শিবাংশু

হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি

সারা বিশ্বে প্রতিটি মানুষগোষ্ঠীর দুরকম পরিচয় থাকে। একটি তার ঐতিহাসিক পরিচয়। কালখণ্ডের উদ্বর্তনের পথ ধরে, নথিবদ্ধ ধারাপাঠের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব অবস্থানকে চিনে নেওয়া। আর অন্যটি তার পরিচিত কাল্পনিক প্রতিমূর্তি বা প্রতিবিম্বভিত্তিক। কোনটাই সর্বৈব সত্য বা মিথ্যা নয়। দুই ধরণের পরিচয়ের ভিতরই কিছু সারবস্তু থাকে। ঐতিহাসিক বস্তুস্থিতি ছাড়াও প্রতিটি জাতির একেকটা স্বীকৃত প্রতিবিম্ব থাকে। বাঙালিরও আছে। এই প্রতিবিম্ব সৃষ্টির পিছনে নানা ধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজ করে। যে ভৌগলিক অবস্থানে আজকের বাঙালিদের বাস, মহাভারতের যুগে তাদের অন্ত্যেবাসী মনে করা হতো। সেকালের অঙ্গদেশ, অর্থাৎ আজকের ভাগলপুর, তার পূর্বের অংশকে হস্তিনাপুরের মানুষ অসভ্য ও অনার্যদেশ মনে করতো। সেখানে আর্যদের নামে মাত্র বসবাস ছিলো। সে জন্যই পরম চতুর দুর্যোধন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় কর্ণকে অঙ্গদেশের রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। বাংলায় যাকে বলে, উড়ো খই গোবিন্দায় নমো। কর্ণ কখনও ভুলেও তাঁর 'রাজ্য' দেখতে আসেননি। বাঙালির এই পরিচয়টি তার প্রতিবিম্বিত লোকশ্রুতির অংশ। উত্তরাপথের আর্যজাতি 'বাঙালি'দের সম্বন্ধে এই রকমই একটি ধারণা করে নিয়েছিলো। বলীরাজার পুত্রদের নিয়ে অঙ্গ, বঙ্গ বা কলিঙ্গের যে লোককথা, তা কিন্তু আর্যেতর মানুষদেরই উপাখ্যান। এই এলাকায় যে রাজ্যগুলো ছিলো, যেমন বঙ্গ, সুহ্ম থেকে প্রাগ জ্যোতিষপুর, সেখানের মানুষদের সম্বন্ধে আর্যাবর্তের দর্পিত অধিবাসীরা বেশ নিচু ধারণাই পোষণ করতো। তার রেশ আজও আছে। কারণ আর্য সভ্যতার সীমানা ছিলো মগধরাজ্যের সমৃদ্ধতম রাজপাট, যার সামনে কোসল থেকে গান্ধার, সবাই নিষ্প্রভ। বাঙালির আদিতম জাতিগত অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠে তার সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে যোগাযোগকে কেন্দ্র করে। কাশ্মিরের রাজকবি কল্হনের লেখায় একটা উল্লেখ পাই, সমতটের মানুষদের। যাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তারা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ এবং দেবভাষা সংস্কৃত জানেনা। তার বদলে তারা পাখির ভাষায় কথা বলে। এসময় থেকেই ন্যায় ও তর্কশাস্ত্রের প্রতি বাঙালির আগ্রহ বেশ প্রচারিত ছিলো। যাঁরা প্রমথনাথ বিশীর 'নিকৃষ্ট গল্প' পাঠ করেছেন ( জানিনা কজন এমন আছেন এখানে) , তাঁদের মনে পড়বে 'ধনেপাতা' নামক সেই বিখ্যাত গল্পটি। মুঘল যুগে জাহাঙ্গির বাদশা বলেছিলেন, 'হুনরে চিন, হুজ্জতে বঙ্গাল'। অর্থাৎ চিন দেশের মানুষের স্কিল অনন্য আর বাঙালি অতুলনীয় হুজ্জত বাধাবার কলায়। সবাই স্বীকার করবেন জাহাঙ্গির যতই আনারকলি-নূরজাহান করুন না কেন, ক্রান্তদর্শী পুরুষ ছিলেন। একদিকে ন্যায় ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগান্তকারী চর্চা, আবার তার সঙ্গেই নিমাই পন্ডিতের ভাসিয়ে দেওয়া প্রেমধর্ম। দিগ্বিজয়ী সমুদ্রযাত্রী বীরের দল, মঙ্গলকাব্যের লোকায়ত দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা, অপরপক্ষে ভীত সন্ত্রস্ত তৈলচিক্কন বাবু কালচারের প্রতিনিধিরা। আবার কী শরণ নিতে হবে সেই, 'মেলাবেন, তিনি মেলাবেন' মন্ত্রের। পশ্চিমে পরাক্রান্ত মগধ, দক্ষিণে সমান পরাক্রান্ত ওড্র, উৎকল ও কলিঙ্গদেশ উত্তরে অরণ্যবিকীর্ণ অঙ্গদেশ ও পূর্বে পর্বতারণ্যানীর সমারোহে অগম্য উপজাতি সভ্যতা, এই নিয়ে বাঙালির যে সভ্যতা গড়ে ওঠে তার মধ্যে আর্য, দ্রাবিড়, মোঙ্গল ও অস্ট্রিক, সবারই কিছু কিছু রক্তবীজ এসে পড়ে। বাঙালি সে অর্থে ভারতবর্ষের প্রথম প্রকৃত pot boiled জাতি। দেশবিদেশে মানুষের মনে বাঙালির যে প্রতিবিম্ব ( বাংলায় যাকে বলে ইমেজ) আছে, তা আমাদের এইসব স্ববিরোধী ঐতিহাসিক অবস্থান থেকেই এসেছে। এই গৌরচন্দ্রিকা থেকে হয়তো একটু আন্দাজ হয় 'বাঙালি'রা কীভাবে তাদের সন্তানসন্ততিদের আত্মপরিচয় সম্বন্ধে ওয়কিফহাল করতে পারে। বাঙালিরা তাদের কোন কোন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের প্রশ্নাতীত ভাবে আইডেন্টিফাই করে অথবা কেন করে, সেটাই বৃহৎ প্রশ্ন। যেমন বলা হয়, as much Bengali as rasogolla। শ্লেষার্থে গড়ে ওঠা এ জাতীয় ধারণাবলী থেকে নিজেদের বার করে আনতে যে পর্যায়ের উদ্যম প্রয়োজন, বাঙালিদের তা আছে বলে মনে হয়না। তাদের ভাবনার বাইনারি জগতে লাল-সবুজ দাদাদিদি, ইস্ট-মোহন, বাঙাল-ঘটি,চিংড়ি-ইলিশের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি যতোটা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়, তার ভগ্নাংশও একটা গৌরবজনক আত্মপরিচয় গড়ে তোলার শ্রমসংকুল উপক্রমের জন্য নিয়োজিত হয়না। মনে হয় অচিরকালেই আমাদের উত্তরসূরিরা গোপনে নিজেদের মধ্যে ' হামরাও বঙ্গালি হচ্ছি' বলে পরিচয় বিনিময় করবে।

152

13

Joy

গাজন- একটি গ্রাম্য লৌকিক উৎসবের গল্প

চৈত্র মাসের শেষ| গরমের দাপট শুরু হয়ে গেছে| আর দুদিন পরেই পয়লা বৈশাখ| পয়লা বৈশাখ মানেই সকালে উঠেই মা‚ বাবাকে প্রনাম করে দিন শুরু হত| আজ আর বকাঝকা নয়| আজকের দিনটি ভাল না হলে সারাবছরই খারাপ যায়| মা বাবার সঙ্গে মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়া হত| নতুন জামা‚ নতুন জুতো| দোকানে দোকানে হাল খাতার নিমন্ত্রন| বিকেলে বাবার হাত ধরে দোকানে যাওয়া‚ অনেক ক্যালেন্ডারের থেকে পছন্দ মত ক্যালেন্ডার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া| পয়লা বৈশাখ আমাদের ছোটবেলায় এখনকার মত এত কর্পোরেট‚ আধুনিক ছিল না| বাঙ্গালীদের এক নিজস্ব উৎসব| তার আগে মাকে দেখতাম নীল ষষ্ঠী‚ অশোক ষষ্ঠী এই সব করতে| সন্তানের মঙ্গল কামনায় মা সারাদিন উপোস করে বিকেলে বা সন্ধ্যেবেলায় শিবের মাথায় জল ঢালতে যেতেন| আমাদের নীল বা অশোক ষষ্ঠী নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না| আমাদের উৎসাহ ছিল গাজন দেখার| আমাদের দেশের বাড়ীতে খুব ধুমধাম করে গাজন ও চড়ক উৎসব হত| গাজনের একদিন আগেই আমরা চলে আসতাম কাঁদোয়া| ছোট্ট খুব সুন্দর গ্রাম| তার থেকেও সুন্দর ছিল মোড়াগাছা স্টেশন| একটু ফাঁকা ফাঁকা গ্রাম্য স্টেশন| প্ল্যাট্ফর্ম লাগোয়া প্রচুর গাছ| মনে হয় গাছের তলায় বসে একটু জিরিয়ে নিই| প্ল্যাট্ফর্ম থেকেই নেমেই শুরু হল আঁকা বাঁকা মেঠো রাস্তা| স্ট্শেনের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে কয়েকটি রিক্শা| রিক্শাওয়ালারা বেশীর ভাগই বাবার চেনা| বাবা ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করে দিতেন| কার বাড়ী বানানো হল‚ কারও ছেলের পড়া শোনা তো কারও মেয়ের বিয়ের খবর| ওরাও বাবাকে আমার জ্যেঠু‚ পিসি‚ কাকাদের কথা জানতে চাইতেন| বাবলু মানে আমার ছোট কাকা কেমন আছেন‚ লক্ষীদি কেমন আছে গো সেজদা? আমার মেজো পিসির নাম লক্ষী| গল্প করতে করতেই আমরা একটি রিক্শায় উঠে পরলাম| সেই মেঠো রাস্তা‚ দুপাশে ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমাদের রিক্শা চলতে শুরু করল| রাস্তাটা খুব সুন্দর ছিল| শুখনো পাতা রাস্তায় অবহেলায় পরে রয়েছে| দুপাশে বড় বড় আম গাছের বাগান| এত আম গাছে যেন মনে হয় গাছগুলো বোধহয় এখ্নই ভেঙ্গে পড়বে| গল্প আর শুখনো পাতার মচমচানি শব্দের মাঝে হঠাৎ করে রাস্তায় একটা-দুটো সাপ আমাদের রিক্শার আগেই রাস্তা অতিক্রম করে চলে গেল| আঁতকে উঠে আমরা চিৎকার করে কি সাপ ওগুলো? রিক্শাওয়ালা আমাদের আশ্বাস দেই ঐ সাপের বিষ নেই গো| আর বিষ নেই‚ সাপ দেখেই তো পা দুটো সিটের উপরে তুলে নিয়েছি| অনেকক্ষন লাগে কাঁদোয়া পৌঁছাতে| কিছুক্ষন পর আমাদের রিক্শা একটি মিষ্টির দোকানে থামল| ওখানে অনেক মিষ্টির দোকান| এখানে ছানার জিলিপি খুব জনপ্রিয়| আহা কি স্বাদ| মুখে দিলেই নরম সুস্বাদু বস্তুটি মিলিয়ে যেত| বেশ জমজমাট জায়গা| হাট বসেছে| লোকজন জিনিষপত্র কেনা-বেচা করছে| এই জায়গাটার নাম ধর্মদা| বাবা‚কাকারা এখানের স্কুলে মাধ্যামিকে পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন| কাঁদোয়া থেকে অনেকটা রাস্তা| বাবারা হেঁটে বা সাইকেলে আসতেন| বর্ষাকালে সে এক ভয়ানক অবস্থা| রাস্তা কাদাময়| পুকুর‚ ডোবা জলে ভর্তি| রাস্তায় জল-কাদার মধ্যে ছোট-ছোট মাছ দিব্যি ভেসে বেড়াচ্ছে| যেতে যেতেই বাবা আমাদের লাইব্রেরী দেখাতেন| এই লাইব্রেরীটা আমার বাবা-জ্যাঠারই দ্বায়িত্ব নিয়ে তৈরী করিয়েছিলেন| আমরা মিষ্টি খেয়ে ও হাঁড়ি ভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে আবার রিক্শায় উঠে বসি| আবার পথ চলা| এবার রিকশা এসে থামে আমাদের বাড়ির দোরগোড়ায়| আমাদের দেশের বাড়ি ও মামার বাড়ি দুটো-ই গ্রাম হওয়ার সুবাদে আমার প্রকৃতির সঙ্গে‚ গাছপালা‚ পুকুর‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেতের সঙ্গে নিবিড় এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল| আমার মামার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলায়| দেবী পারুলিয়া নামের সুন্দর এক গ্রামে| ওখানে সাধারনত আমাদের যাবার সময় ছিল শীতকালে| যখন আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত তখন| নদীয়া- মুর্শিদাবাদ দুটো পাশপাশি জেলা হলেও দুই জেলার মধ্যে ভাষাগত‚ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে অনেক ফারাক ছিল| কথার টানে অনেক তফাত‚ দেবী পারুলিয়ার মাটি লাল‚ এঁঠেল মাটি| আমার মামার বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই আবার বীরভূম জেলা| শীতকালে মাঠে ধান ভর্তি| চরিদিকে শুধু সোনালী রঙ্গের প্রলেপ| কোথাও আবার সরষে ক্ষেতের উপর রোদের মোলায়েম স্পর্শ| গরুর গাড়ির মাঠ থেকে ধান নিয়ে যাওয়া| আমরা ভাই-বোনেরা গরুর গাড়িতে ওঠার জন্যে দৌঁড় শুরু করতাম| অনেক দীঘি আর পুকুর| সবেতেই হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে| ওদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে| আবার কোথাও মাঠ ভর্তি আখের ক্ষেত| আমর লুকিয়ে আখের ক্ষেত থেকে আখ ভেঙ্গে খেতাম| এখানে আমরা স্কুল না খোলা পর্যন্ত থাকতাম| বাবা আমাদের রেখে চলে আসতেন কলকাতায়| অফিসের জন্যে বেশীদিন থাকতে পারতেন না| এর পর শুরু হত আমাদের খেলা‚ দুষ্টুমি| গরুর গাড়ি করে তারাপীঠ যাওয়া হত| মামা সব ব্যবস্থা করে দিতেন| খুব মজা হত| কিন্তু আমাদের দেশের বাড়ি কাঁদুয়া আবার একটু অন্য রকম| এখানে আমরা আসতাম এই গ্রীষ্মকালে| গাছ ভর্তি আম‚ জাম‚ কাঁঠাল| আমাদের দোতলা বাগান বাড়ি| কত বড় বাগান‚ আর কত রকমের গাছ| আমরা ঢিল মেরে আম পারতাম| আর ঝড়েও প্রচুর আম পড়ত| সেই আমের খোসা ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন‚ লঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে খেতে খুব ভাল লাগত| আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েও বয়ে চলেছে গঙ্গা| আর একটা বাঁধানো পুকুর ছিল আমাদের| বাড়ীর মেয়ে-বৌরা স্নান‚ কাপড় কাচার জন্যে আসত| এখানে বাবা থাকার জন্যে ও খুব অল্প দিন থাকায় মাত্রাতিরিক্ত দুষ্টুমি করা যেত না| তবে খুব ভালো লাগত গাজন দেখতে| সেটা আবার অন্য রকম আনন্দ| প্রায় ঘন্টা খানেক রিক্শা সফর করে আমাদের বাড়ীতে পৌঁছাতাম| বাড়ীটিতে আমাদের কেউও থাকতেন না| বাবা‚ কাকা‚ জ্যেঠুরা সবাই কাজের জন্যে কলকাতা‚ বহরমপুরে চলে এসেছেন অনেকদিন হল| আমার ঠাকুর্দা ছিলেন ডাক্তার| ঠাকুমা মারা যাবার পর ঠাকুর্দাও পাকাপাকি ভাবে চলে এলেন কলকাতায়| ফলে বাড়িটি ফাঁকাই পরে থাকত| বাবার মুখে শোনা ৭১এর বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় প্রচুর লোক ওপার বাংলা থেকে এখানে চলে আসেন| তাদেরই কেউ আমার দাদুর কাছে এই বাড়িটিতে থাকার জন্যে অনুনয়-বিনয় করাতে ঠাকুর্দা ওদের এই বাড়িটিতে থাকতে দেন| শর্ত ছিল থাকার জন্যে কোন ভাড়া দিতে হবে না‚ কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এলে একটা-দুটো ঘর ছেড়ে দিতে হবে| আমাদের আসা বলতে বছরে একবারই এই গাজনের সময়| আমাদের বাড়ি সংলগ্ন বাগানে শিবের গাজন হত| কয়েকদিন ধরেই চলত তার প্রস্তুতি| বাগানের যে অংশটা রাস্তা ঘেঁষা তার পাশেই ছিল এক ব্ড় অশ্ব্ত্থ গাছ| অনেক প্রাচীন সেই গাছ| তার নিচেই বেদীতে রাখা হত শিবের লিঙ্গ| গাজনের কয়েকদিন আগে থেকেই অনেকেই সন্ন্যাসী হতেন| সারাদিন রোদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করে সন্ধ্যেবেলায় হবিষ্যি ভোজন| আর গাজনের আগের দিন ফলমূল খেয়েই কাটাতেন সন্ন্যাসীরা| আমার বাবা-মা সন্ন্যাসীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন| সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজন মূল সন্ন্যাসী থাকতেন| তার নির্দেশ সব সন্ন্যাসীরা মেনে চলতেন| সন্ন্যাসী ভাড়া নেওয়া হত| কারও কোন মানসিক থাকলে ফল‚ ফুল‚ মিষ্টি দিয়ে শিবের পুজোর ডালি নিয়ে আসতেন| শিবের মাথায় আকন্দ ফুল রাখা হত| শিবের মাথা থেকে ফুল তাড়াতাড়ি মাটিতে পড়া মানে মানসিক তাড়াতাড়ি পুর্ণ হবে| যদি ফুল পরতে দেরী হয় তার মানে তার মনস্কামনা পূর্ণ হতে দেরী হবে এমনই ধারনা ছিল স্থানীয়দের| এবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের নাচ-গান| ঢাক ঢোল আর কাঁসরের আওয়াজে গমগম করত| শিব তুষ্ট করার জন্যে সন্ন্যাসীরা নিজেদের উপর অত্যাচার শুরু করতেন| চাবুক দিয়ে মারা‚ জিভে সুঁচ ফোটানো‚ বঁটি উপর দিয়ে হাঁটা এই সব করা হত| আমার দেখতাম আর শিউড়ে উঠতাম| তার মধ্যে আবার দন্ডি কাটা হত‚ লোকে লোকারন্য হয়ে যেত| পাশেই বসত মেলা| আহামরি কিছু নয় গ্রাম্য মেলা যেমন হয়| বাদাম ভাজা‚ জিলিপির দোকান| নাগরদোলায় কিছু ভীড়| বেশ লাগত দেখতে| কালবৈশাখী ঝড়টা প্রতিবারই এই সময়ই এসে সব লন্ডভন্ড করে যেত| প্রথমে আচমকা থমথমে পরিবেশ‚ আস্তে আস্তে ঘন কালো মেঘ এসে সব ঢেকে যেত| কিছুক্ষন পর ধুলোর ঝড় সঙ্গে বৃষ্টি| আমরা দৌঁড়ে ঢুকে পরতাম বাড়িতে| বাতাসে সোঁদা গন্ধ| অনেক্ক্ষন ধরে চলত বৃষ্টি আর ঝড়ের তান্ডব| আর সঙ্গে ধুপ-ধাপ আওয়াজ| আম পরার শব্দ| ঝড়-বৃষ্টি একটু কমলে বাইরে গিয়ে দেখলেই মনে হয় একটু আগেই বেশ বড়্সড় একটা যুদ্ধ হয়েছে| চারিদিকে মাটি থেকে উৎখাত হওয়া ছোট-বড় অনেক গাছ| চার পাশে পরে রয়েছে অজস্র গাছের ভাঙ্গা ডালপালা| উড়ে আসা খড়ের আর টিনের চাল| সব সরিয়ে আবার শুরু হত সন্ন্যাসীদের তান্ডব নৃত্য| প্রচুর আম পড়ত ঝড়ের সময়| মা-বাবার চোখ এড়িয়ে আমারাও ছুটতাম আম কুড়াতে| আবার চলত সেই শিবের মাথায় ফুল পরা আর গাজনের উৎসব| আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামে‚ গাজন উত্সব শেষ হয়| হাল্কা হয়ে যায় মানুষের ভিড়| কিছু বাচ্চা‚ বুড়ো এখনও আছে মেলায়| হ্যাজাক আর হ্যারিকেনের আলো গাঢ় অন্ধকারকে ফিকে করে দেয়| আমাদের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে| সারাদিনের হৈ-চৈ| একটু কিছু খেয়েই আমরা ঘুমের দেশে| পরের দিন সকালে দেখি বস্তা বস্তা ভর্তি আম| কাল বিকেলের ঝড়ের ফলাফল| পরেরদিন আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নেমতন্ন| মা‚কাকিমারা রান্না করতে ব্যস্ত| এই ফাঁকে বাবার সঙ্গে আমরা গঙ্গায় স্নান সেরে আসি| এখানে গঙ্গা বেশ চওড়া| তবে জল পরিষ্কার| বাবার মুখে গল্প শুনি‚ বাবা-কাকারা নাকি গঙ্গা পেরিয়ে যেতেন| বাবা এখনো সাঁতরে অনেকট দূর চলে যেতেন| ভয় হত আমাদের‚ বাবা যদি জলে ডুবে যান| না সেরকম কিছু হত না| একটু পরেই বাবা সাঁতরে পারে ফিরে আসতেন| বিকেলে বাবাদের বন্ধুদের আড্ডা বেশ জমে উঠত| দুদিন আনন্দে কাটাবার পর এবার ফেরার পালা| পরদিন ফিরে আসা| মনখারাপ করে আবার রিকশায় উঠে বসতাম| আবার চেনা পথ| ধর্মদায় দাঁড়ানো| আমাদের কলকাতার আত্মীয়রা সব ছানার জিলিপির ফর্দ দিয়ে রাখত| প্রচুর মিষ্টি নিয়ে আসা হত কলকাতায়| মোড়াগাছা স্টেশনে এসে একটু দাঁড়ালেই কু ঝিক-ঝিক কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন এসে হাজির| রিকশাওয়ালা আমাদের দেখে বলেন আবার সামনের বছর আসবে তো...মনে মনে বলি আবার আসব| প্রতি বছর আসব| বেশ কিছুদিন চালু ছিল আমাদের এই বেড়াতে আসা| পড়াশোনার চাপ বাড়ার ফলে কমে গেল এখনে আসা| একদিন শুনলাম আমাদের দেশের বাড়িটি ঐ ওপার বাংলার যারা আমাদের বাড়িটিতে থাকতেন ওরা বাড়িটি অধিকার করে নিয়েছে| বাবা-জ্যেঠুরা দৌঁড়াদৌড়িতে নামমাত্র কিছু টাকা পাওয়া গেল| বাবা-কাকারা দেশের বাড়ির গল্প বলতে শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না| সেই আম‚জাম বাগানের গল্প‚ গঙ্গায় সাঁতরে এপার ওপার হওয়ার গল্প| আরও কত কি| বাবা কিছুদিন আগে চলে গেলেন‚ কয়েক বছরের ব্যবধানে মা ও চলে গেলেন ঐ দূর আকাশ পানে| মামার বাড়ি ও দেশের বাড়ি যাওয়া কমে কমে একদম বন্ধই হয়ে গেল| কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনো ফিকে হয়ে যায়নি| মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ গাছ্পালা‚ নদী‚ পাখি‚ শষ্য-ক্ষেত‚পুকুর‚ প্রকৃতি হাতছনি দিয়ে ডাকে| ফিস ফিস করে যেন আমাকে বলে তুমি আসবে বলেছিলে‚ কিন্তু তুমি তো এলে না| ওদের কিছু বলতে পারিনা| নীরবে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে| দিব্যেন্দু মজুমদার

163

10

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

তুলাভিটা, মালদা-শেষপর্ব

শেষ পর্যন্ত এই উৎপীড়ন যখন আর সহ্য হলো না তখন সারা বাংলার রাষ্ট্র নায়কেরা একত্র হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে অধিরাজ বলে নির্বাচন করলেন এবং তাঁর সর্বময় আধিপত্য মেনে নিলেন। এই রাষ্ট্রনায়ক অধিরাজের নাম গোপাল দেব। কে এই গোপাল দেব? গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রলিপি তে বলা হয়েছে "গোপাল দেব ছিলেন দয়িতবিষ্ণুর পুত্র এবং বপ্যটের পৌত্র। মাৎস্যন্যায় দূর করিবার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল"। একটা ব্যাপার লক্ষণীয় পাল রাজাদের রাজ সভায় রচিত কোন গ্রন্থে নিজেদের বংশ কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয় নি। সাধারণ প্রজা দয়িতবিষ্ণুর পুত্র গোপাল দেবের জন্ম ভূমি বরেন্দ্র(রাজশাহী) অঞ্চলে। এবং সেখানে তিনি একজন সামন্ত নায়ক ছিলেন। এবং তিনি যে বাঙালি ছিলেন এতে সন্দেহের অবকাশ নাই। লিপিতে বলা সংস্কৃত প্রকৃতিপুঞ্জ শব্দের অর্থ যদিও জনসাধারণ, কিন্তু বাংলার সকল জনগণ সম্মিলিত হয়ে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এটা মনে হয় না। আসলে তখন দেশ জুড়ে অসংখ্য সামন্ত নায়কেরা ছিল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তারা যখন দেশকে বারবার বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণ থেকে আর রক্ষা করতে পারলেন না, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলেন না, তখন একজন রাজা ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছাড়া বাঁচার আর পথ ছিলনা। তাদের এই শুভ বুদ্ধির ফলে বাংলা- নৈরাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক শত্রুর কাছে বার বার অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেল। আনুমানিক ৭৫০ খৃস্টাব্দে গোপাল দেব(৭৫০ খ্রীঃ-৭৭৫ খ্রীঃ) পাল বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা হয়ে সমস্ত সামন্ত প্রভুদের দমন করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন, দেশ থেকে অরাজকতা দূর করেন, বহিঃ শত্রু আক্রমণ থেকে দেশ কে রক্ষা করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে গোবিন্দ পালের(১১৬১খ্রীঃ-৬৫খ্রীঃ) সঙ্গে সঙ্গে গোপাল প্রতিষ্ঠিত এই পাল বংশের অবসান ঘটে। সুদীর্ঘ চারশো বৎসর ধরে নিরবচ্ছিন্ন একটা রাজবংশের রাজত্ব খুব কম দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়। বৃহত্তর বাংলাকে সংহত ও শক্তিশালী করে গোপাল মারা যাবার পর হাল ধরেন পুত্র ধর্মপাল। তার নেতৃত্বে বাঙালির সামরিক শক্তি তৎকালীন ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি প্রায় সমগ্র পূর্ব ভারতের একের পর এক রাজ্য জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন। "কনৌজ জয় করার পর এক দরবারের আয়োজন করেন। ঐ দরবারে ভোজ, মৎস্য, মুদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, মালব, বেরাব, গান্ধার, পেশোয়ার, কীর প্রভৃতি প্রাচীন রাজ্যগুলির রাজাগন উপস্থিত হইয়া বাঙালি ধর্মপালকে অধিরাজ বলিয়া স্বীকার করেন" - (খালিমপুর তাম্র লিপি) পাঞ্জাব থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন রাজ্যসমূহ ধর্মপাল জয় করেছিলেন। ধর্মপাল মারা যাওয়ার পর রাজা হন পুত্র দেবপাল। দেবপাল পিতার সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করেন। হিমালয়ের সানু দেশ হতে আরম্ভ করে বিন্ধ্য পর্যন্ত এবং উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ থেকে আরম্ভ করে প্রাগজোতিষ পর্যন্ত তার আধিপত্য স্বীকৃত হতো। এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। আরবের বণিক পর্যটক সুলেমান তার বিবরণীতে বলেন:- "বঙ্গরাজ দেব পালের সৈন্যদলে ৫০,০০০ হাতি ছিল এবং সৈন্যদলের সাজসজ্জা ও পোশাক পরিচ্ছদ ধোওয়া, গুছানো ইত্যাদি কাজের জন্যই ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল"। একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন হতোদ্যম বাঙালি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে শৌর্য বীর্য ও দক্ষতার সাথে বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিল। যার যাদু মন্ত্র ছিল বৃহত্তর বাংলার ঐক্যবদ্ধ শক্তি। এই শক্তির ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলে প্রতিষ্ঠাতা গোপাল। বাংলার ইতিহাসে পালবংশের আধিপত্যের এই চারশো বৎসর নানাদিক থেকে গভীর ও ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। বর্তমানের বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয়েছে এই যুগে। শশাঙ্ক যদিও শুরু করেছিলেন কিন্তু পাল আমলেই বাঙালির রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ লাভ করে এই পাল যুগে। বাংলা ভাষা ও লিপির গোড়া খুঁজতে হলে এই চারশো বৎসরের মধ্যে খুঁজতে হবে। এই লিপি, ভাষা, ভৌগলিক সত্ত্বা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শকে আশ্রয় করে একটি স্থানীয় সত্ত্বাও গড়ে উঠে এই যুগে। সেই হাজার বছর আগে পাল রাজাগন ছিলে অসাম্প্রদায়িক। তারা নিজেরা বৌদ্ধ; অথচ বৈদিক হিন্দু ধর্মও তাদের আনুকূল্য ও পোষকতা লাভ করেছিল। এমনকি একাধিক পালরাজা হিন্দু ধর্মের পূজা এবং যজ্ঞে নিজেরা অংশ গ্রহণ করেছেন, পুরোহিত সিঞ্চিত শান্তি বারি নিজেদের মস্তকে ধারণ করেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মে ব্রাহ্মণের নিয়োজিত হতেন, মন্ত্রী সেনাপতি হতেন, আবার কৈবর্তরাও এই সব পদে স্থান পেত। এইভাবে পালবংশ কে কেন্দ্র করে বাংলায় প্রথম সামাজিক সমন্বয় সম্ভব হয়েছিল। পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, সারনাথের বৌদ্ধ সংঘ ও মহাবিহারগুলিকে আশ্রয় করে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ জগতেও বাংলা ও বাঙালির রাষ্ট্র এক গৌরবময় স্থান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এই সকলের সম্মিলিত ফলে বাঙলায় এই সময়েই অর্থাৎ এই চারশো বৎসর ধরে একটি সামগ্রিক ঐক্যবোধ গড়ে উঠে। এটাই বাঙালির স্বদেশ ও স্বজাত্য বোধের মূলে এবং এটাই বাঙালির একজাতীয়ত্বের ভিত্তি। পাল-যুগের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।” - এই পরম্পরা মেনে রাজা মহেন্দ্রপাল, কুড্ডলখটকা বৈশ্য ( জেলা ), এবং পুণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তি ( ডিভিশন) প্রজ্ঞাপারমিতা এবং অন্যান্যদের পূজার জন্য বজ্রদেবকে দায়িত্ব দেন এই বৌদ্ধবিহার গড়ে তোলার জন্য ।একটা ইংরেজী সংবাদ পত্রের খবর দেই Statesman (India) | December 30, 2001 | STATESMAN NEWS SERVICE MALDA, Dec. 29. - The government's delay in developing a Buddhist pilgrimage site at Jagajibanpur in Habibpur block was due to the lack of infrastructure, the chief minister said. Speaking to The Statesman during his visit here on Thursday, the chief minister, Mr Buddhadev Bhattacharya, said: "Jagajibanpur is an important excavation site. But due to lack of infrastructure, we are unable to attract the Buddhist pilgrims, particularly the Japanese, to it. They (international Buddhist tourists) only flock to Bihar and return." He assured that the government was "trying to create the necessary infrastructure at the place". According to Mr Bhattacharya, the completion of excavation work at the site will take some more time. The Archaeological Survey of India is doing the excavation at the site which includes Tulavita, well known during Pala rule. A part of the site falls in Bangladesh. A Bangladeshi archaeologist, Mr Najmul Haque, is also engaged in the task, he pointed out. After the Jagajibanpur project is completed, Mr Bhattacharya, said the state would feature in the itinerary of the Buddhist pilgrims. The chief minister also assured that the Malda unit of the West Bengal Democratic Writers-Artists' Association will set up a museum in Jagajibanpur. The association, however, alleged that the then chief minister, Mr Jyoti Basu, too had promised the museum in March 1994, but no initiative has been taken. It has also demanded that Malda must be covered in the next issue of the West Bengal Magazine published by Information and Cultural Affairs ministry. If the demand is acceded to, it will be for the first time in 24 years of Left Front rule that Malda will feature in the magazine. এই বৌদ্ধ বিহারটির বিস্তৃতি বর্তমান বাংলাদেশ পর্যন্ত । অনুমান, এটা নালন্দার থেকেও বড় । +++++++++ দেখতে গেলে , প্রথমে মালদা শহরে পৌঁছে হোটেলে উঠুন । তারপর একটা ভাড়া করা গাড়ী নিয়ে বলুন :- আইহো- বুলবুলচণ্ডীর রাস্তায় কেন পুকুর, পুকুরিয়া হয়ে এই রাস্তায় জগজীবনপুরে তুলাভিটা যাবো । =================== তথ্যঋণ :- শ্রী কমল বসাকের বই, এবং নেটের বিভিন্ন সাইট চিত্র সৌজন্য:- Shampa Ghosh (মালদা)

137

4

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

তুলাভিটা, মালদা-১

দিনটা ছিল, ১৩ ই মার্চ ১৯৮৭ । স্থানীয় ভাষায় “ নেউ” খোঁড়া মানে, ভিত তৈরি করার জন্য মাটি কাটা । মাটি কিছুটা কাটার পরেই উঠে এলো বিশাল এক তামার পাত । জায়গার নাম, “তুলাভিটা” মালদা জেলার হবিবপুর থানায় পড়ে, (অঞ্চল: বৈদ্যপুর জগজীবনপুর)। শহর ইংলিশ বাজার থেকে দূরত্ব প্রায় ৪১ কি মি । বাংলাদেশ সীমান্ত কাছেই । এই তামার পাতের ওজন- ১১ কে জি ৯০০ গ্রাম, ১৮ ইঞ্চি লম্বা ও ২২ ইঞ্চি চওড়া। হিজিবিজি লেখা এই তামার পাতের মূল্য, স্বাভাবিক ভাবেই ওই ভদ্রলোকের জানার কথা নয় । এই মুহূর্তে সেই ভদ্রলোকের নামটা আমার মনে পড়ছে না ( দুঃখিত), তবে তিনি একটি স্থানীয় স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন বলেই মনে পড়ছে। প্রথমে, এক তামার ব্যবসায়ী এই তামার পাতটি কিনে নিতে চান । কিন্তু, ওই ভদ্রলোকের একটা কিছু মনে হওয়াতে , চলে আসেন ইংলিশ বাজার ( মালদা বলে যাকে আমরা জানি ) শহরে। সৌভাগ্য বশত মালদার অন্যতম ইতিহাসবিদ ও মালদা বিটি কলেজের অন্যতম অধ্যাপক শ্রী কমল বসাকের হাতে ওই তামার ফলকটি আসে । ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ সালে, মালদার সংবাদপত্র “ এই মালদা” তে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে জানান :- এই তাম্রফলকটিতে সিদ্ধার্থ মাত্রিকা লিপিতে লিখিত । ভাষা সংস্কৃত । গদ্য ও পদ্য দুই ধরণের ধাঁচেই এই লিপি উৎকীর্ণ আছে । রাজা মহেন্দ্র পালকে আমরা এযাবৎ জেনে এসেছিলাম গুর্জর প্রতিহার বংশের । কিন্তু এই ফলকে লেখায় সেই ভুল ভাঙে । এই মহেন্দ্র পাল হলেন বাংলার বিখ্যাত পাল বংশের ৪র্থ রাজা দেবপালের ছেলে । এই বংশ সম্বন্ধে আগে বলে নেই, তা হলে আরও সুবিধে হবে, ব্যাপারটা বুঝতে । - বাঙালি রাজা শশাঙ্কের গৌড়কে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গৌড়তন্ত্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা তার মৃত্যুর পর ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শশাঙ্কের ধনুকে গুণ টানার মত বীর অব্যবহিত পরে আর দেখা গেল না। ফলে এর পর সুদীর্ঘ একশো বৎসর(৬৫০ -৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সমগ্র বাংলার উপর নেমে আসে গভীর ও সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতা। প্রখ্যাত বৌদ্ধ ইতিহাস রচয়িতা তারানাথ এই সময় সম্পর্কে বলেন:- 'সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া অভূতপূর্ব নৈরাজ্যের সূত্রপাত হয়। গৌড়ে-বঙ্গে সমতটে তখন আর কোনও রাজার আধিপত্য নাই, সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব তো নাইই। রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্রাহ্মণ। নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, কাল তাহার মস্তক ধূলায় লুটাইতেছে।' এর চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কি হতে পারে! সমসাময়িক লিপি ও কাব্যে (রামচরিত) এ ধরনের নৈরাজ্যকে বলা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। বাহুবলই একমাত্র বল, সমস্ত দেশময় উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মত্ততা; দেশের এই অবস্থাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তাকেই বলে মাৎস্যন্যায়। অর্থাৎ বড় মাছের ছোট মাছকে গ্রাস করার যে ন্যায় বা যুক্তি সেই ন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব। শত বৎসরের এই মাৎস্যন্যায়ের নৈরাজ্যে বাংলায় আর্থ সামাজিক অবস্থা চরম বাজে অবস্থায় চলে আসে। এই নৈরাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে কি পরিমাণ ভোগান্তি ও দুর্দশা ছিল টা সহজেই অনুমেয়। সংস্কৃত গ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূলকল্প থেকে এই সময় ঘটা এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায়। চলবে

157

8

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

সংস্কৃত বলার বিপদ

মালদায় থাকাকালীন, সরকারী ট্যুরিস্ট লজ থেকে ম্যানেজার সাহেব মাঝে মাঝে এত্তেলা দিতেন- গৌড় পাণ্ডুয়ায় বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকদের গাইড হতে। বিনিময়ে টাকাডা, কলাডা, মুলোডা জুটতো। টাকা পয়সা তো মিলতই তার ওপর খ্যাঁটন আর বিলেইতি কারণ বারি । তো, সেবার ডাক পড়লো। গিয়ে দেখলাম এক মধ্যবয়সী দম্পতী। ম্যানেজার বাবু সেই মুহূর্তে ছিলেন না। স্টাফেদের কাছে জানলাম, এঁরা ফ্রেঞ্চ। সব্বোনাশ। এদিকে তো আমি খালি মঁশিয়ে আর মাদামাজোয়েল, এই দুটো শব্দ জানি, তাও নার্ভাস হয়ে কোনটা পুংলিঙ্গ আর কোনটা স্ত্রীলিঙ্গ ভুলে মেরে দিয়েছি। বলির পাঁঠার মত ওনাদের কাছে গিয়ে কাঁপতে লাগলাম। খালি দাঁত বের করে হেসে যাচ্ছি। ম্যানেজারবাবু ততক্ষণে চলে এসেছেন। তাঁকে দেখে, ভদ্রলোকের বিরক্তি প্রকাশ। আমারই মতন টুটাফুটা ইংরেজিতে বললেন- আপনাদের এখানে মূক বধির গাইড দেওয়া হয় নাকি? সাহস পেয়ে আমার "ফ্রেঞ্চ" ইংরেজি বললাম ওনাদের সাথে । বাঙালি হেলায় করিল ফ্রাঁসোয়া জয় । ==== ম্যারিকান ইংরেজী বলা খুব সোজা ! নাকী সুরে বাংলা উচ্চারণে ইংরেজী বললেই হল। যদিও ওদের গুলো বোঝা যেত না সহজে । আরও একবার এই রকমই ডাক পড়লো । গিয়ে দেখি দুই সাহেব । আমার কাছে, সব সাহেবই এক লাগতো দেখতে । তবে, এদের উচ্চারণটা বোঝা যাচ্ছিল । একজন বয়স্ক, আরেকজন তুলনায় কম বয়েসী । রওয়ানা দিলাম । দেখাতে দেখাতে চলেছি । মাঝে দু একটা মুখস্ত করা সংস্কৃত শ্লোক । পরান্নং প্রাপ্যে মূঢ় মা প্রাণেষু দয়াং কুরু। পরান্নং দুর্লভং লোকে, প্রাণাঃ জন্মনি জন্মনি ।। (অস্যার্থঃ- পরের অন্ন ( কেউ কাউকে সহজে ডেকে খাওয়ায় না) এই পৃথিবীতে পাওয়া যায় না। অতএব, হে মূর্খ! যত পারো খাও! আর প্রাণ? সে তো জন্মজন্মান্তরেও পাওয়া যায়। - খাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় দর্শন শেখাচ্ছিলাম ওদের :p ) হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বয়স্ক সাহেবটা বলল :- ইট সিম্স্ ইউ নো সানস্ক্রিট‌ !!! আম্মো ভাবলাম :- সায়েবরা আর সংস্কৃত কি বুঝবে ? তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আমার উত্তর :- ইয়া ইয়া ! সিওর ! তারপরই- বিনা মেঘে বজ্রপাত ! দেন লেট আস টক্ ইন‌ সানস্ক্রিট্ , হোয়াই ইন ইংলিশ ? কিভাবে যে সামলেছিলাম------ ভগাই জানে ! ======= পরে জেনেছিলাম- বয়স্ক মুশকো সাহেবটি জার্মান এবং তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের ডিন্ আর ছোটটি অধ্যাপক সংস্কৃতের । সেই থেকে আর সংস্কৃত নিয়ে কথা বলি না ! মাত্থা খারাপ ?

196

14

মনোজ ভট্টাচার্য

স্বপ্নে আসে চরিত্রেরা !

স্বপ্নের মাধ্যমে কি গল্পের থিম পাওয়া যায় ? হয়ত যায় ! কাল সারা রাত স্বপ্নের মধ্যে বিচরন করল বেশ কয়েকটা চরিত্র ! তাদের মধ্যে মহিলা ছিল কিছু – পুরুষ চরিত্রও ছিল ! কিন্তু তাদের কারুকেই আমি চিনতে পারলাম না ! কেন তারা স্বপ্নের মধ্যে এলো ! – আমাকে কি তাদের কোন কথা বলতে চাইল ! যেমন নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র! পরিচালকের সন্ধানে জলজ্যন্ত ছটা চরিত্র তার পথ খুঁজে নিতে চায় ! – এখানেও তাদের চেয়ে একটু উচ্চতায় যেন তাদের দেখতে পাই – সবাইকেই যাতে দেখা যায় ! এরা তো অতীত নয় ! নাকি বর্তমান – টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে ! লিখেছি – চরিত্রগুলোর কজন নারী – কিছু পুরুষ ! ঠিক কজন – তা সঠিক বোঝা গেল না ! – স্বপ্নের আবছায়ার মধ্যে দিয়ে যেরকম দেখেছি সেরকম ভাবে আঁকার চেষ্টা করি । - মোটামুটি সবারই বয়স কম বেশি চল্লিশের কাছাকাছি । মেয়েদের বয়সও তিরিশ চল্লিশের আশেপাশে ! প্রথমে এক জন - বয়েস মনে হল চল্লিশেক । চোখে চশমা । নাম হওয়া উচিত প্রণব বা প্রনবেশ । একটু রাশভারী ধরনের ! কথায় বার্তায় বেশ একটা ভারিক্কি ভাব দেখাচ্ছে ! মুখে সিগারেট দেখা যাচ্ছে ! মনে হয় জমি জমা সংক্রান্ত ব্যবসায় যুক্ত ! – যদি একে এদের মধ্যে দলপতি বলি – তবু এর মুখে একটা চিন্তান্বিত ভাব রয়েছে ! – দলপতি বলেই কি ? নাকি অন্য কিছু ! দ্বিতীয় জনকে মনে হল – এক নারী । এর চোখে রোদ-চশমা । শ্ল্যাক্সের ওপর টপের ওপরেই তার বয়েস ফুটে উঠেছে ভালো ভাবেই ! সাবলীল অঙ্গভঙ্গি । সবার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ ভাবে মিশছে ! এর যুতসই নাম হবে মাধবী ! – আর এর কাছাকাছি একজনকে দেখা যাচ্ছে – এর চেয়ে বয়েস কম । পুরুষ । একটু বেশি বেশি প্রশ্রয় পাচ্ছে ! এর নাম দেওয়া যাক – কৌশিক ! খুব মিশুকে । সবার কাছেই যাতায়াত করছে । প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করে দিচ্ছে ! তবে মাধবীর কাছে একটু বেশি আবদারি ! কৌশিকের একজন সঙ্গী – মানে স্ত্রী হতেও পারে – আছে । সে কিন্তু ওর কাছ থেকে দূরে দূরে ! এই নিয়ে আবার আরও কিছু জনের মধ্যে রঙ্গ রসিকতা চলছে ! শ্রাবস্তী নাম তার । শ্রাবস্তীকে বেশ স্বাধীনচেতা মনে হয় ! খুব পতিপ্রাণা মনে হয় না ! চেহারার বাঁধুনি আছে ! হাব ভাবে মনে হয় কোনও অফিশে কাজ করে । অর্থাৎ স্বয়ং স্বচ্ছন্দ ! রুচিসম্মত পোশাক – শালোয়ার কামিজে – মানানসই ! আরও যেন কিছু মানুষকে দেখেছিলাম ! যেমন ওদের সঙ্গেই দেখেছি – বছর তিরিশের এক পুরুষ ও তার এক মহিলা সঙ্গী ! – ওরা ওদের বাবলু ও মানু বলেই ডাকছিল ! খুব সম্ভবত বেশিদিন বিয়ে হয় নি । কারন ওরা বেশীরভাগ সময়েই এক সাথেই কাটাচ্ছিল ! বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে – এই অসম্পূর্ণ লেখাটা – পরেই আছে । ওদের চরিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী লিখে রেখেছি – এতদিন । যদি না খবরের কাগজে এই খবরটা দেখতাম – তাহলে হয়ত ভুলেই মেরে দিতাম ! খবরটা আজ আলাদা আলাদা ছবি দিয়ে বের হয়েছে ! আলমবাজারের ঠাকুরবাড়ি অঞ্চল থেকে জনা দশেক বন্ধু-বান্ধব বকখালি বেড়াতে গেছিল ! সন্ধের সময়ে ফেরার পথে জোকায় খোঁড়া রাস্তায় ওদের গাড়ি উল্টে – তিনজন হাসপাতালে যাবার সময়েই - - । বাকিদের খুব বেশি ক্ষতি হয় নি ! – তাদের কাছেই শোনা গেল খাপছাড়া ভাবে - । এক প্রসিদ্ধ প্রমোটার তার স্ত্রী ও কয়েকজন বন্ধু ও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে বকখালিতে বেড়াতে গেছিল । সেখানেই বা ফেরার পথে তার সঙ্গে কয়েকজনের খুব কথা কাটাকাটি হয় তার স্ত্রীর সঙ্গে এক বন্ধুর সম্পর্ক নিয়ে ও প্রচুর টাকা পয়সার লেনদেন নিয়েও ! – কিন্তু তার সঙ্গে দুর্ঘটনার কি সম্পর্ক ! – আসলে কাগজে ধূসর বা অপরিস্কার ছবি দেখেও আমার স্বপ্নে দেখা সেই চরিত্রগুলোর একটা মিল খুঁজে পেয়েছি! সেটা যে ঠিক কি – তা বলা মুস্কিল ! আমি তো গাড়িতে ছিলাম না – বা স্বপ্নের চরিত্রগুলোকে কারুর সঙ্গে মেলাবার চেষ্টাও করিনি ! তবে – আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয় – প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল ! গাড়িতে বা গাড়ির বাইরে ধাবায় চা খেতে খেতে ! – আসলে ওই স্বপ্নের চরিত্রগুলো আমাকে যেন টানছিল ! অনেকদিন কোথাও আটকে থাকা পাখি যেমন বাইরে বেরতে চায় ! আজ আমি সেই চরিত্রগুলোকে আমার বদ্ধ কম্পিউটার থেকে মুক্তি দিলাম ! একটি কৈফিয়ত ! – অনেক অনেক দিন আমি কোনও গল্প লিখিনি ! অর্থাৎ পারিনি। আসলে আমার যা কিছু লেখা – সবই কবিতা-কেন্দ্রিক ! – পড়িই বেশি । ভালো লাগে – কবিতা বিষয়ক আলোচনা ! – সেই আমি কি করে গল্প লেখার চেষ্টা করলাম ! আসলে একটা ধারনা ছিল – স্বপ্নে যাই দেখা যাক না কেন – সেটা একটা ফ্রিজ শট! সেখানে গল্পের পরিণতি পাওয়া যায় না ! – আমিও তাই চরিত্রগুলো এঁকে রেখেছিলাম ! এবং অনেক অন্য লেখার মতোই পড়ে ছিল ! একটা গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে গল্পের সেই পরিণতি আমাকে ডেকে নিল । তবে এই পরিণতি আমার কাছে সুখকর নয় ! মনোজ

125

5

Ramkrishna Bhattacharya Sanyal

ইতি উতি

হউ - শব্দটা একটি ওডিয়া লব্জ । এর কাছাকাছি অর্থ বাংলাতে করলে দাঁড়ায় – আচ্ছা বা বেশ । পুরী বাঙালিদের কাছে বেড়ানোর জায়গা । রথদেখা – কলাবেচা দুটোই হয় । জগন্নাথকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় – চক্কাডোলা । মানে হলো গিয়ে – চাকার মত গোল চোখ । আমি ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পুরীতে বেচুবাবুর কাজ করেছি – দুটো ওষুধ কোম্পানির হয়ে । প্রথমটা – জার্মান রেমেডিস, পরে সারাভাই কেমিক্যালস । অবশ্য দুটো কোম্পানির ক্ষেত্রেই কটকঅ শহরঅ, বড় মনোহরঅ ছিল আমার হেডকোয়ার্টার । পুরী, বড় জেলা হওয়াতে ন্যূনতম সাতদিন কাজ করতে হতো সমস্ত জেলার কিছু বাছা অংশে । সেলও ভালো ছিল ওই জেলায় । থাকার জন্য – ছিল ইউনিয়নের রেষ্টহাউস । রাঁধিয়ে ছিল – নীরঅ । চমৎকার রান্না করতো । যে বাড়ীতে রেস্ট হাউস ছিল- তার নাম ছিল – অক্ষয় ধাম । সব মিলিয়ে দুটো বড় বড় ঘর রেষ্টহাউসে । খাটা পায়খানা । পরিবারকে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না, তবে পরের ঘরটা প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকতো বলে আমরা রেভিনিউ তোলার জন্য – ছেড়ে দিতাম একটা ঘর । রেষ্ট হাউসে মদ খাওয়া বারণ । আমরা কেউই নিয়ম ভাঙতাম না । খেতে ইচ্ছে হলে চেনা শোনা হোটেলে একটা ঘরে ম্যানেজ করে টাংকু টানা চলতো । বেরিয়ে আসার সময় ম্যানেজার আর বয়দের একটা ভালো রকম বখশিস দিতাম আমরা, খাবারের দাম সহ । তবে টাংকু হিসেবে আমাদের বিয়ারটাই বেশী পছন্দ ছিল – কারণ তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোলে পাশ না হওয়া বিয়ারের বোতলগুলো সেই কোম্পানির প্রতিনিধিরাই এনে দিতেন, কখনও পয়সা দিয়ে বা না দিয়ে । না না, গুণগত মান খারাপ ছিল না, তবে কোনো কোনো বোতলে ঠিকঠাক ফিলিং হতো না বলে, সেগুলো কোম্পানি ষ্টাফদের হয় মিনে মাগনায় বা অল্প কিছু টাকা নিয়ে বিলিয়ে দিতো কোম্পানি । পরিভাষায়, এদের নাম ছিল – সেকেন্ডস্ । দাম প্রতি বোতল- দেড় টাকা । ঠিক সেই সময়েই প্রথম ফিল্টার সিগারেট লঞ্চ হয় উইলস কোম্পানিতে । নাম ছিল – ফিলটার উইলস্ । দাম ছিল – প্রতি প্যাকেট আশী পয়সা । একটা প্যাকেটে থাকতো দশটা সিগারেট স্টিক । সেই সময়ে – বেশ দামী সিগারেট । তখন ক্যাপস্টান সিগারেটে দেশী তামাক ব্যবহারের কারণে – গুণমান পড়ে গিয়েছিল, ফলে ঠিক আভিজাত্যটাও ছিল না সেই ব্র্যান্ডের । দামও কমে এসেছিল । পুরী মন্দিরের পেছনেই ছিল লক্ষ্মীবজার । এটা এখন আর নেই । যেমন নেই একটা বিশাল বটগাছ – পুরী মন্দিরে ঢোকার দরজায় । লক্ষ্মীবজারেই ছিল আইটিসির পুরী জেলার ডিষ্ট্রিবিউটার । এনার আসল পরিচয় ছিল – মন্দিরের নাম করা পণ্ডা, বাঙালি উচ্চারণে পাণ্ডা । এই কোম্পানি বাজার ধরার জন্য প্রত্যেক খরিদ্দারকেই এক প্যাকেট কিনলে আরেকটা প্যাকেট ফ্রি দিতেন সেই সময় – যদিও শতকরা নিরানব্বই কেসেই এই ফ্রিটা জুটতো না প্রান্তিক খরিদ্দারের । ‌ আরও একটা ব্যাপার ছিল – একটা প্যাকেটে যদি ৯ টা সিগারেট দৈবাৎ পাওয়া যেত, তবে দোকানে থাকা কোম্পানির ফর্ম ভর্তি করে বিক্রেতার সই ছপ্পর নিলেই , দিনকয়েকের মধ্যেই মিলতো মুফতে পাঁচ প্যাকেট সিগারেট । এই সবই জেনেছিলাম, কারণ ওই ডিস্ট্রিবিটারের আপন ভাই ছিলেন আমার কোম্পানির ডিষ্ট্রিবিটার । তাই সিগারেটটাও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রায় বিনে পয়সায় । বিয়ারও তাই । এঁদের দৌলতে প্রায়ই জগন্নাথ দেবের নিরামিষ ভোগ জুটতো লাঞ্চ হিসেবে । ষোলো রকম তরকারি আর সুগন্ধী আতপ চালের ভাত । ফুরফুরে সুগন্ধে ভরে উঠতো চারিদিক । এখন যেটা স্বর্গদ্বার সেটা আসলে শ্মশান । তারই পাশ দিয়ে আমাদের আসতে হতো রেষ্টহাউসে জনবিরল রাস্তা ধরে । উঁচু নিচু রাস্তার বাঁপাশে ছিল একটা আশ্রম আর ডান দিকে ছিল রেলের গেষ্ট হাউস । তাই, বেশী রাত করতাম না রেস্টহাউসে ফেরার সময়ে । সন্ধে সাতটার মধ্যেই শুনশান হয়ে যেত রাস্তাটা । রেষ্টহাউসের বাঁধা রিক্সাওয়ালা ছিল – বাঙালি রতন । সারা পুরীতে ঐ একটাই বাঙালি রিক্সাচালক । ভয় দেখাতো – নানা গল্প শুনিয়ে, ফলে বিশ্বাস না করলেও একটা শিরশিরে অনুভূতি তো থাকতোই । সবসময় সন্ধে সাতটার মধ্যে ফেরা হতো না, কারণ স্টেশনের কাছে কিছু ডাক্তারদের ভিজিট করে দেরীও হতো । আগেই বলেছি – মন্দিরের সামনে বটগাছ ছিল আর ছিল , একটা উঁচু মত জায়গা, যেখানে বেশ কিছু দোকান এবং ডঃ মহাদেব মিশ্রের চেম্বার ছিল । ভদ্রলোক ইংরেজিতে কথা বলা পছন্দ করতেন না, তবে ওডিয়া টানে বাংলা বলতেন আর আমাদের কথা বাংলাতেই শুনতেন । তবে, মেডিক্যাল টার্ম গুলো ইংরেজিতে না বলে উপায় ছিল না, আর বললে – তিনি কিছু মনেও করতেন না । পুরী শহরে, সেই সময়ে কুল্লে একটাই অভিজাত হোটেল ছিল, বোধহয় এখনও আছে । বি, এন, আর হোটেল নামেই তার পরিচিতি । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ে চালাতেন এই সরাইখানা । সাউথ ইর্স্টান রেলওয়ের আগের নাম ছিল – বেঙল নাগপুর রেলওয়ে । সংক্ষেপে – বি. এন. আর । ঠাট্টা করে বলা হতো – বি নেভার রেগুলার । সময়ে নাকি কোনো ট্রেনই চলতো না । একবার দেখা গেল- একটি ট্রেন ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালো । আশ্চর্য হতেই – গার্ড সাহেব নাকি ভুল ভাঙিয়েছিলেন । এটা গতকালের ট্রেন, পাক্কা চব্বিশ ঘন্টা লেট । আজকের ট্রেনের কোনো পাত্তা নেই । আমি অবশ্য বি. এন. আরের ট্রেনে চড়িনি । তবে, বালেশ্বর, কটক, ভুবনেশ্বর, পুরী, ওয়ালটেয়ার ( বর্তমান বিশাখাপট্টনম্ )ওয়েটিং রুমে, বার্মা টিক কাঠের আলনা, চেয়ার, কাবার্ডে বি. এন. আর নামটা খোদাই করা দেখেছি । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলটি তৈরিই হয়েছিল – সায়েবদের জন্য । নিজস্ব সী বিচ আর নুলিয়াও ছিল হোটেলের । সেভেন কোর্স লাঞ্চ আর ডিনার ছিল – কি বিশেষণ বলি বলুন তো ? এককথায় মাইন্ড ব্লোয়িং । চিকেন আলা কিয়েভ – প্রথম এখেনেই খাই । ছুরি দিয়ে কাটলেই বেরিয়ে আসতো তরল সোনার মত মাখন । ওই স্বাদের “কোনো ভাগ হতো না” । মাখনের সাথে মাংস গুলো ইসোফেগাস ধরে স্টমাকে চলে যেত কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়াই । টেষ্ট বিড গুলো বুঁদ হয়ে থাকতো সেই স্বাদে । “ত্রিলোক তারিণী গঙ্গে, তরল তরঙ্গ রঙ্গে এ বিচিত্র উপত্যকা আলো করি করি চলেছ মা মহোল্লাসে!” ... মাখনে মাংসে জিভ একেবারে “গলগলায়িত” । শেষ পাতে আসতো – হিমালয়ান আইসক্রিম । আকৃতি এবং বপুতে একেবারে হিমালয় । পরতে পরতে তার অনেককিছু থাকতো ।নিজচোখে না দেখলে এই আইসক্রিমের রূপ- বর্ণণা দেয়া খুবই কঠিন। অনেকটা 'অন্ধের হস্তি' দর্শনের মতো। ও হরি – বলাই হয় নি । আমাদের কোম্পানির মিটিং এখানে হতো মূলত আমাদের ম্যানেজারদের দৌলতে । এছাড়া পুরীর ডাক্তারদের মাঝে মাঝে এখানে খাওয়ানো হতো – কোম্পানি দের পয়সায় । আমাদেরটাও ব্যতিক্রম ছিল না । যা হয় আর কি – হোটেলের ম্যানেজার থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য কর্মীদের সাথে আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল সহজবোধ্য কারণেই । এছাড়া ওষুধপত্র তো ছিলই । ১৯৭৪ সালে বিয়ে করে – এই হোটেলে মধুচন্দ্রিমা যাপন করবো ভেবেছিলাম, কিন্তু দামের কথা ভেবে পেছিয়ে আসি । জানতে পেরে -বন্ধুরা চাঁদা তুলে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল । এখানেই আমার একমাস বিয়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারতো । তবে সমুদ্রে সাঁতার কি ভাবে কাটতে হয়, সেটা শিখে যাবার ফলে, চুলের মুঠি ধরে ওনাকে জল থেকে তুলে নিয়েছিলাম – তাই ৪২ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটাতে পারছি শৃঙ্খলিত অবস্থায় । সে সব দুঃখের কথা না হয় পরেই বলবো । দেখুন তো – কথায় কথায় আসল বিষয় থেকে সরে গেছি । ডঃ মহাদেব মিশ্র ভিজিটে কোনো স্যাম্পেল নিতেন না । তবে, মাসে বা দুমাসে একবার করে ক্যাম্প করতেন নুলিয়া এবং রিক্সাওয়ালাদের বস্তিতে । আমরাও সোৎসাহে অংশ গ্রহণ করতাম । সেবার এক জার্মান কোম্পানির ছেলে এলো পুরীতে । পাক্কা দর্জিপাড়ার নতুন দা । ফ্রম টপ টু টো – পুরো ক্যালকেসিয়ান । ধরা যাক, তার নাম অনুপ । অনুপ আমাকে জিজ্ঞেস করলো – দাদা আপনার কোলকাতায় বাড়ী কোথায় ? গম্ভীর হয়ে বলেছিলাম – মেদিনীপুরের কাছেই । অনুপ উত্তর দিয়েছিল – আমি নর্থ কোলকাতার তো । সাউথটা আমার তেমন ঘোরা নেই । মেদিনীপুর, ভবানীপুরের কাছে বোধহয়, তাই না ? এহেন অনুপ কে আমরা পইপই করে বলে দিয়েছিলাম – ডঃ মহাদেব মিশ্রের সাথে ইংরেজিতে কথা না বলতে । বাংলাতেই কাজ সারা যাবে । তোর যে কোনো দুটো প্রডাক্টের কথা বলে দিবি – ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে দেবেন । কিন্তু, ধর্ম কাহিনী কে কবে শুনেছে ? চেম্বারে ঢুকেই বাও করে বলল – ডক্টর, আই অ্যাম ফ্রম ----- হউ বেচারা অনুপ – ভাবল ওটা হাউ উত্তরে বলল – কম্পানি হ্যাজ সেন্ট মি ওভার হিয়ার হউ বিকজ আই হ্যাভ বিন সিলেক্টেড টু ডু সো হউ এরকম “হউ” কাণ্ড খানিক চলার পর ডঃ মিশ্র রেগে মেগে অনুপকে বেরিয়ে যেতে বললেন চেম্বার থেকে । তারপরের এপিসোড অনেক কষ্টে ম্যানেজ করেছিলাম আমরা । এর পরে অনুপকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলতো :- হউ । ----------------------- ইতি পুরী কাণ্ডে “হউ” পর্বঃ সমাপ্তম {/x2} {x1i}itiuti.jpg{/x1i}

157

9

দীপঙ্কর বসু

না না রঙের দিনগুলি

চার শোনাতে বসেছি আমার জামশেদপুর বাস এর স্মৃতি কথা |তাই আমার খড়্গপুরে কাটান দুই বছরের নির্বাসন পর্ব কে এক পাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে চলি | ডেভেলপমেন্ট স্কুল থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে ১৯৬০ সালে আমি পাকাপাকি ভাবে ফিরে এলাম জামশেদপুরে ‚ভর্তি হলাম সাকচি অঞ্চলে চেনাব রোডস্থিত রামকৃষ্ণ মিশনের এর পরিচালনাধীন বিবেকানন্দ মিডল স্কুলে‚ক্লাস সিক্স এ | সকাল সাতটায় স্কুলের ভেতরের দিকের একটা খোলা চত্বরে সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে "ভব সাগর তারণ কারণ হে‚ গুরুদেব দয়া কর দীন জনে" সমবেত কন্ঠে প্রার্থনা সংগীত দিয়ে শুরু হত স্কুলের কার্যক্রম| টেলকো থেকে আমরা যারা পড়তে যেতাম সাকচির বিভিন্ন স্কুলে‚ তাদের বাড়ি থেকে বেরোতে হত বেশ ভোর বেলা | সকাল ছটা থেকে সোয়া ছটার মধ্যে টেলকোর স্কুলের বাস আসত এ রোডের বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ড থেকে আমাদের তুলে টেলকো কারখানার পিছন দিকে মনিপীঠ অঞ্চলের ‚যেখানে সাবেক রেল আমলের কলোনী ছিল‚আমরা যাকে বাবুলাইন নমে চিনতাম ‚সেই পাড়া ঘুরে রওয়ানা হত স্কুলের দিকে| মনে আছে শীতের দিনে হাড় কাঁপান ঠান্ডায় বেশ কষ্টকর ছিল স্কুলে যাওয়ার ব্যপারটা| ১৯৪৫ সালে টাটা কর্তৃপক্ষ ইষ্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের একটি পুরণো কারখানার শেড রেলকলোনী সহ কিনে সেখানে স্টীম লোকোমোটিভ এবং রেলের ব্যবহার যোগ্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপন করেছিল |বাবু লাইন সেই রেল জমানার স্মৃতি বহন করে টিকে ছিল তখন অবধি|পরবর্তী কালে টেলকো অটোমোবাইল ব্যবসায়ে প্রবেশ করার ফলে কারখানার সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ার গ্রাসে বাবুলাইন মুছে গিয়েছিল- কারখানা গ্রাস করে নিয়েছিল অঞ্চলটাকে| সামনের দিকে নাক বাড়ান যে বাসটি বিবেকানন্দ এবং সাকচি হাই স্কুল এর ছেলেদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর ফেরৎ নিয়ে আসার কাজ করত আমরা তার নাম দিয়েছিলাম জার্মান বাস | সম্ভবত জার্মানির ডেইমলার বেঞ্জ এর সঙ্গে চুক্তি করে জামশেদপুরের কারখানায় ট্রাক তৈরির প্রথম পর্বে জার্মানি থেকে অমদানি করা পার্টস এ্যসেম্বল করেকিছু বাহন তৈরি হয়েছিল সেই বাহনেরই একটি ছিল এই বাস ।জার্মান বাস নামকরণের কারণ সম্ভবত এটাই ছিল ।আরো দুতিনটি বাস টেলকো কম্প্যানি স্কুলের ছেলে মেয়েদের স্কুলে যাতায়াতের জন্য চালাত সেগুলি ঐ রকম নাক বাড়ানো চেহারার ছিলনা | সারদামনি ‚ সিস্টার নিবেদিতা ‚ সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট ইত্যাদি স্কুলের মেয়েদের জন্যে ছিল স্বতন্ত্র বাস|কবে থেকে যে এই পরিষেবাটি কম্প্যানি বন্ধ করে দিয়েছে ধীরে ধীরে তা এখন আর মনেই পড়েনা | আমার ছোট্ট জগতটা এবার একটু একটু করে প্রসারিত হয়ে উঠছিল| আমার ক্লাসের সহপাঠীদের সঙ্গে তো বটেই ‚ সেই সঙ্গে একই বাসে নিত্য যাতায়াত করার সুবাদে অন্যান্য ক্লাসের ছেলেদের সাথেও বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে লাগল| তাদের বেশীরভাগের নাম ই আজ আর মনে নেই – মনে আছে বাকা নামে আমার সমবয়সী একটি ছেলে আর তার দাদার কথা | বাকাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের মেলামেশা ছিল |বাকার বাবাকে আমার বাবা সত্যদা নমে ডকতেন এবং আমরা মাঝে মাঝেই ওদের বাড়িতে যেতাম সপরিবারে বেড়াতে| অমার সহপাঠী আর একটি ক্ষ্যাপাটে ছেলের কথাও মনে পড়ছে -তার ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের জন্যই বোধ হয় তাকে সে সময়ে একটু এড়িয়ে চললেও ঐ ক্ষ্যাপামির জন্যেই তার নামটা মনে আছে | তার নাম ছিল উৎ্পল | উৎ্পলের ছিল গানের সখ| স্কুলের টিফিন এর সময়ে দিব্বি ডেস্ক বাজিয়ে আপন মনে গান ধরত |তার বিশেষ প্রিয় একটি গান‚ যেটা সে প্রায়শই অবসর সময়ে গলা ছেড়ে গাইত | গানটি সেকালে মান্না দে র গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় গান -ও আমার মন যমুনার আঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতই খেলা/ বঁধু কি তীরে বসে মধুর হেসেই কাটবে শুধু সারা বেলা ঠিক কোন বছরে মনে পড়ছেন ‚তবে মিড্ল স্কুলে পড়ার সময়েই একদিন ঘটল একট ঘটনা যা আমার মনে গভীর ভাবে রেখা পাত করেছিল |আমাদের স্কুলের বাগানে মেইন গেটের পাশেই ছিল একটা মহুয়া গাছ| বছরের একটি সময়ে অজস্র মহুয়ার ফলে ফুলে ভরে উঠতো গাছটা‚- তার কিছু ফল ঝরে পড়ে ছড়িয়ে থাকত বাগান ময়|অনেকটা বাংলা পাঁচের মত আকৃতির ছোটো ছোট ফলগুলিকে দুই আঙ্গুলের মঝে রেখে চাপ দিলেই তার ভিতর থেকে পিচকারির মত একটা মাদকতাময় গন্ধ যুক্ত তরল বেরিয়ে আসত |আমর প্রায়ই সেগুলিকে কুড়িয়ে নিজেদের পকেটে ভরতাম এবং খেলার ছলে কোন অন্যমনস্ক বন্ধুর মুখে সেই তরল ছিটিয়ে দিতাম অচমকা| আনমনা বালকটি সচকিত হয়ে উঠত | আমরাও মহাউল্লাসে মেতে উঠতাম | বলা বাহুল্য আমাদের এই মজায় স্কুলের মাস্টারমশাইদের সায় ছিলনা |তবে তাঁরা আমাদের এই খেলাটাকে ঠিক কগনিজেবল অফেন্স হিসেবে গন্য করতেননা- উল্টে তাঁদের কেউ কেউ আমাদের এই ছেলেমানুষী মজায় লুকিয়ে মজাও পেতেন বলেই আমার বিশ্বাস | এই নিস্পাপ খেলাটিই একদিন ঝামেলা ডেকে আনল |সামনের বেঞ্চে বসা তন্ময় নমে একটি ছেলে যখন মন দিয়ে মাস্টারমাশাইয়ের পড়ান বোঝার চেষ্টা করছে সেই সময়ে তার পিছনের বেঞ্চিতে আমার ঠিক পাশেই বসা ছেলেটি মাঝে মাঝেই নিজের পকেট জমিয়ে রাখা মহুয়া ফল বের করে দুই আঙ্গুলের চাপে মহুয়ার রস ছিটিয়ে দিচ্ছিল তন্ময়ের কানের পিছন দিকে | প্রথমে দুই একবার উপেক্ষা করার পর একবার হঠাৎই তন্ময় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে সজোরে এক ঘুষি চালিয়ে দিল আমার নাক লক্ষ্য করে| আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঘুঁষি সজোরে আমার নাকে এসে লাগল |নাক দিয়ে রক্তপাত আরম্ভ হল | মাস্টারমশাই সহ গোটা ক্লাস ঘটনার আকষ্মিকতায় হতভম্ব!! মাস্টার মশায়ের নির্দেশক্রমে দুতিনটি ছেলে আমাকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল ক্লাসের বাইরে বাথরুমে মুখে নাকে জলের ছিটে দিয়ে রক্ত ধুয়ে দিতে | সে সব মিটিয়ে ক্লাসে ফিরে এসে দেখি অকুস্থলে হেড মাস্টার মশাই ‚শিবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত হয়েছেন ‚রাগে তাঁর ফর্সা মুখ একেবারে রক্তবর্ণ ‚হাতে ধরা একটি লিকলিকে বেত ‚আর তাই দিয়ে বেদম প্রহার করছেন তন্ময়কে | আর হেডমাস্টার মশায়ের দুচোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রু ধারা | হেড মাস্টার মশাই তন্ময়কে প্রহার করছেন আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেও কেঁদে চলেছেন সমানে| আমি আমার অকারণ নিগ্রহের কথা ভুলে অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলাম আর ভাবছিলাম শিবপ্রসাদ বাবুর মত শান্ত মৃদুভাষী কি ভাবে এমন নির্মম প্রহার করতে পারেন আবার একই সঙ্গে নিজেই কেঁদে ভাসান !! ঘটনাটির কথা আজ এত বছর পরে লিখতে গিয়ে বারে বারে সাদাধুতি আর গেরুয়াপাঞ্জাবী পরিহীত অকৃতদার অভিজাত‚শান্ত সৌম্যকান্তি শিবপ্রসাদ বাবুর চেহারাটা ভেসে উঠছে আমার চোখের সামনে | আমার নিজেরই দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে স্নেহময় সেই হেডমাস্টারমশাইকে মনে করে |

288

23

মুনিয়া

Tell me something good

@সন্দেশ‚ আজকের পর্ব আপনার জন্য: এদেশে পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের অনেক অভিযোগ| তারা কেবল টিকিট দিতে তৎপর‚ আসল কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা| যে কোনো সাধারণতম রাস্তার আইন অমান্য করলেই প্রচুর ফাইন করে‚ ইত্যাদি প্রভৃতি| আমি রোজ সকালে যে পথ ধরে কাজে যাই তার এদিক ওদিক ঘুপচি দেখে দুই তিনজন অফিসর প্রত্যহ লুকিয়ে থাকে| আসতে যেতে প্রায়শই দেখি কাউকে না কাউকে পাকড়াও করেছে| আর একবার ধরলেই প্রচুর টাকার চুনা! আমিও সময়ে সময়ে গজগজ করে থাকি| এতদিন আসছি যাচ্ছি‚ তাই ঠিক জানি কোথায় তারা ঘাপটি মেরে থাকে‚ দেখলেই মনে মনে বলি‚ ঐযে ছিপ ডুবিয়ে বসেছে! আমাদের ছোট থেকে পুলিশ সম্পর্কে একটা ভয় গড়ে উঠেছিল| দেশে নানা অভিজ্ঞতায় চেতনাতে গভীর হয়ে বসেছিল‚ পুলিশ কেবল দুষ্টেরই দমন করে না‚ শিষ্টকেও নানাপ্রকারে উত্ত্যক্ত করে| ধারণাটা এতই পরিস্কার ছিল নিজের কাছে‚ এদেশে প্রথম যেদিন পুলিশ লাইট জ্বালিয়ে পিছু নিল‚ অপমানে চোখে জল এসে গেছিল! গাড়ি থামাতে অফিসর খুব বিনীত হয়ে বলেছিলেন‚ গাড়ির পেছনের আলোটা জ্বলছেনা‚ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা নেবেন| পুলিশ দাঁড় করালো‚ পয়সা চাইল না‚ উৎপীড়ন করল না‚ খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন! কাল কাগজে পুলিশ সম্পর্কে এমন একটা ঘটনা পড়লাম যা হৃদয়কে আলোড়িত করে মুখে হাসি ফোটালো| গত সপ্তাহে নিক এর জন্মদিন ছিল| ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলেটিকে তার মা জিজ্ঞেস করেছিলেন কেমন করে সে তার জন্মদিন পালন করতে চায়| এক মুহূর্তও না ভেবে বাচ্চাটি বলেছিল‚ আমার জন্মদিনের থিম হবে চোর- পুলিশ| আর সেইজন্যে সে স্থানীয় পুলিশ দপ্তরকে নিমন্ত্রণ করতে চায়| নিক পুলিশ সম্পর্কে যাবতীয় কিছুতে সাংঘাতিক আগ্রহী| বাজারে পুলিশের যতরকম কষ্টিউম‚ খেলনা অস্ত্র‚ গাড়ি পাওয়া যায় সবই তার সংগ্রহে আছে| আসলে নিক এর পরিবারের বেশ কিছু সদ্স্য আইন-কানুন সংক্রান্ত জীবিকার সাথে যুক্ত| তাই হয়ত জন্ম থেকেই তার পুলিশ সম্পর্কের তার এই আগ্রহ| পরিবারটি জায়গা বদল করে সদ্য সদ্য এই লিভারমোরের লোকালয়ে এসেছে| কাউকেই তেমন চেনে না| তবুও নিক এর ইচ্ছপূরণ করার তাগিদে মা‚ ন্যান্সি নিকটস্থ পুলিশ দপ্তরকে চিঠি পাঠালেন| লিখলেন‚ যদি একজন পুলিশ অফিসর‚ টহল দেওয়ার গাড়িসহ তার ছেলের জন্মদিনের পার্টির সময়টাতে আসতে পারেন‚ তবে তার ছেলের জন্মদিনে সেটি তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হবে| তার ইমেলের উত্তরে পুলিশ দপ্তর থেকে জানানো হয়‚ যদি সেইসময় কোনো জরুরী দরকারে আটকে না যান তাহলে একজন পুলিশ অফিসর নিশ্চয়ই পার্টিতে হাজির হবেন| জন্মদিনের পার্টির দিন হাজিরা দেবার আধঘন্টা আগে সার্জেন্ট স্টিভ গোয়ার্ড ন্যান্সিকে ফোন করে বলেন‚ শিগগিরিই একজন অফিসর নিক এর সাথে দেখা করতে আসছেন| নিককে সারপ্রাইজ দেওয়া অভিপ্রায়ে ন্যান্সি ছেলেকে নিয়ে বাড়ির সামনে প্রবল খুশি বুকে চেপে অপেক্ষারত থাকেন| তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না যখন দেখেন আলো জ্বালিয়ে একের পর এক‚ সাতটি পুলিশের গাড়ি তাঁর ড্রাইভওয়েতে লাইন দিয়ে দাঁড়ালো! আর ছোট্ট নিক? সে এতই বিস্মিত ছিল যে তার বাকরোধ হয়ে গেছিল| সম্বিত ফিরে পেয়ে সে অফিসরদের সাথে খেলায় মাতে| তাঁরা নিককে নিজেদের সইসহ পুলিশ লেগো সেট উপহার দেন| তাঁদের গাড়িতে বসিয়ে রকমারি যন্ত্রপাতি‚ মেশিনের ব্যবহার ব্যাখ্যা করেন| অনেক অনেক স্টিকার বিলোন নিক ও তার বন্ধুদের এবং বাচ্চাটিকে সারাজীবন উপভোগ করার মত একটি স্মৃতি দিয়ে বিদায় নেন| ঘটনাটি পড়তে পড়তে অসম্ভব একটা ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম| ভাবছিলাম আমাদের সকলের ক্ষমতা আছে অন্যের জীবনে এই এতটুকু হলেও খুশি উপহার দেওয়ার| মন্তব্যের জায়গায় লিভারমোর পুলিশকে সাধুবাদ দিতে গিয়ে একটি মন্তব্যে চোখ আটকে গেল| তারপরে আর হাসি থামছেনা| একটি ছেলে লিখেছে‚ হায়‚ আমিও যদি নিকের মত সৌভাগ্যবান হতে পারতাম| আমার ষোলো বছরের জন্মদিনে বিনা আমন্ত্রণেই পুলিশ এসেছিল| উপহার দেওয়া তো দূরের কথা‚ পার্টি বানচাল করে আমাকে আর আমার বন্ধুদের ঘাড় ধরে তারা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেছিল!!

635

81

ইলতুৎমিস

পচা ডোবা টু প্যাসিফিক

কালুয়া ও কালাপানি পর্ব-৭ (নাহ‚ পচা ডোবা শিরোনাম থেকে বাদ| চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে মাটিতে ভাত খাওয়ার মানে হয়? ইন ফ্যাক্ট‚ আমাদের একটা পুকুর আছে‚ সেটি এখন প্রায় ডোবায় পর্য্যবসিত| সংস্কার হয়না‚ পাড় যাচ্ছে ভেঙ্গে| আজকাল লীজ দেয়া থাকে একবছর এই শরীকের পরের বছর অন্যের| মন্দ প্রাপ্তি হয় না| মাছ চাষ তো আজকাল লোভনীয় ব্যবসা| বিশেষ করে দেশী রুই‚ কাতলা বেশী দামেই বিকোয়| এদিক সেদিক করে একশো দিনের কাজের প্রকল্পের আওতায় আনবার চেষ্টা চলছে‚ ফ্রীতে রিপেয়ার করা হয়ে যাবে| একটু আধটু তো দেশ থেকে কিছু পাবার হক তো আছে‚ দেশের প্রতি নি:শর্ত কর্তব্য করনের বিনিময়ে!) (১) তো কতদূর অবধি এগেয়েছি আমরা? জল কেটে কেটে জাহাজ চলেছে তো চলেছেই | প্রথম‚ দ্বিতীয়‚ তৃতীয় দিন শুধুই চলা| সুখ আর সুখ‚ খাও দাও মস্তি করো| একটু টুকে দিই কোন একদিনের ডিনারের মেনু থেকে| হিমবাহের ১০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র| কয়েকটা স্যাম্পল| Smoked duck breast Premium angus beef sliders Escargots bourguignonne ( Tender snails drenched in melted garlic-herb butter?) Linguini with pomodoro sauce (fragrant tomato, onion and garlic sauce tossed with al dente pasta? না‚ টুকতেই হাত ব্যথা হয়ে গেল| A3 সাইজের এপিঠ ওপিঠ দুপাতা| এ তো গেল একদিনের মেনু| তবে রেস্টুরেন্টের (a la carte ডিনারের‚ বলেছি তো টেবিল পেতে‚ সাজিয়ে ওয়েটার পরিবেশিত| আহামরি নামের পদ কিন্তু ভাইলোগ আমার কি ওসব পোষায়! বরং এক কানা উঁচু কাঁসার থালায় পান্তাভাত চটকে আমানি সমেত (ভাতের জল)‚ গরম আলুভাতে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মাখা খাবারের কথাই মনে পড়ছিল| এ কি সাজা রে বাবা| ওয়াটার ওয়াটার এভরিহোয়ার টাইপের| দুদিন রেস্টুরেন্টে গিয়েই ছোঁড়াগুলোকে বললাম‚ দাদা বৌদিকে রেহাই দাও‚ আমরা এগারো তলার বুফেতেই যাবো| আর ও মুখো হইনি| (২) একটা আইটেমের কথা মনে আছে- cauliflower impregnated with saffron আরও কি যেন| মালটা যখন সার্ভ করলো‚ আমি ভাবছি কি না কি| ও হরি‚ একটা স্লাইস কপির ফুলে গেরুয়া রঙ করা‚ আরও বোধ হয় কিছু স্মোকড মাছ্টাছ ছিল! অন্যপদ কি অর্ডার করেছিলাম মনে নেই| আমি গাঁই গুঁই করতে ওয়েটার একটা বোম্বাই সাইজের স্যামনের পীস এনে দিল‚ গ্রিলড‚ ছাল সমেত‚ তাতে না আছে মশলা না কিছু‚ আঁশটে গন্ধযুক্ত| সেটাও সরিয়ে বোধহয় আলুভাতে mashed potato খেলাম অন্য কারুর অর্ডার করা| তবে কি যা চাইবেন এনে দেবে আর বিল দেবার তো প্রশ্নই নেই| ওয়েটার আবার তামিল ভাষী‚ সোনায় সোহাগা| খুব যত্ন সহকারে সার্ভ করেছিল পুরো দশদিন| না তার যত্নে কোন কৃত্রিমতা ছিল না‚ আগমার্কা আতিথেয়তা| পুরস্কার সকলে মিলে ১০০ মত করে বকশিস দেয়া হয়| বাঙলা টাকায় প্রায় হাজার আশি বা লাখের মতো‚ মন্দ কি‚ দশ দিনে| আমেরিকান কোম্পানী তো ‚ জানে ব্যবসা করতে| অল্প মাইনেতে লোক রাখে‚ তাদের ভর্তুকী বকশিসে| (৩) লাঞ্চ ও ব্রেকফাস্ট অবশ্যই বুফে‚ এগারো তলায়| সত্যি বুফে হলটি এগারো তলায় স্বর্গোদ্যান| জাহাজের পশ্চাদ্দেশ‚ বিশাল গোল জানালা পুরো চওড়া (breadth) জুড়ে‚ তেনার (জাহাজ সর্বদাই স্ত্রীলিঙ্গ) ব্যাস পুরো বেয়াল্লিশ মিটার| আমার এক কলীগ সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন ‚ তিনি গত বছর দুই ধরে বিভিন্ন ক্রুজেই যাচ্ছেন| (হায়‚ আমার আর কোনদিন‚ এজন্মে আর যাওয়া হবে না‚ এদিক সেদিক করে ক্যান অ্যাফোর্ড বাট.......)| সংক্ষেপে ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিক্স দিই: Flag ...... Bhamanian (আর কোথায়!) Gross tonnage= 1,38,194 ton Length= 310 metres Crew members= 1200 Total capacity= 5200 জন (crew সমেত) Motor capacity= 42,000 KW রোজ খাবার তৈরী হয়=২২‚০০০ meal (৪) সম্পাদক মশায় জানতে চেয়েছেন‚ entertainment এর কি ব্যবস্থা থাকে| রোজ সকালে দরজায় গোঁজা থাকতো সে দিনের ফিরিস্তি‚ সেও A3 সাইজের দুপাতা| দু একটা আইটেম তুলে দিই‚ Day 1,2, 3 থেকে| The thrill of the rock climbing wall Welcome aboard Karaoke night Ice skating Battle of the sexes-progressive trivia The world's sexiest man competition আর এগুলো তো আছেই: Basket ball court Big screen movie হ্যানা ত্যানা| (৫) প্রথম তিন দিন একটানা শুধু ভেসে চলা‚ চার দিনের দিন সকালে নিউ ক্যালিডোনিয়ার রাজধানী Noumea দ্বীপ| শেষ অবধি একটু একঘেঁয়ে হয়ে ওঠেনি তা বলবো না| অব্শ্য যারা একটু পানাসক্ত তাদের পক্ষে রমরমা| আমাদের দিন শুরু হতো ছটা বাজলেই পাঁচতলায় চা কফি‚ pastryর কাউন্টার খুলে যেত| আমাদের তো সকাল সকাল ঘুমোতে যাবার অভ্যেস সেই ব্যাঙ্গালোর থেকেই‚ ভোর বেলা উঠেই না সকাল ৭|১৫তে ফ্যাক্টরি পৌঁছুনো| একটা মজার ব্যাপার- স্টাটিসটিক্স ক্লাশের স্যার বলেছিলেন‚ পৃথিবীর সব ঘটনাই কোন না কোন স্ট্যাটসের নিয়ম মেনে চলে| (এটা আমাদের রেসিডেন্ট পন্ডিত পাঠকের জন্যে তোলা থাক)| চাঁদের কলঙ্কের সাথে মুসুর ডালের ভাও এর একটা কো-রিলেশন খুঁজে পাওয়া যাবে!(অথবা আমার ভাষায়- গঙ্গার বান আসার সময়ের সাথে 'আমি তোমাকে ভালবাসি' কবুলের মুহূর্তের! (রাত ভরে বৃষ্টির সাথে দশমাস পরে বাচ্চা হওয়ার সম্পর্ক অবশ্য ১:১ কো-রিলেশন!) | তো সেই নিয়ম মেনেই মোটামুটি একই লোকজনের সাথে ঐ কাক সকালে দেখা হতো| এখানেই তো ফুলবাগানের সেই বাঙালী ছেলেটি সকালে ও নৈনিতালের ছেলেটি বিকালে ভাগাভাগি করে তদারকি করতো| ফুলবাগানের ছেলেটির কতই বা বয়েস‚ ২৮-২৯‚ তাইই তো বললো| ইচ্ছে একটা ফ্ল্যাট কেনার‚ একটু ফান্ডাও বিররণ করলাম| সে ভাবলো‚ আমি কতই না অভিজ্ঞ! (৬) এক সাথে হাম তুম এক কামরায় বন্ধ‚ তাই বলে হে পাঠক ভাববেন না যে চাবি খোয়া যাবে| আরে সে সব সোনার বয়েস কি আছে যে আঙুলে আঙুল ঠেকে গেলে সোনা হবে| আগেই বলেছি এই সব ক্রুজ মধুচন্দ্রিমার পক্ষে আদর্শ| আমাদের অবশ্য চন্দ্রিমা ছিল‚ শুক্লপক্ষের রাত| তবে ঐ পর্য্যন্ত| আসলে ফ্ল্যাশব্যাকে টাইম মেশিনে চাপা - কবে কি হয়েছিল‚ কে বলেছিল‚ কেন ওটা হয়নি‚ আসলে ভুল ডিসিশান নেয়া হয়ে গেছে‚ মেলবোর্নে ট্রান্সফারের অফার নেয়া উচিত ছিল‚ সেবার বন্যার ফলে করমন্ডল এক্সপ্রেসের কিছুটা পথ অন্ধ্র সরকার কি সুন্দর করে বাসে নিয়ে গিয়েছিল‚ মনে আছে‚ ' সেই চিলে কোঠায় গিয়ে সংসার পাতার কথা'‚ প্রতি শনিবার নিয়ম করে কেরোসিনের স্টোভ পরিস্কার করা‚ কাঁচি দিয়ে পলতে সমান করে কাটা যাতে করে নীল ফ্লেম হয়! এই সব গল্প করেই কাটলো| এবার কিন্তু ঝগড়া হলো না‚ কনফাইনড স্পেসে পুরোনো দম্পতি বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকলে অবধারিত ঝগড়া| এই যেমন আমাদের এক চেনা ডাক্তার আছেন সিডনীতে‚ আগে এখানে ছিলেন| মাঝে মাঝে দেখাতে যাই‚ তো ডাক্তার ঠিক ধরে ফেলে মনোমালিন্যের খবর‚ অভয় দেন যে তাঁরাও যখন কয়েক ঘন্টা একসাথে ড্রাইভ করেন‚ তাদের বেলাতেও অন্যথা হয় না| আমাদের নবীন বন্ধুরা তো হৈ হৈ করে পুরো জাহাজ চষে ফেলছে‚ স্কেটিং‚ জগিং ও অতি অবশ্যই ক্যাসিনো| মাহেশ্বরী ও আদিত্য এ বিষয়ে আগ্রহী‚ আমরা দেখা হলেই- কি মাইনাস না প্লাস? যাদের ছোট বাচ্চা তাদের তো পোয়া বারো‚ ফ্রী চাইল্ড কেয়ারের ব্যবস্থা| এসব না করলে সাড়ে চার হাজার যাত্রী পাওয়া কি সোজা কথা? তাও প্রতি দশ দিন অন্তর অন্তর| সেপ্টেম্বরে আবহাওয়া ভাল হতে শুরু করলেই জাহাজ সিডনীতে ভেড়ে আর চলতেই থাকে পিরীতের গাড়ী| সকালে অপেরা হাউস ঘাটে ফেরত আসে‚ একদল যাত্রী নামলো তো নতুন দল নিয়ে সন্ধে হতে আবার পাড়ি দেয়া| হবে নাই বা কেন‚ প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের নৌকো ও বারশো কর্মী‚ খাওয়া দাওয়া‚ জ্বালানী- এলাহি ব্যাপার‚ থেমে থাকলে যে প্রতি মুহূর্তের জন্যে টাকা লস| মার্চ পরহ্তেই আমেরিকা পানে‚ সেখান থেকে আলাস্কা যাওয়া আর আসা চলতেই থাকে‚ আবার সেপ্টেম্বরে সিডনী| চার দিনের দিন সকালে নুমিয়া দ্বীপ| (বিরতির পর)

409

35

kishore karunik

রয়ে যাবে

বঙ্গ বন্ধু -কিশোর কারুণিক কেটে গেল আঁধার ঘাতকদের হলো বিচার, চারিদিক হলো ঝলমলে আলো। কলঙ্ক মোচন হলো জাতির, কলঙ্ক মোচন হলো প্রিয় স্বদেশের। বড় কষ্ট হয় খুব কষ্ট পাই ঘাতকের বুলেটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলে। যাদের বিশ্বাস করেছিলে যাদের স্নেহের ছায়ায় ঠাই দিয়েছিলে, তাদের ভেতর কিছু কুলাঙ্গার তোমার সাথে প্রিয় স্বদেশের সাথে করল চরম বিশ্বাস ঘাতকতা। তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল ওরা তোমার স্বপ্ন, মানবিক চেতনাকে- হত্যা করতে চেয়েছিল। না, ওরা পারে নি তুমি এখনো অম্লান কোটি কোটি বাঙালীর মনি কোঠায় রক্তে কেনা জাতীয় পতাকায় জাতীয় স্তম্ভে তুমি মহান পুরুষ বাংলাদেশের জাতীর জনক- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তুমি শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকো তোমার প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে; তোমার স্বপ্ন, চেতনা, মূল্যবোধ আজ কোটি কোটি বাঙালীর প্রেরণা। তোমার স্বপ্নের সোনাল বাংলা সোনায় সোনায় ভরে উঠবে, বাঙালী হয়ে উঠবে বলিয়ানে তেজস্বী। তোমার চেতনা ধারণ করে মানবিক মূল্যবোধে বাঙালী বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে মেরুদন্ড শক্ত করে, জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়তে । সোনার বাংলা গড়তে সোনার বাংলা গড়তে।

288

8

মনোজ ভট্টাচার্য

ওম মনিপদ মেহুম !

ওম মনিপদ মেহুম ! ( দ্বিতীয় পর্ব ) সকাল হতে দেখতে পেলাম – একটা বেশ বড়-সড় কলেজের একটা এডুকেশানাল টীম এসেছে । ওরা নাকি দুই দেশের দশটা গ্রাম ঘুরবে ! – দুটো বাসে প্রায় চোঁতিরিশ মেয়ে । তাদের সঙ্গে এসেছে কেটারার – জয়গাওর এক বাঙালি - এক রাঁধুনি মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে । হোটেলে তাদের একটা ছোট রান্নাঘর দেওয়া হয়েছে । ওরা শুধু ঐ টীমটার জন্যেই রান্না করবে ! – আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই আলাপ হয়ে গেল ! – এই টীমের মেয়েরা মাঝে মাঝেই – দম করে দরজা খুলে ফেলছে – আর ভুল বুঝতে পেরে সরি বলে বেরিয়ে যাচ্ছে ! সকালে প্রাতরাশ সেরে আমাদের গাড়িতে বেরিয়ে পড়লাম থিম্পু দর্শনে ! – সবই পাহাড়ের চারদিকে ও কখনো ওয়াং চু নদী ও মান চু নদী জড়িয়ে । চু মানেই হচ্ছে নদী ! – আর সবই হয় বুদ্ধ-মূর্তি অথবা গুম্ফা ! তবে মন্দিরের কারুকার্য দেখলে মন ভরে যায় । যতই ছবি তূলি – কেবলই মনে ঠিক হোল না । অর্থাৎ যা দেখছি তা তো আসছে না ! – তবু তুলেই চলি । এক জায়গায় একটা মন্দিরে দেখি অনেক সাধু বা মঙ্ক । তারা নাকি মন্দিরের বাসিন্দা । এখানে শুধুই জপ-তপ করে কাটায় ! এই ঠাণ্ডায় ! – আবার পরে অন্য মন্দিরে চলে যায় ! হয়ত শুধু জপ-তপ করেই সারা জীবন কাটিয়ে দেবে ! শুনলাম – থেকে থেকে অন্য কোথাও থেকে কোন লামা বা বৌদ্ধ গুরু আসে – একদিন বা কিছুদিন জ্ঞান-দান করে আবার অন্য কোন মন্দিরে চলে যায় ! আর এক মন্দিরে দেখি আরতি আরম্ভ হওয়ার আগেই অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু মন্দিরের বাইরে আসন পেতে একটা ছোট্ট ঘণ্টা বাজিয়ে দোহার দিচ্ছে ! – সেই মন্দিরের ভেতরে আট দশজন পুজারী মন্ত্র পড়ছে । মন্দিরের ভেতরে ওহম শব্দ গমগম করছে । বেশ গম্ভীর পরিবেশ ! আমার বিদ্যে-বুদ্ধি দিয়ে বৌদ্ধ মন্ত্র বোঝার বা মুখস্ত করার চেষ্টাও করি নি । কিন্তু আমরা যেটা জানি – অর্থাৎ ওঁ মণিপদ্মে হুম – তার থেকে অনেক দূর ! বরং দুর্বোধ্য - ওম মনিপদ মেহুম ! - om ma ni pad me hung ! আমরা পরের দিন গেলাম – পারো । থিম্পু বা পারোতে মোটামুটি সবই একধরনের মন্দির বা বুদ্ধ মূর্তি বা বৌদ্ধ স্তুপ ! তবে সব কটাই এত উঁচু – যে উঠতে উঠতে দম বেরিয়ে যায় ! অনেকেই অর্ধেকটা উঠেই হাল ছেড়ে দেয় ! – তবে ওপরে উঠলে – পুরোটা দেখা যায় । সর্বোপরি একধরনের সন্তুষ্টিও লাগে ! আর মূর্তির চারদিক ঘিরে নানারকম বুদ্ধের জীবনী-কথা খোদাই করা ! মিউজিয়ামে নানান রকম তথ্য । ভাল লাগল – একটা বীরপুরুষদের নাচ ! বেশ ছন্দে ছন্দে বীরের মতো পা ফেলছে ! – মিউজিয়ামের ঠিক সামনেই একটা অত্যন্ত প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির । কয়েকবছর আগে ভুমিকম্পে ভেঙ্গে গেছে । এখন সারান হচ্ছে – ভেতরে । তাই ওখানে যাওয়া নিষেধ ! অতো উঁচুতে – কি প্রচণ্ড হাওয়া ! প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ! স্থির ভাবে দাঁড়ানোই যাচ্ছে না ! সবাই দেওয়াল ধরে ধরে ছবি তুলছে । অথবা হাওয়া একটু কমলেই শাটার টিপছে ! এখানে পোশাক-আশাক খুবই সাদাসিধে । মেয়েরা মোটামুটি একই ধরনের লম্বা পোশাক – একটু ধূসর চকোলেট রঙের ! আর ওপরে একটা টপ ও এক ধরনের রঙিন ডোরাকাটা লামাঙ্গা ! – আর ছেলেদের পরনে বাকু ! - বাকু - প্রথমবার যখন আসি – তখন থেকেই আমার খুব পছন্দের ছিল । কেনা হয় নি – কারন কলকাতায় হাঁটু পর্যন্ত খোলা পোশাক পড়ে তো যাতায়াত করা যায় না – অনেকটা লুঙ্গি তুলে পড়া আরকি ! কিন্তু এখানে সবাই বাকু ! সরকারী কর্মচারীরা বাধ্যতামুলক ধুসর চকোলেট রঙের বাকু ! রাজতন্ত্রের দেশে রাজার স্থান কোথায় ! এই প্রসঙ্গে আমায় কিছু লিখতে বললে – লিখতাম – সে দেশে রাজাকে চাক্ষুষ দেখা যা না – অথচ রাজা সর্বত্র বিরাজমান ! অর্থাৎ রাস্তায় দোকানে হোটেলে – সব জায়গায় রাজা ও রানী ও যুবরাজের ছবি টাঙ্গানো – সেটা বাধ্যতামুলক কিনা জানা নেই ! – কিন্তু পারো থেকে ফেরার সময়ে হঠাৎ পাহাড়ি রাস্তায় দেখি সব গাড়ি দাঁড়িয়ে – তিন চারটে গাড়ির কনভয় নিয়ে রাজা আমাদের উল্টোদিকে চলে গেল । ওরা বলল – রাজামশাই নাকি এয়ারপোর্ট যাচ্ছে ! এয়ারপোর্টে দেখেছি তিনটে রয়াল প্লেন দাঁড়িয়েছিল ! তারই যেকোনো একটাতে হয়ত যাবে ! এবারের সাত দিনের সফরে – অনেক তেতো-কড়া অভিজ্ঞতা হয়েছে ! নিজেদের দেশকে পায়ের তলায় ফেলে কিভাবে পিষে দিতে হয় – আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেখে শিখতে হয় ! ফ্যাসিস্ট নোট-নীতির জন্যে দার্জিলিঙের চারদিকে প্রায় হাহাকারের মতো অবস্থা ! - সমস্ত ব্যাঙ্কগুলো একেবারে অর্থ-শূন্য ! জয়গাঁও এর মতন জায়গায় – কেউ ক্রেডিট কার্ড নেয় না । পেটিএমএর বোর্ড সাজানো আছে প্রত্যেকটা কাউন্টারে – কাজ করে না নাকি ! – আমরা ক্রেডিট কার্ডের ওপর ভরসা করে যা টাকা নিয়ে গেছলাম – তা শেষ । বন্ধুর আকাউন্ট থেকে টাকা ট্র্যান্সফার করে তবে মান বাঁচে ! - কাগজে তো দেখতাম – চা-ওলা থেকে ভুজিয়াওলা সবাই নাকি পেটেম কার্ড নেয় ! কোথায় সেই প্রধানমন্ত্রীর চা-ওলা ! সেটা কোন দেশে ! – ফেরার সময় অবশ্য একটা বড় রেস্টুরেন্টে ক্রেডিট কার্ড নিল ! একটা কথা না লিখলেই নয় ! স্বচ্ছ ভারতের কথা লিখতে গিয়ে প্রথমেই লিখতে হয় একটা গেটওয়ের কথা ! জয়গাঁও আর ফুটসলিঙ্গের মধ্যে তফাৎ হচ্ছে একটা ভুটানি গেট ! গেটের এদিকে জয় গাঁও – আর তার মেছুয়াবাজার ! মানুষ গাড়ি দোকান বাজার সমস্ত জঞ্জাল নিয়ে যেন স্বাগত জানাচ্ছে ! অথচ গেটের উল্টোদিকে – কোথাও একটা পাতা পড়ে নেই ! পরিষ্কার শুধু নয় – পরিচ্ছন্নও । এমন কি ফুটপাথ দিয়ে মানুষ হাঁটছে । রাস্তা দিয়ে নয় । - আমাদের সামনে রাস্তা দিয়ে হাঁটা লোকেদের ফুটপাথে তুলে দিচ্ছে । নয়ত টিকিট দেবে ! – অসম্ভব হলেও সত্যি ! এদেশে বিড়ি-সিগারেট-গুরাকু ইত্যাদি খাওয়া নিষেধ ! ইহা শুধু সংসারের সর্বনাশ করে – তাই নয় - দেশেরও সর্বনাশ করে ! এই সঙ্গেই আমাদের ‘অথ দার্জিলিং ভায়া ভূটান ভ্রমণ সমাপ্ত’ সমাপ্ত হইল ! মনোজ

187

16

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান...৪

"... তার কাছ থেকে কোনো জ্যোৎস্না ভিক্ষা করে পাবে কিনা। সে কী ফল ভালোবাসে, কে জানে সবুজ কিংবা লাল, কিছুই জানো না তুমি; তবু দীর্ঘ আলোড়ন আছে, অনাদি বেদনা আছে, অক্ষত চর্মের অন্তরালে আহত মাংসের মতো গোপন বা গোপনীয় হয়ে।" (বিনয়) -কী হলো? ডেকে এনে মৌনব্রত... -ডাকিনি তো আমি... -তবে ? অতাপতা জানিয়ে কনফিউজ করলে কেন? -আমি করিনি। তুমি করেছো... -যাহ বাবা, আমি কী করলুম? -স্বাতী বিশ্বাস কে? -মাই গড... তুমি তাকে চিনলে কী করে? -চিনিনা তো, তাই জিগ্যেস করছি.. -একটা মেয়ে, কিন্তু তুমি... মানে তোমাকে কে ওর কথা বলেছে? -যেই বলুক, কথাটা তার মানে সত্যি... -কোন কথাটা? -আর কী কথা হতে পারে? আমি আর এসবের মধ্যে নেই... -বোঝো? তুমি যা ভাবছো, ঘটনাটা একেবারেই তা নয়... -সব ছেলেরাই একথা বলে। অ্যাট লিস্ট তোমার থেকে এইটুকু অনেস্টি আশা করতে পারি... -নিশ্চয় পারো। কিন্তু শুধু এইটুকু বলো তোমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ কীভাবে হলো গত দুদিনের মধ্যে? -ডায়রেক্ট হয়নি। আমার এক বন্ধু, স্বাতীকে চেনে, বললো, ও যখন শুনেছে আমরা বেঙ্গল ক্লাবে সারারাত একসঙ্গে বসে গান শুনেছি... শী বিকেম হিস্টেরিক। আমার ডিটেলস খুঁজে বার করে আমার বন্ধুকে বলেছে, ইউ অ্যান্ড শী আর ইন আ সিরিয়স রিলেশনশিপ.... আর বাকি কী থাকলো? -আমাকে বিশ্বাস করবে? -সত্যি বললে করবো... -স্বাতী আমাকে অনেকদিন থেকে চেনে। ভালো মেয়ে। মানে যা কিছু 'ভালো' হওয়ার লক্ষণ, সব আছে ওর। দর্শনধারী, স্মার্ট, বড়োলোক বাপের মেয়ে। সমস্যা হচ্ছে সারা জীবন ধরে যা চেয়েছে, পেয়েছে। কিছুদিন ধরে দেখছি আমার প্রতি খুব পজেসিভ হয়ে পড়েছে। যেভাবে হোক আমাকে অধিকার করতে চাইছে। অনেক বুঝিয়েছি .. অ্যায়াম নট হার কাইন্ড... কিছুতেই শুনতে চায়না। জানিনা কীকরে দিনে দিনে এতো অধিকারপ্রবণ হয়ে পড়েছে ও... সত্যি বলছি ওর এই ভালনারেবিলিটি আমাকে কষ্ট দেয়... মেয়েটা আদুরে, কিন্তু মনটা খুব ভালো...কী করবো বুঝতে পারছি না? আমি হেল্পলেস... শী ইজ সো ডেসপ্যারেট, বিশ্বাস করছো? -তুমি কি সত্যি বলছো? -এ নিয়ে আমি আর কোনও কথা বলবো না... -আমি কাল সারারাত একবিন্দু ঘুমোতে পারিনি... -আশ্চর্য তো, কেন? তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় বা যোগাযোগ বা ঘনিষ্টতা, কতোটুকু, ক'দিনের? এতো অল্প সময়ের মধ্যে তুমিও পজেসিভ হয়ে পড়লে? কী জন্য তোমার রাতের ঘুম নষ্ট হয়? অবশ্য প্রশ্নগুলো পার্সোন্যাল মনে হলে উত্তর দেবার দরকার নেই। আমি বুঝে নেবো... -আমি জানিনা, কিস্যু জানিনা.... ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, শোবার ঘরের দিকে। আমি চুপ করে বসে থাকি। পাখার আওয়াজ, ঘড়ির আওয়াজ, শ্বাসের শব্দ, পর্দাফাটানো নীরবতার মতো ঘিরে ধরতে থাকে। আমাকে। এবার বোধ হয় আমার বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কেউ এসে পড়লে চূড়ান্ত বিড়ম্বনা। উঠে পড়ি। মনে হলো যাবার আগে একবার বলে যাই, আমি অসৎ নই। ঘরের দরজা খোলা। পর্দা দুলছে পাখার হাওয়ায়। ভিতরে উঁকি দেওয়া বোধ হয় অন্যায় হবে। কিন্তু কীই বা আসে যায়। আর তো দেখা হচ্ছে না। আমার কথাটা বাকি রেখে কী লাভ? পর্দাটা একটু সরিয়ে দেখি বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো বালিশে মুখ গুঁজে আধশোয়া। অনাত্মীয় একজন মহিলাকে এভাবে দেখা উচিত নয়। পর্দা ছেড়ে দিই। -আমি আসছি, দরজাটা বন্ধ করে দাও... বাইরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছোবার আগেই পিছু ডাক, -একটু দাঁড়াও... একটা কথা আছে -বলো... একটু এগিয়ে এলো, ধীরে কিন্তু অবিচলিত পায়ে, -আমি তোমায় বিশ্বাস করেছি... তাকিয়ে থাকি, -কী দেখছো? -তোমার চোখ কী বলছে, দেখতে চাইছি... -একই কথা বলছে... -প্রমাণ? -কীসের প্রমাণ? -যা বলছো, তার.... -কাছে এসে দেখো... ভূতগ্রস্ত মহাকাশচারীর মতো এগিয়ে যাই I হাতটি বাড়িয়ে দেয় সে। এর পর আর কীই বা করার থাকে ? দুহাতে তার মুখটি তুলে ধরি। শুকনো জলের রেখা দুচোখে। কপালে একটা নীল টিপ। আধখোলা ওষ্ঠাধর। আমি তো শশিডাক্তার নই। এ কুসুম শুধু শরীর নয়, শুধু রক্তমাংস নয়। এ যেন শংকরভাষ্যের বোবা নিয়তি । তার নাম জানিনা। ঠিকানা রাখিনা। শরীর, শরীর। তুমি কোথায় থাকো? কোন দেশে? সব সত্ত্বা ঝাপটমারা বৃষ্টির জলে উইন্ডস্ক্রিনের কাচের মতো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অসহায় দেখি এই চোখ বুজে থাকা কলিঙ্গভাস্কর্যের নায়িকার স্পন্দিত ছবি । সে অপেক্ষা করছে, করে যাচ্ছে। বিস্রস্ত আবেগ হয়ে ডুবে যাচ্ছি কোমল নিষাদের মতো পাটলবর্ণ তার ওষ্ঠাধরে। মাথায় ছলকে ওঠেন নাজিম হিকমত। "তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান, কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পেলাম না।" ঐ সুশ্বেত দন্তমালা, বাকদেবতার পূত জিহ্বা, ঐ গোপন সাবান থেকে ছড়িয়ে যাওয়া জলজ গায়ের গন্ধ, ঐ শ্বেতপাথরের মতো নিষ্পাপ কপোলের ক্যানভাসে আমার হোলির নিলাজ রঙের পাগলামি হুসেনের তুলির মতো আছড়ে পড়ে। এই তো আমার সেই বসন্তমুখারির নিঃসীম বিধুমুখ, আমার নির্লজ্জ নেমেসিস। অপেক্ষায় ছিলাম কতো কাল। সে বড়ো সুখের সময় নয়... "...রাত্র ফিকে হয়ে গেছে, বকুল, বকুল ফুল, শুনছ কি, আজ আমি যাই..." --------------------------------------- ঘড়ি থেমে কতোক্ষণ, মনে নেই। জ্বরগ্রস্ত যক্ষিণীর আঁকড়ে থাকা বাহুদুটিতে যেন প্রাণ ফিরে আসে। গোলকোণ্ডার পাথরের মতো নিজেই ঠেলে সরিয়ে দেয় তার অবাক নির্ভরতা। অবসন্ন গলায় স্বগতোক্তির মতো কয়েকটা শব্দ তার... -তুমি আমার সর্বনেশে নেশা...কারুকে ছেড়ে দেবোনা তোমায়, কখনও না... -দিওনা... যতোদিন পারো... -কোনওদিন না... এক মূহুর্তের জন্যও... এবার হেসে ফেলি... -কুল ডাউন... প্রিয়ে । তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর হইলো... -'প্রার্থনা'? হোয়াট প্রার্থনা? আই ক্লেম ইউ.... আআই ক্লে এ এম ইউউ.... আবিরের গুঁড়ো সব রাখা ছিলো। লাল, মেরুন, হলুদ, সবুজ। দৃশ্যের জন্ম হবে বলেই তো তাদের অনন্ত অপেক্ষা। একমুঠো তুলে নিই হাতে। আবির, তুমি কার? যে মাখে, না যে মাখায়? জানিনা, জানিনা বলে উড়ে যায় তারা। বাসবদত্তার রজনীর মতো, খাজুরাহোর প্রোষিতভর্তৃকার মতো, কোণারকের পূর্ণিমার মতো, আমার সকল গান, আমার সকল দৃশ্য, আমার উত্তপ্ত ফাগুয়ার দিন, সমস্ত তোমারে লক্ষ্য করে। -বারান্দায় চলো, ঘরে আবির পড়বে.... ----------------- (শেষ)

191

8

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান...৩

".... দেবতারা বাস করে টিনের ঘরের মধ্যে ইষ্টকনির্মিত সৌধে, খড়ের ঘরেও; দেবতারা চাল সিদ্ধ করে সেই ভাত খায়, রুটি খায়, মাছমাংস খায়; দেখেছি যে দেবতারা পূজা করে নানাবিধ মাটির মূর্তিকে, আমি ধন্য হয়ে গেছি।" (বিনয়) আমাদের শহরে হোলি শুরু হয় একটু বেলায়। অন্তত এগারোটা বাজলে নড়াচড়া শুরু। দোলযাত্রার ঠিক নয়, প্রাক-হোলির খোঁয়ারি কাটতে সবারই সময় লাগে। বিহারে সকালে গিলা, বিকেলে সুখা। যারা বিলিতি খায়না, তারা ভাঙের রসিক। অনেকে অবশ্য দুটো'ই চালিয়ে যায়। বেসিক্যালি তো ব্যাকান্যালিয়ার উৎসব। পরবর্তীকালে ঠাকুরদেবতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া স্যানিটি রাখতে। তাও মুখরক্ষা হয় কোথায়? বছরের এই একটা দিনই 'ধর্মভীরু' জনতা দিনের বেলা দশরথপুত্র সেবন করে, বৌকে কেয়ার না করে। আর যাদের বৌ নেই, তাদের তো শখের প্রাণ, গড়ের মাঠ। পাপীদের ঘুম ভাঙতে ভাঙতে আমি কেটে যাই। বাড়ি গিয়ে জমিয়ে স্নান করতে হবে। তার পর? তার আর পর নেই..... ---------------------------- একটা হাওয়া দেয় এইসময়। উত্তপ্ত ফিলামেন্টের মতো রোদ। ঝলসে দেওয়া চমক তার। কিন্তু হাওয়াটা শরীরে লেগে ফিরে যায়না। পাগলা ঘূর্ণির মতো ঘিরে থাকে । আমার চারিপাশে, মাথার চারিপাশে। কদমা ওয়াই ফ্ল্যাট অন্তত দশ-বারো কিলোমিটার এখান থেকে। তবে হোলির দিন রাস্তা ফাঁকা। দঙ্গলবাজদের জত্থা কাটাতে পারলে আধঘন্টা লাগা উচিত। অপালার বাড়ি কোথায় জানিনা। তবে ওখানে আমার বন্ধু থাকে, বিলু, খোঁজ পেয়েই যাবো। সে সব তো মোবাইলের জমানা নয়। কিছু আড়াল, কিছু ভরম থাকতো মানুষের মধ্যে। মানুষের সব ব্যথা, কথা নেটের খাদ্য হয়ে যায়নি। একটু থেমে মানুষের চোখের দিকে তাকাবার জন্য কিছু সময় থাকতো আমাদের কাছে। সব কিছু যে জেনে ফেলতেই হবে, এমন কোনও তাড়নাও ছিলোনা। ভালো ছিলো? কে জানে? ------------------------ হোলির সকালে বিলু আমাকে দেখে উল্লসিত। -কী বে? তোর গ্যাংকে কাটিয়ে আসতে পারলি? -ভাবলুম এবারে তোদের এখানেই হোলি কাটাই। তোদের ঐ সিন্ধি ভাবিকে রংটং চড়াতে হবে তো.... -এবার বুঝেছি। কিন্তু বরখুদ্দার, ভাবি এবার ভেগে গেছে ... -সে কী রে, কোথায়? -বাপের বাড়ি, বম্বে... বোধ হয় খবর পেয়েছিলো তুই আসছিস... -মাইরি, তুই শালা ফুল ভোঁকচন্দর,... -চল চল তোর দুঃখ কাটিয়ে দিচ্ছি। এটা একটু মেরে নে... একটা কোকের বোতল এগিয়ে দেয়। এক চুমুক দিয়েই বুঝি ছদ্মবেশী রাম। -নাহ, আজ আর বেশি খাবোনা। বাইকে এসেছি... -তুই আবার কবে থেকে এসব নখড়া করছিস রে? -নাহ, সিরিয়স। আচ্ছা তোদের এখানে অপালা কোথায় থাকে বলতো? বিলুর চোখ সরু হয়ে যায়। -আবে কেসটা কী? অপালাকে তুই চিনলি কী করে? -চিনিনা তো, একটু কাজ আছে ওর সঙ্গে.... -গুরু, উধর হাথ মত মারো। মেরি জান চলি জায়গি... -আবে আমি হাথ-টাথ মারছি না। ওদের বাড়িতে একটা মেয়ে এসেছে। তার সঙ্গে কাজ আছে। -পর্ণা? তুই চিনিস? -হুমম... স্লাইট স্লাইট -অব চিজ সমঝ মেঁ আয়া। গুরু এক পুরিয়া পায়ের ধুলো দিবি... -দেবো দেবো, আপাতত আমার কাজটা করে দে... -চল, যাবো ওদের বাড়ি... -শোন, বাড়িটাড়ি যাবোনা। ওদের ডেকে আন নীচে... -------------------------- এই ফ্ল্যাটগুলো একটা ক্যাম্পাসের মধ্যে। সেখানে বাচ্চাদের রং বালতি, ভূতুড়ে পেন্ট নিয়ে দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বড়োরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন বেরোনো হবে। বিলুদের ফ্ল্যাটের পিছনদিকে একটা ছায়াময় কদমগাছ। সেখান থেকে একটু দূরেই অপালাদের বাড়ি। আমি সেই ছায়াতেই দাঁড়াই। পাতা ঝরে একাকার চারদিক। ঘাসগুলো ছিটে ছিটে হলুদ হয়ে আসছে। হাওয়ায় দূর থেকে ফাগুয়া-চইতার নেভা নেভা সিমফনি ঢেউয়ের মতন। উদ্দণ্ড কোরাস, উচ্চকিত ঝাঁঝ আর ঢোলক। পাতার উপর পায়ের আওয়াজ। বিলু ফিরে এসেছে। একা। -কী হলো রে? -ওদের বাড়িতে চ... -আরে বললুম তো, চিনিশুনি না কাউকে.. হঠাৎ করে .. এভাবে -আবে কাকুকাকিমা কালীবাড়ি গেছে, গুরুদেবের হোলিমিলন... -বোঝো... -কী বুঝদার মানুষ বল... সেটিং দ্য স্টেজ ফর আওয়র হোলিমিলন...চল চল, বহুত উতাওলে ইন্তেজার মেঁ হ্যাঁয় দোনো পঞ্ছি... অপালা দরজা খুলে দেয়। বাড়িটা বেশ সাজানো। আমার বিহারি বন্ধুরা যেমন বলে থাকে। দাদালোগোঁকে ঘর হমেশা সঁওয়ারা হুয়া রহতা হ্যাঁয়।ভালো লাগে। তবু তো এক আধটা কমপ্লিমেন্ট বাঙালিরা পায় এখনও। -আসুন আসুন... তখন থেকে আপনার গল্প শুনছি.... -সে কী ? হিরো এতো কম পড়িয়াছে? -আরে হাবুডুবু মানুষের হিরো'ই বা কী, জিরো'ই বা কী? -দমকল ডাকুন, আমার দ্বারা হবেনা... বিলু বলে ওঠে, অপালা, কাকুর স্টক কিছু আছে নাকি বাইরে? -আছে তো, কিন্তু আজ ছাড়ো না ঐসব... -আরে, হোলির দিন পাপ করা ছেড়ে দিলে চিত্রগুপ্ত নরকে হান্টারপেটা করবে... -করুক। আজ ঐসব মতলব থাকলে আমি হান্টারপেটা করবো... -লো, অওরতজাত সুধরেগি নহি... হয়তো একটু প্রগলভা লাগে। কিন্তু অপালা বেশ স্মার্ট মেয়ে। বিলুর পছন্দ ভালো। এতোক্ষণ পর্ণা কোনও কথা বলেনি। --------------------------- সবে জমিয়ে বসেছি, দরজায় ঘন্টার আওয়াজ। বিলু বলে, কাকুকাকিমা রিটার্নড। -আরে না, বাবা-মা'র বিকেল হয়ে যাবে আসতে... -তবে? খুলতেই দরজার বাইরে গোটা কুড়ি লোকজন। কাউকেই চেনা যাচ্ছেনা। বড়োদের হোলি শুরু হয়ে গেছে। প্রচুর কলরব করে আমাদের বাইরে ডাকছে ওরা। ঘরের ভিতর কেউ আবির দেয়না। মেঝে ময়লা হয়। অপালা আর বিলুকে যেতেই হবে। ওদের জায়গা। গণহোলি এড়ানো সম্ভব নয়। -তোরা একটু ওয়েট কর, আমরা দু'চারটে বাড়ি ঘুরে ফিরে আসছি। অবশ্য আমাদের যতো দেরি হয়, তোদের ততো পুলক... -হুমম, রাজা পুলকেশিন... -এক্জাক্টলি... দুদ্দাড় করে তারা বেরিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে শুধু পাখা চলার আওয়াজ। পরিবেশটা প্রায় বুদ্ধগুহের ছোটোগল্পের মতো। সেই ছোটোবেলায় পড়া 'খেলা যখন'। "... এই সব মনে পড়ে, স্বভাবত আরো মনে পড়ে বহু নক্ষত্রের কথা আমার চাঁদের কথা মনে পড়ে, মনোযোগ দিয়ে আমি ভাবি। পৃথিবীতে তারকার আলোক আসার পথপাশে চাঁদ থাকলেই সেই তারকার আলো যায় বেঁকে চাঁদের আকর্ষণেই; তারকাদিগের খোপা, ভুরু, দুই হাত মনোযোগ দিয়ে দেখি, তারকাদিগের সঙ্গে কথাবার্তা বলি।" (বিনয়) (ক্রমশ)

152

7

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান... ২

"... এই হল আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য তাকে দেখেছি অনেকদিন থেকে, কী করে কিশোরী থেকে ক্রমশ যুবতী হল তা দেখেছি আমি। অনেক সৌন্দর্য আছে পৃথিবীতে, আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য অন্য বহু সৌন্দর্যের সঙ্গে কথা বলছিল..." (বিনয়) বসন্তমুখারির রাতের আগে পর্যন্ত পর্ণার সঙ্গে পরিচয়টি ছিলো নেহাত ফর্ম্যাল। নোয়ামুন্ডির মুর্গামহাদেওতে আলাপ হয়েছিলো। আমি থাকতুম চাইবাসা। আর সে কলকাতায় পড়াশোনা করতো। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে দেখা হয়ে যেতো আমাদের ছোটোশহরের ইতিউতি। কবিতাসন্ধ্যা বা গানের জলসায়। তখনও আমাদের গ্রামে যেটা চলতো, পরবর্তীকালে সেটাই তালিবানরা আফঘানিস্তানে আমদানি করে। পেটরোগা, চশমাপরা স্বনিয়োজিত মর‌্যাল কাকাজ্যাঠাদের প্রতাপ ঐ সব সাতফুটিয়া কাবুলিওয়ালাদের থেকে কিছু কম ছিলোনা। রেজাল্ট, মোটামুটি সব কেসই 'আমার অনাগত, আমার অনাহত' হয়েই থেকে যেতো। তোমার বীণাতারে আর তারা বাজার স্কোপ ছিলোনা। তবু তার মধ্যেই খুঁজে নেওয়া নিজস্ব হাহাকার, আজি যে রজনী যায়...... I কোথাও কোনও তন্ত্রীর হার্মনি হয়তো বাঁধা হয়ে গিয়েছিলো। হয়তো জানতুম। হয়তো জানতুম না। লেকিন কুছ বাত তো থি মোহতরমা আপ মেঁ। বেশক থি। ------------------------- বুধাদিত্য শেষে বাজিয়েছিলেন, না ভৈরবী গত নয়, ললিতে একটা ছোট্টো বিস্তার মধ্যলয়ে। সারারাত নেশা করে ভোরের অবসন্নতা কেমন হয়, যাঁরা নেশা করেন তাঁরা জানেন। সুরের নেশার কাছে কোথায় লাগে সিঙ্গল মল্ট, কোথায়ই বা ভাঙের সরবত? তখনও আলো ফোটার সময় আসেনি। বাইরে এসে দাঁড়াই। -কীভাবে যাবে? -চলে যাবো দুজনে ... -এগিয়ে দেবো? -তোমার তো বাইক আছে... আমি সুগতকে বলি, তুই গাড়িটা নিয়ে পাইপলাইনের লালবাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাক। আমি এদের নিয়ে আসছি । সুগত হেভি খুশ। ব্যথা তাকে নাকি বলেছে যে সে জানতো না সুগত ক্ল্যাসিকাল গান এতো পছন্দ করে। মানুষের কতোরকম কষ্ট যে থাকে। কজনই বা জানে সেকথা? যেতে যেতে বিশেষ কথা হয়না। ওদের বাড়ির সামনে ছেড়ে দিই। খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট স্বরে শুনতে পাই, - হোলির দিন কদমা ওয়াই ফ্ল্যাটে অপালাদের বাড়িতে থাকবো আমি... আর কিছু নয়। বোকারা ভাবে অন্যরকম। কিন্তু মেয়েরাই ক্যাপ্টেন থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। জীবনের সব খেলায়। -------------------------------- হোলির আগের দিন রাতে আমাদের বন্ধুদের স্ট্যাগপার্টিটা পুরোনো দস্তুর। সারা বছর যে যেখানেই থাকুক না কেন, দোলপূর্ণিমার সন্ধেবেলা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যেতে হবে। ঠিকানাটা সচরাচর কোনও ব্যাচেলর বন্ধুর ফ্ল্যাটেই থাকতো। এবারও ব্যতিক্রম হলোনা। ছোটোবেলার বন্ধুসব। শ-কার ব-কারের চূড়ান্ত অক্টেভে আলাপ চলে সেখানে। রাত বারোটার মধ্যে সব কনফেশন মোডে চলে যায়। এবার সবার আগে আউট হলো সুমন্ত। আমাকে বেশ কিছু নির্বাচিত গালাগাল দিয়ে বললো, -শালা কটা নৌকোয় পা দিয়ে কাটাবি তুই? -আমার কোনও নৌকোটৌকো নেই। তোর পানসি তুইই চালা... -সুধীর বিশ্বাস তোকে একদিন জমিয়ে পটকাবে... -আবে, সুধীর বিশ্বাসের অ্যায়সি কি ত্যায়সি, আমি কী করবো? -স্বাতী তোকে ছাড়বে না.... -তো? -সুধীর বিশ্বাস জানতে পারলে ওর একমাত্র মেয়ের মেহবুবাকে লাথিয়ে বেন্দাবন পাঠিয়ে দেবে। শালা ঠিকাদার মাফিয়া। হত্তড় সে ফেঁসে যাবি... -আবে, স্বাতীকে নিয়ে আমি কী করবো? এতোবার ফুটিয়ে দিলুম, তবু কমলি নহি ছোড়তি... -শালা রোমিওর বাচ্চা... গান করিস, ড়বিন্দো করিস, ব্যাংকে চাকরি করিস, ইস্মার্ট জওয়ান , তোকে ছাড়বে কেন বে? -শোননা তুই গিয়ে লাইন কর। আমাকে ছাড়... -আবে আমি যা চাকরি করি তাতে স্বাতী বিশ্বাসের লিপস্টিকেরও খরচা উঠবে না... -আরে আমারও সেই অবস্থা। সুধীর বিশ্বাসের জামাই হয়ে যা। ওর ব্যবসা সামলা... -আবে, সুধীর বিশ্বাস আমাকে ওর মুন্সি করে রাখতে পারে। জামাই নয়। তুই লটকে যা। আমাদের একটা সলিড বৌদি লাভ হয়ে যাবে... -শালা তুই হদ লাতখোর ... -তুই পরশুদিন বেঙ্গল ক্লাবে কার সঙ্গে ফোকাস করছিলি বে রাতভর... -তোকে কে বললো.. -আবে সবাই জানে... -তবু? -আমাকে স্বাতী বলেছে। কাল। কান্নাকাটি করছিলো... -বাপরে, এতো দূর? -হুমম, সে জন্যই বলছি। সাবধান থাকবি.... -ছাড়তো, দিমাগ কিরকিরা করিস না... বিনা মতলব কা ফ্যাসাদ। যাকগে। ধীরে ধীরে সব পাবলিকই নেশার ঘোরে এদিক ওদিক শুয়ে পড়ে। আমি জানালা দিয়ে চাঁদ দেখি। কাল সকালে আর রাম খাবোনা। অনেকদূর যেতে হবে । কদমা। ".... তবে সবই ঠিক আছে, ঘুমোবার আগে মনে পড়ে সারা দিনের ঘটনা। মাঝরাতে বিছানায় চাঁদের জ্যোৎস্না এসে পড়ে দূর থেকে। শুধু চাঁদ দেখবার জন্য আমি বিছানায় উঠে বসি, চাঁদ আছে বলে ঘুমোতে বিলম্ব হয়। আমি তাড়াতাড়ি ফের যাব।" (বিনয়)

156

7

শিবাংশু

বসন্তমুখারি: তোমার আর্দ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান... ১

'অমিল পয়ার ছন্দে রচিত বসন্তকাল শেষ হয়ে এলো। পথের উপর আজ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম চারিপাশে মাঠ কালো কালো ধান গাছে ঢাকা আছে, এই সব সুমুদ্রিত ধানগাছগুলি আমার এ জীবনের বসন্তের অভিজ্ঞতা। .... আমার ভরসা এই প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে স্বভাবত কিছু রস ঝরে যাবে মাঝে মাঝে বসন্তসন্ধ্যায়।' (বিনয়) অমিলপয়ার ছন্দে ফাল্গুনের এক বসন্তসন্ধ্যা নেমে আসছিলো আমাদের গ্রামে। বেঙ্গল ক্লাবে সারা রাতের অনুষ্ঠান। বুধাদিত্য বাজাবেন সেদিন। তিনি তখন যুবক এবং অদ্ভুত চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী নবীন প্রতিভা। সন্ধে আটটা নাগাদ অনুষ্ঠানের শুরু। সামনের দিকে সাকচি হাইওয়ের তেলেভাজার দোকানের পাশে বাইকটি লাগিয়ে আমি আর সুগত হলের দিকে এগোচ্ছি। অন্ধকার থেকে গেটের হ্যালোজেন আলোয় আসতেই দেখি সামনে পর্ণা আর একটি মেয়ে। প্রথম গেটে কার্ড দেখাচ্ছে। ঠিক পিছনেই আমরা। ময়ূরপঙ্খি রঙের সিল্ক থেকে মৃদু খসখস শব্দ আর অচেনা কোনও সুরভির অস্পষ্ট ইশারা। চুপ করে দাঁড়িয়েই ছিলুম। মুখ ফেরাতে দেখতে পেলো। -আরে আপনি এখানে? -হুমম, একই কারণে... -সত্যিই, দারুণ... -দারুণ? কেন বলুন তো? এবার বোধ হয় একটু লজ্জা পায়। উচ্ছ্বাসের জন্য, -নাহ, ইয়ে, মনে হয় আজ অনুষ্ঠান খুব ভালো হবে... -তা ঠিক...সে রকমই তো আশা.. ----------------------------- সুগত পদ্য লেখে। কিন্তু ক্ল্যাসিকাল গান বোঝেনা। ওর বর্তমান ব্যথা সঙ্গীতপ্রভাকর থার্ড ইয়ার। সে আবার পদ্য পড়েনা। তাই পর্বতই মহম্মদের কাছে যেতে চাইছে। তখন তো ইউ-টিউবের জমানা ছিলোনা। মেহনত লাগতো। বহুবার বলেছি আমার কাছে কোনও মেড-ইজি নেই। অখিল ভারতীয় কার্যক্রম শোন। রাত জেগে। তার পর আসিস। দেখি যদি কিছু হেল্প করতে পারি। তার অধ্যবসায় 'ধন্যি ছেলে' টাইপ। এই অনুষ্ঠানটি রাতভর চলবে। খুব আঠা না থাকলে, শুধু আঁতেল সাজার জন্য আসা উচিত নয়। সাড়ে এগারোটা থেকে এক'টা পর্যন্ত ঢোলার সময়। তার পর অবশ্য ঘুম উড়ে যায়। কিন্তু এই দু'তিন ঘন্টা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ। যথাসাধ্য বুঝিয়েছি। কিন্তু ফল হয়নি। ওকে একটাই শর্ত দিয়েছি। আমি না বললে কোনও কথা বলবে না। বেরসিকের বকবক অসহ্য লাগে গান শুনতে শুনতে। ---------------------------------- হলগেটের কাছে দেখি সমরদা টিকিট চেক করছে। পর্ণাদের পিছুপিছু আমাদের ঢুকতে দেখে আড়চোখে তাকালো। আমরা করিনি কোন দোষ, তবুও কেবলিই খবরের জন্ম হয়। আমাদের ছোটো গ্রাম। অমুক'দার ছেলে হওয়ার চাপ বড়ো বেশি। তাকাতে গেলে তো চারদিকেই চেনা লোক। চুলোয় যাক। -কোনদিকে বসবেন? যেন ঠিকই আছে আমরা একসঙ্গে বসবো। -বলুন? -একটু পিছনে, কোনার দিকে যাওয়া যায়? -যায়... এগোতে এগোতে চোখে পড়ে সুগত'র ব্যথা তার গলায় কম্ফর্টার, গেরুয়া খদ্দরশোভিত গুরুজির সঙ্গে সদলে বসে আছে। তাহলে এটাই কেস। -আবে, ওখানে গিয়ে বোস.. -হবেনা.. -কেন? -শালা বুড়োটা হেভি খ্যাঁচা... -ঠিক বা... তবে আমার দিমাগ চাটিস না। বুঝতে না পারলে চুপ থাকিস। পরে বুঝিয়ে দেবো। দু'চারটে সলিড পয়েন্ট দিয়ে দেবো। কাল গিয়ে ঝেড়ে দিস। কুড়ি ফঁস জায়গি। গ্র্যান্টি... -মাইরি গুরু, পার লগাদে ইস বার... ------------------------------- মেয়েটার খুব সাহস তো। লক্ষ্য করছি চারদিক থেকে অনেক জোড়া চোখ নজর রাখছে। কিন্তু স্টেডিলি আগে আগে হেঁটে গিয়ে জায়গা খুঁজে নিলো। বেঙ্গল ক্লাবের সেই জংধরা টিনের চেয়ার। সারারাত এতে বসার কথা ভাবলেই রস শুকিয়ে যায়। কিন্তু আজ অন্যরকম। 'চাহিয়া দেখো, রসের স্রোতে রঙের খেলাখানি/ চেয়োনা চেয়োনা তারে নিকটে নিতে টানি।" পাশের চেয়ারে এমন রঙের খেলা থাকলে রসের স্রোতে তো ভরাকোটাল। - আজ প্রথমে কে গাইবেন? -সম্ভবত ফরিদুদ্দিন ডাগর.. -আপনার ধ্রুপদ ভালো লাগে? -ধ্রুপদের আর ভালো-মন্দ কী? ওটা শোনার অভ্যেস না থাকলে তো কিছুই বোঝা যায়না... -তাই? আমি কিন্তু ধ্রুপদ কখনো সামনে বসে শুনিনি.. -আজ শুনুন... -একটু গাইড করে দেবেন? কিছু বলিনা। এতোক্ষণের মধ্যে প্রথমবার শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি। ফিকে হাসি না আগ্রহ? বোঝা দায় হে। ----------------------- উস্তাদজির গলা সেদিন তন্দুরস্ত। ষড়জে পর্দা মিলিয়ে একটা পুকার। রাগ য়মন। নোমতোম আসতে আসতে লোকজন স্তব্ধ হয়ে শুনছে। -গলার কী ডেপথ... তাই না? -ঠিক। ধ্রুপদে এটা জরুরি... সুগত আড়চোখে তাকায়। ওকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে। ধ্রুপদ শেষ হবার পর অলকা কানুনগো'র ওড়িশি। ওঁর অনুষ্ঠান আগে কখনও দেখিনি। পর্ণার বন্ধু দেখি মাঝে মাঝেই উঠে কোথায় যেন যায়। একবার সপ্রশ্নচোখে তাকিয়ে দেখি। অযাচিতভাবে মন্তব্য শুনি, -একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে.... -ও... -এটা চলবে? দেখি দুটো লবঙ্গ এগিয়ে দিচ্ছে। -একশোবার... আজ আনতে ভুলে গেছি... ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজছে। একটা বড়ো বিরতি। সুগতকে বলি, যা বে খেটে খা। -আবে বুঢ্ঢা বহুত হা... -বিনা মতলব কা গালি দিচ্ছিস। অতোগুলো কাশ্মীর কি কলি'কে নিয়ে এসেছে। টেনশন তো থাকবেই। ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে বাইরে দাঁড়া। পৌঁছে যাবে.... -চল গুরু... পর্ণার বন্ধুও যথারীতি গায়েব। দুজনে মুখোমুখি। তবে গভীর সুখে সুখি কি না, জানিনা। আমাকে বলে, চা খাবেন? -আমি তো খাইনা, চলুন সঙ্গ দেবো... হল থেকে বাইরে আসতেই ফাল্গুনের মধ্যরাতের হাওয়া ওডিকলোনের মতো ঝাপটা মেরে স্নিগ্ধ করে দিলো সারা শরীর। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ মাঝ আকাশে। - কী দারুণ না? -আপনি কি এই দারুণটার কথাই বলছিলেন তখন? -ধ্যাৎ... আপনি খুব লেগে থাকতে পারেন। ঐতো কফি পাওয়া যাচ্ছে। এটা তো খেতে পারেন... মনে মনে বলি, টিক টোয়েন্টি দিলেও খেয়ে নেবো মধুময়। ------------------ কফিটা ভালো'ই বানিয়েছে। চুপ করে এক চুমুক। চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চাইছে। তাকিয়ে থাকি। -একটা কথা বলবো? -বলুন... -আর কতোক্ষণ আপনি করে কথা বলবেন? -আরে আমি তো ওতেই স্বস্তি পাই... -খুব স্বস্তি খোঁজেন, না..., সো বোরিং -নাহ, ঠিক তা নয়। নিজে থেকে সম্বোধন বদলাই না। প্রাইভেসিতে আক্রমণ মনে হয়.... -অনুগ্রহ করে বদলাতে পারবেন কি? -হয়তো পারি। কিন্তু সেটা তো রেসিপ্রোক্যাল হওয়া দরকার... এতোক্ষণে সে সত্যিকারের হেসে ওঠে। ঠোঁটের কোনের মাপা ভঙ্গিমা নয়। বসন্তপঞ্চমীর রাতে ঝিরঝির বৃষ্টির মতো ভাসিয়ে দেওয়া জলের শব্দ আসে। ---------------------------------- মধ্যরাতে আড়াইটা তিনটে নাগাদ তিনি বসলেন। সেনী ঘরানাদার উঁচু সপ্তকে বাঁধা যন্ত্র তাঁর । জোয়ারির শব্দ ঝর্ণার মতো, ভাসিয়ে দিয়ে যায়। রাগের নাম বললেন না। বন্দীশ শুনে কখনও মনে হলো আহির ভৈরব, না না এতো জোগিয়ার মতো লাগছে। উদ্গ্রীব হয়ে কান পেতে থাকা, ধরতে চাওয়া লক্ষণগুলিকে। ভৈরব না বসন্ত, কার ছোঁয়া বেশি লাগছে, চোখ বুজে শুনি। অওচার আলাপ শেষ করে বুধাদিত্য ঘোষণা করলেন তিনি রাগ বসন্তমুখারি বাজাচ্ছেন। বসন্তমুখারি, সেই কর্নাটকী রাগ বকুলভরণম I পারস্যের রাগ হিজাজের ছাঁচে এই রাগটিকে নিজের শরীর দিয়েছিলেন পন্ডিত রতনজনকার। । ততোদিন শুধু শোনা ছিলো উস্তাদ আমির খানের গায়নে বসন্তমুখারি। আর পণ্ডিত রবিশংকরের সেতারে দৈবী ছাব্বিশ মিনিট। সঙ্গে স্বপন চৌধুরী, তিন তাল। কিন্তু বুধাদিত্য বাজালেন এক সম্মোহক নেশাগ্রস্ততায় মত্ত সুরের বৃষ্টি। যেন বকুলপারা মেঘ আকাশ ভেঙে ঝরে পড়লো বসন্তের ঝোঁকে। রাগের মুখটি যেন ছুঁতে পারছিলুম আমি। নিমীলিত কাজলের মতো কোমল ঋষভ, নিখুঁত কোমল ধৈবতের মতো নাকের ডৌল আর কোমল নিষাদের মতো কম্পমান ওষ্ঠাধর। অপেক্ষায়। জানালার বাইরে শুদ্ধ গান্ধারের অঝোর বৃষ্টিধারা। শংকর-জয়কিশনজির স্টুডিওফ্লোর থেকে লতাজির সেই আর্তিভরা পুকার " ও বসন্তি পবন পাগল, আজা রে আজা রোকো কো'ই"I বুনোফুলের মধুর মতো মেলোডি, সেতারের তার বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ছিলো স্পিকারের বাক্সো থেকে। এই শিহরণ সুর ছাড়া আর কে'ই বা দিতে পারে?আজানুসমর্পণে দুহাত বাড়িয়ে ভিজে গেলুম সেই শেষ রাতের অন্ধকারে। নিশ্চুপ। নিরাবলম্ব। "... এবং আশ্চর্য এই-- বৃষ্টি হলে শব্দ হয় শব্দ হতে থাকে। সমস্ত সৃষ্টির জন্য এই নভোচর বারি প্রয়োজন। আমি দেখছি অনেক বৃষ্টি হচ্ছে, তা সত্ত্বেও শাশ্বতকালের তুলনায় বৃষ্টি হচ্ছে কয়েক মূহুর্তমাত্র-এই সত্য বুঝি। " (বিনয়) (ক্রমশ)

185

9

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

945

83

দীপঙ্কর বসু

সে দিন দুজনে

তালা কাহিনী বেশ অনেকটা দেরি করে শয্যাত্যাগ করে উঠে সবে দিনের প্রথম কাপ চায়ে একটা চুমুক দিয়েছেন অরুণ বাবু , আর ঠিক তখনই দেওয়ালে লটকান কলিং বেলটা টুং টাং শব্দে বেজে উঠল । -“দুররর ,কে আবার এলো এই সাত সকালে” কিছুটা বিরক্তির সঙ্গেই মনে মনে স্বগতোক্তি করেন অরুণ বাবু । অভ্যাস বশে পরনের লুঙ্গিটা হঠাৎ খুলে যাবার কল্পিত সম্ভাবনা রুখতেই যেন খুঁটটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে আদুর গায়েই এগিয়ে যান দরজার দিকে । দরজাটা একটু ফাঁক করে গলাটাকে বাড়িয়ে দেখে নিতে চান আগন্তুককে । “ওহ আপনি !এত সকালে ! কি ব্যপার !” প্রশ্নটা বিপন্নমুখে দরজার বাইরে দন্ডায়মানা বুলবুলির দিকে ছুঁড়ে দেন অরুণ বাবু । সম্ভবত মনের বিরক্তির কিছুটা আঁচ রয়ে গিয়েছিল প্রশ্নটায় ।অরুণ বাবু লক্ষ্য করলেন বুলবুলির মুখের বিপন্নভাবটা যেন আরও বেড়ে গিয়ে মুখটা কুঁচকে আরও ছোট হয়ে গেল । কিছুটা সানুনাসিক কণ্ঠে বুলবুলি এবারে তার আগমনের হেতুটা ব্যক্ত করে । “দেখুন না দাদা ,সক্কাল সক্কাল কি বিপদেই না পড়েছি । ছুটকির বাবা অফিস যাবে ,তার একটু পরেই ছুটকির স্কুলের বাস আসবে ,তাকে নিয়ে আমি মোড়ের মাথায় যাব বাসে তুলে দিতে এদিকে গেটের তালাটা কিছুতেই খোলা যাচ্ছেনা ।আমি আর ছুটকির বাবা দুজনেই খেপে খেপে অনেক চেষ্টা করেও তালাটা খুলতে পারলামনা । আপনি একবারটি এসে দেখবেন,দাদা ?” রাগের চোটে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি গোটা শরীরটা জ্বলে ওঠে । এ এক যন্ত্রণা হয়েছে অরুণ বাবুর । আদতে শান্তি প্রিয় ,ঠাণ্ডা মাথার মানুষটি কারো সাতে পাঁচে থাকেননা ,চট করে গলা তুলে কথা বলেননা কারো সঙ্গে ,সারাদিন নিজের মনেই থাকেন । কিন্তু তাতেই হয়েছে বিপদ । তাঁর নির্বিবাদী স্বভাবের জন্য একদিকে যেমন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা কিছুটা মান্য করে চলে অরুনবাবুকে । তেমনি আবার তাদের বিশ্বাস ঠিক এমনি একজন সরল নির্বিবাদী মিষ্টভাষী মানুষ ই ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণকারী কমিটির সম্পাদক হিসেবে একেবারে খাপে খাপে ফিট মানুষ ।তিনিই পারবেন ফ্ল্যাটের আবাসিকদের সঙ্গে নিয়ে চলতে । ঘোর অনিচ্ছা সত্বেও উপরোধে ঢেঁকি গিলেছিলেন অরুণ বাবু সেদিন । আর ঝামেলাটা শুরু তখন থেকেই । ফ্ল্যাটের কমন স্পেস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কাজের মাসি আছে ,ড্রেনেজ লাইন ঠিক ঠাক রাখার জন্যে আছে জগদীশ ম্যাথর ,ছোটখাটো সারাই মেরামতির জন্যে কিছু মিস্তিরির তালিকা আছে কমিটির খাতায় । প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র করা ছাড়া এমনিতে সম্পাদকের কাজ বলতে বিশেষ কিছুই নেই । তবে , বড় মাপের কোনা ঝামেলা পোহাতে না হলেও খুচরো ঝামেলা লেগেই থাকে । যেমন আজ সকালের তালা বিভ্রাট । তালার লিভারগুলো কোন কারণে জ্যাম হয়ে যাওয়ায় চাবির মোচড়ে না খুললে সম্পাদকের কিই বা করার থাকে? তিনিতো আর বিশ্বকর্মা নন ।তবু তালা খুলছেনা – দাদাকে বল । এ বড় আজব কথা ! ওপর তলা থেকে কে বা কারা রোজ ময়লা ফেলে নিচের কমন স্পেস নোংরা করছে – দাদার কাছে নালিশ জানাও , তেতলার মুকুজ্জের পেয়ে রিঙ্কু এক পাল ছেলে নিয়ে এসে ঘরের মধ্যে আড্ডা জমাচ্ছে – আবদার কর থানায় নালিশ জানানর । অন্যান্য কেস গুলোতে টুকটাক মিঠে কথা দিয়ে লোকজনকে সমলে নেবার কায়দাটা অরুণ বাবুর কাছে জলভাত ।শুধু মুকুজ্জের মেয়ের হল্লাবাজির বিরুদ্ধে থানায় নালিশ জানানো নিয়ে ঘোর আপত্তি অরুণ বাবুর । ফরিয়াদি পক্ষের অভিযোগের পালটা প্রশ্ন তোলেন - রিঙ্কু বা তার বন্ধুরা কি রিঙ্কুদের ফ্ল্যাটের ভেতরেই হৈহুল্লোড় না করে তাদের ফ্ল্যাটে কোন রকম উৎপাত করে? জবাব আসে –“ন্না ।তা করেনা । ফরিয়াদিদের গলার স্বর নেমে আসে । অরুনবাবু এবারে কিছুটা গলা চড়িয়ে প্রশ্ন করেন , “তা হলে থানায় রিঙ্কুর বিরুদ্ধে ঠিক কি অভিযোগ জানান হবে?কার ঘরে কে এলো গেল তাই নিয়ে কি কোন অভিযোগ পুলিশ নেবে?” ফরিয়াদি পক্ষ চুপ । এই ভাবেই টুকটাক ফুস মন্তরে দিন চলে যায় ।অরুণ বাবু প্রায়ই ভাবেন এবারে একদিন মিটিং ডেকে অব্যাহতি চাইবেন এই উদোর বোঝা বওয়ার হাত থেকে । কিন্তু মিটিং এ প্রতিবারই একই গল্প উঠে আসে। দেখা যায় সকলেরই অফিস আদালত আছে । কেউ বা অত্যন্ত রগ চটা ,কারো হার্টের ব্যামো ...। অগত্যা নিস্তার নেই অরুণ বাবুর । “আচ্ছা ,চলুন । দেখি কি হল আবার তালাটার” ভাবখানা এমন ,যেন তিনি গিয়ে তালাটার সামনে দাঁড়িয়ে “চিচিং ফাঁক” বললেই অমনি বেয়াড়া তালাটা আপনা হতেই খুলে যাবে ! গায়ে একটা শার্ট পরে নিয়ে বোতামগুলো লাগাতে লাগাতেই নিচে নেমে আসেন অরুণ বাবু । সেখানে তখন বুলবুলির কত্তামশাই অসহায়ের মত চাবির তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ,আর বুলবুলি সেই একই রকম বিপন্ন মুখে সানুনাসিক স্বরে ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছে –“তোমার আজ আর আটটা পাঁচের লোকালটা ধরা হয়ে উঠবেনা ।কি একটা মিটিং ছিল বলেছিলে, সেটার কি হবে তা কে জানে !” অকুস্থলে অরুণ বাবুকে দেখতে পেয়ে বুলবুলি আবার শুরু করে – “কি হবে বলুন তো দাদা ।তালাটা্তো কিছুতেই খুলছেনা ।এদিকে ছুটকির বাবার স্কুলে একটা জরুরী মিটিং আছে ,ছুটকির স্কুল বাস আসার সময় হয়ে আসছে ... কাজের মেয়েগুলোকে পই পই করে বলা হয় অমন হ্যাঁচকা মেরে তালা খোলা বন্ধ না করতে,কিন্তু কে শোনে কার কথা।... “অ্যাই ,তুমি একটু চুপ করবে ? তখন থেকে সেই ঘ্যানর ঘ্যানর করেই চলেছে...”। খেঁকিয়ে ওঠেন চ্যাটার্জি বাবু । স্বামীর ধমকে বুলবুলির নাকি কান্না এক্কেবারে বন্ধ । কাঁচুমাচু মুখে সে এক কোনে দাঁড়িয়ে থাকে । অরুণ বাবু এগিয়ে যান বন্ধ গেটের দিকে । “দেখি তো আমার চাবিটা দিয়ে খোলা যায় কিনা তালাটা” । অভিশপ্ত তালাটা বাঁহাতে ধরে ডান হাতে চাবি বাগিয়ে ঘোরান অরুণ বাবু । কিন্তু ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবাধ্য ছেলেটার মতই তালাটাও আর রা কাড়েনা । মহা ফাঁপরে পড়ে যান অরুণ বাবু। বুঝে উঠতে পারেননা কি করা যায়- “তালাটা কি ভাঙতে হবে দাদা”? কিছুটা দ্বিধা জড়িত কণ্ঠে বুলবুলি জানতে চায় । “ওনার আটটা পাঁচের লোকালটা তো গেলই ,ওদিকে ছুটকির স্কুল বাস ...” “আ বা র...।!” গর্জে ওঠেন চ্যাটার্জি বাবু ।স্বামীর রক্ত চক্ষুর দাপটে বাক্যটা অসম্পূর্ণই থেকে যায় বুলবুলির । “গোদরেজের তালা ভাঙ্গা কি চাট্টিখানি কাজ?” অরুণ বাবু র কথায় বুলবুলি একটু সাহস পায় । বলে – “কাছেই একটা ছেলে থাকে। সে মাঝে মাঝে খালি বাড়িতে তালা ভেঙ্গে ঢুকে চুরিচামারি করে । নিচের খোকনের দোকানে তাকে দেখি মঝে মাঝে । ছেলেটাকে একটা খবর দিলে হয়না”! হাসি চেপে রাখতে পারেননা অরুণ বাবু । ততক্ষনে আরও দুজন অফিসযাত্রী নেমে এসেছেন। উদবিগ্ন তারাও - এসেছেন মণিকা রায় । যদিও আপাতত তার বাইরে যাবার তাড়া নেই তবু ঝামেলার গন্ধ পেয়ে আসা । ভিড়ের পেছন থেকে ফোড়ন কাটে - “ভাল কথা বলেছ বুলবুলিদি । নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে চোরকে দিয়ে নিজের ঘরের তালা ভাঙ্গানো !! এ একটা রেকর্ড হবে বটে ” ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলে “আশিস বাবুর কাছে কি একটা তেল আছে ,যেটা লাগালে নাকি জ্যাম হয়ে যাওয়া তালা খুলে যায় ।চেয়ে আনব তেলটা?” পাখির মত উড়ে যায় মণিকা রায় । কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে প্লাস্টিকের ছোট একটা বোতল হাতে। ফোটা ফোটা করে ঢালা হয় সেই তেল চাবির গর্তে । একটু অপেক্ষা । তার পর আবার প্রত্যেকের আনা চাবি দিয়ে একবার করে তালাটাকে খোলার নিষ্ফল চেষ্টা । তালা নট নড়ন চড়ন । উপস্থিত জনতার মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ওঠে – “এক এক জনকে দেখি তালা খোলার সময়ে গায়ের পুরো জোরটা তালার ওপরে লাগিয়ে দেয় ।।কি দরকার বাপু ...” কে আবার চাপা স্বরে বলে মুস্তাফি বাড়িতে কাজ করতে আসে কাঞ্চন বলে যে বৌটা তারই দেখি খুব তাড়া ...” সেই গুঞ্জনের মাঝেই হঠাৎ সিঁড়িতে দেখা যায় মুকুজ্জের মেয়ে রিঙ্কু দুদ্দাড় করে নেমে আসছে । “কি হয়েছে গো ? কি হয়েছে ?তালাটা আবার আটকে গেছে?” বলতে বলতে রিঙ্কু পৌঁছে যায় গেটের সামনে ।নিজের দুহাতে তালাটাকে ধরে হ্যাঁচকা একটা টান মারে রিঙ্কু ।লোহার পাতে মড়া গেটের গায়ে তালাটা ধাক্কা খেয়ে ঘটাং করে আওয়াজ হয় আর তার পরেই খুট করে ছোট্ট আওয়াজ । তালাটা খোলা অবস্থায় ঝুলতে থাকে গেটের আংটায় । “খুলেছে ,খুলেছে” সশব্দে উল্লাস জাগে জনতার কণ্ঠে । জলের পাইপে আবর্জনা আটকে জল জমে থাকার পর আবর্জনা সাফ হওয়া মাত্র জমা জল যেমন হুড়মুড় করে বেরিয়ে যায় ,দরজা খোলা পেয়ে অফিস যাত্রীর দল ঠিক তেমনি ভাবে হুহু করে বেরিয়ে গেল । নাটকের ও যবনিকা পাত ঘটল ।

460

14

kishore karunik

’পাবার মতো চাইলে পাওয়া যায়‘

----কিশোর কারুণিক উপন্যাস-১১ পর্ব পড়ে? আর আমার যখন অর্ধেক পড়া হলো ঠিক তখনই শ্রাবস্তীও নিজের কথা বলল। শ্রাবস্তী অশররিী কিছু না তো। ভাবতেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল্ আমার পছন্দের বই ওর কাছে কেন? আমিই বা কিসের মোহে এখান থেকে সরে যেতে পারছি না। অদ্ভুত সব চিন্তা মাথার ভিতর দৌড় ঝাপ করতে শুরু করেছে। শ্রাবস্তী বললো, “কী হলো, এতো ভাবছেন ?” দিবা স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। “নাÑকি আর ভাববো।” বলে শ্রাবস্তীর দিকে তাকালাম। শ্রাবস্তীর চোখ দুটো খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। মনে হয় সব বুঝতে পারছে ও । আমিও এবার আগ্রহটা বাড়িয়ে দিই। ও যেন আসল ভাব বুঝতে না পারে। বইটা বন্ধ করে বললাম, “ভালোই তো হলো।” শ্রাবস্তী কৌত’হলী ভঙ্গিমায় বললো, “আবার কী হলো।” “আপনি শেষের অর্ধেকটা পড়েছেন আমি শেষের অর্ধেকটা পড়া শেষ করলাম।” “ও , আমি মনে করেছি কী না কী।” কী না কী মানে! শ্রাবস্তী কি অন্য কিছু ভাবছে? কী ভাবতে পারে? ইস ! যদি অন্তর্যামী হতে পারতামÑতাহলে বুঝতে পারতাম। মানুষের মন যে বুঝতে পারে, সেই নাকি মানুষের মধ্যে উত্তম। কয়টি মানুষ বুঝতে পােে অপর মানুষের মনের কথা! আমার বোধ গম্য হচ্ছে না। শ্রাবস্তী কি ভাবছে আমি উত্তম মানুষ না? আসলে আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। শ্রাবস্তীকে বইটা ফেতর দিয়ে দিই। বইটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বররাম, “ আপনার বইটা রাখুন।” শ্রাবস্তী মৃদু হাসি দিয়ে বললো, “ কেন ,আর পড়বেন না?” “না,এই মূহুর্তে আর ভাললাগছে না।” শ্রাবস্তী বইটা আমার হাত থেতে নিয়ে নিলো। ও তো আর একবার অনুরোধ করতে পারতো। কেন এমন মনে হলো বুঝতে পারছি না। “তিলেখাজা খাবেন।?” শ্রাবস্তী ব্যাগ থেকে তিলেখাজা বের করেছে। না বাবা কী মেশানো আছে কে জানে। এবার মনে হচ্ছে শ্রাবস্তী এত সুন্দর হলেও এর ভিতরের জগৎ অন্ধকার। শ্রাবস্তী নিশ্চয় কোন ছিনতাইকারী দলের সদস্য আমি তিলেখাজা যেমনি খাব, তেমনি অজ্ঞান হয়ে যাব। তারপর আমার সবকিছু নিয়ে ও উধাও হবে। “কী হলো, কী ভাবছেন এতো?” “কই।” শ্রাবস্তী বললো, “তিলেখাজা খাবেন?” “না, আমার ক্ষিধে নেই।” “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?” “কই না তো । আপনাকে সন্দেহ করার কিছু আছে নাকি?” শ্রাবস্তী একটু রেগে গিয়ে বললো, “ কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?” “কই কিছু না তো। আপনাকে কী বলব আমি?” শ্রাবস্তী ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একশো টাকার নোটটি বের করে বললো, “টাকাটা---

343

10

আড্ডা অ্যাডমিন

প্রেমতর্পণ

ভ্যালেন্টাইন ডে তে আড্ডাঘরের সদস্যরা লিখলেন একের পর এক মনমাতানো প্রেমের গল্প| সেই সব প্রেমের গল্পের একত্রিত সংকল্ন এই ব্লগে| শিবাংশু, মুনিয়া,প্রবুদ্ধ,কৌশিক,জল,ঝড়, হিমাদ্রী ও ঝিনুকের লেখা ৮ টি গল্প একসাথে। {s1} গণেশ পাইনের রানি {/s1} {s2} লেখক: শিবাংশু {/s2} ".... তুমি ছেঁড়া জামা দিয়েছো ফেলে ভাঙা লন্ঠন, পুরোনো কাগজ, চিঠিপত্র, গাছের পাতা- সবই কুড়িয়ে নেবার জন্য আছে কেউ তোমাদের সেই হারানো দিনগুলি কুড়িয়ে পাবেনা তোমরা আর ।" সুকান্ত আমার অনেকদিনের বন্ধু । সেই হাফপ্যান্টের আগে থেকেই । ডাকনাম সুকু । আমাদের মতো জামশেদপুরেই ওদেরও সব কিছু । ওর কাকা থাকতেন কদমায়। সুকুর সঙ্গে ছোটোবেলা থেকেই যাতায়াত ওঁদের বাড়ি । রিমা, মানে মধুরিমা সুকুর খুড়তুতো বোন । বছর তিনেকের ছোটো হবে আমাদের থেকে । ওকে যে দেখতে কেমন বা ও যে একটা মেয়ে, এমন কোনও অনুভূতিই আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি কখনও। ছেলেরা বড়ো হই মাথায়, মেয়েরা বড়ো হয় মনে। যখন কলেজে পড়ি , তখন মনে হতো রিমা বোধ হয় একটু অন্যভাবে কথা বলে আজকাল । খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছিলো সে । পুজোর সময় তাকে যে অনেকে ঘুরে দেখছে, সেটা বোঝা যেতো । নিয়মিত দেখাশোনা, তবু ব্যক্তিগতভাবে সে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুর বোন, আমার কাছে সেটাই ছিলো তার পরিচয়। কলেজ ছেড়েই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাকরিতে ঢুকে পড়া । তার পর জামশেদপুর ছেড়ে বাইরে । নিত্য যোগাযোগ এভাবেই কম হয়ে যেতে থাকে । এর মধ্যে পর্ণা আসে মঞ্চে । আমি জামশেদপুরে ফিরে আসার পরেও বেশ কিছুদিন রিমার সঙ্গে দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন বিষ্টুপুর বাজারে মেঘানির দোকানের সামনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। চিনতে পারি, কিন্তু তাকে এখন দেখতে হয়েছে যেন সোয়ানলেকের হংসপরী। আমি দেখছিলুম তাকে। আমার সেই বিস্মিত চাওয়া দেখে মৃদুস্বরে বলেছিলো, শিবাজিদা, চিনতে পারছোনা নাকি? -পারছি তো, কিন্তু তুই তো দেখছি একেবারে হিরোয়িন হয়ে গেছিস....!! -বাজে কথা রাখো । তুমি ফিরে এসেছো খবর পেয়েছি, কিন্তু একবারও বাড়িতে আসোনি । মা জিগ্যেস করছিলো... - হ্যাঁরে, এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি ... সত্যি... -কাকে নিয়ে ব্যস্ত হলে, পর্ণা....? -আরে তুই এসব পাকা পাকা কথা শিখলি কবে ? -অনেকদিন... -তুই চিনিস ? পর্ণাকে... -চিনি তো, সাকচিতে থাকে । রবীন্দ্রভবনে গান শেখে... -হমম, অনেক কিছুই জানিস দেখছি...দাঁড়া আসবে একটু পরে ... পরিচয় করিয়ে দেবো... -থ্যাংক ইউ, পরিচয় করাতে হবেনা, আমিই করে নেবো... আজ আসি। বাড়িতে এসো , কথা হবে... -আয়.... এ যেন এক অন্য রিমা । এতোদিন ধরে যাকে চিনি, সে নয়... ------------------------ " প্লাতেরো আমারে ভালোবাসিয়াছে, আমি বাসিয়াছি আমাদের দিনগুলি রাত্রি নয়, রাত্রি নয় দিন যথাযথভাবে সূর্য পূর্ব হতে পশ্চিমে গড়ান তাঁর লাল বল হতে আলতা ও পায়ের মতো ঝরে আমাদের-প্লাতেরোর, আমার, নিঃশব্দ ভালোবাসা ।" মধুরিমার বাবা ছিলেন একটু অন্যধরনের মানুষ। টাটাবাবার স্মেলটারের আগুন আর পুড়িয়ে দেওয়া উত্তাপ তাঁর ভিতরের জলধারাকে শুকিয়ে দিতে পারেনি। গান-কবিতা-জীবনের গভীরতর সন্ধানের দিকে অমলিন টান রয়ে গিয়েছিলো । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'চতুর্দশপদী কবিতা' ছিলো তাঁর প্রিয় বিলাস । আমাদের বিভিন্ন আড্ডা-জমায়েতে অবাধ আসতেন। বয়সের ফারাক বা বোধের পরিণতি আলাপের মধ্যে কোনও অস্বস্তির কারণ হতো না কখনও। চাইবাসা থেকে ফিরে মাঝেমাঝেই তাঁর বৈঠকখানায় আড্ডা হতো আমাদের। শক্তি ও বিনয়'কে নিয়ে আমার পাগলামির প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা ছিলো। এই দুই কবির কবিতা নিয়ে কথাবাত্তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠতো প্রায়ই। সেই কথা চালাচালির চালচিত্রে শিবের মতন দাঁড়িয়ে থাকতেন জীবনানন্দ । রিমা আগের মতো ওদের বাড়ি গেলেই ঘরে এসে বসতো না । কখনও সখনও আসতো, কিন্তু মৌনতাই হয়ে যেতো তার অবয়ব। একদিন রাতে ওদের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় এগিয়ে দিতে এলো বাগান পেরিয়ে । সেদিন চাঁদ ছিলো, হাওয়া ছিলো, ভাসাভাসি হাস্নুহানার গন্ধও ছিলো চারদিকে। এ রকম একটা সময়ে সে আমায় বলে, শিবাজিদা, আমাকে কোনোদিন শক্তির কবিতা শোনাবে, বুঝিয়ে দেবে একটু? -সে কী রে? তুই বাংলা কবিতা শুনবি ? তাও আবার শক্তির,...? -কেন, কবিতা কি শুধু পর্ণার জন্য...? আমি.... -আরে শোন শোন... নিশ্চয় শোনাবো... সে আর অপেক্ষা করেনি, রুদ্ধশ্বাসে ছুটে ফিরে গিয়েছিলো । এতো অচেনা হয়ে গেলো মেয়েটা । ------------------------ ".....সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায় আকাশমনির । ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্লা হাওয়া নয় ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি চন্দ্রমল্লিকার ...." দেখা হলো বহুদিন পরে। তার সঙ্গে। অন্য চরাচর। অন্য চালচিত্রে। অন্য এক বসন্তদিনে I মেঘাতুবুরু'র অতিথশালায় আমায় নিতে এসেছে। তার পতিদেব কুন্তল আসতে পারেনি I যাবো থলকোবাদ। তখন সকাল। রোদ ক্রমে আসিতেছে। ঠিক সাতটা নাগাদ ফোন এলো রিসেপশন থেকে । গাড়ি এসে গেছে । নেমে আসি সামনের গাড়িবারান্দায় । কালো বন্ধ জীপ গাড়ি । খোলা জীপে ধুলোয় লাল হয়ে যেতে হয় । ড্রাইভার গাড়ির দরজাটা খুলে দেয় । উঠতে গিয়ে দেখি রিমা অন্যদিকের জানালার ধারে বসে। -গুড মর্নিং... সে ফিরে তাকাতেই চোখ পড়লো একটা টিপের দিকে, তার কপালে, লাল টুকটুকে । আমি রিমাকে সিঁদুরের টিপ পরে কখনও দেখিনি । সকালের আলো কি ধন্য হলো ঐ রংটাকে এতো বিশ্বস্তভাবে ধরতে পেয়ে । -দারুউউণ... -কী... -টিপ... -মানে..? -কিছু না .... গাড়ি ড্রাইভওয়ে ধরে রাস্তায় নেমে এলো । - শুনলাম তুমি নাকি আসতে চাইছিলে না.. -না না , ঠিক তা না ; সব চেয়ে উৎসাহী ব্যক্তিটি যদি আটকে যান, তবে .. মানে স্ফূর্তিটা একটু নিভে যায় তো... -ওহ, আমি ভাবলাম অন্য কোনও কারণ রয়েছে... -তুই খুব ভাবিস না..? -কেন ? আমাদের কি ভাবতেও মানা ? -ঝগড়া করার মতলব আছে নাকি রে? -নাহ, সেটাও তো মানা.... -বোঝো ...তবে বহুবচনটা, মানে 'আমাদের', ইহার ব্যাখ্যা বলহ... -'আমাদের' মানে, যাদের পর্ণার মতো এলেম নেই, লেসার মর্ট্যালস.... এবার আমি ওর চোখের দিকে তাকাই, রিমা মুখটা ঘুরিয়ে নেয়.. --------------------------- "যাবো না আর ঘরের মধ্যে অই কপালে কী পরেছো যাবো না আর ঘরে সব শেষের তারা মিলালো আকাশ খুঁজে তাকে পাবে না ধরে-বেঁধে নিতেও পারো তবু সে-মন ঘরে যাবে না বালক আজও বকুল কুড়ায় তুমি কপালে কী পরেছো কখন যেন পরে? সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন চতুর্দিক সহজ শান্ত হৃদয় কেন স্রোতসফেন মুখচ্ছবি সুশ্রী অমন, কপাল জুড়ে কী পরেছো অচেনা, কিছু চেনাও চিরতরে। " ---------------------------- স্তব্ধতা ভাঙি, - কী রে, অমন মুখ ব্যাজার করে বসে আছিস কেন ? ভালো লাগছে না ? -না তো, আমি ভাবলাম তুমি বিরক্ত হয়ে আছো বোধ হয়... -ওফ, শুধরাবি না আর... -আপেল খাবে ? -দে একটা...তোর ছেলেটা খুব মিষ্টি হয়েছে, ক'বার আসে বছরে ? এবার উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে যেকোনও মা'য়ের মতন । মসৃণ ঝর্ণায় অনর্গল আত্মজের গল্প ঝরে পড়ে । তার একেবারে ইচ্ছে নয়, ছেলেকে অতোদূরে রেখে পড়ায় । কিন্তু এ তল্লাটে তো কোনও ব্যবস্থা নেই। ভালো ইশকুল সেই জামশেদপুর । সে'ও খুব একটা কাছে নয় । আর সেখানে ভালো হস্টেল পাওয়া যায়না। কুন্তলের এক ভাই দার্জিলিঙে পড়তো । তার ছোটোবেলার স্বপ্ন ছিলো ঐ সব ইশকুল । নিজের হয়নি, ছেলেকে দিয়ে উপর সাধ মেটাচ্ছে । এতোক্ষণে সে যেন স্বাভাবিকতায় ফিরে এলো । যা'কে চিনতুম, সেই মেয়ে । স্পষ্ট বড়ো হয়েছে, শরীরে, মনে । কাঁঠালকাঠের চৌকি বদলে এসেছে খাট, কুঁড়েঘরের দরজা সরে জোড়া কপাট , এখন অনেক বড়ো হয়েছে... চুপ করে শুনি তার উচ্ছল জলতরঙ্গের শব্দভাষ । তাকে বলি, -একটা কথা বলবো ? -নিশ্চয়, বলো... -নাহ, থাক, আফটার অল, ইউ আর আ পরস্ত্রী... -ন্যাকামি করতে হবেনা, এসব কবে থেকে শুরু করলে... -তবে বলি? -না, বোলোনা... -তবে বলেই ফেলি, কী বল..? এবার সে ভেঙে পড়ে হাসির সেই শব্দে, পিয়ানো'র বাঁদিক থেকে ডানদিকে দ্রুত গড়িয়ে দেওয়া আঙুল থেকে যে ঝংকার বেজে ওঠে , শালপাতায় ঝরে পড়া বৃষ্টির প্রথম পশলার মতো ধ্বনি, শুনতে পাই, বলি, -তোকে দেখতে খুব সুন্দর হয়ে গেছে... একটু লজ্জা পায় হয়তো, কিন্তু স্পষ্টতঃ খুশি হয়, তোমার আজ কী হয়েছে ? -না রে, কিছু হয়নি আলাদা করে, ভাবি বলি, তোকে দেখতে গণেশ পাইনের রানির মতো লাগছে... -তোমার মতলবটা কী বলোতো ? -আমার তো ওটাই মুশকিল.. কখনও কোনও মতলব আঁটতেই পারলুম না .. -এবার আমি তোমায় একটা কথা বলি? -বল... -পর্ণা কোথায় আছে ? -ঠিক জানিনা রে, ও দেশেই কোথাও হবে ... -খোঁজোনি? -খুঁজবো কখনও, ইচ্ছে হলে... -আরো কুড়ি বছর পর ? -তার বেশিও হতে পারে .... -ধ্যুৎ... "ঝড়ে হঠাৎ ভেঙে পড়লো তোমার মুখের জলপ্রপাত স্মৃতি? নাকি স্মৃতির মতন নিরুদ্বিগ্ন বিষণ্ণতার একটি করুণ মূর্তি, নাকি ভেঙে পড়লো পূর্ণিমারাত ? বুকের খড়ে মুখটি গোঁজা আধবোজা কোন স্বর্ণলতার ভ্রূমধ্যে টিপ সন্ধ্যাপ্রদীপ যদি দেখাও দুয়ারপ্রান্তে অনেক দূরের একা পথিক-আজো আমায় ডেকে আনতে তোমার ছেলেবেলার পাশে আর কি আছে সেই তামাশা- বলো এবং বলো আমার জীবনমরণ ভালোবাসার ভাষার অধীন, বিপর্যস্ত-স্থাপন করি মুখটি হাতে ।।" --------------------------------------------------------------------------------------------------------------- {s1} হারানো সুর {/s1} {s2} লেখক: মুনিয়া {/s2} {/x2} {x3} সে এক অদ্ভুত কাল ছিল। সেই সময়ে তুখোড় রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত দিনে দমকা বসন্তের বাতাস খোলা চুলে ইলিবিলি কেটে যেত। ঝমঝমে বরষার মাঝে রুকমীদের বাড়ির শ্যাওলা ধরা দেওয়ালের বিবর্ণতা মুছে আকাশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত বিশাল ঝলমলে এক একটা নিখুঁত সাতরঙা রামধনু উঠতো। রুটিনমাফিক লোডশেডিং এ লন্ঠনের নরম আলোতে দুলেদুলে পড়া করতে করতে চোখ চলে যেত বুকাইদের বাড়ির নারকেল গাছের ফাঁকে আটকে থাকা মস্ত বড় গুরু পূর্ণিমার চাঁদটিতে। সেই বয়সে পৌঁছে চাঁদকে আর মামা বলে মনে হতনা। অপার্থিব তার ওই রূপ মনকে বেদনার্ত চিন্তাক্লিষ্ট করে তুলতো। সে যেন কোন সুদূর থেকে অচেনা এক অনুভূতির সংকেত পাঠাচ্ছে যা আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তখন আমাদের জীবনে গাভসকার আর গোগোলের সমান গুরুত্ব ছিল। অশরীরি প্রেতাত্মাদের প্রতি বিশ্বাস অটুট ছিল। টেপজামা গায়ে গামছা দিয়ে মস্ত হাতখোঁপা করে ইস্কুলের টিনের সুটকেস হাতে ঝুলিয়ে ডাক্তার ডাক্তার অতি প্রিয় খেলা ছিল। আবার কুলের আচার হাতের মুঠোয় ভরে লুকিয়ে লুকিয়ে 'সতেরো বছর বয়সে' পড়তে পড়তে তেরোর হৃদয়জুড়ে উথালপাথালি ঢেউ উঠত। মফস্বলের তেরো বছর! এযুগ হাসবে, এযুগ হাসে। কিন্তু আমাদের তেরো অমনই নবোন্মেষিত দোলাচলচিত্তে অস্থির ছিল সারাক্ষণ। মায়ের শাসন দিনে দিনে বাড়ছিল জীবনের সেই পর্যায়ে। সব কিছুতে না। প্রসেনজিৎ, সেই ছয় বছর বয়স থেকে খেলার সাথী। তার সাথে মাদুরে বসে তেতলার ছাদে দোকলা বসে অংক কষা হাবেভাবে মানা হয়ে গেল। গোপাল, পাগল পাগল খেলার মূল পান্ডা। খেলাটি এমন ছিল। গোপাল পাগল সাজবে। চুল এলোমেলো, জামা আলুথালু করে বারান্দায় এক কোণে বসে কাগজ কুচি করবে। আমরা যাব, উত্যক্ত করব। সে আমাদের তাড়া করবে, চুল টেনে ধরবে বা জামা। সহসা মায়ের চোখে বিসদৃশ্য লাগতে লাগল সে খেলা। অপূরিত আকাঙ্খার ক্ষোভাগ্নি বুকে পুরে মন প্রশ্ন করত, কেন? কি হঠাৎ হল যাতে বন্ধুদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল! প্রশ্ন উঠত, সেইসঙ্গে মন এও জানত উত্তর নিজেকে খুঁজে নিতে হবে। বড়দের জিজ্ঞেস করা অনুচিৎ হবে। একটু একটু করে ঔচিত্যানৌচিত্যের এক অচেনা পৃথিবী উন্মেষিত হচ্ছিল চোখের সামনে। কাগজ দেয় রেজাউল, ওর দৃষ্টিটা বাবার সামনে একরকম, বাবা না থাকলে কেমন যেন! পাড়ার রাজীব দা পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে কতবার চুল টেনেছে। এখন যেন কেমন সচেতন, চুল টানা, টিজ করা কবে থেকে বন্ধ করে দিল? পাশ দিয়ে গেলে এখন যেন চেনেই না অথচ বেপাড়ায় দেখা হলে কত কথা। রাজুকাকু ছোটবেলার মত আদর করে গাল টিপে দিলে মনটা কেমন বিরক্ত হয়ে ওঠে! মুখে হাসি অক্ষুণ্ণ রেখে সন্তর্পণে রাজুকাকুর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতাম। মনে আছে কাকু একদিন মাকে ডেকে বলেছিল, দেখো বউদি, মুনিয়াটাও কেমন বড় হয়ে গেল! কাকুর গলায় বেদনা ছিল কি? কিন্তু আমার অপরাধবোধ নিশ্চিতভাবে ছিল। কাকুর প্রতি ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন ছিলনা কিন্তু ভালোবাসা গ্রহণের প্রকাশ অস্বস্তি জাগাচ্ছিল। এইযে মুখে এবং মনের আচরণগত পার্থক্য, এই সচেষ্ট পরিবর্তনও তো নতুন সে সময়ে। সাবালক জীবনের প্রথম ধাপ। কেজি থেকে পড়ে আসা ছেলে বন্ধুরা সে সময় সহপাঠিনীদের ভিন্ন নজরে দেখতে শুরু করেছে। সোনা একদিন চোখের সামনে এক নীলরঙা কাগজ উত্তোলন করে গর্বিত মুখে ঘোষনা করল, অভি প্রোপোজ করেছে রে! -কোন অভি, আমাদের? - নয়ত আর ক'টা অভি আছে! রাগত বিস্ময় সোনার। চোখের সামনে ভেসে উঠলো কেজি ওয়ানের রোরুদ্যমান সহপাঠীর ভেজা মুখ। আর তার সাথে "মার কাছে যাব" গলাচেরা আর্তি।" প্রবল হাসি পেল যাহোক কিন্তু বন্ধুবিচ্ছেদের ভয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে চিঠির ওপরে ঝুঁকে পড়লাম। পুরোটা চিঠি মনে নেই খানিক খানিক অংশ ছাড়া। .....তোমায় রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গাওয়া গানটা খুব ভালো হয়েছে। গাইতে গাইতে তুমি আমার দিকে দেখছিলে বারবার। আমি জানি তুমি মনে মনে আমাকে চাও..... ....রাঙাদাদুর দেওয়া দশটাকা নিয়ে তুমি আর আমি দেবেনে গিয়ে সিঙারা খাব। আর কেউ যেন না জানে.... ....কালকে তুমি দুই বেণুনি কোরো, তবেই আমি সিওর হব যে তুমি আমার...। হাসি মিলিয়ে গিয়ে মনের গহনে তখন ছোট্ট ছোট্ট সবুজ দংশন। অভি লিখেছে সোনাকে! সোনা পুরুলিয়া থেকে এসেছে দুই ক্লাস আগে। তার কত আগে থেকে আমার আর অভির বন্ধুত্ব। চোখে জল এসে গেল। কিছু না বলে দুমদুম করে পা ফেলে চলে গেছিলাম। পুরো ছয়মাস লেগেছিল রাগ পড়তে। ততোদিনে অভি-সোনার সম্পর্ক মুখ থুবড়ে পড়েছে। অভি ভেবেছিল, আমার আড়ালে ওর কৃত কর্মের জন্য আমার এ অভিমান। পুরোটা হয়ত তা সত্য নয়। অভি যদি অমন নীল নীল রঙে ছাপানো চিঠির কাগজে লিখে প্রথমে আমাকে প্রোপোজ করত। ঠিক জানি আমি সটাং মানা করে দিতাম। তারপর ও যাকে খুশী চিঠি দিত, আমি কি খারাপ মানতাম? ঠাট্টার ভেক ধরে মনের গভীর গোপন ইচ্ছে প্রকাশ করে দিয়েছিলাম একদিন। বদলে একরাশ তাচ্ছিল্য জুটেছিল, তোকে কে চিঠি দেবে? যা রাগী তুই! আর তোর মাথার চুলতো নয় যেন শজারুর কাঁটা। হাত বোলালে যা লাগে! অপমান শেষ করে, খুব হাত চুলকাচ্ছে রে, বলে আমার আধ ইনচি কদমছাঁট চুলে খুব করে হাত ঘষেছিল সে। মনে আছে সেই বছরই শেষ নেড়া হয়েছিলাম। বছর দুয়েক পরের কথা। তালগাছের মত বেড়ে গেছি আচমকা। গামছা দিয়ে চুল বানানোর প্রয়োজনীয়তা মিটেছে। ডাক্তার ডাক্তার খেলা ঘুচেছে। লুকোচুরি, গাচ্ছারে গাচ্ছা খেলতে ভালো লাগলেও স্বীকার করিনা। যেন বন্ধুদের চাপে পড়ে খেলছি। খুব ভালোবাসি শীতের সন্ধ্যায় মাঠে আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন। মনে আছে? ঢল গ্যায়া দিন, হো গ্যয়ি শ্যাম, যানেদো, যানা হ্যায়.....। নতুন প্রেম তখন বরিস বেকার, রবি শাস্ত্রী। অমৃতার সাথে কি সম্পর্ক টিকবে? এমনতর ভাবনা চিত্ত আকুল করে। একা একা বই পড়তে ভালো লাগে। নীরা তখন স্বপ্নে জাগরণে। নীলুকে পথে ঘাটে দিকশূন্যপুরে যাওয়ার পথে ট্রেনের কামরায় খুঁজে পাব, এমনতর আশা রাখি। । বাঁ ঠোঁটের ওপরে কাজল দিয়ে তিল আঁকি, তারপরে তার ওপরে পাউডার বুলিয়ে দিয়ে তার ধেবড়ে না যাওয়া নিশ্চিত করি। বেশ কিছু 'লাভ লেটার' এর মালকিন তখন। চুল বেড়েছে, বা দিকে সিঁথি করে, ডানদিকে ইউ শেপ বানিয়ে আধা কপাল ঢাকি। রাগ কিন্তু কমেনি একরত্তি। কেউ প্রোপোজ করার চেষ্টা করলে দাঁত কিড়মিড় করে মুখ ভেঙিয়ে তাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করে প্রায় কাঁদিয়ে ছাড়ি। অথচ তাদের দেওয়া চিঠিগুলো সযত্নে রাখি। মাঝে মধ্যে উল্টোই পাল্টাই। পুলক জাগে কারণে অকারণে। আমাদের সময়ে চিঠিতে প্রোপোজ করার নিয়ম ছিল। হয়ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। মা পুরী থেকে পা ভেঙে এল। তার দুদিন পরে কল্যাণীতে আমার অচেনা এক বাড়িতে বিয়ের নেমন্তন্ন ছিল বাবা মায়ের। তাঁরা কল্যাণীতে নতুন এসেছেন। ভদ্রমহিলা তাঁর কলিগের অসম গোত্রের বিয়ে নিজের বাড়িতে, নিজের দায়িত্বে দিচ্ছেন। নেমন্তন্ন করেছেন চারিপাশের অল্প চেনা কতক পরিবারকে। মা যেতে পারবেনা। আমার ওপর হুকুম হল বাবাকে সঙ্গ দেওয়ার। ক্রিম রঙের কুচি দেওয়া স্কার্ট, ঘটিহাতা সাদা টপ তারসাথে আনুষঙ্গিক সাজ বাহার, যা ওপরের প্যারাতে বর্ণিত, সমাপ্ত করে আমি প্রস্তুত। বিয়েবাড়িতে গিয়ে বাবা জমে গেল তাঁর কাছাকাছি বয়সীদের সাথে। আমার বয়সী কেউ নেই। তুমুল বৃষ্টিতে লন্ঠনের আলোতে মুখবুজে খেয়ে নিলাম। একটি হাড়গিলে শ্যামলা ছেলে অন্যদের সাথে আমাদের পরিবেশন করছিল। কাকীমা বাবাকে ডেকে বললেন, ঘোষদা, এই আমার ছোট ছেলে। দিল্লী আই. আই. টি তে পড়ে। একপলক দেখলাম। সে ও তাকিয়েই ছিল। ঠোঁট বেঁকিয়ে খাবারে মন দিলাম। খাওয়া শেষ করে আধো অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনছি আর মিষ্টি পান চিবাচ্ছি। সে এসে পাশে দাঁড়ালো। কোনো কথা নেই। চুপচাপ দুজনে। দাঁড়িয়েই আছি। মা থাকলে মায়ের শ্যেনদৃষ্টি থাকতো আমার ওপরে। বাবা আমার আপনভোলা। মনের মত বিষয় পেয়ে গল্পে মেতে আছে। অনেকক্ষণ পরে সে বললো, তুমি তখন ভেঙালে কেন? স্বরে রাগ নেই, বিস্ময়। সাহস বেড়ে গেল, বললাম, আমার ভেঙাতে ভালো লাগে। বললো, তাই? আচ্ছা ভেঙাও দেখি আরো একবার। সামনে এসে দাঁড়ালো সে। বুকের ভেতর যেন হাঁপর পিটছে। মুখে রক্তস্রোত, কান গরম। চেষ্টাকৃত সাবলীল হওয়ার তাগিদে গলায় জোর এনে বললাম, এখন ভেঙাবো না। যখন ইচ্ছে তখন ভেঙাব। বলেই দে ছুট। সোজা বাবার কোলে গলা জড়িয়ে টানাটানি করে বাবাকে গল্পের আসর থেকে উঠিয়েই ছাড়লাম। তারপর রোজরোজ তাকে দেখি সর্বত্র। লাইব্রেরীতে বই খুঁজতে খুঁজতে পাশে দেখি সে। স্কুলে টিফিনে আলুকাবলির পাতা চাটতে চাটতে দেখি সে সামনের রাস্তা দিয়ে বন্ধুদের সাথে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। নাচের ক্লাস থেকে, টিউশ্যানির পর বন্ধুদের সাথে হল্লা করতে করতে বাড়ি ফেরার পথে তার সাথে মুখোমুখি দেখা হবেই। এতবার করে দেখতে লাগলাম প্রতিদিন, মনে হতে লাগল স্বপ্ন দেখছি হয়ত, সত্য নয়। কথা তো হয়না। কখনো আমাকে একা পেয়ে এগিয়ে এলেই আমি তড়িঘড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিই। কিন্তু বিনা দৃষ্টিপাতেও তার উপস্থিতির খোঁজ রাখি। বন্ধুদের থেকে সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখেছি নব্যলব্ধ এই অভিজ্ঞতা। তারপর একদিন, রিনির বাড়ি থেকে সন্ধ্যে পার করে সাইকেল চালিয়ে ফিরছি। পাড়ায় ঢোকার মুখেই হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। পড়ে যাওয়ার ভয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে সাইকেল থেকে নেমে ধীরে ধীরে হাঁটছি। পাশে এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো সে। স্পষ্ট কিছু দেখা যায়না, সাদা টিশার্ট আর হাল্কা কোলনের মাতাল করা গন্ধ পেলাম । হাতে একটা বই ধরিয়ে দিল আর একটা কাগজের ঠোঙা। বললো, কাল চলে যাচ্ছি। আমার ঠিকানা দিয়েছি। চিঠি দিও। ভালো থেকো। জানিনা কোন অচেনা হৃদয় নিঙরানো ভাবাবেগে চোখ থেকে তখন জল ঝরছে টপটপ। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে নাক টানতে পারছিনা, কথাও বলছিনা। হয়ত কিছু শোনার আশায় পাশাপাশি কয়েক পা হাঁটলো সে। তারপর বাড়ির কাছাকাছি এসে বিফল মনোরথে, বাই, বলে সাইকেলে উঠে চলে গেল। বাড়িতে ফিরে একছুটে বই,ঠোঙা, মোমবাতি নিয়ে তিনতলার ছাদে জলের ট্যাঙ্কের ওপরে আমার একান্ত জায়গায়। মলাট খুলে দেখি, ন হন্যতে। আর ঠোঙার ভেতরে একটা রক্ত গোলাপ। সাথে একটা চিঠি। যতবার পড়তে যাই চোখ উপচে জল আসে। শেষে হাল ছেড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কেন কাঁদছি বুঝে পাচ্ছিনা। শেষে নিজেকে সামলানো যখন অসম্ভব হয়ে পড়ল তখন গোপন কুঠুরিতে বই, চিঠি আর ফুল লুকিয়ে নীচে গিয়ে বাবার কোলে বসে কান্নার দ্বিতীয় পর্ব শুরু করলাম। মা ভীত, বাবা শঙ্কিত। তাঁদের জেরায় ফোঁপানির মাঝে ভেঙে ভেঙে বললাম, রিনি কত খারাপ ব্যবহার করেছে। কক্ষণো আর ওর সাথে কথা বলবনা। তারপর বাবার বুকে মুখ গুঁজে নিশ্চিন্তে কাঁদতে লাগলাম। বাবা সান্তনা দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, মায়েরও বুকের ভার নামল। পরের দিন থেকে আচমকা সব কেমন ফাঁকা ফাঁকা। এদিক ওদিক চোখ চলে যায়, সেই চেনা অবয়ব কোথাউ নেই। আপাত স্বাভাবিক সমস্তের মাঝে সে এক নিদারুণ শূন্যতা। বন্ধুদের সঙ্গ ভালো লাগেনা, পড়ার বই তো চিরকালই বিষবৎ। এমনকি গল্পের বইও অন্যমনস্ক হয়ে পাতা উল্টে যাই। টিভি দেখার জন্য জন্য যত আগ্রহ সব উধাও। শুধু চিত্রহারে বিরহের যত গান সব আমার জীবনের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। বুঝতে পারি মনে মনে অনেকখানি বয়স বেড়ে গেছে। ঠিক সাতদিন পরে গোলাপি খামে চিঠি আসে। খুলতেই একরাশ গোলাপের পাপড়ি কোলে ঝরে পড়ে। আর তার পরের ছয়টা বছর শনিবার আর ছুটির দিনগুলিতে পিওনের অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকা ভবিতব্য করে নিই। ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} কালিঝোরা {/s1} {s2} লেখক: প্রবুদ্ধ {/s2} {/x3} {x4} আছন্ন বিকেল ক্লান্তিতে ঢলে পড়ছিলো সন্ধ্যার কাঁধে‚ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে আকাশ তখন বিষন্ণ গেরুয়ায় মাখামাখি| ঠিক এই সময়েই জিপটা এসে দাঁড়ালো কালিঝোরা বাংলোর সামনে| খর্গবাহাদুর মরচে ধরা বিশাল গেটটা খুলে দেয়| নুড়িপাথরের ওপর জিপের চাকার খরখর থামতেই পাহাড়ী নদীর দুষ্টুমিভরা হাসির শব্দ| পাহাড় অনেক দিন ধরেই ডাকে| কালিঝোরা বাংলোর খবরটা এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া| শিলিগুড়ি থেকে খুব কাছে‚ বাংলা-সিক্কিম সীমান্তে কালিঝোরা নদীর ধারে জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট সরকারী বাংলো| কুইন্টেসেনশিয়াল পাহাড়ী আইকনগুলো আশেপাশে কুমারী কন্যার মতো সলজ্জে ছড়িয়ে| সবুজের চাদরে মোড়া পাহাড়ের ঢাল‚ শীর্ণ ঝোরা পাথরের শ্যাওলায় পিছলে নেমে পড়ছে আঁকাবাঁকা রাস্তায়| একটু হেঁটে গেলেই রংপো নামে একটা গ্রাম| খর্গবাহাদুর তার পরিবারের সাথে আলাপ করায়‚ এ'কদিন এদেরই খিদমতে থাকতে হবে কিনা| বৌ কমলা‚ মেয়ে বিনীতা আর ছেলে ছত্রবাহাদুর| শেষজনের বয়স দশ‚ দিদির সাথে স্কুলে যায়| আমার মতো কতো অতিথি আস যায়‚ পাহাড়ী মানুষজনকে এক্জোটিক কোনো স্পিসিস ভেবে পটাপট ছবি তোলে‚ দুটো বোকাবোকা প্রশ্ন করে‚ আরো বোকাবোকা স্বরে হয়তো কোনো নেপালী গান গাইতে বলে| ছত্রবাহাদুরের চোখে একটু অবজ্ঞার ছাপই দেখা গেলো যেন| বিনীতার ক্লাশ টেন‚ বয়সের তুলনায় একটু নীচু ক্লাশেই পড়ে বলে মনে হলো‚ গ্রামে অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক| খর্গবাবাদুর সন্ধ্যার ঝোঁকে একটু ঝিমন্ত‚ বাকী তিনজন‚ পাহাড়ী সব্জীর মত টাটকা তাজা| --------- রাত অনেক হয়| খর্গবাহাদুরকে দিয়ে ছাং আনিয়েছিলাম‚ মুরগীর ঝালঝাল ঝোল আর রুটি দিয়ে অনেকটা খাওয়া হয়ে গিয়েছিলো| কাঠের পাত্রে গরম ফেনাওয়ালা দ্রে-ছাং‚ পাহাড়ী ধেনো বলা যায়| শুধু এক চুমুক| ছাং হলো মদিগ্লিয়ানির সোফায় শায়িতা নির্লজ্জ ন্যুড‚ একবার ডাকলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে‚ ঘাড়ের ওপর উঠে কামড়ে ধরে গলা‚ সে কামড়ের থেকে মুক্তি প্রায় চব্বিশ ঘন্টা পরে| প্রায়ান্ধকার ঘরে একা লন্ঠনের আলোয় ছাংয়ের সেই প্রবল ভালোবাসার অত্যাচার ক্রমে অসহ্য হয়ে ওঠে| ঘুম পালিয়েছে কলকাতায়| সারা শরীর গরম হয়ে উঠেছে‚ মনে হচ্ছে সব জামাকাপড় খুলে কালিঝোরার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি| হয়তো সেটাও করেই ফেলতাম‚ ছাংয়ের এমনই মহিমা| বারান্দায় বেরিয়ে এসে একটু খোলা হাওয়ায় দম নিই| বাঁদিকে খানিকটা দূরে খর্গবাহাদুরের কোয়ার্টার| কাচের জানলার পর্দা সরানো‚ বিনীতা পড়েছে| আমার ঘরে লন্ঠনের আলোটা এতো ম্রিয়মান‚ কিন্তু বিনীতার মুখটা লন্ঠনের আলোয় এতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে| চুল খোলা| লাল ব্লাউজে সোনালী সুতোর কাজ| কোনো পোকার কিটকিট আওয়াজ আসে একেবারে কানের পাশ থেকে| কাঠের বারান্দা পায়ের চাপে মচ করে ওঠে| ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ি‚ ঘুমিয়েও| গরম ভাবটা হঠাৎই চলে গেছে| ---------- বাংলোর আশেপাশে পাহাড়ী নদী-জঙ্গলের গন্ধ নিতে নিতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো| এলোমেলো ঘোরার কোনো বিবরণ হয় না| দুপুরে কমলার রান্না ভরপেট খেয়ে ঘন্টাখানেক সশব্দ ঘুমিয়েও নিয়েছি| সন্ধের দিকে গেলাম রংপো-তে| ছোটো গ্রাম‚ উঁচুনীচু পথে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়িয়ে একটা ঝুপড়ি রেস্তোঁরায় চেয়ার টেনে বসি| এক বড়ো বাটিতে থুকপা‚ এক প্লেট গরম খাবজে আর অবশ্যই ছাং| এক দিনেই ছাংয়ের দিওয়ানা হয়ে গেছি| পাশে একটা ভিডিও পার্লার‚ বেশ রগরগে পোস্টার লাগানো‚ বিদেশী সুন্দরীর ছবিতে জায়গায় জায়গায় কালো কালির পোঁচ| ------- পার্লার থেকে বেরিয়ে দেখলাম পা টলছে| কানে লেগে তখনো বিদেশী সুন্দরীর কৃত্রিম শীৎকার| অন্ধকার রাস্তা‚ হেঁটে যেতে একেবারে কম সময় লাগবে না| কলকাতা নয় যে অটো বা রিক্সা নিয়ে নেবো| পাহাড়ে পুরুষদের প্রায় সবারই সন্ধের পর পা টলে‚ তাই কেউ আমার দিকে ফিরে দেখলো না| গ্যাংটকের দিকে ক্রমাগত গাড়ী ছুটে যাচ্ছে রংপোর বুক চিরে‚ তাদের হলুদ হেডলাইটে চোখ ঝাপসায়| একটা পান মুখে পুরে রাস্তার ডান ধার‚ মানে পাহাড়ের দিকটা ধরে ধরে নেমে আসি কালিঝোরায়| ------- কোয়ার্টারের দিকে চোখ চলে যায়| আজ জানলার ধারে বিনীতা নেই| এক গ্লাশ জল চাই‚ গলা শুকিয়ে কাঠ| দরজায় নক করি‚ ভেজানো দরজা আলতো করে খুলে যায়| খর্গবাহাদুরের নাক ডাকার আওয়াজ পাই একটা ঘর থেকে| কমলা চুল্লির ধারে বসে রান্না করছে| খোলা চুলে মুখের একপাশ ঢাকা| ড্র্যাগন আঁকা নীল-সাদা হাতকাটা জ্যাকেটে চুল্লীর আগুনের হলকা| ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আমার দিকে‚ পাহাড়ী হাসি ফুটে ওঠে আগুনরঙ্গা মুখে| জল দেয়| তারপর খাবারের থালি নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আমার ঘরে পৌঁছে দেবে বলে| পাশের ঘরের পর্দা সরিয়ে বিনীতা এসে দাঁড়ায় দরজা ধরে| চুল খোলা‚ লাল ব্লাউজে| ------ কমলার হাত থেকে থালিটা নিয়ে আমি তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ফিরে আসি| দরজাটা বন্ধ করি| জোরে| ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} কনভোকেশন {/s1} {s2} লেখক: কৌশিক {/s2} {/x4} {x5} অধ্যাপক| সকাল থেকে চলছে বটে! তবে শুধু সকাল থেকেই বা বলি কেন - গত এক সপ্তাহ ধরে যা চলছে! আজ কনভোকেশন| বেলা তিনটেতে শুরু‚ কিন্তু তার আগে ঊনকোটি চৌষট্টি কাজ রয়েছে| এডুকেশন মিনিস্টার আসছেন চিফ গেস্ট হয়ে| রাজ্যপাল তো রয়েইছেন| দুজনের সাথেই থাকবে গোটা পাঁচেক লেজুড়| আর এই সকলকে অভ্যর্থনার দায়িত্ব এই রামুর| এটা একটা চাকরি! শালা‚ এসেছিলাম ছাত্র পড়াতে আর করছিটা কি? লোকে শুনলে থুতু দেবে| দেয়ও| কিন্তু কিছু করার নেই| পনের বছর হতে চলল; এখন অন্য কোনো চাকরিও কেউ দেবে না| সারা বছর ধরে লেগেই রয়েছে এই সব ফালতু কাজ| পড়াশুনা সব চুলোয় গেছে| পেটের দায়ে বড় দায়| কিছু করার নেই| একটু আগেই কথা হল রাজ্যপালের ও এস অডি'র সাথে| এখনো এক ঘন্টা লাগবে আসতে| যাই‚ গেটের বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট খেয়ে আসি| -আরে দাদা‚ কহাঁ চলে ? নিউক্লিয়ারের হিতেশ| -চল‚ তুঝে সিগ্রেট পিলাকে লাঁউ| -চলিয়ে| রাজ্যপালের ঝামেলাটা একরকম মিটলো‚ এবার একবার শিক্ষামন্ত্রীর লেজুরটিকে ফোন লাগিয়ে দেখি| শিক্ষামন্ত্রী! "হিরক রাজার দেশে"র ডিভিডি টা আছে বাড়িতে‚ যাওয়ার সময় ম্যাডামকে গিফট করে দিই| রগড় হবে! - হাঁ সন্তোষ জী‚ ঘোষ বোল রহা থা লক্ষ্মণগড় সে| কঁহা তক পঁহুচে আপ লোগ? - ....... -কোই নহি জী‚ আরাম সে আইয়ে| ম্যাডাম কো মেরে তরফ সে প্রণাম বোলিয়েগা| শালা..... এখনো জয়পুরেই রয়েছে! কি করে শুরু হবে অনুষ্ঠান তিনটের সময়? কি যে দরকার এই সব নেতা-মন্ত্রীদের ডাকার‚ কে জানে! মূর্খের দল‚ তারা আবার অন্যকে ডিগ্রী দেবে! এবার ডীন কে দিই এই সুখবরটা! দেবদূতী| একবার পার্লারে যেতে হবে| বেশি কিছু না‚ হাল্কা টাচ আপ| উগ্র সাজ আমার কোনো দিনই ভালো লাগে না, আর তাছাড়া এটা কনভোকেশন - পার্টি নয়| গতকাল রাতে এসে পৌঁছেছি| বন্ধুরা আরো একদিন আগেই এসে গেছিলো| আমারো সেই দিনই আসার কথা ছিলো‚ কিন্তু অফিসে লাস্ট মোমেন্ট একটা কাজ এসে গেল| টিকিট ক্যান্সেল করাতে হলো শেষ মুহূর্তে | বম্বে শহরটা বেশ! ভীষণ প্রাণবন্ত| সারাটা দিন যেন লোকে ছুটছে| অনেকের হয়ত সেটা ভালো লাগে না‚ আমার কিন্তু দারুণ লাগে! সারা সপ্তাহ কাজ করার পর উইক এন্ডে সী বিচে চলে এসো| ওই হট্টমেলার মাঝে একটা ভেলপুরি নিয়ে একা একা চুপ চাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ লাগে| কি করে যে সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না! সত্যি‚ ভাবতেই অবাক লাগে! এই সেদিন বন্ধুদের সাথে রাত জেগে সেমিস্টারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম‚ স্যারের কাছে প্রজেক্ট‚ পেপার‚ কন্ফারেন্স - আর আজকে বম্বে| যোধপুর থেকে এই লক্ষ্মণগড় - কতই বা দূরত্ব! কিন্তু জন্মে থেকে ক্লাস টুয়েলভ অবধি যোধপুরের জীবনটা ছিলো একরকম - নি:শ্চিন্ত‚ ভাবনাহীন | তারপর চার বছর এখানকার জীবনটা আরেক রকম| দায়িত্ব আছে‚ কিন্তু স্বাধীনতা ও আছে| আর বম্বে তে থাকতে থাকতে তো সত্যি মনে হয় যেন বড় হয়ে গেছি! অফিসের প্রজেক্টের চাপ নিজেকে একাই সামলাতে হয়| ফাইন্যাল ইয়ারের প্রজেক্ট নয় যে স্যরের সাহায্য পাওয়া যাবে| রান্নাবান্না অবশ্য করতে হয়না‚ পেয়িঙ গেস্ট থাকার এই সুবিধে| রোজ পোয়াই থেকে মালাড ওয়েস্ট যাতায়াত| বারো কিলোমিটার রাস্তা যেতে সময় লাগে এক ঘন্টা| মারাত্মক ট্র্যাফিক! কিন্তু তবু যেন ভালো লাগে জীবনটা| এই যে বাড়ির থেকে একা একা এত বড় শহরে থেকে লড়াই করছি রোজ - এটা খুব উপভোগ করি! মাথার ওপর ছাতা ধরার কেউ নেই‚ পাপা‚ স্যর- কেউ না - এটা ভাবলে ভীষণ গর্ব হয়! তবে সত্যিই যেটা মিস করি‚ তা হলো এই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসটাকে| কত কিছুর সাক্ষী এই ক্যাম্পাস| গতকাল রাতে এসেছি| রেজিস্ট্রেশন কমিটি থেকে টুয়েলফথ স্ট্রীটের এই নতুন হস্টেলটায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে| আমি যে হস্টেলটায় থাকতাম‚ সেটায় এখন জুনিয়ররা থাকে| দেখতে গেছিলাম কালকেই| অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো| একই ঘর‚ কিন্তু অন্য মানুষ থাকার কারনে নিজেরই খুব অচেনা ঠেকছিলো| মনেই হচ্ছিলোনা যে এই ঘরেই আমি গত চারটে বছর কাটিয়েছি| মায়ের কথা মনে হচ্ছিলো| মা বলে‚ সজাওয়াট সে কমরা বদলতা হ্যায়; বদল যাতা হ্যায়| খুব সত্যি কথা| গতকাল রাতে সবাই মিলে ক্যাম্পাসের রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম| স্টুডেন্ট থাকার সময় রাত নটা বাজলেই দৌড়তে দৌড়তে ঢুকতে হতো হস্টেলে| এখন সে সব বাধা নিষেধ নেই! ভাবতেই অবাক লাগছিলো| ক্যাম্পাসের রাস্তার ধারের বেঞ্চ গুলোতে বসে গল্প করতে করতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম পুরোনো দিন গুলোতে| যারা অফিস থেকে ছুটি পায়নি‚ আসতে পারেনি কনভোকেশনে‚ তাদের জন্য চলছিলো হা-হুতাশ| কখনো বা এমনিই চুপচাপ বসে ছিলাম - স্ট্রীট লাইটের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছিলো আমাদের মুখে| পুরোনো দিন! মাত্র তো আট মাস আগে ছেড়ে গেছি যায়গাটাকে‚ কিন্তু তবু মনে হচ্ছে পুরোনো দিন| এই তো সেদিনের কথা সব‚ কিন্তু তবু যেন অনেক দূরের‚ ধরা ছোঁয়ার বাইরের| এসে থেকে স্যরকে একবারো ফোন করা হয়নি| ইচ্ছে করেই করিনি| আজ একেবারে কনভোকেশন গাউনটা পরেই দেখা করবো স্যরের সাথে| হি ইজ আ গ্রেট মোটিভেটর| ফাইন্যাল ইয়ারের প্রজেক্টটার ওপরে লেখা পেপারটা একসেপ্ট হয়ে গেছে একটা SCI জার্নালে| আমার কোনো ক্লাসমেটের এই এচিভমেন্ট নেই - বিটেক লেভেলে সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্সড পাব্লিকেশন| এ সবই স্যরের জন্য| তবে তার জন্য প্রচুর মেহনৎ করতে হয়েছে| ওহ‚ কি খাটনিটাই না খাটিয়েছিলেন স্যর শেষ এক বছর! এখনো একটা জয়েন্ট কাজ করছি স্যরের সাথে| এই কাজটা করতে করতে মনে মনে ফিরে আসা যায় এই কলেজে| পোয়াইতে নিজের ঘরটাতে বসে রাতের বেলায় যখন এই কাজটার জন্য কোড লিখি‚ তখন আমি যেন নিজের মনেই চলে আসি এই লক্ষ্মনগড়ে| আট মাস পরে আজ স্যরের সাথে দেখা হবে| কি বলবেন স্যর দেখা হলে? অধ্যাপক ও দেবদূতী বাঁচা গেছে! আপদ গুলো ক্যাম্পাস থেকে বিদেয় হয়েছে| ডিগ্রী দেওয়ার পালা শেষ হওয়ার আগেই মশাইরা কেটেছেন| অন্য কোথাও অন্য কারুর মাথা খেতে গেলো বোধহয়! এখন ভিসির ভাষণ | অডিটোরিয়ামের বাইরেটায় এসে ভালো লাগছে| ওহ‚ একটা ঢপের কাজ শেষ হলো! আরে বাবা‚ ডিগ্রী পাবে স্টুডেন্টরা - সেখানে এই গাধা গুলোকে ডাকার কোনো মানে হয়! এদের চক্করে সকাল থেকে পুরোনো ছাত্রদের সাথে দেখাই করা হলো না! এখনো সবাই ভেতরে| ভিসির জ্ঞানগর্ভ ভাষণ শুনে বোর হচ্ছে বোধহয়! ক্যাফেটেরিয়া গিয়ে একটা কফি খেয়ে আসি| ভারি সুন্দর বানিয়েছে নতুন এই ক্যাফেটেরিয়াটা| হাল্কা করে কেনি জি চালিয়েছে| বোসের স্পীকার গুলোতে খেলছে ভালো মিউজিকটা| এবার একটু কড়া কফি খেলে মাথাটা ছাড়বে| কটা দিন যা গেলো! ব্যাটারা তিনটের প্রোগ্র্যাম সাড়ে তিনটেয় শুরু করলো| তারপর হ্যানা ত্যানা করতে করতে পুরো প্রোগ্র্যামের সাইকেলটাই লেট চলতে লাগলো| ছ'টা বেজে গেলো| শীতের দিন| বাইরে অন্ধকার নেমে গেছে| ক্যাফেটেরিয়ার তিন দিকের দেওয়াল কাঁচের| আলো গুলো সব জ্বেলে দিয়েছে| এতক্ষণে বোধহয় সব মিটে গেছে| কার আবার ফোন এলো? -আরে‚ তুম! কঁহা হো? - আপ কঁহা হো স্যর? -ইন নিউ ক্যাফে - আইল বি দেয়ার ইন নো টাইম! প্লীজ ওয়েট ফর মি! সকাল থেকে মেয়েটাকে ফোনই করা হয়নি| যা যাচ্ছিলো! খুব ভালো কাজ করেছিলো প্রজেক্টে! তার পরেও একটা কাজ দিয়েছিলাম‚ অফিস সামলে সে কাজও করছে| নাহ‚ টেনাসিটি আছে মেয়েটার| কটা দিন চাকরি করে নিয়ে GREতে বসবে ঠিক করেছে| শী হ্যাজ রিসার্চ মেটিরিয়াল ইন হার| ওর হবে| এই ক'বছরে খুব ভালো একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে ওর সাথে| বোঝাপড়া ঠিক না হলে এক সাথে কাজ করা যায় না| -হ্যালো স্যার! -হো! ইউ লোক গ্রেট ইন দিস রোব| - থ্যাঙ্কস স্যর! - কনগ্রাটাস! স্যারের হাতের তালুটা গরম| -হোয়্যার হ্যাড ইউ বিন সিন্স মর্নিঙ? আই ওয়জ লুকিঙ ফর ইউ| - আই থট অফ মিটিঙ ইউ উইথ দিস রোব অন| -দ্যাটস গ্রেট! বাট গেট মি টু মোর রোবস| - আই উড স্যার! ডেফিনিটলি! -গুড! বতাও কিয়া লোগে| - যো আপ কহেঁ স্যর! -অরে‚ ইটস ইওর ডে! বতাও‚ বতাও! - আ স্ট্রবেরি শেক উড বি ওকে| স্যার একটা ক্রীম কালারের স্যুট পড়েছেন| ভেতরের চেকস আর পার্পল টাই| গায়ের রঙটা পুড়ে গেছে খানিকটা| কাউন্টারের লোকটার সাথে কি এত কথা বলছেন স্যর? এতক্ষণ লাগে অর্ডার দিতে! -অওর বতাও| কাটিঙ অওর বড়া পাও মাস্ট বি ইওর স্টেপল ফুড বাই নাও? -নাআআহ! উওহ ভি কোই খানে লায়েক চিজ হুই! হাউ আর ইউ স্যার? - একদম বড়িয়া! তুম সুনাও| মন লগ গয়া না বম্বে মে? - জী নহি| -ফিলিঙ হোম সিক? -নট রিয়েলি.. - দেন? -কুছ নহি| আই যাস্ট মিস দিস প্লেস| - ইউ নো সামথিঙ‚ পিপল রিয়েলি ডোন্ট মিস দ্য প্লেস| দে মাইট থিঙ্ক দ্যাট ওয়ে‚ বাট দে ডোন্ট| -ফির? -দে মিস দ্য পিপল| হোয়ট ইউ আর মিসিঙ ইন বোম্বে আর দ্য পিপল হিয়ার ইন লক্ষ্মণগড়| দ্যাটস হোয়াই হি ইজ আ গুড টিচার! হি নোজ ইট অল! বন্ধুদের চলে যেতে বলেছি হস্টেলে| আজ রাতের বাসেই যোধপুর ফিরবো| তার আগে স্যারের সাথে একবার কথা বলে যেতে চেয়েছিলাম| হি ইজ সাচ আ গুড কমিউনিকেটর! সামনের মানুষটার মন না বুঝলে ভালো কমিউনিকেটর হওয়া যায়না| স্যর সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন| গোঁফের ফাক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওঁনার ট্রেড মার্ক স্মিত হাসি| চোখ দুটো চশমার পেছনে ভীষন শান্ত| - ডু ইউ নো সামথিঙ? -কিয়া স্যর? - লাইফ ইজ বিউটিফুল এন্ড ইউ নীড টু মুভ অন| - জী স্যর| - হমে ভী অব চলনা চাহিয়ে| খুশ রেহনা| - স্যর, দিস ইজ ফর ইউ| অধ্যাপক| রাতের দিকে ব্যালকণিতে বসে থাকতে খুব ভালো লাগে| এই ছোট জনপদটা ঘুমিয়ে পরে তাড়াতাড়ি| শীতের দিন‚ তাই আরো শান্ত চারিদিক| একটা রাতচরা পাখি ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল| ছোটো একটা কার্ড| বলেছিলো‚ পরে দেখতে| এদের বয়সটাই এমনি| সর্দি-কাশির মতন কাফ লাভ হয়! একটা বহুল প্রচলিত গান‚ হাতে লেখা| আজকাল কার ছেলে মেয়েরা এই সব গান আজো শোনে? আমরা শুনেছিলাম কলেজ বেলায়| সিনেমাটা অবশ্য আরো পুরোনো| বারান্দার আলোয় লেখাগুলো স্পষ্ট| Those schoolgirl days of telling tales and biting nails are gone But in my mind I know they will still live on and on But how do you thank someone, who has taken you from crayons to perfume? It isn't easy, but I'll try If you wanted the sky I would write across the sky in letters, That would soar a thousand feet high, To Sir, with Love The time has come For closing books and long last looks must end And as I leave I know that I am leaving my best friend A friend who taught me right from wrong And weak from strong That's a lot to learn What, what can I give you in return? If you wanted the moon I would try to make a start But I, would rather you let me give my heart To Sir, with Love ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} একটুকু ভালোবাসা {/s1} {s2} লেখক: জল {/s2} {/x5} {x6} মেট্রো স্টেশনে বসে থাকতে থাকতেই হাত পাগুলো কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দিয়ালির| বুকের ভিতরে ক্রমাগত হাতুড়ি পিটছে | পেটের ভেতরে গুড়গুড় করেই চলেছে| প্রিয় আকাশি-সাদা চুরিদারটা পড়েছে সে| মাথার রেশমকালো চুলগুলোকে হাওয়ায় আজ উড়তে দিয়েছে সে| ফেব্রুয়ারি মাসের ঠান্ডাটা তেমন একটা নেই‚ তবু বেশ শীত শীত লাগছে তার| একটা ট্রেন চলে গেল| প্যাসেঞ্জার নামল-উঠল| উঁকি মেরে দেখে দিয়ালি‚ 'কই সে তো এলো না'| অপেক্ষার মুহুর্তগুলো যেন বড্ড দীর্ঘ| স্টেশনের দোদুল্যমান টিভিতে একটা প্রিয় গানের পিকচারাইজেশনে চোখ মাঝে মাখে আব্দ্ধ‚ মন নয়| চোখ আর মন দ্বৈতভাবে হাতঘড়ির কাঁটায় ঘুরে ঘুরে ফেরে| আরও একটা ট্রেন এসে দাঁড়ায়| চোখ খোঁজে উদ্বিগ্নভাবে| ওদিক থেকে ভেসে আসে 'সামনের কামরায় উঠে পড়'| দরজা বন্ধ হবার আগেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সে‚ বুকের ভিতরে ধুকপুকুনি স্পষ্টভাবে টের পায় সে| লাফ দিয়ে ওঠার জন্য নয়| তার আগমনে| ভিড় বেশ| উঁচু উঁচু মাথার ফাঁক দিয়ে পরিচিত মুখের সন্ধান করে সে| কোথায় গেল? দেখতে পেয়ে স্বস্তি| গায়ের রঙ ঈষৎ তামাটে‚ ব্যাকব্রাশ করা চুল‚ গভীর কালো দুটো চোখ আর চোখের সেই মুগ্ধ করা দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় তাকে| গাল কি রাঙা হয়ে উঠল? ট্রেনটা থেমে যায় পরের স্টেশন| হালকা ঝাঁকুনি তাল সামলাতে পারে না দিয়ালি| হাত ধরে সামাল দেয় তাকে সে| 'খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে' ঝিলিক দিয়ে যায় সাদা মুক্তোর দাঁতের সারিতে হালকা হাসির মুগ্ধ ছোঁয়া| 'তোমাকেও' | হাসে দিয়ালি| 'বাড়িতে কি বললে?' 'ঘুরতে যাব বন্ধুদের সাথে| তোমার জন্য এই প্রথমবার মিথ্যে কথা বললাম' মুখটা তেতো লাগে| 'খারাপ লাগছে?' 'হুম' 'তাহলে মিথ্যে বলতে গেলে কেন?' 'তবে কি বলতাম?' অবাক স্বরে জানতে চায় দিয়ালি| 'বলতে হিমেলের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি' দুষ্টুমি হাসি মুখে ছড়িয়ে যায় সিট খালি হয় পাশাপাশি দুটো| বসে দুজনে পাশাপাশি একটু দুরত্ব রেখে| কথা হয় না কিছু| মেট্রোতে দেখার কিছু নেই আশেপাশে| অস্বস্তি হয়‚ একটা দৃষ্টি মুখের ওপর ঘোরাফেরা করছে না তাকিয়েও বুঝতে পারে সে| গন্তব্য আসতে কত দেরী? নিজেকে অন্যমনস্ক করার আপ্রাণ চেষ্টায় চুল ঠিক করে| মোবাইলটা নিয়ে খুটখাট| একটা মিহি হাসি ছুঁড়ে দেয় হিমেল‚ 'বললাম তো ভালো লাগছে‚ আবার এত কি যে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছ?' 'বেশ করছি তাতে তোমার কি?' 'অনেককিছু|' আবার সেই দৃষ্টি হিমেলের চোখে‚ অবশ করে দেয় তাকে| আচ্ছা সে কি তলিয়ে যাচ্ছে ঐ দৃষ্টির গভীরতায়? গন্তব্য এসে যায়| নেমে পরে ওরা| দিয়ালির বুকের ভিতর পায়রার শিরশিরানি কাঁপুনি| এদিক সেদিক দুরত্ব রেখে খানিক ঘোরাঘুরি‚ টুকটাক কথা‚ হাসি একটু গভীর পরিচয়ের আশায়| 'খিদে পায় নি?' জানতে চায় হিমেল| কখন থেকেই তো পেয়েছে| কিন্তু বলে কি করে? ঘাড় ঈষৎ কাৎ করে জানায় পেয়েছে| 'চল কোথাও বসি'| ----- 'এবার ফিরব' জানায় দিয়ালি| 'এখুনি'? 'মা চিন্তা করবে|' 'আর একটু থাকবে না? তুমি চলে গেলে আমার ভালো লাগবে না|' 'কেন?' 'তোমার ভালো লাগবে?' হাসি হাসি মুখে জানতে চায় হিমেল| 'ওঠা যাক' প্রশ্নটা এড়িয়ে যায় দিয়ালি| নাহ তার একটুও ভালো লাগবে না| কিন্তু কেন? তবে কি... 'এখনো তোমার দ্বন্ধ মনেতে?' 'কিসের?' চমকে জানতে চায় দিয়ালি| পড়ন্ত সূর্যের আলো দিয়ালির চোখে-মুখে-উড়ন্ত চুলে| হিমেলের বুকের ভিতর একটা বেদনা ঘুরে বেড়ায় ইতি উতি| 'যে কথাটা শুনতে চাই‚ বলবে না?' হিমেলের স্বরের একটা মিনতি যেন ছুঁয়ে যায় দিয়ালিকে| উত্তর দেয় না সে| আবার মেট্রোস্টেশন‚ আবার ফিরে চলা‚ বুকের ভিতরে একটা কষ্ট দুমড়ে মুচড়ে দিতে চায় তাকে| চুপচাপ দুজনেই|দিয়ালির গন্তব্য আসছে‚ নেমে যাবার মুহুর্তখানেক আগে ফিসফিসিয়ে বলে যায়‚‚' আই লাভ য়্যু'| অটোমেটিক দরজাটা খুলে যায়| নেমে যায় দিয়ালি| বুকের ভিতরে অসীম সুখ| হ্যপি ভ্যালেন্টাইন ডে| ------------------------------------------------------------------------------------------------------------------ {s1} হয়ত কিছু বলার ছিল {/s1} {s2} লেখক: হিমাদ্রী {/s2} {/x6} {x7} হলঘরের সাউন্ড বক্সে আওয়াজটা কানে আসামাত্রই চোখটা অজান্তেই স্টেজের দিকে চলে গেল| চারটে মেয়ে স্টেজে দাঁড়িয়ে‚একটা টেবিল‚টেবিলের পিছনে দুটো লোক কথা বলছে‚সামনে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের কণিকা মেহেরেওয়াল দাঁড়িয়ে|খুব কৌতুহল হচ্ছে নবনীতার‚বিয়ের পরে এক বছর যেতে না যেতেই বাবাই এসে গেছিল‚ তারপরে তিনটা বছর যে কি ভাবে কেটেছিল -বাবাই কে যত্ন করা‚রিসার্চের পেপার তৈরী করা‚নম নম করে একটা দুটো ক্লাস করে নেওয়া-বাড়ি আসতে না আসতেই অয়নের কটাক্ষ-এবার চাকরি টা ছাড় তো-একটা কচি বাচ্চা কে ফেলে রেখে কি যে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াও‚পারও বটে! -হ্যা-একদম গেজিয়েই গেছিল নবনীতা‚সারাদিন ? বাইরে বাইরে ঘোরা?কতটুকু সময় দেয় অয়ন তার ছেলে কে? সন্তান কি তার ও নয়? দুচোখে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে নিস্পলক তাকিয়ে থাকতো সে অয়নের দিকে | হলঘরে প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেছে‚ গম্ভীর মুখে পেপার পড়ছে এক ভদ্রলোক‚ হলঘরে একবার চোখ বুলালো নবনীতা‚ চেনা অনেকেই রয়েছে-নন্দিতা‚চৈতী‚ অণামিকা‚ ধাওয়ান জী‚ ‚চেনা ‚আধচেনা অনেকেই-নন্দিতা তো কলেজ থেকে সাথে-এর মধ্যে প্রথম ভদ্রলোকের লেকচার শেষ -মাইকে অ্যান্যাউন্স হলো পরবর্তী বক্তার নাম--কুণাল গাঙ্গুলী--এত দিন পরে নামটা শোনার পরেই বুকটা ধক করে উঠলো নবনীতার‚ হ্যা--কুণালদাই তো‚ সেই এক ই ভঙ্গী তে হেঁটে মাইকের দিকে গেল‚ কলেজে একবছরের সিনিয়ার ছিল কুণাল গাঙ্গুলী|রোগা ‚লম্বা‚ দোহারা গায়ের রং‚ চোখে মোটা ফ্রেমের হাই পাওয়ারের চশমা| সত্যি বলতে কি সেই বয়সে মনটা একটু দুর্বল ই ছিল কুণাল গাঙ্গুলীর প্রতি‚সুপুরুষ ছিলনা কুণাল‚কিন্তু কমন রুমে বন্ধুরা বাজার চলতি হিন্দী গানের সুরে ওদের নিয়ে গান ধরতো‚ কেউ কেউ পাকা তবলচির মতো তাতে কাঠের টেবিল বাজিয়ে সঙ্গত ও দিত|বাকি বন্ধুরা হি হি হো হো করে তাতে সায় ও দিত|ভাল ছাত্রদের প্রতি মেয়েদের স্বাভাবিক আকর্ষণ যেমন থাকে তার ও হয়তো ছিল|বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলতো কুণালের ও নাকি তার প্রতি দুর্বলতা আছে-বন্ধুরাই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল-কয়েকবার সবাই মিলে সিনেমা দেখতেও গেছিল-বন্ধুরা মিলে সেবার যে পিকনিক টা করেছিল-তাতে নবনীতা গান ও গেয়েছিল‚ কুণাল পরে বলেছিল-ওর গানের গলাটা নাকি খুব সুন্দর-বন্ধুত্ত্বটা একটু গাঢ় হয়েছিল কি?এম.এ. পরীক্ষার নোট্স গুলো কুণাল ই ওকে দিয়ে দিয়েছিল ‚ আর রেজাল্ট ভালো যে হয়েছিল--তাতে কি কুণালের কি কোনো অবদান নেই? আছে| কুণাল স্টেসস এ চলে যাবার পরে বন্ধুরা রটিয়ে দিয়েছিল -নবনীতার থেকে ধোঁকা খেয়েই নাকি কুণাল বিবাগী হয়ে গেছে--শুনে নবনীতারাগ করলেও হেসে বলতো--বিবাগী হয়ে কেউ কি স্টেসসের এম আই টি তে পি এইচ ডি করতে যায়? ভাবতে গিয়ে এসব-একটু লজ্জা বোধ করছিল নবনীতা‚ কয়েকটা ফেলে আসা জীবনের ছেঁড়া ছবি দেখতে পেল সে চকিতে‚সম্বিত ফিরে পেল হাততালির আওয়াজে| কুণালদার ব্ক্তৃতা শেষ-ঠাসা হল উঠে দাঁড়িয়ে করতালিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে হলঘর‚ কি বললো কুণাল দা? কিছু ই শোনা হলো না-এখন লাঞ্চ ব্রেক-নন্দিতা ওকে দেখে হৈ হৈ করে এলো-লাঞ্চের প্যাকেট নিতে যাবার সময় দেখলো কুণাল দাকে ঐ পাশে বসা ভদ্রলোক কি যেন বোঝাচ্ছে আর কুণাল দা দুদিকে মাথা নেড়ে যাচ্ছে-কোনো গুরু গম্ভীর বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিলো বুঝি-ওর দিকে চোখ পড়তে-ভদ্রলোক কে ছেড়ে প্রায় ছুটে এলো কুণাল- নবনীতা! কেমন আছো তুমি? একটু থমকে যায় নবনীতা.তার কলেজ জীবনের প্রেমিকটি কে মন দিয়ে দেখে সে|- --এত দিন পরে আমাদের কথা মনে এলো? একটু অনুযোগের সুরে বলে নবনীতা| --তোমার কথা কি আমি ভুলতে পারি? সব সময়েই তোমার কথা মনে করেছি আমি-গম্ভীর মুখে টেনে টেনে বলে কুনাল| হয়তো ঠাট্টার ছলে বলে ফেলেছিল কুণাল-কিন্তু নবনীতার মনে হলো হয়তো সত্যি ই বলছে কুণাল|লাঞ্চ ব্রেক শেষ হলে কুণাল বলে-সেমিনার শেষ হলে একটু দাঁড়িও-একসাথে ফিরবো| সেকেন্ড সেশান শেষ হতেই নবনীতা গেটের সামনে দাঁড়ায়-কুণাল আসে নন্দিতাও আসে‚নন্দিতা কুণালের একটা হাত ধরে টেনে রেখেছে-নবনীতা কে দেখে বলে-এই শোন কুণাল দা কে ধরেছি--এখনো বিয়ে করেনি-বাইরে গিয়ে টাকায় পোকার বংশ বানাচ্ছে--আজকে আমাদের কে খাওয়াবে-এত সব অ্যাচিভমেন্টস-- অবাক হয়ে কুণাল কে দেখে নবনীতা--একটু ও বদলায়নি--শুধু ঐ কালো মোটা চশমাটা বদলেছে-মনে মনে খুশি হয় নবনীতা‚ মুখের হাসিটা কে ধরে রেখে একটু কেশে নিয়ে বক্তৃতা দেবার ঢং এ বলে ওঠে কুণাল-বধুগন-স্বীকার করতে লজ্জা নেই-আমি একদিন বিবাগী হয়ে দেশত্যাগ করেছিলাম‚এবং হ্যা‚ সেই কারনেই হয়তো আমার কিচু অর্থ ও প্রাপ্তী হয়েছে‚এখন বিচার-বিবেচনা করে তোমরাই বলো‚আমার ঐ চরম ব্যার্থতার দিনে যারা আমার পাশে এসে দাঁড়ায় নি-তাদের কি সত্যি কোনো খাওয়া পাওনা হয়?নাকি গুরুতর শাস্তি প্রাপ্য? বলে নবনীতার দিকে আড়চোখে তাকায় কুণাল‚হো হো করে হেসে ওঠে সকলে--অনেকদিন পরে প্রাণখুলে হাসে নবনীতা‚এক জমাট বাঁধা মেঘ কে ভেঙ্গে নেমে আসে বৃষ্টির জলধারা-তিন বন্ধু এগিয়ে চলে কোনো রেস্তোঁরায়-- হ্যাপী ভ্যালেন্টাইনস--প্রেমে থাকো বন্ধুতে থাকো--আড্ডাতে থাকো--মস্ত থাকো-- --------------------------------------------------------------------------------------------------- {s1} প্রথম প্রেম {/s1} {s2} লেখক: ঝড় {/s2} {/x7} {x8} প্রথ্ম প্রেমে পড়া ক্লাস নাইনে| পারমিতা| one sided যদিও (মানে আমার সব প্রেম কেসই মনে হয় one sided)| পারমিতা অর্জুনের গার্লফ্রেন্ড (মানে ওরা তেমনই বলত‚ কেমিস্ট্রি ল্যাবে চুমা চাটিও করেছে‚ দরজায় পাহারায় ছিল এই বান্দা - ফোঁসসস)| এ সব জেনেও কেন জানি না ধড়াম করে প্রেমে পড়ে গেলাম| আসলে ও খুব নটখট চুলবুলে টাইপস ছিল - আর ঐটা আমার খুব পছন্দের| কারণ স্কুলের অন্যান্য মেয়েরা কেমন একটা এলিয়েন ক্যাটেগরির - এত ভাও খেত যে মনে হত মার্স থেকে এসেছে| এইবার শুরু হল আসল দ্বুবিধা -- অর্জুন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড -- বিট্রে করব না করব না‚ করব না করব না -- এইসব ভাবতে ভাবতে একদিন দুরুম করে একটা গ্রিটিংস কার্ডে প্রেমপত্র লিখে সটান চালান করে দিয়েছি পারমিতার বায়োলজি কপির মধ্যে| আসলে বায়োলজির ছবি গুলো আমি বেশ ভালো ই আঁকাতাম‚ বুঝলেন| তাই কোনো শক্ত ছবি হলেই পারমিতা আমার দ্বারস্থ হত| আর সেটাও করেছি ওর বাড়িতে বসে ‚ কাকীমার (ওর মা) সামনে বসে| ভেবেছিলাম তখনই ওটা ওর হাতে পড়বে না‚ পরে হয়ত কপি খুলে দেখবে| ভাগ্য বিরূপ হলে যা হয় - কপিটা ওর হাতে দিতেই প্রেমপত্র সমেত কার্ডটা ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল| ও হ্যাঁ‚ বলা হয় নি‚ সেদিন ওর জন্মদিন ছিল‚ তাই গ্রিটিং কার্ড| তো ওটা মাটি থেকে কুড়িয়ে কাকীমার সামনেই পড়ল‚ দেখলাম কেমন মুখ চোখের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে| আমি তো মনে মনে প্রমাদ গুনছি - এই বুঝি কাকীমাকে বলে দিল| কিন্তু না - আমার ভয়কে ভুল প্রমানিত করে হঠাৎ করে মুচকি হেসে thank you বলল| সে রাতে এক ফোঁটা ঘুমোতে পারি নি জানেন? পরের দিন স্কুলে আমাকে আলাদা করে ডেকে বলল - "তুই একটা গাধা| Love Letter কি করে লিখতে হয় জানিসই না?" আমি কোনোরকমে তুতলিয়ে বল্লাম - "কিন্তু ওর উত্তরটা?" ও হেসে বলল "সন্ধেবেলায় বাড়িতে আয়‚ উত্তর পেয়ে যাবি|" বলে ফিরে চলে যাচ্ছিল‚ হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে বলল - "ভয় নেই‚ বাড়িতে কেউ থাকবে না‚ বিয়েবাড়ি যাবে| আমি একা থাকব|" এর পরে যা হল‚ তার জন্য একমাত্র আমিই দায়ী| আসলে একটা গিল্ট ফিলিং হচ্ছিল - তাই আমি অর্জুনের কাছে কনফেস করলাম| সন্ধেবেলা ওর বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারটা সমেত| অর্জুন প্রথমে শুনে কিছু বলল না| শুধু স্কুল ছুটির পরে আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল - "আমার মনে হয় না তোর যাওয়া উচিত| ও বলছে বটে ও একা থাকবে‚ কিন্তু যদি মিথ্যে বলে থাকে? গিয়ে হয়ত দেখলি বাড়িতে সব বলে দিয়েছে‚ লোকজন নিয়ে বসে আছে তোকে ক্যালাবে বলে! ভেবে দেখিস একটু|" আর আমিও শালা তখন একটু ভ্যাবলা‚ ডরপোক টাইপস ছিলাম| গেলাম না ওর বাড়ি| পরদিন স্কুলে আমাকে একা পেয়ে পারমিতা কেমন একটু কঠিন গলায় জিগালো - "কাল এলি না কেন?" আমি আমতা আমতা করে বল্লাম - "আসলে একটু কাজ পড়ে গেছিল‚ তাই মানে --" হীমশীতল গলায় ও কেটে কেটে জিগালো - "কাজ পড়ে গেছিল‚ না তোকে আসতে বারণ করা হয়েছিল?" বুঝলাম অর্জুন শালা ওকে সব বলে দিয়েছে| সেই শেষ কথা ওর সাথে স্কুলে থাককালীন| আর কোনোদিন ও আমার সঙ্গে কথা বলে নি‚ বায়োলজির ছবি নিয়েও আসে নি| ---------------------------------------- কি ভাবছেন এখানেই গল্প শেষ? নাহ - আরো কিছু বাকি আছে| বহু বছর কেটে গেছে তার পর| অনেক জল গড়িয়েছে| ওর সঙ্গে আবার দেখা স্কুলের রিইউনিয়নে| ভেবেছিলাম হয়ত কথা বলবে না| কিন্তু আবার আমাকে ভুল প্রমানিত করে নিজেই এগিয়ে এসে কথা বল্ল| "কেমন আছিস?" "ভালো‚ তুই" "আছি দিব্যি" ................... একথা সেকথা হল‚ ও বিয়ে করেছে‚ এক মেয়ে আছে‚ আসানসোলে থাকে| শেষে ফেসবুকে আছি কিনা জানতে চাইল| তারপর ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট| আমিও অ্যাক্সেপ্ট করলাম| মাঝে মধ্যে টুক টাক কথা‚ জন্মদিনে উইশ‚ ইত্যাদি চলছিল| হঠাৎ একদিন দেখি মেসেজ পাঠিয়েছে - "মনে আছে‚ স্কুলে থাকতে আমাকে প্রোপোজ করেছিলি? আমি তোকে আমার বাড়িতে আসতে বলেছিলাম সন্ধেবেলা? কিন্তু তুই আসিস নি| কেন আসিস নি‚ তোর ব্যাপার -- কিন্তু যদি আসতিস‚ হয়ত ভবিষ্যতটা অন্যরকম হতে পারত| এটা তোকে জানাবার ছিল‚ তাই জানালাম| এই নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো কথা আমরা বলব না‚ মাথায় রাখিস| আমরা অতীত ভুলে ভবিষ্যতে বাঁচি‚ তাই এই নিয়ে আর কথা বলতে চাই ন| ভুল বুঝিস না‚ ভালো থাকিস|" এর উত্তর আমি দিতে পারি নি‚ আজও পারি নি| তবে মেসেজটা পড়ার পরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম - সেটা মনে আছে| ------------------------------------------------------------------------------------------------- {s1} নিবিড় অমা-তিমির হতে…..{/s1} {s2} লেখক: ঝিনুক {/s2} {/x8} {x9} "আমি লিখেছিলাম চিঠিটা" …… প্রণতি বলে ওঠেন হঠাৎ| "কোন চিঠি?" …… সুপারি কুচানো থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন অবাক জয়তী| প্রণতি উত্তর দেবার আগেই কলকল করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে উঠে আসে চাঁদনি আর জিনিয়া‚ "মা‚ মা‚ মান্তুদিরাও কাল আসছে| কি মজাটাই না হবে এবার! তোমার পায়ে ব্যথার অজুহাত কিন্তু একদম চলবে না‚ আগে থেকেই বলে রাখছি‚ সামনের রবিবার সবাই মিলে পিকনিকে যাব হুড্রুতে‚ যাবই| চুটিয়ে মজা করবো এবার"….. এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে চাঁদনি জয়তীকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আদুরে বিড়ালের মত গাল ঘষতে থাকে মায়ের চুলে| সামনের মাসে একত্রিশ বছর বয়স হবে মেয়ের‚ কিন্তু চেহারায়‚ চলনে‚ বলনে কোথাও তার কোন চিহ্ন আছে? মনে হয় যেন এখনো কিশোরীটি| ওর বয়সে জয়তী দুই বাচ্চার মা‚ চাঁদনির পুরো পাঁচ বছর বয়স তখন| জয়তীর হয়ে প্রণতিই উত্তর দেন‚ "সত্যি‚ মান্তু আসছে? অনেকদিন পরে দেখা হবে‚ সেই টিপু হবার সময় শেষ দেখেছিলাম পাঁচ বছর আগে মেয়েটাকে"…… এবার জিনিয়ার পালা‚ "হ্যাঁ মা‚ শুধু মান্তুদি আর টিপু না‚ দিব্যদাও আসছে ওদের সাথে| সত্যিই‚ এবার একদম ফুল রি-ইউনিয়ন…… চাঁদনির থেকে বছর তিনেকের ছোট জিনিয়া‚ কিন্তু হাবে ভাবে যেন চাঁদনির বড় দিদিটি| গড়নে পেটনেও একটু ভারি‚ মাপা হাসি‚ চাপা কথা| "টিপুর জন্য একটা গিফট কিছু কিনে আনিস তাহলে আজই| তোরা তিনজন একসাথে হলে তো আর তোদের টিকিটিরও দেখা পাওয়া যাবে না কাল থেকে"…… মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন প্রণতি| "চাঁদনি‚ রবিবার যদি পিকনিকে যেতে হয়‚ তাহলে গরানকে আজই জানিয়ে পয়সাকড়ি দিয়ে আসিস বাজারঘাট করার জন্য| ও ঘর ছাইছে‚ খুব ব্যস্ত| একটু সময় হাতে রেখে না বললে অসুবিধা হতে পারে" …… তাড়া লাগান জয়তী‚ চিরকালই তিনি একটু গোছানে প্রকৃতির| পান সাজা আপাতত শেষ‚ একটা পান প্রণতিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা মুখে দিলেন জয়তী| যেভাবে এসেছিল‚ ঠিক সেইভাবেই আবার দুদ্দাড়িয়ে নীচে নেমে গেল দুই মেয়ে| ওদের যাবার দিকে চেয়ে রইলেন দুই পাকাচুলের বান্ধবী একসাথে| ওদের দেখে নিজেদের ছোটবেলা যেন ভিড় করে আসতে থাকে এই অবেলার ছাদে| বহুদিন বাদে এবারের শীতে আবার রাঁচিতে প্রণতি আর জয়তী‚ আবাল্যের দুই বান্ধবী| গার্জিয়ান দুই মেয়ে প্ল্যান করেই মায়েদের নিয়ে এসেছে ছুটি কাটাতে| এই শহরেই জন্ম দুজনেরই| পড়াশোনা‚ বড় হওয়া‚ বিয়ে সবই এই শহরে‚ পাশাপাশি বাড়িতে| প্রণতি অবশ্য অনেকদিনই অনাবাসী| বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই স্বামী শোভন বোস ট্র্যান্সফার হয়ে যান দিল্লীতে| কিন্তু প্রণতির সেখানেও থাকা হয় নি| সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন মিস্টার বোসের বদলির চাকরির সুবাদে| গত বছর মি: বোস হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবার পর অধুনা মেয়ের সাথে ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা‚ জিনিয়া সেখানে এক মাল্টিন্যাশন্যাল কম্প্যানির মার্কেটিং ম্যানেজার| জিনিয়া অবশ্য বড় হয়েছে এই রাঁচিতেই‚ কাকু-কাকীমার কাছে| ঐ একটিই সন্তান প্রণতির| জয়তী বছর তিনেক আগে অবধি রাঁচিতেই ছিলেন| স্বামী রজত সেন ছিলেন ব্যারেজের সর্বময় কর্তা‚ শুধু পদাধিকার বলেই নয়‚ সর্ব অর্থেই| ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই চলে গেলেন বিনা আড়ম্বরে| বাবার মৃত্যুর পর ছেলে মেয়ে কেউই রাজি হল না মাকে একা একা রাঁচিতে থাকতে দিতে| চাঁদনির সঙ্গে কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকেন আজকাল‚ মাঝে সাঝে ছুটিতে আসেন রাঁচির বাড়িতে‚ ঝাড়পোঁছ করিয়ে রেখে যান‚ কাঁথাকম্বল রোদে দেন| ইদানিং জর্দাপানের নেশাটা বড্ড বেড়েছে জয়তীর| চাঁদনি কলকাতার আইটি হাবের অসংখ্য কলাকুশলীদের একজন| জয়তীর ছেলে তমাল আই আই টিতে মেক্যানিক্যাল ফাইন্যাল ইয়ার| ওরও আসার কথা ছিল এবার‚ কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর হয়ে উঠলো না| দুই মেয়েতে ভাব সেই ছোট থেকেই| বরং মায়েদের যোগাযোগেই কিছুটা ভাটা পড়েছিল সংসারের চাপে| অবশ্য নেই নেই করেও টুকটাক ফোনাফুনি হত মাঝেসাঝে দুজনের বা ছুটিছাটাতে দেখাও হত| কিন্তু মুখোমুখি বসে এমন ঘনিষ্ঠ আড্ডা হয় নি অনেকদিন‚ সুতোটা কোথায় যেন একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল| অনেকদিন পরে আজ জয়তীদের ছাদে শেষ দুপুরের রোদের আমেজ মেখে দুই সখীতে একথা সেকথা--- মূলত মেয়েদের নিয়েই আলোচনা‚ তাদের ঘিরেই চিন্তা| স্মার্ট‚ শিক্ষিত‚ দেখতেও মন্দ নয় কাউকেই‚ সর্বদিক দিয়েই গুণান্বিতা‚ নয় নয় করে বয়সও কম হল না‚ তবু বিয়ে-থার ব্যাপারে কারো কোন উৎসাহই নেই| এক আধটা প্রেম ট্রেমও যদি করতো‚ কিন্তু তাতেও মন নেই| বন্ধুদের মধ্যে ছেলেবন্ধু অনেকই আছে‚ কিন্তু প্রেমিক কেউ নয়| তাই নিয়ে কিছু বলতে গেলেই‚ "তোমরা না বড্ড ব্যাকডেটেড" …. শুনতে হয়| হয়তো সত্যিই তাই‚ ব্যাকডেটেডই| এই প্রজন্ম অন্যভাবে ভাবতে শিখেছে| তাদের মত হুট বলতেই প্রেমে পড়ার বাতিক এদের নেই| চাঁদনি তো মোটামুটি জানিয়েই দিয়েছে যে বিয়ে সে করবে না| কথায় কথায় ফেলে আসা দিন এসে পড়ে গুটি গুটি পায়ে| স্কুল পেরিয়ে কলেজ‚ পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজো‚ দোলখেলার আবীর‚ ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠান‚ গুপ্ত প্রেম‚ ব্যক্ত প্রেম| রোদ পড়ে এসেছে প্রায়‚ উত্তর দিক থেকে হিমহিমে বাতাস দিচ্ছে| শালটা খুলে আলসের ওপরে রেখেছিলেন জয়তী| টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলেন ভালো করে| "কি যেন বলছিলি তুই‚ কি একটা চিঠির কথা"….. একটু প্রশ্নবোধক স্বরে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন জয়তী| "বলছিলাম যে চিঠিটা আমি লিখেছিলাম"….. "কোন চিঠিটা?"…..ভারি বিভ্রান্ত দেখায় জয়তীকে| "যে চিঠি পড়ে সেই রাতে জগন্নাথ মন্দিরের পেছনে ছুপাদহর মাঠে গিয়েছিলি তুই শুভর সাথে দেখা করতে"…… "কি বলছিস তুই?"……জয়তীর চোখে মুখে উৎকন্ঠা মিশ্রিত বিস্ময়| "হ্যাঁ‚ ঠিকই বলছি| কি করে পারলি তুই‚ জয়ী? আমার শুভ‚ আমার‚ আমার‚ শুভ আমার| তাকে মন দিতে তোর লজ্জা করলো না?"….. কেমন হিসহিসে শোনায় প্রতিমার গলাটা| "না না‚ আমি কোত্থাও যাই নি| কোন চিঠির কথা ব-বলছিস তুই‚ আ-আমি বুঝতে পারছি না"….. একটা কাঁপুনি যেন একেবারে নাভি থেকে শরীর বেয়ে উঠে আসতে থাকে জয়তীর| "মনে নেই বলছিস তোর চিঠিটার কথা? মনে করিয়ে দিই তাহলে ----ঠিক সাতটার সময় যখন আরতি শুরু হবে মন্দিরে তখন এসো ছুপাদহর মাঠে| আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়| ভয় পাচ্ছো নাকি? বোকাটা| কোন ভয় নেই| আমি থাকবো তো| দেখা হবে তাহলে| হবে তো? তোমারই শুভ|---- কি‚ মনে পড়ছে?" চোখ সরু করে শাণিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন প্রণতি| "কিন্তু আমি তো পড়েই পুড়িয়ে ফেলেছিলাম চিঠিটা"….. ভেঙে পড়া স্বরে অস্ফুটে বলেন জয়তী| "চিঠিটা শুভ লেখে নি জয়ী‚ আমি লিখেছিলাম"…… প্রত্যেকটা শব্দ কেটে কেটে বলেন প্রণতি| "কিন্তু কেন?"….. অদ্ভুত শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী বান্ধবীর চোখে চোখ রেখে| প্রণতিকে হঠৎ কেমন নিভন্ত‚ অসহায় দেখায়| একটু আগের সেই স্ফুরিতনাসা‚ অগ্নিবর্ষী প্রণতি ভেঙেচুরে এলিয়ে পড়েন চেয়ারে এই একটুখানি ছোট্ট হয়ে| "রাগে আর হিংসায় পাগল হয়ে জয়ী| মাথার ঠিক ছিল না আমার রাগের চোটে| তোর নিষ্পাপ সৌন্দর্য‚ নরমসরম স্বভাব‚ তোর ম্যাথ আর সায়েন্স স্কোর‚ তোর গানের গলা‚ কোনটার সাথেই পাল্লা দেবার ক্ষমতা তো আমার ছিল না রে| শুভ কিরকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তোর দিকে তাকাতো লুকিয়ে চুরিয়ে‚ আমার বুকের মধ্যে জ্বলে যেত জয়ী| তুইও| তুইও তো পাল্টা ফিরিয়ে দিতি সেই দৃষ্টি চুপি চুপি ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে| কোনদিন ভেবেছিস আমার কথা তোরা কেউ? আমি তখন প্রায় শুভর বাগদত্তা‚ শহরে সবাই জানে আমাদের কথা| সে যে কি ভীষণ পরাজয়‚ কি জ্বালা| তুই বুঝবি না জয়ী"….. প্রণতির গলার স্বরটা ভীষণ বিষণ্ণ শোনায়| "আমার কোন ধারণাই ছিল না যে আমার ওপর তোর এত রাগ ছিল রে ইতি| কিন্তু কি লাভ হয়েছিল তোর মিছিমিছি ঐ চিঠি লিখে?"….. অসম্ভব শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী| "হ্যাঁ‚ আজও মনে পড়লে আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে‚ কিছুতেই ক্ষমা করতে পারি না আমি তোদের| আর সেদিন তো রাগের চোটে দিগবিদিক ঠাহর হচ্ছিলো না আমার| প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম‚ ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ| তারপর পরের দিনই যখন শুনলাম তুই জ্বরে পড়েছিস‚ কি আনন্দ যে হয়েছিল‚ ভাবতে পারবি না| ভগবানকে ডেকেছিলাম তোর মৃত্যু চেয়ে| সবটা না হলেও কিছুটা পূরণ করেছিলেন ভগবান আমার প্রার্থনা| মনে আছে তারপর গোটা মাস ধরে তোর সেই নিউমোনিয়ায় ভোগার কথা?"…. প্রণতির গলার স্বরে তিক্ততা আবার ফিরে আসে| "আছে‚ কিন্তু আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুই লিখেছিলি চিঠিটা"…… অন্যমনস্কভাবে বলেন জয়তী| দপ করে জ্বলে ওঠেন প্রণতি আবার‚ "চিরকালের শান্ত‚ শীলিত‚ বুদ্ধিমতী জয়ী আমাদের| পুড়িয়ে না ফেলে যত্ন করে রেখে দিতে পারতিস তো চিঠিটা লুকিয়ে| মিলিয়ে নিতে পারতি আমার হাতের লেখার সাথে এখন"…. শ্লেষ ঝরে পড়তে থাকে প্রণতির স্বরে| কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠেন তিনি‚ "যাস নি সেদিন তুই সন্ধ্যেবেলা মন্দিরের পেছনের মাঠে চিঠি পেয়ে? সাহস থাকে তো স্বীকার কর আজ| আমি তো জোর গলাতেই বলছি যে চিঠিটা আমিই লিখেছিলাম| বল‚ যাসনি তুই সেদিন? বন্ধুর হবু বরের কাছে গোপন অভিসারে যেতে বাধে নি সেদিন‚ আজ অন্তত স্বীকার করে কিছুটা পাপমুক্ত হ"..... "হ্যাঁ গেছিলাম"…. শান্ত উত্তর জয়তীর| "একবারও মনে হল না তোর আমার কথা যাবার আগে?"….. গলার স্বরে লবণাক্ত অশ্রুর ছোঁয়া এবার প্রণতির| "হয়েছিল"….. "হয়েছিল!! মনে হয়েছিল আমার কথা? তবু পা উঠেছিল যেতে?"…. বিস্ময়ে কন্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে আসতে চায় প্রণতির| "হ্যাঁ‚ হয়েছিল‚ খুব গিলটি ফীল করেছিলাম| যাব কি যাব না দ্বিধায়‚ উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্বে‚ অন্যায়ের গ্লানিতে তিন তিনটে দিন জ্বলেছিলাম"….. "তবু গেলি?" ….. "হ্যাঁ যেতেই হল| সেই প্রথম‚ সেই শেষ চিঠি শুভদার| সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর শেষ অবধি আমি জোগাড় করে উঠতে পারি নি রে ইতি"….. "সে তো বটেই‚ সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর ছিল না‚ এত্ত প্রেম| অথচ তার দুমাসের মধ্যেই বাবামায়ের সুবোধ বালিকা হয়ে কেমন কনে সেজে রজতদার গলায় ঝুলে পড়লি! ইচ্ছে করছে সারা দুনিয়াকে ডেকে তোর আসল রূপটা দেখিয়ে দিতে‚ হিপোক্রিট একটা"….. সন্ধ্যার ডানায় ভর করে অন্ধকার নেমে আসে‚ সাথে ঠাসবুনোট স্তব্ধতা| বেশ কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই| তারপর প্রণতি খুব নীচু গলায়‚ প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেন‚ "I’m sorry”… "এতদিন ধরে চেপে রেখে আজ হঠাৎ কেন জানাতে চাইছিস? আমাকে শাস্তি দিতে?"….. জানতে চাইলেন জয়তী| "না না‚ অত শত ভেবে কিছু করি নি| জানিয়ে দেবার ইচ্ছে তো ছিল তখনই| অ্যাকচিউয়্যালি প্ল্যান তো ছিল সেটাই‚ তোকে টীস করা‚ তোকে বোকা বানিয়ে নাকে ঝামা ঘষে দেওয়া‚ হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডার মধ্যে একা একা ঐ ভূশণ্ডির মাঠে কেমন মজা করলি‚ সেটা জানতে চাইবো পরদিন দুপুরে| কিন্তু চিরকালের ল্যাদাডুস তুই তো সেই সন্ধ্যেতে বেকায়দা ঠাণ্ডা লাগিয়ে এসে নিউমোনিয়ায় অচৈতন্য হয়ে রইলি তার পরের গোটা মাস ধরে| জিজ্ঞাসা করার আর সুযোগ হল না| তারপর সেরে ওঠার পরেই বা আর সময় পেলাম কই? দুই সপ্তাহও তো পেরোল না পুরো‚ তোর বিয়ে হয়ে গেল রজতদার সাথে| নি:শ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিলাম অবশ্য সেদিন‚ ভেবেছিলাম পথের কাঁটা ঘুচলো" ….. ঝড়ের গতিতে একটানা এতগুলো কথা বলে দম নিতে থামেন প্রণতি| "বুঝলাম‚ কিন্তু এতদিন বাদে আজই বা তাহলে আবার টেনে বার করলি কেন সেই সাপ ঝুড়ি থেকে?" "কি জানি‚ রাগটা ভিতরে ভিতরে বোধহয় রয়েই গেছিলো কুণ্ডলী পাকিয়ে| আজ হঠাৎ পুরনো কথার পিঠে বেরিয়ে পড়লো"….. "কিন্তু আমি তো একা একা মজা করি নি সেরাতে ঐ ভূশণ্ডির মাঠে"…… মাত্রাতিরিক্ত শান্ত স্বরে বলেন জয়তী| "তার মানে? কে গেছিলো তোর সাথে?"…… অবাক প্রণতি জানতে চান| "শুভদা"….. সংক্ষিপ্ত উত্তর জয়তীর| "বুঝলাম না‚ ইয়ার্কি করছিস নাকি? ঐ চিঠি তো আমি লিখেছিলাম| শুভকে জানিয়ে লিখেছিলাম ভেবেছিস নাকি?"….. "না‚ শুভদার নামে ঐ চিঠি হয়তো তুই লিখেছিলি‚ ইতি| কিন্তু সেই চিঠির উত্তরটা আমি নিজে হাতেই লিখে দিয়েছিলাম শুভদাকে| আমি যখন পৌঁছেছিলাম ছুপাদহের মাঠে সেদিন সন্ধ্যেতে‚ শুভদা আমার অপেক্ষায় ছিল| কাজেই মজাটা একেবারে একা একা করতে হয় নি রে আমাকে"……. "মিথ্যে কথা‚ হতেই পরে না‚ মিথ্যে বলছিস তুই| লজ্জা করছে না তোর এত বড় মিথ্যেটা বানিয়ে বলতে শুভর নামে? একটু আগেই না ভালোবাসার বড়াই করছিলি? আর এখন মরা মানুষটার নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলছিস?……. "তোর যা প্রাণে চায়‚ বিশ্বাস করতে পারিস ইতি| মিথ্যে আমি বলছি না| ওতে তো তোরই একচেটিয়া অধিকার" ……. ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ান জয়তী পানের কৌটোখানা হাতে নিয়ে| "হুঁহ‚ সেই জয়ী‚ সবসময়ে ফার্স্ট‚ সবেতেই জিতে যাওয়া জয়ী| আমারই চালে আমাকেই হারিয়ে দিলি তাহলে"…… হো হো করে হেসে ওঠেন প্রণতি অন্ধকার সন্ধ্যেটাকে চমকে দিয়ে| "কিন্তু এত জিতেও লাভ কি হল জয়ী? কি পেলি শেষে? শুভকে তো পাওয়া হল না তোর| সেই আমার মত হেরো মেয়েই জিতে নিল শুভকে"…. চেয়ারের হাতলে চাঁদনির রেখে যাওয়া সোয়েটারটা ভাঁজ করে নিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন জয়তী‚ "শুরুটা সেদিনও তুইই করেছিলি ইতি‚ আজও তাই| কি পেয়েছি জানতে চাইছিস তো? শুনবি? সত্যিই শুনবি? সইতে পারবি তো? চাঁদনিকে পেয়েছি"….. আর ঠিক তক্ষুনি শুক্লা ত্রয়োদশীর চাঁদখানা রাজরানীর মত এসে দাঁড়ালো আকাশের পুব অলিন্দে| -------------------------------------------------------------------------------------------------- {/x9} {x1i}rsz_val1.jpg{/x1i} {x2i}val2.jpg{/x2i} {x3i}val3.jpg{/x3i} {x4i}val4.jpg{/x4i} {x5i}val5.jpg{/x5i} {x6i}rsz_val6.jpg{/x6i} {x7i}val7.jpg{/x7i} {x8i}val8.jpg{/x8i}

381

5

দীপঙ্কর বসু

জনৈক যাত্রী

প্রথমেই জানাই আজ পুরনো ফাইল পত্র ঘাঁটতে গিয়ে হাতে উঠে এলো আমার স্বর্গত পিতৃদেব পদ্মলোচন বসুর লেখা কিছু গল্পের খসড়ার ফাইল । সেই ফাইলের একটি গল্প কপি করে এখানে রেখে যাই ।আশাকরি বন্ধুরা উপভোগ করবেন ।ইচ্ছে আছে এই ফাইলে বন্দী আর কিছু গল্প ধীরে ধীরে এখানে নিয়ে আসার । এবারে গল্প পড়ুন -- <শহরের চৌমাথা থেকে যে পথটা উত্তরমুখে চলে গেছে,সেটা শেষ হয়েছে রেলস্টেশনে ।সূর্য ডুবুডুবু হলেই ওই পথ মাড়িয়ে স্টেশনের দিকে পা বাড়ান ইদানীং নেশার মত দাঁড়িয়ে গেছে ।বয়স্ক স্টেশনমাষ্টার গিরিনবাবু লোকটি মন্দ নয় ।সন্ধ্যেটা ওঁর সঙ্গে গল্পগুজবে কেটে যায় ।ছোট স্টেশন। অধিকাংশ ট্রেনই একে বেশ কিছুটা তম্বী করে চলে যায় ।থামে কেবল কটা লোকাল আর দূরপাল্লার প্যাসেঞ্জারটা ।কাজের ব্যস্ততা নেই বিশেষ । ওভিজাত ট্রেনগুলিকে সবুজ পতাকা দেখান আর লোকাল এলে টিকিট বিলির ঘটঘটানি । টেলিগ্রাফের টরেটক্কা আর মাঝে মাঝে মঙ্গল সিং কে হাঁক পাড়া ছাড়া গিরিনবাবুর বিশেষ ন কাজ থাকেনা ।গল্পগাছায় ছেদ পড়ে কদাচিৎ ।ভেন্ডার মেজদার দোকান থেকে কয়েকক্ষেপ চাও এসে যায় ।দৈনিক বসুমতীটা পড়ে থাকে টেবিলের একপাশে । আমাদের আলোচনার বিশ্বপরিক্রমা চলে ওই কাগজটিকে ঘিরে। আটটা বারোর লোকাল পার হলে প্রত্যাগত ডেলিপ্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে গল্প করতে করতে গৃহমুখী হই । এই নতয়ও আসা যাওয়ায় আবাহন নেই বিসর্জনও নেই – তবু ছেদ পড়েনা বড় একটা । দিনটা ছিল শনিবার । এদিনে অপরাহ্নবেলায় স্টেশন বেশ নিরিবিলি থাকে ।ডেলিপ্যাসেঞ্জাররা ফেরে সকাল সকাল । কিন্তু আজ যেন কেমন কেমন লাগছে ।দূর থেকে মনে হচ্ছে স্টেশনে কারা যেন জটলা করছে ।কাছাকাছি এসে দেখা গেল একদল বন্দুকধারী পুলিশ । ব্যপার কি , হঠাৎ এত পুলিশ কেন ? সরকারের কোন কেষ্ট বিষ্টু আসছেন নাকি , নাকি কোন হাঙ্গামা বেধেছে ? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যাই স্টেশন ঘরের সামনে । কি চাই ? একটি কনস্টেবলের কর্কশ সম্ভাষণ । হঠাৎ কোন জবাব ই আসেনা মুখে । আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে এই সরকারি বীরপুঙ্গবদের সঙ্গে আলাপের বিশেষ সুযোগ নেই ,আকাঙ্ক্ষাও নেই । প্রশ্নটি সরল ও সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্বেও স্ফসা জবাব দিতে পারিনি ।সত্যিই ত চাইবার কিছুই নেই ।নিছক স্বাস্থান্বেষনে আসা, সে কথাটা শান্তিরক্ষকের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে ,কে জানে । আমার দ্বিধা লক্ষ্য করে এবার তির্যক কণ্ঠে মন্তব্য – কি দরকারে আসা সেটাই ভুলে গেলেন নাকি ? মরীয়া হয়ে বললাম - গিরীনবাবু আছেন ? সান্ত্রীটি এবারে খিঁচিয়ে উঠলেন – গিরীনবাবু ? কে গিরীনবাবু ?কেউ নেই এখানে ।তাড়াতাড়ি সরে পড়ুন ,নইলে ঝঞ্ঝাটে পড়ে যাবেন । মনে মনে বললাম বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা ,পুলিশের খপ্পরেপড়লে কত ঘা ,কে জানে ।এমত অবস্থায় য পলায়তি স জীবতি আপ্তবাক্য স্মরণ করে পিছন ফিরি ।স্টেশন ঘরের দরজাটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল ।কথপোকথনের অন্তিম পর্বে একটু ক্যাঁচ করে শব্দ ।দরজাটা সামান্য ফাঁক হল ।সেই ফাটলে গিরীনবাবুর নাকের অর্ধাংশ ও একটি চক্ষু দেখা গেল । তারপর বেশ কিছু খুলে স্বস্তিভরা সুরে বললেন – ও আপনি ! আরে আরে ভিতরে আসুন ,ওখানে দাঁড়িয়ে কি গজালি করছেন। -আরে গজালি কি করছি কি সাধে ? দরজা আটকে দুই সম্মুন্ধির পো দাঁড়িয়ে আছে যে । গিরীনবাবু পুলিশটিকে বললেন – ইনি বন্ধু লোক ,আসতে দিন । পুলিশটি একবার গিরীনবাবুর আর একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শেষে বললেন –যান । গিরীনবাবু বেশ পোক্ত করে দরজার হুড়কোটা টেনে বসলেন নিজস্ব আসনে ।আমার দিকে তাকিয়ে বললেন বসুন । পরিবেশটা বেশ রহস্যঘন হয়ে উঠেছে ।গিরীনবাবুর মুখে উদ্বেগের স্পষ্ট ছায়া ।উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জানতে চাইলাম – কি ব্যপার মশাই , এত পুলিশ কেন ? বসুন বসুন । বলছি সব কথা । যা অবস্থা, পুলিশ আসবে না, বরযাত্রী আসবে? ভয়ে আমার তো হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে । ভয়ের একটা কারণ যে ঘটেছে তা তো লাল পাগড়ীর মেলাতেই অনুমান করা যায় ।দিনকাল যে খারাপ,সেটা একটা বাচ্চাও আজকাল বোঝে। অন্যদিন হলে অরাজকতা নিয়ে একটা বিশদ আলোচনা করা যেত । এই ত্রস্ত পরিবেশে তার অবশ্য অবকাশ নেই । গিরীনবাবুর সংক্ষিপ্ত স্বীকারোক্তিতে রহস্যের বিন্দুমাত্র আভাষ পাওয়া গেলনা ।আসল কথাটি গল্পের মর‍্যালের মত টপাক করে বলে ফেলার মানুষ নন গিরীনবাবু । অতি তুচ্ছ ঘটনাকেও বেশ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ,রসিয়ে কষিয়ে না বললে যেন তৃপ্তি পাননা ভদ্রলোক। কোন এক নিমন্ত্রণে ভর পেটে খাবার পর এক হাঁড়ি রসগোল্লা খাওয়ার গল্পটি বলতে তিনি তিন কোয়ার্টার সময় নিয়েছিলেন। আগাত বিপদের মুখেও সে বাচনভঙ্গির কোন হেরফের হয়নি ।মুখটা গম্ভীর করে অতঃপর বললেন – কিছু বুঝলেন? এত স্বল্প তথ্যে কিছু বুঝে ফেলারও মত এলেম আমার নেই ,তাই কেবল বললাম – ব্যপারটা গোলমেলে ঠেকছে । গিরীনবাবু আমার মুখের কথাটা প্রায় থাবড়া মেরে ছিনিয়ে নিয়ে বলে উঠলেন – গোলমেলে? বিকেল থেকে আমার হাত পা পেটের মধ্যে সেধ্যে যাবার জোগাড় হয়েছে ।আর আপনি বলছেন গোলমেলে ব্যপার !! - আরে কি ঘটেছে বলবেন তো -আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। - ঘটেনি ,ঘটতে চলেছে ।ঘটলে কি এমন নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারতেন? দেখতেন এতক্ষণে আমার খুলিটা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে,নয়তো বোমার ঘায়ে চিৎপটাং হয়ে আছি । - বলেন কি মশাই ! গুলি বোমা ! আমার উৎকণ্ঠা চাপা থাকেনা। - তবে আর বলছি কি মশাই। সেই পাঁচটা থেকে এখানে বন্দী হয়ে আছি ।সকাল থেকে এক কাপ চা ও জোটেনি বরাতে । গোলমালের গন্ধ পেয়ে মেজদাও আজ স্টল খোলেনি ।স্টেশন ছেড়ে কোয়ার্টারেও যাবার সাহস হয়নি ।কিছু একটা ঘটে গেলে…… - বাক্যটা সম্পূর্ণ না করেই গিরীনবাবু জিজ্ঞেস করেন – আচ্ছা শশাঙ্কবাবু আজকাল চিঠি লিখে ডাকাতি হয় নাকি আগের দিনের মত ? - -চিঠি লিখে ডাকাতি !! সেকি ! কে দিল !! আমার বিস্মিত প্রশ্ন । - - কে আর দেবে ।আমার পত্নীর ভাই ।আপনিও বেশ লোক মশাই । সে চিঠিতে নাম ধামা ঠিকুজি কুষ্টি থাকে নাকি ? গলায় বিরক্তির সুর । - তবে শুনুন । কালই ডাকে এসেছে চিঠিটা ।কারা যেন আজ অর্থাৎ শনিবার স্টেশন লুঠ করবে চিঠি দিয়েছে । আমি হেসে ফেলি । বলি – ধ্যৎ মশাই । স্রেফ গাঁজা ।আগে ভাগে কেউ আপনায়ে এপ্রিলফুল করেছে । - আমিও গোরায় তাইই ভেবেছিলাম ।তবু সাবধানে মার নেই ।তাই মঙ্গল সিং কে দিয়ে থানায় খবর দি – সঙ্গে চিঠিটাও পাঠিয়ে দি । আর তাই থানা থেকে এই ফোর্স পাঠিয়ে দিয়েছে । গাঁজা হলে কি পুলিশ মৌতাত ছেড়ে পাহারা দিতে আসে! - তাও বটে ।অস্বস্তিটা বাড়ল । এ যেন সেই ভুতের গল্প হল ।বিশ্বাস হয়না ,আবার স্থান কাল বিশেষে গা ছওম ছওম করে ।কোন ছুতোয় এখন উঠে পড়তে পারলেই স্বস্তি । তবু মুখে হাসি বজায় রেখে বললাম আজকের আড্ডাটাই মাটি । - আর আড্ডা । সময় থাকতে আজ সরে পড়ুন ।আমার বরাতে যা আছে তা হোক ,আপনি কে এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়বেন । - গিরীনবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্যে প্ল্যাটফর্মে পা দিলাম । সোয়া ছটার ডাউন লোকাল এর সময় হয়েছে ।যাত্রীর ভিড় বেশি নেই । বেঞ্চিতে বস আছেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক,পাশে জড়সড় হয়ে বসে সম্ভবত তাঁরই কন্যা। মেয়েটির গা ভর্তি গহনা ।মনে হয় সদ্য বিবাহিতা ,চলেছে শ্বশুরঘর ।একে এই বিপদের গন্ধ তার ওপরে ওই সালাঙ্কারা কন্যা ! ভদ্রলোক নাপড়েন অই হুমকি দেওয়া ডাকাতের খপ্পরে । কিছুটা দ্রুত পায়েই ফিরে চললাম বাড়ির পথে । - রাতে শয্যায় অনেকটা সময় কাটল জেগে ।মাথা থেকে গিরীনবাবুর পাওয়া চিঠিটা আর নববধূর মুখটা বারে বারে ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। পরের দিন সকালে কোন রকমে চা-টা গলায় ঢেলেই রওয়ানা হলাম স্টেশনের পথে । সেখানে পৌছে দেখলাম অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক । মেজদার স্টল খোলা স্টেশন ঘরে গিরীনবাবু যথারীতি তাঁর কাষ্ঠাসনে । যাহোক সহাস্য গিরীনবাবুর সঙ্গে দিনের দ্বিতীয় কাপ কাপ চাটা সারা যাবে । গিরীনবাবুর মুখে তখনো যেন গতকালের ছায়া ।আমাকে দেখে উদাসীন কণ্ঠে শুধু বলেন – আসুন । - চার পাশে নিজর বুলিয়ে দেখলাম ঘরের সবকিছুই স্বস্থানে আছে ।ওলটপালটের কোন চিহ্ন নেই । টেলিগ্রাফের যন্ত্র ।লাইন ক্লিয়ারের মেমো বই ।যুগযুগান্তরের চিট ময়লা ধরা টাকার বাক্সটাও যেমন থাকে তেমনি আছে । - মন্তব্য একটা করতেই হয় – যাক সব নিরাপদ তো ? - বিরক্তি চাপা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা - গিরীনবাবু বললেন দেখতেই তো পাচ্ছেন । - একটু সন্তর্পণে বলি – আগেই জানতাম সব ধাপ্পা ।কোনও চ্যাংড়া ছোঁড়ার কীর্তি । - অপ্রত্যাশিত আক্রোশে গিরীনবাবু বলে ওঠেন - চ্যাংড়া ? ঘাটের মড়া মশাই । যম ওর জন্যে হা পিত্যসে করে বসে আছে ।কেও যে এখনও নেয়নি ! আর আপনি বলছেন চ্যাংড়া ! - গিরীনবাবু যে সরাসরি আসলে ঘটনায় আসবেন সে আশা বৃথা ।তাই নীরবে অপেক্ষায় থাকি । - - আচ্ছা শশাঙ্কবাবু ,কাল এখান থেকে যাবার সময় বেঞ্চে কাউকে বসে থাকতে দেখেছিলেন ? গিরীনবাবু জানতে চাইলেন । - হ্যাঁ হ্যাঁ সকন্যা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখেছিলাম তো ।কিন্তু... - আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই গিরীনবাবু চিৎকার করে ওঠেন ।ভদ্রলোক !! ফুঁঃ । একটা আস্ত শয়তান মশাই লোকটা। বুড়োটা ট্রেনে ওঠার আগে মঙ্গল সিং এর হাতে এই চিরকুটটা দেয় আমাকে দেবার জন্যে । চিরকুটটা আমার দিকে এগিয়ে গিরীন বাবু বলেন - পড়ে দেখুন ।কাগজটা হাতে নিয়ে পড়লাম । ছোট্ট চিঠি । - মাষ্টার মশাই, - এক গা গয়না সহ কন্যাকে নিয়ে যেতে হচ্ছে তার শ্বশুরবাড়ির জরুরী তলবে । আমরা চাইলে তো পুলিশ পাহারা পাবনা।তাই এই ছলনা টুকু করতে হল । মার্জনা করবেন । - নমস্কারান্তে - জনৈক যাত্রী

189

12

ঝিনুক

নিবিড় অমা-তিমির হতে…..

"আমি লিখেছিলাম চিঠিটা" …… প্রণতি বলে ওঠেন হঠাৎ| "কোন চিঠি?" …… সুপারি কুচানো থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন অবাক জয়তী| প্রণতি উত্তর দেবার আগেই কলকল করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে উঠে আসে চাঁদনি আর জিনিয়া‚ "মা‚ মা‚ মান্তুদিরাও কাল আসছে| কি মজাটাই না হবে এবার! তোমার পায়ে ব্যথার অজুহাত কিন্তু একদম চলবে না‚ আগে থেকেই বলে রাখছি‚ সামনের রবিবার সবাই মিলে পিকনিকে যাব হুড্রুতে‚ যাবই| চুটিয়ে মজা করবো এবার"….. এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে চাঁদনি জয়তীকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আদুরে বিড়ালের মত গাল ঘষতে থাকে মায়ের চুলে| সামনের মাসে একত্রিশ বছর বয়স হবে মেয়ের‚ কিন্তু চেহারায়‚ চলনে‚ বলনে কোথাও তার কোন চিহ্ন আছে? মনে হয় যেন এখনো কিশোরীটি| ওর বয়সে জয়তী দুই বাচ্চার মা‚ চাঁদনির পুরো পাঁচ বছর বয়স তখন| জয়তীর হয়ে প্রণতিই উত্তর দেন‚ "সত্যি‚ মান্তু আসছে? অনেকদিন পরে দেখা হবে‚ সেই টিপু হবার সময় শেষ দেখেছিলাম পাঁচ বছর আগে মেয়েটাকে"…… এবার জিনিয়ার পালা‚ "হ্যাঁ মা‚ শুধু মান্তুদি আর টিপু না‚ দিব্যদাও আসছে ওদের সাথে| সত্যিই‚ এবার একদম ফুল রি-ইউনিয়ন…… চাঁদনির থেকে বছর তিনেকের ছোট জিনিয়া‚ কিন্তু হাবে ভাবে যেন চাঁদনির বড় দিদিটি| গড়নে পেটনেও একটু ভারি‚ মাপা হাসি‚ চাপা কথা| "টিপুর জন্য একটা গিফট কিছু কিনে আনিস তাহলে আজই| তোরা তিনজন একসাথে হলে তো আর তোদের টিকিটিরও দেখা পাওয়া যাবে না কাল থেকে"…… মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন প্রণতি| "চাঁদনি‚ রবিবার যদি পিকনিকে যেতে হয়‚ তাহলে গরানকে আজই জানিয়ে পয়সাকড়ি দিয়ে আসিস বাজারঘাট করার জন্য| ও ঘর ছাইছে‚ খুব ব্যস্ত| একটু সময় হাতে রেখে না বললে অসুবিধা হতে পারে" …… তাড়া লাগান জয়তী‚ চিরকালই তিনি একটু গোছানে প্রকৃতির| পান সাজা আপাতত শেষ‚ একটা পান প্রণতিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা মুখে দিলেন জয়তী| যেভাবে এসেছিল‚ ঠিক সেইভাবেই আবার দুদ্দাড়িয়ে নীচে নেমে গেল দুই মেয়ে| ওদের যাবার দিকে চেয়ে রইলেন দুই পাকাচুলের বান্ধবী একসাথে| ওদের দেখে নিজেদের ছোটবেলা যেন ভিড় করে আসতে থাকে এই অবেলার ছাদে| বহুদিন বাদে এবারের শীতে আবার রাঁচিতে প্রণতি আর জয়তী‚ আবাল্যের দুই বান্ধবী| গার্জিয়ান দুই মেয়ে প্ল্যান করেই মায়েদের নিয়ে এসেছে ছুটি কাটাতে| এই শহরেই জন্ম দুজনেরই| পড়াশোনা‚ বড় হওয়া‚ বিয়ে সবই এই শহরে‚ পাশাপাশি বাড়িতে| প্রণতি অবশ্য অনেকদিনই অনাবাসী| বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই স্বামী শোভন বোস ট্র্যান্সফার হয়ে যান দিল্লীতে| কিন্তু প্রণতির সেখানেও থাকা হয় নি| সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন মিস্টার বোসের বদলির চাকরির সুবাদে| গত বছর মি: বোস হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবার পর অধুনা মেয়ের সাথে ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা‚ জিনিয়া সেখানে এক মাল্টিন্যাশন্যাল কম্প্যানির মার্কেটিং ম্যানেজার| জিনিয়া অবশ্য বড় হয়েছে এই রাঁচিতেই‚ কাকু-কাকীমার কাছে| ঐ একটিই সন্তান প্রণতির| জয়তী বছর তিনেক আগে অবধি রাঁচিতেই ছিলেন| স্বামী রজত সেন ছিলেন ব্যারেজের সর্বময় কর্তা‚ শুধু পদাধিকার বলেই নয়‚ সর্ব অর্থেই| ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই চলে গেলেন বিনা আড়ম্বরে| বাবার মৃত্যুর পর ছেলে মেয়ে কেউই রাজি হল না মাকে একা একা রাঁচিতে থাকতে দিতে| চাঁদনির সঙ্গে কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকেন আজকাল‚ মাঝে সাঝে ছুটিতে আসেন রাঁচির বাড়িতে‚ ঝাড়পোঁছ করিয়ে রেখে যান‚ কাঁথাকম্বল রোদে দেন| ইদানিং জর্দাপানের নেশাটা বড্ড বেড়েছে জয়তীর| চাঁদনি কলকাতার আইটি হাবের অসংখ্য কলাকুশলীদের একজন| জয়তীর ছেলে তমাল আই আই টিতে মেক্যানিক্যাল ফাইন্যাল ইয়ার| ওরও আসার কথা ছিল এবার‚ কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর হয়ে উঠলো না| দুই মেয়েতে ভাব সেই ছোট থেকেই| বরং মায়েদের যোগাযোগেই কিছুটা ভাটা পড়েছিল সংসারের চাপে| অবশ্য নেই নেই করেও টুকটাক ফোনাফুনি হত মাঝেসাঝে দুজনের বা ছুটিছাটাতে দেখাও হত| কিন্তু মুখোমুখি বসে এমন ঘনিষ্ঠ আড্ডা হয় নি অনেকদিন‚ সুতোটা কোথায় যেন একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল| অনেকদিন পরে আজ জয়তীদের ছাদে শেষ দুপুরের রোদের আমেজ মেখে দুই সখীতে একথা সেকথা--- মূলত মেয়েদের নিয়েই আলোচনা‚ তাদের ঘিরেই চিন্তা| স্মার্ট‚ শিক্ষিত‚ দেখতেও মন্দ নয় কাউকেই‚ সর্বদিক দিয়েই গুণান্বিতা‚ নয় নয় করে বয়সও কম হল না‚ তবু বিয়ে-থার ব্যাপারে কারো কোন উৎসাহই নেই| এক আধটা প্রেম ট্রেমও যদি করতো‚ কিন্তু তাতেও মন নেই| বন্ধুদের মধ্যে ছেলেবন্ধু অনেকই আছে‚ কিন্তু প্রেমিক কেউ নয়| তাই নিয়ে কিছু বলতে গেলেই‚ "তোমরা না বড্ড ব্যাকডেটেড" …. শুনতে হয়| হয়তো সত্যিই তাই‚ ব্যাকডেটেডই| এই প্রজন্ম অন্যভাবে ভাবতে শিখেছে| তাদের মত হুট বলতেই প্রেমে পড়ার বাতিক এদের নেই| চাঁদনি তো মোটামুটি জানিয়েই দিয়েছে যে বিয়ে সে করবে না| কথায় কথায় ফেলে আসা দিন এসে পড়ে গুটি গুটি পায়ে| স্কুল পেরিয়ে কলেজ‚ পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজো‚ দোলখেলার আবীর‚ ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠান‚ গুপ্ত প্রেম‚ ব্যক্ত প্রেম| রোদ পড়ে এসেছে প্রায়‚ উত্তর দিক থেকে হিমহিমে বাতাস দিচ্ছে| শালটা খুলে আলসের ওপরে রেখেছিলেন জয়তী| টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলেন ভালো করে| "কি যেন বলছিলি তুই‚ কি একটা চিঠির কথা"….. একটু প্রশ্নবোধক স্বরে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন জয়তী| "বলছিলাম যে চিঠিটা আমি লিখেছিলাম"….. "কোন চিঠিটা?"…..ভারি বিভ্রান্ত দেখায় জয়তীকে| "যে চিঠি পড়ে সেই রাতে জগন্নাথ মন্দিরের পেছনে ছুপাদহর মাঠে গিয়েছিলি তুই শুভর সাথে দেখা করতে"…… "কি বলছিস তুই?"……জয়তীর চোখে মুখে উৎকন্ঠা মিশ্রিত বিস্ময়| "হ্যাঁ‚ ঠিকই বলছি| কি করে পারলি তুই‚ জয়ী? আমার শুভ‚ আমার‚ আমার‚ শুভ আমার| তাকে মন দিতে তোর লজ্জা করলো না?"….. কেমন হিসহিসে শোনায় প্রতিমার গলাটা| "না না‚ আমি কোত্থাও যাই নি| কোন চিঠির কথা ব-বলছিস তুই‚ আ-আমি বুঝতে পারছি না"….. একটা কাঁপুনি যেন একেবারে নাভি থেকে শরীর বেয়ে উঠে আসতে থাকে জয়তীর| "মনে নেই বলছিস তোর চিঠিটার কথা? মনে করিয়ে দিই তাহলে ----ঠিক সাতটার সময় যখন আরতি শুরু হবে মন্দিরে তখন এসো ছুপাদহর মাঠে| আমি থাকবো তোমার অপেক্ষায়| ভয় পাচ্ছো নাকি? বোকাটা| কোন ভয় নেই| আমি থাকবো তো| দেখা হবে তাহলে| হবে তো? তোমারই শুভ|---- কি‚ মনে পড়ছে?" চোখ সরু করে শাণিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন প্রণতি| "কিন্তু আমি তো পড়েই পুড়িয়ে ফেলেছিলাম চিঠিটা"….. ভেঙে পড়া স্বরে অস্ফুটে বলেন জয়তী| "চিঠিটা শুভ লেখে নি জয়ী‚ আমি লিখেছিলাম"…… প্রত্যেকটা শব্দ কেটে কেটে বলেন প্রণতি| "কিন্তু কেন?"….. অদ্ভুত শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী বান্ধবীর চোখে চোখ রেখে| প্রণতিকে হঠৎ কেমন নিভন্ত‚ অসহায় দেখায়| একটু আগের সেই স্ফুরিতনাসা‚ অগ্নিবর্ষী প্রণতি ভেঙেচুরে এলিয়ে পড়েন চেয়ারে এই একটুখানি ছোট্ট হয়ে| "রাগে আর হিংসায় পাগল হয়ে জয়ী| মাথার ঠিক ছিল না আমার রাগের চোটে| তোর নিষ্পাপ সৌন্দর্য‚ নরমসরম স্বভাব‚ তোর ম্যাথ আর সায়েন্স স্কোর‚ তোর গানের গলা‚ কোনটার সাথেই পাল্লা দেবার ক্ষমতা তো আমার ছিল না রে| শুভ কিরকম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তোর দিকে তাকাতো লুকিয়ে চুরিয়ে‚ আমার বুকের মধ্যে জ্বলে যেত জয়ী| তুইও| তুইও তো পাল্টা ফিরিয়ে দিতি সেই দৃষ্টি চুপি চুপি ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে| কোনদিন ভেবেছিস আমার কথা তোরা কেউ? আমি তখন প্রায় শুভর বাগদত্তা‚ শহরে সবাই জানে আমাদের কথা| সে যে কি ভীষণ পরাজয়‚ কি জ্বালা| তুই বুঝবি না জয়ী"….. প্রণতির গলার স্বরটা ভীষণ বিষণ্ণ শোনায়| "আমার কোন ধারণাই ছিল না যে আমার ওপর তোর এত রাগ ছিল রে ইতি| কিন্তু কি লাভ হয়েছিল তোর মিছিমিছি ঐ চিঠি লিখে?"….. অসম্ভব শান্ত স্বরে জানতে চান জয়তী| "হ্যাঁ‚ আজও মনে পড়লে আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে‚ কিছুতেই ক্ষমা করতে পারি না আমি তোদের| আর সেদিন তো রাগের চোটে দিগবিদিক ঠাহর হচ্ছিলো না আমার| প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম‚ ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ| তারপর পরের দিনই যখন শুনলাম তুই জ্বরে পড়েছিস‚ কি আনন্দ যে হয়েছিল‚ ভাবতে পারবি না| ভগবানকে ডেকেছিলাম তোর মৃত্যু চেয়ে| সবটা না হলেও কিছুটা পূরণ করেছিলেন ভগবান আমার প্রার্থনা| মনে আছে তারপর গোটা মাস ধরে তোর সেই নিউমোনিয়ায় ভোগার কথা?"…. প্রণতির গলার স্বরে তিক্ততা আবার ফিরে আসে| "আছে‚ কিন্তু আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুই লিখেছিলি চিঠিটা"…… অন্যমনস্কভাবে বলেন জয়তী| দপ করে জ্বলে ওঠেন প্রণতি আবার‚ "চিরকালের শান্ত‚ শীলিত‚ বুদ্ধিমতী জয়ী আমাদের| পুড়িয়ে না ফেলে যত্ন করে রেখে দিতে পারতিস তো চিঠিটা লুকিয়ে| মিলিয়ে নিতে পারতি আমার হাতের লেখার সাথে এখন"…. শ্লেষ ঝরে পড়তে থাকে প্রণতির স্বরে| কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠেন তিনি‚ "যাস নি সেদিন তুই সন্ধ্যেবেলা মন্দিরের পেছনের মাঠে চিঠি পেয়ে? সাহস থাকে তো স্বীকার কর আজ| আমি তো জোর গলাতেই বলছি যে চিঠিটা আমিই লিখেছিলাম| বল‚ যাসনি তুই সেদিন? বন্ধুর হবু বরের কাছে গোপন অভিসারে যেতে বাধে নি সেদিন‚ আজ অন্তত স্বীকার করে কিছুটা পাপমুক্ত হ"..... "হ্যাঁ গেছিলাম"…. শান্ত উত্তর জয়তীর| "একবারও মনে হল না তোর আমার কথা যাবার আগে?"….. গলার স্বরে লবণাক্ত অশ্রুর ছোঁয়া এবার প্রণতির| "হয়েছিল"….. "হয়েছিল!! মনে হয়েছিল আমার কথা? তবু পা উঠেছিল যেতে?"…. বিস্ময়ে কন্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে আসতে চায় প্রণতির| "হ্যাঁ‚ হয়েছিল‚ খুব গিলটি ফীল করেছিলাম| যাব কি যাব না দ্বিধায়‚ উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্বে‚ অন্যায়ের গ্লানিতে তিন তিনটে দিন জ্বলেছিলাম"….. "তবু গেলি?" ….. "হ্যাঁ যেতেই হল| সেই প্রথম‚ সেই শেষ চিঠি শুভদার| সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর শেষ অবধি আমি জোগাড় করে উঠতে পারি নি রে ইতি"….. "সে তো বটেই‚ সেই ডাক উপেক্ষা করার মত মনের জোর ছিল না‚ এত্ত প্রেম| অথচ তার দুমাসের মধ্যেই বাবামায়ের সুবোধ বালিকা হয়ে কেমন কনে সেজে রজতদার গলায় ঝুলে পড়লি! ইচ্ছে করছে সারা দুনিয়াকে ডেকে তোর আসল রূপটা দেখিয়ে দিতে‚ হিপোক্রিট একটা"….. সন্ধ্যার ডানায় ভর করে অন্ধকার নেমে আসে‚ সাথে ঠাসবুনোট স্তব্ধতা| বেশ কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই| তারপর প্রণতি খুব নীচু গলায়‚ প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেন‚ "I’m sorry”… "এতদিন ধরে চেপে রেখে আজ হঠাৎ কেন জানাতে চাইছিস? আমাকে শাস্তি দিতে?"….. জানতে চাইলেন জয়তী| "না না‚ অত শত ভেবে কিছু করি নি| জানিয়ে দেবার ইচ্ছে তো ছিল তখনই| অ্যাকচিউয়্যালি প্ল্যান তো ছিল সেটাই‚ তোকে টীস করা‚ তোকে বোকা বানিয়ে নাকে ঝামা ঘষে দেওয়া‚ হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডার মধ্যে একা একা ঐ ভূশণ্ডির মাঠে কেমন মজা করলি‚ সেটা জানতে চাইবো পরদিন দুপুরে| কিন্তু চিরকালের ল্যাদাডুস তুই তো সেই সন্ধ্যেতে বেকায়দা ঠাণ্ডা লাগিয়ে এসে নিউমোনিয়ায় অচৈতন্য হয়ে রইলি তার পরের গোটা মাস ধরে| জিজ্ঞাসা করার আর সুযোগ হল না| তারপর সেরে ওঠার পরেই বা আর সময় পেলাম কই? দুই সপ্তাহও তো পেরোল না পুরো‚ তোর বিয়ে হয়ে গেল রজতদার সাথে| নি:শ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিলাম অবশ্য সেদিন‚ ভেবেছিলাম পথের কাঁটা ঘুচলো" ….. ঝড়ের গতিতে একটানা এতগুলো কথা বলে দম নিতে থামেন প্রণতি| "বুঝলাম‚ কিন্তু এতদিন বাদে আজই বা তাহলে আবার টেনে বার করলি কেন সেই সাপ ঝুড়ি থেকে?" "কি জানি‚ রাগটা ভিতরে ভিতরে বোধহয় রয়েই গেছিলো কুণ্ডলী পাকিয়ে| আজ হঠাৎ পুরনো কথার পিঠে বেরিয়ে পড়লো"….. "কিন্তু আমি তো একা একা মজা করি নি সেরাতে ঐ ভূশণ্ডির মাঠে"…… মাত্রাতিরিক্ত শান্ত স্বরে বলেন জয়তী| "তার মানে? কে গেছিলো তোর সাথে?"…… অবাক প্রণতি জানতে চান| "শুভদা"….. সংক্ষিপ্ত উত্তর জয়তীর| "বুঝলাম না‚ ইয়ার্কি করছিস নাকি? ঐ চিঠি তো আমি লিখেছিলাম| শুভকে জানিয়ে লিখেছিলাম ভেবেছিস নাকি?"….. "না‚ শুভদার নামে ঐ চিঠি হয়তো তুই লিখেছিলি‚ ইতি| কিন্তু সেই চিঠির উত্তরটা আমি নিজে হাতেই লিখে দিয়েছিলাম শুভদাকে| আমি যখন পৌঁছেছিলাম ছুপাদহের মাঠে সেদিন সন্ধ্যেতে‚ শুভদা আমার অপেক্ষায় ছিল| কাজেই মজাটা একেবারে একা একা করতে হয় নি রে আমাকে"……. "মিথ্যে কথা‚ হতেই পরে না‚ মিথ্যে বলছিস তুই| লজ্জা করছে না তোর এত বড় মিথ্যেটা বানিয়ে বলতে শুভর নামে? একটু আগেই না ভালোবাসার বড়াই করছিলি? আর এখন মরা মানুষটার নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলছিস?……. "তোর যা প্রাণে চায়‚ বিশ্বাস করতে পারিস ইতি| মিথ্যে আমি বলছি না| ওতে তো তোরই একচেটিয়া অধিকার" ……. ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ান জয়তী পানের কৌটোখানা হাতে নিয়ে| "হুঁহ‚ সেই জয়ী‚ সবসময়ে ফার্স্ট‚ সবেতেই জিতে যাওয়া জয়ী| আমারই চালে আমাকেই হারিয়ে দিলি তাহলে"…… হো হো করে হেসে ওঠেন প্রণতি অন্ধকার সন্ধ্যেটাকে চমকে দিয়ে| "কিন্তু এত জিতেও লাভ কি হল জয়ী? কি পেলি শেষে? শুভকে তো পাওয়া হল না তোর| সেই আমার মত হেরো মেয়েই জিতে নিল শুভকে"…. চেয়ারের হাতলে চাঁদনির রেখে যাওয়া সোয়েটারটা ভাঁজ করে নিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন জয়তী‚ "শুরুটা সেদিনও তুইই করেছিলি ইতি‚ আজও তাই| কি পেয়েছি জানতে চাইছিস তো? শুনবি? সত্যিই শুনবি? সইতে পারবি তো? চাঁদনিকে পেয়েছি"….. আর ঠিক তক্ষুনি শুক্লা ত্রয়োদশীর চাঁদখানা রাজরানীর মত এসে দাঁড়ালো আকাশের পুব অলিন্দে|

302

7

মনোজ ভট্টাচার্য

ক্যালেন্ডার থেকে খসে পরা আরো একটা দিন !

ক্যালেন্ডার থেকে খসে পরা আরো একটা দিন ! কেউ কখনো শুনেছেন – ভোগের পাতায় মাছের কাঁটা ! না - ঠাট্টা নয় ! সত্যিই সেবাইতরা হয়ত রোজ রোজ নিরামিষ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে দুটো মাছের কাঁটা ছিটিয়ে দিয়েছেন – গঙ্গা জলের মতো ! – কোথায় ? বলছি – শুনুন তবে ! শরৎচন্দ্রের শেষকালের আবাস দেখেছি দেউলটিতে - । দেখতে গেছি জন্ম-আবাস । দেবানন্দপুর ! অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে – যখন পৌঁছলাম – তখন ভো-র দশটা । আবাস স্থলটা হল সরকারী দখলে ! রাজ্য-সরকারের কটায় সকাল হয় ? নিশ্চয় ভোর দশটায় নয় ! অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করেও সাড়ে এগারোটার সময় শরত বাবুর পৈত্রিক আবাস দেখে ফিরে আসার কথা ভাবলাম !- পাশেই সেই বাড়িটার মধ্যে ঢুকে খান কয়েক ছবি তুলে নিলাম ! – অথচ আশেপাশে অনেকেই বলল – একটু অপেক্ষা করুন – কেয়ার টেকার ঠিক এসে যাবে ! কিন্তু আমাদের মনে হল শুক্রবার হয়ত তিনি আসা পছন্দ করেন না ! তো আমরা ব্যান্ডেল চার্চের উদ্দেশ্যে চললাম ! সত্যি অতি সুন্দর চার্চ ! চারিদিকে প্রাচুর্য উপছে পড়ছে ! সমস্ত দেওয়াল জুড়ে যীশুর অলৌকিক মহিমা আঁকা ! ভিড় অল্প বিস্তর হয়েছে ! ঢোকার ও বেরুবার সময়ে চার্চের দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে শীর্ণ শীর্ণ ছোটো ছোটো হাত বেরিয়ে এসেছে – কোনও হাতে ধুপ – কোনও হাতে মোমবাতি ! বিক্রি করছে । আচমকা দেখলে চমকে যেতে হয় ভয়ে ! ইংরিজি সিনেমার দৃশ্যের মতো কবর থেকে হাত উঠে আসছে মনে হয় ! ল্যান্ড অব দ্য লিভিং ডেড ! কেন জানিনা চার্চের মধ্যে ঢুকলেই আমার খুব বারাব্বাসের কথা মনে পড়ে ! – দুজনেই মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত – অথচ মানুষে বেছে নিল বারাব্বাসের মুক্তি ! যীশুর ওপর মানুষের কোনও আস্থাই ছিল না নাকি ! যাকগে, এসব গভীর তত্ত্বকথা – যত জানার চেষ্টা করব তত গরল উঠবে ! শেষে এলাম হংসেশ্বরী মন্দিরে ! – খাবার দোকান ভাল ছিল ব্যান্ডেলে । তার কিছুক্ষণ আগেই ব্রেক ফাস্ট পর্ব সেঁটেছি ভাল মতই ! তাই ব্যান্ডেলে আর খেতে ইচ্ছে করল না ! চলে এলাম এই বাঁশবেরিয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরে ! এই মন্দিরের কথা শুনেছি অনেকদিন – কিন্তু আসা হয় নি ! মন্দিরের কাঠামো দেখে খুব ভাল লেগে গেল ! কিছুটা মস্কো মস্কো ছোঁয়াচ ! হংসেশ্বরী বলতে আমাদের প্রথমেই মনে হল – হাঁসের ওপর সরস্বতী মূর্তির কথা ! কিন্তু কথা হল সরস্বতীর কি সেই ধরনের প্রভাব প্রতিপত্তি থাকতে পারে – হ্যাঁ, সব ঘরে তার পুজো হয় বটে - ! কিন্তু এত সুন্দর একটা মন্দির ! – আসলে তার পাশের মন্দিরের নাম – বাসুদেব মন্দির ! তার মানেই - হংসেশ্বরী মানে কালী ! বেচারী শিবের নাভীর থেকে প্রস্ফুটিত এক পদ্মের ওপর দন্ডায়মান কালী ! নীলবর্না, ত্রিনয়নী, চতুর্ভুজা, খড়্গধারিনী ও নরমুন্ডমালিনী ! যথারীতি এই মন্দিরের কাজ সম্পন্ন হওয়া নিয়েও বেশ কিছু কাহিনী আছে । রাজা নৃসিংহদেব ১৭৯৯ সালে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন । কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৮১৪ সালে ! তার স্ত্রী রানী শঙ্করী সম্পন্ন করেন ! মন্দিরের ছটা মিনার ও মূল মন্দিরের সুউচ্চ চুড়া – যদিও লেখায় আছে তেরটা – দারুণ কারুকাজ ! – আর তার পাশেই বাসুদেব মন্দির । সম্পূর্ণ টেরাকোটা কাজ করা ! কিছু কিছু কাজ খাজুরাহের মন্দিরের কথা স্মরণে আনে ! মন্দিরের প্রধান পুরোহিতই হবে – আমাদের বোঝালেন – হংস মানে কি ! সে এক দুরূহ তত্ত্ব ! মুখ্যত - জ্ঞান ! হিন্দিতে বলে না – দানে দানে পে লিখ্যা হায় খানেবালাকা নাম ! – প্রায় সেরকমই - আমাদের কল্পনাতেও ছিল না – এখানেও ভোগ হয় ! আমাদের চালককে দেখেই কেউ বলে উঠল – সাড়ে বারোটায় ভোগের কুপন দেওয়া শেষ হয়ে গেছে ! – যা আমাদের মনের মধ্যে ছিল না – তার জন্যে তো দুঃখ হয় না ! – তা প্রধান সেবাইত – আমার স্ত্রীকে দেখে দয়া পরবশ হয়ে বললেন – তোমরা ভোগের জায়গায় চলে যাও – ওখানে পেয়ে যেতে পারো ! – তখন আমরা ছবি তুলতে ব্যস্ত ! চালক এসে ডাকল । ভোগের জায়গায় আসতেই নগদ পয়তিরিশ টাকা করে দিতে হল ! ভোগ কারে কয় ! সে কি টল টল করছে খিচুড়ি ! – তারই ওপর ঝাল একটা লাবরা জাতীয় তরকারি, দুটো ছোট্ট ছোট্ট আলু-ভাজা, তারই একদিকে একটু লাল ও সাদা ! লাল ও সাদা দেখে বোঝা গেল – চাটনি ও পায়েস ! – ভোগ বলে কথা – হাসি হাসি মুখ করে খেতে হয় ! সবাই তো বেশ তৃপ্তি সহকারেই খেলো ! কিন্তু আমার স্ত্রী একটা কাঁটা দেখিয়ে বলল – একী – মাছের কাঁটা এলো কোত্থেকে ! - মাছের কাঁটা ! আমাদের চালকও রাঁধুনিকে জিজ্ঞেস করলো – এতে কি মাছ দেওয়া হয়েছে ? – সে কোনও উত্তরই দিল না ! – কিন্তু আরও একজন মাছের ছাল জাতীয় কিছু পেয়েছে ! – বাইরে কেউ কেউ বলল – ওখানে ভোগে নাকি মাছ দেয় ! মাছ কোথায় ! এ তো মাছের ছিটে ! – তাও – ভোগে যে মাছের ছিটে দেয় – তা তো কখনো শুনিনি ! এখনও আমাদের আরও কত কিছু শুনতে হবে ! বলে না - লার্নিং ফ্রম বার্নিং ঘাট ! মনোজ

160

4

শিবাংশু

গণেশ পাইনের রানি

".... তুমি ছেঁড়া জামা দিয়েছো ফেলে ভাঙা লন্ঠন, পুরোনো কাগজ, চিঠিপত্র, গাছের পাতা- সবই কুড়িয়ে নেবার জন্য আছে কেউ তোমাদের সেই হারানো দিনগুলি কুড়িয়ে পাবেনা তোমরা আর ।" সুকান্ত আমার অনেকদিনের বন্ধু । সেই হাফপ্যান্টের আগে থেকেই । ডাকনাম সুকু । আমাদের মতো জামশেদপুরেই ওদেরও সব কিছু । ওর কাকা থাকতেন কদমায়। সুকুর সঙ্গে ছোটোবেলা থেকেই যাতায়াত ওঁদের বাড়ি । রিমা, মানে মধুরিমা সুকুর খুড়তুতো বোন । বছর তিনেকের ছোটো হবে আমাদের থেকে । ওকে যে দেখতে কেমন বা ও যে একটা মেয়ে, এমন কোনও অনুভূতিই আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি কখনও। ছেলেরা বড়ো হই মাথায়, মেয়েরা বড়ো হয় মনে। যখন কলেজে পড়ি , তখন মনে হতো রিমা বোধ হয় একটু অন্যভাবে কথা বলে আজকাল । খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যাচ্ছিলো সে । পুজোর সময় তাকে যে অনেকে ঘুরে দেখছে, সেটা বোঝা যেতো । নিয়মিত দেখাশোনা, তবু ব্যক্তিগতভাবে সে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুর বোন, আমার কাছে সেটাই ছিলো তার পরিচয়। কলেজ ছেড়েই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাকরিতে ঢুকে পড়া । তার পর জামশেদপুর ছেড়ে বাইরে । নিত্য যোগাযোগ এভাবেই কম হয়ে যেতে থাকে । এর মধ্যে পর্ণা আসে মঞ্চে । আমি জামশেদপুরে ফিরে আসার পরেও বেশ কিছুদিন রিমার সঙ্গে দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন বিষ্টুপুর বাজারে মেঘানির দোকানের সামনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। চিনতে পারি, কিন্তু তাকে এখন দেখতে হয়েছে যেন সোয়ানলেকের হংসপরী। আমি দেখছিলুম তাকে। আমার সেই বিস্মিত চাওয়া দেখে মৃদুস্বরে বলেছিলো, শিবাজিদা, চিনতে পারছোনা নাকি? -পারছি তো, কিন্তু তুই তো দেখছি একেবারে হিরোয়িন হয়ে গেছিস....!! -বাজে কথা রাখো । তুমি ফিরে এসেছো খবর পেয়েছি, কিন্তু একবারও বাড়িতে আসোনি । মা জিগ্যেস করছিলো... - হ্যাঁরে, এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি ... সত্যি... -কাকে নিয়ে ব্যস্ত হলে, পর্ণা....? -আরে তুই এসব পাকা পাকা কথা শিখলি কবে ? -অনেকদিন... -তুই চিনিস ? পর্ণাকে... -চিনি তো, সাকচিতে থাকে । রবীন্দ্রভবনে গান শেখে... -হমম, অনেক কিছুই জানিস দেখছি...দাঁড়া আসবে একটু পরে ... পরিচয় করিয়ে দেবো... -থ্যাংক ইউ, পরিচয় করাতে হবেনা, আমিই করে নেবো... আজ আসি। বাড়িতে এসো , কথা হবে... -আয়.... এ যেন এক অন্য রিমা । এতোদিন ধরে যাকে চিনি, সে নয়... ------------------------ " প্লাতেরো আমারে ভালোবাসিয়াছে, আমি বাসিয়াছি আমাদের দিনগুলি রাত্রি নয়, রাত্রি নয় দিন যথাযথভাবে সূর্য পূর্ব হতে পশ্চিমে গড়ান তাঁর লাল বল হতে আলতা ও পায়ের মতো ঝরে আমাদের-প্লাতেরোর, আমার, নিঃশব্দ ভালোবাসা ।" মধুরিমার বাবা ছিলেন একটু অন্যধরনের মানুষ। টাটাবাবার স্মেলটারের আগুন আর পুড়িয়ে দেওয়া উত্তাপ তাঁর ভিতরের জলধারাকে শুকিয়ে দিতে পারেনি। গান-কবিতা-জীবনের গভীরতর সন্ধানের দিকে অমলিন টান রয়ে গিয়েছিলো । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'চতুর্দশপদী কবিতা' ছিলো তাঁর প্রিয় বিলাস । আমাদের বিভিন্ন আড্ডা-জমায়েতে অবাধ আসতেন। বয়সের ফারাক বা বোধের পরিণতি আলাপের মধ্যে কোনও অস্বস্তির কারণ হতো না কখনও। চাইবাসা থেকে ফিরে মাঝেমাঝেই তাঁর বৈঠকখানায় আড্ডা হতো আমাদের। শক্তি ও বিনয়'কে নিয়ে আমার পাগলামির প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা ছিলো। এই দুই কবির কবিতা নিয়ে কথাবাত্তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠতো প্রায়ই। সেই কথা চালাচালির চালচিত্রে শিবের মতন দাঁড়িয়ে থাকতেন জীবনানন্দ । রিমা আগের মতো ওদের বাড়ি গেলেই ঘরে এসে বসতো না । কখনও সখনও আসতো, কিন্তু মৌনতাই হয়ে যেতো তার অবয়ব। একদিন রাতে ওদের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় এগিয়ে দিতে এলো বাগান পেরিয়ে । সেদিন চাঁদ ছিলো, হাওয়া ছিলো, ভাসাভাসি হাস্নুহানার গন্ধও ছিলো চারদিকে। এ রকম একটা সময়ে সে আমায় বলে, শিবাজিদা, আমাকে কোনোদিন শক্তির কবিতা শোনাবে, বুঝিয়ে দেবে একটু? -সে কী রে? তুই বাংলা কবিতা শুনবি ? তাও আবার শক্তির,...? -কেন, কবিতা কি শুধু পর্ণার জন্য...? আমি.... -আরে শোন শোন... নিশ্চয় শোনাবো... সে আর অপেক্ষা করেনি, রুদ্ধশ্বাসে ছুটে ফিরে গিয়েছিলো । এতো অচেনা হয়ে গেলো মেয়েটা । ------------------------ ".....সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায় আকাশমনির । ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্লা হাওয়া নয় ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি চন্দ্রমল্লিকার ...." দেখা হলো বহুদিন পরে। তার সঙ্গে। অন্য চরাচর। অন্য চালচিত্রে। অন্য এক বসন্তদিনে I মেঘাতুবুরু'র অতিথশালায় আমায় নিতে এসেছে। তার পতিদেব কুন্তল আসতে পারেনি I যাবো থলকোবাদ। তখন সকাল। রোদ ক্রমে আসিতেছে। ঠিক সাতটা নাগাদ ফোন এলো রিসেপশন থেকে । গাড়ি এসে গেছে । নেমে আসি সামনের গাড়িবারান্দায় । কালো বন্ধ জীপ গাড়ি । খোলা জীপে ধুলোয় লাল হয়ে যেতে হয় । ড্রাইভার গাড়ির দরজাটা খুলে দেয় । উঠতে গিয়ে দেখি রিমা অন্যদিকের জানালার ধারে বসে। -গুড মর্নিং... সে ফিরে তাকাতেই চোখ পড়লো একটা টিপের দিকে, তার কপালে, লাল টুকটুকে । আমি রিমাকে সিঁদুরের টিপ পরে কখনও দেখিনি । সকালের আলো কি ধন্য হলো ঐ রংটাকে এতো বিশ্বস্তভাবে ধরতে পেয়ে । -দারুউউণ... -কী... -টিপ... -মানে..? -কিছু না .... গাড়ি ড্রাইভওয়ে ধরে রাস্তায় নেমে এলো । - শুনলাম তুমি নাকি আসতে চাইছিলে না.. -না না , ঠিক তা না ; সব চেয়ে উৎসাহী ব্যক্তিটি যদি আটকে যান, তবে .. মানে স্ফূর্তিটা একটু নিভে যায় তো... -ওহ, আমি ভাবলাম অন্য কোনও কারণ রয়েছে... -তুই খুব ভাবিস না..? -কেন ? আমাদের কি ভাবতেও মানা ? -ঝগড়া করার মতলব আছে নাকি রে? -নাহ, সেটাও তো মানা.... -বোঝো ...তবে বহুবচনটা, মানে 'আমাদের', ইহার ব্যাখ্যা বলহ... -'আমাদের' মানে, যাদের পর্ণার মতো এলেম নেই, লেসার মর্ট্যালস.... এবার আমি ওর চোখের দিকে তাকাই, রিমা মুখটা ঘুরিয়ে নেয়.. --------------------------- "যাবো না আর ঘরের মধ্যে অই কপালে কী পরেছো যাবো না আর ঘরে সব শেষের তারা মিলালো আকাশ খুঁজে তাকে পাবে না ধরে-বেঁধে নিতেও পারো তবু সে-মন ঘরে যাবে না বালক আজও বকুল কুড়ায় তুমি কপালে কী পরেছো কখন যেন পরে? সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন চতুর্দিক সহজ শান্ত হৃদয় কেন স্রোতসফেন মুখচ্ছবি সুশ্রী অমন, কপাল জুড়ে কী পরেছো অচেনা, কিছু চেনাও চিরতরে। " ---------------------------- স্তব্ধতা ভাঙি, - কী রে, অমন মুখ ব্যাজার করে বসে আছিস কেন ? ভালো লাগছে না ? -না তো, আমি ভাবলাম তুমি বিরক্ত হয়ে আছো বোধ হয়... -ওফ, শুধরাবি না আর... -আপেল খাবে ? -দে একটা...তোর ছেলেটা খুব মিষ্টি হয়েছে, ক'বার আসে বছরে ? এবার উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে যেকোনও মা'য়ের মতন । মসৃণ ঝর্ণায় অনর্গল আত্মজের গল্প ঝরে পড়ে । তার একেবারে ইচ্ছে নয়, ছেলেকে অতোদূরে রেখে পড়ায় । কিন্তু এ তল্লাটে তো কোনও ব্যবস্থা নেই। ভালো ইশকুল সেই জামশেদপুর । সে'ও খুব একটা কাছে নয় । আর সেখানে ভালো হস্টেল পাওয়া যায়না। কুন্তলের এক ভাই দার্জিলিঙে পড়তো । তার ছোটোবেলার স্বপ্ন ছিলো ঐ সব ইশকুল । নিজের হয়নি, ছেলেকে দিয়ে উপর সাধ মেটাচ্ছে । এতোক্ষণে সে যেন স্বাভাবিকতায় ফিরে এলো । যা'কে চিনতুম, সেই মেয়ে । স্পষ্ট বড়ো হয়েছে, শরীরে, মনে । কাঁঠালকাঠের চৌকি বদলে এসেছে খাট, কুঁড়েঘরের দরজা সরে জোড়া কপাট , এখন অনেক বড়ো হয়েছে... চুপ করে শুনি তার উচ্ছল জলতরঙ্গের শব্দভাষ । তাকে বলি, -একটা কথা বলবো ? -নিশ্চয়, বলো... -নাহ, থাক, আফটার অল, ইউ আর আ পরস্ত্রী... -ন্যাকামি করতে হবেনা, এসব কবে থেকে শুরু করলে... -তবে বলি? -না, বোলোনা... -তবে বলেই ফেলি, কী বল..? এবার সে ভেঙে পড়ে হাসির সেই শব্দে, পিয়ানো'র বাঁদিক থেকে ডানদিকে দ্রুত গড়িয়ে দেওয়া আঙুল থেকে যে ঝংকার বেজে ওঠে , শালপাতায় ঝরে পড়া বৃষ্টির প্রথম পশলার মতো ধ্বনি, শুনতে পাই, বলি, -তোকে দেখতে খুব সুন্দর হয়ে গেছে... একটু লজ্জা পায় হয়তো, কিন্তু স্পষ্টতঃ খুশি হয়, তোমার আজ কী হয়েছে ? -না রে, কিছু হয়নি আলাদা করে, ভাবি বলি, তোকে দেখতে গণেশ পাইনের রানির মতো লাগছে... -তোমার মতলবটা কী বলোতো ? -আমার তো ওটাই মুশকিল.. কখনও কোনও মতলব আঁটতেই পারলুম না .. -এবার আমি তোমায় একটা কথা বলি? -বল... -পর্ণা কোথায় আছে ? -ঠিক জানিনা রে, ও দেশেই কোথাও হবে ... -খোঁজোনি? -খুঁজবো কখনও, ইচ্ছে হলে... -আরো কুড়ি বছর পর ? -তার বেশিও হতে পারে .... -ধ্যুৎ... "ঝড়ে হঠাৎ ভেঙে পড়লো তোমার মুখের জলপ্রপাত স্মৃতি? নাকি স্মৃতির মতন নিরুদ্বিগ্ন বিষণ্ণতার একটি করুণ মূর্তি, নাকি ভেঙে পড়লো পূর্ণিমারাত ? বুকের খড়ে মুখটি গোঁজা আধবোজা কোন স্বর্ণলতার ভ্রূমধ্যে টিপ সন্ধ্যাপ্রদীপ যদি দেখাও দুয়ারপ্রান্তে অনেক দূরের একা পথিক-আজো আমায় ডেকে আনতে তোমার ছেলেবেলার পাশে আর কি আছে সেই তামাশা- বলো এবং বলো আমার জীবনমরণ ভালোবাসার ভাষার অধীন, বিপর্যস্ত-স্থাপন করি মুখটি হাতে ।।"

195

7

জল

অবসর আবার

ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল আধপোড়া‚ ছোট্টখাট্ট‚ খন্ডিত দেহটা পুরোপুরি পুড়ে যেতে| চুপচাপ শ্মশানের বাইরে একটা চায়ের দোকানে বসে বসে সবকিছু দেখছিল দয়াময়ী| একের পর এক দেহ আসছে‚ লাইনে রাখা হচ্ছে| তারপর প্রায়শ্চিত্ত আরও কিসব যেন| তারপর একবার বোল দিয়েই দেহ চলে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক চুল্লীর ভিতরে| শেষবারের জন্য চোখের জল‚ আর্তচিৎকার‚ অপেক্ষার অবসান| তিনটে চুল্লী খেপে খেপে চলছে| এখানে এলে মন আর মাথা পুরো শূন্য হয়ে যায়| দয়াময়ীরও মন-মাথা সব শূন্য| গঙ্গার ঘাটের গা ঘেঁষে কাঠের চুল্লীতে পুড়ছে কারও একান্ত প্রিয় কেউ| কুন্ডলী পাকিয়ে উঠে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল চলে আসে| বয়সের এই এক ধর্ম কারণ অকারণ আর্দ্র হয়ে ওঠা| 'মা সব তো শেষ‚ এবার ফিরি চল' বলে হরি| স্বরে ক্লান্তি আর বিষন্নতা| শূন্য দৃষ্টি মেলে চায় দয়াময়ী| 'সব শেষ' শব্দটা যেন বুকে ধাক্কা মারে| উঠে দাঁড়াতে চেয়েও দাঁড়াতে পারে না| পা দুটো হঠাৎ করেই যেন অবশ মনে হয়| বেঁচে থাকতে থাকতেই দুই সন্তানের মৃত্যু দেখতে হল| কপালে আরও কত কি আছে কে জানে? 'মা‚ শরীর খারাপ লাগছে?' হরি ঝুঁকে আসে| 'না‚ না‚ চলো'| উঠে দাঁড়ায় দয়াময়ী| সকাল থেকেই ত্রিদিব চড়িয়ে বসে আছে| এখন তো ছাড়া গরু| কেউ বাধা দেবার নেই‚ কেউ বলার নেই| দয়াময়ীর কাছে কাছে আসছে না‚ একটু দূরে বসে আছে| মেয়েটাকে খেয়ে এবার শান্তি হল| মনে মনেই ভাবে দয়াময়ী| কোন কৃত্যই করল না| সবটাই হরি করল| শুধু আইনত স্বামী তাই আনতে হয়েছে| টলমল করে হাঁটে দয়াময়ী| কদিন ধরে কিভাবে যে কেটেছে নিজেই জানে| দিনরাত প্রার্থনা করেছে কূলদেবতার কাছে 'ফিরিয়ে দাও‚ আমার সাবুকে'| কিন্তু জানত সাবু ফিরবে না| মন বলেছিল এ যাত্রাই সাবুর শেষ যাত্রা| হরিকে বলেছিল‚ অন্য মেয়েদের বলেছিল একবারটি হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য| কিন্তু কেউই নিয়ে যায়নি| অবশ্য গিয়েই বা কি দেখত! ডাক্তার কিন্তু বলেছিল বাহাত্তর ঘন্টা কেটে গেলে একটা আশা আছে| বাহাত্তর ঘন্টা কেটে যাবার পর একটা ক্ষীণ আশা জেগেছিল মনে| আশা জাগিয়েই গতকাল সকালে চলে গেল| জীবনে মৃত্যু তো কিছু কম দেখল না দয়াময়ী| মন বলেছিল এ ভালো আসলে ভালো না‚ ছলনা| শেষ বিদায়ের আগের শেষ অঙ্কের অভিনয়| 'মা ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?' চোখ তুলে তাকায় দয়াময়ী| শূন্য হয়ে যাওয়া মাথাটায় সাম্প্রতিক অতীত চিন্তা করতে করতেই অন্যদিকে পা বাড়িয়েছিল দয়াময়ী| হরি লক্ষ্য করেছে| এই একটা মানুষের কাছে বড় কৃতজ্ঞ দয়াময়ী| পেটের ছেলে নয়‚ পরের ঘরের ছেলে‚ জামাই ‚ কিন্তু আজ তাকে ছেলেরও বেশি কিছু মনে হয়| আজ তো আর অদিতি নেই| তবু এতটুকু ব্যবহারিক বিচ্যুতি আজও হরির ব্যবহারে পেল না| হরি না রাখলে কোথায় যেত সে| নিজের তো আস্তানা বলতে কিছুই নেই| এ বাড়ি ও বাড়ি ভাড়া থেকেছে সারাটা জীবন| নিজের বাড়ি ছিলও না‚ করবে এমনটা তো কষ্টকল্পনাতেও আনেনি| কপাল ভালো সাবু বাদে বাকি মেয়েগুলোর ঘর-বর দুই ভালো| তাই আজ এ মেয়ের বাড়ি কাল ও মেয়ের বাড়ি করে থাকতে থাকতেই অদিতির বিয়ের পর থিতু হয়েছিল| হরি বলেছিল‚' আমার বাড়িতেই থাক তুমি'| বড় শান্তি পেয়েছিল মনে মনে‚ যদিও লজ্জাও পেয়েছিল‚ জামাইবাড়ি বলে কথা| স্বস্তির কথা ছিল এই যে‚ জামাইয়ের মা-বাপ অনেক আগেই গত হয়েছিলেন| না হলে কি আর এখানে থাকতে পারত| 'মা দেখে বাসে ওঠো' হরি সতর্ক করে| কোণের দিকের জানালায় ফুটকি আর তার পাশে পুটকি বসে| ঠিক তার উল্টোদিকের সিটে বসে দয়াময়ী| ফুটকি এখনো তেমন কিছু তো বোঝে না| সাবুর কপালে চন্দন‚ নতুন লাল শাড়ি‚ সিঁথিতে উপচে পরা সিঁদুর ‚ গলায় মালা‚ যেন নববধুর সাজে সাজিয়েছিল ওরা| দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল দয়াময়ী| সহ্য করতে পারছিল না| ফুটকি দেখে বলেছিল‚'দিদা কাঁদছ কেন? মা দেখ কি সুন্দর সাজে সেজেছে| দিদা মাকে ঠিক নতুন কনে মনে হচ্ছে না| মায়ের কি বিয়ে হবে দিদা'| জল গড়িয়ে পড়ে চোখ বেয়ে| মেয়েদুটোর কি হবে? কে দেখবে ওদের? সাবুদের বাবা যখন মারা যায় অদিতি তখন দেড়বছর| সেখান থেকে গতরে খেটে মেয়েদের মানুষ করা‚ বিয়ে থা অবশ্য নিজেকে দিতে হয়নি‚ যে যার মত করে নিয়েছে‚ তবু কেউ তো বয়ে যায়নি| ত্রিদিব কি দেখবে মেয়েদের? পুটকি না হয় অনেকটা বড় হয়েছে‚ কিন্তু ফুটকি? এখনো মা না খাইয়ে দিলে খায় না| মায়ের আঁচল না ধরে ঘুমোয় না| এখনো ঘুমের মধ্যে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে নিপল খুঁজে ফেরে| একটা বোবা কান্না চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে| 'দিদা কাঁদছ কেন'? ফুটকি জিজ্ঞাসা করে| 'আয়‚ আমার কাছে আয়' কাঁপা কাঁপা হাত বাড়ায় দয়াময়ী| বাড়ানো হাতের আশ্রয় নিয়ে ফুটকি এসে দয়াময়ীর কোলে বসে| বুকে চেপে ধরে দয়ময়ী| মন হাহাকার করে ওঠে| ' কি করলি সাবু? একবারও ভাবলি না ফুটকির কি হবে? ওকে কে দেখবে? ভাবলি না বুড়ি মা টাকে কেন শাস্তি দেব? সন্তান না শত্রু তোরা| ' 'দিদা তুমি এত কাঁদছ কেন? ছোটোমণি বলল মা‚ মাসিমণির কাছে যাচ্ছে| মা সেজেগুজে মাসিমণির কাছে গেল কেন? আমায় নিয়ে গেল না কেন মা? আচ্ছা দিদা মা এত ঘুমোচ্ছে কেন বলোতো?' চুপ করে থাকে দয়াময়ী| ফুটকির মাথাটা বুকের মধ্যে আরও চেপে ধরে| দিন কয় ছোটমেয়ের বাড়িতে ছিল‚ তাই এসব প্রশ্নের সন্মুখীন তাকে হতে হয় নি| এসব অবোধ প্রশ্নের কি জবাব দেবে দয়াময়ী? বাসটা হু হু করে শীতের ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলে গন্তব্যে| (চলবে)

481

33

অলভ্য ঘোষ

অত্যন্ত ঘৃণা প্রকাশ করি ধর্মের নামে জাতের নামে বজ্জাতি নোংরা রাজনীতি কে

একটা সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক উসকানিতে দেখতে পাচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়া ভরে উঠছে। অত্যন্ত ঘৃণা প্রকাশ করি ধর্মের নামে জাতের নামে এ ধরনের বজ্জাতি নোংরা রাজনীতি কে।ইন্ডিয়া মানে কেবল হিন্দু নয়। আর কারাকি জানার দরকার নেই। যারা ভারতের সার্বভৌমত্বতে আঘাত হানছে তারা দেশের সবথেকে বড় শত্রু। হিন্দুস্তান নামটি এসেছে ফার্সি শব্দ "হিন্দু" থেকে। ফার্সি ভাষায় সিন্ধু নদকে বলা হত হিন্দু নদ।হিন্দুস্তানে স্তান অনুসর্গটি ও এসেছে ফার্সি থেকে ফার্সি ভাষায় যার অর্থ স্থান।আর হিন্দু সিন্ধু অববাহিকায় যারা থাকতো তাদের স্থান হিন্দুস্তান।হরপ্পা মহেঞ্জোদারো। আর এদেশের বাসিন্দারা দ্রাবিড় গোষ্ঠীর । আর্য এসেছে পারস্য থেকে। কেউ কেউ মনে করেন রাশিয়ার ইউরাল পর্বতের পাদদেশ থেকে ইন্দ্র ইরানি আর্য গোষ্ঠীর একটি শাখা দুই ভাগ হয়ে একটি ইরানে যায় ও অপরটি ভারতে আসে। তার পর গ্রিক, শক ,হূন ,মুঘল ,পাঠান, বিট্রিশ ,পর্তুগীজ এসেছে এ দেশে।প্রাচীন বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাক আর্য বা অনার্য জনগোষ্ঠী এবং আর্য জনগোষ্ঠী। আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠী মূলত চার ভাগে বিভক্ত- নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়। অস্ট্রিক গোষ্ঠী থেকে বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়। অস্ট্রিক জাতিকে নিষাদ জাতিগোষ্ঠী নামেও অভিহিত করা হয়। এই চার সম্প্রদায়ের রক্ত মিলে মিশে একাকার হয়ে ভারতের শিরা ধমনীতে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। মূলত বাইরে থেকে পুরুষেরা আসতো। নারী সঙ্গী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদেশ থেকে জুটাত কি লুট-করতো। ফলে শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি এটা আপনার আমার শরীরে প্রতিটি ভরতীয়ের অখণ্ড ভারতীয়ের শরীরে সংকর প্রজাতির রক্ত প্রবাহিত। তাই ভারতীয়দের মধ্যে চেহারার সাদৃশ্যে যে বিভিন্নতা বৈচিত্র্য দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আর দেশের শত্রু কেবল পাকিস্তান চায়না বর্ডারে নেই;যারা ভাই আর ভাইয়ে ভেদ গড়ে দেয়; যারা নিজের দেশ মাতৃকাকে টুকরো টুকরো করতে চায় ;মানুষকে লুট করতে চায়;তারা সমান শত্রু। হিন্দু ,মুসলমান, শিক, জৈন ,বৌদ্ধ, খৃষ্টান, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের মনে যখন প্রশ্ন-জাগতে শুরু করেছে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও কেন বেকারত্ব, গরিবি, নিরক্ষরতা, অস্বাস্থ্য ভারত ভূমিকে অভিশাপের মত তাড়া করে বেড়াচ্ছে ।ঠিক তখনই অস্ত্রের কুচকাওয়াজ ধর্মের আফিং খাইয়ে বোকা জনগণকে সীমান্তের ওপারে শত্রু দেখিয়ে দৃষ্টি ভ্রম ঘটানো হচ্ছে।তাদের সমস্যা গুলো থেকে দৃষ্টি এড়াতে। ধর্মের মহিমায় সাধারণ কে ঘুম পাড়িয়ে রাখছে ভারত ,পাকিস্তান ,বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দল ও নেতা নেত্রীরা। আর সংবাদ মাধ্যম গুলো ঢাক ঢোল পিটিয়ে সে খবর বেচে লালে লাল হচ্ছে। কেউ প্রশ্ন-করছেনা ভারত পাকিস্তানের নেতা নেত্রীদের;বাজেটের যত টাকায় আপনারা অস্ত্র কিনছেন;সে টাকায় কত গুলো জাতীয় সরক হতে পারতো?কত গুলো হসপিটাল হতে পারতো?কতগুলো স্কুল হতে পারতো?কতগুলো মানুষের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারতো? অস্ত্রের ঝনঝনানিতেতো পেট ভরবে না দাদা।একটা এমন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করুন দেখি অবৈধ কালো টাকা উদ্ধার হয়ে যাক। ভোটের আগের সুইস ব্যাঙ্ক থেকে কালো টাকা উদ্ধার কিহলো ?সিবিআই জুজু ? রোজভ্যালি, সারদা ,নারদা ?কেঁচো খুরতে গেলে কেউটে বের হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আসুন মজে থাকি মেলা, পর্বনে , যুদ্ধে।রাম রহিমে। এ যেন ধারাবাহিক টিভি সিরিয়াল এলাস্টিকের মত টেনে টেনে লম্বা করা হচ্ছে।

186

3

kishore karunik

’পাবার মতো চাইলে পাওয়া যায়‘

মুহূর্তে বিদ্যুৎ চমকে গেল। হয়তো শ্রাবস্তী নিজেকে সংযত করে বসতে গিয়ে ওর হাত আমার কোমড় স্পর্শ করে। এক ঝলক তাকালাম ওর দিকে। ও যেন লজ্জা পেল। সৌজন্য বোধ থেকেই ও বলে উঠলো “সরি”। কেন যেন মনে হলো, শ্রাবন্তী ভদ্রতা দেখানোর একটুও সুযোগ হাতছাড়া করছে না। ট্রেন পুরোপুরি থেমে গেছে। থেমে গেল। জানালা দিয়ে অনেকে উঁকি দিয়ে দেখছে। কেউ কেউ ট্রেন থেকে নিচে নামছে। আমি সিটে বসলাম। মনের অবস্থা ভাল না। বাড়ি থেকে চিঠি এসেছে যত তাড়াতাড়ি পারি বাড়িতে যেন চলে আসি; যতই কাজ থাকুক। এখন বিয়ে করব না মনোস্থির করেছিলাম। চিঠি পড়ে যা বুঝলাম, বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। চিঠি পাওয়া মাত্র চলে আসবে-মা চিঠিতে লিখেছে। দু’-তিন দিনের পোশাক ব্যাগে নিয়ে রওনা দিয়েছি। শেভ করার সময় পাইনি। মুখটা হয়তো খুবই বিষণœ আর মলিন দেখাচ্ছে! “এখানে ট্রেন তিন ঘন্টা অপেক্ষা করবে। তারপর ছাড়বে।” আমার বামপাশে বসা লোকটি কোথা থেকে যেন শুনে এসে আরেক জনকে বললো। “শ্রাবস্তী, ট্রেনতো আরো ২/৩ ঘন্টা এখানে দাঁড়াবে আমার বাড়ি তো আর বেশি দূরে নয় আমি বরং অন্য কিছুতে চড়ে চলে যাই। তুমি বাড়ি গিয়ে চিঠি দিও।” হয়তো সেই লোকটি। কী জানি শ্রাবস্তীর ঘনিষ্ট কেউ কি-না! শ্রাবস্তী ঘাড় নেড়ে বললো, “আপনি বাড়িতে পৌঁছে মোবাইল করবেন। অনুষ্ঠানে কিন্তু আপনাকে আসতে হবে!” “ঠিক আছে।মন খারাপ করো না। যা হবার তা-তো হবেই। তোমার মোবাইল নম্বর যেন কত?” শ্রাবস্তী নিজের মোবাইল নম্বর বললো। মোবাইল নম্বর লিখে নিয়ে লোকটি বিদায় নিলো। মোবাইল নম্বরটা একবার শুনেই আমার যেন মুখস্ত হয়ে গেল। দু’-এক জন করে ট্রেন থেকে নিচে নামছে। আমিও নামলাম। দু’-একটা হকারও দেখছি। ওরা কি জানত এখানে ট্রেন দ্ঁড়াবে? ট্রেনের ভেতর থাকা হকাররা নিচে নেমে জানালার পাশ দিয়ে ঘোরাফিরা করছে! “এই কলা।” খুবই ক্ষীন শব্দ বের হলো শ্রাবস্তীর কণ্ঠ থেকে। বোধ হয়কলাওয়ালা শুনতে পায়নি। আমি নিচে নেমে শ্রাবস্তীর সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। কেন যেন মনে হচ্ছে কলাওয়ালাকে ডেকে দিই। শ্রাবস্তী আমার দিকে তাকালো। দু’জনের চোখে চোখ পড়লো। কী যেন বললো, মায়াবী চোখের ইশারায়। মুখ ফিরিয়ে নিল, কী কারণে বুঝতে পারলাম না। এর আগে আমার দিকে তাকিয়েছে কি-না তাইবা কে জানে! মেয়েদের প্রতি আমার তেমন কৌত’হল ছিল না। তবু এখন শ্রাবস্তীর প্রতি কৌত’হল জাগছে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। (চলবে)

239

1

kishore karunik

হায় জীবন

-কিশোর কারুণিক এখানে কেউ থাকতে পারে না এখানে কেউ থাকতে পারবে না। তবে এই যদি হয় বিচিত্র বৈভবের জীবনের কী দরকার? কী দরকার মনের মতো করে সব কিছু সাজিয়ে বৈচিত্রের মাধুর্যে দিন যাপনে, কী দরকার আকাশ কুসুম স্বপ্নের পাল তোলা শরীরের মায়াজ্বালে মায়া বাড়ানো কী দরকার নিজেকে না খুঁজে অন্য কিছু অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হায় জীবন হায় জীবন !

152

1

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

আজি এয়স্যা মওকা ফির কাঁহা মিলেগা.... মনটা এখনো পড়ে আছে দেশে, তাই লিখতে বসে প্রথমেই দেশ এসেছিল অবধারিত আবেগে। অথচ এদেশে যাত্রা শুরু করে দেশে পৌঁছনোর প্রাক্কালে চারটে দিন কেটেছে অন্যত্র, স্মৃতি তাকে বেমালুম এড়িয়ে গেছে। বেড়ানোর গল্পে সেই স্থানের ভূমিকাও কিছু কম নয়। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বর্ষাস্নাত এক গম্ভীর দ্বিপ্রহরে। ক্রিসমাসের বড় ছুটির প্রস্তুতি তখন ঘরে ঘরে। আলোকমালায় শরীর জড়িয়ে, কেকের সুঘ্রাণ মেখে ঝকঝকে তকতকে বাড়িঘর কাছে দূরের আত্মীয় অতিথী অভ্যর্থনায় যখন সেজে উঠছে প্রতিনিয়ত, ঠিক সেই সময় তখন পরবাসী আমরা, প্রবাসী অনেক ভাই বন্ধুদের অংশ হয়ে ভীড় জমালাম এয়ারপোর্টের রাস্তায়। ইউনাইটেড এয়ারলাইনস দশ ঘন্টায় পৌঁছে দিল আলোর শহরে। মালপত্র নিয়ে বেরোতে বেরোতে শিশু সকাল দেখি আড়মোড়া ভাঙছে। ছোট থেকে ভাসা ভাসা ছবি দেখা, টুকরো টাকরা গল্প শোনা জায়গাকে, কল্পনায় মোড়কে মুড়ে এক অপার্থিব স্বর্গসম কোনো জায়গা ভেবে নিয়েছিলাম। এয়ারপোর্টের কৃত্তিম আবহাওয়া থেকে বেরোতেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার সাথে গ্যাসোলিনের তীব্র গন্ধে নাক জ্বালা করে উঠলো। উবার নিয়ে হোটেলের পথে যেতে যেতে রাস্তার দুইপাশে দক্ষ হাতের প্রচুর গ্রাফিটি শিল্পকর্ম এড়িয়ে থাকার উপায় নেই। পথের ধারে থেকে থেকে স্তুপীকৃত জঞ্জাল। সব মিলিয়ে সূচনাতেই মনটা কেমন দমে গেল। কল্পস্বর্গীয় ভাবনাটি ছিল এইরকম। এয়ারপোর্টের দ্বারমুক্ত হয়ে বাইরে পা রাখতেই জগতবিখ্যাত ক্রেপের মনমোহক সুগন্ধ বাতাসে ভেসে আসবে। সুসজ্জিত মহিলারা শ্লথ পায়ে, রহস্যময় মোনালিসা হাসিতে চকিত দৃষ্টি হানবে। কোট টুপি পরিহিত পুরুষেরা মাথার টুপি অল্প তুলে মেঘনিন্দিত কন্ঠে বলবে, বিয়ভ্যেনিউ! কোথায় কি! আমাদের অক্লান্তভাষী ফ্রেনচ মোটরচালক কাজের কথা প্রচুর বলছিলেন কিন্তু যে কথা শুনতে কান উন্মুখ ছিল তা আর শোনা হলনা। জানালায় চোখ ঠেকিয়ে দেখছিলাম কর্মব্যস্ত দিনে বহুবর্ণ শীতের পোশাকে আপাদমস্তক ঢেকে নারী পুরুষের দ্রুত পদক্ষেপ। দুটো জিনিস এই ক'দিনে লক্ষ্য করেছি। এক, উভয়লিঙ্গের মানুষেরই ধুমপানের প্রতি প্রভূত আসক্তি। আর দুই, আমাদের দেশের মতই লোকে থুক থুক করে থুতু ফেলছে যত্রতত্র সাথে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। ভারী মন:ক্লেশে ভুগেছি তাদের এমন হীনকর্মে। স্বপ্নের শহরের মানুষদের স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছনোর কোনো দায়দায়িত্ব নেই নাকি! গাড়ি গড়গড়িয়ে মিনিট চল্লিশেক চলার পরে ততোক্ষণে আমরা প্যারিসের বুকের ওপর এসে পৌঁছেছি। লা ম্যাডলেন থেকে স্বপ্ল দূরত্বে আমাদের হোটেল হায়াত ম্যাডলেন। হোটেলের নাম এই কারণে নিলাম, কেউ যদি যান এই হোটেলে ওঠার কথা স্মরণে রাখতে পারেন। প্রথম কথা, হোটেলটি প্যারিসের বুকের ওপরে। হোটেল থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে ইতিহাস ছুঁয়ে বেড়াতে পারবেন। উবার ডাকতে হবেনা। দ্বিতীয়ত, হোটেল কর্মীরা অতিশয় দক্ষ এবং মিষ্টভাষী। পৌঁছতেই সুন্দর করে করে চায়-পানি সহযোগে অভ্যর্থনা করা হল আমাদের। হোটেলে ঘর দখল নিয়ে, তাজা হয়ে, পেটপূজো করে মনটা তখন ছুটে বেরোতে চাইছে। সিক্সটিনথ সেনচুরীর গ্যলো-রোমান স্থাপত্য আমাদের চতুর্দিক জুড়ে। ইতিহাসের মাঝে পড়ে মনটা আবার খুশি খুশি হয়ে উঠছে টের পাচ্ছি। পাঁচদিন আসলে বড়ই কম এমন শহরকে জানতে যেখানে ইতিহাস, স্থাপত্য আর আভিজাত্য হাত ধরাধরি করে আছে। প্রবল ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে দুইবেলা খুব ঘুরেছি। দ্যা ল্যুভ মিউজিয়াম একদিনে যতটা সম্ভব চোখ বুলিয়েছি। চোখ বুলানোই বটে, একমাসও কম সময় ইস্টার্ণ, ইজিপশিয়ান, গ্রিক, রোম্যান, ইটালিক, ইসলামিক, ইউরোপিয়ান, এশিয়ান, আফ্রিকান,আমেরিকান, ফ্রেনচ বিপুল চিত্রকলা এবং শিল্পকলা মন দিয়ে দেখার জন্য। তাই ছয় ঘন্টা ধরে জ্ঞানআরোহনকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা শুধু চোখ দিয়ে স্পর্শ করার আনন্দেই বুঁদ ছিলাম। জগত বিস্মৃত হয়ে কত মানুষ যে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে স্কেচের 'পরে স্কেচ এঁকে চলেছেন! স্কুলের ছোট ছোট ছেলেপুলেরা এসেছে তাদের আর্টের দিদিমণি বা মাষ্টারমশাইদের সাথে। খুদে খুদে হাতে গর্বিত মুখে মনের সুখে সাদা পাতায় আঁচড় কাটছে তারা। সোমার কথা বড্ড মনে পড়ছিল। এমন জায়গা তাঁরই উপযুক্ত! এ ঘর, সে ঘর, ওপর নীচ ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে পেলাম তাঁর দর্শন। অগণিত ফোটোতে তাঁকে আগে দেখে এসেছি, এবার সামনা সামনি দাঁড়িয়ে শরীর-মন এক অনাদ্যন্ত আবেগে পুলকিত হয়ে উঠলো। পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে শ্বাসরোধী জনসমাগমের মাঝেও সারা দুনিয়াকে উপেক্ষা করে তিনি আমার দিকে একচিলতে হাসি ছুঁড়ে দিলেন- মোনালিসা। মিউজিয়ামের যে কোনো অংশের তুলনায় এই অংশে মানুষের আদ্যোপান্ত ভীড় । ভাবতে অবাক লাগছিল মিউজিয়ামের এত হাজার হাজার মনোমুগ্ধকর দুষ্প্রাপ্য বিপুলাকৃতি রংবেরঙি চিত্রকলার মাঝে তাঁর তুলনামূলকভাবে ছোট ( ২১/৩০ ইনচি) প্রতিকৃত জগতব্যাপী খ্যাত, সমাদৃত এবং সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু কেন? তাঁর একচিলতে হাসি? নাকি তাঁর রহস্যাবৃত পরিমন্ডল? অথবা রেঁনেসাঁ বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দোর দ্বারা চিত্রাকৃত হওয়ার বিস্ময় মানুষকে সেই ষোলোশো শতাব্দী থেকে মোহিত করে রেখেছে! ওখানে দাঁড়িয়েই এক রোমাঞ্চকর গল্প শুনলাম। ১৯১১ তে লিওনার্দোর এই অমর সৃষ্টি মিউজিয়াম থেকে চুরি যায় এবং পরের দুই বছর তার কোনো হদিশ ছিলনা। বহু জিজ্ঞাসাবাদ, ধরপাকড় এবং তদন্তের পর চোরের হদিশ মেলে। ভিনচেনজো মিউজিয়ামেরই এক কর্মী ছিলেন। সকলের অলক্ষ্যে কিভাবে তিনি এই চৌর্যবৃত্তি সমপন্ন করেছিলেন সেই গল্প কোনো থ্রিলারের চেয়ে কম নয়। ভিনচেনজো হয়ত স্বপ্নেও কল্পনা করেননি মোনালিসার চিত্রটির নিরুদ্দেশ টেলিভিশন, খবরের কাগজে দুনিয়ায় পৃথিবীর সব প্রান্তে এমন প্রবল ঝড় তুলবে এবং ফ্রেনচ অথরিটি এমন স্বর্গ মর্ত পাতাল এক করে বদ্ধপরিকর হবে তাঁকে খুঁজে পেতে। মোনালিসার চিত্র এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে ভিনচেনজোরও হয়ত কিছুটা অবদানও রয়ে গেছে! মনে মনে ভিনচেনজোকে শত সহস্রবার ধন্যবাদ জানালাম। মোনালিসা তাঁর করায়ত্ব ছিল সুদীর্ঘ দুই বছর। ভাগ্যিস, তিনি চিত্রাঙ্কনটি সযত্নে রেখেছিলেন! ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে, আতঙ্কে ভাগ্যিস তিনি মোনালিসাকে বিনষ্ট করে ফেলেননি! পৃথিবীসুদ্ধু লক্ষ লক্ষ প্যারিস তীর্থ যাত্রীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ জানাই। মিউজিয়ামের ভেতরে জায়গায় জায়গায় সতর্কবাণী ছিল, পকেটমার হইতে সাবধান। একাগ্র দর্শনের মধ্যে সে ও এক অস্বস্তিকর এবং দু:খজনক ব্যাপার বটে! দোলাচলচিত্তে আর যা ই করা যাক, শিল্প উপভোগ করা কঠিন। মাইকেল এনজেলোর 'ডাইং স্লেভ' দেখতে দেখতে, অথবা ইজিপশিয়ান ' লিভিং ইমেজ' এ চোখ ডুবিয়ে যদি আপনার মনে হয় আপনার ডানদিকের স্বর্ণকেশী বারবার আপনার ঘা ঘেঁষে আসতে চাইছে তবে পুরুষ নারী বিশেষে ভিন্ন কারণবশত: ধ্যানভগ্ন হতে আপনার বেশি সময় লাগার কথা নয়! বিদেশ বিভুঁইয়ে পকেটমারি হলে খুব ঝামেলাঝাঁটির ব্যাপার হবে যাহোক। অবশ্য খোলাখুলি ডাকাতিতে খাবার রেঁস্তোরাগুলি কিছু কম যায়না। অন্নদাশঙ্কর রায় মহাশয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পারীতে গিয়ে সুলভে ব্যয়সাধ্য খানা খেয়ে অতিশয় উৎফুল্ল হয়েছিলেন। আমার কিন্তু প্যারিসের খাওয়া দাওয়া বেজায় ব্যয়বহুল লেগেছে, উনি অবশ্য পারীর সাথে ইংল্যান্ডের তুলনা টেনেছিলেন। আমার সে অভিজ্ঞতা নেই তবে এই কথা অনুমান করাই যায় ১৯২৬-১৯২৯ সালের পর থেকে আজকের প্যারিস আগ্রহী সুরসিক মানুষদের তীর্থস্থল হিসেবে বহু পথ পরিক্রমা করে এসেছে। লক্ষ্য করলাম শীতের তীব্র ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে মানুষজন বাইরে খেতে বেশ পছন্দ করে যে কোনো বড় শহরের মতই। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ঘন হয়ে এলেও কফির দোকানগুলো ভীড়ে টইটম্বুর হয়ে থাকছিল ঘনিষ্ঠ মানুষদের আড্ডায় কফির পেয়ালার টুংটাং আর ক্রেপের সুঘ্রাণে। এক রাতের বেলা আলোকোজ্জ্বল বিখ্যাত রাস্তা শাঁঙজেলিঁজের ( আল্লা,আমার গলত উচ্চারণ মাফ করো! প্যারিসের কোনো দুজন মানুষকে দেখলাম না একই জায়গার নাম একই রকম উচ্চারণ করতে) এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ালাম হাজার হাজার জনতার সঙ্গী হয়ে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে ওই রাস্তায় খ্রিসমাসের মেলা বসে। সে এক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা। কি না বেচাকেনা চলে সেখানে! কত না রকমারি ওয়াইন চিজ, মহামূল্যবাণ গাড়ি, প্যারিসের জগতবিখ্যাত সুগন্ধী, যা মনে আসে সব পাবেন একই রাস্তার ওপরে। শুধু পকেটে রেস্ত থাকাটা জরুরী। দুই চোখ কান দিয়ে গলাধ:করণ শেষ করার আগেই প্যারিসের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কড়াঘাত করল। জানিনা এ জন্মে আর হয়ে উঠবে কিনা, দুনিয়াতে দেখবার জানবার জায়গার তো অভাব নেই, কিন্তু সময় বড়ই অপ্রতুল। আর যাওবা অল্প সময় পাই শরীরের আগে মন ছুটে চলে একটিই প্রান্তে, আমার জন্মভূমি। তবে ইচ্ছে আছে, রোজকার এই ছোটাছুটি কর্তব্যের পালা সমাধা করে একদিন আরো বেশি সময়ের জন্য হয়ত ফিরে যাব আলোর শহরে। আবার সে ইচ্ছা যদি পূরণ নাও হয় তবুও দু:খ নেই। এই শীতে যা দেখে নিয়েছি এক জন্মের পক্ষে তা ই যথেষ্ট।

646

25

kishore karunik

ছি:

ছি: -কিশোর কারুণিক কান পাতলেই শুনতে পাই কান্নার আওয়াজ শিশুর কান্না, নারীর কান্না নির্যাতিত মানুষের কান্না। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি বাজারে পকেটে পাঁচটাকা কয়েন মন অশান্ত, শরীর অশান্ত অশান্ত সমাজ প্রিয়স্বদেশ। দেবতারা পূজা নেবার অভিপ্রায়ে পাঁচতারকা হোটেলে বিলাসি জীবন ছন্নছাড়া মানুষগুলো ভাসমান সীমানা কাঁটাতার অতিক্রম করে পরবাসী। মানুষ দেবতার পাটাতনে মানুষের স্বপ্নভঙ্গ দেবতার পৌষ মাস। জ্বলছে ঘর, পুড়ছে মন ঝলছে গেছে মাটি সভ্যতা নামক আধুনিক শব্দটা দেবতার পায়ে করে লুটোপুটি। শাসিত জীবন ব্যবস্থায় শোষিতরা যেন ললিপপ নিঃশেষের তরে যেন তাদের জীবন যাপন। চলছে এই ভাবেই চলছে সেই আদিম থেকে মধ্যযুগ এখন বর্তমান। পাপ বলে যদি কিছু থেকে থাকে দূর্বলতায় এক মহাপাপ। নির্বাণ জীবন যাপনে প্রতি মূহুর্তে প্রতি পদে পদে নিষ্টা, কষ্ট, কিঞ্চিত সুখ জীবনটা যেন তৃণসম দূর্বাঘাস। আমি দূর্বাঘাস হতে চাই না দেবতার অভিশাপ মাথায় পেতে নিলাম আর নয় দেবতার পায়ে অর্ঘ্য অন্তত মনে মনে মৃদু স্বরে বলে যায় ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ কেমন দেবতা তুমি ভক্তের কষ্টার্জিত ঘামে রক্তে- তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে? ছিঃ!

163

3