শিবাংশু

চিতায় দিও মঠ

সেই কোন ত্রেতাযুগে ঠাকুর ব্যাকুলভাবে 'ধর্মপ্রাণ', অতি উৎসাহী কিছু দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, " দন্ত দিয়ে তুলছে টেনে হিন্দু শাস্ত্রের মূল/ মেলাই কচুর আমদানিতে বাজার হুলুস্থূল।" সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে। 'হিন্দু'ধর্মের যাবতীয় লৌকিক আচরণকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, নান্দনিক তত্ত্ব, সমাজতত্ত্বের 'জমপেশ' যুক্তির বন্যা বইয়ে মহীয়ান করার লক্ষ্যে এক বিপুল জনতার আজও রাত্রিদিন ঘুম নেই। এত প্রাচীন একটি ধর্মীয় দর্শনের অনুগামীদের এ পর্যায়ের অসহায় নিরাপত্তাহীনতা অবাক করে। অবশ্য যাঁরা এই প্রয়াসে মত্ত, তাঁদের 'ভারতীয়ত্ব' বা সনাতন ধর্ম, উভয় বিষয়েই কতটুকু ধারণা আছে, সন্দেহ জাগায়। আমার পিতৃদেবের আদেশে আমরা তাঁরা প্রয়াণের পর কোনও রকম লৌকিক ধর্মীয় আচরণ পালন করিনি। সে সময় প্রভূত কটাক্ষ, কটূক্তি বর্ষিত হয়েছিলো আমাদের উপর। একান্তভাবে পারিবারিক সিদ্ধান্তটি কারো কারো কাছে সনাতনধর্মের অবমাননা হিসেবেও গণ্য হয়েছিলো। এই প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে এক বন্ধু জানতে চেয়েছিলেন সনাতনধর্মীয় পারলৌকিক কৃত্যসমূহের উৎস, যাথার্থ্য কীভাবে জানা যেতে পারে? বিশেষত পিতৃপক্ষ, মহালয়া,তর্পণ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কৌতুহলী ছিলেন। আমার প্রাসঙ্গিক তুচ্ছ জ্ঞানের সংক্ষিপ্তসার তাঁকে লিখে জানিয়েছিলুম। পরে এই লেখাটি বিশদে অন্যত্র প্রকাশিতও হয়েছিলো। তাও বহুদিন হলো। যেসব আগ্রহীজন সে লেখাটি পড়েননি, তাঁদের জন্য সংক্ষিপ্তসারটি এখানেও থাক। বিভিন্ন পূর্ণিমার যেমন নামপদ রয়েছে, ( গুরুপূর্ণিমা, বৈশাখীপূর্ণিমা, বসন্তপূর্ণিমা, কোজাগরীপূর্ণিমা ইত্যাদি) তেমনই বিভিন্ন অমাবস্যা তিথিকেও নানা নামে ডাকা হয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি মহালয়া অমাবস্যা। অমাবস্যা তিথিটি সচরাচর যাঁরা তন্ত্র বা শাক্তমতে উপাসনা করেন, তাঁদের জন্য প্রশস্ত বলে কথিত আছে। তাই অমাবস্যার নামের সঙ্গে দেবীপ্রসঙ্গটিই সুলভ। কিন্তু মহালয়া অমাবস্যাটি নিবেদিত 'পিতৃপুরুষে'র উদ্দেশ্যে। সূর্য যখন কন্যারাশিতে প্রবেশ করে তখন যমরাজ তাঁর প্রজাদের, অর্থাৎ মৃতমানুষের আত্মাদের পক্ষকালব্যপী সাময়িক ছুটি মঞ্জুর করেন, 'বাড়ি' যাবার জন্য। 'বাড়ি' অর্থে সেই সব আত্মাদের (যাঁদের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি 'প্রেত' নাম দিয়েছে)উত্তরপুরুষদের ভদ্রাসন। এই সময়কালটি ( সূর্যের কন্যারাশি থেকে বৃশ্চিক রাশিতে সরে যাওয়া) , যার পোষাকি নাম 'পিতৃপক্ষ', পরলোকবাসী আত্মারা অতিথি হয়ে উত্তরপুরুষদের গৃহে আসেন। এই উপলক্ষ্যে বংশধরকুলকে পক্ষকালব্যপী প্রতীকী শোক পালন করার নির্দেশও শাস্ত্রীয় মতে বলবৎ। উদ্দেশ্য, প্রয়াত আত্মাদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করা। সারা পৃথিবীর নানা দেশে এই জাতীয় বিভিন্ন লৌকিক আচার পালন করা হয়। সনাতনধর্মীয়দের মধ্যে এই পক্ষকালে পরলোকগত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে জল ও ফলদান করার বিধি রয়েছে। ব্রাহ্মণরা বলেছেন, এই আচারটি পালিত না হলে পিতৃপুরুষ ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে অভিশাপ দিতে দিতে মহালয়া অমাবস্যার দিন আবার যমলোকে ফিরে যাবেন। সেটা উত্তরপুরুষদের জন্য অকল্যাণকর। তাই মহালয়া অমাবস্যায় পিন্ডদান ও গঙ্গাস্নানের বিধান 'শাস্ত্রের' অঙ্গ । যমলোক'কে 'মহালয়' মনে করা হয় । কারণ এই আলয়ে সমস্ত জীবিত প্রাণীকে একদিন গিয়ে বসবাস করতে হবে।যেহেতু এই অমাবস্যার দিন পিতৃপুরুষদের সাময়িক মর্ত্যবাসের পর আবার মহালয়ে ফিরে যেতে হয়, তাই এর নাম 'মহালয়া অমাবস্যা'। পিতৃপুরুষদের স্মরণ করা অবশ্যই পুণ্যকর্ম এবং সেহেতু এই দিনটি একটি পবিত্র উপলক্ষ্য । কিন্তু এর সঙ্গে শোকের মাত্রা যোগ করাটি পুরাণযুগের অবদান। বৈদিকযুগে মৃত্যুঞ্জয় হবার সাধনা করা হতো, পশ্য, মৈত্রেয়ী, নচিকেতা ইত্যাদি । যেহেতু মৃত্যু জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি, তাই বেদ-উপনিষদের কালে তার মাহাত্ম্য স্বীকার করা হলেও ততো প্রাধান্য দেওয়া হতোনা। কিন্তু পুরাণযুগে মানুষ চারিত্র্যে অল্পপ্রাণ হয়ে যাবার ফলে 'মৃত্যু' মানুষের মনে এক চরম ভীতিকর মাত্রা নিয়ে আসে। এই ভীতির বাণিজ্যিকরণ করে পুরোহিতকুল বহু লোকাচারের সৃষ্টি করেছে। তার মধ্যে মহালয়ার দিন পিন্ডদান ইত্যাদি আচরনীয় কৃত্য। এর মধ্যে অবশ্য আরেকটি স্মার্ত মাত্রাও দেখা যায়। পরবর্তী শুক্লপক্ষ যেহেতু 'দেবী'পক্ষ, তাই তার আগে একটি 'পুরুষ'পক্ষ উদযাপনকেও ব্রাহ্মণ্যব্যবস্থার সিলমোহর দেওয়া হয়েছে। যদি পিতৃপুরুষকে 'স্মরণ' করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে মহালয়া অমাবস্যা নিশ্চয় একটি শুভদিন এবং এইদিন শুভেচ্ছা বিনিময় করাই যায়। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যমাত্রায় অভিঘাতটি নেতিবাচক। বস্তুতঃ, এইদিন এপার বাংলার সনাতনধর্মীয় মানুষদের শুভেচ্ছাবিনিময়ের নিহিত উদ্দেশ্য এটি দেবীপক্ষের প্রথম দিন । গত তিন-চারশো বছরের বিবর্তনে শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতনধর্মীয় বাঙালির প্রধান উৎসব হয়ে উঠেছে। এর তাৎপর্য এখন খ্রিস্টিয়দের বড়োদিন বা মুসলিমদের ঈদপালনের মতো সর্বব্যপী । সভ্যমানুষের শুভেচ্ছা আদানপ্রদানের জন্য কোনও প্রাতিষ্ঠানিক তিথি বা সামাজিক পর্বের অপেক্ষা থাকা উচিত নয় হয়তো, কিন্তু আদতে মানুষ অভ্যাসের দাস। আকাশবাণীর 'মহিষাসুর মর্দিনী' অনুষ্ঠানটি ব্যাকরণের অর্থসম্প্রসারন নামক বিধি অনুযায়ী 'মহালয়া' হয়ে গেছে। যদিও এই অনুষ্ঠানটি একান্তভাবে দেবীপক্ষের স্বাগত সম্পুট, পিতৃপক্ষের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্করহিত । মনে হয় এই 'নাম'পদের মূল রয়েছে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মহালয়া অমাবস্যার মধ্যরাত্রে গঙ্গাস্নান করে সিক্তবসন, ঘোরগ্রস্ত চন্ডীপাঠে অনুষ্ঠানটিকে গ্রন্থিত রাখার অনুষঙ্গে। অথবা শ্রোতারা হয়তো 'মহিষাসুরমর্দিনী' জাতীয় ভারি শীর্ষকের চাইতে সহজ 'মহালয়া' নামপদের মধ্যেই স্বস্তি খুঁজে পায়। এহ বাহ্য, সেই কোনকালে আমাদের কবি বলেছিলেন জীবৎকালে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করলেও মৃত্যুর পর দেশবাসী অবশ্যই তাঁর চিতায় মঠ স্থাপন করবে। আমাদের দৈনন্দিন যাপনেও তার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। জীবৎকালে পিতৃপুরুষকে অভুক্ত, অতৃপ্ত রেখে তাঁদের মৃত্যুর পর বৃষোৎসর্গ করার ঐতিহ্য এখনও চলে আসছে। জানিনা এই জাতীয় পিতৃতর্পণ আমাদের কোন পুণ্যের ভাগী করে?

16

2

দীপঙ্কর বসু

নেড়ার বিদেশ যাত্রা

<অফিস থেকে দুমাসের ছুটি নিয়েছিলাম আমি এদেশে আসব বলে । কাজেই আমি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি ইচ্ছা মত ,কিন্তু বাদ বাকি সকলেরই অফিস ,ল্যাব ,ইউনিভার্সিটি যাওয়া আছে ,কাজেই সপ্তাহান্তের দুটো দিন ছাড়া মাঝের পাঁচটা দিনের অনেকটা করে সময় আমাদের কাটাতে হয় একলা।অবশ্য শ্রীমতীর তাতে খুব একটা যায় আসেনা ,তিনি রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন – অনেকদিন পরে ছেলেকে কাছে পাওয়া গেছে ,ছেলে অনেকদিন ঘরের খাবারের আস্বাদ পায়নি ।তার সে অভাব সুদে আসলে পুষিয়ে দেবার জন শ্রীমতী একেবারে উঠে পড়ে লেগেছেন ।নিত্যই নানাবিধ খানা রান্না হচ্ছে –ঘর ময় তার খুশবাই ছড়াচ্ছে ,আমি ছেলের লিভিং রুমে বসে ছেলের ল্যাপটপে খুটখাট করে মজলিশে অথবা বাংলা লাইভের চ্যাট রুমে মজে আছি, আর তারই মাঝে রান্নার খুশবাই নাকে এসে আমাকে আনমনা করে দিচ্ছে । আবার মাঝে মাঝে দৌড়তে হচ্ছে –“একটা ফুলকপি নিয়ে এস ,অথবা একবান্ডিল ধনে পাতা আনতে হবে” - এই সব ফাই ফরমায়েশ খাটতে ।তবে তাতে আমার বিশেষ আপত্তি ছিলনা , বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে হাডসন নদীর দিকে কয়েক পা হাঁটলেই মস্ত এক বাজারে আলপিন টু এলিফ্যান্ট সব কিছুই মেলে । তাছাড়া ছেলের দৌলতে দুবেলা আমার রসনাও তৃপ্ত হচ্ছে । কাজেই আপত্তি বা বিরক্তি প্রকাশ করাটা এক্ষেত্রে আহাম্মকিরই নামান্তর । এই রকম একটা দিনে হঠাৎ বেজে উঠল ফায়ার এলার্ম । ইন্টার কমে ঘোষণা শুনে যে টুকু বুঝলাম তাতে যেন শুনলাম বিল্ডিং এ ফায়ার এমারজেন্সির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । সমস্ত এপার্টমেন্ট বাসীকে জানান হচ্ছে যে …… আতঙ্কের চোটে এনাউন্সমেন্টের বাকিটা আর শোনার জন্য অপেক্ষা করিনি ।এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের করিডরে একটা চক্কর মারতে গিয়ে দেখি লাল আলোয় বিপদ সঙ্কেত জ্বলছে , বড়বড় হরফে লেখা FIRE ALERT .DONOT USE ELEVATOR . ঘরে ফিরে এসে শ্রীমতী কে বললাম এখনি আমাদের ঘর ছেড়ে নিচে নেমে যেতে হবে ।কিন্তু তিনি তখন রান্নায় ব্যস্ত ,কিছুতেই রান্নাঘর ছেড়ে নিচে নেমে যেতে রাজি নন । শেষ অবধি একরম জোর করেই তাকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা শুরু করলাম । কুড়ি তলা নামতে নামতে মনে হচ্ছিল সিঁড়ি যেন আর শেষই হতে চায়না । শ্রীমতী একবার বোধ হয় ক্ষীণ প্রতিবাদ করেছিলেন সিঁড়িতে আর কাউকে না দেখতে পেয়ে ।কিন্তু ভয় এমনই জিনিষ যে যুক্তি তর্কের পরোয়া করলে তার চলেনা । লবিতে নেমে দেখা গেল বেশ কিছু লোকজন সেখানে জড়ো হয়েছে ইতিমধ্যেই । সেদিকে শ্রীমতীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি –“ দেখ ,এরা সবাই আমাদের আগেই নেমে এসেছে” । একেবারে অকাট্য প্রমাণ চোখের সামনে দেখে তখনকার মত তিনি আর কোন বাদ বিবাদের পথে গেলেননা । লবিতে অপেক্ষমাণ জনতার সঙ্গে আমরাও অপেক্ষায় রইলাম । মিনিট দশেকের মধ্যেই অবশ্য নিচের লবিতে ঘোষণায় জানা গেল সমস্যা চিহ্নিত করা গেছে ,আর ভয়ের কোন কারণ নেই । কিছু সময়ের জন্য এলিভেটর গুলি বন্ধ ছিল । সেগুলি চালু হতেই ধীরে ধীরে লবির জমায়েত পাতলা হতে থাকল ।আমরাও বাকি জনতার পিছু পিছু ফিরে এলাম নিজ নিকেতনে । পরে, সন্ধ্যাবেলায় ছেলে অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তার জননীর মুখে ঘটনার বিবরণ শুনে হেসেই খুন । -“তোমরা এনাউন্সমেন্টের পুরোটা শোননি । এনাউন্সমেন্ট এর সময়ে নিশ্চয়ই বলেছিল standby for further instructions . তোমরা সবটা ভাল করে না শুনেই তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে গেছ” । -“দেখেছিস ? দেখেছিস তো “তোর বাবার সব তাতেই বাড়াবাড়ি । কিছুই হয়নি খামোখা আমাকে টেনে নিয়ে নিচে গেল ...” ইত্যাদি ইত্যাদি । “ এই জন্যেই কোথাও গিয়ে আমার শান্তি নেই । সব সময় কেবল হড়বড় করবে…” উপায় নেই । হাতি গাড্ডায় পড়েছে, এখন বাক্যবাণের হাত থেকে আমার নিস্তার নেই ।আরও কি কি অভিযোগ এরপরে আমার বিরুদ্ধে আনা চার্জ শীটে থাকবে তা আমার অজানা নয় । এমতাবস্থায় শাস্ত্রে বলে যঃ পলায়তি সঃ জীবতি । অতয়েব শাস্ত্রের বিধি মেনে সময় থাকতেই এ বান্দা অকুস্থল থেকে হাওয়া । ওয়াশিংটন বুলেভার্ডের রাস্তা ধরে হন হন করে মেট্রোর নিউপোর্ট স্টেশন অবধি হেঁটে ,বাঁয়ে ঘুরে ওয়াশিংটন মল কে পিছনে রেখে হাডসন নদীর দিকে চলে যাই । নদীর ধার বরাবর একপাশে লোহার রেলিং আর অন্য পাশে গোলাপ গাছের হেজ দিয়ে কেয়ারি করা পথ দিয়ে শ্লথ পায়ে হাঁটতে থাকি । নদীর ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে গোটা ব্যপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল । ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখলাম সত্যি ই এনাউন্সমেন্টের ওই standby for further instructions অংশটুকু আমি কানে তুলিনি অযথা আতঙ্কে । আর লবিতে জমা হয়ে থাকা লোকজনের ব্যপারটাও বুঝলাম । সারাদিন ধরেই বিল্ডিং এর বিভিন্ন তলায় লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে । এলিভেটর বন্ধ থাকায় তারাই ওপরে উঠতে না পেরে লবিতেই অপেক্ষা করছিল এলিভেটর চালু হওয়ার জন্য । মাঝখান থেকে আমিই কেবল বেকুব বনে গেলাম । এক এক সময়ে একলা অথবা শ্রীমতীকে সঙ্গে নিয়ে গোটা এলাকাটি ঘুরে দেখতে বেরই । আমার নেশা ছবি তোলা । হাডসন নদীর ওপারে নিউইয়র্ক মহানগরের বিশাল বিশাল গগনচুম্বী বাড়ির সার দেখে তাক লেগে যায় । খুব ভোরের বেলায় পুবের লাল আকাশের পটে সে বাড়িগুলির শেল্যুট যেমন মনোহারি আবার বিকেলের দিকে পড়ন্ত বেলার আলোয় ক্ষণে ক্ষণে বাড়িগুলির দেওয়ালে দেখি রঙের বাহার । বৈভবের জৌলুষে চোখে ধাঁধা লেগে যায় ।আমার মফস্বলী চোখ ধাঁধিয়ে যায় ওয়াশিংটন মলের পণ্য সামগ্রীর বাহারে । ছেলের বদান্যতায় শ্রীমতীর হাতে কিছু ডলার তাঁকে সর্বদাই খোঁচা মারতে থাকে । বেড়াতে বেরোলে তাঁর চরণ যুগল কেবলই মলের দরজায় হাজির করে তাঁকে । কিন্তু পকেট খালি থাকলে এবং এ জগতে সবই অনিত্য ,একমাত্র ব্রহ্ম সত্য গোছের মন নিয়ে শপিং মলে ঢুকলে দেখেছি সময় কাটানর মত এর চেয়ে ভালো জায়গা আর দ্বিতীয়টি নেই । রকমারি সাজ পোশাক , গয়নাগাটি ,জুতো ,খেলনা আর কসমেটিক্স ,খাবারের দোকানে নানা স্বাদের কেক পেস্ট্রি ,কফি ইত্যাদি কত কিছুরই যে দেখা মেলে তা বলে শেষ করা যাবেনা । বস্তুত ওজন দরে যে রান্না করা খাবার কিনে খাওয়া যায় তাও জানতে পারতুমনা ওয়াশিংটন মলে না ঢুকলে । এই মলেরই একটি খাবারের দোকানে দেখেছিলাম থরে থরে রান্না করা খাবার সাজান আছে । মাছ মাংস এর বিভিন্ন পদ যেমন আছে তেমনি নিরামিষাশীদের জন্যে ঘাস পাতার ও ঢালাও ব্যবস্থা রয়েছে । খদ্দেরকে শুধু নিজের পছন্দ ও পরিমাণ মত খাবার একটি প্লেটে তুলে কাউন্টারে নিয়ে গিয়ে দেখালে সেখানে ডিউটিতে থাকা ব্যক্তিটি খাবারের ওজন দাঁড়িপাল্লায় মেপে জানিয়ে দেবে তার দাম ।অতঃপর দাম মিটিয়ে দিয়ে সাজিয়ে রাখা চেয়ার টেবিলের কোন একটি বেছে নিয়ে বসে পড়লেই হল ।

304

73

জেমস

পথে ঘাটে

নিউ ক্যাসেল- রাত্রি যাপন| শহরটা সিডনী থেকে প্রায় দেড়শো কিমির মতো| আমার শহর থেকে কুল্লে দাঁড়ালো ৩৫০+১৫০=৫০০ মতো| পাঁচশো একদিনে যাওয়া যায়| তবে আমরা তো ট্রেন ধরতে যাচ্ছি না‚ হেসে খেলে‚ হেলে দুলে‚ ঝগড়া করতে করতে‚ পথিমধ্যে বটতলায় (rest area) জিরিয়ে নিয়ে চলেছি| এই রেষ্ট এরিয়া গুলো হাইওয়ের মধ্যে মরুদ্যানের মতো| একটুখানি টিনের শেড‚ দু একটা পার্ক বেঞ্চি‚ টেবিল ও হিসিখানা| বটতলা মনে পড়লো এইজন্যে যে আগে‚ অনেক আগে যখন আমাদের গ্রামের cluster ছাড়িয়ে অন্য গ্রামের cluster এ যেতাম‚ অবশ্যই হেঁটে অথবা কপাল ভাল থাকলে কাকার সাইকেল পেলে চালিয়ে‚ এই বটতলা লাগতো স্বর্গের মতো‚ বিশেষ করে গরমকালে| ছায়া‚ ঝিরঝিরে বাতাস ও একটা টিউবওয়েলও থাকতো| রেষ্ট এরিয়া আর বটতলার মধ্যে আমি শেষেরটা বেছে নেবো| কি সুখ‚ কি সুখ| প্রখর রৌদ্রে প্রতি আধঘন্টা হাঁটার দূরত্বে বটতলা; দুই গ্রামের দূরত্ব মাইল তিনেক মানে প্রায় চার কিমি| ছায়া ছাড়তেই মন চাইতো না|এতই শান্তি‚ এতই আরাম‚ এতই সুখ যে ক্যাটরিনা (তখনকার ইকুইভ্যালেন্ট) হাতছানি দিলেও অবজ্ঞা করা শ্রেয় মনে হতো| সেসব আর নেই এখন‚ প্রধানমন্ত্রীর সড়ক যোজনায় পাকা রাস্তা (অবশ্যই খানা খন্দে ভরা)‚ বটগাছও বোধহয় কেউ কেটে ইঁটভাটা ওয়ালাদের কাছে বেচে দিয়েছে| (২) এই রেষ্ট এরিয়াগুলো মন্দ নয়‚ মাইলের পর মাইল বিরক্তিকর ড্রাইভিং‚ দুধারে একই ইউক্যালিপটাস‚ লোকজনের চিহ্নমাত্র নেই; আসলে গাড়ীর গতি ও হুশ হাশ আওয়াজের জন্য পথের ছোট শহর বা লোকালয়কে bypass করে বানানো হয় হাইওয়ে‚ ফ্রীওয়ে| প্রায় যেখানে এড়ানো যায়না‚ বাড়ীর অধিবাসীদের শব্দ থেকে বাঁচবার জন্য‚ সাউন্ড ব্যারিয়ার; ফাঁপা কংক্রীটের দেওয়াল‚ কিছু ডিজাইনে আবার সেই ফোকরে জল ভরা‚ শব্দ তরঙ্গ absorb করার জন্য‚ এসবই কিন্তু পেটেন্টেড ইনভেনশান| রুবির কাছে বাইপাসের ধারে আমার বন্ধুর ফ্ল্যাট‚ - রাস্তার ধারেই জানালা‚ সারাদিন গাড়ী যাচ্ছেই‚ মনে হয় এইবার থামবে‚ কিন্তু বিরাম তো নেই| অবশ্য থাকতে থাকতে মন ওদিকে খেয়াল করে না| (৩) বটতলা ও রেষ্ট এরিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো টয়লেট| বটতলায় zip খুললেই হলো‚ এখানে টয়লেট| কিন্তু রাস্তার ধারের বলে জল মাপা‚ বৃষ্টির জল বা কাছে শহর থাকলে ট্যাঙ্কে ভরে দিয়ে যায় আর তেমন সার্ভিস হয় না‚ ফলে বেশ চড়া গন্ধ| তবে এসপ্ল্যানেডের বা শিয়ালদা স্টেশনের হিসিখানা থেকে অনেক ভাল| বড় বাইরে পেলেই মুশকিল‚ অধিকাংশই compost পায়খানা‚ উফ ঢাকনা খুললে সে যা গন্ধ! (৪) আমাদের বাড়ী থেকে সিডনী অবধি হাইওয়ে তারপর শহরের মধ্যে আধঘন্টা এবং তারপর আবার ফ্রীওয়ে M1| এটার পোশাকি নাম প্যাসিফিক হাইওয়ে‚ কিছুটা নতুন আর কিছুটা পুরোনো| পুরো উপকূল বরাবর সেই উত্তরে Cairns থেকে শুরু করে ধার বেয়ে বেয়ে মেলবোর্ন অবধি| সিডনী খুবই ঘিঞ্জি শহর‚ রাস্তা অপরিসর এবং জায়গা কম হওয়াতে রাস্তার ধারে পার্কিং অ্যালাউড| বেশ বিরক্তিকর‚ কিছুদূর যাবার পর পার্ক করা গাড়ী সামনে‚ নাও আবার লেন চেঞ্জ করো| তবে লোকেরা ভদ্র‚ যেতে দেয়| এখানে আবার কেউ এভাবে যেতে দিলে‚ ড্রাইভার হাত উঁচিয়ে ধন্যবাদের মুদ্রা দেখায়‚ মধ্যম অঙ্গুলিও চলে তবে বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়! সিডনী পেরোলেই বড় মনোরম দৃশ্য‚ Hawksbury নদী কেটে কুটে‚ অপরূপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে‚ ছবির মতো| ট্রেনও চলে‚ লোক্যাল| নিউ ক্যাসেল থেকে রোজ সিডনী ট্রেনে‚ গাড়ীতে ডেলি প্যাসেঞ্জারের সংখ্যা কম নয়| যাইহোক‚ অবশেষে নিউ ক্যাসেল পৌঁছোলাম শেষ বিকালে| রবিবারের বিকাল‚ চারিদিক শুনশান‚ দোকানপাট বন্ধ কেবল রেস্টুরেন্ট লোক গিজগিজ করছে‚ সেদিন আবার Fathers day কিনা| (৫) উপরের ডিব্বা পাঠানকোট যাবে‚ নীচেরটা মাদ্রাজ‚ সেই জোক মনে আছে? এক বিশেষ প্রদেশের লোক ভুল করে অন্য প্ল্যাটফর্মের ট্রেনে চেপে বসেছে| ডিটেলস লিখলাম না| সেই রকমই হোটেলটা| একই বিল্ডিং‚ কিন্তু দুটো হোটেল‚ আলাদা আলাদা নাম‚ আলাদা বুকিং‚ আলাদা দাম কিন্তু আবার রিসেপশান একই| এসব তো মোটেল‚ কোন সার্ভিসের ব্যবস্থাই নেই‚ থাকে না; কিচেন আছে‚ আছে থালা ঘটি বাটি‚ কড়াই‚ ইচ্ছে হলে রাঁধো বাড়ো খাও| একেবারে শুনশান| লিফটে আটকে পড়লে বোতাম টিপলে লোক আসে শতকরা ৯৯|৯৯৯৯৯৯৯% ক্ষেত্রে কিন্তু চ্যালেঞ্জারও তো খসে পড়ে! এমনই পেশার লোক আমি যে অ্যাবসলুট সেফটি বলে কিছু নেই এই ধরাধামে| রাঁধো বাড়ো? আমরা যখনই বাইরে যাই‚ গাড়ীর বুট'এ একটা দুধের ক্রেটের মত মুখখোলা বাক্সে মশলার সুদর্শন চক্র কৌটো‚ কিছু আলু পেঁয়াজ‚ কয়েক টিন মাছ‚ পাঁউরুটি‚ অল্প চাল ও মসুর ডাল খালি ফ্রুট জুসের বোতলে নিয়ে রাখি| ভাল খাবার জায়গা খুঁজে না পেলে স্বপাক আহার| সেটাই বেশী হয়ে থাকে কারণ ভাল স্বাদ মানে তেল মশলা আর মাখনের শ্রাদ্ধ করা পিন্ড‚ হোটেল রেস্টুরেন্টের নজর তো আমার পকেটের দিকে‚ শরীরের প্রতি নয়| চুপি চুপি বলে নিই‚ কেনই বা ছাড়ি-কে যেন বলেছিল‚ যাদের বাড়ীতে রান্না ভাল হয় এবং যারা অলস না হয় তারা নাকি বাইরে খাবার জন্য ছোঁক ছোঁক করে| (নো অফেন্সেস মেন্ট)| কি যেন কাবাব খুব নাম‚ ওহ মনে পড়েছে টুন্ডে কাবাব- খোদ লক্ষ্ণৌতে খুব ভিড় এমন দোকানে খেতে গিয়েছিলাম‚ স্টীলের থালায় তেল বোধ হয় নবাব ওয়াজিদ আলি শা'র জমানা থেকে চলে আসছে! আমার ভাই বাংলা লুচি আর ডিমের ডালনা কি দোষ করেছে‚ তেলই যদি খাবো তবে ফুলকো ময়দার লুচি কেন নয়? স্বর্গে রম্ভাবতীরা এই খেয়েও কেমন স্লিম থাকেন! (৬) সামান্য এক রাত্তিরের বিরতি‚ গাড়ীতেই মালপত্র রাখা রইলো‚ এমন ভাবে বাঁধা ছাঁদা করা হয়েছিল যে শুধুমাত্র দুটো নিজের নিজের হ্যান্ডব্যাগ (আদি ও অকৃত্রিম থ'লে‚ স্পেশালি দর্জি দিয়ে ভাল জাবদা প্যান্টের কাপড় দিয়ে দেশ থেকে বানিয়ে আনা? নিয়ে ঘরে প্রস্থান| সন্ধে হতে দেরী আছে‚ একটু মুখে চোখে জল দিয়ে সমুদ্রের ধারে গেলাম| আসলে সমুদ্র থেকে কিছুটা নদীর মতো বেরিয়ে এসেছে‚ কি যেন বললো নদীই‚ তবে মাইল দেড়েক দূরে আদ্যিকালের লাইটহাউস‚ এখন সেটা ট্যুরিষ্টদের কাছে টিক মারার দ্রষ্টব্য| আহা লা-ভ লি| সাউন্ড অফ মিউজিকে কি একটা গান ছিল না‚ তেমনি বলতে ইচ্ছে করছে| পুরো পাড় বরাবর মাইল দেড়েক কাঠের পাটাতন (deck)| আর ফুট দেড়েক উঁচু কঙক্রীটের দেওয়াল| হেঁটে সুখ বটে| নতুনদার মতো (নো রিলেশন অফ The most Rev. নতুনদি) আমাদেরও নদীর হাওয়ায় খিদে পেয়ে গেল| ইতি উতি ভেজ ইন্ডিয়ান খুঁজছি‚ আসলে সাউথ ইন্ডিয়ান| ধোসা তো নতুন ফ্রেশ বানাতে হয়‚ তাই পুরানা মাল সার্ভ করার স্কোপ কমই| Batter? সে তো ফারমেন্ট হবার জন্যই 'বলি প্রদত্ত্'| আসলে আমার এক সিলেটি বন্ধুর রেস্টুরেন্টের কিচেনে বসে আড্ডা দিতে যেতাম‚ (শকুন্তলার সেই ওসমান সাহেব)| তো সেখানে যা দেখেছি আর অমুক তমুক চিকেন‚ মাটন অর্ডার করতে মন চায় না! ধোসা ইজ সেফ| কিন্তু বিধি বাম‚ আসলে আমরা মিস করে গেছি| premanade এর ধার ঘেঁসে একের পর এক রেস্টুরেন্ট‚ লোক গিজ গিজ করছে| কিন্তু এত খাবারের গন্ধে মনটা উদ্বেল হয়ে উঠলো| অতএব এক ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকানে| গরম গরম মাছের বড়া আর আলুভাজা তো‚ তার উপর দেখলাম বেশ বিক্রী অতএব let us indulge in cholesterol! আসলে আলুভাজা কখনই বাজে খেতে হতে পারে না‚ যতই অমনোযোগ দিয়ে বানানো হোক না কেন‚ It can't go wrong! আর এইসম মডার্ন আলুভাজার ইনডাস্ট্রিয়াল মেশিন গুলো তো এক কাঠি বাড়া| বেশ কিছু পেটেন্ট দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার পুরানো এরিয়াতে‚ গেদে গেদে আলুতে‚ সম্ভব হলে আলুর অ্যাটমিক স্ট্রাকচারে তেল ঢোকানোর কল| এক বড় পাত্র নিয়ে নদীর ধারে পাতা টেবিলে বসা গেল‚ আহা অমৃত| জনগন বিশ্বাস করবেন না‚ এই আমাদের গত তিরিশ বছরের প্রথম ফিশ অ্যান্ড চিপস| (১) যারা ভেটকির্ফিশ ফ্রাই খেয়েছে তারা কেন মরতে ময়দার ব্যাটারে ভাজা বিন-মশলা মাছ খেতে যাবে? (২)আর আলুভাজা বিষবৎ পরিত্যাজ্য| বাঘার মতো বলতে ইচ্ছে করছিল‚ মন্দ নয়| (৩) বীয়রের সহযোগে বলেই কি অত স্বাদ? হায় রে কপাল‚ ফেরবার পথে দেখি ধোসার ছবি লটকানো রেষ্টুরেন্ট‚ জাবার পথে মিস করে গেছি| অতএব হোটেলে প্রত্যাবর্তন| কাল আবার দূরদেশে‚ আরও চার সাড়ে চার কিমি পাড়ি দিতে হবে Coffs harbour অষ্ট্রেলিয়ার ব্যানানা ক্যাপিটাল‚ যেখানে ৪০% লধিবাসীর সারনেম- সিং| বড় লেবার ইনটেনসিভ কাজ‚ যে সে খোকা সাইজের কলার কাঁদি তো নয়! * ছবি আসিতেছে|

132

20

ঋক আর কিছুনা

ঋকানন্দ মহারাজের দেখাশোনা - মহালয়ার দিন

এটাকে বোধহয় পুজোর লেখা বলা যায় না সে অর্থে । মহালয়ার দুপুর রাতে বাড়ি ফিরে ভোর বেলা উঠি আমি আজো , এদিকে নাস্তিক কিন্তু চারটেয় রেডিওতে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র চাই , পাশের ঘরে গিয়ে । ভোরের দিকটা একটু গা শিরশির করে এ সময়টা , চাদর টানার বদলে মাএর আঁচল টা টেনে গুটিশুটি মেরে এ বয়সেও আমি মহালয়া শুনি ( আজ্ঞে হ্যাঁ , ওই শুদ্ধ মহিষাসুরমর্দিনী আমি কখনই বলিনি ) । তারপর উঠে টিভির মহালয়াটা দেখতে দেখতে বোর হচ্ছি , কি রে বাবা এতো নাচ কেন যুদ্ধে গেলে কেউ নাচে? মারামারি হোক কি তর্ক সবেতেই নাচছে মহা মুশকিল । অন্যবার এ সময় মহালয়ার সকালের আলো ফুটে যায় এবারে দেখি মেঘলা আকাশ । সকাল বেলা মেঘলা আকাশ আমার এম্নিই দু চোখের বিষ মহালয়ার দিন হলে কিরম রাগটা ধরে!! ফের ঘুমিয়ে উঠে দেখি তখনো মেঘলা দিন , চোখ খুলছে না সাকুল্যে ঘন্টা দুই ঘুমিয়েছি , অফিস যেতে হবে । চুল কেটে আসি বরং মাথা ম্যাসাজ করে দেবে একটু হলেও এই ম্যাজম্যাজ ভাবটা কমবে । এক গাদা তেল দিয়ে দিলো মাথায় ররতন দা , আরে লাগাও , ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল , পুজোয়র আগে একটু স্টাইল করবে তবে না মেয়েরা লাইন দেবে ! বোঝো!! তেল মেখে কে কবে স্টাইল করেছে , এমন জ্যাব্জ্যাবে করে তাও! কিন্তু সেলুনে নাপিতের সাথে তক্কো করা আর কোনো মেয়েকে বলা তোমায় ভালো লাগছে না , একই রকম দুঃসাহসী কাজ আর আমি ভীতু মানুষ । মা এর কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছি একটু আরাম করে দাও মাথাটায় , চুল টেনে দাও । আমার মাথায় নাকি ছাগল ছাগল গন্ধ তাই দিতেই চায় না ভদ্রমহিলা ! দু চার মিনিট পেয়েছি জোরজুলুম করে তাও। আজ আর গাড়ি নেবো না । শালা ঘুমে মাথা বুকে ঠেকে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই , কাকে ঠুকে দেবো কেস । বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখি আকাশ কালো করে মেঘ, বৃষ্টি এলো বলে । বাসে উঠতে উঠে বৃষ্টি শুরু , কে বলে এটা শরৎকাল , ওই যে একজনের ছাতা উল্টালো , ফাঁকা জানলার ধার । ইকো পার্কের ওই তাজমহল থেকে পিরামিডের কি সব বানাচ্ছে , না না আমি দোষ দিচ্ছি না , হতেই পারে এই নকল তাজমহল থেকেই কত জনের সাধ পুরন হবে । কিন্তু আমাদের কি চিন্তা ভাবনা এতোই দৈন্য হয়ে যাচ্ছে একটা নতুন স্থাপত্য আর ভাবতেই পারিনা! একটা লোক লুঙ্গিটা মাথা অব্দি মুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় । কাশ ফুল গুলো নেতিয়ে গেলো , গরুগুলো গরুর মতো ভিজছে পিলারটার গাঁ ঘেঁষে । আমার কি হলো আমি নেমে পড়লাম বাস থেকে সেই হুল্লাট বৃষ্টির মধ্যেই । আমি ছাতাই নিইনা আর এক্সট্রা জামা প্যান্ট , এরপর এসিতে ঢুকবো জানি জ্বর হতে পারে কিন্তু এই ফাঁকা রাস্তা অঝোর বৃষ্টি এমন টানতে লাগলো । বাসের লোকগুলো কেমন ঘাবড়ে গেছে , এতোক্ষন একটা পাগল ওদের সাথে মিশে বসে ছিলো ভেবেই হয়তো ! একটা লোকও নেই , মাঝে মাঝে সাঁইসাঁই করে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে , আমি ছপাত ছপাত করে এগোচ্ছি প্যন্টটা আর গুটিয়ে লাভ নেই । শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভিজে অফিসে ঢুকে দেখি অফিসে আজ রঙের এলা । সব মামনি রা শাড়ি আর খোকাবাবুরা পাঞ্জাবি পরে ঘুর ঘুর করছে । যাক কোথাও তো মহালয়া ফ্লেভার আছে অন্তত । রাতের ক্যাবে আমি মোবাইল ডেটা অন করি না , কানে গান গুঁজি না , গল্প করি ক্যাব ড্রাইভারের সাথে । আজ আড্ডা হচ্ছে রেড এফেম না মির্চি কে বেশী জনপ্রিয় তাই নিয়ে । পুজোয় আমার কদিন ছুটি জেনে সে বলল পুজোর চারদিন সেও আর গাড়ি বের করবে না । বল্লাম কেন ভীড়? বলে না না বন্ধুবান্ধব্দের সাথে ঘুরবো মজা করবো সারাবছর কাজ করলে হয় । ছেলেটা খুবই ছোট দেখে মনে হয় , আপনিটা চালানো গেলো না , বললাম বয়স কত কুড়ি? হেসে ঘাড় নাড়ে । পড়াশোনা করলে না? "বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না , , আর টানতে পারতো না , তার চেয়ে বললাম একটা গাড়ি কিনে দাও" । দিব্যি সহজ সুরে বলল । আমি নেগেতিভ কথা ভালোবাসিনা , যারা স্বপ্ন মেখে উৎসাহ নিয়ে জীবন হাঁটে তাদের ভালোবাসি বড় । এই হয়নি সে হয়নির বদলে এই হয়েছে সেই হয়েছে শুনতে ভালোলাগে আমার । সকালের যে রোদটা ওঠেনি বলে পুজো পুজো মনে হচ্ছিলো না সে রোদ টা এই মাঝ্রাতে উঠে গেলো যখন স্বপ্ন স্বপ্ন চোখে রহমান বলছিলো , "সারারাত , সকাল দুপুর গাড়ি চালায় আর বিকেলে ঘুমায় , দিব্যি আছি ভাই বুঝলে , নিজের মতো , রাতের অফিস ডিউটির টাকা বাবাকে দিই আর সকালের টা আমার হাত খরচা তেলের খরচা । পুজোয় ভাই আসবে দিল্লী থেকে , আমার যমজ ভাই কিন্ত ও পড়াশোনা করে । চারদিন ঘুরে বেরিয়ে ঠাকুর দেখে তারপর আবার শুরু । ভালো থাকবেন স্যার । " তুমিও ভালো থাকো রহমান । পুজোর আনন্দ নিয়ে , নাছোড়বান্দা অপরাজিত হয়ে ।

50

6

Ranjan Roy

অচলায়তনের দেয়ালের ফোকর ও ভালবাসা

১২) নতুন নিয়ম হয়েছে। আমাদের হেডমাস্টার মশায় নিজের ছোটছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দোতলার দুটো ঘরে থাকবেন। ইউ -শেপের দোতলায় প্রায় পনেরটা ঘর। ওনার জন্যে ঘর ছেড়ে দেওয়া হল প্রথম সমকোণের ওপর ঘরটায়। আরে, ওর পাশ দিয়েই তো আমাদের ছোট ছাদে যাওয়ার জায়গা। তারমানে? --মানে খুব স্পষ্ট ; কোন শালা নতুন মহারাজদের কাছে গিয়ে দালালি করেছে যে ক্লাস টেনের ছেলেগুলো ওই ছোটছাদটিতে সিগ্রেট খাওয়া আর আড্ডা মারার ঠেক বানিয়েছে। আর গরমের দিনে ওরা খোলা ছাদে বিছানা করে ঘুমোয়! -- বেশ করি ঘুমোই, কার বাবার কি! একটা ঘরেও পাখার বন্দোবস্ত নেই, তো? গরমে সেদ্ধ হব? তারচেয়ে খোলা হাওয়ায় ছাদে শুলে কার কি ক্ষেতি? বরং ভোরের দিকে তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙে। --- বুঝলি না! এসব ওই ক্লাস এইটের বাঁদরগুলোর কাজ। ওরা সেবারের ঘটনার জন্যে আমাদের উপর খার পুষে রেখেছে। গুরু মুখ খোলে। -- ওদের পরে দেখে নেব। কিন্তু সবসময় নেগেটিভ ভাবিস কেন? খালি চুগলি আর ষড়যন্ত্রের ভূত! কারও আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। আসলে হেডস্যারের অসুখ সেরে গেছে, তাই। বিপ্লব আমাদের মত লোয়ার ক্লাসে হোস্টেলে আসেনি। ও জানে না। তাই বলে দিই। -- স্যারের হয়েছিল হাইড্রোসিল। অমন দোর্দন্ডপ্রতাপ লোক। শুধু ছাত্ররা নয়, কিছু স্যারও ভয় পেতেন। উনি কখনও হাসতেন না। 'বেরিয়ে যা শুয়ার'--ছিল ওনার বাঁধা বুলি। একবার ভুল করে একজন নতুন স্যারকে বলে ফেলেছিলেন, তিনি পরের দিন রিজাইন করেন। --উঃ প্রেসি কর। উনি দোতলায় কেন? -- আরে বলতে তো দে! তা অমন রাগী লোক হাইড্রোসিলে কাবু হলেন। সেইজন্যে ওঁকে একতলায় বাথরুমের পাশে একটি ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। তখন পায়খানায় জলের কল ছিল না। বাইরের চৌবাচ্চার থেকে ছোট একটা বালতি করে জল নিয়ে ঢুকতে হত। কিন্তু ওই ফোলা ধুতি নিয়ে পা ফাঁক করে হাঁটতে গিয়ে জল তোলা আর হয়ে উঠত না। তখন যে কোন বাচ্চাকে দেখলেই বলতেন --বৎস, আমায় এক বালতি জল এনে দাও তো! --- তোরা দিয়েছিস? '--সবাই । যে যখন সামনে পড়েছে আর কি। --তুই? -- একবার। ওই সামনে পড়ে গেছ্লাম। কিন্তু সেদিন ওই রাগী ভদ্রলোক অনুনয়ের গলায় বলেছিলেন--বাবা, একটু জল দিয়ে যাবে বাবা? বড় কষ্ট পাচ্ছি গো! সেই হেডস্যার এখন দোতলায় মানে উনি সেরে গেছেন। আর কাউকে জল টেনে দিতে হবে না। হঠাৎ গুরু চমকে ওঠে। --অ্যাই পোদো! শীগগির যা! নীচের বারান্দায় দেয়ালের গায়ে যে ম্যাগাজিনটা ঝুলছে ওটা নামিয়ে নিয়ে আয়। --কেন গুরু? --কেন কী রে ভোঁদাই? ওতে হেডস্যার নাম দিয়ে একটা কবিতা আছে না? স্যার দেখলে--! -- আরে গুরু! ভাল মনে করিয়েছ, ওটা পোদোর জিদেই ছাপা হয়েছিল। ওই খুলে আনুক। ছাপার কথাটা বাড়াবাড়ি। আসলে গত কয়েকমাস ধরে আমরা একটা হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা বের করেছি--- নবীনসাথী। আমি সম্পাদক, কিন্তু তিনজনের কমিটি আছে। একেকবার একেক রঙের আর্ট পেপারে ক্লাস নাইনের সুব্রতর সুন্দর হাতের লেখায় ভরে দেওয়া হয়। এবারে ক্লাস ফোরে একটি বাচ্ছা ফ্রি-তে ভর্তি হয়েছে। ওর মা এই পাড়ায় কাজের মাসি। বাবা নেই। চকচকে চোখের বাচ্চাটা এবার ম্যাগাজিনের জন্যে একটা ছড়া লিখে জমা দিয়েছে। কবিতাটি পড়ে কমিটি খুব হাসল, কিন্তু ছাপতে চাইল না। আমি তখন সম্পাদকের ভেটো পাওয়ার প্রয়োগ করে ছাপালাম। তর্ক দিয়েছিলাম-- ছন্দ ও অন্ত্যমিল নিখুঁত, সেন্স অফ হিউমার আর ছোট্ট বাচ্চাকে উৎসাহ দেওয়া। তাই বড় বড় অক্ষরে বেরোল এবং ছেলেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়তে লাগলঃ হেডশ্বর ========= আমাদের ইস্কুল দুই তিন তলা, টিফিনেতে খেতে দেয় পাউঁরুটি কলা। আমাদের হেডশ্বর এমে বিয়ে পাস, পড়া না পারলে মারে ঠাস ঠাস।। না, ওই দেয়ালপত্রিকা ঠিক সময়েই নামিয়ে আনা হয়েছিল। তারপর এক জরুরী মিটিং এ সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে সম্পাদকের পদ থেকে নামিয়ে শুধু কমিটি মেম্বার করে দেওয়া হল। নতুন সম্পাদক হবে প্রশান্ত। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা গেল। রাত্তিরে ওঁর ঘর ডিঙিয়ে ছাদে যাওয়া সম্ভব নয়। সিগ্রেট খাওয়া তো দূর অস্ত্। উনি বর্ধমানের লোক। প্রতি শনিবার বা অন্ততঃ একবার বাদ দিয়ে পরের বার ট্রেন ধরে বাড়ি যান। সোমবারে দুপুরে ফিরে আসেন। ফলে আমাদের সেই দুদিন ১৫ ই আগস্ট আর ২৬ শে জানুয়ারী। ঘটা করেই পালন করা হয়। কিন্তু একদিন খবর ভুল ছিল। উনি বর্ধমান যান নি। শরীরটা একটু খারাপ হওয়ায় ঘরে শুয়ে ছিলেন। শুধু ওঁর ছেলে গেছল। সন্ধ্যের মুখে উনি ঘর থেকে বেরিয়ে চিৎকার জুড়লেন। -- ও মহারাজ ! মহারাজ! ও সুনীল মহারাজ, এদিকে আসুন। সুনীলদা অবাক। ব্যস্তসমস্ত হয়ে একতলার থেকে দোতলায় এলেন। --কী হয়েছে মাস্টারমশাই? --আর বলবেন না। ক্লাস টেনের রমেনকে দেখি এমনি এমনি করে টেবিল বাজিয়ে বাজিয়ে গাইছে-- আমার যৌবন জ্বালা জুড়াইল রে, আমার যৌবন জ্বালা জুড়াইল রে! এই বয়সেই যদি ওদের যৌবনজ্বালা জুড়িয়ে থাকে তা'লে পরে কী হবে গো! সেদিন আমরা ১৫ই আগস্টের বদলে ১৪ই আগস্ট দেখলাম। কিন্তু হেডস্যারের সঙ্গে ১৫ই অগাস্ট জুড়ে গেছে যে! কোথায়? আমার স্মৃতিতে। আমি তখনো প্রদ্যুম্ন থেকে পোদো হই নি। কচুরিপানায় ঢাকা পুকুরের ঘাটলায় শামুকপচা জলে থালাবাটি ধোয়া, কাপড় কাচা, আর স্নান করে করে হাত- পা খোস-পাঁচড়ায় ভরে যায় নি। ক্লাস সিক্সে নতুন ভর্তি হওয়া রোগা প্যাংলা ভীতু ছেলেটি তখনও মোটা ভাতের সঙ্গে আধসেদ্ধ ছরছরে ডাল, কারি পাউডারের ঝোল আর জলখাবারে ডালডা-চিনি-মুড়ি খেতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এমন সময় ঘনঘোর বর্ষার মধ্যে এসে গেল স্বাধীনতা দিবস। আশ্রমের আবহাওয়া বদলে গেল। চারদিকে সাজো সাজো রব। ১৪ অগাস্টের রাত্তির থেকে সবাইকে নিজেদের বিল্ডিং ছেড়ে ক্যাম্পে থাকতে হবে। সবাই নিজে নিজের বিছানা , দুদিনের মত জামাকাপড়, ডায়েরি, পেন সাবান, ব্রাশ ইতাদি নিয়ে চলে যাবে। ১৫ তারিখ ক্যাম্প ফায়ারের পর প্রাইজ দেওয়া হলে সবাই সে'রাত্তির ক্যাম্পে ঘুমিয়ে পরের দিন সকালে আবার পুরনো জীবনে ফিরে আসবে। প্রদ্যুম্ন দেখল এলাহি ব্যাপার। সমস্ত ছেলেগুলোকে আটটি গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ১৩ অগাস্ট ডাইনিং হলে তাদের নাম ও গ্রুপ ক্যাপ্টেনের নাম ঘোষণা করা হল। জানা গেল যে হাইস্কুল বিল্ডিং খালি করে ধুয়ে মুছে সেটাকে দু'দিনের জন্যে ক্যাম্প ঘোষণা করা হয়েছে। সামনের আঙিনা ঘিরে গেছে অস্থায়ী পোল ও তারের বেড়ায়। একটা গেট। সেই গেটে কাঠের রাইফেল নিয়ে পাহারা দেবে একজোড়া সেন্ট্রি। দু-দুঘন্টা মার্চ করে করে, বাই টার্ন, সব গ্রুপ থেকে। আর কাউকে ক্যাম্পে ঢুকতে হলে গেটপাস দেখাতে হবে--সেগুলো ক্যাপ্টেনরা জারি করবেন। গেটপাস দেখাতে না পারলে সুনীল মহারাজ , হেডস্যার কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হবে না। আগের বছর একটি গ্রুপের জোড়া সেন্ট্রি, ক্লাস এইটের দুই ছোকরা, সুনীল মহারাজকে আটকে দিয়েছিল। উনি রেগে গিয়ে বরেনদাকে কম্প্লেন করায় জবাব পেলেন-- ওরা ওদের ডিউটি ঠিকমত করেছে।আর সেই গ্রুপটা এই পয়েন্টে বেশি নম্বর পেল। নম্বর অনেক কিছুতে, সেন্ট্রি দেওয়া , ঘর পরিষ্কার, কীর্তালি(কোন ভাষা?) --মানে আশ্রমের মাঠঘাট, পুকুর, নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা, মার্চপাস্ট, ডাইরি লেখা, স্বাধীনতা দিবসের উপর রচনা, কবিতা লেখা, পাঁচ মিনিট এলোকুশন (মানে কী?), সন্ধ্যেয় ক্যাম্প ফায়ারের গান, নাটক ও ইম্প্রোভাইজড কোন স্কিট, মিমিক্রি --সবেতেই। আর সকালে জলখাবারে মগে করে গরম চা দেওয়া হবে, আর্মি স্টাইলে। বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজে প্রীতি-ফুটবল--স্টাফ ভার্সাস স্টুডেন্ট্স। সন্ধ্যেয় অমূল্যদার ম্যাজিক লন্ঠন, অথবা কথা বলা পুতুলের কেরদানি! তারপর আমাদের ক্যাম্প ফায়ার। তাতে আবৃত্তি, মিমিক্রি, গান ও অভিনয়--সুকুমার রায় বা রবীন্দ্রনাথের হাস্যকৌতুক/ব্যঙ্গকৌতুক থেকে--কী নেই? তা সেই আমার জীবনের প্রথম ক্যাম্পে হেডস্যার আমাদের স্বাধীনতা দিবসের মর্ম বোঝাতে গিয়ে বললেন-- মনে রেখ, আজ থেকে মাত্র ১৪ বছর আগে এই শহরে ইউনিয়ন জ্যাক উড়ত। তোমাদের মধ্যে যাদের বয়েস ১৪ বছরের কম তারা নিজেদের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দাও; পরাধীনতার অপমান তোমাদের ভুগতে হয় নি। এগার বছরের প্রদ্যুম্ন্ব ভাবল -- ইস্, মাত্তর ১৪ বছর আগে এখানে বৃটিশরা ছিল? রাইটার্স বিল্ডিংয়ের মাথায় ইউনিয়ন জ্যাক উড়ত? কী অন্যায় ! কী অন্যায়! ভগবানের একচোখোমি! ওকে যদি ভগবান আরও দুই দশক আগে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিত তো ও নিশ্চয়ই কিছু একটা করে ফেলত। সূর্য সেন, বিনয়-বাদল-দীনেশ না হোক অন্ততঃ ১৪ বছরের ক্ষুদিরাম। কিন্তু কোথাও একটা হিসেবে ভুল হচ্ছে না? পাটিগণিতে কাঁচা শ্রীমান প্রদ্যুম্ন কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারল না। ১৩) সম্পাদক পদ হইতে শ্রীমান প্রদ্যুম্নের অপসারণের পিছনে একটি গল্প আছে। এই গল্পের উৎস ওই শিশুসুলভ কবিতাটি, পোদোর সম্পাদকসুলভ আভিজাত্যবোধ ও ক্ষমতার অহংকার । এটাই কমিটির মিটিংয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। না, একটু ভুল হল। এব্যাপারে কমিটির সমর্থন ও সহানুভূতি আমার সঙ্গেই ছিল। আসল অভিযোগ হল আমি উপরোক্ত কারণের বশে , বিশেষতঃ ক্রোধ ও মাৎসর্য্য রিপুর দাস হইয়া ক্লাস এইটের বর্বর গুন্ডাপ্রকৃতির ছেলেদের সঙ্গে ,মারপিটে জড়াইয়া পড়িয়া উত্তমমধ্যম প্রাপ্ত হইয়া ক্লাস টেনের প্যাট্রিশিয়ানদের প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন ঢালিয়া দিই। ফলে ক্লাস টেন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিনিয়র ক্লাসের সমান রক্ষার্থে হা-রে -রে রবে ক্লাস এইটের সঙ্গে ক্লাস-ওয়ারে জড়াইয়া পড়ে। অগত্যা ম্যানেজমেন্টের হস্তক্ষেপে সিজ-ফায়ার ঘোষণা হয়, কিন্তু ক্লাস এইট ও সেভেন আমাদের দেওয়াল পত্রিকায় কোন লেখা দিবে না ঘোষণা করায় সিনিয়রদের কূটনৈতিক ও রণনীতিগত লোকসান হয়। শেষে আমাকে না জানাইয়া গুরু ও তাঁহার দক্ষিণ হস্ত ক্লাস এইটের নেতাদের সঙ্গে গোপনে আলোচনা চালায়। উহারা সমস্ত ঘটনা ভুলিয়া শেক হ্যান্ড করিতে রাজি হয় ও ম্যাগাজিন বয়কটের সিদ্ধান্ত বাতিল করে-- কিন্তু শর্ত রাখে যে নষ্টের গোড়া শ্রীমান পোদোকে পত্রপাঠ সম্পাদকের পদ হইতে নামাইতে হইবে। ব্যাপারটা এই রকম। ক্লাস এইটের কতগুলো বখা ছেলের গ্রুপ ধীরে ধীরে আমাদের চক্ষুশূল হয়ে উঠছিল। নাইনের ছেলেদের সঙ্গে আমাদের ভাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে উঠেছিল, কয়েকজন ব্যক্তিগত বন্ধু হল। পড়াশুনো, লাইব্রেরির বই পড়া , নাটক ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে। ওরাও আমাদের মতই প্রথম ও ফিফথ পিরিয়ডে ব্যাক বেঞ্চে বসে ঘুমোত। স্যারেদের ও ডে-স্কলার ছেলেদের হাসির ও বিদ্রূপের খোরাক হত । আবার অ্যানুয়াল পরীক্ষায় মেরিট লিস্টে উপরের দিকে থাকত। কিন্তু ক্লাস এইটের ব্যাচটা একটা ব্যাচ বটে! এদের মধ্যে বেশ কজন আমাদের ও নাইনের ব্যাচের থেকে ফেল করে ভিড় জমিয়েছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল, য্খন তখন কড়কড়ে নোট বের করে। এও সহ্য হচ্ছিল। জানা গেল এদের পালের গোদা দুজনের হরমোন অত্যধিক ক্ষরণের কারণে প্রায়ই বেশ কিছু বাচ্চা এদের শিকার হচ্ছে। এ নিয়ে এরা বেশ গর্বিত। এমনকি লুকোনোর চেষ্টাও করে না। আমদের পাঁচজনের টিম এদের ব্যুহ ভেদ করতে ব্যর্থ হল। যে তিনজন মুখ খুলতে রাজি হল তারা স্বামীজির সামনে গিয়ে বেঁকে বসল। মারের ভয়! পরে সেই মাফিয়ারাই ওই বাচ্চাদের নিয়ে মেজমহারাজের কাছে (প্রাক্তন পুলিশ অফিসার ) নালিশ করাল যে ক্লাস টেনের আমরা ক'জন নাকি ওদের ভয় দেখিয়ে মিথ্যে অভিযোগ করাতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। বোধহয় আমাদের অন্য কোন ব্যক্তিগত ইস্যু আছে। মেজ মহারাজ চিবিয়ে চিবিয়ে ইংরেজিতে আমাদের যা বললেন তা দুটো লাইনে বলা যায়ঃ ডক্টর, কিওর দাইসেল্প্ফ! অয়েল ইন ইয়োর ওন মেশিন! ওই ঘটনার পর থেকে ‘ওরা –আমরা’ সৃষ্টি হল; আমরা একে অপরের ক্লাস-এনিমি হয়ে গেলাম। এই অবস্থায় একদিন ওদের ক্লাসের দুজন বাচ্চামত ছেলে হাতে করে দুটো কবিতা নিয়ে আমাদের ঘরে এল। দেয়াল পত্রিকায় ছাপতে হবে। ওদের দেখেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সেই দুটো বাচ্চা! যারা বয়ান বদলে আমাদের মুর্গী করেছিল! তবু বিক্রমাদিত্যের সিংহাসনে বসলে জাজমেন্ট দেওয়ার আগে পূর্বাগ্রহ মুক্ত থাকাই আদর্শ আচরণ বিধি। আমি ও বিপ্লব লেখাগুলো পড়তে লাগলাম। তারপর গম্ভীর মুখে বললাম-- এটা কী লিখেছ? --কবিতা। --কোথায় কবিতা? ও অবাক হয়ে মিনমিন করে বলল--কেন, পোদোদা? আপনার হাতেই তো ধরা রয়েছে। দেখুন না--বর্ষাকাল। পোদোদা! হাড়পিত্তি জ্বলে গেল। গম্ভীর মুখে বললাম, - হুঁ, বর্ষাকালই বটে! বর্ষা আসিল, ডাকিয়া উঠিল আকাশের যত মেঘ? এটা কবিতা হয় নি, শুধু অন্ত্যমিল মিলিয়ে একটা গোদা বাহ্যিক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এটা ছাপা যাবে না। পরেরবার চেষ্টা কর। অন্য বাচ্চাটা করুণ মুকেহ বিপ্লবকে বলল --আমারটা তো ঠিক আছে? বিপ্লব খেঁকিয়ে উঠল। -- এটা? এটা তো ডাহা চুরি! গতবারের স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন থেকে টুকলি! বাচ্চাটার চোখে হতাশা ও আতংক। --না, টুকলি নয়। বিপ্লব উঠে গিয়ে ওর তাক হাতড়ে একটা বিস্কিট রঙের ম্যাগাজিন বের করে এনে দ্রুত হাতে পাতা ওল্টাতে লাগল। --পেয়েছি; এই যে! শোন্। " ৩২ নম্বর বাসের তলায় ব্যাঙ রাজার মৃত্যু" ---------------------------------------------- হৈ চৈ পড়ে গেছে সারা বরানগরে, ব্যাঙেদের মহারাজা মারা গেছে আহা রে! ------ । একেবারে কমা-সেমিকোলন পর্য্যন্ত টোকা। না, না; এসব চালাকি চলবে না। -- বিপ্লবদা , একটু দেখুন। দুটো এক নয়। ওটা হল ৩২ নম্বর বাসের তলায়, আর আমি লিখেচি--৩৪ নম্বর বাসের তলায়। বিপ্লব খ্যা -খ্যা করে হাসতে লাগল। -- ওরে একটু চুপ কর। ৩২ নম্বরকে ৩৪ নম্বর করে দিলেই কবিতা আলাদা হয়ে গেল? -- দেখুন, দুটো বাসই তো এসপ্ল্যানেড থেকে বরানগর যায়, তবে? আমার আর সহ্য হল না। উঠে ঠেলতে ঠেলতে বাচ্চাদুটোকে ঘর থেকে বের করে দিলাম। বললাম--কবিতা লেখা? কবি? খালি ২ কে ৪ করে লিখলি তো হয়ে গেল? ইয়ার্কিরও একটা সীমা আছে। তোদের গোটা ক্লাসটাই এইরকম গবেট নাকি? দুটো দিন কেটে গেল। বিকেলে ফুটবল পেটাতে না গিয়ে ম্যাগাজিনের লেখাগুলোর ফাইল খুলে বসেছিলাম, আমি আর বিপ্লব। নরেশ আর সুদীপ এল। ক্লাস এইটের সেই মাফিয়া টাইপের ছেলে গুলো। সুদীপের একটু রোমশ চেহারা। এই বয়সেই গোঁফের রেখা দেখা দিচ্ছে। ওকে দেখা মাত্র আমার মাথায় খুন চড়ে গেল। শুনেছিলাম নতুন ছেলেদের পেছনে লাগার সময় ওর দুটো চ্যালা অনিচ্ছুক বাচ্চাটার হাত ধরে রাখে। আর গত পূজোর সময় ওর বাড়ির লোক নিয়ে যেতে এসেছিল। ও নাকি তখন ঘরের মধ্যে একটি ছেলের সঙ্গে রাসলীলায় মত্ত ছিল। বন্ধ ঘরের মধ্য থেকে বাড়ির লোককে বলে -- একটু অপেক্ষা কর। প্যাকিং করছি, জামাকাপড় বদলাচ্ছি--সময় লাগবে। ওরা ঢুকল, একটু পেছনে আগের সেই বাচ্চা দুটো। -- এই যে, এডিটর! এদের কবিতাগুলো রিজেক্ট করলে কেন? -- একটা কবিতা হয় নি, অন্যটা টুকে লেখা--তাই। --কোনটা কবিতা আর কোনটা নয়, কে ঠিক করবে? তুমি? --আলবাৎ; এটাই আমার কাজ। আমাদের পত্রিকার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। ---- বেশ, কোনটা তোমার কাছে কবিতা? ওই ফালতু " টিফিনেতে খেতে দেয় পাঁউরুটি-কলা"? নরেশ দোহার দেয়,-- ওই কবিতাটার টাইটেল আবার "হেডশ্বর"! গুরুজনদের স্যারেদের নিয়ে ইয়ার্কি করলেও ম্যাগাজিনের স্ট্যান্ডার্ড থাকে, তাই না পোদো? বিপ্লব তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলে-- অ্যাই, নরেশ! মুখ সামলে। তোর দু'বছরের সিনিয়র, প্রদ্যুম্নদা বলবি। ওরা হেসে উঠল। তারপর বলল,-- দু'বছর আগে আমরা ক্লাসমেট ছিলাম, তখন থেকেই ও আমাদের পোদো। কী রে , ঠিক বলেছি না? আমি কোন কথা বলি না। সুদীপ আবার বলে-- তাহলে আমাদের ক্লাসের দুটো কবিতা রিজেক্ট করছ? আমি ওদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে বাচ্চাদুটোকে দেখি--উকিল ধরে এনেছিস? লাভ হবে না। ঘরে ফিরে যা। ওরা তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সুদীপদের বলি--শোন, ক্লাস -টাস নয়। একটু ভাল কবিতা নিয়ে এস, নিয়ে নেব। ওরা চোখে চোখে কথা বলে। তারপর সুদীপ বলে-- আধুনিক কবিতা চলবে? গদ্য কবিতা? --হ্যাঁ হ্যাঁ। নিয়ে এস। --অ্যাই নরেশ, তোর সেই আধুনিক কবিতাটা দেখা তো আমাদের সম্পাদককে, স্ট্যান্ডার্ডটা দেখে নিক। নরেশ ভালমানুষের মত মুখ করে একটা চোথা কাগজ বের করে আমার হাতে দেয়। আমি ভাঁজ খুলে হতভম্ব , এটা কী? --কেন , আধুনিক কবিতা। আমার মুখের ভাব দেখে বিপ্লব কাগজটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চোখ বোলায়, তারপর হা-হা করে হেসে ওঠে আমাকে ফেরৎ দেয়। কাগজটায় কয়েকটি রেলস্টেশনের নাম একটি বিশেষ অর্ডারে লেখা রয়েছে। " টালিগঞ্জ-বালিগঞ্জ, টালিগঞ্জ-বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া--যাদবপুর। গড়িয়া-সোনারপুর, বজবজ-বজবজ।" আমি কিছু বলার আগে বিপ্লব হাসতে হাসতেই বলে-- সরি ! এইসব অশ্লীল লেখা ছাপতে পারব না। অশ্লীল লেখা! ওরা আকাশ থেকে পড়ে। -- ওতে কোন শব্দটা অশ্লীল? নাকি দু'ক্লাস উঁচুতে পড়েন বলে যা খুশি কমেন্ট করবেন? আমি রাগের চোটে কাগজটা নিয়ে কুচিকুচি করে ছিঁড়তে থাকি। ওরা হাঁ-হাঁ করে ওঠে। --এটা কী হল সম্পাদক মশাই? আপনার লেখা রিজেক্ট করার রাইট আছে; কিন্তু ছিঁড়ে ফেলা? --- পছন্দ না হয় ফেরৎ দিয়ে দে। ছিঁড়লি কী করে? --বেশ করব, এই সব অশ্লীল ইয়ার্কি আমার সঙ্গে নয়, অন্য কোথাও মারাবি! ওরা কাগজটা কেড়ে নেবার চেষ্টায় আমার সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম চড় বোধহয় আমিই মেরেছিলাম। কিন্তু ওরা তৈরি হয়েই এসেছিল। আমি বা বিপ্লব কেউই মারামারিতে অভ্যস্ত নই, একটু লালুটাইপ। ফলে দুজনেই বেশ মার খেলাম। আমার বরাদ্দে একটু বেশি জুটল। তারপর ক্লাস-স্ট্রাগল, সিজফায়ার ইত্যাদি। ওরা চ্যালেঞ্জ করে মহারাজকে বলল-- আমি ব্যক্তিগত কারণে ওদের গ্রুপের কারও কবিতা ছাপতে চাই না। তাই ওদের একটি ভাল আধুনিক কবিতাও ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি। আমরা বললাল--যা তা অশ্লীল লেখা! --ওরা বলল বাজে কথা, পোদো কাগজটা দেখাক। কী করে দেখাব, ছিঁড়ে ফেলেছি যে! হেডস্যারকে দিয়ে তদন্ত করানো হল। উনি বললেন--প্রদ্যুম্ন, কাগজ নেই তো কি হয়েছে, তুমি মুখে বল বা লিখে দাও যে ওরা কী অশ্লীল শব্দ লিখেছে--মেনে নেব। ওরা মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। আমার কাছ থেকে শুনে হেডস্যার সন্দিগ্ধ মুখে মাথা নাড়তে লাগলেন। এ তো ক'টা রেলস্টেশনের নাম-- অশ্লীল কোথায়? আমার মুখে বাক্যি নেই। আমার অভিযোগ খারিজ হয়ে গেল, বন্ধুরা বলল আমার বোকামি আর গোঁয়ার্তুমি আমাদের গোটা ব্যাচের হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে দিল। সেই থেকে আমরা ও ক্লাস এইটের ব্যাচ আশ্রমের বাকি জীবনে তীব্র জীবনমরণের শ্রেণীসংগ্রামে বৃত হইলাম। (চলবে)

434

61

ঋক আর কিছুনা

ঋকানন্দ মহারাজের দেখাশোনা ( এবারে কিছু উড়ে আসা চিঠি)

একজন এর চিঠির খাতা আমার হাতে এসে পড়েছিলো , এ চিঠির প্রাপক প্রেরক আমি না । তার খাতা থেকে টুকে দিলাম । ********************************************************************************************************************* চিঠি - এক নেই সম্পর্কের চিঠির আবার সম্মোধন কি। তাই সোজাসুজি শুরু করলাম কেমন? জানি প্রথম লাইনটা পড়েই ভাববে আহ এতো ঘ্যাম নিয়ে কেউ চিঠি লেখে ইত্যাদি। বুঝলে সমস্যাটা সেখানেই। এই যে না বুঝতে পারার সমস্যা। আচ্ছা উদাহরণ দিই? পেটুক মানুষ খাবারের উদাহরণ টাই হোক নাকি? গুড় আর নারকেলের কম্বিনেশন যে অমন একটা অমৃত টাইপ ব্যাপার হয় সে কি করে বের করা গেছিলো কে জানে কিন্তু ওই পাক দেওয়াটাই আসল বুঝলে। তোমার জগৎ আর আমার জগৎ ভয়ানক ভয়ানক আলাদা। আমার মধ্যবিত্ত বারান্দায় কুমড়োর দানা শুকোতে থাকে, আমার স্টিলের থালায় ভাত, আমার মুড়ির কাঁসি এসব নিয়ে আমি কুঁকড়ে থাকিনা সত্যিই কিন্তু প্রেম যেই বাস্তবে আসে এরা যেন বলে ওঠে আলাদা, ভয়ানক আলাদা, মিলবে না। তুমি সেদিন প্রেম আর ভালোবাসার তফাৎ নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলে। অত আমি বুঝি না বুঝলে, আমার মা আর বাবা রোজ রোজ ঝগড়া করে করে এ বয়সে এসে এক সাথে বিকেলের চা খাওয়াটা প্রেম না ভালোবাসা আমি জানিনা। এই ধরো গাছের জগৎ আর মাটির জগৎ আলাদা কি করে ওদের প্রথম সংকোচ কাটে কে জানে, আবার মরুভূমির ক্যাকটাসের সাথে কি সুন্দরবনের মাটির মিলবে। তার চেয়ে বরং এই দূরটাই ভালো। গল্প শোনাবো তোমায় মনে মনে রোজ, যে গল্পগুলো সামনে বসে শোনালে নির্ঘাত হাই তুলবে। এই যে ভীড় জ্যামে দাঁড়িয়ে সুমন গাইছে, 'যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা' আর আমি জানলার কাচ টাচ তুলে তোমার সঙ্গে শুনছি এইই ভালো না? না না ভীড় বাসে কোনোরকমে এক ঠ্যাঙে দাঁড়িয়েও 'তবু আজো আমি রাজি, চাপা ঠোঁটে কথা ফোটে' শুনতে শুনতে আমি একা হয়ে যাই। তোমায় বোঝাতে পারবোনা, হেসে উঠবে কিংবা বিরক্ত হবে সব কিছুর অবয়ব না থাকাই ভালো। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় দেখি মেঘ করে এসেছে, রাস্তা গাছ পালা সব্বাই অপেক্ষা করছে কখন বৃষ্টি নামবে, তারপর সেই হাওয়াটা দিলো জানো। তুমি জানোনা বোধহয় ওই হাওয়াটা, বৃষ্টি আসার আগেই আসবে, বেশী জোরে আসলে আর বৃষ্টি হয়না আবার একদম না এলেও হয়না, ওই প্রেমের আবেগটার মতো। একটু এ চাল ওচাল হলেই ডুব দেওয়া প্রেম, নইলে নির্ভর বন্ধু। আর আর... আরো কিছু গোলমাল হলে? পুরো লছমনঝোলা কেস। কোলকাতা শহরে রাত দেখেছ? উৎসবের রাত না এমনি রাত। বোধহয় দেখোনি, আসলে কোলকাতার রাত গুলো মেল শভিনিস্ট তোমার ভাষায়। ওই সময় রাস্তায় লুঙ্গি বা হাফপ্যান্ট পরে খালি গায় রেডিও শোনে পান বিড়ির দোকানের লোকটা। ফাঁকা রাস্তায় ফোন কানে কোনো সদ্য প্রেমে পড়া ছেলে, আমার মতো ফেক প্রেমিক না, বেশ চোখ মুখ উজ্জ্বল হওয়া কথা বলতে বলতে স্বপ্ন মাখা প্রেমিক। তোমার ভাষায় তো আমি নিজেকে ছাড়া কাউকে কিছুকেই ভালোবাসিনা। না না কথা শোনাচ্ছিনা অ্যাক্সেপ্ট করছি কেবল। বেশী বেশী ইংরাজি শব্দ ঢুকে যাচ্ছে না? আচ্ছা পরের বার খেয়াল রাখবোখন, এবার শোনো যা বলছিলাম। সেই রাতের রাস্তায় দুর্দান্ত ভাবে ছুটে চলা বাইককে খুব ভয়ানক খিস্তি মারে ড্রাইভার সে এমন টাইপ তোমার সামনে সে কথা ভেবে লিখলেও লজ্জা লাগবে। রিক্সাওলা গান চালাতে চালাতে যাবে, হেঁকে হেঁকে আদিরসাত্মক চুটকি বলবে চা ওলা তার বন্ধু কোনো সব্জিওলাকে। হ্যাঁ মাঝ্রাতেও সবজি বিক্রি হয় জানো, কাদের জন্য আমার দেখা হয়নি কখনো। একটাও মেয়ে দেখিনা আমি রাস্তায় এ সময়, এমনকি বাইকের পিছনেও না। শুধু মেয়েরা দখল করে নেয় এরকম কোনো সময় চব্বিশ ঘন্টার কখনো? বেশী লম্বা হয়ে গেলো না? ধ্যুত এর চেয়েও বেশী বকবক করি আমি তোমার সাথে। ভালো থেকো বোলেগা নেহি ন্যাকামো বলবে, ইয়ে একখান উত্তর দেবে নাকি? নীল খাম টাম চাইনা এমনি রুল্টানা খাতার পাতায় লিখলেও পড়ে নেবো। ********************************************************************************************************************** চিঠি - দুই ************************** কি করছো বলো দেখি? ব্যস্ত ব্যস্ত? সারাদিন কী এতো ব্যস্ত থাকো বলোতো, খালি নিজেকে ভোলাতে তা জানো? তোমার রান্না করার ছল, নিত্যনতুন সিনেমা সব আমার ভারী চেনা, আমিও ভুলিয়ে রাখি কিনা নিজেকে। হরেকমাল পাঁচটাকায়। মাঝে মাঝে ভয়ানক ডিপ্রেসিভ চিন্তা আসে জানো, এই যে নিজেকে নিত্য নতুন জিনিস দিয়ে ভুলিয়ে রাখি কেন? মানে এই নাম যশ আহার মৈথুন এর কি মানে আছে? কেন করছি এসব দিনগত পাপক্ষয়? আসলে ইমেজের ভয় বোধহয়, লোকে কি বলবে? চাকরিটা দুম করে ছেড়ে দিলে। বাউণ্ডুলে হবার সাহস তো সবার হয়না। ভয় পেওনা, আমি সে ভোঁতা মনখারাপের গর্তে ফের পড়বো না। তোমায় বলা হয়নি না? আমার সব মন খারাপ আমি পাহাড়ের কুয়াশায় গাছের ফাঁকে মিলিয়ে দিয়েছি। আমায় টের পেতে দেয়নি কি করে তারা নিয়ে নিয়েছে কিন্তু নিয়ে নিয়েছে তাই সেই অকারণ বিষাদ আমায় ছুঁতে পারেনা আর জানো? চিঠি লেখাটাও একটা নেশা বুঝলে, আমার হাজারটা খেলার, নেশার একটা অংশ আর কি। তোমায় লিখি, তুমি পড়ে মুচকি হাসো, ভ্রু কোঁচকাও বা ঘাবড়ে যাও তিনটেই আমি দেখতে পাই। কিন্তু অত চাপ নিও না, আমায় তো চেনো তুমি, দাবী নিয়ে সামনে দাঁড়ানোর মতো চওড়া বুক যে আমার নেই। ঢাক বাজছে, নীল আকাশে মেঘ গুলো নানান আকার নিচ্ছে, ভগবান মানিনা কিন্তু উৎসব মানি, উৎসব আসছে। অনেক রাত্তিরে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েছ কখনো? দ্বাদশীর চাঁদে অল্প অল্প করে বইতে থাকা হাওয়া, চাঁদের ছায়া জলে পড়ে, তিরতির করে কাঁপতে থাকে সমুদ্রের জল, বাতাস না ওই চাঁদের আলো কার জন্য কাঁপছে কে বলতে পারে কিন্তু সবটুকু মিলিয়ে বড় ভালো লাগে। তেমনই ঠিক কি জন্য ভালো লাগে জানিনা কিন্তু মাঝে মাঝে সব কিছু বড় ভালো লাগে জানো, ওই যে এক গলা সস্তার মদ খেয়ে নাচতে নাচতে বিশ্বকর্মা পুজো উদযাপন করা লোক গুলো আর চড়া দামে ডান্স ফ্লোর কিনে সেখানে উদ্দাম নাচা তরুণ তরুণী, ভীড় রাস্তায় বিরক্তি নিয়ে বসে থাকা ছেলেটার কাঁধে মেয়েটা মাথা রাখার পর হাসি ফুটে ওঠা ছেলেটা, ফোকলা হাসি নিয়ে ওই বুড়িটা, শোক জরা সব কিছুকে হারিয়ে জীবনকে আলিঙ্গন করা, সব কিছুই বড় ভালো লাগে। জানো তোমাদের বাড়ির পাশের যে গাছটা আছে, যেখানে সেই পাখিটা এসে বসে মাঝে মাঝে আমার তার সাথেও কথা হয়, গাছেরা অনেক জানে কিন্তু বলে না সে তোমায় বলেছি আগেই । ঘ্যানঘেনে প্রেমিক টাইপ চিঠি মনে হচ্ছে নাকি? আসলে এই উৎসবের মরশুমে প্রতিদিনের নতুন করে বেঁচে থাকায় তোমায় খুঁজি জানো, হাত ধরতে চাইনা হাত ছেড়ে দিলে কানা গলিতে ঘুরপাক, বরফ পড়া তীব্র শীতের রাত বড় বেশি তাড়া করবে। আর আমি তো আমায় চিনি, বড় পিচ্ছিল এ হাত, তুমি পারবে না ধরে রাখতে, বরং ধরার ফলেই হুমড়ি খাবে আরো বেশী। মানুষ তো হাত ধরে ভরসা পেতে যে হাত খালি অনিশ্চয়তা দেবে সে হাত বাড়ানোও তো ঠিক না। তাই ঘাবড়ে যেও না। যা বলছিলাম, এই যে চারিদিকে এতো জীবন এ সবই বড় ভালো লাগে মাঝে মাঝে কিন্তু মাঝে মাঝে সব কিছু থেকে পালাতে ইচ্ছে করে, মাইকের ওই 'ম্যায় তো তন্দুরি মুরগি হুঁ ইয়ার, কাটকালে মুঝে অ্যালকোহোল সে' যেন বড় বেশী সবখানে, এতো কিছু কেন চাইছে লোকে, আমার দমবন্ধ লাগে। পালাতে না পেরে তোমার কাছে যাই, তোমার কাছ থেকে পালাতে পারলে একদিন সব ছেড়েও পালাতে পারবো জানি। কিন্তু পালাতেই কি চাই, ক জন যে এ ঘরে বসত করে কে জানে! এভাবেই পৌঁছে যাবো একদিন হয়তো কোথাও বা একটা নদীর ধারে কিংবা পাহাড়ে পাইন গাছের গোড়ায় সাড়ে তিনহাত জায়গা পেয়ে যাবো। ভালো থাকো, এ চিঠিটা শীতকালের ভোরে লেপ ছেড়ে যাওয়ার মতো খারাপ হলো, পরের বার একটা গরমের বিকেলের হাওয়ায় ভরা চিঠি দেবো ঠিক

93

8

জেমস

গলার কাঁটা

পুরোনো লেখা‚ আর একবার| ---- গলার কাঁটা- সত্যিকারের সেই কবে থেকে নিজে নিজেই মাছ খেতে শিখেছি- "যখন আমার রথীর মত বয়স ছিল" তখন থেকে| তার আগে কাকিমা কাঁটা বেছে আঙুলে টিপে টিপে নি:সন্দেহ হলেই তবে মুখে তুলে দিতেন| বিশেষ করে রাত্তিরে খাবার সময়‚ ঘুম ঘুম চোখ‚ হাট থেকে আনা রুই বা পোনা মাছ‚ আবার বায়না ধরলে কোন কোন দিন সকালের পান্তাভাতও খাইয়ে দিতেন| আহা‚ পান্তাভাত প্রচুর আমানি সহ (ভাত ভেজা জল)‚ garnished with KL (কাঁচা লঙ্কা) এবং served with আগের দিনের বাসি মাছের ঝোল! আমার থিয়োরি হল মাছ কাঁটা বেছে খাওয়াও একটা experience এর ব্যাপার; মাছের অ্যানাটমির বিশেষ করে অস্থি সজ্জার সম্যক জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়‚ কৈ মাছের পেটের দিকের সেই বাঁকা কাঁটা অথবা ফলুই মাছের কাঁটার বিন্যাসে যে পার্থক্য আছে‚ যেটা একমাত্র অভিজ্ঞতাতেই ট্যাকল করা সম্ভব; খয়রা মাছের সুক্ষ্ম কাঁটা যে চিবিয়ে খাওয়াই শ্রেয় সে কি বলার অপেক্ষা রাখে? আচ্ছা‚ আমিই বা কেন বেওকুফের মত কাজ করছি- যারা এই লেখা পড়ছেন তারা সকলেই বাঙালী অতএব মায়ের কাছে মাসীর গল্প হয়ে যাচ্ছে‚ তাই না? হুঁ‚ যাহা বলিতেছিলাম| ২০০৭ এর মাঝামাঝি এক সন্ধেবেলা ডিনার টেবিলে কতিপয় অতিথি‚ একটু আনকা কিছু পরিবেশনের তাগিদে পেঁয়াজ‚ সরষে দিয়ে সরল পুঁটির ঝাল রান্না হয়েছে| সরল পুঁটিগণ তার ছমাস আগে বাঙলাদেশের কোন নদী নালায় আত্মসমর্পন করেন এবং আমি মাস দুয়ের আগে মেলবোর্ন ভ্রমনের সময় সেখানকার দোকান থেকে সযত্নে বয়ে আনি- মহার্ঘ্য সওদা! এইখানে একটু কিন্তু আছে‚ আমাদের লঙ্কা ওদের কাছে মরিচ তেমনি আমাদের সরপুঁটি ও তাদের সরলপুঁটি যে এক species নয় তা কে জানতো! ভেবেছিলাম অপভ্রংশে ল হাওয়া! ( এই হাওয়া হয়ে যাওয়াটাকে ব্যাকরণে কি যেন একটা বলে‚ অভি...‚অভিকর্ষ‚ অভি....‚ অভিসার (?)| না:‚ ভুলেই মেরে দিয়েছি| খাওয়া দাওয়া চলছে‚ সঙ্গে স্যালাড হিসাবে যথারীতি দেশোদ্ধার‚ ইন্ডিয়াতে কি অবস্থা ইত্যাদি| ফিশ উইথ লেমন প্লাস সাদা ফেনিত দ্রাক্ষারস- আহা..........| খক‚ খক..... এই রে মনে হচ্ছে গলায় যেন খচ খচ করছে‚ কাঁটা ফুটলো কি! যথারীতি এক দলা ভাত‚ আস্ত কলা সব দাওয়াই প্রয়োগ করা হল; নাহ‚ তাতেও ফল হল না| কি অনাসৃষ্টি কান্ড‚ অতিথিদের সামনে‚ ভাগ্যিস বড় সড় পার্টি নয়‚ সামান্য দু চার জন মাত্র| দেবব্রত ওরফে দেবু‚ ডাক্তার হাসপাতালের ব্যাপারে এক্সপার্ট- 'চলো‚ হাসপাতালেই যাওয়া যাক"| শনিবার উইকএন্ডে তা ছাড়া আর ডাক্তারই বা কোথায় মিলবে| আবার হাসপাতাল‚ হে ভগবান! এবং এমার্জেন্সীতে| গেটকীপার নার্স দিদিমণি- যিনি সাব্যস্ত করেন ভর্তি করা হবে কিনা বা কি প্রায়োরিটি‚ সব শুনে বললেন অপেক্ষা করুন| স্বাভাবিক‚ আমার তো প্রাণসংশয় নয়‚ আরও কত কত রোগী আছেন‚ অপেক্ষায়| যাইহোক‚ ঘন্টাচারেক বাদে ভেতরে নিয়ে গেল‚ উইকএন্ডের এমার্জেন্সী ওয়ার্ড‚ নামকরা হাসপাতাল- ফাইভ স্টার হোটেলের মত ঝকঝকে (ইয়েস‚ পাবলিকই)‚ কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রচন্ড গাদাগাদি মনে হল‚ বেশ ব্যস্ততা| আসলে আমি তো সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তি‚ গলায় কেবল কাঁটা বিঁধে আছে ‚ এই যা! জ্ঞান টনটনে‚ আমার তো অমনি মনে হবেই! বেডে শুইয়ে যথারীতি সব রকম টেস্ট| লজ্জাও করছে‚ রাত বেরাতে জ্বালাতন করা| যে নার্সই আসছেন‚ জিজ্ঞেসবার্তা করতে আমি ডিসক্লেমার দিয়েই শুরু করছি‚ " sorry সিস্টার‚...তোমাদেরকে বিরক্ত করছি‚ তোমরা এত ব্যস্ত ইত্যাদি কাঁদুনি গাইছি|' তো তারা সান্ত্বনা দিচ্ছেন‚ আরে না না‚ এরকম কাঁটা ফোটা কেস মাঝে মাঝেই আসে‚ "তুমি একা নও"| সংক্ষেপে সারি‚ এক্সরে হলো‚ কোন সন্দেহ নেই‚ কাঁটা বেশ ভেতরেই জমিয়ে বসে আছেন; ENT সার্জন পরদিন সকালে আসবেন‚ অতএব আবার অপেক্ষা| তিনি এলেন‚ সকালে হাতে ছোট্ট গীটারের মতন বাক্স| ভীষণ সিরিয়াস ডাক্তারবাবু‚ প্রৌঢ়‚ মুখে হাসি নেই তবে মুর্তিমান আত্মপ্রত্যয়| একটা নাকছাবির হীরের সাইজের ক্যামেরা লাগানো আধা শক্ত দড়ি মতন কি একটা নাসিকার মধ্যে চালান করে দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রায় দিলেন‚ "Book him for OT"| তিনি যা বললেন‚ মর্মার্থ হল‚ এমনি হাঁ করিয়ে বের করতে পারবেন না| যা: গেল! আবার অপেক্ষা‚ এবার অপারেশন থিয়েটারের এর ante room এ| বুঝুন ঠেলা‚ এ যাত্রা জলজ্যান্ত সুস্থ আমি; অনেক সত্যিকারের অসুস্থ রোগীর সাথেই অপেক্ষা করছি| ভয় তো আছেই আর আছে লজ্জা‚ ছি ছি‚ একি কান্ড বাধিয়ে বসেছি| ও: এর মাঝে শনিবারের রাত গড়িয়ে রবিবারের দুপুর হয়ে এসেছে| দেবু‚ মাঝে মাঝেই আসছে যাচ্ছে‚ সে এখানকার ইউনিভার্সিটিতে এরোনটিক্য়াল ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ায়‚ কাছেই তার অফিস‚ মাঝে মাঝে গিয়ে পরীক্ষার খাতা দেখে আসছে| অপেক্ষা তো বেড়ে যাবেই‚ এক একটা এমার্জেন্সী কেস আসছে আমি আবার লাইনের পেছনে পড়ে যাচ্ছি| তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে‚ সরল পুঁটির কাঁটা হলে কি হবে‚ জেনারাল অ্যানেস্থেসিয়ার সকল জটিল পদ্ধতি মেনে চলতেই হবে যে! অবশেষে‚ স্বর্গদ্বারে প্রবেশপত্র মিললো‚ আবার সেখানকার নার্স দিদিদ্বয়কে কাঁদুনি গেয়ে শোনালাম| তারাও বললেন‚ এরকম কেস তারা মাঝে মাঝেই সামলান| আমায় ছেলে ভোলালেন কিনা কে জানে| অত:পর‚ একটি ট্যাবলেট এবং ছোট্ট ইঞ্জিশান! * * * অসম্ভব শান্ত‚ প্রায় নি:শব্দ একটা বিরাট লম্বা হলে ঘুম ভাঙ্গলো‚ সিস্টার রেডি ছিলেন‚ একটা ছোট্ট ক্লীয়ার প্ল্যাস্টিকের শিশিতে আমায় উপহার দিলেন সেই সরল পুঁটির বক্র কন্টক! ইতোমধ্যে জীবনের তেইশ ঘন্টা পার| ভাবছিলাম‚ জীবন মৃত্যুর মধ্যে মাত্র একচুল ফারাক! আচ্ছা পটকে গেলে? কি লজ্জা‚ কি লজ্জা| সরল পুঁটি খাইতে গিয়া পটল তুলিয়াছেন .... Moral: না জানিয়াসু অচেনা অজানা মৎস্যম মা ভক্ষ:|

67

5

Srija

আত্মরক্ষা

"আজ এই পর্যন্তই থাক‚ পরের দিন নেক্সট চ্যাপ্টার ধরবো" - - এই বলে আর.জি ম্যাডাম বেড়িয়ে গেলেন| উর্মি তাড়াতাড়ি ব্যাগে ডাইরী‚ পেন ঢুকিয়ে নিল| এখন এস.ডি র কাছে টিউশন পড়তে যেতে হবে| আজ উর্মি একাই কলেজে এসেছে| অন্যদিন রিয়া‚ সুস্মিতা‚ চৈতালি‚ পারমিতা‚দেবিকা‚ অঙ্কিতা সবাই একসাথে আসে| আজ ওরা কেউ আসেনি‚ তাই ভিড় ট্রেনে 'একা একা' সফর করতে হয়েছে উর্মিকে| মা জানলে আজ কলেজে আসতেই দিত ন| উচ্চমাধ্যমিকের পর যখন কলেজে ভর্ত্তির পর্ব এল বাড়ীর সবাই চেয়েছিল লোকাল কলেজেই ভর্ত্তি হোক‚ কিন্তু পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ার জন্যে উর্মি এই কলেজেই ভর্ত্তি হল| বাবা-মার একেবারেই মত ছিল না‚ মা-বাবাকে রাজী করাতে উর্মিকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে| দেখতে দেখতে দুবছর কেটে গেল‚ এটা ফাইনাল ইয়ার চলছে| আসলে উর্মি খুব শান্তশিষ্ট‚ ঠান্ডা প্রকৃতির‚ নামের সাথে একেবারেই মেলে না| সে তুলনায় উর্মির বোন লহরী একেবারে অন্যরকম‚ যেমন নাম‚ স্বভাবও সেইরকম| লহরী ক্লাস নাইনে পড়ে| এখন স্কুলে স্কুলে আত্মরক্ষার জন্যে ক্যারাটে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে‚ লহরী সেখানে ভালো নাম করেছে| উর্মিদের সময় এসব ছিল না‚ আর থাকলেও উর্মির দ্বারা ওসব হত না‚ কারো সাথে গলা তুলে কথা পর্যন্ত বলতে পারেনা‚ সে করবে মারামারি! আজ পড়তে যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না উর্মির| কিন্তু কলেজে ঢোকার মুখেই ম্যাডামের সামনে পরে যায়|-"এই আর সব কই?"-'আর কেউ আসেনি ম্যাম্'| "সবার হল কি আজ?! ঠিক আছে তুই চলে আসিস‚ বেশী দেরী করবি না‚ সাড়ে চারটের মধ্যে ঢুকবি|" একথা বলে ম্যাডাম চলে গেলেন| অগত্যা মুখ ব্যাজার করে উর্মি ক্লাসে গিয়ে ঢুকল| আজ লাস্ট ক্লাস হয়নি‚ এ.কে.বি আসেননি| তনুজা বলছিল ক্যান্টিনে গিয়ে অড্ডা মারবে| উর্মি গেল না| তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে যাবে এই ভেবে তিনটে নাগাদ কলেজ থেকে বেড়িয়ে পড়ল উর্মি| রাস্তা পেড়িয়ে বাস স্টপেজে এল| আজ সঙ্গে সঙ্গেই বাস পেয়ে গেল| বসার জায়গা অবশ্য ছিল না‚তাতে কি! পাঁচ মিনিটের তো জার্নি| আগে এই জার্নিটাও উর্মির সহ্য হোতো না‚ এখন অভ্যেস হয়ে গেছে| ম্যাডামের ফ্ল্যাটটা অড জায়গায়| বাস থেকে নেমে বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়| সবাই থাকলে ওরা হেঁটেই আসে‚ একসঙ্গে গল্প করতে করতে চলে আসে‚ দূর আর দূর থাকেনা| আজ উর্মি একা তাই বাসে উঠল| বাস থেকে নেমেই দেখল কিসের যেন ক্যাম্প হচ্ছে| কাছে যেতে বুঝতে পরল এইডস নিয়ে সচেতনতা শিবির| একটা মেয়ে উর্মিকে দেখে এগিয়ে এসে একটা কাগজ দিল| উর্মি কাগজটা নিয়ে দেখে এইডস প্রতিরোধের উপায় লেখা অছে| উর্মি সাইড খাপে রাখলো| তারপর পা চালিয়ে এগিয়ে গেলো| ম্যাডামের ফ্ল্যাটে গিয়ে ডোর বেল টিপলো উর্মি| ম্যডাম দরজা খুলেই অবাক! "এত তাড়াতাড়ি?" - - 'লাস্ট ক্লাস হয়নি|' "ওহ‚ সে ভালো করেছিস| আজ অনেকগুলো নোট লিখিয়ে দেবো‚ বাকীদের দিয়ে দিস|" ব্যস হয়ে গেল! এখন বসে বসে একগাদা নোট লিখতে হবে‚ দেরী করে এলেই ভালো হোতো| পড়া শেষ করে বেড়োতে আজ একটু দেরীই হয়ে গেল| এখন বাস ধরে সোজা ষ্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরবে| এদিকের রাস্তাটা খুব একটা ভালো না‚ বিশেষ করে সন্ধ্যের পর থেকে যতরকম অসামাজিক কাজকর্ম হয়| উর্মি তাড়াতাড়ি পা চালায়‚যতক্ষণ না বাসে উঠছে শান্তি নেই| হঠাৎ চারটে ছেলে যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়| চারদিক থেকে উর্মিকে ঘিরে ধরে| প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়ে ব্যাগটা হাত থেকে পড়ে যায়| ছেলেগুলো খুব বিশ্রী ইঙ্গিত করতে থাকে| উর্মি ভেবে পায়না কি করবে? চিৎকার করলে কেউ আসবে না‚ দুপাশে আগাছায় ভরা জমি| ছুটে পালাবে সে উপায় নেয়‚ চারজন ওকে ঘিরে রেখেছে| তাছাড়া এদের সঙ্গে দৌড়ে ও পারবে না| ছেলেগুলো উর্মির আরো কাছে এগিয়ে আসে| উর্মি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা‚ মাটিতে পরে যায়| ব্যাগটা তুলে নিয়ে বুকের কাছে আড়াল করে| সাইড খাপে হাত পরতেই একটা কাগজ উর্মির হাতে ঠেকে| বিদ্যুৎ গতিতে মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়| উর্মি উঠে দাঁড়ায়| ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে--"চল‚ কোথায় যেতে হবে‚ এখন তো আমার কাছে কেউ আসেনা| তোরা চাইছিস যখন অমি যাব| "ছেলেগুলো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে| তারপর একজন বলে--" ওরে এ যে অন্য জিনিস"| - - আরেকজন বলে"এই লাইনে কদিন আছিস?এখন কেউ আসে না কেন? " উর্মি বলে" সবই জেনে গেছে যে| "--" এই কি জেনে গেছে? "--" এই যে‚ আমি তো আজ ঐ ক্যাম্পে গেছিলাম‚ সব জেনে নিয়েছি‚ তোদের কোন ভয় নেই|"এই বলে ক্যাম্প থেকে পাওয়া সেই কাগজটা বাড়িয়ে দেয়| একটা ছেলে কাগজটা নিয়ে দেখে| - - "এর মানে!! তোর এই রোগ আছে নাকি?" - -" হ্যাঁ‚ তবে আমি ডাক্তার দেখিয়েছি| " ছেলেটা কাগজটা ছুড়ে ফেলে দেয়‚--" এই দুরে যা‚ কাছে আসবি না! এই চল চল| " অন্ধকারের মধ্যে ছেলেগুলো মিলিয়ে যায়| উর্মি প্রায় ছুটতে ছুটতে মেনরোডে আসে| সামনেই দেখে বাস দাঁড়িয়ে আছে| বাসে উঠে বসার জায়্গাও পেয়ে যায়| একটু ধাতস্ত হবার পর পুরো ঘটনাটা ভাবতে থাকে উর্মি| আচ্ছা ক্যারাটে জানলেই কি ওদের সঙ্গে একা লড়তে পারতো? আজ বুদ্ধির জোরেই নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে সে| রক্ষা করতে পেরেছে নিজের আব্রু‚ আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে সে|

76

10

ঋক আর কিছুনা

ঋকানন্দ মহারাজের দেখা-শোনা

গল্প আর প্রেম দুইই ইজ নট মাই কাপ অফ টি। আমি যা দেখি তাই লিখি টাইপ কথক। তা খাচ্ছিলো তাঁতী তাঁত বুনে কাল হলো তার এঁড়ে গরু কিনে, আমার সেই দশা, আজ পোকা নড়লো এই দুই কঠিন জিনিস ছুঁয়ে দেখার। দেওয়ালে দিচ্ছিলাম না, কারনন এ আমি পরে পড়ে মনে হয়েছিলো খুব খাজা লেখা। তো এক গ্রুপে ভয়ে ভয়ে টাঙানোর পর একজন এটা বলল " মেয়েদের শাড়ী হাজার রকম হয়, কোনটা চকচকে, কোনটা খসখসে, কোনটা নরম।তোর লেখাটা মলমলের শাড়ীর মত। বিয়ে বাড়ি পরবনা কিন্তু সারাবছরের সঙ্গী করব।" তাই দিলাম। **************************** জানি দেখা হবে পাতলা নাক, ছিপছিপে ভ্রু, অল্প ফোলা ঠোঁটে সুন্দরী সুলভ উদাসীনতা মাখিয়ে মেয়েটা একমনে কিছু একটা পড়ছিলো ফোনে। ঘাড় পাক করে চুলের গোছাকে, জানলা দিয়ে উড়ে আসা হাওয়ার থেকে সামলাচ্ছে একটা হাত। বুবাই ভীড়ে ধাক্কা খেতে খেতে এগোচ্ছিলো মেয়েটার সামনে গিয়ে ফ্রিজ শট দিয়ে দিলো। ও দাদা সামনে এগোনকে স্রেফ গড়িয়াহাটের পুজোর গুঁতোর মতো উড়িয়ে। কলেজে আজ একটা জরুরী প্র‍্যাক্টিক্যাল আছে ওর, নাহলে এই সময় অফিস ভীড় গুঁতিয়ে ও বাসে চড়ার বান্দাই না। হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো বুবাই, মেয়ে দেখলেই হাঁ করবে এমন না, ওর কলেজ কিছু রিয়াধের শহরে না যে মেয়ে দেখতে পায়না, কিন্তু এ মেয়েটা চোখ দুটো খুন করতে যাওয়া লোককেও রামপ্রসাদী গাইয়ে দিতে পারে। ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে টের পেলো কেউ তাকিয়ে আছে, সেই পাগলা চোখ তুলে আলগোছে দেখে ফের পড়ায় ডুব দিলো মেয়েটা। কলেজের স্টপ এলো, চলে গেলো, তিনিটে স্টপ পরে বুবাই নামলো তার পিছু পিছু। রাস্তা ঘাটে পিছু নেওয়া চোখের দৃষ্টিতে অভ্যস্ত মুনাই। ও জানে কোন চোখ শরীর চাটে কোন চোখ স্তুতি। বাসে জানলার ধারটা পেয়ে নিশ্চিন্ত ছিলো যাক আজ আর ব্যাগএর ঢাল দিয়ে কাউকে আটকাতে হবেনা। পাপনের একটা মেসেজ, হুঁ হাঁ করে কাটালো, এ সম্পর্কটা বোঝা হয়ে গেছে ও নিজেও জানে তবু আটকাতে পারছে কই। ওদিকে বাড়িতেও আর ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ধুত্তোর, বলে একটা গল্প পড়া শুরু করলো। ফেসবুকের অনেক কটা পেজে দিব্যি গল্প থাকে ভালো ভালো। তখনই টের পেলো ছেলেটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। একবার তাকিয়ে দেখলোও, ভারী ক্যাবলা তো বা খুবই নির্লজ্জ তাও তাকিয়ে আছে। এমন পাগল পাগল করে তাকিয়ে আছেই বা কেন। ওই একনজর তাকাতেই মুনাইএর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো যে, পাগলাটে ইচ্ছে হচ্ছে এক্ষুনি ওই ছেলেটার হাত ধরতে। এমন হয় নাকি! ধ্যার। আজকাল প্রেমেই ভরসা চলে যাচ্ছে আর প্রথম দর্শন প্রেমের মতো স্কুল লেভেলের প্রেম! আরে এ তো ফলো করতে আরম্ভ করেছে, নাকি এখানেই নামার ছিলো ছেলেটার? বাসস্ট্যান্ডের ভীড়, রিকশার হর্ন এড়িয়ে এগোয় মেয়েটা, বুবাই পিছন পিছন।।খুব রিস্কি খুব অবাস্তব ন্যাকা একটা কাজ করছে বুবাই নিজেও জানে কিন্তু কি করবে, ওর উপায় নেই, সেটাও টের পাচ্ছে। এবার একটা এস্পার ওস্পার করতেই হয় তো। ছেলেটা তো রীতিমত পিছু ধাওয়া করছে। প্যাঁ পোঁ হর্ন, চতুর্দিকে এতো লোকের মাঝে কিই বা আর হবে, মুনাই ঘুরে দাঁড়ালো। অবিশ্রান্ত লোকের মাঝে স্থির হওয়াও মুশকিল। ছেলেটা থতমত খেয়ে গেছে কিন্তু, কিন্তু, এ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ওর এরকম বুক কেঁপে উঠছে কেন বার বার। মুনাই, মুনাই এটা দুহাজার সতেরো সাল তুই চব্বিশ বছরের মেয়ে এরকম বোকা বোকা কাজ এখন আর মানায় না। কড়কে দে ছেলেটাকে। এইরে কেস করেছে, এবার নিশ্চয়ই মার খাওয়াবে মেয়েটা। সত্যিই তো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। এরকমভাবে অপরিচিত একজন মেয়েকে ফলো করাটা ঠিক হয়নি। বুবাই ঘাবড়ে গেলো একটু। কিন্তু ও তো ছিঁচকে চোর না, দাঁড়িয়েই রইলো। কি হবে অপমান করবে মারবে যাই হোক, হোকগে। আবার সেই হাইওয়েতে বাইক ছোটানোর মতো পাগলা চোখ নিয়ে তাকালো মেয়েটা। -আপনি কি কিছু বলবেন? তখন থেকে ফলো করছেন দেখছি। বৈশাখের গরমে অনেকদূর হেঁটে তালু শুকিয়ে কাঠ যখন সে সময়, কাঁসার গ্লাসে জল খেতে দিলে যেমন হয় তেমন অবস্থা এখন বুবাইএর। এমনিতে ও লাজুক স্বভাবের, মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব আছে গ্রুপে কিন্তু আলাদা করে কারোর সাথেই কথা বলা, ইয়ার্কি ঠাট্টার বাইরে, হয়ে ওঠেনি। অদ্ভুত সাহস এসে গেলো কেমন। অধিক শোকে পাথরের পরের স্টেজ আর কি, অধিক চাপে পদার্থে ট্রান্সফরমেশন। "না মানে, তোমার মানে আপনার চোখ দুটোয় বড্ড মায়া। হাসবেননা খিল্লি করবেন না প্লিজ, আমি, আমি এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারনে নিজেও ঘেঁটে গেছি। " - ও তাই? আচ্ছা জানলাম। এবার? মুনাই কঠিন নিরাসক্ত হয়ে বলতেই ছেলেটার মুখটা নিভে গেলো। কষ্ট হচ্ছে কেন মুনাই এর এ আবার কি। ধুত্তোর নিকুচি। ঘুরে হাঁটা দিলো সে। হঠাৎ সব হাওয়া থেমে গেলে কি হয়, এই ভীড় রাস্তা এমন নির্জন হয়ে যায় কি করে, পিচের রাস্তায় এমন পিছল হয়ে যায় কি করে। বুবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কতক্ষণ। পাশের ফলওলার তার ছোট মেয়েটাকে এনে রেখেছে, ক্ষুদেটার চোখে এখন সারা দুনিয়ার ভালোবাসা আর বিস্ময়। সারাদিন সে দেখে কত লোক আসে তাদের ছোট্ট ঠেলাগাড়ি দোকানে, তার বাবা তাকে একটা আম ধরিয়ে দিয়েছে, গুটগুট করে এগিয়ে আসে, 'রো মত, ইয়ে লো ম্যাঙ্গো', বুবাই হাসে ফ্যাকাশে। আকাশে মেঘ ভেসে আসছে। নাম জানা নেই, ঠিকানা বিহীন এ শহরে প্রেম খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আজকাল সোশ্যাল নেটওয়ার্কও পারেনা। তাছাড়া একে প্রেম বলা যায় নাকি, চেনা নেই জানা নেই স্রেফ চোখটা জানে। দিন কাটে, চাকরি, ভাত, দিনযাপন। মেয়েটা হারিয়েই যায় তার মায়া মায়া চোখ নিয়ে। ছেলেটাকে কি খুব বেশী কড়া করে বলা হয়ে গেছিলো? চায়নি তো কিছুই, জোরও ছিলো না, অমন তাচ্ছিল্য না করলেই হতো হয়ত। কিন্তু অমন হুট করে কিছু বলা যায়। কি প্রোপোজ করার ছিরি! ভারী রাগ হচ্ছে, আর কিছু বলল না কেন, অমন মুচরে যাওয়া মুখ নিয়ে রয়ে গেলো। আর একদিনও এলো না ও রাস্তায়। মুনাই কত দিন বাসে উঠে দেখেছে, হুহ নির্ঘাত ওই মেয়েদের সাথে ছ্যাবলামো করে বেড়ানো ছেলে। কিন্তু ওই এলোমেলো চুল, অভিমানী নিভে যাওয়া মুখটা তাড়া করে যে। আর আসবেইনা? তারপর? তারপর দিন আসে দিন যায়, বৃষ্টিতে কোলকাতা ভাসে, গরমে হাঁসফাস করে, ভীড়ের চাপে ধুঁকতে থাকে। নতুন রূপকথা আর জন্মায় না। দুহাজার সতেরোতে লাভ এট ফার্স্ট সাইট এর গল্প শুনে নিউটাউনের কমপ্লেক্স হাসিতে ফেটে পড়ে। জিও সিম পার্টনার বদলে দেয় মুহূর্তের ছোঁয়ায়। তবুও এ শহরেই গরমে কৃষ্ণচূড়া ফোটে, ব্যারিকেড আটকানো রাস্তায় পুলিশ গলি রাস্তা দেখিয়ে দেয় একজোড়া তরুণ তরুণীকে, বুড়ো মানুষটাকে রাস্তা পার করে দেয় ইংলিশ মিডিয়মে পড়া যুবতী, মাকে টিচার্স ডে তে নিজের পকেটমানি বাঁচিয়ে লিপ্সটিক কিনে দেয় বছর আষ্টেকের বিচ্ছু যে আগের রাতেই মা এর কথা না শুনে মার খেয়েছে। তাই এই শহরেই রূপকথা জন্ম নেয় আচম্বিতে। বইমেলায় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এর বই খুঁজছিলো বুবাই, ইতিহাসে ডুব দিয়েছে সে আজকাল। ধূলোর স্তুপ, মেঝেয় ডাঁই করে রাখা বইগুল ভারী অযত্নে, ভারী কাচের চশমা এঁটে উবু হয়ে বসে বই খুঁজছে, মুখ তুলে তাকায় হঠাৎ সবুজ কুর্তিতে সেই চোখ। এতোদিন পরে! চিনতে পারার প্রশ্নই নেই ও তরফে। এবারে আর সাহস হয়না এগিয়ে গিয়ে বলে। সেদিনের ছেলেমানুষির জন্য মাঝে মাঝে হাসিই পায় তার, কিন্তু ভুলতে পারলো কই! মুনাই এলোমেলো ঘুরছিলো বইমেলায়, পাপনের সাথে ব্রেকাপের পর একা একা বইমেলায় আসতে ইচ্ছে করতো না, জোর করে এনেছে বন্ধুরা এবার। তাও ওদের থেকে আলাদা হয়েই গেছে, লেখকদের সাথে সেল্ফি আর অটোগ্রাফ ওর ভালোলাগেনা। পুরোনো বই নেই এবার তেমন, শশাঙ্ক বইটা পাওয়া যায় নাকি বলে ঢুঁ মারতে ঢুকেছিলো! সেই ছেলেটানা? নাহ ভুল হবার না, দোমড়ানো আহত মুখটা গোপনে ভালোবাসতে শুরু করেছে কবে নিজেই জানে না। খালি মনে হয় একবার দেখা পেলে পাগলাটাকে আর ওরকম কষ্ট পেয়ে পালাতে দেবেনা। দেখা হবে আশা ছিলোনা বলেই হুট করে দেখতে পেয়ে খুব ধাক্কা খেয়েছে, ছেলেটাও দেখেছে। এগিয়ে যাবে? যদি সেদিনের অপমানের বদলা নেয়? যদি আবার সেই আগের মতোই সম্পর্ক ক্রমে বোঝা হয়ে যায়? কই ছেলেটা তো এগোচ্ছে না তবে কি ভুলে গেছে? মৃতের শহরে আলো জ্বলতে শুরু করেছে, অলৌকিক বাতাসটা বইমেলার ভ্যাপসা গরম মুছে দিচ্ছে তখন। দুজোড়া চোখ এগিয়ে গেছে কয়েকবর্ষ আলোকমাইল, পা জোড়া এগোবার অপেক্ষায় তখন।

102

13

জেমস

কিছু ইনভেনশন (A)

নন-A মার্কা| অনেকদিন ইনোভেশন‚ ইনভেনশান নিয়ে ফোড়ন কাটিনি| পাবলিকে খায় কম| ওদিকে আবার সুকুমার শিল্প‚ আর্ট‚ কালচার‚ সঙ্গীত‚ চিত্রকলা ও অতি অবশ্যই সাহিত্য‚ কবিতা সম্পর্কে আমি একেবারেই অজ্ঞ| আজ আবার কি করে বাই চাগিয়ে উঠলো| একটা ইনভেনশন চোখে পড়লো‚ একটার পর একটা আসে যায়‚ ডাক্তারদের রোগী দেখার মতো| পরক্ষণেই কিছু মনে থাকে না| ভাগ্যিস‚ থাকে না| আজকাল তো অনলাইনে জিনিষপত্র কেনা খুব চলছে‚ আর চিরাচরিত পার্শেল ডেলিভারী তো আছেই| মিয়াঁ বিবি চাকুরীতে‚ বাচ্চারাও স্কুল কলেজে| একটু বেসাইজ প্যাকেট বা পার্শেল হলেই চিত্তির| লেটার বক্সে ঢুকবে না; অগত্যা ক্যুরিয়ার বা পোষ্টম্যান হয় দরজার সামনে (রিসিট না নেবার থাকলে) অথবা একটা কার্ড রেখে হাওয়া| ছোট দশ কিলোমিটার দূরে পোষ্ট অফিসে| তো এই ইনভেনশনের বিষয় বস্তু হলো এমন একটা contrivance যাতে করে পিয়ন মালটা ঢুকিয়ে দিতে পারবে কিন্তু অন্য কেউ খুলতে পারবে না| আর সবচেয়ে ইমপর্ট্যান্ট হলো‚ এই receptacle লাগাতে দেওয়াল খুঁড়তেও হবে না‚ বিশেষ করে সুবিধা হবে যারা ভাড়া থাকে| উচ্চশিক্ষিত‚ স্বচ্ছল পরিবারের কথা স্বতন্ত্র‚ তাদের ঝি চাকর‚ হুঁকা বরকরদার থাকেই বাড়ীতে| দরজার তলা দিয়ে অকটা tab গলিয়ে দিয়ে মালকীন চলে গেলেও অসুবিধা নেই| আরও ডিটেলস আছে‚ অনেক লিখতে হবে| যেমন এমন চিপ ঢোকানো থাকবে যে ডেলিভারীর ছোঁড়া স্ক্যান করলে মালকীন খবর পাবে; এমনকি ট্রাকিং সিস্টেমের সাথেও কানেক্ট করা যাবে| মরুকগে‚ প্রাঞ্জল করে লিখতে গেলে অনেক অনেক লিখতে হবে| -- অত্যন্ত mundane বিষয় যথা প্রাত:কৃত্যের সুবিধার জন্য কত কত ইনভেনশন‚ একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঝলকিয়াঁ দিলাম নীচে‚ বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগের; অথবা আখ (ইক্ষু)‚ বীনস‚ আলু harvesting এর ইমপ্লিমেন্টস| মজার কথা হলো‚ কবি সাহিত্যিক‚ কুত্তা বিল্লী সকলেরই প্রয়োজন ডাইরেক্টলি অথবা ইনডাইরেক্টলি| জয়রামজীকী| ---------------------- FLUSH CLOSET 300.1 With toilet tissue holder 300.2 With bedpan rinser 300.3 With splash guard or water baffle 301 Urinals only 302 Flush actuation automatically responsive to condition 303 Periodic flush 304 By radiant energy responsive means 305 By electric condition responsive means 306 Ventilated, i.e., noxious fume removal 307 Folding type 308 Pedal actuated flush 309 With disinfectant means 310 Vertical type 311 Bowl type 312 Folding type ++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++ Harvesting of standing crops (A01D 44/00 takes precedence; threshing machines adapted for special crops, threshing devices for combines adapted for special crops A01F 11/00) [2006.01] A01D 45/02 of maize [2006.01] A01D 45/04 of rice [2006.01] A01D 45/06 of flax [2006.01] A01D 45/10 of sugar cane [2006.01] A01D 45/16 of tobacco [2006.01] A01D 45/22 of beans [2006.01] A01D 45/24 of peas [2006.01] A01D 45/26 of cabbage or lettuce [2006.01] A01D 45/28 of spinach [2006.01] A01D 45/30of grass-seeds or like seeds [2006.01] ================================================&gt;

582

10

Ranjan Roy

বাঙালবাড়ির কিস্যা (প্রথম ভাগ)

এলেম আমি কোথা থেকে( ৮ম পর্ব) --------------------------------------------------- নাকতলার সেকন্ড স্কীমের ফুটবল মাঠে সেদিন হেব্বি হল্লা, বাওয়াল হয়েছে বাপ-ছেলেতে, হেসে মরছে পাড়াপড়শি, ছেলেছোকরারা। বাসস্টপে নেমে হরিদাস পাল রঞ্জন সেদিন হনহনিয়ে হাঁটছে, আজকে শেষ রিহার্সাল। পরশু ওয়ান অ্যাক্ট কম্পিটিশনে প্লে নামাবে ওরা, আঠারো বছর বয়সের ছয়জন বন্ধু। জজের প্যানেলে আছেন থিয়েটারে আলোকসম্পাতের জগতে বিপ্লব ঘটানো তাপস সেন ,থাকেন পাশের পাড়া রামগড়ে। ব্যস্, এই কম্পিটিশন জিততে পারলেই কেল্লা ফতে। পাব্লিক? " বুঝবে তখন বুঝবে!' তখন নিশ্চয়ই সবাই ঝুলোঝুলি করবে -- আমাদের ওখানে একটা শো' করুন না! ওদের যে কেউ ডাকে না, বিনিপয়সায় করতে চাইলেও না। কোন ক্লাবের বার্ষিক অনুষ্ঠানে নাটক করার জন্যে তার সেক্রেটারিকে ধরে অনেক আমড়াগাছি করে শো করার অনুমতি পাওয়া গেল। তেড়ে একমাস রিহার্সাল দেয়া গেল। বাড়ির লোকজন, গার্লফ্রে¾ড সব্বাইকে বলা হয়ে গেছে-- অমুক তারিখ আমার শো'। তারপর ঠিক একদিন আগে জানা গেল ওদের নাম কেটে শো অন্য কোন সিনিয়র নাটকের দলকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু খেলার মাঠের পাশে আজকে কিসের বাওয়াল? ---- ওই হাফপ্যান্ট পরা ছোঁড়াটা কে র্যা? হাড়বজ্জাত ছেলে! ----- বেলেঘাটা থেইক্যা কয়মাস হইল আইছে, খালি মাজাকি করে! ----- আমাদের পাড়ার দারোগাবাবু, হেই যে বাদলার বাপ! উনার একটু কম্পলেক্স আছে। রোজই আফিস থেইক্যা আইস্যা লুঙি পইর্যা উনি পাড়ার ছেলেদের ইংরাজির পরীক্ষা নে'ন। যেমন,-- "" তিমির, তুমি তো ভাল ছাত্র, কও দেখি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়িতেছে, এর ইংরাজি কি অইব? হা:-হা:-হা:! পারলা না তো, জানতাম। আইজকাইল ইসকুলে কিস্যু শিখায় না। আচ্ছা, এইডা কও-- টিপ্ টিপ্ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে। এইডাও জান না? বেশ, এইবার একটা সহজ প্রশ্ন করি-?"" মস্মস্ করা নতুন জুতা''-- এর ইংরেজি কও? সব চুপ! কিন্তু হেই হারাম্জাদাটা কয় কি? ----- এরা কিস্যু জানে না, মেসোমশায়। আপনেই কন--" কচ্কচ্ করা নতুন বাল'' এর ইংরাজি কী? - হারামজাদা পোলা! আমি তর বাপের বয়সী, আমার লগে ইয়ার্কি! আইজই তর বাপেরে কমু, কি শিক্ষা দিছেন নিজের পোলারে? কিন্তু আজকে খেলার মাঠে দারোগাবাবুকে তো দেখছি না,ওই ছোঁড়াটা দৌড়ুচ্ছে , পেছনে ওর বাপ। ব্যাপারটা কি? ------- আর বলিস না। দারোগাবাবুর নালিশ শুনে বাপ তো ছেলেকে আচ্ছা করে কড়কে দিল। কিন্তু ছেলেটা এক্কেবারে যাকে বলে রেকটাম-রাইপ। আজ খেলার মাঠে বন্ধুদের তোল্লাই খেয়ে নিজের বাপকেই জিগ্যেস করেছে-- ' বাবা, আইজ ক্লাসে মাস্টারে জিগাইসে স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রয়ীর নাম। আমি দুইটা কইসি,--" লাল' আর" পাল '। আরেকটা নাম কি যেন? কী ""গঙ্গাধর তিলক''? ------ তারপর? ------- তারপর আর কি! বাপের তেলেভাজার দোকান, তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে এসেছে, স্কুলের মাঠে এবারে নতুন প্লেয়ার শ্যাম থাপার খেলা দেখবে বলে।। রেগে গিয়ে বলেছে-- বানচোইৎ! জাননা কী গঙ্গাধর? ''বাল""! তারপর কী হচ্চে দেখতেই পাচ্ছিস। না, রনজন কিছুই দেখছে না। ওর কানে বাজছে ওই দু-অক্ষরের শব্দটি। কালকেই ওর দলের একটি ছেলে বলেছে--- এইসব বালের নাটক করে কী হবে? পাড়াতেও এরকম কিছু টিপ্পনী কানে এসেছে। কী হবে? ও নিজেও জানেনা কী হবে। খালি জানে ওকে নাটক করতেই হবে। আজ নয়তো কাল। হবে, একদিন হবে। বনৎ বনৎ বনি জাই, বিগড়ি বনৎ বনি জাই। দরকার একটা জেদ, একটা পাগল করা জেদ। কিন্তু, ও কি পারবে? ওর কি আছে সেই জেদ? ওর বাবা সলিলকুমারের ছিল। কিন্তু ও যে এক্কেবারে অন্যরকম, ভীতুর ডিম, বাবার মত নয়। দাদুর আদরের নাড়ুগোপাল। কিন্তু ওর ভুতের ভয়, আরশোলাকে দেখে ভয়,বহুরূপীকে দেখে ভয়, সাঁতার কাটতে ভয় , ইনজেকশন নিতে ভয়-- এইসব দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে দাদু সতীশচন্দ্র বলে উঠতেন-"' এইডা সিংহের ঘরে শিয়াল জন্ম নিছে''। হ্যাঁ, ওর বাবা সলিলকুমার চারদিকের খটাশ, ভোঁদড়, সজারু, নেকড়ে আর হায়েনার পালের মধ্যে সিংহ ছিলেন। মরেছেন ও সিংহের মত, অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে। বলতেন-- আমি বিছানায় শুয়ে ভুগে ভুগে তোমাদের সেবা শুশ্রুষা নিয়ে কেঁদে ককিয়ে মরবো না। কাউকে বিরক্ত না করে তার আগেই চলে যাবো। যখন সময় হবে, মানে চিত্রগুপ্তের লেজারে আমার ব্যালান্স "জিরো' হবে, যমদূত নিতে আসবে, বলব-- একটু দাঁড়াও, জুতোর ফিতে বেঁধে পানামা সিগ্রেট ধরিয়ে একটা সুখটান দিয়ে নি। ব্যস্, এবার চল। ভগবান বোধহয় ওঁর মনের ইচ্ছে শুনেছিলেন। তাই ভিলাই স্টীল প্ল্যান্টের কন্স্ট্রাকশন এরিয়ায় মেদিনীপুরের কাঁথি থেকে লেবারের কাজ করতে আসা ছেলেটির ওপর যখন সীমেন্স কোম্পানীর বানানো মোটর কন্টোল সেন্টারের বিশাল এম সি সি মেশিন স্লিপ হয়ে গড়িয়ে পরে পিষে ফেলছিল তখন উনি দৌড়ে এসে দুইহাতে ওই মেশিনটিকে ক্রেট শুদ্ধু ঠেলে ধরে রাখেন। ছেলেটি নীচের থেকে গড়িয়ে সরে গিয়ে বেঁচে গেল। কিন্তু সলিলকুমার আর পেছনে সরে যাওয়ার জায়গা পেলেন না। ফলে ওই মেশিন ক্রমশ: ওনাকে পিষতে লাগল, মাটিতে পেড়ে ফেললো। যখন সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ওনাকে নিয়ে গেল, তখন উনি পরিচিত ডাক্তারকে বল্লেন--- পা টা তো গেছে, মাত্র এক ইঞ্চি আটকে থেকে ঝুলছে। বুটজুতো খুলে দে। ব্যথা লাগছে। কিন্তু এসব কিছু না। আসল হল পেটের ওপর মেশিন পড়ে লিভারে চোট লেগেছে , বড্ড ব্যথা। একটা পেন কিলার ইনজেকশন দাও। তারপর চোখ বুজলেন, আর খুললেন না। পুলিশ ওয়্যারলেসে খবর পৌঁছলো কোরবা জেলার আদিবাসী এলাকায় ছুরি গাঁয়ে। রাত আটটায় খবর পেয়ে হরিদাস পাল তো বৌকে নিয়ে রাত জেগে ভীড়ের ট্রেনে চেপে পড়িমরি করে ভিলাই পৌঁছলো পরের দিন সকালে, বাবার বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে মর্গে ঘুমিয়ে থাকা শরীর থেকে বরফ জল মুছে পোস্টমর্টেম করাতে নিয়ে গেল। পাশের কামরায় ডোম যখন হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে সলিলকুমারের মাথার খুলি খুলে দেখছিল তখন হরিদাস পালের মনে হচ্ছিল যেন গ্যারেজে ট্রাক মেরামত চলছে। কিন্তু যখন চিতায় শুইয়ে সারা শরীরে , বিশেষ করে পেটে-বুকে ডোমের সেলাইয়ের ওপর ঘি মাখাচ্ছিল তখন হাত যেন আর চলে না। পরিচিত পুরুতঠাকুর ধমকে উঠলেন--- কী হল? তাড়াতাড়ি করুন। এমন অন্যমনস্ক হলে চলে! কিন্তু হরিদাস পাল করবে কী? ও যে দেখতে পাচ্ছে যে এই দু 'দিনের বাসি মড়া সলিলকুমার নয়। সলিলকুমার তো এখন মেঘনা নদীতে নৌকো ভাসিয়েছেন। গলুইয়ের পাশে বসে বিড়িতে টান দিয়ে ইয়ারবন্ধুদের সঙ্গে গান ধরেছেন--- মনপাগলা রে! কই হতি কই লইয়া যাও! এরপর উনি ডুব দিয়ে পাট তুলবেন বেশকিছু। তারপর সেই পাট মহাজনের কাছে বেচে বন্ধুদের সঙ্গে রসগোল্লা কিনে খাবেন। বাবা মাছ আনতে আট আনা দিলে ময়মনসিংহের বাড়ির চৌকাঠে সেই পয়সা নামিয়ে রাখছেন সলিলকুমার। না, পুরো একটাকাই চাই। সেটা দিয়ে অন্তত: দুইসেরি বা আড়াইসেরি রুই মাছ কিনবেন। বাড়ির চাকর সেটা পেছন পেছন নাকের থেকে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি আনবে, আর মাছের লেজ সারা রাস্তা পথের ধুলো সাফ করতে করতে আসবে। এই না হলে বাঙাল! দেশভাগের পর পার্কসার্কাসের বাড়িতে সামনের ধাঙড় বাজারের কিছু গুন্ডা আক্রমণ করল, সময়মত গুরুসদয় দত্ত রোডের ছাউনি থেকে কিছু গোরা সৈন্য ও কড়েয়া থানার পুলিশ এসে পড়ায় কোন জানমালের ক্ষতি হয়্নি। সলিলের বড়দি সেই গুন্ডাদের চিনিয়ে দিলেন। ওরা হাজতে রইল। তারপর পাড়ার একজন রাজনৈতিক নেতা গুন্ডাদের মুক্তির জন্য জনগণের সইসাবুদ সংগ্রহ করতে বেরোলেন। ক্রুদ্ধ সলিল ওই পিটিশনে সাইন করতে অস্বীকার করলেন। বল্লেন-- অরা ঠিক জায়গাতেই আছে, অদের উপযুক্ত জায়গায়। কিন্তু ভিলাইয়ে দাঙ্গাবাঁধার উপক্রম হলে সারারাত অফিসের জীপ নিয়ে উত্তেজনা যাতে না ছড়ায় তার জন্যে টহলদারি করেছেন। নিজের মুসলমান কর্মচারিদের সঙ্গে একসাথে বসে খেয়েছেন। হালাল ও ঝটকা মাংস নিয়ে কেউ কিছু বললে বলতেন -- নেতাজী সুভাষ বোস বর্মায় থাকার সময় খাবার লাইনে ঝটকা-হালাল নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেপাইদের দুই আলাদা পংক্তিতে খেতে বসা দেখে অবাক হয়ে দুইবাটির আলাদা মাংস একটি বালতিতে ঢেলে নিয়ে রেগুলেশন সোর্ড দিয়ে ঘেঁটে দিয়ে বলেছিলেন, এবার কোনটা ঝটকা আর কোনটা হালাল পদ্ধতিতে রান্না মাংস কেউ চিনিয়ে দিক তো। আর যে ছেলেটাকে আজ বাঁচাতে গেলেন বছর আগে সেই ছেলেটারইতো মে মাসের গরমে হিটস্ট্রোক হয়ে প্রচন্ড জ্বর আর বমি হয়েছিল। সবাই ধরাধরি করে গাড়িতে করে বাড়ি এনে ওকে মাটিতে শোয়ালো। স্ত্রী স্মৃতিকণা ঘাড়ের নীচে কাগজ দিয়ে মাথায় জল ঢালছেন। কিন্তু ঠিকমত হচ্ছে না।সলিল ভ্রূ কুঁচকে দেখছিলেন। এবার ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বল্লেন-- এবার ভাল করে মাথা ধুইয়ে দাও। সেইদিন হরিদাস পালের চোখে ওর বাবার হাইট অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সবার কাছে বাবা-মা রা রোল মডেল। কিন্তু হরিদাস পাল রনজনের রোল মডেল ওর বাবা নয়। ও জানে ও কোনদিন ওর বাবার মত হতে পারবে না। সলিলকুমার অন্য ধাতুতে গড়া। দেখতে কিঞ্চিৎ কাঠখোট্টা ভদ্রলোকের ভীষণ ম্যানলি পেটানো চেহারা। যখন মহিলাদের সামনে একটু ঝুঁকে বাও করে কাউকে বলেন----" ভাল আছেন? ভাল থাকুন' , তখন সেই "" অদা'' দেখে ওরা দু'ভাই বাবার শিভালরাস নাইট ইমেজের প্রতি ফিদা হয়ে যায়, কিন্তু ভীষণ জেলাস হয়। হরিদাস পাল মেয়েদের সামনে আজীবন দড়কচা মেরেই রইল। আবার সলিলকুমারের চোখে রোলমডেল তাঁর মাতৃভক্ত বাবা সতীশচন্দ্র ন'ন। যে ভদ্রলোক কোলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লি যাবার সময় মায়ের কথায় চাকরি ছেড়ে ময়মনসিংহ ফিরে যায় সে ঠিক পুরুষকারে বিশ্বাসী সলিলকুমারের শ্রদ্ধার পাত্র হতে পারে না। -----বিপ্লব করবি? বিপ্লবের মানে বুঝস্ ? বিপ্লব করতে অইলে নিজের নিজের ডেথ ওয়ারেন্টে নিজে সাইন কইর্যা তবে পথে নামতে হয়। তর আছে সে সাহস! -------তোমরা না সেই আনন্দমঠের যুগে পড়ে আছ। তোমাদের মেটাফরগুলো না!---- ----- আরে, তোদের যারা খেপাইতাছে সব ভীতুর ডিম। চিন ও ভীতু। দ্যাখ, বুড়া হো চি-মিন হাঁটুডুবা ধানের ক্ষেতে দাঁড়াইয়া এত মেন্নত কইর্যা ভিয়েতনামরে স্বাধীন করলো, এখন তাদের জমিতে চিন আর আমেরিকার প্রক্সি ওয়ার হইতাছে। যা শত্রু পরে পরে! হিম্মত থাকলে সামনাসামনি লড়াই করুক না। নেফায় লাদাখে খুঁচাখুঁচি করা এক আর নাপামবৃষ্টির সামনে দেশের লোকজনেরে আগাইয়া দেওয়া আর এক। মাও সে তুং ও ভীতু। আর তরা প্যাট ব্যাক্কল। ---কী ভীতু-ভীতু শুরু করেছ, গোলপোস্ট ঠিক কর। --- শোন, ভীতু লোকেরাই লোভী, কুচক্রী, ষড়যন্ত্রকারী হয়। ভীতু লোকদের থেকে সতর্ক থাকবি, এরা তোষামুদে হয়। -----তুমি ভয় পাওনা? কোন ভয় নেই এমন কেউ আছে! --- ধ্যাৎ,কখনো ভয় পায় নাই এমুন হয় না। সবার চেয়ে বড় হইল মৃত্যুভয়। সবারই ভয়ের জায়গা আছে, রাজারও আছে, প্রজারও আছে। ছাগা যেমুন বাঘারে ডরায়, বাঘাও ছাগারে ডরায়। কিন্তু ভয় পাওয়া এক কথা আর ভীতু হওয়া এক কথা। --- মানে? -- মানে ভয় পাইলে তারে যুক্তি দিয়া বিচার কইর্যা সামনা করতে হইব। বুঝতে হইব বেশিডা কী আর হইব! মরতে হইব,এই ত? তার লেইগ্যা আইজ যদি চৌখ্যের সামনে মাইয়ামানুষের প্রতি অত্যাচার দেইখ্যা চুপ কইর্যা থাক,তা হইলে তুমি ভীতু। আরে, কাইল যদি সেই মাইয়া তুমার বইন হয়, বউ হয়, বেটি হয়! ----- অরা যদি সংখ্যায় বেশি হয়? ------- মেয়েদের বাঁচাইতে হইব, যেমনে পার, পলাইলে ওদের সঙ্গে নিয়া পলাইবা। না পারলে -- ---- হ, না পারলে কি করন? ------ না পারলে মরতে অইব, আর কোন বিকল্প নাই। (চলবে)

326

29

জল

গল্প

খোলি নম্বর ৪২০ ... একটু একটু করে লোকালয় জমে উঠছে| সার সার দাঁড়িয়ে থাকা একচালা বাড়িগুলো যেন প্রাণ পাচ্ছে| এদিকে -ওদিকে যেদিকেই ফাঁকা জায়গা‚ সেখানেই বাঁশ পুতে টাঙানো হয়েছে দড়ি‚ শুকোতে পড়েছে কাচা শাড়ি‚ প্যান্ট‚ জামা‚ বাচ্চাদের পোশাক| এখনও এখানকার জমি নরম| অনায়াসেই বাঁশগুলো পোঁতা যায় |খালের ধার ধরে একপ্রস্থ বাঁশের আধিপত্য| যে যার নিজের জায়গা দখল করে রাখছে| এখানে সবাই দখলদার থেকে আজ এক একটা বাড়ির মালিক| সেই কোন অতীতে রেল লাইনের ধার ঘেঁষে গড়ে তুলেছিল বসতি| বাঁশের চাঁচর‚ কঞ্চি‚ চাটাই ‚ টিন‚ অ্যাসবেস্টস দিয়ে গড়ে উঠেছিল এক একটা ঘর| বর্ডার পেরিয়ে এসে রেল লাইনের ধার ঘেষে গড়ে তুলেছিল অবৈধ আবাস| বার বার ভেঙ্গে-গুড়িয়ে দিতে এসেছে পুলিশ-প্রশাসন-মন্ত্রীরা| তারা আসলে এখানে বহিরাগত| অধিকার নেই এই জমিতে তাদের বসতি গড়ার| কিন্তু ভাঙব বললেই কি আর ভাঙ্গা যায়| এলাকার রাজনৈতিক নেতারা কি করতে আছে? সময় যত গড়িয়েছে ‚ ততই স্থায়ীভাবেই বসে গেছে বাপ-ঠাকুর্দারা| তারপর তো পরিণত হয়েছে ভোটব্যাঙ্কে| ভোটব্যাঙ্ক উপড়ে ফেলা অত সহজ| হাসে রাজা| রাজনীতি জিনিসটা বেজায় জটিল| ল্যাজে পা দিয়েছ কি মরেছ| তেঁনারা যদি বলেন জল উঁচু তো জল উঁচু আর যদি বলে জল নীচু তো জল নীচু| এই যে এখানে বেশ ভালো তো আছে তো তারা অথচ এই জায়গায় আসা নিয়ে কি কম জল ঘোলা হল| রাজা অবশ্য আগেই রাজি হয়ে গেছিল এখানে আসাতে| রাজনীতিটা আজকাল একটু আধতু বোঝে| বুঝেছিল ঐ রেললাইনের ধার ছেড়ে দিতেই হবে‚ ফালতু জলঘোলা করে লাভ কি? উন্নয়ন শুরু হয়েছে যখন তার জন্য এই স্বার্থত্যাগ তো করতেই হবে| স্বার্থ না হাতি‚ নরুণের বদলে নাক পাচ্ছে সেটাই বড় কথা| আর কেউ উচ্ছেদ করতে পারবে না| আর খারাপটাই বা কি ‚ সে তো সেই কবে থেকেই জানে যে যখন রাজা তখন তার কথা শুনেই চলা ভালো| আগে যে রাজা ছিল সেই পার্টির কথা শুনে চলেছে‚ তারা তখন স্বার্থ দেখত‚ তাদেরই ভোট দিয়েছে| ভোট দিয়ে টাকা পেয়েছে| এখনও পায় এই নতুন দলের কাছ থেকে| রাজনীতি মানে সে বোঝে নিজের স্বার্থ ব্যস আর কিছু না| আজকাল আদর্শের জন্য বাপ-ঠাকুর্দার পথ আঁকড়ে থাকা মানে পথে বসা| একবার তো বসেছে পুর্বপুরুষ‚ আবার বসতে চায় না| খোলি নম্বর ৪২০| হুম ওটাই ওর ঘরের নম্বর| খালের থেকে অনেকটা পিছনে| মশার উপদ্রব থাকলেও খুব একটা বেশি নয়| একটু দুরেই আছে একটা বড় জঞ্জালখানা| রাতদিন নোংরা পড়ছে‚ সারাদিন ঘড়ঘড় করে নোংরার গাড়ি ঢুকছে‚ পুড়ছে দাউ দাউ করে নোংরাগুলো| সেই গন্ধটা প্রথম প্রথম বড় উৎকট লাগত| এখন অবশ্য সয়ে গেছে| সয়ে যেতেই হয়| এই যে নেতারা এসে এত এত কথা বলল‚ 'মানবিক অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে| কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের ন্যুনতম প্রাথমিক প্রয়োজন খাদ্য‚ বস্ত্র‚ বাসস্থানের অধিকার| পুনর্বাসনের নামে এই উদ্বাস্তু মানুষগুলোকে নরকে ঠেলে দিচ্ছে বর্তমান সরকার| সরকারের এই চক্রান্ত বানচাল করতে সরকারের সাথে সহযোগিতার সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিন বন্ধুগণ|' রাজা শুনেছে‚ মিটিং-এ গেছে‚ ব্যস ঐ পর্যন্ত| জলে থেকে কুমীরের সাথে বিবাদ চলে না| তাই মাথায় নেয় নি| আর এই সময় এই বাসস্থানে চলে এসে কেমন মওকা মত একটা মুদির দোকানও দিয়ে দিয়েছে| লোক আজ না হোক কাল ঠিক এখানে চলে আসবেই| তখন তো আর লোক ঐ লাইনপাড়ে জিনিসপত্র আনতে যাবে না| কাছাকাছি পেলে‚ কে আর দুরে যায়| দশটার মধ্যে আটটা কাস্টমার সে পাবেই| শুধু ছিপ ফেলে অপেক্ষা করে গেছে| সবুরে মেওয়া ফলেওছে| এই যে এখন হুড়মুড় করে বেশ কিছু লোক এসে গেছে‚ তারা তো তার লক্ষ্মী| হাসে রাজা মনে মনে| নিজের বিচক্ষণতায় নিজেই মুগ্ধ হয়| এতদিন দখলদার ছিল এখন নিজের বাসস্থান| খাটা পায়খানা ছেড়ে পাকা পায়খানা‚ এক চিলতে রান্নাঘর| কম কি? ঐ লাইনপাড়ের থেকে অনেক ভালো আছে| রাজা অত্মসুখে ভর করে নিজের ঘরটাকে চোখ দিয়ে সোহাগ করে নেয়| খোলি নম্বর ৪২০|

1081

104

চঞ্চল

আশিয়ানা ঢুন্ডতা হ্যায়!!

(৯) অন্যবাড়ির বিয়ে তো অনেক দেখেছি‚ এবার নিজেদের বাড়িতে বিয়ে| সকাল থেকেই যে কত কি হচ্ছে বলার কথা নয়| সকাল সকাল আমি কুর্তা-পাজামা পরে তৈয়ারী হয়ে নিয়েছি | অন্যসময় হলে আমি কুর্তা-পাজামা পরতাম না‚ কিন্তু মা বলল‚ বিয়ের দিন সকালে ধুতি বা কুর্তা-পাজামা পরাই নিয়ম| জেঠু তো সকাল থেকে ধুতি পরে বিয়ে বাড়িতে রয়েছে| বাবা‚ কাকারা সবাই ধুতি-পাঞ্জাবী পড়েছে দেখে আমি আর আপত্তি করলাম না| মা প্রমিস করেছে যে‚ বিকেলে আমাকে পঠানি স্যুটটা নামিয়ে দেবে| আমি তো ভেবেছিলাম সকালেই ওটা মা নামিয়ে দেবে আলমারী থেকে| দিদির বিয়ের জন্য নতুন বানিয়েছি কিনা‚ ডার্ক গ্রিন কালারের| নাহ‚ এসব ভাবার সময় এখন নেই‚ তাড়াতাড়ি নিচে যেতে হবে‚ কিছু যেন মিস না হয়ে যায়| সবাই ভীষন ব্যস্ত হয়ে এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে-আসছে| জেঠুর বন্ধুরা চেয়ার পেতে বসে ভীষন গম্ভীর কিছু আলোচনা করছে আর ঘন ঘন চা খাচ্ছে| তাদের সাথে দেখলাম‚ মামারাও বসে আছে| বুঝলাম ওঁনাদের বিশেষ কিছু কাজ নেই‚ শুধু আমাদের দিকে নজর রাখা আর সময়ে সময়ে গুরুজনোচিত বকুনি দিয়ে আমাদের তটস্থ করে রাখা ছাড়া| ওটাই ওদের বিশেষ কাজের মধ্যে পড়ে| এই যেমন সকালে যখন আশীর্বাদ হচ্ছিল‚ তখন বাবলুদার নেতৃত্বে আমরা দুটো সন্দেশই সরিয়েছিলাম‚ তার জন্য বাবলুদা তো একচোট বকুনি খেল| বাবলুদা বকুনি খেয়েও একদম বিন্দাস ভাব‚ বলল‚ - ও কিছু ভাবিস না‚ বাবা বকুনি না দিলেই চিন্তার ব্যাপার| যখন বকছে‚ তখন ধরে নে সব নর্ম্যাল আছে| বোঝো‚ আমাকে এত বকুনি দিলে তো আমি কেঁদেই ফেলতাম| সবাই মিলে দল বেঁধে এবার ওপরে গেলাম| ওখানে এখন কচুরি আর ছোলার ডাল হচ্ছে| আমাদের তো সকালের খাওয়া হয়ে গেছে‚ তবে এগুলো কাদের জন্য হচ্ছে? রসৌইয়া বললে‚ - গায়ে হলুদের তত্ত্ব নিয়ে যারা আসছে জামাইরাজার বাড়ি থেকে‚ এগুলো তাদের জন্য| তা এবার রসৌইয়া মহারাজ আমাদের হাতে কিছু কচুরি না চাইতেই দিয়ে দিল| অবশ্য নিজের থেকেই নয়‚ বলল‚ -মজলে বাবুকা অর্ডার হ্যায়‚ তোমাদের দেবার জন্য| তাই দিলাম| ওহহ‚ বাবা না আমাদের মনের কথা ঠিক বুঝে নেয়| আমি তো সেটা সেই কবে থেকেই জানি‚ কিন্তু আজকের এই ঘটনায় ভাইরাও সব জেনে গেল দেখে বাবার জন্য আমার বেশ গর্ব হল| হঠাৎ কিছু একটা মনে আসল‚ আমি দুটো কচুরি পকেটে পুড়ে দৌড়লাম দিদির ঘরের দিকে| কাল রাতে কে যেন বলেছিল‚ দিদি আজ সারাদিন কিছু খেতে পারবে না| না‚ যাই কচুরি দুটো দিদিকে খাইয়ে দিয়ে আসি‚ বেচারী না জানি কতক্ষণ খায়নি| একি দিদির ঘরের দরজা তো ভিতর থেকে বন্ধ| ঠকঠক করতে ভিতর থেকে মা আর পিসির গলার আওয়াজ এল একসাথে‚ - কে ? - আমি‚ তোমরা দরজা বন্ধ করেছ কেন? - তোর আবার এখন এখানে কি চাই বাবা? বলতে বলতে পিসি দরজা খুলল| - তোমরা কি করছ এখানে? বলে দিদির দিকে তাকিয়ে দেখি দিদি মুখ নিচু করে রয়েছে আর গালদুটো ফোলা| - একি দিদি তুমি খাচ্ছ? আমি মায়ের হাতে প্লেট দেখেই বুঝলাম কি চলছে এখানে| - ওহহ আমি ভাবলাম তুমি বুঝি না খেয়ে রয়েছ‚ তাই তোমার জন্য দুটো কচুরি নিয়ে এসেছিলাম‚ বলে পকেট থেকে কচুরি দুটো বার করে দেখালাম| - দে আমাকে‚ আমি খাব| দিদির গলাটা হঠাৎ বুজে গেল কেন? - খাবে? এই নাও বলে আমি বাড়িয়ে দিতে গেলাম কচুরি কিন্তু দিদি বলল‚ - তুই খাইয়ে দে|... বিকেল হতে আর বেশি দেরি নেই| বর ও বরযাত্রী বিকেল সাতটায় আসবে| অনেকদুর‚ সেই তিমারপুর থেকে আসবে| পার্কে মস্ত বড় পন্ডাল লেগেছে‚ সেখানেই বরযাত্রীদের বসার জায়গা আর পাশে আর একটা পন্ডালে খাবার জায়গা| আমরা দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে সব তদারক করে বেরাচ্ছি| - হ্যাঁরে গোরা কত গেস্ট হবে বলত? বাবুয়াদার প্রশ্ন| - জানি না ঠিক‚ তবে কেউ যেন বলল হাজার বারোশ মত| -ওরে বাবা এত? বাবলুদা বলল| - হ্যাঁ তো‚ বাবা‚ জেঠু‚ ছোটকা‚ ছোড়দা সবার বন্ধুরাই তো আসবে‚ আর বরযাত্রীও তো আসবে অনেক না! শুনেছি বরযাত্রী প্রায় একশ কুড়ি জনের মত হবে|সব ব্যাপার বাবা‚ ছোটকা আর ছোড়দা সামলাচ্ছে| তিনজনেই চরকির মত ঘুরছে| যদিও ছোড়দা শুধু বাড়ির ভেতরের কাজগুলো সামলাচ্ছে| আর আছে বাবার বন্ধুরা‚ তারা অফিস ছুটি নিয়ে সেই সকাল থেকেই কাজ করে যাচ্ছে| এইসব দেখেশুনে বাবলুদাই ভালো বলেছে‚ - এটা বিয়েবাড়ি না দুর্গাপুজো বোঝা মুশকিল| ক্যাটারিংয়ের ওখানে গিয়ে দেখলাম ছোড়দা প্লেট গোনাচ্ছে| আমি ছোড়দার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম| - আয় আয় তোর তো আজকাল টিকিই দেখা যাচ্ছে না| ছোড়দা আমার গলা একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল| চোখ কিন্তু প্লেটের দিকে| - দেখছিস তো গেস্ট প্রায় দেড়হাজার আর প্লেট এনেছে মাত্র আটশো| -ভাই আপ সমঝো না‚ ম্যানেজার মনে হয় আমাদের কথা বুঝতে পারল|‚ - যেমন যেমন খাওয়া হবে‚ প্লেট ধুয়ে তো চলেই আসবে| কম তো পরনে কা সওয়াল হি নহি প্যেয়দা হোতা হ্যায় ভাইজী| - ওহো‚ তো হিসাব কি করে রাখব? ছোড়দার পাল্টা প্রশ্ন| - ভাইজী জগ্গু ভৈঁয়ার বেটি কি শাদি মতলব আমার বেটির শাদি| আমি কি বেইমানি করতে পারি? খুব দুঃখের সাথে ম্যানেজার বলল| -আরে ভাই করো যো মরজি| ছোড়দা ফাইনালি হাল ছেড়ে দিল| - দুর দুর এসব কাজ আমার পোষায় না| বাইরের এত কাজ পরে আছে‚ সব বেচারা মেজকাকেই সামলাতে হচ্ছে| আমাকে তো বাড়ি থেকে বেরোতেই দিচ্ছে না| - সেসব নিয়ে তুমি কিছু ভেবো না ছোড়দা‚ বাবার বন্ধুরা আছে ‚ সব হয়ে যাবে| - ওয়ে তু য়হা হ্যায়!! সবাইকে জিজ্ঞাসা করে করে এখানে তোকে পেলাম| পন্ডালের পিছনে তুই কি করছিস? - ওয়ে অবিনাশ তু য়ঁহা? তোকে তো নেমন্তন্ন করি নি| তুই এলি যে বড়? ছোড়দার ক্লাসের বন্ধু‚ তাই এইধরনের মজাক তো চলতেই থাকে| - চল‚ মজাক ছোড়‚ জরুরী কাজ আছে তোর সাথে‚ সাইডে আয়| বুঝলাম আমার সামনে বলবে না‚ তাই ওখান থেকে বেরিয়ে আমি দাদা-ভাইদের খুঁজতে গেলাম| দেখলাম ওরা এক জায়গায় গোল করে চেয়ার লাগিয়ে গল্প করছে| আর কি নিয়ে যেন সবাই মুখ টিপে হেসে চলেছে| আমি কাছে যেতেই ইশারা করে কথা বলতে বারণ করল আর পাশের দিকে দেখতে ইশারা করল| দেখলাম বড়মামা‚ আমাদের দুটো বাড়ি ছাড়িয়ে যে যোশি অংকল আছেন তার সাথে গল্প করছেন| যোশি অংকল খুব বিদ্বান মানুষ| উনি কম্পিউটার জানা লোক‚ এক কথায় বলতে গেলে জিনিয়স | ওঁনার ঐ কম্পিউটারের ওপর জ্ঞানের কারণে গতবছর প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন| আমি জানি কারণ সেই সময় আমাদের রেসিডেন্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ওঁনাকে সন্মান জানিয়েছিল| একটু মন দিয়ে ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম‚ বড়মামা যোশি অংকলকে কম্পিউটারের ব্যাপারে বোঝাচ্ছে| এবার বুঝলাম সবাই কেন মুখ টিপে চুপিচুপি হাসছে| আমি তো কখনও কম্পিউটারই দেখিনি‚ তবে আন্দাজ করতে পারি‚ ওটা বিশাল কিছু একটা জিনিস হবে| কিন্তু বড়মামা তো রেলওয়েতে কাজ করে‚ কম্পিউটার নিয়ে কি কিছু জানে? - বাবা ওমনিই‚ জানিস তো‚ এমন কিছু নেই যা জানেন না| সব ব্যাপারে জ্ঞান দেবে| বাবার এই জ্ঞান দেওয়া নিয়ে সবাই মজাক করে‚ কিন্তু বাবাকে কে বোঝাবে বল? বাবলুদা দুঃখ করে বলল| -সবজান্তা গামছাওয়ালা!! বাবলুদা আর খোকনদা দুজনেই একসাথে বলে ফেলে হাসতে লাগল| আমি কিছুই বুঝলাম না| এই গামছাওয়ালা আবার কে? ভাবছি জিজ্ঞেস করি‚ দেখি অবিনাশ ভৈয়া আর ছোড়দা এদিকেই আসছে| - এই তোরা মেজকাকে দেখেছিস? - না তো এখানে তো কোথাও দেখিনি| আমি বললাম| - দাদা মনে হয় বাইরে গেছে‚ একটু আগেই তো যেতে দেখলাম| জয়াদি বলল| - ওহ তাহলে তো ওয়েট করতে হবে| অবিনাশ তু অ্যায়সা কর‚ খানা খা লে পহলে| বলে ছোড়দা জোর করে অবিনাশ ভৈয়াকে নিয়ে চলল পন্ডালের পিছনে যেখান রান্না হচ্ছিল| - পরে এসে কিন্তু গিফটটা দিয়ে যাস| যেতে যেতেই ছোড়দা ভৈয়ার পিছনে লাগতে লাগল| ছোড়দারা এইভাবেই নিজেদের মধ্যে কথা বলে দেখেছি| ওরা পন্ডালের পিছনে যেতে না যেতেই বাবা আর একজন বাইকে করে ভিতরে চলে এল| আমি দৌঁড়ে গিয়ে বাবাকে বললাম যে‚ ছোড়দা তোমাকে খুঁজছে| - কোথায় ও?বাবা জিজ্ঞেস করল| - ঐ যেখানে রান্না হচ্ছে‚ ওখানেই আছে| বাবা বাইকটা লাগিয়ে ঐদিকেই গেল‚ আমিও বাবার পিছন পিছন গেলাম| কিন্তু ওদের একদম কাছে না গিয়ে একটু আগেই দাঁড়িয়ে পড়লাম| অবিনাশ ভৈয়া একটা প্লেটে খাবার নিয়ে খাচ্ছিল| বাবাকে দেখে নমস্তে করে একটা টেবলে প্লেটটা রেখে দিল| বাবা প্লেটটা তুলে ভৈয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে কথা বলতে লাগল| আমি ওখান থেকেই বুঝতে পারলাম যে কোন গম্ভীর বিষয়েই ওরা আলোচনা করছে| আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল‚ ওরা কি নিয়ে কথা বলছে‚ কিন্তু আমি আজকাল শিখে গেছি যে‚ অন্য কারও কথাবার্তা দাঁড়িয়ে শোনা উচিত নয়| তাই দুর থেকেই বোঝার চেষ্টা করলাম কি কথা হচ্ছে| কিন্তু নাহ‚ কিছুই বুঝতে পারলাম না কি কথা হচ্ছে| আমার বন্ধুরা সবাই নিশ্চয় এসে গেছে এতক্ষণে‚ তাই ওখানে বেকার দাঁড়ানোর কোন মানে হয় না| আর ভেতর থেকেও আওয়াজ এল‚ বর এসে যাবে একটু পরেই| আমরা বন্ধুরা যেখানে গল্প করছিলাম‚ সেখানে জয়াদি আর বাড়ির অন্য মেয়েরাও বসে গল্প করছিল| তারাও বর আসছে শুনে বাড়ির দিকে দৌড়ালো‚ কি সব যেন করতে হবে বলে| আমরা ছেলেরাই শুধু বসে রইলাম| বাবুয়াদা‚ বাবলুদারা ভালো হিন্দী জানে না‚ তাও আমার বন্ধুদের সাথে গল্প জমিয়ে দিল| আমি চুপ করে ওদের কথা শুনছিলাম| কিন্তু কোন কথাই ঠিক যেন কানে পুরোপুরি ঢুকছিল না| মনটা পড়ে আছে বাবা‚ ছোড়দা আর অবিনাশ ভৈয়ার দিকে| এত কিছু হচ্ছে আশেপাশে কিন্তু কেন জানিনা কিছুই ঠিক লাগছে না | যাই বরং একটু মায়ের কাছ থেকে হয়ে আসি| অনেকক্ষণ তো মাকে দেখিনি| আমি চুপচাপ পন্ডাল থেকে বেড়িয়ে বাড়ির দিকে চললাম| ওঃ বাবা এতক্ষণ তো খেয়ালই করিনি‚ বাড়িটা লাইটে সেজে কি সুন্দর লাগছে| কিছু কিছু লাইট তো নানারকম ডিজাইনও বানাচ্ছে| দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলাম| হঠাৎ হাতে টান পরতেই দেখি প্রিতি দাঁড়িয়ে আছে| - কোথায় ছিলি রে? আমি কখন থেকে তোকে খুঁজছি| আজ প্রিতিকে সত্যি খুব সুন্দর লাগছে| একটা সবুজ রঙের লহঙ্গা সাথে লাল রঙের দুপট্টা| আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম| - ওয়ে কেয়া দেখ রহা হ্যায় ? মেয়ে দেখিসনি নাকি কখনও তুই? প্রিতি হেসে জিজ্ঞেস করল| - না না‚ আমি নিজের বোকামীতেই লজ্জা পেলাম| - তু ভি তো বড়া হ্যান্ডসম লগ রহা হ্যায় পঠানি স্যুট মে| তুই পড়িস না কেন কখন এসব? আর দেখ তোরও গ্রিন আর আমারও গ্রিন‚ এক্দম ম্যাচিং না? - হ্যাঁ তো‚ আমি তো নোটিশই করিনি| আমরা দুজনে হেসে ফেললাম| - কোথায় যাচ্ছিলি তুই? - একটু মা-এর কছে যাচ্ছিলাম‚ দরকার ছিল| - অচ্ছা? চল‚ আমিও যাই তোর সাথে‚ য়হা বোর হো রহি থি ম্যেয়| - চল ফির‚ আমি বললাম| হঠাৎ দেখলাম বাবুয়াদা পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলল‚ - হাতটা ধর‚ হাতটা ধর পাগল!! - তোর দাদা কি বলতে বলতে গেল রে? প্রিতি ঠিক শুনে নিয়েছে| - কিছু না‚ কিছু না‚ চল যাই| হয়ে গেল এবার আমার| আজ রাতে সবাই ঠিক পিছনে লাগবে| বাড়ির ভিতরে ঢুকতে যাব‚ গেটের কাছে‚ পাড়ার মেয়ে অফসার সাথে দেখা হল| দুজনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগল| - তুই যা‚ অ্যান্টির সাথে কথা বলে আয়‚ আমি আর অফসা পন্ডালে বসছি ওকে!! তুই কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে আসিস| চল অফসা! বলে প্রিতিরা আবার পন্ডালের দিকেই চলে গেল| আমি বাড়ির ভিতরে মা'কে খুঁজতে লাগলাম| এত ভিড় বাড়ির ভিতর! উঠোনে যেখানে বিয়ে হবে‚ সেখানটাও বেশ সাজানো হয়েছে‚ অনেক চেয়ারও পাতা| কিন্তু ভিড়ের মধ্যে মাকে তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না| তবে কি মা উপরে হবে? একবার দেখি গিয়ে| যা ভেবেছি ঠিক তাই‚ মা ওপরেই আছে‚ তবে বাবার সাথে কি যেন কথা বলছে| - মা তোমায় খুঁজছি কখন থেকে| বলে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম| - সারাদিন তোমার কোনো থেকে দেখা নেই কেন? যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছ না? বলে মা ঠাস করে এক চড় মারল আমার গালে| - এ কি তুমি ওকে মারলে কেন? ও কি করেছে বলে আমাকে নিজের কাছে টেনে নিল বাবা| আমি তো অবাক| মা'তো কোনদিন আমাকে মারেনি| কি হল তবে আজ? আমি চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রাইলাম| কোনদিন আমি কেঁদেছি কিনা তা তো মনে পড়ে না‚ কিন্তু চোখের জল আটকাতে পারছি না| বাবা আমাকে জোরে নিজের বুকে চেপে ধরল| আড়চোখে দেখলাম‚ মায়ের চোখেও জল| - তুমি ওকে মারলে কেন? ও কি করেছে? তোমার রাগ ওর ওপরে বার করলে তুমি? বাবা সত্যি রেগে গেছে| - আমি জানি না‚ আমার মাথা কাজ করছে না| কি করব‚ কি করব না কিছু বুঝতে পারছি না| সরি বেটা‚ আই অ্যাম রিয়েলি সরি বেটা|বলে মা আমাকে বাবার কাছ থেকে নিজের কাছে টেনে নিল| মা কাঁদছিল| মা'কে কাঁদতে দেখে আমার আরও কান্না পেতে লাগল| আমি মাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরলাম| -এই জগু‚ জগু রে‚ ঘরে আছিস তুই? বলতে বলতে জেঠু ঘরে ঢুকল| - দাদা এসো‚ বলে বাবা জেঠুকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল| - তোরা এখানে কি করছিস? আমার গোরা বেটা‚ কুনু কাঁদছে কেন? তোরা বলবি আমাকে কি হয়েছে? জেঠু ভীষন উতলা হয়ে উঠল| - দাদা আপনি এখানে বসুন একটু বলে মা আমাকে ছেড়ে জেঠুকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল| - আরে বসলে চলবে কেন? এখনই তো বর-বরযাত্রী সব চলে আসবে| এখন আমাদের এখানে বসে থাকলে হবে? - কুনু তুমি বরং নীচে চলে যাও‚ দাদা ঠিকই বলেছে এইসময় আমাদের মধ্যে কেউ নীচে না থাকলে অতিথিরা কিছু মনে করতে পারে| দুরে বাজি পোড়ানোর যা আওয়াজ পাচ্ছি‚ তাতে মনে হচ্ছে আর আধঘন্টার মধ্যে ওরা পৌঁছে যাবে| আমি দাদার সাথে কথা বলে নীচে আসছি| ততক্ষণ তুমি একটু সামলে নাও| - ঠিক আছে তাই করি| বলে মা তাড়াতাড়ি করে চোখ মুছে নিল ‚ আঁচল দিয়ে আমারও চোখ মুছিয়ে দিয়ে কপালে‚ গালে আদর করে অনেক চুমু খেল| - সরি বেটা‚ আর হবে না| ঠিক আছে? বলে মা দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে গেল‚ যাবার আগে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেল| আমিও গিয়ে জেঠুর কোলে বসে পড়লাম| - কি কান্ড‚ বিয়েবাড়ি সবাই হৈ চৈ করছে আর এই বাচ্চা ছেলেটা ঘরে কাঁদছে‚ ব্যাপারটা কি‚ তোরা কি ওকে বকেছিস? - না‚ মা মেরেছে| আমি নিয়মমত নালিশ করেই দিলাম| - কি ? মেরেছে? কেন রে জগু? ও কি করল যে কুনু ওকে মারল? জেঠু উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল| - আহা কিছু না দাদা‚ তুমি বোসো| বলে বাবা‚ জেঠুকে ধরে বসিয়ে দিল| তারপর বাবা বলতে শুরু করল‚ - একটু আগে কুশুর বন্ধু অবিনাশ এসেছিল| ও বলল‚ আজ দুপুরে গ্রিনপার্ক মার্কেটের কাছে বেশ গন্ডগোল হয়েছে| এবার শুধু MNU নয়‚ ইউনিভার্সিটির ছেলে-মেয়েরাও তাতে যোগ দিয়েছিল| আসলে ঘটনাটা শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে, পুলিশ থানার লক আপে বেশ কিছু স্টুডেন্টকে আটকে রেখেছিল আট-দশদিন ধরে| প্রচুর মারধোরও করে ওদের| তাদের মধ্যে দুটো ছেলে মারের চোটে অজ্ঞান হয়ে যায়| তাদের হসপিটালে দুদিন আগে ভর্তি করা হয়‚ তাদের মধ্যেই একজন আজ মারা গেছে| তাতে স্টুডেন্টরা ক্ষেপে যায় আর থানায় হামলা করে| প্রায় ছয়-সাতশো জন মিলে ভাঙচুড় চালায়| কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ চলে নি| ঘন্টাখানেকের মধ্যে আরও পুলিশ চলে আসে| ওরা লাঠিচার্জ করে‚ টিয়ারগ্যাস ছোঁড়াও হয়| প্রচুর ছেলেমেয়েকে অ্যারেস্ট করে এবারেও বিভিন্ন থানায় আটকে রেখেছে|এই ঘটনায় নেতাজীর ছেলে বলেছে যে‚ 'স্টুডেন্টদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে‚ যাতে আর কোনদিন মাথা তুলতে না পারে| আর এই ব্যাপারে যদি জানা যায় যে টিচিং স্টাফরাও এই গন্ডগোলের সাথে জড়িত আছে‚ তাহলে তাদেরও রেহাই দেওয়া হবে না|' এই সুত্রে নেতাজীর ছেলে MNU আর দিল্লী ইউনিভার্সিটির ইউনিয়নের যারা অ্যাকটিভ মেম্বার তাদের একটা লিস্ট বানাতে বলেছে| আর সেটা যদি বানানো হয় দাদা‚ হয় বলছি কেন নেতাজীর ছেলে যখন বলেছে হবেই‚ তখন কি অবস্থা হবে তুমি তো আন্দাজ করতেই পারছ| এতক্ষণ বাবা কথা বলছিল বলে‚ জেঠু কোন কথা বলেনি| চুপ করে বসে শুনছিল| বাবা থামতে‚ জেঠু বলল‚ 'তা তুই কি ভেবেছিস?' - আপাতত যেটা মাথায় আসছে‚ তা হলে‚ কুনুর এখানে থাকা চলবে না| আমি ভাবছি ওকে আমার কাছেই নিয়ে যাব| কিন্তু গোরার কি হবে সেটাই চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে| - কিন্তু কুনু কেন যাবে? বাবার কথার মাঝেই জেঠু প্রশ্ন করল| - দাদা‚ ঐ মন্ত্রীজীর ছেলে কি জিনিস তা তো তুমি ভালো করেই জান| একবার যদি ঐ লিস্টটার থেকে বাছতে শুরু করে‚ তাহলে যে কুনুর নাম আসবে না‚ তার কি গ্যারান্টি কোথায়? - হুম| জেঠু চুপ করে গেল| আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না‚ মা থাকবে না এখানে? সেটা কি করে সম্ভব? - তা আমি বলছিলাম কি‚ কাল বিয়েটা মিটে গেলে একবার বিকেলের দিকে মিনার কাছে চল না? ও কি সাজেস্ট করে দেখ না| - হ্যাঁ দাদা‚ সেটাও ভেবেছি| মিনা ভৈয়ার সাথে একটা আলোচনা করে ওঁনার রায়ও নিয়ে নেব| তবে আমি আমার এক বন্ধুকে খবর পাঠিয়েছি‚ যত কাছ্কাছি ডেটের সম্ভব কুনুর ট্রেন টিকিট করিয়ে নিতে| সেরম হলে পরে ক্যানসেল করে দিলেই হবে| তুমি কি বল? - তুই ঠিকই করেছিস| উপায় যখন নেই তখন এটাই ভালো হবে| কিন্তু কুশুর কি করব? তুইই যা করার কর‚ আমি তো কিছুই বুঝছি না| আর আমার কোন কথাই তো ও শুনবে না| আমি হা করে একবার বাবার কথা শুনছি আর একবার জেঠুর কথা শুনছি| এতক্ষণ দুর থেকে ব্যান্ড বাজার আওয়াজ আসছিল‚ টেরই পাইনি কখন এক্দম বাড়ির নিচে চলে এসেছে| তার সাথে দুমদাম বাজি ফাটার আওয়াজ| জানালা দিয়ে ঝুঁকে দেখলাম তুমুল নাচ চলেছে ব্যান্ডের সাথে| - দাদা চলো‚ ওঠো‚ নীচে চলো| কাল সময় করে এর উপর কথা বলে নেব| এখন কাউকে কিছু বলার দরকার নেই| - হুম‚ তাই করি| চল‚ নীচে যাই| আয় বাবু‚ আমার হাতটা ধর তো| চল নীচে যাই‚ বর এসেছে না? তোর তো জামাইবাবু হবে| মনে হলো যেন জেঠুর কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে, তবুও বলে যাচ্ছে কথা | - হ্যাঁ তো‚ তবে দিদি বলেছে‚ দাদা বলে ডাকতে| - যাহ!! দাদা আবার কি? জামাইবাবু বলবি‚ শুনতে বেশ লাগে| - ঠিক আছে| আমরা কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নীচে আসতে লাগলাম| নীচে তখন হৈ-হুল্লোড়ে কারও কথাই শোনা যাচ্ছে না| ওফ কি আওয়াজ| বাজি‚ ব্যান্ড‚ হৈ-চৈ মিলিয়ে সে এক মস্ত কান্ড বটে!! বাবলুদারা তার মাঝখান থেকেই চেঁচিয়ে আমায় কি যেন বলল‚ কিছুই শুনতে পেলাম না| ওরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নাচ দেখছিল বরযাত্রীদের| তারমধ্যে একজন রাস্তায় শুয়ে যা নাগিন ডান্স করল না‚ যে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছিল| আমারও খুব মজা লাগছিল দেখতে| প্রিতি ভিড়ের মধ্যে আমার হাত ধরে কানে কানে বলল‚ - আঁখ পোঁছলে| এক্দম লাল হয়ে আছে তোর চোখ‚ জল দিয়ে ধুয়ে আয়| ....ক্রমশঃ|

1003

113

জেমস

আজকের আপডেট

আজকের আপডেট-৩৫ রাজু বন গয়া ট্রাভেলার! ছুটি যাকে হলিডে বলে তেমন করে নেয়া হয়নি| অ্যানুয়াল লীভ খরচ হয়েছে 'বাড়ী' যেতে| সে বিহার থেকে হোক‚ বম্বে থেকে‚ ব্যাঙ্গালোর থেকে‚ মেলবোর্ন যেখান থেকেই হোক| এখন অনুশোচনা হয়‚ কিন্তু! চললাম কুইন্সল্যান্ডে‚ গোল্ড কোষ্টে‚ ব্রিসবেন| অনেক লম্বা সফর‚ প্রায় ১২০০ কিমি| ড্রাইভ করেই অবশ্য| উড়ে গেলে কোথাও যাচ্ছি ‚ বোধই হয় না; আবার এদেশে রেল যোগাযোগ নেই বললেই চলে| যারা ট্রাক চালায়‚ গাড়ী বেচে তারা লবি করে হতে দেয়নি| ৭০০ কিমি মেলবোর্ন অবধি একটানা ‚ মাঝে দুবার আধঘন্টার বিরতি‚ যাবার অভ্যাস আছে| শেষদিকে মনে হয় রাস্তা আর ফুরোয় না বিশেষ করে ফেরবার সময়| গৃহিণী সাথ দেন গাড়ী চালিয়ে‚ তবে সে নামকা ওয়াস্তে‚ বরং ফোড়ন কাটতেই তিনি দড়; ট্রাককে যেতে দাও‚ কত স্পীডে যাচ্ছো এখানে ১১০‚ আমি চালাবো? ব্যস ঐ অবধি| সবকিছু মোটামুটি প্ল্যানড| কোন রাজকার্য্যে তো যাচ্ছি না‚ অতএব দুটো স্টপ| ক্যারাভান পার্কের ফিক্সড কেবিন ও অন্যটা সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট| কারণ কিচেন থাকতেই হবে‚ কে আর কোথায় খানা মিলবে তার জন্যে ঘুরে মরে| অবশ্য এইসব কেবিনে‚ ঘরে থালা ঘটি বাটি‚ চুলা‚ কাপ ডিশ ‚ মায় ঝাড়ু‚ ডিশওয়াশিং লিকুইড অবধি থাকে| শর্ত কেবল যেমনটি নিয়েছো ঠিক তেমন অবস্থায় কিচেন ফেরৎ দিতে হবে| প্রথম স্টপ পাঁচঘন্টা বাদে‚ নিউ ক্যাসেল| পরেরটা কফস হারবার| শেষেরটার বিশেষত্ব‚ সেখানকার টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে ৭০% পদবী সিং‚ গুরুদ্বারাও আছে| ইচ্ছে আছে সেখানে লঙ্গরে হাজিরা দেবার| কালকের ব্রেকের জন্য‚ খিচুড়ী ও ডিমের ডালনা উইথ লেফট ওভার মুলো‚ কুমড়ো‚ শাক‚ গাজর‚ ব্রকোলির ঘ্যাঁট| সব এক সাথে আলাদা আলাদা take away কন্টেনারে‚ মাঝপথে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য| -- মেয়ে এসেছিল পাক্ষিক ভিজিট দিতে| গাড়ী ভর্তি করে রান্না খাবার দাবার ভাগে ভাগে বাক্স করে নিয়ে যেতে| আরও কাজ আছে‚ বাবা গাড়ী ধুয়ে দেবে‚ তেল জল চেক করবে‚ কাচ মুছে দেবে‚ চাইকি গাড়ীর হাওয়া দিয়ে নিয়ে আসবে| অনেক কথা হচ্ছিল‚ আমি দু:খ করছিলাম‚ কি কি মেজর ভুল করেছি তা নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর| অবাক কান্ড‚ সে বলে কিনা সবাই যদি পারতো‚ তো ঠিক পথেই যেত‚ কিন্তু তা কি সম্ভব? আমার সন্তান আমাকেই সান্ত্বনা দিচ্ছে| কিন্তু মন্দ বলেনি সে| দেখি কালকে আবার আপডেট দেয়া যাবে|

1430

146

Dalia2017

বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রম ( ৩য় পর্ব) :::::::::::::::::::::::: আবার ধরলুম কাগজ কলম| গত ৬ মাসে যেন লেখার সাথে কোন সম্পর্ক ছিলনা‚ কেমন যেন হয়ে গেছিলুম| এটাও বোধহয় বুড়ো বয়সের একটা দোষ| কিন্তু পরে ভাবলুম‚ এভাবে তো কাটাতে পারবনা| তাই এই গভীর শোক কে ঠেলে দুরে ফেলে দেবার চেষ্টা কোরলুম| ফিরে এলুম আমার প্রিয় আড্ডাতে| সকলকে দেখে মনটা আনন্দে ভরে গেল| কতদিন পরে সকলকে দেখছি‚ শুনছি তাদের ডালিয়াদি ডাক| যাক‚ এবারে লিখব আর আলজাইমারের ওপরে| এই আলজাইমার একটা ভীষন মানসিক অসুখ| এটাকে পাগল হয়ে যাবার আগের পর্যায় ও অনেক সময় ডাক্তাররা বলে থাকেন|এ রোগ ও আমার নিজের চোখে দেখা| এই রোগে অনেক সময় মানুষের হিতহিত গ্যান থাকেনা| আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে একজন এই আলজাইমার মহিলা ছিলেন‚ দিব্যি আছেন আমাদের সাথে| হঠাৎ কান্না শুরু করলেন| কি হয়েছে? কোন উত্তর নেই| তারপরে তার স্বামীকে ফোন করা হোল‚ স্বামী এলেন| উনি এসে যা বললেন‚ চমকে যেতে হয়| ভদ্রলোক বল্লেন‚ "আমাদের একটি ৩ বছরের ছেলে মারা যায়| তারপর থেকে আমার স্ত্রীকে এই আলজাইমার রোগে ধরে| অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি‚ অনেক অসুধ খেয়েছে‚ এখনো খায়| কিন্তু কোন উপকার হয়না| এমনকি রাতে ঘুমের ঘোরে বাইরে বেরিয়ে যয়‚ ৩ বার পুলিশ গিয়ে ধরে নিয়ে এসেছে| আমার ও তো কাজ আছে‚ দিনরাত এইরকম একটা রুগীকে কি করে দেখি? তাই সপ্তাহে ৩ দিন এখানে পাঠাই‚ তাও জোর জবরদস্তি করে| বাড়িতে এটা ওটা ছুড়ে ছুড়ে ফেলে‚ ভান্গে| তারপরে হঠাৎ দেখি মাইকে আর আসেন| কি ব্যপার? না মাইকে কে আর বাড়িতে রাখা যায়নি‚ তাকে ""ডিকথার"" বলে একটা হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে| এই ডিকথার কি? এটাকে আলজাইমার রুগীদের হাসপাতাল ও বলা যেতে পারে| বিরাট একটা বড় বাড়ি আর খুব উচু পাচিল দিয়ে ঘেরা| ( চন্দ্রবিন্দুটা দিতে পারছিনা)| ভেতরে আলজাইমার রুগীদের খেলাধুলো‚ বাগানে বেড়ানো‚ সব ব্যবস্থা আছে| খাবার সময় খাবার দেয়| কিন্তু গেটের বাইরে বেরোতে পারবেনা| এইখানেই তাদের চিকিৎ্সা চলে| কেউ যদি ভাল হয়‚ তবে বাড়ি যেতে পারে‚ তবে খুব কম লোকই ভাল হয়|হল্যান্ডে এইরকম ডিকথার আছে কিছু| সব গুলো ই প্রায় ভর্তি| মাইকে যখন ভাল থাকত‚ কত কাজ করে দিত| খাবার টেবিল গোছানো ‚ খাবার পরে টেবিল থেকে বাসন গুছিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া‚ এইভাবে সাহায্য করত মাইকে স্বেচ্ছাসেবিকাদের| কিন্তু এই আলজাইমার রোগ চরমে উঠলে মেয়েটি একেবারে বদলে যেত| এইসব রোগের জন্যেই বৃদ্ধাশ্রমে আমাদের মাথার কাজ করায়| যেমন কুইজ‚ অন্গ| ৪+৩ কত হয়? ৩_২ কত হয়| খুব হাসির ব্যপার‚ তাইনা? তোমার আমার কাছে কিছুই নয়‚ কিন্তু এমন বৃদ্ধবৃদ্ধা আছেন‚ যাদের এই জিনিস ই বের করতে ২০ মিনিট সময় কেটে যায়| আবার পরের বারের জন্যে কিছু লিখব‚আজ থামি|

350

31

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

1042

88

stuti..

ছাইপাঁশ

দোয়াত কলম ---------------------- উপহার কেনা মহা ঝামেলা । প্রথমে ভাবতে হবে নিমন্ত্রণের উপলক্ষ কি ? তারপর যাকে উপহার দেব তার পছন্দ কি রকম । হাজার ঝামেলা । তাই নিমন্ত্রন এলে সোনালী মোরকে ভরে টাকা দিয়েই কাজ সারি । যে যার পছন্দ মতন জিনিষ কিনে নেবে । আগামীকাল এক উপনয়নে যেতে হবে । একসময় উপনয়নে পেন উপহার দেবার খুব চল ছিল । হঠাত ইচ্ছা হল পেন উপহার দেব ।আজকাল কিছু কিনতে গেলেই মলে যেতে হয় । গেলাম মলে ।মলে হাজার জিনিষের হাজার দোকান থাকে । কিন্তু বই বা পেনের দোকান একটি থাকে বা থাকে না ।অনেক খুঁজে বইর দোকান পাওয়া গেল। সে দোকানে পেন থাকলেও বেশীরভাগই বল পয়েন্ট এবং ইউজ এন্ড থ্রো । আর কিছু পেন আছে দাম লাখ টাকার কাছাকাছি । মনে হয় সেসব পেন দিয়ে MOU সই হয় । উপহার দেবার মত পেন পাওয়া ভার । অনেক কষ্টে পার্কার কোম্পানীর পেন ,মানিব্যাগ , পেন ড্রাইভ সহ এক সেট পাওয়া গেল । সেটাকেই বগলদাবা করে বাড়ী এলাম । আগে ভাল পেন কেনা এত কঠিন কাজ ছিল না । তখন অবশ্য পেন বলতাম না বলতাম কলম । আদিকালে লেখা হত পালক দিয়ে তারপরে এল খাগের কলম । কালিতে চুবিয়ে লিখতে হত । কলমের সাথে কালির এক অটূট বন্ধন । নতুন কলম কিনলেই সাথে এক দোয়াত সুলেখা কালি কেনা হত । কেউ কেউ শখ করে বলপয়েন্টে লিখত । কিন্তু পরীক্ষার খাতা ,ব্যাঙ্ক ,পোষ্টাপিসের কাজকর্ম বলপয়েন্টে চলত না । আর শুনতাম বলপয়েন্টে লিখলে নাকি হাতের লেখা খারাপ হয়ে যায় । সেসময় সুন্দর হাতের লেখার খুব কদর ছিল । ছোটবেলায় পড়াশুনার শেষে রোজ একপাতা করে হাতের লেখা করতাম &nbsp;। এখন কীবোর্ডের জোয়ারে হাতের লেখা কালি কলম সব ভেসে গেছে । ক্লাস ফাইভে প্রথম পেন দিয়ে লেখা শুরু করি ।সে কি উত্তেজনা ।জানুয়ারী মাসে নতুন বই খাতার সাথে পেন কেনা হল। প্লাসটিক বডি সাথে এক দোয়াত সুলেখা কালি ও ড্রফার &nbsp;।দিদিমা বললেন এই সুলেখা নাকি তাদের সাথে স্কুলে পড়েছে ।সেই শুনে কলম দিয়ে লেখার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গেল । পেনের মাঝখানটা খুলে ড্রফার দিয়ে কালি ভরা হল &nbsp;। সাদা কাগজে হাত চালাতেই । নীল কালিতে মোটা মোটা অক্ষর ফুটে উঠল । উফ সেকি অনাবিল আনন্দ উচ্ছাস । লেখা শুরু। কিন্তু কালির কলম মাঝে মাঝেই মহা বিড়ম্বনায় ফেলত আমাকে । অঙ্কের উত্তর না মিললেই পেনসিল চিঁবিয়ে আধখানে করে ফেলতাম &nbsp;। মাঝে মাঝে কলমের পেছনও চিঁবিয়ে ফেলতাম । ব্যস চিত্তির &nbsp;। স্কুল থেকে ফিরলাম হাতে মুখে জামায় কালির ছোপ । ঠাকুমা বলতেন - হাতে কালি মুখে কালি বাবা আমার লিখে এলি &nbsp;। মার বকুনি ।আবার নতুন পেন কিনতে দোকানে ছোটা । কারণ আমাদের একটাই কলম থাকত । একাধিক কলম রাখার বিলাসিতা ছিল না । বাবার হাতের লেখা খুব সুন্দর । লিখত ফাউন্টেন পেন দিয়ে । ফাউন্টেন পেনের বাঙ্গলা নাম ছিল ঝরনা কলম । সে পেনেটি বেশ সরু ।কালো বডি সোনালি ঢাকনি , ভিতরে ইনবিল্ট ড্রপার ছিল । বাবার কাছে আর একটি পেন ছিল একটু মোটা মত ।সেটা আলমারীতে বাক্স্বর মধ্যে সযত্নে শুয়ে থাকত । শুনতাম ওটা পার্কার পেন । বিশেষ কাজে ব্যবহার করা হত । আমাদের বাড়ির দলিল সই করার সময় ওই পেন দিয়ে লিখতে দেখেছি । খুব লোভ ছিল ঐ কলমের প্রতি । কিন্তু বাবার কলম হাত দেওয়া বারণ তবু সুযোগ পেলেই একটু হাত বুলিয়ে নিতাম পেনটায় । একদিন অফিসে বাবা পেনটা হারিয়ে ফেলল । বাবার কতটা মন খারাপ হয়ে ছিল জানিনা । কিন্তু আমি প্রচণ্ড মন খারাপের চোটে শয়নে স্বপনে সে কলমের ভুত দেখতে থাকলাম &nbsp;। প্রতি বছর ভাইফোঁটায় মামা মাকে ঝরনা কলম উপহার দিত । তাই ঝরনা কলমের স্টক মার কাছে ভালই ছিল । পুরানোগুলো দিয়ে মা রোজকার জমাখরচের খাতা লিখত । মা বলত বড় হলে ভাল ঝরনা কলম কিনে দেবে । স্বপ্ন দেখতাম ঝড়না কলমের ঝড়না বইছে আমার হাত দিয়ে । কিন্তু আমি বড় হতে হতে বলপয়েন্টের জোয়ারে ঝড়না কলম সমুদ্রে পাড়ি জমালো । এখন কালির কলমে হাত ও চলে না । এখন মনেহয় কবি সাহিত্যিকরা রাত জেগে কলম দিয়ে গল্প কবিতা লেখেন না ।কলমের জোড় কথাটা আসতে আস্তে উঠে যাচ্ছে । এখন চলছে কীবোর্ডের ঝড় ।

594

82

Ranjan Roy

বান্গল বাড়ির কিসসা--দ্বিতীয় খন্ড (কলিকত পর্ব)

বাঙালবাড়ির কিস্সা ( কলিকাতা পর্ব) -------------------------------------- (২) ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় --------------------------------- পার্কসার্কাসের ধাঙড় বাজারের সার্কাস হোটেল। সামনের ফুটপাথে একটা হাইড্রেন, তার থেকে মুখ খুলে হোসপাইপ লাগিয়ে কর্পোরেশনের লোক রোজ ভোরে রাস্তা ধুয়ে দেয়। সময়টা যে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি। তোড়ে যে জল বেরিয়ে আসে তা কিন্তু গঙ্গার ঘোলা জল, আর ফুটপাথে থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠলেই খোলা উনুন বসানো। সেখানে ঝকঝকে শিকে গেঁথে পোড়ানো হচ্ছে মশলা মাখা লালচে হলুদ রঙের মাংসের টুকরো। তৈরি হচ্ছে শিককাবাব। তার পাশেই দু'জন ময়দা মেখে লেচি বানিয়ে সেঁকছে রুমালি রুটি আর ভেজে তুলছে পরোটা। রাস্তার ওপারে ভাড়াবাড়ির লম্বাটে জাফরিকাটা এল-শেপের বারান্দার থেকে আমরা বাচ্চারা উঁকি মেরে দেখি কেমন কায়দা করে দুহাতের তালুতে লেচিগুলো থাপড়ে থাপড়ে আকার দেওয়া হচ্ছে আর শেষ মুহুর্তে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার বাজিগরের মত লুফে নেওয়া হচ্ছে। আমরা বড় হই শিককাবাবের সেঁকা-ঝলসানো-পোড়া মাংসের গন্ধ নাসায় নিয়ে, অভ্যস্ত হই । যদিও অজ্ঞাত কারণে ওখান থেকে লোভনীয় দেখতে শিককাবাব কিনে বাড়িতে আনার কথা কেউ বলে না। সেজকার বিয়ে হল খড়গপুরের ইন্দায়। সেখান থেকে নতুন কাকিমার বোন হিমানীমাসি এলেন ক'দিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলে। কিন্তু সারাক্ষণ নাকে আঁচল গোঁজা, বারান্দা পা রাখতেন নিতান্ত অনিচ্ছায়। --- কী হল মাসি, শরীর ভালো লাগছে না? -- হ্যাঁ রে, তেমন কিছু না। ওই বিচ্ছিরি গন্ধ, আমার মাথা ধরে যায়, গা গোলায়, বমি পায়। --- সে কী, ও তো মাংস সেঁকার গন্ধ। আমাদের তো অসুবিধে হয় না। তুমি মাংস খাও না? --- দুর বোকা, খাব না কেন? কিন্তু ওগুলো যে গরুর মাংস, বীফ! ছি! আমরা এই নতুন শব্দটি উচ্চারণ করতে জিভে আরাম পাই--বীফ! বীফ! কেমন জয়ন্তী মণিমেলার মাঠে ড্রিলের হুইসিলের আওয়াজের মতন শোনায়--বীফ! বীফ! বিপ! বিপ! পরে মা-কাকিমাদের জিগ্যেস করি। সামনের হোটেলে গরুর মাংস রান্না করে কেন? কেন আবার, ওটা যে মুসলমানের হোটেল। আমরা ওসব খাই না। কেন খাই না? উঃ, এটা হদ্দ বোকা। আমরা যে হিন্দু। আমাদের ধর্মে গরু খাওয়া বারণ। কে বারণ করেছে? পন্ডিতমশাই? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব পন্ডিতমশাই। এবার যা তো এখান থেকে! ছাদে গিয়ে খেল গে যা! ছাদে গিয়ে খেলতে থাকি নীচের তলার ইলির সঙ্গে। কী জানি কেন ইলিকে দেখলেই আমার ঠাকুমার গা জ্বলে যায়। --- যা, তর গুরুঠাকুর আইছে! তুই পুষ্যালোক, মাইয়ামাইনসের লগে খেলস ক্যারে? শ্যাষে তুই ও মাইগ্যা ( মেয়েলি?) হইবি, হেইডা বুঝস? আমি সরে যাই। একটাই বুঝি, আমি ক্লাস থ্রি তে পড়ি, ইলিও তাই, তবে আলাদা স্কুলে। হ্যাঁ, ও পরে ফ্রক আর ইজের, আমি গেঞ্জি আর প্যান্ট। কিন্তু ঠাকুমা যে হাত নেড়ে তেড়ে তেড়ে আসে-- পড়াশুনায় মন নাই, খালি ছাদে গিয়া ইলির লগে কিলিকিলি করস্! শ্যাক বাড়ির ছেরির লগে অত কিয়ের পীরিত? অনুপ্রাসের ধ্বনি ও অন্ত্যমিলের মজা আমার বালক মনের নান্দনিকবোধে সুড়সুড়ি দেয় বটে, কিন্তু কথার ঝাঁঝে পিত্তি জ্বলে যায়। --- হ্যাঁরে ইলি! তোরা মুসলমান? --- হ্যাঁ তো; আমার ভাল নাম মনিজা খাতুন। --- কী অদ্ভূত নাম! আর তোর ছোটবোন জুলি? ও কি মুসলমান? ইলি খিলখিল করে হাসে। ও আলাদা করে কিছু হবে নাকি? ওর ভাল নাম আফরোজা! ---- মনিজা, আফরোজা!-- এরকম শব্দ তো কখনও শুনিনি। তোর নামের মানে কি রে? --- আমিও জানি না। এগুলো উর্দূ নাম; মার থেকে জেনে তবে কালকে বলব। -- আমাদের বাড়ির বা চেনা কারও অমন নাম হয় না। --- কী করে হবে, তোরা যে হিন্দু? ---- আমরা কিসে আলাদা? -- উমম্ তোরা পূজো করিস কেষ্টঠাকুরের, নামাজ পড়িস না। আমরা আমরা পূজো করি না, আল্লার জন্যে নামাজ পড়ি। --- নামাজ কেমনি করে পড়ে রে? ও হাসতে থাকে। -- আরে দেখা না! ও হাসতে থাকে। --তুই কিস্যু জানিস না, জানলে দেখা। ও গম্ভীর হয় , তারপর পালাক্রমে দু'কানে হাত দিয়ে ,হাঁটু গেড়ে মাটিতে উবু হয়ে 'আল্লাহু আকবর' উচ্চারণ করে দেখাতে থাকে। তারপর দুজনেই হেসে ফেলি। আমি ভাবি নামাজ পড়ার রহস্য জেনে গেছি। এই ফ্ল্যাটবাড়িতে কোন বাচ্চা জানে না। তখন ইলি বলে যে আরেকটা ব্যাপার আছে। তোরা ছুন্নত করিস না। আমাদের ছেলেরা করে। ---- সেটা আবার কী? --- ছেলেরা নয় -দশ বছরের হলে বাড়িতে বড়রা কোন মোল্লাকে ডেকে আনে। তারপর বাচ্চাটাকে ন্যাংটো করে হাতে একটা ছুরি নিয়ে বলে-- উ দেখ লালচিড়িয়া ! উ দেখ লালচিড়িয়া ! --তারপর? --তারপর ঘ্যাঁচ করে নুনুর সামনেটা কেটে দেয়। --ওরে বাবা! ওর লাগে না? রক্ত বেরোয় না? --একটু লাগে, কেউ কেউ কাঁদে। তারপর ওষুধে দু-একদিনে ঠিক হয়ে যায়। -- কাউকে ন্যাংটো করে নুনু কেটে দেওয়া? অমন অসব্য কাজ কেন করে? --- আরে আমাদের ধর্মের নিয়ম যে! ছুন্নত করলে তবে মুসলমান হয়। --- নাঃ, আমি কক্ক্ষণো মুসলমান হব না। --- তোকে কে হতে সাধছে? ---- আচ্ছা, তুই তো মুসলমান, তোর ছুন্নত হয়েছে? --- ধ্যাৎ, ওসব খালি ছেলেদের হয়, আমাদের নুনু নেই তো? --তোদের কী রকম? দেখাবি? --এবার মার খাবি। বলছি তো অন্যরকম। অপ্রস্তুত হয়ে অন্য কথায় আসি। -- আচ্ছা, ইলি! তুই গোরুর মাংস খাস? --খেয়েছি; কখনও সখনও। --তোদের বাড়িতে রোজ রান্না হয় না? --না; আমাদের মাংস হয় মাসে একদিন। খাসির। গোস্ত রাঁধা হয় পরবের দিনে। --রোজ কী হয়? --- মাছ হয়, তোদের মতনই। আর তোকে বলি খেতে ভাল খাসি আর মুরগী। পরের দিন দুপুরে ছোট ভাইকে মন দিয়ে হিন্দু মুসলমানের তফাৎ বোঝাছি এমন সময় কড়া নড়ে উঠল। আমার আগে ভাই দৌড়ে গেল। সবুজরঙা দরজার উঁচুতে ছিটকিনি লাগানো, আঙুল উঁচু করেও নাগাল পাইনে। ভাই জানলায় উঠে হাত বাড়িয়ে দরজাটা খোলে তারপরই 'দাদা, শকুনিবুড়ো এসেছে রে" বলে বাড়ির ভেতরের দিকে ছুট লাগায়। অগত্যা আমি দরজা খুলে কড়া নাড়া আগন্তুককে দেখি। লম্বা শুকনো চেহারার এক হাড়-খটখট বুড়ো। তোবড়ানো গালে সাতদিনের না-কামানো দাড়ি। বাঁকানো নাক আর হলদেটে চোখে তীব্র চাউনি। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন--খোকা, তোমার দাদুকে খবর দাও। বল, আমি এখন তোমাদের বাড়ি খাব। --- দাদু তো বাড়ি নেই। --- ঠাকুমা আছেন তো? তাহলেই হবে, গিয়ে বল। ওঁর গলার হুকুমের সুরে পেছনে হটি। কী নাম বলব? --নাম বলার দরকার নেই। আমি খাব বললেই হবে, উনি বুঝবেন। দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখি ভাইয়ের মুখে খবর পৌঁছে গেছে। -- যাও, ওনাকে এনে বাইরের ঘরের চেয়ারে বসাও। তারপর ঠাকুমার নির্দেশমত মাথায় ঘোমটা দিয়ে মা এসে বাইরের ঘরে মাটিতে জল দিয়ে জায়গাটা মুছে আসন পেতে দেয়। তারপর থালায় করে ভাত আর বাটিতে করে ডাল, তরকারি আর দু'টুকরো মাছের সঙ্গে ঝোল এনে দেয়। ভদ্রলোক খেতে বসেন। ঠাকুমা পাখা হাতে করে নাড়তে থাকে। উনি সুন্দর করে ডাল দিয়ে ভাত মেখে তরকারি দিয়ে গুছিয়ে পাত পরিষ্কার করে খেয়ে নিয়ে বললেন--বৌমা, আরও ভাত লাগবে। মা তৈরিই ছিল। উনি মাছের ঝোল দিয়ে মেখে চেটেপুটে তৃপ্তি করে খেলে মা টমেটোর চাটনি এনে দিল। ঠাকুমা ওনাকে জল দিয়েছেন ইসলামপুরি কাঁসার গেলাসে। দেশভাগের সময় ওপার থেকে নিয়ে আসা। উনি বিদায় নিলে বলি--ঠাকুমা , শকুনিবুড়ো কে? কোথায় থাকেন? -- অ্যাই! খবরদার শকুনিবুড়ো কইবি না। উনি তোর দাদুর বয়সি। আমাদের ময়মনসিংহের আঠারবাড়িয়া গাঁয়ের পড়শি। এখানে ভাগ্নের কাছে থাকেন। ওনার আর কেউ নেই। -- ভাগ্নে কে? তুমি চেন? -- তুইও চিনিস, আমাদের পাড়ার বীরেন কম্পাউন্ডার। -- যিনি আমাদের বাড়িতে এসে হাসিমুখে গল্প বলে কলেরা টি এ বি সি ইঞ্জেক্শন, বসন্তের টিকা লাগিয়ে যান? --হ্যাঁ, তাইন বটে! --- উনি আমাদের বাড়ি খাইতে আসেন ক্যারে? বিনা নিমন্তনে? দুই-তিন মাস পরে পরে? --- ভাইগনায় ঠিকমত খাওন দেয় না, পেট ভরে না। বুড়া শুকাইয়া যাইত্যাছে, মরলে ওদের হাড় জুড়ায়। -- হেই লেইগ্যা? -- হ, নাতি। খিদা পাইলে মাইনষে কি না করে! প্যাটের জ্বালা বড় জ্বালা! ২) আজ সকাল থেকেই বাচ্চাগুলো ভয়ে ভয়ে রয়েছে। কেননা বাড়ির কর্তা সতীশচন্দ্রের মেজাজ সকাল থেকেই বেলা বারোটার রোদ্দূরের মত উত্তাপ ছড়াচ্ছে। তার অনেকটাই পড়েছে মেজ নাতির ওপর। কী জানি কেন উনি এই নাতিকে বিশেষ পছন্দ করেন না। আবার বড় নাতিকে মাথায় চড়িয়ে রেখেছেন। অনায়াসে বলেন নাতিদের মইধ্যে বড় শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আমার ছেলেদের মধ্যে খুকা শ্রেষ্ঠ। খুকা বা খোকা তাঁর তৃতীয় সন্তান। পোষা জন্তু ও বাচ্চারা তাদের ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে চিনে নেয় কে তাদের আশকারা দেবে আর কে দুরছাই করবে। বড়নাতি দাদুর সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোয়। আর মেজনাতি দাদুর থেকে দূরে দূরেই থাকে। কিন্তু আজ ওর কপাল খারাপ। ছাদে খেলতে খেলতে পেটে মোচড় দেওয়ায় দৌড়ে নেমে বারান্দা পেরিয়ে এক ধাক্কায় বাথরুমের ভেজানো দরজা খুলে পায়খানায় ঢুকতে যাবে এমন সময় এক ধমক। ভেতরে ওর দাদু বসে আছেন , দরজা ঠিক মত বন্ধ হয় নি। এদিকে বাইশ জন সদস্যের জন্যে একটিই বাথরুম পায়খানা। আগে বাথরুমে ঢুকলে তবে পায়খানায় যাওয়া যায়। তাই অধিকাংশ সময়েই কোন একজন সেখানে প্রবেশাধিকার পায়-- সে বড় বাইরেই হোক কি ছোট বাইরে। বাজপড়ার মত এক ধমকে ওর তলপেটের চাপ উর্দ্ধমুখী হয়ে যায়। ও একহাতে প্যান্ট তুলে নিয়ে এক দৌড়ে আবার ছাদে ফিরে যায়। অনেকক্ষণ হয়ে গেল। উনি কি এখনও বেরোন নি? আবার পেটের ভেতরে মেঘ ডাকতে শুরু করেছে যে! ও পা টিপে টিপে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় নেমেছে কি আবার সামনে দাদু। উনি সেজে গুজে কাঁধে একটি গরম চাদর নিয়ে বেরোচ্ছেন, আজ মামলার দিন পড়েছে, কোর্টে যাবেন। চোখে চোখ পড়তেই নাতি ভয়ে কেঁচো। উনি চোখ পাকিয়ে আহাম্মক অপোগন্ডটিকে এক নজর দেখলেন। বন্দুকের গুলির মত মুখ থেকে ছিটকে বেরোল-- বলদ! নাতি মাথা নীচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ওঁকে পাশ কাটিয়ে সোজা বাথরুমে। সুযোগসন্ধানী বড়নাতি ভাইয়ের হেনস্থা আন্দাজ করে ধীরে সুস্থে নীচে নেমে রান্নাঘরে গেল। ও বড়দের গল্প ও পরচর্চা হাঁ করে গেলে। সেখানে ঠাকুমা ও পিসিমার উত্তেজিত কথা বার্তা থেকে যা বুঝল তা হচ্ছে আজ সতীশচন্দ্রের মেজাজ বিগড়োনোর প্রত্যক্ষ কারণ পূর্ব পাকিস্তানে থেকে আসা একটি চিঠি। ময়মনসিংহ জেলার আঠারবাড়িয়া গ্রাম থেকে কোন এক লাউয়া মিঞা বা মোম আলি পনের টাকা ধার চেয়ে লিখেছে এক নাতিদীর্ঘ পত্র। ছালাম আলেকুম, বড়কর্তা, আশা করি খোদার দয়ায় আপনে মা ঠাউরাইন শংকর, নারু, খোকা, ও বাকি সব ছাওয়ালেরা খেইরতে আছেন। হিন্দুস্থানে গিয়া আপনারা ভাল থাকেন, আমি খোদার কাছে হেই দোয়া করি, মোনাজাত করি। আমরা এখানে ভাল নাই। যারা আপনের ধানীজমি আর বাড়ি কিনছে তারা অইন্য মুনিষ অইন্য মাইন্দার রাখছে। আমারে কেউ কামে লয় নাই। বড় ব্যাডার বিয়া দিছি, অপনাদের দয়ায় বড় মাইয়া জহিরন বিবিরও নিকা হইয়া গ্যাছে। কর্তা , কথা হইলে কিছু ধার কর্জ হইয়া গেছে। এইবার পাটের ফসল মাইর গ্যাছে। নিবেদন এই যে যদি আমার ঠিকানায় পনেরডি ট্যাহা পাঠাইয়া দেন তো খাইয়া বাঁচি। আমি এই ট্যাহা দশ মাসে শোধ দিয়াম। আপনে দ্যাখছেন আইজ অব্দি আপনাদের লাউয়া মিঞার মুখ দিয়া হাচা বই মিছা বাইরয় নাই। খোদা হাফিজ! আপনদের বান্দা মোম আলি উরফ লাউয়া। নিরক্ষর লাউয়া মিঞা নিশ্চয় এই চিঠি কাউকে ধরে লিখিয়েছে। এই চিঠি পড়ে সতীশচন্দ্রের মুখ ভার। স্ত্রী সরযুবালা সব শুনে বললেন-- দ্যান পাঠাইয়া পনেরডা ট্যাহা! পারলে শোধ দিব, না পারলে নাই। কত ট্যাহা তো আনালে যায়। স্ত্রীর এই ওকালতিতে সতীশচন্দ্র রেগে আগুন। --এইডা কী কইলা? আমাদের নিজেদেরই একহনও মাথা গুঁজবার ঠাঁই জুটে নাই,সাহার বাড়িতে ভাড়া আছি। গুণা গনতি ট্যাহা। রোজ বাজার থেইক্যা ফিরা এক এক পয়সা তবিল মিলাইয়া তবে সকালের জলখাবার খাই। নাঃ শ্যাকের লাথথি খাইয়া হেই দেশ থেইক্যা এই পারে আইছি এখ্ন আর লাউয়ার সঙ্গে কুন সম্বন্ধ নাই। মেঘনা নদী পার হইয়া সবকিছু চুইক্যা বুইক্যা গ্যাছে। সরযূবালা ,মুখ ভার করে দুপুরে খেলেন না। বড়মেয়ে বকুল আর বড় বৌ স্মৃতিকণাকে বললেন-- কথাডা শুনলি? লাউয়া আর অর ভাই বুইধ্যা আমাদের ছেলেপিলেদের কোলেকাঁখে কইর্যা কানমলা দিয়া বড় করছে--এখন কুন সম্বন্ধ নাই কইলে হইব? ৩) - ' দ' য়ের হইল মাথায় ব্যথা। দাদু শ্লেটে চক পেনসিল দিয়ে একটা বড় করে 'দ' আঁকলেন। --চন্দ্র আইলেন দেখতে। এবার দ'য়ের পাশে একটা চন্দ্রবিন্দু আঁকা হল। -- তাইন দিলেন বাইশ টাকা। দাদু দয়ের পেটের নীচে বিচ্ছিরি করে ২২ লিখলেন। --- এইবার মাথাব্যথা পলাইয়া গেল। একটানে উনি দয়ের মাথাও লেজ মিলিয়ে দিলেন। --দ্যাখ দাদুভাই, কেমুন পাখি হইছে! দাদুভাই শোয়া থেকে উঠে বসে দাদুর হাতের শ্লেটে উঁকি মারে। হ্যাঁ, একটা বাচ্চাদের আঁকা পাখির মত দেখা যাচ্ছে বটে! দ' হল পাখির ঠোঁট আর পেট, ২২ হল জোড়া পা আর চন্দ্রবিন্দু পাখির চোখ । জ্বর এখনো সারেনি। একটু আগে ওর মা এসে মাথা ধুইয়ে দিয়েছেন। বালিশের নীচে একটা বড়সড় গামছা ঘাড়ের নীচে গোঁজা যাতে বালিশ না ভিজে যায় । আর তার নীচে একটা লালরঙা রাবার ক্লথ, কিন্তু বাঙালবাড়িতে বলা হয় অয়েল- ক্লথ; কেন? কে জানে। সেই অয়েলক্লথ ওর বালিশ থেকে নেমে গেছে একটি লোহার বালতির ভেতর। পাশে একটা চেয়ারে বসে ওর মা ঘটি দিয়ে বালতি থেকে জল তুলে ঝিরঝির করে ওর মাথায় ঢালছেন আর মাথায় হাত বুলিয়ে জলধারাকে সঠিক দিশায় চালনা করছেন। কপাল ও মাথা ভিজিয়ে সেই জল অয়েলক্লথ বেয়ে বালতিতে ফিরে যাচ্ছে। দুই চোখ আরামে বুজে আসে। বারান্দায় রেলিং এ বসে কাক ডাকছে। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের টানা বারান্দায় কেউ ধাঁই ধপাস করে কাপড় কাচছে আর ওদের লোক্যাল সেট রেডিওতে বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার বলে একজন মহিলা ভারী গলায় খেয়াল গাইছেন। এই মাথা ধুইয়ে দেওয়া যেন বন্ধ না হয়, অনন্তকাল ধরে চলে। ক্লাস টু'র দাদুভাই জানে না অনন্তকাল মানে কতকাল। দাদুর মুখে পুরাণের গল্প শোনার সময় অনন্তকাল শব্দটা অনেকবার শুনে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। এটুকু বোধ হয়েছে যে এটার মানে অন্ততঃ কয়েকমাস বা তারও বেশি হবে। কিন্তু কোন ভাল জিনিসই অনন্তকাল চলে না। তাই মাথামুছিয়ে দিয়ে মা নিয়ে এসেছেন একবাটি বার্লি, লেবু দেওয়া। এঃ কিছুতেই খাবে না , ওর বমি পায়। আর ও জানে যে বার্লির বাটি খালি হলেই পাশের কালো টেবিলে রাখা একটা কাঁচের শিশি থেকে একদাগ মিক্শ্চার ছোট কাঁচের গ্লাসে করে খেতে ওকে বাধ্য করা হবে। অতদিন ধরে মা ওর মাথায় জল ঢালতেই থাকবে? দূর সে আবার হয় নাকি? বাড়ির একমাত্র বৌ ওর মা, ভোর থেকে হেঁসেল সামলায়। রাত্তির এগারটায় ছুটি। তো কী হয়েছে? মা না হোক, ঠাকুমা আছে, আছে পিসিমণি। আর বড়পিসিমা। এছাড়া ছুটির দিনে মেজকাকাও তো জল ঢালতে পারেন। এরা সবাই হরিদাসকে ভাল বাসেন। ও যে হিন্দু সংযুক্ত পরিবারের কর্তার বড়ছেলের বড়ছেলের বড়ছেলে। দাদু হুকুম করলেই সবাই মেনে নেবে। ও যে দাদুর আদরে বাঁদর হচ্ছে সেটা ওর কাকারা কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন। তাতে ওর বয়েই গেছে। ও বায়না ধরে দাদুকে ডাক, উনি বললে তবে খাব। দাদু দৌড়ে এসেছেন। ওর কপালে হাত দিয়ে জ্বরের আন্দাজ নিয়ে ওর বিছানায় বসে শ্লেটে পাখি আঁকতে শেখাচ্ছেন। --এই বার পথ্য খাইয়া লও সোনাভাই। এক চুমুকে বাটি খালি কর। ওষুধ্হ খাও, তারপরে চোখ বুইজ্যা শুইয়া থাক। তাড়াতড়ি সাইর্যা উঠবা। আচ্ছা, ঘটিদের বাড়িতে বড়দা-মেজদা-সেজদা-ছোড়দার মাঝখানে ফুলদা, নতুনদা, --কী সুন্দর সব নাম। কিন্তু বাঙালদের সেজদা ও ছোড়দার মাঝে অবধারিত ভাবে একজন ধনদা, ধনদি, সোনাদা, সোনাদি, রাঙাদা-রাঙাদির পর একখানা কুলিদা এসে জুটবে। ধনদার কোন ধন নেই; কুলিদা কোন স্টেশনে মাথায় করে মাল বইতে যায় না। ওর কাকারা ওকে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতে শিখিয়েছেন--'সেদিন দেখিনু রেলে, কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।' হাওড়া স্টেশনে লাল জামা গায়ে হাতে বাঁধা পেতলের চাকতি মাথায় গামছ পাকানো পাগড়ি কুলিদের ও দেখেছে। ওদের মনে হয়েছে অন্যগ্রহের জীব। ওর বড় হয়ে কুলি হতে একটুও ইচ্ছে করে না। তবে কেন দাদু ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে নীচুগলায় বলছেন-- আমার সোনাভাই! আমার কুলিভাই! তাড়াতাড়ি সাইর উঠ, সুস্থ হও। অনেক কাজ করনের আছে। দাদুর গলায় ময়মনসিংহের ঘুমপাড়ানো গানের সুরঃ 'আয় ঘুম, যায় ঘুম, ঘুমাল গাছের পাতা, হেঁসেলঘরে যায় ঘুম মাগুরের মাথা। আগদুয়ারে যায় ঘুম কালো কুকুর, বিছানাতে যায় ঘুম বাপের ঠাকুর।' গানের একঘেয়ে সুরের দোলানিতে ও কখন ঘুমিয়ে পড়ে। (ক্রমশ:)

178

13

জেমস

চুপ চাপ- একা একা

চুপচাপ একা একা -২৫ যাত্রার শুরু- দো'কা জীবন ব্যাঙ্গালোর‚ নতুন শহর‚ নতুন ফ্যাক্টরিতে চাকরী‚ নতুন টেকনিক্যাল এরিয়া| সবই নতুন| ভাষা নতুন‚ রাস্তাঘাট বাড়ী ঘরদোরের ডিজাইন আলাদা‚ লোকজনের মুখের আড়া ভিন্ন‚ ক্যান্টিনে রেস্টুরেন্টে খাবার ভিন্ন| একেবারে সবই নতুন প্রায়‚ নতুন করে শুরু| মানুষের স্বভাবই পরিবর্তন পছন্দ না করা‚ আমার তো আরও বেশী; বরাবরের ঘরকুনো‚ বন্ধুবান্ধব পালটাই না‚ প্রেমিকা(?) অবশ্য বদলায় তবে তাতে আমার কোন হাত নেই‚ তারাই বদলায় আমাকে| (২) এখন সমস্যা হলো থাকবার জায়গা‚ মাথার উপর একটা ছাদ| বন্ধুর ছিমছাম ভাড়াবাড়ী দেখে ইন্টারভিউ দেবার সময় ভেবেছিলাম‚ ওরকম কিছু না কিছু আমারও জুটে যাবে‚ ভাড়াও সাধ্যের বাইরে নয়| এখন তো পোড় খাওয়া পার্টি‚ তখন ইন্টারভিউ এর সময় টাকা বেশী না চেয়ে‚ কোয়ার্টার পাওয়া সাপেক্ষে চাকরী নেয়ার শর্ত দিলে কি এই অবস্থা হতো| (৩) এস্টেট এজেন্টদের কাছে ঘোরাঘুরি করি‚ এই প্রথম বাড়ীর দালাল কি জিনিষ তার পরিচিতি লাভ হলো| অটো রিকশা করে এমন এমন জায়গায় গিয়ে থামে যে বাড়ী দেখবার ইচ্ছাই করে না| আজন্ম ফাঁকা বাড়ীতে থেকে অভ্যাস‚ সে যখন মাটির বাড়ী ছিল তখনও| ইন ফ্যাক্ট সেই মাটির বাড়ীতে যা আরাম তা আর কোথাও পাইনি| টিনের চাল‚ উঁচু plinth‚ একটাই ঘর কিন্তু চারি পাশে বারান্দা‚ যারে verandah কয়! নদীর ধারে বাড়ী‚ দক্ষিণমুখো‚ গ্রীষ্মকালে ফুরফুরে বাতাস| অনেকগুলো এরকম বাড়ী মিলে আমাদের পরিবারের cluster‚ বিশাল উঠোন‚ আমবাগান| পরে যখন পিতাশ্রী‚ কাকাশ্রী আর্থিক সম্পন্নতা লাভ করলেন‚ পাশের জমির লোক বেচে কিনে চলে যাওয়াতে সব মিলিয়ে পেল্লায় দালান হাঁকালেন| প্রায় এক একর জমি নিয়ে আমাদের বসতবাটী| এখনও সেই দালান কোঠাই আমার বাড়ী| পরে অবশ্য বিভিন্ন হস্টেলে আমার আবাস; সেসবও মন্দ নয়‚ খোলামেলা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন| তারপর শিল্পনগরী| মাঝে অবশ্য কলকাতায় এক বছর বৌবাজারের মেসে‚ বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে তৈরী পলেস্তারা খসা বাড়ী! কিন্তু তখন তো মনে আশা‚ ভাল চাকরী পেয়ে গেলেই এই মেসে তো থাকবো না| তবে এই মেসজীবনের অভিজ্ঞতাও এখন সুখের স্মৃতি‚ সে এক আলাদা জগৎ‚ একেবারে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে উঠে আসা| সে বিষয়ে অন্যত্র লেখা যাবে| (৪) এমন লোকের ভাড়া বাড়ী পছন্দ হওয়া মুশকিলের তার উপর সাধ্য অতি সীমিত| মাস দুয়েক আগে বিয়ে হয়েছে‚ বাড়ী যাওয়ার ট্রেন ভাড়া‚ চাকরীতে যোগ দেবার জন্য ট্রেনভাড়া‚ বিয়েতেও একখানা বেনারসী ও নিজের পাঞ্জাবী কিনতেও পকেট খরচ‚ তা সে অতীব শস্তা পাটসিল্কের বেনারসী হোক না কেন| আমার এক বন্ধু বলতো-জুটোলীন‚ টেরিলিনের আদলে| বিয়েতে আগড়োম বাগড়োম থালা গেলাস‚ বিছানাপত্রের বদলে আমি পাত্রীপক্ষকে মূল্য ধরে দিতে অনুরোধ করি‚ কারণ দশ মাসের ভাড়া অ্যাডভান্স দিতে হবে! দহেজ‚ যৌতুক? May be! তাঁরাও এমন কিছু রকফেলার নন| আমার তখনকার অবস্থা এখনকার ভাষায় যাকে বলে‚ ঘেঁটে ঘ| আসলে স্টেজে মেরে দেবার অভ্যাস কিনা‚ বিয়ে তো করলেই হলো না‚ বিয়ে করলে বউ থাকবে‚ থাকবার বাড়ীর প্রয়োজন হবে‚ এসব তেমন করে ভাবিনি| আমিই বর‚ আমিই বরকর্তা! সত্যি বলতে কি‚ ভাল চাকরী পেলে ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজী‚ যখন আমার সেই শুভানুধ্যায়ী সিনিয়র কলীগকের স্ত্রীকে বলেছিলাম‚ তখন নতুন ভাল চাকরী পাওয়াই priority ছিল‚ বিয়ে থা? ও পরে দেখা যাবে| যখন পুরো ব্যাপরটা বোধগম্য হতে শুরু করেছে‚ দ্বিতীয়বার মেয়ে দেখাবার দিন এলো আমি চাইছিলাম কোন honourable way out! মেয়েটিই যাতে আমায় নাকচ করে সেই হেতু একটা পকেট ছেঁড়া দুপকেটের জামা পরে যাই| (৫) কিন্তু‚ নিয়তি কেন বাধ্যতে! বিয়ে হয়েই গেল আর আমি? চিরদিনের বোহেমিয়ান আমি‚ যাঁতাকলে আটকে পড়লাম| নাহ‚ বাড়ী আর পাইনি‚ সাধ ও সাধ্যের অনেকখানি ফারাক যে| ওদিকে বন্ধুর বাড়ী থেকে বেরোতে হবে‚ তার মা আসবেন| অগত্যা অফিসেরই এক কলীগের সাহায্যে একটি চিলেকোঠা পাওয়া গেল| চিলে কোঠা‚ তাই সই| ঝকঝকে পরিস্কার‚ লাগোয়া টয়লেট‚ সেখানেই বালতী ভরে চান‚ একটু এদিক ওদিক হলেই টয়লেট Bowl এর পুণ্য স্পর্শ| সিঁড়িতে উঠে বেশ কিছুটা ল্যান্ডিং‚ ব্যালকনি ও বিস্তীর্ণ ফাঁকা ছাদ| (৬) আগষ্টে কাজে যোগ দিয়েছি আর সেবার সেপ্টেম্বরে পুজো| এদিকে নতুন চাকরী‚ সবেধন সাতটি মাত্র ক্যাজুয়াল লীভ বছরে‚ তাও ভাঙ্গা বছরে pro rata! বাড়ীর তো ঐ অবস্থা| ব্যাঙ্গালোর থেকে শ্বশুরালয় তখন দুদিনের দূরত্ব‚ তাও ডাইরেক্ট ট্রেন নেই| এখনকার নব্য চাকুরেদের মতো নয় যে ইচ্ছে হলো তো উড়ে গেলাম! পুজোতে আবার মাত্র একদিনই ছুটি‚ বিজয়া দশমীর দিন ওরা আয়ূধ পুজো করে| এদিক সেদিক করে‚ রবিবার জুড়ে চললাম| কি করে রেলের টিকিট কিনেছিলাম‚ পেয়েছিলাম এখন আর মনে নেই| বহুদিনের ব্যাচিলর থাকার অভ্যাস কেটে গেছে বুঝতে পারি‚ আমি যে আর একা নই ধীরে ধীরে মাথায় গেঁথে উঠছে| (৭) পুজো শেষ‚ 'ফিরে যেতে হবে আজি দূর কর্মস্থানে'! কবি অত্যন্ত সহৃদয়‚ আমার কথা ভেবে লিখে গেছেন| কিন্তু চিলেকোঠায় রান্নাঘর বিহীন বাসায় সংসার কি প্রকারে পাতিতে হয়‚ সে বিষয়ে তিনি নীরব| একাই ফিরে আসবো এরকমই ঠিক ছিল কিন্তু আমার সেই সিনিয়র কলীগের স্ত্রী মিসেস দত্ত কেন জানিনা কোন কথা মানতেই চাইলেন না‚ আর আমিও স্ত্রী সমভিব্যাহারে ব্যাঙ্গালোর ওয়াপস| আবার ও রেলের টিকিট ও রিজার্ভেশন কি করে পেয়েছিলাম মনে করতে পারছি না| তখন তো নেট বা irctc.co.in ছিল না| ছিল তারের নেটের জানালার ওপারে বুকিং ক্লার্ক‚ বিশাল বিশাল জাবেদা খাতা আর বিশৃঙ্খল লাইন| (৮) অতএব কোন এক শারদ প্রভাতে ট্রেন ব্যাঙ্গালোর সিটিতে ইন করলো| বেচারী আমি‚ অস্ফীত পকেট ও সঙ্গী সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী| আচ্ছা ঈশ্বরের কিরকম উলটো বিচার| এখন হলে? ঈর্ষা করিনে তবু নতুন নতুন ছেলেদেরকে দেখি‚ বিদেশে চাকরী করতে শুরু করেছে‚ অল্প বয়স‚ গাড়ী বাড়ী সবই মজুত| আমি তো এত কিছুই চাইনি| আমার বাড়ীওয়ালা গোঁড়া কানাড়া ব্রাহ্মণ‚ দয়াপরবশ হয়ে চিলে কোঠা ভাড়া দিয়েছিল‚ ব্যাচিলর মানুষ‚ রাঁধবে বাড়বে না| ঠিক আছে‚ থাকুক‚ এমনই অ্যাটিচিউড| বলতে গেলে ভয়ে ভয়েই গিয়ে পৌঁছুলাম| বাড়ীওয়ালার স্ত্রী দেখলেন‚ কি যেন বললেন; আমিও কানাড়া বুঝি না তিনি হিন্দী বা ইংরেজী কোনটাই না| আসবাবপত্র বলতে তো মেঝেতে পাতা বিছানা‚ একটা স্টীলের গেলাস আর প্ল্যাস্টিকের জাগ| নতুন বউকে সব কিছু দেখিয়ে ‚ বুঝিয়ে দিয়ে আমি ফ্যাক্টরির পানে‚ ছুটি কই আর! এতদিন ভোজন তো যত্রতত্র‚ দুপুরে অফিসার্স ক্লাবে রাত্তিরে উডুপী হোটেল| সকালের প্রাত:রাশ অফিসের ক্যান্টিন থেকে ট্রলি করে মাখন মাখানো কাঁচা পাঁউরুটি আর কফি| আহা সে কি স্বাদ‚ কফি ডুবিয়ে মাখন স্যান্ডউইচ‚ এখনও ভুলিনি| কিন্তু এখন? এখন তো আর একজন মানুষ বাড়ীতে রেখে যেতে হচ্ছে‚ এত কিছু তো ভাবিনি| অবশ্য কোনদিনই বা পরে কি হবে‚ ভবিষ্যতে কি হবে ভেবেছি‚ কচুরী পানার মতো স্রোতে ভেসেই চলেছি| কাছের কর্ণার শপ থেকে একটা পাঁউরুটি আর কলা কিনে রেখে আমি কাট| 'মাথা খাও‚ ভুলিয়ো না খেয়ো মনে করে'? এখন নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করে আমার অবিবেচনার জন্য| এই সেদিনও তাই ভাবছিলাম হাসপাতালের এমার্জেন্সীর বেডে বিবিজান শুয়ে‚ এটা সেটা টেষ্ট চলছে‚ আমি ভাবছি আর ভাবছি| আমি নাহয় ভাইবোন সকলের দায়িত্ব নিয়ে শুধুই সামনেই এগিয়ে চলেছি একটু স্থায়িত্বের আশায়‚ একটু সচ্ছ্বলতার আশায়‚ সে তো কোন দোষ করেনি| তার সাদামাটা বিয়ে হলে এভাবে আমার সঙ্গে ছুটে মরতে হতো না‚ আর পাঁচটা মেয়ের মতো তারও ছিমছাম ধীর স্থির সংসার হতো‚ আমি চেয়েছি অথবা পেয়েছি এই জীবন‚ সে তো চায়নি! (৯) ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে অবাক| বাড়ীওয়ালার স্ত্রী তাকে ডেকে নিয়ে‚ মানে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে আর কি‚ দুপুরে ভাত সম্বর খাইয়েছেন| আমি তো আমতা আমতা করে বলছি‚ একটা বাড়ী পেয়ে যাবো‚ গেলেই ছেড়ে দেবো| প্রায় সপ্তাহখানেক চললো রাত্তিরে হোটেলে খেয়ে‚ দুপুরে কি খেয়ে থাকতো এখন আর মনে নেই| তবে একদিন বাড়ীওয়ালার স্ত্রীই বললেন‚ সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে যে প্রশস্ত জায়গা আছে‚ সেখানে আমরা রাঁধতে পারি| এটা কিন্তু অনেক উদারতার পরিচায়ক‚ বিনা রান্নাঘরে রান্নাবান্না করলে সিলিং ও দেওয়ালের কি যে অবস্থা হয়! আমাদেরও কষ্ট হতো‚ রোজ হোটেলে খাওয়া| গ্রীন সিগন্যাল মিলতেই সোজা জয়নগর ফোর্থ ব্লকের শপিং ম্যল| হ্যাঁ‚ তখনই এই শপিং সেন্টার নতুন তৈরী হয়‚ ব্যাঙ্গালোরেই প্রথম| আজকালকার মতো না হলেও সবই ছিল একই বিল্ডিং এ| সেখানকার সুপারমার্কেট থেকে এক লপ্তে‚ অ্যালুমিনিয়ামের কড়াই‚ ডেকচি‚ দু একটা পাতলা গামলা (যার আধুনিক নাম মিক্সিং bowl) ও একটি পারফেক্ট ব্রান্ডের কেরোসিন স্টোভ| ওখানে বোধহয় হাঁড়ির চল ছিল না‚ ঐ ঢাকা দেয়া ডেকচিতেই ভাত রান্না| ছাদে একটা কল ছিল‚ সেখানেই বাসন মাজা| তবে হাঁ‚ শুক্লপক্ষে ছাদটাকে মোহময় লাগতো‚ হাত বাড়ালেই নারকেল গাছের মাথা| সহৃদয় পাঠক‚ এত বছর বাদে‚ এত শহর ঘুরে‚ এত এত বাড়ী পালটেও সেই ডেকচি‚ কড়াই ও পাতলা গামলা এখনও আমাদের কিচেন কাবার্ডে শোভা পাচ্ছে| আর সেই Perfect স্টোভ‚ সত্যিই পারফেক্ট বটে| প্রতি রবিবার আমার অবশ্য কর্ম ছিল‚ তার পলতে কেটে সমান করা‚ ঝাড়পোঁছ করা; কি সুন্দর ব্লু ফ্লেম হতো এই এখনকার জার্মান গ্যাস কুক টপের চেয়ে কোন অংশে কম নয়! সেই কড়াই‚ সেই একই ডেকচি ; তফাৎ কেবল শহরের‚ বাড়ীর‚ কুকটপের| মালিক মালকীন অবশ্য একই রয়ে গেছে| একই কি? মাঝে কেটে গেছে একটা আস্ত জীবন!

1265

165

নব ভোঁদড়

আফ্রিকান সাফারি

স্যামিকে ফেলে চলে যেতে একটু বিবেক কুড়কুড়োচ্ছিল| তা রেঞ্জারদের হুড়ো দিয়ে বিবেক একটু ঠান্ডা হল| তাতে যে বুলডোজারটা গাড়ি তুলবে সেটাকে তেল-জল খাওয়ানো হচ্ছে দেখে নিয়েছি| এইবারে যারা আমাদের ওপর সদয় হয়ে রাইড দিল তাদের দিকে নজর ফেরানোর অবসর হল| এ বাবা‚ এ তো দেখি দুটি টিনএজার খোকাখুকু‚ নিজেদের নিয়েই মগ্ন| খালি খালি কাচ ভাঙ্গা হাসি‚ আর এ ওর গায়ে ঢলে পড়া| গাড়ীর ছাদ দিয়ে হুহু করে হাওয়া ঢুকছে‚ ঠিক যেন দুটো টিউলিপ দুলছে| যৌবনবেদনারসে উচ্ছল আমার দিনগুলি‚ হে কালের অধীশ্বর অন্যমনে গিয়েছ কি ভুলি‚ হে ভোলা সন্ন্যাসী| - ওটা কি বলছ তুমি? সাম ইনক্যান্টেশন? দেখি টিউলিপেরা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে| মন্ত্রই বটে‚ আমাদের জীবনমন্ত্র| আমাদের কবি লিখে গেছেন| জানিনা বুঝল কিনা‚ কিন্তু মাথা দোলাল| হে বিদেশী ফুল‚ আমি পুছিলাম‚ কি তোমাদের নাম? নাম শুনে বললাম - তোমরা কি রোমানিয়া থেকে? খুবই অবাক হল‚ তুমি আমাদের নাম শুনেই দেশ বলে দিলে? আমি হাবভাব করলাম‚ও কিছু না‚ নাম শুনে আমি পলিনেশিয়ার কোন ট্রাইব‚ আমাজনের কোন জঙ্গলগ্রামের লোক‚ তাও বলতে পারি| এ তো মোটে একটা ইউরোপীয় দেশ| কিন্তু পয়গম্বর বলে গেছেন - যাকে তার বৌ শ্রদ্ধা করে সে সত্যিকারের মহৎ মানুষ| গিন্নি আমার চালিয়াতি ঠিকই ধরে ফেলেছে‚ ঐ নামে আমার এক রুমানিয়ান সহকর্মী আছে| কটমট করে চোখ পাকিয়ে বাংলায় বকুনি দিল - বাচ্চা পেয়ে ঢপ মারছিস!! আমি একটু মাথা চুলকে হেঁহেঁ করে নিলাম| ছেলেটির পরিবার রুমানিয়ার একটি ব্যবসায়ী পরিবার| কয়েক পুরুষের ব্যবসা| শুরু করেছিল ছাপাখানার ব্যবসা দিয়ে| এখন সে ব্যবসা বোটানিক্যাল গার্ডেনের বটগাছ| এ কাকা ওষুধের ডিলার‚ তো ও জ্যাঠার গাড়ীর দোকান| যে ভাইটার কিছুই হল না সে লোকাল ইউনিভার্সিটিতে কমার্স পড়ায়| পরিবারের রীতি অনুযায়ী কুড়ি পেরোতে না পেরোতে গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করে ফেলেছে| এখন হানিমুন মানাতে বেরিয়েছে| মাস ছয়েক ধরে পৃথিবীর নানা দেশে হানিমুন সেরে দেশে ফিরে কোন একটা ব্যবসায় লেগে যাবে| এক সময়ে এরকম একটা প্রথা ছিল| ইউরোপের ধনী পরিবারের ছেলেরা বিয়ে করে কাজ-কর্ম শুরু করার আগে একটা লম্বা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ত| বাবা বন্ধু মহলে চোখ টিপে বলত ছেলে তার বুনো জই ছড়াতে গেছে| এরা বিয়ে করেই বেরিয়েছে| জোয়ালে জুতে যাবার আগে একটু দুনিয়া দেখে নিতে চায়| এইসব খেজুরে আলাপের মধ্যে গাড়ী প্রায় মারাম্বোই ক্যাম্পের কাছে পৌঁছে গেছে| ওদের গাইড হঠাৎ গাড়ী থামিয়ে দিয়ে একদিকে আঙুল তুলল| আমরা এখন ক্যাম্পের আশে-পাশে বিস্তৃত ঘাসজমির মধ্যে| ঘাসের ভেতরে পেট অবধি ডুবিয়ে গ্যাজেল আর জেব্রার পাল চড়ে বেড়াচ্ছে| আমি একটু অবাক হলাম‚ এতো কতই দেখা যায়| এর জন্যে দাঁড়াতে হবে? সূর্য্য পাটে বসেছে| মরা আলোতে চোখ সয়ে যাবার পর দেখলাম গ্যাজেল আর জেব্রার পালের মাঝখানে ঘাসের ভেতর থেকে চারটে হলুদ কান বেরিয়ে আছে| দুই চিতা ভাই রেকি করছে| শিকার ধরা যাবে কিনা| চিতাদের মধ্যে নিয়ম হল ভাইয়েরা অনেক সময়েই বেশ বড় হওয়া অবধি‚ কখনো বা সারা জীবন একসাথে দল বেঁধে থেকে যায়| ভাইয়েদের এই দলগুলো একসাথে শিকার ধরে| মাংসাশী প্রানীদের মধ্যে চিতা একটু দুর্বল| তাই দল না বাঁধলে একটু বড় শিকার‚ যেমন জেব্রা‚ ধরতে পারে না| গ্যাজেলদের জন্য অবিশ্যি একা চিতাই যথেষ্ট| কিন্তু গ্যাজেলরা খুব ভাল দৌড়তে পারে| চিতা পৃথিবীর দ্রুততম স্থলচারী প্রানী| কিন্তু চিতার স্ট্যামিনা খুব কম| টপ স্পীডে পাঁচ কি ছশো ফুটের বেশী দৌড়তে পারে না| টপ স্পীডে খানিকটা দৌড়নোর পর চিতার শরীরের তাপ‚ নাড়ির গতি এতটাই বেড়ে যায় যে বেশ খানিকটা বিশ্রাম দরকার হয়| অন্যদিকে‚ গ্যাজেল চিতার চেয়ে একটু আস্তে দৌড়লেও অনেক বেশী সময় ধরে দৌড়তে পারে| সুতরাং চিতার শিকার ধরার কায়দা হল সারপ্রাইজ অ্যাটাক| অনেকক্ষণ ধরে ঘাসের আড়ালে আড়ালে গ্যাজেলদের খুব কাছে গিয়ে পড়া‚ যাতে কোন একটি গ্যাজেল এক দৌড়ের পাল্লার ভেতরে এসে যায়| তারপর চিতা হঠাৎ দৌড় শুরু করে| ভাগ্য কখনো চিতার দিকে থাকে‚ শিকার হয়| কখনো ভাগ্য গ্যাজেলের দিকে থাকে‚ তখন চিতা শিকার করতে পারে না| আশায় আশায় ছিলাম একটা শিকার দেখতে পাব| কিন্তু চিতা বা কোন শিকারী প্রানীই ধরতে পারার সম্ভাব্না না থাকলে শিকারের পেছনে তাড়া করে না| কুড়ি পঁচিশ মিনিট অপেক্ষা করার পরে ওদের গাইড বলল‚ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে‚ এবারে ক্যাম্পে যাওয়া দরকার| এই দুদিনেই শিখে গেছি‚ আফ্রিকার জঙ্গলে গাইডের কথা অমান্য করাটা বুদ্ধিমানের কাজ না| সুতরাং গ্যাজেলদের দীর্ঘ রাত্রি আর চিতাদের হাতে তুলে দিয়ে ক্যাম্পে ফেরত আসা হল| গিন্নি তাঁবুতে ফিরে বলল একবার স্যামিকে হোয়াটস্অ্যাপ কর‚ ফিরল কিনা| আমি এর মধ্যেই মেসেজ করেছি| কোন উত্তর পাই নি| জঙ্গলে ফোন কানেকশন প্রায়ই পাওয়া যায় না| জঙ্গল থেকে বেরোলে তবে ও মেসেজ পাবে| সেটাই বললাম| গিন্নি একটু কান্না কান্না গলায় বলল - আমি যা ভাবছি তুইও কি তাই ভাবছিস? আমারও একটু একটু কান্না পাচ্ছিল‚ স্যামি যদি হাতির হাতে দলাই-মলাই হয়ে যায় তো এই জঙ্গলে আমাদের কি হবে? কিন্তু আপাত আনন্দ হল গিন্নি একটু ভয় পেয়েছে| এই মেয়েটির অনেক দোষ আছে‚ এত বছরে কম তো দেখলাম না| কিন্তু গড়পড়তা বঙ্গজননীর হিসেবে তুলনাহীন সাহস| কাজেই আমার এনাকে তড়পানোর সুযোগ খুব একটা হয় না| এবারে সুযোগ পেয়ে খুব গম্ভীর গলায় বললাম‚ আমি তোর চেয়ে অনেক বেশী কিছু ভাবছি| আজ যেখানে চিতা দেখলি কাল সেখানে একা একা হাঁটতে আসতে চেয়েছিলি| গ্যাজেলগুলোতো দৌড়তে পারে| তোর কি হত? বকুনি শুনে উনি ভেঁউ-ভেঁউ করে কেঁদে ফেললেন - আর বলিস না প্লীজ| আমাকে চিতা খেয়ে ফেলত‚ স্যামি হাতি চাপা পড়ে যেত‚ তুই একা একা কি করতিস রে?

1133

213

Shafiqul Islam

তবুও বৃষ্টি আসুক”…..শফিকুল ইসলাম

গ্রন্থ পর্যালোচনায় – ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী। ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ কবি শফিকুল ইসলামের অনন্য কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। তার কবিতা আমি ইতিপূর্বে পড়েছি । ভাষা বর্ণনা প্রাঞ্জল এবং তীব্র নির্বাচনী। ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ গ্রন্থে মোট ৪১ টি কবিতা রচিত হয়েছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ গ্রন্থ পাঠ করে পূর্বেই বলেছি, মন অনাবিল তৃপ্তিতে ভরে যায়। বইটির প্রথম কবিতায় মানবতাহীন এই হিংস্র পৃথিবীতে কবির চাওয়া বিশ্ব মানবের সার্বজনীন আকাংখা হয়ে ধরা দিয়েছে। কবি বলেছেন– ‘তারও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে- সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক, আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা,হৃদয়ের গ্লানি… (কবিতা:তবুও বৃষ্টি আসুক’) প্রকৃতি, প্রেম, নারী, মুক্তিযোদ্ধা, মা এবং সুলতা নামের এক নারী তার হৃদয় ভরে রেখেছে। তাকে কিছুতেই ভোলা যায় না। মা তার কাছে অত্যন্ত আদরের ধন। মাকে তার বারবার মনে পড়ে। মনে পড়ে সুন্দরী সুলতাকে, যে তার হৃদয়ে দোলা দিয়েছিল। বেচারা তার জীবন, মৃত্যুহীন মৃত্যু &nbsp;। তাই তিনি এখন ও সুলতাকে খুঁজেন । যার জন্য তিনি অনন্তকাল প্রতীক্ষায় আছেন। এই প্রিয়তমা তার হৃদয়-মন ভরে আছে। নদীর জল ও তীরের মত এক হয়ে মিশে আছে । এই প্রেম বড়ই স্বর্গীয়, বড়ই সুন্দর । একে ভোলা যায় না। প্রকৃতি আর সুলতা কখন একাকার হয়ে যায় হৃদয়ে। কাব্যগ্রন্থটি পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। বইটির ছাপা অত্যন্ত সুন্দর। ধ্রুব এষের প্রচছদ চিত্রটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। [প্রাপ্তিস্থান– আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০। ফোন– ৭১১১৩৩২, ৭১১০০২১। মোবাইল– ০১৮১৯২১৯০২৪] এছাড়া www.rokomari.com থেকে অনলাইনে সরাসরি বইটি সংগ্রহ করা যাবে। তবুও বৃষ্টি আসুক…শফিকুল ইসলাম বহুদিন পর আজ বাতাসে বৃষ্টির আভাস, সোঁদা মাটির অমৃত গন্ধ- এখনই বুঝি বৃষ্টি আসবে সবারই মনে উদ্বেগ- তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। তবু আমার মনে নেই বৃষ্টি ভেজার উদ্বেগ আমার চলায় নেই কোনো লক্ষণীয় ব্যস্ততা। দীর্ঘ নিদাঘের পর আকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির সম্ভাবনা অলক্ষ্য আনন্দ ছড়ায় আমার তপ্ত মনে – আর আমি উন্মুখ হয়ে থাকি বৃষ্টির প্রতীক্ষায় – এখনই বৃষ্টি নামুক বহুদিন পর আজ বৃষ্টি আসুক। দীর্ঘ পথে না থাকে না থাকুক বর্ষাতি – বৃষ্টির জলে যদি ভিজে যায় আমার সর্বাঙ্গ পরিধেয় পোশাক-আশাক- তবুও বৃষ্টি আসুক – সমস্ত আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামুক বৃষ্টি নামুক মাঠ-প্রান্তর ডুবিয়ে। সে অমিতব্যয়ী বৃষ্টিজলের বন্যাধারায় তলিয়ে যায় যদি আমার ভিটেমাটি তলিয়ে যাই যদি আমি ক্ষতি নেই। তবুও বৃষ্টি নামুক ইথিওপিয়ায়, সুদানে খরা কবলিত, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত দুর্ভাগ্য জর্জরিত আফ্রিকায়- সবুজ ফসল সম্ভারে ছেয়ে যাক আফ্রিকার উদার বিরান প্রান্তর। তার ও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক, আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি। মানুষের জন্য মানুষের মমতা ঝর্ণাধারা হয়ে যাক বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে – সব পিপাসার্ত প্রাণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাক অনন্ত ধারাজল হয়ে। বহুদিন পর আজ অজস্র ধারায় অঝোরে বৃষ্টি নামুক আজ আমাদের ধূলি ধূসরিত মলিন হৃদয়ের মাঠ-প্রান্তর জুড়ে ॥

92

5

শিবাংশু

নিধুবাবুর ধারাজল

একটা মত বলে (ভবতোষ দত্ত) নিধুবাবু প্রথমবার ছাপরা যা'ন ১৭৬১ সাল নাগাদ। ফিরে আসেন বছর সাতেক পর। এর মধ্যে ছাপরার দক্ষিণে গঙ্গা পেরিয়েই বক্সারের যুদ্ধ হয়ে গেছে। বাংলার সুবেদার মির কাশিম, অওধের শুজাউদ্দৌল্লাহ, দিল্লির শাহ আলম-২ বনাম ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হেক্টর মুনরো সাহেব। যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছিলো, সবাই জানে। ফিরে আসার পর তাঁর প্রথম বিবাহও হয়েছিলো। ১৭৭১ সালে তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্র দুজনেই গত হ'ন। একলা মানুষটি পুনর্বিবাহ করেন সম্ভবত ঐ বছরেই। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যে তাঁর দ্বিতীয় পত্নীও ইহলোক ত্যাগ করেন। এই সময় নিধুবাবু জাগতিক ব্যাপারে বেশ উদাসিন হয়ে পড়েন। কলকাতা তাঁর আর ভালো লাগেনা। তাঁর গ্রাম চাপতার মানুষ রামতনু পালিত তখন ছিলেন ছাপরায় কালেক্টর মন্টগোমারি সাহেবের দেওয়ান। তাঁর সঙ্গেই নিধুবাবু ছাপরা কালেক্টরেটে ছোটোবাবুর চাকরি নিয়ে ১৭৭৬ সালে আবার ছাপরা ফিরে যান। সময়টা মনে রাখতে হবে। রাজা রামমোহন তখন সবে জন্মেছেন। দ্বিতীয়বার ছাপরা গিয়ে নিধুবাবু সেখানে ছিলেন পুরো আঠারো বছর। বেশ কিছুদিন আগে একবার কাজে গিয়েছিলুম ছাপরা। একদিন কাজ পালিয়ে সোজা কালেক্টরেট। নিধুবাবুর কোনও খোঁজখবর যদি এখনও সেখানে পাওয়া যায়। নিছক পাগলামি। তবু পুরানা কচহরির কিছু খণ্ডহর এখনও রয়েছে সেখানে। কিন্তু নো নিধুবাবু। সেতো চাতরা সেরেস্তায় গিয়ে ১৮০৫-০৬ সালের সেরেস্তাদার রামমোহন রায়ের খোঁজও করেছিলুম। একটা ছবি অবশ্য আছে তাঁর। ভাবতে অবাক লাগে, সেকালের মোকাম কলকাতার সব থেকে আলোকপ্রাপ্ত নাগরিক বাবুর দল কীভাবে ছাপরা বা চাতরার মতো জায়গায় থাকতেন? থেকে যেতেন। যেসব জায়গা এখনও প্রায় সভ্যতার প্রান্তসীমার বিন্দুমাত্র। ছাপরায় দ্বিতীয়বার থাকার সময় নিধুবাবু একজন মুসলিম ঘরানাদার উস্তাদের কাছে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথাগত পাঠ নে'ন। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন অতি দক্ষ। তার উপর গান ছিলো তাঁর রক্তে। অল্পদিনের মধ্যেই উস্তাদের তালিম পুরো হাসিল করে নিলেন। কিন্তু গুরু তাঁকে আর নতুন কিছু শেখান না। বুঝতে পারলেন ঘরানাদার উস্তাদরা অওলাদ-দামাদের বাইরে 'খাস চিজ' শেখাবেন না। উস্তাদের এই বঞ্চনা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু তা ছিলো বাংলাগানের প্রতি বিধাতার আশীর্বাদ। নিধুবাবু ঠিক করলেন তিনি আর হিন্দি, উর্দু, ফার্সি গান গাইবেন না। নিজে গান বাঁধবেন আর নিজের মতো করেই তা গাইবেন। অনেকে ভাবেন "নানান দেশের নানান ভাষা" গানটি নিধুবাবুর 'স্বাদেশিকতা'র গান। যেহেতু সেখানে 'বিনা স্বদেশী ভাষা' শব্দবন্ধটি রয়েছে। কিন্তু ঘটনা হলো তখনও রাজনৈতিক অর্থে বাংলাভাষার কোনও 'স্বাদেশিক' অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠেনি। গানটি ছিলো নিধুবাবুর অন্তর্লীন ক্ষোভের উৎস থেকে গড়িয়ে আসা নিজের ভাষায় গান বাঁধার অনুপ্রেরণা। তাঁর প্রথমদিকে বাঁধা বাংলা টপ্পাগুলির মধ্যে পঞ্জাবি টপ্পার জমজমা ও তালফের্তার ছাপ ছিলো । পরের দিকে গিয়ে তা অনেক ভাবপ্রধান হয়ে গেছে। এখানে একটি সেরকম টপ্পার লিংক রাখছি সমঝদারদের অনুমতি নিয়ে। পরে আসবো নিধুবাবুর ভাবপ্রধান টপ্পার প্রসঙ্গে।

118

8

দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

আজ সকাল থেকে এই গানটা মনের মধ্যে একটানা বেজেই চলেছে । এখানেও বাজুক সেই গানের সুর

1028

113

শিবাংশু

আজাদি হে

টুকরো শব্দে বাজে কার্তুজ পেলেট আলি শা করেছো জীর্ণ শরীরের ফ্রেম ভুল বাঁচি, অধর্মকে দিয়ে যাই ভেট বেঁচে থাকা চাঁড়ালের রংরেজ প্রেম মাঝে মাঝে ঘুরে যাই মহুয়ামিলন কোয়েল পারের বৃষ্টি, নদীটির বাঁক রোদেজলে ভিজি পুড়ি নিমসঞ্জীবন কবিতার কাছে শুধু ছায়াটুকু থাক ছায়াটুকু থাক আর থাক ভালোবাসা ভালো থাক, যারা ততো ভালো নেই আজ তাদের তেষ্টার জল যন্ত্রনার ভাষা তাদের স্বপ্নজুয়া ছেঁড়া গন্ধরাজ তাদের ভিতরে বাঁচি সুবর্ণরেখায় তাদেরই জন্য যাক, যদি দিন যায়.........

98

7

Ranjan Roy

ছত্তিশ্গড়ের কিসসা

পর্ব-৪ পুলিশ, ওরে পুলিশ! গৌরচন্দ্রিকা সাতসকালে রায়গড় স্টেশন থেকে মুম্বাই মেল চড়ে গরম কফির কাপে চুমুক দিয়ে সবে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছি, বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।প্রথম পাতায় হেডলাইনঃ রানিবোদলি গ্রামে নকশাল আক্রমণে পঞ্চান্নজন পুলিশ নিহত। বস্তারের যে জায়গাটার কথা বলা হয়েছে বিশেষ বাহিনীতে ভর্তি হয়ে গত মাসে সেখানেই গেছে আমাদের নাটকের দলের সক্রিয় সদস্য অবিনাশ চোপড়ে।অবিনাশ হিন্দি সাহিত্যে এম এ পাশ করে একটি স্কুলে পড়াচ্ছিল। কোন মাসে মাইনে পেত, কোন মাসে হরিমটর।এর মধ্যে বিয়ে করল আমাদের দলেরই একটি মেয়েকে। মেয়েটি হাসপাতালের নার্স।তার কয়েক মাস পরেই স্ত্রীভাগ্যে ধনলাভ। জুটে গেল বিশেষ পুলিশ বাহিনীতে সাব ইন্সপেক্টরের চাকরি। নিহতদের তালিকায় নামগুলো আঁতিপাতি করে দেখি। তারপর একটা শ্বাস ছাড়ি। ততক্ষণে আড়মোড়া ভেঙে রেলের কামরা জেগে উঠেছে। চারদিকে উত্তেজিত কথাবার্তা শুরু হয়ে গিয়েছে। : এ সরকার অপদার্থ, বস্তারকে মিলিটারির হাতে তুলে দেওয়া উচিৎ। :ছত্তিশগড়ের পান্তাভাতখেকো পুলিশ কোন কম্মের নয়।লড়াই না করে পালিয়ে গেছে।বিহার ইউপি থেকে শিক্ষিত বেকার ছেলেদের দলে দলে পুলিশে ভর্তি করে হাতে বন্দুক দিয়ে দেখুন, নকশালদের সোজা নকশালবাড়ি পাঠিয়ে দেবে। : মশাই, ট্রেনের কামরায় বসে এমন উড়ন ছুঁ কথাবার্তা বলা সহজ; যান তো দেখি অবুঝমাঢ় কি বাসাগুড়ায়! : ছত্তিশগড়ি পুলিশ ডরপোক? খালি পান্তাভাত খায় আর ঘুমোয়? হুঁ:! সেই ছকে বাঁধা কথাবার্তা; আমার একঘেয়ে লাগে। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। আমার চেতনায় পুলিশ নির্মাণ আরে আরে মারবি নাকি? দাঁড়া, একটা পুলিশ ডাকি! বাচ্চা রবীন্দ্রনাথকে ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ পুলিশ আসছে বলে ভয় দেখাতেন। পুলিশ মানে খাঁকি টুপি, বেল্ট, বুটজুতো! লাঠি, বন্দুক!বেশ, কিন্তু আমার ফোর্ট উইলিয়মে চাকরি করা ফৌজিবাবা?উনিও তো খাঁকি পরেন, বেল্ট বাঁধেন, বুটজুতো পরে খটখটিয়ে চলেন।তফাৎ কোথায়? মাকে জিজ্ঞেস করি। মার সরল সমাধানঃ পুলিশ নিজের দেশের লোককে মারে, মিলিটারি দেশের দুশমনকে। কাজেই মিলিটারি, মানে তোমার বাবা, ভাল। তাই মিলিটারি সম্মান পায়, পুলিশ পায় না। একটু বড় হয়ে কানে এলঃ পুলিশ তুমি যতই মারো, মাইনে তোমার একশ বারো। অর্থাৎ পুলিশ শব্দটির সঙ্গে মারামারি ব্যাপারটা কেমন যেন জড়িয়ে রয়েছে।ময়দানে ফুটবল ম্যাচ নিয়মিত দেখতে যান, অথচ টিকিটের লাইনে ঘোড়সোয়ার পুলিশের তাড়া কিংবা ব্যাটনের গুঁতো খাননি এমন কেউ আছেন কি? কিন্তু দক্ষিণ কোলকাতার নাকতলায় লুঙ্গি পরে বাজার করা পুলিশ অনুকুলবাবুকে দেখে কোনদিনই ভয় পাইনি কেন?ষাটের দশকের শেষে বাংলাবন্ধের দিনগুলোতে খাঁকি হাফপ্যান্ট পরে শুকনো মুখে লাঠি ঘোরাতে দেখেও না।বরং নাদাপেটে অমন পোশাকে ওঁকে কমেডিয়ান জহর রায়ের মত লাগত। এল -সত্তরের দশক, মুক্তির দশক। কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে গলিতে, পুলিশ মরছে। মরছে আর মারছে, মারছে আর মরছে। তারপর? রক্তমাখা অস্ত্রহাতে যত রক্তআঁখি, শিশুপাঠ্য কাহিনিতে থাকে মুখ ঢাকি।শুনেছি, বিয়ের বাজারে জামাই হিসেবে পুলিশদের বাজারদর তখন বেশ পড়ে গিয়েছিল। ছত্তিশগড়ে এসে দেখি পুলিশজামাতা পেয়ে শ্বশুরের নাক বেশ উঁচু হচ্ছে। মাইনে যাই হোক উপরি টুপরি ভালই, মেয়ে সুখে থাকবে। উটের নুনু ঠিক কোনখানে? ট্রেনে করে আমরা কজন ভোপাল যাচ্ছি একটা ইন্টারভিউ দিতে। দুর্গ থেকে উঠলেন একজন পুলিশ অফিসার। কথায় কথায় বললেনঃ আজকাল যেসব ছেলেছোকরার দল নতুন নতুন গ্র্যাজুয়েট বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হয়ে পুলিশের চাকরিতে আসছে এরা সব ভুষিমাল, কিস্যু জানে না।কত করে বোঝাই যে দিনকাল পাল্টেছে, হিসেব করে চল। পুরো মাইনেটাই ব্যাংকে জমা কর, আর এদিক সেদিক করে যা পাবে তাই দিয়ে সংসার চালাও। কিন্তু শোনে কে! এরা জানে শুধু ছুটি আর বদলির দরখাস্ত লিখতে। কোন্ও বাস্তববুদ্ধি নেই। জিজ্ঞেস করুন: উটের নুনু ঠিক কোনখানে? বলতে পারবে না। পশুর অ্যানাটমি নিয়ে অমন উচ্চস্তরের জ্ঞানলাভের কথা শোনাচ্ছিলাম কোরবা শহরের সদর থানা বা কোতোয়ালির থানেদার উত্তম সিং রনধাওয়াকে। উনি রবিশংকর ইউনিভার্সিটিতে আমার সিনিয়র ছিলেন।উত্তমজী হাসলেন না। গম্ভীর হয়ে বললেনঃ রায়, একটা কথা ভেবেছিস, আমরা পুলিশেরা কত একা? আমাদের সমাজ কেন এড়িয়ে চলে? সেদিন রকের আড্ডায় বসে হেসে গড়াচ্ছিলি। কিন্তু আমি গিয়ে যেই বললাম ক্যা চল রহা ভাই? হমে ভি বাতাও, আমি্ও তোমাদের সঙ্গে হেসে নিই; ব্যস্, তোদের মুখে কুলুপ এঁটে গেল। কেন? পুলিশের কি হাসি পেতে নেই? হোলির দিনের কথাই ধর। সবাই একে তাকে রং মাখাবে, কিন্তু পুলিশ বাদ। আমরা সেদিন ডিউটি দেব, শান্তিরক্ষা করব।আমাদের ছুটি পরের দিন।সেদিন পুলিশেরা খালি নিজেদের মধ্যে হোলি খেলবে।মানে, পুলিশেরা খালি খাঁকি বৌদিদের রং মাখাবে। কেন? আমাদের কি পাড়ার অন্য বৌদিদের রং মাখাতে ইচ্ছে করে না? আর দেখেছিস, হেড কোয়ার্টারে থাকলে আমাদের কোন ছুটি নেই!আমাকে যদি তোর মেয়ের জন্মদিনের পার্টিতে যেতে হয় তো রোজনামচায় তোদের পাড়ার কাছে কোথাও ইনস্পেকশনে বা ইনভেস্টিগেশনে যাচ্ছি দেখিয়ে রেজিস্টারে এন্ট্রি করে তবে যেতে পারব। আমাদের শালা রাতে ঘুম পেতে নেই। পরপর দুদিন না ঘুমোলেও কিছু হয় না!এসব তো সামান্য ব্যাপার। আমাদের বৌদের জন্যেই তোদের বাঙালী কবি লিখে গিয়েছেন: ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে। এরপর কিছু উল্টোপাল্টা হয়ে গেলে রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে মানবাধিকার কমিশন।ওদের হিসেবে চোরডাকাত, খুনি, টেররিস্ট সবারই হিউম্যান রাইটস্ আছে, নেই শুধু পুলিশের। আমরা তো হিউম্যান নই। ওরা শেখাবে: অপরাধিদের বাবাবাছা, আপনি আজ্ঞে করে কথা বলতে হবে।ওরা আমার মা বোন তুলে মুখখারাপ করলে্ আমাদের বাধ্য ছাত্রের মত সোনামুখ করে শুনতে হবে, ওদের পেঁদিয়ে বিন্দাবন দেখানো চলবে না। আমি বলিঃ আপনি দাদা হিউম্যান রাইটস্ এর ব্যাপারটা কিচ্ছু বোঝেন নি। তারপর ঝাড়ি একটা মাস্টারজি মার্কা লম্বা লেকচার। রাজা জন, ম্যাগনাকার্টা, রাষ্ট্রসংঘ, চার্টার অফ হিউম্যান রাইটস্ পেরিয়ে সোজা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে এসে দম নিই। রনধা্ওয়াজি আমাকে টেরচা চোখে দেখতে লাগলেন।আমার উৎসাহ কমে না। বলিঃ দোষ আপনার একার নয়, দোষ আপনাদের সিস্টেমের।ভাবটা হল যার একমাস পরে ফাঁসি হবে তার এখন থেকেই খাওয়া বন্ধ করে দাও।সরকারের খরচা বাঁচে।এখানেই মানবাধিকারের প্রশ্ন।আচ্ছা, আপনাকে দিয়েই শুরু করি। এই থানার লক আপে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা ব্যবস্থা আছে? : বিলকুল আছে; যা না, এগিয়ে গিয়ে দ্যাখ। দুধনাথ, রায়সাবকো ইঁহা কী ব্যবস্থা জরা দিখা দো। দুধনাথ বা থানার মুন্সীজির সঙ্গে ওঁর চোখে চোখে কিছু কথা হয়।ও আমাকে একটা লক আপের দিকে নিয়ে গিয়ে তালা খোলে।বলে, যান, দেখুন গে। চোখে পড়ে কোণের দিকে একটা গোটানো কম্বল আর একটা এলুমিনিয়ামের সানকি। কিন্তু বাথরুম পায়খানার ব্যবস্থা? কিছুই তো দেখছিনে! কানে আসে থানেদারের কণ্ঠস্বরঃ সবই আছে, আরেকটু এগিয়ে যা, ঠিক দেখতে পাবি। ভেতরে কোন বাল্ব নেই।তবু দু পা এগিয়ে যাই।এমন সময় পেছনে আওয়াজ, ঘড় ঘড় ঘড়াৎ।দুধনাথ লক আপের গেট বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। আমার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। বলি: রনধাওয়াজি, এটা কি হচ্ছে? অ্যাই দুধনাথ, তালা খোল, এসব ইয়ার্কি ভাল লাগে না। দুধনাথ বোবা চোখে তাকায়, তালা খোলার কোন চেষ্টা করে না। থানেদার উবাচঃ এটা ইয়ার্কি কে বললে? আমার গলা শুকোতে থাকে, এর মানে? মামার বাড়ি নাকি! : মামার বাড়ি কি শ্বশুরবাড়ি ভাল করে বুঝবি যখন ভাবীজি এসে তোকে জামিনে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। : আমার অপরাধ? : অপরাধ অনেক। এক, কোরবা বাজারের সব্জিওয়ালি জামুনবাঈকে যৌনসংসর্গের জন্য প্ররোচিত করা।দুই, উক্ত জামুনবাঈ অস্বীকূত হইলে তাহার সহিত জোরজবরদস্তি করা।তিন, প্রকাশ্য বাজারে তাহার গায়ে হাত তোলা।চার, উহার চিৎকার শুনিয়া বাজারে কর্তব্যরত পুলিশ সিপাহী দুধনাথ সিং শান্তিরক্ষা করিতে গেলে তাহাকে বাধা দেওয়া। পাঁচ, তাহাকে চপেটাঘাত করা। ছয়, তাহাকে মাতূগমনকারী নরাধম বলিয়া অভিহিত করা। দুধনাথ!এবার রায়জিকে এই ছয় অপরাধ পেনাল কোডের কোন কোন ধারায় দন্ডনীয় তা বুঝিয়ে দে। দুধনাথ বলির সময় পুরুতঠাকুরের মন্ত্র পড়ার মত কিছু অং বং চং বলে।আমার মাথা ঘুরতে থাকে, হাত পা কাঁপে। কাঁপা গলায় শেষ চেষ্টা করি। : এ সব ডাহা মিথ্যে। সব জানেন, শুধু শুধু । : সত্যি মিথ্যে আদালত ঠিক করবে। :মানে? আপনি আমাকে কোর্টে তুলবেন!চালান পেশ করবেন? : আলবাৎ, আইন আইনের পথে চলবে। : প্রমাণ করতে পারবেন? তাছাড়া কে এই জামুনবাঈ? আমি চিনি না।আমি তো হাটবাজার করিনে, আমার স্ত্রী করে।কাজেই আপনার ওসব গুলপট্টি ওকে খাওয়াতে পারবেন না। ও আমাকে ভাল করে চেনে। : এগজ্যাক্টলি! বৌদি নিজে বাজার করেন। তাই তরকারিওয়ালি জামুনবাঈকে ভাল করে চেনেন।হার্ডকোর রেণ্ডি। আর ও হচ্ছে পুলিশের খবরি! গোপন খবর দেয়। মাসোহারা পায়। পুলিশের যেমনটি চাই তেমনই সাক্ষী দেবে।তারপর বৌদি তোকেও নতুন করে চিনবেন।চিন্তা করিসনে। যে কদিন জামিন না হয় তোর মানবাধিকারের হিসেবে সব সুবিধে পাবি।জামাকাপড়, টুথব্রাশ, খবরের কাগজ।বাড়ি থেকে খাবার আসবে। উকিলের সাথে কথা বলতে পারবি। আমার হাঁটু আর ভার সামলাতে পারে না, গরাদের ওপাশে মাটিতে বসে পড়ি।নিজের গলার স্বর চিনতে পারিনে।একটা ফ্যাঁসফেঁসে গলা বলেঃ আমায় ছেড়ে দিন, ঘাট হয়েছে। :দুধনাথ! লক আপের তালা খুলে দে। রায়কে বাইরে নিয়ে আয়। ও আর কোনদিন থানায় বসে মানবাধিকার নিয়ে লেকচার দেবে না।আরে! বেচারার হাত পা কাঁপছে।যা, ওকে মোটরবাইকে বসিয়ে বাসস্টপে ছেড়ে দে। দুধনাথ বলেঃ চলুন রায়জি, গাড়ি স্টার্ট করছি। ________________________________________ গিন্নি দেখি আরও এককাঠি সরেস। তৎক্ষণাৎ আলমারি খুলে একটা বাঁধানো খাতা বার করল, তাতে কোলাজের ঢংয়ে খবরের কাগজের নানান কাটিং আঠা দিয়ে সাঁটা। :পুলিশ কী পারে আর কী পারে না দেখে না্ও। না:, আমি হাল ছাড়িনি। পুলিশ সম্বন্ধে শেষ কথা বলার সময় এখন্ও আসে নি। মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন যে সংসদে একতূতীয়াংশ মহিলা হলে সেশন অনেক সংযত ও উন্নতমানের হবে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় যে ওখানে সনিয়া গান্ধী, রেণুকা চৌধুরি, সুষমা স্বরাজ, বূন্দা কারাতদের সংখ্যা বেড়ে গেলে অমুকভাইয়া বা তমুকউদ্দিনদের হাতের গুলি ফোলানো বা বিরোধীদের সংগে শকারবকার বিনিময়ে কিছুটা ভাটা পড়বে। মাথায় টিউবলাইট জ্বলে ওঠে।তাহলে পুলিশ কেন বাদ যায়? ইউরেকা! চাই পুলিশবাহিনীতে তেত্রিশ পার্সেন্ট মহিলা আরক্ষণ! তবেই পুলিশি বর্বরতা কমবে, পুলিশ আরও গণমুখী হবে।মার দিয়া কেল্লা! এই আইডিয়াটা লিখে পাঠাতে হবে।পাঠাবো দুজনকে, মাননীয়া কিরণ বেদী ও মাননীয়া মমতা ব্যানার্জীকে। কদিন পরে যেতে হল থানায়।রাতের অন্ধকারে আমার পরিচিত এক ভদ্রলোকের গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারার চেষ্টা হয়েছে। হামলাকারীরা পরিচিত। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক দলের চাপে পুলিশ ডায়েরি নিচ্ছে না। থানায় মুন্সীজি বললেন: দেখুন, আপনি যে ভাবে লিখে এনেছেন তাতে কেসটা উইক হয়ে যাবে।শব্দগুলো আর ঘটনার ক্রমপরম্পরা একটু বদলে নিলে এটাই অন্তত: হাজার চল্লিশের কেস, কী বুঝলেন? আর আপনি যেমন লিখে এনেছেন তাতে মাত্র দশহাজার, ক্যা সমঝে আপ? বলতে লজ্জা করছে, আমাদের এত বড় থানার স্টেশনারি খরচা বাবদ মাসিক বরাদ্দ মাত্র চল্লিশ টাকা! সেতো মাসের পহেলা হপ্তাতেই শেষ হয়ে যায়। এখন মাসের কুড়ি তারিখ। কাজেই কাগজ কার্বন পেপার ইত্যাদি কেনার জন্যে কিছু দিন, আর স্টাফদের জন্যে নাস্তা। তারপর দেখুন মজা! শালেলোগোকোঁ হাতকড়ি লগওয়াকে দোচার লাথমুক্কা লাগাতে হুয়ে ঘর সে খিঁচকর লায়েংগে। তব না উনকে ঘরওয়ালোঁ নে হাতকড়ি খুলওয়ানে কে লিয়ে অউর কুছ মালপানি দেঙ্গে? (ব্যাটাদের হাতকড়ি পরিয়ে ঠুঁসোলাথ মারতে মারতে ঘর থেকে টেনে আনা হবে, তবে তো ওদের ঘরের লোকজন কিছু মালপানি উপুড় করবে?) আমি পকেট থেকে দুটো নম্বরি নোট বের করে চা জলখাবারের নামে একজন সেপাইয়ের হাতে দিলাম। এমনসময় থানার ভেতরে শোনা গেল এক চাপা উল্লাসধ্বনি।তাকিয়ে দেখি একজন সেপাইয়ের পেছন পেছন সলজ্জমুখে ঢুকছেন দুই মহিলাপুলিশ।ভাবটা যেন দ্বিরাগমনের পর নতুন বৌ ছোটবোনকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরছে। তক্ষুণি চাওয়ালা এসে সবাইকে চায়ের গেলাস ধরিয়ে দিল।তারপর পাশের একটি কামরায় ছোটবোনপুলিশ একটু গড়িয়ে নিলে।আর পেছনের বারান্দায় জনতা স্টোভ জ্বেলে বৌপুলিশ সবার জন্যে খিচুড়ি চড়িয়ে দিল। আমি আলাপ জমাই।আপনারা কোন কেসের ব্যাপারে এসেছেন? : বড়সড় সিঁদেল চুরির কেস।কোরবা শহরে কেলো করে জবড়াপাড়ায় গা ঢাকা দিয়ে আছে।দলের লীডার একজন মেয়েছেলে, তাই আমরা এসেছি। : আপনার বেশ সাহস তো! :দূর! একা যাব নাকি?দুজন সেপাইয়ের মোটরবাইকের পেছনে বসে যাব। উনি শরীরে ঢেউ তুলে হাসলেন। মহিলাদের উপস্থিতি যে থানাকে একটু সভ্যভব্য করে তুলবে আমার এই বিশ্বাস দূঢ হল। বিকেলে হঠাৎ উদয় হলেন আমার কলেজ জীবনের দুই দোস্ত, বিজয় আর প্রসাদ।রাত্তিরে গিন্নির কূপায় খ্যাটন বেশ ভাল হল।মে মাস। গরমকাল।বেশ গরম হাওয়া দিচ্ছে, ঘুম আসছে না।তাই আমরা তিনবন্ধু রাস্তায় একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরোলাম।পায়ে পায়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছি। রাত বারোটা, ফিরতে হবে।পাড়াটা একটু নির্জন,আলোগুলো প্রায় নিভে গেছে। হঠাৎ কেউ যেন কঁকিয়ে এল।কোথায়? কোনদিকে, নাকি মনের ভুল!এবার একটা আর্তনাদ, তারপর চাপা গোঙানি।কোথাও কোন ভুল নেই, আওয়াজটা আসছে সামনের কোতোয়ালি থানা থেকে। চারদিকের নিকষকালো অন্ধকারের মধ্যে প্রায় দেড়শো মিটার দূরের থানার আলোজ্বলা হলঘর টিভির পর্দার মত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দুজন সেপাই একটা গেঁয়ো লোকের হাত টেনে ধরে রয়েছে আর একটা খেঁটে লাঠি দিয়ে তাকে মেরে পাটপাট করে দিচ্ছে সকালে আলাপ হওয়া সেই বৌপুলিশ!মারতে মারতে খুলে যাচ্ছে তার শাড়ি।হাঁফাতে হাঁফাতে কাপড়চোপড় সামলে নিয়ে জলটল খেয়ে আবার মার! না, মহিলা পুলিশমন্ত্রী ও শ্রীমতী কিরণ বেদীকে সেই চিঠি আজও পোষ্ট করা হয়ে ওঠেনি। ভয়ের রং খাঁকি! বর্ষশেষ।৩১ ডিসেম্বরের রাত।মোবাইল ও এসএমএস এর দৌলতে নিমন্ত্রণ পেয়ে গিন্নির ও বাচ্চাদের চোখ এড়িয়ে পৌঁছেচি আমার এক বন্ধু গজ্জুশেঠের হোটেলে।মধ্যরাতে নববর্ষ বরণ করতে হবে।জড়ো হয়েছি আমরা ক’জন্– কলেজজীবনের জনাদশেক বন্ধু।একটা হলঘরে মাটিতে গদি আঁটা বিছানা, তাকিয়া।সামনে প্লেটে সাজানো ফিশফ্রাই,কাবাব,টিকিয়া ইত্যাদি পাকস্থলীকে বিরক্ত করার মত কিছু খাদ্যদ্রব্য।গেলাসে গেলাসে রঙিন জল।অদীক্ষিতদের জন্যে কোকস্। কিন্তু একি!একপাশে হাসিমুখে বসে জনাদুই খাঁকি পোশাক।কেন?এদের কে ভিসা দিয়েছে? আমার বাঁকা ভুরু দেখেই গজ্জুশেঠ সাফাই গাইল– ‘এরা দুজন আমার বিশেষ অতিথি’। আমি রাগ চাপতে পারলাম না।এখন এদের সামনে মেপে মেপে কথা বলতে হবে।খেয়াল রাখতে হবে আমিষ চুটকিগুলো পলিটিক্যালি কারেক্ট হচ্ছে কি না! কী চাপ! গজ্জু হেসে বলল–‘ শান্ত হয়ে বস দিকি!একটু পরে টের পাবি যে এঁরা লোকাল থানার কেউ ন’ন।বিলাসপুরেই বাড়ি, ছুটিতে এসেছেন।কাজেই বিশ্বাস করতে পারিস যে এঁরা আমার হোটেলে হপ্তা নিতে আসেননি।এসেছেন পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে’। লম্বাটে চেহারার তিওয়ারি বললেন– বুঝতে পারছি খাঁকি পোশাকে আপনার এলার্জি। বেশ, খুলে রাখলাম’। এই বলে তিনি গেঞ্জি গায়ে বসে পড়লেন।সবাই খেলার ক্রিকেট মাঠের ‘হাউজ দ্যাট’ এর মতন চেঁচিয়ে উঠল। চুটকি, পান–ভোজন, একে তাকে চিমটি কাটা–– এর মধ্যে কেউ গান ধরল।দু’পাত্তর চড়ানোর ফলে ওর গলা যেন ভুল স্পীডে চলা পঁচাত্তর আরপিএম এর গ্রামোফোন রেকর্ড।পাবলিক হেসে গড়াচ্ছে।কেউ বলছে গুলাম আলির গজল চাই তো কেউ বলছে সুফি শুনবো। এর মধ্যে দেখি গজ্জু ওই তিওয়ারির কানে কানে কী যেন গুজগুজ ফুসফুস করছে আর পুলিশ–তিওয়ারি নতুন কনেবৌটির মত সলজ্জ মাথা নাড়ছে। তারপর পাশের কামরা থেকে এসে গেল একটি হারমোনিয়াম। আর তাজ্জব কী বাৎ, গজব কী বাৎ, ওই বাদ্যযন্ত্রটি এসে নামল সোজা ওই পুলিশ ইনস্পেক্টরের সামনে! তাকিয়ে দেখি হারমোনিয়ামে হাত ছোঁয়াতে্ই ওর চেহারা বদলে গেছে।খানিকটা বেলো করে চাপা গলায় একটু আলাপ করে ধরল–‘তুম আপনি রঞ্জোগম, আপনি পরেশানি মুঝে দে দো।কুছ দিন কে লিয়ে ইয়ে নিগেবানি মুঝে দে দো’। আমরা ভুলে গেলাম গালগল্প। সুর চড়ছে। ‘তোমার সব ব্যথার বোঝা, দু:খের ভার আমায় দাও’। গলা ছুঁয়ে যাচ্ছে তারার কোমলগান্ধার। ‘ম্যায় দেখুঁ তো দুনিয়া তুমে ক্যায়সে সতাতী হ্যায়?কুছ দিনকে লিয়ে ইয়ে নিগেবানি মুঝে দে দো’। আমার বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। ‘দেখি তো তোমায় কে এত কষ্ট দেয়?ক’দিনের জন্যে তোমার সব ভার আমায় দাও’। কিসের এত কষ্ট?খাঁকি পোশাক তো দু:খ দেওয়ার জন্যে, পাওয়ার জন্যে তো নয়। সাতদিন পর সাতসকালে স্টেশন গেছি, কোলকাতা থেকে মা আসছেন।দেখি সেই তিওয়ারিজি।পরনে যথারীতি খাঁকি ধরাচূড়া। আমাকে দেখেও দেখলেন না প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কামরার জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে আদর করে যাচ্ছেন একটি ষোড়শীকে, আর কিমাশ্চর্য্যম!রুমাল দিয়ে চোখ মুছে চলেছেন। কাঁধে চাপ পড়তেই দেখি গজ্জু শেঠ।বন্ধুর জন্যে নিয়ে এসেছে কিছু আপেল আর কমলালেবু।কী ব্যাপার রে? গজ্জু ইশারায় সরে আসতে বলে।তারপর ব্যাখ্যা করে: তিওয়ারির হয়েছে মাওবাদী বেল্টে ট্রান্সফার।অনেক ধরাধরি করেও আটকাতে পারেনি।এদিকে ওই একটি মেয়ে। ভিলাইয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।বাপের সঙ্গে দেখা করে ফিরে যাচ্ছে।পরশুদিন । তি্ওয়ারি গিন্নি স্বামীর ললাটে তিলক লাগিয়ে ‘জয়যাত্রায় যাও গো’ বলে বস্তারের নারায়ণপুরের জন্যে টা–টা করবে আর প্রার্থনা করবে যেন জগদলপুরের দন্তেশ্বরীমাতা স্বামীকে ভালোয় ভালোয় বছরখানেকের মধ্যে বিলাসপুরে ফিরিয়ে দেন।আজকাল ছত্তিশগড়ে পুলিশের জীবনের কোন ভরসা নেই যে! আমি পুলিশকে আর ডরাইনে; তা সে ধরাচূড়া পরেই থাকুক বা না পরে। বুঝে গেছি যে খাঁকি হল পুলিশের সাপের খোলস, ওদের প্রোটেকশন। কিন্তু পুলিশ সামনে এলে মনে মনে প্রয়াত কবি তুষার রাযের দেওয়া মন্ত্রটি বিড়বিড় করি: ‘পুলিশ!ওরে পুলিশ! কবির সামনে আসার আগে টুপিটা তোর খুলিস্’। ============================*******======================================

482

26

শিবাংশু

নানা স্বর- ফুলের কোরাস

'বহুস্বর' একটা পবিত্র শব্দ। মানুষের সভ্যতার বিবর্তন ঘটেছে এই শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে। সরলরৈখিক, একস্বর প্রতিক্রিয়া মানবিক অধিকারের বিপ্রতীপ বিড়ম্বনা। মানুষই একমাত্র প্রাণী যার কোনও একমুখী অস্তিত্ব নেই। অনেক মানুষ তো বটেই, একাকী মানুষেরও অস্তিত্বেও বহুস্বরের ব্যঞ্জনা তাকে প্রতি মূহুর্তে সমৃদ্ধ করে। সামাজিক বা রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র মানুষের এই চারিত্র্যটিকে ভয় পায়। তাই তাদের আপ্রাণ প্রয়াস থাকে মানুষকে একস্বর গড্ডলিকার স্রোতে টেনে আনার, তাড়না করার। এর ব্যতিক্রম আমরা স্থান-কাল নির্বিশেষে পাইনি। তাই মানুষের যাবতীয় সংগ্রাম তার বহুস্বরের অধিকার রক্ষার স্বার্থে। ------------------- 'এপিক' নামক শিল্পশৈলিটি মানুষ তৈরিই করেছে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। শিল্পসৃষ্টির কিছু সর্বকালীন অনুপ্রেরণা থাকে। তাদের সঠিক প্রেক্ষিতে বিচার করার জন্য একটি কালনিরপেক্ষ মঞ্চ বিশেষ প্রয়োজন। সময়ের কাদামাটিকে অতিক্রম করে যখন কিছু চিরকালীন মূল্যবোধের কথা বলতে হয় তখন যাবতীয় শিল্পমাধ্যমই এপিক শৈলির আশ্রয় নেয়। কারন চিরকালীন কথা সমকালীন প্রেক্ষিতে ধরার জন্য এপিকের থেকে উত্তম কোনও মঞ্চ নেই। কাব্য, সাহিত্য, চিত্র, ভাস্কর্য, নাট্য, সঙ্গীত, মাধ্যম যাই হোক না কেন এপিকশৈলির আশ্রয়ে তার শ্রেয়তর স্ফুরণ ঘটে। সারা বিশ্বে সর্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতেই এপিক শৈলির আধারে মানুষের শাশ্বত ক্ষোভ, দুঃখ, নিপীড়ন, সুখ, প্রতিবাদ বা মহত্ত্বের ইতিকথা লেখা হয়ে থাকে। সব রকম সৃষ্টিমাধ্যমেই তার উপস্থাপনা আমরা দেখে আসছি গত প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে। নিপীড়িত, অত্যাচারিতের যে দীর্ঘশ্বাস ঈশ্বর পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেনা, তারা জায়গা করে নেয় এপিকের পাতায় পাতায়, দৃশ্যে দৃশ্যে। প্রাচীন আথেন্স থেকে পাটলিপুত্ত, রোম থেকে উজ্জয়িনী, তারা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। য়ুরোপিয় ধরণটি নিয়ে এখন বলছি না, কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যবোধের বিবর্তিত কালচক্রকে ধরে রাখার জন্য আমাদের পূর্বজরা মহাভারত নামক যে মহা-আধারটি সৃষ্টি করে এসেছেন প্রায় তিন হাজার বছর ধরে, তার জন্য আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ, নতজানু। নিজেদের যথাসাধ্য প্রয়াস থেকে তাঁদের তর্পণ সমীপেষু করে থাকি যখন তখন। সম্প্রতি একটি নাটক দেখলুম। এপিকের আধারে এই মূহুর্তে আমাদের নির্যাতিত মূল্যবোধের খতিয়ানকে ধরার প্রয়াস করা হয়েছে সেখানে। ------------------------- 'বহুরূপী' বাংলা নাট্যধারার প্রাচীনতম জীবিত সঙ্ঘ। যে দেশে এক দশক কেন, এক এককেই সঙ্ঘ ভেঙে যায়, সেখানে তাঁদের বন্ধুর হিংলাজপথের অবিরত যাত্রা সারাদেশের নাট্যপ্রাণ মানুষদের প্রেরিত করে। এহেন বহুরূপীর বার্ষিক নাট্য উৎসবের প্রথম প্রস্তুতি হিসেবে যে নাটকটিকে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন, তার নাম 'নানা ফুলের মালা'। রচনা শ্রী অলখ মুখোপাধ্যায়। নির্দেশনার দায়িত্বে শ্রী দেবেশ রায়চৌধুরী। নাটকটি শুনলুম তাঁরা বছর দুয়েক আগে মঞ্চস্থ করতেন। এবার নবপর্যায়ে আবার তার উপস্থাপনা শুরু করা হয়েছে। আশ্চর্য লাগে বস্তুস্থিতি বা সামাজিক বাস্তবতা যেন আরো তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এই ক'দিনে। ভারতবর্ষের শাশ্বত বহুস্বরবাদী সামাজিক অবস্থানের প্রতি যে ধরণের ক্রমাগত আঘাত বর্ষিত হয়ে চলেছে সাম্প্রতিককালে, তাকে উপজীব্য করে এই নাট্যপ্রস্তুতিটিতে সময়ের স্বরকে ধরার সনিষ্ঠ প্রয়াস লক্ষ্য করলুম। ------------------------- নাটকটির কাল্পনিক পরিমণ্ডল মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বের ঘটনাক্রমের সঙ্গে সমান্তরাল রাখা হয়েছে। যখন পরাজিত, রণক্লান্ত, অবসন্ন দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে বিশ্রামের জন্য এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে সঞ্জয়, কৃপ, কৃতবর্মা, অশ্বত্থামার সঙ্গে সেখানে আসেন এবং দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে বিধ্বস্ত কৌরব সেনাদলের সেনাপতি অভিষিক্ত করলেন। চরের মুখে সংবাদ পেয়ে সেখানে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি, দ্রৌপদীপুত্ররা, শিখণ্ডী আরো অনেকে এসে পৌঁছোলেন। আহত, বিপর্যস্ত দুর্যোধনের অবস্থা দেখে দয়ার্দ্র যুধিষ্ঠির প্রস্তাব দিলেন তিনি যেকোন একজন পাণ্ডবের সঙ্গে দ্বৈতযুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে পারেন। যদি জয়ী হ'ন, তবে হস্তিনাপুর আবার তাঁর হবে। যুধিষ্ঠিরের এমত 'মূঢ়' প্রস্তাব শুনে শ্রীকৃষ্ণ চকিত হয়ে পড়েন। কারণ গদাযুদ্ধে মহাপরাক্রমশালী দুর্যোধন যদি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান তবে অনায়াসেই জয়ী হতে পারেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্তার কৃপাদৃষ্টি থেকে সদাবঞ্চিত দুর্যোধন, তাঁরা প্রিয়তম বন্ধু প্রথম পার্থ কর্ণের মতো'ই অন্যায়যুদ্ধে জয়ী হতে চাননি। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভীমসেনকেই বেছে নেন। তাঁর গুরু বলরামের উপস্থিতিতে এই দ্বৈরথে ন্যায়ত তিনি ভীমসেনকে পরাজিত করেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের কূট ষড়যন্ত্রে অন্যায়ভাবে ভীমসেন দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করে তাঁকে পরাজিত করেন। এই অন্যায়কর্মের জন্য ক্ষিপ্ত বলরাম ভীমসেনকে হত্যা করতে উদ্যত হ'ন। কিন্তু এবারেও শ্রীকৃষ্ণের কূটবুদ্ধি জয়ী হয়। ফলত দুর্যোধনের মৃত্যু ও অশ্বত্থামার পাণ্ডবশিবিরে হত্যাযজ্ঞ। মহাভারতের মূলতত্ত্ব 'ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়' এভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের যুক্তিতে। অন্যস্বরের যুক্তি পরিত্যক্ত হলো সার্বিকভাবে। সেই ট্র্যাডিশন আজো চলেছে এদেশে। ------------------------ এই নাটকটিতে নাট্যকার কিন্তু মহাভারতের কোনও নবতর ইন্টারপ্রিটেশন দিতে চাননি। তিনি আমাদের এই মূহুর্তের ভারতবর্ষে 'নীরবে, নিভৃতে কাঁদা বিচারের বাণী'কেই উপজীব্য করেছেন। যার ফলে এপিকের আধারে, বর্তমানের পরিসরে মনুষ্যত্বের অবমাননার বিশ্বস্ত নাট্যমূহুর্তগুলি গড়ে উঠেছে। যে ব্যাধের মুখে পাণ্ডবপক্ষ দুর্যোধনের ঠিকানা জানতে পেরেছিলেন সেই চরিত্রটি থেকেই এই ডিসকোর্সের সূত্রপাত। সমাজের প্রান্তিকস্তরের একজন মানুষ তার মূল্যবোধে স্থির থাকে, যখন সমাজের শিরোমণিরা সুবিধেবাদের স্বার্থপরতাকে শিরোধার্য করে। ভিন্ন ভিন্ন ফুলে গাঁথা একটি মালা হয়ে ওঠে জয়ের প্রতীক। অন্য একটি তর্কের অবতারণাও করা হয়েছে পরিশেষে যুধিষ্ঠির ও কুন্তীর কথোপকথনের মাধ্যমে। আমাদের মূল্যবোধের শিকড় কোথায় রয়েছে? এই বোধ আমাদের কর্তব্যজাত না প্রণয়জাত? এই প্রশ্নটির প্রাসঙ্গিকতা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। কারণ দিনের শেষে 'মহাভারত' মানে একটা শাশ্বত মূল্যবোধের গঙ্গোত্রী। তর্কবিতর্কের অযুতনিযুত উপলখণ্ডের বাধাপ্রতিরোধকে জয় করে সে মনুষ্যত্বের মহাসাগরের দিকে ছুটে যায়। ----------------------- নাটকটিতে সংলাপরচনা বেশ সতর্কতার সঙ্গে করা হয়েছে। মহাকাব্যের আধারে নাট্যপ্রস্তুতিতে নাট্যকারের কাছে একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ থাকে। ভার ও ধারের সঙ্গে আপোস না শব্দচয়ন করতে হয়। সঙ্গতভাবেই তৎসম শব্দের বহুল প্রয়োগ থাকে সেখানে । কিন্তু দেশজ বা তদ্ভব শব্দের মিশেল যদি সঠিক অনুপাতে না থাকে, তবে তা হয় গৈরীশী নয় চিৎপুরি ফাঁদে পড়ে যেতে পারে। সেই প্ররোচনা এই নাটকে অতিক্রম করা হয়েছে। নাটকটির বৃহৎ সম্পদ নির্দেশক শ্রী দেবেশ রায়চৌধুরীর দুর্যোধনের ভূমিকায় অভিনয়। উচ্চগ্রামী মহাকাব্যিক চরিত্রকে সঠিক আবেগে, সন্তুলিত সংবেদনায় ধরে রাখার জটিল সৃজনশীলতা এই অভিজ্ঞ, পরিণত নাট্যব্যক্তিত্ব সহজভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শবর ও যুধিষ্ঠিরের ভূমিকায় যথাক্রমে শ্রী গৌতম চক্রবর্তী ও শ্রী অমিয় হালদার সুবিচার করেছেন। কুন্তীর ভূমিকায় শ্রীমতী তুলিকা দাস সনিষ্ঠ থেকেছেন। কিন্তু 'কুন্তী' বস্তুত মাটির অন্য নাম । যেখানে প্রধান পুরুষেরা তাঁদের শ্রেষ্ঠতা কর্ষণ করে থাকেন। তাই কুন্তী আখ্যানের প্রয়োজনে রাজ্ঞী হলেও ব্যক্তিত্বের বিচারে তাঁর বিশেষত্ব মৃত্তিকাময় দার্ঢ্যে। তিনি অনেক সময়ই তাঁর পুত্রবধূ যাজ্ঞসেনীকে অতিক্রম করে যান স্বাধীনচিত্ততায়, নারীত্বের মৌল বিক্রমে। এই নাটকে কুন্তীর চরিত্রটিকে অতি পরিশীলিত, সহনশীল মনে হয়েছে আমার। অন্যান্য চরিত্রের কুশীলবরাও যথোচিত দায়িত্বসচেতন ছিলেন। আলোয় জয় সেন উল্লেখ দাবি করেন। এই নাটকে নির্দেশকের শিল্পবোধ ও রম্য সৃজনশীলতা নিঃসংশয়ে প্রতিষ্ঠিত। ---------------------- নানা ফুলের মালায় প্রতিটি ফুলই নিজের বৈশিষ্ট্যে ও যাথার্থ্যে যেমন উজ্জ্বল, প্রনিধানযোগ্য; তেমনি সফল সমাজের মহিমা তার বহুস্বরের বৈচিত্র্য ও স্বীকৃতির স্বতঃস্ফূর্ততায়। নাটকটি সেই কথাই বলে।

126

6

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

"বহু দিন ধ'রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে       দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,              দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া       একটি ধানের শিষের উপরে              একটি শিশিরবিন্দু।" এমন করেই দুইপা ফেলতে ফেলতে চলে গেলাম প্রায় দুশো মাইল! গরমের ছুটি সমাপন প্রায়। মনের মধ্যে চিনচিনে কষ্ট। আবার সেই প্রাত্যহিকতার আবর্তে ঘড়ির কাঁটাকে সাথে নিয়ে ছুটে বেড়ানো। তার আগে এই এক সপ্তাহে মধ্যে কোথায় ঘুরে আসা যায়? পাহাড় নাকি সমুদ্র? মন বললো, চল কাটিয়ে আসি সবুজের মাঝে। যেখানে কপাল চুম্বন করে যায় পাহাড় আর সমুদ্র ছুঁয়ে যায় চরণ! চারিদিকে সটাং খাড়া রেডউড, পাইন গাছের দল অতন্দ্র পাহারা দেয়। সানফ্রানসিসকো থেকে মোটামুটি ১৬৩ মাইল নর্থে ঠি ক এমনই একটি জায়গার নাম, ম্যানডোসিনো। জনসংখ্যা হাজারের নীচে। আমাদের আসা যাওয়ার পথ, সান ফ্রানসিসকো আর স্যান্ড ডিয়াগোর মাঝখানের জঙ্গল, সমুদ্র আর নদীকে পাশে নিয়ে চকচকে সরিসৃপের মত এঁকেবেঁকে চলতে থাকা রুট ওয়ান, পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর! ক্যামেরার সাধ্য কি সেই সৌন্দর্য তুলে ধরা! ম্যানডোসিনোর বাতাস প্রতিনিয়ত শুদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে ৩,০০০ মাইল ব্যাপী প্যাসিফিক ওশান, তাপমাত্রা সারা বছর ধরে মনোরম। রং বেরঙি ফুলের, সবজির বাগান এই শহরের বৈশিষ্ট। এইস্থান, গাধা, লামা, ঘোড়া, রেকুন, শিয়াল, হরিণ, ববক্যাট, ক্রোগার, কালো ভাল্লুকের ইত্যাদি পশু আর পাখিদের নিরাপদ আস্তানা। আর এখানকার মানুষ সদা সচেতন অজস্র জীব-জন্তুর স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। ম্যানডোসিনোর সৃষ্টি হয়েছিল সিভিল ওয়ারের আগে, ১৯৫০ এর শেষের দিকে। এই গ্রামটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নেট স্মিথ নামে একজন কালো মানুষ। আমরা গিয়ে উঠেছিলাম ম্যানডেসিনো কোষ্টের পাহাড়ের পাশে অবস্থিত একটি ইকো ফ্রেন্ডলি রেজর্টে, স্টান্ডোফোর্ড ইন। রিজর্টের রেষ্টোরেন্টটি পুরোপুরি ভিগন, মানে এদের তৈরী যে কোনো পানীয় বা খাবারে কোনোরকম পশুপাখির ছোঁয়াচ থাকে না। তাই চা কফির সাথে এরা দেয় নারকেল বা সয়া দুধ, রান্নায় চীজের বদলে তফু বা কাজুবাদামের ক্রিম। ডিম না, মাছ না মাংস না। সব খাদ্য গাছনির্ভর। রিজর্টটির নিজস্ব অরগ্যানিক বাগান আছে, সেখানে গিয়ে দেখে এলাম, মহা সমারোহে সবজি পাতি, মশলা, এমনকি ফুলেরও চাষ হচ্ছে। আমাদের আমিষ জিভ এইরকম সবকিছু গাছনির্ভর বিশেষ উপকরণ দিয়ে বানানো খাদ্যসামগ্রীতে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু মন উদগ্রীব ছিল, এমন অভিজ্ঞতা উপলব্ধ করার তাগিদ ছিল। ইন্টারনেট খুবই ধীরে, মাঝে মাঝে নেই হয়ে যায়। পাওয়ার কাট হয়ে যায় আচমকা, তখন লবির আলো ছায়া পথ ধরে রিজর্টের অফিসে পৌঁছালে, তারা লন্ঠন বা মোমবাতি ধরিয়ে দেন। শেষ কবে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল, মনে পড়েনা। মানুষ এখানে আসে জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথ ধরে সবুজে হারিয়ে যেতে, বাইক করতে, কায়াকিং করতে, যোগা করতে এবং জীবনযাপনের জটিলতা ভুলে মানসিক এবং শারীরিকভাবে তরতাজা হয়ে উঠতে। তাই এই শান্ত জায়গাটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের হতাশ করতে পারে। একদিন গেলাম পাশের ছোট্ট শহর ফোর্ট ব্র্যাগ এর গ্লাস বিচ এ। ১৯০৬ নাগাদ ফোর্ট ব্র্যাগের বসবাসকারীরা এই বিচ এ এসে তাদের যত জঞ্জাল ফেলে যেত। তারমধ্যে কাচ থাকতো, অকেজো যন্ত্রপাতি এমনকি পুরোনো গাড়িও থাকতো। ১৯৪৩ নাগাদ যখন জায়গাটি জঞ্জাল দিয়ে ভরে এল, তখন তারা অন্য জায়গা খুঁজে নিল। শহর উদ্যোগ নিল জায়গাটি পরিস্কার করার, ততোদিনে সমুদ্রের ঢেউ এসে কাচ, মাটির পাত্র গুঁড়িয়ে দিয়ে ছোট ছোট রংচঙে মসৃণ আকার দিয়েছে, যা গয়না বানাবার উপযুক্ত। মানুষজন, বাচ্চা থেকে বুড়ো দেখলাম একমনে সেই কাচ খুঁজে থলিতে ভরছে। ক্ষণিক আমরাও মাতলাম সেই খেলায়। এমন করেই চারটে দিন অলস গতিতে বয়ে গেল। জীবনরসে ভরপুর হয়ে ফিরে এলাম আমরা, নতুন করে আবার জীবনযুদ্ধে মাততে।

793

36

শিবাংশু

আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে...

আজ বাইশে শ্রাবণ, ".... কর্মক্লিষ্ট, সন্দেহপীড়িত, বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটাকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে একটি নিত্যশোক, নিত্য ভয়, নিত্যমিনতির ভাব আছে। আমাদের হৃদয় উদ্ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়।.... ভৈরবীতে সেই চিরসত্য, সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে......" -২১শে নভেম্বর, ১৮৯৪, কলকাতা

95

5

Ranjan Roy

তিন তালুকদার : নাটক

তিনজন তালুকদার ============== (খালি মঞ্চে সেন্টার স্টেজে একটি বেঞ্চ পাতা।বাঁদিক থেকে ১ম অভিনেতা তুড়ি বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে ঢুকে এক উইংস থেকে বিপরীত উইংস পর্যন্ত ফুটলাইটের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। তারপর ফিরে এসে সেন্টার স্টেজে দাঁড়িয়ে দর্শকদের মুখোমুখি হয়।) ১ম: 'তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে, এমন সময় করল তাড়া মিশকালো এক কুকুরে। কুকুরটা যেই করল ধাওয়া, আর হল না শালুক খাওয়া, ছুটল ভালুক বাড়ির পানে সেদিন বেলা দুকুরে।' আচ্ছা, এই শীতের দুপুর পার্কে এসে একটু নিরিবিলিতে রোদ পোহাব, তারও জো নেই। এই অ্যাত্তোগুলো লোক এখানে তামাশা দেখতে হাজির হয়েছে। বলি, ও মশাইরা! আপনাদের কি আর খেয়েদেয়ে কোন কাজ নেই, দুপুরবেলা বাড়িতে চারাপোনার ঝোল দিয়ে দুটি খেয়ে নিয়ে কোথায় লেপমুড়ি দিয়ে ভাতঘুম দেবেন, তা নয়, পার্কে এসে ভিড় করেছেন।ঠিক আছে, ঠিক আছে, দুপুরে নাই ঘুমুলেন সর্দি হবে, মাথা ধরবে, তাই তো? তো টিভি খুলে সিরিয়াল দেখতে কে মানা করেছে!ও,আপনার ওসব পছন্দ নয়? কেন? ঘরে ঘরে আজকাল অমন শাস–বহু সিরিয়াল চলছে? বেশ তো, পুরনো বাংলা সিনেমা দেখুন না! উত্তম–সুচিত্রা? সাড়ে চুয়াত্তর, হারানো সুর, বিপাশা, সপ্তপদী, গূহদাহ।আর বিকেলে খেলা? ডার্বি?দুর মশাই! আপনাদের দেখছি কিছুতেই উৎসাহ নেই। সব অকালে বুড়িযে গেছেন। ও, গি্ন্নি এইসময় টিভি কব্জা করে বসে থাকেন? আচ্ছা, উনি নেই? বাপের বাড়ি গেছেন? কদ্দিনের জন্যে? কি বললেন? দশবছর হল? মানে? না না, ভেরি সরি। কী হয়েছিল বললেন? ক্যানসার?ভেরি সরি। কিন্তু টিভি? ও বৌমার কব্জায়? মশায় আপনি সিনিয়র সিটিজেন, আপনার জন্যে কোন কনসিডারেশন নেই?সিনিয়র সিটিজেনদের সবাই কনসিডার করে। সরকার পাবলিক সবাই। রেলে কনসেশন, বাসে স্পেশাল সিট, মেট্রো রেলেও।না, না। এ আপনার বৌমার ভারি অন্যায়!আপনি বুঝিয়ে বলুন। আর অবুঝ হলে ছেলেকে বলুন। আপনাকে একটা আলাদা টিভি করে দিক। ছেলে কী বলল? বেশি টিভি দেখা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়? ডাক্তারে বলেছে? যত্তসব! না, না। খামোকা আপনার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছি না। ভেরি সরি। কিন্তু আপনি নিজের জায়গা এত সহজে ছেড়ে দেবেন না। ছাড়তে ছাড়তে শেষে নিজের ঘর ছেড়ে বারান্দায় ঠাঁই হবে। বুঝলেন? আর শেষ কোথায় হবে কেউ জানে না। হয়ত বাড়ি ছেড়ে সরে পরতে হবে। কোথায় ? কোথায় আবার? হয় বৃদ্ধাশ্রমে, নয় রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। না না। আপনাকে অপমান করছি না। খালি বলছি -এত সহজে হার মেনে নেবেন না। কী করতে পারেন? অনেক কিছু। যেমন ধরুন, বৌমা যখন ওনার পছন্দের সিরিয়ালটি দেখতে বসবেন তখন আপনিও গিয়ে ওখানে চেয়ার টেনে বসে পড়বেন। বলবেন যে আপনিও ওই সিরিয়ালটি দেখতে এসেছেন। খুব প্রশংসা করবেন ওই সিরিয়ালের অল্পবয়সী নায়িকার। বলবেন-- এমন বৌমা যেন সবার ঘরে হয়। আর নিন্দেমন্দ করবেন সিরিয়ালের কুচক্কুরে শ্বাশুড়ি, খান্ডার ননদ এবং নিপাট ভালোমানুষ ন্যাকা শ্বশুরের। কী বলছেন? পারবেন না? লজ্জা করে? দূর মশাই, এই জন্যেই বাঙালীর কিছু হবে না। ঠাকুর বলে গেছেন-- লজ্জা, মান , ভয়; তিন থাকতে নয়। বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন। তাই মার্গারেট নোবল নামের মেমসাহেবকে কোলকাতায় নিয়ে আসতে লজ্জা পান নি। ওসব ন্যাকামি ওনার ছিল না। বরানগর মঠের জন্যে ভিক্ষে করতে, থুড়ি মাধুকরীর জন্যে পথে বেরোতে মান-সম্মান গেল ভাবেন নি। আর ভয়? সে তো কবেই--। নইলে জাহাজে চড়ে বিদেশে গিয়ে বাঘা বাঘা সাহেবসুবোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইংরিজিতে লেক্চার দেন? কী বললেন? ভাট বকছি! না মশাই, বৌমাকে আমার একনম্বর দাওয়াই দিয়ে দেখুন।সাতদিনের মধ্যে হাতে গরম রেজাল্ট! না পেলে আবার আমাকে কনসাল্ট করবেন, বিনে পয়সায়। প্রতি রোববার, দুপুরবেলা , এই পার্কে। ও হো হো! জানতে চান আমি এখানে কি করছি? আমার ওষুধ আমার বাড়িতেই কেন ফল দেয় নি? সে মশাই গুঢ় তত্ত্ব। এ'রকম চেঁচিয়ে বলা যাবে না। শুধু আপনাকে বলতে পারি। উঠে আসুন। হ্যাঁ, এদিক দিয়ে। দেখুন স্টেজের বাঁ পাশে ছোট্ট সিঁড়ি আছে। আর হ্যাঁ, লাইটের তার-টার গুলো একটু দেখে, নইলে গোটা স্টেজ অন্ধকার। হ্যাঁ, আসুন। এসে এই বেঞ্চে আমার পাশটিতে চুপটি করে বসুন। তারপর বলছি। আরে মশাই, অনেক জায়গা আছে।যদি হয় সুজন, তো তেঁতুল পাতায় ন'জন। আর এত বড় বেঞ্চ, খালিই পড়ে আছে। [দর্শকদের থেকে একজন মঞ্চে উঠে আসে।] ২য়ঃ দেখুন মশাই, অনেক হয়েছে। তখন থেকে আপনার আগড়ম বাগড়ম শুনে যাচ্চি, এবার ঝেড়ে কাশুন দিকি! সবাই কে তো ঘরে থাকার ফর্মূলা ৪৪ দিচ্চেন, নিজে কী কচ্চেন? কথায় বলে না--আপনি আচরি ধম্মো! তা আপনাকে কে হুড়ো দিচ্চে? গিন্নি না বৌমা? গিন্নি? [১ম ইশারায় উপরের দিকে দেখায়।] ও, আপনারো সেই দশা! তা আপনিও তো সিনিয়র সিটিজেন। সেই সিটিজেন'স চার্টার নিজের বাড়িতে অচল। এই সব বক্তিমে ছেলে-ছেলে বউকে শোনান না! সে ব্যাপারে লবডংকা! কিচুই বুঝলাম না! আপনার মাথার ব্যামো নেই তো? অনেক্ক্ষণ পেটে কিচু পড়েনি বুঝি? বেচারা! চিনেবাদাম চলবে? আমার কাছে একটু বেঁচে আছে। ১মঃ আরে না মশাই। যা ভাবছেন তা একেবারেই নয়। বৌমা আমার খুব যত্ন করে। আমার খুঁটিনাটি খেয়াল রাখে। সকালে বেড-টি, বিস্কিট। রোজ নতুন নতুন জলখাবার। দশটায় মৌসুমী ফলটল। হরলিক্স। চানের সময় গরম জল।দুপুরে বাঁশকাঠি চালের ভাত। মাছের ঝোল। রোব্বারে মাংস। দুদিন অন্তর বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় পাল্টে দেওয়া। বিকেল সাড়ে চারটেয় ঘড়ি ধরে চা। সন্ধ্যেয় টিভিতে সিনেমা। আমার ঘরে আলাদা পোর্টেবল সেট। রাত্তিরে ঘড়ি ধরে শুতে পাঠায়, মশারি টাঙিয়ে দেয়। ২য়ঃ ডাক্তারের চেক আপ? ১মঃ প্রতি মাসে নিয়ম করে। ঘরে এসে প্রেসার চেক। ছ'মাসে সুগার কোলোস্টেরল টেস্ট, ইসিজি। ২য়ঃ ওব্বাবা! আপনি তো ভগোবানের বরপুত্তুর! আর বইপত্তর? ১মঃ হ্যাঁ, দুটো কাগজ।একটা ইংরিজি আর একটা বাংলা। দেশ পত্রিকা। পাড়ার লাইব্রেরির কার্ড। বৌমা নিজে গিয়ে বই বদলে আনে। ২য়ঃ উঃ! কালীদা গো কালীদা! আর পারি না। সবই বুঝলাম। এসব হল গতজন্মের পুণ্যি! এবার আপনার সিরিয়ালের টুইস্ট? ১মঃ টুইস্ট? ২য়ঃ হ্যাঁ মশাই। হর কহানী কে অন্ত মেঁ এক টুইস্ট হোতা হ্যায়। নইলে ঘরে এত যত্ন আত্তি ! তবু আপনি দুকুরবেলা এখানে বসে! ১মঃ বলছি, বলছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে।আগে একটু ভিজিয়ে নিই। [সঙ্গের ঝোলার থেকে একটি জলের বোতল ও আনন্দবাজার পত্রিকা বের করে পত্রিকাটি ২য়ের হাতে ধরিয়ে দেয়, তারপর বোতল থেকে এক ঢোঁক খেয়ে তৃপ্তির শব্দ করে বেঞ্চিতে বসে, ২য়কে বসায়।] ২য়ঃ (কিঞ্চিৎ বিরক্ত) কই মশাই, শুরু করুন। ১মঃ বলছি, বলছি। আপনাকে ছাড়া কাকে বলব? একজন কাউকে তো বলতেই হবে। ২য়ঃ ধেত্তেরি, যত ভ্যান্তারা। বুইতে পেরেচি, নজ্জা করচে! ছেলে পোঁচে না, ছেলেবৌ ভাত দেয় না! সেই হরিদাসের গুপ্তকতাটা আবার কানে কানে বলতে হবে! এদিকে দুনিয়ার পাবলিককে ফিরিতে জ্ঞানদান কচ্চে , যেন ক্লাবকে সরকারি ডোনেশন! আমি চল্লেম, তোমার দৌড় জানা আচে। বলি ' এতই তোর বুদ্ধি হলে, আজ কেন তোর ক্যাঁতা বগলে?' চল্লেম! [ ২য় পত্রিকটি বেঞ্চের ওপর ছুঁড়ে ফেলতেই ১মজন হাঁ-হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটা তুলে নেয়। ২য় একটু অপ্রস্তুত।] কী আচে ওতে? কোন সাত রাজার ধন মাণিক? ১মঃ আরে ওটাই তো আসল! ওর জন্যেই তো এখানে আসা! ওটাকে অমন হতচ্ছেদ্দা করলে ধম্মে সইবে? ২য়ঃ আমি আবার কাকে হতচ্চেদ্দা করলাম? ১মঃ আরে এই পত্রিকাটা; এই রোববারের আনন্দবাজার! এর জন্যেই গোটা সপ্তাহ হা-পিত্যেশ করে বসে থাকি। এর জন্যেই চুপিচুপি দুপুরের রোদে পার্কে এসে বসি। ২য়ঃ মানে? নিজের ঘরে বসে আনন্দবাজার পড়তে পারেন না? আর এদিকে বড়ফট্টাই হচ্চে যে ছেলে-ছেলেবৌ আমায় চোকে হারায়? এমন ধ্যাষ্টামো-- ১মঃ দূর মহায়! এই দেখুন 'পাত্রপাত্রী' কলমগুলো। এগুলো কখনো মন দিয়ে পড়েছেন? ২য়ঃ খামোকা কেন পড়তে যাবো? ছেলের পরে একটি মেয়ে ছিল। তা তিনি অফিসের মাদ্রাজি বসের সাথে রেজিস্ট্রি করে মুম্বাইয়ে ঘর বেঁধেছেন। বুড়ো বয়সে নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে রোববার রোববার ওই সব কলম দেখব আর লালকালিতে দাগাব, সে চান্সই দিলে না। আপনারও কি মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি? ১মঃ আরে আমারও একই অবস্থা। এক ছেলে আর বৌমা। সে ইন্টারনেটে সার্চ করে ওদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আমি এগুলো দেখি নির্মল আনন্দের খোরাক বলে। শুনবেন নাকি দু-একটা স্যাম্পল? (খুলে পড়তে থাকে) এই যে, এটা দেখুন। 'সুন্দরী ফর্সা শিক্ষিতা পাত্রীর জন্য কেঃ সঃ চাঃ/ রাঃসঃ চাঃ / বেঃ সঃ চাঃ পাত্র চাই। বা বেঃ সঃ নেশাহীন সুপাত্র কাম্য। ২য়ঃ এইসব কেঃ সঃ চাঃ/ রাঃসঃ চাঃ / বেঃ সঃ চাঃ কোডের মানে? ১মঃ তা ও জানেন না? কেন্দ্রীয় সরকারী চাকুরে/ রাজ্য সরকারি চাকুরে/ বেসরকারী চাকুরে। আরো দেখুন। কি পরিমাণে ডিভোর্সী কেস? এটা—ডিভোর্সী --- সন্তান নেই; এটা--শুধুই রেজিস্ট্রি, আইনে অসিদ্ধ, সোশ্যাল হয় নি। আর এটা-- সোশ্যাল ম্যারেজ হইয়াছিল। কিন্তু অষ্টমঙ্গলার পর হইতেই কন্যা পিতৃগৃহে; পতিসংসর্গ হয় নাই। ২য়ঃ উঃ থামুন তো! মাথা ধরিয়ে দিলেন। এইসব ফালতু জিনিস পড়তে আনন্দবাজার বগলে নিয়ে পার্কে আসেন? কেন? নিজের ঘরে বসে বৌমার দেওয়া চা অথবা ফলের রসে চুমুক দিতে দিতে-- ১মঃ আরে সেটাই তো রহস্য। আস্তে আস্তে ভাঁজ খুলছি।তার আগে আরও কিছু স্যাম্পল দেখুন না! -- এই যে, উজ্বলশ্যামবর্ণা, ম্যাট্রিক পাস, গৃহকর্মনিপুণা, সম্ভ্রান্ত পূঃবঃ সম্ভ্রান্তবংশীয় সৌকালীন গোত্র, কায়স্থ। সুউপায়ী, সৎপাত্র কাম্য। পঃ বঃ চলিবে না। কী বুঝলেন? অমন হাঁ-মুখ দেখেই বুঝেছি, বোঝেন নি। শুনুন, বলছে বাঙাল কায়স্থ পড়াশোনায় লবডংকা, কালো মেয়ে। কুলীন কায়স্থ। তবে ছেলে ঘটি হলে চলবে না। -- -- আর এটা, সুন্দরী ফর্সা শিক্ষিত (অনধিক ২৫/২৬) পাত্রী চাই। পাত্র বিদেশে নামজাদা মালটিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত। শীঘ্র বিবাহ; কোন দাবিদাওয়া নাই। কেবল প্রকৃত সুন্দরীর অভিভাবকগণ ফোটো সহ আবেদন করুন। ২য়ঃ শালা, যেন চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। ১মঃ এটাকে কী বলবেন? পাত্র (৪০) কোলকাতার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী স্বর্ণবণিক পরিবারের একমাত্র পুত্র। কলিকাতায় নিজস্ব বাড়ি আছে। মাসিক আয় (৪০০০০/-)। জাতিবন্ধন নাই। তবে চাকুরিরতা অথবা পূঃবঃ কাম্য নহে। ২য়ঃ ঢের হয়েছে। ক্ষ্যামা দিন; আর পারছি না। ১মঃ ব্যস্ ব্যস্; এই শেষ মণিমুক্তোঃ গরীব পরিবারের মেধাবী পুত্র। সম্পন্ন পরিবারের কানা/খোঁড়া বা যে কোন খুঁতসম্পন্ন কন্যাকে বিবাহ করিতে রাজি। ঘরজামাই প্রস্তাবেও আপত্তি নাই। অভিভাবকগণের অনুমতি আছে। ২য়ঃ ঘেন্না ধরে গেল। ১মঃ আমারও । দেখছেন? সমাজ কোন পথে চলেছে? সোজা অধঃপতন। ২য়ঃ খুব দেখছি, পতন তো অধঃই হয়; উর্দ্ধপতন বলে কিছু হয় কি? ১মঃ অ্যাই, কোন অশ্লীল কথা নয়; এটা ভদ্রলোকের পাড়া। ২য়ঃ অশ্লীল কথা কেউ বলেনি, আপনার নোংরা মন, তাই সাধারণ কথার বিকৃত মানে করছেন? ১মঃ কী বললেন? আমার নোংরা মন? ২য়ঃ নয়তো কি? নইলে কেউ এই বয়সে পার্কে বসে ঐসব অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ঘাঁটে? বিকৃতরুচি! ১মঃ শুনুন মশাই; আমরা হলাম ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার সাজনপুর পরগণার তালুকদার ফ্যামিলি। সেই ইংরেজ আমল থেকে।আমাদের বংশে কেউ সরকার বাহাদুরের খাজনা বাকি রাখে নি। অনাবৃষ্টির বছরেও, ফসলের দাম পড়ে গেলেও। দশটা গাঁয়ে আমাদের সুনাম ছিল। চরিত্র নিয়ে কোন কথা উঠে নি। আর আপনি— ২য়ঃ সে কী! আপনিও তালুকদার? আমরাও তাই। তবে যশোরের নড়াইল এলাকার। খুঁজলে হয়ত লতায়-পাতায় একটা আত্মীয়তা বেরিয়ে পড়তেও পারে। ১মঃ না, পারে না। যশোর জেলায় কোন তালুকদার হতে পারে না। আপনারা নকল। ২য়ঃ কী আবোলতাবোল বকছেন? আমাদের পদবী তালুকদার পরাশর গোত্র। আপনি না-না করলেই হল? যত্ত কাঠবাঙালের গোঁ! ১মঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের পদবী তালুকদার নয়। আমরা আসলে সাজনপুর পরগণার গোটা তালুকের মালিক। ডায়রেক্ট ইংরেজ সরকারকে খাজনা দেওয়া হত; তাই উপাধি তালুকদার। এ নিয়ে আজও আমাদের পরিবারের সবাই গর্বিত। ২য়ঃ এতে গর্বিত হওয়ার কী আছে? ১মঃ আরে, মাঝখানে কোন মিডলম্যান বা মধ্যসত্ত্বভোগী নেই। সোজা সরকার বাহাদুরকে খাজনা দেওয়া। কত্ত বড় সম্মান! আপনি এসব বুঝবেন না। ২য়ঃ কেন বুঝব না? আমাদের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের আস্তাবলের সহিস। উনি একদিন ঘোড়ার একটা বাতিল জিন থেকে একটুখানি চামড়া আর রবারের টুকরো কেটে নিয়ে গুলতি বানিয়ে নাতিকে দিয়েছিলেন। তো ধরা পড়ে যান। তখন ম্যজিস্ট্রেট বাহাদুর তাঁকে কাছারিতে ডেকে এনে সবার সামনে হান্টার দিয়ে চাবকে ছিলেন। সেই ঘা শুকোতে অনেক দিন লেগেছিল। আজও আমরা প্রপিতামহের পিঠে সেই চাবুকের দাগ নিয়ে গর্ব অনুভব করি। ১মঃ এসব কী ভাট বকছেন? সাহেব কষে চাবকেছে তো গর্বিত হওয়ার কী আছে? ২য়ঃ সায়েব সবার সামনে জামা খুলিয়ে নিয়ে নিজের হাতে চাবকেছে। ডায়রেক্ট! মাঝখানে কোন মিডলম্যান ছিল না। কী গৌরবের কথা। আপনি বুঝবেন না। ১মঃ ঠাট্টা করছেন? সে করুন গে। কিন্তু আপনাদের তালুক কেন, নিজের বলতে বোধহয় এক ছটাক জমিও ছিল না। আমাদের গোটা একটা পরগণা। ২য়ঃ হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না। কিন্তু আপনাদের সেই তালুকও তো 'ছিল', এখন 'নেই'। এখন আপনি হরিদাস পাল ছেলেবৌমার চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে এখানে পার্কে পত্রিকা পড়ছেন। কাজেই আমিই আসল তালুকদার, ওটাই আমার পদবি; আপনি নকল। ১মঃ ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনিই ঠিক। আমিই ভুল। আসুন আমরা মিটমাট করে নেই। (হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু ২য় দু'পা পিছিয়ে যায়।) কী হল? ২য়ঃ না মানে আমি কোলাকুলি করি না। ১মঃ সে কী, বিজয়দশমী বা ঈদের দিনেও না? ২য়ঃ না; আমার ওইসব জাদুই ঝাপ্পি দেওয়া নিয়ে একটু রিজার্ভেশন আছে। ১মঃ আচ্ছ? কারণটা বলতে আপত্তি আছে? ২য়ঃ না, মানে ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে কংসবধ পালা দেখেছিলাম। সেখানে নিজের পিতাকে কেন বন্দী করেছে সেটা খোলসা করতে গিয়ে কংস বলছে যে আসলে ওর মা কোন দৈত্য। সে ব্যাটা ভরবিকেলে কোন উদ্যানে গিয়ে কংসের মাকে একা পেয়ে আলিঙ্গন করল, আর তার ফলে কংসের জন্ম হল। তখন থেকেই আমার মনে কোলাকুলি নিয়ে কেমন ভয় ধরে গেছে। ১মঃ ধ্যাত্তেরি! আপনি বা্চ্চা নাকি? ওসব তো রূপক বা প্রতীকাত্মক। সাহিত্যে বোঝাতে গেলে--। ২য়ঃ আমিও সাহিত্যে এম এ। তবে ইংরেজিতে। বুঝি সবই। তবে বলা তো যায় না। যদি কিছু হয়ে যায়। এটা ভারতবর্ষ। ১মঃ আপনিও আজব লোক মশাই। অবশ্যি তালুকদারেরা ও'রম একটু হয়েই থাকে। তো শেকহ্যান্ড করতে তো কোন আপত্তি নেই? ২য়ঃ তা নেই। কিন্তু আগে আপনি বলুন ঘরে বসে কেন পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়তে পারেন না? কেন ঝোলায় পুরে পার্কে এসে পড়তে হয়? ১মঃ (মাথা চুলকে) উপায় নেই। নিজের ঘরে সারাক্ষণ হয় বৌমা নয় ছেলে আমাকে চোখে চোখে রাখে। বাবা, এবার একটু বেদানা, এই দু'কুচি আপেল, এবার মুরগির আংসের স্টু! আচ্ছা বাবা , আগের বইটা মানে নারায়ণ সান্যাল আপনার পড়া হয়ে গেছে? আজকে বদলে দিছি। জরাসন্ধ পড়বেন? উঃ হাঁপিয়ে উঠেছি। যেন চিড়িয়াখানায় বাঘকে খাঁচায় ঢুকিয়ে যত্ন আত্তি করা হচ্ছে। আমাদের বাড়িতে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন আসে না। কার সঙ্গে মনের কথা বলব। ২য়ঃ তা আপেল বেদানা মুর্গীর ঠ্যাং চিবুতে চিবুতেই না হয় রোববারের আনন্দবাজার পড়তেন; প্রবলেম কোথায়? ১মঃ ওই পাত্রপাত্রীর পাতাটা খুলতে দেখলেই ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়।তক্ষুণি শুরু হবে ঘ্যানঘ্যান। (নকল করে)-বাবা, আমরা কি আপনার যত্ন আত্তি করি না?তবে কেন ঐসব ছাইপাঁশ পড়েন? - বল বাবা, তোমায় ঠিক করে খেতে পরতে দিই না? ২য়ঃ মানে? ১মঃ মানে ওরা ভাবে আমি বুড়ো বয়সে আবার বিয়ে করতে চাই; নিদেন পক্ষে সঙ্গী খুঁজছি। ভয় পায়, যদি উইল বদলে ফেলি, যদি বাড়ি আর ব্যাংক ব্যালান্স কোনো উড়ে এসে জুড়ে বসা শাকচুন্নি হাতিয়ে ফেলে? কত বুঝিয়েছি যে আমি এই বয়সে আবার ছাঁদনাতলায় যাওয়ার চক্করে নেই; কিন্তু ভবি ভোলে না।তাই লুকিয়ে পার্কে এসে পড়ে নেওয়া ছাড়া কোন রাস্তা নেই। ২য়ঃ উই আর ইন দ্য সেম বোট ব্রাদার! এবার হাত মেলাতে পারি। আমাদের তালুকদার ক্লাবে আপাততঃ দুজন সদস্য--আমি নামে তালুকদার, আপনি কামে তালুকদার। ১মঃ তাহলে আমি তালুকদার নম্বর এক; আপনি দুই। না না, রেগে যাবেন না। আপনাকে দুনম্বরি বলছি না।(ঘড়ি দেখে) এই রে, চারটে বেজে গেছে। আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। নইলে বৌমা চিন্তা করবে। ও আবার ঘড়ি ধরে সাড়ে চারটেয় চা দেয় কি না! আর আপনিও বাড়ি যান। গিয়ে আমার দাওয়াই নম্বর এক প্রয়োগ করুন। আর সাতদিন পরে রোববার দুপুরে এসে আমাকে প্রগ্রেস রিপোর্ট করুন। ২য়ঃ (দর্শকদের) আপনারাও আসুন, নতুন ফর্মূলা শিখতে, আগামী রোববার দুপুর দুটোয় ঠিক এই খানে। দ্বিতীয় দৃশ্য =========== [পার্কের বেঞ্চিতে বসে ১ম ও ২য় খোসগল্পে মেতে আছে] ১মঃ বাঃ, আপনি তো হেভি অ্যাক্টিং করতে পারেন মশাই! তা আপনার ডায়লগ শুনে বৌমা কী বললে? ২য়ঃ ও প্রথমে চোখ গোল গোল করে খানিকক্ষণ আমাকে দেখল। তারপর একটা মোড়া টেনে কাছে এসে বলল-- না বাবা, এই সিরিয়ালে শ্বশুর তেমন একটা ন্যালাক্যাবলা নয়, এক সপ্তাহ নিয়মিত দেখলে বুঝতে পারবেন। ও'রকম শ্বশুর আছে রাত ন'টার সিরিয়ালে--নামটা হল "চরকা কাটে চাঁদের বুড়ি" । সেটায় শাশুড়ি খুব ভাল। বৌটা নানান প্যাঁচ কষে, দিনভর গুজগুজ ফুসফুস করে দেওরের মাথা খায়, কু'মন্তর দেয়। আর শাশুড়ির ক্ষুরধার বুদ্ধি , ঠান্ডা মাথা; বৌটার সব প্যাঁচ মাঞ্জা দিয়ে ঢিল ছেড়ে খেলার মত করে খেলিয়ে কুচ কুচ করে কেটে দেয়। দেখবেন নাকি বাবা? আমি মাথা হেলিয়ে সায় দেওয়ায় নাচ বোলিয়ে স্টেপে রান্নাঘরে গিয়ে দু'কাপ গ্রিনলেভেল লিপটন চা নিয়ে এল। ১মঃ মার দিয়া কেল্লা! ২য়ঃ এবার? ১মঃ এবার দুনম্বর ফর্মূলা। আপনাকে একসপ্তাহ পরে বলতে হবে--বৌমা, তুমি যখন ব্যস্ত থাক, মানে টুকুনকে স্কুলে ছাড়তে গেলে, আনতে গেলে, কি পার্লারে গেলে--তখন যদি আমি বাংলা বা ইংরেজি খবরের চ্যানেলগুলো বা ফুটবল ক্রিকেট টেনিস একটু দেখি, তো আপত্তি আছে? তবে তুমি আসলেই আমি রিমোট ফেরত দিয়ে দেব। আর যখন রিয়েলিটি শো হবে, যেমন মাধা-গাধা-নিসা বা ধিতাং ধিতাং বোলে-- তখন তো অন্য কিছু দেখার প্রশ্নই ওঠে না, কী বল? ২য়ঃ তাতে আমার কোন মোক্ষলাভ হবে? ১মঃ হবে, হবে। আগামী দুটো রোববার ছেড়ে তিননম্বর রোববারে এই পার্কে এসে আমাকে রিপোর্ট করবেন। আরে আমার ওপর ভরসা রাখুন। বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ। ২য়ঃ ইয়েস, এইভাবে চললে লাইফ একদম হলিউড জলিগুড হয়ে যাবে। থ্রি চিয়ার্স ফর তালুকদার ক্লাব- (একসঙ্গে) হিপ -হিপ-হুররে! (দুজনে হাসিমুখে উঠে দাঁড়ায়। হাত ধরাধরি করে নাচতে থাকে।) "আমরা দু'টি ভাই, শিবের গাজন গাই, একটি-দুটি পয়সা পেলে বাড়ি চলে যাই। আমরা দু'টি ভাই---"। (হঠাৎ বেঞ্চির পেছন থেকে কেউ চেঁচিয়ে ওঠে-- " ফাউল! ফাউল! দুই নয় তিন; থ্রি মাস্কেটিয়ার্স"! " সেই শুনে দুই তালুকদার চমকে উঠে প্রায় ভিরমি খায় আর কি! তারপর দুজনে বেঞ্চির পেছনে উঁকি মেরে দেখতে থাকে এই চিৎকারের উৎস কোথায়! এমন সময় বেঞ্চির পেছন থেকে উঠে দাঁড়ায় আরেক জন। তালুকদার নম্বর তিন। সে উঠে হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে, তারপর হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেয়। দুজনের কেউই হাত মেলায় না, এক পা পিছিয়ে আসে।) ১মঃ অমন বিচ্ছিরি ফাউল-ফাউল চিৎকার কি আপনার? ৩য়ঃ আজ্ঞে হ্যাঁ। ২য়ঃ নিকুচি করেছে ‘আজ্ঞে-আপনির’। কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন জানেন? যদি হার্ট অ্যাটাক হত? ১মঃ আগে বলুন, চেঁচালেন কেন? ৩য়ঃ সরি সরি! আসলে আপনারা ভুল বললেন না, তাই। ১মঃ কী ভুল? ৩য়ঃ ওই যে বললেন--দুই তালুকদার,সেটা তো ভুল। ২য়ঃ কীসের ভুল? ৩য়ঃ আরে দুই নয়, তিন হবে, তিন তালুকদার। ২য়ঃ অ ! তা সেই তিননম্বর শ্রীমান কখন আবির্ভূত হবেন? ৩য়ঃ এই যে, আপনাদের সামনে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি; তালুকদার নম্বর থ্রি। আমাকে তালুকদার ক্লাবে নেবেন না? ১মঃ ইয়ার্কি হচ্ছে? আপনিও তালুকদার! কোথাকার? ৩য়ঃ আজ্ঞে, আমি কবি তালুকদার। কোথাকার জানিনা।জন্ম থেকে কোলকাতার। ২য়ঃ এটা কোন নাম হল? ৩য়ঃ কেন নয়? বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত গায়কের নাম যদি কবি মজুমদার হয়, সেই যে " যৌবন-সরসী নীরে" গাওয়া--তো আমি তো কবিতা লিখি-- আমাকে কবি তালুকদার বলে মেনে নিতে আপত্তি কেন? ১মঃ আপনি কবিতা লেখেন? ৩য়ঃ এই একটু আধটু; শুনবেন নাকি? ২য়ঃ সে শুনবো'খন। তার আগে বলুন তো, আপনি কোত্থেকে উদয় হলেন? ১মঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ; আর আড়ি পেতে আমাদের কথা শুনছিলেন কেন? ৩য়ঃ না ঠিক আড়ি পাতি নি। অনেক আগেই বেঞ্চির উপর ওই কৃষ্ণচুড়া গাছের ছায়া দেখে ওর পেছনে, মানে মাটিতে হেলান দিয়ে বসেছিলাম। তারপর কখন যে চোখ লেগে গেছল আর আমি গড়িয়ে প্রায় ওর নীচে ঢুকে পড়েছিলাম টেরই পাইনি। ১মঃ এই যে, কেন মিথ্যে কথা বলছেন বলুন তো? আমাদের কথা কান পেতে না শুনলে কী করে ঠিক সময় দুয়ের জায়গায় তিন তালুকদার বলে অমন চেঁচিয়ে উঠলেন? ঊঃ, পিলে চমকে গেছল মাইরি! ৩য়ঃ সরি, সরি! আসলে কাল সারারাত ঘুম আসে নি। তাই এখানে গাছের ছায়ায় ঝিরঝিরে বাতাসে চোখ বুজে গেছল। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। কানে এল আপনাদের কথাবার্তা। তখন মনে হল আরে আমিও তো তালুকদার, নকল নয়,পৈতৃক পদবি। তো আপনাদের সঙ্গে দোস্তি করলে কেমন হয়? একেবারে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! ২য়ঃ এঃ, একেবারে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। তবু স্বপ্ন দেখা চাই। ৩য়ঃ ঠিক তাই; স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ২য়ঃ ওরে বাবা, স্বপ্নগুলোকে! একটা স্বপ্নকে নিয়েই কত ঝামেলা। আর এতগুলো স্বপ্ন? কী লোক মাইরি আপনি। ৩য়ঃ কেন আপনার আমার সবার স্বপ্ন। আলাদা আলাদা স্বপ্ন। আপনি কোন স্বপ্ন দেখেন না? নিশ্চয়ই দেখেন। ১মঃ এত জোর দিয়ে বলছেন কী করে? আমাদের আপনি কতটুকু চেনেন? ৩য়ঃ আপনারা বেঁচে আছেন যে! তার মানে আপনাদের স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয় নি। সবচেয়ে দুর্ভাগা সে যার কোন স্বপ্ন নেই। সে আসলে বেঁচে নেই। মুশকিলটা এই -- সে নিজেও জানে না যে কবে মরে গেছে। ২য়ঃ ও! সে নিজে জানে না বেঁচে আছে কী মরে? অথচ আপনি জানেন! আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে। ৩য়ঃ ঠিক তাই; ও জানে না, কিন্তু আমি জানি ও কবে মারা গেছে। ২য়ঃ বেশ, বলে ফেলুন ও কবে মারা গেছে। ঢ্যামনামি! ১মঃ কী হল মশাই, বলুন। কবে? ৩য়ঃ যেদিন থেকে ও স্বপ্ন দেখা ছেড়েছে। ২য়ঃ এটা কোন উত্তর হল? ৩য়ঃ কেন নয়? ২য়ঃ আমি জিগ্যেস করলাম-- কবে ভাল হব ডাক্তারবাবু? উনি জবাব দিলেন-- যে দিন অসুখ সেরে যাবে। ক্লাসে স্যারকে জিগ্যেস করলাম-- কাগজ সহজে পুড়ে যায় কেন? উত্তর পেলাম-- কাগজ হল দাহ্য পদার্থ। বোঝ ঠ্যালা। আরে দাহ্য পদার্থ মানেই তো যেটা সহজে পোড়ে! তেমনি আপনার কথা। স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিলে মানুষ মরে যায়। বেশ! অমুক কবে মরেছে? যেদিন ও স্বপ্ন দেখা ছেড়েছে। এগুলো কোন উত্তর নয়।শুধু প্রশ্নটাকেই ঘুরিয়ে বলা। লজিকের ভাষায়--; নাঃ থাকগে। ৩য়ঃ কী হল, বলুন--লজিকের ভাষায়? (উত্তেজিত হয়ে আঙুল তুলে) হ্যাঁ, থামবেন না,থামতে নেই। বলুন--লজিকের ভাষায় এদের বলে--? ২য়ঃ (নীচু গলায়)সার্কুলার রিজনিং। ফ্যালাসি। প্রশ্নটাকেই ঘুরিয়ে উত্তর বলে চালিয়ে দেওয়া- প্রমাণ নয়, প্রমাণের ভড়ং। ৩য়ঃ আপনি লজিক পড়েছেন? ২য়ঃ (নীচু গলায়) পড়াতাম। গাঁয়ের স্কুলে। আমার পাশের গাঁয়ে। ৩য়ঃ এটাই আপনার স্বপ্ন ছিল? ২য়ঃ (নীচু গলায়) হ্যাঁ, মানে না। আমি ফিলজফি পড়ে ভাবলাম সবার লজিক শেখা উচিত। সবার। চাষী, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, আমলা, মন্ত্রী, দলগুলো--সবার। ১মঃ তাতে কী কচুপোড়া হত? ২য়ঃ বিশ্বাস করতাম --সবাই যদি লজিক্যালি ভাবতে শেখে তাহলে নিজেদের ভুল বা কুযুক্তিগুলো বুঝতে পারবে। খামোকা এঁড়ে তক্কো, গাজোয়ারি বন্ধ হবে। লোকে ভাল থাকতে শিখবে। ১মঃ কেমন করে? ২য়ঃ সবাই লজিক দিয়ে দেখলে তো একই সিদ্ধান্তে পৌঁছবে, তাই না? ৩য়ঃ তারপর? ২য়ঃ দিনে দিনে লজিকের ছাত্র কমতে লাগল। এটা পড়ে ছেলেপুলেদের কী লাভ হবে, কী রকম রোজগারপাতি হবে সেটা অভিভাবকদের বোঝাতে পারি নি। ১মঃ শেষে কী হল? ২য়ঃ কী আর হবে, একদিন স্কুল কমিটি আমাকে একমাসের আগাম মাইনে দিয়ে নোটিস ধরিয়ে দিল। ওদের দোষ নেই। কাছাকাছি দশটা গাঁয়ে কোন স্কুলে লজিক পড়ানো হয় না। ৩য়ঃ তাতে আপনার স্বপ্ন দেখা থেমে গেল? ১মঃ না, থামে নি তো! নইলে কি উনি সার্কুলার লজিক আর ফ্যালাসি বলে রেফারির মত হুইসল্ বাজাতে পারতেন? ২য়ঃ এখন একটাই স্বপ্ন, ছেলে-বৌমার থেকে একটু ভাল ব্যবহার , নিদেন পক্ষে সংসারে একটু স্পেস, অর্থাৎ বলতে চাই-- আমাকে আমার মত থাকতে দাও! ৩য়ঃ সে নিয়ে পরে কথা হবে 'খন। আগে বলুন--! ১মঃ (৩য়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) না, এসব ভ্যান্তারা অনেক হয়েছে। আগে আপনি মশাই আপনার কবিতা শোনান। শুনে ঠিক করব আপনাকে তালুকদার ক্লাবের মেম্বারশিপ দেয়া হবে কী না? ৩য়ঃ নইলে? ২য়ঃ নইলে রইলে, পার্কে ঘুমনো ফোতো কবি হয়ে। ৩য়ঃ আচ্ছা বেশ, কি'রকম কবিতা শুনতে চান, যদি বলেন। ১মঃ এ আবার কী? কবিতা মানে কবিতা, ভালো কবিতা।এটা কি বাজারে মাছ কিনতে আসা? ছোট না বড়,টাটকা না পচা? ৩য়ঃ কবিতা নানা রকমের হতে পারে। অ্যাবস্ট্রাকট ছবির মত, ল্যান্ডস্কেপের বা ক্ল্যাসিক্যাল গানের মত। ২য়ঃ আচ্ছা, তাহলে ফোক সংয়ের মত বা সিনেমার পোস্টারের মত? ১মঃ বা দাদের মলমের বিজ্ঞাপনের মত, ২য়ঃ বিনা ছুরিকাঁচি অপারেশনের হ্যান্ডবিলের মত? ৩য়ঃ হ্যাঁ; সবই হতে পারে। তবে এই শতকের কবিতা অনেকটাই ব্যক্তিগত সংলাপ। ১মঃ অথবা প্রলাপ। ২য়ঃ আচ্ছা কথা কাটাকাটি থাক। আপনি ভাই স্যাম্পল পেশ করুন। ৩য়ঃ প্রথমে ধরুন--ল্যান্ডস্কেপের মত কবিতা। " শরৎকাল ব্যাঙের লাফ টুপ্ করে শব্দ।" ১মঃ তারপর? ৩য়ঃ তার আর পর নেই। এটি জাপানী হাইকু, ওইটুকুই হয়। ১মঃ হাইকু কেন, বলুন জাপানি হারাকিরি। কবিতার আত্মহত্যা। ৩য়ঃ আপনি কবিতাটি শুনে চোখ বুজে ধ্যান করুন, দেখতে পাবেন শরতের দুপুর। নির্জন। নিস্তরঙ্গ পুকুরের স্থির জলে একটি ব্যাঙ লাফ দিল। এমনই শান্ত পরিবেশ যে ঈথারে আওয়াজ উঠল-- টুপ্! ২য়ঃ এটাকে কোন গন্ডমূর্খ কবিতা বলবে? ৩য়ঃ রবীন্দ্রনাথ; নিজেই অনুবাদ করেছেন। ১মঃ মানছি না, মানবো না। রবি ঠাকুর বললেও না। ৩য়ঃ কে মানতে বলছে? বললাম তো কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয়। একজন মানলেও অন্যে না মানতেই পারে। এটা দেখুনঃ " সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে দুর্যোধনের ভাই, গর্জনে তার তূর্য বাজে, তর্জনে ভয় পাই"। ১ম ও ২য়ঃ হ্যাঁ , হ্যাঁ, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কেমন ছন্দ-মিল ও অলংকার। আর বুর্জোয়ার মুন্ডপাত করায় বেশ বিপ্লবী বিপ্লবী মনে হচ্ছে। ৩য়ঃ কিন্তু এটা কবিতা হয় নি, শুধু বাইরের খোলসটা আছে। ১মঃ কোন শালা বলে? ৩য়ঃ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্কোত্তি মশায় লিখেছেন। (১ম ও ২য় বেশ ঘাবড়ে গেছে।) ২য়ঃ আচ্ছা, কবিতা চর্চা থাক। আগে বলুন কাল গোটা রাত্তির ঘুমোন নি কেন? ৩য়ঃ আজ্ঞে কবিতা লিখছিলুম। ১মঃ গুল! একটা কবিতা লিখতে সারারাত জাগতে হয়? সে তো লক্ষ্মী আসবেন বলে কোজাগরী পূর্ণিমায়। সরস্বতীর জন্যেও এত? ৩য়ঃ নইলে উনি ধরা দেন না যে। ১মঃ দূর মশাই; কোন খাঁটি তালুকদার এমন বোকামি করে না। ২য়ঃ ঠিক আছে; ওই কবিতাটাই শুনিয়ে দিন। ১মঃ এই শেষ- হ্যাঁ। এটা শুনেই ঠিক করব আপনাকে নেব কি না! বেশ খেলিয়ে সুর করে পড়ুন দিকি। ৩য়ঃ (গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে) আমার যা কিছু প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে কবিতা ছুঁয়েছে স্বপ্নের বাতিঘর। খড়কুটো নিয়ে বুকেতে বেঁধেছে বাসা, কবিতা--আমার আড়াইটে অক্ষর। আড়াই আখরে যে প্রেম দিল না ধরা, কবিতা যে তার গোপন দীর্ঘশ্বাস। মাঝরাত্তিরে জানলায় দিয়ে টোকা, করল আমার চরম সর্বনাশ। হঠাৎ কখন অকালবৈশাখীর তান্ডবে ঘরে ঢোকে দুরন্ত হাওয়া, এক ফুৎকারে নিভিয়ে ঘরের বাতি শুরু হয়ে যায় কবিতার আসা যাওয়া।" ১মঃ ব্যস্ ব্যস-; আর পড়ার দরকার নেই। বেশ পছন্দ হল। আপনাকে মেম্বার করে নিলাম। তালুকদার নম্বর তিন! ২য়ঃ আপনি কবিতাটা বুঝতে পেরেছেন? ৩য়ঃ কবিতা তো বুঝবার জন্যে নয়, বাজবার জন্যে। ২য়ঃ আঃ, পন্ডিতি করা ছাড়ুন তো!(১ম কে) কী বুঝলেন, আমাকে বুঝিয়ে দিন। ১মঃ (লজ্জা লজ্জা মুখ করে) তেমন কঠিন তো লাগল না। কবিতা হচ্ছে ওনার স্বপ্ন বা স্বপ্নসুন্দরী। ৩য়ঃ বাঃ! তারপর? ১মঃ কিন্তু গোটা কবিতাটা কিরম অসইব্য মত। কবিতা বলে মেয়েটি, যাকে নিয়ে আপনি স্বপ্ন দেখেন- সে রাত্তিরে এসে আপনার জানলায় টোকা দিয়ে দরজা খোলা্চ্ছে। তারপর দমকা হাওয়ার মত ঘরে ঢুকে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিচ্ছে! আর বলতে পারব না।এমন লজ্জা পাওয়ার মত কবিতা লেখেন কেন? ২য়ঃ (৩য়কে)ঠিক আছে? ৩য়ঃ বললাম তো, কবিতায় ঠিক ভুল বলে কিছু হয় না। এটাও একটা ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে। আসলে কবিতা তো পাঠের পরে পাঠকের মনে তৈরি হয়। ১মঃ ওরে বাবা! আপনি তো দেখছি মহা গুরুঘন্টাল! আচ্ছা, আপনার কোনটা পছন্দ? ৩য়ঃ মানে? ১মঃ মানে এই গাঁজা, ভাঙ, চরস, এলএসডি। ৩য়ঃ হঠাৎ এরকম প্রশ্ন? ১মঃ রাগ কইরেন না। মিনিমাম নেসাসারি কৌতূহল, স্যার। সবাই জানে উঁচুদরের কবিতা লিখতে গেলে ব্যোমভোলে বলে একটু ওইসব সেবন না করলে হয় না। মানে নেশার সিঁড়ি বেয়ে তুরীয় মার্গে পৌঁছুলে তবেই দিনের বেলা গোলাপী হাতি দেখা যায়। ৩য়ঃ আচ্ছা, তাহলে কবিতা লেখা আর গোলাপী হাতি দেখা একই জিনিস? ২য়ঃ মেটাফর স্যার , মেটাফর। আসলে কবিরা মাটির থেকে দেড় ইঞ্চি উঁচুতে উঠে নিজের একান্ত ভুবন তৈরি করেন তো! তাই বলছিলাম কী--! ৩য়ঃ দেখুন, আমার ব্যাগে একটু ভোদকা আছে, ইম্পোর্টেড। চলবে? ২য়ঃ না মশাই। আমি ওসব ছুঁই নে। বুড়ো বয়সে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে বৌমার কাছে এখনও যতটুকু ইজ্জত আছে তা খোয়াব নাকি? ৩য়ঃ কিছু হবে না। এ আপনার দেশি চোলাই বা ধেনো নয়। কোনো উগ্র গন্ধ নেই। মৌরি চিবিয়ে বাড়ি যাবেন। কিস্যু হবে না। ২য়ঃ বলছেন? ৩য়ঃ আরে মশাই গ্র্যান্টি দিচ্ছি। ২য়ঃ না থাক। ১মঃ আমি রাজি। সোজা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব, ব্যস। ৩য়ঃ(ঝোলা থেকে একটি জলের বোতল বের করে, আর চানাচুরের প্যাকেট)। নিন, দুগ্গা বলে শুরু করুন। বোতলের ঢাকনা দিয়ে আলগা করে খাবেন, ব্যস। (১ম শুরু করে)। ব্যস্,আপনিই বা বাদ যাবেন কেন? একযাত্রায় পৃথক ফল? কাম অন্! বী এ স্পোর্ট্! ২য়ঃ কী জানেন! অনেক আগের কথা। ছেলেটা কলেজে পড়ছে। মেয়েটা ইস্কুলে। স্কুল কমিটি আমাকে সদ্য সদ্য একমাসের আগাম মাইনে আর প্রেমপত্র ধরিয়েছে। আমি বাড়ি না ফিরে ফুটবল মাঠের পাশে বসেছিলাম। হিন্দি টিচার, গেম টিচার আর কারিগরি শিক্ষার টিচারের সঙ্গে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। ছেলেরা সব ঘরে ফিরে গেছে। ওরা বলল মন খারাপ কর না। দুঃখকে ভুলে সামনে দেখ। ঠাকুর ঠিক পথ বাতলাবেন। হিন্দি টিচার বলল- হাঁ ইয়ার, ইস গম কো মার ডালো। বুঝতেই পারছেন, ওদের কথায় ভেসে গেলাম। অভ্যেস নেই। নেশা হয়ে গেল। ওরা ধরে ধরে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিল। ৩য়ঃ তারপর? ২য়ঃ তারপর যা হল সে আর বলার মত নয়। ১মঃ তালুকদারদের কাছে কিছু লুকোতে নেই। বলে ফেলুন। ২য়ঃ আমার গিন্নির সে কী রণচন্ডী মূর্তি! শুধু তাই নয়, ছেলেমেয়ে দুটোকে উসকে দিল। ওরা চেঁচাতে লাগল-- বাবা, তুমি মুত্ খেয়েছ, মুত খেয়েছ। আমাদের ফ্যামিলির নাক কেটেছ। এত কষ্ট পেয়েছিলাম--আর ছুঁই নি। ১মঃ তাতে লাভটা কী হয়েছে? এবার বিদ্রোহ করুন। ছেলে ছেলে-বৌ কিছু বললে বলবেন--বেশ করেছি। নিজের জমা পয়সায় খেয়েছি। আমাকে আমার মত থাকতে দাও। বাড়াবাড়ি করলে দুই তালুকদার এসে তোমাদের ক্লাস নেবে। ৩য়ঃ হিয়ার! হিয়ার! থ্রি চিয়ার্স ফর ক্লাব তালুকদার। থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের মটো মনে আছে তো? ২য়ঃ হ্যাঁ, ওয়ান ফর অল। ১ম ও ৩য় (একসঙ্গে)ঃঅল ফর ওয়ান। ২য়ঃ (হাসে) দেখবেন, নেশা টেশা হবে না তো? ৩য়ঃ কিস্যু হবে না। হলে আমরা আপনাকে সেই ধরে ধরে বাড়ি পৌঁছে দেব। (সবাই হাসে। খাওয়া শুরু হয়।) ১মঃ বেশ ফুরফুরে লাগছে। একটা গান গাই? ২য়ঃ এই না না; পাবলিক প্লেসে বসে আছেন। আপনার বোধহয় নেশা হচ্ছে। ১মঃ তাহলে একটা কবিতা শোনাই? বাংলা হাইকু? ল্যান্ডস্কেপ? “গাছের ডালে বসে একজোড়া পাখি। একটা এদিকে উড়ে গেল আর একটা ওদিকে।“ দেখলেন তো? আমার নেশা হয় নি। ৩য়ঃ হয় নি তো। সত্যিই হয় নি। ১মঃ ঠিক বলেছেন। এবার তাহলে একটা গানই গাই। ৩য়ঃ শুধু গান? যা যা প্রাণে চায় সব করুন। ১মঃ (ব্রতচারীর গান গাইতে থাকে) আমরা বাঙালী সবাই বাংলা মা'র সন্তান, বাংলা ভূমির জল-হাওয়ায় তৈরি মোদের প্রাণ। মোদের স্নেহ মোদের ভাষা মোদের নাচার গান, বাংলাভূমির মাটি-হাওয়া-জলেতে নির্মাণ। (এই কটি লাইনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে থাকে, ৩য় যোগ দেয়। তারপর দুজনে উঠে ব্রতচারীর নাচ নাচতে নাচতে এগিয়ে যায়, আবার একইভাবে পিছিয়ে আসে। এরপর ওরা ২য়কে দুহাত ধরে টেনে তোলে। অবশেষে তিনজনে হাত ধরাধরি করে একই লাইন গাইতে গাইতে নাচতে থাকে।) তৃতীয় দৃশ্য ====================== [স্টেজে শুধু ৩য় দাঁড়িয়ে; ফ্রন্ট স্টেজে গিয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে] ৩য়ঃ সেদিন যা হল না, বললে পেত্যয় যাবেন না।প্রথম দিনেই তালুকদারদের তালুকদারি খতম। হয়েছে কী ওরা দুজন তো সাদাজলটল খেয়ে নেচে গেয়ে এ ওর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। এমন সময় এক ব্যাটা পুলিস এ্সে-- (১ম ও ২য় উত্তেজিত ভাবে স্টেজে ঢোকে) ১মঃ অ্যাই, আর একটাও কথা বলবেন না। ঠগ, জোচ্চোর! ২য়ঃ কাওয়ার্ড! বলে কি না তালুকদারি খতম! তোর ক্ষ্যামতা আছে খতম করবার। তুই কি ইংরেজ বাহাদুর? ৩য়ঃ মাথাটাথা কি একেবারেই গেছে? আমি ঠগ? আমি কাওয়ার্ড? তাহলে থানা থেকে কে আপনাদের ছাড়িয়ে আনল? কে জামিন করাল? ১মঃ হ্যাঁ, সেটা মানছি। কিন্তু তার আগে? ৩য়ঃ তার আগে আবার কী? ২য়ঃ আরে পুলিশ ধরতে এলে আপনি কিছু না বলে আমাদের ফেলে পালিয়ে যান নি? ৩য়ঃ ঠিক ও'রকম না। ১মঃ ঠিক কী রকম? ৩য়ঃ জলটল খেয়ে আপনাদের ঘুম পেল আর আমার পেল সুসু। তা আমি পার্কের ওদিকে চলে গেলাম, কিন্তু আপনাদের কড়ে আঙুল দেখিয়ে বলে গেলাম কোথায় যাচ্ছি। ১মঃ কিন্তু আমি তো দেখি নি। ৩য়ঃ দেখবেন কী করে? আপনি তখন টল্লি হয়ে ওনার কোলে মাথা রেখে শোয়ার তাল করছেন। ১মঃ মিথ্যে কথা। কোলে নয়, কাঁধে। ৩য়ঃ ওসব আদালতে জজের সামনে বলবেন'খন। ২য়ঃ কেন? আদালতে যেতে হবে কেন? ১মঃ আপনি যে আমাদের ছাড়িয়ে আনলেন? তো আবার কোর্ট কাচারি কিসের? ৩য়ঃ ধেত্তেরি! আমি তো খালি বন্ড দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছি।কিন্তু পুলিশ যে এফ আই আর করেছে।কোর্টে কেস উঠবেই। তখন আপনাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে সত্যি কথাটা বলতে হবে। তখন কোথায় মাথা রেখেছিলেন, কোলে না কাঁধে, সেসব বলবেন'খন। ২য়ঃ কাঁধেই রেখেছিল, কোলে টলে নয়। আর আমরা তো কোন বেআইনি কাজ করিনি। তবে? ৩য়ঃ পুলিশের রিপোর্টে অন্যরকম লিখেছে(পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে পড়তে থাকে) হুম্--- পাবলিক প্লেসে দুই বয়স্ক লোক মাল খেয়ে টল্লি হয়ে জড়াজড়ি করছিল। বুঝলেন শুধু পাবলিক প্লেসে মদ্যপানই নয়, ধারা ৩৭৭ ও লাগিয়েছে। ২য়ঃ সেটা আবার কী? ৩য়ঃ এটা হল সমলিঙ্গের প্রেম, মানে ছেলে-ছেলে বা মেয়ে-মেয়েতে প্রেম বা বিয়ে আটকানোর ধারা। ১মঃ কী যা তা! কিন্তু ওসব নাকি এখন বে -আইনী নয়? সেই যে সুপ্রীম কোর্টে কেস চলছিল? অনেক মোমবাতি মিছিল হয়েছিল? ৩য়ঃ ওই পর্য্যন্তই। সে কেস এখনও চলছে, ফয়সালা হয় নি। ততদিন--। ২য়ঃ ছাড়ুন তো! আমরা তো ওসব কিছু করি নি। তাহলে কেস খাব কেন? ৩য়ঃ খাবেন। কারণ দিনকাল পাল্টে গেছে। এখন বড্ড কড়াকড়ি। ১মঃ কড়াকড়ি হওয়া ভাল তো। নইলে রামা শ্যামা এসে হুজ্জুতি করে, চোখ রাঙায়। আইনকে কাঁচকলা দেখায়। ৩য়ঃ ব্যাপারটা এত সোজা না। (দর্শকদের দিকে ফিরে) গিন্নিকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যান, কী গরমের দিনে পার্কে গিয়ে বসতে-- পকেটে ম্যারেজ সার্টিফিকেটটি রাখতে ভুলবেন না। ১মঃ নইলে? ৩য়ঃ দেখবেন? (গলার সুর পাল্টে আঙুল উঁচিয়ে এগিয়ে যায়) অ্যাই! এখানে কী হচ্ছে? এসব কী হচ্ছে? পাবলিক প্লেসে বেলেল্লাপনা? লজ্জা করে না? বাড়ির লোকজনকে লুকিয়ে এখানে এসে-- ১মঃ কী ফালতু কথা বলছেন? আমরা স্বামী-স্ত্রী। ৩য়ঃ স্বামী-স্ত্রী! আমাকে বোকা বানাবি? (২য়কে) কী খুকি? সত্যি? (২য় মাথায় আঁচল টানার ভঙ্গি করে মাথা হেলিয়ে 'হ্যাঁ' বলে।) আচ্ছা? তোমার বাবাকে ডেকে আনি? ১মঃ এবার কিন্তু আপনি খামোকা হ্যারাস করছেন।আপনার কোন রাইট নেই এসব করবার। ৩য়ঃ আচ্ছা, আমাকে আইন শেখাবি? চল থানায়। সরকারী কর্মচারির কাজে বাধা দেওয়া?মজা দেখবি! ২য়ঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের বিয়ে হয়েছে দশবছর, ম্যারেজ সার্টিফিকেট আছে। ৩য়ঃ কোথায়? দেখা দিকি? ২য়ঃ সে তো ঘরে লকারে রাখা আছে। কেউ পকেটে নিয়ে ঘোরে নাকি? ৩য়ঃ ও ! ঘরের লকারে রাখা আ্ছে? এইসব পট্টি দিয়ে কেটে পড়বে? এখন থানার লক আপে চল। সেখান থেকে ফোন করে ঘরের লোকজনকে বল লকার থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে। ১মঃ সে কী করে হবে? লকারের চাবি তো আমার হ্যান্ডব্যাগে। ৩য়ঃ হুঁ, তাহলে বাড়ির লোকজনকে বল পাড়ার কাউন্সিলরকে সঙ্গে নিয়ে এসে তোমাদের আইডেন্টিফাই করে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। ১মঃ (হু-হু করে কেঁদে ওঠে)ঃ বাড়িতে আমার দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে। পাড়ায় এ নিয়ে জানাজানি হলে মুখ দেখাতে পারব না। প্লীজ, আপনি অন্য কোন রাস্তা বের করুন। থানায় যাব না, প্লীজ কিছু করুন। ৩য়ঃ (এবার স্বাভাবিক স্বরে দর্শকদের) দেখলেন তো! ১মঃ আচ্ছা, সঙ্গে সার্টিফিকেট রাখলেও যদি পুলিশ দেখতে না চায়? ২য়ঃ শুধু পুলিশ? এখন রাম-শ্যাম-যদু-মধু এসে বলবে--! ১মঃ কী বলবে? (স্বর পালটে)এই যে দেখুন না, আমার --। ২য়ঃ (গলার স্বর পালটে) এঃ সার্টিফিকেট দেখাচ্ছে! ওসব ফল্স সার্টিফিকেট অনেক দেখেছি। আগে প্রমাণ কর যে সার্টিফিকেট জাল নয়। ৩য়ঃ (১মকে)ঃ কী করে বুঝব যে কাগজটায় যে নাম লেখা আছে সেটা আসলে কার? তুমি যে তুমি, অন্য কেউ নও--তার প্রমাণ? ১ম ও ২য়ঃ (দর্শককে)ঃ দেখলেন তো।আগে তো এমন হত না? এখন কেন? ৩য়ঃ আসল কথা হল সময়! সময় বদলে গেছে। পুরুষ বলী নহী হোত হ্যায়, সময় হোত বলবান। ভিল্লন লুটী গোপিকা, ওহি অরজুন, ওহি বাণ।। ১মঃ সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাদের পুলিশ টেনে হিঁচড়ে থানায় নিয়ে গেল আর আপনি কেটে পড়লেন কেন সেটা বুঝিনি। ৩য়ঃ বললাম তো, গেছলাম পার্কের কোণায় একটা গাছের গোড়ায় জল দিতে, তলপেট হালকা করতে। ফেরার সময় দেখি দুটো পুলিস দুই তালুকদারকে বগলদাবা করেছে। ২য়ঃ আর অমনি আপনি তিন নম্বর সটকে পড়লেন? আপনি মশাই তালুকদার নন, জমাদার। ৩য়ঃ মিথ্যে কথা! আদৌ সটকে পড়ি নি। আমি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলছিলাম। ১মঃ আ-হা-হা! ছবি তুলছিলাম! দেখেন নি যারা সাহায্য করতে না এসে ছবি তোলে তাদের মিডিয়া কেমন গালাগাল দেয়? ৩য়ঃ গুলি মারুন মিডিয়াকে! আমি ওখানে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে আমাকেও কালোগাড়িতে তুলে কোতোয়ালিতে নিয়ে যেত? তাতে কোন পুণ্যিটা হত শুনি? আর আপনাদের কোন ইজ্জত লুটে নিচ্ছিল যে আমি তক্ষুণি হেল্প হেল্প করে চেঁচাব, তাও ভর দুপুরে নির্জন পার্কে? ( দর্শকদের) এদের কথা ছাড়ুন। আপনারা আমার বুদ্ধি নিন। যদি দেখেন দুশমন দলে বা শক্তিতে ভারি তাহলে আগে মোবাইলে ছবি তুলে তারপর ১০০ নম্বর ডায়াল করুন। ২য়ঃ তাতে কোন মোক্ষলাভ হবে? ৩য়ঃ হবে। এই ছবিগুলো দিয়ে অপরাধীকে আইডেন্টিফাই করা যাবে। কোর্ট সংজ্ঞান নেবে। পুলিশ চাইলেও পয়সা নিয়ে কেস চেপে দিতে পারবে না। ২য়ঃ পাবলিককে তো ফিরিতে জ্ঞান বিলোচ্চেন, আপনি নিজে ফোটো খিঁচে তারপর কী করলেন সেটা বলুন। ৩য়ঃ (মুচকি হেসে)ঃ বলতে দিচ্ছেন কই! আমি একজন বড় পার্টিকে ফোন করে বললাম-- আমার বন্ধুদের মিথ্যে মিথ্যে ধরে নিয়ে গে্ছে। মাল খেয়ে নোংরামি করার চার্জ লাগিয়েছে। আপনি ফোন করে আটকান। ওদের আমার পার্সোনাল বন্ডে ছেড়ে দিতে বলুন। ১মঃ ব্যস্? এতেই ম্যাজিক হল? ৩য়ঃ না না। সে বলল--চার্জ যদি জেনুইন হয়? আমি বললাম মেডিক্যাল টেস্ট্ট হোক। অ্যালকোমিটার এনে ওদের শ্বাস পরীক্ষা হোক। ২য়ঃ কী সর্বনাশ! ১মঃ কতবড় রিস্ক নিয়েছিলেন জানেন? ৩য়ঃ জানি। ১মঃ যদি টেস্ট পজিটিভ হত? ৩য়ঃ হয়েছে কি? ২য়ঃ না হয় নি। হয়ত মেশিন খারাপ।অথবা আপনি ঘুষ দিয়েছেন। ৩য়ঃ না; মেশিন ঠিকই আছে। আমি জানতাম পরীক্ষায় কিছু পাওয়া যাবে না। ১মঃ এঃ সবজান্তা! কী করে জানতেন? ৩য়ঃআসলে আমার বোতলে মদ ছিল না। (কয়েক সেকন্ড নীরবতা। সবাই এই খবরে যেন স্ট্যাচু!) ২য়ঃ তো আমরা যে খেলাম! কী খেলাম? ৩য়ঃ আপনারা খেয়েছেন একটি এনার্জি ড্রিংক; নন-অ্যালকোহলিক। আমি মদ খাই না। ১মঃ তার মানে আপনি আমাদের ঠকিয়েছেন। দিল্লি কা ঠগ! জোচ্চোর! ৩য়ঃ হ্যাঁ, ঠকিয়েছি। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আমি যে তালুকদার। ২য়ঃ যাকগে, ভালই হয়েছে। বৌমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে কোন চাপ হবে না।কিন্তু আপনি তাঅলুকদার ন'ন। আপনি কে ঠিক করে বলুন দেখি। ১মঃ বোঝ নি? উনি একটি হারামির হাতবাক্স। ওনার চক্করে সেদিন থানায় যেতে হয়েছিল। ৩য়ঃ (সামনে দর্শকদের দিকে দু'পা এগিয়ে স্বগতোক্তির মত করে) ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম--কবি হব। ম্যাগাজিনে কবিতা পাঠাতাম, ছাপা হত না। নিজে প্রেস খুললাম। তাতে হ্যান্ডবিল, পরীক্ষার কোশ্চেন, বিয়ের কার্ড--সবই ছাপা হয়। ভালই চলে। কিন্তু আয়ের আদ্দেক পয়সা দিয়ে আমি কবিতার বই ছাপি। আমার ও এইরকম আরও অনেকের। পেপারব্যাক, একশ' কপি।বইমেলায় কুড়ি কপি বিক্রি হয়। চল্লিশ কপি বন্ধুবান্ধব চেনা লোকজনের মধ্যে বিলিয়ে দিই। বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশনে উপহার দিই। এইসব পাগলামি গিন্নির সহ্য হয় নি। ওর আলাদা স্বপ্ন। তাই ছেলের সংসারে মুম্বাই গিয়ে রয়েছে। পূজোতেও আসে না। আমি আছি বন্ধুদের নিয়ে, মানে যারা নতুন কবি হতে চায়। নিজের পৈতৃক বাড়ি। হেসে খেলে চলে যায়। আপনাদের কথা শুনে বন্ধুত্ব পাতাতে ইচ্ছে হল। তাই তালুকদার হলাম। কিন্তু বুঝতে পারছি-- সেটা আমার কপালে নেই। তালুকদারেরা বন্ধুদের ঠকায় না, ধোঁকা দেয় না। তাই চললাম। ভালো থাকুন, কিন্তু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করবেন না, প্লীজ! (উইংসের দিকে হেঁটে যায়) ১মঃ দাঁড়ান। আপনাকে তালুকদার ক্লাবের মেম্বার করেছিলাম না? আপনি আজীবন সদস্য থাকবেন, বলে দিলাম ব্যস্! ৩য়ঃ কিন্তু আমি যে-- ১মঃ সে কথা বললে আমিও তো--। ২য়ঃ মানে? ১মঃ না, আমার কোন ছেলে বা কেয়ারিং ছেলে-বৌ নেই। আসলে আমার বিয়েই হয় নি। দাদা অকালে চলে গেলেন। বৌদি আর দুটো বাচ্চার ভার আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। ওদের লেখাপড়া চাকরি, বিয়ে সব সামলাতে সামলাতে বয়স হয়ে গেছল। ধাক্কা খেলাম যখন বুঝলাম যে ওরা চাইছে কিছু টাকা নিয়ে আমি যদি বাড়িটা ছেড়ে চলে যাই। তাই করলাম, ওরা সুখী হোক। জানি দাদা ওপর থেকে আশীর্বাদ করবেন। এখন একটি বৃদ্ধাবাসে থাকি। মন্দ না। কিন্তু মাঝে মাঝে একঘেয়ে লাগে। সব বয়স্ক আর বুড়োর দল। সব পুরুষ। দিন গোণে কবে ওপরের ডাক আসবে।তাই এখানে চলে আসি।খবরের কাগজে পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়ি। আসলে মনে মনে স্বপ্ন দেখি--আমার ছেলে, ছেলে বৌ, নাতি -নাতনি। স্বপ্ন দেখা তো বন্ধ করা উচিত নয়। কী বলেন? ৩য়ঃ নিশ্চয়ই। নইলে ইউ আর ডেড। (২য়কে) তাহলে বাকি রইলেন আপনি-- থ্রি মাস্কেটিয়ার্স এর মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি, আসল তালুকদার। যার লজিক পড়ানোর স্বপ্ন পুড়ে ছাই।যে নিজে এখন ছেলে-ছেলেবৌয়ের হুজ্জতে হাড়-ভাজাভাজা হচ্ছে। ২য়( একটু ক্ষণ ভেবে নিয়ে মাথা তোলে দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে)ঃ ইয়ে, লজিক্যালি দেখলে আপনার স্টেটমেন্টেও একটা ফ্যালাসি আছে। মেরী কহানী মেঁ ভী থোড়া টুইস্ট হ্যায়। (সবাই চুপ, প্রতীক্ষারত) আসলে বাস্তব ছবিটা ঠিক উল্টো। ছেলে-ছেলেবৌ কিছু করে নি। আমিই উল্টে ওদের দাবড়ে রেখেছি।আসলে লজিক পড়ানোর চাকরি চলে যাওয়ার পর ঘরে বাইরে অবহেলার শিকার হলাম। শেষে লজিক্ক ছেড়ে অংকের ট্যুইশন শুরু করলাম। ধীরে ধীরে সাফল্য এল, পয়সা হল।বাড়ি বানালাম।কিন্তু বড় বেশি হিসেবি হয়ে পড়লাম। পয়সার মহত্ব অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বুঝেছি। কিন্তু ওটাও একটা ফ্যালাসি, রজ্জুতে সর্পভ্রম। তবে বুঝলাম যখন স্ত্রীর স্বাস্থ্য গেল, ঠিকমত চিকিত্সা হল না। ছেলে আর্থিক ভাবে সফল নয়। তাই ওকে লুজার ভাবি। আরে আমাকেও তো গোড়াতে সবাই তাই ভাবত। বাড়ি আমার, সংসার চালাতে আমার কন্ট্রিবিউশন কম নয়। তাই টিভি আমার ঘরে থাকে। আমি ঘরে না থাকলে কেউ ছুঁতে পারবে না। তবে ইদানীং নাতনিটাকে অ্যালাউ করেছি। আর ওকে এখন থেকেই ঘরে আলাদা করে লজিক পড়াচ্ছি। ৩য়ঃ এইসব করে আপনি আনন্দে আছেন? তাহলে লজিক্যালি ঠিক করছেন। ২য়ঃ না নেই। খালি মনে হয় কোথাও একটা ফ্যালাসি আছে। সেটা ঠিক ধরতে পারছি না। ১মঃ আসলে নিজের দোষ কেউ দেখতে পায় না। সেটা দেখতে হলে একটা আয়না চাই। ২য়ঃ ঠিক বলেছেন। ভারতীয় ন্যায়ে একটা যুক্তি আছে;-- কেউ নিজের কাঁধে চড়তে পারে না, যতবড় পালোয়ানই হোক। সবাইকে অন্যের কাঁধেই চড়তে হয়। তা আপনারা মানে দুই তালুকদারেরা আমার মুখের সামনে আয়না ধরুন না, প্লীজ। ৩য়ঃ আসুন, আমরা সবাই একে অপরের আয়না হয়ে যাই। ১মঃ ইয়েস্, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স্। ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান। ৩য়ঃ একটা কথা। (১মকে) -- আপনি বৃদ্ধাশ্রম ছেড়ে দিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসুন। জায়গার অভাব নেই। আর আমার স্বপ্ব দেখা অনামা কবির দল? তারাই আমার পরিবার। সেখানে আপনারও জায়গা হবে। আর অনেকেই অল্পবয়সী। স্বাদ পাবেন সংযুক্ত পরিবারের। ১মঃ (২য়কে) আপনিও চলে আসুন। ছেলে ছেলেবৌকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওদের এখন হাত পা ছড়িয়ে নিজের হিসেবে বাঁচতে দিন। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবেন, তাতে শান্তি পাবেন। আমি কালকেই হিসেব চুকিয়ে ব্যাংকের ডেবিট কার্ড আর পাসবই নিয়ে কবির ঘরে চলে আসছি। আপনি আসলে ষোলকলা পূর্ণ হবে। বাড়িটার সামনে বোর্ড লাগিয়ে দেব-- " তালুকদার ক্লাব"। কী? আসছেন তো? ২য়ঃ দেখুন। এটা লজিক্যালি পারফেক্ট হল না। ফ্যালাসি আছে। ভেবে দেখলাম আগে নিজের মন পরিষ্কার করতে হবে। নিজের জন্যে স্পেস চাইবার আগে অন্যদের জন্যে স্পেস ছাড়তে হবে। তাই আমি বাড়ি গিয়ে প্রথমে টিভিটা আমার ঘর থেকে বের করিয়ে বসবার ঘরের দেয়ালে ফিট করাবো; যে যখন ওখানে বসবে সে তার মত চ্যানেল ঘোরাবে, আমাকে জিগ্যেস করার দরকার নেই। আর বাড়িটা ছেলে ও ছেলেবৌয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দেব। রেজিস্ট্রির কাগজ আগামী মাসে ওদের বিবাহবার্ষিকীর দিন উপহার দেব। সেদিন বিরিয়ানি হবে--খাসির মাংসের। আর আপনারা দুই তালুকদার আমাদের বাড়িতে খেতে আসবেন। ১মঃ সেরেছে! পরে যদি আপনাকে ওরা বের করে দেয়? বদলা নেয়? ২য়ঃ দিলে দেবে; তখন আপনারা আছেন। তালুকদার ক্লাব আছে। ১মঃঅনেক রিস্ক নিচ্ছেন কিন্তু। দিনকাল খারাপ। ২য়ঃ নিচ্ছি।প্রথম জীবনে একবার নিয়েছিলাম--এখন আবার নেব।নইলে জীবনটা বড্ড আলুনি আলুনি হয়ে যাচ্ছে।চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দিনকাল খারাপ হলেও সূর্য তো এখনও পূবদিকেই ওঠে। ৩য়ঃ হ্যাঁ; আমাদের দাড়িদাদুও তাই বলে গেছেন। ১মঃ কী? ৩য়ঃ “মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন”! ভালোর সংখ্যাই হরেদরে বেশি। তাই পৃথিবীটা ঘুরছে। চাঁদ তারারা হারিয়ে যাচ্ছে না। (তিনজনে একসঙ্গে দর্শকদের)ঃআপনারা এবার আসুন। রাত বাড়ছে। কিন্তু রবি ঠাকুরের দেওয়া এই মন্ত্রটা রোজ শোয়ার আগে জপ করবেনঃ "মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন!" আমাদের সঙ্গে তিনবার বলুন!---- (এবার তিনজন 'তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে' গাইতে গাইতে দর্শকদের মধ্যে দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায়।) === সমাপ্ত=====

126

4

Ranjan Roy

ফেরারি ফৌজ

তৃতীয় ভাগ আঠের বছর বয়েসের গদ্য ================ 'তোমাতে নই, আমাতে নই বিষয়ে আমি লিপ্ত, লাগাম ছেঁড়া পাগলঘোড়া তিনটে ভীষণ ক্ষিপ্ত। বিজন মাঠ, বধ্যভূমি ধরতে গেলাম, তখন তুমি সরে দাঁড়াও অশ্ববাহন এবং বলদৃপ্ত, রক্তে নাচাও মাতাল ঘোড়া তিনটে ভীষণ ক্ষিপ্ত।' -----শক্তিপদ ব্রহ্মচারী (১) ডেকচিতে ফুটন্ত ভাত উথলে উঠেছে। বিজনদা উঠে গিয়ে ঢাকনা তুলে দুটো ভাত টিপে আবার ঢাকনা চাপিয়ে দিল। --আর দু-তিন মিনিট; তার পরেই নামিয়ে দেব। --ঠিক আছে; কোন তাড়া নেই। শংকর অন্যমনস্ক ভাবে বলে বিজনদার তামাকের প্যাকেট থেকে এক চিমটি তুলে হাতের তেলোয় ডলতে থাকে। আমি মাদুরের কোণা থেকে একটা কাঠি বের করে দাঁত খোঁচাতে থাকি। দরজার ফাঁক দিয়ে জুন মাসের দুপুরের একচিলতে রোদ্দুর মেজেতে মৌরসীপাট্টা নিয়ে বসে আছে। উঠোনের জলের বালতির ওপর বসে একটা কাক ডাকছে।মাঝে মাঝে ঠোঁট দিয়ে খোঁচা মেরে জল খাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ওটা বিজনদার বাসন ধোয়ার বা কাপড় কাচার জল। ভাবছি কাকটাকে তাড়িয়ে দেব কি না, ব্যাটা নিজেই বোর হয়ে উড়ে গেল। বিজনদা ভাত বাড়ছে, সেই মুসুর ডাল, বাগানের গন্ধলেবু, আলুসেদ্ধ আর ডিমের বড়া। আমার কোন অসুবিধে হয় না। আমাদের চিনেমাটির প্লেটে দিয়ে নিজে কাঁসার কানিওঠা থালায় নিল, বাঙাল ভাষায় বলে--কাঁসার বেলি। এই বয়সেও অনেকটা ভাত খায় বিজনদা-- আর কাঁসার থালায়। আমি জানি থালাটার গায়ে বিজনদার মায়ের নাম লেখা আছে--সরোজিনী। এই থালাটা ছোড়দি ওকে দিয়ে গেছে। মায়ের নাকি সেইরকমই ইচ্ছে। শেষকাজের সময় বিজনদা পুরুলিয়ার জেলে। শংকর খায় ভাল করে ডাল দিয়ে মেখে, লেবু চটকে, একটু হাপুস হুপুস করে। আজ কিন্তু খাওয়ায় মন নেই। কিছু একটা ভাবছে। অন্যদিন হলে আমার ডিমের বড়ার থেকে খামছে অন্ততঃ একটা তুলে নিয়ে নির্বিকার মুখে চিবোতে থাকত--যেন ওটাই স্বাভাবিক। আজকে আমি গোটা ডিমটাই খেয়ে নিলাম-- ও যেন দেখেও দেখছে না। হাত-টাত ধুয়ে আবার মাদুরে ফিরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছি কি বিজনদা গামছা এনে আমাদের হাত মুখ মুছিয়ে দিল। উঃ , এখনও সেই বড়পিসিমাগিরি! শংকর আবার তামাক ডলে কাগজ পাকিয়ে একটা সরু ফানেলের মত করে তাতে কাঠি দিয়ে ঠুসতে লাগল। আমি নিজের প্যাকেট খুলে একটা ধরিয়ে অন্যটা বিজনদার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আগে আমরা ইচ্ছে করে একটা কাঠির থেকেই তিনজন ধরাতাম-- কুসংস্কারের বেড়া ভাঙতে হবে যে! এখন ওসব নিয়ে ভাবি না। জানি, কোন লাভ নেই। বিজনদা একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল-- এবার? --এবার কী? -- তোরাই বল, আমি খালি জিগ্যেস করছি। -- রমেন হিসেব দেবে। ও ফেরারী ফৌজের আটজন ঘোড়সওয়ার চিত্রগুপ্তের লেজার খুলবে--শালা ব্যাংকের ফোতো ক্লার্ক! -- কেন? তুই বলবি না কেন? -- ফেরারি ফৌজ প্রোজেক্টটা ওর, আমার পিতৃদেবের নয়। ওই বলুক। আমি কাশতে থাকি, উঠে গিয়ে উঠোনে পেয়ারা গাছের গোড়ায় একদলা থুতু ফেলি। তারপর মাথা নেড়ে বলি--হক কথা। হিসেব আমইই দেব। সোজা হিসেব। শুনে নাও, ভুল হলে ধরিয়ে দিও। আটজন ঘোড়সওয়ার। দু'জন-- রণক্ষেত্রে শহীদ। একজন-- দলত্যাগী, রেনেগেড। একজন-- কর্কটরোগে প্রয়াত। একুনে চারজন। হাজির ও সাক্ষাৎ হইয়াছে-- বাকি চারজন। এই অবশিষ্টদের ব্যালান্সশিট নিম্নরূপঃ একজন--শিল্পপতি, বাড়ি গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালান্সের মালিক। একজন-- অবসরপ্রাপ্ত সংসারী; দুর্বল হার্ট। কিন্তু স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বেপরোয়া। বাকি দুইজন-- পত্নীপরিত্যক্তা, এক্কাগাড়ির সওয়ার। --ব্যস্? --ব্যস্। --- তাহলে? ব্যাক টু স্কোয়ার এ? বিজনদা যেন খেলনা কেড়ে নেওয়া বাচ্চা। শংকর নড়ে চড়ে বসে। নিভে যাওয়া পাকানো সিগ্রেটটা মেজেতে ঘষে ঘরের কোণায় ছুঁড়ে দেয়। -- আমি বলি কি আমরা অতীত হাতড়ে দেখি--কেন আমরা পথে নেমে ছিলাম। গোড়া থেকে--মানে বিপ্লবের বুলি কপচেও কেন সেই ডাকাতের দলে ভিড়েছিলাম? সবাই নিজের নিজের কথা বলবে, আলাদা করে। রমেন শুরু করুক। আর খালি গল্প বললে হবে না। কোন যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করা না-পিওর ফ্যাক্ট বলবে আর শেষে বলতে হবে আজকে কে কী ভাবছে; নাকি ভাবাভাবির দিন শেষ? নে, শুরু কর শালা! আমাকে অবাক করে বিজনদা বলে ওঠে-ধ্যোর বাল! আমরা তিনজনেই হেসে ফেলি। -- শংকর কী বললি? আমরা বিপ্লবের বুলি কপচে কেন ডাকাতের দলে ভিড়েছিলাম? ডাকাতের দলে? না তো। -- না বললেই হল? আমাদের খাওয়া পরা চলতে কী করে? বাপের হোটেলে? বাপের হোটেলে খেয়ে বিপ্লব? তোর, আমার, বিজয়দার জন্যে প্রতি মাসে একটা করে সাদা খাম ধরিয়ে দেওয়া হত না? তার উপর নাম ও নামের পাশে টাকার অংক লেখা থাকত না? যেমন আমার খামের উপর লেখা থাকত--" শংকর--১৩৫/-"। এগুলো তাহলে কী? -- আমরা ছিলাম প্রফেশনাল রেভোলুশনারি--পেশাদার বিপ্লবী। একেবারে লেনিনের ' কী করিতে হইবে' (What is to be done) মেনে। ওগুলো ছিল আমাদের মাসিক বেতন বা ওয়েজ। বিজয়্দা মুখ খোলে,-- এর মধ্যে লেনিনকে নিয়ে টানাটানি কেন? --বাঃ! সব ভুলে গেলে? তুমি ছিলে সেকশন কম্যান্ডার। তাই তুমি পেতে ১৫০/-। --সেটা কি লেনিন ঠিক করে দিয়েছিলেন ? -- কথা ঘুরিও না। "কী করিতে হইবে" লেখায় উনি বোঝান নি যে বিপ্লব করতে হলে আগে দরকার পেশাদার বিপ্লবী সংগঠন। কারণ বিপ্লব কোন অ্যামেচার ন্যাকামো ভাব-ভালবাসা নয়। এটা ফুল টাইম ব্যাপার আর --। --- আর জনতার অন্ধ ভীড় দিয়ে অরাজকতা হয়, বিপ্লব হয় না। এর জন্যে চাই প্রশিক্ষিত রেভোলুশনারি। তাই আমরা--। --তাই আমরা ডাকাতির পয়সায় হোটেলে খেতাম, এক কামরা ঘরের ভাড়া দিতাম, ট্রাম-বাস--ট্যাক্সি চড়তাম? --ডাকাতির পয়সায়? ওভাবে কেন বলছিস! আমরা তো মার্সেনারি নই। পেশাদার সৈনিক মজুরি নেবে না? মাওয়ের গণমুক্তি ফৌজের সৈনিকদের বেতন দেওয়া হত না? তাই কুয়োমিন্টাংদের সৈন্যরা দলত্যাগ করে লালফৌজে যোগ দেয় নি? আর তুই বলছিস ডাকাতের দল? --শোন শংকর! আজ আমরা অতীত; মানছি হেরে যাওয়া অতীত। তাই বলে নিজেদের ছোট করতে হবে কেন? আত্মগ্লানি আত্মকরুণা ভাল কথা নয়। খেয়াল করে দ্যাখ,--আমাদের সংগঠনের নাম আরসিসিআই বা রেভোলুশনারি কম্যুনিষ্ট কোঅর্ডিনেশন অফ ইন্ডিয়া। আমাদের নেতা যাঁকে তোমরা কোনদিন দেখনি-- আর দেখতেও পাবে না-- ছিলেন অনন্ত সিং। হ্যাঁ, সেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের খ্যাতিপ্রাপ্ত অনন্ত সিং-- মাস্টারদা সূর্য সেনের ডানহাত, মিলিটারি স্ট্র্যটেজিস্ট। বিজয়দাকে এবার লেকচারে পেয়েছে। টিউশনের ছেলেদের বোঝানোর মত করে বলতে থাকে। -- সূর্য সেনের ফাঁসি হল, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে প্রাণ দিলেন। অনন্ত সিংয়ের কালাপানি হল। দেশ স্বাধীন হলে উনি আন্দামান থেকে অন্য অনেকের মত কমিউনিস্ট হয়ে ফিরে এলেন। পার্টির টেকনিক্যাল কোরের দায়িত্ব পেলেন। --হ্যাঁ হ্যাঁ; সবটা বল। উনি পার্টির মধ্যে একটি সমান্তরাল গোপন সংগঠন গড়ে তুললেন--নাম ছিল আওয়ার স্ট্যান্ড। কিছু ডাকাতি করলেন--স্বদেশী গুপ্ত সংগঠনের কায়দায়। কমিউনিস্ট পার্টি প্রমাদ গুনল। আসলে যদ্দিন পার্টি নিষিদ্ধ ছিল ততদিন এসেব কজে দিয়েছিল। কিন্তু যেই পার্টি অজয় ঘোষের নেতৃত্বে ১৯৫২র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল তখন অনন্ত সিংয়ের কাজকম্ম হল গলার কাঁটা। তাই ওঁকে ওনার চেলাচামুন্ডা সমেত দল থেকে বের করে দেওয়া হল। কিন্তু অনন্ত সিং হলেন আদ্যপান্ত বাঙালী; নাহয় চাটগেঁয়ে বাঙাল। আর কে না জানে বাঙালীর লোহা দেখলেই গুয়া চুলকোয়। তাই কিছুদিন ঘাপটি মেরে কাটিয়ে যেই বাংলাবাজারে 'বন্দুকের নলই শক্তির উৎস' দেয়ালে লেখা দেখলেন অমনি আরেকটা ডাকাতের দল গড়লেন--- এমএমজি বা ম্যান-মানি-গান। --ফের ডাকাতের দল! ম্যান-মানি -গান নামটা বিদ্রূপাত্মক, আমাদের বিরোধীদের দেওয়া। আমাদের আসল নাম তো বললাম-- আরসিসিআই। -- সে যাই বল, বাংলাবাজারে আমাদের সবাই এম-এম-জি বলেই জানে। আর স্বদেশী যুগের মত ডাকাতির পয়সায় সংগঠন চালানো! -- কেন? খালি স্বদেশী কেন? লেনিনের পার্টি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের জন্যে , আর্মস এবং গোপনে ইসক্রা পত্রিকা চালাতে ডাকাতি করত না? এন বাউম্যানরা করেন নি? মন্তিস্লাভস্কির "বসন্তের দূত রুক" বইটি আমাদের অবশ্য পাঠ্য ছিল না? স্তালিন বাকু ও জর্জিয়ায় ডাকাতি করতেন না? অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থে নয়; পার্টি ও বিপ্লবের স্বার্থে; কোন সাধারণ মানুষের থেকে কিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয় নি। ট্রেজারি ও জমিদারদের খাজনা --! --- হ্যাঁ, স্তালিনের প্রথম জীবনে ওইসব কাজকম্ম ওয়েল ডকুমেন্টেড। কিন্তু আজ মনে হয় ডাকাতিটা ডাকাতিই। নিজেরটা ছোঁচাও কি অন্যের; হাত নোংরা হবেই । তাই যদি বলি যে আমরা ভেড়ার পালের মত অনন্ত সিং নামের এক প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামীর বিপ্লবের ভাঁওতায় ভুলে ডাকাত দলের খোঁয়াড়ে ঢুকেছিলাম সেটা কি খুব ভুল বলা হবে? -- বিজনদা! শংকর কি ঠিক বলছে? আমাদের মাসিক ওয়েজ কি ডাকাতির টাকায়? আর অনন্ত সিং কোথায়? আমাদের সিক্রেট সংগঠনের চিফ তো "ওল্ড গার্ড" বা অবিনাশ। -- অনেকটা ঠিকই বলেছে। অবিনাশই অনন্ত সিং। ওঁর সঙ্গে দেখা করতে পারত শুধু টপ তিন জন। সিক্রেসির উপর উনি খুব জোর দিতেন। আর আমাদের ওয়েজ আসত পার্ক স্ট্রিট পোস্টাপিস রবারির টাকায়-- যেটা ১৯৬৮ সালে হয়েছিল। পরে ১৯৬৯ সালে স্টেট ব্যাংক ডাকাতির সময় আমরা অলরেডি অনন্ত সিংয়ের দল থেকে আলাদা হয়ে গেছি। -- আচ্ছা? আমি এগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। শুধু কিছু শুনেছিলাম, বীরুর কাছ থেকে। মনে হচ্ছে শংকর জানে, হয়ত ও ছিল। এখানে খুলে বলুক। পাপস্খালন বা আত্মার শুদ্ধিকরণ হোক! শংকর কিছু ভাবে। তারপর হঠাৎ উঠে বাইরে যায়। আমি আর বিজয়দা চুপ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকি। ও চায়ের জল চড়ায়। চা ছাঁকার আগেই শংকর ফিরে আসে। পাড়ার দোকান থেকে দু'প্যাকেট সিগারেট কিনে এনেছে। মাঝখানে একটা প্যাকেট রেখে ধোঁয়া ছেড়ে জানলার দিকে তাকিয়ে বলে-- আজ এতদিন পরে সব গুছিয়ে বলা বেশ কঠিন। তবে চেষ্টা করব। ভুল হলে দাদা ধরিয়ে দেবে। প্রথমে পার্ক স্ট্রিট পোস্টাফিসের ডাকাতি। ২) পার্ক স্ট্রীটের সেই সকালটা ================== বর্ষাকাল। কিন্তু গত দু'দিনে একফোঁটা বৃষ্টি হয় নি। ভ্যাপসা গরম আরও বেড়েছে। তাই ছেলেছোকরার দলটা যে একঘন্টার মধ্যে বার কয়েক কোল্ডড্রিংকে গলা ভেজাবে, তাতে আশ্চর্যের কি ? পার্ক স্ট্রিটের উল্টো দিকে কোণের দোকানটায় চা'-লেড়ো বিস্কুট, ঘুগনি, পাঁউরুটি আলুর দম, ওমলেট সবই পাওয়া যায়। আর কোণের দিকে রাখা আছে কোকাকোলার বোতল। কিন্তু পাঁচজন ছোকরার দলটি বসেছে দোকানের বাইরে ফুটপাথ ঘেঁষে রাখা বেঞ্চ আর দুটো কাঠের টুলে। --- এক প্যাকেট পানামা দিন তো? দোকানদার প্যাকেট এগিয়ে দিতে দিতে ভাবে-- এরা ঠিক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে সিগ্রেট ফুঁকতে আসা ছাত্র নয়।আধঘন্টা ধরে বসে আছে। কিন্তু কথা কম। মুচকি চাপা হাসি আর কিছু অঙ্গভঙ্গী। এপাড়ায় কি কখনও আগে দেখেছে? মনে করতে পারছে না। দুজন এই গরমেও ফুলশার্ট পরে আছে। আর একজনের সোনালি চুল। তা এই সাহেব পাড়ায় অমন দু-একজন এখনও দেখা যায়। ওর পাশের ছেলেটি ঘড়ি দেখছে। বেলা সাড়ে নয়। এবার ও চোখ তুলে সোনালি চুলের দিকে তাকাল। সোনালি চুল আস্তে করে চোখের পাতা নামাল। অন্য একজন এর মধ্যেই দোকানাদারের পয়সা মিটিয়ে দিয়েছে। সোনালি চুল ও ঘড়িদেখা ছেলেটি এবার টুল থেকে উঠে রাস্তায় নেমেছে। একটু ক্যাজুয়াল ভাবভঙ্গী; রাস্তার এ'পাশ ও'পাশ দেখছে। কিন্তু বাঁদিকে তাকিয়ে হটাৎ ওদের ঘাড় টানটান। অন্ততঃ একশ ফুট দূরে একটি চশমা পরা ছেলে রাস্তার ধারে একটা খালি সন্দেশের বাক্স মত নামিয়ে দিয়ে আস্তে করে হেঁটে পাশের গলিতে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওরা জানে যে এর মানে ওই চশমুদ্দিন প্রায় একশ ফুট দূরে একজনকে একটা সবুজ রুমাল মাটিতে ফেলে আবার ঝেড়ে হুড়ে তুলে নিতে দেখেছে। আর সে দেখেছে রাস্তার ক্রসিং এ ধুতিপরা একজনকে ছাতা খুলে রাস্তা পার হতে হতে ছাতাটা আবার বন্ধ করতে। সে দেখেছে--। নাঃ, এই চিন্তার সূতোর লাটাই দ্রুত গুটিয়ে সোনালি চুল পেছন ফিরে বাকিদের দিকে তাকাল। অন্য ছেলেগুলোও যেন আড়মোড়া ভেঙে ওর পেছন পেছন এগিয়ে গেল। দোকানদারের চোখে পড়ল যে দু'জন অনেকটা কোল্ডড্রিংক ছেড়ে গেছে। আরে, একটা বোতল তো খোলাই হয় নি। কিন্তু পুরো পয়সা তো আগাম দিয়ে দিয়েছে। নাঃ , ও এমন ভাবে দাঁও মারবে না। বারো আনার জন্যে এমনি করলে ধম্মে সইবে না। ও পয়সা ফেরত দিয়ে দেবে। -- ও মশাই! শুনছেন? এদিকে দেখে যান। কিন্তু মশাইরা কিছুই শুনছেন না। কারণ, একটা লালরঙা গাড়ি, পেছনে তারের জাল, এসে পার্কস্ট্রিট পোস্ট অফিসের সামনে থেমেছে। গাড়ির সামনে ড্রাইভারের পাশে বন্দুকধারী একজন রক্ষী। আর পেছনে জাল ঘেরা জায়গায় একটা বড় ক্যাশবাক্সের সঙ্গে আরও দুজন সশস্ত্র গার্ড হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে। এবার ওরা প্রতিবারের মত ভেতর থেকে বন্ধ দরজাটা খুলে বাক্স নিয়ে নামবে। কিন্তু ওরা আর নামতে পারল না। খালি দরজাটা খুলে একজন চেন ও তালা লাগানো বড়সড় ট্রাংকের মত বাক্সটাকে ঠেলে দরজার সামনে এনেছে তক্ষুণি দু'জন ছোকরা ওর পেটে ও গলায় ছোঁয়াল পাইপগান ছোঁয়াল। আর একটু হোঁৎকামত তৃতীয়জন ট্রাংকটা টেনে মাটিতে নামাল। সিকিউরিট গার্ডের কিছু করার নেই। এত কাছ থেকে বন্দুক চালানো যায় না। কিন্তু দ্বিতীয়জন অবস্থা এঁচে নিয়ে খাঁচাটার কোনার দিকে সরে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সোজা গুলি চালিয়ে দিল। গুলি সোনালি চুলের কম্যান্ডারের কানের পাশ দিয়ে সোঁ করে বেরিয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যে পাইপগানের জোড়া গুলি লেগে রক্ষী গাড়ির ফ্লোরের মধ্যে ধপাস করে পড়ল। পিঠ দেয়ালে , জামাটা রক্তে ভিজে উঠছে। এদিকে সামনের গেটে ড্রাইভার কানের পাশে ঠান্ডা ধাতব নলের ছোঁয়ায় নেতিয়ে পড়েছে। কিন্তু ওর পাশে বিপরীত দরজার দিকে বসে থাকা রক্ষী জালি লাগানোর জানলার গায়ে ঠেকিয়ে রাখা মাস্কেটটি র ট্রিগারে সকলের অজান্তে চাপ দিল। ফল হল উল্টো। গুলি লাগল না। কিন্তু পেছনের গেট থেকে সোনালিচুলো কম্যান্ডার এসে জালির গায়ে নল ঠেকিয়ে ঘোড়া টিপল। রক্ষীর হাতে গুলি লাগতেই ও কাতরে উঠল। এই অভাবিত ঘটনায় রাস্তার দুধারের দোকানপাট নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল। পার্কস্ট্রীটে সাত সকালে শ্মশানের স্তব্ধতা। ইতিমধ্যে ডাকগাড়িটির হাত পাঁচেক দূরে থেমেছে একটি কালো অ্যাম্বাসাডর। তার চালক সিট থেকে নড়েনি, ইঞ্জিন বন্ধ করে নি। তবে সঙ্গীটি নেমে এসে খুলে ফেলল অ্যাম্বাসাডরের ডিকি। এই পাঁচজনের দলটি দ্রুত হাতিয়ে নিল তিনটি মাস্কেট। ডিকির মধ্যে উধাও হয়ে গেল ট্রাংক আর ওদের পাইপগান। তিনজন উঠে বসল অ্যাম্বাসাডরের পেছনের সিটে। কিন্তু গাড়িটি স্টার্ট নিয়ে আটকে গেল। কিশোর ড্রাইভার নার্ভাস হয়ে গেছে, ক্লাচ - একসিলেটর-ব্রেক এর কোঅর্ডিনেশন ঠিক হচ্ছে না। অভিজ্ঞ সঙ্গীটি ওকে সরিয়ে পাকা হাতে স্টিয়ারিং ধরল। গাড়ি একটু বাঁক নিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল তার উল্টোদিকে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুজন--হাতে তিনটি দখল করা মাস্কেট,গুলির বেল্ট রয়ে গেছে আহত রক্ষীদের কোমরে। এভাবে গেল দেড় মিনিট। গলির মধ্যে থেকে উঠে এসেছে একটি ফিয়েট। তাতে চালান হয়ে গেল মাস্কেটগুলো। এবার পেছনের সিটে সওয়ার হয়ে মিলিয়ে গেল শেষ দুই অশ্বারোহী। গোটা অপারেশন সম্পন্ন হল সাড়ে চার মিনিটে। আধঘন্টা পরে যখন সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স ও বিশাল পুলিশ বাহিনী পোঁছল তখন পার্ক স্ট্রিট পোস্ট অফিসের সামনে লালচে গাড়িটিকে ঘিরে মানুষের জটলা। এম্বুলেন্স কর্মীরা দ্রুত হাতে দুই আহত সুরক্ষা গার্ডকে স্ট্রেচারে করে তুললেন। পুলিশের একটি দল পোস্ট আফিস ঘিরে ফেলল। চশমা পরা একজন অফিসারের নেতৃত্বে একটি ছোট দল ভেতরে পোস্ট মাস্টার, স্টাফ ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নিতে ব্যস্ত হল। আর একটি দল ডাকগাড়ির ড্রাইভার, অক্ষত সুরক্ষা গার্ড ও রাস্তার ওপারের চায়ের দোকানের মালিককে ইন্টারোগেট করবে বলে কালো গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে গেল। সেই সময় গড়িয়ার কামডহরির কাছে একটি ঝিলের পাশে বিশাল নির্জন বাগানবাড়িতে এক টাকমাথা ধবধবে গায়ের রং ষাট পেরিয়ে যাওয়া ভদ্রলোক ওঁর স্টাডি রুমে একা একা দাবা খেলছিলেন। ওঁর পরনে সাদা ফতুয়া ও বার্মিজ ধরণের লুঙ্গি। পায়ের কাছে একটি দেশি কুকুর অলস ভঙ্গিতে গা ছেড়ে দিয়ে থাবা চাটছে। বই দেখে বটভিনিক ও টালের একটি বিখ্যাত গেমের ওপেনিং গুলোকে বদলে বদলে নতুন ভাবে খেলছিলেন। কিন্তু আজ খেলায় মন নেই। মাঝে মাঝে কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা। ঘন্টা দুই কেটে গেল। এমন সময় হঠাৎ পোষা কুকুরটা গরর্ করে উঠল। উনি প্রায় লাফিয়ে উঠে জানলা দিয়ে দেখলেন যে দারোয়ান গেট খুলে দিচ্ছে আর বাগান পেরিয়ে এদিকে হেঁটে আসছে সোনালি চুল।উনি নিজেকে সংযত করলেন। গম্ভীর মুখে বললেন--রিপোর্ট! --- সাকসেসফুল। এভরিথিং ওকে। -- ভেহিকল্স্? -- ওকে, ইন দ্য হাভেন। নেমপ্লেট কালার চেঞ্জড্। -- এনি ক্যাজুয়ালটি? -- টু গার্ড্স ইন্জিওর্ড, নট ফ্যাটাল; নান অ্যাট আওয়ার সাইড। লম্বা মানুষটি বেঁটে সোনালিচুলোকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমো খেলেন।

264

27