অলভ্য ঘোষ

নেতা

যে দেশে এই অতিমানব যত বেশি জন্মায় সে দেশের সাধারণ ততো দুর্বল।কারণ সাধারণ শক্তিশালী হলে অতিমানব কে জন্মাতে হতো না।এটাই ট্রাজেডি ভারতে মহাপুরুষের ছড়াছড়ি।।ব্যক্তি সংগ্রাম দিয়ে সংগঠিত প্রতিষ্ঠান টলানোর স্বপ্ন ;গাঁজা খেয়ে রাজা হওয়া।ইতিহাস বলে জনগণের উত্থানই কেবল দিতে পারে সার্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন।তাই মানুষের ভবিতব্য ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে না থেকে আজি তাকে নিজহাতে তুলে নিতে হবে।নেতা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। হ্যামলীনের বাঁশীওয়ালার মত তার কোন Supernatural Power বা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নেই ।জনগনই শক্তির উৎস। একটা দেশের মানবসম্পদ সেদেশের জনগণ।ভারত প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ উভয় সম্পদে সমৃদ্ধশালী কেবল উভয় সম্পদই লুট হয়ে যায় এ দেশে।আর লুটেরারা চায় সাধারণ সংগঠিত না হোক।তারা ভাগ্য নিয়তি ভগবান এসবে একটু বেশি করে আস্থা রাখুক।তাতে সংগঠিত সংগ্রামের বৈজ্ঞানিক চেতনা খর্ব হয় অতি সহজে।আবার সাধারণের নেতা হিসেবে নিজেদের লোক নিয়োজিত করে সাধারণের নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজি বাদী ,সম্রাজ্য বাদীর দল।যদি ধরে নিই যে কোন আন্দোলনের নেতা বাঞ্ছনীয় তবুও মুখ্য জনগন। যেমন বিবাহে মুখ্য পাত্র পাত্রী ঘটক নয়।নেতা কেউ হয়ে জন্মায় না। জনগণি তার নেতার জন্ম দেয়।নেতৃত্বের আভিজাত্য নিয়ে কখনো নেতা হওয়া যায় না। নেতা কেবল জনগণের ইন্টারপ্রেটার দোভাষী।জনগণের ভাবি তার ভাব। সে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

126

1

Dr Samya Dutta

নলেনগুড়ের পায়েস

গিলবার্ট কোম্পানির তৈরি অমন একপিস জাঁদরেল গ্র্যান্ডফাদার ক্লক কোনো সদাগরী আপিসের কেরানির হাতে আসবার কথাই নয়! পার্ক স্ট্রিটের রাসেল এক্সচেঞ্জ থেকে সিধা নিউ আলিপুরের কোনো খানদানী ড্রয়িংরুমে শোভা পাওয়াটাই ও'ঘড়ির পক্ষে দস্তুর। তবুও যে ঠাকুর্দা সনাতন আঢ্যি চমৎকার দাঁওখানা মারতে পেরেছিলেন, সে নেহাৎ ইন দ্যা ইয়ার নাইন্টিন ফিফটি তাঁর গুড লাকটা ভালো চলছিল বলে! ভাড়াবাড়িটার ঘুপচি ঘরে দিনমানেও আলো ঢোকে না। হারুর মা চলতে-ফিরতে হরদম ঘড়িতে হোঁচট খায়। নেপালবাবু নিজেও খান, কিন্তু প্রাণ থাকতে গ্র্যান্ডফাদারের শেষ স্মৃতিচিহ্নটি তিনি একচুলও সরাবেন না। ঠাকুর্দা ঘড়ির দশা এখন ঠাকুর্দারই শেষ বয়সের মত। এখানে-সেখানে উইপোকাদের মৌরসিপাট্টা, পুরনো পালিশের চটা উঠে উঠে কেসটার গায়ে বিচিত্র সব মহাদেশের মানচিত্র- তা হলেই বা! ওই গুমগুমে ঘন্টাধ্বনি তো এতটুকুও টসকায়নি! শুনলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। এবাড়িতে শীতের সকালগুলো আড়মোড়া ভাঙে বেশ বাঁধাধরা গতে। চানঘরের দরজাটা বেজায় অবাধ্য, কিছুতেই খিল আঁটতে চায় না। ঠিক সাতটায় ঘড়িটার প্রথম ঢং আর বেয়াড়া খিলটাকে বশে আনতে আনতে নেপালবাবুর প্রথম 'শালা' উচ্চারণ- এই দুইয়ের সমাপতন এবাড়ির রুটিন। তারপর শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে নেপালবাবু ঠিক আরও ছ'বার সম্বন্ধীকে স্মরণ করেন, প্রতিবার ঘড়ির ঢং-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ভিজে শরীরে শীতের কামড়টা যত জাঁকিয়ে বসে, গলার পর্দায় কাঁপনও তত পাল্লা দিয়ে বাড়ে। শেষ 'শালা'টা মুখ থেকে বেরোনোর আগেই কিন্তু নেপালবাবুকে উত্তরের বক্স জানালাটা খুলে ফেলতে হবে, কারণ টবের তুলসীনারায়ণের এখন জলগ্রহণের সময়। আদুর গায়ে মাঘের কনকনে হাওয়ার মুখে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো কষ্টকর, তাই 'তুলসী, তুলসী তুমি নারায়ণ'-এর পর বাকিটা তাঁকে 'হুঁ হুঁ' করে সংক্ষেপে সারতে হবে। বাড়ির লাগোয়া বাজারের একমাত্র নালাটি তাঁর এই জানলার ঠিক পাশে, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকেই হালকা হবার তাগিদে এখানে আসতে হয়। তাই কষ্টসহিষ্ণু নেপালবাবু যদিও বা কদাচিৎ 'তোমার শিরে ঢালি জল' অবধি অগ্রসর হন, নাকে দুর্গন্ধ ঢোকামাত্র "এই শালা, এটা বারোয়ারি পেচ্ছাপখানা পেয়েছিস? হারামজাদা, তোর বাড়ির দেয়ালে মুতে আসব, দেখবি?" ইত্যাদি বলে চেঁচাতে একরকম বাধ্য হবেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও কি শান্তি আছে? বাসি ক্যালেন্ডারে মা লক্ষ্মী কখন থেকে একখানি ধুপের অপেক্ষায় বসে আছেন। তা ধুপ ধরাতে গিয়ে হাতের দেশলাই যদি হাওয়ায় নিভেই যায়, নেপালবাবুকেও তো 'ধ্যাশ্শালা' বলতেই হবে! শেষটায় চারবারের চেষ্টায় ধুপ জ্বললে, নেপাল আঢ্যি সেই ধুপ বনবন করে বারকতক মা লক্ষ্মীর সামনে ঘুরিয়ে, ক্যালেন্ডারে মায়ের পায়ের কাছটা খাবলে একবার প্রণাম ঠুকে নেবেন। খাবলানোর চোটে হয়তো বৈশাখের কয়েকটা দিন ছিঁড়ে হাতেই চলে আসবে! তা সেসব নিতান্তই আর পাঁচটা দিনের ব্যাপার। আজ দিনটা অন্যরকম। আজ বাজারে যাবার মুখে বাড়িওয়ালীর ছেলে সত্যর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সত্য দাঁত মাজার ব্রাশ মুখের ভেতর চিবোতে চিবোতে বলল, "কাকাআউ, ঙাঁ অলছিল... এ আঁসের আড়াটা, অডি এট্টু আড়াটাড়ি..." অন্যদিন হলে নির্ঘাত নেপালবাবু চোখ পাকিয়ে, মুখে ফেনা তুলে তর্ক জুড়ে দিতেন, "ভাড়া! কীসের ভাড়া হে! বলি, দু'বেলা পাম্প চলে না কেন? সিঁড়ির আলো জ্বলে না কেন? কল থেকে জল না পড়ে ছাদ ফুটো হয়ে পড়ছে, আবার ভাড়া! হুঃ!" আজ কিন্তু সেসব কিছুই বললেন না। বরং কন্ঠে মধু ঢেলে বললেন, "বাবা সত্য! আজ তো সবে দোসরা। পেনশনটা তুলতে দাও, তারপর নাহয়... আহা! তোমাকে কি তাগাদা দিতে হয়েছে কখনও? তোমার বাবা বেঁচে থাকতে কিন্তু..." সত্যর পরলোকগত পিতার স্মৃতিচারণ অসমাপ্তই থেকে গেল, দোতলার জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে সত্যর মা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, "মিঠে কথায় ভুলিসনি, সতে! তোর বাপকেও অমনধারা কথার ফাঁদে ফেলেই অক্ত চুষে খেয়েছে!" সর্বৈব মিথ্যা! এলেবেলে একটা দিনে এমন ভয়ানক অনৃতভাষণ শুনলে নেপালবাবুর শিখার কাছটা কি দপ করে জ্বলে উঠত না? কিন্তু, আজকের দিনটা তো আর... আজ নেপালবাবু একটা পীড়িত হাসি হেসে শুধু বললেন, "বৌদি, গরীব ভাইটার কথাও একটু ভেবে দেখুন! আসছে হপ্তায়... কথা দিচ্ছি..." হারুর মা ঠিক এইসময়টায় কাজে আসে। সদর দরজার সামনে মনিবের সঙ্গে তার নিত্য ঠোকাঠুকি হয়। আজও নেপালবাবুকে তার নিয়মমাফিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হল। "এবেলা কী রান্না হবে?" গতকাল অবধি নেপালবাবু এই প্রশ্নের উত্তরে মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছেন, "আমার পিন্ডি!" আজ টাকটা বারকতক চুলকে, কী যেন একটু ভেবে নিয়ে বললেন, "দুপ্পুরটা একটু হালকা দেওয়াই ভালো, নইলে আবার... ভাতে-ভাত যা হোক করে দে না!" ওই যে বললাম, আজ দিনটা একটু ব্যতিক্রমী। ভাগ্যিস সতে বেটা টের পায়নি! নেপালবাবুর পকেটে আজ কড়কড়ে টাকা। আজ দুধ আসবে, একটু বেশি করেই আসবে, আর আসবে গোবিন্দভোগ চাল। আর...আর, ফেরার পথে মুদির দোকানে একটিবার ঢুঁ মারতে হবে। উমদা কাজু-কিশমিস চাই, সঙ্গে চাই পাটালি, ভালো খেজুর গুড়ের পাটালি। আজ নেপালবাবু পায়েস রাঁধবেন। নলেনগুড়ের পায়েস। ছেলেবেলায় শোনা একটা গান গুনগুন করে ভাঁজতে গিয়ে নেপালবাবু টের পেলেন, মুখের ভেতরটা লালায় ভরে যাচ্ছে: "আযা পিয়া, তোহে পেয়ার দুঁ/ গোরি বাঁইয়া..." -বেশি লাগবে না? কী বলিস! আরে, পরমান্ন বলে কথা! -"তা'বলে অ্যাত্ত!" বিস্ময়ে হারুর মায়ের হাঁ বন্ধ হতে চায় না। -নয়তো কী? দু'কেজি দুধে একমুঠো চাল। সরেস গোবিন্দভোগ। এই হচ্ছে হিসেব, বুঝলি? -কই, বিশ্বেসদের বুড়িটা সেবার পায়েস দিয়ে গেল... সেই যে গো, মনে নেই? আরে, নাতিটার বাট্টে না কী যেন ছিল... তা, তিনি তো... -থাম দিকিনি, থাম! ওটা পায়েস হয়েছিল? দুধ একদিকে, চাল একদিকে, আর চিনি আর একদিকে। যেন কারো সঙ্গে কারোর মুখ দেখাদেখি নেই! ওই সাদা ফ্যাটফ্যাটে দুধ-ভাতের নাম পায়েস? ছোঃ! ডানহাতে হাতাটা নাড়তে নাড়তেই বাঁ-হাতখানা নেড়ে নেপালবাবু বিশদে বোঝাতে শুরু করেন, "চালটা যখন সেদ্ধ হয়ে আসবে... টিপে দেখে নিতে হয়, বুঝলি? তখন পাটালিগুলো ছেড়ে দিয়ে দুধটাকে ফুটতে দে। যত ফুটবে, তত ঘন হবে। শেষটায় যখন লালচে হয়ে আসবে, দেখবি বুজকুরি কাটছে... তখন আঁচ বন্ধ করে ঢাকনা দিয়ে দাও, ব্যস! খালি নামানোর সময় এট্টু কাজু-কিশমিস ছড়িয়ে দিলেই..." নেপালবাবু জিভের জল সামলান। অশথ্ব গাছটার মগডালে একটা পেটকাটি ঘুড়ি আটকা পড়েছে। উত্তুরে বাতাসে বল পেয়ে, ঘুড়িটা আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাঁধন কাটিয়ে পালানোর। আওয়াজ হচ্ছে লাগাতার... ফরফর...ফরফর... জানলা দিয়ে একমনে সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন বলেই হারুর মায়ের কথাটা তাঁর ঠিক কানে গেল না। -কে আসবে বললি? -ঝুমুদিদি গো! বাচ্চাদুটোরে ইস্কুল থেকে নেবার পথে হয়ে যাবে বলল। অশথ্ব গাছের মাথা থেকে মনটা মাটিতে ফিরে আসতে খানিকক্ষণ সময় নেয়। আচমকা হোঁচট খেয়ে কোঁৎ পাড়ার মত থেমে থেমে প্রশ্নটা করলেন নেপালবাবু, "ঝুমু...আসবে! এখানে! মানে, আজ? আজই? মানে, তুই...তুই জানলি কীকরে?" । -ওই দেকো! আপনেরে ফোন করে পায়নি বলেই তো, আমায় খপরটা দেতে বলল... বাবু, আমার হারুটার জন্যি এট্টু পায়েস নে যাবো? ও বাবু?" একসঙ্গে হাজার হাজার ছুঁচ শরীরে বিঁধলে কেমন যেন অবশ-অবশ লাগে। তখন ঠান্ডা হাওয়ার ঠকঠকানিও আর টের পাওয়া যায় না, খোলা জানলার সামনে বসে থাকতে থাকতেই একটু ঢুল এসে যায়। আট নম্বর বিড়িটা দু'আঙুলের ফাঁকে ফুরিয়ে যেতে যেতে ছ্যাঁকা দিয়ে গেল। ঘুম জড়ানো গলায় একটিবার "উরিশ্শালা!" বলে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন নেপালবাবু। বাতিটা জ্বালানো হয়নি। ঘর অন্ধকার পেয়ে পায়ের কাছটা ছেঁকে ধরেছে মশায়। "ধুশ্শালা!" নেপালবাবু পায়ের গোছটা চুলকে নিলেন। রাত কত হল? বাইরেটাও কেমন থমথমে, কেবল অশথ্ব গাছটা থেকে এখনও শব্দ আসছে: ফরফর... ফরফর... ধুশ্শালা! ঘরময় তুলোর ওড়াউড়ি। নাতিদুটো দাদুর বালিশ নিয়ে কৌরব-পান্ডব খেলেছে। তারপর যুদ্ধবাজের বুভুক্ষা নিয়েই পায়েস সাবড়েছে, পাক্কা দু'বাটি। তাদের মাও বাদ যায়নি। আরও এক। চক্ষুলজ্জার খাতিরে জামাইয়ের জন্যও টিফিন কৌটো ভরে দিতে হয়েছে। বাকিটা নিয়ে গেছে হারুর মা। পায়েস খেয়ে হারূ কাল সকালে দাদুকে পেন্নাম করতে আসবে। ফরফর... ফরফর... "ধুশ্শালা!" ঘুড়িটার মরিয়া প্রচেষ্টায় এবার তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠেন নেপালবাবু। উঠে জানলাটা বন্ধ করতে যাবেন, পিছনে একটা 'ঠুং' শুনে তাঁর কান খাড়া হয়ে ওঠে। একজোড়া দুর্বল পা একটা একটা ক্ষয়াটে শরীরকে বয়ে এনেছে ঘরের ভেতর। পায়ের আওয়াজে ক্লান্তির ছাপ ঢেকে দিচ্ছে হাপরের মত শ্বাস টানার শব্দ। রোগা মানুষটার লম্বা ছায়া পড়েছে মেঝেতে। আর তার হাত থেকে যে জিনিসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা হয়েছে এইমাত্র, অন্ধকারেও সেটার দুলতে দুলতে স্থির হওয়াটা দেখতে পেলেন নেপালবাবু। সেটা আর কিছুই নয়, তাঁর পায়েসের হাঁড়ি! -কী গো? তুমি... এত রাত্তিরে! শরীরটা আবার খারাপ হল নাকি? রোসো, ডাক্তারকে একটা... ধুশ্শালা! ফোনটা আবার কোথায়... -আহ! থামবে তুমি? অত ব্যস্ত হবার কিছু হয়নি। -তবে? কনকলতার চোখজোড়া কোনদিনই ঠিক পটলচেরা নয়। তবে, শরীরটা রোগা বলেই বোধহয় চোখদুটো এখন বড়বড় দেখায়। সেই বড়বড় চোখদুটো কিছুক্ষণ নেপালবাবুর মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল। "খেয়ে নাও।" -খেয়ে নেব? কী খেয়ে নেব? -কেন? সারাটাবেলা হাত পুড়িয়ে যা রাঁধলে! শুয়ে থাকি বলে কি খবর পাইনা ভেবেছ? মেয়েরা যখন খাচ্ছিল, বিষনজরে দেখছিলে তো! নাও, যেটুকু আছে, খেয়ে উদ্ধার করো দেখি! -যাহ্! কী যে বল... ও পায়েস... ও আমি কীকরে খাবো? -কেন? -গেল মাসে সুগারের রিপোর্ট দেখে ডাক্তার কী ধমকটাই না দিলে! আবার পায়েস খেয়েছি শুনলে... ওরে বাবা! না না, রক্ষে করো! দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে মানুষটার কীর্তিকলাপ দেখে দেখে, কনকলতা এখন বিস্মিত হতেও ভুলে গেছেন। তবুও কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলেন, "তবে, অত খেটেখুটে রাঁধলে কেন?" নেপালবাবু একটা বোকাটে হাসি হাসেন। তারপর আমতা আমতা করে বলেন, "তোমার মনে আছে? ঝুমু তখন খুব ছোটো... রাঙাপিসিমাদের কুলতলির বাড়িতে খাঁটি গুড় আসত। পিসিমা পায়েসটা করতেনও চমৎকার! তুমি সেবার খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিলে।" -হুঁ... -বাপরে বাপ! এক জামবাটি পায়েস একাই মেরে দিলে। -যাহ্! মোটেই না। -"হে হে।" হাঁড়িটার গায়ে পায়েসের চাঁচিটুকু লেগে রয়েছে। নেপালবাবু সেটুকু যত্ন করে তুলে বৌয়ের মুখের সামনে ধরলেন। "নাও, খেয়ে নাও। লক্ষীটি।" দুই বুড়োবুড়ি পাশাপাশি বসে পড়েন। খানিকক্ষণ চুপচাপ, শুধু বাইরে থেকে আওয়াজ আসে, ফরফর... ফরফর... -ডাক্তারের সাথে কাল কী কথা হল গো? স্বামীকে নতমুখে চুপ করে থাকতে দেখে কনকলতা বলে ওঠেন, "দেখো, ডাক্তার যদি হাল ছেড়ে দিয়েই থাকে, আর ওসব ওষুধপত্তর-হাসপাতালের হ্যাঙ্গাম কেন? এই তো বেশ আছি! না বাপু, আর ওই রে নিতে যেতে পারবো না।" নেপালবাবুর মুখে ব্যথাতুর নীরবতা। কনকলতা আবার বলেন, "সমু এমাসে টাকা পাঠায়নি, না?" উত্তর নেই। নিস্তব্ধ ঘরে কেবল কনকলতার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। -শোনো, যেকটা দিন আছি, আমার সামনে অমন গোমড়া মুখ করে থেকো না বাপু! একটু হাসো তো! কী হল? সেই বোকাটে হাসিটা হাসতে গিয়ে নেপালবাবুর দু'চোখে জল টলটল করে ওঠে। -উফ! আচ্ছা, শোনো! এই, শোনোনা... কাল একটু দই-পটল করবে? কনকলতার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। এবার নেপালবাবুও সত্যিকারের হাসি হেসে ফেলেন। "তোমার মনে আছে? সেবার ভাগলপুরের জেঠুমণিদের বাড়িতে..." দুই বুড়োবুড়ির মাঝে একটা ঝুঁঝকো আঁধার এতক্ষণ গুমরে মরছিল। এবার কোথা থেকে একফালি মরা চাঁদের জ্যোৎস্না এসে জোটে। ঠিক নলেনগুড়ের পায়েসের মত তার রঙ। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, পেটকাটি ঘুড়িটা একটা দমকা বাতাস পেয়ে, অশথ্ব গাছের ডাল ছাড়িয়ে কোথায় যেন উড়ে চলে যায়।

152

9

সৌমিত্র বিশ্বাস

ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম

অনেক অনেক দিন হল সময় নিয়ে ব্লগ খোজা হয় না। আজ ছোট্ট বাবুটা সকাল সকাল ঘুমিয়ে যেতেই পুরোনো অভ্যসটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। গুগলে ঠিক কি লিখে সার্স দিয়েছিলাম মনে নেই কিন্তু এই সাইটা ইনডেক্সের প্রথমেই চলে এলো। ক্লিক করে এখনে এসেই চমকে গেলাম, একটু ব্যতিক্রমী মনে হল সবকিছু। চট করে রেজিষ্ট্রেশন করে ফেললাম।

165

3

ভোঁদড়

অমিতাভের পদ্য ইত্যাদি

ছিল নাকি‚ একফোঁটা জল? সেইখানে‚ দুপুরবেলায়? তেষ্টাও পেয়েছিল নাকি? মনে মনে এখন মেটাই|

168

0

মনোজ ভট্টাচার্য

মধ্য প্রদেশে ভ্রমণ !

মধ্য প্রদেশ ভ্রমণ ! ( তৃতীয় পর্ব ) মান্ডু বা মান্দভগড় – বোধহয় মণ্ডপ-দুর্গা থেকে হয়েছে ! দুর্গ মানে আশ্রয় ! দাই-মা কা ডেরা বা মহল – একটা গোলাকার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের সামনে আমাদের গাইড বেশ একটা ম্যাজিক দেখাল । প্রাসাদের ঠিক উল্টোদিকে একটা জলাশয়ের সামনে এসে – চেঁচিয়ে কিছু বললেই তার প্রতিধ্বনি আসতে লাগল । ঠিক একটা নিদিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ালেই প্রতিধ্বনিটা শোনা যাচ্ছে ! রূপমতির চত্বর ! এটা একটা পবিত্র ও সুন্দর প্রেমের কাহিনী । মালোয়ার রাজকন্যা রূপমতি খুব সুন্দর গান গাইতেন ও কবিতাও লিখতেন ! মান্ডুর সুলতান বাজ বাহাদুর রূপমতির গান শুনতে পেয়ে তার প্রেমে পড়ে যায় ও হিন্দু ও মুসলিম রীতিতে দুজনে বিয়েও করে ! একটা সর্ত ছিল ! প্রতিদিন সকালে সবার আগে রূপমতি গান গাইতে গাইতে নর্মদা দর্শন করবে ! আর সেই সময় বাজ বাহাদুর দূর থেকে তা অবলোকন করবেন ! বাজ বাহাদুর আর রূপমতির কাহিনী প্রসারিত হতে থাকল আর সম্রাট আকবরের কানেও এসে পৌঁছল – তিনি আদম খান নামে এক সেনাপতিকে পাঠালেন রূপমতিকে নিয়ে আসতে । সম্রাটের অতশত সৈন্যর কাছে মান্ডুর অতি কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বাজ বাহাদুর পরাজিত হল ! তাই দেখে রূপমতি তার অন্তরঙ্গ সখীদের নিয়ে বিষ খেয়ে আত্মঘাতি হন ! এইসব কারনেই এই রূপমতির চত্বর – এখানকার বাসিন্দাদের কাছে খুব পবিত্র ! কোনও এক সম্রাটের হারেমে নাকি দেড় হাজার বেগম বা রমণী ছিল ! তার আবার দুটো জিনিস একেবারে না-পসন্দ ছিল । এক – কোন রমণীর চুল যেন সাদা না হয় – আর দুই কোন রমনী যেন স্থুলকায়া না হয় ! – পাকা চুল সাদা হওয়ার জন্যে এক ধরনের ফলের গাছ আনা হয়েছিল । সেই ফলের সাবানের মতো মাথায় লাগিয়ে সামনের পুকুরের জলে ধুতে হত ! – আর স্থুলকায়া রানীদের জন্যে কি করা ! – সম্রাটের প্রাসাদে অনেক সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে হত রানীদের – সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে একটি করে আসরফি রাখা থাকত ! প্রতিটি আসরফি কুড়িয়ে কুড়িয়ে এনে জমা দিতে হত । পরে অবশ্য সেই আসরফিগুলো দিয়ে ইতরজনেদের মধ্যে ভোজ দেওয়া হত ! সিঁড়ির ধাপগুলো খুবই অসমান – উচু-নীচু ! একবার ওঠাই প্রচন্ড শ্রমসাধ্য ! তাই তো এখন সবাই জিমএ যায় ! কে অত সিঁড়ি ভাঙবে ! – আমাদের অনেকেই একবার উঠতে পারেনি ! এ রকম কত গল্প ও প্রেম-গাথা কথিত আছে ! – মনে হয় যেন প্রাসাদের প্রত্যেকটা গম্বুজ প্রত্যেকটা অলিন্দ এইসব সুখদুঃখের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ! কে জানে হয়ত কোন এক থামের ভেতরেই আছে – কোনও মানুষের জীবন্ত দীর্ঘশ্বাস ! লিখতে ভুলে যাচ্ছিলাম – খুব সম্ভবত জব্বলপুরে ঋষি হোটেলে আমাদের বাস থামতেই – বেশ কয়েকজন সুবেশা মহিলা মালা হাতে ও চন্দন সহযোগে সবাইকে সম্বর্ধনা করলো ! একদম হাওয়াইয়ান রীতিতে ! নিজেদের মনে হচ্ছিলো সম্মানীয় অতিথি ! সে তো বটেই ! আমরা তো সম্মানীয় অতিথি বটেই ! - কিন্তু কোনও হোটেলেই তো বিশেষ কোনও সম্বর্ধনা জানানো হয় হয়নি ! এমন কি এত জন অতিথি হোটেলে পদার্পণ করতেই – একটা অনীহা ভাব ! – ভালই লাগল ঋষি হোটেলটাকে ! এবং অবশ্যই মহিলাদেরও ! মধ্য প্রদেশ এত বড় ও এত দর্শনীয় স্থান আছে – যে কোনও ট্র্যাভেল এজেন্টএর মাধ্যমে এলে একবার কেন – কয়েকবার এলেও দেখা পূর্ণ হয় না ! আর আমাদের মত লোকেদের পক্ষে একাকি দেখাও সম্ভব নয় ! – তবু যেটুকু চোখে ধরে – মনে ধরে – দেখে যা - - ! ( শেষ ) মনোজ

255

11

শিবাংশু

কোলাহলকলম

বাঙালির উমা আসেন শরৎকালে। আমাদের উমা আসার কোনও নিশ্চিত সময় নেই। তিনি ছয়ঋতুর যেকোনও সময় এসে আবির্ভূত হ'ন। কিন্তু স্পিরিটটা একই রকম। মজলিশি ইভেন্ট ম্যানেজার পার এক্সেলেন্স শিল্পীদেবীর ফোন এসেছিলো দু'চারদিন আগে। এবার তিনি আসবেন বছরের শেষদিনে। তবে তো সেদিনই বোধন। সাকিন সেই একই। সাউথ সিটি মল। যেখানে ফুডকোর্টে নিজের গলার আওয়াজই শোনা যায়না। তবু আমাদের আড্ডা বোধ হয় কথা শুনতে পারলেও জমে যায়। সময় দেওয়া ছিলো দোপহর বারহ বজে। আমি সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছে দেখি ততোক্ষণে বাবিদা দ্য সিনিয়র থেকে সস্ত্রীক ঋত্বিক দ্য জুনিয়রসহ সোমা, সাহেবশঙ্খ অলরেডি পৌঁছে গেছেন।তবে দেবীর তখনও দর্শন নেই। একটু দেরিতেই এলেন উমামহেশ্বর, লক্ষ্মীদেবী সমভিব্যাহারে। একটু পিছিয়ে সুদীপদা। অ্যাবং সর্বশেষে কিকি দ্য গ্রেট। এমত আবহে কী আর গপ্পো জমতে দেরি হয়? দু'চারটে ভদ্রস্থ বিষয় 'আলোচনা'র পরেই ফোকাসে এসে যায় চিরাচরিত মজলিশি কিস্যার ইয়ার্কি ফাজলামি। গুরু বলেছিলেন, " এতো বুড়ো কোনওদিন হবো নাকি আমি/ হাসি'তামাশারে যবে কবো ছ্যাবালামি।" গুরুবাক্য বৃথা হয়না। অতএব ফোয়ারার মতো হাস্যপরিহাস আর মাঝে মাঝে কিছু গম্ভীর 'প্রপঞ্চ' (দেবাশিসের পেটেন্ট ট্যাগলাইন)। কী কী কথা হলো তার বিশদ এখানে দেওয়া হবেনা। সেসব শুধু আড্ডাধারীদের কপিরাইট। মহেশ্বরবাবু সক্রিয়ভাবে অন্যদের এলবো আউট করে প্রভূত খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করে ফেললেন। থিম ছিলো তাঁর বর্তমান নিবাস, স্যামচাচার ভোজনপসন্দ লিস্টি থেকে। সেসব উড়ে যেতে পলকও লাগলো না। তার পর আবার নতুন উদ্যমে পরচর্চা। ------------------- এর পরের আড্ডাটি আবার কবে হবে এই প্রসঙ্গে কথা উঠতেই স্থির হলো মজলিশের দীর্ঘমেয়াদি উপযুক্ত সুপাত্রের উদ্বন্ধনই হবে সঠিক উপলক্ষ্য। পাত্র নিজে এ বিষয়ে খুব নিশ্চিত না হলেও ধ্বনিভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়ে গেলো। আড্ডার নেশায় ঋত্বিক সেই খড়্গপুর থেকে ধেয়ে এসেছে। বাকিরাও ফিরে যাবে যথাস্থানে। আসছে বছর আবার হবে প্রতিশ্রুতিসহ সভাভঙ্গ হলো বটে। কিন্তু কাস্টমারি তিনতলার কাচের মেঝের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোটুসেশনটা না হলে আর কিছু না হোক, মহাভারত তো নিশ্চয় অশুদ্ধ হয়ে যাবে। তা কিছুতেই হতে দেওয়া যায়না। সেটা হলো। শেষ ছবিটি তোলা হবে কোনও অচেনা মানুষের হাতে। যাতে সবাই নিজেদের শ্রীমুখ নিয়ে ফোটোস্থ হবার গৌরব অর্জন করতে পারেন। তাও হলো। তবে মিস করলুম কয়েকজন নিশ্চিত মজলিশিকে। যাঁরা নানা কারণে এবার এসে পৌঁছোতে পারলেন না। পরের বার নিশ্চয় আসবেন। -------------------------- কৎবেলের জয়ধ্বনি দিয়ে ভক্তগণ নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।

172

7

মানব

আনকোরা আপডেট

চরিত্রঃ ১। প্রবাল – ইঞ্জিনিয়ার ২। মিহির – স্বনির্ভর ৩। অর্নব – সাহিত্যিক ৪। সুকান্ত – শিক্ষক (চারিদিকে প্রস্তুতি চলছে কলেজ ফেস্টের। বিভিন্ন রকম সাউন্ড চেক, লাইট চেকের শব্দ, আর ঝিকিমিকি নানা রঙের আলোতে চারিদিক মুখর। এরই মধ্যে অর্ণবের প্রবেশ।) অর্ণব – কলেজের ভাগ্যাকাশে আজ চাকরীর দুর্দশা। তার ক্লাসরুম গুলিতে আজ প্রতিশ্রুতির বাতেলা। কে চাকরী দেবে ষাটখানা ছেলেকে, কে ঘোচাবে তাদের বেকারত্বের জ্বালা... (দুরন্ত গতিবেগে প্রবালের প্রবেশ) প্রবাল – আরে অর্ণব যে, এতদিন পর কলেজের দিকে কি মনে করে? অর্ণব – আমি তো ভাই এখানেই থাকি। তুই ই তো এলি বহুদিন পর? আরে বেশ নধর হয়েছে তো চেহারাখানা। কি ব্যাপার? (ভুঁড়িতে খোঁচা মেরে) প্রেম ট্রেম নাকি? প্রবাল – হ্যাঁ তা পাঁচ বছর হয়ে গেল বৈকি। অর্ণব – ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে? প্রবাল – আরে তা না, আমি কলেজ ছাড়ার কথা বলছিলাম। আর লক্ষ্য করে দেখ আজকের দিনটাতেই আমাদের হস্টেল লাইফের শেষ হয়েছিল, আর সেই দিনটাও ছিল সোমবার। ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে বারবার। অর্ণব – আঃ অত চাপ নেওয়ার কোন দরকার নেই ভাই। এসেছি যখন বিন্দাস মজা করে কাটাবো। বেশি ক্যালকুলেশন কপচানোর দরকার নাই। প্রবাল – ধুর তোদের আর মানুষ করতে পারলাম না। তোর মনে আছে মাজিদা যখন তোকে সিগারেট ধরাতে বলেছিল তুই ধুপের মত করে সিগারেটখানা ধরলি আর জ্বালাতে গিয়ে পুরো সিগারেটটা কালো করে ছেড়ে দিলি। অর্ণব – তাও তো চেষ্টার কোন ত্রূটি রাখিনি বল। তবুও কি বিচ্ছিরি রকমের গালাগালি করল বল! প্রবাল – শালা অত দামি সিগারেট চোখে দেখেছিস কোনদিন? ওই জিনিস যদি কেউ পুড়িয়ে কালো করে দেয় যে কেউ তাকে খিস্তি মারবে। অর্ণব – কিন্তু মাজিদারও তো বোঝা উচিত ছিল যে আমি যখন সিগারেট খাইনা তখন নিশ্চয়ই আমি মুখে নিয়ে ধরাবোনা। প্রবাল – তা, লেখালেখি করে তো আশাকরি ভালোই কামাচ্ছিস। অর্ণব – হ্যাঁ ওই কি যেন বলে, ‘আমার বকলেসহীন জীবন জিন্দাবাদ।’ টাকাপয়সা ঠিকঠাক জুটুক বা না জুটুক, জীবনে আনন্দ আছে, মনের মত কাজ পেয়েছি বলে। সেই সময়ে ঠিকঠাক ডিসিশনটা নিয়েছিলাম বলেই তো। আর তোর সাথে সেই দুঘন্টার আলোচনা হয়েছিল এটা নিয়ে, মনে আছে? প্রবাল – মনে আবার থাকবেনা। সে যা টেনশন দিয়েছিলি! অর্ণব – (ফোনের দিকে তাকিয়ে) এই দেখ ভাগ্নের মেসেজ এসেছে। উন্নাসিক কি সমাস জিজ্ঞেস করছে। মেনে নিলাম দুচারখানা বই লিখে পেটের ভাতটা জোগাড় হয়ে যাচ্ছে। তাই বলে এরা কেন বোঝে না যে আমি বাংলা অনার্স নই, আমি বি. টেক. এর স্টুডেন্ট। জানিনা বললেও আবার উল্টো বিপদ। মনে মনে ভাববে মামাটা চোথা করে পাশ করেছে। প্রবাল – খুব একটা ভুল ভাববে কি? চোথা শিল্পে তুই যে বিবর্তন এনেছিলি, তা সত্যিই প্রেরণার যোগ্য। সে যাইহোক, আপাতত কি যেন বলছে ভাগ্নে? অর্ণব – হ্যাঁ, উন্নাসিক... প্রবাল – উনুনের শিক, জ্বলন্ত সমাস... অর্ণব – হাঃ হাঃ। তুই পারিসও। তা কাজকর্ম কেমন চলছে? অবশ্য তোর তো ভালভাবেই চলার কথা। ইঞ্জিনিয়ারিং কে ভালোবেসে তুই ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিস। নিজের প্রেমিকাকে বিয়ে করলে বিবাহিত জীবন সুখেরই হবার কথা। প্রবাল – (মাতলামি করে) শালা, প্রেম নিয়ে আমাকে গল্প শুনতে হচ্ছে একটা লেখকের কাছে, যে কিনা জীবনে একটাও প্রেমের গল্পও লেখেনি। কি দিন এলো মাইরি... অর্ণব – তোর মনে হচ্ছে নেশা হয়ে গেছে। চল চল একটু রেস্ট নিবি চল। সারারাত আবার জাগতে হবে তো। প্রবাল – আরে না। কোন নেশা টেশা নয়। এমনি একটু চমকে দিলাম। এই এলাকার এমন কোন নেশা নেই যেটা আমি চেখে দেখিনি। কিন্তু আজকাল আর তেমন সময় হয়ে ওঠেনা। কাজের বড়ই চাপ, সময়ের বড়ই অভাব। অর্ণব – আজ অন্তত ওসব ছাড়, ফুলটুস এনজয় করব আজকে... (প্রস্থান) (রাস্তা চলতে চলতে মিহির আর সুকান্তের মধ্যে গল্প) মিহির – সিরিয়াসলি জানিস, আমি ভাবতে পারিনি, তুই শালা মাস্টারবাবু আমার সাথে বার-এ মাল খেতে আসবি। আমি ভাবলাম তুই বড্ড অদর্শবান হয়ে গেছিস। সুকান্ত – সঙ্গদোষ রে, সঙ্গদোষ। সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে নরকবাস। তুই যে কি মাল, ভগবানও বোধহয় তা ডিসাইড করে উঠতে পারেননি। তাই আমাকে যদি স্বর্গ আর নরকের মাঝখানে ঝুলিয়ে ফেলে রাখেন, আমার অবস্থাখানা কি হবে ভেবে দেখেছিস? মিহির – আবে, ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঙ্গা পা আছে বলেই হাঁটার বদলে দৌড়াতে হবে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে? একটু ধীরেসুস্থে চলতে পারিসনা? সুকান্ত – তুই যদি পেল্লাই এমন একখানা পেট বানাস, যার ভার নিতে তোর পায়েরা হিমসিম খায় সেটা কি আমার দোষ? আস্তে চলতে বাপু আমার কষ্ট হয়। আস্তে চললেই মনে হয় যেন একটা পা ছোট আর একটা পা বড় হয়ে গেছে। মিহির - আরে ওই দুটোকে দেখ। কেমন হাঁ করে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আছে। হ্যাংলা যত্তসব। (স্টেজের অন্যপাশে পার্কের চেয়ারে প্রবাল আর অর্ণব বসে বসে গল্পগুজব করছে। প্রবালের হাতে কোল্ড ড্রিঙ্কস এর বোতল, আর অর্ণবের হাতে ফুল ক্রীম দুধের প্যাকেট। সে প্যাকেট টা ছিঁড়ে মুখে ঢালতে শুরু করল।) সুকান্ত – তা মামণিরা যখন দেখানোর জন্যই এত সেজেগুজে আসে, না দেখাটাই তো ওদের অপমান। দেখাটা তো ওদেরকে রেসপেক্ট জানানো বই আর কিছুই নয়। যখন অফিস জব করতাম, জানিস, শুধু ছেলেরা ফর্মালস পরে আসত। আর মেয়েরা হাত-কাটা, পা-কাটা, এখানে কাটা ওখানে কাটা পরে এলেও অফিসের বস কিচ্ছু বলত না। আর বলবেই বা কেন। শালা যত্তসব লোকদেখানো জেন্টলম্যান। দেশ এত উন্নত হওয়া সত্ত্বেও ছেলেরা সবদিক থেকে এত বঞ্চিত কেন বলতে পারিস? মিহির – সে তো বটেই। সব জায়গায় মহিলাদের জন্য সিট বরাদ্দ, আর এদিকে ওরা এসে বসছে জেনারেল সিটে। পুরুষ যাত্রীরা টোটাল কনফিউসড, মহিলা সিটটা খালি থাকা সত্ত্বেও বেচারারা বসতে পারেনা, পাছে কোন মহিলা এসে অপমান করে তাকে তুলে দেয়। সুকান্ত – এ তো দেখছি মদ খাওয়ার আগেই আমাদের নেশা চড়ে গেছে। চল ওদের সাথে দেখা করি। মদ খাওয়া চুলোয় যাক। ওই ব্যাটা অর্নব, ওই প্রবাল... এসেছিস একবার জানালিনা? সেই তো দেখেই ফেললাম। অর্ণব – আরে তা নয়। আমি কাউকেই জানাইনি। ভাবলাম একবার এমনি এমনিই ঘুরে আসা যাক। এখানে এসে হঠাৎ করেই প্রবালের সাথে দেখা, আর এখন তোদের সাথে। তা ভাই মিহির, তোমার স্বনির্ভর প্রকল্প কেমন চলছে? মিহির – আর বলিসনা। আমার প্রথম প্রকল্প ছিল কাঁচামাল কিনে এনে জোড়া লাগিয়ে পাওয়ার ব্যাঙ্ক, মিনি টর্চলাইট এইসব বানিয়ে বিক্রী করা। তা ধীরে ধীরে কাজটা কেমন যেন বোরিং টাইপের হয়ে যাচ্ছিল, আর শরীরে অত ধকল সহ্য হচ্ছিল না। একদিন পুরনো কোম্পানি থেকে পাওয়া আমার বিজনেস কার্ড পকেট থেকে পড়ে গেল, আর একজন ক্রেতার চোখে পড়ল সেটা। সে বলল, ‘একি, তুমি এতবড় কোম্পানিতে চাকরী করতে, আর আজ দরজায় দরজায় ফেরি করে বেড়াও? কি ব্যাপার, চাকরী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি? চুরির কেস?’ রাগে মাথায় রক্ত উঠে যাবার যোগাড়। কোনরকমে নিজের রাগ সামলে বাড়ি ফিরলাম। তারপর ডিসাইড করলাম, করতেই যদি হয় তো শালা ইনোভেটিভ কিছু করব। অর্ণব – তা কি এমন করলি ভাই? আমরাও ট্রাই করতে পারি তাহলে। স্বনির্ভর সংস্থা একটা খুলেছিস জানি, কিন্তু কি নিয়ে কাজ করিস তার ডিটেলস আর জানা হয়ে ওঠেনি... মিহির – একটু মার্কেট ঘেঁটে পাবলিকের দাবীটা বুঝতে চেষ্টা করলাম। তারপর অনেক এদিক ওদিক ঘুরে, অনেক তথ্য সংগ্রহ করে বাজারে ছাড়লাম সস্তায় স্মার্টফোনের জন্য সোলার চার্জার। ওইযে তোর হাতে যে পাওয়ার ব্যাংকটা রয়েছে, ওঠা আমার কোম্পানিরই তৈরী। দিনের বেলা ঘন্টা দুয়েক রোদে ফেলে রাখলেই হল। পুরো চারদিন তোর মোবাইলকে জাগিয়ে রাখতে পারবে, উইথ নেট, ইভেন উইথ জি. পি. এস.। সুকান্ত – আরিব্বাস, একটু লেগ ডাস্ট দাও গুরু। মিহির – আরে করিস কি! টিচার হয়ে যদি আমার লেগ ডাস্ট নিতে চাস, তাহলে লক্ষী, সরস্বতী দুজনেরই অভিশাপ লাগবে। প্রবাল – ভাই, তোর কোম্পানিতে একটা চাকরী হবে? মিহির – না ভাই, অত মাইনে দিয়ে আমি লোক রাখতে পারবনা। কোনরকমে দুচারটে প্রোডাক্ট বেচে ক’রে খাচ্ছি, আবার তোদের মত বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার রাখতে গেলে, দেনার দায়ে নিঃস্ব হয়ে যাব। আমার ব্যাবসায় নজর দিসনা বাপু। বেশ তো চাকরী করছিস। সুকান্ত – তা অর্ণব তুই তো লেখালেখির পাশাপাশি নাটক টাটকও করতিস এককালে? সেসব কি এখনও করছিস নাকি? লাইনটা তো মোটামুটি একই রকম... অর্ণব – বাহ, বেশ সময়ে প্রশ্নটা করেছিস। এ সম্পর্কে আমি একটা নাট্যকাব্য বা কাব্যনাট্য টাইপের কিছু লিখেছিলাম, সেটাই তবে করে শোনানো যাক। আশাকরি এই প্রশ্নের উত্তর এর মধ্য দিয়েই পেয়ে যাবি। এই চল তো পার্কের মাঝে মিনি স্টেজটায় গিয়ে পড়া যাক। দুচারটে দর্শক যোগাড় হলেও মন্দ হয়না। প্রবাল – হ্যাঁ হ্যাঁ, চল না। কলেজ লাইফে কতবার স্টেজে উঠে মেকআপ দিয়েছি। শুধু কি বলতে হবে বলে দে। অর্ণব – আরে নিজে থেকে কিছু করতে হবেনা। শুধু এই কাগজে যা লেখা আছে, হ্যাঁ, এই ক্যারাক্টার টা তুই পড়বি, আর এটা আমি। (দুই বন্ধু হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে পার্কের মাঝের ছোট্ট স্টেজে উঠে জোর গলায় শ্রুতিনাটক শুরু করে দেয়।) মিহির – পাগলা আছে মালদুটো, সিরিয়াসলি। (স্টেজ থেকে প্রবাল ও অর্ণব) - ওহে গোবর্ধন, শুনিলাম নাটকের দলে লিখাইয়াছ নাম! - শুনিয়াছ ভায়া সঠিক, তবে মামলা বড়ই প্যাথেটিক। - কি এমন বল’ ঘটিল’? কহিতেছ কথা এমন জটিল... - রোজ রোজ করিতেছি রিহার্সাল, বস বা ডিরেক্টর সবাই দিতেছে গালাগাল নিজের জন্য বল সময় কোথা পাই বিজি শিডিউল-এ তিল ধারণের নাইকো ঠাঁই। - আহা! দু-চারখানা রোল দাও নামিয়ে, ফাউ-ফকটে কিছু পয়সা নাও কামিয়ে। - সে গুড়ে ভায়া বালি, চা-সিঙ্গারাই মাঝে মাঝে জোটে খালি। আর টাকা? এসব কাজে পকেটই শুধু হয় ফাঁকা। অফিসেতে কাজ করে পাই ঘন্টায় এক শত বিশ, আর নাটক করা, যেন ঘরের খাইয়া তাড়াই বনের মহিষ। - আমার ঘন্টা তো ভাই আরও সস্তা, মাঝে মাঝে যদি করি বিকেলের নাস্তা পকেটেতে টান পরে মাসের শেষকালে, পড়া শেষে পড়লাম চাকরীর জাঁতাকলে। এর থেকে মুক্তির উপায় কি আছে? জানিতেই আসিলাম তোমার কাছে। - আমার কেস ভাই বড়ই জটিল, রিহার্সালে যেতে যেতে খবর রটিল, করিতেছি হিরোগিরি বড় এক দলে, বসের কানে খবরটা কেউ দিল তুলে। সর্বনাশের মাথায় বাড়ি, এরেই বোধহয় কয়, ইনক্রিমেন্টের তো হলই নয়ছয়, তার উপর শোনালেন বন্ধ ঘরে ডেকে সরে এসেছি যে আমি কাজের ফোকাস থেকে। আতস কাঁচ নিয়ে তাই তুললাম ছবি ফেসবুক-এ আপলোডে লাইক পেল খুবই। - আমার এমন হলে থুথু ফেলে ডুবি, তুমি হয়ে গেলে ভায়া ফ্রাস্ট্রু খাওয়া কবি? - ভগবানের দয়া ভায়া, তিনিই করেন সবই। ওসব ছেড়ে এবার তুমি একটু কাশো ঝেড়ে, কেন তব আগমন এতদিন পরে? - আসিনাই জেনো শুধু খোঁজ খবর নিতে ভাবিলাম একটু হোক খাওয়াদাওয়া ফ্রিতে তার সাথে নাটকের কথাটাও পাড়িব কি করিয়া তোমার দলে আমিও ভিড়িব এতক্ষণ শুনিলাম তোমার বিবরণ মনে হয় পেলাম যেন নতুন এক জীবন নাটক ফাটক মাথাতেই থাকুক আপাতত এখন শুধুই লিখে যাব আজব সাহিত্য এই নাও তোমার কপি, এই কপিটা আমার শুরু করি পড়তে তবে এর সারৎসার... (দুজনে মিলে সুর করে) আহা সবাই মিলে ওপেন দিল-এ খুলেছিলাম গ্রুপ হঠাৎ করেই মোদের ফটোয় লেগে গেল ধুপ কি জ্বালা বল... কি জ্বালা বল...ছলছল করছিল দুচোখ তবু বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ‘ওদের ভালো হোক’ যেমন সবাই বলে... যেমন সবাই বলে...দলে দলে যোগ দিয়ে নির্দলে সময় ঘড়ি, নদীর জলও সেই নিয়মেই চলে আমিও চলে যাব... আমিও চলে যাব...মলে যাব সব ব্যাটারই কান যে দলেরই হোক, অভদ্রলোক, সে বাম কিম্বা ডান, যতই ঝাড়ুক ইংলিশ... যতই ঝাড়ুক ইংলিশ...করুক মালিশ, মাখন কিম্বা তেল আসলে লোক দেখানো দেখনদারি, সব ব্যাটাই আঁতেল আমিও আঁতেল বটি... আমিও আঁতেল বটি...খুঁটিনাটি গুচ্ছ আদিখ্যেতায় তাই নতুন করে ভাবের ঘোরে এলাম আবার হেথায়... আহা হরি বল... আহা হরি বল...কাঁধে তোলো নিতে পারলে ওজন নইলে লোক ডাকো, ডাকতে থাকো, যত প্রয়োজন...(Tempo X 1, 2, 3, 3) (চারিদিকে দর্শকরা হাততালিতে ফেটে পড়ল। মাঝে মাঝেই কোরাসে শব্দ শোনা যায়, ‘আর একটা হোক, আর একটা হোক’।) অর্ণব – না না, স্টকে যেটুকু ছিল ছেড়ে দিয়েছি। আর কিসসু নেই... এই তোরা বুঝতে পারছিস তো আমার কেসটা? নাটক করার আনন্দ? সুকান্ত – বিলক্ষণ! সে আর বলতে। তা এখন তো চাকরী ছেড়ে দিয়েছিস, এখন তো আবার নতুন করে চেষ্টা করতে পারিস? অর্ণব – না ভাই, ওটা আর হবেনা। তবে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছি কয়েকটা, একটা মোটামুটি সিলেক্টও হয়ে গেছে। সুকান্ত – বাংলা তো? ভালো বাংলা সিনেমা প্রায় উঠেই গেছিল একটা সময়। তোদের মত দুচারটে উটকো লেখক এসে পড়াতে তাও একটা দুটো ভালো সিনেমা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে... চেষ্টা চালিয়ে যা বস। অর্ণব – আমার লেখার থেকে অনেক নিম্নমানের লেখা নিয়ে সিনেমা অলরেডি হয়ে গেছে ভাই। কোথাও না কোথাও তো চান্স পেয়েই যাব। তবে তোর কাজটা বেশ শান্তির, তাইনা? সুকান্ত – একরকম বলতে পারিস। ছেলে পড়িয়ে যে আনন্দ তা আর কিছুতেই নেই। আর একটা মজা কি জানিস? একটা সময়ে ছাত্র হিসাবে যে সাবজেক্ট গুলোতে প্রায় ফেল করতে করতে বেঁচেছি, টিচার হবার পর সেগুলো কত সুন্দর করে বুঝে যাই, আবার গোটা ক্লাসকে সেগুলো বুঝিয়েও দি। মিহির – ভাবা যায়!! আরে যেটা বলার জন্য তোদের কাছে আসা... এইভাবে হ্যাংলার মত মেয়ে দেখছিলি বলে দূর থেকেই তোদের চিনতে পেরেছি। তা বিয়ে টিয়ে কবে করছিস? প্রবাল – প্রেমটা আগে জুত করে করতে হবে, তারপর বিয়ে। তোরা শুরু কর, আমি লাইনে তো থাকলামই। সুকান্ত – উহ, একটা সময় তোর পাল্লায় পরে যা সময় গেছে। ব্যাটাচ্ছেলের উঠলো বাই তো বেনাচিতি যাই। সারারাত ধরে একটা অচেনা মেয়ের বাড়ি খুঁজতে সারারাত ঘুরিয়েছিস। তারপর রাত দুটোর সময় খিদেয় তেষ্টায় দাদুর দোকানে গিয়ে আলুসেদ্ধ দিয়ে স্যান্ডুইচ। মিহির – দাদুর ব্যাবসায়িক বুদ্ধি কিন্তু দারুণ ছিল বল... রাত দুটো থেকে ভোর পাঁচটা... তার মধ্যেই যা ইনকাম। মাত্র তিনঘণ্টা ডিউটি্‌। আমরা এত পড়াশুনা করেও ওই দাদুর ধারেকাছে পৌঁছাতে পারলামনা রে। তা আমি বিয়ে করছি, সঙ্গীতা কে, পরের বছর। সবাইকে ছুটি নিয়ে আসতে হবে কিন্তু বলে রাখলাম। সুকান্ত – ওরে কাকা। তলে তলে এসব চলছিল, জানতেও পারলামনা কোনদিন। যাইহোক আমাদের জানিয়েছিস, নেমন্তন্ন করেছিস এতেই আমরা ধন্য। তা অর্ণব বাবা, তোমার বিয়ের ব্যাপারে কিছু বল’। অর্ণব – তুই কি শেষে বিয়ে পাগলা হয়ে গেলি নাকি? এক তো বাড়িতে এত টেনশন দিচ্ছে বিয়ে বিয়ে করে এখন আবার তুই এলি। বাড়ি গেলেই তিন-চারটে করে ফটো নিয়ে দেখাতে বসে যায় মা বাবা মিলে। ছেলেটার একটা হিল্লে হয়ে গেলে যেন বাঁচে। এবার দেখবি ধীরে ধীরে কন্যাদায় কথাটা উঠেই যাবে। পুত্রদায়ে পরবে বাবা-মায়েরা এবার। সুকান্ত – আরে ওই মেয়েটাকে দেখ কি হেব্বি দেখতে, চেনা চেনা লাগছে না? প্রবাল – তোর মেয়ে মেয়ে বাই গেলনা বাপু। মেয়ে দেখলেই খালি চেনা চেনা লাগছে। বাড়িতে জানে? অর্ণব – আরে ও তো আমাদের হস্টেলের পাশের কলোনিতে থাকত, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট রসিকের মেয়ে না? হ্যাঁ হ্যাঁ। দ্যাখ মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেছে। সুকান্ত – ধুর তোদের সঙ্গে পার্কে বসে বাওয়ালি করতে গিয়ে আমাদের বার-এ যাওয়ার প্ল্যানটাই ভেস্তে গেল। সে কি আর করা যাবে, বন্ধু যখন, রাস্তায় একা তো আর ছেড়ে দিতে পারিনা। নিজের নেই ঠিকানা, হাজার লোকের আনাগোনা। অর্ণব –(ঘড়ি দেখে) আরে অনেকটা দেরি হয়ে গেল, এই সময় রিইউনিয়ন না কি যেন একটা হবার কথা আছে চল চল কলেজে যাওয়া যাক। মিহির – ও, তাই নাকি, চল চল। প্রবাল – সবই তো হল কিন্তু ক্যাম্পাসিং এর কি হালচাল? সুকান্ত – মনে তো হয়না কিছু হচ্ছে বলে, তাও ছেলেগুলো দুঃখ ভোলার জন্য যে এরকম একটা চেষ্টা করছে আমাদের সবাইকে ডেকে এনে, এটাই তো অনেক। অর্ণব – একি... লুৎফার চোখে, থুরি সুকান্তের চোখে জল?(চোখ মুছিয়ে দেয় আবেগের সঙ্গে) সবাই হেসে ওঠে... (সমাপ্ত)

153

2

Aratrik Mukhopadhyay

হংসচঞ্চু

আমরা যখন বাইরে খেলতে যেতাম, দু’টো দল মিলে একটা দল হয়ে যেত। আর সেই দলে গোলে সিরাজ, সেন্টার ব্যাক হোঁদল, হাফে ভৃগুদা, ফরোয়ার্ডে আমি আর নেলো ছিলাম বাঁধা। ভৃগুদাও বাঁধা ক্যাপ্টেন। একবার তিনটে স্টেশন পরে একটি শহরে গিয়েছি। রেল লাইনের ধার দিয়ে রাস্তা। সাইকেল করে দুপুর দুপুর পৌঁছে গেলাম। রাঙাকাকাকে নিয়ে হোঁদল পৌঁছল গাড়ি করে। আমরা সবাই মোহনবাগান। হোঁদলটা কেন কে জানে ৩ নম্বর জার্সি পরত। খেলা শুরু হওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যে দেখা গেল, হোঁদল একা দশ জন হয়ে ডিফেন্স সামলাচ্ছে। সিরাজ দু’টো আসাধারণ সেভ করে দিয়েছে। আমার পায়ে কোনও বলই আসেনি। নেলো একবার বল নিয়ে উঠতে গিয়ে ল্যাং খেয়ে পড়েছে। ভৃগুদা বল ধরলেই তিন জন করে তাকে ঘিরে ধরছে। রাঙাকাকা আমাকে নেমে খেলতে ইশারা করল। আমি একটু বেশি নেমে গেলাম। হোঁদল একজনকে ট্যাকল করে বলটা ক্লিয়ার করে দিতে গিয়ে দেখে সামনেই আমি। হোঁদলের সেই বিখ্যাত উক্তিটা তার ঠিক পরেই। বলটা পায়ের টোকায় আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘যা, গোলটা করে দিয়ে আয়।’ গোলটা হয়েছিল। আর তারপর থেকেই হোঁদলের কথাটা আমাদের মহলে বিখ্যাত হয়ে যায়। কেমন একটা বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল, হোঁদল যদি বলত, গোলটা করে দিয়ে আয়, তা হলে গোল হবেই। কথাটা শোনার জন্যই মাঝেমধ্যে নিজেদের ডিফেন্সের কাছে ঘোরাফেরা করতাম। রাঙাকাকা গালাগাল করত। তাই হোঁদলই হাফ লাইন অব্দি উঠে এসে অনেক সময় আমাকে চিৎকার করে কথাটা বলে দিয়ে নেমে যেত। নেলো একদিন বলল, ‘আমাকেও বল’। হোঁদল বললও। নেলো বল নিয়ে সোঁ সাঁ করে উঠে তিন জনকে কাটিয়ে গোলকিপারের হাতে বল তুলে দিয়ে ফিরে এল। হোঁদলের পরবর্তী বিখ্যাত উক্তিটি তারপরে—‘তুই আমার সম্মান নষ্ট করলি।’ অধবদন নেলো আর কোনওদিন হোঁদলের কাছ থেকে বল চায়নি। হোঁদল আমাদের চেয়ে বছর দু’য়েকের বড় ছিল। চেহারাটা তো বড় ছিলই। শিক্ষাগত যোগ্যতাতেও নেলো আর সিরাজের চেয়ে এগিয়ে। তাই সবসময় কত্তামি করত। গুণ কখনও কখনও কিছু কম পড়ছে দেখে মূল্যবোধ নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিল। তাতে সত্যিই ওর আর একটা পরিচয় তৈরি হল। বছর কয়েক পরে গ্যারাজ করার সময় সমবায় ব্যাঙ্কের লোন নিতে যায়। একে তো সবাই চেনা। তার উপরে রাঙাকাকা গ্যারান্টার। তাই কোনও ঝামেলা সুদূর দিগন্তেও নেই। কিন্তু কে জানে কেন, হোঁদল কাগজখানা ভাল করে পড়ে দেখল, ঋণগ্রহীতাকে অন্তত দশম শ্রেণি পাশ হতে হবে। সত্যবাদী হোঁদল ম্যানেজার শিশিরকাকাকে গিয়ে বলে এল, সে মাধ্যমিকে ফেল করেছে। তিন বার দিয়েছে। তিন বারই ফেল করেছে। শিশিরকাকা হলেন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর নাম মুষল হওয়া উচিত ছিল। অমন কড়া প্রকৃতির সত্যনিষ্ঠা সচরাচর দেখা যায় না। প্রতি বছর বিবেকানন্দের জন্মদিনে বিরাট শোভাযাত্রা বার করতেন। আর সবাইকে কেক, ডিমসেদ্ধ, কলা, সন্দেশের টিফিন দিতেন। অতএব, সত্যবাদিতা ও সত্যনিষ্ঠার যুগলবন্দিতে হোঁদলের লোন ক্যান্সেল। রাঙাকাকা অফিসের টুরে বোম্বে গিয়েছিল। ফিরে এসে কাগজপত্র নিয়ে শিশিরকাকার বাড়ি গেল। তারপরে ফিরে এসে হোঁদলকে বলল, ‘কাল গিয়ে টাকা নিয়ে আসবি। একটা কথা বললে মেরে দাঁত ভেঙে দেব।’ কিন্তু কী করে পারল? রাঙাকাকা মুচকি হেসে বলল, ‘ক্লজটা হচ্ছে ক্লাস টেন পাস। আরে ক্লাস টেনের টেস্টে তো ও পাশ করেছিল। তাতেই হবে। মাধ্যমিকের কথা কিছু ক্লজে নেই।’ গ্যারাজটা হওয়ার পরে হোঁদল একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মধ্যে ওই তখন সব থেকে বেশি রোজগার করে। তার উপরে নিজের ব্যবসা। রাঙাকাকার ঠেলায় ও জর্জ টেলিগ্রাফে কয়েকদিন প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সত্যবাদিতাটা একটা বিপজ্জনক ব্যাপার। হোঁদল ফাঁকি দিতে পারত না। রোজ রোজ যেত, সময় মতো যেত। তাই শেষ পর্যন্ত অনেক কিছু শিখেও গেল। এ ব্যাপারে ওর একটা ন্যাকও ছিল। রাঙাকাকার গাড়ি চালাচ্ছে সেই কবে থেকে। ব্যবসাটা তাই জমিয়ে ফেলেছিল। হোঁদল বিয়েও করে ফেলল এক দিন। আমি তখন দিল্লিতে। ওর গ্যারাজেরই পিছনে একটা ঘর তুলেছিল। ওর বাবার ছিল মাইকের ব্যবসা। সেই ব্যবসা ও বাড়ির প্রতি কোনও টান ছিল না। ও বরং আমাদের বাড়িতেই থাকত। বিয়ের পর ওই ঘরে গিয়ে সংসার পাতল। আমি ফেরার পরে সামান্য যে কয়েকদিন শহরে ছিলাম, হোঁদলের স্ত্রীর সঙ্গে ভাল আলাপ হয়ে গিয়েছিল। জেলেপাড়ার এক প্রান্তে তাঁদের বাড়ি। তাঁর বাবাকে চিনতাম। খুব ভালমানুষ। কিন্তু হোঁদলের বিরাট চেহারার পাশে ওই ফুরফুরে মেয়েটিকে কেমন যেন লাগত। হোঁদল খাটের উপরে লুঙ্গি পরে বসে হাসি হাসি মুখে তাঁর দিকে চেয়ে থাকত, এটা অনেকবার দেখেছি। হোঁদল স্বীকার করেছিল, তার গ্যারাজের পাশ দিয়ে স্কুলে যেত সেই মেয়ে। তখনই প্রণয়ের সঞ্চার। হোঁদল কী জানি কেন মনে করেছিল, যে মেয়েকে সে একবার প্রণয়ের চোখে দেখেছে, তাকেই বিয়ে করবে এবং আর কোনও মেয়েকে সে চোখ তুলে কখনও দেখবে না। এটা কী ধরনের সত্যবাদিতা তা জানি না। হোঁদলের কাছেও কোনও ক্লু ছিল না। কিন্তু এটা দেখেছিলাম, হোঁদল সৎ বলতে আরও নানা কথা মনে করত। যেমন, ওর ধারণা ছিল, রাঙাকাকা একজন গুরুদেব প্রকৃতির লোক। কোনও বড় কাজ থাকলে, রাঙাকাকা, মেজোকাকাকে প্রণাম করে আসত। কিন্তু ব্যবসাটা পড়ে গেল। প্রধানত কয়েকটি বড় গাড়ি সারানোর দোকানের চেন তৈরি হয়ে যাওয়ায়, ওর মতো ছোট গ্যারাজে আর কেউ আসত না। শেষ তক, শুনেছিলাম, ও টোটো সারাত। এটা একধরনের ব্যাটারি চালিত ছোট ভাড়ার গাড়ি। অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু খুব চলে। নিজেও একটা টোটো কিনেছিল। সেটা কখনও কাউকে চালাতে দিত। কখনও নিজেই চালাত। বিয়ের অনেক দিন পরে ছেলে হয়। ছেলেকে ভর্তি করেছিল রামকৃষ্ণ মিশনে। হোস্টেলে রাখত। একবার ছেলের ছবি দেখতে চাওয়ায় গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ‘ও সব হবে না। এসে দেখে যা।’ ঠিক। আমার ছেলে হওয়ার সময় সারা রাত নার্সিংহোমের সামনে তো ও দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে বিড়ি দিয়ে বলেছিল, ‘অত সিগারেট খাস না। বিড়িতে ক্ষতি কম হয়। নে, একটা ধরা।’ হোঁদলের রিপুর দোষ ছিল অখাদ্য প্রীতি। বরাবর ও হাবিজাবি খেতে ভালবাসত। সত্যবাদিতার যে বিপুল একটা সংজ্ঞা ও বানিয়েছিল, তা থেকে কী করে এটা বাদ পড়ে গিয়েছিল, জানি না। শুনলাম, এখন নাকি রোজ সন্ধে বেলা রাস্তার রোল-চাউমিন খেত। খেতও অনেক। ছোটবেলায় মনে আছে, পেয়ারা খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। গোটা পনেরো শেষ করে হাই তুলত। আমরা অনেক বার বারণ করেছি। কে কার কথা শোনে! বলেছি না, ও নিজেকে আমাদের কত্তা ভাবত। ফোনে খবর পেলাম, ও আর নেই। ভোররাতে বাথরুমে গিয়েছিল। তারপরে ঘরে ফেরার সময় আচমকা স্ট্রোক। ছিটকে পড়েছিল ঘরের দাওয়ায়। ওর স্ত্রী ফোন ধরে বললেন, ‘আমি পুরোটা দেখেছি জানেন। ও বাথরুম থেকে বেরোনোর সময় দরজাটা জোরে খুলেছিল। তারপর দেখি বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল। একটা হাত ছিল ঘরের দরজাটার পাল্লায়। আমি ভাবছি এই আসবে এই আসবে। হঠাৎ দেখি, দুম করে ছিটকে পড়ল। ছুটে গিয়ে মাথাটা তুলে ধরে দেখি, চোখ দু’টো স্থির।’ ওর ছেলেকে এই প্রথম দেখলাম। হোয়াট্যসঅ্যাপ ভিডিও কলে। বলল, ‘কাকা, আজ আসতে হবে না। পারলে পরে একবার আসবেন। আর শ্রাদ্ধের দিন রাঙাদাদুকে নিয়ে আসবেন।’ ভৃগুদাকে ফোনে জানালাম। সবে ঘুম থেকে উঠেছে। বলল, ‘তোর মনে আছে, ও তোকে বলেছিল যা গোলটা করে দিয়ে আয়।’ ‘আছে।’’ ‘‘মজাটা কী জানিস, এখনও আমি কোথাও আটকে গেলে শুনতে পাই, হোঁদল তোকে চিৎকার করে বলছে, যা গোলটা করে দিয়ে আয়। আর ম্যাজিকের মতো কাজ করে মনে।’’ ‘‘ধুস। কী সব বলছ।’’ হঠাৎ শুনতে পেলাম, রাঙাকাকা কাকে যেন হাসি হাসি মুখে ফোনে বলছে, ‘আরে আমি তোমাকে লোক পাঠিয়ে দেব। তুমি এখন বুড়ো বয়সে কোথায় যাবে। যাকে পাঠাব, তোমার গাড়ি পুরো ঠিক করে দেবে। আমার ছেলের মতো। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।’ রাঙাকাকাকে বলিনি। বলার সাহসও পাচ্ছি না। হোঁদল থাকলে বলতাম, একবার প্লিজ বল, ‘যা গোলটা করে দিয়ে আয়।’

1166

227

Dr Samya Dutta

তিন এক্কে তাতা

আপনি যদি মনে করেন, ভরপেট ভাত আর পাশে পাশবালিশ পেলেই একটি নিটোল ভাতঘুম সেরে নিতে পারবেন, তাহলে বলতে হয়, আপনি ঘুমিয়েই আছেন, এখনও ঘুমোতে শেখেননি। ঠিক যেরকম এবং যতখানি ঘুমুলে তাকে তোফা ঘুম বলা চলে, সেরকম ঘুম এক তোফা- অর্থাৎ উপহার বিশেষ। ভাতের গরম আর পাশবালিশের নরম ছাড়াও আরেকটা জিনিস লাগে। এতক্ষণ যে বইটা পড়তে পড়তে চোখের পাতা বুজে আসছিল, সেইটা আড়াআড়ি বিছিয়ে দিন বুকের ওপর। এইবার চোখ বুজেই দিব্যি টের পাবেন, ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি আপনার মাথার কাছটিতে বসে ইকির-মিকির খেলছেন। আর পায়ে-পায়ে ঘুমপরী নেমে আসছেন আপনার চোখে। ব্যস! এরপর শুধু মনে মনে 'আয় ঘুম, যায় ঘুম, দত্তপাড়া দিয়ে' দু'কলি ভেঁজে নিন। ওই মনে মনে হলেই হবে। এই দেখুন, আপনি এক্কেবারে ঘুমিয়ে কাদা! এত জোগাড়যন্ত্র করে যেই না একটা ফুরফুরে ঘুম এসেছে, নাকটাও হয়তো ফুরফুর করে বার দুই ডেকে উঠেছিল...বেমক্কা বারকতক হাঁচি হাঁচতে গিয়ে, হাঁউ-মাঁউ-কাঁউ মানুষের গন্ধ পাঁউ করে খাট থেকে প্রায় ছিটকেই পড়েছি। ধড়মড় করে উঠে বসে, চোখটোখ কচলে নিয়ে দেখি, একটা সাহেবসুবো গোছের লোক, পেন্সিলের মত খাড়াই নাক আর সেই নাকে রসগোল্লার মত চশমা, প্যাটপ্যাট করে আমার দিকে চেয়ে আছে। এইবার লোকটা তার পেন্সিলের মত নাকটা কুঁচকে সিঙাড়ার মত করে, ভয়ানক রকমের একটা ভেচকুরি কেটে বলল, "যাক বাবা, উঠেছ তাহলে!" আমি খুব চটেমটে বললাম, "কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে কেন শুনি?" লোকটা বলল, "ওমা, তোমার নাক ডাকছিল যে!" -তা'তে কী হল? -তাও বুঝি জানো না? শোনো, সেই একজন লোক ছিল, সে মাঝেমাঝে এমন ভয়ঙ্কর নাক ডাকাত, যে, সবাই তার উপর চটা ছিল। একদিন তাদের বাড়ি বাজ পড়েছে, আর অমনি সবাই দৌড়ে তাকে দমাদম মারতে লেগেছে। হোঃ হোঃ হোঃ..." এইবার আমার বেজায় রাগ হল, তেড়ে উঠে বললাম, "তুমি বাপু লোক ভালো নও!" লোকটা অমনি মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করলে, "উঁহু.. লোক নয়, লোক নয়, আমার নাম হল শ্রোডিঙ্গার। আমার নাম শ্রোডিঙ্গার, আমার ভাইয়ের নাম শ্রোডিঙ্গার, আমার পিসের নাম শ্রোডিঙ্গার।" -তার চেয়ে বললেই হয়, তোমার গুষ্টিশুদ্ধু সবাই শ্রোডিঙ্গার। লোকটা, থুড়ি, শ্রোডিঙ্গারটা একটু ভেবে বলল, "তা তো নয়। আমার মামার নাম কোয়ান্টাম। আমার মামার নাম কোয়ান্টাম, আমার খুড়োর নাম কোয়ান্টাম, আমার শ্বশুরের নাম কোয়ান্টাম।" শ্বশুরের নাম কোয়ান্টাম শুনে কেমন যেন একটু সন্দেহ হল। বললাম, " ঠিক বলছ?" শ্রোডিঙ্গারটা আবার একটু ভেবে বলল, "না না, আমার শ্বশুরের নাম কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন।" -যত্তসব বাজে কথা! তোমার নাম যাই হোক, আমার নাকে রুমাল ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলে কেন? একথা শুনে শ্রোডিঙ্গারটা মনে হল খুব দুঃখ পেল। মুখখানা বেগুনভাজার মত বিষন্ন করে বলল, "না হে, রুমাল নয়, ওটা আদতে একটা বেড়াল।" -বেড়াল কীরকম? -কীরকম শুনবে? তাহলে... অ্যায়! এই দেখ নোটবই, পেন্সিল এ'হাতে, এই দেখ ভরা সব কিলবিল লেখাতে। পড়ে দেখ দেখি, কিছু বোঝো কিনা! পড়ে অবিশ্যি আমি কিছুই বুঝিনি, কিন্তু পাছে সেকথা বললে শ্রোডিঙ্গারটা আবার দুঃখ-টুঃখ পেয়ে বেগুনভাজার মত বিষন্ন হয়ে যায়, তাই খুব খানিকটা ঘাড়-টাড় নেড়ে হুঁ হুঁ করে গেলাম। শ্রোডিঙ্গার খুশি হয়ে বলল, "হ্যাঁ, বাক্সের মধ্যে বেড়ালটা যেই না ঢুকেছে, অমনি একখানা রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্ট ছেড়ে দিয়েছি।" -বেড়ালের তালব্য শ-এ আকার ল-এ আকার! তারপর? -তারপর... হো হো হো... সেকথা বলতেও আমার বেজায় হাসি পাচ্ছে... রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্টটা যেই অ্যাক্টিভ হবে, অমনি দিকে দিকে রেডিওবার্তা রটে যাবে... আর সঙ্গে সঙ্গে... হি হি হি...উফ্! গেল গেল, নাড়ি-ভুঁড়ি সব ফেটে গেল... ফ্লাস্কের বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে এসে- -পুসিক্যাট পপাত চ! -এবং মমার চ! মার্জার মায়ের ভোগে! হা হা হা, ভাবো দেখি, কী মজার ব্যাপার! -কিন্তু...রুমাল তাহলে আসছে কোথ্থেকে? শ্রোডিঙ্গার এবার হঠাৎ হাসি-টাসি থামিয়ে খুব গম্ভীর হয়ে বলল, "সেইখানেই তো হিসেবটা মিলছে না।" -"মিলবে না কেন?" আমি তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম, "এ তো খুব সোজা হিসেব।" -"না হে, তুমি ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবছ না। অঙ্কটা এলসিএমও নয়, জিসিএমও নয়। সুতরাং হয় ত্রৈরাশিক, নাহয় ভগ্নাংশ।" বলেই শ্রোডিঙ্গারটা ছকাছক করে মাটিতে একটা ছক কেটে বলল, "মনে কর, এলিমেন্টটা অ্যাক্টিভই হল না আদৌ। তখন?" -কোয়ায়েটলি ভেবে দেখলে, কোয়ায়েট পসিবল। তেজস্ক্রিয় আদপেও সক্রিয় হল না, তার তেজ হয়তো আগাগোড়া নিষ্ক্রিয়ই থেকে গেল, নিষ্কৃতি পেলে না একটুও। এ তো হতেই পারে। পদার্থ অপদার্থের মত আচরণ করতেই পারে। -তাহলে তো বাতাসে বিষও মিশল না! ফলে বেড়ালটার কড়া জানও এযাত্রায় আর কড়কে গেল না। -হুঁ! তাহলে বেড়ালটাকে এখন কী বলব? বেড়াল তো বেঁচে থাকতে পারে, আবার টেঁসেও যেতে পারে। -পারেই তো! তাই, জীবিত বলতে পারো, মৃত বলতে পারো, আবার একসঙ্গে দুটোই বলতে পারো। -দুটোই? কীরকম? শ্রোডিঙ্গার এবার একচোখ বুজে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে বিচ্ছিরি ভাবে হেসে বললে, "তাও বুঝলে না?" আমি ভারি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। মনে হল, 'একসঙ্গে দুটোই' ব্যাপারটা আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, " হ্যাঁ হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে।" শ্রোডিঙ্গার মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, বাক্স যতক্ষণ না খোলা হচ্ছে, দ্যা বেড়াল ইজ বোথ ডেড অ্যান্ড অ্যালাইভ।" -তা তুমি বাস্ক খুলে কী দেখলে? শ্রোডিঙ্গার খানিকক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, "ওইখানেই তো মুশকিল, হিসেবটা ওখানেই ঘেঁটে গেল। খুলে দেখলাম, বেড়াল-টেড়াল কিচ্ছুটি নেই। জীবিত, মৃত, জীবন্মৃত- কিস্যু লয়। তার বদলে, ওই রুমালটা পড়ে আছে।" -ওইটে? -হুঁ। আমি অবাক হয়ে বললাম, "তা, এতে মুশকিলের কী আছে? ছিল বেড়াল, হয়ে গেল রুমাল। ছিল ডিম, হয়ে গেল দিব্যি একটা প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁস। এ তো হামেশাই হচ্ছে।" -ঠিক! ঠিক বলেছ। উত্তরটা মিলছিল না, তোমার ওই বইটা দেখতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল। -আমার বই? ও, যেটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ওইটে? -ইয়েস! ওই বইতেও ঠিক এই কথাটাই লিখেছে। -কী লিখেছে? -ওই তুমি যা বললে, "এ তো হামেশাই হচ্ছে।" এইবার আমার বেজায় রাগ হয়ে গেল। বললাম, "তখন থেকে খালি আবোলতাবোল বকছ। দিলে তো মাথাটা গরম করিয়ে! আমার বাপু রাগ হলেই আবার খিদে-খিদে পায়। এখন কী খাই বল দেখি? দেখ না ফ্রিজিডেয়ারটা হাঁটকে, কিছু পাও কিনা।" শ্রোডিঙ্গার আবার সেরকম ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হেসে উঠল। "উঁহু! সেটি হবার নয়, সে হবার যো নেই। ফ্রিজিডেয়ার বিলকুল ফাঁকা, কিস্যুটি নেই। তবে হ্যাঁ, এইটে মনে রেখো- নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?" বলেই আবার একটা ভেচকুরি কেটে জানলা গলে পালিয়ে গেল। নেই বললেই হল! শ্রোডিঙ্গারের কথায় প্রথমটা খুব রেগে গেসলাম। তারপর যেই মনে পড়ল, মামার আনা মিহিদানার হাঁড়িটা এখনও ফ্রিজেই আছে, অন্তত দুপ্পুর অবধি তাকে সেখানেই স্বমহিমায় বিরাজমান দেখেছি, অমনি রাগ-টাগ গলে জল হয়ে গেল। চুলোয় যাক শ্রোডিঙ্গার, হমারে পেটমে চুহা দৌড় রাহা হ্যায়। ফ্রিজের একদম নীচের তাক থেকে মিহিদানার হাঁড়িটা যেন আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাক বুঝে, যেই না তাকে বগলদাবা করে তার ঢাকনা খুলেছি- আচমকা ফুটফাট দুমদাম ধুপধাপ শব্দে তান্ডব কোলাহলে সারা বাড়িটা একেবারে কাঁপিয়ে তুলল। মনে হল যেন, যত রাজ্যের মিস্ত্রিমজুর সব একযোগে ছাদ পিটতে শুরু করেছে, দুনিয়ার যত কাঁসারি আর লাঠিয়াল যেন পাল্লা দিয়ে হাতুড়ি আর লাঠি ঠুকতে লেগেছে। আমি তো ভয়ের চোটে হাঁউমাঁউ করে হাত থেকে হাঁড়ি-টাঁড়ি ফেলে দিয়ে, পড়ার বইয়ে যাকে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়' বলে, তারও এককাঠি ওপরে উঠে একেবারে 'কিংকংকর্তব্যবিমূঢ়' হয়ে হাঁ করে বসে রইলাম। কতক্ষণ ওভাবে বসে ছিলাম জানি না, হঠাৎ একটা বিটকেল গুরুগম্ভীর আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠতে হল। চেয়ে দেখি একটা দেড় হাত লম্বা বুড়ো, তার পা পর্যন্ত সবুজ দাড়ি, আর মাথাভরা টাক। সেই টাকে আবার খড়ি দিয়ে কবিতা লিখেছে। বুড়োটার হাতে একটা হুঁকো, তা'তে কল্কে-টল্কে কিচ্ছু নেই, সেটাকেই দূরবীনের মত করে চোখের সামনে ধরে আমাকে দেখছে। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা রঙিন কাঁচ বের করে সেগুলো দিয়ে আবার কিছুক্ষণ দেখল। দেখা-টেখা শেষ হলে, তেমনি ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, "অন্তমিলটা মিলিয়ে দাও তো হে! চটপট!" আমি দস্তুরমত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, "মিল? কিসের মিল?" -উঁহু উঁহু! 'কিসের'-এর সঙ্গে তো অনেক কিছুই মিল দেওয়া যায়। এই যেমন ধর- পিসের, সিসের ইত্যাদি প্রভৃতি। ও তো খুব সোজা, সবাই পারে। ওকথা বলছি না। ওই শ্রোডিঙ্গার যে লাইনটা বললে, তার সঙ্গে মিল দিয়ে একখানা লাইন ভেবে বের করো দেখি! তবে বুঝব, তুমি কেমন কবি! ব্যাজার মুখ করে বললাম, " আমি ওসব পারি না।" -"পারবে না? তুমিও পারবে না? ইস! তোমার ওপর যে বড্ড ভরসা ছিল হে!...নাহ্! তেত্রিশ বছর কাটলো, একটা মিল আর মিলল না।" বুড়োটা মনে হল হতাশ হয়েছে, ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "তবে আমারও তোমার মতই দশা হয়েছিল। তাই না প্রথম লাইনটা লিখতে পারলুম।" -কীরকম? -গল্পটা তোমায় বলিনি, না? আচ্ছা শোনো... আমার নাম কবি কালিদাস। আমি হলাম হাফটাইম কবি, বুঝলে? -হাফটাইম কেন? -আগে ফুলটাইম কাব্যচর্চা করতুম। তারপর আমার ব্রাহ্মণী সেনকো গোল্ডে খাতা খুললেন। তাই, এখন দিনের মিনিমাম একটা সময়, মিনি নামের মিনি সাইজের একটা মেয়েকে টিউশনি পড়াতে হয়। তা সেদিনও মিনিবাস থেকে নেমে মিনির বাড়ির দিকেই যাচ্ছি, এমন সময় চোখে ঝিলমিল লেগে গেল। -কানা হয়ে গেলে নাকি? -উঁহু! কানা নয়, মিহিদানা। মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে তা'তেই চোখ আটকে গেসল। কিনেই ফেললুম, এক হাঁড়ি। -তাপ্পর? -এমনিতে আমার ছাত্রীটিকে পড়ানোর বিশেষ ঝঞ্ঝাট নেই, বুঝলে? 'নদী শব্দের রূপ কর' বলে চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়লেই হল। মিনিও স্লেট নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে লেগে যায়। তা সেদিনও মিহিদানার হাঁড়িটা চেয়ারের তলায় রেখে সবে চোখদুটো বুজেছি, মিহি স্বপ্নের দানায় চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে, অমনি- ঠিক ওইরকম শব্দকল্পদ্রুম! বাসরে বাস! একলাফে চেয়ার-টেবিল ডিঙিয়ে ঘরের মধ্যিখানে গিয়ে পড়েছি। -বলো কী! -তবে আর বলছি কী! ঠাসঠাস দ্রুমদ্রাম শুনেই খটকা লেগেছিল। গোলমাল একটু কমলে পর, হাঁড়ি খুলে দেখি, ওমা! মিহিদানা কই, এ তো চীনেপটকা! -অ্যাঁ! -হ্যাঁ। আর তাই দেখেই না ওই লাইনখানা ভেবে ফেললুম! ওই মিহিদানা নেই দেখেই তো! রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাকবি আবার স্বভাবকবি কিনা- 'নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?' কিন্তু ওই এক লাইনই। মনের মত একপিস মিল, সে অমিলই থেকে গেল। অনেক মাথা চুলকেও আর কল্কে পেলাম না। তা বাপু, একটু দেখবে নাকি মাথা খাটিয়ে? এবার আমি বড় বাড়াবাড়ি রকমের বিরক্ত হয়ে গেলাম। "একে ওই শ্রোডিঙ্গার না কুলাঙ্গার কে একটা এসে কাঁচা ঘুমটা চটকে দিলে, তার ওপর হাঁড়ির মিহিদানা পটকা হয়ে ফাটতে লেগেছে, এত সব দেখেশুনে আমার আর কাব্যি-টাব্যি পাচ্ছে না। যাও তো বাপু, জ্বালিয়ো নাকো মোরে! বিদেয় হও, পথে যেতে যেতে ওসব ভাবার অনেক মওকা পাবে।" এই অবধি যেই না বলেছি, বুড়োটা বেজায় উত্তেজিত হয়ে আট দশ পাক বনবন করে ঘুরে নিলে। "কী বললে, কী বললে? পথে যেতে যেতে? অ্যাঁ! তাই বললে তো? ওরে মা রে, মেশোমশাই রে, মিলেছে রে, মিলেছে! ও শ্রোডিঙ্গার, ভাই আমার, শুনে যা! মিল গয়া মিল ! 'নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে? কহেন কবি কালিদাস, পথে যেতে যেতে।' কেয়াবাত! ওরে বুধো রে! বিভূষণ-বিভীষণ-বিভূতিভূষণ সব বাগিয়ে নিয়েছি রে! 'কহেন কবি কালিদাস...' হুঁ হুঁ বাবা, 'পথে যেতে যেতে।' কেয়াব্বাত! (ক্রমশ)

145

7

Arnab Bhattacharya

লিখিপড়ি

ইতিহাসের বীরেশবাবু একবার ভবিষৎবাণী করলেন.. করেই ফেললেন.. বললেন... অসাধারণ.. তুই নিজেই লিখে ফেলবি একদিন... ইতিহাস.. হাঁসফাঁস করেই বললেন..!! তা, আমাকে বাবর আকবর আর হলদিঘাটের সন তারিখ জিজ্ঞেস করা কেন বাপু... বললাম.. স্যার পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে কি লাভ... দেখুন পৃথিবী কত এগিয়ে গেছে..!! পৃথিবী এগোক আর না এগোক.. বীরেশবাবু এগিয়ে এলেন... অগ্নিশর্মা... ইতিহাস মানে জানিস.. জানিয়েই ছাড়বেন...!! ঠান্ডা মাথায়... ঠ্যাঙ কাঁপিয়ে.. শালীনতায় ভরা মোটের ওপর উত্তর ছিল.. যার শুরুতেই ইতি তা জেনে কি হবে..!! এক চড়ে.. আর জানিনা... বাবাকে অনেক জ্ঞান শুনতে হয়েছিল... আর তারপরে বাবা সেইগুলো সুর তালে কনভার্ট করে আমার পিঠে বাজিয়ে..যারপরনাই হাতের সুখ...!! ভূগোলের মুক্তি দিদিমণি সত্যিই মুক্তি চাইতেন.. আমার কাছ থেকে মুক্তি... স্কুলের সাথে চুক্তির কারনে যুক্তি করতে পারতেন না...!! ভূগোলে ভূমি গোলাকার.. এর সবচেয়ে বড় যুক্তি কি..!" তা আমার ভূগোল পরীক্ষার খাতায় পাওয়া যায় বলেই উনি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন..! কদাচিৎ কিছু সংখ্যারা আমার ভূগোল খাতায় অবতীর্ণ.. আর, উনি হাহাকার করতেন.. পৃথিবীর আকার বদলে যাবে বলে..!! বাংলার অমূল্যস্যার সমাসে সন্ধিতে এমন বন্দী করলেন... যে পালানোর ফন্দী আঁটতে স্বরচিত রচনাকৌশল আবিষ্কার করতে হল..!! দেরি করে স্কুলে গেলাম.. প্রশ্ন কোথায় ছিলি...!! বললাম হাসপাতাল..!! ব্যস... বল দেখি সমাস...!!! বিনাবাক্যব্যয়ে.. "মানুষ হাসতে হাসতে যেস্থানে পাতাল প্রবেশ করে.."!! উনি বললেন "আশ্চর্য"..!! আমি ভাবলাম সমাস করতে বললেন..!! তড়িঘড়ি জবাব.. "আশায় থাকেন যে আচার্য.."!! যেমন আপনি আছেন.. আমি একদিন সমাস সন্ধি শিখে যাব.. সেই আশা..!! অবাক হয়ে তাকিয়ে উনি... আমি অস্বস্তিতে... বললাম আমাকে সন্ধিবিচ্ছেদ করতে দিন..!! মৃদুস্বরে বললেন...তুই বিচ্ছেদ করবি.. আর যে তাদের সন্ধি করাতে পারবনা রে বাবা...!! রসায়নে রসের যোগান তদানীংকালে কি কমে গেছিল.. জানিনা...!! রসায়নে একফোঁটাও রস আনয়ন করতে পারিনি.. মানে পারেননি রসময়বাবু..!!! তা মাঝে মাঝে রসময়ের সাথেও রসিকতা হত... একবার বলেছিলাম... স্যার কে এই মিস্ট্রি সলভ করে সেটাই জানিনা তাই তো কেমিস্ট্রি... নাহ বাবাকে স্কুলে যেতে আলাদা চটিজুতো কিনতে হয়েছিল.. মানে কিনিয়েই ছেড়েছিলাম...!! অঙ্কশাস্ত্র আর পদার্থবদ্যার শিক্ষকদের বদান্যতায় এই অপদার্থ পড়াশোনা নামক অমোঘ দৌড়ে টিকে ছিল...!! বিজ্ঞানী হবার সবরকম সম্ভাবনা ছিল ... হয়েই যেতাম... বাধসাধল বাংলায় সুপন্ডিত এক স্থানীয় দাদা যিনি দাদাস্থানীয়... বিজ্ঞানী আর বি-জ্ঞানীর মধ্যে আমাকে ঝুলিয়ে মানে ঝুল ফুল দিয়েও বলা চলে... নিজে গেলেন সটকে....!! আমি সেই ঝুলনায় বসে আজ সফটওয়্যারে দোল খাচ্ছি...!! তাই বাংলা জানা খুব দরকার.. মোদ্দা কথা হল.. বাঙলা না জানলে বিজ্ঞানী হওয়া যায়না..!!!

208

16

Dr Samya Dutta

অমৃতের পুত্র

♢♢♢♢♢♢ অমৃতের পুত্র ♢♢♢♢♢♢ "বিরহিণী রাধার কাছে কৃষ্ণনাম করে ফেললেন, বন্ধু!" বৃদ্ধ হাসলেন, "কিন্তু এবিষয়ে একবার মুখ খুললে যে আর থামতে জানিনে.....শেষে আপনি হয়তো ভেবে বসলেন, বুড়োটা একেবারে ছিটগ্রস্ত!"      অনাবিল আনন্দের হাসিতে প্রাচীন মুখখানা ভরে উঠল। জানলা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে তাঁর মুখে, উদ্ভাসিত মুখ থেকে হাসির তরঙ্গ ঢেউ তুলছে সাদা দাড়ি-গোঁফে। চোখের কোলের কুঞ্চন আরো গভীর হল, মুখের বলিরেখায় হালকা কাঁপন।      হাসি জিনিসটা বড় সংক্রামক। বৃদ্ধকে হাসতে দেখে এবার আমার ঠোঁটের কোণেও আলগা হাসি। বললাম, "আপনার বড় প্রিয় বিষয়, তাই না?" -আমি তাঁর সঙ্গ পেয়েছি মোটে পাঁচটা বছর, তা সেও ধরুন অর্ধশতাব্দী আগেকার কথা। তবু..... কীরকম জানেন? মনে করুন, বইয়ের ভাঁজে একখানা ফুল রেখে দিয়েছিলেন.....অনেকদিন পর খুলে দেখলেন..... হয়তো শুকিয়ে গেছে,  ঝরে পড়েছে পাপড়িগুলো ..... তবু, নাকের কাছে আনলে একটা সুগন্ধ.....      বৃদ্ধের কন্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছিল। শেষের কথাকটা আমায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে শুনতে হল। এক মুহুর্তের নীরবতা, তারপর হাত দেখিয়ে আমাকে তাঁর পাশে এসে বসতে বললেন।      লম্বা চাতালটার একপাশ থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে চারতলার ছাদ পর্যন্ত। সিঁড়িটা দিনের বেলাতেও বেশ অন্ধকার, তবে দোতলা অবধি উঠলে ছাদের খোলা দরজা দিয়ে আলো আসতে দেখা যায়। উঠতে উঠতে মনে মনে হাসছিলাম, অন্ধকারের শেষে আলোয় উত্থান? কখনো কখনো সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে এসে উপমারা এমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, অবুঝ মন ভেবে বসে, এই বুঝি জীবনের নতুন এক পরিচ্ছেদ শুরু হল! কী অদ্ভুত!       যে ছেলেটি এতক্ষণ আমাকে পথ দেখিয়ে  আনছিল, এবার আমায় বসতে বলে নীচে গেল খবর দিতে। দেখলাম, বসার ব্যবস্থা বলতে দু'দিকে দেয়ালের সঙ্গে লাগানো মুখোমুখি দুটো তক্তা। একপাশে মেঝেয় ডাঁই করা কিছু বইপত্র, একখানা জলের কুঁজো- এছাড়া ঘরের নিরাভরণ রূপটা প্রথম দর্শনে কেমন চোখে লাগে! যেন অনাবশ্যককে ছেঁটে ফেলার একটা নির্মম চেষ্টা..... কী জানি! হয়তো এভাবে বাহুল্যের বন্ধন ছিঁড়ে না ফেললে একটা ঘর প্রকৃত আশ্রয় হয়ে ওঠে না।      বসে থাকতে থাকতে এলোমেলো ভাবনার একটা ঘোর এসে গিয়েছিল। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হতে তাই প্রথমটায় একটু চমকে উঠেছিলাম। একটা ধীর অথচ দৃপ্ত পদধ্বনির অনুরণন তুলে অশীতিপর মানুষটা খোলা ছাদ পেরিয়ে ঘরে ঢুকলেন। একঝলক দেখেই মনে হল, এঁর আর কোনো পরিচয় অনাবশ্যক।  লুপ্তকেশ, মুখে সাদা মেঘের মত গোঁফ-দাড়ির জঙ্গলের মাঝেও যেটা নজর কাড়ে, সেটা তাঁর গভীর, কালো দুটো চোখ। শান্ত, কিন্তু উজ্জ্বল। প্রশস্ত কপাল, কাঁধদুটো পার্থিব অভিজ্ঞতার ভারে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে পড়েছে। ইনিই তিনি! -হাসছেন যে? বৃদ্ধের প্রশ্নে একটু লজ্জিত হলাম। "মাফ করবেন, কিন্তু আপনাকে হঠাৎ দেখলে মনে হয়, বাইবেলের পাতা থেকে উঠে এলেন বুঝি!" -"তাই? তবে এইমুহুর্তে কিন্তু আমি দোতলা থেকে উঠে আসছি।" হাসতে হাসতে বৃদ্ধ উল্টো দিকের তক্তায় বসেছিলেন।      এইবার আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। খানিকক্ষণ অপলক চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। কোনো কথা নেই। ভুরুদুটো সামান্য কোঁচকানো, আর অস্ফুট একটা হাসি মুখময় খেলে বেড়াচ্ছে। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে তিনি বললেন, "ইয়ংম্যান,  দেখছি এরমধ্যেই আপনার ভারতবর্ষের ছোঁয়া লেগে গেছে!"  আমি হাসলাম।আমার শরীরের যেটুকু অংশ উন্মুক্ত ছিল, সেখানে চামড়ার রঙ এখন ব্রোঞ্জের মত। দেখিয়ে বললাম, " হ্যাঁ, আমার মাও বোধহয় আর আমাকে একনজরে চিনতে পারবেন না।" -গায়ের রঙ..... সে তো অবশ্যই! তবে আমি কিন্তু সেকথা বলিনি। -তাহলে? বৃদ্ধ একমুহুর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর হঠাৎ তাঁর ডানহাতের তর্জনীটা দিয়ে আমার বুকের ঠিক মাঝখানে স্পর্শ করলেন। একটু নড়েচড়ে বসলাম। খুব মৃদু, গম্ভীর স্বরে বললেন, "আমি এখানকার কথা বলছি। এইখানে এক ভারতবর্ষ বাসা বেঁধেছে, স্বয়ংপ্রকাশ ..... যেন সহস্রদল পদ্ম, একেএকে তার দলগুলি মেলে ধরছে। । অপেক্ষা করুন, কালে কালে তার পূর্ণ রূপ দেখবেন। রাই ধৈর্যং, রহু ধৈর্যং!" ".....আজ আমার কথাগুলো বড় বেশি অভিযোগের মত শোনাচ্ছে, তাই না? বিশ্বাস করো, এতদিন এসব কথা বুকের ভেতর চেপে রেখেছি শুধু এই ভেবে যে, একদিন তুমি নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারবে। কিন্তু তোমার কাছে বয়সোচিত পরিণতি আশা করাটাও বোধহয় বাতুলতা! তাই নতুন করে আরো একবার তোমার হঠকারিতার পরিচয় পেয়ে বিস্ময়ে, হতাশায় আজ আমার ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে মনের গোপন কুঠুরি থেকে এতদিনের চাপা ক্ষোভ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। খুব একটা দোষ আমায় দেওয়া যায় কি?       কী জানো রাফা, পরিচয়ের প্রথম দিকে কিন্তু তোমার চরিত্রের এই দিকটা আমাকে আকৃষ্টই করেছিল। তোমার মত সুদর্শন যুবকের প্রকৃতিতে এই উদাস, বাউণ্ডুলে ভাবটা কুমারী বয়সের যেকোনো মেয়ের মনকেই একটা বাড়তি রোম্যান্টিক মেদুরতায় আচ্ছন্ন করবে, সে আর আশ্চর্য কি? বলা বাহুল্য, আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। কিন্তু আশা করেছিলাম, সাংসারিক দায়দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়লে যেমন সব ছন্নছাড়া প্রেমিকেরই স্বামীতে উত্তরণ হয়, তোমার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হবে না। ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে আমার সে আশা কিভাবে ধূলিসাৎ হয়েছে, সেসব স্মৃতিচারণ এখন অপ্রাসঙ্গিক। তা'তে তিক্ততাই কেবল বাড়বে, আর সেটা আমার এই চিঠি লেখার উদ্দেশ্য নয়।      কিন্তু বলতে পারো রাফা, আমাদের একমাত্র সন্তান কী দোষ করেছিল? নিজের ছেলের প্রতি এই উদাসীনতা, এই দায়িত্বজ্ঞানের অভাব তুমি নিজে ক্ষমা করতে পারো? কেনির সামনে একটা গোটা জীবন পড়ে আছে, এইসময় তার মাথার ওপর বাবার ছায়াটুকু কতখানি প্রয়োজনীয়, তা কি সত্যিই তোমার অজানা? এই তুলনাটা টানতে আমি ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হচ্ছি, তবু বলি, নিজের ছেলে না হওয়া সত্ত্বেও কেনির প্রতি কর্তব্য পালনে গিলের তরফে কোনো ত্রুটি আমি কখনো দেখিনি। সাত বছরের কেনির এখন কতটুকুই বা বিচারশক্তি, কিন্তু কাল যদি সে প্রশ্ন করে, আমাদের এই মৃত সম্পর্কের লাশ কেন তাকে  বহন করতে হচ্ছে, বাবা হিসেবে পারবে তো উত্তর দিতে?....." রেলগাড়ির দুলুনিতে আমার ভালোই ঘুম হয়। কাল রাতেও কামরায় অত হৈচৈ না হলে, আমার ঘুম বোধহয় একেবারে হাওড়ায় এসেই ভাঙতো। কাঁচাঘুম ভেঙে যাওয়ায় একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমটায়, তার ওপর কামরার অন্ধকারে কারো মুখ দেখাই দায়। আবছা আলোয় মনে হল সেই ফেজ মাথায় মুসলমান ভদ্রলোকটিকে দেখলাম, খুব উত্তেজিত। দিনভর মারোয়াড়িদের উচ্চস্বরের আলাপ শুনেছি, এবার তাদেরও গলা পেলাম। একমাত্র আমার সামনের বার্থের মাদ্রাজি ব্রাহ্মণটিই দেখলাম অবিচলিত। উঠে বসেছেন, তবে বিশেষ হেলদোল নেই।       ট্রেন থেমেছিল প্রায় একঘন্টা। কেন, সেটা কাল রাতে আমরা জানতে পারিনি, জানলাম আজ সকালে ট্রেন থেকে নেমে। আসলে রাতের পথ ছিল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, অন্ধকারে আমাদের গাড়ি নাকি একটা প্যান্থার জাতীয় জানোয়ারকে ধাক্কা মেরেছিল। তৎক্ষণাৎ ট্রেন থেমে যায়, কিন্তু শত চেষ্টা সত্বেও জন্তুটার লাশ ইঞ্জিনের লোহার খাঁচা থেকে আলাদা করা যায়নি। বাধ্য হয়ে লাশটা সমেত ওইভাবেই গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। মৃত জন্তুটা এই এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে, তবু তার ঘাতককে মরণ-আলিঙ্গন থেকে মুক্তি দেয়নি।      আমার মাদ্রাজি সহযাত্রীটি প্রথম থেকেই আমার কৌতূহল উদ্রেক করেছিলেন। দুপুরের দিকে ইনি যখন ট্রেনে ওঠেন, মারোয়াড়িদের পাটোয়ারি আলোচনায় তখন কামরায় কান পাতা দায়। মুসলমান ভদ্রলোকটি একপাশে বসে ঢুলছিলেন। অবশ্য তিনি যে খুব মিশুকে নন, সেটা আগাগোড়াই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনিতেই ভাষা এখানে মানুষের সাথে আলাপ জমানোর একটা বড় অন্তরায়, অথচ কথা বলার জন্য আমার মন তখন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখলাম, এই নতুন আগন্তুকও উঠেই একটা বই খুলে বসলেন- অর্থাৎ মেলামেশায় উৎসাহী নন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমিয়ে নেব কিনা ভাবছি, হঠাৎ চোখ আটকে গেল ব্রাহ্মণের হাতের বইটায়।      ইনি বসেছেন আমার ঠিক উল্টো দিকে, সুতরাং বইটা ভালো করে দেখার জন্য আমাকে বিশেষ কষ্ট করতে হল না। 'দ্য লাইফ অফ.....' বাকিটা তাঁর আঙুলের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। তবে প্রচ্ছদে যাঁর ছবি আছে, তিনিই বোধহয় বইয়ের বিষয়বস্তু। হঠাৎ মনে হল, ছবিটা আমার চেনা.....আগে কোথাও দেখেছি.....কোথায়? লন্ডন? গতবছর, নাকি তারও আগে? কী একটা আলোচনা সভা.....      হঠাৎ খেয়াল হতে দেখি, ব্রাহ্মণ চোখে কৌতুহলের সঙ্গে কিছুটা বিষ্ময় মেশানো চাহনি নিয়ে আমাকে জরিপ করছেন। ধরা পড়ে গিয়ে একটু অপ্রস্তুত হাসি হাসলাম।  -"এঁকে চেনেন? শুনেছেন এঁর কথা?" আমার ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই প্রচ্ছদের ছবিটার ওপর আঙুলের দুটো টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক। -"ছবিটা চেনা চেনা মনে হল, তাই..... হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে, লন্ডনে এঁর জীবন সম্পর্কে একটা বক্তৃতা শুনছিলাম। খুব আকর্ষণীয় চরিত্র, নিঃসন্দেহে!" বলতে বলতেই আমার খেয়াল হল, দু'বছর আগেই ঠিক করেছিলাম, এঁর সম্পর্কে আরও পড়াশোনা করব। তারপর সময়াভাবে আর..... বক্তার একটা কথা শুনে তখনই বেশ আশ্চর্য হয়েছিলাম, কী যেন.....আমি মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম, "দ্যা লাস্ট অফ দ্যা হিন্দু সেজেস?" -"অ্যান্ড দ্যা মোস্ট পারফেক্ট।" ব্রাহ্মণ বেশ জোর গলায় বললেন। দেখলাম, বলার সময় ওঁর চোখ দুটো অদ্ভুত ভাবে জ্বলে উঠল। "দ্যা লাস্ট অ্যান্ড দ্যা মোস্ট পারফেক্ট।" -আচ্ছা, এঁরই এক শিষ্য তো.....  -ঠিক ধরেছেন। সশরীরে আর নেই, কিন্তু এখনও পশ্চিমের দুটি মহাদেশেই তাঁর বিরাট প্রভাব। -তাই তো! আপনি বললেন বলে মনে পড়ল, আচ্ছা..... আপনি নিশ্চয়ই জানেন এঁর কথা। বলুন, প্লিজ বলুন..... আমিও জানতে চাই.....      উৎসাহের বশে ব্রাহ্মণের হাঁটুদুটো চেপে ধরেছিলাম। আমার ছেলেমানুষি আগ্রহ দেখে ভদ্রলোক হাসলেন।  - শুনতে চান, তা বেশ! কিন্তু আমার কাছে কেন? আসল লোকই তো রয়েছেন! আপনি বোধহয় কলকাতা যাচ্ছেন?  -আজ্ঞে হ্যাঁ। -আমার গুরু থাকেন কলকাতার নেটিভ কলোনির একেবারে মধ্যিখানে। তিনি এই মহাপুরুষের সাক্ষাৎ পার্ষদদের অন্যতম। আপনি চান তো.....            আজ সকালে ট্রেন থেকে নেমে দেখি সেই মাদ্রাজি ভদ্রলোকটিও আমার পেছন পেছন নেমেছেন। চোখাচোখি হতেই বললেন, "নাম, ঠিকানা- সব মনে আছে তো?" -"Mastar-mah-asaya..... Mastar mahasaya....." বারকয়েক উচ্চারণ করে সড়গড় হয়ে নিলাম। "আমহার্স্ট স্ট্রিট বললেন তো?" -হ্যাঁ, স্থানীয় লোকে ওই নামেই চিনবে। আসলে আমার গুরুর কর্মজীবন কেটেছে স্কুলমাস্টার হিসেবে। তা, আর দেরি কেন? বেলা বাড়ছে, যেতে হয় তো এইবেলাই..... আমি বিদায় নিয়ে যেতে যেতেও ঘুরে এলাম। ব্রাহ্মণ কুলির পিঠে মাল চাপাতে ব্যস্ত ছিলেন, আমাকে ফিরে আসতে দেখে অবাক হলেন। -ইয়ে, মানে..... কোনো পরিচয়পত্র..... সুপারিশ-টুপারিশ..... আমার একদিনের সহযাত্রীটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা স্নেহের হাসি হাসলেন। বড় স্নিগ্ধ সে হাসি। "বন্ধু, আপনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন, এই ইচ্ছেটাই তো আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয়পত্র! আর কোনো সুপারিশের প্রয়োজন নেই।" ".....এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। কিন্তু তোমার এই হঠকারিতা সমর্থনের অযোগ্য। সতেরো তারিখ তোমায় জাহাজে তুলে দিতে আসব। কিন্তু সেই জাহাজ তোমায় কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা ভেবে দেখেছ? এমন একটা দেশে চললে, যেখানে আমাদের স্বদেশী, সভ্য মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। শুনেছি কলেরা, ম্যালেরিয়ায় প্রতি বছর লাখো মানুষ মারা যায়.....আর, আগের মত শান্তির পরিবেশও যে আর নেই! শুনতে পাই, কিছুটা শিক্ষাদীক্ষা আর সভ্যতার স্বাদ পেতেই নেটিভরা রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। যারা আজ থেকে একশো বছর আগেও ছিল অসভ্য, বর্বর, আজ তাদের রাজদ্রোহের উন্মত্ততা দেখলে তোমার জন্য আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে। ঈশ্বরের পরিত্যক্ত ওই দেশ থেকে তোমার কী পাওনা আছে, রাফা? কিসের সন্ধানে যাচ্ছ?     আমি  এখনো আশাবাদী তুমি অন্তত শেষমুহূর্তে এই খামখেয়াল ত্যাগ করবে। আমার কথায় না হোক, তোমার নিজের জন্য, কেনির জন্য। ঈশ্বরের কাছে তোমার শুভবুদ্ধির প্রার্থনা করি। ইতি,  এখনো তোমার শুভাকাঙ্খী,  অগাস্টা।" -"বিয়ে করেছিলে, তা'তে কী? তিনি বলতেন, কেল্লার ভেতর থেকে যুদ্ধ করা! আমিও সংসারের জ্বালায় জ্বলে পুড়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম..... কিন্তু বিধির বিধান, আমার বন্ধু একদিন নিয়ে গেল রাসমণির বাগান দেখাতে....."      আমি কথার মাঝখানে বাধা দিলাম। "এদেশের আধ্যাত্মিক সম্পদের কথা বলছিলেন না? কিন্তু, মনে করুন, এই আমার মত..... পশ্চিমের মানুষরা.....ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের শিরায় শিরায়। আজ ঘটনাচক্রে এখানে এসে পড়েছি, কিন্তু এই সম্পদের খোঁজ পেলেই বা কী? যদি বিশ্বাস ঠিকঠিক না থাকে.....ঈশ্বর এসে আমার সদর দরজায় কড়া নাড়লেও তো চিনতে পারব না! " -"তুমি ঘাটে নেমে ডুব দিয়ে চান কর অথবা কেউ ঠেলে জলে ফেলে দিক- ভিজতে যে হবেই।"       চমকে উঠলাম। অবশ্য এই ক'দিনের নিত্য যাতায়াতে চমকে ওঠাটাও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ছেলেবেলায় একটা গল্পে পড়েছিলাম, সারাদিনের কাজ শেষে এক ক্লান্ত চাষা গেছে এক সরাইখানায়। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যায় যায়, চাষা বললে, যেভাবে পারো আমার তৃষ্ণা নিবারণ করো। যদি দামি মদ আনতে হয়, আনো। বিরলতম আরক আনতে হলেও কুছ পরোয়া নেহি! কিন্তু সরাইখানার মালিক তাকে দিলে এক গেলাস জল, আর তাই খেয়েই চাষার তৃষ্ণা উধাও। দেখে সরাইখানার মালিক মিটিমিটি হাসে। তারপর চাষা রোজ আসে, ভাবে আজ নিশ্চয়ই দুর্লভ কোনো অমৃত দেবে, কিন্তু রোজই পায় সেই এক গেলাস জল। আর রোজ সেই চাষা অবাক হয়ে আবিষ্কার করে, ওই এক গেলাস জলেই তার তৃষ্ণার নিবৃত্তি, প্রাণের আরাম।       সেই মূঢ় চাষার মতই হতবাক হয়ে বসেছিলাম। ঘরে আরো গুটিকয় লোক। মেট্রোপলিটন কলেজের দুটি ছোকরা এসেছে। এবার তাদের একজন প্রশ্ন করল, "আপনি কি আমাদের নিয়মিত শাস্ত্রপাঠ করতে উপদেশ দেবেন?" - শাস্ত্রপাঠ..... সেও জরুরী। তবে ভগবান লাভ করা শুধু পাণ্ডিত্যের কর্ম নয়। নির্জনে গোপনে তাঁকে প্রার্থনা করতে হয়। যীশু বলতেন- "ভেরিলি আই সে আনটু ইউ, এক্সসেপ্ট ই বি কনভার্টেড, অ্যান্ড বিকাম অ্যাজ লিটল চিলড্রেন, ই শ্যাল নট এন্টার ইনটু দ্যা কিংডম অফ হেভেন।" যারা জগতে নগণ্য তারাই ঈশ্বরের অতি প্রিয়। আবার যারা জগতে গণ্যমান্য তারা তাঁর কাছে নগণ্য। শিশুর মত সরল হলে তবে ঈশ্বর লাভ হয়। এমনি কাণ্ড। এখানকার বড়, বড় নয়। তাঁর জন্য যাঁরা ব্যাকুল তাঁরাই বড়। কেননা, তাঁরা যে তাঁর অতি প্রিয়।      ঈশ্বর? তাঁর জন্য ব্যাকুলতা কী জিনিস জানিনা, তবে বেশ বুঝতে পারি এই অসমবয়সী বন্ধুটির প্রতি আমার একটা টান তৈরি হয়েছে। কলকাতায় রইলাম, তা বেশ কিছুদিন তো হল..... এখন হিসেব করে দেখছি, তার অধিকাংশই কেটেছে এনার সাথে এই ঘরে বসে আলাপচারিতায়। ইনিও বোধহয় আমার মনোভাব টের পেয়েছেন। আজ এসেছি, তখন সন্ধ্যে হব হব। ঘরে ঢুকতেই বললেন, "ওই রে, আবার এসেছে!"       ঘরময় একটা হাসির রোল উঠল। আমি অবাক হয়ে তাকাতেই বললেন, "এমনি নেশায় বুঁদ হয়ে আমিও তাঁর কাছে ছুটে যেতাম। সেই গল্পটা শুনেছ? একটা ময়ূর ছিল, বুঝলে! তাকে ক'দিন ধরে ঠিক বিকেল চারটের সময় আফিম খাইয়ে দিত। তারপর দেখা গেল, রোজ যেই চারটে বাজে, অমনি ময়ূরটা গুটিগুটি পায়ে এসে হাজির হয় আফিম খেতে।"      এবার আমিও হাসিতে যোগ দিলাম। বললাম, "ভক্তি বড়, না কর্ম?" -শুদ্ধাভক্তিই শেষ কথা। তবে সেসব তো ফস করে হয় না! তোমরা হলে রজোগুণী- তোমাদের ভেতরে কর্মের প্রবৃত্তি আছে, কী করা! তাই, বলা হচ্ছে, নিষ্কাম কর্ম।       মাথা নাড়লাম। এক গেলাস জল। একবুক পূর্ণতা নিয়ে বসে আছি আমি। আর আমার সেই অসমবয়সী বন্ধু, সেই সরাইখানার মালিকের মতই নির্মল হাসি হাসছেন আমার দিকে চেয়ে। -তুমি চলে যাচ্ছ? -হ্যাঁ। হয়তো দিনদুয়েকের মধ্যেই। -তোমাকে একটা কথা বলি..... যদি আবার কখনো কলকাতায় আসো, হয়তো আর দেখা হবে না। আমার ঘট ভেঙে দেবার সময় হয়ে এসেছে। বন্ধন..... সেসব এখন বড় অসহ্য লাগে।      চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ আগে এক তরুণ সাধু এসেছিলেন। যাবার সময় প্রণাম করে বিদায় নিতে যাচ্ছেন, উনি বাধা দিলেন "ওটা করবেন না। 'তৃণাদপি সুনীচেন'- ওসব থাক।" সাধু চলে যাবার পর আমরা খোলা ছাদে এসে বসেছিলাম। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলতে শুরু করলেন। এবার খুব ধীর লয়ে, থেমে থেমে, কিছুটা তদগত ভাবে, "এই 'আমি'টাই হল যত নষ্টের গোড়া! 'আমি' অর্থাৎ অহঙ্কার। আমি ম'লে ঘুচবে জঞ্জাল। গুরুর কৃপায় সে উপায়ও বোধহয় খুঁজে পেয়েছি। সুতরাং, আর কেন..... তুমি.....জেনো, আমি তোমার সঙ্গেই আছি।"      আবার বিরতি, এবার আরো দীর্ঘ। হঠাৎ 'কুমারসম্ভব' আবৃত্তি করলেন। ".....এইখানে দেবাদিদেবের ধ্যানের বর্ণনা আছে, শোনো। গুহাভ্যন্তরে মহাদেব সমাধিমগ্ন, আর গুহাদ্বারে নন্দী বেত্রহস্তে পাহারা দিচ্ছেন আর সকল জীব ও সমস্ত প্রকৃতিকে তাদের যাবতীয় চঞ্চলতা ত্যাগ করতে আদেশ দিচ্ছেন। তাঁর অলঙ্ঘনীয় আদেশে বৃক্ষ নিষ্কম্প, ভ্রমর গুঞ্জনহীন, বিহগকুল মূক.....বোঝাতে পারছি?" নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লাম।       বেশ গুমোট বোধ হচ্ছিল। কলকাতা শহরের বাতাস যেন আচমকা এই ছাদটাকে সন্তর্পণে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে, অথচ কাছেপিঠের  যেকটা মন্দির এখান থেকে চোখে পড়ে, তাদের চুড়োয় পতাকারা দিব্যি হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। এবার আমিও বিদায় নেব ভাবছিলাম, কিন্তু বলতে গিয়েও থামতে হল। মরা চাঁদের আলো এখন তাঁর মুখ জুড়ে খেলা করছে, সে মুখে অদ্ভুত এক প্রসন্নতার ছায়া। দু'চোখ বন্ধ। ধ্যানগম্ভীর নন, মনে হল ধ্যানসুন্দর। তাঁকে বিরক্ত না করে তাই যথাসম্ভব নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম। আমহার্স্ট স্ট্রিট শুনশান, যেন একটা নিস্তব্ধতার চাদর কেউ বিছিয়ে দিয়ে গেছে। কেবল আশেপাশের কোনো মসজিদ থেকে একটানা আওয়াজ আসছে, "আল্লাহু আকবর।" গাঢ় কালো আকাশের নীচে ঘুমের অতলে তলিয়ে আছে কলকাতা। দূরে, খুব দূরে, দিগন্তের কাছে একপোঁচ সাদার প্রলেপ ধরেছে সবেমাত্র। তা'তে অন্ধকার তরল হয়নি, এখনও তা অনাগত কোনো উজ্জ্বল দিনের ভবিষ্যৎবাণীই কেবল। কিন্তু ভেবে দেখলে, সেই বা কম কী?       অগাস্টার চিঠিটা এতদিন বয়ে বেরিয়েছি পকেটে। এবার সেটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতেই একমুখী হাওয়া ছুট দিল গঙ্গার দিকে। যাক! পাঁচহাজার বছরের এই সভ্যতার সব মলিনতা ধুইয়ে দিয়ে বইছে এই নদী, আমার পুরনো জীবনের নোংরা কঙ্কালটা নাহয় সেই স্রোতস্বিনী গঙ্গার বুকেই বিসর্জন দিলাম। আমি জানি, নিশ্চিত জানি, আমার আগামী দিনগুলো আর দিশেহারা হয়ে পড়বে না। ছিন্নবীণার তার ঠিক সুরে বেঁধে দিয়েছেন এক দক্ষ যন্ত্রী, যিনি ওই চারতলা বাড়িটার ছাদের  এককোণে ধ্যানমগ্ন। তিনি আমার বন্ধু, আমার মাস্টারমশাই। আনকোরা নতুন এক রাফায়েলের তিনিই জন্মদাতা। শ্রী মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের ডায়রি থেকে: ইউনিভার্সিটির সেনেট হলের বারান্দায় কিছু ভবঘুরে এসে জোটে রাত গভীর হলে। অন্যত্র যাদের রাতটুকু কাটানোর মত একটা আশ্রয় জোটে না, কলকাতা শহর এইখানে নিভৃত কোল পেতে রাখে তাদের জন্য। এরা কেউ দিনমানে মজুর খাটে, কেউ বা ধাঙড়ের কাজ করে। আর যারা একান্ত অক্ষম, তারা এই শহরের ভিক্ষান্নে প্রতিপালিত।      এই দলটার মধ্যমণি এখন কানা ভিখিরি লক্ষণ। উদাত্ত গলার খাতিরেই বোধহয় তার রোজগার বাকি ভিক্ষাজীবীদের তুলনায় কিছু বেশি হয়। রাফায়েল যখন খুব ধীর পায়ে এই দঙ্গলটার দিকে এগিয়ে আসছে, লক্ষণ তখনও গান গাইছিল: "মন কি তত্ত্ব কর তাঁরে, যেন উন্মত্ত আঁধার ঘরে । সে যে ভাবের বিষয় ভাব ব্যতীত, অভাবে কি ধরতে পারে ৷৷ অগ্রে শশী বশীভূত কর তব শক্তি-সারে । ওরে কোঠার ভিতর চোর-কুঠরি, ভোর হলে সে লুকাবে রে ৷৷ ষড় দর্শনে না পায় দরশন, আগম-নিগম তন্ত্রসারে ।" আমি ইশারায় রাফায়েলকে বসতে বললাম। ভিখুয়া ডোম বসেছিল আমার পাশে। আমার দিকে ফিরে তার ছোপধরা দাঁত দেখিয়ে হাসল, "এ বুড়া বাবা, তু আবার এসেচিস? পাগাল আচিস নাকি রে! কেনো আসিস বলতো রোজ রোজ?" -ভালো লাগে, তাই আসি। ইঁট-কাঠের বাড়িতে শুয়ে আমার ঘুম হয়না রে! আমার মাথার ওপর ছাদ আছে, ভাবতেই দমবন্ধ হয়ে আসে। এই 'আমি'টা কে বল দেখি? কোথায়? মাথার ওপর ছাদ দেবারই বা আমি কে? কিন্তু ভাবলে কী হবে, বাড়িতে থাকলে 'আমি'টা আঠার মত লেগে থাকে। তার চেয়ে এই ভালো, আদপে যে আমার কিছুই নেই, সেটা এখানে না এলে টের পাওয়া যায় না। -কী যে বলিস! পাগাল আছিস পুরা..... এ সাহিব কে আছে রে? -পাগল! তোর-আমার মতই। অনেকদিনের অনেক জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে হালকা হতে এসেছে। -জঞ্জাল ফেলতে এসেছে এখানে..... এতো রাতে কে সাফ কারবে বলতো.....এ লখনা, গানা বন্ধ কিঁউ কিয়া রে? শুরু হো যা ফির.....      লক্ষণ আবার গান ধরে। রাতের নিরন্ধ্র অন্ধকারে ঘুমোয় সুসভ্য কলকাতা। শুধু এক জন্মান্ধ ভিখারীর গানে জেগে থাকে একটুকরো শহর। উঁচু উঁচু ইমারতের দম্ভের ভিড়ে, একটুকরো নিরহঙ্কার শহর। "সে যে ভক্তিরসের রসিক, সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ৷৷ সে ভাব লাগি পরম যোগী, যোগ করে যুগ-যুগান্তরে । হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন, লোহাকে চুম্বকে ধরে ৷৷ প্রসাদ বলে মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যাঁরে । সেটা চাতরে কি ভাঙব হাঁড়ি, বোঝ না রে মন ঠারে ঠোরে ৷৷" (রাফায়েল হার্স্ট তাঁর ভারতভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন পল ব্রান্টন ছদ্মনামে। 'শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত'-এর রচয়িতা শ্রী মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ওরফে মাস্টার মহাশয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় কথামৃতকারের দেহত্যাগের অল্পকাল পূর্বে।) তথ্যসূত্র: শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা (স্বামী গম্ভীরানন্দ) In search of secret India (পল ব্রান্টন)

134

3

Nilanjan

মৌসুমির ডায়েরি

অনুরণন ------ আজ বাড়ি ফিরে হঠাৎ নিজের বীণার দিকে চোখ পড়ে গেল ভাস্করের।কত দিন বাজায়নি সে তার তানবাহার কে।তানবাহার নাম রেখেছিল সে তার বীণার।তাকে বীণা বাজাতে শিখিয়েছিল মৌসুমি নিজের হাতে।নিজের ঘরে রাখা স্বরস্বতী মূর্ত্তির সামনে ধূপকাঠি ধরিয়ে যখন মৌ বীণা বাজাতো সেই লাল পাড় সাদা শাড়ী টা পড়ে,স্নান করে উঠে আসা সেই ভেজা চুল,কপালে সিঁদুর হাতে সোনার বালা,শাখা, পলা, আর পায়ে ভাস্করের দেওয়া সেই রুপো দিয়ে তৈরি নুপুর। সকালের মিষ্টি রোদের সাথে মৌ এর হাতের তৈরি বেড টি খেয়ে আধবোজা চোখে মৌয়ের বীণার অনুরণন ভাস্করকে নতুন শক্তি দিত।প্রেম করে ওদের বিয়ে হয়েছিল।নতুন সংসারের নতুন প্রেম ওদের আরো কাছাকাছি এনে দিয়েছিল।কিন্তু আজ......আজ সেই প্রেম ওদের একাকার করে দিয়েছে......সেই দিনের সেই গাড়ির ধাক্কা টা ওদের আলাদা করতে পারে নি।একসাথে শপিং করে ফিরছিল ওরা।বাইকে চেপে।হঠাৎ ব্রেকফেল হওয়া একটা গাড়ি যমদূত হয়ে ওদের বাইকে ধাক্কা মারে.....তারপরে সব অন্ধকার।কোথাও কিচ্ছু নেই.....কিন্তু আজ এতদিন পরে বাড়ি ফিরেও কোন কিছুই ছুঁতে পারছে না ভাস্কর,এমনকি তার মৌ এর ছবিটাও না।ব্যর্থ হয়ে বিছানায় বসে ফুপিয়ে কাঁদছিল ভাস্কর।হঠাৎ খুব চেনা একটা গলার স্বর শুনতে পেল সে,"এমা!!আমি তো জানতাম সারাজীবন শুধু একা আমি কেঁদেছি"ভাস্কর চমকে তাকিয়ে দেখে মৌ দঁাড়িয়ে আছে....."তুমি আবার এখানে ফিরে এলে?"ভাস্কর অবাক হয়ে বলল,"আবার মানে??এটা আমাদের বাড়ি।এখানে যাব না তো কোথায় যাব? "মৌ আগেকার মতই ভাস্করের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,"ভুলে গেলে সেই গাড়ির ধাক্কায় শুধু আমি মারা যাই নি......"তারপর বরফের মতো ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া ভাস্কর তার গালে অনুভব করল আর সেই সাথে মৌ এর গলার স্বর,"তুমিও মারা গেছিলে।আমরা আলাদা হই নি,মৃত্যুতেও না।" (ক্রমশ....)

134

5

Dr Samya Dutta

এ আমার গুরুদক্ষিণা

'যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়...'- আজ্ঞে না, আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যেতেন না। এক রাবড়ি ব্যতীত অন্য কোনো নেশাই তাঁর ছিল না। জমিদার বংশে জন্মেছিলেন, কিন্তু জীবনটা কাটিয়েছেন ত্যাগীর মত। আমার সেই গুরু, মুক্তারামের সেই মুক্তপুরুষ, আমাদের ফুটপাতে শুয়ে আকাশ দেখতে শিখিয়েছিলেন। শিব্রাম চক্কোত্তি- গতকাল ছিল তাঁর জন্মদিন। না, নতুন কিছুই লেখা হয়নি। উচিত ছিল নিশ্চই, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এদিকে নতুন লেখা দিচ্ছি না বলে শ্রীপর্ণা ম্যাডাম গুছিয়ে বকে দিয়েছেন। এই লেখাটা ভোটের সময়ে লেখা, নেহাতই খেলাচ্ছলে। আসলে কেবলমাত্র ভোটের কালি লাগানো আঙুলের ছবি পোস্ট করতে বাধো-বাধো ঠেকছিল, অথচ নিজেকে দায়িত্ববান নাগরিক প্রমাণ না করলেই নয়। তাই আবোলতাবোল লিখে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। সেই বাসি মালই ছাড়ছি, ভালো না লাগলে গালাগালিটা আড়ালে দেবেন: ☆☆☆☆ ভোট দিলেন হর্ষবর্ধন ☆☆☆☆ রোব্বারে হর্ষবর্ধনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফি রোব্বারই যাই, প্রচুর চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়র বন্দোবস্ত থাকে। হর্ষবর্ধনও খাওয়াতে ভালোবাসেন, গলা অবধি খেলেও গলাধাক্কা দেননা, গলাধঃকরণ করিয়েই ছাড়েন। গিয়ে দেখি দুই ভাই ভারি চিন্তিত মুখে বসে। আমাকে দেখে গোবর্ধন শুধালে, "এই যে, শিব্রামবাবু। আপনি তো বেশ পন্ডিত মানুষ, একটা প্রশ্নের চটপট উত্তর দিন দেখি!" আমি বিনিত ভাবে বললাম, " ভাই গোবরা, পন্ডিত হতে গেলে শুনেচি অনেক পড়াশুনো করতে হয়। আমি নিজের লেখাই কখনো পড়ি না, সুতরাং পন্ডিত আমি হতেই পারি না, সে পণ্ডশ্রম আমি কখনো করিনি।কিন্তু, তোমার মনে হঠাৎ কি প্রশ্নের উদয় হল? তোমাকে তো প্রশ্নাতীত বলেই জানতুম।" -"আচ্ছা, বলুন দেখি, গণতন্ত্র কা'কে বলে?" ভারি জটিল সমস্যায় পড়া গেল। গণতান্ত্রিক দেশেই থাকি বলে শুনেছি, পাঁচবছর অন্তর ভোট হয় দেখেছিও। আমি অবশ্য ভোট দিতে যাই না, এসব পাঁচপেঁচি ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই, বরং বাড়তি পাঁচ মিনিট ঘুমিয়ে নিই ভোটের দিন। আমতা আমতা করে বললাম, "ইয়ে, গণতন্ত্র আসলে একরকম তন্ত্রসাধনা বই নয়। তবে প্রক্রিয়া-প্রকরণ জানা নেই ভাই, বলো তো তারানাথ তান্ত্রিককে শুধোই!" -"হুমম, তাই হবে। তন্ত্রসাধনাই হবে। শবসাধনার প্রয়োজন হয় বলেই বুঝি এত খুনজখম করতে হয়।" হর্ষবর্ধনের সুচিন্তিত মতামত। "কিন্তু, ভোট তো দেন আপনি। ভাটের কথা তো নয় সেটা, তা দেন কা'কে?" -"আজ্ঞে, আমি ভোট দিতে যাই না। রোদ্দুরে পুড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে ভাবলে লালায়িত হই না মোটেই, লালা ঝরে না আমার। কা'কে ভোট দেব ভেবে মাথা না ঘামিয়ে বরং মেসেই শুয়ে থাকি, ঘুমিয়েই নিই একচোট।" -"উঁহু! এটা কোনো কাজের কথা হল না মশাই।" গোবরার আপত্তি, "গণতান্ত্রিক অধিকার-টধিকার নাহয় নাই বুঝলেন, অন্তত গুড়-জল খেতেও তো যেতে পারেন। গেলেই দেয় শুনেচি, গালাগালিও করে না চাইলে।" -"না ভাই। গুড় শুনলেই পেট গুড়গুড় করে আমার। তাছাড়া নীরেও আসক্তি নেই, নিরাসক্তই বলতে পারো।" -"কিন্তু, ভোট দিতে যাবার বাহানায় খানিক প্রাতঃভ্রমণ তো হয়, সফর করেও তো আসতে পারেন খানিক।" হর্ষবর্ধন ভেটো প্রয়োগ করেন। -"আমার সব সফর ওই সোফার ওপরেই। সোফায় শুয়ে শুয়ে, সো ফার অ্যান্ড নো ফারদার।" কিন্তু যুক্তিতে হর্ষবর্ধন ন বধ্যতে। "সে আপনি যাই বলুন মশাই! ভোট আমি দেবই। কিন্তু কা'কে দেব, সেইটে এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি, এই যা!" -"ওই মাখনের দলকেই দিলে হত না দাদা! জিতলে সন্দেশ-দরবেশ কিসব খাওয়াবে বলছিল যে!" -"সন্দেশের দর যে বেশ, তা আমার ভালোরকমই জানা আছে।মাখনের মত বর্বরের পয়সায় খেতে আমারও আপত্তি নেই। বারেবারে তাদের ধণক্ষয় করিয়েই আমার এত বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু ওদিকে যে গড়গড়ি!" -"গড়গড়ি?" আমার আর গোবরার সম্মিলিত কৌতুহল। -"গড়গড়ি। আগে আমাদের কাঠের কারখানাতেই কাজ করত। পরে তহবিল ভেঙে চম্পট দেয়। ইদানীং চাপাতি ছাপ দলের হয়ে কারখানাতেই তোলা তুলতে আসত। বলে গেছে, ভোট চাপাতিতে না দিলে গড়গড়ির হাতেই গড়াগড়ি যাবে, মুন্ডু একদিকে আর ধড় একদিকে।" আমি গোবরাকে সাবধান করে দিই, "তাহলে মাখনের সাথে মাখোমাখো না হওয়াই ভালো, কাজ নেই বেশি মাখামাখিতে। তুমি গড়গড়ির হাতে গেলে, তোমার দাদার বংশ আর গড়াবে কি করে?" -"ঠিক!" হর্ষবর্ধন সমর্থন করেন, "আমার ছেলেপুলে-নাতিনাতনি নেই বটে, কিন্তু নাতিবৃহৎ তুই তো আছিস। তুই গেলেই বর্ধন বংশ লোপ পেল, আর বর্ধিত হতে পা'বে না। না রে গোবরা! ওসব মাখন-ফাখনকে ভোট দেওয়া তোর চলবে না।" -"চেতলায় থেকে থেকে তুমি ভারি হীনচেতা হয়ে পড়েছ দেখছি দাদা! চেতনা লোপ পেয়েছে তোমার। আচ্ছা, মাখনকে নাহয় ছেড়েই দিলাম, নিষ্কর করের কথাটাও ভাববে না তুমি! আমাদের কারখানা থেকেই তো কাঠ নেন ভদ্দরলোক। ধার বাকিতেই নেন অবিশ্যি, কিন্তু তা'বলে তাঁর ধার ধারবে না তুমি! ভোটটাই দেবে না তাঁকে! এরপর কাঠ চাইতে এলে মুখ দেখাতে পারবে ভেবেছ?" বুঝলাম দুই ভাইয়ের সমস্যার সমাধান সহজে হবে না। ভোটাধিকারের একটা ফয়সালা না করে এঁরা জলযোগের নামও করবেননা, এদিকে আর দেরি করলে মেসের হরিমটরও এবেলা আর জুটবে না। তাই ভোটের পরদিন এসে খবর নেব বলে পলায়নপর হই, একরকম পালিয়েই আসি পা চালিয়ে। খোঁজ অবশ্য আমাকে নিতে হয় না। ভোট দিয়ে হর্ষবর্ধন-গোবর্ধনই সরাসরি এসে হাজির হন আমার মেসে, একেবারে সশরীরে। -"ভোটটা দিয়েই এলাম মশাই।" হর্ষবর্ধনের ঘোষণা। -"ভুটভুটি চেপেই গেসলাম দুজনে, আমার মোটরবাইকেই।" গোবরার সঙ্গত। -"যাক! সব ভালো যার শেষ ভালো। কিন্তু, দিলেন কা'কে? মাখন না গড়গড়ি? নাকি করের করতলগতই হয়ে গেলেন শেষটায়?" দুভাই প্রাণখোলা হাসি হাসতে থাকেন। "না মশাই, অনেক ভেবেচিন্তেও যখন কূল পেলাম না, তখন দাদা একটা জব্বর মতলব ঠাউরালে।" গোবরা দাদার গরবে গর্বিত হয়। "ভাবলুম, কাউকে চটিয়ে লাভ কি!" দাদাও আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন, "গুনতিতে দেখলুম মোট পাঁচজনের নাম ওই যন্তরে। তাই হাতের পাঁচ আঙুল পাঁচটা বোতামে রেখে একসাথে টিপে দিইচি। আমিও, গোবরাও। সবাইকেই খুশি করা হল, আবার যন্তরের কল্যানে আমাদের যন্তরনাও আর রইল না। জয় গণতন্ত্র মাঈ কি!" -"অ্যাঁ! " -"হ্যাঁ।" আমার বিঘতখানেক লম্বা হাঁয়ের দিকে পুলকিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন বর্ধন অ্যান্ড বর্ধন কোম্পানির দুই মালিক।

146

9

Dr Samya Dutta

পুরীষ পুরাণ

পুরা-কথা: ....দানবরাজ ইল্বল তখন করজোড়ে নিবেদন করলেন, " হেঁ হেঁ, লজ্জা করবেন না স্যার, পেট ভরে খাবেন! বেশি কিছু করতে পারিনি, আপনার অনারে একটু ল্যাম্ব স্টু করেছি মাত্তর। স্যার কি খাওয়া শুরু করে দিলেন নাকি? হাত ধোয়া-টোয়া.... কী বলছেন? শুদ্ধাত্মা ঋষির আবার ডেটল সাবানের কী প্রয়োজন? তা তো বটেই, তা তো বটেই, 99.99% জীবাণু তো ব্রহ্মতেজেই মরে যাবে.... বেশ, বেশ, খান স্যার, খান! সব ঠিক আছে? ঝাল-টাল, নুন-টুন? " অগস্ত্য মুনি একটি আস্ত ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ উদরস্থ করে একটা নাতিবৃহৎ ঢেকুর তুললেন। ইল্বলরাজের গোঁফের ফাঁকে কি একটু মুচকি হাসি দেখা গেল? মিলিটারি গোঁফজোড়ায় একবার আদরের তা দিয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, " পিয়া তু উ উ উ, অব তো আ যা.... আয় রে বাতাপি, বেরিয়ে আয়, ভাইটু!" ওমা, কোথায় কী! যে বাতাপি অন্যদিন সিগনাল পাওয়া মাত্র মুনিপ্রবরদের পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, আজ সে নট নড়নচড়ন, নট কিচ্ছু! ইল্বলের মুখ শুকিয়ে আমসি! আর তাই দেখে অগস্ত্য মুনি ভুঁড়ি-টুঁড়ি কাঁপিয়ে, মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে প্রথমে খিঁ খিঁ, তারপর খ্যাঁক খ্যাঁক, শেষে খ্যাঁখৌ খ্যাঁখো করে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে বললেন, " ফ্রম গুড়-বাতাসা টু বাতাপি, যো অন্দর গ্যায়া, সমঝো বিলকুল হজম হো গ্যায়া। কুছু নাহি নিকলেগা।" উত্তর-কথা: অ্যায়, অ্যায় বেরিয়েছে! আড়চোখে কমোডের তলদেশে একবার চোখ বুলিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন অগস্ত্যবাবু। আর শুধু নীচুতলায় কেন, কমোডের খোলা ঢাকনায়, মায় পেছনের দেয়ালেও তাঁর রেক্টাল স্প্রে পেন্টিং-এ নতুন দেওয়াল লিখন হয়ে গেছে। একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন অগস্ত্য সাধুখাঁ। বসার টাইমিং-এ সামান্য দেরি হয়ে যাওয়ায় সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি, তা হোক! ওটুকু কোল্যাটারাল ড্যামেজ। কবিতার খাতাটা কলের মাথায় ব্যালান্স করে রাখা ছিল, পেনটা সাবানের কৌটোয় হেলানো। সাবধানে টেনে নিয়ে অগস্ত্যবাবু লিখতে শুরু করেন: আবির্ভাব সময় সকালবেলা/ ডান হাতে জ্বলন্ত চারমিনার, বাঁ হাতে বালতি/ মানব চলেছে তার সাধন কক্ষে/ ক্যাঁচ! দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়/ আর তার একটু পরেই --- আবির্ভাব / নিস্তব্ধ, শূন্য প্যানের 'পরে, পড়িল সে ছড়াত করে/ মূর্তিমতী তুমি আম! একটু আগেই ভুলিয়েছিলে আমার বাপের নাম/ থকথকে জেলী রূপ! অপূর্ব, অদ্ভুত! / কপালে রক্তচন্দন, জীবনে নাহিকো বন্ধন, পিছলিয়ে চলে যাও অতল গহ্বরে / বারবার আনি জল, যেন তব ট্রাঙ্ককল/ হাত দুটি ব্যথিত আজিকে / দুধ মুড়ি যাই খাই, অথবা মন্ডা- মিঠাই, সবে লয়ে এক সাথে দেখা দাও সুপ্রভাতে/ তোমাকে পারি না আর, তাই তব খুরে খুরে নমস্কার।নমস্কার। নমস্কার। নাহ্, বেড়ে হয়েছে! কফি হাউসে এমন একখানা 'জীবনমুখী কবিতা' পড়তে পারলে অনেকগুলো থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেওয়া যাবে। ক্লাস নাইনকে বোর্ডে জ্যামিতি শেখাচ্ছিলেন অগস্ত্যবাবু। হঠাৎ একটা মিহি, প্রায় কানে শোনা যায় না, এমন শব্দ পেয়ে ফার্স্ট বেঞ্চের রাখাল বলে উঠল, " ওই রে, সম্পাদ্য বেরিয়েছে! " সঙ্গে সঙ্গে চাঁদা-কম্পাস ফেলে গোটা ক্লাস ব্যস্ত হয়ে পড়ল মুখে রুমাল চাপা দিতে। খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর আবার সতর্কতা জারি হল, "এইবার উপপাদ্য!" ব্যাস! আবার রুমাল চাপা। ফার্স্ট বয় সুবোধ বেচারি স্যারের ঠিক পেছনেই বসে। স্যারের ভয়ে প্রথম দু'বার মুখে রুমাল চাপা দিতে পারেনি, কিন্তু 'প্রতিপাদ্য' শোনামাত্র সে দম টেনে নিঃশ্বাস বন্ধ করল। বোর্ডে ইউক্লিডকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে অগস্ত্যবাবু এবার ছাত্রদের দিকে ফিরলেন। আড়চোখে সুবোধের বেগুনি হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, " বাবা রাখাল, গুরুমশাইকে নিয়ে ঠাট্টা করাটা কি উচিত হচ্ছে, বাপ! এবার কিন্তু আমিই অঙ্কের খাতা দেখব! তাই বলি কি, রুমাল-টুমাল ভারি বিলাসিতার জিনিস, ওসব সরিয়ে রেখে কষ্টসহিষ্ণু হও। মনে রেখো, যে সয়, সেই রয়; আর যে না সয়, সে পরের বছরও এই ক্লাসেই রয়।" ফিজিক্সের মাস্টার রসিক যেমন চালিয়াত, তেমনি ফিচেল। জয়েনিং-এর দিন পরে এসেছিল সবুজ জামা আর ক্যাটক্যাটে মেরুন প্যান্টুল। বেজায় উৎসাহিত হয়ে অগস্ত্যবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ভাই, তুমি বুঝি মোহনবাগান?" ওইখানটায় তাঁর মস্ত দুর্বলতা। -কী বলছেন দাদা! আমার বাবা তো মোহনবাগানে খেলত! -"অ্যাঁ!" অগস্ত্য সাধুখাঁ রোমাঞ্চে আর বিষ্ময়ে প্রায় কেঁদে ফেলেন, "কী নাম বল তো?" -ওই যে আটের দশকে লেফ্ট আউট খেলত.... আহা, কী নামটা চট করে বলে ফেলুন....পেটে আসছে তবু মুখে আসছে না.... -" আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে! তবে হ্যাঁ, ভালো কথা.... অন্য কেউ হলে বলতুম না, নেহাৎ তুমি বলেই...." অগস্ত্যবাবু ফিসফিসিয়ে ওঠেন, "বাকিদের সঙ্গে বেশি মাখামাখিতে কাজ নেই। সবকটা কুচুটে, আর ইস্টবেঙ্গল!" সেই ফিচেল ফিজিক্স টিচার আজ অগস্ত্যবাবুকে টিচার্স রুমে ঢুকতে দেখে, কতকটা যেন আপন মনেই ফোড়ন কাটল, " প্রভুপাদ আবির্ভূত হলেন, জয় গুরু!" ঘরের ভেতর একটা চাপা হাসির হিল্লোল উঠল। অগস্ত্যবাবু কড়া চোখে একবার তাকিয়ে, রসকেটাকে ভষ্ম করে দিয়ে নিজের আসনে বসে পড়লেন। পিছনেই বসে ছিলেন বাংলার হরগৌরীবাবু। অগস্ত্যবাবুর পিঠে একটা পেনের খোঁচা দিয়ে বললেন, " দেখো সাধুখাঁ, ফাইনালের খাতা দেখছি। দয়া করে, এখন আর তোমার ওই 'ফুসিকা প্রাণঘাতিকা'টি ছেড়োনা বাপু!" কথাটা পড়তে পেল না, একটা প্রাণঘাতী দুর্গন্ধ পেয়ে রসিক চেঁচিয়ে উঠল, " হরদা, ফাইনাল সামলান! রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করেছেন।" নাক আর গলার মাঝে 'ফোঁৎ' গোছের একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে অগস্ত্যবাবু আনন্দবাজারটা টেনে নিলেন। জ্যোতিষার্ণব বলছেন, " মেষ রাশির জাতক আজ পেটের অসুখে ভুগতে পারেন...." সে আর নতুন কী! অগস্ত্য সাধুখাঁ বারোমাস পেটের রোগ নিয়ে ঘর করেন। ছয় মাস তাঁর কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে, বাকি ছয় মাস ডায়রিয়া। তাছাড়া গ্যাস, অম্বল, চোঁয়া ঢেকুর আর ওই 'ফুসিকা' তো তাঁর পুরাতন ভৃত্য। এ নিয়ে অবিশ্যি তাঁর মনোভাবটা বেশ ডোন্ট কেয়ার ধরনের। "পরমহংসদেব কী বলেছেন জানো? শরীর ধারণ করলে তার ট্যাক্স তো দিতেই হবে, ওগুলো হল সেই ট্যাক্সো!" মুর্গি-মাটন তিনি ছাড়বেন না, চিকিৎসা করাবেননা। অ্যালোপ্যাথি তাঁর বিলকুল না পসন্দ! হাত ফেঁড়ে ব্লাড নেবে, পেট ফেঁড়ে, পিঠ ফেঁড়ে এটা নেবে, সেটা নেবে, ধুস! নিজে এককালে হোমিও শিখেছিলেন, গিন্নী খুব ঘ্যানঘ্যান করলে ওই হুমোপাখির মিষ্টি গুলিই খান। সাধুখাঁগিন্নী কিন্তু দত্তদের বৌয়ের কাছে বিস্তর অনুযোগ করেন। "আর ভাই, পনেরো বচ্ছর বে হয়েচে, একটা রাত একটু শান্তিতে ঘুমুতে দিলে না গা!" -কেন, দাদার বুঝি খুব নাক ডাকে? -নাক নয় ভাই, পেছন ডাকে। খালি শব্দ আর গন্ধ! আর পেছন বন্ধ হল তো গলা। ঢ্যাক ঢ্যাক করে ঢেকুর! ঘুমের ঘোরে কেউ অমন ঢেকুর তুলতে পারে, বাপের কালে দেকিনি! টিফিন পিরিয়ডে মাঠের বকুল গাছটার তলায় বসে পকেট থেকে চিঠিটা বের করল বিন্ধ্য। চিঠিটা আজ সকালের ডাকে এসেছে, আলমোড়ার পোস্টমার্ক। ওপরে তার নাম লেখা: বিন্ধ্য সাধুখাঁ, কেয়ার অফ অগস্ত্য সাধুখাঁ। এই হাতের লেখা তার ভীষণ চেনা: " দাদুভাই, তোমার চিঠি পেতে একটু দেরি হল। আসলে ক'দিন বাড়িতে ছিলুমনা। করবেট সাহেবের গপ্প বলেছিলাম তোমায়, সেই করবেটের নামে এদিকে মস্ত জঙ্গল আছে, সেইখানে বেড়িয়ে এলুম। কী ভাবছ, দাদুভাই তোমায় ফাঁকি দিয়ে বেড়িয়ে নিলে? তুমি একটু বড় হও, তোমাকেও নিয়ে আসব। কিন্তু, তোমার চিঠি পড়ে সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে গেল। তোমার বাবা পিটিএ মিটিং-এ গিয়ে প্রথমে বিশ্রী গন্ধ ছেড়েছে, তারপর হড়হড় করে হেডমিস্ট্রেসের টেবিলে বমি করে দিয়েছে, আর সেই নিয়ে তোমার বন্ধুরা হাসাহাসি করেছে, এ তো ভারি লজ্জার কথা! তোমার বুঝি ইস্কুলে যেতে খুব লজ্জা করছে? ঠিক হ্যায়, শরমাও মাত! তোমায় কিচ্ছুটি ভাবতে হবে না, এর ব্যবস্থা আমিই করছি! কয়েকদিনের মধ্যেই তোমাদের ওখানে গিয়ে পড়ব। তবে সেটা এখন গোপন রেখো, টপ সিক্রেট! আর সাবধান! চিঠি যেন বাবার হাতে না পড়ে! ততদিন সাবধানে থেকো, আর রোজ স্কুলে যেও। ইতি, তোমার দাদুভাই আজ ইস্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভা। মঞ্চ আলো করে হেডমাস্টার নিত্যগোপালবাবুর পাশে বসে রয়েছেন স্কুল ইনস্পেক্টর ডি.সি.গড়গড়ি। বাকি মাস্টাররাও রয়েছেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বাজেট কম বলে সবার জন্য লুচি-বোঁদে, কেবল ইনস্পেক্টর সাহেবের জন্য মা তারা মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্পেশাল প্যাকেট, তার পাঁচ খোপে পাঁচ রকম মিষ্টি, আর মধ্যিখানে মা তারার স্পেশালিটি রাজাধিরাজ ভোগ। অগস্ত্যবাবু একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। ক্লাস টেনের ছোকরাদের উদ্বোধনী সঙ্গীত, মাল্যদানটান শেষ হবার পর সবে সেক্রেটারি নন্দবাবু বলতে উঠেছিলেন, " আজকের এই শুভদিনে...." ইত্যাদি, দারোয়ান রামচতুর হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিলে, " ইনিস্পেকটার সাহিবকা পাকিট গায়াব!" গায়েব মানে! বলছিস কী রে হতভাগা! এর উত্তরে রামচতুর কাঁচুমাচু মুখ করে জানালে, ইসমে তার কোনো কসুর নেই। সে বরাবর খাবারের প্যাকেট পাহারা দিচ্ছিল, "বস একবার থোড়া ধার মারনে গ্যায়া থা, উও ভি সিরফ পাঁচ মিনট কে লিয়ে।" আর এসেই দেখে প্যাকেট বেপাত্তা! অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। নিত্যগোপালবাবু টেনশনে দৌড়াদৌড়ি করছেন, আর সব্বাইকে ধমক মারছেন। গড়গড়ি সাহেবও ব্যাপারটা টের পেয়েছেন, তাঁর মুখ কালো হয়ে গেছে। সেক্রেটারি নন্দবাবু তাঁকে হাতটাত কচলে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন। পিটি টিচার বাঁটুলবাবু বললেন, " গেটটা লাগিয়ে দিন। কেউ যেন বেরোতে না পারে। সবার তল্লাশি নেব।" শুনে নিত্যগোপালবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন, "ক্ষেপেছেন মশাই! সাতশো ছাত্তর, তাদের শ পাঁচেক গার্জেন, তল্লাশি করতে চাইলে ভাঙচুর শুরু হয়ে যাবে যে!" এদিকে গার্জেনরাও ততক্ষণে নানারকম পরামর্শ দিতে শুরু করেছেন: -থানায় খবর দিন। -দমকল ডাকুন, দমকল। -না না, নির্বাচন কমিশন। -রাষ্ট্রপুঞ্জের নম্বরটা কত যেন? গোলমালটা বেশ পাকিয়ে উঠেছে, চিন্তায় সবার মাথার চুল ছেঁড়ার দশা, এমন সময়.... "ব্যোম শঙ্কর! ব্যোম কালী কলকাত্তাওয়ালি!" হাঁকটা এসেছে স্টেজের পিছন দিক থেকে, আর এসেছে কামান দাগার মত। সবাই চমকে উঠে দেখেছে, এক পেল্লায় সাধুবাবা! মাথায় জটা, বুক অবধি লম্বা দাড়ি, পরনে নেংটির মত একটা কাপড় আর গোটা শরীরে ছাইভস্ম মাখা। সাধুবাবার এক হাতে ত্রিশূল আর অন্য হাতে একটা চিমটে। সাধু জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, "চোর খুঁজতে থানা-পুলিশ করছিস হতভাগারা! আর ইদিকে ত্রিকালজ্ঞ সন্ন্যাসী তোদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই কারো! পাষণ্ড! পামর! আমার মা না চাইলে, পুলিশের সাধ্যি আছে, চোর ধরে দেবে?" নন্দবাবু ভক্ত লোক, সম্প্রতি চার ধামের যাত্রা করে এসেছেন। তিনি সবার আগে ছুটে গিয়ে সাধুর পায়ে পড়ে গেলেন। "বাবা, অধমদের বাঁচান, বাবা! প্যাকেট উদ্ধার না হলে মুখ দেখাতে পারব না।" সাধু হা হা করে হেসে, নন্দবাবুর পিঠে দুটো চাপড় মেরে বললেন, " ওঠ ব্যাটা! স্বামী জৃম্ভনানন্দ থাকতে ভয় কী রে!" হাসি হাসি মুখ করে নন্দবাবু চোখের জল মুছতে মুছতে সাধুর পা ছাড়লেন, আর অমনি যেন বাবাজীর পদধূলি নেবার হরির লুঠ পড়ে গেল। শুধু গড়গড়ি দূর থেকে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। অগস্ত্যবাবুও গিয়েছিলেন প্রণাম ঠুকতে, বাবাজীর সঙ্গে একবার চোখাচোখি হতে মুখটা কেমন যেন চেনা ঠেকল। কিন্তু ভালো করে দেখার আগেই ভূগোলের শিক্ষক টেকো শিবপদবাবু তাঁকে কনুই-এর গুঁতোয় স্থানচ্যুত করলেন। এবার বাবাজীকে সসম্মানে নিয়ে তোলা হল স্টেজে। মাঠে তখন পিন ড্রপ সাইলেন্স। সমবেত দর্শকের মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে সাধুবাবা প্রথমে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিসব মন্ত্র পড়লেন। তারপর কান পেতে কিছু একটা শোনার ভঙ্গি করে ত্রিশূলটা ভীষণ জোরে দু'বার স্টেজে ঠুকে বললেন, "কী বললি মা? চোর এখানেই আছে? চোরের পাতলুন দেখব? হলদে হয়ে যাবে? বেশ! তবে তাই হোক, মা! সবই তোর ইচ্ছে। ব্যোমকালী! ....অ্যায়ো, তুম!" এবার আদেশ হল রামচতুরের প্রতি, " সবকা পাতলুন চেক করো। পেহলে মাস্টার লোগোকা। জিসকা পিছওয়াড়া পিলা হোগা, উসকো কান পাকড়কে লে আও!" অগস্ত্যবাবুর গতকাল থেকে ডায়রিয়া সংক্রান্তি শুরু হয়েছে। আজ সকালে পরিমাণে ঘাটতি দেখে ডায়রিতে নোট করেছিলেন, " সকাল সাতটা। আনন্দবাজার সহযোগে আড়াইশো গ্রাম। বিকেলে পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা।" প্যাকেট চুরির চূড়ান্ত টেনশনের মধ্যেই টের পাচ্ছিলেন, নিম্নচাপ ক্রমশ বর্ধমান। ভেবেছিলেন, গোলমাল মিটলে একফাঁকে সেরে আসবেন। কিন্তু সাধুবাবা এসে পড়ে সব ঘেঁটে দিলেন। রামচতুর এবার মাস্টারদের লাইন করে দাঁড় করাতেই, অগস্ত্যবাবু টের পেলেন, চাপের চোটে কোলন এখন কোলে উঠতে চাইছে। অগস্ত্যবাবুর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। তিনি প্যাকেট নেননি, হলফ করে বলতে পারেন, কিন্তু সেকথা কা'কে বিশ্বাস করাবেন? মোক্ষম সময়েই যে তাঁর পেট সাবোতাজ করেছে! প্রথমে ফিজিক্সের রসিক, সসম্মানে পাশ.... অগস্ত্যবাবু দাঁতে দাঁত চেপে আছেন.... হেডমাস্টার নিত্যগোপালবাবু, বাঁটুলবাবু, পাশ....পাশ.... অগস্ত্যবাবুর ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে.... শিবপদবাবুর কাছে আসতেই.... ছ্যাড়-ছ্যাড়-ছ্যাড়াক! একটা বিশ্রী আওয়াজ তুলে অগস্ত্য সাধুখাঁর পেট পুরোপুরি ধর্মঘটে চলে গেল। অবাক দর্শক দেখল সবুজ মাঠের খানিকটা পীতাভ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ সব চুপ, তারপর আকাশ ফাটিয়ে একটা " চোর, চোর! দুয়ো, দুয়ো!" রব উঠল। সাধুবাবা স্টেজ থেকে এক লাফে নেমে সোজা অগস্ত্যবাবুর সামনে এসে চিমটেটা দিয়ে সজোরে তাঁর নাক টিপে ধরলেন। ব্যাথায় চোখ জলে ভরে গেল, 'আঁ আঁ' করে একটা চিৎকার করতে করতে সেই ঝাপসা চোখেই অগস্ত্যবাবু দেখলেন, সাধুবাবা তাঁরই পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা প্যাকেট বের করে এনেছেন। তার ওপর লেখা, 'মা তারা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।' রাত দশটা নাগাদ ইস্কুলের ভাঙা পাঁচিলের পাশে বসে দাড়ি আর পরচুলা খুলতে খুলতে স্বামী জৃম্ভনানন্দ বললেন, " বাবা রসিক, আরেকটু চুলকে দাও তো! উফ! পরচুলোয় এত উকুন কে জানত! " রসিক মাষ্টার একগাল হেসে বললে, "এই দিই! থ্যাঙ্কু জ্যাঠামশাই! আজ যা উপকার করলেন...." পুনশ্চঃ আরো ছয় মাস অতিক্রান্ত। অগস্ত্যবাবু এখন কলকাতার নামী অ্যালোপ্যাথকে দেখিয়ে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত। রোজ মর্নিং ওয়াক করেন, আমিষ ছেড়েছেন, সম্প্রতি উইলও করেছেন: " আমার পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্রাদি যে উত্তরপুরুষ ক্রনিক পেটের ব্যারামে ভুগবে, সে আমার সমুদয় সম্পত্তি হতে বঞ্চিত হবে।"

140

6

Dr Samya Dutta

ল র ব য হ

'লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে'- একথা বলে কে? যে বলে, সে নির্জলা দুষ্টু লোক। আমার ঠাকুমা কিন্তু ভারি ভালোমানুষ। ঠাকুমা বলে, বেশি পড়ালেখা করলে চাঁদি গরম হয়, রাত্তিরে চোঁয়া ঢেকুর ওঠে, আর চাঁদনি রাতে পেতনিতে ধরে। সেই ছোট্টটি থেকে ঠাকুমার সব কথাই আমি হাঁ করে গিলি আর ধাঁইধাঁই বিশ্বাস যাই। তা একথাটাই বা অবিশ্বাস করি কেন? বিশেষ করে কথাটা যখন আমার মনে ধরেছে খুউউব! অবিশ্বাসের কারণ অবিশ্যি এমনিও ছিল না, কিন্তু আমার বিশ্বাসটাই আরও পাকাপোক্ত করে দিয়ে গেলেন বিদ্যেধর বিশ্বাস, অর্থাৎ আমার বিদ্যে পিসে। পিসের আদি নিবাস ছিল কলকাতায়। বিদ্যাধর বিদ্যা কম ধরতেন না, বস্তুত ধরাধামের কোনো বিদ্যাই তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল না। নবীন, প্রাচীন, অর্বাচীন সব শাস্ত্র গুলে খেয়ে পিসে অ্যায়সা বিচক্ষণ হয়ে উঠেছিলেন, যে সাহেবরা তাঁকে আদর করে ডাকত 'Very intelligent pandit,' সংক্ষেপে 'ভিআইপি।' বিদ্যে পিসে বইয়ের সঙ্গেই সই পাতিয়েছিলেন। বইয়ের বিরহবেদনা একদন্ডও সইতে পারতেন না। হুঁকো খেতে খেতে ফুকো পড়তেন, সাত্রে পড়ে তাঁর রাত্রে ঘুম হত না। শেষে মায়াকোভস্কি আর বুকাওস্কি পড়ে যেই না মাথায় খুস্কি হয়েছে, ডাক্তার তাঁকে নিদান দিলেন চেঞ্জে যেতে। আর যায় কোথা? ডাক্তারের মুখ থেকে কথা খসেছে কি খসেনি, পিসে কলকেতা ছেড়ে কেটে পড়েছেন- রানাঘাট, ডায়মন্ডহারবার হয়ে একদৌড়ে সোওওজা সেই তিব্বত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিব্বতের ঠান্ডাটা সবার সয় না। পিসেরও সইল না। মাথার খুস্কি তো গেলই না, মাঝখান থেকে সেখানকার বরফের ওপর দিয়ে স্কি করতে করতে পিসে গিয়ে পড়লেন অতল খাদে। এতখানি অধঃপতন আত্মায় সইল না, দেন অ্যান্ড দেয়ার পরমাত্মায় বিলীন হয়ে গেলেন। পপাত চ অ্যান্ড মমার চ! সশরীরেই পড়েছিলেন, কিন্তু পড়ামাত্রই অশরীরী হয়ে গেলেন। ভিআইপি থেকে এক ধাক্কায় আর.আই.পি। তা যেতে তো সবাইকেই হবে, দু'দিন আগে বা পরে! 'জন্মিলে মরিতে হবে' ইত্যাদি... কিন্তু যেতে যেতে পথে, পিসে আমাকে একেবারে পথে বসিয়ে গেলেন। দেখা গেল, মৃত্যুর পূর্বে বিদ্যে পিসে উইল করে গেছেন। অ্যান্ড ইফ দেয়ার ইজ আ উইল, দেয়ার ইজ আ উকিল। শামলা-গায়ে সেই শ্যামবর্ণ উকিল, শেয়ালের মত মুখ করে পিসের অন্তিম উইলটি ব্যক্ত করলেন। জানতে পারলুম, পিসে তাঁর বইয়ের তাকটি তাক করে আমার ঘাড়েই চাপিয়ে গেছেন। আর শুধু তাক দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তাকের বইগুলোও ঠাকুমার এই বাধ্য নাতিটিকে গছিয়ে গেছেন। বই এবং বইয়ের তাক, দুইই আমার ভাগে পড়েছে। যাতে একেবারে বয়ে না যাই, সেদিকে তাকিয়েই নাকি তাঁর এই সিদ্ধান্ত। সকলে বাড়ি-গাড়ি, মায় বৈঠকখানার তাকিয়াটি অবধি ভাগ করে নিলে, আমি কেবল ইয়া ব্বড় তাক ঘাড়ে নিয়ে তাকধিনাধিন নাচতে নাচতে বাড়ির পথ ধরলাম। কিন্তু বাড়ির দরজা অবধিই পৌঁছনো গেল। তাকের দিকে একঝলক তাকিয়ে, ওই দরজা থেকেই মা আমাকে দরজা দেখিয়ে দিলে। ভদ্রলোকের সঙ্গে তবু এককথা চলে, ভদ্রমহিলার কাছে নো ট্যাঁ-ফোঁ! সাফ কথা, ধুলোটুলো ঝেড়ে সাফসুতরো না করলে, ওই তাকের এবাড়িতে প্রবেশ নিষেধ, এবং সেইসঙ্গে আমার অর্থাৎ তাকের মালিকেরও। অগত্যা একহাতে ন্যাকড়া, একহাতে ঝুলঝাড়া আর অন্যহাতে কলিন স্প্রে নিয়ে মলিন মুখে তাকের যাবতীয় মলিনতা দূর করতে নেমেছি। বাপরে বাপ! কী ঝুল! আর সেই ঝুলে ঝুলে থাকবার জন্য মাকড়সাদের মধ্যে যেন ঝুলোঝুলি পড়ে গেছে। মাকড়সা, মাকড়সার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতবৌ এবং তাদের ছেলেমেয়েরা মিলে সে এক হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার। ঝুলঝাড়াটা বাগিয়ে ধরে যেই না ঝুল ঝাড়তে গেছি, ওই অত্ত মাকড়সা তাদের আট পায়ে লেফট-রাইট করে তেড়ে এসেছে! কী ব্যাপার? না তারা 'ঊর্ণনাভ উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি।' তাদের দাবি মানতে হবে, নইলে তাকের দাবি ছাড়তে হবে। কী দাবি? মোস্ট সিনিয়র মাকড়সা এগিয়ে এসে ম্যাকম্যাকিয়ে বললে, "উচ্ছেদ চলবে না। আর যদি একান্তই উচ্ছেদ করতে হয়, তবে মাকড়সাদের পুনর্বাসন দিতে হবে আর সেটাও মাকড়দার কাছাকাছিই দিতে হবে।" যেই না বলা, অমনি সবকটা মিলে "চলছে না, চলবে না," "দিতে হবে, দিতে হবে" ইত্যাদি বলে পোঁ ধরেছে। সে কী শব্দকল্পদ্রুম, বাপরে বাপ! কিন্তু আমিও অত সহজে ছাড়বার পাত্র নই। বললাম, " তা বাপু, তোমরাই যে এ অঞ্চলের আদিবাসী, তার প্রমাণ কই? বলি, কদ্দিন হল এখানে আছ, অ্যাঁ?" মোস্ট সিনিয়র মাকড়সা একটু ভেবে বলল, "তা আছি অনেকদিন, তবে ঠিক আদিবাসী আমাদের বলা চলে না। আগে এখানে কতগুলো টিকটিকি থাকত। তারপর যেই না বিদ্যেবাবুর রামছাগলটা এসে সব টিকটিকি খেয়ে ফেলেছে, ব্যস! আমরাও এসে ঘাঁটি গেড়েছি।" বলেই খ্যাঁ খ্যাঁ, খৌঁ খৌঁ, খৌঁয়া খৌঁয়া করে তার কী হাসি! আর সেই হাসি শুনেই সব ব্যাটাচ্ছেলে মাকড়সা একসাথে হাসতে লেগেছে। কেবলই হাসে, গড়াগড়ি দেয় আর বলে, "এই গেল গেল, পেট ফেটে গেল!" এসব দেখেশুনে আমার বেজায় রাগ হল। ভাবলুম মাকড়সারা বুঝি আমায় নিয়ে মশকরা কচ্চে। তাই চোখ লাল লাল আর গোল্লা গোল্লা করে কষে ধমক দিলাম, "অ্যায়ো, মাকড়ামি করতা হ্যায়? হম কৌন হ্যায়, জানতা নেহি? অভি অভি তাক ছোড়কে নিকালো, নেহি তো হমারা অভিভাবককো বুলায়েগা, তব মজা টের পায়েগা।" দেখলাম ওষুধ ধরেছে। সিনিয়র মাকড়সা মিটমিট করে আমার দিকে চেয়ে বলল, "বাপু হে, বলি অত হ্যাঙ্গামে কাজ কি? তার চেয়ে মিটমাট করে নিলেই হয়।" বলামাত্র বাকিগুলোও কোরাস ধরল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, নিলেই হয়, নিলেই হয়।" -হ্যাঁ খোকা, ওই গানটা শুনেছ তো? আরে, কোনটা কী হে, ওই গানটা! আরে ওইটে... শোনোনি? ওরে, ও মাকু, গা তো বাবা, গেয়ে শোনা... একটা ছোকরা গোছের মাকড়সা, বোধহয় মাকড়সাদের যাত্রাপালায় সখী সাজে, খুব করুণ গলায় গান ধরল: "স্পাইডারম্যান,স্পাইডারম্যান ফ্রেন্ডলি নেবারহুড, স্পাইডারম্যান।" ওই দুকলিই জানে। সেটাই একবার গাইল, দু'বার গাইল, পাঁচবার দশবার গাইল। তা, আমার গানটা মন্দ লাগেনি, কিন্তু মানেটা বুঝি বুঝি করেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। সেটা মুখে বলতেই, সিনিয়র মাকড়সা মাথা নেড়ে বলল, "হুঁ, মানেটা খুব শক্ত। সবাই ধরতে পারেনা। এর মানে হল গিয়ে: মাকড়-মানুষ ভাইভাই, এক ঠাঁই, এক ঠাঁই।" তার কথা শেষ হতেই আবার সবাই মিলে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলে, "এক ঠাঁই, এক ঠাঁই।" তা বলছিলুম কী, প্রস্তাবটা আমারও খুব একটা যে খারাপ লেগেছে, তা নয়! আমি ততক্ষণ একটু ভেবে নিই, আর... আর আপনাদের কি আজ বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়, অফিস এবং আদালত, নবান্ন ও পলান্ন সব ছুটি নাকি মোয়াই, অ্যাঁ? যান, এসব আজেবাজে কথায় কান না দিয়ে নিজের কাজে মন এবং নিজের চরকায় তেল দিনগে! যান যান!

156

6

Dr Samya Dutta

আমিই ইন্ডাস্ট্রি

জ্যেষ্ঠ ডিউক কহিলেন, "হে মেলাংকলিক মদনা! তুমি কহিলে যে, কলিকালে এক নাটুকে নটবরলাল ছোকরার আবির্ভাব ঘটিবে। সেই ছোকরা আপন ড্রামাবাজির ড্রামটি কিরূপে পেটাইবে এবং আপনার রঙ্গিলা রঙ্গের দ্বারা পৃথিবীর এই রঙ্গশালাটিকে কী প্রকারে রঙ্গিন করিবে, তাহা শুনিতে বড় কৌতূহল জন্মিতেছে। হে পুঙ্গিপুঙ্গব, তুমি এই আখ্যান সবিস্তারে বর্ণনা কর।" জ্যাক কহিল, "ইরিত্তারা! কী ভাসা নামিয়েচো কাকা! পুরো বঙ্কিমের বাপ বিদ্যেসাগর তো! সেভেনে সমোস্কিত ছিল, না? অ্যাঁ! ছিল বলচো? তবে একপিস ডায়ালগ যা ঝেড়েছ না, উফফ! মাখন কাকা, পুরো মাখন! 'পৃথিবীর রঙ্গশালা!' হেব্বি হাইট হয়েচে। All the world's a stage, and all the men and women merely players... His acts being seven ages... তা, এ ছোঁড়ার সাতকাহন আর তোমায় কী বলব কাকা! তবু শুনতে যখন চাইচ...অ্যাজ ইউ লাইক ইট! তো কেসটা হচ্চে, এ মালের ন্যাংটোবেলায়, মানে তকনো প্যান্টে ইন করেনি আর কি- ইনফ্যান্টই বলতে পারো... তকনো মিউ মিউ করে Mewling আর পুক পুক করে puking in the nurse's arms... নচ্ছারটার নাটুকেপনার তকন থেকেই লিমিট নেইকো। খেতে নাটক, ঘুমুতে নাটক, বোসতে তকনো শেকেনিকো- কিন্তু শিকলে বস বোসতেও নাটক কত্ত নিঘ্ঘাত! কিন্তু কেসটা কী বলো তো... ওসব চ্যাংড়ামি এক সাইডে, আর নাটকের এস্টেজে উঠে নটরাজ হওয়া আরেক সাইডে। মহানায়ক কি আর গাছে ফলে কাকা! বলো? সে ছিল আমাদের যৈবনে গুরু উত্তমকুমার, উফফ! কী অ্যাক্টো! টোটাল গায়ে কাঁটা, চোখে জল, হলে সিটি... কিন্তু এসব নভিস নাবালককে নাটকে নাবালে কী কেলো হয়, শোনো..." এস্থলে এন্ট্রি নেওয়া একান্ত এসেন্সিয়াল। ফরেস্ট অফ আর্ডেনের আপদটি ডিউকডাডুর মাথায় যত খুশি খাজা গপ্পের কাঁঠাল ভাঙুক, এই যে আত্মকথনের জন্য আমার পরাণটা আটুপাটু করছে, তার কারণ হ্যাজ। ব্যাপারটা হল গে, বাজারে আমার ফিচেল বদনামটা বড্ড বেশি ফেটেছে। তা'তে যে আমি অখুশি হয়েছি, এমনটা অবিশ্যি নয়। তবে, ওই যে, কে যেন কবে যেন কার যেন কানেকানে কুমন্তর দিয়েছিলেন, রসিক হতে হলে আগে রসের হাঁড়িটা নিজের মাথায় ভাঙো! অর্থাৎ ব্যঙ্গের বাণখানি আগে নিজের দিকে বাগিয়ে ধর। আমার সেন্স অফ হিউমার আগে আমাকেই হিট করুক, তার ধাক্কায় যদি সেন্সলেস হয়ে না পড়ি, তবেই ইস জাঁহাকো লেকে জাঁকিয়ে খিল্লি করনা জায়েজ হ্যায়! তো, হিউমারের হিগস-বোসন কণাটি হল এই- ফিচলেমির ফাতনাটি আগে আপন অন্তঃস্থলে ডোবাতে হবে। অলরাইট, ভেরি গুড! ও ভয়ে কম্পিত নয় বীরের হৃদয়, ইত্যাদি! তা, যেমনটা জ্যাক বলছিল আর কি! বড় হয়ে আমি যে গিরীশ ঘোষ দ্যা সেকেন্ড বা ওই গোছেরই কিছু একটা হব, তা আমার কোষ্ঠীতেই লেখা ছিল। কিন্তু, মাঝখান থেকে কী, কেন, কিভাবে ঘটে গিয়ে কেসটা কেঁচিয়ে দিল- সেকথা যদি জানতে চান, একটু অতীতে ফিরতে হবে। বেশি নয়, এই বিশ-বাইশ বছর। আপত্তি নেই তো? তাহলে আসুন, ষষ্ঠী তিথির ষষ্ঠীপুজোর ফাঁকে সেই গল্পটাই চট করে সালটে দিই: প্রতিটা মফস্বলের প্রতিটা পাড়ার প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ মেনে আমাদের পাড়াতেও পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ হয় শ্যামা-শাপমোচন, নাহয় চিত্রাঙ্গদা-চন্ডালিকার চর্বিতচর্বন হত। মূল স্টার ইয়ার কলাকার, অর্থাৎ আমাদের মায়েরা তাঁদের ছানাপোনাদের, অর্থাৎ আমাদের ট্যাঁকে করে নিয়ে যেতেন রিহার্সালে। তা, সে আমাদের শৈশবের কিরকম শুরুওয়াতকাল, সেটা বোঝাতে একটা উদাহরণই যথেষ্ট। মনে করুন, বৈশাখের বিজবিজে গরমে বিব্রত কোনো বালক সখেদে বলল, "খুব গওম কচ্চে!" তৎক্ষণাৎ বাকিরা সমস্বরে বিস্ময় প্রকাশ করত, "ওমা! তুই এখনো প্যান্টু পরে আছিস কেন?" এবার প্রথম বালকটিও 'সত্যিই তো! জগৎ গরমে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, তোমার কি বসনাবৃত হবার বিলাসিতা সাজে?' ইত্যাদি ভেবে দেন অ্যান্ড দেয়ার দিগম্বর হয়ে যেত। তারপর প্রশস্ত ছাদের একদিকে চলত নাটকের মহড়া, অন্যদিকে নগ্নসুন্দর মহাকালদের ধরাধরি-ব্যাটবল-লুকোচুরি খেলা। তবে, প্রতিভা আর ল্যাজ কখনও চাপা থাকে না। থাকলে ঠিক ঠেলে বেরোবেই। আর আমরা ছিলাম, যাকে বলে 'জন্ম হইতেই নাটকের জন্য বলিপ্রদত্ত।' সুতরাং, স্রেফ ধরাধরি খেলায় আমাদের ধরে রাখা গেল না। 'পীতবসন পরা সন্ন্যাসী' আনন্দর পেছনে পায়চারি করার জন্য একদল চ্যালার প্রয়োজন পড়েছিল। নাটকের প্রধান উদ্যোক্তা স্থির করলেন, এই চপলমতি চিংড়িদের দিয়েই চ্যালার কাজ করাবেন। আমাদের আর পায় কে! মা-মাসিরা মাসাধিক কাল মহড়ায় মত্ত, সেই অজুহাতে সন্ধ্যেবেলার পড়াশোনাও মুলতুবি আছে, আমরা তা'তেই চোদ্দআনা খুশি ছিলাম। ফাউ হিসেবে যদি স্টেজে ওঠার সুযোগটুকুও পাওয়া যায়, বাকি দু'আনাও আপসে এসে যায়। মারহাব্বা! দেখতে দেখতে এসে পড়ল সেই শিহরণ জাগানো সন্ধ্যা। আনন্দর সঙ্গে ম্যাচিং কস্টিউমে সাজুগুজু করে আমরা কচিরাও মনোরম রূপ ধরলাম। তবে, ড্রেসিংরুমের আয়নার নিজেকে দেখে কিন্তু আমি মোটেও প্রীত হইনি। তখনও টেনিদার সঙ্গে আমার টরেটক্কা হয়নি, নইলে হাবুল সেনের কথা মনে পড়ে আতঙ্কিতই হতাম। "তরে কেমন লাগতে আসে? তুই যেন বজ্রবাঁটুল, প্যান্টুল পইরা চালকুমড়া সাজছস!" অবশ্য প্যান্টুল আমি পরিনি, আমাকে পরানো হয়েছে ধুতি। সেটা আবার বেখাপ্পা রকমের বড়। বোধহয় আমাকে দিয়ে স্টেজে এক রাউন্ড ঝাঁট দিইয়ে নেবার পরিকল্পনা ছিল। ড্রেসারকাকুর কাছে একবার মৃদু প্রতিবাদ করতে গেছিলাম। তিনি তখন আনন্দকে সাজাবার আনন্দে মশগুল, আমার চাঁদিতে চাঁটি মেরে ভাগিয়ে দিলেন। কী আর করা! দীর্ঘশ্বাস দমন করে ফিরে এলাম। হায় মূঢ় মানব! ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ নট, যে কিনা মঞ্চাভিনয়ের মোড়ই ঘুরিয়ে দেবে, তার আজ পুণ্য আবির্ভাব। একটা ইতিহাসের সূচনা হতে যাচ্ছে, আর তুমি কিনা... যাকগে! 'চন্ডালিকা'র গল্প আপনারা সবাই জানেন। নতুন করে বলা অনাবশ্যক, বিস্তর আজেবাজে সিনের পর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ক্ষণ। আনন্দ স্টেজের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত হেঁটে যাবে, ব্যাকগ্রাউন্ডে 'বুদ্ধং শরণং' আর হাতজোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে তাকে ফলো করবে তার ফলোয়ারের দল অর্থাৎ আমরা। এই দলটিকে সাজানো হয়েছে সাইজের ডিক্রিজিং অর্ডারে। অর্ডার অনুযায়ী আমার স্থান হয়েছে পেনাল্টিমেট। এই নিয়েও আমার একটু ক্ষোভ ছিল- তা সেকথা থাক। স্টেজের একপাশ দিয়ে এন্ট্রি নিয়েই একবার চট করে মুখ তুলে ওপরের দিকে দেখে নিলাম। স্বর্গ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হবে বলে সব রেডি, 'ওরে কে আছিস! আরো ফুল নিয়ে আয়' ইত্যাদি হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে, সুরাসুর শঙ্খধ্বনি করবেন বলে শাঁখ থাবড়ে নিচ্ছেন, এমন সময়- কেরেকটেকটাকট ঘ্যাচাং! না, একবার ভেবে দেখুন, কত খুচরো গাড্ডায় পড়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে যায়! কত তুচ্ছ হিড়িকে হিস্ট্রির পাতাজুড়ে হিস্টিরিয়া দেখা দেয়, সেকথাই বলছিলাম, আর কি! হলটা কী, আমার ঠিক পিছনে যে মহাপ্রভু ছিলেন, তিনিই ঝাঁকের সবচেয়ে কচি কই। দু'পায়ে হাঁটার বিদ্যেটা তিনি অতি অল্পকাল আগেই আয়ত্ত করেছেন। তাই, যাতে অবশিষ্ট গ্যাং-এর সাথে গতি মেলাতে অসুবিধা না হয়, তাঁকে শেখানো হয়েছিল একটু বড় বড় পদক্ষেপে মার্চ করার মত করে হাঁটতে। এমনিতেই আমার ধুতির পঞ্চাশ শতাংশ মাটিতে লুটোচ্ছিল, মার্চপাস্ট করার মারকাটারি উত্তেজনায় মহাপ্রভু আমার ধুতিটিকে দিলেন মাড়িয়ে। আগেই বলেছি, ধুতিটার যা সাইজ তা'তে আমার মত আরেকজনকে ঢুকিয়ে নেওয়া যেত। আচমকা এই প্রবল পেছুটান এসে পড়ায়, জাড্যের সূত্র মেনে ধুতি জমে রইল পেছনে, আমি বীরদর্পে সামনে এগিয়ে গেলাম। ব্যাপারটা গোড়ায় ধরতে পারিনি, দর্শকদের মধ্যে 'হা হা' হাসির রোল উঠতে দেখে যখন খেয়াল করলাম, ততক্ষণে আমার রোলের দফারফা হয়ে গেছে! আনন্দসহ বাকি সন্ন্যাসীরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ন যযৌ ন তস্থৌ! স্টেজে টাঙানো রবীন্দ্রনাথের ছবিটার দিকে আড়চোখে চেয়ে দেখি, বেচারি রবি কবি তাঁর নাটকের এহেন কমিক পরিণতিতে লজ্জায় প্রায় চোখ বুজে ফেলেছেন। দেখুন, আগেই বলেছি, আমি হলাম বর্ন অ্যাক্টর। তা, বর্ন অ্যাক্টররা কোনো বিপর্যয়েই বিবর্ণ হন না। আমিও হলাম না। পেছনের পয়মালটিকে প্যাঁদানোর সুযোগ পরেও পাওয়া যাবে। আপাতত উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে, মাটিতে পড়ে থাকা ধুতিটাকে একহাতে তুলে অন্য হাতটা সেই নমস্কারের ভঙ্গিতেই স্টেডি রেখে প্রথমে দর্শকের দিকে তাকিয়ে একটা কোলগেট হাসি দিলাম। তারপর এক দৌড়ে তাদের ওভারটেক করে, আনন্দর ঘাড়ের ওপর দিয়ে হাইজাম্প মেরে উইংসের ওপারে উধাও হলাম। সুকুমারমতি পাঠক এই গল্প শুনে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করতেই পারেন। এমনকি রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্স নিয়ে যাঁরা নিত্য ডিসকাস থ্রো করছেন, চন্ডালিকায় আচমকা ন্যুড আর্ট ঢুকে পড়লে তাঁদেরও ভিরমি খাওয়ারই কথা। তবে কিনা কোষ্ঠীতে লেখা ছিল আমি প্রথমে নট্য কোম্পানির নটসূর্য হব, তারপর চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত হয়ে নাগাড়ে বিশ বচ্ছর গলা কাঁপিয়ে ডায়ালগ ঝাড়ব, "মাহাআআ! আআআমি কিন্তু চুউউউরি করিইইনি!" আর তা'তেই বাজার কাঁপবে। তারপর কলিকাল কালো হলে সত্যজিৎ যখন সত্যচ্যুত হয়ে 'সৃ' হবেন, তখন সেই একই কম্বুকন্ঠে বলব, "আমিই ইন্ডাস্ট্রি!" তা, সেসব কিছুই আর হল না! মেকুরে হুড়ুম খাইয়া হক্কৈর কইরা দিল!

156

9

শমীক

আজব দেশ

এ এক আজব দেশে এসে পড়লাম। জানিনা স্বপ্নে না কল্পনায়। এখানে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত। তবে সেটা মার্ক্সের থেকে বেশী মনে হচ্ছে লেনানের imagine গানের মত। হ্যাঁ, দেশও নেই, ধর্মও নেই। তবে একটা প্রশাসন আছে। তার স্বরূপটা বুঝে উঠতে আরো কয়েকদিন লাগবে। খাবার দাবার co-oprative -এ পাওয়া যাচ্ছে। আমি সে অর্থে একটা কমিউনেই আছি। কেননা সেখানে অনেকেই আছে। বিশেষতঃ মার্থা আর মারুমের সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। ওরা বোধহয় পরস্পরকে ভালবাসে। তা যাই হোক। আমাকে বেশ ভালবাসে। আমি তো এখানে দেখছি, বেশ বিখ্যাত। আমার অনুগত একটা দলের মত এরা আমায় ঘিরে রেখেছে। কিন্তু আমার আবার মার্ক্সীয় শিক্ষা উথলে উঠছে। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার পাচ্ছি। কিন্তু আমার সাধ্য অনুযায়ী কাজটা যে কি সেটাই বুঝতে পারছি না। একটা হলুদ জামা পরা মেয়ে দেখছি। বেশ চুটকুলি লাগছে। একটু ইন্টু মিন্টু হলে মন্দ হয়না। ঠারকিবাজী ছাড়া আমার তো কোনো কাজই দেখছি না। কাজ এসেছে। কিন্তু সেটা এদের so called norms – এর বিপরীত। আমার গলায় একটা চেন আছে। তাতে শিবের symbolic একটা লকেট। এটা নিয়ে এরা সেদিন এক তাত্ত্বিক আলোচনায় বসে গেল। আমাকে বেশী cross করায় আমিও stonch হয়ে গেলাম। কিছুটা জলমগ্ন থাকার কারণে শিব নিয়ে একটা প্রায় monograph নামিয়ে দিলাম (একটা কথা অনস্বীকার্য, জল ও বাতাস এখানে যে level -এ পাওয়া যায়, তা তুলনাহীন)। কমিউনের লোকে case -টা খেয়ে গেল। ফলে পরদিন থেকে program হল একটা শিবমন্দির (ঠিক মন্দির নয়, archive type -এর কিছু) তৈরী করতে হবে। ব্যাস, আর দেখে কে ? আমি তো রাস্তায় মিছিলও নামিয়ে ফেললাম। মিছিল এরা দেখেনি। প্রশাসন থেকে ডাক এল। সিরিন বলে একজন আমাকে আটক করে অনেকক্ষণ জেরা করল। বললঃ “আপনি কি ধর্ম ফিরিয়ে আনতে চাইছেন নাকি ?” আমি বললামঃ “না, ঠিক সেভাবে ভাবিনি।“ সিরিন বলেঃ “একজন legendary myth -এর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন শুনলাম।“ আমি একটু ঝেঁকে গেলাম। তার মানে এরা শিবকে ইতিহাস বলে মনে করে। বললামঃ “So what! legendary should be portrayed as inspiration.“ সিরিন বললোঃ “দেখুন, আমরা কোনো মতের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করি না। কিন্তু আপনার এই প্রস্তাবনায় আমরা কোনো সামাজিক সাহায্য করব না। যদি আপনি ব্যক্তিগত surplus থেকে সাহায্য পান, আমরা বাধা দেব না।“ ভয়ে সিরিনকে আর জিজ্ঞাসা করলাম না, ‘ব্যক্তিগত surplus’ টা কি ? তবে মার্থাকে রাতে বললাম। তখন রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। মার্থা আর আমি পাশাপাশি শুয়ে সেদিনের গতি অগতির হিসাব করছিলাম রোজকার মত। মার্থাকে সব বলছিলাম সিরিনের কথা। বললঃ “তুমি কি সত্যিই এটা চাও ? ভিতর থেকে চাও ?” মার্থা যেন একটু বেশী সরে আসল। আমিও আরও একটু ঘন হয়ে বললামঃ “তুমি কি জাননা, আমি কি চাই ?” (ঠারকি তো, তাই শেষটা একটু sexy ভাবে হিস হিস করে বললাম।) মার্থা case টা খেয়ে গেল। প্রায় গায়ের উপর এসে বললঃ “We will fight for it and I know we will win.“ (শেষটা ও ও আমার মত হিস হিস করে বলল।) আর কি সয়? আমি মার্থাকে জড়িয়ে ধরলাম। “You are my comrade!“ মার্থা হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরল। তারপর আস্তে আস্তে আমার কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে, চুলে হাত বুলাতে বুলাতে চুমু খেতে লাগল। আমি মার্থাকে পাগলের মত জড়িয়ে ধরলাম। বারবার দ্বিধা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, মারুমের কথা জিজ্ঞাসা করে নিই। তবে ওই চরম মুহূর্তে সেটা অবান্তর বলে মনে হল। মনে হল, reciprocation is (or, may be) legitimate. আমি আর মার্থা পাগলের মত একে অপরকে চুমু খেতে শুরু করলাম। একে অপরের শরীর জানতে শুরু করলাম। আর একে অপরের শরীরে মিশে গেলাম। মাঝে আর একবার মারুমের কথা মনে এসেছিল। কিন্তু মার্থা যে আবাগে, যে আন্তরিকতায় আমাকে গ্রহণ করল, তাতে আমি ডুবে গেলাম, ভেসে গেলাম (spontaneity কে তো সব থেকে বেশী point দিতেই হয়)। পরদিন line of action! ওই যে সিরিন বলেছে ‘ব্যক্তিগত surplus‘, ওটা আমি clarify করলাম। Extra labour দিয়ে কেউ earn করতে পারে, সেটা তার স্বাধীন। প্রশাসনের under -এ নয়। প্রশাসন তাতে দাঁত ফোটাতে পারবে না। ব্যাস, ওটাই হল আমার trump card. শ্লোগানে, মিছিলে, আবেদনে ফাটিয়ে দিলাম। আমার পুরো কমিউন আমাকে support করল। আর support করল অদ্ভূত ভাবে হাজার হাজার মানুষ। যখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখনই খবর এল মূর্তি স্থাপনের জন্য যথেষ্ট রসদ হাজির। এমনকি মূর্তির পিছনের দেওয়াল করার রসদও চলে এসেছে। এরপরটা দেখার মত। সিরিনের মত আমারও ভয় করল। হাজারে হাজারে উন্মত্ত জনতা নাচছে। ধর্ম কি ফিরে এল নাকি ? তবে একটা আশ্চর্য ব্যাপার, কেউ ফুল মালা দিয়ে পুজো করছে না। যেন একটা পুরোনো relics খুঁজে পেয়েছে। আমাদের পোস্টার, ব্যানারে লেখা পুরাণের গল্প গুলো গোগ্রাসে গিলছে। এই উন্মাদনাটা নতুন কিছু উপলব্ধির, যেটা ওদের জনজীবনে নেই। মনে হয়, এরা মহাভারতটা এখনো খুঁজে পায়নি। যা হোক, আমি কি আর এসব বোঝার জায়গায় ছিলাম ? বাড়ী (বা, কমিউন) ফিরলাম। গোটা শহর জয়ের আনন্দে উত্তাল। আমার গোটা কমিউনও তাই। ফিরে দেখি, সেই হলুদ জামা পরা মেয়েটা। ফিরতেই জড়িয়ে ধরল। আমি আর chance নিলাম না। একটু আদরই করে ফেললাম। But naturally I was deadly waiting for martha. মার্থা ঢুকলো। আমরা শুধু চোখে চোখে পরস্পরের দিকে তাকালাম। তারপর বাকি ছিল, বিষ্ফোরণ। পাগলের মত বারে বারে জয়ের জয়সূচক চুমু এঁকে দিলাম একে অপরের চোখে। ও ঢুকতেই আমি এমন ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ওর sunglass ছিটকে গিয়ে ভেঙ্গে গেল। আমি জানতাম, ওটা surplus earn ছিল। কিন্তু তখন তো আমরা বন্য। চুমায় চুমায় ভরিয়ে দিলাম ওর সবকিছু। ও পাগলের মত আমায় জড়িয়ে শুধু বলতে থাকলঃ “আমরা জিতেছি! We have won! We have won!” আমি মার্থাতে সমর্পিত হলাম। ক্রিয়ার প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় হাই হাই করে হাঁপাচ্ছি, আমার হৃদপিন্ডে চার ডবল ধুকপুকুনি বাড়িয়ে মারুম ঢুকল ঘরে। “কি ?” – মারুম বলল। আমি বললামঃ “কি !” তারপর যা হয়, আমরা বাগবাজার গঙ্গার ধারে। বাতাস টানছি। ধুম নেশা হয়ে গেল। মারুম বললঃ “জলে নামবে ?” আমি – “চল।“ ঘাটে দু তিনবার আছাড় খেয়ে জলে নামলাম। কি আনন্দ! Lovely! বলে বোঝানো যাবেনা। দু’ চারবার সাঁতার কাটলাম ছোটো দূরত্বে। আমি তো বেশী দূর সাঁতার জানিনা। মারুম এগিয়ে এল কাছে। বললঃ “সাবান মাখবে ?” মাখলাম। তারপর মারুম সাবান মাখাল। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। মারুম আরও ঘনিষ্ঠ হল। শেষমেষ জড়িয়ে ধরল। আমি বিরক্তিতে ছাড়াতে চাইলাম। কিন্তু দেখলাম, মারুমের শরীর নরম হয়ে আসছে। মারুম আমায় আরো জড়িয়ে ধরল। দেখলাম শরীরে শিহরণ জাগছে। ঘাবড়ে গেলাম। আমি কি শালা gay হয়ে গেলাম নাকি ? একি, মারুমের শরীর নরম। মারুম আমায় চেপে ধরেছে। ওর বুক ফুলে গেছে। নরম। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি। মারুম আমাকে চুমু খাচ্ছে। আমি যতই নেশা করে থাকি, দেখছি ওর শরীরে স্তন জেগে উঠেছে। ভয়ে আমার গা হাত পা কাঁটা দিয়ে উঠল। আরে, এরা কি ভূত নাকি ? তবু আমি sexually provoked হয়ে গেলাম। এক অদ্ভূত কৌতুহলে আমি সেগুলো অনুভব করতে শুরু করলাম। তারপর আরও গভীরে যাত্রা করে দেখলাম ও সত্যিই মেয়ে হয়ে গিয়েছে। ওই জলের মধ্যে ওর শরীর আমার কাছে জল হয়ে গেল। কি স্বচ্ছন্দে আমি মাছের মত বিচরণ করতে লাগলাম সেই শরীরে। একটা ভয়ংকর ঘোরের মধ্যে আমি কমিউনে ফিরে এলাম। ফিরে ইস্তক যেন কাউকে মুখ দেখাতে পারছি না। কি হল, সেটাও বোধশক্তির বাইরে। মারুমের সাথে জল থেকে ওঠার পর কোনো কথা বলিনি। সেটা মূলতঃ লজ্জায়। তারপর আরও লজ্জা, ফিরেই মার্থার মুখোমুখি। মাথা নিচু করে আমার বাঙ্কে ঢুকে পড়লাম। সন্ধ্যা অবধি কেউ ডাকেনি। dinner - এ মার্থা ডাকল। আমার কি লজ্জা! উঁ, আঁ করে বললামঃ “আমি খাবনা।“ এক ঘন্টা পরে ওরা ফিরে এল। মার্থা আবার ডাকল। বললঃ “তুমি জানতো কাল কি ?” এবার প্রথম আমার মনে পড়ল, হ্যাঁ, কাল আমার চলে যাবার দিন। এই জগৎ ছেড়ে আমার চলে যাবার দিন। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। তারপর ভয়ে আবার শুতে যাচ্ছিলাম। মার্থা বললঃ “এসো, কথা আছে।“ ওর গলায় কেমন একটা command ছিল। একজন অপরাধীর মত দাঁড়ালাম মার্থা আর মারুমের মাঝখানে। Over smart হওয়ার ঢঙ করে বললামঃ “আমি কাল চলে যাব। তোমরা ভাল থেকো। পরস্পরকে ভালবেসো। মার্থাও শুনেছি যাবে। তবে কাছেই। আমি এত দূরে যাব, আর আসা যাবেনা।“ মারুমকে বললামঃ “তোমাদের খুব miss করব। Sorry, আমি কিছু ভুল করেছি। কিন্তু আমি তো আর থাকব না। তাই আর ভুল হবেনা।“ এ বাবা, দেখছি গোটা কমিউন কেমন আমার দিকে জ্বলজ্বল চোখ করে এগিয়ে আসছে। আমিতো ভাবলাম এই শেষ। ক্যালাবে নাকি ? ম্রিয়মাণ হয়ে বললামঃ “Sorry!“ ঠিক সেই মুহূর্তে মার্থা আমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল। আমি জানি এটাই শেষ। হয়ত এভাবেই ওরা মারে। হয়ত কোনো injection! মার্থা আর এক হাতে মারুমকেও জড়িয়ে ধরল। খুব মিষ্টি স্বরে বললঃ “Darling, this world is not binary! আমরা তিনজনেই তিনজনকে ভীষণ ভালবাসি। এখানে নারী পুরুষ ভেদ নেই। যে কেউ যখন ইচ্ছে নারী বা পুরুষ হতে পারে। যে যার choice - এ নারী বা পুরুষ হয়ে থাকে। তুমি এত ভয় পেওনা। আবার বলছি, আমরা তিনজনেই তিনজনকে ভালবাসি। That’s all! There is no possession!” ( Lennon - এর গানটার কথা আবার মনে পড়ল।) মারুম তো আমার প্রতিটা সংগ্রামে আমার পাশেই ছিল। যদিও আমি আর মার্থাই command দিচ্ছিলাম। Lead করছিলাম। কখনই ও তার মাঝখানে আসেনি। মনে পড়ল, শিব তো অর্ধনারীশ্বর। এজন্যই কি এরা শিব নিয়ে এতটা excited ছিল? যা হোক, মার্থা বললঃ “নারী পুরুষ নেই। তুমি আমাদের দুজনকেই ভালবাসতে পার। আবার আমরা একে অপরকে ভালবাসি। তুমি ঠিক বুঝবে না হয়ত।“ আমি বুঝিনি। হয়ত ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। হয়ত ভয়ে কল্পনার সে জগৎ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। এখন ভাবি, কিসের ভয় ? মার্থা আর মারুম বেঁচে থাক ওদের নিয়মে। আমিই হয়ত মেনে নিতে পারিনি। তাই এই ঢ্যামনা জগতে পড়ে আছি। এই ভাই, ছুঁয়োনা আমাকে, একটু measure কর।

115

4

শমীক

ইস্তেহার

অনেক শূন্যতা ঘেঁটে অবশেষে শান্তি পাব বলে লুকিয়েছি ভিড়ের আড়ালে শূন্য হাতে নয় যত্নে ঝুলিতে ভরে কাল কিছুটা শিশুর ধৃষ্টতা কিছুটা আমার কঙ্কাল। কিছুটা শিশির ধোয়া সন্তান সন্তানের বড় কাছাকাছি জেগেছিল রাত্রি এক ঘোর অবিশ্বাসী। কতটা বেদনা তার নেবে দিবানিশি যে পরাজয় বালিশে মাথা রেখে কাঁদে, জ্বলে, পোড়ে তবু দগ্ধ হয়না অবিরাম দিনলিপি লেখে। অহোরাত্র তাম্র পাত্র ভরে যতই ঢেলেছি থালায় ঘন বিষ ব্যঙ্গের সুরে দুয়ার বলেছে আজ থাক, 'আজ'-কে চলে যেতে দিস। এসব শূন্যতা গেলে রাতের কোঠরে ভোর বেলা মাঠে নেমে যাই যেখানে বনের দেখা শুরু সেখানে গাছ পথ হাঁটি পায় কিছুটা তোমাকে চেনাতে আমি ভীরু। তোমারই চোখের নিচে চোখ তোমার এই ভুরুর নিচে বালি আমাকে কিছু শব্দ দাও আজ সরবে শূন্যতা ঢেকে ফেলি। লোকের ভিড়ে হারিয়ে গিয়ে লোক গানের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে গান শতক থেকে অর্ধ গেল চুরি আর বাকিটা পূর্ণ জাগুক প্রাণ। ০২/১২/২০১৬ (পঞ্চাশ পূরণে)

96

6

শমীক

উপক্রমণিকা

বন্ধুবর আরাত্রিক ও অর্ণবের অনুরোধে বা তাড়নায় এই আসরে অনুপ্রবেশ। কিভাবে শুরু করব ভাবতে গিয়ে মনে হল, শেষ দিয়েই শুরু করা ভাল। তাই একটি গল্প ও একটি কবিতা নিয়ে অন্দরে এলাম। অন্তরে আসার পথ দীর্ঘ। দুটোই নতুন লেখা। কোনোটিই এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাহলে চলা যাক, জয়গুরু...

105

5

Dr Samya Dutta

পাগল, পরমাণু প্রভৃতি

।। পাগল ।। ক্লাবঘরটার দক্ষিণে যে একফালি ফাঁকা জায়গা, সেটা আদতে ছেড়ে রাখা হয়েছিল বাগান করার জন্য। তখন ক্লাবঘর ছিল একতলা, অ্যাসবেস্টসের ছাউনি ফুটো হয়ে বর্ষার জল ঢুকত। তবুও সেই ভাঙাচোরা ক্লাবঘরকে সামনে রেখে, খোলা জায়গাটায় পতাকা উত্তোলন,  বৃক্ষরোপণ এবং লাড্ডু বিতরণ জাতীয় সামাজিক অনুষ্ঠান হত বছরে দু'দিন- ছাব্বিশে জানুয়ারি আর পনেরোই আগস্ট। শ্যামাচরণ স্মৃতিরত্ন (এম.এ) সেই কোন বৈদিক যুগে বর্ডার পেরিয়ে এসে এপাড়ায় বাসা করেন। সেসব সোনালি দিনের স্মৃতি, নবতিপর স্মৃতিরত্ন মশায়ের (এম.এ) স্মৃতির রত্নভান্ডারে এখনও  ধরা আছে।      তারপর কালে কালে কলিকাল ঘোর হলে ক্লাবঘরের দোতলা উঠল। এখন সন্ধ্যা নামলেই সদস্যরা গুটিগুটি এসে দোতলায় জড়ো হন। দিনভর দুনিয়াদারির জেরে তাঁদের ছ্যাঁকা খাওয়া পশ্চাদ্দেশ, দোতলার ঠান্ডাই যন্ত্রের সামনে বসলে কিঞ্চিৎ শীতলতার স্পর্শ পায়। পুজোর বাজেটও সম্প্রতি পঞ্চাশ লাখ ছাড়িয়েছে। তাছাড়া সামাজিক কর্তব্যে অবিচল ক্লাবের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স চাইলে রাতবিরেতেও পাওয়া যায়। প্রেসিডেন্টের কড়া নির্দেশ আছে, অ্যাম্বুলেন্সের ডাক এলে শববাহী শকটের চালককেও তৈরি থাকতে হবে।      কেবল সেই একফালি খোলা জায়গাটা এখন জঞ্জাল জমে এমনই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে যে, দুর্গন্ধ আর মশার উপদ্রবে দক্ষিণের জানলা সবসময় বন্ধ রাখতে হয়।      সেই নোংরা জায়গাটায় খালি সিগারেটের প্যাকেটের পাহাড়, স্তূপাকার ভাঙা কাঁচের বোতল আর ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা ব্যবহৃত কন্ডোমের মাঝখানে আজ ভোরে হর পাগলার লাশ পাওয়া গেল।      ক্লাবের পাশেই চাঁদুর চায়ের দোকান। সেই চাঁদুই ভোরবেলা দোকান খুলতে এসে প্রথম দেখতে পায়। বছরখানেক হল ক্লাবের কোমলমতি ছেলেদের করুণাধারা আচমকা পাগলের প্রতি ধাবিত হওয়ায়, হর পাগল রাতটুকু ওখানে শোবার অনুমতি পেয়েছিল। কাল রাতেও তার সেই নিশিযাপনের নড়চড় হয়নি। কেবল খেঁকি কুকুরে তাড়া করলে বা স্কুলফেরত বাচ্চাগুলো ঢিল মারলে যেমন বোবা চোখে তাকিয়ে থাকত, হর পাগলার তেমনই এক বোবা, শূন্য দৃষ্টি, ভোরের আলো ফোটার আগেই আরও বড় কোনো শূন্যের পথে যাত্রা করেছে।      দগদগে ঘা থেকে পুঁজ চুঁইয়ে পড়ে চাঁদির কাছটা পিচ্ছিল, জটপাকানো চুল লেপ্টে আছে সেই পুঁজে মাখামাখি হয়ে। দুহাতের লম্বা, পান্ডুর নখ মাটিতে এলোমেলো আঁচড় কেটে স্থির হয়ে গেছে, হয়তো শেষবেলায় প্রাণপণে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল। বেগ চেপে রাখার ক্ষমতা ছিল না, শতচ্ছিন্ন হাফ প্যান্টটা অন্তিম স্রোতে ভিজে চুপচুপে। বদ গন্ধে আশেপাশে টেকা দায়!  প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেরার পথে স্বাস্থ্য সচেতনদের একটা ছোটখাটো ভিড় জমে গেছিল ক্লাবঘরের সামনেটায়। খবর পেয়ে ক্লাবের সেক্রেটারি এসে নাকে রুমাল আর কানে মোবাইল চেপে কীসব ব্যবস্থা করলেন, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই মিউনিসিপালিটির ধাঙড় এসে পায়ে দড়ি বেঁধে লাশটা টানতে টানতে নিয়ে গেল। সব ঝামেলা চুকেবুকে গেলে চাঁদু জায়গাটা ভালো করে ঝাঁট দিয়ে এক বালতি জলে ধুয়ে দিলে। ক্লাবের ফান্ড থেকে তাকে একশোটা টাকা দেওয়া হবে। চাঁদু এবার বেঞ্চিগুলো ঝাড়পোঁছ করে, পুরনো ক্যালেন্ডারের মা লক্ষ্মীকে ধুপ দেখিয়ে চায়ের জল চাপিয়ে দেবে। পড়ে পাওয়া একশো টাকার স্বপ্ন তার মনে বুজকুরি কাটতে থাকুক, আমরা ততক্ষণ.....ততক্ষণ..... ওই, ওই শুনুন..... শুনতে পাচ্ছেন? "প্যাসেঞ্জার কৃপয়া ধিয়ান দে, ডাউন মেমরি লেন টাইম মেশিন, দো হাজার ষোলা নম্বর প্ল্যাটফর্ম সে ছুট রহা হ্যায়। Passengers pay attention..." দিনকে রাত করে, রাত্রিকে দিন মাগনায় চেপে নিন টাইম মেশিন। 'খালি গাড়ি' 'খালি গাড়ি' ডাক শুনতে কি পান পেছনের দিকে ছোটে সময়ের যান। (ঝিনচ্যাক..... ঝিনচ্যাক.....) আপনার বৌ-ছেলে, বালিশ-বিছানা ফ্ল্যাট বাহারি বলিহারি ইনস্টলমেন্টে কেনা। উড়ে উড়ে যায় সব, সব মিলিয়ে যায় সময় যেন বুলেট রেল পেছনপানে ধায়। (ঝিনচ্যাক..... ঝিনচ্যাক.....) মাল্টিপ্লেক্স, শপিং মলও হচ্ছে ভ্যানিশ পুরানো সেই দিনের কথায় জার্নি ফিনিশ। আঠারো বছর আগের এক বিকেলবেলায় কচি ছেলেদের দল মাঠে খেলা জমায়। (ঝিনচ্যাক..... ঝিনচ্যাক.....) <br/>।। পরমাণু ।। প্রথম বোমা: লিটল বয় -অ্যাই! -উঁ! -অ্যাই! খেলবি না? -উঁ..... -কী হয়েছে রে তোর? খেলবি না? -হুঁ..... অ্যাই শোন! তোকে না একটা কথা বলব। চুপিচুপি কিন্তু! তুই কাউকে বলবি না তো? -কী রে? -আগে গড প্রমিস কর। কাউকে বলবি না- -গড প্রমিস! বলব না। -জানিস তো, এটা চুপিচুপি কিন্তু..... মা বলতে বারণ করেছে..... দিদি না, বাড়িতে নেই! -(প্রাথমিক অভিঘাতে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে) কোথায় গেছে? মামাবাড়ি? -জানিনা। মাও জানেনা, আর বাবাও জানেনা। শুধু মা বলল হরকাকু সঙ্গে গেছে..... অ্যাই! তুই হরকাকুকে চিনিস? -হুঁ! তোদের ওই বড় মত সাদা মত গাড়িটা চালায়। তোকে ইস্কুলে দিতে আসে তো, দেখেছি। -হ্যাঁ তো! কিন্তু বাবা বলছিল, হরকাকু আর দিদি ফিরে এলে, হরকাকুকে আর গাড়ি চালাতে দেবে না। রাস্তায় ফেলে জুতো করে মারবে, তারপর শুয়োরের বাচ্চা, আরও কীসব বলছিল- -(উৎফুল্ল হয়ে) তাহলে তুই আমার সঙ্গে বাসে যাবি? আমি কিন্তু জানলার ধারে বসব.....অ্যাই, জানিস তো, রনি আমাকে কিছুতেই জানলার ধারে বসতে দেয় না... দ্বিতীয় বোমা: ফ্যাট ম্যান বিরানব্বই কিলোর বোসবাবু বসেছিলেন। সেই বিকেল থেকেই বসে আছেন, এই বিশাল বপুটি নিয়ে বেশি দৌড়ঝাঁপ করা মানেই বিড়ম্বনা। এবার বসে বসেই বিকট একটা হাঁক ছাড়লেন: -বাঁটুল! ও বাবা বাঁটুল! কোথায় গেলি বাপ?... অ্যাই শালা বাঁটলো! একটি গিরগিটি সদৃশ লোক বোধহয় এই সম্বন্ধী সম্বোধনের অপেক্ষাতেই এতক্ষণ চুপচাপ দরজার পাশে দাঁড়িয়েছিল। এইবার টুক করে ঘাড় নেড়ে পর্দা সরিয়ে মুন্ডু গলিয়ে দিল। -বাবু ডাকতিছেন? -রাস্কেল! থাকিস কোন চুলোয়? যাকগে... শোন, সাতটা তো বাজতে চলল। যা, চট করে একবার নাড়িয়ে দেখ দিকিন! বাঁটুল তৎক্ষণাৎ জিভ কেটে মা কালী হল: -যাহ্! কী যে বুলেন বাবু! ওসব কি আর যখন-তখন... সে রাত্তিরে মুড হলে নাহয়- -হাআআ-রাআম-জাদা! একটি চড়ে তোমার বদন বিগড়ে দেব। ফাজলামি করার জায়গা পাওনি? বলছি, সাতটার খবর শুরু হল বলে। যা ছাদে উঠে টিভির অ্যান্টেনাটা নেড়েচেড়ে দেখ, ছবি আসে কিনা... মুড! মুড হওয়াচ্ছি তোমার! ফের যদি বজ্জাতি দেখেছি না, শালা নড়া পকড়কে নিকাল দেঙ্গে তুমকো-       নড়া ধরে নাড়া খাবার ভয়েই বোধহয় বাঁটুল তড়িঘড়ি নাড়তে ছুটল। হায় বাঁটুল! তুমি যদি জানতে, তোমার নাড়ানাড়ির নিমন্ত্রণে কী বিরাট বিষ্ফোরণ আসতে চলেছে! "I have an announcement to make: today at 15:45 p.m, India conducted three underground nuclear tests in the Pokhran range....." -"বাঁহাহাটুল! (উত্তেজনায় গলা কাঁপিয়ে) ওরে বাঁটুল রে! বাঁটলো!" বোসবাবু ডাক ছাড়লেন, পরপর তিনবার। বাঁটুল বিদ্যুৎবেগে ছাদ থেকে দৌড়ে নামল, "হেঁই গো কত্তাবাবু, কী হইচে?" -"ওরে বাঁটুল! ফাটিয়েছে রে, ফাটিয়েছে!" বোসবাবু বাঁটুলকে জড়িয়ে ধরে প্রায় নাচতে শুরু করেন। -হেই দ্যাকো! ভর সন্ধ্যেবেলায় আবার কার ফাটায়ে এলেন? -ওরে আমি নয় রে, আমি নয়। অটল ফাটিয়েছে। -সেইডা আবার কে গো? কী ফাটালো? -অ্যাটম। অ্যাটম বোমা বুঝিস? বাবুর আলিঙ্গনে আবদ্ধ বাঁটুল নাচতে নাচতে এবং হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "ওই দ্যাকো! মিছিমিছি আটার বোমা ফাটাতে গেল ক্যানো? আর আপনাকেও বলিহারি কত্তা, কবে থেকে বলচি চাট্টি বাঁদর-খ্যাদানো পটকা কিনে আনুন। বাঁদরের উৎপাতে ছাদে মোটে যাওয়া যাচ্ছে নে, তা নয়, আটার বোমা! -ধুর হারামজাদা! এইবার দেখ না, বর্ডারের ওপারের কাটার বাচ্চাগুলোকে কীরকম দেখিয়ে...       কথা অসমাপ্ত রয়ে গেল। দেখাদেখি এবং দেখে নেওয়াও আপাতত মুলতুবি রইল। প্রভু-ভৃত্য নৃত্য থামিয়ে সভয়ে দেখলেন, বোসগিন্নী দ্বারের কাছে দণ্ডায়মান। চেন রিঅ্যাকশন: মাঝরাত, মশারি, মারকাটারি -শুনছ? -উঁ! -শুনছ? অ্যাই!  -উঁ... (হাই তুলে) কী? -ঘুমুচ্ছ নাকি? ধ্যাৎ! বলি, এতক্ষণ যা বললাম, কানে গেল? -উঁ! হুঁ...কী বলছিলে যেন? -উফ! কী ঘুম রে বাবা! আরে ওই সামন্তদের মেয়েটা আছে না, ওই বিউটি না লাভলি কী যেন নাম... ওদের ড্রাইভারের সাথে ভাব করে ভেগেছে গো ! (মুখে আঁচল চেপে হাসি) -অ! তাই বুঝি?  -হ্যাঁ গো হ্যাঁ, তাই। -তা... (হাই তুলে) তুমি এতসব খবর পেলে কোথায়?  -খবর রাখতে হয় গো, খবর রাখতে হয়। তোমার মত কী আর? 'চোখে বেঁধেছি ঠুলো আর কানে গুঁজেছি তুলো'... যত্তসব! তোমার ছেলে, আজ বিকেলে খেলতে গিয়ে খবর এনেছে... -অ্যাঁ! আমার ছেলে! মানে বিল্টু? বিল্টু এসব খবর কোথায় পেল? -আ মলো যা! ওদের ছেলেটা যে বিল্টুরই বয়সী, একসঙ্গেই খেলা করে তো... জানো না নাকি? -তাই?  -নয়তো কী? বলি ওগো, শুনছ? ধ্যাত্তেরি! আবার ঘুমুচ্ছ? অ্যাই! ওঠো তো, ওঠো! (সুড়সুড়ি) -উঁহ... বলো না, কী বলছ! -বলি, এটা কত বড় সুযোগ ভেবে দেখেছ? -সুযোগ? কীরকম সুযোগ?  -আহ্! তোমার কী ঘটে কিচ্ছুটি নেই! আরে সেবার খালপাড়ের সেই জমিটা নিয়ে সামন্তরা আমাদের কম জ্বালান জ্বালিয়েছিল? ভুলে মেরেছ নাকি সেসব? -ননা... তা ভুলব কেন? কিন্তু... -উফ! তোমার যদি এতটুকু বুদ্ধি থাকে! শোনো, যা বলছি কর। কাল সক্কাল সক্কাল একবাট্টি মলয়দার বাড়ি যাও দিকি! -মলয়দা! কে মলয়দা? -আ মলো! এ তল্লাটে মলয়দা আবার কটা আছে শুনি? পাকড়াশী গো, পাকড়াশী! -অ্যাঁ!  বারকতক ভীষণ বিষম খেয়ে বোসবাবু টের পেলেন, বাকি রাতটুকুর মত তাঁর চোখ থেকে ঘুম বিদায় নিয়েছে। পাকড়াশী ও পেরেস্ত্রৈকা: বাড়িটার কিছু বিশেষত্ব আছে। লাল রঙের বাড়িটার কালো ছায়া দিনমানেও কেউ পারতপক্ষে মাড়ায় না। পাড়ার কুকুর-বেড়াল অবধি এবাড়িটা এড়িয়ে চলে। আর বেপাড়ার বাসিন্দা কেউ ভুল করে কাছাকাছি এসে পড়লে, বাতাসে কিসের যেন অশুভ গন্ধ শুঁকে দ্রুত এই পথটুকু পার হয়ে যায়।       সেই লাল রঙের বাড়িটার লম্বা কালো ছায়া মাড়িয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ঢুকতে গিয়ে বোসবাবু টের পেলেন, গেটের পাশে মার্বেলে খোদাই করে বাড়ির নাম লেখা আছে:                                  মার্ক্স বাটি বাড়ির বাইরের দিকের একটা ঘরে তখন কমরেড মলয় পাকড়াশীর (পার্টি লাইনে যাঁর ডাকনাম মলয় মলোটভ) সঙ্গে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ঝালিয়ে নিচ্ছেন উঠতি যুবনেতা মেটিরিয়ালিস্ট মন্টু: -হিহিহি! বড়দা যা দিলেন না মাইরি! উফফ! বুর্জোয়া বাটলিওয়ালাটা পুরো টাইট খেয়ে গেছে। -বুয়েচ মন্টু, বিপ্লবের স্বার্থে সবাইকেই কমবেশি স্বার্থত্যাগ করতে হবে। ঠিক কিনা? হ্যা হ্যা! ওই বাঁআ বাটলিওয়ালার পোষা মেয়েছেলে আছে। খোঁজ নিয়ে দেক, তার মোতার জন্য সোনার ডাবর গড়িয়ে দিয়েচে। ইদিকে পার্টিফান্ডে চাঁদা দেবার বেলা (থুক করে পানের পিক ফেললেন। লাল পিক) মাত্তর দশ লাখ নিয়ে ঝুলোঝুলি! কী বাওয়াল, কী বাওয়াল! দিয়েচি বাঁআ... -হিহি! তাও তো সেসব সোনার দিন আর নেই! সেই বার্লিনের দেওয়াল থাকলে... হিহি...বড়দা যে কত বাটলিওয়ালাকে ধরিয়ে দাঁড় করাতেন! -হ্যা হ্যা! তা যা বলেচ...       এক্ষণে একটু প্রাককথনের প্রয়োজন আছে। বোসবাবু এইমাত্র যে গেট ঠেলে মার্ক্স বাটিতে প্রবেশ করলেন, কিছুক্ষণ আগে শহরের এক বিখ্যাত বেওসাদার সেই গেট দিয়েই প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়েছেন। কে, কেন এবং কিভাবে- সেই বৈপ্লবিক ব্যাকগ্রাউন্ডটি আমাদেরও একটু জেনে নেওয়া আবশ্যক। -আরে বিজয়চাঁদজি! বেকার মুখ ব্যথা করাচ্চেন মাইরি! দশ লাখটা আপনার কাছে কোনো ব্যাপার হল, অ্যাঁ! আপনার কিনা ম্যোয়াই তিন তিনটে রাইস মিল, উদিকে আবার পেট্রল পাম্প হাঁকাচ্ছেন! আর সামান্য দশ লাখ নিয়ে... -হামি মারা যাবে মোলয়বাবু, একদম মারা যাবে! কুছ তো কনসিডার- -উফফ! কেন যে আপনারা অ্যাতো ক্যাঁচাল পাড়েন! ... মন্টু, ও মন্টু! যাও তো, চাঁদবদনকে গুলাগ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসো।       টুঁ শব্দ করার আগেই বিজয়চাঁদ বাটলিওয়ালা বেশ বুঝতে পারলেন, তাঁর কলারটি করায়ত্ত করে মন্টু তাঁকে হিড়হিড় করে টানছে। -আরে, কিধার যাচ্ছেন মোন্টুবাবু? -আসুন, আসুন। ঘাবড়াচ্ছেন কেন, চলে আসুন।       বাটলিওয়ালা বুঝলেন, মন্টু তাঁকে যেভাবে বাগিয়ে ধরেছে, তা'তে না গিয়ে তাঁর উপায় নেই। বাগানের এককোণে এসে কিন্তু তাঁর চোখ কপালে উঠল। -আরে ইতো... ইতো... -হ্যাঁ, খাটা পায়খানা। ইসিকা নাম গুলাগ। কিঁউ? আরে দেখছেন না, সব জায়গামে ক্যায়সা গু লাগা হুয়া হ্যায়, ইসিলিয়ে নাম হ্যায়- গুলাগ! অব বাটলিওয়ালাজি, হয় তুম ঘর পে ফোন করকে দশ লাখ আনাতা হ্যায়, নয়তো... হিহি... ওইযে সব শুকিয়ে সোনা হয়ে যাওয়া দাগ হ্যায় না... হিহি... উও সব চাটকে পরিষ্কার করনা পড়েগা... আরে, ওই দ্যাখো! রোতা কিঁউ হ্যায়? -কে ওকানে? কী চাই?       বেজায় নার্ভাস বোসবাবু এতক্ষণ দরজার কাছে টু বি অর নট টু বি মোডে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফতুয়াটা ঘামে ভিজে ঝুপ্পুস। এই আচমকা প্রশ্নে হঠাৎ থতমত খেয়ে নিজের ডান কানের কাছে ঘুসি পাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন: "লাল সেলাম, কমরেড!" -কে মোয়াই? মেটিরিয়ালিস্ট মন্টু তৈরিই ছিল। পাশ থেকে ফোড়ন কাটল: -বড়দা, ইনি হচ্চেন বিদ্যাসাগরপল্লীর বোসবাবু। বঙ্কিম বোস। ব্যাঙ্ক অফ বরোদা। বাড়িতে বৌ-বাচ্চা-বুড়ো বাপ। ব্রিজ খেলেন। -অ! তা মন্টু, ওনাকে একটু জায়গা দাও, উনি মার্ক্সের মন্দিরে বসুন।  বোসবাবু একটা লাল চেয়ারে থপ করে বসে পড়লেন। "একটু নিবেদন ছিল স্যার... মানে কমরেড।" -বলুন বোসবাবু। ধীরেসুস্থে বলুন। জানেন তো, 'যুগ যুগ কেটে যায় বিপ্লবের প্রতীক্ষায়?'       তা বোসবাবু বললেন বইকি! বেশ গুছিয়েই বললেন। তবে, ঝাড়া বারো মিনিট একনাগাড়ে বলার পর যে তাঁকে থামতে হল, সে নেহাৎ তাঁর বিস্ময়বোধ অল্পস্বল্প বেঁচে আছে বলে।       পুজোর থালা হাতে ম্যাডাম পাকড়াশী প্রবেশ করেছেন। দু'দিকের দেওয়ালজোড়া তাক। একদিকে বৈদিক, পৌরাণিক দেবদেবীদের সাথে ঠাসাঠাসি-গাদাগাদি করে কোনমতে একটু জায়গা করে নিয়েছেন সাঁই-সন্তোষী ও লোকনাথ। এবাড়িতে তাঁদের তেমন কদর নেই, কেমন যেন কমন মাস হয়ে আছেন। আরেক দিকে, তাকের ওপর লাল ভেলভেটের গদিতে বসে বাঁধানো ছবি থেকে বরাভয় বিলোচ্ছেন এক দাড়িমুখো জার্মান দার্শনিক, থুড়ি দেবতা। এই কাঁচাখেগো দেবতাটির ওপর ম্যাডাম পাকড়াশীর অচলা ভক্তি। ওসব আদ্যিকালের দ্যাবতারা সব্বাই ঠুঁটো জগন্নাথ! এই জার্মান দেবতাটি কিন্তু ভারি জাগ্রত! বালির বিজিনেস হল, তেতলা উঠল, খোকাখুকুরা মোটরে করে ইস্কুলে যায়- ম্যাডাম পাকড়াশী খুব ভক্তিভরে ধুপ দেখিয়ে তাঁর সামনে দুটো লাল বাতাসা রাখলেন।       পুজো শেষ করে মন্টু এবং মন্টুর বড়দার কপালে সিঁদুরের লাল তিলক কেটে ম্যাডাম লং মার্চ করে ফিরে গেলেন। বোসবাবুর ব্যোমভোলা মুখের দিকে চেয়ে কমরেড মলয় পাকড়াশী একটু হেসে বললেন, "কী বোসবাবু! ব্যোমকে গেলেন নাকি মোয়াই, অ্যাঁ? আরে পেরেস্ত্রৈকা বোঝেন তো? -না স্যার... ইয়ে, মানে কমরেড। সংস্কৃত বুঝি? -উঁহু! ফ্রম রাশিয়া, উইথ লাভ। -আজ্ঞে না! রাশিয়ান পরস্ত্রীর ব্যাপারে তো তেমন কিছু- -উঁহু! উঁহুঁ! পরস্ত্রী নয়। পেরেস্ত্রৈকা। বোঝেন না? সেকি? আপনি পার্টির কাগজ পড়েন না? মন্টু, কাল থেকে বোসবাবুর বাড়িতে পার্টির কাগজ দেবে, দামটা নগদে... হ্যাঁ, কী বলছিলাম? পেরেস্ত্রৈকা, কেমন? মানে নতুন যুগের নতুন নিয়ম আর কি! এ নিয়ে মুখপত্রে কত্ত আলোচনা... তা, ধম্মটম্ম মানিনা মোয়াই! তবু, সমাজে থাকতে হয় তো, তাই আর কি- -তাহলে স্যার... সরি, কমরেড, আগেকার সেসব মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ...  -সব বাদ, বরবাদ। এখন শুধু ওই- -পরস্ত্রী?  -উঁহু! পেরেস্ত্রৈকা। মেন লাইনের আলোচনা কর্ড লাইনে চলে যাচ্ছে দেখে বোসবাবু এবার মিনমিন করে বললেন, "আমার ব্যাপারটা তাহলে..." -হুঁ! সামন্তদের মেয়ে, আঠারো হয়ে গেছে বলচেন? তা সে ড্রাইভারের সঙ্গে ভাগবে না মাস্টারের সঙ্গে আশনাই করবে, তা'তে ওর বাপের মাথা গলানোর কী রাইট আছে? ড্রাইভারের নামটা কী বললেন? হরললাল যাদব, মন্টু... -আজ্ঞে বড়দা পিওর সর্বহারা শ্রেণী। টালির বাড়িতে থাকে। তিনকুলে থাকার মধ্যে একটা দিদি, তাকে হাবাগোবা বলে স্বামী তাড়িয়েছে। অবশ্য হেব্বি ডব... ইয়ে, মানে স্বাস্থ্যবতী!       কমরেড পাকড়াশী একটু কম রেড চোখে মন্টুকে একবার মেপে নিলেন। -তা এই সর্বহারার ওপর বুর্জোয়া সামন্তরা যখন শোষন করছিল, তুমি কি চুষছিলে?...না না, সামন্ততন্ত্রের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। ঠিক আছে বোসবাবু। খবরটা দিয়ে ভালো করলেন। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, আপনিও। এবার তাহলে-"       বোসবাবুকে বিদায় করে কমরেড পাকড়াশী ওরফে মলয় মলোটভ মন্টুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। "কী বুঝলে বল দেখি, কমরেড মন্টু?" -কীসের দাদা? পেরেস্ত্রৈকা?  -উঁহু! হরলালের দিদি। পরস্ত্রী। হ্যা হ্যা...কী বুঝলে, অ্যাঁ? লাল বাড়িটা থেকে বেরিয়ে বোসবাবু কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না, তাঁর খুশি হওয়া উচিৎ কি উচিৎ নয়! আনমনে হাঁটতে হাঁটতে ক্লাবের সামনে পৌঁছে গেছিলেন, এমন সময় গানটা কানে এল: "সমাজতন্ত্রের ছাতার তলায় ওই দম্পতি কেন বাসর সাজায়? কে যায়..." -এই পিন্টু! খাসা গান তো! কার গান রে? ক্লাবের কালচারাল সেক্রেটারি পিন্টু সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপলক্ষে মাইক বাঁধার তদারকিতে ছিল। দাঁত দেখিয়ে বলল, "কী বোসদা, লাল সেলাম ঠুকে এলেন? না আপনাকেই ঠুকে লাল করে দিল?" -আহ্! বড় বাজে বকিস! কার গলা বল না? -সেকি দাদা (চোখ কপালে তুলে) আপনি এর গান শোনেননি? এর লাম লচি...কেতা, ফাটাফাটি গাইছে এখন- -রাখ তোর ফাটাফাটি! এদিকে পাড়ায় কী ফাটছে খবর রাখিস? -কী দাদা? -ইদিকে আয়, বলচি।       বোসবাবু বললেন। পিন্টু শুনল। কপাল পুড়ল লচিকেতার। তার গান বদলে মান্ধাতা আমলের একখানা গান লাগানো হল। সেই গান দিনভর বাজল একনাগাড়ে । পাড়াময় লাউড স্পিকারের সরব উপস্থিতি, তারই মধ্যে একটা  লাগানো হল বেছেবেছে সামন্তদের বাড়ির ঠিক সামনেটায়: "আরে ছো ছো ছো কেয়া শরম কি বাত! ভদ্দর ঘরকা লড়কি ভাগে ডেরাইভারকা সাথ" পরবর্তী পাঁচ অধ্যায়: এক।। হরলাল যাদবের সঙ্গে বাড়ি-পালানো বিউটি না লাভলি সামন্তকে সাতদিনের মাথায় পুলিশ খুঁজে পেল দীঘা থেকে। বিউটির সিঁথি থেকে কালীঘাটের সিঁদুর রগড়ে তোলা হল, হরললালের স্থান হল গারদে। দুই।। বেলাশেষের রাঙা আলোয় একদিন পাড়া কাঁপিয়ে লাল ফৌজের মিছিল বেরলো। 'কমরেড হরলাল লালে লাল লাল সেলাম' স্লোগানে ত্রিভুবন আলোড়িত হল। সামন্তদের বাড়িতে ঢুকে সিনিয়র সামন্তর হাতে স্মারকলিপি দেবার একটা বৈপ্লবিক প্রস্তাবও ইস্তেহারে ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, বাড়ির সামনে এসে মিছিলটা আচমকাই পাতলা হয়ে গেল। তার কারণ বোধহয় গেটে লেখা একটা সতর্কবাণী:              'কুকুর হইতে সাবধান' তিন।। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে হরললাল তার টালির ঘরে ফিরে আবিষ্কার করল, গেহ শূন্য!  কমরেড পাকড়াশী তার ডব... থুড়ি স্বাস্থ্যবতী এবং হাবাগোবা দিদিকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করতে গেছিলেন, কলকেতা শহরের করাল হাঁয়ের মুখে সে মেয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে। কোনো ত্যাঁদড় প্রতিক্রিয়াশীল কখনও জিজ্ঞেস করলে কমরেড মলয় মলোটভ চোখ টিপে বলেন, "যে ক্লাসের মেয়ে, বোঝেনই তো!" চার।। প্রাক্তন ড্রাইভার হরলাল যে বর্তমানে পুরোদস্তুর পাগল, সেটা টের পাওয়া গেল বিউটি না লাভলির বিয়ের দিন। বিয়ের আসরে বিসমিল্লার করুণ বিস্তারের মাঝে পাগল কোথা থেকে একখানা পেল্লায় ক্যাসেট প্লেয়ার ঘাড়ে হাজির হয়। সেদিন সামন্তপ্রভুদের পেয়াদারা তাকে জুতিয়ে বের করে দিলেও, এরপর হামেশাই তাকে রাস্তাঘাটে ক্যাসেট প্লেয়ার ঘাড়ে দেখা যেত। হর পাগলা আরও আঠারো বছর বেঁচেছিল, একবগ্গা পাগলের প্লেয়ারে কখনো একটা বই দুটো গান কেউ শোনেনি: "মেরা কুছ সামান, তুমহারে পাস পরা হ্যায়" পাঁচ।। হরর লাশ ধাঙড়ে নিয়ে গেলে, ওই আবর্জনার গাদার মধ্যে থেকে সেই ক্যাসেট প্লেয়ারটাও উদ্ধার হয়। সেটা আপাতত চা-ওলা চাঁদুর হেফাজতে আছে। চাঁদুর চায়ের খদ্দেররা আজকাল চায়ে পে চর্চার সঙ্গে কিঞ্চিৎ সঙ্গীতচর্চাও করছেন।

99

5

Dr Samya Dutta

মেডিকেল মাখন

বাসে নিয়মিত যাতায়াত করার অভ্যাস যাঁদের আছে, ( যদি গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে কেউ থেকে থাকেন, তিনি হয়তো 'অভ্যাস' শব্দটিকে অসাংবিধানিক এবং অবমাননাকর মনে করতে পারেন। বিশ্বাস করুন, আমার শব্দভান্ডারের ভাঁড়ে মা ভবানী না হলে লিচ্চয় আমিও 'দুর্ভাগ্য'ই বলতাম।) তাঁরা বিলক্ষণ জানেন, সরকারি বাসের সিট মোটেও আরামদায়ক নয়। ঝাড়া দুঘন্টা বসতে হলে বরং লেজের ব্যথায় 'জয় সিটারাম' বলে লাফাতে হতে পারে। আমিও লাফাতে লাফাতেই ধর্মতলায় নেমে গুটিগুটি পায়ে মেট্রোর দিকে এগোচ্ছিলাম। এইখানে একটা সমস্যা আছে, পীড়িত পশ্চাদ্দেশ নিয়ে খুব দ্রুত হাঁটা যায় না। আবার ধর্মতলার বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গে পরিচয় থাকলে, আপনি নিশ্চিত জানেন, 'স্বচ্ছ ভারত প্রকল্প' এইখানে এসে কিভাবে অস্বচ্ছতায় বিলীন হয়ে গেছে। আগে এই চত্বরে একটিমাত্র সুলভ শৌচাগার ছিল, এখন আরও খানদুই গজিয়ে উঠেছে।কিন্তু বাসযাত্রীরা সাইডে গিয়ে হালকা হবার প্রাচীন অভ্যাসটি পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারেননি। হয়তো গঙ্গা থেকে যে কয়েক ঝলক শীতল বাতাস পথ ভুলে এদিকে এসে পড়ে, তারা ব্লাডারে বাড়তি বিসর্জনের উদ্দীপনা যোগায়। তা সেসব উচ্চতর গবেষণার বিষয়, মোটকথা দুর্গন্ধে ওই তল্লাটে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোও যায় না। আমাকে কিন্তু দাঁড়াতে হল। যে দেওয়ালের গায়ে আমার কতিপয় সহযাত্রী পাইকারি হারে শান্তিজল ছেটাচ্ছিলেন, তার পাশ দিয়ে যেতে গিয়েই থমকে দাঁড়াতে হল। আসলে 'ছ্যার, ছ্যার' আওয়াজটা স্থানমাহাত্ম্যে অপ্রত্যাশিত নয়, কিন্তু তারপর 'ও ছ্যার, ইদিকে' শুনে বুঝলাম সেটা সিক্ত দেওয়ালের আর্তনাদ নয়, আসছে মানুষের গলা থেকে। চিনতে একটু সময় লেগেছিল। শেষমেষ চিনতে পেরে কিন্তু বমকে গেলাম। -মাখন? আপনি, মানে তুমি... মানে তুই মাখনই তো, নাকি? আমাদের সেই মাখনা? মাখন ঢিপ করে আমাকে পেন্নাম ঠুকলে। ভালো করে দেখে বুঝলাম, চিনতে যে প্রথমটায় পারিনি, সে দোষ নির্জলা আমার নয়। মাঝে তিনটে বছর পেরিয়ে গেছে বটে, কিন্তু আসলি বদল এসেছে মাখনের চেহারায় আর চিকনাইতে। হলফ করে বলতে পারি, সেইসময় যারা তাপ্পিমারা শার্ট আর বারমুডা পরিহিত, সিড়িঙ্গে নফর গোছের মাখনকে চিনত, তারা কেউই তাকে এই অবতারে চিনতে পারবে না। চোখের দামি গগলসটা খুলে, হাতের প্যাকেটটার দিকে ইশারা করে মাখন বললে, "পুজোর আগে শপিং সাল্টাতে এসছিলাম ছ্যার। এই দেকচেন না...ওই যে গো, টরেন জিন না হরেন জিন কী বলে, এরকম ছেঁড়াখোঁড়া প্যান্টুল নাকি এখন ফ্যাসন- মার্কেটে হেব্বি খাচ্চে। তা ভাবলাম, আমাদের উদিককার পাব্লিক তো শালা গাওয়ার। এমন দামনা-দেকানো প্যান্টুল দেকিয়ে চমকে দিব। আসুন ছ্যার, চা খাবেন আসুন..." দুকাপ চা অর্ডার করে মাখন পকেট থেকে এক প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক বের করলে। তারপর তারই একটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে, ঝিকিমিকি-টুংটাং লাইটার দিয়ে সেটা ধরিয়ে দিলে। চা সহযোগে মাখনের সঙ্গে আমার কুশল প্রশ্নাদি বিনিময় হতে থাকুক, ততক্ষণ এই অসাধারণ চরিত্রটির একটু পূর্ব পরিচয় পাঠককে দেওয়া দরকার। সিক্সথ ক্লাসে বার চারেক গাড্ডু খেয়ে, মাখনা মাইতি কিভাবে তার বাপের পকেট কেটে কলকাতা পাড়ি দিয়েছিল 'পোসেনজিত' হবার তাড়নায়, সে ইতিহাস একদা শুনে থাকলেও এখন আর স্মরণে নেই। বরং তার সঙ্গে আমার পরিচয়ের ইতিহাসটা একটু বলা দরকার। কলেজজীবনে আমি যে পাড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম, সেই পাড়ারই এক ডাক্তারবাবুর চেম্বারে মাখন ফাইফরমাশ খাটত। টুকিটাকি কাজকর্মের ফাঁকে মাখনের বিশেষ আগ্রহ ছিল, চেম্বারে আসা বিবিধ পেশেন্টের রোগের বিবরণ আর চিকিৎসা পদ্ধতি নিরীক্ষণ করা। স্মৃতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা উচিত হবে না বুঝতে পেরে, (মাখনের নিজের কথায় "উ শালোর পাঁচের ঘরের নামতা ইয়াদ হতে আমার পুরা দু'বচ্ছর লাগি গেছিল।") মাখন তার লব্ধ জ্ঞান লিখে রাখার জন্য একখানা খাতা জোগাড় করে। ডাক্তারবাবু বলতেন, "সংসারে দুটো খাতাকে আমি বিলক্ষণ ভয় করি। একটা পরলোকে চিত্রগুপ্তের আর একটা ইহলোকে মাখনের।" সেই খাতা একবার আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। শুরুর কয়েক পাতা পাঠোদ্ধার করতে পারিনি, ব্রাহ্মী বা খরোষ্ঠী লিপির সঙ্গে আমার সম্যক পরিচয় নেই, কিন্তু যে পাতাটা মোটামুটি পাঠযোগ্য, দেখলাম তার ওপরে হেডলাইন দেওয়া আছে: "হাগা" "হড়কে গেলে- পেট হড়হড় করবে। বারেবারে যাতি হবে। গাঁতিয়ে ইলেক্টেরেরল খাওয়াতি হবে। কষে গেলে- কালা পাথ্থর। ঢুকুঢুকু ঈশপের গুল মারলে মর্নিং-এ কিলিয়ার।" বানানের যা নমুনা দেখেছিলাম, ওই দু'লাইন পড়লেই বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা দ্বিতীয় বার খসে পড়ত। তবে সাইন-সিম্পটম বর্ণনা দেখে আমার একটা পেইন কিলারে কাজ হয়নি, ডবল লেগেছিল। সেই মাখন এখন আমার সামনে দন্তবিকাশ করে দাঁড়িয়ে। বললে, "গাঁয়ে ফিরে গিয়ে হেব্বি প্যাকটিস ঝাড়ছি ছ্যার। আপনেদের আসিব্বাদ... গাঁয়ের লোকে একডাকে চিনে, 'মেডিকেল মাখনা।' বোড লটকে লিকেও দিচি, ডা: মাখন মাইতি, বারা কেটে এম.ডি। -একেবারে এম.ডি! ব্র্যাকেটটা বাড়াবাড়ি হল না? মাখন খুব বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বললে, "না ছ্যার, এম.ডি না লিকলে মার্কেটে ফাটবে না। ফিলিম হল তো দেব, আর ডাক্তার হল তো এম.ডি- এছাড়া ছ্যার পাব্লিক খাচ্চে না।" -হুঁ... তা মাখনবাবু, বিয়ে-টিয়ে... মাখন লজ্জা - লজ্জা মুখ করে মাথা এবং নিতম্ব চুলকালো। "ওই ছ্যার... পাশের গাঁয়ের মেয়ে, ফুলমণি, লভ হইচিল তো..." -ওরে শাল্লা! তুমি তো বেজায় ঘুঘু! মাখন আবার হেঁ হেঁ করে বলল, "তবে সাদির পর থেকে কিন্তুক ছ্যার বিজিনেস আরও বেড়ে গেচে।" -তাই বুঝি? -হ্যাঁ ছ্যার! আসলে মানুসের কেস করে তো সেরকম লাভ হচ্চিল না... তাই একন গরুর কেস ধরিচি। সোসুর আর বোঁয়াই পাটনর। -কীরকম? -ধরুন আপনি হাটে গরু কিনিচেন, ইদিকে বচ্ছর কাবার কিন্তুক গরু বাছুর দেয় না। আমার সোসুর হল গে গুনিন, বুইলেন তো- শনিবারে মায়ের পেসাদি জবাফুল... মানে... কানটা এট্টু ইদিকে আনুন ছ্যার... (ফিসফিস করে) বলদার হুঁহুঁতে বেঁইধে দিতি হয়। বোঁয়াইয়ের জমিজিরেত আছে। উর কাছ থিকেই বলদা আসে। আর গরুর ডেলিভারি করাই আমি। পুরো প্যাকেজ দশ হাজার। -দশ! -হাজার। মাখন অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবসায়িক বুদ্ধি দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। কিন্তু বিষ্ময়ের তখনও অবধি ছিল। -দেখো বাপু, ওই গরু অবধিই ঠিক আছে। মানুষের ডেলিভারি করতে যাসনি যেন- মাখন দেড় হাত লম্বা জিভ কাটল। "কী যে বুলেন ছ্যার! পোয়াতি কেসে আগে ভিজিটটো লিয়ে লি, তারপর বলে দিই কেস খারাপ আছে, হাসপাতালে দিতি হবে। হে হে..." -বাহ্! তা হ্যাঁ রে, শপিং করতে একা এলি যে বড়? বৌ এল না? -কী করে আসবে বুলেন? (মাখন আবার লজ্জাবনত শিরে নিতম্ব চুলকায়) আট মাস চলতিছে তো... মানে বুইলেন না... -বলিস কী রে! তুই বাপ হবি? -হেঁ হেঁ, ওই আর কি! আমাদের, মানে আমার আর ফুলমণির ভালোবাসার পেথ্থম ফুল। -হুঁ! তা, এও কি জবাফুল? -যাহ্! কী যে বুলেন... ও ছাড়েন। এইবেলা একটা কাজের কতা পেড়ে লিই। বুইলেন ছ্যার... ভাবতিছি একটা মেডিকেল কলেজ খুললি কেমন হয়? " -কী বললি! -মেডিকেল কলেজ গো! আসলে একা এত পেসার নিতি পারছি না। তাই, এইবেলা কটা সাকরেদ ফিট করি নিলে ভালো হয়।তা ধরুন, তাদের তো টেনিংটা দিতি হবে- -তার নাম মেডিক্যাল কলেজ? হতভাগা, জেলে দেবে তোকে! -"কী বুলচেন ছ্যার!" মাখন সগর্বে বুক চাপড়ায়। "আমার সাউড়ি পঞ্চায়েতের মেম্বর লয়! আমি লিজেও তো পাটি করি। দিখবেন, আসচে বার এমএলএ টিকিট বাগাই কিনা! আরে মাখনা ডাক্তারের ভুটভুটি গেলে পাড়া থরথর কাঁপে!" মাখন, আমাদের মাখন হবে বিধায়ক? শিহরণে খানিকটা চা শ্বাসনালীতে ঢুকে গেল। মাখন এক বোতল মিনারেল ওয়াটার কিনে আমার মাথায় থাবড়ে দিলে। -শুনুন ছ্যার, শুনতিছেন? একবার কলেজটো খুলতি দেন, তারপর আপনাকে উ কলেজের হেঁটমাস্টার করি লিব। চা শেষ। ভাঁড়টা ফেলে তড়িঘড়ি হাঁটা লাগালাম। ভাবছি বেকার থেকে বরং 'হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান' ইত্যাদি আওড়াব। কিন্তু মেডিকেল মাখনার মেডিক্যাল কলেজের 'হেঁটমাস্টার' হতে আমি নারাজ।

102

8

দীপঙ্কর বসু

রামধুরায় তিন দিন

চা পর্ব সেরে কিছুক্ষণের জন্য বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম । বারন্দার নিচে অন্ধকার বেশ গাঢ হয়ে গেছে ইতি মধ্যেই । সামনের পাহাড়ি টিলাগুলোতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আলোর বিন্দু – যেন হাজার হাজার জোনাকির আলো টিলার গায়ে লেগে আছে । না কি তারাভরা আকাশটাই নেমে এসেছে মাটির এই পৃথিবীতে । আর শীত বুড়ো ও যেন সূর্য ডোবার অপেক্ষাতেই ছিল । আঁধার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে জায়গাটায় । ঘরের বাইরে ঠাণ্ডা ,হাতে কোন কাজ নেই , একটা গল্পের বই সঙ্গে থাকলেও এই পরিবেশে তাতে মন বসলনা অগত্যা ... অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা এলাকাটা যেন ঘুমে ঢলে পড়েছে । কোথাও কোন শব্দ নেই ,শুধু মাঝে মাঝে এক আধটা ভারি ট্রাকের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল । সেই গভীর নৈশব্দের পটে এক সময় শুনতে পেলাম সেই ভ্রমর গুঞ্জন । সেই মাদকতায় ভরা সুরে গুনগুন গান গাইতে গাইতে রাতের খাবার নিয়ে উপস্থিত পূজা । শরীর ক্লান্ত ছিল ,তার ওপরে দ্রব্যগুণে নৈশাহার সেরে ঘুমিয়ে পড়তে সময় লাগল না । ঘুম ভাঙ্গল পরের দিন ভোর সাড়ে পাঁচটার কিছু পরেই । সাধারাণত আর পাঁচটা দিনে আমার মত বেকার লোকের অত ভোরে বিছানা ছেড়ে ওঠার কোন কারণ থাকেনা । আজকে কিন্তু কি একটা অজানা তাগিদ অনুভব করলাম মনে । তড়বড়িয়ে উঠে পড়লাম আর পায়ের কাছে জানালার পর্দাটা সরানো মাত্রই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম । দেখলাম উত্তর দিগন্তে অন্ধকার কিছুটা তরল হয়ে এসেছে আর সেই আধো অন্ধকারে কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় দিনের প্রথম সূর্যালোক এসে পড়েছে !! সে এক অপার্থিব দৃশ্য !! গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে এলাম ঘর ছেড়ে বারান্দায় ।ছবিতে বন্দী করলাম দৃশ্যটাকে ।কিন্তু ক্যামেরায় তোলা ছবিতে সে অপার্থিব মুহূর্তের অনুভবটাকে ধরি এমন ক্ষমতা আমার কোথায় !!আমার বাহ্যজ্ঞান যেন ছিলনা বেশ কিছুক্ষণের জন্যে । চেয়ে রইলাম উত্তর দিগন্তের পানে । কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়া থেকে লালচে বেগুনি রঙ যেন চুঁইয়ে নেমে এসে গোটা শৃঙ্গটাআকে রাঙিয়ে দিল । আর তার পর সেই রঙ একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ল গোটা পর্বত মালায় । আমার মুগ্ধ দুই চোখের সামনে বেগুনি ক্রমে লাল হল , ক্রমে লাল আরও হাল্কা হয়ে পাকা সোনার রঙ ধরল ... শুধু কি দূর দিগন্তের তুষারাবৃত পর্বতমালা ? পিছিয়ে নেই বারাব্দার নিচের পাহাড়ি উপত্যকাও – যেখানে উঁচু উঁচু পাহাড়ি টিলার ভিড়ে ফাঁক ফোকর এর মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে তিস্তা। যদিও সে নদী এখন দৃষ্টির বাইরে । সে এখন ঘন মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে । টিলাগুলির মাথায় হাল্কা ধুসর বর্ণের মেঘ সমস্ত উপত্যকায় যেন রঙ ,শুধু রঙ এর মেলা বসেছে । দেখতে দেখতে নেশা ধরে যায় । নোট ঃ ভোরের উপত্যকার ছবি যা এই লেখারও সঙ্গে থাকা উচিৎ ছিল , সেগুলি ইতিমধ্যেই ছবিঘরে "সামনে চেয়ে এই যাদেখি" শীর্ষক এলবামে দিয়ে ফেলেছি ।উৎসাহী পাঠক আশা করব সেগুলি এক ঝলক দেখে নেবেন

168

26

জল

বারোয়ারীর আঙিনায়

জল খাবেন? ঠান্ডা কৌতুকের স্বরে জানতে চায় তালতলা থানার সেকেন্ড অফিসার কুন্দন চ্যাটার্জী| ভরা ঠান্ডাতেও গলগল করে রীতিমত ঘামছে মেখলা| ন না‚ লাগবে না| গলাটা নিজের অজান্তেই কেঁপে যায়| আমাকে ধরে আনা হল কেন এখানে? ধরে তো আনা হয়নি ম্যাডাম| আপনি নিজের পায়ে হেঁটে গাড়িতে উঠেছেন‚ তারপর গাড়ি থেকে নেমে এখানে নিজের পায়ে হেঁটে এসেছেন আমাদের সঙ্গে| স্বরে এখনো কৌতুক ধরে রেখেছেন কুন্দন চ্যাটার্জী| হাতে সময় আছে‚ একটু খেলিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে| বড় বড় চোর বদমাশ খুনে নিয়ে কারবার তার| সেখানে এ মেয়ের তো দুধের দাঁত পড়েনি| অপরাধ করে কেউ কখনো পার পায়নি‚ পায় না| তারপর মিস মেখলা মুখার্জী‚ উপাসনার সাথে আলাপ কি করে হল? আগেই তো বললাম আমার ক্লাসমেট| ওহ্হ বললেন তো| তা উপাসনা কোথায় এখন জানেন নিশ্চয়? ন না জানি না আমি| যোগাযোগ নেই আমার সাথে| গলাটা নিজের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য শোনালো না| কিন্তু আপনার কললিস্ট তো অন্য কথা বলছে| আমাদের এত বোকা কেন ভাবেন ম্যাডাম? একটু বলে ফেলুন তো কি কি কথা হয়েছে? এতক্ষণের কৌতুকস্বর অকস্মাৎ ঠান্ডা বরফশীতল কন্ঠে পরিণত হয়| তেমন কিছু না‚ ঐ কেমন আছি এইসব আর কি... তোতলাতে থাকে মেখলা| আর চিঠি? চিঠিটা তো উপাসনাই ছাড়তে বলেছিল তাই না? মনে পড়ে উপাসনা সেদিন ফোন করে বলেছিল জেরক্স করা চিঠিটা ছেড়ে দে ত্রিদিবের ঠিকানায়| আর ভুলেও লিখবি না তোর বা আমার ঠিকানা| চিঠিটা সে পাঠিয়েছিল রুপসার নামে‚ ত্রিদিবের বউ রুপসা| এ যাবতকাল যত মেইল লেখা হয়েছিল উপাসনা আর ত্রিদিবের তরফে তার প্রিন্টেড কপি| যাতে পড়তে পড়তে রুপসা রেগে ওঠে‚ জ্বলে ওঠে‚ জ্বালিয়ে দেয়| উত্তর দিতে হবে না| আমরা সবটাই জানি| অনেক আগে থেকেই আপনারা ভেবে রেখেছিলেন যে চিঠিটা ত্রিদিব পড়বেই| আর ত্রিদিবের অভ্যাস ছিল পাতা ওল্টানোর সময় জিভের থেকে থুতু নিয়ে পাতা ওল্টানো| সুযোগটা ওখানেই নিলেন আপনারা| প্রতিটা পাতার ওপরের দিকে লাগিয়ে দিলেন বিষ| আর সেই বিষ ধীরে ধীরে পেটে গিয়ে ত্রিদিব মারা যাবে| আর হলও তাই| ত্রিদিব মারা গেলেন| কি বলছেন স্যর ত্রিদিব স্যার মার্ডার হয়েছেন! বিস্ময় ঝরে পড়ে মেখলার কন্ঠ থেকে| কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি স্বীকার করছি চিঠিটা আমি পাঠিয়েছি‚ কিন্তু বিষ আমি মাখাইনি| আপনি না মাখালে উপাসনা মাখিয়েছে| সেটা তো ফরেন্সিক রিপোর্ট এলেই পরিস্কার হয়ে যাবে| না স্যর উপাসনাও লাগায় নি| লাগালে আমি আপনার সামনে এইভাবে বসে থাকতে পারতাম না| ভুরু কোঁচকায় কুন্দন চ্যাটার্জী| স্যর ঐ চিঠির প্রত্যেকটা কপি আমি পড়েছি| আর আমারও বদভ্যাস মাঝে মাঝেই আমি পাতা ওল্টাই ঐ মুখের থেকে থুতু নিয়ে| এ আবার কি ধাঁধা? বেশ চিন্তায় পড়ে যায় অফিসার| মেয়েটা মিথ্যে বলছে না যে সেটা মেয়েটার চোখ মুখে দেখেই পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে| জ্বলন্ত দেশলাই কাঠির মত আত্মবিশ্বাস প্রতিটা শব্দের উচ্চারণে| একটু আগের সেই বিহ্বল‚ দুর্বল ভেঙ্গে পড়া চেহারাটা যেন নিমেষে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে| তবে কে করল খুনটা? ..... দিনগুলো কেমন যেন আলস্যে ভরা| উঠি উঠি করেও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না| আরও একটু গড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হয়| বছর শেষের অনেকগুলো সি এল পড়ে আছে| না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে| তাই উপাসনা সি এল গুলো নিয়ে নিয়েছে| শুয়ে-বসে বই পড়েই সময় কাটাচ্ছে| উৎসব নেই| বাড়ি গেছে| রোজকার একটা অভ্যেসে বেশ পরিবর্তন এনে দিয়েছে ছেলেটা| মুখের কাছে তৈরি চা‚ ব্রেকফাস্ট| হুম অভ্যেসটা বেশ খারাপ করে দিয়েছে| মনে মনেই হাসে উপাসনা| ছেলেটা স্পষ্টঃতই তার প্রেমে পড়েছে| মুখে না বলুক অনুভবে বোঝে সে| আরও পরিবর্তন এনেছে‚ এই যে বই পড়া‚ কোনকালেই তার চরিত্রে ছিল না| কিন্তু এখন অবসর পেলে পড়ে| সবই অবশ্য উৎসবের সংগ্রহ থেকে নিয়েই পড়ে| ছেলেটার কালেকশন ভালো| শেক্সপীয়ার থেকে রবীন্দ্রনাথ‚ বুদ্ধদেব গুহ থেকে হাল আমলের হর্ষ দত্ত সবই আছে| নাহ বেলা অনেক হল| উঠে পড়ে উপাসনা| বাড়ির জন্য মনটা কেমন কেমন করছে| কতদিন মাকে দেখেনি‚ বাবাকে মাঝে মাঝেই মিস করে| আর আরাধনা তার আদরের রুপি সবাই যেন কেমন দুরের মানুষ হয়ে গেছে| বাবা বলতেন রাগ বড় চন্ডাল| প্রতিহিংসা তার থেকেও বেশি| আচ্ছা ত্রিদিবের পরিবারে এতদিনে নিশ্চয় একটা ওলোট -পালোট ঘটে গেছে| নিশ্চিন্তে ঘর করার স্বপ্ন এতদিনে ছাই হয়ে গেছে| অবশ্য বাঙালী মেয়ে তো বুক পোড়ে তবু মুখ ফোটে না| আর পুরুষ মানুষ তো সোনার আঙটি| একটু আধতু চারিত্রিক ত্রুটি থাকবে না তাই হয় নাকি| মনে মনে হাসে উপাসনা| পুড়িয়ে খাক করে দিতে চায় সে ত্রিদিব আচার্য্যকে| ধক ধক করে জ্বলে ওঠে প্রতিহিংসা তার চোখে| টেবলের ওপর রাখা সেলফোনটা বেজে ওঠে| আড়চোখে তাকিয়ে দেখে উৎসব| ব্রেকফাস্টে ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানাচ্ছিল| হাতটা ধুয়ে কলটা রিসিভ করতে করতেই কেটে যায়| আবার আসবে| একটু দাঁড়ায় উপাসনা| কিন্তু সেলটা আর বাজে না| বদলে একটা মেসেজ ঢোকে| তুলে নিয়ে দেখে উৎসবের মেসেজ| দুটো শব্দ লেখা| 'পালান উপাসনা'| ভুরু কুঁচকে যায়| পালান মানে কি বলতে চাইছে উৎসব? কোথায় পালাবে? কেন পালাবে? রিং ব্যাক করে কিন্তু ওপ্রান্তে কেউ ফোনটা রিসিভ করে না| আবারও এবং বারবার রিং করে কিন্তু কেউ কলটা রিসিভ করে না| পাগল পাগল লাগে| চিন্তায় মাথাটা ছিঁড়ে যায়| ডোরবেলটা মারাত্মক জোরে চিৎকার করে ওঠে| অশনি সংকেত টের পায় উপাসনা| দরজাটা প্রাণপণে দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরে থাকে সে‚ দরজাটা খুলবে না কিছুতেই খুলবেনা সে| .... মাত্র কদিনেই ফোটোটাতে ধুলো জমে গেছে| পরম ভালোবাসায় সাদা শাড়ির আঁচলের খোঁট দিয়ে মুছে দেয় ফটোটা রুপসা| কদিন আগেও কি ভাবতে পেরেছিল এই পোশাকটা তাকে পড়তে হবে! কি সব যেন হয়ে গেল| এই তো কদিন আগেই বিদেশে ঘুরে এলো| এর মধ্যেই মানুষটা তাকে ছেড়ে চলে গেল| চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জল| ত্রিদিব যে খুন হতে পারে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি সে| কার সাথে কি এমন শত্রুতা যে সে এইভাবে প্রতিশোধ নেবে? অবশ্য মানুষ হিসাবে ত্রিদিব যে উচ্চমানের ছিল তা নয়| কোচিং ক্লাসে কত মেয়ে আর কতজন যে ত্রিদিবের ওপর ফিদা সে নিজে উপলব্ধি করেছে| যখন ত্রিদিব তাকে দেখতে এসেছিল‚ এত মিস্টি করে কথা বলছিল‚ শুধু ঐ কথার জন্যই হ্যাঁ বলে দিয়েছিল| কোন মানুষ এত সুন্দর কথা বলতে পারে ভাবতেই পারে নি| তারপর দুই বাড়ি সন্মতিতে বেশ কিছুদিনের কোর্টশিপ‚ টুকটাক ছোঁয়াছুঁয়ি পাগল করে দিয়েছিল তাকে| মনে হয়েছিল ত্রিদিব ছাড়া সে নিজে অসম্পুর্ণ| সম্পুর্ণ করে পেতে চেয়েছিল| পেল কিন্তু রাখতে পারল কোথায়? চোখ বেয়ে জল গন্ড ভাসিয়ে দেয়| লবণাক্ত চোখের জল বুক বেয়ে নামতেই জ্বালা করে ওঠে| একটা গভীর ক্ষততে জলটা পড়তেই চিড়বিড় করে ওঠে‚ করুক‚ ওষুধ লাগাবে না| ওটা যতদিন থাকবে ততদিন ত্রিদিব বেঁচে থাকবে তার শরীরে| বেঁচে থাকবে যন্ত্রণারা| জলেভরা চোখদুটো হঠাৎ করেই জ্বলে ওঠে| বউমা থানা থেকে ফোন| উঠে যায় রুপসা ফোনটা ধরতে| কি জানি নতুন কোন খবর আছে হয়ত নাকি আরও কিছু জানা বাকি? ওভার টু শ্রী নাও :)

476

15

Samya Dutta

ঢেঁকি হলে যেতেম বেঁচে

ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙে, কিন্তু ডাক্তার স্বর্গে যাবার আগে অবধি যেখানেই যাক, ডিসপেনসারি ঘাড়ে নিয়ে যায়। বিয়েবাড়িতে মেলা আত্মীয়ের ভিড়। চেনা-অচেনা-অল্পচেনা এই আত্মীয়েরা বোধহয় আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন। আমি বাড়িতে পা দেওয়ামাত্র এঁরা আমায় ছেঁকে ধরলেন।বাস রে! চক্করবূহ্যে পড়ে অভিমন্যুরও বুঝি এমন দশা হয় নি! ঘন্টাখানেকের মধ্যে কত রোগের যে ফিরিস্তি শুনলাম আর নিদান দিলাম, তার ইয়ত্তা নেই। গেঁটে বাত, আমাশার ধাত, মায় গব্বযন্তরনায় কুপোকাত অবধি তাবৎ ব্যাধির তখন পাইকারি চিকিৎসা চালাচ্ছি। এসে অবধি দানাপানি জোটেনি, কিন্তু মানবসেবা আর থামছে না। কী বলচেন? আরে মশয়, কেটে পরা কি অতই সস্তা! মারাদোনাকে ডিফেন্ডাররা যেমন ছেঁকে ধরত, ওই স্বজনের দল তখন আমায় তেমনি করে ধরে আছে। কিন্তু ভগবান শেষটায় মুখ তুলে চাইলেন, বুইলেন কিনা! জীবে প্রেমের ঠেলায় আমার যখন জিভ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, তখ্খনই ভ্যাঁপ্পোর ভোঁ করে বরের গাড়ি এসে পরল। রোগজর্জরের দল এবার গেলেন বর দেখতে এবং বরযাত্রীদের আপ্যায়ন করতে। আমিও দেখলাম এই সুযোগ! এককোনে স্টল বসিয়ে কফির ফোয়ারা ছুটেছে। তা, সবে ভাবছি একটু গলাটা ভিজিয়ে নিলে মন্দ হয় না, তারই মধ্যে বরযাত্রীদলের মেয়েরা গিয়ে কফিওয়ালাকে ছেঁকে ধরেছে। আর তাদের বেশভূষার জৌলুস কি রে কাকা! পুরো চত্বরটার ঔজ্জ্বল্য কয়েক হাজার ওয়াট বেড়ে গেছে। কফিওয়ালার কিন্তু ক্লান্তি নেই, সে গদমুখে এই ললনাদের কফি খাইয়ে চলেছে। নিকষিত হেম! হে হে.....আমি শ্লা যেই না যেয়ে কফি চেয়েছি, কফিওয়ালা সেরেফ দৃষ্টিতে আমাকে ভষ্ম করে দিলে। ওফ্, সেই লুক মনে করলে এখনো হেঁচকি তুলি! আপনাদের গব্বর সিং-মোগ্যাম্বোরাও অমন লুক দিতে পারলে ধন্য হত। বাধ্য হয়ে সাইড করে সটকে গেলুম এককোনে অন্ধকারের দিকে, সিগারেট ধরানো দরকার। এমন সময় অন্ধকারের ভেতর থেকে ঘরঘরে গলায় কে যেন বলল, "এই যে বাপধন, তোমাকেই খুঁজছিলাম।" চমকে উঠে হাতের দেশলাইটা ফেলে দিয়েছিলাম। কন্ঠস্বরের মালিক এবার সামনে এলেন। একটু আগেই আলাপ হয়েছে, বড়মাসিমার ননদের শ্বশুরবাড়ির কে যেন বটেন। কার্তিকি অমাবস্যার মত গায়ের রং, উপরন্তু গাঢ় রঙের কোট প্যান্টুলুন পরে থাকায় অন্ধকারে ভালো ক্যামোফ্লাজ হয়েছে। বললেন,"কটা কথা ছিল, তা তোমাকে এদিকে আসতে দেখে পেছু নিলাম।" বোঝো! তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে! -"তা তুমি এখন কোথায় বসছ টসছ?" মনে মনে বললাম,"কমোডে," কিন্তু মুখে বললাম, " হেঁ হেঁ...ওই আর কি..." -"আমার বুঝলে কি না, মাসখানেক ধরে মাজাটা খুব টনটন..." সাধ্যমত নিদান দিয়ে সটকাতে যাচ্ছি, উনি খপ করে ধরলেন! -"তা আমার আবার অ্যালোপ্যাথিতে তেমন ইয়ে নেই..." আমার ওপর আজ গান্ধী ভর করেছে, মনে মনে এক থেকে দশ গুনতে শুরু করলাম। এক... দুই... -"...গেল হপ্তায় হোমিও দেখালাম। এক দাগ ওষুধ দিলে, বলতে নেই ব্যথা একদম উধাও।" (হে ধরণী! দ্বিধা হও! সাতচল্লিশ...ছিয়াশি...) -"তা বাপ, তোমার এই দাওয়াই মাথা ধরাতেও চলবে কি? তোমার মাসিমার আবার মাঝেমধ্যে..." -"চলবে বইকি! আচ্ছা আমি তাহলে এখন..." -"হাঁটু ঝনঝন? দাঁত কনকন? শিরদাঁড়া টনটন?" গান্ধীবাদের হার হল। তেতোমুখ করে বললাম, "এক বিরহবেদনা ছাড়া আর সবেতেই চলবে। সক্কল দরদের দমদম দাওয়াই। " -"অ! আচ্ছা... আচ্ছা তাহলে ওই বরাহ না কি বললে, ওই ব্যথারও একখানা ওষুধ লিখে দাও।বলা তো যায় না..." "

116

12

Samya Dutta

কহেন কবি কালিদাস

নাহ্, দত্তকুলোদ্ভব হলেই বুঝি কিছু কবি হওয়া যায় না! যায় যে না, তার ডবল এক্সেল প্রমাণ এই আমি। বিগত দু'ঘন্টা নাগাড়ে খাতার পাতা আর মাথার চুল ছিঁড়ে চলেছি, টুবি পেন্সিলের মাথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে নট টুবি হয়ে গেছে, একটা গোটা তো দূর অস্ত, সিকিখানা কবিতাও বেরোয়নি। আধখানা পেন্সিল হজম করে কেবল আমার জ্ঞানপিঠের শিরদাঁড়া টনটনে হয়ে উঠেছে, বিধাতার দুনিয়ায় কোনো ন্যায়বিচার নেই। নইলে ভাবুন, এই হাজার হাজার ডক্টর হাজরা, থুড়ি, কবির রাজ্যে অকবি একলা আমি! আটের খোকা থেকে আশির বুড়ো, গার্সিয়া লোরকা টু চন্ডীদাসের খুড়ো - সবাই ধ্যাড়াধ্যাড় কবিতা নামাচ্ছে । কবির নাম জীবনানন্দ, লিখছেন মৃত্যু-চেতনার কবিতা, নামটা এন্তেকাল আলি হলে বোধহয় জীবনমুখী কবিতা লিখতেন। আর ফেসবুকে! ইয়াল্লা! সেখেনে কত কিসিমের কত কবি। বেঁটে-মোটা, লম্বা-সরু, কাঁধে ঝোলা, আপনভোলা- কত্ত ভ্যারাইটি! মোমবাতি প্রতিবাদী ঘ্যাম বেশি কবি পাবেন, আবার মাথাভরা টাকে এলোকেশী কবি? তাও পাবেন। আর আমি- আরে ছ্যা ছ্যা! রামোচন্দর! এর মধ্যে আবার সুরঞ্জনাকে মুখ ফসকে বলে ফেলেছি, "অইখানে যেয়োনাকো তুমি, বোলনাকো কথা অই যুবকের সাথে।" তা'তে অ্যায়সান মুখঝামটা দিলে! "কেন বে! ইউ নো, হি ইজ আ পোয়েট! আর তুই শালা পাইরেট বই তো কিসু লয়!" ভাবলুম তা হবেও বা, আমার মামাবাড়ির কালীকে লোকে ডাকাতে কালী বলে, দস্যুর ডিএনএ কি একটুও থাকবেনা? ওয়ান অফ দি ইননিউমারেবল ডেকয়েটস ইন দিস ডেকয়েট ইনফেস্টেড ল্যান্ড! ঠিক হ্যায়, উও ছোকরা মিলিটারি, তো হম ভি মিলিটারি! উও ফেসবুক মেসেঞ্জার করতা হ্যায়, হম তুমহারে লিয়ে ক্লাউড মেসেঞ্জার ভেজেগা! যাকে বলে মেঘদূত! ও হরি! সে মোলাসিসেও সিলিকন! বাল্মীকি প্রতিভা বুঝি রত্নাকরেরই ছিল, আবিষ্কার করলুম আমার ট্যালেন্টের টুনির কোনো ঝিকিমিকিই নেই। অগত্যা? রণে-বনে-ড্রেনে বিপদে পড়লে বাঙালির বাচ্চা আজম্ম যা করে এসেছে, ত্রাহি মধুসূদন! গুরু, তুমিও দত্ত, আমিও দত্ত। তাই বলছি, হেঁ হেঁ, আপদে-বিপদে দত্তরাই তো দত্তদের দেখবে, বল! পিলিজ বস! ওই একখানা চতুষ্পদ না চতুর্দশপদী কী বলে, ওই মাল একপিস আমার কলম বেয়ে হড়কে দাও। বেশ চোখ-টোখ বুঝে প্রার্থনার ভাব এনে ফেলেছি, এমন সময়- "আরে দিওয়ানো, মুঝে পহচানো কাঁহা সে আয়া, ম্যায় হুঁ কন!" বাজখাঁই চেল্লানি শুনে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠেছিলাম। চোখ কচলে, বারকতক পিটপিট করে দেখি: একটা লোক। পরনে মাদ্রাজি স্টাইলের ধুতি, খালি গায়ে পৈতে জড়ানো, ন্যাড়া মাথার মধ্যিখানে শজারুর মত খোঁচা খোঁচা স্পাইক, চোখে গুচ্চি গগলস চড়িয়ে আমার জানলায় বসে আছে অনেকটা ইয়ে করার ঢঙে। -ওওও ববববাবা গো! মাআআআ গো! চো-চো-চো..... লোকটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল, "জানতুম, চিনতে পারবি না! তাই বলে এক্কেরে চোর বলে দিলি! শোন, মাই নেম ইজ দাস, কালিদাস।" -কালিদাস! কোন কালিদাস? আমি তো একজন কালিদাসকেই চিনি, মহুয়া হলে টিকিট ব্ল্যাক করত। -এ তুই কোন পিঁজরাপোলের মাল রে! আমায় আজকের চ্যাঙড়া পেয়েছিস? আমি হলাম সেই বি.সি..... -যাহ! নিজেই নিজেকে গাল দিচ্ছে, হে হে..... -"খ্রীঈঈঈঐষ্টপূর্ব!" লোকটা ধমকে উঠল, "খ্রীষ্টপূর্ব বুঝিস? আমি হলাম সেই রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাকবি কালিদাস।" এইবার আমার বিষম খাওয়ার পালা। হাতজোড় করে ছলছল চোখে বললাম, "অ্যাঁ! আপনিই সেই! আসুন কবীন্দ্র, আসুন মহাভাগ! আস্তাজ্ঞে হোক, বস্তাজ্ঞে হোক।" -ওসব কী সাধু ভাষায় খিস্তি কচ্চিস রে! মধুর নাম ধরে ডাকাডাকি কচ্চিলি, তা সে বাবু তো সক্কাল সক্কাল চার পেগ মেরে আউট, তাই বাধ্য হয়ে.....ওকি রে! অমন গোঁ গোঁ করছিস কেন? -নননা, মমমানে, হঠাৎ খেয়াআআল হল, আপনি তো ভূভূভূ..... -ভূত তোর পিসেমশাই! জানিস না, কবিরা অমর হয়! তা আমি হলুম আদি কবি, সুতরাং আকবর এবং অ্যান্টনিও। যাকগে, এসিটা বাড়া দিকি! কী গরম মাইরি! গোটা পিঠে ঘামাচি বেরিয়ে গেল। একটু চুলকে দে তো বাপ..... আরেকটু বাঁ দিকে, আরেকটু..... -অ! তোরও দেকচি সেই সনাতনী কেস। হৃদয়হরণ কবিতা চাস। -আজ্ঞে, শুধু হৃদয় হলে হবে নে, নারীহৃদয়। স্পেসিফিক বললে, সুরঞ্জনার..... মানে, এমন পদাবলী নামাতে হবে যাতে- -পদপল্লব মুদারম পাওয়া যায়! তাই তো? -আজ্ঞে। -তা বাপু, সেল্ফ হেল্প শিখিসনি বুঝি? স্বনির্ভর প্রকল্প- -চেষ্টার কি ত্রুটি রেখেছি ভাবছেন? কিন্তু ওসব কবিতা-ফবিতা আসছে না কলমে। (দীর্ঘশ্বাস) -ফবিতা কী মাল জানিনে, ও আমার দ্বারাও হবে না। তবে, কবিতা.....তোর ওদিকে মাথা খেলে না বলছিস? -আজ্ঞে না (দীর্ঘতর শ্বাস) -তা ভালো! ভেবে দেখ, নেই তাই খাচ্ছিস, থাকলে কোথায় পেতি'? -হেঁয়ালি করছেন? তবে আর পোড়া প্রাণ রেখে কী হবে! ধরনী, দ্বিধা হও! (দীর্ঘতম শ্বাস) -আ মলো যা! ফ্যাঁচফ্যাঁচ করিসনি তো! শোন, তোরও কোবতে হবে! আগে একটু ব্রাহ্মণের সেবা কর দিকিন! যা, সোডা আর বরফ দিয়ে চট করে একটা..... কী বলছিস? খাসনা? সেকি রে! তুই তো ফুল কেএলপিডি! মদ-মাতালি করিস না..... তা হ্যাঁ রে, কিছুই কি নেই, সোমরস? আদিরস? নেই? আখের সরবত, তাও না? ধুস্সালা! তা বাপ, সাধু-সন্ন্যিসি করিস বুঝি? হ্যাঁ বললি? অ, তা ভালো! আচ্ছা, একটা গোল্ড ফ্লেকই দে..... হ্যাঁ, এইবার বল, কবিতা! আলবাত হবে..... যা, চট করে একটা খাতা নিয়ে আয়। -খাতা? -তুই কি আতা? খাতা বুঝিস না? দৌড়ে গিয়ে একটা খাতা নিয়ে এসে বললাম, "হ্যাঁ, এইবার বলুন।" -"বোলুউউনন!" কবি বিচ্ছিরি ভাবে ভ্যাঙালেন, "আবে শ্লা, এ কি কলেজের নোট পেয়েছিস? তুই খাতা নিয়ে থেবড়ি খেয়ে বসবি আর আমি ডিক্টেট করব! ওভাবে হবে না, আগে একটু কাব্যদেবীর আরাধনা করে নিতে হবে।" -অ! সেই যেমন আপনি করেছিলেন, "শুনিয়াছি লোকমুখে আপনি, ভারতী....."তারপর কী যেন হল? -সে খপরে তোর কী বে! চট করে কটা ফুল আন দিকি..... ওটা কী আনলি? পেলাস্টিকের ফুল? উহ্! শ্লা আচ্ছা গাড়লের পাল্লায় পড়া গেল তো! যাকগে, মাথাটা আন.... জয় জয় দেবী চরাচর সারে..... হুঁহু..... ধরেনা বীণা শ্রীকরে, ইত্যাদি..... ওম নিবাস, ওম নিভোরাস, ওম ব্রোমিটার..... যা, তোকে কাব্যশক্তি দান কল্লাম। এইবার লেখ, যা! আর হ্যাঁ, আমি কী বসে বসে মশা মারব নাকি? একখান দেবের বই লাগিয়ে দিয়ে যা..... -বলি? -বল। -ইয়ে, মানে বলছি তাহলে- -নেকুপুষু! বল বলচি! -হ্যাঁ,হ্যাঁ, এই তো (গলা খাঁকরে) "ওগো প্রিয়ে, এমন চাঁদনী রাতে কেন তুমি বদনা হাতে....." -থাম, থাম! থাম বলছি, মাকড়া! থামলি! এটা কবিতা হয়েছে? -হয়নি? -ন্যা! এমন কবিতা লিখলে কী হবে জানিস? সুরঞ্জনা ওই বাঁদরটার গলায় মুক্তোর মালা হয়ে দুলবে, আর তোকে ডাকবে বিয়েতে পরিবেশন করতে। "দাদা, আর দুটো লুচি দেব?" গোঁজ হয়ে বসে রইলাম, বোধহয় চোখে দুএক ফোঁটা জলও এসে গিয়েছিল। কবির মায়া হল, "থাক, আর ন্যাকামো করতে হবে নে! শোন, তোর দ্বারা অরজিনাল কিস্সু হবে না। তুই ককটেল ঢাল।" -আজ্ঞে? -ল্যাবা! ককটেল বুঝিসনা? মনে কর, পাঁচজন নামজাদা কবি, যাদের তুই অল্পস্বল্প পড়েছিস আর কি, তাদের এর থেকে এক আঁজলা, ওর থেকে দু'মুঠো- বুঝেছিস? -ইয়ে, একটু যদি- -এক্জাম্পল? -আজ্ঞে। -হুঁ! ধর, আমাদের সুনীল। সুনীলের একচিমটে নিয়ে তা'তে- -শক্তির এক ড্রপ মেশাবো? -অ্যায় তো! পাঁঠারও তা'লে আইকিউ হয়! এবার তার মধ্যে দুচামচ জয় ছেড়ে দে। -দেব না গোঁসাই? -দুটোই। আর শেষে ফোড়ন দেবার মত রোব্বাবু, এবার বুঝলি? -জলের মত। -তাহলে হাঁদার মত দাঁড়িয়ে আছিস যে! লেগে পড়, লেগে পড়! কবীন্দ্র কালিদাস বোম ভোলা হয়ে, চোখদুটো রসগোল্লার মত গোল করে, চিৎপটাং হয়ে মেঝেয় শুয়েছিলেন। চিঁচিঁ করে বললেন, "মাথা ভোঁ ভোঁ করছে রে! জল দে এট্টু..... উঁহু! মুখে না, মাথায়, মাথায়..... হ্যাঁ, এইবার ঠিক হ্যায়! আরেকটিবার শোনা তো, কী লিখলি।" - "কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি তাই ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো। তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব’লে যে-প্রেমিক ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে। যেতে পারি যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি কিন্তু, কেন যাবো? দেখলাম মেঘোদয় ধূমল গিরিতটে একদা আষাঢ়ের প্রথম দিনে, ভাবলাম- প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস- তোমার দন্তরুচি কৌমুদী, আমার সর্বনাশ।" -উরে শ্লা! তুই তো বোম্ব বার্স্টিং মাল রে! প্লেজিয়ারিজমের প্লেবয় পুরো! তা, সবই ঠিক আছে, সবই চিনলাম, মাঝের ওই দু'লাইন..... -দেখলাম মেঘোদয়, ওইটে? -ইয়েস! ওটা কেমন যেন, ইয়ে ইয়ে লাগছে..... -চিনতে পারবেন। এট্টু হিন্ট দিচ্ছি, "আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং-" কবি কালিদাস, খানিক দাঁত কিড়মিড় করে, শ-কার, ব-কারে কিছু মন্ত্রোচ্চারণ করে, রাগে তোতলাতে তোতলাতে বললেন, "হারামজাদা! তততুই শেষে..... শেষে কিনা, আমার লেখাও..... শালা উনুনমুখো....." কবির মসৃণ করে কামানো গালে চকাস করে একটা হামি খেয়ে বললাম, "এই তো জীবন, কালীদা!"

114

8

আড্ডা অ্যাডমিন

Remembering Debashis Payin (পানু বাবু)

বালা র মজলিশ থেকে কিছু টুক টাক কথোপকথন| Courtesy: সমীর| ওর লেখা কোনো গল্প‚ কবিতা‚ প্রবন্ধ খুঁজে পেলাম না| সব মনে হয় কালের স্রোতে ভেসে গেছে|

117

0

Samya Dutta

পাঁচ এক্কে এক (শেষ পর্ব)

চা এল। দুধ-চিনি ছাড়া চা। খুড়ো তা'তে একটা তৃপ্তির চুমুক দিয়ে তাঁর এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বিড়ির একটা ধরালেন। কিন্তু গপ্প মাঝপথে থেমে গেলে কী আর শ্রোতাদের ভালো লাগে! তাই ভুলু একটু তাড়া দিল, "কী হল খুড়ো! শুরু করুন আবার!" "দাঁড়া, দাঁড়া!" খুড়ো বললেন, "সেই বেনেটোলা টু বালিগঞ্জ হেঁটে এইচি। একটু রেলিশ করে চা খেতে না পারলে কি আর গপ্প বলার মুড থাকে!" "আচ্ছা, ফেলু মিত্তির তো নামকরা ডিটেক্টিভ।" মাঝখান থেকে ন্যাপলা হঠাৎ ফোড়ন কাটল, "তাঁর সঙ্গে আপনার সত্যিই পরিচয় আছে, নাকি এটাও ওই আর্টের খাতিরে রঙ চড়াচ্ছেন?" সত্যি! খুড়োকে এরকম কথা বলার সাহস এক ন্যাপলারই আছে! খুড়ো কিন্তু ভুরুটা ওপরে তুলে বললেন, "বলিস কি! আমার ইস্কুল লাইফের বন্ধু ছিল সিদ্ধেশ্বর বোস। আমরা দুজনে ছিলাম, যাকে বলে হরিহর আত্মা! সেই সিধুকে তোদের ওই টিকটিকি জ্যাঠা বলে ডাকে, সেই সুবাদেই পরিচয়। কম করে বিশ বচ্ছর তো হবেই.... তা সে যাকগে....আমরা গিরিডি পৌঁছলাম পয়লা মে বিকেলের দিকে। ঠিক হল, রাত গভীর হলে শঙ্কুর ল্যাবরেটরিতেই বসা হবে। প্ল্যানচেটের অভিজ্ঞতা যে আমার আছে, সে কথা তোদের আগেও বলেছি। তবে শঙ্কুর এই যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তাই তাকে বলেছিলাম আগেভাগে যেন আমাকে একটা ডিমনস্ট্রেশান দিয়ে দেয়। নিওস্পেক্ট্রোস্কোপ। অ্যাসিড ব্যাটারি তোরা দেখেছিস তো? অনেকটা সেইরকম দেখতে একটা যন্তরের সঙ্গে দুটো বৈদ্যুতিক তার দিয়ে জোড়া একটা ধাতব হেলমেট। মনে মনে তারিফ করলাম। এরকম যন্তর থাকলে মিডিয়ামের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। রাত দুটোর পর বসা হল। যন্তরটাকে রাখা হয়েছে একটা গোল টেবিলের ওপর আর তা'কে ঘিরে পাঁচটা চেয়ার সাজিয়ে বসেছি আমরা পাঁচজন। আমার ডান দিকে লালমোহন, তার পাশে তপেশ। বাঁদিকে ফেলুচাঁদ আর শঙ্কু। আমি প্রথমেই বলে নিলাম, "তোমরা সবাই জানো আজ আমরা কোন প্রেতাত্মাকে আহ্বান করতে চলেছি। ঘটনাচক্রে ইনি আমাদেরণ প্রত্যেকেরই বিশেষ পরিচিত। এখন আমাদের কর্তব্য হল, এক মনে তাঁর স্মরণ করা। শেষবার তাঁকে যেভাবে দেখেছ, সেটুকুই হুবহু মনে করার চেষ্টা কর।" মিডিয়াম যেহেতু আমি, হেলমেট আমাকেই পড়তে হল।প্রথম আধঘন্টা চুপচাপ। তারপর হঠাৎ একটা তবলার বোলের মত শব্দ পেয়ে দেখি, লালমোহনের হাতদুটো কেঁপে উঠে টেবিলটাকে তবলার মত বাজিয়ে তুলেছে।ভাগ্যিস ছোকরা নিজেই ভুলটা টের পেয়েছিল, তাই জিভ কেটে "সরি!" বলে কোনমতে হাতদুটো স্টেডি করে নিলে। আরো আধঘন্টা কাটল। ভেতরে ভেতরে একটু অধৈর্য হয়ে উঠেছি, এমন সময়! এখনো স্পষ্ট মনে আছে, বুঝলি! ল্যাবরেটরির ঘড়িতে ঢং-ঢং করে তিনটে বাজছে, আর পাঁচজোড়া চোখের সামনে যন্ত্রের ঠিক সেন্টারে একটা নীলচে ধোঁয়া ধীরে ধীরে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। আর তার ভেতরে ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে একটা কঙ্কালের অবয়ব। প্রথমে দেখা গেল গলা থেকে ওপরের দিকটা, তারপর ক্রমে ক্রমে শরীরের নীচের অংশ। ধারালো মুখ, ক্ষুরধার দৃষ্টি, ঠিক যেমনটি চিনতাম। থুতনির খাঁজটা? হ্যাঁ! সেটাও দেখা যাচ্ছে! আরো পনেরো মিনিট পর পুরো শরীরটা স্পষ্ট হল। আর চিনতে ভুল হবার কোনো কারণ নেই! "হ্যাল্লো, মাই চিলড্রেন! অনেকদিন পর তোমাদের একসাথে দেখে বড় ভালো লাগছে।" সেই গমগমে গলা, সেই নিখুঁত সাহেবি উচ্চারণ! কি বলবো তোদের, লাস্ট শুনেচি নাইন্টি টুতে। অ্যাদ্দিন পরও গায়ে কাঁটা দিল! আমাদের মধ্যে ফেলুই প্রথম কথা বলল,"আমরা খুব বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।" -হ্যাঁ, জানি।খোদ নিশ্চিহ্নাস্ত্রই নিশ্চিহ্ন।কি, তাই তো, মাই ডিয়ার প্রোফেসর? -"আজ্ঞে হ্যাঁ। আমরা অবিশ্যি প্রথমে মগনলালকে সন্দেহ করেছিলাম।" শঙ্কুর জবাব। -হা হা হা। মগনলাল! সেই যার একটি ভেঙে পাঁচটি হয়, সেই ভিলেন! না হে, এটা তার কীর্তি নয়। -তবে কে? -আই টুক ইট। -"আপনি!" এবার আমাদের হাঁ হবার পালা। -ওহ্ ইয়েস! আই হ্যাড টু পারফর্ম মাই লাস্ট ভ্যানিশিং অ্যাক্ট। আড়চোখে একবার ঘরের বাকি মুখগুলো দেখে নিলাম। অন্ধকারেও দিব্যি বুঝতে পারছি, আমি যে তিমিরে, অন্যরাও সেই তিমিরেই। তবুও সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, "কিন্তু কি ভ্যানিশ করলেন স্যার? একটু বুঝিয়ে বলবেন কি!" -"ডেথ।" ঘর কাঁপিয়ে উত্তর এল। "মৃত্যু। অ্যানাইহিলিনের ট্রিগার টিপে মৃত্যুকেই নিশ্চিহ্ন করে দিলাম। সো দ্যাট আই কুড স্টে অ্যালাইভ, ফরেভার।" -"হ্যা....হ্যা....হ্যালাইভ!" জটায়ুর গলাটা বোধহয় ভয় আর বিস্ময়ের কম্বিনেশনেই একটু কেঁপে গেল। -ইয়েস লালমোহন, আয়্যাম অ্যালাইভ। তোমাদের মধ্যে দিয়েই তো আমি বেঁচে আছি। তুমি, তপেশ, ফেলু, তারিণী আর শঙ্কু। অনেকটা পাজলের পাঁচটা টুকরোর মত। এবার বুঝেছ? -"বুঝেছি।" শঙ্কুর উত্তর। -এবার টুকরো গুলো জুড়ে দাও। কি পাচ্ছ বল দেখি? মনে হল ধাঁধাটা ধরতে পেরেছি। মনে জোর এনে বললাম, "আমরা যাঁর বহুমুখী প্রতিভার পাঁচটি প্রজেকশন, সেই আপনাকে।" -রাইট এগেইন! সৃষ্টি আর স্রষ্টার মাঝে মৃত্যু বড় অস্বস্তিকর একটা পরদার মত, বুঝলে! তোমাদের রেখে গেলাম; যা'তে বড়, আরো বড় হবার নেশায় পেয়ে সবাইকে বেজায় বুড়ো হয়ে যেতে না হয়। অথচ যখন দেখি চারপাশে ঠিক সেইটাই হচ্ছে, তখন বুঝতে পারলাম, আমার কাজ এখনো ফুরোয়নি! তাই.... আচ্ছা, রহস্যের সমাধান তো হল, এবার বিদায়! জিতে রহো বচ্চো! ভালো থেকো, আর যারা আগামী কয়েকশো বছর তোমাদের মধ্যে দিয়ে আমায় খুঁজবে, তাদের খুব ভালো রেখো। টেক কেয়ার! নীল ধোঁয়ার কুণ্ডলী সমেত আত্মা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক মিনিট সব চুপ। তারপর ফেলু উঠে বাইরে গেল, বুঝলাম চারমিনার ধরাবে। শঙ্কুর দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখ বোজা, যেন ধ্যানস্থ। জানলা দিয়ে সকালের প্রথম আলো এসে পড়ছে। সূর্য উঠছে, দোসরা মে'র সূর্য। মনে মনে বললাম, "হ্যাপি বার্থডে, মানিকবাবু।"

103

5

Samya Dutta

পাঁচ এক্কে এক

29শে এপ্রিল -না, কাল আপনাকে দেখলাম উশ্রীর ধারে, মর্নিং ওয়াক কারছিলেন।তাই ভাবলাম একবার দেখা কোরে যাই, হে হে হে। -ওটা আমার নিত্যদিনের অভ্যাস, আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে করছি। -ভেরি গুড, ভেরি গুড! তা, গিরিডিতে আপনার কেতো দিন হল? -আমাদের কয়েকপুরুষের বাস এখানে। বাবা এখানকার নামী চিকিৎসক ছিলেন, দাদু... -অউর, আপকা হাতিয়ার? -হাতিয়ার? -দ্যা ভেনিশিং গান। হেসে বললাম, "আপনি বিজ্ঞানের জগতের খবরও রাখেন রাখেন তাহলে?" -উপায় আছে প্রোফেসর, খবর দিবার লোক আছে। -সে তো বুঝতেই পারছি। লোকটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ। বসার ঘরে আজ আমার ল্যুমিনিম্যাক্সটা জ্বালানো হয়নি, কিন্তু আবছা অন্ধকারেও স্পষ্ট বুঝতে পারছি লোকটার জ্বলজ্বলে, ধূর্ত দুটো চোখ একদৃষ্টে আমারই দিকে চেয়ে আছে। -একবার দিখাবেন? -ও জিনিস তো হাতের কাছে রাখিনা সবসময়। ওটা থাকে আমার ল্যাবরেটরিতে। আবার বিরতি, এবার আরো দীর্ঘ। তারপর আবার সেই বরফের মত ঠান্ডা, হিসহিসে কন্ঠস্বর, "আমি ফিফটি ল্যাকস অফার করছি প্রোফেসর। আপনি ইচ্ছা কোরেন তো আজহি দিতে পারি, কেশ।" মাথা নেড়ে বললাম, " টাকার আমার অভাব নেই। তাছাড়া, হঠাৎ করে বড়লোক হবার বাসনাও নেই। একা মানুষ, দিব্যি চলে যায়।সুতরাং...." -সেভেন্টি ফাইভ ল্যাকস, সোচিয়ে প্রোফেসর। লোকটার ধৃষ্টতা এবার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে একটু কড়া করেই বলতে হল, "আমার প্রতিটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আমার দীর্ঘদিনের সাধনার ফল। তাদের একটিকেও বেচে মুনাফা করার মানসিকতা আমার নেই।বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না।" -ওয়ান করোর প্রোফেসর, ফাইনাল অফার। সোবার কাছে আমি জিনিস চেয়ে নিই না, দরকার হোলে... -জানি। আমার আর কিছু বলার নেই। আপনি আসুন। -এটা আপনার শেস কোথা? -শেষ কথা। রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু বললেন, "আচ্ছা, এই অ্যানাইহিলিন যন্তরটা কি মশাই?" -"নিশ্চিহ্নাস্ত্র।" ফেলুদা বলল, "শত্রুকে জখম না করে, বিনা রক্তপাতে তাকে একেবারে গায়েব করে দেবার মোক্ষম হাতিয়ার। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে দুশমনের দিকে তাক করে ঘোড়া টিপে দিলেই কেল্লাফতে।" - আরেব্বাস! এর কাছে আপনার কোল্ট পয়েন্ট থ্রি টুও তো নস্যি মশাই! -সে তো বটেই! তবে শুধু অ্যানাইহিলিনই নয়, প্রোফেসর শঙ্কুর প্রত্যেকটি আবিষ্কারই এককথায় ইউনিক। আপনি মিরাকিউরল বড়ির নাম শুনেছেন? এর উত্তরে লালমোহনবাবু বললেন, তিনি প্রোফেসর শঙ্কুর নামই এই প্রথম শুনছেন। "কাগজে ছবি দেখলুম মশাই! বেঁটেখাটো, টাকমাথা, মুখে ছুঁচলো দাড়ি। এতবড় কনভেন্টর দেখে বোঝে কার সাধ্যি!" কনভেন্টর' অবিশ্যি 'ইনভেন্টর'-এর জটায়ু সংস্করণ।তবে ভদ্রলোক বললেন, গিরিডিতে তাঁর এক পরিচিত থাকেন। "অবিনাশ চাটুজ্জ্যে । এথিনিয়াম ইনস্টিটিউটে তিন ক্লাস ওপরে পড়ত। যদি যাবার মতলব করেন, তাহলে বলুন, এই বেলা লিখে দিই।" এখানে বলে রাখি, বিখ্যাত আবিষ্কারক প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর আবিষ্কার অ্যানাইহিলিন পিস্তল বা নিশ্চিহ্নাস্ত্র যে তাঁরই ল্যাবরেটরি থেকে থেকে চুরি গেছে, একথা কাগজে পড়েছিলাম। কিন্তু চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই যে ভদ্রলোক ফেলুদাকে ফোন করে তার সাহায্য চাইবেন এই চুরির তদন্তে, সেটা আন্দাজ করতে পারিনি। শঙ্কু অবশ্য বলেছিলেন, তিনি ফেলুদার সুনামের সঙ্গে পরিচিত। "তোমার বাবা জয়কৃষ্ণ ছিলেন আমার সহপাঠী। তোমাদের বাড়ি গিয়েছি তাঁর সঙ্গে, তখন অবিশ্যি তুমি খুবই ছোট।" উত্তরে ফেলুদা জানিয়েছিল সেও প্রোফেসর শঙ্কুর গুণমুগ্ধ, এই বিপদে তাঁকে সাহায্য করতে পারলে তার ভালোই লাগবে। -তাহলে তোমাকে বলে রাখি, দু'দিন আগে বেনারসের এক ভদ্রলোক হঠাৎ বেয়াড়া এক আব্দার নিয়ে হাজির হন।তিনি অ্যানাইহিলিন কিনতে চান, এক কোটি পর্যন্ত অফার করেন। -এবং আপনি রাজি হননি, তাই তো? -সে আর বলতে! কি জানো ফেলুবাবু, বিজ্ঞানকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য কাজে লাগাব, তেমন ইচ্ছে তো হয়নি কখনো! -ভদ্রলোকের নাম? -তোমার পুরনো আলাপী।মগনলাল, মগনলাল মেঘরাজ। ফোনটা এসেছিল আধঘন্টা আগে।ইদানীং ফোন এলে ফেলুদা স্পিকারে দিয়েই কথা বলে। প্রোফেসরের কথা শেষ হওয়ামাত্র শুনতে পেলাম, আমার ঠিক পাশেই লালমোহনবাবুর হাঁটুদুটো পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি খেয়ে বিশ্রী ঠকঠক আওয়াজ তুলেছে। ভদ্রলোকের মাথাটাও ক্রমশ যেন নীচের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে, ধরে না ফেললে হয়ত পড়েই যাবেন।ওঁকে দোষ দেওয়া যায় না। অতীতে যতবার এই দুর্ধর্ষ দুশমনের সঙ্গে ফেলুদার সংঘর্ষ হয়েছে, প্রত্যেকবার একটা বড় ঝড় বয়ে গেছে ওঁর ওপর দিয়ে। আমিও যেন বুকের ভেতরের ধুকপুকুনিটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আর কতবার? কতবার এই ভয়ানক শয়তানের মুখোমুখি হতে হবে? ফেলুদা কিন্তু দেখলাম বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলল, "ঠিকই বলেছেন, এঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার আমার মোলাকাত হয়েছে। নিঃসন্দেহে একটি অসামান্য বিচ্ছু। তবে ভাববেন না, এই বুনো ওলের জন্য বাঘা তেঁতুলের ব্যবস্থা আমিই করব।" ফেলুদাকে এত অস্বাভাবিকরকম গুম মেরে যেতে অনেকদিন দেখিনি। শঙ্কুর ফোনটা এসেছিল সকালে। বিকেল পাঁচটা নাগাদ প্রথমে বেনারসের ইনস্পেক্টর তেওয়ারি আর তারপর লালবাজারের ইনস্পেক্টর গড়গড়ি ফোন করে জানালেন, ফেলুদার কথামত কাশী এবং কলকাতায় মগনলালের দুই বাড়ি আর গদিতে একসাথে রেইড হয়েছে। কিছুই পাওয়া যায় নি, তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাশীতেই মগনলালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন বাজে ন'টা। এই চার ঘন্টা ফেলুদা একনাগাড়ে আমাদের বসার ঘরটাতে পায়চারি করেছে, তার ভুরুদুটো অসম্ভব কোঁচকানো, যদিও এখন ঠোঁটের কোণে একটা হাসির আভাস দেখে বুঝতে পারছি ও হয়ত একেবারে অন্ধকারে নেই। মাঝেমধ্যে থেমে ওর নীল ডায়রিতে হিজিবিজি কিসব লিখেছে আর একটার পর একটা চারমিনার ধ্বংস করেছে। জানি এইসময় ও কথা বলা পছন্দ করে না, তবু খেতে বসে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, "পিস্তলটা তো মগনলাল পায়নি, তাই না ফেলুদা!" উত্তরে গম্ভীর ভাবে মাথা নেড়ে বলল, "পেলে সে আর এ তল্লাটে থাকত না। দুনিয়াময় ও জিনিসের খদ্দেরের তো আর অভাব নেই।" -তাহলে এবার? -"এবার মাছ। তারপর দই, তারপর চাটনি। তারপর একটা পান খেয়ে গিরিডিতে একটা ফোন করব। তারপর ঘুম।"একটু থেমে বলল, "তবে, আমার মন কি বলছে জানিস, তোপসে! চেনা পথে এই রহস্যের সমাধান হবে না।দেখি, প্রোফেসর কি বলেন...." 30শে এপ্রিল আজ রাত দশটা নাগাদ ফেলুর ফোন পেলাম। মগনলালের বাড়িতে খানাতল্লাসি যে নিষ্ফল হয়েছে, সেটা জানিয়ে ও বলল, "প্রোফেসর,আমার ধারনা মগনলাল এই চুরির সঙ্গে জড়িত নয়। আপনার অস্ত্রের ওপর তার লোভ ষোলআনা, কিন্তু সেটা তার হাতে পৌঁছয়নি।" মনের মধ্যে একটা সন্দেহ ক্রমেই দানা বাঁধছিল। বললাম, "ফেলু, আমি যা ভাবছি, তুমিও কি ঠিক তাই ভাবছ?" ফেলু একমুহুর্ত চুপ। তারপর বলল, "এছাড়া আর উপায় নেই প্রোফেসর। যিনি এসব কিছুর মূলে থেকেও এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তাঁর সাহায্য নেওয়া ছাড়া আর উপায় দেখছি না।" -তোমার ইঙ্গিত বুঝেছি ফেলুবাবু। বেশ, আমি আমার নিওস্পেক্ট্রোস্কোপ বের করে রাখব। তোমরা তিনজন বরং কালই এখানে চলে এস। তবে একটা কথা- -কি? -অ্যানাইহিলিন চুরি যাবার পর থেকে মানসিক চাপটা বেশ টের পাচ্ছি। এ অবস্থায় হয়ত আমার পক্ষে কনসেনট্রেট করার অসুবিধা হবে। সুতরাং, একজন ভালো মিডিয়ামের খোঁজ করতেই হচ্ছে! -সে আর ভাবনা কি? একজন তো হাতের কা ছেই আছেন। -কে? কার কথা বলছ? -নাম বললেই চিনবেন,তারিণীচরণ বাঁড়ুজ্যে। (ক্রমশ)

113

6

Samya Dutta

মণি

".....ঠিক এমনই এক বাদলার দিনে ফটকের পাশের আমগাছটা থেকে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে বেজায় চোট পেলেন গোপাল ভটচাজ। বাড়িতে তখন আর কেউ নেই। মা গেছেন হালদার পুকুরে নাইতে, আমি চিলেকোঠার ঘরে বসে কেশব নাগে হাবুডুবু খাচ্ছি। একটা হুড়মুড়-দুমদাম শব্দ পেয়ে জানলা দিয়ে দেখি দা'মশাই, দাদুকে ওই নামেই ডাকতাম, ফটকের পাশটায় পড়ে কাতরাচ্ছেন। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে আরেকবার উঠতে গেলেন..... বৃষ্টিতে বোধহয় জায়গাটা পিছল হয়ে গিছিল, পা হড়কে আবার পড়ে গেলেন। দু'বার আছাড় খেয়েছেন, কিন্তু আমকটা হাতছাড়া করেননি। মাথায় রইল ত্রৈরাশিক, আমি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখি, দা'মশাই ততক্ষণে দাওয়ার ওপরটায় উঠে এসেছেন। আমাকে দেখে বললেন, "দাদুর হেঁটো দুটো বোধহয় গেল রে! লক্ষী ভাই আমার..... ও ঘরে তাকের ওপর মালিশের তেলটা আছে, দিবি এট্টু? তোকে ঘুড়ি কিনতে পয়সা দেব।" ছুটির দিনে ভটচাজ কাকার বাড়িতে আড্ডা জমানোটা এখন একরকম রুটিন। বয়সটা ওই 'কাকা' সম্বোধনের মানানসই হলে কী হবে, মনে পাক ধরেনি! মানুষটা গপ্পের খনি, এককালে চাকরির দৌলতে সারা দেশ চষে বেরিয়েছেন, রসিয়ে রসিয়ে সেসব গল্প বলতেও এঁর জুড়ি মেলা ভার। লম্বা বারান্দার একটা দিকে আমরা আসর জমিয়েছি, ভেতর থেকে সবে তৃতীয় রাউন্ড চা এসে হাজির হয়েছে, এমন সময় একটা শব্দ পেয়ে মনযোগটা সেই দিকে চলে গেল। কাকার বছর চারেকের নাতনিটা এতক্ষণ পাশেই একটা বেতের চেয়ারে বসে তার কোলের পুতুলটাকে বকাঝকা করছিল। গল্পে মশগুল ছিলাম, তবুও থেকেথেকেই সেদিকে চোখ পড়ছিল। দিব্য টের পাচ্ছিলাম, মৌখিক শাসনে পুতুলের চিত্তশুদ্ধি না হলে, মাঝেমধ্যেই তার কপালে চড়টা-চাপড়টা জুটছে। এখন বুঝলাম, শাসনের মাত্রা কিঞ্চিৎ বেশি হয়ে যাওয়ায় পুতুলের দু'চোখে বান ডেকেছে, তাই ক্ষতে মলম লাগানোর পর্ব চলছে। "কেঁদোনা, কেঁদোনা মণি, কাঁদায়োনা আর....." বাচ্চাটা হঠাৎ সুর করে বলে উঠল। একবার, দু'বার, বারবার! ওই একটাই লাইন: "কেঁদোনা, কেঁদোনা মণি, কাঁদায়োনা আর....." বেশ মজা পেলাম ঠিকই, আবার অবাকও হলাম একটু। "ব্যাপার কী, কাকা? কী বলছে নাতনি?" কাকা যেন কী একটা বলতে গিয়েও আচমকাই থমকে গেলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে, একটু অন্যমনস্ক ভাবে একদৃষ্টে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইলেন জানলার দিকে। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, পিচ রাস্তার ধুলো মরে গিয়ে চারপাশে বেশ একটা নরম ভিজে ভিজে ভাব। রাস্তা শুনশান, কেবল দূরে বাসস্ট্যান্ডের ছাউনির তলায় গুটিকয় লোক ভিড় করেছে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। কিন্তু কাকার দৃষ্টি ঠিক সেদিকে নয়, যেন সেসব ছাড়িয়েও আরো দূরের পথ ধরেছে। যেন একটু আনমনা, কিছু একটা বলি বলি করেও যেন বলছেন না, হয়তো ভাবছেন বলাটা উচিত হবে কিনা। আর যতক্ষণ না মনের ভেতর গুছিয়ে উঠতে পারছেন, যেন জোর করেই আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছেন। এদিকে চা জুড়িয়ে জল হয়ে এসেছে, বাচ্চাটাও কখন জানি উঠে গেছে। পুতুলটা এখন তেরচা হয়ে পড়ে আছে বেতের চেয়ারে। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। হালকা একটা গলা খাঁকারি দিতেই, কাকা যেন চটকা ভেঙে চাইলেন আমার দিকে। তারপর একটা অপ্রস্তুত হাসি হেসে বললেন, "কী বলছে, জানতে চাও, কেমন? আচ্ছা! তাহলে বলি শোনো..... পলাশডাঙায় এখন যেখানে এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট হয়েছে, সেখান থেকে হুগলির দিকে বিশ কিলোমিটার গেলে পড়বে হিজল, আমাদের দেশগাঁ। বছর পঞ্চাশ আগে, আমার ঠাকুর্দা গোপাল ভটচাজই ছিলেন সেই গ্রামের একমাত্র ব্রাহ্মণ। আর শুধু হিজল নয়, এপাশে পলাশডাঙা থেকে ওদিকে নবীচর অবধি সেকালে দ্বিতীয় কোনো ব্রাহ্মণের বাস ছিল না। সুতরাং গোপাল ভটচাজের যজমান ছিল বিস্তর। পাকা বাড়ি ছিল, দুচার বিঘে খেতি, গোয়ালে দুধেল গাই.....রোজ নাহক দশ লিটার দুধ পেতাম..... আর ছিলেন আমার ঠাকুমা। মণিমালার বরাবরই একটু মাথার দোষ ছিল, শোনা যায় বাপের বাড়ি থেকে নাকি বিয়ের আগে সেকথা চেপে গিছিল। তার ওপর বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে পরপর তিনটি সন্তান নষ্ট হওয়ায় মানসিক ধাক্কাটাও পেয়েছিলেন তেমনি। আমার বাবা যখন বছর দুয়েকের, ঠাকুমা তখনই ঘোর উন্মাদ। হঠাৎ হঠাৎ মাথাটা বেড়ে গেলে খুব ভায়োলেন্ট হয়ে উঠতেন। মাকে কতবার উনুনের কাঠকয়লা ছুঁড়ে মারতে দেকিচি! আমার অবিশ্যি ঠাকুমার ধারেকাছে ঘেঁষা বারণ ছিল, ভয়ও পেতাম খুব। এমনকি বাবা-মাও একটু তফাতেই থাকতেন। ঠাকুমার ঘরে ঢোকার সাহস ছিল কেবল দা'মশায়ের। সাহস, আবার তাগিদও। ওই পাগল বউয়ের প্রতি বামুনের ভালোবাসা ছিল দেখবার মত। ভালোবাসাও বলতে পারো, আবার..... ঠিক কী যে ছিল বলা কঠিন! বাৎসল্য, সখ্য, প্রেম আর তার সঙ্গে কর্তব্যবোধ..... সব মিলিয়ে মিশিয়ে সে এক বিচিত্র অনুভূতি আমার দা'মশাইকে সর্বক্ষণ চালনা করত। নইলে ভাবো, ঠাকুমার খুব খারাপ অবস্থায়..... রাতের পর রাত জেগে ওই পাগল বউয়ের সেবা করতে দেকিচি মানুষটাকে! এমনকি বাড়াবাড়ির সময় দু'বেলা নাইয়ে-খাইয়ে দেওয়া, মায় গু-মুত পরিষ্কার করা অবধি! যেদিনের কথা বলছি, তার দিনকতক আগে সকাল থেকে ঠাকুমা বেপাত্তা। উনুন ধরিয়ে রেখে কোথায় গেছে কেউ জানেনা। খোঁজ, খোঁজ..... দা'মশাই মাথায় হাত দিয়ে দাওয়ায় বসে আছেন, বেলার দিকে মিত্তিরদের ছোট ছেলে এসে খবর দিলে ন'পাড়ার মাঠে যে যাত্রাপার্টি এসেছে, ঠাকুমা তাদের আস্তানায় ঢুকে তুমুল হল্লা করছে। দলের গায়েন গান ধরেছে, বাজনা বাজছে জোর, আর পাগলি দুলে দুলে নাচছে সবার সামনে। কোনমতে ধরেবেঁধে তো তাকে আনা হল। এদিকে ফিরে এসে পাগলের সে কী তম্বি! উনুন ধরানো দেখে মা রান্নাটা এগিয়ে রেখেছেন, বেলা গড়িয়ে দুপুর..... সবার খাওয়াদাওয়ার তো একটা ব্যাপার আছে, বিশেষ করে বাড়িতে বাচ্চা ছেলে রয়েছে যেখানে..... কিন্তু সেকথা ঠাকুমাকে বোঝায় কার সাধ্যি। 'উনুন যখন আমি ধরিয়ে গেছি, আমিই রাঁধব।' বোঝো ঠ্যালা ! এক লাথিতে ভাতের হাঁড়ি তো উল্টে দিলেই, মাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করলে! বৌমার লাঞ্ছনা দেখে দা'মশাই বোধহয় কিছু বলতে গেছিলেন, পাগলি একটা চ্যালাকাঠ কুড়িয়ে এনে তাঁকে লাগালে ঘা কতক। সেদিন বাড়িশুদ্ধু সবাই উপোস দিলে। গভীর রাতে, বোধহয় খিদের চোটেই আমার ঘুম ভেঙে গিছিল..... গুটিগুটি ভাঁড়ারঘরের দিকে যাচ্ছি, দেখি ঠাকুমার ঘরের দরজা আধখোলা, ভেতর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ আসছে। কী ব্যাপার! উঁকি দিয়ে দেখি, খাটের ওপর বসে ঠাকুমা হাপুস নয়নে কাঁদছে। দা'মশাই নিজে হাতে একবাটি দুধ নিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন বউকে আর থেকে থেকে সুর করে কিছু একটা বলছেন, অনেকটা বাচ্চাদের কান্না থামাতে যেমন ভোলায়! ভালো করে কান পাততে শুনি, কেঁদোনা, কেঁদোনা মণি, কাঁদায়োনা আর হাসিমুখে দেহ চুমো, কাঁদাবোনা আর..... বাবা, তোমরা তো প্রেমের কথা বড়াই করে বল। এক অশিক্ষিত, গেঁয়ো বামুন আর তার বদ্ধ উন্মাদ বৌয়ের যে দৃশ্য আমি সে রাতে দেখেছিলাম, তাকে কী বলব বলতে পারো? প্রেম নয়?" কাকা থামলেন একটুক্ষণ। হয়তো পুরনো স্মৃতি ঝালিয়ে নিলেন চোখ বুজে। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, "দা'মশায়ের পড়ে যাবার দিনও ঠাকুমা তেমনি সকালে উধাও হয়েছেন। কোথায়, কেউ জানেনা! মা স্নান সেরে ফিরতে কিন্তু দা'মশাই চোটের কথাটা বেমালুম চেপে গেলেন। "বৌমা, আজ আর ভাত চড়িয়ে কাজ নেই, তোমার শাউড়িকে তো জানোই..... আম পেড়ে রেখিচি, দই-চিঁড়ে দিয়ে মেখে খেয়ে নাও দিকিন! আর নাতরাটাকেও খাইয়ে দিও....." এভাবেই দিন কাটছিল। তাল কাটল বছর দুই বাদে, পুজোর সময়। বাবা বাড়ি ফিরেছেন, অন্যবার কত হাসি, কত গল্প..... এবার কিন্তু দেখলাম, বাবার মুখটা ভয়ঙ্কর গম্ভীর। দা'মশায়ের ঘরে বাবা খুব চাপা গলায় বাপকে ধমক দিচ্ছেন, আর আমি দরজার ফোঁকর দিয়ে চোখ রেখিচি, স্পষ্ট মনে আছে। প্রায় ছ'ফুট লম্বা আমার দা'মশাই, ঠাকুমার কথায় 'বেউড় বাঁশের মত চেহারা'টা যেন অপমানে, গ্লানিতে অ্যাত্তটুকু হয়ে গেছে! কী ব্যাপার, সে আমি আরো বড় হয়ে জেনেছি। গাঁয়ের ঘোষেদের অনেক বিষয়-সম্পত্তি ছিল। বড় তরফের ছেলেপুলে নেই, বৌটি বিধবা হলে, উত্তরাধিকার রইল না। শেয়াল-কুকুরেরা গন্ধ পেয়ে তলেতলে নড়েচড়ে বসল। ঘোষেদের বাড়ির পেছনে কয়েকঘর মুসলমানের বাস। একদিন তাদেরই একজন, বোধহয় ভোরবেলা বাহ্যে যাবে বলে বেরিয়েছিল, দেখে ঘোষবাড়ির খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে একটা খুব ঢ্যাঙা লোক আবছা অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রথমটা জিন-পিরেত ভেবে ভয় পেলেও, পরে ঠাহর হয়, এ তো দা'ঠাকুর! গাঁয়ের একমাত্র বাউনঠাকুর, সবাই তাঁকে চেনে, অন্ধকারেও ভুল হবার কথা নয়। গাঁময় ঢিঢি পড়ে গেল। খবরটা সদরে বাবার কান অবধি কে পৌঁছলো জানিনা, তবে দা'মশাইকে মুখের ওপর কেউ কিছু বলতে সাহস করেনি। কিন্তু গাঁদেশে এমন মুখরোচক কেচ্ছা চাপা থাকে না, মাকে ঠারেঠোরে অন্য বাড়ির মেয়ে-বউরা যে অনেক কথা শুনিয়েছিল, তা এখন বুঝতে পারি! অনেকদিন রান্নাঘরে চুপিচুপি বসে মাকে কাঁদতে দেখেছি। গাঁয়ের মাতব্বরদের সব আস্ফালন গিয়ে পড়ল ঘোষেদের বিধবাটির ওপর। সিদ্ধান্ত হল, তাঁকে বাপের বাড়ি ফেরত পাঠানো হবে, জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গে আর ঘোষবাড়ির কোনো সম্পর্ক থাকবে না। সম্পত্তিতে তাঁর অংশ, মেজ আর ছোট তরফের মধ্যে ভাগ হবে।" -তারপর? -তারপর আর কী? দা'মশাই আর বেশিদিন বাঁচেননি। শেষের দিকটা নিজেকে ভীষণ গুটিয়ে নিয়েছিলেন, নিজের ঘর ছেড়ে পারতপক্ষে বেরোতেন না। ঘরের সামনে দিয়ে যাতায়াতের সময় লক্ষ্য করতাম, প্রায় সবসময়ই খাটের কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। হাতদুটো কোলের ওপর জড়ো করা, কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে, মুখটা নীচু হয়ে প্রায় ঠেকে গেছে বুকের সঙ্গে। ভালো লাগত না। কেবল একটা জিনিস দেখে অবাক হতাম। -কী? -মাথা ঠান্ডা থাকলে, দেখতাম ঠাকুমা এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে, কখনো বা খাটের পাশে। দুই বুড়োবুড়ি, কেউ কিছু বলছে না, নিস্তব্ধ ঘর। অথচ মনে হত, কী ভীষণ এক ভাবের আদানপ্রদান হচ্ছে দুটো মানুষের মধ্যে। তবে দা'মশায়ের চলে যাবার দিন যা দেখলাম, তা কখনো ভুলব না। মানুষটার লম্বা কাঠামোটা খাটিয়ায় শোয়ানো, শ্মশানবন্ধুরা এসে পড়েছে, সবাই তৈরি..... এমন সময়, ঠাকুমা কোথা থেকে জানি হাঁপাতে হাঁপাতে এল। হাতে একটা বালিশ! ওমা! বালিশ কী হবে! ঠাকুমা দেখি আলতো করে বালিশটা দা'মশায়ের মাথার তলায় গুঁজে দিচ্ছে! তারপর কোঁচড় থেকে খানিকটা মুড়ি বের করে পাশে রেখে দিলে। সবাইকে হতবাক করে পাগলি গুটিগুটি পায়ে ফিরে যেতে যেতে বলল, "অতটা পথ যাবে, খিদে পাবে তো..... এমনিতে তো বালিশ ছাড়া ঘুম হত না, এখন দেকো কেমন শুয়ে আচে মিনসে...." ওঠার সময় হয়েছে। তবুও একটা প্রশ্ন অনেকক্ষণ খোঁচা দিচ্ছিল, এবার করেই ফেললাম, "ঘোষেদের বিধবার ব্যাপারটা..... মানে....." কাকা কিছু না বলে উঠে গেলেন। যখন ফিরে এলেন, হাতে দুটো ছবি। আদ্যিকালের সাদাকালো ছবি, তবু মুখ চেনা যায়। একটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, "এটা আমার ঠাকুমার মৃত্যুর ক'দিন আগে তোলা। আর এইটে..... এটা আমি তুলেছিলাম, এককালে ওদিকে ন্যাক ছিল..... ঘোষজেঠাইমার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাতের দিন, ওঁরও তখন বেশ বয়স হয়েছে....." ছবি দুটো হাতে নিয়েই চমকে উঠতে হল। কাকা বলে না দিলে কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না দুটো ছবি দু'জন ভিন্ন মানুষের। রঙ চটে গেছে, পুরনো ছবি আজকের দিনের মত স্পষ্ট নয়, কিন্তু দুই মহিলার কী আশ্চর্য মিল! মুখের গড়নে, বসার ভঙ্গিতে, এমনকি ক্যামেরার দিকে তাকানোতেও অদ্ভূত মিল। আমি কী বলব বুঝতে না পেরে, ফ্যালফ্যাল করে কাকার দিকে চাইলাম। "ঘোষজেঠাইমা সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন....." কাকার গলা একটু ভারী শোনায়, "দা'মশাই তাঁকে ভীষণ স্নেহ করতেন বরাবরই। তাঁর স্বামী জীবিত থাকাকালীনও..... কিন্তু, মানে..... ওই অবধিই, খুব দিয়ে বলেছিলেন..... অবিশ্যি গাঁয়েগঞ্জে কলঙ্কিনীর কথা আর কে শোনে..... বিধবা হবার পরেও গাছের ফলটা, গরুর দুধটা নিয়মিত দিয়ে আসতেন দা'মশাই, তবে দিনমানেই..... সেই রাতে.....তাঁর তখন প্রবল জ্বর, ওদিকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, শুনে থাকবে..... দা'মশাই সারারাত রোগীর শিয়রে জেগে ছিলেন...... জেঠাইমার কেবল মনে ছিল কপালে জলপটির ঠান্ডা স্পর্শ, আর হুঁশ ফিরতে যতবারই চোখ মেলে চেয়েছেন..... একটা লম্বা দোহারা চেহারা....." -এঁকে পেলেন কোথায়? -ওঁর বাপের বাড়িতে। ভায়েরা ভীষণ অচ্ছেদ্যা করত..... তবে, আরেকটা কথা সেদিন বলেছিলেন জেঠাইমা..... -কী কথা? -ওঁর আসল নাম ছিল কমলা। কিন্তু দা'মশাই কখনও সেই নাম ব্যবহার করতেন না। উনি শেষদিন অবধি অন্য নামে ডেকেছেন। -কী নাম? -মণি।

114

8

Samya Dutta

বিশ্বাসঘাতক

"...পরমুহুর্তেই অম্বিকাবাবুর বিশাল তালতলার চটির একটা পাটি গিয়ে সজোরে আছাড় খেল বিকাশবাবুর গালে। সব শেষে শুনলাম রুকুর রিনরিনে গলার চিৎকার: 'বিশ্বাসঘাতক! বিশ্বাসঘাতক! বিশ্বাসঘাতক! ' " -খোসবাগ পৌঁছে গেছি গো! নেমে আসেন স্যার, নেমে আসেন। গাইডের ডাক শুনে হুঁশ ফিরল। হাতের বইটা বন্ধ করে নেমে এলাম গাড়ি থেকে। ব্রাহ্মণ নই, উপনয়নের প্রশ্নই ওঠে না, তবে দূরদৃষ্টির অভাবে বাড়তি দুটো চোখ পাওনা হয়েছে। কিন্তু সে চোখ বড়ই শৌখিন, গাড়ির ঠান্ডাই যন্ত্রের আওতা থেকে বেরোতেই ঝাপসা। জামার খুঁটে চশমাটা মুছে চোখে দিতেই, চোখ পড়ল একটা সাইনবোর্ডে: 'সাধারনের দর্শনার্থে কোনো পয়সা লাগে না। প্রযত্নে: ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ' হে মোর কঞ্জুষ হৃদয়, খোসবাগে এসে এরপরেও কি তুমি খুশ হবে না? লাব-ডুব ছন্দ ছেড়ে আনন্দের তুড়িলাফ দেবে না একটা? নাহ্! সার্থক নাম। খোসবাগ। আনন্দ বাগিচা। বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস নিতে গিয়ে টের পেলাম, একটা সিগারেটের জন্য শ্বাসযন্ত্র জুড়ে শীৎকার উঠেছে। অন্তরাত্মাকে কষ্ট দিতে নেই, অনতিদূরেই এক হিন্দুস্থানী দোকানদার নানারকম নিকোটিনের পসরা নিয়ে বসেছে, গুটিগুটি পায়ে সেদিকেই যাচ্ছি, এমন সময়... আমাকে পেরিয়ে যে ভদ্রলোক এইমাত্র দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁর উচ্চতা কিছু নাহোক ছ'ফুট। লম্বা, ঋজু শরীরটার ততোধিক লম্বা ছায়া যাবার সময় আমাকে ছুঁয়ে গেছে। চোখ না তুলেও দিব্যি বুঝতে পেরেছি, ভদ্রলোকের পরনের কালো প্যান্টের ওপর শার্টটার রঙ নীল আর তিনি সোজা এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের আরেকটা লোকের দিকে। এই দ্বিতীয় লোকটা এতক্ষণ দোকানদারের সঙ্গে কথা বলছিল, তার চশমার কাঁচে রোদ পড়ে চকচক করছে। এইবার সে ঘাড় ঘোরাতেই প্রথম ভদ্রলোকটিকে দেখতে পেল, আর দেখামাত্র... -অবাক হলেন মনে হচ্ছে? -আপ...মানে, আপনি... এখানে... মানে, আপনাকে এখানে ঠিক... -আমি কিন্তু আপনাকে এক্সপেক্ট করেছিলাম। -আম... আমাকে... মানে ... -একটু কথা ছিল, জরুরী। এখানে তো বলা যাবে না, একটু নিরিবিলি চাই। -কিন্তু আমি তো এখন... -সিগারেট পরে হবে, এখন চলুন। হম লোগ ওয়াপস আয়েঙ্গে। শেষের কথাটা বলা দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে, সেও দেখলাম হাসিমুখে হাতজোড় করে ঘাড় নাড়ল, "আচ্ছা জি, আচ্ছা।" মনের ভেতর এতক্ষণ দিব্যি একটা ফুরফুরে ভাব ছিল। এবার বুঝতে পারলাম, সেটা উধাও হয়ে গিয়ে তার জায়গায় একটা উত্তেজনার শিরশিরানি দেখা দিয়েছে। বুকের ভেতর একটানা হাতুড়ি পেটার শব্দ, পা দুটো কাঁপছে, তবুও সেই কাঁপা কাঁপা পায়েই মন্ত্রমুগ্ধের মত পেছু নিলাম। হাতকয়েক তফাতে আছি, সেখান থেকে দুজনের কথোপকথন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। -আপনি কিছু বলার আগে আমি একটা প্রশ্ন করি। আপনার মিথ্যে বলার বদ অভ্যেসটা শুধরেছে কিনা বোঝা দরকার। আপনি মুর্শিদাবাদে কী করছেন? -কী করছি মানে... এমনি... জাস্ট এমনি... (এবার গলায় একটু অস্বাভাবিক জোর এনে) কেন? আসতে পারিনা নাকি? -আসতেই পারেন। একবার চুরির দায়ে জেল খাটলেই কারো মুর্শিদাবাদে ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয় না। কিন্তু, আপনি এমনি আসেননি। আপনার একটা উদ্দেশ্য আছে, সেটা কী? -মমমানে... কী বলতে চাইছেন? লম্বা ভদ্রলোক এবার হাঁটা থামিয়ে পাশের লোকটার চোখে চোখ রেখে সোজাসুজি তাকালেন। জ্বলজ্বলে চাহনি, ঠান্ডা অথচ ধারালো কন্ঠস্বর, "মিস্টার সিংহ, যে একবার শয়তানের খপ্পরে পড়ে, তার এত সহজে মুক্তি হয়না। আপনি জেল থেকে বেরিয়ে বেকার বসেছিলেন, হয়তো অনাহারেই মারা যেতেন যদি না..." -প্লিজ! আমি... আমি কিছু জানিনা। আমাকে যেতে দিন, প্লিজ! -এখান থেকে বর্ডার খুব কাছে। এই শহরকে ঘাঁটি করে সেই সাক্ষাৎ শয়তান চোরাকারবারের একটা পরিকল্পনা আঁটছে। আপনাকে আগেভাগে পাঠিয়েছে হাওয়া বুঝতে। ঠিক কিনা? -প্লিজ...প্লিজ... ভদ্রলোক এবার একটু চুপ করলেন। তারপর, দৃষ্টি না সরিয়েই আবার বলতে শুরু করলেন, "আপনি চুরি করেছিলেন নেহাৎ লোভে পড়ে। একটা নির্বাসন দশা থেকে মুক্তির তাড়নায়। খুন আপনি করেননি, যদিও আপনার আহাম্মকিই সেজন্য দায়ী। কিন্তু আপনার আসল অপরাধ কী জানেন? আপনি বিশ্বাসঘাতক।" -প্লিজ... -মিস্টার সিংহ, এটা মুর্শিদাবাদ শহর। এখানে বিশ্বাসঘাতকের কী পরিণতি হয় জানেন তো? -প্লিজ... -বিশ্বাসঘাতকের পরিণতি। জানা আছে, মিস্টার সিংহ? -দোহাই আপনার! ছেড়ে দিন আমায়... ভদ্রলোক আবার থামলেন। তারপর পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বের করে একটা নিজে ধরিয়ে অন্যটা বাড়িয়ে দিলেন দ্বিতীয় লোকটাকে। "নিন।" লোকটা মুখ নীচু করে ফেলেছিল। এবার চোখ তুলে তাকাল। এখনও তার চশমার কাঁচে রোদ, কিন্তু ভেতরের চোখজোড়ায় এখন একরাশ বিস্ময়। -নিন। ধরান। তারপর আসুন, আপনাকে একটা গল্প বলি। -গল্প! মানে... -আসুন। এঁরা যতক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমিও দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। এখন আবার চলতে শুরু করলাম। তবে খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাই ভদ্রলোকের পকেট থেকে যে সিগারেটের প্যাকেটটা বেরলো, তার ব্র্যান্ডটা আমার চোখ এড়ায়নি। চারমিনার। -আপনার বাঁহাতে খেয়াল করুন মিস্টার সিংহ। এই কবরে শুয়ে আছেন নবাব আলিবর্দির বড় মেয়ে, ঘসেটি বেগম। -অর্থাৎ... -অর্থাৎ সিরাজের বড়মাসি। যিনি বোনপোকে দু'চক্ষে দেখতে পারতেন না। -ও! -সিরাজকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ইনি ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। সিরাজ সেটা টের পেয়ে এঁর মোতিঝিলের প্রাসাদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। -ও! -সিরাজ তো ক্ষমতাচ্যুত হলেন। মাসির কী দশা হল বলুন তো? মীরজাফরের বড় ছেলে মীরন এঁকে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারলেন। -আচ্ছা। -এই মীরনেরই আরো গল্প বলি শুনুন। এই ডানদিকে একসারি কবর দেখছেন? গুনে দেখুন, সতেরোটা। এঁরা সকলেই সিরাজের আত্মীয়, সিরাজ বন্দি হয়েছেন খবর পেয়ে এঁরা ঢাকা থেকে নবাবকে মুক্ত করতে এসেছিলেন। মীরন এঁদের বিষ খাইয়ে মারলেন। -হুঁ! -ভেতরে দেখবেন সিরাজের পাশেই তাঁর নাবালক ভাইয়ের কবর আছে। মীরন তাকে হাতির পায়ের নীচে পিশে মেরেছিলেন। -(চুপ) -আচ্ছা, বলুন তো? মীরনের কী পরিণতি হল? -ঠিক... ঠিক জানিনা। -ব্রিটিশরা মীরনকে চিনতে ভুল করেনি। বিহারের শাহ আলমের সঙ্গে যুদ্ধের সময় জেনারেল ওয়ালসের নির্দেশে ব্রিটিশরাই মীরনের তাঁবু পুড়িয়ে দেয়। রটিয়ে দেওয়া হল, মীরন বজ্রাঘাতে মরেছেন। -হুঁ! -এইবার দেখুন, আপনার ডানদিকে, পাশাপাশি তিনটে কবর। মিস্টার সিংহ, দানসা ফকিরের নাম শুনেছেন? -হুঁ। -এই সেই দানসা ফকির, যে সিরাজকে ধরিয়ে দিয়েছিল মীরকাশেমের হাতে। ছদ্মবেশে সিরাজ পালাচ্ছিলেন রাজমহলের দিকে, সঙ্গে ছিলেন বেগম লুৎফা ও মেয়ে উম্মত জারা। পথে ভগবানগোলার কাছে সেই একরত্তি মেয়ে খিদে - তেষ্টায় অধীর হয়ে উঠলে, খানিকটা বাধ্য হয়েই নৌকো থামাতে হল। তারপর কী হল বলুন তো? -জুতো... সিরাজের নাগরা জুতো দেখে... -ঠিক! ওই জুতো দেখেই দানসা নবাবকে চিনে ফেলল। সিরাজ তো বন্দী হলেন। কিন্তু আগেই বলেছি, ব্রিটিশরা বেইমানের শেষ রাখা পছন্দ করত না...ওই তিনটে কবরে শুয়ে আছে দানসা ফকির, তার স্ত্রী ও ছেলে। আচ্ছা, এই প্রসঙ্গে অন্য দুজনের কথা বলে রাখি। মীরকাশেমের ভাগ্যে বাংলার মসনদ জুটেছিল বটে। কিন্তু তারপর বক্সার যুদ্ধে হেরে সেই যে পালিয়ে গেলেন, ইংরেজদের ভয়ে তাঁকে পালিয়েই বেড়াতে হল আমৃত্যু। মিস্টার সিংহ, শুনছেন তো? -(চুপ) -আরেকজনের কথা বলি তবে, মহম্মদী বেগ। সিরাজের হত্যাকারী। শেষে মাথার ব্যারামে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা। শুনছেন? -(চুপ) -জগৎ শেঠ। মীরকাশেম এঁকে এঁর প্রাসাদের চুড়ো থেকে গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দেন। নেক্সট, উমিচাঁদ। ক্লাইভ এঁর সঙ্গেও প্রতারণা করলেন। ফলে বদ্ধ উন্মাদ দশায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মর্মান্তিক মৃত্যু। ইয়ার লতিফ- যুদ্ধের পর নিখোঁজ। সম্ভবত গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত। -প্লিজ...চুপ করুন... -মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি হল। রায় দুর্লভ মরলেন কারাগারে। -চুপ করুন... আপনার পায়ে পড়ছি... -ব্রিটিশদের কথা শুনবেন না? ক্লাইভ? দেশে ফিরে প্রচুর সম্মান তো পেলেন, কিন্তু হঠাৎ কী অজ্ঞাত কারণে বাথরুমে ঢুকে নিজের গলায় ক্ষুর বসিয়ে দিলেন। -আমি আর পারছি না... চুপ করুন, প্লিজ! -আরো আছে। ওয়াটসন, স্ক্রাফটন... -কিন্তু... কিন্তু... আপনি আসল লোকটার কথা কেন বলছেন না? মীরজাফর? কেন এড়িয়ে যাচ্ছেন আপনি? -ঠিক বলেছেন মিস্টার সিংহ। মীরজাফর নবাব হয়েছিলেন। একবার নয়, দু'বার। কিন্তু তাঁকে সন্তানের মৃত্যু দেখতে হল, এত সাধের রাজ্যপাট হারালেন জামাইয়ের হাতে । শেষে কুষ্ঠ রোগের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শোচনীয় মৃত্যু। তাছাড়া... -তাছাড়া? -আপনি তো জাফরাগঞ্জেই নাম ভাঁড়িয়ে বাড়িভাড়া নিয়েছেন? ক্ষুদিরাম রক্ষিত, তাই তো? এই মীরজাফরের নাম থেকেই মহল্লার নাম জাফরাগঞ্জ। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, মীরজাফরের ভাঙাচোরা প্রাসাদ স্থানীয় লোকেই দেখিয়ে দেবে। এখানকার লোকের কাছে অবিশ্যি সে প্রাসাদের একটা চলতি নাম আছে। কী বলুন তো? -কককী? -'নমকহারাম দেউড়ি।' মনে রাখবেন মিস্টার সিংহ, আড়াইশো বছর পার করে এসেছি আমরা। এখনও সেই প্রাসাদের পরিচিতি এক বেইমানের বাড়ি হিসেবেই। -ওহ্! স্টপ ইট, স্টপ ইট! চুপ করুন বলছি, প্লিজ! চুপ করুন আপনি! -কাঁদছেন? কাঁদবেন না মিস্টার সিংহ, কেঁদে কোনো লাভ নেই! বিশ্বাসঘাতকতার পথ বড় পিচ্ছিল, আর এই শহরের ইতিহাস বলছে বেইমানের এখানে কোনো ক্ষমা নেই। লোভের বশেও একবার যখন সে পথে পা বাড়িয়েছেন, মুর্শিদাবাদ আপনার জন্য আর নিরাপদ নয়। -আমি... আমি তাহলে... মানে, এখন কী করব? -আমি বলি? সবার আগে মগনলালের চাকরিতে ইস্তফা দিন। তারপর ফিরে যান, বেনারস। -বেনারস! আপনি কি পাগল হলেন? সেখানে... না না, অসম্ভব! ভদ্রলোক এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে, থেমে থেমে বললেন, "মিস্টার সিংহ, উমানাথ ঘোষাল তাঁর বুড়ো বাপের সাথে আর যোগাযোগ রাখেন না। বাকি আত্মীয়েরাও একেএকে আসাযাওয়া বন্ধ করেছে। ওই প্রকান্ড ঘোষালবাড়িটায় অম্বিকা ঘোষাল এখন একা। বৃদ্ধ, অশক্ত। কেউ দেখার নেই... ফিরে যান মিস্টার সিংহ। র‍্যাক্সিটের আজ আপনাকে বড় প্রয়োজন।" -কিন্তু... তা কি আর হয়? অম্বিকাবাবু আমাকে আর... -মিস্টার সিংহ, অম্বিকা ঘোষালকে আপনি চেনেননি। আপনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু সেই ভুলটুকু ক্ষমা করে আপনাকে আরেকটা সুযোগ দেবার মত বড় মন অম্বিকাবাবুর আছে। ফিরে যান। অম্বিকাবাবুকে বলবেন, তাঁর দেওয়া পারিশ্রমিক আমার কাছে খুব যত্নে আছে... আচ্ছা, আমি এখন আসি। গুড বাই, মিস্টার সিংহ! ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন, পিছন থেকে একটা ডাক শুনে ফিরে তাকালেন। "শুনুন।" -কিছু বলবেন? -মিস্টার মিত্তির, থ্যাঙ্ক ইউ! -ইউ আর ওয়েলকাম বিকাশবাবু, ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।

127

7