দেশদ্রোহী

আজকের আপডেট

হ্যাঙ্গার ( @stuti..@স্তুতি ম্যাডামের অনুপ্রেরণায় লিখিত*) অতি সাধারণ নিত্যকার ব্যবহারের একটি নগণ্য বস্তু‚ নয় কি? বড় মেয়ে এসেছিল তার ত্রৈমাসিক সফরে বেচারী মা বাপকে দেখতে| মায়ের সাথে প্রতি রবিবারে সন্ধে সাতটায় নিয়ম করে কথা হয়‚ বাপের সাথে শুধু জরুরী ইমেল| তারাই ঘর দোর পরিস্কার করতে একটি পুরানো হ্যাঙ্গার খুঁজে পেয়েছে| (২) আর সপ্তাহ দুয়েক বাদেই আমেরিকা প্রবাসী আমার কলেজ সহপাঠী ও তাঁর স্ত্রী আসছেন এই ডাউন আন্ডারে| বলাই বাহুল্য একই বয়স আমাদের‚ সেই কবে পাঁচটা বছর একই ক্লাশে বসেছি‚ প্রথম বছরে সে তো আমার ঠিক ওপরে দোতলায় থাকতো| মাঝে কত দশক দেখা সাক্ষাৎ‚ যোগাযোগ নেই‚ আমরা আবার আলাদা গ্রুপে চলাফেরা করতাম| তবে বাকী সব একই| একই ক্যাম্পাসে সেই সদ্য বুনি ওঠা বয়সে ১৬ কিংবা ১৭'য় ফার্ষ্ট ইয়ার; এগারো ক্লাশের উচ্চ মাধ্যমিকের যুগে| মাঝে গঙ্গায়‚ ইছামতী‚ কাবেরী‚ মিসিসিপিতে অনেক জল গড়িয়ে গেছে| কোন যোগাযোগই নেই; না রি-ইউনিয়নে না কিছু| ভাবতে কেমন লাগে একই কলকাতা শহর আমরা এমনই কলেজের অনেক সহপাঠীরা একই সাথে শেয়ার করেছি মাঝেসাঝে কিন্তু কেউ কাউকে চিনিই না| একটু সংক্ষেপে সারি‚ ২০০৮ নাগাদ আবার ক্ষীণ যোগাযোগ হয়‚ ইন্টারনেটের সৌজন্যে বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে‚ এই সহপাঠীর সাথেও| যোগাযোগ মানে ঐ গ্রুপ ইমেল‚ ব্যস| কেউ কাউকে দেখে‚ না বলে দিলে‚ চিনতে না পারার কথা| (৩) সে থাকে আমেরিকায়‚ বিক্কলেজ ছাড়বার পর ম্যাথসে ডক্টরেট করে আইটিতে ‚ বেশ বড়সড় মনসবদার ভুবন বিখ্যাত কোম্পানীতে| আমিও বেলাইনে বম্বে'তে উচ্চ শিক্ষা করে‚ এদিক সেদিক ঘুরে এখানে| কিন্তু আসলী দোস্তি বিক্কলেজীয়‚ যেমনটা হয় আর কি‚ বিক্কলেজীয় বন্ধুত্ব‚ ভ্রাতৃত্ব একটু অন্য ধরণের‚ যারা জানে তারা জানে| তাঁর স্ত্রীর আবার পশুপ্রীতি আছে এবং তার নিজেরও আছে এই পান্ডববর্জিত মহাদেশ সম্বন্ধে আগ্রহ| 'আয় বেড়াতে' ইত্যাদি bon-homie‚ কিন্তু সে তো ছুটি-হীন দেশের চাকুরে| 'আসবো অমুক সালে তমুক সালে'ইত্যাদি| হয়েই ওঠে না তার| আমায় যেতে বলে কিন্তু আমি চাচার দেশ সম্পর্কে তেমন উৎসাহী ছিলাম না তখন পর্য্যন্ত| শিকাগো গিয়েই মত বদলায়| তো মেয়ে গ্রাজুয়েশনের পর কোথাও যেতে চাইতে মনে এলো হোয়াই নট ইউএস| এই দেশে আমেরিকা ও ইংল্যান্ড ভ্রমণের ওপর বেশ প্রিমিয়াম আছে‚ দেশে যেমন বিলাত ফেরৎ সম্পর্কে ছিল| শালা‚ আবাপ'তেই তো বিজ্ঞাপনই দিতো‚ উচ্চশিক্ষার্থে বিলাত যাত্রা! মাই ফুট| কথায় কথায় ঠিক হলো মা ও মেয়ে যাবেন আমেরিকা ভ্রমণে; গেলেনও| সে কি এখানে‚ ১৪+৫ ঘন্টার দীর্ঘ উড়ান‚ তার উপর সম্পূর্ণ নূতন দেশ এবং সর্বোপরি তারা তো বটেই আমিও কেউ কাউকে চিনবো না| কিন্তু ঐ যে বললাম‚ বিক্কলেজীয় ভ্রাতৃত্ব| তারা ফিরে এসে বন্ধুর ও তাঁর স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ; যেন জনম জনমের পরিচিত| তারপর অবশ্য দু একবার তাদের সাথে দেখা হয়েছে‚ কলকাতায় রি-ইউনিয়নে‚ আমাদের কূটীরেও অন্য কিছু বন্ধুর সাথে আড্ডা‚ পান ভোজনও হয়েছে| কিন্তু এতদিন বাদে অবসর নেবার পর তাদের সময় হয়েছে ফর এ ভিজিট টু ডাউন আন্ডার| (৪) হ্যাঙ্গারের গীত গাইতে এত কথা কেন? ধীরজ রাখিয়ে (ধরিয়ে!)| তাঁরা আসছেন‚ বাড়ী ঘরদোর সাফসুরত করা হচ্ছে আপতকালীন তৎপরতায়‚ বঙ্গদেশে পুজোর আগে যেমন ভাঙ্গা ইঁটের টুকরো দিয়ে রাস্তা সারানো হয় তেমনি| খুচ-খাচ এটা সেটা সব চেঞ্জ করার ধূম পড়ে গেছে| এন্ট্র্যানস থেকে প্ল্যানট পট সরানো- অনেকটা খোলা লাগছে‚ লেপ কাঁথা সব নতুন কেনা হচ্ছে; আসলে আমাদের নিরাড়ম্বর জীবনযাত্রায় একটু রঙের পোঁচ| 'পার্টনারও নতুন কিনে আনলে পারো তো'‚ মিন মিন করে জানান দিই| 'আরে অত ঝামেলার কি আছে‚ দেখো না মাণিকদার ইন্টারভিউ নিতে দেশ বিদেশ থেকে কত লোক আসে‚ তিনি তো ঐ বই খাতাপত্তর‚ স্তূপাকৃত ফাইলের মধ্যে ইজি চেয়ারে ঢোলা পাজামা পাঞ্জাবী পরে কথা বলেন!' 'শাট আপ‚ তিনি তিনিই‚ তোমার জগৎজোড়া খ্যাতি হোক‚ তব দিখা যায়েগা!' (৫) বড় মেয়ে উড়ে এসে হাত লাগিয়েছে মায়ের সাথে স্বচ্ছ কূটীর বানানোর প্রচেষ্টায়| এমন অপারেশনে অনেক কিছুই goes to the bin! হায় হায়‚ আমার এখানকার ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনীয়ার্স মেম্বারশিপের সাট্টিপিট (শংসাপত্র )‚ পুরানো op-shop (দু-নম্বরী দুকান) এর ফ্রেমে লটকানো ছিল গ্যারেজে‚ সেটাও| 'ঐ ঘোড়ার ডিমে আর কি প্রয়োজন?' রিটায়ার করে আমি কি উহা চর্বন করবো! দিশী সাট্টিপিট তো ফাইলেই আছে| আসলে মেম্বারশিপ ফী দিইনি বলে আমি বস্তুত: আর মেম্বার নই‚ ঐ সাট্টিপিট defunct; এখানে চাকরী পাওয়ার অব্যবহিত পরই মেম্বারশিপ কাট| (৬) আরে ওটা কি‚ সবুজ মতো? ওয়ার্ডরোব থেকে বেরিয়েছে সেই ছোট হয়ে যাওয়া কোট টাঙানো ছিল হ্যাঙ্গার| মুহূর্তে ফিরে গেলাম সেই প্রথম জীবনে‚ কত দশক আগে| সমীর বিয়ে করে ইঞ্জিনীয়ার্স হোষ্টেল ছেড়ে গেল‚ আমি তার ঘরে গিয়ে উঠলাম বেশী রোদ পাবো বলে| তখন কোয়ার্টার মিলতো শুধু বিয়ে করলেই| আমার তো তখন হয়নি‚ হবে বলে আশাও ইল্লা| কে জানে এমনিতে ব্যাচিলরদের কোয়ার্টার দিলে হয়তো ঐ কোম্পানীতে‚ শহরেই থেকে যেতাম এতদিন| আমাদের সামনা সামনি ঘর ছিল| সে ঐ হ্যাঙ্গারটি ফেলে যায়| এবং ওটি আমার সাথে সাথে সাত ঘাটের জল খেতে খেতে এই ডাউন আন্ডারে! কারুর কি মনে আছে‚ তখনকার দিনে extruded অ্যালুমিনিয়ামের রঙ বেরঙের তারের মাল বাজারে এলো‚ তার আগে তো লোহার তারের rubber clad অথবা কাঠের মালই পাওয়া যেত? (৭) একটু ছুঁয়ে দেখলাম‚ আমারই বয়স হয়ে গেছে‚ 'Gems the ঘাটের মড়া আখ্যায় ভূষিত হচ্ছি' লোকজন তাতে হাততালিও দিচ্ছে‚ কিন্তু সে রয়ে গেছে অবিকৃত‚ অবিকল‚ ঠিক যেমনটি তখন ছিল| (৮) এই বার লাইনে আসি‚ ঘুরে ফিরে সেই ইনোভেশনে| ইয়েস‚ মামুলী হ্যাঙ্গারেরও ইনোভেশন হয়| লোকে‚ কোম্পানীগুলো লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে পেটেন্ট নেয়| কত কত রকমের হ্যাঙ্গার দোকানে বিশেষ করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সে লক্ষ্য করে দেখবেন| কেন‚ বাড়ীতেও তো মেয়েদের অন্তর্বাস ঝোলানোর জন্য slit ওয়ালা‚ টাই ঝোলাবার অন্যরকম‚ দোকানে ১২‚ ১৪‚ ১৬ নম্বর লাগানো হ্যাঙ্গার নোটিশ করে থাকবেন| এখনও এই ২০১৮ তেও নিরন্তর ইনোভেশন চলেছেই| জনগণ‚ গুগল পেটেন্টস বলে কাকুর একটা আলাদা ইঞ্জিনই আছে @নব ভোঁদড় @ স্যার‚ শুনছেন?); কাকুও জানে বাজার ধরতে‚ শুধু শুধুই লিটল ম্যাগে কি স্কচ মেলে! যে কোন জিনিষ আশে পাশে‚ নিত্য ব্যবহার্য্য গুগলেই দেখবেন‚ লক্ষ লক্ষ এন্ট্রি| চুলের কাঁটা‚ হৃদয়ের stent‚ খোকাবাবু ঘুমিয়ে থাকেন তাকে ডাকবার জন্য বড়ি (V i a g r a)‚ কম ইলেকটারি খরচের LED বাতি‚ নগন্য সুইচ‚ সব পাবেন| শুধু শুধুই কি লোকে Anchor এর প্লাগ খোঁজে?‚ যদিও মালটি আদ্যিকালের‚ লোকজন বিনা দ্বিধায় কেনে‚ তাই চলছে| আপনারা কবিতা লিখুন প্রেমানন্দে‚ বিরহ যাতনা সয় না বলে হা হুতাশ করুন আমি চললাম ফ্রীজ খুলে বিজয়দার কিঙফিশারের ছিপি খুলতে| আরে বিজয়দা‚ তুসি গ্রেট হো‚ হামলোক ইধার বিড়ি ফুঁকতা হ্যায় আর আপনি তৃতীয় মধুচন্দ্রিমায়‚ এক্সপিরিয়েন্সড দাদা আমাদের! তার আগে একটা লিঙ্ক দিয়ে যাই‚ সময় পেলে দেখবেন এখনই ৯২৪‚৬১৩ এন্ট্রি‚ আপনি যখন খুলবেন তখন দেখবেন বেড়ে গেছে| জয়রামজীকী| * তিনিই ছোট খাটো‚ এটা সেটা নিয়ে রচনার সূত্রপাত করেন এই আড্ডায়| https://patents.google.com/?q=hanger&oq=hanger

1913

150

দেশদ্রোহী

তাসমান সাগর পেরিয়ে

তাসমান সাগর পেরিয়ে (২) Day-0 বহ্বারম্ভে লঘু ক্রিয়া| উপরোক্ত শব্দ বন্ধটির মানে কি? আবছা আবছা মনে পড়ছে- শুরুতেই গন্ডগোল বা সেইরকম কিছু? একটা যুতসই শিরোনাম না দিতে পারলে ঠিক‚ ঠিক লাগে না| এই শিরোনামের অভাবে কত কত চুটকী আর লেখাই হয়ে ওঠেনি| (২) আগামী কাল সমুদ্রযাত্রা| গতবারের যাত্রায় আমরা এক দঙ্গল পরিবার গিয়েছিলাম আস্ত একটা বাস ভাড়া করে ক্যানবেরা থেকে একেবারে সোজা সিডনীর জাহাজঘাটা অবধি| এবার তো আমরা একাই‚ অন্য পরিবার তো ব্রিসবেন থেকে| দশ এগারো দিনের মামলা‚ সাথে মালপত্র তো থাকবে‚ ওদিকে সিডনীতে তেমন যাতায়াত নেই| জাহাজঘাটার ওদিকে তো নয়ই‚ গেলেও গাড়ী চালিয়ে বিখ্যাত সিডনী ফিশ (আপ) মার্কেটে মাছ কিনতে একবারই মাত্র| মাছের দোকান না মিষ্টির দোকান বোঝাই যায় না‚ দামও তেমনি সেখানে| ঐ একবারই| (৩) খোঁজখবর করা গেল; এটা ঠিক অপেরা হাউসের পাশেই‚ সেটা জানতাম কিন্তু বাসে ট্রেনে ট্যাক্সি করে কিভাবে যাবো? এই যাতায়াতের ব্যাপারে আমি একটু অ্যাডভান্স প্ল্যানে বিশ্বাসী‚ নেমে হাতড়ানো না-পসন্দ| এসব কি শুচিবায়ু? কে জানে! আর এই জন্যেই কোথাও যাবার নাম শুনলে ভাল লাগে ঠিকই কিন্তু প্ল্যান করবে কে‚ কে কিনবে টিকিট‚ কে করবে হোটেল বুকিং| পূর্বাশ্রমে কোম্পানী বাহাদুরের কৃপায় এসব ভাবতে হতো না‚ অ্যাডমিনকে বলে দিলেই হতো| এখন তো আপনা হাত! গতবারের যাত্রায় আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম‚ ওরাই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল আমি শুধু টাকা দিয়ে খালাস| সুবিধা হলো এরা‚ আমরা মানে গ্রুপের সকলে একই শহরের এপাড়া ও পাড়ার বাসিন্দা‚ কাজকর্মও মোটামুটি একই লেভেলের ট্যাঁকের অবস্থাও তথৈবচ‚ সুতরাং - all done! এমনিতে এক্সপ্রেস বাস যায় সিডনী ইন্ট্যারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট হয়ে সিডনী সেন্ট্রাল স্টেশন অবধি| আবার এখান থেকে দিনে একবারই মাত্র যায় আসে সবেধন তিন ডিব্বার ট্রেন- সিডনী সেন্ট্রাল অবধি| কিন্তু সেই তো কে পৌঁছাবে স্টেশন অবধি‚ তারপর ট্রেন থেকে নেমে কতদূর‚ খোদায় মালুম| সিডনীর ভূমিপুত্র‚ বন্ধুবর শ্রীমান কৌস্তুভ তো ডা ডা ডা করে একপ্রস্থ বলেই খালাস| সেন্ট্রাল পেরিয়ে তারপর Circular Quay স্টেশন তারপর একটু হাঁটলেই! একটু? হাউ মাচ ইজ একটু? তিনি নিজে তো spring chicken আর আমরা থুত্থুড়ে বৃদ্ধ| (আবাপ তে আমাদের সমবয়সীদেরকে ঐ নামেই তো অভিধা দিয়ে থাকে)| ওহ‚ বলতে ভুলে গেছি‚ সবকিছু বিবেচনা করে সাব্যস্ত করা হলো‚ সোজা সেল্ফ-ড্রিভেন গাড়ী করে সিডনীতে অন্য এক বন্ধুর কাছের স্টেশন থেকে ট্রেনে চাপবো| গাড়ীটা তাদের বাড়ীর সামনে রাখা থাকবে কদিন| চারটে'য় চেক ইন আমরা বাড়ী থেকে সাতটা‚ আটটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লে সাড়ে এগারোটা বারোটা নাগাদ সিডনী| মালপত্র সমেত বিবিজানকে লোক্যাল স্টেশনে নামিয়ে আমি বন্ধুর বাড়ী থেকে হেঁটে ফ্লেমিংটন স্টেশন অবধি| আমি ভাই শিয়ালদা স্টেশন থেকে যাতায়াত করা পার্টি‚ লোক্যাল ট্রেন সম্বন্ধে একেবারে ঘরপোড়া গরু| এদিকে দু একবার সিডনীর ট্রেনে চেপেছি তাও দূরের গন্তব্যে| অবশ্য সে ১০০/২০০ কিমি দূরের‚ এদের কাছে লোক্যালই‚ ঘন্টা সওয়া ঘন্টা লাগে| শান্তিপুর‚ রানাঘাট? নাকি আসানসোল দুর্গাপুর| কিন্তু এটা আসলী লোক্যাল ভিড় তো হয় সকালের দিকে| (৪) হে নিপীড়িত পুং spouse গণ| এবার আপনাদের সহানুভূতি কামনা করি| সুটকেশ গোছানো| "বোতল বিছানা বাক্স‚ রাজ্যের বোঝাই" তাও মোটে দশদিনের যাত্রায়? কিন্তু হে সহৃদয় জনগণ‚ দশদিন কি প্লেন অ্যান্ড সিম্পল দশদিন মাত্র? সর্বাধুনিক Cruise ship‚ টাইটানিকের ঠাকুর্মা প্রমোদ তরণী| কি আছে কি নেই গুগলেই দেখতে পাবেন| দশদিন সকাল বিকেল কি একই পোশাক শোভা দেয়? Nope! বিভিন্ন ডেকের নাম ও বিস্তৃতিও তেমন| কোনটা এসপ্ল্যানেড‚ কোনটা promenade সেসব ডেক এ ফুর ফুর করে লোকে ঘুরবে আর তিনি কিনা একই জামাকাপড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে! কাভি নেহী| তার উপর লাঞ্চ‚ ডিনার এবং ফুটনোট হিসাবে বিভিন্ন বন্দরে ঘুম ঘাম! বন্দরে অবশ্য বুড়ি ছোঁয়াই হয়‚ মেরে কেটে সাত ঘন্টা তার দুঘন্টা বাদ যায় নামা ও ওঠাতে| ৪৮০০ জন যাত্রী কি কম কথা! (৫) উনাকে স্টেশনে নামিয়ে বন্ধুর বাড়ী| বন্ধুর স্ত্রী সহৃদয়া‚ তিনি ডাল ভাত রেঁধে বসে আছেন; ওদিকে আমি তো টেনশানে‚ ট্রেনে উঠতে হবে‚ টিকিট কি করে কিনতে হয় তাই জানি না| বড় ৪-৫ প্ল্যাটফর্মের স্টেশন হলেও কি‚ নো ম্যানস ল্যান্ড; কোথাও কেউ নেই; সবই মেশিন! একজন বলে নিউজ এজেন্টের দোকান থেকে অ্যাডভান্স টিকিট কিনতে হবে তো অন্যজন বলে স্টেশনেই নাকি ভেন্ডিং মেশিন রয়েছে| গ্রামের লোক শহরের স্টেশনে গিয়ে লেজে গোবরে হবো কিনা কে জানে| তায় মালপত্রের বোঝা| তিন তিনটে উড়োজাহাজের কেবিন ফ্রেন্ডলি সুট্কেশ‚ পিঠব্যাগ ও এক হাতে তাঁর হাতে জল ও খাবারের থলি| হোয়াই জল? এখানে অব্শ্য যে কোন ট্যাপের জলই পেয় কিন্তু কোথায় পাবো তারে? একবার তো মেলবোর্ন এয়ারপোর্টে গলাকাটা দামে জল কিনতে হলো‚ ব্যাটারা সব ফন্দি করে দাম বাড়িয়ে রাখে‚ NSCBI তে কাগজের ওষুধের গেলাস সাইজে কুড়ি টাকা হাঁকে‚ নেতানো সিঙ্গাড়াও তথৈবচ‚ দেশে বিদেশে সকলই সমান| (৬) নিউজ এজেন্ট বললেন দশ দশ কুড়ির টিকিট যাতায়াত; আমাদের তো একপিঠ| কিন্তু কুনো অপশান ইল্লা| এদেশে এসে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা‚ গাঁট কাটার ব্যাপারে সরকারও কম যায় না| তবে তিনি সহৃদয়‚ বললেন ভেন্ডিং মেশিনে একপিঠের টিকিট মেলে| চল‚ চল হোথা| বিবিজান ঠায় দাঁড়িয়ে‚ বাবু চললেন টিকিট কিনতে| একটা WT হয়ে যাবে নাকি! মন বললো‚ লালুজীর জমানা থেকে সে গুড়ে বালি; তিনি এই মহৎ কার্য্যটি সুসম্পন্ন করেছিলেন সুচারু ভাবে‚ নো টিকেট‚ নো ট্রেনে চাপা; ধরা পড়লেই মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট| আজীব‚ আনকা মেশিন; কোথায় কি ঢোকাতে হবে কে জানে! কোথায় পয়সা‚ কোথায় বা নোট| তার উপর বোতাম কোনটা টিপবো? ধারে কাছে তো এক্জনও দেখিনে| তা ছাড়া কোন লাইনের টিকিট কিনবো‚ কোন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াবো| আইটি ভায়েরা অবশ্য মোটামুটি ফুল-proof সব কল বানিয়ে রেখেছেন| সবই তো আন্দাজে‚ আন্দাজে| বিশ টাকার নোট দিলাম‚ দাম ১০.৪০‚ ন'টাকা ষাট ফেরৎ পাবো কিন্তু তখন কে জানতো! খুচরো গুলো আর টিকিট পেয়েই খুশী‚ পরে নেমে এসে (মেশিনটা ওপর তলায়) মিলিয়ে দেখি একটা ৫ টাকার নোট ফেরৎ পাবার কথা‚ ফিরে গিয়ে দেখি চেঞ্জ হাওয়া| স্বাভাবিক| আমি জানতাম না‚ নোট কোন slit দিয়ে বেরোয়; সিঙ্গাপুরে দেখেছি একই chute দিয়ে বোধ হয়| রাগ ও বিরক্তি হলো‚ এ কেমন মেশিন রে বাবা‚ ফুল-প্রুফ হওয়াই তো উচিত| এই এক কল হয়েছে আজকাল‚ দেশে এটিয়েমে কার্ড ঢুকিয়ে বের করে নিতে হয়‚ এখানে কিছুক্ষণের জন্য মেশিনের ভিতর; নতুন মেশিন বসিয়েছে তাতে এক জায়্গা থেকে কার্ড ফেরত‚ অন্যটা থেকে রিসিট এবং অন্য chute থেকে টাকা; একবার তো অন্যমনস্ক ছিলাম বলে কিছুটা এগিয়ে এসেছি‚ এক্জন পিছন থেকে ডাকছে; টাকাই ভুলে এসেছিলাম‚ ভাগ্যিস টাকা তুললে ঐ বিশ‚ চল্লিশ বড় জোর দুটো পঞ্চাশ টাকার নোট| একশো টাকার নোট তো চোখেই দেখি না‚ এখনও দেশের ছোটবেলায় ঢাউস ঘুড়ি সাইজের একশো টাকার নোটের মতো মূল্যবান; সাইজে ছোট কিন্তু buying power এ ভারী| এক দেড় পারসেন্ট ইনফ্লেশনের দয়ায়‚ পে রিভিশান হলেও তেমনি‚ মেরে কেটে আড়াই‚ পাঁচ বৃদ্ধি| (৭) ট্রেন ধরতে হবে‚ ভাগ্যিস লিফ্ট আছে নতুবা নিউ দিল্লী স্টেশনের মতো হলে আর সমুদ্রযাত্রা হতো ই না‚ অত মালপত্র নিয়ে কে সিঁড়ি ভাঙবে| অবশ্য এই স্টেশনের লিফট বসানোয় আমার বন্ধুটির অবদান অনেকটাই| তিনি মিউনিসিপ্যালিটির কাউন্সিলর‚ তাঁর স্ত্রীর ঘ্যানঘ্যানানিতে এবং স্থানীয় লোকজনের মন ও ভোট জয় করতে এটির আগমণ ত্বরান্বিত হয়েছে কারণ ঠিক ওপারেই সপ্তাহে আড়াই দিন হাট বসে| যৎসামান্য অবদান আমারও‚ এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগের সমান| ঐ যাকে পিপিএম (parts per million) বলে কর্পোরেশনের জলে দূষিত পদার্থের অনুপাত বোঝাতে| তাঁর ভোটের দিনে আমি ও আমার সহধর্মিণী লাইনে প্রতীক্ষারত ভোটদাতাদের হাতে লীফলেট বিতরণ করেছি এবং আমি (lo and behold) এখানকার হাইস্কুলের ভোট কেন্দ্রে তাঁর এজেন্ট ছিলাম‚ ভোট গণনার| এখনও কাগজের ব্যালট পেপার‚ ভোট শেষে সেই কেন্দ্রেই গণনা| বিরল অভিজ্ঞতা| উভয় দলের লোক‚ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই‚ হাতাহাতি নয়! কিছু কিছু বাঞ্চ দুবার ‚ তিনবার গোণা হয়‚ হিসাব না মিললে| বাধ্যতামূলক ভোট‚ তাই কিছু কিছু লোক তাদের ক্ষোভ উগরে দেন ব্যালট পত্রে| (৮) নাহ‚ ট্রেন ফাঁকাই| সব অফিস কাছারী খুব বেশী হলে নটা বা সাড়ে নটায় খোলে‚ বেলা সাড়ে এগারোটায় হাজির হওয়া এক্কেবারে নো নো! বেশীর ভাগ যাত্রীই তো আমার মতো নন-অফিসী লোক আর সিনিয়র সিটিজেনগণ‚ অফ-পীক আওয়ারে স্বল্পমূল্যের ভ্রমণ| আবার স্মরণ করিয়ে দিই‚ আমরা আক্ষরিক অর্থে গ্রাম থেকে মেট্রো শহরে‚ রীতিনীতিই ভিন্ন| চোখ ও কান খোলা রাখতে হচ্ছে গন্তব্য না পেরিয়ে যাই! মিটিমিটি হাসতে দেখে বিবিজান জিজ্ঞাসা করলেন কি হেতু? প্ল্যাটফর্ম অন দ্য রাইট সাইড‚ প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে এবং প্ল্যাটফর্ম ডাহিনে তরফ শুনতে হচ্ছে না| এত এত ইঞ্জিরী চলে‚ ব্যাঙ্ক থেকে বাসের নম্বর‚ গন্তব্য অবধি সেখানে রাইট‚ ডান বা ডাহিনে তরফের কি যুক্তি কান ঝালাপালা করা ছাড়া; আছে হয়তো কোন গূঢ় কারণ‚ বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি| তবে 'দরওয়াজা পাস পাস খুলতা হয়' হলো ক্লাসিক! কারণটা আমি অল্পবিস্তর অনুধাবন করতে পারি| পূর্বাশ্রমে প্রায় বছরখানেক রেল কোচ বিল্ডিং কোম্পানীর ডিজাইন অফিসে ও ফ্যাক্টরিতে ট্রেনিং পিরিয়ডে কাজ করেছি| বাঙালী অফিস‚ টেন্ডার অনুযায়ী তিন ভাষায় লিখতে গিয়েই বোধহয় এই চিত্তির! (৯) অবশেষে রেলযাত্রার সমাপ্তি‚ জাহাজঘাটার অব্যবহিত পাশেই রেল স্টেশন‚ নোঙর করা বিশাল ১৪ তলা Ovation of the Seas| টিপটিপ করে বৃষ্টি‚ ভাগ্যিস একটা বহু পুরানো ভাঙ্গা ছাতা‚ একটা শিক থেকে সেলাই ছেঁড়া| যতই আপেল বা স্যামসঙ মারাও না কেন‚ ছাতার কোন ছিঁড়বেই‚ তা সে ফোল্ডিং হোক বা অন্যকিছু| আসলে যত লোড কমানো যায়‚ গতবার Vanuyatu ও Noumea দ্বীপে প্রথমটায় চড়া রোদ দ্বিতীয়টায় বৃষ্টিতে বেশ নাজেহাল হতে হয়েছিল| ট্রপিকস তায় দ্বীপ‚ সোনায় সোহাগা| এবার নো রিস্ক‚ সিঙ্গল ইউজ ছাতা‚ আসবার পথে goes to the bin! জাহাজঘাটা তো লোকে লোকারণ্য‚ জাহাজের যাত্রীদের ভিড় তার উপর এটা আবার লোক্যাল ফেরিঘাটও বটে‚ সিডনীর নর্থ আর সাউথ shore এর মধ্যে‚ দূরত্ব অনেকটাই কমে‚ বাগবাজারের গঙ্গার ঘাট থেকে হাওড়া স্টেশন অবধি যেমন| ৪৮০০ তো জাহাজেরই যাত্রী| তায় ইমিগ্রেশন‚ ধীরে ধীরে‚ ব্যাগ ড্রপ করা‚ তেলের শিশি ১০০ সিসির কম‚ সবই হ্যাপা| কেন জানি না বহু বছর আগের মনিহারী ঘাটের কথা মনে ভেসে এলো‚ তখনও ফরাক্কার ব্রীজ হয়নি‚ আর জীবন নদী দিয়ে এত এত জলও বয়ে যায়নি‚ সেই ক-অ-অ-অ-বে! এদেশে ও আমেরিকাতেও দেখেছি লাইন একটানা লম্বা হয়না‚ জিগ জ্যাগ; তাতে করে মনে হয় না যে অত লম্বা লাইন‚ সিটি সেন্টার-২ থেকে হলদিরাম অবধি এটিয়েমের লাইনের মতো| যে পিছনে আছে সেও psychologically ভাবে এই তো সামনেই কাউন্টার! তবে লাইন ছোট হলে কি হবে‚ লাটসাহেবের বাড়ীর সামনে এসপ্ল্যানেড ম্যানসনে দ:পূ রেলের টিকিট কাউন্টারের লাইনের কথা ভাবলে এখনও গায়ে জ্বর আসে; ইন ফ্যাক্ট মাঝে মধ্যে দু:স্বপ্নে দেখি| সেই ঢাউস লেজার‚ টিকিটের পশ্চাদ্দেশে বার্থ নম্বর‚ আর পাশ থেকে কাউন্টারে হাত ঢুকিয়ে জিজ্ঞাসা করার মাস্তান| কপালে কি লেখা আছে জানা নেই তবে এই জীবনে আর ঐ লাইনে দাঁড়াতে হবে না সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত| তাই কি? NSCBI তে ঢোকার মুখে সিআরপির গেটে তো লাইন দিতেই হয়| নাহ‚ কালীদা আর পারি না| (১১) এঁকা বেঁকা লাইন হয়ে‚ সিকিউরিটি পেরিয়ে ক্যারি অন লাগেজ টানতে টানতে‚ ramp বেয়ে বেয়ে কখন যে জাহাজের খোলে ঢুকে পড়েছি খেয়ালই নেই| সেই পরিচিত পরিবেশ এই গতবছর ফেব্রুয়ারীতেই তো‚ সবে ১২ মাস হয়েছে; যদিও অত্যাধুনিক জাহাজ তবে একই কোম্পানীর জাহাজ কিনা‚ তাই lay-out একই রকম‚ যেন কতকালের চেনা| আর ধাক্কাধাক্কি নেই‚ ঘর অবধি পৌঁছুতে পারলেই হয়| লিফটে করে সোজা ছ'তলা‚ ওহ ডেক বলতে হয়‚ ডেক-৬‚ তলা ফলা চলবেনি কো| ঘরে ঢুকে‚ " AT LAST"‚ অপু জাহাজের কেবিনে ফেরৎ আসিয়াছে‚ সরি কেবিন বলতে হয় না‚ Stateroom! বিগার্ডেন থেকে ৫৫ নম্বরে হা: স্টেশন‚ সেখান থেকে ১০ নম্বরে ১০ পয়সার টিকিটে শিয়ালদা‚ দেড়টার ট্রেনে ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে‚ আরও দেড় দু ঘন্টা পরে ট্রেন থেকে নেমেই দে ছুট‚ বাসে জায়গা নিতে হবে| বাসে ঘন্টাখানেক বাদে‚ ইছামতীর খেয়াঘাট‚ পেরিয়ে হেঁটে রিকশায় এক মাইল‚ আবার টাবুরে নৌকা (ডিঙি‚ flat bottom)‚ তাতে করে আরও আড়াই ঘন্টা বাদে নিজেদের বাড়ীর ঘাট| ততক্ষণে প্রায় রাত্রির প্রথম প্রহর‚ হেরিকেনের আলোয় ঘাট থে বাড়ী‚ টিউ কলে হাত পা ধুয়ে তবে শান্তি‚ প্রথমেই এক থালা ভাত| আজকাল অবশ্য যৎসামান্য উন্নতি হয়েছে| এখানে? লাগেজ রেখে সোজা ডেক-১৪ এ‚ বুফে ২৪ ঘন্টার ডাইনিং হলে‚ তবু মন ও চোখ খুঁজে চলে কোন কাউন্টারে‚ কোন ট্রেতে রাজমা আছে; মূলো ভাজা দিয়ে মুগের ডাল এ জন্মে দেখতে পাবো না‚ তাই কঢ়ী চাওল ই সই| এবার নিশ্চিন্ত আগামী দশ দিনের জন্য| তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিল‚ কখন যে Juggernaut চলতে শুরু করেছে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে অপেরা হাউসের কমলার খোসা‚ দেশদ্রোহী চললো দেশভ্রমণে| (ছবি আসিবে পরে)

189

14

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

সিটি বা উল্ফ হুইসল তখনো বেশ ছোট| একটু বড় দিদিদের সাথে রাস্তায় বেরোলে রকে বসা ছেলেরা সিটি বাজাতো| দিদিরা চোখ কড়া করে নাক কুঁচকে ঘুরে অব্জ্ঞা দেখিয়ে আমাদের নিয়ে রাস্তা পার হয়ে যেত| আমরা যতদিনে বড় হয়েছি সিটির চল উঠে গেছে| আমাকে দেখে কেউ কোনদিন সিটি মেরেছে মনে পড়ে না| বরং আমাদের গ্যাংটা একটু টমবয়িশ ছিল| আমি তো পুরো ই টমবয় ছিলাম| শিস দেওয়া রপ্ত করেছিলাম বেশ ছোটবেলাতেই| মা শাসন করতো বলে মায়ের আড়ালেই চলতো শিস দেওয়া| মায়ের লজিক ছিল মেয়েরা শিস দেয় না| এই লজিক টা চিরকাল ই বোগাস মনে হয় আমার| তাই টিপিক্যালি মেয়েরা যেগুলো করে না সব ই আমি করার চেষ্টা করতাম| জোর করে না| স্বত:স্ফূর্ত ভাবে আসতে বলেই| ৩/4 জন একসাথে আছি ‚ একটা ছেলে সামনে দিয়ে যাচ্ছে‚ আমরাই তাকে গান গেয়ে‚ আওয়াজ দিয়ে নাকাল করতাম‚ এরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে| সিটি না দিতে পারলেও শিস দেওয়া ভালো ই পারতাম| কিন্তু ছেলেদের সিটি বাজানো ৮০/ ৯০ এর দশকে শুনি নি কখনো| এমনকি সিনেমাতেও চোখে পড়তো না| ৬০ এর দশকের সিনেমায় দেখেছি - তনুজা রাস্তা পার হচ্ছে‚ রকে বসে সৌমিত্র ও ওনার সাথীরা সিটি দিচ্ছে‚ তনুজা রাগ রাগ চোখে তাকাচ্ছে| এরপরে সব আমাদের জেনের ছেলেদের দেখলাম কেউ সিটি তো দূর শিস ও দিতে পারে না| সবাই খুব অবাক আর অ্যাপ্রিসিয়েটিভ হত আমার স্কিল দেখে| আর আমি ভাবতাম ৭ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধা জননী <img class="emojione" alt="😋" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F60B.png?v=1.2.4"/> এসব ভুলেই গেছিলাম| আজ বিবিসিতে এডিটর্স পিক পড়ে আবার মনে পড়ে গেল| ফ্রান্সে ল মেকাররা ৯০ ইউরো (আমাদের টাকায় ৭০০০ এর কিছু বেশি) ফাইন করার কথা ভাবছেন উল্ফ হুইসল আর ক্যাট কলিং এর জন্য| উল্ফ হুইসল - ১৯৪৪ এর মুভি To have and have not| একসাথে বসে ট্রেডিং করতে করতে নায়িকা ব্যাকাল হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে চুমু খেয়ে ফেলে নায়ক বোগার্টকে| নায়ক কিংকর্তব্যবিমূঢ়| নায়িকা বেরিয়ে যেতে যেতে ছুঁড়ে যায় তির্য্যক মন্তব্য - আর কিছু না পারো ঠোঁট দুটো একসাথে জুড়ে উল্ফ হুইসল দেওয়ার চেষ্টা তো করতে পারো| তারপরে হিস্ট্রি| নায়্ক সাথে সাথে লম্বা হুইসল দেয়| সাংঘাতিক ছিল তাঁদের অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি| শ্যুটিং ফ্লোরেই শুরু তাঁদের রোম্যান্স| সিনেমা রিলিজ হতেই বিয়েও করে ফেলেন| ততদিনে উল্ফ হুইসল ফ্যাশনের তুঙ্গে| রাস্তায় ঘাটে মেয়ে দেখলেই উঠতি যুবকরা মুখে দু আঙুল পুরে সিটি দিতে ব্যস্ত| ইন ফ্যাক্ট সিটি দিতে কেউ না পারলে তা বেশ নট ম্যানলি বলেই গণ্য হত| কি এই উল্ফ হুইসল| অনেকে ভাবতেন নাবিকরা এই হুইসল নিজেদের মধ্যে ব্যবহার করতো অর্ডার দেওয়ার জন্য| কিন্তু অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় পার্বত্য অঞ্চলের রাখালদের মধ্যে এর ব্যবহার| নেকড়ে বাঘ দেখা দিলে পরস্পরকে আর নিজেদের পাহারাদার কুকুরদের সতর্ক করার জন্য রাখালরা মুখের মধ্যে দু আঙুল পুরে এই লম্বা সুউচ্চ আওয়াজের শিস দিত| কিন্তু লোক সমাজের এর ব্যবহার শুরু হল কি করে? ১৯৩৭ সালে রেড রাইডিং হুড কার্টুনে টেক্স অ্যাভেরি এর ব্যবহার করেন| গল্পের উল্ফ এই সিটি বাজাতে বাজাতে ছোট্ট রেড রাইডিং হুডকে তাড়া করে ফিরছিল| ইন ফ্যাক্ট সে এই টা করার জন্য একটা মেশিন ই বার করে ফেলে| শেষে মাথায় হাতুড়ি পড়তে সে নিরস্ত হয়| তবে উল্ফ হুইসল তুমুল জনপ্রিয় এর সিকুয়েলে| রেড হট রাইডিং হুড| রেড রাইডিং হুড তখন বার সিঙ্গার| উল্ফ হোটেলে গিয়ে তাকে দেখে পাগল হয়ে যায়| লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গড়াগড়ি দিয়ে হাস্যকর কান্ড করতে থাকে‚ তার সাথে অবশ্যই থাকে উল্ফ হুইসলের ঢল| তাজ্জব ব্যাপার‚ এই সিনেমাটা সেক্সুয়ালি এত প্রোভোকেটিভ ছিল যে কার্টুন হওয়া সত্ত্বেও সেন্সর বোর্ডের খাঁড়ার কোপে পড়ে| কিন্তু তখন দ্বিতীয় বিশ্বাযুদ্ধের সময়ে‚ তাই ইউএস গভর্নমেন্ট সেন্সরের আওতা থেকে বাঁচিয়ে এই সিনেমা চালু রাখেন| কারণ? এত সেক্সুয়ালি প্রোভোকেটিভ সিনেমা দেখে সৈন্যদের যৌন আকাংখ্শা বেড়ে যাবে আর তারা হতাশ হয়ে পড়বে| আর যত হতাশ হবে তত তারা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে| সেই সময়ে এমন কোন অ্যামেরিকান সৈন্য ছিল না যিনি রেড হট রাইডিং হুড দেখেননি| সমস্ত অল্প বয়সী ছেলেদের ও দেখা হয়ে গেছিল এই সিনেমা| ফল? যারা তখনো উল্ফ হুইসল করতো না‚ সিনেমা দেখার সাথে সাথেই তারাও শুরু করে দিতে হুইসলিং| তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলো হুইসলিং| উল্ফ হুইসলিং প্রথম ধাক্কা খায় অ্যাফ্রিকান অ্যামেরিকান টিলের মৃত্যুতে| ১৪ বছরের টিল বাজারে এক সাদা চামড়ার মেয়েকে দেখে সিটি বাজিয়েছিল| তাকে কিডন্যপ করে অমানুষিক মেরে‚ গুলি করে‚ গলায় প্লেনের পার্ট্স বেঁধে জলে ডুবিয়ে দেয় আততায়ীরা| টিলে মা জোর করে ওপেন কাস্কেট বেরিয়া করেছিলেন টিলের‚ পৃথিবী দেখানোর জন্য কি নারকীয় অত্যাচার করা হয়েছে ১৪ বছরের এক কিশোরের ওপর| সিভিল রাইট্স মুভমেন্টের স্লোগান হয়ে ওঠে টিলের মৃত্যু | উল্ফ হুইসলের জনপ্রিয়তার পতন ও শুরু সেই থেকে| এরপরে ফেমিনিজমের শুরু থেকে কফিনে পেরেক গাঁথা শুরু উল্ফ হুইসলের| ৫০/ ৬০ দশকের নির্ভেজাল মজা কয়েন্ড হয় নারী অবমাননার প্রতীক হিসেবে| আর একটা কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার‚ If you r in France, never wolf whistle, else you will find your pocket lighter by 90 Euros. ☺

1304

92

ঝিনুক

জাপানী প্রেমিক

গল্পের শুরু এক বৃদ্ধাবাস থেকে| শহরের অন্যতম নামী এবং দামী পরিবারের প্রবীণতমা সদস্যা অশীতিপর অলমা বেলাসকো| প্রাসাদোপম ঘরবাড়ি‚ আত্মীয়-পরিজন‚ নেশা-পেশা সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এসে সেই বৃদ্ধাবাসের বাসিন্দা হয়ে গেলেন একদিন হঠাৎ| লোকজনকে অবাক করে দিয়ে নিয়ম করে কে যেন চিঠি পাঠায় হলুদ খামে ভরে অলমার জন্য‚ সাথে একগোছা গন্ধরাজ ফুল| গোপন প্রেমিক? আশি পেরিয়ে!! সালটা ১৯৩৯‚ অলমার বয়স তখন মাত্র সাত ……যুদ্ধের দামামা বাজছে সারা বিশ্ব জুড়ে‚ তবে পোল্যাণ্ড তখনও পুরোপুরি হিটলারের দখলে চলে যায় নি‚ অসউইৎজের দু:স্বপ্ন সত্যি হতে তখনো কিছুদিন বাকি| আসন্ন সেই অশনিসঙ্কেত থেকে বাঁচাতে স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে এক দু:সম্পর্কের মাসি আর মেসোর কাছে মেয়েকে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলেন অলমার নিরুপায় বাবা-মা| ড্যানজিগ থেকে যখন জাহাজ ছাড়লো অলমা আর তার গভর্নেসকে নিয়ে‚ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন অলমার বাবা‚ পাশেই মায়ের কান্নায় ভেঙে পড়া চেহারা শেষবারের মত দেখতে দেখতে অলমা দাঁড়িয়েই থাকলো ডেকের রেলিঙ ধরে‚ এমনকি বাবামায়ের চেহারা ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাবার পরেও| তিন মাস আগে ঠিক এই জেটি থেকেই জাহাজ ছেড়েছিল তার দশ বছরের বড় দাদাকে নিয়ে‚ লণ্ডনের উদ্দেশ্যে‚ না নিরাপত্তার নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপের পানে নয়‚ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে চলে গেছিল অলমার দাদা স্যামুয়েল মেন্ডেল| এই সুদূরভ্রমণ এবং বিদেশবাসের ব্যবস্থা নিতান্তই সাময়িক‚ যুদ্ধ শেষ হলেই তারা সবাই আবার একসাথে হবে‚ জীবন আবার আগের মত নিশ্চিন্তে বয়ে যাবে…… যতই আশার বাণী শোনাক না কেন তার বাবা-মা‚ মুছে যাওয়া তটরেখার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে শরীরের প্রত্যেকটা কোষ অলমার চিৎকার করতে থাকে‚ এই শেষ‚ আর কোনদিন দেখা হবে না বাবা-মায়ের সাথে| মোট সতেরো দিনের যাত্রাপথ --- ড্যানজিগ থেকে লণ্ডন হয়ে সাউদাম্পটন‚ সেখান থেকে ট্র্যান্স-অ্যাটলান্টিক ফেরিতে স্যান ফ্র্যানসিসকো| প্রথম দুতিনদিন কাটলো সী-সিকনেসে‚ তারপর বিরক্তি আর ক্লান্তিতে| চিৎকার চেঁচামেচি করে কান্নাকাটি করা অলমার স্বভাবে বা শিক্ষায় নেই‚ মায়ের জন্য নীরবে লুকিয়ে কাঁদে অলমা| জাহাজ যখন স্যান ফ্র্যানসিস্কোতে পৌঁছালো‚ মাসি লিলিয়ান‚ মেসো আইসাক‚ দুই মাসতুতো দিদি মার্থা আর সারা আর দাদা ন্যাথানিয়েল‚ অভিজাত বেলাসকো পরিবারের সব সদস্যই হাজির তখন জাহাজঘাটায় অলমাকে স্বাগত জানাতে| আইসাক বেলাসকো বিশাল ধনী‚ শুধু অর্থে আর প্রতিপত্তিতেই নয়‚ হৃদয়ে ও মানবিকতাতেও| মাতৃময়ী লিলিয়ানও আইসাকের যোগ্য সহধর্মিণী| ভাইবোনেরাও তিনজনেই ভারি ভালো| মস্ত প্রাসাদের একখানা সুবিশাল ঘর অলমার জন্য সাজিয়ে রেখেছেন মাসি আর মেসো| মা-বাবাকে কেউই প্রতিস্থাপন করতে পারে না‚ তবু আইসাক আর লিলিয়ান পরম মমতায় আর ভালোবাসায় অলমাকে ভরে দিতে চেষ্টা করলেন‚ গভীর স্নেহে তাকে কাছে টেনে নিলেন| প্রথম মাস কয়েক লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদলো অলমা আর ডায়রিতে লেখা হতে থাকলো মা-বাবার জন্য মনখারাপ| আস্তে আস্তে চোখের জলও ফুরিয়ে আসতে থাকলো‚ সেই সাথে বাবা-মায়ের সাথে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাও| ধীরে ধীরে অলমা বেলাসকো পরিবারের একজন হয়ে উঠলো| বিশেষ করে ন্যাথানিয়েলের সাথে অলমা একেবারে এঁটুলির মত লেগে থাকে| আসলে বয়সের দিক থেকে তেরো বছরের ন্যাটই অলমার সবচেয়ে কাছের| উঠতে ন্যাট‚ বসতে ন্যাট‚ ন্যাট ছাড়া অলমার দুনিয়া অন্ধকার| কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট‚ নরম স্বভাবের ন্যাটও বড় দাদার মতই অলমার সব আবদার আর উপরোধের কর্ণধার| অলমার সব দু:খসুখের একান্ত খবর শুধু ন্যাটের কর্ণকুহরের জন্যই| এতটাই নির্ভর ন্যাটের উপর যে প্রথম ঋতুদর্শনে আতঙ্কিত অলমা ন্যাটের শরণাপন্ন হয়‚ লিলিয়ানের নয়| এই ন্যাটের হাত ধরেই অলমার সঙ্গে পরিচয় হয় ইচিমেইয়ের‚ বাগানের জাপানী মালী টাকাও ফুকুদার ছোট ছেলে‚ আট বছর বয়স| শান্ত স্বভাবের ছোটখাটো চেহারার ইচিমেই‚ শিল্পীর যত্নে বাগানের পরিচর্যা করে‚ ছবি আঁকায় আর মার্শাল আর্টে তুখোড়‚ ন্যাটকে সে সেই সব কৌশল শেখায় আর আলমাকে শেখায় ফুল-লতা-পাতা| প্রথম দেখার মুহূর্ত থেকেই দু'জনায় তুমুল বন্ধুত্ব| বয়সে এক বছরের ছোট হলেও অলমার বাড়ন্ত গড়ন আর দাপুটে স্বভাবের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বিনয়ী‚ অনুগত ইচিমেইর বেশি সময় লাগে না| বাল্যপ্রণয় কুসুমিত হতে না হতে বিচ্ছেদের ঘন্টা বেজে গেল| সেই সর্বনাশা যুদ্ধ| ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাস‚ পার্ল হারবারে বোমা ফেললো জাপান| অ্যামেরিকা জুড়ে শুরু হয়ে গেল জাপানী বিদ্বেষ| পরের বছর অগাস্ট মসের মধ্যে নারী-পুরুষ‚ শিশু-বৃদ্ধ‚ সুস্থ-অসুস্থ নির্বিশেষে এক লাখ কুড়ি হাজারেরও বেশি জাপানীকে উদ্বাসন দিয়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে অন্তরীণ করা হল| তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে এসে সে দেশটাকেই দেশ বলে মেনে নিয়েছে বহু বহু বছর আগে‚ ইচিমেইয়ের মত অনেকের জন্মই হয়েছে অ্যামেরিকাতে‚ তারা জন্মসূত্রে সে দেশের নাগরিক| তবু তারা জাপানী| হিংসা কোন যুক্তির ধার ধারে না| এমনকি আইসাকের টাকা বা প্রতিপত্তিও কোন কাজে দিল না| টাকাওকে পরিবার নিয়ে উদ্বাসনের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হল| যাবার আগে অলমার কাছে বিদায় নিতে এসে দাঁড়ালো ইচিমেই| পাগলির মত ইচিমেইকে ধরে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলো অলমা‚ কেন‚ কেন‚ কেন? কেন তারা চলে যাচ্ছে? কেন যে যাচ্ছে‚ কোথায় যাচ্ছে‚ আর কখনো দেখা হবে কিনা….. এর কোনটার উত্তরই ইচিমেইয়ের কাছে ছিল না সেদিন| 'চিঠি দিও'‚ 'চিঠি দিও'‚ দুজনার আর্তিটুকু শুধু পড়ে রইলো ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া বাসের পিছনে| অলমা স্বাধীন‚ চিঠি লেখায় কোন বাধা তার নেই‚ কিন্তু ইচিমেই? তার সব চিঠিকে তো ক্যাম্পের সেন্সর বোর্ড পার করে যেতে হয়| অকরুণ হাতে কাটাছাঁটা হয়ে সেই চিঠি যদি বা অলমার হাতে পৌঁছায়‚ পড়ে তার অর্থ খুঁজে পাওয়া ভার| তবু অলমা প্রত্যেকটা চিঠি জমিয়ে রাখে আর হাজারবার পড়ে| অনেক ভেবে ইচিমেই একটা উপায় বার করলো‚ লেখা ছেড়ে ছবি এঁকে পাঠাতে শুরু করলো সে| পেন্সিলের রেখায় তার বন্দী জীবনের টুকরো টাকরা গল্প‚ অলমার সঞ্চয় ভরে উঠতে থাকে সেই সব ছবিময় চিরকুটে| বছরখানেক কাটলো‚ ধীরে ধীরে ইচিমেইয়ের চিঠি লেখায় ভাটা পড়তে পড়তে একসময়ে বন্ধই হয়ে গেল| ওদিকে অলমা আশায় আশায় রইলো প্রায় বছরখানেক| তারপর আস্তে আস্তে একদিন সেই আশার প্রদীপ নিভে এল‚ যেভাবে এক এক করে নিভিয়েছে সে বাবা-মা-দাদার জন্য জ্বেলে রাখা প্রদীপগুলি| আপাতদৃষ্টিতে অভ্যাস হয়ে গেল বন্ধুর নীরবতায়‚ কিন্তু ভিতরে ভিতরে চলতে থাকলো এক অনি:শেষ কথোপকথন‚ ডায়রির পাতায় পাতায় ফুটে উঠতে থাকলো তার ছাপ| কেউ জানলো না সে কথা শুধু ন্যাট ছাড়া| এদিকে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সেই ন্যাট চললো হার্ভার্ডে ল পড়তে| অলমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো| শুধু কি প্রিয়বিচ্ছেদই লেখা আছে তার কপালে‚ প্রথমে দাদা‚ বাবা-মা‚ তারপরে ইচিমেই আর এবার ন্যাট? ন্যাট যতই সান্ত্বনা দেয়‚ 'চিঠি লিখব‚ ছুটিতে তো আসবই'‚ অলমা শুনতে চায় না| ইচিমেইও তো বলেছিল চিঠি দেবে…… ১৯৪৫-এর অগাস্ট মাসে জাপান আত্মসমর্পণ করার পরে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বন্দীদের ছেড়ে দেওয়া শুরু হল| দুই সন্তান হারিয়ে বহু দু:খদিনের শেষে আবার স্বাধীনতা‚ ফুকুদা পরিবারের নতুন জীবনযুদ্ধ শুরু হল আরিজোনায়| ইচিমইয়ের তখন চোদ্দ বছর বয়স| আঙুলের যাদুতে বাগানে ফুল ফোটাতে পারে সে অবলীলায়‚ সাবলীল ছবি আঁকতে পারে‚ কিন্তু পড়াশোনায় তেমন একটা দড় নয় ইচিমেই‚ দিদি সাথে করে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিল| শুরু হল পড়াশোনা‚ শুরু হল বড় হয়ে ওঠা‚ শুরু হল বাঁচার লড়াই| প্রাণপণ চেষ্টায় স্কুলের গণ্ডিটুকু পেরোল সে কোনক্রমে| ইচিমেইয়ের এক বছর আগেই অলমা স্কুল শেষ করল আর ন্যাটের পিছে পিছে হাজির হল বস্টনে| মাসির মোটেই ইচ্ছে ছিল না অলমাকে অতদূরে পড়তে পাঠানোয়‚ বরং উপযুক্ত ঘরেবরে সম্প্রদান করে দিতে পারলেই তিনি খুশি হতেন‚ চেষ্টারও কিছু কমতি ছিল না তাঁর পক্ষ থেকে| কিন্তু মেসো রইলেন অলমার পক্ষে‚ ওনার দাক্ষিন্যে অসুবিধে তেমন হল না‚ অলমা চলে গেল পড়তে বস্টনে| বস্টনে পৌঁছেই সে ন্যাটকে জানালো লিলিয়ানের পাত্র খোঁজার কথা‚ জানাল ইচিমেই ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করতে পারবে না| ন্যাট বোঝাতে চেষ্টা করলো যে ইচিমেইয়ের হয়তো মনেই নেই তাকে আর যদি বা থাকেও মনে‚ যদি কোনদিন সে ফিরেও আসে‚ তাহলেও এ বিয়ে সম্ভব নয়| শুধু যে দু'জনে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশীয়‚ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ তাই নয়‚ আর্থসামাজিক দিক থেকে তারা দুইজনে দুই পৃথিবীর বাসিন্দা| এ বিয়ে হলেও অলমা সুখী হবে না কক্ষণো| অলমা ঘোষণা করলো সে আজীবন অবিবাহিতাই থাকবে তাহলে| পাস করে ফিরে গেল ন্যাট স্যান-ফ্র্যানসিসকোতে পরের বছর| মাসি চেয়েছিল অলমাও ফিরে আসুক ন্যাটের সাথে| কিন্তু অলমা ততদিনে খুঁজে পেয়েছে তার পথের দিশা‚ Design and Painting…. পড়াশোনা শেষ করে সিল্ক স্ক্রীন পেইন্টিঙ নিয়ে কাজ করবে সে‚ অনেক স্বপ্ন তার‚ দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবে তার কাজ নিয়ে| আস্তে আস্তে স্বভাব চরিত্রেও বদল আসতে থাকে অলমার‚ আত্মবিশ্বাস বাড়ে‚ মাসির আদর আর বৈভব থেকে অনেক দূরে একা নিজের কাজ গুছিয়ে করার অভ্যাস তৈরী হয়| যৌবনের উপবনে ভ্রমরের গুঞ্জন চিরকালই অনিবার্য‚ একজন‚ দু'জন‚ তিনজন……. অলমার সদ্যযুবতী শয্যা উষ্ণ করতে সঙ্গীর অভাব হয় না‚ কিন্তু কেন যেন অলমার মনে হয় ইচিমেই যেভাবে বাজাতে পারত তার শরীরের তানপুরাটা‚ সেভাবে আর কেউ পারে না‚ পারবে না| শরীর পেরিয়ে সম্পর্ক আর মনের গভীরতায় পৌঁছোয় না কারো সাথেই| চার বছর পরে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এল অলমা‚ তার বয়স তখন একুশ| ন্যাট ততদিনে প্রতিষ্ঠিত উকিল‚ বাবার আইনের ব্যবসা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে‚ মাসি লিলিয়ানের চুল সব পেকে গেছে‚ কানেও প্রায় শোনেনই না বললে চলে‚ মেসো আইসাক হার্ট অ্যাটাক সামলে উঠে ভারি দুর্বল হয়ে পড়েছেন| অলমাকে দু'জনেই অসম্ভব স্নেহ করেন‚ তাকে ফিরে পেয়ে ভীষণ খুশি হলেন‚ বিশেষ করে আইসাক| বাগান করতে খুব ভালোবাসতেন তিনি‚ অলমার হাত ধরে নতুন উদ্যমে বাগানে গাছপালা নিয়ে মেতে উঠলেন| এমন সময়ে একদিন আরিজোনা থেকে ইচিমেইয়ের ফোন এল আইসাকের কাছে| প্রায়াত বাবার শেষ ইচ্ছে পূর্ণ করতে তাকে আসতে হবে আইসাকের সাথে দেখা করতে বিশেষ প্রয়োজনে| খবরটা শোনামাত্রই আনন্দে লাফিয়ে ওঠে অলমা| বারো বছর পরে আবার দেখা হল ইচিমেইয়ের সাথে| দরজা খুলে ইচিমেইকে স্বাগত জানল অলমাই‚ তাকে চমকে দিয়ে জাপটে ধরে উন্মাদের মত চুমু খায় অলমা| ইচিমেইয়ের জন্য একটা নার্সারির ব্যবস্থা করে দেন আইসাক| মা আর দিদিকে নিয়ে ইচিমেই আবার ফিরে আসে স্যান-ফ্র্যানসিসকোতে‚ সালটা ১৯৫৫| শুরু হয় অসমাপ্ত প্রণয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়‚ একটু একটু করে পুরাতন প্রেম নতুন শিখায় জ্বলে ওঠে| প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা দু'জনার গোপন অভিসার শুরু হয়| একটা সস্তার মোটেলে যেখানে অলমাকে কেউ চিনবে না‚ ঘর ভাড়া করে অলমা রোজ| ইচিমেই তার যাদুস্পর্শে অলমার শরীরের বীণায় ঝঙ্কার তোলে‚ অলমা দেবীর মত পূর্ণ করে ইচিমেইয়ের বাসনা| অলমা বাড়িতে দোহাই দেয় সান্ধ্য ক্লাসের‚ শুধু ন্যাট জানে অলমা আর ইচিমেইয়ের প্রণয়ের কথা| তবে জানে মানেই যে তার সমর্থন আছে এই সম্পর্কের ব্যাপারে তা নয়| ইচিমেইয়ের মত একজন সামান্য মালির মধ্যে যে অলমা কি দেখেছে সে বুঝে উঠতে পারে না| ধনে-মানে তো নয়ই এমনকি ইচিমেইয়ের নিতান্ত ছোটখাটো চেহারার মধ্যেও কোন পুরুষোচিত সৌন্দর্যের ছায়ামাত্রও নেই| অলমার বড়সড় সম্ভ্রান্ত চেহারার পাশে তাকে যে কি বেমানান দেখায়! স্বভাবে চরিত্রেও দুজনে একেবারে বিপরীত| মনে মনে সে শুধু আশা করতে থাকে‚ অলমা একদিন ঠিক বুঝতে পারবে তার ভুল‚ নিজেই সংশোধন করে নেবে নিজেকে| অঘটন অথবা বলা ভালো ঘটনা ঘটতে সময় বেশি লাগলো না| যে মুহূর্তে অলমা বুঝ্তে পারল সে গর্ভবতী‚ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো তার| বুদ্ধিমতী‚ আপাতদৃষ্টিতে বয়সের তুলনায় যেন একটু বেশীই পরিণত‚ কিন্তু অন্তরে অন্তরে আদতে ছেলেমানুষ অলমা কেন যেন এই সম্ভাবনাটা সব ইক্যুয়েশনের বাইরে রেখে প্রেমের খেয়া ভাসিয়েছিল| সেই অবশ্যম্ভাবী ঘটে যাবার পরে তার বোধোদয় হল‚ কাজটা ঠিক হয় নি| ইচিমেইকে সে বলতে পারবে না‚ কিছুতেই না| কারণ ইচিমেই জানতে পারলে এই শিশুর দায়িত্ব নিতে এক মুহূর্তের দ্বিধাও করবে না‚ সে নিশ্চিত জানে যে এই খবর পেলেই ইচিমেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে| কিন্তু ইচিমেইকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়‚ এই ব্যাপারে ন্যাট একশোভাগ ঠিক| দুদিনও টিকবে না তাদের প্রেম এই বিয়ে হলে| অগত্যা সে গিয়ে তার অগতির গতি ন্যাটের বুকে আছড়ে পড়লো| ইচিমেইয়ের মত মানুষ পৃথিবীতে দুর্লভ‚ সে কারো ক্ষতি চায় না‚ নির্লোভ‚ অজাতশত্রু‚ অমিত পরিশ্রমী মানুষ সে কিন্তু তার কোন উচ্চাকাঙ্খা নেই‚ সে অল্পে সন্তুষ্ট‚ প্রায় সাধু-সন্তের মত জীবন তার‚ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছুতে তার কোন আগ্রহ নেই| 'ইচিমেইকে আমি বড্ড ভালোবাসি‚ ভালোবাসবো‚ যতদিন বাঁচবো‚ কিন্তু ওকে বিয়ে করে ঐ টিনের বাড়িতে গিয়ে মালির বউ হয়ে জীবন আমি কাটাতে পারবো না ন্যাট'‚ অলমার স্বীকারোক্তি| প্ল্যান-প্রোগ্র্যাম সব তার করা হয়ে গেছে| শুধু ন্যাটের সমর্থন আর সহায়তা দরকার তার এই বিপদ থেকে মুক্তি পেতে| অলমার জন্য ন্যাট যে কোন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে| কাজেই পছন্দ না হলেও অলমার বেআইনী পরিকল্পনা মেনে নিতে হয় তাকে| পনেরো ঘন্টা ড্রাইভ করে সে অলমাকে নিয়ে যায় মেক্সিকোতে অ্যাবরশন করাতে| কিন্তু মেক্সিকো পৌঁছে একশো ডলার হস্তান্তরিত করার পরে তারা বুঝতে পারলো হাতুড়ের পাল্লায় পড়েছে| বোঝামাত্র ন্যাট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল‚ সে বিয়ে করবে অলমাকে| 'না' বলার মত মনের জোর অলমা জোগাড় করে উঠতে পারল না| পার্থিব সুখসুবিধার ঊর্ধ্বে নিজের ভালোবাসাকে রাখতে না পারার লজ্জায়‚ ন্যাটকে এইভাবে জড়িয়ে ফেলার আত্মধিক্কারে মরমে মরে যেতে থাকে অলমা| কিন্তু মনের ভাব মনের বাইরে প্রকাশ করার চেয়ে লুকিয়ে রাখতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ‚ সেই ছোটবেলা থেকেই| মেক্সিকো থেকে ফিরে এসে ইচিমেইয়ের সাথে আবার দেখা হল| ইচিমেই অনুভব করতে পারলো কোথায় যেন তার ছিঁড়ে গেছে| প্রথম কয়েক দিন ইচিমেইয়ের সব প্রশ্ন এড়িয়ে গেল অলমা নানা ছলনায়| কিন্তু শেষে বলতেই হল‚ না না তার গর্ভস্থ সন্তানের কথা নয়| বলতে হল‚ সে আর দেখা করতে আসতে পারবে না‚ বাড়িতে সবাই সন্দেহ করছে‚ এভাবে আর চলবে না| সে লণ্ডনে চলে যাবে পড়তে| আর তাদের এই সম্পর্কের তো আর সত্যি সত্যি কোন সফল পরিণতি সম্ভব নয়‚ তার চেয়ে এখানেই পরস্পরের কাছে চিরতরে বিদায় নেওয়া ভালো| অসম্ভব দীর্ঘ এক নীরবতার পরে ইচিমেই জানালো সে বুঝেছে‚ শান্ত দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল‚ Forever is a long time, Alma. I think we’ll meet again in happier circumstances or other lives….. বিয়ে হয়ে গেল ন্যাট আর অলমার‚ কোনভাবেই দ্বিচারিণী হবে না সে‚ I won’t fail you, I’ll always be faithful…. প্রতিজ্ঞা করল অলমা ন্যাটের কাছে বিয়ের রাতে| স্থিতধী ন্যাট জবাব দিল‚ "Let’s not make promises we might not be able to keep. We’re going to travel this path together, step by step, day by day, with the best of intentions. That’s all we can promise tonight to one another..….." ইচিমেইয়ের বাচ্চাটা অবশ্য পৃথিবীর আলো দেখতে পেল না| অলমার উচ্চ রক্তচাপজনিতে অসুস্থতার কারণে মিসক্যারেইজ হয়ে গেল| ন্যাট আর অলমার দু'জনে দু'জনকে ভালোবাসায় কোন খাদ নেই| ন্যাটের চেয়ে বড় বন্ধু দুনিয়ায় কেউ নেই অলমার‚ উল্টোটাও সত্যি‚ অলমার মত করে ন্যাটকে কেউ বোঝে না| কিন্তু দু'জনার সম্পর্কে কোন স্ফুলিঙ্গ নেই‚ নেই পরস্পরের প্রতি দুর্নিবার শরীরি আকর্ষণ| জবরদস্তি দাম্পত্যের প্রচেষ্টায় একটি ছেলের জন্ম দেয় অলমা| আইসাক আর লিলিয়ানের নয়নের মণি অলমা আর ন্যাটের সেই ছেলে ল্যারি‚ বেলাসকো পরিবারের শিবরাত্রির সলতে‚ ঠাম্মির যত্নে‚ দাদুর আদরে আর ঠাকুর চাকরের সেবায় বড় হয়ে ওঠে| অলমাকে বিশেষ কোন পরিশ্রম করতে হয় না ছেলে মানুষ করতে| ধীরে ধীরে আবার বিবাহপূর্ব সম্পর্কে ফিরে যায় দু'জনে| ক্যুইন সাইজ শোবার ঘরের কিং সাইজ বিছানায় অলমা একাই ঘুমায় বেশির ভাগ দিন‚ ন্যাট পাশেই লাগোয়া স্টাডিতে| আস্তে আস্তে দুজনেই নিজের নিজের জগত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে‚ অলমা তার পেইন্টিং নিয়ে আর ন্যাট তার আইনী ব্যবসায়| অপরাধবোধে ভোগে অলমা‚ ন্যাটকে বলে বিয়েটা ভেঙে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিতে| কিন্তু ন্যাট রাজি হয় না| অলমা জানায় কাউকে যদি ন্যাট মন দেয় বা সম্পর্ক গড়ে তোলে কারো সাথে‚ তার কোন আপত্তি নেই‚ শুধু সমাজে জানাজানি যেন না হয়‚ ডিভোর্সে যখন সে রাজি নয়‚ তার স্ত্রীয়ের মর্যাদাটুকু যেন অক্ষুণ্ণ থাকে| সাত বছর কেটে গেল বিয়ের পর| আইসাক মারা গেলেন‚ সারা শহর ভেঙে লোক আসল তাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে আর সম্মান প্রদর্শন করতে পরোপকারী‚ দরাজ-হৃদয় আইসাকের অন্ত্যেষ্টিতে| এল ইচিমেইও‚ সাথে মা‚ দিদি আর বউ| ইচিমেইকে দেখামাত্র অলমা যেন তড়িতাহত‚ যেন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা রূপকথার রাজকুমারী| ইচিমেইয়ের তরফে কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না‚ বরং সে যেন একটু বেশীই ফর্ম্যাল‚ অলমাকে 'মিসেস বেলাসকো' বলে সম্বোধন করে সে তার শোকজ্ঞাপন করল বার বার বিদায় নেবার আগে| পরের কয়েকদিন অলমা চেষ্টা করল নার্সারিতে ফোন করে ইচিমেইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে‚ কিন্তু প্রতিবারই ফোনে ইচিমেইয়ের স্ত্রীর কন্ঠস্বর শুনে ফোন নামিয়ে রাখল সে| কিছুদিন এইভাবে চলার পরে ইচিমেইয়ের কাছ থেকে একটা চিঠি পেল অলমা| না প্রেমপত্র নয়‚ তার জীবনের আর নার্সারির বিবরণ দিয়ে‚ আইসাকের মৃত্যুর জন্য দু:খ করে চিঠি শেষ করেছে ইচিমেই‚ না তাতে অতীতের কোন আভাষ‚ না ফিরতি উত্তরের কোন প্রত্যাশা| আক্ষরিক অর্থেই একটি বিদায়ী চিঠি‚ অলমাকে জানিয়ে দিতে যে সে কোনরকম যোগাযোগে আর উৎসাহী নয়| সত্যিই তো‚ যে মহা অন্যায় সে করেছে ইচিমেইয়ের সাথে‚ তা তো একেবারেই ক্ষমার অযোগ্য| পেরিয়ে গেল আরো সাতটা বছর| আঁকাজোকায় নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেয় অলমা‚ তার সিল্ক স্ক্রীন প্রিন্টিঙের ব্যবসাও ফুলেফেঁপে ওঠে‚ তার সাথে নানা চ্যারিটি আর জনসেবা| কাজের জন্য দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে হয় অলমাকে‚ বাড়িতে সে থাকে না বললেই চলে| যখন থাকে তখনও ন্যাটের সাথে শরীরি সম্পর্কে কোন জোয়ার আসে না| অলমা নিজের মনে ভেবে নেয়‚ ন্যাট নিশ্চয়ই কারো দেখা পেয়েছে শরীরের চাহিদা মেটানোর জন্য| মনে মনে সে খুশিই হয়‚ কিন্তু মুখে কিছু জানতে চায় না| দুজনার দাম্পত্যে আর কোন কিছুই কথোপকথনের বাইরে নয়‚ কোথাও কোন আড়াল নেই‚ দুজনেই দুজনের আর সব সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল‚ বন্ধ শুধু মনের ভিতরকার একান্ত কোণের ঘরটি| তা নিয়ে দুজনের কেউ কাউকে কখনো কোন প্রশ্ন করে না| মেনে নিয়েছিল অলমা তার বিরহকে‚ আর সে চেষ্টা করে নি ইচিমেইয়ের সাথে কোনরকম যোগাযোগের| কিন্তু বারবার সেই একই মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে থাকে তাকে জীবন‚ যে মোড়ের নাম ইচিমেই| এক অর্কিড শোতে আবার দেখা হয়ে গেল তার ইচিমেইয়ের সাথে| অনেক বদলে গেছে অলমা‚ চেহারায় বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে‚ একটু যেন রোগাও হয়ে গেছে‚ কিন্তু ইচিমেই সেই একই রকম রয়ে গেছে| তার কথা বলার ধরণ‚ মাথা ঝুঁকিয়ে চলার ধরণ‚ তার স্মিত শান্ত হাসি…. যত দেখতে থাকে অলমা‚ তত তার মনের ভিতর ছটফটানি বাড়তে থাকে| তবে এবার আর অলমা একা নয়‚ ইচিমেইও যেন বেশ উৎসুক| পারস্পরিক কুশলবিনিময় থেকে শুরু করে ডিনার হয়ে একটি বিদায়ী চুম্বনের সঞ্চারীতে এসে ঘটে গেল বিস্ফোরণ যত জমে থাকা আবেগের‚ লুকিয়ে রাখা কামনা‚ বাসনা লাভাস্রোতের মত ছলকে বেরোল| আবার শুরু হল দু'জনের দেখাশোনা‚ চিঠি লেখা‚ বিনিময়| যৌবনের প্রেমোচ্ছ্বাস বয়সের সাথে সাথে পরিণত রূপ ধারণ করে| শরীরি বিনিময়কে ছাপিয়ে যায় অন্তরের দেওয়া-নেওয়া‚ মনে মনে ছুঁয়ে থাকাটুকু| সমাজ-সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সেরে দুজনে মিলিত হতে থাকে মাঝে মাঝেই‚ মধ্যের সময়টুকু চিঠিতে বা ফোনে যোগাযোগ| যে প্রেম পরিণতি পায় নি‚ সেই প্রেম গোপনে পুষ্পিত হয়ে ওঠে সবার চোখের আড়ালে| এইভাবে কাটে পরের চোদ্দটা বছর| Aids- এ আক্রান্ত ন্যাটের শরীর খারাপ হতে হতে একেবারে শেষ অবস্থায় এসে ঠেকে| পাগলের মত অলমা চেষ্টা করতে থাকে ন্যাটকে বাঁচানোর| কিন্তু কোন লাভ হয় না| রঙ-তুলি পড়ে থাকে‚ নিত্যভ্রমণ থমকে যায়‚ এমনকি ইচিমেইয়ের সাথেও সে আর দেখা করতে যায় না‚ ইচিমেই চিঠি লেখে‚ চিঠির সাথে পাঠায় একগোছা গন্ধরাজ ফুল| বেশির ভাগ চিঠিরই আর জবাব দেওয়া হয় না অলমার| চব্বিশ ঘন্টা সে ন্যাটের বিছানার পাশে| দুই চোখ ছাপিয়ে জলে ভেসে যায় অলমার গাল‚ চিবুক| কোনদিন প্রকাশ্যে কারো সামনে কাঁদে নি অলমা সেই ছোট্টটি থেকে‚ এমনকি ন্যাটের সামনেও নয়| কিন্তু মৃত্যুপথযাত্রী ন্যাটের শয্যার পাশে বসে সে আর নিজেক সংযত রাখতে পারে না‚ অকপটে কাঁদে| অবাক হয়ে যায় ন্যাট‚ বলে 'তুমি কাঁদছো! আমার জন্য কেঁদো না'| উত্তর অলমা বলে 'আমি তোমার জন্য কাঁদছি না‚ আমি আমার জন্য কাঁদছি‚ আমাদের জন্য কাঁদছি‚ যা কিছু তোমায় বলি নি‚ বলতে পারি নি‚ যা কিছু দিতে পারি নি‚ আমার যত ত্রুটি-বিচ্যুতি আর না-বলা রয়ে যাওয়া সব কথা‚ তার জন্য কাঁদছি'…"I’m not crying for you, but for me. And for us, for everything I’ve never told you, the omissions and lies, the betrayals and time I robbed you of"…. তাকে অবাক করে দিয়ে ন্যাট জানায় সে ইচিমেইয়ের সাথে অলমার যোগাযোগের কথা জানে| কিন্তু তাতে তার কোন ক্ষোভ বা রাগ নেই| সে তো জানেই ইচিমেই অলমার হৃদয়ের একচ্ছত্র অধিপতি| সে আরো বলে‚ 'আমি তো জানি আমার ভালো চাওয়ায়‚ আমার প্রতি ভালোবাসায় তোমার কোন খাদ নেই| তোমার মত বন্ধু আমার সত্যিই আর কেউ নেই অলমা| আর কাউকেই বিয়ে করে আমি এত সুখী হতে পারতাম না| তুমি তো জানো তোমাকে আমি কত ভালোবাসি‚ কত স্নেহ করি‚ তোমাকে আমি আমার হাতের তালুর মত চিনি অলমা‚ কিন্তু তুমি আমার সত্যি আমিটাকে পুরোপুরি জানো না'| সেই প্রহর শেষের অন্ধকারে অলমার বুকে মাথা রেখে ন্যাট তার গোপন জীবনের স্বীকারোক্তি শোনায় তাকে‚ সে সমকামী| জানায় লেনি‚ তার পার্টনারের কথা| সকাল হওয়া মাত্র ফোন বই থেকে লেনির নম্বর খুঁজে বার করে অলমা যোগাযোগ করল লেনির সাথে| আসলে দাঁতের ডাক্তার‚ গ্রীক দেবতার মত চেহারার লেনিকে বাড়ির লোকের কাছে নার্স পরিচয় দিয়ে ডেকে নিয়ে আসে অলমা‚ বড়ঘরের বড় বিছানা ন্যাট আর তার সাথীকে ছেড়ে দিয়ে মাঝের দরজা বন্ধ করে সে পাশের ছোট ঘরে আশ্রয় নেয়| শেষের কটা দিন লেনি আর অলমা দুজনে পাশাপাশি প্রাণপণে সেবা করল ন্যাটের| Aids… শব্দটা তখন অত্যন্ত ঘৃণার| কাজেই সকলকে জানানো হল ন্যাটের ক্যান্সার হয়েছে| ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে বিছানায় মিশে গেল ন্যাট| অসহ্য যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি দিতে মারণ ডোসে মরফিন ইঞ্জেকশন দিল লেনি ন্যাটকে‚ আর সেই চরম মুহূর্তে পাশে বসে পরম মমতায় হাত ধরে রইলো অলমা তার সারাজীবনের সাথী‚ তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়‚ তার একান্ত নির্ভরস্থল‚ তার পরম বান্ধব‚ তার তিরিশ বছরের বিয়ে হওয়া স্বামীর| ন্যাটের মৃত্যু আরো কাছাকাছি নিয়ে এল ইচিমেই আর অলমাকে| নিয়মিত দেখাশোনা হয় দুজনের‚ তবু চিঠি লেখা আর বন্ধ হতে দিল না অলমা| সেই হলুদ খামে চিঠি আর একগোছা গন্ধরাজ ফুল আলমার ঠিকানায় পৌঁছে যেতে থাকল নিয়মিত| চুক্তি মোতাবেক অলমার সব চিঠি পড়েই ছিঁড়ে ফেলে ইচিমেই বরাবর| কিন্তু অলমা জমিয়ে রাখে ইচিমেইয়ের প্রত্যেকটা চিঠি আবার পড়বে বলে| এইভাবে কেটে গেল পরের ছাব্বিশটা বছর| ছেলে বিয়ে করে সংসারী হল‚ পরিবারের আইনী ব্যবসা ঘাড়ে তুলে নিল‚ অলমাও আবার আগের মতই সমাজসেবা আর তার সিল্ক স্ক্রীন পেইন্টিঙে নিয়ে তুমুল ব্যস্ত| কিন্তু কি যে হল‚ হঠাতই ২০১০-এর এক সকালে অলমা ব্যবসা বাণিজ্য গুটিয়ে বাড়ি ছেড়ে এক বৃদ্ধাবাসে চলে গেল‚ নিয়ে গেল যৎসামান্য আসবাবপত্র‚ জামাকাপড়‚ ন্যাট আর ইচিমেইয়ের ছবি আর তার চিঠির ঝাঁপি| বাড়ির লোক ভেবে কূল করতে পারে না কি কারণে তার অতুল বৈভব ছেড়ে সে একা একা বৃদ্ধাবাসে থাকার সিদ্ধান্ত নিল| ছেলে‚ বৌমা‚ নাতি‚ নাতনি আসে যায়‚ আলমাও উৎসবে অনুষ্ঠানে বাড়িতে যায়‚ কিন্তু সবই কর্তব্যের খাতিরে| তার সবচেয়ে পছন্দের মানুষ হল নাতি সেঠ‚ ল্যারির ছেলে| এই সেঠকেই বলবে অলমা তার বর্ণময় জীবনের কাহিনী একদিন| সেঠ আবার জড়িয়ে পড়বে আইরিনার সাথে‚ বৃদ্ধাবাসের কর্মী‚ অলমার সেক্রেটারি একটি ইমিগ্র্যান্ট মেয়ের সাথে| মেয়েটি ভারি ভালো| এই একটা দারুণ ব্যাপার এই কাহিনীর‚ কুশীলবরা সকলেই ভারি ভালো এবং অতীব ধনী (শুধু আইরিনা ছাড়া‚ তবে তার সেই অভাব পোষাতে তো সেঠ হাজির)| জীবনের অন্ধকার অতীত পেরিয়ে আলোতে উত্তরণের একটা সমান্তরাল গল্প রয়েছে এই আইরিনাকে নিয়ে| ঘটনাচক্রে সেই বৃদ্ধাবাসে লেনিও এসে ওঠে| লেনির সাথে অলমার নিভৃত আলাপচারিতার কিছু কিছু কথা শুনে ফেলে আইরিনা‚ জানতে পারে ইচিমেইয়ের কথা| সেই সেঠকে ইচিমেইয়ের কথা জানায়| জানায় মাঝে মাঝেই একটা হলুদ খামে করে চিঠি আসে অলমার নামে‚ সাথে একগোছা গন্ধরাজ ফুল আর মাসে একবার কি দুবার আলমা সেজেগুজে ওভারনাইট ব্যাগে তার পছন্দের ভালো ভালো রাতপোশাক গুছিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যায় দু'তিনদিনের জন্য| কার কাছে যে যায়‚ কে সেই মনের মানুষ‚ দু'জনে মিলে অলমার গোপন প্রেমিককে নিয়ে নানারকম তত্ত্ব ফাঁদে| কিন্তু শেষমেশ ঠাম্মার প্রাইভেসি লঙ্ঘন করার রুচি আর হয় না সেঠের| তবে আইরিনা জানায় সে হোটেলের বিল দেখেছে কাগজপত্র গোছগাছ করতে গিয়ে| অলমার বয়স এখন ৮১‚ হাতপা কাঁপে‚ কদিন ধরে বুকে ব্যথা হচ্ছে‚ কোথাও বেরোতে পারছে না‚ প্রায় শয্যাশায়ী| সেই চিঠি আর ফুল আসাও বেশ কদিন ধরে বন্ধ| আইরিনার কাছে জানতে পেরে সেঠ একগোছা গন্ধরাজ ফুল নিয়ে আসে একদিন আর সরাসরি প্রশ্ন করে ঠাম্মাকে ইচিমেইয়ের ব্যাপারে| অলমা কপট রাগ দেখায়‚ জানতে চায় সেঠ তার ওপর গোয়েন্দাগিরি করছে কিনা…… তারপরে একটু একটু করে তার সুদীর্ঘ জীবনের ঘটনাবহুল গল্প শোনায় সেঠ আর আইরিনাকে| কিন্তু কোথায় তার ইচিমেই এখন? কোন অন্তরাল থেকে তার পাঠানো চিঠি আর ফুল আসে‚ কেন সে নিজে আসে না‚ সেই প্রশ্ন শুধানোর আগেই একদিন অলমা আবার কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যায় এবং এইযাত্রায় গাড়ি নিয়ে সোজা খাদে চলে যায়| তার দলামোচড়া শরীর যখন উদ্ধার হল‚ তখনো প্রাণটুকু ধুকপুক করছে| হসপিটালে দিন দুয়েক বাদে মারা যায় অলমা| অন্ত্যেষ্টিতে সবাই এল‚ এল না শুধু ইচিমেই‚ হয়ত খবর পায় নি‚ সেঠ ভাবে| কাগজে বড় বড় করে অলমার মৃত্যুসংবাদ ছাপা হল‚ পথ চেয়ে থাকে সেঠ‚ ইচিমেই একবার নিশ্চয়ই আসবে দয়িতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে‚ কিন্তু না| এ কেমন প্রেম? শেষে আর থাকতে না পেরে রীতিমত রাগ করে সেঠ একদিন ইচিমেইয়ের নার্সারিতে হাজির হয়‚ ইচিমেইয়ের খোঁজ করতে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে তার বিধবা স্ত্রী ডেলফাইন‚ প্রায় আভূমি নত হয়ে বাও করে‚ জানায় ইচিমেই তো মারা গেছে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে| ওদিকে বৃদ্ধাবাসে অলমার ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে আইরিনা আবিষ্কার করে অলমার সেই চিঠির ঝাঁপি| প্রত্যেকটা চিঠিই দুটো করে খামে জড়ানো‚ একটায় আলমার বাড়ির ঠিকানা লেখকের হাতের অক্ষরে‚ আর বাইরের খামের ঠিকানা বৃদ্ধাবাসের‚ অলমার হাতের লেখায়| প্রত্যেকটি চিঠির তারিখ অতীতের‚ শেষ চিঠি ২০১০-এর ৮-ই জানুয়ারি‚ তার পরে আর কোন চিঠি নেই| দুজনে মিলে পড়তে থাকে সেই সব চিঠি| পড়তে পড়তে শেষে রহস্যটুকু পরিষ্কার হয়ে যায় দু'জনের কাছে| ইচিমেই মারা যেতেই অলমা নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে চলে এসেছিল বৃদ্ধাবাসে‚ শুধু ইচিমেইয়ের স্মৃতি জড়িয়ে শেষের কটা দিন বাঁচতে| সেই পুরনো চিঠিগুলো সে নিজেই এক এক সপ্তাহে আবার নতুন খামে জড়িয়ে পোস্ট করত বৃদ্ধাবাসের ঠিকানায়‚ সাথে গন্ধরাজ ফুল‚ ঠিক যেমনটি ইচিমেই পাঠাতো‚ একা একাই যেত হোটেলে রাত কাটাতে যেখানে ইচিমেইয়ের সাথে গোপন অভিসারে মিলিত হত...... তার সুদীর্ঘ সত্তর বছরের প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখার এক অদ্ভুত রোম্যান্টিক প্রয়াসে| __________________________________________________________________________________ উপন্যাসের সারাংশ লেখা ভারি কঠিন কাজ‚ বুঝতে পারলাম| আর তার থেকেও কঠিন অন্যের লেখা নিজের ভাষায় নতুন করে লেখা| এনিওয়ে‚ ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে গেলাম লিখতে গিয়ে‚ আমার সেই প্রশ্নটার উত্তর কিন্তু চাই| গল্পটা ভালো না খারাপ? নিজের নিজের উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে লেখো/ লিখুন…….

203

8

শিবাংশু

শান-এ-হিন্দুস্তান

ভারতবর্ষ বলতে যাঁদের জানি, তাঁদের একজন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। অমন 'দেশি' মানুষ আর কজনকে খুঁজে পাওয়া যায়। উস্তাদজি'র কাছে বহুবার অনুরোধ এসেছে বিদেশে গিয়ে বসবাস করার জন্য। তিনি উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ, আমি যাবো। কিন্তু আমার জন্য সেখানে একটা গঙ্গার ঘাট, বালাজি মন্দির, বনারসি গলিঘুঁজি আর সুননেওয়ালোঁদের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। নয়তো সেখানে গিয়ে আমি কী করবো? এই সমস্ত নিয়েই তো বিসমিল্লাহ খান। একটা বাদ গেলেই আমি আর আমি থাকবো না। কী শুনবেন আমার কাছে? বালাজি মন্দিরের কথা যখন এসেই গেলো, তখন উস্তাদজির কাছে শোনা একটা কিস্যাও শোনা যাক। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের গুরু ছিলেন তাঁর মামুজান উস্তাদ আলি বখ্স। তাঁর নির্দেশে বাল্যকাল থেকে রাত ভোর হবার আগে থেকেই উস্তাদজি পঞ্চগঙ্গা বালাজি মন্দিরে বসে রিয়াজ করতেন। তাঁর মামুজান বলে দিয়েছিলেন সেখানে তাঁর যদি কোনও রকম অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা হয়, তবে সেকথা যেন কাউকে না বলেন। একদিন শেষরাতে ধ্যানের মধ্যে তিনি রিয়াজ করছিলেন মন্দিরের ভিতর বসে। দরজা বন্ধ ছিলো। হঠাৎ তিনি চন্দন আর জুঁইফুলের গন্ধ পান। ভাবলেন কেউ এসেছে বোধ হয়। চোখ খুলে দেখেন সামনে বালাজি দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক যেমন তাঁকে বিগ্রহে দেখা যায়। দেবতা তাঁকে যেন বললেন, 'বজাও বেটা' । কিন্তু তিনি তখন প্রায় আত্মজ্ঞান লুপ্ত হয়ে ঘেমে চলেছেন। থেমে গেলেন। পরে মামুজানকে এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গেলে তাঁর গুরু তাঁকে সপাটে চপেটাঘাত করে বলেন নিষেধ করা সত্ত্বেও কেন তিনি একথা তাঁর কাছে প্রকাশ করলেন? উস্তাদজি সারাজীবন এই মন্দিরে ভোরবেলা শহনাই বাজিয়ে তাঁর পূজা সমাপন করতেন। তিনি জীবৎকালেই গন্ধর্ব থেকে সুরের দেবতা হয়ে গিয়েছিলেন। মন্দাকিনীর ধারা, ঊষার শুকতারা সবই নেমে এসেছে তাঁর যন্ত্রের শব্দ হয়ে। শুভ জন্মদিন হে দেবতা। গরিব ভিখিরিদেরও মনে রেখো.... https://www.youtube.com/watch?v=B28O1MhtAxM

117

4

Ranjan Roy

(বুড়ো বয়সের) বসন্তের কবিতাগুচ্ছ

ভালবাসার জামা ----------------- গড়িয়াহাটের মোড়ের থেকে রাসবেহারী, এ দোকান সে দোকান , আমি প্রাণপণে খুঁজে বেড়াই একটা জামা, ভালোবাসার জামা। দোহাই তোমাদের! আমায় অন্ততঃ একটা পিস জামা দাও, পুরনো স্টকের হলেও চলবে; মিনি মাগনা চাইছি নে, এটিএম আছে। ওরা হাসে -- বুড়ো,কোন ফায়দা নেই। তোর গায়ে ওসব বড্ড ঢলঢলে! ওদের বোঝাতে পারছি নে, আমার এমন জামা চাই যা গায়ে উঠলে আমার ভালবাসতে ইচ্ছে করবে সব্বাইকে, এমনকি তোমাকেও।। নুনের পুতুল সাগরে ------------------- ঠাকুরের মুখে বহুবার শোনা সেই গল্পটা সবাই জানে। সেই যে নুনের পুতুল সাগরে গিয়েছিল জল মাপতে। তারপর কী হয়েছিল? সবাই জানে। রাজাকে যে ন্যাংটো বলেছিল তার কী হয়ে ছিল? লোকে জানে কিন্তু বলে না। নাঃ, আমাকে মাপ করবেন। আমার আর কিছু জানা নেই। লাস্ট বেঞ্চে বসা ছেলেগুলো ---------------------------- লাস্ট বেঞ্চে বসা ছেলেগুলো মাথা নীচু করে অংকের খাতায় কাটাকুটি খেলে। কেউ গোল্লা কেউ ক্রশ দিয়ে যাচ্ছে একাগ্র, উৎসুক। ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা যত সাইন-কস-থিটা-গামা নিয়ে উহাদের হেলদোল নাই। অনায়াসে ভাগ করে লেবেঞ্চুস, হজমিগুলি আর যত নিষিদ্ধ বৈভব। স্যারের সন্ধানী আলো? এ ওকে সতর্ক করে চলে। বাকি ক্লাস টানটান সামনে চোখ, চাঁদমারি মাঠ। স্যারের হস্তমুদ্রা তাদের রেখেছে জাদু করে। ধ্যানমগ্ন ছেলেগুলো মনে মনে বিড় বিড় করে এবারের শেষ দৌড়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আমি তো নতুন ছাত্র, একনজরে গোটা ক্লাস দেখি, তারপর পায়ে পায়ে লাস্ট বেঞ্চে জায়গা খুঁজে নেই।।

205

18

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

রচি মম ফাল্গুনী…… নদীয়া কা পানি ভি খামোশ বেহতা ইয়াহাঁ খিলি চান্দনি মে ছিপি লাখ খামোশিয়াঁ বারিষ কি বুঁদো কি হোতি কাহাঁ হ্যায় জুবাঁ সুলগতে দিলোঁ মে হ্যায় খামোশ উঠতা ধুয়াঁ….. বারিষ কি বুঁদো কি জুবান থাকে না-- সত্যি কথাই‚ কিন্তু মঞ্জীর তো থাকে চরণে| রিমঝিম গিরে শাওন অথবা রিমঝিম রিমঝিম‚ রুমঝুম রুমঝুম‚ টাপুর টুপুর সারা দুপুর…… বৃষ্টির নূপুর কত রকম বোলেই তো বাজে| খামোশিয়াঁ আকাশ হ্যায় তুম উড়নে তোহ আও জারা খামোশিয়াঁ এহ্সাস হ্যায় তুমহে মেহসুস হোতি হ্যায় ক্য় বেকারার হ্যায় বাত করনে কো কেহনে দো ইনকো জারা….. হা-আ-আ-আ-আ খামোশিয়াঁ…….. তেরি মেরি খামোশিয়াঁ খামোশিয়াঁ……… লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ...... গান শেষ হয়ে যায়| তার পরেও চুপ করে বসেই থাকি গাড়িতে কিছুক্ষণ‚ সঙ্গী শুধু লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ| নি:শব্দে ঝরে চলে বরফ‚ স্তব্ধ চরাচর জুড়ে| গানটা নতুন করে লেখা দরকার‚ বারিষ নয়‚ বরফ কি বুঁদো লেখা উচিত ছিল| বরফ পড়ার সত্যিই কোন শব্দ নেই‚ না জুবান‚ না পায়েলিয়া| যত তুমুল বরফই পড়ুক না কেন‚ তার পায়ের ঘুঙুরে কেবল একটি বোলই বাধা‚ নীরবতা‚ খামোশিয়াঁ‚ লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ| ভাবতে ভাবতে চাবি‚ ব্যাগ‚ কফির কাপ সব গুছিয়ে নিয়ে নামি| মাথায়‚ মুখে মিহিন তুহিন স্পর্শ বরফের নরম তুলোর‚ তাপমান প্রায় বসন্ত ছুঁই ছুঁই‚ মাত্রই মাইনাস সাত| চোখ বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কয়েক মিনিট| হলই না হয় আমার আজকের এই ফিরোজা রঙের সন্ধ্যা বরফঝরা খামোশিয়াঁয় লাজানো| তবু কোথাও তো ১৪-ই মার্চের টাইমটেবিলে কুহু কুহু হুইসেল বাজিয়ে ফাল্গুনের শেষ ট্রেন ছাড়ছে‚ তুলকালাম পলাশ পেছনে ফেলে মধুমাসের তুমুল লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে| হঠাৎ গুণগুণ করে ওঠে মন‚ "জানি না কাহার ভুল‚ তোমার পূজার ফুল আমি লইলাম….." না না‚ আজ কোনরকম মনখারাপের গান নয় একদম…... পাগলি এসে হাত ধরে| আজকের দিন শুধু সেলিব্রেশনের-- ফায়ার প্লেসের নীল উষ্ণ উত্তাপ‚ সাথে কোন ধ্রুপদী মাধ্বী‚ 'কবিতার চরণের মত যার নাম‚ সূর্যাস্তের আভার মত যার রঙ‚ যাতে মশলার‚ অন্ধকারের আর স্মৃতির সুগন্ধ'….. বাহ‚ মন্দ নয়‚ কিন্তু গান? ….. আহা‚ গান তো থাকতেই হবে‚ ভালোলাগা গান‚ ভালোবাসা সুর| কি শুনবে বলো? তোমার ঠাকুরের গান? বিক্রম হলে কেমন হয়? নাকি জর্জ বিশ্বাস? ….. উল্টেপাল্টে দেখে আবার জায়গামত রেখে দিই অ্যালবামগুলো| গুলজার শুনবে? ….. নাহ….. তাহলে বাংলা আধুনিক? মানবেন্দ্র না প্রতিমা? অনেকদিন গীতা দত্ত শোনা হয় নি ….. পাগলির বকম বকম শুনতে শুনতে ঠিক করে ফেলি---- কুড়ি বছরের ভিন্টেজ পোর্টের বোতলটা খোলা যাক আজ| বোতলটা তুলে ধরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাই পাগলির মুখের দিকে| থাম্বস আপ দেখায় আমাকে হতচ্ছাড়ি| "যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে‚ ধুয়ো লাশ আমার 'এই' লাল পানি দিয়ে….." বেজায় বেসুরে গাইতে গাইতে গ্লাসে ঢালি ওয়াইনটা‚ এবং তিন টুকরা লেবুর চাকা কাটিয়া সযত্নে শরাবে নিমজ্জিত করিয়া….. চিয়ার্স- আআহ...... পোর্টের tawny (বাংলা কি হবে?) স্বাদেই কি না‚ কি জানি‚ হঠাৎ মনে পড়ে গেলো‚ ছোটবেলায় রেডিয়োতে হারানো দিনের গান বলে একটা প্রোগ্র্যাম হত| হায়রে কবে হারিয়ে গেছে সেই রেডিয়োর কাল‚ আর ছোটবেলা তো কবেই ফুরিয়ে গেছে| কিন্তু হারানো দিনের সেই গানগুলো তো রয়ে গেছে সাথে আজও| সেই ভালো‚ আজকের সন্ধ্যাটা হারানো দিনের সেই সব গানেরই হোক বরং…… পাগলি তাল মেলায় আমার সাথে| "নিজেরে হারায়ে খুঁজি..... গান শুরু হয়ে যায়| আজকের অনুষ্ঠনের প্রথম শিল্পী মাধুরী চট্টোপাধ্যায়…… পাগলির ঘোষণা| আলোগুলো কমিয়ে প্রায় নিভু নিভু করে দিয়ে পা ছড়িয়ে বসি দুজনায় পাশাপাশি| ভিতরে পাগলি‚ আমি আর আমার গানভাসি ফাগুনের উষ্ণ সাঁঝবেলা‚ বাইরে নি:শব্দে ঝরে যেতে থাকে ঝুরো ঝুরো বরফের গুঁড়ো| একসময় গান ফুরায়| ঘিরে থাকে শুধু খামোশিয়াঁ‚ লিপটি হুয়ি খামোশিয়াঁ| অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকে ফুরিয়ে যাওয়া সুরের রেশ‚ "মরণ পেরিয়ে যাব এমনি করে‚ কোন পিছু ডাকে আর থামবো না‚ একটু থেমে থাকি তোমার কাছে"……. পাগলি গুণগুণ করে ওঠে আমার কাঁধে মাথা রেখে‚ "তুমিও আমার সাথে চলো না"…… অনেকক্ষণ হল‚ পাগলিটা চলে গেছে| যাবার আগে একটা চিরকুট দিয়ে গেছে হাতে গুঁজে| উঠে আলোটা বাড়াই‚ কাগজের টুকরোটা খুলে দেখি‚ পাগলি লিখেছে----- নন্দিনী লিখেছিল…… "শুভঙ্কর‚ কী যে কৃতজ্ঞ আমি তোমার কাছে| অভ্যাসের বদ্ধ চিলে কুঠরী থেকে এই কিনারাহীন জলসমারোহের কিনারায় তোমারই হ্যাঁচকা টানে| মনে হচ্ছে বত্তিচেল্লীর ঝিনুক থেকে জন্মালাম আর একবার"…….

1190

90

দীপঙ্কর বসু

দক্ষিন রায়ের দেশে

অথৈ জলে পড়া – এই বাংলা প্রবাদটার প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করলাম “মামার বাড়ি” র আঙিনা হয়ে ফেরার পথে । যে খাঁড়ি তে লঞ্চে করে আমরা মামারবাড়ির আঙিনা দিয়ে এসেছিলাম ফেরার সময়ে লঞ্চ আমাদের ফেরত নিয়ে চলল আর এক পথ ধরে ।অবশ্য এ অঞ্চলে সমস্ত পথই আমাদের পক্ষে একই –কারন আমরা কোন পথই চিনিনা ।এ অঞ্চলের জল জঙ্গল – সবই আমাদের কাছে একই রকম লাগে ।তবে কিছুদূর চলার পর দেখলাম চোখের ওপর থেকে কে যেন অকস্মাৎ সবুজ পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছে । আমার চোখের সামনে এখন কুল কিনারাহীন অতল জলরাশি । ছোট ছোট ঢেউ গুলোর ওপরে মধ্যদিনের সূর্যালোক চিকচিক করছে ।এক অপার ভয়মিশ্রিত বিস্ময় বোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল । এই অতল জলরাশির মধ্যে আমাদের লঞ্চ চলেছে যেন একটা খেলনা ভেলা মাত্র!গাইড এর কাছে জানতে পারলাম আমরা মাতলা নদীর মোহনা দিয়ে চলেছি । এখানে মাতলা নদী এসে বঙ্গপোসাগরে মিশেছে । আমাদের মধ্যে থেকে গাইডকে প্রশ্ন করলেন এই রকম কূলকিনারাহীন জলের মধ্যে আপনারা সঠিক পথটাকে চিনে চলেন কি করে ? মৃদু হেসে গাইড জবাব দেন “এ সব জলপথ ,নদী জঙ্গল সবই আমরা নিজের হাতে তালুর মতই চিনি ।আমাদের দিক নির্দেশের জন্যে কম্পাসের সাহায্য ও দরকার হয়না । নিজের মনেই ভাবলুম ঠিক এই ভাবেই বোধ হয় সমুদ্রপথে ভারতবর্ষের সন্ধানে বেরিয়ে কলম্বাস আমেরিকার ভূখন্ডে পৌছে গিয়েছিলেন অতীতে । আমরাও যে ঠিক তেমনি ভাবে আমাদের অস্থায়ী আস্তানা ওয়াক্সপল ঘাটের বদলে অন্য কোন দ্বীপে গিয়ে ঠেকবনা তার নিশ্চয়তা কোথায় । কিন্তু আপাততঃ আমরা কটি ভ্রমন পিপাসু মানুষ নিরুপায় । সারেং এর ওপরে ভরসা রাখা ভিন্ন গতি নেই আমাদের । সকালবেলা লঞ্চে করে যেতে যেতে গহন বনের মধ্যে একটা ছোট মন্দির চোখে পড়েছিল । গাইডকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলাম বনের মধ্যে ওটি বনবিবির মন্দির । বনবিবির একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও জেনেছিলাম গাইডের কাছে । প্রাচীনকালে ইব্রাহিম নামে এক ফকিরের বাস ছিল এই অঞ্চলে ।স্থানীয় লোকেরা তাকে ডাকত বেরহিম নামে । ইব্রাহিমের প্রথমা স্ত্রী ফুলবিবি সন্তানধারণে অক্ষম হওয়ায় ফুলবিবির সম্মতিক্রমে ইব্রাহিম ওরফে বেরহিম গোলাবিবি নামে আর এক মহিলাকে বিয়ে করে । তবে কেন জানিনা সন্তান লাভের ইচ্ছায় ইব্রাহিমের দ্বিতিয় বিবাহে ফুল বিবি সম্মতি দিলেও একটি শর্তও জুড়ে দিয়েছিল সেই সঙ্গে ।শর্তটি হল সন্তান জন্মের পর ইব্রাহিম গোলাবিবিকে পরিত্যাগ করবে । শর্ত অনুযায়ী গোলাবিবি সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর ইব্রাহিম তাকে গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসে ।সেখানে গোলাবিবির গর্ভে স্বয়ং খোদাতালার আশীর্বাদ ধন্য বনবিবি আর শাহজংলী জন্মগ্রহন করে । এক সময়ে গোলাবিবি শাহজংলীকে সঙ্গে নিয়ে বন ছেড়ে চলে যায় ।বনবিবি একা পড়ে থাকে বনের মধ্যে । এর পরে বহুদিন বাদে ইব্রাহিম নিজের কাজে অনুতপ্ত হয়ে গোলাবিবিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং তাকে নিয়ে মক্কায় চলে যায় । গল্প করতে করতে এক সময়ে আমরা ফিরে আসি আমাদের রিসোর্টের ঘাটে । রিসোর্টে ফিরে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে গাইডের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি দয়াপুর গ্রামটা ঘুরে দেখতে । সুন্দর ছিমছাম সাজান গ্রামখানি । আমাদের কপালে বাঘমামার দর্শন ছিলনা ।তবে এ গ্রামে মাঝে মাঝেই তাঁর পদধুলি পড়ে । কংক্রিটের বাঁধান রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে গাইড একটি মাটির বাড়ি দেখিয়ে জানালেন কিছুদিন আগে এই বাড়িতেই রাতের বেলায় এক বাঘের আগমন ঘটেছিল । বাঘটির নজর সম্ভবত ছিল গোয়ালঘরটির দিকে ।কিন্তু কোনও ভাবে বাড়ির বাসিন্দারা বাঘের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রচুর হৈহল্লা জুড়ে দেওয়ায় বাঘটি ভয় পেয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বাড়ির হেঁসেলে । বাড়ির লোকেরা বুদ্ধি করে হেঁসেলের দরজায় শিকল লাগিয়ে বাঘটিকে বন্দী করে ফেলে ।খবর যায় বনদপ্তরে । সেখান থেকে কর্মীরা এসে বাঘটিকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় ।গাইডের মুখে বাঘের হানার কথা শুনে মনে পড়ল এই খবরটা সংবাদ পত্রে পড়েছিলাম সে সময়ে । অদ্যই আমাদের শেষ রজনী এই টাইগার ক্যাম্পে । সন্ধ্যেবেলায় রিসোর্টের কর্মীবৃন্দ বনদেবীর মহিমা বিষয়ক একটি যাত্রাপালার আয়োজন করেছিলেন ।যাত্রাপালার গল্প খুবই মামুলি ধরণের । সুন্দরবনে একদা ধনা ও মনা নামে দুই ভাই বাস করত । কোনও এক বছর ধনা সাতটি ডিঙি নৌকা নিয়ে বনের মধ্যে মধু আহরণে যাবার উদ্যোগ করে । কিন্তু মন্দ কপাল ধনার ।জঙ্গলের মধ্যে মধু ,মোম কিছুই জোটেনা তার ভাগ্যে । এক রাত্রে সে বনের রাজা দক্ষিনরায় স্বপ্নে ধনাকে দেখা দিয়ে বলেন যে ধনা যদি একটি বালককে তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে তবেই ধনা জঙ্গল থেকে মধু সংরহ করতে পারবে । বিফল মনোরথ ধনা ফিরে আসে নিজের গ্রামে ।পরের বার দুখে নামে গ্রামের এক গরীব ঘরের কিশোরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হয় জঙ্গলের উদ্দেশ্যে ।তার মতলব দুখে কে সে উৎসর্গ করবে দক্ষিনরায়কে তুষ্ট করতে । এবারে ধনা প্রচুর মধু আর মোম সংগ্রহ করে আনে ।জঙ্গলে একা পড়ে থাকে দুখে ।দক্ষিনরায় বাঘের বেশ ধারণ করে দুখেকে হত্যাকরতে উদ্যত হয় ।তাই দেখে মনে মনে বনবিবিকে ডাকতে থাকে দুখে । দুখের আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে বনবিবি আর তার সহোদর শাহ জংলী এগিয়ে আসে ।ঘোর যুদ্ধ বেধে যায় শাহজংলী আর দক্ষিনরায়ের মধ্যে । অবশেষে দক্ষিনরায় পরাজিত হয় ।প্রাণ রক্ষা পায় দুখের । বেশ মজা লাগল যাত্রাপালা সেরে অভিনেতারা আবার সাধারণ পোষাক আসাক পরে খাবার ঘরে আমাদের রাত্রের খাবার পরিবেশন করার কাজে লেগে পড়লেন । তাদের মুখে তখনও রংচং মাখা ।

227

25

শিবাংশু

চারতিরিশের চম্পূ

অনেকদিন হলো। তখন আমি জামশেদপুরের একটা ব্রাঞ্চে পোস্টেড। বিয়েথাওয়া হয়নি। শুধু কিছু বদনাম আছে। ঐ যা সব জোয়ান ছেলেদের থাকে। কবি যাকে বলেছেন, "উপেক্ষা করিতে চাই তারে;/ মড়ার খুলির মতো ধরে আছাড় মারিতে চাই তারে,/ জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে/ তবু সে মাথার চারিপাশে/তবু সে চোখের চারিপাশে....।" শুধু হর্মোনজাত আকুলিবিকুলি নয়। অন্য মাত্রাও থাকে, অন্য অনুভূতিও। একছত্র বিজয়ী হওয়াই লক্ষ্য নয়। বিনিময় করার প্ররোচনাও তো থাকে পুরো মাত্রায়। তখনও মানুষের জীবনে কিছু আলোছায়া ছিলো। 'রোমান্স' শব্দটা এরকম সপাটে ত্যক্ত হয়ে যায়নি। পরশুদিন ফেবু'তে এক বালকের ফতোয়া দেখলুম 'রোমান্স' নামক ধারণাটি নাকি নারীনিপীড়নের একটা অজুহাতমাত্র। সমানাধিকারের পরিপন্থী। নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় ও পরিত্যজ্য। আমি বলতে পারবো না। মেয়েরাই বলবে। যাকগে। আমাদের একজন গ্রাহক ছিলেন। নামটা একটু বিচিত্র, টমাস বক্স বিশ্বাস। বয়্স সত্তরের বেশ খানিকটা উপরে। তবে বয়স নয়, অকালজরা তাঁকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিলো প্রায়। শাদা চুল, শাদা শার্ট, শাদা ধুতি। ক্ষীণ কণ্ঠস্বর, ন্যুব্জদেহ। কটকের 'বাঙালি', তবে ওড়িশার টানটাই বেশি। চাকরি করতেন টাটা কোম্পানিতে একসময়। তবে তিনি ছিলেন স্থানীয় একটি গির্জার সর্বক্ষণের সেবক। থাকতেনও সেখানে। অবিবাহিত, দারাপুত্রহীন। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর কিছু টাকাপয়সা পেয়েছিলেন। সেগুলো'ই রাখা ছিলো ব্যাংকে। মাসে একবার সুদ তুলতে আসতেন। তখন এটিয়েমের জমানা নয়। নিজেকে আসতে হতো। এতোদূর পর্যন্ত ঠিক আছে। তাঁর সঙ্গে আসতেন এক ভ্দ্রমহিলা। বয়স পঞ্চাশের নীচে। শাদা শাড়ি, নীল পাড়। মাথায় ঘোমটা। ঘনশ্যাম এই নারীর দাঁতগুলি ছিলো উজ্জ্বলশ্বেত এবং তিনি যতিহীন কথা বলে যেতে পারতেন। আমাদের একজন অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন নড়বড়ে গ্রাহকদের জন্য অন্ধের যষ্টি। আমরা তাঁকে সম্মানসূচক বড়োবাবু বলতুম। এই ভদ্রমহিলা, নাম খ্রিস্টদাসী বিশ্বাস, ছিলেন তাঁর একান্ত অনুগত। মাসে একবার এসে সারামাসের গপ্পো সেরে যেতেন। তখনও আমরা মানুষের মুখের দিকে চেয়ে কথা বলতুম। কম্পুর মনিটরের দিকে তাকানো ছিলোনা। মুশকিল ছিলো সেই ভদ্রমহিলা একাই দখল করে রাখতেন বড়োবাবুকে। তাঁর অন্য গ্রাহকেরা আর নাগাল পেতেন না। এ অবস্থায় আমাদের আসতে হত। বড়োবাবুর আটকে থাকা কাজগুলো এগিয়ে দিতে। এই যুগল আমাদের অভিনিবেশে থাকতেন তাঁদের অভিনবত্বের জন্য। টম বক্সের জড়িত উচ্চারণ আমরা ঠিক বুঝতে পারতুম না। বড়োবাবু পারতেন। ভদ্রমহিলার উচ্চস্বরের আলাপ, যার মধ্যে ভাইঝির বিয়ের সমস্যা, রাতে রুটি খেতে না চাওয়ার দুঃখ, রিকশচালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, হোমোপাতিই আসল ওষুধ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান ছড়িয়ে দিতেন চারদিকে। মাঝে মাঝে বড়োবাবুর কানে কানে কীসব যেন বলতেন। এই 'কইবো কথা কানে কানে' পর্বটি নিয়ে আমাদের বিশেষ কৌতুহল থাকতো। বিকেলের দিকে ফাঁকা হলে আমাদের বড়োবাবুকে সটান প্রশ্ন। আজ 'কানে কানে'র বিষয় কী ছিলো? বড়োবাবু নীরসমুখে বলতেন , আর কী? একই গপ্পো। -মানে? -ও'ইই, বিশ্বাসবাবু যে বিশ্বাসযোগ্য ন'ন তাই নিয়ে নানা অনুযোগ... -ইয়ে, তিনি আবার কী বিশ্বাসভঙ্গ করলেন? -আর বোলোনা! ঘটনা হচ্ছে ভদ্রমহিলা বিশ্বাসবাবুর বিবাহিতা স্ত্রী ন'ন... -সে কী? অতো সিঁদুরের ঘনঘটা? -তাই তো। উনি বলেন পাদ্রিসাহেব ওঁদের বিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বাসবাবু ওসব মানেন না... -তব কেস ক্যা হুয়া? -পুরো গন কেস... -বিশ্বাসবাবুও তো আপনার কানে কানে কী সব বলেন... -ঐ কথাই বলেন। তিনি নিজেকে জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী মনে করেন। বিয়ে-টিয়ে ওসব পাপকাজে উনি নেই... -টমবাবুর অবস্থা যা দেখি, তাতে' জিতেন্দ্রিয়' ব্যাপারটা তো মানতেই হয়...তবে কী আনন্দময়ী? -ধ্যুস, ভদ্রমহিলা নাকি ওঁর প্রেমে পাগল... -বড়োবাবু, থোড়া রহম করেঁ... -আরে, আমি সত্যি বলছি... -হদ কর দিয়া রে ভাই... -তবে ট্যুইস্টটা অন্য জায়গায়। খ্রিস্টদাসী বিশ্বাসবাবুর চরিত্রে সন্দেহ করেন.... -অ্যাঁ... -অ্যাঁ না, হ্যাঁ। ভদ্রমহিলা আমাকে অনুরোধ করেন আমি যেন বিশ্বাসবাবুকে বোঝাই অন্য কোনও মেয়ে তাঁর থেকে বেশি ভালোবাসতে পারবেনা....উনি যেন অন্য কোনও মহিলাকে প্রশ্রয় না দেন... -বড়োবাবু, আপনি কমলকুমার মজুমদারকে চেনেন? -ক-ম-ল-কু-মা-র-, কোন ব্রাঞ্চে আছেন ভদ্রলোক? -ব্রাঞ্চে নেই। লেখক... -নাহ, আমি হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় আর শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা পড়ি। আর কোনও লেখককে চিনিনা.... কিন্তু কেন? -ওঁর 'অন্তর্জলীযাত্রা' নামে একটা লেখা আছে। অন্তর্জলীতে থেকেও প্রেম করার আইডিয়াটা টমবক্সবাবুর গপ্পো শুনে মনে পড়ে গেলো...ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান নিক্সন.... -অ্যায় অ্যায়, নিক্সন নয়... -আরে খুব বেশি স্ট্রেঞ্জ হয়ে গেলে নিক্সন হয়ে যায়.... ----------------------- সম্প্রতি এক দেশি ফিলমি তারকা যুগলকে নাকি বিদেশে প্রেম করতে দেখা গেছে। অবশ্যই 'বিবাহ'বহির্ভূত। কিন্তু তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ নেই। মানুষজন বলছেন, দুজনেই ষাটবছর পেরিয়েছেন। এখনও প্রাণে এতো প্রেম বাঁচে কী করে? অকাট্য যুক্তি। তবে যাঁরা প্রশ্নটি তুলছেন তাঁদের হয়তো ষাট পেরোতে অনেক দেরি। ষাটের পরের জীবনটা যে ঠিক কী রকম হতে পারে, সে বিষয়ে তাঁদের ধারণাটি নেহাতই কুয়াশা। এই বয়সের যাপন নিয়ে সব চেয়ে নিপুণভাবে লিখতেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র ও বিমল কর। অনেকেই হয়তো লিখেছেন, কিন্তু সেগুলি ছুঁয়ে যাওয়ামাত্র। এঁরা ছিলেন উস্তাদোঁ কি উস্তাদ। জানিনা এখনকার পাঠকেরা এঁদের লেখাপত্র কতটা কী পড়েন। জনতার সচেতনতা তৈরি হয় টিভি সিরিয়ালের সংস্কারী যুগলদের ক্রিয়াকলাপ দেখে। ছাপান্ন ইঞ্চিমার্কা বোধের দুনিয়ায় সবই অবোধের গোবধ। মার্কা দেওয়া আছে, কুড়ি বছরের মানুষের সেলফিযাপন, চল্লিশ বছরে পরকীয়া আর ষাট বছরে জয় মাতা দি। তাহার বাহিরে আর জীবন নাই, শ্যামাদা । ছোটবেলা থেকে জেনেছি, " সহজলোকের মতো কে চলিতে পারে। কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে সহজলোকের মতো।" 'সহজলোক' হতে পারার দুরাশা কখনও করিনি। তাদের মতন ভাষা কথা বলতে পারার নিশ্চয়তা অর্জন করা হয়নি কদাপি। কিন্তু তার পরেই আসে প্রশ্নটি। 'শরীরের স্বাদ আর প্রাণের আহ্লাদ' সকল লোকের মতো কীভাবে আয়ত্ব হবে। তার কোন শরীরী এক্সপায়রি তারিখ রয়েছে কী? শরীরে মাটির গন্ধমাখা, শরীরে জলের গন্ধমাখার পাঠ কী দেওয়া হয় কোনও চৈতন্যের ইশকুলে? হর্মোনের ঊর্ধে গিয়ে কী নিউরন কিছু কমাল দেখাতে পারে? আগে হয়তো বুঝতাম না। এখন জগৎটা অনেক স্পষ্ট, স্বচ্ছ হয়ে আসছে। চশমায় নতুন কাচ বদলালে অকস্মাৎ যেমন দুনিয়াটা চমক দিয়ে যায়, অনেকটা সেরকম। ষাট বছরের পরের যাপন কোন ফর্মুলায় চলে? আদৌ কোনও ফর্মুলা আছে কী? উত্তরটা কী এভাবে দেওয়া যায়? জীবনস্মৃতির কৈলাশ চাটুজ্যের অতিখ্যাত প্ল্যানচেটিয় উক্তিটি বারবার ঘুরে আসে। "আমি মরিয়া যাহা জানিয়াছি" ইত্যাদি। যা বুঝেছি, মানুষের বার্ধক্য বয়সে আসেনা, বোধে আসে। বিস্ময়বোধ ফুরিয়ে যাওয়া মানেই শেষের সেদিন কী ভয়ঙ্কর। ‘সহজ’লোকের স্বপ্ন আছে, শান্তি আছে, কিন্তু অকারণ বিস্ময়বোধের তাড়না নেই। উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে, চাষার মতন প্রাণ পেয়ে জেগে থাকার দায় তাকে বহন করতে হয়না। বিস্ময়বোধের তাড়না যাদের সতত ব্যস্ত রাখে তাদের মনেই থাকেনা শরীরের বল্কল কোনবেলা কুঁচকিয়ে যায়। পাতাঝরার ঋতু কবে এসে দুয়ারে কড়া নাড়ে। এই মানুষদের জন্যই কী গুরু'র বিখ্যাত বিশেষণ, 'জন্মরোমান্টিক।' আধুনিক বাঙালির সাংখ্যদর্শনে 'চৌত্রিশ' এক জলবিভাজক নম্বর। রোমান্টিকতায় তার কোনও ভূমিকা আছে কি না, জানা নেই। সহজলোকের মত 'চৌত্রিশ' বছরের যৌথখামার চাষ করে এসে মনে হয় নম্বরটা বেশ গূঢ়। ঠাকুর বলেছেন, রে বাঙালি 'চৌত্রিশ' পেরিয়েই অতো লাফালাফি করিসনে। বাতাসে অক্সিজেন কমে আসছে, মাটিতে আর্সেনিক। তার মধ্যে রোমান্টিকতা? শোনে কে? প্রতি বছর দশ মার্চ এসে নিঃশব্দে কোলে ল্যান্ড করে। লোকে বলে মূর্খ বড়ো, লোকে বলে সুধরেগা নহি। আমাকেও হাবিজাবি লিখতে হয়। বন্ধুরা অতিষ্ঠ হয়ে লাইক মারেন। আর কদ্দিন?

142

8

দেশদ্রোহী

ফেক Gems ফ্রম জেমস

BLUE PLANET II Why marine animals can't stop eating plastic By Josh Gabbatiss share Back to blog Plastic doesn’t just look like food, it smells, feels and even sounds like food. In a recent interview about Blue Planet II, David Attenborough describes a sequence in which an albatross arrives at its nest to feed its young. “And what comes out of the mouth?” he says. “Not fish, and not squid – which is what they mostly eat. Plastic.” It is, as Attenborough says, heartbreaking. It’s also strange. Albatrosses forage over thousands of kilometres in search of their preferred prey, which they pluck from the water with ease. How can such capable birds be so easily fooled, and come back from their long voyages with nothing but a mouthful of plastic? It’s small comfort to discover that albatrosses are not alone. At least 180 species of marine animals have been documented consuming plastic, from tiny plankton to gigantic whales. Plastic has been found inside the guts of a third of UK-caught fish, including species that we regularly consume as food. It has also been found in other mealtime favourites like mussels and lobsters. In short, animals of all shapes and sizes are eating plastic, and with 12.7 million tons of the stuff entering the oceans every year, there’s plenty to go around. Even in the most remote areas of the open ocean, plastic flotsam can be found, with far-reaching consequences for marine life (Credit: BBC 2017) Even in the most remote areas of the open ocean, plastic flotsam can be found, with far-reaching consequences for marine life (Credit: BBC 2017) The prevalence of plastic consumption is partly a consequence of this sheer quantity. In zooplankton, for example, it corresponds with the concentration of tiny plastic particles in the water because their feeding appendages are designed to handle particles of a certain size. “If the particle falls into this size range it must be food,” says Moira Galbraith, a plankton ecologist at the Institute of Ocean Sciences, Canada. Like zooplankton, the tentacled, cylindrical creatures known as sea cucumbers don’t seem too fussy about what they eat as they crawl around the ocean beds, scooping sediment into their mouths to extract edible matter. However, one analysis suggested that these bottom-dwellers can consume up to 138 times as much plastic as would be expected, given its distribution in the sediment. For sea cucumbers, plastic particles may simply be larger and easier to grab with their feeding tentacles than more conventional food items, but in other species there are indications that plastic consumption is more than just a passive process. Many animals appear to be choosing this diet. To understand why animals find plastic so appealing, we need to appreciate how they perceive the world. “Animals have very different sensory, perceptive abilities to us. In some cases they’re better and in some cases they’re worse, but in all cases they’re different,” says Matthew Savoca at the NOAA Southwest Fisheries Science Center in Monterey, California. One explanation is that animals simply mistake plastic for familiar food items – plastic pellets, for example, are thought to resemble tasty fish eggs. But as humans we are biased by our own senses. To appreciate animals’ love of plastic, scientists must try to view the world as they do. Many animals appear to be choosing a plastic diet (Credit: BBC 2017) Many animals appear to be choosing a plastic diet (Credit: BBC 2017) Humans are visual creatures, but when foraging many marine animals, including albatrosses, rely primarily on their sense of smell. Savoca and his colleagues have conducted experiments suggesting that some species of seabirds and fish are attracted to plastic by its odour. Specifically, they implicated dimethyl sulfide (DMS), a compound known to attract foraging birds, as the chemical cue emanating from plastic. Essentially, algae grows on floating plastic, and when that algae is eaten by krill – a major marine food source – it releases DMS, attracting birds and fish that then munch on the plastic instead of the krill they came for. Even for vision, we can’t jump to conclusions when considering the appeal of plastic. Like humans, marine turtles rely primarily on their vision to search for food. However, they are also thought to possess the capacity to see UV light, making their vision quite different from our own. Qamar Schuyler at The University of Queensland, Australia, has got into turtles’ heads by modelling their visual capabilities and then measuring the visual characteristics of plastics as turtles see them. She has also examined the stomach contents of deceased turtles to get a sense of their preferred plastics. Her conclusion is that while young turtles are relatively indiscriminate, older turtles preferentially target soft, translucent plastic. Schuyler thinks her results confirm a long-held idea that turtles mistake plastic bags for delicious jellyfish. Colour is also thought to factor into plastic consumption, although preference varies between species. Young turtles prefer white plastic, while Schuyler and her colleagues found that seabirds called shearwaters opt for red plastic. Every year, around 8 million metric tons of plastic waste enters the ocean (Credit: BBC 2017) Every year, around 8 million metric tons of plastic waste enters the ocean (Credit: BBC 2017) Besides sight and smell, there are other senses animals use to find food. Many marine animals hunt by echolocation, notably toothed whales and dolphins. Echolocation is known to be incredibly sensitive, and yet dozens of sperm whales and other toothed whales have been found dead with stomachs full of plastic bags, car parts and other human detritus. Savoca says it’s likely their echolocation misidentifies these objects as food. “There’s this misconception that these animals are dumb and just eat plastic because it is around them, but that is not true,” says Savoca. The tragedy is that all these animals are highly accomplished hunters and foragers, possessing senses honed by millennia of evolution to target what is often a very narrow range of prey items. “Plastics have really only been around for a tiny fraction of that time,” says Schuyler. In that time, they have somehow found themselves into the category marked ‘food’. Because plastic has something for everyone. It doesn’t just look like food, it smells, feels and even sounds like food. Our rubbish comes in such a range of shapes, sizes and colours that it appeals to a similarly diverse array of animals, and this is the problem. Schuyler recalls someone asking, “why don't we make all the plastics blue?”, seeing as experiments suggest this colour is less popular among turtles. But other studies have shown that for other species the opposite is true. So if there is no ‘one size fits all’ solution, no aspect of plastic that we can easily change to prevent animals from eating it, then what can we take from our foray into the minds of plastic-eaters? Savoca hopes that tragic stories like Attenborough’s albatross will help to turn the consumer tide against disposable plastics and encourage people to empathise with these animals. Ultimately this will help to cut off the supply of junk food pouring into the oceans. By Josh Gabbatis সংগৃহীত- BBC

491

61

Joy

অমানুষ হওয়ার জন্যে আর কতটা নীচে নামতে হবে আমাদের?

অমানুষ হওয়ার জন্যে আর কতটা নীচে নামতে হবে আমাদের? মানুষ মানে কি অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া‚ অন্যকে অপমান করা‚ আর কিছু মানুষ প্রতিবাদ করলে তাকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে মারা? আর সমবেত ভীড় লাইভ নাটক দেখতে ব্যস্ত থাকা? প্রশ্ন ভীড় করে আসে মনে| বড্ড ঘৃনা হয়‚ খুব ছোট লাগে নিজেকে| আরও টাইট মুখোশ লাগবে আমাদের| আরে বাবা সারাদিন অফিস‚ আদালতে খাটনি| বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত জীবনে কার সময় আছে বলুন তো ঐ উটকো ঝামেলায় নাক গলানোর| আমারা কিছু দেখি নি‚ দেখতে নেই আমাদের| কে মরল‚ কে মারল আমাদের কি যায় আসে? কোন মেয়েকে রাস্তায় ফেলে ধর্ষণ করা হল‚ আমাদের কি আসে যায়? খারাপ মেয়েদের সঙ্গে ঐ রকমই হয়| ভরা বাসে কোন মেয়ের শ্লীলতাহানি হলে আমরা মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকব| কোন পশু মেয়েটির শরীরে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে‚ মেয়েটি চিত্কার করেলও আমরা শুনতে পাবো না| কারন আমরা তো বধির হয়ে গেছি| আরে দাদা কি দরকার আপনার ঝামেলায় জড়ানোর| আপনি ভালভাবে বাড়ী যান| বাড়ীতে বৌ‚ বাচ্চা আপনার অপেক্ষা করছে| নাইট শোতে আজ নতুন মুভি দেখতে যাব আমার পরিবারকে নিয়ে| ছাড়ুন তো প্রতিবাদ করে কি হবে‚ সব কি অন্যায় বন্ধ হয়ে যাবে? নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুন‚ শপিং মলে যান‚ পার্কে যান| আনন্দ করুন| বাড়ীর আশে পাশে বখাটে ছেলেগুলো মদ খেয়ে হোলি খেলবে| মুখে গালাগালি থাকবে‚ পথচলতি মেয়েদের রং দেবার অছিলায় শরীরে হাত দেবে| আপনি বাজারের ব্যাগটা সাইড করে বাড়ী ফিরবেন| আরে ধুর মাংসে রং পরবে| মেয়েগুলো ও বা আজ রাস্তায় বেড়োয় কেনো? মেয়েটি লজ্জায়‚ ঘেন্নায় কুঁকড়ে যাবে| কেউ কেউ হেসে বলবে বুরা না মানো হোলি হ্যায়| আর কতটা নিচে নামলে পশু হওয়া যায়? না দেখলেও হল‚ সব ব্যাপারে আমরা কেন মাথা গলাতে যাবো? দশটা-পাঁচটা ডিউটি| পরিবার‚ পরিজন‚ ফেসবুক‚ টুইটার‚ ক্রিকেট‚ কেচ্ছার গল্প শুনে আমরা তো ভালই আছি| কিন্তু কতদিন ভাল থাকবো আমরা‚ আর কতদিন ভালো থাকবে আমাদের সন্তানরা? কি করে ও নি:শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে ওরা এই বিষ বাষ্পে? আর কতদিন আমরা নিজেকে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখব| আমারা সত্যিই কি সেফ সাইডে আছি| অফিস থেকে রাত্রির করে ফিরে আসা মেয়েটি না আসলে আপনার চিন্তা হবে না তো? আপনি সপরিবারে মুভি দেখে একটু রাত্রি করে ফেরার সময় ঐ বখাটে ছেলেগুলো মদ খেয়ে চুর হয়ে মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলে বলবেন না প্লিজ মেয়েগুলো কেন রাত্রিতে বাইরে বের হয়| সামাজিক অবক্ষয় অনেক হয়েছে| রাস্তা-ঘাটে নোংরামি বেড়েছে| তার জন্যে কি আমরা দায়ী নই? মুখোশের মোটা‚ পুরু আবরন ভেদ করেও কানে আর্তনাদ আসছে| ঐ আর্তনাদটা কার? ধুর ছাড়ুন তো| যত সব ঝামেলা| আরে আপনি বাঁচলে বাপের নাম| ছেলেরা একটু মদ খাবে না‚ জুয়া খেলবে না‚ মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে না তাই কি হয়| আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি| রাস্তায় একটা ছেলেকে দশ-বারোটা ছেলে কুপিয়ে মেরেছে| অফিস টাইমে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবতীর মুখে কেউ acid ছুড়ল| মেয়েটা যন্ত্রনায় রাস্তায় পরে থাকে| পুড়ে কুন্ডলী পাকানো শরীরটা একটু জল চায়| বাস আসে‚ বাস যায়| আমরা বাসে উঠে পরি| কানে হেডফোন দিয়ে চোখ বন্ধ করি| কেউ বলে দাদা কি হয়েছিল ওখানে এত ভিড় কেন? চোখ বন্ধ করে বলি রাস্তায় কত কি তো হচ্ছে‚ কার এত সময় আছে দাদা| অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে টিভিতে নিউজটা খুলতেও সেই আজ সকালের খবর| এক পাশে আগের সুন্দর মুখ‚ পাশে acidএ পোড়া ঝলসানো মুখ| আগের মুখটা দেখেই চমকে উঠলাম আরে এতো অপর্না| আমার স্টুডেন্ট ছিল| ক্লাস টেন পর্যন্ত আমার কাছেই পড়ত| বেশ গরীব ঘরের| খুব কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেয়েছিল কয়েক মাস আগেই| মেয়েটির চাকরির স্বপ্ন‚ বাঁচার স্বপ্ন পুড়ে শেষ হয়ে গেল| আজ আর পারিনি টিভির চ্যানেলটা পাল্টে দিতে| পাড়ার বখাটে ছেলেগুলোর কল্যানে কালী পুজোর সারা রাত চকলেট ব্যোম‚ পটকা‚ বাজির ভয়ানক আওয়াজ| সব কটাই ১৮ থেকে ২৫ এর মধ্যে| সারা রাত ঘুমাতে পারল না আমার বাচ্চাটা‚ ঘুমের ঘোরে ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরে মাকে| পাশের বাড়ির মিত্র কাকু শয্যাশায়ী| দুবছর ধরে প্যারালাইসিসে ভুগছেন| সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি| বারন করাতে ছেলেরা বাজি ফাটানো আরও বাড়িয়ে দিল| এবার আমাদের ঘর লক্ষ করে চকলেট ব্যোম এসে পড়ছে| নিউ টাউন থানায় ফোন করে সব বললাম| কোথা থেকে বলছেন‚ কি নাম‚ এটাই আপনার ফোন নাম্বার তো? দাঁড়ান লোক পাঠাচ্ছি| কিছুক্ষন পরে এক অফিসারের ফোন আপনি যে বললেন ব্যোম ফাটছে| ওর তো সব বাচ্চা| আপনকে একবার রাতে থানায় আসতে হবে| কেন জানতে চাইলে উত্তর এল আপনাকে দেখি একবার| ভুল ইনফর্মেশন দেন কেন? চুপ করে গেলাম| বাড়ির পাশ দিয়ে ঐ বাচ্চা ছেলেগুলো গালাগালি দিতে দিতে চলে গেল| কত দিন পুলিস থাকবে দেখবো‚ স্পষ্ট ওদের হাসি শুনলাম| আর কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলো না| কেউ কেউ বলল কালী পুজোতে একটু ব্যোম-পটকা তো ফাটবেই| আবার প্রতিদিনের মত বেঁচে থাকা| দাদা ছাড়ুন না কি হবে এসব ভেবে| বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হয়ে কি হবে? কদিন পর IPL শুরু হচ্ছে| কোন প্লেয়ারের দাম কত উঠল| শ্রীদেবীর মৃত্যুটা স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক আসুন এসব নিয়ে চর্চা করি| কেউ বা রাস্তায় প্রতিবাদ করে রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকে| আপনি কিছু দেখেন নি তো| একবার গিয়ে দেখবেন নাকি ঐ থ্যাঁথলানো মুখটা| চেনা চেনা লাগছে কি?

153

5

দীপঙ্কর বসু

ফিরে ফিরে চাই ...

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাস । জর্জ দা অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাস জামশেদপুরে রবীন্দ্রমেলায় আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে এসে উঠেছিলেন আমাদের বাসায় । তাঁর অনুষ্ঠান হয়ে যাবার পরের দিন সকালে আমাদের বাড়ির লন এ রোদ্দুরে একটা ইজি চেয়ারে বসে খোস গল্পে মেতেছিলেন আমাদের দুই ভাইয়ের সঙ্গে ।কথায় কথায় উঠল তাঁর গায়নে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তথাকথিত বিকৃতি নিয়ে কারো কারো অভিযোগের প্রসঙ্গ । মুচকি হেসে আমাকে বললেন একটা খাতা আর কলম দিতে ।আমি আমার গানের খাতাটি বাড়িয়ে দিলাম ওনার হাতে ।ভাবলাম বুঝি অটোগ্রাফ দেবেন । কিন্তু না ।দেখলাম দ্রুত হাতে কলমের আঁচড়ে খাতার পাতায় একটি স্কেচ এঁকে ফেললেন । নিচে সই ও করলেন নিজের নাম ।তারপর খাতাটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন এই ছবিটার একটা পূর্ব ইতিহাস আছে । সেটা আমি বলে যাচ্ছি লিখে নাও । আমি শ্রুতিলিখনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে বসতেই উনি গল্প শুরু করলেন । শ্রুতিলিখন শেষ হলে আমার কাছ থেকে খাতাটি ফেরৎ নিয়ে লেখার নিচে তারিখ সহ নিজের নাম সই করলেন ।এবার জর্জ দার জবানীতে গল্পটি - আমি খুব হাঁপানি রোগে ভুগছি ,এই খবর শুনে বাংলাদেশ ,কুষ্ঠীয়ার একটি কলেজ পড়ুয়া মুসলমান মেয়ে একটি হাঁপানির মাদুলি চিঠির মধ্যে পুরে আমাকে পাঠিয়েছিল ,এবং নির্দেশ দিয়েছিল খাজাবাবার নাম স্মরণ করে আমি যেন মাদুলিটি ধারণ করি ।আমি তার নির্দেশ মত খাজাবাবার নাম স্মরণ করে মাদুলিটি ধারণ করে তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলাম আর লিখেছিলাম খাজাবাবা টি কে ,এবং কোথায় থাকেন আমি তো জানিনা ! উত্তরে মেয়েটি জানিয়েছিল যে খাজা বাবা ইন্ডিয়ার আজমীরে দেহরক্ষা করেছিলেন,সেখানে তাঁর একটি বিরাট মাজার (কবর) আছে । মানুষের মঙ্গল সাধন করার জন্য খাজা বাবা বহু তপস্যা করে খোদাতালার কাছ থেকে ক্ষমতা আদায় করেছিলেন ।যদি কোন মুসলমানের পক্ষে মক্কায় হজ করতে যাওয়া সম্ভব না হয় তাহলে তিনি আজমীরে হজ করতে পারেন – এতখানি মর্যাদা তিনি খোদাতালার কাছ থেকে আদায় করেছিলেন । এই চিঠির উত্তরে আমিসেই মেয়েটিকে জানিয়েছিলাম যে খাজা বাবার পরিচয় পেয়ে ভালই লাগল । তবে খাজা বাবার মাদুলি ধারণ করার পর ফলাফল কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা ।সঙ্গে সঙ্গে আরো জানিয়েছিলাম এই ব্যপারে একটি গোপন খবর আছে। খবরটি যেন কাউকে ফাঁস করে দেওয়া না হয় । গোপন খবরটি হল – কয়েকবৎসর আগে কয়েকজন রবীন্দ্রসঙ্গীত স্পেশালিস্ট প্ল্যাঞ্চেটের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর কাছে নালিশ জানিয়েছিলেন এই মর্মে যে এই পৃথিবীতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের দারুণ বিকৃতি ঘটে যাচ্ছে এবং এই বিকৃত রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনকারিদের দলে যারা আছেন তাদের মধ্যে আমিই পয়লা । এই খবরটি পেয়ে রবীন্দ্রনাথের আত্মা নিদারুণ দুসচিন্তাগ্রস্থ হয়ে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন । তাঁর এই অবস্থা লক্ষ্য করে সুরলোকের কর্তারা একটি কনফারেন্সের ব্যবস্থা করলেন । মধ্য এশিয়া থেকে যিশু খৃষ্টবাবুর পরম পিতা ,মক্কা থেকে স্বয়ং খোদাতালা , এবং ভারত থেকে নারায়ন বাবু ,ব্রহ্মাবাবু মহেশ্বর বাবু ,গৌতম বুদ্ধবাবু এবং রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবতা পরমব্রহ্মবাবু উপরোক্ত কনফারেন্সে যোগদান করেছিলেন । পরে তাঁরা সবাই মিলে একটি চুক্তি সম্পাদন করলেন । সেই চুক্তির সারাংশ নিচে দেওয়া হল । ১। জর্জ বিশ্বাস ওরফে দেবব্রত বিশ্বাসকে না না রোগে ভুগিয়ে ভুগিয়ে শেষ করে দেওয়া হোক । ২। পরজন্মে তাকে একটি বায়স অর্থাৎ কাক হয়ে জন্মগ্রহন করতে হবে ৩। সেই কাকটিকে সুরলোকে শুকনো মাটি ও পাথরের মধ্যে গজানো একটি রাবীন্দ্রিক বৃক্ষের কাছে আর একটি শুকন মরা গাছের ডালে বসে অনেক বৎসর রাবীন্দ্রিকতা শিখতে হবে । ৪।তারপর তাকে আবার প্ররথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবার জন্য । এই রাবীন্দ্রিক বৃক্ষের একটি নমুনাও সেই মেয়েটিকে পাঠান হয়েছিল,এবং শ্রীমান দীপঙ্কর বসুর এই খাতায় সেই নমুনাটি দেওয়া হল । স্বাঃ দেবব্রত বিশ্বাস সাতাসে জানুয়ারি উনিশশো পঁচাত্তর

168

7

Stuti Biswas

চাঁদনী চকের হট্টমেলা

সেদিন প্রায় দশ বার বছর পরে গিয়েছিলাম চাঁদনী চকের ভগীরথ প্লেসে । ভগীরথ প্লেস ল্যাম্পসেড ও ইলেক্ট্রিক্যাল জিনিষপত্রের খনি বলা যায় । ছোট বড় পাইকারী ও খুচরো দোকান । চারিদকে আলোর রোশনাই । ঢুকলেই মনে হয় আজ দেওয়ালি । চাঁদনী চক মানে উপচে পড়া ভিড় ,হৈচৈ , ঠেলাঠেলি । সরু অলিগলি । প্রতিটি বাঁকে বসে বা দাঁড়িয়ে আছে হকার । ওপরদিকে তাকালে এক চিলতে নীল দেখা ভার । অগণিত ইলেকট্রিক , টেলিফোন আর কেবলের তার এঁকেবেঁকে জানজট সৃষ্টি করেছে । রাস্তার দুই পাসে গাড়ী পার্ক করা । তারই ফাঁক ফোকর দিয়ে গলে যেতে হয় । ফুটপাথ দিয়েও বেশ সর্ন্তপনে চলতে হয় ।ফুটপাথ জুড়ে জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের জিনিষ বিক্রী হচ্ছে । একটু বেশামাল হলেই ঠেলাওলার ঠেলা বা মুটের ধাক্কা খেতে হয় । দোকানগুলো সব পুরানো অবয়বে ব্যবসা করে । বেশীর ভাগ দোকানেই নেই নিওন লাইটের চমকানি ।সাদা মাটা সাইনবোর্ড । রাস্তার ধারে দোকানের এজেন্ট দাঁড়িয়ে থাকে । কানের কাছে সমানে রানিং কমেন্ট্রী চালিয়ে যায় । সেল লাগা দিয়া সস্তে মে স্যুট , শাড়ী ,ল্যাঙ্ঘা- চোলী , নাইটি মিল রহে ...আইয়ে দেখিয়ে । ইয়ে হামারি দোকান কি কার্ড ............... হাতে ধরিয়ে দেবে এরকম শতাধিক কার্ড । একবার এরকম এক লোকের পাল্লায় পরে তার দোকানে গেছিলাম । সামনেই দোকান বলে গলির মধ্যে নিয়ে গেল । সে গলিতে সামনাসামনি বাড়ীর লোকেরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে হ্যাণ্ডসেক করতে পারে । একটা বেশ বাড়ী । দেখলেই বোঝা যায় কোনকালের ধনী ব্যক্তির বাড়ী ছিল ।ভেতরে ঊঠান ভর্তি দোকান । একপাশের সরু সিঁড়ি । একসাথে দুইজন ওঠা যায় না । দোতলায় বারান্দার চারিদিকের প্রতিটী ঘর এক একটি দোকান । এরকম ভাবে তিনতলা ঘুরিয়ে ছাদে নিয়ে তুলল । সে ছাদ থেকে আকাশ দেখা যায় না ।সারা ছাদ ভর্তি কাঠের পার্টিশন করা দোকান । দরজা ঠেলে একটীর ভেতরে নিয়ে গেল ।ভেতরে এয়ারকণ্ডিশন &nbsp;। মাটিতে ফরাস পাতা । মান্ধাতা স্টাইলে মাটিতে বসে কেনা বেচা চলছে । মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত আলমারী শাড়ী , সালোয়ার কামিজে ঠাসা । ওই টঙের ওপর দোকানে এত স্টক দেখে মাথা ঘুরে গেছিল । যারা জানে তারাই ওখানে যেতে পারে । ১৬৫০ সালে শাহজাহান কন্যা জাহানারার স্থাপনা চাঁদনী চক । লাল কেল্লার লাহোরি গেট থেকে শুরু হয়ে ফতেপুরী মসজিদে শেষ । মূল নকশা অনুযায়ী চৌকোনা বাজারটির দোকানগুলি বানানো হয়েছিল অর্ধচন্দ্রাকৃতি আকারে । মাঝখানে টলটলে দিঘি । এ ছাড়াও চাঁদনী রাতে ঝলমল করার জন্য বাজারের মাঝে নহের বা খাল কেটে জলের ব্যবস্থা করা ছিল । ১৯৫০ সালে সেই দিঘি বুজিয়ে ঘন্টাঘর বানানো হয়েছে । চাদনী চকের মূল রাস্তাটি তিন ভাগে বিভক্ত । লাহোরি গেট থেকে কোতয়ালী চক পর্যন্ত অংশটির নাম উর্দু বাজার । এখানে প্রধানত দরবারের উচ্চ পদাধিকারীদের বাস ছিল । কোতয়ালী থেকে মাঝখানের দিঘি অবধি জায়গা র নাম ছিল জহুরী বাজার । ওখান থেকে ফতেপুরী মসজিদ অবধি বাজারের নাম ছিল ফতেপুরী বাজার । যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মের মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ হয়েছে চাঁদনী চক । পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শ্রী দিগম্বর জৈন মন্দির ,গৌরিশঙ্কর মন্দির ,শিব নবগ্রহ মন্দির ,ব্যপটীস্ট চার্চ ,গুরদুয়ারা শীশগঞ্জ সহিব , ফতেপুরি মসজিদ ,সুনহেরি মসজিদ । দিল্লী লুন্ঠনের সময় নাদির শাহ সুনেহরি মসজিদে বসে কোতলে -ই-আম ( দেখা মাত্র মেরে ফেল ) প্রত্যক্ষ করেছিল । তিরিশ হাজার লোকের প্রাণনাশ করেছিল ।শেষ মাথায় ফতেপুরী মসজিদের স্থাপনা করেছিল ফতেপুরী বেগম ( শাহজাহানের এক বেগম ) । জনস্ফিতির চাপে সেই সুন্দর পরিচ্ছন্ন বাজার পরিবর্তিত হয়েছে উত্তরভারতের প্রধান হোলসেল মার্কেটে । লালকেল্লার উল্টোদিকে বেগম সম্রুর প্যালেস পরিণত হয়েছে ইলেকট্রিক্যাল জিনিষের বাজার ভগীরথ প্লেস । গলি খাজাঞ্চির খাজাঞ্চি হাভেলি খুজে পাওয়া ভার । নিরাপদে টাকা পয়সা আনা নেওয়ার জন্য নাকি এই হাভেলি থেকে মাটির তলায় সুরঙ্গ দিয়ে লাল কেল্লার সাথে যোগাযোগ ছিল ।বলিমারানে মির্জা গলিবের হাভেলি অবশ্য মিউজিয়াম হয়েছে ।নীল কাটরার চুনরমল নামে এক ধনী বস্ত্র ব্যবসায়ীর হাভেলি পরিণত হয়েছে সালোয়ার কামিজের পিসের হোলসেল মার্কেটে । দিল্লী আসার প্রথম দিকে মাঝে মাঝেই লাল কেল্লার পারকিং এ গাড়ী রেখে চাঁদনী চকে যেতাম । এমনি দিনে দোকান পাট খোলা , রবিবারে মার্কেট বন্ধ কিন্তু সেদিন ফুটপাথ জুড়ে বিরাট বাজার । চাঁদনী চকের ওলিগলিতে ঘোরা একটা নেশায় দাঁড়িয়ে গেছিল । কত কিছু পাওয়া যেত । কিনারী বাজারে সেলাই র জিনিষ ,পাথরের সম্ভার । দরীবাকালানে ছোট ছোট সোনা চাঁদীর দোকানের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেশ রোমাঞ্চিত হতাম । পরোঠেওলা গলি দেখে বেশ হতাশ হয়ে ছিলাম । গলিতে পরোঠা র দোকানের থেকে শাড়ী জামাকাপড়ের দোকান বেশী । পরোঠার দোকানে যে কাল তেলে পড়োঠা ভাজছিল তা দেখে খুব একটা খেতে ভক্তি হয় নি &nbsp;। নীল কাটরার কিছু গলি দুইজনে একসাথে যাওয়া যায় না । কিন্তু ঢুকলে মনে হয় শাড়ী ,সালোয়ার কামিজের কাপড়ের খনিতে এসে পড়েছি । দেখেশুনে কিনতে পারলে বেশ সস্তায় পাওয়া যায় । পারকিং তুলে দেওয়ায় যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল ।আবার নাগালের মধ্যে এনেদিয়েছে মেট্রো । এখন চাঁদনী চক আর লাল কেল্লা দুটো স্টেশন থেকেই যাওয়া যায় । আবার জৌলুস ফিরে পাচ্ছে চাঁদনি চক । মেট্রো থেকে নেমে গলি পেরিয়ে যখন মেন রাস্তায় উঠলাম... দেখি চাঁদনী চকের ভোল একদম পালটে ফেলেছে ।চাঁদনী চকের পালে লেগেছে আধুনিকতার হাওয়া । ঝলমলে এল-ই-ডি লাইটের রোশনাই । দোকানে দোকানে কাঁচের শোকেস। জিনিষপত্র ঝলমলে আলোয় ঝিলিক মারছে । রাস্তায় ভিড় জ্যাম আছে । রিক্সার জায়গা নিয়েছে ই-রিক্সা । হলদিরাম খোলনালচে পাল্টিয়ে নতুন সাজে সেজেছে । সাজতে ত হবেই কারন পাশেই পা নাচাচ্ছে ম্যাগডোনাল্ড বাবু &nbsp;। নতুন জোয়ারে গা ভাসিয়েছে চক । চিরাচরিত বাঙ্গালী মিষ্টির দোকান অন্নপূর্ণা সুইটস বা ঘন্টিওলা মনে হল উঠে গেছে ।

196

10

মনোজ ভট্টাচার্য

নাগরিক জীবনে নীরব বিবর্তন !

নাগরিক জীবনে নীরব বিবর্তন ! হঠাৎ কদিন ধরে আমাদের মনে হচ্ছিল – আমাদের কমপ্লেক্সে বয়স্ক মানুষদের জন্যে একটা কমিউনিটি কিচেনএর বন্দোবস্ত করলে কেমন হয় ! – এটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের ধারনা । কমিউন ! তার পরিপ্রেক্ষিতটাও আলাদা ছিল ! অনেক মানুষ আছে – যারা রান্নাঘরে যাবার সময় পায় না । সক্কাল সক্কাল উঠেই অফিশ যাবার তাড়া ! এখান থেকে অনেককেই সুন্দরবনের কাছাকাছি গিয়ে কাজ করতে হয় ! তাই ব্রেক ফাস্টে দিদির তেলেভাজা, মোদীর পকোড়া বা ইঁদুর-টিকটিকি খাবার সময় পায় না ! আবার দিনান্তে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসেও রান্নাঘরে ঢোকার অনীহা থাকে ! এদিকে মাসে চারদিন তো রান্নার লোকের ছুটি বরাদ্দ ! কমিউনিটি কিচেন না হলেও এই ধরনের হেঁসেল তো চলছেই – হোম ডেলিভারি নামে । আগে ধারনা ছিল – হোম ডেলিভারি যা দেবে তাই আমাদের গলাধঃকরণ করতে হবে ! ঠিক তা নয় ! শুক্তো-পোস্তও হয় ! আমরা কি খাবো সেটা তাদের বলে দিতে হয় ! স্বাদ মন্দ নয় ! – তবে ষ্ট্যাণ্ডার্ড ঝাল থাকবেই ! অনেকেই হোম ডেলিভারি মারফত বাড়িতে খাবার দাবার আনান ও নৈশাহার সারেন ! আর এই অর্ডার মাফিক খাবার জোগান দিয়েও কত মানুষের রোজগার হচ্ছে ! কয়েকজন বন্ধু মিলে রান্না করে অনেক পরিবারকে খাবার জোগান দেয়- হোম ডেলিভারি যাকে বলে ! খাবার কি দেয় ? ভাত, ডাল, ভাজা-ভুজি, তরকারি, মাছ – সাধারনত চারা পোনা- অথবা ডিম মাঝে মাঝে মাংস ও সবশেষে চাটনি ! - আহা ! ও - রুটির অভ্যেস থাকলে – তাও করে দেয় ! আবার এমনকি – শুধু রুটিও দিতে দেখেছি সন্ধ্যেবেলায় ! সব শুদ্ধ আশি টাকা থেকে দেড়শ মতো পরে ! আর রান্নার এই বিরাট কর্মযজ্ঞের জন্যে আমাদের কি কি সাশ্রয় হয় ! প্রথম ও প্রধানত আমাদের শ্রম ! সকালে বাজার যেতে হবে না, ফিরে এসে রান্নার ঝামেলা নেই, গ্যাসের জন্যে চিন্তা নেই ! আর – আর রান্নার লোক আসবে কি আসবে না – তার জন্যে স্ত্রীদের কি টেনশান ! আর স্ত্রীদের টেনশান না হলে – আমাদেরও টেনশান ফ্রী ! – যদি একটা ইন্ডাকশান স্টোভ থাকে তো – চা, কফি, টোস্ট, অমলেট ইত্যাদি করে নেওয়া যায় বৈকি ! আঃ ! লাইফ মেড ইজী ! সংসার থেকে হেঁসেল বিদায় ! আগেই বিদায় হয়েছে – কাঠকয়লা-গুল-ঘুঁটের উনুন । জনতা স্টোভ । পরে গ্যাসের গঞ্জনা ! – মুক্তি মুক্তি – হেঁসেল হইতে মুক্তি ! মাকে বাবাকে পাঠিয়েছি বৃদ্ধাবাসে ! এবার হেঁসেল বিদায় করে আমরাই সংসারটাকে বৃদ্ধাবাসে পরিনত করেছি ! মনোজ

149

6

শিবাংশু

বিহারি বসন্ত ও গিমলেট

এমন নয় যে দিল্লি একেবারেই যাইনা। কিন্তু এটাও সত্যি যে গেলেও যাই কাজেকম্মে। হাতে বিশেষ সময় থাকেনা। অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চলছে, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাটেবলে হচ্ছেনা। এবার যাবার প্ল্যান হতেই চঞ্চলের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলুম। কঁহি মিলনা হ্যাঁয়। সেই মতো বসন্ত বিহারে সোনার ড্র্যাগনের ছায়ায় বসা ঠিক হলো। মজলিশ আমাকে যেসব বন্ধুবান্ধব নসিব করেছে, তাঁদের মধ্যে চঞ্চল ও হিমু উস্তাদ আমার খুব কাছের মানুষ। মানে মনের কাছে। হিমুর সঙ্গে তো আগে কখনও দেখাই হয়নি আর চঞ্চলের সঙ্গে একবার অতি সংক্ষেপে। কিন্তু কোনও একটা দৈবী আঠা কাজ করে ভিতর ভিতর। তাদের নিঃসংশয় নিজের লোক মনে হয়। আমি ছিলুম ইস্ট অফ কৈলাশে ব্যাংকের অতিথশালায়। হিমু বা চঞ্চল দুজনের আস্তানা থেকে বহুদূর। আমাকেও নিত্য গুড়গাওঁ আর ফরিদাবাদ ছোটাছুটি করতে হচ্ছিলো। কিন্তু সেদিন সকালে ব্রাহ্মণী তাঁর দুই কন্যা সমভিব্যাহারে গার্লস ডেআউটে বেরিয়ে পড়েছিলেন আর আমি ফাঁক পেয়ে পুরানা কিলা। যথেচ্ছ ঘুরেফিরে, কয়েকশো ছবি তুলে যখন ভাবছি এবার নবাব সফদারজঙ জাঁহাপনার মকবরা সন্দর্শনে যাবো, তখনই চঞ্চলের ফোন। হিমু যথারীতি বিলম্বে পৌঁছেচে। বসন্তবিহার পৌঁছোতে একটা-দেড়টা হয়ে যাবে। কো'ই গল নহি। আমিই আগে পৌঁছে গেলুম। অকুস্থলে। সামনেই ভারতীয় স্টেট ব্যাংক, বসন্ত বিহার ব্রাঞ্চ। পাশে দিল্লির টিপিক্যাল সেক্টর টাইপ বাজার। একটা মস্তো শিরিষ গাছ। জড়াজড়ি করে আছে আরেকটা নিমগাছের সঙ্গে। নিচে আলোছায়ায় ফুল-ফলের দোকান। আর একটা হলুদ রংচটা বেঞ্চি। খাকি কামিজ পাৎলুন পরা একটি প্রৌঢ় সেখানে রোদ পোয়াচ্ছে। তাকে দেখি বাজারের দোকানিরা সলাম করে যাচ্ছে। সামনে দিয়ে গেলেই। তার পাশে বসে পড়লুম। বহু বহুদিন পরে এমন একটা অবসর। বিদেশবিভুঁই জায়গায় শীতের অলস অপরাহ্ন অচেনা লোকেদের অলস, কিন্তু আন্তরিক কথোপকথন। রুখু শীত হাওয়া, পাতার ছায়ায় নরম রোদ। এবার শীতের সীমানা শেষ হবে। এমন সময় প্রার্থিত ফোন। দুই মূর্তি পৌঁছে গেছেন। সোনার ড্র্যাগনের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিউতি খুঁজছেন কাউকে। আমি একটা কাঠবাদাম গাছের নীচে ঠেস দিয়ে টমসন-থমসনের লীলা দেখছি। দেখতে পেয়েই হিমু উস্তাদ ছুটে এসে পঞ্জাবি ইসটাইলে প্রণিপাত । আমরা ড্র্যাগনের মুখবিবরে প্রবেশ করি। ভিতরে তখনও খালি। ছুটির দিন। লোকজন ধীরেসুস্থে পৌঁছোবে ভোজ খেতে। চিনেদের মতো দেখতে দুয়েক জন বান্দা সেখানে ঘোরাফেরা করছে। চঞ্চলের কাছে শুনলুম এটা দিল্লির একটা প্রাচীন চিনে খাবারের ঠেক। চঞ্চল যতো'ই আদেশ করুক, এরকম দিনদুপুরে বসে সুরাপান করলে বাবা খুব বকবেন এমত বিশ্বাসে আমি রাজি হচ্ছিলুম না। কিন্তু সে ভদ্রলোক কোন সুদূর পরবাসে, এ জন্মে দেখা হবার কোনও সম্ভাবনা নেই। অথচ সি-ই-ও সাহেব সামনে বসে হুংকার দিচ্ছেন। 'অপনা জান প্যারা হ্যাঁয় ' থিওরিতে 'হ্যাঁ' বলতেই হলো। বহুদিন পর 'গিমলেট' সেবা হলো ভরপুর। তখন শোনা গেলো বদোদড়া থেকে জনৈক পাঁড় মাতাল মাঝে মাঝেই দিল্লিতে আসেন। বদোদড়ার মতো একটা গোমূত্রসেবী সন্তদের শহরে, জনৈকা ভিলনি দেহরক্ষীর কবলে পর্যুদস্ত জীবনে ক্রমাগত বেড়ে ওঠা অবদমিত আকাঙ্খার বোঝা লাঘব করতে তিনি মধ্যরাতে পুরানা কিলায় ব্রেক ড্যান্স করে টেনশন নামাতে চান। তিনি তো চান, ক্ষতি নেই, কিন্তু তাঁর হোস্টদের জীবনে তো অতো চাপ নেই। চঞ্চল বা হিমু'র মতো ‘সুভদ্র’ অতিথিপরায়ণ মানুষদের জন্য তা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। সারা রাত ধরে এক শুঁড়িখানা থেকে অর্ধচন্দ্র দিলে অন্য শুঁড়িখানায় গিয়ে বল্লিমারানের শ্যের কিংবা বুনু'দার ট্রিটমেন্টের গপ্পো কাঁহা তক সহ্য হয়? কিন্তু যদুপুরের গোপ-আহিররদের অতোটা কন্সিডারেশন থাকলে তো। দুবছরের জামশেদপুরিয়া হোক বা চার পুরুষের, ফর্ক নহি পড়তা। কথা তো হবেই। সঙ্গে পুরোনো মজলিশের অনেক হাঁড়ির খবর আর চরিত্র বিশ্লেষণ তো আবশ্যিক গোপন তন্ত্রচর্চার অঙ্গ। সেসব নিয়ে তো আর প্রকাশ্যে আলোচনা করা যায়না। ঠাকুর রাগ করবেন। আমাদের সি-ই-ও হোস্ট মশায় ক্রমাগত চৈনিক খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে ব্রহ্মসেবা করে গেলেন। পুরাকাল হলে তাঁকে পুত্রবান হবার বর দেওয়া যেতো। কিন্তু এখন সে Rumও নেই, ব্রাহ্মণের সে তেজও নেই। ঘোর ভক্ত হিমুমহারাজের দশ আঙুলে নবগ্রহ তুষ্টকারী নয়টি অঙ্গুরীয় ঝলমল করছিলো। দর্শনীয় দৃশ্য। অনেকবেলা গড়িয়ে গেলো অকথা-কুকথায়। তিনজন দেহলির তিনপ্রান্তে ফিরবে। পরবর্তী জামাতের উইশ করে আসর ভঙ্গ করা হলো। এমন সময় হিমুর পোশ্নো। " আচ্ছা, শিবুদা? হিমু'কে দেখে তোমার কী মনে হলো?" সত্যিকথাটাই বলে দিলুম, " ঠিক হিমুর মতন...."<img class="emojione" alt="😃" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F603.png?v=1.2.4"/>

173

8

মিতা

'সে চলে গেল বলে গেল না, সে কোথায় গেল ফিরে এলো না'

নিজেদের মৃত্যু নিয়ে আমরা সচেতন ভাবে রোজ ভাবি না l এমনিতে মৃত্যু সহজে আসে না বলেই মনে হয়, মানুষের জীবনের গড় আয়ু এখন অনেক বেশি, দেশে গিয়েও দেখলাম আমার আশি নব্বই বছরের অনেক আত্মীয় স্বজন শারীরিক ভাবে মোটামুটি আরো বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে দিতে পারবেন বলে মনে হয় l কিছু মৃত্যু আসে জানান দিয়ে, আবার কিছু মৃত্যু কাউকে কোন রকম প্রস্তুতির অবকাশ না দিয়ে অতর্কিতে এসে যায় l যে চলে যায় সে তো চলেই যায়, তার প্রিয়জন যারা রয়ে যায় তাদের নতুন করে জীবনের পথে চলার অভ্যাস করতে হয় l আমি ভাবছি যার অসময়ে যাবার কথা ছিল না, সে নিজেও তো প্রস্তুত ছিল না, তাহলে তার কি হয়? হিন্দু ধৰ্ম মতে কর্মফল অনুযায়ী পুনর্জন্ম হয়, তাই যদি হয় তাহলে সেটা কবে, কতদিন পর হয়? দিন, মাস, বছর এগুলোর হিসেব মৃত্যুর পরে কি ভাবে হয়?

192

2

Shibanshu De

দর্জিপাড়ার ছেলে

শরৎচন্দ্র এই উপকারটি করেছিলেন। নতুনদাকে দিয়ে বলিয়ে দিয়েছিলেন, " আমি দর্জিপাড়ার ছেলে..." ইত্যাদি। তার পর থেকে দর্জিপাড়ার ছেলেরা পার্মানেন্টলি 'বদনাম' হয়ে গেলো। যত্তো কলকাত্তাই নষ্টামির অবতার মানেই দর্জিপাড়ার ছেলে। আমার পূর্বপুরুষরা বিডন স্ট্রিটের আদি পাবলিক ছিলেন। সাতুবাবু-লাটুবাবুদের এলাকায় কাটিয়েছেন প্রায় চার পুরুষ। আমার ঠাকুরদা পর্যন্ত ওরিয়েন্টাল সেমিনারি। ১৯২২ সালে ঠাকুরদা যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে কলকাতা ছাড়েন। তখন থেকে আমরা জামশেদপুরি। তবে রক্তে তো নর্থ-কলকাত্তাই জিন থেকেই গেছে। আগমার্কা ঘটি, সঙ্গে বিহারি ক্রোমোজোম। সবার উপরে দর্জিপাড়ার জল খেয়েছিলেন পূর্বপুরুষ। বিপজ্জনক তো বটেই। উঠতি বয়সে কলকাতা এলে বিডন স্ট্রিটে চিৎপুর সড়কের অন্য পার নিমতলাঘাট স্ট্রিটে এক আত্মীয়শুভার্থীর বাড়ি থাকতুম। সে এক জায়গা বটে। বনারসের গলির মতো এদিকওদিক ঘুঁজি বেরিয়ে গেছে। সুঁচ হয়ে ঢুকে গেলে কোত্থেকে ফাল হয়ে বেরিয়ে যাবে বোঝা যেতোনা। পায়ে হেঁটে কলকাতা চেনা তখন থেকেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নতুনবাজার, কোম্পানিবাগান পার্ক, অর্থাৎ রবীন্দ্রকানন থেকে কখনও বাঁয়ে যাত্রাপাড়া, আহিরিটোলা হয়ে শোভাবাজার, কখনও ডাইনে মুড়ে জোড়াসাঁকো। নাক বরাবর গেলে মিনার্ভা থিয়েটার হয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভেন্যু। মোড় পেরোলেই বাঁদিকে সাতুবাবু-লাটুবাবুর প্রাসাদ। তার পর বিধান সরণির মোড়। বিডন স্ট্রিট যে কবে গিরিশবাবুর পুত্র দানিবাবুর নামে পাল্টে গেছে জানতুমও না। পরবর্তীকালে আমাদের বিস্তীর্ণ পরিবার, যার পোশাকি নাম 'দেবায়তন' এই মুলুকেই ছিলো কোথাও। কোনও একটা রংচটা, ঝুরঝুরে তিন-চার মহলা বাড়িগুলোর কোনও একটায়। খুঁজে যেতুম। পাইনি কখনও। কিছুদিন আগে পুজো দেখতে পৌঁছে গিয়েছিলুম সাতুবাবু-লাটুবাবুর ভদ্রাসনে। মেয়েদের বললুম, জানিস এখানেই কোথাও ছিলো আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িঘর। প্রায় একশো বছর ধরে। ঠাকুরদা এরকমই কিছু বলেছিলেন। আজ ঐ বাড়িটির ছবি দেখে আবার মনে পড়ে গেলো।

199

8

Shibanshu De

ফেরো, ফেরো, ফেরো, আকাশের নীচে......

তিনি বলতেন, তাঁর গান যখন অন্য লোকে গাইবে, যদি তখন তাঁর মৃত্যুও হয়, সেই মৃত্যু তৃপ্তির, আনন্দের। পীট সীগরের গানের শরীর নিয়ে সারা পৃথিবীতে অনেক মূল্যবান আলোচনা হয়েছে । যাঁরা গান শোনেন, ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য তা খুবই জরুরি। একজন ভারতীয় শ্রোতা হিসেবে যখন আমরা তাঁর গান শুনি, তখন তাঁর গানে শরীরের ঊর্দ্ধে আত্মার সম্পদটি আমাদের অধিক টানে । আমরা শ্রোতা হিসেবে পশ্চিমের লোকেদের থেকে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ । আমাদের গান শোনার ধরনটির (একটা লক্ষণ মেলোডির প্রতি আমাদের অতি পক্ষপাত) মধ্যে সেটা খুব প্রকট। সেই কারণেই আমাদের একটা ভাটিয়ালি গানকে তার শরীর অক্ষুণ্ণ রেখেও যদি ঝুমুরে পরিবেশন করা হয় তবে আমাদের কাছে তা স্বীকৃত হয়না । কেউ মনে করেন, পীট সীগর বা বব ডিলান কালো মানুষদের থেকে হয়তো মার্লে বা হেন্ড্রিক্সের মতো উচিত সম্মান পাননা । এই ধরনের ধারণা সূক্ষ্ম রসবোধের অতি সরলীকরন । 'প্রতিবাদ' বা 'সমর্পণ', বিষয় যাই হোক না কেন, যে কোনও রচনার গান হয়ে ওঠাটা জরুরি । আমাদের সঙ্গীতধারায় সমর্পণের গানও কেমন 'প্রতিবাদী' হয়ে ওঠে তার নমুনা হিসেবে আমরা গত তিনশো বছরের বাংলাগানে ভক্ত বা আশ্রিত কম্পোজারদের দেখি ঈশ্বরের অবিচারের প্রতি তাঁরা কতোটা প্রতিবাদমুখর। তাঁদের আকুল আর্তিগুলি আমাদের ভাবায়। 'দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে' তাঁরা থেমে যাননা।আমাদের লোকসঙ্গীতের নানা ধারায় ঐশী শক্তির প্রতি বঞ্চিতের এ ধরনের প্রতিবাদ শুনতে পাওয়া যায়। আমি পীট সীগর বা বব ডিলানের গান শুনি তাদের ভিতরে প্রতিবাদী সত্ত্বা আবিষ্কারের নেশায় নয় । আমি শুনি সুরবদ্ধ কিছু সত্যি কথা। শুধু সুরই পারে আমাদের খণ্ডসত্যের জগতের সংলাপকে শাশ্বতসত্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে । বব ডিলানের কণ্ঠসম্পদ নিয়ে আমার দ্বিধা রয়েছে । কিন্তু তাঁর হৃদয়সম্পদ এতো বেশি প্লাবিত করে যে তাঁর নাসিক্য পরিবেশনের সীমাবদ্ধতা কোথায় ভেসে চলে যায় । 'প্রতিবাদ' মানে যেখানে দু'টি বা ততোধিক পক্ষ যুক্ত রয়েছে । কিন্তু এঁদের গান সত্যের গান, যাকে শাক্যমুনির ভাষায় বলা যায়, বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায় । সেখানে পক্ষপাতের শর্তগুলি ঠিক দাঁড়াতে পারেনা। পীটের গানের বর্গীকরণ কী হবে তা নিয়ে ভারতীয় শ্রোতাদের মধ্যে মতান্তর থাকতে পারে। তা কি লোকগান, না অনেক উচ্চ মাত্রার পরিস্রুত দার্শনিক বোধকে লোকসুর ও তদ্ভব প্রকাশশৈলির মাধ্যমে, পরিশীলনের সঙ্গে পরিবেশন করা। পশ্চিমের গানের ফোক বা কান্ট্রি বা এজাতীয় বর্গীকরনের সঙ্গে আমাদের লোকসঙ্গীতকে সমানুপাতিকভাবে স্থাপন করা যায়না। কারণ আমাদের লোকগানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অধ্যাত্ম বা ঐশী আবেগ দিয়ে মানুষের প্ররোচনা বা প্রবঞ্চনার কথা বলা হয় । সত্যি কথা বলতে কি সারা ভারতের কথা যদি ছেড়েও দিই, শুধু বাংলা লোকগানের যে ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্য রয়েছে তাকে পশ্চিমের লোকগানের সঙ্গে ঠিক সমান্তরালভাবে বিচার করা সমীচীন নয়। একালে আমাদের ভাষায় 'প্রতিবাদী' গানকে লোকগানের আঙ্গিকে পরিবেশন করার ধরনটি বেশ জনপ্রিয় । এই ধারাটি আমরা পশ্চিম থেকে পেয়েছি। অনুষঙ্গের যন্ত্রটি দোতারা হোক বা গিটার, গানটির পৌঁছোনোর জায়গাটি কিন্তু একই । শুনতে পাই, অনেক বাবা-মায়েরা বলছেন, ছোটোরা পীট সীগরের গানের মন দিয়ে শুনছে।কেউ হয়তো অবাকও হ'ন। কিন্তু আমি জানি, এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। ছোটদের শ্রবণজগতে পূর্বাগ্রহ খুব কম । তারা ভানরহিত সঙ্গীত ও তার বাণীকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে নিপুণভাবে অনুভব করতে পারে। যে জীবনদর্শন শুধু বইয়ের পাতায় নয়, অধ্যাপকের ভাষণে নয়, পণ্ডিতের বাগবিস্তারের মধ্যে নয়, গভীরভাবে শিকড় ছড়ায় অবাঙ্মানসগোচর হৃদকমলে, তাই তো সরস্বতীর শিল্প। তার মাহাত্ম্য প্রশ্নের ঊর্দ্ধে। আমার কাছে পীট এজন্যই একজন মহাত্মা শিল্পী । তাঁর মাহাত্ম্য 'লাল'গ্রস্ত হওয়ার বা নেশাগ্রস্ত না হওয়ার মধ্যে নয়। তিনি আজীবন খণ্ডসত্যের জগতের সঙ্গে সহবাস করেও সতত শাশ্বত সত্যের সন্ধান করেছেন, এজন্যই তিনি মানুষের প্রণম্য। এই গানটা আমার মতো অসংখ্য মানুষকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। প্রিয় শিল্পী জুডি কলিনস বলেন প্রতিটি গান তাঁর কাছে যেন ধ্যান। যখন তাঁর দৈবী সমর্পণ নিয়ে গানটি স্রষ্টা'কে শোনাচ্ছেন, তখন মনে হয় স্বামী হরিদাস যেন গান শোনাচ্ছেন তাঁর আরাধ্য দেবতাকে। যে দুনিয়ায় রাজা নেই, খুনি নেই, ধর্ষক নেই, ঈর্ষাপন্ন অন্ধকার থেকে বহু দূরে কোনও এক পৃথিবীতে ঘন্টাধ্বনির মতো বেজে যাচ্ছে, টু এভরিথিং টার্ন, টার্ন, টার্ন.... “.....সব ফেলে শেষে ফিরে গেলে যাও ফেরাতে যাবোনা আমরাও একদিন তোমার পিছনে যাবো ফুলের নতুন দেশ হাডসন ভ্যালির ঘন্টাঘর হলুদ গিটার থেকে সি-মেজর অন্তহীন শুনে যাওয়া ফেরো ফেরো ফেরো....শান্তিকল্যাণে ফিরে এসো...”

149

4

প্রবুদ্ধ

ঊর্বশী ও আরো কয়েকজন

ঊর্বশী ********** --ওঠ খানকীর মাইয়্যা‚ পড়ে পড়ে আরাম করচে দ্যাকোনি? সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চল্লো ঠাপনা কি তোর মায়ে দেবে রে রাঁড়ের বেটী.... বিশ্রী একটা চিৎকারে আতঙ্কিত চোখদুটো চমকে খুলে যায় রূপুর| তার সাথে পাছায় একটা তীব্র চিমটি‚ রক্ত বেরিয়ে এলো বুঝি| মাসীর পানজর্দা খাওয়া মুখের উগ্র গন্ধটা ধক করে সোজা মাথায় গিয়ে আঘাত করে| প্রায় নগ্ন দেহটাকে কোনোমতে সায়ায় জড়িয়ে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসে রূপু| সকালের রোদ চোখের ওপর চাবুক মারে| এক ঝটকায় ভোররাতে আসা গভীর ঘুমের আরামটা চিরে ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যায়| এইভাবেই রূপুর সকাল হয় রোজ| এইভাবেই রূপুকে রোজ মনে করিয়ে দেওয়া হয়‚ সকাল হোলো রে খানকী| এরপর সারাদিনে দশ থেকে বারোবার লোহার শলায় ফালাফালা হয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয় রূপু| গভীর রাতে জানলার ওপারে ঝুলে থাকা হলুদ মরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রোজই একবার বলে ‚ মা! তারপর ঘুম| তারপর আবার সকাল| সকালবেলায় কলতলাটা যেন নরক| এই বস্তির সবটাই নরক যদিও| তবু কলতলাটা যেন বড় বেশী নারকীয়| নারকীয় নয়‚ পার্থিব| পৃথিবীর সমস্ত ক্লেদ কেউ মাখিয়ে রেখে গেছে আলকাতরার বড়ো বড়ো পোঁচে| কেউ সম্পূর্ণ নগ্ন‚ বেশির ভাগ মেয়ের বুকের কাছে সায়াটা আলগোছে বাঁধা| যত তারা মাথার চুল‚ দাঁত‚বগল‚ বুকের খাঁজ আর যোনি পরিষ্কার করতে থাকে‚ তত যেন গলগল করে বেরিয়ে আসে পাঁক| এত ঘৃণা‚ এত গরল বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা যায়| যায়| বাঁচতে হয়| ছায়ামূর্তির মত কতগুলি পুরুষের অবয়ব ঘুরে বেড়ায় কলতলায়| কৃকলাসের মতো শীর্ণ‚ কোনোরকমে একটা জাঙিয়ায় ঢেকে রাখে নিজেদের মরে যাওয়া পৌরুষ| এই ক্লেদাক্ত কলতলায় জীবন্ত মানুষও ধরফড় করে মরে যাবে‚ এতো বিষ এখানকার হাওয়ায়| সেই বিষ নিতে নিতে‚ সেই বিষ পরিষ্কার করতে করতে এরাও আজ জীবন্মৃত| বালতি ভরে ভরে জল এনে দেয় মেয়েদের‚ পিঠ বা থাই ঘষে দেয় পরম নিরাসক্তিতে| শরীর জাগার তো কোনো প্রশ্নই নেই‚ ঘষা চোখে রোজকার দেখা মেয়েদের শরীরগুলো পাথরের টুকরোর মতো লাগে| রাতের বেলা এই রকমই এক শীর্ণ ভূত উঁকি দেয় রূপুর ঘরে| অসুস্থ চাঁদের আলোটা আড়াল করে দাঁড়ায় জানলার শিক ধরে| বিছানার এক কোণে সারা দুনিয়ার সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলে গিয়ে রূপুর রোগা নগ্ন শরীরটা উপুড় হয়ে পড়ে| এক সমুদ্র ঘুমের নীচে রূপু তখন ডুবে | পাছার যেখানে রোজ মাসী চিমটি কেটে ঘুম ভাঙ্গায় তাকে‚ তার ঠিক ওপরেই দাঁতের দাগ একটা‚ ভূতের মাথাটা সরে যেতে চাঁদের অসুস্থ আলোটা সেইখানেই এসে পড়ে| শিক গলে শরীরটাকে ঘরে ঢোকায় ভূত| জাঙ্গিয়াটাকে খুলে ফেলে| তারপর বিছানার সেই অন্ধকার কোণে গিয়ে রূপুর শরীরটাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে| রূপুর নড়ারও শক্তি নেই‚ তবু সে নড়ে ওঠে একবার| তারপর ঘুমিয়ে পড়ে| দুজনেই| শিথিল নিথর দুটো শরীরেরই একে অন্যের ছোঁয়া ভালো লাগে খুব| ------------ ওপরের গল্প লিখেছিলাম দুদিন আগে‚ সেটার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে| জাদপ্পুরে পড়ার সময় সেকেন্ড ইয়ারে আমি হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে যাই| ঐ বয়সে বিদ্রোহ আর কার বিপক্ষে করা যায়‚ বাবা মা ছাড়া| তো সেটাই শুরু হলো| প্রতিটা কথায় উল্টো সুর গাওয়া‚ খিঁচিয়ে জবাব দেওয়া| না বলে সারারাত বাড়ীর বাইরে কাটানো| মায়ের পা ভাঙ্গলো যোধপুর পার্কের মোড়ে গাড়ীর ধাক্কায়‚ শয্যাশায়ী মাকে বাবা আর ঠাকুমার হাতে ছেড়ে শুশনিয়া পাহাড়ে চলে যাওয়া| বাবার বারবার বারণ সত্বেও কলকাতার অন্ধকার জায়গাগুলোয় দিশাহারা ভাবে ঘুরে বেড়াতাম| টিবি হসপিটালের মাঠে গাঁজার আড্ডায়| সার্কুলার রেলের লাইন ধেরে হাঁটা| স্যালভেশন আর্মির গেস্ট হাউসে‚ যেটা গীটার হাশিশ আর আনপ্রোটেক্টেড সেক্সের ডিপো| ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে দালালের সাথে দেখতে যাওয়া‚ "কোথায় হয়"| গড়িয়ায় পাঁচ নম্বর বাস স্ট্যান্ডের কাছে একটা বস্তী ছিলো‚ সেখানে চলে যেতাম| বয়স কম আর রোগাপাতলা সাধাসিধা দেখতে হওয়ায় কোনো যায়গায় নিজেকে মানাতে অসুবিধা হতো না| তবে বাঙ্গালীর ছেলে‚ কাফকার সেই "Point of no return"-এর একচুল আগেই থেমে যেতাম| তাই গাঁজা‚ বেশ্যাসঙ্গ বা যৌনরোগ কোনোটাই হয় নি| বাবা এমনিতেই কম কথার মানুষ‚ সেসময় আরো বেশী চুপ করে থাকতো| সারারাত হস্টেলে মদ খেয়ে সকালে বাড়ী এসে দুপুর অবধি ঘুমোতাম| বাবা তখন রিটায়ার করে মধুসূদন মঞ্চে আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্রের অফিসে অ্যাডভাইসর‚ বিকেলবেলা থেকে রাত অবধি কাজ| আমার বাড়ী আসা অবধি অপেক্ষা করতো ঠিক| আমায় ঘুম থেকে তুলে টেবলে খাবার সাজিয়ে রাখতো| আর একটাই কথা বলেছিলো‚ তাও মাত্র একবার‚ "তোর যা ঠিক মনে হয় করিস| আমার বারণ করা কাজ‚ পরে বুঝবি কেন বারণ করছি|" শেষ বয়সে বরোদায় থাকার সময় এক বিকেলে এই নিয়ে কথা হচ্ছিলো| বাবা খুব শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতো| কোনো দিক থেকেই বাবার সাথে নিজেকে মেলাতে পারিনা| না কথায়‚ না ব্যাবহারে‚ না জীবনদর্শনে| বলেছিলো‚ "তখন যদি তোর কোনো বিচ্যুতি হতো‚ পারতি আজকের মতো এই জীবনচর্যা বজায় রাখতে? ক্ষতিটা তো তোর একার হতো না| মিতা আর সোনারও হতো" মৃত্যুর আগে তার প্রাণপ্রতিম নাতিকেও শেষ উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলো‚ "নিজে যা ভালো বুঝবি তাই করিস সোনা| তোর নিজের পথটাই ঠিক পথ‚ কারোর দেখিয়ে দেওয়া পথ নয়| কিন্তু পথ খোঁজার দায়িত্বও তোর| সে দায়িত্বটা পালন করিস"| সৌভাগ্যবশত‚ বোঁচুয়া অনেক বেশি দায়িত্বপরায়ণ| তার বাবার মতো মেকীবিদ্রোহী আর পলাতক নয়| ও‚ ঐ বিদ্রোহ বেশিদিন চলে নি| দ্রুত কুকুর আবার তার লেজ গুটিয়ে ঘরে ফিরে এসেছিলো| তখনও বাবা কিছু বলেনি| কিন্তু দুটো নীরবতার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ| গড়িয়ার ঐ বস্তির ওপরেই গল্পটা লেখা| সব চরিত্রগুলো-ই সামনাসামনি দেখা| শেষের দিকে "রোমান্টিকতা" নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি করেছেন‚ একজন (এখানকার নয়) ফোনে জানালেন‚ এমনটা হয়ই না| কিন্তু রোমান্টিক তো তত কিছু দেখাই নি‚ সব শেষ হয়ে যাওয়া একটা মেয়ে একটুখানির জন্যও তো কারোর স্পর্শে solace পেতে পারে‚ তা সে যতই অদ্ভুত কোনো প্রাণীর থেকেই হোক না কেন‚ এইটাই বলতে চেয়েছিলাম| এর মধ্যে রোমান্স বা প্রেম নেই‚ শুধু ভালো লাগা আছে| যাইহোক‚ প্রতিক্রিয়াগুলো পরে কাজে দেবে| এই পৃথিবীকে এখনো অনেক সাহিত্য দেওয়া বাকী আছে আমার| _______ শিবাংশুদা আমার লেখাটা নিয়ে বলেছেন‚ অনেক বড়ো পাওনা (যদিও লাস্টে একটু সুক্ষ্ম দিয়েছেন‚ উনার অননুকরণীয় স্টাইলে)| সমরেশ বসুর কথা লিখেছেন‚কমলকুমার‚ সন্দীপন‚ জ্যোতিরিন্দ্র‚ কিন্তু এই "জঁর"এর অন্যতম protagonistএর নাম নেন নি‚ মাণিক বন্দ্যো| সত্যি বলতে‚ আমার গল্পটায় "কৃকলাস" আর কলতলা এই দুটোকে এক জায়গায় আনার পেছনেও মাণিকেরই একটা গল্পেরই ছায়া| শ্যেনদৃষ্টি মাণিকেরও ছিলো‚ বিভূতিভূষণেরও| আবার বাবার কথায় আসি‚ এই দুজনের কথা একসাথে উঠলে বাবা বরাবর বিভূতিবাবুর দিকেই যেতো| সব ভাঙ্গচুরের পরেও শেষে একটা আলোর রেশ থাকা উচিৎ‚ সারাজীবন ধরে করা নানা লড়াইয়ের কথা ভেবে বাবা এটাই মনে করতো| চ্যাপলিনের ছবি তাই এতো পছন্দ ছিলো বাবার| "দেখবি‚ লোকটি সারা ছবিতে মার খেয়ে‚ না খেতে পেয়ে‚ অপমানে অভিমানে জর্জরিত হলেও শেষে মেরুদন্ড সোজা করে দর্শকের দিকে পেছন ফিরে কেমন বীরদর্পে হেঁটে যায়‚ দুনিয়াকে তার থোড়াই কেয়ার| এই মনোভাবটা চাই|" শিবাংশুদার লেখায় জোলা ও ফরাসী সাহিত্যের কথা এসেছে| হ্যাঁ‚ ফরাসী সাহিত্যের রিয়ালিজম তো যেকোনো সময়েই "জার্ক লিটরেচার"-এর গাইডবুক| জোলার সাথে কাফকা আর কাম্যুর নামও আসবে| বাবা অনেক বার কাম্যু পড়তে বারণ করতো‚ ওসব পড়ে নাকি বাবার সুইসাইডাল অনুভূতি জাগতো| কাফকার "Jackals and Arabs" পড়ে আমিও এক রাত জেগে ছিলাম মনে আছে‚ লাগছিলো জানলার বাইরে শেয়ালগুলো জিভ বার করে ঘুরছে| এটা আমার আঁতলেমো নয়‚ এটা কাফকার লেখার গুণ‚ বা দোষ| তবে ফরাসী সাহিত্যের‚ ইন ফ্যাক্ট‚ সমগ্র ফরাসী চরিত্রেরই‚ সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার প্যাশন| তাঅভের্নিয়েরের The Bait" বলে একটা সিনেমা দেখেছিলাম‚ একটা কিশোরী মেয়ে আর তার দুই ছেলে বন্ধুর ওপর| সে মেয়েটা‚ বয়স আঠারোর নীচেই হবে‚ নিজের প্যাশন চরিতার্থ করতে যে কি করতে লাগলো সে বসে দেখা যায় না| এতো প্যাশন আমার অন্তত হজমের বাইরে| অনিয়ন্ত্রিত প্যাশনসমৃদ্ধ ফরাসী সাহিত্যের চেয়ে আরো শক্ত কঠিন জমির ওপর দাঁড়িয়ে ল্যাটিন সাহিত্য| সেখানে ইউএসপি হলো নিরাসক্তি‚ নির্লিপ্ততা| রকের ভাষায় ধোর বাল অ্যাটিটুড| মার্কেজের একটা জার্নালিস্টিক পীস আছে (ওঁর সব লেখাই জার্নাল অবশ্য) ‚ আলিয়েন নামে| একটি কিউবান রিফিউজী শিশুর কথা| একেবারে বরফকঠিন বিবরণ‚ লেখকের যেন কিছুই যায় আসে না‚ শুধু দেখা আর লেখাইই তার কাজ| বুনুয়েল‚ কি অত্যাচার নিজের ছবির চরিত্রগুলির ওপর‚ এমনকি ছবির জানোয়ারগুলির ওপরও| কোয়েলহোতেও লাইনে লাইনে সেই নিরাসক্তি| রিয়ালিজম যদি শিখতে হয়‚ তো ল্যাটিন সাহিত্য থেকে| তবে ঐ বরফশীতলতাকে সহ্য করার ধক চাই| ------- আবার আমার গল্পটায় আসি| গল্পটা গৌণ‚ তার বিষয়টা‚ rather| একজন গণিকার জীবন নিয়ে লিখতে গেলে তিন রকম সম্ভাবনা দিয়ে গল্পের শেষ হতে পারে: ১) সে ঐ জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বামীর ঘরে বা পিতৃগৃহে সুখে থাকলো ২) যেমন চলছিলো তেমনিই চলতে থাকলো ৩) যেমন চলছিলো চললো‚ শুধু মাঝে মাঝে তার জীবনেও ভালো লাগার মুহুর্ত তৈরী হতে থাকলো| এবার মাণিক বা সমরেশ হলে সম্ভবত: দুয়েতেই আটকে যেতেন‚ এক নম্বর অপশনটাকে দেখতেনই না| বিভূতিবাবু কিন্তু তিন তো বটেই‚ এমনকি প্রায়-অসম্ভব এক নম্বর অপশনটাকেও পরম মমতায় গ্রহণ করতেন| নইলে অথর বা কাঠ-বিক্রী বুড়ো লেখা হতো না‚ যেখানে গাটারের মধ্যেও সুর্যোদয় হয়| গাটার বলতে মনে এলো| নন্দনের অন্ধকার কোণে বসে এক নি:শ্বাসে দেখেছিলাম "Le joueur de violon (The violin player") নামে একটা ছবি| এক বেহালাবাদকের জীবনকহিনী| শেষের দিকে কেউ তার বেহালাটাকে ভেঙ্গে দেয়| শেষ সিকোয়েন্সে সে একটা নৌকোয় চড়ে প্যারিসের আন্ডারগ্রাউন্ড বিশাল নর্দমায় ভেসে যায়‚ আর এক অদৃশ্য ভায়োলিন বাজাতে থাকে হাতের ভঙ্গিমায়| গাটারের ধারে ধারে গৃহহীন অসংখ্য পরিবার উঠে দাঁড়িয়ে সেই বাদকের দিকে দেখতে থাকে‚ তাদের মুখের ওপর ক্যামেরা ফ্লোট করার সময় বোঝা যায় তারাও সেই অদৃশ্য ভায়োলিনের সুর শুনতে পাচ্চ্ছে| সে এক অপার্থিব দৃশ্য‚ আর যেকোনো ক্ষতবিক্ষত মনও সে দৃশ্য দেখে একটুখানির জন্যও solace পাবে‚ আমার গল্পের রূপু-র মতো| --------- এবার গল্পটাকে‚ মানে গল্পের বিষয়টাকে‚ একটা অন্য অ্যাঙ্গল থেকে দেখার চেষ্টা করা হলো| একজন লিখেছেন‚ এখানকারই একজন‚ "..... লেখাটি প্রধানত রুপুর প্রতি সহানুভূতিশীল। ঘটনাচক্রে তোমার চরিত্রটি এক রূপোপজীবীর। কিন্তু এই একই কষ্ট ষন্ত্রণা যে কোনও শ্রমদাসের হতে পারত। শরীরের মনের কষ্ট সব শ্রমদাসের হয়। সবার মাসি থাকে। তার নাম ইটভাটা মালিকও হতে পারে। কলতলা হতে পারে পাথরখাদানও। তাই ‘পৃথিবীর সমস্ত ক্লেদ’ আরও অন্য ভাবেও অনেকে অনুভব করেন। &lt;...... শুধু প্রসঙ্গটা একটু বলে যাই—তোমার চরিত্র প্রধানত শরীরজীবী নন। তিনি কোনও একটা এমন অনুভবের বেসাতি করেন, যা কাম্য রমণীয় এবং লালিত্যময়। তাকে ক্লেদাক্ত করতে গেলে আরো অন্য পথ ভাবতে হবে।" এই ছোট্টো মেসেজটা একটা প্যান্ডোরার বক্সের মতো| অনেক কথা লুকিয়ে আছে অল্প কথায়| ১| আমি নিজে চাকরীসূত্রে শ্রমিকদের খুব কাছের মানুষ| "যেকোনো শ্রমদান" আর দেহব্যবসা (অন্য শব্দও ব্যবহার করা যেতো) এক গোত্রের নয়‚ অনেক মিল থাকলেও| দেহব্যবসায় যাঁরা রয়েছেন‚ সেই মেয়েদের সামাজিক অবস্থান অন্য শ্রমজীবী মানুষের চেয়ে অনেক অনেক নীচে| সেটা সমাজের দায়‚ সমাজ বদলালে হয়তো দেখার চোখও বদলাবে‚ কিন্তু সমাজের আরো বেশী দায় এইখানে‚ কেন মেয়েদের এই পেশায় আসতে হবে? যে বালিখাদানে কাজ করছে‚ তার শ্রম তো কোনো কনস্ত্রাক্টিভ কাজে লাগছে‚ এই পেশার ডেলিভারেবলস কি? আমার যেটুকু দেখা‚ এই পেশা না থাকলেও দুনিয়ার কিছু ক্ষতি হতো না| এতগুলি ম্যানপাওয়ারকে অন্য কাজে লাগানো যেতো| তাই আমি এই পেশা সম্পূর্ণ বন্ধের পক্ষে| সমাজের দায় এই মেয়েগুলি ও তাদের পরিবারের গ্রাসাচ্ছদনের অন্য কোনো সুযোগ জোগানোর| এই পেশার কোনো দরকারই নেই| তাই অন্য শ্রমের ক্লেদ ঐ কলতলার কাছে কিছুই না| ২| আমি রূপুর প্রতি সহানুভূতিশীল অবশ্যই‚ কারণ রূপুকে আমি দেখেছি‚ তার জীবনযাপন দেখেছি| কিন্তু তার পেশায় কোনো রমণীয়তা বা লালিত্য আমার চোখে পড়েনি| দারিদ্র্যের romanticisation হয়‚ বেশ্যাবৃত্তির হয় না‚ কারণ ওপরেই লিখেছি| ঊর্বশী মেনকা রম্ভা অনেক কবিতার জন্ম দিতে পারে‚ কিন্তু বাস্তবের তারা শুধুই ঘৃণা আর হতাশা নিয়ে বাঁচে| রূপু নামক গণিকা--- "তিনি কোনও একটা এমন অনুভবের বেসাতি করেন, যা কাম্য রমণীয় এবং লালিত্যময়। তাকে ক্লেদাক্ত করতে গেলে আরো অন্য পথ ভাবতে হবে।" এই পথ আমার অজানা‚ তাই অপেক্ষা করে আছি কখন কেউ সেই পথের গল্প লিখবেন|

240

12

শিবাংশু

লুট কর মেরা জঁহা

রাতটা ছিলো একত্রিশে ডিসেম্বরের।বহু বহু দিন হলো। রাতের বাসে দিল্লি থেকে হরিদ্বার যাচ্ছি। দিল্লি ছেড়েছে রাত ন'টা। ঘুরে ঘুরে ঘাজিয়াবাদ পৌঁছোতে সাড়ে দশটা। পারা নামতে শুরু করে দিয়েছে চার-পাঁচ। মেরঠ পেরিয়ে গেলো প্রায় একটা। ধীরে ধীরে চলছিলো গাড়ি। কুয়াশার জন্য। বাসের ভিতর-বাহির নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। লোকজন কম্বল মুড়ি দিয়ে অন্যলোকে। বাসটা ধীরে হতে হতে দাঁড়িয়েই গেলো শেষ পর্যন্ত। জায়গাটা একেবারেই সুবিধের নয়। উত্তর-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বদনাম বস্তি। জেগেই ছিলুম। অনন্ত চরাচর অন্ধকারে ভেসে যাচ্ছে। ফিকে একটা চাঁদ। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আলো দেবার মুরোদ নেই। জানালা দিয়ে উঁকি দিই। কিস্যু দেখা যাচ্ছেনা। ঠাণ্ডায় হাত-পা জমে গেছে। নামা দরকার। নেমেও আসি। স্মার্ট লোকেরা এমন সময় সিগারেট ধরায়। আমি আনস্মার্ট। রাস্তার কিনারে ভিজে সপসপে ঘাস। চারদিকে অস্ফুট টপ টপ করে একটা আওয়াজের ছন্দ কানে আসছে। দেখা যাচ্ছেনা কিছুই। একটা বছর ফুরিয়ে গেলো। আরেকটা আসছে আঁধার রাতে একলা পাগলের মতো।কানের কাছে ফিস ফিস করে কে বলে উঠলো, " সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো রাত্রি নেমে এলো..." -আরে, তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে... পর্ণা বলে, এতো অন্ধকার আলোর মতো চোখ ঝলসে দেয়। ঘুম ভেঙে গেলো... ড্রাইভারসাহেব কে শুধাই, রোক দিয়ে কিঁউ? -কুছ নজর নহি আ রহি হ্যাঁয়...সামনে কি শিশা ধোনা পড়েগা... -দের হোগা..? -নহি, পাঁচ মিনট.. পর্ণাকে বলি, ভিতরে যাও.. ঠাণ্ডা লেগে যাবে.. কিছু না বলে হাতটা এগিয়ে দেয়.. -আরে দস্তানা খুলেছো কেন? -হাত ধরবো বলে... কুয়াশার মধ্যে সেই গাছপালা ছড়ানো অনন্ত প্রান্তরে অনেকটা দূরে কোথাও একটা টিমটিমে আলো। মনে হলো একটা ধাবা হতে পারে। এখনও মানুষ জেগে রয়েছে। ভাবা যায়না... বিস্ময় এখানেই শেষ নয়। ওখান থেকে স্তব্ধ হিমেল বাতাসে ভেসে এলো একটা গান। শুনছে কেউ। লতাজির গলায় শচীনকত্তা। সেই কোন ১৯৫১র কচি গলায় গেয়েছিলেন লতাজি। নাহ, সেই ভার্সনটা নয়। এটা ১৯৭৬রে মুকেশজির সঙ্গে কানাডা সফরের সময় গাওয়া গান। মুকেশজি সেখান থেকে আর দেশে ফেরেননি। শরীরটা এসেছিলো শুধু। এই গানটি দিয়ে লতাজি তাঁর প্রিয় মুকেশভাইয়াকে তর্পণ করেছিলেন। এই গায়ন অনেক পরিণত, পরিশীলিত। সহজতম ফর্ম্যাটে ফিলমি ঘজল। মতলা, কাফিয়া, রদীফ সব লক্ষণই রেখেছিলেন সাহির সাহেব। ঐ নিকষ কালো চরাচরে লতাজির গলায় তার সপ্তকে "লুট কর মেরা জঁহা, ছুপ গয়ে হো তুম কঁহা?" রবীন্দ্রসঙ্গীত ভাঙা মূর্চ্ছনা বড়োকত্তার। এই সুরের কাছে মৃত্যু করজোড়ে ক্ষমা চায়। বলে, ভুল হয়ে গেছে বস.... হাতটা আঁকড়ে ধরে পর্ণা। বলেনা কিছুই। বলা যায়না। সত্যিকারের গান হয়ে উঠলে তা একান্ত ব্যক্তিগত সুখ হয়ে যায়। কাউকে কিস্যু বলা যায়না। ড্রাইভার ডাকে। যেতে হবে, দূরাগত ধ্বনি ভেসে আসে... "দিল কো ইয়েহ ক্যা হো গয়া, কো'ই শয় ভাতী নহী, লুট কর মেরা জঁহা..." বিলকুল লুটা গয়ে হম লোগ হুজুরে আলি, কুছ তো রহম করেঁ ...

212

15

শিবাংশু

'পারিবারিক' কারবার

বিষয়টা এতোবার আলোচনা হয়েছে যে তা নিয়ে কিছু আলোচনা পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু হবে না। তাই আমি তার মধ্যে যাচ্ছিনা। মানে মজলিশ বা বাংলা-আড্ডা, জমায়তের যে নামই হোক না কেন, সেটার প্রকৃত মেজাজটা কী? অনেক পুরোনো নাম এখন এখানে দেখা যায়না। কিছু নতুন নাম এসেছে। কিন্তু মেজাজটা বদলায়নি। এই পরিসরটি আদতে কিছু ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার বৈঠকখানা। এটাই এর USP। নৈর্ব্যক্তিক মেধাচর্চা নয়, ব্যক্তিকস্তরের অনুভব বিনিময়ের ঐতিহ্যটি এর সঙ্গে ওতপ্রোত। ব্লগে অবশ্য সৃজনশীল নানা প্রয়াস ধরা থাকে। সেটা যেকোনও ওয়েব পত্রিকার মতো'ই' 'স্বাভাবিক'। কিন্তু আড্ডার পাতাটা অন্যরকম। আমি অনেক ওয়েবপাতায় যাওয়া আসা করি, কিন্তু অন্য কোথাও এই উষ্ণতাটি দেখিনি। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কিছু প্রিয়জন মিলেমিশে পরস্পর ভাবভালোবাসা বিনিময় করছেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এর মূল্য অনেক। যেসব জায়গায় তথাকথিত সেরিব্রাল আবহটি খুব প্রখর, সেটাই আমার একমাত্র গন্তব্য হওয়া উচিত, এমত মোহ আমার নেই। যদিও সেসব জায়গায় আমার নিয়মিত গতায়াত আছে। তর্ক করে যেহেতু কাউকেই স্বমতে আনা যায়না, তাই নিজেকেই নিজের আয়ত্বে রাখার কঠিনতর কাজটি নিয়ে থাকতে স্বচ্ছন্দবোধ করি। পূর্বতন মজলিশ বা বর্তমান আড্ডাঘর প্রসঙ্গে গীতার শ্লোকটিই মনে পড়ে, "স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়/ পরোধর্ম ভয়াবহ।" প্রবুদ্ধের লেখাটি পড়লুম। সে সম্বন্ধে কিছু বলার আগে বলেনি সে যে আমার ভাতৃপ্রতিম এক প্রিয়জন সে ব্যাপারটা এ প্রসঙ্গে আমল পাচ্ছেনা। যেকোনও লেখার মধ্যেই একটা মেসেজ থাকে। আবার এ মতটিও রয়েছে সব লেখায় যে একটা মেসেজ থাকবেই তার বাধ্যবাধকতা নেই। কে কোন মতটি মানবে, সেটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় পৃথিবীর সর্বত্র মূলস্রোতের লেখালেখি মেসেজ ছাড়া হয়না। আলোচ্য লেখাটির গড়ন আমার মূলস্রোত অনুসারী মনে হয়েছে, তাই ধরে নিচ্ছি এর মধ্যে একটি মেসেজ দেবার প্রয়াস হয়েছে। সেটি কী? আমার মনে হলো সামাজিকভাবে মলিন, ক্লিষ্ট জীবনযাপন করলেও মানুষের ভিতরের কিছু চিরন্তন আকাঙ্খা, আকুলতার মৃত্যু হয়না। লেখক হয়তো এই মেসেজটিই দিতে চেয়েছেন। এর মধ্যে অবশ্য কোনও অভিনবত্ব নেই, কিন্তু সত্য রয়েছে। এবার আসি লিখনশৈলী প্রসঙ্গে। সেখানে সচেতনভাবে কিছু জার্ক দেবার চেষ্টা হয়েছে। এই টেকনিকটি আমরা উনিশ শতকে দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসি ন্যাচরালিস্ট সাহিত্য ধারার অনুগামীদের মধ্যে প্রথম দেখেছি। তাঁদের মধ্যে একজন প্রধান লেখক এমিল জোলা এ নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। পরবর্তীকালের ফরাসি ডাডাবাদীদের কাজে বা হালের মার্কিন পাংকসাহিত্যের মধ্যেও এই জার্ক দেবার পরম্পরাটিকে খুব কার্যকরী টেকনিক হিসেবে ধরা হয়। আমাদের ভাষায় 'বৈদ্যুতিক ছুতার' এই ধরনের ধারা যখন শুরু করেছিলেন, তখন বেশ কিছু ধীমান ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় একাই হয়ে যান। সুবিমল বসাক ছাড়া আর বিশেষ কেউ সৃজনশীল থাকেননি। অন্যদিকে মূলধারার লেখালেখিতে প্রধানত সমরেশ বসু, সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বা কমলকুমার মজুমদারের মধ্যে এই টেকনিক প্রয়োগের প্রয়াস আমরা দেখেছি। বিটি রোডের ধারে থেকে যুগ যুগ জীয়ে, সর্বত্রই সমরেশ এই অস্ত্রটি প্রয়োগ করেছিলেন। একবার তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার সময় আমায় বলেছিলেন যে তিনি এই প্রকরণটি ম্যাক্সিম গর্কি ও দস্তয়েভস্কির অনুসরণে করে থাকেন। আমি এ ব্যাপারে আমার ভিন্নমত তাঁকে জানাই। কারণ গর্কি বা দস্তয়েভস্কির সঙ্গে ফরাসি ন্যাচরলিস্টদের সাহিত্যচর্চার তুলনা করা আমার বাতুলতা মনে হয়। গণিকাপল্লীর 'বাস্তবতা' নিয়ে বাংলায় বহুকিছু লেখা আছে। সমরেশই তো 'যুগ যুগ জীয়ে'তে এনিয়ে দীর্ঘ গ্র্যাফিক লেখাজোখা করেছেন। সুনীল করেছেন, কমলকুমার করেছেন, একটু অন্যভাবে সন্দীপনও করেছেন। কিন্তু আমাদের ভাষায় শেষ পর্যন্ত এই ধরনের লেখার কোনও জঁর তৈরি হয়নি। ফরাসিভাষায় যেমন রয়েছে। প্রবুদ্ধ যদি বাংলা-আড্ডার নিস্তরঙ্গ 'পারিবারিক' আবহে ঝাঁকুনি দেবার জন্যই এই সংক্ষিপ্ত লেখাটি লিখে থাকেন, তবে তিনি স্বাগত। :-)

225

6

জল

কিসসা জিন্দেগী ক্যা

নিশুতি রাতে ঘড়ির কাঁটার টিক টিক চলন আর নিজের শ্বাসঃপ্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই| নাইট লাইটের আলোয় ঘরটা আলো-ছায়াময়| রাত এখন কত ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না মনোরমার| শরীর জুড়ে একটা আলিস্যি| রাতে শুতে যাবার আগে রোজকার মত একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছে‚ তবু চোখে ঘুম নেই| নির্ঘুম রাতে মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় ঘুণপোকার মত কতশত চিন্তা| এই যে সংহিতার ফিরে আসা‚ ফিরে এসেছে দেখেই খুশিই হয়েছিল মনোরমা| মেয়েটার তবে মতি ফিরেছে| কিন্তু যেভাবে ফিরে এসেছে সেটা তো চায়নি মনোরমা| প্রতি মুহুর্তে মেয়েটা একটু একটু করে ভালোবাসার কষ্টে মরছে| মেনে নিয়েছিল সে‚ সবকিছু মেনে নিয়েছিল মনোরমা| বিয়ে না করে ওদের একসাথে থাকাটা পছন্দ না হলেও তো মেনে নিয়েছিল| প্রথম প্রথম ভালো ছিল সংহিতা| দেবশঙ্করের ইচ্ছেতেই হয়ত জিম জয়েন করেছিল| এর আগেও তো মনোরমা নিজেই কতবার বলেছিল‚ জিম জয়েন করার কথা‚ একটু সাজগোজ করার কথা| ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে সংহিতা| কিন্তু দেবশঙ্করের সাথে থাকতে থাকতেই দেবশঙ্করের মতানুযায়ী নিজেকে বদলে ফেলছিল সংহিতা| বদলটা বেশ ভালো লাগছিল‚ যদিও ভিতরে ভিতরে একটা চোরা কাঁটার দংশন টের পাচ্ছিল মনোরমা| একটা চোরা অভিমান মনের ওপরে সরের মত আস্তরণ ফেলেছিল| পরের ছেলে এত প্রিয় হয়ে উঠল যে‚ সে যেভাবে নাচাচ্ছে সেভাবেই নাচছিল সংহিতা| তবু ভালো তো ছিল| তারপর কি এমন ঘটল যে সংহিতা রাতের পোশাক পরেই ফিরে এল এই বাড়িতে? দেবশঙ্করের জীবনে কি নতুন কেউ এসে গেছে? আর কি ভালোবাসে না সে সংহিতাকে? এইসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল| আর তারসাথেই ঘুণপোকার মত মাথার ভিতরে উথলে উঠছিল ঠিক তেত্রিশ বছর আগের স্মৃতি| ঠিক একইভাবে সেও একদিন ফিরে এসেছিল গৌতমের ঘর ছেড়ে‚ কোলে তখন সংহিতা আর রুপসিতা তখন বছর পাঁচেকের| দোষ ছিল তার‚ মস্ত বড় দোষ| পরপর দুটি মেয়েকে জন্ম দেবার দোষ| মেয়ে মাটির ঢিপি‚ তাকে জন্ম দিলে তো শাস্তি পেতেই হয়| লম্বা‚ ফর্সা‚ উচ্চশিক্ষিত‚ সফল চাকুরে গৌতমের মা তার মত মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে বরপণ উসুল করেছিল ভালোমত| মনোরমার মুখ-চোখ কাটা কাটা হলেও গায়ের রঙটি পেয়েছিল মায়ের মত কালো ‚ মা বলত বার্নিস| তার ওপর উচ্চতাও গড়পড়তা বেশি বলেই বর জুটছিল না| তাই গৌতমের মা ঝোপ বুঝে কোপটা মেরেছিল| কি লাভ হল অত বরপণ দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে? সেই তো ফিরে আসতেই হল| বরপণ দিয়ে বিয়েটা করতে চায়নি মনোরমা| শুধুমাত্র একটা বিয়ের জন্য বাপ-মাকে কাঙাল করে দেবে এটা মেনে নেওয়া বেশ কঠিন ছিল| আজকের দিন হলে হয়ত রুখে দাঁড়ানোটা সহজ হত‚ কিন্তু তখন আত্মীয়-স্বজন যেভাবে উঠে-পড়ে মা'কে কথা শোনাতে শুরু করেছিল‚ তাতে হাতের ওপর হাত রেখে বিয়েতে রাজী হওয়া ছাড়া তেমন কিছু মনেও আসেনি| সংহিতা হবার পরপরই শ্বাশুড়ি আর গৌতমের ব্যবহার বদলে গেছিল| শ্বাশুড়িকে নিয়ে ভাবেনি সে| আগেকার দিনের মানুষ‚ মনের মধ্যে ভরে দেওয়া চিন্তা-ভাবনা নিয়ে চলছিলেন| কিন্তু গৌতম সে তো হাল আমলের লেখাপড়া জানা লোক| সে কিভাবে দুই সন্তানের দায় এককভাবে তার ওপর চাপাতে পারে ভাবতেই পারেনি মনোরমা| সদ্যজাত মেয়েকে কোলে করা তো দুর‚ ঘরেই ঢুকত না| মা-ছেলে একরকম তাকে একঘরে করে দিয়েছিল| যে রুপসিকে এত ভালোবাসত‚ তাকেও কাছে ডাকত না| ছেলেমানুষ মেয়ে বুঝত না‚ থেকে থেকেই বাপের কাছে ঘেঁষতে চাইত| কিন্তু গৌতম তাকে পাত্তা দিত না‚ আগের মত কোলের ওপর তুলে চুমু খেত না‚ আদর করত না‚ আবার যে খেদিয়ে দিত তাও না| রুপসি একদিন কিভাবে যেন বুঝে গেল বাবা নামক মানুষটা তাকে পছন্দ করছে না| একটু একটু করে কিভাবে যে ঐটুকু বাচ্চা নিজের মনের কষ্টটাকে জয় করে নিল আজও সেটা অবাক করে| এসব সইয়েই তো ছিল দেড়টা বছর বাইরের লোকের মত| কথা বলার অনেক চেষ্টা করেছিল গৌতমের সাথে| ফিরত এত রাতে আর বেরিয়ে যেত এত সকালে যে দেখাই হত না| তারপর একদিন নিজে এসেই কথা বলল গৌতম| 'মা চাইছেন আমি আর একটা বিয়ে করি?' 'তুমি কি চাইছ?' 'মা যা চাইছেন'| 'তোমার নিজের কোন চাহিদা নেই?' 'না‚ নেই| মা চেয়েছিলেন তাই তোমায় বিয়ে করেছি| মা এখন চাইছেন আবার বিয়ে করি'| 'শুধু মা কেন‚ আসলে তুমিও চাইছ আরও একটা বিয়ে করতে|' চিড়বিড়িয়ে উঠেছিল মনোরমা| 'যা মনে কর|' কোনো মানুষ কি এতটা নিস্পৃহ হতে পারে| শুধু মা চাইছেন বলেই বিয়ে করেছিল‚ না হলে করত না| মা চাইছে বলে আবার একটা বিয়ে| 'আমার দোষটা কোথায়?' 'তুমি পুত্রসন্তানের মা হতে অপারগ তাই|' 'তা সে দায় কি আমার?' অপর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর তখনি আসে না| সময় বয়ে চলে| তারপর বলে‚ 'মায়ের মতে তুমি পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে পারবে না|' 'তা যাকে বিয়ে করবে সে পারবে পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে?' 'জানি না| কিন্তু মা চান‚ আর তুমি ভালো মত জান‚ মা যেটা চান আমি সেটাই করি| তাই তুমি এককালীন খোরপোশ নিয়ে আমাকে মুক্তি দাও| মিউচুয়াল সেপারেশনটা হয়ে যাবে|' 'আর মেয়েরা? তাদের দায়িত্ব কে নেবে?' 'আমি নেব না| নিতে পারতাম কিন্তু‚ মা চাইছেন না তাঁর কোনো নাতনীকে নিতে| আমি কি করব বলো| তুমি নিয়ে যাও|' 'আমি কোথায় যাব? মায়ের কাছে? এত বরপণ নিয়ে বিয়ে করলে আর এখন বলছ চলে যেতে| সেপারেশন দিয়ে দিতে| এত সহজে আমি চলে যাব‚ আমি ছেড়ে দেব তোমাদের?' 'কেন শুধু শুধু মুখে কালি মাখতে চাইছ?' ঠান্ডা গলা থেকে যেন শব্দগুলো ঝরে পড়ে| চমকে ওঠে মনোরমা| কি বলতে চাইছে গৌতম? কিসের কালি? কোন কালি? অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে| 'নিজের আর মেয়েদের ভালো চাইলে ঝামেলা পাকিও না| আমার কিন্তু তোমাকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করতে বেশি সময় লাগবে না|' কথা হারিয়ে ফেলেছিল মনোরমা| গৌতম এত নীচ কোনদিন তো ধারনাই করতে পারেনি| অথচ মন-প্রাণ দিয়ে এই মানুষটাকেই ভালোবেসেছিল| 'দরজা খোল দিদি‚ সই-এর বড্ড জ্বর| একটা ওষুধ দে|'| ছিঁড়ে যায় চিন্তাসূত্র সুরমার দরজা ধাক্কানিতে| ধড়মড় করে উঠে বসে মনোরমা| মেয়েটার জ্বর| হন্তদন্ত হয়ে ড্রেসিং টেবলের ড্রয়ারটা খুলে একটা প্যারাসিটামল বার করে নিয়ে দরজাটা খুলে দেয়| 'কত জ্বর দেখেছিস?' 'জ্বরটা ওঠা নামা করছে| এখন একশ দুই য়ের কাছাকাছি| জলপট্টি দিচ্ছিলাম| ভাবলাম কমে যাবে| কমেও গেছিল| কিন্তু আবার এখন বেড়েছে| তাই ভাবলাম ওষুধটা খাইয়ে দি| তুই শুয়ে পড়| আর কাঁদছিস কেন? সই ভালো হয়ে যাবে|' বলে সুরমা নিজের ঘরের দিকে চলে যায়| মনোরমা চোখের কোনে হাত দিয়ে দেখে কখন যেন চোখ বেয়ে জল গড়িয়েছে| তেত্রিশ বছরেও শুকিয়ে যায়নি কষ্টের ধারাস্রোত| .. ক্রমহ্স|

343

21

Ranjan Roy

আলো-অন্ধকারে যাই

শেষ দিন।অদ্যই শেষ রজনী। রাত্রে ক্যাম্প ফায়ার। কালকে শুধু ইন্টারফে্স- ভ্যালেডিকশন, বিদায় নেয়া, ফিরে চলো আজ আপন ঘরে-- ইত্যাদি। সবাই সময়মত এসেছে। ওয়ালিয়া , থুড়ি অ্যানাকোন্ডা, আজ আবার আধশোয়া হয়ে শেষনাগের শয্যায়। ও কি বুঝতে পেরেছে যে বাবু হরিদাস পাল আজ ওকে ঝাড়বে বলে কোমর কষে এসেচে? সবাই উশখুশ করচে, জয়ন্ত সবার ফর্মগুলো নিয়ে দেখচে যে কোন ডেটা বাদ পড়েছে কি না! হরিদাস পালের গলা শুকিয়ে গেছে। পেটের মধ্যে এক ডজন ইঁদুরের ছুটোছুটি। পর্দা ওঠার আগে মেক আপ নিয়ে উইংসের মধ্যে দাঁড়িয়ে যেমন মনে হয় আর কি! আর কত দেরি করবে হরিদাস পাল?---- গুরু, হো যা শুরু! কোন স্টার্টার নেই, নিজেই নিজেকে স্টার্ট দাও। রেডি, অন ইয়োর মার্ক, সেট তো অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, এবার--গো! আরে, কি হল? গো- ইন্ডিগো-গো! ---" দোস্তোঁ, আমার কিছু বলার ছিল। সময় বেশি নেই, আপনাদের সবার মনোযোগ আশা করতে পারি কি? বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না। বেশ। গতকাল আমাদের মেন্টর ওয়ালিয়া সাহেব এই ক্লাসরুমে আমার সম্বন্ধে কিছু উক্তি, কিছু বক্তব্য রেখেছেন। সেটা ওনার প্রেরোগেটিভ। কিন্তু সেগুলি সত্যি হলে বলার কিছু ছিল না। আমি কাল সারারাত ওনার বক্তব্য, তথ্য, যুক্তি নিয়ে অনেক ভেবেছি। না, আমার মনে হয় নি উনি যা যা বলছিলেন সেগুলো নির্বিবাদ তথ্যের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। "দেখুন, যিনি আমার ভগ্নিপতি তিনি আমাকে শ্যালক সম্বোধনে আপ্যায়িত করতেই পারেন, আমি আহ্লাদে গলে যাবো। কিন্তু তিনি যদি আমার বোনকে বিয়ে না করে থাকেন তাহলে আমি কথাটাকে গালাগাল অর্থেই নেব। উনি এই টি-মেথডের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন যে কারো সম্বন্ধে কিছু ফিডব্যাক দিতে হলে তা ইম্প্রেসনিস্টিক না হয়ে ডেটা বেসড হতে হবে। কিন্তু উনি কি করেছেন? আমি দেখাচ্ছি যে আমার সম্বন্ধে ওনার অভিযোগগুলো সব মিথ্যে, আদৌ এ কদিনের ডেটা ওনার বক্তব্যকে সাপোর্ট করে না। "প্রথম, আমি সবসময় নিজেকে ফোকাসে রাখার চেষ্টা করি। তাই সেদিন ওনাকে দেখিয়ে জলের বোতলগুলো ভরে রাখছিলাম। আশ্চর্য্য? আমি গ্রুপ-ফিলিং থেকে ওই কাজটা করলাম তাতেও দোষ? আপনারাই বিচার করুন। "দ্বিতীয়, আমি জয়ন্তকে চোখের জল ফেলতে দেখে রুমাল এগিয়ে দিলাম তাতেও উনি আমার ভন্ডামি দেখতে পেলেন! আমি মশাই রুমাল-টুমাল বেশি ব্যবহার করিনা। গতবার বেসিক ল্যাবের কোর্স করার সময় মেন্টর শিবশংকর সিং কে দেখেছিলাম একটি মেয়ের চোখ মোছার জন্যে রুমাল এগিয়ে দিতে। আমি ভেবেছি সেটাই পলিটিক্যালি করেক্ট বিহেভিয়ার। এখন আমার মেন্টর, যিনি গোটা ওয়ার্কশপের ডীন বটেন, বলছেন সেটা ভুল! আমি সবাইকে আমার তুলনায় দুর্বল ভাবি? যাচ্চলে! "তৃতীয়, আমার বিনীতাকে হাগ্ করার বডিল্যাংগোয়েজে নাকি আমার মেয়েদের প্রতি পেট্রোনাইজেশন প্রকাশ পেয়েছে! আমি নাকি সেই সময় ওর পিঠে যেভাবে হাত বোলাচ্ছিলাম---! মাইরি,এমন গাঁজাখুরি অ্যানালিসিস বাপের জন্মে শুনি নি। হতে পারে উনি ভারতবর্ষের নামকরা বিহেভিয়ার স্পেশালিস্ট, কিন্তু আমিও নাটকের সঙ্গে যুক্ত। হ্যান্ড সিগন্যাল, ফুট সিগন্যাল-- আমরাও কিছু কিছু শিখেছি। আমাকে একটু ডেমো দিতে অনুমতি দিন। ( অ্যানাকোন্ডার চ্যাটালো মাথা থেকে দুটো কুতকুতে চোখ নির্নিমিষে আমাকে দেখতে থাকে।) বিনীতা, তুমি গোটা ওয়ার্কশপে আমাকে অনেকবার সাহায্য করেছ, আজ শেষবারের মত একটু সাহায্য কর। উঠে দাঁড়াও।" বিনীতা শুভা মুদগল ভূতগ্রস্তের মত উঠে দাঁড়ায়। হরিদাস পাল মাপা পায়ে ওর দিকে এগিয়ে যায়, ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ওর উন্নত পাঞ্জাবী পুষ্ট বুক হরিদাস পালের বুকে পিষ্ট হয়। কিন্তু হরিদাস কিছুই অনুভব করে না। বিনীতার গলা দিয়ে কি চাপা গোঙানির আওয়াজ বেরোল? না বোধহয়। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে হরিদাস পালের ক্যাম্পেন, যেন দৈনন্দিন রেলযাত্রীদের মাঝে লজেন্স বেচছে কোন ক্যানভাসার। ---" দেখুন, আপনারা সবাই দেখুন, আমার হাত বিনীতার পিঠে সমান্তরাল রেখায় ঘোরাফেরা করছে। এর ভাষা বন্ধুত্বের, সিগন্যাল ভরসা দেয়ার। আই গেট য়ু ফ্রেন্ড-বলার। যদি পেট্রনাইজিং হত? তাহলে এইরকম মুভমেন্ট হত, ভার্টিক্যাল, নট হরাইজন্টাল।" এই বলে ও আবদুল্লাকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে ওর পিঠ ব্র্যাভো বলার ভঙ্গিতে থাবড়ে দেয়। --" কাজেই আমার বক্তব্য, ওনার শেখানো মেথড অনুযায়ী খতিয়ে দেখলে , আমি আদৌ আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষমতার ধামাধরা, স্কীমার নই। হয় উনি বিশ্লেষণে ভুল করেছেন, নয় অন্য কোন মোটিভের বশবর্তী হয়ে আমাকে অপমান করেছেন। আমি এথিক্স কমিটিতে যাব না। আপনারাই বিচার করুন।" দশ মিনিট কেউ কোন কথা বলে না।অ্যানাকোন্ডার ভাবলেশহীন মুখ। হটাৎ বিনীতা মুখ খুলল। --" হরিদাস, আমি কিছুই বুঝছি না।খালি এটুকু বুঝেছি যে এই মুহুর্তে তোর মনের স্থায়ী ভাব বা ইমোশন হল ক্রোধ, অ্যাংগার! আর তোর ডেমো নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। এটা আদৌ সিন্সিয়ার বিশ্লেষণ নয়। বরং একটি ওয়েল-রিহার্সড স্কিট, কলেজের সোশ্যালে যেমন হয়, বা বড়জোর টিভির রিয়েলিটি শো।" জয়ন্ত চশমা সাফ করতে থাকে।---আপনি একটু কনফিউজড, হরিদাস । নিজের বেলায় হিয়ার-অ্যান্ড-নাউ মেথডকে ঠিক করে প্রয়োগ করতে পারেন নি। শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে দেখছেন। গাছ দেখছেন, জঙ্গলকে নয়। রামজীবন--" আমার খুব খারাপ লাগছে আপনার গতবারের মেন্টরকে টেনে আনায়। উনি তো আজকে সামনে নেই। ওটা তো দেয়ার -অ্যান্ড-দেন হল, হিয়ার -অ্যান্ড-নাউ নয়।" হরিদাস পালের সাজানো বাগান শুকিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক ব্যাটসম্যান হেলায় উইকেট দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে নীচু গলায় আবদুল্লা কথা বলছে--" দাদা, আমি শকড্; এ কোন চেহারা দেখছি আপনার! আপনি বিনীতাকে আপনার নাটকের প্রপস্ এর মত ব্যবহার করলেন? আপনি কি গিরগিটি? এই দাদার জন্যে আমি ম্যাডামের সঙ্গে ঝগড়া করে নিয়ম ভেঙে রুম বদলে পাশের খাট দখল করলাম? হায় আল্লা!" এবার হাতে বল নিয়েছেন ওয়ালিয়া। না, টেল-এন্ডারকে কেউ দয়া করে না। সোজা বডি লাইন লক্ষ্য করে শর্ট পিচ বল উড়ে আসছে। ---- আমার পাল্টা জবাব দেয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার অবজেক্টিভ ডিবেট জেতা নয়। মনের দরজা-জানালা-গিঁট খোলা। তাই কিছু বলছি। এক, আমার কলিগ শিবশংকর যদি কোন সেশনে কোন পার্টিসিপেন্টকে কাঁদতে দেখে রুমাল এগিয়ে দিয়ে থাকেন তবে তিনি ভুল করেছেন। একটু কাঁদলে কোন ক্ষতি হয় না। যদিও আমি ঠিক বিশ্বাস করিনা যে ও এমন করেছে। হরিদাস পাল আউট অফ কন্টেক্স্ট অনেক কথা বলে থাকে। তবু আমি ওকে জিগ্যেস করব। কাউকে দুর্বল মনে করা উচিৎ নয়। মেয়ে বলে তো আরো নয়, তাহলে জেন্ডার বায়াসের প্রশ্ন উঠবে। দুই,আমাদের রায়মহাশয় শুধু বুদ্ধিমান নয়, অত্যন্ত ধূর্ত এবং শাতির দিমাগের লোক। সে আমার শিক্ষাকে আমারই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ভাল গুরুদক্ষিণা দিয়েছে। আমার অথরিটি, ইন্টিগ্রিটিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমার বিরুদ্ধে গোটা ব্যাচকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। এমনকি অপ্রত্যক্ষ ভাবে এথিকস কমিটিতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। এত অহংকারী লোকের উদ্ধারের আশা নেই। এই ওয়ার্কশপে ও কিছুই শেখেনি, কারণ ও সহজ সরল নয়। আমারই ব্যর্থতা! সবাই কথা বলছে। অনেক কথা। হাসি , ঠাট্টা, ছোট ছোট চুটকি।কিন্তু হরিদাস পালের কানে কিছু ঢুকছে না।শব্দ , শুধু শব্দ। যার কোন অর্থ হয় না, আওয়াজ মাত্র। এর মধ্যে কেউ কাউকে চাঁটি মারার কথা বলল, কেউ জল নিয়ে এল। কেউ হেসে উঠল। কিন্তু ও কেন কিছু বুঝতে পারছে না? এরা কোন ভাষায় কথা বলছে? এসবই কি ওয়ালিয়ার নির্দেশ? এরা কারা? এদের চেহারা অচেনা লাগছে কেন? মাথার মধ্যে বড্ড যন্ত্রণা, কেউ যেন চোখে লংকাবাটা দিয়েছে। জলের বোতলটা কোথায় গেল? কেউ সরিয়ে নিয়েছে? চোখে বেশ খানিকটা জলের ছিটে আর মাথায় জলের ঝাপটা পেয়ে হরিদাস পাল যখন উঠে বসল তখন ওয়ালিয়া ওকে চেপে আবার শুইয়ে দিলেন। ভিজে জামা, অস্বস্তি লাগছে, কিন্তু ওয়ালিয়া নাড়ি ধরে রয়েছেন। এবার বল্লেন-- ভয়ের কিছু নেই। কেউ ক্যান্টিনে গিয়ে আমার নাম বলে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে এস। তোমরা এবার গল্প কর , আমি চললাম। ঘন্টাখানেক কেটে গেছে। সবাই হরিদাস পালকে ঘিরে বসে আছে। জয়ন্ত ওকে জড়িয়ে ধরে আছে। --- আমরা তোমার বন্ধু, আমরা চাই তুমি নিজেকে বুঝতে চেষ্টা কর। নিজের ওপর ওয়ার্ক কর। খালি ডুয়িং-ডুয়িং নয়, বিয়িং এর সাথে একাত্ম হও, নিজে জীবনে কি চাও ভাব, আর কি করছ তাও। -- এমন কেন হল? তোমরা সবাই যেটা বুঝতে পারছ, যেটা দেখতে পারছ, আমি কেন পারছি না? একি সেই এইচ জি ওয়েলসের গল্প? আমি দৃষ্টিহীনের দেশে এসেছি? নাকি আমারই চোখ গেছে? শুভা মুদগল হাসে। --- তিমির, সবাই বইকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বইয়ের সাচ্চা-ঝুটা খতিয়ে দেখে। আর তুমি এমন আজব প্রাণী যে জীবনকে বইয়ের ফর্মূলার সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা কর। নেপালী ছেলেটি প্রস্তাব করে যে আজকের সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ারে আমাদের গ্রুপের তরফ থেকে কালচারাল প্রেজেন্টেশন হবে দাদার মোনো-অ্যাক্টিং। সবাই হেসে ওঠে। এর পরে আরও? কৈলাশ বলে-- আমি কিন্তু সিরিয়াস। তবে আমার একটা শর্ত আছে। --- কি শর্ত? ---- দাদা কথা দিন যে আজ রাত্তির আপনি নিজের ওপর ওয়ার্ক করবেন। তারপর কালকের প্রথম সেশনে আপনার মুখ থেকে মেঘ কেটে যাবে। যদি আমার সাহায্য চান তো আমি আপনার সঙ্গে রাত জাগতে রাজি, লাল চা করে খাওয়াতে, সিগ্রেট এনে দিতে রাজি। কি হল? চোখে কিছু একটা পড়েছে, বড্ড জ্বালা করছে। ও কৈলাশের হাত ধরে। দুপুর একটা। লাঞ্চের আগে বিদায়-সম্ভাষণ। বিশাল কমিউনিটি হলে সবগুলো গ্রুপ মিলে জনাচল্লিশেক ছেলেমেয়ে আর দশজন ফেসিলিটেটর। সবাই মাটিতে বসে। সবাইকে একটি করে চিরকুটে লিখতে হবে ও এখান থেকে কি নিয়ে যাচ্ছে, আর এখানে কি ছেড়ে যাচ্ছে। সেটা বাই টার্ন সবার সামনে পড়ে শুনিয়ে তারপর বিরাট বাক্সটাতে ফেলে দিতে হবে। ফেসিলিটেটররাও এর হাত থেকে ছাড় পাবেন না। ওয়ালিয়ার পালা এলে উনি উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন--- আমি এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি আমার টি-গ্রুপ মেথডের ওপর পুরনো আস্থা, এ অসাধ্য সাধন করতে পারে। আর ছেড়ে যাচ্ছি আমার খামখেয়ালিপনা। হরিদাস পালের পালা এল। ও উঠে দাঁড়িয়ে দেখল ওর দিকে তাকিয়ে আছে ওয়ালিয়া, শিবশংকর ও আর একজন মহিলার চোখ , যার সঙ্গে ইচ্ছে থাকলেও আলাপ করা হয়ে ওঠেনি। --- আমি ছেড়ে যাচ্ছি আমার ঔদ্ধত্য , যার কারণ আমি সাথী মহিলার সঙ্গে অসভ্য ব্যবহার করেছিলাম। আর এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি নিজের মনের অন্ধকার দিকটাকে ভাল করে দেখার সাহস। এবার কোলাকুলির পালা। ওয়ালিয়া নিজেই এগিয়ে এলেন। -- কাল সন্ধ্যে থেকে তোমাকে দেখছি। কালচারাল প্রোগ্রামের আসরে তুমি নিজের টিমকে এগিয়ে দিয়েছ, নিজেকে নয়। আরও কাজ করতে হবে নিজের ওপর। জীবনে কি চাও? অনেক নাম? খ্যাতি? নামকরা এইচ আর ট্রেনার? --- না স্যার! ওসব যা হবার হবে। না হলেও কোন দুঃখ নেই। জীবন শেষ হয়ে যাবে না। আমি চাই নিজের কাছে সৎ থাকতে। ---- বেশ তো, লোককে ভাল বাসো, কিন্তু দয়া করবে না। অযাচিত সাহায্যও নয়। এসব দুপক্ষকেই হ্হোট করে। আর কখনো দরকার মনে করলে আমাকে ই-মেইলে যোগাযোগ করতে পারো। আমি তোমাদের জন্যে আছি। একের পর এক গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। কোনটা ইটার্সি রেল স্টেশন, কোনটি বেরাগড় এয়ারপোর্ট। শোনা যাচ্ছে টুকরো গানের কলি, হাসি, ঠিকানার আদান-প্রদান। আবার দেখা করার শপথ। হরিদাস হাসে। ও জানে যে দুবার একই নদীতে স্নান করা যায় না। গাড়িতে উঠতে উঠতে বিনীতাকে ডাকে। -- অ্যাই, এদিকে আয়। তোর সঙ্গে আলাদা করে কথা আছে। সবাই হাসে। -- কি রে বল্? -- একটা কথা কাউকে বলবি না? একটু আগে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলি না, আমি কিন্তু আজ চান করিনি। --- দাঁত মেজেছিলি তো? তাহলেই হল। আমি না হয় দিল্লি পৌঁছে আবার চান করে নেব। (সমাপ্ত)

753

123

দীপঙ্কর বসু

এক দুপুরের গপ্পো

উদ্দেশ্যহীন টোটোকোম্পানী করতে বেরিয়ে হাওড়াগামী একটা বাসে চেপে বসেছিলুম|যেহেতু কোথায় যাব তার স্থিরতা ছিলনা ‚তাই টিকিট কেটেছিলাম বাসের অন্তিম গন্তব্য হাওড়া অবধি|কিন্তু মাঝপথে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সামনে ট্র্যাফিক সিগ্নালে বাসটা কিছুক্ষনের জন্য আতকে পড়তেই আমার মাথার পোকাগুলো নড়ে উঠল |নেমে পড়লুম বাস থেকে| নামতে নামতে কানে এলো বাস কন্ডাক্টারের বিস্মিত কন্ঠের প্রশ্ন - "আরে আপনি তো হাওড়ার টিকিট কাট্লেন ‚এখানে নেমে পড়ছেন কেন.|" কেন নেমে পড়ছি সেকথা কন্ডাক্টারদাদাকে ক্যামনে বোঝাই |তাই জোড়াতালি মার্কা একটা জবাব বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে- "আরে হঠাৎ এখানে আমার একটা জরুরী কাজের কথা মনে পড়ে গেল.|" আমার কৈফিয়ৎ কন্ডাক্টারের কানে গেল কিন বা গেলেও সে কি বুঝল তার পরোয়া না করেই হাঁটা দিলাম রাজভবনের পাঁচিলে ঘেঁষে যে রাস্তাটি চলে গেছে বিধান সভার দিকে সেই পথে| এখানে পথের ধরে অনেকগুলি ব্রিটিশ আমলের পুরোন বাড়ির সার |এই বাড়িগুলি আমাকে ভেতর থেকে প্রবল ভাবে আকর্ষণ করে বরাবরই|শীতের রোদ্দুর মেখে পথচলাটা বেশ উপভোগই করছিলাম|হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে বিধানসভা ভবন কে পিছনে ফেলে এসে দাঁড়ালাম চৌরাস্তার মোড়ে| রাস্তা পার হবার আগে ট্র্যাফিক সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নজরে পড়লো রাস্তার উল্টো দিকে সেন্ট জন্'স চার্চের উঁচু সূচালো ক্লক টাওয়ারটি |ব্যাস‚আমার গন্তব্য স্থির হয়ে গেল এক লহমায়| চার্চের খোলা গেট দিয়ে ঢুকে দশটাকার টিকিট কেটে অনুমতি পেয়ে গেলাম চার্চের মধ্যে প্রবেশের এবং তার চেয়ে বড় কথা অবাধে যত খুশী যেখানে খুশী ছবি তোলার অনুমতি পেয়ে |আমাকে আর পায় কে !! চার্চ প্রান্গনের মোরাম বাঁধান রাস্তা ধরে ‚বাগান জুড়ে ডালিয়াফুলের মেলাকে তখনকার মত এক পাশে রেখে উপস্থিত হই মূল ফটকের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা চার্চের পোর্টিকোতে|কলকাতায় এটিই সম্ভবত প্রথম Anglican church যার স্থাপনা হয়েছিল ১৭৮৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে| পোর্টিকো থেকে উপাসনা মন্দিরে প্রবেশের মুখেই দেখলাম দুটি প্রস্তর ফলক জানান দিচ্ছে শোভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব এর দান করা জমির ওপরে বেঙ্গল ইন্জিনিয়ার্সের স্থপতি‚ জনৈক জেমস অ্যাব এর পরিকল্পনা মাফিক ভবনটির নির্মান হয়েছিল|নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল পাবলিক লটারির মাধ্যমে| ভবনটির শুভ উদ্বোধন করেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস সায়েব| এবারে পা রাখি চার্চের উপাসনা মন্দিরে | বিশাল উপাসনা মন্দিরের প্রধান অল্টারকে মাঝে রেখে দুপাশে যূথবদ্ধ উঁচু উঁচু থামের সারি যেন উপাসনামন্দিরটিইকে তিন ভাবে বিভক্ত করেছে| একেবারে অল্টারের কাছে এক পিয়ানো বাদককে দেখলাম এক মনে পিয়ানো তে সুর তুলেছেন |সে সুরের গমগমে রেশ সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে | এ সুরের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই ‚শুধু অনুভব করতে পারছিলাম এ সুরে এমন কিছু এক মায়া আছে যা মনকে শান্ত স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে একাগ্র করে তোলে|উপাসনা মন্দিরের ছাদের কড়ি বর্গা থেকে ঝুলছে ঝাড় বাতি ‚পায়ের তলার মেঝে তে পাতা গৌড় মাল্দার ধংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করে আনা নীলচে ধুসর রঙের মার্বেল| মন্দিরের দুপাশের দেওয়ালে শ্বেত মর্মরের মূর্তি |অল্টারের বাঁ পাশে দেওয়ালে ঝুলছে লাস্ট সাপার এর ছবি |তবে এছবি লিওলান্দোদ্য ভিঙ্চির আঁকা লাস্ট সাপার নয় |এ ছবি এঁকেছেন জোহান জোফানি | এছবিতে জোফানি বাইবেলেবর্নিত লাস্ট সাপারের কাহিনীতে কিছু ভারতীয় মেজাজ এনেছেন অলঙ্করণে| উপাসনা মন্দিরের দেওয়ালের মর্মর মূর্তিগুলিতেও আছে ভারতীয়ত্বের ছোঁয়া| একটি ট্যাবলেটে দেখা গেল এ দেশীয় সৈন্যদের সঙ্গে কোম্পানীর ফৌজের লড়াই এর দৃশ্য |অন্য একটিতে শাড়ি পরিহীতা নারী মূর্তি| চমৎ্কার ছিমছাম সাজানো উপাসনা মন্দিরে কিন্তু কিছু কিছু বয়েসের বলিরেখা চোখে পড়ল |মনে মনে হিসেব করে দেখলাম গীর্জাটির বয়েস এখন ২৩০ ন্বছর !! উপাসনা মন্দিরের বারে লাগোয়া একটুই ঘরে দেখতে পেলাম ওয়ারেন হেস্টিংসের ব্যবহার করা টেবিল চেয়ার |চেয়ারের গদির অবস্থা যদিও বয়সের ভাবে জরাজীর্ণ | উপাসনা মন্দির থেকে বাইরে এসে চার্চের উত্তরদিকের বারান্দায় এসে লেডিক্যানিং এর সূরম্য সমাধ্হি| লেডি ক্যানিং ছাড়াও গীর্জা প্রাঙ্গনে রয়েছে বহু চেনা অচেনা ইংরেজ রাজপুরুষ আর মহিলাদের সমাধি‚যার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্ব্পূর্ণ বোধ হয় কলকাতা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত জোব চার্নকের সমাধি |জোব চার্নক ছাড়াও এই প্রাঙ্গনে পেলাম জোব চার্নকের কন্যাদের ‚ব্রিটিশ নৌসেনাধক্ষ্য ওয়াট্শন ‚লর্ড ব্রবোর্ন প্রমুখের সমাধি |তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে রোমাংচকর লাগল কুখ্যাত অন্ধকূপহত্যার স্মারকটি | যদিও স্মারকটি কে তার আসল অবস্থান থেকে তুলে এনে পরবর্তীকালে এই গীর্জা প্রাঙ্গনের এক পাশে স্থাপন কারা হয়েছে| দীর্ঘক্ষন ঘোরাঘুরি করে বুঝলাম সবচাইতে বড় হল পাপী পেটের টান|তাই এক সময়ে সেন্ট জন এর কাছে ছুটি চেয়ে নিয়ে রোয়ানা দিলাম আহার্যের সন্ধানে| রাতে স্বপ্নে চার্নক সায়েব দেখা দিলেন| শুনলাম তিনি বলছেন "বাবু‚প্রভু যীশাসের প্রতি টোমার আগ্রহ দেখিয়া হামি অট্যন্ট প্রীট হইয়াছি" তার পর বিড় বিড় করে আরো কত কি বলে গেলেন বুঝতে পারলুম না

234

12

নব ভোঁদড়

স্বর্গের আগের ইস্টিশনে দুর্নীতি

https://www.nbcnews.com/news/us-news/louisiana-teacher-handcuffed-arrested-bringing-school-board-meeting-n836231 এটাকে কি দুর্নীতি বলে? স্কুল বোর্ডের মিটিঙে স্কুলের সুপারিন্টেন্ডেন্টের অত্যধিক মাইনে বাড়া নিয়ে প্রশ্ন করায় শিক্ষিকাকে হাতকড়া দিয়ে গ্রেফতার করা হল| আমাদের পিসী এর চেয়ে বেশী কি করেন? ও হ্যাঁ‚ এটা আমেরিকারই ঘট্না| একই খবর নিউ অর্লিয়েন্স টাইমস পিকিউনে‚ আরো ডিটেলে| http://www.nola.com/opinions/index.ssf/2018/01/teacher_school_board_arrest.html

435

10

Joy

রহস্যময়ী সুন্দরবনের জঙ্গলে আমরা কজন...

অনেকদিন ধরেই অভিজিত আমকে বলে আসছে ওর বাড়ীতে আসার জন্যে| আমি নিউ অলিপুরে একটা ইনস্টিউটে মাল্টিমিডিয়া শিক্ষক ছিলাম| ওখানেই ও মাল্টিমিডিয়া শিখে গত চার বছর ধরে চাকরী করছে| ওর বাড়ী পিয়ালি| ওর মামার বাড়ি ঝড়খালি| ওখানে ওর এক দিদিও থাকেন| আমি মাঝে মাঝেই বলতাম‚ তোমাদের বাড়ি গেলে সুন্দরবন যাবো| হ্যাঁ স্যার আসুন না একবার| আপনাকে আমি সুন্দরবন নিয়ে যাবো| দিন ঠিক হয়‚ আবার পরিবর্তন হয়| ওর বা আমার কাজের জন্যে| এবার ঠিক করলাম এবার যাবই যাবো| দিন ঠিক হল| ডিসেম্বরের শুরুতেই| অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সেদিনই চলে যাবো ঝড়্খালি| তাহলে রবিবার সারদিন ভালো করে ঘুরতে পারবো সুন্দরবন| পঙ্কজকে ফোনে আগেই বলেছিলাম ঘোরার কথা| আমাদের দুই বন্ধুর একটু সময়-সুযোগ পেলেই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পরা| ফ্যামিলি ট্যুর আলাদা আর বন্ধুদের ট্যুর একটু অন্যরকম| ফ্যামিলি ট্যুর অনেক চিন্ত ভাবনা করে‚ নিশ্চিন্ত‚ আরামদায়ক হতে হয়| বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ট্যুর| যেখানে যেমন খুশি থাকা‚ খাওয়ার কোন সমস্যা নেই| ফলে বছরে একটা-দুটো এইরকম বেড়ানোর মজাটা একটু আলাদা| আমি‚ পঙ্কজ‚ অভিজিত তিনজনে যাব| শিয়ালদহ সাউথে আমরা মিট করব| অভিজিত দুদিন আগের থেকেই আমাকে বার বার ফোন করে বলে দিয়েছে| কোথায় দাঁড়াব‚ কটায় ট্রেন‚ক্যানিং থেকে কি ভাবে আমরা ঝড়খালি যাব ইত্যাদি| প্ল্যাটফর্মে আমি অগে এসে ট্রেনের টিকিটা কেটে নিলাম| একটু পরেই অভিজিত হাজির| স্যার কেমন আছেন‚ বাড়ির সবাই ভালো তো? কথা সেরে পঙ্কজের জন্যে অপেক্ষা| ট্রেন যথা সময়েই প্ল্যাটফর্মে ঢুকল‚ কিন্তু পঙ্কজ এখনো এসে পৌঁছায়নি| ফোন করতে ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল আরে জ্যামে আটকে আছি| চলে এসেছি| অভিজিতের মুখে চিন্তার ভাঁজ| স্যার এই ট্রেনটা মিস করলে ক্যানিং থেকে ঝাড়খালি যাবার পরের বাসটা খুব ভীড় হয়ে যাবে| আপনাদের অসুবিধা হবে| কিছু হবে না বলে ওকে আশ্ব্স্থ করলাম| কিন্তু চোখের সমানে দিয়ে ক্যানিং লোকাল বেরিয়ে গেল| কিছুক্ষনের মধ্যেই পঙ্কজ হাজির| অথএব পরের ট্রেনের অপেক্ষা| এর মধ্যে চা-টা খাওয়া হল| পরের ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই সবাই লাফিয়ে ট্রেনে উঠছে| আমাদের লোকাল ট্রেনে যাওয়া খুব একটা হয় না| আর ট্রেনের ভিড় খুব ভয়ানক| তবু গায়ের জোরেই উঠে পরলাম আমরা| ভাগ্যক্রমে সিটও পেলাম|পার্কসার্কাস এলেই বোঝা গেল লোকাল ট্রেনের মর্মকথা| দুপাশে সিটের মাঝাখানে দশজন দাঁড়িয়ে গেল| পা টাও সারনোর জায়গা নেই| এর মধ্যেই গল্প‚ মজা| যত স্টেশন আসে ভিড় তত ঘন হয়| জানালার পাশে বসেও দম বন্ধ হয়ে আসে| বনগাঁ লাইনে ভিড় ট্রেনের ভিড় দেখেছি| মেন লাইনেও অফিস টাইমেও খুব ভ্ড়ি হয়| কিন্তু এখানের ভিড় অস্বাভাবিক| কোন ফেরিওয়ালা ট্রেনে চোখে পরল না| বোধহয় প্রচন্ড ভিড়ের জন্যে কেউ আসেনি| সোনারপুর এলেই আবার জায়াগা পরিবর্তন করতে হবে| মানে আমাদের সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের বসতে দিতে হবে| আমারা এবার উঠে পরব| ভালো কনসেপ্ট| এটা বম্বের লোকাল ট্রেনেও দেখেছি| যাইহোক আমারা ক্যানিং স্টেশনে নামলাম| স্যার তাড়াতাড়ি চলুন ঝড়্খালির বাস ওদিক থেকে ছাড়ে| তাড়াতাড়িই এলাম| বাস তখন যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা করছে| বাসেও জায়গা পেলাম| কিছুক্ষনের মধ্যেই বাস চলতে শুরু করল| আস্তে আস্তে গদখালি‚ মাতলা নদীর ব্রীজ‚ সজনেখালি পেরিয়ে যাচ্ছি| চারপাশে অন্ধকার| মাঝে মাঝেই বাস থামে যেখানে বেশ আলো‚ দোকান‚ কিছু লোক| আবার পথ চলা| ঘন্টা দেড়েক বাদে আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছালাম| অভিজিতের মামাএর বাড়ি মেন রাস্তা থেকেই দেখা যায়| বাড়িতে আসতেই বিপুল সংবর্ধনা| যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চা তেলেভাজা-মুড়ি| পরিচয় হল ওর দাদা অঙ্গদ‚ উনার স্ত্রী‚ মা বা ও ছোট্ট মেয়েটির সাথে| গল্প জমে উঠল| স্যার এক দান ক্যারাম হয়ে যাক না| না বলতে পারলাম না| খেলা এক থেকে দুই দান হয়ে গেল| রাত বাড়ে| ঠান্ডা বাড়ে| আপনারা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে নিন| কাল ভোরে উঠতে হবে আপনাদের| গরম গরম মাছের ঝাল‚ ভাত‚ ডাল| চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি| এক কথায় অনবদ্য| খাওয়া সেরে সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পরি তাড়াতাড়িই| সকালে ঘুম ভেঙ্গে যায় হালকা রোদের মৃদু উত্তাপে‚ পাখিদের কলকাকলির টানে| পরের দিন সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পরলাম| ভ্যান পাওয়া যায় নদীর তির অবধি‚ কিন্তু অভিজিত বলল স্যার হেঁটে চলুন গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে| পথের মধ্যে পুকুর‚ ধান জমি ফেলে আমরা চলেছি| পুকুরে আলো করে পদ্ম আর শালুক ফুল ফুটে আছে| নরম রোদের চাদরে ধান ক্ষেত মোড়া| কিছুক্ষন চলার পর ঝড়খালি বাজারের কাছে এসে পৌঁছালাম| এখনে এসে দেখি হরেক রকমের মাছ নিয়ে জেলেরা বসে আছে| এত বড় চিঁংড়ি এর আগে দেখিনি| গলদা‚ বাগদা‚ বান মাছ‚ পার্শে‚ খয়রা আর কত মাছ| অনেক মাছের নামও জানি না| নদীর পাড় ধরে কিছুটা হেঁটে‚ ফোটো তুললাম আমরা| এর মধ্যে অভিজিতের এক বন্ধু ঝড়খালিতেই থাকে ও আমাদের সঙ্গে এসে ভিড়ল| ঐ ছেলেটিও আমাদের নৌকা ভ্রমনের সঙ্গী হবে| কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরই অভিজিতের জামাইবাবু নৌকা নিয়ে হাজির হলেন| আরও দু-চারজন জামাইবাবুর বন্ধু আমাদের সঙ্গে বেড়িয়ে পরলাম| নৌকাতে উঠে পড়লাম আমরা| ওঠার আগে ডিজেল কেনা হল নৌকার জ্বালানি হিসেবে| কত দেরী হবে জানি না| দের্রী হলে নৌকাতেও রান্না-বান্না হবে| সব নিয়ে নেওয়া হল| বেশ একটা অদ্ভূত থ্রিলিং হচ্ছে| ভটভট শদ করে নৌকা চলতে শুরু করল| দুপাশে জল আর জল| মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপ দেখা যায়| কোনটায় মনুষ্য বসতি আছে‚ কোনটায় আবার জন মানবহীন‚ ওখানে যাবার পারমিশন নেই| বাদা বনের জঙ্গলে‚ নৌকা মাঝে মাঝে আটকে যায় ঝোঁপ-জঙ্গলে‚ খাঁড়ির মধ্যে দেখি একটা নৌকায় দুজন জাল নিয়ে বসে আছে| জেলে বলে মনে হল| আজ সারা দিন রাত জাল ফেলে কাল মাছ তোলা হবে| ওদের রেখে আবার গভীরে যাওয়া শুরু হল| জামাইবাবুকে গল্প বলার অনুরোধ করলাম আমরা| জলে জঙ্গলে ঘোরার গল্প| বাঘ দেখার গল্প| জামাইবাবু লজ্জা পেয়ে যান| বলেন কি বলবো আপনাদের‚ এখানার লোকেরা খুব কষ্ট করে বেঁচে থাকে| দু-চার মাস নৌকা নিয়ে সাগরের জলে আমাদের দিন-রাত এক করে মাছ ধরে নিয়ে আসি| ঐ সময়্টা কিছু টাকা-পয়সা হাতে আসে| আবার কিছুদিন বাড়িতে থাকা| কেউ কেউ আবার মধু আর কাঁকড়ার জন্যে গভীর -জঙ্গলে চলে যায়| কেউ ফিরে আসে| কেউ ফেরে না| পরে ওর আধ-খাওয়া দেহটা পাওয়া যায়| কখনো বা কঙ্কালটা পাওয়া যায় ঝোপের আড়ালে| মানুষ খেকো বাঘ সাবাড় করে দিয়েছে| বিশ্বাস হয় না| কি করে মানুষ এখানে লড়াই করে বেঁচে আছে| রোদের তেজ বাড়ে| জলের উপর রোদ পরে রুপোর মত চকচক করে| নৌকা ঢেউ তুলে এগিয়ে চলে| অহংকারীর মত‚ কাউকে পাত্তা না দিয়ে| এবার একটা দ্বীপে আমরা নৌকা ভিড়ালাম| এখানে মানুষের বসবাস আছে| আমারা কাদা| জল-বাদা বনের জঙ্গলে নামা হল| এখানে আমাদের ফটো সেশন শুরু হল| কাছের গ্রাম থেকে ডাব পেড়ে খাওয়া হল| সঙ্গে কিছু পেয়েরা নিয়ে এসেছিলাম আমরা‚ সেটাই নুন দিয়ে মেখে খাওয়া হল| আবার নৌকায় ওঠা হল| নৌকা চলা শুরু করল| দূরে আরও কিছু নৌকা দেখা যায়‚ খুব কম বড় নৌকা ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছে| আমরা তো ট্যুরিস্ট নই| আমরা সে ভাবে আসতেও চাইনি| বেলা পরে আসে| এবার রোদ নরম হয়| শীত শীত করে| জামাইবাবু সুজিত হালদার বলেন এবার দেরী হলে ভাঁটা নেমে আসবে| ভাঁটার টান আসছে| এবার আমাদের ফিরতে হবে| নাহলে মাঝরাত অবধি আটকে থাকতে হবে| কাদাময় সুন্দরী‚ গরানের জঙ্গল| খুব নিস্তব্ধতা| ভারী রহস্যময় পরিবেশ| সুজিত বাবুর বাঘের মুখের থেকে ফিরে আসার গল্প শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়| কি ভঙ্ককর অথচ সুন্দর এই অরন্য| এই জঙ্গল কোথয় গিয়ে শেষ হয়েছে‚ কিছুটা ইন্ডিয়া তে বেশির ভাগ টাই বাংলাদেশে| শুধু জল আর জল| এখনকার লোকগুলোর জল‚ জঙ্গল‚ বাঘ‚ কুমীরের সাথে ঘর সংসার| মাঝে মাঝে এই সব নদী‚ জঙ্গলের গ্রাম গুলোতে হিংস্র বাঘ হানা দেয়| গরু‚ ছাগল নিয়ে চলে যায় নদী পেরিয়ে গভীর জঙ্গলে| আয়লা ঝড়ে অনেক বদলে দিয়েছে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা| নোনা জল বদলে দিয়েছে জমির চরিত্র| পাড়ে এসে নৌকা রেখে এগোয় আমরা| সুর্য অস্ত যাবার সময় হয়ে আসে| গোধুলির আলোয় নদী সোনার মত সেজে উঠেছে| নৌকা ভ্রমণের যাবার সময়ই আবার সুজিতবাবুর স্ত্রী আমাদের খাওয়ার নেমতন্ন করে দিয়েছেন| বারে বারে বারন করা সত্ত্বেও| নৌকা ভ্রমণ সেরে সুজিত বাবুর বাড়ি আসা হল| ওনার স্ত্রী আমাদের জন্যে দু-তিন রকমের মাছের নানান পদ রান্না করে খেতে দিলেন| সুস্বাদু খাবার আর খিদেও পেয়েছিল খুব| জমিয়ে খাওয়া হল| একটু বিশ্রাম নিয়ে অঙ্গদ দার বাড়ি যাবার জন্যে তৈরী হতে হবে| আমাদের রাস্তা পর্যন্ত এসে টোটোতে উঠিয়ে দিলেন সুজিতবাবু আর ওনার স্ত্রী| আবার আসার জন্যে বার বার অনুরোধ করলেন| এবার এলে পরিবার নিয়ে আসবেন স্যার| আমারা সবাই বড় নৌকা নিয়ে দু-তিনদিনের জন্যে সুন্দরবন ঘুরে দেখব| খুব মজা হবে| নৌকাতেই রান্না‚খাওয়া-দাওয়া হবে| সুজিত বাবুর বড় জামাইএর ও নৌকার ব্যব্সা| ট্যুরিস্ট নৌকা আছে খান দুয়েক| কোন অসুবিধা হবে না আপনাদের| কথা দিই আসব নিশ্চয় আসব| এই অতিথি বৎসল মানুষদের ব্যবহার অনেক দিন মনে থাকবে| অন্ধকার রাস্তা চিরে আমাদের টোটো এগিয়ে চলে| ঠাণ্ডা এবার বেশ ভালো বোঝা যাচ্ছে| ঝড়খালি বাজারের উপর দিয়ে এগিয়ে গেলাম| বাজারটা বেশ জমজমাট এখনও| মুদির দোকান| মাছ-ওয়ালা| চপ-মুড়ির দোকান| আশে পাশে ছোট্ট কয়েকটা ঔষুধের দোকান| দোকানের দেওয়ালে সদ্য শেষ হওয়া যাত্রা-পালার পোস্টার লাগানো| হৈ-চৈ‚ আলো পেরিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে পৌঁছে গেলাম অঙ্গদ বাবুদের বাড়ি| বাড়ি পৌঁছাতেই সারাদিনের গল্প| কিছুক্ষনের পরেই রাতের খাবারের জন্যে হাকডাক| সারাদিনের জার্নির পর আর খাবার ইচ্ছে নেই| কিন্তু না খেয়ে উপায় নেই| খেতে হবেই| মেশোমশাই স্বয়ং আমাদের ডাকতে এসেছেন| অগত্যা খেতে যেতেই হল| খেতে বসেই রসনা তৃপ্ত হয়ে গেল| বৌদির রান্নার গুনে খিদে বেড়ে গেল| খাওয়া দাওয়া হলে বিছানায় পরেই এক ঘুম| ভোরে পাখি আর মুরগীর ককর-ক আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে| আমরা আসার জন্যে তোড়জোড় শুরু করি| বাস আমাদের বাড়ির কাছেই থামবে বলে আশ্ব্স্থ করে অভিজিত| এর মধ্যেই গরম গরম পরোটা আর তরকারি সহযোগে খাবার নিয়ে বৌদি হাজির| সকালের মিঠে রোদ মেখে গোবর নিকানো উঠোনে দাঁড়ায়| খেজুর‚ টগর‚ নারকেল‚ নিম গাছ ঘেরা চারদিক| ফুলের হাল্কা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে| এই সব গাছ্পালা‚ বাঁধানো পুকুর সবাইকে বিদায় জানিয়ে দাদা‚ বৌদি‚ মেশোমশায়‚ মাসিমা আর অঙ্গদ দার ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটাকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে চললাম| বাস এসে গেছে দুয়ারের কাছে| দুদিনে মধ্যে এত টান‚ এত আন্তরিকতা মনটা খারাপ হয়ে গেল| এখানে প্রকৃতি অপরূপ সুন্দরী নয়| একটু অগোছলো‚ কাজল কালো‚ সরল গ্রামের মেয়েটির মত| পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠল| মনে হল ওরা যেন বলল ভালো থেকে বন্ধু| আবার এসো| ফিসফিসিয়ে বললাম আসব আবার| আসতে আমায় হবেই এই গাছ-পালা‚ পুকুর‚ মাঠ‚ নদী এই প্রকৃতির মাঝে| *ফটো আপলোড করবো কিভাবে একটু জানালে ভালো হয়|

237

10

শিবাংশু

ধুস...............

লিখে ফেলে রাখলুম দু'তিনদিন। থাক। কিন্তু আবার মনে হলো, দেওয়াই যায়। আমরাও তো খেলা খেলেছিলেম, আমরাও তো গান গেয়েছি.... " ২০১১ তে যখন মজলিশে লিখতে শুরু করি‚ কত উত্তপ্ত পোস্ট আসতো । সব যৌবনের মধ্যগগনে বিরাজ করা উদ্দীপ্ত যুবকদের থেকে । অনেক যুবতীও যোগ্য সঙ্গত করতো । আজ দেখি সবার ই ভাবপ্রকাশের ভঙ্গি অনেক বদলে গেছে । দৃষ্টিভঙ্গিও় আগে হয়তো যে বিষয়ে মনে হত‚ এই জিনিসটা বোঝাতে হবে‚ সবাইকে স্বীকার করাতেই হবে যে এটাই ঠিক‚ আজ মনে হয় ধুস আমার কি । আমার পরে নাই ভুবনের ভার । বা নিজের ই বিশ্বাস অনেক ঘুরে গেছে । আগে যা মনে হত সার্বভৌম সত্য আজ মনে হয় অন্যরকম ও তো হতে পারে ।" যেজন আছে মাঝখানে। সেরকমই মনে হল নিজের। ২০১১ সালে আমি ছিলুম পঞ্চান্ন। দুহাজার রকম পিছুটান। তবু তখনও এই পাতায় পূর্ণ উদ্যমে কথাবাত্তা কইতুম। যা মনে হতো। সীমান্তহীন, মনে হওয়া শুধু । তার পরেই কীবোর্ডে আঙুল। কোনও না কোনও ভাবে নিজেকে মনে করানো। প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে... হায় অগ্নিকন্যা ! তুমিও.... :-) ২০১১ সালে যে "যৌবনের মধ্যগগনে বিরাজ করা উদ্দীপ্ত যুবক", সে ২০১৭ পেরোতে মনে করে "ধুস আমার কি । আমার পরে নাই ভুবনের ভার় " ছ'বছরেই কী এরকম হয়? কে জানে? ছ'বছর মানে দেড়টা পোস্টিং। সতেরোটা পোস্টিং আর উনচল্লিশ বছর পেরিয়ে এসে ভাবি এখনও গোটা পাঁচেক পোস্টিং হেসেখেলে সামলে নিতে তৈরি আছি। প্রতি তিন-চার বছর অন্তর এই বিশাল দেশের কোন কোন প্রান্তে প্যারাশুট ল্যান্ডিং করতে হবে, জানা নেই। একা থাকতে পারিনা। লটবহর নিয়ে ঘুরে বেড়াই। ইহুদি বাস্তুচ্যুত মানুষদের মতো। যতোদিন যায় কাজকম্মো আরো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।কিন্তু তার মধ্যেই তো সব কিছু করতে হবে। লিখতে হবে, পড়তে হবে, গাইতে হবে, রাগতে হবে, হাসতে হবে, দেশ দেখতে হবে, আড্ডা মারতে হবে। সংসারপালন এবং 'চাকরি', তাও তো করতে হবে শেষ পর্যন্ত। এক মূহুর্তের জন্যও কেন মনে হয়নি "ধুস আমার কি" বলার সময় এসে গেছে। বিশ-একুশেই যেমন বুঝে গিয়েছিলুম কারো বয়স দশ পেরিয়ে গেলে তর্ক করে তার মত 'বদলানো' যায়না। দ্বিতীয়ত 'সার্বভৌম' সত্য বলে কিছু নেই। এটা বোধ হয় দ্বান্দ্বিকতার শিক্ষা? কিন্তু দাঁড়াবার জায়গা তো এভাবেই তৈরি হয়েছে। শক্তির অপচয় এড়িয়ে যাওয়া। গতকালই এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিলো। তিনি বললেন এখন 'বাপ-মা'য়েরা খুব স্মার্ট হয়ে গেছে। যতো'ই বয়স হোক, ছেলেপুলেদের বিশেষ তোয়াক্কা করেনা। নিজেরাই চালিয়ে নেয়। বললুম, খুব সত্যি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আর্থিকভাবে স্বয়ম্ভর। ছেলেমেয়েদের উপর নির্ভরতাটা নেহাৎ বিমূর্ত ধরনের। কিন্তু সন্তানদের বাপ-মায়ের উপর নির্ভরতা দেখতে পাই বেড়ে গেছে। কারণ এখন মেয়েরা অনেকেই ব্যস্ত চাকুরিজীবী। 'সংসার' চালানোর শিক্ষা ও দম এখন মেয়েদের বৃত্তিগত উদ্বেগ কেড়ে নেয়। কিন্তু 'সংসারে'র উপর প্রত্যাশাটি তাদের রয়েছে পুরোদমে। এই প্রত্যাশাপূরণের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই নিতে হয় বাপ-মা'কে। তাঁরা এই দায়িত্ব পালনও করেন যথাসাধ্য। দীর্ঘ জীবনযুদ্ধের বিলম্বিত পর্বে তাঁরা এই 'দায়িত্ব' পালনের শক্তি কোথা থেকে পান? মনে হয়, তাঁরা জীবনের কোনও পর্বেই বোধ হয় 'ধুস' বলেননি। জীবনের প্রথমপর্বে প্রবীণ বাবামায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। কারণ সেটাই দস্তুর ছিলো। তার পর নিজের সন্তানদের। তার পর পরবর্তী প্রজন্ম। আর্থিক স্বাচ্ছল্যও ছিলোনা আজকের মতন। আজকের হিসেবে উঞ্ছবৃত্তিও করতে হয়েছে তাঁদের সময় সময়। কিন্তু 'ধুস'? নৈব নৈব চ। এই সব প্রতিক্রিয়া দেখলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আবার গ্রুভে ফিরে আসি যখন পড়ি একজন মধ্য অশীতিপর তরুণ লিখে ফেলছেন এই কথাগুলো। "আসলে আমি খুব কিছু হতাসা বা কিছু নেই বোধ করছিনা় তার কারন মনে মনে জানি এটা ঘটবে । আর যা আমার হাতের বাইরে তাকে নিয়ে কি হল বা কি হত তাই ভেবে সময় নষ্ট করি কেন? ওটা আমার স্বভাবে নেই় কেউ তার সাধ্যের বাইরে কিছু করতে পারবেনা় সাধ্য মত করে তার পর পাস ফিরে ঘুমানো যায়়" তাঁর বয়ঃক্রমে আসতে তো আমার অনেক দেরি। যদি বেঁচে থাকি। তবু একেই তো অক্সিজেন বলে। একটু শ্বাস নিয়ে রনপায়ে ছুটে যাওয়া। এর মধ্যে 'ধুস' আর কোত্থেকে ঢুকবে?

219

11

Sujonmax

161

0

হিমাদ্রী

বরণীয় লেখকের স্মরণীয় কিছু--

: ঝুমকোলতার স্নানের দৃশ্য ও লম্বোদরের ঘাটখরচ: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ভূষণ একটু দূর থেকে তার বউ ঝুমকোলতাকে দেখছিল। ঝুমকো কুয়ো থেকে জল তুলছে। মাত্র পাঁচ দিনের পুরনো বউ। কত কী দেখার আছে নতুন-নতুন। ভূষণ কি কালও জানত যে, তার বউয়ের মাথার গড়নটা অনেকটা মাদ্রাজী নারকেলের মতো? এরকমের গড়নের মাথা ভাল না মন্দ তা ভুষণ জানে না। সে ঝুমকোলতার যা দেখছে তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই একটা মেয়েমানুষের মধ্যে যে নিত্যি নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করছে, পেয়ে যাচ্ছে গুপ্তধন, লাভ করছে কত না জ্ঞান। মাত্র পাঁচ দিনে। ঝুমকো এই যে সাতসকালে বালতি-বালতি জল তুলে চান করবে বলে, এ ভূষণের ভালো লাগছে না। তার ইচ্ছে করছে হাত থেকে বালতি কেড়ে নিয়ে নিজেই জল তুলে দেয়। কিন্তু তা হওয়ার নয়। বাড়িভরতি গুরুজন, আত্মীয়কুটুম, হাজার জোড়া চোখ নজর রাখছে তাদের দিকে। রাখবেই। নতুন বিয়ের বর-বউ। তো নজর দেওয়ারই জিনিস। তবু তার মধ্যেই ভূষণ নানা কায়দা কৌশল করে লুকিয়ে চুরিয়ে ঝুমকোলতাকে একটু আধটু দেখে নেয়। এই যে এখন উত্তর দিককার ঘরে ভূষণের কোনও কাজ নেই, তবু সে এসে ঢুকে পড়েছে। এ-ঘর তুলসীজ্যাঠার। বুড়োমানুষ। দেশের কাছে গান্ধীবাবার অনুগত হয়ে জীবন উৎসর্গ করবেন বলে নাছোড়বান্ধা হয়ে লেগে গিয়েছিলেন, তাই আর সংসারধর্ম করেননি। উড়ণচণ্ডী হয়ে গাঁ-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন, তকলি চরকা কাটতেন। বুড়ো বয়সে এসে আবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু ততদিনে গুষ্টি বেড়েছে, ভালো-ভালো ঘরগুলো বেহাত হয়েছে। উত্তরের এই ঘরে থাকে জ্বালানি কাঠ, খোলভুসির বস্তা, বীজধান, তারই একধার দিয়ে কোনওরকমে বুড়ো মানুষটার জন্য একটা চৌকি পাতা হয়েছে। আগে গুটিকয় ছাগলও থাকত। আজকাল থাকে না, তবু ঘরটায় কেমন ছাগল-ছাগল গন্ধ। কস্মিনকালেও ভূষণ এই ঘরে আসে না। কিন্তু ঝুমকোলতা চান করতে যাচ্ছে আঁচ পেয়েই ভূষণ হঠাৎ এ ঘরে এসে সেঁধিয়েছে। কারণ, এ ঘরের জানালার ফোকর দিয়ে কুয়োতলাটা ভারী পরিষ্কার দেখা যায়। একটা লেবুগাছের আবডালও আছে, তাকে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তো আর জানালায় হামলে পড়া যায় না। জ্যাঠা কী বা মনে করবে। যদিও গান্ধীবাবার শিষ্য, চিরকুমার এবং বুড়ো, তবু সাবধানের মার নেই। ভূষণ ঘরে ঢুকেই চৌকির একধারটায় চেপে বসে বলল, জ্যাঠামশাই, শরীর-গতিক কেমন? তুলসীজ্যাঠা বুড়ো হলেও মজবুত গড়নের লোক। মাঠে ঘাটে ঘুরে-ঘুরে শরীর পোক্তই হয়েছে। তার ওপর খাওয়া-দাওয়ায় খুব সংযমী। নেশা ভাঙ নেই। এখনও নিজের কাপড় নিজে কাচেন, নিজের ঘর নিজে সাফ করেন, স্নানের জলও নিজেও তোলেন। কারও তোয়াক্কা রাখেন না। বসে একখানা বই পড়ছিলেন। হিন্দি বই। মুখ তুলে বললেন, খারাপ থাকব কেন রে? ভালোই আছি। তোর খবর-টবর কী? মাথা চুলকে ভূষণ বলে, এই আর কী, ঘাড়ে আবার বোঝা চাপল, বুঝতেই পারেন। বোঝা বলে বোঝা? এ একেবারে গন্ধমাদন। বলে তুলসীজ্যাঠা একটু হাসলেন। তারপর বললেন, বউ তো আনলি, তা মেয়েটা লেখাপড়া জানে তো? ভূষণের নজর কুয়োতলায়। বলল, ওই আর কী। গাঁয়ের স্কুলে অজ আম পড়েছে। এঃ, স্ত্রী শিক্ষাটাই আমাদের দেশে হল না। তা একখানা বই দেবোখন ভারতীয় নারীর ঐতিহ্য। বইখানা বউমাকে পড়াস। ও বাবা, ওসব খটোমটো বই কি আর পড়বে। পড়বে। জোর করে পড়াস। পড়াটা অভ্যাসের ব্যাপার। প্রথম-প্রথম পড়তে চাইবে না। তারপর রস পেলে হামলে পড়বে। বুড়োমানুষরা এমনিতেই একটু ভ্যাজর ভ্যাজর করে, তার ওপর এ মানুষ আবার আদর্শবাদী, ভূষণ জানালাটার দিকে একটু চেপে বসে বাইরের দিকে চেয়ে উদ্বেগের সঙ্গে বলল, এঃ, লেবুগাছটায় দেখি পোকা লেগেছে। তুলসীজ্যাঠা তাঁর হিন্দি বইখানা সাবধানে মুড়ে রাখলেন। তারপর বললেন, যাই, হোমিওপ্যাথির বাক্সটা নিয়ে একটু মাঠেঘাটে পাক দিয়ে আসি। সেই ভালো। বলে ভূষণ এ ঘরে থাকার ছুতো খুঁজতে হিন্দিবইখানাই খুলে বসল। বলল, ইঃ, বাবা এ যে দেখছি তুলসীদাসের রামচরিতমানস। অ্য্যাঁ! কতকাল ধরে বইখানা পড়ার ইচ্ছে। তা পড় না, বসে-বসে পড়। তুলসীজ্যাঠা বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভূষণ অপলক নয়নে ঝুমকোলতাকে দেখছে। হাতে রামচরিতমানস এলিয়ে আছে। আচ্ছা, এই যে ভূষণ ঝুমকোলতাকে দেখছে, ঝুমকো কি তা টের পাচ্ছে? মোটেই না। ভূষণের তো মনে হয় এই পাঁচ দিনে একটা অচেনা মেয়েকে সে যেমন অষ্টেপৃষ্টে ভালোবেসে ফেলেছে, তার সিকির সিকি ভাগও ঝুমকোলতা পারেনি। ভূষণের যেমন আনচান অবস্থা, চোখে হারাই হারাই ভাব, তেমনটা ঝুমকোলতার কই? দিব্যি ঘুমোচ্ছে, শ্বশুরবাড়ির নতুন সব চেনাদের সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারছে, ভূষণ বলে যে কেউ আছে তাই বোধহয় সারাদিন মনে পড়ে না। এসব কথা নিয়ে কাল রাতেও হয়ে গেছে একচোট। কিন্তু যা কথায়-কথায় কাঁদতে পারে মেয়েটা। ভূষণ শেষে পা অবধি ধরেছে। কে একজন ছোকরা মতো ঝুমকোর খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল? অ্যাঁ! সাহস তো কম নয়। পিছন থেকে মুখটা দেখা যাচ্ছে না বটে। কে ও? ভূষণ একটু খর চোখেই তাকিয়ে রইল। নাঃ, পল্টু। ভূষণের ভাইপো। কাকিমার জল তুলতে কষ্ট হচ্ছে দেখে এগিয়ে এসেছে। ছেলেটা বড় ভালো। খুব হেসে-হেসে গল্প করছে কাকিমার সঙ্গে। ভূষণ মুখটা একটু আড়াল করল। পল্টুটা না আবার তাকে দেখে ফেলে। আবার সন্তর্পণে মুখ বার করে দেখতে পেল, আরও দুচারজন এসে জুটেছে কুয়োতলাআয়। পল্টু জল তুলছে। ঝুমকো গুলতানি মারছে। মুখটা আড়াল করতেই হয়। নইলে দেখে ফেলবে। রামচরিতমানসখানা খুলে দু-চার লাইন পড়ার চেষ্টা করল ভূষণ। হিন্দিটা তার ভালো আসে না। তা ছাড়া রামচরিত পড়ার মতো মনের অবস্থাও নয়। মন এখন উটাচন। বই রেখে বালিশের পাশে ডাঁই করে রাখা বইপত্র একটা খাতামতো জিনিস তুলে নেয়, খুলে দেখে মুক্তোর মতো পরিষ্কার অক্ষরে ঝরঝরে বাংলা লেখা। ‘তিনি চলিয়াছেন, গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে, দেশ হইতে দেশান্তরে। পরণে সেই দরিদ্র ভারতবাসীর লজ্জা নিবারণের পক্ষে যৎসামান্য দুটি বস্ত্রখণ্ড। ভুলিলে চলিবে না। তাঁহার এই পোশাকও বড় উপযুক্ত, বড় দেশজ, বড় প্রতীকী। হাতে দীর্ঘ শীর্ণ যষ্টি। তাঁহার সহিত আকারে প্রকারে ওই যষ্টিটারও যেন সুদূর মিল রহিয়াছে। রস মরিয়া ওই যষ্টি যেমন ঋজু ও কঠিন হইয়াছে, জীবনের সমস্ত উপভোগ, আমোদ, আনন্দ ইত্যাদিকে ত্যাগ ও তপস্যার অনলে শুকাইয়া তিনিও ঋজু, রিক্ত, কঠিন। সেই কাঠিন্য কাহাকেও আঘাত করে না, কিন্তু সব আঘাতকেই অনমনীয়ভাবে প্রতিরোধ করে।’ ‘বাবুরা, ধনিকেরা, গৃহীরা তাঁহাকে চিনে না। তাহারা শুধু মহাত্মা গান্ধীর জয় জোকার দিয়া ক্ষণিক আবেগ অনুভব করে মাত্র। মহাত্মাজি দেশের কাজ করিতেছেন, তিনিই দেশোদ্ধার করিবেন, আমাদের কিছু করিবার নাই, এইরূপ ধারণা লইয়া তাহারা বেশ নিশ্চিন্তে ইংরেজের গোলামি করিতেছে বা কালোবাজারিতে মুনাফা লুটিতেছে, ঘুস লইতেছে বা অন্যবিধ অপকর্ম করিয়া যাইতেছে। গান্ধীবাবা আছেন, ভালো কাজ তিনিই করিবেন।’ ‘মাঝে-মাঝে ভাবি, তিনি এই দেশে জন্মগ্রহণ করিলেন, তবু কই দেশের তো কলঙ্ক ঘুচিল না। ইহাও কি সম্ভব যে তিনি এই দেশের বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করিলেন, তবু এই দেশের বায়ু পবিত্র হইল না? তাঁহার চরণরেণু মাখিয়াও এই দেশের মাটি ধন্য হই;ল না।‘ ঝুমকোলতা বেড়া দিয়ে ঘেরা চানের জায়গাটায় ঢুকে আড়াল হল, কিন্তু তাতে কি? ঝুমকোর টুকটুকে লাল শাড়ি, রাঙা গামছা আর ধপধপে শায়া যে বেড়ার ওপর। তারও কি শোভা কম? তাতেই নেশা লেগে যায় যে। উঁকি মেরে মুখটা আবার চট করে সরিয়ে নেয় ভূষণ। তার মেজ কাকিমা চাল ধুতে এসে এদিকপানে চেয়ে কী যেন দেখছে। দেওয়ালের দিকে সরে বসল ভূষণ, এ বাড়িটা একেবারে হাট। এত লোক যে কেন যেখানে সেখানে হুটহাট আনাগোনা করে তা বোঝা মুশকিল। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ভূষণ ঘরখানা দেখছিল। লকড়ির মাচানের নিচে কুঁইকুঁই শব্দ শুনে ভূষণ উঁকি মেরে দেখল, গোটাচারেক কুকুরছানা দলা পাকিয়ে আছে। বাড়িতে কুকুরের অভাব নেই, তারই একটা এসে এ-ঘরে বাচ্চা দিয়েছে। বাস্তবিক গান্ধীবাবার শিষ্য ছাড়া বোধহয় কারও পক্ষেই এ-ঘরে বাস করা সম্ভব নয়। বস্তা-বস্তা বীজধান, ভূসি, খোল আর রাজ্যের লকড়িতে ঘর পনেরোয়ানা বোঝাই। একটা বিটকেল গন্ধও থানা গেড়ে আছে। মাটির ভিতে নানা মাপের অজস্র ফুটো। লেপাপোঁছার বালাই নেই। এমন বুকচাপা দম আটকানো ঘরে তুলসীজ্যাঠাই থাকতে পারে, যার জন্য লড়ার কেউ নেই। একটু কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়েছিল ভুষণ, সেই ফাঁকে কখন চানটি সেরে বেরিয়ে পড়েছে ঝুমকোলতা। বেরিয়ে সোজা সেজোকাকির ঘরের ভিতর দিয়ে অন্দরমহল। তবে ভূষণ একেবারে বঞ্চিত হল না। উঠোনের তারে ভেজা শাড়ি মেলার জন্য মিনিটদুই দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ভালো করে দেখে নিল। এ-বাড়ির অন্দরমহল হল রাক্ষসপুরী। একবার যাকে গ্রাস করে নেয় তাকে আর সহজে ছাড়ে না। এই যে ঝুমকোলতা অন্দরে ঢুকল এর মানে হল, সে সংসারে সামগ্রী হয়ে গেল। আর ভূষণের জিনিস রইল না। ফের সেই রাত দশটার পর ঝুমকোলতা আবার ভূষণের হবে। রাক্ষসপুরীর কথা কি আর সাধে মনে হয় ভূষণের। আর তুলসীজ্যাঠার ঘরে বসে লাভ নেই। ভূষণ বেরিয়ে এসে দরজার শিকল তুলে দিল। বিয়ের মধ্যে যে আনন্দ আর রোমহর্ষ ছিল, তা বিয়ের আগে জানত কোন আহাম্মক? ভূষণ ভাবত, বিয়েটা একটা ব্যাপারই হবে বটে, কিন্তু তা যে এ-রকম ভালো, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। যারা বিয়ে না করে থাকে, তাদের জীবনটাই বৃথা। এই যে তুলসীজ্যাঠা, কী নিয়ে যে বেঁচে আছে ভগবান জানে। মাঠেঘাটে ঘুরছে, হোমিওপ্যাথি করে বেড়াচ্ছে, আর দিনান্তে রামচরিতমানস বা গান্ধীর বই খুলে মুখ গুঁজে বসে আছে। অসুখ-বিসুখ হলে জলটুকু এগিয়ে দেওয়ারও লোক নেই। অসুখের কথায় ভুষণ হঠাৎ নিজেই চমকায়, তাই তো। কথাটা তো জব্বর মনে পড়েছে। অ্যাঁ! এখন যদি তার অসুখ হয়, তাহলে ঝুমকোসুন্দরী কী করে? অ্যাঁ! ধরো জ্বর উঠে গেল পাঁচ-সাত ডিগ্রী, ভুষণ চোখ উলটে গোঁ-গোঁ করছে, ডাক্তার নাড়ি ধরে গম্ভীর মুখে বসে আছে আর ঘড়ি দেখছে, অ্যাঁ। তখন কী করবে ঝুমকো? বুকের অপর পড়ে, ‘ওগো, পায়ে পড়...’ এই সব বলবে না? অ্যাঁ! কাণ্ডটা কী হবে তখন! বেজায় শীত পড়েছে এবার। সকালে রোদটাও বড্ড ঢিমে। একটা মোটা খদ্দরের চাদর জড়িয়ে ভুষণ বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। বন্ধুবান্ধবেরা আজকাল তাকে দেখলেই মুখ বেজার করছে। সেদিন ফণী তো বলেই ফেলল, উরে বাব্বা, তোর ঝুমকোলতার গল্প শুনতে-শুনতে যে আঁত শুকিয়ে গেল বাপ। তা ভুষণই বা করে কী? ঝুমকোলতার কথা ছাড়া তার যে আর কথা আসছে না গত তিন-চার দিন। এখনও মেলা কথা বলার বাকি। ছোলাখেত বাঁয়ে রেখে হনহন করে হাঁটছে ভুষণ। পাশের গাঁ হল মুনসির চক। গোকুল থাকে। এমনিতে গোকলেটা যাকে বলে গর্ভাস্রাব। ধান বলতে কান বোঝে। কিন্তু তার কাছে কথা বলে সুখ আছে। যাই বল না কেন, হাসি-হাসি মুখ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনবে, ফোড়ন কাটবে না, বিরক্ত হবে না, উঠি-উঠি করবে না, কাজ দেখবে না। আজ গোকলেকে পাকড়াও করতে হবে। পেটে ঝুমকোলতকার গপ্প ভুড়ভুড়ি কাটছে। না বললেই নয়। এ গাঁয়ের বন্ধুগুলো বড্ড সেয়ানা হয়ে গেছে। মনসাতলায় অশ্বত্থ গাছে নীচে বাঁধানো জায়গাটায় কয়েকজন বসে আছে গোমড়া মুখে। একজঅন তুলসীজ্যাঠা। তিনি ওষুধের বাক্স খুলে শিশি তুলে-তুলে নাম দেখছেন ওষুধের। ওরে ও ভুষণ, কোথা যাস? ভূষণ জ্যাঠার ডাক শুনে একটু থমকায়। তারপর বলে, এই যাচ্ছিলাম একটু, কাজেই। এদিকে যে লম্বোদর প্রামানিকের হয়ে গেল। ঘাটখরচের যোগাড় নেই। একটু দেখবি বাবা? ভূষণ একটু নরম হল। লম্বোদরের কী হল, বৃকোদরের কী হবে, দামোদরের কী হচ্ছে, এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারটাই বা কী আছে, তাই সে বোঝে না। যে যার মতো বেঁচে থাকছে, মরে যাচ্ছে, খাবি খাচ্ছে, দুনিয়ার তাই নিয়ম। থাক, যাক, খাক, তাতে তার কী? তবু ভূষণ দাঁড়িয়ে গেল। যত যাই হোক, এই পাগোল লোকটার তো কেউ নেই, জীবনের স্বাদই পায়নি, মায়া হল ভূষণের। --কী করতে হবে জ্যাঠা? করার অনেক আছে। চারটে ছেলেপুলে, একটা মুখ্যু বউ, ঘরে দানাপানির জোগাড় নেই। তা সে না হয় পরে ভাবা যাবে। আগে ঘাটখরচা তো তোলা লাগে। এই এরা সব বসে আছে ওষুধের জন্যে, আমি নড়তে পারছি না। একটু গাইয়ের ঘরে-ঘরে ঘুরে খরচটা তুলে দিবি বাবা? সে কী কথা? ঘুরব কেন? ঘাটখরচ নয় পকেট থেকেই দিয়ে দিচ্ছি! তুলসীজ্যাঠা একগাল হাসলেন, দূর পাগল। ও বাহাদুরী ক’দিন? আজ লম্বোদর গেছে, কাল বিধু নস্কর যাবে, পরশু বিনোদ হাতি মরবে, কারোর ঘরে মামলোত নেই। ক’জনেরটা দিতে পারবি? তার চেয়ে ঘরে-ঘরে ঘোরা ভালো। পাঁচজনকে সমাজ-সচেতনও করা যায়, দশের কাজে নামানো যায়। যাবি বাবা? ভূষণ তত্ত্বটা বুঝল না। তবে একটু আঁচ করল। কথাটা মন্দ নয়। একটু মাথা চুলকোল সে। তারপর বলল, আচ্ছা দেখছি। যা বাবা, তুই পারবি। দোনামোনা করে ভূষণ গাঁয়ের দিকে ফিরল। কাজটা খুব শক্ত নয়। সবাই তাকে চেনে। চাইলে দেবে। দিলও। বেলা দশটা নাগাদ শুরু করেছিল ভূষণ। সাড়ে এগারোটার মধ্যে শ’আড়াই টাকা উঠে গেল। পাঁচ টাকা কম ছিল, সেটা নিজে পুরণ করে দিল। লম্বোদর যখন মাচানে চেপে শ্মশানে রওনা করল, তখন পড়ন্ত বেলা। চারটে ছেলেমেয়ে আর বউ—কিছুটা শোকে, কিছুটা খিদেয় আর কিছুটা ভবিষ্যতের ভয়ে কাঁদছে লুটোপুটি খেয়ে। দৃশ্যটা বেশিক্ষণ দেখতে পারল না ভূষণ। ঘরদোরের যা চেহারা, তাতে বোঝা যায়, এদের নুন আনতে পান্তা জুটলে সেদিন ভোজ। ফেরার সময় তুলসীজ্যাঠা ছাতাটা মেলে ধরে বলল, আয়, ছাতার নিচে আয়। মুখটা রাঙা হয়ে গেছে তোর। জ্যাঠার এত কাছাকাছি কখনও হয়নি ভূষণ। আজ তার বড় জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল, কীসের আনন্দে বেঁচে আছেন আপনি? কী সুখ পেয়েছেন জীবনে? কিন্তু কথাটা সরল না মুখে। আনন্দেরও তো কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কে যে কী থেকে আনন্দ পায়! কখনও ঝুমকোলতার স্নানের দৃষ্যে, কখনও লম্বোদরের ঘাটখরচ জোগাড়ে।

292

10

শিবাংশু

আমার ভালোবাসার ধনে হবে, তোমার চরণপূজা....

বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো, তাঁকে নিয়ে একটা বড়ো লেখা তৈরি করার কথা ভাবছিলুম। ওঁর বইগুলো পড়া, সব গানগুলো শোনা, এইসব প্রাথমিক কাজকম্মো শুরুও করেছিলুম। আবার আমার পুরোনো অভ্যেস অনুযায়ী প্রয়াসটি বারবার বেলাইনও হয়ে গেছে। নিতান্ত বালক ছিলুম, যখন ওঁর গান প্রথম কানে এসেছিলো। "কে যেন আমার কানে কানে বলে গেল, কোকিলের মাস এলো...।" তখন থেকেই যখন সুযোগ ঘটেছে ওঁর সৃষ্টির স্পর্শে থাকার অবসর অপচয় করিনি। আমরা বাইরের লোক, কখনও চাক্ষুষ সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু ওঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতি মুগ্ধতা সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছিলো। যখন ইউটিউব ছিলোনা, তখন কলকাতায় এলেই ওঁর রেকর্ড বা ক্যাসেট খুঁজে বেড়াতুম। একসময় একটি লেখায় ওঁকে সলিল এবং সুমনের জমিদারির মাঝখানে থাকা এক স্বাধীন নৃপতি বলে মন্তব্য করেছিলুম। কিন্তু পরে ভেবেছি ওঁর সাম্রাজ্যের জাঁকজমক হয়তো ততো চমকায় না, কিন্তু তাঁর রাজত্বের সীমানা বহুদূর গেছে মুগ্ধ শ্রোতার হৃদয়ের ভিতর। সুরযোজনা, লিরিকরচনা এবং গায়ন তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর সামর্থ্য বাংলাগানের চিরাচরিত কমপ্লিট কম্পোজারদের সোনালি ঐতিহ্যে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। শাদা শার্ট, ধুতি, সাইকেল আর হারমোনিয়ম দিয়ে ঘেরা বাংলাগানের কালজয়ী হিরোদের লিস্টিতে তিনি সম্ভবত ছিলেন শেষ নাম। যে নাম শুনলে শ্রোতাদের মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো নতুন প্রত্যাশার। বিশদে তাঁকে নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা রয়েছে পুরো মাত্রায়। জানিনা কবে সময়ের প্রশ্রয় পাবো। এই মূহুর্তে তাঁর গাওয়া আমার অতি প্রিয় সময়জয়ী একটি গান মনে পড়ছে। আমার অদীক্ষিত গায়নে তাকে ধরার চেষ্টা করেছিলুম একবার। মন্ত্রী নই তো। বাণী দেবার এলেম নেই। সেই অপটু গানটিই রেখে দিলুম তাঁর পায়ের কাছে। তিনি হয়তো প্রত্যাখ্যান করবেন না অধম ভক্তের এই স্পর্ধা।আশা তো করতেই পারি। তিনিই তো বলেছিলেন, "আমার স্বপন কিনতে পারে, এমন আমির কই?"

210

3