দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

শেষের কবিতা ... একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা

761

77

ভোঁদড়

আফ্রিকান সাফারি

আজ রাতে আমাদের থাকার কথা মারাম্বোই ক্যাম্পে| আমার যে বোনটি গিন্নিকে নাচিয়েছিল সে বিশেষ করে বলে দিয়েছিল এই জায়গাটার কথা| তারাঙ্গিরির ভেতরেও থাকার জায়গা আছে| কিন্তু মারাম্বোই নাকি সেগুলোর চেয়ে ভাল| আমার বোনটি জীবনের অনেকগুলো বছর আফ্রিকায় কাটিয়েছে| জন্তু জানোয়ার দেখা তার একটা নেশা| সেরেঙ্গেটিতে সে একাই ঘুরেছে অন্তত্ঃ বার পাঁচেক‚ বিভিন্ন ঋতুতে| তাই তার কথাটা একেবারে ফেলে দেবার মত নয়| সুতরাং স্যামির সাথে যখন আলোচনা হচ্ছিল তখন আমরাও স্যামিকে এখানে থাকার কথা বলে দিয়েছিলাম| হাইওয়ে ধরে যেতে যেতে স্যামি এক জায়গায় মেঠো রাস্তায় ডাইনা মুড়ল| একটা কাঠের বোর্ডে লেখা আছে মারাম্বোই টেন্টেড ক্যাম্প| মারাম্বোই হল ঐ অঞ্চলের একরকম পাম গাছের নাম| ক্যাম্পটা যেখানে‚ তার আশেপাশে ঐ গাছটা আছে| যেতে যেতে স্যামি বোঝাচ্ছিল‚ তারাঙ্গিরি আর লেক ম্যানিয়ারা মিলিয়ে একটা অ্যানিম্যাল মাইগ্রেশন সিস্টেম| রিফট ভ্যালির একদিকের পাহাড়‚ যেখানে তারাঙ্গিরি নদী পাহাড় ছেড়ে উপত্যকায় নেমেছে‚ সেখানে হল তারাঙ্গিরি ন্যাশনাল পার্ক| আর ভ্যালির প্রায় অন্যদিকের পাহাড়ের কাছে লেক ম্যানিয়ারা‚ যেখানে বানানো হয়েছে ম্যানিয়ারা ন্যাশনাল পার্ক| তারাঙ্গিরি বর্ষাকালে সবুজ‚ অথচ জল জমে না| তাই জন্তুরা বর্ষায় এবং তার পরেও যতদিন জল পাওয়া যায়‚ ঘাস পাওয়া যায়‚ ততদিন তারাঙ্গিরিতে থাকে| কিন্তু যত শীত এগোয়‚ তারাঙ্গিরিতে ঐ নদীটুকু ছাড়া জল থাকে না‚ ঘাসও শুকিয়ে আসে| বাওবাব গাছের ছাল খেয়ে জন্তুদের আর চলে না| অ্যাকেসিয়ার শুধু কাঁটাই সার| তখন অনেক জন্তু‚ বিশেষ করে জেব্রা‚ জিরাফ‚ কেপ বাফেলো আর ওয়াইল্ড বিস্টরা তারাঙ্গিরি ছেড়ে লেক ম্যানিয়ারার দিকে চলে যায়| সিংহ‚ চিতা‚ লেপার্ড আর হায়নারাও খাবারের পেছনে পেছনে যায়| একমাত্র হাতিরা অনেকেই থেকে যায়‚ নদীর জল আর বাওবাব গাছের ছাল সম্বল করে| মারাম্বোই ক্যাম্পটি হল এই লোকাল মাইগ্রেশন পাথের ওপরে| তাই ক্যাম্পের আশেপাশে অনেক জন্তু থাকে‚ রাতে ঘরে বসে দেখা যায়| ক্যাম্পের এলাকায় ঢোকার আগে থেকেই দুদিকে অজস্র জেব্রার পাল| দু-চারটে জিরাফ| হাইওয়ে থেকে বেশ কয়েক মাইল ভেতরে ক্যাম্প| ক্যাম্প মানে বড়বড় তাঁবু| মাঝখানে কয়েকটা খুব বড় তাঁবু মিলে কিচেন‚ অফিস আর ডাইনিং রুম| ডাইনিং রুম পছন্দ না হলে বাইরে বসে খাওয়া যায়| বড় ডেক আছে চেয়ার টেবিল পাতা‚ মাথায় ছাউনি| তাঁবুগুলো দেখি সবই মাটির থেকে উঁচুতে| কাঠের ফুট চারেক খাম্বা‚ তার ওপরে প্ল্যাটফর্ম| সেই প্ল্যাটফর্মের ওপর তাঁবু| এরকম ব্যাবস্থা আগে দেখেছি কাম্বোডিয়াতে| সেখানে বন্যার হাত থেকে বাঁচতে এরকম উঁচু করে বাড়ী বানায়| সুতরাং আমিও ভাবলাম এখানেও সেই কান্ড| স্যামি জানাল সেরকম কিছু নয়| মারাম্বোই যেহেতু জন্তুদের মাইগ্রেশন পাথের ওপরে‚ তাই আইন অনুযায়ী মাটির থেকে ওপরে বাড়ী বানাতে হয়| তাতে জন্তুদের চলাফেরায় বাধা হয় না| তবে কিনা‚ খুব বৃষ্টির সময় জন্তুরা আবার ঐ তাঁবুর নীচে আশ্রয় নেয়| স্যামি নাকি একবার ঐ রকম তাঁবুর নীচে থাকা একটি সিংহের মুখোমুখি পড়ে গিয়েছিল| ক্যাম্প অফিসের সামনে গাড়ী পার্ক করতে কয়েকজন কর্মচারী এসে আমাদের মালপত্র নামাল| তারপর আমাদের হাতমুখ মোছার জন্য বরফজলে ভেজানো তোয়ালে‚ আর দুরকম সরবত দিল| একরকম সরবত জবা ফুলের পাপড়ি থেকে বানানো‚ অন্যটি ভুলে গেছি| সারাদিন ধুলো খাবার পর এটা যে কি ভাল লাগল| তারপর খাতায় নামধাম লিখতে হল‚ পাসপোর্ট দেখাতে হল ইত্যাদি| পয়সা স্যামি আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিল‚ তাই সেটা আর করতে হল না| এবারে একটি মিষ্টিমত মেয়ে ক্যাম্পের নিয়ম বোঝাতে বসল| আমাদের তাঁবু অফিস তাঁবু থেকে খানিকটা দুরে| তাঁবুতে ফোন আছে| স্যামি ফোড়ন কাটল‚ মাথার কাছে এর পরে পাবে না‚ এই মারাম্বোইতেই শেষবার| এমনি তাঁবুর আশেপাসে দিনের বেলা কোন অসুবিধা নেই| কিন্তু সন্ধের পর তাঁবু থেকে একা বেরোনো নিষেধ| কোন কারনে বেরোতে হলে অফিসে ফোন করতে হবে| অফিস থেকে বর্শাধারী মাসাই গার্ড আলো হাতে করে এসে নিয়ে যাবে| ডিনার শুরু হবে সন্ধে সাতটায়| তখন অন্ধকার হয়ে যাবে| তাই ডাইনিং রুমে আসার জন্যও গার্ড নিতে হবে| খেয়ে ফেরার সময়ও তাই| ঘরে যাবার জন্য উঠতে দেখি একজন মাসাই ওদের লাল-কালো পোষাকে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে‚ তার নাম আলি| পরে জেনেছিলাম এরকম আরো ডজনখানেক গার্ড এই ক্যাম্পে কাজ করে| ক্যাম্পের দুজন কর্মী আমাদের মালপত্র নিয়ে আমাদের সঙ্গে তাঁবুতে এল| তাবুটি বেশ বড়| পনেরো ফুট বাই পনেরো ফুট তো হবেই| উঁচুও ফুট দশেক| অর্থাৎ হোটেলের ঘরের চেয়ে কম নয় কোন ভাবেই| ঘরের একপাশে বাথরুম‚ তাতে গরম জল ঠান্ডা জলের ব্যাবস্থা| সোলার পাওয়ারে ঘরে বিদ্যুতবাতি‚ দেখতে আবার হারিকেনের মত| একটি কিং সাইজ বিছানা‚ তাতে মশারি| হেডস্ট্যান্ডে ফোন‚ জলের জাগ| সঙ্গীরা জানাল‚ আরো খাবার জল দরকার হলে ফোন করতে| এই বলে তারা বিদায় নিল| আমরা একটু গুছিয়ে নিয়ে স্নানে ঢুকলাম| তাঁবুর একদিকে বিরাট কাঁচের দরজা| দরজা সরালে বারান্দা‚ চেয়ার পাতা| আমরা দুটি চেয়ার টেনে বারান্দায় বসলাম| দূরে অস্তসূর্য্যের আলোয় লেক ম্যানিয়ারার জল চিকচিক করছে| মাঠে জেব্রার পাল চড়ে বেড়াচ্ছে| আশেপাশে কয়েকটা মারাম্বোই পামের গাছ| আঃ‚ কি আরাম|

776

148

Dalia2017

বৃদ্ধাশ্রম ( প্রথম পর্ব)

""বৃদ্ধাশ্রম ( প্রথম পর্ব) মানুষের জীবনে চারটি পর্যায়, শৈশব, কৈশর, যৌবন ও বার্ধক্য। আমি প্রথম তিনটে অধ্যায় পার হয়ে পৌঁচেছি বার্ধক্যে। তার ওপর তিনমাস আগে হারিয়েছি স্বামীকে, যিনি ছিলেন আমার সুখ দুঃখের সাথী, সকল কাজের সঙ্গী, সকল কাজের উপদেষ্টা। উনি মারা যাবার পরে আমি ছিলুম লোহার মত শক্ত, মেয়েরা ভেবেছিল মা খুব ভেঙ্গে পরবে। কিন্তু না, আমি ভেঙ্গে পরিনি, চোখের জল তখন শুখিয়ে গেছিল, একটুও কান্না আসতনা , মনে হোত," কাঁদব কেন? চলে গেছেন নিজের জায়গায়, আনন্দে থাকুন।" সেই ১৬ বছর বয়স থেকে মানুষটা একা, বাড়ি ছাড়া, তারপর ১৯ বছর বয়সে বিদেশে এসে অনেক যুদ্ধ করে নিজের পায়ে দাঁড়ান। এর থেকে রেহাই পেয়েছেন।" ইনি ছিলেন Self made man. কোনদিন কারুর সাহায্য নেননি, নিজেই নিজেকে তৈ্রী করেছেন। মানুষ বোধহয় মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পান, তাই হাসপাতালে আমার হাতদুটো ধরে বলেছিলেন," শক্ত থেকো, তুমি পারবে।" ভাবলুম আমাকে একা রেখে চলে গেলেন, কোনদিকে আর ফিরে তাকালেননা। বিদায় দিয়ে এলুম, তুলে দিলুম চুল্লিতে। একফোঁটা ছিলনা আমার চোখে জল। কিন্তু আজ তিনমাসের ওপর উনি নেই, আজ যেন আমার বুক ফেটে যায়, চোখ ফেটে জল আসে, বড় একা লাগে। যেতে শুরু করলুম আবার বৃদ্ধাশ্রমে, ডুবিয়ে দিলুম আবার নিজেকে নানা কাজকর্মে। মানুষের সঙ্গ তো আমি চিরকাল ই খুব পছন্দ করি, তাই সারাদিনে লোকজনের অভাব হয়না। কিন্তু রাত্তিরটা যেন গিলে খেতে আসে। আজ বড় একা লাগছে, ভাল রোদ উঠেছে, কিন্তু একটুও বেরোতে ইচ্ছে করছেনা। এইরকম ই তো হয় মাঝে মাঝে। তাই আজ বসে গেলুম বৃদ্ধাবস্থার ওপরে কিছু লিখতে। মনটাকে একটু অন্যমনস্ক করতে। মেয়েরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পরে নিজেকে বড় একা লাগত সারাদিন, কর্তা যেতেন কাজে। কি করি!একজনের পরামর্শে লেগে গেলুম বৃদ্ধাশ্রমে ভল্যান্টারি কাজ করতে। কিছুই জানিনা, কি করে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলব, তাঁদের অশ্রু মোছাব, কিছুই তো জানিনা। আমাদের লিডার, কলিগরা সব আমাকে শিখিয়ে দিতে লাগলেন। আস্তে আস্তে সব শিখে গেলুম, এবং সকলের ই খুব প্রিয় হয়ে উঠলুম। বৃদ্ধা বৃদ্ধাদের ভালবাসাও পেলুম অনেক। তাঁদের সুখদুঃখের কথা শুনে কষ্ট পেতুম, কিন্তু তাও আস্তে আস্তে সহে গেল। প্রায় ১৪ বছর এই বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করেছি। এখন আমার চুলেও পাক ধরেছে, আর ওসব কাজ করতে পারিনা। আমি নিজেই যাই বৃদ্ধাশ্রমে, সপ্তাহের দুটো দিন এই বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সঙ্গে দিব্যি হেসে খেলে কেটে যায়। যখন নিজের দুঃখকে ওঁদের সঙ্গে তুলনা করি, ভাবি, মানুষ নিজের দুঃখকেই বড় করে দেখে, কিন্তু আমার চেয়েও আরো দুঃখ যে অন্য মানুষের আছে, সেটা আমরা ভেবে দেখিনা। এই তো সেদিন,এক বৃদ্ধা চোখে জল নিয়ে বললেন, "জান, আমার ৭৫ বছরের ছেলে ৩ দিন আগে মারা গেছে, ক্যান্সার হয়েছিল, কাল তার ক্রিমেসান।" অবাক বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললুম," তুমি এখানে এসেছ আজ।?" বললেন, " আমার জুলাইয়ে ৯৭ বছর বয়স হবে, মেয়েকেও তার ৬৭ বছর বয়সে হারিয়েছি , জানিনা যীশাস আর কত কষ্ট দেবেন, তাই সব ভুলে থাকতে এখানে তোমাদের কাছে আসি।" এসবের তো কোন স্বান্তনা হয়না? কি বলব? ভদ্রমহিলা একা থাকেন, রোজ নার্স আসেন তাঁকে দেখতে, অসুধ খাওয়াতে। এইরকম হাজারো মানুষ দেখেছি, এখনো দেখছি। তখন শক্ত করি নিজেকে, মনে হয় মানুষ তো আসে একা, যায় ও একা, আমারো তাই হবে। ভয় কি? আজকাল আর সেরকম লিখতেও পারিনা, বুঝি শরীরের শক্তি আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে, আর সেরকম জোড় নেই। মানুষ প্রথম তিনটে অধ্যায় পেরিয়ে আসতে পারে, কিন্তু নিজেকে দিয়ে বুঝি, এই বৃদ্ধাবস্থা টা পার হওয়া বড় মুস্কিলের । সব কাজ শেষ হয়ে গেছে, মেয়েরা নিজেদের ব্যবস্থা করে নিয়েছে, ওদের নিয়ে ভাবনার কোন কারণ নেই, তবুও ভাবনা তো মাঝে মাঝে আসেই। আমি তো আসলে এখন ঝারা হাত পা। তবু বুড়ো বয়সের এই একাকিত্ব গ্রাস করে আমাকে, আর যখন এইসব বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের তাকিয়ে দেখি, মনে হয় এঁরাও তো একা, আমিও পারব। এঁদের মধ্যে আবার কিছু বৃদ্ধ বৃদ্ধা আছেন, নিজের মনেই কথা বলে চলেন, এটাই বোধহয় তাঁদের একাকিত্ব ঘোচানোর উপায়। এঁরা কিন্তু পাগল নন, এঁদের পাগল বলা এখানে আইন বিরুদ্ধ। এঁদের সম্বন্ধে পরের পর্বে লিখব। ( চলবে)>

50

3

শিবাংশু

বঙ্গ আমার

দুচার দিন আগের কথা। দুপুরবেলা, নিউ দিল্লি ইশটেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম। অরবিন্দ মার্গে জ্যামের ঠিক নেই তাই ছত্তরপুর থেকে সময়ে পৌঁছোবার তাড়ায় বেশ খানিকটা আগেই চলে আসা। তাপমাত্রা দেখাচ্ছে চুয়াল্লিশ। কিন্তু হাওয়া বইছে টাটার পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেস ছোঁয়া। বাতানুকূল অপেক্ষাশালার দোরগোড়ায় এক ভদ্রলোক বিপন্নমুখে খাতা নিয়ে বসে আছেন। পি এন আর নম্বর দিতে গেলে তিনি ম্লান হেসে বলেন, দরকার নেই। -কেন? -ভিতরে ঢুকতেই পারবেন না... উঁকি মেরে দেখি ভিতরে ১৯৪৭শের সেপ্টেম্বর মাসে শিয়ালদহ প্ল্যাটফর্ম। এতোজন মানুষ, তাদের লটবহর, ঘামক্লান্তিদীর্ঘশ্বাস কী করে ধরে রেখেছে ঐ ঘরটা? বিস্ময়। শ্বাসরোধী ভিড় আর অবর্ণনীয় আর্দ্র তাপে ফুটছে চারদেওয়াল। ঢুকিনা। প্ল্যাটফর্মেও কোথাও বসা দূরস্থান, দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। মেঝেতে কাগজ পেতে সপরিবার যাত্রীরা কুকুরকুণ্ডলী হয়ে পুড়ে যাচ্ছেন রোহিলাখণ্ডের তপ্ত বাতাসে। এদিকওদিক চোখ চালিয়ে দেখি একটি দেওয়াল সংলগ্ন সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটি পরিবার বসে আছেন। স্বামীস্ত্রী আর দুটি শিশু। মাঝখানে আরেকটি বসার জায়গা আছে। সেখানে কয়েকটি খালি জলের বোতল ফেলে রাখা আছে। ব্রাহ্মণী বলেন তিনি বোতলগুলি সরিয়ে সেখানেই একটু বসছেন। আমি গিয়ে কতো নম্বরে আমাদের গাড়ি আসবে ইত্যাদি, যেন দেখে আসি। আমি প্যাঁটরাগুলি সেখানে রেখে খোঁজ করতে বেরো'ই। মিনিট পনেরো পরে গাড়ির খোঁজখবর নিয়ে অকুস্থলে এসে দেখি সেই পরিবারের কর্তাটি আমার ব্রাহ্মণীর উপর প্রচণ্ড চেঁচামিচি করছেন এবং ঐ খালি জলের বোতল গুলো সরিয়ে বসতে চাওয়ায় তাঁকে প্রায় মারতে যান আর কী? তাঁর বক্তব্য হচ্ছে ঐ বোতলগুলো নিয়ে তাঁর 'বাচ্চারা খেলছে'। তাই তিনি জায়গা থাকা সত্ত্বেও কাউকে বসতে দেবেননা। জাতবিহারি হিসেবে এসব ছিঁচকে দাদাগিরি'র ওষুধ আমি জানি। কিন্তু সেই ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছিলেন বাংলাতে। হ্যাঁ, মোদের গরব, মোদের আশা। চারদিকে বাংলা শুনতে পাবো বলেই তো সারা দেশ ছেড়ে এই মূহুর্তে আমার বঙ্গদেশে থাকতে আসা। তখন কিন্তু সেই ভাষাই আমাকে রীতিমতো বিমর্ষ করে ফেললো। তবে বিশেষ অবাক হলুম না। সত্যি কথা বলতে কি, সারাদেশে অবিরত ঘুরে বেড়াবার অভিজ্ঞতা আমায় শিখিয়েছে ভালো করে বিচার না করে তথাকথিত 'বাঙালি'দের সঙ্গে তৎকাল বাংলায় কথা বলাটা অনেক সময়েই বিড়ম্বনা ডেকে আনে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আমার ব্রাহ্মণী তাঁকে বাংলাতেই বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন এবং তিনি ততোধিক উত্তপ্তভাবে তাঁকে প্রায় শারীরিকভাবে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন আমাকেও আসরে নামতে হলো। বাংলাতেই। তাঁর বক্তব্য হলো তিনি গত চারঘন্টা ধরে ঐ বেঞ্চিটিতে বসে আছেন। তাই তিনি আর কাউকে কিছুতেই বসতে দেবেননা। এই বলে নিজে অকারণ সম্প্রসারিত হয়ে যথাসম্ভব জায়গা অধিকারের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এসব ক্ষেত্রে আমরা মুখের থেকে হাতের ব্যবহারে অধিক বিশ্বাসী। নির্বাচিত ভোজপুরি খিস্তিসহ চতুর্দশ পুরুষের ঘুমভাঙানো যেসব ক্রিয়াকলাপে আমরা অভ্যস্ত, সেই মুষ্টিযোগ তো কদাপি কোনও 'বাঙালি'র প্রতি প্রয়োগ করিনি। জানিওনা কীভাবে করবো? ব্রাহ্মণী আমার সেই রূপ দেখেছেন অনেক। চোখের ইশারায় অনুরোধ করলেন রিয়্যাক্ট না করতে। সামলে নিলুম। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাঁদের সামনে লোকটিকে সমুচিত শিক্ষা দেবার ইচ্ছে বলপূর্বক সম্বরন করতে হলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের বইটিতেই মনোনিবেশ করলুম। আধঘন্টাটাক পরে তাঁদের গাড়ির সময় হলো। আমাদের প্রতি অগ্নিদৃষ্টি হানতে হানতে বিদায় হলেন তাঁরা। ঐ চত্বরে যতো বসার জায়গা ছিলো, সবগুলিতেই অগণিত মানুষ আসছেন, বসছেন, উঠে যাচ্ছেন। কোনও রকম গা'জোয়ারি, জবরদস্তির দৃশ্য নেই। সারাদেশের লোক রয়েছেন সেখানে। পঞ্জাবি, বিহারি, রাজস্থানি। তথাকথিত গোবলয়ের 'অসংস্কৃত', 'অমার্জিত' লোকজন সব। কিন্তু ন্যূনতম ভদ্রতার ব্যাঘাত নেই কোথাও। 'বাঙালি'য়ানার এই রূপটি প্রবাসী হিসেবে আমাদের খুব অচেনা নয়। এরকম একটি অবাঞ্ছিত, অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা আমার ব্রাহ্মণীকে বেশ অপ্রতিভ করেছিলো। আমাকে বললেন, -তুমি ঠিকই বলো! এই ভুল আর করবো না। -মানে? -বাঙালি দেখলেই আগ বাড়িয়ে বাংলা বলা....

68

5

মানব

প্যারোডি

ব্যাজার মুখ করে কত কাজ করিয়াছি, দুঃখের সাথে মাথার উপর থেকে ঘাম শুধু ঝরে পড়ে পায়ের উপরে পাত্তা দিইনা আমি, নিজেরেই কষিয়াছি সজোর সপাটে স্বামী থেকে আসামী, সই ও তো করিয়াছি ডিভোর্স পেপারে হয়ে গেছি নির্বোধ এক, ওনারা যে মজাই লোটেন বুঝতে পারিনি তাই ছুটে রোজ যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন সেখানেই গেলে ভাবি খুঁজে পাব পথের দিশা যাহা বলে শিরোধার্য, যেমতি বাপের চাকর পুরনো মনিবের হোক কেন যতই দুর্দশা পালাতে না পারে তবু বাবুদের করে দিয়ে পর তেমনি দেখি সেথা বারে বারে, বর্বরতা, ভাবি "বাবুরা তো এম'নি চলেন" পরদিন সব ভুলে তাই চলে সেই যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন। দিনশেষে সন্ধ্যা আসে ঘটেনাকো অঘটন কেন যে; ওনাদের মনোভাবে পড়েনাকো খিল রাত হয় বেড়ে চলে ঘ্যাঁটঘ্যেঁটে শরীরের ওজন খোলা চোখ হয়ে পড়ে বড়ই কাহিল সবাই ঘুমাতে যায়, আমাকেও যেতে হবে ছেড়ে, এই খাতা পেন শুধু পড়ে রবে, একা এই ভবে, বিধাতার হাঁদারাম লেন।

344

10

মনোজ ভট্টাচার্য

চিনা গল্পেরা !

এক পেয়ালায় হাজার দিন ! তুং সান শহরে তি শী নামে এক শুঁড়ি ( মদ্য প্রস্তুত কারক ) নানা ধরনের মদ তৈরী করতে পারত ! তার মধ্যে থাকত নানারকম আয়ুর্বেদ মিশ্রিত এক ধরনের মদ - যেটা কিনা এক পেয়ালা খেলে এক হাজার দিন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে ! ওই অঞ্চলেই আরেকপ্রান্তে শুয়ান শী নামে এক পাঁড় মদ্যপ থাকত l সে তিএর তৈরী সেই বিশেষ মদ পান করার জন্যে দোকানে গেল l এক পেয়ালা চাইল পান করতে l ' - এই মদ তো এখনো জ্বাল দেওয়া হয় নি ! ' - দোকানদার তি বলল : ' এই অবস্থায় একটুও তোমায় দেওয়া উচিত হবে না !' ' – আরে - যা হয়েছে তারই অন্তত এক পেয়ালা দাও' - লিউ কাতর ভাবে অনুরোধ করলো l লিউএর ঐরকম বায়নায় - তি নিরুপায় হয়ে এক পেয়ালা সেই বিশেষ মদ দিল l ' - আহ ! দারুন হয়েছে ! আর একটু দাও !' ' - এখন দয়া করে কেটে পড়ো - বাড়ি যাও - আবার কোনো একদিন এস ' - তি খুব ধমক দিয়ে তাকে বারণ করলো l ' - যে এক পেয়ালা তুমি খেয়েছ - তারই জেরে এক হাজার দিন তুমি বুঁদ হয়ে থাকবে ' ! ধমক খেয়ে লিউ দোকান ছেড়ে চলে গেল l ও'র মুখের রং ইতিমধ্যেই বেশ ফ্যাকাশে মেরে গেছে l বেসামাল পায়ে টলতে টলতে - বাড়িতে গিয়েই লিউ প্রচন্ড মাদকতায় - মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়ল l ঘুম তো ঘুম ! - কদিন পরেও যখন ওর ঘুম ভাঙল না - পরিবারের লোকেরা ওকে মদ খেয়ে মরে গেছে ভেবে খুব কান্নাকাটি করলো ও যথা নিয়মে সমাধিস্ত করলো l আড়াই বছর পরে, দোকানদার তি'র মনে পড়ল লিউর কথা : - ' এবার তো লিউর জেগে ওঠার সময় হলো ! যাই, একবার ওর বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসি ! ' খোজ করে করে লিউএর বাড়ি এসে পৌছালো তি l -' লিউ কি বাড়ি আছে ?' লিউর বাড়ির লোকেরা খুব অবাক হয়ে গেল তি এর কথা শুনে l ‘ - লিউ তো অনেক দিন হলো মারা গেছে ! ওর অন্তেস্টিও হয়ে গেছে '! শুনে তি'র তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া ; ও বলে উঠলো -' আরে না না ! ও মরবে কি ! আমি যে মদ ওকে করে খাইয়েছি, সেটা খুবই কড়া - সেই এক পেয়ালার মৌতাতে ওর এক হাজার দিন ধরে ঘুমোবার কথা ! ও হয়ত আজ-কালই ঘুম ভেঙ্গে উঠবে !' তি তখন জোর করে লিউর পরিবারের সবাইকে নিয়ে কবরখানায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে কফিন ভাঙ্গতে বলল I ওই কবর থেকে সুমিষ্ট গন্ধ আসতে লাগলো l কফিন খুলতে দেখা গেল লিউ চোখ পিট পিট করে চেয়ে রয়েছে ও - ওকে যে সবাই ডাকছে তা শুনতে পারছে ! ' - নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকতে যে কি ভালো লাগে !’ লিউ বলে উঠলো ; আর তি কে জিজ্ঞেস করলো -' তুমি কি মিশিয়ে এই মদ তৈরী করেছ বাবা , যে খেয়ে একেবারে বুঁদ হয়ে গেছি ! - খুব কি বেলা হয়ে গেছে !' একথা শুনে সবাই খুব জোরে হেসে ফেলল l লিউর মুখ থেকে মদের ভীষণ মিষ্টি গন্ধ আসতে লাগলো - যা নাকি আড়াই বছর ধরে লিউকে বুঁদ করে রেখেছে ! মনোজ

266

50

দীপঙ্কর বসু

রবীন্দ্রনাথের গান - কিছু ভাবনা

রবীন্দ্রনাথের গানের সুরে এমন কিছু একটা আছে যে কারণে শুধু মাত্র সুরটুকু কানে এলেই তাকে সহজেই রাবীন্দ্রিক ঘরানার সুর বলে সনাক্ত করে ফেলা যায় অথচ অনেক সময়ে অন্য কোন সুরকার প্রায় একই কম্বিনেশন অফ নোটস প্রয়োগ করে অথবা সেই কম্বিনেশনে যৎসামান্য অদলবদল করে অন্যকোন গানে যখন প্রয়োগ করেন তখন সে সুরটি রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত স্বতন্ত্র সুর বলে মনে হয় এমন একটি আলোচনার সূত্রপাত করেছেন আমার এক সংগীতানুরাগি বন্ধু। তার আগ্রহ সুরের এই প্রকৃতি বদলের রহস্য উদ্ঘাযটন করায়। প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল, কারণ প্রথমতঃ “মনে হওয়া” ব্যপারটা একান্ত ভাবে ব্যক্তি নির্ভর,কাজেই ব্যখ্যার অতীত । আর দ্বিতীয়তঃ রবীন্দ্রনাথের কিশোর বয়স থেকে শুরু করে জীবনের অন্তিম পর্ব অবধি গান রচনার যে ধারাটি বহতা নদীর মতই বারে বারে বাঁক নিয়েছে নতুন নতুন দিশায় , গানের আঙ্গিকে ,কথায় ,ভাবে, সুরে ছন্দে যে ক্রম উত্তরণ ঘটেছে তার কোন খণ্ডিত অংশকে আমরা রবীন্দ্রনাথের গানের সুরের প্রতিনিধিস্থানীয় রূপ বলে গ্রহণ করব? ভারতীয় রাগ সংগীতের আধারে বিকশিত হয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের গানের সুর তো কোনও বাঁধাধরা ছকে আটকা পড়েনি । গান রচনার ধারায় শাস্ত্রীয় রাগরাগিণীর সঙ্গে এসে মিলেছে বাংলার বিভিন্ন লৌকিক গানের সুর । মিলেছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাদেশিক সুর ,পাশ্চাত্যগানের সুর । একটু একটু করে গড়ে উঠেছে আধুনিক বাংলা কাব্যসংগীতের সুরের ঠাট – যে সুরের ঠাটে ধরা পড়ে রবীন্দ্রনাথের মানসলোকটি । সুরের এই ঠাটেই আমরা পেয়েছি “আর কি কখনও কবে এমন সন্ধ্যা হবে /জনমের মত হায় হয়ে গেল হারা” র মত গানের লাইন । দেখতে পেয়েছি “সেদিন ভরা সাঁঝে , /যেতে যেতে দুয়ার হতে কী ভেবে ফিরালে মুখখানি /কী কথা ছিল যে মনে মনে” র মত এক অপূর্ব রোমান্টিক ছবি । অনাড়ম্বর ,আপাত সরল সুরে উচ্চারিত উল্লিখিত দুটি গানের লাইনগুলি কেমন অবলীলায় অন্তরের তন্ত্রীতে অনুরণন জাগিয়ে তোলে । এ গান শ্রোতাকে এন্টারটেন করে তো বটেই একই সঙ্গে মানুষের মনের সুকুমার বৃত্তিগুলিকেও উজ্জীবিত করে তোলে । পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি উল্লিখিত “গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকে ছিল তারা” গানটির সঞ্চারীর সুরটির দিকে। সঞ্চারির সুরটি কথা সহযোগে সোচ্চারে অথবা গুন গুন করে গেয়ে দেখুন – চেয়েছিনু যবে মুখে তোল নাই আঁখি /আঁধারে নীরব ব্যথা দিয়েছিল ঢাকি ... লাইন দুটি মধ্য সপ্তকের মা স্বরের স্থির দাঁড়িয়ে থেকে এক মাত্রার জন্য গান্ধারে নেমে আবার পঞ্চম স্বরে উঠে সেখানেই সুর স্থিতি পায় । গোটা “আঁধারে নীরব ব্যথা দিয়েছিল ঢাকি” লাইন জুড়ে অপলকে স্থির থাকে ।শুধু সেই নিস্তরঙ্গ সুরের প্রবাহে ছোট্ট এক টুকরো সুরের মোচড় –অনেকটা টপ্পার সুরের কারুকাজের মত ,আর তার পরেই ঘটে যায় আবেগের বিস্ফোরণ । এক সব হারানর তীব্র আর্তি যেন সমস্ত স্থৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে প্লাবন আনে । “আর কি কখনো কবে” ...এই উচ্চারণ করতে গিয়ে সুর পঞ্চম থেকে বিপুল জলোচ্ছ্বাসের মত উঠে পৌঁছে যায় তার সপ্তকের গান্ধার স্বরে । এই সুরের নাটকীয়ই পরিণতির জন্যেই যেন গোটা গানটার সুরে প্রস্তুতি চলছিল । এমনি আরও কত শত চমক ই যে এক একটি গানের সুরের ভাঁজে ভাঁজে সঙ্গোপনে লুকিয়ে আছে !কোন সংবেদনশীল গায়ক বা গায়িকার মরমী পরিশীলিত কণ্ঠে সেই সব গান শুনতে শুনতে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে আমাদের অন্তর আলোকিত হয়ে ওঠে । রবীন্দ্রনাথের গানের সুর এখানেই অনন্য । এই ছোট ছোট অলঙ্করণ এবং নাটকীয়তা অধিকাংশ গানেই খুব উচ্চকিত নয় ।আর উচ্চকিত নয় বলেই তা অসাবধানী শ্রোতা বা গায়ক গায়িকার নজর এড়িয়ে যায় ।তা ছাড়া পারদর্শিতার প্রশ্নটাও ওঠে অনেক ক্ষেত্রে। এমনি আর বহু গানের মধ্যে এখনি মনে পড়ছে একটি গানের কথা – “ও চাঁদ ,চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে” গানের কাফি রাগের সুরে কোমল গান্ধারের বারবার প্রয়োগ করে কান যখন ওই স্বরে অভ্যস্থ হয়ে যায় ঠিক সেই সময়েই গানের সঞ্চারিতে এসে - “পথিক সবাই পেরিয়ে গেল ঘাটের কিনারাতে /আমি কেবল আকুল আলোয় দিশা হারা রাতে” আলোয়” শব্দটি যখন মধ্য সপ্তকের ষড়জ থেকে শুদ্ধ গান্ধারে গড়িয়ে চলে যায় তখন অতি সঙ্গোপনে গানের মধ্যে এক নতুন আলোর ঝলকানি ফুটিয়ে তোলে ।সেই আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়না বরং,মনযোগী শ্রোতার অন্তরলোকটি আলোকিত হয়ে ওঠে সুরের আমেজের সেই আকস্মিক দিশা বদলের ফলে । সুরের চলনে এই ডেলিকেট মুভমেন্টগুলি কানে ধরা না পড়লে রবীন্দ্রনাথের গান শ্রোতাকে প্রার্থিত রসপোলব্ধির আনন্দ দিতে পারেনা । তখনই সুরগুলিকে এক ঘেয়ে প্যানপ্যানে বলে মনে হতে থাকে । ঠিক এই জায়গাতেই গায়ক গায়িকার ভূমিকাটা বড় হয়ে দেখা দেয় । এক বিদেশি রবীন্দ্রানুরাগির একটি লেখা উদ্ধৃত করে দেখাতে চাই যে গায়কের কণ্ঠের প্রভাবে ,বা পরিবেশন রীতির ফেরে গানের রূপ কতটা বদল হয়ে যেতে পারে ,চেনা গান কত অচেনা হয়ে যেতে পারে তার প্রমাণ পাই Philippe Stern একটি সংক্ষিপ্ত লেখায় । Stern লিখছেন “And remembering the deep and penetrating charm of his songs when he sang them and hearing them today perforomed by students or on gramophone records and accompanied by several instruments , I am afraid, much afraid lest we lose what is most precious in all he gave us,and which in certain interpretations has disappeared. Hearing once at an Indian festival that song he had sung to me and which had become the national anthem, I did not get up. I did not recognize it. The delicate continuous line with its accents on “Victory” had become a military march ,hammered out with a regular beat, its essence lost” (Rabindranath Tagore ,A centenary Volume 1861- 1961 সংকলন গ্রন্থ থেকে Philippe Stern এর The real Rabindranath Tagore and his music শীর্ষক রচনার অংশ )

89

4

Aratrik

হংসচঞ্চু

‘গাঃ সন্নিবর্ত্য সায়াহ্নে সহরামো জনার্দনঃ। বেণুং বিরণয়ন্ গোষ্ঠমগাদ বীক্ষ্য তে মেনিরেহমহরম্।। গোপীনাং পরমানন্দে আসীদ্ গোবিন্দদর্শনে। ক্ষণং যুগশতমিব যাসাং যেন বিনাভবৎ।।’ রামচরণ আমাকে দেখে হেসে এই শ্লোকটি বলেছিলেন। দিল্লির বাড়িতে আমাদের দোতলার বারান্দাটা ছিল একেবারে রাস্তার উপরে। বছর কয়েক আগে একবার গিয়েছিলাম। দেখলাম একটা দোকানের শেড হয়ে গিয়েছে। তখন ছিল না। রাস্তাটা অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যেত। এমন ঘিঞ্জি রাস্তা খুব কমই আছে। বাড়িগুলোও একে অপরের ঘাড়ের উপরে। মাঝখানে ফাঁক নেই বললেই হয়। এর জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওর জানলায় রাখা আচারের বোয়াম ফাঁকা করে দেওয়া যায়। সেই বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি সকালে একটি স্কুলে পড়াতেন। তারপরে মোড়ে নেমে হেঁটে আসতেন। আপনাদের আগের বারে যে মাঠের মধ্যে দিয়ে তাঁর হাঁটার কথা বলেছি, এ ঠিক তেমন নয়। তখ ছিলেন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ। এখন তিনি মহিলা। তাই এখন তিনি যখন হেঁটে আসতেন, তাঁর একটি প্রতিষ্ঠাও সঙ্গে সঙ্গে আসত। এই প্রতিষ্ঠা শুধু সমাজকে চেনার নয়, সমাজকে চিনিয়ে দেওয়ারও। বাক্যের দ্বিতীয় অংশটা মনে রাখবেন। উমা বা শকুন্তলার মতো একটি পরিচয় চিহ্ন তিনি পরে আসতেন। সারা পাড়া অবাক হয়ে দেখত এক মহিলা বাড়ি ফিরছেন। মহিলা বলতে আমি উওম্যানের কথা বলছি। উওম্যান কেবল বয়স হলেই হয় না। উওম্যান হয়ে উঠতে হয়। কালিদাস শকুন্তলা বা উমার বড় হয়ে ওঠার কথা বড় যত্নে বলেছেন। সেই যত্নে প্রচ্ছন্ন রয়েছে একটি বার্তা যে, প্রেমে পড়তে হয় এবং প্রেমে আহত হতে হয়। শকুন্তলা মা হওয়ার পরেও উওম্যান হয়ে ওঠেননি। তারপরেও তিনি সরল এক কিশোরীই। তাঁকে প্রথমবার উওম্যান বলে চিনে নেওয়া যায়, দুষ্যন্তের রাজসভায়। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে। সেই যে তিনি ভরা রাজসভায় স্বয়ং রাজাকে আক্রমণ করলেন, আর তাতেই তিনি পেরিয়ে গেলেন কৈশোর। সে ক্ষেত্রে সাহিত্য তত্ত্ব বলে, কেবল একা একা তেমনটি হওয়া যায় না। শেক্সপিয়রে দেখুন। সেই উওম্যানকে সাজিয়ে তুলতেও হয়। তাঁকে পরতে পরতে আভরণ বড় যত্ন নিয়ে পরাতে হয়। কী করে তা করতে হয়, তার তত্ত্বও রয়েছে। সেটুকু নিবেদন করি। প্রথমে আমন্ত্রণ করতে হয়, তারপরে প্রতিষ্ঠা, তারও পরে বন্দনা। এবং শেষে অভীপ্সা। প্রথম তিনটি ক্রিয়া বড় আবশ্যিক। এই তিনটি যদি না হয়, তা হলে শেষটি হয়ে ওঠে না। আর কে না জানে, শেষটুকুর জন্যই তো... যাই হোক, যে কথা বলছিলাম, তা বলার আগে আরও দু’চারটি অন্য কথা বলি। কেননা, এই যে তিনি হেঁটে আসছেন, ঝকঝকে রোদে, যদি গরম কাল হত, আঁচলটা ঘোমটার মতো করে নিতেন, নাক পর্যন্ত চাপা দিয়ে, তাতে অপ্রতিরোধ্য আকর্ষক হয়ে উঠত তাঁর সেই আসাটুকু। প্রতিটি পা ফেলতেন, দিল্লি কেঁপে উঠত। আচ্ছা বেশ, আমাদের পাড়া কেঁপে উঠত। তাতেও যদি খুশি না হন, আমার হৃদয় কেঁপে উঠত বললে নিশ্চয় কেউ ঝগড়া করবেন না। আসলে এই হাঁটার মধ্যে, দাঁড়ানোর মধ্যে একটা কথা থাকে। এক ধরনের ডিসকোর্স। প্রধানত কথাটা চোখ সম্বন্ধে চলে। রোমিও যেমন জুলিয়েটের আঁখি সম্পর্কে বলেছিল, Her eye discourses. তারপরে নিজেই বলেছিল I will answer it. কিন্তু উত্তরটা দেবে কী করে? চোখে চোখে তো নয়। জুলিয়েট তো এখনও রোমিওকে দেখেইনি। শুধু ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র। তাই বলছি, এই দাঁড়ানোটাই একটা কথা কওয়া। এমনই কথা কওয়া, যে তার একটা উত্তর দিতে পর্যন্ত ইচ্ছে করে। যেমন কি না, তাঁর হাঁটাটি। যেমন কি না, ওই ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তাঁর একবার আমাকে দেখে নেওয়াটি। যদি ঘোমটা না থাকত, তা হলেও তিনি একবার আমার দিকে চেয়ে নিতেন। রাস্তায় আরও লোক। তাঁরাও আমাকে দেখছেন। তাঁকেও দেখছেন। তাঁরাও জানেন, আমাদের সম্পর্ক। কী প্রশ্রয় কী প্রশ্রয় যে ওই পাড়া আমাদের দিয়েছে। তিনি যখন তাই যখন পাড়ায় পা ফেলতেন, সারা পাড়া খুশি হয়ে যেত। আমার তাতে একটি সামান্য চরিত্র ছিল। কিন্তু মোট কথা হল, সারা পাড়া এই প্রেমটিতে খুশি হত। মনের দুঃখগুলো সব চাপা পড়ে যেত। তথ্যের খাতিরে বলে রাখা দরকার, ঠিক সেই সময়েই রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যান সিনেমাটা এসেছিল। সেটা দেখতে কেউ বাদ রাখেনি। আর তারপরে নিজেদের মহল্লায় এই প্রেমটুকু যে বেশ মেনে নেওয়ার মতো, তাও বোধকরি তাঁরা ভেবেছিলেন। কিন্তু সেটাই সব কথা নয়। প্রেমের নিজস্ব একটা ভাল লাগার দাবিও থাকে। চোখের সামনে কেউ প্রেম করছে দেখলেই মনে একটা খুশির ভাব সঞ্চারিত হয়। এবং, সাহস তৈরি হয়। আর প্রেমে পড়লে তো আর কথাই নেই। আবার বলি কথাটা, তখন তিনি উওম্যান। ভরা সূর্যালোকে তিনি যখন হেঁটে আসতেন, তাঁর ভাবনার মধ্যে, আচরণের মধ্যে সেই ভাবটি বরাবর ফুটে উঠত। সেই ভাবটির সঙ্গে নিয়মিত মোলাকাতে আমিও বড় হয়ে উঠতাম। আমার গায়ে এসে সেই ঢেউগুলো পড়ত। আমি যেন একটা ঘাট। যে ঘাটে এ বার বড় জাহাজ এসে ঠেকছে। সত্যিকারের জাহাজ। আমায় সেই জাহাজের ঢেউ সামলাতে শক্ত হতে হত। আমাকে তৈরি হতে হত। আমাকে সাহস করে সেজে উঠতে হত। আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে সেই সেজে ওঠাটি সেজে উঠতে হত। রোমিওর কথাগুলো দেখুন। কেমন আস্তে আস্তে সে বড় হয়ে উঠছে। But soft! What light through yonder window breaks? It is the east, and Juliet is the sun. তারপরে নিজের সম্পদে সে উজ্জ্বল। সে অন্য সব কিছু অস্বীকার করতে চায়। এবং উপমা বদলে নিতে চায়। চিরটাকাল সুন্দরী রমণীর সঙ্গে চাঁদের তুলনা হয়েছে। কিন্তু এই যে পনেরো বছরের একি মেয়ে উওম্যান হয়ে গিয়েছে তার কাছে, সে এখন সৌন্দর্যে জ্বলজ্বল করছে সূর্যের মতো। এই সম্পদ রোমিও মনে সূর্যের মতো জৌলুস ছড়াচ্ছে। এত বড় এই সম্পদ যে তাকে সে আর কিছুর সঙ্গেই তুলনা করে পেরে উঠছে না। তাকে কেবল সূর্যের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। হত্যা করছে চিরকালের চাঁদকে। Arise, fair sun, and kill the envious moon, Who is already sick and pale with grief, That thou, her maid, art far more fair than she. এই বার সে সাজাচ্ছে। এ বার আবার সে প্রাচীন উপমাটি ব্যবহার করতে শুরু করেছে। আর তারপরে সে তাকে আক্রমণ করছে। প্রেমে পড়লে সাহস বাড়ে। সাহস না থাকলে উওম্যানের সঙ্গে প্রেম করাই যায় না। Be not her maid since she is envious. Her vestal livery is but sick and green, And none but fools do wear it. Cast it off! এই যে শেষ তিনটি বাক্যটি—হাঁদারা ছাড়া আর কেউ কুমারী থাকার গৌরব বোধ করে না—এর মধ্যে একটা অধিকারবোধও বেশ বোঝা যাচ্ছে। আমি এই তিনটি বাক্য যখন এক অনিদ্র গ্রীষ্মের রাতে তাঁকে বলেছিলাম, তিনি আমার দিকে অনিমেষ নয়ানে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি তখন কুমারী নন। আমাদের জানলার পর্দা তোলা ছিল। আমরা একটা ওয়াটার কুলার কিনেছিলাম। সেটা ভয়ঙ্কর শব্দ করত। তার মধ্যেই যতটা নরম করে সম্ভব, আমি যখন একটা একটা করে বাক্য বলছি, তিনি, আমি তো জানিই, জানেন, পুরো বাক্যটা। আমি তো সত্যি সত্যি কেবল ধরতাইটুকুই দিতে চেয়েছিলাম। Be not her maid since she is envious বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জানেন, আমি কী বলতে চাইছি। তিনি অপেক্ষা করছিলেন আমি কোথায় থামি, সেটি দেখার জন্য। আমি তাই Cast it off! বলে যখন থামলাম, তিনি আরও গভীর ভাবে আমার দিকে তাকালেন। কেন জানেন? ওই যে উওম্যান। তিনি পরের বাক্যটি শুনতে চান। না হলে আমার আগে বলা কথাগুলোর তো কোনও মানে হয় না। জুলিয়েট কুমারী ছিল। তাকে রোমিও বলতে পারত। কিন্তু আমি কী করে তাঁকে সেই একই চরণগুলো বলব? তাই পরের লাইনটা প্রয়োজন। প্রচণ্ড প্রয়োজন। তাঁর সারা অভিব্যক্তিতে সেই প্রয়োজনটুকু ফুটে উঠল। আমি তাঁর কানের কাছে গিয়ে তাই বললাম, It is my lady. Oh, it is my love. সরল বাক্য। খুবই সরল। কিন্তু তাতেই সব বাধা দূর হয়ে গেল। এই যে দাবিটুকু, আমার বলে দাবিটুকু, তাতেই একটা ঘেরাটোপ তৈরি হয়ে যায় বাকি বিশ্বের সঙ্গে। এ বার প্রতিটি শব্দের ওজন হয় এই ঘেরাটোপটুকুর মধ্যে তার অর্থ নিয়ে। এ বার তার বাইরে কে কী করেছে, তা অর্থহীন। তাই তিনি প্রসন্ন হয়ে তাকালেন। কেননা, এই বার কথাটা ঠিক হল। এ বার তাঁর কৌমার্য, আমার ও তাঁর সম্পর্কের প্রেক্ষিতে, ঠিক ভাবে বলা গেল। এইটুকু না হলে, শেক্সপিয়রকে ভুল ভাবে ব্যবহার করা হত। অবাক হয়ে দু’জনেই সেই রাতে অমন একটা অবস্থার মধ্যেও ভেবেছিলাম, কী আশ্চর্য শক্তি শেক্সপিয়রের। আমি বারবার আপনাদের বলেছি, আমি নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে করি। আমি শেক্সপিয়র পড়েছি। আমি রবীন্দ্রনাথও পড়েছি। দু’টোই মূল ভাষায় পড়েছি। এমন সৌভাগ্য সারা পৃথিবীতে বাঙালি ছাড়া হওয়া শক্ত। কী আশ্চর্য, দেখুন, সে রাত ছিল তারা ভরা। ‘‘জাগিছে তারা নিশীথ-আকাশে, জাগিছে শত অনিমেষ নয়ান॥’’ আমি তাঁর কানের কাছেই মুখটি রেখে তারপরে বলেছিলাম, The brightness of her cheek would shame those stars, As daylight doth a lamp. Her eye in heaven, Would through the airy region stream so bright, That birds would sing and think it were not night. কিন্তু বুঝলেন, এও হল আমন্ত্রণ। এরপরে প্রতিষ্ঠা, তারপরে বন্দনা তারপরে অভীপ্সা। কিন্তু আমন্ত্রণটুকুতেই মানুষ হয়ে গেলাম। বড় জাহাজের জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। কেননা রাতের মধ্যেই রাত চলে গিয়েছে। যে রাত চাঁদের রাজত্ব, তার অবসান হয়েছে। কৌমার্যহৃত সেই উওম্যান এ বার তাঁর দৃষ্টিতেই রাতের অবসান ঘটালেন, ওই যে শুনুন না, পাখিগুলো গান গাইতে শুরু করেছে। ভেবেছে রাত কেটেছে। দিন হয়েছে। ওই যে তিনি সূর্যালোকে হেঁটে আসছেন, বাড়ির সামনের রাস্তাটি দিয়ে। ওই যে তিনি তাকাচ্ছেন। সারা মহল্লা খুশি। সারা মহল্লা না জেনেই জেনে গিয়েছে সব কথা। রামচরণ আমাকে তারপরে পাশে দাঁড়িয়ে বললেন— শ্রীগোবিন্দের বিরহে একটি ক্ষণও যাঁদের কাছে শতযুগ বলে মনে হত, সেই গোপীগণ ব্রজে প্রত্যাবৃত তাঁর দর্শন লাভ করে পরমানন্দসাগরে মগ্ন হলেন।

1410

250

stuti..

ছাইপাঁশ

বন্ধুত্ব কি একাকীত্ব দূর করে …......।। মায়াজালের দৌলতে আমাদের এখন বন্ধুর অভাব নেই । কারো শয়ে শয়ে বন্ধু তো কারো হাজারে হাজারে । অসংখ্য বন্ধুর মাঝেও কিন্তু অনেকে একাকীত্বে ভুগছে । এত বন্ধু থাকা স্বত্বেও কিন্তু তরুন প্রান ঝরে যায় অকালে । অগণিত বন্ধু গ্রুপের সদস্য হয় সবাই কিন্তু পাশের বাড়ীর প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্ব করে না । চেনা অচেনা বন্ধুর সাথে রাতের পর রাত জেগে চ্যাট করে কিন্তু কেউ কাউকে অনুভব করে না । নিজের স্ট্যাটাসে কত লাইক পড়ল সে নিয়ে সবাই মাতোয়ারা  । প্রকৃত বন্ধুত্ব অনেক ক্ষেত্রেই একাকীত্ব দূর করে । সেইজন্যই আমরা সারা জীবনের সঙ্গী খুঁজি । একা একা জীবন কাটাতে গেলে প্রথম চোটে জীবন খুব আনন্দময় । কোন বন্ধন নেই  । মুক্তবিহঙ্গের মত যেদিকে মন চায় ডানা মেলে উড়ে বেড়াও যা খুশি তাই করা যায় । ইচ্ছে মত জীবনকে চালনা করা যায় । কিন্তু কিছুদিন পরে সব আনন্দ উত্তেজনার অবসান । তখন একঘেয়েমী পেয়ে বসে । মানুষ একাকীত্বের শিকার হয় । একাকীত্ব থেকে আসে হতাশা । একজনকে দেখেছি একটু কথা বলার জন্য সারাদিন জানলায় বসে থাকত । রাস্তা দিয়ে কেউ গেলেই ডেকে কথা বলত । পথচারীরা অনেকেই বিরক্ত হত । তাড়াতাড়ি ওনাকে কাটিয়ে যেতেন । ওনার সাইকোলজি বোঝার সময় কারো ছিল না । সাধারণভাবে আমাদের সমাজে বলা হয় মেয়েদের থেকে ছেলেরা বেশী একাকীত্বে ভোগে । অনেক কারণের মধ্যে একটি হল মেয়েদের ঘরোয়া স্বভাব । যতই তারা স্বাধীনচেতা হোক বাইরে গিয়ে ছেলেদের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে যু ঝুক । তবু তাদের সংসারী মন অনেকটা একাকীত্ব দূর করে । আজকাল মানুষের মধ্যে সমঝোতা করার প্রবনতা কমে গেছে । আগে পশ্চিমি দুনিয়াতে ছিল । এখন আমাদের মধ্যেও ভালই সংক্রামিত হয়েছে । আমার জানাশোনা বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে দেখছি তারা বিয়ের এক বছরের মধ্যেই বুঝে ফেলেছে তাদের বনিবনা হবে না তাই আলাদা থাকা শুরু করেছে । এটা অবশ্য হয় যেহেতু মেয়েরাও আজ স্বাবলম্বী । নারী স্বাধীনতার হাওয়া একেকজনের পালে এমন লেগেছে যে তারা কি করে নিজেরাই জানে না । কাছেই একটি ফ্ল্যাটে এক স্বামীস্ত্রী থাকে । তারা মাঝে মাঝেই ধুন্ধুমার ঝগড়া করে । তারপর মেয়েটি বেলকনিতে গিয়ে বলে আমি নীচে ঝাপ মারছি । ছেলেটি এসে তাকে সামলায় । আমার পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী মহিলা বয়স ৭০ কাছাকাছি  । একা থাকেন দুটী কুকুর নিয়ে । কারো সাথে দরকার ছাড়া কথা বলেন না ।আগে মেয়ে থাকত সাথে ।এখন সে বিদেশে চলে গেছে কখনও সখনো আসে । ছেলে দেশেই থাকে । তাকে গত দশ বারো বছরে চার পাঁচ বার আসতে দেখেছি । বাড়ীতে ঝি , রাঁধুনী , কুকুর ঘোরানোর লোক, মালী সব আছে । তিনি আবার কুকুর প্রেমী । রাস্তার কুকুরদের প্রতি তার প্রান উতলা । রোজ দুইবেলা রাঁধুনীকে দিয়ে কুকুরদের জন্য রান্না করিয়ে লোক দিয়ে তাদের পার্সেল পাঠিয়ে দেয় রাস্তায় । এই নিয়ে অকারনে প্রায়ই সবার সঙ্গে ঝগড়া করে । যতদিন চাকুরী করতেন একরকম ছিলেন । ইদানিং দেখি রোজ সকালে রাঁধুনীর সাথে ঝগড়া বাধায় । উনিও একাকীত্বে ভোগেন । তার অভিব্যাক্তি ঝগড়ার মাধ্যমে প্রকাশ পায় । একসময় আমাদের দেশে সই বা মিতা পাতানোর রেওয়াজ ছিল । জলসই , বকুল ফুল , শিউলি ফুল , সবুজ পাতা , গঙ্গাজল এমনি ছিল বন্ধুদের বিশেষ নাম । বন্ধুদের জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতেও পেছপা হত না । আজকাল বন্ধু খুঁজতেই জীবন শেষ হয়ে যায় ।

315

50

শিবাংশু

এক জন খগেন ও তার বাবার নাম...

পঁচিশে বৈশাখ সকালে খগেন ভাবলো অফিসে যাবেনা। কারণ ঐ দিন 'পঁচিশে বৈশাখ'। সরকারি পাব্লিক হলে একটা ছুটি পাওয়া যেতো, নিখরচায় I তার কপালে নাই। তার এও মনে হলো কোনও জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনে শনিপুজোর ভক্তদের মতো হাত জোড় করে বসে না থেকে কিছু অন্য কাজ করলে হয়তো বাবার আত্মা বেশি খুশি হবে। হ্যাঁ, খগেন অনেক বাঙালির মতো রবিবাবুর স্বঘোষিত সন্তান। তার এই স্বোপার্জিত পিতা সম্পর্কে আজকাল লোকজন কী ভাবছে সেটা নিয়ে একটা ওপিনিয়ন পোল করা যেতে পারে। সহজ কাজ অথচ বেশ স্টিমুলেটিং। গলির মোড়ের গাছতলাটা বেশ ছায়া... কিছুক্ষণ দাঁড়ানো যায় সেখানে। লোকজনেরও আসাযাওয়া আছে। -এইযে নমস্কার, আপনার নামটা একটু বলবেন... -ক্যানো... -এই একটা কথা জানার ছিলো... -আমার নামে কোনও কথা নেই, অমলেন্দু রঞ্জন হালদার...বলুন, - আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? -কে কোবি রবীন্দ্রনাথ? কিস্যু ভাবিনা। ভাবার কী আছে? কতো লোক ভাবছে... আর ভাবতে পারিনা... ওসব পদ্য টদ্য পড়ে হবেটা কী? তবে জানেন বিয়ের পরে একদিন বৌকে ইম্প্রেস করতে একটা কোবিতা বলতে গেসলুম, বাংলা অনার্স কি না.. তা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে... বুঝলুম ও লাইনে হবেনা। তার পর কোবিতা-টোবিতা মায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। - ইয়ে...ঠিক আছে, ধন্যবাদ... -আপনার নামটা একটু যদি বলেন... - রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের নাম জিগ্যেস করাটা বেশ ভালো কাজ, তবে একটু ডেঞ্জারাস ... - না, না আমি একটা প্রশ্ন করতুম শুধু... - কোথায় থাকি? বলবো না... আর কিছু.... - না না তা নয়, আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? - বাহ, আপনার টেকনিকটা বেশ ভালো... - না না আমি সত্যি শুধু এইটুকুই জানতে চাই... - সুদক্ষিণা মজুমদার, - দারুণ... - ঠিক ধরেছি , মতলবটা খারাপ... -আরে না না খারাপ নয়, মতলব মানে শুধু রবীন্দ্রনাথ... -বেশ, তবে বলি... -আজ্ঞে হ্যাঁ - দেখুন রোবীন্দ্রনাথ হলেন গিয়ে রোবীন্দ্রনাথ, মানে রোবীন্দ্রনাথই সেই রোবীন্দ্রনাথ, অর্থাৎ কি না যে রোবীন্দ্রনাথ আমাদের সব কিছু। মানে আমার নামটা দেখছেন এবং আর অন্য যা কিছু, সব কিছুই ঐ রোবীন্দ্রনাথ। বুজলেন... - হ্যাঁ জলের মতো, অনেক ধন্যবাদ... ছেলেটির চেহারা বেশ উজ্জ্বল। এরা কি রবীন্দ্রনাথ পড়ে? দেখা যাক, -এই যে ভাইটি, আপনার নামটা একটু বলবেন? -কোন নাম? আমার বহু নাম আছে... পদ্য লেখার নাম? গদ্য লেখার নাম? ফেসবুকের নাম? প্রেমিকার দেওয়া নাম? মাস্টারের দেওয়া নাম? আমারি নাম বলবো, আমি বলবো নানা ছলে....(সুরে) - আপনার বাবার দেওয়া কোনও নাম আছে কী? - আছে, তাও আছে, তবে সেটা তেমন ভালো নয়, চিন্ময় কর... - আপনি নিশ্চয় কবিতা লেখেন - অবশ্যই, দুহাতে লিখি, কেন? - এই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আপনি কী ভাবেন, এই একটু কৌতূহল আর কি? - (চোখ বুজে) ভরণী নক্ষত্র থেকে ঝরেছে দু এক বিন্দু জল, বিশাখায়, সে কোন তিয়াসায়, দিবাকর রশ্মি যেন, মার্গদর্শী রাজপথে লুপ্ত হলো বিভোর বিভাবরী.... - সাংঘাতিক... - সাংঘাতিক !!! মানে? - মানে ফাটিয়ে দিলেন আর কি... - তাই বলুন... কী যেন জানতে চাইছিলেন? - ঐ রবীন্দ্রনাথ... - ওনার সম্বন্ধে আমি বাংলায় তেমন কিছু বলতে পারিনা, ইংরিজি চলবে... - আমি আবার তেমন বুঝিনা ওটা.... - ধ্যুস মশায় , ওয়েস্টিং মাই টাইম... - নিশ্চয়, নিশ্চয়.... অনেক ধন্যবাদ... এই মেয়েটিকে খুব স্মার্ট লাগছে, কলেজ থেকে ফিরছে বোধ হয়... - নমস্কার, কলেজ ফেরত নাকি? - আপনি কে মশায়, বেশ অসভ্য তো... - আজ্ঞে না না আমি একটু রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা বোঝার চেষ্টা করছি... - ও, তাই বলুন। আমি কলেজ থেকে ফিরছি না , ছেলেকে স্কুল পৌঁছিয়ে আসছি, - সে কী আপনার এতো বড়ো ছেলে ? - হ্যাঁ যথেষ্ট ধেড়ে ছেলে আমার... - বাহ বাহ, এদিকেই থাকেন না কি? - দেখুন, এই তাপসী চ্যাটার্জির রাগ তারাতলা থেকে আমতলা সব লোক জানে... সমঝে চলে... - ওহ সরি, রাগবেন না প্লিজ, আমি ঐ রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দু চারটে কথা, মানে আপনার কথা জানতে চাইছিলাম... - দেখুন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে আমি একটু ভাবালু হয়ে পড়ি। চোখে-টোখে জল এসে যায়, একটু নিশ্বাসের কষ্টও হয়... - তবে থাক থাক... - তবে ওনার লেখা গল্প থেকে যতো সিন্মা হয়েছে সেগুলো আমি চান্স পেলেই দেখি। তবে ভাববেন না আমি কবিতা বুঝিনা, একবার কাম্পুচিয়াতে মানুষের হাড়ের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে "ভগবান তুমি যুগে যুগে" পড়েছিলাম... - বাহ বাহ শুনলেই কম্পো হয়.. তা আপনি ওদিকেও যান নাকি... -আরে মশাই আমি তো ওদিকেই থাকি... - আচ্ছা আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ... এছেলেটি মনে হয় কিছু ভাবছে, একটা ভাবুক ব্যাপার আছে চেহারায়... - নমস্কার, আমি খগেন ... আপনার নামটা জানতে পারি - পারেন। শত্রুদমন চক্রবর্তী। - এমন নাম বিশেষ শুনিনি... - কী জানেন আপনি পৃথিবীর? বহু কিছু জানা বাকি আছে... - ইয়ে তাতো বটেই।।এদিকেই থাকেন নাকি? - আমি স্থলপথে থাকি চুয়ান্ন নম্বরে, তবে বেশির ভাগই জলপথে থাকতে হয়... (উদাসিন) - ও বুঝেছি, নেভিতে আছেন নাকি? - না আমি সরকারি বৈজ্ঞানিক... - আচ্ছা আচ্ছা ... আসলে আমি একটু কৌতূহলী আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন, এই নিয়ে? আসলে আপনাকে একটু অন্যমনস্ক দেখছি .... বাড়িতে সবাই ভালো তো? - না ঠিক অন্যমনস্ক নই, মন্দাক্রান্তা এখন একটা পদ্য লিখছে ঘরে বসে আমি তার শব্দগুলো অনুমান করার চেষ্টা করছি... - ঘরে বসে পদ্য, শব্দ এখানে? আপনার বান্ধবী বুঝি? - ধুর মশাই.. আপনি একটি যন্ত্র... মন্দাক্রান্তা একজন কালজয়ী কবি , আমি তার ভক্ত... - তবে রবীন্দ্রনাথও আপনি পড়েছেন? - পড়েছি, কিন্তু ওনার পদ্যগুলো ফুরাতে চায়্না... ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কখনো দেখা হলে পরের জন্মে একটু ছোটো কবিতা লেখার রিক্যুয়েস্ট করবো। আসলে লেখার নেশায় এতো আজে বাজে লিখেছেন ... কে পড়বে এতো... তবে এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা হয়না.. সন্ধের পর নিম্তলাঘাটে আসবেন, তখন কথা হবে, জলপথে... - য়্যাঁ.. বেঁচে থেকে? - ইয়েস । কেলো আর পঞ্চা অনেক ক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলো খগেনকে। ওরা পেশায় প্রায় 'সমাজবিরোধী' আর নেশায় রাজনৈতিক কর্মী। - এই খগা। অনেক্ষণ থেকে দেকচি তুই এর পিছনে ওর পিছনে ঘুরচিস, ব্যাওড়াটা কী... - আরে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে লোকেদের কাছে জানতে চাইছি... - কোন রবি? ঐ পাংচারওয়ালা? - আরে না না , কবি রবীন্দ্রনাথ... - কোবি ড়োবিন্দনাত...!!! - হ্যাঁ ঠিক তাই.. - কোতায় থাকে সালা.. - আরে ছি ছি অমন বলিস না - তবে খুঁজচিস ক্যানো? - এমনিই.... - কাদের পাট্টি ছিলোরে? এবার পঞ্চা তার ক্ষুরধার বুদ্ধি জাহির করে, - বুয়েচি বুয়েচি, ঐ দাড়িওয়ালা বুড়োটা... ভোটের সময় ওর কোবতেগুলো বলেচিলো দেওয়ালে লিকতে...ওর পুজোয় অ্যাকন ছুট্টি দ্যায়.... দ্যাক খগা, ও বুড়ো আমাদের পাট্টি, তুই ভোটার ভাগাবার চক্কর কোরিস না, পাড়ার ছেলে তাই এবার ছেড়ে দিলাম... এখন ফোট, নয়তো বাবার নাম... যাহ তুই তো স্লা নিজেই খগেন, তোর বাপের আর নাম কী হবে.....?

121

15

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

অবশেষে মঞ্জুর ক্রন্দনরত ভেজা মুখটি আবছা হয়ে পথের ধারে মিলিয়ে গেল| তার যাওয়ার আগের তিনদিন স্বপ্নের মত কেটেছে| এগারো বছরের বন্ধুত্বে কখনো সুযোগ আসেনি এতগুলো ঘন্টা একত্রে পার করার| পরিবার পরিজন সহযোগে কিছুক্ষণের জন্য মধ্যাহ্নভোজন অথবা রাতের খাবারে সঙ্গী হওয়া‚ সেরকমটাই হয়ে এসেছে আজ অব্দি| ফোনেও বা কোথায় যোগাযোগ? আমি খুব একটা সামাজিক নই‚ মঞ্জুও তাই| তাই দরকার ছাড়া কথা হয়না| ভাগ্যক্রমে আমার সকল কাছের বন্ধুদের সাথে সম্পর্কটা এইরকমই‚ যতদিনই আমরা না দেখে‚ না কথা বলে কাটাই না কেন তবুও আমাদের অন্তরস্থ মানসিক নৈকট্যে চিড় ধরেনা| সম্পর্কের শুরুর পর্বটা খুব আকর্ষণীয় ছিল| মঞ্জুর বর‚ সত্যা আর দেববাবু একই অফিসে কাজ করতেন| একজন মার্কেটিং টিমে অন্যজন ফাইন্যান্স এ| কাজের প্রকৃতিতে দুজনকে অনেক ক্ষেত্রে একসাথে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হত| প্রায়দিনই তুমুল তর্কবিতর্কের উপক্রম ঘটত দুজনের মধ্যে কোনো একটি প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে| তারফলে বাড়িতে দেববাবুর হতাশা কখনো সখনো জাহির হয়ে পড়ত| মুষ্টিবদ্ধ রাগ ছিটকে আসত আচম্বিতে‚ কি ডিফিকাল্ট চরিত্রের সাথে যে দর কষাকষি করতে হয়! যদিও এই নিয়ে কথা হয়নি তবুও আমি জানি মঞ্জুও এমন উক্তি সত্যার মুখ থেকে বহুবার শুনেছে| এমন পরিস্থিতি দেখে আসছিলাম বছর দুই ধরে যখন আমরা স্যালিনাসে ছিলাম| তারপর একদিন বাড়িতে বিরাট চুরি হয়ে যাওয়ার পর সে জায়গাটা থেকে মন উঠে গেল| স্যালিনাস মূলত চাষাবাদের জন্য বিখ্যাত| আর দুই একটা অফিসের হেডকোয়াটার সেখানে| এক ধারে মাইল এর পর মাইল জুড়ে চাষাবাদের জমি‚ অন্যধারে পাহাড়ের গা ঘেষে লোকালয়| সন্ধ্যে নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকার আর দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ ভুতুড়ে শব্দ প্রথম প্রথম কেমন ভীতি জাগাতো| মুনুদের স্কুলে পি. ই তে চোরকাঁটা তোলাতো| আসেপাশে চাষীদের ছেলেমেয়েরা ওর সহপাঠী ছিল| চুরিটা হল ডিসেম্বারে মুনু মিডিল স্কুল শুরু করার ছয় মাস আগে| আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল ওকে ভালো স্কুলে পাঠাব| চুরির পরে আর একদিনও থাকতে চাইছিলাম না| অনেক রিসার্চের পরে চলে এলাম সারাটোগাতে| সুন্দর সুরক্ষিত জায়গা‚ শ্রেষ্ঠ স্কুল দেখে| দেববাবুর অফিস হয়ে পড়ল ষাট মাইল দূরত্বে| আসতে যেতে ১২০ মাইল| দুই লেনের( তখন) রাস্তা পরিস্কার থাকলে দুই ঘন্টায় যাওয়া আসা| প্রজেক্টের চাপে কখনো রাত দুটোয় ফিরে আবার ছটায় বেরিয়ে যাওয়া| এতদূর রোজরোজ বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তনে আর প্রজেক্টের স্ট্রেস নিয়ে গাড়ি চালানো... মনে মনে চিন্তিত থাকতাম| তাই যখন শুনলাম কয়েকজন মিলে কারপুলের ব্যবস্থা করেছে তখন যেন একটু স্বস্তি পেলাম| সত্যা থাকতেন সারাটোগার আর স্যালিনাসের রাস্তার ধারে‚ সারাটোগার দিকে| অবিলম্বে তিনিও কারপুলের দলে নাম লেখালেন| কাজের বাইরে ঐ প্রথম দুজনের একসাথে সময় কাটানো| দুজন কঠিন একগুঁয়ে টাইপের মানুষ হয়ত প্রতিদিন একসাথে আসতে যেতে যেতে নিজেদের মধ্যে কিছু মিল খুঁজে পেয়েছিলেন‚ সেই পর্ব আমার অজানা| চমক লাগল একদিন যখন দেববাবু সত্যাকে আমন্ত্রণ করার বাসনা প্রকাশ করলেন| -আমি ভেবেছি তোমার ওঁকে ভালো লাগেনা| -রোজ যাতায়াত করি একসাথে| চক্ষুলজ্জা বলে কিছু আছেতো! মনে মনে হাসলাম| চক্ষুলজ্জার জন্য অপছন্দের মানুষকে দেববাবু নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছেন‚ এই বক্তব্যটি সম্পূর্ণ সারশূন্য অবাস্তব লাগল| নির্দিষ্ট দিনে ওঁরা এলেন| কল্পনায় ছিল সত্যার স্ত্রী হিসেবে শাড়ি গয়নায় জর্জরিত এক দক্ষিণ ভারতীয় মহিলার সাথে আলাপ হবে| লম্বা বেণীতে ফুলের মালার কল্পনা করেও কষ্টকল্পনা বুঝতে পেরে শেষে বাদ দিয়েছিলাম| নিশ্চিত ভয় ছিল অহংকারে মটমটে কেউ হবেন কারণ ওরা আসছে শুনে অপর এক নিমন্ত্রিত শুভার্থী আমাকে আগে থেকেই নামী অতিথিদের সম্পর্কে খবরাখবর দিয়ে বলেছিলেন‚ মঞ্জুর বাবা দেশের এক আই আই টির ডিরেক্টার| তখন প্রায় প্রতি শহরে একটি করে আই আই টি গজিয়ে ওঠেনি| তাই পদটির যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল| দুজনেই প্রচন্ড 'ওয়েল অফ্' পরিবার থেকে এবং তখনই মঞ্জু বে এরিয়ার এক নামকরা আইটি কম্পানীর অত্যন্ত দায়িত্বশীল পোষ্টে কাজ করে| অন্যদিকে আমি দুই সন্তান নিয়ে এলেবেলে প্রায় পুরোপুরি গৃহিণী| প্রায় পুরোপুরি কারণ তখন চাকরী করিনা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াই| মানে সমাজসেবা করে হাঁপিয়ে গিয়ে ঘরের কাজে প্রবল ফাঁকি দিয়ে চালাই| সেদিন বেল বাজতে দরজা খুলে দেখি জিনস‚ কুর্তি আর ববকাট চুলে‚ মেক আপ বর্জিত এক হাসিমাখা মুখ| হাত ভরা সুগন্ধী নার্সিসাস| বললো‚ সত্যা বলেছে উপহার হিসেবে ফুল তোমার সবচেয়ে প্রিয়? বুঝলাম দেববাবুর সাথে সত্যার ঘনিষ্ঠতা এতই ঘনীভূত হয়েছে যে আমার পছন্দের উপহার কি সেই নিয়েও আলোচনা হয়েছে| সমাদরে দুজনকে নিয়ে ঘরে বসালাম| বাকী সম্মানিত অতিথিবৃন্দও এসেছেন সকলে| আমি বসার ঘর আর রান্নাঘরের মধ্যে রকেটের গতিতে যাতায়াত করছি| বাকীরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছেন| এক ফাঁকে চুপিসারে মঞ্জু উঠে এল| আমার সাথে কথা বলতে বলতে নির্দ্বিধায় হাত লাগাল রান্নাঘরের কাজে| ব্যাপার হল‚ দেববাবুর আর সত্যার সম্পর্কের বিগত ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত ছিলাম বলে আমি প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ভদ্র ব্যবহার করব কিন্তু ঘনিষ্ঠতা বাড়াব না| কিন্তু মঞ্জুর হাবেভাবে মনেহল আমাকে যেন সে বহুদিন চেনে| ততক্ষণে খাওয়া দাওয়ার সেরে অতিথিরা বিদায় নিলে পরে সে সিঙ্ক পরিস্কার করছে‚ ডিশ ওয়াশারে প্লেট ঢোকাচ্ছে আর আমি অসহায় বাধা দিতে গিয়ে ক্ষণে ক্ষণে পরাজিত হচ্ছি| অথচ তার কোনো কাজই গা-জোয়ারি নয়| তার কারণ তার মধ্যেকার সহজাত ভদ্রতা এবং অচেনাকে আপন করে নেওয়ার প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা| প্রথম দিনেই সে আমার প্রিয় হয়ে উঠল| দিনের পর দিন যেতে সাক্ষাৎপর্ব বাড়তে লাগল| কিছুদিন পরে দেববাবু আর সত্যা দুজনেরই কর্মক্ষত্র পাল্টে যাওয়ায় ওর সাথে সহজ মেলামেশা করার অন্তরায় কাটিয়ে ভারমুক্ত হলাম| অনেকবার গোপনে লক্ষ্য করে দেখেছি‚ তুমুল কঠিন মুহূর্তেও মঞ্জুর কন্ঠের টোন‚ হাসিমুখের কোনো পরিবর্তন হয়না| হয়ত সে প্রচন্ড বিরক্ত তবুও তার কন্ঠস্বর ওঠেনা| ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পর আমি মঞ্জুকে অনুরোধ করেছিলাম যখন তুমি একান্তে সত্যার সাথে গলাতুলে ঝগড়া করবে আমাকে প্লিজ শুনিও তা কেমনতর ব্যাপার হয়! খুব খুব হেসেছিল সে| ------------------------------------------- মাস ছয়েক আগে সত্যার মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে| সত্যা চাকরী ছেড়ে দেশে রওনা দেয়| মায়ের অসুখ‚ আমাদের নিজেদের পক্ষে যতদূর সাধ্য করতে হবে‚ এরমধ্যে কোনো কিন্তু নেই| এরমধ্যে প্রশ্ন আসেনা‚ কেন আমাদের ওপরেই সব দায়িত্ব‚ কেন সত্যার ভাই এই দায়িত্বের ভাগ নেবেনা? ঐসব চিন্তা অবান্তর‚ আমারা কতটা কি করতে পারি সেইটেই ভাবতে হবে আমাদের| তাছাড়া ভাইয়ের সন্তান আছে‚ আমরা নি:সন্তান| আমাদের পক্ষে এ দেশ ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ- এই ছিল ওদের মনোভাব| অতএব সত্যা পাড়ি দিল দেশে| আর মঞ্জু থেকে যায় আরো ছয়মাস। চব্বিশ বছরের সংসার গোটানো সহজ কথা তো নয়! বাড়ি বিক্রি, চাকরীতে বদলি নেওয়া সব কর্তব্য মাথায় নিয়ে নি:শব্দে দায়িত্বপালনে ব্রতী হয় সে। আমি একবারের জন্যও ওকে এইনিয়ে অসন্তোষ জাহির করতে দেখিনি| আমার গুজরাটি বন্ধুদের সাথে দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধুদের এই একটা দুটো বিষয়ে মিল পাই আমি। এক,পরিবার এঁদের কাছে সর্বপ্রথম। আর পরিবার মানে শুধু নিজের রক্তের সম্পর্ক যেখানে গাঢ়, সেখানেই নয়। নিজের শ্বশুরবাড়ি, দিদির শ্বশুরবাড়ি সব সম্পর্কই সমান মান্যতা পায়। অন্যটি হল খাওয়া দাওয়ায় সাত্ত্বিক সাদাপনা ! টকদই, আচার, সম্বর। খাওয়া শেষ। আর সে কি তৃপ্তির খাওয়া! তাই বিক্রির উদ্দেশ্যে বাড়িটাকে তাকিকাভুক্ত করে মঞ্জু যখন এসে উঠলো আমাদের বাড়ি তখন রোজ রোজ চারবেলা কি রান্না করব সেই নিয়ে আমাকে একটুও ভাবতে হয়নি‚ বরং সেই তিনদিন কাজ থেকে ফিরে দেখেছি আমার জন্য গরম গরম টাটকা খাদ্যদ্রব্য অপেক্ষায় আছে! মঞ্জু নিজের সময়মত খেয়ে নিয়ে পরম যত্নে আমার আহার গুছিয়ে রেখে ক্লায়েন্ট মিটিং এ ব্যস্ত! এই তিনটে দিন আমার জীবনে অমূল্য হয়ে থাকবে| পয়সাকড়ি থাকলে মানুষকে বড়লোক আখ্যা দেওয়া হয়‚ কিন্তু ধনে-মানে সব বড়লোক অভিজাত হয়না| আভিজাত্য আসে উত্তরাধিকারসূত্রে| এক পিঁড়ি থেকে অন্য পিঁড়িতে যা প্রবাহিত হয়| মঞ্জুর জাগতিক ঐশ্বর্য্যে কতটা ধনী জানা নেই তবে আভিজাত্য তার শিরায় শিরায়! বড়ই নিরুচ্চার তার প্রকাশ| কিন্তু তার অভিঘাত সুদূরপ্রসারী| একবার কথায় কথায় বলেছিল‚ ওর প্রপিতামহের সৃষ্টি তামিলনাড়ুর প্রত্যন্ত গ্রামে একটি স্কুল আছে‚ সেখানে বংশ পরম্পায় ওদের অর্জিত অর্থ সমস্ত জমা হয়| মঞ্জুর ঠাকুর্দা ওর বাবা কাকাদের এবং ওর বাবা কাকারা মঞ্জু ও তার ভাইবোনেদের কোনো সম্পত্তি টাকা পয়সা দিয়ে যাবেন না| সমস্ত পয়সা যাবে স্কুলের ট্রাস্টে| ব্যবহারিক শিক্ষা আমাদের পূর্বপুরুষের থেকে পাওয়া একমাত্র ধন‚ যার সাহায্যে আমাদের খেটে খেতে হবে সারাজীবন| বলতে বলতে মঞ্জু হাসছিল‚ অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছিল ওর হাসিতে| এক যুগ ধরে যে বন্ধুটিকে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে ভাববিহ্বল হতে দেখিনি যাওয়ার সময় তার চোখ উপচে জল ঝরছিল ঝরঝরিয়ে| উবার ড্রাইভার দেখছে আমাদের অপলকে‚ আমি সচেতন‚ ছলছল চোখে অতি দক্ষতায় নিজেকে সামলে রেখেছি| মঞ্জুর কোনো বিকার নেই| বরাবরের মত ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশে সে বড়ই সৎ| তাদের নতুন বাড়ির নির্মাণপালা চলছে‚ সেই গৃহে সম্মানিত অতিথি হওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে‚ উবারের জানালায় আঁকা সেই প্রিয় মুখটি রাস্তার বাঁকে হারিয়ে গেল অনেক অনেকদিনের জন্য!

1061

94

মোহিতলাল v2.0

শটকে শঙ্খ হ'

শ'টকে শঙ্খ হ (১০) কলকাতা‚ দোতলা বাস এবং শিবপুর প্রিয় সুবর্ণা‚ তুমি খেই হারিয়ে ফেলছো বুঝতে পারি‚ আগে পরে হয়ে যাচ্ছে‚ তাই না? আরে স্মৃতির ফাইল কি পর পর সিরিয়্য়ালি খোলে; জগাখিচুড়ি পাকিয়ে আছে সব‚ যখন যেটা সামনে আসে‚ shuffle modeএ| তোমার অসুবিধের কথা মনে রেখে যতটা পারি ক্রমানুসারে লিখতে চেষ্টা করবো| (২) স্কুলের পাট শেষ হবো হবো‚ তেমন কোন কেরিয়ারের চিন্তা তখনকার দিনে আমাদের মধ্যে ছিল না; একে মফ:স্বলের শহর তার ওপর গ্রামের ছেলে| দিনকাল অন্য রকম ছিল; মেয়ের মা জামাই হিসেবে ব্যাঙ্কের চাকুরেকে বেশী প্রাধান্য দিতেন কারখানার শ্রমিকের চাইতে| মধ্যবিত্ত বাঙালী পরিবারে কারখানার মজদুর বিয়ের হাটে অচ্ছ্যুৎ প্রায়| এসব বোধহয় জমিদারী সমাজের তলানির প্রভাব! খাটবো না‚ পায়রা ওড়াবো- এরাই রোল মডেল ছিল মনে হয়‚ যেটা কাটতে বিশ পঞ্চাশ বছর লেগে গেল| উত্তম কুমার বিশ্বজিতের মত লালটু চেহারার অভিনেতারাই হিরো| আজকের সব্যসাচীরা তখনও অনাদৃত! সত্যি বলতে কি কেরিয়ার- সাদা বাঙলায় কি করে খাবো সে সম্পর্কে খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা খুব কম ছেলেদের ছিল‚ 'ছেলে' ইচ্ছে করেই লেখা‚ তখনও মহিলারা আনুপাতিক হিসেবে কম সংখ্যায় চাকুরী করতেন| অবশ্য একেবারেই যে ছিল না তাও নয়| (৩) ইংরেজীর স্য়ার শিবদাসবাবু ক্লাশে তাঁর পুরোনো ছাত্রদের কথা বলতেন আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে- 'অশোক‚ গ্লাসগো থেকে ফার্ষ্ট ক্লাশ ইঞ্জিনীয়ার' অথবা 'তপন‚ শিবপুর থেকে পাশ করে.... অমুক ‚ তমুক্'| তুমি ভাবছো তা কি করে সম্ভব‚এতটাই অজ্ঞতা; আজকাল যেখানে পানওয়ালা থেকে কাজের মাসী অবধি জয়েন্টের খবর রাখেন (no offences meant)! ইয়েস‚ আমি অন্তত জয়েন্ট এনট্র্যান্সের খবর পাই ক্লাশ ইলেভেনের শেষের দিকে| কেরিয়ার প্ল্যানিং বস্তুটা তখন এমনিই ছিল| লাগে তুক‚ না লাগে তাক| যাইহোক‚ স্ংক্ষেপে সারি‚ জয়েন্ট দেয়া হল; না‚ আলাদা কোন প্রস্তুতি নয়‚ ঐ ক্লাশ ইলেভেনের পরীক্ষার পরপরই কিনা| তখন অবশ্য তেমন কোন কোচিং ক্লাশ ছিল কি? ব্রিলিয়ান্ট কোচিং এর নাম মনে পড়ছে‚ সে অবশ্য কলকাতা বা বড় শহরে| ওহ‚ সেই প্রথম পরিচয় পোষ্টাল অর্ডারের সন্গে‚ অত সুন্দর ব্যাঙ্ক নোটের মত দেখতে‚ পুরোনো দিনের নম্বরী নোট অর্থাৎ একশো টাকার নোটের সাইজের| কিন্তু তার পর থেকে চাকরীর দরখাস্তের সন্গে এই বস্তুটি ওতপ্রতভাবে জুড়ে যায়‚ তাই পোস্টাল অর্ডারের প্রতি আমার কেমন যেন pathological hatred! (৪) বেড়ালের ভাগ্যে ভাগ্য়িস শিকে ছিঁড়েছিল‚তখন এত মণিপাল বা দুরদুরান্তের কলেজের রমরমা ছিল না| সবেধন নীলমণি চার পুর- শিবপুর‚ যাদবপুর‚ খড়গপুর‚ দুর্গাপুর আর জলপাইগুড়ি| যাই হোক‚ শতরঞ্চি মোড়া বেডিং ও স্টীলের ট্রাঙ্ক সমেত‚ 'চল পানসি শিবপুর'| বেশ মনে পড়ে‚ প্রসপেক্টাসে লিষ্টিতে দেয়া ছিল কি কি নিয়ে হোষ্টেলে যেতে হবে- লম্বা লিষ্ট‚ তাতে সাহেবী জানার কেতার ছাপ স্পষ্ট; মজার কথা হল তোয়ালের উল্লেখ ছিল তাতে; সে এক ঝক্কি‚ সারা জীবন গামছা ব্যবহার করে অভ্যস্ত‚ ঢাউস তোয়ালে দিয়ে কি করে গা মুছবো সেই চিন্তায় ঘুম হয় না| অবশ্য এসব প্রসপেক্টাসের চটি বই এর কথা‚ হয়তো পঞ্চাশ ষাট বছর আগে লেখা হয়েছিল‚ সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিয়াছে‚ মক্ষী কে মক্ষী ছেপেই চলেছে! (৪) পরদিন সকালে চান করতে গিয়ে তো আবার আবিষ্কার‚ মাথার ওপর কলের জলে চান তো অভ্যেস নেই‚ কাউকে জিজ্ঞেস করতেই পারিনে লজ্জায়‚ ভাগ্যিস বাথরুমে দরজা ছিল‚ আমার আনপড় অবস্থা ধরা পড়ার ভয় নেই| শাওয়ার রোজের জায়গায় অবশ্য শুধুই নল‚ ঝিরঝিরে ধারার বদলে গল গল করে জলের তোড়; তবুও সত্যি বলতে কি কাক চান করার মতো ই মনে হয়েছিল প্রথম বার‚ পুকুরে নদীতে ডুব দেবার অভ্যেস ত্যাগ করা কি এতই সোজা! ফোর্থ‚ ফিফথ ইয়ারের সিন্গল সীটার হোষ্টেল গুলোতে সত্যিই বাথরুম খুল্লম খুলা ছিল| নো দরজা! অনেক অনেক বছর পরে‚ এদেশে এসে দেখি‚ সুইমিং পুল বা জিমের চেঞ্জরুমে কোন দরজাই নেই‚ বুড়ো দামড়ারা বেমালুম উদোম হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে| শিবপুর খোদ সাহেবদের স্থাপনা করা কলেজ তো‚ তাদের দেশের রীতি রেওয়াজই চালু করেছিল এবং পরে সেটা আর কেউ বদলাবার কথা ভাবেনি| (৫) জানো বোধহয়‚ শিবপুর পুরোপুরি রেসিডেন্সিয়াল (এখন নাকি বদলে গেছে)‚ কলেজের গেটের বাইরে বাড়ী হলেও কি তোমায় হোষ্টেলেই থাকতে হবে| কারণটা বোধকরি কলেজের টাইমিং এর জন্যে; সকাল সাতটা থেকে এগারোটা‚ দুঘন্টার চান খাওয়ার ছুটি‚ আবার একটা থেকে চারটে| রীতিমত আঁটোসাঁটো রুটিন‚ পঁয়ত্রিশ প্লাস চার ‚ মোট ঊনচল্লিশ ঘন্টা‚ এখন ভাবতেই গায়ে জ্বর আসে| (৬) মপ্ফ:স্বলের শহর থেকে খোদ কলকাতা কুঁয়ার ব্যাঙের সাগরে গিয়ে পড়ারই মতো প্রায়| কলকাতার ছেলেরাই সংখ্যায় ভারী‚ তা ছাড়াও সারা পশ্চিমবন্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সব সহপাঠীরা‚ কত বিচিত্র কথার টান‚ অচেনা অদেখা শহরের‚ গ্রামের ছেলেরা‚ সদ্য এগারো ক্লাশ পাশ‚ ১৭ কিংবা ১৮ র পাশাপাশি বয়সের| হুম‚ তখন সেই 'বয়স'! যদি আবার ফেরৎ পেতাম| (৭) ক্যাম্পাসের একটু বর্ণনা দিই‚ তোমার পক্ষে পরিবেশটা বুঝতে সুবিধে হবে| শিবপুর একটা মিনি শহর‚ কলেজ‚ ল্যাবোরেটরি‚ ওয়ার্কশপ‚ বিশাল বিশাল বয়লার‚ চিমনী তো ছিলই| ছিল একটা আস্ত হাই স্কুল‚ প্রাইমারী স্কুল‚ একটা পলিটেকনিক| আড়াই হাজার ছাত্রের বাস কুড়ি বাইশটা হস্টেল জুড়ে; শিক্ষক‚ প্রফেসরদের কোয়ার্টার‚ কর্মচারীদের ব্লক অফ ফ্ল্যাট্স‚ এলাহি কান্ড| আরও ছিল‚ একটা ছোট্ট হাসপাতাল‚ জিমন্যাসিয়াম দু দুটো ঢাউস খেলার মাঠ‚ ধোপাদের কাচবার পুকুর এবং মাছ ধরবার ঝিল| ও আসল জায়গাটার উল্লেখ করতেই ভুলে গেছি একদম‚ ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন‚ একেবারে লাগোয়া; কয়েকশো একরের ঐ গার্ডেন কলেজের অ্যানেক্স বলাই ঠিক হবে‚ উঠতে বসতে কারণে অকারনে আমরা যেতাম সেখানে| ফ্রী এরকম বেড়াবার জায়গা! আর অন্য আকর্ষণও ছিল‚ অনেক অনেক শাড়ী পরিহিতা পাখিও আসতো কলেজ কেটে‚ এদিক থেকে হবু ইঞ্জিনীয়ারগণ; বটানির কো-এডুকেশান আর কি! আবার ক্যাম্পাসের পেছনের বাউন্ডারি বেয়ে গঙ্গা| দ্বিজেন্দ্রলাল বোধহয় আমাদের ক্যাম্পাসে বসেই লিখেছিলেন‚ 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি'! আইডিয়াটা পেয়েই ক্যাম্পাসের জায়গায় দেশ জুড়ে দিয়েছেন! (৮) সবই কিন্তু স্মৃতি থেকেই লিখছি‚ পাশ করার পর আর যাওয়া হয়নি তেমন | সব ক্যাম্পাসই বোধ হয় এরকমই হয়; পরে ছোট বড় অনেক ক্যাম্পাসে থেকেছি কিন্তু কেন জানিনা শিবপুরের ঐ পাঁচ বছরের কথাই ঘুরে ফিরে আসে| (৯) বুঝলে সুবর্ণা‚ বৃত্ত বেড়েই চলেছে- গ্রাম থেকে আধা শহরে সেখান থেকে আবার কলকাতায়| এঁদো পুকুরে ঢিল ফেললে বৃত্ত বাড়তেই থাকে আবার ধীরে ধীরে তা মিলিয়েও যায়| 'আমরা যথা হইতে আসি তথায় ফিরিয়া যাই'| বাইরে পরিধি যত বেড়েছে আমি ততই যেন নিজের মধ্যে বেশী করে গুটিয়ে গেছি| এখানেই শেষ করি এই কাহিনীর‚ পরে সময় পেলে কোনদিন কলেজ জীবনের সুখ দু:খ‚ প্রথম যৌবন‚ ছেঁড়া ছুটো প্রেম এর উপাখ্যান লেখার ইচ্ছে রইলো| হ্যাঁ‚ তখনকার দিনে প্রেমিকা হতো‚ গার্ল ফ্রেন্ড নয়‚ যখন আঙুলে আঙুল ঠেকে গেলে সোনা হতো| ইতি‚ শুভেচ্ছাসহ‚ সুহাস -- একের পিঠে শূণ্য দিলে দশ হয় দশের শূণ্য নামে হাতে এক রয় | (শেষ)

368

50

Kaushik

গীতালি‚ চন্দ্রনাথ‚ আর নববর্ষ

- তুই তার মানে প্যান্ডেলের পারমিশন নিতে যাবি না? - কাম অন গীতু! সত্যি করে বল তো - এই সব হুজুগের কি কোনো দরকার আছে? - এতে হুজুগের কি দেখলি? আর দরকারটাই বা নেই কেন? - আরে‚ নতুন বছর নিয়ে এই আদিখ্যেতার মানে কি! সেই তো পৃথিবী সূর্যর চারিদিকে পাক খাবে আর লাট্টুর মতন ঘুরবে; দিন-রাত হবে আর তার থেকেই একটা দিনকে "নতুন বছর" বলে তোরা লাফাবি; কিছু লোক পার্ক স্ট্রীটে আর কিছু জোড়াসাঁকোতে গিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করবে| এই তো? - তাই নাকি! তবে তো রবীন্দ্র জয়ন্তীতেও কোনো অনুষ্ঠান না করলেই হয়| আর প্রতি বছর ৭ই নভেম্বরেই বা গলার শিরা ফুলিয়ে‚ হাত মুঠো করে কি প্রমাণ করতে চাস? - যে উদাহরণ দুটো দিলি‚ তার সাথে এই কেসটার পার্থক্য আছে - সেটা বুঝতে শেখ! দুটো কেস এক নয়| - নেচারটা অবশ্যই এক নয়‚ কিন্তু ডিগ্রীটা একই! - তোকে বলেছে! যা বুঝিস না‚ তা নিয়ে কথা বলতে আসিস না| - ঝগড়া করবি না| লজিকে আয়! - আবে‚ কিসের লজিক! যে ক্যালেন্ডার মেনে সারা বছর একটাও কাজ করিনা‚ সেই ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনে উদ্বাহু হয়ে নাচা আমার পোষাবে না! - সে তো ধ্রুপদি মার্ক্সিজিম মেনে দুনিয়াতে একটাও দেশ চলে না; তাতে কি ব্যাপারটা মিথ্যে হয়ে যায়‚ নাকি তার জন্য তোরা রাজনীতি করা ছেড়ে দিয়েছিস? - ধুর! এটা কোনো লজিকই নয়! ১লা বৈশাখ‚ ২৫ শে বৈশাখ‚ ২২শে শ্রাবণ - এই তো দৌড়! এর বাইরে একটা তারিখও কেউ মনে রাখে না| তাই বাংলা নতুন বছর নিয়ে আদিখ্যেতা আমার কাছে অন্তত ভাবের ঘরে চুরি! - তা নয় রে চাঁদু! গত বছর সেমিস্টারের পরে বাবার সাথে একটা সরকারি অনুষ্ঠানে গেছিলাম| অরুণাচলের লোহিত ডিস্ট্রিক্ট| ওখানকার মিশমি জনজাতীর মানুষদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ছিলো| ডায়াসে বসা সব ডেলিগেটরা মিশমিদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পড়েছিলো| তাই এই বাংলা নববর্ষ উদযাপনটাকেও একই ভাবে দেখতে কি তোর খুব অসুবিধে হচ্ছে? - বুঝলাম| মানে‚ একটা endangered ক্যালেন্ডারকে বাঁচানোর ঠেকা নিতে হবে| তাই তো? - ঠেকা নেওয়ার তুই-আমি কেউ নই রে চাদুঁ! প্রতি বছর নীলার সাথে যে ঢুলতে ঢুলতে ডোভার লেনে গিয়ে বসে থাকিস - কেন থাকিস? ওই ধরনের গান বাজনায় তো তোর কোনো উৎসাহ নেই‚ তবু কেন যাস? ওর ভালো লাগবে বলেই তো যাস|! সে ভাবেই ভাব না ব্যাপারটাকে| - মানে? কার ভালো লাগার জন্য নববর্ষ উদযাপন করতে যাবো? তোর? - আমার ভালো লাগা নয় রে গাধা! নববর্ষ উদযাপনের সাথে অনেক মানুষের ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে| আমরা পয়লা বৈশাখের একটা অনুষ্ঠান করলে কিছু মানুষ যদি খুশি হয় - সে টুকু বুঝবি না| - আরে‚ তার জন্য আমরা কেন? ইউনিভার্সিটি কেন? পাড়ায় পাড়ায় তো হচ্ছে ম্যারাপ বেঁধে অনুষ্ঠান| লোকে সেখানে গেলেই তো পারে! - বোকা বোকা লজিক দিস না! তা হলে তো সারা কলকাতার দূর্গা পুজো কমিয়ে একটাতে নামিয়ে আনলেই হয়! সকলে সেখানে গিয়েই ঠাকুর নমো করে আসবে না হয়! - প্রচন্ড বোকা বোকা ব্যাপার! ধুর শালা‚ এই জন্য তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না| - যাক! মেনে নিয়েছিস তা হলে| যা‚ এবার সোনা ছেলের মতন ভিসির কাছে পারমিশন নিতে যা| - ফোট‚ তোর ওই সব ঢপের লজিক কোনো লজিকই নয়! তোর ওপর দয়া করে যাচ্ছি কথা বলতে - বুঝলি! - তাড়াতাড়ি যা - ভিসি বেড়িয়ে যাবেন নইলে| আরে চাঁদু‚ শুনে যা! - কি? - শুভ নববর্ষ!

122

9

মোহিতলাল v2.0

আজকের আপডেট

আজকের আপডেট-২৫ ছুটিই ছুটি| কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠছি‚ কস্মিনকালে ভেবেছি যে এমনি হেলায় বেলায় দিন কাটাবো| সকালে ওঠার তাড়া নেই‚ টু ডু লিষ্ট নেই‚ অফিস পলিটিক্স নেই| একেবারে নির্ভেজাল ছুটি‚ অলটার্নেট বৃহস্পতি বারে ব্যাঙ্কে মাইনে জমা পড়ছে| এক একবার ভাবছি দেশে গিয়ে বসে থাকি নদীর পাড়ে অথবা হাটখোলায় চায়ের দোকানে| গতকাল বসেছিলাম আমার ট্রাঙ্ক খুলে| গত ৫০ বছরের সাথী‚ সেই যখন প্রথম বেরিয়ে পড়ি বাড়ী থেকে| তবে এটা সেই ট্রাঙ্ক নয়| একে ওকে দিয়ে এটা হলো নবতম এডিশান- ২৭ বছরের পুরানো| ভারতবর্ষে বিভিন্ন শহরে রিকশার ডিজাইনে যেমন বৈচিত্র্য থাকে‚ ট্রাঙ্কেও তেমনি| (২) সেই ক্লাশ নাইনে ছিল নতুন বউ শ্বশুরবাড়ী যাবার ডিজাইন| স্টীলের রঙ করা‚ ওপরের ঢাকনা arch টাইপের‚ নতুন রঙের গন্ধ থাকতো| বড়জোর কুড়ি পঁচিশ টাকা তার দাম| না না আমি ফুল লতাপাতা আঁকা সুটকেশের কথা বলছি না| গাঁয়ের লোক হলেও সেখানে আমার বাপাকাকা রীতিমত ধনী- এই ধনী ব্যাপারটা তো আপেক্ষিক| মিলিটারি ট্রাঙ্ক আবার কালো রঙের rectangulaar paaraallelopiped‚ সেটা শহুরে বন্ধুদেরকে ব্যবহার করতে দেখেছি| বম্বেতে একটা কিনেছিলাম 'দাদার টিটি' থেকে‚ সেটা বোধহয় ৩৪"‚ সলিড স্টীলের| সেসব কোথায় যে হারিয়ে গেছে| এই নবতম সংস্করণটি ব্যাঙ্গালোরের- গ্যালভানাইজড স্টীলের| আসলে অন্তর্বর্তী সময়ে স্টীল মিলের অনেক উন্নতি হয়েছে তো| এই শর্মা কিছুদিন স্টীল মিল ইকুইপমেন্ট ডিজাইন অফিসে ঘষটেছে কিনা| (৩) কাজের কথায় আসি| মেঝেতে বসে এক এক করে স্মৃতির ঝাঁপি খালি করতে লাগলাম| তেমন কিছু অ্যান্টিক নয় যদিও| মেয়েদের KG স্কুলের রিপোর্ট কার্ড‚ তাদের দু একটা এক্সার্সাইস বুক‚ ছোটবেলার জামা এক আধটা| এখানে আসবার সময় ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র (কোন একটা আইনে যেন পরেও রেজেষ্ট্রী করা যেত!)‚ বিবিজানের প্রথম মাইনের পে-স্লিপ| তখন তিনি ট্রেনিং করতেন‚ ওরা সামান্য কিছু সাম্মানিক দিতো‚ একেবারে প্রথম সপ্তাহের ‚ মাত্র ২৫ ডলার| আমি তো তখন কাঠ বেকার সরকারী doleএর উপর নির্ভরশীল| আমার একমাত্র CVর কপি‚ এখানে চাকরী পেয়ে আর নতুন করে বানানোর প্রয়োজন পড়েনি‚ সেটাই এদেশে প্রথম ও শেষ| আসলে কিছু ঘটনা ঘটে যার ফলে আর অ্যাম্বিশানে ঘি ঢালিনি‚ 'কাঠের উনুনে' অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে ভাতেভাত ফুটিয়ে চালিয়ে দিয়েছি! প্রসঙ্গত: দেশ থেকে মানে সেই হাটখোলা থেকে কেনা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে এখনও ভাত সেদ্ধ হয়- তফাৎ কেবল মোটা লাল চালের বদলে ইন্ডিয়া গেট পারবয়েলড রাইস‚ আর উনুন হলো গিয়ে মেড ইন জার্মানী গ্যাস কুক টপ| অবশ্য আমার কাছে ভাত ইজ ভাত‚ লাল চালই হোক বা বাসমতী- তফাৎ হলো কি তরকারী বা ডাল‚ কি তাদের স্বাদ| তবে বাঙলা উপন্যাসে মাঝে মাঝেই 'ধবধবে সাদা গোবিন্দভোগ চালের ভাত' পড়ি‚ ব্যাপারটা কি আমার মাথায় ঢোকে না| (৪) ওহ‚ আরও কিছু মূল্যবান টুকি টাকি বেরোলো ট্রাঙ্কের পেট থেকে| আমার কিছু কয়েন কালেকশান| এক সেট ব্রোঞ্জের সব খেলার প্রতীক সহ সিডনী অলিম্পিকের স্মারক| সে সময় একটা সোনার পেন্ড্যান্ট‚ বিবিজানের নিমিত্ত‚ তিনি ওটা পরেনই না‚ লাল নীল লোগো যদি ব্যবহারে ক্ষয়ে যায়| কিছু পুরানো ফটো‚ স্টুডিয়োর খামে‚ মেয়ের স্কুলের বাসpass‚ কিছু বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র‚ যাদের বিয়ের তাদের কাছেই হয়তো নেই! ওহ‚ আমার ক্লাশ ফাইভ‚ সিক্স থেকে উ:মা: অবধি স্কুলের মার্কশীট‚ নম্বরগুলো এখন অর্থহীন কিন্তু তার জন্য সেই সময় কত না হেরিকেনের আলোয় প্রাণপাত করেছি| জানি আর কিছুদিন‚ বছর বাদে ওগুলো রিসাইক্লিং বিনে ফেলে দেবে কেউ| ক্লাশ ফাইভের ইংরেজীতে আমার ৮৭ কোনদিনও চারুবালার ৯২ ছুঁতে পারবে না| সে কি এখনও আছে‚ শেষ দেখা হয়েছিল তখন সে বয়স্কা ঠাকুরমা‚ তার বৌমা‚ পাড়া নাতি নাতনী পরিবৃতা‚ কানে কম শোনে‚ পাড়ওয়ালা সাদাখোলের শাড়ী‚ হেডমাষ্টার স্বামী প্রয়াত| নাহ‚ ঝাঁপি বন্ধ করা যাক| অনেক কাজ পড়ে আছে‚ ওয়াশিং মেলে দিতে হবে‚ ঝিঙে কুটে রাখতে হবে| আগামীকাল আবার হেলেন্সবার্গে লর্ড ভেকটেশ্বর মন্দিরে যাবার কথা হচ্ছে| ए काज कब मुझे छोड़ेगा?

932

106

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

ঠাম্মা ঠাম্মা বলতে একজন বেশ লম্বা চওড়া বাংলা করে সাদা খোলের শাড়ি পরা একজনকে মনে পড়ে| খজুরির বারান্দা থেকে উঠোনে নামছে| আর মনে পড়ে মায়ের চুল খোলা‚ মা খুব কাঁদছে| আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি| তারপরে ঠাম্মাকে দেখেছি শুধু ই ফটোতে| মুখশ্রী অপরূপ নয়| আমার ঠাকুরদার রূপবান হিসেবে খ্যাতি ছিল| ঠাকুরদার বাবা খুব অল্প বয়সে মারা যান| তার আগে জমি সম্পত্তি সব খুইয়েছিলেন নেশা করে| সে অন্য গল্প| ঠাম্মার বাবা ছিলেন ঢাকার ডাক্তার| বেশ কটি ছেলে মেয়ে| মেয়েদের সবার ই বিয়ে দিয়েছিলেন শিক্ষিত মানুষ দেখে| ঘটনাক্রমে তারা বেশ রূপবান ও ছিলেন| একজন ছাড়া| ঠাম্মার আগের দিদির বিয়ে হয়েছিল যাঁর সাথে তিনি ডাবল এম এ| মায়ের কাছে শুনেছি এই দাদু খুব কালো ছিলেন| তা‚ এই দিদা লোপাদির কাছে দুঃখ করতেন‚ তোর ঠাকুরদা দেখতে ভালো ছিল না একদম| লোপাদি বলতো‚ "ঠাকুরদা যে ডাবল এম এ হয়ে তোমার মত নিরক্ষর মহিলাকে বিয়ে করেছিল সেইটা ভেবে আনন্দে থাকো|" দাদুকে ঠাম্মার বাবা বলেন ডাক্তারি পড়াবেন| দাদু ক্যাম্পবেল স্কুল থেকে ডাক্তারি পাস করলে পর ঠাম্মার সাথে বিয়ে হয়| ঠাম্মা তখন ১৪‚ দাদু ২৭/২৮| দাদু রেলে জয়েন করেন| পোস্টিং ছিল খজুরিতে| পুরোপুরি গ্রাম| চারপাশে ও তাই| আশে পাশে আর দু একটি বাঙালি পরিবার‚ বাকি সব মৈথিলী‚ কিছু নেপালী ও ছিল| ডাক্তার বলতে ঐ একজন| দাদু কে রোগী দেখতে‚ ডেলিভারি করাতে অনেক দূর দূর যেতে হত| এসে ইচ্ছে করে ঠাম্মাকে রাগাবার জন্য রোগিনী র হাত কি ভাবে ধরে নাড়ি দেখেছেন সেই গল্প শোনাতেন| কিশোরী বধূটি রেগে কথা বন্ধ করে দিতেন| ছোটবেলা থেকে নাকি ঠাম্মা বলতো "আমার ১০ ছেলে মেয়ে হবে|" হয়েও ছিল| একটি হওয়ার পর পর ই চলে যায়| বাদবাকি ৩ মেয়ে‚ ৬ ছেলেকে প্রচুর কষ্ট স্বীকার করে মানুষ করেছেন| সবসময়ে একসাথে দুজনের কাঁথা শুকোতো ঠাম্মার ঘরে| গ্রামে থাকলে পড়াশোনা হবে না| এত ছোট বয়সে হোস্টেলে পাঠিয়েছেন‚ যে তখন আমার বাবা পায়জামা র দড়ি নিজে বাঁধতে পারতো না| ক্লাস ওয়ানে পড়ে| দু বছরের বড় মেজদা দড়ি বেঁধে দিত| হস্টেলে জায়গা পায় নি বলে বাবা আর বাবার দুই দাদা হোটেলের এক ঘরে থেকে পড়তেন| শুনেছি দ্বারভাঙ্গার সেই হোটেলের ঘরে তখন থেকে শুধু ছাত্র রাই থাকেন| বাবার এই পরিবেশে থেকে‚ খাবার দাবারের অব্যবস্থায় ৪ বার টাইফয়েড হয়েছিল| তাও ঠাম্মা দমে যান নি| বাকি ৩ ভাই কাছাকাচি জয়নগরে পড়তো| সেখানে ভাতের সাথে আলুসেদ্ধ পাওয়ার জন্য ঠাকুরকে ঘুষ দিত কাকারা| একবার বাড়িতে মাংস হচ্ছে শুনে এক কাকা ট্রেন ধরে চলে এসেছিল| ঠাম্মা বাড়িতে ঢুকতে দেন নি| "মাংস খাবার লোভে চলে এসেছিস?" কাকা তারপর গিয়ে ট্রেনের কামরায় লুকিয়েছিল| মেজদাদু দেখতে পেয়ে বাড়ি নিয়ে আসেন| "বৌদি‚ তুমি মা না রাক্ষসী?" কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার‚ বাপিরা সবাই দেখতাম ঠাম্মাকে খুব ভালোবাসতো| পুজোর সময়ে সবাই একরাহি যেতাম| পথে খজুরি| সেবার বিজয়ার পরেই| ঠাম্মা কি কারণে খজুরিতে ছিল| হঠাৎ শরীর খারাপ| সবাই একরাহি থেকে এসে পড়লো| ঠাম্মাও রওনা হয়ে গেল অনন্ত যাত্রায়| ৬০ বছর ও বয়স হয় নি| আর কিআশ্চর্য‚ ৯ ছেলে মেয়ে যারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে‚ তারা পুজো উপলক্ষে সবাই তখন ওখানে| ঠাম্মা ভালো গান করতো| বাপিকে গানের প্রথম পাঠ ঠাম্মা ই দিয়েছিল| আর বাপি কলকাতা থেকে নতুন গান শিখে গিয়ে ঠাম্মাকে শোনাতো| এরকম ভাবেই শুনিয়েছিল‚ আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা‚ আমি যে পথ চিনি না ... আর একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে ... বাপি গল্প করেছিল - "জানিস একবার মা কে নিয়ে কলকাতায় এসেছি| ট্রেন থেকে নেমে ট্রামে চাপলাম| এখন ভাবি মায়ের হয়তো কতই ক্লান্ত লাগছিল| ট্যাক্সি নেওয়া উচিৎ ছিল| ঐ বয়সে বুঝি নি|" বাপি ও চলে গেছে আজ কতদিন হল| আমার ও এরকম কত আক্ষেপ‚ কিছু ই করা হয়নি বাপির জন্য| যুগে যুগে বুঝি ছেলে মেয়েরা এক ই রকম ভাবে| আর বাবা মায়েরাও - শুধু ই সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন| তারা ভালো থাকলেই তাঁদের আর কোন আক্ষেপ থাকে না|

750

69

সুচেতনা

জমানো দুপুর

আমার ঘুম বড় অদ্ভুত। ঘুমের মধ্যে জ্ঞান থাকে। হিসেব করতে পারি। ঘুমের মধ্যেই নিজেকে বলি মনে মনে যখন এত কিছু পারছি, তখন নিশ্চয়ই আমি জেগে আছি, ঘুমিয়ে নেই। ঘুম থেকে ওঠার পরেও ঘুমের মধ্যে কী কী দেখেছি, কী কী ভেবেছি সব ছবির মত মনে থাকে। শুধু সময়জ্ঞানটা থাকে না। স্থানকাল খেয়াল থাকে না। সেদিন ভরসন্ধ্যেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না। ছেঁড়া ঘুম। যতবার আধোঘুমে চোখ মেললাম, সব অন্ধকার, নিশ্চুপ দেখে ঘুমের মধ্যেই ভাবছিলাম রাত দুটোতিনটে হবে। ছেলে যখন দরজায় চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকছিল, তখন সেই আওয়াজে ঘুমের মধ্যেই মনে হল - এত রাতে চোরই নিশ্চয়ই চাবি ঘুরিয়ে ঢুকছে ঘরে, ঘুমের মধ্যেই "কে কে" বলে এমন চেঁচালাম, ছেলে দরজা খুলে ভয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেল, প্রতিবেশিনী ছুটে এলেন। ঘড়িতে তখন মোটে সন্ধ্যে আটটা। আজকাল নতুন উপসর্গ হয়েছে। ঘুমের মধ্যে অতীতভ্রমণ। ফেলে আসা সময়গুলো ছবির মত দেখতে পাই। বড় জ্যান্ত ছবি, নিজেকে সেই ফেলে আসা মুহুর্তটাতেই দেখতে পাই। দুপুরবেলায় বড় ঘুম পায় আজকাল, ঘুমোতে তো আর পাই না দুপুরবেলায়। অথচ বছর তিরিশেক আগেও মা বৃহস্পতিবারের দুপুরে আর রবিবারের দুপুরে, তারপর গরমের ছুটির দুপুরে রোজ সাধ্যসাধনা করত, একটু ঘুমিয়ে নিতে। আমার সেই ঘুমটুকুরও সময় হত না তখন। সেই পাপেই মনে হয়, এখন দুপুরবেলা এত ঘুম পায়। বিয়াল্লিশবছরের ফেলে রাখা ঘুম শোধ তুলতে চায়। তাই হয়তো রাতের বেলায় আজকাল আমাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে তিরিশ-বত্রিশ বছর আগেকার দুপুরগুলোয়। তখন সুবিধেমতন দশবছরের বা বারোবছরের মেয়ে হয়ে যাই। বিয়াল্লিশবছরের বুড়িটা গালে হাত দিয়ে দেখে নেয় সেই উমনোঝুমনোটাকে। যেসব দুপুরবেলাগুলো আজকাল রাতেরবেলায় হানা দেয়, তেমন কয়েকটা লিখে রাখলাম। ভাগ্যিস ঘুমের মধ্যে ফেলে আসা দুপুরগুলো দেখতে পাচ্ছি, তা নয়তো স্মৃতিশক্তির যা অবস্থা হয়েছে আজকাল! কত কিছুই যে জমে থাকে ছাই! থাকুক তবে জমে। #জমানোদুপুর-১ আমার সেই পুরনো ঘরের সরু খাট। বালিশের উপর শিউলিবাড়ি। বইয়ের আদ্ধেক অব্দি পড়ে চোখ বন্ধ করে উপুড় হয়ে দেখছি - রুক্ষ পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বেয়ে একটা লোক উপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। চওড়া পিঠ, বড়সড় কাঠামো। উঁচু পাথর, ঝোপঝাড় কিচ্ছু মানছে না। ঝোপের গাছ মুঠো করে খাবলে ধরে দিব্যি টপাটপ পাথর চড়ছে, তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার পিঠের সাদা পিরাণটা খোঁচা লেগে ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। বহু দূর থেকে ঝপঝপ করে জল পড়ার আওয়াজ হয়েই চলেছে। আওয়াজটা থামছে না। কোথা থেকে জল পড়ছে, দেখাও যাচ্ছে না। আমিও দেখতে পাচ্ছি না, লোকটাও পাচ্ছে না। আমি জানি লোকটা কোথায় যাচ্ছে। একটা নদীর উৎসমুখ খুঁজতে। লোকটার কাছে ম্যাপ নেই, কম্পাস নেই, কিচ্ছুটি নেই। #জমানোদুপুর-২ এখন আসলে আর দুপুর নেই। কখন যেন দুপুর গড়িয়ে আলতো অন্ধকার আসি আসি করছে। মায়ের বড় খাটে মধ্যিখানে জোড়া হাতি আঁকা জয়পুরি চাদর। মা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু মায়ের হাতে এখনো আলগোছে ধরা 'ফাঁসির মঞ্চ থেকে'। আমার হাতে মোটা একটা বই - প্লাস্টিকের জ্যাকেট পরা অপু। প্লাস্টিকের জ্যাকেটের ধারগুলো ছিঁড়ে এসেছে। আমি বসে আছি সতুদের বাগানে। বসে বসে দেখছি - রাণুদি কাজলকে ভাত আর মাছ মেখে গরাস পাকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের শোওয়ার ঘরের কোনে কে ওটা দাঁড়িয়ে আছে? আমি তো বাগানে ছিলাম, আমাদের ঘরের ভিতরটা দেখতে পাচ্ছি কী করে? শাড়ি পরে টিপ পরে দাঁড়িয়ে আছে। গুনগুন করে কী যেন বলছে! আমাকে বর চাইতে বলল কি? কিন্তু আমি তো ভালো মেয়ে নই। তবে? #জমানোদুপুর-৩ শীতকাল। গায়ে হাল্কা গোলাপি রঙের উলের চাদর জড়িয়ে একটা কমলালেবু রঙের দুপুরে মায়ের পাশে মাদুরে বসে আছি। আমার হাতে গালিনা দেমিকিনার বনের গান। আর মায়ের হাতে দেশ। আমার হাল্কা গোলাপি রঙ বড় প্রিয় বলে দিদা নিজের হাতে এত বড় উলের চাদর বুনে দিয়েছে। বাবার ছাই রঙা শালটা বড় আরাম, ওটা গায়ে জড়ালে মনে হয় বাবার কোলে বসে আছি, তাই ওটা জড়িয়ে থাকতাম সবসময় শীতকালে। সোয়েটার পরলে আমার গা কুটকুট করে। তাই দিদা আমাকে উলের চাদর বুনে দিয়েছে। আমাদের বাড়িতে রোদ আসে না বলে মা শীতের দুপুরবেলায় বাড়ির সামনের মাঠে বসে রোদ পুইয়ে নেয়, আমিও মায়ের পাশে বসি তখন। বনের গান বইটা আমার বড় প্রিয়। তিনটে গল্প আছে। কিন্তু শেষের গল্পটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় - আমার কাপ্তেন। পেতিয়া নামের একটা ছেলে হাঁটতে পারে না, তার গল্প। হর্তাকর্তা মিনসে তাকে খবরের কাগজ কেটে হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দিয়েছিল। ওটা বনবনদি ফিরছে না কলেজ থেকে? ছোট্ট ছোট্ট হলুদ কল্কা বসানো বাদামি রঙের শাড়ি পরে! দৌড়ে গিয়ে বনবনদির হাত ধরি, বনের গান খুলে দেখাই, "বনবনদি আমাকে এরকম হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেবে?" বনবনদি কখনো কাউকে "না" বলে না। বলতেই জানে না। বনবনদির হাত ধরে জেঠিমার বাড়ি। জেঠু-জেঠিমাও খবরের কাগজের তাড়া নিয়ে আসে, বনবনদি হাসিমুখে বসে বসে আমাকে এত এত হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেয়। বাবাইদাদা দেখে মুচকি হেসে বলে, "দাঁড়া, আমিও তোকে একটা মালা বানিয়ে দিই।" বাবাইদাদাও খবরের কাগজ ভাঁজ করে করে তার উপর কী যেন আঁকে, দেখতে দেয় না। কাঁচি দিয়ে কেটে যখন মালা বানিয়ে দেয়, দেখি লেজে লেজে জোড়া লাগানো, বসে থাকা বাঁদরের মালা। আমি ঠোঁট ফোলাই, সবাই হাসে। জেঠিমা হাসিমুখে বাবাইদাদাকে চোখ পাকায়। বাবাইদাদা তখনো হাসতে থাকে। আমি রেগে গিয়ে বাবাইদাদাকে বলি "আর কক্ষনো তোমার সঙ্গে কথা বলব না।" বাবাইদাদার উপর শুধু ঘুমের মধ্যেই আজকাল রাগ করতে পারি। কখনো দেখা হয়ে গেলে সামনাসামনি ঝগড়া করার উপায় বাবাইদাদা আর কোনোদিনের জন্য রাখে নি। রাখে যে আর নি, সে খবর তো আমিই মাকে দিয়েছিলাম ফেসবুক থেকে জানতে পেরে। তার মানে আমি এখন ঘুমিয়ে আছি। বাবাইদাদা ঘুমের মধ্যেই থেকো তবে।

106

11

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

সমুদ্রযাত্রা এবং টাইটানিক (প্রকাশিত লেখা)

সমুদ্র মানেই এক অজানার হাতছানি। মানুষ এই অজানাকে জানার চেষ্টা করেছে বারবার, সেই প্রাচীন কাল থেকেই। আমাদের প্রাচীন ভারতেও সমুদ্র যাত্রা ছিল। এই যাত্রা মূলত হত ব্যবসার কারণে। পরে, আরও নানা কারণে এই যাত্রা হত। ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হয়েছে, বহু শতাব্দী ধরে। চিন, আরব, পারস্য আর ইউরোপের অনেক পরিব্রাজকের লেখাতেও এর উল্লেখ আছে। বেশ কিছুদিন আগে, গুজরাতের লোথাল অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার বছর আগের বানানো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ড্রাই ডকের (dry dock) আবিষ্কার হয়েছে। পূর্ব এবং পশ্চিমে, তিনটি মহাদেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে ভারতের বহু হাজার বছর ধরে কৃষ্টি আর বাণিজ্যের সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রমাণ ঐ মহাদেশগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার আগে তৈরি উর ( UR) এবং সম্রাট নেবুকাডনেজারের (Nebuchadnezzar) প্রাসাদে যে কাঠের তক্তা এবং থাম পাওয়া গেছে, তা হলো ভারতীয় টিক আর দেবদারু গাছের গুঁড়ি থেকে তৈরি। ঋগ্বেদে দেখি:- সমুদ্র দেবতা বরুণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা। বরুণদেবতার আশীর্বাদ ছাড়া, সেকালে এবং এখনও সমুদ্রযাত্রা যে নিরাপদ নয় , সেটা বারবার বলা আছে। মন্ত্রটি হল:-শম্ ন বরুণঃ! অর্থাৎ:- হে সমুদ্র দেবতা বরুণ, তোমার আশীর্বাদ যেন নিরন্তর পাই! এইটাই এখন ভারতীয় নৌবাহিনীর CREST বা ব্যাজ! ১৯৪৮ এ চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী এটা বেছে দেন। বৃক্ষ আয়ুর্বেদে আছে জাহাজ তৈরির বিশদ বিবরণ!!!! শ্রী রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় তাঁর- HISTORY OF INDIAN SHIPPING বইতে লিখেছেন:- ধারা রাজ্যের ভোজ, যাকে আমরা ভোজরাজা বা ভোজ নরপতি নামে জানি আর যিনি প্রাচীন ভারতে ম্যাজিকের স্রষ্টা( ভোজবাজী হচ্ছে- MAGIC এর কমন বাংলা), কৌটিল্য বা চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের মতই একটা বই লিখেছিলেন। নাম:- “যুক্তি কল্পতরু”। এতে রাজ্য শাসনের বিস্তৃত তথ্য আছে। এরই মধ্যে, একটা অংশ হলো বৃক্ষ আয়ুর্বেদ। এই খানে জাহাজ তৈরির জন্য কাঠের জাতি বিভাগ বা WOOD CLASSIFICATION আছে। আমাদের সামুদ্রিক ইতিহাসের আরও অনেক কথা, অনেক ঘটনা নানা জায়গায় আছে, যা হারিয়ে যাওয়া পুঁথি এবং তথ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরিব্রাজক মার্কো পোলো তাঁর ডায়রিতে লিখে গেছেন, তখন ভারতে তৈরি জাহাজে থাকতো চারটি মাস্তুল, চোদ্দটি ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্ট, ষাটটি কেবিন আর দশটি লাইফবোট আর ক্রেন। এবার ভাব, এইসব তো একদিনে তৈরি হয় নি! এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, সমুদ্রযাত্রার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং তার পর আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা। যখন মানুষের নানা বিষয়ে শ্রীবৃদ্ধি হয়, যখন বৈভব এবং ঐশ্বর্য তাদের কাছে সুখ বাড়াতে সাহায্য করে, তখন নিজের দেশ ছেড়ে দুর্গম স্থানে পাড়ি দিয়ে, ব্যবসা করে উত্তরোত্তর বৈভব এবং ঐশ্বর্য বাড়ানোর জন্য নিজের জান কবুল করতেও দ্বিধা করে না। তখনকার সময়ে রাস্তাঘাটে, হিংস্র জন্তু, ডাকাতকে মোকাবিলা করে, অপার সমুদ্র পাড়ি দিতেও দোনোমোনো করত না। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু কম্পাস ছিল না! তাহলে এরা দিকভ্রষ্ট হত না কেন? এখানেই খুব সহজ উত্তর আছে। ব্যবসার জন্যই জ্ঞান- বিজ্ঞানের চর্চা আর জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছিল। লিখতে যতখানি সময় লাগছে, তার চেয়েও ঢের বেশী সময় লেগেছে এই ব্যাপারে গবেষণা করতে। এই সমুদ্র যাত্রার বিপদও ছিল অনেক। জাহাজ ডুবিতে প্রচুর মানুষের প্রাণ গিয়েছে। তাও মানুষ এই নেশাটা ছাড়তে পারে নি। ফলে, আমাদের দেশে সমুদ্র যাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়। জাত- ধর্ম যাবে, এই দোহাই দিয়ে কালাপানি বা সমুদ্রযাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ তো গেল, প্রাচীন ভারত বা পৃথিবীর কথা। ফিরে আসি মাত্র একশ পাঁচ বছর আগের কথায়। ইংল্যাণ্ড থেকে আমেরিকায় যাতায়াতের জন্য দরকার পড়ত আটলান্টিক মহাসাগর পেরনোর। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিমান বা প্লেন ছিল না। জাহাজই ছিলো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার একমাত্র ভরসা। ইউরোপ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার জাহাজ ব্যবসা ছিল খুব লাভজনক। কম সময়ে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পার হবার জন্য, যাত্রীদের আকৃস্ট করতে জাহাজ কোম্পানী গুলোর মধ্যে চলত প্রতিযোগীতা। ঐ সময়ের ইংল্যান্ডের প্রধান দুই জাহাজ কোম্পানী হল হোয়াইট স্টার(White Star) এবং কুনার্ড( Cunard )। ১৯০৭ সালে কুনার্ড কোম্পানী যখন খুব কম সময়ে আমেরিকা পৌছানোর দ্রুতগতি সম্পন্ন জাহাজ লুইজিতানিয়া (Lusitania )এবং মৌরিতানিয়া ( Mauretania) তাদের বহরে যোগ করল , চিন্তায় পড়ে গেলেন হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর চেয়ারম্যান ইসমে ( J. Bruce Ismay )। বেলফাস্টের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) এর মালিক উইলিয়াম পিরি ( William Pirrie,) এর সাথে পরামর্শ করে তিনটা বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ অলিম্পিক( Olympic ) টাইটানিক (Titanic)এবং ব্রিটানিক(Britannic, এটাও ডুবে গেছিল। ) তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। এই কোম্পানীর সব জাহাজেরই নাম শেষ হতো “ইক” দিয়ে। এই নামকরণের আর একটু ইতিহাস বলে নিলে, সুবিধে হবে। গ্রিক পুরাণে জাইগান্টোস (Gigantos) হচ্ছে, ধরিত্রী দেবী গেয়া (Gaea) এবং আকাশ দেবতা ইউরেনাসের (Uranus) একশ সন্তান, দৈত্যাকার বন্য এক প্রজাতি। এরা দেখতে মানুষের মত, কিন্তু সুবিশাল আকার ও শক্তির জন্য খ্যাত। জাইগান্টোমেকি (gigantomachy) নামে এক যুদ্ধে অলিম্পিয়ানদের (Olympian) হাতে এরা ধ্বংস হয়ে যায়। জাইগান্টোসদের মতো টাইটানরাও গেয়া ও ইউরেনাসের সন্তান আরেকটি প্রজাতি। অলিম্পিয়ানদের সর্দার জিউস টাইটানোমেকি (titanomachy) যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার আগে এরা পৃথিবী শাসন করত। এদের নাম থেকে টাইটানিক শব্দটি পাওয়া যায়, যার মানে অত্যন্ত বৃহদাকার। ১৯০৯ সালে হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) কোম্পানির এনজিনিয়ার, টমাস এন্ড্রু (Thomas Andrews ) র নকশায় শুরু হল টাইটানিক জাহাজের নির্মাণ কাজ। সেই সময়ের সবচেয়ে বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে টাইটানিককে গড়ে তোলা হল। জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজকে ভাগ করা হয় ১৬টা আলাদা প্রকোষ্ঠে বা চেম্বারে। এক প্রকোষ্ঠ হতে অন্য প্রকোষ্ঠে জল ঢোকা ছিল অসম্ভব । ১৬ টার মধ্যে ৪ প্রকোষ্ঠে জল ঢুকলেও জাহাজ ভেসে থাকতে অসুবিধা হত না। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন টাইটানিক জাহাজ কোনদিন ও ডুববে না। ৩১শে মে ১৯১১ সালে ২২ টন সাবান দিয়ে মসৃণ করে তোলা রাস্তা বেয়ে জলে নামান হল টাইটানিককে। জলে নামানোর সময় কাঠের তক্তা পড়ে মারা যায় এক কর্মী। জানা নেই. তারই অভিশাপ লেগেছিল কিনা টাইটানিকের ওপর। তারপর শুরু হল যন্ত্রপাতি লাগানো, সাজশয্যা। ১৯১২ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে পরীক্ষামূলক সমুদ্র যাত্রা শেষ হওয়ার পর তাকে নিরাপদ এবং আরামদায়ক সমুদ্র ভ্রমন উপযোগী জাহাজ হিসেবে হস্তান্তর করা হল জাহাজ কোম্পানীর কাছে । জাহাজের পুরো নাম হল RMS Titanic (Royal Mail Ship = RMS)। ওজন-৪৬,৩২৮ টন। লম্বায়- ৮৮২ ফুট ৬ ইঞ্চি। গতিবেগ :-ঘন্টায় ২৩ নট বা ৪৪ কিলোমিটার। ধোঁয়া বোরোনোর জন্য ফানেল ছিল, ৪ টে। প্রত্যেকটার উচ্চতা ছিল- ৬২ ফুট। ২৯ টা বয়লার ছিল, বাষ্প তৈরি করার জন্য। যাত্রী বহন ক্ষমতা ছিল-৩৫০০। যদিও প্রথম ও শেষ যাত্রায় যাত্রী ছিলেন-২২২৪ জন। এদের মধ্যে বেঁচে ফিরেছিলেন মাত্র ৭১০ জন। জাহাজে, কুকুর ছিল ১০ টা। সব কটাই মারা গেছিল। এই জাহাজ কোনোদিন ডুববে না, এই ঘোষণা হয়, সেই সময়। তাই জাহাজে ৬৫ টি লাইফবোট নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ঐ দিন ছিল মাত্র ২০ টি । লাইফবোটের মোট ক্ষমতা ছিল ১১৭৮ জন। কিভাবে লাইফবোট ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে মহড়া অনুষ্ঠানের কথা ছিল ১৪ই এপ্রিল,১৯১২ র সকালে। অজ্ঞাতকারনে টাইটানিকের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ ঐ দিন মহড়া অনুষ্ঠান বাতিল করেন। মহড়া হলে আরো কিছু জীবন রক্ষা পেত এমন ধারনা করেন অনেকে। আটলান্টিক পেরুনোর ,২৬ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের। এইখানে একটা কথা বলা দরকার। সেইসময়, পাল তোলা জাহাজের আর বাস্পচালিত জাহাজের ছিল যুগসন্ধিক্ষণ। দুরকম ভাবে জাহাজের মুখ ঘোরানো হত। পাল তোলা জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে, ঠিক তার উল্টো দিকে হুইল/ টিলার ঘোরাতে হত। একে বলা হত, “টিলার অর্ডার”। বাস্পচালিত জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে সেইদিকেই হুইল/টিলার ঘোরালেই হত। একে বলা হত “ রাডার অর্ডার”। জাহাজের চালক, রবার্ট হিচিনস, এই দুটোই জানতেন। কারণ, তখন আটলান্টিক পেরুনোর জন্য এই দুটো পদ্ধতিই জানা আবশ্যিক ছিল। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, এই ষ্টিয়ারিং ভ্রান্তি। জাহাজ কম সময়ে পাড়ি দেবে, আর ডুবে যাবে না, এই ধারণাতেই ক্যাপ্টেন স্মিথ সমুদ্রে বড় বড় হিমশৈল থাকার প্রায় গোটা সাতেক সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছিলেন। পরে জানা গিয়েছিল, হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর অন্যতম মালিক ব্রুসের নির্দ্দেশ ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের ওপর, তিনি যেন কোনো অবস্থাতেই জাহাজের গতিবেগ না কমান। পরে, হিমশৈল থাকার বিপদ বুঝে, ফার্ষ্ট অফিসার উইলিয়াম মার্ডক যখন চালক হিচিনসকে পরামর্শ দেন, জাহাজের মুখ ঘোরানোর জন্য, তখন হিচিনস ভয়ে, “টিলার অর্ডার” আর “ রাডার অর্ডারের” মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। “টিলার অর্ডার” দিয়ে তিনি জাহাজের মুখ ঘোরানোর চেষ্টা করলেও জাহাজ কিন্তু আসলে, হিমশৈলের দিকে গিয়ে ধাক্কা মারে। তারপরেই ঘটে যায়, ঠিক শতাব্দী প্রাচীন সেই মারাত্মক দুর্ঘটনা। আমরা সবাই সেই আত্মাদের শান্তি কামনা করি, যারা মারা গিয়েছিল, সেই অভিশপ্ত রাতে। ১৫/০৪/১৯১২ র রাত ১.৩০ থেকে রাত ৩.৩০ এর মধ্যে।

91

9

সঞ্চিতা চ্যাটার্জী

যদি জানতেম

তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি:। শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিবাদ্যেব ধাতু:।। (মহাকবি কালিদাস) তন্বী, শ্যামা, আর সুক্ষদন্তিনী নিম্ননাভি, ক্ষীণমধ্যা, জঘন গুরু বলে মন্দ লয়ে চলে,চকিত হরিণীর দৃষ্টি অধরে রক্তিমা পক্ক বিম্বের, যুগল স্তনভারে ঈষৎ-নতা, সেথায় আছে সে-ই, বিশ্বস্রষ্টার প্রথম যুবতীর প্রতিমা। (শ্রী বুদ্ধদেব বসু) দীপ্তর একবার শখ হয়েছিল কালিদাসের রচনা পড়বে| সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি না থাকায় উপযুক্ত বাংলা অনুবাদের সন্ধানে ছিল| সেই ভাবেই সন্ধান পায় বুদ্ধদেব বসুর মেঘদূত এর| পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যেত‚ যেভাবে কালিদাস যক্ষপ্রিয়ার রূপ বর্ণনা করেছেন‚ আধুনিক সাহিত্যে কখনো দেখতে পায় নি নারীর শারীরিক সৌন্দর্য্যর এরকম বর্ণনা| শরীর কে কি করে প্রেমের মন্দিরে স্থাপন করা যায় তার অপূর্ব আলেখ্য ফুটে ওঠে সেই আখ্যানে| তারপরে পড়ে কুমারসম্ভব| পার্বতীর রূপের বর্ণনা| অপরূপ ভাবে পার্বতীর শরীরের প্রতিটি অংশ উঠে এসেছিল সেই বর্ণনায়| কোমল বাহু‚ নীলকান্ত মণির আভাযুক্ত নিম্ন নাভি‚ কৃশ কটি‚ এমন কি নিতম্বের বর্ণনাও করেছেন মহাকবি| দীপ্তর কালিদাস পূর্ববর্তী কোন লেখকের লেখা পড়া হয় নি| তবে জেনেছে তাঁরা শুধু পার্বতীর স্তনযুগল বর্ণনা করতেই শ্লোক রচনা করেছেন অস্ংখ্য| সেই তুলনায় কালিদাস অনেক পরিমিত‚ অনেক সংযত| আশ্চর্য সেই বর্ণনা পড়ে সেই নারীর প্রতি কামনা জাগে| কিন্তু কখনো শ্লীলতা পরিহার হয়েছে বলে মনে হয় না| আধুনিক সাহিত্য অনেক পড়েছে দীপ্ত| কমপ্রিহেন্সিভ ক্লেইম করতে না পারলেও‚ অনেক | রবীন্দ্রনাথ‚ শরৎচন্দ্র‚ প্রভাত মুখোপাধ্যায়‚ প্রমথ বিশী‚ বুদ্ধদেব বসু‚ শরদিন্দু‚ সুনীল‚ শীর্ষেন্দু‚ বুদ্ধদেব গুহ‚ সমরেশ বসু‚ শঙ্কর| এই ভাবে নারী সৌন্দর্যর বর্ণনা কেউ করেছেন বলে মনে পড়ছে না| বেশিরভাগ ই নারী সৌন্দর্য মুক্তর মত হাসি‚ মরাল গ্রীবা‚ ধনুকের মত ভুরু আর আয়ত চোখে সীমাবদ্ধ রেখেছেন| শরদিন্দু তন্বী শ্যামা শিখরদশনা অবধি এগিয়েছেন আর বেশি ডিটেলে যান নি| ঘরে বাইরের বিমলার ছিল অন্যরকম সৌন্দর্য‚ তীব্র আকর্ষণ| তা যত না বর্ণিত হয়েছে শরীর ভাষায়‚ তার থেকে বেশি ফুটেছে তাঁর আচরণে‚ ব্যবহারে| বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টি‚ সমরেশ বসুর বিবরে যৌনতা আছে‚ খুব উগ্র ভাবে| নারী দেহর সম্যক কাব্য কোথায়! আর আজকের দিনে তো পার্বতীর শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য লিখলে আর দেখতে হবে না| সোজা গারদের পেছনে| ভাগ্যিস কালিদাস আজকের দিনে জন্মাননি| ক'টা যে এফ আই আর হত ওঁর নামে‚ কে জানে| আজকের হনুমান বাহিনীর বোধয় সংস্কৃত কাব্য পড়া নেই| নইলে আর কালিদাসের রক্ষা পাওয়ার উপায় ছিল না| ঘরে হিটিং চলছে‚ ঘর বেশ গরম| দীপ্ত লেপটা নামিয়ে দিয়েছে| স্বভাবতই প্রমার গা থেকেও কিছুটা সরে গেছে লেপটা| তার শোয়ার ভঙ্গী কিছু অদ্ভুত| গর্ভস্থ ভ্রূণের মত বুকের কাছে দুই পা জড়ো করে ঘুমায় সে| এই মুহূর্তে প্রমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না দীপ্ত| রতিশেষে শ্রান্ত পরিতৃপ্ত নিদ্রাভিভূতা তার প্রিয় নারী| কয়েকটা চুল লেপটে আছে মুখে ঘাড়ে| লম্বা গলা প্রমার| এইরকম গলাকেই বোধহয় কাব্যে মরাল গ্রীবার উপমা দেওয়া হয়| দীপ্ত মনে মনে কাব্য করার চেষ্টা করলো| মরাল গ্রীবা থেকে অনাবৃত কাঁধ বেয়ে লতিয়ে আছে ময়ূর পুচ্ছের মত উজ্জ্বল কেশভার| শ্যামমুখ পান্ডুবর্ণ স্তনদ্বয় এতটাই পুষ্ট যে আপন ভারে পরস্পরকে পীড়িত করছে| গুরু জঘন আজকের দিনে আউট অফ ফ্যাশন| প্রমার লম্বাটে গড়ন‚ সুন্দর লম্বা পা দুটি মুড়ে শুয়ে আছে| দীপ্ত আলতো করে পা দুটো নামিয়ে দিল| সম্মুখে বিকশিত কৃশ কটি‚ আধো ছায়াবৃত গভীর নাভি নীলকান্ত মণির মত দীপ্তি ছড়াচ্ছে| নিতম্ব এত সুন্দর যে মহাদেবের কোলে স্থাপিত হতে পারে‚ যা অন্য কোন রমণীর কল্পনাতীত| দীপ্তর চোখের সামনে পার্বতী ফুটে উঠছেন‚ সে হারিয়ে যাচ্ছে মহাদেবের প্রেমোঙ্মুখ পার্বতীর নব যৌবনের রূপমাধুরীধারায়| হঠাৎ প্রমার চোখ খুলে যায়| দেখে দীপ্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে‚ চোখে কিসের ঘোর| "কি গো‚ কটা বাজে?" চমকে ওঠে দীপ্ত| ঘড়ি দেখে| "আড়াইটে| দেখো তো কত দেরি হয়ে গেল! আজ বোধহয় আর স্প্যানিশ স্টেপস হবে না|" "আগেই হবে না ভাবছো কেন? আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি| ৩ টের সময়ে বেরিয়ে যাবো|" "ওকে প্রিয়তমা| দেখো যদি হয় খুব ভালো হবে|" সুন্দর দাঁতের সারি ঝলকিয়ে হাসে প্রমা| দীপ্তর মাথায় আবার পাক খেতে থাকে‚ "তন্বী শ্যামা শিখরদশনা ..." {/x2} {x1i}jantem8.jpeg{/x1i}

482

41

শিবাংশু

হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি

সারা বিশ্বে প্রতিটি মানুষগোষ্ঠীর দুরকম পরিচয় থাকে। একটি তার ঐতিহাসিক পরিচয়। কালখণ্ডের উদ্বর্তনের পথ ধরে, নথিবদ্ধ ধারাপাঠের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব অবস্থানকে চিনে নেওয়া। আর অন্যটি তার পরিচিত কাল্পনিক প্রতিমূর্তি বা প্রতিবিম্বভিত্তিক। কোনটাই সর্বৈব সত্য বা মিথ্যা নয়। দুই ধরণের পরিচয়ের ভিতরই কিছু সারবস্তু থাকে। ঐতিহাসিক বস্তুস্থিতি ছাড়াও প্রতিটি জাতির একেকটা স্বীকৃত প্রতিবিম্ব থাকে। বাঙালিরও আছে। এই প্রতিবিম্ব সৃষ্টির পিছনে নানা ধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজ করে। যে ভৌগলিক অবস্থানে আজকের বাঙালিদের বাস, মহাভারতের যুগে তাদের অন্ত্যেবাসী মনে করা হতো। সেকালের অঙ্গদেশ, অর্থাৎ আজকের ভাগলপুর, তার পূর্বের অংশকে হস্তিনাপুরের মানুষ অসভ্য ও অনার্যদেশ মনে করতো। সেখানে আর্যদের নামে মাত্র বসবাস ছিলো। সে জন্যই পরম চতুর দুর্যোধন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় কর্ণকে অঙ্গদেশের রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। বাংলায় যাকে বলে, উড়ো খই গোবিন্দায় নমো। কর্ণ কখনও ভুলেও তাঁর 'রাজ্য' দেখতে আসেননি। বাঙালির এই পরিচয়টি তার প্রতিবিম্বিত লোকশ্রুতির অংশ। উত্তরাপথের আর্যজাতি 'বাঙালি'দের সম্বন্ধে এই রকমই একটি ধারণা করে নিয়েছিলো। বলীরাজার পুত্রদের নিয়ে অঙ্গ, বঙ্গ বা কলিঙ্গের যে লোককথা, তা কিন্তু আর্যেতর মানুষদেরই উপাখ্যান। এই এলাকায় যে রাজ্যগুলো ছিলো, যেমন বঙ্গ, সুহ্ম থেকে প্রাগ জ্যোতিষপুর, সেখানের মানুষদের সম্বন্ধে আর্যাবর্তের দর্পিত অধিবাসীরা বেশ নিচু ধারণাই পোষণ করতো। তার রেশ আজও আছে। কারণ আর্য সভ্যতার সীমানা ছিলো মগধরাজ্যের সমৃদ্ধতম রাজপাট, যার সামনে কোসল থেকে গান্ধার, সবাই নিষ্প্রভ। বাঙালির আদিতম জাতিগত অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠে তার সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে যোগাযোগকে কেন্দ্র করে। কাশ্মিরের রাজকবি কল্হনের লেখায় একটা উল্লেখ পাই, সমতটের মানুষদের। যাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তারা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ এবং দেবভাষা সংস্কৃত জানেনা। তার বদলে তারা পাখির ভাষায় কথা বলে। এসময় থেকেই ন্যায় ও তর্কশাস্ত্রের প্রতি বাঙালির আগ্রহ বেশ প্রচারিত ছিলো। যাঁরা প্রমথনাথ বিশীর 'নিকৃষ্ট গল্প' পাঠ করেছেন ( জানিনা কজন এমন আছেন এখানে) , তাঁদের মনে পড়বে 'ধনেপাতা' নামক সেই বিখ্যাত গল্পটি। মুঘল যুগে জাহাঙ্গির বাদশা বলেছিলেন, 'হুনরে চিন, হুজ্জতে বঙ্গাল'। অর্থাৎ চিন দেশের মানুষের স্কিল অনন্য আর বাঙালি অতুলনীয় হুজ্জত বাধাবার কলায়। সবাই স্বীকার করবেন জাহাঙ্গির যতই আনারকলি-নূরজাহান করুন না কেন, ক্রান্তদর্শী পুরুষ ছিলেন। একদিকে ন্যায় ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগান্তকারী চর্চা, আবার তার সঙ্গেই নিমাই পন্ডিতের ভাসিয়ে দেওয়া প্রেমধর্ম। দিগ্বিজয়ী সমুদ্রযাত্রী বীরের দল, মঙ্গলকাব্যের লোকায়ত দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা, অপরপক্ষে ভীত সন্ত্রস্ত তৈলচিক্কন বাবু কালচারের প্রতিনিধিরা। আবার কী শরণ নিতে হবে সেই, 'মেলাবেন, তিনি মেলাবেন' মন্ত্রের। পশ্চিমে পরাক্রান্ত মগধ, দক্ষিণে সমান পরাক্রান্ত ওড্র, উৎকল ও কলিঙ্গদেশ উত্তরে অরণ্যবিকীর্ণ অঙ্গদেশ ও পূর্বে পর্বতারণ্যানীর সমারোহে অগম্য উপজাতি সভ্যতা, এই নিয়ে বাঙালির যে সভ্যতা গড়ে ওঠে তার মধ্যে আর্য, দ্রাবিড়, মোঙ্গল ও অস্ট্রিক, সবারই কিছু কিছু রক্তবীজ এসে পড়ে। বাঙালি সে অর্থে ভারতবর্ষের প্রথম প্রকৃত pot boiled জাতি। দেশবিদেশে মানুষের মনে বাঙালির যে প্রতিবিম্ব ( বাংলায় যাকে বলে ইমেজ) আছে, তা আমাদের এইসব স্ববিরোধী ঐতিহাসিক অবস্থান থেকেই এসেছে। এই গৌরচন্দ্রিকা থেকে হয়তো একটু আন্দাজ হয় 'বাঙালি'রা কীভাবে তাদের সন্তানসন্ততিদের আত্মপরিচয় সম্বন্ধে ওয়কিফহাল করতে পারে। বাঙালিরা তাদের কোন কোন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের প্রশ্নাতীত ভাবে আইডেন্টিফাই করে অথবা কেন করে, সেটাই বৃহৎ প্রশ্ন। যেমন বলা হয়, as much Bengali as rasogolla। শ্লেষার্থে গড়ে ওঠা এ জাতীয় ধারণাবলী থেকে নিজেদের বার করে আনতে যে পর্যায়ের উদ্যম প্রয়োজন, বাঙালিদের তা আছে বলে মনে হয়না। তাদের ভাবনার বাইনারি জগতে লাল-সবুজ দাদাদিদি, ইস্ট-মোহন, বাঙাল-ঘটি,চিংড়ি-ইলিশের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি যতোটা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়, তার ভগ্নাংশও একটা গৌরবজনক আত্মপরিচয় গড়ে তোলার শ্রমসংকুল উপক্রমের জন্য নিয়োজিত হয়না। মনে হয় অচিরকালেই আমাদের উত্তরসূরিরা গোপনে নিজেদের মধ্যে ' হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি' বলে পরিচয় বিনিময় করবে।

121

13

Joy

গাজন- একটি গ্রাম্য লৌকিক উৎসবের গল্প

চৈত্র মাসের শেষ| গরমের দাপট শুরু হয়ে গেছে| আর দুদিন পরেই পয়লা বৈশাখ| পয়লা বৈশাখ মানেই সকালে উঠেই মা‚ বাবাকে প্রনাম করে দিন শুরু হত| আজ আর বকাঝকা নয়| আজকের দিনটি ভাল না হলে সারাবছরই খারাপ যায়| মা বাবার সঙ্গে মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়া হত| নতুন জামা‚ নতুন জুতো| দোকানে দোকানে হাল খাতার নিমন্ত্রন| বিকেলে বাবার হাত ধরে দোকানে যাওয়া‚ অনেক ক্যালেন্ডারের থেকে পছন্দ মত ক্যালেন্ডার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া| পয়লা বৈশাখ আমাদের ছোটবেলায় এখনকার মত এত কর্পোরেট‚ আধুনিক ছিল না| বাঙ্গালীদের এক নিজস্ব উৎসব| তার আগে মাকে দেখতাম নীল ষষ্ঠী‚ অশোক ষষ্ঠী এই সব করতে| সন্তানের মঙ্গল কামনায় মা সারাদিন উপোস করে বিকেলে বা সন্ধ্যেবেলায় শিবের মাথায় জল ঢালতে যেতেন| আমাদের নীল বা অশোক ষষ্ঠী নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না| আমাদের উৎসাহ ছিল গাজন দেখার| আমাদের দেশের বাড়ীতে খুব ধুমধাম করে গাজন ও চড়ক উৎসব হত| গাজনের একদিন আগেই আমরা চলে আসতাম কাঁদোয়া| ছোট্ট খুব সুন্দর গ্রাম| তার থেকেও সুন্দর ছিল মোড়াগাছা স্টেশন| একটু ফাঁকা ফাঁকা গ্রাম্য স্টেশন| প্ল্যাট্ফর্ম লাগোয়া প্রচুর গাছ| মনে হয় গাছের তলায় বসে একটু জিরিয়ে নিই| প্ল্যাট্ফর্ম থেকেই নেমেই শুরু হল আঁকা বাঁকা মেঠো রাস্তা| স্ট্শেনের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে কয়েকটি রিক্শা| রিক্শাওয়ালারা বেশীর ভাগই বাবার চেনা| বাবা ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করে দিতেন| কার বাড়ী বানানো হল‚ কারও ছেলের পড়া শোনা তো কারও মেয়ের বিয়ের খবর| ওরাও বাবাকে আমার জ্যেঠু‚ পিসি‚ কাকাদের কথা জানতে চাইতেন| বাবলু মানে আমার ছোট কাকা কেমন আছেন‚ লক্ষীদি কেমন আছে গো সেজদা? আমার মেজো পিসির নাম লক্ষী| গল্প করতে করতেই আমরা একটি রিক্শায় উঠে পরলাম| সেই মেঠো রাস্তা‚ দুপাশে ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমাদের রিক্শা চলতে শুরু করল| রাস্তাটা খুব সুন্দর ছিল| শুখনো পাতা রাস্তায় অবহেলায় পরে রয়েছে| দুপাশে বড় বড় আম গাছের বাগান| এত আম গাছে যেন মনে হয় গাছগুলো বোধহয় এখ্নই ভেঙ্গে পড়বে| গল্প আর শুখনো পাতার মচমচানি শব্দের মাঝে হঠাৎ করে রাস্তায় একটা-দুটো সাপ আমাদের রিক্শার আগেই রাস্তা অতিক্রম করে চলে গেল| আঁতকে উঠে আমরা চিৎকার করে কি সাপ ওগুলো? রিক্শাওয়ালা আমাদের আশ্বাস দেই ঐ সাপের বিষ নেই গো| আর বিষ নেই‚ সাপ দেখেই তো পা দুটো সিটের উপরে তুলে নিয়েছি| অনেকক্ষন লাগে কাঁদোয়া পৌঁছাতে| কিছুক্ষন পর আমাদের রিক্শা একটি মিষ্টির দোকানে থামল| ওখানে অনেক মিষ্টির দোকান| এখানে ছানার জিলিপি খুব জনপ্রিয়| আহা কি স্বাদ| মুখে দিলেই নরম সুস্বাদু বস্তুটি মিলিয়ে যেত| বেশ জমজমাট জায়গা| হাট বসেছে| লোকজন জিনিষপত্র কেনা-বেচা করছে| এই জায়গাটার নাম ধর্মদা| বাবা‚কাকারা এখানের স্কুলে মাধ্যামিকে পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন| কাঁদোয়া থেকে অনেকটা রাস্তা| বাবারা হেঁটে বা সাইকেলে আসতেন| বর্ষাকালে সে এক ভয়ানক অবস্থা| রাস্তা কাদাময়| পুকুর‚ ডোবা জলে ভর্তি| রাস্তায় জল-কাদার মধ্যে ছোট-ছোট মাছ দিব্যি ভেসে বেড়াচ্ছে| যেতে যেতেই বাবা আমাদের লাইব্রেরী দেখাতেন| এই লাইব্রেরীটা আমার বাবা-জ্যাঠারই দ্বায়িত্ব নিয়ে তৈরী করিয়েছিলেন| আমরা মিষ্টি খেয়ে ও হাঁড়ি ভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে আবার রিক্শায় উঠে বসি| আবার পথ চলা| এবার রিকশা এসে থামে আমাদের বাড়ির দোরগোড়ায়| আমাদের দেশের বাড়ি ও মামার বাড়ি দুটো-ই গ্রাম হওয়ার সুবাদে আমার প্রকৃতির সঙ্গে‚ গাছপালা‚ পুকুর‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেতের সঙ্গে নিবিড় এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল| আমার মামার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলায়| দেবী পারুলিয়া নামের সুন্দর এক গ্রামে| ওখানে সাধারনত আমাদের যাবার সময় ছিল শীতকালে| যখন আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত তখন| নদীয়া- মুর্শিদাবাদ দুটো পাশপাশি জেলা হলেও দুই জেলার মধ্যে ভাষাগত‚ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে অনেক ফারাক ছিল| কথার টানে অনেক তফাত‚ দেবী পারুলিয়ার মাটি লাল‚ এঁঠেল মাটি| আমার মামার বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই আবার বীরভূম জেলা| শীতকালে মাঠে ধান ভর্তি| চরিদিকে শুধু সোনালী রঙ্গের প্রলেপ| কোথাও আবার সরষে ক্ষেতের উপর রোদের মোলায়েম স্পর্শ| গরুর গাড়ির মাঠ থেকে ধান নিয়ে যাওয়া| আমরা ভাই-বোনেরা গরুর গাড়িতে ওঠার জন্যে দৌঁড় শুরু করতাম| অনেক দীঘি আর পুকুর| সবেতেই হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে| ওদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে| আবার কোথাও মাঠ ভর্তি আখের ক্ষেত| আমর লুকিয়ে আখের ক্ষেত থেকে আখ ভেঙ্গে খেতাম| এখানে আমরা স্কুল না খোলা পর্যন্ত থাকতাম| বাবা আমাদের রেখে চলে আসতেন কলকাতায়| অফিসের জন্যে বেশীদিন থাকতে পারতেন না| এর পর শুরু হত আমাদের খেলা‚ দুষ্টুমি| গরুর গাড়ি করে তারাপীঠ যাওয়া হত| মামা সব ব্যবস্থা করে দিতেন| খুব মজা হত| কিন্তু আমাদের দেশের বাড়ি কাঁদুয়া আবার একটু অন্য রকম| এখানে আমরা আসতাম এই গ্রীষ্মকালে| গাছ ভর্তি আম‚ জাম‚ কাঁঠাল| আমাদের দোতলা বাগান বাড়ি| কত বড় বাগান‚ আর কত রকমের গাছ| আমরা ঢিল মেরে আম পারতাম| আর ঝড়েও প্রচুর আম পড়ত| সেই আমের খোসা ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন‚ লঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে খেতে খুব ভাল লাগত| আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েও বয়ে চলেছে গঙ্গা| আর একটা বাঁধানো পুকুর ছিল আমাদের| বাড়ীর মেয়ে-বৌরা স্নান‚ কাপড় কাচার জন্যে আসত| এখানে বাবা থাকার জন্যে ও খুব অল্প দিন থাকায় মাত্রাতিরিক্ত দুষ্টুমি করা যেত না| তবে খুব ভালো লাগত গাজন দেখতে| সেটা আবার অন্য রকম আনন্দ| প্রায় ঘন্টা খানেক রিক্শা সফর করে আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাতাম| বাড়ীটিতে আমাদের কেউও থাকতেন না| বাবা‚ কাকা‚ জ্যেঠুরা সবাই কাজের জন্যে কলকাতা‚ বহরমপুরে চলে এসেছেন অনেকদিন হল| আমার ঠাকুর্দা ছিলেন ডাক্তার| ঠাকুমা মারা যাবার পর ঠাকুর্দাও পাকাপাকি ভাবে চলে এলেন কলকাতায়| ফলে বাড়িটি ফাঁকাই পরে থাকত| বাবার মুখে শোনা ৭১এর বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় প্রচুর লোক ওপার বাংলা থেকে এখানে চলে আসেন| তাদেরই কেউ আমার দাদুর কাছে এই বাড়িটিতে থাকার জন্যে অনুনয়-বিনয় করাতে ঠাকুর্দা ওদের এই বাড়িটিতে থাকতে দেন| শর্ত ছিল থাকার জন্যে কোন ভাড়া দিতে হবে না‚ কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এলে একটা-দুটো ঘর ছেড়ে দিতে হবে| আমাদের আসা বলতে বছরে একবারই এই গাজনের সময়| আমাদের বাড়ি সংলগ্ন বাগানে শিবের গাজন হত| কয়েকদিন ধরেই চলত তার প্রস্তুতি| বাগানের যে অংশটা রাস্তা ঘেঁষা তার পাশেই ছিল এক ব্ড় অশ্ব্ত্থ গাছ| অনেক প্রাচীন সেই গাছ| তার নিচেই বেদীতে রাখা হত শিবের লিঙ্গ| গাজনের কয়েকদিন আগে থেকেই অনেকেই সন্ন্যাসী হতেন| সারাদিন রোদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করে সন্ধ্যেবেলায় হবিষ্যি ভোজন| আর গাজনের আগের দিন ফলমূল খেয়েই কাটাতেন সন্ন্যাসীরা| আমার বাবা-মা সন্ন্যাসীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন| সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজন মূল সন্ন্যাসী থাকতেন| তার নির্দেশ সব সন্ন্যাসীরা মেনে চলতেন| সন্ন্যাসী ভাড়া নেওয়া হত| কারও কোন মানসিক থাকলে ফল‚ ফুল‚ মিষ্টি দিয়ে শিবের পুজোর ডালি নিয়ে আসতেন| শিবের মাথায় আকন্দ ফুল রাখা হত| শিবের মাথা থেকে ফুল তাড়াতাড়ি মাটিতে পড়া মানে মানসিক তাড়াতাড়ি পুর্ণ হবে| যদি ফুল পরতে দেরী হয় তার মানে তার মনস্কামনা পূর্ণ হতে দেরী হবে এমনই ধারনা ছিল স্থানীয়দের| এবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের নাচ-গান| ঢাক ঢোল আর কাঁসরের আওয়াজে গমগম করত| শিব তুষ্ট করার জন্যে সন্ন্যাসীরা নিজেদের উপর অত্যাচার শুরু করতেন| চাবুক দিয়ে মারা‚ জিভে সুঁচ ফোটানো‚ বঁটি উপর দিয়ে হাঁটা এই সব করা হত| আমার দেখতাম আর শিউড়ে উঠতাম| তার মধ্যে আবার দন্ডি কাটা হত‚ লোকে লোকারন্য হয়ে যেত| পাশেই বসত মেলা| আহামরি কিছু নয় গ্রাম্য মেলা যেমন হয়| বাদাম ভাজা‚ জিলিপির দোকান| নাগরদোলায় কিছু ভীড়| বেশ লাগত দেখতে| কালবৈশাখী ঝড়টা প্রতিবারই এই সময়ই এসে সব লন্ডভন্ড করে যেত| প্রথমে আচমকা থমথমে পরিবেশ‚ আস্তে আস্তে ঘন কালো মেঘ এসে সব ঢেকে যেত| কিছুক্ষন পর ধুলোর ঝড় সঙ্গে বৃষ্টি| আমরা দৌঁড়ে ঢুকে পরতাম বাড়িতে| বাতাসে সোঁদা গন্ধ| অনেক্ক্ষন ধরে চলত বৃষ্টি আর ঝড়ের তান্ডব| আর সঙ্গে ধুপ-ধাপ আওয়াজ| আম পরার শব্দ| ঝড়-বৃষ্টি একটু কমলে বাইরে গিয়ে দেখলেই মনে হয় একটু আগেই বেশ বড়্সড় একটা যুদ্ধ হয়েছে| চারিদিকে মাটি থেকে উৎখাত হওয়া ছোট-বড় অনেক গাছ| চার পাশে পরে রয়েছে অজস্র গাছের ভাঙ্গা ডালপালা| উড়ে আসা খড়ের আর টিনের চাল| সব সরিয়ে আবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের তান্ডব নৃত্য| প্রচুর আম পড়ত ঝড়ের সময়| মা-বাবার চোখ এড়িয়ে আমারাও ছুটতাম আম কুড়াতে| আবার চলত সেই শিবের মাথায় ফুল পরা আর গাজনের উৎসব| আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামে‚ গাজন উত্সব শেষ হয়| হাল্কা হয়ে যায় মানুষের ভিড়| কিছু বাচ্চা‚ বুড়ো এখনও আছে মেলায়| হ্যাজাক আর হ্যারিকেনের আলো গাঢ় অন্ধকারকে ফিকে করে দেয়| আমাদের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে| সারাদিনের হৈ-চৈ| একটু কিছু খেয়েই আমরা ঘুমের দেশে| পরের দিন সকালে দেখি বস্তা বস্তা ভর্তি আম| কাল বিকেলের ঝড়ের ফলাফল| পরেরদিন আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমতন্ন| মা‚কাকিমারা রান্না করতে ব্যস্ত| এই ফাঁকে বাবার সঙ্গে আমরা গঙ্গায় স্নান সেরে আসি| এখানে গঙ্গা বেশ চওড়া| তবে জল পরিষ্কার| বাবার মুখে গল্প শুনি‚ বাবা-কাকারা নাকি গঙ্গা পেরিয়ে যেতেন| বাবা এখনো সাঁতরে অনেকট দূর চলে যেতেন| ভয় হত আমাদের‚ বাবা যদি জলে ডুবে যান| না সেরকম কিছু হত না| একটু পরেই বাবা সাঁতরে পারে ফিরে আসতেন| বিকেলে বাবাদের বন্ধুদের আড্ডা বেশ জমে উঠত| দুদিন আনন্দে কাটাবার পর এবার ফেরার পালা| পরদিন ফিরে আসা| মনখারাপ করে আবার রিকশায় উঠে বসতাম| আবার চেনা পথ| ধর্মদায় দাঁড়ানো| আমাদের কলকাতার আত্মীয়রা সব ছানার জিলিপির ফর্দ দিয়ে রাখত| প্রচুর মিষ্টি নিয়ে আসা হত কলকাতায়| মোড়াগাছা স্টেশনে এসে একটু দাঁড়ালেই কু ঝিক-ঝিক কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন এসে হাজির| রিকশাওয়ালা আমাদের দেখে বলেন আবার সামনের বছর আসবে তো...মনে মনে বলি আবার আসব| প্রতি বছর আসব| বেশ কিছুদিন চালু ছিল আমাদের এই বেড়াতে আসা| পড়াশোনার চাপ বাড়ার ফলে কমে গেল এখনে আসা| একদিন শুনলাম আমাদের দেশের বাড়িটি ঐ ওপার বাংলার যারা আমাদের বাড়িটিতে থাকতেন ওরা বাড়িটি অধিকার করে নিয়েছে| বাবা-জ্যেঠুরা দৌঁড়াদৌড়িতে নামমাত্র কিছু টাকা পাওয়া গেল| বাবা-কাকারা দেশের বাড়ির গল্প বলতে শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না| সেই আম‚জাম বাগানের গল্প‚ গঙ্গায় সাঁতরে এপার ওপার হওয়ার গল্প| আরও কত কি| বাবা কিছুদিন আগে চলে গেলেন‚ কয়েক বছরের ব্যবধানে মা ও চলে গেলেন ঐ দূর আকাশ পানে| মামার বাড়ি ও দেশের বাড়ি যাওয়া কমে কমে একদম বন্ধই হয়ে গেল| কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনো ফিকে হয়ে যায়নি| মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ গাছ্পালা‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেত‚পুকুর‚ প্রকৃতি হাতছনি দিয়ে ডাকে| ফিস ফিস করে যেন আমাকে বলে তুমি আসবে বলেছিলে‚ কিন্তু তুমি তো এলে না| ওদের কিছু বলতে পারিনা| নীরবে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে| দিব্যেন্দু মজুমদার

119

10

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

তুলাভিটা, মালদা-শেষপর্ব

শেষ পর্যন্ত এই উৎপীড়ন যখন আর সহ্য হলো না তখন সারা বাংলার রাষ্ট্র নায়কেরা একত্র হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে অধিরাজ বলে নির্বাচন করলেন এবং তাঁর সর্বময় আধিপত্য মেনে নিলেন। এই রাষ্ট্রনায়ক অধিরাজের নাম গোপাল দেব। কে এই গোপাল দেব? গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রলিপি তে বলা হয়েছে "গোপাল দেব ছিলেন দয়িতবিষ্ণুর পুত্র এবং বপ্যটের পৌত্র। মাৎস্যন্যায় দূর করিবার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল"। একটা ব্যাপার লক্ষণীয় পাল রাজাদের রাজ সভায় রচিত কোন গ্রন্থে নিজেদের বংশ কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয় নি। সাধারণ প্রজা দয়িতবিষ্ণুর পুত্র গোপাল দেবের জন্ম ভূমি বরেন্দ্র(রাজশাহী) অঞ্চলে। এবং সেখানে তিনি একজন সামন্ত নায়ক ছিলেন। এবং তিনি যে বাঙালি ছিলেন এতে সন্দেহের অবকাশ নাই। লিপিতে বলা সংস্কৃত প্রকৃতিপুঞ্জ শব্দের অর্থ যদিও জনসাধারণ, কিন্তু বাংলার সকল জনগণ সম্মিলিত হয়ে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এটা মনে হয় না। আসলে তখন দেশ জুড়ে অসংখ্য সামন্ত নায়কেরা ছিল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তারা যখন দেশকে বারবার বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণ থেকে আর রক্ষা করতে পারলেন না, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলেন না, তখন একজন রাজা ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছাড়া বাঁচার আর পথ ছিলনা। তাদের এই শুভ বুদ্ধির ফলে বাংলা- নৈরাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক শত্রুর কাছে বার বার অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেল। আনুমানিক ৭৫০ খৃস্টাব্দে গোপাল দেব(৭৫০ খ্রীঃ-৭৭৫ খ্রীঃ) পাল বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা হয়ে সমস্ত সামন্ত প্রভুদের দমন করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন, দেশ থেকে অরাজকতা দূর করেন, বহিঃ শত্রু আক্রমণ থেকে দেশ কে রক্ষা করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে গোবিন্দ পালের(১১৬১খ্রীঃ-৬৫খ্রীঃ) সঙ্গে সঙ্গে গোপাল প্রতিষ্ঠিত এই পাল বংশের অবসান ঘটে। সুদীর্ঘ চারশো বৎসর ধরে নিরবচ্ছিন্ন একটা রাজবংশের রাজত্ব খুব কম দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়। বৃহত্তর বাংলাকে সংহত ও শক্তিশালী করে গোপাল মারা যাবার পর হাল ধরেন পুত্র ধর্মপাল। তার নেতৃত্বে বাঙালির সামরিক শক্তি তৎকালীন ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি প্রায় সমগ্র পূর্ব ভারতের একের পর এক রাজ্য জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন। "কনৌজ জয় করার পর এক দরবারের আয়োজন করেন। ঐ দরবারে ভোজ, মৎস্য, মুদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, মালব, বেরাব, গান্ধার, পেশোয়ার, কীর প্রভৃতি প্রাচীন রাজ্যগুলির রাজাগন উপস্থিত হইয়া বাঙালি ধর্মপালকে অধিরাজ বলিয়া স্বীকার করেন" - (খালিমপুর তাম্র লিপি) পাঞ্জাব থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন রাজ্যসমূহ ধর্মপাল জয় করেছিলেন। ধর্মপাল মারা যাওয়ার পর রাজা হন পুত্র দেবপাল। দেবপাল পিতার সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করেন। হিমালয়ের সানু দেশ হতে আরম্ভ করে বিন্ধ্য পর্যন্ত এবং উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ থেকে আরম্ভ করে প্রাগজোতিষ পর্যন্ত তার আধিপত্য স্বীকৃত হতো। এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। আরবের বণিক পর্যটক সুলেমান তার বিবরণীতে বলেন:- "বঙ্গরাজ দেব পালের সৈন্যদলে ৫০,০০০ হাতি ছিল এবং সৈন্যদলের সাজসজ্জা ও পোশাক পরিচ্ছদ ধোওয়া, গুছানো ইত্যাদি কাজের জন্যই ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল"। একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন হতোদ্যম বাঙালি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে শৌর্য বীর্য ও দক্ষতার সাথে বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিল। যার যাদু মন্ত্র ছিল বৃহত্তর বাংলার ঐক্যবদ্ধ শক্তি। এই শক্তির ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলে প্রতিষ্ঠাতা গোপাল। বাংলার ইতিহাসে পালবংশের আধিপত্যের এই চারশো বৎসর নানাদিক থেকে গভীর ও ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। বর্তমানের বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয়েছে এই যুগে। শশাঙ্ক যদিও শুরু করেছিলেন কিন্তু পাল আমলেই বাঙালির রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ লাভ করে এই পাল যুগে। বাংলা ভাষা ও লিপির গোড়া খুঁজতে হলে এই চারশো বৎসরের মধ্যে খুঁজতে হবে। এই লিপি, ভাষা, ভৌগলিক সত্ত্বা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শকে আশ্রয় করে একটি স্থানীয় সত্ত্বাও গড়ে উঠে এই যুগে। সেই হাজার বছর আগে পাল রাজাগন ছিলে অসাম্প্রদায়িক। তারা নিজেরা বৌদ্ধ; অথচ বৈদিক হিন্দু ধর্মও তাদের আনুকূল্য ও পোষকতা লাভ করেছিল। এমনকি একাধিক পালরাজা হিন্দু ধর্মের পূজা এবং যজ্ঞে নিজেরা অংশ গ্রহণ করেছেন, পুরোহিত সিঞ্চিত শান্তি বারি নিজেদের মস্তকে ধারণ করেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মে ব্রাহ্মণের নিয়োজিত হতেন, মন্ত্রী সেনাপতি হতেন, আবার কৈবর্তরাও এই সব পদে স্থান পেত। এইভাবে পালবংশ কে কেন্দ্র করে বাংলায় প্রথম সামাজিক সমন্বয় সম্ভব হয়েছিল। পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, সারনাথের বৌদ্ধ সংঘ ও মহাবিহারগুলিকে আশ্রয় করে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ জগতেও বাংলা ও বাঙালির রাষ্ট্র এক গৌরবময় স্থান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এই সকলের সম্মিলিত ফলে বাঙলায় এই সময়েই অর্থাৎ এই চারশো বৎসর ধরে একটি সামগ্রিক ঐক্যবোধ গড়ে উঠে। এটাই বাঙালির স্বদেশ ও স্বজাত্য বোধের মূলে এবং এটাই বাঙালির একজাতীয়ত্বের ভিত্তি। পাল-যুগের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।” - এই পরম্পরা মেনে রাজা মহেন্দ্রপাল, কুড্ডলখটকা বৈশ্য ( জেলা ), এবং পুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তি ( ডিভিশন) প্রজ্ঞাপারমিতা এবং অন্যান্যদের পূজার জন্য বজ্রদেবকে দায়িত্ব দেন এই বৌদ্ধবিহার গড়ে তোলার জন্য ।একটা ইংরেজী সংবাদ পত্রের খবর দেই Statesman (India) | December 30, 2001 | STATESMAN NEWS SERVICE MALDA, Dec. 29. - The government's delay in developing a Buddhist pilgrimage site at Jagajibanpur in Habibpur block was due to the lack of infrastructure, the chief minister said. Speaking to The Statesman during his visit here on Thursday, the chief minister, Mr Buddhadev Bhattacharya, said: "Jagajibanpur is an important excavation site. But due to lack of infrastructure, we are unable to attract the Buddhist pilgrims, particularly the Japanese, to it. They (international Buddhist tourists) only flock to Bihar and return." He assured that the government was "trying to create the necessary infrastructure at the place". According to Mr Bhattacharya, the completion of excavation work at the site will take some more time. The Archaeological Survey of India is doing the excavation at the site which includes Tulavita, well known during Pala rule. A part of the site falls in Bangladesh. A Bangladeshi archaeologist, Mr Najmul Haque, is also engaged in the task, he pointed out. After the Jagajibanpur project is completed, Mr Bhattacharya, said the state would feature in the itinerary of the Buddhist pilgrims. The chief minister also assured that the Malda unit of the West Bengal Democratic Writers-Artists' Association will set up a museum in Jagajibanpur. The association, however, alleged that the then chief minister, Mr Jyoti Basu, too had promised the museum in March 1994, but no initiative has been taken. It has also demanded that Malda must be covered in the next issue of the West Bengal Magazine published by Information and Cultural Affairs ministry. If the demand is acceded to, it will be for the first time in 24 years of Left Front rule that Malda will feature in the magazine. এই বৌদ্ধ বিহারটির বিস্তৃতি বর্তমান বাংলাদেশ পর্যন্ত । অনুমান, এটা নালন্দার থেকেও বড় । +++++++++ দেখতে গেলে , প্রথমে মালদা শহরে পৌঁছে হোটেলে উঠুন । তারপর একটা ভাড়া করা গাড়ী নিয়ে বলুন :- আইহো- বুলবুলচণ্ডীর রাস্তায় কেন পুকুর, পুকুরিয়া হয়ে এই রাস্তায় জগজীবনপুরে তুলাভিটা যাবো । =================== তথ্যঋণ :- শ্রী কমল বসাকের বই, এবং নেটের বিভিন্ন সাইট চিত্র সৌজন্য:- Shampa Ghosh (মালদা)

92

4

জল

গল্প

দাম্পত্য .... ঘুম ঘুম চোখে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসে নাসিমা| কিছুতেই যেন ঘুম ভাঙ্গতে চায় না| মোবাইলটা বেজেই চলেছে| এবার না লাইনটা কেটে যায়| এমনিতেই ঘুমটা ভাঙতে দেরীই হয়েছে| হাতটা বাড়িয়ে সেটাটা তুলে কলটা রিসিভ করে নেয় সে| - খুলছি| বলেই সেটটা রেখে দরজাটা খুলে বাইরে বের হয়| আঁচলের খোঁটে বেঁধে রাখা চাবিটা নিয়ে দ্রুত মেইনডোরটা খুলে দেয়| -এসো| আহ্বান জানায় নাসিমা| - খুব ঘুমোচ্ছিলে? নাসিমা জবাব দেয় না| রাত এখন তিনটে| আশে-পাশে বাড়িতে সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন| এই নিশুতি রাতে শব্দরা যেন প্রাণ পায়| ফিসফিসিয়ে বলা কথাও যেন গমগম করে ওঠে| হায়দর‚ নাসিমার স্বামীর গলাটা যেন সবসময় সপ্তকে চড়ে থাকে| - হাতমুখ ধুয়ে নাও| আমি খাবারগুলো গরম করে ফেলছি| কথা এগোতে দেয় না নাসিমা| শব্দের ভার মাঝেই মাঝেই বড় অসহনীয় হয়ে ওঠে| দ্রুত হাতে ফ্রিজ খুলে কষা মাংস আর ভাতটা বার করে আনে| গত সন্ধ্যেতে হুকুম হয়েছিল‚ রেওয়াজি পাঁঠার কষা কষা করে মাংস আর ঝরঝরে ভাতের| দুটো ওভেন জ্বেলে একটায় মাংসটা‚ আর একটা আঁচ কমিয়ে ভাতটা বসিয়ে দেয়| এবার একটা মাইক্রো কিনতে হবে মনে মনেই ভাবে| বলা চলবে না‚ এখানে কর্তার ইচ্ছেতেই কর্ম হয়| - হল গরম? হায়দররের অসহিষ্ণু গলা ভেসে আসে| - জ্বী হয়ে গেছে| বাড়ছি| গলায় একটু খাতিরদারি এনে কথা বলে নাসিমা| দ্রুত হাতে নক্সী ফাইবারের থালায় ভাত আর বাটিতে মাংস বেড়ে নিয়ে টেবলে হাজির হয়| হায়দরের চোখ তখন টিভির পর্দায়| দ্রুত হাতে খবরের চ্যানেল সার্ফ করে যায়| নিশুতি রাতে টিভি যেন গমগম করে| রেহান আর রাইসা দুজনেই উঠে পড়ে টিভির শব্দে| ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াতে রাইসা একটু ক্ষুন্ন‚ ঘ্যান ঘ্যান করে| দু বছরের রাইসা আর ছয় বছরের রেহান| - বাবা কখন এলে? ঘুমভাঙ্গা চোখে রোজকার মত প্রশ্ন করে রেহান| হায়দার কোলে তুলে নেয় দু সন্তানকে| একটু খুনসুটি করে| রাইসা জোরে কেঁদে ওঠে| ঠিক এইসময় খুনসুটি নয়‚ ঘুমটাই তার কাছে প্রিয়| দৌড়ে যায় নাসিমা| হায়দরের কোল থেকে নিয়ে নেয় নাইসাকে| তারপর ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করতে থাকে| -জ্বী খাবার তো ঠন্ডা হয়ে যাচ্ছে| হায়দর এগিয়ে যায় টেবলের দিকে| অল্প ভাত মেখে মুখে তোলে| নাসিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে| খাবার হায়দরের পছন্দ হয়েছে| রান্নাটা ভালো করে নাসিমা| তবু একই র্াঅন্না তো রোজ রোজ একরকম হয় না| একই মশলা‚ একই তেল‚ একই সবকিছু তবু একরকম হয় না| আর না হলে হায়দরের পছন্দ হয় না| যেদিন যেদিন রাত বিরেতে ফেরে হায়দর সেদিন সেদিন দিল হাতে নিয়ে বসে থাকে নাসিমা| তার মর্দের মরজি বোঝা খুব মুশকিল| ভালো খানা হলে ভালো না হলেই রাতবিরেতেই থালা সুদ্ধু খাবার ছুঁড়ে ফেলবে| খুব লজ্জা করে নাসিমার| আশে পাশে সবাই তো আছে| কে কি ভাবে! রাইসা ঘুমিয়ে পড়েছে| ছোট্ট শরীরটা শুইয়ে দেয় দুই পাশবালিশের মধ্যিখানে| রেহানও শুয়ে পড়েছে| ছ বছরের রেহানও বাপকে বেশ ভালোমত চেনে| জানে কখন মুড অন আর অফ থাকে| আজকাল বাচ্চাদের কিছু কি আর শেখাতে হয়!| -নাসিমা আজ মাংসটা বঢ়িয়া রেঁধেছ| দিল খুশ হয়ে গেল বুঝলে| হাত চাটতে চাটতে বলে হায়দর| বুকে একটা খুশির হাওয়া বয়ে যায় নাসিমারও| তাড়াতাড়ি করে এঁটো বাসনগুলো নামিয়ে টেবলটা মুছে দেয়| কাল সকালে বাসন মাজবে| অলোটা নিভিয়ে দিয়ে ঘরে যায়| টিভিটা বন্ধ করে দেয় হায়দার‚ ঘুমন্ত রাইসাকে আদর করে হায়দর| ঘুমের মধ্যেই গুচ্ছের বিরক্তি প্রকাশ করে| নাসিমা রেহানের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে আলোটা নিভিয়ে| কাল সকাল সকাল উঠতে হবে| রেহানের স্কুল আছে| রাতও বেশি তো বাকি নেই| চারটে বাজতে চলল| রেহানের চোখে তখনও ঘুম নেই| চুপ করে শুয়ে থাকে সে চোখ মুদে| মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নাসিমা| নাইট ল্যাম্প্টা নিভিয়ে দেয় হায়দর| প্রমাদ গনে নাসিমা| রাইসার শরীর ওপর দিয়ে এগিয়ে আসে হায়দরের শরীর| রিস্ক নেয় না নাসিমা| রেহানের পাশ থেকে শব্দ না করে উঠে আসে হায়দরের পাশে| -রেহান এখন ঘুমোয়নি| - হায়দর লঘু স্বরে ডাকে 'বেটা রেহান|' নাসিমা জানে রেহান সাড়া দেবে না| আজকালকার বাচ্চারা খুব বুদ্ধি রাখে| কাঠ হয়ে শুয়ে আছে‚ ঘুমোলে কারও শরীর ওমন কাঠ হয়ে থাকে না‚ শিথিল হয়ে থাকে| একদিন রেহান জানতে চেয়েছিল‚ 'বাবা রাতে কি করছিল মা ?' সেই থেকে খুব সতর্ক নাসিমা| কিন্তু হায়দরের খিদে যখন জেগেছে তাকে শান্ত না করে উপায় নেই| মিশে যেতে ইচ্ছে করে নাসিমার মাটির সাথে| তবু উপায় নেই‚ দাম্পত্য জীবন যে নির্বাহ করতেই হয়| কাল সকালে আবার যদি রেহান প্রশ্ন করে কি উত্তর দেবে নাসিমা? দাম্পত্য|

717

58

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

তুলাভিটা, মালদা-১

দিনটা ছিল, ১৩ ই মার্চ ১৯৮৭ । স্থানীয় ভাষায় “ নেউ” খোঁড়া মানে, ভিত তৈরি করার জন্য মাটি কাটা । মাটি কিছুটা কাটার পরেই উঠে এলো বিশাল এক তামার পাত । জায়গার নাম, “তুলাভিটা” মালদা জেলার হবিবপুর থানায় পড়ে, (অঞ্চল: বৈদ্যপুর জগজীবনপুর)। শহর ইংলিশ বাজার থেকে দূরত্ব প্রায় ৪১ কি মি । বাংলাদেশ সীমান্ত কাছেই । এই তামার পাতের ওজন- ১১ কে জি ৯০০ গ্রাম, ১৮ ইঞ্চি লম্বা ও ২২ ইঞ্চি চওড়া। হিজিবিজি লেখা এই তামার পাতের মূল্য, স্বাভাবিক ভাবেই ওই ভদ্রলোকের জানার কথা নয় । এই মুহূর্তে সেই ভদ্রলোকের নামটা আমার মনে পড়ছে না ( দুঃখিত), তবে তিনি একটি স্থানীয় স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন বলেই মনে পড়ছে। প্রথমে, এক তামার ব্যবসায়ী এই তামার পাতটি কিনে নিতে চান । কিন্তু, ওই ভদ্রলোকের একটা কিছু মনে হওয়াতে , চলে আসেন ইংলিশ বাজার ( মালদা বলে যাকে আমরা জানি ) শহরে। সৌভাগ্য বশত মালদার অন্যতম ইতিহাসবিদ ও মালদা বিটি কলেজের অন্যতম অধ্যাপক শ্রী কমল বসাকের হাতে ওই তামার ফলকটি আসে । ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ সালে, মালদার সংবাদপত্র “ এই মালদা” তে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে জানান :- এই তাম্রফলকটিতে সিদ্ধার্থ মাত্রিকা লিপিতে লিখিত । ভাষা সংস্কৃত । গদ্য ও পদ্য দুই ধরণের ধাঁচেই এই লিপি উৎকীর্ণ আছে । রাজা মহেন্দ্র পালকে আমরা এযাবৎ জেনে এসেছিলাম গুর্জর প্রতিহার বংশের । কিন্তু এই ফলকে লেখায় সেই ভুল ভাঙে । এই মহেন্দ্র পাল হলেন বাংলার বিখ্যাত পাল বংশের ৪র্থ রাজা দেবপালের ছেলে । এই বংশ সম্বন্ধে আগে বলে নেই, তা হলে আরও সুবিধে হবে, ব্যাপারটা বুঝতে । - বাঙালি রাজা শশাঙ্কের গৌড়কে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গৌড়তন্ত্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা তার মৃত্যুর পর ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শশাঙ্কের ধনুকে গুণ টানার মত বীর অব্যবহিত পরে আর দেখা গেল না। ফলে এর পর সুদীর্ঘ একশো বৎসর(৬৫০ -৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সমগ্র বাংলার উপর নেমে আসে গভীর ও সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতা। প্রখ্যাত বৌদ্ধ ইতিহাস রচয়িতা তারানাথ এই সময় সম্পর্কে বলেন:- 'সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া অভূতপূর্ব নৈরাজ্যের সূত্রপাত হয়। গৌড়ে-বঙ্গে সমতটে তখন আর কোনও রাজার আধিপত্য নাই, সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব তো নাইই। রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্রাহ্মণ। নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, কাল তাহার মস্তক ধূলায় লুটাইতেছে।' এর চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কি হতে পারে! সমসাময়িক লিপি ও কাব্যে (রামচরিত) এ ধরনের নৈরাজ্যকে বলা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। বাহুবলই একমাত্র বল, সমস্ত দেশময় উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মত্ততা; দেশের এই অবস্থাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তাকেই বলে মাৎস্যন্যায়। অর্থাৎ বড় মাছের ছোট মাছকে গ্রাস করার যে ন্যায় বা যুক্তি সেই ন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব। শত বৎসরের এই মাৎস্যন্যায়ের নৈরাজ্যে বাংলায় আর্থ সামাজিক অবস্থা চরম বাজে অবস্থায় চলে আসে। এই নৈরাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে কি পরিমাণ ভোগান্তি ও দুর্দশা ছিল টা সহজেই অনুমেয়। সংস্কৃত গ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূলকল্প থেকে এই সময় ঘটা এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায়। চলবে

120

8

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

সংস্কৃত বলার বিপদ

মালদায় থাকাকালীন, সরকারী ট্যুরিস্ট লজ থেকে ম্যানেজার সাহেব মাঝে মাঝে এত্তেলা দিতেন- গৌড় পাণ্ডুয়ায় বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকদের গাইড হতে। বিনিময়ে টাকাডা, কলাডা, মুলোডা জুটতো। টাকা পয়সা তো মিলতই তার ওপর খ্যাঁটন আর বিলেইতি কারণ বারি । তো, সেবার ডাক পড়লো। গিয়ে দেখলাম এক মধ্যবয়সী দম্পতী। ম্যানেজার বাবু সেই মুহূর্তে ছিলেন না। স্টাফেদের কাছে জানলাম, এঁরা ফ্রেঞ্চ। সব্বোনাশ। এদিকে তো আমি খালি মঁশিয়ে আর মাদামাজোয়েল, এই দুটো শব্দ জানি, তাও নার্ভাস হয়ে কোনটা পুংলিঙ্গ আর কোনটা স্ত্রীলিঙ্গ ভুলে মেরে দিয়েছি। বলির পাঁঠার মত ওনাদের কাছে গিয়ে কাঁপতে লাগলাম। খালি দাঁত বের করে হেসে যাচ্ছি। ম্যানেজারবাবু ততক্ষণে চলে এসেছেন। তাঁকে দেখে, ভদ্রলোকের বিরক্তি প্রকাশ। আমারই মতন টুটাফুটা ইংরেজিতে বললেন- আপনাদের এখানে মূক বধির গাইড দেওয়া হয় নাকি? সাহস পেয়ে আমার "ফ্রেঞ্চ" ইংরেজি বললাম ওনাদের সাথে । বাঙালি হেলায় করিল ফ্রাঁসোয়া জয় । ==== ম্যারিকান ইংরেজী বলা খুব সোজা ! নাকী সুরে বাংলা উচ্চারণে ইংরেজী বললেই হল। যদিও ওদের গুলো বোঝা যেত না সহজে । আরও একবার এই রকমই ডাক পড়লো । গিয়ে দেখি দুই সাহেব । আমার কাছে, সব সাহেবই এক লাগতো দেখতে । তবে, এদের উচ্চারণটা বোঝা যাচ্ছিল । একজন বয়স্ক, আরেকজন তুলনায় কম বয়েসী । রওয়ানা দিলাম । দেখাতে দেখাতে চলেছি । মাঝে দু একটা মুখস্ত করা সংস্কৃত শ্লোক । পরান্নং প্রাপ্যে মূঢ় মা প্রাণেষু দয়াং কুরু। পরান্নং দুর্লভং লোকে, প্রাণাঃ জন্মনি জন্মনি ।। (অস্যার্থঃ- পরের অন্ন ( কেউ কাউকে সহজে ডেকে খাওয়ায় না) এই পৃথিবীতে পাওয়া যায় না। অতএব, হে মূর্খ! যত পারো খাও! আর প্রাণ? সে তো জন্মজন্মান্তরেও পাওয়া যায়। - খাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় দর্শন শেখাচ্ছিলাম ওদের :p ) হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বয়স্ক সাহেবটা বলল :- ইট সিম্স্ ইউ নো সানস্ক্রিট‌ !!! আম্মো ভাবলাম :- সায়েবরা আর সংস্কৃত কি বুঝবে ? তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আমার উত্তর :- ইয়া ইয়া ! সিওর ! তারপরই- বিনা মেঘে বজ্রপাত ! দেন লেট আস টক্ ইন‌ সানস্ক্রিট্ , হোয়াই ইন ইংলিশ ? কিভাবে যে সামলেছিলাম------ ভগাই জানে ! ======= পরে জেনেছিলাম- বয়স্ক মুশকো সাহেবটি জার্মান এবং তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের ডিন্ আর ছোটটি অধ্যাপক সংস্কৃতের । সেই থেকে আর সংস্কৃত নিয়ে কথা বলি না ! মাত্থা খারাপ ?

158

14

মনোজ ভট্টাচার্য

স্বপ্নে আসে চরিত্রেরা !

স্বপ্নের মাধ্যমে কি গল্পের থিম পাওয়া যায় ? হয়ত যায় ! কাল সারা রাত স্বপ্নের মধ্যে বিচরন করল বেশ কয়েকটা চরিত্র ! তাদের মধ্যে মহিলা ছিল কিছু – পুরুষ চরিত্রও ছিল ! কিন্তু তাদের কারুকেই আমি চিনতে পারলাম না ! কেন তারা স্বপ্নের মধ্যে এলো ! – আমাকে কি তাদের কোন কথা বলতে চাইল ! যেমন নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র! পরিচালকের সন্ধানে জলজ্যন্ত ছটা চরিত্র তার পথ খুঁজে নিতে চায় ! – এখানেও তাদের চেয়ে একটু উচ্চতায় যেন তাদের দেখতে পাই – সবাইকেই যাতে দেখা যায় ! এরা তো অতীত নয় ! নাকি বর্তমান – টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে ! লিখেছি – চরিত্রগুলোর কজন নারী – কিছু পুরুষ ! ঠিক কজন – তা সঠিক বোঝা গেল না ! – স্বপ্নের আবছায়ার মধ্যে দিয়ে যেরকম দেখেছি সেরকম ভাবে আঁকার চেষ্টা করি । - মোটামুটি সবারই বয়স কম বেশি চল্লিশের কাছাকাছি । মেয়েদের বয়সও তিরিশ চল্লিশের আশেপাশে ! প্রথমে এক জন - বয়েস মনে হল চল্লিশেক । চোখে চশমা । নাম হওয়া উচিত প্রণব বা প্রনবেশ । একটু রাশভারী ধরনের ! কথায় বার্তায় বেশ একটা ভারিক্কি ভাব দেখাচ্ছে ! মুখে সিগারেট দেখা যাচ্ছে ! মনে হয় জমি জমা সংক্রান্ত ব্যবসায় যুক্ত ! – যদি একে এদের মধ্যে দলপতি বলি – তবু এর মুখে একটা চিন্তান্বিত ভাব রয়েছে ! – দলপতি বলেই কি ? নাকি অন্য কিছু ! দ্বিতীয় জনকে মনে হল – এক নারী । এর চোখে রোদ-চশমা । শ্ল্যাক্সের ওপর টপের ওপরেই তার বয়েস ফুটে উঠেছে ভালো ভাবেই ! সাবলীল অঙ্গভঙ্গি । সবার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ ভাবে মিশছে ! এর যুতসই নাম হবে মাধবী ! – আর এর কাছাকাছি একজনকে দেখা যাচ্ছে – এর চেয়ে বয়েস কম । পুরুষ । একটু বেশি বেশি প্রশ্রয় পাচ্ছে ! এর নাম দেওয়া যাক – কৌশিক ! খুব মিশুকে । সবার কাছেই যাতায়াত করছে । প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করে দিচ্ছে ! তবে মাধবীর কাছে একটু বেশি আবদারি ! কৌশিকের একজন সঙ্গী – মানে স্ত্রী হতেও পারে – আছে । সে কিন্তু ওর কাছ থেকে দূরে দূরে ! এই নিয়ে আবার আরও কিছু জনের মধ্যে রঙ্গ রসিকতা চলছে ! শ্রাবস্তী নাম তার । শ্রাবস্তীকে বেশ স্বাধীনচেতা মনে হয় ! খুব পতিপ্রাণা মনে হয় না ! চেহারার বাঁধুনি আছে ! হাব ভাবে মনে হয় কোনও অফিশে কাজ করে । অর্থাৎ স্বয়ং স্বচ্ছন্দ ! রুচিসম্মত পোশাক – শালোয়ার কামিজে – মানানসই ! আরও যেন কিছু মানুষকে দেখেছিলাম ! যেমন ওদের সঙ্গেই দেখেছি – বছর তিরিশের এক পুরুষ ও তার এক মহিলা সঙ্গী ! – ওরা ওদের বাবলু ও মানু বলেই ডাকছিল ! খুব সম্ভবত বেশিদিন বিয়ে হয় নি । কারন ওরা বেশীরভাগ সময়েই এক সাথেই কাটাচ্ছিল ! বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে – এই অসম্পূর্ণ লেখাটা – পরেই আছে । ওদের চরিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী লিখে রেখেছি – এতদিন । যদি না খবরের কাগজে এই খবরটা দেখতাম – তাহলে হয়ত ভুলেই মেরে দিতাম ! খবরটা আজ আলাদা আলাদা ছবি দিয়ে বের হয়েছে ! আলমবাজারের ঠাকুরবাড়ি অঞ্চল থেকে জনা দশেক বন্ধু-বান্ধব বকখালি বেড়াতে গেছিল ! সন্ধের সময়ে ফেরার পথে জোকায় খোঁড়া রাস্তায় ওদের গাড়ি উল্টে – তিনজন হাসপাতালে যাবার সময়েই - - । বাকিদের খুব বেশি ক্ষতি হয় নি ! – তাদের কাছেই শোনা গেল খাপছাড়া ভাবে - । এক প্রসিদ্ধ প্রমোটার তার স্ত্রী ও কয়েকজন বন্ধু ও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে বকখালিতে বেড়াতে গেছিল । সেখানেই বা ফেরার পথে তার সঙ্গে কয়েকজনের খুব কথা কাটাকাটি হয় তার স্ত্রীর সঙ্গে এক বন্ধুর সম্পর্ক নিয়ে ও প্রচুর টাকা পয়সার লেনদেন নিয়েও ! – কিন্তু তার সঙ্গে দুর্ঘটনার কি সম্পর্ক ! – আসলে কাগজে ধূসর বা অপরিস্কার ছবি দেখেও আমার স্বপ্নে দেখা সেই চরিত্রগুলোর একটা মিল খুঁজে পেয়েছি! সেটা যে ঠিক কি – তা বলা মুস্কিল ! আমি তো গাড়িতে ছিলাম না – বা স্বপ্নের চরিত্রগুলোকে কারুর সঙ্গে মেলাবার চেষ্টাও করিনি ! তবে – আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয় – প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল ! গাড়িতে বা গাড়ির বাইরে ধাবায় চা খেতে খেতে ! – আসলে ওই স্বপ্নের চরিত্রগুলো আমাকে যেন টানছিল ! অনেকদিন কোথাও আটকে থাকা পাখি যেমন বাইরে বেরতে চায় ! আজ আমি সেই চরিত্রগুলোকে আমার বদ্ধ কম্পিউটার থেকে মুক্তি দিলাম ! একটি কৈফিয়ত ! – অনেক অনেক দিন আমি কোনও গল্প লিখিনি ! অর্থাৎ পারিনি। আসলে আমার যা কিছু লেখা – সবই কবিতা-কেন্দ্রিক ! – পড়িই বেশি । ভালো লাগে – কবিতা বিষয়ক আলোচনা ! – সেই আমি কি করে গল্প লেখার চেষ্টা করলাম ! আসলে একটা ধারনা ছিল – স্বপ্নে যাই দেখা যাক না কেন – সেটা একটা ফ্রিজ শট! সেখানে গল্পের পরিণতি পাওয়া যায় না ! – আমিও তাই চরিত্রগুলো এঁকে রেখেছিলাম ! এবং অনেক অন্য লেখার মতোই পড়ে ছিল ! একটা গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে গল্পের সেই পরিণতি আমাকে ডেকে নিল । তবে এই পরিণতি আমার কাছে সুখকর নয় ! মনোজ

91

5

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

ইতি উতি

হউ - শব্দটা একটি ওডিয়া লব্জ । এর কাছাকাছি অর্থ বাংলাতে করলে দাঁড়ায় – আচ্ছা বা বেশ । পুরী বাঙালিদের কাছে বেড়ানোর জায়গা । রথদেখা – কলাবেচা দুটোই হয় । জগন্নাথকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় – চক্কাডোলা । মানে হলো গিয়ে – চাকার মত গোল চোখ । আমি ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পুরীতে বেচুবাবুর কাজ করেছি – দুটো ওষুধ কোম্পানির হয়ে । প্রথমটা – জার্মান রেমেডিস, পরে সারাভাই কেমিক্যালস । অবশ্য দুটো কোম্পানির ক্ষেত্রেই কটকঅ শহরঅ, বড় মনোহরঅ ছিল আমার হেডকোয়ার্টার । পুরী, বড় জেলা হওয়াতে ন্যূনতম সাতদিন কাজ করতে হতো সমস্ত জেলার কিছু বাছা অংশে । সেলও ভালো ছিল ওই জেলায় । থাকার জন্য – ছিল ইউনিয়নের রেষ্টহাউস । রাঁধিয়ে ছিল – নীরঅ । চমৎকার রান্না করতো । যে বাড়ীতে রেস্ট হাউস ছিল- তার নাম ছিল – অক্ষয় ধাম । সব মিলিয়ে দুটো বড় বড় ঘর রেষ্টহাউসে । খাটা পায়খানা । পরিবারকে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না, তবে পরের ঘরটা প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকতো বলে আমরা রেভিনিউ তোলার জন্য – ছেড়ে দিতাম একটা ঘর । রেষ্ট হাউসে মদ খাওয়া বারণ । আমরা কেউই নিয়ম ভাঙতাম না । খেতে ইচ্ছে হলে চেনা শোনা হোটেলে একটা ঘরে ম্যানেজ করে টাংকু টানা চলতো । বেরিয়ে আসার সময় ম্যানেজার আর বয়দের একটা ভালো রকম বখশিস দিতাম আমরা, খাবারের দাম সহ । তবে টাংকু হিসেবে আমাদের বিয়ারটাই বেশী পছন্দ ছিল – কারণ তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোলে পাশ না হওয়া বিয়ারের বোতলগুলো সেই কোম্পানির প্রতিনিধিরাই এনে দিতেন, কখনও পয়সা দিয়ে বা না দিয়ে । না না, গুণগত মান খারাপ ছিল না, তবে কোনো কোনো বোতলে ঠিকঠাক ফিলিং হতো না বলে, সেগুলো কোম্পানি ষ্টাফদের হয় মিনে মাগনায় বা অল্প কিছু টাকা নিয়ে বিলিয়ে দিতো কোম্পানি । পরিভাষায়, এদের নাম ছিল – সেকেন্ডস্ । দাম প্রতি বোতল- দেড় টাকা । ঠিক সেই সময়েই প্রথম ফিল্টার সিগারেট লঞ্চ হয় উইলস কোম্পানিতে । নাম ছিল – ফিলটার উইলস্ । দাম ছিল – প্রতি প্যাকেট আশী পয়সা । একটা প্যাকেটে থাকতো দশটা সিগারেট স্টিক । সেই সময়ে – বেশ দামী সিগারেট । তখন ক্যাপস্টান সিগারেটে দেশী তামাক ব্যবহারের কারণে – গুণমান পড়ে গিয়েছিল, ফলে ঠিক আভিজাত্যটাও ছিল না সেই ব্র্যান্ডের । দামও কমে এসেছিল । পুরী মন্দিরের পেছনেই ছিল লক্ষ্মীবজার । এটা এখন আর নেই । যেমন নেই একটা বিশাল বটগাছ – পুরী মন্দিরে ঢোকার দরজায় । লক্ষ্মীবজারেই ছিল আইটিসির পুরী জেলার ডিষ্ট্রিবিউটার । এনার আসল পরিচয় ছিল – মন্দিরের নাম করা পণ্ডা, বাঙালি উচ্চারণে পাণ্ডা । এই কোম্পানি বাজার ধরার জন্য প্রত্যেক খরিদ্দারকেই এক প্যাকেট কিনলে আরেকটা প্যাকেট ফ্রি দিতেন সেই সময় – যদিও শতকরা নিরানব্বই কেসেই এই ফ্রিটা জুটতো না প্রান্তিক খরিদ্দারের । ‌ আরও একটা ব্যাপার ছিল – একটা প্যাকেটে যদি ৯ টা সিগারেট দৈবাৎ পাওয়া যেত, তবে দোকানে থাকা কোম্পানির ফর্ম ভর্তি করে বিক্রেতার সই ছপ্পর নিলেই , দিনকয়েকের মধ্যেই মিলতো মুফতে পাঁচ প্যাকেট সিগারেট । এই সবই জেনেছিলাম, কারণ ওই ডিস্ট্রিবিটারের আপন ভাই ছিলেন আমার কোম্পানির ডিষ্ট্রিবিটার । তাই সিগারেটটাও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রায় বিনে পয়সায় । বিয়ারও তাই । এঁদের দৌলতে প্রায়ই জগন্নাথ দেবের নিরামিষ ভোগ জুটতো লাঞ্চ হিসেবে । ষোলো রকম তরকারি আর সুগন্ধী আতপ চালের ভাত । ফুরফুরে সুগন্ধে ভরে উঠতো চারিদিক । এখন যেটা স্বর্গদ্বার সেটা আসলে শ্মশান । তারই পাশ দিয়ে আমাদের আসতে হতো রেষ্টহাউসে জনবিরল রাস্তা ধরে । উঁচু নিচু রাস্তার বাঁপাশে ছিল একটা আশ্রম আর ডান দিকে ছিল রেলের গেষ্ট হাউস । তাই, বেশী রাত করতাম না রেস্টহাউসে ফেরার সময়ে । সন্ধে সাতটার মধ্যেই শুনশান হয়ে যেত রাস্তাটা । রেষ্টহাউসের বাঁধা রিক্সাওয়ালা ছিল – বাঙালি রতন । সারা পুরীতে ঐ একটাই বাঙালি রিক্সাচালক । ভয় দেখাতো – নানা গল্প শুনিয়ে, ফলে বিশ্বাস না করলেও একটা শিরশিরে অনুভূতি তো থাকতোই । সবসময় সন্ধে সাতটার মধ্যে ফেরা হতো না, কারণ স্টেশনের কাছে কিছু ডাক্তারদের ভিজিট করে দেরীও হতো । আগেই বলেছি – মন্দিরের সামনে বটগাছ ছিল আর ছিল , একটা উঁচু মত জায়গা, যেখানে বেশ কিছু দোকান এবং ডঃ মহাদেব মিশ্রের চেম্বার ছিল । ভদ্রলোক ইংরেজিতে কথা বলা পছন্দ করতেন না, তবে ওডিয়া টানে বাংলা বলতেন আর আমাদের কথা বাংলাতেই শুনতেন । তবে, মেডিক্যাল টার্ম গুলো ইংরেজিতে না বলে উপায় ছিল না, আর বললে – তিনি কিছু মনেও করতেন না । পুরী শহরে, সেই সময়ে কুল্লে একটাই অভিজাত হোটেল ছিল, বোধহয় এখনও আছে । বি, এন, আর হোটেল নামেই তার পরিচিতি । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ে চালাতেন এই সরাইখানা । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ের আগের নাম ছিল – বেঙল নাগপুর রেলওয়ে । সংক্ষেপে – বি. এন. আর । ঠাট্টা করে বলা হতো – বি নেভার রেগুলার । সময়ে নাকি কোনো ট্রেনই চলতো না । একবার দেখা গেল- একটি ট্রেন ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালো । আশ্চর্য হতেই – গার্ড সাহেব নাকি ভুল ভাঙিয়েছিলেন । এটা গতকালের ট্রেন, পাক্কা চব্বিশ ঘন্টা লেট । আজকের ট্রেনের কোনো পাত্তা নেই । আমি অবশ্য বি. এন. আরের ট্রেনে চড়িনি । তবে, বালেশ্বর, কটক, ভুবনেশ্বর, পুরী, ওয়ালটেয়ার ( বর্তমান বিশাখাপট্টনম্ )ওয়েটিং রুমে, বার্মা টিক কাঠের আলনা, চেয়ার, কাবার্ডে বি. এন. আর নামটা খোদাই করা দেখেছি । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলটি তৈরিই হয়েছিল – সায়েবদের জন্য । নিজস্ব সী বিচ আর নুলিয়াও ছিল হোটেলের । সেভেন কোর্স লাঞ্চ আর ডিনার ছিল – কি বিশেষণ বলি বলুন তো ? এককথায় মাইন্ড ব্লোয়িং । চিকেন আলা কিয়েভ – প্রথম এখেনেই খাই । ছুরি দিয়ে কাটলেই বেরিয়ে আসতো তরল সোনার মত মাখন । ওই স্বাদের “কোনো ভাগ হতো না” । মাখনের সাথে মাংস গুলো ইসোফেগাস ধরে স্টমাকে চলে যেত কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়াই । টেষ্ট বিড গুলো বুঁদ হয়ে থাকতো সেই স্বাদে । “ত্রিলোক তারিণী গঙ্গে, তরল তরঙ্গ রঙ্গে এ বিচিত্র উপত্যকা আলো করি করি চলেছ মা মহোল্লাসে!” ... মাখনে মাংসে জিভ একেবারে “গলগলায়িত” । শেষ পাতে আসতো – হিমালয়ান আইসক্রিম । আকৃতি এবং বপুতে একেবারে হিমালয় । পরতে পরতে তার অনেককিছু থাকতো ।নিজচোখে না দেখলে এই আইসক্রিমের রূপ- বর্ণণা দেয়া খুবই কঠিন। অনেকটা 'অন্ধের হস্তি' দর্শনের মতো। ও হরি – বলাই হয় নি । আমাদের কোম্পানির মিটিং এখানে হতো মূলত আমাদের ম্যানেজারদের দৌলতে । এছাড়া পুরীর ডাক্তারদের মাঝে মাঝে এখানে খাওয়ানো হতো – কোম্পানি দের পয়সায় । আমাদেরটাও ব্যতিক্রম ছিল না । যা হয় আর কি – হোটেলের ম্যানেজার থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য কর্মীদের সাথে আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল সহজবোধ্য কারণেই । এছাড়া ওষুধপত্র তো ছিলই । ১৯৭৪ সালে বিয়ে করে – এই হোটেলে মধুচন্দ্রিমা যাপন করবো ভেবেছিলাম, কিন্তু দামের কথা ভেবে পেছিয়ে আসি । জানতে পেরে -বন্ধুরা চাঁদা তুলে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল । এখানেই আমার একমাস বিয়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারতো । তবে সমুদ্রে সাঁতার কি ভাবে কাটতে হয়, সেটা শিখে যাবার ফলে, চুলের মুঠি ধরে ওনাকে জল থেকে তুলে নিয়েছিলাম – তাই ৪২ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটাতে পারছি শৃঙ্খলিত অবস্থায় । সে সব দুঃখের কথা না হয় পরেই বলবো । দেখুন তো – কথায় কথায় আসল বিষয় থেকে সরে গেছি । ডঃ মহাদেব মিশ্র ভিজিটে কোনো স্যাম্পেল নিতেন না । তবে, মাসে বা দুমাসে একবার করে ক্যাম্প করতেন নুলিয়া এবং রিক্সাওয়ালাদের বস্তিতে । আমরাও সোৎসাহে অংশ গ্রহণ করতাম । সেবার এক জার্মান কোম্পানির ছেলে এলো পুরীতে । পাক্কা দর্জিপাড়ার নতুন দা । ফ্রম টপ টু টো – পুরো ক্যালকেসিয়ান । ধরা যাক, তার নাম অনুপ । অনুপ আমাকে জিজ্ঞেস করলো – দাদা আপনার কোলকাতায় বাড়ী কোথায় ? গম্ভীর হয়ে বলেছিলাম – মেদিনীপুরের কাছেই । অনুপ উত্তর দিয়েছিল – আমি নর্থ কোলকাতার তো । সাউথটা আমার তেমন ঘোরা নেই । মেদিনীপুর, ভবানীপুরের কাছে বোধহয়, তাই না ? এহেন অনুপ কে আমরা পইপই করে বলে দিয়েছিলাম – ডঃ মহাদেব মিশ্রের সাথে ইংরেজিতে কথা না বলতে । বাংলাতেই কাজ সারা যাবে । তোর যে কোনো দুটো প্রডাক্টের কথা বলে দিবি – ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দেবেন । কিন্তু, ধর্ম কাহিনী কে কবে শুনেছে ? চেম্বারে ঢুকেই বাও করে বলল – ডক্টর, আই অ্যাম ফ্রম ----- হউ বেচারা অনুপ – ভাবল ওটা হাউ উত্তরে বলল – কম্পানি হ্যাজ সেন্ট মি ওভার হিয়ার হউ বিকজ আই হ্যাভ বিন সিলেক্টেড টু ডু সো হউ এরকম “হউ” কাণ্ড খানিক চলার পর ডঃ মিশ্র রেগে মেগে অনুপকে বেরিয়ে যেতে বললেন চেম্বার থেকে । তারপরের এপিসোড অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছিলাম আমরা । এর পরে অনুপকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলতো :- হউ । ----------------------- ইতি পুরী কাণ্ডে “হউ” পর্বঃ সমাপ্তম {/x2} {x1i}itiuti.jpg{/x1i}

125

9

দীপঙ্কর বসু

না না রঙের দিনগুলি

চার শোনাতে বসেছি আমার জামশেদপুর বাস এর স্মৃতি কথা |তাই আমার খড়্গপুরে কাটান দুই বছরের নির্বাসন পর্ব কে এক পাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে চলি | ডেভেলপমেন্ট স্কুল থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে ১৯৬০ সালে আমি পাকাপাকি ভাবে ফিরে এলাম জামশেদপুরে ‚ভর্তি হলাম সাকচি অঞ্চলে চেনাব রোডস্থিত রামকৃষ্ণ মিশনের এর পরিচালনাধীন বিবেকানন্দ মিডল স্কুলে‚ক্লাস সিক্স এ | সকাল সাতটায় স্কুলের ভেতরের দিকের একটা খোলা চত্বরে সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে "ভব সাগর তারণ কারণ হে‚ গুরুদেব দয়া কর দীন জনে" সমবেত কন্ঠে প্রার্থনা সংগীত দিয়ে শুরু হত স্কুলের কার্যক্রম| টেলকো থেকে আমরা যারা পড়তে যেতাম সাকচির বিভিন্ন স্কুলে‚ তাদের বাড়ি থেকে বেরোতে হত বেশ ভোর বেলা | সকাল ছটা থেকে সোয়া ছটার মধ্যে টেলকোর স্কুলের বাস আসত এ রোডের বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ড থেকে আমাদের তুলে টেলকো কারখানার পিছন দিকে মনিপীঠ অঞ্চলের ‚যেখানে সাবেক রেল আমলের কলোনী ছিল‚আমরা যাকে বাবুলাইন নমে চিনতাম ‚সেই পাড়া ঘুরে রওয়ানা হত স্কুলের দিকে| মনে আছে শীতের দিনে হাড় কাঁপান ঠান্ডায় বেশ কষ্টকর ছিল স্কুলে যাওয়ার ব্যপারটা| ১৯৪৫ সালে টাটা কর্তৃপক্ষ ইষ্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের একটি পুরণো কারখানার শেড রেলকলোনী সহ কিনে সেখানে স্টীম লোকোমোটিভ এবং রেলের ব্যবহার যোগ্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপন করেছিল |বাবু লাইন সেই রেল জমানার স্মৃতি বহন করে টিকে ছিল তখন অবধি|পরবর্তী কালে টেলকো অটোমোবাইল ব্যবসায়ে প্রবেশ করার ফলে কারখানার সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ার গ্রাসে বাবুলাইন মুছে গিয়েছিল- কারখানা গ্রাস করে নিয়েছিল অঞ্চলটাকে| সামনের দিকে নাক বাড়ান যে বাসটি বিবেকানন্দ এবং সাকচি হাই স্কুল এর ছেলেদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর ফেরৎ নিয়ে আসার কাজ করত আমরা তার নাম দিয়েছিলাম জার্মান বাস | সম্ভবত জার্মানির ডেইমলার বেঞ্জ এর সঙ্গে চুক্তি করে জামশেদপুরের কারখানায় ট্রাক তৈরির প্রথম পর্বে জার্মানি থেকে অমদানি করা পার্টস এ্যসেম্বল করেকিছু বাহন তৈরি হয়েছিল সেই বাহনেরই একটি ছিল এই বাস ।জার্মান বাস নামকরণের কারণ সম্ভবত এটাই ছিল ।আরো দুতিনটি বাস টেলকো কম্প্যানি স্কুলের ছেলে মেয়েদের স্কুলে যাতায়াতের জন্য চালাত সেগুলি ঐ রকম নাক বাড়ানো চেহারার ছিলনা | সারদামনি ‚ সিস্টার নিবেদিতা ‚ সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট ইত্যাদি স্কুলের মেয়েদের জন্যে ছিল স্বতন্ত্র বাস|কবে থেকে যে এই পরিষেবাটি কম্প্যানি বন্ধ করে দিয়েছে ধীরে ধীরে তা এখন আর মনেই পড়েনা | আমার ছোট্ট জগতটা এবার একটু একটু করে প্রসারিত হয়ে উঠছিল| আমার ক্লাসের সহপাঠীদের সঙ্গে তো বটেই ‚ সেই সঙ্গে একই বাসে নিত্য যাতায়াত করার সুবাদে অন্যান্য ক্লাসের ছেলেদের সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে লাগল| তাদের বেশীরভাগের নাম ই আজ আর মনে নেই – মনে আছে বাকা নামে আমার সমবয়সী একটি ছেলে আর তার দাদার কথা | বাকাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের মেলামেশা ছিল |বাকার বাবাকে আমার বাবা সত্যদা নমে ডকতেন এবং আমরা মাঝে মাঝেই ওদের বাড়িতে যেতাম সপরিবারে বেড়াতে| অমার সহপাঠী আর একটি ক্ষ্যাপাটে ছেলের কথাও মনে পড়ছে -তার ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের জন্যই বোধ হয় তাকে সে সময়ে একটু এড়িয়ে চললেও ঐ ক্ষ্যাপামির জন্যেই তার নামটা মনে আছে | তার নাম ছিল উৎ্পল | উৎ্পলের ছিল গানের সখ| স্কুলের টিফিন এর সময়ে দিব্বি ডেস্ক বাজিয়ে আপন মনে গান ধরত |তার বিশেষ প্রিয় একটি গান‚ যেটা সে প্রায়শই অবসর সময়ে গলা ছেড়ে গাইত | গানটি সেকালে মান্না দে র গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় গান -ও আমার মন যমুনার আঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতই খেলা/ বঁধু কি তীরে বসে মধুর হেসেই কাটবে শুধু সারা বেলা ঠিক কোন বছরে মনে পড়ছেন ‚তবে মিড্ল স্কুলে পড়ার সময়েই একদিন ঘটল একট ঘটনা যা আমার মনে গভীর ভাবে রেখা পাত করেছিল |আমাদের স্কুলের বাগানে মেইন গেটের পাশেই ছিল একটা মহুয়া গাছ| বছরের একটি সময়ে অজস্র মহুয়ার ফলে ফুলে ভরে উঠতো গাছটা‚- তার কিছু ফল ঝরে পড়ে ছড়িয়ে থাকত বাগান ময়|অনেকটা বাংলা পাঁচের মত আকৃতির ছোটো ছোট ফলগুলিকে দুই আঙ্গুলের মঝে রেখে চাপ দিলেই তার ভিতর থেকে পিচকারির মত একটা মাদকতাময় গন্ধ যুক্ত তরল বেরিয়ে আসত |আমর প্রায়ই সেগুলিকে কুড়িয়ে নিজেদের পকেটে ভরতাম এবং খেলার ছলে কোন অন্যমনস্ক বন্ধুর মুখে সেই তরল ছিটিয়ে দিতাম অচমকা| আনমনা বালকটি সচকিত হয়ে উঠত | আমরাও মহাউল্লাসে মেতে উঠতাম | বলা বাহুল্য আমাদের এই মজায় স্কুলের মাস্টারমশাইদের সায় ছিলনা |তবে তাঁরা আমাদের এই খেলাটাকে ঠিক কগনিজেবল অফেন্স হিসেবে গন্য করতেননা- উল্টে তাঁদের কেউ কেউ আমাদের এই ছেলেমানুষী মজায় লুকিয়ে মজাও পেতেন বলেই আমার বিশ্বাস | এই নিস্পাপ খেলাটিই একদিন ঝামেলা ডেকে আনল |সামনের বেঞ্চে বসা তন্ময় নমে একটি ছেলে যখন মন দিয়ে মাস্টারমাশাইয়ের পড়ান বোঝার চেষ্টা করছে সেই সময়ে তার পিছনের বেঞ্চিতে আমার ঠিক পাশেই বসা ছেলেটি মাঝে মাঝেই নিজের পকেট জমিয়ে রাখা মহুয়া ফল বের করে দুই আঙ্গুলের চাপে মহুয়ার রস ছিটিয়ে দিচ্ছিল তন্ময়ের কানের পিছন দিকে | প্রথমে দুই একবার উপেক্ষা করার পর একবার হঠাৎই তন্ময় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে সজোরে এক ঘুষি চালিয়ে দিল আমার নাক লক্ষ্য করে| আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঘুঁষি সজোরে আমার নাকে এসে লাগল |নাক দিয়ে রক্তপাত আরম্ভ হল | মাস্টারমশাই সহ গোটা ক্লাস ঘটনার আকষ্মিকতায় হতভম্ব!! মাস্টার মশায়ের নির্দেশক্রমে দুতিনটি ছেলে আমাকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল ক্লাসের বাইরে বাথরুমে মুখে নাকে জলের ছিটে দিয়ে রক্ত ধুয়ে দিতে | সে সব মিটিয়ে ক্লাসে ফিরে এসে দেখি অকুস্থলে হেড মাস্টার মশাই ‚শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত হয়েছেন ‚রাগে তাঁর ফর্সা মুখ একেবারে রক্তবর্ণ ‚হাতে ধরা একটি লিকলিকে বেত ‚আর তাই দিয়ে বেদম প্রহার করছেন তন্ময়কে | আর হেডমাস্টার মশায়ের দুচোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রু ধারা | হেড মাস্টার মশাই তন্ময়কে প্রহার করছেন আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেও কেঁদে চলেছেন সমানে| আমি আমার অকারণ নিগ্রহের কথা ভুলে অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলাম আর ভাবছিলাম শিবপ্রসাদ বাবুর মত শান্ত মৃদুভাষী কি ভাবে এমন নির্মম প্রহার করতে পারেন আবার একই সঙ্গে নিজেই কেঁদে ভাসান !! ঘটনাটির কথা আজ এত বছর পরে লিখতে গিয়ে বারে বারে সাদাধুতি আর গেরুয়াপাঞ্জাবী পরিহীত অকৃতদার অভিজাত‚শান্ত সৌম্যকান্তি শিবপ্রসাদ বাবুর চেহারাটা ভেসে উঠছে আমার চোখের সামনে | আমার নিজেরই দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে স্নেহময় সেই হেডমাস্টারমশাইকে মনে করে |

241

23

মুনিয়া

Tell me something good

@সন্দেশ‚ আজকের পর্ব আপনার জন্য: এদেশে পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের অনেক অভিযোগ| তারা কেবল টিকিট দিতে তৎপর‚ আসল কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা| যে কোনো সাধারণতম রাস্তার আইন অমান্য করলেই প্রচুর ফাইন করে‚ ইত্যাদি প্রভৃতি| আমি রোজ সকালে যে পথ ধরে কাজে যাই তার এদিক ওদিক ঘুপচি দেখে দুই তিনজন অফিসর প্রত্যহ লুকিয়ে থাকে| আসতে যেতে প্রায়শই দেখি কাউকে না কাউকে পাকড়াও করেছে| আর একবার ধরলেই প্রচুর টাকার চুনা! আমিও সময়ে সময়ে গজগজ করে থাকি| এতদিন আসছি যাচ্ছি‚ তাই ঠিক জানি কোথায় তারা ঘাপটি মেরে থাকে‚ দেখলেই মনে মনে বলি‚ ঐযে ছিপ ডুবিয়ে বসেছে! আমাদের ছোট থেকে পুলিশ সম্পর্কে একটা ভয় গড়ে উঠেছিল| দেশে নানা অভিজ্ঞতায় চেতনাতে গভীর হয়ে বসেছিল‚ পুলিশ কেবল দুষ্টেরই দমন করে না‚ শিষ্টকেও নানাপ্রকারে উত্ত্যক্ত করে| ধারণাটা এতই পরিস্কার ছিল নিজের কাছে‚ এদেশে প্রথম যেদিন পুলিশ লাইট জ্বালিয়ে পিছু নিল‚ অপমানে চোখে জল এসে গেছিল! গাড়ি থামাতে অফিসর খুব বিনীত হয়ে বলেছিলেন‚ গাড়ির পেছনের আলোটা জ্বলছেনা‚ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা নেবেন| পুলিশ দাঁড় করালো‚ পয়সা চাইল না‚ উৎপীড়ন করল না‚ খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন! কাল কাগজে পুলিশ সম্পর্কে এমন একটা ঘটনা পড়লাম যা হৃদয়কে আলোড়িত করে মুখে হাসি ফোটালো| গত সপ্তাহে নিক এর জন্মদিন ছিল| ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলেটিকে তার মা জিজ্ঞেস করেছিলেন কেমন করে সে তার জন্মদিন পালন করতে চায়| এক মুহূর্তও না ভেবে বাচ্চাটি বলেছিল‚ আমার জন্মদিনের থিম হবে চোর- পুলিশ| আর সেইজন্যে সে স্থানীয় পুলিশ দপ্তরকে নিমন্ত্রণ করতে চায়| নিক পুলিশ সম্পর্কে যাবতীয় কিছুতে সাংঘাতিক আগ্রহী| বাজারে পুলিশের যতরকম কষ্টিউম‚ খেলনা অস্ত্র‚ গাড়ি পাওয়া যায় সবই তার সংগ্রহে আছে| আসলে নিক এর পরিবারের বেশ কিছু সদ্স্য আইন-কানুন সংক্রান্ত জীবিকার সাথে যুক্ত| তাই হয়ত জন্ম থেকেই তার পুলিশ সম্পর্কের তার এই আগ্রহ| পরিবারটি জায়গা বদল করে সদ্য সদ্য এই লিভারমোরের লোকালয়ে এসেছে| কাউকেই তেমন চেনে না| তবুও নিক এর ইচ্ছপূরণ করার তাগিদে মা‚ ন্যান্সি নিকটস্থ পুলিশ দপ্তরকে চিঠি পাঠালেন| লিখলেন‚ যদি একজন পুলিশ অফিসর‚ টহল দেওয়ার গাড়িসহ তার ছেলের জন্মদিনের পার্টির সময়টাতে আসতে পারেন‚ তবে তার ছেলের জন্মদিনে সেটি তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হবে| তার ইমেলের উত্তরে পুলিশ দপ্তর থেকে জানানো হয়‚ যদি সেইসময় কোনো জরুরী দরকারে আটকে না যান তাহলে একজন পুলিশ অফিসর নিশ্চয়ই পার্টিতে হাজির হবেন| জন্মদিনের পার্টির দিন হাজিরা দেবার আধঘন্টা আগে সার্জেন্ট স্টিভ গোয়ার্ড ন্যান্সিকে ফোন করে বলেন‚ শিগগিরিই একজন অফিসর নিক এর সাথে দেখা করতে আসছেন| নিককে সারপ্রাইজ দেওয়া অভিপ্রায়ে ন্যান্সি ছেলেকে নিয়ে বাড়ির সামনে প্রবল খুশি বুকে চেপে অপেক্ষারত থাকেন| তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না যখন দেখেন আলো জ্বালিয়ে একের পর এক‚ সাতটি পুলিশের গাড়ি তাঁর ড্রাইভওয়েতে লাইন দিয়ে দাঁড়ালো! আর ছোট্ট নিক? সে এতই বিস্মিত ছিল যে তার বাকরোধ হয়ে গেছিল| সম্বিত ফিরে পেয়ে সে অফিসরদের সাথে খেলায় মাতে| তাঁরা নিককে নিজেদের সইসহ পুলিশ লেগো সেট উপহার দেন| তাঁদের গাড়িতে বসিয়ে রকমারি যন্ত্রপাতি‚ মেশিনের ব্যবহার ব্যাখ্যা করেন| অনেক অনেক স্টিকার বিলোন নিক ও তার বন্ধুদের এবং বাচ্চাটিকে সারাজীবন উপভোগ করার মত একটি স্মৃতি দিয়ে বিদায় নেন| ঘটনাটি পড়তে পড়তে অসম্ভব একটা ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম| ভাবছিলাম আমাদের সকলের ক্ষমতা আছে অন্যের জীবনে এই এতটুকু হলেও খুশি উপহার দেওয়ার| মন্তব্যের জায়গায় লিভারমোর পুলিশকে সাধুবাদ দিতে গিয়ে একটি মন্তব্যে চোখ আটকে গেল| তারপরে আর হাসি থামছেনা| একটি ছেলে লিখেছে‚ হায়‚ আমিও যদি নিকের মত সৌভাগ্যবান হতে পারতাম| আমার ষোলো বছরের জন্মদিনে বিনা আমন্ত্রণেই পুলিশ এসেছিল| উপহার দেওয়া তো দূরের কথা‚ পার্টি বানচাল করে আমাকে আর আমার বন্ধুদের ঘাড় ধরে তারা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেছিল!!

593

81

মোহিতলাল v2.0

পচা ডোবা টু প্যাসিফিক

কালুয়া ও কালাপানি পর্ব-৭ (নাহ‚ পচা ডোবা শিরোনাম থেকে বাদ| চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে মাটিতে ভাত খাওয়ার মানে হয়? ইন ফ্যাক্ট‚ আমাদের একটা পুকুর আছে‚ সেটি এখন প্রায় ডোবায় পর্য্যবসিত| সংস্কার হয়না‚ পাড় যাচ্ছে ভেঙ্গে| আজকাল লীজ দেয়া থাকে একবছর এই শরীকের পরের বছর অন্যের| মন্দ প্রাপ্তি হয় না| মাছ চাষ তো আজকাল লোভনীয় ব্যবসা| বিশেষ করে দেশী রুই‚ কাতলা বেশী দামেই বিকোয়| এদিক সেদিক করে একশো দিনের কাজের প্রকল্পের আওতায় আনবার চেষ্টা চলছে‚ ফ্রীতে রিপেয়ার করা হয়ে যাবে| একটু আধটু তো দেশ থেকে কিছু পাবার হক তো আছে‚ দেশের প্রতি নি:শর্ত কর্তব্য করনের বিনিময়ে!) (১) তো কতদূর অবধি এগেয়েছি আমরা? জল কেটে কেটে জাহাজ চলেছে তো চলেছেই | প্রথম‚ দ্বিতীয়‚ তৃতীয় দিন শুধুই চলা| সুখ আর সুখ‚ খাও দাও মস্তি করো| একটু টুকে দিই কোন একদিনের ডিনারের মেনু থেকে| হিমবাহের ১০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র| কয়েকটা স্যাম্পল| Smoked duck breast Premium angus beef sliders Escargots bourguignonne ( Tender snails drenched in melted garlic-herb butter?) Linguini with pomodoro sauce (fragrant tomato, onion and garlic sauce tossed with al dente pasta? না‚ টুকতেই হাত ব্যথা হয়ে গেল| A3 সাইজের এপিঠ ওপিঠ দুপাতা| এ তো গেল একদিনের মেনু| তবে রেস্টুরেন্টের (a la carte ডিনারের‚ বলেছি তো টেবিল পেতে‚ সাজিয়ে ওয়েটার পরিবেশিত| আহামরি নামের পদ কিন্তু ভাইলোগ আমার কি ওসব পোষায়! বরং এক কানা উঁচু কাঁসার থালায় পান্তাভাত চটকে আমানি সমেত (ভাতের জল)‚ গরম আলুভাতে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মাখা খাবারের কথাই মনে পড়ছিল| এ কি সাজা রে বাবা| ওয়াটার ওয়াটার এভরিহোয়ার টাইপের| দুদিন রেস্টুরেন্টে গিয়েই ছোঁড়াগুলোকে বললাম‚ দাদা বৌদিকে রেহাই দাও‚ আমরা এগারো তলার বুফেতেই যাবো| আর ও মুখো হইনি| (২) একটা আইটেমের কথা মনে আছে- cauliflower impregnated with saffron আরও কি যেন| মালটা যখন সার্ভ করলো‚ আমি ভাবছি কি না কি| ও হরি‚ একটা স্লাইস কপির ফুলে গেরুয়া রঙ করা‚ আরও বোধ হয় কিছু স্মোকড মাছ্টাছ ছিল! অন্যপদ কি অর্ডার করেছিলাম মনে নেই| আমি গাঁই গুঁই করতে ওয়েটার একটা বোম্বাই সাইজের স্যামনের পীস এনে দিল‚ গ্রিলড‚ ছাল সমেত‚ তাতে না আছে মশলা না কিছু‚ আঁশটে গন্ধযুক্ত| সেটাও সরিয়ে বোধহয় আলুভাতে mashed potato খেলাম অন্য কারুর অর্ডার করা| তবে কি যা চাইবেন এনে দেবে আর বিল দেবার তো প্রশ্নই নেই| ওয়েটার আবার তামিল ভাষী‚ সোনায় সোহাগা| খুব যত্ন সহকারে সার্ভ করেছিল পুরো দশদিন| না তার যত্নে কোন কৃত্রিমতা ছিল না‚ আগমার্কা আতিথেয়তা| পুরস্কার সকলে মিলে ১০০ মত করে বকশিস দেয়া হয়| বাঙলা টাকায় প্রায় হাজার আশি বা লাখের মতো‚ মন্দ কি‚ দশ দিনে| আমেরিকান কোম্পানী তো ‚ জানে ব্যবসা করতে| অল্প মাইনেতে লোক রাখে‚ তাদের ভর্তুকী বকশিসে| (৩) লাঞ্চ ও ব্রেকফাস্ট অবশ্যই বুফে‚ এগারো তলায়| সত্যি বুফে হলটি এগারো তলায় স্বর্গোদ্যান| জাহাজের পশ্চাদ্দেশ‚ বিশাল গোল জানালা পুরো চওড়া (breadth) জুড়ে‚ তেনার (জাহাজ সর্বদাই স্ত্রীলিঙ্গ) ব্যাস পুরো বেয়াল্লিশ মিটার| আমার এক কলীগ সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন ‚ তিনি গত বছর দুই ধরে বিভিন্ন ক্রুজেই যাচ্ছেন| (হায়‚ আমার আর কোনদিন‚ এজন্মে আর যাওয়া হবে না‚ এদিক সেদিক করে ক্যান অ্যাফোর্ড বাট.......)| সংক্ষেপে ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিক্স দিই: Flag ...... Bhamanian (আর কোথায়!) Gross tonnage= 1,38,194 ton Length= 310 metres Crew members= 1200 Total capacity= 5200 জন (crew সমেত) Motor capacity= 42,000 KW রোজ খাবার তৈরী হয়=২২‚০০০ meal (৪) সম্পাদক মশায় জানতে চেয়েছেন‚ entertainment এর কি ব্যবস্থা থাকে| রোজ সকালে দরজায় গোঁজা থাকতো সে দিনের ফিরিস্তি‚ সেও A3 সাইজের দুপাতা| দু একটা আইটেম তুলে দিই‚ Day 1,2, 3 থেকে| The thrill of the rock climbing wall Welcome aboard Karaoke night Ice skating Battle of the sexes-progressive trivia The world's sexiest man competition আর এগুলো তো আছেই: Basket ball court Big screen movie হ্যানা ত্যানা| (৫) প্রথম তিন দিন একটানা শুধু ভেসে চলা‚ চার দিনের দিন সকালে নিউ ক্যালিডোনিয়ার রাজধানী Noumea দ্বীপ| শেষ অবধি একটু একঘেঁয়ে হয়ে ওঠেনি তা বলবো না| অব্শ্য যারা একটু পানাসক্ত তাদের পক্ষে রমরমা| আমাদের দিন শুরু হতো ছটা বাজলেই পাঁচতলায় চা কফি‚ pastryর কাউন্টার খুলে যেত| আমাদের তো সকাল সকাল ঘুমোতে যাবার অভ্যেস সেই ব্যাঙ্গালোর থেকেই‚ ভোর বেলা উঠেই না সকাল ৭|১৫তে ফ্যাক্টরি পৌঁছুনো| একটা মজার ব্যাপার- স্টাটিসটিক্স ক্লাশের স্যার বলেছিলেন‚ পৃথিবীর সব ঘটনাই কোন না কোন স্ট্যাটসের নিয়ম মেনে চলে| (এটা আমাদের রেসিডেন্ট পন্ডিত পাঠকের জন্যে তোলা থাক)| চাঁদের কলঙ্কের সাথে মুসুর ডালের ভাও এর একটা কো-রিলেশন খুঁজে পাওয়া যাবে!(অথবা আমার ভাষায়- গঙ্গার বান আসার সময়ের সাথে 'আমি তোমাকে ভালবাসি' কবুলের মুহূর্তের! (রাত ভরে বৃষ্টির সাথে দশমাস পরে বাচ্চা হওয়ার সম্পর্ক অবশ্য ১:১ কো-রিলেশন!) | তো সেই নিয়ম মেনেই মোটামুটি একই লোকজনের সাথে ঐ কাক সকালে দেখা হতো| এখানেই তো ফুলবাগানের সেই বাঙালী ছেলেটি সকালে ও নৈনিতালের ছেলেটি বিকালে ভাগাভাগি করে তদারকি করতো| ফুলবাগানের ছেলেটির কতই বা বয়েস‚ ২৮-২৯‚ তাইই তো বললো| ইচ্ছে একটা ফ্ল্যাট কেনার‚ একটু ফান্ডাও বিররণ করলাম| সে ভাবলো‚ আমি কতই না অভিজ্ঞ! (৬) এক সাথে হাম তুম এক কামরায় বন্ধ‚ তাই বলে হে পাঠক ভাববেন না যে চাবি খোয়া যাবে| আরে সে সব সোনার বয়েস কি আছে যে আঙুলে আঙুল ঠেকে গেলে সোনা হবে| আগেই বলেছি এই সব ক্রুজ মধুচন্দ্রিমার পক্ষে আদর্শ| আমাদের অবশ্য চন্দ্রিমা ছিল‚ শুক্লপক্ষের রাত| তবে ঐ পর্য্যন্ত| আসলে ফ্ল্যাশব্যাকে টাইম মেশিনে চাপা - কবে কি হয়েছিল‚ কে বলেছিল‚ কেন ওটা হয়নি‚ আসলে ভুল ডিসিশান নেয়া হয়ে গেছে‚ মেলবোর্নে ট্রান্সফারের অফার নেয়া উচিত ছিল‚ সেবার বন্যার ফলে করমন্ডল এক্সপ্রেসের কিছুটা পথ অন্ধ্র সরকার কি সুন্দর করে বাসে নিয়ে গিয়েছিল‚ মনে আছে‚ ' সেই চিলে কোঠায় গিয়ে সংসার পাতার কথা'‚ প্রতি শনিবার নিয়ম করে কেরোসিনের স্টোভ পরিস্কার করা‚ কাঁচি দিয়ে পলতে সমান করে কাটা যাতে করে নীল ফ্লেম হয়! এই সব গল্প করেই কাটলো| এবার কিন্তু ঝগড়া হলো না‚ কনফাইনড স্পেসে পুরোনো দম্পতি বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকলে অবধারিত ঝগড়া| এই যেমন আমাদের এক চেনা ডাক্তার আছেন সিডনীতে‚ আগে এখানে ছিলেন| মাঝে মাঝে দেখাতে যাই‚ তো ডাক্তার ঠিক ধরে ফেলে মনোমালিন্যের খবর‚ অভয় দেন যে তাঁরাও যখন কয়েক ঘন্টা একসাথে ড্রাইভ করেন‚ তাদের বেলাতেও অন্যথা হয় না| আমাদের নবীন বন্ধুরা তো হৈ হৈ করে পুরো জাহাজ চষে ফেলছে‚ স্কেটিং‚ জগিং ও অতি অবশ্যই ক্যাসিনো| মাহেশ্বরী ও আদিত্য এ বিষয়ে আগ্রহী‚ আমরা দেখা হলেই- কি মাইনাস না প্লাস? যাদের ছোট বাচ্চা তাদের তো পোয়া বারো‚ ফ্রী চাইল্ড কেয়ারের ব্যবস্থা| এসব না করলে সাড়ে চার হাজার যাত্রী পাওয়া কি সোজা কথা? তাও প্রতি দশ দিন অন্তর অন্তর| সেপ্টেম্বরে আবহাওয়া ভাল হতে শুরু করলেই জাহাজ সিডনীতে ভেড়ে আর চলতেই থাকে পিরীতের গাড়ী| সকালে অপেরা হাউস ঘাটে ফেরত আসে‚ একদল যাত্রী নামলো তো নতুন দল নিয়ে সন্ধে হতে আবার পাড়ি দেয়া| হবে নাই বা কেন‚ প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের নৌকো ও বারশো কর্মী‚ খাওয়া দাওয়া‚ জ্বালানী- এলাহি ব্যাপার‚ থেমে থাকলে যে প্রতি মুহূর্তের জন্যে টাকা লস| মার্চ পরহ্তেই আমেরিকা পানে‚ সেখান থেকে আলাস্কা যাওয়া আর আসা চলতেই থাকে‚ আবার সেপ্টেম্বরে সিডনী| চার দিনের দিন সকালে নুমিয়া দ্বীপ| (বিরতির পর)

350

35

kishore karunik

রয়ে যাবে

বঙ্গ বন্ধু -কিশোর কারুণিক কেটে গেল আঁধার ঘাতকদের হলো বিচার, চারিদিক হলো ঝলমলে আলো। কলঙ্ক মোচন হলো জাতির, কলঙ্ক মোচন হলো প্রিয় স্বদেশের। বড় কষ্ট হয় খুব কষ্ট পাই ঘাতকের বুলেটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলে। যাদের বিশ্বাস করেছিলে যাদের স্নেহের ছায়ায় ঠাই দিয়েছিলে, তাদের ভেতর কিছু কুলাঙ্গার তোমার সাথে প্রিয় স্বদেশের সাথে করল চরম বিশ্বাস ঘাতকতা। তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল ওরা তোমার স্বপ্ন, মানবিক চেতনাকে- হত্যা করতে চেয়েছিল। না, ওরা পারে নি তুমি এখনো অম্লান কোটি কোটি বাঙালীর মনি কোঠায় রক্তে কেনা জাতীয় পতাকায় জাতীয় স্তম্ভে তুমি মহান পুরুষ বাংলাদেশের জাতীর জনক- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তুমি শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকো তোমার প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে; তোমার স্বপ্ন, চেতনা, মূল্যবোধ আজ কোটি কোটি বাঙালীর প্রেরণা। তোমার স্বপ্নের সোনাল বাংলা সোনায় সোনায় ভরে উঠবে, বাঙালী হয়ে উঠবে বলিয়ানে তেজস্বী। তোমার চেতনা ধারণ করে মানবিক মূল্যবোধে বাঙালী বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে মেরুদন্ড শক্ত করে, জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়তে । সোনার বাংলা গড়তে সোনার বাংলা গড়তে।

254

8