ঋক আর কিছুনা

ঋকানন্দ মহারাজের দেখাশোনা ( এবারে কিছু উড়ে আসা চিঠি)

একজন এর চিঠির খাতা আমার হাতে এসে পড়েছিলো , এ চিঠির প্রাপক প্রেরক আমি না । তার খাতা থেকে টুকে দিলাম । ********************************************************************************************************************* চিঠি - এক নেই সম্পর্কের চিঠির আবার সম্মোধন কি। তাই সোজাসুজি শুরু করলাম কেমন? জানি প্রথম লাইনটা পড়েই ভাববে আহ এতো ঘ্যাম নিয়ে কেউ চিঠি লেখে ইত্যাদি। বুঝলে সমস্যাটা সেখানেই। এই যে না বুঝতে পারার সমস্যা। আচ্ছা উদাহরণ দিই? পেটুক মানুষ খাবারের উদাহরণ টাই হোক নাকি? গুড় আর নারকেলের কম্বিনেশন যে অমন একটা অমৃত টাইপ ব্যাপার হয় সে কি করে বের করা গেছিলো কে জানে কিন্তু ওই পাক দেওয়াটাই আসল বুঝলে। তোমার জগৎ আর আমার জগৎ ভয়ানক ভয়ানক আলাদা। আমার মধ্যবিত্ত বারান্দায় কুমড়োর দানা শুকোতে থাকে, আমার স্টিলের থালায় ভাত, আমার মুড়ির কাঁসি এসব নিয়ে আমি কুঁকড়ে থাকিনা সত্যিই কিন্তু প্রেম যেই বাস্তবে আসে এরা যেন বলে ওঠে আলাদা, ভয়ানক আলাদা, মিলবে না। তুমি সেদিন প্রেম আর ভালোবাসার তফাৎ নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলে। অত আমি বুঝি না বুঝলে, আমার মা আর বাবা রোজ রোজ ঝগড়া করে করে এ বয়সে এসে এক সাথে বিকেলের চা খাওয়াটা প্রেম না ভালোবাসা আমি জানিনা। এই ধরো গাছের জগৎ আর মাটির জগৎ আলাদা কি করে ওদের প্রথম সংকোচ কাটে কে জানে, আবার মরুভূমির ক্যাকটাসের সাথে কি সুন্দরবনের মাটির মিলবে। তার চেয়ে বরং এই দূরটাই ভালো। গল্প শোনাবো তোমায় মনে মনে রোজ, যে গল্পগুলো সামনে বসে শোনালে নির্ঘাত হাই তুলবে। এই যে ভীড় জ্যামে দাঁড়িয়ে সুমন গাইছে, 'যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা' আর আমি জানলার কাচ টাচ তুলে তোমার সঙ্গে শুনছি এইই ভালো না? না না ভীড় বাসে কোনোরকমে এক ঠ্যাঙে দাঁড়িয়েও 'তবু আজো আমি রাজি, চাপা ঠোঁটে কথা ফোটে' শুনতে শুনতে আমি একা হয়ে যাই। তোমায় বোঝাতে পারবোনা, হেসে উঠবে কিংবা বিরক্ত হবে সব কিছুর অবয়ব না থাকাই ভালো। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় দেখি মেঘ করে এসেছে, রাস্তা গাছ পালা সব্বাই অপেক্ষা করছে কখন বৃষ্টি নামবে, তারপর সেই হাওয়াটা দিলো জানো। তুমি জানোনা বোধহয় ওই হাওয়াটা, বৃষ্টি আসার আগেই আসবে, বেশী জোরে আসলে আর বৃষ্টি হয়না আবার একদম না এলেও হয়না, ওই প্রেমের আবেগটার মতো। একটু এ চাল ওচাল হলেই ডুব দেওয়া প্রেম, নইলে নির্ভর বন্ধু। আর আর... আরো কিছু গোলমাল হলে? পুরো লছমনঝোলা কেস। কোলকাতা শহরে রাত দেখেছ? উৎসবের রাত না এমনি রাত। বোধহয় দেখোনি, আসলে কোলকাতার রাত গুলো মেল শভিনিস্ট তোমার ভাষায়। ওই সময় রাস্তায় লুঙ্গি বা হাফপ্যান্ট পরে খালি গায় রেডিও শোনে পান বিড়ির দোকানের লোকটা। ফাঁকা রাস্তায় ফোন কানে কোনো সদ্য প্রেমে পড়া ছেলে, আমার মতো ফেক প্রেমিক না, বেশ চোখ মুখ উজ্জ্বল হওয়া কথা বলতে বলতে স্বপ্ন মাখা প্রেমিক। তোমার ভাষায় তো আমি নিজেকে ছাড়া কাউকে কিছুকেই ভালোবাসিনা। না না কথা শোনাচ্ছিনা অ্যাক্সেপ্ট করছি কেবল। বেশী বেশী ইংরাজি শব্দ ঢুকে যাচ্ছে না? আচ্ছা পরের বার খেয়াল রাখবোখন, এবার শোনো যা বলছিলাম। সেই রাতের রাস্তায় দুর্দান্ত ভাবে ছুটে চলা বাইককে খুব ভয়ানক খিস্তি মারে ড্রাইভার সে এমন টাইপ তোমার সামনে সে কথা ভেবে লিখলেও লজ্জা লাগবে। রিক্সাওলা গান চালাতে চালাতে যাবে, হেঁকে হেঁকে আদিরসাত্মক চুটকি বলবে চা ওলা তার বন্ধু কোনো সব্জিওলাকে। হ্যাঁ মাঝ্রাতেও সবজি বিক্রি হয় জানো, কাদের জন্য আমার দেখা হয়নি কখনো। একটাও মেয়ে দেখিনা আমি রাস্তায় এ সময়, এমনকি বাইকের পিছনেও না। শুধু মেয়েরা দখল করে নেয় এরকম কোনো সময় চব্বিশ ঘন্টার কখনো? বেশী লম্বা হয়ে গেলো না? ধ্যুত এর চেয়েও বেশী বকবক করি আমি তোমার সাথে। ভালো থেকো বোলেগা নেহি ন্যাকামো বলবে, ইয়ে একখান উত্তর দেবে নাকি? নীল খাম টাম চাইনা এমনি রুল্টানা খাতার পাতায় লিখলেও পড়ে নেবো। ********************************************************************************************************************** চিঠি - দুই ************************** কি করছো বলো দেখি? ব্যস্ত ব্যস্ত? সারাদিন কী এতো ব্যস্ত থাকো বলোতো, খালি নিজেকে ভোলাতে তা জানো? তোমার রান্না করার ছল, নিত্যনতুন সিনেমা সব আমার ভারী চেনা, আমিও ভুলিয়ে রাখি কিনা নিজেকে। হরেকমাল পাঁচটাকায়। মাঝে মাঝে ভয়ানক ডিপ্রেসিভ চিন্তা আসে জানো, এই যে নিজেকে নিত্য নতুন জিনিস দিয়ে ভুলিয়ে রাখি কেন? মানে এই নাম যশ আহার মৈথুন এর কি মানে আছে? কেন করছি এসব দিনগত পাপক্ষয়? আসলে ইমেজের ভয় বোধহয়, লোকে কি বলবে? চাকরিটা দুম করে ছেড়ে দিলে। বাউণ্ডুলে হবার সাহস তো সবার হয়না। ভয় পেওনা, আমি সে ভোঁতা মনখারাপের গর্তে ফের পড়বো না। তোমায় বলা হয়নি না? আমার সব মন খারাপ আমি পাহাড়ের কুয়াশায় গাছের ফাঁকে মিলিয়ে দিয়েছি। আমায় টের পেতে দেয়নি কি করে তারা নিয়ে নিয়েছে কিন্তু নিয়ে নিয়েছে তাই সেই অকারণ বিষাদ আমায় ছুঁতে পারেনা আর জানো? চিঠি লেখাটাও একটা নেশা বুঝলে, আমার হাজারটা খেলার, নেশার একটা অংশ আর কি। তোমায় লিখি, তুমি পড়ে মুচকি হাসো, ভ্রু কোঁচকাও বা ঘাবড়ে যাও তিনটেই আমি দেখতে পাই। কিন্তু অত চাপ নিও না, আমায় তো চেনো তুমি, দাবী নিয়ে সামনে দাঁড়ানোর মতো চওড়া বুক যে আমার নেই। ঢাক বাজছে, নীল আকাশে মেঘ গুলো নানান আকার নিচ্ছে, ভগবান মানিনা কিন্তু উৎসব মানি, উৎসব আসছে। অনেক রাত্তিরে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েছ কখনো? দ্বাদশীর চাঁদে অল্প অল্প করে বইতে থাকা হাওয়া, চাঁদের ছায়া জলে পড়ে, তিরতির করে কাঁপতে থাকে সমুদ্রের জল, বাতাস না ওই চাঁদের আলো কার জন্য কাঁপছে কে বলতে পারে কিন্তু সবটুকু মিলিয়ে বড় ভালো লাগে। তেমনই ঠিক কি জন্য ভালো লাগে জানিনা কিন্তু মাঝে মাঝে সব কিছু বড় ভালো লাগে জানো, ওই যে এক গলা সস্তার মদ খেয়ে নাচতে নাচতে বিশ্বকর্মা পুজো উদযাপন করা লোক গুলো আর চড়া দামে ডান্স ফ্লোর কিনে সেখানে উদ্দাম নাচা তরুণ তরুণী, ভীড় রাস্তায় বিরক্তি নিয়ে বসে থাকা ছেলেটার কাঁধে মেয়েটা মাথা রাখার পর হাসি ফুটে ওঠা ছেলেটা, ফোকলা হাসি নিয়ে ওই বুড়িটা, শোক জরা সব কিছুকে হারিয়ে জীবনকে আলিঙ্গন করা, সব কিছুই বড় ভালো লাগে। জানো তোমাদের বাড়ির পাশের যে গাছটা আছে, যেখানে সেই পাখিটা এসে বসে মাঝে মাঝে আমার তার সাথেও কথা হয়, গাছেরা অনেক জানে কিন্তু বলে না সে তোমায় বলেছি আগেই । ঘ্যানঘেনে প্রেমিক টাইপ চিঠি মনে হচ্ছে নাকি? আসলে এই উৎসবের মরশুমে প্রতিদিনের নতুন করে বেঁচে থাকায় তোমায় খুঁজি জানো, হাত ধরতে চাইনা হাত ছেড়ে দিলে কানা গলিতে ঘুরপাক, বরফ পড়া তীব্র শীতের রাত বড় বেশি তাড়া করবে। আর আমি তো আমায় চিনি, বড় পিচ্ছিল এ হাত, তুমি পারবে না ধরে রাখতে, বরং ধরার ফলেই হুমড়ি খাবে আরো বেশী। মানুষ তো হাত ধরে ভরসা পেতে যে হাত খালি অনিশ্চয়তা দেবে সে হাত বাড়ানোও তো ঠিক না। তাই ঘাবড়ে যেও না। যা বলছিলাম, এই যে চারিদিকে এতো জীবন এ সবই বড় ভালো লাগে মাঝে মাঝে কিন্তু মাঝে মাঝে সব কিছু থেকে পালাতে ইচ্ছে করে, মাইকের ওই 'ম্যায় তো তন্দুরি মুরগি হুঁ ইয়ার, কাটকালে মুঝে অ্যালকোহোল সে' যেন বড় বেশী সবখানে, এতো কিছু কেন চাইছে লোকে, আমার দমবন্ধ লাগে। পালাতে না পেরে তোমার কাছে যাই, তোমার কাছ থেকে পালাতে পারলে একদিন সব ছেড়েও পালাতে পারবো জানি। কিন্তু পালাতেই কি চাই, ক জন যে এ ঘরে বসত করে কে জানে! এভাবেই পৌঁছে যাবো একদিন হয়তো কোথাও বা একটা নদীর ধারে কিংবা পাহাড়ে পাইন গাছের গোড়ায় সাড়ে তিনহাত জায়গা পেয়ে যাবো। ভালো থাকো, এ চিঠিটা শীতকালের ভোরে লেপ ছেড়ে যাওয়ার মতো খারাপ হলো, পরের বার একটা গরমের বিকেলের হাওয়ায় ভরা চিঠি দেবো ঠিক

156

8

জেমস

গলার কাঁটা

পুরোনো লেখা‚ আর একবার| ---- গলার কাঁটা- সত্যিকারের সেই কবে থেকে নিজে নিজেই মাছ খেতে শিখেছি- "যখন আমার রথীর মত বয়স ছিল" তখন থেকে| তার আগে কাকিমা কাঁটা বেছে আঙুলে টিপে টিপে নি:সন্দেহ হলেই তবে মুখে তুলে দিতেন| বিশেষ করে রাত্তিরে খাবার সময়‚ ঘুম ঘুম চোখ‚ হাট থেকে আনা রুই বা পোনা মাছ‚ আবার বায়না ধরলে কোন কোন দিন সকালের পান্তাভাতও খাইয়ে দিতেন| আহা‚ পান্তাভাত প্রচুর আমানি সহ (ভাত ভেজা জল)‚ garnished with KL (কাঁচা লঙ্কা) এবং served with আগের দিনের বাসি মাছের ঝোল! আমার থিয়োরি হল মাছ কাঁটা বেছে খাওয়াও একটা experience এর ব্যাপার; মাছের অ্যানাটমির বিশেষ করে অস্থি সজ্জার সম্যক জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়‚ কৈ মাছের পেটের দিকের সেই বাঁকা কাঁটা অথবা ফলুই মাছের কাঁটার বিন্যাসে যে পার্থক্য আছে‚ যেটা একমাত্র অভিজ্ঞতাতেই ট্যাকল করা সম্ভব; খয়রা মাছের সুক্ষ্ম কাঁটা যে চিবিয়ে খাওয়াই শ্রেয় সে কি বলার অপেক্ষা রাখে? আচ্ছা‚ আমিই বা কেন বেওকুফের মত কাজ করছি- যারা এই লেখা পড়ছেন তারা সকলেই বাঙালী অতএব মায়ের কাছে মাসীর গল্প হয়ে যাচ্ছে‚ তাই না? হুঁ‚ যাহা বলিতেছিলাম| ২০০৭ এর মাঝামাঝি এক সন্ধেবেলা ডিনার টেবিলে কতিপয় অতিথি‚ একটু আনকা কিছু পরিবেশনের তাগিদে পেঁয়াজ‚ সরষে দিয়ে সরল পুঁটির ঝাল রান্না হয়েছে| সরল পুঁটিগণ তার ছমাস আগে বাঙলাদেশের কোন নদী নালায় আত্মসমর্পন করেন এবং আমি মাস দুয়ের আগে মেলবোর্ন ভ্রমনের সময় সেখানকার দোকান থেকে সযত্নে বয়ে আনি- মহার্ঘ্য সওদা! এইখানে একটু কিন্তু আছে‚ আমাদের লঙ্কা ওদের কাছে মরিচ তেমনি আমাদের সরপুঁটি ও তাদের সরলপুঁটি যে এক species নয় তা কে জানতো! ভেবেছিলাম অপভ্রংশে ল হাওয়া! ( এই হাওয়া হয়ে যাওয়াটাকে ব্যাকরণে কি যেন একটা বলে‚ অভি...‚অভিকর্ষ‚ অভি....‚ অভিসার (?)| না:‚ ভুলেই মেরে দিয়েছি| খাওয়া দাওয়া চলছে‚ সঙ্গে স্যালাড হিসাবে যথারীতি দেশোদ্ধার‚ ইন্ডিয়াতে কি অবস্থা ইত্যাদি| ফিশ উইথ লেমন প্লাস সাদা ফেনিত দ্রাক্ষারস- আহা..........| খক‚ খক..... এই রে মনে হচ্ছে গলায় যেন খচ খচ করছে‚ কাঁটা ফুটলো কি! যথারীতি এক দলা ভাত‚ আস্ত কলা সব দাওয়াই প্রয়োগ করা হল; নাহ‚ তাতেও ফল হল না| কি অনাসৃষ্টি কান্ড‚ অতিথিদের সামনে‚ ভাগ্যিস বড় সড় পার্টি নয়‚ সামান্য দু চার জন মাত্র| দেবব্রত ওরফে দেবু‚ ডাক্তার হাসপাতালের ব্যাপারে এক্সপার্ট- 'চলো‚ হাসপাতালেই যাওয়া যাক"| শনিবার উইকএন্ডে তা ছাড়া আর ডাক্তারই বা কোথায় মিলবে| আবার হাসপাতাল‚ হে ভগবান! এবং এমার্জেন্সীতে| গেটকীপার নার্স দিদিমণি- যিনি সাব্যস্ত করেন ভর্তি করা হবে কিনা বা কি প্রায়োরিটি‚ সব শুনে বললেন অপেক্ষা করুন| স্বাভাবিক‚ আমার তো প্রাণসংশয় নয়‚ আরও কত কত রোগী আছেন‚ অপেক্ষায়| যাইহোক‚ ঘন্টাচারেক বাদে ভেতরে নিয়ে গেল‚ উইকএন্ডের এমার্জেন্সী ওয়ার্ড‚ নামকরা হাসপাতাল- ফাইভ স্টার হোটেলের মত ঝকঝকে (ইয়েস‚ পাবলিকই)‚ কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রচন্ড গাদাগাদি মনে হল‚ বেশ ব্যস্ততা| আসলে আমি তো সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তি‚ গলায় কেবল কাঁটা বিঁধে আছে ‚ এই যা! জ্ঞান টনটনে‚ আমার তো অমনি মনে হবেই! বেডে শুইয়ে যথারীতি সব রকম টেস্ট| লজ্জাও করছে‚ রাত বেরাতে জ্বালাতন করা| যে নার্সই আসছেন‚ জিজ্ঞেসবার্তা করতে আমি ডিসক্লেমার দিয়েই শুরু করছি‚ " sorry সিস্টার‚...তোমাদেরকে বিরক্ত করছি‚ তোমরা এত ব্যস্ত ইত্যাদি কাঁদুনি গাইছি|' তো তারা সান্ত্বনা দিচ্ছেন‚ আরে না না‚ এরকম কাঁটা ফোটা কেস মাঝে মাঝেই আসে‚ "তুমি একা নও"| সংক্ষেপে সারি‚ এক্সরে হলো‚ কোন সন্দেহ নেই‚ কাঁটা বেশ ভেতরেই জমিয়ে বসে আছেন; ENT সার্জন পরদিন সকালে আসবেন‚ অতএব আবার অপেক্ষা| তিনি এলেন‚ সকালে হাতে ছোট্ট গীটারের মতন বাক্স| ভীষণ সিরিয়াস ডাক্তারবাবু‚ প্রৌঢ়‚ মুখে হাসি নেই তবে মুর্তিমান আত্মপ্রত্যয়| একটা নাকছাবির হীরের সাইজের ক্যামেরা লাগানো আধা শক্ত দড়ি মতন কি একটা নাসিকার মধ্যে চালান করে দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রায় দিলেন‚ "Book him for OT"| তিনি যা বললেন‚ মর্মার্থ হল‚ এমনি হাঁ করিয়ে বের করতে পারবেন না| যা: গেল! আবার অপেক্ষা‚ এবার অপারেশন থিয়েটারের এর ante room এ| বুঝুন ঠেলা‚ এ যাত্রা জলজ্যান্ত সুস্থ আমি; অনেক সত্যিকারের অসুস্থ রোগীর সাথেই অপেক্ষা করছি| ভয় তো আছেই আর আছে লজ্জা‚ ছি ছি‚ একি কান্ড বাধিয়ে বসেছি| ও: এর মাঝে শনিবারের রাত গড়িয়ে রবিবারের দুপুর হয়ে এসেছে| দেবু‚ মাঝে মাঝেই আসছে যাচ্ছে‚ সে এখানকার ইউনিভার্সিটিতে এরোনটিক্য়াল ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ায়‚ কাছেই তার অফিস‚ মাঝে মাঝে গিয়ে পরীক্ষার খাতা দেখে আসছে| অপেক্ষা তো বেড়ে যাবেই‚ এক একটা এমার্জেন্সী কেস আসছে আমি আবার লাইনের পেছনে পড়ে যাচ্ছি| তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে‚ সরল পুঁটির কাঁটা হলে কি হবে‚ জেনারাল অ্যানেস্থেসিয়ার সকল জটিল পদ্ধতি মেনে চলতেই হবে যে! অবশেষে‚ স্বর্গদ্বারে প্রবেশপত্র মিললো‚ আবার সেখানকার নার্স দিদিদ্বয়কে কাঁদুনি গেয়ে শোনালাম| তারাও বললেন‚ এরকম কেস তারা মাঝে মাঝেই সামলান| আমায় ছেলে ভোলালেন কিনা কে জানে| অত:পর‚ একটি ট্যাবলেট এবং ছোট্ট ইঞ্জিশান! * * * অসম্ভব শান্ত‚ প্রায় নি:শব্দ একটা বিরাট লম্বা হলে ঘুম ভাঙ্গলো‚ সিস্টার রেডি ছিলেন‚ একটা ছোট্ট ক্লীয়ার প্ল্যাস্টিকের শিশিতে আমায় উপহার দিলেন সেই সরল পুঁটির বক্র কন্টক! ইতোমধ্যে জীবনের তেইশ ঘন্টা পার| ভাবছিলাম‚ জীবন মৃত্যুর মধ্যে মাত্র একচুল ফারাক! আচ্ছা পটকে গেলে? কি লজ্জা‚ কি লজ্জা| সরল পুঁটি খাইতে গিয়া পটল তুলিয়াছেন .... Moral: না জানিয়াসু অচেনা অজানা মৎস্যম মা ভক্ষ:|

111

5

Srija

আত্মরক্ষা

"আজ এই পর্যন্তই থাক‚ পরের দিন নেক্সট চ্যাপ্টার ধরবো" - - এই বলে আর.জি ম্যাডাম বেড়িয়ে গেলেন| উর্মি তাড়াতাড়ি ব্যাগে ডাইরী‚ পেন ঢুকিয়ে নিল| এখন এস.ডি র কাছে টিউশন পড়তে যেতে হবে| আজ উর্মি একাই কলেজে এসেছে| অন্যদিন রিয়া‚ সুস্মিতা‚ চৈতালি‚ পারমিতা‚দেবিকা‚ অঙ্কিতা সবাই একসাথে আসে| আজ ওরা কেউ আসেনি‚ তাই ভিড় ট্রেনে 'একা একা' সফর করতে হয়েছে উর্মিকে| মা জানলে আজ কলেজে আসতেই দিত ন| উচ্চমাধ্যমিকের পর যখন কলেজে ভর্ত্তির পর্ব এল বাড়ীর সবাই চেয়েছিল লোকাল কলেজেই ভর্ত্তি হোক‚ কিন্তু পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ার জন্যে উর্মি এই কলেজেই ভর্ত্তি হল| বাবা-মার একেবারেই মত ছিল না‚ মা-বাবাকে রাজী করাতে উর্মিকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে| দেখতে দেখতে দুবছর কেটে গেল‚ এটা ফাইনাল ইয়ার চলছে| আসলে উর্মি খুব শান্তশিষ্ট‚ ঠান্ডা প্রকৃতির‚ নামের সাথে একেবারেই মেলে না| সে তুলনায় উর্মির বোন লহরী একেবারে অন্যরকম‚ যেমন নাম‚ স্বভাবও সেইরকম| লহরী ক্লাস নাইনে পড়ে| এখন স্কুলে স্কুলে আত্মরক্ষার জন্যে ক্যারাটে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে‚ লহরী সেখানে ভালো নাম করেছে| উর্মিদের সময় এসব ছিল না‚ আর থাকলেও উর্মির দ্বারা ওসব হত না‚ কারো সাথে গলা তুলে কথা পর্যন্ত বলতে পারেনা‚ সে করবে মারামারি! আজ পড়তে যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না উর্মির| কিন্তু কলেজে ঢোকার মুখেই ম্যাডামের সামনে পরে যায়|-"এই আর সব কই?"-'আর কেউ আসেনি ম্যাম্'| "সবার হল কি আজ?! ঠিক আছে তুই চলে আসিস‚ বেশী দেরী করবি না‚ সাড়ে চারটের মধ্যে ঢুকবি|" একথা বলে ম্যাডাম চলে গেলেন| অগত্যা মুখ ব্যাজার করে উর্মি ক্লাসে গিয়ে ঢুকল| আজ লাস্ট ক্লাস হয়নি‚ এ.কে.বি আসেননি| তনুজা বলছিল ক্যান্টিনে গিয়ে অড্ডা মারবে| উর্মি গেল না| তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে যাবে এই ভেবে তিনটে নাগাদ কলেজ থেকে বেড়িয়ে পড়ল উর্মি| রাস্তা পেড়িয়ে বাস স্টপেজে এল| আজ সঙ্গে সঙ্গেই বাস পেয়ে গেল| বসার জায়গা অবশ্য ছিল না‚তাতে কি! পাঁচ মিনিটের তো জার্নি| আগে এই জার্নিটাও উর্মির সহ্য হোতো না‚ এখন অভ্যেস হয়ে গেছে| ম্যাডামের ফ্ল্যাটটা অড জায়গায়| বাস থেকে নেমে বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়| সবাই থাকলে ওরা হেঁটেই আসে‚ একসঙ্গে গল্প করতে করতে চলে আসে‚ দূর আর দূর থাকেনা| আজ উর্মি একা তাই বাসে উঠল| বাস থেকে নেমেই দেখল কিসের যেন ক্যাম্প হচ্ছে| কাছে যেতে বুঝতে পরল এইডস নিয়ে সচেতনতা শিবির| একটা মেয়ে উর্মিকে দেখে এগিয়ে এসে একটা কাগজ দিল| উর্মি কাগজটা নিয়ে দেখে এইডস প্রতিরোধের উপায় লেখা অছে| উর্মি সাইড খাপে রাখলো| তারপর পা চালিয়ে এগিয়ে গেলো| ম্যাডামের ফ্ল্যাটে গিয়ে ডোর বেল টিপলো উর্মি| ম্যডাম দরজা খুলেই অবাক! "এত তাড়াতাড়ি?" - - 'লাস্ট ক্লাস হয়নি|' "ওহ‚ সে ভালো করেছিস| আজ অনেকগুলো নোট লিখিয়ে দেবো‚ বাকীদের দিয়ে দিস|" ব্যস হয়ে গেল! এখন বসে বসে একগাদা নোট লিখতে হবে‚ দেরী করে এলেই ভালো হোতো| পড়া শেষ করে বেড়োতে আজ একটু দেরীই হয়ে গেল| এখন বাস ধরে সোজা ষ্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরবে| এদিকের রাস্তাটা খুব একটা ভালো না‚ বিশেষ করে সন্ধ্যের পর থেকে যতরকম অসামাজিক কাজকর্ম হয়| উর্মি তাড়াতাড়ি পা চালায়‚যতক্ষণ না বাসে উঠছে শান্তি নেই| হঠাৎ চারটে ছেলে যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়| চারদিক থেকে উর্মিকে ঘিরে ধরে| প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়ে ব্যাগটা হাত থেকে পড়ে যায়| ছেলেগুলো খুব বিশ্রী ইঙ্গিত করতে থাকে| উর্মি ভেবে পায়না কি করবে? চিৎকার করলে কেউ আসবে না‚ দুপাশে আগাছায় ভরা জমি| ছুটে পালাবে সে উপায় নেয়‚ চারজন ওকে ঘিরে রেখেছে| তাছাড়া এদের সঙ্গে দৌড়ে ও পারবে না| ছেলেগুলো উর্মির আরো কাছে এগিয়ে আসে| উর্মি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা‚ মাটিতে পরে যায়| ব্যাগটা তুলে নিয়ে বুকের কাছে আড়াল করে| সাইড খাপে হাত পরতেই একটা কাগজ উর্মির হাতে ঠেকে| বিদ্যুৎ গতিতে মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়| উর্মি উঠে দাঁড়ায়| ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে--"চল‚ কোথায় যেতে হবে‚ এখন তো আমার কাছে কেউ আসেনা| তোরা চাইছিস যখন অমি যাব| "ছেলেগুলো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে| তারপর একজন বলে--" ওরে এ যে অন্য জিনিস"| - - আরেকজন বলে"এই লাইনে কদিন আছিস?এখন কেউ আসে না কেন? " উর্মি বলে" সবই জেনে গেছে যে| "--" এই কি জেনে গেছে? "--" এই যে‚ আমি তো আজ ঐ ক্যাম্পে গেছিলাম‚ সব জেনে নিয়েছি‚ তোদের কোন ভয় নেই|"এই বলে ক্যাম্প থেকে পাওয়া সেই কাগজটা বাড়িয়ে দেয়| একটা ছেলে কাগজটা নিয়ে দেখে| - - "এর মানে!! তোর এই রোগ আছে নাকি?" - -" হ্যাঁ‚ তবে আমি ডাক্তার দেখিয়েছি| " ছেলেটা কাগজটা ছুড়ে ফেলে দেয়‚--" এই দুরে যা‚ কাছে আসবি না! এই চল চল| " অন্ধকারের মধ্যে ছেলেগুলো মিলিয়ে যায়| উর্মি প্রায় ছুটতে ছুটতে মেনরোডে আসে| সামনেই দেখে বাস দাঁড়িয়ে আছে| বাসে উঠে বসার জায়্গাও পেয়ে যায়| একটু ধাতস্ত হবার পর পুরো ঘটনাটা ভাবতে থাকে উর্মি| আচ্ছা ক্যারাটে জানলেই কি ওদের সঙ্গে একা লড়তে পারতো? আজ বুদ্ধির জোরেই নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে সে| রক্ষা করতে পেরেছে নিজের আব্রু‚ আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে সে|

129

10

জেমস

কিছু ইনভেনশন (A)

নন-A মার্কা| অনেকদিন ইনোভেশন‚ ইনভেনশান নিয়ে ফোড়ন কাটিনি| পাবলিকে খায় কম| ওদিকে আবার সুকুমার শিল্প‚ আর্ট‚ কালচার‚ সঙ্গীত‚ চিত্রকলা ও অতি অবশ্যই সাহিত্য‚ কবিতা সম্পর্কে আমি একেবারেই অজ্ঞ| আজ আবার কি করে বাই চাগিয়ে উঠলো| একটা ইনভেনশন চোখে পড়লো‚ একটার পর একটা আসে যায়‚ ডাক্তারদের রোগী দেখার মতো| পরক্ষণেই কিছু মনে থাকে না| ভাগ্যিস‚ থাকে না| আজকাল তো অনলাইনে জিনিষপত্র কেনা খুব চলছে‚ আর চিরাচরিত পার্শেল ডেলিভারী তো আছেই| মিয়াঁ বিবি চাকুরীতে‚ বাচ্চারাও স্কুল কলেজে| একটু বেসাইজ প্যাকেট বা পার্শেল হলেই চিত্তির| লেটার বক্সে ঢুকবে না; অগত্যা ক্যুরিয়ার বা পোষ্টম্যান হয় দরজার সামনে (রিসিট না নেবার থাকলে) অথবা একটা কার্ড রেখে হাওয়া| ছোট দশ কিলোমিটার দূরে পোষ্ট অফিসে| তো এই ইনভেনশনের বিষয় বস্তু হলো এমন একটা contrivance যাতে করে পিয়ন মালটা ঢুকিয়ে দিতে পারবে কিন্তু অন্য কেউ খুলতে পারবে না| আর সবচেয়ে ইমপর্ট্যান্ট হলো‚ এই receptacle লাগাতে দেওয়াল খুঁড়তেও হবে না‚ বিশেষ করে সুবিধা হবে যারা ভাড়া থাকে| উচ্চশিক্ষিত‚ স্বচ্ছল পরিবারের কথা স্বতন্ত্র‚ তাদের ঝি চাকর‚ হুঁকা বরকরদার থাকেই বাড়ীতে| দরজার তলা দিয়ে অকটা tab গলিয়ে দিয়ে মালকীন চলে গেলেও অসুবিধা নেই| আরও ডিটেলস আছে‚ অনেক লিখতে হবে| যেমন এমন চিপ ঢোকানো থাকবে যে ডেলিভারীর ছোঁড়া স্ক্যান করলে মালকীন খবর পাবে; এমনকি ট্রাকিং সিস্টেমের সাথেও কানেক্ট করা যাবে| মরুকগে‚ প্রাঞ্জল করে লিখতে গেলে অনেক অনেক লিখতে হবে| -- অত্যন্ত mundane বিষয় যথা প্রাত:কৃত্যের সুবিধার জন্য কত কত ইনভেনশন‚ একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঝলকিয়াঁ দিলাম নীচে‚ বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগের; অথবা আখ (ইক্ষু)‚ বীনস‚ আলু harvesting এর ইমপ্লিমেন্টস| মজার কথা হলো‚ কবি সাহিত্যিক‚ কুত্তা বিল্লী সকলেরই প্রয়োজন ডাইরেক্টলি অথবা ইনডাইরেক্টলি| জয়রামজীকী| ---------------------- FLUSH CLOSET 300.1 With toilet tissue holder 300.2 With bedpan rinser 300.3 With splash guard or water baffle 301 Urinals only 302 Flush actuation automatically responsive to condition 303 Periodic flush 304 By radiant energy responsive means 305 By electric condition responsive means 306 Ventilated, i.e., noxious fume removal 307 Folding type 308 Pedal actuated flush 309 With disinfectant means 310 Vertical type 311 Bowl type 312 Folding type ++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++ Harvesting of standing crops (A01D 44/00 takes precedence; threshing machines adapted for special crops, threshing devices for combines adapted for special crops A01F 11/00) [2006.01] A01D 45/02 of maize [2006.01] A01D 45/04 of rice [2006.01] A01D 45/06 of flax [2006.01] A01D 45/10 of sugar cane [2006.01] A01D 45/16 of tobacco [2006.01] A01D 45/22 of beans [2006.01] A01D 45/24 of peas [2006.01] A01D 45/26 of cabbage or lettuce [2006.01] A01D 45/28 of spinach [2006.01] A01D 45/30of grass-seeds or like seeds [2006.01] ================================================>

623

10

Ranjan Roy

বাঙালবাড়ির কিস্যা (প্রথম ভাগ)

এলেম আমি কোথা থেকে( ৮ম পর্ব) --------------------------------------------------- নাকতলার সেকন্ড স্কীমের ফুটবল মাঠে সেদিন হেব্বি হল্লা, বাওয়াল হয়েছে বাপ-ছেলেতে, হেসে মরছে পাড়াপড়শি, ছেলেছোকরারা। বাসস্টপে নেমে হরিদাস পাল রঞ্জন সেদিন হনহনিয়ে হাঁটছে, আজকে শেষ রিহার্সাল। পরশু ওয়ান অ্যাক্ট কম্পিটিশনে প্লে নামাবে ওরা, আঠারো বছর বয়সের ছয়জন বন্ধু। জজের প্যানেলে আছেন থিয়েটারে আলোকসম্পাতের জগতে বিপ্লব ঘটানো তাপস সেন ,থাকেন পাশের পাড়া রামগড়ে। ব্যস্, এই কম্পিটিশন জিততে পারলেই কেল্লা ফতে। পাব্লিক? " বুঝবে তখন বুঝবে!' তখন নিশ্চয়ই সবাই ঝুলোঝুলি করবে -- আমাদের ওখানে একটা শো' করুন না! ওদের যে কেউ ডাকে না, বিনিপয়সায় করতে চাইলেও না। কোন ক্লাবের বার্ষিক অনুষ্ঠানে নাটক করার জন্যে তার সেক্রেটারিকে ধরে অনেক আমড়াগাছি করে শো করার অনুমতি পাওয়া গেল। তেড়ে একমাস রিহার্সাল দেয়া গেল। বাড়ির লোকজন, গার্লফ্রে¾ড সব্বাইকে বলা হয়ে গেছে-- অমুক তারিখ আমার শো'। তারপর ঠিক একদিন আগে জানা গেল ওদের নাম কেটে শো অন্য কোন সিনিয়র নাটকের দলকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু খেলার মাঠের পাশে আজকে কিসের বাওয়াল? ---- ওই হাফপ্যান্ট পরা ছোঁড়াটা কে র্যা? হাড়বজ্জাত ছেলে! ----- বেলেঘাটা থেইক্যা কয়মাস হইল আইছে, খালি মাজাকি করে! ----- আমাদের পাড়ার দারোগাবাবু, হেই যে বাদলার বাপ! উনার একটু কম্পলেক্স আছে। রোজই আফিস থেইক্যা আইস্যা লুঙি পইর্যা উনি পাড়ার ছেলেদের ইংরাজির পরীক্ষা নে'ন। যেমন,-- "" তিমির, তুমি তো ভাল ছাত্র, কও দেখি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়িতেছে, এর ইংরাজি কি অইব? হা:-হা:-হা:! পারলা না তো, জানতাম। আইজকাইল ইসকুলে কিস্যু শিখায় না। আচ্ছা, এইডা কও-- টিপ্ টিপ্ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে। এইডাও জান না? বেশ, এইবার একটা সহজ প্রশ্ন করি-?"" মস্মস্ করা নতুন জুতা''-- এর ইংরেজি কও? সব চুপ! কিন্তু হেই হারাম্জাদাটা কয় কি? ----- এরা কিস্যু জানে না, মেসোমশায়। আপনেই কন--" কচ্কচ্ করা নতুন বাল'' এর ইংরাজি কী? - হারামজাদা পোলা! আমি তর বাপের বয়সী, আমার লগে ইয়ার্কি! আইজই তর বাপেরে কমু, কি শিক্ষা দিছেন নিজের পোলারে? কিন্তু আজকে খেলার মাঠে দারোগাবাবুকে তো দেখছি না,ওই ছোঁড়াটা দৌড়ুচ্ছে , পেছনে ওর বাপ। ব্যাপারটা কি? ------- আর বলিস না। দারোগাবাবুর নালিশ শুনে বাপ তো ছেলেকে আচ্ছা করে কড়কে দিল। কিন্তু ছেলেটা এক্কেবারে যাকে বলে রেকটাম-রাইপ। আজ খেলার মাঠে বন্ধুদের তোল্লাই খেয়ে নিজের বাপকেই জিগ্যেস করেছে-- ' বাবা, আইজ ক্লাসে মাস্টারে জিগাইসে স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রয়ীর নাম। আমি দুইটা কইসি,--" লাল' আর" পাল '। আরেকটা নাম কি যেন? কী ""গঙ্গাধর তিলক''? ------ তারপর? ------- তারপর আর কি! বাপের তেলেভাজার দোকান, তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে এসেছে, স্কুলের মাঠে এবারে নতুন প্লেয়ার শ্যাম থাপার খেলা দেখবে বলে।। রেগে গিয়ে বলেছে-- বানচোইৎ! জাননা কী গঙ্গাধর? ''বাল""! তারপর কী হচ্চে দেখতেই পাচ্ছিস। না, রনজন কিছুই দেখছে না। ওর কানে বাজছে ওই দু-অক্ষরের শব্দটি। কালকেই ওর দলের একটি ছেলে বলেছে--- এইসব বালের নাটক করে কী হবে? পাড়াতেও এরকম কিছু টিপ্পনী কানে এসেছে। কী হবে? ও নিজেও জানেনা কী হবে। খালি জানে ওকে নাটক করতেই হবে। আজ নয়তো কাল। হবে, একদিন হবে। বনৎ বনৎ বনি জাই, বিগড়ি বনৎ বনি জাই। দরকার একটা জেদ, একটা পাগল করা জেদ। কিন্তু, ও কি পারবে? ওর কি আছে সেই জেদ? ওর বাবা সলিলকুমারের ছিল। কিন্তু ও যে এক্কেবারে অন্যরকম, ভীতুর ডিম, বাবার মত নয়। দাদুর আদরের নাড়ুগোপাল। কিন্তু ওর ভুতের ভয়, আরশোলাকে দেখে ভয়,বহুরূপীকে দেখে ভয়, সাঁতার কাটতে ভয় , ইনজেকশন নিতে ভয়-- এইসব দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে দাদু সতীশচন্দ্র বলে উঠতেন-"' এইডা সিংহের ঘরে শিয়াল জন্ম নিছে''। হ্যাঁ, ওর বাবা সলিলকুমার চারদিকের খটাশ, ভোঁদড়, সজারু, নেকড়ে আর হায়েনার পালের মধ্যে সিংহ ছিলেন। মরেছেন ও সিংহের মত, অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে। বলতেন-- আমি বিছানায় শুয়ে ভুগে ভুগে তোমাদের সেবা শুশ্রুষা নিয়ে কেঁদে ককিয়ে মরবো না। কাউকে বিরক্ত না করে তার আগেই চলে যাবো। যখন সময় হবে, মানে চিত্রগুপ্তের লেজারে আমার ব্যালান্স "জিরো' হবে, যমদূত নিতে আসবে, বলব-- একটু দাঁড়াও, জুতোর ফিতে বেঁধে পানামা সিগ্রেট ধরিয়ে একটা সুখটান দিয়ে নি। ব্যস্, এবার চল। ভগবান বোধহয় ওঁর মনের ইচ্ছে শুনেছিলেন। তাই ভিলাই স্টীল প্ল্যান্টের কন্স্ট্রাকশন এরিয়ায় মেদিনীপুরের কাঁথি থেকে লেবারের কাজ করতে আসা ছেলেটির ওপর যখন সীমেন্স কোম্পানীর বানানো মোটর কন্টোল সেন্টারের বিশাল এম সি সি মেশিন স্লিপ হয়ে গড়িয়ে পরে পিষে ফেলছিল তখন উনি দৌড়ে এসে দুইহাতে ওই মেশিনটিকে ক্রেট শুদ্ধু ঠেলে ধরে রাখেন। ছেলেটি নীচের থেকে গড়িয়ে সরে গিয়ে বেঁচে গেল। কিন্তু সলিলকুমার আর পেছনে সরে যাওয়ার জায়গা পেলেন না। ফলে ওই মেশিন ক্রমশ: ওনাকে পিষতে লাগল, মাটিতে পেড়ে ফেললো। যখন সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ওনাকে নিয়ে গেল, তখন উনি পরিচিত ডাক্তারকে বল্লেন--- পা টা তো গেছে, মাত্র এক ইঞ্চি আটকে থেকে ঝুলছে। বুটজুতো খুলে দে। ব্যথা লাগছে। কিন্তু এসব কিছু না। আসল হল পেটের ওপর মেশিন পড়ে লিভারে চোট লেগেছে , বড্ড ব্যথা। একটা পেন কিলার ইনজেকশন দাও। তারপর চোখ বুজলেন, আর খুললেন না। পুলিশ ওয়্যারলেসে খবর পৌঁছলো কোরবা জেলার আদিবাসী এলাকায় ছুরি গাঁয়ে। রাত আটটায় খবর পেয়ে হরিদাস পাল তো বৌকে নিয়ে রাত জেগে ভীড়ের ট্রেনে চেপে পড়িমরি করে ভিলাই পৌঁছলো পরের দিন সকালে, বাবার বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে মর্গে ঘুমিয়ে থাকা শরীর থেকে বরফ জল মুছে পোস্টমর্টেম করাতে নিয়ে গেল। পাশের কামরায় ডোম যখন হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে সলিলকুমারের মাথার খুলি খুলে দেখছিল তখন হরিদাস পালের মনে হচ্ছিল যেন গ্যারেজে ট্রাক মেরামত চলছে। কিন্তু যখন চিতায় শুইয়ে সারা শরীরে , বিশেষ করে পেটে-বুকে ডোমের সেলাইয়ের ওপর ঘি মাখাচ্ছিল তখন হাত যেন আর চলে না। পরিচিত পুরুতঠাকুর ধমকে উঠলেন--- কী হল? তাড়াতাড়ি করুন। এমন অন্যমনস্ক হলে চলে! কিন্তু হরিদাস পাল করবে কী? ও যে দেখতে পাচ্ছে যে এই দু 'দিনের বাসি মড়া সলিলকুমার নয়। সলিলকুমার তো এখন মেঘনা নদীতে নৌকো ভাসিয়েছেন। গলুইয়ের পাশে বসে বিড়িতে টান দিয়ে ইয়ারবন্ধুদের সঙ্গে গান ধরেছেন--- মনপাগলা রে! কই হতি কই লইয়া যাও! এরপর উনি ডুব দিয়ে পাট তুলবেন বেশকিছু। তারপর সেই পাট মহাজনের কাছে বেচে বন্ধুদের সঙ্গে রসগোল্লা কিনে খাবেন। বাবা মাছ আনতে আট আনা দিলে ময়মনসিংহের বাড়ির চৌকাঠে সেই পয়সা নামিয়ে রাখছেন সলিলকুমার। না, পুরো একটাকাই চাই। সেটা দিয়ে অন্তত: দুইসেরি বা আড়াইসেরি রুই মাছ কিনবেন। বাড়ির চাকর সেটা পেছন পেছন নাকের থেকে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি আনবে, আর মাছের লেজ সারা রাস্তা পথের ধুলো সাফ করতে করতে আসবে। এই না হলে বাঙাল! দেশভাগের পর পার্কসার্কাসের বাড়িতে সামনের ধাঙড় বাজারের কিছু গুন্ডা আক্রমণ করল, সময়মত গুরুসদয় দত্ত রোডের ছাউনি থেকে কিছু গোরা সৈন্য ও কড়েয়া থানার পুলিশ এসে পড়ায় কোন জানমালের ক্ষতি হয়্নি। সলিলের বড়দি সেই গুন্ডাদের চিনিয়ে দিলেন। ওরা হাজতে রইল। তারপর পাড়ার একজন রাজনৈতিক নেতা গুন্ডাদের মুক্তির জন্য জনগণের সইসাবুদ সংগ্রহ করতে বেরোলেন। ক্রুদ্ধ সলিল ওই পিটিশনে সাইন করতে অস্বীকার করলেন। বল্লেন-- অরা ঠিক জায়গাতেই আছে, অদের উপযুক্ত জায়গায়। কিন্তু ভিলাইয়ে দাঙ্গাবাঁধার উপক্রম হলে সারারাত অফিসের জীপ নিয়ে উত্তেজনা যাতে না ছড়ায় তার জন্যে টহলদারি করেছেন। নিজের মুসলমান কর্মচারিদের সঙ্গে একসাথে বসে খেয়েছেন। হালাল ও ঝটকা মাংস নিয়ে কেউ কিছু বললে বলতেন -- নেতাজী সুভাষ বোস বর্মায় থাকার সময় খাবার লাইনে ঝটকা-হালাল নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেপাইদের দুই আলাদা পংক্তিতে খেতে বসা দেখে অবাক হয়ে দুইবাটির আলাদা মাংস একটি বালতিতে ঢেলে নিয়ে রেগুলেশন সোর্ড দিয়ে ঘেঁটে দিয়ে বলেছিলেন, এবার কোনটা ঝটকা আর কোনটা হালাল পদ্ধতিতে রান্না মাংস কেউ চিনিয়ে দিক তো। আর যে ছেলেটাকে আজ বাঁচাতে গেলেন বছর আগে সেই ছেলেটারইতো মে মাসের গরমে হিটস্ট্রোক হয়ে প্রচন্ড জ্বর আর বমি হয়েছিল। সবাই ধরাধরি করে গাড়িতে করে বাড়ি এনে ওকে মাটিতে শোয়ালো। স্ত্রী স্মৃতিকণা ঘাড়ের নীচে কাগজ দিয়ে মাথায় জল ঢালছেন। কিন্তু ঠিকমত হচ্ছে না।সলিল ভ্রূ কুঁচকে দেখছিলেন। এবার ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বল্লেন-- এবার ভাল করে মাথা ধুইয়ে দাও। সেইদিন হরিদাস পালের চোখে ওর বাবার হাইট অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সবার কাছে বাবা-মা রা রোল মডেল। কিন্তু হরিদাস পাল রনজনের রোল মডেল ওর বাবা নয়। ও জানে ও কোনদিন ওর বাবার মত হতে পারবে না। সলিলকুমার অন্য ধাতুতে গড়া। দেখতে কিঞ্চিৎ কাঠখোট্টা ভদ্রলোকের ভীষণ ম্যানলি পেটানো চেহারা। যখন মহিলাদের সামনে একটু ঝুঁকে বাও করে কাউকে বলেন----" ভাল আছেন? ভাল থাকুন' , তখন সেই "" অদা'' দেখে ওরা দু'ভাই বাবার শিভালরাস নাইট ইমেজের প্রতি ফিদা হয়ে যায়, কিন্তু ভীষণ জেলাস হয়। হরিদাস পাল মেয়েদের সামনে আজীবন দড়কচা মেরেই রইল। আবার সলিলকুমারের চোখে রোলমডেল তাঁর মাতৃভক্ত বাবা সতীশচন্দ্র ন'ন। যে ভদ্রলোক কোলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লি যাবার সময় মায়ের কথায় চাকরি ছেড়ে ময়মনসিংহ ফিরে যায় সে ঠিক পুরুষকারে বিশ্বাসী সলিলকুমারের শ্রদ্ধার পাত্র হতে পারে না। -----বিপ্লব করবি? বিপ্লবের মানে বুঝস্ ? বিপ্লব করতে অইলে নিজের নিজের ডেথ ওয়ারেন্টে নিজে সাইন কইর্যা তবে পথে নামতে হয়। তর আছে সে সাহস! -------তোমরা না সেই আনন্দমঠের যুগে পড়ে আছ। তোমাদের মেটাফরগুলো না!---- ----- আরে, তোদের যারা খেপাইতাছে সব ভীতুর ডিম। চিন ও ভীতু। দ্যাখ, বুড়া হো চি-মিন হাঁটুডুবা ধানের ক্ষেতে দাঁড়াইয়া এত মেন্নত কইর্যা ভিয়েতনামরে স্বাধীন করলো, এখন তাদের জমিতে চিন আর আমেরিকার প্রক্সি ওয়ার হইতাছে। যা শত্রু পরে পরে! হিম্মত থাকলে সামনাসামনি লড়াই করুক না। নেফায় লাদাখে খুঁচাখুঁচি করা এক আর নাপামবৃষ্টির সামনে দেশের লোকজনেরে আগাইয়া দেওয়া আর এক। মাও সে তুং ও ভীতু। আর তরা প্যাট ব্যাক্কল। ---কী ভীতু-ভীতু শুরু করেছ, গোলপোস্ট ঠিক কর। --- শোন, ভীতু লোকেরাই লোভী, কুচক্রী, ষড়যন্ত্রকারী হয়। ভীতু লোকদের থেকে সতর্ক থাকবি, এরা তোষামুদে হয়। -----তুমি ভয় পাওনা? কোন ভয় নেই এমন কেউ আছে! --- ধ্যাৎ,কখনো ভয় পায় নাই এমুন হয় না। সবার চেয়ে বড় হইল মৃত্যুভয়। সবারই ভয়ের জায়গা আছে, রাজারও আছে, প্রজারও আছে। ছাগা যেমুন বাঘারে ডরায়, বাঘাও ছাগারে ডরায়। কিন্তু ভয় পাওয়া এক কথা আর ভীতু হওয়া এক কথা। --- মানে? -- মানে ভয় পাইলে তারে যুক্তি দিয়া বিচার কইর্যা সামনা করতে হইব। বুঝতে হইব বেশিডা কী আর হইব! মরতে হইব,এই ত? তার লেইগ্যা আইজ যদি চৌখ্যের সামনে মাইয়ামানুষের প্রতি অত্যাচার দেইখ্যা চুপ কইর্যা থাক,তা হইলে তুমি ভীতু। আরে, কাইল যদি সেই মাইয়া তুমার বইন হয়, বউ হয়, বেটি হয়! ----- অরা যদি সংখ্যায় বেশি হয়? ------- মেয়েদের বাঁচাইতে হইব, যেমনে পার, পলাইলে ওদের সঙ্গে নিয়া পলাইবা। না পারলে -- ---- হ, না পারলে কি করন? ------ না পারলে মরতে অইব, আর কোন বিকল্প নাই। (চলবে)

412

29

জেমস

আজকের আপডেট

আজকের আপডেট-৩৫ রাজু বন গয়া ট্রাভেলার! ছুটি যাকে হলিডে বলে তেমন করে নেয়া হয়নি| অ্যানুয়াল লীভ খরচ হয়েছে 'বাড়ী' যেতে| সে বিহার থেকে হোক‚ বম্বে থেকে‚ ব্যাঙ্গালোর থেকে‚ মেলবোর্ন যেখান থেকেই হোক| এখন অনুশোচনা হয়‚ কিন্তু! চললাম কুইন্সল্যান্ডে‚ গোল্ড কোষ্টে‚ ব্রিসবেন| অনেক লম্বা সফর‚ প্রায় ১২০০ কিমি| ড্রাইভ করেই অবশ্য| উড়ে গেলে কোথাও যাচ্ছি ‚ বোধই হয় না; আবার এদেশে রেল যোগাযোগ নেই বললেই চলে| যারা ট্রাক চালায়‚ গাড়ী বেচে তারা লবি করে হতে দেয়নি| ৭০০ কিমি মেলবোর্ন অবধি একটানা ‚ মাঝে দুবার আধঘন্টার বিরতি‚ যাবার অভ্যাস আছে| শেষদিকে মনে হয় রাস্তা আর ফুরোয় না বিশেষ করে ফেরবার সময়| গৃহিণী সাথ দেন গাড়ী চালিয়ে‚ তবে সে নামকা ওয়াস্তে‚ বরং ফোড়ন কাটতেই তিনি দড়; ট্রাককে যেতে দাও‚ কত স্পীডে যাচ্ছো এখানে ১১০‚ আমি চালাবো? ব্যস ঐ অবধি| সবকিছু মোটামুটি প্ল্যানড| কোন রাজকার্য্যে তো যাচ্ছি না‚ অতএব দুটো স্টপ| ক্যারাভান পার্কের ফিক্সড কেবিন ও অন্যটা সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট| কারণ কিচেন থাকতেই হবে‚ কে আর কোথায় খানা মিলবে তার জন্যে ঘুরে মরে| অবশ্য এইসব কেবিনে‚ ঘরে থালা ঘটি বাটি‚ চুলা‚ কাপ ডিশ ‚ মায় ঝাড়ু‚ ডিশওয়াশিং লিকুইড অবধি থাকে| শর্ত কেবল যেমনটি নিয়েছো ঠিক তেমন অবস্থায় কিচেন ফেরৎ দিতে হবে| প্রথম স্টপ পাঁচঘন্টা বাদে‚ নিউ ক্যাসেল| পরেরটা কফস হারবার| শেষেরটার বিশেষত্ব‚ সেখানকার টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে ৭০% পদবী সিং‚ গুরুদ্বারাও আছে| ইচ্ছে আছে সেখানে লঙ্গরে হাজিরা দেবার| কালকের ব্রেকের জন্য‚ খিচুড়ী ও ডিমের ডালনা উইথ লেফট ওভার মুলো‚ কুমড়ো‚ শাক‚ গাজর‚ ব্রকোলির ঘ্যাঁট| সব এক সাথে আলাদা আলাদা take away কন্টেনারে‚ মাঝপথে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য| -- মেয়ে এসেছিল পাক্ষিক ভিজিট দিতে| গাড়ী ভর্তি করে রান্না খাবার দাবার ভাগে ভাগে বাক্স করে নিয়ে যেতে| আরও কাজ আছে‚ বাবা গাড়ী ধুয়ে দেবে‚ তেল জল চেক করবে‚ কাচ মুছে দেবে‚ চাইকি গাড়ীর হাওয়া দিয়ে নিয়ে আসবে| অনেক কথা হচ্ছিল‚ আমি দু:খ করছিলাম‚ কি কি মেজর ভুল করেছি তা নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর| অবাক কান্ড‚ সে বলে কিনা সবাই যদি পারতো‚ তো ঠিক পথেই যেত‚ কিন্তু তা কি সম্ভব? আমার সন্তান আমাকেই সান্ত্বনা দিচ্ছে| কিন্তু মন্দ বলেনি সে| দেখি কালকে আবার আপডেট দেয়া যাবে|

1520

146

Dalia2017

বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রম ( ৩য় পর্ব) :::::::::::::::::::::::: আবার ধরলুম কাগজ কলম| গত ৬ মাসে যেন লেখার সাথে কোন সম্পর্ক ছিলনা‚ কেমন যেন হয়ে গেছিলুম| এটাও বোধহয় বুড়ো বয়সের একটা দোষ| কিন্তু পরে ভাবলুম‚ এভাবে তো কাটাতে পারবনা| তাই এই গভীর শোক কে ঠেলে দুরে ফেলে দেবার চেষ্টা কোরলুম| ফিরে এলুম আমার প্রিয় আড্ডাতে| সকলকে দেখে মনটা আনন্দে ভরে গেল| কতদিন পরে সকলকে দেখছি‚ শুনছি তাদের ডালিয়াদি ডাক| যাক‚ এবারে লিখব আর আলজাইমারের ওপরে| এই আলজাইমার একটা ভীষন মানসিক অসুখ| এটাকে পাগল হয়ে যাবার আগের পর্যায় ও অনেক সময় ডাক্তাররা বলে থাকেন|এ রোগ ও আমার নিজের চোখে দেখা| এই রোগে অনেক সময় মানুষের হিতহিত গ্যান থাকেনা| আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে একজন এই আলজাইমার মহিলা ছিলেন‚ দিব্যি আছেন আমাদের সাথে| হঠাৎ কান্না শুরু করলেন| কি হয়েছে? কোন উত্তর নেই| তারপরে তার স্বামীকে ফোন করা হোল‚ স্বামী এলেন| উনি এসে যা বললেন‚ চমকে যেতে হয়| ভদ্রলোক বল্লেন‚ "আমাদের একটি ৩ বছরের ছেলে মারা যায়| তারপর থেকে আমার স্ত্রীকে এই আলজাইমার রোগে ধরে| অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি‚ অনেক অসুধ খেয়েছে‚ এখনো খায়| কিন্তু কোন উপকার হয়না| এমনকি রাতে ঘুমের ঘোরে বাইরে বেরিয়ে যয়‚ ৩ বার পুলিশ গিয়ে ধরে নিয়ে এসেছে| আমার ও তো কাজ আছে‚ দিনরাত এইরকম একটা রুগীকে কি করে দেখি? তাই সপ্তাহে ৩ দিন এখানে পাঠাই‚ তাও জোর জবরদস্তি করে| বাড়িতে এটা ওটা ছুড়ে ছুড়ে ফেলে‚ ভান্গে| তারপরে হঠাৎ দেখি মাইকে আর আসেন| কি ব্যপার? না মাইকে কে আর বাড়িতে রাখা যায়নি‚ তাকে ""ডিকথার"" বলে একটা হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে| এই ডিকথার কি? এটাকে আলজাইমার রুগীদের হাসপাতাল ও বলা যেতে পারে| বিরাট একটা বড় বাড়ি আর খুব উচু পাচিল দিয়ে ঘেরা| ( চন্দ্রবিন্দুটা দিতে পারছিনা)| ভেতরে আলজাইমার রুগীদের খেলাধুলো‚ বাগানে বেড়ানো‚ সব ব্যবস্থা আছে| খাবার সময় খাবার দেয়| কিন্তু গেটের বাইরে বেরোতে পারবেনা| এইখানেই তাদের চিকিৎ্সা চলে| কেউ যদি ভাল হয়‚ তবে বাড়ি যেতে পারে‚ তবে খুব কম লোকই ভাল হয়|হল্যান্ডে এইরকম ডিকথার আছে কিছু| সব গুলো ই প্রায় ভর্তি| মাইকে যখন ভাল থাকত‚ কত কাজ করে দিত| খাবার টেবিল গোছানো ‚ খাবার পরে টেবিল থেকে বাসন গুছিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া‚ এইভাবে সাহায্য করত মাইকে স্বেচ্ছাসেবিকাদের| কিন্তু এই আলজাইমার রোগ চরমে উঠলে মেয়েটি একেবারে বদলে যেত| এইসব রোগের জন্যেই বৃদ্ধাশ্রমে আমাদের মাথার কাজ করায়| যেমন কুইজ‚ অন্গ| ৪+৩ কত হয়? ৩_২ কত হয়| খুব হাসির ব্যপার‚ তাইনা? তোমার আমার কাছে কিছুই নয়‚ কিন্তু এমন বৃদ্ধবৃদ্ধা আছেন‚ যাদের এই জিনিস ই বের করতে ২০ মিনিট সময় কেটে যায়| আবার পরের বারের জন্যে কিছু লিখব‚আজ থামি|

404

31

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

1091

88

stuti..

ছাইপাঁশ

দোয়াত কলম ---------------------- উপহার কেনা মহা ঝামেলা । প্রথমে ভাবতে হবে নিমন্ত্রণের উপলক্ষ কি ? তারপর যাকে উপহার দেব তার পছন্দ কি রকম । হাজার ঝামেলা । তাই নিমন্ত্রন এলে সোনালী মোরকে ভরে টাকা দিয়েই কাজ সারি । যে যার পছন্দ মতন জিনিষ কিনে নেবে । আগামীকাল এক উপনয়নে যেতে হবে । একসময় উপনয়নে পেন উপহার দেবার খুব চল ছিল । হঠাত ইচ্ছা হল পেন উপহার দেব ।আজকাল কিছু কিনতে গেলেই মলে যেতে হয় । গেলাম মলে ।মলে হাজার জিনিষের হাজার দোকান থাকে । কিন্তু বই বা পেনের দোকান একটি থাকে বা থাকে না ।অনেক খুঁজে বইর দোকান পাওয়া গেল। সে দোকানে পেন থাকলেও বেশীরভাগই বল পয়েন্ট এবং ইউজ এন্ড থ্রো । আর কিছু পেন আছে দাম লাখ টাকার কাছাকাছি । মনে হয় সেসব পেন দিয়ে MOU সই হয় । উপহার দেবার মত পেন পাওয়া ভার । অনেক কষ্টে পার্কার কোম্পানীর পেন ,মানিব্যাগ , পেন ড্রাইভ সহ এক সেট পাওয়া গেল । সেটাকেই বগলদাবা করে বাড়ী এলাম । আগে ভাল পেন কেনা এত কঠিন কাজ ছিল না । তখন অবশ্য পেন বলতাম না বলতাম কলম । আদিকালে লেখা হত পালক দিয়ে তারপরে এল খাগের কলম । কালিতে চুবিয়ে লিখতে হত । কলমের সাথে কালির এক অটূট বন্ধন । নতুন কলম কিনলেই সাথে এক দোয়াত সুলেখা কালি কেনা হত । কেউ কেউ শখ করে বলপয়েন্টে লিখত । কিন্তু পরীক্ষার খাতা ,ব্যাঙ্ক ,পোষ্টাপিসের কাজকর্ম বলপয়েন্টে চলত না । আর শুনতাম বলপয়েন্টে লিখলে নাকি হাতের লেখা খারাপ হয়ে যায় । সেসময় সুন্দর হাতের লেখার খুব কদর ছিল । ছোটবেলায় পড়াশুনার শেষে রোজ একপাতা করে হাতের লেখা করতাম  । এখন কীবোর্ডের জোয়ারে হাতের লেখা কালি কলম সব ভেসে গেছে । ক্লাস ফাইভে প্রথম পেন দিয়ে লেখা শুরু করি ।সে কি উত্তেজনা ।জানুয়ারী মাসে নতুন বই খাতার সাথে পেন কেনা হল। প্লাসটিক বডি সাথে এক দোয়াত সুলেখা কালি ও ড্রফার  ।দিদিমা বললেন এই সুলেখা নাকি তাদের সাথে স্কুলে পড়েছে ।সেই শুনে কলম দিয়ে লেখার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গেল । পেনের মাঝখানটা খুলে ড্রফার দিয়ে কালি ভরা হল  । সাদা কাগজে হাত চালাতেই । নীল কালিতে মোটা মোটা অক্ষর ফুটে উঠল । উফ সেকি অনাবিল আনন্দ উচ্ছাস । লেখা শুরু। কিন্তু কালির কলম মাঝে মাঝেই মহা বিড়ম্বনায় ফেলত আমাকে । অঙ্কের উত্তর না মিললেই পেনসিল চিঁবিয়ে আধখানে করে ফেলতাম  । মাঝে মাঝে কলমের পেছনও চিঁবিয়ে ফেলতাম । ব্যস চিত্তির  । স্কুল থেকে ফিরলাম হাতে মুখে জামায় কালির ছোপ । ঠাকুমা বলতেন - হাতে কালি মুখে কালি বাবা আমার লিখে এলি  । মার বকুনি ।আবার নতুন পেন কিনতে দোকানে ছোটা । কারণ আমাদের একটাই কলম থাকত । একাধিক কলম রাখার বিলাসিতা ছিল না । বাবার হাতের লেখা খুব সুন্দর । লিখত ফাউন্টেন পেন দিয়ে । ফাউন্টেন পেনের বাঙ্গলা নাম ছিল ঝরনা কলম । সে পেনেটি বেশ সরু ।কালো বডি সোনালি ঢাকনি , ভিতরে ইনবিল্ট ড্রপার ছিল । বাবার কাছে আর একটি পেন ছিল একটু মোটা মত ।সেটা আলমারীতে বাক্স্বর মধ্যে সযত্নে শুয়ে থাকত । শুনতাম ওটা পার্কার পেন । বিশেষ কাজে ব্যবহার করা হত । আমাদের বাড়ির দলিল সই করার সময় ওই পেন দিয়ে লিখতে দেখেছি । খুব লোভ ছিল ঐ কলমের প্রতি । কিন্তু বাবার কলম হাত দেওয়া বারণ তবু সুযোগ পেলেই একটু হাত বুলিয়ে নিতাম পেনটায় । একদিন অফিসে বাবা পেনটা হারিয়ে ফেলল । বাবার কতটা মন খারাপ হয়ে ছিল জানিনা । কিন্তু আমি প্রচণ্ড মন খারাপের চোটে শয়নে স্বপনে সে কলমের ভুত দেখতে থাকলাম  । প্রতি বছর ভাইফোঁটায় মামা মাকে ঝরনা কলম উপহার দিত । তাই ঝরনা কলমের স্টক মার কাছে ভালই ছিল । পুরানোগুলো দিয়ে মা রোজকার জমাখরচের খাতা লিখত । মা বলত বড় হলে ভাল ঝরনা কলম কিনে দেবে । স্বপ্ন দেখতাম ঝড়না কলমের ঝড়না বইছে আমার হাত দিয়ে । কিন্তু আমি বড় হতে হতে বলপয়েন্টের জোয়ারে ঝড়না কলম সমুদ্রে পাড়ি জমালো । এখন কালির কলমে হাত ও চলে না । এখন মনেহয় কবি সাহিত্যিকরা রাত জেগে কলম দিয়ে গল্প কবিতা লেখেন না ।কলমের জোড় কথাটা আসতে আস্তে উঠে যাচ্ছে । এখন চলছে কীবোর্ডের ঝড় ।

655

82

জেমস

চুপ চাপ- একা একা

চুপচাপ একা একা -২৫ যাত্রার শুরু- দো'কা জীবন ব্যাঙ্গালোর‚ নতুন শহর‚ নতুন ফ্যাক্টরিতে চাকরী‚ নতুন টেকনিক্যাল এরিয়া| সবই নতুন| ভাষা নতুন‚ রাস্তাঘাট বাড়ী ঘরদোরের ডিজাইন আলাদা‚ লোকজনের মুখের আড়া ভিন্ন‚ ক্যান্টিনে রেস্টুরেন্টে খাবার ভিন্ন| একেবারে সবই নতুন প্রায়‚ নতুন করে শুরু| মানুষের স্বভাবই পরিবর্তন পছন্দ না করা‚ আমার তো আরও বেশী; বরাবরের ঘরকুনো‚ বন্ধুবান্ধব পালটাই না‚ প্রেমিকা(?) অবশ্য বদলায় তবে তাতে আমার কোন হাত নেই‚ তারাই বদলায় আমাকে| (২) এখন সমস্যা হলো থাকবার জায়গা‚ মাথার উপর একটা ছাদ| বন্ধুর ছিমছাম ভাড়াবাড়ী দেখে ইন্টারভিউ দেবার সময় ভেবেছিলাম‚ ওরকম কিছু না কিছু আমারও জুটে যাবে‚ ভাড়াও সাধ্যের বাইরে নয়| এখন তো পোড় খাওয়া পার্টি‚ তখন ইন্টারভিউ এর সময় টাকা বেশী না চেয়ে‚ কোয়ার্টার পাওয়া সাপেক্ষে চাকরী নেয়ার শর্ত দিলে কি এই অবস্থা হতো| (৩) এস্টেট এজেন্টদের কাছে ঘোরাঘুরি করি‚ এই প্রথম বাড়ীর দালাল কি জিনিষ তার পরিচিতি লাভ হলো| অটো রিকশা করে এমন এমন জায়গায় গিয়ে থামে যে বাড়ী দেখবার ইচ্ছাই করে না| আজন্ম ফাঁকা বাড়ীতে থেকে অভ্যাস‚ সে যখন মাটির বাড়ী ছিল তখনও| ইন ফ্যাক্ট সেই মাটির বাড়ীতে যা আরাম তা আর কোথাও পাইনি| টিনের চাল‚ উঁচু plinth‚ একটাই ঘর কিন্তু চারি পাশে বারান্দা‚ যারে verandah কয়! নদীর ধারে বাড়ী‚ দক্ষিণমুখো‚ গ্রীষ্মকালে ফুরফুরে বাতাস| অনেকগুলো এরকম বাড়ী মিলে আমাদের পরিবারের cluster‚ বিশাল উঠোন‚ আমবাগান| পরে যখন পিতাশ্রী‚ কাকাশ্রী আর্থিক সম্পন্নতা লাভ করলেন‚ পাশের জমির লোক বেচে কিনে চলে যাওয়াতে সব মিলিয়ে পেল্লায় দালান হাঁকালেন| প্রায় এক একর জমি নিয়ে আমাদের বসতবাটী| এখনও সেই দালান কোঠাই আমার বাড়ী| পরে অবশ্য বিভিন্ন হস্টেলে আমার আবাস; সেসবও মন্দ নয়‚ খোলামেলা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন| তারপর শিল্পনগরী| মাঝে অবশ্য কলকাতায় এক বছর বৌবাজারের মেসে‚ বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে তৈরী পলেস্তারা খসা বাড়ী! কিন্তু তখন তো মনে আশা‚ ভাল চাকরী পেয়ে গেলেই এই মেসে তো থাকবো না| তবে এই মেসজীবনের অভিজ্ঞতাও এখন সুখের স্মৃতি‚ সে এক আলাদা জগৎ‚ একেবারে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে উঠে আসা| সে বিষয়ে অন্যত্র লেখা যাবে| (৪) এমন লোকের ভাড়া বাড়ী পছন্দ হওয়া মুশকিলের তার উপর সাধ্য অতি সীমিত| মাস দুয়েক আগে বিয়ে হয়েছে‚ বাড়ী যাওয়ার ট্রেন ভাড়া‚ চাকরীতে যোগ দেবার জন্য ট্রেনভাড়া‚ বিয়েতেও একখানা বেনারসী ও নিজের পাঞ্জাবী কিনতেও পকেট খরচ‚ তা সে অতীব শস্তা পাটসিল্কের বেনারসী হোক না কেন| আমার এক বন্ধু বলতো-জুটোলীন‚ টেরিলিনের আদলে| বিয়েতে আগড়োম বাগড়োম থালা গেলাস‚ বিছানাপত্রের বদলে আমি পাত্রীপক্ষকে মূল্য ধরে দিতে অনুরোধ করি‚ কারণ দশ মাসের ভাড়া অ্যাডভান্স দিতে হবে! দহেজ‚ যৌতুক? May be! তাঁরাও এমন কিছু রকফেলার নন| আমার তখনকার অবস্থা এখনকার ভাষায় যাকে বলে‚ ঘেঁটে ঘ| আসলে স্টেজে মেরে দেবার অভ্যাস কিনা‚ বিয়ে তো করলেই হলো না‚ বিয়ে করলে বউ থাকবে‚ থাকবার বাড়ীর প্রয়োজন হবে‚ এসব তেমন করে ভাবিনি| আমিই বর‚ আমিই বরকর্তা! সত্যি বলতে কি‚ ভাল চাকরী পেলে ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজী‚ যখন আমার সেই শুভানুধ্যায়ী সিনিয়র কলীগকের স্ত্রীকে বলেছিলাম‚ তখন নতুন ভাল চাকরী পাওয়াই priority ছিল‚ বিয়ে থা? ও পরে দেখা যাবে| যখন পুরো ব্যাপরটা বোধগম্য হতে শুরু করেছে‚ দ্বিতীয়বার মেয়ে দেখাবার দিন এলো আমি চাইছিলাম কোন honourable way out! মেয়েটিই যাতে আমায় নাকচ করে সেই হেতু একটা পকেট ছেঁড়া দুপকেটের জামা পরে যাই| (৫) কিন্তু‚ নিয়তি কেন বাধ্যতে! বিয়ে হয়েই গেল আর আমি? চিরদিনের বোহেমিয়ান আমি‚ যাঁতাকলে আটকে পড়লাম| নাহ‚ বাড়ী আর পাইনি‚ সাধ ও সাধ্যের অনেকখানি ফারাক যে| ওদিকে বন্ধুর বাড়ী থেকে বেরোতে হবে‚ তার মা আসবেন| অগত্যা অফিসেরই এক কলীগের সাহায্যে একটি চিলেকোঠা পাওয়া গেল| চিলে কোঠা‚ তাই সই| ঝকঝকে পরিস্কার‚ লাগোয়া টয়লেট‚ সেখানেই বালতী ভরে চান‚ একটু এদিক ওদিক হলেই টয়লেট Bowl এর পুণ্য স্পর্শ| সিঁড়িতে উঠে বেশ কিছুটা ল্যান্ডিং‚ ব্যালকনি ও বিস্তীর্ণ ফাঁকা ছাদ| (৬) আগষ্টে কাজে যোগ দিয়েছি আর সেবার সেপ্টেম্বরে পুজো| এদিকে নতুন চাকরী‚ সবেধন সাতটি মাত্র ক্যাজুয়াল লীভ বছরে‚ তাও ভাঙ্গা বছরে pro rata! বাড়ীর তো ঐ অবস্থা| ব্যাঙ্গালোর থেকে শ্বশুরালয় তখন দুদিনের দূরত্ব‚ তাও ডাইরেক্ট ট্রেন নেই| এখনকার নব্য চাকুরেদের মতো নয় যে ইচ্ছে হলো তো উড়ে গেলাম! পুজোতে আবার মাত্র একদিনই ছুটি‚ বিজয়া দশমীর দিন ওরা আয়ূধ পুজো করে| এদিক সেদিক করে‚ রবিবার জুড়ে চললাম| কি করে রেলের টিকিট কিনেছিলাম‚ পেয়েছিলাম এখন আর মনে নেই| বহুদিনের ব্যাচিলর থাকার অভ্যাস কেটে গেছে বুঝতে পারি‚ আমি যে আর একা নই ধীরে ধীরে মাথায় গেঁথে উঠছে| (৭) পুজো শেষ‚ 'ফিরে যেতে হবে আজি দূর কর্মস্থানে'! কবি অত্যন্ত সহৃদয়‚ আমার কথা ভেবে লিখে গেছেন| কিন্তু চিলেকোঠায় রান্নাঘর বিহীন বাসায় সংসার কি প্রকারে পাতিতে হয়‚ সে বিষয়ে তিনি নীরব| একাই ফিরে আসবো এরকমই ঠিক ছিল কিন্তু আমার সেই সিনিয়র কলীগের স্ত্রী মিসেস দত্ত কেন জানিনা কোন কথা মানতেই চাইলেন না‚ আর আমিও স্ত্রী সমভিব্যাহারে ব্যাঙ্গালোর ওয়াপস| আবার ও রেলের টিকিট ও রিজার্ভেশন কি করে পেয়েছিলাম মনে করতে পারছি না| তখন তো নেট বা irctc.co.in ছিল না| ছিল তারের নেটের জানালার ওপারে বুকিং ক্লার্ক‚ বিশাল বিশাল জাবেদা খাতা আর বিশৃঙ্খল লাইন| (৮) অতএব কোন এক শারদ প্রভাতে ট্রেন ব্যাঙ্গালোর সিটিতে ইন করলো| বেচারী আমি‚ অস্ফীত পকেট ও সঙ্গী সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী| আচ্ছা ঈশ্বরের কিরকম উলটো বিচার| এখন হলে? ঈর্ষা করিনে তবু নতুন নতুন ছেলেদেরকে দেখি‚ বিদেশে চাকরী করতে শুরু করেছে‚ অল্প বয়স‚ গাড়ী বাড়ী সবই মজুত| আমি তো এত কিছুই চাইনি| আমার বাড়ীওয়ালা গোঁড়া কানাড়া ব্রাহ্মণ‚ দয়াপরবশ হয়ে চিলে কোঠা ভাড়া দিয়েছিল‚ ব্যাচিলর মানুষ‚ রাঁধবে বাড়বে না| ঠিক আছে‚ থাকুক‚ এমনই অ্যাটিচিউড| বলতে গেলে ভয়ে ভয়েই গিয়ে পৌঁছুলাম| বাড়ীওয়ালার স্ত্রী দেখলেন‚ কি যেন বললেন; আমিও কানাড়া বুঝি না তিনি হিন্দী বা ইংরেজী কোনটাই না| আসবাবপত্র বলতে তো মেঝেতে পাতা বিছানা‚ একটা স্টীলের গেলাস আর প্ল্যাস্টিকের জাগ| নতুন বউকে সব কিছু দেখিয়ে ‚ বুঝিয়ে দিয়ে আমি ফ্যাক্টরির পানে‚ ছুটি কই আর! এতদিন ভোজন তো যত্রতত্র‚ দুপুরে অফিসার্স ক্লাবে রাত্তিরে উডুপী হোটেল| সকালের প্রাত:রাশ অফিসের ক্যান্টিন থেকে ট্রলি করে মাখন মাখানো কাঁচা পাঁউরুটি আর কফি| আহা সে কি স্বাদ‚ কফি ডুবিয়ে মাখন স্যান্ডউইচ‚ এখনও ভুলিনি| কিন্তু এখন? এখন তো আর একজন মানুষ বাড়ীতে রেখে যেতে হচ্ছে‚ এত কিছু তো ভাবিনি| অবশ্য কোনদিনই বা পরে কি হবে‚ ভবিষ্যতে কি হবে ভেবেছি‚ কচুরী পানার মতো স্রোতে ভেসেই চলেছি| কাছের কর্ণার শপ থেকে একটা পাঁউরুটি আর কলা কিনে রেখে আমি কাট| 'মাথা খাও‚ ভুলিয়ো না খেয়ো মনে করে'? এখন নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করে আমার অবিবেচনার জন্য| এই সেদিনও তাই ভাবছিলাম হাসপাতালের এমার্জেন্সীর বেডে বিবিজান শুয়ে‚ এটা সেটা টেষ্ট চলছে‚ আমি ভাবছি আর ভাবছি| আমি নাহয় ভাইবোন সকলের দায়িত্ব নিয়ে শুধুই সামনেই এগিয়ে চলেছি একটু স্থায়িত্বের আশায়‚ একটু সচ্ছ্বলতার আশায়‚ সে তো কোন দোষ করেনি| তার সাদামাটা বিয়ে হলে এভাবে আমার সঙ্গে ছুটে মরতে হতো না‚ আর পাঁচটা মেয়ের মতো তারও ছিমছাম ধীর স্থির সংসার হতো‚ আমি চেয়েছি অথবা পেয়েছি এই জীবন‚ সে তো চায়নি! (৯) ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে অবাক| বাড়ীওয়ালার স্ত্রী তাকে ডেকে নিয়ে‚ মানে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে আর কি‚ দুপুরে ভাত সম্বর খাইয়েছেন| আমি তো আমতা আমতা করে বলছি‚ একটা বাড়ী পেয়ে যাবো‚ গেলেই ছেড়ে দেবো| প্রায় সপ্তাহখানেক চললো রাত্তিরে হোটেলে খেয়ে‚ দুপুরে কি খেয়ে থাকতো এখন আর মনে নেই| তবে একদিন বাড়ীওয়ালার স্ত্রীই বললেন‚ সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে যে প্রশস্ত জায়গা আছে‚ সেখানে আমরা রাঁধতে পারি| এটা কিন্তু অনেক উদারতার পরিচায়ক‚ বিনা রান্নাঘরে রান্নাবান্না করলে সিলিং ও দেওয়ালের কি যে অবস্থা হয়! আমাদেরও কষ্ট হতো‚ রোজ হোটেলে খাওয়া| গ্রীন সিগন্যাল মিলতেই সোজা জয়নগর ফোর্থ ব্লকের শপিং ম্যল| হ্যাঁ‚ তখনই এই শপিং সেন্টার নতুন তৈরী হয়‚ ব্যাঙ্গালোরেই প্রথম| আজকালকার মতো না হলেও সবই ছিল একই বিল্ডিং এ| সেখানকার সুপারমার্কেট থেকে এক লপ্তে‚ অ্যালুমিনিয়ামের কড়াই‚ ডেকচি‚ দু একটা পাতলা গামলা (যার আধুনিক নাম মিক্সিং bowl) ও একটি পারফেক্ট ব্রান্ডের কেরোসিন স্টোভ| ওখানে বোধহয় হাঁড়ির চল ছিল না‚ ঐ ঢাকা দেয়া ডেকচিতেই ভাত রান্না| ছাদে একটা কল ছিল‚ সেখানেই বাসন মাজা| তবে হাঁ‚ শুক্লপক্ষে ছাদটাকে মোহময় লাগতো‚ হাত বাড়ালেই নারকেল গাছের মাথা| সহৃদয় পাঠক‚ এত বছর বাদে‚ এত শহর ঘুরে‚ এত এত বাড়ী পালটেও সেই ডেকচি‚ কড়াই ও পাতলা গামলা এখনও আমাদের কিচেন কাবার্ডে শোভা পাচ্ছে| আর সেই Perfect স্টোভ‚ সত্যিই পারফেক্ট বটে| প্রতি রবিবার আমার অবশ্য কর্ম ছিল‚ তার পলতে কেটে সমান করা‚ ঝাড়পোঁছ করা; কি সুন্দর ব্লু ফ্লেম হতো এই এখনকার জার্মান গ্যাস কুক টপের চেয়ে কোন অংশে কম নয়! সেই কড়াই‚ সেই একই ডেকচি ; তফাৎ কেবল শহরের‚ বাড়ীর‚ কুকটপের| মালিক মালকীন অবশ্য একই রয়ে গেছে| একই কি? মাঝে কেটে গেছে একটা আস্ত জীবন!

1322

165

নব ভোঁদড়

আফ্রিকান সাফারি

স্যামিকে ফেলে চলে যেতে একটু বিবেক কুড়কুড়োচ্ছিল| তা রেঞ্জারদের হুড়ো দিয়ে বিবেক একটু ঠান্ডা হল| তাতে যে বুলডোজারটা গাড়ি তুলবে সেটাকে তেল-জল খাওয়ানো হচ্ছে দেখে নিয়েছি| এইবারে যারা আমাদের ওপর সদয় হয়ে রাইড দিল তাদের দিকে নজর ফেরানোর অবসর হল| এ বাবা‚ এ তো দেখি দুটি টিনএজার খোকাখুকু‚ নিজেদের নিয়েই মগ্ন| খালি খালি কাচ ভাঙ্গা হাসি‚ আর এ ওর গায়ে ঢলে পড়া| গাড়ীর ছাদ দিয়ে হুহু করে হাওয়া ঢুকছে‚ ঠিক যেন দুটো টিউলিপ দুলছে| যৌবনবেদনারসে উচ্ছল আমার দিনগুলি‚ হে কালের অধীশ্বর অন্যমনে গিয়েছ কি ভুলি‚ হে ভোলা সন্ন্যাসী| - ওটা কি বলছ তুমি? সাম ইনক্যান্টেশন? দেখি টিউলিপেরা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে| মন্ত্রই বটে‚ আমাদের জীবনমন্ত্র| আমাদের কবি লিখে গেছেন| জানিনা বুঝল কিনা‚ কিন্তু মাথা দোলাল| হে বিদেশী ফুল‚ আমি পুছিলাম‚ কি তোমাদের নাম? নাম শুনে বললাম - তোমরা কি রোমানিয়া থেকে? খুবই অবাক হল‚ তুমি আমাদের নাম শুনেই দেশ বলে দিলে? আমি হাবভাব করলাম‚ও কিছু না‚ নাম শুনে আমি পলিনেশিয়ার কোন ট্রাইব‚ আমাজনের কোন জঙ্গলগ্রামের লোক‚ তাও বলতে পারি| এ তো মোটে একটা ইউরোপীয় দেশ| কিন্তু পয়গম্বর বলে গেছেন - যাকে তার বৌ শ্রদ্ধা করে সে সত্যিকারের মহৎ মানুষ| গিন্নি আমার চালিয়াতি ঠিকই ধরে ফেলেছে‚ ঐ নামে আমার এক রুমানিয়ান সহকর্মী আছে| কটমট করে চোখ পাকিয়ে বাংলায় বকুনি দিল - বাচ্চা পেয়ে ঢপ মারছিস!! আমি একটু মাথা চুলকে হেঁহেঁ করে নিলাম| ছেলেটির পরিবার রুমানিয়ার একটি ব্যবসায়ী পরিবার| কয়েক পুরুষের ব্যবসা| শুরু করেছিল ছাপাখানার ব্যবসা দিয়ে| এখন সে ব্যবসা বোটানিক্যাল গার্ডেনের বটগাছ| এ কাকা ওষুধের ডিলার‚ তো ও জ্যাঠার গাড়ীর দোকান| যে ভাইটার কিছুই হল না সে লোকাল ইউনিভার্সিটিতে কমার্স পড়ায়| পরিবারের রীতি অনুযায়ী কুড়ি পেরোতে না পেরোতে গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করে ফেলেছে| এখন হানিমুন মানাতে বেরিয়েছে| মাস ছয়েক ধরে পৃথিবীর নানা দেশে হানিমুন সেরে দেশে ফিরে কোন একটা ব্যবসায় লেগে যাবে| এক সময়ে এরকম একটা প্রথা ছিল| ইউরোপের ধনী পরিবারের ছেলেরা বিয়ে করে কাজ-কর্ম শুরু করার আগে একটা লম্বা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ত| বাবা বন্ধু মহলে চোখ টিপে বলত ছেলে তার বুনো জই ছড়াতে গেছে| এরা বিয়ে করেই বেরিয়েছে| জোয়ালে জুতে যাবার আগে একটু দুনিয়া দেখে নিতে চায়| এইসব খেজুরে আলাপের মধ্যে গাড়ী প্রায় মারাম্বোই ক্যাম্পের কাছে পৌঁছে গেছে| ওদের গাইড হঠাৎ গাড়ী থামিয়ে দিয়ে একদিকে আঙুল তুলল| আমরা এখন ক্যাম্পের আশে-পাশে বিস্তৃত ঘাসজমির মধ্যে| ঘাসের ভেতরে পেট অবধি ডুবিয়ে গ্যাজেল আর জেব্রার পাল চড়ে বেড়াচ্ছে| আমি একটু অবাক হলাম‚ এতো কতই দেখা যায়| এর জন্যে দাঁড়াতে হবে? সূর্য্য পাটে বসেছে| মরা আলোতে চোখ সয়ে যাবার পর দেখলাম গ্যাজেল আর জেব্রার পালের মাঝখানে ঘাসের ভেতর থেকে চারটে হলুদ কান বেরিয়ে আছে| দুই চিতা ভাই রেকি করছে| শিকার ধরা যাবে কিনা| চিতাদের মধ্যে নিয়ম হল ভাইয়েরা অনেক সময়েই বেশ বড় হওয়া অবধি‚ কখনো বা সারা জীবন একসাথে দল বেঁধে থেকে যায়| ভাইয়েদের এই দলগুলো একসাথে শিকার ধরে| মাংসাশী প্রানীদের মধ্যে চিতা একটু দুর্বল| তাই দল না বাঁধলে একটু বড় শিকার‚ যেমন জেব্রা‚ ধরতে পারে না| গ্যাজেলদের জন্য অবিশ্যি একা চিতাই যথেষ্ট| কিন্তু গ্যাজেলরা খুব ভাল দৌড়তে পারে| চিতা পৃথিবীর দ্রুততম স্থলচারী প্রানী| কিন্তু চিতার স্ট্যামিনা খুব কম| টপ স্পীডে পাঁচ কি ছশো ফুটের বেশী দৌড়তে পারে না| টপ স্পীডে খানিকটা দৌড়নোর পর চিতার শরীরের তাপ‚ নাড়ির গতি এতটাই বেড়ে যায় যে বেশ খানিকটা বিশ্রাম দরকার হয়| অন্যদিকে‚ গ্যাজেল চিতার চেয়ে একটু আস্তে দৌড়লেও অনেক বেশী সময় ধরে দৌড়তে পারে| সুতরাং চিতার শিকার ধরার কায়দা হল সারপ্রাইজ অ্যাটাক| অনেকক্ষণ ধরে ঘাসের আড়ালে আড়ালে গ্যাজেলদের খুব কাছে গিয়ে পড়া‚ যাতে কোন একটি গ্যাজেল এক দৌড়ের পাল্লার ভেতরে এসে যায়| তারপর চিতা হঠাৎ দৌড় শুরু করে| ভাগ্য কখনো চিতার দিকে থাকে‚ শিকার হয়| কখনো ভাগ্য গ্যাজেলের দিকে থাকে‚ তখন চিতা শিকার করতে পারে না| আশায় আশায় ছিলাম একটা শিকার দেখতে পাব| কিন্তু চিতা বা কোন শিকারী প্রানীই ধরতে পারার সম্ভাব্না না থাকলে শিকারের পেছনে তাড়া করে না| কুড়ি পঁচিশ মিনিট অপেক্ষা করার পরে ওদের গাইড বলল‚ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে‚ এবারে ক্যাম্পে যাওয়া দরকার| এই দুদিনেই শিখে গেছি‚ আফ্রিকার জঙ্গলে গাইডের কথা অমান্য করাটা বুদ্ধিমানের কাজ না| সুতরাং গ্যাজেলদের দীর্ঘ রাত্রি আর চিতাদের হাতে তুলে দিয়ে ক্যাম্পে ফেরত আসা হল| গিন্নি তাঁবুতে ফিরে বলল একবার স্যামিকে হোয়াটস্অ্যাপ কর‚ ফিরল কিনা| আমি এর মধ্যেই মেসেজ করেছি| কোন উত্তর পাই নি| জঙ্গলে ফোন কানেকশন প্রায়ই পাওয়া যায় না| জঙ্গল থেকে বেরোলে তবে ও মেসেজ পাবে| সেটাই বললাম| গিন্নি একটু কান্না কান্না গলায় বলল - আমি যা ভাবছি তুইও কি তাই ভাবছিস? আমারও একটু একটু কান্না পাচ্ছিল‚ স্যামি যদি হাতির হাতে দলাই-মলাই হয়ে যায় তো এই জঙ্গলে আমাদের কি হবে? কিন্তু আপাত আনন্দ হল গিন্নি একটু ভয় পেয়েছে| এই মেয়েটির অনেক দোষ আছে‚ এত বছরে কম তো দেখলাম না| কিন্তু গড়পড়তা বঙ্গজননীর হিসেবে তুলনাহীন সাহস| কাজেই আমার এনাকে তড়পানোর সুযোগ খুব একটা হয় না| এবারে সুযোগ পেয়ে খুব গম্ভীর গলায় বললাম‚ আমি তোর চেয়ে অনেক বেশী কিছু ভাবছি| আজ যেখানে চিতা দেখলি কাল সেখানে একা একা হাঁটতে আসতে চেয়েছিলি| গ্যাজেলগুলোতো দৌড়তে পারে| তোর কি হত? বকুনি শুনে উনি ভেঁউ-ভেঁউ করে কেঁদে ফেললেন - আর বলিস না প্লীজ| আমাকে চিতা খেয়ে ফেলত‚ স্যামি হাতি চাপা পড়ে যেত‚ তুই একা একা কি করতিস রে?

1190

213

Shafiqul Islam

তবুও বৃষ্টি আসুক”…..শফিকুল ইসলাম

গ্রন্থ পর্যালোচনায় – ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী। ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ কবি শফিকুল ইসলামের অনন্য কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। তার কবিতা আমি ইতিপূর্বে পড়েছি । ভাষা বর্ণনা প্রাঞ্জল এবং তীব্র নির্বাচনী। ‘তবুও বৃষ্টি আসুক’ গ্রন্থে মোট ৪১ টি কবিতা রচিত হয়েছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ গ্রন্থ পাঠ করে পূর্বেই বলেছি, মন অনাবিল তৃপ্তিতে ভরে যায়। বইটির প্রথম কবিতায় মানবতাহীন এই হিংস্র পৃথিবীতে কবির চাওয়া বিশ্ব মানবের সার্বজনীন আকাংখা হয়ে ধরা দিয়েছে। কবি বলেছেন– ‘তারও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে- সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক, আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা,হৃদয়ের গ্লানি… (কবিতা:তবুও বৃষ্টি আসুক’) প্রকৃতি, প্রেম, নারী, মুক্তিযোদ্ধা, মা এবং সুলতা নামের এক নারী তার হৃদয় ভরে রেখেছে। তাকে কিছুতেই ভোলা যায় না। মা তার কাছে অত্যন্ত আদরের ধন। মাকে তার বারবার মনে পড়ে। মনে পড়ে সুন্দরী সুলতাকে, যে তার হৃদয়ে দোলা দিয়েছিল। বেচারা তার জীবন, মৃত্যুহীন মৃত্যু  । তাই তিনি এখন ও সুলতাকে খুঁজেন । যার জন্য তিনি অনন্তকাল প্রতীক্ষায় আছেন। এই প্রিয়তমা তার হৃদয়-মন ভরে আছে। নদীর জল ও তীরের মত এক হয়ে মিশে আছে । এই প্রেম বড়ই স্বর্গীয়, বড়ই সুন্দর । একে ভোলা যায় না। প্রকৃতি আর সুলতা কখন একাকার হয়ে যায় হৃদয়ে। কাব্যগ্রন্থটি পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। বইটির ছাপা অত্যন্ত সুন্দর। ধ্রুব এষের প্রচছদ চিত্রটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। [প্রাপ্তিস্থান– আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০। ফোন– ৭১১১৩৩২, ৭১১০০২১। মোবাইল– ০১৮১৯২১৯০২৪] এছাড়া www.rokomari.com থেকে অনলাইনে সরাসরি বইটি সংগ্রহ করা যাবে। তবুও বৃষ্টি আসুক…শফিকুল ইসলাম বহুদিন পর আজ বাতাসে বৃষ্টির আভাস, সোঁদা মাটির অমৃত গন্ধ- এখনই বুঝি বৃষ্টি আসবে সবারই মনে উদ্বেগ- তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার ব্যস্ততা। তবু আমার মনে নেই বৃষ্টি ভেজার উদ্বেগ আমার চলায় নেই কোনো লক্ষণীয় ব্যস্ততা। দীর্ঘ নিদাঘের পর আকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির সম্ভাবনা অলক্ষ্য আনন্দ ছড়ায় আমার তপ্ত মনে – আর আমি উন্মুখ হয়ে থাকি বৃষ্টির প্রতীক্ষায় – এখনই বৃষ্টি নামুক বহুদিন পর আজ বৃষ্টি আসুক। দীর্ঘ পথে না থাকে না থাকুক বর্ষাতি – বৃষ্টির জলে যদি ভিজে যায় আমার সর্বাঙ্গ পরিধেয় পোশাক-আশাক- তবুও বৃষ্টি আসুক – সমস্ত আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামুক বৃষ্টি নামুক মাঠ-প্রান্তর ডুবিয়ে। সে অমিতব্যয়ী বৃষ্টিজলের বন্যাধারায় তলিয়ে যায় যদি আমার ভিটেমাটি তলিয়ে যাই যদি আমি ক্ষতি নেই। তবুও বৃষ্টি নামুক ইথিওপিয়ায়, সুদানে খরা কবলিত, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত দুর্ভাগ্য জর্জরিত আফ্রিকায়- সবুজ ফসল সম্ভারে ছেয়ে যাক আফ্রিকার উদার বিরান প্রান্তর। তার ও আগে বৃষ্টি নামুক আমাদের বিবেকের মরুভূমিতে সেখানে মানবতা ফুল হয়ে ফুটুক, আর পরিশুদ্ধ হোক ধরা, হৃদয়ের গ্লানি। মানুষের জন্য মানুষের মমতা ঝর্ণাধারা হয়ে যাক বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে – সব পিপাসার্ত প্রাণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাক অনন্ত ধারাজল হয়ে। বহুদিন পর আজ অজস্র ধারায় অঝোরে বৃষ্টি নামুক আজ আমাদের ধূলি ধূসরিত মলিন হৃদয়ের মাঠ-প্রান্তর জুড়ে ॥

145

5

শিবাংশু

নিধুবাবুর ধারাজল

একটা মত বলে (ভবতোষ দত্ত) নিধুবাবু প্রথমবার ছাপরা যা'ন ১৭৬১ সাল নাগাদ। ফিরে আসেন বছর সাতেক পর। এর মধ্যে ছাপরার দক্ষিণে গঙ্গা পেরিয়েই বক্সারের যুদ্ধ হয়ে গেছে। বাংলার সুবেদার মির কাশিম, অওধের শুজাউদ্দৌল্লাহ, দিল্লির শাহ আলম-২ বনাম ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হেক্টর মুনরো সাহেব। যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছিলো, সবাই জানে। ফিরে আসার পর তাঁর প্রথম বিবাহও হয়েছিলো। ১৭৭১ সালে তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্র দুজনেই গত হ'ন। একলা মানুষটি পুনর্বিবাহ করেন সম্ভবত ঐ বছরেই। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যে তাঁর দ্বিতীয় পত্নীও ইহলোক ত্যাগ করেন। এই সময় নিধুবাবু জাগতিক ব্যাপারে বেশ উদাসিন হয়ে পড়েন। কলকাতা তাঁর আর ভালো লাগেনা। তাঁর গ্রাম চাপতার মানুষ রামতনু পালিত তখন ছিলেন ছাপরায় কালেক্টর মন্টগোমারি সাহেবের দেওয়ান। তাঁর সঙ্গেই নিধুবাবু ছাপরা কালেক্টরেটে ছোটোবাবুর চাকরি নিয়ে ১৭৭৬ সালে আবার ছাপরা ফিরে যান। সময়টা মনে রাখতে হবে। রাজা রামমোহন তখন সবে জন্মেছেন। দ্বিতীয়বার ছাপরা গিয়ে নিধুবাবু সেখানে ছিলেন পুরো আঠারো বছর। বেশ কিছুদিন আগে একবার কাজে গিয়েছিলুম ছাপরা। একদিন কাজ পালিয়ে সোজা কালেক্টরেট। নিধুবাবুর কোনও খোঁজখবর যদি এখনও সেখানে পাওয়া যায়। নিছক পাগলামি। তবু পুরানা কচহরির কিছু খণ্ডহর এখনও রয়েছে সেখানে। কিন্তু নো নিধুবাবু। সেতো চাতরা সেরেস্তায় গিয়ে ১৮০৫-০৬ সালের সেরেস্তাদার রামমোহন রায়ের খোঁজও করেছিলুম। একটা ছবি অবশ্য আছে তাঁর। ভাবতে অবাক লাগে, সেকালের মোকাম কলকাতার সব থেকে আলোকপ্রাপ্ত নাগরিক বাবুর দল কীভাবে ছাপরা বা চাতরার মতো জায়গায় থাকতেন? থেকে যেতেন। যেসব জায়গা এখনও প্রায় সভ্যতার প্রান্তসীমার বিন্দুমাত্র। ছাপরায় দ্বিতীয়বার থাকার সময় নিধুবাবু একজন মুসলিম ঘরানাদার উস্তাদের কাছে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথাগত পাঠ নে'ন। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন অতি দক্ষ। তার উপর গান ছিলো তাঁর রক্তে। অল্পদিনের মধ্যেই উস্তাদের তালিম পুরো হাসিল করে নিলেন। কিন্তু গুরু তাঁকে আর নতুন কিছু শেখান না। বুঝতে পারলেন ঘরানাদার উস্তাদরা অওলাদ-দামাদের বাইরে 'খাস চিজ' শেখাবেন না। উস্তাদের এই বঞ্চনা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু তা ছিলো বাংলাগানের প্রতি বিধাতার আশীর্বাদ। নিধুবাবু ঠিক করলেন তিনি আর হিন্দি, উর্দু, ফার্সি গান গাইবেন না। নিজে গান বাঁধবেন আর নিজের মতো করেই তা গাইবেন। অনেকে ভাবেন "নানান দেশের নানান ভাষা" গানটি নিধুবাবুর 'স্বাদেশিকতা'র গান। যেহেতু সেখানে 'বিনা স্বদেশী ভাষা' শব্দবন্ধটি রয়েছে। কিন্তু ঘটনা হলো তখনও রাজনৈতিক অর্থে বাংলাভাষার কোনও 'স্বাদেশিক' অস্তিত্ত্ব গড়ে ওঠেনি। গানটি ছিলো নিধুবাবুর অন্তর্লীন ক্ষোভের উৎস থেকে গড়িয়ে আসা নিজের ভাষায় গান বাঁধার অনুপ্রেরণা। তাঁর প্রথমদিকে বাঁধা বাংলা টপ্পাগুলির মধ্যে পঞ্জাবি টপ্পার জমজমা ও তালফের্তার ছাপ ছিলো । পরের দিকে গিয়ে তা অনেক ভাবপ্রধান হয়ে গেছে। এখানে একটি সেরকম টপ্পার লিংক রাখছি সমঝদারদের অনুমতি নিয়ে। পরে আসবো নিধুবাবুর ভাবপ্রধান টপ্পার প্রসঙ্গে।

172

8

শিবাংশু

আজাদি হে

টুকরো শব্দে বাজে কার্তুজ পেলেট আলি শা করেছো জীর্ণ শরীরের ফ্রেম ভুল বাঁচি, অধর্মকে দিয়ে যাই ভেট বেঁচে থাকা চাঁড়ালের রংরেজ প্রেম মাঝে মাঝে ঘুরে যাই মহুয়ামিলন কোয়েল পারের বৃষ্টি, নদীটির বাঁক রোদেজলে ভিজি পুড়ি নিমসঞ্জীবন কবিতার কাছে শুধু ছায়াটুকু থাক ছায়াটুকু থাক আর থাক ভালোবাসা ভালো থাক, যারা ততো ভালো নেই আজ তাদের তেষ্টার জল যন্ত্রনার ভাষা তাদের স্বপ্নজুয়া ছেঁড়া গন্ধরাজ তাদের ভিতরে বাঁচি সুবর্ণরেখায় তাদেরই জন্য যাক, যদি দিন যায়.........

150

7

Ranjan Roy

ছত্তিশ্গড়ের কিসসা

পর্ব-৪ পুলিশ, ওরে পুলিশ! গৌরচন্দ্রিকা সাতসকালে রায়গড় স্টেশন থেকে মুম্বাই মেল চড়ে গরম কফির কাপে চুমুক দিয়ে সবে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছি, বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।প্রথম পাতায় হেডলাইনঃ রানিবোদলি গ্রামে নকশাল আক্রমণে পঞ্চান্নজন পুলিশ নিহত। বস্তারের যে জায়গাটার কথা বলা হয়েছে বিশেষ বাহিনীতে ভর্তি হয়ে গত মাসে সেখানেই গেছে আমাদের নাটকের দলের সক্রিয় সদস্য অবিনাশ চোপড়ে।অবিনাশ হিন্দি সাহিত্যে এম এ পাশ করে একটি স্কুলে পড়াচ্ছিল। কোন মাসে মাইনে পেত, কোন মাসে হরিমটর।এর মধ্যে বিয়ে করল আমাদের দলেরই একটি মেয়েকে। মেয়েটি হাসপাতালের নার্স।তার কয়েক মাস পরেই স্ত্রীভাগ্যে ধনলাভ। জুটে গেল বিশেষ পুলিশ বাহিনীতে সাব ইন্সপেক্টরের চাকরি। নিহতদের তালিকায় নামগুলো আঁতিপাতি করে দেখি। তারপর একটা শ্বাস ছাড়ি। ততক্ষণে আড়মোড়া ভেঙে রেলের কামরা জেগে উঠেছে। চারদিকে উত্তেজিত কথাবার্তা শুরু হয়ে গিয়েছে। : এ সরকার অপদার্থ, বস্তারকে মিলিটারির হাতে তুলে দেওয়া উচিৎ। :ছত্তিশগড়ের পান্তাভাতখেকো পুলিশ কোন কম্মের নয়।লড়াই না করে পালিয়ে গেছে।বিহার ইউপি থেকে শিক্ষিত বেকার ছেলেদের দলে দলে পুলিশে ভর্তি করে হাতে বন্দুক দিয়ে দেখুন, নকশালদের সোজা নকশালবাড়ি পাঠিয়ে দেবে। : মশাই, ট্রেনের কামরায় বসে এমন উড়ন ছুঁ কথাবার্তা বলা সহজ; যান তো দেখি অবুঝমাঢ় কি বাসাগুড়ায়! : ছত্তিশগড়ি পুলিশ ডরপোক? খালি পান্তাভাত খায় আর ঘুমোয়? হুঁ:! সেই ছকে বাঁধা কথাবার্তা; আমার একঘেয়ে লাগে। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। আমার চেতনায় পুলিশ নির্মাণ আরে আরে মারবি নাকি? দাঁড়া, একটা পুলিশ ডাকি! বাচ্চা রবীন্দ্রনাথকে ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ পুলিশ আসছে বলে ভয় দেখাতেন। পুলিশ মানে খাঁকি টুপি, বেল্ট, বুটজুতো! লাঠি, বন্দুক!বেশ, কিন্তু আমার ফোর্ট উইলিয়মে চাকরি করা ফৌজিবাবা?উনিও তো খাঁকি পরেন, বেল্ট বাঁধেন, বুটজুতো পরে খটখটিয়ে চলেন।তফাৎ কোথায়? মাকে জিজ্ঞেস করি। মার সরল সমাধানঃ পুলিশ নিজের দেশের লোককে মারে, মিলিটারি দেশের দুশমনকে। কাজেই মিলিটারি, মানে তোমার বাবা, ভাল। তাই মিলিটারি সম্মান পায়, পুলিশ পায় না। একটু বড় হয়ে কানে এলঃ পুলিশ তুমি যতই মারো, মাইনে তোমার একশ বারো। অর্থাৎ পুলিশ শব্দটির সঙ্গে মারামারি ব্যাপারটা কেমন যেন জড়িয়ে রয়েছে।ময়দানে ফুটবল ম্যাচ নিয়মিত দেখতে যান, অথচ টিকিটের লাইনে ঘোড়সোয়ার পুলিশের তাড়া কিংবা ব্যাটনের গুঁতো খাননি এমন কেউ আছেন কি? কিন্তু দক্ষিণ কোলকাতার নাকতলায় লুঙ্গি পরে বাজার করা পুলিশ অনুকুলবাবুকে দেখে কোনদিনই ভয় পাইনি কেন?ষাটের দশকের শেষে বাংলাবন্ধের দিনগুলোতে খাঁকি হাফপ্যান্ট পরে শুকনো মুখে লাঠি ঘোরাতে দেখেও না।বরং নাদাপেটে অমন পোশাকে ওঁকে কমেডিয়ান জহর রায়ের মত লাগত। এল -সত্তরের দশক, মুক্তির দশক। কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে গলিতে, পুলিশ মরছে। মরছে আর মারছে, মারছে আর মরছে। তারপর? রক্তমাখা অস্ত্রহাতে যত রক্তআঁখি, শিশুপাঠ্য কাহিনিতে থাকে মুখ ঢাকি।শুনেছি, বিয়ের বাজারে জামাই হিসেবে পুলিশদের বাজারদর তখন বেশ পড়ে গিয়েছিল। ছত্তিশগড়ে এসে দেখি পুলিশজামাতা পেয়ে শ্বশুরের নাক বেশ উঁচু হচ্ছে। মাইনে যাই হোক উপরি টুপরি ভালই, মেয়ে সুখে থাকবে। উটের নুনু ঠিক কোনখানে? ট্রেনে করে আমরা কজন ভোপাল যাচ্ছি একটা ইন্টারভিউ দিতে। দুর্গ থেকে উঠলেন একজন পুলিশ অফিসার। কথায় কথায় বললেনঃ আজকাল যেসব ছেলেছোকরার দল নতুন নতুন গ্র্যাজুয়েট বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হয়ে পুলিশের চাকরিতে আসছে এরা সব ভুষিমাল, কিস্যু জানে না।কত করে বোঝাই যে দিনকাল পাল্টেছে, হিসেব করে চল। পুরো মাইনেটাই ব্যাংকে জমা কর, আর এদিক সেদিক করে যা পাবে তাই দিয়ে সংসার চালাও। কিন্তু শোনে কে! এরা জানে শুধু ছুটি আর বদলির দরখাস্ত লিখতে। কোন্ও বাস্তববুদ্ধি নেই। জিজ্ঞেস করুন: উটের নুনু ঠিক কোনখানে? বলতে পারবে না। পশুর অ্যানাটমি নিয়ে অমন উচ্চস্তরের জ্ঞানলাভের কথা শোনাচ্ছিলাম কোরবা শহরের সদর থানা বা কোতোয়ালির থানেদার উত্তম সিং রনধাওয়াকে। উনি রবিশংকর ইউনিভার্সিটিতে আমার সিনিয়র ছিলেন।উত্তমজী হাসলেন না। গম্ভীর হয়ে বললেনঃ রায়, একটা কথা ভেবেছিস, আমরা পুলিশেরা কত একা? আমাদের সমাজ কেন এড়িয়ে চলে? সেদিন রকের আড্ডায় বসে হেসে গড়াচ্ছিলি। কিন্তু আমি গিয়ে যেই বললাম ক্যা চল রহা ভাই? হমে ভি বাতাও, আমি্ও তোমাদের সঙ্গে হেসে নিই; ব্যস্, তোদের মুখে কুলুপ এঁটে গেল। কেন? পুলিশের কি হাসি পেতে নেই? হোলির দিনের কথাই ধর। সবাই একে তাকে রং মাখাবে, কিন্তু পুলিশ বাদ। আমরা সেদিন ডিউটি দেব, শান্তিরক্ষা করব।আমাদের ছুটি পরের দিন।সেদিন পুলিশেরা খালি নিজেদের মধ্যে হোলি খেলবে।মানে, পুলিশেরা খালি খাঁকি বৌদিদের রং মাখাবে। কেন? আমাদের কি পাড়ার অন্য বৌদিদের রং মাখাতে ইচ্ছে করে না? আর দেখেছিস, হেড কোয়ার্টারে থাকলে আমাদের কোন ছুটি নেই!আমাকে যদি তোর মেয়ের জন্মদিনের পার্টিতে যেতে হয় তো রোজনামচায় তোদের পাড়ার কাছে কোথাও ইনস্পেকশনে বা ইনভেস্টিগেশনে যাচ্ছি দেখিয়ে রেজিস্টারে এন্ট্রি করে তবে যেতে পারব। আমাদের শালা রাতে ঘুম পেতে নেই। পরপর দুদিন না ঘুমোলেও কিছু হয় না!এসব তো সামান্য ব্যাপার। আমাদের বৌদের জন্যেই তোদের বাঙালী কবি লিখে গিয়েছেন: ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে। এরপর কিছু উল্টোপাল্টা হয়ে গেলে রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে মানবাধিকার কমিশন।ওদের হিসেবে চোরডাকাত, খুনি, টেররিস্ট সবারই হিউম্যান রাইটস্ আছে, নেই শুধু পুলিশের। আমরা তো হিউম্যান নই। ওরা শেখাবে: অপরাধিদের বাবাবাছা, আপনি আজ্ঞে করে কথা বলতে হবে।ওরা আমার মা বোন তুলে মুখখারাপ করলে্ আমাদের বাধ্য ছাত্রের মত সোনামুখ করে শুনতে হবে, ওদের পেঁদিয়ে বিন্দাবন দেখানো চলবে না। আমি বলিঃ আপনি দাদা হিউম্যান রাইটস্ এর ব্যাপারটা কিচ্ছু বোঝেন নি। তারপর ঝাড়ি একটা মাস্টারজি মার্কা লম্বা লেকচার। রাজা জন, ম্যাগনাকার্টা, রাষ্ট্রসংঘ, চার্টার অফ হিউম্যান রাইটস্ পেরিয়ে সোজা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে এসে দম নিই। রনধা্ওয়াজি আমাকে টেরচা চোখে দেখতে লাগলেন।আমার উৎসাহ কমে না। বলিঃ দোষ আপনার একার নয়, দোষ আপনাদের সিস্টেমের।ভাবটা হল যার একমাস পরে ফাঁসি হবে তার এখন থেকেই খাওয়া বন্ধ করে দাও।সরকারের খরচা বাঁচে।এখানেই মানবাধিকারের প্রশ্ন।আচ্ছা, আপনাকে দিয়েই শুরু করি। এই থানার লক আপে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা ব্যবস্থা আছে? : বিলকুল আছে; যা না, এগিয়ে গিয়ে দ্যাখ। দুধনাথ, রায়সাবকো ইঁহা কী ব্যবস্থা জরা দিখা দো। দুধনাথ বা থানার মুন্সীজির সঙ্গে ওঁর চোখে চোখে কিছু কথা হয়।ও আমাকে একটা লক আপের দিকে নিয়ে গিয়ে তালা খোলে।বলে, যান, দেখুন গে। চোখে পড়ে কোণের দিকে একটা গোটানো কম্বল আর একটা এলুমিনিয়ামের সানকি। কিন্তু বাথরুম পায়খানার ব্যবস্থা? কিছুই তো দেখছিনে! কানে আসে থানেদারের কণ্ঠস্বরঃ সবই আছে, আরেকটু এগিয়ে যা, ঠিক দেখতে পাবি। ভেতরে কোন বাল্ব নেই।তবু দু পা এগিয়ে যাই।এমন সময় পেছনে আওয়াজ, ঘড় ঘড় ঘড়াৎ।দুধনাথ লক আপের গেট বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। আমার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। বলি: রনধাওয়াজি, এটা কি হচ্ছে? অ্যাই দুধনাথ, তালা খোল, এসব ইয়ার্কি ভাল লাগে না। দুধনাথ বোবা চোখে তাকায়, তালা খোলার কোন চেষ্টা করে না। থানেদার উবাচঃ এটা ইয়ার্কি কে বললে? আমার গলা শুকোতে থাকে, এর মানে? মামার বাড়ি নাকি! : মামার বাড়ি কি শ্বশুরবাড়ি ভাল করে বুঝবি যখন ভাবীজি এসে তোকে জামিনে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। : আমার অপরাধ? : অপরাধ অনেক। এক, কোরবা বাজারের সব্জিওয়ালি জামুনবাঈকে যৌনসংসর্গের জন্য প্ররোচিত করা।দুই, উক্ত জামুনবাঈ অস্বীকূত হইলে তাহার সহিত জোরজবরদস্তি করা।তিন, প্রকাশ্য বাজারে তাহার গায়ে হাত তোলা।চার, উহার চিৎকার শুনিয়া বাজারে কর্তব্যরত পুলিশ সিপাহী দুধনাথ সিং শান্তিরক্ষা করিতে গেলে তাহাকে বাধা দেওয়া। পাঁচ, তাহাকে চপেটাঘাত করা। ছয়, তাহাকে মাতূগমনকারী নরাধম বলিয়া অভিহিত করা। দুধনাথ!এবার রায়জিকে এই ছয় অপরাধ পেনাল কোডের কোন কোন ধারায় দন্ডনীয় তা বুঝিয়ে দে। দুধনাথ বলির সময় পুরুতঠাকুরের মন্ত্র পড়ার মত কিছু অং বং চং বলে।আমার মাথা ঘুরতে থাকে, হাত পা কাঁপে। কাঁপা গলায় শেষ চেষ্টা করি। : এ সব ডাহা মিথ্যে। সব জানেন, শুধু শুধু । : সত্যি মিথ্যে আদালত ঠিক করবে। :মানে? আপনি আমাকে কোর্টে তুলবেন!চালান পেশ করবেন? : আলবাৎ, আইন আইনের পথে চলবে। : প্রমাণ করতে পারবেন? তাছাড়া কে এই জামুনবাঈ? আমি চিনি না।আমি তো হাটবাজার করিনে, আমার স্ত্রী করে।কাজেই আপনার ওসব গুলপট্টি ওকে খাওয়াতে পারবেন না। ও আমাকে ভাল করে চেনে। : এগজ্যাক্টলি! বৌদি নিজে বাজার করেন। তাই তরকারিওয়ালি জামুনবাঈকে ভাল করে চেনেন।হার্ডকোর রেণ্ডি। আর ও হচ্ছে পুলিশের খবরি! গোপন খবর দেয়। মাসোহারা পায়। পুলিশের যেমনটি চাই তেমনই সাক্ষী দেবে।তারপর বৌদি তোকেও নতুন করে চিনবেন।চিন্তা করিসনে। যে কদিন জামিন না হয় তোর মানবাধিকারের হিসেবে সব সুবিধে পাবি।জামাকাপড়, টুথব্রাশ, খবরের কাগজ।বাড়ি থেকে খাবার আসবে। উকিলের সাথে কথা বলতে পারবি। আমার হাঁটু আর ভার সামলাতে পারে না, গরাদের ওপাশে মাটিতে বসে পড়ি।নিজের গলার স্বর চিনতে পারিনে।একটা ফ্যাঁসফেঁসে গলা বলেঃ আমায় ছেড়ে দিন, ঘাট হয়েছে। :দুধনাথ! লক আপের তালা খুলে দে। রায়কে বাইরে নিয়ে আয়। ও আর কোনদিন থানায় বসে মানবাধিকার নিয়ে লেকচার দেবে না।আরে! বেচারার হাত পা কাঁপছে।যা, ওকে মোটরবাইকে বসিয়ে বাসস্টপে ছেড়ে দে। দুধনাথ বলেঃ চলুন রায়জি, গাড়ি স্টার্ট করছি। ________________________________________ গিন্নি দেখি আরও এককাঠি সরেস। তৎক্ষণাৎ আলমারি খুলে একটা বাঁধানো খাতা বার করল, তাতে কোলাজের ঢংয়ে খবরের কাগজের নানান কাটিং আঠা দিয়ে সাঁটা। :পুলিশ কী পারে আর কী পারে না দেখে না্ও। না:, আমি হাল ছাড়িনি। পুলিশ সম্বন্ধে শেষ কথা বলার সময় এখন্ও আসে নি। মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন যে সংসদে একতূতীয়াংশ মহিলা হলে সেশন অনেক সংযত ও উন্নতমানের হবে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় যে ওখানে সনিয়া গান্ধী, রেণুকা চৌধুরি, সুষমা স্বরাজ, বূন্দা কারাতদের সংখ্যা বেড়ে গেলে অমুকভাইয়া বা তমুকউদ্দিনদের হাতের গুলি ফোলানো বা বিরোধীদের সংগে শকারবকার বিনিময়ে কিছুটা ভাটা পড়বে। মাথায় টিউবলাইট জ্বলে ওঠে।তাহলে পুলিশ কেন বাদ যায়? ইউরেকা! চাই পুলিশবাহিনীতে তেত্রিশ পার্সেন্ট মহিলা আরক্ষণ! তবেই পুলিশি বর্বরতা কমবে, পুলিশ আরও গণমুখী হবে।মার দিয়া কেল্লা! এই আইডিয়াটা লিখে পাঠাতে হবে।পাঠাবো দুজনকে, মাননীয়া কিরণ বেদী ও মাননীয়া মমতা ব্যানার্জীকে। কদিন পরে যেতে হল থানায়।রাতের অন্ধকারে আমার পরিচিত এক ভদ্রলোকের গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারার চেষ্টা হয়েছে। হামলাকারীরা পরিচিত। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক দলের চাপে পুলিশ ডায়েরি নিচ্ছে না। থানায় মুন্সীজি বললেন: দেখুন, আপনি যে ভাবে লিখে এনেছেন তাতে কেসটা উইক হয়ে যাবে।শব্দগুলো আর ঘটনার ক্রমপরম্পরা একটু বদলে নিলে এটাই অন্তত: হাজার চল্লিশের কেস, কী বুঝলেন? আর আপনি যেমন লিখে এনেছেন তাতে মাত্র দশহাজার, ক্যা সমঝে আপ? বলতে লজ্জা করছে, আমাদের এত বড় থানার স্টেশনারি খরচা বাবদ মাসিক বরাদ্দ মাত্র চল্লিশ টাকা! সেতো মাসের পহেলা হপ্তাতেই শেষ হয়ে যায়। এখন মাসের কুড়ি তারিখ। কাজেই কাগজ কার্বন পেপার ইত্যাদি কেনার জন্যে কিছু দিন, আর স্টাফদের জন্যে নাস্তা। তারপর দেখুন মজা! শালেলোগোকোঁ হাতকড়ি লগওয়াকে দোচার লাথমুক্কা লাগাতে হুয়ে ঘর সে খিঁচকর লায়েংগে। তব না উনকে ঘরওয়ালোঁ নে হাতকড়ি খুলওয়ানে কে লিয়ে অউর কুছ মালপানি দেঙ্গে? (ব্যাটাদের হাতকড়ি পরিয়ে ঠুঁসোলাথ মারতে মারতে ঘর থেকে টেনে আনা হবে, তবে তো ওদের ঘরের লোকজন কিছু মালপানি উপুড় করবে?) আমি পকেট থেকে দুটো নম্বরি নোট বের করে চা জলখাবারের নামে একজন সেপাইয়ের হাতে দিলাম। এমনসময় থানার ভেতরে শোনা গেল এক চাপা উল্লাসধ্বনি।তাকিয়ে দেখি একজন সেপাইয়ের পেছন পেছন সলজ্জমুখে ঢুকছেন দুই মহিলাপুলিশ।ভাবটা যেন দ্বিরাগমনের পর নতুন বৌ ছোটবোনকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরছে। তক্ষুণি চাওয়ালা এসে সবাইকে চায়ের গেলাস ধরিয়ে দিল।তারপর পাশের একটি কামরায় ছোটবোনপুলিশ একটু গড়িয়ে নিলে।আর পেছনের বারান্দায় জনতা স্টোভ জ্বেলে বৌপুলিশ সবার জন্যে খিচুড়ি চড়িয়ে দিল। আমি আলাপ জমাই।আপনারা কোন কেসের ব্যাপারে এসেছেন? : বড়সড় সিঁদেল চুরির কেস।কোরবা শহরে কেলো করে জবড়াপাড়ায় গা ঢাকা দিয়ে আছে।দলের লীডার একজন মেয়েছেলে, তাই আমরা এসেছি। : আপনার বেশ সাহস তো! :দূর! একা যাব নাকি?দুজন সেপাইয়ের মোটরবাইকের পেছনে বসে যাব। উনি শরীরে ঢেউ তুলে হাসলেন। মহিলাদের উপস্থিতি যে থানাকে একটু সভ্যভব্য করে তুলবে আমার এই বিশ্বাস দূঢ হল। বিকেলে হঠাৎ উদয় হলেন আমার কলেজ জীবনের দুই দোস্ত, বিজয় আর প্রসাদ।রাত্তিরে গিন্নির কূপায় খ্যাটন বেশ ভাল হল।মে মাস। গরমকাল।বেশ গরম হাওয়া দিচ্ছে, ঘুম আসছে না।তাই আমরা তিনবন্ধু রাস্তায় একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরোলাম।পায়ে পায়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছি। রাত বারোটা, ফিরতে হবে।পাড়াটা একটু নির্জন,আলোগুলো প্রায় নিভে গেছে। হঠাৎ কেউ যেন কঁকিয়ে এল।কোথায়? কোনদিকে, নাকি মনের ভুল!এবার একটা আর্তনাদ, তারপর চাপা গোঙানি।কোথাও কোন ভুল নেই, আওয়াজটা আসছে সামনের কোতোয়ালি থানা থেকে। চারদিকের নিকষকালো অন্ধকারের মধ্যে প্রায় দেড়শো মিটার দূরের থানার আলোজ্বলা হলঘর টিভির পর্দার মত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দুজন সেপাই একটা গেঁয়ো লোকের হাত টেনে ধরে রয়েছে আর একটা খেঁটে লাঠি দিয়ে তাকে মেরে পাটপাট করে দিচ্ছে সকালে আলাপ হওয়া সেই বৌপুলিশ!মারতে মারতে খুলে যাচ্ছে তার শাড়ি।হাঁফাতে হাঁফাতে কাপড়চোপড় সামলে নিয়ে জলটল খেয়ে আবার মার! না, মহিলা পুলিশমন্ত্রী ও শ্রীমতী কিরণ বেদীকে সেই চিঠি আজও পোষ্ট করা হয়ে ওঠেনি। ভয়ের রং খাঁকি! বর্ষশেষ।৩১ ডিসেম্বরের রাত।মোবাইল ও এসএমএস এর দৌলতে নিমন্ত্রণ পেয়ে গিন্নির ও বাচ্চাদের চোখ এড়িয়ে পৌঁছেচি আমার এক বন্ধু গজ্জুশেঠের হোটেলে।মধ্যরাতে নববর্ষ বরণ করতে হবে।জড়ো হয়েছি আমরা ক’জন্– কলেজজীবনের জনাদশেক বন্ধু।একটা হলঘরে মাটিতে গদি আঁটা বিছানা, তাকিয়া।সামনে প্লেটে সাজানো ফিশফ্রাই,কাবাব,টিকিয়া ইত্যাদি পাকস্থলীকে বিরক্ত করার মত কিছু খাদ্যদ্রব্য।গেলাসে গেলাসে রঙিন জল।অদীক্ষিতদের জন্যে কোকস্। কিন্তু একি!একপাশে হাসিমুখে বসে জনাদুই খাঁকি পোশাক।কেন?এদের কে ভিসা দিয়েছে? আমার বাঁকা ভুরু দেখেই গজ্জুশেঠ সাফাই গাইল– ‘এরা দুজন আমার বিশেষ অতিথি’। আমি রাগ চাপতে পারলাম না।এখন এদের সামনে মেপে মেপে কথা বলতে হবে।খেয়াল রাখতে হবে আমিষ চুটকিগুলো পলিটিক্যালি কারেক্ট হচ্ছে কি না! কী চাপ! গজ্জু হেসে বলল–‘ শান্ত হয়ে বস দিকি!একটু পরে টের পাবি যে এঁরা লোকাল থানার কেউ ন’ন।বিলাসপুরেই বাড়ি, ছুটিতে এসেছেন।কাজেই বিশ্বাস করতে পারিস যে এঁরা আমার হোটেলে হপ্তা নিতে আসেননি।এসেছেন পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে’। লম্বাটে চেহারার তিওয়ারি বললেন– বুঝতে পারছি খাঁকি পোশাকে আপনার এলার্জি। বেশ, খুলে রাখলাম’। এই বলে তিনি গেঞ্জি গায়ে বসে পড়লেন।সবাই খেলার ক্রিকেট মাঠের ‘হাউজ দ্যাট’ এর মতন চেঁচিয়ে উঠল। চুটকি, পান–ভোজন, একে তাকে চিমটি কাটা–– এর মধ্যে কেউ গান ধরল।দু’পাত্তর চড়ানোর ফলে ওর গলা যেন ভুল স্পীডে চলা পঁচাত্তর আরপিএম এর গ্রামোফোন রেকর্ড।পাবলিক হেসে গড়াচ্ছে।কেউ বলছে গুলাম আলির গজল চাই তো কেউ বলছে সুফি শুনবো। এর মধ্যে দেখি গজ্জু ওই তিওয়ারির কানে কানে কী যেন গুজগুজ ফুসফুস করছে আর পুলিশ–তিওয়ারি নতুন কনেবৌটির মত সলজ্জ মাথা নাড়ছে। তারপর পাশের কামরা থেকে এসে গেল একটি হারমোনিয়াম। আর তাজ্জব কী বাৎ, গজব কী বাৎ, ওই বাদ্যযন্ত্রটি এসে নামল সোজা ওই পুলিশ ইনস্পেক্টরের সামনে! তাকিয়ে দেখি হারমোনিয়ামে হাত ছোঁয়াতে্ই ওর চেহারা বদলে গেছে।খানিকটা বেলো করে চাপা গলায় একটু আলাপ করে ধরল–‘তুম আপনি রঞ্জোগম, আপনি পরেশানি মুঝে দে দো।কুছ দিন কে লিয়ে ইয়ে নিগেবানি মুঝে দে দো’। আমরা ভুলে গেলাম গালগল্প। সুর চড়ছে। ‘তোমার সব ব্যথার বোঝা, দু:খের ভার আমায় দাও’। গলা ছুঁয়ে যাচ্ছে তারার কোমলগান্ধার। ‘ম্যায় দেখুঁ তো দুনিয়া তুমে ক্যায়সে সতাতী হ্যায়?কুছ দিনকে লিয়ে ইয়ে নিগেবানি মুঝে দে দো’। আমার বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। ‘দেখি তো তোমায় কে এত কষ্ট দেয়?ক’দিনের জন্যে তোমার সব ভার আমায় দাও’। কিসের এত কষ্ট?খাঁকি পোশাক তো দু:খ দেওয়ার জন্যে, পাওয়ার জন্যে তো নয়। সাতদিন পর সাতসকালে স্টেশন গেছি, কোলকাতা থেকে মা আসছেন।দেখি সেই তিওয়ারিজি।পরনে যথারীতি খাঁকি ধরাচূড়া। আমাকে দেখেও দেখলেন না প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কামরার জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে আদর করে যাচ্ছেন একটি ষোড়শীকে, আর কিমাশ্চর্য্যম!রুমাল দিয়ে চোখ মুছে চলেছেন। কাঁধে চাপ পড়তেই দেখি গজ্জু শেঠ।বন্ধুর জন্যে নিয়ে এসেছে কিছু আপেল আর কমলালেবু।কী ব্যাপার রে? গজ্জু ইশারায় সরে আসতে বলে।তারপর ব্যাখ্যা করে: তিওয়ারির হয়েছে মাওবাদী বেল্টে ট্রান্সফার।অনেক ধরাধরি করেও আটকাতে পারেনি।এদিকে ওই একটি মেয়ে। ভিলাইয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।বাপের সঙ্গে দেখা করে ফিরে যাচ্ছে।পরশুদিন । তি্ওয়ারি গিন্নি স্বামীর ললাটে তিলক লাগিয়ে ‘জয়যাত্রায় যাও গো’ বলে বস্তারের নারায়ণপুরের জন্যে টা–টা করবে আর প্রার্থনা করবে যেন জগদলপুরের দন্তেশ্বরীমাতা স্বামীকে ভালোয় ভালোয় বছরখানেকের মধ্যে বিলাসপুরে ফিরিয়ে দেন।আজকাল ছত্তিশগড়ে পুলিশের জীবনের কোন ভরসা নেই যে! আমি পুলিশকে আর ডরাইনে; তা সে ধরাচূড়া পরেই থাকুক বা না পরে। বুঝে গেছি যে খাঁকি হল পুলিশের সাপের খোলস, ওদের প্রোটেকশন। কিন্তু পুলিশ সামনে এলে মনে মনে প্রয়াত কবি তুষার রাযের দেওয়া মন্ত্রটি বিড়বিড় করি: ‘পুলিশ!ওরে পুলিশ! কবির সামনে আসার আগে টুপিটা তোর খুলিস্’। ============================*******======================================

552

26

শিবাংশু

নানা স্বর- ফুলের কোরাস

'বহুস্বর' একটা পবিত্র শব্দ। মানুষের সভ্যতার বিবর্তন ঘটেছে এই শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে। সরলরৈখিক, একস্বর প্রতিক্রিয়া মানবিক অধিকারের বিপ্রতীপ বিড়ম্বনা। মানুষই একমাত্র প্রাণী যার কোনও একমুখী অস্তিত্ব নেই। অনেক মানুষ তো বটেই, একাকী মানুষেরও অস্তিত্বেও বহুস্বরের ব্যঞ্জনা তাকে প্রতি মূহুর্তে সমৃদ্ধ করে। সামাজিক বা রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্র মানুষের এই চারিত্র্যটিকে ভয় পায়। তাই তাদের আপ্রাণ প্রয়াস থাকে মানুষকে একস্বর গড্ডলিকার স্রোতে টেনে আনার, তাড়না করার। এর ব্যতিক্রম আমরা স্থান-কাল নির্বিশেষে পাইনি। তাই মানুষের যাবতীয় সংগ্রাম তার বহুস্বরের অধিকার রক্ষার স্বার্থে। ------------------- 'এপিক' নামক শিল্পশৈলিটি মানুষ তৈরিই করেছে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। শিল্পসৃষ্টির কিছু সর্বকালীন অনুপ্রেরণা থাকে। তাদের সঠিক প্রেক্ষিতে বিচার করার জন্য একটি কালনিরপেক্ষ মঞ্চ বিশেষ প্রয়োজন। সময়ের কাদামাটিকে অতিক্রম করে যখন কিছু চিরকালীন মূল্যবোধের কথা বলতে হয় তখন যাবতীয় শিল্পমাধ্যমই এপিক শৈলির আশ্রয় নেয়। কারন চিরকালীন কথা সমকালীন প্রেক্ষিতে ধরার জন্য এপিকের থেকে উত্তম কোনও মঞ্চ নেই। কাব্য, সাহিত্য, চিত্র, ভাস্কর্য, নাট্য, সঙ্গীত, মাধ্যম যাই হোক না কেন এপিকশৈলির আশ্রয়ে তার শ্রেয়তর স্ফুরণ ঘটে। সারা বিশ্বে সর্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতেই এপিক শৈলির আধারে মানুষের শাশ্বত ক্ষোভ, দুঃখ, নিপীড়ন, সুখ, প্রতিবাদ বা মহত্ত্বের ইতিকথা লেখা হয়ে থাকে। সব রকম সৃষ্টিমাধ্যমেই তার উপস্থাপনা আমরা দেখে আসছি গত প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে। নিপীড়িত, অত্যাচারিতের যে দীর্ঘশ্বাস ঈশ্বর পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেনা, তারা জায়গা করে নেয় এপিকের পাতায় পাতায়, দৃশ্যে দৃশ্যে। প্রাচীন আথেন্স থেকে পাটলিপুত্ত, রোম থেকে উজ্জয়িনী, তারা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। য়ুরোপিয় ধরণটি নিয়ে এখন বলছি না, কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যবোধের বিবর্তিত কালচক্রকে ধরে রাখার জন্য আমাদের পূর্বজরা মহাভারত নামক যে মহা-আধারটি সৃষ্টি করে এসেছেন প্রায় তিন হাজার বছর ধরে, তার জন্য আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ, নতজানু। নিজেদের যথাসাধ্য প্রয়াস থেকে তাঁদের তর্পণ সমীপেষু করে থাকি যখন তখন। সম্প্রতি একটি নাটক দেখলুম। এপিকের আধারে এই মূহুর্তে আমাদের নির্যাতিত মূল্যবোধের খতিয়ানকে ধরার প্রয়াস করা হয়েছে সেখানে। ------------------------- 'বহুরূপী' বাংলা নাট্যধারার প্রাচীনতম জীবিত সঙ্ঘ। যে দেশে এক দশক কেন, এক এককেই সঙ্ঘ ভেঙে যায়, সেখানে তাঁদের বন্ধুর হিংলাজপথের অবিরত যাত্রা সারাদেশের নাট্যপ্রাণ মানুষদের প্রেরিত করে। এহেন বহুরূপীর বার্ষিক নাট্য উৎসবের প্রথম প্রস্তুতি হিসেবে যে নাটকটিকে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন, তার নাম 'নানা ফুলের মালা'। রচনা শ্রী অলখ মুখোপাধ্যায়। নির্দেশনার দায়িত্বে শ্রী দেবেশ রায়চৌধুরী। নাটকটি শুনলুম তাঁরা বছর দুয়েক আগে মঞ্চস্থ করতেন। এবার নবপর্যায়ে আবার তার উপস্থাপনা শুরু করা হয়েছে। আশ্চর্য লাগে বস্তুস্থিতি বা সামাজিক বাস্তবতা যেন আরো তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এই ক'দিনে। ভারতবর্ষের শাশ্বত বহুস্বরবাদী সামাজিক অবস্থানের প্রতি যে ধরণের ক্রমাগত আঘাত বর্ষিত হয়ে চলেছে সাম্প্রতিককালে, তাকে উপজীব্য করে এই নাট্যপ্রস্তুতিটিতে সময়ের স্বরকে ধরার সনিষ্ঠ প্রয়াস লক্ষ্য করলুম। ------------------------- নাটকটির কাল্পনিক পরিমণ্ডল মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বের ঘটনাক্রমের সঙ্গে সমান্তরাল রাখা হয়েছে। যখন পরাজিত, রণক্লান্ত, অবসন্ন দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে বিশ্রামের জন্য এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে সঞ্জয়, কৃপ, কৃতবর্মা, অশ্বত্থামার সঙ্গে সেখানে আসেন এবং দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে বিধ্বস্ত কৌরব সেনাদলের সেনাপতি অভিষিক্ত করলেন। চরের মুখে সংবাদ পেয়ে সেখানে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি, দ্রৌপদীপুত্ররা, শিখণ্ডী আরো অনেকে এসে পৌঁছোলেন। আহত, বিপর্যস্ত দুর্যোধনের অবস্থা দেখে দয়ার্দ্র যুধিষ্ঠির প্রস্তাব দিলেন তিনি যেকোন একজন পাণ্ডবের সঙ্গে দ্বৈতযুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে পারেন। যদি জয়ী হ'ন, তবে হস্তিনাপুর আবার তাঁর হবে। যুধিষ্ঠিরের এমত 'মূঢ়' প্রস্তাব শুনে শ্রীকৃষ্ণ চকিত হয়ে পড়েন। কারণ গদাযুদ্ধে মহাপরাক্রমশালী দুর্যোধন যদি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান তবে অনায়াসেই জয়ী হতে পারেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্তার কৃপাদৃষ্টি থেকে সদাবঞ্চিত দুর্যোধন, তাঁরা প্রিয়তম বন্ধু প্রথম পার্থ কর্ণের মতো'ই অন্যায়যুদ্ধে জয়ী হতে চাননি। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভীমসেনকেই বেছে নেন। তাঁর গুরু বলরামের উপস্থিতিতে এই দ্বৈরথে ন্যায়ত তিনি ভীমসেনকে পরাজিত করেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের কূট ষড়যন্ত্রে অন্যায়ভাবে ভীমসেন দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করে তাঁকে পরাজিত করেন। এই অন্যায়কর্মের জন্য ক্ষিপ্ত বলরাম ভীমসেনকে হত্যা করতে উদ্যত হ'ন। কিন্তু এবারেও শ্রীকৃষ্ণের কূটবুদ্ধি জয়ী হয়। ফলত দুর্যোধনের মৃত্যু ও অশ্বত্থামার পাণ্ডবশিবিরে হত্যাযজ্ঞ। মহাভারতের মূলতত্ত্ব 'ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়' এভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের যুক্তিতে। অন্যস্বরের যুক্তি পরিত্যক্ত হলো সার্বিকভাবে। সেই ট্র্যাডিশন আজো চলেছে এদেশে। ------------------------ এই নাটকটিতে নাট্যকার কিন্তু মহাভারতের কোনও নবতর ইন্টারপ্রিটেশন দিতে চাননি। তিনি আমাদের এই মূহুর্তের ভারতবর্ষে 'নীরবে, নিভৃতে কাঁদা বিচারের বাণী'কেই উপজীব্য করেছেন। যার ফলে এপিকের আধারে, বর্তমানের পরিসরে মনুষ্যত্বের অবমাননার বিশ্বস্ত নাট্যমূহুর্তগুলি গড়ে উঠেছে। যে ব্যাধের মুখে পাণ্ডবপক্ষ দুর্যোধনের ঠিকানা জানতে পেরেছিলেন সেই চরিত্রটি থেকেই এই ডিসকোর্সের সূত্রপাত। সমাজের প্রান্তিকস্তরের একজন মানুষ তার মূল্যবোধে স্থির থাকে, যখন সমাজের শিরোমণিরা সুবিধেবাদের স্বার্থপরতাকে শিরোধার্য করে। ভিন্ন ভিন্ন ফুলে গাঁথা একটি মালা হয়ে ওঠে জয়ের প্রতীক। অন্য একটি তর্কের অবতারণাও করা হয়েছে পরিশেষে যুধিষ্ঠির ও কুন্তীর কথোপকথনের মাধ্যমে। আমাদের মূল্যবোধের শিকড় কোথায় রয়েছে? এই বোধ আমাদের কর্তব্যজাত না প্রণয়জাত? এই প্রশ্নটির প্রাসঙ্গিকতা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। কারণ দিনের শেষে 'মহাভারত' মানে একটা শাশ্বত মূল্যবোধের গঙ্গোত্রী। তর্কবিতর্কের অযুতনিযুত উপলখণ্ডের বাধাপ্রতিরোধকে জয় করে সে মনুষ্যত্বের মহাসাগরের দিকে ছুটে যায়। ----------------------- নাটকটিতে সংলাপরচনা বেশ সতর্কতার সঙ্গে করা হয়েছে। মহাকাব্যের আধারে নাট্যপ্রস্তুতিতে নাট্যকারের কাছে একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ থাকে। ভার ও ধারের সঙ্গে আপোস না শব্দচয়ন করতে হয়। সঙ্গতভাবেই তৎসম শব্দের বহুল প্রয়োগ থাকে সেখানে । কিন্তু দেশজ বা তদ্ভব শব্দের মিশেল যদি সঠিক অনুপাতে না থাকে, তবে তা হয় গৈরীশী নয় চিৎপুরি ফাঁদে পড়ে যেতে পারে। সেই প্ররোচনা এই নাটকে অতিক্রম করা হয়েছে। নাটকটির বৃহৎ সম্পদ নির্দেশক শ্রী দেবেশ রায়চৌধুরীর দুর্যোধনের ভূমিকায় অভিনয়। উচ্চগ্রামী মহাকাব্যিক চরিত্রকে সঠিক আবেগে, সন্তুলিত সংবেদনায় ধরে রাখার জটিল সৃজনশীলতা এই অভিজ্ঞ, পরিণত নাট্যব্যক্তিত্ব সহজভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শবর ও যুধিষ্ঠিরের ভূমিকায় যথাক্রমে শ্রী গৌতম চক্রবর্তী ও শ্রী অমিয় হালদার সুবিচার করেছেন। কুন্তীর ভূমিকায় শ্রীমতী তুলিকা দাস সনিষ্ঠ থেকেছেন। কিন্তু 'কুন্তী' বস্তুত মাটির অন্য নাম । যেখানে প্রধান পুরুষেরা তাঁদের শ্রেষ্ঠতা কর্ষণ করে থাকেন। তাই কুন্তী আখ্যানের প্রয়োজনে রাজ্ঞী হলেও ব্যক্তিত্বের বিচারে তাঁর বিশেষত্ব মৃত্তিকাময় দার্ঢ্যে। তিনি অনেক সময়ই তাঁর পুত্রবধূ যাজ্ঞসেনীকে অতিক্রম করে যান স্বাধীনচিত্ততায়, নারীত্বের মৌল বিক্রমে। এই নাটকে কুন্তীর চরিত্রটিকে অতি পরিশীলিত, সহনশীল মনে হয়েছে আমার। অন্যান্য চরিত্রের কুশীলবরাও যথোচিত দায়িত্বসচেতন ছিলেন। আলোয় জয় সেন উল্লেখ দাবি করেন। এই নাটকে নির্দেশকের শিল্পবোধ ও রম্য সৃজনশীলতা নিঃসংশয়ে প্রতিষ্ঠিত। ---------------------- নানা ফুলের মালায় প্রতিটি ফুলই নিজের বৈশিষ্ট্যে ও যাথার্থ্যে যেমন উজ্জ্বল, প্রনিধানযোগ্য; তেমনি সফল সমাজের মহিমা তার বহুস্বরের বৈচিত্র্য ও স্বীকৃতির স্বতঃস্ফূর্ততায়। নাটকটি সেই কথাই বলে।

172

6

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

"বহু দিন ধ'রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে       দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,              দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া       একটি ধানের শিষের উপরে              একটি শিশিরবিন্দু।" এমন করেই দুইপা ফেলতে ফেলতে চলে গেলাম প্রায় দুশো মাইল! গরমের ছুটি সমাপন প্রায়। মনের মধ্যে চিনচিনে কষ্ট। আবার সেই প্রাত্যহিকতার আবর্তে ঘড়ির কাঁটাকে সাথে নিয়ে ছুটে বেড়ানো। তার আগে এই এক সপ্তাহে মধ্যে কোথায় ঘুরে আসা যায়? পাহাড় নাকি সমুদ্র? মন বললো, চল কাটিয়ে আসি সবুজের মাঝে। যেখানে কপাল চুম্বন করে যায় পাহাড় আর সমুদ্র ছুঁয়ে যায় চরণ! চারিদিকে সটাং খাড়া রেডউড, পাইন গাছের দল অতন্দ্র পাহারা দেয়। সানফ্রানসিসকো থেকে মোটামুটি ১৬৩ মাইল নর্থে ঠি ক এমনই একটি জায়গার নাম, ম্যানডোসিনো। জনসংখ্যা হাজারের নীচে। আমাদের আসা যাওয়ার পথ, সান ফ্রানসিসকো আর স্যান্ড ডিয়াগোর মাঝখানের জঙ্গল, সমুদ্র আর নদীকে পাশে নিয়ে চকচকে সরিসৃপের মত এঁকেবেঁকে চলতে থাকা রুট ওয়ান, পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর! ক্যামেরার সাধ্য কি সেই সৌন্দর্য তুলে ধরা! ম্যানডোসিনোর বাতাস প্রতিনিয়ত শুদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে ৩,০০০ মাইল ব্যাপী প্যাসিফিক ওশান, তাপমাত্রা সারা বছর ধরে মনোরম। রং বেরঙি ফুলের, সবজির বাগান এই শহরের বৈশিষ্ট। এইস্থান, গাধা, লামা, ঘোড়া, রেকুন, শিয়াল, হরিণ, ববক্যাট, ক্রোগার, কালো ভাল্লুকের ইত্যাদি পশু আর পাখিদের নিরাপদ আস্তানা। আর এখানকার মানুষ সদা সচেতন অজস্র জীব-জন্তুর স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। ম্যানডোসিনোর সৃষ্টি হয়েছিল সিভিল ওয়ারের আগে, ১৯৫০ এর শেষের দিকে। এই গ্রামটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নেট স্মিথ নামে একজন কালো মানুষ। আমরা গিয়ে উঠেছিলাম ম্যানডেসিনো কোষ্টের পাহাড়ের পাশে অবস্থিত একটি ইকো ফ্রেন্ডলি রেজর্টে, স্টান্ডোফোর্ড ইন। রিজর্টের রেষ্টোরেন্টটি পুরোপুরি ভিগন, মানে এদের তৈরী যে কোনো পানীয় বা খাবারে কোনোরকম পশুপাখির ছোঁয়াচ থাকে না। তাই চা কফির সাথে এরা দেয় নারকেল বা সয়া দুধ, রান্নায় চীজের বদলে তফু বা কাজুবাদামের ক্রিম। ডিম না, মাছ না মাংস না। সব খাদ্য গাছনির্ভর। রিজর্টটির নিজস্ব অরগ্যানিক বাগান আছে, সেখানে গিয়ে দেখে এলাম, মহা সমারোহে সবজি পাতি, মশলা, এমনকি ফুলেরও চাষ হচ্ছে। আমাদের আমিষ জিভ এইরকম সবকিছু গাছনির্ভর বিশেষ উপকরণ দিয়ে বানানো খাদ্যসামগ্রীতে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু মন উদগ্রীব ছিল, এমন অভিজ্ঞতা উপলব্ধ করার তাগিদ ছিল। ইন্টারনেট খুবই ধীরে, মাঝে মাঝে নেই হয়ে যায়। পাওয়ার কাট হয়ে যায় আচমকা, তখন লবির আলো ছায়া পথ ধরে রিজর্টের অফিসে পৌঁছালে, তারা লন্ঠন বা মোমবাতি ধরিয়ে দেন। শেষ কবে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল, মনে পড়েনা। মানুষ এখানে আসে জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথ ধরে সবুজে হারিয়ে যেতে, বাইক করতে, কায়াকিং করতে, যোগা করতে এবং জীবনযাপনের জটিলতা ভুলে মানসিক এবং শারীরিকভাবে তরতাজা হয়ে উঠতে। তাই এই শান্ত জায়গাটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের হতাশ করতে পারে। একদিন গেলাম পাশের ছোট্ট শহর ফোর্ট ব্র্যাগ এর গ্লাস বিচ এ। ১৯০৬ নাগাদ ফোর্ট ব্র্যাগের বসবাসকারীরা এই বিচ এ এসে তাদের যত জঞ্জাল ফেলে যেত। তারমধ্যে কাচ থাকতো, অকেজো যন্ত্রপাতি এমনকি পুরোনো গাড়িও থাকতো। ১৯৪৩ নাগাদ যখন জায়গাটি জঞ্জাল দিয়ে ভরে এল, তখন তারা অন্য জায়গা খুঁজে নিল। শহর উদ্যোগ নিল জায়গাটি পরিস্কার করার, ততোদিনে সমুদ্রের ঢেউ এসে কাচ, মাটির পাত্র গুঁড়িয়ে দিয়ে ছোট ছোট রংচঙে মসৃণ আকার দিয়েছে, যা গয়না বানাবার উপযুক্ত। মানুষজন, বাচ্চা থেকে বুড়ো দেখলাম একমনে সেই কাচ খুঁজে থলিতে ভরছে। ক্ষণিক আমরাও মাতলাম সেই খেলায়। এমন করেই চারটে দিন অলস গতিতে বয়ে গেল। জীবনরসে ভরপুর হয়ে ফিরে এলাম আমরা, নতুন করে আবার জীবনযুদ্ধে মাততে।

849

36

শিবাংশু

আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে...

আজ বাইশে শ্রাবণ, ".... কর্মক্লিষ্ট, সন্দেহপীড়িত, বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটাকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে একটি নিত্যশোক, নিত্য ভয়, নিত্যমিনতির ভাব আছে। আমাদের হৃদয় উদ্ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়।.... ভৈরবীতে সেই চিরসত্য, সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে......" -২১শে নভেম্বর, ১৮৯৪, কলকাতা

149

5

Ranjan Roy

তিন তালুকদার : নাটক

তিনজন তালুকদার ============== (খালি মঞ্চে সেন্টার স্টেজে একটি বেঞ্চ পাতা।বাঁদিক থেকে ১ম অভিনেতা তুড়ি বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে ঢুকে এক উইংস থেকে বিপরীত উইংস পর্যন্ত ফুটলাইটের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। তারপর ফিরে এসে সেন্টার স্টেজে দাঁড়িয়ে দর্শকদের মুখোমুখি হয়।) ১ম: 'তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে, এমন সময় করল তাড়া মিশকালো এক কুকুরে। কুকুরটা যেই করল ধাওয়া, আর হল না শালুক খাওয়া, ছুটল ভালুক বাড়ির পানে সেদিন বেলা দুকুরে।' আচ্ছা, এই শীতের দুপুর পার্কে এসে একটু নিরিবিলিতে রোদ পোহাব, তারও জো নেই। এই অ্যাত্তোগুলো লোক এখানে তামাশা দেখতে হাজির হয়েছে। বলি, ও মশাইরা! আপনাদের কি আর খেয়েদেয়ে কোন কাজ নেই, দুপুরবেলা বাড়িতে চারাপোনার ঝোল দিয়ে দুটি খেয়ে নিয়ে কোথায় লেপমুড়ি দিয়ে ভাতঘুম দেবেন, তা নয়, পার্কে এসে ভিড় করেছেন।ঠিক আছে, ঠিক আছে, দুপুরে নাই ঘুমুলেন সর্দি হবে, মাথা ধরবে, তাই তো? তো টিভি খুলে সিরিয়াল দেখতে কে মানা করেছে!ও,আপনার ওসব পছন্দ নয়? কেন? ঘরে ঘরে আজকাল অমন শাস–বহু সিরিয়াল চলছে? বেশ তো, পুরনো বাংলা সিনেমা দেখুন না! উত্তম–সুচিত্রা? সাড়ে চুয়াত্তর, হারানো সুর, বিপাশা, সপ্তপদী, গূহদাহ।আর বিকেলে খেলা? ডার্বি?দুর মশাই! আপনাদের দেখছি কিছুতেই উৎসাহ নেই। সব অকালে বুড়িযে গেছেন। ও, গি্ন্নি এইসময় টিভি কব্জা করে বসে থাকেন? আচ্ছা, উনি নেই? বাপের বাড়ি গেছেন? কদ্দিনের জন্যে? কি বললেন? দশবছর হল? মানে? না না, ভেরি সরি। কী হয়েছিল বললেন? ক্যানসার?ভেরি সরি। কিন্তু টিভি? ও বৌমার কব্জায়? মশায় আপনি সিনিয়র সিটিজেন, আপনার জন্যে কোন কনসিডারেশন নেই?সিনিয়র সিটিজেনদের সবাই কনসিডার করে। সরকার পাবলিক সবাই। রেলে কনসেশন, বাসে স্পেশাল সিট, মেট্রো রেলেও।না, না। এ আপনার বৌমার ভারি অন্যায়!আপনি বুঝিয়ে বলুন। আর অবুঝ হলে ছেলেকে বলুন। আপনাকে একটা আলাদা টিভি করে দিক। ছেলে কী বলল? বেশি টিভি দেখা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়? ডাক্তারে বলেছে? যত্তসব! না, না। খামোকা আপনার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছি না। ভেরি সরি। কিন্তু আপনি নিজের জায়গা এত সহজে ছেড়ে দেবেন না। ছাড়তে ছাড়তে শেষে নিজের ঘর ছেড়ে বারান্দায় ঠাঁই হবে। বুঝলেন? আর শেষ কোথায় হবে কেউ জানে না। হয়ত বাড়ি ছেড়ে সরে পরতে হবে। কোথায় ? কোথায় আবার? হয় বৃদ্ধাশ্রমে, নয় রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। না না। আপনাকে অপমান করছি না। খালি বলছি -এত সহজে হার মেনে নেবেন না। কী করতে পারেন? অনেক কিছু। যেমন ধরুন, বৌমা যখন ওনার পছন্দের সিরিয়ালটি দেখতে বসবেন তখন আপনিও গিয়ে ওখানে চেয়ার টেনে বসে পড়বেন। বলবেন যে আপনিও ওই সিরিয়ালটি দেখতে এসেছেন। খুব প্রশংসা করবেন ওই সিরিয়ালের অল্পবয়সী নায়িকার। বলবেন-- এমন বৌমা যেন সবার ঘরে হয়। আর নিন্দেমন্দ করবেন সিরিয়ালের কুচক্কুরে শ্বাশুড়ি, খান্ডার ননদ এবং নিপাট ভালোমানুষ ন্যাকা শ্বশুরের। কী বলছেন? পারবেন না? লজ্জা করে? দূর মশাই, এই জন্যেই বাঙালীর কিছু হবে না। ঠাকুর বলে গেছেন-- লজ্জা, মান , ভয়; তিন থাকতে নয়। বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন। তাই মার্গারেট নোবল নামের মেমসাহেবকে কোলকাতায় নিয়ে আসতে লজ্জা পান নি। ওসব ন্যাকামি ওনার ছিল না। বরানগর মঠের জন্যে ভিক্ষে করতে, থুড়ি মাধুকরীর জন্যে পথে বেরোতে মান-সম্মান গেল ভাবেন নি। আর ভয়? সে তো কবেই--। নইলে জাহাজে চড়ে বিদেশে গিয়ে বাঘা বাঘা সাহেবসুবোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইংরিজিতে লেক্চার দেন? কী বললেন? ভাট বকছি! না মশাই, বৌমাকে আমার একনম্বর দাওয়াই দিয়ে দেখুন।সাতদিনের মধ্যে হাতে গরম রেজাল্ট! না পেলে আবার আমাকে কনসাল্ট করবেন, বিনে পয়সায়। প্রতি রোববার, দুপুরবেলা , এই পার্কে। ও হো হো! জানতে চান আমি এখানে কি করছি? আমার ওষুধ আমার বাড়িতেই কেন ফল দেয় নি? সে মশাই গুঢ় তত্ত্ব। এ'রকম চেঁচিয়ে বলা যাবে না। শুধু আপনাকে বলতে পারি। উঠে আসুন। হ্যাঁ, এদিক দিয়ে। দেখুন স্টেজের বাঁ পাশে ছোট্ট সিঁড়ি আছে। আর হ্যাঁ, লাইটের তার-টার গুলো একটু দেখে, নইলে গোটা স্টেজ অন্ধকার। হ্যাঁ, আসুন। এসে এই বেঞ্চে আমার পাশটিতে চুপটি করে বসুন। তারপর বলছি। আরে মশাই, অনেক জায়গা আছে।যদি হয় সুজন, তো তেঁতুল পাতায় ন'জন। আর এত বড় বেঞ্চ, খালিই পড়ে আছে। [দর্শকদের থেকে একজন মঞ্চে উঠে আসে।] ২য়ঃ দেখুন মশাই, অনেক হয়েছে। তখন থেকে আপনার আগড়ম বাগড়ম শুনে যাচ্চি, এবার ঝেড়ে কাশুন দিকি! সবাই কে তো ঘরে থাকার ফর্মূলা ৪৪ দিচ্চেন, নিজে কী কচ্চেন? কথায় বলে না--আপনি আচরি ধম্মো! তা আপনাকে কে হুড়ো দিচ্চে? গিন্নি না বৌমা? গিন্নি? [১ম ইশারায় উপরের দিকে দেখায়।] ও, আপনারো সেই দশা! তা আপনিও তো সিনিয়র সিটিজেন। সেই সিটিজেন'স চার্টার নিজের বাড়িতে অচল। এই সব বক্তিমে ছেলে-ছেলে বউকে শোনান না! সে ব্যাপারে লবডংকা! কিচুই বুঝলাম না! আপনার মাথার ব্যামো নেই তো? অনেক্ক্ষণ পেটে কিচু পড়েনি বুঝি? বেচারা! চিনেবাদাম চলবে? আমার কাছে একটু বেঁচে আছে। ১মঃ আরে না মশাই। যা ভাবছেন তা একেবারেই নয়। বৌমা আমার খুব যত্ন করে। আমার খুঁটিনাটি খেয়াল রাখে। সকালে বেড-টি, বিস্কিট। রোজ নতুন নতুন জলখাবার। দশটায় মৌসুমী ফলটল। হরলিক্স। চানের সময় গরম জল।দুপুরে বাঁশকাঠি চালের ভাত। মাছের ঝোল। রোব্বারে মাংস। দুদিন অন্তর বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় পাল্টে দেওয়া। বিকেল সাড়ে চারটেয় ঘড়ি ধরে চা। সন্ধ্যেয় টিভিতে সিনেমা। আমার ঘরে আলাদা পোর্টেবল সেট। রাত্তিরে ঘড়ি ধরে শুতে পাঠায়, মশারি টাঙিয়ে দেয়। ২য়ঃ ডাক্তারের চেক আপ? ১মঃ প্রতি মাসে নিয়ম করে। ঘরে এসে প্রেসার চেক। ছ'মাসে সুগার কোলোস্টেরল টেস্ট, ইসিজি। ২য়ঃ ওব্বাবা! আপনি তো ভগোবানের বরপুত্তুর! আর বইপত্তর? ১মঃ হ্যাঁ, দুটো কাগজ।একটা ইংরিজি আর একটা বাংলা। দেশ পত্রিকা। পাড়ার লাইব্রেরির কার্ড। বৌমা নিজে গিয়ে বই বদলে আনে। ২য়ঃ উঃ! কালীদা গো কালীদা! আর পারি না। সবই বুঝলাম। এসব হল গতজন্মের পুণ্যি! এবার আপনার সিরিয়ালের টুইস্ট? ১মঃ টুইস্ট? ২য়ঃ হ্যাঁ মশাই। হর কহানী কে অন্ত মেঁ এক টুইস্ট হোতা হ্যায়। নইলে ঘরে এত যত্ন আত্তি ! তবু আপনি দুকুরবেলা এখানে বসে! ১মঃ বলছি, বলছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে।আগে একটু ভিজিয়ে নিই। [সঙ্গের ঝোলার থেকে একটি জলের বোতল ও আনন্দবাজার পত্রিকা বের করে পত্রিকাটি ২য়ের হাতে ধরিয়ে দেয়, তারপর বোতল থেকে এক ঢোঁক খেয়ে তৃপ্তির শব্দ করে বেঞ্চিতে বসে, ২য়কে বসায়।] ২য়ঃ (কিঞ্চিৎ বিরক্ত) কই মশাই, শুরু করুন। ১মঃ বলছি, বলছি। আপনাকে ছাড়া কাকে বলব? একজন কাউকে তো বলতেই হবে। ২য়ঃ ধেত্তেরি, যত ভ্যান্তারা। বুইতে পেরেচি, নজ্জা করচে! ছেলে পোঁচে না, ছেলেবৌ ভাত দেয় না! সেই হরিদাসের গুপ্তকতাটা আবার কানে কানে বলতে হবে! এদিকে দুনিয়ার পাবলিককে ফিরিতে জ্ঞানদান কচ্চে , যেন ক্লাবকে সরকারি ডোনেশন! আমি চল্লেম, তোমার দৌড় জানা আচে। বলি ' এতই তোর বুদ্ধি হলে, আজ কেন তোর ক্যাঁতা বগলে?' চল্লেম! [ ২য় পত্রিকটি বেঞ্চের ওপর ছুঁড়ে ফেলতেই ১মজন হাঁ-হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটা তুলে নেয়। ২য় একটু অপ্রস্তুত।] কী আচে ওতে? কোন সাত রাজার ধন মাণিক? ১মঃ আরে ওটাই তো আসল! ওর জন্যেই তো এখানে আসা! ওটাকে অমন হতচ্ছেদ্দা করলে ধম্মে সইবে? ২য়ঃ আমি আবার কাকে হতচ্চেদ্দা করলাম? ১মঃ আরে এই পত্রিকাটা; এই রোববারের আনন্দবাজার! এর জন্যেই গোটা সপ্তাহ হা-পিত্যেশ করে বসে থাকি। এর জন্যেই চুপিচুপি দুপুরের রোদে পার্কে এসে বসি। ২য়ঃ মানে? নিজের ঘরে বসে আনন্দবাজার পড়তে পারেন না? আর এদিকে বড়ফট্টাই হচ্চে যে ছেলে-ছেলেবৌ আমায় চোকে হারায়? এমন ধ্যাষ্টামো-- ১মঃ দূর মহায়! এই দেখুন 'পাত্রপাত্রী' কলমগুলো। এগুলো কখনো মন দিয়ে পড়েছেন? ২য়ঃ খামোকা কেন পড়তে যাবো? ছেলের পরে একটি মেয়ে ছিল। তা তিনি অফিসের মাদ্রাজি বসের সাথে রেজিস্ট্রি করে মুম্বাইয়ে ঘর বেঁধেছেন। বুড়ো বয়সে নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে রোববার রোববার ওই সব কলম দেখব আর লালকালিতে দাগাব, সে চান্সই দিলে না। আপনারও কি মেয়ের বিয়ে দেওয়া বাকি? ১মঃ আরে আমারও একই অবস্থা। এক ছেলে আর বৌমা। সে ইন্টারনেটে সার্চ করে ওদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আমি এগুলো দেখি নির্মল আনন্দের খোরাক বলে। শুনবেন নাকি দু-একটা স্যাম্পল? (খুলে পড়তে থাকে) এই যে, এটা দেখুন। 'সুন্দরী ফর্সা শিক্ষিতা পাত্রীর জন্য কেঃ সঃ চাঃ/ রাঃসঃ চাঃ / বেঃ সঃ চাঃ পাত্র চাই। বা বেঃ সঃ নেশাহীন সুপাত্র কাম্য। ২য়ঃ এইসব কেঃ সঃ চাঃ/ রাঃসঃ চাঃ / বেঃ সঃ চাঃ কোডের মানে? ১মঃ তা ও জানেন না? কেন্দ্রীয় সরকারী চাকুরে/ রাজ্য সরকারি চাকুরে/ বেসরকারী চাকুরে। আরো দেখুন। কি পরিমাণে ডিভোর্সী কেস? এটা—ডিভোর্সী --- সন্তান নেই; এটা--শুধুই রেজিস্ট্রি, আইনে অসিদ্ধ, সোশ্যাল হয় নি। আর এটা-- সোশ্যাল ম্যারেজ হইয়াছিল। কিন্তু অষ্টমঙ্গলার পর হইতেই কন্যা পিতৃগৃহে; পতিসংসর্গ হয় নাই। ২য়ঃ উঃ থামুন তো! মাথা ধরিয়ে দিলেন। এইসব ফালতু জিনিস পড়তে আনন্দবাজার বগলে নিয়ে পার্কে আসেন? কেন? নিজের ঘরে বসে বৌমার দেওয়া চা অথবা ফলের রসে চুমুক দিতে দিতে-- ১মঃ আরে সেটাই তো রহস্য। আস্তে আস্তে ভাঁজ খুলছি।তার আগে আরও কিছু স্যাম্পল দেখুন না! -- এই যে, উজ্বলশ্যামবর্ণা, ম্যাট্রিক পাস, গৃহকর্মনিপুণা, সম্ভ্রান্ত পূঃবঃ সম্ভ্রান্তবংশীয় সৌকালীন গোত্র, কায়স্থ। সুউপায়ী, সৎপাত্র কাম্য। পঃ বঃ চলিবে না। কী বুঝলেন? অমন হাঁ-মুখ দেখেই বুঝেছি, বোঝেন নি। শুনুন, বলছে বাঙাল কায়স্থ পড়াশোনায় লবডংকা, কালো মেয়ে। কুলীন কায়স্থ। তবে ছেলে ঘটি হলে চলবে না। -- -- আর এটা, সুন্দরী ফর্সা শিক্ষিত (অনধিক ২৫/২৬) পাত্রী চাই। পাত্র বিদেশে নামজাদা মালটিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত। শীঘ্র বিবাহ; কোন দাবিদাওয়া নাই। কেবল প্রকৃত সুন্দরীর অভিভাবকগণ ফোটো সহ আবেদন করুন। ২য়ঃ শালা, যেন চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। ১মঃ এটাকে কী বলবেন? পাত্র (৪০) কোলকাতার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী স্বর্ণবণিক পরিবারের একমাত্র পুত্র। কলিকাতায় নিজস্ব বাড়ি আছে। মাসিক আয় (৪০০০০/-)। জাতিবন্ধন নাই। তবে চাকুরিরতা অথবা পূঃবঃ কাম্য নহে। ২য়ঃ ঢের হয়েছে। ক্ষ্যামা দিন; আর পারছি না। ১মঃ ব্যস্ ব্যস্; এই শেষ মণিমুক্তোঃ গরীব পরিবারের মেধাবী পুত্র। সম্পন্ন পরিবারের কানা/খোঁড়া বা যে কোন খুঁতসম্পন্ন কন্যাকে বিবাহ করিতে রাজি। ঘরজামাই প্রস্তাবেও আপত্তি নাই। অভিভাবকগণের অনুমতি আছে। ২য়ঃ ঘেন্না ধরে গেল। ১মঃ আমারও । দেখছেন? সমাজ কোন পথে চলেছে? সোজা অধঃপতন। ২য়ঃ খুব দেখছি, পতন তো অধঃই হয়; উর্দ্ধপতন বলে কিছু হয় কি? ১মঃ অ্যাই, কোন অশ্লীল কথা নয়; এটা ভদ্রলোকের পাড়া। ২য়ঃ অশ্লীল কথা কেউ বলেনি, আপনার নোংরা মন, তাই সাধারণ কথার বিকৃত মানে করছেন? ১মঃ কী বললেন? আমার নোংরা মন? ২য়ঃ নয়তো কি? নইলে কেউ এই বয়সে পার্কে বসে ঐসব অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ঘাঁটে? বিকৃতরুচি! ১মঃ শুনুন মশাই; আমরা হলাম ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার সাজনপুর পরগণার তালুকদার ফ্যামিলি। সেই ইংরেজ আমল থেকে।আমাদের বংশে কেউ সরকার বাহাদুরের খাজনা বাকি রাখে নি। অনাবৃষ্টির বছরেও, ফসলের দাম পড়ে গেলেও। দশটা গাঁয়ে আমাদের সুনাম ছিল। চরিত্র নিয়ে কোন কথা উঠে নি। আর আপনি— ২য়ঃ সে কী! আপনিও তালুকদার? আমরাও তাই। তবে যশোরের নড়াইল এলাকার। খুঁজলে হয়ত লতায়-পাতায় একটা আত্মীয়তা বেরিয়ে পড়তেও পারে। ১মঃ না, পারে না। যশোর জেলায় কোন তালুকদার হতে পারে না। আপনারা নকল। ২য়ঃ কী আবোলতাবোল বকছেন? আমাদের পদবী তালুকদার পরাশর গোত্র। আপনি না-না করলেই হল? যত্ত কাঠবাঙালের গোঁ! ১মঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের পদবী তালুকদার নয়। আমরা আসলে সাজনপুর পরগণার গোটা তালুকের মালিক। ডায়রেক্ট ইংরেজ সরকারকে খাজনা দেওয়া হত; তাই উপাধি তালুকদার। এ নিয়ে আজও আমাদের পরিবারের সবাই গর্বিত। ২য়ঃ এতে গর্বিত হওয়ার কী আছে? ১মঃ আরে, মাঝখানে কোন মিডলম্যান বা মধ্যসত্ত্বভোগী নেই। সোজা সরকার বাহাদুরকে খাজনা দেওয়া। কত্ত বড় সম্মান! আপনি এসব বুঝবেন না। ২য়ঃ কেন বুঝব না? আমাদের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের আস্তাবলের সহিস। উনি একদিন ঘোড়ার একটা বাতিল জিন থেকে একটুখানি চামড়া আর রবারের টুকরো কেটে নিয়ে গুলতি বানিয়ে নাতিকে দিয়েছিলেন। তো ধরা পড়ে যান। তখন ম্যজিস্ট্রেট বাহাদুর তাঁকে কাছারিতে ডেকে এনে সবার সামনে হান্টার দিয়ে চাবকে ছিলেন। সেই ঘা শুকোতে অনেক দিন লেগেছিল। আজও আমরা প্রপিতামহের পিঠে সেই চাবুকের দাগ নিয়ে গর্ব অনুভব করি। ১মঃ এসব কী ভাট বকছেন? সাহেব কষে চাবকেছে তো গর্বিত হওয়ার কী আছে? ২য়ঃ সায়েব সবার সামনে জামা খুলিয়ে নিয়ে নিজের হাতে চাবকেছে। ডায়রেক্ট! মাঝখানে কোন মিডলম্যান ছিল না। কী গৌরবের কথা। আপনি বুঝবেন না। ১মঃ ঠাট্টা করছেন? সে করুন গে। কিন্তু আপনাদের তালুক কেন, নিজের বলতে বোধহয় এক ছটাক জমিও ছিল না। আমাদের গোটা একটা পরগণা। ২য়ঃ হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না। কিন্তু আপনাদের সেই তালুকও তো 'ছিল', এখন 'নেই'। এখন আপনি হরিদাস পাল ছেলেবৌমার চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে এখানে পার্কে পত্রিকা পড়ছেন। কাজেই আমিই আসল তালুকদার, ওটাই আমার পদবি; আপনি নকল। ১মঃ ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনিই ঠিক। আমিই ভুল। আসুন আমরা মিটমাট করে নেই। (হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু ২য় দু'পা পিছিয়ে যায়।) কী হল? ২য়ঃ না মানে আমি কোলাকুলি করি না। ১মঃ সে কী, বিজয়দশমী বা ঈদের দিনেও না? ২য়ঃ না; আমার ওইসব জাদুই ঝাপ্পি দেওয়া নিয়ে একটু রিজার্ভেশন আছে। ১মঃ আচ্ছ? কারণটা বলতে আপত্তি আছে? ২য়ঃ না, মানে ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে কংসবধ পালা দেখেছিলাম। সেখানে নিজের পিতাকে কেন বন্দী করেছে সেটা খোলসা করতে গিয়ে কংস বলছে যে আসলে ওর মা কোন দৈত্য। সে ব্যাটা ভরবিকেলে কোন উদ্যানে গিয়ে কংসের মাকে একা পেয়ে আলিঙ্গন করল, আর তার ফলে কংসের জন্ম হল। তখন থেকেই আমার মনে কোলাকুলি নিয়ে কেমন ভয় ধরে গেছে। ১মঃ ধ্যাত্তেরি! আপনি বা্চ্চা নাকি? ওসব তো রূপক বা প্রতীকাত্মক। সাহিত্যে বোঝাতে গেলে--। ২য়ঃ আমিও সাহিত্যে এম এ। তবে ইংরেজিতে। বুঝি সবই। তবে বলা তো যায় না। যদি কিছু হয়ে যায়। এটা ভারতবর্ষ। ১মঃ আপনিও আজব লোক মশাই। অবশ্যি তালুকদারেরা ও'রম একটু হয়েই থাকে। তো শেকহ্যান্ড করতে তো কোন আপত্তি নেই? ২য়ঃ তা নেই। কিন্তু আগে আপনি বলুন ঘরে বসে কেন পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়তে পারেন না? কেন ঝোলায় পুরে পার্কে এসে পড়তে হয়? ১মঃ (মাথা চুলকে) উপায় নেই। নিজের ঘরে সারাক্ষণ হয় বৌমা নয় ছেলে আমাকে চোখে চোখে রাখে। বাবা, এবার একটু বেদানা, এই দু'কুচি আপেল, এবার মুরগির আংসের স্টু! আচ্ছা বাবা , আগের বইটা মানে নারায়ণ সান্যাল আপনার পড়া হয়ে গেছে? আজকে বদলে দিছি। জরাসন্ধ পড়বেন? উঃ হাঁপিয়ে উঠেছি। যেন চিড়িয়াখানায় বাঘকে খাঁচায় ঢুকিয়ে যত্ন আত্তি করা হচ্ছে। আমাদের বাড়িতে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন আসে না। কার সঙ্গে মনের কথা বলব। ২য়ঃ তা আপেল বেদানা মুর্গীর ঠ্যাং চিবুতে চিবুতেই না হয় রোববারের আনন্দবাজার পড়তেন; প্রবলেম কোথায়? ১মঃ ওই পাত্রপাত্রীর পাতাটা খুলতে দেখলেই ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়।তক্ষুণি শুরু হবে ঘ্যানঘ্যান। (নকল করে)-বাবা, আমরা কি আপনার যত্ন আত্তি করি না?তবে কেন ঐসব ছাইপাঁশ পড়েন? - বল বাবা, তোমায় ঠিক করে খেতে পরতে দিই না? ২য়ঃ মানে? ১মঃ মানে ওরা ভাবে আমি বুড়ো বয়সে আবার বিয়ে করতে চাই; নিদেন পক্ষে সঙ্গী খুঁজছি। ভয় পায়, যদি উইল বদলে ফেলি, যদি বাড়ি আর ব্যাংক ব্যালান্স কোনো উড়ে এসে জুড়ে বসা শাকচুন্নি হাতিয়ে ফেলে? কত বুঝিয়েছি যে আমি এই বয়সে আবার ছাঁদনাতলায় যাওয়ার চক্করে নেই; কিন্তু ভবি ভোলে না।তাই লুকিয়ে পার্কে এসে পড়ে নেওয়া ছাড়া কোন রাস্তা নেই। ২য়ঃ উই আর ইন দ্য সেম বোট ব্রাদার! এবার হাত মেলাতে পারি। আমাদের তালুকদার ক্লাবে আপাততঃ দুজন সদস্য--আমি নামে তালুকদার, আপনি কামে তালুকদার। ১মঃ তাহলে আমি তালুকদার নম্বর এক; আপনি দুই। না না, রেগে যাবেন না। আপনাকে দুনম্বরি বলছি না।(ঘড়ি দেখে) এই রে, চারটে বেজে গেছে। আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। নইলে বৌমা চিন্তা করবে। ও আবার ঘড়ি ধরে সাড়ে চারটেয় চা দেয় কি না! আর আপনিও বাড়ি যান। গিয়ে আমার দাওয়াই নম্বর এক প্রয়োগ করুন। আর সাতদিন পরে রোববার দুপুরে এসে আমাকে প্রগ্রেস রিপোর্ট করুন। ২য়ঃ (দর্শকদের) আপনারাও আসুন, নতুন ফর্মূলা শিখতে, আগামী রোববার দুপুর দুটোয় ঠিক এই খানে। দ্বিতীয় দৃশ্য =========== [পার্কের বেঞ্চিতে বসে ১ম ও ২য় খোসগল্পে মেতে আছে] ১মঃ বাঃ, আপনি তো হেভি অ্যাক্টিং করতে পারেন মশাই! তা আপনার ডায়লগ শুনে বৌমা কী বললে? ২য়ঃ ও প্রথমে চোখ গোল গোল করে খানিকক্ষণ আমাকে দেখল। তারপর একটা মোড়া টেনে কাছে এসে বলল-- না বাবা, এই সিরিয়ালে শ্বশুর তেমন একটা ন্যালাক্যাবলা নয়, এক সপ্তাহ নিয়মিত দেখলে বুঝতে পারবেন। ও'রকম শ্বশুর আছে রাত ন'টার সিরিয়ালে--নামটা হল "চরকা কাটে চাঁদের বুড়ি" । সেটায় শাশুড়ি খুব ভাল। বৌটা নানান প্যাঁচ কষে, দিনভর গুজগুজ ফুসফুস করে দেওরের মাথা খায়, কু'মন্তর দেয়। আর শাশুড়ির ক্ষুরধার বুদ্ধি , ঠান্ডা মাথা; বৌটার সব প্যাঁচ মাঞ্জা দিয়ে ঢিল ছেড়ে খেলার মত করে খেলিয়ে কুচ কুচ করে কেটে দেয়। দেখবেন নাকি বাবা? আমি মাথা হেলিয়ে সায় দেওয়ায় নাচ বোলিয়ে স্টেপে রান্নাঘরে গিয়ে দু'কাপ গ্রিনলেভেল লিপটন চা নিয়ে এল। ১মঃ মার দিয়া কেল্লা! ২য়ঃ এবার? ১মঃ এবার দুনম্বর ফর্মূলা। আপনাকে একসপ্তাহ পরে বলতে হবে--বৌমা, তুমি যখন ব্যস্ত থাক, মানে টুকুনকে স্কুলে ছাড়তে গেলে, আনতে গেলে, কি পার্লারে গেলে--তখন যদি আমি বাংলা বা ইংরেজি খবরের চ্যানেলগুলো বা ফুটবল ক্রিকেট টেনিস একটু দেখি, তো আপত্তি আছে? তবে তুমি আসলেই আমি রিমোট ফেরত দিয়ে দেব। আর যখন রিয়েলিটি শো হবে, যেমন মাধা-গাধা-নিসা বা ধিতাং ধিতাং বোলে-- তখন তো অন্য কিছু দেখার প্রশ্নই ওঠে না, কী বল? ২য়ঃ তাতে আমার কোন মোক্ষলাভ হবে? ১মঃ হবে, হবে। আগামী দুটো রোববার ছেড়ে তিননম্বর রোববারে এই পার্কে এসে আমাকে রিপোর্ট করবেন। আরে আমার ওপর ভরসা রাখুন। বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ। ২য়ঃ ইয়েস, এইভাবে চললে লাইফ একদম হলিউড জলিগুড হয়ে যাবে। থ্রি চিয়ার্স ফর তালুকদার ক্লাব- (একসঙ্গে) হিপ -হিপ-হুররে! (দুজনে হাসিমুখে উঠে দাঁড়ায়। হাত ধরাধরি করে নাচতে থাকে।) "আমরা দু'টি ভাই, শিবের গাজন গাই, একটি-দুটি পয়সা পেলে বাড়ি চলে যাই। আমরা দু'টি ভাই---"। (হঠাৎ বেঞ্চির পেছন থেকে কেউ চেঁচিয়ে ওঠে-- " ফাউল! ফাউল! দুই নয় তিন; থ্রি মাস্কেটিয়ার্স"! " সেই শুনে দুই তালুকদার চমকে উঠে প্রায় ভিরমি খায় আর কি! তারপর দুজনে বেঞ্চির পেছনে উঁকি মেরে দেখতে থাকে এই চিৎকারের উৎস কোথায়! এমন সময় বেঞ্চির পেছন থেকে উঠে দাঁড়ায় আরেক জন। তালুকদার নম্বর তিন। সে উঠে হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে, তারপর হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেয়। দুজনের কেউই হাত মেলায় না, এক পা পিছিয়ে আসে।) ১মঃ অমন বিচ্ছিরি ফাউল-ফাউল চিৎকার কি আপনার? ৩য়ঃ আজ্ঞে হ্যাঁ। ২য়ঃ নিকুচি করেছে ‘আজ্ঞে-আপনির’। কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন জানেন? যদি হার্ট অ্যাটাক হত? ১মঃ আগে বলুন, চেঁচালেন কেন? ৩য়ঃ সরি সরি! আসলে আপনারা ভুল বললেন না, তাই। ১মঃ কী ভুল? ৩য়ঃ ওই যে বললেন--দুই তালুকদার,সেটা তো ভুল। ২য়ঃ কীসের ভুল? ৩য়ঃ আরে দুই নয়, তিন হবে, তিন তালুকদার। ২য়ঃ অ ! তা সেই তিননম্বর শ্রীমান কখন আবির্ভূত হবেন? ৩য়ঃ এই যে, আপনাদের সামনে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি; তালুকদার নম্বর থ্রি। আমাকে তালুকদার ক্লাবে নেবেন না? ১মঃ ইয়ার্কি হচ্ছে? আপনিও তালুকদার! কোথাকার? ৩য়ঃ আজ্ঞে, আমি কবি তালুকদার। কোথাকার জানিনা।জন্ম থেকে কোলকাতার। ২য়ঃ এটা কোন নাম হল? ৩য়ঃ কেন নয়? বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত গায়কের নাম যদি কবি মজুমদার হয়, সেই যে " যৌবন-সরসী নীরে" গাওয়া--তো আমি তো কবিতা লিখি-- আমাকে কবি তালুকদার বলে মেনে নিতে আপত্তি কেন? ১মঃ আপনি কবিতা লেখেন? ৩য়ঃ এই একটু আধটু; শুনবেন নাকি? ২য়ঃ সে শুনবো'খন। তার আগে বলুন তো, আপনি কোত্থেকে উদয় হলেন? ১মঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ; আর আড়ি পেতে আমাদের কথা শুনছিলেন কেন? ৩য়ঃ না ঠিক আড়ি পাতি নি। অনেক আগেই বেঞ্চির উপর ওই কৃষ্ণচুড়া গাছের ছায়া দেখে ওর পেছনে, মানে মাটিতে হেলান দিয়ে বসেছিলাম। তারপর কখন যে চোখ লেগে গেছল আর আমি গড়িয়ে প্রায় ওর নীচে ঢুকে পড়েছিলাম টেরই পাইনি। ১মঃ এই যে, কেন মিথ্যে কথা বলছেন বলুন তো? আমাদের কথা কান পেতে না শুনলে কী করে ঠিক সময় দুয়ের জায়গায় তিন তালুকদার বলে অমন চেঁচিয়ে উঠলেন? ঊঃ, পিলে চমকে গেছল মাইরি! ৩য়ঃ সরি, সরি! আসলে কাল সারারাত ঘুম আসে নি। তাই এখানে গাছের ছায়ায় ঝিরঝিরে বাতাসে চোখ বুজে গেছল। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। কানে এল আপনাদের কথাবার্তা। তখন মনে হল আরে আমিও তো তালুকদার, নকল নয়,পৈতৃক পদবি। তো আপনাদের সঙ্গে দোস্তি করলে কেমন হয়? একেবারে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! ২য়ঃ এঃ, একেবারে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। তবু স্বপ্ন দেখা চাই। ৩য়ঃ ঠিক তাই; স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ২য়ঃ ওরে বাবা, স্বপ্নগুলোকে! একটা স্বপ্নকে নিয়েই কত ঝামেলা। আর এতগুলো স্বপ্ন? কী লোক মাইরি আপনি। ৩য়ঃ কেন আপনার আমার সবার স্বপ্ন। আলাদা আলাদা স্বপ্ন। আপনি কোন স্বপ্ন দেখেন না? নিশ্চয়ই দেখেন। ১মঃ এত জোর দিয়ে বলছেন কী করে? আমাদের আপনি কতটুকু চেনেন? ৩য়ঃ আপনারা বেঁচে আছেন যে! তার মানে আপনাদের স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয় নি। সবচেয়ে দুর্ভাগা সে যার কোন স্বপ্ন নেই। সে আসলে বেঁচে নেই। মুশকিলটা এই -- সে নিজেও জানে না যে কবে মরে গেছে। ২য়ঃ ও! সে নিজে জানে না বেঁচে আছে কী মরে? অথচ আপনি জানেন! আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে। ৩য়ঃ ঠিক তাই; ও জানে না, কিন্তু আমি জানি ও কবে মারা গেছে। ২য়ঃ বেশ, বলে ফেলুন ও কবে মারা গেছে। ঢ্যামনামি! ১মঃ কী হল মশাই, বলুন। কবে? ৩য়ঃ যেদিন থেকে ও স্বপ্ন দেখা ছেড়েছে। ২য়ঃ এটা কোন উত্তর হল? ৩য়ঃ কেন নয়? ২য়ঃ আমি জিগ্যেস করলাম-- কবে ভাল হব ডাক্তারবাবু? উনি জবাব দিলেন-- যে দিন অসুখ সেরে যাবে। ক্লাসে স্যারকে জিগ্যেস করলাম-- কাগজ সহজে পুড়ে যায় কেন? উত্তর পেলাম-- কাগজ হল দাহ্য পদার্থ। বোঝ ঠ্যালা। আরে দাহ্য পদার্থ মানেই তো যেটা সহজে পোড়ে! তেমনি আপনার কথা। স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিলে মানুষ মরে যায়। বেশ! অমুক কবে মরেছে? যেদিন ও স্বপ্ন দেখা ছেড়েছে। এগুলো কোন উত্তর নয়।শুধু প্রশ্নটাকেই ঘুরিয়ে বলা। লজিকের ভাষায়--; নাঃ থাকগে। ৩য়ঃ কী হল, বলুন--লজিকের ভাষায়? (উত্তেজিত হয়ে আঙুল তুলে) হ্যাঁ, থামবেন না,থামতে নেই। বলুন--লজিকের ভাষায় এদের বলে--? ২য়ঃ (নীচু গলায়)সার্কুলার রিজনিং। ফ্যালাসি। প্রশ্নটাকেই ঘুরিয়ে উত্তর বলে চালিয়ে দেওয়া- প্রমাণ নয়, প্রমাণের ভড়ং। ৩য়ঃ আপনি লজিক পড়েছেন? ২য়ঃ (নীচু গলায়) পড়াতাম। গাঁয়ের স্কুলে। আমার পাশের গাঁয়ে। ৩য়ঃ এটাই আপনার স্বপ্ন ছিল? ২য়ঃ (নীচু গলায়) হ্যাঁ, মানে না। আমি ফিলজফি পড়ে ভাবলাম সবার লজিক শেখা উচিত। সবার। চাষী, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, আমলা, মন্ত্রী, দলগুলো--সবার। ১মঃ তাতে কী কচুপোড়া হত? ২য়ঃ বিশ্বাস করতাম --সবাই যদি লজিক্যালি ভাবতে শেখে তাহলে নিজেদের ভুল বা কুযুক্তিগুলো বুঝতে পারবে। খামোকা এঁড়ে তক্কো, গাজোয়ারি বন্ধ হবে। লোকে ভাল থাকতে শিখবে। ১মঃ কেমন করে? ২য়ঃ সবাই লজিক দিয়ে দেখলে তো একই সিদ্ধান্তে পৌঁছবে, তাই না? ৩য়ঃ তারপর? ২য়ঃ দিনে দিনে লজিকের ছাত্র কমতে লাগল। এটা পড়ে ছেলেপুলেদের কী লাভ হবে, কী রকম রোজগারপাতি হবে সেটা অভিভাবকদের বোঝাতে পারি নি। ১মঃ শেষে কী হল? ২য়ঃ কী আর হবে, একদিন স্কুল কমিটি আমাকে একমাসের আগাম মাইনে দিয়ে নোটিস ধরিয়ে দিল। ওদের দোষ নেই। কাছাকাছি দশটা গাঁয়ে কোন স্কুলে লজিক পড়ানো হয় না। ৩য়ঃ তাতে আপনার স্বপ্ন দেখা থেমে গেল? ১মঃ না, থামে নি তো! নইলে কি উনি সার্কুলার লজিক আর ফ্যালাসি বলে রেফারির মত হুইসল্ বাজাতে পারতেন? ২য়ঃ এখন একটাই স্বপ্ন, ছেলে-বৌমার থেকে একটু ভাল ব্যবহার , নিদেন পক্ষে সংসারে একটু স্পেস, অর্থাৎ বলতে চাই-- আমাকে আমার মত থাকতে দাও! ৩য়ঃ সে নিয়ে পরে কথা হবে 'খন। আগে বলুন--! ১মঃ (৩য়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) না, এসব ভ্যান্তারা অনেক হয়েছে। আগে আপনি মশাই আপনার কবিতা শোনান। শুনে ঠিক করব আপনাকে তালুকদার ক্লাবের মেম্বারশিপ দেয়া হবে কী না? ৩য়ঃ নইলে? ২য়ঃ নইলে রইলে, পার্কে ঘুমনো ফোতো কবি হয়ে। ৩য়ঃ আচ্ছা বেশ, কি'রকম কবিতা শুনতে চান, যদি বলেন। ১মঃ এ আবার কী? কবিতা মানে কবিতা, ভালো কবিতা।এটা কি বাজারে মাছ কিনতে আসা? ছোট না বড়,টাটকা না পচা? ৩য়ঃ কবিতা নানা রকমের হতে পারে। অ্যাবস্ট্রাকট ছবির মত, ল্যান্ডস্কেপের বা ক্ল্যাসিক্যাল গানের মত। ২য়ঃ আচ্ছা, তাহলে ফোক সংয়ের মত বা সিনেমার পোস্টারের মত? ১মঃ বা দাদের মলমের বিজ্ঞাপনের মত, ২য়ঃ বিনা ছুরিকাঁচি অপারেশনের হ্যান্ডবিলের মত? ৩য়ঃ হ্যাঁ; সবই হতে পারে। তবে এই শতকের কবিতা অনেকটাই ব্যক্তিগত সংলাপ। ১মঃ অথবা প্রলাপ। ২য়ঃ আচ্ছা কথা কাটাকাটি থাক। আপনি ভাই স্যাম্পল পেশ করুন। ৩য়ঃ প্রথমে ধরুন--ল্যান্ডস্কেপের মত কবিতা। " শরৎকাল ব্যাঙের লাফ টুপ্ করে শব্দ।" ১মঃ তারপর? ৩য়ঃ তার আর পর নেই। এটি জাপানী হাইকু, ওইটুকুই হয়। ১মঃ হাইকু কেন, বলুন জাপানি হারাকিরি। কবিতার আত্মহত্যা। ৩য়ঃ আপনি কবিতাটি শুনে চোখ বুজে ধ্যান করুন, দেখতে পাবেন শরতের দুপুর। নির্জন। নিস্তরঙ্গ পুকুরের স্থির জলে একটি ব্যাঙ লাফ দিল। এমনই শান্ত পরিবেশ যে ঈথারে আওয়াজ উঠল-- টুপ্! ২য়ঃ এটাকে কোন গন্ডমূর্খ কবিতা বলবে? ৩য়ঃ রবীন্দ্রনাথ; নিজেই অনুবাদ করেছেন। ১মঃ মানছি না, মানবো না। রবি ঠাকুর বললেও না। ৩য়ঃ কে মানতে বলছে? বললাম তো কবিতা ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয়। একজন মানলেও অন্যে না মানতেই পারে। এটা দেখুনঃ " সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে দুর্যোধনের ভাই, গর্জনে তার তূর্য বাজে, তর্জনে ভয় পাই"। ১ম ও ২য়ঃ হ্যাঁ , হ্যাঁ, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কেমন ছন্দ-মিল ও অলংকার। আর বুর্জোয়ার মুন্ডপাত করায় বেশ বিপ্লবী বিপ্লবী মনে হচ্ছে। ৩য়ঃ কিন্তু এটা কবিতা হয় নি, শুধু বাইরের খোলসটা আছে। ১মঃ কোন শালা বলে? ৩য়ঃ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্কোত্তি মশায় লিখেছেন। (১ম ও ২য় বেশ ঘাবড়ে গেছে।) ২য়ঃ আচ্ছা, কবিতা চর্চা থাক। আগে বলুন কাল গোটা রাত্তির ঘুমোন নি কেন? ৩য়ঃ আজ্ঞে কবিতা লিখছিলুম। ১মঃ গুল! একটা কবিতা লিখতে সারারাত জাগতে হয়? সে তো লক্ষ্মী আসবেন বলে কোজাগরী পূর্ণিমায়। সরস্বতীর জন্যেও এত? ৩য়ঃ নইলে উনি ধরা দেন না যে। ১মঃ দূর মশাই; কোন খাঁটি তালুকদার এমন বোকামি করে না। ২য়ঃ ঠিক আছে; ওই কবিতাটাই শুনিয়ে দিন। ১মঃ এই শেষ- হ্যাঁ। এটা শুনেই ঠিক করব আপনাকে নেব কি না! বেশ খেলিয়ে সুর করে পড়ুন দিকি। ৩য়ঃ (গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে) আমার যা কিছু প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে কবিতা ছুঁয়েছে স্বপ্নের বাতিঘর। খড়কুটো নিয়ে বুকেতে বেঁধেছে বাসা, কবিতা--আমার আড়াইটে অক্ষর। আড়াই আখরে যে প্রেম দিল না ধরা, কবিতা যে তার গোপন দীর্ঘশ্বাস। মাঝরাত্তিরে জানলায় দিয়ে টোকা, করল আমার চরম সর্বনাশ। হঠাৎ কখন অকালবৈশাখীর তান্ডবে ঘরে ঢোকে দুরন্ত হাওয়া, এক ফুৎকারে নিভিয়ে ঘরের বাতি শুরু হয়ে যায় কবিতার আসা যাওয়া।" ১মঃ ব্যস্ ব্যস-; আর পড়ার দরকার নেই। বেশ পছন্দ হল। আপনাকে মেম্বার করে নিলাম। তালুকদার নম্বর তিন! ২য়ঃ আপনি কবিতাটা বুঝতে পেরেছেন? ৩য়ঃ কবিতা তো বুঝবার জন্যে নয়, বাজবার জন্যে। ২য়ঃ আঃ, পন্ডিতি করা ছাড়ুন তো!(১ম কে) কী বুঝলেন, আমাকে বুঝিয়ে দিন। ১মঃ (লজ্জা লজ্জা মুখ করে) তেমন কঠিন তো লাগল না। কবিতা হচ্ছে ওনার স্বপ্ন বা স্বপ্নসুন্দরী। ৩য়ঃ বাঃ! তারপর? ১মঃ কিন্তু গোটা কবিতাটা কিরম অসইব্য মত। কবিতা বলে মেয়েটি, যাকে নিয়ে আপনি স্বপ্ন দেখেন- সে রাত্তিরে এসে আপনার জানলায় টোকা দিয়ে দরজা খোলা্চ্ছে। তারপর দমকা হাওয়ার মত ঘরে ঢুকে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিচ্ছে! আর বলতে পারব না।এমন লজ্জা পাওয়ার মত কবিতা লেখেন কেন? ২য়ঃ (৩য়কে)ঠিক আছে? ৩য়ঃ বললাম তো, কবিতায় ঠিক ভুল বলে কিছু হয় না। এটাও একটা ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে। আসলে কবিতা তো পাঠের পরে পাঠকের মনে তৈরি হয়। ১মঃ ওরে বাবা! আপনি তো দেখছি মহা গুরুঘন্টাল! আচ্ছা, আপনার কোনটা পছন্দ? ৩য়ঃ মানে? ১মঃ মানে এই গাঁজা, ভাঙ, চরস, এলএসডি। ৩য়ঃ হঠাৎ এরকম প্রশ্ন? ১মঃ রাগ কইরেন না। মিনিমাম নেসাসারি কৌতূহল, স্যার। সবাই জানে উঁচুদরের কবিতা লিখতে গেলে ব্যোমভোলে বলে একটু ওইসব সেবন না করলে হয় না। মানে নেশার সিঁড়ি বেয়ে তুরীয় মার্গে পৌঁছুলে তবেই দিনের বেলা গোলাপী হাতি দেখা যায়। ৩য়ঃ আচ্ছা, তাহলে কবিতা লেখা আর গোলাপী হাতি দেখা একই জিনিস? ২য়ঃ মেটাফর স্যার , মেটাফর। আসলে কবিরা মাটির থেকে দেড় ইঞ্চি উঁচুতে উঠে নিজের একান্ত ভুবন তৈরি করেন তো! তাই বলছিলাম কী--! ৩য়ঃ দেখুন, আমার ব্যাগে একটু ভোদকা আছে, ইম্পোর্টেড। চলবে? ২য়ঃ না মশাই। আমি ওসব ছুঁই নে। বুড়ো বয়সে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে বৌমার কাছে এখনও যতটুকু ইজ্জত আছে তা খোয়াব নাকি? ৩য়ঃ কিছু হবে না। এ আপনার দেশি চোলাই বা ধেনো নয়। কোনো উগ্র গন্ধ নেই। মৌরি চিবিয়ে বাড়ি যাবেন। কিস্যু হবে না। ২য়ঃ বলছেন? ৩য়ঃ আরে মশাই গ্র্যান্টি দিচ্ছি। ২য়ঃ না থাক। ১মঃ আমি রাজি। সোজা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব, ব্যস। ৩য়ঃ(ঝোলা থেকে একটি জলের বোতল বের করে, আর চানাচুরের প্যাকেট)। নিন, দুগ্গা বলে শুরু করুন। বোতলের ঢাকনা দিয়ে আলগা করে খাবেন, ব্যস। (১ম শুরু করে)। ব্যস্,আপনিই বা বাদ যাবেন কেন? একযাত্রায় পৃথক ফল? কাম অন্! বী এ স্পোর্ট্! ২য়ঃ কী জানেন! অনেক আগের কথা। ছেলেটা কলেজে পড়ছে। মেয়েটা ইস্কুলে। স্কুল কমিটি আমাকে সদ্য সদ্য একমাসের আগাম মাইনে আর প্রেমপত্র ধরিয়েছে। আমি বাড়ি না ফিরে ফুটবল মাঠের পাশে বসেছিলাম। হিন্দি টিচার, গেম টিচার আর কারিগরি শিক্ষার টিচারের সঙ্গে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। ছেলেরা সব ঘরে ফিরে গেছে। ওরা বলল মন খারাপ কর না। দুঃখকে ভুলে সামনে দেখ। ঠাকুর ঠিক পথ বাতলাবেন। হিন্দি টিচার বলল- হাঁ ইয়ার, ইস গম কো মার ডালো। বুঝতেই পারছেন, ওদের কথায় ভেসে গেলাম। অভ্যেস নেই। নেশা হয়ে গেল। ওরা ধরে ধরে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিল। ৩য়ঃ তারপর? ২য়ঃ তারপর যা হল সে আর বলার মত নয়। ১মঃ তালুকদারদের কাছে কিছু লুকোতে নেই। বলে ফেলুন। ২য়ঃ আমার গিন্নির সে কী রণচন্ডী মূর্তি! শুধু তাই নয়, ছেলেমেয়ে দুটোকে উসকে দিল। ওরা চেঁচাতে লাগল-- বাবা, তুমি মুত্ খেয়েছ, মুত খেয়েছ। আমাদের ফ্যামিলির নাক কেটেছ। এত কষ্ট পেয়েছিলাম--আর ছুঁই নি। ১মঃ তাতে লাভটা কী হয়েছে? এবার বিদ্রোহ করুন। ছেলে ছেলে-বৌ কিছু বললে বলবেন--বেশ করেছি। নিজের জমা পয়সায় খেয়েছি। আমাকে আমার মত থাকতে দাও। বাড়াবাড়ি করলে দুই তালুকদার এসে তোমাদের ক্লাস নেবে। ৩য়ঃ হিয়ার! হিয়ার! থ্রি চিয়ার্স ফর ক্লাব তালুকদার। থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের মটো মনে আছে তো? ২য়ঃ হ্যাঁ, ওয়ান ফর অল। ১ম ও ৩য় (একসঙ্গে)ঃঅল ফর ওয়ান। ২য়ঃ (হাসে) দেখবেন, নেশা টেশা হবে না তো? ৩য়ঃ কিস্যু হবে না। হলে আমরা আপনাকে সেই ধরে ধরে বাড়ি পৌঁছে দেব। (সবাই হাসে। খাওয়া শুরু হয়।) ১মঃ বেশ ফুরফুরে লাগছে। একটা গান গাই? ২য়ঃ এই না না; পাবলিক প্লেসে বসে আছেন। আপনার বোধহয় নেশা হচ্ছে। ১মঃ তাহলে একটা কবিতা শোনাই? বাংলা হাইকু? ল্যান্ডস্কেপ? “গাছের ডালে বসে একজোড়া পাখি। একটা এদিকে উড়ে গেল আর একটা ওদিকে।“ দেখলেন তো? আমার নেশা হয় নি। ৩য়ঃ হয় নি তো। সত্যিই হয় নি। ১মঃ ঠিক বলেছেন। এবার তাহলে একটা গানই গাই। ৩য়ঃ শুধু গান? যা যা প্রাণে চায় সব করুন। ১মঃ (ব্রতচারীর গান গাইতে থাকে) আমরা বাঙালী সবাই বাংলা মা'র সন্তান, বাংলা ভূমির জল-হাওয়ায় তৈরি মোদের প্রাণ। মোদের স্নেহ মোদের ভাষা মোদের নাচার গান, বাংলাভূমির মাটি-হাওয়া-জলেতে নির্মাণ। (এই কটি লাইনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে থাকে, ৩য় যোগ দেয়। তারপর দুজনে উঠে ব্রতচারীর নাচ নাচতে নাচতে এগিয়ে যায়, আবার একইভাবে পিছিয়ে আসে। এরপর ওরা ২য়কে দুহাত ধরে টেনে তোলে। অবশেষে তিনজনে হাত ধরাধরি করে একই লাইন গাইতে গাইতে নাচতে থাকে।) তৃতীয় দৃশ্য ====================== [স্টেজে শুধু ৩য় দাঁড়িয়ে; ফ্রন্ট স্টেজে গিয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে] ৩য়ঃ সেদিন যা হল না, বললে পেত্যয় যাবেন না।প্রথম দিনেই তালুকদারদের তালুকদারি খতম। হয়েছে কী ওরা দুজন তো সাদাজলটল খেয়ে নেচে গেয়ে এ ওর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। এমন সময় এক ব্যাটা পুলিস এ্সে-- (১ম ও ২য় উত্তেজিত ভাবে স্টেজে ঢোকে) ১মঃ অ্যাই, আর একটাও কথা বলবেন না। ঠগ, জোচ্চোর! ২য়ঃ কাওয়ার্ড! বলে কি না তালুকদারি খতম! তোর ক্ষ্যামতা আছে খতম করবার। তুই কি ইংরেজ বাহাদুর? ৩য়ঃ মাথাটাথা কি একেবারেই গেছে? আমি ঠগ? আমি কাওয়ার্ড? তাহলে থানা থেকে কে আপনাদের ছাড়িয়ে আনল? কে জামিন করাল? ১মঃ হ্যাঁ, সেটা মানছি। কিন্তু তার আগে? ৩য়ঃ তার আগে আবার কী? ২য়ঃ আরে পুলিশ ধরতে এলে আপনি কিছু না বলে আমাদের ফেলে পালিয়ে যান নি? ৩য়ঃ ঠিক ও'রকম না। ১মঃ ঠিক কী রকম? ৩য়ঃ জলটল খেয়ে আপনাদের ঘুম পেল আর আমার পেল সুসু। তা আমি পার্কের ওদিকে চলে গেলাম, কিন্তু আপনাদের কড়ে আঙুল দেখিয়ে বলে গেলাম কোথায় যাচ্ছি। ১মঃ কিন্তু আমি তো দেখি নি। ৩য়ঃ দেখবেন কী করে? আপনি তখন টল্লি হয়ে ওনার কোলে মাথা রেখে শোয়ার তাল করছেন। ১মঃ মিথ্যে কথা। কোলে নয়, কাঁধে। ৩য়ঃ ওসব আদালতে জজের সামনে বলবেন'খন। ২য়ঃ কেন? আদালতে যেতে হবে কেন? ১মঃ আপনি যে আমাদের ছাড়িয়ে আনলেন? তো আবার কোর্ট কাচারি কিসের? ৩য়ঃ ধেত্তেরি! আমি তো খালি বন্ড দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছি।কিন্তু পুলিশ যে এফ আই আর করেছে।কোর্টে কেস উঠবেই। তখন আপনাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে সত্যি কথাটা বলতে হবে। তখন কোথায় মাথা রেখেছিলেন, কোলে না কাঁধে, সেসব বলবেন'খন। ২য়ঃ কাঁধেই রেখেছিল, কোলে টলে নয়। আর আমরা তো কোন বেআইনি কাজ করিনি। তবে? ৩য়ঃ পুলিশের রিপোর্টে অন্যরকম লিখেছে(পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে পড়তে থাকে) হুম্--- পাবলিক প্লেসে দুই বয়স্ক লোক মাল খেয়ে টল্লি হয়ে জড়াজড়ি করছিল। বুঝলেন শুধু পাবলিক প্লেসে মদ্যপানই নয়, ধারা ৩৭৭ ও লাগিয়েছে। ২য়ঃ সেটা আবার কী? ৩য়ঃ এটা হল সমলিঙ্গের প্রেম, মানে ছেলে-ছেলে বা মেয়ে-মেয়েতে প্রেম বা বিয়ে আটকানোর ধারা। ১মঃ কী যা তা! কিন্তু ওসব নাকি এখন বে -আইনী নয়? সেই যে সুপ্রীম কোর্টে কেস চলছিল? অনেক মোমবাতি মিছিল হয়েছিল? ৩য়ঃ ওই পর্য্যন্তই। সে কেস এখনও চলছে, ফয়সালা হয় নি। ততদিন--। ২য়ঃ ছাড়ুন তো! আমরা তো ওসব কিছু করি নি। তাহলে কেস খাব কেন? ৩য়ঃ খাবেন। কারণ দিনকাল পাল্টে গেছে। এখন বড্ড কড়াকড়ি। ১মঃ কড়াকড়ি হওয়া ভাল তো। নইলে রামা শ্যামা এসে হুজ্জুতি করে, চোখ রাঙায়। আইনকে কাঁচকলা দেখায়। ৩য়ঃ ব্যাপারটা এত সোজা না। (দর্শকদের দিকে ফিরে) গিন্নিকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যান, কী গরমের দিনে পার্কে গিয়ে বসতে-- পকেটে ম্যারেজ সার্টিফিকেটটি রাখতে ভুলবেন না। ১মঃ নইলে? ৩য়ঃ দেখবেন? (গলার সুর পাল্টে আঙুল উঁচিয়ে এগিয়ে যায়) অ্যাই! এখানে কী হচ্ছে? এসব কী হচ্ছে? পাবলিক প্লেসে বেলেল্লাপনা? লজ্জা করে না? বাড়ির লোকজনকে লুকিয়ে এখানে এসে-- ১মঃ কী ফালতু কথা বলছেন? আমরা স্বামী-স্ত্রী। ৩য়ঃ স্বামী-স্ত্রী! আমাকে বোকা বানাবি? (২য়কে) কী খুকি? সত্যি? (২য় মাথায় আঁচল টানার ভঙ্গি করে মাথা হেলিয়ে 'হ্যাঁ' বলে।) আচ্ছা? তোমার বাবাকে ডেকে আনি? ১মঃ এবার কিন্তু আপনি খামোকা হ্যারাস করছেন।আপনার কোন রাইট নেই এসব করবার। ৩য়ঃ আচ্ছা, আমাকে আইন শেখাবি? চল থানায়। সরকারী কর্মচারির কাজে বাধা দেওয়া?মজা দেখবি! ২য়ঃ আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের বিয়ে হয়েছে দশবছর, ম্যারেজ সার্টিফিকেট আছে। ৩য়ঃ কোথায়? দেখা দিকি? ২য়ঃ সে তো ঘরে লকারে রাখা আছে। কেউ পকেটে নিয়ে ঘোরে নাকি? ৩য়ঃ ও ! ঘরের লকারে রাখা আ্ছে? এইসব পট্টি দিয়ে কেটে পড়বে? এখন থানার লক আপে চল। সেখান থেকে ফোন করে ঘরের লোকজনকে বল লকার থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে। ১মঃ সে কী করে হবে? লকারের চাবি তো আমার হ্যান্ডব্যাগে। ৩য়ঃ হুঁ, তাহলে বাড়ির লোকজনকে বল পাড়ার কাউন্সিলরকে সঙ্গে নিয়ে এসে তোমাদের আইডেন্টিফাই করে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। ১মঃ (হু-হু করে কেঁদে ওঠে)ঃ বাড়িতে আমার দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে। পাড়ায় এ নিয়ে জানাজানি হলে মুখ দেখাতে পারব না। প্লীজ, আপনি অন্য কোন রাস্তা বের করুন। থানায় যাব না, প্লীজ কিছু করুন। ৩য়ঃ (এবার স্বাভাবিক স্বরে দর্শকদের) দেখলেন তো! ১মঃ আচ্ছা, সঙ্গে সার্টিফিকেট রাখলেও যদি পুলিশ দেখতে না চায়? ২য়ঃ শুধু পুলিশ? এখন রাম-শ্যাম-যদু-মধু এসে বলবে--! ১মঃ কী বলবে? (স্বর পালটে)এই যে দেখুন না, আমার --। ২য়ঃ (গলার স্বর পালটে) এঃ সার্টিফিকেট দেখাচ্ছে! ওসব ফল্স সার্টিফিকেট অনেক দেখেছি। আগে প্রমাণ কর যে সার্টিফিকেট জাল নয়। ৩য়ঃ (১মকে)ঃ কী করে বুঝব যে কাগজটায় যে নাম লেখা আছে সেটা আসলে কার? তুমি যে তুমি, অন্য কেউ নও--তার প্রমাণ? ১ম ও ২য়ঃ (দর্শককে)ঃ দেখলেন তো।আগে তো এমন হত না? এখন কেন? ৩য়ঃ আসল কথা হল সময়! সময় বদলে গেছে। পুরুষ বলী নহী হোত হ্যায়, সময় হোত বলবান। ভিল্লন লুটী গোপিকা, ওহি অরজুন, ওহি বাণ।। ১মঃ সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাদের পুলিশ টেনে হিঁচড়ে থানায় নিয়ে গেল আর আপনি কেটে পড়লেন কেন সেটা বুঝিনি। ৩য়ঃ বললাম তো, গেছলাম পার্কের কোণায় একটা গাছের গোড়ায় জল দিতে, তলপেট হালকা করতে। ফেরার সময় দেখি দুটো পুলিস দুই তালুকদারকে বগলদাবা করেছে। ২য়ঃ আর অমনি আপনি তিন নম্বর সটকে পড়লেন? আপনি মশাই তালুকদার নন, জমাদার। ৩য়ঃ মিথ্যে কথা! আদৌ সটকে পড়ি নি। আমি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলছিলাম। ১মঃ আ-হা-হা! ছবি তুলছিলাম! দেখেন নি যারা সাহায্য করতে না এসে ছবি তোলে তাদের মিডিয়া কেমন গালাগাল দেয়? ৩য়ঃ গুলি মারুন মিডিয়াকে! আমি ওখানে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে আমাকেও কালোগাড়িতে তুলে কোতোয়ালিতে নিয়ে যেত? তাতে কোন পুণ্যিটা হত শুনি? আর আপনাদের কোন ইজ্জত লুটে নিচ্ছিল যে আমি তক্ষুণি হেল্প হেল্প করে চেঁচাব, তাও ভর দুপুরে নির্জন পার্কে? ( দর্শকদের) এদের কথা ছাড়ুন। আপনারা আমার বুদ্ধি নিন। যদি দেখেন দুশমন দলে বা শক্তিতে ভারি তাহলে আগে মোবাইলে ছবি তুলে তারপর ১০০ নম্বর ডায়াল করুন। ২য়ঃ তাতে কোন মোক্ষলাভ হবে? ৩য়ঃ হবে। এই ছবিগুলো দিয়ে অপরাধীকে আইডেন্টিফাই করা যাবে। কোর্ট সংজ্ঞান নেবে। পুলিশ চাইলেও পয়সা নিয়ে কেস চেপে দিতে পারবে না। ২য়ঃ পাবলিককে তো ফিরিতে জ্ঞান বিলোচ্চেন, আপনি নিজে ফোটো খিঁচে তারপর কী করলেন সেটা বলুন। ৩য়ঃ (মুচকি হেসে)ঃ বলতে দিচ্ছেন কই! আমি একজন বড় পার্টিকে ফোন করে বললাম-- আমার বন্ধুদের মিথ্যে মিথ্যে ধরে নিয়ে গে্ছে। মাল খেয়ে নোংরামি করার চার্জ লাগিয়েছে। আপনি ফোন করে আটকান। ওদের আমার পার্সোনাল বন্ডে ছেড়ে দিতে বলুন। ১মঃ ব্যস্? এতেই ম্যাজিক হল? ৩য়ঃ না না। সে বলল--চার্জ যদি জেনুইন হয়? আমি বললাম মেডিক্যাল টেস্ট্ট হোক। অ্যালকোমিটার এনে ওদের শ্বাস পরীক্ষা হোক। ২য়ঃ কী সর্বনাশ! ১মঃ কতবড় রিস্ক নিয়েছিলেন জানেন? ৩য়ঃ জানি। ১মঃ যদি টেস্ট পজিটিভ হত? ৩য়ঃ হয়েছে কি? ২য়ঃ না হয় নি। হয়ত মেশিন খারাপ।অথবা আপনি ঘুষ দিয়েছেন। ৩য়ঃ না; মেশিন ঠিকই আছে। আমি জানতাম পরীক্ষায় কিছু পাওয়া যাবে না। ১মঃ এঃ সবজান্তা! কী করে জানতেন? ৩য়ঃআসলে আমার বোতলে মদ ছিল না। (কয়েক সেকন্ড নীরবতা। সবাই এই খবরে যেন স্ট্যাচু!) ২য়ঃ তো আমরা যে খেলাম! কী খেলাম? ৩য়ঃ আপনারা খেয়েছেন একটি এনার্জি ড্রিংক; নন-অ্যালকোহলিক। আমি মদ খাই না। ১মঃ তার মানে আপনি আমাদের ঠকিয়েছেন। দিল্লি কা ঠগ! জোচ্চোর! ৩য়ঃ হ্যাঁ, ঠকিয়েছি। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আমি যে তালুকদার। ২য়ঃ যাকগে, ভালই হয়েছে। বৌমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে কোন চাপ হবে না।কিন্তু আপনি তাঅলুকদার ন'ন। আপনি কে ঠিক করে বলুন দেখি। ১মঃ বোঝ নি? উনি একটি হারামির হাতবাক্স। ওনার চক্করে সেদিন থানায় যেতে হয়েছিল। ৩য়ঃ (সামনে দর্শকদের দিকে দু'পা এগিয়ে স্বগতোক্তির মত করে) ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম--কবি হব। ম্যাগাজিনে কবিতা পাঠাতাম, ছাপা হত না। নিজে প্রেস খুললাম। তাতে হ্যান্ডবিল, পরীক্ষার কোশ্চেন, বিয়ের কার্ড--সবই ছাপা হয়। ভালই চলে। কিন্তু আয়ের আদ্দেক পয়সা দিয়ে আমি কবিতার বই ছাপি। আমার ও এইরকম আরও অনেকের। পেপারব্যাক, একশ' কপি।বইমেলায় কুড়ি কপি বিক্রি হয়। চল্লিশ কপি বন্ধুবান্ধব চেনা লোকজনের মধ্যে বিলিয়ে দিই। বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশনে উপহার দিই। এইসব পাগলামি গিন্নির সহ্য হয় নি। ওর আলাদা স্বপ্ন। তাই ছেলের সংসারে মুম্বাই গিয়ে রয়েছে। পূজোতেও আসে না। আমি আছি বন্ধুদের নিয়ে, মানে যারা নতুন কবি হতে চায়। নিজের পৈতৃক বাড়ি। হেসে খেলে চলে যায়। আপনাদের কথা শুনে বন্ধুত্ব পাতাতে ইচ্ছে হল। তাই তালুকদার হলাম। কিন্তু বুঝতে পারছি-- সেটা আমার কপালে নেই। তালুকদারেরা বন্ধুদের ঠকায় না, ধোঁকা দেয় না। তাই চললাম। ভালো থাকুন, কিন্তু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করবেন না, প্লীজ! (উইংসের দিকে হেঁটে যায়) ১মঃ দাঁড়ান। আপনাকে তালুকদার ক্লাবের মেম্বার করেছিলাম না? আপনি আজীবন সদস্য থাকবেন, বলে দিলাম ব্যস্! ৩য়ঃ কিন্তু আমি যে-- ১মঃ সে কথা বললে আমিও তো--। ২য়ঃ মানে? ১মঃ না, আমার কোন ছেলে বা কেয়ারিং ছেলে-বৌ নেই। আসলে আমার বিয়েই হয় নি। দাদা অকালে চলে গেলেন। বৌদি আর দুটো বাচ্চার ভার আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। ওদের লেখাপড়া চাকরি, বিয়ে সব সামলাতে সামলাতে বয়স হয়ে গেছল। ধাক্কা খেলাম যখন বুঝলাম যে ওরা চাইছে কিছু টাকা নিয়ে আমি যদি বাড়িটা ছেড়ে চলে যাই। তাই করলাম, ওরা সুখী হোক। জানি দাদা ওপর থেকে আশীর্বাদ করবেন। এখন একটি বৃদ্ধাবাসে থাকি। মন্দ না। কিন্তু মাঝে মাঝে একঘেয়ে লাগে। সব বয়স্ক আর বুড়োর দল। সব পুরুষ। দিন গোণে কবে ওপরের ডাক আসবে।তাই এখানে চলে আসি।খবরের কাগজে পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়ি। আসলে মনে মনে স্বপ্ন দেখি--আমার ছেলে, ছেলে বৌ, নাতি -নাতনি। স্বপ্ন দেখা তো বন্ধ করা উচিত নয়। কী বলেন? ৩য়ঃ নিশ্চয়ই। নইলে ইউ আর ডেড। (২য়কে) তাহলে বাকি রইলেন আপনি-- থ্রি মাস্কেটিয়ার্স এর মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি, আসল তালুকদার। যার লজিক পড়ানোর স্বপ্ন পুড়ে ছাই।যে নিজে এখন ছেলে-ছেলেবৌয়ের হুজ্জতে হাড়-ভাজাভাজা হচ্ছে। ২য়( একটু ক্ষণ ভেবে নিয়ে মাথা তোলে দর্শকদের দিকে মুখ করে বলে)ঃ ইয়ে, লজিক্যালি দেখলে আপনার স্টেটমেন্টেও একটা ফ্যালাসি আছে। মেরী কহানী মেঁ ভী থোড়া টুইস্ট হ্যায়। (সবাই চুপ, প্রতীক্ষারত) আসলে বাস্তব ছবিটা ঠিক উল্টো। ছেলে-ছেলেবৌ কিছু করে নি। আমিই উল্টে ওদের দাবড়ে রেখেছি।আসলে লজিক পড়ানোর চাকরি চলে যাওয়ার পর ঘরে বাইরে অবহেলার শিকার হলাম। শেষে লজিক্ক ছেড়ে অংকের ট্যুইশন শুরু করলাম। ধীরে ধীরে সাফল্য এল, পয়সা হল।বাড়ি বানালাম।কিন্তু বড় বেশি হিসেবি হয়ে পড়লাম। পয়সার মহত্ব অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বুঝেছি। কিন্তু ওটাও একটা ফ্যালাসি, রজ্জুতে সর্পভ্রম। তবে বুঝলাম যখন স্ত্রীর স্বাস্থ্য গেল, ঠিকমত চিকিত্সা হল না। ছেলে আর্থিক ভাবে সফল নয়। তাই ওকে লুজার ভাবি। আরে আমাকেও তো গোড়াতে সবাই তাই ভাবত। বাড়ি আমার, সংসার চালাতে আমার কন্ট্রিবিউশন কম নয়। তাই টিভি আমার ঘরে থাকে। আমি ঘরে না থাকলে কেউ ছুঁতে পারবে না। তবে ইদানীং নাতনিটাকে অ্যালাউ করেছি। আর ওকে এখন থেকেই ঘরে আলাদা করে লজিক পড়াচ্ছি। ৩য়ঃ এইসব করে আপনি আনন্দে আছেন? তাহলে লজিক্যালি ঠিক করছেন। ২য়ঃ না নেই। খালি মনে হয় কোথাও একটা ফ্যালাসি আছে। সেটা ঠিক ধরতে পারছি না। ১মঃ আসলে নিজের দোষ কেউ দেখতে পায় না। সেটা দেখতে হলে একটা আয়না চাই। ২য়ঃ ঠিক বলেছেন। ভারতীয় ন্যায়ে একটা যুক্তি আছে;-- কেউ নিজের কাঁধে চড়তে পারে না, যতবড় পালোয়ানই হোক। সবাইকে অন্যের কাঁধেই চড়তে হয়। তা আপনারা মানে দুই তালুকদারেরা আমার মুখের সামনে আয়না ধরুন না, প্লীজ। ৩য়ঃ আসুন, আমরা সবাই একে অপরের আয়না হয়ে যাই। ১মঃ ইয়েস্, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স্। ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান। ৩য়ঃ একটা কথা। (১মকে) -- আপনি বৃদ্ধাশ্রম ছেড়ে দিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসুন। জায়গার অভাব নেই। আর আমার স্বপ্ব দেখা অনামা কবির দল? তারাই আমার পরিবার। সেখানে আপনারও জায়গা হবে। আর অনেকেই অল্পবয়সী। স্বাদ পাবেন সংযুক্ত পরিবারের। ১মঃ (২য়কে) আপনিও চলে আসুন। ছেলে ছেলেবৌকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওদের এখন হাত পা ছড়িয়ে নিজের হিসেবে বাঁচতে দিন। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবেন, তাতে শান্তি পাবেন। আমি কালকেই হিসেব চুকিয়ে ব্যাংকের ডেবিট কার্ড আর পাসবই নিয়ে কবির ঘরে চলে আসছি। আপনি আসলে ষোলকলা পূর্ণ হবে। বাড়িটার সামনে বোর্ড লাগিয়ে দেব-- " তালুকদার ক্লাব"। কী? আসছেন তো? ২য়ঃ দেখুন। এটা লজিক্যালি পারফেক্ট হল না। ফ্যালাসি আছে। ভেবে দেখলাম আগে নিজের মন পরিষ্কার করতে হবে। নিজের জন্যে স্পেস চাইবার আগে অন্যদের জন্যে স্পেস ছাড়তে হবে। তাই আমি বাড়ি গিয়ে প্রথমে টিভিটা আমার ঘর থেকে বের করিয়ে বসবার ঘরের দেয়ালে ফিট করাবো; যে যখন ওখানে বসবে সে তার মত চ্যানেল ঘোরাবে, আমাকে জিগ্যেস করার দরকার নেই। আর বাড়িটা ছেলে ও ছেলেবৌয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দেব। রেজিস্ট্রির কাগজ আগামী মাসে ওদের বিবাহবার্ষিকীর দিন উপহার দেব। সেদিন বিরিয়ানি হবে--খাসির মাংসের। আর আপনারা দুই তালুকদার আমাদের বাড়িতে খেতে আসবেন। ১মঃ সেরেছে! পরে যদি আপনাকে ওরা বের করে দেয়? বদলা নেয়? ২য়ঃ দিলে দেবে; তখন আপনারা আছেন। তালুকদার ক্লাব আছে। ১মঃঅনেক রিস্ক নিচ্ছেন কিন্তু। দিনকাল খারাপ। ২য়ঃ নিচ্ছি।প্রথম জীবনে একবার নিয়েছিলাম--এখন আবার নেব।নইলে জীবনটা বড্ড আলুনি আলুনি হয়ে যাচ্ছে।চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দিনকাল খারাপ হলেও সূর্য তো এখনও পূবদিকেই ওঠে। ৩য়ঃ হ্যাঁ; আমাদের দাড়িদাদুও তাই বলে গেছেন। ১মঃ কী? ৩য়ঃ “মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন”! ভালোর সংখ্যাই হরেদরে বেশি। তাই পৃথিবীটা ঘুরছে। চাঁদ তারারা হারিয়ে যাচ্ছে না। (তিনজনে একসঙ্গে দর্শকদের)ঃআপনারা এবার আসুন। রাত বাড়ছে। কিন্তু রবি ঠাকুরের দেওয়া এই মন্ত্রটা রোজ শোয়ার আগে জপ করবেনঃ "মন্দ যদি তিন-চল্লিশ ভালোর সংখ্যা সাতান্ন!" আমাদের সঙ্গে তিনবার বলুন!---- (এবার তিনজন 'তালুকদারের ভালুক গেল শালুক খেতে পুকুরে' গাইতে গাইতে দর্শকদের মধ্যে দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায়।) === সমাপ্ত=====

193

4

Ranjan Roy

ফেরারি ফৌজ

তৃতীয় ভাগ আঠের বছর বয়েসের গদ্য ================ 'তোমাতে নই, আমাতে নই বিষয়ে আমি লিপ্ত, লাগাম ছেঁড়া পাগলঘোড়া তিনটে ভীষণ ক্ষিপ্ত। বিজন মাঠ, বধ্যভূমি ধরতে গেলাম, তখন তুমি সরে দাঁড়াও অশ্ববাহন এবং বলদৃপ্ত, রক্তে নাচাও মাতাল ঘোড়া তিনটে ভীষণ ক্ষিপ্ত।' -----শক্তিপদ ব্রহ্মচারী (১) ডেকচিতে ফুটন্ত ভাত উথলে উঠেছে। বিজনদা উঠে গিয়ে ঢাকনা তুলে দুটো ভাত টিপে আবার ঢাকনা চাপিয়ে দিল। --আর দু-তিন মিনিট; তার পরেই নামিয়ে দেব। --ঠিক আছে; কোন তাড়া নেই। শংকর অন্যমনস্ক ভাবে বলে বিজনদার তামাকের প্যাকেট থেকে এক চিমটি তুলে হাতের তেলোয় ডলতে থাকে। আমি মাদুরের কোণা থেকে একটা কাঠি বের করে দাঁত খোঁচাতে থাকি। দরজার ফাঁক দিয়ে জুন মাসের দুপুরের একচিলতে রোদ্দুর মেজেতে মৌরসীপাট্টা নিয়ে বসে আছে। উঠোনের জলের বালতির ওপর বসে একটা কাক ডাকছে।মাঝে মাঝে ঠোঁট দিয়ে খোঁচা মেরে জল খাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ওটা বিজনদার বাসন ধোয়ার বা কাপড় কাচার জল। ভাবছি কাকটাকে তাড়িয়ে দেব কি না, ব্যাটা নিজেই বোর হয়ে উড়ে গেল। বিজনদা ভাত বাড়ছে, সেই মুসুর ডাল, বাগানের গন্ধলেবু, আলুসেদ্ধ আর ডিমের বড়া। আমার কোন অসুবিধে হয় না। আমাদের চিনেমাটির প্লেটে দিয়ে নিজে কাঁসার কানিওঠা থালায় নিল, বাঙাল ভাষায় বলে--কাঁসার বেলি। এই বয়সেও অনেকটা ভাত খায় বিজনদা-- আর কাঁসার থালায়। আমি জানি থালাটার গায়ে বিজনদার মায়ের নাম লেখা আছে--সরোজিনী। এই থালাটা ছোড়দি ওকে দিয়ে গেছে। মায়ের নাকি সেইরকমই ইচ্ছে। শেষকাজের সময় বিজনদা পুরুলিয়ার জেলে। শংকর খায় ভাল করে ডাল দিয়ে মেখে, লেবু চটকে, একটু হাপুস হুপুস করে। আজ কিন্তু খাওয়ায় মন নেই। কিছু একটা ভাবছে। অন্যদিন হলে আমার ডিমের বড়ার থেকে খামছে অন্ততঃ একটা তুলে নিয়ে নির্বিকার মুখে চিবোতে থাকত--যেন ওটাই স্বাভাবিক। আজকে আমি গোটা ডিমটাই খেয়ে নিলাম-- ও যেন দেখেও দেখছে না। হাত-টাত ধুয়ে আবার মাদুরে ফিরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছি কি বিজনদা গামছা এনে আমাদের হাত মুখ মুছিয়ে দিল। উঃ , এখনও সেই বড়পিসিমাগিরি! শংকর আবার তামাক ডলে কাগজ পাকিয়ে একটা সরু ফানেলের মত করে তাতে কাঠি দিয়ে ঠুসতে লাগল। আমি নিজের প্যাকেট খুলে একটা ধরিয়ে অন্যটা বিজনদার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আগে আমরা ইচ্ছে করে একটা কাঠির থেকেই তিনজন ধরাতাম-- কুসংস্কারের বেড়া ভাঙতে হবে যে! এখন ওসব নিয়ে ভাবি না। জানি, কোন লাভ নেই। বিজনদা একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল-- এবার? --এবার কী? -- তোরাই বল, আমি খালি জিগ্যেস করছি। -- রমেন হিসেব দেবে। ও ফেরারী ফৌজের আটজন ঘোড়সওয়ার চিত্রগুপ্তের লেজার খুলবে--শালা ব্যাংকের ফোতো ক্লার্ক! -- কেন? তুই বলবি না কেন? -- ফেরারি ফৌজ প্রোজেক্টটা ওর, আমার পিতৃদেবের নয়। ওই বলুক। আমি কাশতে থাকি, উঠে গিয়ে উঠোনে পেয়ারা গাছের গোড়ায় একদলা থুতু ফেলি। তারপর মাথা নেড়ে বলি--হক কথা। হিসেব আমইই দেব। সোজা হিসেব। শুনে নাও, ভুল হলে ধরিয়ে দিও। আটজন ঘোড়সওয়ার। দু'জন-- রণক্ষেত্রে শহীদ। একজন-- দলত্যাগী, রেনেগেড। একজন-- কর্কটরোগে প্রয়াত। একুনে চারজন। হাজির ও সাক্ষাৎ হইয়াছে-- বাকি চারজন। এই অবশিষ্টদের ব্যালান্সশিট নিম্নরূপঃ একজন--শিল্পপতি, বাড়ি গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালান্সের মালিক। একজন-- অবসরপ্রাপ্ত সংসারী; দুর্বল হার্ট। কিন্তু স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বেপরোয়া। বাকি দুইজন-- পত্নীপরিত্যক্তা, এক্কাগাড়ির সওয়ার। --ব্যস্? --ব্যস্। --- তাহলে? ব্যাক টু স্কোয়ার এ? বিজনদা যেন খেলনা কেড়ে নেওয়া বাচ্চা। শংকর নড়ে চড়ে বসে। নিভে যাওয়া পাকানো সিগ্রেটটা মেজেতে ঘষে ঘরের কোণায় ছুঁড়ে দেয়। -- আমি বলি কি আমরা অতীত হাতড়ে দেখি--কেন আমরা পথে নেমে ছিলাম। গোড়া থেকে--মানে বিপ্লবের বুলি কপচেও কেন সেই ডাকাতের দলে ভিড়েছিলাম? সবাই নিজের নিজের কথা বলবে, আলাদা করে। রমেন শুরু করুক। আর খালি গল্প বললে হবে না। কোন যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করা না-পিওর ফ্যাক্ট বলবে আর শেষে বলতে হবে আজকে কে কী ভাবছে; নাকি ভাবাভাবির দিন শেষ? নে, শুরু কর শালা! আমাকে অবাক করে বিজনদা বলে ওঠে-ধ্যোর বাল! আমরা তিনজনেই হেসে ফেলি। -- শংকর কী বললি? আমরা বিপ্লবের বুলি কপচে কেন ডাকাতের দলে ভিড়েছিলাম? ডাকাতের দলে? না তো। -- না বললেই হল? আমাদের খাওয়া পরা চলতে কী করে? বাপের হোটেলে? বাপের হোটেলে খেয়ে বিপ্লব? তোর, আমার, বিজয়দার জন্যে প্রতি মাসে একটা করে সাদা খাম ধরিয়ে দেওয়া হত না? তার উপর নাম ও নামের পাশে টাকার অংক লেখা থাকত না? যেমন আমার খামের উপর লেখা থাকত--" শংকর--১৩৫/-"। এগুলো তাহলে কী? -- আমরা ছিলাম প্রফেশনাল রেভোলুশনারি--পেশাদার বিপ্লবী। একেবারে লেনিনের ' কী করিতে হইবে' (What is to be done) মেনে। ওগুলো ছিল আমাদের মাসিক বেতন বা ওয়েজ। বিজয়্দা মুখ খোলে,-- এর মধ্যে লেনিনকে নিয়ে টানাটানি কেন? --বাঃ! সব ভুলে গেলে? তুমি ছিলে সেকশন কম্যান্ডার। তাই তুমি পেতে ১৫০/-। --সেটা কি লেনিন ঠিক করে দিয়েছিলেন ? -- কথা ঘুরিও না। "কী করিতে হইবে" লেখায় উনি বোঝান নি যে বিপ্লব করতে হলে আগে দরকার পেশাদার বিপ্লবী সংগঠন। কারণ বিপ্লব কোন অ্যামেচার ন্যাকামো ভাব-ভালবাসা নয়। এটা ফুল টাইম ব্যাপার আর --। --- আর জনতার অন্ধ ভীড় দিয়ে অরাজকতা হয়, বিপ্লব হয় না। এর জন্যে চাই প্রশিক্ষিত রেভোলুশনারি। তাই আমরা--। --তাই আমরা ডাকাতির পয়সায় হোটেলে খেতাম, এক কামরা ঘরের ভাড়া দিতাম, ট্রাম-বাস--ট্যাক্সি চড়তাম? --ডাকাতির পয়সায়? ওভাবে কেন বলছিস! আমরা তো মার্সেনারি নই। পেশাদার সৈনিক মজুরি নেবে না? মাওয়ের গণমুক্তি ফৌজের সৈনিকদের বেতন দেওয়া হত না? তাই কুয়োমিন্টাংদের সৈন্যরা দলত্যাগ করে লালফৌজে যোগ দেয় নি? আর তুই বলছিস ডাকাতের দল? --শোন শংকর! আজ আমরা অতীত; মানছি হেরে যাওয়া অতীত। তাই বলে নিজেদের ছোট করতে হবে কেন? আত্মগ্লানি আত্মকরুণা ভাল কথা নয়। খেয়াল করে দ্যাখ,--আমাদের সংগঠনের নাম আরসিসিআই বা রেভোলুশনারি কম্যুনিষ্ট কোঅর্ডিনেশন অফ ইন্ডিয়া। আমাদের নেতা যাঁকে তোমরা কোনদিন দেখনি-- আর দেখতেও পাবে না-- ছিলেন অনন্ত সিং। হ্যাঁ, সেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের খ্যাতিপ্রাপ্ত অনন্ত সিং-- মাস্টারদা সূর্য সেনের ডানহাত, মিলিটারি স্ট্র্যটেজিস্ট। বিজয়দাকে এবার লেকচারে পেয়েছে। টিউশনের ছেলেদের বোঝানোর মত করে বলতে থাকে। -- সূর্য সেনের ফাঁসি হল, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে প্রাণ দিলেন। অনন্ত সিংয়ের কালাপানি হল। দেশ স্বাধীন হলে উনি আন্দামান থেকে অন্য অনেকের মত কমিউনিস্ট হয়ে ফিরে এলেন। পার্টির টেকনিক্যাল কোরের দায়িত্ব পেলেন। --হ্যাঁ হ্যাঁ; সবটা বল। উনি পার্টির মধ্যে একটি সমান্তরাল গোপন সংগঠন গড়ে তুললেন--নাম ছিল আওয়ার স্ট্যান্ড। কিছু ডাকাতি করলেন--স্বদেশী গুপ্ত সংগঠনের কায়দায়। কমিউনিস্ট পার্টি প্রমাদ গুনল। আসলে যদ্দিন পার্টি নিষিদ্ধ ছিল ততদিন এসেব কজে দিয়েছিল। কিন্তু যেই পার্টি অজয় ঘোষের নেতৃত্বে ১৯৫২র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল তখন অনন্ত সিংয়ের কাজকম্ম হল গলার কাঁটা। তাই ওঁকে ওনার চেলাচামুন্ডা সমেত দল থেকে বের করে দেওয়া হল। কিন্তু অনন্ত সিং হলেন আদ্যপান্ত বাঙালী; নাহয় চাটগেঁয়ে বাঙাল। আর কে না জানে বাঙালীর লোহা দেখলেই গুয়া চুলকোয়। তাই কিছুদিন ঘাপটি মেরে কাটিয়ে যেই বাংলাবাজারে 'বন্দুকের নলই শক্তির উৎস' দেয়ালে লেখা দেখলেন অমনি আরেকটা ডাকাতের দল গড়লেন--- এমএমজি বা ম্যান-মানি-গান। --ফের ডাকাতের দল! ম্যান-মানি -গান নামটা বিদ্রূপাত্মক, আমাদের বিরোধীদের দেওয়া। আমাদের আসল নাম তো বললাম-- আরসিসিআই। -- সে যাই বল, বাংলাবাজারে আমাদের সবাই এম-এম-জি বলেই জানে। আর স্বদেশী যুগের মত ডাকাতির পয়সায় সংগঠন চালানো! -- কেন? খালি স্বদেশী কেন? লেনিনের পার্টি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের জন্যে , আর্মস এবং গোপনে ইসক্রা পত্রিকা চালাতে ডাকাতি করত না? এন বাউম্যানরা করেন নি? মন্তিস্লাভস্কির "বসন্তের দূত রুক" বইটি আমাদের অবশ্য পাঠ্য ছিল না? স্তালিন বাকু ও জর্জিয়ায় ডাকাতি করতেন না? অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থে নয়; পার্টি ও বিপ্লবের স্বার্থে; কোন সাধারণ মানুষের থেকে কিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয় নি। ট্রেজারি ও জমিদারদের খাজনা --! --- হ্যাঁ, স্তালিনের প্রথম জীবনে ওইসব কাজকম্ম ওয়েল ডকুমেন্টেড। কিন্তু আজ মনে হয় ডাকাতিটা ডাকাতিই। নিজেরটা ছোঁচাও কি অন্যের; হাত নোংরা হবেই । তাই যদি বলি যে আমরা ভেড়ার পালের মত অনন্ত সিং নামের এক প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামীর বিপ্লবের ভাঁওতায় ভুলে ডাকাত দলের খোঁয়াড়ে ঢুকেছিলাম সেটা কি খুব ভুল বলা হবে? -- বিজনদা! শংকর কি ঠিক বলছে? আমাদের মাসিক ওয়েজ কি ডাকাতির টাকায়? আর অনন্ত সিং কোথায়? আমাদের সিক্রেট সংগঠনের চিফ তো "ওল্ড গার্ড" বা অবিনাশ। -- অনেকটা ঠিকই বলেছে। অবিনাশই অনন্ত সিং। ওঁর সঙ্গে দেখা করতে পারত শুধু টপ তিন জন। সিক্রেসির উপর উনি খুব জোর দিতেন। আর আমাদের ওয়েজ আসত পার্ক স্ট্রিট পোস্টাপিস রবারির টাকায়-- যেটা ১৯৬৮ সালে হয়েছিল। পরে ১৯৬৯ সালে স্টেট ব্যাংক ডাকাতির সময় আমরা অলরেডি অনন্ত সিংয়ের দল থেকে আলাদা হয়ে গেছি। -- আচ্ছা? আমি এগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। শুধু কিছু শুনেছিলাম, বীরুর কাছ থেকে। মনে হচ্ছে শংকর জানে, হয়ত ও ছিল। এখানে খুলে বলুক। পাপস্খালন বা আত্মার শুদ্ধিকরণ হোক! শংকর কিছু ভাবে। তারপর হঠাৎ উঠে বাইরে যায়। আমি আর বিজয়দা চুপ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকি। ও চায়ের জল চড়ায়। চা ছাঁকার আগেই শংকর ফিরে আসে। পাড়ার দোকান থেকে দু'প্যাকেট সিগারেট কিনে এনেছে। মাঝখানে একটা প্যাকেট রেখে ধোঁয়া ছেড়ে জানলার দিকে তাকিয়ে বলে-- আজ এতদিন পরে সব গুছিয়ে বলা বেশ কঠিন। তবে চেষ্টা করব। ভুল হলে দাদা ধরিয়ে দেবে। প্রথমে পার্ক স্ট্রিট পোস্টাফিসের ডাকাতি। ২) পার্ক স্ট্রীটের সেই সকালটা ================== বর্ষাকাল। কিন্তু গত দু'দিনে একফোঁটা বৃষ্টি হয় নি। ভ্যাপসা গরম আরও বেড়েছে। তাই ছেলেছোকরার দলটা যে একঘন্টার মধ্যে বার কয়েক কোল্ডড্রিংকে গলা ভেজাবে, তাতে আশ্চর্যের কি ? পার্ক স্ট্রিটের উল্টো দিকে কোণের দোকানটায় চা'-লেড়ো বিস্কুট, ঘুগনি, পাঁউরুটি আলুর দম, ওমলেট সবই পাওয়া যায়। আর কোণের দিকে রাখা আছে কোকাকোলার বোতল। কিন্তু পাঁচজন ছোকরার দলটি বসেছে দোকানের বাইরে ফুটপাথ ঘেঁষে রাখা বেঞ্চ আর দুটো কাঠের টুলে। --- এক প্যাকেট পানামা দিন তো? দোকানদার প্যাকেট এগিয়ে দিতে দিতে ভাবে-- এরা ঠিক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে সিগ্রেট ফুঁকতে আসা ছাত্র নয়।আধঘন্টা ধরে বসে আছে। কিন্তু কথা কম। মুচকি চাপা হাসি আর কিছু অঙ্গভঙ্গী। এপাড়ায় কি কখনও আগে দেখেছে? মনে করতে পারছে না। দুজন এই গরমেও ফুলশার্ট পরে আছে। আর একজনের সোনালি চুল। তা এই সাহেব পাড়ায় অমন দু-একজন এখনও দেখা যায়। ওর পাশের ছেলেটি ঘড়ি দেখছে। বেলা সাড়ে নয়। এবার ও চোখ তুলে সোনালি চুলের দিকে তাকাল। সোনালি চুল আস্তে করে চোখের পাতা নামাল। অন্য একজন এর মধ্যেই দোকানাদারের পয়সা মিটিয়ে দিয়েছে। সোনালি চুল ও ঘড়িদেখা ছেলেটি এবার টুল থেকে উঠে রাস্তায় নেমেছে। একটু ক্যাজুয়াল ভাবভঙ্গী; রাস্তার এ'পাশ ও'পাশ দেখছে। কিন্তু বাঁদিকে তাকিয়ে হটাৎ ওদের ঘাড় টানটান। অন্ততঃ একশ ফুট দূরে একটি চশমা পরা ছেলে রাস্তার ধারে একটা খালি সন্দেশের বাক্স মত নামিয়ে দিয়ে আস্তে করে হেঁটে পাশের গলিতে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওরা জানে যে এর মানে ওই চশমুদ্দিন প্রায় একশ ফুট দূরে একজনকে একটা সবুজ রুমাল মাটিতে ফেলে আবার ঝেড়ে হুড়ে তুলে নিতে দেখেছে। আর সে দেখেছে রাস্তার ক্রসিং এ ধুতিপরা একজনকে ছাতা খুলে রাস্তা পার হতে হতে ছাতাটা আবার বন্ধ করতে। সে দেখেছে--। নাঃ, এই চিন্তার সূতোর লাটাই দ্রুত গুটিয়ে সোনালি চুল পেছন ফিরে বাকিদের দিকে তাকাল। অন্য ছেলেগুলোও যেন আড়মোড়া ভেঙে ওর পেছন পেছন এগিয়ে গেল। দোকানদারের চোখে পড়ল যে দু'জন অনেকটা কোল্ডড্রিংক ছেড়ে গেছে। আরে, একটা বোতল তো খোলাই হয় নি। কিন্তু পুরো পয়সা তো আগাম দিয়ে দিয়েছে। নাঃ , ও এমন ভাবে দাঁও মারবে না। বারো আনার জন্যে এমনি করলে ধম্মে সইবে না। ও পয়সা ফেরত দিয়ে দেবে। -- ও মশাই! শুনছেন? এদিকে দেখে যান। কিন্তু মশাইরা কিছুই শুনছেন না। কারণ, একটা লালরঙা গাড়ি, পেছনে তারের জাল, এসে পার্কস্ট্রিট পোস্ট অফিসের সামনে থেমেছে। গাড়ির সামনে ড্রাইভারের পাশে বন্দুকধারী একজন রক্ষী। আর পেছনে জাল ঘেরা জায়গায় একটা বড় ক্যাশবাক্সের সঙ্গে আরও দুজন সশস্ত্র গার্ড হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে। এবার ওরা প্রতিবারের মত ভেতর থেকে বন্ধ দরজাটা খুলে বাক্স নিয়ে নামবে। কিন্তু ওরা আর নামতে পারল না। খালি দরজাটা খুলে একজন চেন ও তালা লাগানো বড়সড় ট্রাংকের মত বাক্সটাকে ঠেলে দরজার সামনে এনেছে তক্ষুণি দু'জন ছোকরা ওর পেটে ও গলায় ছোঁয়াল পাইপগান ছোঁয়াল। আর একটু হোঁৎকামত তৃতীয়জন ট্রাংকটা টেনে মাটিতে নামাল। সিকিউরিট গার্ডের কিছু করার নেই। এত কাছ থেকে বন্দুক চালানো যায় না। কিন্তু দ্বিতীয়জন অবস্থা এঁচে নিয়ে খাঁচাটার কোনার দিকে সরে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সোজা গুলি চালিয়ে দিল। গুলি সোনালি চুলের কম্যান্ডারের কানের পাশ দিয়ে সোঁ করে বেরিয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যে পাইপগানের জোড়া গুলি লেগে রক্ষী গাড়ির ফ্লোরের মধ্যে ধপাস করে পড়ল। পিঠ দেয়ালে , জামাটা রক্তে ভিজে উঠছে। এদিকে সামনের গেটে ড্রাইভার কানের পাশে ঠান্ডা ধাতব নলের ছোঁয়ায় নেতিয়ে পড়েছে। কিন্তু ওর পাশে বিপরীত দরজার দিকে বসে থাকা রক্ষী জালি লাগানোর জানলার গায়ে ঠেকিয়ে রাখা মাস্কেটটি র ট্রিগারে সকলের অজান্তে চাপ দিল। ফল হল উল্টো। গুলি লাগল না। কিন্তু পেছনের গেট থেকে সোনালিচুলো কম্যান্ডার এসে জালির গায়ে নল ঠেকিয়ে ঘোড়া টিপল। রক্ষীর হাতে গুলি লাগতেই ও কাতরে উঠল। এই অভাবিত ঘটনায় রাস্তার দুধারের দোকানপাট নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল। পার্কস্ট্রীটে সাত সকালে শ্মশানের স্তব্ধতা। ইতিমধ্যে ডাকগাড়িটির হাত পাঁচেক দূরে থেমেছে একটি কালো অ্যাম্বাসাডর। তার চালক সিট থেকে নড়েনি, ইঞ্জিন বন্ধ করে নি। তবে সঙ্গীটি নেমে এসে খুলে ফেলল অ্যাম্বাসাডরের ডিকি। এই পাঁচজনের দলটি দ্রুত হাতিয়ে নিল তিনটি মাস্কেট। ডিকির মধ্যে উধাও হয়ে গেল ট্রাংক আর ওদের পাইপগান। তিনজন উঠে বসল অ্যাম্বাসাডরের পেছনের সিটে। কিন্তু গাড়িটি স্টার্ট নিয়ে আটকে গেল। কিশোর ড্রাইভার নার্ভাস হয়ে গেছে, ক্লাচ - একসিলেটর-ব্রেক এর কোঅর্ডিনেশন ঠিক হচ্ছে না। অভিজ্ঞ সঙ্গীটি ওকে সরিয়ে পাকা হাতে স্টিয়ারিং ধরল। গাড়ি একটু বাঁক নিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল তার উল্টোদিকে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুজন--হাতে তিনটি দখল করা মাস্কেট,গুলির বেল্ট রয়ে গেছে আহত রক্ষীদের কোমরে। এভাবে গেল দেড় মিনিট। গলির মধ্যে থেকে উঠে এসেছে একটি ফিয়েট। তাতে চালান হয়ে গেল মাস্কেটগুলো। এবার পেছনের সিটে সওয়ার হয়ে মিলিয়ে গেল শেষ দুই অশ্বারোহী। গোটা অপারেশন সম্পন্ন হল সাড়ে চার মিনিটে। আধঘন্টা পরে যখন সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স ও বিশাল পুলিশ বাহিনী পোঁছল তখন পার্ক স্ট্রিট পোস্ট অফিসের সামনে লালচে গাড়িটিকে ঘিরে মানুষের জটলা। এম্বুলেন্স কর্মীরা দ্রুত হাতে দুই আহত সুরক্ষা গার্ডকে স্ট্রেচারে করে তুললেন। পুলিশের একটি দল পোস্ট আফিস ঘিরে ফেলল। চশমা পরা একজন অফিসারের নেতৃত্বে একটি ছোট দল ভেতরে পোস্ট মাস্টার, স্টাফ ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নিতে ব্যস্ত হল। আর একটি দল ডাকগাড়ির ড্রাইভার, অক্ষত সুরক্ষা গার্ড ও রাস্তার ওপারের চায়ের দোকানের মালিককে ইন্টারোগেট করবে বলে কালো গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে গেল। সেই সময় গড়িয়ার কামডহরির কাছে একটি ঝিলের পাশে বিশাল নির্জন বাগানবাড়িতে এক টাকমাথা ধবধবে গায়ের রং ষাট পেরিয়ে যাওয়া ভদ্রলোক ওঁর স্টাডি রুমে একা একা দাবা খেলছিলেন। ওঁর পরনে সাদা ফতুয়া ও বার্মিজ ধরণের লুঙ্গি। পায়ের কাছে একটি দেশি কুকুর অলস ভঙ্গিতে গা ছেড়ে দিয়ে থাবা চাটছে। বই দেখে বটভিনিক ও টালের একটি বিখ্যাত গেমের ওপেনিং গুলোকে বদলে বদলে নতুন ভাবে খেলছিলেন। কিন্তু আজ খেলায় মন নেই। মাঝে মাঝে কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা। ঘন্টা দুই কেটে গেল। এমন সময় হঠাৎ পোষা কুকুরটা গরর্ করে উঠল। উনি প্রায় লাফিয়ে উঠে জানলা দিয়ে দেখলেন যে দারোয়ান গেট খুলে দিচ্ছে আর বাগান পেরিয়ে এদিকে হেঁটে আসছে সোনালি চুল।উনি নিজেকে সংযত করলেন। গম্ভীর মুখে বললেন--রিপোর্ট! --- সাকসেসফুল। এভরিথিং ওকে। -- ভেহিকল্স্? -- ওকে, ইন দ্য হাভেন। নেমপ্লেট কালার চেঞ্জড্। -- এনি ক্যাজুয়ালটি? -- টু গার্ড্স ইন্জিওর্ড, নট ফ্যাটাল; নান অ্যাট আওয়ার সাইড। লম্বা মানুষটি বেঁটে সোনালিচুলোকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমো খেলেন।

352

27

Aratrik

হংসচঞ্চু

মেঘদূত শেষ পর্ব। আপনারা যে আমাকে ডেকেছেন, কথা বলতে বলেছেন, সে কথা শুনবেন বলে এমন অপেক্ষা করছেন, বিশ্বাস করুন, শুধু তাতেই আমি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার এই ধর্মটি আমি শিখেছিলাম আমার কুড়ি বছর বয়সে। ১৯৮৭ সাল। এক অতি উচ্চশিক্ষিত মহিলার সঙ্গে আমি সে সময় বাংলার পশ্চিমে একটি রাজ্যে গিয়েছিলাম। এখন সেটি আবার রাজ্য হয়ে গিয়েছে। ছোট কয়েকটি গ্রামে গিয়েছিলাম আমরা। যে গ্রামে রাস্তা তেমন কিছু নেই। গাছের মোটা মোটা শিকড় পথের উপর দিয়ে এ পাশ থেকে ও পাশে চলে গিয়েছে। আমরা একরকম দুলতে দুলতে যাচ্ছিলাম। মোটরবাইকের ইঞ্জিন লাগানো ভ্যানে আমরা যখন যাচ্ছিলাম, আমার বন্ধু রফিক বলে উঠেছিল, ‘ঠিক যেন নাগরদোলায় উঠেছি।’ আর ঠিক সেই সময়েই সেই সদ্য তরুণী উচ্চ শিক্ষিতা টাল সামলাতে না পেরে আমার কোলের উপরে পড়েন। ভ্যানে আমার বন্ধুরা সকলেই হেসে ওঠেন। কিন্তু ওই গ্রামের যে কয়েকজন ছিলেন, তাঁরা অবাক হয়ে যান। পরে তাঁরাও হেসেছিলেন, তবে তার কারণ, আমাদের ওই ভাবে ভ্যানে চলার অনভ্যাস। কিন্তু তাঁরা বুঝে উঠতে পারেননি, ‘নাগর’ শব্দটির ব্যাঞ্জনাতেই আমরা হেসেছিলাম। সেই উচ্চশিক্ষিতা তরুণী সেই হাসি উপভোগ করেছিলেন। তাতে বুঝতে পেরেছিলাম, তিনি একদিকে নাগর শব্দটি ও অন্য দিকে অনভ্যাসের স্নেহ, দু’টিই সমান উপভোগ করছেন। তিনি আমার কানে কানে রবীন্দ্রনাথের লেখা কিছু গানের কথা বললেন। সেই সঙ্গে বললেন, অনেক দিন আগে শোনা মেঘদূতের কয়েকটা লাইন। ভূয়াশ্চাহ ত্বমপি শয়নে কণ্ঠলগ্না পুরা মে নিদ্রাং গত্বা কিমপি রুদতী সস্বরং বিপ্রবুদ্ধা সান্তর্হাসং কথিতমসকৃৎ পৃচ্ছতশ্চ ত্বয়া মে দৃষ্টঃ স্বপ্নে কিতব রময়ন্ কামপি ত্বয় ময়েতি কথাটা হল এই, মেঘকে যক্ষ বলছে, তুমি যে আমার দূত হয়ে যাবে, তা সে তো তোমাকে চিনতে না-ও পারে? তাই এমন কোনও একটা ঘটনার কথা তোমাকে বলছি, যা কেবল আমিই জানি। সেই কথাটা তুমি তাকে বললে, সে বুঝতে পারবে, তোমাকে আমি ছাড়া আর কেউ পাঠায়নি। সেই কথাটা হল, একদিন রাতে যক্ষের কণ্ঠলগ্না হয়ে ঘুমোনোর সময় যক্ষের সেই অতুলনীয়া স্ত্রী হঠাৎ কেঁদে জেগে ওঠে। কেন তিনি এমন করছেন, জানতে চাইলে, তিনি যক্ষকে বলেন, ‘একটি স্বপ্ন দেখেছেন, তাতে তিনি দেখেছেন, যক্ষ অন্য এক মহিলার সঙ্গে রমণ করছে।’ কেন তিনি এই কথাটা বললেন? তাঁর যুক্তি, এই যে দু’টি নরনারীর মধ্যে একটি একান্ত সম্পর্ক, সেখানে কিছু উপাদানের প্রয়োজন হয়। এমন কিছু বাক্য, এমন কিছু অভিজ্ঞতা, যাতে তা দিয়েই শুধু ধরে নেওয়া যায়, এই দু’জন নরনারী সেই উপাদানের মাধ্যমে যুক্ত। এই যে তিনি আমার গায়ের উপরে পড়লেন, এই যে তখন আমি তাঁর চুলের গন্ধ পেলাম, এই যে তিনি স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি সময় ধরে সেই ভাবেই বসে রইলেন, এই যে তিনি কানের কাছে ঠোঁট দু’টি এনে কথা বলে গেলেন, তাতে সেই উপাদান তৈরি হল। এটি এক ধরনের এক্সক্লুড করার পদ্ধতি। অন্য সবাইকে এক্সক্লুড করে দেওয়া। তাতে নিজেদের জন্য একই সময় ও অবস্থায় আলাদা সময় ও অবস্থা তৈরি করে নেওয়া যায়। এই এক্সক্লুড করাটি নিয়ে দু’চার কথা বলা দরকার। সর্বভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবরই নানা ধরনের মতের জন্য বাউন্ডারি বেশ বড়। তাই যে কোনও মত পেশ করেই আপনি মনের আনন্দে কয়েকটা সিঙ্গলস নিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু ছক্কা হাঁকানো বেশ বেশ কঠিন। এই যে একটা বড় মাঠ, তার সুযোগটা সকলেই নিত। এই ধরনের কলেজে বামপন্থীদের কদর সব সময়েই ভারির দিকেই ছিল। তার প্রধান কারণ, ওদের একটু আঁতেল মতো দেখতে হত। কথায় একটু শিক্ষিত টান থাকত। দু’একটা জারগন বলত। দু’চারটে বিদেশি নাম ড্রপ করত। তাতে চোখ সামান্য হলেও ট্যারা হওয়ার কথা। হতও। ধর্মান্ধরা একটু কোণঠাসা। তার প্রধান কারণ, ওদের মত সব সময়ই গোঁড়া। স্বাধীনতারও খুব অভাব। কোনও একটা কথা বললে, সেটা মেনে চলতেই হবে। না হলেই ওরা সন্দেহ করবে। বামপন্থীরা যে তেমনটা ছিল না, তা নয়। কিন্তু তারা তর্ক করার পরিসরটা দিত। তাতে তর্ক কিছু হত না। ওদের কথাই শুনতে গত, রাদার গিলতে বাধ্য হতে হত, কিন্তু তবু তারপরে পিঠে হাত দিয়ে বলত, চল চা খাই। ওদের ভয় ছিল, একবার যদি বিশ্বাসটা ভেঙে যায়, তা হলে সেটা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মান্ধরা সে ভয়টা পেত না। তাদের বিশ্বাসও ছিল খুবই গোঁড়া। আর কলেজ পেরিয়ে কে আর গোঁড়া মতকে সমর্থন করে বলুন! কংগ্রেসের মতো বড় মঞ্চ টাইপের দলের প্রভাব তেমন ছিল না। তার কারণটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা একটু ভেঙে বলি—আশির দশক থেকে নানা ছোট দলের যে বাড়বাড়ন্ত হচ্ছিল, তার প্রভাবটা পড়েছিল চোখে পড়ার মতো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত অনেক ছোট মাঝারি শহরের ছেলেমেয়ে। তারা স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব সঙ্গে নিয়ে আসত। ধরুন, পঞ্জাবের কোনও ছোট শহরের একটি মেয়ে এল। তার উপরে অকালি নেতাদের একটা প্রভাব রয়েছে। আবার কেউ এল তামিলনাড়ু থেকে। তার উপরে রয়েছে এনটিআর-জয়ললিতার প্রভাব। কেউ এল বিহার থেকে। তার উপরে নীতীশ, লালুর প্রভাব। লখনৌয়ের ছেলে দেবীলালের ভক্ত। এলাহাবাদের ছেলে মুলায়মের। একটু নীচের দিক থেকে কেউ এল, সে কাসিরামকে ভগবান বলে মনে করে। অনেকে ঠিক উল্টোটাও ছিল। দেবীলাল আর তার ছেলেকে দেখতে পারত না, এমন ছেলেমেয়েও দেখেছি। কিন্তু কথা হল, স্থানীয় দলের এই প্রভাবটা সব সময় বোঝা যেত। যেমন আমরা কলকাতার ছেলে। আমরা কংগ্রেস বলতে সোমেন মিত্র বুঝতাম। (আমার আসলে আমহার্স্ট স্ট্রিটে যাতায়াত ছিল)। একটু বড়লোকী চাল, ঠাঁটবাট, কালীপুজো ইত্যাদি। যে ছেলেটি ভুপাল থেকে এসেছে সে বুঝত সিন্ধিয়াকে। ছোট জমিদার নয়, একেবারে রাজা। যে মেয়েটি এলাহাবাদ থেকে এসেছে, তার ধারণা ছিল কংগ্রেস মানেই খুব বাজে। সে শিউরে উঠত। এলাহাবাদেই নেহরুদের বাড়ি। কিন্তু সেই মেয়েটি এলাহাবাদে পান খাওয়া, অশিক্ষিত, ছোড়া পিস্তল হাতে কিছু কংগ্রেস নেতা দেখেছে, সেটাই তার মনে রয়েছে। তাই সে বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংকে পছন্দ করত। ভিপি-র মধ্যে একটা অধ্যাপক সুলভ মেজাজও ছিল, তাই তাঁকে অনেকেই পছন্দ করত। কিন্তু এই স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবের ফলে তাদের মধ্যে মিলটা এই জায়গায় ছিল যে, সকলেই নিজের নিজের ভালটা বুঝত। প্যান ইন্ডিয়া একটা ধারণার তারা বরং বিরোধিতাই করত। তারাই এক ধরনের এক্সক্লুড করার রাজনীতিতে বিশ্বাস করত। ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক চরিত্রটি খুবই নিজের নিজের করে রাখত। অন্য কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতে পর্যন্ত চাইত না। যেমন ধরুন, ম্যাঙ্গালোর থেকে আসা একটি মেয়ে কর্ণাটকী সঙ্গীত নিয়ে যদি কেউ হাসাহাসি করে, তা হলে খুব রেগে যেত। বিবেকানন্দ এমন কী একটা কথা বলেছিলেন, সেটা উল্লেখ করায় আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই একই মেয়ে পঞ্জাবী লোকগীতিকে একটু নিচু চোখে দেখত। পাঁইয়াদের নিয়ে হাসাহাসিও যথেষ্ট করত। বাঙালিদের নিয়ে হাসাহাসি তো হতই। তবে সে প্রসঙ্গ অন্য একদিন। মোট কথা, এই ছেলেমেয়েরা যে কোনও তর্কে নিজেদের রাজ্যের কোনও ঘটনা বা সাংস্কৃতিক ঘরানার উদাহরণ দিত, সেগুলো না মানা হলে সেক্টারিয়ান বলে গাল পাড়ত। তাই সবাই নিজের নিজের মতো করে সিঙ্গলস নিয়ে খেলত। ছক্কা টক্কা হত না। কিন্তু ওই যে এক্সক্লুড করার রাজনীতি, তার সুযোগটা নিত ওই রকমই কিছু সংগঠন, যারা স্থানীয় সেন্টিমেন্টকে কষে এক্সপ্লয়েট করত। সেই ফাঁদে অনেকেই পা দিত। আমার রাজনীতি সম্পর্কে একটু ভয়ই ছিল। তাই সাধারণ নির্বাচনটনগুলোও এড়িয়ে চলতাম। আমার ফোকাসটা ছিল, দিল্লি, বোম্বে, কলকাতার মতো বড় শহর থেকে আসা ছেলেমেয়েদের মতোই, ডিগ্রিটা গুছিয়ে নিয়ে কেটে পড়ব। তাই নানা রকমের রাজনীতির গন্ধওলা লেকচার মেকচার এড়িয়ে চলতাম। গ্রাফিতি ট্রাফিতি তেমন দেখতাম না। বরং ইকনমিক হিস্ট্রির ক্লাস করতে যেতাম। আমার খুব ভাল লাগত। তাতে, যারা হোস্টেলে থাকে, তারা আমাকে একটু আওয়াজ দিত। সে সব আমি খুব কিছু গায়ে মাখিনি কোনওদিনই। কারণ, ওই যে বললাম, ছক্কাটা কেউই হাঁকাতে পারত না। তাই দু’টো সিঙ্গলস যদি নিতে চায়, নিক না। আর, হ্যাকনিড কথা বলায় ওরা ওস্তাদ ছিল। কিন্তু একবার একটু অসুবিধার মুখে পড়লাম। জায়গার নামটাম বাদ রাখাই ভাল। পাত্রপাত্রীর নামও উল্টোপাল্টা করে দিচ্ছি। তবে একজন পাত্রীর কথা না বললেই নয়, সে তো আপনারা জানেনই। রফিক বলে একটি ছেলে ছিল। মধ্যপ্রদেশের ছোট শহর থেকে এসেছিল। ইকোনোমিক্সের ছেলে। তার মধ্যে সব সময়েই একটা মেজাজ ছিল। খাদির শার্ট, চটি, জিন্সের প্যান্ট পরত। হাল্কা দাড়ি আর বড় বড় চোখ। তাই ওর চারপাশে মেয়েদের ভিড় লেগেই থাকত। কোনও কোনও সময় মাথায় গামছা বেঁধে রাখত আরাফতের টারবানের মতো করে। ঘোরতর ইস্রায়েল বিরোধী। আমি সাধারণত ওকে দেখলেই অন্য দিকে পালাতাম। ছেলেটার সব থেকে বড় দোষ ছিল, সামনে এসে দাঁড়াত, যেন অমিতাভ বচ্চন। গলা ভারি করে তারপরে এমন সব বুকনি দিত, যা শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। একদিন ওর সামনে পড়ে গেলাম। রফিক ওর শাগরেদদের সঙ্গে সিঁড়ি জুড়ে বসে কোনও একটা বড় তর্কের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে দেখেই ও এক লাফে উঠে এসে রাস্তা আটকে দাঁড়াল। তারপরে ওই এক পা দূরে ফেলে, বেশ মেজাজ দেখিয়ে বলল, পরের দিন ওদের কর্নারে যেতেই হবে। আমি পরিষ্কার না করে দিলাম। আর ও এই সুযোগটাই খুঁজছিল। কেন না? এই প্রশ্নটার উত্তর না পেয়ে ও নড়বে না। বললাম, তোদের মতটতগুলো আমি কিছু বুঝি না। রাজনীতিই কিছু বুঝি না। শুনে বলল, তা হলে তো আরও বেশি করে যেতে হবে। কারণ, ভারতের এখন বেশি করে শিক্ষিত যুবসমাজ দরকার। সেই শিক্ষিত যুব সমাজ মানে যে অর্থনীতি, ইতিহাস বা বিজ্ঞান বোঝে। যারা সাহিত্য-টাহিত্য পড়ে, বিশেষ করে বিদেশি ভাষা, তাদের মগজধোলাই সব থেকে জরুরি। কেননা, তারা শিক্ষিত কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল। তাই তারা বড় বেশি করে বিপজ্জনক। তাই তাদেরই সব থেকে আগে টেনে আনতে হবে, বোঝাতে হবে। বোঝো। আমি বললাম, তোর তিন রান নেওয়া হয়ে গিয়েছে। এ বার ভাগ। শুনে বলল, নো। তোকে দলে টেনে আমি একটা চার অন্তত হাঁকাবই। বলেই আমার হাত ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল। তাতে নড়া খুলে যায় আর কী। কিন্তু সে সব মিটলে, আমাকে কথা দিতে হল, যাব। সত্যি বলতে কী, গেলামও। ওদের কথা শুনে খুব নতুন কিছু যে লাগল তা একেবারেই নয়। কিন্তু নাড়া দিয়ে গেল এক ভদ্রলোকের কথা। লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে তিনি আস্তে আস্তে (কেননা, ওই হিন্দি আমাদের বোঝা শক্ত) একটা অদ্ভুত কাহিনী বললেন। এমন একটা গ্রাম, এমন তার লোকজন, এমন আশ্চর্য সব কাণ্ড ঘটে, যেন মনে হয়, এটা পুরোটাই আজগুবি। এমনটা হয় না। কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বললেন, হয়। তাঁর সারা গায়ে সেই ‘হয়’-এর নানা চিহ্ন। সে দিন রাতে তাঁর সঙ্গে ভোডকা খেতে খেতে অনেক কথা হল। তিনি মঞ্চে যা বলেছিলেন, তার থেকে অনেক বেশি বললেন। আর তারপরে আমাদের তাঁর সেই আজগুবি গ্রামে যেতে অনুরোধ করলেন। তখন অল্প অল্প ঠান্ডা পড়েছে। আমরা পাঁচ জনে ওই গ্রামে গেলাম। ট্রেনে রাইপুর। সেখান থেকে বাসে ঘণ্টা সওয়া ঘণ্টা। নামলাম যেখানে সেটা একটা ধু ধু জায়গা। তিন দিকে সবুজে সবুজ পাহাড়। সামনে একটা ছোট কাঁচা রাস্তা। একটা লোক কাঁধে টেপ রেকর্ডার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা নামতেই টেপটা চালিয়ে দিল। তা থেকে বেরিয়ে এল ওই ভদ্রলোকের কণ্ঠ—‘আপনারা এসেছেন তাতে খুব খুশি হয়েছি। এই লোকটির কাছে কিছু খাবার রয়েছে, খেয়ে নিন। তারপরে ওর দেখানো পথ ধরেই হেঁটে কিছুটা আসুন। তারপরে দেখবেন একটা মোটরভ্যান রয়েছে। তাতে নিশ্চিন্তে চেপে বসুন। সেই ভ্যান আপনাদের আমার কাছে পৌঁছে দেবে।’ এই ভদ্রলোকের নাম দেওয়া গেল কবীর। আমরা সেই সেই মতো করলাম। এর কিছু ক্ষণ পরে যখন গ্রামের মানুষ আমাদের চারপাশে ঘিরে ধরে চারপাইতে বসানোর ব্যবস্থা করলেন, আমাদের জন্য খাবার দাবার, ফল নিয়ে আসা হল, তখন প্রশ্নোত্তর পর্বে আমরা কিছুটা একঘেয়ে উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত বোধ করছিলাম, অশোক, আকবর, আমস্ট্রংদের কথায় আমরা চমক পেতে পেতেও ক্লান্ত বোধ করছিলাম, কেননা, দেখা গেল, সেই গ্রামের মানুষ এঁদের কারও নামই শোনেননি। চাঁদে যে মানুষের পা পড়েছে, তা-ও জানেন না। রকেট কথাটি পর্যন্ত অচেনা। শেক্সপিয়রের নাম শুনলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। সে সময়ে যাঁর ডাকে আমরা গিয়েছিলাম, তাঁকে সেই তরুণী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, এঁরা কী জানেন, যে ভারত বলে একটা দেশের নাগরিক এঁরা?’ এ বার জানা গেল, সেটাও তাঁরা জানেন না। আমরা যে চারপাইতে বসেছিলাম, সেটি নিচু। তিনি আমার পাশে বসেছিলেন। তাই কথা বলার ঝোঁকে বারবার আমার দিকে হেলে পড়ছিলেন। আমরা যখন তাই ভারত নিয়ে গভীর চিন্তায় ঢুকতে যাচ্ছি, ওই গ্রামের এক মহিলা তাঁর দেহাতি হিন্দিতে আমাকে বলে উঠলেন, ‘তুমি বাছা ওকে ধরে বসছো না কেন? তুমি তো জানো, ও এ ভাবে বসতে পারে না। কেন মিছিমিছি লজ্জা পেয়ে কষ্ট দিচ্ছ?’ আমরা চুপ করে গেলাম। ‘লজ্জা পেয়ে কষ্ট দেওয়ার’—ধারণাটাই আমাদের ছিল না। আমরা নাগর শব্দটি জানি, আমরা আমস্ট্রং কেন, গ্যাগারিনেরও নাম জানি, আমরা অশোকের বাবা ও ছেলের নাম জানি, আকবরের গোটা গুষ্টির কথা জানি, শেক্সপিয়র তো পড়েইছি, ওয়েবস্টারও পড়েছি—কিন্তু এই লজ্জা পেয়ে কষ্ট দেওয়াটা জানিনি। তিনি আমাদের সকলের চেয়ে স্মার্ট। সকলের চেয়ে বেশি শিক্ষিত। তিনি তাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এই ওর স্বভাব। আগে নিজের অনুভূতির কথা ভাবে, তারপরে আমার।’ ভ্যাবাচাকা খেয়ে যখন তাকিয়ে রয়েছি, তখন সেই গ্রামের সেই মহিলা বললেন, ‘তাহলে তো তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত মা। নিজের কথা না ভেবে তোমার কথা ভাবলে, সে ভাবনাটিতে শুধু কৃত্য থাকে, কৃতজ্ঞতা থাকে না।’ কথাগুলো নিশ্চয়ই এমন সাধু বাংলায় বলেননি। দেহাতি প্রতিশব্দতেই বলেছিলেন। এরপরে আমরা কত কত ঘুরলাম। ছোট ছোট সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সেই গ্রাম। সেখানে অনেক গল্প শুনলাম। কোনওটা ভূতের, কোনওটা পরীর। এ বার প্রশ্ন হল, ভূত বা পরী কী করে? অর্থাৎ, ভূত ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করে? পরী কী ধরনের ভালো করে? ভূতের ক্ষেত্রে দেখা গেল, আখের রস জ্বাল দেওয়ার সময় তারা ঠেলে আগুনে ফেলে দেয়। মরা মানুষের দেহের গন্ধের সঙ্গেই সেই রস বিক্রি হয়ে যায়। কেউ ধরতে পারে না। একদিন গভীর রাতে, বিরাট চাঁদ আকাশে, গ্রাম্য মদ খেতে খেতে সেই কথা বলতে বলতে হা হা করে হেসে ফেললেন গ্রামবৃদ্ধ। বলে ফেললেন, ‘শহরে কেউ বুঝতেও পারল না, আখের রসের সঙ্গে খেয়ে যাচ্ছে একটা আস্ত মানুষকে।’ কিন্তু আপনারা যখন বুঝতে পারলেন, তখন ওই লোকটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি? উত্তর এল, ‘সে আবার কেউ করে না কি? তা হলে তো ভূতে তাকেও ওই আগুনে ফেলে দেবে। একটা মানুষের বদলে অনেক মানুষ পড়ে গেলে রস খারাপ হয়ে যাবে। কেউ কিনবে না।’ ভূত আর কী করে? উত্তর এল, অনেক রাতে যখন কেউ একা একা পাহাড়ের পাশ দিয়ে ফেরে, তখন তাকে রাস্তা ভুলিয়ে দিয়ে ঠাকুরদের গ্রামে নিয়ে গিয়ে ফেলে। শেষ দিকটায় এমন তাড়া করে যে, ওই রাতে সে যে হঠাৎ করে ঠাকুরদের গ্রামে ঢুকে পড়ার পরে কোনওমতে চুপিচুপি পালিয়ে যাবে, তা আর হয় না। তার নিজেরই হাঁকডাকে তাকে সবাই ধরে ফেলে। তারপরে লাঠিপেটা করে। তারপরে তিন মাস গরুর খাটালে কাজ করতে হয়। তারপরে খুব সমবেত হাসি। হাসছেন কেন? উত্তর এল, ‘আরও কত কী যে করতে হয় ঠাকুরদের গ্রামে। বলতে বলতে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে।’ ভূত বড় সাঙ্ঘাতিক বস্তু। আর পরী কী করে? গ্রামের এক মহিলা বললেন, সে-ও খুব খারাপ করে অনেক সময়। একবার গ্রামের এক ছেলে পাটনা গিয়েছিল। পড়াশোনা করে। একবার গ্রামে ফেরার পথে স্টেশনে সে দেখে একটা টাঙ্গা নিয়ে পরী বসে রয়েছে তার জন্য। রফিক বলল, ‘ধুস, পরীর নাম কি বাসন্তী?’ সেই মহিলা অবাক হয়ে বললেন, ‘পরীর নাম অমন হয় না। পরীর কোনও নামই হয় না। সব পরীই পরী।’ আমরা মুখ চাওয়াচায়ি করছি। তিনি বলে চললেন, ‘সেই পরী ওই ছেলেটিকে একটা হ্রদের সামনে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল।’ তিনি উদগ্রীব হলেন। সেই রমণী বললেন, ‘তারপরে পরের দিন সেই ছেলেটির দেহ পাওয়া গিয়েছিল ওই হ্রদেরই ধারে।’ আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ওই হ্রদ থেকে ঠাকুরদের গ্রাম কত দূরে?’ কবীর হেসে ফেললেন, ‘এত সোজা অঙ্ক নয়। এই গ্রামে কেউ পড়াশোনা শিখলে ঠাকুরদের কিছু যায় আসে না।’ কেন? কবীর বললেন, ‘পড়াশোনা করে কেউ এত বড় হতে পারবে না, যাতে সে ঠাকুরদের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে। পড়াশোনা করে আপনি খুব বেশি হলে ডিএম, আইপিএস হবেন। সেটা ওরা হাতের ময়লার মতো মনে করে। ওরা ভয় করে কেবল পলিটিক্সকে। এ ছাড়া আর কোনও শর্তকে নয়।’ তা হলে পরীটা সত্যি ছিল। সত্যিই তো ছিল। সেই রাতে ওই হ্রদের পাশে গিয়েছিলাম আমরা। আমি আর তিনি। বাকি সবাই এক্সক্লুডেড। একটা বিরাট হ্রদ। তার চারপাশে চাঁদের আলো। আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কী শীত কী বলব! চারিদিকে যেন বরফ জমাট হয়ে রয়েছে। তাতে নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন। আর তার মধ্যে মাঝে মধ্যে ঝুপ ঝুপ করে শব্দ। কী পড়ছে? আমি তাঁর দিকে চাইলাম। তিনি সামনে তাকিয়ে রয়েছেন। আমি তাঁর আরও কাছে ঘেঁসে বসলাম। তিনি কিছু বললেন না। বরং নরম স্বরে বললেন, ‘‘যে যক্ষ তার স্ত্রীকে এত ভালবাসে, সে কেন সেই ভালবাসার পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে না? যে যক্ষ মেঘকে দূত করে পাঠাতে পারে, সেই পাঠানোর ভাবনাটি ভাবতে পারে, কেন তার প্রতি তার প্রেমিকার এই অনাস্থা? কেন তার প্রেমিকা মনে করে, সেই যক্ষ অন্য রমণীর সঙ্গে রমণ করতে পারে?’’ তারপরে তিনি বললেন, ‘‘গাবুর পাড়ার ওই অজন্তা স্যার যে বলেছিল, ওই প্রেমিকাকে নিজের চিন্তাতেই তৈরি করেছে যক্ষ, তাই সে ওই ষোলো বছরের কিশোরী হয়েও বিরাট একটি দেহ পায়, সেই শরীর সে পায় ওই যক্ষের কল্পনাতেই, তবু কেন, যাকে নিজের কল্পনাতেই তৈরি করা হয়েছে, সে পর্যন্ত বিশ্বাস করে না যক্ষকে? সৃষ্টি কেন বিশ্বাস করে না সৃজনকারকে?’’ তারপরে তিনি বললেন, ‘‘শেষ শ্লোকটা মনে পড়ছে আমার। কচ্চিৎ সৌম্য...বিচার প্রাবৃষা সম্ভৃত শ্রীর্মা ভূদেবং ক্ষণমপি চ তে বিদ্যুতা বিপ্রয়োগঃ। দেখো, সৃষ্টির এই সন্দেহ কেমন করে এক্সক্লুড করছে সৃজনকারকে পর্যন্ত। সৃজনকারও নিজেকে এক্সক্লুড করছে সৃষ্টি থেকে। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে দু’জনের।’’ তিনি বললেন, ‘‘আর তাই এই শেষ শ্লোক। মেঘকে বলছেন যক্ষ—আমার সঙ্গে যেমন বিচ্ছেদ হয়েছে আমার প্রেমিকার, তোমার সঙ্গে যেন তা না হয়। তোমার সঙ্গে যেন সর্বদা লেগে থাকে বিদ্যুৎ।’’ আকাশ থেকে নামল পরীরা। তারা নামল জমাট জলের উপরে। তিনি বললেন, ‘‘হ্যামলেটও তাই বলেছে। সে-ও নিজেকে এক্সক্লুড করেছে। নিজেকে নিজে থেকে এক্সক্লুড করেছে।’’ সব পরী তখন তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। কুয়াশায় তাঁকে দেখতে পাচ্ছি কি পাচ্ছি না। তিনি বললেন, ‘‘এক্সক্লুড করছি। নিজেকে নিজে থেকে এক্সক্লুড করছি।’’ Who does it, then? His madness. If’t be so, Hamlet is of the faction that is wronged. His madness is poor Hamlet’s enemy. আমার সময় সেই হ্রদের পাশেই শেষ হয়েছে। আপনাদের জন্য রইল আরও একটি লাইন। Is it not monstrous that this player here, But in a fiction, in a dream of passion, Could force his soul so to his own conceit.

1908

286

মনোজ ভট্টাচার্য

নকল গয়না !

নকল গয়না ! কমল একটা কমার্শিয়াল কোম্পানিতে কাজ করত ! মাইনে যে খুব একটা ভালো ছিল তা নয় ! কিন্তু ওর বৌ নীপা বেশ গোছানে ও সঞ্চয়ী । তাই ওর সংসারে বিশেষ অসুবিধে হত না – বরং বাইরে থেকে ওদের ধনীই মনে হত ! দুবছর আগে বাবা মারা যাবার পর এখন তার দরুন আর খরচ হয় না ! – তাছাড়া ওদের বিয়ের এত দিন বাদেও কোন সন্তান না হওয়ায় – ওদের ভালভাবেই চলে যাচ্ছিল ! নীপার খুব সিনেমা দেখার শখ ছিল! হিন্দি-বাংলা সব সিনেমা দেখা চাইই ! প্রথম প্রথম কমল ওর সঙ্গে এসব দেখতে যেত । কিন্তু যেহেতু ওর খুব একটা উৎসাহ ছিল না এসবে তাই – কিছুদিন পরে খুব বোর হয়ে গিয়ে নীপার সঙ্গে যাওয়া বন্ধ করে দিল ! বরং কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আরেকজনের বাড়ি গিয়ে তাস খেলত । নীপাকেও তাই প্রতিবেশি কারুর সঙ্গে যেতে হত ! ও, বলতে তো ভুলেই যাচ্ছিলাম – নীপার আরও একটা অভ্যেস আছে । নকল গয়না কেনা ! প্রায়ই গয়না কিনত ! আত্মীয় বা কোনও বন্ধুর সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলেই নীপা কমলকে সঙ্গে করে সেখানে যেত । সেখানে নতুন গয়না পরে যেত নীপা – ও সবার নজরে পড়ার জন্যে ঠিক ঠিক সময়েই ঘোমটা খুলে যেত ! – কমল এটা খুবই লক্ষ্য করেছে ! অনেকেই সেই গয়না দেখে এগিয়ে এসে হাত দিয়ে দেখত, দাম জিজ্ঞেস করত ও প্রশংসা করত! কমল খুবই অবাক হয়ে যেত – নীপা যে দামগুলো বলত – সে দামে কমলের ক্ষমতাই ছিল না কোন গয়না কিনে দেবার ! – তার মানে নীপা খুব চাল মারত লোকের কাছে ! সন্দীপের বৌকে তুমি তোমার নেকলেসটার অতো দাম বললে কেন ? – মাঝে মাঝে হয়ত কমল জিজ্ঞেস করতো । - এটা কি সত্যিই অতো দাম বলবো নাই বা না কেন !- নীপা উত্তর দিত । - ও যদি ওর ওই ঝুটো নেকলেসটার দাম বলতে পারে ষাট হাজার টাকা – তবে আমারটাই বা সত্তর হাজার হবে না কেন ! সত্তর হাজার টাকা ! কমলের তো প্রায় দম আটকে যায় আর কি ! অতো টাকা দাম তোমার এই নেকলেসটার ?– এটা কবে কিনলে ? অতো টাকা পেলে কোথায় ? আরে না না ! – নীপা কমলকে আশ্বস্ত করে বলল – এগুলো আসল নয় – ইমিটেশান ! তবে দামি ! দশ হাজার টাকা দাম ! দশ হাজার টাকাও কম নয় কমলের কাছে ! কিন্তু সেটা নীপা কিনতেই পারে ! তাই কমল আর কথা বাড়াল না ! তাছাড়া – গয়নার ব্যাপারে ও খুব একটা এক্সপার্ট নয় ! ফলে কোনটার কত দাম হতে পারে – তার কোন ধারনাই নেই ! নীপা যা বলে – সেটাই স্বীকার করে নেয় ! তাছাড়া কমলের খানিকটা প্রশ্রয়ও ছিল নীপার ওপর ! এভাবেই সুখে-দুঃখে কমল-নীপার দিনাতিপাত হচ্ছিলো । নীপার নিঃসন্তান হওয়ার কারনে – অনেকেরই সোজা-বাঁকা নানান মন্তব্যও শুনতে হত ! বিজ্ঞানের এত অগ্রগতির দিনে – কেন ওরা সে সুযোগ নিচ্ছে না ! এরকম কত কি ! এরই মধ্যে একদিন নাইট শোয়ে সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার সময়ে রাস্তায় গাড়ির ধাক্কায় নীপাকে ভর্তি হতে হোল হাসপাতালে । আঘাত তত গুরুতর নয় – কিন্তু হাসপাতালের অমানুষিক অবহেলায় – নীপা আটদিনের মাথায় মারাই গেল ! নীপার মৃত্যুর পর কমল একেবারে ভেঙ্গে পড়ল ! যদিও স্ত্রী-মৃত্যুর শোক লোকে বেশি পাত্তাও দেয় না ! - একে তো এত বড় দুর্ঘটনা – তায় সংসারের চাপ এসে পড়ল ঘাড়ের ওপর ! নীপাই সব কিছু সামলাত – সব কিছু ওর নখদর্পণে ছিল । কমল ঠিকমত খবরও রাখত না কোথায় কি খরচ হয় না হয় ! হাসপাতালের বিল মেটাতে ব্যাঙ্কের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল ! এবার মাসের শেষে খরচ করতে গিয়ে কমলের খুব বিপদ হোল ! সংসারের হাজার মুখ – একটা মেটে তো আরেকটা হাঁ হয়ে থাকে ! – এতদিনে কমলের উপলব্ধি হোল – সে খুব বেশি রোজগার করে না ! অবাক হয় ভেবে – নীপা কি করে ঠিকঠাক সংসার চালাত ! পরের মাসে তৃতীয় সপ্তার মাঝেই একদিন দেখে বাজারের পয়সা শেষ ! সকালে চা বা জল খাবারের পয়সা নেই । অফিশে যাবার বাসের ভাড়া আছে । কিন্তু টিফিনের পয়সা কিছু নেই ! খুবই অসুবিধের মধ্যে পড়ে গেল কমল ! তখন আলমারির খাঁজে খোঁজে খুঁজতে লাগল – যদি কোথাও কিছু টাকা গোঁজা থাকে । নাহ – কোনও টাকাই পাওয়া গেল না ! তখন ওর আচমকাই মনে পড়ল – নীপা যে গয়নাগুলো পড়ত – সেগুলো বিক্রি করলে কি কিছু টাকা পাওয়া যাবে না ! যতই ইমিটেশান হোক – কিছু দাম তো পাওয়া যেতে পারে ! অন্তত এই কটা দিনের খরচ তো চালাতে পারবে ! অফিশে বেরোবার সময় কমল একটা নেকলেস রুমালে মুড়ে পকেটে রাখল । টিফিন টাইমে অফিস পাড়ায় কোনও দোকানে খোঁজ করবে ! – যা দাম দেয় শ্যাকরা ! বউবাজারে অনেক সোনার দোকান আছে । ছোট বড় জুয়েলারী দোকানে ভর্তি ! টিফিনের সময় কমল কাউকে কিছু না জানিয়ে হেঁটে হেঁটে সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের কাছাকাছি একটা ছোটখাটো – লক্ষ্মী জুয়েলারী দেখতে পেয়ে – সেখানেই ঢুকে পড়ল । - বাইরে থেকে যতটা ছোটো মনে হয়েছিল – ততটা ছোটো নয় । দোকানের ভেতর সরু লম্বাটে অনেকটা জায়গা ! কাউন্টারের ওপাশে একজন লোককে জিগ্যেস করলো – আপনারা পুরনো সোনার গয়না কেনেন ? – ইমিটেশানের কথাটা ও ইচ্ছে করেই চেপে গেল ! কি গয়না – সেটা দেখলে বলতে পারবো । সঙ্গে এনেছেন নাকি ? – দোকানী তীক্ষ্ণ চোখে কমলকে খুব ভালভাবেই মাপতে লাগল ! এই যে সঙ্গেই এনেছি ! আমার স্ত্রীয়ের গয়না ! কমল খুব দুঃখ দুঃখ মুখে বলল । আমার স্ত্রী খুব সম্প্রতি মারা গেছেন ! দোকানদার ছোঁ মেরে হারটা তুলে নিল – মুখে একটু চুক চুক আওয়াজ তুলল ! চোখের ভেতর একটা ঠুলি গুঁজে দেখতে দেখতে – মুখে একটা অনিচ্ছার ভাব তুলে বলল – পুরনো গয়না ! কতয় দেবেন ? আপনি বলুন – আমার তো কোনও ধারনা নেই ! কমল আমতা আমতা করতে লাগল ! এটা তো বেশ পুরনো – দোকানদার যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে – খাদ বাদ যাবে মজুরি বাদ যাবে – তা আপনাকে পঁয়তাল্লিশ দিতে পারি ! যদি দিতে রাজি থাকেন - তো আপনাকে একটা আধার কার্ডের কপি দিতে হবে ! কমলের মাথাটা কিরকম ঝিম মেরে গেল । কি বলছে লোকটা – একটা ঝুটো গয়নার দাম পঁয়তাল্লিশ ! ও কি – নেকলেসটা ঝুটো বুঝতে পারেনি ! কমলের গলাটা শুকিয়ে গেল । তবু ও সাহস করে বলল – ঠিক আছে দেখি একটু অন্য দোকানে ! দেখুন – বলে ওর নেকলেসটা রুমালে মুড়ে ফেরত দিল ! কমল বেরিয়ে একবার সন্দেহের চোখে দোকানের দিকে ফিরে তাকাল ! দোকানী কি ওকে পরীক্ষা করছিলো ! একটা ঝুটো নেকলেসের এত দাম বলল কেন ! – তবু অন্তত একটা বড় দোকানে যাচাই করে নেওয়া দরকার ! কমল আরও হেঁটে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত এসে দেখল – বেশ কয়েকটা নামকরা দোকান ! দোকানে ঢোকার আগে ভাবল – একটু চা খেলে হত ! আর কিছু খাবার তো পয়সা নেই । অথচ পকেটে নাকি পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ! কি রসিকতা ! আসুন আসুন – ভেতরে চলে আসুন ! দোকানে বেশ কয়েকজন লোক আছে কাউন্টারে । কমলের একটু সাহস হয়েছে এখন । - হ্যাঁ – দেখুন আমি একটা গয়না বিক্রি করতে এসেছি । আপনি এদিকে চলে আসুন । একদম শেষের জন ওকে ডাকল । - কি আছে – বলুন ! কমল রুমাল থেকে নেকলেসটা বার করে কাউন্টারের ওপর রাখল ! সেই কর্মচারীটি হারটা নিয়ে চোখে ঠুলি লাগিয়ে দেখতে লাগল । অনেকক্ষণ দেখে পাশেই একটা দরজা ঠেলে ভেতরে চলে গেল ! – কমলের তখন বেশ নার্ভাস লাগতে আরম্ভ করলো ! এটা যে আসল নয় - এরা নিশ্চয় ধরে ফেলবে ! খুব জল তেষ্টা পেয়ে গেল। কিন্তু পাছে ওদের কিছু মনে হয় – তাই ও চুপ করে অপেক্ষা করতে লাগল । মিনিট খানেক পরেই সেই ঘর থেকে আগের দোকানী আরেকজনকে সঙ্গে করে বেরিয়ে এলো । দ্বিতীয় জন একটু নাদুস নুদুস ধরনের । সেই কমলের সামনে এসে বলল – এই নেকলেসটা আপনার তো ? হ্যাঁ আমার স্ত্রীর ! ও সম্প্রতি মারা গেছে । তাই - ! বুঝতে পেরেছি বুঝতে পেরেছি ! আপনার এখন খুব অসুবিধে হচ্ছে ! তাই বিক্রি করতে চাইছেন ! – ঠিক আছে – আমরা আপনাকে পঁচাত্তর হাজার দেবো ! এতে আমাদের বিশেষ লাভ হবে না ! তবু আপনার অবস্থা দেখে আর দরাদরি করছি না ! - আপনার কাছে আধার কার্ডের জেরক্স কপি আছে ? না তো ! – তবে আমার অফিশের আই ডি আছে ! তাতে আমার অফিশের নাম ও ঠিকানা আছে ! – যদি বলেন কাল এসে আধারের কপি দিয়ে যাব ! মনে করে নিশ্চয় দিয়ে যাবেন । এখন এত কড়াকড়ি চলছে – এইসব ব্যাপারে ! আজ আপনার আই ডি টা দেখান – তাতেই হবে । - এই কার্তিক – ওনাকে একটা ড্রিঙ্ক দে । চা খাবেন না লিমকা খাবেন ? লিমকাই দিন ! – কমল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ! তাহলে এগুলো ফলস নয় – আসলি গয়না ! হাতে কড়কড়ে পঁচাত্তর হাজার টাকা পেয়ে – পকেটে রাখল । তারপর জিজ্ঞেস করলো – আচ্ছা একটা কথা জিগ্যেস করবো ? হাঁ বলুন । এই নেকলেসটার আসল দামটা কত ছিল – বলতে পারবেন ? তা বলতে পারবো না কেন ! আমরা তো এই কাজই করি ! এটার দাম ছিল এক লাখ কুড়ি হাজারের মতন ! তারপর এর খাদ ও মজুরি বাদ দিয়ে পঁচাত্তর হাজার দিচ্ছি ! এতে আমাদের বিশেষ লাভ থাকছে না ! তবে আপনার অসুবিধের কথা ভেবেই - ! আচ্ছা – আরেকটা কথা । এরকম নেকলেস আমার কাছে আরও কয়েকটা আছে । আর তো আমার দরকার হবে না ! সেগুলো নিয়ে এলে আপনারা নেবেন ? নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই ! – আপনি নিয়ে আসুন – আমরা চেষ্টা করবো আরও ভালো রেট দেওয়ার ! আফটার অল – আপনার যাতে সুবিধে হয় – আমরা নিশ্চয়ই করবো ! রাস্তায় নেমে – কমলের প্রথমেই মনে হোল – বউবাজার স্ট্রিটটা কত সুন্দর – এই প্রচন্ড রোদ্দুরও কত মোলায়েম ! যেন একটা স্বপ্ন ! রাস্তার মানুষদের দিকে না তাকিয়ে ওপর দিকে তাকাল । কত ভালো ভালো বাড়ি - কত বড় বড় দোকান – ফ্ল্যাট ! কত ধনী লোকেরা থাকে – ব্যাবসা করে ! ভুলে গেল অফিশের কথা – ভুলে গেল খাবার কথা ! পকেটে ওর এত টাকা ! – এখন ও কোথায় যাবে – অফিশে - না কি ময়দানে ? অনেক অনেক প্রশ্ন মাথায় গিজ গিজ করছে ! অথচ মাথাটা যেন ফাঁকা – চিন্তা করার ক্ষমতাই নেই ! কমল অভ্যেস বশত হাঁটতে লাগল ডালহৌসির দিকে ! প্রচন্ড গরম – শূন্য উদর – শূন্য মস্তিস্ক ! কমল হঠাৎ পড়ে গেল ফুটপাথের ধারেই – একটা দোকানের পাশেই ! বেশ কিছু লোক এগিয়ে এলো – কেউ কেউ মুখে জলের ঝাপটা দিল ! তারাই আবার সবচেয়ে কাছের ডাক্তারখানার বেঞ্চিতে বসিয়ে দিল । - ততক্ষণে কমল পুরোপুরি সুস্থ্য ! গল্পটা এখানে শেষ হলেই - মনে হয় – ঠিক হত ! কিন্তু শেষ বলে তো কিছু হয় না ! – তাই - - ! সেই দুপুরেই অফিশে ফেরত গিয়ে ওর ওপরওলাকে জানালো – ওর ভীষণ শরীর খারাপ লাগাতে একটা ডাক্তারখানাতে ঢুকে বসে ছিল – তাই এত দেরি হয়ে গেছে ! – ওপরওলা ওকে বাড়ি চলে যেতে বলল । কমল বাড়ি গিয়েই সমস্ত আলমারি সুটকেস তন্ন তন্ন করে খুঁজে যত গয়না পেল – মানে আরও পাঁচটা হার ও কানের দুল ও হাতের চুড়ি – নিয়ে একটা ছোটো ব্যাগে রাখল । একটা রসিদও পেল একটা বড় দোকানের ! একটায় দাম লেখা আছে – এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা ! গত বছরের তারিখ ! পরের দিন কমল কাজে না গিয়ে একটু বেলায় বেরিয়ে গেল সেই দোকানটায় ! কালকের সব লোকই সেখানে ছিল – সেই নাদুস চেহারা লোকটাও বেরিয়ে এলো কাউন্টারে । ও যেন একটু বেশি খাতির পেতে লাগল ! আজ আধার কার্ডের কপি সঙ্গে নিয়ে গেছিল – দিয়ে দিল । অনেকক্ষণ সময় নিয়ে দোকানের লোকেরা পরীক্ষা টরিক্ষা করে অবশেষে ছ লাখ দশ হাজারের মতো দাম হোল । কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী সব টাকা ক্যাশে দেওয়া যাবে না ! তাই চেকে নিতে রাজি হোল ! ওদের একটা বিলে কমল সই করে দিল । ইতিমধ্যে কালকের মতোই লিমকা খেতে দিল ! একটা হোটেলে ঢুকে রুটি-মাংস খেয়ে বাড়ি ফিরে এলো ! – কমলের তখন চিন্তা হতে লাগল – কমলের যা মাইনে – তাতে ছ সাত বছরে কি এত টাকার গয়না কেনা সম্ভব ! আর আগে তো এত মাইনেও ছিল না ! বাবার দরুন বেশ কিছু টাকা পাঠাতে হত ! – এ ছাড়া সমস্ত লৌকিকতা চালিয়ে যাওয়া ! নীপার আবার শখ ছিল খুব সিনেমা দেখার ! প্রায় সব সিনেমাই দেখত ! আচমকা কমলের মাথায় যেন কারেন্ট খেলো ! সিনেমায় যেত - ! যেতই বা কার সঙ্গে ! কে ছিল নীপার সঙ্গী ! তাহলে কি নীপা উপহার পেত এইসব গয়না কারুর কাছ থেকে ? মনোজ

188

10

দীপঙ্কর বসু

Oh calcutta

by Suresh Subrahmanyan (Suresh Subrahmanyan revisits the city of his childhood, university education and the cradle of most of his professional career. He finds that much has changed in Calcutta, not all for the better.) I’ve kissed the girls of Naples, I’ve kissed them in Paree, But the ladies of Calcutta do something to me. I was in Calcutta recently after a gap of over fifteen years – a city that was my home for almost four decades. I know the bustling metropolis has been officially renamed Kolkata, but old habits die hard. In this respect, I appear to be in excellent company. The Telegraph masthead continues to refer to its ‘Calcutta edition’, the universal airlines code for the City of Joy is still CCU, and not KKU. The venerated, and a tad moth-eaten, Calcutta Club has not become Kolkata Club, and the sporty Calcutta Cricket & Football Club retains its moniker of CC & FC, not KC & FC. After a tedious morning flight into Calcutta, I wended my weary way through the maze of baggage carousels and trolleys one must necessarily encounter in a modern airport. Walked into the gentlemen’s loo, and was assailed by that familiar noxious pong – a heady admixture of phenyl and urine. To say nothing of the wet and slippery floors. I did a quick about turn and postponed the urgent ablution. I was soon ensconced in the car that ferried me into the city. My eyes were peeled for nostalgia to claim me. I was not prepared for what was to follow. For the first forty minutes of the drive, I could not recognise even the teeniest bit of landscape. Shiny, new skyscrapers were ranged on both sides of the roads, like some poor man’s Manhattan. Logos of familiar brand names whizzed past. Was I in Calcutta, or erroneously transported to some futuristic, brushed aluminium, sci-fi jungle? I put it to the driver. ‘Amra kothai?’ I enquired, eager to inflict my rusty Bengali on my unsuspecting victim. He smiled at me patronizingly and declared, ‘This is Rajarhat, sir. New Town, it is the new Kolkata’. All in perfectly good English! Thus enlightened, I waited for something vaguely recognisable to hove into view. After driving over a sleek flyover, we descended on terra firma, and what looked like Park Circus. I checked with my genial driver Arjun, who nodded in assent. Finally, traffic jams, ramshackle buildings, antiquated buses, clattering Jurassic trams, yellow Ambassador taxis that had seen better days, hand pulled rickshaws, street pavements lined with stalls selling everything under the sun – I was home! My joy knew no bounds. As I was proceeding towards Alipore, I prepared myself for a misty-eyed drive through memory lane – Park Street, Chowringhee, Theatre Road, Red Road, Victoria Memorial, the Maidan, Eden Gardens, Race Course, the Zoo, National Library et al. What I did not bargain for was another flyover, which obfuscated many of those landmarks, and took me in a trice towards the race course. I barely glimpsed two outstanding architectural relics, Victoria Memorial and St. Paul’s Cathedral. I reached my destination much sooner than I had expected. But then, who wants to get to any place in Calcutta in a hurry? The whole idea was to wallow in the snail’s pace traffic and soak in the sights. I felt short changed. It’s another matter altogether that when you actually live in Calcutta for long periods, you are constantly carping about the grime, sweat, crowds, jams and many other blots on the landscape that are peculiar to its denizens. Once you take up residence elsewhere, those very blots become endearing quirks that you want to return to. Distance lends enchantment! You can’t stop thinking about kaati rolls at Nizam’s, pucchkas and jhaal muri almost anywhere, rum balls at Flury’s, crisp dosa and filter coffee at Jyoti Vihar, prawn cocktail at Skyroom (RIP), Olympia Bar on Park Street – my ad agency colleagues’ daily watering hole, the clattering No. 24 tram that ferried me early morning from Triangular Park to Chowringhee / Park Street Crossing – thence the trek to St. Xavier’s College, endless 'cholbe na' processions and power cuts, the ecstacy of kalbaisakhi, the agony of the monsoon floods, streets being hosed down at the crack of dawn from roadside hydrants, the powerful water jets picturesquely arcing across the roads, a newspaper vendor on bicycle bellowing ‘Teshmann’, as he hurls a rolled-up, weighted newspaper with pin-point accuracy over a third floor balcony while still in motion! Checking out the latest record releases at Harry’s Music House on Chowringhee, listening to Musical Bandbox every Sunday afternoon on AIR Calcutta with BK, Ita Jane and Jija Bhattacharya! And who can forget the mildly erotic Italian thriller, ‘Blow Hot, Blow Cold’ at the New Empire? It ran for nearly 60 weeks, for all the wrong reasons – censorship notwithstanding! And Satyajit Ray – my college mates were livid that I had not seen a Bengali movie, and took me straight to the top of the class – a Ray film called Ashani Sanket (Distant Thunder) – about the Great Bengal Famine of 1943. All I recall was the camera drooling over a drop of water from a leaf, indicating the onset of the monsoon, for what seemed an eternity. The emotional and technical significance of this scene was discussed threadbare by the film buffs for the next three days! They did that with Bergman and Kurosawa as well. A motley, random list from the memory bank, but it is what it is. Nostalgia, with a pair of rose tinted glasses. Never mind about rose glasses, I was now trying to grapple with an obsession with the colour blue, that Calcuttans had apparently become addicted to. Driving and walking through the streets of Calcutta, there was this ‘blue madness’ that appeared to have gripped the city. Now blue is a colour I am quite partial to, in moderation. Blue sky, blue sea, blue eyes, the song Blue Moon, blue films – these we accept as part of our everyday existence. But miles of blue coloured walls, lamp posts draped in blue and white bulbs that shone so brightly at night that you were unsure about your geo-stationary position in the city. Even the peripheral walls of Alipore jail were swathed in blue paint. Consequently all roads looked the same. Under a different political dispensation, one was accustomed to seeing red in various parts of Calcutta – in more ways than one! So now you can whiz around Calcutta till you are literally blue in the face! However, some things never change. The ageless Usha Uthup, nèe Iyer (The Trincas girl), was still belting out Jambalaya at the Calcutta Club. The dulcet strains of Rabindra Sangeet from the recorded voices of Suchitra Mitra and Pankaj Mullick, or S.D. Burman’s folksy boat songs, even now waft through the iron barred windows of Bengali homes in north and south Calcutta, the vegetable vendors in Lake Market still speak a smattering of broken Tamil, Mohun Bagan is even now jousting with East Bengal in the local football derby, and the oleaginous pimps on Free School Street continue to whisper salacious invitations conspiratorially into your earhole. Hogg Market, more familiarly referred to as New Market, was almost unrecognizable, but for the brick red façade. What about street names? They keep changing them, but I refuse to address Free School Street as Mirza Ghalib Street, any more than I would acquiesce to calling Lower Circular Road, Acharya Jagadish Chandra Bose Road. Or, just to rub it in, Lansdowne Road as Sarat Bose Road, Dharamtolla as Lenin Sarani and Harrington Street as Ho Chi Minh Sarani. Even the taxi drivers stare glassily at you if you do not employ the old names. And does anyone, other than Calcutta’s celebrated quizzards at the Dalhousie Club, know that glitzy Park Street is now officially Mother Teresa Sarani? For crying out loud!‘ Hey guys, let’s go on a bender and get sloshed at Mother Teresa Sarani.’ That doesn’t even sound politically correct. And when did the cannon at the New Market centre vanish? And why? Where Lighthouse once was is now a déclassé departmental store, and New Empire shows Hindi movies. For the icing on the cake, Dunlop House on Free School Street being renamed Pataka House is an intolerable abomination; the builders vainly attempting to erect afaux façade that is an apology for the venerable tyre major’s frontage. I had worked for many years in Dunlop, and this affront to the city’s heritage architecture was galling. All this and more have been captured on camera for posterity. But then, how do you capture the absence of a cannon? That’s a question for the ages. My friends in Calcutta exhorted me to return to the city of my halcyon days. They were quite persuasive and I was moved by their eloquence. However, reason returned to its throne. It is never a great idea to rewind the clock to ‘way back when’. Visits to my early haunts like Rash Behari Avenue, Lake Road, Keyatala, Southern Avenue, Alipore, Belvedere, Ballygunge Circular Road, Camac Street, Sunny Park and so on, did catch me in an epiphanic trance, but only for fleeting, stream of consciousness, moments. Rather like Irish mystic poet and singer-songwriter Van Morrison, going back to his roots in hometown Belfast, and being memorably ‘conquered in a car seat’ and ‘caught one more time, upon Cyprus Avenue’. The problem, dear reader, is that Calcutta is no longer Calcutta. It is Kolkata. Another place altogether.

162

7

শিবাংশু

এক জন ফেরারি ও পুরিয়াকল্যান

সরস্বতী ছিলো একটি নদীর নাম। তার পর নামটি ঘিরে একজন দেবীকে কল্পনা করা হলো। তারও পরে কোনও একদিন বৌদ্ধ তন্ত্রের দুর্গম দেবতা। শেষে বাঙালির বসন্ত পঞ্চমীতে সন্ত ভালেন্তিনের নারী অবতার। আধুনিকতম ভিজ্যুয়ালটি শুক্লা, শুভ্রা, মহাশ্বেতা, বীণাবাদিকা এক কোমল তরুণী। বটতলার ক্যালেন্ডারে শাদা শাড়ি, শাদা ব্লাউজ, ক্ষীণতটী, গোলাপি পদ্মাসনা। শিবাকাশির ক্যালেন্ডারে সবুজ শাড়ি, মেরুন ব্লাউজ, পূর্ণ দেহিনী, গুরু নিতম্বিনী এক দ্রাবিড় সুন্দরী। কিন্তু শ্যামলা মেয়েদের দেশে য়্যাপারথেইডের প্রতীক হয়ে এই দেবীমূর্তির কল্পনাটি পৌরাণিক যুগ থেকে পাব্লিক বেশ খেলো। শাদা নাকি জ্ঞানের রং, শান্তির প্রতীক, স্বস্তির ধারক। যাদের গায়ের চামড়া শাদা, তাদের নাকি এসব থাকে, যেমন আমাদের গৌরী দেবীটি। এহেন দেবীমূর্তির কল্পনা যাঁরা করেছিলেন, ধরে নিই প্রাক পৌরাণিক যুগের 'আর্য'রা, তাঁরা কিন্তু দেবতাদের পোষাক আশাক বিষয়ে বেশ সাম্যবাদী ছিলেন। পুরুষ বা নারী দেবতার আবরণ কিন্তু অধোবাসেই সীমাবদ্ধ থাকতো। উত্তরীয়ের কল্পনা পরবর্তী কালের নাগরিক রাষ্ট্রের সময় এলেও, দেবতামূর্তির কল্পনায় তার কোনও ভূমিকা ছিলোনা। আর যদি সমান্তরাল ভাবে চলা প্রকৃতিপূজা ও সেই ধারার কল্পিত দেবীদের কথা ভাবি, তবে তো দেখবো, 'বিশ্বে মায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগ্বসন', এই তত্ত্ব দু-তিন হাজার বছর ধরে চলেছে। তাই যখন সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে দেবীর য়্যানাটমির নিবিড় প্রশংসা আবৃত্তি করে ছাত্রছাত্রীরা অঞ্জলি দেয়, তখন জ্ঞানের দেবী ( যদি কেউ থেকে থাকেন, মিনার্ভা?) হয়তো নিভৃতে পুলকিত হন। এ জীবনে এখনও পর্যন্ত যতো সরস্বতীর রূপকল্প দেখেছি, ক্ষীণ, প্রায় অপ্রকাশ্য নীবিবন্ধে প্রতীকী বসন ব্যতিরেকে কোনও আবরণ কখনও দেখিনি। সেদিন থাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর মন্দিরে ( একাদশ শতক) আর মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে (পঞ্চদশ শতক ) সরস্বতীর মূর্তি খুব যত্ন সহকারে দেখলুম। রক্ষণশীল দ্রাবিড় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ তীর্থেও আর্য সভ্যতার নন্দনতত্ত্বকে অবিকল অনুসরন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এই প্রসঙ্গ কেন? প্রসঙ্গটি, আমি ও আমার মতো অসংখ্য ভারতীয়ের কাছে বহুদিন ধরেই অবসন্ন পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনে। আচ্ছা, ব্রাহ্মণ মানে কি 'হিন্দু' জাতির অংশ একটি গোষ্ঠী? হয়তো না, অন্তত যখন 'ব্রাহ্মণ' শব্দ বা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিলো, তখন 'হিন্দু' নামে ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠী তো ছিলোনা। তখন 'সারস্বত' সাধনা যে সব মানুষের জীবনচর্যা ছিলো তারা সবাই ছিলো ব্রাহ্মণ। সেভাবে কি পান্ধারপুরের জন্ম নেওয়া সেই মুসলমান সারস্বত সাধকটিকে 'ব্রাহ্মণ' বলা যায়? জানি, এই প্রশ্নের উত্তরে এদেশে স্বল্প হলেও কয়েকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত এগিয়ে বলবে 'না'। এই সব হাতের মালিক ভান্ডারকরের জাদুঘর ভাঙ্চুর করে, মিরা নায়ারের সিনেমা সেটে আগুন লাগায়, হুসেনের ছবি ছিঁড়ে ফেলে। মেরুদন্ডহীন সরকারের সঙ্গে আমাদের মতো নপুংশক দেশবাসী শুধু খবর কাগজ পড়ি, টিভিতে দেখি আর মকবুল ফিদা হুসেন কাতারের নাগরিক হয়ে যান সাতাশি বছর বয়েসে। ছবির জগতে হুসেনের সঙ্গে তুলনা করা যায় গানের জগতে ভীমসেনের। হুসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জে জে আর্ট স্কুলে, কিন্তু তা নিতান্তই প্রারম্ভিক। আসল শিক্ষা প্রতি বর্গফুটে চার আনা পারিশ্রমিক হিসেবে সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে শুরু হয়। জীবনের এই পর্বেই তিনি বুঝতে পারেন ছবি মানে ভিজ্যুয়াল, ছবি মানে আগের চোখের পরীক্ষায় পাস করা , ছবি মানে আমি যা দেখতে চাই কিন্তু দেখতে পাইনা, ছবি মানে কল্পনার শেষ ঘোড়া যাতে আমি বাজি ধরতে চাই , ছবি মানে এক ধরনের ইল্যুশন যাকে বেদান্ত খুঁজেছিলো। এই সব অধরা মাধুরীকে (লিটারালি!!) ধরতে লাগে অসম্ভব প্যাশন, অন্তর্লীন আকুলতা। এই প্যাশন পুথিপত্রে নেই, স্কুল কলেজে নেই, সভাপর্বে, স্ফটিকস্তম্ভে নেই , আছে শুধু নিজের শিল্পের প্রতি তীব্র আকর্ষণের মধ্যে, জৈব লিবিডোর সীমা বিচূর্ণ করে, সর্বনাশের শেষ দেখতে চাওয়ার মধ্যে। যাকে কোনও মধ্যবিত্ত মননে বাঁধা যায়না, একেবারে তৃণমূলস্তরে প্রকৃতিসঞ্জাত আবেগের ফলশ্রুতি এইসব সিদ্ধি। একালে যা আমরা পেয়েছি হুসেন ও ভীমসেনের দাক্ষিণ্যে। এই সব সৃষ্টির মৌল লক্ষণ হচ্ছে এর সারল্য, ভনিতাবিহীন সৃজনশীল শ্রমের কারুকার্য, যা চোখের কাছে, কানের কাছে, সহস্রার মূলাধারের কাছে আমাদের পার্থিব অস্তিত্বকে আঘাত করে সেই সব অশ্রুত অব্যক্ত সার্থকতার কাছে পৌঁছে দেবে, যখন কোনও মধ্যবিত্ত বুজরুকি না করেও বলতে পারবো, ' রূপসাগরে ডুব দিয়েছি, অরূপরতন আশা করি'। উৎকেন্দ্রিকতার বিচারে হুসেন সালভাদোর দালিকেও মাৎ করে দেবেন। নিজের উৎপাদিত ফসল, শ্রমের মূল্যের নিরিখ তিনি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, যেখানে সব চেয়ে সেয়ানা বেনিয়াও মাথা ঝুঁকিয়ে সেই দাম চুকিয়ে দেবে। তিনি আগে শ্রমিক, পরে শিল্পী। প্রথমে আর্টিজান, পরে আর্টিস্ট। বাংলা ঘরানার মার্জনা, লালিত্য তাঁর জন্য নয়। পি এ জির বাঁধনও তিনি অস্বীকার করেন। মাটিতে ক্যানভাস ফেলে নীচের দিকে তাকিয়ে ছবি আঁকেন। কীভাবে ঐ সব বিশাল পটে স্থানিকতা, বর্ণিকতা, আলোছায়ার ফ্ল্যাট বিভঙ্গকে লম্বা তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে নথিবদ্ধ করেন, বিস্ময়ে মাথা নত করা ছাড়া কিছু করার নেই। তাঁর তুলি যেন ভীনসেনের গমক তান, হলক উৎসার, চাবুকের মতো কানে, ক্যানভাসে আছড়ে পড়ে। মানুষের ছবি আঁকার আদি প্রয়াস রেখাভিত্তিক ড্রইং থেকে শুরু হয়েছিলো, তাই হুসেন মানেন ড্রইংই ছবির মেরুদন্ড। তাঁর সমসাময়িক সব বড়ো শিল্পীরা রেখার ড্রইং আঁকতে দ্বিধাবোধ করতেন। হয়তো ভাবতেন রেখাভিত্তিক তেলরঙের ছবির মধ্যে যথেষ্ট সফিস্টিকেশন আনা যাবেনা। কিন্তু শ্রমজীবী শিল্পী হুসেন মনে করতেন ইতরযানী রেখার ছবিই মানুষের কাছে সব থেকে সহজে পৌঁছোয়। যেমন ভীমসেন চিরদিন অপ্রয়োজনীয় তানকারি থেকে নিজেকে নিরস্ত রেখেছিলেন। প্রচুর নিরেস ছবি এঁকেছেন, ছবি নিয়ে অকারণ বাণিজ্য করেছেন। যা কিছু করেছেন তার মধ্যে সতত অল্পবিস্তর 'শক ভ্যালু' আরোপ করেছেন। মানুষকে চমকে দিয়ে শিশুর মতো উপভোগ করেছেন। যাবতীয় ভারতীয় দর্শন ও পুরাণশাস্ত্রে অগাধ বিদ্যা অর্জন করেছিলেন। বস্তুত তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি সব ভারতীয় পুরাণের মিথস্ক্রিয়ার ফসল। কিন্তু তিনি জন্মসূত্রে মুসলিম। সরস্বতীর 'লজ্জা নিবারণের দায়িত্ব তাঁর জন্মগত কর্তব্য। তিনি কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মতো স্বপ্নে দিগম্বরী দেবীমূর্তি দর্শন করার অধিকারী নন। তাঁর জন্য এরকম কল্পনা করাও পাপ। তিনি তো ব্রাহ্মণ নন, 'হিন্দু'ও নন। এই সব ধৃষ্টতা যদি করে ফেলেন তবে তাঁর বিচার করবে কয়েকজন দুর্বৃত্ত, যাদের 'শিল্প' শব্দটি বানান করার যোগ্যতা নেই। তারা চোখ পাকিয়ে, কোমরে হাত দিয়ে বলবে, আঁকো তো দেখি পয়গম্বরের ছবি, আঁকো দেখি মা ফতিমাকে নির্বসন করে। হেঁ হেঁ বাবা , আমরা অত্যন্ত সহিষ্ণু, অহিংস্র সভ্য জনতা। শুধু ছবিগুলো ছিঁড়েই ছেড়ে দিলাম। নয়তো.... তিনি স্বেচ্ছায় ফেরারি হন। কিন্তু বুকের ভিতর রাত্রিদিন জেগে থাকে ভারতবর্ষ। কখনও অভিযোগ করেননা তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। সতত বলেন তিনি স্বেচ্ছায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে দেশ থেকে দূরে রয়েছেন। চলে যাবার আগের দিন বোম্বাইয়ের কুলফি ফালুদা খেতে চান। মহার্ঘ সাহেবি আইসক্রিম প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের সৃষ্টির পঙ্কিল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কোনও জবাবদিহি করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ তিনি জানতেন এই সব নির্বোধের সংখ্যা তাঁর গুণগ্রাহীদের তুলনায় নগণ্য। হুসেন এবং ভীমসেন চিরকালীন ভারতীয় সাব অল্টার্ন সংস্কৃতিচেতনার এ যুগের পুরোধা। ব্রাহ্মণ্য ছুঁতমার্গের বিরুদ্ধে প্রাংশু প্রতিবাদ। এই লেখাটি লেখার সময় ভীমসেনের পুরিয়া কল্যান শুনছিলাম ক্রমাগত, ' বহুত দিন বিতে, অজহুঁ ন আয়ো... ' ফেরারি আর ফিরবে না। বহুকাল আগে একটা পদ্য লিখেছিলুম। কেউ কেউ হয়তো বা অন্যত্র দেখেছেন এই অকিঞ্চিৎকর রচনাটি। মার্জনা চেয়ে পুনরাবৃত্তি করলাম, হুসেন ও ভীমসেন ------------------------------ হুসেন ও ভীমসেন ছবি আঁকে তেলরঙে গারায় পঞ্চমে সামনে অনেক গ্রাহী, অনেক ফরাসি স্বেদ, ঠোঁটের উজ্জ্বল লাল জরি, জড়িমায় ধৃত চিত্তকোষ ছবি চলে জ্বলন্ত স্ট্রোভ কোটালের স্রোত বেয়ে তারা তো ছবিই চেয়েছিলো শুদ্ধ, কোমল, মৌল রঙের দাপট সুরের লপক তুলি যেই ছন্দে ক্যানভাসে, কানে, কর্ণপটে চোখের অমলভ্রান্তি, জোড় থেকে সমে হুসেন ও ভীমসেন ছবি আঁকে তেলরঙে গারায় , পঞ্চমে....

169

6

Ranjan Roy

জনৈক কাপুরুষের কিস্সা

জনৈক কাপুরুষের কিস্সা ---------------------------- ১) শনিবারের বারবেলা। দেবাংশু এসব মানে না। কিন্তু বৌ-মেয়ে মানে। তাই ঘর থেকে বেরোনোর সময় চেপে গেল। এই দক্ষিণ দিল্লির আস্তানা থেকে কোথাও একচক্কর ঘুরে আসতে গেলে শত বাধানিষেধ। মেয়ে আর বৌয়ের রে-রে করে যুগলবন্দী শুরু হয়ে যাবে। --তুমি একা বেরোবে না। তুমি অন্যমনস্ক থাক। রাস্তা পেরোনোর সময় তোমার মাথায় ভাবের ঘুঘু ডাকতে থাকে। কোন দিন অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।একা একা কোত্থাও ঘুরবে না। এটা তোমার কোলকাতা না। --শনিবার বেরোবে। আমাদের সঙ্গে, ড্রাইভার নিয়ে। অটো বা মেট্রো নয়। হাঁটু নিয়ে সমস্যা হতে কতক্ষণ? বয়েসের হিসেবে চল। বিরক্ত হয়ে ও চুপ করে যায়। -- দেখ বাবা, আমরা তোমার ভালর জন্যেই বলছি। -- বটেই তো! -- সারাজীবন নিজের ইচ্ছেমত চলে আমাদের অনেক জ্বালিয়েছ, এখন মেয়ের অফিসে টেনশন চলছে। তুমি আর নতুন করে কিছু--। --না না; ঠিক আছে। শনিবার রোববার ছাড়া বেরোব না আর তোদের সঙ্গেই বেরোব। ঠিক আছে? -- বাবা , মনখারাপ কর না। তোমার জন্যে অ্যামাজন এ নতুন দুটো বই আনতে দিয়েছি। আর শনিবার একটা মলে যাব। ওখানে তোমার জন্যে এইচ অ্যান্ড এম থেকে তোমার কিছু জামাকাপড় কিনে দেব। এগুলো সব পুরনো আর জ্যালজেলে হয়ে গিয়েছে। আর বিগ চিল বলে একটা রেস্তোরাঁয় দারুণ লাঞ্চ খাইয়ে দেব। খুব এনজয় করবে, দেখে নিও। বেরোতে বেরোতে দেরি হয়ে গেল। দেবাংশু অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়ে মেয়ের ঘরে বইয়ের তাক হাটকাচ্ছিল। হটাৎ চোখে পড়ল বেণীমাধব শীলের হাফ পঞ্জিকা, নতুন এডিশন। --এ আবার কী? তোকে এইবয়সেই এসব রোগে ধরেছে? --বাজে বোকো না তো! ঠাম্মি এইটা খুব মানত। অসুস্থ অবস্থায়ও আমাকে বলেগেছে যে আমি যেন প্রতিবছর এটা কিনে ঘরে রাখি। আর বাড়ি-টাড়ি কেনার সময় যেন দিনক্ষণ দেখে নেই। তাই গাড়িটা কেনার সময় দেখে নিয়েছিলাম। তিনবছর হল একবারও অ্যাকসিডেন্ট হয় নি, গাড়িতে একটা মাইনর স্ক্র্যাচও লাগে নি। আর ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির সময়ও দিন দেখেই গেছলাম। ঠাম্মির সবকথা হালকা ভাবে উড়িয়ে দিও না। তখনই কৌতুহলের বশে আজকের দিনের সময় দেখতে গিয়ে দেখল দ্বিপ্রহর আড়াই ঘটিকা হইতে সাড়ে চার ঘটিকা পর্য্যন্ত বারবেলা। শনিগ্রহের অবস্থান হেতু এই সময় বিদেশ যাত্রা নববস্ত্রপরিধান , মৎস্য, মাংস ,অলাবু, বার্তাকু ও স্ত্রীসম্ভোগ নিষিদ্ধ। খেয়েছে! ও তো কোলকাতার বাসিন্দে। ওর কাছে তো গোটা দিল্লিই বিদেশ। আর মেয়েটা এত মাছ-মাংস খেতে ভালবাসে, এখন এইসব পঞ্জিকা থেকে পড়ে শোনালে ওর আনন্দ মাটি হবে ,। চাই কি, দেবাংশুর ঘর থেকে বেরোনো রদ হয়ে যেতে পারে। একেবারে হাতে হ্যারিকেন কেস। ড্রাইভার নামিয়ে দিয়ে পার্কিং প্লেসে চলে গেছে। দেবাংশুর চোখ আটকে যায় বড় একটি রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে-- লেবানীজ অ্যান্ড অ্যারবিয়ান কুইজিন। -- আঃ বাবা! অমন হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না। পেছনে অটো হর্ন দিচ্ছে। চল, আমার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাটা পেরোও। আচ্ছা, আমি ব্যাগ চেক করিয়ে আসছি। তুমি মেল চেকিং এর দিক দিয়ে ঢুকে যাও। এবার ওরা কোস্টা কফির সুন্দর খাবার জায়গা পেরিয়ে চলমান সিঁড়ির কাছে যায়। এখনও দেবাংশু প্রথম স্টেপ ফেলার আগে একটু ইতস্ততঃ করে। মেয়ে-বৌ দু'ধাপ ওপরে উঠে যাচ্ছে। ওপরে গিয়ে দেবাংশুর মনে হল যেন কোন অচেনা দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে। চারদিকে এত আকর্ষক পণ্যসম্ভার। পোষাক, জুয়েলারি, জুতো, ঘর সাজানোর জিনিস, ইলেক্ট্রনিক্স-- খুব চমৎকার সাজানো। আর খাবার জিনিস কতরকম। -- বাবা, তোমার কি পছন্দ বল? আজ মা'র কথা শুনবো না। উইক এন্ডে আমার কথামত চলবে তোমরা। এখন বিগ চিল এ নম্বর লাগিয়ে আমরা জামাকাপড় কিনতে এইচ এন্ড এম এ ঢুকবো। তারপর খেয়েদেয়ে বাকি মার্কেটিং করে নীচে কফি খেয়ে তবে বাড়ি ফিরবো। কী পছন্দ হল? -- আরে একদম পয়সা উশুল! ওর স্ত্রী মুখ বাঁকায়, মেয়ে হেসে ওঠে। জামাকাপড়ের দোকানে ও হতভম্ব হয়ে যায়। কার সঙ্গে কী ম্যাচিং হবে সেটা নিয়ে এত কথা? ওর নীরস লাগে। মেয়ে যা ওকে ট্রায়াল দিতে বলে সেটাকেই ও হ্যাঁ করে। কিন্তু ট্রায়াল রুমে গিয়ে দেখে ট্রাউজারগুলো বড় ঢলঢলে। একটু কাটিয়ে নিতে হবে। এমন সময় মেয়ের মোবাইল বেজে ওঠে। একটু কথা বলেই ও বলে-- চল, চল। টেবিল খালি হয়ে গেছে। খেয়ে দেয়ে এসে তারপর এই কেনাকাটা গুলো ফাইনাল করব। ওরা বেরিয়ে আবার চলমান সিঁড়ি ধরে আর একটা ফ্লোরে ওঠে। দেবাংশুর একটু হাঁফ ধরেছে। মা মেয়ে এগিয়ে গেছে টেবিল দখল করতে । ও ধীরে সুস্থে হাঁটতে থাকে। ওর চোখ যায় এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনী ও তার সঙ্গীর দিকে। হাঁটুর নীচে অবধি ঢোলা প্যান্ট ও চোখে চশমা পুরুষটির মাথায় টাক। কিন্তু স্বর্ণকেশীকে দেখতে একেবারে মোনিকা বেলুচ্চি। ওর পাশ দিয়ে একটি অল্পবয়েসি মেয়ে মোবাইলে চোখ রেখে আঙ্গুল চালাতে চালাতে হাঁটছে। ও সরে গিয়ে মেয়েটিকে এগিয়ে যেতে দিল। ওর মেয়ে বিগ চিলের দরজায় পৌঁছে গেছে, স্ত্রী ওকে ইশারায় তাড়াতাড়ি করতে বলে মেয়ের পেছন পেছন ঢুকে গেল। ও আবার দেখছে মোনিকা বেলুচ্চিকে। ওরা ব্যালকনির রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে পরে নিজেদের মধ্যে হাত-পা নেড়ে কথা বলছে। দেবাংশু দাঁড়িয়ে পরে। কী ভাষায় বলছে ওরা? ইতালিয়ান ? ও কান পাতে। না, ও ইতালিয়ান জানে না। তবু দেখতে চায় ওরা ইংরেজি না বলে অন্য কিছু বলছে কি না। মনে মনে বাজি ধরে। এরা নিশ্চয়ই ইংরেজ বা আমেরিকান হবে না। ও একটু ওদের দিকে এগিয়ে যায়। এমন সময় ওর পেছন থেকে কেউ ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে। ভয়ানক চমকে উঠে পেছন ফিরতেই দেখে সেই মোবাইলে চোখ রেখে চলা অল্পবয়েসি মেয়েটি। -- ইডিয়েট! হাউ ডেয়ার ইউ? ও যারপরনাই অবাক হয়। --হোয়াট? -- আর য়ু ড্রাংক অর হোয়াট? হাউ কুড য়ু? -- এইসা কিঁউ বোল রহে আপ? ম্যায়নে ক্যা কিয়া? --- শর্ম আনা চাহিয়ে আপ কো! উম্র কো দেখিয়ে। আমি আপনার মেয়ের বয়েসি হব। আপনার একটুও লজ্জা করেনি? কী রকম নোংরা বুড়ো আপনি? দেখতে দেখতে ভিড় জমে যায়। -- ক্যা হুয়া রে রেশমি? হোয়াট হ্যাপেন্ড? -- সী! দিস ওল্ড হ্যাগার্ড! দিস স্টাফড মাংকি অফ অ ম্যান টাচড্ মি! টাচড্ মি ইন অ্যান অফুল ওয়ে! দেবাংশুর হাত পায়ে জোর নেই। ও ব্যালকনির রেলিং ধরে ফেলে। এক লহমায় দেখে যে মোনিকা বেলুচ্চিরা ওর দিকে কৌতুহলের চোখে তাকিয়ে আছে। ও ভাঙা ভাঙা আওয়াজে বলার চেষ্টা করে যে এরকম কিছুই হয় নি। একটি যুবক তেড়ে ওঠে! -- ক্যা রেশমি ঝুঠ বোল রহীঁ হ্যাঁয়? তরিকে সে বাত কর বুডঢে! নহীঁ তো দুঁ ক্যা--? একজন সিকিউরিটির লোক এগিয়ে আসে। মেয়েটির উত্তেজিত কথা শুনে ও শান্ত নির্বিকার মুখে দেবাংশুর কাঁধের কাছটা খিমচে ধরে। এবার মরিয়া দেবাংশু উঁচু গলায় বলে--শুনিয়ে! জরুর কুছ গলতি হুই। ম্যায় তো আপকে আগে আগে জা রহা থা। আপ তো মোবাইল দেখতে দেখতে চল রহী থী। সবাই মেয়েটার বয়ান শুনতে চায়। মেয়েটি জানায় যে ও মোবাইলে ওর বন্ধুকে টেক্স্ট করতে করতে হাঁটছিল। সেই সময়ে হটাৎ ও ওর ডানদিকে বাম এ একটা পিঞ্চিং টের পায়। চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। ওর পাশে এই বুড়োটা ভালমানুষের মত মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। --দেখুন, ও নিজেই বলল যে আমাকে মোবাইলে টেক্স্ট করতে ও খেয়াল করেছে। তার মানে ও অনেকক্ষণ ধরে আমাকে স্টক করছিল। তারপরে কাছে এসে সুযোগ নিয়েছে। ও বোধহয় হ্যাবিচুয়াল স্টকার না ভিড়ের মধ্যে হাত চালানো পাবলিক। দেবাংশু শুধু ছানাবড়া চোখে এর ওর ও মেয়েটির মুখের দিকে পালা করে দেখতে থাকে। এবার ওর কাঁধের উপর সিকিউরিটির চাপ বাড়ে। --চলিয়ে আংকল। নীচে ম্যানেজমেন্টকে অফিস মেঁ। আপ ভী আইয়ে ম্যাডাম। আপকো কম্প্লেইন মেঁ সাইন করনা হোগা। ভীড় থেকে একটা সমর্থনসূচক চাপা উল্লাস বেরিয়ে আসে। --এক মিনিট।ম্যাডাম, আপ জব ইন কো দেখে তব ইয়ে আপ কে কিস তরফ খড়ে থে? টু ইয়োর লেফ্ট অর রাইট? একটা মেয়েলি কিন্তু ভারী আওয়াজ শুনে সবাই ঘুরে তাকায়। -- টু মাই রাইট, ইয়েস। --আর য়ু শিওর? --ইয়েস, আ অ্যাম। নো ডাউট অ্যাবাউট ইট। -- দিদ ওল্ড ম্যান ইজ ক্যারিয়িং ওয়ান আমব্রেলা -- এ ফোল্ডেড ওয়ান ইন হিজ লেফ্ট হ্যান্ড। -- ইয়েস , হি ইজ। --ওয়জ হি হোল্ডিং দ্য সেম আমব্রেলা অ্যাট দ্যাট টাইম? ডু ইউ রিমেম্বার? অর ওয়জ হি সাম আদার পারসন? -- নো নো; দ্য সেম, স্টিল হোল্ডিং দ্য সেম পিংক রিডিকুলাস লেডিস আমব্রেলা। -- প্লীজ ম্যডাম, যদি ও বাঁহাতে ছাতা ধরে ছিল তো কী করে আপনার ডান বামে হাত দিল। -- কেন? ডান হাত দিয়ে! -- ভেবে দেখুন; ও আপনার ডান দিকে ছিল। তাহলে ওর বাঁ হাত আপনার দিকে ছিল। সেখানে আপনার ডান বামে ও কী করে ডান হাত দিয়ে ছোঁবে? একটা চাপা গুজগুজ ফুসফুস আওয়াজ ভিড় থেকে শোনা গেল। এবার প্রশ্নকর্ত্রী মেয়েটি নিজের ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে মেয়েটিকে বলে-- আমি প্রফেশনাল অ্যাডভোকেট। এতে আমার ফোন নম্বর আছে। বলছি-- আপনার কোন মিস্টেক হচ্ছে। যে হাত চালিয়েছে। সে সম্ভবতঃ বাঁ দিক থেকে ডান হাত চালিয়ে কেটে পড়েছে। এইসব লোকগুলো খুব ধূর্ত হয়। এই বুড়ো ভদ্রলোক আমার পড়শি। ইনি একটু ভ্যাবলা গোছের। কিন্তু এসব করতেই পারেন না। আমি এঁকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। আপনি যদি এর বিরুদ্ধে পুলিশে কপ্লেইন করতে চান তবে একবার আমাকে ফোনে কন্ট্যাক্ট করে নেবেন। আগে আমার কথাগুলো ভাল করে ভেবে দেখুন। তারপর মেয়েটি সিকিউরিটির কবল থেকে দেবাংশুকে ছাড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় বলে-- বাবা, আমরা এখন সোজা বাড়ি যাচ্ছি। ২) সারা রাস্তা কেউ কোন কথা বলছিল না। দেবাংশু ড্রাইভারের পাশে উসখুশ করছিল। ড্রাইভার একবার আড়চোখে দেখে বাঁহাত বাড়িয়ে সীটবেল্টটা ঠিক করে লাগিয়ে দিল। তখন ও মুখ খুলল-- মিনু, ভাগ্যিস তুই সাথে ছিলি। আমাদের কোলকাতা হলে এরকম হত না। কী করে যে আমার নামে এমন--। ওর কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই পেছনের সীট থেকে সী-শার্পে মেয়ের গলা-- প্লীজ, এ নিয়ে গাড়িতে আলোচনা না করাই ভাল। দেবাংশু যেন আচমকা একটা থাবড়া খেল। বাড়ি ফিরে ও ঘরে ঢুকে সোফায় বসে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল। মেয়ে একটু পরে ড্রাইভারের থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দরজা লক করল। দেবাংশু একটু অবাক। এখন তো মাত্র বিকেল গড়িয়েছে। আর লাঞ্চ হয় নি। যা ঝক্কি গেল! এখন এই অ্যাপার্টমেন্টের চার দেওয়ালের মধ্যে অনেক নিশ্চিন্ত লাগছে। তাই খিদেটাও অনেকটা চাগিয়ে উঠেছে। --বিগ চিলে খাওয়া তো হল না। ঘরে ওবেলার জন্যে যা আছে তাই এখন খেয়ে নিই? অবেলায় বেশি খাওয়া যাবে না। রাত্তিরে হালকা খেলেই হবে। কী বলিস মিনু? মিনু উত্তর না দিয়ে এই ডুপ্লে অ্যাপার্টমেন্টের দোতলায় নিজের কামরায় যেতে যেতে মায়ের উদ্দেশে বলে-- তোমরা খেয়ে নাও মা; আমি খাব না। ইচ্ছে করছে না। --সে কী রে! শরীর খারাপ লাগছে? ডঃ জ্বর জ্বর করছে নাকি? মেয়ে কোন উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। স্ত্রী চুপচাপ কিচেন থেকে দুটো প্লেট নিয়ে এসে ঢাকা খাবার খুলে বেড়ে দেয়। দেবাংশু টিভি চালু করে রিমোট নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে চ্যানেল পাল্টাতে থাকে। স্ত্রী ঘন্টাদুই পরে এসে বলে -- আজ আর আমার কিছু রাঁধতে ইচ্ছে করছে না। রান্নার মেয়েটি অনেকটা মাশরুম স্যুপ বানিয়ে গেছে। তাই খানিকটা করে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পর। --মিনু যে দুপুর থেকে না খেয়ে রয়েছে? -- সে তোমায় ভাবতে হবে না। বৌয়ের গলার আওয়াজটা কি একটু বেশি চড়া? না কানের ভুল? ঘুম ভেঙে গেছে। তলপেটে প্রস্রাবের তীব্র চাপ। দেবাংশু তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকল। ইদানীং এই হয়েছে এক জ্বালা! সব পরীক্ষা-টরিক্ষা করে ডাক্তার বলেছেন এটা নাকি প্রস্ট্রেট গ্রন্থি বেড়ে যাবার সমস্যা। এই বয়সে অনেকেরই হয়। দেবাংশু ঘাবড়ে গেছল। ও প্রস্ট্রেটের ব্যাপার্রটা জেনেছিল তসলিমার নাসরিনের লেখা পড়ে।উনি তো ডাক্তার।বলেছেন এটা বেড়ে গেলে পুরুষাঙ্গের আপাত দৃঢ়তা ও উৎত্থান নাকি অনেকের মত কিছু বুড়ো মৌলবীদের মনেও দ্বিতীয় যৌবনের ভ্রান্তি এনে দেয়। অনেকে এই অকালযৌবন বেদনায় অস্থির হয়ে নাতনীসমা মেয়েদের বিয়ে করে বসেন। তারপর এই বসন্তের মরীচিকা অল্পদিনেই হটাৎ বিনা নোটিসে পাতা না ঝরিয়েই গায়েব হয়ে যায়। তখন নবপরিণীতাটির দুর্দশার একশেষ। ওর মনে পড়ে যেত স্কুলবয়েসে ওদের নেতাজীনগর পাড়ায় এক পন্ডিতমশাইয়ের ওই ভাবে নকল কোকিলের কুহুডাকে উতলা হয়ে বিড়ম্বনা ডেকে আনার ছ্যাবলা গল্পটি। না;, ও জানে যে ওর অমনটি হবে না। ও মরীচিকার পেছনে ছুটে বেড়ানোয় বিশ্বাস করে না। তাই বিএসসি পাশ করে একটি ব্যাংকের পরীক্ষা দিয়ে ক্যাশিয়ার হয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিল। ইঞ্জিনিয়ারি`ডাক্তারি এসব পড়ার কথা ভাবেই নি। কোন টিউটোরিয়ালে ভর্তি হয় নি। আলাদা করে কোথাও কম্পিউটারও শেখার চেষ্টা করে নি। ইউনিয়নে চাঁদা দিয়েছে। স্ট্রাইকের সময় সবাই যোগ দিলে নিজেও যোগ দিয়েছে, কিন্তু মিছিলে না হেঁটে বাড়ি চলে গেছে। কোনদিন বদলি হওয়া নিয়ে কোথাও আবেদন নিবেদন করেনি। বিয়ে হলে বৌকে একবার পুরী নিয়ে গেছল। ব্যাংকের হলিডে হোম এ ছিল, ব্যস্। ভালভাবেই জীবন কেটেছে, মেয়ে হওয়ার বছরে প্রমোশন পেয়ে হেড ক্যাশিয়ার হয়েছিল। পয়মন্ত মেয়ে। তবে মায়ের ধাত পেয়েছে। জেদী, অ্যামবিশাস। মেয়েটার পাঁচবছর ন্যাশনাল ল' ইউনিভার্সিটিতে পড়ার খরচা শুনে ও আঁতকে উঠে বলেছিল --কী করে হবে? মেয়ে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল,-- ড্যাড্, এত ভয় পাও কেন? এডুকেশন লোন নেবে? -- লোন সাত লাখ? আমায় কে দেবে? বৌ ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল,-- তোমার ব্যাংক দেবে! সবাইকে দিচ্ছে তোমায় দেবে না? কী লোক তুমি? ---- কে শোধ দেবে? --- আমি শোধ দেব বাবা। কোন চিন্তা কর না। পাশ করার একবছরের মধ্যে একটা ঝিনচ্যাক চাকরি জোগাড় করব, কোন বড় ল' ফার্মে। দিল্লি-মুম্বাই বা লুরুতে। ---কেন কোলকাতা কী দোষ করল? এখানে বাড়িভাড়া যাতায়াত কত শস্তা। -- উঃ বাবা! কোলকাতায় সব শস্তা কারণ এখানে খুব কম লোকের হাতে পয়সা আছে। এখানে মাইনেও কম, কাজও কম। বৌ খুব রেগে গেছল। রাগলে ওকে বেশ সুন্দর লাগে দেবাংশুর। তাই ও বৌকে শান্ত করার খুব একটা চেষ্টা করে না। --শোন, কোলকাতা হল রিটায়ার্ড লোকেদের জন্যে আদর্শ শহর। কারও কোন তাড়া নেই। সব ব্যাটাছেলে দুপুরে মাছভাত খেয়ে দোকান বন্ধ করে ঘুমোয়। তুমি তখন কোলকাতায় থেকো। মেয়ে আমার আজকালকার , ওকে দিল্লি-পুণে- মুম্বাই যেতে দিও। পাছু ডেক না। ওর জীবন, ও ঠিক করবে। দেবাংশু পেছনে হটে । ও ঠিকই জানে আসলে কে ঠিক করবে। ঘরে ফিরে আলো নেভাতে যাবার আগে ও জলের বোতল আনতে খাবার ঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। অবাক কান্ড! ওপরে মেয়ের ঘরে কথা বলার আওয়াজ। প্রায় ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর আভাস। ভাবল, বোধহয় কোন বন্ধু বা কলিগের সঙ্গে ফোনালাপ চলছে। এদের কখন যে দিন হয় আর কখন রাত, তা ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু অন্য স্বরটি যে ওর স্ত্রীর। আজকে তো মিতালি ঘুমোতেই আসেনি। এত রাত অব্দি ওরা জেগে? মেয়েটা খেয়েছে তো? বোধহয় ওকে ওর মা ওর বিছানাতেই খাইয়ে দিচ্ছে। এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। কিন্তু ঘরে ফিরে আসতে গিয়ে ওর পা মাটিতে সেঁটে যাচ্ছে যে! মা-মেয়ের চাপাগলায় উত্তেজিত কথা বার্তা শান্ত রাতে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। -তুই বিশ্বাস করিস না যে মেয়েটি মিথ্যে কথা বলছে? তোর বাবা অমন লোক নয়। এতদিন ধরে তো দেখছি। -- মা, ও বাবাকে চেনে না। ওর বাবার সঙ্গে কোন ইস্যু নেই, কেন মিথ্যে কথা বলবে? ওর কী লাভ? -- হয়ত অন্য কারও লাভ। কেউ হয়ত ওকে লাগিয়েছে, হয়ত পয়সা দিয়েছে। মেয়েটাকে দেখেছিস্? কেমন বেহায়ার মত একটা ছেঁড়া জিনের হাফ বা কোয়ার্টার প্যান্ট পরে হাজারো লোকজনের সামনে মলে ঘুরে বেড়াচ্ছে! -- মা, তুমি থামবে? কী সব বলছ? এক, এই দিল্লিতে বাবাকে কেউ চেনে না। বাবা একজন সাধারণ লোক। ভীড়ের মধ্যে একজন।পেছনে লাগতে কার বয়ে গেছে? আর ওটা ছেঁড়া খাটো প্যান্ট নয়, ওটাকে বলে-- --তুই আর ওসব ফ্যাশনের ব্যাপার শেখাতে আসিস না। প্যান্ট ইচ্ছে করে ছিঁড়ে ফ্যাশন হচ্ছে! --- আমাকে বলতে দাও। দুই, মেয়েটা মিথ্যে কথা বলেনি। -- সেকি? তুই যে তখন বললি? -- মা , ও ভুল বলেছে। মিস্টেক। তিন, মিথ্যে আর ভুলের মধ্যে তফাৎ আছে। একটা হল জেনে শুনে অসত্য স্টেটমেন্ট দেওয়া--অ্যাক্ট অফ ইনটেনশন অ্যান্ড ভলিশন। এখানে মেয়েটা যা বলেছে সেটা ও সত্যি বলে বিশ্বাস করে, তাই বলেছে। ---- তাঁর মানে তুই মনে করিস ওর অভিযোগটা ফ্যাক্ট। -- ওইটুকু , অর্থা`ৎ কেউ ওর বাটকে পিঞ্চ করেছে। কোন ভিড়ের মধ্যে হাত চালানো পাবলিক। মিতালির গলা উত্তেজনায় চড়ে যায়। --- আর তুই এটাও বিশ্বাস করিস যে ঐ ভিড়ের -মধ্যে -হাত-- চালানো পাবলিকটি তোর বাবা? --- মা, আমি বিশ্বাস করতে চাই যে ওই পারভার্ট লোকটি আমার বাবা নয়, অন্য কেউ। -- বিশ্বাস করতে চাই? এটা আবার কী বললি? এক মিনিট কেউ কিছু বলে না। তারপর মিনু বলে-- মা, টেকনিক্যালি দেখলে সেখানে ওই মেয়েটির কাছে আর কাউকে দেখা যায় নি তো! ---- তবে তুই যে তখন বললি? ওইসব কোন হাতে ছাতা না কি যেন ছাতার মাথা যুক্তি? সেগুলো সত্যি নয়! --- আমি তা বলছি না। আসল সত্যিটা কী সেতো আমরা কেউ জানিনা। আর দেখ, বাটক পিঞ্চিং এমন ব্যাপার যে তখনি মেয়েটি চমকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর বাবা ছাড়া কাউকে দেখতে পায় নি। সারকামস্ট্যান্শিয়াল এভিডেন্স দেখলে-- আদালত কিন্তু মেয়েটির অভিযোগকেই সত্যি বলে মেনে নেবে। আমি যা বলেছি সেটা কোর্টরুম প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞ্তা থেকে। দরকার হলে কোর্টেও তাই বলব। -- বলছিস কী মিনু? এটা কোর্টে উঠতে পারে? --কেন নয়? ওই মেয়েটি আমি হলে আমিই কোর্টে যেতাম, বুড়ো মানুষ বলে রেয়াৎ করতাম না। আগেকার দিন গেছে। মিতালির গলার স্বর বদলে যায়। --তুই মেয়ে হয়ে বাবাকে কাঠগড়ায় তুলবি? এই তোর বুদ্ধি? এই তোর শিক্ষা? তাই মেয়েটাকে কার্ড দিয়ে এলি? ওর হয়ে বাবার বিরুদ্ধে তুই--! --- আঃ মা! এবার থাম। ভয়ের চোটে মাথাটা গেছে। আমি তো ওকে ধমকে এলাম। চাইবে এ নিয়েআর কোথাও যেন কোন কথা না ওঠে। আমার একটা সম্মান একটা পরিচিতি আছে না? বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। --তোর ক্ষতি ? আর তোর বাবার? --ছাড় তো! তুমি আমার মুখে কথা বসাচ্ছ। --- শোন, একটা আইডিয়া এসেছে। ওখানে সিসিটিভি আছে। ওর ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে তোর বাবা নির্দোষ। এও দেখা যাবে কে দোষী বা আদৌ কিছু হয়েছিল কি না। হতে পারে সবটা মেয়েটার কল্পনা, তুই তো বড় ফার্মের অ্যাডভোকেট। চেনাজানা আছে। একটু চেষ্টা করে দেখ না , যদি সেই সময়ের প্রিন্ট পাওয়া যায়! --মা, এটা আমাকে হ্যান্ডল করতে দাও। প্রিণ্টে কী দেখা যাবে আমরা কেউই জানি না। তাই এসব দোধারি তলওয়ার নিয়ে নাড়াচাড়া না করাই ভাল। দেবাংশুর হাত থেকে জলের বোতল শব্দ করে পড়ে যায়। --- কে? কে ওখানে? মিতালি সিঁড়ির বাঁকে এসে দাঁড়ায়, তারপর চমকে ওঠে। --তুমি? কেন উঠে এসেছ? রাত একটা বাজে। যাও জল খেয়ে শুয়ে পড়। মিনুর ঘরের বাতি নিভে যায়। ৩) কয়েক দিন গড়িয়ে গেছে। দেবাংশু অনেকটা নিশ্চিন্ত। রোজ তন্ন তন্ন করে স্থানীয় পত্রিকার পাতা উল্টেছে। কোথাও কোন মলে কোন মেয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের খবর নেই। কিন্তু মেয়ের ব্যবহারে কোন পরিবর্তন নেই। কেন নেই? একটা ঘটনা ঘটেছিল, বড় জোর দুর্ঘটনা। তাতে ওর কোন হাত নেই। তবু মেয়ের রাগ পড়েনি। এটা কি বাড়াবাড়ি না? মায়ের আশকারায় মেয়েটা মাথায় চড়েছে। তক্ষুণি ওর মনে পড়ল । আরে সেদিন মলে এইচ অ্যান্ড এম এ'র শপে ওর গোটা তিনেক প্যান্ট পছন্দ করে ফিটিং এর জন্যে ছেড়ে আসা হয়েছিল। কথা ছিল বিগ চিল এ লাঞ্চ করে তুলে নেবে। তারপর যা ঘটেছিল! ওরা তো সোজা বাড়ি ফিরে এল। প্যান্টগুলো? নতুন আর বেশ পছন্দের । শিনো না কি যেন ! অন্য রকম কাটিং, অন্য রকম কাপড়ের টেক্সচার। কিন্তু সেগুলোর কী হল? আজ মেয়ে অফিসে যাওয়ার সময় ও জিগ্যেস করেই ফেললঃ হ্যাঁরে মিনু! সেদিনের প্যান্টগুলো ? নিতে যাবি না? মেয়ে জবাব না দিয়ে ল্যাপটপের ব্যাগ তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। এবার সত্যি অপমান লাগছে। কেন মরতে বলতে গেল? ও নেবে না ওইসব কেতাদুরস্ত পোষাক। কোলকাতায় ফিরে গিয়ে পাড়ার দর্জিকে দিয়ে বানিয়ে নেবে মাপমত। কিনে নেবে কাটপিস, যেমন এতদিন করেছে। ও বেরিয়ে যেতেই মিতালী চায়ের কাপ এনে সোফায় বসল। খবরের কাগজ খুলে মুখের সামনে মেলে ধরে বিড়বিড় করে বলল-- ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। মেয়ে ফোন করে ওগুলো ক্যানসেল করে দিয়েছে। যাচ্চলে! যতই রাগ হোক, বেশ পছন্দ হয়েছিল তো! তারপর ভাবল আপদ গেছে। ওই মলে আর কোনদিন পা রাখবে না। আর দিল্লির মেয়েগুলো যেন কি! সত্যি সেদিন কী হয়েছিল? দেবাংশু নিজের মনে ঘটনাটি রি-ওয়াইন্ড করে স্লো -মোশনে চালিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। প্যান্ট পছন্দ করে ট্রায়াল দিয়ে লেংথ দেড় ইঞ্চি কম করতে দিয়েছে কি খাবার জায়গা থেকে টেবিল খালি হওয়ার খবর এল। ওরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে চলমান সিঁড়ি ধরে একটা তলা উঠল। দেবাংশু পিছিয়ে পড়েছিল। বৌ-মেয়ে প্রায় রেস্তোরাঁর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু ও হাঁ করে এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনি ও তার সঙ্গীকে দেখছিল। অনেকটা মোনিকা বেলুচ্চির মত দেখতে। কিন্তু মেয়েটা তখন কোথায় ছিল? ওর খেয়াল নেই। শুধু এইটুকু মনে পড়ছে যে একটু আগে মোবাইল চোখ এবং কানে হেডফোন মেয়েটিকে ও সাইড ছেড়ে এগুতে দিয়েছিল। তাহলে কি মেয়েটি এগিয়ে যায় নি? কথা বলতে বা টেক্স্ট করতে করতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল? তা নাহলে ওর সঙ্গে বডি-কনট্যাক্ট হল কী করে? বডি-কনট্যাক্ট? কন্যাসম মেয়েটির সঙ্গে? কী বিচ্ছিরি শব্দ? ওর মনে এল কেন? না, আসতেই পারে। এটাই তো অভিযোগ। বাটক পিঞ্চিং! একরকমের বডি কনট্যাক্ট তো বটেই, তবে স্বেচ্ছাকৃত। উঁহু; সেসব কিছু হয় নি। কোন ধাক্কা বা বডি কনট্যাক্টই হয় নি। হলে ওর মনে পড়ত। আর চিমটি কাটা? জীবনে কোন মেয়েকে করেনি, নিজের বৌকেও না; আর আজ! মনে পড়ে গেল; ও করে নি। কিন্তু বৌয়ের খেমচানো চিমটি কাটা এসব অভ্যেস ছিল। বিয়ের প্রথম দিকে, মানে মিতালি সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়েছে তখন। কোন কিছু জোর দিয়ে বলতে গেলেই ও দেবাংশুকে চিমটি কাটত। জবলপুরে বড় হওয়া প্রবাসী বাঙালী মেয়ে, হিন্দি শব্দটাই বলত, চিকোটি কাটনা। শব্দ করে হেসে ফেলল দেবাংশু। হাসির শব্দে সামনে থেকে কাগজ সরিয়ে বিরক্ত মুখে তাকাল মিতালি-- এত হাসির কী হল? -- না, মানে এমনিই। --এমনিই? সব কিছু তোমার এমনিই হয়ে যায়? -- কী বলতে চাইছ? -- ঠিকই বুঝেছ কী বলছি। মলে কয়েকশ' লোক। তার মধ্যে মেয়েটি বেছে বেছে এমনিই তোমার নামে কম্প্লেন করল? -- আমি কি করে জানব কেন করল? -- এমনিই। তোমাকে টাইটেলও দিয়ে দিল-- "ভীড়ের মধ্যে-হাত-চালানো-পাবলিক"! এমনিই। --- উঃ! সব কিছুরই একটা সীমা আছে। ওটা একটা দুর্ঘটনা। রাস্তায় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগার মত। অন্যের দোষেও হয়। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না যে কেন এমন হল। সেদিন মেয়ে নিজেই ওকে বলেছিল যে ওর ভুল হচ্ছে।আসল অপরাধী ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছে। মানছি; ও তখন স্ট্যান্ড না নিলে আমাকে হয়ত থানায় যেতে হত। তারপরও তোমরা মা মেয়ে আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছ যেন--! আর আমিও একটা মানুষ। সব কিছুরই একটা সীমা আছে। প্লীজ, ওই টাইটেল-ফাইটেল আর বলবে না। ভাল লাগছে না। --আমাদের ভাল লাগছে? ওই মুখরোচক টাইটেলটি যে এখন অনেকের ছ্যাবলা কমেন্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। --- মানে? -- শোন। সেদিনের ঘটনাটা সেদিন কেউ মোবাইলে তুলে নিয়েছিল। তারপর ফেসবুকে আপলোড করে দেয়। দেবাংশুর হাত থেকে খানিকটা চা চলকে টেবিলে পড়ে । মিতালি বলতে থাকে। ---- ওই ক্লিপটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। প্রথমে যে পোস্ট করেছিল তাতে বলেছিল কেমন করে আজকের প্রজন্মের একটি মেয়ে এক বুড়ো ভদ্রলোককে গ্রেফতার হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।আ ব্রেভ গার্ল , আ মডার্ন পোর্শিয়া! একগাদা লাইক পড়ে। অনেকেই বলে আজকালকার বুড়ো শকুন উকিলেরা যখন গরীব ক্লায়েন্টের পচামাংসে ঠোকরায় তখন এই ব্যতিক্রমী অ্যাডভোকেট মেয়েটি আমাদের ভরসা । কিন্তু এর পরে অনেকের সুর বদলায়। কথা ওঠে --ওই কানে হেডফোন মেয়েটি তিলকে তাল করছে। একটু ছোঁয়া লাগলেই কম্প্লেইন? অমন ছুঁতমার্গ তো ঘরে বসে থাকলেই পারে। কেউ বললে অনেক মেয়ে আজকাল বড্ড অ্যাটেনশন সিকিং, আর আইনগুলো একতরফা, মেয়ে ঘেঁষা। ব্যস্, জেন্ডার-ইস্যু শুরু হয়ে গেল। মোবাইল আর হেডফোনের অতি-ব্যবহারের ফলে কত অ্যাকসিডেন্ট হয় তার ডেটা আর লিংক এসে গেল। কিছু মেয়ে বলল-- ভদ্রলোক কে আদৌ ধোয়া তুলসীপাতা মনে হচ্ছে না। কারও মোবাইলে ধরা পড়েছে এমন ছবি যাতে মনে হয় বুড়োটা স্টকার। একাগ্র হয়ে এক বিদেশিনি জোড়াকে হ্যাংলার মত দেখছে। কেউ কেউ বলল--মেয়েটির উচিত মহিলা থানায় কম্প্লেইন করা। তাহলে পুলিশি তদন্তে সত্যিটা ঠিক বেরিয়ে পরবে। পাল্টা এল-- সেই জন্যেই তো করছে না, করলে শেষে মিথ্যে অভিযোগের জন্যে ভদ্রলোকের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দিতে হবে, তাই। দেবাংশু উত্তেজিত। -- একদম ঠিক।করুক, কম্প্লেইন। আমি তৈরি। ও না করলে আমিই করব। তুমি মেয়ের সঙ্গে কথা বল। ডিফেমেশন ফাইল করে মোটা টাকার কমপেন্সেশন চাইব। আজকে রাত্তিরে ফিরে আসুক, আজকেই কথা বল। আমি রাজি। কোথায় যেতে হবে? তিসহাজারি কোর্টে? ---ছটফট কর না তো! মেয়ে রাজি নয়। হয়েছে কি, ওর অফিসে কেউ কেউ ক্লিপিং এর মধ্যে তোমাকে চিনে ফেলেছে। ওর বন্ধুরা! বলেছে-- আরে, ইয়ে তো আংকল জ্যায়সা দিখ রহা হ্যায়। ওরা প্রশ্ন তুলেছে যে তাহলে মিনু কেন বলছে ভদ্রলোক আমার চেনা, প্রতিবেশী? কেন পিতৃপরিচয় গোপন করল? তবে কি ও অভিযোগটি নিয়ে নিঃসন্দেহ নয়? কাজের জায়গায় দলাদলি, জেলাসি থাকেই। কেউ কেউ ওই "'ভীড়ের মধ্য হাতচালানো পাবলিক" টাইটেল নিয়ে ন্যাকা সেজে নানান অছিলায় ওর কানের পাশে কথা ছুঁড়ে দিচ্ছে। ওর এখানে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, মাথার ঠিক নেই। তুমি এটা যে কী করলে? --- আমি করলাম? এ'কথা তুমি বলতে পারলে? এত বছর একসঙ্গে থেকে আমাকে এই চিনেছ? পঁয়তিরিশ বছর! কোনদিন এতটুকু বাজে কথা উঠেছে? সুযোগ দিয়েছি? এমনকি তোমার দুইবোনকে নিয়েও কখনও কোন শালী-জামাইবাবু গোছের ইয়ার্কি করিনি। সুবোধদার বৌ আমার সমবয়সী; একই ব্যাচে এইচ এস পাশ করেছি। এত ঘনিষ্ঠতা, দু-বাড়িতেই। তবু বৌদি বলেই ডেকেছি। আর সম্পর্কের সম্মান বজায় রেখেই মেলামেশা করেছি। সব তুমি দেখেছ, তবু বলছ-- হাত চালানো পাবলিক? একদমে এতগুলি কথা বলে দেবাংশু হাঁফাতে থাকে। মিতালি তীক্ষ্ণ চোখে ওকে দেখতে থাকে। ফুলে উঠছে নাকের পাটা, চোখের তারা বড় বড়, চোখের কোণায় লালচে ভাব। ও উঠে যায়, ভেতর থেকে একটা প্রেশারের ট্যাব্লেট ও একগ্লাস জল এনে দিয়ে বলে-- মাথাগরম করে লাভ নেই।আমি যা সবাই বলছে তাই বলেছি, নতুন কিছু বলিনি। তারপর ভেতরে চলে যায়। দেবাংশু বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বেরিয়ে এসে অন্যমনস্ক ভাবে আগের দিনের গেঞ্জি ও পাজামা পরে ফেলে। খেতে বসে চুপচাপ খায় আর ভাবে --এর শেষ কোথায়? মিতালির চোখে ধরা পরে গেছে ওর বাসিকাপড়। একসেট ধোয়া কাপড় বিছানায় রেখে দিয়ে প্রায় আদেশের সুরে বলে-- খেয়ে উঠে কাপড় বদলে নিও। আর ছাড়া কাপড়গুলো বাস্কেটে ফেলে দিও। দেবাংশু জানে যে আজ ও কী করবে। খাবার পর ও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে । তারপর জামাকাপড় না বদলে একটি পূজোসংখ্যা হাতে নিয়ে বিছানায় লম্বা হয়। পাতা উল্টে যায়, কিন্তু কোন লেখাই মনে ধরে না। এভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়ে সেটা ও নিজেও জানে না। ৪) আজ মাসের প্রথম রোববার। দুপুরের খাবার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে মা-মেয়ে মাসের বাজার করতে রিল্যান্সের একটি দোকানে যাবে। ফিরতে বেশ দেরি হবে। এই কয়েক ঘন্টা দেবাংশু বাড়িতে একাই থাকবে। তাতে কোন অসুবিধে নেই। পূজো সংখ্যা আছে গোটা তিন। এছাড়া রিও অলিম্পিকের কিছু খেলা। সময় টের পাওয়া যাবে না। আর বিকেলে রান্নার মেয়েটি এসে রাত্তিরের রুটি-তরকারি করার আগে আংকলকে চা করে দেবে, নিজেও খেয়ে নেবে। কিন্তু বেরোনোর সময় মিতালি বলল-- দুকাপ চা করে ফ্লাস্কে রেখে গেলাম। সময়মত খেয়ে নিও। দরকার হলে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিও। -- খামোকা কষ্ট করলে কেন? বিকেলে সন্ধ্যা আসবে তো, ওই বানিয়ে দিত। --না, ও আজ আর ওবেলায় আসবে না। মিনু বলে দিয়েছে আজ বিকেলে না আসতে। আমরা বেরোচ্ছি তো! -- তোমরা বেরোচ্ছ, আমি তো থাকছি। কথাটা এবার দেবাংশুর কানেই কেমন বেখাপ্পা লাগল। মিতালি কিছু না বলে বাজারের লিস্ট আর পার্স তুলে নিল। সন্ধ্যের মুখে মিতালির ফোন এল যে ওরা আসছে , আর পনের মিনিটের দূরত্বে আছে। জোরে বেল বেজে উঠল। কে এল আবার? কাজের মেয়ে তো এত জোরে কখনও বাজায় না। আর মিতালি কখনো এমন করে না। দরজা খুলে দেখল অনামিকা। মিনুর কলিগ ও বন্ধু। ও একগাল হেসে বলল--গুড ইভনিং, অন্দর আও বেটি। কিন্তু বরাবরের হাসিখুশি মেয়েটির আজ কী হল? অন্যান্য দিনের মত হেসে 'নমস্তে আংকল' না বলে সোজা জিগ্যেস করল মিনু ঘরে আছে কি না! ফেরেনি? এক্ষুণি আসবে? ঠিক আছে , আমি ফোন করে একটু পরে আসছি। এত কিসের তাড়াহুড়ো? আজ আবার অফিসে নতুন কিছু হল নাকি? খানিকক্ষণ পরে দরজা ঠেলে ঢুকল মিনু, অনামিকা । ওরা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা মিনুর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। একটু পরে হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে এল মিতালি, পেছনে বাজারের তিনটে ভারি ব্যাগ নিয়ে ড্রাইভার ছেলেটি। মিতালি সব দরজা জানলার কবাট টানা আছে কি না দেখে নিয়ে এসি অন করল। -- বড্ড হিউমিড ক্লাইমেট। গরম কমেছে, কিন্তু উমস্ বেড়ে গেছে। দেবাংশু এক গ্লাস জল এনে দেয়। মিতালি বাজারের জিনিসপত্র নামিয়ে লিস্টির সঙ্গে মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। --- চা খাবে? ফ্লাস্কে কিছুটা আছে, গরম করে দিই? --ব্যস্ত হয়ো না। সে আমি করে নেব। একটু জিরিয়ে নিই আগে। একটু সময় কেউ কোন কথা বলে না। শেষে দেবাংশু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে-- কী হয়েছে বল দেখি? অনামিকা ঘরে না ঢুকে চলে গেল। তারপর মিনুর সঙ্গে এসে হুড়মুড়িয়ে সোজা ওপরে। আগে কখনও হয় নি। সিরিয়াস কিছু? তুমি টের পেলে? মিতালি খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর রিলায়েন্সের দোকান থেকে আনা একটা সুগন্ধি মুখশুদ্ধির শিশি খুলে গোটা কয়েক দানা মুখে পোরে। --- ও দিল্লি ছাড়ছে। --কে? --আমাদের মেয়ে, মিনু। --অ্যাঁ? কী ব্যাপার? --আর ব্যাপার! সেই ভাইরাল মোবাইল ক্লিপিং! এ নিয়ে অফিসে একজন সিনিয়রের সঙ্গে মিনুর জোর একরাউন্ড হয়ে গেছে। শেষে ও রাগের মাথায় রেজিগনেশন লিখে দেয়। ল' ফার্মের পার্টনার ওকে অনেক বোঝান, কিন্তু ও গোঁ ধরে থাকে। ওকে তো জান। শেষে একটা রফা হয়েছে। আপাততঃ ওকে ওদের পুণে অফিসে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। দু'বছরের জন্যে। ফার্ম চাইছে ওকে ধরে রাখতে। আশা করছে দিল্লি থেকে কিছুদিন সরে থাকলে ওর মন পাল্টাবে। অনামিকা মেয়েটি সেই জন্যেই এসেছে। -- কী জন্যে? -- মিনুকে দশদিনের মধ্যে পুণে অফিস জয়েন করতে হবে। ততদিন ছুটিতে থাকতে পারে। সেই সব দরকারি চিঠিপত্র, প্লেনের টিকিট--ও নিয়ে এসেছে। -- আমরাও পুণে যাচ্ছি? --- না, আমরা পরশু সকালের ফ্লাইটে কোলকাতা যাচ্ছি। --ঠিক কথা; আগে ও পুণেতে গিয়ে থিতু হয়ে বসুক, তারপর আমরা যাব। দিল্লি পচে গেছে। এখানে আর কিছু দেখার নেই। পুণে গেলে লোনাবালা, খান্ডালা, পঞ্চগনি, মহাবালেশ্বর --সব ঘুরে দেখব। -- না। মেয়ে বলে দিয়েছে একবছর যেন আমরা পুণে না যাই। ওর একটু সময় চাই-- এতবড় ধাক্কাটা সামলে উঠতে হবে তো, অন্ততঃ একটা বছর। -- অনামিকা কি আমাদের টিকিটও নিয়ে এসেছে? --হ্যাঁ; অফিস থেকেই করে দিয়েছে। -- তাহলে আমি যখন দরজা খুললাম কিছু বল না তো? --বলবে না। ওই ক্লিপিংটা ও দেখেছে যে! দেবাংশুর মাথা ঘুরে ওঠে। গোটা ঘর দুলতে থাকে। ও সোফা থেকে উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ে। --আরে কী হল? --কিছু না; মাথাটা একটু ঘুরছিল। এখন ঠিক হয়ে গেছে। না, কোন ওষুধের দরকার নেই বৌ হ্যান্ডব্যাগ থেকে ওকে একটা ক্যপসুল বের করে দেয়। ও হাত নেড়ে বারণ করে। ওর ভেতরে একটা চন্ডাল রাগ গরম কালের আঁধির মত পাক খেয়ে উঠছে। -- কী হল? -- মেয়েকে বল টিকিটি ক্যানসেল করতে। আমি ওদের অফিসের টিকিটে যাব না। নিজের পয়সায় রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকিট কাটব, নয়াদিল্লি-শেয়ালদা। --- এ আবার কি? --শোন, আমি কবে যাব, কোথায় যাব, কীভাবে যাব--এটা অন্য কেউ ডিক্টেট করতে পারে না। --- আচ্ছা পাগল! কে ডিক্টেট করছে? ওকে এখান থেকে সব গুছিয়ে গাছিয়ে পুণে যেতে হবে, বাড়ি খুঁজতে হবে। তার সাত-সতের নানান ফ্যাকড়া। আমাদের আগে কোলকাতায় শিফ্ট না করে ও এসব কাজ--! -- একটা কথা জিগ্যেস করি? তুমিও কি আমাকে দোষী ভাব? বা একটু-আধটু সন্দেহ? মিতালি চুপ করে থাকে। দেবাংশু এগিয়ে গিয়ে ওর দু'কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকে। -- স্পষ্ট করে বল? হ্যাঁ কি না? আমায় অবিশ্বাস কর--হ্যাঁ কি না! -- হ্যাঁ, তোমায় বিশ্বাস করি। জানি তুমি নির্দোষ। -- তাহলে কোলকাতা যাবার আগে একটা কাজ করতে হবে। কাল তুমি আমার সঙ্গে চল। --কোথায়? --ওই মলে। তুমি আর আমি। কাউকে বলার দরকার নেই। কারও অনুমতি চাই না। গিয়ে সেই এইচ অ্যান্ড এম শপে যাব। পছন্দের তিনটে প্যান্ট কিনব। আমার ডেবিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করব। সেদিনের সেই সিকিউরিটির লোক বা ম্যানেজমেন্টের লোক যদি কিছু বলে তো ডিমান্ড করব সিসিটিভি'র প্রিন্ট আউট বের করে দেখে তবে কথা বলুক। অনেক সহ্য করেছি, আর চুপ করে থাকব না। কী হল? চুপ করে আছ যে? -- শুনছি। একটু চা গরম করে নিয়ে আসি। যা আছে দুজনে ভাগ করে নেব। চা খেতে খেতে মিনিট পাঁচ ওরা চুপ করে থাকে। দেবাংশু ব্যগ্র হয়ে বৌয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। একজন ওকে বিশ্বাস করে। একজন অন্ততঃ ওর সঙ্গে আছে। -- এবার বল? কাল যাবে আমার সঙ্গে? প্যান্ট কিনতে? -- বলছি; তোমার হয়ত ভাল লাগবে না। বললাম না যে তোমাকে বিশ্বাস করি। কারণ আমি জানি অমন কাজ তুমি করতে পার না। (দেবাংশুর মুখে হাজার ওয়াটের হ্যলোজেন।) কেন? তুমি হচ্ছ ভীতুর ডিম। আসলে ওইরকম অসভ্যতা করতেও একধরণের সাহস লাগে। ধরা পড়ার, মার খাওয়ার, অপদস্থ হওয়ার। ওইরকম জোখিম নেওয়ার লোক তুমি নও। তুমি সারাজীবন সেফ সাইডে খেলেছ। ( দেবাংশুর ফিউজ উড়ে গেছে!) কাজেই আর হিরো হতে যেও না। ইউ আর নট কাট ফর দ্যাট। তুমি নিজে কখনও কোন ডিসিশন নাও নি। ভর্তি হতে চাইতে গভর্মেন্ট আর্ট কলেজে, বাবার ধ্যাতানি খেয়ে গেলে পাড়ার কলেজে বিএসসি পড়তে। পাশের বাড়ির মন্দিরা চেয়েছিল তুমি যেন ওর বাবাকে গিয়ে বল। তুমি পারলে না। বিয়ের পর শ্বাশুড়ির অন্যায় সব হুকুম ও নজরদারি দেখেও দেখ নি। বললে এড়িয়ে গেছ, বলেছ নিজেরা মিটিয়ে নাও। এখন শেষ বয়সে আর নতুন করে নিজেকে বদলাতে পারবে না। তাই মেয়ের কথা মেনে কোলকাতা ফিরে চল। সেখানে আমরা নিজেদের চেনা সার্কেলে নিরাপদে থাকব। (৫) পরদিন সকালে চা খাবার পর দেবাংশু বাথরুমে যায়। দুদিন দাড়ি কামানো হয়নি। কাঁচাপাকা খোঁচাখোঁচা দাড়ি এখন কামিয়ে না ফেললে চেহারাটা অসুস্থ অসুস্থ দেখাবে। গালে সাবান লাগিয়ে রেজার হাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মিতালি ডাকল একবার সম্ভবত। ব্রেকফাস্ট রেডি বা ঐধরণের কিছু বলছে, ঠিকমতো শুনতে পায়নি দেবাংশু কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পায়। দাড়ি কামিয়ে বেরিয়ে উঁকি মেরে দেখে টোস্টেড ব্রাউন ব্রেড, ফল, রোজকার ওষুধ রাখা রয়েছে খাবার টেবিলে। মিতালি মনে হয় আবার ঢুকে গেছে কিচেনে। মিনুর কোনো সাড়াশব্দ পায় না। বেডরুমে গিয়ে সে বাইরের পোশাক পরে নেয়, রিস্টওয়াচ গলিয়ে নেয় হাতে, চুল আঁচড়ানো হয়না, যদিও আঁচড়ানোর মতো তেমন চুল অবশিষ্ট নেই মাথায়। বেডরুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফের ফিরে যায় সেখানে। ওয়ালেটটা ভুলে গেছল নিতে। এবার পায়ে জুতো গলিয়ে মোবাইলটা নেবে কি নেবেনা দুবার ভেবে নিয়েই নেয় সঙ্গে। দরজা খুলে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। ঘন্টাখানেক পরে তাকে দেখা যায় শপিং মলটার বাইরে। মল সবে খুলছে। চেকিং পেরিয়ে সে ঢুকে যায় ভেতরে। না। কেউ তাকে কিছু বলেনি। কেউ বাধা দেয়নি। চিনেও ফেলেনি। এইচ অ্যান্ড এমের দোকানে ঢুকে সে খুঁজতে থাকে সেদিনের পছন্দ করা ট্রাউজার্সগুলো। একটা ছিলো কালো রঙের, আরেকটা খাকি। তিননম্বরটা গ্রে রঙের কিন্তু ওর সাইজেরটা পাওয়া যায় না। আজ আর ট্রায়ালরুমে গিয়ে পরে দেখবার দরকার নেই। একটা কটনের কালো টিশার্ট পছন্দ হয় কলারওয়ালা। মাপ দেখে মনে হচ্ছে গায়ে হয়ে যাবে। ক্যাশে গিয়ে ডেবিট কার্ড দিয়ে দুটো প্যান্ট আর একটা টিশার্টের দাম মিটিয়ে দেয় সে। একটু ঘোরে মলের ভেতরে। সকাল সকাল বলে এখনো সেরকম ভিড় নেই। একটা কাফেটেরিয়াতে বসে এক কাপ কাপুচিনো খায় সে। চিনি দিয়ে। আজ সকালে শুগারের ওষুধ প্রেশারের ওষুধ আরো গোচা দুয়েক ওষুধ খাওয়া হয় নি। নতুন কেনা শার্টপ্যান্টের প্যাকেট সঙ্গে করে মল থেকে বেরোনোর পরে সে বাইরে একদণ্ড দাঁড়ায়। এবার খেয়াল হয় পকেটে মোবাইলটা বাজল যেন। বের করে দেখে চারটে মিসড কল। চারটেই মিতালির। মোবাইলের ভলিউম কমানো ছিল তাই শুনতে পায় নি সে। এই কলটাও সে রিসিভ করবার আগেই কেটে গেছে। ফোনে চার্জ খুব কম। চব্বিশ পার্সেন্ট। কাল রাতে চার্জে বসিয়ে রাখতে ভুলে গেছল কি? ফোনে দেখাচ্ছে কিছু ভয়েস মেসেজ রয়েছে। মিতালিকে কল ব্যাক করে দেবাংশু। -- কী ব্যাপার? তুমি ব্রেকফাস্ট না খেয়ে কোথায় বেরিয়ে গেছো? আমরা বারবার কল করছি, ধরছিলে না কেন ফোন? -- শুনতে পাই নি, ভলিউম কমানো ছিল। --কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তোমার? অত ইম্পালসিভ হলে চলে? চলে এলো বাড়ি। মিনু এমনিতেই টেনশনে রয়েছে। আর টেনশন বাড়িও না। দেবাংশু চুপ করে থাকে। কোনো কথা বলে না। মিতালির সবকটা কথা তার কানে গেছে বলেও মনে হয় না। --কী হলো? হ্যালো, হ্যালো। তুমি কোথায় এখন? শুনতে পাচ্ছ? --হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। --তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো। দেবাংশু ফোন কেটে দেয়। সে এখন ফিরবে না। অটো হোক কি ট্যাক্সি, সে এখন নিউদিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাবে। সেখান থেকে ট্রেনের টিকিট কেটে যাবে কোথাও একটা কাছে পিঠে হোক কি দূরে। মোবাইলের চার্জার তার সঙ্গে নেই। আস্তে আস্তে মোবাইলটা বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়িতে জানাতে পারে না, গুছিয়ে বলবার মত ভাষা তার নেই। দুটো প্যান্ট একটা টিশার্ট এবং ওয়ালেট সঙ্গে করে কাপুরুষ দেবাংশু রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যেতে থাকে। (শেষ)

216

10

মিতা

ফুলকুমারী - যাঁরা কোমল মনের তাঁরা পড়বেন না (Not for over sensitive people)

আজ শোনাই সত্যি গল্প, ফুলকুমারীর l এরকম ঘটনা হয়তো অনেকই হয়, তবে কাছ থেকে দেখা ঘটনার অভিঘাত অনেক বেশি l তার নাম আমি রেখেছিলাম ফুলকুমারী, মনে মনে ! আজ জানি না সে কোথায় আছে, কেমন আছে l এই বিষাক্ত দুনিয়ায় ফুলকুমারীরা কি ভালো থাকতে পারবে ? অনেক দিন আগের কথা, তখন আমি জুনিয়ার রেসিডেন্সি করি মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে l সে সময় আমাদের হাসপাতালে সব ডিপার্টমেন্টে শুধুই মহিলা পেশেন্ট ভর্তি হতো l ওয়ার্ড ডিউটি থাকলে সকালে গিয়ে ভর্তি হওয়া সব রুগীদের দেখে নোটস লিখে রাখতে হতো চার্টে, সিনিয়ররা রাউন্ডে আসার আগে l সেদিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি একটা বেডে ফ্রক পরা ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে বসে আছে, দেখে মনে হলো বেশ ভাল ঘরের (সরকারি হাসপাতালের রুগীদের তুলনায়) তবে বয়স বছর দশেকের বেশি মনে হলো না l আমি অবাক হয়ে ভাবলাম এই বাচ্চা মেয়েটা এখানে কেন, ওর তো পিডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে থাকার কথা l কার ভুল হল ! আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, তোমার কি হয়েছে? ও তার সারল্য মাখা চোখ তুলে জবাব দিলো 'আমি জানি না' l ওর পাশে এক মহিলা দাঁড়ানো ছিল, ভাবলাম মেয়েটির মা, তাকে জিজ্ঞেস করলাম তোমার মেয়ের কি হয়েছে, এখানে কেন? সেই মহিলা বললো 'আমি ওর চাচী হই, আমিও জানিনা না ওর কি হয়েছে, বোধহয় পেটে ব্যাথা, ওর কাগজে লেখা আছে' l আমার একটু রাগ ই হয়ে গেলো, মহিলাকে বললাম তুমি কেমন চাচী, বাচ্চাটাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছো, আর জান না ওর কি হয়েছে l আসে পাশের বেডের রোগিনীরাও আমাদের কথা শুনছে, মাথা নাড়ছে l মেয়েটার চার্ট ওর বেড এ ছিল না, মহা বিরক্ত হয়ে আমি নার্সিং স্টেশন এ সিস্টারদের বলতে গেছি চার্ট বেডে নেই কেন - সিস্টার আমাকে ওর চার্ট টা দিয়ে বললো, কারণ আছে l চার্টের প্রথম পাতায় নাম, বয়স, ভর্তির তারিখ, ইত্যাদির সাথে একটা ডায়াগনসিস ও লেখা থাকে, কিন্তু এর চার্টে দেখলাম নাম, বয়স ১৩ বছর, কোন ডায়াগনসিস নেই.. একটু কনফিউসড হয়ে পাতা উল্টে দেখবো, তখন সেই চাচী এসে দাঁড়ালো, বললো 'আমি সবার সামনে আপনাকে বলতে চাই নি, ওর পেটে বাচ্চা আছে' l আমি মহা অপ্রস্তুত! ভাবতেই পারি নি এরকম কিছু l চাচী পুরো কাহিনী বলে গেলো, শুনতে শুনতে আমার মনে হলো এ তো ফুলকুমারী ! ফুলের মতো নিষ্পাপ, সরল একটা বাচ্চার সাথে এরকম যারা করে তারা পশু বলার ও যোগ্য নয় l শুনুন ওর গল্প: ফুলকুমারী জন্মাবার সময় কোন কারণে ওর ব্রেইনে অক্সিজেন কম গিয়েছিলো, তাই ওর মানসিক বৃদ্ধি অসম্পূর্ণ l তিন বছর পর তার ভাই জন্মালে মা পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে যায়, ঘর সংসার কিছুই দেখতে পারতো না l চাচা চাচী ও এক বাড়িতে থাকে, তাদের এক ছেলে সবার ছোট l চাচী স্কুলে পড়ায় l ফুলকুমারীর বাবা ব্যবসায়ী, বাবার কারখানা আছে বাড়ির নীচতলায় - সেখানে লোকজনের আসা যাওয়া চলে অবিরাম l দিনের বেলা ভাইরা স্কুলে যায়, ফুলকুমারী পড়ে চাচির কাছে সন্ধ্যের পর, দিনে সে থাকে আপন মনে l ফুলকুমারীর বয়স বাড়ে, মনের বিকাশ হয় না, মা থেকেও নেই, কার কু নজরে পড়ে ফুলের মতো মেয়েটি l কিছু দিন আগে চাচী খেয়াল করে ফুলকুমারীর দৈহিক পরিবর্তন - জেরা করতে থাকে কে করলো তার এই সর্বনাশ l সরলা বালিকা বলে 'সে (কারখানার কোন কর্মী) আমায় গলা টিপে মেরে ফেলবে বলেছে যদি আমি কাউকে কিছু বলি, আমার এতো ব্যাথা লাগে, তবুও আমি কাউকে কিছু বলিনি' l বাবা সেই জানার পর থেকে উন্মাদ প্রায় l সংসারে কলঙ্কের ভয়ে, কথা জানাজানি যাতে না হয়, তাই চাচা চাচী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছে চুপিচুপি, পাপ মুক্ত করাতে l ফুলকুমারী সত্যিই জানে না তার কি হয়েছে, কেন সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে l ওরা তাকে সেটা বলতেও চায় না পাছে ও লোকের সামনে বলে ফ্যালে l আমি চার্ট খুলে দেখলাম ও গাইনি ডিপার্টমেন্ট এর পেশেন্ট, ওদের অনুরোধে এখানে রাখা হয়েছে, তবে যেটা আরো খারাপ ব্যাপার তা হল ওর এমটিপির সময় সীমা অনেক দিন পার হয়ে গেছে, ওকে ইন্ডিউস করতে হবে, অর্থাৎ ড্রিপ চালিয়ে ডেলিভারি করাতে হবে, মনটা খুব ই খারাপ হয়ে গেলো l দুপুরের দিকে ওকে গাইনি ওয়ার্ডে পাঠাতে হলো প্রিপারেশনের জন্য l আমার এক বন্ধু ছিল সেখানে, তাকে বলে দিলাম বাচ্চা মেয়েটাকে খেয়াল রাখতে l আমার বন্ধুর ও খুব খারাপ লেগেছিলো, সেও চেষ্টা করেছিল মেয়েটাকে কিছু বুঝতে না দিতে, কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না l ইন্ডিউস করার পর ব্যাথা শুরু হয়, ওকে লেবার রুমে পাঠাতে হয় l আমরা পরদিন গিয়ে জানতে পারি রাত্রে ওর ডেলিভারি হয়েছিল, ফিটাস টা আয়ারা ওকে নাকি দেখিয়েছিলো, বলেছিলো 'দেখ তোর বাচ্চা' (মানুষের না বুঝে করা নিষ্ঠুরতা অনেক সময় সীমা হীন) l আমার আর দেখা হয় নি ফুলকুমারীর সাথে, আমার বন্ধু বলেছিলো সে ওয়ার্ডে ফেরার পর নিজেই বলছিলো 'পেট মে বাচ্চা থা, মর গিয়া' l

186

0

Sarita Ahmed

বাঘবন্দী খেলা ও টিকটিকি তত্ত্ব

হাল্লারানীর রাজত্বে নাকি সেদিন কে 'ম্যাও' ডেকেছে । এই নিয়ে রানী তার উদোমুখো, হুঁকোমুখো ও ল্যাদারু দের সভায় এনকোয়ারি কমিশন বসালেন । কি ব্যাপার ? না, হাল্লা সাম্রাজ্যের বিশ্বাস 'টিকটিকি গায়ে হাগলে / পড়লে তা বেজায় অলুক্ষুণে ।' এতে কারু কোনো দ্বিমত নেই । দিব্যি সবাই টিকটিকিকে ভয়ভক্তি করে, মান্যিগন্যি করে চলে । এরই মাঝে 'ম্যাও' ডাক -- " টিকটিকি গায়ে পড়লে যদি এতই অকল্যাণ হয় , তবে দেশ থেকে টিকটিকি সরিয়ে ফেললেই হয় ।" ব্যাস ! হাল্লারানীসহ সব্বাই চটে গেল । 'উদোমুখো কোতোয়াল' খবর নিল ওটা 'ম্যাও' ছিল না , ছিল 'হালুম' । একদল বাঘের বাচ্চা 'টিকটিকি তত্ত্বে' বিশ্বাস রাখে না তাই বেজায় মাথা খাটিয়ে প্রচলিত 'কেতাব' কে প্রশ্নটশ্ন করে তারা আজব আজব তত্ত্বের অবতারণা করেছে এবং দেখিয়েছে , টিকটিকি না থাকলে প্রজাদের ভাত-কাপড়ের অভাব তো হবেই না, উলটে সব্বাই নির্ভয়ে জীবন কাটাতে পারবে । এত তো ভারি আজব কথা ! এদ্দিন দেশে কেউ এভাবে ভাবেনি । সব্বাই ধূপ ধুনো দেখিয়ে টিকটিকি র প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি দেখিয়ে এসেছে আর এখন এরা এমন 'হালুম' ডাকল , যে না শুনে পারাও যাচ্ছে না। ফলে দলে দলে কিছুজন সাহস দেখিয়ে বাঘ নাকি বিড়ালের সভায় যেতে টেতে লাগল , বুঝতে লাগল। হাল্লারাজ্যে অলক্ষ্যেই একটা ঢেউ উঠল , মাথা খাটানোর ঢেউ । সত্যিই তো , অমঙ্গল যদি টিকটিকির কারণে হয় তাহলে গা বাঁচিয়ে না থেকে টিকটিকি তাড়ালেই মিটে যায় । কিন্তু এমনভাবে মাথার ব্যায়ামের চর্চা দেখ, হুঁকোমুখো জল্লাদরা কি বসে থাকবে ? এদ্দিনের মান্যিগন্যির ব্যবসা সামান্য ম্যাও ডাকে লাটে উঠতে দেওয়া তো যায় না । ব্যাস, 'ল্যাদারু-দপ্তরে' খবর গেল ম্যাও না হালুম যাই হোক তাদের সভায় যোগ দিয়ে গোপন খবর নিয়ে এস । এরা দলে দলে হুকুম তামিল করতে ছুটল এবং অনলাইনরাজ্য নামক আজবদেশ থেকে খবর আনল চশমা আঁটা পণ্ডিত পণ্ডিত বাঘের বাচ্চারা প্রমান করে টিকটিকি তত্ত্বের বারোটা বাজাচ্ছে । দেশে আর টিকটিকি মেলাই দুস্কর হবে যদি ম্যাও ডাক ছড়িয়ে পড়ে । এই শুনে জল্লাদের দল চিল্লে উঠল "যারা যারা টিকটিকিতে বিশ্বাস করবে না তাদের গর্দান যাবে ।" হাল্লারানীও সায় দিয়ে বললে , 'হতে পারে ওরা বাঘের বাচ্চা , তাই বলে টিকটিকি কি ফেলনা নাকি ! রাজ্যে যখন 'টিকটিকি তত্ত্ব' আছে, তখন সবাইকে মানতে হবে ।' এই রায়কে সায় দিয়ে 'হুক্কাহুয়া-কাজী'র দলও বলল, ' টিকটিকিকে রাজ্যে খুবই প্রয়োজন । রাজ্যে বাঘ না থাকলেও চলবে , কিন্তু টিকটিকি না থাকলে রাজ্য রসাতলে যাবে । জল্লাদদের আমরা ঠেকাতে পারব না । কারণ জল্লাদরা মনপ্রাণ দিয়ে টিকটিকির রক্ষা করে এসেছে এতকাল , তাই তো আমাদের কারু গায়ে টিকটিকি হাগে নি ও অমঙ্গল হয় নি । সুতরাং সমাজে জল্লাদ আর টিকটিকি থাকা খুবই দরকার ।বাঘ না বিড়াল নিজের রাস্তা নিজেরা মাপুক ।' হালুম বাহিনী পাত্তাই দিল না; ফলে দলের বেশ কিছুজনের গর্দান গেল । এই নিয়ে পাশের রাজ্য ও তার পাশের রাজ্য সবেতেই একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হল , সত্যি তো , দেশে কার বেশি প্রয়োজন ? টিকটিকি , জল্লাদ, ল্যাদারু নাকি বাঘ ! ব্যাপার হল, কেউই বুঝে উঠতে পারল না , যাকে নিয়ে এত হৈচৈ , যার সুরক্ষার জন্য এত হুকুম তামিল সেই টিকটিকি স্বয়ং কই ? টিকটিকি তত্ত্বের জনক রক্তচোষাকে পাওয়া গেছে । কিন্তু... রক্তচোষার বিচার তো হতে দেওয়া যায় না । 'হুঁকোমুখো জল্লাদ' বাহীনি 'রক্তচোষা' -ব্রাঞ্চের হুকুম তামিল করে মাত্র , তাদের হুকুম তামিল করে 'উদোমুখো কোতোয়াল' , তার হুকুম তামিল করে 'হুক্কাহুয়া কাজী'র দল তারা আবার পরামর্শ দেয় মহান 'হাল্লারানী'কে । সেইজন্য এদের সবার কথা মেনে তবে রাজ্যপাট চালাতে হয় রানীকে । এটা একটা 'চুইঁয়ে পড়া নীতি' মানা সাম্রাজ্য । যেখানে টিকটিকি কে কেউ না দেখলেও তার জনক রক্তচোষাকে আলবাত দেখেছে । তার ক্ষমতা নিয়ে কারু কোনো প্রশ্ন নেই । আরো বড় ব্যাপার হল রক্তচোষা ব্রাঞ্চের সাথে জল্লাদ বাহীনি ও সাঙ্গপাঙ্গদের আঁতাত সেই পুরাকাল থেকে । শুধু তাই না , এরা দলগত ভাবে ভীষন বলিষ্ঠ ও সঙ্ঘবদ্ধ । ফলে কেউ যদি এদের না মেনে একলা স্বাধীন শিকারি বাঘ নাকি বেড়াল কে মান্যি করে তবে মূর্খ্যটা কে ? আশপাশের রাজ্যগুলোতেও তাই হুক্কাহুয়া কাজীর থেকে নোটিশ গেল , --- " 'টিকটিকি তত্ত্বে'র গ্রহণযোগ্যতা কতদূর অটুট আছে তা সরজমিনে দেখতে 'হুঁকোমুখোজল্লাদ' রা ইনভেস্টিগেশনে যাচ্ছে । তাদের আটকাতে যেহেতু আমরা পারিনি ও আপনারাও পারবেন না তাই এতদ্বারা ম্যাও-ডাকা বাহীনির মুখে সেলোটেপ বা কন্ডোম পরাতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে । যদিও ম্যাও বাহীনির প্রসব রেট রক্তচোষার রেটের চেয়ে বেশি নয়, তবু যাতে তাদের গর্দান সালামত থাকে তাই এই কন্ডোম তত্বের নোটিশ । আপনারা এরম 'ম্যাও' ডাক শুনলেই জল্লাদ বাহীনিকে খবর দিন , নয়তো নিজ হাতে বেড়ালডাকা বাঘ বন্দী করুন ও টিকটিকি রক্ষা করুন ।" নোটিশে সই করলেন স্বয়ং হাল্লারানী এবং তার উদোমুখো -হুঁকোমুখো -ল্যাদারু সামন্তরা । এই ভাল ... হয় , স্বাধীনচেতা বাঘের একলা বাঁচার সুযোগ নিয়ে জল্লাদবাহীনি একযোগে ঝাঁপিয়ে গর্দান নিক , অথবা , বাঘ স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় বিদেশে পাচার হোক । যাই হোক না কেন টিকটিকিকে বাঁচাতে হবে ম্যাও বাহীনির থেকে । আর কে না জানে, রাজতন্ত্রে সকলের তরে সকলে আমরা ... সুতরাং 'টিকটিকির জয়' গাইতেই হবে । নোটিশ ছড়াতেই আশপাশ থেকে তুমুল রবে হাল্লারাজ্যের জাতীয় সঙ্গীত শোনা গেল ... 'ক্যায়া হুয়া ... হুক্কা হুয়া ...' বহিরাগত আমি ল্যালাকান্ত এতক্ষণ এই রাজসভায় আড়ি পেতেছিলাম । কে জানে দেওয়ালের কান আছে বলেই হয়তো, এদের বিজাতীয় সঙ্গীতকে একবার শুনলাম ' নারায়ে তকবির ...' তো পরক্ষণেই " জয় শ্রী রাম !" এসব পাঁচমেশালি ধ্বনির সাথে আমার কর্নপটহে খুব জোরে ভেসে এল টিকটিকির হাঁচি ... ঠিক ঠিক ঠিক ! ল্যালাকান্তের কানের আর কি বা দোষ ! পুনশ্চ : -- তারপর নাকি কেটে গেছে বছর দশেক। অত:পর জানা গেল, হাল্লারাজ্য এখন টিকটিকির রক্ষাকর্তাতে ভরে গেছে, বাঘসুমারি এখন বন্ধ তাই ম্যাও ডাক শোনা যায় কিনা কেউ জানে না। আর টিকটিকি? সে আদৌ কারু গায়ে এখনো অবধি হাগল কিনা সেটাও কেউ স্বীকার করে না। সবাই এখন সেদেশে ফিসফিস স্বরে টিকটিকির নাকি সাপের ভাষায় কথা বলে। ------------------------------------------------- ( বিধিমত সতর্কিকরণ : উক্ত ঘটনার সাথে হালফিলের 'সিক্কুলারিজমে'র কোনো আঁতাত নেই । সুতরাং বাদুরিয়া, বসিরহাট, বাংলাদেশ অথবা আশেপাশের অধিবাসীগণ চিন্তামুক্ত থাকুন । মেলা ব্রেন খাটিয়ে ম্যাও ডাকবেন না যেন ! টিকটিকির জয় হোউক । )

183

12

শিবাংশু

আলোতে-ছায়াতে

<একশো বছরের উপর হয়ে গেলো। ১৯০৫ সাল। জাজপুরের এসডিও চক্রবর্তীসাহেব বেরিয়েছিলেন জঙ্গলমহাল সরজমিন ঘুরে দেখতে। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে গভীর বনের মধ্যে কিছু ভাঙাচোরা পাথরের ভাস্কর্য। সঙ্গীদের কাছে জানতে চা'ন এই জায়গাটার নাম কী? তারা বলে নালতিগিরি। ঘন গাছ-বনস্পতির আলোছায়ার মধ্যে দেখা যাচ্ছে উঁচুনিচু টিলা আর লালমাটির রং। জাজপুরে ফিরে এসে তিনি ব্যাপারটা একেওকে জানান। কিন্তু তা নিয়ে কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেননি।শেষে ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাদুঘরের পণ্ডিত রমাপ্রসাদ চন্দ মশাই এখানে এসে নিদর্শনগুলি পরীক্ষা করেন। তার ফলশ্রুতি হিসেবে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের দলিলে নালতিগিরি জায়গা পেয়ে যায়। ক্রমাগত খোঁজাখুঁজির সুবাদে ১৯৩৭ সালে সরকার স্থির করেন এই পুরাবশেষটিকে সংরক্ষিত তকমা দেওয়া দরকার। কিন্তু তার পরেও কোনও ব্যবস্থা হলোনা। কেটে গেলো আরো চল্লিশ বছর। ১৯৭৭ সালে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় আর পুরাতত্ত্ব বিভাগের আয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ির কাজে কিছুমাত্রায় গতি দেখা গেলো। তাও যথেষ্ট নয়। অবশেষে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ মধ্যে পাওয়া নানা নিদর্শন দেখে পণ্ডিতেরা বুঝতে পারলেন এই নালতিগিরিই প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখিত ললিতগিরি'র গরিমাময় বৌদ্ধবিহার। ললিতগিরি ছিলো প্রবাদপ্রতিম পুষ্পগিরি বিহারের একটা অংশ। পৃথিবীতে প্রাচীনতম বৌদ্ধসংস্কৃতির নিদর্শনগুলির মধ্যে একটি প্রধান পীঠ। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টিয় দশম শতক পর্যন্ত এখানে ছেদহীনভাবে বৌদ্ধসভ্যতার বৈজয়ন্তী উড়েছিলো। অনেকে বলেন ললিতগিরি উত্তরমৌর্যযুগ থেকে তেরোশতক পর্যন্ত পূর্বভারতে বৌদ্ধধর্মের নিরন্তর তীর্থভূমি হয়ে থেকেছে। ------------------------- খননকাজের পর এখানে ছোটো পাহাড়ের চূড়ায় একটি বিশাল স্তূপ আত্মপ্রকাশ করে। এই স্তূপটির গভীর থেকে একটি খোণ্ডালাইট পাথরের বাক্স পাওয়া যায়। প্রথম বাক্সটির ভিতরে আরেকটি স্টিয়াটাইট পাথরের কৌটো। তার ভিতর প্রথমে রুপোর ও তারও ভিতরে একটি সোনার কৌটো। এই সোনার কৌটোর ভিতরে ছিলো শাক্যমুনি বুদ্ধের দেহাস্থি। ------------------------- এই স্তূপটি ছাড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরানিদর্শন রয়েছে ললিতগিরিতে। পূর্বমুখী উপবৃত্তাকার চৈত্যগৃহ। ৩৩X১১ মিটারের ইঁটের নির্মাণ। যার দেওয়ালগুলি ১১ ফিট চওড়া। এর কেন্দ্রে আছে একটি বৃত্তাকার স্তূপ। তার উপর কুশান ব্রাহ্মী লিপিতে খোদিত শিলালেখ। এটি এবং আনুষঙ্গিক পুরা নিদর্শনগুলি দেখে মনে করা হয় এগুলি পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে, অর্থাৎ গুপ্তযুগের নির্মাণ। -------------------------- ললিতগিরি গড়ে উঠেছিলো বিভিন্নপর্বে তৈরি হওয়া চারটি বৌদ্ধবিহারকে কেন্দ্রে রেখে। প্রথম বিহারটি বৃহত্তম ও দশম-একাদশ শতক নাগাদ নির্মিত হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিহারটি পরবর্তীকালে, যখন বৌদ্ধধর্মের দিন ফুরিয়ে আসছিলো এদেশে। তৃতীয় ও চতুর্থ বিহারগুলি আগে পরে তৈরি হওয়া। এখানেই একটি নবম-দশম শতকের পোড়ামাটির সিলমোহর পাওয়া যায়। তার উপর উৎকীর্ণ ছিলো "শ্রী চন্দ্রাদিত্যবিহার সমগ্র আর্য ভিক্ষু সঙ্ঘস্য।" এই উল্লেখটি থেকেই ললিতগিরির পরিচয়টি পণ্ডিতেরা জানতে পারেন। ------------------ ওড়িশার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বহুকথিত স্বর্ণিম'ত্রিভুজের প্রাচীনতম বিন্দুটি এই ললিতগিরি। কটক থেকে পারাদিপের পথে জগৎসিংপুর জেলায় রাজপথ থেকে একটু ভিতরদিকে এই পুরাবশেষটি দেখতে পাওয়া যাবে। মূলস্রোত থেকে একটু দূরবর্তী হওয়ার জন্য রত্নগিরি বা উদয়গিরির মতো জনসমাগম এখানে দেখতে পাওয়া যায়না। কিন্তু ললিতগিরির গুরুত্ব অবিসম্বাদী এর প্রাচীনত্বের কারণে। এখানে মহাযানী সংস্কৃতির নানা পুরা নিদর্শন পাওয়া গেছে। সোনারুপোর অলংকার, শিলাপট্ট, নানা শিলমোহর ছাড়াও অবলোকিতেশ্বর, তারা, হারীতি, অমিতাভ, মহিষমর্দিনী, গণেশ, বুদ্ধ, বোধিসত্ব, জম্ভলা ইত্যাদি মূর্তি প্রধান। এইসব ভাস্কর্যে গান্ধার ও মথুরা শৈলির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। শেষ পর্যায়ে এখানে বজ্রযানী তন্ত্রসাধনার কেন্দ্রও গড়ে উঠেছিলো। -------------------------- মহাস্তূপের উপর থেকে নিচে তাকালে আদিগন্ত সবুজের সমারোহে উজ্জ্বল উৎকলের সমভূমি। রোমাঞ্চ লাগে, যখন ভাবি হাজার হাজার বছর আগে আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষারা নিজেদের কর্মভূমি, তপোভূমি হিসেবে এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণ করাই আমাদের তর্পণ। আলোয় ছায়ায় নিরন্তর আসাযাওয়া। আমার ভারতবর্ষ।>

197

12

Stuti Biswas

পেরেম্বানান ......... হিন্দু মন্দির

গাড়ী পারকিং করে টিকিট ঘরের কাছে যেতেই দেখি লম্বা লাইন । মনটা দমে গেল । তুফান জানাল আমরা এসেছি রামাদান (ইদ )ছুটীর মরসুমে । এখন এখানে সাত দিন ধরে ছুটি চলছে তাই এত ভীড় । তবে বিদেশীদের জন্য আলাদা গেট । ফাঁকা । টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম । চোখ জুড়িয়ে গেল । আগ্নেয়গিরির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারই পদতলে সবুজের ভাসাভাসি । নিকটেই মাউন্ট মেরাপি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি &nbsp;। শেষ ২০১০ এ জ্বলন্ত লাভা উগড়ে দিয়েছিল । সবুজের বাগানে নীল আকাশের নীচে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর মন্দির । ভাবতে অবাক লাগে সেই প্রাচীন কালে ঝড়ঝঞ্জা জয় করে সাতসমুদ্র তেরো নদী অতিক্রম করে হিন্দুধর্ম পৌছেগেছিল ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ পুঞ্জে । আর আজ আমরা হিন্দুধর্মের উৎস তেই তাকে বজায় রাখার জন্য নানা ছলছুতো করতে থাকি । ইন্দোনেশিয়ায হিসাব করা মহা ঝকমারী ।মুদ্রার নাম রুপয়া । শুরু ১০০০ নোট থেকে । হোটেল থেকে মালিবু রোড রিক্সা ভাড়া চাইল ৩৫০০০ রুপয়া । আকাশ থেকে পড়লাম ।একিরে ভাই …কোন দেশে এলাম রিক্সাওলাও হাজার ছাড়া কথা বলে না । ডাব খেলাম । এত জল ,এত জল যে পেট ফুলে জয়ঢাক হবার জোগাড় &nbsp;। দাম চাইল ১৫০০০ রুপয়া ।কোন কিছু হিসাব করতে গেলেই শূন্যরা মাথার মধ্যে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিচ্ছিল। শূন্যের আধিক্যে মাঝে মাঝে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলাম । আচ্ছা এই লক্ষ ,কোটিপতি রিক্সাওলা, ডাবওলা এরপর এরা কি পতি হবে!!!!!!!!!!!! এই দেশের জন্যই মনে হয় ক্যাল্কুলেটর এখনো বেঁচে আছে কমপ্লেক্সে ঢুকতেই আমাদের স্বাগত জানাল বল্লমধারী সান্ত্রীরা ।এগোতে গিয়েও পিছিয়ে এলাম দেখি রাক্ষস খোক্কস ঘোরাফেরা করছে । ক্যামেরা হাতে নিতেই তারা পাশে এসে দাঁড়াল ।চললো নানা ভঙ্গিমায় ফটো সেসন । পেরেম্বানানে ছয়টি মূল মন্দির ছাড়াও আরো ছোট ছোট ২৩৫ টি মন্দির ছিল । বেশীরভাগই ধবংস হয়ে গেছে &nbsp;।স্থানীয় লোকেরা পরিতক্ত পাথর নিয়ে কাজে লাগিয়েছে । এখন অবশ্য সবই সংরক্ষিত ।মন্দিরগুলি ধূসর কালচে রঙের আগ্নেয়গিরির পাথর দিয়ে তৈরি &nbsp;। সংস্কারের পর কয়েকটি মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে । তারমধ্যে সবচেয়ে বড় শিবগৃহ । তার দুইপাশে অপেক্ষাকৃত ছোট ব্রহ্মা ও বিষ্ণু মন্দির । এই তিন মন্দিরের সামনে বাহন নন্দী, গারুদা ও হংস মন্দির । এ ছাড়া দুর্গা ও গনেশের আলাদা মন্দির । ব্রহ্মা ও শিব মন্দিরের গায়ে পাথরের ব্লকে খোদাই করা রামায়ন গাথা &nbsp;। বিষ্ণু মন্দিরের গায়ে খচিত শ্রীকৃষ্ণের জীবনের নানা কাহিনী । অন্যান্য মন্দিরে র গায়ে ভগবত পুরাণের কাহিনী বর্ননা করা আছে । প্রত্যেক মন্দিরে উঠতে হল পাথরের উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে । মন্দিরের কারুকার্য সত্যি দেখার মত । সংরক্ষণের এত বন্দোবস্ত করলেও আশ্চর্য লাগল দেখে যে মন্দিরের ভিতরে কোন আলোর বন্দোবস্ত নেই । ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভিড়ে দম বন্ধ হবার যোগার । আলো না থাকায় পাথরের মুর্তির ভাল করে ফটো তোলা গেল না । পাথরের গায়ে খোদাই করা কারুকার্য দেখতে দেখতে পৌঁছেগেছিলাম সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে &nbsp;।খেয়াল করিনি কখন সূর্য পশিম গগনে হেলে গেছে ।।কমপ্লেক্সটি বিরাট বড় । ভাল করে দেখতে হলে পুরোদিন হাতে করে যেতে হবে । ছুটির মরসুম হওয়ায় বেশ ভীড় ছিল । তবে প্রায় সবই লোকাল লোকজন । বিদেশী খুব একটা নজরে এল না । ফিরতে মন চায় না। দেখার তৃষ্ণা মেটেনা ।কিন্তু ফিরতে হবেই । ফেরার পথে কমপ্লেক্স সংলগ্ন মার্কেট থেকে কিছু কাঠের জিনিষ কেনা হল । ভালই দরাদরি চলে । যখন গাড়ীতে চড়লাম তখন চারিদিকে গোধূলির কমলা আলোর মায়াময়তা ।পাখিরা ডানায় ক্লান্তি মেখে ফিরছে । কমপ্লেক্স পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরলাম &nbsp;। ম্লান আলোয় দূরের গ্রামগুলি ছায়াছায়া হয়ে জেগে উঠছে । পেরেম্বানান রহস্যের সীমা নেই । খননের ফলে এখনো বেড়িয়ে আসছে অনেক মন্দিরের নির্দশন &nbsp;। সম্প্রতি ১৩ মিটার আগ্নেয়গিরির ছাইর নীচে চাপা পরা মন্দির আবিস্কৃত হয়েছে । সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রচুর মূল্যবান নির্দশন লুকিয়ে আছে এখানে । বিদায় পেরেম্বানান …। আর কোনদিন হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে না । এই ভাবেই শতাব্দী ধরে ইতিহাসের পাতায় তুমি বেঁচে থাকবে ।

164

21

Srijita

ধন্যবাদ বাংলাআড্ডা

ছোটবেলায় গল্প লেখার চেষ্টা করতাম যদিও সেগুলো খুবই শিশুসুলভ ছিল‚ তবুও লিখ্তাম| সব খাতার পিছনের পাতা খুলে দেখলেই আমার কীর্তি নজরে পড়ত| একটু বড়ো হওয়ার পর অবশ্য সেসব ইচ্ছা চলে গেল‚ কেন? তা বলতে পারব না| তবে এরই মধ্যে স্কুল-ম্যাগাজিনে দুটো লেখা বেড়িয়ে ছিল| তারপর সব বন্ধ| অনেক বছর পর বাংলাআড্ডার খোঁজ পেলাম|এখানে ভূতের গল্প প্রতিযোগীতা দেখে মনে হল একবার চেষ্টা করেই দেখি| কিন্তু লিখতে বসে সব গুলিয়ে যেত‚ অনেক কিছুই মনে আসতো কিন্তু ঠিক করে লিখতে পারতাম না‚ একটু লিখেই আবার সব মুছে দিতাম‚ অবশেষে অতি কষ্টে একটা ছোট গল্প লিখলাম‚ তাও শেষটা ঠিক মনের মতো হল না| তবু অনেকদিন পরে লিখে বেশ ভালোলাগল| দুদিন আগে আবার হঠাৎ লিখতে ইচ্ছা হল‚ লিখতে বসলাম| দেখলাম এবারে বেশ লিখতে পারছি‚ আগের বারের মতো গুলিয়ে যাচ্ছেনা| যাই হোক মনে যা এল লিখলাম| কেউ কেউ লাইক দিল‚ কম্যান্ট করল| ইচ্ছাটা ডেলিপ্যাসাঞ্জার হয়ে যাক এমন wish পেয়েছি| ইচ্ছা তো ডেলি না হলেও প্রায়ই জেগে উঠছে| প্যাসাঞ্জার নিয়ে ট্রেন কতদূর যাবে জানি না‚ তবে ষ্টেশনে রোজই আসা হয় এটা বলতে পারি| <img class="emojione" alt="☺" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/263A.png?v=1.2.4"/> সবই বাংলাআড্ডার দৌলতে| ধন্যবাদ|

190

6