m

ভূতের গল্প

এই সাইট টি খুব ভাল লাগলো| কিছুদিন ধরে এ পাতায় আসছিলাম‚ নীরবে| ভূতের গপ্প লেখার আমন্ত্রন দেখে কিছু লিখতে ইচ্ছে হল| এবারে শোনাই সেই ভূতের গল্প: সময়্টা ১৯৯০র সামার| আমরা ইংল্যান্ড বেড়াতে গেছি| লন্ডন থেকে ভাসুরের বাড়ি এডিনবরা যাবো গাড়িতে‚ নানা জায়্গায় থামতে থামতে‚ আর রাত্তিরে থাকবো পথে পড়ে দাদার বন্ধু কুশলদার বাড়ি ব্র্যাড্ফর্ড নামে একটা ছোট শহরে| সেই সময় সেল ফোন ছিল না‚ লন্ডন থেকে বেরোবার আগে কুশলদাকে ফোন করে জানানো হল আমাদের প্ল্যান‚ কুশলদাও খুব সোৎসাহে রাজি| যা হোক‚ সকালে লন্ডন থেকে বেড়িয়ে কেমব্রিজ ইত্যাদি ঘুরে সন্ধ্যের পর আমরা পৌঁছুলাম সেই শহরে| এটি একটি পুরোনো ছোটো শহর‚ রাত্তিরে আর বিশেষ কিছু দেখা গেল না| কুশলদার বাড়ি গিয়ে শুনি ওঁর বৌ ও ছেলে দেশে গেছে গরমের ছুটিতে‚ আর আমাদের সেটা জানান নি‚ পাছে শুনে আমরা না আসি| উনি নিজেই রান্না করে রেখেছেন আমাদের জন্য‚ তবে আমাদের দেরি দেখে একাই পান পর্ব শুরু করে দিয়েছেন এবং সেটা মোটামুটি মনে হোল অনেক ক্ষন ধরেই চলছে| আমাদের বলে দিলেন ওপরে আমাদের জন্য বেড রুম রেডি করা আছে| আমার জায়ের কাছে আগেই শুনেছিলাম বৌদি মানে কুশলদার স্ত্রী সুগৃহিনী‚ এবার তার পরিচয় পেলাম| বাড়িটি পুরোনো কিন্তু খুবই রুচি সম্মত সুসজ্জিত| কুশলদাও অত্যন্ত সুদর্শন‚ আলাপী‚ বন্ধু বত্সল এবং রোমান্টিক| আমার নাম জিগেস করে আমার বর কে বললেন 'এর তো নাম শুনেই বুকে ধাক্কা লেগে যায়'| আমি আমার বর কে ইশারায় ওঁর পানীয় গ্লাস দেখালাম| যাই হোক‚ আমরা ওপরে গেলাম‚ আমাদের ঘরে ফ্রেশ হয়ে এসে ডিনার করবো| দেখি ও পাশের একটি ঘর থেকে সালোয়ার কামিজ পরা এক মহিলা বের হয়ে এসে আমাদের 'নমস্তে' বললেন| মহিলাকে দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত‚ চল্লিশোর্ধ পাঞ্জাবি মহিলা মনে হল| আমাদের হতভম্ব ভাব দেখে মহিলা বললেন 'ও তোমাদের কুশল বলে নি বুঝি আমার কথা! ড্রিংক করতে শুরু করলে ও সব ভুলে যায়| আমার নাম কবিতা অরোরা‚ আমি ওদের বন্ধু হই| সুনিতা (কুশলদার স্ত্রী) দেশে তো‚ তাই আমি কুশলের খবর নিতে আসি মাঝে মাঝে‚ আর আজ তোমরা আসবে বলে ওকে একটু সাহায্য করছিলাম| যাও তোমরা চেঞ্জ করে খেতে এস‚ আমি সব রেডি করছি' বলে মহিলা নীচে চলে গেলেন| আমদের একটু অবাক লাগলেও মহিলার ভদ্র ব্যবহার ও কথা বার্তা শুনে খুব ভাল লাগলো| পরে নীচে খেতে গিয়ে দেখলাম পরিপাটি করে টেবিল সেট করা‚ খাবার গরম করা সব হয়ে গেছে| কবিতাজী খুব যত্ন করে খাওয়ালেন আমাদের‚ তবে কুশলদা অলমোস্ট ড্রান্ক থাকায় বিশেষ কিছু খেলেন না| উনিও দেখলাম কিছু বললেন না কুশলদা কে| ডিনারের পর কবিতাজী বললেন 'তোমরা তো এবারে বাঙলায় আড্ডা দেবে‚ আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি‚ রাত জাগতে পারি না একদম' বলে আমাদের গুড নাইট জানিয়ে ওপরে চলে গেলেন| আমাদের আড্ডা চলেছিল রাত তিনটে অব্দি‚ কুশলদা আড্ডাবাজ‚ আমুদে লোক‚ গল্প করতে করতে নেশার ঘোর ও কেটে গেছিল ওঁর| কত রকম গল্প শোনালেন আমাদের| আড্ডার শেষে হঠাৎ আমার বর কে জিগেস করলেন 'এই বাড়িটার বয়স কত বল তো? দেয়াল টা ধরে দেখ'| আমরা ধরে দেখলাম দেয়াল গুলো পাথরের‚ ঠান্ডা - আমি বাহাদুরি করে বললাম‚ মনে হয় একশো বছরের পুরোনো বাড়ি| কুশলদা হেসে বললেন 'আর ও পঞ্চাশ যোগ কর| কত ভূত থাকতে পারে ভাব এই পুরোনো বাড়িতে!' শুনেই তো আমাদের গা শিরশির করতে লাগলো| রাত তিনটে তে দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ির ভূতের গল্প শোনার চাইতে ঘুমিয়ে পড়াই ভাল মনে হলো| কুশলদা সত্যিই ভালো হোস্ট‚ এত রাতে ঘুমিয়েও সকালে আমরা তৈরী হয়ে নীচে নামতে নামতে চা‚ জলখাবার সব রেডি করে ফেলেছিলেন| কবিতাজী কে নীচে না দেখে কুশলদা কে জিগেস করলাম উনি চা খাবেন না? কুশলদা খুব অবাক হয়ে বললেন 'কার কথা বলছো?' এবারে আমাদের অবাক হবার পালা‚ সে কি? কবিতাজী কাল আমাদের এত যত্ন করলেন ডিনারের সময়‚ আর সকালে কি উনি চলে গেলেন আমরা নামার আগেই? কুশলদা খানিক্ক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে রইলেন‚ তারপর বললেন 'কবিতার উপস্থিতি আমিও মাঝে মাঝেই টের পাই‚ বিশেষত সুনিতা বাড়িতে না থাকলে'| তারপর শোনালেন তাঁদের কথা| কুশলদা দিল্লিতে পড়াশোনা করেছিলেন ইকোনমিক্স নিয়ে‚ সেখানে তাঁর সহপাঠিনি ছিলেন কবিতা অরোরা| দুজনের ভালবাসার সম্পর্ক হয়েছিল গভীর| এরপর লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ দুজন মাস্টার্স করে এবং বাড়িতে জানায় তারা বিয়ে করে সেটল করতে চায়| গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের এক মাত্র ছেলে পাঞ্জাবি মেয়ে বিয়ে করবে শুনে মায়ের হার্ট এটাক হয়ে যায়‚ মৃত্যু শয্যায় মাকে কথা দিতে হয় কবিতাকে বিয়ে করবে না| দু জনে সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে না করার| কবিতা দিল্লির কলেজে পড়ানোর চাকরী পেয়ে চলে যায়‚ কুশল থেকে যায় ইংল্যান্ডে| দুজনের যোগাযোগ কমে আসছিল| ইতিমধ্যে বাবা পীড়াপীড়ি শুরু করলেন তাঁর বন্ধুর মেয়ে সুনিতা কে পুত্রবধূ করে আনতে চান‚ কুশলকে রাজি হতে হয়| বিয়ের পর আর যোগাযোগ ছিল না কবিতার সাথে| ঘটনা চক্রে কয়েক বছর বাদে কবিতার সাথে দেখা হয় একটা কনফারেন্সে| কুশল তাকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে| কুশলের স্ত্রী‚ পুত্র‚ সংসার দেখে কবিতা বলে ‚ 'ভালই করেছ আমাকে বিয়ে না করে‚ সুনিতার মত এত ভাল গৃহিণী আমি কখনো হতে পারতাম না'| সুনিতা সব ই জানতো‚ কবিতাকে ওর ও ভালো লেগে যায়| এর পর কয়েক বছর কবিতা ইংল্যান্ডে আসলেই কুশল সুনিতার সাথে কয়েক দিন কাটিয়ে যেত| কখনো সুনিতা যদি নাও থাকতো তবুও আসতো‚ তাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছিল কবিতা| বছর দুই আগে কুশলরা খবর পায় কবিতার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে‚ তাও বেশ এড্ভান্সড স্টেজ| ওরা দিল্লি গিয়েছিল‚ কিন্তু কবিতা অনুমতি দেয় নি হাসপাতালে ওদের দেখা করতে দিতে‚ নিজের ক্যান্সার ক্লিষ্ট চেহারা ওদের দেখতে দিতে চায় নি| কবিতার চলে যাবার খবর জানিয়েছিল তার এক কলীগ| কুশলদা বললেন গত দেড় বছরে ওঁর মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে কবিতা এসেছে‚ কিন্তু স্বপ্নের মত অস্পষ্ট| আমরা যেরকম দেখলাম‚ কথা বললাম‚ সেরকম কিছু হয় নি| আমদের তখন মানসিক অবস্থা অভিভূত ...কিন্তু নাহ ভয় করে নি| এটি স্বপ্ন ও ভূতের মিলিত গল্প‚ ভূতকে সব সময় ভয় পেতে হবে এরকম কোন কথা নেই| অনেক সময় ত্ঁারা মনুষের চাইতেও বেশি ভদ্র সভ্য হন|

23

8

Dalia2017

বৃদ্ধাশ্রম

আবার বসেছি বৃদ্ধাশ্রমের ওপরে লিখতে। বড্ড গরম, তার ওপরে গত সপ্তাহে দুদিন হাসপাতালে ছুটি কাটাতে গেছিলুম। বুড়ো বয়সের অনেক ঝামেলা। সে যাই হোক, তবু মানুষ বাঁচতে চায়। আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে একজন সুরেনামের মহিলা আছেন, তাঁর কিছুদিন আগে ৯৭ বছর বয়স হল। তিনি বলেন, " আমি ১০০ বছর বাঁচতে চাই। আমার ১০০ বছর বয়স হলে আমি তোমাদের বড় রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে ডিনার খাওয়াব। " আমরা তাঁকে বলি," তুমি ১০০ বছর নিশ্চই বাঁচবে। কি মজা! আমরা বড় রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার খাব। " খুব খুশী হন ভদ্রমহিলা। কত অল্পেতে এই বৃদ্ধা বৃদ্ধারা খুশী হন। এঁরা চাননা কোন পয়সা, যেটুকু জীবন ধারণের জন্যে দরকার , সেই টুকুই। কিন্তু একটু ভালবাসা , একটু স্নেহের কথাবার্তা। সে যাই হোক, বৃদ্ধাশ্রমে যোগ দেবার পরে অনেক কিছুই শিখেছি। শিখেছি, আমরা যাকে পাগল বলি , তাঁরা পাগল নন, ডিমেন্ট। সেটা আমি জানতুমনা। বৃদ্ধাশ্রমে যোগ দেবার পরে আমাদের হাতে একটা নামের লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হোত। তাঁদের ওপর থেকে নীচে নামাতে হবে।কেউ বা হুইল চেয়ারে, কেউ বা চার চাকার গাড়িতে, কারুকে বা ঝরিয়ে ধরে নামাতে হত। তা সেদিন আমার হাতেও ১০ জনের একটা লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি ওপর থেকে একে একে সব নামাচ্ছি। একজনের ঘরে গিয়ে বললুম," ম্যাডাম, তোমাকে আমি নিতে এসেছি, নীচে আমাদের এ্যক্টিভিটি আছে, চল সেখানে। ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললেন," আমি এখন কি করে যাব? আমার স্বামী আসবেন কাজ থেকে, ছেলেরা আসবে, আমাকে রান্না করতে হবে, আমি তো এখন যেতে পারবনা।" অবাক বিস্ময়ে মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলুম। ঠিক সেই সময় একজন নার্স যাচ্ছিলেন। ভদ্রমহিলাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর ঘরে সোফায় বসিয়ে দিলেন। তারপরে আমার কাছে এসে বললেন," খুব অবাক লাগছে তাই না! " বললুম, "তা তো লাগছেই।মহিলা কি পাগল?" নার্স একটু রাগত ভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, " এঁদের কখনো পাগল বলবেনা, এঁরা ডিমেন্ট। এঁদের আগের জীবনের কথা মনে থাকে, কিন্তু একটু আগে কি হয়েছে, তা মনে করতে পারেননা।" একটু পরে মহিলা এসে আমাকে বললেন," তুমি আমাকে নীচে নিয়ে যেতে এসেছ না? চল, আমি প্রস্তুত।" তখন মহিলাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে নীচে নামিয়ে আনলুম। সেদিন থেকে শিখলুম, দেশে আমরা যাঁদের পাগল বলি, তাঁদের পাগল বলা ঠিক নয়, তাঁরা ডিমেন্ট। আমাদের আমলে আমি এইরকম বহু মানুষ দেখেছি, যাঁদের এইরকম কথাবার্তার জন্যে পাগল বলা হত, এখন জানিনা এঁদের পাগল বলা হয় কিনা? আমি একজনকে জানি, ভদ্রমহিলা খুব সুন্দর রামায়ন, মহাভারত বলে যেতেন, সব তাঁর কন্ঠস্থ ছিল। কিন্তু তাঁকে পাগল বলে একটা ঘরে আটকে রাখা হোত। কি তফাত দুই দেশের মধ্যে, তাইনা! কিন্তু এখানের বৃদ্ধাশ্রম সেদিন আমার চখ খুলে দিল, বুঝতে পারলুম, ডিমেন্টদের কখনো পাগল বলতে নেই। আর এইভাবেই শিখতে লাগ্লুম বৃদ্ধাশ্রমে নানান ঘটনার মাধ্যমে নানা জিনিস, শিখলুম অনেক কিছুই। এর পরে বলব আলজাইমার ওপরে। আজ থামি।

142

12

ইলতুৎমিস

চুপ চাপ- একা একা

পর্ব-২২ এর পর| ভাবিতে উচিত ছিল‚ প্রতিজ্ঞা যখন! বিয়ে ঊনত্রিশে আর তার একমাস পরের পয়লায় নতুন চাকরীতে জয়েন করবার তারিখ| একমাসের নতুন বউকে বাপের বাড়ীতে রেখে নিরুদ্দেশ যাত্রা| প্রায় তাই| যে শহরে যাচ্ছি‚ সেখানে কেবল বম্বেতে পড়াকালীন এক সহপাঠী ভিন্ন আর সবই অচেনা| বিধাতার লিখন‚ অদৃষ্ট নাকি কোয়েন্সিডেন্স‚ কে জানে| দরখাস্ত শুরু হয়েছিল ফ্রী ফার্ষ্ট ক্লাশ ভাড়ায় ভ্রমণ আর যেহেতু বন্ধু থাকে সেখানে| ইন্টারভিউ উপলক্ষ মাত্র| কিন্তু শহরটাকে ভাল লেগে গেল‚ চাকরীটার শিকেও ছিঁড়লো| আগেই লিখেছি বেশ ভাল মতন মাইনে বাড়লো| সবই আপেক্ষিক| মাইনে তো বাড়লো কিন্তু সুদূর দক্ষিণের শহরে‚ বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন থেকে দূরে‚ ভিন্ন সংস্কৃতির সমাজে অনির্দিষ্ট যাত্রা? সত্যিই কি বাড়লো? (২) আরও‚ আরও আরও ভাল'র পিছনে তো ছুটেই চলেছি| আবার এই ভাল চাকরীর জন্যই বিয়ের কথা মনে হয়েছিলো‚ নতুবা একারই দিন আনা দিন খাওয়া| মা ভাইবোনেদের বরাদ্দ মাসিক টাকা তেমনি রেখে নিজের ও আর একজনের চলে যাবে এই অলীক স্বপ্নে জীবনের সবচেয়ে বড় ডিসিশান নিয়ে ফেললাম| কিন্তু খেয়ে পরেই যে দুজনের সংসার চলে তা তো নয়| আছে বাড়ীভাড়া‚ আছে আসবাবপত্র‚ রেলভাড়া‚ পুজোতে সবার জামাকাপড়‚ ঔষধপত্র‚ সিঙ্গাড়া জিলিপি! ইন hindsight‚ হঠকারিতাই হয়ে গিয়েছিল| বাট দ্য গ্যাম্বল ওয়ার্কড! (৩) রাঁচী তখন ঝাড়খন্ডের রাজধানী হয়নি‚ দূর মেট্রো শহরের সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল না| ঘন্টা আড়াই লোক্যাল ট্রেনে গিয়ে তারপর মুরী স্টেশন| গ্রীষ্মের শেষ বিকাল‚ দূরপাল্লার গাড়ী যখন এলো তখন দিনের আলো মরে এসেছে| অনেকক্ষণ গাড়ী থামে তবু সেই অনেকক্ষণ যেন নিমেষে শেষ হয়ে গেল| গার্ডের বাঁশী আর দূরে রেলব্রীজের ওপর সে ও তার এক কাকা‚ তাদের বাড়ীতেই আশ্রিত‚ অবিবাহিত; এদেরকে কোলে পিঠে মানুষ করেছেন| মিসেস দত্ত'র উপহার দেয়া ছাপা সিন্থেটিক শাড়ীর মালকীন দূরে আর আমি ট্রেনের ভিতর বিজাতীয় ভাষার কিচিরমিচির যাত্রীদের মাঝে‚ সামান ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত| তামিল‚ তেলুগু ভাষার সঙ্গে তখন তো যৎসামান্যই পরিচয়| অতএব আবার যাত্রা হলো শুরু| নিজের গ্রাম‚ নিজের প্রদেশের শহর ছেড়েছি‚ তাও এক রাতের রেল দূরত্বে ছিলাম‚ এবার বলতে গেলে দেশান্তরে! (৪) আবার সেই ট্রাঙ্ক ও হোল্ড অল মোড়া বিছানা পত্র| উঠলাম তো বন্ধুর বাড়ী‚ তার ভাড়া বাড়ী| বেশ ছিমছাম‚ ভাল রাস্তার উপর এবং ভাড়াও মোটামুটি সাধ্যের মধ্যে| কিন্তু আমার বাড়ীভাগ্য বরাবরই খারাপ‚ সে ভাড়ার বাড়ী‚ কোম্পানী কোয়ার্টার অথবা নিজের বাড়ীই হোক না কেন| খোঁজা শুরু হলো বাড়ী| সংসার পাততে হবে| কিন্তু এইবার রূঢ় বাস্তব চোখে খুললো| এতদিন তো হোস্টেল‚ মেসে কাটিয়ে এসেছি‚ ভাড়া বাড়ী যে কি বস্তু কোন অভিজ্ঞতাই নেই| বাড়ীর দালাল এটা সেটা বলে এমন জায়্গায় বাড়ী দেখায় যে নিজের উপর রাগ হয়; এই ছিল কপালে? আসলে বাড়ীর দোষ কি‚ বাড়ী ছিল কিন্তু ভাড়া ও তার অ্যাডভান্স সাধ্যের বাইরে| কতদিনই বা অন্যের বাড়ীতে থাকা যায়‚ বন্ধুটির মা বেড়াতে আসছেন তখন‚ শেষে কাছেই একজনের বাড়ীর চিলেকোঠা মিললো| চিলে কোঠা তাই সই‚ অন্তত: আলোবাতাস আর উন্মুক্ত ছাদ; পাড়াটাও ভাল‚ কোম্পানীর বাসও আসে পাশের রাস্তায়| শুরু হলো ভাড়াটের জীবন| কি কুক্ষণে যে নতুন চাকরীর জন্য জিভ লকলক করে উঠেছিল‚ বেশ তো ছিল তাঁতী‚ রাঁচীতে; বিয়ে করলেই কোয়ার্টার মিলতো| (৫) তখন না ছিল মোবাইল না ছিল কালো ফোন| নতুন বরবধূর যোগাযোগ আদি অকৃত্রিম ইনল্যান্ড লেটারে| চিঠি আসতো অফিসের ঠিকানায় কারণ আমার যে বাঁধা কোন ঠিকানাই হয়নি তখন| আর সেই অফিসের নিয়মে সব চিঠিই খোলা হতো সেন্ট্রাল রেজিষ্ট্রিতে‚ কনফিডেন্সিয়াল বাদ দিয়ে| তাঁকে কে বোঝাবে ঠিকানার উপর সেটা লিখতে! এসব অফিস কেতার সাথে তাঁর কোন পরিচয়ই ছিল না| ফল? মাঝে মাঝে চিঠি আসতো খোলা| ঈশ্বরের অশেষ দয়া‚ তখন ঐ সুদূর শহরে বাঙলা পড়বার লোক কমই আর আমাদের ফ্যাক্টরীতে তো গোনাগুণতি চার কি ছ'জন! সেন্ট্রাল রেজিষ্ট্রিতে সবই অমুক আপ্পা তো অমুক আইয়া‚ আপ্পা ও আইয়া অথবা স্বামী সম্মনসূচক সাফিক্স‚ গুজরাতে যেমন ভাই| নামের শেষে জুড়েই দেয় পাছে কেউ অসম্মান না করতে পারে| মেয়েদের নামে আম্মা| আমার এক সহকর্মী ছিল তার নাম বিজয়াম্মা‚ আমরা আড়ালে হাসাহাসি করতাম‚ তার হাবি তাকে কি বলে ডাকে! Small mercies! (৬) Cometh September‚ সেবার পুজো আশ্বিনেই ছিল| -- (চলবে‚ তবে আজ এই পর্য্যন্ত ভূতের কাহিনী| ভুতের গল্প লিখতে হবে যে| জয়রামজীকী|)

1088

157

দীপঙ্কর বসু

গান ,বাজনা ,কবিতা পাঠের আসর

শিবাজিকে অনুরোধ করেছি একটি টপ্পা গান শোনাতে । তা, ও যতক্ষণে প্রস্তুত হয়ে গানটি শোনাচ্ছে ততক্ষণ আমি একটু গেয়ে নিই । কেউ তো আর মার মার করে তেড়ে আসবেনা গান গাওয়ার অপরাধে । "শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে শেষ কথা যাও বলে'" গানটি শুনে দেখুন তো কেমন লাগে

880

96

জল

গল্প

সুখী পরিবার ................... ফেসবুকে ফটোটা আপলোড করার সাথে সাথেই একান্নটা লাইক| টুকটাক কমেন্ট| একটা একটা করে চোখ বুলিয়ে যায় ঐহি| লাস্ট কমেন্টায় চোখ আটকায়| গোটা গোটা বাংলায় লেখা 'সুখী পরিবার'| বাস্তবিকই একটা সুখী পরিবারের ছবি সে আপলোড করেছে| অমরের পাশে গা ঘেঁষে সে দাঁড়িয়ে আছে| দুজনের দুপাশে দুই ছেলে মেয়ে| তার পাশে ঐশ্বর্য্য আর অমরের পাশে তিতুমীর| তিতুমীর নামটা ঐহির দেওয়া| সেও তো সেই প্রজন্মের নারী যখন আর কৃষ্ণ‚বিষ্ণু‚ সমর এসব নাম রাখার চল উঠে যাওয়ার মুখে| বেশ আনকমন নাম রাখার চল শুরু হয়েছে| আর তিতুমীরের বীরত্ব তাকে বার বার নাড়া দিত| একটা বাঁশের কেল্লাকে সম্বল করে প্রবল প্রতাপশালী ইংরেজ সরকারের তাঁবেদার জমিদারদের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল‚ সেকি নামজাদা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের থেকে কম কিছু| নামটা শুনে অনেকে নাক কুঁচকেছে‚ হেসেছে‚ বাঁকা কথা বলেছে| অমর কিন্তু সেদিন খুব সাপোর্ট করেছে| অমরের কিন্তু দিন দিন গ্ল্যামার বাড়ছে| লোকে বলে প্রেমে পড়লে নাকি রূপ খুলে যায়| অমরকে দেখে তেমনটাই বোধ হচ্ছে| মোবাইল আপলোড ফটোটার দিকে তাকিয়ে থাকে ঐহি| প্রেম যে কি বস্তু আজও বোঝা হল না| সেই কুড়ি বছর বয়সে প্রেমে পরেই বিয়ে| তারপর একে একে ঐশ্বর্য্য‚ তিতুমীর| বেশ তো ভালো এগোচ্ছিল জীবনের চাকা ছোট ছোট সুখ‚ ছোট ছোট দুঃখ‚ ছোট ছোট আবেগ‚ ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়াকে প্যাডল করে নিয়ে| আপাত সুখী পরিবার| না আপাত কেন? ঐহির তো কোনদিন মনেই হয়নি যে এই সুখী পরিবারের খোলসটা আস্তে আস্তে ঢিলে হয়ে আসছে| বোঝার মত সময়ই বা কোথায় ছিল? সংসার‚ মেয়ে-ছেলের স্কুল‚ টিউশন সারাদিন চড়কিবাজির মত ঘুরে চলা| রাতের একান্তে বিছানায় পরম প্রিয় মানুষটার শরীরের সাথে মিশিয়ে দিতে দিতেও তো কোনদিন মনে হয়নি আসলে এটা একটা অভ্যাস| প্রেম আছে জীবনে মধ্য চল্লিশেও সেটাই ছিল বিশ্বাস| কিন্তু অমর একদিন বুঝিয়ে দিল প্রেম ছিল এখনও আছে তবে অন্যভাবে| এখনও মনে পরে সেই দিনটার কথা স্পষ্টভাবে| অমর বরাবর শান্ত প্রকৃতির| উচ্ছ্বাস কম| - তোমায় একটা কথা বলার ছিল| ছেলে- মেয়েরা খেয়ে টেবল ছেড়ে উঠে যাবার পরও সেদিন বসেছিল অমর| ঐহি খেয়াল করেছে কিন্তু জানতে চায়নি কিছু| অনেকদিন পরে রুটিন কথাবার্তার মাঝে বলেছিল অমর| একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ঐহি| - একটি মেয়ের সাথে বেশ কিছুদিন আগেই আলাপ হয়েছিল| আর তারপর বেড়েছে ঘনিষ্টতা| আমি বুঝতে পারছি ঐহি আমি মেয়েটিকে ভালোবাসি| কিন্তু তোমার প্রতি‚ আমার সন্তানদের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে| তাই মেয়েটি চাইলেও আমি বিয়ে করব না| আমরা যেমন আছি তেমনই থাকব| শুধু অনেকদিনের কিছু অভ্যাস পাল্টে যাবে| আমি জানি সময়ের সাথে সাথে তুমিও মানিয়ে নেবে| আর যদি তুমি চাও সম্পর্ক থেকে বেড়িয়ে যেতে আমি বাধা দেব না| আবার একটা নোটিফিকেশন| সেই একই ট্যাগ হ্যাপি ফ্যামিলি| হাসে ঐহি| আসলে এই সুখী গৃহকোন ছেড়ে যাবেই বা কোথায়? মেয়েটা বড় হয়েছে কিন্তু ছেলেটা এখনও বেশ ছোট| আর অমর ওদের ভালোবাসেও ভীষন| সেখানে ফাঁকি নেই| ফাঁকি নেই তার প্রতি কর্ত্যব্যেও| সেদিন সেই কথাগুলো শুনে পায়ের তলার মাটি সরে গেছিল| মাথাটা পুরো ফাঁকা| তার পরেও আরও অনেক কিছু বলেছিল অমর‚ কিন্তু কিছুই শোনেনি ঐহি| কয়েকটা দিন কেঁদেছে-কেটেছে আড়ালে - অবসরে| কিন্তু হা-হুতাশ করেনি| আলগা হয়ে যাওয়া কোন বাঁধনকে শক্ত করে বেঁধে রাখার চেষ্টা হয়ত কিছুদিনের জন্যই সফল হতে পারে‚ বেশিদিনের জন্য নয়| ডিপ্রেশন আর ডিপ্রেশন| ক্রমশ ডুবে যেতে যেতেই ভেসে উঠেছে বারবার| প্রেম‚ ভালোবাসা শব্দগুলো আসলে মস্ত ফাঁকি| তখনি মনে হয়েছে কি এমন বয়স হয়েছে তার? এখনো রাস্তায় বের হলে অনেকের চোখই চকচক করে| অমর যদি প্রেম করতে পারে‚ তবে সে কেন নয়! আসলে সেটা একটা প্রতিহিংসা হয়ত| মনের অন্দরে পালিত একটা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র| কিংবা অমরকে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়াস তোমার কাছে পুরোনো হয়ে গেলেও আমি ফুরিয়ে যাই নি| প্রেম নয় আসলে শরীর| শাকিলের সাথে এই সোস্যাল সাইটেই আলাপ| আলাপ থেকে ভালো লাগা আসতে বেশি দেরি হয় নি| শূণ্য মন‚ বিদীর্ণ হৃদয় অপেক্ষায় ছিল ক্ষতনিরাময়ী এক মলমের| শাকিল সেই মলম| একটু একটু করে তাকে সামলে যেতে সাহায্য করেছে| তারপর তীব্র আকর্ষণে পতঙ্গ উড়ে গিয়েছে আগুনের দিকে‚ আরও একবার নিজেকে ঝলসে নেবার অভিপ্রায়ে| মানসিক আশ্রয় থেকে অবস্থান বদলে গেছে শারীরিক আশ্রয়ে| আর তখনই একটু একটু করে আলগা হয়ে যেতে শুরু করেছে শাকিলের সাথে সম্পর্ক| ঐহি যত ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে শাকিলকে‚ শাকিল তত ছটফটিয়েছে বেরিয়ে যাবার জন্য| আসলে ঐহি কোনদিন বুঝতেই পারেনি এসব সম্পর্কের আয়ু খুব কম| আশা রাখতে নেই‚ প্রত্যাশা তো নয়ই| শুধু তিতুমীর মাঝে মাঝে আজও আসে মায়ের গায়ের গন্ধে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকতে| এখনও যত কথা তার মায়ের সাথেই| তখন যেন আলাদা ভালোলাগা ঐহিকে জড়িয়ে ধরে| আর তো কটা বছর| তারপর তিতুমীরের জীবনের উদ্দেশ্য -বিধেয়গুলো পালটে যাবে‚ প্রয়োজনীয়তা স্থান বদলাবে|ততদিন ‚ ততদিন .. নাহ বাক্যটা শেষ করতে চায় না ঐহি| একটু একটু করে বেরিয়ে এসেছে শাকিলের সাথে সম্পর্ক থেকে| এখন ঐহি অনেকটাই সুখী| কারও কাছে কোন আশা-প্রত্যাশা কিছুই নেই| একই ছাদের তলায় চারটে আলাদা আলাদা ঘরে তাদের চারজনের বাস| যে যার সে তার মত করে বেশ ভালো আছে| একই ছাদের নীচে মাঝেই চলে আসে অত্মীয়- স্বজন‚ ঘনিষ্ট বন্ধু-বান্ধব| অভিনীত হয় সুখী পরিবারের নাটক| সেলফির যুগ| তাই গায়ের ওপ গা লাগিয়ে ওঠে ফটো| পোস্ট হয় সোস্যাল মিডিয়ায়| ঠিক যেমন আজকেরটা| কে বলবে দেখে‚ যে অমর আর তার মাঝে এক ছাদের নীচে থাকা ছাড়া আর প্রয়োজন ছাড়া কোন সম্পর্কই নেই| আপত সুখী পরিবার তাদের| ঝাপসা চোখে লাইক দিয়ে যায় সবকটা কমেন্টে|

873

79

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

নীল সমুদ্র‚ নীল আকাশ| সে কোন সত্যযুগের কাহিনী| মাসটা ছিল এপ্রিল‚ তারিখও মনে আছে‚ কি আশ্চর্য্য! তার মানে প্রখর বৈশাখ| মফ:স্বল শহরে কলেজের সামনের বাস স্টপ| সময় সকাল দশটা‚ এগারোটা হবে বোধহয়| সুদূর হাওড়া থেকে অত সকালে পৌঁছোতে ছেলেটি বেরিয়েছে সেই সাত সকালে| প্রথম দেখা- প্রথম ডেট‚ ইয়াঙ্কী ভাষায়| (২) ছেলেটি পরে এসেছে হোস্টেলের বন্ধুর শার্ট‚ ডেট বলে কথা| বিনা অনুমতিতে ধার করা| কিন্তু অমোঘ প্রবাদবাক্য অনুযায়ী ‚ এসবে পাপ নেই| উত্তেজনায় বুক দুরু‚ দুরু| দেখা নাহয় হলো‚ কি বলবে‚ কোথায় গিয়ে দুদন্ড বসবে সবই ধোঁয়াশা| তো মেয়েটি এলো‚ যথারীতি ছেলেটিকে বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করিয়ে| নীল ছাপা সূতীর শাড়ী‚ কপালে নীল টিপ| ছাপার প্যাটার্ন- জয়পুরী বাঁধনী শাড়ীর মতো তবে ডায়মন্ড শেপের ছাপ আর সেই বড় ডায়মন্ডের মধ্যে ছোট ছোট ডায়মন্ড| অতি পরিচিত‚ অতি সাধারণ ডিজাইন; এখনও বোধ হয় সেই ডিজাইন সমানে চলে| শাড়ী জামার ছাপার ডিজাইন তো কয়েকটা বেসিক‚ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে| ডায়মন্ড‚ জ্যামিতিক আকার‚ ফুল‚ লতাপাতা (a la Taj) অথবা বাঙ্গালীর নিজস্ব কল্কা| এবার একটু ভূমিকা| প্রথম দর্শনেই প্রেম টাইপের কিছুই নয়| আলাপ করিয়ে দিয়েছিল মেয়েটিরই পাশের বাড়ীতে থাকে আমার সহপাঠী| প্রাণের বন্ধু‚ সেই হাই স্কুল থেকে| বন্ধুর ভাই এর পৈতের উৎসবে| তখন তো এখনকার মতো বিয়েফ‚ জিয়েফের চল ছিল না| প্রেম থাক আর নাই থাক প্রেমিক‚ প্রেমিকাই চলতো| ডেমোগ্রাফির হিসাবে ৫০:৫০ হলেও ছেলে ও মেয়ের অনুপাত হাজারে বা খুব বেশী হলে শ'য়ে এক; অন্তত: বাইরের জগতে| কারুর ভাগ্যে প্রেমিকা জুটেছে মানে লোকে তাকে আলেকজান্ডার ভাবতো| (৩) সংক্ষেপে সারি| আলাপের পর‚ অবধারিত প্রলাপ| সেই কয়েক মিনিটের আলাপের পর যেন‚'মন প্রাণ যা ছিল'- এই ২১ শতাব্দীতে অবাক কান্ড মনে হয়‚ তাই না| কিন্তু ভো‚ ভো জনগণ‚ ডিমান্ড সাপ্লাই এর ইকোয়েশন যদি মানেন তবে আশ্চর্য হবার কিছু নেই| তার উপর প্রায় নারী বর্জিত সমাজ| দেখা সাক্ষাত হবে তবেই না গাইতে গাইতে গান? সে সুযোগ কই| কিছু করিতকর্মা ছেলে বোটানিক্যাল গার্ডেনে জীববিজ্ঞানের ক্লাশ করতে যেত আর তাদের জন্যে আসতো হাওড়া গার্লসের পরীর ঝাঁক| বীরভোগ্যা বসুন্ধরা‚ অতএব‚ হাম য্যায়সা বাচ্চে লোগ অঙ্গুলি চুষতে রহো! নীল রঙের খাম; একেবারে কপিবুক মেনেই| দিন দুই তো সপ্তম স্বর্গে অবস্থান- দিবাস্বপ্নও কপিবুক মেনে| সেই সব প্রলাপচারিতার ফলশ্রুতি এই আঠারো তারিখের ডেট| (৪) টিনের বাস‚ কাঠের চেয়ারে নারকেলের ছোবড়ার গদি‚ একদম পিছনের লম্বা সীটের সামনে ডানদিকের 'কাটা' সীট| সে বসে আমি দাঁড়িয়ে| কি কনট্রাস্ট| কোথায় লেদার অ্যাডজাস্টেবল‚ এর্গোনমিক‚ শীতে যা হীটেড করবারও ব্যবস্থাওয়ালা সীট আর কোথায় নারকেলের শক্ত ছোবড়া| একেবারে আনরোম্যান্টিক| আধঘন্টাটাক দূরে গিয়ে নেমে পড়া গেল এক গঞ্জ মতন স্টপে| তারপর? একটু হেঁটে কোন এক বিশাল দীঘির পাড়ে‚ চটকা গাছের গুঁড়ির উপর বসা| (চটকা= শিরীষ?)| একটি ছেলে আর একটি মেয়ে ছাড়া সবই কেমন বেখাপ্পা‚ নয় কি? কথাবার্তা? দূর মশায়‚ সেসব কি কেউ মনে রাখে‚ না মনে থাকে? তবে‚ না থাক! (৫) পরিণতি? ঠিকই ধরেছেন| অবধারিত ল্যাং| আসলে আমি ছিলাম তার টেষ্টিং দ্য ওয়াটারস| তার প্রেমের মানুষটি আমার সেই বন্ধুটি| তবে আমার পা মাটিতেই ছিল‚ প্রাথমিক শক কাটিয়ে উঠবার পর| তারা সাত বোন‚ বাবার বিড়ির পাতা‚ তামাকের ব্যবসা| পাশের বাড়ীর বন্ধুটির প্রতিষ্ঠিত পরিবার| মেয়েটির সহজাত নিরাপত্তাবোধ তাকে শিখিয়েছে‚ খুঁটে খাবার| 'টুটা ফুটা' ইঞ্জিনীয়ার ( আমার সহধর্মিণী প্রদত্ত অভিধা) উইথ বিশাল সংসারের জোয়াল কাঁধে‚ সেই ঘোড়া যে আদৌ দৌড়োবে না‚ বরং গাধার সমান‚ এটা বুঝবার বুদ্ধি মেয়েটির ছিল| অতএব সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেষ্ট| রাখাল ছেলে আর রাজার মেয়ে হ্যানস অ্যান্ডারসেনের গল্পেই মানায়| (৬) তারপর? জীবন সংগ্রামে সকলেই নিজের নিজের ফ্রন্টে| বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ কখনই বিচ্ছিন্ন হয়নি‚ শত্রু মিত্র সকলের খবর রাখা আমার বদভ্যাস| বন্ধুটি যথারীতি ইনকাম ট্যাক্সের চাকুরে বাপের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে মনের সুখে সংসার করছে| পুত্র কন্যা‚ নাতি নাতনি পরিবৃত| বছরে একবার ভ্রমণ‚ কলিকাতায় ফ্ল্যাট‚ একেবারে কপিবুকের প্রতিষ্ঠিত সুখী মানুষ| মেয়েটি? বড্ড বেশী আমার বন্ধুটির প্রেমে পড়েছিল‚ সেই ঘোর তার কখনই কাটেনি| লেখাপড়া করে‚ ইংরেজীতে এম এ| বিয়ে থা করে অন্য জেলার এক সদরের স্কুলে শিক্ষিকা| ঐ যে বলেছি‚ আমি সকলেরই খবরাখবর রাখি‚ চেষ্টা করি| সমুদ্রে তারা দেখে বিয়ারিং রাখার মতো| ছোট্ট এই নগণ্য জীবনে কতই বা মানুষের সাথে পরিচয় হয়‚ দুশো? আর কাছ থেকে দেখা মানুষের সংখ্যা বোধহয় পঞ্চাশও নয়; এই বিশাল পৃথিবীতে ৬০০ কোটি লোকের মধ্যে মাত্র ২০০! সবই খবর ঐ বন্ধুরই মারফত‚ তাও অনেক জেরা করে তবেই| ছাড়াছাড়ি(?) হবার বছর পনেরো বাদে একবার দেখা হয়েছিল‚ চান্স মীট‚ এবং সেই কলেজের সামনে| আমি চিনতেই পারিনি| ঠিকানাও দিয়েছিল‚ ব্যস| না‚ আমি মনে ক্ষোভ পুষে রাখিনি‚ আমি জানতাম হোয়ার আই স্ট্যান্ড| আর তেমন তো আকুলি বিকুলি ছিল না‚ ঐ সাধারণ বয়সের ব্যাপার সাপার| বরং নিজের অদৃষ্টকে ধন্যবাদ দিই‚ সম্পর্ক আর এগোয়নি বলে| আমার নুন আনতে পান্তা ফুরানো জীবনে উচ্চাকাঙ্ক্ষীর আগমণ কখনই সুখের বা শান্তির হতো না| বিশেষ করে তার ব্যথা ছিল অন্যখানে| ঠিকানার কোন ব্যবহারই হয়নি‚ মুখস্থই ছিল‚ অমুক জেলাসদরের সরকারী গার্লস কুল এবং সেখানে টীচার; এটুকু ভুলে যাওয়া শক্ত| তার জন্মদিনে একবার কেন জানি না একবার শুভেচ্ছা পাঠাতেই ফেরৎ ডাকে এলো একটা কবিতা| "আমার যা শ্রেষ্ঠধন‚ সে শুধু........" আর শেষে‚ 'আমি বোধহয় ভুল করেছি!' থার্টি ইয়ার্স টু লেট! ওহ‚ কোন অনুচ্ছেদে বলি: নতুন বয়স আমার‚ ইংরেজী উপন্যাসে হাতেখড়ি হয়েছিল এক নীরস জেন অষ্টেনে- ভিক্টোরিয়ান প্যাচপ্যাচানি! তা থেকেই সে আমার কাছে হয়ে গিয়েছিল ‚ "Cynthia" | এবং ম্যাচিং ইঞ্জিরী নামের প্রয়োজনে আমি হয়ে গেলাম- জানেন তো সবাই| সিন্থিয়া গন কিন্তু আমি সেই নাম বহন করে চলেছি‚ বিচ্ছেদের পর পদবী বয়ে বেড়াবার মতো‚ ম্যাডেলিন অলব্রাইট যেমন বয়ে বেড়িয়েছেন বা মিসেস মার্কেল| (৭) বন্ধুটির পৈতৃক বাড়ীতে জ্ঞাতি গুষ্ঠি মিলিয়ে অনেক কাকা‚ জ্যাঠা| যাতায়াতের ফলে আমার সাথে তাদের অনেকের সাথেই যোগাযোগ রয়েছে| সেই সেদিন ডাক্তার কাকিমার সাথে ফোনে কথা বলছিলাম| এই কাকিমা আমাদের চেয়ে বয়সে সামান্য বড়‚ তিনি সবই জানতেন| 'একটা খারাপ খবর আছে‚ সুমি মারা গেছে'! সুমি অর্থাৎ সুমিতা‚ নীল শাড়ী পরিহিতা| তারপর কয়েকবার বন্ধুটিকে ফোন করেছি‚ অনেক কথা হয়েছে‚ তার ছেলের বিয়ে‚ মেয়ে হায়দারাবাদে স্বামীর কাছে চলে গেছে‚ কোথায় কোন চা বাগানের বাংলোতে বেড়াতে গিয়ে কাটিয়ে এসেছে‚ সবই| কেবল তার নাম একবারও উচ্চারণ করেনি| আমিও চুপ করে থেকেছি| বন্ধুটির সাথে সুমির ফোনে যোগাযোগ ছিল‚ আসলে সুমি তাকে ভুলতেই পারেনি| আমি পার্শ্বচরিত্র তবু ফর ওল্ড টাইমস সেক‚ বন্ধুটিকে কতবার যে অনুরোধ করেছি‚ এই চার দশক বাদে সে কেমন দেখতে হয়েছে রে? ছবি দেখাতে পারিস‚ আজকাল তো ছবি ফটো তো জলভাত| এড়িয়ে গেছে| (৮) যেদিন খবরটা পাই‚ তখন ছিল শুক্লপক্ষ‚ পিছনের ব্যাকইয়ার্ডে লাইট পল্যুশন নেই বলে সেই নীল শাড়ী পরা মেয়েটিকে যেন দেখতে পেলাম| নাহ‚ দু:খ হা হুতাশ নয়| শুধু সেই চটকা গাছের কথা মনে পড়লো‚ তার আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল‚ পরিষ্কার রোদ সেদিন| সুমি‚ তোমার obituary তো The Statesman এ বেরোবে না‚ আমিই না হয় লিখলাম| নীল শাড়ীটা সঙ্গে নিয়ে গেছো তো? নীল আকাশের সাথে ম্যাচ করবে| https://www.youtube.com/watch?v=h2Z0dRI9CFg

837

77

শিবাংশু

দাশুরায়ের দাপট

বর্ধমানের বাঁধমুড়া গ্রামে ১৮০৬ সালে ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছিলেন এই ধীমান মানুষটি। পীরগ্রামে মামা'র কাছে বাংলা আর ইংরেজি শিখে অল্প বয়সেই নীলকুঠির কেরানি হয়েছিলেন তিনি। এতোদূর পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু যখন কবিগানের নেশায় আকা বাইয়ের দলে যোগ দিলেন, বাড়ির লোক তাঁকে ত্যাগ করলো। এ কী ব্রাহ্মণের যোগ্য কাজ? ব্রাত্যজনের নেশা এই সব। তাও ছাড়েননি কবিগান। কিন্তু যখন কবিয়াল রামপ্রসাদ স্বর্ণকার তাঁকে আসরের মধ্যে তিরস্কার করলেন, তখন তিনি কবিগান ছেড়ে পাঁচালিরচনা শুরু করলেন। সেও সেই ১৮৩৬ সালে। এ পাঁচালি সাবেক লক্ষ্মী বা মনসার পাঁচালি নয়। সম্পূর্ণ নতুন ধরণে সমাজসচেতন, 'লোকশিক্ষে'র মাধ্যম ছিলো সেই সব গান। নবদ্বীপের উন্নাসিক পণ্ডিতসমাজ সেই পাঁচালিগানের নতুনত্ব দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। স্বয়ং রাজা রাধাকান্ত দেব ও বর্ধমানরাজের মতো দিগগজরা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। ১৮৫৭ সালে তিনি গত হ'ন। পাঁচালিকার হিসেবে বিখ্যাত হলেও তাঁর বিভিন্ন রকম বাংলাগানে গভীর ব্যুৎপত্তি ছিলো। মাতৃসঙ্গীত, বৈঠকী গান বা কীর্তন, বাংলাগানের সব শাখাতেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। তাঁর একটি টপ্পাঙ্গের গান, অক্ষম প্রয়াস করেছিলুম, সহিষ্ণু বন্ধুদের জন্য এখানে রাখ্লুম। দাশরথির ট্রেডমার্ক উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাশ এতো ছোটো পরিসরেও শুনতে পাচ্ছি আমরা.... কৃষ্ণের আক্ষেপ, " লিখিতে শিখিলাম আমি কই...."

70

6

ইলতুৎমিস

আজকের আপডেট

নতুন কোন আপডেট দেবার নেই| বাড়ী থাকার চেয়ে অফিস যাওয়া শ্রেয়| সেখানে ফ্রী'তে গরম‚ সরকারী মাল‚ বেশ ২১ ডিগ্রীতে সেট করা থাকে| নাহ‚ অফিসেই ফিরে যাবো বোধহয়| দোটানায় আছি| আর কিছু নাহোক‚ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া| বাড়ীতে ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু এই তো আবার ইলেকট্রিসিটি ও গ্যাসের দাম বাড়লো‚ প্যারিসে গিয়ে কি সব চুক্তি সই করে এসেছেন এনারা| ক্লাইমেট চেঞ্জের বিষয়ে আমি ডোনাল্ডদার সাথে সহমত| -- দেশে যাবার টিকিট কেনা হলো| আগে? ত্রাভেল এজেন্টের সাথে এটা না সেটা সব ঠিক ঠাক করে উঠতে ঘন্টা দেড়েক তো ফোনে‚ কান ব্যথা হয়ে যেত| এখন শুধু ক্লিকের অপেক্ষা| ভাবা যায়‚ এই সেদিনও সাউথ ইষ্টার্ণ রেলের এসপ্ল্যানেড ম্যানসনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে| তায় আবার পাশ দিয়ে‚একটা কথা জিজ্ঞেস করার নাম করে লোকের ঢুকে পড়া| টিকিট কেনা তো নয়‚ যুদ্ধ জয় করা| এখনও পাশ দিয়ে যেতে বাড়ীটাকে দেখলে আতঙ্ক হয়| আর ব্যাঙ্কে? সে কথা না ওঠাই ভাল| -- এবার কিছু নিজেদের কথা| হিন্দু টেম্পল‚ নর্থ সাউথ দুই প্রজাতিরই টেম্পলে অতি অবশ্যই ভোজন প্রসাদ থাকে| ফ্রী'তে| ISKCON এ ও| তা যাদের একটু লোকলজ্জা আছে‚ মেম্বারশিপের চাঁদা দেয়‚ অবরে সবরে ডোনেশন দেয়| টেম্পল বলে তো প্রপার্টি ট্যাক্স থেকে ইলেকট্রিক সব তো সর্বশক্তিমান পুষ্পবৃষ্টি করেন না| খাবার দাবার‚ আই মীন প্রসাদও গুপী গায়েনের বরে সাপ্লাই হয় না| একটা জিনিষ সকলেই একমত| পুজো শুরু হলো‚ কীর্তন ভজন সবই চলছে‚ হল ফাঁকা‚ গুটি কয়েক নির্জলা ভক্ত| কিন্তু ধীরে ধীরে প্রসাদ বিতরণের- চর্ব্য চোষ্য সবই‚ সময় এগিয়ে আসে অমনি হল ভরতে থাকে| মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন| BTW সাউথ ইন্ডিয়ান টেম্পল বাড়ীর কাছে হলেও আমরা ৩৫ কিমি উজিয়ে নর্থ ইন্ডিয়ান টেম্পলে যাই| যদিও সেখানেও লক্ষ্মীর চার হাত| সাথ ইন্ডিয়ান টেম্পলে গেলে দেব দেবীদের কেমন যেন আনকা লাগে‚ বড় বেশী সিরিয়াস তাঁরা|

1127

125

ইলতুৎমিস

শকুন্তলার প্রত্যাবর্তন

পর্ব-২ ভারত ভ্রমণ| তা প্রায় এগারো বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে| এই তো সেদিন ২০০৬ সালে‚ মধ্যেকার বৎসর‚ মাস যেন ঝড়ের বেগে চলিয়া গেল| এইসব পশ্চিমী দেশে সময় যেন বড় দ্রুতবেগে ধায়| প্রাণ রাখিতেই প্রাণান্ত| একে তো অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তদুপরি গৃহকর্ম| দেশের ঝি চাকর পরিবৃত পিতা কণ্বের সংসারে লালিত‚ ননীর পুতুলের ন্যায় ছিল তাহার শরীর| রবি বর্মার চিত্রের ন্যায় শকুন্তলার গোলগাল‚ চিকনি চামেলী শরীর আজি শুকাইয়া কাঠ| তার উপর লন্ডনের এই আবহাওয়া! এখানে নবজাতরা ক্যাঁ করিয়া উঠিতেই নার্স তাহাদের হাতে একটি করিয়া ছাতা ও এক বাক্স নাক ঝাড়িবার টিস্যু ধারাইয়া অভ্যর্থনা করেন| 'বাছা‚ এই তো শুরু| বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া| সারাজীবনের সঙ্গীর সহিত পরিচিতি লাভ করহ|' জিয়েফসির ধাক্কায় দুষ্যন্তের চাকরী নট| আয় নাই অথচ তাঁর সেই রহিসি মেজাজ রহিয়া গিয়াছে| পাবে যাতায়াত অব্যাহত| পাইঁট কে পাইঁট আইরিশ বীয়র আকন্ঠ পানের অভ্যাস তাহার; কে যোগাইবে তাহার খরচ| অগত্যা লন্ডনের রাস্তায় ট্যাক্সি চালকের আসনে উপবিষ্ট হইয়া তাহার দিন কাটে| হায় রে কোথায় গেল‚ সেইসব সোনালী দিন| কলিকাতায় বুনি উঠিতে না উঠিতে তাহার মোটরবাইকে শহর পরিক্রমা‚ ছিপলি দেখিলেই হিড়িক মারা‚ সকলই গন উইথ দ্য উইন্ড| রয়্যাল এনফিল্ডের ভট ভট ভট‚ ডুব ডুব শব্দে শকুন্তলার সদ্য যৌবনা মস্তক থাউজ্যান্ড আরপিয়েমে ঘুরিবার ফলশ্রুতিই তো বকখালিতে গমণ| হায়রে যৌবন বড় ক্ষণস্থায়ী‚ 'জীবন প্রবাহ বহি কালসিন্ধু পানে' অতীব তাড়াতাড়ি ধায়| কবি গাহিয়াছেন‚ মহা বিশ্বে সবকিছু ধায়িছে টাইপের কিছু| শকুন্তলা কি অতশত জানেন‚ পালিত পিতার গৃহে গৌতমী মাতা ও পিতা কণ্বের আদরের দুলালী‚ অতি কষ্টে বি.এ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন‚ ভাগ্যিস| সেই সাদা মাটা বিএ তাহার সাথ দিতেছে এখন| একটি খুচ খাচ বি এড ডিপ করিয়া তিনি এখন একটি কিন্ডারগার্টেনের টীচার| এদেশে অবশ্য মিস বলিয়া সম্বোধনের চল নাই‚ ম্যাডাম অথবা স্যারও অপ্রচলিত‚ শুধুই মিসেস বসু| পশ্চিমী দেশ‚ ফরেন দূর হইতেই অতীব সবুজ মনে হয়‚ হীথরো'র ইমিগ্রেশন কাউন্টার পার হইবার পরই বুঝা যায়‚ হাউ মেনি প্যাডি মেকস হাউ মেনি রাইস! দুইজনে রোজগার করেন‚ নতুবা সংসার আজি কোথায় ভাসিয়া যাইতো ! মিনসের তো কাজে মন নাই‚ তাহার ইচ্ছা ডোল এ বসিয়া খাইবেন‚ পাবে ফুটা মস্তানী করিবেন; কথায় বলে স্বভাব যায় না ম'লে| এদেশে আসিবর পর দুষ্যন্ত ট'বাবুর স্টীল মিলে বেশ কয়েক বৎসর আরামে কাটাইয়াছেন| মেকানাইজড মিল‚ তাহার তো কোন টেকনিক্যাল কোয়ালিফিকেশন কোন জন্মেই ছিল না‚ স্টোরস ক্লার্ক| স্টীল মিলের স্টোরস বলে কথা‚ আদতে একটি বিশাল ফ্যাকটরি বলিলে অত্যুক্তি হয় না| কিন্তু সুখ সহিলো না তাহার কপালে| ঐ চাইনীজ ব্যাটারা যে সুলভ মূল্যে ইস্পাত সারা বিশ্বে সাপ্লাই করিবে কে জানিত| তাহার কলিকাতাতুত ভ্রাতা পিত্তলের দুনিয়াও টলোমলো চৈনিক আগ্রাসনের মুখে| সবার দিন কি একই ভাবে যায়! দুষ্যন্ত'র মাঝে মধ্যেই দেয়ালে লিখিত চেয়ারম্যানের বাণীর কথা মনে পড়ে‚ ঐ লোকটির কি অমোঘ দূরদৃষ্টি; বলো বলো ‚ বলো সবে চিল চিৎকারে কি জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন মেলে? শুধু কথায় কবেই বা চিঁড়া ভিজিয়াছে| উন্নতির নিমিত্ত চাহি পরিশ্রম‚ নিয়মানুবর্তিতা| তো ট'বাবুর ইস্পাত কারখানা হইতে রিডান্ডান্সি বাবদ কিছু থোক টাকা হাতে আসিয়াছিল| তাহা লইয়া দুষ্যন্তের ফুটানি কে দেখে! অসৎসঙ্গ তাহার ভূষণ| কয়েক সপ্তাহ নিরুদ্দেশ- টাকা ফুরানো অবধি থাইল্যান্ডে এসকর্ট পরিবৃত হইয়া হলিডে বানাইয়া ফিরিলেন| শকুন্তলা প্রথমে আন্দাজ করিতে পারেন নাই| ভাবিয়াছিলেন‚ বেচারীর চাকুরী নাই‚ আশিয়ান টাইগারদের দেশে ফোকসওয়াগনের নতুন কারখানা খুলিয়াছে‚ তথায় তাহার পতিদেবতা নিজ ভাগ্য ফিরাইবেন আর তিনিও তল্পি তল্পা গুটাইয়া ট্রপিকসে প্রস্থান করিবেন| ভরতকে লইয়া চিন্তা নাই কোনও বোর্ডিং স্কুলে দিলেই হইলো| আহা ট্রপিকস| পাপায়া‚ আম কাঁঠাল গাছ এমনকি নিম গাছ দেখিতে যে এত নয়নাভিরাম‚ তাহা কে জানিতো| চারি ঘন্টার উড়ানে এনেসসিবিআই ইয়ানী দমদম এয়ারপোর্ট‚ এমন দিন কি কভূ আসিবে| কিন্তু হায় রে শকুন্তলার কপাল| দুষ্যন্ত সেখানে মৌজ মস্তির নিমিত্ত গিয়াছেন তাহা শকুন্তলা আন্দাজও করিতে পারেন নাই| ঐসকল দেশে‚ পাব এ ‚ ডান্স বার এ বসিতে না বসিতে‚ ' উইল য়ু বাই মি এ ড্রিঙ্ক?'| ওয়ান থিং লীডস টু অ্যানাদার| বারওয়ালারা সম্যক অবহিত‚ কে কাস্টোমার আর কে ছেলেধরা| তাহাদের ব্যবসায় তো এই| জল ভিজাবো না ব্যবসায়ে অচল| আসল মুনাফা তো ঘন্টাপ্রতি ঘর ভাড়ায়| এসবের পরিণতি যাহা হইয়া থাকে‚ বাহ্ট ফুরাইতেই ঘরের ছেলে ঘরে| এবং দিনরাত গঞ্জনা ও পাব এর খরচ জুটাইতে এই ট্যাক্সি চালনা| শকুন্তলা নীরবে অশ্রুপাত করেন| ওসমান সাহেবের গৃহে অবস্থানের দিনগুলির কথা মনে পড়ে| শেষ বয়সে তাঁহার সিলেটে যাইবার ইচ্ছা বলবৎ হয়‚ সেখানেই তাহার ইন্তেকাল হয়; বাপ দাদা চাচাদের পাশেই মাজারে তাহার শেষ শয্যা| মার্গারেট পতির সহিত যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে বিচক্ষণ ওসমান তাহাকে নিবৃত্ত করেন| সেখানে মার্গারেট কখনই মানাইতে পারিবেন না ইহা তিনি সম্যক জ্ঞাত ছিলেন; কোথায় রানিং ওয়াটার আর কোথায় বা বাথরুম শাওয়ার? টিউকল তলায় ঘ্যাটাং ঘাটাং করিয়া গোশলের পানি আর দীঘিতে স্নান‚ মার্গারেটের কভূ সহ্য হইবে না| বরং স্মৃতিটুকু থাকুক| মার্গারেট এখন এক বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক| রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ের সঞ্চয়ের কিছু পাউন্ড ওসমান সাহেব সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ডে নিয়মিত জমা করিতেন; তাহাই ফুলিয়া ফাঁপিয়া মার্গারেটের খরচে লাগে| তিনি দয়াশীলা‚ শকুন্তলাকে নিজের কন্যার নায় আশ্রয় দান করেন‚ ঈশ্বর তাহার প্রতি কৃপা বর্ষণ করিয়াছেন‚ তিনি কাহারও দয়ার প্রতি নির্ভর নন| (চলিবে) ৩৪২১৯৬১৭

376

9

দীপঙ্কর বসু

পাহাড়তলিতে কদিন

সান্থালিখোলা পরের দিন সকাল নটায় একটা টাটা সুমোয় চেপে আমরা রওয়ানা হলাম সামসিং সান্থালিখোলার পথে । অবাক কান্ড , গাড়ির চালককে প্রথম দর্শনে আমার পছন্দ হলনা । রোগা টিং টিঙে চেহারা,গালে কয়েকদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি ,আর নাকের নিচে ফুলঝাড়ুর মত ঝুলন্ত বিচ্ছির একজোড়া গোঁফ ! তবে চালকবাবুর চেহারা যতই আমার মনে বিরূপতার জন্ম দিক না কেন ক্রমশ প্রকাশ পেল রায়চৌধুরি লোকটি অত্যন্ত ভদ্র – কিছুটা বেআক্কেলে হয়ত বা ।কিন্তু সে কথা পরে হবে । আপাতত আমরা দ্রুতবেগে চলেছি ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে । আমাদের দুপাশে ঘন সবুজ বন ।বেশ কিছুদূর চলার পর ডাইনে বাঁয়ে কয়েকটা মোচড় মেরে আটকে গেলাম একটা লেভেল ক্রসিং এ । গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আর সৌম্য নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে । যদিও রায়চৌধুরি মৃদু আপত্তি জানিয়েছিল আইনের দোহাই দিয়ে । এই বনাঞ্চলে নাকি পায়ে হেটে চলাফেরা করায় নিষেধ আছে ! পথের দু পাশে লম্বা লম্বা গাছের সবুজ বন । গাছগুলোর কালচে বাদামি গুড়ির ফাঁকে সবুজ পাতার ফাঁকফোকর গলে এসে পড়ছিল সকালের নরম রোদ্দুর । ভারি মায়াময় আলোআঁধারির সৃষ্টি হয়েছিল ।সেই সঙ্গে সবুজ ক্যানভাসের এখানে ওখানে লাল ,বেগুনি আর হলুদ রঙের ছোঁয়া ! এমন অপার্থিব দৃশ্য দেখে স্থির থাকা যায় ? গাড়ির মধ্যে নিজেকে আটকে রাখা যায় ? ইতিমধ্যে প্রচুর হাঁকডাক সহকারে ঝমাঝম করে উপস্থিত হল একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন । ট্রেন পার হয়ে যাবার পর গেট খোলার উপক্রম হচ্ছে দেখে রায়চৌধুরি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছেন দেখে আমরাও ঝটপট ফিরে এলাম যে যার আসনে । রায়চৌধুরির কাছে সংবাদ পেলাম কিছু দিন আগেই এই লেভেল ক্রসিঙের কাছেই লাইন পার হতে গিয়ে কয়েকটি হাতি নাকি ট্রেনের ধাক্কায় মারা পড়েছিল । মনে পড়ে গেল ঘটনাটা খবরের কাগজে বেশ আলোড়ন জাগিয়েছিল । তারপর থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সমস্ত ট্রেন চলে ধীর গতিতে – প্রচুর শোরগোল তুলে । বেড়াতে বেরিয়ে সময় বা দূরত্বের হিসেব করতে যাওয়া বৃথা ।স এহিসেব আমি রাখিও না,তাই লেভেল ক্রসিং থেকে ছাড়া পাবার পর কতক্ষণ চলেছি বা কত দূর গিয়েছি মনে নেই।মনে আছে সমতল পথে চলতে চলতে গাড়ি সহসা একটা বাঁক নিয়ে চড়াই ভেঙ্গে উঠতে লাগল ওপরের দিকে । গাড়ি টিলার ওপরের দিকে যেমন যেমন উঠছে নিচের দিকে সমতলের ঘরবাড়ি ,রাস্তাঘাট ,গাছপালা সবই ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে । বেশ কিছুটা চড়াই পথ অতিক্রম করে গাড়িটাকে একটা পাঁচিল ঘেরা পার্কার গেটের সামনে দাঁড় করালেন ।সুন্দর করে গোছান পার্কটা একেবারে খাদের গায়ে । আমরা সটান চলে গেলাম খাদের ধার ঘেঁষা পার্কের রেলিং এর কাছে ।সেখান থেকে দেখলাম অনেকটা নিচে ফেলে আসা জনপদ যেন ওপরের দিকে মুখ তুলেয়ামাদের দিকে হাত নাড়ছে। এখান থেকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে জনপদটাকে । তার খানাখন্দ , নালানর্দমা – এক কথায় যা কিছু অসুন্দর তা যেন প্রকৃতি একটা সবুজ চাদরে মুড়ে দিয়েছে । সে চাদরের জায়গায় জায়গায় বেগুনি রঙের ছোপ । মিনিট পনেরো কুড়ির বিরতির পর আবার আমাদের চলা শুরু হল । রাস্তার দুপাশে এখন পরের পর চা বাগান ।কোনটা ডানকান ,কনটা বা গুডরিক বা টাটা টি । দুই একটি চা বাগানের মাঝে বাংলো , দুই একটা টি প্রসেসিং প্ল্যান্টও দেখা গেল ।যদিও তার কোনটিতেই কোন কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়লনা । প্রায়ই শোনা যায় উত্তরবঙ্গে চা শিল্পের সঙ্কটেতর কথা ।হয়তো সেই সঙ্কটের জেরেই প্রসেসিং প্ল্যান্টগুলোর এমন ভুতুড়ে দশা । সে সব পিছনে ফেলে আমরা একটা জনাকীর্ণ বাজারের বিকিকিনি ছাড়িয়ে একটা সঙ্কীর্ণ গলি পথে ঢুকলাম ।পথের দুপাশে টিনের চালের ছোট ছোট বাড়ির সার । প্রতি বাড়ির সামনে একচিলতে কাঠের রেলিং ঘেরা বারান্দা ।দুএকটা বাড়ির সামনে দেখলাম অল্পবয়সী যুবকরা জটলা করছে ,আবার কোন কোন বারান্দায় বসেছে মেয়েলি গল্পের আসর । খাঁদা নাক , খর্বাকৃতি এ মেয়েদের পরনের বেশবাস চোখে পড়ার মতই রংচঙে । আমার মনে হল যেন বেগুনি আর আকাশী নীল রঙের প্রতি বেশ কিছুটা পক্ষপাতিত্ব আছে এদের । প্রতি বাড়ির বারান্দায় ছোট ছোট টবে নানা রঙের ফুলের গাছ সাজান রয়েছে ।তবে পোশাক আষাকে কিম্বা গৃহসজ্জায় যতই রঙের বাহার থাকুক না কেন বাড়িগুলো বেজায় নোংরা আর পাড়াটার দশা তথৈবচ । আমার মনোভাব আঁচ করেই রায়চৌধুরি মন্তব্য করে “ব্যাটারা মাসে একদিন চান করে কিনা সন্দেহ । কাছে যায় কার সাধ্য ।গায়ের গন্ধে ভুত পালায়”। বেলা এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম সান্থালিখোলায় একটা মোটামুটি সমতল জায়গা দেখে গাড়ি থামালেন রায়চৌধুরি । এর আগে কোন টুরিস্ট গাড়ির ই যাবার অনুমতি নেই । গাড়ির ভিতর থেকে মাটিতে পাদিয়েই চোখে পড়ল একটা ঘন সবুজ পাহড়ি টিলার দিকে । টিলার গায়ে ঝাঁকে ঝাঁকে লম্বা লম্বা গাছ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে হঠাৎ আমার পিতামহ ভীষ্মের শরশয্যার কথা মনে পড়ল । গাছগুলো ঘন সবুজ পাতায় মোড়া আর তাদের মাথার ওপরে ঘন কুয়াশার ওড়না বিছান ।টিলার গায়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন উচ্চতায় কয়েকটা বেশ সুন্দর বাংলো টাইপের বাড়ি চোখে পড়ল । মনে মনে ভাবলাম ওই রকম একটা বাংলোতে কয়েকটা দিন কাটাতে পারলে বেশ হত। এমনি কতশত ইচ্ছাই ত অপূরণ রয়ে গেল এ জীবনে । অনেকক্ষণ সেদিক থেকে আর চোখ সরাতে পারিনা । কিন্তু শুধু ওই টিলার দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবেনা এই চত্বর থেকে একটা ঢালু রাস্তা সর্পিল পথে নেমে গেছে বেশ অনেকটা নিচুতে । সবাই দেখলাম সেই দিকেই চলেছে ।সে পথের প্রান্তে কি আছে তা না জেনেই আমিও চললাম সবার পিছু পিছু । নিচের দিকে নামতে নামতে ভাবছি ফেরার সময়ে এই পথেই আবার চড়াই ভেঙ্গে উঠতে হবে পায়ে হেঁটে ।কাজটা খুব সহজ হবে না জানি ,কিন্তু কেমন জানি মনে একটা রোখ চেপে গেল । যা থাকে কপালে বলে ভাবনা চিন্তা ছেড়ে নামতে লাগলাম সর্পিল পথ ধরে। তবে পথের কষ্ট ভোলানোর জন্যে প্রকৃতি দেবী তার রূপের পশরা সাজিয়ে বসেছেন পথের ধারে । পথের ধার ফিটে আছে অজস্র বনফুল ,কত যে লতা গুলম ,ফার্ন গাছ কোথাও আবার পাথরে ফাটল বেয়ে নেমে আসছে শীর্ণ জলধারা ।চলার পথটাই এত সুন্দর যে পথের ক্লান্তির কথা মাথায় থাকেনা । নামতে নামতে অবশেষে গিয়ে পৌঁছলাম দুপাশের পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা এক খরস্রোতা নদীর তীরে । নদীর নাম সান্তালি খোলা । খোলা নাকি স্থানীয় ভাষায় নদীর প্রতিশব্দ ।অপরের দিক থেকে নেমে আসা পথটা শেষ হয়েছে নড়বড়ে একটা কাঠের সেতুর মুখে ।আমরা সেই সেতু পেরিয়ে এসে দাঁড়ালাম নদীর ধারে । খরস্রোতা নদী গর্ভে পড়ে আছে অজস্র বোল্ডার । সে সব বোল্ডারে নদীর স্বচ্ছ হাল্কা নীলাভ জল বাধা পেয়ে জায়পগায় জায়গায় ফেনিল আবর্ত তৈরি করছে । বেড়াতে আসা লোকেদের মধ্যে অল্পবয়সীদের ভিড় ই বেশি । বিশেষ করে দুই এক জোড়া দম্পতির হাবভাব দেখে মনে হল তারা হয়তো সদ্য বিবাহিত । তারা নিজেদের মধ্যেই বিভোর হয়ে আছে । এক জোড়া দম্পতি দেখলাম নদীরও জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে পাশাপাশি খুব ঘন হয়ে ।তাদের ভাব দেখে মনে হল সমাজ সংসার মিছে সব ...। ফেরার ভাবনাটা মনকে পীড়া দিচ্ছিল বলে কিছুক্ষণ সেই নদীর ধারে কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম । জানি এবারেই কথন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে এই চড়াই ঠেলে ওঠার। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম আমার ভগিনীটি কি এক অদ্ভুত কৌশলে সিকিউরিটি সার্ভিসের এক জীপের চালককে কিছু অর্থের বিনিময়ে রাজি করিয়ে ফেলেছেন আমাদের মত বয়স্ক লোকেদের তার জীপে করে ওপরে যেখানে আমাদের গাড়ি আছে সেখান অবধি পৌঁছে দিতে । হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম । তবে এই পর্বের ওপরে যবনিকা টানার আগে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে নদীর খাত থেকে ওপরে উঠে এসে একটি দোকানে র টেরেস এ বসে মৌজ করে বীয়ার খাওয়া আর সঙ্গে অতি উপাদেয় চিকেন মোমোর চাট – সর্বক্লান্তি হরা । অমন স্বাদ আমি কলকাতায় কোথাও মোমো তে পাইনি । আর সঙ্গের ঝাল সস – সেও তুলনা রহিত ।

141

14

Kaushik

বাবাকে না পাঠানো খোলা চিঠি

অল্প আঁকিবুকি| শব্দের| শিক্ষকের জীবন| দুজনারই| নেহাত মন্দ নয়| অল্প সম্মান‚ অল্প অর্থ‚ অল্প আরাম| এই সব অল্প‚ অল্প-অল্প করে মিলে - অ-নেকটা সুখ| তা অনেকটাই| লেখাপড়া-গবেষণার সময় চুরি করে অল্প লেখালিখি| অল্পই| বেশ লাগে| দশদিকে চিৎকৃত ভোগবাদের হাতছানি| কিন্তু অর্থের ভাঁড়ারে যে টুকু আছে‚ তা দিয়ে খেয়ালি পোলাও ভিন্ন অন্য রান্না চলে না! তবু আছি| বেশ আছি| দুটো ফুল| চারা গাছ বললেই হয়ত সঠিক উপমা হয়| যত্ন করতে হবে| লালন ও| পরিনত করতে হবে মহিরুহে যাতে কিনা অপরকে ছায়া দিতে পারে| ছায়া দিতে পারাটা জরুরি| বাবা একবার বলেছিলো - বট গাছের মতন হবি‚ তোদের ছায়ায় যেন অপরে আশ্রয় পায়| কিন্তু বাবা‚ আশ্রিত যদি আমারই দাড়ি ওপড়ায় - তখন? আমি তো অত মহান নই‚ বাবা! তবু চাইব‚ আমার সন্তানেরা যেন বট গাছের মতই হয়| শিক্ষিত হয়| তোমার মতন অঙ্কে দড় হয়| সংস্কৃত হয়‚ কৃতি হয়| এবং - সর্বোপরি‚ খুব খুব খুব ভালো মানুষ হয়! হয়ত অনেকটাই বেশি চাওয়া| তবু চাইব - মন থেকে চাইব - আমার সন্তানেরা যেন এরকমই হয়| লক্ষ্মণগড়‚ ৭/২/১৪ (কেবিনে আপন মনে| বেলা ১:১৫)

74

10

চঞ্চল

আশিয়ানা ঢুন্ডতা হ্যায়!!

(৩) যাক বাবা‚ বাঁচা গেল| দিদির‚ ছেলে পছন্দ হয়েছে এবার| বাড়ির সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল| দিদি তো এখানকার ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে নামী কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে তার উপর সবাই বলে দেখতেও নাকি খুব সুন্দরী| ছেলেওয়ালাদের অপছন্দ হবার কোন কারণই ছিল না| দিদিরই তো ছেলে পছন্দ হত না| এক তো দিল্লী ছেড়ে যাবে না‚ তায় ছেলেকে দেখতে ভালো হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি| কি যে নখরেওয়ালি কি বলব!| বড়মা তো সারাক্ষণ এই নিয়েই চিন্তা করত| কি যে মজা হবে এবার| আজ বাড়িতে দিদির বিয়ের ব্যাপার নিয়ে মিটিং বসবে| এ বাড়িতে আমি এই প্রথমবার বিয়ে দেখব| অবশ্য এর আগে ছোটকার বিয়ে হয়েছিল‚ কিন্তু তখন আমি খুব ছোট ছিলাম‚ তাই কিছুই মনে নেই| আর যাই হোক‚ খাবার পরই ঘুমোতে যেতে হবে না এই অনেক| কত লোক যে আসবে বাড়িতে| বাবা তো সবার আগেই আসবে‚ এবার নিশ্চয় একটা লম্বা ছুটি নেবে| তারপর আমার মামাবাড়ি থেকে দাদা আর ভাইরা আসবে| পিসীরা সবাই‚ মানে পিসী‚ পিসো আর তাদের তিন মেয়ে‚ সবাই আমার থেকে এক দু বছরের ছোটো বড় হবে‚ আরো যে কত গেস্ট আসবে‚ ওহ আর ভাবতে পারছি না| সবাই আসলে যে কি কি করব তারও একটা প্ল্যান করে ফেলতে হবে‚ নাহ‚ পড়াতে মনই বসছে না| - ওগো শুনছ! সবাই কোথায় গেলে? জেঠুর গলা| কি ব্যাপার? -তাড়াতাড়ি বাইরে এসো সবাই| একটা সারপ্রাইজ আছে| জেঠু খুব খুশী থাকলে গলার স্বরটা কেঁপে কেঁপে যায়| এখনও জেঠুর গলাটা কাঁপছে| নিশ্চয় বড় কিছু ব্যাপার হবে| পড়িমড়ি করে দৌড়ে সোজা বাইরে| ততক্ষণে সবাই এসে গেছে| জেঠুর কালী কীর্তন গ্রুপের চারজন বন্ধুও আছেন‚ নীলমণি জেঠু‚ সেনগুপ্ত জেঠু‚ প্রভাস জেঠু আর আছে মন্টুকাকু‚ যিনি খোল বাজান| - এই যে দেখো এই গাড়িটা কিনলাম| জেঠুর চোখ একদম জ্বলজ্বল করছে| -গাড়ি!!! সবাই হাঁ করে রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়িটার দিকে তাকালাম| গাড়ির চেহারা দেখে তো আমি হেঁচকি তুলতে লাগলাম| - এটা কি মুড়ির টিন কিনেছ গো? গাড়ি দেখে বড়মার আর্ত চিৎকার| এটাকে কি গাড়ি বলে? গাড়িটা দেখে আমারও সেই একই অবস্থা| গাঢ় সবুজ রঙের অ্যাম্বাসাডার গাড়ি| যদিও ছাল চামড়া উঠে গিয়েছে| সামনের আর পিছনের দরজা নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা| গাড়ির ইঞ্জিন চলছে‚ ভেতরে ড্রাইভার সাব একা বসে| আর আওয়াজ!!! যেন মনে হচ্ছে পালম এয়ারপোর্টে দশটা প্লেন একসাথে ছাড়ছে| - এই যে নীলমণি ঠাকুরপো‚ তোমরা বন্ধু হয়ে এ কি গাড়ি কেনালে শুনি? এটা গাড়ি? জেঠু কি রকম একটা বেচারা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমি জেঠুর হাত ধরে কিছু বলতে যেতেই জেঠু ইশারায় আমায় চুপ করতে বলল| -বৌদি গাড়িটা তো ভালই| এই একটু মেরামত করলেই ঠিক হয়ে যাবে| -ঠিক হয়ে যাবে!! এই গাড়ি ঠিক করতে কত খরচা পরবে‚ সেটা এই বীরপুরুষ হিসাব কষেছেন কি? বড়মার মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল| ব্যস নীলমণি জেঠুর স্বভাবসিদ্ধ তোতলামি এসে গেল| এটাই জেঠুর সবচেয়ে বড় প্রবলেম| ঘাবড়ে গেলে বা রেগে গেলেই তোতলাতে থাকেন| বাড়ির সবই আড়ালে তাই 'তোতলা নীলমণি' বলে| আমিও দু-একবর তোতলা জেঠু বলে ফেলায়‚ মায়ের কাছে কানমলা খেয়েছি| - না মানে বৌদি‚ গাড়িটা তো এমনিতে বেশ ভালো‚ তবে ঐ একটাই অসুবিধে‚ চললে থামে না‚ আর থামলে চলে না| ও সব সুরিন্দর ড্রাইভার ঠিক করে দেবে‚ এক্দম চিন্তা করবেন না বৌদি| আর বৌদি!! এরপর আর বড়মা ওখানে দাঁড়ায়? দুমদাম পা ফেলে সোজা ভেতরে চলে গেল| অগত্যা আমিও বড়মার পেছন পেছন রান্নাঘরে দৌড়লাম| গিয়ে দেখি মা আর ছোটমা হেসে কুটোপাটি| বড়মাকে দেখে দুজনেই চুপ করে গেল| - কান্ডটা দেখলি কি তোরা? দুদিন বাদে যার মেয়ের বিয়ে‚ সে কিনা খরচ করে একটা গাড়ি কিনে আনল| বড়মা রাগে ফেটে পড়ল| -দিদি একটু শান্ত হও দেখি| এখন যখন কিনেই ফেলেছেন তখন আর কি করবে বলত? এমনিতেও বিয়েবাড়িতে একটা নিজেদের গাড়ি থাকলে সুবিধেই হবে| মা বোঝোনোর চেষ্টা করল| - চুপ কর দিকি| ওটা গাড়ি কোন দিক দিয়ে রে? ঐ তোতলা নীলমণি কি বলল শুনলি না| চললে থামে না‚ আর থামলে চলে না| তুই তো নিজের কানেই শুনলি সব| আর যায় কোথায়‚ মা আর ছোটমা আবার ঠহাকা লাগিয়ে হাসতে শুরু করল| দেখি বড়মাও হাসতে শুরু করেছে| জেঠুকে নিয়ে হাসাহাসি আমার একদম ভালো লাগে না| কত মনে কষ্ট পাচ্ছে না জেঠু? আমি ওখান থেকে চুপচাপ সরে এলাম| শুনলাম পিছনে বড়মা বলছে‚ - ঐ যে চলল ভক্ত প্রহল্লাদ নালিশ লাগাতে| আবার একপ্রস্থ হাসি সবার| গা জ্বলে গেল একদম| আমার জেঠুর মত এত বুদ্ধি কারও আছে?কত ভেবেই না কিনেছে গাড়িটা| সত্যি তো কত লোক আসবে‚ বর আনতে যেতে হবে‚ দোকান-বাজার যেতে হবে‚ আরও কত কাজ| সবসময় কি সাইকেলে কাজ হয়? যাক গে‚ যখন কাজে লাগবে তখন সবাই বুঝতে পারবে| আমি আবার বাইরে চলে এলাম| গাড়িটা এখন সামনের পার্কের পাশে দাঁড় করানো হয়েছে| সুরিন্দর ড্রাইভার সাব আর ওর সাথে আরও দুজন লোক গাড়িটার তদারক করছে| জেঠুও দেখলাম কোমরে হাত দিয়ে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু বোঝার চেষ্টা করছে‚ আর সুরিন্দরের সাথে কিসব আলোচনা করছে| আমাকে দেখে জেঠু বলে উঠল‚ - আয় আয় বেটা| বলতো গাড়িটা কেমন হয়েছে? দেখনা‚ দুটো দিন‚ গাড়িটা একদম নতুন হয়ে যাবে| কিছু চিন্তা করিস না| তখন শুধু তুই আর আমি কণাট প্লেসে বেড়াতে যাব‚ ঠিক! - একদম ঠিক জেঠু‚ কাউকে নেব না| বলে জেঠুর কোমর জড়িয়ে ধরে আমিও গাড়িটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম| - একটু ভেতরে বসি জেঠু| - যা না বস| ওদিকের দরজাটা দিয়ে যা| আমি দরজা খুলে নিয়ে ড্রাইভারের সিটে গিয়ে বসলাম| ইস পিছনে কি যেন ফুটছে| ওহ্হ! সিটের ছোবড়াগুলো বেড়িয়ে আছে তাই| ও ঠিক হয়ে যাবে| অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে যেখানে চাবি দিয়ে স্টার্ট করে‚ সেখানে হাত দিলাম| হাতে একটা ঘন্টি লাগানো দড়ি ঠেকল| - জেঠু চাবির জায়গায় দড়ি কেন? চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম| - আরে ওটা টেনে ধরলেই তো স্টার্ট হয়| দড়ি দিয়ে গাড়ি স্টার্ট!! এবার আমারও গাড়িটার ব্যাপারে একটু একটু সন্দেহ হতে লাগল| আমি তো কতবার অমিতা পিসির গাড়িতে চড়েছি| পিসি এখানে আসলেই আমি গিয়ে ড্রাইভারের সিটে বসে কলকব্জা নাড়তে থাকি‚ তাই জানি কোথায় কি থাকে| এবার হেডলাইটটা যেই জ্বালালাম দেখলাম শুধু বাঁদিকেরটা জ্বলল| ড্রাইভারজি জোরে একটা চাপড় মারল ডানদিকের হেডলাইটার ওপর| দু-তিববার চাপড় মারতেই লাইটটা বেশ জ্বলে উঠল| হর্নটা দাবাতেই নিজেই ভয় পেয়ে ছেড়ে দিলাম| বাপরে! মনে হল পনেরটা গাধা একসাথে চেঁচিয়ে উঠল| নাহ‚ বড্ড কুটকুট করছে পিছনে‚ এবার নেমে পরাই ভালো| রাত্রির সাড়ে নটা থেকে গাড়ির কাজ শুরু হবে‚ ড্রাইভার ভৈয়া জানালে| ওরা এই কথা জানিয়ে চলে গেল| আমিও জেঠুর হাত ধরে ঘরের ভিতর চলে এলাম| ইতি মধ্যে ছোটকা আর দাদাও এসে গেছে| জেঠু ওদের সাথে কথা বলতে লাগল| আমি খাবার ঘরের দিকে দৌড়লাম| ঘড়িতে নটা বেজে গেছে‚ 'ডিনার টাইম'| একটা ম্যান্ড্রেকের বই নিয়ে সবে বিছানায় গিয়েছি| হঠাৎ নিচের থেকে দুমদাম‚ ধড়াম ধড়াম নানা রকমের বিচিত্র আওয়াজ আসতে লাগল| পাশের ঘর থেকে ভেসে এল বড়মার আঁতকে ওঠা কন্ঠস্বর| - এ কি হচ্ছে গো? আমিও দৌড়ে বড়মার ঘরে চলে এলাম| বড়মার ঘরের একমাত্র জানালা দিয়েই সামনের পার্কটা দেখা যায়| দেখি দুজন লোক একটা বাল্ব জ্বালিয়ে গাড়ির দরজা খুলছে আর দুজন লোক বনেট খুলে ইঞ্জিন নিয়ে টানাটানি করছে| বুঝলাম গাড়ির কাজ শুরু হয়ে গেছে| জেঠু একটা চেয়ার নিয়ে সামনেই বসে আছে| জানালা থেকে বড়মার চিল চিৎকার| - বলি এসব কি সারা রাত ধরে চলবে নাকি? -তুমি জানালা বন্ধ করে দাও| জেঠুর সপাট জবাব| বড়মা বুঝে গেছে‚ চেঁচিয়ে লাভ নেই| তাই কষে জানালাটা বন্ধ করে দিল| আওয়াজাটা একটু কমল বটে‚ তবে পুরোপুরি বন্ধ হল না| বড়মা কিরম একটা মুখ করে মাথায় হাত দিয়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়ল| বড়মাকে ঐ অবস্থায় দেখে আমার আর ওখানে দাঁড়াবার সাহস হল না| নিজের ঘরে এসে কমিকসটা খুলে শুয়ে পড়লাম| মা খাওয়া-দাওয়া করে ঘরে আসার আগেই শেষ করে দেব| নিচে সমানে চলছে দুম দাম‚ ধমাস ধম| কাল আবার মা মোতিলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি মানে সবাই যাকে এম.এন.ইউ. বলে‚ সেখানে যাবে| মা তো ওখানে সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস নিতে যায়| দুপুরের মধ্যেই চলে আসে| ছোড়দাও তো ওখানেই পড়ে| বাহ! হাতুড়ির আওয়াজ তো আর তেমন কানে লাগছে না| তালে তালে আওয়াজে যেন ঘুমটা আরও বেশি পাচ্ছে| ...ক্রমশঃ|

344

39

stuti..

ছাইপাঁশ

নাম কীর্তন ======= নাম শুনে মানুষটির একটা অবয়ব আমরা কল্পনা করে নি । ঝিমলি শূর শুনলে মনের জানলায় ভেসে ওঠে এক তন্বী স্টেলেটো হিল খটখটিয়ে হাওয়ায় ভেসে চলেছে। বিশ্বম্ভর দাঁতানি শুনলে মনে হবে জানলায় কেউ দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । মহাকালী পাঠশালায় খুঁজলে এখনও অনিমা ,যূথিকা , রুপালিদের পাওয়া যাবে । কিন্তু ইংরাজী মাধ্যম স্কুলগুলি থেকে এসব নাম উধাও হয়ে গেছে । জায়গা নিয়েছে প্রিয়া , নেহা , গরিমা রা ...। গগনচুম্বী অট্টালিকাতে চিরুনীতল্লাসি চালালেও সনাতন , মদন , পঞ্চানন নামে কাউকে পাবেন না । আবার বর্ধমানের বৈঁচি গ্রামে বিবি রায় , টুকু বোস ,তিরু পাকড়াসীদের খোঁজা মানে খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা  । দর্পনারায়ন , রুদ্রপ্রতাপ নাম শুনলেই ক্ষমতাবান জমিদারদের কথা মনে পরে । জমিদারী প্রথা উঠে যাবার সাথে সাথে এসব নামও হারিয়ে গেছে । লোটোন , জগা ,টাইগার ,হিরু মানেই লোফার বা গুণ্ডার কথা মনে পড়ে । এখন অবশ্য এরাই ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা । যুগের সাথে নামেরও বিবর্তন ঘটছে । আমার শ্বশুরের শ্রাদ্ধের সময় পাড়ার একজন অত্যন্ত বিনীত হয়ে আলাপ করলেন –'আমি হিটলার । মেসোমশাই আমার চাকুরী করে দিয়েছিলেন রেলে '। এমন বিনীত হিটলার দেখে খুব মজা লেগেছিল । মায়ের কোলে যেদিন শিশু চক্ষু মেলে সেদিন তার দেহে বল নেই, মুখে কথা নেই ,গায়ে কোন কাপড় নেই । পরিচয় শুধু ছেলে বা মেয়ে ।। বিশ্বসংসারে পা দিতে না দিতেই সাড়া পরে যায় – ওদের বাড়ী ছেলে হয়েছে বা মেয়ে হয়েছে । নবজাতক ওয়া ওয়া …... রবে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়  । প্রাথমিক আনন্দ উত্তেজনা কাটতে না কাটতেই শুরু হয়ে যায় নাম নিয়ে চুলোচুলি । প্রথমে ডাক নাম । এমন নাম রাখতে হবে যেটা সবার থেকে আলাদা । আগেকার দিনে নাম নিয়ে এত সংকট ছিল না । মেয়ে মা দুর্গা বা মাকালী যাইহোক না কেন পাইকারী হারে ডাক নাম রাখা হত খেঁদী , বুচি , পেঁচী ,বুড়ী …......। হয়তো মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর যাতনা মা বাবাকে এত কুঁড়ে কুঁড়ে খেত যে ভাল কোন নাম মেয়েদের জন্য রাখতে তারা দ্বিধা করতেন । এই সব ডাক নামেই বিবাহ পূর্ব জীবন কেটে যেত । বিবাহের পর নাম হত বড় বৌ বা মেজ বৌ …...... । ছেলে জন্মালে আলাদা আপ্যায়ন । চারিদিকে সারা পরে যেত । তবে ডাক নামের ব্যপারে কেউ অভিধান নিয়ে বসত না । যার যা মনে আসতো সেই নামেই ডাকতো । কেউ বলত চাউনিটা কেমন হাঁদার মত ওর নাম রাখ হাবু । কেউ বলত ওমন চাঁদপানা মুখ ওর নাম রাখ চাঁদু । দাদু বলে বসতেন ফোকলা দাঁতে আমার মতনই হাসছে নাম রাখা হোক বুড়ো । যারা নাম খুঁজে পেত না তাদের নাম হয়ে যেত খোকা বা খোকন । একজনের নাম শুনেছিলাম ছেলু । বোধহয় ছেলে থেকে এসেছিল । অন্নপ্রাশনের সময় ঠিক হত পোশাকী নাম । ছেলেদের বগলাচরন , হরিচরণ , ধূর্জটীপ্রসাদ ,......।।মেয়েদের নাম হত প্রফুল্লবালা , ননীবালা , মনোরমা ,......।যেসব মা রা একটু প্রগতিশীল ছিলেন তারা মেয়েদের নাম রাখতেন সুবর্ণলতা , নিভাননী , স্নেহলতা । এসব নাম শুনে এখন সবাই মুখ বেঁকাবে । এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বলবে ডিসগাসটীং নেম । এরকম নাম রাখা মানে তাকে সারাজীবনের মত বাঁশ দেওয়া । আজকাল সবারই বাহারী নাম । নামকরনের মত জরুরী ব্যপারটা বাবা মা কারো ওপর ছাড়তে ভরসা পায় না । শিশু পৃথিবীতে আসার আগে থেকেই তারা অভিধান খুলে বসে যায় ।সেরা নামটি দিতে হবে নবজাতক কে । ডাকনামের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে বুবাই, বুকাই , টুকাই ,পুটকাই চলে  । ছেলেদের ক্ষেত্রে বাবাই, বাপ্পা , বাপী এত কমন যে ১০ জনকে দাঁড় করিয়ে দিলে ২/৩ টি ছেলের এই নাম পাওয়া যাবে । পোষাকি নামের ক্ষেত্রে অবশ্য বিরাট রিসার্চ চলে । আমার এক আত্মীয়ের বিরাট কালেকশন এ ব্যপারে । পরিচিত মহলে তিনি প্রচুর সাপ্লাই দেন । অনেকসময় দেখেছি ভাল নাম খুঁজে পাচ্ছেনা বলে মা বাবা মর্মাহত । কখনো আফসোস । ইসসস... ঐ নাম টা কি ভাল ছিল আমার মেয়ের রাখব ভেবেছিলাম কিন্তু ভায়ের বউ আগেই তার মেয়ের রেখে ফেলেছে । কেউ আবার আনকমন নাম পেলে পরীক্ষার প্রশ্নের মত গোপন রাখে নিকটজনের রাখবে বলে । নাম নিয়ে চাপানউতর চলতেই থাকে । কিছু কিছু নাম সারাজীবন বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে । একদিন পরিচিত এক বউদির বাড়ী গেছি । বউদি বললেন দাঁড়াও অসীমাকে ডাকি একসাথে গল্প করব । ভাবলাম কোন মহিলা অতিথি । একটু পরেই দেখি দাঁড়িগোঁফ ওলা একটি ছেলে এল । বউদি আলাপ করিয়ে দিলেন তার তুতো দেওর বলে ।ভদ্রলোকের নাম অসীমাভ । বাড়ীতে তাকে অসীমা বলে ডাকে। সীতাংশু নামের ব্যক্তির অনেকসময়েই ডাক নাম হয়ে যায় সীতা । আগের পাড়ায় পাশের বাড়ীতে থাকতেন জালিম সিং । নেমপ্লেট দেখে ভেবেছিলাম না জানি কি সাংঘাতিক লোক হবে । হরিয়ানার বাসিন্দা নিপাট ভাল মানুষ ।অমন অমায়িক ,স্নেহপ্রবণ , পত্নীপ্রেমী কমই দেখেছি । আরেকজনকে চিনি তার নাম অজমের সিং । অনেকে আবার সন্তানসন্ততির নাম বিখ্যাত লোকের না্মের সাথে মিলিয়ে রাখতে পছন্দ করে । নাম হয়ে যায় এন্টোনি , নিউটন ,জিকো , গুলিত …...।পরবর্তী জীবনে এসব নামের ভার বহন করতে অনেককেই কৌতুকের বিষয়বস্তু হতে হয় । আমরা তিন বোন । সুপ্তি , স্তুতি , শ্রুতি । নাম রেখেছিলেন ঠাকুমা । স্কুলের গণ্ডি পাড় হবার আগেই বিয়ে হয়ে গেছিল ।সারাজীবন গ্রামে কেটেছে  । দেশভাগের পর শহরে বসবাস । গল্পের বইর পোকা ছিলেন । পুরানো ছেঁড়া যা পেতেন তাই পড়তেন । কিছু না পেলে ঠোঙা ছিঁড়ে পরতেন । স্মৃতিশক্তি প্রবল ছিল । ঠাকুমার কাছে রোজ নতুন নতুন গল্প না শুনলে আমাদের খাওয়া হত না ।আমার নিজের নাম নিয়ে ছোটবেলায় বেশ অখুশি ছিলাম । বন্ধুরা একবারে উচ্চারণ করতে পারতো না । যবে থেকে নামের মানে বুঝলাম ঠাকুমাকে আরো বেশী ভালবেসে ফেললাম এরকম আনকমন নাম রাখার জন্য ।। এক ভদ্রলোক তার নাতির নাম রাখতে চেয়েছিলেন ওমর মুড়ি কাঁঠাল । কারন জানতে চাওয়াতে বলে ছিলেন ওমর খৈ আম হতে পারে মুড়ি কাঁঠাল কেন হবে না ? সে নাম রাখা হয়েছিল কিনা জানি না ।

390

62

ইলতুৎমিস

শটকে শঙ্খ হ'

শ'টকে সংক্ষিপ্তসার| (১১) এই তো নয়| সে সব তো গত জন্মের কথা| প্রাইমারীতে কোনদিন দ্বিতীয় হইনি| ক্লাশ টু থেকে মনে আছে| ওয়ান থেকে মানে চাটাই থেকে বেঞ্চিতে টু'তে ওঠবার সময় কি বা কেন এখন আর মনে নেই| ফাইভ থেকে অন্য গ্রামে হাই স্কুলে| আমাদের ঐ একটাই হাই| সাত গ্রামের সব ছেলে মেয়ে ঐখানে| চাষীপ্রধান গ্রাম‚ অনেকেই ঝরে পড়তো| তবু সব নতুন‚ বিভিন্ন স্কুলের দিকপাল একত্র| কমপিটিশান তো ছিলই| কুঁয়া থেকে দীঘিতে| আমার আবার প্রতিদ্বন্দিনী! বুঝুন কান্ড| সেসব শটকে'তে লিখেছি| চললো ক্লাশ এইট অবধি‚ ইয়েস প্রতিবারই রোল নং ওয়ান| তবে স্বীকার করি‚ আমার বরাবরই গৃহশিক্ষক ছিলেন| হয়তো আধা কৃতিত্ব তাঁদের প্রাপ্য| তারপর দীঘি থেকে খরস্রোতা নদীতে মানে মহকুমার স্কুলে‚ হোস্টেলে| বলে নিই‚ সর্বদা পিতাশ্রীর উপদেশ কাম খাঁড়া মাথার উপর- কি না ফার্ষ্ট হতে হবে| মহকুমার স্কুলে ক্লাশ নাইনে| গিয়েছিলাম কমার্স পড়তে‚ আমার গৃহ্শিক্ষক রোল মডেল| তিনি বি কম| (পরে অবশ্য এম কম করে কে: স: চা: হন)| সাদা ধুতি জামা পরে বেলা দশটায় স্কুলে আসবো‚ হাটবারে রামপদ'র চায়ের দোকানে আড্ডা‚ এসবই লক্ষ্য| অবশ্য সুপ্ত ইচ্ছা ব্যবসায়ী হবো‚ বাপ দাদাদের ন্যায়| মুদীখানা‚ হার্ডওয়ার‚ কবিরাজী‚ অ্যালোপ্যাথিক সব মিলিয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর! ছিল‚ কাপড়ের দোকানও ছিল তবে বাজারের অন্যদিকে‚ ছিলেন মুহুরীমশায়‚ পাকিস্তান থেকে আসতেন| থিয়েটারে শাহজাহান‚ কি উদাত্ত কন্ঠ্স্বর! ব্যবসায়ী হবো‚ ক্যাশবাক্সের পেছনে টাকা গুনে রবার ব্যান্ড দিয়ে গোছা করার আনন্দই আলাদা; স্বর্গীয় প্রায়| এইসব ক্যাশ রেজিটারের টিং করা till? ধ্যুস‚ তুলনা হয় নাকি! হয়নি‚ কোন আশাই পূর্ণ হয়নি| কাজের কথায় ফিরি| শহরের স্কুলে হেডমাষ্টার ইন্টারভিউ নিলেন| একটু ধরা করা ছিল‚ স্কুলের প্রেসিডেন্ট উকিলবাবুর মক্কেল আমার পিতাশ্রী| হেডমাষ্টার স্যার খুশী হয়ে বললেন‚ ঠিক আছে| পাশেই অ্যাস হেড বলে উঠলেন‚ কমার্সে নয় একে সায়েন্সে ভর্তি করুন| ব্যাস‚হয়ে গেল| কোথায় যাবো দুর্গাপুর তার বদলে ভাইজ্যাগ| সারাটা জীবন কাঁধে জোয়াল চেপে বসলো| নাইন‚ টেন অমানুষিক পরিশ্রম করেছি‚ কি না ফার্ষ্ট হতে হবে| হলামও| কি সব কান্ড‚ সদ্য বুনি ওঠা হোস্টেলমেটরা যখন‚ লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যায়‚ সন্ধে হবো হবো টাইমে ফুটবল মাঠে চক্কর কাটে‚ বিশালাক্ষীরাও(নামটা মনে আছে‚ অক্ষমের আর কি থাকে?) ঘুরঘুর করতো‚ তখন আমি 'নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো' র ব্যাখ্যা আয়ত্ত করতে বাইনোমিয়াল সিরিজের চক্করে সর্ষের ফুল দেখতে ব্যস্ত| কালীদা‚ ডেবিট ক্রেডিট মিলিয়ে কি হলো? সুড়ুৎ করে ফাঁক দিয়ে জীবনটাই চলে গেল| এখন হাতে শুধুই হেরিকেন‚ সামনে অপার অন্ধকার! আছে‚ সেই ক্লাশ ফাইভ থেকে সব মার্কশীট এখনও এতযুগ বাদেও মাষ্টার অফ ইঞ্জিনীয়ারিং এর সার্টিফিকেটের ফাইলে গুছিয়ে রাখা| সেসব বিবর্ণ সবুজ কাগজের নম্বর গুলো কেবল আছে‚ হারিয়ে গেছে জীবনটা কোন ফাঁকে! বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা‚ এগারো'র টেষ্ট পরীক্ষা অবধি জয়েন্ট এনট্র্যান্স সম্বন্ধে অবহিত ছিলাম না| আমারই এক সহপাঠী তার কলকাতাস্থ কাকার এনে দেয়া ফর্মে হেডস্যারের কি সই টই বা তেমন কিছুর প্রসঙ্গে প্রথম জানকারী| আমি বরাবরই লেট লতিফ‚ অলস; বালিতে মুখ গোঁজা পার্টি| চল‚ চল চল| আরও দুই বন্ধু মিলে শিবপুরে ফর্ম নিতে| নাহ‚ ক্যাম্পাস দেখে লোভ হয়নি যে তা নয়| কিন্তু বড় শহর‚ কত কমপিটিশান- পাবো তো? পরীক্ষা দিতে কলকাতায় হেয়ার স্কুলে| সবই আঁখ ফাড়কে দেখার বস্তু| বড় বড় হোর্ডিং পাঁচমাথার মোড়ে; নিঝুম সন্ধ্যায় এর যুগ তখন| কোচিং বলে তখনকার দিনে কিছুই ছিল না; একখানা শ'দুই আড়াই পাতার বই কিনেছিলাম গত কয়েক বছরের প্রশ্নাবলী ও উত্তর| অঙ্ক ছাড়া বাকী উত্তর সব অখাদ্য| সেই কালে আবার আলাদা আলাদা কলেজে (প: ব: তে মোটে পাঁচটা ঐ জয়েন্টের আওতায়) এক পাতার ফর্ম উইথ ৫ টাকার পোষ্টাল অর্ডার দিয়ে ভরতে হতো| তখন বুঝিনি‚ কেবল শিবপুরেই ভরেছিলাম| সেটা বড় বেশী রিস্কি হয়েছিল| চোখ ফুটতে তো অভিজ্ঞতা লাগে‚ তাই না? আই আইটি'র তো প্রশ্নই আসে না‚ সময় পেরিয়ে গিয়েছিল বা কি একটা কারণে অ্যাপ্লাই করা হয়ে ওঠেনি| (না ‚ দাবী করছি না যে করলে পেতাম!) যাইহোক‚ পিঙ্ক ২৩ বাই ৫ খামে বার্তা এলো| একটু মশলা দিই‚ ভুলেই গিয়েছিলাম| পরীক্ষা বোধহয় ভালই হয়েছিল কারণ ভাইভা'তে ভূপাল কোথায় জিজ্ঞেস করাতে‚ বেশ মনে আছে‚ ' স্যার‚ নেপাল‚ ভূপাল!' ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল| বাকীটা পরে কোনদিন|

448

53

ইলতুৎমিস

কিছু ইনভেনশন (A)

ইনভেনশান‚ ইনোভেশন‚ আবিষ্কার! খুঁজে পেতে ব্লগটা তুলে আনলাম| এ বিষয়ে কিছু লেখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি অনেকদিন| আগে নোট রাখতাম‚ কোন চমকপ্রদ ইনভেনশন হাতে এলে তার অ্যাবস্ট্রাক্ট আলাদা ফোল্ডারে জমিয়ে রাখতাম; যাতে করে সূত্র খুঁজে পাই| কিন্তু দেখলাম‚ লোকের কোন ইন্টারেষ্ট নেই এসবে| মানে পাবলিকে খায় না| কবিতা‚ সাহিত্যে সকলের সাড়া মেলে| আমার গতিবিধি তো কুল্লে দু একটা বাঙলা ওয়েবসাইটে| ইংরেজীতে লেখার এলেম নেই‚ লিখলেও বড় বেশী টেকনিক্যাল হয়ে যায়| ইনভেনশান যে শুধু রকেট সায়েন্স বা স্ট্রিং থিয়োরী নয়‚ আমরা প্রতিনিয়ত কোন না কোন ইনভেনশান ব্যবহার করছি‚ যা বিনা আমাদের অস্তিত্ব অচল এটাই বলতে চেয়েছিলাম| ইনভেনশন তখনই পেটেন্টেবল যখন তা মানুষের কাজে আসে এবং যার ব্যবসায়িক মূল্য আছে| সে যাই হোক না কেন| প্রসঙ্গত: স্ট্রিং থিয়োরী পেটেন্টেবল নয়! তবে তা দিয়ে কেউ যদি মোবাইল ফোনের চিপ বানায়‚ সেটা অতি অবশ্যই| আইনের কচাকচিতে না গিয়ে‚ আমি মিথ ভাঙ্গার তালে ছিলাম; তাই একটু মশলাদার কিছু ইনভেনশনের নমুনা পেশ করতাম‚ যাতে করে পাবলিক খায়| কিন্তু হিতে বিপরীত; জনগণ ভাবতে শুরু করলো শুধু ব্রা ও প্যান্টির কথা| আসলে পাবলিক কি খায় তা জানাই তো মার্কেটিং এর গোড়ার কথা| আমি ডাহা ফেল| আমি যে দেশে থাকি‚ সেখনে একটা হোয়াইট পেপার প্রকাশিত হয়েছিল‚ ইনোভেট অর পেরিশ! ইনোভেশনের একটা আলাদা মিনিস্ট্রি আছে| হাতের কাছে ডেটা নেই তবে আইবিয়েম ও মাইক্রোসফটের মেজর আর্নিং আসে ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি থেকে| সেসব আলাদা নোটস ও অ্যাবস্ট্রাকটের কালেকশান -gone to the bin‚ অফিসের বুককেস‚ দেরাজ খালি করবার সময়! নীচে কয়েকটা ছবি দিলাম| এটা ইনটারন্যাশনাল পেটেন্ট ডেটাবেসের ক্লাসিফিকেশন সিস্টেমের দু একটা পাতা| যা কিছু মানুষের ব্যবহারে আসে‚ মোবাইল ফোন থেকে টুথপিক‚ পিস্তল‚ শোল্ডার ফায়ারড মিসাইল‚ বিছানার চাদর‚ ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ‚ স্টেন্ট‚ গাড়ীর ইঞ্জিন- হোয়াট নট? কেন পেটেন্ট? দুলাইনে বলে বিদায় নিই| অনেক হয়েছে‚ নো মোর| আপনি বা আপনার কোম্পানী একটা নতুন স্টেন্ট বের করলেন যা আর্টারিতে গিয়ে চুপসে না যায়‚ ব্লাডফ্লো'র হিজিবিজি হাই ফান্ডা ফ্লুইড মেকানিক্স‚ ফিজিয়োলজি ইত্যাদি সব প্রয়োগ করে ‚ জিনিষটা ট্রায়াল দিয়ে বাজারে বের করলেন| আপনার এই উদ্ভাবনী ক্ষমতার reward আগামী বিশ বছরের জন্য আপনার মনোপলি| আন্য কেউ সেটা বানাতে পারবে না‚ তাহলে আপনি তাকে কোর্টে তুলে ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারেন| নতুবা আপনার থেকে লাইসেন্স নিতে হবে| সোসাইটি বা সমাজের লাভ বিশবছর পর যে কেউ এটা বানাতে পারবে‚ বাজারে কমপিটিশান আসবে দাম কমবে| (হাতের কাছের উদাহরণ: হকিন্স প্রেশার কুকার| এখন তো চিকনি চামেলী ব্রান্ডের মাল পাওয়া যায় অল্প দামে!)| অর্থাৎ লাভ উভয় পক্ষেরই| বিলিয়ন ডলার খরচ করে কেউ ইনভেন্ট করবে ভায়াগ্রা আর নিস্তারিণী ফার্মাসিউটিকালস সেটা আটত্রিশ পয়সায় প্রস্তুত করে এক একটা ট্যাবলেট আটষট্টি টাকায় বেচে লাল হবে‚ তা তো হয় না চাঁদু! এ বিষয়ে আর নয়; অলরেডি বদনাম হয়েই গেছে| কি কান্ড ইনভেনশন বলতে ব্রা আর আমার লেগপুলিং; এটা কেমন হলো কর্ত্তা? দেখুন: ব্রা ‚ প্যান্টি‚ সেমিজের ক্লাসিফিকেশন ও ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জের| সাব-ক্লাসিফিকেশন ও দেখুন| ফটো তুলেই দিলাম‚ পিডিয়েফ ও সাথে কিছু রিয়াল স্টাফের ছবি দিতে পারলে হতো|

481

6

ঝিনুক

স্বপ্নের যাদুঘর......

বলেছিলাম লিখব স্বপ্নশত্রুদের কথা| তারা কারা? এই ধরুন খুব একটা রোহমর্ষক‚ বা কনফিউসিং বা মন খারাপের স্বপ্ন দেখে শেয়ার করতে গেলেন কার সাথে আর সে বলা শুরু করল ঐ শুরু হল তোমার স্বপ্নের গল্প| মাথা নেই‚ মুণ্ডু নেই‚ নিশ্চয় পেট গরম| তাই না? এদের কাছে স্বপ্ন জিনিসটা একটা হাবিজাবি কিছু‚ অর্থহীন যাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই‚ আলোচনা করার কিছু নেই| সত্যি কি তাই? স্বপ্ন মানেই অর্থহীনতা না স্বপ্নের মধ্যে থাকে সম্ভাবনা? চলুন‚ আজকে দেখি কেন স্বপ্ন দেখি আমরা| বোঝার চেষ্টা করি স্বপ্নের বিজ্ঞান কে| কিন্তু তার আগে একটা গল্প হয়ে যাক‚ কেমন? এই গল্পের নায়ক আইনস্টাইন| কিশোর বয়্সে একদিন একটা স্বপ্ন দেখলেন| একটা মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর সেই মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে পালে পালে গরু| সামনেই একটা বিশাল বড় তার‚ যেমন থাকে কাঁটাতারের বেড়া সেইরকম| কিন্তু এই তার আবার বৈদ্যুতিক তার| গরুগুলো এগিয়ে আসছে তারের দিকে‚ একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আইনস্টাইন আর তারের ঐ পারে গরুদের মালিক‚ ফার্মার| হঠাৎ কি যে মাথায় আসল ফার্মারের‚ দুম করে টিপে দিল সুইচ‚ বিদ্যুত বয়ে গেল তারের মধ্যে দিয়ে আর সব গরু গুলো একই সাথে ঝটকা খেয়ে পিছিয়ে চলে এল| অনেকটা synchronised aerobatics যেমন হয়| কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেই আইনস্টানের মনে হল উনি যা দেখলেন ফার্মার সেটা দেখেন নি| ফার্মার এর চোখে একেকটা গরু একসাথে না‚ একের পর এক করে পরপর ঝটকা খেয়েছে| মানে একটা গরু উঠছে পড়ছে‚ তার পরে আর একটা এই রকম| সেই ফুটবল খেলাতে স্টেডিয়ামে লোকে যেমন ওয়েভ বানায় সেইরকম| আইনস্টাইনের মনে হল ঐ ওয়েভ ফর্মেশন দেখবে বলেই ফার্মার গরুগুলোকে শক দিল| এবারে তো স্বপ্ন ভেঙে গেল| অন্য কেউ হলে ধুরছাই কি দেখেছি বলে কাটিয়ে দিত‚ ফ্রয়েড হলে ভাবতে শুরু করত নিশ্চয় আমার মনে মনে প্রচুর গরুর মাংস খাওয়ার শখ তই এমন দেখেছি কিন্তু আইনস্টাইন তো আইনস্টাইন| উনি সবকিছুতেই ফিজিক্স দেখতেন‚ ভাবলেন এ স্বপ্ন যখন দেখেছি এরমধ্যে নিশ্চয় কোন ফিজিক্সের প্রবলেম আছে যেটা আমাকে সলভ করতে হবে আর এই ভাবেই তৈরী হয়ে গেল! কি ? ঠিক ধরেছেন "Theory of Relativity"‚ যেহুতু উনি আর ফার্মার object এর থেকে ভিন্ন দূরত্বে‚ তাই আলো এসে পৌঁছবে ভিন্ন সময়ে ‚ তাই হতেই পারে দুজনে একই জিনিস দেখবেন না| এবারে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে কি? মনে হচ্ছে কি শুধুই পেট গরম বলে স্বপ্নকে অগ্রাহ্য না করাটাও একটা অপশন| থাকতে পারে স্বপ্নের কোন মানে‚ খুলে দিতে পারে কোন সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি অথবা হয়ে উঠতে পারে কোন যুগান্তকারী আবিষ্কারের জনক? চলুন‚ দেখি আমরা স্বপ্ন দেখি কেন| আজকের এই পর্ব এই নিয়েই| স্বপ্ন দেখি কেন আমরা? {/x2} {x3} ১) আকাঙ্খা পূরণ এই থিয়োরি ফ্রয়েড সাহেবের| ওনার মতে যা কিছু অপূর্ণ আকাঙ্খা‚ সেগুলোকেই আমরা স্বপ্নে দেখি| খুব করে বিরিয়ানি খাচ্ছেন স্বপ্নে‚ বা গপাগপ রসগোল্লা মুখে পুরছেন? তার মানে আপনার অনেক্দিন থেকে ওগুলো খাওয়ার খুব সখ| হঠাৎ স্বপ্নে দেখলেন পাখির মত উড়ে চলেছেন? ওটাও মনের অপূর্ণ আকাঙ্খা আপনার যেটা কোনদিনই পূর্ণ হওয়ার না| কোন সুন্দরী মহিলা (বা পুরুষ) এর সাথে স্বপ্নে ঘুরছেন বা আরো কিছু দুষ্টুমি করছেন? ঐ একই ব্যপার| এতদূর অবধি তো ঠিক ছিল| কিন্তু লোকে ছাড়বে কেন? তেড়ে এল ফ্রয়েড সাহেবকে | তাহলে আমি স্বপ্নে কেন দেখলাম আমার মা মারা গিয়েছে? তুমি কি বলতে চাও আমার মনের ইচ্ছে আমার মা মরে যাক? কি ঠিক কিনা? এরকম স্বপ্ন তো আমরা অনেকেই দেখি‚ মন খারাপ করি‚ ফোন করে মায়ের খবর নেই সব ঠিক আছে কিনা| মা মরে যাক এতো কেউ চাই না? তবে? ফ্রয়েড সাহেব বললেন - আরে মরে যাক চাও না ঠিকই কিন্তু মায়ের অস্তিত্বের সাথে কোথাও তোমার কনফ্লিক্ট আছে| এমন কোন সমস্যা আছে তোমার যেটা তুমি ভাবছ মা না থাকলে সমাধান হয়ে যাবে ‚ তাই এই স্বপ্নটা দেখেছ| কিন্তু কে মানবে বলুন এটা? তো এবারে আসরে নামলেন আরো একজন‚ তার নাম কার্ল জাং| উনি একটু অন্যরকম বললেন| বললেন এই সব অম্পূর্ণ আশা আকাঙ্খার গল্প ভুল‚ আসলে প্রতিটা স্বপ্নই আমাদের একটা সমস্যা যার কোন সমাধান নেই তার দিকে ইঙ্গিত করে| স্বপ্ন গুলো বোঝায় আমাদের কি দুস্চিন্তা বা কি আবেগজনিত সমস্যা বা কি ভয়| যেমন ধরুন দেখলেন চাকরীটা চলে গিয়েছে তার মানে আপনার মনের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে আপনাকে ছাড়াও কাজটা হয়ে যেতে পারে‚ আপনি essential নন| এই যে আপনার মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ধারণা আছে‚ সেটাকে এবার জাগিয়ে তুলল স্বপ্ন| এবারে আপনি না বসে থেকে সেটা নিয়ে কাজ করুন| নিজের স্কিল আপডেট করুন বা বসকে তেল দিন বা নতুন চাকরী খুঁজুন| অথবা ধরুন স্বপ্নে দেখলেন আপনার বিবাহিত প্রেমিক চুটিয়ে বৌ এর সাথে প্রেম করছে| ওমনি তার উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে নিজেকে জিগ্যাসা করুন| কি এমন করেছেন আপনি যে ইনসিকিউরিটিতে ভুগছেন? হয়ত উত্তর পেয়ে যাবেন‚ শুধরে নেবেন নিজেকে| {/x3} {x4} ২) অ্যাক্টিভেশন - সিনথেসিস থিয়োরি এটা বোঝার আগে চলুন বুঝি আমরা ঘুমাই কি করে| আমরা সব সময় কিন্তু গভীর খুব ঘুমাই না| ঘুমের একটা ফেজ থাকে যাকে বলে REM স্টেজ অর্থাৎ কিনা rapid eye movement ফেজ| এইসময় চোখের পাতা পিটপিট করে| এই REM ফেজ আপনার পুরো ঘুমের প্রায় এক চতুর্থাংশ সময় জুড়ে চলে কিন্তু একটানা নয়| কখন আপনি গভীর ঘুমে ‚ তারপরে REM‚ আবার গভীর ঘুম‚ REM এই রকম| মোটামুটি ৪-৬ বার রাতের ঘুমে আপনি REM ফেজে থাকেন| এবারে দেখা গিয়েছে যে REM ঘুমের সময় কাউকে ডেকে তুললে প্রায় ৯৫% কেসে তারা বলে স্বপ্ন দেখছিল কিন্তু গভীর ঘুম থেকে ডেকে তুললে মাত্র ১০-১৫% কেসেই লোকে বলে স্বপ্ন দেখছিল| সেই থেকে ধারণা করা হয় যে আমরা স্বপ্ন দেখি REM এর সময়েই| কিন্তু কি হয় এই REM stage এ? এই সময় আমাদের ব্রেন কিন্তু ঘুমিয়ে থাকে না| সজাগ থাকে ব্রেনের কিছু অংশ যেগুলোর নাম amydala আর hippocampus| এদের কাজ আপনার অনুভূতি‚ আবেগ‚ স্মৃতি এগুলো নিয়ে| এবারে হচ্ছে কি আপনার সেই চোখ পিটপিট ঘুমের সময় এরা কাজ করে চলেছে‚ এরা যখন সিগন্যাল দিচ্ছে ব্রেন তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না‚ ব্রেন সিগন্যালগুলোকে বোঝার চেষ্টা করে‚ কিছু একটা মানে দেওয়ার চেষ্টা করে আর সেগুলই আপনার স্বপ্ন হয়ে আসে| কিন্তু পুরো ব্রেনটা তো কাজ করছে না‚ করছে দুই তিনটে পার্ট‚ বাকি পার্টগুলো ঘুমিয়ে‚ সুতরাং এই যে ব্রেন একটা গল্ম্প বানাচ্ছে সেটা কিরকম গল্প হবে? একদম ঠিক ধরেছেন‚ জগা খিচুড়ি গল্প| একের সাথে অন্যের সম্পর্ক নেই - উদ্ভুতুরে| হয়ত বাড়ির মধ্যে বাঘ চলে এল‚ কিংবা সাহরা মরুভুমিতে আমাজন বয়ে চলেছে এইরকম আর কি| অর্থাৎ কিনা এই থিয়োরি যদি মানেন তাহলে স্বপ্ন নিয়ে এক্দম ভাবনা চিন্তার দরকার নেই‚ all trash| কিন্তু কিন্তু পেট গরমের জন্য স্বপ্ন দেখছেন না কিন্তু| কি গরম হয়েছে বলুন তো? হু‚ ঠিক - amydala আর hippocampus| ৩) স্মৃতি থেকে আবর্জনা তাড়ান এই থিয়োরীতে যারা বিশ্বাস করেন তাঁরা ঐ স্বপ্নশত্রুদের দলভুক্ত| এদের মতে সারাদিন আমাদের ব্রেন অনেক কিছু পিক করে যার অনেকটাই আবর্জনা| অনেকটা কম্পিউটারের মত| যখন পিক টাইম নয় তখন যেমন কম্পিউটারের consolidation jobs গুলো চালান হয় ‚ যে তথ্যগুলো আর জরুরী নয় সেগুলোকে ঝেড়ে ফেলা হয়| এই থিয়োরীর মতে এই ভাবেই আমাদের স্বপ্নগুলো হচ্ছে সেইসব অপ্রয়োজনীয় তথ্য যেগুলো নিয়ে ব্রেনের আর কোন কাজ নেই| ব্রেন একের পর এক informaiton process করে‚ আর বাজে information গুলো discard করে‚ আর তারই এক ঝলক আমাদের স্বপ্ন| অর্থাৎ কিনা‚ স্বপ্ন মানেই বাজে ‚ আবর্জনা - ব্রেন যেগুলোকে মাথা থেকে বের করে দিচ্ছে - সেগুলো নিয়ে একটুও মাথা ঘামাবেন না| {/x4} {x5} ৪) মেমরি কনসোলিডেশন এই মতে যারা বিশ্বাসী‚ তাদের মতেও আমদের ব্রেন কম্পিউটারের মত কাজ করে এবং ঘুমিয়ে পড়লে শুরু হয় ব্রেনের consolidation এর কাজ| কিন্তু এরা বিশ্বাস করেন না‚ স্বপ্ন মানে অপ্রয়োজনীয় তথ্য| এনাদের মতে স্বপ্ন হল ব্রেনের সেই প্রসেস যখন ব্রেন সারাদিনের সংগৃহীত তথ্যগুলোকে consolidate করছে আর জমিয়ে রাখছে permanent storage এ| অর্থাৎ কিনা‚ সারাদিনে যে সমস্ত টুকরো টুকরো তথ্য আমাদের ব্রেনে জামা পড়েছিল‚ সেগুলৈ আরো প্রাসারিত হয়ে জমা পড়ছে আর তারই এক ঝলক আমাদের স্বপ্ন| যেমন ধরুন ট্রমার রোগীরা| এনারা ঘুমালেই ট্রমার স্বপ্ন দেখেন‚ আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন‚ তাই ট্রমার রোগীদের জোর করে জাগিয়ে রাখা হয়| ঘুমিয়ে পড়লেই ব্রেনের consolidation job শুরু হয়‚ ট্রমার টুকরো টুকরো ছবির ডট গুলো connected হয়ে তৈরী হতে থাকে পুরো ঘটনাটা‚ play করতে শুরু করে স্বপ্নে আর তাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন রোগীরা| এই থিয়োরী বলে‚ তাই স্বপ্ন আমাদের শেখায়‚ যা কিছু active stage এ আমরা বুঝতে পারি না বা সময় পাই না‚ REM stage এ সেই তথ্যগুলোর মানে বুঝি আমরা যাতে আগামী দিনে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ করতে পারি| {/x5} {x6} ৫) রিহার্সাল এবং সিমুলেশন একটু ডাইগ্রেস করি‚ কেমন? কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম ১৭ লাখ টাকা ক্যাশে বিছানার উপর রেখে‚ ঘর বন্ধ করে কোথায় যেন একটা গিয়েছি| ফিরে এসে দেখি‚ কি একটা কারণে সোসাইটির সেক্রেটারি ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল| আর টাকা? সে একটাও নেই| ভদ্রলোকের নাম নাকি সম্বিত পাত্র| এই নাম জীবনেও শুনি নি| তাকে গিয়ে বারে বারেই বলছি টাকাগুলো কি করলেন‚ ফেরত দিন আর সে বলছে সব স্টক মার্কেটে লাগিয়েছি - লস হয়ে গিয়েছে| ধনে প্রাণে শেষ ভেবে আতঙ্কে কেঁপে উঠতে উঠতে একটা সময় যখন বুঝলাম - এটা স্বপ্ন‚ তখন ওঠার সময় হয়ে এসেছে| উঠেই দেখি ফেসবুকে সম্বিত পাত্র নামে বিজেপির একটা লোককে নিয়ে খুব খবর| সে নাকি NDTV নিয়ে কিসব ফেক খবর দিয়েছে‚ তাই নিয়ে জোর আলোচনা| অদ্ভুত না? লোকটার নামও শুনিনি এর আগে| সে যাক গে‚ এই রকম টাকা চলে গেল বা কেউ আপনাকে মারতে আসছে আর অপনি ঊর্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছেন আর ওরা এগিয়েই আসছে কিংবা ট্রেন ধরতে ছুটছেন আর কিছুতেই ট্রেন ধরতে পারছেন না -এইরকম স্বপ্ন দেখেন তো? খুব কমন এই রকম স্বপ্ন| বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ১০০০ এর মধ্যে নাইটমেয়ার দেখি আমরা| এখান থেকেই এলো থ্রেট সিমুলেশন থিয়োরী| এই থিয়োরীর মতে আমরা সবসময়েই কিছু ভয়‚ আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাই| এই যদি আমাকে কেউ খুন করে ফেলে? বা কেউ যদি আমার টাকা পয়্সা হাতিয়ে নেয়? বা ট্রেন বা প্লেনটা যদি মিস করি? তা এইসব থ্রেট গুলো সত্যি যদি আমাদের সামনে এসে পড়ে কি করব? বাঁচার জন্য কি হবে স্ট্র্যাটেজি? সেগুলোর একটু practice চাই তো যাতে সত্যিকারের ঘটনার সামনে হতভম্ব না হয়ে পারি? আপনার দেখা স্বপ্ন গুলো আর কিছুই না‚ ব্রেনের সেই practice| যা যা কিছু আপনাকে ভীত করে‚ আতঙ্কিত করে - সেই গুলোর বিরূদ্ধে রক্ষা পাওয়ার স্ট্র্যাটেজি যখন ব্রেন প্র্যাকটিস করে‚ তাই নাইটমেয়ার হয়ে আসে| ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান হয়েছে‚ তাদেরকে REM stage এ ঘুমতে না দিয়ে| দেখা গিয়েছে এইসব ইঁদুরেরা আক্রান্ত হলে বেসিক প্রতিরক্ষা করারো চেষ্টা করে না‚ পুরো পাজলড হয়ে যায়| বুঝতে পারছেন তো এবার নাইটমেয়ারও ফেলনা জিনিস না? ৬) প্লেয়িং ডেড ছোটবেলায় আপনারা সবাই বোধহয় শুনেছেন| কি বলুন তো? হঠাৎ করে সামনে যদি ভালুক এসে পড়ে কি করবেন? হুম‚ একদম মরার মত শুয়ে থাকবেন তো? ভালুক এসে গন্ধ শুঁকে চলে যাবে? যদিও ভালুকের ব্যপারটা পুরোটাই গল্প animal world এ আত্মরক্ষার্থে এই মরা সাজার ব্যাপরটা চলে আর কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন অনেক অনেক বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদেরও এই টেকনিকটা ব্যবহার করতে হত| সেই থেকেই এটা আমাদের মজ্জাগত‚ তাই আজও ঘুমিয়ে পড়ে ব্রেন সেই মরা সাজার প্র্যাকটিস করে‚ যখন শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থির‚ শুধু কাজ করে চলেছে ব্রেন| {/x6} {x7} ৭) ইমোশনের সিম্বোলিক অ্যাশোসিয়েশন এটা দিয়েই শেষ করব| স্বপ্নের দার্শনিক ত্বত্ত এটা| এর মতে আমাদের সকলের জীবনের যে দু:খ‚ হতাশা চরমতম ব্যথার যে অনুভূতি সেগুলোকে আমরা একটা বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে‚ একটা দার্শনিক অর্থের সাথে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করি‚ যাতে আমাদের কষ্টের লাঘব হয়| যেমন ধরুন প্রেমিক খুব বড় ধোঁকা দিয়েছে‚ বুক ভেঙে যাচ্ছে‚ নিজেকে বোঝালেন একা এসেছি‚ একাই তো যেতে হবে‚ কে কার| এই যে দার্শনিক তথ্য আপনার মনের মধ্যে আসছে এর মাধ্যমে আপনি মানসিক যন্ত্রণার উপশম খুঁজছেন| রেপ ভিক্টিমদের একটা স্বপ্ন নাকি বারে বারে আসে| এক সমুদ্রের ধারে বসে আছেন‚ একটা বিশাল ঢেউ এসে তাকে ডুবিয়ে দিয়ে গেল| উনি কিন্তু ওনার ট্রমাটা দেখছেন নে‚ দেখছেন সেই দু:খ কষ্টের একটা সিম্বোলিক ছবি‚ একটা বৃহত্তর জীবন দর্শন যা তাঁকে ট্রমা ভুলে থাকতে সাহায্য করছে| সোজা কথায়‚ স্বপ্ন মানসিক যন্ত্রণায় থেরাপির কাজ করে| এবারে আর একটা বিখ্যাত স্বপ্নের গল্প বলে ছুটি নেব| ব্যাণ্ডের নাম - Beatles গান - Yesterday| লেখক - McCartney| উইম্পল স্ট্রীটে গার্লফ্রেণ্ডের বাড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন আর স্বপ্নেই এল এই গানের সুর| তাড়াতাড়ি বসে গেলেন পিয়ানো তে সুরটা তুলতে যাতে ভুলে না যান| তারপরও কিছুতেই বিশ্বাস হয় না| বারে বারেই মনে হচ্ছে নিশ্চয় এই সুর কোথাও শুনেছেন‚ তাই স্বপ্নে এসেছে - এখন এই সুর বাজারে ছাড়লে তো লোকে চোর বলবে| জনে জনে সেই সুর শুনিয়ে জিগ্যেস করেন কেউ শুনেছে কিনা‚ কেউ বলতে পারে না| তারপর মাসখানেক যাওয়ার পরও যখন কেউ এগিয়ে এল না‚ তৈরী হল গানের লিরিকস‚ তৈরী হল Yesterday| শুনুন তাহলে গানটা? {/x7} {x0i}dream0.jpg{/x0i} {x1i}dream1.jpg{/x1i} {x2i}dream2.jpg{/x2i} {x3i}dream3.jpg{/x3i} {x4i}dream4.jpg{/x4i} {x5i}dream5.jpg{/x5i} {x6i}dream6.jpg{/x6i} {x7v}https://www.youtube.com/watch?v=Ho2e0zvGEWE{/x7v}

481

16

Aratrik

হংসচঞ্চু

Sleep dwell upon thine eyes, peace in thy breast. Would I were sleep and peace, so sweet to rest. Hence will I to my ghostly friar’s close cell, His help to crave and my dear hap to tell. এমন কথা আগেও লেখা হয়েছে। পরে তো হয়েইছে। আমাদের ছোটবেলায় একটা বাংলা গান খুব চালু ছিল, যদি হই চোরকাঁটা ওই... ইত্যাদি। আরও কয়েকটি গান ছিল। তার মধ্যে একটি, কথাগুলো মনে পড়ছে না, সেই গান উত্তমকুমার খুব গাইতেন, আর যতদূর মনে পড়ে শর্মিলা ঠাকুর তাতে খুব কষে ন্যাকামি করতেন। কিন্তু মজা হল, গানটার কথা যত খারাপ, উত্তমকুমারের অভিনয় যতই জঘন্য আর শর্মিলার ন্যাকামি যতই অসহ্য হোক, দেখতে ভাল লাগত। তখন এখনকার মতো ইউটিউব, আর কী সব ক্লাউড-টাউডের তেমন রমরমা ছিল না। ‘রমরমা’ শব্দটাই সম্ভবত ছিল না। আমরা চিত্রমালা বলে একটা বাংলা সিনেমার গানের স্লটে টেলিভিশনে সে সব দেখেছি বলে মনে হয়। আমি যে খুব দেখতাম, তা নয়। আমার মনের বাঁকগুলো তৈরি হয়ে গিয়েছিল অন্য ভাবে। এই সব গানে খুব যে আমোদ পেতাম, তা-ও নয়। কিন্তু পুজোর সময় মাইকে গাঁক গাঁক করে বাজত। এটাও ঠিক, আমাদের সময় এত পুজো ছিল না। এখন মাঝেমধ্যেই বাড়ি ফেরার সময়, কসবা গেলে, আমাকে একটু থমকে যেতে হয়। কোনও না কোনও পুজোর মণ্ডপ রাস্তার কোণটিতে দাঁড়িয়ে। ওই একটি জায়গা নির্দিষ্ট করা রয়েছে সব দেবদেবীর জন্য। মনে পড়ে যায়, ‘কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম।’ এমনটা আমাদের যৌবনে ছিল না। আমাদের সময় পুজো বলতে অবশ্য কালী, বিশ্বকর্মা আর সরস্বতী ছাড়াও আরও কী যেন একটা একটা দু’টো পুজো বোঝাত। ঠিক মনে নেই। পণ্ডিতমশায়ের শিক্ষায় আমরা, অন্তত আমি, পুণ্যক্রিয়া থেকে বরাবর দূরেই থেকে গিয়েছি। কিন্তু মজাটা সব সময়েই খুব ভাল করেই নিয়েছি। এমনই কোনও পুজোয় সিরাজ এঁকেবেঁকে নাচছে। সঙ্গে নেলো। পাশে গান চলছে, যদি হই চোরকাঁটা। গানটা বিশেষ করে আমাকেই শোনানো হত। তার প্রধান কারণ, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, তিনি শাড়ি পরতেন। আর, আমার বন্ধুদের মতে, তিনি ছিলেন যথেষ্ট কাতর। আমার বন্ধুরা সে কথা কখনও খোলাখুলি বলত না। ইঙ্গিতে বলত। এই বলাটুকুর মধ্যে ইঙ্গিত করাটুকুর মধ্যে একটা আনন্দ যে ছিল, নির্মল আনন্দ, তা অস্বীকার করার যো নেই। খুব খারাপের সম্মেলন যে সব সময়েই খুব খারাপ হবে তা নয়। তার মধ্যে অনেক সময়েই খুব আনন্দের রেশও তো থেকে যায়। তাই ওই বিশ্রী গানটা শুনে আমার আনন্দই হতো। পণ্ডিতমশায় ঠিক এই কথাটাই বলতেন। বলতেন, এই যে অনেক কিছুর একটা সম্মেলন, তাতে সবই যে খুব মধুর, তা নয়, তবে সেই সম্মেলন থেকে পাওয়া আনন্দ, তা স্বীকার করে নিতে হয়। সে কারণেই বহুত্বের ও বহুত্ববাদের উপরে খুব করে নির্ভর করাটা তখনই শিখে গিয়েছিলাম। পণ্ডিতমশায় বলতেন, এই যে প্রশ্নটি ওঠে, কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম, তারপরে তার উত্তর খুঁজতে বেরোতে হয়। প্রশ্নটি তুলেই যে আলাপ শেষ করে দেওয়া হল না, এইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। আবার বলছি, এইটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। এইটিই বহুত্ববাদের পক্ষে যায়। আমার শেষ দুপুরে একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। নেলোদের গান-নাচে সে সব গেল। কিন্তু আমার ঘর থেকে গঙ্গা দেখা গেলেও, রাস্তার কোণটা দেখা যায় না। তাই প্লাস্টার করা পা নিয়ে মেজোকাকিমার ঘরে গেলাম। মেজোকাকিমা কেন কে জানে, বরাবর মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমোতো। শীতকালে খাটে মাদুর তুলে তার উপরে শুতো। প্রৌঢ় বেলায় বিদেশে গিয়েও তাই করত। এবং এ সব নিয়ে হাসাহাসিকে মোটেই ভাল চোখে দেখত না। কেউ কোনও প্রসঙ্গে মাদুরের কথা বললেই, গম্ভীর হয়ে যেত। মেজোকাকিমার জানলা থেকেই দেখলাম, নেলো আর সিরাজ এঁকেবেঁকে নাচছে। সেটা পেয়েছিল মিঠুনের কাছ থেকে। খুব সাপের মতো করে শরীরটা আঁকিয়ে বাঁকিয়ে ওই নাচ আর মাঝে মধ্যে কোমরটা তুলে দু’পা সামনে ফেলে থপথপ করে লাফানো, এটা তখন খুব প্রচলিত ছিল। তো সেই গান ও নাচ চলছে, আর তিনি হোঁদলবাহিত রাঙাকাকার গাড়ি করে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে পৌঁছলেন। হোঁদল এমনই শয়তান যে, নিঃশব্দে এসেছে। কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে পারেনি। তাই তিনি গাড়ির ভিতর থেকে বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে রয়েছেন। নেলো আর সিরাজ যে তাঁর শাড়ির চোরকাঁটা হওয়ার জন্য আমাকে বিশেষ করে সাধ্য সাধনা করছে, তা তিনি দিনের আলোর মতো পস্ট বুঝতেও পারলেন। আর তারপরে তাঁর রাঙা মুখখানি আরও রাঙা হয়ে উঠতে দেখে, মধ্যাহ্নের সূর্যের তাপটুকু আর একার জন্য রেখে না দিতে চেয়ে, হোঁদল সদাশয় হয়ে ভেঁপু বাজিয়ে দিল। তাতে সকলে চমকে উঠে দেখল, রাঙাকাকার বিশাল ও অতি পরিচিত গাড়িটি ঠিক তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে। উইন্ডস্ক্রিনটা ছিল বিরাট। তার মধ্যে থেকে হোঁদলের বিরাট মুখটি জ্বলজ্বল করছে। আর তারপর প্রত্যাশা মতোই পিছনের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে একটি ব্যালেরিনা জুতো পরা পা। ওই একরত্তি টুকটুকে পা-টিকে আমরা সকলেই যমের মতো ভয় করতাম। আমি ছিলাম মেজোকাকিমার জানলায়। সেখান থেকে ভাঙা পা নিয়ে দেখছিলাম ওদের নাচা-গানা। তিনি যে আসবেন, তা জানতাম না। তবে আন্দাজ একটা ছিল। শিক্ষকমশায়কে ফোন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, একটি বিশেষ পাঠ তিনি আমাদের জন্য সংগ্রহ করেছেন। সেটি তিনি তাঁর হাতে তুলেও দিয়েছেন। তাই আন্দাজ করেছিলাম, ওই পাঠটি নিয়ে তিনি যে দিন আসার কথা নয়, সে দিনও আসতে পারেন। রাঙাকাকার সঙ্গে তাঁর গোপন বোঝাপড়া বরাবরই ছিল। তাই রাঙাকাকা আপিসে পৌঁছনোর পরে তাঁকে আনতে হোঁদলকে পাঠিয়ে দেবেন, এমনটাও ভেবে রেখেছিলাম। এই পাঠটি সম্পর্কে কিছু কথা বলার রয়েছে। পাঠটি হল, কী ভাবে শেক্সপিয়রের সাধারণ মানুষের কথা বলে। কথাটি একটু বিস্তারিত ভাবে বলি। শেক্সপিয়রের নাটকে চরিত্ররা যে কথা বলে, তা তো সব সময়েই খুব ইনটেন্স নয়। সাধারণ কথাবার্তা। যেমন ধরা যাক, রোমিও-জুলিয়েট বা ফার্দিনান্দ-মিরান্ডা। সেখানে ঘটনা তো খুবই সাধারণ। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে। শেক্সপিয়রের নাটকে চরিত্ররা যে কথা বলে, তা তো সব সময়েই খুব ইনটেন্স নয়। সাধারণ কথাবার্তা। যেমন ধরা যাক, রোমিও-জুলিয়েট বা ফার্দিনান্দ-মিরান্ডা। সেখানে ঘটনা তো খুবই সাধারণ। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে। এর মধ্যে বিশেষ ব্যাপারটা হল, দু’টি পরিবার একে অপরের শত্রু। টেম্পস্টের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যাপারটা আরও একটু বড়। যেমন, একটা দ্বীপে একটা ভূতের সঙ্গে থাকে পিতা-পুত্রী এবং তার সঙ্গে যুক্ত হল জাহাজডুবি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে ঘটনাগুলোকে ‘বিশেষ’ বলা হচ্ছে, তা তো তেমন কিছু বিশেষ নয়। কলকাতাতেই আমার এক বন্ধু ছিল রজত। সে প্রেমে পড়েছিল ওই পাড়াতেই তাদের এমন এক পরিবারের সঙ্গে, যাদের সঙ্গে তাদের কথাবার্তা নেই। এক কালে ওই পরিবারটি তাদের বাড়িতেই ভাড়া ছিল, তখন গোলমালের সূত্রপাত। তারপরে তারা উঠে গিয়ে ওই পাড়াতেই অন্য একটি বাড়িতে ভাড়া থাকত। তখন থেকে রজতের প্রেম। আর তারপরে তার সেই প্রেমিকার বাবা ওই পাড়াতেই একটি পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট ওঠার পরে, সেখানেই একটি বাসা কেনেন। পাড়া শুদ্ধু লোক জানত দুই পরিবারের সম্পর্কের কথা। তাই বলছি, এটা তো তেমন কোনও বিরাট ঘটনা নয়। সব জায়গাতেই ঘটে। কিন্তু তখন রজত তার প্রেমিকার সঙ্গে কী ভাবে কথা বলত? সে কি খুব ডেকোরেটিভ বাংলাতে কথা বলবে? তা তো নয়। সাইকেলের ঘণ্টি বাজানো থেকে শুরু করে, পার্কের পাশের অন্ধকার গলিতে লুকিয়ে থেকে পেনসিল টর্চের আলো ফেলা পর্যন্ত যা যা রজতের পক্ষে করা সম্ভব ছিল, সবই করেছিল। কথা হল, এটাই শেক্সপিয়রে পরিণত হলে কী হত? তাঁকে যখন প্রশ্নটা করা হল, তিনি যুক্তি দিয়েছিলাম, শেক্সপিয়র প্রথমত বিষয়টা এতটা সরল রাখতেনই না। তিনি ওই দুই পরিবারের সম্পর্কের এনমিটিটা তিন প্রজন্ম আগে টেনে নিয়ে যেতেন। উনিশ শতকে নিয়ে গিয়ে ফেলতেন। সেখানে ব্যবসা সংক্রান্ত কোনও গোলমাল, খিদিরপুর ডকে মারপিট, ময়দানে পিস্তলের ডুয়েল থেকে এনে হাইকোর্টে বড় বড় লেকচার দিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলতেন ওই বাগবাজারের পার্কে, যেখানে পাশের গঙ্গা থেকে বজরা করে কেউ এসে পার্কের মধ্যে গুলি ছুড়ত। পার্কে যে পাথরের বেদিটা ছিল, যেখানে রজত বসে বসে দুপুরে তার প্রেমপত্রগুলো লিখত, সেখানে সাদা পাথরে লাল রক্তের দাগ গিয়ে লাগত। আর তারপরে একটা হিউজ মনোলোগ। অর্থাৎ, তাঁর কথা মতো, একটা গ্র্যাঞ্জার চাই। না হলে শেক্সপিয়র খুশি হবেন না। কথাটা কিছুমাত্র ভুল নয়। ঠিকও নয়। সাধারণ কথা শেক্সপিয়ারে সাধারণ ভাবেই রয়েছে। কিন্তু তা দিয়ে বোনা হয়েছে অনুভূতির নতুন রকম। আস্তে আস্তে ঘটনা আর কথার মাত্রা চড়েছে। এলিজাবেথান ট্র্যাজেডিগুলো বিরাট বিরাট অনুভূতি নিয়ে কথা বলে। সাধারণ মন্তব্যকে এক একটা কালজয়ী বাক্যে পরিণত করে দেয়। শেক্সপিয়র, মার্লো, কিড সকলেই তা করেছেন। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। শেক্সপিয়রকে একটা বড় সমাবেশকে খুশি করতে হত। শোনা যায়, দ্য কার্টেন থিয়েটারে রানি এলিজাবেথ দ্য ফার্স্ট নিজেই নাকি লুকিয়ে নাটক দেখতে আসতেন। রানির সভায় যে শেক্সপিয়র নাটক করেছেন, তা তো অনেকেই দাবি করেন। চেম্বারলেন’স মেন-এর গুরুত্ব নিয়ে হাজার হাজার পাতা লেখা হয়েছে। আবার তার সঙ্গেই ছিল গ্রাউন্ডলিংস। যারা সামনে বসত। খুব কাছ থেকে দেখত। এই যে দর্শক, তারা লন্ডনার কম। তারা বাইরে থেকে আসত কাজের খোঁজে। তারা সারা দিন খুব পরিশ্রম করত। তাদের কাছে শেক্সপিয়র ছিলেন বলিউড। শেক্সপিয়র তাদের নানা ক্ষোভ, বেদনা, আনন্দ, বিরহ, মিলন ও অত্যাশ্চর্য ঘটনার খিদে মেটাতেন। তারা ভূত বিশ্বাস করত, তারা বিশ্বাস করত স্বপ্নে আগামী দিনের কথা বলা যায়। অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটে। তারা বিশ্বাস করত, এই যে সারা দিন কাজ করে যাচ্ছে, হঠাৎ টেমসের মধ্যে থেকে কোনও জলপরী উঠে এসে তাদের একটি হামি দিয়ে আবার মিলিয়ে যাবে। তারা বিশ্বাস করত, যিনি সবার উপরে, তিনি সব জানেন। তিনি সব ঠিক করে দেন। এই য়ে সারা দিন পরে একটা রুটি মাত্র তারা খেতে পাচ্ছে, অথচ তারা দেখছে স্পেনের সোনা বাজারে আসছে, শুনছে সমুদ্র বলতে যে বিরাট জলরাশি বোঝায়, তার ওপারেও দেশ রয়েছে। সেখানেও মানুষ থাকে। তাই তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে, একদিন রাতে ওই ঘাটের ধারে পড়ে থাকা ব্যারেলটা থেকে এক তরুণী জ্বলজ্বলে একটা গাউন পরে বেরিয়ে আসবে, তার গাউনে আটতে থাকবে সহস্র তারা, তার হাতে থাকবে একটা ম্যাজিক ব্যাটন, আর সে বলবে, ‘‘এসো, বিয়ে করি। তুমি আসলে ঘাটের শ্রমিক নও। তুমি নান-ডাজ-নো ল্যান্ডের রাজপুত্র। তোমাকে প্রচ্ছন্ন হয়ে রাখতে হয়েছিল এতদিন। কেননা তোমার ঠাকুর্দার সঙ্গে প্রেম হয়েছিল এক ডাইনি বুড়ির, এতদিন ধরে সে-ই সবাইকে বন্দি করে রেখেছে। এ বার আমি তাকে হার মানিয়েছি। আমি তোমাকে ওই দেশ ফেরত দেব।’’ দেশ ফেরত দেওয়ার কথা উঠতেই, এ বার শুরু হয়ে গেল, অনুভূতির সাম্রাজ্য। এই লোকটা হঠাৎ রাজা হয়ে গেল। এ বার সে মনে করতে শুরু করল, যে বুড়ি রোজ তাকে একটা করে আপেল বিনে পয়সায় দেয়, তাকে একটা নাইটহুড দিয়ে দিলে কেমন হয়। অর্থাৎ, তার জীবনে, যে সব কিছুকে সে ঠিক বলে মনে করে, যে সব জিনিসকে সে খারাপ বলে মনে করে, সে সবকে সে শাস্তি বা পুরস্কার গিতে শুরু করল। এরপরে পরের দিন ওই বুড়ির কাছে থেকে আপেলটা সে নিল অনেক নিঃসঙ্কোচে। কেননা, আগের রাতেই তো বুড়িকে সে নাইটহুড দিয়ে দিয়েছে। তা হলে দেখুন, একদিকে সেই লোকটা তার নিজের ওই খুব সাধারণ কষ্টের জীবনটা কাটাচ্ছে, সেই সঙ্গে নিয়ে ফিরছে একটা স্বপ্ন। একটা আজগুবি স্বপ্ন। সেটাকে সে নিজেও আজগুবি বলে মনে করে, জানে ও বোঝে। কিন্তু মানে না। সে যে জানে, এমনটা হতে পারে। এলিজাবেথান যুগে এমন সব কাণ্ডই তো হচ্ছিল। অন্য সব কথা ছেড়ে দিন, ইতিহাস বই খুলে দেখে নিন, কিন্তু এটুকু তো মনে করিয়ে দিতেই পারি যে, এক কুমারী রানি আস্ত একটা দেশ শাসন করছে, একের পর এক শক্তিশালী প্রতিবেশীদের দমন করে যাচ্ছে, সমুদ্র তোলপাড় হচ্ছে, মহাকাশের ইতিহাস জানা যাচ্ছে, আজ যে তার কাছের কাল সে দূরের হয়ে যাচ্ছে, এটা তো কম নয়। শুধু এইটাই তো বিরাট একটা কথা। শেক্সপিয়রের উপরে দায়িত্ব পড়েছিল, লেখাপড়ার দেবতা এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এই নতুন যুগের ভোরে এই সাধারণ মানুষগুলোর অসাধারণ স্বপ্নগুলোকে আকার দিতে হবে। ভাবুন দেখি, কী সেই মারাত্মক দায়! যে লোকটির কথা একটু আগে বলছিলাম, যে একটি বুড়িকে নাইটহুড দিয়েছে, তার সঙ্কোচটুকুর দায়ও নিতে হয়েছিল শেক্সপিয়রকে। অতএব শেক্সপিয়রকে একটু ডেকোরেটিভ হতে হয়েছে। টেমস দিয়ে রাতে স্পেনের জাহাজ যখন এসেছে, সেই জাহাজে সোনা রয়েছে বলে খবর যখন মিলেছে, তখন শুধু সেইটুকুর উপরে নির্ভর করে শেক্সপিয়রকে একটা অত্যাশ্চর্য কাহিনী বুনতে হয়েছে। কথা হল, এই কাহিনিটিতেও ওই রাতের টেমসকে বাদ দেওয়া যায়নি। ওই লোকটি, ঘাটের পাশে পড়ে থাকা ব্যারেল, ওই আপেল বিক্রি করা বুড়ির কাঁতামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা, ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজের উপরে রাতের লন্ডন চিড়ে ঘোড়ার গাড়ি যাওয়া, সেই ঘোড়ার পায়ের ক্লপ ক্লপ থেকে শুরু করে সব রাখতে হয়েছে, নিখুঁত ভাবেই রাখতে হয়েছে, আর তারপরে গল্প বুনতে হয়েছে। কত কত কথা, কত কত দৃশ্য, কত কত দাবি, কত কত আশ্চর্য সারা জীবন ধরে বুনতে হয়েছে লোকটাকে। তাই সাধারণ কথা, শেক্সপিয়র বলেছেন একটু সাজিয়ে, আমি যাকে অপেরা ধর্ম বলে মনে করি। কিন্তু সেই অপরা ধর্ম, সাধারণ বাস্তবকে অস্বীকার করে না। সে কথা বলে স্বাভাবিক ভাবেই। আর তার মধ্যে সে বুনে দেয় অত্যাশ্চর্য তারার আলো। সাধারণ গাউনই পরে সেই জলপরী, তাতে কেবল শেক্সপিয়র গেঁথে দেন আকাশের যত তারা। নিঃসঙ্গ ঈর্ষাকাতর চাঁদটা একা একা আলো বিলোয়, নইলে ওই গাউনটি দেখা যাবে কী করে? যত দূর মনে পড়ে তখন, বিকেল হব হব। গাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির সামনে তাঁকে নামতে দেখে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, —A thousand times the worse to want thy light. গান থেমে তো গিয়েছে। মোটামুটি সবাই তাঁর সামনের রাস্তা দিয়ে পালিয়েওছে। এমন একটা ভাব করা হচ্ছে, যেন ওই চোরকাঁটা মার্কা গানটা নেই, কোনওদিন ছিল না। আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল, তাঁর প্রতি আমার বন্ধুদের এই শ্রদ্ধা দেখে। আমাদের সম্পর্কটার প্রতি তাদের এত দরদ দেখে। তিনি কিছু ক্ষণ দাঁড়ালেন। তারপরে একবার চোখ তুলে তাকালেন জানলার দিকে। দেখতে পেলেন আমি আছি। তারপরে গটগট করে বড় গেটের বাইরের উঠোনটা পেরিয়ে এলেন। মেজোকাকিমা পাশ না ফিরেই বলল, ‘‘মেনোর মা-কে চা বসাতে বল।’’ তিনি যে চা খেতেন, মেজোকাকা লালবাজারের কাছ থেকে কোনও একটা দোকান থেকে মকাইবাড়ির চা নিয়ে আসত, সেটি খেতে ভালবাসতেন। সেই চা করা ছিল ঝক্কি। মেনোর মা খুব বিরক্ত হত। আমি খেতাম, এখনও খাই দুধ চিনি ফিনি সব দিয়ে চা। সে বেশ ভাল। মেনোর মা সেই চা একটু কড়া করে করত। কবে মারা গিয়েছেন মহিলা, এখনও মনে রয়েছে। পুঁইশাক কুমড়ো আর চিংড়ি রাঁধতেন, খুব তেল দিয়ে। সবাই রাগ করত। আর আমি, ঠাকুমা আর মেজোকাকিমা মন দিয়ে সাবড়ে দিতাম। মেনোর মা-কে বলতে হয়নি। তিনিও কী করে জেনে গিয়েছিলেন, তিনি এসেছেন। আর তারপরে চা বসেছিল। আমাদের তখন গ্যাসের উনুন এসে গিয়েছে। কিন্তু পুরনো মাটির উনুনও ছিল। তাতেই রান্না করতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন মেনোর মা। ঠাকুমাও। মেজোকাকিমা ছাড়া কেই গ্যাসে হাত দিতে চাইতেন না। তিনি দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন। আমি দোতলার বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিলাম। তিনি উঠোন পেরিয়ে প্রথমে চলে গেলেন তুলসীতলায়। সেখানে কী জানি কেন, একবার বেদিতে হাত ছুঁইয়ে আবার ফিরে এলেন। হাতটি মাথায় উঠল না, বুক ছুঁল না। তিনি একতলার বারান্দায় উঠে তাঁর টুকটুকে জুটো জোড়া খুললেন। তারপরে জানতাম, এ বার সিঁড়ি দিয়ে উঠবেন। কতটা সময় নেবেন, তা-ও মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু সেই সময় বয়ে যায়, তিনি আসছেন না কেন? বেশ খানিক বাদে তিনি যখন উঠলেন মুখটি উজ্জ্বল। ঠাকুমার পাকা চুল তুলে দিয়ে এসেছেন কয়েকগাছি। ওই যে কথাটা, কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম? আমি ঠাকুমাকে খুশি করার কথা বলছি না। আমি তাঁর কথাই বলছি। কত রকম যে তিনি। একই চিন্তাসূত্র। কিন্তু তার কি আশ্চর্য বৈচিত্র। কথাটা হল, কোন দেবতাকে হবিষ্য দেব—এই প্রশ্নটা বিরক্তির নয়। প্রশ্নটা করা হয়েছে বিস্ময়ের সঙ্গে। তাঁর এত এত রূপ? সেই এত এত রূপের মধ্যে কোনটিকে বেছে নেব? আর তারপরেই আবার এই যে প্রশ্নটি করা হচ্ছে—তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই যে এত এত রূপ, আসলে তার বন্দনাই করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রতিটি রূপকেই হবিষ্য দেওয়া উচিত। তিনি এ বার সিঁড়ির মুখটিতে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকোলেন। তারপরে শাড়ির আঁচলটি অভ্যাস মতো টেনে নিলেন। আর তাতেই আমার মনে পড়ে গেল, যদি হই চোরকাঁটা... আমি হাসছি দেখে তিনি আরও অবাক হলেন। তারপরে সেই এক দৃষ্টি—তুঝ মুখ চাহয়ি শতযুগভর দুখ ক্ষণে ভেল অবসান। লেশ হাসি তুঝ দূর করল রে, বিপুল খেদ-অভিমান। সেই হলুদপানা বিকেল। কোথও কোনও শব্দ নেই। গান বন্ধ। চেঁচামেচি বন্ধ। শহরের পরিচিত নিস্তব্ধতা ফিরে এসেছে। কিন্তু তিনি ও আমি দু’জনেই জানি, সেই সুপ্তির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে কোলাহল। নেলো, সিরাজ, হোঁদলরা অপেক্ষা করছে। মেজোকাকিমা জেগে গিয়েছে। ঠাকুমা জেগেই থাকে সারা দুপুর। মেনোর মা চা বসিয়েছে। তাই এই যে কয়েকটি মুহূর্ত আমাদের জন্য রয়ে গিয়েছে নিস্তব্ধতার মাস্ক পরে, যেমন জুলিয়েট বলেছিল, রাত্রির মাস্ক, তেমন একটা সম্পর্কের মাস্ক—এই সব কিছুর মধ্যে হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাই নয়। সকলেই মনে মনে কল্পনা করে নিচ্ছে আমাদের দু’জনের দেখা হচ্ছে, তারা জানে দেখাটা হবে এই দোতলার বারান্দাতেই, তারা জানে তিনি সিঁড়ি দিয়ে উঠেই তাকিয়ে থাকবেন আমার দিকে। আমরা এই কয়েকটা মুহূর্ত তাকিয়েই থাকব। কেন জানি না আমি বলতে চাইলাম, ‘‘এখন পড়াশোনা করব না।’’ কিন্তু কথাটা সে ভাবে বলা তো যায় না। বলতে হয় শেক্সপিয়রের মতো করে। তাই আস্তে আস্তে বললাম, Love goes toward love as schoolboys from their books, But love from love, toward school with heavy looks. তিনি হেসে ফেললেন। তিনি এরপরে যা করেছিলেন, তা আশ্চর্য। বলেছিলেন, ‘‘ওই গানটা কী বাজছিল?’’ বাংলা সিনেমার গান। তুমি কান দিও না। কিন্তু কী একটা বাজে কথা রয়েছে। বাজে আবার কী! বলছে প্রেমিকার শাড়ির সঙ্গে লেগে থাকবে প্রেমিক। শুধু লেগে থাকাটাই প্রেম? তা কেন, তবে এটাও প্রেমের একটা অঙ্গ। কস্মৈ দেবায় হবিষ্য বিধেম? এই অবতারটি আমার পছন্দ নয়। কেন? শেক্সপিয়রেই তো রয়েছে Sleep dwell upon thine eyes, peace in thy breast. Would I were sleep and peace, so sweet to rest. এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘তারপরে কিন্তু আছে—Ah me! How sweet is love itself possessed / When but love’s shadows are so rich in joy!’’ তবে তাঁর পছন্দ কী? সারা বিকেল জাগ্রত হয়ে অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ গঙ্গার দিক থেকে বাতাস উঠল। সেই বাতাল শুনল, তিনি আবৃত্তি করছেন, আমার মন কেমন করে– কে জানে, কে জানে, কে জানে কাহার তরে॥ অলখ পথের পাখি গেল ডাকি, গেল ডাকি সুদূর দিগন্তরে॥ ভাবনাকে মোর ধাওয়ায় সাগরপারের হাওয়ায় হাওয়ায় হাওয়ায়। স্বপনবলাকা মেলেছে ওই পাখা, আমায় বেঁধেছে কে সোনার পিঞ্জরে ঘরে॥ মেজোকাকিমা উঠে এসে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। হোঁদল আমার ঘরের বারান্দায় চলে এসেছিল পাইপ বেয়ে। সে সেখান থেকে তাকিয়ে রইল। আমি জানি নেলো আর সিরাজ তাকিয়ে রয়েছে রাস্তার কোণ থেকে। মেনোর মা সিঁড়ি দিয়ে উঠে চায়ের ট্রে হাতে তাকিয়ে রইল। ঠাকুমা তার পিছনে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। ঠাকুর্দা ঘুম ভেঙে উঠে আচমকা ভাবলেন, আমার বোন এসেছে বুঝি। গলা ছে়ড়ে ডাকতে লাগলেন তার নাম ধরে। তিনি শুধু গাইছিলেন না। তিনি বারান্দার পাশে চলে গিয়েছিলেন। মুখটি উঁচু করা ছিল। হাতের ব্যাগটি পড়েছিল পাশে সোফার উপরে। আঁচলটি বাঁধা ছিল কোমরে। নেলো, সিরাজরা যে দেব বা দেবীর পুজো করছিল, তিনিও তাকিয়ে ছিলেন নিশ্চয়। গান শেষ করে পাশ ফিরে তিনি আমাকে বললেন, ‘‘শরীর দিয়ে লেগে থাকলে কিছু হয় না মূর্খ। ভাবনা দিয়ে লেগে থাকতে হয়। শেক্সপিয়র এই ভাবনাটিরই সঞ্চার ঘটাতেন ওহে বালক। সেই ভাবনার সোনার পিঞ্জরকে তুমি অপেরা ধর্ম বলতে পার।’’ ভাবনার সঞ্চার। কত কত ভাবনা। কত কত রকম। এটা তো এমন একটা জায়গা, যা কেউ কখনও যায়নি, ভাবনা দিয়েই তৈরি। ওই শেক্সপিয়রের সাম্রাজ্যের মতো। কিন্তু সেখানে বহুত্বকে ধরা হয়েছে মর্যাদা দিয়ে। অতখানি দরদ দিয়ে, যাতে কয়েকশো বছর পেরিয়ে, কয়েকশো হাজার মাইল পেরিয়ে অসিক্ষিত এক তরুণও ঠাঁই পেতে পারে এক এমন দুপুরে, যেখানে সে তার নিজের প্রেমিকাকে দু’হাতের মধ্যে পেয়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন অনুভূতিটাকে পুজো দেবে, বলতে পারে না। আমার বয়ে গিয়েছে, ভাবনা দিয়ে লেগে থাকতে। যস্য ছায়ামৃতং যস্য মৃত্যুঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম?

1537

261

ভোঁদড়

আফ্রিকান সাফারি

ওয়াকি টকির মহিমা হল শুধু আমরাই না‚ আরো অনেকগুলো গাড়ি খবর পেয়ে গেছে যে হান্টিং দেখার একটা সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে| তারাও এসে আমাদের আশেপাশেই ভীড় জমালো| স্যামি বলল একটা নিয়ম আছে কোন জন্তুর আশেপাশে কতগুলো গাড়ী দাঁড়াতে পারে| সংখ্যাটা বোধহ্য় পাঁচ| কিন্তু আমাদের আশেপাশে গুটি পনেরো গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে| আমি বললাম যে নিয়ম তো কেউই মানে না দেখছি| যেটা বুঝলাম‚ নিয়ম স্ট্রিক্টলি মানা হয় না‚ কেন না এটাই তো গাইডদের পেটের ভাত| কিন্তু যেটা ওরা নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া করে মেনটেন করে সেটা হল জন্তুদের যেন সত্যি অসুবিধা না হয়‚ এবং ট্যুরিস্টদেরও যেন অসুবিধা না হয়| পরে দেখেছিলাম কোন গাইড জন্তুদের অসুবিধা করলে বাকিরা তাকে ঐ ওয়াকি টকি চ্যানেলেই শাসন করে| সেটাকে সব গাইডই ভয় পায়‚ কেন না পার্ক রেঞ্জারেরা টকি চ্যানেলগুলো মনিটর করে| কোন গাইডকে বারবার অন্যরা বকুনি দিচ্ছে শুনলে তাকে ধরবে‚ টিকিট দেবে‚ এমনকি লাইসেন্সও কিছুদিনের জন্য সাসপেন্ড করতে পারে| যেহেতু এদের পেটের ভাত ঐ লাইসেন্সের ওপর নির্ভরশীল‚ কেউই খুব একটা কনসেন্সাসের বাইরে যায় না| রোদ চড়ছে‚ সিংহীরা নট নড়ন-চড়ন| মোষ মাঝে মাঝে এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে কি দেখছে| আমি একটু অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি‚ সামনে খাবার‚ খাবার নাম নেই! এ কি অভদ্রতা!! পড়ত আমার মায়ের হাতে‚ সিধে করে ছেড়ে দিত| শুনে গিন্নি বলল - তুমি খেতে গেলে তোমার খাবার কি শিং আর খুড় বাগিয়ে তেড়ে আসত? স্যামি হাসল| কথাটা ঠিকই| সিংহ মোষকে ভয় পায়| পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মহিষকে সিংহ আক্রমণ করে কমই| মোষটা খুব বৃদ্ধ বা অসুস্থ হলে করে‚ অথবা খুব খিদে পেলে‚ তাও একা পেলে তবেই| এই মোষটা বুড়ো| তবে খুব বুড়ো নয়| সিংহদেরও খুব চনচনে খিদে পায় নি‚ সেটা ওদের ভাবভঙ্গীতেই বোঝা যাচ্ছে| কি হলে সিংহীদের খিদে পেয়েছে বোঝা যায় জানতে যাব‚ এমন সময় দেখি পাশের গাড়ীর লোকজন রাস্তার উল্টোদিকে দেখছে| স্যামি মাথা না ঘুরিয়েই বলল‚ সিংহীদুটো এদিকে‚ সিংহটা ওদিকে থাকার কথা| তাকিয়ে দেখি একটা নয়‚ দুটো সিংহ রাস্তার ওপারে ফুট চল্লিশেক দূরে উপস্থিত| সিংহদের মাতৃতান্ত্রিক পরিবার| মায়েরাই শিকার টিকার করে বাচ্চা ও বাবাদের খাওয়ায়| পরিবারে এক বা একাধিক পুরুষ সিংহ থাকে| তারা নিজেদের ইচ্ছায় আসে‚ তবে যায় পরিবারের মায়েদের ইচ্ছেয়| মানে সিংহরা খুব বুড়ো হয়ে গেলে‚ বা কোন আগন্তুক সিংহের সাথে লড়াইয়ে হেরে গেলে তাকে পরিবার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়| বেড়ালদের মত‚ পুরুষ সিংহরাও অনেক সময় বাচ্চা খেয়ে ফেলে| সেরকম হলে‚ পরিবার ফেলে কয়েকজন মা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আলাদা হয়ে যায়| বাচ্চারা বড় হয়ে গেলে মায়েরা আবার পুরনো পরিবারে ফিরে আসে| কখনো বা নতুন পরিবার খুঁজে নেয়| সন্তানপালন আর শিকারের কাজগুলো মায়েরা কমিউনিস্ট সিস্টেমে করে থাকে‚ ফ্রম ইচ অ্যাকর্ডিং টু দেয়ার এবিলিটি‚ টু ইচ অ্যাকর্ডিং টু দেয়ার নিড| বাবারা মোটামুটি প্রজনন আর প্রতিরক্ষা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত| এছাড়া শিকারের সময় পার্শ্বরক্ষাও কখনো কখনো বাবাদের দায়িত্ব| এই এখানে যেমন‚ মায়েরা শিকার রেকি করছে| উপযুক্ত বুঝলে আক্রমণ করবে| তখন মোষটা পালানোর চেষ্টা করলে পুরুষদুটি বাধা দেবে‚ বা শিকারে অংশও নিতে পারে| যদিও শিকারে অংশ নেওয়াটা কমই হয়| আধাঘন্টাখানেক কেটে গেল| সিংহীরা বার কতক উঠে দাঁড়াল| শিকারের জন্য দৌড় শুরু করার আগে সিংহীরা যখন দাঁড়ায় সেটা একটা দেখার মত ব্যাপার| নাকের ডগা থেকে লেজের মাথা অবধি একই লাইনে| চোখদুটো সোজা শিকারের ওপর| পায়ের পেশী শক্ত‚ টান-টান| বিশেষ করে দুটি সিংহী যখন পাশাপাশি ওভাবে দাঁড়ায় তখন মনে হয় পেছনে একটি ইজিপশিয়ান কি হিটাইট রথ জুড়ে ক্লিওপ্যাট্রাকে দাঁড় করিয়ে দিলেই সবকিছু মানানসই হত| কিন্তু প্রত্যেকবারই খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে সিংহীরা আবার শুয়ে পড়ে| আমি দাঁতে দাঁত চেপে বলি‚ সব মেয়েরই ফলস পেনের সমস্যা| স্যামি বাংলা না বুঝলেও ইংরাজী শব্দদুটো বুঝল| বলল‚ দেখ‚ আমি এগারো বছর ধরে এই করছি| কাভিং সিজনের বাইরে মোট দশবারও হান্টিং দেখিনি| তারও বেশীরভাগই যখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক টিমের সাথে কাজ করতাম‚ তখন রাত্রিবেলা দেখা| দিনের বেলা সিংহ শিকার কমই করে| এটাও শিকার করবে বলে মনে হয় না| চল‚ আমরা বরং লাঞ্চ খেয়ে নদীর দিকে যাই| তোমার কাজিনের ভাগ্য ভাল| আফ্রিকায় এত বছর ঘুরে বেরিয়ে একবার ঙ্গরোঙ্গরো ক্রেটারে প্রায় সন্ধের মুখে হান্টিং দেখতে পেয়েছিল| তবে সেটা একেবারে মোষ শিকার| আমিও মোষ শিকার বার দুয়েক দেখেছি| বেশীরভাগই যা দেখেছি সে জেব্রা আর গ্যাজেল শিকার| লাঞ্চ করার জন্য বনের মধ্যে কয়েকটা জায়গা আছে| সেসব জায়গায় গাড়ী থেকে নামা যায়| সেরকম একটা জায়গায় স্যামি গাড়ী থামাল| একটা ফুট তিরিশেক উঁচু টিলা| তার পায়ের কাছে একটা ছোট্ট পার্কিঙের জায়্গা‚ মাটির| তার একপাশে বাথরুম‚ বাথরুমের পাশ দিয়ে টিলায় ওঠার পথ| স্যামি বলল‚ বাথরুম সেরে টিলার ওপরে গিয়ে বস‚ আমি আসছি| এতক্ষণ ধরে হাতি আর সিংহ দেখে গাড়ীর বাইরে পথ চলতে আমার বেশ ভয় করছিল| কিন্তু আমি ভয় পেলে গিন্নি আরো বেশী ভয় পাবে| এর মধ্যে আমাকে ফিসফিস করে বলেছে‚ স্যামি সাথে না থাকলে একা যাওয়া ঠিক হবে না| অভিজ্ঞতায় শিখেছি‚ কোন প্রফেশনাল যখন কাজ করে তখন তার কথা শোনাই ভাল| স্যামি যখন বলছে যেতে‚ তখন যাওয়া নিশ্চয়ই খুব বিপদের হবে না| আমি গিন্নিকে সেটাই বোঝালাম| তারপর ভয়ে ভয়ে দুজনে টিলার ওপরে উঠলাম| টিলার ওপরে এক চিলতে একটু জমি‚ ছায়াওয়ালা গাছে ঘেরা| তার মধ্যে মধ্যে গোটা চারেক বেঞ্চিওয়ালা টেবিল পাতা| একটি টেবিলে এক ভদ্রলোক ও তার গাইড আগে থেকেই বসে ছিল| আমরা আর একটা টেবিল দেখে বসলাম| মিনিট পাঁচেকের মধ্যে স্যামি এসে হাজির| সাথে ক্যাম্প থেকে আনা লাঞ্চবক্সগুলো‚ একটি পিকনিক বাস্কেট‚ ও পিঠ থেকে ঝোলানো একটি কুলার| পিকনিক বাস্কেটে টেবিল ক্লথ‚ কয়েক রকম জ্যাম জেলি পিনাট বাটার‚ ডিসপোজেবল থালা‚ বাটি‚ ছুরি কাঁটা চামচ‚ ন্যাপকিন ইত্যাদি| কুলারে ঠান্ডা ফলের রস‚ কোকা কোলা‚ জল| লাঞ্চবক্সে স্যামি নাম লিখে রেখেছিল| চটপট টেবিল ক্লথ পেতে‚ থালা জল সাজিয়ে আমাদের হাতে হাতে যার যার লাঞ্চবক্স ধরিয়ে দিল| খিদে পেয়েছিল‚ পনেরো মিনিটের মধ্যে খাবার শেষ| এবারে পিকনিক বাস্কেট থেকে বেরোল কফির ফ্লাস্ক‚ চিনি‚ কাপ ইত্যাদি| উফ‚ স্যামিটা যে কি!! এমনকি কফিটা আনতেও ভুল করে নি| পিকনিক এরিয়ার আশেপাশে দেখি গাছে গাছে কতগুলো পতাকার মত ঝুলছে| সেগুলোর মাঝখানের অংশটা নীল‚ দুদিকে ধূসর| কৌতূহল হল কি ব্যাপার| পূর্ব আফ্রিকায় ৎ্সেৎ্সি বলে এক রকম মাছি পাওয়া যায়| তারা স্লিপিং সিকনেসের বাহক| স্লিপিং সিকনেসের কোন ফলপ্রসূ চিকিৎসা নেই| যাদের হয়‚ তারা ঝিমোতে থাকে‚ ঝিমোতে ঝিমোতে এক সময় মারা যায়| গরু-মহিষের বেশী হয়‚ মানুষেরও হয়| ৎ্সেৎ্সি মাছিরা কালো‚ নীল‚ ধূসর রঙের দিকে আকৃষ্ট হয়| ঐ পতাকাগুলোর রঙে আকৃষ্ট হয়ে ৎ্সেৎ্সি মাছিরা এসে বসে| পতাকায় মাখানো আছে মাছি মারা ওষুধ| রঙে আকৃষ্ট হয়ে মাছি এসে বসলেই - খাল্লাস| বাঙালির ছেলে‚ খুবই ঘাবড়ে গেলাম এসব শুনে| আমাদের যদি কামড়ায়? কেকারটা জানি না‚ কিন্তু তোমাকে তো কামড়েছে - স্যামি জানাল| সে কি? কখন? মহিষ শিকার দেখার জন্য যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম‚ তখন একটা বিশাল বড় হলুদ রঙের মাছি কামড়েছিল বটে| খুবই যন্ত্রণা হয়েছিল| তা আমি তো দিয়েছি ব্যাটাকে এক চাপড়ে থেবড়ে| সেইটের পেটে পেটে এত? স্যামি দেখলাম মাছি হত্যা একেবারে পছন্দ করে নি| ঘ্যানঘ্যান করল‚ তানজানিয়ান ৎ্সেৎ্সিরা এখন আর স্লিপিং সিকনেসের বাহক না| মিছিমিছি তুমি ওটাকে মারলে| একটু আগে আমাকেও কামড়াল তো| আমি তো শুধুই ওটাকে উড়িয়ে দিলাম| লাঞ্চ খেয়ে বেড়োতে বেড়োতে সূর্য্য খানিক ঢলেছে| নদীর ধারে যাব এবার| যেতে যেতে দেখি হাতির দল পাহাড় থেকে বদীর দিকে নামছে| এখন তারা জল নিয়ে খেলবে‚ কাদায় লুটোপুটি খাবে| তারাঙ্গিরি নদী অগভীর| তিরতির করে জলের ধারা‚ একএক জায়গায় খাড়াই পার‚ বড়বড় ঘাসে ঢাকা চর| এক জায়গায় দেখলাম একটি হাতি পরিবার নদীর চর থেকে জল পার হল| আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম নদীর খাড়াই পার বেয়ে উঠে আমাদের দশ ফুটের মধ্যে রাস্তা পার হয়ে ঘাসের মধ্যে ঢুকে গেল| আর এক জায়গায় নদীর চরে রংবেরঙের মাছরাঙা আর সেক্রেটারি বার্ড‚ কাদার ভেতরে খাবার খুঁজছে| চরের মধ্যে হাতির পাল‚ এঁকে বেঁকে ঘাসের ভেতর দিয়ে এসে জলে নামল| এইভাবে ঘন্টাদেড়েক কাটার পর দেখি নদীর ওপারে কয়েকটা হাতি জলে কাদায় লুটোপুটি খাচ্ছে| সূর্য্যের অবস্থান এমন যে নদীর এপার থেকে কিছুতেই ঠিক আলো পাচ্ছি না| একটা সাবস্ট্যানশিয়াল ব্যাকলাইট থেকেই যাচ্ছে| স্যামিকে বললাম নদীর ওপারে চল| ছবি তুলব| স্যামির এসবে খুব উৎ্সাহ| এক জায়গায় হাতিদের নদী পার হবার পথ ঢালু হয়ে নদীতে নেমেছে| সেখান দিয়ে গাড়ী নদীতে নামিয়ে দিল| নদীর মধ্যে গাড়ী খারাপ চলে নি‚ কিন্তু ওপারে ওঠার জায়গাটা ভাঙা| সেখান দিয়ে গাড়ী তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে গাড়ীর চাকা নদীর বালি-কাদায় বসে গেল| সর্বনাশ যে কতটা সেটা আমরা কেন‚ স্যামিও বোঝে নি| গাড়ী লো গিয়ারে দিয়ে ঠেলে উঠতে গিয়ে অবস্থা আরো খারাপ হল| শেষে যতই অ্যাকসিলারেটর চাপ না কেন‚ শুধুই চাকা ঘোরে‚ গাড়ী নড়ে না| এর মধ্যে আমাদের আটকে যাবার খবর ছড়িয়ে গেছে| নদীর দুদিকে মজা দেখার জন্য গোটা বিশেক গাড়ী দাঁড়িয়ে গেছে| একটা গাড়ীর ইংরাজীভাষী ট্যুরিস্টরা দেখলাম আলোচনা করছে আজকে ক্যাম্পে ফিরে আমরা ডিনার খেতে পাব কিনা| শেষে আমাদের বিপদ খুবই সিরিয়াস বুঝে সামনে থেকে একটি গাড়ী একটা লোহার দড়ি ফেলে দিল| সেটা গাড়ীর সামনের গ্রিলে বেঁধে অনেক চেষ্টা হল আমাদের টেনে তোলার| কিন্তু দেখা গেল আমরা ওঠার বদলে অন্য গাড়ীটাই হড়কে নদীর দিকে নেমে আসছে| সুতরাং সে রণে ভঙ্গ দিয়ে‚ বেস্ট অফ লাক বলে চলে গেল| এবারে অন্য একটি গাড়ী পেছন থেকে নেমে আমাদের ঠেলে তোলার চেষ্টা করল| সে চেষ্টাও ব্যর্থ হল| তবে এ গাড়ীটির গাইড স্যামির বন্ধু‚ কাজেই সে এত সহজে হাল ছাড়ল না| ডেকেডুকে সামনে থেকে একটা গাড়ীকে রাজি করাল এ যখন ঠেলবে তখন সামনে থেকে দড়ি বেঁধে টানতে| এসব করতে গিয়ে উল্টো বিপত্তি| এতক্ষণ গাড়ী সোজা ছিল‚ এবারে একদিকে হেলে গেল| এসবের মধ্যে আমরা গাড়ী থেকে নেমে নদীর জলে পা ভেজাচ্ছিলাম| আগেই বলেছি‚ আমরা হাতি চলার রাস্তা দিয়ে নদী পার হচ্ছিলাম| এবারে দেখি রাস্তার আসল হকদারদের দু'জন‚ একটি মাদী হাতি ও তার বাচ্চা নদী পার হবার জন্য উঁচু পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে| স্যামি আমাদের দুজনকে টেনে হিঁচড়ে গাড়ীতে তুলে দরজা বন্ধ করে দিল| শুধু গাড়ী দেখলে হাতি হয়তো আক্রমণ নাও করতে পারে‚ কিন্তু মানুষেরা তার পার হবার রাস্তা আটকেছে দেখলে হাতির খেপে যাবার সম্ভাবনা বেশী| সামনে ফোঁসফোঁস করা হাতি‚ আর অচল বন্ধ গাড়ীর মধ্যে অসহায় ভাবে আটক আমরা‚ প্রতি মুহুর্তে ভাবছি এই গাড়ীটাই না আমাদের কফিন হয়ে যায়| শেষ অবধি অবশ্য স্যামির ধারণাই ঠিক হল| গাড়ীর ওপর চড়াও না হয়ে হাতিরা একটু ঘুরে নদী পার হয়ে গেল| এর মধ্যে আলো অনেকটা কমে এসেছে| বিপদের পরিমান কতটা এবারে কিছুটা বোধগম্য হয়েছে| এই হাতি পার হবার রাস্তার ওপর যদি অচল হয়ে রাত কাটাতে হয় তাহলে বোধ হয় হার্ট ফেল করেই মারা যাব| বলতে এখন লজ্জা হচ্ছে‚ কিন্তু কাপুরুষের মত স্যামিকে বলে ফেললাম - গাড়ী থাকুক‚ চল আমরা অন্য কোন গাড়ীকে বলি আমাদের পৌঁছে দিতে| কাল সকালে আবার দেখা যাবে| স্যামি বলল ওর পক্ষে গাড়ী ছেড়ে যাওয়া সম্ভব না| তবে ও আমাদের অন্য গাড়ীতে তুলে দিচ্ছে| আমরা যেন যাবার পথে রেঞ্জারদের একটু তাড়া দিয়ে যাই বুলডোজার পাঠানোর জন্য| তাহলেই হবে| গিন্নি একটু গাঁইগুঁই করছিল স্যামিকে একা ছেড়ে যাবার জন্য| কিন্তু আমি সত্যি বলতে কি‚ প্রস্তাবটা স্যামির দিক থেকে আসায় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম| এসব সময়েই নিজের সাথে মানুষের চেনা জানা হয়| আমার মধ্যে কাপুরুষত্ব কতটা আছে সেটা এর আগে এভাবে বুঝিনি| কয়েকটি গাড়ীকে বলার পর একটি গাড়ী আমাদের তুলে নিতে রাজী হল| যাবার পথে রেঞ্জার অফিসে দেখি তারা ওয়াকি টকিতে খবর পেয়ে বুলডোজার পাঠানোর তোড়জোর করছে| অধিকন্তু ন দোষায়‚ আমরাও তাদের একবার মনে করিয়ে দিলাম একজন মানুষ হাতি চলার পথের ওপর একা বসে আছে| ইচ্ছে করছিল আপনাদের ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দিয়ে এই কিস্তি এখানেই শেষ করি| কিন্তু পাপের ভয় আমারও কিছু আছে| সেদিন বুলডোজার সূর্য্যাস্তের আগেই পৌঁছেছিল‚ ও গাড়ী ঠেলে তুলেছিল| স্যামি তার মোবাইল ক্যামেরায় সে ছবি তুলে রেখেছিল‚ ও আমাকে মেল করেছিল|

995

192

Subarna

এই তো জীবন‚ কালিদা

Bদেশ আমার কাছে আলুনি, Aদেশের তুলনায়। নেচারটুকু, আর সিস্টেমস, আর পরিচ্ছন্নতা বাদ দিলে পুরো মিয়ানো মুড়ি, ধুত্তেরি! সেখানে সবকিছুই কেমন খাপে খাপ! বেনিয়মের জায়গা নেই। ভালো লাগে? আর আমার দেশে? যেদিকে চোখ-কান যাবে, সেদিকেই কিছু না কিছু ছাই-চাপা পরশপাথর। তারপর আছে নাইটির সাথে গামছা, স্কিনটাইট প্লে-বয় টিশার্ট আর কেপ্রির সাথে খোঁপা অথবা টিপ, এবড়োখেবড়ো রাস্তায় স্টিলেটো। আরো কত কত বেনিয়ম! দুচোখ ভরে দেখি আর ধপাস ধপাস প্রেমে পড়ে যাই। তবে পরশপাথরের ব্যাপারই আলাদা! পেটে কেমন বুড়বুড়ি করছে। বলেই ফেলি। ** পরশপাথর ১ ** দুই বুড়ো। বয়স আনুমানিক সত্তরের উপরে। এক সুপারহিট সমুদ্রতীরের সৈকতসরণী ধরে খানিক এগোলেই দেখা পাবেন। অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় দুজনে ব্যস্ত হয়ে গুছাচ্ছেন। অপটু হাত। জিনিসপত্র সাজিয়ে গুছিয়ে হাজার এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে অসম যুদ্ধে নেমে পড়বেন একটু পরেই। একজন একটু দুর্বল বয়সের ভারে। আর একজন সতেজ। কিন্তু একটা ব্যাপার দুজনের এক। চোখে মুখে উৎসাহের হাসি। বাচ্চার নতুন খেলনা পেলে যেমন করে, পসরা নিয়ে তাঁরাও ঠিক তেমনই। নজর অন্য কোনদিকে নেই। একাগ্রচিত্ত। এনারা হকার। ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। জানি না, হয়ত সংসারে নিজেদের দায় এখনো নিজেরাই বইতে চান, হয়ত সাহায্য করতে চান, বা হয়ত নিছক বিনোদনের জন্য এনারা গর্বের সাথে হকারি করেন। ** পরশপাথর ২ ** সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউ দেখছি। অনুভব করছি, সব মানুষের উচিৎ মাঝেমাঝেই এরকম জায়গায় এসে চুপচাপ বসে থাকা। এই অসীম ব্যাপ্তির সাথে থাকতে থাকতে মনের ফ্ল্যাট কখন টুবেড থেকে থ্রিবেড হয়ে ফোরবেড হয়ে যাবে, টেরও পাওয়া যাবে না। বাসযোগ্য হয়ে যাবে ধরাধাম। পাশে এসে বসল এক বৃদ্ধা। সবুজ ডুরে সস্তা শাড়ি। পেতে আঁচড়ানো তেল দেওয়া চুল। আধখাওয়া সামনের দাঁত। হাতে পুঁতির সস্তা গয়নার অল্প আয়োজন। "নেবে মা?" কথা বলার মুডে ছিলাম না। মাথা নেড়ে না বললাম। মহিলা গেলেন না। হাতের ছোট ট্রে সামনে নামিয়ে রাখলেন। ওসবে উৎসাহ বিশেষ নেই, তবু কি মনে হল, নেড়েচেড়ে দেখে তিন-চারটে জিনিষ পছন্দ করলাম। মহিলা প্যাকেটে ভরে, দাম বললেন। এরপরেও বাঙ্গালী কথা বলবে না, হয়? একদম দরদাম করতে পারি না। বেশ লজ্জা লজ্জাই লাগে। তাই, একটু হেসে দশটাকা কম বললাম। যদিও পুরো টাকাটাই ব্যাগ থেকে বার করেছি। এরপরেই অপ্রত্যাশিতভাবে ঝটকাটা এলো। মহিলা আমার দুই গাল টিপে আধখাওয়া দাঁত বের করে হেসে বললেন, "ক'টাকা আর লাভ রে মা?" এই বুড়ো বয়সে তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর কমে ঝট করে কোন এক ভালোলাগার কৃষ্ণগহ্বরে চলে গেলাম নিমেষে, যেখানে গাল টিপে কেউ হয়ত আদর করত কখনো। চলে গেলেন পয়সা নিয়ে, আমাকে আজন্ম ঋণী রেখে। পিছনে। ** পরশপাথর ৩ ** বাসে যাচ্ছি। পিছনে বসে এক দম্পতি, কোলে বাচ্চা। সে বাচ্চা বকে বকে মাথা খেয়ে ফেলার জোগাড়। তখনই এক ঝলক ঝোড়ো হাওয়া। বাস লেকটাউনে। মহিলাঃ দ্যাখো! কি সুন্দর বানিয়েছে, না? পুরুষঃ হ্যাঁ, লন্ডনে আছে এরকম। আইফেল টাওয়ার। দম্পতির অলক্ষ্যে কপাল চাপড়ালাম। ইশ! এতো কম জানে! ওটা আইফেল টাওয়ার?!!! পরক্ষণেই ভাবলাম, আমি তো কত্ত জানি! কি লাভ হল? সেই তো একই বাসে চড়ে, সিট পাব কি পাব না-র লটারিতে যোগ দিচ্ছি। আইফেল টাওয়ার যে জার্মানিতে, আর লেকটাউনের মোড়ে ওটা যে লন্ডনের LTP, তা জেনে আমি কি তীর মারলাম জীবনে? (যারা LTP বুঝল না, তাদের জন্য - ওটা লিনিং টাওয়ার অফ পিসা রে বাবা!!) :P

98

9

Aloka

মাঝে মাঝে

ক্যালিডোস্কোপ ব্যাপারটা আর কিছুই না | হঠাৎ আবিষ্কার হওয়া একটা অ্যালুমিনিয়ামের ছোট সুটকেস| কে জি স্কুলে পড়ার সময় মেয়ের ছিল| পরে তাতে আমার পাওয়া সব চিঠিপত্র জমানো আছে | ভুলেই গিয়েছিলাম ওতেই তো বন্দী হয়ে আছে আমার ‚ কৈশোর‚ স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটি বেলা এমন কি তারও পরের কিছু দিন.| বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাওয়া চিঠি প্রাণ ধরে কোনদিন ফেলতে পারিনি সব জমিয়ে রেখেছিলাম . গুছিয়ে সময় নিয়ে দেখতে হবে | আজই সেই দিন| খুললাম বাক্স টা ....একটা সোঁদা গন্ধ যেন ঝাপটা মারল প্র্রচুর চিঠি | কি করে গোছাই এগুলো....চিঠির উপকরণ হিসেবে যথা পোস্টকার্ড‚ পিক্চার পোস্ট্কার্ড ‚ নীল রঙা ইনল্যাণ্ড লেটার ‚ এয়ার লেটার ‚এনভেলাপ না কি চিঠি গুলোর লেখক হিসেবে‚ ঠিকানায় হাতের লেখা দেখে বোঝা যাবে ..|ভেবে পাই না....কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে উপায় বেরোল....চোখ বুজে তুলে নিলাম একটা...উঠে এল একটা পিকচার পোস্ট্কার্ড | অস্প্স্ট লেখা ‚ তারিখ ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ১৯৬২/৬৩ মনে হয় | প্রেরক ছোটমামা| স্পেন থেকে লেখা| পঞ্চাশের দ্শকের একেবারে শেষ দিকে দেশ ছেড়ে জার্মানি চলে যান |প্রত্যেক বছর নানা জায়্গায় ঘুরতে যেতেন আর আমার এই রকম একটি করে পিকচার পোস্ট্কার্ড প্রাপ্তি হত| হাতে নিয়ে বসে থাকি....মনে করার চেস্টা করি ছোটমামাকে| চেহারা টুকুই যা মনে পড়ছে পারিবারিক গল্পের সূত্রে শোনা হাসিখুশি ফুর্তিবাজ ‚ কালীপুজোর সময়ে অমাদের বাড়ী এসে দাদাদের নিয়ে তুবড়ি তৈরী করা কিম্বা সরস্বতী পুজোর ডেকোরেশনে মেতে ওঠা মানুষটিকে মনে করতে পারলাম না| |আবার একই পদ্ধতি অ্যাপ্লাই করলাম| এবার হতে উঠে এল একটা পোস্ট্কার্ড প্রেরক রাঙাকাকা প্রত্যেকবার বিজয়ার আশীর্বাদ জানিয়ে লেখা |এটা অব্শ্য আমার বিয়ের পর থেকে শুরু হয়েছিল| বেহালায় থাকতেন কিন্তু টাকির অদূরে ইছামতীর তীরে আমাদের দেশ সোদ্পুরের প্রতি অসম্ভব টান ছিল‚ এটা আমার বাবারও ছিল|বাবা অতটা না পারলেও এই কাকা প্রায়ই দেশে যেতেন |আর ওখানকার পুজোটা আমাদের পারিবারিক পুজো না হলেও এই কাকাই ছিলেন সেই পুজোর সর্বেসর্বা| মনে পড়ে গেল একবার পুজোর সময় গিয়েছিলাম |খুব মজা হয়েছিল| বিশেষ করে ভাসানের দিন |দুটো নৌকো জোড়া দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে ঠাকুর বসানো হল| দাদাদের সন্গে আমরা কয়েক্জন কুচোকাঁচাও ঠাঁই পেয়েছিলাম সেই নৌকোয়| মাঝ নদীতে গিয়ে দুটো নৌকো দুপাশে সরে গেল ঠাকুর পড়ে গেল জলে | সেদিনই হত আড়্ং এর মেলা | সেদিনের জন্য কোন বিধি নিষেধ থাকত না ...|শুনেছি ও পারের যশোর জেলা থেকেও লোকজন আসত|‚‚‚‚‚একটা চিঠি জাগিয়ে তুলল কত স্মৃতি...| এবার তুলে নিই একটা ইনল্যাণ্ড লেটার | ঠিকানায় হাতের লেখাটা চিনতে পারছি না.....কে .কে...কার হতে পারে এই চিঠি..নাঃ মনে পড়ছে না..|আর দেরী না করে খুলেই ফেলি..খুলেই স্তব্ধ হয়ে যাই.....স্কুল বেলার প্রিয় বন্ধু যশোধারা.. এক লহমায় ফিরে যাই স্কুল জীবনে . ... সেই যশোধারা.|ফর্সা ‚ মোটাসোটা ‚ ভালো মানুষ টাইপের. .স্কুল ছাড়ার পর আর দেখা হয় নি.. খুবই অল্প বয়সে ওর মৃত্যু র খবরটা অবশ্য পেয়েছিলাম.. কি করে ভুলে গেলাম ওকে...অথচ শেষ দিন বিদায় নেবার সময় কারুর চোখই শুকনো ছিল না..কে জানত সেটাই শেষ দেখা ছিল.| সামনেই রয়েছে একটা এয়ার লেটার| না এটা চিনতে কোনই অসুবিধে নেই| ষাটের দশকে সুইডেন প্রবাসী আমার দিদির চিঠি| না খুলে ও বলতে পারি ওতে ও দেশের জীবনযাত্রার বিবরণের সন্গে সন্গে আমার পড়াশুনো কেমন হচ্ছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর নির্দেশ আছে| ঠিক তলায় শুয়ে ছিল একটা আয়তাকার খাম চর্তুর্দিকে ছোট ছোট লাল রংয়ের চৌখুপি চৌখুপি দিয়ে করা বর্ডার | ১৯৯০ এ বিদেশে চলে যাওয়া বন্ধু ও সহকর্মী ইন্দিরার চিঠি | তখনো চিঠি ই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম | দেশ ছেড়ে‚ আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব ছেড়ে সবে বিদেশে পা রাখা ‚বন্ধুটির মন কেমনের খবর নিয়ে আসা চিঠি হাতেনিয়ে বসে থাকি ' মনে আছে তোর..' বলে কত ছোট ছোট ঘটনা‚ মজার কথা| |মনে করিয়ে দিল...|' এখনকার এই থোড়-বড়ি-খাড়া‚খাড়া-'বড়ি--থোড় জীবনে সেই ফেলে আসা রঙীন মূহুর্ত গুলো একটা ক্যালিডোস্কোপিক ভিউ তৈরী করল ....কি যে দামী| সেই মূহুর্ত গুলো.. কিন্তু যেটা খুজ্ঁছিলাম সেটা কই ....|বেশ মনে আছে বাবার লেখা একগোছা পোস্ট্কার্ড গার্ডার দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম...হাঁটকাতে থাকি..যখনই কোন কাজে দূরে কোথাও গিয়েছেন. একটা না একটা পোস্ট্কার্ডের চিঠি পেয়েইছি.. বছরে একবার একটা সর্ব ভারতীয় কনফারেন্সে ‚‚বেশীর ভাগ সময়ে দিল্লীতে হত‚ যেতেনই | আর ফিরতেন শোহন হালুয়া আর কোন একটা নামকরা দোকানের ডালমুট নিয়ে| শুধু তো আমরা নয়‚ পাড়া প্রতিবেশীরাও ভাগ পেতো তার | আর বাড়ী বাড়ী সেগুলো দিয়ে আসার কাজটা করতে হ্ত আমাকে| এই যে .. পেয়েছি| খুদি খুদি অক্ষরে লেখা ...ঝাপসা হয়ে এসেছে একগোছা চিঠি| সময়ের সন্গে সন্গে পাল্টেছে চিঠির বিষয় কালানুক্রমে সাজালে হয়্ত পাওয়া যাবে আমার কিশোরী থেকে দায়িত্ব সম্পন্ন গৃহিণী হয়ে ওঠার এক টুকরো ছবি | বাবা গত হয়েছেন বহুদিন ‚এই চিঠিগুলোর মধ্যে দিয়ে যেন বাবার স্নেহের স্পর্শ পেলাম| আরও আনেক চিঠি রয়েছে .না থাক আজ .. চোখ দুটো কেমন জ্বালা জ্বালা করছে.

742

64

দীপঙ্কর বসু

রবীন্দ্রনাথের গান - কিছু ভাবনা

রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কিত আমার বর্তমান অলোচনার সূত্র ধরে উঠে এসেছে রবীন্দ্রোত্তর যুগের এক শক্তিমান গীতরচয়িতাসুরকার সলিল চৌধুরী রচিত এবং সুরারোপিত “মরি হায় গো হায়” গানের সুরের প্রসঙ্গ| সলিল চৌধুরীর এই গানএর সুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী গানের সুরের কিছুটা সাজুয্য খুঁজে পান কেউ কেউ ‚বিশেষত সলিইল চৌধুরীর তিন স্তবকে রচিত গানটির অন্তরা দুটির শেষ লাইন গুলিতে বরে বারেই রবীন্দ্রনাথের তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী গানের বহিয়া যায় বা চৌদিকে মোর প্রভৃতি অংশের সুরের সুস্প্ষ্ট আবির্ভাব ঘটতে দেখা যায়|সলিল চৌধুরীর আলোচ্য গানটির মৌমাছিরা পরাগ দলে দলে বা ছিন্ন পালে ভাঙা হালে অংশগুলির সুরে| কান পেতে শুনলে গানের আরো কিছু কিছু সুরের মিল পাওয়া যেতে পরে|নিশ্চিত ভাবে বলতে পারিনা তবু মনে হয় সলিল চৌধুরী অলোচ্য গানের সুরের প্রেরনা হয়ত পেয়েছিলেন পূর্বসুরির গানের সুর থেকে|যদিও‚ যে অসামান্য নৈপুণ্যে মরি হয় গো হায় গানটিকে সুরের জলে বেঁধেছেন এবং রবীন্দ্রনাথের সুরের আদলের সঙ্গে কিছুকিছু মিল সত্বেও নিজের গানের সুরে নিজস্বতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা সলিল চৌধুরীর সুরসৃজন ক্ষমতারই সাক্ষ্য বহন করে| গানদুটির সুরের বিশ্লেষন করার আগে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে‚ তুমি কেমন করে গান কর হে এবং মরি হায় গো হায় দুটি গানই মিশ্র খাম্বাজের সুরে নিবদ্ধ|কাজেই খাম্বাজ রাগের স্বর কাঠামোর( যাকে উল্লিখিত বন্ধু combination of notes বলে উল্লেখ করেছেন) আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা| আবার‚ যে কোন রাগেরই স্বরকাঠামোর মধ্যেই থাকে অসংখ্য স্বরগুচ্ছ বা combination of notes সম্ভাবনা|আর সেই সব স্বরগুচ্ছের কুশলী প্রয়োগের ফলেই একই রাগে নিবদ্ধ বিভিন্ন গানের সুর এ আসে বৈচিত্র| আলোচ্য গানদুটির সুরবৈচিত্রের মূলেও আছে এই প্রথমিক সংগীতত্বটিই| তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী আমি অবাক হয়ে শুনি ‚কেবল শুনি এগানে যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে সেই অনাহত সঙ্গীতের প্রতি গীতিকার রবীন্দ্রনাথের ভক্তি মিশ্রিত বিমুগ্ধতা মিশ্র খাম্বাজের সরলরৈখিক সুরে ধরা দিয়েছে|পক্ষান্তরে সলিল চৌধুরীর গানটিতে প্রেমাস্পদকে কাছে পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে তাকে নিজের সমস্ত ঐশ্বর্যের ডালি সাজিয়ে বরণ করে নিতে না পারার আর্তি | স্বভাবতই সে আর্তির সুরের মেজাজ আলাদা| মরি হয় গো হয় এলে যখন আমার ভাঙাঘরে শুন্য আঙিনায়. যেমন গানের প্রথম লাইনেই হায় শব্দটির দুই অক্ষরের মাঝে দীর্ঘ চোদ্দো মাত্রারব্যপী সুরের প্রবাহে গানের কোন কথা নেই |ফলে গনের সুরে অনেকটই স্পেস তৈরি হয়েছে যে স্পেসে মা ধা - ণা | সরসা ধা ণা পা |ধা - - -| স্বর গুলি যেন ভারহীন শরতের মেঘের মত সুরের আকাশে ভেসে চলেছে| সুরের এই পরিকল্পনার ছাপ গানটির অন্যত্রও পাওয়া যায় ‚যেমন অন্ত্রার ধরতাইটাকে লক্ষ্য করা যক| "যখন আমার ঝরা মালায়" অংশের সুরে ঝরা মালা শব্দ দুটিকে গাঁথা হয়েছে পা সা সা গা পা স্বরগুচ্ছে| শুধু গা ও পা স্বরদুটির মাঝে মধ্যম স্বরটির অনুপস্থিতি যেন ভিন্নতর কোন রাগের ছায়পাত মুহুর্তের জন্য ঘটিয়ে আবার মিলিয়ে যায় | এও এক অপূর্ব সৃষ্টিলীলা | এই রকম সুরের বৈচিত্রের সমাবেশে সুরটি নিজস্ব স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে | একই সুরের কাঠামোয় নতুন ধরনের চলন আমদানি করে সুরের প্রকৃতিতে নতুনত্বের সংযোজন করার কৌশলটি রাবীন্দ্রনাথের নিজের গানেও বহু বার ব্যবহার করেছেন |উদাহরন স্বরূপ তিনটি গানের উল্লেখ মাত্র করে এ পর্বে যবনিকাটানি| বিস্তারিত আলোচনা আবার কখনও হবে|যে তিনটি গানের কথা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে সেগুলি হল আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় ‚ গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ এবং বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা |

178

6

শিবাংশু

বঙ্গ আমার

দুচার দিন আগের কথা। দুপুরবেলা, নিউ দিল্লি ইশটেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম। অরবিন্দ মার্গে জ্যামের ঠিক নেই তাই ছত্তরপুর থেকে সময়ে পৌঁছোবার তাড়ায় বেশ খানিকটা আগেই চলে আসা। তাপমাত্রা দেখাচ্ছে চুয়াল্লিশ। কিন্তু হাওয়া বইছে টাটার পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেস ছোঁয়া। বাতানুকূল অপেক্ষাশালার দোরগোড়ায় এক ভদ্রলোক বিপন্নমুখে খাতা নিয়ে বসে আছেন। পি এন আর নম্বর দিতে গেলে তিনি ম্লান হেসে বলেন, দরকার নেই। -কেন? -ভিতরে ঢুকতেই পারবেন না... উঁকি মেরে দেখি ভিতরে ১৯৪৭শের সেপ্টেম্বর মাসে শিয়ালদহ প্ল্যাটফর্ম। এতোজন মানুষ, তাদের লটবহর, ঘামক্লান্তিদীর্ঘশ্বাস কী করে ধরে রেখেছে ঐ ঘরটা? বিস্ময়। শ্বাসরোধী ভিড় আর অবর্ণনীয় আর্দ্র তাপে ফুটছে চারদেওয়াল। ঢুকিনা। প্ল্যাটফর্মেও কোথাও বসা দূরস্থান, দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। মেঝেতে কাগজ পেতে সপরিবার যাত্রীরা কুকুরকুণ্ডলী হয়ে পুড়ে যাচ্ছেন রোহিলাখণ্ডের তপ্ত বাতাসে। এদিকওদিক চোখ চালিয়ে দেখি একটি দেওয়াল সংলগ্ন সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটি পরিবার বসে আছেন। স্বামীস্ত্রী আর দুটি শিশু। মাঝখানে আরেকটি বসার জায়গা আছে। সেখানে কয়েকটি খালি জলের বোতল ফেলে রাখা আছে। ব্রাহ্মণী বলেন তিনি বোতলগুলি সরিয়ে সেখানেই একটু বসছেন। আমি গিয়ে কতো নম্বরে আমাদের গাড়ি আসবে ইত্যাদি, যেন দেখে আসি। আমি প্যাঁটরাগুলি সেখানে রেখে খোঁজ করতে বেরো'ই। মিনিট পনেরো পরে গাড়ির খোঁজখবর নিয়ে অকুস্থলে এসে দেখি সেই পরিবারের কর্তাটি আমার ব্রাহ্মণীর উপর প্রচণ্ড চেঁচামিচি করছেন এবং ঐ খালি জলের বোতল গুলো সরিয়ে বসতে চাওয়ায় তাঁকে প্রায় মারতে যান আর কী? তাঁর বক্তব্য হচ্ছে ঐ বোতলগুলো নিয়ে তাঁর 'বাচ্চারা খেলছে'। তাই তিনি জায়গা থাকা সত্ত্বেও কাউকে বসতে দেবেননা। জাতবিহারি হিসেবে এসব ছিঁচকে দাদাগিরি'র ওষুধ আমি জানি। কিন্তু সেই ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছিলেন বাংলাতে। হ্যাঁ, মোদের গরব, মোদের আশা। চারদিকে বাংলা শুনতে পাবো বলেই তো সারা দেশ ছেড়ে এই মূহুর্তে আমার বঙ্গদেশে থাকতে আসা। তখন কিন্তু সেই ভাষাই আমাকে রীতিমতো বিমর্ষ করে ফেললো। তবে বিশেষ অবাক হলুম না। সত্যি কথা বলতে কি, সারাদেশে অবিরত ঘুরে বেড়াবার অভিজ্ঞতা আমায় শিখিয়েছে ভালো করে বিচার না করে তথাকথিত 'বাঙালি'দের সঙ্গে তৎকাল বাংলায় কথা বলাটা অনেক সময়েই বিড়ম্বনা ডেকে আনে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আমার ব্রাহ্মণী তাঁকে বাংলাতেই বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন এবং তিনি ততোধিক উত্তপ্তভাবে তাঁকে প্রায় শারীরিকভাবে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন আমাকেও আসরে নামতে হলো। বাংলাতেই। তাঁর বক্তব্য হলো তিনি গত চারঘন্টা ধরে ঐ বেঞ্চিটিতে বসে আছেন। তাই তিনি আর কাউকে কিছুতেই বসতে দেবেননা। এই বলে নিজে অকারণ সম্প্রসারিত হয়ে যথাসম্ভব জায়গা অধিকারের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এসব ক্ষেত্রে আমরা মুখের থেকে হাতের ব্যবহারে অধিক বিশ্বাসী। নির্বাচিত ভোজপুরি খিস্তিসহ চতুর্দশ পুরুষের ঘুমভাঙানো যেসব ক্রিয়াকলাপে আমরা অভ্যস্ত, সেই মুষ্টিযোগ তো কদাপি কোনও 'বাঙালি'র প্রতি প্রয়োগ করিনি। জানিওনা কীভাবে করবো? ব্রাহ্মণী আমার সেই রূপ দেখেছেন অনেক। চোখের ইশারায় অনুরোধ করলেন রিয়্যাক্ট না করতে। সামলে নিলুম। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাঁদের সামনে লোকটিকে সমুচিত শিক্ষা দেবার ইচ্ছে বলপূর্বক সম্বরন করতে হলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের বইটিতেই মনোনিবেশ করলুম। আধঘন্টাটাক পরে তাঁদের গাড়ির সময় হলো। আমাদের প্রতি অগ্নিদৃষ্টি হানতে হানতে বিদায় হলেন তাঁরা। ঐ চত্বরে যতো বসার জায়গা ছিলো, সবগুলিতেই অগণিত মানুষ আসছেন, বসছেন, উঠে যাচ্ছেন। কোনও রকম গা'জোয়ারি, জবরদস্তির দৃশ্য নেই। সারাদেশের লোক রয়েছেন সেখানে। পঞ্জাবি, বিহারি, রাজস্থানি। তথাকথিত গোবলয়ের 'অসংস্কৃত', 'অমার্জিত' লোকজন সব। কিন্তু ন্যূনতম ভদ্রতার ব্যাঘাত নেই কোথাও। 'বাঙালি'য়ানার এই রূপটি প্রবাসী হিসেবে আমাদের খুব অচেনা নয়। এরকম একটি অবাঞ্ছিত, অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা আমার ব্রাহ্মণীকে বেশ অপ্রতিভ করেছিলো। আমাকে বললেন, -তুমি ঠিকই বলো! এই ভুল আর করবো না। -মানে? -বাঙালি দেখলেই আগ বাড়িয়ে বাংলা বলা....

116

5

মানব

প্যারোডি

ব্যাজার মুখ করে কত কাজ করিয়াছি, দুঃখের সাথে মাথার উপর থেকে ঘাম শুধু ঝরে পড়ে পায়ের উপরে পাত্তা দিইনা আমি, নিজেরেই কষিয়াছি সজোর সপাটে স্বামী থেকে আসামী, সই ও তো করিয়াছি ডিভোর্স পেপারে হয়ে গেছি নির্বোধ এক, ওনারা যে মজাই লোটেন বুঝতে পারিনি তাই ছুটে রোজ যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন সেখানেই গেলে ভাবি খুঁজে পাব পথের দিশা যাহা বলে শিরোধার্য, যেমতি বাপের চাকর পুরনো মনিবের হোক কেন যতই দুর্দশা পালাতে না পারে তবু বাবুদের করে দিয়ে পর তেমনি দেখি সেথা বারে বারে, বর্বরতা, ভাবি "বাবুরা তো এম'নি চলেন" পরদিন সব ভুলে তাই চলে সেই যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন। দিনশেষে সন্ধ্যা আসে ঘটেনাকো অঘটন কেন যে; ওনাদের মনোভাবে পড়েনাকো খিল রাত হয় বেড়ে চলে ঘ্যাঁটঘ্যেঁটে শরীরের ওজন খোলা চোখ হয়ে পড়ে বড়ই কাহিল সবাই ঘুমাতে যায়, আমাকেও যেতে হবে ছেড়ে, এই খাতা পেন শুধু পড়ে রবে, একা এই ভবে, বিধাতার হাঁদারাম লেন।

409

10

মনোজ ভট্টাচার্য

চিনা গল্পেরা !

এক পেয়ালায় হাজার দিন ! তুং সান শহরে তি শী নামে এক শুঁড়ি ( মদ্য প্রস্তুত কারক ) নানা ধরনের মদ তৈরী করতে পারত ! তার মধ্যে থাকত নানারকম আয়ুর্বেদ মিশ্রিত এক ধরনের মদ - যেটা কিনা এক পেয়ালা খেলে এক হাজার দিন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে ! ওই অঞ্চলেই আরেকপ্রান্তে শুয়ান শী নামে এক পাঁড় মদ্যপ থাকত l সে তিএর তৈরী সেই বিশেষ মদ পান করার জন্যে দোকানে গেল l এক পেয়ালা চাইল পান করতে l ' - এই মদ তো এখনো জ্বাল দেওয়া হয় নি ! ' - দোকানদার তি বলল : ' এই অবস্থায় একটুও তোমায় দেওয়া উচিত হবে না !' ' – আরে - যা হয়েছে তারই অন্তত এক পেয়ালা দাও' - লিউ কাতর ভাবে অনুরোধ করলো l লিউএর ঐরকম বায়নায় - তি নিরুপায় হয়ে এক পেয়ালা সেই বিশেষ মদ দিল l ' - আহ ! দারুন হয়েছে ! আর একটু দাও !' ' - এখন দয়া করে কেটে পড়ো - বাড়ি যাও - আবার কোনো একদিন এস ' - তি খুব ধমক দিয়ে তাকে বারণ করলো l ' - যে এক পেয়ালা তুমি খেয়েছ - তারই জেরে এক হাজার দিন তুমি বুঁদ হয়ে থাকবে ' ! ধমক খেয়ে লিউ দোকান ছেড়ে চলে গেল l ও'র মুখের রং ইতিমধ্যেই বেশ ফ্যাকাশে মেরে গেছে l বেসামাল পায়ে টলতে টলতে - বাড়িতে গিয়েই লিউ প্রচন্ড মাদকতায় - মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়ল l ঘুম তো ঘুম ! - কদিন পরেও যখন ওর ঘুম ভাঙল না - পরিবারের লোকেরা ওকে মদ খেয়ে মরে গেছে ভেবে খুব কান্নাকাটি করলো ও যথা নিয়মে সমাধিস্ত করলো l আড়াই বছর পরে, দোকানদার তি'র মনে পড়ল লিউর কথা : - ' এবার তো লিউর জেগে ওঠার সময় হলো ! যাই, একবার ওর বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসি ! ' খোজ করে করে লিউএর বাড়ি এসে পৌছালো তি l -' লিউ কি বাড়ি আছে ?' লিউর বাড়ির লোকেরা খুব অবাক হয়ে গেল তি এর কথা শুনে l ‘ - লিউ তো অনেক দিন হলো মারা গেছে ! ওর অন্তেস্টিও হয়ে গেছে '! শুনে তি'র তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া ; ও বলে উঠলো -' আরে না না ! ও মরবে কি ! আমি যে মদ ওকে করে খাইয়েছি, সেটা খুবই কড়া - সেই এক পেয়ালার মৌতাতে ওর এক হাজার দিন ধরে ঘুমোবার কথা ! ও হয়ত আজ-কালই ঘুম ভেঙ্গে উঠবে !' তি তখন জোর করে লিউর পরিবারের সবাইকে নিয়ে কবরখানায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে কফিন ভাঙ্গতে বলল I ওই কবর থেকে সুমিষ্ট গন্ধ আসতে লাগলো l কফিন খুলতে দেখা গেল লিউ চোখ পিট পিট করে চেয়ে রয়েছে ও - ওকে যে সবাই ডাকছে তা শুনতে পারছে ! ' - নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকতে যে কি ভালো লাগে !’ লিউ বলে উঠলো ; আর তি কে জিজ্ঞেস করলো -' তুমি কি মিশিয়ে এই মদ তৈরী করেছ বাবা , যে খেয়ে একেবারে বুঁদ হয়ে গেছি ! - খুব কি বেলা হয়ে গেছে !' একথা শুনে সবাই খুব জোরে হেসে ফেলল l লিউর মুখ থেকে মদের ভীষণ মিষ্টি গন্ধ আসতে লাগলো - যা নাকি আড়াই বছর ধরে লিউকে বুঁদ করে রেখেছে ! মনোজ

322

50

শিবাংশু

এক জন খগেন ও তার বাবার নাম...

পঁচিশে বৈশাখ সকালে খগেন ভাবলো অফিসে যাবেনা। কারণ ঐ দিন 'পঁচিশে বৈশাখ'। সরকারি পাব্লিক হলে একটা ছুটি পাওয়া যেতো, নিখরচায় I তার কপালে নাই। তার এও মনে হলো কোনও জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনে শনিপুজোর ভক্তদের মতো হাত জোড় করে বসে না থেকে কিছু অন্য কাজ করলে হয়তো বাবার আত্মা বেশি খুশি হবে। হ্যাঁ, খগেন অনেক বাঙালির মতো রবিবাবুর স্বঘোষিত সন্তান। তার এই স্বোপার্জিত পিতা সম্পর্কে আজকাল লোকজন কী ভাবছে সেটা নিয়ে একটা ওপিনিয়ন পোল করা যেতে পারে। সহজ কাজ অথচ বেশ স্টিমুলেটিং। গলির মোড়ের গাছতলাটা বেশ ছায়া... কিছুক্ষণ দাঁড়ানো যায় সেখানে। লোকজনেরও আসাযাওয়া আছে। -এইযে নমস্কার, আপনার নামটা একটু বলবেন... -ক্যানো... -এই একটা কথা জানার ছিলো... -আমার নামে কোনও কথা নেই, অমলেন্দু রঞ্জন হালদার...বলুন, - আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? -কে কোবি রবীন্দ্রনাথ? কিস্যু ভাবিনা। ভাবার কী আছে? কতো লোক ভাবছে... আর ভাবতে পারিনা... ওসব পদ্য টদ্য পড়ে হবেটা কী? তবে জানেন বিয়ের পরে একদিন বৌকে ইম্প্রেস করতে একটা কোবিতা বলতে গেসলুম, বাংলা অনার্স কি না.. তা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে... বুঝলুম ও লাইনে হবেনা। তার পর কোবিতা-টোবিতা মায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। - ইয়ে...ঠিক আছে, ধন্যবাদ... -আপনার নামটা একটু যদি বলেন... - রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের নাম জিগ্যেস করাটা বেশ ভালো কাজ, তবে একটু ডেঞ্জারাস ... - না, না আমি একটা প্রশ্ন করতুম শুধু... - কোথায় থাকি? বলবো না... আর কিছু.... - না না তা নয়, আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? - বাহ, আপনার টেকনিকটা বেশ ভালো... - না না আমি সত্যি শুধু এইটুকুই জানতে চাই... - সুদক্ষিণা মজুমদার, - দারুণ... - ঠিক ধরেছি , মতলবটা খারাপ... -আরে না না খারাপ নয়, মতলব মানে শুধু রবীন্দ্রনাথ... -বেশ, তবে বলি... -আজ্ঞে হ্যাঁ - দেখুন রোবীন্দ্রনাথ হলেন গিয়ে রোবীন্দ্রনাথ, মানে রোবীন্দ্রনাথই সেই রোবীন্দ্রনাথ, অর্থাৎ কি না যে রোবীন্দ্রনাথ আমাদের সব কিছু। মানে আমার নামটা দেখছেন এবং আর অন্য যা কিছু, সব কিছুই ঐ রোবীন্দ্রনাথ। বুজলেন... - হ্যাঁ জলের মতো, অনেক ধন্যবাদ... ছেলেটির চেহারা বেশ উজ্জ্বল। এরা কি রবীন্দ্রনাথ পড়ে? দেখা যাক, -এই যে ভাইটি, আপনার নামটা একটু বলবেন? -কোন নাম? আমার বহু নাম আছে... পদ্য লেখার নাম? গদ্য লেখার নাম? ফেসবুকের নাম? প্রেমিকার দেওয়া নাম? মাস্টারের দেওয়া নাম? আমারি নাম বলবো, আমি বলবো নানা ছলে....(সুরে) - আপনার বাবার দেওয়া কোনও নাম আছে কী? - আছে, তাও আছে, তবে সেটা তেমন ভালো নয়, চিন্ময় কর... - আপনি নিশ্চয় কবিতা লেখেন - অবশ্যই, দুহাতে লিখি, কেন? - এই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আপনি কী ভাবেন, এই একটু কৌতূহল আর কি? - (চোখ বুজে) ভরণী নক্ষত্র থেকে ঝরেছে দু এক বিন্দু জল, বিশাখায়, সে কোন তিয়াসায়, দিবাকর রশ্মি যেন, মার্গদর্শী রাজপথে লুপ্ত হলো বিভোর বিভাবরী.... - সাংঘাতিক... - সাংঘাতিক !!! মানে? - মানে ফাটিয়ে দিলেন আর কি... - তাই বলুন... কী যেন জানতে চাইছিলেন? - ঐ রবীন্দ্রনাথ... - ওনার সম্বন্ধে আমি বাংলায় তেমন কিছু বলতে পারিনা, ইংরিজি চলবে... - আমি আবার তেমন বুঝিনা ওটা.... - ধ্যুস মশায় , ওয়েস্টিং মাই টাইম... - নিশ্চয়, নিশ্চয়.... অনেক ধন্যবাদ... এই মেয়েটিকে খুব স্মার্ট লাগছে, কলেজ থেকে ফিরছে বোধ হয়... - নমস্কার, কলেজ ফেরত নাকি? - আপনি কে মশায়, বেশ অসভ্য তো... - আজ্ঞে না না আমি একটু রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা বোঝার চেষ্টা করছি... - ও, তাই বলুন। আমি কলেজ থেকে ফিরছি না , ছেলেকে স্কুল পৌঁছিয়ে আসছি, - সে কী আপনার এতো বড়ো ছেলে ? - হ্যাঁ যথেষ্ট ধেড়ে ছেলে আমার... - বাহ বাহ, এদিকেই থাকেন না কি? - দেখুন, এই তাপসী চ্যাটার্জির রাগ তারাতলা থেকে আমতলা সব লোক জানে... সমঝে চলে... - ওহ সরি, রাগবেন না প্লিজ, আমি ঐ রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দু চারটে কথা, মানে আপনার কথা জানতে চাইছিলাম... - দেখুন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে আমি একটু ভাবালু হয়ে পড়ি। চোখে-টোখে জল এসে যায়, একটু নিশ্বাসের কষ্টও হয়... - তবে থাক থাক... - তবে ওনার লেখা গল্প থেকে যতো সিন্মা হয়েছে সেগুলো আমি চান্স পেলেই দেখি। তবে ভাববেন না আমি কবিতা বুঝিনা, একবার কাম্পুচিয়াতে মানুষের হাড়ের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে "ভগবান তুমি যুগে যুগে" পড়েছিলাম... - বাহ বাহ শুনলেই কম্পো হয়.. তা আপনি ওদিকেও যান নাকি... -আরে মশাই আমি তো ওদিকেই থাকি... - আচ্ছা আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ... এছেলেটি মনে হয় কিছু ভাবছে, একটা ভাবুক ব্যাপার আছে চেহারায়... - নমস্কার, আমি খগেন ... আপনার নামটা জানতে পারি - পারেন। শত্রুদমন চক্রবর্তী। - এমন নাম বিশেষ শুনিনি... - কী জানেন আপনি পৃথিবীর? বহু কিছু জানা বাকি আছে... - ইয়ে তাতো বটেই।।এদিকেই থাকেন নাকি? - আমি স্থলপথে থাকি চুয়ান্ন নম্বরে, তবে বেশির ভাগই জলপথে থাকতে হয়... (উদাসিন) - ও বুঝেছি, নেভিতে আছেন নাকি? - না আমি সরকারি বৈজ্ঞানিক... - আচ্ছা আচ্ছা ... আসলে আমি একটু কৌতূহলী আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন, এই নিয়ে? আসলে আপনাকে একটু অন্যমনস্ক দেখছি .... বাড়িতে সবাই ভালো তো? - না ঠিক অন্যমনস্ক নই, মন্দাক্রান্তা এখন একটা পদ্য লিখছে ঘরে বসে আমি তার শব্দগুলো অনুমান করার চেষ্টা করছি... - ঘরে বসে পদ্য, শব্দ এখানে? আপনার বান্ধবী বুঝি? - ধুর মশাই.. আপনি একটি যন্ত্র... মন্দাক্রান্তা একজন কালজয়ী কবি , আমি তার ভক্ত... - তবে রবীন্দ্রনাথও আপনি পড়েছেন? - পড়েছি, কিন্তু ওনার পদ্যগুলো ফুরাতে চায়্না... ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কখনো দেখা হলে পরের জন্মে একটু ছোটো কবিতা লেখার রিক্যুয়েস্ট করবো। আসলে লেখার নেশায় এতো আজে বাজে লিখেছেন ... কে পড়বে এতো... তবে এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা হয়না.. সন্ধের পর নিম্তলাঘাটে আসবেন, তখন কথা হবে, জলপথে... - য়্যাঁ.. বেঁচে থেকে? - ইয়েস । কেলো আর পঞ্চা অনেক ক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলো খগেনকে। ওরা পেশায় প্রায় 'সমাজবিরোধী' আর নেশায় রাজনৈতিক কর্মী। - এই খগা। অনেক্ষণ থেকে দেকচি তুই এর পিছনে ওর পিছনে ঘুরচিস, ব্যাওড়াটা কী... - আরে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে লোকেদের কাছে জানতে চাইছি... - কোন রবি? ঐ পাংচারওয়ালা? - আরে না না , কবি রবীন্দ্রনাথ... - কোবি ড়োবিন্দনাত...!!! - হ্যাঁ ঠিক তাই.. - কোতায় থাকে সালা.. - আরে ছি ছি অমন বলিস না - তবে খুঁজচিস ক্যানো? - এমনিই.... - কাদের পাট্টি ছিলোরে? এবার পঞ্চা তার ক্ষুরধার বুদ্ধি জাহির করে, - বুয়েচি বুয়েচি, ঐ দাড়িওয়ালা বুড়োটা... ভোটের সময় ওর কোবতেগুলো বলেচিলো দেওয়ালে লিকতে...ওর পুজোয় অ্যাকন ছুট্টি দ্যায়.... দ্যাক খগা, ও বুড়ো আমাদের পাট্টি, তুই ভোটার ভাগাবার চক্কর কোরিস না, পাড়ার ছেলে তাই এবার ছেড়ে দিলাম... এখন ফোট, নয়তো বাবার নাম... যাহ তুই তো স্লা নিজেই খগেন, তোর বাপের আর নাম কী হবে.....?

165

15

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

অবশেষে মঞ্জুর ক্রন্দনরত ভেজা মুখটি আবছা হয়ে পথের ধারে মিলিয়ে গেল| তার যাওয়ার আগের তিনদিন স্বপ্নের মত কেটেছে| এগারো বছরের বন্ধুত্বে কখনো সুযোগ আসেনি এতগুলো ঘন্টা একত্রে পার করার| পরিবার পরিজন সহযোগে কিছুক্ষণের জন্য মধ্যাহ্নভোজন অথবা রাতের খাবারে সঙ্গী হওয়া‚ সেরকমটাই হয়ে এসেছে আজ অব্দি| ফোনেও বা কোথায় যোগাযোগ? আমি খুব একটা সামাজিক নই‚ মঞ্জুও তাই| তাই দরকার ছাড়া কথা হয়না| ভাগ্যক্রমে আমার সকল কাছের বন্ধুদের সাথে সম্পর্কটা এইরকমই‚ যতদিনই আমরা না দেখে‚ না কথা বলে কাটাই না কেন তবুও আমাদের অন্তরস্থ মানসিক নৈকট্যে চিড় ধরেনা| সম্পর্কের শুরুর পর্বটা খুব আকর্ষণীয় ছিল| মঞ্জুর বর‚ সত্যা আর দেববাবু একই অফিসে কাজ করতেন| একজন মার্কেটিং টিমে অন্যজন ফাইন্যান্স এ| কাজের প্রকৃতিতে দুজনকে অনেক ক্ষেত্রে একসাথে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হত| প্রায়দিনই তুমুল তর্কবিতর্কের উপক্রম ঘটত দুজনের মধ্যে কোনো একটি প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে| তারফলে বাড়িতে দেববাবুর হতাশা কখনো সখনো জাহির হয়ে পড়ত| মুষ্টিবদ্ধ রাগ ছিটকে আসত আচম্বিতে‚ কি ডিফিকাল্ট চরিত্রের সাথে যে দর কষাকষি করতে হয়! যদিও এই নিয়ে কথা হয়নি তবুও আমি জানি মঞ্জুও এমন উক্তি সত্যার মুখ থেকে বহুবার শুনেছে| এমন পরিস্থিতি দেখে আসছিলাম বছর দুই ধরে যখন আমরা স্যালিনাসে ছিলাম| তারপর একদিন বাড়িতে বিরাট চুরি হয়ে যাওয়ার পর সে জায়গাটা থেকে মন উঠে গেল| স্যালিনাস মূলত চাষাবাদের জন্য বিখ্যাত| আর দুই একটা অফিসের হেডকোয়াটার সেখানে| এক ধারে মাইল এর পর মাইল জুড়ে চাষাবাদের জমি‚ অন্যধারে পাহাড়ের গা ঘেষে লোকালয়| সন্ধ্যে নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকার আর দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ ভুতুড়ে শব্দ প্রথম প্রথম কেমন ভীতি জাগাতো| মুনুদের স্কুলে পি. ই তে চোরকাঁটা তোলাতো| আসেপাশে চাষীদের ছেলেমেয়েরা ওর সহপাঠী ছিল| চুরিটা হল ডিসেম্বারে মুনু মিডিল স্কুল শুরু করার ছয় মাস আগে| আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল ওকে ভালো স্কুলে পাঠাব| চুরির পরে আর একদিনও থাকতে চাইছিলাম না| অনেক রিসার্চের পরে চলে এলাম সারাটোগাতে| সুন্দর সুরক্ষিত জায়গা‚ শ্রেষ্ঠ স্কুল দেখে| দেববাবুর অফিস হয়ে পড়ল ষাট মাইল দূরত্বে| আসতে যেতে ১২০ মাইল| দুই লেনের( তখন) রাস্তা পরিস্কার থাকলে দুই ঘন্টায় যাওয়া আসা| প্রজেক্টের চাপে কখনো রাত দুটোয় ফিরে আবার ছটায় বেরিয়ে যাওয়া| এতদূর রোজরোজ বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তনে আর প্রজেক্টের স্ট্রেস নিয়ে গাড়ি চালানো... মনে মনে চিন্তিত থাকতাম| তাই যখন শুনলাম কয়েকজন মিলে কারপুলের ব্যবস্থা করেছে তখন যেন একটু স্বস্তি পেলাম| সত্যা থাকতেন সারাটোগার আর স্যালিনাসের রাস্তার ধারে‚ সারাটোগার দিকে| অবিলম্বে তিনিও কারপুলের দলে নাম লেখালেন| কাজের বাইরে ঐ প্রথম দুজনের একসাথে সময় কাটানো| দুজন কঠিন একগুঁয়ে টাইপের মানুষ হয়ত প্রতিদিন একসাথে আসতে যেতে যেতে নিজেদের মধ্যে কিছু মিল খুঁজে পেয়েছিলেন‚ সেই পর্ব আমার অজানা| চমক লাগল একদিন যখন দেববাবু সত্যাকে আমন্ত্রণ করার বাসনা প্রকাশ করলেন| -আমি ভেবেছি তোমার ওঁকে ভালো লাগেনা| -রোজ যাতায়াত করি একসাথে| চক্ষুলজ্জা বলে কিছু আছেতো! মনে মনে হাসলাম| চক্ষুলজ্জার জন্য অপছন্দের মানুষকে দেববাবু নেমন্তন্ন করে খাওয়াচ্ছেন‚ এই বক্তব্যটি সম্পূর্ণ সারশূন্য অবাস্তব লাগল| নির্দিষ্ট দিনে ওঁরা এলেন| কল্পনায় ছিল সত্যার স্ত্রী হিসেবে শাড়ি গয়নায় জর্জরিত এক দক্ষিণ ভারতীয় মহিলার সাথে আলাপ হবে| লম্বা বেণীতে ফুলের মালার কল্পনা করেও কষ্টকল্পনা বুঝতে পেরে শেষে বাদ দিয়েছিলাম| নিশ্চিত ভয় ছিল অহংকারে মটমটে কেউ হবেন কারণ ওরা আসছে শুনে অপর এক নিমন্ত্রিত শুভার্থী আমাকে আগে থেকেই নামী অতিথিদের সম্পর্কে খবরাখবর দিয়ে বলেছিলেন‚ মঞ্জুর বাবা দেশের এক আই আই টির ডিরেক্টার| তখন প্রায় প্রতি শহরে একটি করে আই আই টি গজিয়ে ওঠেনি| তাই পদটির যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল| দুজনেই প্রচন্ড 'ওয়েল অফ্' পরিবার থেকে এবং তখনই মঞ্জু বে এরিয়ার এক নামকরা আইটি কম্পানীর অত্যন্ত দায়িত্বশীল পোষ্টে কাজ করে| অন্যদিকে আমি দুই সন্তান নিয়ে এলেবেলে প্রায় পুরোপুরি গৃহিণী| প্রায় পুরোপুরি কারণ তখন চাকরী করিনা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াই| মানে সমাজসেবা করে হাঁপিয়ে গিয়ে ঘরের কাজে প্রবল ফাঁকি দিয়ে চালাই| সেদিন বেল বাজতে দরজা খুলে দেখি জিনস‚ কুর্তি আর ববকাট চুলে‚ মেক আপ বর্জিত এক হাসিমাখা মুখ| হাত ভরা সুগন্ধী নার্সিসাস| বললো‚ সত্যা বলেছে উপহার হিসেবে ফুল তোমার সবচেয়ে প্রিয়? বুঝলাম দেববাবুর সাথে সত্যার ঘনিষ্ঠতা এতই ঘনীভূত হয়েছে যে আমার পছন্দের উপহার কি সেই নিয়েও আলোচনা হয়েছে| সমাদরে দুজনকে নিয়ে ঘরে বসালাম| বাকী সম্মানিত অতিথিবৃন্দও এসেছেন সকলে| আমি বসার ঘর আর রান্নাঘরের মধ্যে রকেটের গতিতে যাতায়াত করছি| বাকীরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছেন| এক ফাঁকে চুপিসারে মঞ্জু উঠে এল| আমার সাথে কথা বলতে বলতে নির্দ্বিধায় হাত লাগাল রান্নাঘরের কাজে| ব্যাপার হল‚ দেববাবুর আর সত্যার সম্পর্কের বিগত ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত ছিলাম বলে আমি প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ভদ্র ব্যবহার করব কিন্তু ঘনিষ্ঠতা বাড়াব না| কিন্তু মঞ্জুর হাবেভাবে মনেহল আমাকে যেন সে বহুদিন চেনে| ততক্ষণে খাওয়া দাওয়ার সেরে অতিথিরা বিদায় নিলে পরে সে সিঙ্ক পরিস্কার করছে‚ ডিশ ওয়াশারে প্লেট ঢোকাচ্ছে আর আমি অসহায় বাধা দিতে গিয়ে ক্ষণে ক্ষণে পরাজিত হচ্ছি| অথচ তার কোনো কাজই গা-জোয়ারি নয়| তার কারণ তার মধ্যেকার সহজাত ভদ্রতা এবং অচেনাকে আপন করে নেওয়ার প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা| প্রথম দিনেই সে আমার প্রিয় হয়ে উঠল| দিনের পর দিন যেতে সাক্ষাৎপর্ব বাড়তে লাগল| কিছুদিন পরে দেববাবু আর সত্যা দুজনেরই কর্মক্ষত্র পাল্টে যাওয়ায় ওর সাথে সহজ মেলামেশা করার অন্তরায় কাটিয়ে ভারমুক্ত হলাম| অনেকবার গোপনে লক্ষ্য করে দেখেছি‚ তুমুল কঠিন মুহূর্তেও মঞ্জুর কন্ঠের টোন‚ হাসিমুখের কোনো পরিবর্তন হয়না| হয়ত সে প্রচন্ড বিরক্ত তবুও তার কন্ঠস্বর ওঠেনা| ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পর আমি মঞ্জুকে অনুরোধ করেছিলাম যখন তুমি একান্তে সত্যার সাথে গলাতুলে ঝগড়া করবে আমাকে প্লিজ শুনিও তা কেমনতর ব্যাপার হয়! খুব খুব হেসেছিল সে| ------------------------------------------- মাস ছয়েক আগে সত্যার মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে| সত্যা চাকরী ছেড়ে দেশে রওনা দেয়| মায়ের অসুখ‚ আমাদের নিজেদের পক্ষে যতদূর সাধ্য করতে হবে‚ এরমধ্যে কোনো কিন্তু নেই| এরমধ্যে প্রশ্ন আসেনা‚ কেন আমাদের ওপরেই সব দায়িত্ব‚ কেন সত্যার ভাই এই দায়িত্বের ভাগ নেবেনা? ঐসব চিন্তা অবান্তর‚ আমারা কতটা কি করতে পারি সেইটেই ভাবতে হবে আমাদের| তাছাড়া ভাইয়ের সন্তান আছে‚ আমরা নি:সন্তান| আমাদের পক্ষে এ দেশ ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ- এই ছিল ওদের মনোভাব| অতএব সত্যা পাড়ি দিল দেশে| আর মঞ্জু থেকে যায় আরো ছয়মাস। চব্বিশ বছরের সংসার গোটানো সহজ কথা তো নয়! বাড়ি বিক্রি, চাকরীতে বদলি নেওয়া সব কর্তব্য মাথায় নিয়ে নি:শব্দে দায়িত্বপালনে ব্রতী হয় সে। আমি একবারের জন্যও ওকে এইনিয়ে অসন্তোষ জাহির করতে দেখিনি| আমার গুজরাটি বন্ধুদের সাথে দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধুদের এই একটা দুটো বিষয়ে মিল পাই আমি। এক,পরিবার এঁদের কাছে সর্বপ্রথম। আর পরিবার মানে শুধু নিজের রক্তের সম্পর্ক যেখানে গাঢ়, সেখানেই নয়। নিজের শ্বশুরবাড়ি, দিদির শ্বশুরবাড়ি সব সম্পর্কই সমান মান্যতা পায়। অন্যটি হল খাওয়া দাওয়ায় সাত্ত্বিক সাদাপনা ! টকদই, আচার, সম্বর। খাওয়া শেষ। আর সে কি তৃপ্তির খাওয়া! তাই বিক্রির উদ্দেশ্যে বাড়িটাকে তাকিকাভুক্ত করে মঞ্জু যখন এসে উঠলো আমাদের বাড়ি তখন রোজ রোজ চারবেলা কি রান্না করব সেই নিয়ে আমাকে একটুও ভাবতে হয়নি‚ বরং সেই তিনদিন কাজ থেকে ফিরে দেখেছি আমার জন্য গরম গরম টাটকা খাদ্যদ্রব্য অপেক্ষায় আছে! মঞ্জু নিজের সময়মত খেয়ে নিয়ে পরম যত্নে আমার আহার গুছিয়ে রেখে ক্লায়েন্ট মিটিং এ ব্যস্ত! এই তিনটে দিন আমার জীবনে অমূল্য হয়ে থাকবে| পয়সাকড়ি থাকলে মানুষকে বড়লোক আখ্যা দেওয়া হয়‚ কিন্তু ধনে-মানে সব বড়লোক অভিজাত হয়না| আভিজাত্য আসে উত্তরাধিকারসূত্রে| এক পিঁড়ি থেকে অন্য পিঁড়িতে যা প্রবাহিত হয়| মঞ্জুর জাগতিক ঐশ্বর্য্যে কতটা ধনী জানা নেই তবে আভিজাত্য তার শিরায় শিরায়! বড়ই নিরুচ্চার তার প্রকাশ| কিন্তু তার অভিঘাত সুদূরপ্রসারী| একবার কথায় কথায় বলেছিল‚ ওর প্রপিতামহের সৃষ্টি তামিলনাড়ুর প্রত্যন্ত গ্রামে একটি স্কুল আছে‚ সেখানে বংশ পরম্পায় ওদের অর্জিত অর্থ সমস্ত জমা হয়| মঞ্জুর ঠাকুর্দা ওর বাবা কাকাদের এবং ওর বাবা কাকারা মঞ্জু ও তার ভাইবোনেদের কোনো সম্পত্তি টাকা পয়সা দিয়ে যাবেন না| সমস্ত পয়সা যাবে স্কুলের ট্রাস্টে| ব্যবহারিক শিক্ষা আমাদের পূর্বপুরুষের থেকে পাওয়া একমাত্র ধন‚ যার সাহায্যে আমাদের খেটে খেতে হবে সারাজীবন| বলতে বলতে মঞ্জু হাসছিল‚ অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছিল ওর হাসিতে| এক যুগ ধরে যে বন্ধুটিকে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে ভাববিহ্বল হতে দেখিনি যাওয়ার সময় তার চোখ উপচে জল ঝরছিল ঝরঝরিয়ে| উবার ড্রাইভার দেখছে আমাদের অপলকে‚ আমি সচেতন‚ ছলছল চোখে অতি দক্ষতায় নিজেকে সামলে রেখেছি| মঞ্জুর কোনো বিকার নেই| বরাবরের মত ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশে সে বড়ই সৎ| তাদের নতুন বাড়ির নির্মাণপালা চলছে‚ সেই গৃহে সম্মানিত অতিথি হওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে‚ উবারের জানালায় আঁকা সেই প্রিয় মুখটি রাস্তার বাঁকে হারিয়ে গেল অনেক অনেকদিনের জন্য!

1110

94

Kaushik

গীতালি‚ চন্দ্রনাথ‚ আর নববর্ষ

- তুই তার মানে প্যান্ডেলের পারমিশন নিতে যাবি না? - কাম অন গীতু! সত্যি করে বল তো - এই সব হুজুগের কি কোনো দরকার আছে? - এতে হুজুগের কি দেখলি? আর দরকারটাই বা নেই কেন? - আরে‚ নতুন বছর নিয়ে এই আদিখ্যেতার মানে কি! সেই তো পৃথিবী সূর্যর চারিদিকে পাক খাবে আর লাট্টুর মতন ঘুরবে; দিন-রাত হবে আর তার থেকেই একটা দিনকে "নতুন বছর" বলে তোরা লাফাবি; কিছু লোক পার্ক স্ট্রীটে আর কিছু জোড়াসাঁকোতে গিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করবে| এই তো? - তাই নাকি! তবে তো রবীন্দ্র জয়ন্তীতেও কোনো অনুষ্ঠান না করলেই হয়| আর প্রতি বছর ৭ই নভেম্বরেই বা গলার শিরা ফুলিয়ে‚ হাত মুঠো করে কি প্রমাণ করতে চাস? - যে উদাহরণ দুটো দিলি‚ তার সাথে এই কেসটার পার্থক্য আছে - সেটা বুঝতে শেখ! দুটো কেস এক নয়| - নেচারটা অবশ্যই এক নয়‚ কিন্তু ডিগ্রীটা একই! - তোকে বলেছে! যা বুঝিস না‚ তা নিয়ে কথা বলতে আসিস না| - ঝগড়া করবি না| লজিকে আয়! - আবে‚ কিসের লজিক! যে ক্যালেন্ডার মেনে সারা বছর একটাও কাজ করিনা‚ সেই ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনে উদ্বাহু হয়ে নাচা আমার পোষাবে না! - সে তো ধ্রুপদি মার্ক্সিজিম মেনে দুনিয়াতে একটাও দেশ চলে না; তাতে কি ব্যাপারটা মিথ্যে হয়ে যায়‚ নাকি তার জন্য তোরা রাজনীতি করা ছেড়ে দিয়েছিস? - ধুর! এটা কোনো লজিকই নয়! ১লা বৈশাখ‚ ২৫ শে বৈশাখ‚ ২২শে শ্রাবণ - এই তো দৌড়! এর বাইরে একটা তারিখও কেউ মনে রাখে না| তাই বাংলা নতুন বছর নিয়ে আদিখ্যেতা আমার কাছে অন্তত ভাবের ঘরে চুরি! - তা নয় রে চাঁদু! গত বছর সেমিস্টারের পরে বাবার সাথে একটা সরকারি অনুষ্ঠানে গেছিলাম| অরুণাচলের লোহিত ডিস্ট্রিক্ট| ওখানকার মিশমি জনজাতীর মানুষদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ছিলো| ডায়াসে বসা সব ডেলিগেটরা মিশমিদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পড়েছিলো| তাই এই বাংলা নববর্ষ উদযাপনটাকেও একই ভাবে দেখতে কি তোর খুব অসুবিধে হচ্ছে? - বুঝলাম| মানে‚ একটা endangered ক্যালেন্ডারকে বাঁচানোর ঠেকা নিতে হবে| তাই তো? - ঠেকা নেওয়ার তুই-আমি কেউ নই রে চাদুঁ! প্রতি বছর নীলার সাথে যে ঢুলতে ঢুলতে ডোভার লেনে গিয়ে বসে থাকিস - কেন থাকিস? ওই ধরনের গান বাজনায় তো তোর কোনো উৎসাহ নেই‚ তবু কেন যাস? ওর ভালো লাগবে বলেই তো যাস|! সে ভাবেই ভাব না ব্যাপারটাকে| - মানে? কার ভালো লাগার জন্য নববর্ষ উদযাপন করতে যাবো? তোর? - আমার ভালো লাগা নয় রে গাধা! নববর্ষ উদযাপনের সাথে অনেক মানুষের ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে| আমরা পয়লা বৈশাখের একটা অনুষ্ঠান করলে কিছু মানুষ যদি খুশি হয় - সে টুকু বুঝবি না| - আরে‚ তার জন্য আমরা কেন? ইউনিভার্সিটি কেন? পাড়ায় পাড়ায় তো হচ্ছে ম্যারাপ বেঁধে অনুষ্ঠান| লোকে সেখানে গেলেই তো পারে! - বোকা বোকা লজিক দিস না! তা হলে তো সারা কলকাতার দূর্গা পুজো কমিয়ে একটাতে নামিয়ে আনলেই হয়! সকলে সেখানে গিয়েই ঠাকুর নমো করে আসবে না হয়! - প্রচন্ড বোকা বোকা ব্যাপার! ধুর শালা‚ এই জন্য তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না| - যাক! মেনে নিয়েছিস তা হলে| যা‚ এবার সোনা ছেলের মতন ভিসির কাছে পারমিশন নিতে যা| - ফোট‚ তোর ওই সব ঢপের লজিক কোনো লজিকই নয়! তোর ওপর দয়া করে যাচ্ছি কথা বলতে - বুঝলি! - তাড়াতাড়ি যা - ভিসি বেড়িয়ে যাবেন নইলে| আরে চাঁদু‚ শুনে যা! - কি? - শুভ নববর্ষ!

160

9

সুচেতনা

জমানো দুপুর

আমার ঘুম বড় অদ্ভুত। ঘুমের মধ্যে জ্ঞান থাকে। হিসেব করতে পারি। ঘুমের মধ্যেই নিজেকে বলি মনে মনে যখন এত কিছু পারছি, তখন নিশ্চয়ই আমি জেগে আছি, ঘুমিয়ে নেই। ঘুম থেকে ওঠার পরেও ঘুমের মধ্যে কী কী দেখেছি, কী কী ভেবেছি সব ছবির মত মনে থাকে। শুধু সময়জ্ঞানটা থাকে না। স্থানকাল খেয়াল থাকে না। সেদিন ভরসন্ধ্যেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না। ছেঁড়া ঘুম। যতবার আধোঘুমে চোখ মেললাম, সব অন্ধকার, নিশ্চুপ দেখে ঘুমের মধ্যেই ভাবছিলাম রাত দুটোতিনটে হবে। ছেলে যখন দরজায় চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকছিল, তখন সেই আওয়াজে ঘুমের মধ্যেই মনে হল - এত রাতে চোরই নিশ্চয়ই চাবি ঘুরিয়ে ঢুকছে ঘরে, ঘুমের মধ্যেই "কে কে" বলে এমন চেঁচালাম, ছেলে দরজা খুলে ভয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেল, প্রতিবেশিনী ছুটে এলেন। ঘড়িতে তখন মোটে সন্ধ্যে আটটা। আজকাল নতুন উপসর্গ হয়েছে। ঘুমের মধ্যে অতীতভ্রমণ। ফেলে আসা সময়গুলো ছবির মত দেখতে পাই। বড় জ্যান্ত ছবি, নিজেকে সেই ফেলে আসা মুহুর্তটাতেই দেখতে পাই। দুপুরবেলায় বড় ঘুম পায় আজকাল, ঘুমোতে তো আর পাই না দুপুরবেলায়। অথচ বছর তিরিশেক আগেও মা বৃহস্পতিবারের দুপুরে আর রবিবারের দুপুরে, তারপর গরমের ছুটির দুপুরে রোজ সাধ্যসাধনা করত, একটু ঘুমিয়ে নিতে। আমার সেই ঘুমটুকুরও সময় হত না তখন। সেই পাপেই মনে হয়, এখন দুপুরবেলা এত ঘুম পায়। বিয়াল্লিশবছরের ফেলে রাখা ঘুম শোধ তুলতে চায়। তাই হয়তো রাতের বেলায় আজকাল আমাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে তিরিশ-বত্রিশ বছর আগেকার দুপুরগুলোয়। তখন সুবিধেমতন দশবছরের বা বারোবছরের মেয়ে হয়ে যাই। বিয়াল্লিশবছরের বুড়িটা গালে হাত দিয়ে দেখে নেয় সেই উমনোঝুমনোটাকে। যেসব দুপুরবেলাগুলো আজকাল রাতেরবেলায় হানা দেয়, তেমন কয়েকটা লিখে রাখলাম। ভাগ্যিস ঘুমের মধ্যে ফেলে আসা দুপুরগুলো দেখতে পাচ্ছি, তা নয়তো স্মৃতিশক্তির যা অবস্থা হয়েছে আজকাল! কত কিছুই যে জমে থাকে ছাই! থাকুক তবে জমে। #জমানোদুপুর-১ আমার সেই পুরনো ঘরের সরু খাট। বালিশের উপর শিউলিবাড়ি। বইয়ের আদ্ধেক অব্দি পড়ে চোখ বন্ধ করে উপুড় হয়ে দেখছি - রুক্ষ পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বেয়ে একটা লোক উপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। চওড়া পিঠ, বড়সড় কাঠামো। উঁচু পাথর, ঝোপঝাড় কিচ্ছু মানছে না। ঝোপের গাছ মুঠো করে খাবলে ধরে দিব্যি টপাটপ পাথর চড়ছে, তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার পিঠের সাদা পিরাণটা খোঁচা লেগে ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। বহু দূর থেকে ঝপঝপ করে জল পড়ার আওয়াজ হয়েই চলেছে। আওয়াজটা থামছে না। কোথা থেকে জল পড়ছে, দেখাও যাচ্ছে না। আমিও দেখতে পাচ্ছি না, লোকটাও পাচ্ছে না। আমি জানি লোকটা কোথায় যাচ্ছে। একটা নদীর উৎসমুখ খুঁজতে। লোকটার কাছে ম্যাপ নেই, কম্পাস নেই, কিচ্ছুটি নেই। #জমানোদুপুর-২ এখন আসলে আর দুপুর নেই। কখন যেন দুপুর গড়িয়ে আলতো অন্ধকার আসি আসি করছে। মায়ের বড় খাটে মধ্যিখানে জোড়া হাতি আঁকা জয়পুরি চাদর। মা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু মায়ের হাতে এখনো আলগোছে ধরা 'ফাঁসির মঞ্চ থেকে'। আমার হাতে মোটা একটা বই - প্লাস্টিকের জ্যাকেট পরা অপু। প্লাস্টিকের জ্যাকেটের ধারগুলো ছিঁড়ে এসেছে। আমি বসে আছি সতুদের বাগানে। বসে বসে দেখছি - রাণুদি কাজলকে ভাত আর মাছ মেখে গরাস পাকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের শোওয়ার ঘরের কোনে কে ওটা দাঁড়িয়ে আছে? আমি তো বাগানে ছিলাম, আমাদের ঘরের ভিতরটা দেখতে পাচ্ছি কী করে? শাড়ি পরে টিপ পরে দাঁড়িয়ে আছে। গুনগুন করে কী যেন বলছে! আমাকে বর চাইতে বলল কি? কিন্তু আমি তো ভালো মেয়ে নই। তবে? #জমানোদুপুর-৩ শীতকাল। গায়ে হাল্কা গোলাপি রঙের উলের চাদর জড়িয়ে একটা কমলালেবু রঙের দুপুরে মায়ের পাশে মাদুরে বসে আছি। আমার হাতে গালিনা দেমিকিনার বনের গান। আর মায়ের হাতে দেশ। আমার হাল্কা গোলাপি রঙ বড় প্রিয় বলে দিদা নিজের হাতে এত বড় উলের চাদর বুনে দিয়েছে। বাবার ছাই রঙা শালটা বড় আরাম, ওটা গায়ে জড়ালে মনে হয় বাবার কোলে বসে আছি, তাই ওটা জড়িয়ে থাকতাম সবসময় শীতকালে। সোয়েটার পরলে আমার গা কুটকুট করে। তাই দিদা আমাকে উলের চাদর বুনে দিয়েছে। আমাদের বাড়িতে রোদ আসে না বলে মা শীতের দুপুরবেলায় বাড়ির সামনের মাঠে বসে রোদ পুইয়ে নেয়, আমিও মায়ের পাশে বসি তখন। বনের গান বইটা আমার বড় প্রিয়। তিনটে গল্প আছে। কিন্তু শেষের গল্পটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় - আমার কাপ্তেন। পেতিয়া নামের একটা ছেলে হাঁটতে পারে না, তার গল্প। হর্তাকর্তা মিনসে তাকে খবরের কাগজ কেটে হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দিয়েছিল। ওটা বনবনদি ফিরছে না কলেজ থেকে? ছোট্ট ছোট্ট হলুদ কল্কা বসানো বাদামি রঙের শাড়ি পরে! দৌড়ে গিয়ে বনবনদির হাত ধরি, বনের গান খুলে দেখাই, "বনবনদি আমাকে এরকম হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেবে?" বনবনদি কখনো কাউকে "না" বলে না। বলতেই জানে না। বনবনদির হাত ধরে জেঠিমার বাড়ি। জেঠু-জেঠিমাও খবরের কাগজের তাড়া নিয়ে আসে, বনবনদি হাসিমুখে বসে বসে আমাকে এত এত হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেয়। বাবাইদাদা দেখে মুচকি হেসে বলে, "দাঁড়া, আমিও তোকে একটা মালা বানিয়ে দিই।" বাবাইদাদাও খবরের কাগজ ভাঁজ করে করে তার উপর কী যেন আঁকে, দেখতে দেয় না। কাঁচি দিয়ে কেটে যখন মালা বানিয়ে দেয়, দেখি লেজে লেজে জোড়া লাগানো, বসে থাকা বাঁদরের মালা। আমি ঠোঁট ফোলাই, সবাই হাসে। জেঠিমা হাসিমুখে বাবাইদাদাকে চোখ পাকায়। বাবাইদাদা তখনো হাসতে থাকে। আমি রেগে গিয়ে বাবাইদাদাকে বলি "আর কক্ষনো তোমার সঙ্গে কথা বলব না।" বাবাইদাদার উপর শুধু ঘুমের মধ্যেই আজকাল রাগ করতে পারি। কখনো দেখা হয়ে গেলে সামনাসামনি ঝগড়া করার উপায় বাবাইদাদা আর কোনোদিনের জন্য রাখে নি। রাখে যে আর নি, সে খবর তো আমিই মাকে দিয়েছিলাম ফেসবুক থেকে জানতে পেরে। তার মানে আমি এখন ঘুমিয়ে আছি। বাবাইদাদা ঘুমের মধ্যেই থেকো তবে।

143

11

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

সমুদ্রযাত্রা এবং টাইটানিক (প্রকাশিত লেখা)

সমুদ্র মানেই এক অজানার হাতছানি। মানুষ এই অজানাকে জানার চেষ্টা করেছে বারবার, সেই প্রাচীন কাল থেকেই। আমাদের প্রাচীন ভারতেও সমুদ্র যাত্রা ছিল। এই যাত্রা মূলত হত ব্যবসার কারণে। পরে, আরও নানা কারণে এই যাত্রা হত। ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হয়েছে, বহু শতাব্দী ধরে। চিন, আরব, পারস্য আর ইউরোপের অনেক পরিব্রাজকের লেখাতেও এর উল্লেখ আছে। বেশ কিছুদিন আগে, গুজরাতের লোথাল অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার বছর আগের বানানো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ড্রাই ডকের (dry dock) আবিষ্কার হয়েছে। পূর্ব এবং পশ্চিমে, তিনটি মহাদেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে ভারতের বহু হাজার বছর ধরে কৃষ্টি আর বাণিজ্যের সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রমাণ ঐ মহাদেশগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার আগে তৈরি উর ( UR) এবং সম্রাট নেবুকাডনেজারের (Nebuchadnezzar) প্রাসাদে যে কাঠের তক্তা এবং থাম পাওয়া গেছে, তা হলো ভারতীয় টিক আর দেবদারু গাছের গুঁড়ি থেকে তৈরি। ঋগ্বেদে দেখি:- সমুদ্র দেবতা বরুণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা। বরুণদেবতার আশীর্বাদ ছাড়া, সেকালে এবং এখনও সমুদ্রযাত্রা যে নিরাপদ নয় , সেটা বারবার বলা আছে। মন্ত্রটি হল:-শম্ ন বরুণঃ! অর্থাৎ:- হে সমুদ্র দেবতা বরুণ, তোমার আশীর্বাদ যেন নিরন্তর পাই! এইটাই এখন ভারতীয় নৌবাহিনীর CREST বা ব্যাজ! ১৯৪৮ এ চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী এটা বেছে দেন। বৃক্ষ আয়ুর্বেদে আছে জাহাজ তৈরির বিশদ বিবরণ!!!! শ্রী রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় তাঁর- HISTORY OF INDIAN SHIPPING বইতে লিখেছেন:- ধারা রাজ্যের ভোজ, যাকে আমরা ভোজরাজা বা ভোজ নরপতি নামে জানি আর যিনি প্রাচীন ভারতে ম্যাজিকের স্রষ্টা( ভোজবাজী হচ্ছে- MAGIC এর কমন বাংলা), কৌটিল্য বা চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের মতই একটা বই লিখেছিলেন। নাম:- “যুক্তি কল্পতরু”। এতে রাজ্য শাসনের বিস্তৃত তথ্য আছে। এরই মধ্যে, একটা অংশ হলো বৃক্ষ আয়ুর্বেদ। এই খানে জাহাজ তৈরির জন্য কাঠের জাতি বিভাগ বা WOOD CLASSIFICATION আছে। আমাদের সামুদ্রিক ইতিহাসের আরও অনেক কথা, অনেক ঘটনা নানা জায়গায় আছে, যা হারিয়ে যাওয়া পুঁথি এবং তথ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরিব্রাজক মার্কো পোলো তাঁর ডায়রিতে লিখে গেছেন, তখন ভারতে তৈরি জাহাজে থাকতো চারটি মাস্তুল, চোদ্দটি ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্ট, ষাটটি কেবিন আর দশটি লাইফবোট আর ক্রেন। এবার ভাব, এইসব তো একদিনে তৈরি হয় নি! এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, সমুদ্রযাত্রার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং তার পর আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা। যখন মানুষের নানা বিষয়ে শ্রীবৃদ্ধি হয়, যখন বৈভব এবং ঐশ্বর্য তাদের কাছে সুখ বাড়াতে সাহায্য করে, তখন নিজের দেশ ছেড়ে দুর্গম স্থানে পাড়ি দিয়ে, ব্যবসা করে উত্তরোত্তর বৈভব এবং ঐশ্বর্য বাড়ানোর জন্য নিজের জান কবুল করতেও দ্বিধা করে না। তখনকার সময়ে রাস্তাঘাটে, হিংস্র জন্তু, ডাকাতকে মোকাবিলা করে, অপার সমুদ্র পাড়ি দিতেও দোনোমোনো করত না। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু কম্পাস ছিল না! তাহলে এরা দিকভ্রষ্ট হত না কেন? এখানেই খুব সহজ উত্তর আছে। ব্যবসার জন্যই জ্ঞান- বিজ্ঞানের চর্চা আর জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছিল। লিখতে যতখানি সময় লাগছে, তার চেয়েও ঢের বেশী সময় লেগেছে এই ব্যাপারে গবেষণা করতে। এই সমুদ্র যাত্রার বিপদও ছিল অনেক। জাহাজ ডুবিতে প্রচুর মানুষের প্রাণ গিয়েছে। তাও মানুষ এই নেশাটা ছাড়তে পারে নি। ফলে, আমাদের দেশে সমুদ্র যাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়। জাত- ধর্ম যাবে, এই দোহাই দিয়ে কালাপানি বা সমুদ্রযাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ তো গেল, প্রাচীন ভারত বা পৃথিবীর কথা। ফিরে আসি মাত্র একশ পাঁচ বছর আগের কথায়। ইংল্যাণ্ড থেকে আমেরিকায় যাতায়াতের জন্য দরকার পড়ত আটলান্টিক মহাসাগর পেরনোর। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিমান বা প্লেন ছিল না। জাহাজই ছিলো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার একমাত্র ভরসা। ইউরোপ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার জাহাজ ব্যবসা ছিল খুব লাভজনক। কম সময়ে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পার হবার জন্য, যাত্রীদের আকৃস্ট করতে জাহাজ কোম্পানী গুলোর মধ্যে চলত প্রতিযোগীতা। ঐ সময়ের ইংল্যান্ডের প্রধান দুই জাহাজ কোম্পানী হল হোয়াইট স্টার(White Star) এবং কুনার্ড( Cunard )। ১৯০৭ সালে কুনার্ড কোম্পানী যখন খুব কম সময়ে আমেরিকা পৌছানোর দ্রুতগতি সম্পন্ন জাহাজ লুইজিতানিয়া (Lusitania )এবং মৌরিতানিয়া ( Mauretania) তাদের বহরে যোগ করল , চিন্তায় পড়ে গেলেন হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর চেয়ারম্যান ইসমে ( J. Bruce Ismay )। বেলফাস্টের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) এর মালিক উইলিয়াম পিরি ( William Pirrie,) এর সাথে পরামর্শ করে তিনটা বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ অলিম্পিক( Olympic ) টাইটানিক (Titanic)এবং ব্রিটানিক(Britannic, এটাও ডুবে গেছিল। ) তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। এই কোম্পানীর সব জাহাজেরই নাম শেষ হতো “ইক” দিয়ে। এই নামকরণের আর একটু ইতিহাস বলে নিলে, সুবিধে হবে। গ্রিক পুরাণে জাইগান্টোস (Gigantos) হচ্ছে, ধরিত্রী দেবী গেয়া (Gaea) এবং আকাশ দেবতা ইউরেনাসের (Uranus) একশ সন্তান, দৈত্যাকার বন্য এক প্রজাতি। এরা দেখতে মানুষের মত, কিন্তু সুবিশাল আকার ও শক্তির জন্য খ্যাত। জাইগান্টোমেকি (gigantomachy) নামে এক যুদ্ধে অলিম্পিয়ানদের (Olympian) হাতে এরা ধ্বংস হয়ে যায়। জাইগান্টোসদের মতো টাইটানরাও গেয়া ও ইউরেনাসের সন্তান আরেকটি প্রজাতি। অলিম্পিয়ানদের সর্দার জিউস টাইটানোমেকি (titanomachy) যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার আগে এরা পৃথিবী শাসন করত। এদের নাম থেকে টাইটানিক শব্দটি পাওয়া যায়, যার মানে অত্যন্ত বৃহদাকার। ১৯০৯ সালে হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) কোম্পানির এনজিনিয়ার, টমাস এন্ড্রু (Thomas Andrews ) র নকশায় শুরু হল টাইটানিক জাহাজের নির্মাণ কাজ। সেই সময়ের সবচেয়ে বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে টাইটানিককে গড়ে তোলা হল। জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজকে ভাগ করা হয় ১৬টা আলাদা প্রকোষ্ঠে বা চেম্বারে। এক প্রকোষ্ঠ হতে অন্য প্রকোষ্ঠে জল ঢোকা ছিল অসম্ভব । ১৬ টার মধ্যে ৪ প্রকোষ্ঠে জল ঢুকলেও জাহাজ ভেসে থাকতে অসুবিধা হত না। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন টাইটানিক জাহাজ কোনদিন ও ডুববে না। ৩১শে মে ১৯১১ সালে ২২ টন সাবান দিয়ে মসৃণ করে তোলা রাস্তা বেয়ে জলে নামান হল টাইটানিককে। জলে নামানোর সময় কাঠের তক্তা পড়ে মারা যায় এক কর্মী। জানা নেই. তারই অভিশাপ লেগেছিল কিনা টাইটানিকের ওপর। তারপর শুরু হল যন্ত্রপাতি লাগানো, সাজশয্যা। ১৯১২ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে পরীক্ষামূলক সমুদ্র যাত্রা শেষ হওয়ার পর তাকে নিরাপদ এবং আরামদায়ক সমুদ্র ভ্রমন উপযোগী জাহাজ হিসেবে হস্তান্তর করা হল জাহাজ কোম্পানীর কাছে । জাহাজের পুরো নাম হল RMS Titanic (Royal Mail Ship = RMS)। ওজন-৪৬,৩২৮ টন। লম্বায়- ৮৮২ ফুট ৬ ইঞ্চি। গতিবেগ :-ঘন্টায় ২৩ নট বা ৪৪ কিলোমিটার। ধোঁয়া বোরোনোর জন্য ফানেল ছিল, ৪ টে। প্রত্যেকটার উচ্চতা ছিল- ৬২ ফুট। ২৯ টা বয়লার ছিল, বাষ্প তৈরি করার জন্য। যাত্রী বহন ক্ষমতা ছিল-৩৫০০। যদিও প্রথম ও শেষ যাত্রায় যাত্রী ছিলেন-২২২৪ জন। এদের মধ্যে বেঁচে ফিরেছিলেন মাত্র ৭১০ জন। জাহাজে, কুকুর ছিল ১০ টা। সব কটাই মারা গেছিল। এই জাহাজ কোনোদিন ডুববে না, এই ঘোষণা হয়, সেই সময়। তাই জাহাজে ৬৫ টি লাইফবোট নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ঐ দিন ছিল মাত্র ২০ টি । লাইফবোটের মোট ক্ষমতা ছিল ১১৭৮ জন। কিভাবে লাইফবোট ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে মহড়া অনুষ্ঠানের কথা ছিল ১৪ই এপ্রিল,১৯১২ র সকালে। অজ্ঞাতকারনে টাইটানিকের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ ঐ দিন মহড়া অনুষ্ঠান বাতিল করেন। মহড়া হলে আরো কিছু জীবন রক্ষা পেত এমন ধারনা করেন অনেকে। আটলান্টিক পেরুনোর ,২৬ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের। এইখানে একটা কথা বলা দরকার। সেইসময়, পাল তোলা জাহাজের আর বাস্পচালিত জাহাজের ছিল যুগসন্ধিক্ষণ। দুরকম ভাবে জাহাজের মুখ ঘোরানো হত। পাল তোলা জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে, ঠিক তার উল্টো দিকে হুইল/ টিলার ঘোরাতে হত। একে বলা হত, “টিলার অর্ডার”। বাস্পচালিত জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে সেইদিকেই হুইল/টিলার ঘোরালেই হত। একে বলা হত “ রাডার অর্ডার”। জাহাজের চালক, রবার্ট হিচিনস, এই দুটোই জানতেন। কারণ, তখন আটলান্টিক পেরুনোর জন্য এই দুটো পদ্ধতিই জানা আবশ্যিক ছিল। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, এই ষ্টিয়ারিং ভ্রান্তি। জাহাজ কম সময়ে পাড়ি দেবে, আর ডুবে যাবে না, এই ধারণাতেই ক্যাপ্টেন স্মিথ সমুদ্রে বড় বড় হিমশৈল থাকার প্রায় গোটা সাতেক সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছিলেন। পরে জানা গিয়েছিল, হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর অন্যতম মালিক ব্রুসের নির্দ্দেশ ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের ওপর, তিনি যেন কোনো অবস্থাতেই জাহাজের গতিবেগ না কমান। পরে, হিমশৈল থাকার বিপদ বুঝে, ফার্ষ্ট অফিসার উইলিয়াম মার্ডক যখন চালক হিচিনসকে পরামর্শ দেন, জাহাজের মুখ ঘোরানোর জন্য, তখন হিচিনস ভয়ে, “টিলার অর্ডার” আর “ রাডার অর্ডারের” মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। “টিলার অর্ডার” দিয়ে তিনি জাহাজের মুখ ঘোরানোর চেষ্টা করলেও জাহাজ কিন্তু আসলে, হিমশৈলের দিকে গিয়ে ধাক্কা মারে। তারপরেই ঘটে যায়, ঠিক শতাব্দী প্রাচীন সেই মারাত্মক দুর্ঘটনা। আমরা সবাই সেই আত্মাদের শান্তি কামনা করি, যারা মারা গিয়েছিল, সেই অভিশপ্ত রাতে। ১৫/০৪/১৯১২ র রাত ১.৩০ থেকে রাত ৩.৩০ এর মধ্যে।

130

9

সঞ্চিতা চ্যাটার্জী

যদি জানতেম

তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি:। শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিবাদ্যেব ধাতু:।। (মহাকবি কালিদাস) তন্বী, শ্যামা, আর সুক্ষদন্তিনী নিম্ননাভি, ক্ষীণমধ্যা, জঘন গুরু বলে মন্দ লয়ে চলে,চকিত হরিণীর দৃষ্টি অধরে রক্তিমা পক্ক বিম্বের, যুগল স্তনভারে ঈষৎ-নতা, সেথায় আছে সে-ই, বিশ্বস্রষ্টার প্রথম যুবতীর প্রতিমা। (শ্রী বুদ্ধদেব বসু) দীপ্তর একবার শখ হয়েছিল কালিদাসের রচনা পড়বে| সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি না থাকায় উপযুক্ত বাংলা অনুবাদের সন্ধানে ছিল| সেই ভাবেই সন্ধান পায় বুদ্ধদেব বসুর মেঘদূত এর| পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যেত‚ যেভাবে কালিদাস যক্ষপ্রিয়ার রূপ বর্ণনা করেছেন‚ আধুনিক সাহিত্যে কখনো দেখতে পায় নি নারীর শারীরিক সৌন্দর্য্যর এরকম বর্ণনা| শরীর কে কি করে প্রেমের মন্দিরে স্থাপন করা যায় তার অপূর্ব আলেখ্য ফুটে ওঠে সেই আখ্যানে| তারপরে পড়ে কুমারসম্ভব| পার্বতীর রূপের বর্ণনা| অপরূপ ভাবে পার্বতীর শরীরের প্রতিটি অংশ উঠে এসেছিল সেই বর্ণনায়| কোমল বাহু‚ নীলকান্ত মণির আভাযুক্ত নিম্ন নাভি‚ কৃশ কটি‚ এমন কি নিতম্বের বর্ণনাও করেছেন মহাকবি| দীপ্তর কালিদাস পূর্ববর্তী কোন লেখকের লেখা পড়া হয় নি| তবে জেনেছে তাঁরা শুধু পার্বতীর স্তনযুগল বর্ণনা করতেই শ্লোক রচনা করেছেন অস্ংখ্য| সেই তুলনায় কালিদাস অনেক পরিমিত‚ অনেক সংযত| আশ্চর্য সেই বর্ণনা পড়ে সেই নারীর প্রতি কামনা জাগে| কিন্তু কখনো শ্লীলতা পরিহার হয়েছে বলে মনে হয় না| আধুনিক সাহিত্য অনেক পড়েছে দীপ্ত| কমপ্রিহেন্সিভ ক্লেইম করতে না পারলেও‚ অনেক | রবীন্দ্রনাথ‚ শরৎচন্দ্র‚ প্রভাত মুখোপাধ্যায়‚ প্রমথ বিশী‚ বুদ্ধদেব বসু‚ শরদিন্দু‚ সুনীল‚ শীর্ষেন্দু‚ বুদ্ধদেব গুহ‚ সমরেশ বসু‚ শঙ্কর| এই ভাবে নারী সৌন্দর্যর বর্ণনা কেউ করেছেন বলে মনে পড়ছে না| বেশিরভাগ ই নারী সৌন্দর্য মুক্তর মত হাসি‚ মরাল গ্রীবা‚ ধনুকের মত ভুরু আর আয়ত চোখে সীমাবদ্ধ রেখেছেন| শরদিন্দু তন্বী শ্যামা শিখরদশনা অবধি এগিয়েছেন আর বেশি ডিটেলে যান নি| ঘরে বাইরের বিমলার ছিল অন্যরকম সৌন্দর্য‚ তীব্র আকর্ষণ| তা যত না বর্ণিত হয়েছে শরীর ভাষায়‚ তার থেকে বেশি ফুটেছে তাঁর আচরণে‚ ব্যবহারে| বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টি‚ সমরেশ বসুর বিবরে যৌনতা আছে‚ খুব উগ্র ভাবে| নারী দেহর সম্যক কাব্য কোথায়! আর আজকের দিনে তো পার্বতীর শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য লিখলে আর দেখতে হবে না| সোজা গারদের পেছনে| ভাগ্যিস কালিদাস আজকের দিনে জন্মাননি| ক'টা যে এফ আই আর হত ওঁর নামে‚ কে জানে| আজকের হনুমান বাহিনীর বোধয় সংস্কৃত কাব্য পড়া নেই| নইলে আর কালিদাসের রক্ষা পাওয়ার উপায় ছিল না| ঘরে হিটিং চলছে‚ ঘর বেশ গরম| দীপ্ত লেপটা নামিয়ে দিয়েছে| স্বভাবতই প্রমার গা থেকেও কিছুটা সরে গেছে লেপটা| তার শোয়ার ভঙ্গী কিছু অদ্ভুত| গর্ভস্থ ভ্রূণের মত বুকের কাছে দুই পা জড়ো করে ঘুমায় সে| এই মুহূর্তে প্রমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না দীপ্ত| রতিশেষে শ্রান্ত পরিতৃপ্ত নিদ্রাভিভূতা তার প্রিয় নারী| কয়েকটা চুল লেপটে আছে মুখে ঘাড়ে| লম্বা গলা প্রমার| এইরকম গলাকেই বোধহয় কাব্যে মরাল গ্রীবার উপমা দেওয়া হয়| দীপ্ত মনে মনে কাব্য করার চেষ্টা করলো| মরাল গ্রীবা থেকে অনাবৃত কাঁধ বেয়ে লতিয়ে আছে ময়ূর পুচ্ছের মত উজ্জ্বল কেশভার| শ্যামমুখ পান্ডুবর্ণ স্তনদ্বয় এতটাই পুষ্ট যে আপন ভারে পরস্পরকে পীড়িত করছে| গুরু জঘন আজকের দিনে আউট অফ ফ্যাশন| প্রমার লম্বাটে গড়ন‚ সুন্দর লম্বা পা দুটি মুড়ে শুয়ে আছে| দীপ্ত আলতো করে পা দুটো নামিয়ে দিল| সম্মুখে বিকশিত কৃশ কটি‚ আধো ছায়াবৃত গভীর নাভি নীলকান্ত মণির মত দীপ্তি ছড়াচ্ছে| নিতম্ব এত সুন্দর যে মহাদেবের কোলে স্থাপিত হতে পারে‚ যা অন্য কোন রমণীর কল্পনাতীত| দীপ্তর চোখের সামনে পার্বতী ফুটে উঠছেন‚ সে হারিয়ে যাচ্ছে মহাদেবের প্রেমোঙ্মুখ পার্বতীর নব যৌবনের রূপমাধুরীধারায়| হঠাৎ প্রমার চোখ খুলে যায়| দেখে দীপ্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে‚ চোখে কিসের ঘোর| "কি গো‚ কটা বাজে?" চমকে ওঠে দীপ্ত| ঘড়ি দেখে| "আড়াইটে| দেখো তো কত দেরি হয়ে গেল! আজ বোধহয় আর স্প্যানিশ স্টেপস হবে না|" "আগেই হবে না ভাবছো কেন? আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি| ৩ টের সময়ে বেরিয়ে যাবো|" "ওকে প্রিয়তমা| দেখো যদি হয় খুব ভালো হবে|" সুন্দর দাঁতের সারি ঝলকিয়ে হাসে প্রমা| দীপ্তর মাথায় আবার পাক খেতে থাকে‚ "তন্বী শ্যামা শিখরদশনা ..." {/x2} {x1i}jantem8.jpeg{/x1i}

545

41