মনোজ ভট্টাচার্য

চিনা গল্পেরা !

ড্রাগনের চোখে আগুন ঝরাও ! সে প্রায় সাড়ে চার শো বছর আগেকার কথা । চীনদেশে চ্যাং শেং চুওং নামে একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ছিল । তার সুন্দর চিত্রকলার জন্যে সম্রাট লিয়াং উ তার খুব প্রশংসা করত । আনদং মন্দিরের দেওয়ালে ছবি আঁকার জন্যে চ্যাঙকে অনুরোধ করা হল । সে অনেকদিন ধরে প্রচন্ড পরিশ্রম করে মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে চারটে ড্রাগন আঁকার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছিল । তাতে দেখা যাচ্ছিল – যে ড্রাগনেরা মেঘের রাসি ভেঙ্গে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে । দেওয়ালের এই আঁকা ছবি দেখে সকলেই খুব প্রশংসা করল । ছবিগুলো খুবই জীবন্ত হয়েছে ! ড্রাগনগুলো যেন সত্যিই আকাশে উড়ে যাচ্ছে ! আবার কিছু সমালোচনাও উঠল । ড্রাগনের চোখে আগুন কোথায় ! - আরে ! ডাগনের চোখে আগুন দাওনি কেন ! এক জন পন্ডিত জিগ্যেস করল । - আগুন না থাকলে কি ড্রাগন হয় ! - - কারন - ওদের চোখে আগুন দিলে ওরা উড়ে চলে যাবে ! – চাং উত্তর দিল। চ্যাং এর কথায় কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না । চ্যাং ঠাট্টা করছে ভেবে ওকে আরও জোর করতে লাগল – ড্রাগনের চোখে আগুন দেওয়ার জন্যে । এমনকি মন্দিরের পণ্ডিতরাও জোরাজুরি করতে লাগল । সবার অনুরোধে বাধ্য হয়েই চ্যাং তার রঙ তুলি নিয়ে আবার মাচায় উঠল ও শুরু করল সেই বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ । বেশ খানিকক্ষণ দ্বিধার মধ্যে থেকে সে চোখের পাতায় আগুনের ফুলকিগুলো আঁকলো - - । প্রথম দুটো ড্রাগনের চোখ আঁকার সঙ্গে সঙ্গেই তারা হঠাৎ মেঘপুঞ্জের বজ্র-বিদ্যুতের মতো শব্দ করতে লাগল । যেন হাজার হাজার বজ্র মন্দিরের ওপর ভেঙ্গে পড়ছে ! চ্যাং মাচার ওপর থেকে রঙ তুলির প্লেট নিয়ে পড়ে গেল মাটিতে । সেই প্রচণ্ড শব্দে উৎসাহী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল । কেউ কেউ মাটিতে পড়ে গিয়ে শুয়ে রইল । কেউ বা থামের আড়ালে গিয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে রইল । প্রচণ্ড একটা সংঘর্ষে মন্দিরের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়ল । কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ড্রাগন দুটো জীবন্ত হয়ে উড়তে উড়তে উড়তে উড়তে অনেক উঁচুতে মেঘের মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে গেল । তাদের আর দেখা গেল না ! সৌভাগ্যক্রমে যে দুটো ড্রাগনের চোখে তখনও আগুন আঁকা হয় নি – তারা দেওয়ালের গায়েই আটকা পড়ে রইল - নিস্পন্দিত ও শান্তিপূর্ণ ভাবে । মনোজ

139

31

মোহিতলাল v2.0

আজকের আপডেট

আজকের আপডেট-২৪ নাহ‚ পরপর দুই সপ্তাহে লঙ উইকেন্ড| ঈষ্টার তো গেলই‚ ২৫শে এপ্রিল ন্যাশনাল হলিডে| আমার তো সবদিনই এখন হলিডে; আপাতত: জুনের শেষ অবধি| এই এত বছর বাদে নিরবচ্ছিন্ন ছুটি উপভোগ করছি| বরবরই তো ছুটি গেছে বাড়ী (দেশে‚ গাঁয়ে) যেতে| যাতায়াত‚ এখানে সেখানে যাওয়ার ধকল‚ ছুটি আর কোথায়! আসলে এটা ইনস্যুরেন্স একরকম| সকলেই জমিয়ে রাখে| তার ওপর নিজস্ব ছুটিও প্রায় বছরখানেকের‚ অবসরের পর অবশ্য নগদ টাকায় বেচা যাবে| এখন দুরূহ সব ক্যালকুলেশন‚ ছুটিতে থাকবো আরও দেড়বছর নাকি অবসর নিয়ে পেনশন + সপ্তাহে ২০ ঘন্টা কাজ? হোয়াই ২০? কারণ তার বেশী করলে নো সিনিয়র কার্ড| কত আর হিসেব করবো; থোড় বড়ি খাড়া| দুটো পয়সা এদিকে লাভ তো ওদিকে হাওয়া| এদিকে আবার ঘরওয়ালী তাঁর কাজের দিন কমিয়ে এনেছেন‚ সপ্তাহে মাত্র তিনদিন| সোম‚ মঙ্গল আর শুক্র| ছুটি বুধ‚ বৃহ| কেন শনি রবির সঙ্গে নয়? মাই ডিয়ার ওয়াটসন‚ লঙ উইকেন্ড এদেশে সাধারণত: শুক্র বা সোমবারে দেয়া হয়| ঐ দিনের ছুটি তাহলে মারা যাবে| আর পারিনা কালীদা‚ এত হিসাব করতে| সমস্যা কি একটা? উনি তো তাঁর আয় কমিয়ে ফেললেন‚ তাহলে ভলান্টারি পিএফে টাকা দিয়ে কি উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে‚ ট্যাক্স ব্রাকেট তো নীচে আসবে| তাঁর অফিসে গিয়ে ওটা অ্যাকাউন্টান্ট দিদিমণিকে জিগাতে হবে| আমার আয় থেকে তাঁর পিএফে টাকা দিতে পারি কিনা‚ তাহলে আমার ট্যাক্সো কমে যাবে| তাহলে আর অবসর রইলো কোথায়? যাক আমার সমস্যা আমাকেই সলভ করতে হবে‚ আপনাদের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে কি লাভ| (২) তিনি তো কাজ ধরিয়ে দিচ্ছেন একটার পর একটা| তরকারী কোটা তো লঘুতম কাজ| রান্নাঘরের জানালার সামনে shrubএর ডালপালা ছোট করতে হবে‚ শীতকালে রোদ আসা চাই; আজ তো গ্যারেজ পরিস্কার করা হলো| এটা সেকেন্ড ইনস্টলমেন্ট‚ তবু শেষ হয়নি| কি না জমা হয়ে আছে| পুরানো সুমিত মিক্সি‚ প্রাণে ধরে ফেলাই হয়নি| জুতোর পাহাড়‚ কি না বাগানে কাজ করতে ঐসব জুতো কাজে আসবে| দেশ‚ আনন্দবাজারের পুজোসংখ্যা| একজন উৎসাহী ভাষাপ্রেমী পেয়েছি আনলোড করার| মেয়েদের স্কুল কলেজের খাতাপত্র‚ বই| ওরা তো বলেই খালাস‚ সব ফেলে দাও|এদিকে সেদিন একটা বই এর খোঁজ করলো| (৩) Gazebo ও কাঠের গেট দুটো আর এবছর বোধ হয় রঙ করা হলো না‚ রোদ নরম হয়ে এসেছে| চড়চড়ে রোদ হবে তবেই না রঙ করে সুখ| ভাবছি‚ হিসেবপত্র কষছি একটু আধটু‚ বাড়ীটা বেচে দিলেই হয়‚ মায়া বাড়িয়ে কি হবে| মেয়েরা তো শেষ অবধি তাই করবে| এদিকে এত বড় বাগান মেনটেন করা বেশ খাটনির| বেচে কুচে ছোট মেয়ের বাড়ীতে ভাড়াটে হয়ে থাকবো কম ভাড়ায়; তার পক্ষেও সুবিধা ভাড়াটে পাবে কি পাবেনা এসব চিন্তা দূর হবে| (৪) নাকি‚ সিডনী চলে যাবো পাততাড়ি গুটিয়ে; বড় শহর হল্লাগুল্লা আছে‚ সেটা মিস করি| এখানে তো অখন্ড নিস্তব্ধতা‚ আর বড় বেশী সাজানো শহর‚ অস্বস্তি হয়| পুরো শহরটাই একটা পার্ক যেন| সিডনীতে আবহাওয়া বম্বের মতো‚ একটু আধটু হিউমিড না হলে কি পোষায়| কিন্তু সেখানে যা বাড়ীর দাম! যত চায়নীজ‚ হংকং‚ তাইওয়ানের ধনীরা এসে দাম দিয়েছে বাড়িয়ে| অভাগা যেদিকে চায়‚ বাড়ীর দাম বাড়িয়া যায়| সিডনীর আরও এবং মুখ্য আকর্ষণ মাছ আর দেশী তরকারী| ঝিঙে‚ মোচা‚ চিচিঙ্গে‚ বরবটি‚ লাউ এবং ঢ্যাঁড়স| (৫) এই গেম থিয়োরীর সমাধান করবে কে? আরও একটা রাস্তা আছে‚ বেশ লোভনীয় কিন্তু ৫৬" ছাতি চাই| দু একজন এমনি করে থাকেন| তবে তারা ট্রু ব্লু অস্ট্রেলিয়ান‚ জিন ই আলাদা| আমি একে কালুয়া তায় বঙস‚ পেটরোগা‚ অম্লশূলের জিন পরিহিত| আমাদের অফিসেরই এক মহিলা তাই করছেন ঠিক এই সময়| বাড়ী বেচে অথবা ভাড়া দিয়ে একখান ক্যারাভান কিনে টেনে টেনে বেড়ানো| ক্যারাভান পার্কে স্বল্পমূল্যে স্পট মেলে‚ স্যুয়ারেজ ও ইলেকট্রিসিটি কানেকশন দেয়| এমনি করে শহর থেকে শহরান্তরে ঘুরে বেড়ানো| কোন জায়গা ভাল লাগলো তো সেখানেই দু মাস; আবার একঘেঁয়ে হয়ে গেলে পরের শহর| শহর মানে শহরের উপান্তে| সবাই বলে‚ দেশটা দেখবার‚ অনুভব করবার এটাই প্রকৃষ্ট পন্থা| এত বড় দেশ- মহাদেশই তো| মেলবোর্ন থেকে পার্থ তো ৪০০০ কিমি‚ কলকাতা থেকে বোধহয় ইস্তাম্বুল! খরচের ব্যাপারটাও মোটামুটি; নিজের বাড়ীর গ্যাস‚ ইলেক খরচ নেই‚ নেই মেন্টেন্যান্স‚ ভাড়াও পাওয়া যায়| হোটেল মোটেলে গিয়ে সুটকেশ খোলা বন্ধ নেই| ক্যারাভান টেনে বেড়ানো আমার দ্বারা হবেক নাই| বরং একটা ক্যাম্পারভ্যান‚ VW ট্র্যান্সপোর্টার কনভার্ট করে বাজারে বেচে‚ দুটো বেড আর খুচখাচ| তবে ক্যারাভানের মতো সব কিছু নিজের নয়| ক্যারাভান পার্কের চান‚ বাথরুম ব্যবহার করতে হয়‚ রান্না অবশ্য পাশে টেন্ট টাঙিয়ে| একদিন Hire car ভাড়া করে ট্রায়াল দিতে হবে‚ আমি পারবো কিনা; ওদিকে তিনিও একটু আধটু পারবেন কিনা| কালীদা দেয়ার ইজ নো শর্টকাট| মাটির ঘরের দাওয়ায়‚ খড়ের চালের নীচে‚ একটা মাদুর (রিয়্যাল মেলে' দিয়ে‚ প্ল্যাস্টিকের নয়) পেতে ঘুমানোর মতো কি স্বস্তি পাবো? ডোন্ট থিঙ্ক সো! (৬) আজ রবিবার‚ যথারীতি ISKCON থেকে ফিরছি‚ Costco থেকে শস্তায় তেল ভরে| দেখি আসছে গাড়ী একটু আলো জ্বালিয়েই নেভালো| এগুলো সহমর্মিতা- মানে এগিয়ে গেলেই পুলিশ ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষারত| ঠিক তাই| আমিও আগত ড্রাইভারদেরকে সতর্ক করলাম| তবে আইন বেশ কড়া‚ পুলিশের গাড়ী দেখলেও তার ৫০০ মিটারের মধ্যে ডিমার ব্যবহার বেআইনী| কিন্তু তা এনফোর্স করা শক্ত| জয়রামজীকী|

835

91

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

সমুদ্রযাত্রা এবং টাইটানিক (প্রকাশিত লেখা)

সমুদ্র মানেই এক অজানার হাতছানি। মানুষ এই অজানাকে জানার চেষ্টা করেছে বারবার, সেই প্রাচীন কাল থেকেই। আমাদের প্রাচীন ভারতেও সমুদ্র যাত্রা ছিল। এই যাত্রা মূলত হত ব্যবসার কারণে। পরে, আরও নানা কারণে এই যাত্রা হত। ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হয়েছে, বহু শতাব্দী ধরে। চিন, আরব, পারস্য আর ইউরোপের অনেক পরিব্রাজকের লেখাতেও এর উল্লেখ আছে। বেশ কিছুদিন আগে, গুজরাতের লোথাল অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার বছর আগের বানানো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ড্রাই ডকের (dry dock) আবিষ্কার হয়েছে। পূর্ব এবং পশ্চিমে, তিনটি মহাদেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে ভারতের বহু হাজার বছর ধরে কৃষ্টি আর বাণিজ্যের সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রমাণ ঐ মহাদেশগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ হাজার আগে তৈরি উর ( UR) এবং সম্রাট নেবুকাডনেজারের (Nebuchadnezzar) প্রাসাদে যে কাঠের তক্তা এবং থাম পাওয়া গেছে, তা হলো ভারতীয় টিক আর দেবদারু গাছের গুঁড়ি থেকে তৈরি। ঋগ্বেদে দেখি:- সমুদ্র দেবতা বরুণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা। বরুণদেবতার আশীর্বাদ ছাড়া, সেকালে এবং এখনও সমুদ্রযাত্রা যে নিরাপদ নয় , সেটা বারবার বলা আছে। মন্ত্রটি হল:-শম্ ন বরুণঃ! অর্থাৎ:- হে সমুদ্র দেবতা বরুণ, তোমার আশীর্বাদ যেন নিরন্তর পাই! এইটাই এখন ভারতীয় নৌবাহিনীর CREST বা ব্যাজ! ১৯৪৮ এ চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী এটা বেছে দেন। বৃক্ষ আয়ুর্বেদে আছে জাহাজ তৈরির বিশদ বিবরণ!!!! শ্রী রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় তাঁর- HISTORY OF INDIAN SHIPPING বইতে লিখেছেন:- ধারা রাজ্যের ভোজ, যাকে আমরা ভোজরাজা বা ভোজ নরপতি নামে জানি আর যিনি প্রাচীন ভারতে ম্যাজিকের স্রষ্টা( ভোজবাজী হচ্ছে- MAGIC এর কমন বাংলা), কৌটিল্য বা চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের মতই একটা বই লিখেছিলেন। নাম:- “যুক্তি কল্পতরু”। এতে রাজ্য শাসনের বিস্তৃত তথ্য আছে। এরই মধ্যে, একটা অংশ হলো বৃক্ষ আয়ুর্বেদ। এই খানে জাহাজ তৈরির জন্য কাঠের জাতি বিভাগ বা WOOD CLASSIFICATION আছে। আমাদের সামুদ্রিক ইতিহাসের আরও অনেক কথা, অনেক ঘটনা নানা জায়গায় আছে, যা হারিয়ে যাওয়া পুঁথি এবং তথ্যে দেখতে পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরিব্রাজক মার্কো পোলো তাঁর ডায়রিতে লিখে গেছেন, তখন ভারতে তৈরি জাহাজে থাকতো চারটি মাস্তুল, চোদ্দটি ওয়াটার টাইট কম্পার্টমেন্ট, ষাটটি কেবিন আর দশটি লাইফবোট আর ক্রেন। এবার ভাব, এইসব তো একদিনে তৈরি হয় নি! এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, সমুদ্রযাত্রার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং তার পর আরও উন্নত করার প্রচেষ্টা। যখন মানুষের নানা বিষয়ে শ্রীবৃদ্ধি হয়, যখন বৈভব এবং ঐশ্বর্য তাদের কাছে সুখ বাড়াতে সাহায্য করে, তখন নিজের দেশ ছেড়ে দুর্গম স্থানে পাড়ি দিয়ে, ব্যবসা করে উত্তরোত্তর বৈভব এবং ঐশ্বর্য বাড়ানোর জন্য নিজের জান কবুল করতেও দ্বিধা করে না। তখনকার সময়ে রাস্তাঘাটে, হিংস্র জন্তু, ডাকাতকে মোকাবিলা করে, অপার সমুদ্র পাড়ি দিতেও দোনোমোনো করত না। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু কম্পাস ছিল না! তাহলে এরা দিকভ্রষ্ট হত না কেন? এখানেই খুব সহজ উত্তর আছে। ব্যবসার জন্যই জ্ঞান- বিজ্ঞানের চর্চা আর জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছিল। লিখতে যতখানি সময় লাগছে, তার চেয়েও ঢের বেশী সময় লেগেছে এই ব্যাপারে গবেষণা করতে। এই সমুদ্র যাত্রার বিপদও ছিল অনেক। জাহাজ ডুবিতে প্রচুর মানুষের প্রাণ গিয়েছে। তাও মানুষ এই নেশাটা ছাড়তে পারে নি। ফলে, আমাদের দেশে সমুদ্র যাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়। জাত- ধর্ম যাবে, এই দোহাই দিয়ে কালাপানি বা সমুদ্রযাত্রা নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ তো গেল, প্রাচীন ভারত বা পৃথিবীর কথা। ফিরে আসি মাত্র একশ পাঁচ বছর আগের কথায়। ইংল্যাণ্ড থেকে আমেরিকায় যাতায়াতের জন্য দরকার পড়ত আটলান্টিক মহাসাগর পেরনোর। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিমান বা প্লেন ছিল না। জাহাজই ছিলো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার একমাত্র ভরসা। ইউরোপ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার জাহাজ ব্যবসা ছিল খুব লাভজনক। কম সময়ে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পার হবার জন্য, যাত্রীদের আকৃস্ট করতে জাহাজ কোম্পানী গুলোর মধ্যে চলত প্রতিযোগীতা। ঐ সময়ের ইংল্যান্ডের প্রধান দুই জাহাজ কোম্পানী হল হোয়াইট স্টার(White Star) এবং কুনার্ড( Cunard )। ১৯০৭ সালে কুনার্ড কোম্পানী যখন খুব কম সময়ে আমেরিকা পৌছানোর দ্রুতগতি সম্পন্ন জাহাজ লুইজিতানিয়া (Lusitania )এবং মৌরিতানিয়া ( Mauretania) তাদের বহরে যোগ করল , চিন্তায় পড়ে গেলেন হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর চেয়ারম্যান ইসমে ( J. Bruce Ismay )। বেলফাস্টের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) এর মালিক উইলিয়াম পিরি ( William Pirrie,) এর সাথে পরামর্শ করে তিনটা বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ অলিম্পিক( Olympic ) টাইটানিক (Titanic)এবং ব্রিটানিক(Britannic, এটাও ডুবে গেছিল। ) তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। এই কোম্পানীর সব জাহাজেরই নাম শেষ হতো “ইক” দিয়ে। এই নামকরণের আর একটু ইতিহাস বলে নিলে, সুবিধে হবে। গ্রিক পুরাণে জাইগান্টোস (Gigantos) হচ্ছে, ধরিত্রী দেবী গেয়া (Gaea) এবং আকাশ দেবতা ইউরেনাসের (Uranus) একশ সন্তান, দৈত্যাকার বন্য এক প্রজাতি। এরা দেখতে মানুষের মত, কিন্তু সুবিশাল আকার ও শক্তির জন্য খ্যাত। জাইগান্টোমেকি (gigantomachy) নামে এক যুদ্ধে অলিম্পিয়ানদের (Olympian) হাতে এরা ধ্বংস হয়ে যায়। জাইগান্টোসদের মতো টাইটানরাও গেয়া ও ইউরেনাসের সন্তান আরেকটি প্রজাতি। অলিম্পিয়ানদের সর্দার জিউস টাইটানোমেকি (titanomachy) যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার আগে এরা পৃথিবী শাসন করত। এদের নাম থেকে টাইটানিক শব্দটি পাওয়া যায়, যার মানে অত্যন্ত বৃহদাকার। ১৯০৯ সালে হারল্যান্ড এন্ড উলফ (Harland and Wolff) কোম্পানির এনজিনিয়ার, টমাস এন্ড্রু (Thomas Andrews ) র নকশায় শুরু হল টাইটানিক জাহাজের নির্মাণ কাজ। সেই সময়ের সবচেয়ে বড় এবং বিলাসবহুল জাহাজ হিসেবে টাইটানিককে গড়ে তোলা হল। জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজকে ভাগ করা হয় ১৬টা আলাদা প্রকোষ্ঠে বা চেম্বারে। এক প্রকোষ্ঠ হতে অন্য প্রকোষ্ঠে জল ঢোকা ছিল অসম্ভব । ১৬ টার মধ্যে ৪ প্রকোষ্ঠে জল ঢুকলেও জাহাজ ভেসে থাকতে অসুবিধা হত না। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন টাইটানিক জাহাজ কোনদিন ও ডুববে না। ৩১শে মে ১৯১১ সালে ২২ টন সাবান দিয়ে মসৃণ করে তোলা রাস্তা বেয়ে জলে নামান হল টাইটানিককে। জলে নামানোর সময় কাঠের তক্তা পড়ে মারা যায় এক কর্মী। জানা নেই. তারই অভিশাপ লেগেছিল কিনা টাইটানিকের ওপর। তারপর শুরু হল যন্ত্রপাতি লাগানো, সাজশয্যা। ১৯১২ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে পরীক্ষামূলক সমুদ্র যাত্রা শেষ হওয়ার পর তাকে নিরাপদ এবং আরামদায়ক সমুদ্র ভ্রমন উপযোগী জাহাজ হিসেবে হস্তান্তর করা হল জাহাজ কোম্পানীর কাছে । জাহাজের পুরো নাম হল RMS Titanic (Royal Mail Ship = RMS)। ওজন-৪৬,৩২৮ টন। লম্বায়- ৮৮২ ফুট ৬ ইঞ্চি। গতিবেগ :-ঘন্টায় ২৩ নট বা ৪৪ কিলোমিটার। ধোঁয়া বোরোনোর জন্য ফানেল ছিল, ৪ টে। প্রত্যেকটার উচ্চতা ছিল- ৬২ ফুট। ২৯ টা বয়লার ছিল, বাষ্প তৈরি করার জন্য। যাত্রী বহন ক্ষমতা ছিল-৩৫০০। যদিও প্রথম ও শেষ যাত্রায় যাত্রী ছিলেন-২২২৪ জন। এদের মধ্যে বেঁচে ফিরেছিলেন মাত্র ৭১০ জন। জাহাজে, কুকুর ছিল ১০ টা। সব কটাই মারা গেছিল। এই জাহাজ কোনোদিন ডুববে না, এই ঘোষণা হয়, সেই সময়। তাই জাহাজে ৬৫ টি লাইফবোট নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ঐ দিন ছিল মাত্র ২০ টি । লাইফবোটের মোট ক্ষমতা ছিল ১১৭৮ জন। কিভাবে লাইফবোট ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে মহড়া অনুষ্ঠানের কথা ছিল ১৪ই এপ্রিল,১৯১২ র সকালে। অজ্ঞাতকারনে টাইটানিকের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ ঐ দিন মহড়া অনুষ্ঠান বাতিল করেন। মহড়া হলে আরো কিছু জীবন রক্ষা পেত এমন ধারনা করেন অনেকে। আটলান্টিক পেরুনোর ,২৬ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের। এইখানে একটা কথা বলা দরকার। সেইসময়, পাল তোলা জাহাজের আর বাস্পচালিত জাহাজের ছিল যুগসন্ধিক্ষণ। দুরকম ভাবে জাহাজের মুখ ঘোরানো হত। পাল তোলা জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে, ঠিক তার উল্টো দিকে হুইল/ টিলার ঘোরাতে হত। একে বলা হত, “টিলার অর্ডার”। বাস্পচালিত জাহাজের মুখ ঘোরাতে হলে, যে দিক ঘোরাতে হবে সেইদিকেই হুইল/টিলার ঘোরালেই হত। একে বলা হত “ রাডার অর্ডার”। জাহাজের চালক, রবার্ট হিচিনস, এই দুটোই জানতেন। কারণ, তখন আটলান্টিক পেরুনোর জন্য এই দুটো পদ্ধতিই জানা আবশ্যিক ছিল। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, এই ষ্টিয়ারিং ভ্রান্তি। জাহাজ কম সময়ে পাড়ি দেবে, আর ডুবে যাবে না, এই ধারণাতেই ক্যাপ্টেন স্মিথ সমুদ্রে বড় বড় হিমশৈল থাকার প্রায় গোটা সাতেক সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছিলেন। পরে জানা গিয়েছিল, হোয়াইট স্টার লাইন (White Star) কোম্পানীর অন্যতম মালিক ব্রুসের নির্দ্দেশ ছিল ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথের ওপর, তিনি যেন কোনো অবস্থাতেই জাহাজের গতিবেগ না কমান। পরে, হিমশৈল থাকার বিপদ বুঝে, ফার্ষ্ট অফিসার উইলিয়াম মার্ডক যখন চালক হিচিনসকে পরামর্শ দেন, জাহাজের মুখ ঘোরানোর জন্য, তখন হিচিনস ভয়ে, “টিলার অর্ডার” আর “ রাডার অর্ডারের” মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। “টিলার অর্ডার” দিয়ে তিনি জাহাজের মুখ ঘোরানোর চেষ্টা করলেও জাহাজ কিন্তু আসলে, হিমশৈলের দিকে গিয়ে ধাক্কা মারে। তারপরেই ঘটে যায়, ঠিক শতাব্দী প্রাচীন সেই মারাত্মক দুর্ঘটনা। আমরা সবাই সেই আত্মাদের শান্তি কামনা করি, যারা মারা গিয়েছিল, সেই অভিশপ্ত রাতে। ১৫/০৪/১৯১২ র রাত ১.৩০ থেকে রাত ৩.৩০ এর মধ্যে।

27

4

মোহিতলাল v2.0

শটকে শঙ্খ হ'

শটকে শঙ্খ হ' (৮) হাইস্কুল বোর্ডিং‚ভাতের বদলে কাঁচকলা প্রিয় সুবর্ণা‚ আমার শ'টকে শঙ্খ হতে অনেক দেরী‚ কে জানে‚ আদৌ সাঙ্গ হবে কিনা‚ নাকি মাঝপথেই যবনিকা পতন! এখন তো বিশের দশকের কথা অতিক্রম করতেই পারলাম না; আমার বয়সের দশক‚শতাব্দীর নয়| তোমায় বোর্ডিং স্কুলের কথা আগে একটু আভাস দিয়েছি| উটি বা কালিম্পং পাহাড়ের মিশনারী স্কুলের বা রামকৃষ্ণ মিশনের মত কোন প্রাতিষ্ঠানিক আবাস এটা ছিল না‚ নিতান্তই সাদামাটা এক মহকুমা শহরের হাই স্কুলের সংলগ্ন দেড়খানা বিল্ডিং| দেড়খানা? প্রথমটায় পাঁচ আর পাঁচ মিলে দশটা ঘর‚ যমজ বিল্ডিংটা অসম্পূর্ণ‚ কেবল নীচের তলাটা বাসযোগ্য‚ ওপরতলার ছাদ ঢালাই হয়নি কোন কারণে‚ কোন গ্রীক ধ্বংসাবশেষের মত দেয়াল আর জানালার খোপ শুধু| (২) বুঝলে বর্ণা‚ জীবনে discrimination এর অভিজ্ঞতা সেই সময় থেকে শুরু| ঐ বোর্ডিঙে থেকে যারা পড়াশোনা করতো তারা সবই অজ পাড়াগাঁ এবং তস্য গাঁ মানে আবাদ অঞ্চলের ছেলেরা| আবাদ বলতে সুন্দরবনের ধার ঘেঁষা গ্রাম‚ ওদের সব নামই খালি দিয়ে শেষ হত‚ ধুচনিখালি‚সন্দেশখালি এইসব| ওরা সবাই বাড়ী যেত লঞ্চে করে‚ তখন অবধি নদীপথই ভরসা; আজকাল শুনি বাসপথও হয়েছে এবং ইছামতীর নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে লঞ্চ সার্ভিস ও নেই| (৩) মহকুমা শহরের নামকরা স্কুল‚ আমরা গুটিকয়েক ছোঁড়া কেবল বাইরের‚ গ্রাম থেকে আসা; ডায়ালেক্ট আলাদা‚ কথায় স্পষ্ট টান‚ চেহারায় গাঁইয়া ছাপ; bullying এর আদর্শ শিকার| তারপর যখন কলকাতায় হোষ্টেলে গেলাম‚ সেখানে যথারীতি কলকাতার লোক্যাল ছাত্ররাই সংখ্যাগুরু| (ছাত্রী? মোট আড়াই হাজারে মেরেকেটে পঞ্চাশ জন)! সেখানে আমি ও আমরা মফ:স্বলীরা সংখ্যালঘু | তারপর ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের শহরে বসবাস করতে গিয়েও সেই একই দশা‚ আমি গুটিকয়েক বাঙালীর একজন; ব্যাঙ্গালোরে তখন বড় জোর হাজারখানেক পরিবার মাত্র! বিদেশে এলাম‚ সেখানেও অল্প কিছু ভারতীয়দের মধ্যে একজন| মানে বুঝতে পারছো‚ সারাটা জীবন সংখ্যালঘুদের একজন হয়েই কাটালাম! সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল‚ মহকুমা শহরে যে ছেলেটি আমায় গাঁইয়া বলে নাক শিঁটকাতো‚ কলকাতার হোষ্টেলে সে নিজেই কিন্তু আমার মত নিপীড়িতদের দলে‚ আর Lo and behold! ইন্ডিয়াতে আমার এক সাঁওতাল আদিবাসী সহকর্মী ছিলেন‚ বিদেশে সে এবং আমি একই‚ BLACK! কালুয়া| No discount for the difference in shade! এদেশে দেখি অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা বড় বেশী যেন ভারতীয়‚ কলকাতা বলতে অজ্ঞান‚ home বলতে ইংল্যান্ড বোঝায় না! (৪) সুশীল বাবু হোস্টেল সুপার‚ ইয়া তাগড়া আশুতোষ মার্কা গোঁফ‚ আর হুঙ্কারও দিতেন তেমনি| নানা রকম বিধিনিষেধের গন্ডী‚ রাত নটার পর আলো জ্বলবে না‚ ঘড়ি ধরে খাবার ঘন্টা বাজবে‚ সিনেমা দেখা নৈব নৈব চ| কালে কালে কি হল‚ সেই সব সিনেমা তো আজকালকার জমানায় মথী লিখিত সুসমাচারের ন্যায় নিষ্পাপ পবিত্র! (৫) দু দুটো খাবার ঘর‚ পর পর দু ব্যাচে; পিঁড়িতে বসে পাত পেতে খাওয়া| মেদিনীপুরবাসী এক ঠাকুর রন্ধন ও পরিবেশন করতেন| কি সব দিনই না ছিল‚ সবাই মিলে এক সাথে প্রায় বিয়েবাড়ীতে খেতে বসার স্টাইলে পংক্তিভোজন| অবশ্য প্রায় প্রতিদিনই আধপেটা খেয়ে থাকার মত‚ অন্তত: এখন তাই মনে হয়; অত অত তরতাজা সব ছেলে‚ কি এমন বেশী রান্না হত! ডাল‚ তরকারি ও এক টুকরো মাছ; সবই মাপা| দোষ দেখিনে‚ আমাদের দেশে খাবার দুর্মূল্য বরাবরই| এখন বিদেশে দেখি সবই উল্টো‚ এত সহজলভ্য আর শস্তা| সেজন্যেই কিনা জানিনা কালুয়াদের (সব ভ্যারাইটি) নিমন্ত্রণে (party) দশ বারো এমনকি পনেরো পদের উপহার; কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবে! (৬) রোজ বাজারে যাবার পালা পড়তো এক এক জনের‚ বাজার এনে মাছ কিভাবে কত পীস কাটা হবে তারই দায়িত্ব| যথারীতি বড় মাছটা পাবার জন্যে সবার আকুলতা তো ছিলই; এইখানে আমাদের হেমন্ত বাবু‚ মহামান্য ঠাকুর এক অতি সুক্ষ্ম চাল দিতেন| আমরা সকলেই তার করুণা পাবার লোভে‚ "হেমন্তদা‚ এই নাও দশ পয়সা‚ বিড়ি খেও"| এই ঘুষ দেয়া কার্য্যটি সকলে গোপনেই সারতো| উফ:‚ কি দুর্গন্ধ সিঁড়ির নীচে ঠাকুর মশায় এবং দুজন কর্মীর সেই ঘরটায়! এতকাল বাদেও গা গুলিয়ে আসছে যেন| ইলিশ মাছের বড় পেটি অথবা বড় গাদার মাছটির জন্যে সেই ক্ষণিকের অস্বস্তি ও আত্মসম্মান বিসর্জন এমন কিছু কষ্টের মনে হতো না| তবে কি‚ হেমন্তবাবু এই কমপিটিশানটা সর্বদা জিইয়ে রাখতেন‚ দশ পয়সার ঘুষে দিনের পর দিন বড় পীসের আশা করা বাতুলতা তা তিনি তাঁর কাজের মধ্যে বুঝিয়ে দিতেন| সেই হল আমার কাছে ম্যানেজমেন্টের প্রথম পাঠ| (৭) এই প্রসন্গে আমার এক বন্ধুর মায়ের কথা মনে পড়লো| তাদের বাড়ীতে আমার উত্তর কৈশোর ও প্রথম যৌবনের অনেক দিন কেটেছে| অত্যন্ত সাদাসিধা মানুষ‚ অমায়িক এবং দয়াশীলা‚ আমার কাছে সারদা মায়ের সমান তিনি| বড় ঘরের গৃহকর্ত্রী‚ কাজের মহিলা (ঝি) নিয়োগের ব্যাপারে তাঁর এক অদ্ভুত নিয়ম ছিল| কারুর কাজ জল আনা জলভরা‚ কারুর কাজ রান্নাটুকু মাত্র‚ আবার কারুর শুধুই ঘর ঝাড়ু‚ মোছা; সবাইকে সেই কাজটুকুর জন্যেই পারিশ্রমিক দিতেন| তখন দেখে মনে হত‚ একজনকে দিয়ে করালেই তো মিটে যায়| কিন্তু না‚ ওটাই তো অ্যাসেম্বলী লাইনের ফান্ডা প্লাস ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনশেরও| কেউ একদিন ডুব মেরে সংসার অচল করে দিতে পারবে না‚ না পারবে তার বারগেনিং পাওয়ারের অপব্যবহার করতে| কল কারখানা তাও বড় সাইজের ছাড়া কোথায় আর ইউনিয়ন এই ২১ শতকেও| আর স্পেশালাইজেশন তো আছেই| (৮) সুশীলবাবু ছাড়াও আরো দু একজন মাষ্টারমশাই বোর্ডিঙএ থাকতেন‚ তাঁরা দূরের মানুষ; আজকাল এসব দেখি উঠে গেছে‚ রোজ রোজ তিন চার ঘন্টা ডেলিপ্যাসেঞ্জারী করাটা কোন ব্যাপারই নয়| বোর্ডিং এ অবশ্য মাষ্টারমশাই হোনে কে নাতে তাঁরা কিছু অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করতেন; যেমন চারটে খাটা পায়খানার একটা ওঁদের জন্যে তালা দেয়া‚ বাকী তিনটে আমজনতার জন্যে অবারিত দ্বার| ইয়েস‚ access to an exclusive privy একধরনের privilege তো বটেই! একবার কোন একজন স্যার চাবিটি ভুলে রেখে এসেছিলেন‚ ব্যস‚ তার পর থেকে আমাদের গুলো পরিষ্কার করানোর জন্যে সুপারকে বার বার বলে মাথা খুঁড়তে হতো না‚ ওঁদেরটায় একটু অপকর্ম করে রাখলেই কেল্লা ফতে| আর বেচারী অল্পবয়সী স্যার ভদ্রলোক মিছামিছিই সুপারের তির্য্যক মন্তব্যের শিকার হতেন! (৯) সেই সব সোনাঝরা দিন‚ সকালে উঠে পুকুরঘাটে মুখ ধোয়া‚ পড়তে বসা‚ পুকুরেই চান; এপার ওপার মিলে দুটো ঘাট (ওপারের ঘাট লেডিজ ওনলি!)| সকাল থেকে সন্ধ্যে সর্বদাই প্রায় socialising‚ হৈ চৈ বন্ধু বান্ধব; এখন যেটা নিয়ম করে ঘড়ি ধরে সপ্তাহান্তের জন্যে আলাদা রাখা; দেখি তো‚ একা একা থাকতে থাকতে কত কত মানুষ নিজের সাথেই কথা বলে‚ কেউ বা হয়তো ডিপ্রেশনের শিকার| (১০) ব্যতিক্রম কি ঘটতো না? শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নির্বিশেষে ছাতা মুড়ি দিয়ে ম্যাটিনী শো তে টুক করে ঢুকে পড়া‚ উত্তম কুমারীয় কায়দায় কাঁচিমার্কা ধরিয়ে কাশির দমক| এর মধ্যেই যারা একটু অকালপক্ক ( আসলে স্মার্ট) তারা সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে বোর্ডিং সংলগ্ন খেলার মাঠে চক্কর কাটতো‚ মাঠের অন্য কোন থেকে বিশালাক্ষী হাওয়া খেতে আসতো| এই একটি নামই স্মৃতিতে রয়ে গেছে‚ আমারই এক রুমমেট দাদার beau| মোবাইল ফোন‚ SMS‚ ফেসবুকের এই জমানায় সেইসব দিনের ফষ্টিনষ্টির গল্পকথা তো প্রায় মহাভারতের যুগের পৌরাণিক কাহিনীর মত শোনাবে| (১১) এরই মধ্যে খাদ্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে‚ নুরুল ইসলাম শহীদ হয়েছেন আমাদের শহর থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে‚ কয়েকদিন আগে| সেই ঢেউ আছড়ে পড়লো মহকুমা শহরের SDO সাহেবের বাংলোর সন্নিহিত কোর্ট হাউসে| ভাতের বদলে কাঁচকলা খান‚ মুখ্যমন্ত্রীর উপদেশ আসছে রেডিওতে| এমনই একদিন দুপুর নাগাদ পুলিশের সন্গে খন্ডযুদ্ধ চলছে স্কুলেরই পাশের রাস্তায়; আমরা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি কৌতূহলভরে| হঠাৎ ফটাস‚ ফটাস আওয়াজ| পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করেছে‚ দু একজন পড়ে গেল পায়ে গুলি লেগে| আমরা লেজ তুলে টুক করে হোস্টেলের ভিতর| অহেতুক কৌতূহলের সেখানেই সমাপ্তি| খাদ্য আন্দোলন বাড়তেই থাকলো| এটা সেটা কারণে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা পিছোতেই থাকে‚ একদিক দিয়ে আমার পক্ষে সেটা সুবিধেজনকই হল‚ পড়াশুনার ফাঁকিটা পূরণ করার সুযোগ পেলাম‚ ভাগ্যিস! তখন তো টাকা দিয়ে ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের সীট কেনা যেত না‚ আর অত টাকাও বা কে দিতো! (১২) নাইন‚ টেন ‚ ইলেভেন মাত্র তিনটি বছর; সেই প্রথম বাইরের জগতের সন্গে যোগাযোগ- বাবা মা ঠাকুমা কেউ নেই সাথে‚ একলা পথ চলার শুরু‚ আপাত অন্তহীন সেই যাত্রার সমাপ্তি কোন শহরের কোন crematoriumএ হবে কে জানে! ওয়ান ওয়ে স্ট্রীট দিয়ে কেবলই এগিয়ে চলা‚ ফিরিবার পথ নাহি| আজ এই পর্য্যন্ত| কথা দিচ্ছি তোমার আর বেশী লিখে বিরক্তি উৎপাদন করবো না| পরের চিঠিতেই ইতি টানবো| ইতি শুভেচ্ছাসহ‚ সুহাস

260

42

stuti..

ছাইপাঁশ

পাখা কাহিনী ফ্যান বলতে আমরা বুঝি বৈদ্যুতিক পাখা । আমাদের দেশে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৮৭৯ সালে । বিদ্যুৎ আসার আগে গরমের দাবদাহ থেকে মুক্তি পেতে সাধারন মানুষ হাতপাখা আর বড় লোকেরা টানা পাখা ব্যবহার করতো । হাতপাখা বানানো হত প্রধানত তালপাতা দিয়ে । ডাঁটি শুদ্ধ পাতার গোঁড়ার দিকের অংশ গোল করে কেটে পাখা বানানো হোত ।তার ওপর রংবেরঙের নকশা আঁকা থাকত । বাড়ীর মেয়েরা এম্ব্রডারী করে সুন্দর ঝালর বানাতো  । এই পাখা হাওয়া দেয়া ছাড়াও আর একটি কাজে বহুল ব্যবহৃত হত । সেটি হল ছোট ছেলেমেয়েরা বদমায়সী করলে তাদের পেটানোর কাজে । বড় লোকেদের বাড়ীতে থাকতো ঝালর দেয়া টানা পাখা । চাকর দূরে বসে সে পাখার দড়ি টানতো আর বাবুরা সুখ নিদ্রা দিতেন । আর এক ধরণের পাখা পাওয়া যেত যাকে বলতো চাইনিজ পাখা । ছোট্ট ভাজ করে ব্যাগের মধ্যে রাখা যেত । গরমের হাত থেকে মুক্তি দিতে পরবর্তী কালে এল বৈদ্যুতিক পাখা । সুইচ টিপলেই বনবন করে ঘোরে , শীতল হাওয়া ছড়িয়ে পরে । আগে পাখাতে ছিল তিনটে ব্লেড এখন ৪/৫ ব্লেডওলা পাখাও পাওয়া যায় । জানি না তাতে হাওয়া বেশী হয় কিনা । অবশ্য পাখার হাওয়া এখন আর আমাদের ঠাণ্ডা করতে পারে না । এসেছে এসি । নিঃশব্দে ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঘর ভরে দেয় । বাইরে কাঠফাটা রোদে মাটি ফেটে গেলেও আপনি ঘুমাবেন হিমালয়ের হিমেল হাওয়ায় । পাখার সাথে প্রথম পরিচয় আমার সেই ছোট্টবেলায় । আমাদের বাড়ীটি দোতলা । ওপর নিচে চারটি ঘর আর চারটি দালান ( বারান্দা ) ।আজকালকার মত ঘরে ঘরে ফ্যান ছিল না । সাকুল্যে তিনটে ফ্যান ছিল তারমধ্যে দুটী টেবিল ফ্যান ও একটি সিলিং ফ্যান । সিলিং ফ্যানটি লাগানো ছিল বসার ঘরে । অতিথি এলে তাকে ফ্যানের হাওয়া খাইয়ে শ্রান্ত করা হবে । ঘরের কড়িবরগার উঁচু ছাদ থেকে দুইফুট রড দিয়ে ফ্যানটি ঝুলতো । ফ্যানটির সাইজ এত ক্ষুদ্র আর ঘরটির সাইজ এত বৃহত ছিল যে অতিথি ওর নীচে বসেও কুলকুল করে ঘেমে উঠত  । কিছুক্ষন ফ্যান চললেই হাতবাক্সের মত রেগুলেটর রেগে গনগনে গরম হয়ে যেত । তখন তাকে ছুলেই হাতে ফোসকা অবধারিত ।তাও সৌজন্য রক্ষার্থে বড়রা রেগুলেটরটি বার বার এক থেকে আটে ঘুরাতো কোন সুরাহা হত না । অতিথি একবার রেগুলেটর একবার ফ্যানের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত । অবশেষে বিদায় নিতেন । টেবিল ফ্যান দুটির একটি থাকত ঠাকুমা ঠাকুরদার বিছানায় । অপরটি দোতলায় আমাদের বিছানায় । সে বিছানা ছিল দুটি ডবলবেডের চৌকি জোড়া দেওয়া বিরাট বিছানা  । রাতে ফ্যানটি মশারির মধ্যে নিয়ে শোয়া হত । ফ্যানটি ছিল মহা ঠ্যাটা আর মেজাজী । আজকালকার স্লিক স্মাট টেবিল ফ্যানের মত নেচে নেচে হাওয়া দিত না । একরোখার মত একদিকে ঘাড় বেঁকিয়ে হাওয়া দিত  । ভাবখানা এমন যদি হাওয়া খেতে হয় আমার সামনে এসে বস নতুবা গরমে ছটফট কর । তাই ধারের দিকে যারা শুত তাদের হাতপাখাই ভরসা । তবে ফ্যানটি শুধু আমাদের হাওয়া দিত না সাথে একটা ঘুম পাড়ানি মিউজিক ও শুনাতো । যেমন সুইচ অন করলেই ফ্যান ঘুরতে শুরু হত সাথে গ্যা গ্যা …...............।। একটু পরেই সুর পালটে যেত গ্যাঙর গ্যাঙর..................।। বিভিন্ন সুরের মূর্ছনা শুনতে শুনতে আমরা ঘুমের দেশে পাড়ি দিতাম । এভাবে গলা সাধতে সাধতে মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ফ্যানের গলা ব্যাথা হয়ে যেত । তখন সে হাওয়া ও সুর বন্ধ করে গো গো রব তুলে বিশ্রাম নিত । আমাদের ঘুম যেত ভেঙে । সেসময় ফ্যানটিকে একটু খুঁচিয়ে দিতে হত । বাবাকে দেখতাম পাখার ডাটি দিয়ে ফ্যানের ব্লেড ঘুরিয়ে দিত । বিরক্ত ফ্যানটি অলস গতিতে আবার চলতে শুরু করতো । কয়েকবার এরকম হলে পরবর্তী রবিবার বাবা ফ্যানটির খোলনালচে খুলে তেল ,গ্রীজ লাগাতেন । তেল জল পেয়ে কয়েকদিন ফ্যানটি মহা উদ্যমে বনবন করে ঘুরত । তারপর আবার যেকে সেই । এইভাবেই টেবিল ফ্যান আর তালপাতার পাখার হাওয়া খেয়ে আমরা বড় হচ্ছিলাম । সময়ের সাথে সাথে আমাদের ফ্যানগুলি বৃদ্ধ থেকে বৃদ্ধতম হয়ে বাতিলের ঘরে কলিং বেল বাজাতে লাগল ।। এক সন্ধ্যায় এলেন নতুন ফ্যান  । জি ই সি কোম্পানীর ধবধবে ফর্সা সুন্দরী তন্বী মেমসাহেব । বাবা আবার মিস্ত্রী ডাকা পছন্দ করতো না । বাড়ীর সমস্ত কলকব্জা নিজেই মেরামত করতো । ফ্যানটি নিজেই লাগিয়ে ফেলল  । সুইচ অন করলেই ঘরময় মিষ্টি শীতল হাওয়া খেলে বেড়াত । প্রচণ্ড রোদে তেতেপুড়ে এসে ঐ ফ্যানের নিচে বসলেই ঠাণ্ডা হয়ে যেতাম । রেগুলে্টারটাও বেশ ভদ্র ছিল  । এক দুয়ে মৃদুমন্দ হাওয়া দিত আর ছয়ে এনে দিত কাল বৈশাখী । এই ফ্যানটি আজও আমাদের বাড়ীতে বিরাজ করছে । ৪০/৪৫ বছর ধরে সমানে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে । তবে মাঝে মাঝে ওকে জলপানি খাওয়ানো হয়েছে । মেমসাহেব থেকে সে এখন কালুয়ার রুপ ধারণ করেছে  । কিন্তু সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে । ফ্যানটির এরকম অবিচ্ছিন্ন সার্ভিস দেওয়ার জন্যই বোধহয় ঐ কোম্পানী ফ্যান বানানো বন্ধ করে দিয়েছে । ভাবুনতো একটা ফ্যান যদি তেলজল খেয়ে ৪০/৪৫ বছর সার্ভিস দেয় তালে কোম্পানী লাটে উঠবে না কেন ? এই সারমর্ম আজকালকার ফ্যান কোম্পানীরা বুঝেছে তাই আমাদের বাড়ীতে আর মান্ধাতা যুগের ফ্যান শোভা পায় না । নিত্যনুতন সুন্দরীরা ছাদ আলো করে ঘর শীতল করে । কয়েক বছর পরেই বিদায় নেয় ।

174

28

সঞ্চিতা চ্যাটার্জী

যদি জানতেম

তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি:। শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিবাদ্যেব ধাতু:।। (মহাকবি কালিদাস) তন্বী, শ্যামা, আর সুক্ষদন্তিনী নিম্ননাভি, ক্ষীণমধ্যা, জঘন গুরু বলে মন্দ লয়ে চলে,চকিত হরিণীর দৃষ্টি অধরে রক্তিমা পক্ক বিম্বের, যুগল স্তনভারে ঈষৎ-নতা, সেথায় আছে সে-ই, বিশ্বস্রষ্টার প্রথম যুবতীর প্রতিমা। (শ্রী বুদ্ধদেব বসু) দীপ্তর একবার শখ হয়েছিল কালিদাসের রচনা পড়বে| সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি না থাকায় উপযুক্ত বাংলা অনুবাদের সন্ধানে ছিল| সেই ভাবেই সন্ধান পায় বুদ্ধদেব বসুর মেঘদূত এর| পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যেত‚ যেভাবে কালিদাস যক্ষপ্রিয়ার রূপ বর্ণনা করেছেন‚ আধুনিক সাহিত্যে কখনো দেখতে পায় নি নারীর শারীরিক সৌন্দর্য্যর এরকম বর্ণনা| শরীর কে কি করে প্রেমের মন্দিরে স্থাপন করা যায় তার অপূর্ব আলেখ্য ফুটে ওঠে সেই আখ্যানে| তারপরে পড়ে কুমারসম্ভব| পার্বতীর রূপের বর্ণনা| অপরূপ ভাবে পার্বতীর শরীরের প্রতিটি অংশ উঠে এসেছিল সেই বর্ণনায়| কোমল বাহু‚ নীলকান্ত মণির আভাযুক্ত নিম্ন নাভি‚ কৃশ কটি‚ এমন কি নিতম্বের বর্ণনাও করেছেন মহাকবি| দীপ্তর কালিদাস পূর্ববর্তী কোন লেখকের লেখা পড়া হয় নি| তবে জেনেছে তাঁরা শুধু পার্বতীর স্তনযুগল বর্ণনা করতেই শ্লোক রচনা করেছেন অস্ংখ্য| সেই তুলনায় কালিদাস অনেক পরিমিত‚ অনেক সংযত| আশ্চর্য সেই বর্ণনা পড়ে সেই নারীর প্রতি কামনা জাগে| কিন্তু কখনো শ্লীলতা পরিহার হয়েছে বলে মনে হয় না| আধুনিক সাহিত্য অনেক পড়েছে দীপ্ত| কমপ্রিহেন্সিভ ক্লেইম করতে না পারলেও‚ অনেক | রবীন্দ্রনাথ‚ শরৎচন্দ্র‚ প্রভাত মুখোপাধ্যায়‚ প্রমথ বিশী‚ বুদ্ধদেব বসু‚ শরদিন্দু‚ সুনীল‚ শীর্ষেন্দু‚ বুদ্ধদেব গুহ‚ সমরেশ বসু‚ শঙ্কর| এই ভাবে নারী সৌন্দর্যর বর্ণনা কেউ করেছেন বলে মনে পড়ছে না| বেশিরভাগ ই নারী সৌন্দর্য মুক্তর মত হাসি‚ মরাল গ্রীবা‚ ধনুকের মত ভুরু আর আয়ত চোখে সীমাবদ্ধ রেখেছেন| শরদিন্দু তন্বী শ্যামা শিখরদশনা অবধি এগিয়েছেন আর বেশি ডিটেলে যান নি| ঘরে বাইরের বিমলার ছিল অন্যরকম সৌন্দর্য‚ তীব্র আকর্ষণ| তা যত না বর্ণিত হয়েছে শরীর ভাষায়‚ তার থেকে বেশি ফুটেছে তাঁর আচরণে‚ ব্যবহারে| বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টি‚ সমরেশ বসুর বিবরে যৌনতা আছে‚ খুব উগ্র ভাবে| নারী দেহর সম্যক কাব্য কোথায়! আর আজকের দিনে তো পার্বতীর শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য লিখলে আর দেখতে হবে না| সোজা গারদের পেছনে| ভাগ্যিস কালিদাস আজকের দিনে জন্মাননি| ক'টা যে এফ আই আর হত ওঁর নামে‚ কে জানে| আজকের হনুমান বাহিনীর বোধয় সংস্কৃত কাব্য পড়া নেই| নইলে আর কালিদাসের রক্ষা পাওয়ার উপায় ছিল না| ঘরে হিটিং চলছে‚ ঘর বেশ গরম| দীপ্ত লেপটা নামিয়ে দিয়েছে| স্বভাবতই প্রমার গা থেকেও কিছুটা সরে গেছে লেপটা| তার শোয়ার ভঙ্গী কিছু অদ্ভুত| গর্ভস্থ ভ্রূণের মত বুকের কাছে দুই পা জড়ো করে ঘুমায় সে| এই মুহূর্তে প্রমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না দীপ্ত| রতিশেষে শ্রান্ত পরিতৃপ্ত নিদ্রাভিভূতা তার প্রিয় নারী| কয়েকটা চুল লেপটে আছে মুখে ঘাড়ে| লম্বা গলা প্রমার| এইরকম গলাকেই বোধহয় কাব্যে মরাল গ্রীবার উপমা দেওয়া হয়| দীপ্ত মনে মনে কাব্য করার চেষ্টা করলো| মরাল গ্রীবা থেকে অনাবৃত কাঁধ বেয়ে লতিয়ে আছে ময়ূর পুচ্ছের মত উজ্জ্বল কেশভার| শ্যামমুখ পান্ডুবর্ণ স্তনদ্বয় এতটাই পুষ্ট যে আপন ভারে পরস্পরকে পীড়িত করছে| গুরু জঘন আজকের দিনে আউট অফ ফ্যাশন| প্রমার লম্বাটে গড়ন‚ সুন্দর লম্বা পা দুটি মুড়ে শুয়ে আছে| দীপ্ত আলতো করে পা দুটো নামিয়ে দিল| সম্মুখে বিকশিত কৃশ কটি‚ আধো ছায়াবৃত গভীর নাভি নীলকান্ত মণির মত দীপ্তি ছড়াচ্ছে| নিতম্ব এত সুন্দর যে মহাদেবের কোলে স্থাপিত হতে পারে‚ যা অন্য কোন রমণীর কল্পনাতীত| দীপ্তর চোখের সামনে পার্বতী ফুটে উঠছেন‚ সে হারিয়ে যাচ্ছে মহাদেবের প্রেমোঙ্মুখ পার্বতীর নব যৌবনের রূপমাধুরীধারায়| হঠাৎ প্রমার চোখ খুলে যায়| দেখে দীপ্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে‚ চোখে কিসের ঘোর| "কি গো‚ কটা বাজে?" চমকে ওঠে দীপ্ত| ঘড়ি দেখে| "আড়াইটে| দেখো তো কত দেরি হয়ে গেল! আজ বোধহয় আর স্প্যানিশ স্টেপস হবে না|" "আগেই হবে না ভাবছো কেন? আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি| ৩ টের সময়ে বেরিয়ে যাবো|" "ওকে প্রিয়তমা| দেখো যদি হয় খুব ভালো হবে|" সুন্দর দাঁতের সারি ঝলকিয়ে হাসে প্রমা| দীপ্তর মাথায় আবার পাক খেতে থাকে‚ "তন্বী শ্যামা শিখরদশনা ..." {/x2} {x1i}jantem8.jpeg{/x1i}

421

41

শিবাংশু

হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি

সারা বিশ্বে প্রতিটি মানুষগোষ্ঠীর দুরকম পরিচয় থাকে। একটি তার ঐতিহাসিক পরিচয়। কালখণ্ডের উদ্বর্তনের পথ ধরে, নথিবদ্ধ ধারাপাঠের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব অবস্থানকে চিনে নেওয়া। আর অন্যটি তার পরিচিত কাল্পনিক প্রতিমূর্তি বা প্রতিবিম্বভিত্তিক। কোনটাই সর্বৈব সত্য বা মিথ্যা নয়। দুই ধরণের পরিচয়ের ভিতরই কিছু সারবস্তু থাকে। ঐতিহাসিক বস্তুস্থিতি ছাড়াও প্রতিটি জাতির একেকটা স্বীকৃত প্রতিবিম্ব থাকে। বাঙালিরও আছে। এই প্রতিবিম্ব সৃষ্টির পিছনে নানা ধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজ করে। যে ভৌগলিক অবস্থানে আজকের বাঙালিদের বাস, মহাভারতের যুগে তাদের অন্ত্যেবাসী মনে করা হতো। সেকালের অঙ্গদেশ, অর্থাৎ আজকের ভাগলপুর, তার পূর্বের অংশকে হস্তিনাপুরের মানুষ অসভ্য ও অনার্যদেশ মনে করতো। সেখানে আর্যদের নামে মাত্র বসবাস ছিলো। সে জন্যই পরম চতুর দুর্যোধন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় কর্ণকে অঙ্গদেশের রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। বাংলায় যাকে বলে, উড়ো খই গোবিন্দায় নমো। কর্ণ কখনও ভুলেও তাঁর 'রাজ্য' দেখতে আসেননি। বাঙালির এই পরিচয়টি তার প্রতিবিম্বিত লোকশ্রুতির অংশ। উত্তরাপথের আর্যজাতি 'বাঙালি'দের সম্বন্ধে এই রকমই একটি ধারণা করে নিয়েছিলো। বলীরাজার পুত্রদের নিয়ে অঙ্গ, বঙ্গ বা কলিঙ্গের যে লোককথা, তা কিন্তু আর্যেতর মানুষদেরই উপাখ্যান। এই এলাকায় যে রাজ্যগুলো ছিলো, যেমন বঙ্গ, সুহ্ম থেকে প্রাগ জ্যোতিষপুর, সেখানের মানুষদের সম্বন্ধে আর্যাবর্তের দর্পিত অধিবাসীরা বেশ নিচু ধারণাই পোষণ করতো। তার রেশ আজও আছে। কারণ আর্য সভ্যতার সীমানা ছিলো মগধরাজ্যের সমৃদ্ধতম রাজপাট, যার সামনে কোসল থেকে গান্ধার, সবাই নিষ্প্রভ। বাঙালির আদিতম জাতিগত অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠে তার সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে যোগাযোগকে কেন্দ্র করে। কাশ্মিরের রাজকবি কল্হনের লেখায় একটা উল্লেখ পাই, সমতটের মানুষদের। যাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তারা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ এবং দেবভাষা সংস্কৃত জানেনা। তার বদলে তারা পাখির ভাষায় কথা বলে। এসময় থেকেই ন্যায় ও তর্কশাস্ত্রের প্রতি বাঙালির আগ্রহ বেশ প্রচারিত ছিলো। যাঁরা প্রমথনাথ বিশীর 'নিকৃষ্ট গল্প' পাঠ করেছেন ( জানিনা কজন এমন আছেন এখানে) , তাঁদের মনে পড়বে 'ধনেপাতা' নামক সেই বিখ্যাত গল্পটি। মুঘল যুগে জাহাঙ্গির বাদশা বলেছিলেন, 'হুনরে চিন, হুজ্জতে বঙ্গাল'। অর্থাৎ চিন দেশের মানুষের স্কিল অনন্য আর বাঙালি অতুলনীয় হুজ্জত বাধাবার কলায়। সবাই স্বীকার করবেন জাহাঙ্গির যতই আনারকলি-নূরজাহান করুন না কেন, ক্রান্তদর্শী পুরুষ ছিলেন। একদিকে ন্যায় ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগান্তকারী চর্চা, আবার তার সঙ্গেই নিমাই পন্ডিতের ভাসিয়ে দেওয়া প্রেমধর্ম। দিগ্বিজয়ী সমুদ্রযাত্রী বীরের দল, মঙ্গলকাব্যের লোকায়ত দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা, অপরপক্ষে ভীত সন্ত্রস্ত তৈলচিক্কন বাবু কালচারের প্রতিনিধিরা। আবার কী শরণ নিতে হবে সেই, 'মেলাবেন, তিনি মেলাবেন' মন্ত্রের। পশ্চিমে পরাক্রান্ত মগধ, দক্ষিণে সমান পরাক্রান্ত ওড্র, উৎকল ও কলিঙ্গদেশ উত্তরে অরণ্যবিকীর্ণ অঙ্গদেশ ও পূর্বে পর্বতারণ্যানীর সমারোহে অগম্য উপজাতি সভ্যতা, এই নিয়ে বাঙালির যে সভ্যতা গড়ে ওঠে তার মধ্যে আর্য, দ্রাবিড়, মোঙ্গল ও অস্ট্রিক, সবারই কিছু কিছু রক্তবীজ এসে পড়ে। বাঙালি সে অর্থে ভারতবর্ষের প্রথম প্রকৃত pot boiled জাতি। দেশবিদেশে মানুষের মনে বাঙালির যে প্রতিবিম্ব ( বাংলায় যাকে বলে ইমেজ) আছে, তা আমাদের এইসব স্ববিরোধী ঐতিহাসিক অবস্থান থেকেই এসেছে। এই গৌরচন্দ্রিকা থেকে হয়তো একটু আন্দাজ হয় 'বাঙালি'রা কীভাবে তাদের সন্তানসন্ততিদের আত্মপরিচয় সম্বন্ধে ওয়কিফহাল করতে পারে। বাঙালিরা তাদের কোন কোন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের প্রশ্নাতীত ভাবে আইডেন্টিফাই করে অথবা কেন করে, সেটাই বৃহৎ প্রশ্ন। যেমন বলা হয়, as much Bengali as rasogolla। শ্লেষার্থে গড়ে ওঠা এ জাতীয় ধারণাবলী থেকে নিজেদের বার করে আনতে যে পর্যায়ের উদ্যম প্রয়োজন, বাঙালিদের তা আছে বলে মনে হয়না। তাদের ভাবনার বাইনারি জগতে লাল-সবুজ দাদাদিদি, ইস্ট-মোহন, বাঙাল-ঘটি,চিংড়ি-ইলিশের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি যতোটা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়, তার ভগ্নাংশও একটা গৌরবজনক আত্মপরিচয় গড়ে তোলার শ্রমসংকুল উপক্রমের জন্য নিয়োজিত হয়না। মনে হয় অচিরকালেই আমাদের উত্তরসূরিরা গোপনে নিজেদের মধ্যে ' হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি' বলে পরিচয় বিনিময় করবে।

85

13

Joy

গাজন- একটি গ্রাম্য লৌকিক উৎসবের গল্প

চৈত্র মাসের শেষ| গরমের দাপট শুরু হয়ে গেছে| আর দুদিন পরেই পয়লা বৈশাখ| পয়লা বৈশাখ মানেই সকালে উঠেই মা‚ বাবাকে প্রনাম করে দিন শুরু হত| আজ আর বকাঝকা নয়| আজকের দিনটি ভাল না হলে সারাবছরই খারাপ যায়| মা বাবার সঙ্গে মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়া হত| নতুন জামা‚ নতুন জুতো| দোকানে দোকানে হাল খাতার নিমন্ত্রন| বিকেলে বাবার হাত ধরে দোকানে যাওয়া‚ অনেক ক্যালেন্ডারের থেকে পছন্দ মত ক্যালেন্ডার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া| পয়লা বৈশাখ আমাদের ছোটবেলায় এখনকার মত এত কর্পোরেট‚ আধুনিক ছিল না| বাঙ্গালীদের এক নিজস্ব উৎসব| তার আগে মাকে দেখতাম নীল ষষ্ঠী‚ অশোক ষষ্ঠী এই সব করতে| সন্তানের মঙ্গল কামনায় মা সারাদিন উপোস করে বিকেলে বা সন্ধ্যেবেলায় শিবের মাথায় জল ঢালতে যেতেন| আমাদের নীল বা অশোক ষষ্ঠী নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না| আমাদের উৎসাহ ছিল গাজন দেখার| আমাদের দেশের বাড়ীতে খুব ধুমধাম করে গাজন ও চড়ক উৎসব হত| গাজনের একদিন আগেই আমরা চলে আসতাম কাঁদোয়া| ছোট্ট খুব সুন্দর গ্রাম| তার থেকেও সুন্দর ছিল মোড়াগাছা স্টেশন| একটু ফাঁকা ফাঁকা গ্রাম্য স্টেশন| প্ল্যাট্ফর্ম লাগোয়া প্রচুর গাছ| মনে হয় গাছের তলায় বসে একটু জিরিয়ে নিই| প্ল্যাট্ফর্ম থেকেই নেমেই শুরু হল আঁকা বাঁকা মেঠো রাস্তা| স্ট্শেনের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে কয়েকটি রিক্শা| রিক্শাওয়ালারা বেশীর ভাগই বাবার চেনা| বাবা ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করে দিতেন| কার বাড়ী বানানো হল‚ কারও ছেলের পড়া শোনা তো কারও মেয়ের বিয়ের খবর| ওরাও বাবাকে আমার জ্যেঠু‚ পিসি‚ কাকাদের কথা জানতে চাইতেন| বাবলু মানে আমার ছোট কাকা কেমন আছেন‚ লক্ষীদি কেমন আছে গো সেজদা? আমার মেজো পিসির নাম লক্ষী| গল্প করতে করতেই আমরা একটি রিক্শায় উঠে পরলাম| সেই মেঠো রাস্তা‚ দুপাশে ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমাদের রিক্শা চলতে শুরু করল| রাস্তাটা খুব সুন্দর ছিল| শুখনো পাতা রাস্তায় অবহেলায় পরে রয়েছে| দুপাশে বড় বড় আম গাছের বাগান| এত আম গাছে যেন মনে হয় গাছগুলো বোধহয় এখ্নই ভেঙ্গে পড়বে| গল্প আর শুখনো পাতার মচমচানি শব্দের মাঝে হঠাৎ করে রাস্তায় একটা-দুটো সাপ আমাদের রিক্শার আগেই রাস্তা অতিক্রম করে চলে গেল| আঁতকে উঠে আমরা চিৎকার করে কি সাপ ওগুলো? রিক্শাওয়ালা আমাদের আশ্বাস দেই ঐ সাপের বিষ নেই গো| আর বিষ নেই‚ সাপ দেখেই তো পা দুটো সিটের উপরে তুলে নিয়েছি| অনেকক্ষন লাগে কাঁদোয়া পৌঁছাতে| কিছুক্ষন পর আমাদের রিক্শা একটি মিষ্টির দোকানে থামল| ওখানে অনেক মিষ্টির দোকান| এখানে ছানার জিলিপি খুব জনপ্রিয়| আহা কি স্বাদ| মুখে দিলেই নরম সুস্বাদু বস্তুটি মিলিয়ে যেত| বেশ জমজমাট জায়গা| হাট বসেছে| লোকজন জিনিষপত্র কেনা-বেচা করছে| এই জায়গাটার নাম ধর্মদা| বাবা‚কাকারা এখানের স্কুলে মাধ্যামিকে পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন| কাঁদোয়া থেকে অনেকটা রাস্তা| বাবারা হেঁটে বা সাইকেলে আসতেন| বর্ষাকালে সে এক ভয়ানক অবস্থা| রাস্তা কাদাময়| পুকুর‚ ডোবা জলে ভর্তি| রাস্তায় জল-কাদার মধ্যে ছোট-ছোট মাছ দিব্যি ভেসে বেড়াচ্ছে| যেতে যেতেই বাবা আমাদের লাইব্রেরী দেখাতেন| এই লাইব্রেরীটা আমার বাবা-জ্যাঠারই দ্বায়িত্ব নিয়ে তৈরী করিয়েছিলেন| আমরা মিষ্টি খেয়ে ও হাঁড়ি ভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে আবার রিক্শায় উঠে বসি| আবার পথ চলা| এবার রিকশা এসে থামে আমাদের বাড়ির দোরগোড়ায়| আমাদের দেশের বাড়ি ও মামার বাড়ি দুটো-ই গ্রাম হওয়ার সুবাদে আমার প্রকৃতির সঙ্গে‚ গাছপালা‚ পুকুর‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেতের সঙ্গে নিবিড় এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল| আমার মামার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলায়| দেবী পারুলিয়া নামের সুন্দর এক গ্রামে| ওখানে সাধারনত আমাদের যাবার সময় ছিল শীতকালে| যখন আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত তখন| নদীয়া- মুর্শিদাবাদ দুটো পাশপাশি জেলা হলেও দুই জেলার মধ্যে ভাষাগত‚ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে অনেক ফারাক ছিল| কথার টানে অনেক তফাত‚ দেবী পারুলিয়ার মাটি লাল‚ এঁঠেল মাটি| আমার মামার বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই আবার বীরভূম জেলা| শীতকালে মাঠে ধান ভর্তি| চরিদিকে শুধু সোনালী রঙ্গের প্রলেপ| কোথাও আবার সরষে ক্ষেতের উপর রোদের মোলায়েম স্পর্শ| গরুর গাড়ির মাঠ থেকে ধান নিয়ে যাওয়া| আমরা ভাই-বোনেরা গরুর গাড়িতে ওঠার জন্যে দৌঁড় শুরু করতাম| অনেক দীঘি আর পুকুর| সবেতেই হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে| ওদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে| আবার কোথাও মাঠ ভর্তি আখের ক্ষেত| আমর লুকিয়ে আখের ক্ষেত থেকে আখ ভেঙ্গে খেতাম| এখানে আমরা স্কুল না খোলা পর্যন্ত থাকতাম| বাবা আমাদের রেখে চলে আসতেন কলকাতায়| অফিসের জন্যে বেশীদিন থাকতে পারতেন না| এর পর শুরু হত আমাদের খেলা‚ দুষ্টুমি| গরুর গাড়ি করে তারাপীঠ যাওয়া হত| মামা সব ব্যবস্থা করে দিতেন| খুব মজা হত| কিন্তু আমাদের দেশের বাড়ি কাঁদুয়া আবার একটু অন্য রকম| এখানে আমরা আসতাম এই গ্রীষ্মকালে| গাছ ভর্তি আম‚ জাম‚ কাঁঠাল| আমাদের দোতলা বাগান বাড়ি| কত বড় বাগান‚ আর কত রকমের গাছ| আমরা ঢিল মেরে আম পারতাম| আর ঝড়েও প্রচুর আম পড়ত| সেই আমের খোসা ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন‚ লঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে খেতে খুব ভাল লাগত| আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েও বয়ে চলেছে গঙ্গা| আর একটা বাঁধানো পুকুর ছিল আমাদের| বাড়ীর মেয়ে-বৌরা স্নান‚ কাপড় কাচার জন্যে আসত| এখানে বাবা থাকার জন্যে ও খুব অল্প দিন থাকায় মাত্রাতিরিক্ত দুষ্টুমি করা যেত না| তবে খুব ভালো লাগত গাজন দেখতে| সেটা আবার অন্য রকম আনন্দ| প্রায় ঘন্টা খানেক রিক্শা সফর করে আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাতাম| বাড়ীটিতে আমাদের কেউও থাকতেন না| বাবা‚ কাকা‚ জ্যেঠুরা সবাই কাজের জন্যে কলকাতা‚ বহরমপুরে চলে এসেছেন অনেকদিন হল| আমার ঠাকুর্দা ছিলেন ডাক্তার| ঠাকুমা মারা যাবার পর ঠাকুর্দাও পাকাপাকি ভাবে চলে এলেন কলকাতায়| ফলে বাড়িটি ফাঁকাই পরে থাকত| বাবার মুখে শোনা ৭১এর বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় প্রচুর লোক ওপার বাংলা থেকে এখানে চলে আসেন| তাদেরই কেউ আমার দাদুর কাছে এই বাড়িটিতে থাকার জন্যে অনুনয়-বিনয় করাতে ঠাকুর্দা ওদের এই বাড়িটিতে থাকতে দেন| শর্ত ছিল থাকার জন্যে কোন ভাড়া দিতে হবে না‚ কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এলে একটা-দুটো ঘর ছেড়ে দিতে হবে| আমাদের আসা বলতে বছরে একবারই এই গাজনের সময়| আমাদের বাড়ি সংলগ্ন বাগানে শিবের গাজন হত| কয়েকদিন ধরেই চলত তার প্রস্তুতি| বাগানের যে অংশটা রাস্তা ঘেঁষা তার পাশেই ছিল এক ব্ড় অশ্ব্ত্থ গাছ| অনেক প্রাচীন সেই গাছ| তার নিচেই বেদীতে রাখা হত শিবের লিঙ্গ| গাজনের কয়েকদিন আগে থেকেই অনেকেই সন্ন্যাসী হতেন| সারাদিন রোদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করে সন্ধ্যেবেলায় হবিষ্যি ভোজন| আর গাজনের আগের দিন ফলমূল খেয়েই কাটাতেন সন্ন্যাসীরা| আমার বাবা-মা সন্ন্যাসীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন| সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজন মূল সন্ন্যাসী থাকতেন| তার নির্দেশ সব সন্ন্যাসীরা মেনে চলতেন| সন্ন্যাসী ভাড়া নেওয়া হত| কারও কোন মানসিক থাকলে ফল‚ ফুল‚ মিষ্টি দিয়ে শিবের পুজোর ডালি নিয়ে আসতেন| শিবের মাথায় আকন্দ ফুল রাখা হত| শিবের মাথা থেকে ফুল তাড়াতাড়ি মাটিতে পড়া মানে মানসিক তাড়াতাড়ি পুর্ণ হবে| যদি ফুল পরতে দেরী হয় তার মানে তার মনস্কামনা পূর্ণ হতে দেরী হবে এমনই ধারনা ছিল স্থানীয়দের| এবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের নাচ-গান| ঢাক ঢোল আর কাঁসরের আওয়াজে গমগম করত| শিব তুষ্ট করার জন্যে সন্ন্যাসীরা নিজেদের উপর অত্যাচার শুরু করতেন| চাবুক দিয়ে মারা‚ জিভে সুঁচ ফোটানো‚ বঁটি উপর দিয়ে হাঁটা এই সব করা হত| আমার দেখতাম আর শিউড়ে উঠতাম| তার মধ্যে আবার দন্ডি কাটা হত‚ লোকে লোকারন্য হয়ে যেত| পাশেই বসত মেলা| আহামরি কিছু নয় গ্রাম্য মেলা যেমন হয়| বাদাম ভাজা‚ জিলিপির দোকান| নাগরদোলায় কিছু ভীড়| বেশ লাগত দেখতে| কালবৈশাখী ঝড়টা প্রতিবারই এই সময়ই এসে সব লন্ডভন্ড করে যেত| প্রথমে আচমকা থমথমে পরিবেশ‚ আস্তে আস্তে ঘন কালো মেঘ এসে সব ঢেকে যেত| কিছুক্ষন পর ধুলোর ঝড় সঙ্গে বৃষ্টি| আমরা দৌঁড়ে ঢুকে পরতাম বাড়িতে| বাতাসে সোঁদা গন্ধ| অনেক্ক্ষন ধরে চলত বৃষ্টি আর ঝড়ের তান্ডব| আর সঙ্গে ধুপ-ধাপ আওয়াজ| আম পরার শব্দ| ঝড়-বৃষ্টি একটু কমলে বাইরে গিয়ে দেখলেই মনে হয় একটু আগেই বেশ বড়্সড় একটা যুদ্ধ হয়েছে| চারিদিকে মাটি থেকে উৎখাত হওয়া ছোট-বড় অনেক গাছ| চার পাশে পরে রয়েছে অজস্র গাছের ভাঙ্গা ডালপালা| উড়ে আসা খড়ের আর টিনের চাল| সব সরিয়ে আবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের তান্ডব নৃত্য| প্রচুর আম পড়ত ঝড়ের সময়| মা-বাবার চোখ এড়িয়ে আমারাও ছুটতাম আম কুড়াতে| আবার চলত সেই শিবের মাথায় ফুল পরা আর গাজনের উৎসব| আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামে‚ গাজন উত্সব শেষ হয়| হাল্কা হয়ে যায় মানুষের ভিড়| কিছু বাচ্চা‚ বুড়ো এখনও আছে মেলায়| হ্যাজাক আর হ্যারিকেনের আলো গাঢ় অন্ধকারকে ফিকে করে দেয়| আমাদের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে| সারাদিনের হৈ-চৈ| একটু কিছু খেয়েই আমরা ঘুমের দেশে| পরের দিন সকালে দেখি বস্তা বস্তা ভর্তি আম| কাল বিকেলের ঝড়ের ফলাফল| পরেরদিন আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমতন্ন| মা‚কাকিমারা রান্না করতে ব্যস্ত| এই ফাঁকে বাবার সঙ্গে আমরা গঙ্গায় স্নান সেরে আসি| এখানে গঙ্গা বেশ চওড়া| তবে জল পরিষ্কার| বাবার মুখে গল্প শুনি‚ বাবা-কাকারা নাকি গঙ্গা পেরিয়ে যেতেন| বাবা এখনো সাঁতরে অনেকট দূর চলে যেতেন| ভয় হত আমাদের‚ বাবা যদি জলে ডুবে যান| না সেরকম কিছু হত না| একটু পরেই বাবা সাঁতরে পারে ফিরে আসতেন| বিকেলে বাবাদের বন্ধুদের আড্ডা বেশ জমে উঠত| দুদিন আনন্দে কাটাবার পর এবার ফেরার পালা| পরদিন ফিরে আসা| মনখারাপ করে আবার রিকশায় উঠে বসতাম| আবার চেনা পথ| ধর্মদায় দাঁড়ানো| আমাদের কলকাতার আত্মীয়রা সব ছানার জিলিপির ফর্দ দিয়ে রাখত| প্রচুর মিষ্টি নিয়ে আসা হত কলকাতায়| মোড়াগাছা স্টেশনে এসে একটু দাঁড়ালেই কু ঝিক-ঝিক কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন এসে হাজির| রিকশাওয়ালা আমাদের দেখে বলেন আবার সামনের বছর আসবে তো...মনে মনে বলি আবার আসব| প্রতি বছর আসব| বেশ কিছুদিন চালু ছিল আমাদের এই বেড়াতে আসা| পড়াশোনার চাপ বাড়ার ফলে কমে গেল এখনে আসা| একদিন শুনলাম আমাদের দেশের বাড়িটি ঐ ওপার বাংলার যারা আমাদের বাড়িটিতে থাকতেন ওরা বাড়িটি অধিকার করে নিয়েছে| বাবা-জ্যেঠুরা দৌঁড়াদৌড়িতে নামমাত্র কিছু টাকা পাওয়া গেল| বাবা-কাকারা দেশের বাড়ির গল্প বলতে শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না| সেই আম‚জাম বাগানের গল্প‚ গঙ্গায় সাঁতরে এপার ওপার হওয়ার গল্প| আরও কত কি| বাবা কিছুদিন আগে চলে গেলেন‚ কয়েক বছরের ব্যবধানে মা ও চলে গেলেন ঐ দূর আকাশ পানে| মামার বাড়ি ও দেশের বাড়ি যাওয়া কমে কমে একদম বন্ধই হয়ে গেল| কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনো ফিকে হয়ে যায়নি| মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ গাছ্পালা‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেত‚পুকুর‚ প্রকৃতি হাতছনি দিয়ে ডাকে| ফিস ফিস করে যেন আমাকে বলে তুমি আসবে বলেছিলে‚ কিন্তু তুমি তো এলে না| ওদের কিছু বলতে পারিনা| নীরবে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে| দিব্যেন্দু মজুমদার

80

10

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

তুলাভিটা, মালদা-শেষপর্ব

শেষ পর্যন্ত এই উৎপীড়ন যখন আর সহ্য হলো না তখন সারা বাংলার রাষ্ট্র নায়কেরা একত্র হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে অধিরাজ বলে নির্বাচন করলেন এবং তাঁর সর্বময় আধিপত্য মেনে নিলেন। এই রাষ্ট্রনায়ক অধিরাজের নাম গোপাল দেব। কে এই গোপাল দেব? গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রলিপি তে বলা হয়েছে "গোপাল দেব ছিলেন দয়িতবিষ্ণুর পুত্র এবং বপ্যটের পৌত্র। মাৎস্যন্যায় দূর করিবার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল"। একটা ব্যাপার লক্ষণীয় পাল রাজাদের রাজ সভায় রচিত কোন গ্রন্থে নিজেদের বংশ কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয় নি। সাধারণ প্রজা দয়িতবিষ্ণুর পুত্র গোপাল দেবের জন্ম ভূমি বরেন্দ্র(রাজশাহী) অঞ্চলে। এবং সেখানে তিনি একজন সামন্ত নায়ক ছিলেন। এবং তিনি যে বাঙালি ছিলেন এতে সন্দেহের অবকাশ নাই। লিপিতে বলা সংস্কৃত প্রকৃতিপুঞ্জ শব্দের অর্থ যদিও জনসাধারণ, কিন্তু বাংলার সকল জনগণ সম্মিলিত হয়ে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এটা মনে হয় না। আসলে তখন দেশ জুড়ে অসংখ্য সামন্ত নায়কেরা ছিল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তারা যখন দেশকে বারবার বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণ থেকে আর রক্ষা করতে পারলেন না, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলেন না, তখন একজন রাজা ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছাড়া বাঁচার আর পথ ছিলনা। তাদের এই শুভ বুদ্ধির ফলে বাংলা- নৈরাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক শত্রুর কাছে বার বার অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেল। আনুমানিক ৭৫০ খৃস্টাব্দে গোপাল দেব(৭৫০ খ্রীঃ-৭৭৫ খ্রীঃ) পাল বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা হয়ে সমস্ত সামন্ত প্রভুদের দমন করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন, দেশ থেকে অরাজকতা দূর করেন, বহিঃ শত্রু আক্রমণ থেকে দেশ কে রক্ষা করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে গোবিন্দ পালের(১১৬১খ্রীঃ-৬৫খ্রীঃ) সঙ্গে সঙ্গে গোপাল প্রতিষ্ঠিত এই পাল বংশের অবসান ঘটে। সুদীর্ঘ চারশো বৎসর ধরে নিরবচ্ছিন্ন একটা রাজবংশের রাজত্ব খুব কম দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়। বৃহত্তর বাংলাকে সংহত ও শক্তিশালী করে গোপাল মারা যাবার পর হাল ধরেন পুত্র ধর্মপাল। তার নেতৃত্বে বাঙালির সামরিক শক্তি তৎকালীন ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি প্রায় সমগ্র পূর্ব ভারতের একের পর এক রাজ্য জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন। "কনৌজ জয় করার পর এক দরবারের আয়োজন করেন। ঐ দরবারে ভোজ, মৎস্য, মুদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, মালব, বেরাব, গান্ধার, পেশোয়ার, কীর প্রভৃতি প্রাচীন রাজ্যগুলির রাজাগন উপস্থিত হইয়া বাঙালি ধর্মপালকে অধিরাজ বলিয়া স্বীকার করেন" - (খালিমপুর তাম্র লিপি) পাঞ্জাব থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন রাজ্যসমূহ ধর্মপাল জয় করেছিলেন। ধর্মপাল মারা যাওয়ার পর রাজা হন পুত্র দেবপাল। দেবপাল পিতার সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করেন। হিমালয়ের সানু দেশ হতে আরম্ভ করে বিন্ধ্য পর্যন্ত এবং উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ থেকে আরম্ভ করে প্রাগজোতিষ পর্যন্ত তার আধিপত্য স্বীকৃত হতো। এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। আরবের বণিক পর্যটক সুলেমান তার বিবরণীতে বলেন:- "বঙ্গরাজ দেব পালের সৈন্যদলে ৫০,০০০ হাতি ছিল এবং সৈন্যদলের সাজসজ্জা ও পোশাক পরিচ্ছদ ধোওয়া, গুছানো ইত্যাদি কাজের জন্যই ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল"। একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন হতোদ্যম বাঙালি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে শৌর্য বীর্য ও দক্ষতার সাথে বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিল। যার যাদু মন্ত্র ছিল বৃহত্তর বাংলার ঐক্যবদ্ধ শক্তি। এই শক্তির ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলে প্রতিষ্ঠাতা গোপাল। বাংলার ইতিহাসে পালবংশের আধিপত্যের এই চারশো বৎসর নানাদিক থেকে গভীর ও ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। বর্তমানের বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয়েছে এই যুগে। শশাঙ্ক যদিও শুরু করেছিলেন কিন্তু পাল আমলেই বাঙালির রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ লাভ করে এই পাল যুগে। বাংলা ভাষা ও লিপির গোড়া খুঁজতে হলে এই চারশো বৎসরের মধ্যে খুঁজতে হবে। এই লিপি, ভাষা, ভৌগলিক সত্ত্বা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শকে আশ্রয় করে একটি স্থানীয় সত্ত্বাও গড়ে উঠে এই যুগে। সেই হাজার বছর আগে পাল রাজাগন ছিলে অসাম্প্রদায়িক। তারা নিজেরা বৌদ্ধ; অথচ বৈদিক হিন্দু ধর্মও তাদের আনুকূল্য ও পোষকতা লাভ করেছিল। এমনকি একাধিক পালরাজা হিন্দু ধর্মের পূজা এবং যজ্ঞে নিজেরা অংশ গ্রহণ করেছেন, পুরোহিত সিঞ্চিত শান্তি বারি নিজেদের মস্তকে ধারণ করেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মে ব্রাহ্মণের নিয়োজিত হতেন, মন্ত্রী সেনাপতি হতেন, আবার কৈবর্তরাও এই সব পদে স্থান পেত। এইভাবে পালবংশ কে কেন্দ্র করে বাংলায় প্রথম সামাজিক সমন্বয় সম্ভব হয়েছিল। পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, সারনাথের বৌদ্ধ সংঘ ও মহাবিহারগুলিকে আশ্রয় করে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ জগতেও বাংলা ও বাঙালির রাষ্ট্র এক গৌরবময় স্থান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এই সকলের সম্মিলিত ফলে বাঙলায় এই সময়েই অর্থাৎ এই চারশো বৎসর ধরে একটি সামগ্রিক ঐক্যবোধ গড়ে উঠে। এটাই বাঙালির স্বদেশ ও স্বজাত্য বোধের মূলে এবং এটাই বাঙালির একজাতীয়ত্বের ভিত্তি। পাল-যুগের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।” - এই পরম্পরা মেনে রাজা মহেন্দ্রপাল, কুড্ডলখটকা বৈশ্য ( জেলা ), এবং পুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তি ( ডিভিশন) প্রজ্ঞাপারমিতা এবং অন্যান্যদের পূজার জন্য বজ্রদেবকে দায়িত্ব দেন এই বৌদ্ধবিহার গড়ে তোলার জন্য ।একটা ইংরেজী সংবাদ পত্রের খবর দেই Statesman (India) | December 30, 2001 | STATESMAN NEWS SERVICE MALDA, Dec. 29. - The government's delay in developing a Buddhist pilgrimage site at Jagajibanpur in Habibpur block was due to the lack of infrastructure, the chief minister said. Speaking to The Statesman during his visit here on Thursday, the chief minister, Mr Buddhadev Bhattacharya, said: "Jagajibanpur is an important excavation site. But due to lack of infrastructure, we are unable to attract the Buddhist pilgrims, particularly the Japanese, to it. They (international Buddhist tourists) only flock to Bihar and return." He assured that the government was "trying to create the necessary infrastructure at the place". According to Mr Bhattacharya, the completion of excavation work at the site will take some more time. The Archaeological Survey of India is doing the excavation at the site which includes Tulavita, well known during Pala rule. A part of the site falls in Bangladesh. A Bangladeshi archaeologist, Mr Najmul Haque, is also engaged in the task, he pointed out. After the Jagajibanpur project is completed, Mr Bhattacharya, said the state would feature in the itinerary of the Buddhist pilgrims. The chief minister also assured that the Malda unit of the West Bengal Democratic Writers-Artists' Association will set up a museum in Jagajibanpur. The association, however, alleged that the then chief minister, Mr Jyoti Basu, too had promised the museum in March 1994, but no initiative has been taken. It has also demanded that Malda must be covered in the next issue of the West Bengal Magazine published by Information and Cultural Affairs ministry. If the demand is acceded to, it will be for the first time in 24 years of Left Front rule that Malda will feature in the magazine. এই বৌদ্ধ বিহারটির বিস্তৃতি বর্তমান বাংলাদেশ পর্যন্ত । অনুমান, এটা নালন্দার থেকেও বড় । +++++++++ দেখতে গেলে , প্রথমে মালদা শহরে পৌঁছে হোটেলে উঠুন । তারপর একটা ভাড়া করা গাড়ী নিয়ে বলুন :- আইহো- বুলবুলচণ্ডীর রাস্তায় কেন পুকুর, পুকুরিয়া হয়ে এই রাস্তায় জগজীবনপুরে তুলাভিটা যাবো । =================== তথ্যঋণ :- শ্রী কমল বসাকের বই, এবং নেটের বিভিন্ন সাইট চিত্র সৌজন্য:- Shampa Ghosh (মালদা)

63

4

Aratrik

হংসচঞ্চু

আপনারা জানেন, আমি একটু গুন্ডা প্রকৃতির লোক। তবে প্রথমেই হাত পা ছুড়ি না। বোঝানোর চেষ্টা করি। যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলে। তারপরে যদি কিছুতেই না বোঝে—ঘুসি। তার জন্য আমি লজ্জিতও নই। আমাদের শহরে এটাই রীতি ছিল। হোঁদলের কথা উঠছে না। ও শুধু সোজা হয়ে দাঁড়ালেই ওবেলিক্স বলে মনে হত। লোকজন ভেগেও যেত। কিন্তু সিরাজের মতো ফিনফিনে চেহারার ছেলেও চমৎকার ঘুসি মারতে পারত। কিন্তু তিনি আমাকে বলতেন, এটা হল আর্বানিটির অভাব। আর্বান মানুষ বিরত থাকতে জানে। যদি লড়াই করতেই হয়, আর্বান প্রথমে ঠিক করে কার সঙ্গে লড়বে। তারপরে ঠিক করে কেমন করে লড়বে। আর অসভ্য যে কেউ চ্যালেঞ্জ করলেই লড়ে আসে। লড়াটাকে কর্তব্য বলে মনে করে। তাই কখনও কখনও তিনি আমাকে নিয়ানডার্থাল বলে ডাকতেন। আর্বানিটিতে পারফেক্ট পুরুষ বলে যে ধারণাটি চলে, তাতে তিনি রাঙাকাকাকে ফেলতেন। আর সে যে কী পারফেকশন, তার একটি নমুনা পেশ করি। সে বার আমাদের সঙ্গে স্টেশন পাড়ার ম্যাচ। যে মাঠে খেলা হবে, তাতে মেলা হয়। নানা রকম মেলা। যাত্রাও হয়। অন্তত হত। মাঠটি বিশাল। এমনি দিনে স্টেশন পাড়ার যে তিন চারটি ক্লাব রয়েছে, তারা একই মাঠের আলাদা আলাদা দিকে খেলত। বড় ম্যাচ থাকলে মাঠের মাঝখানটির চারপাশে মোটা কাছি ফেলে প্লেয়িং এরিয়া তৈরি করা হত। চুনের দাগ দিয়ে হাফ লাইন, পেনাল্টি বক্স তৈরি হত। রাঙাকাকা করল কী, হোঁদলকে গাড়ি আনতে বলল। রাঙাকাকার নিজের গাড়ি নয়। হোঁদলের গ্যারাজে কে যেন একটা ফিয়াট সারাতে দিয়েছিল, সেটা আনতে বলল। সেই ফিয়াটে চেপে রাঙাকাকা সারা মাঠ চরকি পাক খেল। কোথায় কতটা খানা খন্দ রয়েছে, কোথায় ঢিবি, কোন জায়গায় কোন দিকে ঢাল, সে সব একেবারে মুখস্থ করে ফেলল। তারপরে পাড়ায় এসে বসল গোপন মিটিঙে। রাঙাকাকার স্ট্র্যাটেজি হল, ব্যাঙ্কের দিকের হাফ আমাদের হলে, আমরা যাকে ‘বিদেশ’ বলে ডাকতাম, সেই লেফ্ট ফ্ল্যাঙ্কে খেলবে। নেলো একটিু নীচে ভৃগুদার সঙ্গে। আর হেডমাস্টারবাবুর বাড়ির দিকে হাফ হলে, নেলো লেফ্ট ফ্ল্যাঙ্কেই চলে যাবে। আমার দায়িত্ব সব সময়তেই মোটামুটি এক রকম। বেশি নীচে নামা যাবে না। বেশিক্ষণ পায়ে বল রাখা যাবে না। আমার তখন পা ভালই সেরেছে। খেলছি। কলকাতাও যাচ্ছি। তবে ট্রেন বাস নয়। রাঙাকাকা বা মেজোকাকা কেউ না কেউ নিয়ে যাচ্ছে, নিয়ে আসছে। আর তিনি উত্তেজনার চরমে ফুটছেন। সেমিনার এগিয়ে আসছে। শিক্ষকমশায়কে খুব করে জ্বালাতন করা গিয়েছে। তারপরে নিজেরা ড্রাফ্ট তৈরি করছি তো করছি। কিন্তু তার মধ্যে আচমকা কোনও তথ্য মনে এলে সেটা যোগ করতে হচ্ছে। আর এই আচমকা তথ্য মনে একবার এলে তিনি তরতর করে সেটা আমাকে বলতেন। বিশ্বাস করুন, অনেক সময়ই শুনতাম না। তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তিনি যে ভাবে বলতেন, সেইটুকু শুধু দেখে যেতাম। তিনি বলতে বলতে আঁচলটার পাড়টা কাঁধে তুলে নিতেন, তাতে শাড়ির খোলের অংশটা ভিতর থেকে উপছে গিয়ে পড়ে থাকত বাহু বেয়ে। কব্জির কাছে এসে থমকে যেত। যেন শাড়়ির একটি প্রপাত পড়ে রইত। ওই য়ে আঁচলের পাড়টা ডান দিক থেকে ঢেউ খেলার মতো করে উঠে বাঁ কাঁধে পৌঁছে তারপরে আবার বাহুর পাশ থেকে গাছের শিকড়ের মতো নেমে যেত, তার পিছনে যে শাড়ির শরীরের প্রধান রংটি একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করত, সে দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে। ডান কাঁধে ব্যাগ। হাতে বই বা কাগজ। নাকের ডগায় চশমা। চশমা ঠিক করতে করতে মাঝে মধ্যে বুঝতে পারতেন, আমি কেবল তাকিয়েই রয়েছি। তখন ভুরু কুঁচকে যেত। ওষ্ঠ দিয়ে চেপে ধরতেন অধর। আমি অমনি হাবিজাবি বকতে শুরু করে দিতাম। তিনি শান্ত স্বরে বলতেন, ‘‘আমি তো জানি এটা আমার একার দায়। তুমি আমার চাপরাশি।’’ রাশি রাশি চাপ যে ছিল, তা অস্বীকারও করছি না। এই মহিলার সঙ্গে সাধারণ ব্যবহার করাও খুব শক্ত। তিনি এক সঙ্গে সব কিছু। তবে মনে প্রধানত টেম্পস্টের মিরান্ডা। শেক্সপিয়র চর্চার এই প্রখর অনুশীলনে, কোনও লোক কী করে প্রেম করার সুযোগ পায়, সেটাই তিনি বুঝতে পারতেন না। তাই তিনি প্রেম করতেন না। কিন্তু তিনি তো মিরান্ডা। তাই তাঁকে সব সময় আগলে রাখতে হত। একবার কোথায় একটা চা খেলাম। সঙ্গে মনের আনন্দে প্রজাপতি বিস্কুট একখানা নিয়েছি। এমন ভাবে তাকালেন ভয়ে ভয়ে ফেরত দিতে চেষ্টা করলাম। এই তাকানো টুকুর জন্য আমি সারা জীবন দিয়ে দিতে পারি। এর মধ্যে কী যে আছে। শুধু একটু চাওয়া। নয়নপাত। তবে এ ঠিক রবীন্দ্রনাথ দিয়ে হবে না। এই তাকানোর মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকেন কুইন থেকে প্রিন্সেস। কিন্তু দোকানদার অত ইংরেজি পড়েনি। তিনি বিস্কুট ফেরত নিতে চাইলেন না। এ বার কী করি? ফেলে দিলে রেগে যাবেন, কাউকে দিয়ে দিলে রেগে যাবেন, প্যান্টের পকেটে ভরলে তো আর কোনওদিন কথাই বলবেন না। আমি হাতে বিস্কুটটা নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি। দোকানে আরও দু’জন চা খেতে খেতে আমাকে দেখছে, আর শুনছে তোড়ে ইংরেজিতে তিনি বলে যাচ্ছেন, ওফেলিয়া আর মিরান্ডার মধ্যে নিশ্চিত করে দশটি পার্থক্য রয়েছে। দু’জনেই নানা কূটকর্মের একেবারে মধ্যে থেকেও তার আঁচ বুঝতে পারে না। কিন্তু এই বুঝতে না পারাটাও অন্তত পাঁচ রকমের। আমি একবার একটা কথা তুলেছিলাম যে, ওফেলিয়া মিরান্ডার চেয়ে বেশি শিক্ষিত। তাতে কথার তোড় এত বাড়ল যে, চায়ে চুমুক দিতে পর্যন্ত ভয় করছিল। চায়ের দোকানে আর যারা চা খাচ্ছিলেন, তাঁরা নিশ্চয় করে এমন দৃশ্য আগে দেখেননি। হাসছিলেন। সেই হাসিতে একটু পাকামিও ছিল। তবে ইংরেজির চোটে আমাদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা কেউ করেনি। কিন্তু অবস্থাটা যে গোলমেলে হয়ে উঠছে তিনি সেটা বুঝতে পেরে শান্ত ভাবে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে বিস্কুটটা নিয়ে একটা কুকুরের দিকে ছুড়ে দিলেন। যুক্তিটা হল, প্রজাপতি বিস্কুট হজমের বিধি প্রদত্ত ক্ষমতা কুকুরের রয়েছে। ইতিমধ্যে খেলার জন্য আমি দু’একদিন কলকাতা থেকে বিরত রইলাম। ফুটবল আর শেক্সপিয়র এক সঙ্গে হয় হয়তো, শুধু আমার ক্ষেত্রে একটু ভারি ঠেকে। আমাদের প্র্যাকটিশও তখন তুঙ্গে। রাঙাকাকা একটা বেল ডাল নিয়ে ঘোরাফেরা করত। মেজোকাকাও সুযোগ পেলে ঘুরে যেত। ভৃগুদার সঙ্গে আমার তালমিল একেবারে যাকে বলে রবিশঙ্কর-আলাউদ্দিন। আমি আলাউদ্দিন, আলাউদ্দিন খিলজি। সব মুভই ভয়ঙ্কর ভাবে গোলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। সিরাজ থাকলে বেশিরভাগ সময় আটকেও যাচ্ছি। ম্যাচের আগে তিন দিন টানা প্র্যাকটিশ। কলকাতার দিকে ঘেঁসলাম না। শনিবার বিকেলে ভরা মাঠে খেলা শুরু হল। থিকথিক করছে দর্শক। ভৃগুদার একটা দূর থেকে নেওয়া শট পোস্টে লেগে বেরিয়ে গেল। আমি একটা দারুণ মুভ করে পেনাল্টি বক্সের ভিতরে নিজেই নিজেকে ল্যাং মেরে পড়ে গেলাম। বলটা গড়িয়ে গিয়েছিল ফাঁকায়, নেলোর মতো ছেলেও টেনশনে জোরে মেরে বাইরে ফেলে দিল। তবে ওরা খুব ভাল খেলছিল। খুব। নিজেদের মধ্যে লম্বা পাশ খেলছিল। একেবারে ঠিকঠাক পায়ে পড়ছিল সেগুলো। আমরা প্রত্যেকবার ট্যাকল করছিলাম। কয়েকটা বল পাচ্ছিলাম, কয়েকটা পাচ্ছিলাম না। সেগুলো গিয়ে আটকাচ্ছিল হোঁদলের কাছে গিয়ে। ফার্স্ট হাফ গোল লেস। সেকন্ড হাফে নেমেই বুঝতে পারলাম, পায়ে ব্যথা হচ্ছে। আর আমার পা থেকেই বল কেড়ে নিয়ে যে মুভটা শুরু হল, সেটা শেষ হল সিরাজকে পরাস্ত করে। সিরাজ প্রচণ্ড রেগে গেল। হোঁদলও। যা নয় তাই বলতে লাগল। ভৃগুদা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। আমাকে একটু কম বল দিচ্ছিল। আমি অল্প জগ করলাম। দেখলাম ব্যথা হচ্ছে। ঠিক করলাম, বেরিয়ে যাব। কিন্তু একটা কিছু করে বেরোবো। আবার বল নিয়ে উঠতে শুরু করলাম। প্রচণ্ড ট্যাকল করল ওদের লেফট স্টপারটা। ব্যাটা প্রচণ্ড গাঁটাগোট্টা। আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম। রাঙাকাকা চিৎকার করল, ভৃগু ফ্রি কিক নে। ভৃগুদা ফ্রি কিকটা নিল বক্সের বাঁ দিকের কোণে। আমি হেড করার জন্য লাফালাম। কী যেন একটা নীল রং থিকথিকে ভিড়ের মধ্যেই চোখ ধাঁধিয়ে দিল। গোলমাল হয়ে গেল। কী যে হল মাথার মধ্যে। কপালের বদলে ব্রহ্মতালু দিয়ে হেড করলাম। বল লম্বা হয়ে উঠে গেল। কিপারটা আমাকে মারল কনুই দিয়ে। কিন্তু তাই করতে গিয়ে বলটা ফস্কাল। নেলো নিশ্চিন্তে বলটা গোলে ঠেলে দিল। তারপরে ওরা সবাই মিলে আক্রমণ শুরু করল। তার সঙ্গে যা তা গালাগালি। মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। রাঙাকাকা সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, মাথা ঠান্ডা রাখ। কিন্তু কে কার কথা শোনে। ওরা মারছেও খুব। আমাকে নেলোকে ভৃগুদাকে। নেলো যতবার বল ধরছে সোজা গিয়ে লাথি মেরে দিচ্ছে। প্রায় শেষ দিক। আগের বার হেরেছি। এ বার জিততেই হবে। নেলোকে হোঁদল বল দিল। নেলো ধরতে গিয়ে দেখল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ওকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। রেফারি উদাসীন। হঠাৎ আবার ওই নীল রংটা, বুঝলেন, চোখে পড়ল। ভৃগুদা এ বার বিদেশকে একটা বল বাড়াল। আমি আড়াআড়ি ছুটে গিয়ে আচমকা বলটা ধরলাম। তাতে ওরা চমকে গেল। ভৃগুদাও। কারণ মাঝখানটা তখন ফাঁকা। বল দিতে হলে ক্রশ করতে হবে নেলোকে। নেলো থতমত। কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছে না। আমি বলটা ধরে হঠাৎ করেই কোণাকুণি উঠতে শুরু করল। সবাই জানে, একমাত্র নেলো ছাড়া আর কারও ক্ষমতা নেই এমন ভাবে পাঁচ জনকে কাটিয়ে গোল করার। তবু উঠতে লাগলাম। ওরা সরাসরি ট্যাকলে গেল না। চারপাশটা ছোট করে আনল। আমি স্পিড বাড়ালাম। নেলো এ বার বুঝতে পারল, কী করতে চলেছি। তবে ওরা তখন প্রবল আত্মবিশ্বাসী। তার উপরে জানে, আমার পা ভেঙেছিল। ওদের তিন জন সামনে এসে পজিশন নিল। আমি বলটা আউটসাইড করতেই ওদের বড় চেহারার ছেলেটা হেসে ফেলল। ও তো জানে, এমনিই বলটা টেনে নেবে। কিন্তু বুঝতে পারেনি আমি আসলে বলটা হিল করব। ওরা থতমত খেয়ে গেল। নেলো চলে এসেছিল। ও বলটা ধরে লুপ করে ফেলল কোণের দিকে। অফসাইড বাঁচাতে অপেক্ষা করছিলাম। তারপর আমি গায়ের সব জোর দিয়ে ছুটে সবার আগে পৌঁছলাম। ওদের কিপারটাও ছুটে আসছিল। আসবে জানতামও। আমি পড়ে যাওয়ার আগে বাঁ পায়ে ভর দিয়ে নিচু হয়ে চান পায়ে প্রচণ্ড জোরে ভলি করলাম। বল পোস্টে লেগে ঢুকে গেল। কিন্তু কিপারটা ছাড়ল না। ওর বুটটা আমার ভাঙা পা-টাতেই লাগল। আমি গড়িয়ে গোল লাইনের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। বিশ্বাস করুন, গড়িয়ে গিয়ে যেখানে থামলাম, সেই শাড়ির প্লিটসের সামনে। আমার নাকটা গিয়ে থামল একটি তাঁতের সুতোর গায়ে। আমি যদি ঈশ্বর হতাম, সারা পৃথিবী দিয়ে দিতে পারতাম, ওই একটি মুহূর্তের জন্য। কিন্তু কী আশ্চর্য, ঈশ্বরের অপার লীলা, আমাকে কিছুই দিতে হল না। আমাকে যখন সবাই তুলে নিয়ে এল, আমি তখন আসতে চাইনি। সবাই যখন আমাকে জড়িয়ে ধরল, আমি সেই আলিঙ্গন চাইনি। সবাই যখন আমাকে মাথার উপরে তুলে নাচছিল, আমি পড়ে যেতে চাইছিলাম। খেলা শেষ। আমি দেখতে পাচ্ছি তাঁকে। তিনি আশ্চর্য কায়দায় ওই ব্যালেরিনা জুতো পায়ে উঁচুনিচু মাঠের একটি কোণ পেরিয়ে আমাদের দিকে আসছেন। পিছনে দুহাত ছড়িয়ে মেজোকাকা। তিনি এগিয়ে আসছেন, ওই যে মুখটা। আচমকা ওদের স্টপারটা সারা পৃথিবী আড়াল করে আমার সামনে এসে হেসে হ্যান্ডশেক করতে এল। মারলাম ব্যাটার মুখে এক ঘুঁসি। এমন আচমকা মার খাবে বুঝতে পারেনি। ধুপ করে পড়ে গেল। আড়াল সরে গেল। দেখলাম, সেই মুখটা। হে ঈশ্বর, তোমার ভাঁড়ারের সবটুকু অমৃত দিয়ে দিয়েছিলে এই মুখখানির জন্য?

1287

235

জল

গল্প

দাম্পত্য .... ঘুম ঘুম চোখে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসে নাসিমা| কিছুতেই যেন ঘুম ভাঙ্গতে চায় না| মোবাইলটা বেজেই চলেছে| এবার না লাইনটা কেটে যায়| এমনিতেই ঘুমটা ভাঙতে দেরীই হয়েছে| হাতটা বাড়িয়ে সেটাটা তুলে কলটা রিসিভ করে নেয় সে| - খুলছি| বলেই সেটটা রেখে দরজাটা খুলে বাইরে বের হয়| আঁচলের খোঁটে বেঁধে রাখা চাবিটা নিয়ে দ্রুত মেইনডোরটা খুলে দেয়| -এসো| আহ্বান জানায় নাসিমা| - খুব ঘুমোচ্ছিলে? নাসিমা জবাব দেয় না| রাত এখন তিনটে| আশে-পাশে বাড়িতে সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন| এই নিশুতি রাতে শব্দরা যেন প্রাণ পায়| ফিসফিসিয়ে বলা কথাও যেন গমগম করে ওঠে| হায়দর‚ নাসিমার স্বামীর গলাটা যেন সবসময় সপ্তকে চড়ে থাকে| - হাতমুখ ধুয়ে নাও| আমি খাবারগুলো গরম করে ফেলছি| কথা এগোতে দেয় না নাসিমা| শব্দের ভার মাঝেই মাঝেই বড় অসহনীয় হয়ে ওঠে| দ্রুত হাতে ফ্রিজ খুলে কষা মাংস আর ভাতটা বার করে আনে| গত সন্ধ্যেতে হুকুম হয়েছিল‚ রেওয়াজি পাঁঠার কষা কষা করে মাংস আর ঝরঝরে ভাতের| দুটো ওভেন জ্বেলে একটায় মাংসটা‚ আর একটা আঁচ কমিয়ে ভাতটা বসিয়ে দেয়| এবার একটা মাইক্রো কিনতে হবে মনে মনেই ভাবে| বলা চলবে না‚ এখানে কর্তার ইচ্ছেতেই কর্ম হয়| - হল গরম? হায়দররের অসহিষ্ণু গলা ভেসে আসে| - জ্বী হয়ে গেছে| বাড়ছি| গলায় একটু খাতিরদারি এনে কথা বলে নাসিমা| দ্রুত হাতে নক্সী ফাইবারের থালায় ভাত আর বাটিতে মাংস বেড়ে নিয়ে টেবলে হাজির হয়| হায়দরের চোখ তখন টিভির পর্দায়| দ্রুত হাতে খবরের চ্যানেল সার্ফ করে যায়| নিশুতি রাতে টিভি যেন গমগম করে| রেহান আর রাইসা দুজনেই উঠে পড়ে টিভির শব্দে| ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াতে রাইসা একটু ক্ষুন্ন‚ ঘ্যান ঘ্যান করে| দু বছরের রাইসা আর ছয় বছরের রেহান| - বাবা কখন এলে? ঘুমভাঙ্গা চোখে রোজকার মত প্রশ্ন করে রেহান| হায়দার কোলে তুলে নেয় দু সন্তানকে| একটু খুনসুটি করে| রাইসা জোরে কেঁদে ওঠে| ঠিক এইসময় খুনসুটি নয়‚ ঘুমটাই তার কাছে প্রিয়| দৌড়ে যায় নাসিমা| হায়দরের কোল থেকে নিয়ে নেয় নাইসাকে| তারপর ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করতে থাকে| -জ্বী খাবার তো ঠন্ডা হয়ে যাচ্ছে| হায়দর এগিয়ে যায় টেবলের দিকে| অল্প ভাত মেখে মুখে তোলে| নাসিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে| খাবার হায়দরের পছন্দ হয়েছে| রান্নাটা ভালো করে নাসিমা| তবু একই র্াঅন্না তো রোজ রোজ একরকম হয় না| একই মশলা‚ একই তেল‚ একই সবকিছু তবু একরকম হয় না| আর না হলে হায়দরের পছন্দ হয় না| যেদিন যেদিন রাত বিরেতে ফেরে হায়দর সেদিন সেদিন দিল হাতে নিয়ে বসে থাকে নাসিমা| তার মর্দের মরজি বোঝা খুব মুশকিল| ভালো খানা হলে ভালো না হলেই রাতবিরেতেই থালা সুদ্ধু খাবার ছুঁড়ে ফেলবে| খুব লজ্জা করে নাসিমার| আশে পাশে সবাই তো আছে| কে কি ভাবে! রাইসা ঘুমিয়ে পড়েছে| ছোট্ট শরীরটা শুইয়ে দেয় দুই পাশবালিশের মধ্যিখানে| রেহানও শুয়ে পড়েছে| ছ বছরের রেহানও বাপকে বেশ ভালোমত চেনে| জানে কখন মুড অন আর অফ থাকে| আজকাল বাচ্চাদের কিছু কি আর শেখাতে হয়!| -নাসিমা আজ মাংসটা বঢ়িয়া রেঁধেছ| দিল খুশ হয়ে গেল বুঝলে| হাত চাটতে চাটতে বলে হায়দর| বুকে একটা খুশির হাওয়া বয়ে যায় নাসিমারও| তাড়াতাড়ি করে এঁটো বাসনগুলো নামিয়ে টেবলটা মুছে দেয়| কাল সকালে বাসন মাজবে| অলোটা নিভিয়ে দিয়ে ঘরে যায়| টিভিটা বন্ধ করে দেয় হায়দার‚ ঘুমন্ত রাইসাকে আদর করে হায়দর| ঘুমের মধ্যেই গুচ্ছের বিরক্তি প্রকাশ করে| নাসিমা রেহানের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে আলোটা নিভিয়ে| কাল সকাল সকাল উঠতে হবে| রেহানের স্কুল আছে| রাতও বেশি তো বাকি নেই| চারটে বাজতে চলল| রেহানের চোখে তখনও ঘুম নেই| চুপ করে শুয়ে থাকে সে চোখ মুদে| মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নাসিমা| নাইট ল্যাম্প্টা নিভিয়ে দেয় হায়দর| প্রমাদ গনে নাসিমা| রাইসার শরীর ওপর দিয়ে এগিয়ে আসে হায়দরের শরীর| রিস্ক নেয় না নাসিমা| রেহানের পাশ থেকে শব্দ না করে উঠে আসে হায়দরের পাশে| -রেহান এখন ঘুমোয়নি| - হায়দর লঘু স্বরে ডাকে 'বেটা রেহান|' নাসিমা জানে রেহান সাড়া দেবে না| আজকালকার বাচ্চারা খুব বুদ্ধি রাখে| কাঠ হয়ে শুয়ে আছে‚ ঘুমোলে কারও শরীর ওমন কাঠ হয়ে থাকে না‚ শিথিল হয়ে থাকে| একদিন রেহান জানতে চেয়েছিল‚ 'বাবা রাতে কি করছিল মা ?' সেই থেকে খুব সতর্ক নাসিমা| কিন্তু হায়দরের খিদে যখন জেগেছে তাকে শান্ত না করে উপায় নেই| মিশে যেতে ইচ্ছে করে নাসিমার মাটির সাথে| তবু উপায় নেই‚ দাম্পত্য জীবন যে নির্বাহ করতেই হয়| কাল সকালে আবার যদি রেহান প্রশ্ন করে কি উত্তর দেবে নাসিমা? দাম্পত্য|

685

58

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

তুলাভিটা, মালদা-১

দিনটা ছিল, ১৩ ই মার্চ ১৯৮৭ । স্থানীয় ভাষায় “ নেউ” খোঁড়া মানে, ভিত তৈরি করার জন্য মাটি কাটা । মাটি কিছুটা কাটার পরেই উঠে এলো বিশাল এক তামার পাত । জায়গার নাম, “তুলাভিটা” মালদা জেলার হবিবপুর থানায় পড়ে, (অঞ্চল: বৈদ্যপুর জগজীবনপুর)। শহর ইংলিশ বাজার থেকে দূরত্ব প্রায় ৪১ কি মি । বাংলাদেশ সীমান্ত কাছেই । এই তামার পাতের ওজন- ১১ কে জি ৯০০ গ্রাম, ১৮ ইঞ্চি লম্বা ও ২২ ইঞ্চি চওড়া। হিজিবিজি লেখা এই তামার পাতের মূল্য, স্বাভাবিক ভাবেই ওই ভদ্রলোকের জানার কথা নয় । এই মুহূর্তে সেই ভদ্রলোকের নামটা আমার মনে পড়ছে না ( দুঃখিত), তবে তিনি একটি স্থানীয় স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন বলেই মনে পড়ছে। প্রথমে, এক তামার ব্যবসায়ী এই তামার পাতটি কিনে নিতে চান । কিন্তু, ওই ভদ্রলোকের একটা কিছু মনে হওয়াতে , চলে আসেন ইংলিশ বাজার ( মালদা বলে যাকে আমরা জানি ) শহরে। সৌভাগ্য বশত মালদার অন্যতম ইতিহাসবিদ ও মালদা বিটি কলেজের অন্যতম অধ্যাপক শ্রী কমল বসাকের হাতে ওই তামার ফলকটি আসে । ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ সালে, মালদার সংবাদপত্র “ এই মালদা” তে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে জানান :- এই তাম্রফলকটিতে সিদ্ধার্থ মাত্রিকা লিপিতে লিখিত । ভাষা সংস্কৃত । গদ্য ও পদ্য দুই ধরণের ধাঁচেই এই লিপি উৎকীর্ণ আছে । রাজা মহেন্দ্র পালকে আমরা এযাবৎ জেনে এসেছিলাম গুর্জর প্রতিহার বংশের । কিন্তু এই ফলকে লেখায় সেই ভুল ভাঙে । এই মহেন্দ্র পাল হলেন বাংলার বিখ্যাত পাল বংশের ৪র্থ রাজা দেবপালের ছেলে । এই বংশ সম্বন্ধে আগে বলে নেই, তা হলে আরও সুবিধে হবে, ব্যাপারটা বুঝতে । - বাঙালি রাজা শশাঙ্কের গৌড়কে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গৌড়তন্ত্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা তার মৃত্যুর পর ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শশাঙ্কের ধনুকে গুণ টানার মত বীর অব্যবহিত পরে আর দেখা গেল না। ফলে এর পর সুদীর্ঘ একশো বৎসর(৬৫০ -৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সমগ্র বাংলার উপর নেমে আসে গভীর ও সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতা। প্রখ্যাত বৌদ্ধ ইতিহাস রচয়িতা তারানাথ এই সময় সম্পর্কে বলেন:- 'সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া অভূতপূর্ব নৈরাজ্যের সূত্রপাত হয়। গৌড়ে-বঙ্গে সমতটে তখন আর কোনও রাজার আধিপত্য নাই, সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব তো নাইই। রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্রাহ্মণ। নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, কাল তাহার মস্তক ধূলায় লুটাইতেছে।' এর চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কি হতে পারে! সমসাময়িক লিপি ও কাব্যে (রামচরিত) এ ধরনের নৈরাজ্যকে বলা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। বাহুবলই একমাত্র বল, সমস্ত দেশময় উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মত্ততা; দেশের এই অবস্থাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তাকেই বলে মাৎস্যন্যায়। অর্থাৎ বড় মাছের ছোট মাছকে গ্রাস করার যে ন্যায় বা যুক্তি সেই ন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব। শত বৎসরের এই মাৎস্যন্যায়ের নৈরাজ্যে বাংলায় আর্থ সামাজিক অবস্থা চরম বাজে অবস্থায় চলে আসে। এই নৈরাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে কি পরিমাণ ভোগান্তি ও দুর্দশা ছিল টা সহজেই অনুমেয়। সংস্কৃত গ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূলকল্প থেকে এই সময় ঘটা এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায়। চলবে

95

8

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

সংস্কৃত বলার বিপদ

মালদায় থাকাকালীন, সরকারী ট্যুরিস্ট লজ থেকে ম্যানেজার সাহেব মাঝে মাঝে এত্তেলা দিতেন- গৌড় পাণ্ডুয়ায় বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকদের গাইড হতে। বিনিময়ে টাকাডা, কলাডা, মুলোডা জুটতো। টাকা পয়সা তো মিলতই তার ওপর খ্যাঁটন আর বিলেইতি কারণ বারি । তো, সেবার ডাক পড়লো। গিয়ে দেখলাম এক মধ্যবয়সী দম্পতী। ম্যানেজার বাবু সেই মুহূর্তে ছিলেন না। স্টাফেদের কাছে জানলাম, এঁরা ফ্রেঞ্চ। সব্বোনাশ। এদিকে তো আমি খালি মঁশিয়ে আর মাদামাজোয়েল, এই দুটো শব্দ জানি, তাও নার্ভাস হয়ে কোনটা পুংলিঙ্গ আর কোনটা স্ত্রীলিঙ্গ ভুলে মেরে দিয়েছি। বলির পাঁঠার মত ওনাদের কাছে গিয়ে কাঁপতে লাগলাম। খালি দাঁত বের করে হেসে যাচ্ছি। ম্যানেজারবাবু ততক্ষণে চলে এসেছেন। তাঁকে দেখে, ভদ্রলোকের বিরক্তি প্রকাশ। আমারই মতন টুটাফুটা ইংরেজিতে বললেন- আপনাদের এখানে মূক বধির গাইড দেওয়া হয় নাকি? সাহস পেয়ে আমার "ফ্রেঞ্চ" ইংরেজি বললাম ওনাদের সাথে । বাঙালি হেলায় করিল ফ্রাঁসোয়া জয় । ==== ম্যারিকান ইংরেজী বলা খুব সোজা ! নাকী সুরে বাংলা উচ্চারণে ইংরেজী বললেই হল। যদিও ওদের গুলো বোঝা যেত না সহজে । আরও একবার এই রকমই ডাক পড়লো । গিয়ে দেখি দুই সাহেব । আমার কাছে, সব সাহেবই এক লাগতো দেখতে । তবে, এদের উচ্চারণটা বোঝা যাচ্ছিল । একজন বয়স্ক, আরেকজন তুলনায় কম বয়েসী । রওয়ানা দিলাম । দেখাতে দেখাতে চলেছি । মাঝে দু একটা মুখস্ত করা সংস্কৃত শ্লোক । পরান্নং প্রাপ্যে মূঢ় মা প্রাণেষু দয়াং কুরু। পরান্নং দুর্লভং লোকে, প্রাণাঃ জন্মনি জন্মনি ।। (অস্যার্থঃ- পরের অন্ন ( কেউ কাউকে সহজে ডেকে খাওয়ায় না) এই পৃথিবীতে পাওয়া যায় না। অতএব, হে মূর্খ! যত পারো খাও! আর প্রাণ? সে তো জন্মজন্মান্তরেও পাওয়া যায়। - খাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় দর্শন শেখাচ্ছিলাম ওদের :p ) হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বয়স্ক সাহেবটা বলল :- ইট সিম্স্ ইউ নো সানস্ক্রিট‌ !!! আম্মো ভাবলাম :- সায়েবরা আর সংস্কৃত কি বুঝবে ? তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আমার উত্তর :- ইয়া ইয়া ! সিওর ! তারপরই- বিনা মেঘে বজ্রপাত ! দেন লেট আস টক্ ইন‌ সানস্ক্রিট্ , হোয়াই ইন ইংলিশ ? কিভাবে যে সামলেছিলাম------ ভগাই জানে ! ======= পরে জেনেছিলাম- বয়স্ক মুশকো সাহেবটি জার্মান এবং তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের ডিন্ আর ছোটটি অধ্যাপক সংস্কৃতের । সেই থেকে আর সংস্কৃত নিয়ে কথা বলি না ! মাত্থা খারাপ ?

130

13

মনোজ ভট্টাচার্য

স্বপ্নে আসে চরিত্রেরা !

স্বপ্নের মাধ্যমে কি গল্পের থিম পাওয়া যায় ? হয়ত যায় ! কাল সারা রাত স্বপ্নের মধ্যে বিচরন করল বেশ কয়েকটা চরিত্র ! তাদের মধ্যে মহিলা ছিল কিছু – পুরুষ চরিত্রও ছিল ! কিন্তু তাদের কারুকেই আমি চিনতে পারলাম না ! কেন তারা স্বপ্নের মধ্যে এলো ! – আমাকে কি তাদের কোন কথা বলতে চাইল ! যেমন নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র! পরিচালকের সন্ধানে জলজ্যন্ত ছটা চরিত্র তার পথ খুঁজে নিতে চায় ! – এখানেও তাদের চেয়ে একটু উচ্চতায় যেন তাদের দেখতে পাই – সবাইকেই যাতে দেখা যায় ! এরা তো অতীত নয় ! নাকি বর্তমান – টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে ! লিখেছি – চরিত্রগুলোর কজন নারী – কিছু পুরুষ ! ঠিক কজন – তা সঠিক বোঝা গেল না ! – স্বপ্নের আবছায়ার মধ্যে দিয়ে যেরকম দেখেছি সেরকম ভাবে আঁকার চেষ্টা করি । - মোটামুটি সবারই বয়স কম বেশি চল্লিশের কাছাকাছি । মেয়েদের বয়সও তিরিশ চল্লিশের আশেপাশে ! প্রথমে এক জন - বয়েস মনে হল চল্লিশেক । চোখে চশমা । নাম হওয়া উচিত প্রণব বা প্রনবেশ । একটু রাশভারী ধরনের ! কথায় বার্তায় বেশ একটা ভারিক্কি ভাব দেখাচ্ছে ! মুখে সিগারেট দেখা যাচ্ছে ! মনে হয় জমি জমা সংক্রান্ত ব্যবসায় যুক্ত ! – যদি একে এদের মধ্যে দলপতি বলি – তবু এর মুখে একটা চিন্তান্বিত ভাব রয়েছে ! – দলপতি বলেই কি ? নাকি অন্য কিছু ! দ্বিতীয় জনকে মনে হল – এক নারী । এর চোখে রোদ-চশমা । শ্ল্যাক্সের ওপর টপের ওপরেই তার বয়েস ফুটে উঠেছে ভালো ভাবেই ! সাবলীল অঙ্গভঙ্গি । সবার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ ভাবে মিশছে ! এর যুতসই নাম হবে মাধবী ! – আর এর কাছাকাছি একজনকে দেখা যাচ্ছে – এর চেয়ে বয়েস কম । পুরুষ । একটু বেশি বেশি প্রশ্রয় পাচ্ছে ! এর নাম দেওয়া যাক – কৌশিক ! খুব মিশুকে । সবার কাছেই যাতায়াত করছে । প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করে দিচ্ছে ! তবে মাধবীর কাছে একটু বেশি আবদারি ! কৌশিকের একজন সঙ্গী – মানে স্ত্রী হতেও পারে – আছে । সে কিন্তু ওর কাছ থেকে দূরে দূরে ! এই নিয়ে আবার আরও কিছু জনের মধ্যে রঙ্গ রসিকতা চলছে ! শ্রাবস্তী নাম তার । শ্রাবস্তীকে বেশ স্বাধীনচেতা মনে হয় ! খুব পতিপ্রাণা মনে হয় না ! চেহারার বাঁধুনি আছে ! হাব ভাবে মনে হয় কোনও অফিশে কাজ করে । অর্থাৎ স্বয়ং স্বচ্ছন্দ ! রুচিসম্মত পোশাক – শালোয়ার কামিজে – মানানসই ! আরও যেন কিছু মানুষকে দেখেছিলাম ! যেমন ওদের সঙ্গেই দেখেছি – বছর তিরিশের এক পুরুষ ও তার এক মহিলা সঙ্গী ! – ওরা ওদের বাবলু ও মানু বলেই ডাকছিল ! খুব সম্ভবত বেশিদিন বিয়ে হয় নি । কারন ওরা বেশীরভাগ সময়েই এক সাথেই কাটাচ্ছিল ! বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে – এই অসম্পূর্ণ লেখাটা – পরেই আছে । ওদের চরিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী লিখে রেখেছি – এতদিন । যদি না খবরের কাগজে এই খবরটা দেখতাম – তাহলে হয়ত ভুলেই মেরে দিতাম ! খবরটা আজ আলাদা আলাদা ছবি দিয়ে বের হয়েছে ! আলমবাজারের ঠাকুরবাড়ি অঞ্চল থেকে জনা দশেক বন্ধু-বান্ধব বকখালি বেড়াতে গেছিল ! সন্ধের সময়ে ফেরার পথে জোকায় খোঁড়া রাস্তায় ওদের গাড়ি উল্টে – তিনজন হাসপাতালে যাবার সময়েই - - । বাকিদের খুব বেশি ক্ষতি হয় নি ! – তাদের কাছেই শোনা গেল খাপছাড়া ভাবে - । এক প্রসিদ্ধ প্রমোটার তার স্ত্রী ও কয়েকজন বন্ধু ও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে বকখালিতে বেড়াতে গেছিল । সেখানেই বা ফেরার পথে তার সঙ্গে কয়েকজনের খুব কথা কাটাকাটি হয় তার স্ত্রীর সঙ্গে এক বন্ধুর সম্পর্ক নিয়ে ও প্রচুর টাকা পয়সার লেনদেন নিয়েও ! – কিন্তু তার সঙ্গে দুর্ঘটনার কি সম্পর্ক ! – আসলে কাগজে ধূসর বা অপরিস্কার ছবি দেখেও আমার স্বপ্নে দেখা সেই চরিত্রগুলোর একটা মিল খুঁজে পেয়েছি! সেটা যে ঠিক কি – তা বলা মুস্কিল ! আমি তো গাড়িতে ছিলাম না – বা স্বপ্নের চরিত্রগুলোকে কারুর সঙ্গে মেলাবার চেষ্টাও করিনি ! তবে – আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয় – প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল ! গাড়িতে বা গাড়ির বাইরে ধাবায় চা খেতে খেতে ! – আসলে ওই স্বপ্নের চরিত্রগুলো আমাকে যেন টানছিল ! অনেকদিন কোথাও আটকে থাকা পাখি যেমন বাইরে বেরতে চায় ! আজ আমি সেই চরিত্রগুলোকে আমার বদ্ধ কম্পিউটার থেকে মুক্তি দিলাম ! একটি কৈফিয়ত ! – অনেক অনেক দিন আমি কোনও গল্প লিখিনি ! অর্থাৎ পারিনি। আসলে আমার যা কিছু লেখা – সবই কবিতা-কেন্দ্রিক ! – পড়িই বেশি । ভালো লাগে – কবিতা বিষয়ক আলোচনা ! – সেই আমি কি করে গল্প লেখার চেষ্টা করলাম ! আসলে একটা ধারনা ছিল – স্বপ্নে যাই দেখা যাক না কেন – সেটা একটা ফ্রিজ শট! সেখানে গল্পের পরিণতি পাওয়া যায় না ! – আমিও তাই চরিত্রগুলো এঁকে রেখেছিলাম ! এবং অনেক অন্য লেখার মতোই পড়ে ছিল ! একটা গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে গল্পের সেই পরিণতি আমাকে ডেকে নিল । তবে এই পরিণতি আমার কাছে সুখকর নয় ! মনোজ

67

5

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

ইতি উতি

হউ - শব্দটা একটি ওডিয়া লব্জ । এর কাছাকাছি অর্থ বাংলাতে করলে দাঁড়ায় – আচ্ছা বা বেশ । পুরী বাঙালিদের কাছে বেড়ানোর জায়গা । রথদেখা – কলাবেচা দুটোই হয় । জগন্নাথকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় – চক্কাডোলা । মানে হলো গিয়ে – চাকার মত গোল চোখ । আমি ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পুরীতে বেচুবাবুর কাজ করেছি – দুটো ওষুধ কোম্পানির হয়ে । প্রথমটা – জার্মান রেমেডিস, পরে সারাভাই কেমিক্যালস । অবশ্য দুটো কোম্পানির ক্ষেত্রেই কটকঅ শহরঅ, বড় মনোহরঅ ছিল আমার হেডকোয়ার্টার । পুরী, বড় জেলা হওয়াতে ন্যূনতম সাতদিন কাজ করতে হতো সমস্ত জেলার কিছু বাছা অংশে । সেলও ভালো ছিল ওই জেলায় । থাকার জন্য – ছিল ইউনিয়নের রেষ্টহাউস । রাঁধিয়ে ছিল – নীরঅ । চমৎকার রান্না করতো । যে বাড়ীতে রেস্ট হাউস ছিল- তার নাম ছিল – অক্ষয় ধাম । সব মিলিয়ে দুটো বড় বড় ঘর রেষ্টহাউসে । খাটা পায়খানা । পরিবারকে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না, তবে পরের ঘরটা প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকতো বলে আমরা রেভিনিউ তোলার জন্য – ছেড়ে দিতাম একটা ঘর । রেষ্ট হাউসে মদ খাওয়া বারণ । আমরা কেউই নিয়ম ভাঙতাম না । খেতে ইচ্ছে হলে চেনা শোনা হোটেলে একটা ঘরে ম্যানেজ করে টাংকু টানা চলতো । বেরিয়ে আসার সময় ম্যানেজার আর বয়দের একটা ভালো রকম বখশিস দিতাম আমরা, খাবারের দাম সহ । তবে টাংকু হিসেবে আমাদের বিয়ারটাই বেশী পছন্দ ছিল – কারণ তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোলে পাশ না হওয়া বিয়ারের বোতলগুলো সেই কোম্পানির প্রতিনিধিরাই এনে দিতেন, কখনও পয়সা দিয়ে বা না দিয়ে । না না, গুণগত মান খারাপ ছিল না, তবে কোনো কোনো বোতলে ঠিকঠাক ফিলিং হতো না বলে, সেগুলো কোম্পানি ষ্টাফদের হয় মিনে মাগনায় বা অল্প কিছু টাকা নিয়ে বিলিয়ে দিতো কোম্পানি । পরিভাষায়, এদের নাম ছিল – সেকেন্ডস্ । দাম প্রতি বোতল- দেড় টাকা । ঠিক সেই সময়েই প্রথম ফিল্টার সিগারেট লঞ্চ হয় উইলস কোম্পানিতে । নাম ছিল – ফিলটার উইলস্ । দাম ছিল – প্রতি প্যাকেট আশী পয়সা । একটা প্যাকেটে থাকতো দশটা সিগারেট স্টিক । সেই সময়ে – বেশ দামী সিগারেট । তখন ক্যাপস্টান সিগারেটে দেশী তামাক ব্যবহারের কারণে – গুণমান পড়ে গিয়েছিল, ফলে ঠিক আভিজাত্যটাও ছিল না সেই ব্র্যান্ডের । দামও কমে এসেছিল । পুরী মন্দিরের পেছনেই ছিল লক্ষ্মীবজার । এটা এখন আর নেই । যেমন নেই একটা বিশাল বটগাছ – পুরী মন্দিরে ঢোকার দরজায় । লক্ষ্মীবজারেই ছিল আইটিসির পুরী জেলার ডিষ্ট্রিবিউটার । এনার আসল পরিচয় ছিল – মন্দিরের নাম করা পণ্ডা, বাঙালি উচ্চারণে পাণ্ডা । এই কোম্পানি বাজার ধরার জন্য প্রত্যেক খরিদ্দারকেই এক প্যাকেট কিনলে আরেকটা প্যাকেট ফ্রি দিতেন সেই সময় – যদিও শতকরা নিরানব্বই কেসেই এই ফ্রিটা জুটতো না প্রান্তিক খরিদ্দারের । ‌ আরও একটা ব্যাপার ছিল – একটা প্যাকেটে যদি ৯ টা সিগারেট দৈবাৎ পাওয়া যেত, তবে দোকানে থাকা কোম্পানির ফর্ম ভর্তি করে বিক্রেতার সই ছপ্পর নিলেই , দিনকয়েকের মধ্যেই মিলতো মুফতে পাঁচ প্যাকেট সিগারেট । এই সবই জেনেছিলাম, কারণ ওই ডিস্ট্রিবিটারের আপন ভাই ছিলেন আমার কোম্পানির ডিষ্ট্রিবিটার । তাই সিগারেটটাও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রায় বিনে পয়সায় । বিয়ারও তাই । এঁদের দৌলতে প্রায়ই জগন্নাথ দেবের নিরামিষ ভোগ জুটতো লাঞ্চ হিসেবে । ষোলো রকম তরকারি আর সুগন্ধী আতপ চালের ভাত । ফুরফুরে সুগন্ধে ভরে উঠতো চারিদিক । এখন যেটা স্বর্গদ্বার সেটা আসলে শ্মশান । তারই পাশ দিয়ে আমাদের আসতে হতো রেষ্টহাউসে জনবিরল রাস্তা ধরে । উঁচু নিচু রাস্তার বাঁপাশে ছিল একটা আশ্রম আর ডান দিকে ছিল রেলের গেষ্ট হাউস । তাই, বেশী রাত করতাম না রেস্টহাউসে ফেরার সময়ে । সন্ধে সাতটার মধ্যেই শুনশান হয়ে যেত রাস্তাটা । রেষ্টহাউসের বাঁধা রিক্সাওয়ালা ছিল – বাঙালি রতন । সারা পুরীতে ঐ একটাই বাঙালি রিক্সাচালক । ভয় দেখাতো – নানা গল্প শুনিয়ে, ফলে বিশ্বাস না করলেও একটা শিরশিরে অনুভূতি তো থাকতোই । সবসময় সন্ধে সাতটার মধ্যে ফেরা হতো না, কারণ স্টেশনের কাছে কিছু ডাক্তারদের ভিজিট করে দেরীও হতো । আগেই বলেছি – মন্দিরের সামনে বটগাছ ছিল আর ছিল , একটা উঁচু মত জায়গা, যেখানে বেশ কিছু দোকান এবং ডঃ মহাদেব মিশ্রের চেম্বার ছিল । ভদ্রলোক ইংরেজিতে কথা বলা পছন্দ করতেন না, তবে ওডিয়া টানে বাংলা বলতেন আর আমাদের কথা বাংলাতেই শুনতেন । তবে, মেডিক্যাল টার্ম গুলো ইংরেজিতে না বলে উপায় ছিল না, আর বললে – তিনি কিছু মনেও করতেন না । পুরী শহরে, সেই সময়ে কুল্লে একটাই অভিজাত হোটেল ছিল, বোধহয় এখনও আছে । বি, এন, আর হোটেল নামেই তার পরিচিতি । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ে চালাতেন এই সরাইখানা । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ের আগের নাম ছিল – বেঙল নাগপুর রেলওয়ে । সংক্ষেপে – বি. এন. আর । ঠাট্টা করে বলা হতো – বি নেভার রেগুলার । সময়ে নাকি কোনো ট্রেনই চলতো না । একবার দেখা গেল- একটি ট্রেন ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালো । আশ্চর্য হতেই – গার্ড সাহেব নাকি ভুল ভাঙিয়েছিলেন । এটা গতকালের ট্রেন, পাক্কা চব্বিশ ঘন্টা লেট । আজকের ট্রেনের কোনো পাত্তা নেই । আমি অবশ্য বি. এন. আরের ট্রেনে চড়িনি । তবে, বালেশ্বর, কটক, ভুবনেশ্বর, পুরী, ওয়ালটেয়ার ( বর্তমান বিশাখাপট্টনম্ )ওয়েটিং রুমে, বার্মা টিক কাঠের আলনা, চেয়ার, কাবার্ডে বি. এন. আর নামটা খোদাই করা দেখেছি । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলটি তৈরিই হয়েছিল – সায়েবদের জন্য । নিজস্ব সী বিচ আর নুলিয়াও ছিল হোটেলের । সেভেন কোর্স লাঞ্চ আর ডিনার ছিল – কি বিশেষণ বলি বলুন তো ? এককথায় মাইন্ড ব্লোয়িং । চিকেন আলা কিয়েভ – প্রথম এখেনেই খাই । ছুরি দিয়ে কাটলেই বেরিয়ে আসতো তরল সোনার মত মাখন । ওই স্বাদের “কোনো ভাগ হতো না” । মাখনের সাথে মাংস গুলো ইসোফেগাস ধরে স্টমাকে চলে যেত কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়াই । টেষ্ট বিড গুলো বুঁদ হয়ে থাকতো সেই স্বাদে । “ত্রিলোক তারিণী গঙ্গে, তরল তরঙ্গ রঙ্গে এ বিচিত্র উপত্যকা আলো করি করি চলেছ মা মহোল্লাসে!” ... মাখনে মাংসে জিভ একেবারে “গলগলায়িত” । শেষ পাতে আসতো – হিমালয়ান আইসক্রিম । আকৃতি এবং বপুতে একেবারে হিমালয় । পরতে পরতে তার অনেককিছু থাকতো ।নিজচোখে না দেখলে এই আইসক্রিমের রূপ- বর্ণণা দেয়া খুবই কঠিন। অনেকটা 'অন্ধের হস্তি' দর্শনের মতো। ও হরি – বলাই হয় নি । আমাদের কোম্পানির মিটিং এখানে হতো মূলত আমাদের ম্যানেজারদের দৌলতে । এছাড়া পুরীর ডাক্তারদের মাঝে মাঝে এখানে খাওয়ানো হতো – কোম্পানি দের পয়সায় । আমাদেরটাও ব্যতিক্রম ছিল না । যা হয় আর কি – হোটেলের ম্যানেজার থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য কর্মীদের সাথে আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল সহজবোধ্য কারণেই । এছাড়া ওষুধপত্র তো ছিলই । ১৯৭৪ সালে বিয়ে করে – এই হোটেলে মধুচন্দ্রিমা যাপন করবো ভেবেছিলাম, কিন্তু দামের কথা ভেবে পেছিয়ে আসি । জানতে পেরে -বন্ধুরা চাঁদা তুলে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল । এখানেই আমার একমাস বিয়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারতো । তবে সমুদ্রে সাঁতার কি ভাবে কাটতে হয়, সেটা শিখে যাবার ফলে, চুলের মুঠি ধরে ওনাকে জল থেকে তুলে নিয়েছিলাম – তাই ৪২ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটাতে পারছি শৃঙ্খলিত অবস্থায় । সে সব দুঃখের কথা না হয় পরেই বলবো । দেখুন তো – কথায় কথায় আসল বিষয় থেকে সরে গেছি । ডঃ মহাদেব মিশ্র ভিজিটে কোনো স্যাম্পেল নিতেন না । তবে, মাসে বা দুমাসে একবার করে ক্যাম্প করতেন নুলিয়া এবং রিক্সাওয়ালাদের বস্তিতে । আমরাও সোৎসাহে অংশ গ্রহণ করতাম । সেবার এক জার্মান কোম্পানির ছেলে এলো পুরীতে । পাক্কা দর্জিপাড়ার নতুন দা । ফ্রম টপ টু টো – পুরো ক্যালকেসিয়ান । ধরা যাক, তার নাম অনুপ । অনুপ আমাকে জিজ্ঞেস করলো – দাদা আপনার কোলকাতায় বাড়ী কোথায় ? গম্ভীর হয়ে বলেছিলাম – মেদিনীপুরের কাছেই । অনুপ উত্তর দিয়েছিল – আমি নর্থ কোলকাতার তো । সাউথটা আমার তেমন ঘোরা নেই । মেদিনীপুর, ভবানীপুরের কাছে বোধহয়, তাই না ? এহেন অনুপ কে আমরা পইপই করে বলে দিয়েছিলাম – ডঃ মহাদেব মিশ্রের সাথে ইংরেজিতে কথা না বলতে । বাংলাতেই কাজ সারা যাবে । তোর যে কোনো দুটো প্রডাক্টের কথা বলে দিবি – ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দেবেন । কিন্তু, ধর্ম কাহিনী কে কবে শুনেছে ? চেম্বারে ঢুকেই বাও করে বলল – ডক্টর, আই অ্যাম ফ্রম ----- হউ বেচারা অনুপ – ভাবল ওটা হাউ উত্তরে বলল – কম্পানি হ্যাজ সেন্ট মি ওভার হিয়ার হউ বিকজ আই হ্যাভ বিন সিলেক্টেড টু ডু সো হউ এরকম “হউ” কাণ্ড খানিক চলার পর ডঃ মিশ্র রেগে মেগে অনুপকে বেরিয়ে যেতে বললেন চেম্বার থেকে । তারপরের এপিসোড অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছিলাম আমরা । এর পরে অনুপকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলতো :- হউ । ----------------------- ইতি পুরী কাণ্ডে “হউ” পর্বঃ সমাপ্তম {/x2} {x1i}itiuti.jpg{/x1i}

100

9

দীপঙ্কর বসু

না না রঙের দিনগুলি

চার শোনাতে বসেছি আমার জামশেদপুর বাস এর স্মৃতি কথা |তাই আমার খড়্গপুরে কাটান দুই বছরের নির্বাসন পর্ব কে এক পাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে চলি | ডেভেলপমেন্ট স্কুল থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে ১৯৬০ সালে আমি পাকাপাকি ভাবে ফিরে এলাম জামশেদপুরে ‚ভর্তি হলাম সাকচি অঞ্চলে চেনাব রোডস্থিত রামকৃষ্ণ মিশনের এর পরিচালনাধীন বিবেকানন্দ মিডল স্কুলে‚ক্লাস সিক্স এ | সকাল সাতটায় স্কুলের ভেতরের দিকের একটা খোলা চত্বরে সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে "ভব সাগর তারণ কারণ হে‚ গুরুদেব দয়া কর দীন জনে" সমবেত কন্ঠে প্রার্থনা সংগীত দিয়ে শুরু হত স্কুলের কার্যক্রম| টেলকো থেকে আমরা যারা পড়তে যেতাম সাকচির বিভিন্ন স্কুলে‚ তাদের বাড়ি থেকে বেরোতে হত বেশ ভোর বেলা | সকাল ছটা থেকে সোয়া ছটার মধ্যে টেলকোর স্কুলের বাস আসত এ রোডের বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ড থেকে আমাদের তুলে টেলকো কারখানার পিছন দিকে মনিপীঠ অঞ্চলের ‚যেখানে সাবেক রেল আমলের কলোনী ছিল‚আমরা যাকে বাবুলাইন নমে চিনতাম ‚সেই পাড়া ঘুরে রওয়ানা হত স্কুলের দিকে| মনে আছে শীতের দিনে হাড় কাঁপান ঠান্ডায় বেশ কষ্টকর ছিল স্কুলে যাওয়ার ব্যপারটা| ১৯৪৫ সালে টাটা কর্তৃপক্ষ ইষ্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের একটি পুরণো কারখানার শেড রেলকলোনী সহ কিনে সেখানে স্টীম লোকোমোটিভ এবং রেলের ব্যবহার যোগ্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপন করেছিল |বাবু লাইন সেই রেল জমানার স্মৃতি বহন করে টিকে ছিল তখন অবধি|পরবর্তী কালে টেলকো অটোমোবাইল ব্যবসায়ে প্রবেশ করার ফলে কারখানার সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ার গ্রাসে বাবুলাইন মুছে গিয়েছিল- কারখানা গ্রাস করে নিয়েছিল অঞ্চলটাকে| সামনের দিকে নাক বাড়ান যে বাসটি বিবেকানন্দ এবং সাকচি হাই স্কুল এর ছেলেদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর ফেরৎ নিয়ে আসার কাজ করত আমরা তার নাম দিয়েছিলাম জার্মান বাস | সম্ভবত জার্মানির ডেইমলার বেঞ্জ এর সঙ্গে চুক্তি করে জামশেদপুরের কারখানায় ট্রাক তৈরির প্রথম পর্বে জার্মানি থেকে অমদানি করা পার্টস এ্যসেম্বল করেকিছু বাহন তৈরি হয়েছিল সেই বাহনেরই একটি ছিল এই বাস ।জার্মান বাস নামকরণের কারণ সম্ভবত এটাই ছিল ।আরো দুতিনটি বাস টেলকো কম্প্যানি স্কুলের ছেলে মেয়েদের স্কুলে যাতায়াতের জন্য চালাত সেগুলি ঐ রকম নাক বাড়ানো চেহারার ছিলনা | সারদামনি ‚ সিস্টার নিবেদিতা ‚ সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট ইত্যাদি স্কুলের মেয়েদের জন্যে ছিল স্বতন্ত্র বাস|কবে থেকে যে এই পরিষেবাটি কম্প্যানি বন্ধ করে দিয়েছে ধীরে ধীরে তা এখন আর মনেই পড়েনা | আমার ছোট্ট জগতটা এবার একটু একটু করে প্রসারিত হয়ে উঠছিল| আমার ক্লাসের সহপাঠীদের সঙ্গে তো বটেই ‚ সেই সঙ্গে একই বাসে নিত্য যাতায়াত করার সুবাদে অন্যান্য ক্লাসের ছেলেদের সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে লাগল| তাদের বেশীরভাগের নাম ই আজ আর মনে নেই – মনে আছে বাকা নামে আমার সমবয়সী একটি ছেলে আর তার দাদার কথা | বাকাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের মেলামেশা ছিল |বাকার বাবাকে আমার বাবা সত্যদা নমে ডকতেন এবং আমরা মাঝে মাঝেই ওদের বাড়িতে যেতাম সপরিবারে বেড়াতে| অমার সহপাঠী আর একটি ক্ষ্যাপাটে ছেলের কথাও মনে পড়ছে -তার ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের জন্যই বোধ হয় তাকে সে সময়ে একটু এড়িয়ে চললেও ঐ ক্ষ্যাপামির জন্যেই তার নামটা মনে আছে | তার নাম ছিল উৎ্পল | উৎ্পলের ছিল গানের সখ| স্কুলের টিফিন এর সময়ে দিব্বি ডেস্ক বাজিয়ে আপন মনে গান ধরত |তার বিশেষ প্রিয় একটি গান‚ যেটা সে প্রায়শই অবসর সময়ে গলা ছেড়ে গাইত | গানটি সেকালে মান্না দে র গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় গান -ও আমার মন যমুনার আঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতই খেলা/ বঁধু কি তীরে বসে মধুর হেসেই কাটবে শুধু সারা বেলা ঠিক কোন বছরে মনে পড়ছেন ‚তবে মিড্ল স্কুলে পড়ার সময়েই একদিন ঘটল একট ঘটনা যা আমার মনে গভীর ভাবে রেখা পাত করেছিল |আমাদের স্কুলের বাগানে মেইন গেটের পাশেই ছিল একটা মহুয়া গাছ| বছরের একটি সময়ে অজস্র মহুয়ার ফলে ফুলে ভরে উঠতো গাছটা‚- তার কিছু ফল ঝরে পড়ে ছড়িয়ে থাকত বাগান ময়|অনেকটা বাংলা পাঁচের মত আকৃতির ছোটো ছোট ফলগুলিকে দুই আঙ্গুলের মঝে রেখে চাপ দিলেই তার ভিতর থেকে পিচকারির মত একটা মাদকতাময় গন্ধ যুক্ত তরল বেরিয়ে আসত |আমর প্রায়ই সেগুলিকে কুড়িয়ে নিজেদের পকেটে ভরতাম এবং খেলার ছলে কোন অন্যমনস্ক বন্ধুর মুখে সেই তরল ছিটিয়ে দিতাম অচমকা| আনমনা বালকটি সচকিত হয়ে উঠত | আমরাও মহাউল্লাসে মেতে উঠতাম | বলা বাহুল্য আমাদের এই মজায় স্কুলের মাস্টারমশাইদের সায় ছিলনা |তবে তাঁরা আমাদের এই খেলাটাকে ঠিক কগনিজেবল অফেন্স হিসেবে গন্য করতেননা- উল্টে তাঁদের কেউ কেউ আমাদের এই ছেলেমানুষী মজায় লুকিয়ে মজাও পেতেন বলেই আমার বিশ্বাস | এই নিস্পাপ খেলাটিই একদিন ঝামেলা ডেকে আনল |সামনের বেঞ্চে বসা তন্ময় নমে একটি ছেলে যখন মন দিয়ে মাস্টারমাশাইয়ের পড়ান বোঝার চেষ্টা করছে সেই সময়ে তার পিছনের বেঞ্চিতে আমার ঠিক পাশেই বসা ছেলেটি মাঝে মাঝেই নিজের পকেট জমিয়ে রাখা মহুয়া ফল বের করে দুই আঙ্গুলের চাপে মহুয়ার রস ছিটিয়ে দিচ্ছিল তন্ময়ের কানের পিছন দিকে | প্রথমে দুই একবার উপেক্ষা করার পর একবার হঠাৎই তন্ময় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে সজোরে এক ঘুষি চালিয়ে দিল আমার নাক লক্ষ্য করে| আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঘুঁষি সজোরে আমার নাকে এসে লাগল |নাক দিয়ে রক্তপাত আরম্ভ হল | মাস্টারমশাই সহ গোটা ক্লাস ঘটনার আকষ্মিকতায় হতভম্ব!! মাস্টার মশায়ের নির্দেশক্রমে দুতিনটি ছেলে আমাকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল ক্লাসের বাইরে বাথরুমে মুখে নাকে জলের ছিটে দিয়ে রক্ত ধুয়ে দিতে | সে সব মিটিয়ে ক্লাসে ফিরে এসে দেখি অকুস্থলে হেড মাস্টার মশাই ‚শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত হয়েছেন ‚রাগে তাঁর ফর্সা মুখ একেবারে রক্তবর্ণ ‚হাতে ধরা একটি লিকলিকে বেত ‚আর তাই দিয়ে বেদম প্রহার করছেন তন্ময়কে | আর হেডমাস্টার মশায়ের দুচোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রু ধারা | হেড মাস্টার মশাই তন্ময়কে প্রহার করছেন আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেও কেঁদে চলেছেন সমানে| আমি আমার অকারণ নিগ্রহের কথা ভুলে অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলাম আর ভাবছিলাম শিবপ্রসাদ বাবুর মত শান্ত মৃদুভাষী কি ভাবে এমন নির্মম প্রহার করতে পারেন আবার একই সঙ্গে নিজেই কেঁদে ভাসান !! ঘটনাটির কথা আজ এত বছর পরে লিখতে গিয়ে বারে বারে সাদাধুতি আর গেরুয়াপাঞ্জাবী পরিহীত অকৃতদার অভিজাত‚শান্ত সৌম্যকান্তি শিবপ্রসাদ বাবুর চেহারাটা ভেসে উঠছে আমার চোখের সামনে | আমার নিজেরই দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে স্নেহময় সেই হেডমাস্টারমশাইকে মনে করে |

200

23

মুনিয়া

Tell me something good

@সন্দেশ‚ আজকের পর্ব আপনার জন্য: এদেশে পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের অনেক অভিযোগ| তারা কেবল টিকিট দিতে তৎপর‚ আসল কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা| যে কোনো সাধারণতম রাস্তার আইন অমান্য করলেই প্রচুর ফাইন করে‚ ইত্যাদি প্রভৃতি| আমি রোজ সকালে যে পথ ধরে কাজে যাই তার এদিক ওদিক ঘুপচি দেখে দুই তিনজন অফিসর প্রত্যহ লুকিয়ে থাকে| আসতে যেতে প্রায়শই দেখি কাউকে না কাউকে পাকড়াও করেছে| আর একবার ধরলেই প্রচুর টাকার চুনা! আমিও সময়ে সময়ে গজগজ করে থাকি| এতদিন আসছি যাচ্ছি‚ তাই ঠিক জানি কোথায় তারা ঘাপটি মেরে থাকে‚ দেখলেই মনে মনে বলি‚ ঐযে ছিপ ডুবিয়ে বসেছে! আমাদের ছোট থেকে পুলিশ সম্পর্কে একটা ভয় গড়ে উঠেছিল| দেশে নানা অভিজ্ঞতায় চেতনাতে গভীর হয়ে বসেছিল‚ পুলিশ কেবল দুষ্টেরই দমন করে না‚ শিষ্টকেও নানাপ্রকারে উত্ত্যক্ত করে| ধারণাটা এতই পরিস্কার ছিল নিজের কাছে‚ এদেশে প্রথম যেদিন পুলিশ লাইট জ্বালিয়ে পিছু নিল‚ অপমানে চোখে জল এসে গেছিল! গাড়ি থামাতে অফিসর খুব বিনীত হয়ে বলেছিলেন‚ গাড়ির পেছনের আলোটা জ্বলছেনা‚ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা নেবেন| পুলিশ দাঁড় করালো‚ পয়সা চাইল না‚ উৎপীড়ন করল না‚ খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন! কাল কাগজে পুলিশ সম্পর্কে এমন একটা ঘটনা পড়লাম যা হৃদয়কে আলোড়িত করে মুখে হাসি ফোটালো| গত সপ্তাহে নিক এর জন্মদিন ছিল| ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলেটিকে তার মা জিজ্ঞেস করেছিলেন কেমন করে সে তার জন্মদিন পালন করতে চায়| এক মুহূর্তও না ভেবে বাচ্চাটি বলেছিল‚ আমার জন্মদিনের থিম হবে চোর- পুলিশ| আর সেইজন্যে সে স্থানীয় পুলিশ দপ্তরকে নিমন্ত্রণ করতে চায়| নিক পুলিশ সম্পর্কে যাবতীয় কিছুতে সাংঘাতিক আগ্রহী| বাজারে পুলিশের যতরকম কষ্টিউম‚ খেলনা অস্ত্র‚ গাড়ি পাওয়া যায় সবই তার সংগ্রহে আছে| আসলে নিক এর পরিবারের বেশ কিছু সদ্স্য আইন-কানুন সংক্রান্ত জীবিকার সাথে যুক্ত| তাই হয়ত জন্ম থেকেই তার পুলিশ সম্পর্কের তার এই আগ্রহ| পরিবারটি জায়গা বদল করে সদ্য সদ্য এই লিভারমোরের লোকালয়ে এসেছে| কাউকেই তেমন চেনে না| তবুও নিক এর ইচ্ছপূরণ করার তাগিদে মা‚ ন্যান্সি নিকটস্থ পুলিশ দপ্তরকে চিঠি পাঠালেন| লিখলেন‚ যদি একজন পুলিশ অফিসর‚ টহল দেওয়ার গাড়িসহ তার ছেলের জন্মদিনের পার্টির সময়টাতে আসতে পারেন‚ তবে তার ছেলের জন্মদিনে সেটি তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হবে| তার ইমেলের উত্তরে পুলিশ দপ্তর থেকে জানানো হয়‚ যদি সেইসময় কোনো জরুরী দরকারে আটকে না যান তাহলে একজন পুলিশ অফিসর নিশ্চয়ই পার্টিতে হাজির হবেন| জন্মদিনের পার্টির দিন হাজিরা দেবার আধঘন্টা আগে সার্জেন্ট স্টিভ গোয়ার্ড ন্যান্সিকে ফোন করে বলেন‚ শিগগিরিই একজন অফিসর নিক এর সাথে দেখা করতে আসছেন| নিককে সারপ্রাইজ দেওয়া অভিপ্রায়ে ন্যান্সি ছেলেকে নিয়ে বাড়ির সামনে প্রবল খুশি বুকে চেপে অপেক্ষারত থাকেন| তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না যখন দেখেন আলো জ্বালিয়ে একের পর এক‚ সাতটি পুলিশের গাড়ি তাঁর ড্রাইভওয়েতে লাইন দিয়ে দাঁড়ালো! আর ছোট্ট নিক? সে এতই বিস্মিত ছিল যে তার বাকরোধ হয়ে গেছিল| সম্বিত ফিরে পেয়ে সে অফিসরদের সাথে খেলায় মাতে| তাঁরা নিককে নিজেদের সইসহ পুলিশ লেগো সেট উপহার দেন| তাঁদের গাড়িতে বসিয়ে রকমারি যন্ত্রপাতি‚ মেশিনের ব্যবহার ব্যাখ্যা করেন| অনেক অনেক স্টিকার বিলোন নিক ও তার বন্ধুদের এবং বাচ্চাটিকে সারাজীবন উপভোগ করার মত একটি স্মৃতি দিয়ে বিদায় নেন| ঘটনাটি পড়তে পড়তে অসম্ভব একটা ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম| ভাবছিলাম আমাদের সকলের ক্ষমতা আছে অন্যের জীবনে এই এতটুকু হলেও খুশি উপহার দেওয়ার| মন্তব্যের জায়গায় লিভারমোর পুলিশকে সাধুবাদ দিতে গিয়ে একটি মন্তব্যে চোখ আটকে গেল| তারপরে আর হাসি থামছেনা| একটি ছেলে লিখেছে‚ হায়‚ আমিও যদি নিকের মত সৌভাগ্যবান হতে পারতাম| আমার ষোলো বছরের জন্মদিনে বিনা আমন্ত্রণেই পুলিশ এসেছিল| উপহার দেওয়া তো দূরের কথা‚ পার্টি বানচাল করে আমাকে আর আমার বন্ধুদের ঘাড় ধরে তারা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেছিল!!

570

81

মোহিতলাল v2.0

পচা ডোবা টু প্যাসিফিক

কালুয়া ও কালাপানি পর্ব-৭ (নাহ‚ পচা ডোবা শিরোনাম থেকে বাদ| চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে মাটিতে ভাত খাওয়ার মানে হয়? ইন ফ্যাক্ট‚ আমাদের একটা পুকুর আছে‚ সেটি এখন প্রায় ডোবায় পর্য্যবসিত| সংস্কার হয়না‚ পাড় যাচ্ছে ভেঙ্গে| আজকাল লীজ দেয়া থাকে একবছর এই শরীকের পরের বছর অন্যের| মন্দ প্রাপ্তি হয় না| মাছ চাষ তো আজকাল লোভনীয় ব্যবসা| বিশেষ করে দেশী রুই‚ কাতলা বেশী দামেই বিকোয়| এদিক সেদিক করে একশো দিনের কাজের প্রকল্পের আওতায় আনবার চেষ্টা চলছে‚ ফ্রীতে রিপেয়ার করা হয়ে যাবে| একটু আধটু তো দেশ থেকে কিছু পাবার হক তো আছে‚ দেশের প্রতি নি:শর্ত কর্তব্য করনের বিনিময়ে!) (১) তো কতদূর অবধি এগেয়েছি আমরা? জল কেটে কেটে জাহাজ চলেছে তো চলেছেই | প্রথম‚ দ্বিতীয়‚ তৃতীয় দিন শুধুই চলা| সুখ আর সুখ‚ খাও দাও মস্তি করো| একটু টুকে দিই কোন একদিনের ডিনারের মেনু থেকে| হিমবাহের ১০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র| কয়েকটা স্যাম্পল| Smoked duck breast Premium angus beef sliders Escargots bourguignonne ( Tender snails drenched in melted garlic-herb butter?) Linguini with pomodoro sauce (fragrant tomato, onion and garlic sauce tossed with al dente pasta? না‚ টুকতেই হাত ব্যথা হয়ে গেল| A3 সাইজের এপিঠ ওপিঠ দুপাতা| এ তো গেল একদিনের মেনু| তবে রেস্টুরেন্টের (a la carte ডিনারের‚ বলেছি তো টেবিল পেতে‚ সাজিয়ে ওয়েটার পরিবেশিত| আহামরি নামের পদ কিন্তু ভাইলোগ আমার কি ওসব পোষায়! বরং এক কানা উঁচু কাঁসার থালায় পান্তাভাত চটকে আমানি সমেত (ভাতের জল)‚ গরম আলুভাতে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মাখা খাবারের কথাই মনে পড়ছিল| এ কি সাজা রে বাবা| ওয়াটার ওয়াটার এভরিহোয়ার টাইপের| দুদিন রেস্টুরেন্টে গিয়েই ছোঁড়াগুলোকে বললাম‚ দাদা বৌদিকে রেহাই দাও‚ আমরা এগারো তলার বুফেতেই যাবো| আর ও মুখো হইনি| (২) একটা আইটেমের কথা মনে আছে- cauliflower impregnated with saffron আরও কি যেন| মালটা যখন সার্ভ করলো‚ আমি ভাবছি কি না কি| ও হরি‚ একটা স্লাইস কপির ফুলে গেরুয়া রঙ করা‚ আরও বোধ হয় কিছু স্মোকড মাছ্টাছ ছিল! অন্যপদ কি অর্ডার করেছিলাম মনে নেই| আমি গাঁই গুঁই করতে ওয়েটার একটা বোম্বাই সাইজের স্যামনের পীস এনে দিল‚ গ্রিলড‚ ছাল সমেত‚ তাতে না আছে মশলা না কিছু‚ আঁশটে গন্ধযুক্ত| সেটাও সরিয়ে বোধহয় আলুভাতে mashed potato খেলাম অন্য কারুর অর্ডার করা| তবে কি যা চাইবেন এনে দেবে আর বিল দেবার তো প্রশ্নই নেই| ওয়েটার আবার তামিল ভাষী‚ সোনায় সোহাগা| খুব যত্ন সহকারে সার্ভ করেছিল পুরো দশদিন| না তার যত্নে কোন কৃত্রিমতা ছিল না‚ আগমার্কা আতিথেয়তা| পুরস্কার সকলে মিলে ১০০ মত করে বকশিস দেয়া হয়| বাঙলা টাকায় প্রায় হাজার আশি বা লাখের মতো‚ মন্দ কি‚ দশ দিনে| আমেরিকান কোম্পানী তো ‚ জানে ব্যবসা করতে| অল্প মাইনেতে লোক রাখে‚ তাদের ভর্তুকী বকশিসে| (৩) লাঞ্চ ও ব্রেকফাস্ট অবশ্যই বুফে‚ এগারো তলায়| সত্যি বুফে হলটি এগারো তলায় স্বর্গোদ্যান| জাহাজের পশ্চাদ্দেশ‚ বিশাল গোল জানালা পুরো চওড়া (breadth) জুড়ে‚ তেনার (জাহাজ সর্বদাই স্ত্রীলিঙ্গ) ব্যাস পুরো বেয়াল্লিশ মিটার| আমার এক কলীগ সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন ‚ তিনি গত বছর দুই ধরে বিভিন্ন ক্রুজেই যাচ্ছেন| (হায়‚ আমার আর কোনদিন‚ এজন্মে আর যাওয়া হবে না‚ এদিক সেদিক করে ক্যান অ্যাফোর্ড বাট.......)| সংক্ষেপে ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিক্স দিই: Flag ...... Bhamanian (আর কোথায়!) Gross tonnage= 1,38,194 ton Length= 310 metres Crew members= 1200 Total capacity= 5200 জন (crew সমেত) Motor capacity= 42,000 KW রোজ খাবার তৈরী হয়=২২‚০০০ meal (৪) সম্পাদক মশায় জানতে চেয়েছেন‚ entertainment এর কি ব্যবস্থা থাকে| রোজ সকালে দরজায় গোঁজা থাকতো সে দিনের ফিরিস্তি‚ সেও A3 সাইজের দুপাতা| দু একটা আইটেম তুলে দিই‚ Day 1,2, 3 থেকে| The thrill of the rock climbing wall Welcome aboard Karaoke night Ice skating Battle of the sexes-progressive trivia The world's sexiest man competition আর এগুলো তো আছেই: Basket ball court Big screen movie হ্যানা ত্যানা| (৫) প্রথম তিন দিন একটানা শুধু ভেসে চলা‚ চার দিনের দিন সকালে নিউ ক্যালিডোনিয়ার রাজধানী Noumea দ্বীপ| শেষ অবধি একটু একঘেঁয়ে হয়ে ওঠেনি তা বলবো না| অব্শ্য যারা একটু পানাসক্ত তাদের পক্ষে রমরমা| আমাদের দিন শুরু হতো ছটা বাজলেই পাঁচতলায় চা কফি‚ pastryর কাউন্টার খুলে যেত| আমাদের তো সকাল সকাল ঘুমোতে যাবার অভ্যেস সেই ব্যাঙ্গালোর থেকেই‚ ভোর বেলা উঠেই না সকাল ৭|১৫তে ফ্যাক্টরি পৌঁছুনো| একটা মজার ব্যাপার- স্টাটিসটিক্স ক্লাশের স্যার বলেছিলেন‚ পৃথিবীর সব ঘটনাই কোন না কোন স্ট্যাটসের নিয়ম মেনে চলে| (এটা আমাদের রেসিডেন্ট পন্ডিত পাঠকের জন্যে তোলা থাক)| চাঁদের কলঙ্কের সাথে মুসুর ডালের ভাও এর একটা কো-রিলেশন খুঁজে পাওয়া যাবে!(অথবা আমার ভাষায়- গঙ্গার বান আসার সময়ের সাথে 'আমি তোমাকে ভালবাসি' কবুলের মুহূর্তের! (রাত ভরে বৃষ্টির সাথে দশমাস পরে বাচ্চা হওয়ার সম্পর্ক অবশ্য ১:১ কো-রিলেশন!) | তো সেই নিয়ম মেনেই মোটামুটি একই লোকজনের সাথে ঐ কাক সকালে দেখা হতো| এখানেই তো ফুলবাগানের সেই বাঙালী ছেলেটি সকালে ও নৈনিতালের ছেলেটি বিকালে ভাগাভাগি করে তদারকি করতো| ফুলবাগানের ছেলেটির কতই বা বয়েস‚ ২৮-২৯‚ তাইই তো বললো| ইচ্ছে একটা ফ্ল্যাট কেনার‚ একটু ফান্ডাও বিররণ করলাম| সে ভাবলো‚ আমি কতই না অভিজ্ঞ! (৬) এক সাথে হাম তুম এক কামরায় বন্ধ‚ তাই বলে হে পাঠক ভাববেন না যে চাবি খোয়া যাবে| আরে সে সব সোনার বয়েস কি আছে যে আঙুলে আঙুল ঠেকে গেলে সোনা হবে| আগেই বলেছি এই সব ক্রুজ মধুচন্দ্রিমার পক্ষে আদর্শ| আমাদের অবশ্য চন্দ্রিমা ছিল‚ শুক্লপক্ষের রাত| তবে ঐ পর্য্যন্ত| আসলে ফ্ল্যাশব্যাকে টাইম মেশিনে চাপা - কবে কি হয়েছিল‚ কে বলেছিল‚ কেন ওটা হয়নি‚ আসলে ভুল ডিসিশান নেয়া হয়ে গেছে‚ মেলবোর্নে ট্রান্সফারের অফার নেয়া উচিত ছিল‚ সেবার বন্যার ফলে করমন্ডল এক্সপ্রেসের কিছুটা পথ অন্ধ্র সরকার কি সুন্দর করে বাসে নিয়ে গিয়েছিল‚ মনে আছে‚ ' সেই চিলে কোঠায় গিয়ে সংসার পাতার কথা'‚ প্রতি শনিবার নিয়ম করে কেরোসিনের স্টোভ পরিস্কার করা‚ কাঁচি দিয়ে পলতে সমান করে কাটা যাতে করে নীল ফ্লেম হয়! এই সব গল্প করেই কাটলো| এবার কিন্তু ঝগড়া হলো না‚ কনফাইনড স্পেসে পুরোনো দম্পতি বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকলে অবধারিত ঝগড়া| এই যেমন আমাদের এক চেনা ডাক্তার আছেন সিডনীতে‚ আগে এখানে ছিলেন| মাঝে মাঝে দেখাতে যাই‚ তো ডাক্তার ঠিক ধরে ফেলে মনোমালিন্যের খবর‚ অভয় দেন যে তাঁরাও যখন কয়েক ঘন্টা একসাথে ড্রাইভ করেন‚ তাদের বেলাতেও অন্যথা হয় না| আমাদের নবীন বন্ধুরা তো হৈ হৈ করে পুরো জাহাজ চষে ফেলছে‚ স্কেটিং‚ জগিং ও অতি অবশ্যই ক্যাসিনো| মাহেশ্বরী ও আদিত্য এ বিষয়ে আগ্রহী‚ আমরা দেখা হলেই- কি মাইনাস না প্লাস? যাদের ছোট বাচ্চা তাদের তো পোয়া বারো‚ ফ্রী চাইল্ড কেয়ারের ব্যবস্থা| এসব না করলে সাড়ে চার হাজার যাত্রী পাওয়া কি সোজা কথা? তাও প্রতি দশ দিন অন্তর অন্তর| সেপ্টেম্বরে আবহাওয়া ভাল হতে শুরু করলেই জাহাজ সিডনীতে ভেড়ে আর চলতেই থাকে পিরীতের গাড়ী| সকালে অপেরা হাউস ঘাটে ফেরত আসে‚ একদল যাত্রী নামলো তো নতুন দল নিয়ে সন্ধে হতে আবার পাড়ি দেয়া| হবে নাই বা কেন‚ প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের নৌকো ও বারশো কর্মী‚ খাওয়া দাওয়া‚ জ্বালানী- এলাহি ব্যাপার‚ থেমে থাকলে যে প্রতি মুহূর্তের জন্যে টাকা লস| মার্চ পরহ্তেই আমেরিকা পানে‚ সেখান থেকে আলাস্কা যাওয়া আর আসা চলতেই থাকে‚ আবার সেপ্টেম্বরে সিডনী| চার দিনের দিন সকালে নুমিয়া দ্বীপ| (বিরতির পর)

305

35

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

স্মৃতি ও paper shredder| অফিসের দেরাজ‚ আলমারি খালি করছিলাম গত শনিবার| এতদিনের ছুটকো ছাটকা‚ কাগজ পত্র| কিছু অফিসিয়াল‚ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার‚ প্রমোশনের চিঠি‚ পুরোনো চাকরীর প্রশংসা পত্র‚ কিছু ব্যক্তিগত ছবি| কিছু অতি ব্যক্তিগত‚ এ অফিসের ড্রয়ার‚ সে অফিসের ড্রয়ার ঘুরে রয়েই গেছে| ফেলে দিলেই হয়‚ ফেলা হয়নি প্রাণে ধরে| ওভার টু দ্য paper shredder!

646

59

kishore karunik

রয়ে যাবে

বঙ্গ বন্ধু -কিশোর কারুণিক কেটে গেল আঁধার ঘাতকদের হলো বিচার, চারিদিক হলো ঝলমলে আলো। কলঙ্ক মোচন হলো জাতির, কলঙ্ক মোচন হলো প্রিয় স্বদেশের। বড় কষ্ট হয় খুব কষ্ট পাই ঘাতকের বুলেটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলে। যাদের বিশ্বাস করেছিলে যাদের স্নেহের ছায়ায় ঠাই দিয়েছিলে, তাদের ভেতর কিছু কুলাঙ্গার তোমার সাথে প্রিয় স্বদেশের সাথে করল চরম বিশ্বাস ঘাতকতা। তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল ওরা তোমার স্বপ্ন, মানবিক চেতনাকে- হত্যা করতে চেয়েছিল। না, ওরা পারে নি তুমি এখনো অম্লান কোটি কোটি বাঙালীর মনি কোঠায় রক্তে কেনা জাতীয় পতাকায় জাতীয় স্তম্ভে তুমি মহান পুরুষ বাংলাদেশের জাতীর জনক- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তুমি শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকো তোমার প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে; তোমার স্বপ্ন, চেতনা, মূল্যবোধ আজ কোটি কোটি বাঙালীর প্রেরণা। তোমার স্বপ্নের সোনাল বাংলা সোনায় সোনায় ভরে উঠবে, বাঙালী হয়ে উঠবে বলিয়ানে তেজস্বী। তোমার চেতনা ধারণ করে মানবিক মূল্যবোধে বাঙালী বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে মেরুদন্ড শক্ত করে, জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়তে । সোনার বাংলা গড়তে সোনার বাংলা গড়তে।

221

8

মনোজ ভট্টাচার্য

ওম মনিপদ মেহুম !

ওম মনিপদ মেহুম ! ( দ্বিতীয় পর্ব ) সকাল হতে দেখতে পেলাম – একটা বেশ বড়-সড় কলেজের একটা এডুকেশানাল টীম এসেছে । ওরা নাকি দুই দেশের দশটা গ্রাম ঘুরবে ! – দুটো বাসে প্রায় চোঁতিরিশ মেয়ে । তাদের সঙ্গে এসেছে কেটারার – জয়গাওর এক বাঙালি - এক রাঁধুনি মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে । হোটেলে তাদের একটা ছোট রান্নাঘর দেওয়া হয়েছে । ওরা শুধু ঐ টীমটার জন্যেই রান্না করবে ! – আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই আলাপ হয়ে গেল ! – এই টীমের মেয়েরা মাঝে মাঝেই – দম করে দরজা খুলে ফেলছে – আর ভুল বুঝতে পেরে সরি বলে বেরিয়ে যাচ্ছে ! সকালে প্রাতরাশ সেরে আমাদের গাড়িতে বেরিয়ে পড়লাম থিম্পু দর্শনে ! – সবই পাহাড়ের চারদিকে ও কখনো ওয়াং চু নদী ও মান চু নদী জড়িয়ে । চু মানেই হচ্ছে নদী ! – আর সবই হয় বুদ্ধ-মূর্তি অথবা গুম্ফা ! তবে মন্দিরের কারুকার্য দেখলে মন ভরে যায় । যতই ছবি তূলি – কেবলই মনে ঠিক হোল না । অর্থাৎ যা দেখছি তা তো আসছে না ! – তবু তুলেই চলি । এক জায়গায় একটা মন্দিরে দেখি অনেক সাধু বা মঙ্ক । তারা নাকি মন্দিরের বাসিন্দা । এখানে শুধুই জপ-তপ করে কাটায় ! এই ঠাণ্ডায় ! – আবার পরে অন্য মন্দিরে চলে যায় ! হয়ত শুধু জপ-তপ করেই সারা জীবন কাটিয়ে দেবে ! শুনলাম – থেকে থেকে অন্য কোথাও থেকে কোন লামা বা বৌদ্ধ গুরু আসে – একদিন বা কিছুদিন জ্ঞান-দান করে আবার অন্য কোন মন্দিরে চলে যায় ! আর এক মন্দিরে দেখি আরতি আরম্ভ হওয়ার আগেই অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু মন্দিরের বাইরে আসন পেতে একটা ছোট্ট ঘণ্টা বাজিয়ে দোহার দিচ্ছে ! – সেই মন্দিরের ভেতরে আট দশজন পুজারী মন্ত্র পড়ছে । মন্দিরের ভেতরে ওহম শব্দ গমগম করছে । বেশ গম্ভীর পরিবেশ ! আমার বিদ্যে-বুদ্ধি দিয়ে বৌদ্ধ মন্ত্র বোঝার বা মুখস্ত করার চেষ্টাও করি নি । কিন্তু আমরা যেটা জানি – অর্থাৎ ওঁ মণিপদ্মে হুম – তার থেকে অনেক দূর ! বরং দুর্বোধ্য - ওম মনিপদ মেহুম ! - om ma ni pad me hung ! আমরা পরের দিন গেলাম – পারো । থিম্পু বা পারোতে মোটামুটি সবই একধরনের মন্দির বা বুদ্ধ মূর্তি বা বৌদ্ধ স্তুপ ! তবে সব কটাই এত উঁচু – যে উঠতে উঠতে দম বেরিয়ে যায় ! অনেকেই অর্ধেকটা উঠেই হাল ছেড়ে দেয় ! – তবে ওপরে উঠলে – পুরোটা দেখা যায় । সর্বোপরি একধরনের সন্তুষ্টিও লাগে ! আর মূর্তির চারদিক ঘিরে নানারকম বুদ্ধের জীবনী-কথা খোদাই করা ! মিউজিয়ামে নানান রকম তথ্য । ভাল লাগল – একটা বীরপুরুষদের নাচ ! বেশ ছন্দে ছন্দে বীরের মতো পা ফেলছে ! – মিউজিয়ামের ঠিক সামনেই একটা অত্যন্ত প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির । কয়েকবছর আগে ভুমিকম্পে ভেঙ্গে গেছে । এখন সারান হচ্ছে – ভেতরে । তাই ওখানে যাওয়া নিষেধ ! অতো উঁচুতে – কি প্রচণ্ড হাওয়া ! প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ! স্থির ভাবে দাঁড়ানোই যাচ্ছে না ! সবাই দেওয়াল ধরে ধরে ছবি তুলছে । অথবা হাওয়া একটু কমলেই শাটার টিপছে ! এখানে পোশাক-আশাক খুবই সাদাসিধে । মেয়েরা মোটামুটি একই ধরনের লম্বা পোশাক – একটু ধূসর চকোলেট রঙের ! আর ওপরে একটা টপ ও এক ধরনের রঙিন ডোরাকাটা লামাঙ্গা ! – আর ছেলেদের পরনে বাকু ! - বাকু - প্রথমবার যখন আসি – তখন থেকেই আমার খুব পছন্দের ছিল । কেনা হয় নি – কারন কলকাতায় হাঁটু পর্যন্ত খোলা পোশাক পড়ে তো যাতায়াত করা যায় না – অনেকটা লুঙ্গি তুলে পড়া আরকি ! কিন্তু এখানে সবাই বাকু ! সরকারী কর্মচারীরা বাধ্যতামুলক ধুসর চকোলেট রঙের বাকু ! রাজতন্ত্রের দেশে রাজার স্থান কোথায় ! এই প্রসঙ্গে আমায় কিছু লিখতে বললে – লিখতাম – সে দেশে রাজাকে চাক্ষুষ দেখা যা না – অথচ রাজা সর্বত্র বিরাজমান ! অর্থাৎ রাস্তায় দোকানে হোটেলে – সব জায়গায় রাজা ও রানী ও যুবরাজের ছবি টাঙ্গানো – সেটা বাধ্যতামুলক কিনা জানা নেই ! – কিন্তু পারো থেকে ফেরার সময়ে হঠাৎ পাহাড়ি রাস্তায় দেখি সব গাড়ি দাঁড়িয়ে – তিন চারটে গাড়ির কনভয় নিয়ে রাজা আমাদের উল্টোদিকে চলে গেল । ওরা বলল – রাজামশাই নাকি এয়ারপোর্ট যাচ্ছে ! এয়ারপোর্টে দেখেছি তিনটে রয়াল প্লেন দাঁড়িয়েছিল ! তারই যেকোনো একটাতে হয়ত যাবে ! এবারের সাত দিনের সফরে – অনেক তেতো-কড়া অভিজ্ঞতা হয়েছে ! নিজেদের দেশকে পায়ের তলায় ফেলে কিভাবে পিষে দিতে হয় – আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেখে শিখতে হয় ! ফ্যাসিস্ট নোট-নীতির জন্যে দার্জিলিঙের চারদিকে প্রায় হাহাকারের মতো অবস্থা ! - সমস্ত ব্যাঙ্কগুলো একেবারে অর্থ-শূন্য ! জয়গাঁও এর মতন জায়গায় – কেউ ক্রেডিট কার্ড নেয় না । পেটিএমএর বোর্ড সাজানো আছে প্রত্যেকটা কাউন্টারে – কাজ করে না নাকি ! – আমরা ক্রেডিট কার্ডের ওপর ভরসা করে যা টাকা নিয়ে গেছলাম – তা শেষ । বন্ধুর আকাউন্ট থেকে টাকা ট্র্যান্সফার করে তবে মান বাঁচে ! - কাগজে তো দেখতাম – চা-ওলা থেকে ভুজিয়াওলা সবাই নাকি পেটেম কার্ড নেয় ! কোথায় সেই প্রধানমন্ত্রীর চা-ওলা ! সেটা কোন দেশে ! – ফেরার সময় অবশ্য একটা বড় রেস্টুরেন্টে ক্রেডিট কার্ড নিল ! একটা কথা না লিখলেই নয় ! স্বচ্ছ ভারতের কথা লিখতে গিয়ে প্রথমেই লিখতে হয় একটা গেটওয়ের কথা ! জয়গাঁও আর ফুটসলিঙ্গের মধ্যে তফাৎ হচ্ছে একটা ভুটানি গেট ! গেটের এদিকে জয় গাঁও – আর তার মেছুয়াবাজার ! মানুষ গাড়ি দোকান বাজার সমস্ত জঞ্জাল নিয়ে যেন স্বাগত জানাচ্ছে ! অথচ গেটের উল্টোদিকে – কোথাও একটা পাতা পড়ে নেই ! পরিষ্কার শুধু নয় – পরিচ্ছন্নও । এমন কি ফুটপাথ দিয়ে মানুষ হাঁটছে । রাস্তা দিয়ে নয় । - আমাদের সামনে রাস্তা দিয়ে হাঁটা লোকেদের ফুটপাথে তুলে দিচ্ছে । নয়ত টিকিট দেবে ! – অসম্ভব হলেও সত্যি ! এদেশে বিড়ি-সিগারেট-গুরাকু ইত্যাদি খাওয়া নিষেধ ! ইহা শুধু সংসারের সর্বনাশ করে – তাই নয় - দেশেরও সর্বনাশ করে ! এই সঙ্গেই আমাদের ‘অথ দার্জিলিং ভায়া ভূটান ভ্রমণ সমাপ্ত’ সমাপ্ত হইল ! মনোজ

121

16

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

সদা জাগ্রত ---------- মম জীবনে তোমা প্রতি, কামনা-প্রেম-আর্তি সদা জাগ্রত। মাথা ডুবিয়ে একমনে বরাদ্দ কাজগুলো সারছিলাম, আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোবো, মাকে নিয়ে ড: সিনহার চেম্বারে পৌঁছতে হবে। চারটেতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। প্যান্টের পকেটে ফোনটা কুরুক ধ্বনিসহ মৃদু তরঙ্গ তুলে স্তব্ধ হয়ে গেল। বের করে দেখি খোকনের মেসেজ- গুরু, কল দিস। খোকন আমার ন্যাংটোবেলার বন্ধু। গণি খান লেনে আমাদের পাশাপাশি বাড়ি ছিল। একসাথে কিশলয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, কেজি ক্লাসে। আসলে বন্ধু তো নয়, খোকন আমার ভাই ই। ওর দিক থেকে উচ্ছ্বাসটা বরাবরই বেশি। আমি একটু নিরুত্তাপ, চুপচাপ। কিন্তু আমার ভালোবাসা ওর বুক অব্দি পৌঁছে যায় ঠিকই। ক্লাস টেনে আমরা পুরোনো পাড়া ছেড়ে উঠে এসেছিলাম লিন্টন স্ট্রিটে। লরিতে মালপত্র তোলা হয়েছে, মা আর কাকিমা, মানে খোকনের মা, প্রকাশ্যে চোখের জল মুছছে, বাবা অপরাধীর মত মুখ করে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমার গলাটা কেমন টনটন করছিল। ঝাপসা চোখে খোকনকে খুঁজছি চারিদিকে। কোথাউ নেই। খোকন কোথায়, কাকিমা? কাকিমা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, বাড়ির ভেতরে দেখ। সেইদিন খোকন ওর ঘরে দোর দিয়েছিল। শত কাকুতিমিনতিতেও দরজা খোলেনি। সময় বয়ে যাচ্ছিল। বাবা ডাকছিল বাইরে থেকে। শেষ অব্দি ওকে না দেখেই পাড়া ছেড়েছিলাম। মনটা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছিল। মনে হচ্ছিল আমার যেন কোনো অঙ্গহানি হয়েছে। পরেরদিন খোকন একা একা ঠিক বাড়ি চিনে এসে হাজির। মা দরজা খুলে আঁতকে উঠেছিল। এখনো সিনটা মনে আছে। ঘামে ভেজা টিশার্ট পিঠে লেপটে আছে, চুলগুলো এলোমেলো। আমাকে দেখে মুখে হাজার বাতির আলো জ্বলে উঠেছিল ওর। নিজের স্বভাববিরুদ্ধ ভঙ্গিমায় ছুট্টে গিয়ে জাপটে ধরেছিলাম ওকে। তারপর দুজনের সে কি কান্না! মায়েরও মুখে হাসি চোখে জল ছিল। তখন তো আর বাড়িতে বাড়িতে ফোন ছিলনা। নতুন পাড়ার দোকান থেকে দত্তদের বাড়িতে ফোন করে কাকিমাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল খোকনের নিরাপদে পদার্পণের সংবাদ। সেই শুরু। তারপর থেকে কত দিন আর রাত যে আমরা একত্রে কাটিয়েছি। কখনও ও আমার বাড়ি কখনো আমি ওর বাড়ি। পাঁচ বছর আগে হঠাৎ একদিন এই সমীকরণটা বদলে গেল। গলা ধাক্কা দিয়ে আমার পুরোনো পাড়া থেকে আমায় বিদূরিত করা হয়েছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ককে লাম্পট্যের নাম দিয়ে, আমার নৈতিকতা, আমার বাবা মায়ের দেওয়া শিক্ষা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে, তাঁদের অবমাননা করে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল আরজুদের বাড়ি দরজা থেকে রাস্তায়। বিনিময়ে আমার একটি কথাও আরজুর বাবা শুনতে চাননি। আমিও জেদী কম নই। ঠাঁয় বসেছিলাম ওদের দরজার সামনে, যেখানে উপুড় করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। ঠিক সেইখানে। অপেক্ষা করেছিলাম আরজুর। সে আসবে, আমার অপমান, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সব মুছে যাবে ওর উপস্থিতিতে। আরজু আসেনি। খোকন এসে জোর করে নিয়ে গেছিল ওদের বাড়ি। অঝোরে কাঁদছিল খোকন আর সেইসাথে ফুঁসছিল বাঘের মতন। আরজু আর ওর পরিবারের নামে নোংরা নোংরা গালি দিচ্ছিল। আমার ওসবে মন ছিলনা। পাগলের মত একই কথা বলে যাচ্ছিলাম, খোকন, আরজু এসে যদি ফিরে যায়? আমাকে যদি খুঁজে না পায়? গলাটা ব্যথা করে উঠলো। চটকা ভেঙে খোকনকে ফোন লাগালাম। রিঙ হতে না হতেই ঝট করে ফোন তুললো। গলায় চাপা উত্তেজনা। -গুরু, তোর চিড়িয়া বাসায় ফিরেছে। চেয়ারে হেলান অবস্থা থেকে সোজা হলাম। -কি বলছিস? - সত্যি রে। খোকনের শ্বাস ঘন হল। কাল সন্ধ্যেতে পটলার দোকানে কাটলেট প্যাঁদাচ্ছিলাম। তোর ব্যথা দেখি রিক্সা করে যাচ্ছে বাবার সাথে। অন্ধকার হয়ে এসেছিল। ঠিক করে দেখব বলে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। দেখি ওদের বাড়ির সামনেই রিক্সা থামলো। লগবগে বাপটারে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। কিরে শুনছিস? -অ্যাঁ?... হ্যাঁ....ঠিক আছে..... পরে কথা বলছি....। কাজ ছেড়ে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। আমাকে কুকুরের মত তাড়িয়ে দেবার ঠিক ছয় মাসের মধ্যে আরজুকে বিয়ে দিয়ে দেয় ওরা। পাড়ার কাউকে জানানো হয়নি। তিনদিন পরে খবর পেয়ে খোকন আমাকে জানায়। ততোদিনে আরজু তার বরের হাত ধরে পাড়া ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের অফিসের চারতলা থেকে গঙ্গা দেখা যায়। বাইরে প্রখর রৌদ্র ঘোলাজলে মুখ ঝলকাচ্ছে। দূরে একটা নৌকা যাচ্ছে মন্থর গতিতে। তিনটে অল্পবয়সী ছেলে খুব করে জলে দাপাদাপি করছে। এতদূর থেকে কোনো শব্দ পাওয়া যায়না। ঠিক যেন নির্বাক চলচ্চিত্র অভিনীত হচ্ছে আমার সামনে। শুধু বুকের গহন থেকে লাবুডুবু লাবুডুবু শব্দ কানে কানে কি যেন বলতে চাইছে- "যে-জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে! নক্ষত্রের চেয়ে আরে নি:শব্দ আসনে কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে।" ----------------------------------- ড: সিনহা খসখস করে প্রেসস্ক্রিপশন লিখছিলেন। এক পলক মুখ তুলে বললেন, অসুখ বিসুখ কিছুই নেই তেমন। সমস্যাটা মানসিক। মাকে একটু ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা কর। তোমার বাবার মৃত্যুটা এখনো মেনে নিতে পারেন নি। খুবই স্বাভাবিক। এতদিনের দাম্পত্য। ডাক্তারবাবুর গলা মমতাময়। ভরসা যোগায়। মা অপেক্ষাঘরে উদ্বিগ্নমুখে বসেছিল। বললাম, চল, তোমায় নাটক দেখিয়ে আনি। আমার গলার স্বরে মায়ের চিন্তাচ্ছন্ন মুখে ঝলমলে হাসি ফুটলো, সত্যি দেখাবি? তোর বাবার সাথে যেতাম প্রায় প্রতি মাসে। মাকে দেখলাম লুকিয়ে। এই তিন বছরেই চেহারায় ক্ষয় ধরেছে। তবে কি আমি যত্ন করে রাখতে পারিনা মাকে, বাবার মত? বাবার জায়গা নেওয়া কি সম্ভব? কিন্তু ছেলে হওয়ার কর্তব্যও কি করি যথাযথ? সকাল থেকে সন্ধ্যে অফিসে কাটে। ছুটির দিনে বন্ধুদের সাথে। বাবা থাকতে এইসব ভাবতে হয়নি। হঠাৎ কেমন অসহায় লাগতে শুরু করল। গাড়িতে বসে বললাম, - মা, এখন আর যাওনা কেন নাটক দেখতে? এখনও যাবে। তোমার বান্ধবীদের সাথে তো যেতে পারো। আমার গলায় মরীয়া ভাব ফুটে উঠেছিল বোধহয়। মা মৃদু হাসল। ওরা সব সিনেমার পোকা রে। আমাকে প্রায়শই সাধাসাধি করে। ও আমার ভালো লাগেনা। দেখলাম, সাথে সাথেই মিটে গেল। ভুলে গেলাম। আর থিয়েটার? রঙ্গমঞ্চ থেকে হৃদয়ে ঘাঁটি গাড়ে। বুকে মধ্যে করে সর্বত্র সাথে চলে। একসাথে ওঠেবসে দিনের পর দিন, কখনো কখনো বছর পেরিয়ে যায়। সেই যে শুনেছিলাম রুদ্রবাবুর কন্ঠস্বর, কানে গেঁথে আছে তাঁর কন্ঠের ওঠানামা, এখনো মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয় রে..... হা ঈশ্বর, তুমি কি আমাকে বুঝতেও চেষ্টা করবেনা? হে ভাই, আমাদের ওই স্বদেশ, একটা জাহাজ, এটাকে চালাবার জন্য কাউকে না কাউকে তো প্রস্তুত থাকতেই হয়। জাহাজটা ফুটোয় ফুটোয় ঝাঁঝরা। পাপ, অজ্ঞতা, দারিদ্রে বোঝাই জাহাজ প্রায় ডুবুডুবু। নাবিকটা কোনো কাজ করবেনা স্থির করেছে.... মায়ের মুখটা এখন আলোয় আলো। খুব ভালো লাগছিল আমার। এত সামান্য জিনিসে মাকে খুশি করা যায়! নাট্যমঞ্চে পৌঁছে মা বাচ্চা মেয়ের মত চিনেভাজা কেনার বায়না করল। চিনেবাদাম খুলে খুলে ঝালনুন মাখিয়া আয়েস করে চিবাচ্ছিল মা। তৃপ্তিতে চোখ অর্ধনিমীলিত। প্রতিজ্ঞা করলাম মনে মনে, মাকে এইটুকু সুখ অন্তত দেব। - বাবু, বিয়ে করবিনা? কর না রে। আচমকা মায়ের প্রশ্নের অভিঘাতে চমকে গেলাম। এই প্রথম মা বিয়ের প্রসঙ্গ তুললো আর পাঁচ বছরে আজ প্রথম আরজুর খবর দিল খোকন, কি আশ্চর্য সমাপতন। মার কি মনে আছে আরজুকে? -করব। মেয়ে দেখ। মায়ের চোখে সন্দেহ। -সত্যি? -হু। আমি হাসছিলাম জোরে জোরে। -না: তুই ঠাট্টা করছিস। মা বাদামভাজায় মন দিল। মুখে কোনো তাপ উত্তাপ নেই। শান্ত গলায় বললো, তুই আরজুকে এখনও ভুলতে পারিসনি নারে? মা নামটাও ভোলেনি! শুকনো গলায় বললাম, কে আরজু? মা আনমনে বাদামের খোলাগুলো নাড়ছিল, ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। আর কতদিন বিরহী হয়ে বসে থাকবি। অবশ্য ওকে মনে রেখে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে কষ্ট দেবার কোনো মানে হয়না। আমার মত জ্বলতে হবে শেষে। বিস্ময়ে ঘুরে বসলাম। তোমার মত জ্বলতে হবে মানে? মায়ের মুখে দুষ্টু মিষ্টি হাসি। তোর বাবার গার্লফ্রেন্ড ছিল জানিস না? আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বাবার? -হ্যাঁরে। রীতিমত সিরিয়াস ব্যাপার। বিয়ের রাতেই বলে দিয়েছিল খুলে। তোর দাদুর ওপরে কথা বলে উঠতে পারেনি। আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। কত যে কষ্ট পেয়েছিলাম। এখনকার মেয়েরা এইসব সইবে নারে। বাবা মায়ের একসাথের বহু মুহূর্ত চোখের সামনে দিয়ে ভেসে গেল। কই বাবাকে তো কখনো দু:খী লাগেনি! মাকে কম ভালোবাসে এমনও তো মনে হয়নি। মাকেও তো সদাহাস্যময়ী দেখে এসেছি। কত রহস্য বুকে চেপে দাম্পত্য বয়ে চলে, সন্তানদের কাছেও সে খবর পৌঁছয়না। ------------------------------------- খোকনের অপেক্ষায় পার্কের পাঁচিলে বসে অনেকদিন পরে একটা সিগারেট ধরালাম। হায়ার সেকেন্ডারির পর শুরু করেছিলাম। নেশা ধরে গেছিল। বাবাকে মাকে লুকিয়ে, কলেজের প্রফেসারদের নজর এড়িয়ে, পাড়া বেপাড়ার গুচ্ছ গুচ্ছ কাকু- কাকিমা, মাসি-মেসোর থেকে আড়াল খুঁজে প্রত্যহ নেশার আগুনে ধুনো দেওয়া সহজ ছিলনা মোটেও। তবুও লুকিয়ে চুরিয়ে চালিয়ে যেতাম ঠিকই। মায়ের চোখে ধূলো দেওয়া সম্ভব ছিলনা। তখনো না, আর সেদিন নাটক দেখতে গিয়ে বুঝলাম, এখনো না। কতদিন কত রকমে জেরা করেছে, তোর জামায় এমন বোটকা গন্ধ কিসের রে, বাবু? তোর ঠোঁটটা এমন কালো হয়ে যাচ্ছে কেন রে দিনে দিনে? কিছুতেই স্বীকার করিনি, কথা ঘুরিয়ে দিয়েছি। তারপর একদিন কলেজের প্রথম বর্ষে একটা প্রজেক্ট করতে করতে মাঝরাতে তৃষ্ণার্ত হয়ে ছাদে উঠে গেছিলাম। পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ছিলাম বাবা মা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। কখন যে মা নি:শব্দে ছাদে উঠে এসেছিল! টের পেলাম পিঠে প্রচন্ড এক থাবড়া খেয়ে। তারপরেই অসংবৃত অনেকগুলো চড়- চাপড় এসে পড়ল। মায়ের হাত আর মুখ দুটোই চলছিল সমানে, লজ্জা করেনা, বাবা নেশা করেনা আর তুই বাবার কষ্টের রোজগারের পয়সা ধোঁয়াতে উড়িয়ে দিস! ছোটলোক তৈরী হয়েছিস একটা! আমারও অভিমান মাথা চাড়া দিচ্ছিল। চোয়াল শক্ত করে চুপচাপ মার আর তিরস্কার সইছিলাম। কতদিন পরে মা গায়ে হাত তুললো। শুধু ক'টা পয়সা সিগারেটে খরচা করেছি বলে? অন্তু, নীহার, লোকেশ ওরা বাবার পয়সায় কত কিছু করে, মাসে মাসে হাড়কাটা লেনে যায় মেয়েদের কাছে। কতবার আমায় ডেকেছে, বলেছে, আসল মস্তি কাকে বলে বুঝবি তো চল আমাদের সাথে। ভালো ছেলের তকমা ঘোচাতে মরিয়া হয়ে একবারই ওদের সঙ্গ ধরেছিলাম। সারাটা রাস্তা নিজেকে শাপ শাপান্ত করতে করতে গেছি কিন্তু ফিরে আসার সাহস হয়নি। যাদের সাথে প্রতিদিন সিংহভাগ সময় কাটাই তাদের ক্রোধান্বিত করার মত মনোবল জোগাড় করে উঠতে পারিনি। একটা ঘিনঘিনে নোংরা ঘরে আমরা চৌকির ওপর গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছিলাম। ঘরজুড়ে ওই একটাই আসবাব ছিল।আর ছিল বন্ধ জানালার ধুলোধূসরিত তাকে কতগুলো রংহীন প্লাস্টিকের ফুল। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বিজু বলে এক মহিলা নানারকম কৃত্তিম অঙ্গভঙ্গি করে যাচ্ছিল। কখনো আঁচল ফেলে দিচ্ছে, কখনো ঠোঁট আর চোখ মটকাচ্ছে। নীহাররা বেজায় আমোদ পাচ্ছিল তাই দেখে। আমার কেমন যেন দম আটকে আসছিল। মহিলার ভরন্ত উপচে পড়া শরীর, মেচেতার ছোপধরা গাল, চুলবেয়ে ধেয়ে আসা তীব্র জবাকুসুমের গন্ধ, লালচে দাঁত সব মিলিয়ে বমির উদ্রেক হচ্ছিল। এক ঘন্টার সঙ্গলাভের জন্য আমরা তিনশো টাকা গুনে দিয়েছি। পুরুষকন্ঠী এক মহিলা ঘরে ঢোকার আগে বিশ্রী ইঙ্গিত করে খ্যানখ্যানে গলায় নির্দেশ দিয়েছিল, বিজু, দূর থেকে দেখাবি শুধু, এইটাকায় ছোঁয়াছুঁয়ি হবেনা কিন্তু । এত অশালীন বাক্য কি করে কেউ অকপটে উচ্চারণ করে ভেবে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। সেই দু:সহ এক ঘন্টা যে কি করে কাটিয়েছিলাম সে শুধু আমিই জানি। বিজু নামের ওই মহিলা নির্দেশ মেনে চলার কোনো লক্ষণ দেখায়নি। ভয়ে কাঁটা হয়ে আমি ক্রমশ দেওয়ালের দিকে সরে যাচ্ছিলাম। আমার দিকে কারুর মন ছিলনা। সত্যিকারে পেটে মোচড় দিয়ে বমি এসেছিল যখন তখন দরজা খুলে দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসে হড়হড়িয়ে বমি করেছিলাম। খোকনকে বলেছিলাম সেই অভিজ্ঞতা। আচ্ছা করে গালাগালি দিয়েছিল সে, বলেছিল, তোর এমন রুচি হবে আমি কখনো ভাবিনি। রাতের পর রাত আতঙ্কে ঘুম ভেঙে উঠে বসেছি। অন্তুরা আরো অনেকবার সেধেছে কিন্তু কিছুতেই ওদের সাথে যাইনি। কত মানসিক নির্যাতন, ঠাট্টা তামাশা সইতে হয়েছিল, তবুও নয়। আজ আমার এত সামান্য অপরাধে মা এতগুলো কঠিন কথা শোনালো! খুব কান্না কেঁদেছিলাম সেই রাত্রে। বাবা মাকে বকেছিল, আমার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়েছিল। সেদিনের পর থেকে কোনোদিন আর বাবার পয়সায় সিগারেট কিনিনি। খোকনকে ধরে এক সপ্তাহের মধ্যে দুটো টিউশানি জুটিয়ে নিয়েছিলাম। তা দিয়ে আমার যৎসামান্য খরচ খরচা চলে যেত। পরেরমাসে মা যখন হাতখরচ দিতে এল নিইনি। মা ভেবেছিল রাগ করে নিচ্ছিনা রাগ পড়ে গেলেই নিয়ে নেব তাই আর সাধে নি। সপ্তাহ পার করেও যখন পয়সা চাইলাম না তখন বাবাকে দূত করে খবর আমার কাছে পাঠালো। বাবাকে বলেছিলাম, টিউশানি নিয়েছি। হাতখরচের আর দরকার পড়বেনা। বাবা বলেছিল, পড়ায় ক্ষতি হয়ে যাবে নাতো, বাবু? ভরসা দিয়ে বলেছিলাম, চিন্তা কোরোনা। দারুণ খুশি হয়েছিল বাবা। মাকে চেঁচিয়ে ডাক দিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, দেখগো, আমাদের বাবু বড় হয়ে গেছে! আরজুর ভাই ভীশেষ, খোকনের দেওয়া আমার প্রথম ছাত্র। মাড়োয়ারি পরিবার ওরা। কলকাতায় তিনপুরুষের বাস কিন্তু ওদের উচ্চারণে অবাঙালি টান স্পষ্ট। এমনিতে ভীশেষ খুবই ভালো ছাত্র ছিল। শুধু ক্লাস এইটের তুলনায় বাংলায় বেশ খানিকটা কাঁচা। এদিকে ওর বাবার হুকুম ছিল রোভিন্দ্রনাথের লেখনী সম্পর্কে ছেলের যেন সম্যক ধারণা গড়ে ওঠে। আরজুরও খুব উৎসাহ ছিল কবিতা গানে। হুটহাট করে ভাইয়ের পড়ার মাঝে ঢুকে এসে প্রশ্নে প্রশ্নে জ্বালিয়ে মারত, দিব্যদা, চিত্রাঙ্গদা করছি কিন্তু বুঝঝি না যে কিস্যুই। হতাশায় মাথা ঝাঁকিয়ে বলছিল সে, "তুমি যারে করিছ কামনা সে এমনই শিশিরের কণা নিমেষের সোহাগিনী" মানেটা কি? শিশিরের কণা ক্যেমোন করে সোহাগিনী হবে? উফফ, বাংলা ভাষা এত কঠিন ক্যেনো? কেনো টাকে ক্যেনো বলত আরজু, কেমন কে ক্যেমোন। ভীশেষ বলে উঠেছিল,শিশিরের লেড়কি শাদি করেছে নিমেষকে। তাই তার সোহাগিনী। তাই না, দিব্যদা? চোখ পাকিয়ে আরজু বলেছিল, এ, তু চুপ ব্যয়ঠ। আমি হাসি চেপে বলেছিলাম, বুঝবেতো পরে, আগে তো ঠিকভাবে উচ্চারণ শেখো। রাগে দুমদাম করে পা ফেলে চলে গেছিল সে। আন্টি হালোয়া-পুরির প্লেট হাতে ঢুকতে ঢুকতে বলেছিল, মেয়েটার গুস্যা যেনো নাকে লেগে আছে। আমি হাসতে হাসতে মুখে খাবার পুরেছিলাম। ধপ করে তেলতেলে চপ মুড়ির ঠোঙা কোলের ওপরে এসে পড়ল। এক লাফে খোকন পাঁচিলে চড়ে বসল। - গুরু, ও ফিরে এসেছে। বরাবরের জন্য। ------------------------------- দোল পূর্ণিমার মস্ত বড় চাঁদটা একমনে রূপের দ্যুতি ঢালছে। পাঁচবছর পরে আজ আমার পুরোনো পাড়ায় পা দিলাম। সারাদিন হৈ হুল্লোড় করে রঙ খেলে পাড়াটা এখন ঝিমিয়ে আছে। খোকন সাথে আসতে চেয়েছিল, মানা করে দিয়েছি। পাঁচবছর আগের দিব্যর সাথে এই দিব্যর অনেক তফাৎ। তখন পড়ে পড়ে মার-অপমান সহ্য করেছিলাম। আজ কারুর বাপের সাহস হবেনা আমার সাথে অমন ব্যবহার করতে। সেই রাতে ভীশেষকে পড়াবার পর আরজুর ঘরে যাচ্ছিলাম বই দেওয়ার অজুহাত দেখিয়ে। অজুহাতের দরকার ছিলনা, ভীশেষ সবই জানত। বলেছিলাম, আরজুকে বইটি দিয়ে আসছি। নিজের পাঠ্যপুস্তকে চোখ রেখে মুচকি মুচকি হাসছিল ও। তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল, ওকে জীজু। একটা গাঁট্টা মেরে সটাং আরজুর ঘরে ঢুকে দরজা ভিজিয়ে দিয়েছিলাম। ওদের রান্নাঘর থেকে ওর মায়ের হাতের চুড়ির ঠুনঠুনানির সাথে ঘিয়ে ভাজা চাপাটির গন্ধ আসছিল ভুরভুরিয়ে। আমাকে অতর্কিতে ঘরে ঢুকে দোর ভেজিয়ে দিতে দেখে আঁতকে উঠেছিল ও। আলুথালু কেশ, ওড়নাবিহীন পাতলা লখনৌ চুড়িদারের নীচে নরম অথচ উদ্ধত দুটি পায়রা যেন মুক্তির অপেক্ষায় ডানা ঝাপটাচ্ছিল! আমার নজর থমকে গেছিল সেখানে। আমার মতলব টের পেতেই তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে পালাবার ফিকির করছিল সে। দুই হাতের আলিঙ্গনে শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম আমার ছটফটে গুস্যেওয়ালি তিতিরকে। নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিল ও প্রাণপণে। কেউ এসে যাবার ভয়ে জোরে আওয়াজ করতে পারছিল না। ইশারায় মিনতি করছিল। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিলাম, সেদিন যে বললে মুখে সিগারেটের গন্ধ, দেখ, তারপর থেকে আর সিগারেট খাইনি। - আচ্ছা। ফিসফিস করে বলেছিল সে। -না, আচ্ছা নয়। কপট রাগ দেখিয়েছিলাম। পরখ করে বল সত্যি গন্ধ আছে কিনা। চোখের সামনে সকালের স্থলপদ্মে বিকেলের রং লাগল। মোহময় হয়ে আমরা ওষ্ঠপান করছিলাম যেন অনন্তকাল। সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ ভীশেষ অন্যঘর থেকে চেঁচিয়ে ডেকে উঠেছিল আমার নাম ধরে। আমরা ছিটকে সরে যেতে না যেতেই আরজুর ঘরের দরজা খুলে ওর বাবা ঢুকে এসেছিলেন। আমার কলার ধরে খামচে এক প্রচন্ড ধাক্কা দিয়েছিলেন, শালা হারামির জাত! ভদদোরলোকের ঘরে ঢুকে রঙ্গ রঁলিয়া! কানে আসছিল পেছন থেকে আরজুর কান্নারুদ্ধ আর্তনাদ, না ড্যাডি না আ আ। আমি একরাত্রে ওদের ঘরের ছেলে থেকে রাস্তার ছেলের পর্যায়ে নেমে এসেছিলাম। বাড়িটা যেন শোকস্তব্ধ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন একটা উৎসবের রাতেও আলোবিহীন। কলিংবেল খুঁজতে আলোর দরকার ছিল না। বহুদিনের অভ্যাসে বেলে আঙুল ছোঁয়ালাম একবার। আধমিনিট থেমে আবার একবার। এইবার সদরের আলো জ্বলে উঠলো। দরজা খুলে আরজুর বাবা কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থমকে গেলেন। হয়ত প্রত্যয় হচ্ছিল না। ঠিকই বলেছিল খোকন। বয়সের তুলনায় লরঝরে লাগছে। -আরজুর সাথে দেখা করতে এসেছি। নিজের কন্ঠস্বরে আত্মবিশ্বাসের কাঠিন্য ছিল। অপ্রত্যাশিতভাবে সরে ভেতরে আসার রাস্তা করে দিলেন। এত সহজে পথ ফিরে পাব বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমাকে শুনিয়েই বোধহয় বিড়বিড় করছিলেন, জিদ্দি মেয়েটা নিজের পায়ে কুঠারি মেরে মুখ কালা করে ফিরে এসেছে। আরো কিছু বলছিলেন, শোনার প্রয়োজনবোধ করলাম না। খাবার ঘরে ওর মাকে দেখে হাত জড় করলাম, নমস্তে আন্টি। ওর মা এক পলক দেখে মাথা নাড়ালেন আনমনে। আরজু কোথায়? ছাদের দিকে ইশারা করে দেখালেন। জ্যোৎস্নায় সবকিছু দিনের আলোর মত স্পষ্ট। একটা চেয়ারে ভঙ্গুর নি:স্তব্ধ বসে ছিল সে। আমারই দিকে চেয়ে। যেন সেই মুহূর্তে আমার সেখানে পৌঁছনোরই কথা হয়ে ছিল। চুপচাপ সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। অপাঙ্গে দেখলাম ওকে। পাঁচ বছর অনেকটা সময়। তবে আজও তার কেশ আলুলায়িত, চেহারা যেন কৃশ হয়েছে খানিক। বয়সের স্বাভাবিক চাপল্য কেটে পরিণতমনস্কতা এসেছে। সেও চেয়ে আছে। তারপর অনুযোগ করে বললো, কি ঘেন্নার কথা জানো চুমু খাওয়া তো দূরের কথা ভালোবেসে কোনোদিন বুকে জড়িয়ে ধরেনি পর্যন্ত, শুধু কুকুর বেড়ালের মত মিলিত হতাম আমরা, প্রেমহীন দাম্পত্যে। অন্য সময়ে আমার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। একান্নবর্তী পরিবার, এখনো সেই আদিমযুগের ধ্যান ধারণা নিয়ে চলছে। আমি কলেজটা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, তাও রাজী নয়। কেউ একটা বই পড়েনা, গান শোনেনা। ভাবতে পার, দিব্য? আমি কিন্তু সত্যি ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। শত হলেও স্বামীতো! তারপর হাঁপিয়ে গেলাম। আর পারলাম না। না চাইতেও তোমার সাথে তুলনা মনে এসে যেত। একসাথে এতগুলো কথা বলে হাঁপাচ্ছিল সে। সাবধানে মাথার ওপরে হাত রাখলাম। হাতটা কাঁপছিল আমার। বললাম, আরজু, পরশুদিন দুটো সিগারেট খেয়েছি, আর খাবনা। প্রমিস! হাসছিলাম ঠোঁট বিস্তৃত করে, নি:শব্দে। আমার দিকে মুখ উঁচু করে তাকিয়ে দেখল সে, তারপরে খুব মিষ্টি করে হাসল। সেই হাসি ওর ঠোঁট, গাল, চোখ ছুঁয়ে আবার আমার ঠোঁটে ফিরে এল। ------------------------------ <img class="emojione" alt="💀" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F480.png?v=1.2.4"/> ধূমপান আপনার স্বাস্হ্যের পক্ষে ভীষণ ভীষণ ক্ষতিকারক<img class="emojione" alt="💀" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F480.png?v=1.2.4"/>

938

82

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান...৪

"... তার কাছ থেকে কোনো জ্যোৎস্না ভিক্ষা করে পাবে কিনা। সে কী ফল ভালোবাসে, কে জানে সবুজ কিংবা লাল, কিছুই জানো না তুমি; তবু দীর্ঘ আলোড়ন আছে, অনাদি বেদনা আছে, অক্ষত চর্মের অন্তরালে আহত মাংসের মতো গোপন বা গোপনীয় হয়ে।" (বিনয়) -কী হলো? ডেকে এনে মৌনব্রত... -ডাকিনি তো আমি... -তবে ? অতাপতা জানিয়ে কনফিউজ করলে কেন? -আমি করিনি। তুমি করেছো... -যাহ বাবা, আমি কী করলুম? -স্বাতী বিশ্বাস কে? -মাই গড... তুমি তাকে চিনলে কী করে? -চিনিনা তো, তাই জিগ্যেস করছি.. -একটা মেয়ে, কিন্তু তুমি... মানে তোমাকে কে ওর কথা বলেছে? -যেই বলুক, কথাটা তার মানে সত্যি... -কোন কথাটা? -আর কী কথা হতে পারে? আমি আর এসবের মধ্যে নেই... -বোঝো? তুমি যা ভাবছো, ঘটনাটা একেবারেই তা নয়... -সব ছেলেরাই একথা বলে। অ্যাট লিস্ট তোমার থেকে এইটুকু অনেস্টি আশা করতে পারি... -নিশ্চয় পারো। কিন্তু শুধু এইটুকু বলো তোমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ কীভাবে হলো গত দুদিনের মধ্যে? -ডায়রেক্ট হয়নি। আমার এক বন্ধু, স্বাতীকে চেনে, বললো, ও যখন শুনেছে আমরা বেঙ্গল ক্লাবে সারারাত একসঙ্গে বসে গান শুনেছি... শী বিকেম হিস্টেরিক। আমার ডিটেলস খুঁজে বার করে আমার বন্ধুকে বলেছে, ইউ অ্যান্ড শী আর ইন আ সিরিয়স রিলেশনশিপ.... আর বাকি কী থাকলো? -আমাকে বিশ্বাস করবে? -সত্যি বললে করবো... -স্বাতী আমাকে অনেকদিন থেকে চেনে। ভালো মেয়ে। মানে যা কিছু 'ভালো' হওয়ার লক্ষণ, সব আছে ওর। দর্শনধারী, স্মার্ট, বড়োলোক বাপের মেয়ে। সমস্যা হচ্ছে সারা জীবন ধরে যা চেয়েছে, পেয়েছে। কিছুদিন ধরে দেখছি আমার প্রতি খুব পজেসিভ হয়ে পড়েছে। যেভাবে হোক আমাকে অধিকার করতে চাইছে। অনেক বুঝিয়েছি .. অ্যায়াম নট হার কাইন্ড... কিছুতেই শুনতে চায়না। জানিনা কীকরে দিনে দিনে এতো অধিকারপ্রবণ হয়ে পড়েছে ও... সত্যি বলছি ওর এই ভালনারেবিলিটি আমাকে কষ্ট দেয়... মেয়েটা আদুরে, কিন্তু মনটা খুব ভালো...কী করবো বুঝতে পারছি না? আমি হেল্পলেস... শী ইজ সো ডেসপ্যারেট, বিশ্বাস করছো? -তুমি কি সত্যি বলছো? -এ নিয়ে আমি আর কোনও কথা বলবো না... -আমি কাল সারারাত একবিন্দু ঘুমোতে পারিনি... -আশ্চর্য তো, কেন? তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় বা যোগাযোগ বা ঘনিষ্টতা, কতোটুকু, ক'দিনের? এতো অল্প সময়ের মধ্যে তুমিও পজেসিভ হয়ে পড়লে? কী জন্য তোমার রাতের ঘুম নষ্ট হয়? অবশ্য প্রশ্নগুলো পার্সোন্যাল মনে হলে উত্তর দেবার দরকার নেই। আমি বুঝে নেবো... -আমি জানিনা, কিস্যু জানিনা.... ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, শোবার ঘরের দিকে। আমি চুপ করে বসে থাকি। পাখার আওয়াজ, ঘড়ির আওয়াজ, শ্বাসের শব্দ, পর্দাফাটানো নীরবতার মতো ঘিরে ধরতে থাকে। আমাকে। এবার বোধ হয় আমার বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কেউ এসে পড়লে চূড়ান্ত বিড়ম্বনা। উঠে পড়ি। মনে হলো যাবার আগে একবার বলে যাই, আমি অসৎ নই। ঘরের দরজা খোলা। পর্দা দুলছে পাখার হাওয়ায়। ভিতরে উঁকি দেওয়া বোধ হয় অন্যায় হবে। কিন্তু কীই বা আসে যায়। আর তো দেখা হচ্ছে না। আমার কথাটা বাকি রেখে কী লাভ? পর্দাটা একটু সরিয়ে দেখি বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো বালিশে মুখ গুঁজে আধশোয়া। অনাত্মীয় একজন মহিলাকে এভাবে দেখা উচিত নয়। পর্দা ছেড়ে দিই। -আমি আসছি, দরজাটা বন্ধ করে দাও... বাইরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছোবার আগেই পিছু ডাক, -একটু দাঁড়াও... একটা কথা আছে -বলো... একটু এগিয়ে এলো, ধীরে কিন্তু অবিচলিত পায়ে, -আমি তোমায় বিশ্বাস করেছি... তাকিয়ে থাকি, -কী দেখছো? -তোমার চোখ কী বলছে, দেখতে চাইছি... -একই কথা বলছে... -প্রমাণ? -কীসের প্রমাণ? -যা বলছো, তার.... -কাছে এসে দেখো... ভূতগ্রস্ত মহাকাশচারীর মতো এগিয়ে যাই I হাতটি বাড়িয়ে দেয় সে। এর পর আর কীই বা করার থাকে ? দুহাতে তার মুখটি তুলে ধরি। শুকনো জলের রেখা দুচোখে। কপালে একটা নীল টিপ। আধখোলা ওষ্ঠাধর। আমি তো শশিডাক্তার নই। এ কুসুম শুধু শরীর নয়, শুধু রক্তমাংস নয়। এ যেন শংকরভাষ্যের বোবা নিয়তি । তার নাম জানিনা। ঠিকানা রাখিনা। শরীর, শরীর। তুমি কোথায় থাকো? কোন দেশে? সব সত্ত্বা ঝাপটমারা বৃষ্টির জলে উইন্ডস্ক্রিনের কাচের মতো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অসহায় দেখি এই চোখ বুজে থাকা কলিঙ্গভাস্কর্যের নায়িকার স্পন্দিত ছবি । সে অপেক্ষা করছে, করে যাচ্ছে। বিস্রস্ত আবেগ হয়ে ডুবে যাচ্ছি কোমল নিষাদের মতো পাটলবর্ণ তার ওষ্ঠাধরে। মাথায় ছলকে ওঠেন নাজিম হিকমত। "তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান, কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পেলাম না।" ঐ সুশ্বেত দন্তমালা, বাকদেবতার পূত জিহ্বা, ঐ গোপন সাবান থেকে ছড়িয়ে যাওয়া জলজ গায়ের গন্ধ, ঐ শ্বেতপাথরের মতো নিষ্পাপ কপোলের ক্যানভাসে আমার হোলির নিলাজ রঙের পাগলামি হুসেনের তুলির মতো আছড়ে পড়ে। এই তো আমার সেই বসন্তমুখারির নিঃসীম বিধুমুখ, আমার নির্লজ্জ নেমেসিস। অপেক্ষায় ছিলাম কতো কাল। সে বড়ো সুখের সময় নয়... "...রাত্র ফিকে হয়ে গেছে, বকুল, বকুল ফুল, শুনছ কি, আজ আমি যাই..." --------------------------------------- ঘড়ি থেমে কতোক্ষণ, মনে নেই। জ্বরগ্রস্ত যক্ষিণীর আঁকড়ে থাকা বাহুদুটিতে যেন প্রাণ ফিরে আসে। গোলকোণ্ডার পাথরের মতো নিজেই ঠেলে সরিয়ে দেয় তার অবাক নির্ভরতা। অবসন্ন গলায় স্বগতোক্তির মতো কয়েকটা শব্দ তার... -তুমি আমার সর্বনেশে নেশা...কারুকে ছেড়ে দেবোনা তোমায়, কখনও না... -দিওনা... যতোদিন পারো... -কোনওদিন না... এক মূহুর্তের জন্যও... এবার হেসে ফেলি... -কুল ডাউন... প্রিয়ে । তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর হইলো... -'প্রার্থনা'? হোয়াট প্রার্থনা? আই ক্লেম ইউ.... আআই ক্লে এ এম ইউউ.... আবিরের গুঁড়ো সব রাখা ছিলো। লাল, মেরুন, হলুদ, সবুজ। দৃশ্যের জন্ম হবে বলেই তো তাদের অনন্ত অপেক্ষা। একমুঠো তুলে নিই হাতে। আবির, তুমি কার? যে মাখে, না যে মাখায়? জানিনা, জানিনা বলে উড়ে যায় তারা। বাসবদত্তার রজনীর মতো, খাজুরাহোর প্রোষিতভর্তৃকার মতো, কোণারকের পূর্ণিমার মতো, আমার সকল গান, আমার সকল দৃশ্য, আমার উত্তপ্ত ফাগুয়ার দিন, সমস্ত তোমারে লক্ষ্য করে। -বারান্দায় চলো, ঘরে আবির পড়বে.... ----------------- (শেষ)

137

8

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান...৩

".... দেবতারা বাস করে টিনের ঘরের মধ্যে ইষ্টকনির্মিত সৌধে, খড়ের ঘরেও; দেবতারা চাল সিদ্ধ করে সেই ভাত খায়, রুটি খায়, মাছমাংস খায়; দেখেছি যে দেবতারা পূজা করে নানাবিধ মাটির মূর্তিকে, আমি ধন্য হয়ে গেছি।" (বিনয়) আমাদের শহরে হোলি শুরু হয় একটু বেলায়। অন্তত এগারোটা বাজলে নড়াচড়া শুরু। দোলযাত্রার ঠিক নয়, প্রাক-হোলির খোঁয়ারি কাটতে সবারই সময় লাগে। বিহারে সকালে গিলা, বিকেলে সুখা। যারা বিলিতি খায়না, তারা ভাঙের রসিক। অনেকে অবশ্য দুটো'ই চালিয়ে যায়। বেসিক্যালি তো ব্যাকান্যালিয়ার উৎসব। পরবর্তীকালে ঠাকুরদেবতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া স্যানিটি রাখতে। তাও মুখরক্ষা হয় কোথায়? বছরের এই একটা দিনই 'ধর্মভীরু' জনতা দিনের বেলা দশরথপুত্র সেবন করে, বৌকে কেয়ার না করে। আর যাদের বৌ নেই, তাদের তো শখের প্রাণ, গড়ের মাঠ। পাপীদের ঘুম ভাঙতে ভাঙতে আমি কেটে যাই। বাড়ি গিয়ে জমিয়ে স্নান করতে হবে। তার পর? তার আর পর নেই..... ---------------------------- একটা হাওয়া দেয় এইসময়। উত্তপ্ত ফিলামেন্টের মতো রোদ। ঝলসে দেওয়া চমক তার। কিন্তু হাওয়াটা শরীরে লেগে ফিরে যায়না। পাগলা ঘূর্ণির মতো ঘিরে থাকে । আমার চারিপাশে, মাথার চারিপাশে। কদমা ওয়াই ফ্ল্যাট অন্তত দশ-বারো কিলোমিটার এখান থেকে। তবে হোলির দিন রাস্তা ফাঁকা। দঙ্গলবাজদের জত্থা কাটাতে পারলে আধঘন্টা লাগা উচিত। অপালার বাড়ি কোথায় জানিনা। তবে ওখানে আমার বন্ধু থাকে, বিলু, খোঁজ পেয়েই যাবো। সে সব তো মোবাইলের জমানা নয়। কিছু আড়াল, কিছু ভরম থাকতো মানুষের মধ্যে। মানুষের সব ব্যথা, কথা নেটের খাদ্য হয়ে যায়নি। একটু থেমে মানুষের চোখের দিকে তাকাবার জন্য কিছু সময় থাকতো আমাদের কাছে। সব কিছু যে জেনে ফেলতেই হবে, এমন কোনও তাড়নাও ছিলোনা। ভালো ছিলো? কে জানে? ------------------------ হোলির সকালে বিলু আমাকে দেখে উল্লসিত। -কী বে? তোর গ্যাংকে কাটিয়ে আসতে পারলি? -ভাবলুম এবারে তোদের এখানেই হোলি কাটাই। তোদের ঐ সিন্ধি ভাবিকে রংটং চড়াতে হবে তো.... -এবার বুঝেছি। কিন্তু বরখুদ্দার, ভাবি এবার ভেগে গেছে ... -সে কী রে, কোথায়? -বাপের বাড়ি, বম্বে... বোধ হয় খবর পেয়েছিলো তুই আসছিস... -মাইরি, তুই শালা ফুল ভোঁকচন্দর,... -চল চল তোর দুঃখ কাটিয়ে দিচ্ছি। এটা একটু মেরে নে... একটা কোকের বোতল এগিয়ে দেয়। এক চুমুক দিয়েই বুঝি ছদ্মবেশী রাম। -নাহ, আজ আর বেশি খাবোনা। বাইকে এসেছি... -তুই আবার কবে থেকে এসব নখড়া করছিস রে? -নাহ, সিরিয়স। আচ্ছা তোদের এখানে অপালা কোথায় থাকে বলতো? বিলুর চোখ সরু হয়ে যায়। -আবে কেসটা কী? অপালাকে তুই চিনলি কী করে? -চিনিনা তো, একটু কাজ আছে ওর সঙ্গে.... -গুরু, উধর হাথ মত মারো। মেরি জান চলি জায়গি... -আবে আমি হাথ-টাথ মারছি না। ওদের বাড়িতে একটা মেয়ে এসেছে। তার সঙ্গে কাজ আছে। -পর্ণা? তুই চিনিস? -হুমম... স্লাইট স্লাইট -অব চিজ সমঝ মেঁ আয়া। গুরু এক পুরিয়া পায়ের ধুলো দিবি... -দেবো দেবো, আপাতত আমার কাজটা করে দে... -চল, যাবো ওদের বাড়ি... -শোন, বাড়িটাড়ি যাবোনা। ওদের ডেকে আন নীচে... -------------------------- এই ফ্ল্যাটগুলো একটা ক্যাম্পাসের মধ্যে। সেখানে বাচ্চাদের রং বালতি, ভূতুড়ে পেন্ট নিয়ে দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বড়োরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন বেরোনো হবে। বিলুদের ফ্ল্যাটের পিছনদিকে একটা ছায়াময় কদমগাছ। সেখান থেকে একটু দূরেই অপালাদের বাড়ি। আমি সেই ছায়াতেই দাঁড়াই। পাতা ঝরে একাকার চারদিক। ঘাসগুলো ছিটে ছিটে হলুদ হয়ে আসছে। হাওয়ায় দূর থেকে ফাগুয়া-চইতার নেভা নেভা সিমফনি ঢেউয়ের মতন। উদ্দণ্ড কোরাস, উচ্চকিত ঝাঁঝ আর ঢোলক। পাতার উপর পায়ের আওয়াজ। বিলু ফিরে এসেছে। একা। -কী হলো রে? -ওদের বাড়িতে চ... -আরে বললুম তো, চিনিশুনি না কাউকে.. হঠাৎ করে .. এভাবে -আবে কাকুকাকিমা কালীবাড়ি গেছে, গুরুদেবের হোলিমিলন... -বোঝো... -কী বুঝদার মানুষ বল... সেটিং দ্য স্টেজ ফর আওয়র হোলিমিলন...চল চল, বহুত উতাওলে ইন্তেজার মেঁ হ্যাঁয় দোনো পঞ্ছি... অপালা দরজা খুলে দেয়। বাড়িটা বেশ সাজানো। আমার বিহারি বন্ধুরা যেমন বলে থাকে। দাদালোগোঁকে ঘর হমেশা সঁওয়ারা হুয়া রহতা হ্যাঁয়।ভালো লাগে। তবু তো এক আধটা কমপ্লিমেন্ট বাঙালিরা পায় এখনও। -আসুন আসুন... তখন থেকে আপনার গল্প শুনছি.... -সে কী ? হিরো এতো কম পড়িয়াছে? -আরে হাবুডুবু মানুষের হিরো'ই বা কী, জিরো'ই বা কী? -দমকল ডাকুন, আমার দ্বারা হবেনা... বিলু বলে ওঠে, অপালা, কাকুর স্টক কিছু আছে নাকি বাইরে? -আছে তো, কিন্তু আজ ছাড়ো না ঐসব... -আরে, হোলির দিন পাপ করা ছেড়ে দিলে চিত্রগুপ্ত নরকে হান্টারপেটা করবে... -করুক। আজ ঐসব মতলব থাকলে আমি হান্টারপেটা করবো... -লো, অওরতজাত সুধরেগি নহি... হয়তো একটু প্রগলভা লাগে। কিন্তু অপালা বেশ স্মার্ট মেয়ে। বিলুর পছন্দ ভালো। এতোক্ষণ পর্ণা কোনও কথা বলেনি। --------------------------- সবে জমিয়ে বসেছি, দরজায় ঘন্টার আওয়াজ। বিলু বলে, কাকুকাকিমা রিটার্নড। -আরে না, বাবা-মা'র বিকেল হয়ে যাবে আসতে... -তবে? খুলতেই দরজার বাইরে গোটা কুড়ি লোকজন। কাউকেই চেনা যাচ্ছেনা। বড়োদের হোলি শুরু হয়ে গেছে। প্রচুর কলরব করে আমাদের বাইরে ডাকছে ওরা। ঘরের ভিতর কেউ আবির দেয়না। মেঝে ময়লা হয়। অপালা আর বিলুকে যেতেই হবে। ওদের জায়গা। গণহোলি এড়ানো সম্ভব নয়। -তোরা একটু ওয়েট কর, আমরা দু'চারটে বাড়ি ঘুরে ফিরে আসছি। অবশ্য আমাদের যতো দেরি হয়, তোদের ততো পুলক... -হুমম, রাজা পুলকেশিন... -এক্জাক্টলি... দুদ্দাড় করে তারা বেরিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে শুধু পাখা চলার আওয়াজ। পরিবেশটা প্রায় বুদ্ধগুহের ছোটোগল্পের মতো। সেই ছোটোবেলায় পড়া 'খেলা যখন'। "... এই সব মনে পড়ে, স্বভাবত আরো মনে পড়ে বহু নক্ষত্রের কথা আমার চাঁদের কথা মনে পড়ে, মনোযোগ দিয়ে আমি ভাবি। পৃথিবীতে তারকার আলোক আসার পথপাশে চাঁদ থাকলেই সেই তারকার আলো যায় বেঁকে চাঁদের আকর্ষণেই; তারকাদিগের খোপা, ভুরু, দুই হাত মনোযোগ দিয়ে দেখি, তারকাদিগের সঙ্গে কথাবার্তা বলি।" (বিনয়) (ক্রমশ)

99

7

মোহিতলাল v2.0

কিছু ইনভেনশন (A)

যদিও পারিবারিক পত্রিকা কিন্তু আরও কিছু ইনোভেশন (For adults only) অফ কোর্স‚ হিউম্যান নেসেসিটির ক্লাশেই পড়ে‚ আর্টিফিসিয়াল হাঁটু (knee)‚ সিনেমা হলের সীট এসবই| মাসি পিসী‚ ক্ষ্যান্তমণিরা স্ক্রোল ওভার প্লীজ| গুগলে টাইপ করুন US ২ ০ ০ ৩১ ৮ ৭ ৩ ২ ৩ (ইঞ্জিরিতে কোন ফাঁক না দিয়ে) ব্যস পাবেন : বিষয়ের টাইটেল: C l o t h i n g article e.g s w i m w e a r with extension for i n s er t i o n into body c a vi t y "Advantage‚ নাহ দেখে নিন| সোজা ভাষায় লেখা আছে| আমি কেন পাপের ভাগী হই| আমার বক্তব্য‚ কোন কিছুই ফেলনা নয়‚ নাক সিঁটকোবার কারণ নেই| ইউ এসে একটা পেটেন্ট দরখাস্ত শুরু থেকে শেষ অবধি এক লক্ষ ডলার খরচ করতে হয়‚ কম করে| নিশ্চয়ই বাজার রয়েছে তবেই না এসব উদ্ভাবন হয়! আর বাজার মানেই পয়সা‚ পুজোর বোনাস‚ সিমলায় বেড়ানো‚ স্মার্ট টিভি উইথ কার্ভড স্ক্রীন|

401

5

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান... ২

"... এই হল আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য তাকে দেখেছি অনেকদিন থেকে, কী করে কিশোরী থেকে ক্রমশ যুবতী হল তা দেখেছি আমি। অনেক সৌন্দর্য আছে পৃথিবীতে, আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য অন্য বহু সৌন্দর্যের সঙ্গে কথা বলছিল..." (বিনয়) বসন্তমুখারির রাতের আগে পর্যন্ত পর্ণার সঙ্গে পরিচয়টি ছিলো নেহাত ফর্ম্যাল। নোয়ামুন্ডির মুর্গামহাদেওতে আলাপ হয়েছিলো। আমি থাকতুম চাইবাসা। আর সে কলকাতায় পড়াশোনা করতো। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে দেখা হয়ে যেতো আমাদের ছোটোশহরের ইতিউতি। কবিতাসন্ধ্যা বা গানের জলসায়। তখনও আমাদের গ্রামে যেটা চলতো, পরবর্তীকালে সেটাই তালিবানরা আফঘানিস্তানে আমদানি করে। পেটরোগা, চশমাপরা স্বনিয়োজিত মর‌্যাল কাকাজ্যাঠাদের প্রতাপ ঐ সব সাতফুটিয়া কাবুলিওয়ালাদের থেকে কিছু কম ছিলোনা। রেজাল্ট, মোটামুটি সব কেসই 'আমার অনাগত, আমার অনাহত' হয়েই থেকে যেতো। তোমার বীণাতারে আর তারা বাজার স্কোপ ছিলোনা। তবু তার মধ্যেই খুঁজে নেওয়া নিজস্ব হাহাকার, আজি যে রজনী যায়...... I কোথাও কোনও তন্ত্রীর হার্মনি হয়তো বাঁধা হয়ে গিয়েছিলো। হয়তো জানতুম। হয়তো জানতুম না। লেকিন কুছ বাত তো থি মোহতরমা আপ মেঁ। বেশক থি। ------------------------- বুধাদিত্য শেষে বাজিয়েছিলেন, না ভৈরবী গত নয়, ললিতে একটা ছোট্টো বিস্তার মধ্যলয়ে। সারারাত নেশা করে ভোরের অবসন্নতা কেমন হয়, যাঁরা নেশা করেন তাঁরা জানেন। সুরের নেশার কাছে কোথায় লাগে সিঙ্গল মল্ট, কোথায়ই বা ভাঙের সরবত? তখনও আলো ফোটার সময় আসেনি। বাইরে এসে দাঁড়াই। -কীভাবে যাবে? -চলে যাবো দুজনে ... -এগিয়ে দেবো? -তোমার তো বাইক আছে... আমি সুগতকে বলি, তুই গাড়িটা নিয়ে পাইপলাইনের লালবাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাক। আমি এদের নিয়ে আসছি । সুগত হেভি খুশ। ব্যথা তাকে নাকি বলেছে যে সে জানতো না সুগত ক্ল্যাসিকাল গান এতো পছন্দ করে। মানুষের কতোরকম কষ্ট যে থাকে। কজনই বা জানে সেকথা? যেতে যেতে বিশেষ কথা হয়না। ওদের বাড়ির সামনে ছেড়ে দিই। খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট স্বরে শুনতে পাই, - হোলির দিন কদমা ওয়াই ফ্ল্যাটে অপালাদের বাড়িতে থাকবো আমি... আর কিছু নয়। বোকারা ভাবে অন্যরকম। কিন্তু মেয়েরাই ক্যাপ্টেন থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। জীবনের সব খেলায়। -------------------------------- হোলির আগের দিন রাতে আমাদের বন্ধুদের স্ট্যাগপার্টিটা পুরোনো দস্তুর। সারা বছর যে যেখানেই থাকুক না কেন, দোলপূর্ণিমার সন্ধেবেলা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যেতে হবে। ঠিকানাটা সচরাচর কোনও ব্যাচেলর বন্ধুর ফ্ল্যাটেই থাকতো। এবারও ব্যতিক্রম হলোনা। ছোটোবেলার বন্ধুসব। শ-কার ব-কারের চূড়ান্ত অক্টেভে আলাপ চলে সেখানে। রাত বারোটার মধ্যে সব কনফেশন মোডে চলে যায়। এবার সবার আগে আউট হলো সুমন্ত। আমাকে বেশ কিছু নির্বাচিত গালাগাল দিয়ে বললো, -শালা কটা নৌকোয় পা দিয়ে কাটাবি তুই? -আমার কোনও নৌকোটৌকো নেই। তোর পানসি তুইই চালা... -সুধীর বিশ্বাস তোকে একদিন জমিয়ে পটকাবে... -আবে, সুধীর বিশ্বাসের অ্যায়সি কি ত্যায়সি, আমি কী করবো? -স্বাতী তোকে ছাড়বে না.... -তো? -সুধীর বিশ্বাস জানতে পারলে ওর একমাত্র মেয়ের মেহবুবাকে লাথিয়ে বেন্দাবন পাঠিয়ে দেবে। শালা ঠিকাদার মাফিয়া। হত্তড় সে ফেঁসে যাবি... -আবে, স্বাতীকে নিয়ে আমি কী করবো? এতোবার ফুটিয়ে দিলুম, তবু কমলি নহি ছোড়তি... -শালা রোমিওর বাচ্চা... গান করিস, ড়বিন্দো করিস, ব্যাংকে চাকরি করিস, ইস্মার্ট জওয়ান , তোকে ছাড়বে কেন বে? -শোননা তুই গিয়ে লাইন কর। আমাকে ছাড়... -আবে আমি যা চাকরি করি তাতে স্বাতী বিশ্বাসের লিপস্টিকেরও খরচা উঠবে না... -আরে আমারও সেই অবস্থা। সুধীর বিশ্বাসের জামাই হয়ে যা। ওর ব্যবসা সামলা... -আবে, সুধীর বিশ্বাস আমাকে ওর মুন্সি করে রাখতে পারে। জামাই নয়। তুই লটকে যা। আমাদের একটা সলিড বৌদি লাভ হয়ে যাবে... -শালা তুই হদ লাতখোর ... -তুই পরশুদিন বেঙ্গল ক্লাবে কার সঙ্গে ফোকাস করছিলি বে রাতভর... -তোকে কে বললো.. -আবে সবাই জানে... -তবু? -আমাকে স্বাতী বলেছে। কাল। কান্নাকাটি করছিলো... -বাপরে, এতো দূর? -হুমম, সে জন্যই বলছি। সাবধান থাকবি.... -ছাড়তো, দিমাগ কিরকিরা করিস না... বিনা মতলব কা ফ্যাসাদ। যাকগে। ধীরে ধীরে সব পাবলিকই নেশার ঘোরে এদিক ওদিক শুয়ে পড়ে। আমি জানালা দিয়ে চাঁদ দেখি। কাল সকালে আর রাম খাবোনা। অনেকদূর যেতে হবে । কদমা। ".... তবে সবই ঠিক আছে, ঘুমোবার আগে মনে পড়ে সারা দিনের ঘটনা। মাঝরাতে বিছানায় চাঁদের জ্যোৎস্না এসে পড়ে দূর থেকে। শুধু চাঁদ দেখবার জন্য আমি বিছানায় উঠে বসি, চাঁদ আছে বলে ঘুমোতে বিলম্ব হয়। আমি তাড়াতাড়ি ফের যাব।" (বিনয়)

108

7

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান... ১

'অমিল পয়ার ছন্দে রচিত বসন্তকাল শেষ হয়ে এলো। পথের উপর আজ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম চারিপাশে মাঠ কালো কালো ধান গাছে ঢাকা আছে, এই সব সুমুদ্রিত ধানগাছগুলি আমার এ জীবনের বসন্তের অভিজ্ঞতা। .... আমার ভরসা এই প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে স্বভাবত কিছু রস ঝরে যাবে মাঝে মাঝে বসন্তসন্ধ্যায়।' (বিনয়) অমিলপয়ার ছন্দে ফাল্গুনের এক বসন্তসন্ধ্যা নেমে আসছিলো আমাদের গ্রামে। বেঙ্গল ক্লাবে সারা রাতের অনুষ্ঠান। বুধাদিত্য বাজাবেন সেদিন। তিনি তখন যুবক এবং অদ্ভুত চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী নবীন প্রতিভা। সন্ধে আটটা নাগাদ অনুষ্ঠানের শুরু। সামনের দিকে সাকচি হাইওয়ের তেলেভাজার দোকানের পাশে বাইকটি লাগিয়ে আমি আর সুগত হলের দিকে এগোচ্ছি। অন্ধকার থেকে গেটের হ্যালোজেন আলোয় আসতেই দেখি সামনে পর্ণা আর একটি মেয়ে। প্রথম গেটে কার্ড দেখাচ্ছে। ঠিক পিছনেই আমরা। ময়ূরপঙ্খি রঙের সিল্ক থেকে মৃদু খসখস শব্দ আর অচেনা কোনও সুরভির অস্পষ্ট ইশারা। চুপ করে দাঁড়িয়েই ছিলুম। মুখ ফেরাতে দেখতে পেলো। -আরে আপনি এখানে? -হুমম, একই কারণে... -সত্যিই, দারুণ... -দারুণ? কেন বলুন তো? এবার বোধ হয় একটু লজ্জা পায়। উচ্ছ্বাসের জন্য, -নাহ, ইয়ে, মনে হয় আজ অনুষ্ঠান খুব ভালো হবে... -তা ঠিক...সে রকমই তো আশা.. ----------------------------- সুগত পদ্য লেখে। কিন্তু ক্ল্যাসিকাল গান বোঝেনা। ওর বর্তমান ব্যথা সঙ্গীতপ্রভাকর থার্ড ইয়ার। সে আবার পদ্য পড়েনা। তাই পর্বতই মহম্মদের কাছে যেতে চাইছে। তখন তো ইউ-টিউবের জমানা ছিলোনা। মেহনত লাগতো। বহুবার বলেছি আমার কাছে কোনও মেড-ইজি নেই। অখিল ভারতীয় কার্যক্রম শোন। রাত জেগে। তার পর আসিস। দেখি যদি কিছু হেল্প করতে পারি। তার অধ্যবসায় 'ধন্যি ছেলে' টাইপ। এই অনুষ্ঠানটি রাতভর চলবে। খুব আঠা না থাকলে, শুধু আঁতেল সাজার জন্য আসা উচিত নয়। সাড়ে এগারোটা থেকে এক'টা পর্যন্ত ঢোলার সময়। তার পর অবশ্য ঘুম উড়ে যায়। কিন্তু এই দু'তিন ঘন্টা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ। যথাসাধ্য বুঝিয়েছি। কিন্তু ফল হয়নি। ওকে একটাই শর্ত দিয়েছি। আমি না বললে কোনও কথা বলবে না। বেরসিকের বকবক অসহ্য লাগে গান শুনতে শুনতে। ---------------------------------- হলগেটের কাছে দেখি সমরদা টিকিট চেক করছে। পর্ণাদের পিছুপিছু আমাদের ঢুকতে দেখে আড়চোখে তাকালো। আমরা করিনি কোন দোষ, তবুও কেবলিই খবরের জন্ম হয়। আমাদের ছোটো গ্রাম। অমুক'দার ছেলে হওয়ার চাপ বড়ো বেশি। তাকাতে গেলে তো চারদিকেই চেনা লোক। চুলোয় যাক। -কোনদিকে বসবেন? যেন ঠিকই আছে আমরা একসঙ্গে বসবো। -বলুন? -একটু পিছনে, কোনার দিকে যাওয়া যায়? -যায়... এগোতে এগোতে চোখে পড়ে সুগত'র ব্যথা তার গলায় কম্ফর্টার, গেরুয়া খদ্দরশোভিত গুরুজির সঙ্গে সদলে বসে আছে। তাহলে এটাই কেস। -আবে, ওখানে গিয়ে বোস.. -হবেনা.. -কেন? -শালা বুড়োটা হেভি খ্যাঁচা... -ঠিক বা... তবে আমার দিমাগ চাটিস না। বুঝতে না পারলে চুপ থাকিস। পরে বুঝিয়ে দেবো। দু'চারটে সলিড পয়েন্ট দিয়ে দেবো। কাল গিয়ে ঝেড়ে দিস। কুড়ি ফঁস জায়গি। গ্র্যান্টি... -মাইরি গুরু, পার লগাদে ইস বার... ------------------------------- মেয়েটার খুব সাহস তো। লক্ষ্য করছি চারদিক থেকে অনেক জোড়া চোখ নজর রাখছে। কিন্তু স্টেডিলি আগে আগে হেঁটে গিয়ে জায়গা খুঁজে নিলো। বেঙ্গল ক্লাবের সেই জংধরা টিনের চেয়ার। সারারাত এতে বসার কথা ভাবলেই রস শুকিয়ে যায়। কিন্তু আজ অন্যরকম। 'চাহিয়া দেখো, রসের স্রোতে রঙের খেলাখানি/ চেয়োনা চেয়োনা তারে নিকটে নিতে টানি।" পাশের চেয়ারে এমন রঙের খেলা থাকলে রসের স্রোতে তো ভরাকোটাল। - আজ প্রথমে কে গাইবেন? -সম্ভবত ফরিদুদ্দিন ডাগর.. -আপনার ধ্রুপদ ভালো লাগে? -ধ্রুপদের আর ভালো-মন্দ কী? ওটা শোনার অভ্যেস না থাকলে তো কিছুই বোঝা যায়না... -তাই? আমি কিন্তু ধ্রুপদ কখনো সামনে বসে শুনিনি.. -আজ শুনুন... -একটু গাইড করে দেবেন? কিছু বলিনা। এতোক্ষণের মধ্যে প্রথমবার শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি। ফিকে হাসি না আগ্রহ? বোঝা দায় হে। ----------------------- উস্তাদজির গলা সেদিন তন্দুরস্ত। ষড়জে পর্দা মিলিয়ে একটা পুকার। রাগ য়মন। নোমতোম আসতে আসতে লোকজন স্তব্ধ হয়ে শুনছে। -গলার কী ডেপথ... তাই না? -ঠিক। ধ্রুপদে এটা জরুরি... সুগত আড়চোখে তাকায়। ওকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে। ধ্রুপদ শেষ হবার পর অলকা কানুনগো'র ওড়িশি। ওঁর অনুষ্ঠান আগে কখনও দেখিনি। পর্ণার বন্ধু দেখি মাঝে মাঝেই উঠে কোথায় যেন যায়। একবার সপ্রশ্নচোখে তাকিয়ে দেখি। অযাচিতভাবে মন্তব্য শুনি, -একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে.... -ও... -এটা চলবে? দেখি দুটো লবঙ্গ এগিয়ে দিচ্ছে। -একশোবার... আজ আনতে ভুলে গেছি... ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজছে। একটা বড়ো বিরতি। সুগতকে বলি, যা বে খেটে খা। -আবে বুঢ্ঢা বহুত হা... -বিনা মতলব কা গালি দিচ্ছিস। অতোগুলো কাশ্মীর কি কলি'কে নিয়ে এসেছে। টেনশন তো থাকবেই। ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে বাইরে দাঁড়া। পৌঁছে যাবে.... -চল গুরু... পর্ণার বন্ধুও যথারীতি গায়েব। দুজনে মুখোমুখি। তবে গভীর সুখে সুখি কি না, জানিনা। আমাকে বলে, চা খাবেন? -আমি তো খাইনা, চলুন সঙ্গ দেবো... হল থেকে বাইরে আসতেই ফাল্গুনের মধ্যরাতের হাওয়া ওডিকলোনের মতো ঝাপটা মেরে স্নিগ্ধ করে দিলো সারা শরীর। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ মাঝ আকাশে। - কী দারুণ না? -আপনি কি এই দারুণটার কথাই বলছিলেন তখন? -ধ্যাৎ... আপনি খুব লেগে থাকতে পারেন। ঐতো কফি পাওয়া যাচ্ছে। এটা তো খেতে পারেন... মনে মনে বলি, টিক টোয়েন্টি দিলেও খেয়ে নেবো মধুময়। ------------------ কফিটা ভালো'ই বানিয়েছে। চুপ করে এক চুমুক। চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চাইছে। তাকিয়ে থাকি। -একটা কথা বলবো? -বলুন... -আর কতোক্ষণ আপনি করে কথা বলবেন? -আরে আমি তো ওতেই স্বস্তি পাই... -খুব স্বস্তি খোঁজেন, না..., সো বোরিং -নাহ, ঠিক তা নয়। নিজে থেকে সম্বোধন বদলাই না। প্রাইভেসিতে আক্রমণ মনে হয়.... -অনুগ্রহ করে বদলাতে পারবেন কি? -হয়তো পারি। কিন্তু সেটা তো রেসিপ্রোক্যাল হওয়া দরকার... এতোক্ষণে সে সত্যিকারের হেসে ওঠে। ঠোঁটের কোনের মাপা ভঙ্গিমা নয়। বসন্তপঞ্চমীর রাতে ঝিরঝির বৃষ্টির মতো ভাসিয়ে দেওয়া জলের শব্দ আসে। ---------------------------------- মধ্যরাতে আড়াইটা তিনটে নাগাদ তিনি বসলেন। সেনী ঘরানাদার উঁচু সপ্তকে বাঁধা যন্ত্র তাঁর । জোয়ারির শব্দ ঝর্ণার মতো, ভাসিয়ে দিয়ে যায়। রাগের নাম বললেন না। বন্দীশ শুনে কখনও মনে হলো আহির ভৈরব, না না এতো জোগিয়ার মতো লাগছে। উদ্গ্রীব হয়ে কান পেতে থাকা, ধরতে চাওয়া লক্ষণগুলিকে। ভৈরব না বসন্ত, কার ছোঁয়া বেশি লাগছে, চোখ বুজে শুনি। অওচার আলাপ শেষ করে বুধাদিত্য ঘোষণা করলেন তিনি রাগ বসন্তমুখারি বাজাচ্ছেন। বসন্তমুখারি, সেই কর্নাটকী রাগ বকুলভরণম I পারস্যের রাগ হিজাজের ছাঁচে এই রাগটিকে নিজের শরীর দিয়েছিলেন পন্ডিত রতনজনকার। । ততোদিন শুধু শোনা ছিলো উস্তাদ আমির খানের গায়নে বসন্তমুখারি। আর পণ্ডিত রবিশংকরের সেতারে দৈবী ছাব্বিশ মিনিট। সঙ্গে স্বপন চৌধুরী, তিন তাল। কিন্তু বুধাদিত্য বাজালেন এক সম্মোহক নেশাগ্রস্ততায় মত্ত সুরের বৃষ্টি। যেন বকুলপারা মেঘ আকাশ ভেঙে ঝরে পড়লো বসন্তের ঝোঁকে। রাগের মুখটি যেন ছুঁতে পারছিলুম আমি। নিমীলিত কাজলের মতো কোমল ঋষভ, নিখুঁত কোমল ধৈবতের মতো নাকের ডৌল আর কোমল নিষাদের মতো কম্পমান ওষ্ঠাধর। অপেক্ষায়। জানালার বাইরে শুদ্ধ গান্ধারের অঝোর বৃষ্টিধারা। শংকর-জয়কিশনজির স্টুডিওফ্লোর থেকে লতাজির সেই আর্তিভরা পুকার " ও বসন্তি পবন পাগল, আজা রে আজা রোকো কো'ই"I বুনোফুলের মধুর মতো মেলোডি, সেতারের তার বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো স্পিকারের বাক্সো থেকে। এই শিহরণ সুর ছাড়া আর কে'ই বা দিতে পারে?আজানুসমর্পণে দুহাত বাড়িয়ে ভিজে গেলুম সেই শেষ রাতের অন্ধকারে। নিশ্চুপ। নিরাবলম্ব। "... এবং আশ্চর্য এই-- বৃষ্টি হলে শব্দ হয় শব্দ হতে থাকে। সমস্ত সৃষ্টির জন্য এই নভোচর বারি প্রয়োজন। আমি দেখছি অনেক বৃষ্টি হচ্ছে, তা সত্ত্বেও শাশ্বতকালের তুলনায় বৃষ্টি হচ্ছে কয়েক মূহুর্তমাত্র-এই সত্য বুঝি। " (বিনয়) (ক্রমশ)

123

9

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

902

83

দীপঙ্কর বসু

সে দিন দুজনে

তালা কাহিনী বেশ অনেকটা দেরি করে শয্যাত্যাগ করে উঠে সবে দিনের প্রথম কাপ চায়ে একটা চুমুক দিয়েছেন অরুণ বাবু , আর ঠিক তখনই দেওয়ালে লটকান কলিং বেলটা টুং টাং শব্দে বেজে উঠল । -“দুররর ,কে আবার এলো এই সাত সকালে” কিছুটা বিরক্তির সঙ্গেই মনে মনে স্বগতোক্তি করেন অরুণ বাবু । অভ্যাস বশে পরনের লুঙ্গিটা হঠাৎ খুলে যাবার কল্পিত সম্ভাবনা রুখতেই যেন খুঁটটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে আদুর গায়েই এগিয়ে যান দরজার দিকে । দরজাটা একটু ফাঁক করে গলাটাকে বাড়িয়ে দেখে নিতে চান আগন্তুককে । “ওহ আপনি !এত সকালে ! কি ব্যপার !” প্রশ্নটা বিপন্নমুখে দরজার বাইরে দন্ডায়মানা বুলবুলির দিকে ছুঁড়ে দেন অরুণ বাবু । সম্ভবত মনের বিরক্তির কিছুটা আঁচ রয়ে গিয়েছিল প্রশ্নটায় ।অরুণ বাবু লক্ষ্য করলেন বুলবুলির মুখের বিপন্নভাবটা যেন আরও বেড়ে গিয়ে মুখটা কুঁচকে আরও ছোট হয়ে গেল । কিছুটা সানুনাসিক কণ্ঠে বুলবুলি এবারে তার আগমনের হেতুটা ব্যক্ত করে । “দেখুন না দাদা ,সক্কাল সক্কাল কি বিপদেই না পড়েছি । ছুটকির বাবা অফিস যাবে ,তার একটু পরেই ছুটকির স্কুলের বাস আসবে ,তাকে নিয়ে আমি মোড়ের মাথায় যাব বাসে তুলে দিতে এদিকে গেটের তালাটা কিছুতেই খোলা যাচ্ছেনা ।আমি আর ছুটকির বাবা দুজনেই খেপে খেপে অনেক চেষ্টা করেও তালাটা খুলতে পারলামনা । আপনি একবারটি এসে দেখবেন,দাদা ?” রাগের চোটে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি গোটা শরীরটা জ্বলে ওঠে । এ এক যন্ত্রণা হয়েছে অরুণ বাবুর । আদতে শান্তি প্রিয় ,ঠাণ্ডা মাথার মানুষটি কারো সাতে পাঁচে থাকেননা ,চট করে গলা তুলে কথা বলেননা কারো সঙ্গে ,সারাদিন নিজের মনেই থাকেন । কিন্তু তাতেই হয়েছে বিপদ । তাঁর নির্বিবাদী স্বভাবের জন্য একদিকে যেমন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা কিছুটা মান্য করে চলে অরুনবাবুকে । তেমনি আবার তাদের বিশ্বাস ঠিক এমনি একজন সরল নির্বিবাদী মিষ্টভাষী মানুষ ই ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণকারী কমিটির সম্পাদক হিসেবে একেবারে খাপে খাপে ফিট মানুষ ।তিনিই পারবেন ফ্ল্যাটের আবাসিকদের সঙ্গে নিয়ে চলতে । ঘোর অনিচ্ছা সত্বেও উপরোধে ঢেঁকি গিলেছিলেন অরুণ বাবু সেদিন । আর ঝামেলাটা শুরু তখন থেকেই । ফ্ল্যাটের কমন স্পেস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কাজের মাসি আছে ,ড্রেনেজ লাইন ঠিক ঠাক রাখার জন্যে আছে জগদীশ ম্যাথর ,ছোটখাটো সারাই মেরামতির জন্যে কিছু মিস্তিরির তালিকা আছে কমিটির খাতায় । প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র করা ছাড়া এমনিতে সম্পাদকের কাজ বলতে বিশেষ কিছুই নেই । তবে , বড় মাপের কোনা ঝামেলা পোহাতে না হলেও খুচরো ঝামেলা লেগেই থাকে । যেমন আজ সকালের তালা বিভ্রাট । তালার লিভারগুলো কোন কারণে জ্যাম হয়ে যাওয়ায় চাবির মোচড়ে না খুললে সম্পাদকের কিই বা করার থাকে? তিনিতো আর বিশ্বকর্মা নন ।তবু তালা খুলছেনা – দাদাকে বল । এ বড় আজব কথা ! ওপর তলা থেকে কে বা কারা রোজ ময়লা ফেলে নিচের কমন স্পেস নোংরা করছে – দাদার কাছে নালিশ জানাও , তেতলার মুকুজ্জের পেয়ে রিঙ্কু এক পাল ছেলে নিয়ে এসে ঘরের মধ্যে আড্ডা জমাচ্ছে – আবদার কর থানায় নালিশ জানানর । অন্যান্য কেস গুলোতে টুকটাক মিঠে কথা দিয়ে লোকজনকে সমলে নেবার কায়দাটা অরুণ বাবুর কাছে জলভাত ।শুধু মুকুজ্জের মেয়ের হল্লাবাজির বিরুদ্ধে থানায় নালিশ জানানো নিয়ে ঘোর আপত্তি অরুণ বাবুর । ফরিয়াদি পক্ষের অভিযোগের পালটা প্রশ্ন তোলেন - রিঙ্কু বা তার বন্ধুরা কি রিঙ্কুদের ফ্ল্যাটের ভেতরেই হৈহুল্লোড় না করে তাদের ফ্ল্যাটে কোন রকম উৎপাত করে? জবাব আসে –“ন্না ।তা করেনা । ফরিয়াদিদের গলার স্বর নেমে আসে । অরুনবাবু এবারে কিছুটা গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করেন , “তা হলে থানায় রিঙ্কুর বিরুদ্ধে ঠিক কি অভিযোগ জানান হবে?কার ঘরে কে এলো গেল তাই নিয়ে কি কোন অভিযোগ পুলিশ নেবে?” ফরিয়াদি পক্ষ চুপ । এই ভাবেই টুকটাক ফুস মন্তরে দিন চলে যায় ।অরুণ বাবু প্রায়ই ভাবেন এবারে একদিন মিটিং ডেকে অব্যাহতি চাইবেন এই উদোর বোঝা বওয়ার হাত থেকে । কিন্তু মিটিং এ প্রতিবারই একই গল্প উঠে আসে। দেখা যায় সকলেরই অফিস আদালত আছে । কেউ বা অত্যন্ত রগ চটা ,কারো হার্টের ব্যামো ...। অগত্যা নিস্তার নেই অরুণ বাবুর । “আচ্ছা ,চলুন । দেখি কি হল আবার তালাটার” ভাবখানা এমন ,যেন তিনি গিয়ে তালাটার সামনে দাঁড়িয়ে “চিচিং ফাঁক” বললেই অমনি বেয়াড়া তালাটা আপনা হতেই খুলে যাবে ! গায়ে একটা শার্ট পরে নিয়ে বোতামগুলো লাগাতে লাগাতেই নিচে নেমে আসেন অরুণ বাবু । সেখানে তখন বুলবুলির কত্তামশাই অসহায়ের মত চাবির তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ,আর বুলবুলি সেই একই রকম বিপন্ন মুখে সানুনাসিক স্বরে ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছে –“তোমার আজ আর আটটা পাঁচের লোকালটা ধরা হয়ে উঠবেনা ।কি একটা মিটিং ছিল বলেছিলে, সেটার কি হবে তা কে জানে !” অকুস্থলে অরুণ বাবুকে দেখতে পেয়ে বুলবুলি আবার শুরু করে – “কি হবে বলুন তো দাদা ।তালাটা্তো কিছুতেই খুলছেনা ।এদিকে ছুটকির বাবার স্কুলে একটা জরুরী মিটিং আছে ,ছুটকির স্কুল বাস আসার সময় হয়ে আসছে ... কাজের মেয়েগুলোকে পই পই করে বলা হয় অমন হ্যাঁচকা মেরে তালা খোলা বন্ধ না করতে,কিন্তু কে শোনে কার কথা।... “অ্যাই ,তুমি একটু চুপ করবে ? তখন থেকে সেই ঘ্যানর ঘ্যানর করেই চলেছে...”। খেঁকিয়ে ওঠেন চ্যাটার্জি বাবু । স্বামীর ধমকে বুলবুলির নাকি কান্না এক্কেবারে বন্ধ । কাঁচুমাচু মুখে সে এক কোনে দাঁড়িয়ে থাকে । অরুণ বাবু এগিয়ে যান বন্ধ গেটের দিকে । “দেখি তো আমার চাবিটা দিয়ে খোলা যায় কিনা তালাটা” । অভিশপ্ত তালাটা বাঁহাতে ধরে ডান হাতে চাবি বাগিয়ে ঘোরান অরুণ বাবু । কিন্তু ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবাধ্য ছেলেটার মতই তালাটাও আর রা কাড়েনা । মহা ফাঁপরে পড়ে যান অরুণ বাবু। বুঝে উঠতে পারেননা কি করা যায়- “তালাটা কি ভাঙতে হবে দাদা”? কিছুটা দ্বিধা জড়িত কণ্ঠে বুলবুলি জানতে চায় । “ওনার আটটা পাঁচের লোকালটা তো গেলই ,ওদিকে ছুটকির স্কুল বাস ...” “আ বা র...।!” গর্জে ওঠেন চ্যাটার্জি বাবু ।স্বামীর রক্ত চক্ষুর দাপটে বাক্যটা অসম্পূর্ণই থেকে যায় বুলবুলির । “গোদরেজের তালা ভাঙ্গা কি চাট্টিখানি কাজ?” অরুণ বাবু র কথায় বুলবুলি একটু সাহস পায় । বলে – “কাছেই একটা ছেলে থাকে। সে মাঝে মাঝে খালি বাড়িতে তালা ভেঙ্গে ঢুকে চুরিচামারি করে । নিচের খোকনের দোকানে তাকে দেখি মঝে মাঝে । ছেলেটাকে একটা খবর দিলে হয়না”! হাসি চেপে রাখতে পারেননা অরুণ বাবু । ততক্ষনে আরও দুজন অফিসযাত্রী নেমে এসেছেন। উদবিগ্ন তারাও - এসেছেন মণিকা রায় । যদিও আপাতত তার বাইরে যাবার তাড়া নেই তবু ঝামেলার গন্ধ পেয়ে আসা । ভিড়ের পেছন থেকে ফোড়ন কাটে - “ভাল কথা বলেছ বুলবুলিদি । নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে চোরকে দিয়ে নিজের ঘরের তালা ভাঙ্গানো !! এ একটা রেকর্ড হবে বটে ” ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলে “আশিস বাবুর কাছে কি একটা তেল আছে ,যেটা লাগালে নাকি জ্যাম হয়ে যাওয়া তালা খুলে যায় ।চেয়ে আনব তেলটা?” পাখির মত উড়ে যায় মণিকা রায় । কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে প্লাস্টিকের ছোট একটা বোতল হাতে। ফোটা ফোটা করে ঢালা হয় সেই তেল চাবির গর্তে । একটু অপেক্ষা । তার পর আবার প্রত্যেকের আনা চাবি দিয়ে একবার করে তালাটাকে খোলার নিষ্ফল চেষ্টা । তালা নট নড়ন চড়ন । উপস্থিত জনতার মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ওঠে – “এক এক জনকে দেখি তালা খোলার সময়ে গায়ের পুরো জোরটা তালার ওপরে লাগিয়ে দেয় ।।কি দরকার বাপু ...” কে আবার চাপা স্বরে বলে মুস্তাফি বাড়িতে কাজ করতে আসে কাঞ্চন বলে যে বৌটা তারই দেখি খুব তাড়া ...” সেই গুঞ্জনের মাঝেই হঠাৎ সিঁড়িতে দেখা যায় মুকুজ্জের মেয়ে রিঙ্কু দুদ্দাড় করে নেমে আসছে । “কি হয়েছে গো ? কি হয়েছে ?তালাটা আবার আটকে গেছে?” বলতে বলতে রিঙ্কু পৌঁছে যায় গেটের সামনে ।নিজের দুহাতে তালাটাকে ধরে হ্যাঁচকা একটা টান মারে রিঙ্কু ।লোহার পাতে মড়া গেটের গায়ে তালাটা ধাক্কা খেয়ে ঘটাং করে আওয়াজ হয় আর তার পরেই খুট করে ছোট্ট আওয়াজ । তালাটা খোলা অবস্থায় ঝুলতে থাকে গেটের আংটায় । “খুলেছে ,খুলেছে” সশব্দে উল্লাস জাগে জনতার কণ্ঠে । জলের পাইপে আবর্জনা আটকে জল জমে থাকার পর আবর্জনা সাফ হওয়া মাত্র জমা জল যেমন হুড়মুড় করে বেরিয়ে যায় ,দরজা খোলা পেয়ে অফিস যাত্রীর দল ঠিক তেমনি ভাবে হুহু করে বেরিয়ে গেল । নাটকের ও যবনিকা পাত ঘটল ।

395

14

kishore karunik

’পাবার মতো চাইলে পাওয়া যায়‘

----কিশোর কারুণিক উপন্যাস-১১ পর্ব পড়ে? আর আমার যখন অর্ধেক পড়া হলো ঠিক তখনই শ্রাবস্তীও নিজের কথা বলল। শ্রাবস্তী অশররিী কিছু না তো। ভাবতেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল্ আমার পছন্দের বই ওর কাছে কেন? আমিই বা কিসের মোহে এখান থেকে সরে যেতে পারছি না। অদ্ভুত সব চিন্তা মাথার ভিতর দৌড় ঝাপ করতে শুরু করেছে। শ্রাবস্তী বললো, “কী হলো, এতো ভাবছেন ?” দিবা স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। “নাÑকি আর ভাববো।” বলে শ্রাবস্তীর দিকে তাকালাম। শ্রাবস্তীর চোখ দুটো খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। মনে হয় সব বুঝতে পারছে ও । আমিও এবার আগ্রহটা বাড়িয়ে দিই। ও যেন আসল ভাব বুঝতে না পারে। বইটা বন্ধ করে বললাম, “ভালোই তো হলো।” শ্রাবস্তী কৌত’হলী ভঙ্গিমায় বললো, “আবার কী হলো।” “আপনি শেষের অর্ধেকটা পড়েছেন আমি শেষের অর্ধেকটা পড়া শেষ করলাম।” “ও , আমি মনে করেছি কী না কী।” কী না কী মানে! শ্রাবস্তী কি অন্য কিছু ভাবছে? কী ভাবতে পারে? ইস ! যদি অন্তর্যামী হতে পারতামÑতাহলে বুঝতে পারতাম। মানুষের মন যে বুঝতে পারে, সেই নাকি মানুষের মধ্যে উত্তম। কয়টি মানুষ বুঝতে পােে অপর মানুষের মনের কথা! আমার বোধ গম্য হচ্ছে না। শ্রাবস্তী কি ভাবছে আমি উত্তম মানুষ না? আসলে আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। শ্রাবস্তীকে বইটা ফেতর দিয়ে দিই। বইটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বররাম, “ আপনার বইটা রাখুন।” শ্রাবস্তী মৃদু হাসি দিয়ে বললো, “ কেন ,আর পড়বেন না?” “না,এই মূহুর্তে আর ভাললাগছে না।” শ্রাবস্তী বইটা আমার হাত থেতে নিয়ে নিলো। ও তো আর একবার অনুরোধ করতে পারতো। কেন এমন মনে হলো বুঝতে পারছি না। “তিলেখাজা খাবেন।?” শ্রাবস্তী ব্যাগ থেকে তিলেখাজা বের করেছে। না বাবা কী মেশানো আছে কে জানে। এবার মনে হচ্ছে শ্রাবস্তী এত সুন্দর হলেও এর ভিতরের জগৎ অন্ধকার। শ্রাবস্তী নিশ্চয় কোন ছিনতাইকারী দলের সদস্য আমি তিলেখাজা যেমনি খাব, তেমনি অজ্ঞান হয়ে যাব। তারপর আমার সবকিছু নিয়ে ও উধাও হবে। “কী হলো, কী ভাবছেন এতো?” “কই।” শ্রাবস্তী বললো, “তিলেখাজা খাবেন?” “না, আমার ক্ষিধে নেই।” “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?” “কই না তো । আপনাকে সন্দেহ করার কিছু আছে নাকি?” শ্রাবস্তী একটু রেগে গিয়ে বললো, “ কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?” “কই কিছু না তো। আপনাকে কী বলব আমি?” শ্রাবস্তী ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একশো টাকার নোটটি বের করে বললো, “টাকাটা---

267

10