটবেলায় মুভিটি দেখার ফলে মনের মধ্যে যে সাংঘাতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ এত বছর পরেও রয়ে গেছে। জীবনে কখনো ভাবিনি যে সেই মুভির শ্যুটিং স্থল বোডেগা বে তে আমরা দুদিনের জন্য ক্যাম্প খাটিয়ে থাকার ভাগ্য হবে! কিন্তু ভাগ্যদেবতা উদার হয়ে সে সৌভাগ্য মঞ্জুর করলেন। তাই শুক্রবারে তল্পী তল্পা গুটিয়ে, আমরা চার পরিবার চললাম স্যান ফ্রান্সসিসকোর মোটামুটি ৬৫ মাইল উত্তরে। যাওয়া এবং ফেরার পথে গোল্ডেন গেট ব্রিজ পড়ল। ব্রিজটি এত বছর ধরে দেখে আসছি কিন্তু মুগ্ধতা একটি বিন্দুও কম হয়না। প্রতিবার অবাক বিস্ময়ে ভাবি, সত্যি! মানুষের কি অদ্ভুত সৃষ্টি! বিকেল বিকেল পৌঁছে তাঁবু খাটিয়ে, রান্নার সরঞ্জাম বের করে রাতের আহারের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। প্রথম আহারের দায়িত্ব ছিল আমাদের কাঁধে। কিমা বিরিয়ানি, রুটি, করলা মশালা আর ঘুঘনি।শেষে কেক। এই ছিল মেনু। যেহেতু প্রথমেই আমার পালা তাই বাড়ি থেকেই রান্না প্রায় করে নিয়ে গেছিলাম। মোটামুটি গরম করলেই কাজ সারা হয়ে যাবার কথা। কিন্তু পড়তে গিয়ে ব্যাপারটা যত সোজা মনে হচ্ছে ক্যাম্প গ্রাউন্ডে রাতের বেলা খাবার গরম করার পদ্ধতিটা এত সোজা নয়। প্রথম কথা ছোট্ট গ্যাসের দুই উনান যুক্ত বার্ণারে একপাশে ডেচকি চড়ালে, অন্যপাশে মিহি কোনো রান্নার পাত্র ছাড়া জায়গা হবেনা। আর আমাদের রান্নার পাত্র বাড়ন্ত। তার মানে হল, একটি পাত্রকেই বার কয়েক ব্যবহার করতে হবে। তাই কিমা বিরিয়ানি গরম করে, ঢেলে রেখে, সেই পাত্র নিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতে লন্ঠন নিয়ে কলতলায় গিয়ে বাসন মেজে আবার তাতে অন্য কিছু গরম করতে হবে। আর এই প্রক্রিয়াটি জলদি হওয়া আবশ্যক কারণ এই সময়ে বোডেগা বে এর তাপমাত্রা দিনে, রাতে প্রায় পনের ডিগ্রির ব্যবধান। তারওপরে সে কি পাগলা ঝোরো হাওয়া। কম্বল ভেদ করে অস্থি মজ্জা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তাই গরম করা খাদ্য, দুই মিনিটেই ঠান্ডা। আমাদের তাঁবু খাটাতে গিয়ে দেখা গেল, যেহেতু অপরাধী তন্ময় হয়ে খেলায় ডুবে ছিলেন, তাই তাঁবুর ওপরের rain-fly বাড়িতে ফেলে রেখে আসা হয়েছে। পরিস্থিতিটা কল্পনা করতে পারছেন? অর্থাৎ কিনা, তাঁবুর ভেতরে শুয়ে কনকনে ঠান্ডা রাতে আপনি চাঁদ-তারা দেখবেন, কুয়াশায় ভিজবেন, এমনকি ইন্দ্র দেবতার দয়া হলে বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়াও বাধাতে পারেন! চিন্তা ক্লিষ্ট মন যখন নানা সম্ভব অসম্ভব কল্পনায় ম্রিয়মান, তখন অপরাধী নিজেই পাপ খন্ডনের উপায় ঠাউরালেন। একটা এয়ার ম্যাটট্রেস আর বেড শিট দিয়ে তাঁবুর মাথায় জালের ছাউনির ওপর বিছিয়ে ভালোভাবেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা গেল। রাতের আহার শেষ করে আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসা হল। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। আগুনের আলোর চারিপাশে আমাদের ছায়ামাখা অবয়ব, তারপর থেকে আলকাতরার ন্য্যায় অন্ধকার শুরু হয়েছে। তাতে মনে হচ্ছে বৃক্ষগুলি যেন সুবৃহৎ ডাইনোসর, ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে। হাওয়ার টানে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলছে, এই এলাম বলে! বাতাসের প্রাবল্যে গাছে গাছে এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে। আর সেই বিশাল প্রকৃতির মধ্যেখানে আমরা, আর আমাদের ঘিরে শুদ্ধ সতেজ পরিবেশ, মুখ তুলে আকাশে চাইলে ঝকঝকে নক্ষত্রখচিত আকাশ। সকলে মিলে অন্তাক্ষরী খেলা শুরু হল। পুরোনো দিনের অনেক ভুলে যাওয়া গান উঠে আসছিল। আর ভেসে আসছিল নিজেদের জীবনের অনেক না বলা কথা। অন্যে কি ভাববে তার তোয়াক্কা না করেই। আমি চুপটি করে বসে ভাবছিলাম, এই আমরাই, শহুরে জীবনে, সামাজিক অবস্থান আর ঋতু কুমারের শাড়ি- জামার অন্তরালে কত অন্য মানুষ। পরের দিন দুই মাইল হাইক করে গেলাম সমুদ্রতটে। অপূর্ব আইস প্ল্যানটের পাশ কাটিয়ে, বালির ওপর দিয়ে সে হাইক কষ্টসাধ্য ছিল। পৌঁছে দেখি, আরে, এ তো এক অতি নি:সঙ্গ সমুদ্র! যেদিকেই দুচোখ যায় কোনো জনপ্রাণী নেই। শুধু তীরময় কঙ্কালসম কতগুলি কাঠের গুঁড়ি পড়ে আছে। আর রাগী সমুদ্র যেন তার ধ্যানভঙ্গের অপরাধে আমাদের গ্রাস করতে ইচ্ছুক! ফোঁস ফোঁস করে সে মৃত্যুশীতল নি:শ্বাস ফেলে আমাদের হাত বাড়িয়ে ডাকছে! দুই দিন আর কোনো কথা নেই শুধু অনুভব আর দুই চোখের দ্বারা রসাস্বাদন! https://youtu.be/19r7ctge2lI কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন- আ.দা

1072

44

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

আবিল প্রথম সাক্ষাতেই রেবা খুব স্পষ্ট করে বুঝে গেছিল। সুকুমারকে ছাড়া তার গতি নেই। তার থেকে কম করে চোদ্দ-পনের বছরের বড় সুকুমার। বাজারে যাদের তিনপুরুষের কাঁসার দোকান। গ্রামের প্রথম পাকাবাড়ি মালিক যারা। একবার ইস্কুলে যাবার পথে নীরবে যে তার সাইকেলের চেন লাগিয়ে দিয়েছিল। চৌরাস্তার মোড়ে দুইহাতে সাইকেলের দুই হ্যান্ডেল ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে অসহায় আবেগে ভিজছিল সে যেদিন। ত্রস্ত চোখে ভরসার কাউকে খুঁজছিল।পাশ দিয়ে রিক্সা, অটো, ছাতায় মুখ ঢেকে সাইকেল আরোহীগণ সাঁই সাঁই করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। টপ টপ করে জল পড়ছিল তার চোখ বেয়ে, তারপর তা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে ইস্কুলের সাদা ব্লাউজের বুক ভিজিয়ে দিয়ে তাকে নীলচে বর্ণে রূপান্তরিত করছিল। কোনো জায়গায় নীল বেশি পড়ায় সে জায়গাগুলোতে গাঢ় রং ধরছিল। অত দু:খের মধ্যেও সে তা লক্ষ্য না করে পারেনি। প্রথম পিরিয়ডে ভূগোল পরীক্ষা ছিল সেদিন। দ্রুত সময় বয়ে যাচ্ছিল। চেনে হাত দিলেও লাগাতে পারবে কিনা নিশ্চিত ছিলনা। সাইকেলটা গড়বড় করছে ক’দিন ধরে। তবে হাত লাগালেই যে নাছোড় কালিময় হয়ে যাবে তার দুই হাতের তালু, ব্যাপারটা সে জানত। তাই ইতস্তত করছিল। বিমল স্যারের তির্যক হাসি চোখে ভাসছিল। গত দুইদিন সেই হাসি ভুত হয়ে ওকে গুলে খাইয়েছে পরীক্ষার যাবতীয় পড়া। স্যার ভাববেন ফেল করার ভয়ে সে ডুব মারল। স্যারের হাসিটা ফিরে ফিরে আসছিল আর বাবার ওপর ভয়ঙ্কর রকমের রাগ বাড়ছিল। তাদের সংসারে কেবল নাই নাই রব। সবকিছুতে জোড়াতালি যতক্ষণনা তা ধ্বসে পড়ে। মায়ের তালিমারা শাড়ি, বাবার লড়ঝড়ে টেম্পো আর তার বারে বারে চেন পড়ে যাওয়া জংধরা সাইকেল। খুব লজ্জা লাগে ইস্কুলে নিয়ে যেতে। চোখের আড়ালে মাঠের কোণে জিগা গাছের গুঁড়ির আড়ালে চেন দিয়ে বেঁধে রাখে। না বাঁধলেও কেউ নিতনা নিশ্চিত। কে দায়ী তাদের এই অবস্থার জন্য? বাবাই তো। সরকারী অফিসের পিয়নের নিশ্চিন্ত চাকরি ছেড়ে কেন যে বাবা ব্যবসা করার মোহে মাতলো? আর হ্যাঁ, মাও দায়ী। কেন মা বাবাকে নিষেধ করল ন! মা মানা করলে বাবা কক্ষনো সর্বস্ব পণ করে প্রায় নি:স্ব হতনা। রেবারা এক পুরুষের গরীব। তাই গরিবিয়ানা তার রপ্ত হয়নি এখনো। মনে মনে কিছুতেই নিজেকে গরিব বলে ভাবতে পারেনা সে। খুব মনখারাপের দিনে ইঁট দিয়ে উঁচু করা তার আর মায়ের তক্তপোষের নীচে রাখা লোহার ট্রাঙ্কটা খুলে বসে। জং ধরা ডালা খুলতেই নিমপাতার চেনা কটু গন্ধটা নাকে ঝাপটা দেয় আর ভেতরে উঁকি দিলেই সুখের দিনের কোলাজ ছড়ানো দেখে। তার অন্নপ্রাশনের কুট্টি সিল্কের জামা, রূপোর থালা-বাটি-গ্লাস । মায়ের বিয়ের ভারী মেরুন বেনারসী, হাতের চূড়। বাবার গিলে করা মিহি ধুতি-পাঞ্জাবি, সোনার বোতাম। হলদে হয়ে যাওয়া অতীতের দুর্লভ কিছু মুহূর্ত। চরম দুর্দশার দিনেও মা যা বাঁচিয়ে রেখেছে। বাকি অনেক কিছু আবার তেমন হারিয়েও গেছে। যেমন চোখ বুজলেই সে আঘ্রাণ পায় টগবগ করে ফুটতে থাকা আতপ চালের ভাতের। শুনতে পায় মায়ের খিলখিলে হাসি, দেখতে পায় রোদের থেকেও চকমকে বাবার দুই চোখ। বাবা তাকে শূন্যে ছুঁড়ে আবার বুকে লুফে নিচ্ছে, তার ধুকপুকে বুক, দুরুদুরু দৃষ্টি শুধুই বাবার চোখের মনি দুটিতে নিবদ্ধ। একবার আকাশে থেকে আবার পরক্ষণেই বাবার দুইহাতের আবেষ্টনের মধ্যে থেকে। সেদিনের সেই একলা ভেজার দিনে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল রেবা। কিছু করেই হোক এই জীবন থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধুঁকে ধুঁকে, খুঁটে খেয়ে বেঁচে থাকার জীবন সে চায়না। তার অনেক আশা। অনেক স্বপ্ন। আর আশ্চর্যজনকভাবে ঠি ক সেই মুহূর্তেই বড় বড় পা ফেলে সুকুমার এগিয়ে এসেছিল। একটি শব্দও খরচা না করে একপলক দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে উবু হয়ে বসে অতীব দক্ষতায় সাইকেলের চেন তুলে দিয়ে বাঁ হাতে সাইকেলটাকে শূন্যে উঠিয়ে ডান হাতে প্যাডেলটাকে আগেপিছে করে চাকার ঘূর্ণন পরখ করে দেখেছিল একবার। তারপর সাইকেলটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাজারের দিকে চলে গেছিল। পুরো ব্যাপারটা এমন খণ্ড মুহূর্তের নিরিখে ঘটেছিল রেবা কিছু বলেকয়ে উঠতে পারেনি। ধ্যানভঙ্গ ঘটতেই অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে প্রাণপনে প্যাডেল করে ইস্কুলে পৌঁছেছিল সে। সকলে তখন মাথা গুঁজে লিখতে শুরু করে দিয়েছে। স্যারের থেকে সাদা কাগজ নিয়ে ঝড়ের গতিতে পাতার পর পাতা ভরিয়ে তুলেছিল। আশা ছিল ক্লাসের প্রথম হওয়া গীতাকে একবারের জন্য হলেও টপকে যাবে। খাতা বেরোতে দেখা গেল তবুও সে তিন নম্বর পিছিয়ে আছে। না, গীতার কাছে হেরে যাওয়া তাকে হতাশ করেনি। মনের মধ্যে ‌অন্য যুদ্ধে জেতার গভীর আকাঙ্খা জন্ম নিয়েছে ততদিনে। পরীক্ষা বা পরীক্ষার নম্বর সেখানে তুচ্ছ। বৃষ্টি স্নাত সেইদিনের মুহূর্তগুলিকে দিনের মধ্যে হাজারবার মনের পর্দায় ফুটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রোজ দেখে সে। অনায়াসে সাইকেলের ভার তুলে নেওয়া সুকুমারের ফুলে ওঠা সুঠাম বাহু তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। লোকটার কালিভরা হাতের খড়খড়ে তালু দুটি গালে ঘষতে মন চায়। কোনদিন একটিও কথা বলেনি তারা, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড়, বিবাহিত, এক মেয়ের বাবা সুকুমারকে সেদিনই সে মনপ্রাণ দিয়ে বসেছে। জীবন যুদ্ধে সে এমন মানুষই সঙ্গ কামনা করে, যে এক পলকে তার সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দেবে। তার সংসারেও সুগন্ধ ছড়াবে, আতপ চালের ভাত। (২) ব্যাপারটা অত সহজ ছিলনা। সন্ধ্যাকে সে চিনত। বাজারে মন্দিরে কখনো সখনও মুখোমুখে পড়ে গেলে দুই একটা আলগা কথার বিনিময় ঘটত। মা সঙ্গে থাকলে মায়ের সাথেই বেশি। হয়ত বয়সের তারতম্যের কারণে দুই পক্ষই ঘনিষ্ঠতার কোনো আগ্রহ দেখায়নি এতদিন। এবার মাকে দিয়ে সে বাড়ির শীতলা পুজোয় সন্ধ্যাকে আমন্ত্রণ জানাল। মায়ের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে খুব স্বাভাবিক মুখে আগে থেকে ভেবে রাখা গল্প শোনালো। -ভাবতাছি সিলাই পরীক্ষার কুরুশের কাজডি সন্ধ্যাদির থাইক্যা শিইখ্যা নিমু। আরো মাস তিনেক লেগেছিল প্রথমবারের মত সুকুমারের দোরগোড়ায় পৌঁছতে। সতৃষ্ণ নয়নে যতটুকু নজরে আসে, বাড়ির প্রতিটি কোণা ইতিউতি গিলে খাচ্ছিল সে। ফুলকাটা বিছানার চাদর, রান্নাঘরের তাকে ধুয়ে রাখা ঝকঝকে কাঁসার থালা, গ্লাস, আলনায় পরিপাটি করে ঝোলানো শাড়ি, ব্লাউজ, খানদুয়েক শার্ট, কোনোটাই অচেনা ছিলনা তার কাছে। এ তো তারই সংসার। বরং সন্ধ্যা একেবারে বেমানান এখানে। তার সংসারে জবরদস্তি ঢুকে পড়া কোনো আগন্তুক যেন। সন্ধ্যাদি খুব মন দিয়ে টেবিলের ঢাকনা বানানো শেখাচ্ছিল। শেখাতে শেখাতে একবার উঠে রান্নাঘরে গেল ডালে সম্বার দিতে। চকিতে সে আলনার নীচে ধোয়ার জন্য ফেলে রাখা জামা কাপড়ের ভেতর থেকে রুমালটা তুলে ব্যাগে ভরেছিল। তিন বছরের লাবু নানা অর্থহীন শব্দসহ একমনে পাশে বসে পুতুল খেলছিল। জ্যান্ত পুতুলের মত মেয়েটাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সারাজীবনের মত সে বধির এবং শব্দহীনা। মা একবার বলেছিল যে ওর জন্মের পর থেকেই নাকি সন্ধ্যাদির পুজোআর্চা ঈশ্বরপ্রীতি বেড়ে গেছে। শোবার ঘরে মাদুর পেতে পাশাপাশি বসেছিল ওরা। এত কাছে যে সন্ধ্যাদির গা থেকে লাইফবয় সাবান আর চুল থেকে রিঠা ঘষার বুনো গন্ধ খুব নিবিড়ভাবে পাচ্ছিল। ওর সিঁথির চওড়া করে টানা জ্বলজ্বলে সিঁদুর, ছোট্ট কপাল জুড়ে পূর্ণিমার রাতের মস্ত চাঁদ চোখে জ্বালা ধরাচ্ছিল। খুব সুন্দর একটা খলসে রঙের জমির ওপর চওড়া গোলাপি পাড় তাঁতের শাড়ি পরেছিল সন্ধ্যাদি। আয়নাতে পাশাপাশি তাদের প্রতিবিম্বের দিকে রেবার চোখ গেল। এ বাড়িতে আসছে বলে মায়ের সবচেয়ে সুন্দর ছাপা শাড়িটা পরে এসেছে সে। নারকেল তেল ঘষে ঘষে রুক্ষ চুলগুলিকে কলাবিনুনিতে বেঁধেছে। চানের পরে সর্ষের তেল ডলেছে সারা অঙ্গে। বিকেলের সূর্যের আলো তার মসৃণ ত্বকে পড়ে যেন পিছনে যাচ্ছে। তবুও ছোট্টখাট্ট সন্ধ্যাদির পাশে তাকে কত নীরস দেখাচ্ছ! -ওই মাইয়্যা, নিজেরেই দেখবি নাকি কিছু শিইখ্যা নিবি? সন্ধ্যাদি আলতো করে তার পিঠে থাবড়া দেয়। তর দাদায় আইল্যো বইলা। পাশের ঘর থেকে চির অসুস্থ দয়াময়ীর ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে, বৌমা, অ মা....। সন্ধ্যাদি ওঘরে যেতে সেলাই পত্র গুটিয়ে লাবুর পাশে থেবড়ে বসে রেবা। লাবু অবিশ্রাম বকে চলেছে, লা লা ক ল কলল...। দুই ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে তার জামার বুক ভিজিয়ে দিয়েছে। এক ঝটকায় পুতুলটা টেনে নেয় রেবা। মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে লাবু জান্তব স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে। আমূল কেঁপে উঠে পুতুলটা তাড়াতাড়ি তার হাতে ধরিয়ে চটপট নিজের জায়গায় ফিরে আসে সে। -কি হইছে, চাঁদ? সন্ধ্যাদি ছুটে আসে। -কিচ্ছু না সন্ধ্যাদি, পুতুলডা পইড়া গেছিল। -ওইটাই ওর জগত বুঝলি নাকি। ওর বাবায় আইন্যা দিছিল,অতটুকখানি ছিল তহন! -কে কান্দায় রে আমার মাইয়্যাডারে? তার মায়ে নাকি....বলতে বলতে ঘরে ঢোকে সুকুমার। তাকে দেখে থমকে যায়। বলে, প্রভাত কাকার মাইয়্যা না? কি নাম তর? -রেবা। -হুঁ, সুকুমার তার মেয়ের দিকে মন দেয়। বউকে বলে, কি দিবা চটপট দাও দেহি।দুকান ছাইড়্যা আইছি। রেবাকে বলে, কেমন আছেরে প্রভাত মেসো। অনেকদিন দেহা হয় নাই। রেবা কথা বলে আর দেখে। ঘন কালো চুল, মোটা গোঁফ, পুরু কালো ঠোঁট, বাঁ চোখের ওপরে কাটার দাগ। সারা শরীরে সে মাতন টের পায়! খুব ইচ্ছে করে ওই কাটা দাগটায় আঙুল ছোঁয়ায়। প্রচন্ড গরম লেগে হঠাৎ হাঁসফাস করে ওঠে সে। বলে, যাই এহন, সন্ধ্যাদি। পরে আসুমনে। -আইচ্ছা। দশডা চেইন দিয়া পাপড়ি বানাইয়্যা আনিছ। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে ঝটপট উঠে দাঁড়ায় রেবা। ভয় হয় তার বুকের ধুকধুক সন্ধ্যাদি শুনে ফেলবে। ঘরের বাইরে পা দিয়ে শুনতে পায় সুকুমার বলছে, খুশির বিয়াতে হ্যারে দেখছিলাম। কয় বছরে বেশ ডাঙ্গর হইছে তো। উত্তরে সন্ধ্যাদি কি বলে আর শোনা হয়না। সে সন্তর্পণে ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে মুঠোতে শক্ত করে চেপে নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেয় তারপর সেটাকে ব্লাউজের ভিতরে বুকে গুঁজে রাখে। (৩) এরপরে দেখা হওয়াটা হঠাৎই খুব ঘন ঘন ঘটতে লাগল। আর হবে নাই বা কেন বাজারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে রেবা। সুকুমারের দোকান পাকা বাজারে। সবজিপাতি কিনতে সেখানে যাওয়ার দরকার পড়েনা। তবুও রেবা যায়। মাকে বলে, পাকা বাজারে সবজি কত সতেজ। দামডাও সরস। চিন্তা কি তোমার? আমি সাইকেল লগে দুইমিনিটে নিইয়্যা আসুমনে। দুই মিনিটে যদিও হয়না। এটা ওটা দরাদরি করে দেখে বেড়াবার ফাঁকে সে সুকুমারের দোকানের আশেপাশে ঘুরঘুর করে যতক্ষণ না তাকে দেখা যায়। মুখোমুখি পড়ে গেলেই মিষ্টি হেসে আলাপ জমায়। দুদিন সুকুমার তাকে ডেকে দোকানে বসিয়েছিল। একদিন শালপাতায় মোড়া তার ভাগের মিষ্টি খাইয়েছিল জোর করে। আর একদিন বাজারে কার থেকে পাওনা পয়সা আনতে গেছিল তার ওপরে দোকানের ভার দিয়ে। সে দিন নিজের সৌভাগ্যে বিশ্বাস হচ্ছিল না তার! সুকুমারের গদিতে বসে মনে হচ্ছিল তার থেকে সুখী কেউ নেই এই ধরাধামে। সন্ধ্যাদির কোনোদিন এমন ভাগ্য হবেনা! সেদিন খুব দেরী হয়ে গেছিল। মা শুধু মারতে বাকি রেখেছিল। বাবাকে ডেকে বলছিল, মাইয়্যাডার পা বড় বাড়ছে। কাডনের দরকার। দিনরাত টো টো কইরা ঘুইরা বেড়ায়। বাবাও রেগে আগুন হয়ে তাকে দুদশ কথা শুনিয়ে দিল। মনে মনে রাগে ফুঁসছিল রেবা, মনে পড়ল ভাবার্থ লিখতে হয়েছিল ইস্কুলে, “ভাত দেবার মুরোদ নেই কিল দেবার গোঁসাই।” দুই একদিন সমঝে চললো সে, এক সপ্তাহ পার হল না পাকা বাজার তাকে নেশার মত ডাকতে লাগল। আজকে আর বাজার করতে নয় মাকে বললো বিনীর বাড়ি যাচ্ছে। কয়েকদিন মুখ গোমড়া করে বাড়িতে বসে ছিল তাই মা হয়ত একটু নরম পড়ে গেছিল। বললো, সন্ধ্যা লাগনের আগ দিয়া ঘরে ঢুকস। এদিক ওদিক না ঘুরে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে সোজা গিয়ে সুকুমারের দোকানে ঢুকলো সে। মুখ নিচু করে হিসাবের খাতায় কিছু লিখছিল সুকুমার মুখ তুলে তাকে দেখেই চেহারায় যেন লক্ষ প্রদীপ জ্বলে উঠল, কিরে, কই ছিলি? এতদিন আইছস না যে এদিকপানে? মাথা নামিয়ে বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে সিমেন্টের মেঝেতে আঁচড় কাটছিল রেবা। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। গদি থেকে নেমে কাছে এসে দাঁড়ালো সুকুমার। কিরে, হইলডা কি তর? তারপর অবাক বিস্মিয়ে গালে আঙুল ছুঁয়ে বললো, এই পাগলি, কান্দোস ক্যান? আর নিজেকে সামলাতে পারলনা রেবা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো, আমি আর পারতেছি না। আপনি আমারে দয়া করেন। সুকুমারের খসখসে হাত তার গাল, তারপর পিঠ ছুঁয়ে থমকে দাঁড়ালো। যেমনটা সে বহুবার কল্পনায় দেখেছে। এই পাগলি, ক্ষ্যাপার মত কথা কইছ না। মাথা ঠান্ডা কর। তর বয়স অনেক কম। তর সামনে জীবন পইরা আছে। আমার ঘরে বউ, মাইয়্যা। লোকে আমারে থুতু দিব। -আপনি কি চান হেইডা কন, লোকের কথায় আমার কাম নাই। -আমি কি চাই জানিনা রে। তরে ভালোলাগে, তর কথা মনে করতাছি গত আট দিন ধইরা। কিন্তু সন্ধ্যারে আমি ছাড়তে পারুম না। ওর তিনকুলে কেও নাই। -ছাড়তে কে কইছে। একসাথেও তো থাকন যায়। -দূর বোকা মাইয়্যা। ভুত চাপছে তর মাথায়। যা, বাড়ি যাইয়্যা মাথায় জল দিয়া থাবড় দে। রেবা মাথা তুলে চোখে চোখ রাখল এবার। অভিমানে গাল ফুলে উঠেছে। সুকুমার হাত ধরতে গেলে ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দিল। আর আসুম না আমি। থাকেন আপনের বউ বাচ্চা লইয়া। আড় পাড়া থাইক্যা সম্বন্ধ আইছে, বাবায় বিয়া দিয়া দিব অঘ্রাণে। সুকুমারের চোখ নিষ্প্রভ দেখায়। -আড়পাড়ার কেডা? সামন্তগো বাড়ি নাকি? -তাইলে আপনার কি? মিথ্যা কথা ধরা পড়ে যাবার ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে রেবা। সেই সঙ্গে খুশি হয় ভেবে ওষুধে কাজ হয়েছে। -না, আমার আর কি হইব? ম্রিয়মাণ হয়ে বলে সুকুমার। এবারে কাছ ঘেঁষে আসে রেবা। এতটাই কাছে যে দুজনের নি:শ্বাস দুজনকে ছুঁয়ে যায়। সুকুমার কেমন বিচলিত হয়ে পড়ে। ঝুঁকে পড়ে তার ওপরে। -এখন ক্যান? যান গিয়া। রেবা চোখ পাকায়। নির্ভুল ভাবে বুঝতে পারে মোম গলছে। দুই হাতে ঠেলে সরিয়ে দেয় সুকুমারকে। তারপর হাসতে হাসতে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, পালকি লইয়া আইবেন, তবেই নাগলে পাইবেন আমারে। (৪) পরের কয়েকটা দিন খুব খুশিমনে ইস্কুল আর বাড়ি করেই কাটায় রেবা। বলার আগেই মায়ের হাতে হাতে সংসারের কাজ করে। টেম্পোতে চালানের ভারী জেনারেটরগুলি ওঠাতে বাবাকে সাহায্য করে। বাজারে যাবার, কোনো বন্ধুর বাড়ি যাবার বা বাড়ির বাইরে বেরোবার কোনোরকম ফিকির খোঁজেনা। অবসর সময়ে বইখাতা খুলে গভীরভাবে কিছু ভাবে। মা খুব খুশি হয়। মেয়েটার পাড়াবেড়ানো স্বভাব বন্ধ হয়েছে। পড়াশোনায় মন লেগেছে। পরশু কালি মন্দিরে সন্ধ্যার সাথে দেখা হতে সেও বললো, কাকি, রেবার তো দেহা পাওয়াই ভার হইছে। সেলাই পরীক্ষা হইল কেমন? মেয়েকে সে কথা বলাতে হুঁ হা করে কাটিয়ে দিল। স্কুল ফাইনালটা দিলেই বিয়ে দিয়ে দেবে। যুগটা ভালো নয়। মেয়েটার শরীর বাড়ন্ত।গতরে সতেরো বছরের অনেক বেশি লাগে। চেনা অচেনা সকলে ডেকে জানতে চায়, মাইয়্যারে বিয়া দিবানা? কিছুদিন পরে রেবা একা বাড়িতে। বাবা মা জয়রাম ঘাটে মাসির বাড়ি গেছে। মাসতোতো দিদিকে দেখতে আসবে। রেবারও যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সকাল থেকে প্রচন্ড পেটব্যথা শুরু হয়ে গেল তার। মা তাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। সে জোর করে পাঠালো। শুইয়্যাই তো থাকুম, তুমি থাইক্যা কি করবা। বাবা-মা বেরিয়ে যাবার পরে আরো কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইলো। তারপর ভর দুপুরে তক্তপোষ ছেড়ে উঠলো। এতক্ষণে সুকুমার দোকানে ফিরে গিয়েছে। দয়াময়ী আর লাবুকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো শেষ করে সন্ধ্যাদি নিজের কাজে ব্যস্ত। একপা একপা করে উঠোনে বেরিয়ে এল সে। তার ভাবলেশহীন মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে সকাল থেকে সে কেমন বেদনায় কাতরাচ্ছিল। বাইরে বেরিয়ে সদরে শিকল তুলে আঁচল দিয়ে মাথা মুখ ভালো করে ঢেকে নিল। দুপুরের চিতাকাঠের মত খাঁ খাঁ আগুন রোদে চরাচরে ফেটে পড়েছে। জন-মনিষ্যি তো দূরস্থান একটা কাক-পক্ষীও দেখা যায়না। চারিদিক দেখে আলপথ নেওয়াই মনস্থ করে। একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছবে। প্রচন্ড গরমে মাথার তালু ফেটে যাচ্ছে, চোখে অন্ধকার দেখছে। পায়ের নীচে যেন জলন্ত অঙ্গার। তবুও কোন জেদের ভরে তার পা যেন তাকে টেনে নিয়ে চলেছে। মিনিট পাঁচেক পরে ভেজানো সদর দরজা ঠেলে উঠোনে পা দিল। কুয়োতলায় অ্যাসবেসটারের ছাউনির নীচে গলদঘর্ম হয়ে সন্ধ্যাদি বেডকাভার ধমাস ধমাস শব্দে কেচে চলেছে। সর্বাঙ্গ জলে সাবানে মাখামাখি। উঠোনে লাবু পুতুল নিয়ে খেলা করছে। তাকে দেখে সন্ধ্যাদির হাসি ফুটলো মুখে, অাইছস। লাবুরে একটু শুইয়া দিয়া আইবি, মনা? শোয়াইয়া চুষিকাঠিখান মুখে গুঁইজ্যা দিস। ঘুমাইয়্যা পরবোনে। আমার দেরী ‌হইব। শাউরি বিছানায় মুইত্যা থুইছে। চুপচাপ লাবুকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকলো রেবা। ওকে মেঝেতে পাতা মাদুরে শুইয়ে চুষিকাঠি মুখে ঢুকিয়ে দিল। তারপর আস্তে আস্তে ওর পিঠে চাপড় দিতে লাগল। মুখের কাছে মুখ নিয়ে রেবা ওকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছিল। ভুরুজোড়া আর চোখ একেবারে বাবার মত, ঠোঁটটা মায়ের মত পাতলা। লাবু কখনো কারুর চোখে চোখ রাখেনা। শুয়ে পুতুলটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। ধীরে ধীরে তার চোখ বুজে এল। পুতুলটা হাত থেকে খসে পড়ল। ওর পাশ থেকে উঠে বিছানায় ‌উঠে অল্পক্ষণ শুলো সে। তারপরে আলনা থেকে সুকুমারের জামাটা নিয়ে মুখে চেপে ধরল। মনমাতানো এক বন্য গন্ধ তাতে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো রেবার। জামাটা গুছিয়ে রেখে আয়নার সামনে এসে সুকুমারের ছোট্ট চিরুনিটা দিয়ে সিঁথির পাশদুটো আঁচড়ে নিল। সিঁদুরের কৌটো খুলে কপালে একটা টি প দিল। তারপর সন্ধ্যাদির সামনে কুয়োতলায় এসে দাঁড়ালো। সন্ধ্যায়দি মুখ তুলে কিছু বলতে গিয়ে থমকে গেল। কপালে কি লাগাইছস? -সিন্দুর। -ক্যান? কুয়োর চারিপাশের বাঁধানো চাতলে পা তুলে বসলো রেবা। -সুকুমারদা তোমারে কিছু বলে নাই? -কি বলবো? রেবা মুখ টিপে টিপে হাসতে থাকে। -আরে ছেমড়ি, বলনের আছেডা কি? কইবি তো। রেবা তবুও ফুলে ফুলে হাসতে থাকে। রাগে রক্তবর্ণ হয়ে উঠে দাঁড়ায় সন্ধ্যা। থাবা দিয়ে রেবার একটা বেণি টেনে নিজের কাছে আনে তারপর মুখঝামটা দিয়ে বলে, এক ঠেকনা দিয়া দাঁতকটি ফ্যালাইয়া দিমু। মাথায় রক্ত লাফিয়ে উঠলো রেবার। একলাফে চাতাল থেকে নেমে সজোরে পাশের দিকে এক ধাক্কা দিল সন্ধ্যাদিকে। পালকসম শীর্ণ শরীরে সেই বেগ প্রতিরোধ করতে পারল না। রেবা কিছু বোঝার আগেই সন্ধ্যাদি কুয়োর অন্ধকারে তলিয়ে গেল। ঝপাং করে শব্দ হতেই সম্বিত ফিরে পেল সে। কালো জলে প্রবল একটা আলোড়ন উঠলো কয়েক মুহূর্ত। ভিতরে মুখ বাড়িয়ে আকুলভাবে সে ডাকল, সন্ধ্যাদি। কোনো সাড়া নেই। মিনিটখানেক চুপ করে বুকের ধুকধুকি শান্ত হলে কুয়োর জলে ফেলে রাখা দড়ি বাঁধা বালতিটা টেনে চাতালে উঠিয়ে রাখল। আরো একবার চাপাগলায় ডাকলো, সন্ধ্যাদি…। কুয়োর গভীর কালো জল তখনো নি:স্তব্ধ। মৃদু হেসে বালতি থেকে সন্ধ্যাদির শাড়ির অংশ উঠিয়ে কপালের থেকে সিঁদুরের চিহ্নটা ঘষে মুছে ফেললো সে, তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ির পথ ধরল। কোণার ঘর থেকে তখন দয়াময়ী একঘেয়ে সুরে ডেকে চলেছেন, বৌমা, অ বৌমা, বৌমা, অ বৌমা…। ______________________________________________ কৃতজ্ঞতা স্বীকার: শাহিন সুলতানা

1926

151

সৃজিতা

জন্মদিনের উপহার

আজ আড্ডার জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে অভিনন্দন জানানো ছাড়াও কিছু তো লেখা উচিত; এই ভেবে কাল রাতে লিখতে বসলাম। বসলাম বললে ভুল হবে, কারণ লেখার কাজটা আমি শুয়ে শুয়ে করছিলাম। এমনিতেই খেলা দেখে শুতে দেরী হয়ে গেছে। শুয়ে শুয়ে ভাবছি কি লেখা যায়। গত বছরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত বছর এই সময় আমি আড্ডায় এসেছিলাম। জন্মদিন উপলক্ষে ভূতের গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। ফেসবুক মারফত সেই খবর জানতে পারি। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই এই পাতায় আসা। তার আগে কোনো আইডিয়া ছিল না আমার যে এরকম একটা পাতা আছে। গল্প ভালো লিখতে পারিনি কিন্তু এই পাতা আমার মন টেনেছিল। রয়ে গেলাম সদস্য হয়ে। একবছর কেটে গেল। তাই ভাবলাম একটা ভুতের গল্প লিখি, আগেরবার ভালো লিখতে পারিনি। কিন্তু লিখবো বললেই তো আর লেখা যায় না। গল্পের একটা বিষয়বস্তু থাকা চাই, যেটা গল্পের আকারে সাজাতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ কে যেন জোরে ধাক্কা দিল। ঘুম ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। খাটের সামনে বিশাল একটা পর্দার মত কিছু আছে, অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, কে! কে ওখানে? ----আমি আড্ডা। -----আড্ডা কারো নাম হয় নাকি! সবাই তো আড্ডা মারে। -----আমি বাংলা আড্ডা। আড্ডা ঘরের সদস্য হয়ে আমাকে চিনতে পারছো না! -----ও তুমি। কিন্তু তুমি এরকম আকার ধারণ করেছ কেন? ভূতের মতো! ------সদস্যরা যদি আমাকে ভুলে যায় তাহলে আমার মৃত্যু ঘটবে। আর আমি ভূত হয়ে যাব। তাই তো সদস্যদের কাছে আমার অনুরোধ আমাকে বাঁচাও। ------অ্যাডমিনদের কাছে যাও। পুরোনো সদস্যরা থাকতে আমার মতো নতুনের কাছে কেন! ------নতুন বলে কি কোন দায়িত্ব নেই! যখন আড্ডায় প্রথম এসেছিলে সবাই আপন করে নিয়ে ছিল। এখন অন্যদের সব দায় চাপিয়ে নিজে সরে যেতে চাইছো! পুরোনোদের সাথে নতুনরা দায়িত্ব না নিলে পাতা এগোবে না। ------এটা তো ভেবে দেখিনি! কথা দিচ্ছি সবাই মিলে বাংলা আড্ডা কে এগিয়ে নিয়ে যাব। ছায়াটা মিলিয়ে গেল। জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। একটা নতুন দিনের শুরু হল। আড্ডা তিন পেরিয়ে চারে পা রাখলো। এইভাবে এগিয়ে চলবে। আড্ডাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখবোই।।

76

12

দীপঙ্কর বসু

গো হারা

মকবুল মিয়াঁর গরু হারিয়েছে । শান্তশিষ্ট গরুটা ভারি আদরের ছিল মকবুল মিয়াঁর ।গরুর কপালে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি সাদা দাগ দেখে নাম রেখেছিল চাঁদকপালি ।আজ তিনদিন হতে চলল খোঁজ নেই চাঁদদকপালির । আর পাঁচটা দিনের মতই পরশুদিন খুকির মা অর্থাৎ মকবুলের বিবি ,সকালে গরুটাকে নিয়ে গিয়ে বাড়ির অদূরে খিড়কি পুকুরের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় খুঁটিতে বেঁধে রেখে এসেছিল ।ওখানেই গরুটা আপন মনে খুঁটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘাস পাতা খায় ,আবার মাঝে মাঝে গাছতলায় শুয়েবসে জাবর কাটে সারাটা দিন । তারপর বেলা পড়ে এলে খুকির মা ঘরের কাজকর্ম সেরে গরুটাকে ফিরিয়ে আনে ঘরে।কিন্তু পরশু বিকেলে গরু আনতে গিয়ে খুকির মা দেখে গরুটা গাছতলায় নেই ।কোথায় গেল সে ! আসেপাশে কোথাও তার চিহ্নমাত্র নেই ।ছুটতে ছুটতে বাড়ি এসে খুকির মা মকবুলকে খবরটা দেয় – চাঁদকপালিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা । পাড়াপড়শী কেউ বলতে পারলনা কিছুই ঘরের মাটির দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে আকাশপাতাল ভাবছিল মকবুল কি হল গরুটার কোথায় গেল সে !মকবুলের ভাবনায় বাধা পড়ল ।রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে গিয়ে মকবুলকে অমন অবস্থায় বসে থাকতে দেখে সাইকেল থামিয়ে মেহের আলি সামনে এসে দাঁড়ায় মকবুলের । “কি হল মিয়াঁ ,অমন হতভম্ব হয়ে বসে বসে কি অত ভাবছ ?” মকবুলএর মুখে গোটা বৃত্তান্ত শুনে গম্ভীর হয়ে যায় মেহের আলি । স্বগতোক্তি করার মত চাপা গলায় বলে ওঠে “হুমমম” তারপর একটু চিন্তা করে নিয়ে মকবুলের কাছে জানতে চায় “তা মিয়াঁ ,সব জায়গায় ত খুঁজে দেখলে কিন্তু একবারটি ইয়াকুব ভাই এর গদিতে খোঁজ নিয়েছ কি ? অই যে গ কালিতলার ইয়াকুব বালচাকা র গদিতে গ” ইয়াকুব বালাচাকা নামটা কানে যেতেই চমকে ওঠে মকবুল ।তাই তো ,ইয়াকুব বালাচাকার কথাটা তার মাথায় আসেনি তো !! অথচ গ্রামের আর সবার মতই মকবুলও জানে তেজারতি কারবার ছাড়াও ইয়াকুব বালাচাকার একটা চোরা কারবারের কথাও লোকের মুখে মুখে ফেরে ।কারবারটা আর কিছু নয় – সহজ কথায় গরুচুরি। তার চাঁদকপালির মতই গ্রামের এক আধটা গরু মাঠে ঘাটে চরতে চরতে হঠাৎ ই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়ে ঠাঁই পায় ইয়াকুবের কোনও এক গোপন খোঁয়াড়ে ।তারপর লোকমুখে কানাঘুষোয় সে খবর ঠিক পৌঁছে যায় গরুর মালিকের কাছে ।তার গরু ইয়াকুব ভাই এর হেপাজতে নিরাপদেই আছে ।অনতিবিলম্বে ইয়াকুব ভাইয়ের দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ বাবদ টাকা মিটিয়ে দিয়ে মালিক যেন নিজের গরু ফিরিয়ে নিয়ে আসে ।নচেৎ......। সে পরিণামের কথা মাথায় না আনাই ভাল । সেই হারিয়ে যাওয়া গরু হয় সুন্দরবনের খালবিল নদীনালা পেরিয়ে ভিন দেশে পাচার হবে নয় জবাই হবে । লোকে বলে মানুষ তো নয় ইয়াকুব বালাচাকা –সাক্ষাত নরপিশাচ একটা ।তা, লোকে যা বলে বলুক, তাতে ইয়াকুবের হবে কচু । মকবুলকে চুপ করে থাকতে দেখে মেহের আলি বলে “বলতো আমি খবর নিতে পারি ।আমি যাচ্ছি কালীতলাতেই। মনে হচ্ছে মন্দ কপাল তোমার ।এখন দেখ যদি কিছু খচ্চাপাতি করে গরু ছাড়িয়ে আনতে পার ।” বিকেলবেলাতেই খবর নিয়ে আসে মেহের আলি ।ঠিকই অনুমান করেছিল মেহের আলি ।মকবুলের গরু আছে ইয়াকুব ভাই এর খোঁয়াড়ে । মেহের এর অনুরোধে ইয়াকুব ভাই মকবুলের গরু ফেরৎ দিতে রাজি ,তবে তার জন্যে মকবুলকে দিতে হবে এক হাজার টাকা । “এক হাজার টাকা !!” মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মকবুলের । “কোথায় পাব ভাই এত টাকা” মেহের আলি সখেদে জবাব দেয় “কি আর করবে ভাই , গরু ফেরৎ পেতে হলে দুই একদিনের মধ্যে টাকাটা মিটিয়ে দিতে হবে ইয়াকুবের গদিতে” মকবুল হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে তার অল্প যে কটা টাকা সঞ্চিত আছে তা এবার বুঝি গেল গরুটার পেছনে ।কিন্তু ইয়াকুব যে ধরণের লোক তাতে তাকে কি বিশ্বাস করা যায়? ধর, টাকাটা পাবার পর ইয়াকুব যদি আবার নতুন কোন বায়নাক্কা ধরে তখন ?তখন কি হবে? তখন গরুতো গেলই আর টাকা কটাও মাঠে মারা গেল!” মকবুলের সন্দেহের কথাটা শুনে এবার মেহের আস্বস্ত করে ।“সে তুমি চিন্তা কোরনা গদিতে টাকা দিতে যাবার পথে বেদোখালির মাঠ পড়বে ,সে মাঠে যাতে তুমি তোমার গরুকে দেখতে পাও সে ব্যবস্থা নাহয় আমি করে দেব ইয়াকুব ভাই কে বলে । উপায়ান্তর না দেখে পরদিন মকবুল টাকাকড়ি নিয়ে হাজির হয় কালীতলায় ইয়াকুব বালাচাকার গদিতে ।পথে বেদোখালির মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখে পড়ে “ওই তো ,ওইতো তার আদরের চাঁদকপালি !কেমন নিশ্চিন্তে মাঠের মাঝখানে আপন মনে ঘাস খাচ্ছে ! বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে মকবুলের । মনে মনে কসম খায়,আজ চাঁদকপালিকে না নিয়ে বাড়ি ফিরবেনা । মকবুলকে ঘরে ঢুকতে দেখে ইয়াকুব বলে ওঠে “আরে মকবুল মিয়াঁ যে ,তা কি মনে করে ...? মকবুল মরীয়া ।সরাসরি কাজের কথায় আসে – “হুজুর আমার গরুটা কদিন হল হারিয়ে গেছে ।কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছিনি ,সেই অবস্থায় মেহের আলির কাছে শুনলুম আমার গরুটা নাকি হুজুরের হেপাজতে আছে ।মেহেরই বললে মকবুল শিগগির যা ইয়াকুব বাবুর পায়ে গিয়ে পড় । দয়ার শরীল বাবুর ।দেখবি ঠিক তিনি তোর দুঃখ ঘুচিয়ে দেবেন” । মকবুলের নিবেদন কানে যেতে ইয়াকুব এবার তার ছদ্মব্যস্ততা ছেড়ে টান টান হয়ে বসে ।নিজের নামের সঙ্গে বাবু ডাক শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে ইয়াকুব বালাচাকা । এত দিন ধরে জেনে এসেছে গাঁয়ের লোকে তাকে আড়ালে পিচাশ বলে ,সেই তাকেই কেউ মানী লোকদের মত বাবু বলবে এ তার স্বপ্নের অতীত । আগ্রহ চেপে রাখতে পারেনা ইয়াকুব । মকবুলকে জিজ্ঞাসা করে “কি বললে মেহের ? মেহের আমাকে বাবু বললে, বাবু ?তুই ঠিক শুনিচিস তো আমাকে ইয়াকুব বাবু বলেচে?” মকবুল মিনমিন করে অবাব দেয় “আজ্ঞে ,সেই কথাই ত বললে মেহের ।বললে বাবুর দয়ার শরীল । সামান্য কিছু টাকা বাবুকে নজরানা দিলেই ইয়াকুব বাবু তোর হারিয়ে যাওয়া গরু ফিরিয়ে দেবেন” “আরে থাক থাক ,তুই গরীব মানুষ ,তোকে আর টাকা দিতে হবেনা । বাবু বলেচে আমায় ! যা ওই বেদোখালির মাঠে তোর গরু চরছে ।আমার লোক আছে সেখানে ।তাকে গিয়ে বলবি ইয়াকুব বাবুর হুকুম হয়েছে তোকে গরুটা ফেরৎ দিয়ে দেবার।তা, হ্যাঁ রে তুই ঠিক শুনিচিস তো মেহের আমাকে বাবু বললে?” “আজ্ঞে আমি ঠিকই শুনেছি বাবু ,এবার তবে আমি আসি বাবু ? বেলা হয়ে এল ।এর পর গরুটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দিন কাবার হয়ে যাবে” ইয়াকুবের গলায় যেন মধু ঝরে পড়ে – “হ্যাঁ হ্যাঁ আর দেরি করিসনি ।জলদি যা ...। আমায় বাবু বললে !!”

63

7

মনোজ ভট্টাচার্য

ডন – তাকে ভালো লাগে ! চেতনা !

ডন – তাকে ভালো লাগে ! চেতনা ! একটি উপাখ্যান ! ডন ছি হতে - একটি ফ্যান্টাসি নাটক হতে পারে ! কিন্তু আমি যা লিখছি – সেটা সত্যি ! এমনকি একাডেমী চত্বরে পাথরের দিব্যি ! কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে অন লাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে আটকে গেলাম ! এখানে আমি এখনও ক্রেডিট কার্ডে রপ্ত হতে পারিনি ! – তা হাল ছেড়ে দিয়ে ভেবেছিলাম – একাডেমীতে গিয়ে টিকিট কাটবো ! দুপুরে ফোন এলো । একাডেমী থেকে – আমরা কি অন লাইনে টিকিট কাটতে চাইছি ? – বললাম কোথায় আটকাচ্ছে ! একজন আছেন চ্যাটার্জি – উনি বললেন আরেকবার চেষ্টা করতে । যথারীতি হল না ! তখন আমার স্ত্রী ফোন তুলে সেই চ্যাটার্জিকে অনুরোধ করলো – আমাদের জন্যে টিকিট রাখতে । প্রথমে গাইগুই করে রাজি হল ! স্ত্রীর বক্তব্য – অরুন মুখোপাধ্যায়ের থিয়েটার আমরা প্রথম থেকে দেখছি ! -সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার জন্যে ডিস্কাউন্ট দিচ্ছেন না ! একটা সুবিধে তো করবেন – টিকিট রেখে দিন ! আমরা গিয়ে নিয়ে নেবো । - যদিও অসুবিধে কি – ওদের - বুঝতে পারিনি – পরে দেখলাম রাজি হয়ে গেল ! – আধ ঘণ্টা পরে – টিকিটের নাম্বারও দিয়ে দিল ! পিকচার আভি ভি বাকি হায় ! একাডেমীতে আমরা আগেই পৌঁছে টিকিট পকেটে পুরে ঘুরতে লাগলাম ! থিয়েটারের কলা কুশলীদের মোটামুটি আমরা চিনি । এটা আগেও ওরা করেছে ! এখন চেতনা গোষ্ঠীর পরিচালনায় । এই শোটা এগারোতম । দেখলাম অনেক বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এসেছেন । অনেকে সিরিয়ালে করেন ! এবং ব্রেকের সময় দেখলাম সৌমিত্রবাবুকে । - দাঁড়িয়ে নমস্কার করলাম – উনিও যথারীতি তাই করলেন ! নাটক আরম্ভ হোল ! সুজন ও সুমন – দুজনেই আছে । গল্পটা আমাদের মনে ছিল না । - সেই ডন কুইক্সট বলতাম ছোটবেলায় ! স্পেনের লা মাঞ্চা অঞ্চলের এক মাঝ বয়েসী আদর্শবাদী মানুষ ! একজন সহকারী - সাংকো পাঞ্জাকে সঙ্গে করে পৃথিবীর জঞ্জাল সাফ করতে বেরিয়ে পড়ল । চোখে তার স্বপ্নের নায়িকা – মহীয়সী নারী আলডনসাঁ বা ডুলিসিনিয়া ! – প্রচুর কলাকুশলী ! এখনকার প্রত্যেকেই বেশ ভালো অভিনয় করে ! মঞ্চ আলো শব্দ ইত্যাদি খুব দক্ষতার সঙ্গেই ব্যবহার করে । নাটকে প্রধান যা দরকার – গতি – এই নাটকের সেই গতিই নাটককে দাঁড় করিয়েছে । জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ উন্মাদ - না - উন্মাদ শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী - মুল বক্তব্য অর্থাৎ ডনের আদর্শবাদী ভাবনা – তাও কিন্তু ক্রিয়াশীল ! কোনও অভিনেতাকে নিশ্চুপ দেখিনি ! বিশেষ করে ডন বা সাংকো পাঞ্জা ! সারাক্ষণই মঞ্চ জুড়ে নেচে যাচ্ছে ! আরও একজন ডনের সেই মহীয়সী নারী – ডুলিসিনিয়া ! – অপেরাধর্মী হওয়ার ফলে দর্শকদের একেবারে বোর হতে দেয় নি! নীলের কথায় জানা গেল – এরপরের অভিনয় হবে আগস্ট মাসে ! বেশ অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা নাটক দেখা হোল ! মনোজ

58

5

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

মাঝে মাঝে জেগে স্বপ্ন দেখি‚ কোন জায়গা জানি না‚ বোধহয় আমার দেশের বাড়ি ই হবে| দড়ির খাটিয়ায় বিশ্রাম নিচ্ছি| আশে পাশে নাতিপুতি‚ বুরুনের বৌ কাঁসার গ্লাসে করে গরম চা দিয়ে গেল| ফানি‚ তাই না? আমার দেশের বাড়ি বিহার নেপাল সীমান্তে| যখন ছোট ছিলাম ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না| বাহন বলতে গরুর গাড়ি আর পাল্কি| নাহলে পায়ে হাঁটো| মানুষের সাথে সাপ আর ভূতেরো সহজ সহাবস্থান| সকালে উঠে টিউবওয়েলএর পাশে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করতাম| কোন কাজের লোক হাঁসঘর থেকে হাঁস ছেড়ে দিত| তারা প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে লাইন করে এপাশ ওপাশ দুলতে দুলতে বেরিয়ে যেত| আমি তাই দেখতে আপন খেয়ালে মজে থাকতাম| উল্টো দিকের বারান্দায় লাইন করে বিছানা করে মশারি টাঙিয়ে বাবা জ্যেঠা কাকারা শুতো| বাড়ির মেয়েরা শুতো ঘরে| শীতের সময়ে খড় দিয়ে উঁচু করে মেঝেতে বিছানা হত| সে এক এমনবাড়ি‚ গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে পাশে মা থাকলেও ভয় করতো| মায়ের কাছে ঘেঁষে এসে শুতাম| কিন্তু ভারি মায়া ছিল সে বাড়িতে| ট্রাঙ্ক খুলে কত পুরনো শারদীয়া‚ গল্পের বই পেতাম| দুপুরে সবাই যখন গল্প করতো আমি একধারে বসে সেই পুরনো গন্ধ ওয়ালা বইগুলো শেষ করতাম| তুতো বোনেরা মিলে গান করতাম| পুজোর সময়ে বাপি গানের ফাংশনের দায়িত্ব নিত| কেউ করতো নাচ| কেউ নাটক| জমজমাট সেই বাড়িটা এখন একাই দাঁড়িয়ে আছে| কেউ থাকে না| মজার ব্যাপার এখন গ্রামে ইলেক্টৃক আলো‚ বাড়িতে আলো পাখা ফ্রিজ‚ দোরের গোড়ায় বাসস্টপ সব এসে গেছে| শুধু সেগুলো ব্যবহার করার লোকগুলো হারিয়ে গেছে| জিন্দেগী...

1374

97

দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

আজ এই গানটা রেখে যাই এরা পরকে আপন করে আপনারে পর বাহিরে বাঁশির রবে ছেড়ে যায় ঘর https://youtu.be/F2CQo0msg9M

1491

136

শিবাংশু

জাতি অপমানা

বাবার অটোগ্র্যাফ খাতায় আচার্য সুনীতিকুমার লিখে দিয়েছিলেন তুলসীদাসের একটা দোঁহা| " যদ্যপি জগ দারুণ‚ দুখ নানা‚ সব তেঁ কঠিন জাতি অপমানা . প্রায় চুয়াত্তর বছর আগের কথা| লাটসাহেবের বাড়িতে তখনও ইউনিয়ন জ্যাক উড়তো| তাঁরা ভেবেছিলেন একদিন আমরা 'জাতি-অপমানা' জয় করবো| ব্যস‚ ইউনিয়ন জ্যাকটা নামিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা| জ্ঞান হবার সময় থেকে লেখাটি দেখেছি| 'জাতি-অপমানা যে কী ব্যাপার সেটা জানতে হাত ধরেছি কবির| সারা পরিবার আদ্যন্ত রবীন্দ্রনিমজ্জিত| সেই মানুষ যাঁর মননে আন্তর্জাতিকতা একটা ভিন্ন মাত্রা ছিল| তাঁর যা কিছু সিদ্ধি সব কিছুর মধ্যে দেশের উপরে জেগে থাকতো তাঁর আন্তর্জাতিক মানবতাবোধ| গান্ধিজির মতো মানুষও বুঝে উঠতে পারেননি কবির স্বভাবের এই দিকটি| 'Religion of Man' লিখে এদেশে ওদেশে সব মূঢ় জাতীয়তাবাদীদের থেকে নিন্দার ভাগী হয়েছিলেন| কিন্তু 'জাতি অপমানা'র বেদনা তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে| জালিয়াঁওয়ালাবাগ নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া তো সবাই জানে| 'প্রবাসী' হওয়া 'অপরাধ' নয়| তার জন্য কোনও যথার্থীকরণও নিষ্প্রয়োজন| কোনটা যে 'দেশ' সেটাই তো সবসময় বুঝে ওঠা যায়না| চামড়ার রং নিয়ে পক্ষপাত তো এদেশেও রয়েছে পুরো মাত্রায়| রয়েছে জন্মগত জাতি নিয়ে কটাক্ষ| সে তো ব্যক্তি আমি পারিবারিক ভাবে দেখতে গেলে নিজের দেশেই 'প্রবাসী' চার পুরুষ| আমার যে বিপুল পরিমাণ আত্মীয়-বন্ধু ছড়িয়ে আছেন য়ুরোপ বা আমেরিকায়‚ তাঁদের সঙ্গে যখনই সাক্ষাৎ হয়‚ জানতে চাই 'জাতি অপমানা' কেমন লাগে| নবীন প্রজন্মের মানুষেরা হয়তো ততোটা স্পর্শকাতর ন'ন| কিন্তু চল্লিশ পেরোনো আত্মীয়রা নিজেদের অস্বস্তি ঢাকেন না| একই স্তরের‚ হয়তো উচ্চ স্তরেরও যোগ্যতা‚ কুশলতা নিয়েও শুনেছি শাদা চামড়াদের থেকে অনেক অধস্তন থাকার বেদনা সইতে হয়| আমার এক ভাই‚ সে এম আই টি ও হার্ভার্ডে উচ্চ শিক্ষিত| দীর্ঘদিন বস্টনে থাকে| হঠাৎ সেদিন বললো কোথাও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল| হঠাৎ দু-চারজন শাদা চামড়া স্রেফ ধাক্কা দিয়ে তাকে লাইন থেকে বার করে নিজেরা দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানে| বললো‚ পিছনে গিয়ে দাঁড়াও| আমি বলি‚ কী করলি তখন? সে বললো‚ কী আর করবো? পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম| বলি‚ কেউ কিছু বললো না? না দাদা‚ কেউ কিছু বলেনা| আমার এক ভায়রাভাই আরো লক্ষ মানুষের মতো 'মূলধন' জমিয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিল| কারণ তখনও তার গায়ের চামড়াটা একটু মিহি থেকে গিয়েছিল| কিন্তু এখন সে আরো লক্ষ মানুষের মতো সব পেয়েছির দেশের অংশ হয়ে গিয়েছে| এগুলো হয়তো নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা| অন্যরকম উদাহরণও হয়তো রয়েছে ভূরি ভূরি| উপার্জনের মাত্রা‚ যাপনের স্থিরতা‚ সাহেবি অনুশাসনের স্বাচ্ছন্দ্য‚ এককালের 'সচেতন' ভারতীয়দের জাতি-অপমানা ভুলিয়ে দেয়| সেদেশে একটা সরকার পাল্টায় | কিছুদিন উদ্বেগে থাকে| আবার মানিয়ে নেয়| ভারতীয়দের মতো 'মানিয়ে' নেবার ক্ষমতা শুধু চিনদেশের মানুষদেরই থাকে| পুরোনো সভ্যতার পুণ্য| মানুষের রক্তে জাতিহিংসা রয়েছে| কেউ তাকে লালনপালন করে আনন্দ পায়| কেউ লুকিয়ে রাখে| কিন্তু বিষ থেকেই যায়| কী এদেশে‚ কী ওদেশে| কখনও মনে হয় তুলসী কি সুনীতিকুমার কী এক অলীক দেশের মানুষ? যাঁদের জন্য শুধু রাখা থাকে আমাদের ব্যর্থ নমস্কার|

90

4

উদাসী হাওয়া

সাতকাহন

সাতকাহন ১ অমল ধবল পাবেনা বৃষ্টি পাবে শ্যাওলা পরা ছাদ দুটো চ্যাংড়া চড়ুই তুড়ি মেরে আসে জড়সড় আরও দুটো কাঁধ। পাগল হুট করে ছলাত্ ছল গায়ে-পড়া ছিটবেই জল ভিজে শাড়ি ভিজে বি-ফ্ল্যাটে কিছু শুকনোর সাথে ইচ্ছেদের ভুলভাল মেলে ধরে রাতে। ছুঁড়ে দিলি উড়ো মস্তান বল হাত ধুলি নিঙাড়ি আঁচল তারপর ময়দানে, মনকথা, পুরাকথা, মাটিমুখ দাঁতচিপে যত্নে রাখিস উথলি অনর্গল। সেনরিটার বেসুরো বীণ কেঁদে ফেলে বর্ষার দিন ঝাঁপিয়ে আছড়ে বকা ‘তুম বিন যাউ কাঁহা’, বোকা, ফের ফোনে যদি বলে উঠিস, পাগল! চুপ-পায়ে চিলেকোঠা! বাঁধা ছিল অর্গল! ২ সাবেকী রঙ্গমঞ্চ পুরোটাই জানে প্লিজ, নিয়ে যাবি? প্রিয় নাটক টানে! ভাবিনি আসবিনা, বসবিনা, অনাম্নীই হাঁটু-মুড়ে পাশে, গা ঝেড়ে ভুলপথ ঠিক পথেই মোটামুটি উল্লাসিনীর অবজ্ঞার হুতাসে। এরপর ধুম জ্বর বিকেল নামে প্রলাপের আঁচে সন্ধে হল, কথা আঁকি ভুল ছিল, জলঘসা কাঁচে গুঁড়ো গুঁড়ো অস্বীকার আচমকার ইতিহাসে। ৩ অবিমৃষ্যকারি বিচ্যুতি প্রবেশিকা বৃষ্টিকে ভাল খবর ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিল। বাজপাখি নিঃশব্দে আরও ভাল ছিল! বুদ্ধিমতী ঠোঁট তোর আগুন ছুঁয়েছিল চুড়িদারে চক্রযানে তোর গজদন্ত হাসি কে আর দলামোচা সাতকাহন শেষ রেশ রাখে! ৪ বিদেশী ফিনকি হাওয়ায় হাওয়ায় আরও ভাল কৃতকার্য্য পাওয়ায়! বাজে, ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া খামচিঠিরা বৃষ্টিতে নৌকারা ছন্দবদ্ধ উল্টাতে থাকে। ৫ এখন আনন্দজালে রাতপোকা তোলে মাতোয়ারা সূর্য চাঁদ হইচই পৃথিবীরা ঝলমল দেয়ালে দেয়ালে ডুব দিলি পানকৌটি জল ঝেড়ে ডানা মেলিস হুল্লোড় আড়ালে ফেসবুকে ছশো মিতা তোর অন্তরীক্ষে নৌকা ভাসায়। ৬ শহরতলি কেঁদে যাবে, জমবেই জল সোনা রুপা খুঁজে যাবে জানে পাবেনা তল উৎসাহী জমকালো কত ভালোর ভিড়ে ‘অবগুন্ঠন যায় যে উড়ে’ তলে তলে নৌকা কাঠ শুকায় ডাঙায়। ৭ কি করিস! যত্নে থাকিস! সুন্দর মোবাইল হাতে যতই ফিরে থাকিস, সাকুল্যে পাড়ার বেঞ্চটা কাঁদে ‘অনেক হয়েছে লেনাদেনা’ যত্নে রাখি অসুখ আর গান লিখে যাবো কিছু প্রশ্নের জানাবো না কিসের আশায়।

86

5

জল

গল্প

বিদর্ভ .... গত রাত থেকে গলার কাছে একটা ব্যথা কাঁটার মত বিঁধে আছে| একটা কষ্ট বুকের কাছে দলা পাকিয়ে হৃপিন্ডটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে| তবু ব্যথাটাকে উপড়ে ফেলার কোন উপায় দেখছে না সে| তার তিনবছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম বিদর্ভ কিছু চেয়েছে| বিদর্ভ একজন মুখচোরা নিপাট ভালো মানুষ| এক একজন মানুষ হয় যারা নিজেকে বিলিয়ে দেয় ‚ অন্যের সুখে নিজের সুখ খোঁজে ‚ বিদর্ভ তেমনই একজন মানুষ| যোগীরও তো কিছু পেতে ইচ্ছা হয়| সে মোক্ষ খোঁজে আর সংসারী মানুষ মায়ার বাঁধনে আরও শক্ত করে প্রবিষ্ট হতে চায়| এই চাওয়ার মধ্যে তো কোন অন্যায় নেই| আর অন্যায় নেই বলেই সে কষ্ট পাচ্ছে| বিদর্ভকে সে আশাহত করতে চায় না| কিন্তু তার যে সত্যি কিছু করার নেই| সত্যি কথাটা একরকম ভুলেই গেছিল| বিদর্ভ হঠাৎ করে মনে করিয়ে দিল| কি করে সে সত্যিটা বলবে বিদর্ভকে| কিন্তু বলতে তো হবেই| আর তখন সম্পর্কের রসায়নটা কি বদলে যাবে? বিদর্ভ কি তাকে ঘৃণা করবে? তাকে কি মিথ্যাবাদী বলবে না? ... দূরে তালগাছের মাথার পাশে থমকে থাকা সুর্যটা একটু একটু করে ডুবে যেতে থাকে| আকাশে তখন আধো আলো আধো অন্ধকারের একটা খেলা শুরু হয়ে গেছে| নানান রঙের মেঘগুলো রঙ খুঁইয়ে একটু একটু করে একরঙা কালো মেঘে দ্রুত পরিণত হচ্ছে| একটা দিনের সমাপ্তি| এইসময় মনটা কেমন যেন বিষন্ন হয়ে ওঠে| জীবন থেকে খসে গেল আরও একটা দিন| হারিয়ে গেল চিরতরে দিনটা স্মৃতির চিলেকোঠায় কিছু মুহুর্তকে গচ্ছিত রেখে| তবে আজকের মুহুর্তগুলো সুখের নয়| দুঃখেরও তো নয়| তবু একটা দ্বিধা একটা দ্বন্ধ পরিবেশটাকে গুমোট করে তুলেছে| 'কি হবে এবার বিলাস?' বেশ ভয়ে ভয়ে প্রশ্নটা করে এক নারী কন্ঠ| 'কি আবার হবে তরী?" ফিরতি প্রশ্ন করে বিলাস নাম্নী পুরুষটি| ঘরের ভিতরের গুমোট যেন শব্দের আঘাতে কিছুটা ছিন্নভিন্ন হয়| ঘরের ভিতরে অন্ধকার| আলো জ্বালতে যেন ভুলে গেছে দুই নারী-পুরুষ| কিম্বা জ্বালতে চাইছেই না| অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে ওদের| 'আলোটা জ্বেলে দাও বিলাস| দমটা কেমন যেন অন্ধকারে আটকে আসছে|' বলে তরী নাম্নী নারীটি| মুহুর্তে জ্বলে ওঠে আলো| খাটের ওপর জড়সড় হয়ে বসে আছে তরী| পরণের শাড়িটিও কেমন যেন অবিন্যস্ত| মুখ দিয়ে তেল-ঘাম গড়াচ্ছে| চোখের কোণে কালি| পাশেই একটা মোটা কাগজ আধভাঁজ করা‚ একটা খাম পড়ে আছে একটু দুরে| খামটা কোন ডায়গোনাস্টিক সেন্টারের সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়| সম্ভব্ত একটা রিপোর্ট| 'মাকে জানাবে না?' তরী জানতে চায়| 'জানাবো সময় সুযোগ বুঝে| এখনি তুমি কিছু বলতে যেও না|' বিলাস সুইচবোর্ডের কাছ থেকে সরে এসে খাটে তরীর পাশে বসে তরীর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিতে নিতে বলে| 'আমি ! না না আমি কিছু বলব না| তুমি বোলো|' চটপট বলে তরী| 'হুম'| বলে বটে কিন্তু কপালের ভাঁজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে চিন্তার রেখা| কি করে বলবে সে‚ যে তরী আবার করে মা হতে যাচ্ছে| সবটাই তার নিজের দোষ| 'সব দোষ আমার তরী| সন্তান আসছে এ তো বড় সুখের গো| তবু আমরা সুখী হতে পারছি না| আমি সক্ষম নই বলেই এত চিন্তা|' তরী জড়িয়ে ধরে বিলাসকে| এই একটা মানুষই তো তার একান্ত আপন| মানুষটা না ভেবে ভেবে অসুস্থ হয়ে পড়ে| বুকের মধ্যে একটা অজানা ভয় যেন সারাক্ষণ গুঁড়ি মেরে থাকে| 'ভেবো না বিলাস‚ জীব দিয়েছেন যিনি আহার যোগাবেনও তিনি'‚ তরী স্বান্তনা দেবার চেষ্টা করে বিলাসকে| এক একটা মানুষ জীবনে কোথাও শক্ত মাটি পায় না পায়ের তলায় যতই চেষ্টা করুক না কেন| ব্যর্থতা যেন তাদের জীবনে স্থায়ী আর পাকাপোক্ত| বিলাস গ্রাজুয়েশনের পর থেকেই একের পর এক চাকরীর পরীক্ষা‚ ইন্টারভ্যু দিয়ে এসেছে কিন্তু কোথাও কিছু হয়নি| শেষে সে একের পর এক বিজনেস করেছে কিন্তু কোনটাই দাঁড়ায় নি| এর মাঝেই কখন যেন তরীকে ভালোবেসে ফেলেছিল‚ তরী যখন তারই কলেজে জুনিয়র তখন সে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছিল| তারপর একরকম বেকার অব্স্থাতেই বিয়ে| কতদিন আর ঘোরাঘুরি করা যায়| আর বিয়ের পর থেকে তারা স্বামী -স্ত্রী দুজনের নির্ভরশীল শ্বশুর আর শ্বাশুরীর ওপর| বিয়ের পর পরই মেয়ে পরী এলো কোলে| শ্বশুর ছিলেন সরকারী কর্মচারী| উঁচু পোস্টে চাকুরী করতেন| সেই সুত্রে সংসারে কোন অভাবই ছিল না| শ্বাশুরী নিস্তারিনীও ছিলেন অত্যন্ত গোছানে| ছেলেকে দাঁড় করানোর কম চেষ্টা তিনিও করেননি| টাকার যোগান দিয়েছেন ব্যবসা করার জন্য| তরী নিজের গয়না গাঁটি যা কিছু বাবা-মা দিয়েছিল সবই তুলে দিয়েছিল বিলাসের হাতে| টুকটাক করে ব্যবসা যাতে চলে| কিন্তু বিধি বাম‚ লক্ষ্মী কিছুতেই ধরা দিলেন না| তবু চলছিল| তরী বুঝে গিয়েছিল এ সংসারে টিঁকে থাকতে গেলে তাকে শ্বশুর আর শ্বাশুরীর মন যুগিয়ে চলতে হবে| তাই চলছিল| পরী তার মেয়ে বটে কিন্তু তার ওপর সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ শ্বাশুরীর| নিস্তারিনিই যেন ওর মা| সারাক্ষণ পরীকে নিয়ে অজস্র ভাবনা তার| পরীকে নিজের কাছে টানার চেষ্টাও তাই তরী করে না| পরীর একটা সুন্দর জীবন হোক সে সবসময় চায়| ঠাকুমার হাত ধরেই হোক| শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়লেন হঠাৎ করেই| ভলান্টারী রিটায়ারমেন্ট নিতে বাধ্য হলেন| এই সময়টাকে কাজে লাগালো তরী যাতে শ্বাশুরীর নেকনজর সবসময় থাকে| এখনকার দিনে তিন তিনটে মানুষের খাই খরচ তো কম নয়| সংসারে টুকটাক কিছু তো দিতেই পারে না বিলাস| নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেই বিলাসের অল্প রোজগার শেষ হয়ে যায়| তারওপর এটা ওটা হাজার একটা প্রয়োজন আছে| পরী এখন নয় বছরের| তার মাঝেই এই ছন্দপতন| আরও একজন আসা মানে সংসারে আরও একটা অতিরিক্ত পেট| কি করবে সে? আবোর্ট করে দেবে কি? বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে| ..... 'মা‚ বাবা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?' ঘরের দরজার কাছে এসে বিলাস প্রায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করে| ইদানীং বাবা প্রায় ঘুমোনো ভুলে গেছেন| সারাক্ষণ চোখদুটো খোলাই থাকে| অথচ কিছুই দেখে না‚ চোখের দৃষ্টিতে অপার শূণ্যতা| ওষুধের প্রভাবে কিছুটা ঝিমুনি আসলে চোখদুটো সাময়িক বন্ধ হয়‚ কিন্তু সামান্য আওয়াজ হলেই আবার চোখদুটো খুলে যায়| সেই ঘোলাটে শূণ্য দৃষ্টি| সহ্য হয় না বিলাসের| নিস্তারিনী বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে পা টিপে টিপে| তারপর লাগোয়া বারান্দার শেষপ্রান্তে মা-ছেলে হেঁটে যায়| বাড়িটা একতলা‚ লম্বাটে প্যাটানের| 'বল'| 'মা‚ মানে বলছিলাম কি...' তোতলায় বিলাস| আজও সে মাকে ভয় পায় সেই ছোটবেলার মত| অথচ মা কিন্তু কোনদিন তাকে মারেনি‚ বকেনি‚ তেড়ে কথা বলেনি| কিন্তু যেটুকু বলে‚ যতটা বলে ততটাই বিলাস জানে মেনে চলতে হয়| ছোট থেকেই দেখেছে বাবা কি অপরিসীম শ্রদ্ধা করত মায়ের বিচক্ষণতাকে‚ মায়ের বুদ্ধিমত্তাকে| মা'ও তাই‚ বাবাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করত‚ করত কেন এখনও তো করে| বাবাকে ‚ অসুস্থ বাবাকে মা যেভাবে সেবা করে‚ সে পারবে না| বাবা-মায়ের সম্পর্ক কখনও তিক্ত হতে সে দেখেনি| সব কেমন যেন গুলিয়ে যেতে থাকে| কি করে বলবে‚ তরী এখন তিনমাসের অন্তঃস্বত্তা? 'কি বলবি‚ বলছিস না তো?' 'তুমি কি কিছু জানো মা? মানে তরীর ব্যাপারে?' ঢোঁক গিলে কথাটা মায়ের দিকেই ঠেলে দেয়| মায়ের চোখ খুব সতর্ক| কিছু তো নিশ্চয় চোখে পড়েছে| একটু চোখ কুঁচকে থাকে নিস্তারিনী| জানে ‚ আজ দু-তিনমাস ধরে তরীর পিরিয়ড বন্ধ| আশঙ্কা যেটা করছিল সেটা তাহলে সত্যি? কিন্তু উত্তর দেয় না| 'মা তরী‚ তরী মানে আসলে...' কথা আটকে যায়| একটা অপরাধবোধ সবসময় মনের ওপর চেপে বসে আছে বলেই হয়ত বলে উঠতে পারছে না বিলাস| 'থাক আমি বুঝেছি| কিন্তু বাবু একটা জিনিস তো ভাববি‚ তোর বাবা অসুস্থ‚ তার ওষুধপত্র‚ সংসারের এত খরচ খরচা‚ পরীর লেখাপড়া এসবের মাঝে আরও একজন আসছে| আর সে যখন আসছে তাকে তো আমি ফেলে দিতে পারব না| তোর যদি একটা ভালো আয় থাকত আজ এইভাবে আমার সামনে তোকে এইভাবে অপরাধী হতে হত না| আমি বুঝি বাবা‚ তোর কষ্টটাও বুঝি| কিন্তু কি করব বল‚ বাবার পেনশনের টাকা আর জমানো টাকায় চালাতে গেলে তো আমাকে বুঝে চালাতেই হবে| তাতে আমি জানি তরীর অনেক আশা আকাঙ্খা মেটে না| ভাবে ওঁকে আমি আমার তাঁবেদারীতে রেখেছি|' 'না মা‚ তুমি যদি বল আমরা না হয় অ্যাবোর্ট করে নেবার কথা ভাবব?' 'না‚ যে আসছে আসুক| তবে আর না| এবার একটা অপারেশন আমি করিয়ে নেবো তরীর| ' 'না‚ মানে মা‚ আর হবে না‚ মানে ..' 'সে ভাবনা এখন থাক‚ পরে ভাববি| ' ..... 'তরী‚ তরী‚ এই তরী‚ কি হয়েছে তোমার' একটা ধাক্কায় আচমকা সম্বিত ফিরে পায় তরী| বিদর্ভ‚ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে‚ কিছুটা চিন্তিতও| 'শরীর ঠিক আছে তো? দুবার ফোন করলাম ফোন তুললে না| দোকান থেকে ছুটতে ছুটতে আসছি‚ বেল বেজে বেজে থেমে গেল| শেষে ডুপ্লিকেট কি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে এলাম| কি হয়েছে তোমার?' বিদর্ভের গলা দিয়ে উদ্বেগ ঝরে পড়ে| তরী কিছু যেন বুঝে উঠতে পরে না তখনি| এতক্ষণ সে অতীতে বাস করছিল? বিলাস‚ বিলাস তো নেই| হঠাৎ করেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে চোখ বেয়ে জল নামে'| বিদর্ভ আরও হকচকিয়ে যায়| কি করবে বুঝে উঠতে পারে না| মেয়েরাও নেই| মায়ের সাথে দিন দুইয়ের জন্য দিদুনের বাড়ি ঘুরতে গেছে ওরা| 'তরী কি কষ্ট হচ্ছে বলো না আমায়? কোথায় কষ্ট হচ্ছে? এভাবে কাঁদছ কেন?' এবার তরী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে‚' কাল রাতে তুমি কি চাইলে বিদর্ভ? তোমার সন্তান হলে আমার মেয়েরা যদি ভেসে যায়?' 'উফ‚ তুমি পারো বটে তরী| এসব ভেবেছ আজ সারাটা দিন ধরে? কেন এত ভয় তরী? এরাও তো আমারই সন্তান| নাই বা আমি ওদের জন্মদাতা‚ বিলাস আর আমি কি আলাদা তরী? এই যে শারী‚ ও তো জানেই না‚ চেনেই না বিলাসকে‚ বাবা হওয়ার আস্বাদ তো আমি ওর ডাকেই প্রথম পাই| এই প্রাপ্তির তৃপ্তি তুমি বুঝবে না তরী| তবু কেন যে কাল নিজের সন্তানের জন্য এতটা আকুতি মনে এল বুঝতে পারলাম না| অন্যায় আব্দার হয়ত| তবে তরী‚ তুমি এটা ভেবো না আমার নিজের সন্তান এলে আমি পরী‚ শারীকে আর সেই নজরে দেখব না‚ যে নজরে আজ দেখি| এতটা দীন আমাকে মনে করো না তরী‚ প্লিজ|' আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে বিদর্ভ| 'আমি জানি তোমাকে‚ চিনি তোমাকে বিদর্ভ| আজ তুমি বুঝতে পেরেছিলে বিলাস চলে যাওয়াতে আমি কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম বলে না আমাকে তুমি বিয়েটা করেছিলে সমাজের তোয়াক্কা না করে‚ পাঁচজনে পাঁচকথা বলবে জেনেও আমাকে তুমি আশ্রয় দিয়েছিলে‚ আমার আর বিলাসের সন্তানদের পিতৃত্ব দিয়েছিলে| এসব আমি কি করে ভুলি বিদর্ভ? তার সাথে এও তো কিছু অন্যায় আব্দার নয় ‚ যে তুমি আমার কাছ থেকে তোমার সন্তান চাও| বিশ্বাস কর আমি তোমায় ফেরাতে চাই না| কিন্তু পথ যে বন্ধ বিদর্ভ| তোমার মাসীমণি শারী হবার পর পরই আমার বন্ধ্যাকরণ করিয়ে আনেন| আমার তোমাকে এসব জানানো উচিত ছিল বিদর্ভ| কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে আমি তোমার প্রস্তাব পাওয়ার পর শুধু মেয়েদের ভবিষ্যতটা চিন্তা করেছিলাম‚ নিজের কথা চিন্তা করেছিলাম‚ ঐ পরিবেশ‚ তোমার মাসিমণির তাঁবেদারী থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম| তোমার কথা যে একবারের জন্য চিন্তা করিনি| ' তরী কাঁদতে থাকে অনবরত| স্তব্ধ হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য বিদর্ভ| তরীকে সে ভালোবাসত সেই কবে থেকেই‚ যখন বিলাসের সাথে তরীর আলাপও হয়নি| বিলাস আর সে দুই মাসতুতো ভাই| বয়সে সে বিলাসের থেকে দু বছরের ছোট| গানের প্রতি ছোট থেকেই একটা টান বিদর্ভের| আর সেই টানেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়| সেই কোন একটা অনুষ্ঠানেই দেখেছিল তরীকে| গানের গলাটা ভারী সুন্দর| আলাপ করা হয়ে ওঠেনি| ভেবেছিল একদিন আলাপ করে মনের কথা জানাবে| সে সুযোগ আর মেলেনি| বিলাস হঠাৎ করে ক্যান্সারে মারা গেল| তরীর অবস্থা দেখে বড় খারাপ লেগেছিল| বিলাসের কিছু ছিল না| মাসীমণির ওপর সম্পুর্ণ নির্ভরশীল তরীর বাবা-মায়েরও তেমন স্বচ্ছলতা ছিল না যে মেয়েকে সাহায্য করে| আর মাসীমণি বরাবরের দূরের মানুষ| ভয় পায় না‚ শ্রদ্ধা করে ঠিকই তবে দূর থেকে| ব্যাক্তিত্বের চাপে চাপা পড়ে যায় সবকিছু| এমন একজন মানুষের কাছে তরী কিছুতেই ভালো থাকতে পারে না| মনের অনেক বাঁধা কাটিয়ে তরীকে বলেছিল মনের কথা| অনেকগুলো দিন তরী শুধু ভেবেছে| তারপর একদিন বিয়ে করেছে তারা| নাহ ‚ নিজের না হোক এই দুটো সন্তান যে তাকে মেনে নিয়েছে এই সৌভাগ্যই বা কম কি| পরী তো সব বোঝে এখন ‚ জানে এখন‚ তবু এতটুকু অসম্মান করে না| চোখটা বড্ড ঝাপসা হয়ে উঠছে| কান্নার দমকে ফুলে ওঠা তরীকে ভালোবাসার হাতে তুলে আনে নিজের বুকে| শব্দ নয়‚ নীরবতা দিয়ে তরীকে আশ্বস্ত করতে চায় বিদর্ভ| মুছিয়ে দেয় চোখের জল| কিছু বলতে চায় তরী| বিদর্ভ ঠোঁটের ওপর আলতো করে নিজের আঙুলটা রাখে|

1865

172

শিবাংশু

ইন্দিররাজার জলযাপন

পুরী একটা খুব রহস্যময় জায়গা। কতদিনের পুরোনো জানা নেই। কিন্তু এর ইতিহাস-বর্তমান সব কিছুই আলোছায়াময়। বাস্তব আর পরাবাস্তব হাত ধরাধরি করে চলেছে এখানে হাজার দুই বছর। চৈতন্য মৃত্যুরহস্য হয়তো নেতাজি মৃত্যুরহস্যের থেকেও বাঙালি বেশি খেয়ে থাকে।বাঙালিরা ভাবে পুরী তাদের খুব চেনা জায়গা। কিন্তু অচেনা পুরী, চেনা পুরীর থেকে অনেক বড়ো। হিসেব নেই, কিন্তু মনে হয় এ শর্মা জ্ঞান বয়েস থেকে অন্তত বার পঞ্চাশেক তো গেছেই। বিশেষ করে চাকরিজীবনের শেষ পাঁচ বছর প্রতি দেড়-দুমাসে একবার পুরীর খেপ হয়েই যেত। কিন্তু স্বীকার করি এখনও সব চিনিনা। দারুব্রহ্ম জগন্নাথকে নিয়ে লেখাটা লিখতে গিয়ে দেখলুম ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার কিংবদন্তি এড়ানো যায়না। নীলাচলের আদি শবর রাজা, যাকে নিয়ে আর্য বিষ্ণুবাদী আর অনার্য প্রকৃতিবাদীরা লড়ে আসছে অন্তত হাজার দেড়েক বছর ধরে, তার কোনও চিহ্ন তো পুরীতে থাকা উচিত। খোঁজ করতে পাওয়া গেল একটি সরোবর। ইন্দ্রদ্যুম্নের নামে। জায়গাটার নাম মাকুবন। গুণ্ডিচাবাড়ি থেকে যেতে হয়। এই সরোবরটির সৃষ্টিকথা শুনলে গোমাতার ভক্তরা অনুপ্রেরিত হবেন। কিংবদন্তি বলছে এই স্থানটিতে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সত্যযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। সেই যজ্ঞে সমবেত ব্রাহ্মণদের প্রত্যেককে এক হাজারটি গাভীদান করা হয়েছিল। সেই সব গাভীদের পদক্ষুরাঘাতে এখানে বিপুল গহ্বর সৃষ্টি হয়। সেই গহ্বর পূর্ণ হয়ে যায় পবিত্র গোমূত্রে। সেই সুবাদে এই পাঁচ একরব্যাপী সরোবরটি তীর্থের মর্যাদা লাভ করে। স্কন্দপুরাণের মতে এটি শ্রেষ্ঠ তীর্থের মধ্যে পড়ে। জগন্নাথের চন্দনযাত্রা আর শীতলস্থলী উৎসব এই জলাশয়টিতেই পালন করা হয়। এতোদূর পর্যন্ত পুরাণের এলাকা। কিন্তু ইতিহাসেও এই সরোবরটির বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুর কল্যাণে। তিনি নিজে ছাড়া তাঁর প্রধান অনুগামীরা এই জলাশয়টিকে বৃন্দাবনের যমুনা জ্ঞানে জলকেলি করতেন। সেই সব নামের মধ্যে রয়েছেন অদ্বৈত আচার্য, নিত্যানন্দ, স্বরূপ দামোদর, বিদ্যানিধি, মুরারি গুপ্ত, বাসুদেব দত্ত, শ্রীবাস ঠাকুর, রাঘব পণ্ডিত, গদাধর পণ্ডিত, সার্বভৌম ভট্টাচার্য, গোপীনাথ আচার্য মায় রামানন্দ রায়। অর্থাৎ গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের সব দিগগজেরা এখানে বালকের মতো জলখেলায় অংশগ্রহণ করতেন। তাঁদের এই জাতীয় প্রগলভতা দেখে মহাপ্রভু নাকি তাঁদের ছদ্ম ভর্ত্সনাও করতেন। এই সরোবরে মহাপ্রভুর ইচ্ছেতে অদ্বৈত আচার্য শেষনাগ বাসুকীর মতো শায়িত থাকতেন আর চৈতন্য তাঁর শরীরের উপর শেষসায়ী বিষ্ণুর মতো লম্বিত হতেন। রথযাত্রার আগের দিন মহাপ্রভুর নেতৃত্বে এই সরোবর থেকে জল নিয়ে গিয়ে গুণ্ডিচাবাড়ি ধোয়াধুয়ি করা হতো। এই মূহুর্তে এখানে একটি মন্দির ইন্দ্রদ্যুম্নের নামে, একটি সাক্ষীগোপালের নামে ও একটি নীলকান্তেশ্বর শিবের নামে উৎসর্গিত। ইন্দ্রদ্যুম্নের মূর্তিটি অবশ্য কষ্টিপাথরের। তাঁকে অনার্য বলে স্বীকার করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত। আর রয়েছে নেমে যাওয়া ঘাটের সিঁড়ি। পুরোনো জটাজুটধারী বটের ছায়াছন্ন ছমছমে আবহ। চিরাচরিত ওড়িশার মন্দিরের মতো ঘি-কর্পূরের গন্ধে ভারি পরাবাস্তব পুরাণজগতের ইশারা যেন। কিছুক্ষণের জন্য টাইমমেশিনে সওয়ার হওয়াই যায়। বিশ্বাসী বিলাসের স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া যথোচিত পুণ্যফল পিপাসায়...

88

4

Kaushik

একটা অর্ধ-সমাপ্ত গল্প

পর্ব ৬। ডালিম গাছটায় ফল এসেছে। ছোটো ছোটো ডালিম ফলেছে গাছ জুড়ে। আর মাসখানেকের মধ্যেই পেড়ে খাওয়ার মতন হবে ফল গুলো। তবে হনুমানের যা উপদ্রব এখানে, ততদিন ফল গুলো থাকলে হয়! নবদ্বীপে আসা ইস্তক এ জিনিস দেখে আসছেন ছবি - কারোর বাড়ীতে একটু বাগান করার জো নেই! ফুলের গাছ, ফলের গাছ - কিছুই রক্ষা পায় না ওদের হাত থেকে। নতুন বাড়ীটায় আসা ইস্তক এক চিলতে জায়গাটায় কর্তা কিছু না কিছু লাগাতেন নিয়ম করে। কিন্তু ছবির ওসবের প্রতি কোনোদিন কোনো উৎসাহ না থাকায়, কোনোটাই বেশি দিন আগলে রাখা যেত না ওই হনুমান বাহিনীর হাত থেকে। তবে ডালিম গাছটা কি করে যেন বেঁচে গেছিলো। আর যবে থেকে ডোডোটা একটু বড় হয়েছে, তবে থেকেই ছবির নিজের ভেতরেই একটা চাড় এসেছে গাছের ফল গুলো কে হনুমানের হাত থেকে রক্ষা করার। ডোডো নবদ্বীপে এলে ওকে নিজের হাতে গাছটা থেকে ডালিম পেড়ে খাওয়ানোর মধ্যে একটা পরিতৃপ্তি পান ছবি। বাজারে এর চাইতে ভালো ডালিম পাওয়া গেলেও ডোডোকে তা খাইয়ে মন ভরে না ছবির। নিজেদের গাছের ফল বলে কথা। হোক না ভাড়া বাড়ী, কিন্তু গাছটা তো কর্তার নিজের হাতে লাগানো! এই সব সেন্টিমেন্ট ছবির আগে কোনোদিন ছিলো না। আসলে ছবির ছোটোবেলাটা অত্যন্ত শহুরে, অত্যন্ত সাহেবি হওয়ার দরুন, কোনোদিন বুঝতে পারেননি "নিজের" গাছের ফল-সবজির স্বাদ কেনো সেরা। বেয়ারা-বাবুর্চি যা সাজিয়ে এনেছে, ভালো লাগলে তাই খেয়েছেন আর না লাগলে ফেলে দিয়েছেন। ভোজ্যের সাথে জিহ্বার অতিরিক্ত মনেরো যে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, তা ধারনা তেই ছিলো না কোনোদিন। কর্তারা পাবনার ভূস্বামী ছিলেন। বিয়ের পরে যে ছ'টি বছর পবনায় ছিলেন, তখন খাবার জিনিষ মাত্রেই নিজেদের এস্টেটের উপজ। দেশভাগের পর থেকে নবদ্বীপেই। তখন শুরুর দিকের কিছু বছর দেখেছিলেন কর্তার হা-হুতাশ - পটল গুলার কোনো স্বাদ নাই, বা শালগেড়িয়ার বড় পুকেরের মতন আর মাছ খাইলাম না! সত্যি বলতে কি, কথা গুলো শুনলে তখন গ্রাম্য-মধ্যবিত্ত আদিখ্যেতা বলেই মনে হত ছবির। কিন্তু এই যে আজ তিনি দুপুরে জেগে আছেন হনুমান তাড়ানোর জন্য, এর মধ্যেও কি সেই একই গ্রাম্য ও মধ্যবিত্ত আদিখ্যেতা নেই? তবে বোধহয় গ্রাম্যই হয়ে গেছেন ছবি। বিত্ত তো সেদিনই হারিয়েছেন যেদিন রাতারাতি পাবনা ছেড়ে দুটো সুটকেস নিয়ে নবদ্বীপের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন। আর বিয়ের আগের বছর গুলো বাদ দিলে শহরে থাকা আর হয়নি ওঁনার। হিসেব করলে তেতাল্লিশ বছর দাঁড়ায়, যবে থেকে উনি কলকাতা ছাড়া। তেতাল্লিশ বছরের সংসার করা হয়ে গেলো ছবির। বিয়ের পর কলকাতা ছেড়ে পাবনায় থাকতে অসুবিধে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে অসম্মান ছিলো না। সাঁইত্রিশ বছর ধরে এই নবদ্বীপের জীবনটা মানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু প্রতি পদে গায়ে লেগে থেকেছে অপমান। দারিদ্রের অপমান। মধ্যবিত্ত যে আসলে একটা মানসিকতা, একটা জীবনধারার নাম - সে কথা ছবি বুঝেছেন বিয়ের পরে পরেই। স্থাবর অ-স্থাবর সম্পত্তি খুব কম ছিলো না কর্তাদের - হয়ত বা বাপের বাড়ির থেকে বেশি কিছুই ছিলো। কিন্তু চলতি ভাষায় যেটাকে বলে পালিশ; তা ছিলো না। গ্রাম্যতা তো ছিলোই, সৌখিনতার অভাবো বিদ্যমান ছিলো পুরো মাত্রায়। খাওয়া দাওয়া ভিন্ন আর তেমন কোনো বিলাসিতা ছবি দেখেননি শ্বশুর বাড়ীর লোকেদের মধ্যে। কর্তার বই কেনার নেশা বাদ দিলে আর কোনো নেশা ছিলো না। শার্ট ধুতি যা পড়তেন তা সবই শালগেড়িয়া টাউনের বাজার থেকে কিনে আনা। বাড়ীর অন্য লোকেদের তো কথাই নেই! তাঁদের সকালে উঠেই প্রথম চিন্তা - জলখাবারে কি রান্না হবে। ঠাকুর ঘি দিয়া ভালো কইরা লুচি ভাজবা কিন্তু! তা সেই লুচি খেয়ে উঠে আঁচাতে না আঁচাতেই আবার হাঁক ডাক শুরু হয়ে যেত - নিতাইয়ের মা কুমড়া গুলা ডুমো ডুমো কইরা কাটবা আর মাছের পেটি বাইর কোইরো না! সে খাবারটা হজম হতে না হতেই আরেক চিন্তা - রাত্রে পাঁঠার মাংস রান্ধন করলে কেমন হয়? কর্তার কথা অবশ্য আলাদা। সারা জীবন জ্ঞান চর্চায় কাটানোর ফলেই হয়ত একটা সহজাত পরিমিতি বোধ ওঁনার জীবনধারায় দেখতে পাওয়া যায়। তখনো দেখা যেত। আসলে মানুষটা আলাদা মাটি দিয়ে তৈরি। খাওয়া দাওয়া বাদ দিলে বাড়ীর লোকেদের আলোচনায় খালি ফিরে ফিরে আসতো জমি জমার কথা - এবার ধানের ফলন আগের বারের থিক্যাও ভালো হইবো বা পাট গাছ গুলায় আঁশ কম। যদিও পাবনায় থাকতে সংসারে কোনো কায়িক শ্রম দান করতে হয়নি ছবিকে, কিন্তু সর্বক্ষণ এহেন স্থুল সাংসারিক কথাবার্তায় দম বন্ধ হয়ে আসতো ওঁর। রাত্রে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে গ্র্যান্ড পিয়ানোটা বাজাতেন একা একা। ফিরে যেতে চাইতেন নিজের ফেলে আসা অতীতের কাছে। কার্সিয়াঙের সিস্টার ভেরনিকার কাছে, রবি কাকার কাছে, মিসেস ও'ব্রায়ানের কাছে। ছবির নিজের জীবনের প্রিয়তম মানুষ বাবা। সেই বাবার কাছে কিছুতেই ফিরতেন চাইতেন না ছবি। পাবনার ওই ডানা ভাঙা ছবিকে দেখলে বাবা কষ্টই পেতেন। আর কারুর কাছে কি ফিরে যেতে চাইতেন ছবি? না। তার কাছে আর যে ফেরা যায় না। দেখতে দেখতে প্রায় চোদ্দোটা বছর কেটে গেলো এই বাড়ীতে, তবু এটাকে এখনো মনে মনে "নতুন বাড়ী" বলেই ডাকেন ছবি। বিশ্বনাথের সাথে শোভার ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর থেকেই এই বাড়ীতে চলে আসা। শোভা আর বিশ্বনাথের বিয়ের পরেই অবশ্য ছবি চলে আসতে চেয়েছিলেন আগের বাড়ীটা ছেড়ে - বেয়াই বাড়ীতে ভাড়া থাকলে সম্মান থাকে না - কিন্তু কর্তার মাথায় এ সকল সাংসারিক সমীকরন কোনোদিনই ঢোকে না। সেদিনও ঢোকে নি। আজো কি ঢুকেছে? এই যে সুধাটার বিয়ে হলোনা এখনো, তা নিয়ে ওঁনার কোনো তাপ উত্তাপ আছে বলে তো মনে হয়না। ছবির রাগ হয়, কিন্তু কর্তার ওপরে রাগ প্রকাশ করার কোনো অধিকার ছবির নেই। যে মানুষটাকে খুশি করতে পারেননি, তার ওপরে রাগ করবেন কোন অধিকারে? এতগুলো বছরে কর্তার কোনো অভিব্যক্তিতেও প্রকাশ হয়নি যে উনি অখুশি; ওঁনার স্বভাবই সেরকম নয়। কিন্তু ছবি নিজে তো জানেন! মানুষটাকে সম্মান করেছেন চিরকাল, কিন্তু ভালোবাসতে যে পারেননি, সে কথা নিজের থেকে গোপন করবেন কী ভাবে? সন্তানদের জন্যই বা কী করতে পেরেছেন ছবি? শোভাটাকে নিজের মনের মতন করে মানুষ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারলেন কোথায়? লেখাপড়া শেষ করার আগেই বিয়ে করলো। অল্প বয়সে সন্তানের জন্ম দিলো। বিয়েটাও ভেঙে গেলো। তবে শোভার চেয়েও সুধাটার কথা ভাবলে বড় কষ্ট হয় ছবির। শোভা নিজের জীবনের পথ নিজে বেছে নিয়েছে। সে অধিকার ওর ছিলো, আছে। কিন্তু সুধা? ঊনচল্লিশ বছর বয়সেও যে ও অনূঢ়া, সে লজ্জা কি ছবির নয়? সুধার মতন গুণী মেয়ের জীবনে কেউ এলো না, এটা মেনে নিতে পারেন না ছবি। আসলে সুধাই আসতে দেয়নি কাউকে ওর কাছে। জানেন ছবি। ভেবেছে বাবা-মা'কে দেখবে কে? বিয়ের পর থেকেই খোকন গোমোতে। তার নিজের সংসার আছে। কর্তার রিটায়ারমেন্টেরও বিশেষ দেরি নেই। এ সব ভেবেই মেয়েটা বিয়েই করলো না। মুখে না বললেও ছবি জানেন এটাই আসল কারন। মা হিসেবে এর চেয়ে বেশি লজ্জার আর কিছু কি থাকতে পারে ছবির কাছে? ঈশ্বর বোধহয় ওঁনার কপালে নানাবিধ লজ্জাই লিখেছেন। ভালোবাসা হারানোর লজ্জা, দারিদ্রের লজ্জা, সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালন করতে না পারার লজ্জা। লিপি আর কিরণ অবশ্য নিজেদের জীবনে সুখি। ভালো বিয়ে হয়েছে দু'জনারই। এইটুকুই বা কম কি! এইটুকুই যদি ঈশ্বর ছবির কপালে লিখে থাকেন, তাই সই। বিকেল হয়ে এল। কর্তার ফেরার সময় হয়ে এসেছে। সুধার ও। চায়ের জলটা উনুনে চড়িয়ে দিতে উঠে পড়লেন ছবি।

772

45

Ranjan Roy

<এলোমেলো ভাবনাঃ ----- রঞ্জন রায়>

<কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কে নিয়ে আমার দুটি কথা ============================== না; আমি আধুনিক কবিতা বা চিত্রকলা বুঝি এমন অপবাদ আমার অতি বড় শত্তুরেও দেবে না। তবে সব বঙ্গসন্তানই বড় হয়ে 'জল পড়ে পাতা নড়ে' আর ' বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর' শুনে। আর গোঁফ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে পদ্য লেখে , পাশের বাড়ির রাইকিশোরী মেয়েটির প্রেমে পড়ে। আমিও ব্যতিক্রম নই। অন্যদের মত আমারও রবি ঠাকুরের কিছু পদ্য, জীবনানন্দের 'বনলতা সেন', 'রূপসী বাংলা' থেকে কোটেশন চুরি করে চিঠিতে গুঁজে দেওয়ার অভ্যেস ছিল। কিন্তু এর পরের কবিরা? সত্যিই বুঝতে পারি নি, মানে বেশির ভাগই কিরকম ক্যালকুলাসের অংকের মত লেগেছে। কিন্তু সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম আছে। যে দু-একজন কবিদের কবিতা সেই প্রথম যৌবনেও ভাল লেগেছিল নীরেন্দ্রনাথ তাঁদের অগ্রগণ্য। কেন ভাল লেগেছিল? বুঝতে পারতাম বলে। ভুল বললাম,-- কবিতা তো বুঝবার জন্যে নয়, বাজবার জন্যে। হ্যাঁ, ওঁর কবিতায় বুকের মধ্যে কিছু একটা বেজে উঠত। শব্দের মায়া ছাড়িয়ে মনে হত এত আমার কথা বলছে। আমার কথা? না, শুধু আমার কথা নয়। আমাদের কথা। মানে ষাটের দশকের শেষের দিক থেকে সত্তরের দশকের বছরগুলোতে হাওয়াই চটি পায়ে কোলকাতা চষে বেড়ানো ছেলেগুলোর কথা। ঠিক তাও না, গুছিয়ে বললে ওদের চোখে দেখা সেই সময়ের কোলকাতার কথা। আস্তে আস্তে নীরেন্দ্রনাথ এর কবিতা সেই সময়ের কোলকাতার চালচিত্র হয়ে উঠলো। সেই কোলকাতায় বড় বড় মল ছিল না, ফ্লাই ওভার ছিল না। ঝাঁ চক্চকে রাস্তা, এত গাড়ি, আইনক্সে সিনেমা -- কিছুই ছিল না। আর চাকরিও ছিল না। আমরা ছিলাম দিশাহীন। আমরা ছিলাম উচ্ছন্নে যাওয়া। কিন্তু আমরা ভালবাসতাম, কেরিয়ারকে নয়---নারীকে, আসলে কোলকাতাকে। সেই কোলকাতা জীবন্ত হয়ে আছে নীরেন্দ্রনাথের কবিতায়। কিন্তু উচ্চকিত নয়, শ্লোগান মুখরিত মুষ্টিবদ্ধ হাত নয়। তাঁর কবিতা সেতারের আলাপের মত আন্তরিক, মৃদু উচ্চারণের। এই কবিতাটি দেখুনঃ কোলকাতার যীশু। একহিসেবে ওঁর সিগনেচার কবিতা। কলকাতার যিশু ----------------------- লালবাতির নিষেধ ছিল না, তবুও ঝড়ের-বেগে-ধাবমান কলকাতা শহর অতর্কিতে থেমে গেল; ভয়ংকর ভাবে টাল সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ট্যাক্সি ও প্রাইভেট, টেম্পো, বাঘমার্কা ডবল ডেকার 'গেল- গেল' আর্তনাদে রাস্তার দুদিক থেকে যারা ছুটে এসেছিল- ঝাঁকামুটে, ফেরিওয়ালা, দোকানি ও খরিদ্দার- এখন তারাও যেন শিল্পীর ইজেলে স্থিরচিত্রটির মত লগ্ন হয়ে আছে। স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে, টালমাটাল পায়ে রাস্তার এক-পার থেকে অন্য-পারে হেঁটে চলে যায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটি শিশু। খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গীপাড়ায়। এখন রোদ্দূর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মত মেঘের হৃৎপিন্ড ফুঁড়ে নেমে আসছে ; মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর। স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে। ভিখারী মায়ের শিশু, কোলকাতার যিশু, সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ। জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের দাঁতের ঘষটানি কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নেই; দু-দিকে উদ্যত মৃত্যু,তুমি তার মাঝখান দিয়ে টলতে টলতে হেঁটে যাও। যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেতে চাও হাতের মুঠোয়। যেন তাই টালমাটাল পায়ে তুমি পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য কিনারে চলেছ। ----------------- দেখতেই পাচ্ছেন, কিভাবে কবিতাটি সেই সময়ের কোলকাতার দৈনন্দিন জীবনের একটি ঘটনার থেকে শুরু হয়ে এক মহত্তর আবেদনে পৌঁছে গেছে। ১৯৬৯ এর দুটি শারদীয় সংখ্যায় উনি দুটি কবিতা লেখেন । একটি উল্লিখিত 'কলকাতার যিশু' অন্যটি 'চতুর্থ সন্তান'। এর প্রেক্ষিত নিয়ে দুটো কথা বলি। আমার প্রজন্মের মানুষজনের মনে পড়বে যে পরিবার নিয়ন্ত্রণের শুরুর দিকে সরকারী শ্লোগানগুলো অন্যরকম ছিল। প্রথমে, ' দো ইয়া তিন,ব্যস্'। এর পরে এল ' হম দো, হমারে দো'। তো নীরেন্দ্রনাথের কবিতা সেই' তিন পর্য্যন্ত' ফরমানের দিনে লেখা। সেখানে কোন পরিবারে জন্ম নেওয়া অবাঞ্ছিত "চতুর্থ সন্তান" অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বসে। নীরেন্দ্রনাথের সংবেদনশীল কবিমন বলে ওঠে ' কে তোমাকে চায়'! ওঁর কলমে ফুটে ওঠে ঋষির মতন অমোঘ সত্যবচন-- যে পৃথিবী এই চতুর্থ সন্তানকে ওর ইচ্ছের অপেক্ষা না রেখে জন্মদিয়ে এখন 'দুর ছাই' করছে, কাল সে নিজে অভিমানে প্রতিশোধ নিতে পারে এই পৃথিবীটাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে! চমকে উঠে টের পাই-- ওই অবাঞ্ছিত শিশুটি তো আমি বা আমরা! যাদের চাকরি নেই, পাড়ায় পরিবারে সম্মান নেই, আমরা যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই-- আমরাই তো এক বৃহত্তর অর্থে শহর কোলকাতার চতুর্থ সন্তান। আমাদের মধ্যে রয়েছে নিজেকে ধ্বংস করার প্রবণতা। উনি চমকে দিলেন আবার, সত্তরের গোড়ায়। আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় সাময়িকীতে নিয়মিত লিখলেন "কবিতার কথা",--- কবিকঙ্কণ পেন- নেম নিয়ে। প্রথমে আমাদের অভিজ্ঞ মাস্টারমশাইয়ের মত ধৈর্য ধরে বোঝালেন -- কবিতা কাকে বলে। অর্থাৎ কী কী থাকলে একটি লেখা কবিতা হয়ে ওঠে। আবার সেগুলো না থাকলে শুধু মাত্রা গুণে ছন্দ মিলিয়ে অন্ত্যমিল দিলেও সেটা কবিতা হয় না। উদাহরণ দিলেনঃ " সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে দুর্যোধনের ভাই। গর্জনে তার তূর্য বাজে তর্জনে ভয় পাই"। কিন্তু পরে একটি বেস্ট সেলার বই হয়ে বেরনো 'কবিতার কথা' আসলে বাংলা ছন্দের কথা। এখানে আমরা পেলাম ছান্দসিক নীরেন্দ্রনাথকে। এই লেখাগুলোর মাঝে প্রখ্যাত ছান্দসিক প্রবোধ চন্দ্র বাগচীর সঙ্গে ওঁর মত বিনিময় আমাদের মত হরিদাস পালদের জন্যে অত্যন্ত স্বাদু শিক্ষণীয় পাঠ হয়ে উঠল। আমরা ধীরে ধীরে শিখে নিলাম যে বাংলা ছন্দ মূলতঃ তিনরকম--অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত। উনি এগুলোকে চেনার এবং মাত্রাগোণার পদ্ধতি দেখালেন, বাদ গেল না বাংলা ছড়ার ছন্দের মাত্রাও ( যোমনাবতী সরস্বতী কাল যোমনার বে')। "কবিতার ক্লাস" এর মধ্যে মধ্যে বিশুদ্ধ হাস্যরসের চৌপদীও থাকত। একটি নমুনাঃ "ছন্দের গুঁতো খেয়ে পোড়োদের হায়, চোখ থেকে অবিরল অশ্রু গড়ায়। কহে কবিকঙ্কণ কান্না থামাও, ক্লাস থেকে মানে মানে চম্পট দাও"। কবি নীরেন্দ্রনাথ পরবর্তী কবিতাগুলোয় আরও মিতবাক হলেন। অসহ্য দমবন্ধ পরিবেশ বোঝাতে তিনি বলেন--" দু-পায়ে ভেতরে ঢুকলে মনে হয় চারপায়ে বেরিয়ে যাই।" এমনসময় এল বাংলা বানান সংস্কারের আন্দোলন। সংস্কৃতের অন্ধ নকল ছেড়ে বাংলা বানান মুখের কথার কাছাকাছি আসতে চাইল। আরও সহজ হয়ে উঠল। অনেক র-ফলার পরে যুক্তাক্ষরকে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করা হল। অনেক বিতর্ক কমিটি বাদানুবাদ শুরু হল। নীরেন্দ্রনাথ লিখলেন--"কী লিখবেন, কী লিখবেন না"। যাঁরা আজকের আধুনিক বাংলা লিখতে চান তাঁদের কাছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত বইটি বাইবেলের মত। কোলকাতার বাঙ্গুর এভিনিউয়ের বি-ব্লকে কাকিমার বাড়িতে গেলে চোখে পড়ত দীর্ঘদেহী ছিপছিপে পাকাচুলের নীরেন্দ্রনাথ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বাজারের থলি হাতে হেঁটে যাচ্ছেন,-- আদ্যন্ত সুভদ্র নম্রকন্ঠ এক সংবেদনশীল বাঙালী কবি।> ================================

108

8

দীপঙ্কর বসু

মঠদিঘীর কিস্সা

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা গ্রাম মঠদিঘী । গ্রামের একধারে স্বচ্ছ টলটলে মিষ্টি জলের একটা বেশ বড়সড় একটা দিঘী ,আর তারই পাড়ে ঝোপজঙ্গলে ঘেরা পাঁচ ছটা খুপরি ওয়ালা একটা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ।জনশ্রুতি বাড়িটা নাকি একসময়ে কোন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মঠ ছিল । সেই মঠ আর দিঘীই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট গ্রামটা পরিচয় ।গ্রামের নাম হয়ে গিয়েছিল মঠদিঘী । কয়েকঘর অবস্থাপন্ন চাষি যাদের নিজস্ব ধানি জমিজিরেত আছে , দু-ঘর বামুন ছাড়া গ্রামের অধিকাংশ লোকই মুসলমান ক্ষেতমজুর শ্রেণীর। তাদের না আছে জমি জমা না আছে কোন স্থায়ী উপার্জন । ছাষবাসের কয়েকটা মাসই শুধু তারা কাজ পায় ক্ষেতমজুর হিসেবে ।সেই সময়গুলোতে হাতে আসে সামান্য কিছু অর্থ যা দিয়ে কটাদিন একটু মানুষের মত খেয়ে বাঁচে ,ঘরের ছেলেপুলেগুলোর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারে ।বছরের বাদবাকি সময়টা কাটে অর্ধাহারে ,মণিব-বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে আনা ভাতের ফ্যান আর বুনো শাকপাতা সিদ্ধ খেয়ে ।সেটুকুও না জুটলে দিনের পর দিন চলে উপবাস ।ছেলে মেয়েগুল তাদের কঙ্কালসার শরীর আর স্ফীত উদর নিয়ে ধুকতে থাকে বা পড়ে থাকে ঘরের মধ্যে নির্জীবের মত । তবে ওদের মধ্যে সবাই শুধু পড়েপড়ে ভাগ্যের মার সহ্য করতে নারাজ । খিদের জ্বালায় উপায়ান্তর না দেখে কেউ করে ডাকাতি কেউ সিঁদ কাটে সম্পন্ন গৃহস্তের ঘরে । পেটের দায় কখনো কখনো খুন খারাপিও ঘটে যায় । যে সময়ের গল্প বলতে বসেছি সেটা ছিল উনিশশো ষাটের শেষ ভাগ ।এই উনিশশো ছেষট্টি কি সাতষট্টি হবে ।দেশ জুড়ে চলছে তীব্র খাদ্য সঙ্কট – প্রায় দুর্ভিক্ষের মতই অবস্থা । সরকার লেভি ধার্য করেছে ক্ষেতের ফসলের ওপরে । ফসলের একটা নির্দিষ্ট অংশ সরকারের ভান্ডারে দিতে হবে ।তাই দিয়ে চলবে শহর গঞ্জের মানুষদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা । সরকারের নজর কৃষকের ঘরে মজুদ করা উদ্বৃত্ত ফসলের দিকে আর কৃষকে নজর সরকারের শ্যেন দৃষ্টি এড়ানো ।তাই তারা ফন্দি এঁটে কিছু কিছু ধানচাল বোঝাই বস্তা গরীব ক্ষেত মজুরদের ঘরে লুকিয়ে রাখা । এমতাবস্থায় মঠদিঘী গ্রামের ওস্তাদ সিঁদেল চোর বড়কচি স্যাঙাত আয়নুদ্দিন দপ্তরীর মাধ্যমে খবর পায় মন্ডল্ বাবুদের কয়েকবস্তা চাল নাকি গচ্ছিত রাখা আছে তাহের আলির ঘরে । সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বড়কচি “আজ রাতে তাহের আলির ঘরে সিঁদ কেটে দু বস্তা চাল যে করে হোক বের করে আনতেই হবে।অনেকদিন হয়ে গেল পেটে একদানা ভাত পড়েনি।” উল্লসিত আয়নুদ্দিন আনন্দে মাতোয়ারা । -“কদ্দিন পরে ঘরের ছেলেপিলেগুলোর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারব ভাবদিকি ওস্তাদ” তার আর তর সয়না । গ্রামে গঞ্জে সুজ্জি ডুবলেই নিশুত রাত ।তাও বেশ রাত করে সাগরেদ আয়নুদ্দিনকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বড়কচি সিঁদ কাটে তাহের আলির ঘরে । অন্ধকারের মধ্যেই বড়কচির চোখে পড়ে দুপাশে রাখা বেশা কয়েকটা চালের বস্তার মাঝখানে একপাল অনাহারক্লিষ্ট আন্ডাবাচ্চা সহ তাহের আলি আর তার বিবি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে । দেরি করেনা বড়কচি । একবস্তা চাল দুজনে মিলে ধরে চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসে সেই সুড়ঙ্গ ধরে ।তার পর চালের বস্তা মাথায় নিয়ে দ্রুত পদে হাঁটা দেয় ন্যাড়ামাঠের দিকে ।পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে আয়নুদ্দিন তার উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেনা ।লোভে তার চখদুট চকচক করতে থাকে ।কেবলি বলে চলে “উফফফ কতদিন পরে দুমুঠো ভাত খাব বলতো ওস্তাদ ।ছেলেমেয়েগুলো কি রকম আহ্লাদ হবে একবার ভাব দি’নি ওস্তাদ!” স্যাঙাতের ঘ্যানঘ্যানিতে বিরক্ত হয়ে এক সময়ে চলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বড়কচি ।ধমক লাগায় আয়নুদ্দিনকে –“অ্যাই ,থাম তো দেহি ।সেই থেকে সেই এক কতা ঘ্যানঘ্যান করে চলেচে কানের কাছে । ইদিকে আমি ভাবচি অন্য কতা” “কি কতা ওস্তাদ”? উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করে আয়নুদ্দিন । ক্লিষ্ট স্বরে বড় কচি জবাব দেয় “দেখ ,আমরাতো এই চাল ফুটিয়ে ভাত খাব ।ওদিকে তাহের আলির হেনস্তার কতাটা একবার ভাবতো ।কত্তাদের গচ্ছিত চাল তাহের আলির হেপাজত থেকে খোয়া গেলে তাহের আলি নিস্তার পাবে ? কত্তারা খোয়া যাওয়া মালের খেসারত আদায় করবেনা তাহের আলির কাছে থেকে ?হয়ত তাহের আলির মজুরি থেকে লোসকানের উসুলি করবে কত্তারা ।এমনিতেই খেতে পায়না তার ওপর মজুরি কাটা গেলে কি হবে তাহের আলির? ওর ঘুমন্ত ছেলেপিলে কটার মুখগুলো বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে আসচে ।চল বস্তাটা তাহের আলিকে ফেরৎ দিয়ে আসি গে” আকাশ থেকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে আয়নুদ্দিন । বল কি ওস্তাদ মুখের গেরাস মুখে না তুলে ফেরৎ দিয়ে আসবে তাহের আলিকে !! পারবে ফেরৎ দিতে?” মাঠের মধ্যে দুজনের এই কথাপোকথনের মধ্যে তাদের চোখে পড়ে দূর থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে দ্রুতবেগে ছটে আসছে একটা ছায়া মূর্তি ।পালানর ভাবনা মাথায় আসার আগেই কাছে এসে পড়গে ধাবমান ছায়া মূর্তি ।অন্ধকারের মধ্যেই চেনা যায় তাহের আলিকে ।ঘুমের মধ্যেই খুটখাট আওয়াজে সে জেগে ওঠে । ঠিক কি কান্ড হটেছে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে তার ।তার পরেই পাগলের মত ছুট লাগায় মাঠের দিকে । তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ই তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে হাজির করে বমাল সমেত চোরেদের সুমুখে । হাতের লাঠিটা তুলে ধরে চোর নিধনের জন্যে ।ঠিক সেই সময়েই ধপ করে তাহেরের পায়ের কাছে মাটিতে চালের বস্তাটা নামিয়ে রাখে বড়কচি । কাতর কন্ঠে তাহের আলিকে উদ্দেশ্য করে বলে “বড় ভুল করিচি রে বাপ । চালের বস্তাটা নে’ যেতে যেতে দেকতে পাচ্ছিলুম তোর কচিকাচাগুলানের মুখগুলো ।ফেরৎ নে যা ভাই তোর চালের বস্তা ।ও চালের ভাত আমার পেটে সইবেনি রে”

92

6

মনোজ ভট্টাচার্য

ভিয়েনা একটি জনপদ !

ভিয়েনা একটি জনপদ ! ভার্জিনিয়া প্রদেশের ছোট একটা জনপদের নাম ভিয়েনা ! যদিও ওয়াশিংটনের থেকে খুব কাছেই – কিন্তু উত্তর ভার্জিনিয়ার এই শহরটার নাম বিশ্বের খুব বেশি মানুষ শুনেছে বলে মনে হয় না ! তবু আগেকার দিনের গোল্ড রাশের মত না হলেও - ওয়াশিংটনের কাছে এই ছোট শহরটার গুরুত্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে । বিশেষত ভারতীয়দের জন্যে ! আই টি অফিস ছাড়াও বিভিন্ন পেশাধারী মানুষ এসে এখানে ভিড় করেছে । বিরাট বিরাট অফিশ বাড়ির আশেপাশে শুধু তিন চার লেনের বড় বড় রাস্তা । এরই আশেপাশে - ভিয়েনার একটা ট্রেলওয়ে পথ এখন আমাদের লক্ষ্য । ঘুরতে ঘুরতে যেভাবে হোক এখানে এসে পড়েছি । - আমার সাথে রয়েছে ছজন কাউবয় ! প্রত্যেকের পরনে র্যাং লার জিনস – কোমরে লং হর্ন বেল্টে বাঁধা কোল্ট পিস্তল ! দুজনের গায়ে আবার ভ্যকেরো ধরনের জ্যাকেট ! – সবাই চলেছি এই অচেনা ট্রেইলওয়ে ধরে । - জন্তু- জানোয়ারের চেয়ে বেশি আমাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে অন্য কোন ইয়াঙ্কিদের ! ওদের হাতেও এই বন্দুক আছে ! আমাদের এখানে আসার একটা কারন আছে । - সেটা হল এই ভার্জিনিয়ান ট্রেলওয়ে ধরে কোনও যান চালানো যায় কিনা – ব্যাপারটা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা । এই পথটা কতটা নিরাপদ ও কতটা পাহাড়ি – বা এখানে অন্য যান চালানো কতটা ব্যবসায়িক ভাবে সাফল্য পাবে – সেটাও দেখা ! ঘোড়া দিয়ে বড় ওয়াগন নিয়ে যাওয়া বেশ অসুবিধেকর । ছোট ছোট রেল পেতে ট্রেন নিয়ে গেলে কেমন হয় ! – বেশ কদিন ধরেই এখানে যাতায়াত করছি। আমাদের রিপোর্টের ওপর এখানে কি ধরনের যান চলাচল করবে – সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ! অবশেষে ১৯০২ সালে আঞ্চলিক কয়েকজন ভূস্বামী ও ব্যবসায়ী সমবেতভাবে জন রোল ম্যাকলীনের নেতৃত্বে প্রথমে তৈরি হল গ্রেট ফলস ও ওল্ড ডোমিনিয়ন রেলরোড মাত্র পনেরো মাইল । দুদিকে জঙ্গল ও পটোম্যাক নদীর ওপর দিয়ে দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে ওয়াশিংটন চলে যাওয়া যেত ! পরে আবার ওয়াশিংটন রেলরোডের সঙ্গে মিলে আরও পথ বেড়ে গেল । কিন্তু ক্রমশ ভাড়া বৃদ্ধি ও যাত্রীর অভাবের জন্যে এই রেল পথ শেষ পর্যন্ত উঠে গেছিলো । তখনও কিন্তু আমরা দক্ষিণের কাউবয়রা এখান দিয়েই ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ! রেল লাইনের পাশ দিয়ে – বাঁদিকে একটা মিল নতুন তৈরি হয়েছে । এখন বাইক নিয়ে যায় এখানকার সাধারন লোকেরা আর ছেলে-মেয়েরা জগিং করে ! অবশ্য বাইরের কেউই এসবের খোঁজ রাখে না ! অনেকদিন হল রেল চলে না এখানে – তবু পুরনো রেল লাইন পাতা আছে । একটা ট্রেনের কামরাও সাজিয়ে রাখা আছে । ভিয়েনা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আছে বেশ সাজানো গোছানো । টিকিট কাউন্টার – আর ওয়েটিং এরিয়া । আর আছে অতি পুরনো একটা চা ঠাণ্ডা পানীয় খাবার স্টল ! আমাদের মতো দুরন্ত কাউবয়দের পানীয় জোগান দিতে ! ওখানে পানাহার সেরে চলে যেতাম পটোম্যাক ধরে ওয়াশিংটন শরের দিকে ! এখন আমরা আর ঐ পথ দিয়ে ঘোড়া নিয়ে যাইও না ! মনোজ

86

7

উদাসী হাওয়া

হেলায় শ্রদ্ধায়

তিনশো টাকায় পাঁচশ কবিতা পাওয়া যায়! তিনশো টাকায় পাঁচশ কবিতা পাওয়া যায়। ভাবা যায়! এই বাজারে! কার আর নজরে পড়বে! আমার মতই কিছু হতচ্ছাড়া, কোমরে লাঠির বাড়ি মারা কোনও জীবন্মৃত বেড়ালের বা মেয়ের ভগ্নাংশের না পারা অন্ত্যাধুনিক সরলের ভুল উত্তর তরল হয়ে ফুটবে। অথবা জুটে যাবে যত ছোটখাট ভালবাসি তাই গাই - গিটারের দল, ট্রেনে চেপে, বাঁধা রাখা সাইকেলে চেপে রোজ বাড়ি ফেরে যারা, আজও যারা সাদাকালো মোবাইলের পাশে, দশ টাকার টপ-আপ আছে! রিংটোনে শুধু পিংপিং বাজে গীত গাতা চল। হবে সেই রকম কিছু সাপ, ব্যাঙ, আর মানুষের চিৎকার - হয়ত দরকার আছে! কিছু কবিতা এই নিয়েই বাঁচে। ঠিক খুঁজে নেয় দুঃখ বিলাসী কবিকুল অন্তরীক্ষ ঝলমল। কারখানা বন্ধ হলেই ভোরবেলা শপিং মল। আদার ব্যাপারী দু তিনটে জাহাজের বোঝা নিয়ে ঘরে ফিরে ঝোলা ঝেড়ে দেখে কোন কনফিডেন্স নেই একচুয়ালি কবিতা লেখে সেইই। ইদানিং মেরুদণ্ডহীন ডিভিডির ফাইলটুকু পেন-ড্রাইভে মেপে, স্রেফ গাঢ় নীল আপেক্ষিক আসে শারীরিক যন্ত্রণা প্রশমনের জীন। আজও আসে রীতিমত। চুপচাপ, এ শহরে কুদেখা আজও নেকুপুশু – পাপ! এখনও মোঘলাই অনুগত বটতলাকে ঠেসে বলে, ভীষণ জেদের বশে, বাৎস্যায়নী ব্যাঙের ছাতা করে নেব জয়- তাই, রাতে বাড়ি ফিরতেই না ফিরতেই আঠালো ভয় যাই হোক কিছু একটা ডিকেডেন্স চায় মাথার ভিতর নগ্ন বনিতা ঘোরে, ঘড়ির কাঁটায় সুখ শ্রান্তি কমে বাড়ে। মর্ষিত প্যানাসিয়া রোজকার মত ট্রাম-বাস ট্রেন থেকে, শত শত রিকশা থেকে, হঠাৎ ট্যাক্সি থেকেও নামে ওরা খালবিল পার হয়! পায়েল-কোয়েলের নতুন গান হয়ে আসে কিছুক্ষণ আপনমনে ভাসে। বাথরুমে দৌড়ে যায় সাইবার ক্যাফে ইউটিউবের নির্যাসে। যদি কিছু পায়! ওপারে পুরানো বাড়িটা বিক্রি হবে সস্তায় দামি মাল পাওয়া যদি যায়! ওদের নজরে পড়বেই, জানে, ধোপে টিকতে পারবে না পারবেনা কিছুই কিনে নিতে, পয়সা নেই, জোর নেই, টিকে থাকার ইচ্ছেও নেই ওরা শুধু আছে কিছু জ্যান্ত লাশ, নিস্তরঙ্গ শৌখিন প্লাস্টিকের আর রবারের চটি সকাল এখানে বিকেল ওখানে রুজিরুটিরা চায়ের দোকানে বসে সিওপিডিরা কাশে, শুধু তাকিয়ে থাকতে ভালবাসে। হঠাৎ, দুপুরে বাসি কাগজ পড়তে এসে ফসসাপনা মেয়েটির স্পর্শ পেয়ে যায়। কেউ কেউ নাকি জাদুটোনাও জানে, বউদিরা কেউবা হাত ধরে টানে বিকেল গোল হয়ে বসে সবাই মিলে হাসে। কিছু জ্যাম, ডিম-পাঁউরুটি, চাউমিন নিয়ে ড্যালহাউসির মধ্যবিত্ত দিন দুশো বছর পার হয়ে সোঁদা গন্ধের নামই মূত্রাশয় জানবার পর, যারপরনাই চিৎকার শহর তুমি কার! এইতো আমি সান্যালদা! তোমার অলিখিত বেয়াদব ঋণ। তারপরই বাৎসরিক দুর্গা পূজার ঝঙ্কার, থেকে থেকে কাশফুল হুটোপাটি করতেই থাকে কোনও ভুলভাল কলকাতার পাশে হাওয়া লিখে দেয় শরতের ক্লিশে রূপকের নগণ্য আশীর্বাদী রাস্তার ফুলমালার বকুনি, শুকিয়ে যায় তখুনি। একচ্ছত্র অধিপতি মনটা পড়ে থাকে একটা হারু পাগলার রকে। নানাবিধ ক্যাশমেমো, ক্রেডিট কার্ডের মুখরিত জ্বলা আনন্দে উড়ে যাবে, ‘বাবা আরেকটা বেলুন কিনে দেবে? ভেসে যাব বেশ আরও কিছুদিন’। ‘আরে বলোনা, কি কি কিনতে হবে আর নিউ মার্কেটই যেতে হবে তারপর কিন্তু প্লিজ হালকা একটু নেব, কপাট দিয়ে দ্বারে রোজকার মধুচন্দ্রিমার খোল সেখানেই তোমার গল্পের গরু তালগাছে পাবে সঙ্গোপনে নতুন ক্যরেক্টার রোল’। এইভাবে ভোর হয়, সন্ধে হয়, রাত্রি ক্ষয়ে আবার লোহার পেটাই খাটে শোবে এইভাবেই তাদেরও ছেলেমেয়ে, যেদিন প্রথম সূর্য গিলতে ছুটেছিল হনুমানের দল মানে, ওই অতিকৃত কাল জানে না কাটবে কিনা পার হবে তবু লাঙলের ফলায় অনেকদিনই প্রেরণা জবুথবু। বাইরে ঘরে নান্দনিক আতঙ্ককে শুনে পদধ্বনি গোনে। সেন্সেক্স পড়ে যাচ্ছে নাকি ঠিক তালে তালে ওই আসে বা এসে গেছে প্রায়। অসভ্যতার মাপা চাপা ধ্বনি শোনাতে চায় - মর্ত্যের স্বর্গ থেকে পাতালের জঠর থেকে আকাশের ছায়াপথ থেকে ক্রন্দসী আলোর জাটিঙ্গা নিজেই আসছে ধেয়ে আবশ্যিক ভৈরবী ডমরুর শব্দ নিয়ে ভাবতেও ভাল লাগে আমরা একসাথেই মরব তবে! বোকা, ওরা চাঁদে চলে যাবে! তারপর তোমাকেই আবার বলি, ‘মধুবংশীর গলি বজ্রনিনাদে তোমাকেও ডেকে বলি’ কালের শতচ্ছিন্ন মলিন কাঁথায় নকশা কাটে রাস্তার ধারে বসে থাকা কুকুর, প্লাস্টিকে ভরা পুকুর। জীবনযাত্রায় কোথাও কোথাও একই রকম দারিদ্র চলাফেরা কিছু কিছু রাস্তার কোনে অবিক্রীত, বিকৃত সম্ভার অগুন্তি তিরস্কার -- কানমলা, কিল চড়, লাথি মর তোরা মর। পুড়ে যাওয়া মুখ ভাঙ্গা আয়নার কাঁচে, আর কোথাও ঘুঁটে ভরা উনুনের আঁচে, অন্যমনস্ক এই শহরের আনাচে কানাচে ভর্তি থাকে কাক, চড়ুই, চিল, কলতলার ভিড়। জল নিতে দৈনিক ঝগড়ার সাথে মেলবন্ধন, পুরান জিনিস বেচবার আর নতুন, প্লাস্টিক গামলায় দুদিনেই চিড়। প্রতিদিন কাছে দূরে -- তবু বিক্রি হতে থাকে হরেক মাল তিরিশ টাকা আজকাল। ভোর হয়, এখনও কোথাও নাকি সন্ধেবেলা গান গায়, রাত্রি মিলে যায় বিছানায় পেতে রাখা মাদুরে মানব মানবীর শান্তির জল। কাঁচের মত দানব টাকার মায়া নিজেদের ইচ্ছাভৃত ছায়া, যত চায় সব পেয়ে যায় অমরাবতীর ফ্যান্টাসি জাপ্টে ধরে ওদের এই নতুন শহর বারে বহরে বাহারে। তারা আজও কোজাগরীর প্রসাদ পাবে, কেউ অবসন্ন অপসৃত নয়, তারা কবিতা লেখে না, তারা গান শোনে না তারা কেনে, তারা বেচে, অব্যর্থ সাইলকের সন্ততির মতিগতি ঠিক ফুলের দেশে, অবশেষে কংক্রীটই লেটেক্স, সেক্সিকীট যারা দামি, যারা অস্বাভাবিক, যারা ধ্বংস করে, যারা তৈরি করে, যারা ঘরে ফেরে ব্যুগাতি চড়ে, যারা সস্তায় স্তুপাকার বাবার প্রিয়তমা কারখানার মর্ত্যভুমি কেনে, কারনে, অকারনে তাদের জন্য রাখা থাকে অন্যরকম ছায়াপথ তাদের ডিসাইনার চশমার ফ্রেমে ফুটবে নতুন আরেক শহরের নতুন ফুল। ঐ যে শিশির মার্কেট, ঐ যে সংশয়বিদ ঐ যে জিন্সের নিচে সাবাল্টার্ন চাপ, আরেকটু সালাট দাওনা, সালাড, মুড়ি আর লঙ্কার চপ হে এলোমেলো মুখের উপরে কমটে থাকা চুল তিনশো টাকায় পাঁচশ কবিতা পাওয়া বড়সড় ভুল!

106

4

শিবাংশু

..... যেন হেঁটে যেতে পারি..

".... আমি তো সুড়ঙ্গের পথ বেয়ে কুবেরের চূড়োয় সিঁদ কাটতে চাইনি কেবল ঘাস ফুলের শিশিরে জাজিমে এক চিলতে আকাশের বুক ছুঁতে চেয়েছিলাম..." বাবা'র কথা কীভাবে লিখতে হয়? নাহ, সে মডেল তো এদেশে অনেক আছে। কিন্তু সে সব কথা তো সবার আলাদা। তাঁরা কেমন হ'ন? ঠাকুরদাস, মহর্ষি, রাজনারায়ণ দত্ত, বিশ্বনাথ দত্ত, উপেন্দ্রকিশোর, তাঁরা তো সব বিখ্যাত মানুষ। নয়তো একজন হরিহর বাঁড়ুজ্যে বা সেই একজন বাবা, যিনি ছেলের কাঁধ ছুঁয়ে বলেন, দেখিস, আমরাও একদিন.... ছেলে'দের বাবা আর মেয়ে'দের বাবা কি কখনও এক রকম হন ? বোধ হয় সেটা হওয়া যায়না। মেয়ে'রা বাবা'র কথা যতোটা স্বতোৎসার লিখতে পারে, ছেলেরাও পারে কি? জানিনা.... ----------------------------------- ",.... হেমন্তের ঘাসে ঘাসে শিশিরের শব্দ মৃত হলে ফেরারি পাখির ডানা স্মৃতিস্পন্দে ভারী হয়ে আসে নাভিপদ্মে পুণ্যতোয়া সৃষ্টির সৌরভে স্মৃতি নামে কোনো নারী মুখ ঢাকে উদ্বেল আশ্লেষে..." আমার বাবা ছিলেন একজন অতি সুদর্শন ভদ্র বাঙালি। প্রায় ফুট ছয়েক দীর্ঘ, নয়নাভিরাম তাঁর উপস্থিতির আবহ। অনেক সম্পদ ছিলো তাঁর, বিমূর্ত। কিন্তু ধনপতি কুবের কখনও তাঁকে কেয়ার করেননি। মধ্যস্তরের বাঙালি যেমন টানাটানি করে নৈমিত্তিক হাল সামলায়, সেরকম একজন। অবশ্য বাবা'কে কবে আর হাল সামলাতে হয়েছে? তার জন্য তো একজন অতন্দ্র সঙ্গিনী তাঁর জুটে গিয়েছিলো। বেঁচে থাকার মলিন কাদাজলের ছিটে থেকে বাবা'কে সতত আড়াল করে রেখেছিলো তাঁর ছড়িয়ে রাখা আঁচল, পুরো সাঁইত্রিশ বছর। তিনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথা রাখেননি। একাকী চলে গেলেন, অসময়ে। সকল লোকের মাঝে বসে, মানুষ কীভাবে একা, আলাদা হয়ে যায়, বাবা'কে দেখেছি শেষ তিন বছর। সেই বাবা, সবসময় যাঁকে আমার মনে হতো তিনি মাটির পৃথিবীতে থাকেন না। লেখালেখি, বইপত্র, অধ্যয়ন-অধ্যাপনার কোনও এক নৈর্ব্যক্তিক জগতে সতত অন্যমন হয়ে বিচরণ করে যাচ্ছেন। তিনি মাটিতে নেমে এলেন, কিন্তু কোন মাটি? যে মাটিতে মিশে যাবার জন্য আমাদের ইহজগতের এই সব প্রস্তুতিপার্বণ? ------------------ ".....যেখানে সিংহাসনে উড়ন্ত সম্রাট পায়ের তলায় পৃথিবীকে দেখেও দেখেনা সে আকাশে ছাড়পত্রের আবেদন করিনি আমি বৃক্ষের নীচেই ভালো আছি...." শুনেছি, বাবা'র যেদিন বিয়ে হয়েছিলো, সেদিন তিনি ছিলেন একেবারে বেকার। বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের মেজোছেলে। বিয়ের দিন কোনও এক রাখিপূর্ণিমার সন্ধেবেলা, তিনি কী ভাবছিলেন, জানতে ইচ্ছে করে। জীবনের এই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করার মূহুর্তে তাঁর কোনও নিজস্ব রোজগার নেই। ১৯৫৫ সালের পক্ষেও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিলো তাঁর আগামী দিনগুলি। জামশেদপুরের লোক হয়েও ইঞ্জিনিয়র না হবার জন্য তাঁর যুদ্ধ। পিতামহ নিজে সেকালের পাস দেওয়া ইঞ্জিনিয়র। চেয়েছিলেন তাঁর এই ধীমান পুত্রটি পিতার পেশা নিক। বাবা আইএসসি পড়লেন, কিন্তু দাস ফার, নো ফার্দার। কারিগরি বৃত্তিতে তাঁর অনীহা। বেলুড় ছেড়ে সেন্ট পলস। অধ্যাপক নিশীথরঞ্জন রায়ের প্রিয় ছাত্র। পড়াশোনা তো সে এক রকম। যতোরকম সাহিত্যসংস্কৃতি জাতীয় কাজকারবার হতে পারে, সবেতেই ফুলটাইম। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে যতো অনুষ্ঠান, কম্পিটিশন, খালি হাতে ফেরা নয়। সেই সময়ে তাঁর পুরস্কারে পাওয়া রাশিরাশি বইগুলি বাড়িতে দেখেছি, ছোটোবেলা থেকে। কিন্তু লক্ষ্মী আর সরস্বতীর রেশারেশি, সেখানেই তো ক্যাচ। ---------------------------------- "..... কোনো নিষ্ঠুরতার বদলে আমার জয় আমি চাইনি কাচঘরের কানা গলিতে শংখচূড়ের বন্দীবাস নয় কঠিন জ্যোতিষ্কের কাছে মুঠির উত্তাপ চেয়েছিলাম..." তাঁর চিরকাল স্বপ্ন। পেশা বলতে শিক্ষকতা। জামশেদপুর থেকে বাংলাসাহিত্যের প্রথম পি-এইচ-ডি, সেই কোনকালে। নেশা কবিতা। আনুগত্য বলতে শুধু একজন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমন মানুষ আর কোথা থেকে লক্ষ্মীর প্রসাদ পাবেন? প্রথমে পড়াতেন ইশকুলে। তার পর কলেজে। ছাত্রদের অপার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। কিন্তু অন্নচিন্তা চমৎকারা।তার চেয়েও বেশি তিনি ছিলেন একজন আদ্যন্ত শিক্ষক, শিক্ষাজীবী একেবারে ন'ন। শিক্ষাবেচার পেশায় নিযুক্ত বিষয়ী লোকেদের পাটিগণিতটি কখনও বুঝতে পারেননি। এভাবে কি টেকা যায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর চাকরি পেয়ে একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর স্বপ্নের বৃত্তি। কিছুদিন পড়ালেনও। কিন্তু টিকে থাকার অঙ্কটি কোনওদিন শিখলেন না। চিরকাল কাজ করে গেলেন টাটার একটি সংস্থায়। তা বলে পড়ানোর নেশায় কোনও দিন ছেদ পড়েনি। অগণিত ছাত্রছাত্রী চারদিকে। বাংলা ও বাঙালিয়ানা, প্রবাসে বাঙালির যাবতীয় যাপনে তিনি আমন্ত্রিত, আদৃত, আশ্বস্ত। ------------------------------------------------------ ".... তবুও সপ্তরথী দুর্মর পাহারা মুক্তির ঘ্রাণ আসে পাছে অভিমন্যু ফিরে এসো এখনো সময় অভিমানী আত্মার কাছে...." আমাদের লোহার শহরে এক সময় 'কবি' বলতে বাঙালিরা বাবা'কেই চিনতো। সে হয়তো আমার অতি শৈশবে অথবা বাল্যে, কিম্বা আরো পরে। বাবা'র ভ্রাতৃপ্রতিম সেই সব কবিরা, স্বদেশ সেন,বারীন ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের কাছে তো সেরকমই শুনেছি। বেশ কিছুদিন আগে, আমি তখন হায়দরাবাদে, বন্ধুবর অলক ( প্রাবন্ধিক অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী) আমাকে ডাকে একটি পত্রিকা পাঠালো। উত্তরবঙ্গ থেকে প্রকাশিত, যেখানে বারীন'দার স্মৃতিচারণ রয়েছে। সেখানে দেখি তিনি লিখছেন এসব কথা।আমি সেসব দিন দেখিনি, তাঁরা দেখেছেন। আরো অনেকের কাছে শোনা ও নিজে দেখা জামশেদপুরের বাংলা সারস্বতসাধনার সঙ্গে তিনি কী পর্যায়ে বিজড়িত ছিলেন। চলন্তিকা থেকে রবীন্দ্র সংসদ, কৌরব থেকে কালিমাটি ( কাজল তাঁর স্নেহধন্য ছাত্র), টেগোর সোসাইটি থেকে তুলসিভবন, কোথায় তিনি নেই? --------------------------------------------------- "..... আমাদের মন্ত্রবীজ অবিরাম কাজ করে মাটির গভীরে একদিন রাত ভেঙে সূর্য হবে বলে....." জামশেদপুরে তাঁর সুহৃদসতীর্থরা মিলে তৈরি করেছিলেন বাংলার মূলস্রোত থেকে একটু দূরে আরেকটি বাংলা উপনিবেশ।একাধিক প্রজন্মের শিকড়ে চারিয়ে গিয়েছিলো সেই রস। আমার বিবাহের কিছুদিন পর আমার নববিবাহিতা স্ত্রী একটি গল্প বললেন। তিনি গিয়েছিলেন রাজেন্দ্রনগরে, তাঁর মামাবাড়ি। সেখানে দেখা করতে আসেন ঘনিষ্ট পরিচিত তাঁর কিছু আত্মীয়ারা। তাঁদের বিনিময়টি ছিলো এরকম, -তুই তো সত্যেন'দাকে রোজ দেখিস, তোর কী রকম লাগে? -কেমন আর লাগবে, বাবার মতন... -না তুই রোজ ওঁর সাথে কথা বলিস, কাছে কাছে থাকিস, তোর কী ভাগ্য... -বাহ, এতে ভাগ্যের কী আছে? -এখন বুঝবি না, পরে বুঝবি, ধীরে ধীরে। ওঁর সঙ্গে থাকলে কতো কী পাওয়া যায়... একুশ বছরের সদ্যোবিবাহিতা কন্যাটি তখনও বোঝেননি এই অনুভূতির মর্ম। আমিই কী আর বুঝে ছিলুম? 'অনাত্মীয়'রা যেভাবে বুঝতে পারতেন, তাঁকে। ------------------------------------------ ".... যতোবার বৃত্ত ভেঙে সূর্যগন্ধা আকাশের মুখ দুহাতে ছুঁয়েছি পায়ে পায়ে বিস্ফোরণ রক্তগঙ্গা ঝড়..." মায়ের চলে যাবার পর হয়তো বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিলো তাঁর। সঙ্গ চাইতেন শুধু চারজন শিশু নাতনির। এই পাঁচজন নিজেদের একটা নিজস্ব বৃত্তের মধ্যে বেঁধে রেখে দিয়েছিলো। এর মধ্যে চাকরিতে আমার একটি বদলি'র আদেশ এলো, দূরে। তাঁকে বিচলিত হতে দেখলুম। এই শহর, এই অগণিত পরিজন সান্নিধ্য, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা চলে যাওয়া সঙ্গিনীর স্মৃতিচিহ্ন। "তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো" বলার মতো আত্মবিশ্বাস তখন তাঁর আর ছিলোনা। চিরকালই 'নেই' হয়ে থাকা তাঁর নিজের সংসারে। তাঁর জন্য যেন কারো কখনও কোনও 'অসুবিধে' না হয়, সেটাই তাঁর একমাত্র সচেতন উদ্যম। একদিন ভোররাতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বুঝলুম হৃদযন্ত্র আর টানতে চাইছে না। সে যাত্রা হাসপাতাল থেকে ফিরে এলেন। কিন্তু শরীরের সাইরেন নীরবে বেজেই যাচ্ছিলো বোধ হয়। আমাকে যেতে হলো শহরান্তরে। ভাইয়ের থেকে ফোনে খবর পাই। আর পাই বাবার অনিন্দ্যসুন্দর হাতের লেখায় অন্তর্দেশী পত্র। ঠিক হলো, পুজোর সময় বাড়ি গিয়ে বাবা'কে পাটনায় নিয়ে আসবো। তার পর একবার দিল্লি গিয়ে তাঁর স্বাস্থ্যের বিশদ পরীক্ষা দরকার। জামশেদপুরে চিকিৎসার সুবিধে খুবই সীমাবদ্ধ। চৌঠা সেপ্টেম্বর অফিস থেকে ফিরে তাঁর চিঠি পেলুম। তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েছেন পাটনায় এসে থাকার জন্য। আমার সারা শরীরে যেন একটা স্বস্তির প্রলেপ ছড়িয়ে গেলো। এভাবে বাবার থেকে দূরে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সেদিন আবার আমার ভাইঝির জন্মদিন। বাড়িতে উৎসব উদযাপন চলছে। সন্ধে থেকে পাটনায় অসম্ভব বেগে অঝোর প্রপাতের মতো বৃষ্টি। তখনও আমার পাট্নার বাড়িতে ফোনের কানেকশন লাগেনি। দুই কন্যাসহ ভিজতে ভিজতে আমরা চারজন গেলুম একটি এসটিডি বুথে, বাড়িতে কথা বলার জন্য। বাবা'র সঙ্গে কথা হলো তাঁর নাতনিদের, তাঁর বৌমার সঙ্গে অনেকক্ষণ। কিন্তু আরো কিছু মানুষ অপেক্ষা করছিলেন ফোন বুথে। তাঁদের কথা ভেবে আমি আর সংলাপ প্রলম্বিত করলুম না। আমার সঙ্গে আর কথা হলোনা বাবা'র। কাল নিশ্চিত ফোন করবো। --------------------------------------- ".... হাতে হাতে ছুঁয়ে থাকো বিস্ফোরণ সময় হয়েছে তার ঢেউ কেড়ে নেবো রক্তের গভীরে তার পর শেষ রাতে ঝোড়ো হাওয়া মিছিলের মুখে বর্ণমালার ফাঁদে ফেরারি প্রভুর তাঁবু ছাড়পত্র পেয়ে যাবো মৃত্যু মহাদেশে..." পরদিন ভোরবেলা যে ঘরটিতে বাবা এলে থাকবেন সে ঘরটিতে বসে আমরা প্ল্যান করছি কীভাবে সেটিকে সাজাতে হবে। অবিন্যস্ত থাকা তাঁকে কষ্ট দেয়। উপরতলার প্রতিবেশীর ছেলে এসে জানালো আমার ফোন এসেছে। এ রকম সময়ে ফোন, বাড়ির থেকে? একেবারে অপ্রত্যাশিত। ছুটে উপরে যাই। রিসিভারটি তুলে বলি হ্যালো... ওপাশে ভাইয়ের সাড়া পাচ্ছি, কিন্তু সে কোনও কথা বলতে পারছেনা... -কী হলো রে? বল... বহুদূর প্রতিধ্বনির মতো তার রুদ্ধ স্বর.. -দাদা, বাবা চলে গেলো... -কী বলছিস... তুই... ভগ্নীপতি ফোনটা ধরে বলে, আমি শুনতেও পাই, -দাদা, বাবা আর নেই, আজ ভোররাতে...ঘুমের মধ্যেই... সেদিন শিক্ষকদিবস। বাবার বয়স হয়েছিলো পঁয়ষট্টি, মাত্র। আমি সময়ে বাড়ি পৌঁছোতে পারবোনা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের কারণে। আর আমার জন্য বাবা'কে যেন বরফ-ট্রে'র অসম্মান সইতে না হয়। এ ছাড়া সেই মূহুর্তে আমার আর কোনও প্রার্থনা নেই। ------------------------------------------------ "....পথে নেমে পায়ে পায়ে পিছুটান ভালো নয় সামনে তাকাও মাঠঘাটে তামাটে রোদ্দুর আকাশ নেমেছে বেতবনে......" বাবা একটি ইচ্ছাপত্র লিখে রেখে গেছেন। তাঁর যেন কোনও পারলৌকিক কৃত্য না করা হয়। মুখাগ্নি যেন না করা হয়। প্রথাটা অসুন্দর। কেউ যেন কোন অশৌচ পালন না করে। কোন লোকাচারভিত্তিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান নৈব নৈব চ। যদি ইচ্ছে হয়, তবে একদিন আত্মজনেরা একটি স্মরণ সভার আয়োজন করবে। সেখানে তাঁর একটি প্রতিকৃতি যেন শুধু রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো হয়। একটি গানের আর একটি কবিতার সূচি। ছেলে, মেয়ে, আত্মীয়, বন্ধু, প্রত্যেকের নামে নামে। স্মরণসভায় শুধু যেন সেগুলিই নিবেদিত হয়। তাঁর ইচ্ছা প্রতিপালিত হয়েছিলো। বহু পরিচিত মানুষ তাঁর পুত্রদের নিন্দা করেছিলো যথোচিতভাবে পিতৃদায় পালন না করার জন্য। আমাদের সবার থেকে যেসব গান তিনি শুনতে চেয়েছিলেন, আমরা গেয়েছিলুম। যে কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন, তা আবৃত্ত হয়েছিলো। তাঁর স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করা নিজের আর অন্য কবিদের কবিতা বাজছিলো। "যাবার সময় হলো বিহঙ্গের", " দু এক মূহুর্ত শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে", " সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ", " এই যে জানু পেতে বসেছি পশ্চিম, " হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান" , মনে আছে। তাঁর কণ্ঠে আরো বাজছিলো একজন ঘনিষ্টতম সহোদরপ্রতিম কবিবন্ধুর তরুণবয়সে লেখা একটি কবিতা, যেটি আমার মায়েরও খুব প্রিয় ছিলো, " আনিনি মাথায় বয়ে, মা, তোমার সোনার কাঁকই।" কবিতাটি বাজার সময় কবি নিজে দু'হাতে চোখ ঢেকে, মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিলেন শ্রোতাদের মধ্যে। শোকতপ্ত মানুষ একজন, জয়নাল আবেদিনের ব্রাশস্ট্রোক থেকে উঠে আসা ছবি যেন। কবির নাম স্বদেশ সেন। ------------------------------- জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার। আজ শিক্ষকদিবস। তাঁর চলে যাওয়া ঠিক কুড়ি বছর হলো। স্থানীয় সংবাদপত্রে সেদিন যেমন লেখা হয়েছিলো, " মূর্ধণ্য শিক্ষক ডঃ সত্যেন্দ্র দে শিক্ষকদিবস কে অবসর পর হি চল বসেঁ।" তিনি চলে গিয়েছিলেন এমনিই এক বৃষ্টিমুখর দিনে। কী অচেনা কুসুমের গন্ধে, কী গোপন আপন আনন্দে, কোন পথিকের কোন গানে.....কখন কে জানে.... ".... সব আলো মরে গেলে অন্ধকারে মুখ দ্যাখে দলছুট দু একটা তারা আর কেউ থাকেনা সেখানে সব গান ঝরে গেলে বাতাসে ঘুমিয়ে থাকে কিছু ভাঙা সুর, অন্য শব্দ জাগে না সেখানে সব মৃত্যু, শোক হেনে থেমে থেমে যায় দু একটা স্বর থামেনা কখনও...." (ঊদ্ধৃত কবিতাংশগুলি বাবা'র বিভিন্ন কবিতা থেকে নেওয়া)

99

6

দীপঙ্কর বসু

যে ফুল ঝরে সেই তো ঝরে

সম্প্রতি একটি ঘরোয়া গানের আসরে এক মাহিলাশিল্পী গাইছিলেন যে ফুল ঝরে সেই তো ঝরে ফুল তো থাকে ফুটিতে - বাতাস তারে উড়িয়ে নে’ যায়, মাটি মেশায় মাটিতে।। মানব জীবনের একটা অমোঘ সত্য মিশ্রপুরবী রাগাশ্রয়ী সুরের ছোঁয়ায় বেশ একটা বৈরাগি-মেজাজ পাচ্ছিলাম গায়িকার সুমধুর পরিশীলিত কন্ঠে। আবার দুই স্তবকের ছোট্ট গানটির দ্বিতীয় স্তবকে যেন একটু করুণ রসের আভাষ পেলাম – গন্ধ দিলে, হাসি দি্লে,ফুরিয়ে গেল খেলা ভালবাসা দিয়ে গেল, তাই কি অবহেলা সুগীত গানটি শেষ হওয়া মাত্র এক বিশিষ্ট সঙ্গীতপ্রেমী শ্রোতা তাঁর তৃপ্তিলাভের কথা জানাতে গিয়ে বললেন গানের সুরে একটা চমক তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।যদিও তিনি সুরের চমক ,যেটা তাঁকে বিশেষভাবে আনন্দ দিয়েছে সেটাকে নির্দিষ্ট করে বলেননি, তবে আমার অনুমান “গন্ধ দিলে হাসি দিলে ফুরিয়ে গেল খেলা” গানের এই অংশের শেষভাগে “খেলা” শুব্দটি্র সুরের মোচড় তাঁকে মাতিয়ে দিয়েছিল । বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে শ্রোতা বন্ধুটি আমাকে কিছুটা খাতির করেন বলেই বোধহয় আমাকে অনুরোধ করেছিলেন গানের সুরের চমৎকারিত্বটুকু উপস্থিত অন্যান্য শ্রোতাদের কাছে ব্যখ্যা করতে ।কিন্তু গান শুনতে বসে বাগবিস্তার করাটা আমার বরাবরই না-পসন্দ ,উপরন্তু এ ধরণের মাস্টারি করায় আমার সঙ্কোচ হয় ।কেননা গানবাজনার রস সমুদ্রের কতটুকুই বা আমি জানি বা বুঝি যে অন্যকে আমার সেই খন্ডিত বোধ দিয়ে আলোকিত করব ? গান যদি শ্রোতার অনুভবের তারে ঝঙ্কার না তোলে তবে কি নিছক বুদ্ধিগ্রাহ্য ভাষা দিয়ে গানের রস গ্রহনে তাদের সাহায্য করা যাবে? তবে একথা অনস্বীকার্য যে কোনও কোনও রসিক সঙ্গীতবিদ পারেন এই কর্মটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে ।গান নিয়ে তাঁদের বিশ্লেষনে এমন কিছু উপাদান থাকে যা সঙ্গীততত্বের আলোচনাকে নিছক “মাস্টারির” স্তর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে রসলোকের দরজাটি আমাদের মত গড়পড়তা শ্রোতাদের কাছে খুলে দিতে ।কিন্তু অধিকাংশ সময়েই গানের আলোচনা সেই প্রার্থিত স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারেনা ।তাই সেদিন অনুজপ্রতীম বন্ধুটির প্রস্তাব এড়িয়ে গিয়েছিলাম । কিন্তু এখন কয়েকটা দিন অতিক্রান্ত হবার পর নিভৃতে বসে স্মৃতিরোমন্থনের ছলে গানটি নিয়ে নিজের দুচার কথা লেখা যেতেই পারে । আলোচ্য গানটি্র রচনাকাল ১৮৮৫(বাংলা ১২৯১)সাল ।অল্পদিন পূর্বে ১৮৮৪ সালের ১৯শে এপ্রিল রবীন্দ্রনাথের পরমাত্মীয় ,যিনি শিশুকাল থেকে কবির “জীবনে পূর্ণ নির্ভর” ছিলেন, কবির সেই নতুনবৌঠান কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গেছে।এই মৃত্যুবিচ্ছেদ বেদনা রবীন্দ্রনাথের মানসিক জগতে যে প্রবল বিপর্যয় ঘটিয়েছিল তার প্রকাশ বিভিন্ন সমকালীন রচনায় ছায়াপাত করেছে।যেমনটা ঘটেছে “পুস্পাঞ্জলি” শীর্ষক গদ্য কবিতাগুচ্ছের অন্তর্গত আলোচ্য গানটিতে । গানের দ্বিতীয় স্তবকে সেই বেদনার প্রকাশ সুস্পষ্ট ।যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়েছে গানটিতে সুরের সংযমী অলঙ্করণ মৃত্যুশোক থেকে কবির মানসিক উত্তরণের একটা সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করার মত বিষয় । সাধারণভাবে বাংলা গানে একটা সময়ে করুণ রসের প্রকাশে পুরবীর সুর বিশেষ উপযোগী বলে গণ্য হত । সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের আলোচ্য গানটি প্রচলিত ধারার থেকে স্বাতন্ত্রের দাবীদার নয় ।কিন্তু প্রচলিত ধারার মধ্যে থেকেও সুরের চলনে ,ছন্দের বৈচিত্রে কিছু কিছু রাবীন্দ্রিক কৌশল যেন উঁকি ঝুকি মারে । যেমন একটানা সুরের চলনে মাঝে মাঝে আড়ছন্দের প্রয়োগ সুরে চলনে একঘেয়েমি বাসা বাধতে দেয়না ।শ্রোতার কানকে থেকে থেকেই সজাগ করে দেয় ।যেমন গানের দ্বিতীয় লাইন “বাতাস তারে উড়িয়ে নে’ যায়”এর বাতাস শব্দটি উচ্চারিত হয় তালের প্রথম দুটি মাত্রা ছেড়ে তৃতীয় মাত্রা থেকে । এ যেন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে শ্রোতার মনযোগকে জাগিয়ে রাখার কৌশলী প্রয়াস । একই কৌশল দেখি গানের দ্বিতীয় স্তবকের শুরুতেও ।সেখানেও দেখি “গন্ধ দিলে হাসি দিলে ফুরিয়ে গেল খেলা” অংশে গন্ধ শব্দটি শুরু হয় তালাবর্তনের তৃতীয় মাত্রা থেকে । এ হয়ত বিশাল ভারতীয় সংগীত জগতে অজানা অচেনা কোন নতুন কৌশল নয় কিন্তু সংযমী অনুচ্চকিত প্রয়োগ এই গানে কৌশলটি এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছে বলেই আমার ধারণা। গানটিতে সুরের অলঙ্করণের আর একটি নিদর্শনের উল্লেখ না করলে আলোচনাটা সম্পূর্ণতা পাবেনা । তা হল “ফুরিয়ে গেল খেলা” অংশটিতে খেলা শব্দটির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত তিনমাত্রার তান - পধা নর্সন র্ঋর্সনা – এর প্রয়োগ গানের সুরের বাঁধা লয়ের চলনে আকস্মিক গতি সঞ্চার করেই পর মুহূর্তেই আবার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া গানটিকে নাটকীয়তা প্রদান করেছে । আমার চোখে এই ভাবেই একটি ব্যক্তিগত শোক বেদনার প্রকাশ গান হয়ে উঠেছে - স্রষ্টার অন্তর থেকে সঞ্চরিত হয়েছে শ্রোতাদের হৃদয়ে

100

7

মনোজ ভট্টাচার্য

বুদ্ধু কারে কয় !

বুদ্ধু কারে কয় ! পৃথিবীতে কাদের বুদ্ধু বলে বা কত রকম বুদ্ধু আছে তার একটা নমুনা মাঝে মাঝে আয়নায় দেখতে পাই বটে ! আমাদের কমপ্লেক্সের পাশেই একটা চায়ের দোকানের পাশে এক জনকে দেখতে পাই । হত কুচ্ছিত একটা ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে আর ততোধিক ময়লা একটা লুঙ্গি পরে – ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মেক আপ নিয়ে বসে থাকে । বাজার করে ফেরার পথে চোখাচোখি হলেই একটা আকুতি নিয়ে তাকায় – যেন কিছু বলতে চায় ! কিছু বলবে ? – যদিও বুঝতে পারি কি বলবে – তবু জিজ্ঞেস করি । খিদে পেয়েছে ! – এমন করুণ ভাবে বলে - শুনে খুবই খারাপ লাগে । পকেট থেকে কিছু দিয়ে দিই । - যদি চা বিস্কুট খায় ! সে তো হাত পেতে নেয় ! মাঝে মাঝেই এইরকম চা খাওয়ার জন্যে দিয়ে থাকি ! – কেউ কিছুই মন্তব্য করে না । হয়ত খেয়ালও করে না । কারই বা এত সময় থাকে সকালে ! গতকাল কিন্তু মাল কট ! – যথারীতি বাজার সেরে ফিরছি । লোকটি একই যায়গায় বসে একই ভাবে তাকায় ! – কি চাই ? আমি জিজ্ঞেস করি । খিদে পেয়েছে ! – সেই মুখে আর্তি ভাব এনে বলে । আমি পকেটের সব খুচরো টাকা দিয়ে বলি – যাও দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে নাও ! ব্যাপারটা খুবই সাধারন । একটা দুঃস্থ লোককে আমি চায়ের পয়সা দিয়েছি । সেও নিয়েছে – ব্যস । মিটে গেল ! – কিন্তু না ! এবারে ঠিক অত সহজ হল না ! বাড়ির গেটের পাশেই এক একটু বয়স্ক লোক বাইক থামিয়ে অপেক্ষা করছিলো । আমার জন্যে ! – দাদা একটু শুনবেন ! আমি দাঁড়ালাম – এবার ঠিকানা জিজ্ঞেস করবে – কিম্বা পথনির্দেশ । কিম্বা হয়ত আমাকে চেনে – কিছু বলতে চায় ! – বলুন । আপনি ঐ লোকটাকে চেনেন ? পেছন দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাল সেই ভিখিরিকে । আমি বুঝতেই পারলাম ! – ঠিক চিনি না । ওখানেই তো বসে থাকে! কেন বলুন তো ? আপনি ওকে পয়সা দিলেন ? – ও বাবা ! এ যে একেবারে তদন্ত ! হ্যাঁ – চা খেতে দিলাম । ও কি আপনার কাছে পয়সা চাইল ? না ও চায় নি ! কিন্তু বলল খ্যিধে পেয়েছে ! – আমি সাফাই গাইবার চেষ্টা করি ! আপনি জানেন না – ও লোকটা পেনশান পায় ! সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের কর্মচারী ছিল ! এখন রিটায়ার্ড ! উল্টোদিকের বাড়িটা ওদের ! কেন্দ্রীয় কর্মচারী ! তবে তো পেনশান পায় – প্রতি বছরই বাড়ে ? আমি প্রায় থ ! হ্যাঁ । - আপনি ভুল যায়গায় পয়সা দিচ্ছেন ! অন্য যে ডিজার্ভ করে তাকে দিলে - সে খেয়ে বাঁচবে ! আমি এতটাই ব্যোমকে গেছি যে জিগ্যেস করতেও ভুলে গেলাম – তিনিই বা কে ! আমি তাকে চিনি না – অথচ আমাকে ঠিক লক্ষ্য রাখে ! – সারাদিন মাথার মধ্যে কথাটা ঘুরতেই লাগলো – যে ডিজার্ভ করে – তাকে দিলে - - ! আজ সকালে বাজারে যাবার সময়ে দোকানের একজন চেনা-জানা লোককে ব্যাপারটা খুলে বলতেই – সে স্বীকার করল – যদিও আমি তাকে চিনি না – কিন্তু অনেকেই আমাকে চেনে আর খেয়াল রাখে ! – আর সেই ভিখিরি-দর্শন লোকটি সত্যিই কেন্দ্রীয় কর্মচারী ছিল – এখন পেনশান পায় ! উল্টোদিকের বাড়িটা ওরই ! – আরও একটা অযাচিত তথ্য দিল ! কোন এক প্রাক্তন মন্ত্রীর পরিবারের জামাই ছিল ! উপদেশও দিল – ওকে আর পয়সা দেবেন না ! আমার গালে কে যেন সপাটে এক থাপ্পড় কষালো ! এক বিত্তবান লোককে আমি চা খাবার পয়সা ভিক্ষা দিই ! আর সেও দিব্যি হাত পেতে নেয় ! নিজের ওপর একটা রাগ হচ্ছিল । কেউ যেন পকেট কেটে মানিব্যাগটা নিয়ে গেছে ! একটা ঠকে যাওয়া অপরাধের মতো – চিনচিনে যন্ত্রণা ! ফেরার পথে দেখি সেই দুর্ভিক্ষের প্রতিনিধি একই যায়গায় বসে আছে । আপনি তো পেনশান পান ? – আমি সামনে এসে প্রশ্ন করি । হ্যাঁ – পেনশান পাই তো ! – অকপটে স্বীকার করে লোকটা । তবে এভাবে ভিক্ষা করেন কেন ? – নিজের ঠকে যাওয়ার জ্বালা ওর ওপরেই ঢালি । আপনাকে পয়সা দিয়েছি বলে আমাকে ধমকাচ্ছে লোকে ! লোকটা অসহায়ের মতো একইভাবে বলল – খিদে পায় যে ! কেন ! বাড়িতে খেতে দেয় না ? – আমার অসহিষ্ণু গলার স্বর নিজের কানেই ঠেকল ! সে আর কোন উত্তর দিল না ! এখানেই শেষ হতে পারে ঘটনাটা । কিন্তু আমার প্রবীণদের সঙ্গে মেশার জন্যে – অন্য কথাও মনে হল । তাহলে কি বাড়িতে উনি খুব অবহেলিত ! হয়ত বা নির্যাতিতও ! কোনও কারনে ওর হাতে পয়সা দেওয়া হয় না ! বাড়িতে চা কি দেওয়া হয় না ? তাহলে কি আমি চায়ের পয়সা দিয়ে অন্যায় করেছি ! নাকি এবার থেকে পয়সা না দিয়ে ভুল করবো ! – কে জানে ! মনোজ

100

3

ঝিনুক

ভোরের খুব কাছে‚ কিন্তু যেখানে ভোর হয় না …..

মোমবাতিদের মন....... এক সপ্তাহ ফুরাতে আর কতক্ষণ? বিশেষ করে যখন ইচ্ছে করে না সপ্তাহটা ফুরিয়ে দিতে| সময় একটা অদ্ভুত প্রপঞ্চ‚ যখন মনে হবে একটু থমকে দাঁড়ালে ভালো হয়‚ তখন দৌড়োতে থাকে সুপারসনিক স্পীডে আর ঠিক যখন দৌড়োলে উপকার হয় তখনই জমে বরফের মত চাক বেঁধে যেতে চায় যে কেন? ফুরিয়ে গেল এক সপ্তাহ চোখের নিমেষে| আবার সব ঘরদুয়ার বন্ধ করে‚ তালার উপর তালা লাগিয়ে বাড়িটাকে একলা ফেলে গাড়িতে উঠি| এই দরজা থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়াটা চিরকালই বেদনাবিধুর| বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পিছু ফিরে চাওয়া‚ যতক্ষণ দেখা যায়| আগে দু'জন দাঁড়িয়ে থাকত অপলকে চেয়ে বিদায়বেলায় এই বারান্দায়| তারপর একজন‚ আজ শূণ্য বারান্দাটা দাঁড়িয়ে রইল কি ভীষণ একা একা| আগে ফেলে চলে যাওয়ার যে কষ্ট তার সাথে মিশে থাকত মস্ত সেই বটগাছের কাছে আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা‚ আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি| আজ যাবার বেলায় মাথার উপরে খর রোদ্দুর আর এই একলা বাড়িটাকে হায়েনা‚ শকুনের লোলুপ থাবার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার গুরুদায়িত্ব| কি দ্রুত যে বদলে গেল জীবনটা….. পরের দিন গয়া যাত্রা| বেরোবার আগে সোনার দুল‚ চুড়ি‚ হার‚ আংটি‚ সব খুলে রাখতে হল| অনেক টানাটানি করেও গোটা দুয়েক আংটি কিছুতেই খোলা গেল না আঙুল থেকে| মনের মধ্যে সাপটা ফণা তোলে‚ ফুঁসতে থাকে‚ তবু খুলে ফেলি| আমার জন্য অন্যদের বিপদে পড়তে হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না| বিকেল পাঁচটায় রাজধানী‚ আমরা দুই বোন আর আমাদের দুই মাণিক| অনেকদিন পরে দূরপাল্লার ট্রেনে চড়তে পেরে খুব খুশি আমার গাণুশ| ও ব্যাটারও আমার মত ভ্রমণরাশিতে জন্ম| বেড়াতে আমরা মাব্যাটা দুজনেই দারুণ ভালোবাসি‚ চিরকালই- সেই ছোট্ট থেকেই| আমার এক মাসতুতো বোনের বর ভারতীয় রেলের গণ্যমান্য পদাধিকারী| গয়া যাব শুনে সে যেচেই দায়িত্ব ঘাড়ে নিল‚ "আমি বলে রাখব দিদি"| বলে রাখার বিশেষ কোন প্রয়োজন ছিল না| মাত্রই তো পাঁচ-ছ ঘন্টার জার্নি| রাজধানীর ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট ভালো‚ সার্ভিস নিয়ে অনুযোগ করার বিশেষ জায়গা নেই (যদিও আমার একটু ভয় ছিল খাবার নিয়ে‚ আগের বছরের সেই দুরন্তের অভিজ্ঞতার দরুণ| কিন্তু দেখলাম খাবার ট্রেতে রুটিই দিয়েছে‚ শুকনো চটির পচা চামড়া নয়)| তবু একটু বাদে বাদেই একজন‚ দু'জন করে এসে জানতে চায় "কিছু লাগবে কিনা‚ কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো"? বাথরুমে একটা স্পেশ্যাল ধোলাই হল এক্সট্রা ধানবাদে| যদিও আমি একবারের জন্যেও যাই নি বাথরুমে| লজ্জা করতে থাকে আমার| পাশের সীটের বর্ষীয়ান প্যাসেঞ্জার আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন‚ "আরে এতবার করে জানতে চাইছে‚ কুছ তো মাঙ্গো| কুছ নহি তো এক কাপ চায় তো পি লো মুফত সে| ইক বোতল পানি লে লো এক্সট্রা"| যা খেতে দিল তাই সবটা খেয়ে ওঠার ক্ষমতা নেই‚ আবার ফ্রি চা! না বলাতে ভারি মন:ক্ষুন্ন হলেন ভদ্রলোক| আসলে যেখানকার যা দস্তুর‚ শুনলাম আমার সেই ভগ্নিপতি ফ্যামিলি নিয়ে ভেকেশনে বেরোলে নতুন কোচ দিয়ে দেওয়া হয় সেদিনের ট্রেনে ওদের জন্য| কিন্তু আমার অস্বস্তি হতে থাকে এই অকারণ অ্যাটেনশনে| না‚ 'বলে রাখা'টা বিশেষ আর প্রয়োজন সেদিন হয় নি| কিন্তু সেই বলে রাখা কাজে দিল ফেরার দিন| বোনের বর স্টেশনে ছিল গয়াতে আমাদের রিসিভ করতে| ও-ই আগে গিয়ে হোটেলের ঘর বুক করে রেখেছিল| একদম স্টেশনের গায়েই হোটেল| ব্যবস্থা কিছু মন্দ ছিল না‚ তবু ঘুম হল না সারা রাত| আসলে ঘুম তো আমার আর জম্মের সতীন এমনিতেই‚ সহসা কাছে ঘেঁষতে চায় না| তায় পরের দিন রাত না পোহাতেই বিশাল গুরুদায়িত্বের কাজ| বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয়‚ ভালোবাসায় কতটা পাক ধরেছে জানি না‚ তবে রাত জেগে হৃদয়ের পায়চারি করাটা মিথ্যে নয় আর আজকাল সব কিছুতেই বড় টেনশন হয়| সারা রাত বালিশ ঠিক করতে করতে‚ কাল্পনিক মশা খুঁজে খুঁজে‚ স্টেশনের ঘোষণা শুনে আর এসি বাড়িয়ে কমিয়েই কেটে গেল| ভোর হতে না হতেই স্নান সেরে তৈরী হয়ে পথে| বহু পুরাতন শহর গয়া‚ তায় তীর্থক্ষেত্র| কলুষ আর পারুষ্যে জরোজরো‚ শহরের বেশির ভাগ অধিবাসীই মনে হল কোন না কোনভাবে মৃত্যুর কারবারি| প্রতিদিন কয় লক্ষ লোক যে এই শহরে আসে শুধু পিতৃপুরুষের ঋণমুক্ত হতে কে জানে? সব ট্রেনে গোটা দু'চার করে কম্পার্টমেন্ট থাকে শুধু গয়া স্পেশ্যাল‚ উজাড় করে প্ল্যাটফর্ম উপচে লোক নামে‚ ওঠেও| সারা রাত খোলা আকাশের নীচে পুতিগন্ধময় রাস্তাঘাটে‚ স্টেশনচত্বরে‚ প্ল্যাটফর্মে অকাতরে ঘুমিয়ে থাকে মানুষজন ভয়ঙ্কর মশার কামড় অগ্রাহ্য করে| ঘুমন্ত মানুষ ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে রাস্তা পেরোতে হয়| সকাল হতে না হতেই চোখ মেলে চাওয়া যায় না এমনি গনগনে সূর্যের তেজ| সারা শহর জুড়ে ঘুঁটের আলপনা| কোন দেওয়াল‚ কোন গাছ কোথাও খালি নেই| পশুপাখি‚ মানুষজন নির্বিশেষে সকল কৃষ্ণের জীবই রাস্তাঘাটে যত্রতত্র পটি এবং পিপি করে বেড়ায় মনের সুখে নাগরিক অধিকারে| দোকানপাট‚ বাজারঘাট আর পাঁচটা ছোট শহরের মতই| আর আছে দলে দলে গরু‚ মোষ‚ ছাগল‚ শুয়োর আর পাণ্ডা| জিনসপরিহিত‚ মোবাইলখচিত‚ গুটখারঞ্জিত‚ মোটরবাইক্শোভিত‚ টিকিওয়ালা পাণ্ডার দল‚ শুনলাম সবাই নাকি গয়াসুরের বংশধর| সেই সব অসুরদের দাবিদাওয়া না মিটিয়ে গয়াতে এক পাও কোথাও যাওয়া সম্ভব না| তবু ভালোভাবেই মিটে গেল বাবামায়ের শেষ কাজ‚ সেই সব মহাপণ্ডিতদের একজন কাজ করালেন‚ তার কাছেই জানলাম পিতৃঋন চুকিয়ে ফেলা যায় পিণ্ডদানান্তে ফল্গুর জলে কনুই অবধি হাত ধুয়ে ফেলে‚ কিন্তু গর্ভধারিণীর ঋণ শোধ হয় না| আরো যা বুঝলাম‚ যত বেশি টাকা ধুলোর মত ছড়ানো যায়‚ বাপমায়ের মুক্তির মাপও ততটাই বড় থেকে আরো বড়তর হয়| জানি না কতটা ঋণমুক্ত হতে পারলাম‚ তবে মনটা যেন আরো ভারি হয়ে গেল| এগারোটার মধ্যেই কাজকর্ম সব চুকে গেল| ঐসব ধম্মোকম্মো‚ পুণ্যির কাজ তো জুতো পায়ে দিয়ে হয় না‚ ঐ বীভৎস নোংরা রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে সারা শরীরের মধ্যে ঘিনঘিন করতে থাকে| হোটেলে ফিরেই আবার ঘষে মেজে স্নান| তারপর ভোজনপর্ব সেরে যাই কি না যাই করতে করতে শেষ অবধি রওনা হয়েই গেলাম বোধগয়ার পথে| অটোর সাথে চুক্তি হল‚ যাওয়া-আসা| অটো তো নয়‚ ভটো‚ কর্ণবিদারী আওয়াজ করে রাস্তা কাঁপিয়ে‚ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে নিয়ে চললো আমাদের| ঝাঁকুনির চোটে শরীরের হাড়ক'খানা সব আলগা হয়ে যাবার উপক্রম| পাশে পাশে চললো ফল্গু‚ জল দেখা যায় না‚ এপার থেকে ওপার জুড়ে শুধু বিস্তীর্ণ বালুকার রাশি| সে এক অদ্ভুত নদী| "এ নদী এমন নদী-ই-ই-ই‚ এ প্রিয়ার চোখের পাতা ছায়াতে হয় না কালো‚ কখনো নয়ন তারায় ঝড়েনা স্নিগ্ধ আলো"….. ইচ্ছে ছিল নদীটার সাথে একটু সময় কাটানোর| কিন্তু সময় হল না| ফল্গুর ধার দিয়ে দিয়ে মকাইয়ের ক্ষেত‚ ঘরবাড়ি‚ দীঘল ঘোমটা ঢাকা বউ‚ ন্যাংটো খোকা‚ ছাগল‚ গরু‚ শুয়োর‚ মুরগি আর মুহুর্মুহু রাস্তা কাঁপিয়ে ধাবমান ভটো আর মোটরবাইক| যেতে যেতে পথে বেশ কয়েকটা বৌদ্ধমন্দির পড়লো| গরম বাতাসের হলকায় ততক্ষণে মুখচোখ জ্বলছে| মাটি তেতে পুরো তপ্ত খইয়ের খোলা‚ হেঁটে যেতে পায়ে ফোস্কা পড়ার উপক্রম| তার ওপর অসম্ভব ক্লান্ত‚ শরীরে এবং মনে| তাই বেশির ভাগ মন্দিরই পেরিয়ে যাই| একেবারে সোজা বোধগয়াতে চলে যাওয়াই মনস্থ করেছিলাম| কিন্তু থামতে হল‚ অগ্নিবর্ষী সেই সূর্যের নীচে ধ্যানস্থ সুবিশাল বুদ্ধমূর্তিটির পদতলে না থেমে পারা গেল না| বসে রইলাম কিছুক্ষণ সেই মহাপুরুষের ছায়ায়| পাশেই থাইল্যাণ্ডের বুদ্ধমন্দির| আবার রওনা দেবার আগে পায়ে পায়ে সেই মন্দিরে একটু উঁকি দিলাম| সোনালি বুদ্ধমূর্তি‚ ভিতরটা ঠাণ্ডা‚ সুবিশাল দরজায় ততোধিক বিশাল কড়া| সেই দুয়ারে দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রণাম ক'রে বলি‚ "এসেছিলাম‚ দেখে গেলাম‚ ওগো মহামানব তোমার দুয়ারে কড়া নেড়ে গেলাম‚ তুমি কি শুনতে পেলে"? পরের স্টপ বুদ্ধগয়া| পাঁচজনের সাতখানা ফোন‚ ট্যাব‚ চার্জার‚ পাওয়ারপ্যাক‚ সব জমা করতে হল প্রবেশদ্বারে| ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা যায় পয়সা দিয়ে টিকেট করে| কিন্তু এযাত্রায় ক্যামেরা আনার কথা কারোরই মনে হয় নি| তারা হয় কানাডায় নয় কলকাতাতেই রয়ে গেছে| সে থাক‚ ছবি নাই বা তুললাম‚ মনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে তো আর বাধা নেই| প্রচুর পুলিশ‚ সান্ত্রী‚ তল্লাসি‚ পাহারা পেরিয়ে লাইন দিয়ে মূল মন্দিরে| অনন্ত ধ্যানে সমাহিত গৌতম বুদ্ধ‚ এই পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র মানব যিনি শান্তির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিলেন| সুন্দর বললে কম বলা হয়‚ ছবির মত সাজানো বাগান মন্দির ঘিরে‚ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তকতকে‚ মনে পড়ল সেই কোটেশন‚ কোন চার্চে পড়েছিলাম …. "Cleanliness is next to Godliness"…… শান্তি যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে প্রতিটি ডালপালা‚ প্রতিটি পত্রপুষ্প থেকে| মাথা আপনিই নত হয়ে আসে এই পরম প্রশান্তির সামনে দাঁড়িয়ে| বাগানে একান্তে উপাসনা করার আয়োজন করা রয়েছে আগ্রহী ভক্তদের জন্য| বিশাল একটি বাঁধানো পুকুরে মাছেদের বৈকালিক যোগব্যায়াম দেখলাম বসে কিছুক্ষণ| মন্দিরের কোলে সেই বোধিবৃক্ষ‚ বিশালকায় অক্ষয় অশ্বত্থ‚ যার চরণোপান্তে সিদ্ধার্থ বুদ্ধ হয়েছিলেন| গাছের গোড়া ঘিরে রাখা পোক্ত বেষ্টনী দিয়ে‚ মানুষের লোলুপ স্পর্শ থেকে বাঁচাতে| কিন্তু সেই মহীরুহের ঊর্দ্ধে প্রসারিত ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে ছাতার মত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে| জায়গায় জায়্গায় ঠেকা দিয়ে রাখা মোটা মোটা ডালে| একটি পাতাও বৃথা যায় না সেই মহাবৃক্ষের‚ পড়ামাত্রই কেউ না কেউ কুড়িয়ে নেয়| আমিও পেলাম একটি পাতা| কোলের মধ্যেই এসে পড়ল| কৃতজ্ঞচিত্তে অঞ্জলিভরে গ্রহণ করলাম‚ সাথে করে নিয়ে যাব এই শান্তির প্রসাদ| উপাসনার মন্ত্র আমার অজানা‚ যে মন্ত্র জানি‚ খুব নীচু গলায় প্রায় অস্ফুটে সেই মন্ত্রই গুণগুণ করি….. "বাসনা সব বাঁধন যেন কুঁড়ির গায়ে - ফেটে যাবে, ঝরে যাবে দখিন বায়ে, একটি চাওয়া ভিতর হতে ফুটবে তোমার ভোর-আলোতে, প্রাণের স্রোতে- অন্তরে সেই গভীর আশা বয়ে বেড়াই"…..আর সেই পুণ্যতরুর ছায়ায় নিঝুম হয়ে বসে ভাবি‚ সত্যি সত্যিই এইখানে‚ এই মাটিতে সেই যুগপুরুষের পায়ের ছোঁয়া পড়েছিল কখনো‚ কোনদিন ….. চেয়ে চেয়ে দেখি ভক্তের দল যে যার মত নিশ্চুপে উপাসনায় মগ্ন| ধর্ম যে এত নি:শব্দ হতে পারে‚ সাধনা যে এমন নিরুচ্চারে করা যায়‚ তাও ভারতবর্ষে‚ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল| ইচ্ছে হচ্ছিল বসেই থাকি‚ থেকে যাই ঐ শান্তির পদতলে কপাল ছুঁয়ে‚ কিন্তু ইচ্ছের ডানা ছেঁটে ফেলার পোশাকি নামই তো জীবন| কাজেই ফিরতে হয়| আবার ভটো‚ হোটেলে ফিরে স্নান খাওয়া সেরে তৈরী হওয়া| রাত সোয়া ন'টায় ট্রেন‚ ক'টায় আসবে সেই খবর নেওয়া| তা সেজন্য অবশ্য বেশি অপেক্ষা করতে হল না| হোটেলে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সেই বোনাইয়ের ফোন‚ ট্রেন আপাতত সাড়ে চার ঘন্টা লেট‚ মানে রাত পৌনে দু'টোয় গয়া‚ তবে ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হবে এই লেটের ধামাকা‚ এখুনি বলা যাচ্ছে না| ট্রেনে ডিউটিরত একজনের নাম‚ ফোন নাম্বার দিয়ে দিল‚ বললো‚ "চিন্তা করবেন না‚ ওকে বলা আছে‚ মোগলসরাই ছাড়লে ফোন করে দেবে‚ ঘুমিয়ে নিন একটু ততক্ষণ"| বুঝলাম আজকের রাত গয়াতেই কাটাতে হবে| ঘরের বুকিং ছিল রাত বারোটা অবধি| মাঝরাতে টোলটুপলা নিয়ে স্টেশনে গিয়ে মশার কামড় খেতে পারব না‚ অন্ততপক্ষে সকাল ন'টা অবধি তো বুকিং বাড়ানো যাক‚ আধবেলার পয়সা আরো দেব| খুব কম লোকই বোধহ্য় গয়ায় গিয়ে হোটেলে থাকে| কাজেই ঘরের যে খুব আকাল‚ বুকিং একেবারে ভরাভর্তি‚ তা নয়| কিন্তু সুযোগ পেলে কে আর মাথা মুড়োতে ছাড়ে? অগত্যা আবার পুরো দিনের পয়সাই দিতে হল| খেয়েদেয়ে এসে ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে আবার ঘুমের মহড়া| আজ তো আরো বৃহত্তর ক্যাচাল‚ পুরো ত্রিশঙ্কু কেস| কথা ছিল ট্রেনের বিছানায় ঘুমানোর‚ সে বিছানা রইলো কোথায়‚ কতদূরে‚ কোন পুকুরের পারে‚ কোন স্টেশনের ধারে কে জানে? আমি শুধু এপাশ ওপাশ করি আর ঘড়ি দেখি| ট্রেনের সেই ভদ্রলোককে ফোন করা হল বার তিনেক| দু'টো থেকে গড়িয়ে সময় চারটে পেরিয়ে গেল| তবু ট্রেনের দেখা নাই রে ট্রেনের দেখা নাই| অবশেষে সুখবর এল‚ ট্রেন ডেহরি অন শোন ছেড়েছে‚ ঘড়িতে সাড়ে চারটে| আমরাও গাত্রোত্থান করে বাঁচলাম| রুম সার্ভিসের অভিজ্ঞতা সুবিধার হয় নি আগের দিন‚ বিশেষ করে দুধ-চিনি ছাড়া কালো চা এক দুষ্প্রাপ্য বস্তু| তাই জামাকাপড় পরে সোজা স্টেশনে গিয়েই চা খাওয়া মনস্থ হল| আকাশে তখনও আলো ফোটে নি| অগণিত ঘুমন্ত মানুষ‚ এর পা‚ তার হাতের ওপর দিয়ে ডিঙি মেরে মেরে স্টেশনচত্বরে পৌঁছানো গেল| দোকানদাদাকে নির্দেশ দিয়ে কালো চা বানিয়ে খাওয়া হল| গাঁক গাঁক করে মাইকে ঘোষণা চলছে একটু পরে পরেই‚ আপ এক চার শূণ্যি দো ছে মুম্বাই মেল দো নম্বর প্ল্যাটফরম মে‚ ডাউন অমুক এক্সপ্রেস পাঞ্চ নম্বর প্ল্যাটফরম সে…. ট্রেন আসে‚ যায়‚ ব্যস্তসমস্ত লোকজন বাক্সপ্যাঁটরা সামলে ওঠে‚ নামে‚ দৌড়াদোড়ি করে‚ একের পর এক কয়লা ভর্তি মালগাড়ি চলে যায়| তার মধ্যেই পরম সুখে ঘুমাচ্ছে কত লোক‚ রকমারি নাসিকাধ্বনিতে সরগরম শেষরাতের স্টেশন| দেখে হিংসে হয় আমার‚ কত সুখী হলে এমন নিশ্চিন্ত ঘুম ঘুমানো যায় পথেঘাটে! কেউ কেউ আবার ঘুম ভেঙে উঠে প্ল্যাটফরমের ধারেই দাঁড়িয়ে জলবিয়োগ করে হাল্কা হয়ে নেয় নির্দ্বিধায়‚ লোটা ভরে জল নিয়ে বিকট শব্দে কুলকুচি করে মুখ ধোয় কেউ| ঐসব ন্যক্কারজনক কীর্তিকলাপ দেখেশুনে আমার বাবুজী তো নিদারুণ বিরক্ত| চোখ কড়কড় করছে‚ পালে পালে মশা ছেঁকে ধরে‚ এক মুহূর্ত সুস্থির হয়ে বসার উপায় নেই| ভালো করে পায়চারি করার উপায়ও নেই| প্ল্যাটফর্মে বেশির ভাগ আলো নেভানো‚ সেই আধো-আলোতে‚ স্বল্প পরিসরেই এদিক থেকে ওদিক হেঁটে বেড়াই আমি আর গাণুশ| হঠাৎ গাণুশ জানতে চাইল‚ "দিদুনের মত তুমিও কি এগুলো বিশ্বাস করো মা? তুমি মরে গেলে কি আমায় আবার আসতে হবে এখানে এইসব করতে"? বললাম‚ "কক্ষনো না‚ তোমাকে তো বলেই দিয়েছি‚ ক্রেমেটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়ার সময়ে সেই শেষ পথটুকু শুধু আমার সাথে থেকো‚ যদি সম্ভব হয়| আর পারলে ছাইটা ভাসিয়ে দিও ক্যানানাস্কিস নদীর জলে| কোন শ্রাদ্ধশান্তি‚ পুজোআচ্চা কিচ্ছু করবে না‚ যে যতই বলুক| এমনকি মেমোরিয়াল সার্ভিসও করবে না আমার জন্য"| এইসব গুলতানি করতে করতেই আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটল| শেষমেশ সাড়ে ছটা নাগাদ তিনি এলেন ভোঁ বাজিয়ে| আহা ধড়ে প্রাণ এল| কিন্তু জানার তখনও আরো বাকি ছিল| ট্রেনে উঠে দেখি আমাদের সীট বেদখল‚ গুছিয়ে কম্বল-চাদর মুড়ি দিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন দু'জন দু'পাশে| বাধ্য হয়ে তাদের সুখের নিদ্রা ভঙ্গ করতে হল| এক দেহাতী দম্পতি‚ প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে উঠে বসল| উপরে নীচে চারটে সীটই আমাদের| সীট ছেড়ে দিতে বলায় খেঁকিয়ে উঠল পায়ের দিকটা দেখিয়ে‚ "ব্যাইঠিয়ে না"| তারপর আরো কি কি যেন বকবক করে গেল এক বিচিত্র ভাষায়| কিছুই প্রায় বুঝলাম না| যা বুঝলাম তার মর্মার্থ হচ্ছে‚ ওরা দু'জন দু'টো জানালার ধারে বসে যাবে‚ আমরা ইচ্ছে হলে পাশে বসতে পারি| মগের মুলুকের আইনকানুনেরও বোধহয় এতটা হাঁড়ির হাল ছিল না| যাগ্গে‚ সেই 'বলে রাখা' কাজে দিল এইবার| সেই ভদ্রলোক এলেন‚ আরো জনাদুই কর্মচারীও এসে পড়েছেন ততক্ষণে আমাদের স্বাগত জানাতে| তাদেরকেও প্রায় নস্যাত করে দিচ্ছিল তালেবর স্বামীটি‚ কোন এক হোমরাচোমড়া আমলা তাদের নাকি এই সীটে বসিয়ে দিয়ে গেছে| কাজেই এই সীটের সত্ত্বাধিকার এযাত্রায় তাদেরই| ওসব টিকেট ফিকেটের তোয়াক্কা তারা করে না| এভাবেই তারা নিত্য যাতায়াত করে থাকে‚ এমনধারা বদতমিজি তাদের সাথে কেউ করে না| কিন্তু কার মুখ দেখে যে বেরিয়েছিল বেচারীরা এযাত্রায়‚ কে জানে? টিটিও এসে পড়লেন আমাদের খোঁজ নিতে| ব্যস ছবিটা পালটে গেল মুহূর্তের মধ্যে| ভেবেছিলাম বোধহয় কোন আপার বার্থের টিকেট‚ খালি দেখে এসে নীচের বার্থে শুয়ে পড়েছে| উঠিয়ে দিলে চলে যাবে নিজের জায়গায়| বুঝি নি যে কোনরকম রিসার্ভেশন তো দূরের কথা‚ কোন টিকেট ছাড়াই উঠে পড়েছে ট্রেনে| ঘাড় ধরেই একরকম নামিয়ে দিলেন সবাই মিলে দু'জনকে ট্রেন থেকে‚ সাথে বোধহয় ডজনখানেক ধুমসো ধুমসো ব্যাগ| বৌটার সে কি প্রাণান্তকর পরিস্থিতি‚ সাড়ে তিনহাত বহরের ঘোমটা সামলাবে না বোঁচকা টানবে| সাতসকালে সে এক বিচিত্র নৌটঙ্কি| অবশেষে ট্রেন ছাড়লো‚ চাদর‚ কম্বল‚ বালিশ সব পাল্টে দিয়ে গেল‚ ঝাড়ু দিয়ে গেল| আমরা গুছিয়ে বসলাম| ছেলে আর মেয়ে ওপরে উঠে শুয়ে পড়ল সটান| বোনের বরও টান টান হয়ে নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মন দিল| পরের স্টেশনে চায়ে গরম উঠতেই নুন লেবু দিয়ে কড়া মিষ্টি চা খেলাম দু'কাপ| তারপর গুছিয়ে একটা পান খেয়ে আমরা দুই বোনেও গা এলিয়ে দিলাম| এ তো রাজধানী নয়| ধীর কদমে‚ দোদুল চালে চলে আর থামে‚ থামে আর চলে| গোমো‚ কোডারমা‚ হাজারিবাগ‚ একের পর এক সেই সব স্টেশন‚ যার গায়ে আরণ্যকের জাঙ্গলিক সীলমোহর‚ আগে বাঙালী যেখানে স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে‚ অবসর কাটাতে যেত আর 'শুন বরনারী'র মত উপন্যাস লেখা হত| আমার এক অদ্ভুত রোগ‚ অসময়ে‚ অজায়গায় গান পায় আমার‚ কোন একটা গান মাথা খেতে থাকে হঠাৎ করে‚ তখুনি না শুনলে প্রাণ যায় যেন| সেই রোগ মাথা চাড়া দেয় ভীমবেগে‚ ফোন বার করে কানে গান গুঁজে বসি‚ বোন বলে‚ "স্পিকারেই বাজা না‚ এখানে তো শুধু আমরাই‚ আমিও একটু শুনি"| হেডফোন খুলে দিই‚ ফোন গান শোনায়….. "শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া আছো রাধে ঘুমাইয়া‚ হায় কলঙ্কের ভয় কি তোমার নাই ওগো রাধে‚ জাগো শ্যামের মনমোহিনী‚ বিনোদিনী রাই‚ রাই জাগো গো‚ জাগো শ্যামের মনমোহিনী‚ বিনোদিনী রাই"….. আধশোয়া হয়ে ঝিকিঝিকি ঝিকিঝিকি দোল খেতে খেতে‚ গান শুনতে শুনতে আর বাইরের দৃশ্যপট দেখতে দেখতে ধানবাদ এসে গেল| খাবার অর্ডার নিয়ে গিয়েছিল আগেই| ট্রেন থামতেই দুপুরের খাবার চলে এল| তখনও একটু আগেই খাওয়া ঝালমুড়ি হজম হয় নি পেটে| ওদিকে প্রত্যেকটা স্টেশনে থামলেই কিছু না কিছু উঠছে‚ ঝাল লজেন্স‚ বাদামভাজা‚ পুরি সবজি (বোন কিছুতেই খেতে দিল না)‚ ঝাড়খন্ডের সীমানা পেরিয়ে বাংলায় ঢুকতেই শুরু হয়ে গেল চপ-সিঙারা| হাওড়া যত কাছে আসতে থাকে‚ ট্রেনের গতিও ততই মন্থরতরো হতে থাকে| বেশ কিছুক্ষণ হালুয়ায় (হাওড়া ও লিলুয়ার মধ্যবর্তী যে অনির্ধারিত হল্টে প্রায় সব ট্রেনই নিয়মিত থেমে থাকে আর কি) দাঁড়িয়ে থাকার পর ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছালো প্রায় বারো ঘন্টা লেটে‚ ততক্ষণে সন্ধ্যে ছটা বেজে গেছে বেআক্কেলে ঘড়িতে| একটা গোটা দিন গঙ্গার ঘোলা জলে ভেসে গেল অকারণে| বন্ধুবান্ধব কারো সাথেই এবার আর দেখা হল না| না না হয়েছে‚ শঙ্খর সাথে দেখা হয়েছে এক ঝলক একটুখানি| মায়ের কাজের দিন সন্ধ্যাবেলা সব মিটে যাবার পর সবে গা ধুয়ে রাজবেশখানি পরে বেরিয়েছি‚ শুনি বাইরে একটা গাড়ি ব্যাক করতে চেষ্টা করছে জানালা ঘেঁষে প্রায় আমাদের সিঁড়ির উপর দিয়ে আর কে যেন বলছে "লেগে যাবে‚ লেগে যাবে"| কেডা রে? পর্দা সরিয়ে কটমটিয়ে দেখতে চেষ্টা করি সোফার উপর হুমড়ি খেয়ে‚ ওম্মা‚ এ তো দেখি শঙ্খ‚ মাথা নেড়ে নেড়ে শুধাচ্ছে‚ "কবে এসেছো"? অঝোর বৃষ্টি পড়ছে তখন| অনেক দূর থেকে ফিরছে বেচারা ড্রাইভ ক'রে| আমার অনুরোধ রাখতে দাদার হাতে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে জুতো খুলে ভিতরে এল‚ সামান্য কয়েক মিনিট‚ কুশল বিনিময়টুকু শুধু হল| মায়ের কাজের দিনও গিয়েছিল শঙ্খ‚ আজ বর্ষপূর্তিতেও ওর পায়ের ধুলো পড়ল বাড়িতে| ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই আমার| মুনমুন খবর নিয়েছে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই| ফোনেই কথা হল ওর সাথে বার কয়েক| সোমাকে ফোন করলাম| ওরও তো হাবিডুবি অবস্থা| আর এক বন্ধু আসবে বলে কথা দিয়েও অ্যাস ইউসুয়াল কথা রাখে নি| অথবা হয়তো আমারই শোনার ভুল‚ বোঝার ভুল‚ ভেবেছিলাম দেখা হবে‚ হল না| রইল বাকি স্কুলের বন্ধুরা| সকলেই ব্যস্ত‚ সবারই এক অনুযোগ - "আগে জানালি না"? দুন এক্সপ্রেসের নাম শুনে এক বন্ধু নাক কুঁচকে (আমার নটখটে হাঁটুর দিব্যি‚ ফোনেই পরিষ্কার শুনতে পেলাম ওর নাক কুঁচকানো) বললো‚ "ইসস‚ ওটা তো মার্কামারা‚ ঐ ট্রেনে কেউ চড়ে"? ভাবলাম বলি "তখনও কলকাতা আসার টিকেটও বুক করি নি রে‚ চারমাস আগে এই টিকেট করা হয়েছিল‚ তাতেই এই হাল‚ আর কোন ট্রেনে এসি থ্রী টায়ারও পাই নি"| কিন্তু আর বললাম না| আমাকে ধুর ভাবতে পেরে ওর যদি একটু শান্তি হয়‚ হোক না| শুধু মনের কোণে কোথাও একটা কাঁটা ফোটে খচ করে‚ এরা আমার ছোটবেলার বন্ধু‚ বেড়ে ওঠার সাথী‚ একসাথে টিফিন ভাগ করে খেয়েছি একদিন‚ দুষ্টুমি করে একসাথে শাস্তি পেয়েছি| অথচ দু'দিনের পরিচয় যার সাথে হাইকের দলে‚ আক্ষরিক অর্থেই পথের দেখা‚ সেও আসার আগের রবিবারের হাইক শেষে জড়িয়ে ধরে আমাকে বলেছিল‚ "Have a wonderful trip, don’t get raped and come back safely".... শুধুই মৌখিক? হলই বা‚ তবু তো শুভেচ্ছা| এই আকালের বাজারে সেইটুকুই কি কম পাওয়া? আমায় মারবেন না গো বাবুবিবিরা‚ আমি তো স্রেফ গল্পবলিয়ে‚ ভারতবর্ষের ছবিখানাই এমনতরো চমৎকার এখন বিশ্বের দরবারে| গল্প হবে অথচ ভোজনের ঘ্রাণ থাকবে না‚ তাও কখনো হয়? কথায় বলে বাসনার সেরা বাসা নাকি রসনায় ….. তা নয় নয় করে মন্দ হল না একেবারে| পাড়ার মোড়ের ফুচকা‚ ঘুগনি‚ চুরমুর‚ সিঙারা‚ আলুর চপ‚ ডিমের চপ‚ ভেজিটেবল চপ‚ বেগুনি‚ পেঁয়াজি‚ রোল‚ চাওমিন‚ মোগলাই পরোটা‚ মোমো‚ নন্দনচত্বরে আমন্ত্রনের ফিসফ্রাই‚ ডিমের ডেভিল‚ রবীন্দ্রসদনের ঝালমুড়ি ইত্যাদি তো হলই| তাছাড়াও ১৬ বালিগঞ্জ প্লেস‚ ষোল আনা বাঙালী‚ ফ্লেইম অ্যাণ্ড গ্রিল‚ আমিনিয়া‚ কলাপাতা‚ অওধের বিরিয়ানি আর লাজবাব কাবাব‚ এমনকি একদিন কোলাঘাট অবধি ধেয়ে গিয়ে শের-ই-পাঞ্জাবেও কবজি‚ না না‚ কনুই অবধি ডুবিয়ে খাওয়া হল| আর বোনের রাঁধা তেলকই‚ খাসির মাংস‚ চিকেন কষা‚ মোরলা মাছের বাটিচচ্চড়ি‚ ভেটকি পাতুরি‚ চিংড়ি ভাপা‚ এন্তার পার্শে ভাজা‚ এঁচোর‚ মোচা‚ পটল‚ সজনে ডাটা পোস্ত দিয়ে‚ কচুর লতি‚ লাল শাক‚ কলমি শাক‚ পুঁই শাক‚ লাউ শাক ইত্যাকার নিত্যনৈমিত্তিক পঞ্চব্যাঞ্জন তো এহ বাহ্য| নিজের ভোজনক্ষমতায় নিজেই আবাক্যি মেরে গেলাম| শুধু থোড়টা আর খাওয়া হল না বেতালা দৌড়াদৌড়ির গোলেমালে| বাদ রয়ে গেল অনাদির মোগলাই আর গোলবাড়ির কষা মাংস| গড়িয়াহাটের বেদুইনের রোলও প্রায় বাদের খাতাতেই যাচ্ছিল‚ কিন্তু ঐ রোল একটাও না খেয়ে ফিরে গেলে পাপ হবে মারাত্মক‚ তাই একরকম জোরজুলুম করেই যাওয়া হল এক বিকেলে| বাপরে‚ চৈত্র সেলের বাজারে লোকে আমাকেই প্রায় ২০০% ছাড়ে বেচে দেয়‚ এমন অবস্থা! পুলিশে দড়ি ধ'রে ধ'রে লোকজনের ভিড় নিয়ন্ত্রন করছে রাস্তার মোড়ে| আমি আর আমার বীরপুরুষ দু'জনেই রয়ে গেলাম পুলিশের রশির এপারে‚ বোন আর মেয়ে পেরিয়ে চলে গেল| ওরা হেসে বাঁচে না| আবার ফিরে এসে আমাদের ধরে ধরে রাস্তা পার করায় দু'জনে| রাস্তা তো পেরনো গেল‚ কিন্তু বাজারের মধ্যে সেঁধোবার উপায় নেই‚ এমন ভিড়ে ভিড়াক্কার| গরুর মত দু'টো না হলেও অন্তত একটা শিঙও যদি থাকত মাথায়! তবে দেখলাম শিঙ বিনাই লোকজন দিব্যি গুঁতোতে পারে| আমি চিরকালের কেবলি‚ সেই গুঁতো খেয়ে ধপাস করে সোজা ভূমিশয্যায় কেতরে পড়লাম‚ বোন এসে তাড়াতাড়ি হাত ধ'রে তুলতে চেষ্টা করে| বিন্দুমাত্র দৃকপাত না করে গুঁতোদেনেওয়ালা আমায় ডিঙিয়ে‚ আমার ভাঙা চরণখানা পাড়িয়ে চলে যাবার তালে ছিল| আশেপাশে লোকজন যথারীতি নির্বিকার‚ ব্যাগ নিয়ে দরাদরি চলছে‚ চুলের ক্লিপ নিয়ে তর্কাতর্কি‚ কেউ নাইটি হাতড়াচ্ছে‚ যে যার মত পাশ কাটিয়ে‚ ডিঙিয়ে চলে যাচ্ছে| কিন্তু মায়ের হেনস্থা চুপচাপ মেনে নেবার বাছা আমার গাণুশ নয়| লোহার মত শক্ত মুঠিতে লোকটার হাত ধরে এক হ্যাঁচকায় দাঁড় করালো‚ চোয়াল শক্ত‚ চোখে আগুন| আমি পড়ি কি মরি করে হ্যাঁচোড় প্যাচোড় করতে করতে উঠে দাঁড়াই‚ সেরেছে রে‚ আমাশাক্লিষ্ট সেই বাংলার ষাঁড়ের দেশলাই কাঠির মত পোক্ত বাহু‚ পট করে না দুখণ্ড হয়ে যায় বাবির কুড়ি পাউণ্ডের মুষল সাধা হাতের চাপে| "ছেড়ে দে বাবা"‚ বোন আর আমি দুজনে মিলে ছাড়াই সেই বজ্রমুষ্টি‚ লোকটা হাত ডলতে ডলতে চলে যায় বিড়বিড় করতে করতে| এদিকে বাবিও ফুঁসতে থাকে| "হে মা দুগ্গি‚ এবারটার মত পার করে দে মা এই জনসমুদ্দুর‚ নাকে খত‚ কান মুলছি‚ আর কক্ষনো ভুলেও আসব না কো হেথায় চত্তির মাসে"| ইচ্ছে ছিল কলিগদের গিফট দেবার জন্য টুকটাক কেনাকাটা করার| সে সব ইচ্ছে চট করে শিকেয় তুলে কয়েক কদম এগিয়ে রোল কিনেই কোনক্রমে আবার সেই সার্কাসের ট্র্যাপিসের খেলার স্টাইলে রাস্তা পেরিয়ে গাড়িতে| যাওয়া হল না আমার পরম তীর্থ দক্ষিণাপণেও‚ মানে আর সাহসে কুলালো না| তৃষাতুর চোখে চেয়ে থাকি জানালা দিয়ে‚ গাড়ি ব্রিজ পেরিয়ে দক্ষিণাপণকে ডাইনে রেখে এগিয়ে যায় ….. না গো না, দেয় নি ধরা- না গো না, দেয় নি ধরা, হাসির ভরা দীর্ঘশ্বাসে যায় ভেসে, মিছে এই হেলা-দোলায় মনকে ভোলায় - মিছে এই হেলা-দোলায় মনকে ভোলায়, ঢেউ দিয়ে যায় স্বপ্নে সে, সে বুঝি লুকিয়ে আসে বিচ্ছেদেরই রিক্ত রাতে, নয়নের আড়ালে তার নিত্য-জাগার আসন পাতে - ধেয়ানের বর্ণছটায় ব্যথার রঙে মনকে সে রয় রঙ্গিতে, রয় রঙ্গিতে- যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে…. হয়ে গেল‚ বিহঙ্গের যাবার সময় হল| আবার বাক্স নামিয়ে গোছাতে বসা ….. "শুধু দেখা পাওয়া‚ শুধু ছুঁয়ে যাওয়া‚ শুধু দূরে যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া‚ শুধু নব দুরাশায় আগে চলে যায়‚ নব নব দুরাশায় আগে চলে যায়‚ পিছে ফেলে যায় মিছে আশা‚ শুধু যাওয়া আসা‚ শুধু স্রোতে ভাসা"……. মনে হয় গানগুলো সব ঠাকুর আমার জন্যই লিখেছিলেন যেন| ফাইন্যাল এক রাউণ্ড বাজার --- আমসত্ত্ব‚ বড়ি‚ মুখরোচক চানাচুর‚ সর্ষেগুঁড়ো‚ সর্ষের তেল‚ চালের গুঁড়ো‚ গোবিন্দভোগ চাল‚ সোনামুগের ডাল‚ পানমশলা‚ জর্দা---মাথা খুঁড়ে মরে গেলেও যে জিনিষগুলো আমি ওখানে পাবো না কিছুতেই| দীর্ঘ দুই দশক ধরে যাচ্ছি‚ আসছি| আগে আগে ভয় পেতাম‚ আইন ভাঙতে সঙ্কোচ হত| তার সাথে ছিল এক যুধিষ্ঠিরের তালিবানি শাসন| কিন্তু দেখলাম "লজ্জা‚ ঘৃণা‚ ভয়‚ তিন থাকতে নয়"| লোকে সারা বছরের চাল‚ ডালও কিনে নিয়ে যায় এখান থেকে সামান্য দুটো পয়সা বাঁচাতে‚ বাক্স ভরে শাড়ি কিনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে| আমি তো নেব আমার খাবার জন্য‚ তাও যদি ওখানে পেতাম‚ নিতাম না| এই শেষের দু'তিনটে বছর ধরে তাই চুপচাপ কাউকে কিছু না বলেই নিয়ে যাচ্ছি কয়েকটা জিনিষ| "জীনা তো হ্যায় চার হি দিন‚ জিয়েঙ্গে মস্তি মে" ...... অনেক দিন তো বাঁচলাম বড় ভয়ে ভয়ে‚ অতি সাবধানে‚ নাহয় দেখাই যাক কি লেখা আছে অন্য দিকটাতে| বোন পাটালি গুড়‚ খেজুর রস জ্বাল দিয়ে বানানো গুড়‚ তিলতক্তি গুছিয়ে রেখেছে‚ কুলের আচার বানিয়ে রেখেছে মস্ত এক বয়াম| তার সাথে যোগ হল পেড়ে আনা কাঁচা আম আর ডাগর কিছু কাঁচালঙ্কা| সব পরিপাটি করে গোছাই‚ এই দীর্ঘ পথ পার করে এসব নিয়ে যাওয়া‚ সে যে কি গোছানো‚ যে না গুছিয়েছে‚ সে কল্পনাও করতে পারবে না| বাক্সসর্বস্ব জীবন‚ পৃথিবীর দুইপারে দুই পা‚ কোথায় আমার সুখের বসত আর কোনটা যে পরবাস‚ বুঝতে পারি না| গোছানো শেষ| আজকের দিন পুরো বিশ্রাম‚ শুধু ঘরে বসে পর্বে পর্বে ভোজন আর নির্ভেজাল আলস্য| দু'একটা ফোন‚ যাবার আগে শেষবার একবার প্রিয় কন্ঠস্বর শুনতে চাওয়া….. "আধোখানি কথা সাঙ্গ নাহি হয়‚ লাজে ভয়ে ত্রাসে‚ আধো বিশ্বাসে শুধু আধোখানি ভালোবাসা"…… নাহ যাই এবারে - "হাত ধরেছি অন্ধকারে ছাড়তে কতক্ষণ হয়তো আমার আঙুল জানে মোমবাতিদের মন পর্দা ওড়ায় বৃষ্টি হাওয়া ছাদে মাদুর পাতি দূরে কোথাও আশার গলায় " কাঁচেরই ঝাড়বাতি ".... সঙ্গে মুড়ি , জোছনামাখা কাঁচা লঙ্কা, ঘ্রাণে মোমবাতিদের মন কিছুটা আমার আঙুল জানে । বেশীর ভাগই স্পর্শকাতর কিছু স্মৃতিহীনা রইল ছাদে মাদুর পাতা ..... আমি তো বসছি না ।" ......শ্রীজাত

241

20

Ranjan Roy

গল্পঃ এক ও দুই রঞ্জন রায়

গল্প ১ গন্ধ: সাদত হসন মন্টো মূল ভাষা থেকে বাংলাঃ রঞ্জন রায় [ এটি মন্টোর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর অন্যতম না হলেও প্রতিনিধিমূলক তো, তাই অক্ষম অনুবাদে পেশ করলাম।] সেদিনও এমনি বূষ্টি পড়ছিল। জানলার বাইরে অশ্বত্থের পাতাগুলো এমনি করে ভিজছিল। ।স্প্রিংয়ের গদিওলা সেগুনের খাটে একটি পাহাড়ি মেয়ে রণধীরের সঙ্গে লেপটে শুয়েছিল। খাটটি জানলার পাশ থেকে সরিয়ে ঘরের ভেতরের দিকে টেনে আনা আর জানলার বাইরে দুধসাদা অন্ধকারে অশ্বত্থের পাতাগুলো ঝুমকোর মত থরথরিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নাইতে লেগেছিল। এদিকে খাটের উপর থরথর পাহাড়ি মেয়েটি রণধীরের গায়ে লেপটে শুয়ে। সারাদিন ধরে একটা ইংরেজি কাগজের সমস্ত খবর মায় বিজ্ঞাপন শুদ্দু পড়তে পড়তে বিকেল গড়িয়ে গেলে ও একটু পায়চারি করবে বলে সবে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে , চোখে পড়ল বূষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে তেঁতুল গাছের নীচে দাঁড়ানো পাহাড়ি মেয়েটি; বোধহয় কাছের দড়িপাকানোর কারখানায় কাজ করে। একটু কাশি আর গলাখাঁকারির শব্দে চোখ তুলে তাকাতেই ও মেয়েটাকে হাত নেড়ে ওপরে ডেকে নিল। কিছুদিন ধরে ওর বড্ড একলা একলা লাগছিল। যুদ্ধ লাগতেই বেশির ভাগ ক্রিশ্চান ছুঁড়িগুলো, যাদের আগে নামমাত্র টাকায় পাওয়া যেত, মেয়েদের অক্সিলিয়ারি ফোর্সে ভর্তি হয়ে গেল। কয়েকজন ফোর্টের পাশে ডান্সিং স্কুল খুলে দিল যেখানে শুধু গোরা সৈনিকরা যেতে পারবে। রণধীরের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক।রণধীর জানে যে ওই গোরা সেপাইদের চেয়ে ও অনেক বেশি ভদ্র, শিক্ষিত আর দেখতেও ভাল। শুধু রঙটা ফর্সা নয় বলে ও ক্লাবগুলোতে ঢুকতে পারবে না!যুদ্ধের আগে নাগপাড়া ও তাজ হোটেলের এলাকায় বেশ নামকরা কিছু ক্রিশ্চান মেয়ের সঙ্গে ওর শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল। যে ক্রিশ্চান ছোঁড়াগুলো ওই মেয়েগুলোর পেছনে ঘুর ঘুর করে শেষে কোন একটাকে বিয়ে করে ফেলত, ও জানত, ওরা ওর পাশে দাঁড়ানোর যুগ্যি নয়। ওই পাহাড়ি মেয়েটিকে ইশারায় ওপরে ডেকে নেওয়ার সময় রণধীরের মনে শুধু হেজেল বলে ক্রিশ্চান মেয়েটির ওপর খার তোলার ইচ্ছে ছিল। হেজেল বলে মেয়েটা থাকে ওর নীচের তলার ফ্ল্যাটে। রোজ সকালে উর্দি পরে খাকি রঙের তেরচা টুপিতে ববকাট চুল ঢেকে এমন কায়দা করে চলে যেন গোটা রাস্তার লোক ওর পায়ে লুটিয়ে পড়বে। রণধীরকে ও একদম পাত্তা দেয় না। রণধীর ভেবে পায় না কেন ওই ক্রিশ্চান ছুঁড়িগুলোকে নিয়ে ও এত মাথা ঘামায়! কোন সন্দেহ নেই যে ওরা শরীরের যা যা দেখানোর জিনিস সব বেশ কায়দা করে দেখায়। নি:সংকোচে নিজের সব কিছু শোনয়, এমনকি পুরানো প্রেমিকদের নিয়ে গল্প শোনাতেও ছাড়ে না। আর নাচের সুর বেজে ওঠা মাত্তর তালে তালে পা’ কাঁপাতে থাকে। সে না হয় হল, তবে এসব গুণ তো অনেক মেয়ের মধ্যেই দেখা যায়। মেয়েটাকে ওপরে নিয়ে যাওয়ার সময় রণধীরের একটুও বিশ্বাস হয় নি যে ওর সঙ্গে শুতে পারবে। কিন্তু একটু পরে ওর চোখ পড়ল ওর জবজবে ভিজে কাপড়ের দিকে। ভাবল–– আহা, বেচারির নিমোনিয়া না হয়ে যায়! বলল––‘ কাপড়চোপড় ছেড়ে ফেল, ঠান্ডা লেগে যাবে’। মেয়েটা সব বুঝতে পারছিল, তাই চোখে লজ্জার লালিমা। কিন্তু রণধীর একটা শুকনো ধুতি বের করে দিলে ও একটু ভেবে ওর ঘাঘরা খুলে ফেলল–– ভিজে গিয়ে ওটার ময়লা ময়লা ভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।ভিজে কাপড় একপাসে রেখে ও ধুতি দিয়ে গোটা শরীর ঢেকে নিল। তারপর তাড়াহুড়ো করে দুটো কোনা আঁটো করে বাঁধা চোলির গিঁট খোলার চেষ্টা করতে লাগল। ওটা ওর উদ্ধত বুকের খাঁজে বেশ কেটে বসেছে। বেশ খানিকক্ষণ গিঁট খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে হার মেনে ও মারাঠি ভাষায় রণধীরকে যা বলল তার নিগলিতার্থ––– কী করি? খুলছে না যে! আসলে ভিজে গিয়ে ওর চোলি খুব কড়া হয়ে গেছল। রণধীর ওর পাশে বসে টানাটানি করে খুলতে না পেরে দু’হাতে চোলির দু’পাশ ধরে মারল এক হ্যাঁচকা টান।গিঁট খুলল, ওর হাত ছিটকে সরে গেল আর ওর মুঠোয় এল ধুকপুক দুই নরম বুক। পাহাড়ি মেয়েটার বুকের নরম নরম মাটির তাল ওর কুমোরের মত পাকা হাতে দুটো পেয়ালার রূপ ধরেছে।ও ই ভরা বুক যেন কুমোরের চাক থেকে সদ্য বেরনো বাসন; তেমনি সুডোল,কোমল, উষ্ণ ও শীতল। মেটে রঙের নির্মল দুই বুকে এক অদ্ভুত চকচকে ভাব। ধোঁয়া ধোঁয়া আলোর আভা। যেন দীঘির কালো জলের তলে কেউ জলটুঙ্গিতে প্রদীপ জ্বেলেছে। হ্যাঁ, সেটা ছিল এমনি এক বূষ্টিঝরা দিন। জানলার বাইরে বূষ্টির ফোঁটায় থিরথিরিয়ে কাঁপে বটের পাতা। পাহাড়ি মেয়েটার ওই দু’টুকরো জবজবে ভিজে পোষাক ঘরের এককোণে মাটিতে লুটোয় আর ও নিজে রণধীরকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে। ওর নগ্ন ময়লা শরীরের উষ্ণতা রণধীরের শরীরে শীতের দিনে নোংরা বাথরুমে গরম জলের ফোয়ারায় স্নান করার আরাম ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সারারাত্তির ও রণধীরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে শুয়ে রইল। কথা হল মাত্র দু’একটা । কারণ গরম নি:শ্বাস, ঠোঁট ও হাতের ছোঁয়ার পরে বাকি সব ফালতু হয়ে যায়। রণধীরের হাত সারারাত ওর বুকে মাঠের ওপর বয়ে যাওয়া হাওয়ার মত খেলে বেড়ায়। ছোট ছোট স্তন, বোঁটার চারপাশে কালো বূত্ত–– ওই পাগল হাওয়ায় জেগে উঠে পাহাড়ি নারীর শরীরে এমন কাঁপন ধরায় যে রণধীরের শরীরও দপ করে জ্বলে ওঠে। এমন কাঁপন–জাগানো অনুভূতির সঙ্গে রণধীরের অনেক পুরনো পরিচয়। বহু মেয়ের নরম ও উদ্ধত বুকে বুক লাগিয়ে এমন অনেক রাত ও কাটিয়েছে। এমন খোলামেলা মেয়েও জুটেছে যে রাতভোর ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের ঘরের সেসব কেচ্ছা শুনিয়েছে যা কেউ অপরিচিতকে বলে না। ওর সেরকম কিছু মেয়ের সঙ্গেও শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল যারা সবকিছু নিজে এগিয়ে এসে করে দিত, ওকে কিস্যু করতে হত না। কিন্তু ওই পাহাড়ি মেয়েটা! তেঁতুলগাছের নীচে দাঁড়িয়ে ভিজছিল আর ওর এক ইশারায় উপরে চলে এল, কিন্তু কেমন যেন আলগা আলগা উদাস ভাবভঙ্গি। ওর শরীর থেকে এক অদ্ভূত গন্ধ রণধীরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সারারাত।সে’ গন্ধ যেমন অসহ্য তেমনি মাদক। গন্ধ ভেসে আসছিল ওর বগল থেকে, চুল থেকে, বুকের ভাঁজ থেকে, পেট থেকে, বোধহয় ওর গোটা শরীর থেকে আর ছড়িয়ে পড়ছিল ওর প্রত্যেক শ্বাস–প্রশ্বাসে। সমস্ত রাত ওর মনে হচ্ছিল যদি ওই পাহাড়ি মেয়েটি এত কাছাকাছি না শুতো বা ওর গা’ থেকে অমন তীব্র গন্ধ না ছড়াত। অমন গন্ধ যা রণধীরের হূদয়মনের পরতে পরতে বাসা বাঁধছে, ওর সমস্ত পুরনো ও নতুন ভাবনাচিন্তাকে দখল করে ফেলছে। ওই গন্ধ রণধীর আর ওই মেয়েটাকে একরাতের বাঁধনে এমন করে বাঁধল যে ওরা একে অন্যের গহনে প্রবেশ করে মানবীয় অনুভূতির, কামনার অতল গভীরে ডুবে গেল। সে কামনা যেন সাময়িক হয়েও চিরন্তন। ওরা দু’জন যেন এক জোড়া পাখি যারা আকাশের নীলিমায় উড়তে উড়তে এক পলকের জন্যে দেখা দেয়। পাহাড়ি মেয়ের শরীরের সমস্ত রোমকূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া ওই গন্ধকে রণধীর বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু তার ব্যাখ্যা করা ওর সাধ্যের বাইরে। খানিকটা যেন রুক্ষ মাটিতে কয় ফোঁটা জল পড়লে যেমন সোঁদা গন্ধ বেরোয় – সে’রকম; না:, ঠিক তা’ও না। এই গন্ধটা যেন একটু অন্যরকম। এতে ল্যাভেন্ডার ও আতরের নকলভাবটা নেই। এ হল খাঁটি জিনিস–– পুরুষ ও নারীর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মত আসল ও খাঁটি। ঘামের গন্ধে রণধীরের বড্ড ঘেন্না। স্নানের পর ও নিজের বগলে সুগন্ধ পাউডার লাগায়, নইলে এমন কোন জিনিস লাগায় যাতে ঘামের গন্ধ চাপা পড়ে।আর কি আশ্চর্য! ও কতবার পাহাড়ি মেয়েটার লোমে ভরা বগলে চুমু খেল কিন্তু একটুও ঘেন্না হল না!বরং ও নিজের ভেতরে এক অদ্ভূত কামনার জোয়ার টের পেল। বগলে নরম নরম লোম ঘামে ভিজে একশা’। ওখান থেকেও তাড়া করছে সেই চেনা–চেনা তবু–অচেনা গন্ধটা। রণধীরের মনে হল গন্ধটাকে ও ভাল করে জানে, চেনে, ওর মানেও বোঝে– কিন্তু অন্য কাউকে বোঝাতে পারে না। সেদিনটাও এমনিই ছিল; এমনি এক বূষ্টি–ঝরঝর দিন। এই জানলাটা দি্য়েই বাইরে তাকালে চোখে পড়ছিল বটের পাতার জলধারায় স্নানের আনন্দে মেতে ওঠা। হাওয়ায় সরসর–ফরফর মিলেমিশে যায়। অন্ধকার, কিন্তু তারমধ্যেই ঘোলাটে আলোর রেখা।ঠিক যেন বূষ্টিধারায় ঠিকরে পড়া তারার ফিকে আলো। সত্যি, সেদিনও ছিল এমনি এক বর্ষার দিন। তখন রণধীরের এই ঘরটায় শুধু একটাই সেগুনের পালংক দেখা যেত,আজ কিন্তু দু্টো পালংক,পাশাপাশি,–– কোণে আবার একটা নতুন ড্রেসিং টেবিল। আজকের দিনটা অমনি বর্ষামুখর, আবহাওয়াও ঠিক তাই। বূষ্টিধারায় ঠিকরে পড়া তারার ফিকে আলোও চোখে পড়ছে। খালি বাতাস ভারি হয়ে আছে হেনার আতরের তীব্র গন্ধে। অন্য খাটটা খালি।রণধীর নিজের খাটে উপুড় হয়ে জানলার বাইরের আলো–আঁধারিতে বূষ্টিভেজা বটের পাতার নাচন দেখছিল, এক ফর্সা মেয়ে ওর পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে কাদা। মেয়েটা ওর নগ্ন শরীর ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিছানার চাদর টেনে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর লাল রেশমী সালোয়ার পাশের খাটে লুটোচ্ছে।তার গাঢ় লালরঙা একটা ফিতে খাটের পাশ থেকে নীচে ঝুলছে। অন্য খাটে ওর বাকি কাপড়চোপড় ঢিপ হয়ে পড়ে আছে---ওর সোনালি ফুলকাটা কামিজ, ব্রেসিয়ার, প্যান্টি আর ওড়না,–– সব লালরঙের, খুনখারাপি লাল। সমস্ত কাপড়ে হেনার আতরের তীব্র গন্ধ। মেয়েটির কালো চুলে জরির ফিতের বিনুনি কেমন জমে থাকা ময়লার মত দেখাচ্ছিল। গালের রুজ, লাল লিপস্টিক ও চুলের জরি মিলেমিশে অদ্ভুত এক রঙের আবহ তৈরি করেছে। প্রাণহীন,উদাস। ওর ফরসা বুকে লালরঙা আঁটোসাঁটো বক্ষবন্ধনী লাল লাল ছোপ লাগিয়েছে। সাদা দুধেল স্তন, তাতে অল্প নীলচে আভা। পাঁশুটে রঙা কামানো বগল। রণধীর বেশ কয়েকবার মেয়েটিকে দেখে আর ভাবে––মনে হচ্ছে, ওকে যেন প্যাকিং বাক্সের পেরেক খুলে মাত্র বের করেছি--বই বা চিনেমাটির বাসনের মতন। বইযের গায়েও ঠেসে ভরার দাগ থাকে, চিনেমাটির বাসনেও নাড়াচাড়ার ফলে চুলফাটা দাগ ধরে। মেয়েটার শরীরেও যেন তেমনি কিছু দাগ আছে। রণধীর যখন ওর কড়া আঁটোসাঁটো ব্রেসিয়ার খুলেছিল তখন ওর পিঠে এবং বুকের নরম নরম মাংসের তালে ডোরাডোরা দাগ দেখতে পেয়েছিল। আরো ছিল–– কষি আলগা করায় কোমরের চারপাশে ও ভারি চোখা জড়োয়া নেকলেস সরানোয় গলায় ও বুকে নোখ দিয়ে জোরে খিমচানোর মত লালচে দাগ। সেদিনটাও এমনিই ছিল; এমনি এক বূষ্টি–ঝরঝর দিন। বটের কোমল পাতায় বূষ্টির ফোঁটা পড়ে তেমনি আওয়াজ হচ্ছিল, যেমনটি রণধীর সেদিন রাতভোর শুনতে পেয়েছিল। দারুণ আবহাওয়া। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা আসছে, কিন্তু তাতে যে মিশে আছে হেনা–আতরের তীব্র গন্ধ! রণধীরের হাত ঘুরে বেড়ায় দুধসাদা মেয়েটির কাঁচাদুধের মত বুকে, ঝোড়ো হাওয়ার মত, অনেকক্ষণ। ওর আঙুল ওই শ্বেতশুভ্র নারীদেহের ভেতর নানা তরঙ্গের খোঁজ পেয়ে যায়। টের পায় ওই নরম নরম শরীরের অনেক অংশ জেগে উঠছে, ছুটে বেড়াচ্ছে আবেগ। এবার ও বুকে বুক লাগায় আর ওর প্রতিটি রোমকূপে ছড়িয়ে পড়ে নারীদেহটির বীণার তারের ঝংকারের অনুরণন। কিন্তু কোথায় সেই আহ্বান? কোথায় সে’ ডাক? যে ডাক ও শুনতে পেয়েছিল পাহাড়ি মেয়েটির শরীরের মাদক গন্ধে!যে ডাক দুধের জন্যে শিশুর কান্নার চেয়ে স্পষ্ট। আজ সে’ডাক কোথায় হারিয়ে গেল? রণধীর জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। জানালার পাশে বটের পাতা নেচে বেড়ায; কিন্তু ওর দূষ্টি পেরিয়ে যায় বটের পাতার নাচনকোঁদন, দেখতে চায় দূরে, অনেক দূরে, যেখানে ময়লাছোপ ধরা মেঘের ভেতর চোখে পড়ে এক ঘোলাটে আলো; এমন আলো যা দেখেছিল পাহাড়ি মেয়েটির বুকে, যা গোপনকথার মত গোপন থেকেও নিজেকে জানান দেয়। রণধীরের পাশে শুয়ে এক দুধসাদা নারী, যার শরীর দুধ–ঘি দিয়ে মাখা আটার তালের মত নরম, যার নেতিয়ে পড়া শরীরে হেনা–আতরের সুবাসের ক্লান্তি। রণধীরের দম আটকে আসে, অসহ্য লাগে এই মরুটে গন্ধ। এতে এখন টকটক গন্ধ, এক বেয়াড়া টোকো গন্ধ যা চোঁয়া ঢেকুরের মত। এবার ও পাশে শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকায়। দুধ কেটে গেলে যেমন সাদা সাদা গুঁড়ো ট্যালটেলে জলের মধ্যে চ্যাপচেপে হয়ে থেকে যায় তেমনি মেয়েটির নারীত্ব ওর চেতনায় বসত করে––চ্যাপচেপে সাদা সাদা গুঁড়ো হয়ে। আসলে রণধীরের চেতনে–অবচেতনে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই গন্ধ যা পাহাড়ি মেয়েটির শরীর থেকে অনায়াসে পেয়েছিল;যা হেনা– আতরের চেয়ে বেশ নরম কিন্তু ছড়িয়ে পরে অনেক দূরে; যাকে কষ্ট করে শুঁকতে হয় না, যা নিজে–নিজেই সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে যায়। রণধীর এবার শেষ চেষ্টা করল। মেয়েটার ফর্সা শরীরে হাত বোলাল; না, কোন স্পন্দন নেই, কোন অনুরণন জাগল না। ওর সদ্য বিয়ে করা বৌ-- ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে, বিএ পাশ, কলেজের একশ’ ছেলের বুকের ধুকধুকি-- রণধীরের বুকে কোন ঢেউ তুলতে পারল না। হেনার মিলিয়ে যাওয়া গন্ধের মধ্যে ও আতুর হয়ে খুঁজতে লাগল সেই অদ্ভূত এক গন্ধ যা ও পেয়েছিল এমনি এক বাদলঝরা দিনে, যখন জানলার পাশে বটের পাতা বূষ্টিধারায় স্নান করছিল আর ও ডুবেছিল এক পাহাড়ি মেয়ের আধময়লা শরীরে।<br/>্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্্ গল্প-২ কোলকাতা , তুমি কার? Ranjan Roy বাঙাল থেকে বং: কোলকাতার এক সঙ ======================== আদৌ রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা নয়, এ যেন আকাশগঙ্গা নেমেছে। কোলকাতা জলমগ্ন, বাইপাসের ধারে কালিকাপুরে নৌকো চলছে।আমরা গূহবন্দী। কাজেই আড্ডা, চা, তেলেভাজা, মুড়ি, ফের চা, ফের তক্কাতক্কি, ফের লাল সবুজ। হাতজোড় করি, এমনদিনে রাজনীতি ছেড়ে অন্য কিছু নিয়ে কথা হোক। কিল্তু ইলিশ নাকি হাজার টাকা? চিংড়িও আটশ৹ ছাড়িয়েছে ?কোলকাতার এই হাল? কে দায়ী? লাল হলুদ, নাকি মেরুন সবুজ? সত্তর পেরোনো নন্দীকাকিমার খ্যানখেনে গলা: যেদিন থেকে এই জার্মানগুলো হাঁড়িকুড়ি, ক্যাঁতা নিয়ে পিলপিল করে শ্যালদায় নেমেছে সেদিনই চিত্রগুপ্তের খাতায় আমাদের কোলকাতার নাম উঠে গেছে। ঃ আজাইরা তর্ক কইরেন না বৌদি! খেঁকিয়ে উঠলেন মজুমদারকাকু,ঃ আমাদের কোলকাতা? ক্যান, কইলকাতা আমাগো না? চৌত্রিশ বছর ধইরা বঙ্গদেশরে চালাইল কেডা?বঙ্গের গৌরব জ্যোতিবসু ঢাকার বারদি গ্রামের পোলা না?কুন হালার ঘটি লীডারের নাম দ্যাশের প্রধানমন্ত্রী পদের লাইগ্যা শুনছেন কুনো দিন? ঃ সেই কতাই তো হচ্চে! রেফুজিগুলোকে মাতায় তুলে বামদলগুলো অ্যাদ্দিন গদি আঁকড়ে থেকে কোলকাতার ভুষ্টিনাশ করে ছেড়েছে। তাই সাবর্ণ চৌধুরিদের লতায় পাতায় আত্মীয় ভবানীপুরের দিদি ঝ্যঁটা ধরেছেন। কোলকাতাকে সাফসুতরো করবেন। ঃ হ:, লন্ডন বানাইবেন! আইজ ত ঢাকুরিয়া লেক। আবার হাতজোড় করি, নো পলিটিক্স প্লীজ! নো আমরা ওরা! আজকের নতুন বিষয়: কোলকাতা তুমি কার? দুপক্ষের থেকে একজন করে বলবেন; কেউ ফোড়ন কাটবেন না, শুধু আমি মাঝেমধ্যে ক্ল্যারিফিকেশন চাইতে পারি। কেউ কেউ মুখ বেঁকালেন। কিন্তু কথায় কাজ হল।প্রথমে মজুমদারকাকু। জবাব দেবেন নন্দীকাকিমা। বাঙালের আমরা ওরা: :ওরা কখনো আমাগো একই দ্যাশের মানুষ মনে করে নাই। স্যাম্পল দ্যাখেন: বাঙাল মনুষ্য নয় ওড়ে এক জন্তু, লম্ফ দিয়ে গাছে ওঠে লেজ নাই কিন্তু। অথবা, এই কমিক গানটা: বাঙালো, ভাত খাইলো, ভাঁড় ভাঙিলো, পয়সা দিল না। : আপনারা ছেড়ে দিতেন? : হ:, কুন হালায় ছাইড়া দিব? আমরা কইতাম: বাঙ্গাল বাঙ্গাল করিস না, বাঙ্গাল তোর পিতা, পূজার সময় কিনে দিবে একজোড়া জুতা। অথবা, বাঙ্গাল বাঙ্গাল করস ক্যান, বাঙ্গাল তোর কেডা? আমরা থাকি মাছেভাতে, পান্তা খায় তর জ্যাডা! ( এরপর উনি যা যা বললেন সে সব আমি খানিকটা সম্পাদনা করে তার সুবোধ সংস্করণ নীচে দিয়ে দিলাম।) ঃ ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে পা টিপে টিপে ঢুকে গেছে একধরণের হীনমন্যতা, সংখ্যা লঘু হওয়ার ভয়। পাড়ায়, স্কুলে, ফুটবল মাঠে জানতে পেরেছি আমরা বাঙাল,আমরা উদ্বাস্তু। আমরা এসেছি, তাই কোলকাতা শহর কল্লোলিনী তিলোত্তমা হয়ে উঠতে পারল না।আমাদের জন্য বরাদ্দ শেয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আর আমেরিকা থেকে পাঠানো গুঁড়ো দুধ। আমাদের নিয়ে ওদের কবি ছাপার অক্ষরে ছড়া লেখে, সেগুলো অনায়াসে শিশুপাঠ্য বইয়ে ছাপা হয়। : আমরা ভাল লক্ষ্মীছেলে, তোমরা ভারি বিশ্রী, তোমরা খাবে নিমের পাঁচন, আমরা খাবো মিশ্রী। ভীড়ের মধ্যে নিজেকে লুকোতে পারিনে। জিভের আড় পুরোপুরি ছাড়েনি, আমার প্রাকূত ভাষা, ধরা পড়ে যাই।দুই বিনুনি করা সুন্দরীরা আমার কথা শুনে হেসে ফেলে; মনের কথা মনেই থেকে যায়। বাংলা নাটকে সিনেমায় বাঙাল হল কমিক চরিত্র। সিওর সাকসেস। মুখ খুললেই দর্শকের হাসি।ভানু বন্দোপাধ্যায়েরা কখনই নায়ক হতে পারেন না, মাসিসা মালপোয়া খামু বলাটাই আমাদের নিয়তি। ধীরে ধীরে আমি থেকে আমরা হই; তারপর আমরা আর ওরা। ভয় সংকোচ সব কখন যেন রাগের চেহারা নিতে থাকে। শেকড় হাতড়ে বেড়াই। মৈমনসিংহ সম্মিলনী, বরিশাল সম্মিলনী করি। ঘেট্টো বানাই। হালতু, বাপুজিনগর, নেতাজিনগর, আজাদগড়, বিজয়গড়, বিদ্যাসাগর; তালিকা বেড়েই চলে। ঢাকুরিয়া ব্রিজের উত্তরপাড় থেকে কোলকাতা, আর দক্ষিণপাড় থেকে ৸নেই কোলকাতা৸, মানে আমাদের রাজত্বি।আমরা দরমা, কাঠের ফ্রেম, টিন আর খাপরা দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকি, হ্যারিকেনের আলোয় লেখাপড়া করি, প্রায় লাংগল চষা মাঠে ফুটবল খেলি, আর অমুকের ব্যাটা হয়ে তমুকের মাইয়ার লগে প্র্যাম করি। এরমধ্যে একটা ব্যাপার ঘটে যায়। ফুটবল মাঠে মোহনবাগানকে চিরশত্রু আখ্যা দিই। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হয় যে ওদের হয়ে পায়ের জাদু দেখিয়ে গোল করলেন যে চুনী গোস্বামী তিনি মৈমনসিংহের লোক।পরিশীলিত গলায় রাবীন্দ্রিক উচ্চারণে গান গেয়ে কয়েক দশক মাতিয়ে রাখা জর্জ বিশ্বাস বা আবোলতাবোল ও ফেলুদার সুকুমার সত্যজিৎ ও তাই। ৸সুনন্দর জার্নালের নারাণ গাঙ্গুলি বা নীরার জন্যে অপেক্ষায় থাকা সুনীল গাঙ্গুলি? খুশি হই যে এরাও বাঙাল।আর সুচিত্রা সেন ? অর্ধশতক আগে ঘটিদের লা ফেম ফ্যাতালে? আরে,উনি তো পাবনার রমা সেন! কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না। একজন আবুল কালাম রাষ্ট্রপতি হলে, বা একজন ইউসুফ ভাই মুম্বাইয়ের শেরিফ হলেই কি মুসলমানদের বর্ডারের ওপারে পাঠাও বলতে মুখে আটকায়? আমরা বুঝে গেছি যে মহামানবেরা কারোরই নন; ওঁরা নিজেরাই একটা আলাদা জাত। তবু আমরা গর্বে ফুলে উঠি, আইকন বেছে নিই। মানচিত্র ধরে শিলাইদহ কোথায় আবিষ্কার করি, ধানসিঁড়ি নদীর উৎস খুঁজতে থাকি। এইভাবেই কেটে যায় স্বাধীনতা পরবর্তী দুটো দশক।সত্তরের দশকে পালটে গেল অনেক কিছু। অনেক খনার বচন মিথ্যে হয়ে গেল। অনেকেই কথা রাখল না।কিন্তু এইপর্বেই ইস্টবেঙ্গল আমাগো চিরশত্রু হালার মোহনবাগানকে পাঁচবার হারিয়ে দিল, একবার তো পাঁচশূণ্য! সেই ধাক্কা ওরা আজও সামলে উঠতে পারেনি। প্রথমে ভেবেছিলাম বাংলাদেশ মানে বাঙালদের দেশ। শিগ্গিরই ভুল ভেঙে গেল। টের পেলাম ওপার আর এপারের মাঝখানে অনেকখানি চর জেগে উঠেছে। ওটা আমাদের পাশের বাড়ি, বাপের বাড়ি নয়।ফলে কোলকাতাকে আমরা আরো আঁকড়ে ধরলাম। এদিকে গঙ্গা দিয়েও অনেক জল গড়িয়ে গেছে। কোলকাতা গায়েগতরে অনেকখানি ছড়িয়ে গেছে। একদিকে কেষ্টপুর রাজারহাট, অন্যদিকে সোনারপুর নরেন্দ্রপুর। যাদবপুর নাকতলা টালিগঞ্জ এখন আর যাযাবর রিফিউজিদের গজিয়ে ওঠা কলোনি নয়, বরং কোলকাতার নতুন বর্দ্ধিষ্ঞু পাড়া। একাত্তর থেকে আসা শরণার্থীর ঢলে কোলকাতার পথেঘাটে বাঙাল কথার অসংকোচ ফুলঝুরি আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগে সহমর্মিতাবশে নিকষঘটিদের বাঙাল শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের চেষ্টায় ধীরে ধীরে বাঙালদের এথনিক ভাষা কৌলিন্য পেল।পূববাংলার পল্লীগীতি এখন ইন থিং।হুসেনশাহি পরগণার লোকগাথা নিয়ে লেখা ৸মাধব মালঞ্চি কইন্যা৸ সুপারহিট নাটক।পূববাংলার কথ্যভাষায় তৈরি সিরিয়াল বা টেলিফিল্ম দেখে কেউ আর আশ্চর্য হয় না।গড়িয়াহাটের মোড়ে হন্ডা সিটি থেকে নামা এক ওষ্ঠরঞ্জিতা, ভ্রুপল্লবঅংকিতা মধ্যবয়সিনী অনায়াসে কোন পরিচিতকে খাস শ্রীহট্টের উপভাষায় ডেকে ওঠেন, : সোমেেশ নী রে বা? অর্থাৎ, আজকে আর ৸সধবার একাদশী৸র বাংগাল ৸বাগ্যদরির বাগ্যদর৸ কে কোলকাতার ঘটি না হতে পারার কষ্টে আত্মবিলাপ করতে হবে না: সাহেববারির বিস্কুট খাইছি,মাগীবারি গেছি, বৌ ব্যইগ্যদরি দিয়া আমার রক্ষিতার পায়ে হাত দিয়া দিদি ডাকাইছি তবু কলকাত্তাই হইতে পারলাম না। আজকে রাঢ়বাংলার তিলোত্তমারা অনায়াসে পূববাংলার গলায় বরমালা পরিয়ে দেন।আমরা আর তোমরা কখন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, এখন আমরাই কোলকাতা! ঘটির চোখে আমরা ওরা: ঃতেলে জলে মিশ খায়না, বাঙাল ঘটি একসঙ্গে থাকতে পারে না। ঃ কিন্তু কাকিমা, আজকাল যে বিয়ে হচ্ছে? ঃ হ্যাঁ, খোঁজ নিয়ে দ্যাকো, বেশিরভাগের ডিভোর্স হয়ে গ্যাচে। ক্যানো? ক্যালোর ব্যালোর বন্দ কোরে একটু আমার কতা শোন্। এদের সম্বন্ধে ভাটপাড়ার বাচষ্পতিমশাই বাঙ্গালজাতির ইতিহাস গ্রন্থে কী লিখেছেন পড়ে শোনাচ্ছি। : বাঙাল এক স্বতন্ত্র জাতি। ইহারা মুখ্যত: তিনপ্রকার। বাস্তবাঙাল, ভ্যাদভেদে বাঙাল ও কাষ্ঠবাঙাল। (তাই শিলাইদহে ইহাদের পর্য্যবেক্ষণ করিয়া রবিবাবু লিখিয়াছিলেন: ত্রম্ব্যকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ, শক্তিভেদে ব্যক্রিভেদে দ্বিগুণ বিগুণ।) এখন ইহাদের গুণাগুণ সম্যকরূপে অবহিত হউন। প্রথম, বাস্তুবাঙাল। ইহারা সকলেই নাকি প্রাচীন পূর্বপাকিস্তানে, অধুনা বাংলাদেশে জমিদার ছিল। তাই আজ বাস্তুচ্যুত হইয়া হা বাস্তু! যো বাস্তু! করিয়া গরিলার ন্যায় বুক চাপড়াইয়া কাঁদে। লক্ষ্যণীয়, ইহারা উদ্যোগী পুরুষসিংহ বটে! তাই কলিকাতা মহানগরীর উপান্তে অনায়াসে জমি জবরদখল করিয়া উদ্বাস্তু উপনিবেশ গড়িয়া তুলে এবং অতি অল্পদিনে স্থানীয় রাজনেতার পিএ পদপ্রাপ্ত হয়। ইহারাই বর্তমান ঠিকাদার মাফিয়া জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ। দ্বিতীয়, ভ্যাদভেদে বাঙাল। ইহারা সর্বদা নিজেদের বাঙাল পরিচয় লুকাইয়া রাখিতে সচেষ্ট, কেবল ঘটিদের সহিত বিবাহাদি সম্পর্কস্থাপনের প্রয়াসে ধরা পড়িয়া যায়। ইহাদের ময়ূরপুচ্ছ দাঁড়কাক বলিলে কম বলা হয়। তূতীয়, কাষ্ঠবাঙাল। ইহারা তামসিক স্বভাবের, অত্যন্ত কোপন ও দাংগাবাজ। একবার এক ঘটি উহাকে দূর ব্যাটা বাঙাল! বলায় সেই কাষ্ঠবাঙাল সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে গলা টিপিয়া হত্যা করে এবং মূতদেহ মাটির পনের ফুট নীচে পুঁতিয়া ফেলে।তাহাতেও ক্রোধ শান্ত না হওয়ায় পনের দিন পরে গর্ত খুঁড়িয়া কংকালের বুকের উপর বসিয়া গলা টিপিয়া বলে: আর কখনো বাঙ্গাল বলিবি? বুঝলি, ওরা হল মোচলমানদের কাছাকাছি।ওদের রান্নাবান্নাগুলো দ্যাখ।সব তেলমশলা রসুনপেঁয়াজ দেওয়া মাছের পদ। আমাদের সুক্তনি, আমাদের বাটিচচ্চড়ি, বাটনাচচ্চড়ির ধারেকাছে আসে? আর পোস্তবাটার কথা ছেড়েই দিলাম। আমরা একটু খ্রীষ্টানদের কাছাকাছি।দ্যাখ না, কোলকাতার আর্মানি গির্জে, সেন্ট পিটার্স, সেন্ট পলসের মত পূববাংলায় কিছু আছে? আর ব্রাহ্মদের যত উপাসনা মন্দির, বালিকা বিদ্যালয় সব কোলকাতায়।রবি ঠাকুর খ্রীষ্টানদের প্রেয়ারেরও অনুবাদ করেছেন। শুনবি? তুমি আমাদের পিতা, তোমায় পিতা বলে যেন জানি, তোমায় নত হয়ে যেন মানি, তুমি কোর না কোর না রোষ। ঃ কিন্তু কাকিমা, রবীন্দ্রনাথ তো বাঙাল জমিদার। পদ্মাপাড়ে নৌকোয় বসে কত ০০০। ওখানে পতিসরে সমবায় ব্যাংক০০০। ঃ ছাড় তো!টিঁকতে পারলেন ওদেশে? সেই শিয়ালদহ থেকে শ্যালদা হয়ে আমাদের রাঢ়বাংলার বোলপুরে এসে থিতু হতে হল। আর পদ্মাপাড়ে ?শোন, যত অশ্লীল গান সব বাঙালদের দেশে বসে লিকেচেন। শুনবি? ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো, আমার বুকের কাপড়খানি। ঃ কাকিমা! ওটা বুকের নয়, মুখের কাপড়খানি। ঃ লেখাপড়া তো কল্লি নে! মুজতবা আলী পড়, প্রথমে বুকের ছিল, পরে আমাদের দেশে এসে বেম্মদের শাসন মেনে মুখের হল। আর আমার মুখ খোলাস নি! সিনথেসিস: অং বং ডং ইতিমধ্যে হৈ হৈ করতে করতে ঘরে ঢুকেছে জনাকয় ওয়াই জেন ছেলেমেয়ে। ওদের মধ্যে রয়েছে মজুমদারকাকুর নাতনি, নন্দীকাকিমার নাতি ও আমার ভাইপো। ঃ কী ব্যাপক বূষ্টি হয়েছে , মাক্কালী! ঃ তবে কোন চাপ নেই, জল নেমে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। ঃ তোরা ভিজিসনি তো? ছিলি কোথায়? ঃ আইনক্সে ভাগ্ মিলখা ভাগ্ দেখতে গেছলাম। সিনেমাটা যা হয়েছে না, ফ্যান্টাবুলাস্! আমার মাথায় টিউবলাইট জ্বলে ওঠে। ঃ একটা কথা বল তো! এই কোলকাতাটা কাদের? ওরা গোলগোল চোখ করে আমার দিকে তাকায়। কাদের আবার? আমাদের। ঃ তোরা কী? বাঙাল না ঘটি? ঃ এত চাপ নিচ্ছ কেন, ওসব কিচ্ছু না; আমরা হলাম বং। এসব অংবংচং আবার কী? সত্যজিত রায়ের ছড়ায় এক ডং এর কথা ছিল যে সবুজচুলো পাপাঙ্গুলের মেয়ের জন্যে কাঁদতে কাঁদতে বঙ্গীবনে সেঁধিয়ে ছিল।এদের কোন রোগে ধরল? ঃ তোরা বোধহয় ফেলুদা সিরিজ ইংরিজিতে পড়িস?রবীন্দ্রসংগীতকে টেগোর্স সং বলিস! ঠিক করে বলত বং এর ইউ এস পি কী? ঃ আমাদের ইউ এস পি হল বিশ্বায়ন। ইংরেজি হল বিশ্বভাষা। তাই বাঙালীর সংক্ষিপ্ত রূপ হল বং। কেন, বং কানেকশন দেখনি? যেমন, গুজরাতিরা গুজ্জু, মালয়ালিরা মাল্লু, সর্দার হল স্যাড্; ব্যস্, এই হল গল্প। এতক্ষণ স্পিকটি নট্ মজুমদারকাকু মুখ খুল্লেন: বিশ্বায়ন ঘন্টা ওই বাজে ঢং ঢং, গুজ্জু নাচে, মাল্লু নাচে, সঙ্গে নাচে বং। নন্দীকাকিমা মুচকি হেসে বল্লেন: আমেন! ৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹

112

7

দীপ

কবিতার কোলাজ_দীপ

ক্লান্তির খোঁজে ------------------- বিকেল ভেঙে পড়লো বাগমারীর জঙ্গলে ডমরুর আর্তনাদ শুনতে পেলাম সাঁওতালী রঙে। পিদিম প্রেমে ব্যাস্ত নারী হেঁটে চললো ভাটিয়ালি সুরে। তোমায় প্রথম দেখলাম গেরুয়ার গাম্ভীর্যে। ভেজা আবছা স্টেশনটা ছুটে চলল নিজ গন্তব্যে। ঝিকঝিক শব্দে ট্রেনকে সঙ্গে নিলে তুমি, আমিও চললাম! চললাম মৃদু স্বরে, ক্লান্তির খোঁজে।। .........

124

7

উদাসী হাওয়া

বাৎসরিক উল্কাপাত ও নিপাত যাক!

ফরসা হয়ে বেলা অনেক বয়েচে, গঙ্গাজল গড়িয়ে নেবুতলা অবদি এসে গ্যাচে, টিম টিম দোকান খুলে বাবুদের কুকুরের হাগাপনা মুকের দিকে তাকিয়ে, ১টা ২টা বিস্কুট বিক্কিরি হয়! ভাবের সাগরে নামি (২) আশি বচ্চরের শাকালিমাসির পিচনে রগুড়ে তারকাটা লাগবে কি লাগবেনা মনে কচ্চে আর মোবাইলে ব্যাটারির রসদ নেই দেকে দুর @# বলেচে কি বলেনি... পস্টো শুনে রাস্তার ওপারের পাতাচাটা ভাব্লে ওকে বলেচে আর খিস্তি করতে বসলে। হেতায় সহরের পাড়ার শেষটুকু অঞ্চলে যেটুকু ভদ্দবাবুদের মনে রবি ঠাকুরের জন্মদিন মনে রাকার কথা --- জমিদার, বুরজোয়া, বেওসায়ি, ইংরাজ তবিলদার, সখি বানানো বাত্তেলাবাজ, রোবিন্দোরবাবু থেকে ড়ৌবিন্দ্রনাঠ ট্যগ্যৌর ভুলে কলকেতে সহরের পবিত্র কর্ম্ম নিমকি জিলিপি যোগে গান-কবিতার শেষ মঞ্চ, (গত ৪-৫ বচ্চরে একই কতা শুনেচে), গতকাল দুপুর থেকে বানানোর চেস্টায় রত, যাতে কোন ক্রিয়ে কর্ম ফাক্ না যায় চিৎকারে পাড়ার সব কুকুরদের জড়ো করে ফেলেচে। এ দিকে আমাদের এই আমুদে বাবুদের আরেক তরফের, যারা রবিঠাকুর কিসের ঠাকুর, বা কি এমন লোক, বা জ্বালালে এট্টু ঘুমাতে দিলে না, বা যত্তসব ধ্যাস্টেমো, বা ওই সুরু হল, বা ওসোব অভি চলে না, বা ওই এক দেড়েল বুড়ো ভেবে রেগে ঘুম থেকে উটে ঝিমমাথায় যে যার পাইখানার দিকে যাচ্চে। আরেক দল, বাবুদের কাজের মাসিরা সক্কালবেলায় রেল লেট করে মঞ্চের বাশে হোচঁট খেয়ে ওই মিনসে বুড়ো আবার এসে গ্যাচে কোরে গজগজ কত্তে (২) কাগোজওলার সাইকেলের পিচোনে (২) যেতে লাগ্ লো। মঞ্চে ঠাকুরকে তুলে আমাদের নতুনবাবু দুই বার বল বল বল সবে গেয়ে উটতেই, রগুড়ে তারকাটা আর পাতাচাটা একসাতে হাততালি আর দুয়ো দিল। ধুপকাঠি আর বেলফুলের গন্ধ ততক্ষণে সহরের এই এলাকায় বোদয় হুজুকে মেজাজ এনে দিয়েছে। দুটো চারটে ডেঁপো বাচ্চা মা'দের আঁচল টেনে মাটের দিকে দেকাচ্চে -- ওকেনে দজ্জাল বিবি বাবুকে ধমকাচ্চে। বাবু ভয়ে পেয়ে হোঁচট খেয়েচেন। সহরের নতুন তেঢ্যাঙা বাড়ির খোপে (২) লম্বু জকি আজ সবাই ক্যাঁতাফোঁড় পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত, একুনে আজ সারাদিন রেডিয়োতে বিজ্ঞাপনের মাঝে রবিঠাকুরের গান গুজে দিতে হবে, বিজ্ঞাপনের মাঝে চিল্লিয়ে শোনাতে হবে রবিঠাকুরের কতা, নাটা ফাজিল জকিকে বুজিয়ে দিচ্চে, কোনও গন্দি বাত আজ বলা চলবে না বলে শাসিয়েও দিলে। চ্যানেলে (২) রবিঠাকুরের গান বাজতে শুরু করলে জকিরা ঝিম মেরে ফেসবুকে নিজেদের ছবি বদল করতে ব্যাস্ত হল। ন'পাড়ায় বৈশাখি সক্কালবেলায় শরত তোমার অরুণ আলো লাগিয়ে আমোদের সহর, ছ'পাড়ায় আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার বাজিয়ে প্রমোদের সহরে বাৎসরিক উল্কাপাতের সুত্রপাত হল। যে দল বাবুদের আজও আপিস আচে ছাতারমাতা, যে দলের কানে গান গুজে বারে বারে চ্যানেল বদলে ব্যাস্ত হয়ে কোতাও অন্য গান শুনতে না পেয়ে চটে গেলে, কন্ডাকটরের সাতে ঝকড়া কত্তে (২) ক্লান্ত হল। যে দল বাবুদের ওলায়, উবারে, বন্দ কর, বন্দ কর বলে মোবাইল টিপতে লাগলে, যে বাবুদের আমারে না যেন করি প্রচার না কল্লে বিক্কিরি হবে না তারা বাতকর্ম্ম কত্তে (২) যাত্রা শুরু করলে। এদিকের মঞ্চের উপর ঠাকুরও ধাক্কাধাক্কিতে কান্নিক মেরে গ্যাচে আর বাঁশেরগাঁট ঠিক ওনার মুকের ওপর এমন ভাব মেরে পড়েছে, কাচের মাঝে নম্বা চিড় ধরিয়ে দিল, গ্যালো, গ্যালো করে ভট্চাজ্জি চুড়িদারের নাড়ায় মঞ্চের বাশ আটকে সটান পড়ল। রবিঠাকুরের জন্মদিন কলকেতেয় হবে আর দালাল থাকবে না ভেবে মনে গন্ডগোল না বাধে, সেইজন্ন বাবুদের কারবারে এই সক্কালবেলায় উপস্থিত হয়েচেন। মাইক, সাউন্ড, লাইট, রাংতা, তবলা, হারমনি, ঘোষক, মেয়েদের সারি, বিবিদের গোরের মালা, বাবুদের মাল, নাচের তাল নিয়ে এয়েচেন। প্রভাত ফেরি শুরু করিয়ে দিয়ে বসবেন। সৎকর্ম্মে বাঙ্গালিদের চোক্ ফুটে উঠবে আজ।

111

5

Aloka

গণ্ডীর বাইরে

পূর্বাচলের পানে.... ঘুম ভেঙে গেল..আলসেমি ঝেড়ে উঠে পড়ি | বের হই| গন্তব্য পূর্ব দিক| এসে হাজির হই চৌমাথায়| রাস্তা পেরোব.|কিছুদিন আগে তৈরী হওয়া আণ্ডারপাস এখনো খোলে নি ভীম বেগে ট্রাক ‚ লরি চলছে.ফাঁক বুঝে রাস্তা পার হই | আগে রাস্তার এ পাশটায় ছিল মস্ত বড় বড় বাগান | গরমের দিনে ঝুড়ি ভর্তি আম ‚সারা বছরের তেঁতুল ‚ শীতে আচারের কুল সব এদিক থেকেই যেত আমাদের বাড়ীতে |যথা নিয়মে বেশির ভাগ বাগান ই উধাও | বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছি....অবশেষে পাওয়া গেল একটা বাগানের ভগ্নাংশ..পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটায় ঢুকে পড়ি.. এ.দিকটায় আগে আসিনি কোন দিন |ডান দিক বাঁ দিক দু দিকেই রয়েছে পাঁচিল ঘেরা বাগান পুরোনো দিনের সব গাছ ‚ কিছু কিছু গাছের ডালপালা পাঁচিল ছাড়িয়ে রাস্তায় চলে এসেছে ফলে রাস্তাটা বেশ ছায়াছন্ন |চলেছি পুব মুখো | বহুকাল অশ্রুত পাখীর কিচিরমিচির শুনতে পাচ্ছি ‚ হঠাৎ ই গাছ পালার ফাঁক দিয়ে দেখি " পূর্ব গগন ভালে সূর্য ওঠে প্রাত্ঃকালে" ঠিক মুখোমুখি সূর্যটা. .. একদম জবাকুসুম সঙ্কাশ্ং .....মনে করতে চেস্টা করি শেষ কবে এই দৃশ্য দেখেছি.. রাস্তাটা ডান দিকে মোড় ঘুরেছে...কোনায় দেখি অমনি আর একটা উঁচু পাঁচিল ঘেরা বাগান দোতলা‚ তিনতলা কতগুলো বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে | কাছে এসে দেখি ফলকে লেখা Sisters of Charity /Oasis Capitanio,OasisGerosa একদম নতুন না হলেও খুব পুরোনো বলেও ত মনে হচ্ছে না..কি জানি এঁরা কারা ‚ কি এঁদের কাজ জানতামই না এখানে এমন একটা কিছু আছে .... এগো ই.....জনবিরল রাস্তায় মাঝে মাঝে দু এক্জন সাইকেল বাহিত লোক বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছে... বেশ লাগছে .. একটা পাড়ার শুরু..ডানদিকে দেখছি দোতলা একটা বাড়ী. ফলকে লেখা. এলেম বক্স ভবন...আশে পাশে ছোট ছোট কতগুলো বাড়ী‚ উঠোনে মুরগী ঘুরে বেড়াচ্ছে....ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ জন নিত্য নৈমিত্তিক কাজে লেগে পড়েছে..কি এদের জীবিকা কি জানি.. এ গিয়ে চলি....রাস্তাটা সরু হলেও পাকা | দু পাশে বাঁশ ঝাড়..ইতঃস্তত বেশ কিছু প্রাচীন বৃক্ষ যাকে বলে..একটা আম গাছ কে ই শুধু চিনতে পারলাম.আম হয় বলে তো মনে হল না....তা না হোক মনে পড়িয়ে দিল আমাদের দেশের কথা...ঠিক এই রকম ছিল |বাঃ দিব্ব্যি একটা পুকুর ও রয়েছে দেখছি..পরিষ্কার ই বলতে হবে..দু পাশ থেকে বড় বড় গাছ্পালা ঝুঁকে ..পড়েছে..অদ্ভুত লাগল.একটা জিনিস দেখে...পুকুরের একটা অংশে একটা জাল দেখছি জলের লেভেল এর বেশ কিছুটা ওপর দিয়ে এ পাড় থেকে ও পাড় অবধি টানা রয়েছে.|ত্রিসীমানায় কাউকে দেখছি না যে জিজ্ঞাসা করব কারণ টা কি..যাক গে .অনেক টা ভিতরে চলে এসেছি.|এবার ফিরি 'যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল‚ সে পথ দিয়ে ফিরল না কো তারা'..আমিও আসা-পথে ফিরব না দেখি কোন না কোন রাস্তা নিশ্চয় ই আছে..এগো ই..|দু চারটে ঘর বাড়ী দেখা যাচ্ছে.| বাঃ সামনে দেখি একটা পাকা মণ্ডপ....লেখা সেণ্ট্রাল গভ্ঃ এমপ্ল্য়ীস কো অপারেটিভ হাউসিং এস্টেট.. ছোট ছোট প্লটে সিঙ্গল ইউনিট বাড়ী. পরিকল্পিত ভাবে তৈরী কাজেই বেশ ছিম ছাম পরিষ্কার পরিচ্ছ্ন্ন একটা পাড়া...বড় রাস্তা থেকে অনেকটাই ভেতরে এরকম একটা হাউসিং আছে ....অভাবিত ব্যাপার.বিশেষ করে এই দিকটা আগে অতটা উন্নত ছিল না |খানিকটা এগোতেই দেখি অনেকটা জায়্গা সাদা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা...এতটা জায়্গা...কি হতে পারে...ভাবতে ভাবতে দেখি একটা গেট..আধখোলা ..|ঢুকব কি ঢুকব না করতে করতে ঢুকেইপড়ি..ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল...বি--রা----ট এলাকা জুড়ে সৎ্সন্গ ভবন তৈরী হচ্ছে‚ এটা তার পেছন দিক | কতগুলো আমবাগান ধ্বংস হয়েছে জানি না তবে বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে | পুরো এলাকাটা পরিষ্কার..কোথাও কোথাও ছোট ছোট মাচা করে কিছু লাগানো হয়েছে...কোথাও টমেটো ‚ ফুল কপি‚ বাঁধা কপির ও চাষ হয়েছে | ধব ধবে সাদা কতগুলো বিল্ডিং ....গেষ্ট হাউস ‚ মন্দির‚ থাকার জায়্গা ইত্যাদি তৈরী হয়েছে আরো কাজ চলছে | দু একটা আম গাছ অবশিষ্ট আছে....কোকিল রা বোধ হয় সেখানে আশ্রয় নিয়েছে..ডাক তো শুনতে পাচ্ছি....সব মিলিয়ে বেশ একটা ভালো লাগা তৈরী হল | সামনের গেট পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে উঠি | একটু এগিয়েই চৌমাথায় পৌঁছ ই| বৃত্ত সম্পূর্ণ হল | বেশ সুন্দর একটা ভোর কাটল রাস্তা পার হবার অপেক্ষা.... ভালো লাগার রেশটুকু নিয়ে এবার মন চল নিজ নিকেতনে..

183

13

উদাসী হাওয়া

কানু কহে রাই...

বড়ই বিড়ম্বনায় আছি। ক্ষমাপ্রার্থনা করে বলি এখনও সড়গড় হইনি এইস্থানে; তার উপর আমার বাচাল মুঠোফোনটি যখনই সুইচ্ এডিট্যরে আসে তার যববন্ধ হয়। সরাসরি কাউকে, [দীপংকরদা] লিখতে পারছিনা। আপনারা বহুদিনের বাসিন্দা, আশাকরি এই এক হপ্তা বয়সীকে, (অর্বাচীনের আবার ফেসবুক ইত্যাদিস্থানীয় কোনও অভিজ্ঞান নেই), বুঝবেন। অধম জিন-আঠালো, চ্যাটচ্যাটে, চর্যাপদী, চ্চু চ্চু কুত্তা-প্রেরক, সর্বগুণাধারী বাঙালী। বাকিটা ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে অধমের একমাত্র গুণ "আঁকা-লেখা-লুকিয়ে রাখা" মনের কথা, চৈত্রদিনের ঝরাপাতা। আপনাদের লেখা পড়া শুরু করেই আমার দাদার উপদেশে এইদেশে আসা। মনুষ্যত্ব লয়ে ভাসা ভাসা ভাষার কিছু চিন্তা, 'আপন হতে বাহির হয়ে...' ট্যু 'imagine' এ টুকি মারা। আর সাথে আমার শ্রী চৈতন্য, নিত্যানন্দ, গৌর ভক্তবৃন্দ, আমার শ্রী তুলসী, ভানু, জহর, চিন্ময় নবদ্বীপ, ওই দেশের হুলো - জ্যাঁক তাতি, ইত্যাদি। উমা বসু, সাহানা দেবী, কনক বিশ্বাস শুনে আজও গায়ে লাগে কাঁটা, চক্ষে আসে জল, বাকিরা বাচাল, বল সখী বল! (এইমাত্র কোশিকী বনাম কমলা ঝরিয়া)।

129

3