প্রবুদ্ধ

ঊর্বশী ও আরো কয়েকজন

ঊর্বশী ********** --ওঠ খানকীর মাইয়্যা‚ পড়ে পড়ে আরাম করচে দ্যাকোনি? সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চল্লো ঠাপনা কি তোর মায়ে দেবে রে রাঁড়ের বেটী.... বিশ্রী একটা চিৎকারে আতঙ্কিত চোখদুটো চমকে খুলে যায় রূপুর| তার সাথে পাছায় একটা তীব্র চিমটি‚ রক্ত বেরিয়ে এলো বুঝি| মাসীর পানজর্দা খাওয়া মুখের উগ্র গন্ধটা ধক করে সোজা মাথায় গিয়ে আঘাত করে| প্রায় নগ্ন দেহটাকে কোনোমতে সায়ায় জড়িয়ে ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসে রূপু| সকালের রোদ চোখের ওপর চাবুক মারে| এক ঝটকায় ভোররাতে আসা গভীর ঘুমের আরামটা চিরে ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যায়| এইভাবেই রূপুর সকাল হয় রোজ| এইভাবেই রূপুকে রোজ মনে করিয়ে দেওয়া হয়‚ সকাল হোলো রে খানকী| এরপর সারাদিনে দশ থেকে বারোবার লোহার শলায় ফালাফালা হয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয় রূপু| গভীর রাতে জানলার ওপারে ঝুলে থাকা হলুদ মরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রোজই একবার বলে ‚ মা! তারপর ঘুম| তারপর আবার সকাল| সকালবেলায় কলতলাটা যেন নরক| এই বস্তির সবটাই নরক যদিও| তবু কলতলাটা যেন বড় বেশী নারকীয়| নারকীয় নয়‚ পার্থিব| পৃথিবীর সমস্ত ক্লেদ কেউ মাখিয়ে রেখে গেছে আলকাতরার বড়ো বড়ো পোঁচে| কেউ সম্পূর্ণ নগ্ন‚ বেশির ভাগ মেয়ের বুকের কাছে সায়াটা আলগোছে বাঁধা| যত তারা মাথার চুল‚ দাঁত‚বগল‚ বুকের খাঁজ আর যোনি পরিষ্কার করতে থাকে‚ তত যেন গলগল করে বেরিয়ে আসে পাঁক| এত ঘৃণা‚ এত গরল বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা যায়| যায়| বাঁচতে হয়| ছায়ামূর্তির মত কতগুলি পুরুষের অবয়ব ঘুরে বেড়ায় কলতলায়| কৃকলাসের মতো শীর্ণ‚ কোনোরকমে একটা জাঙিয়ায় ঢেকে রাখে নিজেদের মরে যাওয়া পৌরুষ| এই ক্লেদাক্ত কলতলায় জীবন্ত মানুষও ধরফড় করে মরে যাবে‚ এতো বিষ এখানকার হাওয়ায়| সেই বিষ নিতে নিতে‚ সেই বিষ পরিষ্কার করতে করতে এরাও আজ জীবন্মৃত| বালতি ভরে ভরে জল এনে দেয় মেয়েদের‚ পিঠ বা থাই ঘষে দেয় পরম নিরাসক্তিতে| শরীর জাগার তো কোনো প্রশ্নই নেই‚ ঘষা চোখে রোজকার দেখা মেয়েদের শরীরগুলো পাথরের টুকরোর মতো লাগে| রাতের বেলা এই রকমই এক শীর্ণ ভূত উঁকি দেয় রূপুর ঘরে| অসুস্থ চাঁদের আলোটা আড়াল করে দাঁড়ায় জানলার শিক ধরে| বিছানার এক কোণে সারা দুনিয়ার সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলে গিয়ে রূপুর রোগা নগ্ন শরীরটা উপুড় হয়ে পড়ে| এক সমুদ্র ঘুমের নীচে রূপু তখন ডুবে | পাছার যেখানে রোজ মাসী চিমটি কেটে ঘুম ভাঙ্গায় তাকে‚ তার ঠিক ওপরেই দাঁতের দাগ একটা‚ ভূতের মাথাটা সরে যেতে চাঁদের অসুস্থ আলোটা সেইখানেই এসে পড়ে| শিক গলে শরীরটাকে ঘরে ঢোকায় ভূত| জাঙ্গিয়াটাকে খুলে ফেলে| তারপর বিছানার সেই অন্ধকার কোণে গিয়ে রূপুর শরীরটাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে| রূপুর নড়ারও শক্তি নেই‚ তবু সে নড়ে ওঠে একবার| তারপর ঘুমিয়ে পড়ে| দুজনেই| শিথিল নিথর দুটো শরীরেরই একে অন্যের ছোঁয়া ভালো লাগে খুব| ------------ ওপরের গল্প লিখেছিলাম দুদিন আগে‚ সেটার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে| জাদপ্পুরে পড়ার সময় সেকেন্ড ইয়ারে আমি হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে যাই| ঐ বয়সে বিদ্রোহ আর কার বিপক্ষে করা যায়‚ বাবা মা ছাড়া| তো সেটাই শুরু হলো| প্রতিটা কথায় উল্টো সুর গাওয়া‚ খিঁচিয়ে জবাব দেওয়া| না বলে সারারাত বাড়ীর বাইরে কাটানো| মায়ের পা ভাঙ্গলো যোধপুর পার্কের মোড়ে গাড়ীর ধাক্কায়‚ শয্যাশায়ী মাকে বাবা আর ঠাকুমার হাতে ছেড়ে শুশনিয়া পাহাড়ে চলে যাওয়া| বাবার বারবার বারণ সত্বেও কলকাতার অন্ধকার জায়গাগুলোয় দিশাহারা ভাবে ঘুরে বেড়াতাম| টিবি হসপিটালের মাঠে গাঁজার আড্ডায়| সার্কুলার রেলের লাইন ধেরে হাঁটা| স্যালভেশন আর্মির গেস্ট হাউসে‚ যেটা গীটার হাশিশ আর আনপ্রোটেক্টেড সেক্সের ডিপো| ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে দালালের সাথে দেখতে যাওয়া‚ "কোথায় হয়"| গড়িয়ায় পাঁচ নম্বর বাস স্ট্যান্ডের কাছে একটা বস্তী ছিলো‚ সেখানে চলে যেতাম| বয়স কম আর রোগাপাতলা সাধাসিধা দেখতে হওয়ায় কোনো যায়গায় নিজেকে মানাতে অসুবিধা হতো না| তবে বাঙ্গালীর ছেলে‚ কাফকার সেই "Point of no return"-এর একচুল আগেই থেমে যেতাম| তাই গাঁজা‚ বেশ্যাসঙ্গ বা যৌনরোগ কোনোটাই হয় নি| বাবা এমনিতেই কম কথার মানুষ‚ সেসময় আরো বেশী চুপ করে থাকতো| সারারাত হস্টেলে মদ খেয়ে সকালে বাড়ী এসে দুপুর অবধি ঘুমোতাম| বাবা তখন রিটায়ার করে মধুসূদন মঞ্চে আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্রের অফিসে অ্যাডভাইসর‚ বিকেলবেলা থেকে রাত অবধি কাজ| আমার বাড়ী আসা অবধি অপেক্ষা করতো ঠিক| আমায় ঘুম থেকে তুলে টেবলে খাবার সাজিয়ে রাখতো| আর একটাই কথা বলেছিলো‚ তাও মাত্র একবার‚ "তোর যা ঠিক মনে হয় করিস| আমার বারণ করা কাজ‚ পরে বুঝবি কেন বারণ করছি|" শেষ বয়সে বরোদায় থাকার সময় এক বিকেলে এই নিয়ে কথা হচ্ছিলো| বাবা খুব শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতো| কোনো দিক থেকেই বাবার সাথে নিজেকে মেলাতে পারিনা| না কথায়‚ না ব্যাবহারে‚ না জীবনদর্শনে| বলেছিলো‚ "তখন যদি তোর কোনো বিচ্যুতি হতো‚ পারতি আজকের মতো এই জীবনচর্যা বজায় রাখতে? ক্ষতিটা তো তোর একার হতো না| মিতা আর সোনারও হতো" মৃত্যুর আগে তার প্রাণপ্রতিম নাতিকেও শেষ উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলো‚ "নিজে যা ভালো বুঝবি তাই করিস সোনা| তোর নিজের পথটাই ঠিক পথ‚ কারোর দেখিয়ে দেওয়া পথ নয়| কিন্তু পথ খোঁজার দায়িত্বও তোর| সে দায়িত্বটা পালন করিস"| সৌভাগ্যবশত‚ বোঁচুয়া অনেক বেশি দায়িত্বপরায়ণ| তার বাবার মতো মেকীবিদ্রোহী আর পলাতক নয়| ও‚ ঐ বিদ্রোহ বেশিদিন চলে নি| দ্রুত কুকুর আবার তার লেজ গুটিয়ে ঘরে ফিরে এসেছিলো| তখনও বাবা কিছু বলেনি| কিন্তু দুটো নীরবতার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ| গড়িয়ার ঐ বস্তির ওপরেই গল্পটা লেখা| সব চরিত্রগুলো-ই সামনাসামনি দেখা| শেষের দিকে "রোমান্টিকতা" নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি করেছেন‚ একজন (এখানকার নয়) ফোনে জানালেন‚ এমনটা হয়ই না| কিন্তু রোমান্টিক তো তত কিছু দেখাই নি‚ সব শেষ হয়ে যাওয়া একটা মেয়ে একটুখানির জন্যও তো কারোর স্পর্শে solace পেতে পারে‚ তা সে যতই অদ্ভুত কোনো প্রাণীর থেকেই হোক না কেন‚ এইটাই বলতে চেয়েছিলাম| এর মধ্যে রোমান্স বা প্রেম নেই‚ শুধু ভালো লাগা আছে| যাইহোক‚ প্রতিক্রিয়াগুলো পরে কাজে দেবে| এই পৃথিবীকে এখনো অনেক সাহিত্য দেওয়া বাকী আছে আমার| _______ শিবাংশুদা আমার লেখাটা নিয়ে বলেছেন‚ অনেক বড়ো পাওনা (যদিও লাস্টে একটু সুক্ষ্ম দিয়েছেন‚ উনার অননুকরণীয় স্টাইলে)| সমরেশ বসুর কথা লিখেছেন‚কমলকুমার‚ সন্দীপন‚ জ্যোতিরিন্দ্র‚ কিন্তু এই "জঁর"এর অন্যতম protagonistএর নাম নেন নি‚ মাণিক বন্দ্যো| সত্যি বলতে‚ আমার গল্পটায় "কৃকলাস" আর কলতলা এই দুটোকে এক জায়গায় আনার পেছনেও মাণিকেরই একটা গল্পেরই ছায়া| শ্যেনদৃষ্টি মাণিকেরও ছিলো‚ বিভূতিভূষণেরও| আবার বাবার কথায় আসি‚ এই দুজনের কথা একসাথে উঠলে বাবা বরাবর বিভূতিবাবুর দিকেই যেতো| সব ভাঙ্গচুরের পরেও শেষে একটা আলোর রেশ থাকা উচিৎ‚ সারাজীবন ধরে করা নানা লড়াইয়ের কথা ভেবে বাবা এটাই মনে করতো| চ্যাপলিনের ছবি তাই এতো পছন্দ ছিলো বাবার| "দেখবি‚ লোকটি সারা ছবিতে মার খেয়ে‚ না খেতে পেয়ে‚ অপমানে অভিমানে জর্জরিত হলেও শেষে মেরুদন্ড সোজা করে দর্শকের দিকে পেছন ফিরে কেমন বীরদর্পে হেঁটে যায়‚ দুনিয়াকে তার থোড়াই কেয়ার| এই মনোভাবটা চাই|" শিবাংশুদার লেখায় জোলা ও ফরাসী সাহিত্যের কথা এসেছে| হ্যাঁ‚ ফরাসী সাহিত্যের রিয়ালিজম তো যেকোনো সময়েই "জার্ক লিটরেচার"-এর গাইডবুক| জোলার সাথে কাফকা আর কাম্যুর নামও আসবে| বাবা অনেক বার কাম্যু পড়তে বারণ করতো‚ ওসব পড়ে নাকি বাবার সুইসাইডাল অনুভূতি জাগতো| কাফকার "Jackals and Arabs" পড়ে আমিও এক রাত জেগে ছিলাম মনে আছে‚ লাগছিলো জানলার বাইরে শেয়ালগুলো জিভ বার করে ঘুরছে| এটা আমার আঁতলেমো নয়‚ এটা কাফকার লেখার গুণ‚ বা দোষ| তবে ফরাসী সাহিত্যের‚ ইন ফ্যাক্ট‚ সমগ্র ফরাসী চরিত্রেরই‚ সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার প্যাশন| তাঅভের্নিয়েরের The Bait" বলে একটা সিনেমা দেখেছিলাম‚ একটা কিশোরী মেয়ে আর তার দুই ছেলে বন্ধুর ওপর| সে মেয়েটা‚ বয়স আঠারোর নীচেই হবে‚ নিজের প্যাশন চরিতার্থ করতে যে কি করতে লাগলো সে বসে দেখা যায় না| এতো প্যাশন আমার অন্তত হজমের বাইরে| অনিয়ন্ত্রিত প্যাশনসমৃদ্ধ ফরাসী সাহিত্যের চেয়ে আরো শক্ত কঠিন জমির ওপর দাঁড়িয়ে ল্যাটিন সাহিত্য| সেখানে ইউএসপি হলো নিরাসক্তি‚ নির্লিপ্ততা| রকের ভাষায় ধোর বাল অ্যাটিটুড| মার্কেজের একটা জার্নালিস্টিক পীস আছে (ওঁর সব লেখাই জার্নাল অবশ্য) ‚ আলিয়েন নামে| একটি কিউবান রিফিউজী শিশুর কথা| একেবারে বরফকঠিন বিবরণ‚ লেখকের যেন কিছুই যায় আসে না‚ শুধু দেখা আর লেখাইই তার কাজ| বুনুয়েল‚ কি অত্যাচার নিজের ছবির চরিত্রগুলির ওপর‚ এমনকি ছবির জানোয়ারগুলির ওপরও| কোয়েলহোতেও লাইনে লাইনে সেই নিরাসক্তি| রিয়ালিজম যদি শিখতে হয়‚ তো ল্যাটিন সাহিত্য থেকে| তবে ঐ বরফশীতলতাকে সহ্য করার ধক চাই| ------- আবার আমার গল্পটায় আসি| গল্পটা গৌণ‚ তার বিষয়টা‚ rather| একজন গণিকার জীবন নিয়ে লিখতে গেলে তিন রকম সম্ভাবনা দিয়ে গল্পের শেষ হতে পারে: ১) সে ঐ জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বামীর ঘরে বা পিতৃগৃহে সুখে থাকলো ২) যেমন চলছিলো তেমনিই চলতে থাকলো ৩) যেমন চলছিলো চললো‚ শুধু মাঝে মাঝে তার জীবনেও ভালো লাগার মুহুর্ত তৈরী হতে থাকলো| এবার মাণিক বা সমরেশ হলে সম্ভবত: দুয়েতেই আটকে যেতেন‚ এক নম্বর অপশনটাকে দেখতেনই না| বিভূতিবাবু কিন্তু তিন তো বটেই‚ এমনকি প্রায়-অসম্ভব এক নম্বর অপশনটাকেও পরম মমতায় গ্রহণ করতেন| নইলে অথর বা কাঠ-বিক্রী বুড়ো লেখা হতো না‚ যেখানে গাটারের মধ্যেও সুর্যোদয় হয়| গাটার বলতে মনে এলো| নন্দনের অন্ধকার কোণে বসে এক নি:শ্বাসে দেখেছিলাম "Le joueur de violon (The violin player") নামে একটা ছবি| এক বেহালাবাদকের জীবনকহিনী| শেষের দিকে কেউ তার বেহালাটাকে ভেঙ্গে দেয়| শেষ সিকোয়েন্সে সে একটা নৌকোয় চড়ে প্যারিসের আন্ডারগ্রাউন্ড বিশাল নর্দমায় ভেসে যায়‚ আর এক অদৃশ্য ভায়োলিন বাজাতে থাকে হাতের ভঙ্গিমায়| গাটারের ধারে ধারে গৃহহীন অসংখ্য পরিবার উঠে দাঁড়িয়ে সেই বাদকের দিকে দেখতে থাকে‚ তাদের মুখের ওপর ক্যামেরা ফ্লোট করার সময় বোঝা যায় তারাও সেই অদৃশ্য ভায়োলিনের সুর শুনতে পাচ্চ্ছে| সে এক অপার্থিব দৃশ্য‚ আর যেকোনো ক্ষতবিক্ষত মনও সে দৃশ্য দেখে একটুখানির জন্যও solace পাবে‚ আমার গল্পের রূপু-র মতো| --------- এবার গল্পটাকে‚ মানে গল্পের বিষয়টাকে‚ একটা অন্য অ্যাঙ্গল থেকে দেখার চেষ্টা করা হলো| একজন লিখেছেন‚ এখানকারই একজন‚ "..... লেখাটি প্রধানত রুপুর প্রতি সহানুভূতিশীল। ঘটনাচক্রে তোমার চরিত্রটি এক রূপোপজীবীর। কিন্তু এই একই কষ্ট ষন্ত্রণা যে কোনও শ্রমদাসের হতে পারত। শরীরের মনের কষ্ট সব শ্রমদাসের হয়। সবার মাসি থাকে। তার নাম ইটভাটা মালিকও হতে পারে। কলতলা হতে পারে পাথরখাদানও। তাই ‘পৃথিবীর সমস্ত ক্লেদ’ আরও অন্য ভাবেও অনেকে অনুভব করেন। <...... শুধু প্রসঙ্গটা একটু বলে যাই—তোমার চরিত্র প্রধানত শরীরজীবী নন। তিনি কোনও একটা এমন অনুভবের বেসাতি করেন, যা কাম্য রমণীয় এবং লালিত্যময়। তাকে ক্লেদাক্ত করতে গেলে আরো অন্য পথ ভাবতে হবে।" এই ছোট্টো মেসেজটা একটা প্যান্ডোরার বক্সের মতো| অনেক কথা লুকিয়ে আছে অল্প কথায়| ১| আমি নিজে চাকরীসূত্রে শ্রমিকদের খুব কাছের মানুষ| "যেকোনো শ্রমদান" আর দেহব্যবসা (অন্য শব্দও ব্যবহার করা যেতো) এক গোত্রের নয়‚ অনেক মিল থাকলেও| দেহব্যবসায় যাঁরা রয়েছেন‚ সেই মেয়েদের সামাজিক অবস্থান অন্য শ্রমজীবী মানুষের চেয়ে অনেক অনেক নীচে| সেটা সমাজের দায়‚ সমাজ বদলালে হয়তো দেখার চোখও বদলাবে‚ কিন্তু সমাজের আরো বেশী দায় এইখানে‚ কেন মেয়েদের এই পেশায় আসতে হবে? যে বালিখাদানে কাজ করছে‚ তার শ্রম তো কোনো কনস্ত্রাক্টিভ কাজে লাগছে‚ এই পেশার ডেলিভারেবলস কি? আমার যেটুকু দেখা‚ এই পেশা না থাকলেও দুনিয়ার কিছু ক্ষতি হতো না| এতগুলি ম্যানপাওয়ারকে অন্য কাজে লাগানো যেতো| তাই আমি এই পেশা সম্পূর্ণ বন্ধের পক্ষে| সমাজের দায় এই মেয়েগুলি ও তাদের পরিবারের গ্রাসাচ্ছদনের অন্য কোনো সুযোগ জোগানোর| এই পেশার কোনো দরকারই নেই| তাই অন্য শ্রমের ক্লেদ ঐ কলতলার কাছে কিছুই না| ২| আমি রূপুর প্রতি সহানুভূতিশীল অবশ্যই‚ কারণ রূপুকে আমি দেখেছি‚ তার জীবনযাপন দেখেছি| কিন্তু তার পেশায় কোনো রমণীয়তা বা লালিত্য আমার চোখে পড়েনি| দারিদ্র্যের romanticisation হয়‚ বেশ্যাবৃত্তির হয় না‚ কারণ ওপরেই লিখেছি| ঊর্বশী মেনকা রম্ভা অনেক কবিতার জন্ম দিতে পারে‚ কিন্তু বাস্তবের তারা শুধুই ঘৃণা আর হতাশা নিয়ে বাঁচে| রূপু নামক গণিকা--- "তিনি কোনও একটা এমন অনুভবের বেসাতি করেন, যা কাম্য রমণীয় এবং লালিত্যময়। তাকে ক্লেদাক্ত করতে গেলে আরো অন্য পথ ভাবতে হবে।" এই পথ আমার অজানা‚ তাই অপেক্ষা করে আছি কখন কেউ সেই পথের গল্প লিখবেন|

204

12

শিবাংশু

লুট কর মেরা জঁহা

রাতটা ছিলো একত্রিশে ডিসেম্বরের।বহু বহু দিন হলো। রাতের বাসে দিল্লি থেকে হরিদ্বার যাচ্ছি। দিল্লি ছেড়েছে রাত ন'টা। ঘুরে ঘুরে ঘাজিয়াবাদ পৌঁছোতে সাড়ে দশটা। পারা নামতে শুরু করে দিয়েছে চার-পাঁচ। মেরঠ পেরিয়ে গেলো প্রায় একটা। ধীরে ধীরে চলছিলো গাড়ি। কুয়াশার জন্য। বাসের ভিতর-বাহির নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। লোকজন কম্বল মুড়ি দিয়ে অন্যলোকে। বাসটা ধীরে হতে হতে দাঁড়িয়েই গেলো শেষ পর্যন্ত। জায়গাটা একেবারেই সুবিধের নয়। উত্তর-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বদনাম বস্তি। জেগেই ছিলুম। অনন্ত চরাচর অন্ধকারে ভেসে যাচ্ছে। ফিকে একটা চাঁদ। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আলো দেবার মুরোদ নেই। জানালা দিয়ে উঁকি দিই। কিস্যু দেখা যাচ্ছেনা। ঠাণ্ডায় হাত-পা জমে গেছে। নামা দরকার। নেমেও আসি। স্মার্ট লোকেরা এমন সময় সিগারেট ধরায়। আমি আনস্মার্ট। রাস্তার কিনারে ভিজে সপসপে ঘাস। চারদিকে অস্ফুট টপ টপ করে একটা আওয়াজের ছন্দ কানে আসছে। দেখা যাচ্ছেনা কিছুই। একটা বছর ফুরিয়ে গেলো। আরেকটা আসছে আঁধার রাতে একলা পাগলের মতো।কানের কাছে ফিস ফিস করে কে বলে উঠলো, " সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো রাত্রি নেমে এলো..." -আরে, তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে... পর্ণা বলে, এতো অন্ধকার আলোর মতো চোখ ঝলসে দেয়। ঘুম ভেঙে গেলো... ড্রাইভারসাহেব কে শুধাই, রোক দিয়ে কিঁউ? -কুছ নজর নহি আ রহি হ্যাঁয়...সামনে কি শিশা ধোনা পড়েগা... -দের হোগা..? -নহি, পাঁচ মিনট.. পর্ণাকে বলি, ভিতরে যাও.. ঠাণ্ডা লেগে যাবে.. কিছু না বলে হাতটা এগিয়ে দেয়.. -আরে দস্তানা খুলেছো কেন? -হাত ধরবো বলে... কুয়াশার মধ্যে সেই গাছপালা ছড়ানো অনন্ত প্রান্তরে অনেকটা দূরে কোথাও একটা টিমটিমে আলো। মনে হলো একটা ধাবা হতে পারে। এখনও মানুষ জেগে রয়েছে। ভাবা যায়না... বিস্ময় এখানেই শেষ নয়। ওখান থেকে স্তব্ধ হিমেল বাতাসে ভেসে এলো একটা গান। শুনছে কেউ। লতাজির গলায় শচীনকত্তা। সেই কোন ১৯৫১র কচি গলায় গেয়েছিলেন লতাজি। নাহ, সেই ভার্সনটা নয়। এটা ১৯৭৬রে মুকেশজির সঙ্গে কানাডা সফরের সময় গাওয়া গান। মুকেশজি সেখান থেকে আর দেশে ফেরেননি। শরীরটা এসেছিলো শুধু। এই গানটি দিয়ে লতাজি তাঁর প্রিয় মুকেশভাইয়াকে তর্পণ করেছিলেন। এই গায়ন অনেক পরিণত, পরিশীলিত। সহজতম ফর্ম্যাটে ফিলমি ঘজল। মতলা, কাফিয়া, রদীফ সব লক্ষণই রেখেছিলেন সাহির সাহেব। ঐ নিকষ কালো চরাচরে লতাজির গলায় তার সপ্তকে "লুট কর মেরা জঁহা, ছুপ গয়ে হো তুম কঁহা?" রবীন্দ্রসঙ্গীত ভাঙা মূর্চ্ছনা বড়োকত্তার। এই সুরের কাছে মৃত্যু করজোড়ে ক্ষমা চায়। বলে, ভুল হয়ে গেছে বস.... হাতটা আঁকড়ে ধরে পর্ণা। বলেনা কিছুই। বলা যায়না। সত্যিকারের গান হয়ে উঠলে তা একান্ত ব্যক্তিগত সুখ হয়ে যায়। কাউকে কিস্যু বলা যায়না। ড্রাইভার ডাকে। যেতে হবে, দূরাগত ধ্বনি ভেসে আসে... "দিল কো ইয়েহ ক্যা হো গয়া, কো'ই শয় ভাতী নহী, লুট কর মেরা জঁহা..." বিলকুল লুটা গয়ে হম লোগ হুজুরে আলি, কুছ তো রহম করেঁ ...

182

15

শিবাংশু

'পারিবারিক' কারবার

বিষয়টা এতোবার আলোচনা হয়েছে যে তা নিয়ে কিছু আলোচনা পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু হবে না। তাই আমি তার মধ্যে যাচ্ছিনা। মানে মজলিশ বা বাংলা-আড্ডা, জমায়তের যে নামই হোক না কেন, সেটার প্রকৃত মেজাজটা কী? অনেক পুরোনো নাম এখন এখানে দেখা যায়না। কিছু নতুন নাম এসেছে। কিন্তু মেজাজটা বদলায়নি। এই পরিসরটি আদতে কিছু ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার বৈঠকখানা। এটাই এর USP। নৈর্ব্যক্তিক মেধাচর্চা নয়, ব্যক্তিকস্তরের অনুভব বিনিময়ের ঐতিহ্যটি এর সঙ্গে ওতপ্রোত। ব্লগে অবশ্য সৃজনশীল নানা প্রয়াস ধরা থাকে। সেটা যেকোনও ওয়েব পত্রিকার মতো'ই' 'স্বাভাবিক'। কিন্তু আড্ডার পাতাটা অন্যরকম। আমি অনেক ওয়েবপাতায় যাওয়া আসা করি, কিন্তু অন্য কোথাও এই উষ্ণতাটি দেখিনি। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কিছু প্রিয়জন মিলেমিশে পরস্পর ভাবভালোবাসা বিনিময় করছেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এর মূল্য অনেক। যেসব জায়গায় তথাকথিত সেরিব্রাল আবহটি খুব প্রখর, সেটাই আমার একমাত্র গন্তব্য হওয়া উচিত, এমত মোহ আমার নেই। যদিও সেসব জায়গায় আমার নিয়মিত গতায়াত আছে। তর্ক করে যেহেতু কাউকেই স্বমতে আনা যায়না, তাই নিজেকেই নিজের আয়ত্বে রাখার কঠিনতর কাজটি নিয়ে থাকতে স্বচ্ছন্দবোধ করি। পূর্বতন মজলিশ বা বর্তমান আড্ডাঘর প্রসঙ্গে গীতার শ্লোকটিই মনে পড়ে, "স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়/ পরোধর্ম ভয়াবহ।" প্রবুদ্ধের লেখাটি পড়লুম। সে সম্বন্ধে কিছু বলার আগে বলেনি সে যে আমার ভাতৃপ্রতিম এক প্রিয়জন সে ব্যাপারটা এ প্রসঙ্গে আমল পাচ্ছেনা। যেকোনও লেখার মধ্যেই একটা মেসেজ থাকে। আবার এ মতটিও রয়েছে সব লেখায় যে একটা মেসেজ থাকবেই তার বাধ্যবাধকতা নেই। কে কোন মতটি মানবে, সেটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় পৃথিবীর সর্বত্র মূলস্রোতের লেখালেখি মেসেজ ছাড়া হয়না। আলোচ্য লেখাটির গড়ন আমার মূলস্রোত অনুসারী মনে হয়েছে, তাই ধরে নিচ্ছি এর মধ্যে একটি মেসেজ দেবার প্রয়াস হয়েছে। সেটি কী? আমার মনে হলো সামাজিকভাবে মলিন, ক্লিষ্ট জীবনযাপন করলেও মানুষের ভিতরের কিছু চিরন্তন আকাঙ্খা, আকুলতার মৃত্যু হয়না। লেখক হয়তো এই মেসেজটিই দিতে চেয়েছেন। এর মধ্যে অবশ্য কোনও অভিনবত্ব নেই, কিন্তু সত্য রয়েছে। এবার আসি লিখনশৈলী প্রসঙ্গে। সেখানে সচেতনভাবে কিছু জার্ক দেবার চেষ্টা হয়েছে। এই টেকনিকটি আমরা উনিশ শতকে দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসি ন্যাচরালিস্ট সাহিত্য ধারার অনুগামীদের মধ্যে প্রথম দেখেছি। তাঁদের মধ্যে একজন প্রধান লেখক এমিল জোলা এ নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। পরবর্তীকালের ফরাসি ডাডাবাদীদের কাজে বা হালের মার্কিন পাংকসাহিত্যের মধ্যেও এই জার্ক দেবার পরম্পরাটিকে খুব কার্যকরী টেকনিক হিসেবে ধরা হয়। আমাদের ভাষায় 'বৈদ্যুতিক ছুতার' এই ধরনের ধারা যখন শুরু করেছিলেন, তখন বেশ কিছু ধীমান ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় একাই হয়ে যান। সুবিমল বসাক ছাড়া আর বিশেষ কেউ সৃজনশীল থাকেননি। অন্যদিকে মূলধারার লেখালেখিতে প্রধানত সমরেশ বসু, সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বা কমলকুমার মজুমদারের মধ্যে এই টেকনিক প্রয়োগের প্রয়াস আমরা দেখেছি। বিটি রোডের ধারে থেকে যুগ যুগ জীয়ে, সর্বত্রই সমরেশ এই অস্ত্রটি প্রয়োগ করেছিলেন। একবার তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার সময় আমায় বলেছিলেন যে তিনি এই প্রকরণটি ম্যাক্সিম গর্কি ও দস্তয়েভস্কির অনুসরণে করে থাকেন। আমি এ ব্যাপারে আমার ভিন্নমত তাঁকে জানাই। কারণ গর্কি বা দস্তয়েভস্কির সঙ্গে ফরাসি ন্যাচরলিস্টদের সাহিত্যচর্চার তুলনা করা আমার বাতুলতা মনে হয়। গণিকাপল্লীর 'বাস্তবতা' নিয়ে বাংলায় বহুকিছু লেখা আছে। সমরেশই তো 'যুগ যুগ জীয়ে'তে এনিয়ে দীর্ঘ গ্র্যাফিক লেখাজোখা করেছেন। সুনীল করেছেন, কমলকুমার করেছেন, একটু অন্যভাবে সন্দীপনও করেছেন। কিন্তু আমাদের ভাষায় শেষ পর্যন্ত এই ধরনের লেখার কোনও জঁর তৈরি হয়নি। ফরাসিভাষায় যেমন রয়েছে। প্রবুদ্ধ যদি বাংলা-আড্ডার নিস্তরঙ্গ 'পারিবারিক' আবহে ঝাঁকুনি দেবার জন্যই এই সংক্ষিপ্ত লেখাটি লিখে থাকেন, তবে তিনি স্বাগত। :-)

191

6

জল

কিসসা জিন্দেগী ক্যা

নিশুতি রাতে ঘড়ির কাঁটার টিক টিক চলন আর নিজের শ্বাসঃপ্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই| নাইট লাইটের আলোয় ঘরটা আলো-ছায়াময়| রাত এখন কত ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না মনোরমার| শরীর জুড়ে একটা আলিস্যি| রাতে শুতে যাবার আগে রোজকার মত একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছে‚ তবু চোখে ঘুম নেই| নির্ঘুম রাতে মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় ঘুণপোকার মত কতশত চিন্তা| এই যে সংহিতার ফিরে আসা‚ ফিরে এসেছে দেখেই খুশিই হয়েছিল মনোরমা| মেয়েটার তবে মতি ফিরেছে| কিন্তু যেভাবে ফিরে এসেছে সেটা তো চায়নি মনোরমা| প্রতি মুহুর্তে মেয়েটা একটু একটু করে ভালোবাসার কষ্টে মরছে| মেনে নিয়েছিল সে‚ সবকিছু মেনে নিয়েছিল মনোরমা| বিয়ে না করে ওদের একসাথে থাকাটা পছন্দ না হলেও তো মেনে নিয়েছিল| প্রথম প্রথম ভালো ছিল সংহিতা| দেবশঙ্করের ইচ্ছেতেই হয়ত জিম জয়েন করেছিল| এর আগেও তো মনোরমা নিজেই কতবার বলেছিল‚ জিম জয়েন করার কথা‚ একটু সাজগোজ করার কথা| ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে সংহিতা| কিন্তু দেবশঙ্করের সাথে থাকতে থাকতেই দেবশঙ্করের মতানুযায়ী নিজেকে বদলে ফেলছিল সংহিতা| বদলটা বেশ ভালো লাগছিল‚ যদিও ভিতরে ভিতরে একটা চোরা কাঁটার দংশন টের পাচ্ছিল মনোরমা| একটা চোরা অভিমান মনের ওপরে সরের মত আস্তরণ ফেলেছিল| পরের ছেলে এত প্রিয় হয়ে উঠল যে‚ সে যেভাবে নাচাচ্ছে সেভাবেই নাচছিল সংহিতা| তবু ভালো তো ছিল| তারপর কি এমন ঘটল যে সংহিতা রাতের পোশাক পরেই ফিরে এল এই বাড়িতে? দেবশঙ্করের জীবনে কি নতুন কেউ এসে গেছে? আর কি ভালোবাসে না সে সংহিতাকে? এইসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল| আর তারসাথেই ঘুণপোকার মত মাথার ভিতরে উথলে উঠছিল ঠিক তেত্রিশ বছর আগের স্মৃতি| ঠিক একইভাবে সেও একদিন ফিরে এসেছিল গৌতমের ঘর ছেড়ে‚ কোলে তখন সংহিতা আর রুপসিতা তখন বছর পাঁচেকের| দোষ ছিল তার‚ মস্ত বড় দোষ| পরপর দুটি মেয়েকে জন্ম দেবার দোষ| মেয়ে মাটির ঢিপি‚ তাকে জন্ম দিলে তো শাস্তি পেতেই হয়| লম্বা‚ ফর্সা‚ উচ্চশিক্ষিত‚ সফল চাকুরে গৌতমের মা তার মত মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে বরপণ উসুল করেছিল ভালোমত| মনোরমার মুখ-চোখ কাটা কাটা হলেও গায়ের রঙটি পেয়েছিল মায়ের মত কালো ‚ মা বলত বার্নিস| তার ওপর উচ্চতাও গড়পড়তা বেশি বলেই বর জুটছিল না| তাই গৌতমের মা ঝোপ বুঝে কোপটা মেরেছিল| কি লাভ হল অত বরপণ দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে? সেই তো ফিরে আসতেই হল| বরপণ দিয়ে বিয়েটা করতে চায়নি মনোরমা| শুধুমাত্র একটা বিয়ের জন্য বাপ-মাকে কাঙাল করে দেবে এটা মেনে নেওয়া বেশ কঠিন ছিল| আজকের দিন হলে হয়ত রুখে দাঁড়ানোটা সহজ হত‚ কিন্তু তখন আত্মীয়-স্বজন যেভাবে উঠে-পড়ে মা'কে কথা শোনাতে শুরু করেছিল‚ তাতে হাতের ওপর হাত রেখে বিয়েতে রাজী হওয়া ছাড়া তেমন কিছু মনেও আসেনি| সংহিতা হবার পরপরই শ্বাশুড়ি আর গৌতমের ব্যবহার বদলে গেছিল| শ্বাশুড়িকে নিয়ে ভাবেনি সে| আগেকার দিনের মানুষ‚ মনের মধ্যে ভরে দেওয়া চিন্তা-ভাবনা নিয়ে চলছিলেন| কিন্তু গৌতম সে তো হাল আমলের লেখাপড়া জানা লোক| সে কিভাবে দুই সন্তানের দায় এককভাবে তার ওপর চাপাতে পারে ভাবতেই পারেনি মনোরমা| সদ্যজাত মেয়েকে কোলে করা তো দুর‚ ঘরেই ঢুকত না| মা-ছেলে একরকম তাকে একঘরে করে দিয়েছিল| যে রুপসিকে এত ভালোবাসত‚ তাকেও কাছে ডাকত না| ছেলেমানুষ মেয়ে বুঝত না‚ থেকে থেকেই বাপের কাছে ঘেঁষতে চাইত| কিন্তু গৌতম তাকে পাত্তা দিত না‚ আগের মত কোলের ওপর তুলে চুমু খেত না‚ আদর করত না‚ আবার যে খেদিয়ে দিত তাও না| রুপসি একদিন কিভাবে যেন বুঝে গেল বাবা নামক মানুষটা তাকে পছন্দ করছে না| একটু একটু করে কিভাবে যে ঐটুকু বাচ্চা নিজের মনের কষ্টটাকে জয় করে নিল আজও সেটা অবাক করে| এসব সইয়েই তো ছিল দেড়টা বছর বাইরের লোকের মত| কথা বলার অনেক চেষ্টা করেছিল গৌতমের সাথে| ফিরত এত রাতে আর বেরিয়ে যেত এত সকালে যে দেখাই হত না| তারপর একদিন নিজে এসেই কথা বলল গৌতম| 'মা চাইছেন আমি আর একটা বিয়ে করি?' 'তুমি কি চাইছ?' 'মা যা চাইছেন'| 'তোমার নিজের কোন চাহিদা নেই?' 'না‚ নেই| মা চেয়েছিলেন তাই তোমায় বিয়ে করেছি| মা এখন চাইছেন আবার বিয়ে করি'| 'শুধু মা কেন‚ আসলে তুমিও চাইছ আরও একটা বিয়ে করতে|' চিড়বিড়িয়ে উঠেছিল মনোরমা| 'যা মনে কর|' কোনো মানুষ কি এতটা নিস্পৃহ হতে পারে| শুধু মা চাইছেন বলেই বিয়ে করেছিল‚ না হলে করত না| মা চাইছে বলে আবার একটা বিয়ে| 'আমার দোষটা কোথায়?' 'তুমি পুত্রসন্তানের মা হতে অপারগ তাই|' 'তা সে দায় কি আমার?' অপর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর তখনি আসে না| সময় বয়ে চলে| তারপর বলে‚ 'মায়ের মতে তুমি পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে পারবে না|' 'তা যাকে বিয়ে করবে সে পারবে পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে?' 'জানি না| কিন্তু মা চান‚ আর তুমি ভালো মত জান‚ মা যেটা চান আমি সেটাই করি| তাই তুমি এককালীন খোরপোশ নিয়ে আমাকে মুক্তি দাও| মিউচুয়াল সেপারেশনটা হয়ে যাবে|' 'আর মেয়েরা? তাদের দায়িত্ব কে নেবে?' 'আমি নেব না| নিতে পারতাম কিন্তু‚ মা চাইছেন না তাঁর কোনো নাতনীকে নিতে| আমি কি করব বলো| তুমি নিয়ে যাও|' 'আমি কোথায় যাব? মায়ের কাছে? এত বরপণ নিয়ে বিয়ে করলে আর এখন বলছ চলে যেতে| সেপারেশন দিয়ে দিতে| এত সহজে আমি চলে যাব‚ আমি ছেড়ে দেব তোমাদের?' 'কেন শুধু শুধু মুখে কালি মাখতে চাইছ?' ঠান্ডা গলা থেকে যেন শব্দগুলো ঝরে পড়ে| চমকে ওঠে মনোরমা| কি বলতে চাইছে গৌতম? কিসের কালি? কোন কালি? অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে| 'নিজের আর মেয়েদের ভালো চাইলে ঝামেলা পাকিও না| আমার কিন্তু তোমাকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করতে বেশি সময় লাগবে না|' কথা হারিয়ে ফেলেছিল মনোরমা| গৌতম এত নীচ কোনদিন তো ধারনাই করতে পারেনি| অথচ মন-প্রাণ দিয়ে এই মানুষটাকেই ভালোবেসেছিল| 'দরজা খোল দিদি‚ সই-এর বড্ড জ্বর| একটা ওষুধ দে|'| ছিঁড়ে যায় চিন্তাসূত্র সুরমার দরজা ধাক্কানিতে| ধড়মড় করে উঠে বসে মনোরমা| মেয়েটার জ্বর| হন্তদন্ত হয়ে ড্রেসিং টেবলের ড্রয়ারটা খুলে একটা প্যারাসিটামল বার করে নিয়ে দরজাটা খুলে দেয়| 'কত জ্বর দেখেছিস?' 'জ্বরটা ওঠা নামা করছে| এখন একশ দুই য়ের কাছাকাছি| জলপট্টি দিচ্ছিলাম| ভাবলাম কমে যাবে| কমেও গেছিল| কিন্তু আবার এখন বেড়েছে| তাই ভাবলাম ওষুধটা খাইয়ে দি| তুই শুয়ে পড়| আর কাঁদছিস কেন? সই ভালো হয়ে যাবে|' বলে সুরমা নিজের ঘরের দিকে চলে যায়| মনোরমা চোখের কোনে হাত দিয়ে দেখে কখন যেন চোখ বেয়ে জল গড়িয়েছে| তেত্রিশ বছরেও শুকিয়ে যায়নি কষ্টের ধারাস্রোত| .. ক্রমহ্স|

303

21

Ranjan Roy

আলো-অন্ধকারে যাই

শেষ দিন।অদ্যই শেষ রজনী। রাত্রে ক্যাম্প ফায়ার। কালকে শুধু ইন্টারফে্স- ভ্যালেডিকশন, বিদায় নেয়া, ফিরে চলো আজ আপন ঘরে-- ইত্যাদি। সবাই সময়মত এসেছে। ওয়ালিয়া , থুড়ি অ্যানাকোন্ডা, আজ আবার আধশোয়া হয়ে শেষনাগের শয্যায়। ও কি বুঝতে পেরেছে যে বাবু হরিদাস পাল আজ ওকে ঝাড়বে বলে কোমর কষে এসেচে? সবাই উশখুশ করচে, জয়ন্ত সবার ফর্মগুলো নিয়ে দেখচে যে কোন ডেটা বাদ পড়েছে কি না! হরিদাস পালের গলা শুকিয়ে গেছে। পেটের মধ্যে এক ডজন ইঁদুরের ছুটোছুটি। পর্দা ওঠার আগে মেক আপ নিয়ে উইংসের মধ্যে দাঁড়িয়ে যেমন মনে হয় আর কি! আর কত দেরি করবে হরিদাস পাল?---- গুরু, হো যা শুরু! কোন স্টার্টার নেই, নিজেই নিজেকে স্টার্ট দাও। রেডি, অন ইয়োর মার্ক, সেট তো অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, এবার--গো! আরে, কি হল? গো- ইন্ডিগো-গো! ---" দোস্তোঁ, আমার কিছু বলার ছিল। সময় বেশি নেই, আপনাদের সবার মনোযোগ আশা করতে পারি কি? বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না। বেশ। গতকাল আমাদের মেন্টর ওয়ালিয়া সাহেব এই ক্লাসরুমে আমার সম্বন্ধে কিছু উক্তি, কিছু বক্তব্য রেখেছেন। সেটা ওনার প্রেরোগেটিভ। কিন্তু সেগুলি সত্যি হলে বলার কিছু ছিল না। আমি কাল সারারাত ওনার বক্তব্য, তথ্য, যুক্তি নিয়ে অনেক ভেবেছি। না, আমার মনে হয় নি উনি যা যা বলছিলেন সেগুলো নির্বিবাদ তথ্যের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। "দেখুন, যিনি আমার ভগ্নিপতি তিনি আমাকে শ্যালক সম্বোধনে আপ্যায়িত করতেই পারেন, আমি আহ্লাদে গলে যাবো। কিন্তু তিনি যদি আমার বোনকে বিয়ে না করে থাকেন তাহলে আমি কথাটাকে গালাগাল অর্থেই নেব। উনি এই টি-মেথডের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন যে কারো সম্বন্ধে কিছু ফিডব্যাক দিতে হলে তা ইম্প্রেসনিস্টিক না হয়ে ডেটা বেসড হতে হবে। কিন্তু উনি কি করেছেন? আমি দেখাচ্ছি যে আমার সম্বন্ধে ওনার অভিযোগগুলো সব মিথ্যে, আদৌ এ কদিনের ডেটা ওনার বক্তব্যকে সাপোর্ট করে না। "প্রথম, আমি সবসময় নিজেকে ফোকাসে রাখার চেষ্টা করি। তাই সেদিন ওনাকে দেখিয়ে জলের বোতলগুলো ভরে রাখছিলাম। আশ্চর্য্য? আমি গ্রুপ-ফিলিং থেকে ওই কাজটা করলাম তাতেও দোষ? আপনারাই বিচার করুন। "দ্বিতীয়, আমি জয়ন্তকে চোখের জল ফেলতে দেখে রুমাল এগিয়ে দিলাম তাতেও উনি আমার ভন্ডামি দেখতে পেলেন! আমি মশাই রুমাল-টুমাল বেশি ব্যবহার করিনা। গতবার বেসিক ল্যাবের কোর্স করার সময় মেন্টর শিবশংকর সিং কে দেখেছিলাম একটি মেয়ের চোখ মোছার জন্যে রুমাল এগিয়ে দিতে। আমি ভেবেছি সেটাই পলিটিক্যালি করেক্ট বিহেভিয়ার। এখন আমার মেন্টর, যিনি গোটা ওয়ার্কশপের ডীন বটেন, বলছেন সেটা ভুল! আমি সবাইকে আমার তুলনায় দুর্বল ভাবি? যাচ্চলে! "তৃতীয়, আমার বিনীতাকে হাগ্ করার বডিল্যাংগোয়েজে নাকি আমার মেয়েদের প্রতি পেট্রোনাইজেশন প্রকাশ পেয়েছে! আমি নাকি সেই সময় ওর পিঠে যেভাবে হাত বোলাচ্ছিলাম---! মাইরি,এমন গাঁজাখুরি অ্যানালিসিস বাপের জন্মে শুনি নি। হতে পারে উনি ভারতবর্ষের নামকরা বিহেভিয়ার স্পেশালিস্ট, কিন্তু আমিও নাটকের সঙ্গে যুক্ত। হ্যান্ড সিগন্যাল, ফুট সিগন্যাল-- আমরাও কিছু কিছু শিখেছি। আমাকে একটু ডেমো দিতে অনুমতি দিন। ( অ্যানাকোন্ডার চ্যাটালো মাথা থেকে দুটো কুতকুতে চোখ নির্নিমিষে আমাকে দেখতে থাকে।) বিনীতা, তুমি গোটা ওয়ার্কশপে আমাকে অনেকবার সাহায্য করেছ, আজ শেষবারের মত একটু সাহায্য কর। উঠে দাঁড়াও।" বিনীতা শুভা মুদগল ভূতগ্রস্তের মত উঠে দাঁড়ায়। হরিদাস পাল মাপা পায়ে ওর দিকে এগিয়ে যায়, ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ওর উন্নত পাঞ্জাবী পুষ্ট বুক হরিদাস পালের বুকে পিষ্ট হয়। কিন্তু হরিদাস কিছুই অনুভব করে না। বিনীতার গলা দিয়ে কি চাপা গোঙানির আওয়াজ বেরোল? না বোধহয়। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে হরিদাস পালের ক্যাম্পেন, যেন দৈনন্দিন রেলযাত্রীদের মাঝে লজেন্স বেচছে কোন ক্যানভাসার। ---" দেখুন, আপনারা সবাই দেখুন, আমার হাত বিনীতার পিঠে সমান্তরাল রেখায় ঘোরাফেরা করছে। এর ভাষা বন্ধুত্বের, সিগন্যাল ভরসা দেয়ার। আই গেট য়ু ফ্রেন্ড-বলার। যদি পেট্রনাইজিং হত? তাহলে এইরকম মুভমেন্ট হত, ভার্টিক্যাল, নট হরাইজন্টাল।" এই বলে ও আবদুল্লাকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে ওর পিঠ ব্র্যাভো বলার ভঙ্গিতে থাবড়ে দেয়। --" কাজেই আমার বক্তব্য, ওনার শেখানো মেথড অনুযায়ী খতিয়ে দেখলে , আমি আদৌ আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষমতার ধামাধরা, স্কীমার নই। হয় উনি বিশ্লেষণে ভুল করেছেন, নয় অন্য কোন মোটিভের বশবর্তী হয়ে আমাকে অপমান করেছেন। আমি এথিক্স কমিটিতে যাব না। আপনারাই বিচার করুন।" দশ মিনিট কেউ কোন কথা বলে না।অ্যানাকোন্ডার ভাবলেশহীন মুখ। হটাৎ বিনীতা মুখ খুলল। --" হরিদাস, আমি কিছুই বুঝছি না।খালি এটুকু বুঝেছি যে এই মুহুর্তে তোর মনের স্থায়ী ভাব বা ইমোশন হল ক্রোধ, অ্যাংগার! আর তোর ডেমো নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। এটা আদৌ সিন্সিয়ার বিশ্লেষণ নয়। বরং একটি ওয়েল-রিহার্সড স্কিট, কলেজের সোশ্যালে যেমন হয়, বা বড়জোর টিভির রিয়েলিটি শো।" জয়ন্ত চশমা সাফ করতে থাকে।---আপনি একটু কনফিউজড, হরিদাস । নিজের বেলায় হিয়ার-অ্যান্ড-নাউ মেথডকে ঠিক করে প্রয়োগ করতে পারেন নি। শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে দেখছেন। গাছ দেখছেন, জঙ্গলকে নয়। রামজীবন--" আমার খুব খারাপ লাগছে আপনার গতবারের মেন্টরকে টেনে আনায়। উনি তো আজকে সামনে নেই। ওটা তো দেয়ার -অ্যান্ড-দেন হল, হিয়ার -অ্যান্ড-নাউ নয়।" হরিদাস পালের সাজানো বাগান শুকিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক ব্যাটসম্যান হেলায় উইকেট দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে নীচু গলায় আবদুল্লা কথা বলছে--" দাদা, আমি শকড্; এ কোন চেহারা দেখছি আপনার! আপনি বিনীতাকে আপনার নাটকের প্রপস্ এর মত ব্যবহার করলেন? আপনি কি গিরগিটি? এই দাদার জন্যে আমি ম্যাডামের সঙ্গে ঝগড়া করে নিয়ম ভেঙে রুম বদলে পাশের খাট দখল করলাম? হায় আল্লা!" এবার হাতে বল নিয়েছেন ওয়ালিয়া। না, টেল-এন্ডারকে কেউ দয়া করে না। সোজা বডি লাইন লক্ষ্য করে শর্ট পিচ বল উড়ে আসছে। ---- আমার পাল্টা জবাব দেয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার অবজেক্টিভ ডিবেট জেতা নয়। মনের দরজা-জানালা-গিঁট খোলা। তাই কিছু বলছি। এক, আমার কলিগ শিবশংকর যদি কোন সেশনে কোন পার্টিসিপেন্টকে কাঁদতে দেখে রুমাল এগিয়ে দিয়ে থাকেন তবে তিনি ভুল করেছেন। একটু কাঁদলে কোন ক্ষতি হয় না। যদিও আমি ঠিক বিশ্বাস করিনা যে ও এমন করেছে। হরিদাস পাল আউট অফ কন্টেক্স্ট অনেক কথা বলে থাকে। তবু আমি ওকে জিগ্যেস করব। কাউকে দুর্বল মনে করা উচিৎ নয়। মেয়ে বলে তো আরো নয়, তাহলে জেন্ডার বায়াসের প্রশ্ন উঠবে। দুই,আমাদের রায়মহাশয় শুধু বুদ্ধিমান নয়, অত্যন্ত ধূর্ত এবং শাতির দিমাগের লোক। সে আমার শিক্ষাকে আমারই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ভাল গুরুদক্ষিণা দিয়েছে। আমার অথরিটি, ইন্টিগ্রিটিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমার বিরুদ্ধে গোটা ব্যাচকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। এমনকি অপ্রত্যক্ষ ভাবে এথিকস কমিটিতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। এত অহংকারী লোকের উদ্ধারের আশা নেই। এই ওয়ার্কশপে ও কিছুই শেখেনি, কারণ ও সহজ সরল নয়। আমারই ব্যর্থতা! সবাই কথা বলছে। অনেক কথা। হাসি , ঠাট্টা, ছোট ছোট চুটকি।কিন্তু হরিদাস পালের কানে কিছু ঢুকছে না।শব্দ , শুধু শব্দ। যার কোন অর্থ হয় না, আওয়াজ মাত্র। এর মধ্যে কেউ কাউকে চাঁটি মারার কথা বলল, কেউ জল নিয়ে এল। কেউ হেসে উঠল। কিন্তু ও কেন কিছু বুঝতে পারছে না? এরা কোন ভাষায় কথা বলছে? এসবই কি ওয়ালিয়ার নির্দেশ? এরা কারা? এদের চেহারা অচেনা লাগছে কেন? মাথার মধ্যে বড্ড যন্ত্রণা, কেউ যেন চোখে লংকাবাটা দিয়েছে। জলের বোতলটা কোথায় গেল? কেউ সরিয়ে নিয়েছে? চোখে বেশ খানিকটা জলের ছিটে আর মাথায় জলের ঝাপটা পেয়ে হরিদাস পাল যখন উঠে বসল তখন ওয়ালিয়া ওকে চেপে আবার শুইয়ে দিলেন। ভিজে জামা, অস্বস্তি লাগছে, কিন্তু ওয়ালিয়া নাড়ি ধরে রয়েছেন। এবার বল্লেন-- ভয়ের কিছু নেই। কেউ ক্যান্টিনে গিয়ে আমার নাম বলে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে এস। তোমরা এবার গল্প কর , আমি চললাম। ঘন্টাখানেক কেটে গেছে। সবাই হরিদাস পালকে ঘিরে বসে আছে। জয়ন্ত ওকে জড়িয়ে ধরে আছে। --- আমরা তোমার বন্ধু, আমরা চাই তুমি নিজেকে বুঝতে চেষ্টা কর। নিজের ওপর ওয়ার্ক কর। খালি ডুয়িং-ডুয়িং নয়, বিয়িং এর সাথে একাত্ম হও, নিজে জীবনে কি চাও ভাব, আর কি করছ তাও। -- এমন কেন হল? তোমরা সবাই যেটা বুঝতে পারছ, যেটা দেখতে পারছ, আমি কেন পারছি না? একি সেই এইচ জি ওয়েলসের গল্প? আমি দৃষ্টিহীনের দেশে এসেছি? নাকি আমারই চোখ গেছে? শুভা মুদগল হাসে। --- তিমির, সবাই বইকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বইয়ের সাচ্চা-ঝুটা খতিয়ে দেখে। আর তুমি এমন আজব প্রাণী যে জীবনকে বইয়ের ফর্মূলার সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা কর। নেপালী ছেলেটি প্রস্তাব করে যে আজকের সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ারে আমাদের গ্রুপের তরফ থেকে কালচারাল প্রেজেন্টেশন হবে দাদার মোনো-অ্যাক্টিং। সবাই হেসে ওঠে। এর পরে আরও? কৈলাশ বলে-- আমি কিন্তু সিরিয়াস। তবে আমার একটা শর্ত আছে। --- কি শর্ত? ---- দাদা কথা দিন যে আজ রাত্তির আপনি নিজের ওপর ওয়ার্ক করবেন। তারপর কালকের প্রথম সেশনে আপনার মুখ থেকে মেঘ কেটে যাবে। যদি আমার সাহায্য চান তো আমি আপনার সঙ্গে রাত জাগতে রাজি, লাল চা করে খাওয়াতে, সিগ্রেট এনে দিতে রাজি। কি হল? চোখে কিছু একটা পড়েছে, বড্ড জ্বালা করছে। ও কৈলাশের হাত ধরে। দুপুর একটা। লাঞ্চের আগে বিদায়-সম্ভাষণ। বিশাল কমিউনিটি হলে সবগুলো গ্রুপ মিলে জনাচল্লিশেক ছেলেমেয়ে আর দশজন ফেসিলিটেটর। সবাই মাটিতে বসে। সবাইকে একটি করে চিরকুটে লিখতে হবে ও এখান থেকে কি নিয়ে যাচ্ছে, আর এখানে কি ছেড়ে যাচ্ছে। সেটা বাই টার্ন সবার সামনে পড়ে শুনিয়ে তারপর বিরাট বাক্সটাতে ফেলে দিতে হবে। ফেসিলিটেটররাও এর হাত থেকে ছাড় পাবেন না। ওয়ালিয়ার পালা এলে উনি উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন--- আমি এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি আমার টি-গ্রুপ মেথডের ওপর পুরনো আস্থা, এ অসাধ্য সাধন করতে পারে। আর ছেড়ে যাচ্ছি আমার খামখেয়ালিপনা। হরিদাস পালের পালা এল। ও উঠে দাঁড়িয়ে দেখল ওর দিকে তাকিয়ে আছে ওয়ালিয়া, শিবশংকর ও আর একজন মহিলার চোখ , যার সঙ্গে ইচ্ছে থাকলেও আলাপ করা হয়ে ওঠেনি। --- আমি ছেড়ে যাচ্ছি আমার ঔদ্ধত্য , যার কারণ আমি সাথী মহিলার সঙ্গে অসভ্য ব্যবহার করেছিলাম। আর এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি নিজের মনের অন্ধকার দিকটাকে ভাল করে দেখার সাহস। এবার কোলাকুলির পালা। ওয়ালিয়া নিজেই এগিয়ে এলেন। -- কাল সন্ধ্যে থেকে তোমাকে দেখছি। কালচারাল প্রোগ্রামের আসরে তুমি নিজের টিমকে এগিয়ে দিয়েছ, নিজেকে নয়। আরও কাজ করতে হবে নিজের ওপর। জীবনে কি চাও? অনেক নাম? খ্যাতি? নামকরা এইচ আর ট্রেনার? --- না স্যার! ওসব যা হবার হবে। না হলেও কোন দুঃখ নেই। জীবন শেষ হয়ে যাবে না। আমি চাই নিজের কাছে সৎ থাকতে। ---- বেশ তো, লোককে ভাল বাসো, কিন্তু দয়া করবে না। অযাচিত সাহায্যও নয়। এসব দুপক্ষকেই হ্হোট করে। আর কখনো দরকার মনে করলে আমাকে ই-মেইলে যোগাযোগ করতে পারো। আমি তোমাদের জন্যে আছি। একের পর এক গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। কোনটা ইটার্সি রেল স্টেশন, কোনটি বেরাগড় এয়ারপোর্ট। শোনা যাচ্ছে টুকরো গানের কলি, হাসি, ঠিকানার আদান-প্রদান। আবার দেখা করার শপথ। হরিদাস হাসে। ও জানে যে দুবার একই নদীতে স্নান করা যায় না। গাড়িতে উঠতে উঠতে বিনীতাকে ডাকে। -- অ্যাই, এদিকে আয়। তোর সঙ্গে আলাদা করে কথা আছে। সবাই হাসে। -- কি রে বল্? -- একটা কথা কাউকে বলবি না? একটু আগে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলি না, আমি কিন্তু আজ চান করিনি। --- দাঁত মেজেছিলি তো? তাহলেই হল। আমি না হয় দিল্লি পৌঁছে আবার চান করে নেব। (সমাপ্ত)

697

123

দীপঙ্কর বসু

এক দুপুরের গপ্পো

উদ্দেশ্যহীন টোটোকোম্পানী করতে বেরিয়ে হাওড়াগামী একটা বাসে চেপে বসেছিলুম|যেহেতু কোথায় যাব তার স্থিরতা ছিলনা ‚তাই টিকিট কেটেছিলাম বাসের অন্তিম গন্তব্য হাওড়া অবধি|কিন্তু মাঝপথে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সামনে ট্র্যাফিক সিগ্নালে বাসটা কিছুক্ষনের জন্য আতকে পড়তেই আমার মাথার পোকাগুলো নড়ে উঠল |নেমে পড়লুম বাস থেকে| নামতে নামতে কানে এলো বাস কন্ডাক্টারের বিস্মিত কন্ঠের প্রশ্ন - "আরে আপনি তো হাওড়ার টিকিট কাট্লেন ‚এখানে নেমে পড়ছেন কেন.|" কেন নেমে পড়ছি সেকথা কন্ডাক্টারদাদাকে ক্যামনে বোঝাই |তাই জোড়াতালি মার্কা একটা জবাব বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে- "আরে হঠাৎ এখানে আমার একটা জরুরী কাজের কথা মনে পড়ে গেল.|" আমার কৈফিয়ৎ কন্ডাক্টারের কানে গেল কিন বা গেলেও সে কি বুঝল তার পরোয়া না করেই হাঁটা দিলাম রাজভবনের পাঁচিলে ঘেঁষে যে রাস্তাটি চলে গেছে বিধান সভার দিকে সেই পথে| এখানে পথের ধরে অনেকগুলি ব্রিটিশ আমলের পুরোন বাড়ির সার |এই বাড়িগুলি আমাকে ভেতর থেকে প্রবল ভাবে আকর্ষণ করে বরাবরই|শীতের রোদ্দুর মেখে পথচলাটা বেশ উপভোগই করছিলাম|হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে বিধানসভা ভবন কে পিছনে ফেলে এসে দাঁড়ালাম চৌরাস্তার মোড়ে| রাস্তা পার হবার আগে ট্র্যাফিক সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নজরে পড়লো রাস্তার উল্টো দিকে সেন্ট জন্'স চার্চের উঁচু সূচালো ক্লক টাওয়ারটি |ব্যাস‚আমার গন্তব্য স্থির হয়ে গেল এক লহমায়| চার্চের খোলা গেট দিয়ে ঢুকে দশটাকার টিকিট কেটে অনুমতি পেয়ে গেলাম চার্চের মধ্যে প্রবেশের এবং তার চেয়ে বড় কথা অবাধে যত খুশী যেখানে খুশী ছবি তোলার অনুমতি পেয়ে |আমাকে আর পায় কে !! চার্চ প্রান্গনের মোরাম বাঁধান রাস্তা ধরে ‚বাগান জুড়ে ডালিয়াফুলের মেলাকে তখনকার মত এক পাশে রেখে উপস্থিত হই মূল ফটকের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা চার্চের পোর্টিকোতে|কলকাতায় এটিই সম্ভবত প্রথম Anglican church যার স্থাপনা হয়েছিল ১৭৮৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে| পোর্টিকো থেকে উপাসনা মন্দিরে প্রবেশের মুখেই দেখলাম দুটি প্রস্তর ফলক জানান দিচ্ছে শোভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব এর দান করা জমির ওপরে বেঙ্গল ইন্জিনিয়ার্সের স্থপতি‚ জনৈক জেমস অ্যাব এর পরিকল্পনা মাফিক ভবনটির নির্মান হয়েছিল|নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল পাবলিক লটারির মাধ্যমে| ভবনটির শুভ উদ্বোধন করেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস সায়েব| এবারে পা রাখি চার্চের উপাসনা মন্দিরে | বিশাল উপাসনা মন্দিরের প্রধান অল্টারকে মাঝে রেখে দুপাশে যূথবদ্ধ উঁচু উঁচু থামের সারি যেন উপাসনামন্দিরটিইকে তিন ভাবে বিভক্ত করেছে| একেবারে অল্টারের কাছে এক পিয়ানো বাদককে দেখলাম এক মনে পিয়ানো তে সুর তুলেছেন |সে সুরের গমগমে রেশ সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে | এ সুরের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই ‚শুধু অনুভব করতে পারছিলাম এ সুরে এমন কিছু এক মায়া আছে যা মনকে শান্ত স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে একাগ্র করে তোলে|উপাসনা মন্দিরের ছাদের কড়ি বর্গা থেকে ঝুলছে ঝাড় বাতি ‚পায়ের তলার মেঝে তে পাতা গৌড় মাল্দার ধংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করে আনা নীলচে ধুসর রঙের মার্বেল| মন্দিরের দুপাশের দেওয়ালে শ্বেত মর্মরের মূর্তি |অল্টারের বাঁ পাশে দেওয়ালে ঝুলছে লাস্ট সাপার এর ছবি |তবে এছবি লিওলান্দোদ্য ভিঙ্চির আঁকা লাস্ট সাপার নয় |এ ছবি এঁকেছেন জোহান জোফানি | এছবিতে জোফানি বাইবেলেবর্নিত লাস্ট সাপারের কাহিনীতে কিছু ভারতীয় মেজাজ এনেছেন অলঙ্করণে| উপাসনা মন্দিরের দেওয়ালের মর্মর মূর্তিগুলিতেও আছে ভারতীয়ত্বের ছোঁয়া| একটি ট্যাবলেটে দেখা গেল এ দেশীয় সৈন্যদের সঙ্গে কোম্পানীর ফৌজের লড়াই এর দৃশ্য |অন্য একটিতে শাড়ি পরিহীতা নারী মূর্তি| চমৎ্কার ছিমছাম সাজানো উপাসনা মন্দিরে কিন্তু কিছু কিছু বয়েসের বলিরেখা চোখে পড়ল |মনে মনে হিসেব করে দেখলাম গীর্জাটির বয়েস এখন ২৩০ ন্বছর !! উপাসনা মন্দিরের বারে লাগোয়া একটুই ঘরে দেখতে পেলাম ওয়ারেন হেস্টিংসের ব্যবহার করা টেবিল চেয়ার |চেয়ারের গদির অবস্থা যদিও বয়সের ভাবে জরাজীর্ণ | উপাসনা মন্দির থেকে বাইরে এসে চার্চের উত্তরদিকের বারান্দায় এসে লেডিক্যানিং এর সূরম্য সমাধ্হি| লেডি ক্যানিং ছাড়াও গীর্জা প্রাঙ্গনে রয়েছে বহু চেনা অচেনা ইংরেজ রাজপুরুষ আর মহিলাদের সমাধি‚যার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্ব্পূর্ণ বোধ হয় কলকাতা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত জোব চার্নকের সমাধি |জোব চার্নক ছাড়াও এই প্রাঙ্গনে পেলাম জোব চার্নকের কন্যাদের ‚ব্রিটিশ নৌসেনাধক্ষ্য ওয়াট্শন ‚লর্ড ব্রবোর্ন প্রমুখের সমাধি |তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে রোমাংচকর লাগল কুখ্যাত অন্ধকূপহত্যার স্মারকটি | যদিও স্মারকটি কে তার আসল অবস্থান থেকে তুলে এনে পরবর্তীকালে এই গীর্জা প্রাঙ্গনের এক পাশে স্থাপন কারা হয়েছে| দীর্ঘক্ষন ঘোরাঘুরি করে বুঝলাম সবচাইতে বড় হল পাপী পেটের টান|তাই এক সময়ে সেন্ট জন এর কাছে ছুটি চেয়ে নিয়ে রোয়ানা দিলাম আহার্যের সন্ধানে| রাতে স্বপ্নে চার্নক সায়েব দেখা দিলেন| শুনলাম তিনি বলছেন "বাবু‚প্রভু যীশাসের প্রতি টোমার আগ্রহ দেখিয়া হামি অট্যন্ট প্রীট হইয়াছি" তার পর বিড় বিড় করে আরো কত কি বলে গেলেন বুঝতে পারলুম না

186

11

নব ভোঁদড়

স্বর্গের আগের ইস্টিশনে দুর্নীতি

https://www.nbcnews.com/news/us-news/louisiana-teacher-handcuffed-arrested-bringing-school-board-meeting-n836231 এটাকে কি দুর্নীতি বলে? স্কুল বোর্ডের মিটিঙে স্কুলের সুপারিন্টেন্ডেন্টের অত্যধিক মাইনে বাড়া নিয়ে প্রশ্ন করায় শিক্ষিকাকে হাতকড়া দিয়ে গ্রেফতার করা হল| আমাদের পিসী এর চেয়ে বেশী কি করেন? ও হ্যাঁ‚ এটা আমেরিকারই ঘট্না| একই খবর নিউ অর্লিয়েন্স টাইমস পিকিউনে‚ আরো ডিটেলে| http://www.nola.com/opinions/index.ssf/2018/01/teacher_school_board_arrest.html

391

10

Joy

রহস্যময়ী সুন্দরবনের জঙ্গলে আমরা কজন...

অনেকদিন ধরেই অভিজিত আমকে বলে আসছে ওর বাড়ীতে আসার জন্যে| আমি নিউ অলিপুরে একটা ইনস্টিউটে মাল্টিমিডিয়া শিক্ষক ছিলাম| ওখানেই ও মাল্টিমিডিয়া শিখে গত চার বছর ধরে চাকরী করছে| ওর বাড়ী পিয়ালি| ওর মামার বাড়ি ঝড়খালি| ওখানে ওর এক দিদিও থাকেন| আমি মাঝে মাঝেই বলতাম‚ তোমাদের বাড়ি গেলে সুন্দরবন যাবো| হ্যাঁ স্যার আসুন না একবার| আপনাকে আমি সুন্দরবন নিয়ে যাবো| দিন ঠিক হয়‚ আবার পরিবর্তন হয়| ওর বা আমার কাজের জন্যে| এবার ঠিক করলাম এবার যাবই যাবো| দিন ঠিক হল| ডিসেম্বরের শুরুতেই| অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সেদিনই চলে যাবো ঝড়্খালি| তাহলে রবিবার সারদিন ভালো করে ঘুরতে পারবো সুন্দরবন| পঙ্কজকে ফোনে আগেই বলেছিলাম ঘোরার কথা| আমাদের দুই বন্ধুর একটু সময়-সুযোগ পেলেই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পরা| ফ্যামিলি ট্যুর আলাদা আর বন্ধুদের ট্যুর একটু অন্যরকম| ফ্যামিলি ট্যুর অনেক চিন্ত ভাবনা করে‚ নিশ্চিন্ত‚ আরামদায়ক হতে হয়| বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ট্যুর| যেখানে যেমন খুশি থাকা‚ খাওয়ার কোন সমস্যা নেই| ফলে বছরে একটা-দুটো এইরকম বেড়ানোর মজাটা একটু আলাদা| আমি‚ পঙ্কজ‚ অভিজিত তিনজনে যাব| শিয়ালদহ সাউথে আমরা মিট করব| অভিজিত দুদিন আগের থেকেই আমাকে বার বার ফোন করে বলে দিয়েছে| কোথায় দাঁড়াব‚ কটায় ট্রেন‚ক্যানিং থেকে কি ভাবে আমরা ঝড়খালি যাব ইত্যাদি| প্ল্যাটফর্মে আমি অগে এসে ট্রেনের টিকিটা কেটে নিলাম| একটু পরেই অভিজিত হাজির| স্যার কেমন আছেন‚ বাড়ির সবাই ভালো তো? কথা সেরে পঙ্কজের জন্যে অপেক্ষা| ট্রেন যথা সময়েই প্ল্যাটফর্মে ঢুকল‚ কিন্তু পঙ্কজ এখনো এসে পৌঁছায়নি| ফোন করতে ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল আরে জ্যামে আটকে আছি| চলে এসেছি| অভিজিতের মুখে চিন্তার ভাঁজ| স্যার এই ট্রেনটা মিস করলে ক্যানিং থেকে ঝাড়খালি যাবার পরের বাসটা খুব ভীড় হয়ে যাবে| আপনাদের অসুবিধা হবে| কিছু হবে না বলে ওকে আশ্ব্স্থ করলাম| কিন্তু চোখের সমানে দিয়ে ক্যানিং লোকাল বেরিয়ে গেল| কিছুক্ষনের মধ্যেই পঙ্কজ হাজির| অথএব পরের ট্রেনের অপেক্ষা| এর মধ্যে চা-টা খাওয়া হল| পরের ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই সবাই লাফিয়ে ট্রেনে উঠছে| আমাদের লোকাল ট্রেনে যাওয়া খুব একটা হয় না| আর ট্রেনের ভিড় খুব ভয়ানক| তবু গায়ের জোরেই উঠে পরলাম আমরা| ভাগ্যক্রমে সিটও পেলাম|পার্কসার্কাস এলেই বোঝা গেল লোকাল ট্রেনের মর্মকথা| দুপাশে সিটের মাঝাখানে দশজন দাঁড়িয়ে গেল| পা টাও সারনোর জায়গা নেই| এর মধ্যেই গল্প‚ মজা| যত স্টেশন আসে ভিড় তত ঘন হয়| জানালার পাশে বসেও দম বন্ধ হয়ে আসে| বনগাঁ লাইনে ভিড় ট্রেনের ভিড় দেখেছি| মেন লাইনেও অফিস টাইমেও খুব ভ্ড়ি হয়| কিন্তু এখানের ভিড় অস্বাভাবিক| কোন ফেরিওয়ালা ট্রেনে চোখে পরল না| বোধহয় প্রচন্ড ভিড়ের জন্যে কেউ আসেনি| সোনারপুর এলেই আবার জায়াগা পরিবর্তন করতে হবে| মানে আমাদের সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের বসতে দিতে হবে| আমারা এবার উঠে পরব| ভালো কনসেপ্ট| এটা বম্বের লোকাল ট্রেনেও দেখেছি| যাইহোক আমারা ক্যানিং স্টেশনে নামলাম| স্যার তাড়াতাড়ি চলুন ঝড়্খালির বাস ওদিক থেকে ছাড়ে| তাড়াতাড়িই এলাম| বাস তখন যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা করছে| বাসেও জায়গা পেলাম| কিছুক্ষনের মধ্যেই বাস চলতে শুরু করল| আস্তে আস্তে গদখালি‚ মাতলা নদীর ব্রীজ‚ সজনেখালি পেরিয়ে যাচ্ছি| চারপাশে অন্ধকার| মাঝে মাঝেই বাস থামে যেখানে বেশ আলো‚ দোকান‚ কিছু লোক| আবার পথ চলা| ঘন্টা দেড়েক বাদে আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছালাম| অভিজিতের মামাএর বাড়ি মেন রাস্তা থেকেই দেখা যায়| বাড়িতে আসতেই বিপুল সংবর্ধনা| যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চা তেলেভাজা-মুড়ি| পরিচয় হল ওর দাদা অঙ্গদ‚ উনার স্ত্রী‚ মা বা ও ছোট্ট মেয়েটির সাথে| গল্প জমে উঠল| স্যার এক দান ক্যারাম হয়ে যাক না| না বলতে পারলাম না| খেলা এক থেকে দুই দান হয়ে গেল| রাত বাড়ে| ঠান্ডা বাড়ে| আপনারা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে নিন| কাল ভোরে উঠতে হবে আপনাদের| গরম গরম মাছের ঝাল‚ ভাত‚ ডাল| চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি| এক কথায় অনবদ্য| খাওয়া সেরে সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পরি তাড়াতাড়িই| সকালে ঘুম ভেঙ্গে যায় হালকা রোদের মৃদু উত্তাপে‚ পাখিদের কলকাকলির টানে| পরের দিন সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পরলাম| ভ্যান পাওয়া যায় নদীর তির অবধি‚ কিন্তু অভিজিত বলল স্যার হেঁটে চলুন গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে| পথের মধ্যে পুকুর‚ ধান জমি ফেলে আমরা চলেছি| পুকুরে আলো করে পদ্ম আর শালুক ফুল ফুটে আছে| নরম রোদের চাদরে ধান ক্ষেত মোড়া| কিছুক্ষন চলার পর ঝড়খালি বাজারের কাছে এসে পৌঁছালাম| এখনে এসে দেখি হরেক রকমের মাছ নিয়ে জেলেরা বসে আছে| এত বড় চিঁংড়ি এর আগে দেখিনি| গলদা‚ বাগদা‚ বান মাছ‚ পার্শে‚ খয়রা আর কত মাছ| অনেক মাছের নামও জানি না| নদীর পাড় ধরে কিছুটা হেঁটে‚ ফোটো তুললাম আমরা| এর মধ্যে অভিজিতের এক বন্ধু ঝড়খালিতেই থাকে ও আমাদের সঙ্গে এসে ভিড়ল| ঐ ছেলেটিও আমাদের নৌকা ভ্রমনের সঙ্গী হবে| কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরই অভিজিতের জামাইবাবু নৌকা নিয়ে হাজির হলেন| আরও দু-চারজন জামাইবাবুর বন্ধু আমাদের সঙ্গে বেড়িয়ে পরলাম| নৌকাতে উঠে পড়লাম আমরা| ওঠার আগে ডিজেল কেনা হল নৌকার জ্বালানি হিসেবে| কত দেরী হবে জানি না| দের্রী হলে নৌকাতেও রান্না-বান্না হবে| সব নিয়ে নেওয়া হল| বেশ একটা অদ্ভূত থ্রিলিং হচ্ছে| ভটভট শদ করে নৌকা চলতে শুরু করল| দুপাশে জল আর জল| মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপ দেখা যায়| কোনটায় মনুষ্য বসতি আছে‚ কোনটায় আবার জন মানবহীন‚ ওখানে যাবার পারমিশন নেই| বাদা বনের জঙ্গলে‚ নৌকা মাঝে মাঝে আটকে যায় ঝোঁপ-জঙ্গলে‚ খাঁড়ির মধ্যে দেখি একটা নৌকায় দুজন জাল নিয়ে বসে আছে| জেলে বলে মনে হল| আজ সারা দিন রাত জাল ফেলে কাল মাছ তোলা হবে| ওদের রেখে আবার গভীরে যাওয়া শুরু হল| জামাইবাবুকে গল্প বলার অনুরোধ করলাম আমরা| জলে জঙ্গলে ঘোরার গল্প| বাঘ দেখার গল্প| জামাইবাবু লজ্জা পেয়ে যান| বলেন কি বলবো আপনাদের‚ এখানার লোকেরা খুব কষ্ট করে বেঁচে থাকে| দু-চার মাস নৌকা নিয়ে সাগরের জলে আমাদের দিন-রাত এক করে মাছ ধরে নিয়ে আসি| ঐ সময়্টা কিছু টাকা-পয়সা হাতে আসে| আবার কিছুদিন বাড়িতে থাকা| কেউ কেউ আবার মধু আর কাঁকড়ার জন্যে গভীর -জঙ্গলে চলে যায়| কেউ ফিরে আসে| কেউ ফেরে না| পরে ওর আধ-খাওয়া দেহটা পাওয়া যায়| কখনো বা কঙ্কালটা পাওয়া যায় ঝোপের আড়ালে| মানুষ খেকো বাঘ সাবাড় করে দিয়েছে| বিশ্বাস হয় না| কি করে মানুষ এখানে লড়াই করে বেঁচে আছে| রোদের তেজ বাড়ে| জলের উপর রোদ পরে রুপোর মত চকচক করে| নৌকা ঢেউ তুলে এগিয়ে চলে| অহংকারীর মত‚ কাউকে পাত্তা না দিয়ে| এবার একটা দ্বীপে আমরা নৌকা ভিড়ালাম| এখানে মানুষের বসবাস আছে| আমারা কাদা| জল-বাদা বনের জঙ্গলে নামা হল| এখানে আমাদের ফটো সেশন শুরু হল| কাছের গ্রাম থেকে ডাব পেড়ে খাওয়া হল| সঙ্গে কিছু পেয়েরা নিয়ে এসেছিলাম আমরা‚ সেটাই নুন দিয়ে মেখে খাওয়া হল| আবার নৌকায় ওঠা হল| নৌকা চলা শুরু করল| দূরে আরও কিছু নৌকা দেখা যায়‚ খুব কম বড় নৌকা ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছে| আমরা তো ট্যুরিস্ট নই| আমরা সে ভাবে আসতেও চাইনি| বেলা পরে আসে| এবার রোদ নরম হয়| শীত শীত করে| জামাইবাবু সুজিত হালদার বলেন এবার দেরী হলে ভাঁটা নেমে আসবে| ভাঁটার টান আসছে| এবার আমাদের ফিরতে হবে| নাহলে মাঝরাত অবধি আটকে থাকতে হবে| কাদাময় সুন্দরী‚ গরানের জঙ্গল| খুব নিস্তব্ধতা| ভারী রহস্যময় পরিবেশ| সুজিত বাবুর বাঘের মুখের থেকে ফিরে আসার গল্প শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়| কি ভঙ্ককর অথচ সুন্দর এই অরন্য| এই জঙ্গল কোথয় গিয়ে শেষ হয়েছে‚ কিছুটা ইন্ডিয়া তে বেশির ভাগ টাই বাংলাদেশে| শুধু জল আর জল| এখনকার লোকগুলোর জল‚ জঙ্গল‚ বাঘ‚ কুমীরের সাথে ঘর সংসার| মাঝে মাঝে এই সব নদী‚ জঙ্গলের গ্রাম গুলোতে হিংস্র বাঘ হানা দেয়| গরু‚ ছাগল নিয়ে চলে যায় নদী পেরিয়ে গভীর জঙ্গলে| আয়লা ঝড়ে অনেক বদলে দিয়েছে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা| নোনা জল বদলে দিয়েছে জমির চরিত্র| পাড়ে এসে নৌকা রেখে এগোয় আমরা| সুর্য অস্ত যাবার সময় হয়ে আসে| গোধুলির আলোয় নদী সোনার মত সেজে উঠেছে| নৌকা ভ্রমণের যাবার সময়ই আবার সুজিতবাবুর স্ত্রী আমাদের খাওয়ার নেমতন্ন করে দিয়েছেন| বারে বারে বারন করা সত্ত্বেও| নৌকা ভ্রমণ সেরে সুজিত বাবুর বাড়ি আসা হল| ওনার স্ত্রী আমাদের জন্যে দু-তিন রকমের মাছের নানান পদ রান্না করে খেতে দিলেন| সুস্বাদু খাবার আর খিদেও পেয়েছিল খুব| জমিয়ে খাওয়া হল| একটু বিশ্রাম নিয়ে অঙ্গদ দার বাড়ি যাবার জন্যে তৈরী হতে হবে| আমাদের রাস্তা পর্যন্ত এসে টোটোতে উঠিয়ে দিলেন সুজিতবাবু আর ওনার স্ত্রী| আবার আসার জন্যে বার বার অনুরোধ করলেন| এবার এলে পরিবার নিয়ে আসবেন স্যার| আমারা সবাই বড় নৌকা নিয়ে দু-তিনদিনের জন্যে সুন্দরবন ঘুরে দেখব| খুব মজা হবে| নৌকাতেই রান্না‚খাওয়া-দাওয়া হবে| সুজিত বাবুর বড় জামাইএর ও নৌকার ব্যব্সা| ট্যুরিস্ট নৌকা আছে খান দুয়েক| কোন অসুবিধা হবে না আপনাদের| কথা দিই আসব নিশ্চয় আসব| এই অতিথি বৎসল মানুষদের ব্যবহার অনেক দিন মনে থাকবে| অন্ধকার রাস্তা চিরে আমাদের টোটো এগিয়ে চলে| ঠাণ্ডা এবার বেশ ভালো বোঝা যাচ্ছে| ঝড়খালি বাজারের উপর দিয়ে এগিয়ে গেলাম| বাজারটা বেশ জমজমাট এখনও| মুদির দোকান| মাছ-ওয়ালা| চপ-মুড়ির দোকান| আশে পাশে ছোট্ট কয়েকটা ঔষুধের দোকান| দোকানের দেওয়ালে সদ্য শেষ হওয়া যাত্রা-পালার পোস্টার লাগানো| হৈ-চৈ‚ আলো পেরিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে পৌঁছে গেলাম অঙ্গদ বাবুদের বাড়ি| বাড়ি পৌঁছাতেই সারাদিনের গল্প| কিছুক্ষনের পরেই রাতের খাবারের জন্যে হাকডাক| সারাদিনের জার্নির পর আর খাবার ইচ্ছে নেই| কিন্তু না খেয়ে উপায় নেই| খেতে হবেই| মেশোমশাই স্বয়ং আমাদের ডাকতে এসেছেন| অগত্যা খেতে যেতেই হল| খেতে বসেই রসনা তৃপ্ত হয়ে গেল| বৌদির রান্নার গুনে খিদে বেড়ে গেল| খাওয়া দাওয়া হলে বিছানায় পরেই এক ঘুম| ভোরে পাখি আর মুরগীর ককর-ক আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে| আমরা আসার জন্যে তোড়জোড় শুরু করি| বাস আমাদের বাড়ির কাছেই থামবে বলে আশ্ব্স্থ করে অভিজিত| এর মধ্যেই গরম গরম পরোটা আর তরকারি সহযোগে খাবার নিয়ে বৌদি হাজির| সকালের মিঠে রোদ মেখে গোবর নিকানো উঠোনে দাঁড়ায়| খেজুর‚ টগর‚ নারকেল‚ নিম গাছ ঘেরা চারদিক| ফুলের হাল্কা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে| এই সব গাছ্পালা‚ বাঁধানো পুকুর সবাইকে বিদায় জানিয়ে দাদা‚ বৌদি‚ মেশোমশায়‚ মাসিমা আর অঙ্গদ দার ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটাকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে চললাম| বাস এসে গেছে দুয়ারের কাছে| দুদিনে মধ্যে এত টান‚ এত আন্তরিকতা মনটা খারাপ হয়ে গেল| এখানে প্রকৃতি অপরূপ সুন্দরী নয়| একটু অগোছলো‚ কাজল কালো‚ সরল গ্রামের মেয়েটির মত| পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠল| মনে হল ওরা যেন বলল ভালো থেকে বন্ধু| আবার এসো| ফিসফিসিয়ে বললাম আসব আবার| আসতে আমায় হবেই এই গাছ-পালা‚ পুকুর‚ মাঠ‚ নদী এই প্রকৃতির মাঝে| *ফটো আপলোড করবো কিভাবে একটু জানালে ভালো হয়|

201

10

শিবাংশু

ধুস...............

লিখে ফেলে রাখলুম দু'তিনদিন। থাক। কিন্তু আবার মনে হলো, দেওয়াই যায়। আমরাও তো খেলা খেলেছিলেম, আমরাও তো গান গেয়েছি.... " ২০১১ তে যখন মজলিশে লিখতে শুরু করি‚ কত উত্তপ্ত পোস্ট আসতো । সব যৌবনের মধ্যগগনে বিরাজ করা উদ্দীপ্ত যুবকদের থেকে । অনেক যুবতীও যোগ্য সঙ্গত করতো । আজ দেখি সবার ই ভাবপ্রকাশের ভঙ্গি অনেক বদলে গেছে । দৃষ্টিভঙ্গিও় আগে হয়তো যে বিষয়ে মনে হত‚ এই জিনিসটা বোঝাতে হবে‚ সবাইকে স্বীকার করাতেই হবে যে এটাই ঠিক‚ আজ মনে হয় ধুস আমার কি । আমার পরে নাই ভুবনের ভার । বা নিজের ই বিশ্বাস অনেক ঘুরে গেছে । আগে যা মনে হত সার্বভৌম সত্য আজ মনে হয় অন্যরকম ও তো হতে পারে ।" যেজন আছে মাঝখানে। সেরকমই মনে হল নিজের। ২০১১ সালে আমি ছিলুম পঞ্চান্ন। দুহাজার রকম পিছুটান। তবু তখনও এই পাতায় পূর্ণ উদ্যমে কথাবাত্তা কইতুম। যা মনে হতো। সীমান্তহীন, মনে হওয়া শুধু । তার পরেই কীবোর্ডে আঙুল। কোনও না কোনও ভাবে নিজেকে মনে করানো। প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে... হায় অগ্নিকন্যা ! তুমিও.... :-) ২০১১ সালে যে "যৌবনের মধ্যগগনে বিরাজ করা উদ্দীপ্ত যুবক", সে ২০১৭ পেরোতে মনে করে "ধুস আমার কি । আমার পরে নাই ভুবনের ভার় " ছ'বছরেই কী এরকম হয়? কে জানে? ছ'বছর মানে দেড়টা পোস্টিং। সতেরোটা পোস্টিং আর উনচল্লিশ বছর পেরিয়ে এসে ভাবি এখনও গোটা পাঁচেক পোস্টিং হেসেখেলে সামলে নিতে তৈরি আছি। প্রতি তিন-চার বছর অন্তর এই বিশাল দেশের কোন কোন প্রান্তে প্যারাশুট ল্যান্ডিং করতে হবে, জানা নেই। একা থাকতে পারিনা। লটবহর নিয়ে ঘুরে বেড়াই। ইহুদি বাস্তুচ্যুত মানুষদের মতো। যতোদিন যায় কাজকম্মো আরো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।কিন্তু তার মধ্যেই তো সব কিছু করতে হবে। লিখতে হবে, পড়তে হবে, গাইতে হবে, রাগতে হবে, হাসতে হবে, দেশ দেখতে হবে, আড্ডা মারতে হবে। সংসারপালন এবং 'চাকরি', তাও তো করতে হবে শেষ পর্যন্ত। এক মূহুর্তের জন্যও কেন মনে হয়নি "ধুস আমার কি" বলার সময় এসে গেছে। বিশ-একুশেই যেমন বুঝে গিয়েছিলুম কারো বয়স দশ পেরিয়ে গেলে তর্ক করে তার মত 'বদলানো' যায়না। দ্বিতীয়ত 'সার্বভৌম' সত্য বলে কিছু নেই। এটা বোধ হয় দ্বান্দ্বিকতার শিক্ষা? কিন্তু দাঁড়াবার জায়গা তো এভাবেই তৈরি হয়েছে। শক্তির অপচয় এড়িয়ে যাওয়া। গতকালই এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিলো। তিনি বললেন এখন 'বাপ-মা'য়েরা খুব স্মার্ট হয়ে গেছে। যতো'ই বয়স হোক, ছেলেপুলেদের বিশেষ তোয়াক্কা করেনা। নিজেরাই চালিয়ে নেয়। বললুম, খুব সত্যি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আর্থিকভাবে স্বয়ম্ভর। ছেলেমেয়েদের উপর নির্ভরতাটা নেহাৎ বিমূর্ত ধরনের। কিন্তু সন্তানদের বাপ-মায়ের উপর নির্ভরতা দেখতে পাই বেড়ে গেছে। কারণ এখন মেয়েরা অনেকেই ব্যস্ত চাকুরিজীবী। 'সংসার' চালানোর শিক্ষা ও দম এখন মেয়েদের বৃত্তিগত উদ্বেগ কেড়ে নেয়। কিন্তু 'সংসারে'র উপর প্রত্যাশাটি তাদের রয়েছে পুরোদমে। এই প্রত্যাশাপূরণের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই নিতে হয় বাপ-মা'কে। তাঁরা এই দায়িত্ব পালনও করেন যথাসাধ্য। দীর্ঘ জীবনযুদ্ধের বিলম্বিত পর্বে তাঁরা এই 'দায়িত্ব' পালনের শক্তি কোথা থেকে পান? মনে হয়, তাঁরা জীবনের কোনও পর্বেই বোধ হয় 'ধুস' বলেননি। জীবনের প্রথমপর্বে প্রবীণ বাবামায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। কারণ সেটাই দস্তুর ছিলো। তার পর নিজের সন্তানদের। তার পর পরবর্তী প্রজন্ম। আর্থিক স্বাচ্ছল্যও ছিলোনা আজকের মতন। আজকের হিসেবে উঞ্ছবৃত্তিও করতে হয়েছে তাঁদের সময় সময়। কিন্তু 'ধুস'? নৈব নৈব চ। এই সব প্রতিক্রিয়া দেখলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আবার গ্রুভে ফিরে আসি যখন পড়ি একজন মধ্য অশীতিপর তরুণ লিখে ফেলছেন এই কথাগুলো। "আসলে আমি খুব কিছু হতাসা বা কিছু নেই বোধ করছিনা় তার কারন মনে মনে জানি এটা ঘটবে । আর যা আমার হাতের বাইরে তাকে নিয়ে কি হল বা কি হত তাই ভেবে সময় নষ্ট করি কেন? ওটা আমার স্বভাবে নেই় কেউ তার সাধ্যের বাইরে কিছু করতে পারবেনা় সাধ্য মত করে তার পর পাস ফিরে ঘুমানো যায়়" তাঁর বয়ঃক্রমে আসতে তো আমার অনেক দেরি। যদি বেঁচে থাকি। তবু একেই তো অক্সিজেন বলে। একটু শ্বাস নিয়ে রনপায়ে ছুটে যাওয়া। এর মধ্যে 'ধুস' আর কোত্থেকে ঢুকবে?

184

11

Sujonmax

133

0

হিমাদ্রী

বরণীয় লেখকের স্মরণীয় কিছু--

: ঝুমকোলতার স্নানের দৃশ্য ও লম্বোদরের ঘাটখরচ: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ভূষণ একটু দূর থেকে তার বউ ঝুমকোলতাকে দেখছিল। ঝুমকো কুয়ো থেকে জল তুলছে। মাত্র পাঁচ দিনের পুরনো বউ। কত কী দেখার আছে নতুন-নতুন। ভূষণ কি কালও জানত যে, তার বউয়ের মাথার গড়নটা অনেকটা মাদ্রাজী নারকেলের মতো? এরকমের গড়নের মাথা ভাল না মন্দ তা ভুষণ জানে না। সে ঝুমকোলতার যা দেখছে তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই একটা মেয়েমানুষের মধ্যে যে নিত্যি নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করছে, পেয়ে যাচ্ছে গুপ্তধন, লাভ করছে কত না জ্ঞান। মাত্র পাঁচ দিনে। ঝুমকো এই যে সাতসকালে বালতি-বালতি জল তুলে চান করবে বলে, এ ভূষণের ভালো লাগছে না। তার ইচ্ছে করছে হাত থেকে বালতি কেড়ে নিয়ে নিজেই জল তুলে দেয়। কিন্তু তা হওয়ার নয়। বাড়িভরতি গুরুজন, আত্মীয়কুটুম, হাজার জোড়া চোখ নজর রাখছে তাদের দিকে। রাখবেই। নতুন বিয়ের বর-বউ। তো নজর দেওয়ারই জিনিস। তবু তার মধ্যেই ভূষণ নানা কায়দা কৌশল করে লুকিয়ে চুরিয়ে ঝুমকোলতাকে একটু আধটু দেখে নেয়। এই যে এখন উত্তর দিককার ঘরে ভূষণের কোনও কাজ নেই, তবু সে এসে ঢুকে পড়েছে। এ-ঘর তুলসীজ্যাঠার। বুড়োমানুষ। দেশের কাছে গান্ধীবাবার অনুগত হয়ে জীবন উৎসর্গ করবেন বলে নাছোড়বান্ধা হয়ে লেগে গিয়েছিলেন, তাই আর সংসারধর্ম করেননি। উড়ণচণ্ডী হয়ে গাঁ-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন, তকলি চরকা কাটতেন। বুড়ো বয়সে এসে আবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু ততদিনে গুষ্টি বেড়েছে, ভালো-ভালো ঘরগুলো বেহাত হয়েছে। উত্তরের এই ঘরে থাকে জ্বালানি কাঠ, খোলভুসির বস্তা, বীজধান, তারই একধার দিয়ে কোনওরকমে বুড়ো মানুষটার জন্য একটা চৌকি পাতা হয়েছে। আগে গুটিকয় ছাগলও থাকত। আজকাল থাকে না, তবু ঘরটায় কেমন ছাগল-ছাগল গন্ধ। কস্মিনকালেও ভূষণ এই ঘরে আসে না। কিন্তু ঝুমকোলতা চান করতে যাচ্ছে আঁচ পেয়েই ভূষণ হঠাৎ এ ঘরে এসে সেঁধিয়েছে। কারণ, এ ঘরের জানালার ফোকর দিয়ে কুয়োতলাটা ভারী পরিষ্কার দেখা যায়। একটা লেবুগাছের আবডালও আছে, তাকে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তো আর জানালায় হামলে পড়া যায় না। জ্যাঠা কী বা মনে করবে। যদিও গান্ধীবাবার শিষ্য, চিরকুমার এবং বুড়ো, তবু সাবধানের মার নেই। ভূষণ ঘরে ঢুকেই চৌকির একধারটায় চেপে বসে বলল, জ্যাঠামশাই, শরীর-গতিক কেমন? তুলসীজ্যাঠা বুড়ো হলেও মজবুত গড়নের লোক। মাঠে ঘাটে ঘুরে-ঘুরে শরীর পোক্তই হয়েছে। তার ওপর খাওয়া-দাওয়ায় খুব সংযমী। নেশা ভাঙ নেই। এখনও নিজের কাপড় নিজে কাচেন, নিজের ঘর নিজে সাফ করেন, স্নানের জলও নিজেও তোলেন। কারও তোয়াক্কা রাখেন না। বসে একখানা বই পড়ছিলেন। হিন্দি বই। মুখ তুলে বললেন, খারাপ থাকব কেন রে? ভালোই আছি। তোর খবর-টবর কী? মাথা চুলকে ভূষণ বলে, এই আর কী, ঘাড়ে আবার বোঝা চাপল, বুঝতেই পারেন। বোঝা বলে বোঝা? এ একেবারে গন্ধমাদন। বলে তুলসীজ্যাঠা একটু হাসলেন। তারপর বললেন, বউ তো আনলি, তা মেয়েটা লেখাপড়া জানে তো? ভূষণের নজর কুয়োতলায়। বলল, ওই আর কী। গাঁয়ের স্কুলে অজ আম পড়েছে। এঃ, স্ত্রী শিক্ষাটাই আমাদের দেশে হল না। তা একখানা বই দেবোখন ভারতীয় নারীর ঐতিহ্য। বইখানা বউমাকে পড়াস। ও বাবা, ওসব খটোমটো বই কি আর পড়বে। পড়বে। জোর করে পড়াস। পড়াটা অভ্যাসের ব্যাপার। প্রথম-প্রথম পড়তে চাইবে না। তারপর রস পেলে হামলে পড়বে। বুড়োমানুষরা এমনিতেই একটু ভ্যাজর ভ্যাজর করে, তার ওপর এ মানুষ আবার আদর্শবাদী, ভূষণ জানালাটার দিকে একটু চেপে বসে বাইরের দিকে চেয়ে উদ্বেগের সঙ্গে বলল, এঃ, লেবুগাছটায় দেখি পোকা লেগেছে। তুলসীজ্যাঠা তাঁর হিন্দি বইখানা সাবধানে মুড়ে রাখলেন। তারপর বললেন, যাই, হোমিওপ্যাথির বাক্সটা নিয়ে একটু মাঠেঘাটে পাক দিয়ে আসি। সেই ভালো। বলে ভূষণ এ ঘরে থাকার ছুতো খুঁজতে হিন্দিবইখানাই খুলে বসল। বলল, ইঃ, বাবা এ যে দেখছি তুলসীদাসের রামচরিতমানস। অ্য্যাঁ! কতকাল ধরে বইখানা পড়ার ইচ্ছে। তা পড় না, বসে-বসে পড়। তুলসীজ্যাঠা বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভূষণ অপলক নয়নে ঝুমকোলতাকে দেখছে। হাতে রামচরিতমানস এলিয়ে আছে। আচ্ছা, এই যে ভূষণ ঝুমকোলতাকে দেখছে, ঝুমকো কি তা টের পাচ্ছে? মোটেই না। ভূষণের তো মনে হয় এই পাঁচ দিনে একটা অচেনা মেয়েকে সে যেমন অষ্টেপৃষ্টে ভালোবেসে ফেলেছে, তার সিকির সিকি ভাগও ঝুমকোলতা পারেনি। ভূষণের যেমন আনচান অবস্থা, চোখে হারাই হারাই ভাব, তেমনটা ঝুমকোলতার কই? দিব্যি ঘুমোচ্ছে, শ্বশুরবাড়ির নতুন সব চেনাদের সঙ্গে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারছে, ভূষণ বলে যে কেউ আছে তাই বোধহয় সারাদিন মনে পড়ে না। এসব কথা নিয়ে কাল রাতেও হয়ে গেছে একচোট। কিন্তু যা কথায়-কথায় কাঁদতে পারে মেয়েটা। ভূষণ শেষে পা অবধি ধরেছে। কে একজন ছোকরা মতো ঝুমকোর খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল? অ্যাঁ! সাহস তো কম নয়। পিছন থেকে মুখটা দেখা যাচ্ছে না বটে। কে ও? ভূষণ একটু খর চোখেই তাকিয়ে রইল। নাঃ, পল্টু। ভূষণের ভাইপো। কাকিমার জল তুলতে কষ্ট হচ্ছে দেখে এগিয়ে এসেছে। ছেলেটা বড় ভালো। খুব হেসে-হেসে গল্প করছে কাকিমার সঙ্গে। ভূষণ মুখটা একটু আড়াল করল। পল্টুটা না আবার তাকে দেখে ফেলে। আবার সন্তর্পণে মুখ বার করে দেখতে পেল, আরও দুচারজন এসে জুটেছে কুয়োতলাআয়। পল্টু জল তুলছে। ঝুমকো গুলতানি মারছে। মুখটা আড়াল করতেই হয়। নইলে দেখে ফেলবে। রামচরিতমানসখানা খুলে দু-চার লাইন পড়ার চেষ্টা করল ভূষণ। হিন্দিটা তার ভালো আসে না। তা ছাড়া রামচরিত পড়ার মতো মনের অবস্থাও নয়। মন এখন উটাচন। বই রেখে বালিশের পাশে ডাঁই করে রাখা বইপত্র একটা খাতামতো জিনিস তুলে নেয়, খুলে দেখে মুক্তোর মতো পরিষ্কার অক্ষরে ঝরঝরে বাংলা লেখা। ‘তিনি চলিয়াছেন, গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে, দেশ হইতে দেশান্তরে। পরণে সেই দরিদ্র ভারতবাসীর লজ্জা নিবারণের পক্ষে যৎসামান্য দুটি বস্ত্রখণ্ড। ভুলিলে চলিবে না। তাঁহার এই পোশাকও বড় উপযুক্ত, বড় দেশজ, বড় প্রতীকী। হাতে দীর্ঘ শীর্ণ যষ্টি। তাঁহার সহিত আকারে প্রকারে ওই যষ্টিটারও যেন সুদূর মিল রহিয়াছে। রস মরিয়া ওই যষ্টি যেমন ঋজু ও কঠিন হইয়াছে, জীবনের সমস্ত উপভোগ, আমোদ, আনন্দ ইত্যাদিকে ত্যাগ ও তপস্যার অনলে শুকাইয়া তিনিও ঋজু, রিক্ত, কঠিন। সেই কাঠিন্য কাহাকেও আঘাত করে না, কিন্তু সব আঘাতকেই অনমনীয়ভাবে প্রতিরোধ করে।’ ‘বাবুরা, ধনিকেরা, গৃহীরা তাঁহাকে চিনে না। তাহারা শুধু মহাত্মা গান্ধীর জয় জোকার দিয়া ক্ষণিক আবেগ অনুভব করে মাত্র। মহাত্মাজি দেশের কাজ করিতেছেন, তিনিই দেশোদ্ধার করিবেন, আমাদের কিছু করিবার নাই, এইরূপ ধারণা লইয়া তাহারা বেশ নিশ্চিন্তে ইংরেজের গোলামি করিতেছে বা কালোবাজারিতে মুনাফা লুটিতেছে, ঘুস লইতেছে বা অন্যবিধ অপকর্ম করিয়া যাইতেছে। গান্ধীবাবা আছেন, ভালো কাজ তিনিই করিবেন।’ ‘মাঝে-মাঝে ভাবি, তিনি এই দেশে জন্মগ্রহণ করিলেন, তবু কই দেশের তো কলঙ্ক ঘুচিল না। ইহাও কি সম্ভব যে তিনি এই দেশের বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করিলেন, তবু এই দেশের বায়ু পবিত্র হইল না? তাঁহার চরণরেণু মাখিয়াও এই দেশের মাটি ধন্য হই;ল না।‘ ঝুমকোলতা বেড়া দিয়ে ঘেরা চানের জায়গাটায় ঢুকে আড়াল হল, কিন্তু তাতে কি? ঝুমকোর টুকটুকে লাল শাড়ি, রাঙা গামছা আর ধপধপে শায়া যে বেড়ার ওপর। তারও কি শোভা কম? তাতেই নেশা লেগে যায় যে। উঁকি মেরে মুখটা আবার চট করে সরিয়ে নেয় ভূষণ। তার মেজ কাকিমা চাল ধুতে এসে এদিকপানে চেয়ে কী যেন দেখছে। দেওয়ালের দিকে সরে বসল ভূষণ, এ বাড়িটা একেবারে হাট। এত লোক যে কেন যেখানে সেখানে হুটহাট আনাগোনা করে তা বোঝা মুশকিল। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ভূষণ ঘরখানা দেখছিল। লকড়ির মাচানের নিচে কুঁইকুঁই শব্দ শুনে ভূষণ উঁকি মেরে দেখল, গোটাচারেক কুকুরছানা দলা পাকিয়ে আছে। বাড়িতে কুকুরের অভাব নেই, তারই একটা এসে এ-ঘরে বাচ্চা দিয়েছে। বাস্তবিক গান্ধীবাবার শিষ্য ছাড়া বোধহয় কারও পক্ষেই এ-ঘরে বাস করা সম্ভব নয়। বস্তা-বস্তা বীজধান, ভূসি, খোল আর রাজ্যের লকড়িতে ঘর পনেরোয়ানা বোঝাই। একটা বিটকেল গন্ধও থানা গেড়ে আছে। মাটির ভিতে নানা মাপের অজস্র ফুটো। লেপাপোঁছার বালাই নেই। এমন বুকচাপা দম আটকানো ঘরে তুলসীজ্যাঠাই থাকতে পারে, যার জন্য লড়ার কেউ নেই। একটু কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়েছিল ভুষণ, সেই ফাঁকে কখন চানটি সেরে বেরিয়ে পড়েছে ঝুমকোলতা। বেরিয়ে সোজা সেজোকাকির ঘরের ভিতর দিয়ে অন্দরমহল। তবে ভূষণ একেবারে বঞ্চিত হল না। উঠোনের তারে ভেজা শাড়ি মেলার জন্য মিনিটদুই দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ভালো করে দেখে নিল। এ-বাড়ির অন্দরমহল হল রাক্ষসপুরী। একবার যাকে গ্রাস করে নেয় তাকে আর সহজে ছাড়ে না। এই যে ঝুমকোলতা অন্দরে ঢুকল এর মানে হল, সে সংসারে সামগ্রী হয়ে গেল। আর ভূষণের জিনিস রইল না। ফের সেই রাত দশটার পর ঝুমকোলতা আবার ভূষণের হবে। রাক্ষসপুরীর কথা কি আর সাধে মনে হয় ভূষণের। আর তুলসীজ্যাঠার ঘরে বসে লাভ নেই। ভূষণ বেরিয়ে এসে দরজার শিকল তুলে দিল। বিয়ের মধ্যে যে আনন্দ আর রোমহর্ষ ছিল, তা বিয়ের আগে জানত কোন আহাম্মক? ভূষণ ভাবত, বিয়েটা একটা ব্যাপারই হবে বটে, কিন্তু তা যে এ-রকম ভালো, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। যারা বিয়ে না করে থাকে, তাদের জীবনটাই বৃথা। এই যে তুলসীজ্যাঠা, কী নিয়ে যে বেঁচে আছে ভগবান জানে। মাঠেঘাটে ঘুরছে, হোমিওপ্যাথি করে বেড়াচ্ছে, আর দিনান্তে রামচরিতমানস বা গান্ধীর বই খুলে মুখ গুঁজে বসে আছে। অসুখ-বিসুখ হলে জলটুকু এগিয়ে দেওয়ারও লোক নেই। অসুখের কথায় ভুষণ হঠাৎ নিজেই চমকায়, তাই তো। কথাটা তো জব্বর মনে পড়েছে। অ্যাঁ! এখন যদি তার অসুখ হয়, তাহলে ঝুমকোসুন্দরী কী করে? অ্যাঁ! ধরো জ্বর উঠে গেল পাঁচ-সাত ডিগ্রী, ভুষণ চোখ উলটে গোঁ-গোঁ করছে, ডাক্তার নাড়ি ধরে গম্ভীর মুখে বসে আছে আর ঘড়ি দেখছে, অ্যাঁ। তখন কী করবে ঝুমকো? বুকের অপর পড়ে, ‘ওগো, পায়ে পড়...’ এই সব বলবে না? অ্যাঁ! কাণ্ডটা কী হবে তখন! বেজায় শীত পড়েছে এবার। সকালে রোদটাও বড্ড ঢিমে। একটা মোটা খদ্দরের চাদর জড়িয়ে ভুষণ বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। বন্ধুবান্ধবেরা আজকাল তাকে দেখলেই মুখ বেজার করছে। সেদিন ফণী তো বলেই ফেলল, উরে বাব্বা, তোর ঝুমকোলতার গল্প শুনতে-শুনতে যে আঁত শুকিয়ে গেল বাপ। তা ভুষণই বা করে কী? ঝুমকোলতার কথা ছাড়া তার যে আর কথা আসছে না গত তিন-চার দিন। এখনও মেলা কথা বলার বাকি। ছোলাখেত বাঁয়ে রেখে হনহন করে হাঁটছে ভুষণ। পাশের গাঁ হল মুনসির চক। গোকুল থাকে। এমনিতে গোকলেটা যাকে বলে গর্ভাস্রাব। ধান বলতে কান বোঝে। কিন্তু তার কাছে কথা বলে সুখ আছে। যাই বল না কেন, হাসি-হাসি মুখ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনবে, ফোড়ন কাটবে না, বিরক্ত হবে না, উঠি-উঠি করবে না, কাজ দেখবে না। আজ গোকলেকে পাকড়াও করতে হবে। পেটে ঝুমকোলতকার গপ্প ভুড়ভুড়ি কাটছে। না বললেই নয়। এ গাঁয়ের বন্ধুগুলো বড্ড সেয়ানা হয়ে গেছে। মনসাতলায় অশ্বত্থ গাছে নীচে বাঁধানো জায়গাটায় কয়েকজন বসে আছে গোমড়া মুখে। একজঅন তুলসীজ্যাঠা। তিনি ওষুধের বাক্স খুলে শিশি তুলে-তুলে নাম দেখছেন ওষুধের। ওরে ও ভুষণ, কোথা যাস? ভূষণ জ্যাঠার ডাক শুনে একটু থমকায়। তারপর বলে, এই যাচ্ছিলাম একটু, কাজেই। এদিকে যে লম্বোদর প্রামানিকের হয়ে গেল। ঘাটখরচের যোগাড় নেই। একটু দেখবি বাবা? ভূষণ একটু নরম হল। লম্বোদরের কী হল, বৃকোদরের কী হবে, দামোদরের কী হচ্ছে, এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারটাই বা কী আছে, তাই সে বোঝে না। যে যার মতো বেঁচে থাকছে, মরে যাচ্ছে, খাবি খাচ্ছে, দুনিয়ার তাই নিয়ম। থাক, যাক, খাক, তাতে তার কী? তবু ভূষণ দাঁড়িয়ে গেল। যত যাই হোক, এই পাগোল লোকটার তো কেউ নেই, জীবনের স্বাদই পায়নি, মায়া হল ভূষণের। --কী করতে হবে জ্যাঠা? করার অনেক আছে। চারটে ছেলেপুলে, একটা মুখ্যু বউ, ঘরে দানাপানির জোগাড় নেই। তা সে না হয় পরে ভাবা যাবে। আগে ঘাটখরচা তো তোলা লাগে। এই এরা সব বসে আছে ওষুধের জন্যে, আমি নড়তে পারছি না। একটু গাইয়ের ঘরে-ঘরে ঘুরে খরচটা তুলে দিবি বাবা? সে কী কথা? ঘুরব কেন? ঘাটখরচ নয় পকেট থেকেই দিয়ে দিচ্ছি! তুলসীজ্যাঠা একগাল হাসলেন, দূর পাগল। ও বাহাদুরী ক’দিন? আজ লম্বোদর গেছে, কাল বিধু নস্কর যাবে, পরশু বিনোদ হাতি মরবে, কারোর ঘরে মামলোত নেই। ক’জনেরটা দিতে পারবি? তার চেয়ে ঘরে-ঘরে ঘোরা ভালো। পাঁচজনকে সমাজ-সচেতনও করা যায়, দশের কাজে নামানো যায়। যাবি বাবা? ভূষণ তত্ত্বটা বুঝল না। তবে একটু আঁচ করল। কথাটা মন্দ নয়। একটু মাথা চুলকোল সে। তারপর বলল, আচ্ছা দেখছি। যা বাবা, তুই পারবি। দোনামোনা করে ভূষণ গাঁয়ের দিকে ফিরল। কাজটা খুব শক্ত নয়। সবাই তাকে চেনে। চাইলে দেবে। দিলও। বেলা দশটা নাগাদ শুরু করেছিল ভূষণ। সাড়ে এগারোটার মধ্যে শ’আড়াই টাকা উঠে গেল। পাঁচ টাকা কম ছিল, সেটা নিজে পুরণ করে দিল। লম্বোদর যখন মাচানে চেপে শ্মশানে রওনা করল, তখন পড়ন্ত বেলা। চারটে ছেলেমেয়ে আর বউ—কিছুটা শোকে, কিছুটা খিদেয় আর কিছুটা ভবিষ্যতের ভয়ে কাঁদছে লুটোপুটি খেয়ে। দৃশ্যটা বেশিক্ষণ দেখতে পারল না ভূষণ। ঘরদোরের যা চেহারা, তাতে বোঝা যায়, এদের নুন আনতে পান্তা জুটলে সেদিন ভোজ। ফেরার সময় তুলসীজ্যাঠা ছাতাটা মেলে ধরে বলল, আয়, ছাতার নিচে আয়। মুখটা রাঙা হয়ে গেছে তোর। জ্যাঠার এত কাছাকাছি কখনও হয়নি ভূষণ। আজ তার বড় জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল, কীসের আনন্দে বেঁচে আছেন আপনি? কী সুখ পেয়েছেন জীবনে? কিন্তু কথাটা সরল না মুখে। আনন্দেরও তো কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কে যে কী থেকে আনন্দ পায়! কখনও ঝুমকোলতার স্নানের দৃষ্যে, কখনও লম্বোদরের ঘাটখরচ জোগাড়ে।

259

10

শিবাংশু

আমার ভালোবাসার ধনে হবে, তোমার চরণপূজা....

বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো, তাঁকে নিয়ে একটা বড়ো লেখা তৈরি করার কথা ভাবছিলুম। ওঁর বইগুলো পড়া, সব গানগুলো শোনা, এইসব প্রাথমিক কাজকম্মো শুরুও করেছিলুম। আবার আমার পুরোনো অভ্যেস অনুযায়ী প্রয়াসটি বারবার বেলাইনও হয়ে গেছে। নিতান্ত বালক ছিলুম, যখন ওঁর গান প্রথম কানে এসেছিলো। "কে যেন আমার কানে কানে বলে গেল, কোকিলের মাস এলো...।" তখন থেকেই যখন সুযোগ ঘটেছে ওঁর সৃষ্টির স্পর্শে থাকার অবসর অপচয় করিনি। আমরা বাইরের লোক, কখনও চাক্ষুষ সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু ওঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতি মুগ্ধতা সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলেছিলো। যখন ইউটিউব ছিলোনা, তখন কলকাতায় এলেই ওঁর রেকর্ড বা ক্যাসেট খুঁজে বেড়াতুম। একসময় একটি লেখায় ওঁকে সলিল এবং সুমনের জমিদারির মাঝখানে থাকা এক স্বাধীন নৃপতি বলে মন্তব্য করেছিলুম। কিন্তু পরে ভেবেছি ওঁর সাম্রাজ্যের জাঁকজমক হয়তো ততো চমকায় না, কিন্তু তাঁর রাজত্বের সীমানা বহুদূর গেছে মুগ্ধ শ্রোতার হৃদয়ের ভিতর। সুরযোজনা, লিরিকরচনা এবং গায়ন তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর সামর্থ্য বাংলাগানের চিরাচরিত কমপ্লিট কম্পোজারদের সোনালি ঐতিহ্যে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। শাদা শার্ট, ধুতি, সাইকেল আর হারমোনিয়ম দিয়ে ঘেরা বাংলাগানের কালজয়ী হিরোদের লিস্টিতে তিনি সম্ভবত ছিলেন শেষ নাম। যে নাম শুনলে শ্রোতাদের মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো নতুন প্রত্যাশার। বিশদে তাঁকে নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা রয়েছে পুরো মাত্রায়। জানিনা কবে সময়ের প্রশ্রয় পাবো। এই মূহুর্তে তাঁর গাওয়া আমার অতি প্রিয় সময়জয়ী একটি গান মনে পড়ছে। আমার অদীক্ষিত গায়নে তাকে ধরার চেষ্টা করেছিলুম একবার। মন্ত্রী নই তো। বাণী দেবার এলেম নেই। সেই অপটু গানটিই রেখে দিলুম তাঁর পায়ের কাছে। তিনি হয়তো প্রত্যাখ্যান করবেন না অধম ভক্তের এই স্পর্ধা।আশা তো করতেই পারি। তিনিই তো বলেছিলেন, "আমার স্বপন কিনতে পারে, এমন আমির কই?"

184

3

শিবাংশু

চল টুসু, মেলায় যাবো

যাঁরা কলিকাতা শহরে মেট্রোতে যাতায়াত করেন, তাঁরা গত বেশ কিছুদিন ধরে একটি ছবির প্রচার শুনতে পাচ্ছেন প্রতিটি ইসটেশনে। কিছু নাট্যমূহুর্তের ছবি, সঙ্গে ওঝার মন্ত্রের সুরে গাওয়া টাইটল সং। তার পর হল থেকে বেরিয়ে আসা দর্শকদের মুগ্ধ প্রতিক্রিয়ার সারি। গতকাল গিয়েছিলুম আকাদেমিতে গৌতম হালদারের 'মেঘনাদবধকাব্যে'র অধুনাতম সংস্করণটি দেখতে। পথে নন্দন আসতে ব্রাহ্মণী ইচ্ছা প্রকাশ করলেন তিনি 'চল কুন্তল' দেখতে ইচ্ছুক। মনোজ মিত্র এবং সৌমিত্রকে দেখা যাচ্ছে। তো পরদিনের টিকিট নেওয়া গেলো। পৌনে দুটোয় শো। দুপুরের খাওয়াটা তেমন মন দিয়ে করা গেলোনা। বর্ষার দিনে খিচুড়ি দুচার রকমের ভাজাভুজি দিয়ে সেরে বেরিয়ে পড়া গেলো । এবার মেট্রো ইসটেশনে গিয়ে ক্লিপিংগুলো আবার দেখলুম। বোঝা যাচ্ছে মেট্রো ইসটেশনে যাঁরা বিজ্ঞাপন ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করেন, ছবিটি তাঁদেরই প্রযোজিত। যথেষ্ট আগে পৌঁছে দেখি নন্দনের সামনে লম্বা লাইন। মানে বাংলাছবির সুদিন এসেছে। কয়েকদিন হয়ে যাবার পরেও ভিতরে বেশ জনসমাগম। ভালো লাগলো। বাংলাছবির সঙ্গে যোগাযোগ তো কম। চিনিও না সবাইকে। বাংলাছবির সবলতা বা দুর্বলতা সবই স্টোরিলাইনকেন্দ্রিক। সেখানে কোনও বদল আসেনি আমার জ্ঞান বয়স থেকে। সমস্যাটা সেখানেই। মৌলিক গল্প বলে তো কিছু নেই। দশ জায়গা থেকে যা যা লোকে খায়, একপাতে আনার একটা ব্যাপার থাকে। দর্শকরা যে সব 'যুগযন্ত্রণা'র সঙ্গে স্বচ্ছন্দ, সেসবের জোগান দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। কয়েকটি বিষয়, ১. মধ্যবিত্ত বাঙালির বৃদ্ধ বয়সের যাপনসংকট ২. সংবেদনশীলতা আর দায়িত্বজ্ঞানহীন সন্তান ৩.রাজনীতিক আর অপরাধীদের গাঁটছড়া ৪.খুচরো প্রতিবাদ ইত্যাদি এসবই আছে এই ছবিতে। মনে রাখতে তপন সিংহ এবং গোবিন্দ নিহালানি নামের দুই পরিচালক দুটি ছবি বানিয়েছিলেন। মাদার অফ হান্ড্রেড মুভিজ। আপনজন আর অর্ধসত্য। এই ছবিতে ছায়াদেবীর জায়গায় আছেন সৌমিত্র, মনোজ মিত্র এবং সমীর বিশ্বাস। স্বরূপ দত্ত ও শমিত ভঞ্জের জায়গায় প্রতীক সেন ও রাজা দত্ত। নাহ, রাজা দত্ত পিওর ভিলেন, শমিত ন'ন। পীড়িত মা অনুরাধা রায়, প্রায় নায়িকা দেবলীনা। এছাড়া মাফিয়াপুলিশ, এম এল এ দীপংকর দে, সদাশিব অমরাপুরকরের প্রক্সি। এছাড়া আছেন দহিবড়ামার্কা এনারাই পুত্র, লাতখোর কলকাত্তাই পুত্র, তাদের ততোধিক ভিলেন বৌয়েরা। তিনটি বাঁশের ছড়ি। শেষদৃশ্যে ভিলেনের ঝাড়পিট থেকে 'বাবু, বাবু' করতে করতে প্রাণ দেওয়া বাঙালিমাতা সবই রয়েছে। শেষ দৃশ্যে 'আকাশ জুড়ে শুনিনু' সৌমিত্রের থামস আপ, স্যুইসিডাল।পরিচালক রাজ মুখার্জি কোনও রিস্ক নেননি। যেহেতু বাঙালি দর্শক সিনেমার থেকে সিরিয়ালকে বেশি ভালোবাসেন, তাই বাজার ধরতে বাংলা সিনেমা ক্রমশ বড়োপর্দার সিরিয়াল হয়ে গেছে। শট, সিক্যুএন্স, মন্তাজ, ট্রিটমেন্ট, সব কিছুর মধ্যেই সিরিয়ালের গেরস্তপোষা মাত্রাকে পেরোনোর কোনও প্রয়াস নেই। আর রয়েছে চিৎপুরি ড্রামাছাপের নাট্যমূহুর্ত। তার মধ্যেই মনোজ মিত্র, সৌমিত্র, দীপংকর জানিয়ে যান 'আছি, আছি'.... তবে বহুমানুষ দেখছেন ছবিটি। এই ব্যাপারটা ভালো লাগলো। কী দেখছেন, সেটা তেমন জরুরি নয়।

182

8

সুকান্ত ঘোষ

ক্রিকেট

১। সেলিব্রিটি পাবলিকদের মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেবার সময় গুগলি প্রশ্ন দেবার চেষ্টা করে। তেমনি এক অখাদ্য গুগলি টাইপের প্রশ্ন হল, আপনি জীবনে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট কি পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে। বলাই বাহুল্য আমি বিখ্যাত কেউ নেই, তাই আমাকে এই প্রশ্ন কেউ করে নি। কিন্তু আমি নিজে নিজেকে অনেক করেছি সেই জিজ্ঞাসা। প্রচন্ড ভেবে ভেবে দেখা গেল - লাইফে কমপ্লিমেন্ট পাবার মতন তেমন কিছু তো করি নি! অবশ্য ক্লাস সেভেন থেকে প্রায় টুয়েলভ পর্যন্ত কার্তিক, চঞ্চল সহ অনেক জনতাকে দায়িত্ব নিয়ে ইংরাজী পরীক্ষার পাস মার্ক সরাবরাহ করার ব্যাপারটা যদি না ধরা হয়। অবশ্য তখন জানতাম না কমপ্লিমেন্ট কি জিনিস! কোন কমপ্লিমেন্টই জীবনে পাই নি বলে যখন প্রায় স্থির করে ফেলেছি, তখনি মনে পড়ে গেল ক্রিকেট খেলার কথা! সে কি সময় ছিল তখন - টেনিস বল ক্রিকেটই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। হেলমেট পড়ে আন্তর্জাতিক উইকেট কীপাররা স্টাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে ফাষ্ট বোলারদের কীপ করা ব্যাপক ভাবে চালু হবার অনেক আগে থেকেই আমি সেই জিনিস করে এসেছি দীর্ঘকাল। আমাদের দিকে তখন একদিনের টুর্ণামেন্ট ছয়-আট ওভার এবং রানিং টুর্ণামেন্ট ১৪-১৬ ওভার করে হত। একদিনের টুর্ণামেন্টে শীতের দিনে বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওভারের সংখ্যাও কমে আসত। অনেক অনেক ফাইনাল ম্যাচ খেলেই দুই ওভারের। ব্যাটসম্যান বল দেখতে পাচ্ছে না, আম্পায়ার দেখতে পাচ্ছে না, আমি উইকেটকীপার দেখতে পাচ্ছি না - বোলার আলো আঁধারীতে বল ছুঁড়ছে, এই জিনিস চলে এসেছে বছরের পর বছর। আর কম ওভারের খেলা হবার জন্যই ক্রীজের বাইরে বেরিয়ে ব্যাট হাঁকাবার একটা ডিম্যান্ড ছিল। তা যাই হোক, আমাদের নিমো গ্রামের সাথে রাই- ভ্যালারি ছিল পাশের গ্রাম বিষ্ণুপুরের। তবে আমাদের অবস্থা সেই আশি-নব্বই দশকের ভারতীয় দলের মত হলে, বিষ্ণুপুর ছিল পাকিস্তান। কি সব প্লেয়ার! তবে ছয় ওভারের খেলায় বেশী ভালো খেলোয়ারের দরকার হত না - চারজন ভালো প্লেয়ার থাকলেই হত - বাকিরা দুধেভাতে। বিষ্ণুপুরের পিঙ্কি আর গোপাল এই দু জনেই বেশীর ভাগ খেলা শেষ করে দিত। পরের দিকে গোপালের ভাই এসে 'চাক' বোলিং শুরু করার পর বিষ্ণুপুর প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ল। তেমনি এক সময়ে, কাঁঠালগাছির মাঠে নিমো গ্রামের সাথে সেমি-ফাইন্যাল খেলা হচ্ছে বিষ্ণুপুরের। বিষ্ণুপুর বেশীর ভাগ সময় নিজেদের প্লেয়ায় নিয়েই খেলত - মানে 'হায়ার' তেমন কেঊ খেলত না ওদের হয়ে। তবে সেই বার কেন জানি না এক বাইরের ব্যাটসম্যান ওদের দলে খেলতে এল। ফুতুদা বল করছে, সেই ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে নামল ওয়ান ডাউনে। প্রথমে রানার্স এন্ডে ছিল। উইকেটের পিছনে আমি। এক রান হলে পড়ে এবার সেই ব্যাটসম্যান ক্রীজে এল ফেস করতে ফুতুদাকে। হঠ করে মাঠের বাইরে থেকে বিষ্ণুপুরের খোকনদার নির্দেশ এল নতুন ব্যাটসম্যানের কাছে। খোকনদা ছিল বিষ্ণুপুরের ক্রীকেট টিমের মেন্টর কাম কর্মকর্তা কাম প্রধান উৎসাহী সমর্থক। আমি স্ট্যাম্পের কাছে থাকার জন্য শুনতে পেলাম, সেই নির্দেশ হল, ক্রীজ ছেড়ে সে যেন না বেরিয়ে খেলে। আসলে চেনাশুনা প্লেয়ার হলে তাকে বলতে হত না, আমি কীপিং করলে সবাই ক্রীজেই প্রোথিত থাকত, কিন্তু এ হল নতুন প্লেয়ার আমাদের এলাকায়, তাই সেই নির্দেশ। পরের গল্প সোজা, ফুতুদা বল করল, সেই ব্যাটা এগিয়ে গিয়ে মারতে গেল এবং ফলত বল মিস করে স্ট্যাম্প। এবার সেই ছেলে ব্যাট বগলে করে মাঠ থেকে বেরুচ্ছে - ভেসে এল খোকনদার চিৎকার - "বোকাচোদাকে হাজার বার বললাম ক্রীজ থেকে বেরুস না, বেরুস না! নাই সেই বেরুবে! তুমি বাঁড়া জানো না, কে আছে উইকেটের পিছনে!" এই এতোদিন পরে আমি খোকনদার সেই বক্তব্যকে কমপ্লিমেন্ট হিসাবেই নিলাম! বাই দি ওয়ে, গল্পে কোন জল নেই। উত্তর খেলোড়ারী জীবনে ফুতুদা এখন সফল ব্যবসায়ী - মেমারী নিমতলা মার্কেটে 'নিউ লাইট কর্ণার' নামক বিশাল চালু ইলেক্ট্রিক্যাল এর দোকান। সুকান্ত ঘোষের লেজেন্ডারী উইকেট কিপিং-র গল্প তার কাছ থেকে এখনো যাচাই করে নেওয়া যাবে। খোকন-দার ডায়লগ এখনো আমায় হন্ট করে - "তুই কিপিং ছেড়ে বাঁড়া কেন যে বালের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলি!" ২। তেমনি এক শীতের দিনে পড়ন্ত বেলায় নিমো স্টেশনের পাশে কুমারদের জমির আলে লুঙ্গিটা ঠিক করে উবু হয়ে বসে আলম আমাদের বলল, “বুঝলি টনি আর মকসুদকে তুলতে হবে খুব শিগগিরি। ওরা যা শুরু করেছে আজকাল তোরা ভাবতে পারবি না”। টনি আর মকসুদ হল আমাদের পাশের গ্রাম কেজার ছেলে। আলমের প্রস্তাব শুনে আমাদের হালকা টেনশন এসে গেল। বিশেষ করে যখন পাশের গ্রাম থেকে তোলার কোন হিষ্ট্রি তখনো আমাদের ছিল না। আলম আমার সেই ন্যাংটো বেলার বন্ধু – বাবা মারা যাবার আগের দিন পর্যন্ত মনে এই ধারণা পুষে রেখেছিল যে মাধ্যমিকে আমার নাম্বার আশানুরূপ না হবার মূল কারণ ছিল আলম। তবে বাবার মতে ড্যামেজিং জিনিসটি ছিল আমাদের নিমো গ্রামের শিবতলায় ভ্যাঁটা খেলা। ভ্যাঁটা (বা গুলি খেলা) খেলে খেলে নাকি আমার নাম্বার সেই ক্লাস সিক্স থেকে কমতে শুরু করেছে, মাধ্যমিকে গিয়ে দ্যাট টাচড্‌ দ্যা রক বটম। আলমকে আমি ভ্যাঁটা খেলায় হারাতে পারি নি – সেই প্রশ্নই ওঠে না, শুধু আমি না, নিমো গ্রামেই আলমকে বীট দেবার মত কেউ ছিল না। আলমের আরেক পরিচয় হল সে পচা মোড়লের নাতি, যে পচা মোড়ল ছিল গিয়ে আমাদের গ্রামে চাল পোড়া, হাঁড়ি চালা, জল পোড়া, বাণ মারা – এই সব ব্যাপারে সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট। বি ই কলেজ জনিত আমার এক ক্ষতেও আলম প্রলেপ দিয়েছিল পরোক্ষ ভাবে – তবে তেল পোড়া, জল পোড়া বা তাবিজ দিয়ে নয়। বি ই কলেজ আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক ব্যবহার করতে পারে নি – এ ছাড়া আর বিশেষ লার্জ স্কেলের কিছু অভিযোগ কলেজের প্রতি আছে বলে আমি তো এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। অনেকে কারপেন্ট্রী ক্লাস, মেসে রান্না হওয়া ৫ দিনের পুরানো মাছ, বা নাকুর গান, চাকুরী না পাওয়া এই সব জিনিস নিয়েও টালাবাহানা করে, কিন্তু আমি সেই সব ক্ষুদ্র জাগতিক জিনিস নিয়ে নাড়াঘঁটা করে নিজের স্ট্যান্ডার্ড নীচে নামাতে পারলাম না। আসলে বি ই কলেজ জানত না সে কি হারাচ্ছে। আর তা ছাড়া আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক মত ব্যবহার না করতে পারার মূল কারণ তো আর কলেজ নিজে ছিল না, ছিল ন্যাংটো (বিশেষ্য)। ন্যাংটোকে দিয়েই কলেজ কাজ চালালো সেই কত বছর। মানলাম না হয় যে ন্যাংটো বাকি অনেক কিছু আমার থেকে ভালো পারত, কিন্তু তা বলে এটা? বি ই কলেজ ব্যবহার না করতে পারলেও, আমার বাল্যবন্ধু আলম আমার পোতিভাকে শুষে নিয়ে ব্যবহার করেছিল ক্রিকেট টুর্ণামেন্টে। আলম ক্রিকেটও খেলত ভালোই – ক্লাশ ইলেভেন পর্যন্ত আমাদের সাথে বেশ খেলল – তার ন্যাচার‍্যাল বোলিং অ্যাকশন ছিল অফ কাটার। এটা কেউই জানত না, কেবল আমিই জানতাম উইকেট কিপিং করার দারুণ। তা সেই আলম হট করে ১৬ বছর বয়েসে কম্পিটিটিভ ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি ক্রিকেট কর্মকর্তা বনে গেল। এর পর থেকে তার প্রধান কাজই হয়ে দাঁড়ালো ক্রিকেট টিম তৈরী করা এবং টুর্ণামেন্ট ধরা। এবার আমরা এই সব ব্যাপারে আলমকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতাম না – কারণ কে কোথায় ভালো খেলছে, সেটা তার থেকে কেউ আর ভালো জানত না। কারণ ক্রিকেট প্লেয়ার স্কাউটিং আলম শুরু করেছিল সেই হিরো সাইকেলের আমলে (অবশ্য অনেকে অ্যাভন ব্যবহার করত), হিরো হোন্ডা গ্রামের ঘরে ঘরে তখনো ঢোকে নি। ভাঙাচোরা সাইকেল নিয়ে মেমারী ব্লক পুরো চষে ফেলে প্লেয়ারদের ডাটাবেস তৈরী করা সে কাজ চাট্টীখানি ছিল না। আলম সেই কাজ করেছিল বছরের পর বছর প্রধানত সুতপা বিড়ির সাহায্য নিয়ে। তার সেকেন্ডারী সাহায্যে ছিল আমাদের সমবয়সী বা জুনিয়ার কেউ, আলমের সাইকেল চালক হিসাবে। মোটামুটি আমাদের ‘তোলা’ প্লেয়ার ৩ থেকে ৪ জন থাকত ম্যাক্সিমাম, তবে বেশীর ভাগ সমইয়েই মাত্র ২ জন। যদি আমার স্মৃতি ভুল না করে, তা হলে নিমো গ্রামের হয়ে হায়ার খেলার সূচনা করেছিল আমাদের সময়ে মেমারীর কাত্তিক পোল্লে (কালীতলা পাড়া) এবং ক্রিষ্টির তনুপ। তবে সেই সব ছিল ৫ ফুট ২ এর খেলা। সিনিয়র খেলায় এন্ট্রি পেয়ে এরা আমাদের হয়ে আর কোনদিন খেলে নি, যদিও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে সিনিয়ার হয়েও তনুপ কোনদিন ৫ ফুট ২ পেরিয়েছিল কিনা! কাত্তিক পোল্লের সাথে আমার সম্পর্ক আবার অন্য রকম, আমাদের হয়ে ফ্রীতে খেলেছিল। ওই ইংরাজী পরীক্ষা আর ক্রিকেট - মিথোজীবিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের মধ্যে। তা যা বলছিলাম, সিনিয়র লাইফে নিমো ভারত ক্রিকেট সমাজের টিমে আমাদের ব্যাচে প্রথম ‘তোলা’ (যাকে হায়ার করা বলে আর কি) ওই টনি আর মকসুদ। এবং বলতে নেই, মোহনপুর মাঠে তারা দুই জনেই মান রেখেছিল। মকসুদ দারুণ বল করেছিল, আমি একটা ম্যাচে চারটে স্টাম্প। গোটা একদিনের টুর্নামেন্ট মোট স্ট্যাম্পিং মনে হয় দশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম সেমিফাইন্যাল পর্যন্ত যেতে পারব না – তাই কেউ বাড়ি থেকে তৈরী হয়ে যাই নি (মানে চান করে, মুড়ি খেয়ে)। সেই ফাইন্যালে ওঠার পর গ্রামের সাপোর্টাররা গামছা বেঁধে মুড়ি নিয়ে গেল বাড়ি থেকে – মোহনপুর মাঠ যাকে বলে একবারে মিডিল অভ নো-হ্যোয়ার। ফাইন্যাল খেলতে গিয়ে আমার কেষ্ট স্যারের কাছে প্রাইভেট মিস – কোন বোকাচোদা আমার ভালোর জন্য সেই খবর আবার আমার বাপের কানে তুলে দেয় – ফলতঃ বাপের হাতে উদুম ক্যালানী – ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কাপ জিতে ফেরার ফলে নিমোর সিনিয়ররা বাড়ি ঢোকার আগে নিমো বটতলায় কোচোর দোকানে সিঙ্গারা, এবং বাসি দানাদার খাইয়ে বাড়িতে ছেড়ে ছিল। ফলতঃ বাপের ক্যালানী তত বেশী মনে এফেক্ট ফ্যালে নি, পেট ভরা থাকার জন্য। আলম আমাদের নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেন ছিল না ঠিকই – কিন্তু আমাদের হয়ে টস করতে ওই যেত। কেন না পচা মোড়লের নাতি আলম যে টসে জিতবে প্রতিবার এমনি আমাদের বিশ্বাস ছিল এবং আলম তার মর্যাদা রেখেছিল ৯৫% ক্ষেত্রে। আমরা জোর জবরদস্তি করে আলমকে ওর দাদুর কাছ থেকে টসে জেতার ডার্ক আর্টটা শিখে নিতে চাপ দিয়েছিলাম। শীতকালে আলমের ফুলটাইম জব ছিল ক্রিকেট কর্মকর্তা, গ্রীষ্মের সময় তখনও ফুটবল খেলা হত, ফলতঃ ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত, বর্ষা আর শরতের মাঝের সময়টায় সে ব্যস্ত থাকত মাছ ধরা নিয়ে – আর বছরের বাকি সময়টায় সে বড় ভাইয়ের আন্ডারে জামা কাপড়ের টেলারিং কাজ করত। এবং সমস্ত সময়েই আলমের কনস্ট্যান্ট সাথী ছিল লটারী এবং জুয়া। তবে সেই লটারী এবং জুয়া খেলার গল্প অন্য সময়। ওই বিষয় গুলি জটিল, অনেক গবেষণা এবং অনেক উত্থান-পতন তার মধ্যে জড়িয়ে আছে। শুধু কর্মকর্তা হিসাবে নয় – আলম আর হাবা, এই দুই পাবলিকের জন্য নিমো ক্রিকেট মাঠে ড্রেস কোড চালু হয়। ড্রেস কোড মানে, লুঙ্গি পরে ব্যাট করতে নামা যাবে না। একে তো টেনিস বলের খেলায় এল বি ডব্লু ছিল না, তার পর এরা দুজন লুঙ্গি ছড়িয়ে ব্যাট করতে নামা চালু করলে, বোল্ড করে প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল। বল যতই জোরে যাক, ব্যাট বীট হলে বল গিয়ে জড়াবে সেই দুই পায়ের মাঝে ছড়িয়ে থাকা লুঙ্গির ভাঁজে। তা হলে বাকি রইল ক্যাচ এবং স্টাম্পিং-রান আউট। সে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াতে, নিমো ভারত সেবক সমাজের কার্যকরী সমিতির মিটিং ঠিক হল – নো লুঙ্গি। আলম আমাদের অনেক টুর্নামেন্ট দিয়েছিল – আমরা হেরেছিলাম বেশী, জিতেছিলাম ও অনেক। তবে আলম কিন্তু আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সফল হায়ারড প্লেয়ার ফুতুদাকে স্কাউট করে আনে নি – সে এসেছিল সঞ্জুর বন্ধু হিসাবে। সঞ্জু ছিল আমাদের গ্রামের বাই ফার দ্যা গ্রেটেষ্ট প্লেয়ার অব অলটাইম। এমনও শুনেছিলাম যে লোকে নিমোর খেলা দেখতে এসেছিল সঞ্জুর ব্যাটিং-বোলিং এবং আমার কিপিং দেখবে বলে। নিমো গ্রামের বুকে ফাষ্ট বোলিং এবং এগিয়ে গিয়ে বুক চিতিয়ে ছয় মারা সঞ্জুই শিখিয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত ফুতুদা প্রায় আমাদের গ্রামের ছেলে হয়ে উঠেছিল – সময় এগুতে এগুতে এক সময় বন্ধু বিচ্ছেদ হয়, পাবলিকেরা স্বাভাবিক ভাবেই ত্রিকোণ প্রেমের ব্যাপার টেনে আনে, তবে সেই সব গল্প এবং একবার টুর্নামেন্ট ফাইন্যালে জেতার জন্য ২৬ না করতে পারার গল্প পরের বার। অনেক দিন হল শীতকালে বাড়ি যাই না – নিমোর হয়ে ক্রিকেটও অনেকদিন খেলি নি। আগের বার বাড়ি গিয়ে ফুতুদার ইলেকট্রিকের দোকানে একটা ইস্ত্রী কিনতে গেছি। ফুতুদা বলল, কিরে সুকান্ত একবার শীতকালে আয়, একবার বুড়ো হাড়ে একবার নামা যাক – আর আলমকে না হয় টিম বানাতে বলা যাবে। ফুতুদাকে বললাম ক্রিকেট ছাড়ো, “আলম এখন মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত। এই তো দু-দিন আগে দেবীপুর থেকে মাছ ধরে এলাম”। [ক্রমশঃ] বিঃ দঃ লেখাটি পূর্বে 'গুরুচণ্ডালি' ব্লগে পোষ্ট করেছিলাম।

223

13

জল

দিল্লী কালিবাড়িতে একটি রাত

ছোটমামা এসে গেছিলো বলেই ম্যাক্সির ওপর একটা ওড়না চাপিয়ে চলে এসেছিলাম| বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে| পাশের গাছটা কি গাছ ঠিক জানিনা| কিংবা জানতাম‚ এখন মনে পড়ছে না| ঘন হয়ে আসা ছায়ায় রাত গভীরের ইঙ্গিত| চারিদিকের হলুদ আলোতেই কেমন একটা ঝিমধরা ভাব| কালীবাড়ির ভিতরেও হলুদ আলো-আঁধারি| ওপরে চলে আসি| সবাই ঘরে চলে এসেছে| তিনটে তক্তাপোশের ওপর বসে খানিক আড্ডা চলল| এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরার অভ্যাস তো কলকাতাতে আমাদের নেই| আমি অবশ্য একা‚ তিনি গেছেন তার জায়গায়| আর তেঁনাকে নিয়েই হি হি হা হা থেকে এদিক ওদিকে হয়ে শাখাপ্রশাখায় আড্ডা| কনকনানি বাড়ছে‚ বাড়ছে মশাও| জানলাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হল| ব্যাগ থেকে বেড়িয়ে পড়ল অল আউট| মোবাইলগুলো চার্জেও বসাতে হবে| ঘরে সেই ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়| আগে-পরে করে দিয়ে নিতে হবে| এবার সবাই গড়িয়ে নিতে চায়| চোখ খুলেই নিজামুদ্দিনে ছুটতে হবে| তার আগে আছে প্রাত্যহিক কর্ম| সকালের অভিজ্ঞতা আমাদের অভিজ্ঞ করে তুলেছে| বড় তক্তাপোশের একটায় ছেলেরা মানে শ্যামলদা‚ নৃপেনদা‚ গোরাদা আর দীপঙ্কর| অন্যটায় মুন্নাবৌদি‚ কালুর পিসি‚ সোমা‚ সোমার ছেলে আর ছোটটায় আমি‚ পুচুন আর পুচুনের মেয়ে| দীপঙ্কর তৈরি হচ্ছে‚ অন্যরা তখন বডি ফেলে দিয়েছে| জানে না তো এই লোকটাকে| পরিপাটি করে মুখে বোরোলীন ঘষা হল‚ এবার ঠোঁটের ওপর পুরু করে বোরোলীন দিয়ে ঠোঁটদুটোকে এক্দম এঁটে দিল| ও খিল আজ রাতে আর খুলবে না| এবার যা কথা হবে ইশারায়| আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি| ইশারা-মিশারা বুঝি না| বাকিরা চোখ মেলে দেখছে আর হি হি হা হা| সোমা ক্লান্ত‚ মাঝে মাঝে আচমকা হি হি শুনে মাথা তুলে দেখে হেসেই আবার ঘুম| এক্দম লাস্টে নৃপেনদার পাশে শুল দীপঙ্কর| তক্তাপোশের ওপর পাতা কম্বলগুলো মা যদি দেখত‚ তাহলে অবধারিতভাবেই বলত‚ এগুলো মরাফেলা কম্বল| তার ওপরে আমাদের চাদরগুলো পেতে শোয়া হয়েছে| তবু যে কেন কুটকুট করছে কে জানে!! মনের ভিতরেই যে খুতখুতানি‚ তাই হয়ত ঘুম আসতে চায় না| তা না হলে শরীর যে পরিমাণ ক্লান্ত তাতে অন্য যেকোন লোক নাক ডাকিয়ে ঘুমোতো| তারওপর আবার কোনদিন চৌকিতে শোবার অভ্যাসটাও তো নেই| ওদিকে সোমার নাক বজ্রনাদের মত নিশুতিরাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিচ্ছে| যোগ্য সঙ্গতে গোরাদা| পুচুন সতর্ক মেয়ের ঘুম না ভেঙ্গে যায়| আমিও তাই| একপাশ হয়ে কোনোরকমে গুটিয়ে শুটিয়ে শুয়েছি| পাশ ফেরার উপায় নেই| মেয়েটার ঘাড়ে গিয়ে পড়ব| কখন ঘুমিয়েছি কে জানে? তবে বেশিক্ষণ যে ঘুমায়নি সেটা বুঝতেই পারছি| নিস্তব্ধ ঘরে নাসিকার ফিসফাস‚ শ্বাসের ওঠাপড়া| বন্ধ জানলার ফুটো দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে একটা কৌনিক আলোর রেখা| ঘুম ভাঙলেই একবার টয়লেট যেতেই হয়| কিন্তু এখানে চেপে থাকি| অন্ধকারে বুঝতে পারছি না রাত কটা? কেউ কি জেগে আছে? পাশ ফিরতে পারছি না বলে ঘাড়ে ব্যাথা করছে| এককাৎ-এ শুয়ে থাকা বেশিক্ষণ যায় না| আস্তে আস্তে উঠি| আমাদের তক্তপোশের পাশেই একটা টেবলে আমার মোবাইলটা রাখা| তুলে দেখি রাত আড়াইটে| কোথায় কি? মাথা ব্যাথা করতে থাকে সাথে চোখ জ্বালা| উসখুশ‚ উঠি বসি| ওপাশের তক্তাপোশেও কেউ উঠেছে| মনে হল গোরাদা| সবাই মোটামুটি উঠেই পরেছে| অন্ধকারেই আমরা একটা বিশেষ ব্যাপার নিয়ে হাসাহাসি করি| সোমা তখনও গভীর ঘুমে| ধেবরা হয়ে থাকা কাজল যেন চোখের তলায় পলি ফেলেছে| সোমা যাই সাজুক না সাজুক সারাটাদিন চোখে মোটা করে কাজল লাগিয়ে থাকে| মনে হয় ঘুমোতে যাবার আগেও তোলে না| আর তুললেও ওঠে না| স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে| দীপঙ্কর বেচারা আর উঠতে পারে না| নৃপেনদা এমন চেপে ধরে তাকে ঘুমোচ্ছে‚ তার ওপর ঠোঁটে আঁটা খিল‚ আমাদের ঘর কাঁপানো হাসি শুনে নৃপেনদা উঠে পড়ে| এই নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ চলে আমাদের হাসাহাসি| ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে| আমরা ভোর থাকতেই তৈরি হয়ে নিতে থাকি| এইসময় কলে ভালো জলও ছিল| বেশিরভাগই ঘুমোচ্ছে| চান করি না‚ পরে করব‚ এত সকালে গরম জল কোথায় পাব| লাগেজ নিয়ে আমরা নীচে নেমে আসি| শ্যামলদা সবাইকে চা খাওয়ায়| অফিসিয়াল কাজ সেরে আমরা বেরিয়ে পরি পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে| দিল্লীকালীবাড়ির অনেককিছু ভালো লাগেনি যেমন ‚ তেমন একটা রাতকে স্মরণীয় করে রেখেছে| ঐ রাতটা আমারা খুব এনজয় করে কাটিয়েছিলাম| তার সবটাই এখানে খুলে লেখা গেল না| গতদিনের সব অভিযোগ‚ বিরক্তি কেটে গিয়েছিল| মনে হয়েছিল‚ সব অভিজ্ঞতাই জীবনে থাকা ভালো|

365

35

মনোজ ভট্টাচার্য

বাওয়ালির রাজবাড়িতে !

বাওয়ালির রাজবাড়িতে ! আমাদের আশেপাশে কত না জানা অজানা জায়গা আছে – কিছু দেখা কিছু বা অদেখা ! তারই মধ্যে আমরা ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পৌঁছে গেলাম – বজবজের বাওয়ালি রাজবাড়িতে ! আগে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিতে হয় ! কারন ভেতরে ঢুকতে হলে লাঞ্চ করতে হবে ! যারা জঙ্গলে মধু আহরন ও কাঠ আনতে যায় - তাদেরি সাধারনত বাওয়ালি বলে । এই বাওয়ালি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এই অঞ্চলে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বসবাস করছে ! প্রায় সতের শতকে সম্রাট আকবর তার এক বিশ্বস্ত কর্মচারী বাসুদেব রায়কে বাওয়ালীর আঞ্চলিক শাসনকর্তা করে পাঠিয়েছিল । পরবর্তীকালে তারই এক উত্তরাধিকার হরনন্দ মণ্ডল এখানে বাওয়ালী সম্প্রদায়ের ওপর কর্তৃত্ব করে ও জমিদারী পত্তন করে । ব্রিটিশ ভারত দখলের পর এই জমিদারেরা ব্রিটিশদের অধিনতা স্বীকার করে নিয়ে জমিদারি বজায় রাখে ! আমরা বাওয়ালী রাজবাড়িতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তি রঙের শাড়ী পরিহিতা কয়েকটি মেয়ে দোর-গোড়াতেই আমাদের চন্দনের টিপ পড়িয়ে বরন করে নিল ! – উজ্জয়নীতেও একটা হোটেলে – মালা টিপ পড়িয়ে বরন করেছিল বাসশুদ্ধু সবাইকে ! – সে যাইহোক, রাজবাড়ি বলে কথা ! ব্যাপার-স্যাপার একটু রাজকীয় তো হতেই পারে ! লক্ষ্য করলাম – একটু বেশিই খাতির করা হচ্ছে আমাদের ! মানে - অন্তত ছ সাতজন বাসন্তী শাড়ী, পাঁচ-ছ জন টাই-সুট পড়া কম বয়েসী কর্মচারী সমানে আমাদের তত্ত্বাবধান করছে । দুজন আমাদের নিয়ে গেল ওপর তলায়, বাইরে বাগানে । সেখানে আছে বিরাট প্যাভেলিয়ান – প্রায় দু-আড়াই শো জন লোককে বসিয়ে খাওয়ান যেতে পারে । ওদিকে একটা সুইমিং পুল, তার পাশেই আছে রৌদ্র স্নান করার ফ্ল্যাট সোফা । তার পেছনে মনে হল রান্না ঘর ! আমাদের সঙ্গে গোটা চারেক রাজ হাঁস সমানে ঘুরছে ! আর এদিক ওদিক বেশ কিছু দেশী ও বিদেশী অতিথি বসে আছে রোদ্দুরে ! একতলায় একদিকে ওদের অফিশ । বলল – আগে নাকি এখানে কারাগার ছিল ! জায়গাটা বেশ অন্ধকার । আর দেওয়ালগুলো যে কী পুরু ! – এখন সেখানে প্রচুর সোফা ও কিছু ফ্যান্সি আসবাব রাখা আছে ! – অফিশ ঘরে রয়েছে কম্পিউটারের সরঞ্জাম । আর গোটা আস্টেক টেবিলে কম্পিউটার রানিং অবস্থায় ! – সি সি টিভি ! – কেন জানিনা – ব্যাপার স্যাপার দেখে জেমস বন্ডের সিনেমার কথা মনে পড়ে যায় ! প্রায় দেড়টা নাগাদ আমাদের খাবার টেবিলে ডেকে নিয়ে যাওয়া হল । - বিরাট দর-দালান । সেটা ভাগ করে দুদিকে ডাইনিং স্পেস করা হয়েছে ! দুদিকে পঁচিশ পঁচিশ করে চার সিটের টেবিল । - এককালে এখানে নিশ্চয় দুর্গা-পুজো হত ! আজ আমাদের পেট পুজো হচ্ছে ! সিটে বসতেই চোখে পড়ল জানলার বাইরে একটা মন্দিরের চুড়া – ভাঙ্গা-চোরা ! এখানে নাকি অনেকগুলো মন্দির আছে – রাজবাড়িকে ঘিরে ! কিন্তু যেগুলো চোখে পড়ল – সবই ভাঙ্গা – গাছ গজিয়ে গেছে ! দেখে মনে হল না – কেউ পুজো-টুজো দেয় ! – শুনলাম সন্ধ্যে বেলায় নাকি আরতি হয় ! কোন ঠাকুরের – কেউ জানেনা ! আগে যেহেতু এখানে পুজো হত – তাই আরতি হয় ! এখানে দ্রষ্টব্য আছে অনেক কিছু – যদিও আমাদের রাজবাড়ির আদর খেতে খেতে সময় চলে গেছে – দেখা কিছুই হয় নি ! স্বামী বিবেকানন্দ চিকাগো থেকে ফিরে আসার পরেই ১৮৯৭ সালে বজবজে তাঁকে সম্বর্ধনা জানানো হয় ! তারপর তিনি বজবজের ফেরিঘাট থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন ! এখানেই আবার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কিছু ইতিহাসও আছে ! যেমন কোমাগাতা মারু জাহাজের ঘটনা উল্লেখযোগ্য ! ১৯১৪ সালে - শিখ নেতা গুরদিথ সিংএর নেতৃত্বে ১৯ জন সহযোদ্ধাকে ব্রিটিশরা গুলি করে হত্যা করে ! এখানে হুগলী নদীর ধারে তার একটি স্মারক আছে ! এখানকার জমিদাররা বেশ কিছু রাধাকৃষ্ণ জিউর মন্দির তৈরি করেছে ! – এছাড়াও অছিপুরে ১৭১৮ সালে তৈরি একটা চীনা মন্দিরও আছে । রাজাদের শেষ সলতে আমাদের সঙ্গে দেখা করে অনেক গল্প করলেন ! ওদের একটি মেয়ে খুব কম বয়েসে মারা গেছে । তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দের জন্মোৎসব উপলক্ষে সাতদিন ধরে একটি সঞ্চারি মেলা হয় ! নানারকম একাডেমীক কর্মশালা হয় ! খুব লোকসমাগম হয় ! – সেই সুত্রে – আমাদেরও নিমন্ত্রন হয়ে গেল ! শেষ কথাটা যাই বলে – লাঞ্চের ডিশে সতেরোটা পদ ! এবং জন প্রতি দাম মাত্র - বারো শো পঞ্চাশ টাকা ! – রাত্তিরে থাকলে সাত হাজার টাকা প্রতি ঘর ! – টাকার জন্যে চিন্তা নেই – রাজবাড়ি ক্রেডিট কার্ড নেয় ! মনোজ

222

12

মনোজ ভট্টাচার্য

সুন্দরবনে দেড় দিন !

সুন্দরবনে দেড় দিন ! বনবিবি বা বনদেবী – সুন্দরবন জল জঙ্গলের একচ্ছত্র দেবী – যার কাছে মুসলমান হিন্দু সবাই মাথা নত করে – পুজো দেয় ! বনবিবি সমস্ত জঙ্গলকে শাসন করে ! যারা মধু আনতে যায় বা কাঠ আনতে যায় তারা প্রার্থনা যাতে দক্ষিণ রায়ের এলাকা থেকে নির্বিঘ্নে প্রত্যাবর্তন করতে পারে ! কথিত আছে মক্কা থেকে আগত বেরহিম ( ইব্রাহিম ) নামে এক ফকিরের অপুত্রক প্রথমা স্ত্রী ফুলবিবির কাছে দ্বিতীয় বিয়ের জন্যে অনুমতি চাইলে – ফুলবিবি একটা সর্ত দেয় । কি সেই সর্ত ! – গোলাববিবির কোন সন্তান হলে তাকে জঙ্গলে নির্বাসন দিতে হবে ! সেই মতো গোলাববিবি সন্তানসম্ভবা হলে তাকে জঙ্গলে রেখে আসা হয় । তার দুই সন্তান হয় – কন্যা বনবিবি ও পুত্র শা-জংলি ! – পরবর্তী কালে বেরাহিম অনুতাপবশত বনবিবিদের ফিরিয়ে আনতে গেলেও – তারা কেউই বন ছেড়ে ফিরতে রাজি হয় নি ! জঙ্গলের মানুষদের ওপর দক্ষিণ রায়ের অত্যাচারে ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বনবিবি – এমনকি তার মা গুলাববিবির সঙ্গেও ফিরতে চায় নি ! তার ভাইও দিদির সঙ্গে থেকে যায় ! মানুষদের সংগ্রামে সামিল হয় ! দক্ষিণ রায়ের মধু ও কাঠ আহরণকারী মানুষের ওপর ক্রমশ বাড়তে থাকায় – তারা মা-বনবিবির পুজা করতে থাকে ! এতে দক্ষিণ রায়ের আরও ক্রোধ হয় ও বনবিবির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্যত হয় ! কিন্তু তার মা নারায়নী দেবী তাকে নিরস্ত করে এই বলে যে - কেবলমাত্র মেয়েরাই মেয়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে ! বনবিবির সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত করতে না পেরে নারায়নী দেবী শেষ পর্যন্ত সন্ধি করে ও বনবিবিকে সই বলে সম্বোধন করে ! তারপর থেকে বনবিবি ও দক্ষিণ রায় – দুজনেই পুজা পেতে থাকে ! কিন্তু দক্ষিণ রায় খুব খুসী হয় নি এই সমঝোতায় । সুযোগ পেলেই বনবিবির অনুগামীদের ওপর অত্যাচার করত ! এই সময়ে দুখী বলে মাওলিদের একজন তার মায়ের সঙ্গে বাস করত এখানে । দুখীর বাবা মারা গেছিল বাঘের থাবায় । দুখীর ধনি-চাচা নামে এক কাকা এসে জঙ্গলে তাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইল !- মায়ের অশ্রুজলসিক্ত বাধা স্বত্বেও দুখী ধনী চাচার সঙ্গে বেরিয়ে যায় । পথে কোন জায়গায় যথারীতি দক্ষিণ রায়ের ফাঁদে পড়ে ওদের দল । দক্ষিণ রায় বাঘের রূপ ধরে এসে ধনী চাচাকে বলে দুখীকে কেদোখালি বলে গভীর জঙ্গলে রেখে চলে যেতে – তাহলে ওরা যথেষ্ট মধু ও কাঠ নিয়ে আসতে পারবে । - দুখী কিন্তু ঘুমের মধ্যেও এই কথা শুনতে পায় ! ভয়ের চোটে দুখী মায়ের নাম করে কাঁদতে থাকে ! তখন তার মনে পড়ে যায় – তার মা তাকে বিপদে পড়লে বনবিবি দেবীকে ডাকতে বলেছিল । ধনি চাচা তার লোকজনকে নিয়ে মধু ও কাঠ নিয়ে আসার সময়ে ঐ দ্বীপে মধু ভর্তি নদী দেখেছিলো । তাই ঐ জায়গার আরেক নাম মধু-পানী ! এদিকে বনবিবি তো তার ভক্তের আহ্বান শুনতে পেয়ে তার ভাই শা-জংলিকে নিয়ে দক্ষিণ রায়কে আক্রমন করতে এলো । অনেকদিন ধরে এই যুদ্ধ চলার পর অবশেষে দক্ষিণ রায় আত্মসমর্পণ করে ! এই গল্পের ভিন্ন রূপ ও ব্যাখ্যাও আছে !তবে এই পালাটাই বেশ জনপ্রিয় ! কেন এই ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলোর ব্যাখ্যান ! কারন এবার আমাদের যাত্রা হল সুন্দরবনে ! তাও মাত্র দেড় দিন ! পশ্চিমবঙ্গ সরকারী লঞ্চে চিত্ররেখায় শনিবার বেলা বারোটা নাগাদ শুরু ! চিত্ররেখাকে দেখে তো আমাদের দারুন লাগলো ! লঞ্চ বা ক্রুজের ছোট জাহাজও অবশ্য এর চেয়ে অনেক গুন বড় ও আরামপ্রদ ! – কিন্তু এখানে এই পরিসরে এরও অনেক আকর্ষণ আছে বৈকি ! আমাদের কেবিন বুক করা । ভেবেছিলাম কেবিন ভাল – একদম আলাদা ! আলাদাই বটে ! একতলার ডেক পেরিয়ে জলের পাশ দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ! প্রায় লঞ্চের বাইরে – ঠেলে বাইরে জলে ফেলে দেওয়া আর কি ! কিন্তু আজকের ট্রিপে চল্লিশ জনের স্থানে মাত্র চোদ্দ জন ! – অঢেল জায়গা ! নিচে ওপরে – বিশেষ করে ডেকে আমাদের সবার বসার বদলে ফুটবল খেলতেও পারতাম ! কিন্তু ডেকে বসে বসে সময় কাটানো – আহা ! কোথাও দৌড়নো নেই – কোথাও হেঁটে গিয়ে কোন কিছু দেখা নেই ! শুধু বিশ্রাম – বাংলায় যাকে বলে রিল্যাক্স ! – আমরা চারজন – ওরা চারজন – তারা চারজন – আর একটি দম্পতি ! – সামনে অনন্ত জলরাশি – বিরাট বিস্তৃত নদী - ! একটা নদী থেকে আরেকটা নদী ! কয়েকটা নদী ছাড়া বেশ কয়েকটা নদীর নামই জানিনা ! – আর দূরে দূরে শুধু বন – বনানি – বনান্তর ! সোনাখালি থেকে লঞ্চ ছাড়ল দুপুরে । তার আগে বাসে আসতে আসতে আমাদের ব্রেক ফাস্ট ইতিমধ্যেই সারা ! – লঞ্চে উঠেই আবার লাঞ্চ – সেও বেশ উপাদেয় ! ঘণ্টা খানেক গিয়ে সজনেখালি ও সুধন্যখালি । খুব সম্ভবত নদীর নাম – খালি ! কারন বেশিরভাগ নদীর পদবীই খালি ! খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে ঝাপিয়ে এলো নদীর বুকে ! – আমরা তখন ওপরে ডেকে বসে স্ন্যাক্স খাচ্ছি । আমরা যেমন চিত্ররেখা লঞ্চে চরেছি - তেমনি আরও একটা লঞ্চ সর্বজয়া । আগের দিন ছেড়েছে – কোনভাবে সেও আমাদের প্রায় সাথে-সাথে আগেপিছে চলেছে ! রাতের অন্ধকারে ঐ লঞ্চের আলো নদীর বুকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে ! লঞ্চে যখন অত জায়গা – তখন আমরা ঐ কেবিনে বন্দীত্ব যাপন করি কেন ! সোজা চলে এলাম ডেকে ! সবার সঙ্গে – সবার মাঝে ! এখানেই রাত কাটাই ! পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল – বিশ্বাস করুন – বেড-টিএর ডাকে ! আহা কি মধুর সে ডাক – মুখের কাছে গরম চা ! সকালে যারা নিজেরা চা করে খায় – তাদের কাছে – বেড-টিয়ের ডাক ! সকালে ভরা জোয়ার । ওদিকে লঞ্চ তখন চলতে আরম্ভ করেছে ! একটু পরেই এলো ব্রেক ফাস্ট ! সে এক আই ঢাই ব্যাপার ! ফুলকো লুচি আলুর দম মিষ্টি ফ্রুট স্যালাড – ইত্যাদি ইত্যাদি ! এবার এসে গেল – দো-বাঁকি ! এখানে ব্যঘ্র প্রকল্প ! ও, হ্যাঁ ! সুন্দরবনে নাকি একশ চল্লিশটা বাঘও আছে ! রোজই টিভিতে কাগজে দেখি – বাঘে ধরেছে ! শুনি বটে – বাঘে-কুমিরে লড়াই ! – আমরা তো হাঁটতে হাঁটতে ওপরের ওয়াকওয়ে ধরে একদম শেষ পর্যন্ত গেছি ! গাইডের কথা অনুযায়ী গতকালই নাকি বাঘে হরিন ধরেছিল ! – একথা তো আমরা আগে যেবার এসেছি – তখনও শুনেছি – মানে চল্লিশ বছর আগেকার কথা ! আমাদের আগে আগে সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায় কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে সুন্দরি নামে একটা সুদৃশ্য লঞ্চে ঘুরছেন ! – একদম নামার সময়ে আমাদের কাঁধে হাত দিয়ে ছবিও তুললেন ! প্রকৃতপক্ষে অন্য একটা গ্রুপের এক মহিলা ছবিটা তুলেছে ! লঞ্চে ফিরেই খাবারের তাড়া – তখন সাড়ে এগারোটা ! লঞ্চ ফিরবে সোনাখালি দেড়টায় – তাই - ! অগত্যা - ! সোনাখালিতে ফিরে আমাদের জলের সঙ্গে বনের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল ! নাম না জানা কত নদী – মাতলা, কালি, বিদ্যা, ইত্যাদি ! - তারপর আবার আমাদের বাস ! আমরা বাঘ বা কুমীর দেখতে পাইনি ঠিক কথা – কিন্তু তার জন্যে আমাদের কোন আফসোস নেই ! এই যে কলকাতার জীবন থেকে হঠাৎ দুটো দিন ছিটকে এলাম – সেই মুক্তির স্বাদ পাবো কোথায় ! মনোজ

193

7

সুকান্ত ঘোষ

ভোজ-পুজো অথবা পুজো-ভোজ

ইস্কুলের সেক্রেটারীর কি মাহাত্ম্য সে বোঝার বয়স তখনো হয় নি, কিন্তু পটল বিষয়ীর মহিমা বোঝার মত বয়স হয়ে গিয়েছিল। সবে আনন্দমার্গ ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মেমারী বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে ক্লাস ফাইভে ঢুকেছি – সেক্রেটারী কি জিনিস জানা নেই – পটল বিষয়ীকে চিনি না। এমন অবস্থায় দুরদার করে চলে এল হাইস্কুলে আমার প্রথম সরস্বতী পুজো আর তখনি একদিন দুম্‌ করে সেক্রেটারী পটল বিষয়ীর ব্যাপারটা ক্লীয়ার হয়ে গেল। এক সিনিয়ার দাদা ফিসফাস করে আমাদের জানালো পটল বিষয়ীর সেক্রেটারী রয়ে যাবার পিছনে মূল কারণ হচ্ছে তেল। আমরা জানতে চাইলাম ‘রয়ে’ যাওয়া মানে কি? দাদা বলল, আরে বোকা, গাব গাছের আঠা দেখেছিস? কোনদিন জামায় লাগিয়েছিস? ওই গাব আঠা যেমন জামায় লেগে থাকে, বারবার কাচলেও যায় না, তাকেই বলে ‘রয়ে’ যাওয়া। দাদা আরো জানালো যে তার দাদার আমলেও নাকি ইস্কুলের সেক্রেটারী ছিল পটল বিষয়ী – এমনকি সে তার বাবাকে জিঞ্জেস করলে বাবা জানায়, ঠিক মনে করতে পারছি না, তবে মনে হয় আমাদের সময়েও পটল বিষয়ীয় ছিল। এতো প্রশ্নের পর আর আমরা তেল কি ভাবে, কোথায় পটল বিষয়ী কাজে লাগায় জানার সাহস পেলাম না। অতঃপর আমাদের মন ছুঁক ছুঁক – অন্য দাদাদের কাছে ঘুর ঘুর করছি। একদিন সাহস করে আমরা জিঞ্জেস করে ফেললাম – দাদা, ওই পটল বিষয়ী আর তেলের ব্যাপারটা যদি আমাদের শিখিয়ে দাও। যা জানা গেল তা হল এই – প্রতি বার ইস্কুলের সরস্বতী পুজোর সময় লুচি ভাজার তেলটা পটল বিষয়ী দান করে। তখনো আমাদের দিকে ডোনেশন ব্যাপারটা তেমন চালু হয় নি – সবাই দান করত। আমাদের ক্লাসমেট (বাই দি ওয়ে আমাদের তখন ক্লাসমেটও ছিল না – বন্ধু ছিল। তবে সেই বিষয়ক আঁতেল মার্কা লেখা পরে হবে) দেবুর বাবার মেমারী স্টেশন বাজারে মনোহারী দোকান ছিল। তাই তেল, গুড়, চাল এই সব ম্যাসিভ স্কেলের জিনিস সম্পর্কে দেবুর হালকা ধারণা ছিল। দেবু প্রশ্ন করল – সব লুচি ভাজতে যা তেল লাগবে সব পটল দেবে? সে তো অনেক লুচি গো! প্রশ্ন শুনে সিনিয়র ঘাবড়ে গেল – সে তার সিনিয়র ডেকে আনলো। ঠিক সমাধান পাওয়া গেল না প্রশ্নের – কেউ বলল পটল মাত্র এক টিন তেল দেয়, কেউ বলল দু-টিন। সব লুচি ভাজতে মোট কয় টিন তেল লাগে তার আইডিয়া না থাকার জন্য এই প্রশ্ন অমিমাংসিত থেকে গেল। কিন্তু দেবু মেমারীর ছেলে – আমি তো আর ঠিক মেমারীর নয়, মেমারীর পাশের গ্রাম নিমোর। তেল নিয়ে খটকা লাগার আগে, আমার আরো বেসিক খটকা ছিল – সরস্বতী পুজোর সাথে লুচির কি সম্পর্ক! তার পর এল বিষ্ময় – পুজোতে নাকি স্কুলের সব ছেলেকে লুচি খাওয়ানো হয়! ভাবা যায়! আশে পাশের ইস্কুলের কোন কোনটায় খিচুড়ি খাওয়ায় শুনেছি – যেমন রসুলপুর স্কুল। তা বলে লুচি! জাষ্ট ভাবতে পারছিলাম না আমার সেই ক্ষুদ্র ব্রেন দিয়ে। আরো পরে জেনেছি যে মেমারী স্কুলের এই লুচি খাওয়া ব্যাপারটায় একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব লুকিয়ে আছে – সেই গর্ব রসুলপুর স্কুলকে টেক্কা দেবার আবেশ। মাধ্যমিকের রেজাল্টে মেমারী সব সময় রসুলপুরকে টেক্কা দিতে পারত না বলে আমরা রিভেঞ্জ নিতাম এই বলে যে, আমাদের সরস্বতী পুজোয় লুচি হয়, তোদের হয়! মেনু খুবই সিম্পল – লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম, বোঁদে, চাটনী এবং দুটো করে রসগোল্লা। সে এক আলাদা স্বর্গীয় স্বাদ – লুচি ঠান্ডা হয়ে জুতোর সুকতলা হয়ে গেছে, কোই পরোয়া নেই – আলুর দমে আলুর থেকে খোসা বেশী ভাসছে, তাই সই – বোঁদে আগের দিন থেকে ক্লাস সিক্স সেকশন ‘এ’ মেঝেতে পড়ে থেকে গন্ধ হয়ে গেছে, তাতে যেন স্বাদ আরো খুলেছে। তবে পটল বিষয়ী শুধুই একা দান করত বললে ভুল বলা হবে – পটল বাবুর দেখাদেখি মেমারির আরো বিজনেস ম্যানেরা এগিয়ে এল – নারান কুন্ডুর আলুর গদি থেকে আওয়াজ এল, ওরে দু বস্তা আলু নিয়ে যাস। সোমেশ্বর তলার পাশে কাঁচাবাজারে যে ফুল কপি বিক্রী হল না, সেগুলি ফেলে দেবার বদলে বলা হল – নিয়ে যাস রে। অবশ্য সেই বাতিল ফুলকপির ঝুড়ির উপরে ছড়ান থাকতো কিছু পুষ্ট ফুলকপি – ঠিক যেমন ফুলসজ্জার বিছানায় ছড়ানো থাকে প্রথাগত ভাবে গোপালের পাপড়ি – সবই সিম্বলিক ব্যাপার। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত শুধুই খেয়ে চলে আসা – ক্লাস নাইন থেকে যুক্ত হল ফেরার পথে মেমারী রসিকলাল স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়ের পথে উঁকি ঝুঁকি। তবে সেই কৈশোরের প্রেম অঙ্কুরদগমের থেকেও বেশী চার্মিং ছিল স্কুলে সরস্বতী পূজোর দায়িত্ব সামিল হওয়া, বিশেষ করে ভাঁড়ারে ঢোকার অধিকার। ক্লাশের মনিটর এবং ‘ফার্ষ্ট’ বয় হবার জন্য স্যারদের দেওয়া রোল গুলির মধ্যে কোনটা আমি চুজ্‌ করব সেই নিয়ে চ্যালেঞ্জ আসে নি কোনদিন। তা আমার ভোজ এবং পুজোর কম্বিনেশানের মধ্যে ভোজ-পুজোর অর্ডার অব্‌ প্রেফারেন্সটাই সহি মনে হয়েছিল সেই বয়েস থেকেই পুজো-ভোজ এই অর্ডারের থেকে। ফলতঃ রোল নাম্বার ওয়ান আমি গেলাম ভাঁড়ারের দিকে, আর রাম-শ্যাম-যদু-মধু সহ নানা রোল নাম্বার গেল পুজার সাজ সরঞ্জাম সহ কদমা, তিলে প্যাটালি, মুড়কি ইত্যাদি ইত্যাদি কেনার দিকে। পুজোর দিকে সকাল সকাল স্কুলে গিয়ে দেখলাম অলরেডি অ্যাসেম্বলি লাইন চালু হয়ে গ্যাছে – সবাই কেমন তেল দেওয়া মেশিনের মত খাবার তৈরীতে লেগে গেছে। তখনই প্রায় ক্লাশ সিক্সের ‘বি’ সেকশনের ঘরের অর্ধেক খবরের কাগজ বিছানো আর প্রায় জানালা পর্যন্ত লুচি ভেজে ভরিয়ে তোলা হয়েছে। আমার তো সেই দেখে প্রায় ইয়ে ট্যাঁকে উঠে যাবার অবস্থা। আমি বাসুদেব স্যারকে বললাম – ইহা কি হইয়াছে? বাসুদেব স্যার বলল, ইহা হইয়াছে কারণ কোন এক জ্ঞানী এবং সমাজসংস্করক ব্যক্তি বিদ্যালয়ে পুজোরে খাবারের লুচি বিতরণের পলিসিতে চেঞ্জ আনেন। আগে নাকি জন প্রতি আটটা মত লুচিতে সীমাবদ্ধ থাকত ব্যাপার – কিন্তু তিনি বলিলেন যে সবাইকে ভর-পেট লুচি খাওয়ানো হবে, অর্থাৎ ঢালাও লুচি পরিবেশিত হবে। এর ফলে নাকি ওই আটটা লুচির সসীম পরিসীমা ইলাষ্টিক ব্যান্ডের মত বাড়তে থাকে। আমি সন্দেহের চোখে বললাম স্যারকে, কত আর বাড়বে স্যার! বাসুদেব স্যার আমার অজ্ঞানতা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখে জানালেন রবি হেমব্রম চল্লিশ, সজল ক্ষেত্রপাল সাঁইত্রিশ এমন সব স্ট্যাটিস্টিক্স। বললা, ওরা তো স্যার খাবেই। স্যার বললেন, ওরে শুধু ওরা নয়, গড়ে প্রায় কুড়িটা করে লুচি ধরতে হবে পার হেড। তোর কাকার ছেলে কটা লুচি খায় তুই জানিস না? আবার ওদের দোষ দিচ্ছিস? তবে কিনা আগে থেকে যতই বানিয়ে রাখিস, ঠিক সময়ে দেখবি লুচি দিয়ে যোগান দিতে পারছিস না। স্যারের কথা সঠিক প্রমাণিত হল – সেই পাহাড় প্রমাণ লুচি কয়েক ব্যাচের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। তারপর পুরো বলিুডি-হলিউডি সিনেমার জেলের মধ্যে পাবলিকের থালা বাজানোর মতন দৃশ্য। লুচির ঝুড়ি নিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্রই, দাদা এই দিকে, দাদা এই দিকে – বলে টেবিল বাজিয়ে চিৎকার। সে এক রণক্ষেত্র প্রায়। যাই হোক বাকি তেমন কিছু গল্প নেই – প্রতি বছর সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। রসিকলাল বালিকা বিদ্যালয় আমাদের টেক্কা দিয়েছিল এই মর্মে যে, ওদের পুজোতে লুচির সাথে ফ্রায়েড রাইস পরিবেশন করে। কিন্তু রসিকলালে তো আর ছিল না রবি হেমব্রম, সজল ক্ষেত্রপাল বা আমার কাকার ছেলেরা। ওই সব পালক পালক মেয়েরা কতটা খেতে পারে সেই সম্পর্কে নিজেদের মনে একটা ধারণা তৈরী করে নিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে খাওয়া-দাওয়া বিষয়ে রসিকলালের সাথে কম্পিটিশনে ঢোকা মানে নিজেদের লেভেল নিচে নামানো। তা ফ্রায়েড রাইসের অন্তর্ভুক্তি আমাদের কনফিডেন্সে কোন টাল খাওয়াতে পারে নি। এতো গেল সরস্বতী পুজোর নিরামিষ খাওয়া – এর প্রায় উল্টোদিকে আমাদের ছোটবেলা জুড়ে ছিল আমাদের পাশের গ্রাম ‘কেজা’-র ঝাপান। কেজার ঝাপান হত জৈষ্ঠ মাসে, কালী পুজা উপলক্ষ্যে। সে নাকি বিশাল জাগ্রত কালী ছিল বা এখনো আছে। ফলে মানত দেওয়া পাঁঠা বলির হিড়িক পড়ে যেত – কেজার কালিতলায় রক্তে বন্য বয়ে যেত লিট্যারেলি। সেই অনেক অনেক দিন আগে আমাদের বাচ্ছা বেলায় প্রায় ১২০০ থেকে ১৪০০ মত পাঁঠা বলি হত পুজোর দিন সকালে। আমাদের গ্রামের অনেক পরিবারও প্রতি বছর পাঁঠা বলি দিত নিয়ম করে। প্রবলেম ছিল একটাই – একই দিনে নানা বাড়িতে নিমন্ত্রণ। কি যে লস্‌ হত বলে বোঝানো যেত না। এমন দিন গ্যাছে যে তিন বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়েছি এক রাতের বেলায় – প্রবলেম হয় নি, কারণ মেনু ছিল সাধারণ। ভাত, মাংস, একটা তরকারী, চাটনী আর হয়ত বা মিষ্টি। অ্যাডজাষ্ট করে খেয়ে নিলেই হত, কিন্তু কোনটা অ্যাডজাষ্ট করব সেটা ঠিক করাই ছিল মূল ব্যাপার। সাধারণত মাংস-ই থাকত মেন টারগেট, ব্যতিক্রম আমার আরেক জ্যাঠার ছেলে পিকুল। পরিবারের মধ্যে গ্রামের দিকে নিমন্ত্রণের ধরণ থাকে দুই ধরণের – খুব বেশী মেলামেশা পরিবারের মধ্যে না থাকলে নিমন্ত্রণ হয় পরিবার প্রতি একজনার। আর ক্লোজ ফ্যামিলিদের মধ্যে নিমন্ত্রণ হাঁড়ি-বাড়ন্ত বা কেবল বউ-দের, এমন ভাবেও হয়। পরিবার প্রতি একজনা নিমন্ত্রণ ক্যাটাগরী সামলাতাম আমরা তিন জন তিন ভাইয়ের ফ্যামিলি থাকে। বড় দাদুর পরিবার থেকে গোপালদা, ছোটদাদুর দিক থেকে পিকুল এবং মেজো অর্থাৎ আমার দাদুর পরিবার থেকে আমি। আমাদের এই তিনজনের টিমকে গ্রামের সবাই এমনকি পাশের গ্রামের অনেকেও চিনত। এমনভাবেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে যে- “গোপাল, পিকুল আর সুকানের নেমত্তন্ন রইল গো”। কেউ কিছু মনে করে নি – নিজেদের নাম দিয়ে নেমত্তন্ন পেয়ে কলার যতটা উঁচু হত, পরবর্তী জীবনে বেশ কিছু নামজাদা অ্যাকাডেমিক পুরষ্কার পেয়েও কলার ততটা ওঠে নি। তবে তার কারণ বুঝতে গেলে গ্রামের দিকে লোকেদের আগেকার দিনে নিমন্ত্রণ বিষয়ক সাইকোলজি কেমন ভাবে কাজ করত জেনে নিতে হবে। আপ্যায়ন ছিল খুবই এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার – আর কে আপ্যায়ণ করছে সেটা। হতে পারে তুমি প্রভুত বড়লোক – কিন্তু নেমন্তন্নের দিন এই এক্সপেক্টেশন থাকবে যে তুমি বা তোমার কোন ইমিডিয়েট ফ্যামিলির সিনিয়র মেম্বার আপ্যায়ণ করবে। কিছুই না – জাষ্ট এই বলা যে, আরে এসো এসো বা আয়, আয় বা কখন এলি, পরের ব্যাচেই তা হলে বসে পড়িস। এমনো হয়েছে যে আমার কাকা অনেক ক্ষণ নিমন্ত্রণ বাড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে আপ্যায়ণ না পেয়ে না খেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। আপ্যায়ন ছাড়া আরোও একটা ব্যাপার ছিল আমাদের দিকে তা হল, সামনা-সামনি নিমন্ত্রণ করা। মোবাইল ফোন তো তখন ছিল না, এমনি গ্রামে ঘরে টেলিফোনও তেমন বেশী কিছু চল ছিল না। ফলে নিমন্ত্রণ করার সহজ পথ ছিল চিঠি পাঠানো। কিন্তু শুধু চিঠি পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ খুব একটা উদার চোখে দেখা হত না। তবে সেই সব জটিল সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা অন্য কোন খানে করা যাবে ক্ষণ। এই পুজোর খাওয়ার সাথে যে সামাজিক অভ্যাস যুক্ত ছিল তা হল – ডাকতে যাওয়া। অর্থাৎ কখন খেতে যেতে হবে সেটা বলতে আসা। সেই কাজটা করত আমাদের গ্রামের চিঠি বিলি করার পিওন মিতা ময়রা (ছেলে)। এমনি দিন গেছে যে আমি, গোপালদা, আর পিকুল বিকেল থেকে না খেয়ে ড্রেস করে বসে আছে কখন মিতা ময়রা ডাকতে আসবে – আসে আসে করে রাত নটার সময় মিতা ময়রা এল – তার পর আমাদের খাওয়া যাওয়া। গোপালদার সাথে খেতে গিয়ে যতটাই আনন্দ, পিকুল ততটাই খামতি ডেকে আনত খাওয়া ব্যালেন্সে। আমার জানামতে পিকুল খুব বেশী দিন তরকারীর পরিসীমা ছাড়িয়ে মাংসে গন্ডীতে পৌঁছতে পারে নি। বেচারা তরকারী খেতে এত বেশী ভালোবসত যে মাংস পরিবেশীত হবার আগেই ডাল-তরকারী খেয়ে পিকুল পেট ভরিয়ে হাত তুলে ঢেঁকুর তুলত। গোপালদা ছিল নিঃশব্দের কারিগর – বেশি কথা বার্তা বলতে পছন্দ করত না, মন থাকত মূল বিষয়ে। আমাদের মধ্যে একমাত্র গোপালদাই তিনটি নিমন্ত্রণ বাড়ি খেত কোনটাতেই খাবার পরিমান না কমিয়ে! ফিজিক্সের লজিকে যে কিছু গোলামাল আছে তা আমি ‘ট্রাবল উইথ ফিজিক্স’ বই পড়ার আগে গোপালদার খাওয়া দেখেই শিখতে পেরেছিলাম। এমনকি এখন ভাবতে বসে দেখি হয়ত লিমিট থিওরীর লিমিটেশনের উদাহরনও ছিল গোপালদার খাওয়া। গোপালদার গোটা নিমো গ্রামে রিপিট নিমন্ত্রণ সাড়ার একমাত্র কম্পিটিশন ছিল মোড়লদের শৈলেন। শৈলেনের ছেলের পেটে বলির পাঁঠার মাংস ঠিক হজম না হবার জন্য ফ্যামিলির সব দাবাওয়াত সে নিজের সারত। কিন্তু পুজোর বলির মাংস রান্না এত সহজ নয় – খুব আধুনিক কালের বৌমারা অনেক ফাইট দিয়ে তাদের রেসপেকটিভ হেঁসেলে ‘মিট মশালা’ জাতীয় জিনিস ঢুকিয়েছে। বলির মাংস রান্না হবে ঝোল-ঝোল – কথায় বলে কচি পাঁঠার ঝোল। সেই ঝোলকে কনটামিনেটেড করা অনেক শ্বাশুরী ঠিক চোখে দেখে নি – নয় তুমি থাকবে হেঁসেলে, নয়ত আমি। এই বলে অনেক শ্বাশুরী সন্ধ্যের ভাঁটে বা টি ভি সিরিয়ালে মুখ ডোবালো। শ্বাশুড়ি-বৌমা ব্যাপার মিটলেও, যে জিনিস মেটার চান্স ছিল না, তা হলে একটা মাত্র পাঁঠা বলি দিয়ে নিমন্ত্রিত সবার পেট ভরানো। বলি দেবার জন্য পাঁঠা সিলেক্ট করা হত সাধারণত দশ কেজির নীচে – সাত থেকে আট কিলো অপ্টিমাম। মানে গিয়ে সলিড মাংস দাঁড়াতো পাঁচ থেকে সাত কেজি। পাঁঠার মাংসে প্রতি কেজিতে পাঁচ জন লোক খাবে সেই হিসাবে ২৫ থেকে ৩৫ জন লোকের মাংসের জোগান দিতে পারত সেই শহীদ হয়ে যাওয়া পাঁঠা। তাহলে কি হবে? আরে ফ্যামিলির লোকই তো ২০ জন! যারা গোঁড়া ধর্ম ভক্ত তারা বলি দিতে লাগল একাধিক পাঁঠা, আর বাকিরা চালু করল ‘কনটামিনেশন’। মানে হল গিয়ে বাজার থেকে পাঁঠার মাংস কিনে নিয়ে এসে মিশিয়ে দেওয়া। আমার বাড়িতেও তাই চালু হল – ঠাকুমা আপত্তি করলে বাবা বলল, প্রসাদ তো করে দিচ্ছি নাকি? মানে পুজোর বলির পাঁঠার মাংস মিশিয়ে দেওয়া হল কেনা মাংসের সাথে। ঠাকুমা কুঁই-কাঁই করে মেনে নিল শেষে। পুজোর পাঁঠা অনেকে বাড়িতে পালন করত – এতে পয়সার সাশ্রয় বেশী হত। কারণ বড় পাঁঠার দাম সাপ্লাই-ডিম্যান্ড এর উপর নির্ভর করে বাড়ত-কমত। আর তা ছাড়া আমাদের দিকে তেমন পাইকেরের চল ছিল না পুজোর পাঁঠা নিয়ে ডিল করার জন্য। নিজেদেরই খুঁজতে বেরুতে হত একখনি নিখুঁত পাঁঠা। নিখুঁত ব্যাপারটি কিন্তু এখানে লক্ষণীয় – পাঁঠা দাগি হয়ে গেলে কিন্তু তাকে আর বলি দেওয়া যায় না ঠাকুরের উদ্দেশ্যে। দাগী অর্থে চোট পাওয়া, গায়ে গরম জল ছুঁড়ে দেওয়া, সাপে কেটে বেঁচে যাওয়া, রেলে হালকা ধাক্কা খেয়ে প্রাণ টিকিয়ে রাখা – এই সব। তাই পাঁঠা কিনতে গিয়ে বারবার ক্লারিফাই করতে হত- হ্যাঁরে, মাল দাগী নয়ত? মানুষে মানুষে অবিশ্বাস দিন দিন বাড়তে থাকে – তাই অনেকেই নিজেরা পাঁঠা পালতে শুরু করে চোখে চোখে রাখা শুরু করল। বলির দিন যত এগিয়ে আসবে, টেনশন ততই বাড়বে। একবার স্টেশনের কালি পুজোর ঠিক আগের দিন পালিত পাঁঠা ট্রেনের তলায় চলে গেল – চারিদেকে হায় হায়। আমার বন্ধু হাবা ডিক্লেয়ার দিল যে পরের বার থেকে ব্যাক-আপ থাকবে পাঁঠার। সবাই ভেবে দেখে বলল, ঠিকই, ঠিকই – খুবই যুক্তিযুক্ত কথা। গাঁজাখোর বরুণ মাথা চুলকে বলল যে, ব্যাক-আপো যদি এক পালে থেকে মানুষ হয়, তাহলে সেই ব্যাক-আপও ফেল করতে পারে। আফটার অল পাঁঠা তো! এক জন গেলেই আরেকজন ফলো করবে দেখাদেখি। সবাই বলল এও ঠিক ঠিক। তার পর স্টেশনে পুজো কমিটি জরুরী মিটিং ডেকে ঠিক করল যে, দুই পাঁঠা পালিত হবে দুই আলাদা পালে – তাদের নিজেদের মধ্যে যেন কদাচিত সাক্ষাত না হয় এবং তারা যেন জানতে না পারে যে তারা একে অপরের ব্যাক-আপ। এক পাঁঠা গেল হাবার কাছে – অন্য পাঁঠা মানুষ হতে লাগল সুধীরের কাছে। ওই স্টেশনের কালী পুজোয় ব্যাক-আপ পাঁঠারা দুই জায়গায় মানুষ হতে থাকলেও গাঁজারু বরুণের রেকমেণ্ডশনে আরো একটা সতর্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বরুণ পরামর্শ দেয় যে, পাঁঠাদের সামনে কালী পূজো নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। পাঁঠারা নিজেরা যদি বুঝে ফেলে, তাহলে হয়ত বলির আগের দিন নিজেরা ইচ্ছে করে ইনজিওরড হয়ে যেতে পারে! প্রাণের ভয় কার আর না আছে! বরুণের কথা সবার যুক্তিযুক্ত মনে হল - এবং পুজো কমিটি ফরমান জারি করল যে পাঁঠা আশেপাশে থাকলে কালী পুজোর গল্প করা যাবে না। ফলে দেখা গেল বিকেলে স্টেশনে বসে পাবলিক পুজো নিয়ে আলোচনা সবে শুরু করেছে, এমন সময় চায়ের দোকান থেকে করিম-কা আওয়াজ দিল, অ্যাই চুপ, চুপ, পাঁঠা আসছে। দেখা গেল হাবা ছাগল চরিয়ে ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সবাই চুপ করে থাকল - অনেকে আবার এদিক ওদিক তাকাতে থাকল - পাঁঠাদের চোখের দিকে তাকাল না। ধীর লয়ে অনন্ত সময় নিয়ে পাঁঠা স্টেশন পার হলে আবার পুজোর গল্প শুরু। পাঁঠা বলি দেওয়া বেশ এক চমকপ্রদ ব্যাপার। কেজার ঝাপান ছাড়া আমাদের নিমো গ্রামের ঝাপানেও পাঁঠা বলি হত। কিন্তু আমাদের গ্রামের ঝাপান তেমন ইন-ক্লুসিভ ছিল না, অন্তত পুজো জিনিসটা। কারণ গ্রামে আরো অনেক কিছুর মতই এই ঝাপান এবং ঝাপানের জায়গা সবই ছিল আমাদের ঘোষ গুষ্টির অধিন। অর্থাৎ, পুজো করবে আমাদের বামুন, পুজো যাবে আমাদের বাড়ি থেকে, ঝাপানের তোলা তুলবে আমাদের বাড়ির লোকেরা ইত্যাদি ইত্যাদি। নিমোর ঝাপান হয় প্রতি বছরের পয়লা ভাদ্র মনসা পুজো উপলক্ষ্যে। সেই ঝাপানে অনেকে পুজো দিলেও পাঁঠা বলি হত খুব কম। পাঁঠা বলি করত কামারে – আর আন-রোমাণ্টিক ভাবে কামার আসত কামারপাড়া থেকে। এই এতো এতো বছর ধরে একই লোক আমাদের বাড়িতে বলি দিয়ে আসছে – কিন্তু আমরা প্রায় কেউই তার নাম জানি না। তাকে কামার বলেই ডাকতাম আমরা – সাকুল্যে বছরে দেখা হত দুই বার – বাড়ির দূর্গা পুজোয় সে আসত নবমীর দিন বলি দিতে। আর সেই পয়লা ভাদ্র ঝাপানে পাঁঠা বলি দিতে। তবে আমাদের বাড়ির দূর্গা নাকি নিরামিশাষী – তাই বাড়িতে নবমীর দিন বলি দেওয়া হত আখ, কলা, ছাঁচি-কুমড়ো ও শসা। সেই সবের সিম্বলিক অর্থ নিয়ে আলোচনা অন্য সময় – মূল ব্যাপার হল, বলি কিন্তু দিত কামার সেই একই রকম পেশী ফুলিয়ে। আমাদের এই ধরণা গড়ে উঠেছিল যে তিন গাছি আখ এবং একটি দশ কেজি পাঁঠা বলি দিতে সম পরিমান শারীরিক এবং মানসিক শক্তির দরকার হয়। চৈত্র মাসের শেষ চার দিন গ্রামে শিবের গাজন উপলক্ষ্যে ফল এবং ভোগ। এখানে ফল অর্থে শুধু ফল নয় – একটা দিনও বটে। গাজনের প্রথম দিনকে বলা হত মহা-হবিষ্যি, দ্বিতীয় দিন ফল, তৃতীয় দিন নীল এবং শেষ দিন ঝাঁপ সহ চরক। আমার ঘোষ বংশের পূর্বপুরুষেরা গ্রামের প্রায় সব জিনিসেই মাথা গলিয়েছেন – তাহলে এই ফল-ই বা বাকি থাকে কেন! গাজনে সন্ন্যাসীরা ফলের দিন নিজেদের বাড়িতে ফল খেতে যাবার আগে কাদের বাড়িতে ফল খাবে? অব্‌-কোর্স ঘোষ বাড়িতে। তবে সেই খাওয়া খুবই মনোহর লাগত আমার কাছে ছোট বেলায়। আমাদের ঠাকুর দালানে সার দিয়ে সাদা কাপড়, গলায় পৈতে এবং উত্তরীয় লাগানো সন্ন্যাসীরা বসে পড়েছে – তবে মাটিতে তো আর বসা যাবে না – আমাদের ছোটদের কাজ ছিল ছিল দুই গাছি করে খড় পেতে দেওয়া। খাবার দেওয়া হত কলাপাতায় – প্রথমে বেলের সরবত, পরে ডাল ভিজোনো সহ গুড় এবং তারপর নানা বিধ ফল। বাজারে ঐ চৈত্র মাসে যা যা ফল পাওয়া যায় সব সার্ভ করা হত। আখরোট, সবেদা, সহ সুগন্ধী জামরুল। অনেক দিন পর্যন্ত সেই সব ফল আসত আমাদের বাড়িতে ব্যাগ বা বস্তা করে কোলকাতা থেকে। বড় জ্যাঠা আমাদের দোকানের মাল বড়বাজারে কিনতে গিয়ে সেই ফলও আনত। গাজনে সন্ন্যাসীরা নিজেরা যে ভোগ রান্না করত সে আমার কাছে রহস্যই রয়ে গ্যাছে – প্রতি বার সেই ভোগ রান্না করতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলত। একবার থাকতে না পেরে ঠাকুমার কাছে অনুযোগ জানালাম – ঠাকুমা বলল, ধুর বোকা, ওটা তো ইচ্ছে করেই পুড়িয়ে ফেলা হয়। পুড়িয়ে ফেলা অর্থে এখানে সেই চালের পায়েসকে কাঠের আগুনে আঁচ দিয়ে ধরিয়ে ফেলা। সুখে থাকতে ভুতে কিলানোর মত সবাই হাঁড়ির চারিদিকে বসে অপেক্ষা করবে কখন মাল ধরে যাবে – সে এক আন-সলভেবল মিষ্ট্রি। গাজনের প্রথম তিন দিন বিকেলে সেই ভোগ রান্না হত – খেতে বেশ মিষ্টি মিষ্টি বলে আমিও বাটি হাতে লাইনে দাঁড়াতাম রন্ধন পদ্ধতি নিয়ে ডিফারেন্স অব্‌ ওপিনিয়ন থাকা সত্ত্বেও। গাজন শেষের পরের দিন, অর্থাৎ পয়লা বৈশাখের দিন, নিজেদের পৈতে খুলে ফেলার আগে সন্ন্যাসীরা আবার অনেক বাড়িত মুড়ি খেতে যেত। তবে ডাক পেলে তবেই যেত – আর যথারীতি আমাদের বাড়িতে সেই ডাক বরাদ্দ ছিল প্রতিবার। খুবই পাতি মেনু – মুড়ি, আলুর দম, বোঁদে এবং দুই খান রসগোল্লা। একবার আলুর দাম ভালো পাওয়ায় আলু পাইকের রায়েদের বাপি সন্ন্যাসীদের ডেকে খাওয়ালো মুড়ি এবং দুই-খান রসগোল্লার বদলে নিয়ম ভেঙে পেট ভর্তি মিষ্টী। বলল এতে করে নাকি সন্ন্যাসীদের আশীর্বাদ পাওয়া যাবে এবং ফলতঃ পরের বারে আরো বেশী লাভ আলুতে। যাদের বিশ্বাস করার তারা বিশ্বাস করল - আর বলতে নেই পরের বার থেকে সন্ন্যাসীরা এতো বেশী নিমন্ত্রণ পেতে লাগল যে মেজো জ্যাঠা বলতে বাধ্য হল, স্কাউন্ড্রেল সব – মিষ্টী খাইয়ে আশীর্বাদ কিনছে! আশীর্বাদ কেনা যেত কিনা বলতে পারব না – কিন্তু আশীর্বাদ ভিক্ষা করতে অনেক দূর দূর থেকে গাজনে সন্ন্যাসীদের কাছে আসতে দেখেছি। বিশেষ করে ‘ফল’ নিতে – ‘ফল’ নেওয়া অর্থে নিঃসন্তান মহিলারা জলে ডুব মেরে সে ভেজা কাপড়ে শিব দালানে দাঁড়িয়ে থাকত, আর সন্ন্যাসীরা ঝাঁপ মারতে মাচায় উঠার আগে নিজেদের কোঁচড় থেকে আলোচাল এবং কিছু ফল বের করে সেই সন্তান কামনায় প্রার্থনারত মহিলাদের দিত খেতে। আমাদের গ্রামের শিব নাকি বহুত জাগ্রত – দুনিয়া ট্রীটমেন্ট করে ফেল মহিলা আমাদের গ্রামে ফল নিয়ে সন্তানবতী হয়েছে এমন খবর বাজারে আছে। তাহলে আর রইল গিয়ে পীর বাবার সিন্নি – আমাদের গ্রামে হিন্দু মুসলমান সবার কাছেই সে এক আকর্ষনীয় অনুষ্টান ছিল। মাত্র এক বিকেলের ব্যাপার – পীর তলায় মালসার ছড়াছড়ি। পীর বাবার আশীর্বাদের থেকেও আমাদের কাছে ইন্টারেষ্টিং ছিল সোনা ময়রার তৈরী ছোলা-গুড় এবং গুড়-বাদাম। এতো ভুয়া ছোলা এবং বাদাম সোনা ময়রা কি ভাবে সংগ্রহ করত সে আমাদের কাছে এক বিষ্ময় ছিল। মানে সেই গুড়-বাদামের সমাহারে একটি, কেবল একটি ভালো, পুষ্ট, তেতো নয় এমন বাদাম খুঁজে পাওয়া আমাদের কাছে এক চ্যালেঞ্জ স্বরূপ ছিল। শুরু করেছিলাম সরস্বতী পুজার গল্প দিয়ে – প্রায় গল্পেই থেকে যায় নষ্টালজিয়া – আমি রোমন্থান করি আর ভাবি আমরা কেবল পিছিয়ে গেছি সময়ের সাথে – আগেকার দিন এই ছিল, এমন ছিল, কত ভালো ছিল, আন্তরিক ছিল। কিন্তু সব সময় এমন হয় না, অনেক সময় অবাক হয়ে দেখি, আমাদের গ্রাম এগিয়েও গ্যাছে। সেই বার আমষ্টারডাম থেকে এক সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে ফোন করেছি ডিউটি পালনের জন্য – কেউ ফোন ধরল না। পরের দিন জানলাম আমাদের ঘোষ পাড়ায় সেই বার থেকে ঠিক হয়েছে যে সরস্বতী পুজোর একদিন পাড়ায় কারো বাড়ি রান্না হবে না। পাড়ার সবাই একসাথে খাবে – পুজোর প্যান্ডেলের ধারে রান্না হবে, আর লম্বা রাস্তায় ত্রিপল পেতে খাওয়া দাওয়া। অনেকের মনে সন্দেহ ছিল সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, কারণ পাড়ায় একে অপরের সাথে গলায় গলায় ভাব – এমন অপবাদ শত্রুও দিতে পারবে না! কিন্তু বিষ্ময়ের সাথে ব্যাপারটা খুবই হিট করে যায় – এমনকি আমার বাবাও আজকালকার ছেলেদের মন খুলে প্রশংসা করে। আমি আমষ্টারডামের জানালা দিয়ে সামনের ক্যানেল দেখি, আর ভাবি আজ প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেল আমরা আমাদের ঘোষ পাড়ার পুরানো বাড়ি ছেড়ে পুকুরের অপরদিকের পাল পাড়ার বাসিন্দা হয়েছি, কিন্তু ঘোষ পাড়ার গন্ধ আজও আমাদের গা থেকে যায় নি! স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবি – ঠিক আছে, যা ভাবি, তার সাথে এই লেখার কোন সম্পর্ক নেই।

234

21

ঋক আর কিছুনা

ঋকানন্দ মহারাজের দেখা-শোনা

মাটি জল রোদ দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়, শিকড়ের সমস্যা আছে মনে হয় বা আগের জন্মে শিওর গাছ ছিলাম। কোথাও কিছু নেই ফাঁকা গাছ তলায় একতা চা এর দোকান আর একটা আয়না টাঙানো সেলুন। শীতের এই হাওয়া, মিঠে রোদ গোলমাল করে দেয় বড়। ঘিজঘিজে ভীড়, এস্ক্যালেশন সব ফেলে পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া শেভিং ব্রাশ আর ফটকিরি ঘষে নিশ্চিন্ত হতে ইচ্ছে করে। একটা স্বচ্ছতোয়া নদীর বড় অভাব, এমনকি একটা নালাও নেই, বুকের ভিতরে বাইরে সব জলের ধারাই শেষ করে দিয়েছি, কুচকুচে কালো জল। গুরুদ্বোয়ারা, মসজিদ, মিশন সব পেরিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছি, দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ফ্লাইওভার এর নীচে ছেঁড়া টুপি বাবার পিঠে হাফপ্যান্টুল ছেলে বসে কি যেন বলছে, ওই আবার ফস করে সামনে চলে এলো, হাত নেড়ে চোখ বড় করে বোঝাচ্ছে....গুড়কাঠি চাইছে না স্মার্ট ফোন? কে জানে, জানতেও যে চাই খুব তাও না। বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় জনা ছয়েক স্কুল ড্রেস পরা কিশোরী, হাসছে, পা নাচাচ্ছে। সাইকেলে করে একটা দাদা, রডে ভাইকে বসিয়ে স্কুল নিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের এই সময়টা ভালো হত না খারাপ মনে পড়ছেনা, আচ্ছা হাফইয়ার্লির খাতা কি এসময়েই দিতো? তাহলে খুব খারাপ হতো। কোত্থাও কিছু নেই হঠাৎ গাছের নীচে চায়ের দোকান, আমার তাড়া আছে, অফিস ছুটি নেওয়া মহার্ঘ্য দিন তবু নিয়ম মেনে চলা যে আমার দস্তুর নয় তাই বোধহয় নেমে যায় আঘাটায়...বিচ্ছিরি চা আর বেকারি বিস্কুট খেয়ে হাঁ করে বসে থাকি....হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে বড় দেরী হয়ে গেলো না?

466

29

শিবাংশু

হেমন্ত এখানে স্থির

স্থির থাকো কবি পুরোনো আসবাব যেমন কীটদষ্ট না হয়ে বার্নিশ জড়িয়ে সুখে থাকে সুখে থাকো বিজড়িত শীতঘুমে ঘেরা রাতশয্যার লীলাময় আসঙ্গবিহীন কুয়োতলা নারীরাও ততোটা উষ্ণ নয় যেমন প্রত্যাশিত যতোটা তোমার ওম তাহাদের দেহাতুর সাবানের গন্ধ তাহাদের মৌন রূপটান হেমন্তপ্যাস্টেলে স্থির তপ্ত ত্বক তাহাদের বিলোল মলাটমূর্তি কটাক্ষে ডেকেছো শেষবার সর্ষেখেত কবে দেখেছিলে কবি কাজের বাড়িতে ভীত শিশু হয়ে লুকিয়ে রয়েছো এখনও কি দেখো চুপচাপ ধানে দুধ এলো হেমন্ত অসুখে কেমন কেঁপেছে ঝাঁপঘর

183

4

সুকান্ত ঘোষ

পারফিউম

এত প্রশ্ন আমাকে আগে কেউ করেছে কিনা আমার ঠিক মনে পড়ল না। সেই প্রশ্ন কর্তাদের লিষ্টে অন্তর্ভুক্ত আছেঃ ১। অ্যালাপ্যাথি ডাক্তার। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার নয় কিন্তু – তাদের আবার বিরাট রেঞ্জের প্রশ্ন ক্ষেপণের স্বভাব আছে। আমাদের নিমো বাস স্ট্যান্ডের নারাণ ডাক্তার আমার লাইফ প্রশ্নবাণে যাকে বলে জর্জরিত করে দিয়েছিল একবার। সেবার ডান হাতের তর্জনীর তালুর দিকে একটা কি ফোঁড়ার মতন হল – মাল আর ফাটছে না, এদিকে উইকেট কিপিং করতে গিয়ে দেদার লাগছে। বেশ ভজকট অবস্থা। বাপকে বলতেও পারছি না যে কিপিং করতে অসুবিধা হচ্ছে, তা হলে বাপ জেনেশুনে সেই ফোঁড়া হয়ত আর ভালো করার পরামর্শ দেবে না। এমন অবস্থায় ঠাকুমা বলল, তুই আমাদের নবগ্রামের নারাণকে দেখিয়ে আয় না একবার। আমি গেলাম নিমো বটতলায় নারাণ ডাক্তারের চেম্বারে। আগে যেখানে খুকু ডাক্তার বসত, সেখানে হোমিওপ্যাথি ঐতিহ্য মেনে এখন বসত নারাণ ডাক্তার। কিন্তু ঔষুধ দেবার আগে নানা ফ্যাঁকড়া - আমাকে ছোটবেলায় বিড়ালে কামড়েছে কিনা, বা আমি ক্লাস সেভেনে ফেল করেছিলাম কিন্তু স্বীকার করতে লজ্জা পাচ্ছি কেন – এই সব জটিল প্রশ্ন। তখন হাতের ফোঁড়া এমন জ্বালাচ্ছে যে পারলে ক্লাস সেভেনে ফিরে গিয়ে ফেল-ও করে আসতাম যদি নারাণ ডাক্তার ভালো হয়ে যাবার গ্যারান্টি দিত। সে অনেক নেড়ে ঘেঁটে ঔষুধ দিল যা কিনা আবার বাড়ি গিয়ে চালের বস্তায় ঢুকিয়ে রাখতে হত। প্রতি দিন সকালি বাসি মুখে চালের বস্তা থেকে এক পুরিয়া করে বের করে খাওয়া। বলতে নেই, একদিন ফোঁড়া ফেটে গেল – তা ক্রিকেট বলের ক্রমাগত আঘাতে নাকি নারান ডাক্তারের পুরিয়ায়, তা বলতে পারব না। ২। সেপ্টেম্বর ২০০১ ট্রেড সেন্টার ভেঙে পড়ার পর থেকে আমেরিকার ইমিগ্রেশন কাউন্টারের বেরসিক গম্ভীর অফিসার সকল। সেই অফিসারটা বাদে যে আমাকে ‘সিরামিক’ দিয়ে এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনের পার্টস বানাতে প্রবলেম কি সেটা ব্যাখ্যা করতে বলেছিল। ৩। চাকুরীর ইন্টারভিউ নেওয়া পাবলিক বা এইচ আর। অবশ্য মিসেস বোস আমাকে একবার অনেক ঘেঁটে দেবার চেষ্টা করেছিলেন, যখন আমি দাবী করেছিলাম যে অবসর সময়ে আমি একটা নাটক লিখেছি রেসেন্টলি। ৪। আমষ্টারডাম শহর থেকে বন্ধুদের জন্য নিয়ে যাওয়া ‘স্ত্রুপ-ওয়াফেল’ নিয়ে টানাটানি করে প্রায় ফেলে দেওয়া বার্মিংহাম এয়ারপোর্টের সেই দুষ্টু কাষ্টমস অফিসারটা – সে আমি যতই বলি না যে ওই ‘স্ত্রুপ-ওয়াফেল’ গুলোতে গাঁজা ভরা নেই! অথচ আমি এদের খপ্পরে পরতে চাই নি – টুক করে ঢুকে, টুক করে কিনে নিয়ে চলে আসব ভেবেছিলেম। কিন্তু কপাল খারাপ থাকলে কি আর করা। লবঙ্গলতিকা – আপনি কি চাইছেন স্যার? আমি – ওই একটা আর কি। - তাহলে স্যার কি আপনার নিজের জন্য? - না, না – আমার বউয়ের জন্য - আপনার বউ কি রকম জিনিস ভালোবাসে? আমার দীর্ঘশ্বাস – এবার লবঙ্গলতিকার অ্যাটাক শুরু হল অন্য দিক দিয়ে - আপনার বউ কি ফ্লাওয়ারি, নাকি ফ্রুটি ভালোবাসে - ওই ধরে নাও গিয়ে মাঝামাঝি - আপনি তা হলে এই গুলো ট্রাই করুন একের পর এক শিশি বোতল খুলে ভিতরের ড্রপারের মতন জিনিসটা নাকের কাছে নিয়ে আসে। দুনিয়ার নাম-না জানা ফুল-ফলের নাম দেখলাম। চেনা বলতে গোলাপ, দুটো কাঠবাদাম, একটু চন্দন, একটা বেদানা, আর একটা জুঁই, একটু দারুচিনি। একটা অনেক কষ্টে পছন্দ করলাম। - স্যার, এটা কিন্তু ছেলেদের - শিশির গায়ে লেখা নেই তো! আমাকে করুণার দৃষ্টি দিয়ে মেপে নিলেও দয়া বশতঃ কিছু দাবকানি দিল না। - আসলে স্যার, গন্ধের ইনটেন্সিটি দেখে বুঝে নিতে হবে। এটা আপনি নিজের জন্য নিন বরং। আমি কি আর বলব, গন্ধের ইনটেন্সিটি শব্দ সমষ্টি শুনে নষ্টালজিক হয়ে পড়লাম। ক্লাস এলেভেন-টুয়েলভে আমাদের সায়েন্সের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস আমরা ছেলেরা নিজেরাই সামলাতাম। স্যার এবং দিদিমণিরা আমাদের থেকে দূরে থাকতেন সেই গন্ধের ইনটেন্সিটির জন্যই। টিফিন বেলায় ক্রিকেট বা ফুটবল পেঁদিয়ে আমাদের গা থেকে ঘামের যা গন্ধ বেরোত, তাতে করে পরবর্তি জীবনে সৌগতের কথা মত আমরা অ্যানাস্থেটিকসের বিকল্প হতে পারতাম। সৌগত বলত যে, কেবল মাঠের চারদিকে কয়েক পাক দৌড়ে রুগীর নাকের কাছে এসে নাকি বগল তুলে শোঁকালেই কেল্লা ফতে! অপারেশন করানোর আগে ক্লোরফোম অপচয়ের কোন দরকার হত না! তবে সেই নষ্টালজিয়ায় সু-গন্ধও জড়িয়ে ছিল বৈকী! আমাদের ছোটবেলায় বাপ-কাকাদের দেখতাম সেই এক ইঞ্চি শিশিতে জন্ডিসের সময় পেচ্ছাপের মতন রঙের ‘সেন্ট’ ঢালত রুমালে। পারফিউম বলা তখন দস্তুর ছিল না আর তা গায়ে মাখাও নয়। মাঝে মাঝে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকের কাছে নিয়ে যাওয়া বা বাতাসে একবার ঘুরিয়ে দেওয়া, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। আরো একটু বড় হলাম, লাইফে ‘গোল্ডি’ সেন্টের আগমণ ঘটল, ‘চার্লি’-কে টপকে। ‘চার্লি’ থেকে ‘গোল্ডি’ সে এক বিশাল ব্রেক-থ্রু। বেশ কয়েক রাত উত্তেজনায় ঘুমাতে পারি নি বাড়িতে প্রথম ‘গোল্ডি’ ঢোকার পর। আরো একটু বড় হলাম – নিজের সেন্ট নিজে খুঁজে বের করার ক্ষমতা অ্যাপ্রুভ হবার পর প্রথম স্টপ হল গিয়ে মধুর পানের দোকান। তবে মধুর কাছে আমরা সেন্ট কিনতাম না – কিনতাম তার ভাগনা আমাদেরই বয়সী বাপি-র কাছ থেকে। তার কাছ থেকেই প্রথম শেখা ‘ব্রুটস’ নামক এক জিনিস। তবে কিনা আমরা সবাই অলিখিত জানতাম বিদেশী নাম হলেও মাল সব তৈরী হত নবদ্বীপে। যা কিছু নাম করা সাবান, সেন্ট, পরের দিকে ডিও, তা সবই প্রায় নকল তৈরী হত নবদ্বীপে। কিন্তু মনে হচ্ছে মাঝে একটা স্টেপ বাদ চলে গেল যেই স্টেপে মেমারী পুরানো রেলগেটের কাছে বাদলের দোকানেও এমন নবদ্বীপ জাত বিদেশী জিনিস পত্র কেনা হয়েছিল। তার পর এল গিয়ে শিবপুর – কলকাতার কিছু আঁতেল (এবং শ্রীরামপুরের সৌগত) পাবলিকের কাছ থেকে সভ্য হবার শিক্ষা নেবার জন্য ট্রেনি হয়ে গেলাম অজান্তেই। ডিও স্প্রে এল – ডিও রোল এল, ফ্যান্সি মার্কেট এবং এসপ্ল্যানেড এল। এই করতে করতে একদিন ডিউটি ফ্রী ‘কুল-ওয়াটার’স। ততদিনে বেশ খানিক আঁতেল হয়েছি। দু চারটে নামও শুনেছি ‘পারফিউমের’ – ছেলেদের এবং মেয়েদের ‘ফারফিউম’ যে আলাদা, সেটা জানতে পেরেছি। কানে তুলোয় ভরা আতর গুঁজে বেরোনোর বয়স যে অনেক দিন পেরিয়ে এসেছি সেটাও মালুম হয়েছিল। এর পর থেকে মোটামুটি ডিউটি ফ্রী-ই আমাকে ঠ্যাকান দিয়ে রেখেছিল। বাহ্যিক জগতে আর পারফিউম তেমন কিনতে বের হতাম না। যাই হোক, অনেক দিন পর এবার এই ঘটনা হল – আমি সেই লবঙ্গলতিকাকে বললাম যে এই যাত্রায় আমার কেবল বৌয়ের জন্যই কেনার আছে। অনেক টালাবাহানার পর তিনটে শিশি শর্ট লিষ্ট হল। এবার তাদের মধ্যে থেকে ফাইন্যাল নির্বাচন – - স্যার, আপনার বউ কোথায় যাবে পারফিউম মেখে? - নানা জায়গায় যাবে - তা বললে তো হবে না, আরও স্পেসিফিক হতে হবে - এই উইকেন্ডে বা উইকের মধ্যে বাইরে বেরেনো - সঙ্গে কে থাকে আর কাদের সাথে দেখা করবেন - এই ধরো পার্টি, বা একসাথে গল্পগুজব - ও, তার মানে, আপনি রোমান্টিক ডিনার জাতীয় অকেশনের কথা ভাবছেন না – - না, মানে সব সময় তো ভাবা হয় না - তাহলে স্যার গোলাপের সুগন্ধটা নেবেন না। ওটা সাত রকমের গোলাপ দিয়ে বানানো রোমান্টিক গন্ধ - বেশ, নেবো না – তাহলে কোনটা নেব? - আপনি স্যার দারুচিনির সাথে মিনোসা ফুল মেশানো গন্ধ টা নিন - মিনোসা ফুল কি? বিরাট বোকামো করে বসলাম প্রশ্নটা করে! এদিকে আসুন বলে আমাকে সাইডে নিয়ে গিয়ে ইয়াব্বর ক্যাটালগ এবং ট্যাব ইত্যাদি খুলে বসল। আমাকে ওই দিকে ফোর্থ ফ্লোরের লেবানিজ রেষ্টুরেন্টটা প্রায় হাতছানি দিচ্ছে। অনেক কষ্টে মিনোসা ফুলের হাত থেকে মুক্তি পেলাম। তাহলে এবার কনফিউশন দাঁড়ালো দুটোর মধ্যে। - স্যার, আপনি এক কাজ করুন। দুই হাতে আপনার আমি দুই গন্ধ লাগিয়ে দিচ্ছি। আপনি সেই গন্ধ লাগিয়ে শপিং কমপ্লীট করে আসুন। কিছু ক্ষণ দেখবের এদের প্রকৃত গন্ধ আপনার কাছে প্রকট হবে - খুব ভালো প্রস্তাব। (স্বগতঃ আমাকে লেবানন ডাকছে), দাও লাগিয়ে দুই হাতে লাগিয়ে আমি শপিং মলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ক্রমাগত একবার এই হাত আর অন্যবার সেই হাত শুঁকচি – অনেকে আমার দিকে ট্যারাচোখে তাকাচ্ছে – তবে আমার লা-পরোয়া, গন্ধ বাছতেই হবে। খেতে গিয়ে ‘হামুস’ এর গন্ধের সাথে মিনোসা মিশে এক জটিল ব্যাপার। লেবানন আমার পেট ঠান্ডা করল – আমি পকেট থেকে একটা কয়েন বার করে টস করে ঠিক করলাম কোন হাতেরটা নেব। দোকানে ফিরে এসে সেই লবঙ্গলতিকাকে বাঁ হাতটা শুঁকিয়ে বললাম – এইটা দেও। এরপর শুরু হল প্যাকিং – প্যাকিং এর মাঝামাঝি আমার আবার খিদে পেয়ে গেলে আমি আইস্ক্রীম খেতে গেলাম। সেই খেয়ে ফিরে এসে আমি প্যাকিং-য়ের শেষটা দেখতে পেলাম। পয়সা মেটালেও আমাকে কাউন্টারে প্যাকেটটা হস্তান্তর করল না। লবঙ্গলতিকে দরজার কাছ পর্যন্ত এগিয়ে এসে আমাকে প্যাকেটা দিল – বলল, প্লিজ কাম এগেন। আমি আর ভয়ে পিছু ফিরে তাকালাম না। ঘটনা ‘পারফিউম’ সিনেমার থেকেও জটিল। এই ঘটনা আগে ঘটলে ছেলেটি কেন খুন করছে সেই মনস্তত্ত্ব বুঝতে কোনই প্রবলেম হত না!

238

18

সুকান্ত ঘোষ

ডাক্তার জানে না, আমার অসুখের নাম পিকনিক

অনেক বয়স হবার পর কোন এক কবির লেখায় যেন এমন কয়েকলাইন পড়েছিলাম – “ডাক্তার জানে না, আমার অসুখের নাম পিকনিক”। সেই কবি আবার অন্য এক কবির লেখা থেকে এই লাইন ধার করেছিলেন - সে এক কনফিউজিং ব্যাপার। যাই হোক, যে রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে শতকরা ৬০ ভাগ লোক পেটের রোগের চিকিৎসা করাতে আসেন সে রাজ্যেরই এক কবি যে এমন কথা লিখবেন সে আর আশ্চর্য কি! তবে ডাক্তারের না জানার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, অন্ততঃ আমাদের দিকের ডাক্তাররা আমাদের অসুখের উৎপত্তি ও নিরাময় দুইই জানত বেশ ভালো করে। আর পাঁচটা বালকের মত আমাদের ছোটবেলাটাও পিকনিকের সাথে বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে ছিল। পিকনিকের বাঙলা প্রতিশব্দ কি? কাছাকাছি রয়েছে চড়ুইভাতি ও বনভোজন। চড়ুইভাতি শব্দটির মধ্যে কেমন যেন একটা সখি সখি ভাব লেগে আছে। ম্যাচো ভাবটা কম, তাই একটা বয়সের পর আর চড়ুইভাতি করা যায় না যতক্ষন না আর একটা নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানো যাচ্ছে। আমাদের দিকে রেঞ্জটা ১০-৬০ বছরের মধ্যে ছিল। আর বনভোজন বাঙালী আতেঁল ও কলকাতাবাসী লোকেরা করে বলে আমাদের ধারণা ছিল। আমরা করতাম Feast – শব্দ ভেঙে ভেঙে ‘ফিষ্টি’ তে পৌঁছেছিল। আমাদের গ্রাম্য বাল্য জীবন যখন নিস্তরঙ্গ ও বর্ণহীন হয়ে আসত মাঝে মাঝে (আলু ও ধানের ফলন বা দাম ভালো না থাকলে) তখন এই ফিষ্টি নামক মোচ্ছবটি আমাদের এক্সট্রা প্রাণবায়ু ইনজেক্ট করত। ফিষ্টি বিবর্তন নিয়ে রীতিমত এক থিসিস ফেঁদে ফেলা যায় সোস্যাল সাইন্সে। যে কোন উপলক্ষেই ফিষ্টি হতে পারত – তবে বয়সের উপর নির্ভর করে স্থান ও কাল বদলেছে, পাত্র প্রায় একই থেকে গেছে। খুব ছোটবেলায় ফিষ্টির হাতেখড়ি হয়েছিল ঝুলন খেলার মধ্যে দিয়ে। আমরা ছোটরা নিজেদের খেলনা জড়ো করে ঝুলন পাততাম ও বড়দের কাছ থেকে পয়সা আদায় করতাম। ঝুলনের শেষে সেই টাকা দিয়ে ফিষ্টি হত। মেনু খুবই সিম্পল থাকত – কোন বছর লুচি-ঘুঘনি ও তৎসহ মিষ্টি। আবার কোন বছর ভাত-মাংস। বাড়ির পিসি ও মায়েদের দল সব কিছুর ভার নিত, আমরা শুধু খেয়েই খালাস। মনে আসে তখন বাড়ীতে মুরগীর মাংস রান্না হত না, ফলতঃ পাঁঠা বা খাসি খেয়েই আমরা বড় হয়েছি (দূর্জনেরা বলেন অনুরূপ চারিত্রিক বৈশিষ্ট লাভ করেছি)। ছোটবেলার ফিষ্টি সব অর্থেই নিরামিষ ছিল। পিকনিক তার প্রকৃত রূপ খুলতে শুরু করল ক্লাস নাইন-টেন উঠার পর থেকে। স্থান পরিবর্তিত হল – বাড়ি থেকে ফিষ্টির স্থান সরে গিয়ে গ্রামের ইস্কুলবাড়িতে। আমাদের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের স্থানমাহাত্ম আমাদের কাছে কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, তিরুপতি বা ইডেন গার্ডেনসের মতই ছিল। গ্রামের একপ্রান্তে এই স্কুলের চত্তরেই আমাদের বেশীর ভাগ ফিষ্টি সম্পন্ন হত। সামনেই ছিল এক প্রকাণ্ড পুকুর ও খালি মাঠ, আর স্কুলের ভিতর ছিল এক বকুল গাছ। তাই প্রাক বৈদ্যুতিক যুগে সন্ধ্যের পর সেই স্থান এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করত। আবার গ্রামের একধারে হবার জন্য জলীয় দ্রব্য পানেরও অসুবিধা হত না আমাদের। প্রত্যেক বড় পূজা সম্পন্ন হবার পর একটা ফিষ্টি বাঁধা ছিল – ভাবটা এই ছিল যে, পূজার আয়োজন (বাজনা ও মাইক ভারা করা এবং বিজয়ার দিন নাচা) সম্পন্ন করে পাবলিক খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং রিল্যাক্সের জন্য একটু খাওয়া-দাওয়া দরকার। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে এ সবই হত ব্যাচ সিষ্টেমে। যেমন আমাদের বাবা/কাকাদের একটা গ্রুপ ছিল, তার পরের জেনারেশনের একটা গ্রুপ, তার পরে আরো একটা এবং তার পরে আমরা। ওই ইস্কুল বাড়িতে সব গ্রুপই ফিষ্টি করত। খাদ্য বস্তু বা মেনু মূলতঃ এক থাকলেও, পার্থক্য থাকত পানীয় ও ধূমপান লিমিটে। আমাদের আগের গ্রুপটি ধেনো (দেশী মদ) ও গাঁজা প্রেফার করত। আমাদের ব্যাচে প্রথমে শুরুর দিকে (হাতেখড়ির সময়) চালু ছিল থ্রি-এক্স রাম ও অফিসার চয়েস। হুইস্কি তখন বুঝতাম না, তা সেই নিয়ে মাথাব্যাথাও তত ছিল না। অবশ্য বয়স বাড়ার সাথে সাথে পছন্দের এনভেলপ প্রসারিত হতে শুরু করে – রয়েল স্ট্যাগ দুরদার করে জীবনে অনুপ্রবেশ করে। আমাদের ব্যাচ আবার গাঁজা খুব একটা পচ্ছন্দ করত না – কোন এক বিশেষ কারণ বশতঃ পক্ষপাতিত্ব ছিল খৈনীর দিকে। আর তা ছাড়া রাতের দিকে ফিষ্টি শুরু হবার আগে অনেককেই দেখতাম ‘তাড়ি’ খেয়ে চূড় হয়ে আছে। আমরা যখন ক্লাশ ১০-১২ তে পড়ি তখন তাড়ির চল নিদারুণ বেড়ে গিয়েছিল। সুজনেরা বলে এর পিছনে আমাদের দুই বন্ধু আলম ও মনসার অবদান সবিশেষ। যাদের জানা নেই (অর্থাৎ দূর্ভাগার দল) তাদের অবগতির জন্য জানাই তাড়ি তৈরী হত তালরস গেঁজিয়ে। গরমের দিনে ভোরের দিকে তালরস সত্যই সুস্বাদু। তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরমে মাল গেঁজে উঠত। আর সেই জিনিস তূরীয় হত বেলা দুটো-তিনটের দিকে। গরম কালে ঘরের ভিতর দুপুরে আমরা এমনিই কেউ ঘুমুতে পারতাম না – আশ্রয় হত মূলতঃ বাগানগুলিতে। সেই সব আম বা গাব গাছের ছায়ায় বসে তালরস পানের মজাই আলাদা। কলকাতার আতেঁলরা বছরে একবার সেই তালরস শান্তিনিকেতনের দিকে খায়ে সারা বছর তার ঢেকুর তোলে আর সাহিত্য পয়দা করে। যাঁরা পার্কস্ট্রীটের পাবগুলিতে গিয়ে পরের দিন অফিসে ফাট্টাই মারেন তাঁদের জেনে রাখা ভালো যে নেশার জগতে খুব অল্পটাই তাঁরা ছুঁতে পেরেছেন – অন্ততঃ আবহের দিক থেকে। গোমড়া মুখো বারটেণ্ডারের বীয়ারের গ্লাস এগিয়ে দেওয়া আর শ্যামা বা বুধোর মায়ের মাটির ভাঁড়ে (বা গ্লাস) করে তাড়ি এগিয়ে দেওয়ার মধ্যে অনেকটাই পার্থক্য। এর সাথে যোগ করুন ফুরফুরে প্রাকৃতিক হাওয়ার অ্যাডভাণ্টেজ! তাড়ি ছিল গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা নেশার পানীয়। তাড়ি পান ঠিক আছে – কিন্তু তৈরী হত সেই সেবনের পর মাঠে ফুটবল খেলতে নামলে। তাড়ি খাবার পর যে ঘাম হয় তার দূর্গন্ধ অস্বাবাভিক। ড্রাগটেষ্টের ব্যাপার না থাকায় অনেক ফুটবল ম্যাচ আমরা তাড়ির জোরে জিতেছিলাম। তার যতটা না নেশাগ্রস্ত হয়ে অকুতভয় খেলার জন্য, তার থেকেও বেশী ঘামের দূর্গন্ধের জন্য। বিপক্ষ প্লেয়ার কাছে আসার সাহসই পেত না! আমাদের গ্রামের সব ব্যাচেরই ফিষ্টির মেনু ছিল প্রায় ওয়ান ডাইমেনশনাল। ভাত, একটা তরকারী, মাংস ও শেষ পাতে চাটনী-মিষ্টি। ফাণ্ডের অবস্থার উপর নির্ভর করে মাংসের রকমফের হত, খাসী নয়ত মুরগী। মুরগী আবার দুই প্রকার, দেশী ও পোলট্রী। ফাণ্ডের অবস্থা শোচনীয় হলে তবেই পোলট্রী মুরগী কেনা হত। আর সিজিন অনুযায়ী রকমফের ঘটত তরকারীর। শীতকালে জনপ্রিয় ছিল বাঁধাকপি। তবে তরকারী কেন যে করা হত আমি সেটা আজও বুঝতে পারি নি। ফিষ্টি সময় তরকারীর ভূমিকা কোন প্রতিযোগীতার তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচের মত – কোনই গুরুত্ব নেই, শুধু করতে হয় বলে করা। পোলট্রী মুরগীর দাম ৩৫ টাকা কেজি দিয়ে বহুযুগ আগে ফিষ্টি শুরু করার পর এখন তা ১৪০ টাকায় পৌঁছেছে। পোলট্রী মুরগী পাওয়া বা কেনা সহজ – ওরা প্রায় শহীদ হয়েই আছে মাংসের ভারে। সমস্যা হত দেশী মুরগী সংগ্রহ করা নিয়ে। ফিষ্টির দলে কতকগুলি সদস্য ছিল যারা বাড়িতে মুরগী পুষত, আর স্বাবাভিক ভাবেই তারাই প্রাইম টার্গেট থাকত মুরগী সাপ্লাই দেবার জন্য। মুরগী সংগ্রহ ব্যাপারটাই ছিল বেশ রোমাঞ্চকর, অনেক সময় খাওয়ার থেকেও বেশী। এমন সময় গেছে যখন সন্ধ্যাবেলা মুরগী খুঁজতে বেরিয়েছি রাতে ফিষ্টির জন্য। বাড়ি বাড়ি ঘুরছি – এ্যাই মুরগী বিক্রী করবে তোমারা? হয়ত কেউ বলল হ্যাঁ করব – তখন শুরু হল মুরগী ধরার পালা। সেই মুরগী আম গাছের ডগায় ঝিম মেরে বসে আছে। নিকষ অন্ধকারে আমগাছের ডাল বেয়ে চুপিসারে মুরগী ধরতে উঠছি এ দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক ছিল এককালে। আর আমরা যেহেতু গ্রামের ছেলে ছোকরার দল ছিলাম এবং সবাই নিজেদের গাছের/বাগানের ফল-মূল ইনট্যাক্ট রাখতে চাইত – তাই প্রায়শঃই জিনিস কিনতে গিয়ে আমাদের একটা কথা শুনতে হত, “যা, তোদের কেনা দামে দিয়ে দিলাম”। কেনা দামটা যে কি আর যে বাড়িতে পোষা মুরগী বিক্রী করছে তার কাছে কেনা দাম কি ভাবে প্রযোজ্য হয়, সেটা আন্দাজ লাগাবার বৃথাই একটা চেষ্টা দিতাম। মুরগী ধরার পর ছাড়ানাও এক হ্যাপার কাজ। সৌভাগ্য বশতঃ বেশ কিছু সুদক্ষ সার্জনও ছিল আমাদের দলে। মুরগী ছাড়ানোর মধ্যে কোন পৈশাচিক আনন্দ আছে কিনা বলতে পারব না, তবে আমাদের সার্জেনদের দেখতাম বেশ তারিয়ে তারিয়ে অথচ ক্ষিপ্রহস্তে মুরগী নিধন করছে। দলের ফিষ্টিতে বেশির ভাগ সময় রান্না আমিই করতাম। যৌথ পরিবারে মানুষ (!) হবার জন্য খাবার-দাবার ভাগ-বাটোয়ারা বিষয়ে আমার ধারণা বেশ স্বচ্ছ ছিল। ফলতঃ ছেলেরা সানন্দেই আমার হাতে রান্না ও মাংস ভাগের দায়িত্ব ছেড়ে দিত। মুরগী রান্না আদপেই সোজা কাজ, কারন মাংস প্রায় স্বয়ংসিদ্ধই বলা যেতে পারে – তাও আবার যদি মাতালদের উপযোগী রান্না করতে হয়। সবচেয়ে বেশী বিতর্ক অবশ্য মাংস ভাগ নিয়ে বা রান্না পদ্ধতি নিয়ে নয়, মাংস ধোয়া হবে কিনে সেই নিয়ে হত। অনেকের মতে মাংস ধুলে তার স্বাদ নাকি চলে যায় – এটা আবশ্য পরিক্ষীত সত্য নাকি মাতাল জিহ্বার ইলিউশন তা বলতে পারব না। গড়পড়তা হিসাবে জন প্রতি ২৫০ গ্রাম মুরগীর মাংস ধরা হত, খাসী হলে সেটা কমে দাঁড়াত ২০০ গ্রাম। মাংস মেখে নেওয়া হত তেল, নুন, মশলা, টক দই, আদা-রসুন বাটা ইত্যাদি দিয়ে। তারপর গরম তেলে পেঁয়াজ ছেঁকে আলাদা করার পর, সেই ছাঁকা তেলেই মাংস কষে নেওয়া হত। আলুর রকমফের অনুসারে তা আগে ছাঁকা হত বা ডাইরেক্ট ঝোলে দেওয়া হত। মাংস কষা হলে জল দিয়ে ফোটানো এবং প্রায় সিদ্ধ হয়ে এলে তাতে গরম মশালা দিয়ে ঘেঁটে দেওয়া। মাংস রান্না বা ফিষ্টি করতে গেলে উনুন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এখন আমাদের দিকে এই সব কাগের জন্য গ্যাস সিলিণ্ডার সহ ওভান ভাড়া পাওয়া যায়। তবে আগে আমরা উনুন নিজেরাই বানিয়ে ফিষ্টি করতাম। উনুন তৈরী ও তা ধরানোর দায়িত্বে থাকত ‘হাবা’ – সে একাজে অভূতপূর্ব পারদর্শিতা অর্জন করেছিল। জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হত মূলত কাঠ ও ঘুঁটে, শুরুতে কেরোশিনের সাহায্য। পরে যখন সমাজ এগোয়, তখন আমরা কাঠের উনুন থেকে কেরোসিনের স্টোভে সিফট করে গিয়েছিলাম। হাবা এতে হালকা দুঃখ পেয়েছিল, তবে এর পরেও কেরোসিনের স্টোভটি সেই নিয়ে আসত ও ধরাত। কাঠের অভাব খুব একটা আমরা অনুভব করি নি। আমাদের নিমো স্টেশনে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি রেল কাটতে শুরু করে কোন এক সময়। আমার মেজো জ্যাঠা তখন সদ্য চাকুরী থেকে রিটায়ার করে সারাদিন কি করবে ঠাওর করতে না পেরে পাগলের মত কাজ (বা অকাজ!) খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই জ্যেঠু গ্রামের বালক সম্প্রদায় কে নিয়ে গাছ বাঁচাও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরে। যে কয়টা গাছ কাটা হয়েছিল সেগুলি পড়ে রইল – রেল বাকি গাছ কাটা বন্ধ করল। এখন ঘটনা হচ্ছে ওই কাটা গাছগুলির কি হবে? আমাদেরই গ্রুপের রবি কাঠমিস্ত্রীকে ধরা হল সেগুলি কেনার জন্য। রবি বিজনেসের সময় বিজনেস বলে শুধু মোটা গুঁড়িগুলো কিনল – বাকি থাকল গুচ্ছের ডাল পালা। সেট কাঠ বিক্রির টাকায় ফিষ্টি হল এবং তার পরের অনেক ফিষ্টিরই জ্বালানি ওই পড়ে থাকা ডাল পালা সাপ্লাই করেছিল। অপ্রাসঙ্গিক, তবু জানিয়ে রাখা ভালো রবি সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের খাট বানিয়ে কাঠাঁল কাঠের খাট বলে এক স্বদেশীয় বিহারীকে বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিল। গ্রামে রেলের প্রতিনিধি ছিল স্টেশন মাষ্টার আমার সেজ জ্যাঠা যাকে বলা হইয়েছিল যে গাছ বিক্রির টাকা “নিমো ভারত সেবক সমাজ” (আমাদের গ্রামের ক্লাবের নাম) এর উন্নতিকল্পে লাগানো হবে। জ্যাঠা আমাদের ভাবগতিক সম্পর্কে অবহিত থাকার জন্য পরে আর উন্নতি বিষয়ক কোন খোঁজ নেয় নি। আগের পর্বে আমাদের ক্লাবে শোনপাপড়ী কারখানা খোলা ও তা উঠে যাবার কথা লিখেছিলাম। তা সেই কারখানা উঠে যাবার পর পড়ে থেকে একটা বাঁশের আটচালা যেখানে মাটির উনুনে রস জ্বাল দেওয়া হত। আর পড়ে ছিল একটা মাল বইবার তিন চাকার ভ্যান রিক্সা। একবার বর্ষাকালে ফিষ্টির স্থান পরিবর্তন করে স্কুল বাড়ি থেকে ক্লাবে নিয়ে আসা হয় ওই উনুনের সুবিধা নেবার জন্য। দ্বিতীয়বার সেই জায়গায় ফিষ্টি করতে গিয়ে রাত দশটা নাগাদ জ্বালানীতে টান পড়ল – পাবলিক তখন প্রায় মাতাল। তাই তারা আর কাঠের সন্ধানে অন্য কোথাও না গিয়ে সেই বাঁশের চালাটাই ভেঙে জ্বালানি করতে শুরু করে। সেই দিন মাংস পাঁঠার হবার জন্য পুরো চালাটাই লেগে যায় মাংস সিদ্ধ করতে। তাও সেই শোনপাপড়ী কারখানার স্মৃতি আরও কিছুদিন ছিল যখন আমরা সেই ভ্যান রিকশা নিয়ে ফিষ্টির বাজার করতে বেরোতাম। পরের একবার ফিষ্টিতে সেই রিস্কার কাঠের ফ্রেমও জ্বালানি হইয়ে যায়, ততসহ কারখানার শেষ স্মৃতি। একবার ঠিক হল মেনুতে বৈচিত্র আনতে হবে মাছের কোন একটা আইটেম করে। কেউ বিয়ে বাড়িতে তখন সদ্য বাটার ফ্রাই খেয়ে এসেছিল, সেই প্রস্তাব দিল যে বাটার ফ্রাই হোক তাহলে। আমাদের মধ্যে মৎস-সম্রাট শুভর কাছে অর্ডার হল টাটকা তোপসে জোগাড়ের জন্য। শুভ করিতকর্মা ছেলে, ১০০-১৫০ গ্রাম সাইজের মাছ সে জোগাড় করে ফেলে – তারপর সেই মাছ বেসনে (সোডা মেশানো) ডুবিয়ে ভাজা। সে এক দেখার মতন দৃশ্য – সবাই (ইনক্লুডিং মাতালেরা) উনুনের চারিদিকে গোল হয়ে বসে মাছ ভাজা দেখছে, আর আমি মাছ ভাজছি। টেষ্ট করতে করতেই মাছ প্রায় শেষ হয়ে যাবার জন্য খাবার পাত পর্যন্ত আর সেই বাটারফ্রাই পৌঁছয় নি। রান্নার সময় আর একটা প্রধান ঝামেলার সৃষ্টি হত ঝালের পরিমাণ নিয়ে। চারপাশে দাঁডিয়ে পড়ল সব – এ বলে আর একটু গুঁড়ো লঙ্কা দাও মাংসে, তো ও বলে একদম বেশী দিও না! প্রায়শই ব্যাপারটা ফ্রেণ্ডলি মারামারির পর্যায়ে চলে যেত। যে বেশী ঝাল খেতে পারত না তাকে বলা হত রসগোল্লার পড়ে থাকা রসটা তুই পাবি! গ্রামের বাইরে আমরা ফিষ্টি করতে যেতাম মূলত শীতকালে, মানে যখন আর সবাই যায় আর কি। আমাদের যাবার জায়গা একটাই ছিল – দামোদরের ধার। আমাদের গ্রামের থেকে দামোদর ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনে পাল্লা রোড বলে একটা স্টেশন আছে যেটা ফিষ্টির জায়গা বলে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেছিল। এর কারণ মূলত আশির দশকে সেখানে হওয়া একাধিক বাংলা সিনেমার শুটিং – পাল্লা রোডের ডাকবাংলোকে তাপস-শতাব্দী বিখ্যাত করে দিয়েছিল। তবে সত্যি কথা বলতে কি, জায়গাটা শীতকালে প্রকৃতই মনোরম হত। দামোদরের জল প্রায় শুকিয়ে আসা – ফুরফুরে বাতাস, মিঠে রোদ, আর নদীর চড়াতে ফিষ্টি। আমরা গ্রাম থেকে যেতাম ট্রাক্টরে করে, ক্লাবের সদস্য প্রায় জনা ৫০ ছিল। মাল পত্র তুলে নিয়ে সকাল সকাল রওনা – মাঝে মাংস এবং মদ কেনার জন্য স্টপ। তবে আমি এত্যো পাবলিকের রান্না করার সাহস পেতাম না, তাই গ্রামের গোপাল ঠাকুরকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হত। গোপাল ঠাকুর বা তার সহকারী বুধো কলুর সাথে আমাদের একটা দুষ্ট মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে এরা আমাদের ফিষ্টিতে রান্না করতে আসত কোন রকম ফিনান্সিয়াল লাভের আশা ছাড়াই। শীতাকাল হলেই ওরা জিজ্ঞাসা করতে শুরু করত, কি রে তোদের ফিষ্টি কবে? সেই বুঝে অন্যদের ডেট দেব। পাবার মধ্যে ভাগ্য ভালো হলে গোপাল ঠাকুর বেঁচে থাকা তেল, গরম মশলা, বা জিরে-ধনে গুঁড়ো একটু বাড়ি আনতে পারত। বুধো কলু কেবল একটু মাংসের ঝোল ছেলের জন্য নিয়ে যেত – মাতালরা বিশ্বভাতৃত্ববোধের ইউনেস্কো দূত হতে পারে সেটা আমাদের পিকনিক থেকে ভালো বোঝা যেত – পাবলিক যতই মাতাল হোক, বুধো তার ছেলের জন্য মাংস নিয়ে যেতে পারে নি কোনবার সেটা হয় নি। তবে একবার ফেরার পথে ওদের রান্নার হাতা-খুন্তি নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিল – সবাই এটা জানে যে হালুইকরেরা নিজেদের বড় বড় হাতা ও খুন্তি নিয়ে রান্না করতে আসে। আর আমাদের পিকনিকের থেকে ফেরার সময় একটা রুটিন ছিলে যে বাকি রান্নার জিনিসপত্র একেবারে ডেকরেটারের ঘরে নামিয়ে বিল মিটিয়ে ঘরে ফেরা। তা সেইবার ফেরার সময় কারো কাছে আর বিল মেটাবার টাকা ছিল না – ফলে গোপাল ঠাকুরের রান্নার ফেমাস খুন্তি-হাতা গুলি বন্ধক রাখার তোড়জোর করা হয় – এর ফলে গোপাল ঠাকুর খুবই রেগে গিয়েছিল – কিন্তু তা সত্ত্বেও পরের বছর পিকনিকে যথারীতি হাজির হয়। সারাদিন পিকনিকে গেলে একটা জলখাবারের ব্যবস্থাও করতে হয় সকালের দিকে – আমাদের সময় সেটার প্রায় ফিক্সড মেনু ছিল মুড়ি, ছোলা ছাঁকা, বেগুনী, ঘুঘনী। কেউ একবার লুচি চালু করতে চায়, তাকে যথারীতি আতেঁল বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে রুটি-ঘুঘনী হয়েছিল কোন কোন বার জলখাবার হিসাবে – কিন্তু শীতকালে ক্রিকেট টুর্ণামেণ্টগুলিতে ওটা পেটেণ্টেড মেনু থাকার জন্য আর কেউ রিপিট করতে চাইত না সেই একই খাবার। ক্রিকেট টুর্ণামেণ্ট ও ততসহ খাবার দাবার বিষয়ে একটা আলাদা পর্ব লিখব, না হলে আমাদের যৌবনের সাথে অন্যায় করা হবে। সেই ফিষ্টির মেনুও কিন্তু একই ছিল প্রায় – মাঝে মাঝে ফ্রায়েড রাইস মাংস মেনুতে উচ্ছাস বয়ে আনত। রান্না ছাড়াও আরো একটা বড় কাজ ছিল ওই ফিষ্টির সময় মাতাল সামলানো – জলে ডু্বে মারা যাবার ঘটনাও আছে – তাই সর্তক থাকতে হত যে পাবলিক যাতে কন্ট্রোলে থাকে। যারা মাল না খেয়ে ফিষ্টিতে স্যাক্রিফাইস দিত, তারাই মাতাল সামলাবার দায়িত্বটাও নিত। গোপাল ঠাকুর কিন্তু খুব কম সময়ে রান্না করতে পারত – সেই রান্না দেখার পর আজকাল টিভিতে একটা ডিস তৈরী করতে ৩ ঘন্টা সময় নেওয়া হয় দেখে রিলেটিভিটি জিনিসটা আরও হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে পারি। একবার তেমনই এক ফিষ্টিতে আমি সদ্য বিদেশ থেকে শেখা ‘সাংগ্রিয়া’ পানীয় প্রস্তুত করে সবাইকে খাওয়াই। সেই গল্প পরেরবার।

247

18

শিবাংশু

হেমন্তের জলছবি অথবা পীর চঞ্চুশাহের গল্প

দিল্লিশরিফের পীরসাহেব বাবা চঞ্চুশাহ স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন। তা হলো বেশ কিছুদিন। তিনি মুকাম কলকত্তায় তশরিফ রাখতে যাচ্ছেন চন্দ পলোঁ কে লিয়ে। অপনা খ্যরিয়ত কা খ্যয়াল রখনেওয়ালোঁ জনতা যেন যথাস্থানে তাঁর কদম্বুশি করতে পৌঁছে যা'ন। পীরের লীলা কে বলতে পারে? কোনও মানে হয়? ঘোর হেমন্তের রোদোজ্জ্বল একটি দিন এভাবে মেঘের তাড়সে ডুবে যায়? পীরসাহেব পদধূলি দিচ্ছেন কলকাতার অফিসপাড়ার একটি ওয়েসিসে। অবশ্য এই ঠেকটির অসলি মালিক হলেন বাবু মনোজ ভট্টাচার্য। হাফসেঞ্চুরি হয়ে গেলো, তিনি এই ঠেকটির ঠেকা নিয়ে রেখেছেন। 'লাইমলাইট' নামের এই সরাইখানাটিতে পুরোনো কলকাতার কাফে টাইপ একটা আধোজাগা সুরভি রয়েছে। তাঁর দৌলতে আমরা এখানে জমায়ত করেছি আগেও। আমাদের টিপিক্যাল লেকম্যল বা সাউথসিটি ম্যলের নারকীয় শব্দপ্রদূষণের বিষ থেকে বহুদূর একটা আয়েসী ঠেক লাইমলাইট। যদিও আড্ডাধারীরা প্রায় সবাই দক্ষিণী জনতা, স্তুতি আর জল ছাড়া। অবশ্য মনোজদাও আছেন 'সিঁথি'র সিঁদুর সামলাবার জন্য। আমি তো প্রায় পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের লোক। দুটোর মধ্যে পৌঁছোতে হবে ডালহৌসি। দুপুর একটা থেকে তৈরি হয়ে বসে আছি গড়িয়া বাইপাসের প্রান্তে। আসলে আমার বাড়ি থেকে খুদিরাম মেট্রো দেড়েক কিমি। বাইকে মেরে দিই মিনিট পাঁচের মধ্যে। কিন্তু এরকম আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে ওটা নেওয়া যাবেনা। চারচাকায় মেরেই দেওয়া যায়। কিন্তু রাখবো কোথায়? ডালহৌসি মানে পুলিশমামাদের যৌবনের উপবন। যেখানেই পার্ক করিনা কেন, তাঁদের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবোনা। সে আর এক ঝামেলা। সেই মেট্রো'ই ভরসা। বাস চড়িনি বছর পঁচিশ। ভাড়ার টেসকিও সব গায়েব। ভাবি, পীরসাহেবকে গুস্তাখিমাফ বলে কেটে পড়ি। কিন্তু পরকালের চিন্তাও তো করতে হয়। দেড়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফোন মারলুম। শুনি তিনি ততক্ষণে ধুনি জ্বালিয়ে বসে পড়েছেন পঞ্চমুণ্ডিতে। তখন নিরুপায়, মহেন্দ্র দত্তের কালাছত্রি মাথায় দিয়ে সংসার পারাবারে ঝাঁপিয়েই পড়তে হলো। আধ কিমি এসে একটা রিকশা। ভাবা যায়? রিকশায় চড়লুম? চড়েই পড়লুম? পীরসাহেবের বদ দুয়া যেন না লাগে। মেট্রো তো এলো। কিন্তু তারও ভিতরে যত্তো ভেজা লোক, ভেজা ছাতা, ভেজা কাক রোগা রোগা ছেলেপুলের দল। এসপ্ল্যানেডে এসে দেখি জলের তোড় একটু কম। কিন্তু অবিশ্রান্ত ধারা। ছাতা থাকলে মাথা বেঁচে যাবে। ট্রামলাইনের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা নানা রঙের জলের আয়না। রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে যাই সোজা ডেকার্স লেন। ঐ অন্ধগলির দুদিকে তখন অনন্ত ভোজের রাজসূয় আয়োজন। কী নেই সেখানে? দেশের সব চেয়ে সুলভ আর ব্যাপক 'ভোজবাজি।' গলি পেরিয়ে গ্রেট ইস্টার্নের গলি। সেখান থেকে বড়োরাস্তা। ভিজতে ভিজতে কলকাতার গোঁয়ার গাড়ির স্রোত ও নাছোড় পাবলিকদের মিছিলে শামিল হয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেই গেলুম পীরবাবার আস্তানায়। ততক্ষণে ধুনি ঘিরে চক্রধারীরা মৌতাত জমাতে শুরু করে দিয়েছেন। পীরসাহেব নে গলে লগা লিয়েঁ। ধন্য ভাগ সেওয়া কা অবসর পায়া। সমঝদারেরা প্রথম দফা যীশুর রক্ত শেষ করে ফেলেছেন। বেরসিকেরা চিনিজল। অতঃপর রসগোল্লার উপর পিঁপড়ের মতো আড্ডার জমে ওঠা। দেখুন এখন সব কিছুতেই রসগোল্লা। জাগো বাঙালি। আমার মতো লোকেদেরই ভারি মুশকিল। পোশ্চিমবঙ্গে তো মাত্তর বছরখানেক। ওড়িশায় পাঁচ বছর। ইতোমধ্যে সাহেবশঙ্খের এন্ট্রি হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে স্তুতি জীবনের প্রথম মোবাইল ফোনটি হারিয়ে একটু কাহিল ছিলেন। কিন্তু যেই মনে পড়ে গেছে ছেলে একটা লতুন কিনে দেবে, তুরন্ত ফরেশ।আমারও মনে পড়ে যায়, আমার কন্যা আমার ফোন (তারই কিনে দেওয়া ও মাত্র এক বৎসরের পুরাতন) নিয়ে বিশেষ হীনমন্যতায় ভোগে । মা'কে দুবেলা বলে বাবাকে একটা লতুন ফোন পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু তার বাবার কাছে টিভি সিরিয়াল ও মোবাইল ফোন, দুটো'ই সমান ত্যাজ্য। কে বোঝাবে? আমার ফোন হারালে সেও বোধ হয় বিশেষ প্রীত হবে। জলের সঙ্গে পেরথম দেখা। যতোটা মনে হয়েছিলো, তার থেকেও বাচ্চা। সেই কবে কিকি আর জল আমার বাড়িতে খিচুড়ি আর বেগনি-কুমড়ি খেতে আসবে বলেছিলো। আমি বলেছিলুম দুজনে যেন হাত-ধরাধরি করে আসে। রাস্তায় কেউ লবেঞ্চুস দিলে যেন কখনও না নেয়। তা শেষ পর্যন্ত ওদের আসা হয়নি। কিন্তু আমার আশঙ্কাটি রয়েই গিয়েছিলো। এই মেয়েগুলোর লেখালেখি সুযোগ পেলেই পড়ি। অবশ্যই ভালো লাগে বলে পড়ি। তা জল'কে সামনে পেয়ে কিঞ্চিৎ জ্ঞানও দিলুম। কীভাবে আরো ভালো করা যাবে। দেখা যাক, কী করে...? কালকের একটা বড়ো ঘটনা হলো, মনোজদা একবারও মাঝখানে লাফিয়ে উঠে 'আমি চলি' বললেন না। খোঁজ নিতে জানা গেলো কাল নাকি বৌদি নিজে এসে ওঁকে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। তাই নির্ভয়। শঙ্কা জাগে, আমাদের কপালেও কী এই আছে। সাহেবশঙ্খের একটা কথা অনেকেই জানেনা। বলেই ফেলি। একসময় রতন টাটাকে দেখলেই আপনজনেরা জিগ্যেস করতো, বিয়েটা কবে করবে বাবা? শঙ্খের জন্মের পর থেকে রতনকে ছেড়ে প্রশ্নটা সবাই ওকেই করে। টাটাসাহেব নিশ্চিন্ত। তা আমরা ইতরজন কবের থেকে ধুতিপাঞ্জাবি ইস্ত্রি করে অপেক্ষা করছি। কিন্তু তিনি কিছুই বলেন না। তবে কাল তিনি আমাদের হৃদয় ভেঙে দিলেন। তাঁর মতে 'বিয়ে' করাটা নিতান্ত বাজে ব্যাপার। তিনি লিভিং টুগেদারের পক্ষে। ক্ষীণস্বরে বলতে চেষ্টা করলুম, বিয়ে করাটা তত খারাপ ব্যাপার নয়। এইতো আমি মহারাজ নবকৃষ্ণের আমলে বিয়ে করেছি। কোনও অফসোস নেই। তা বেশ শ্লেষের সঙ্গে যা বললো তা বাংলা করে বলতে গেলে হবে আমরা বুড়ো হয়েছি। তার মধ্যে ওকে ধরা যাবেনা। একটা পাক্কা নেমন্তো পুরো কেঁচিয়ে গেলো। বাবিদা'র সঙ্গে দেখা হলেই গানবাজনা নিয়ে দু'চার কথা হয়েই যায়। কালও হলো। আসলে বাবিদা আর খোদ চঞ্চুশাহ দুজনেই আমার কলেজতুতো আত্মীয়। আর জামশেদপুর ফ্যাক্টর তো কাঁঠালের আঠা। লাগলে পরে ছাড়েনা। গিরিজা দেবী আর বনারসি ঠুমরি নিয়ে দু'চার কথা। কয়েকজন মজলিশি আড্ডাধারীদের নিয়ে তিন'ছয় কথা। 'নুনেতে-ভাতেতে-৩' এর জন্য ওয়াইন নিয়ে একটা বড়ো লেখা লিখতে গিয়ে সম্রাট পিয়দস্সি অশোকের ওয়াইনপ্রীতির গপ্পো জেনে ফেলা। লালপোর্টের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বাঁধা ভোঁদড়বাবু। হায়দরাবাদে আমার বাড়িতে বিরিয়ানি দিয়ে যীশুর রক্তপান তাঁর প্রিয় ব্যসন। এসব কথাবাত্তা হতে হতে লালমদিরা ক্রমাগত শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাতেলা শীর্ষে পৌঁছোলো, যখন ছিপিবন্ধ বোতল থেকে সাহেবশঙ্খ আমার পাত্রে তরলটি ঢালার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লো। তার পর কী হইলো জানেন বাবিলাল। তবে খ্যাঁটনটি বেশ জমপেশ হয়েছিলো। মনোজদা পুরো সাহেব হয়ে গেছেন। সামান্য ইন্দোচিন খাবারদাবার তাঁকে যতো ঝালের চোট দেয়, সাহেবশঙ্খ তত ভুতজলোকিয়ার আচার খেয়ে সে কী সুখ পায় তা ফলাও করে শোনায়। এদেশে ছেলেপিলে সব উচ্ছন্নে গেছে। ঠেক থেকে বেরিয়ে কাস্টমারি ছবি তোলা তো বাদ দেওয়া যায়না। তবে কাল সব ছাতা মাথায় ছত্রপতির জলছবি। ডালহৌসির অফিসফেরত জনতার ফুটপাথ আটকে সমবেত কোরাসের ছবি রয়ে যাবে। বৃষ্টির ঝাপট রয়ে গেছে তখনও। জলের পাগলামিও কাটেনি। তার মধ্যে শরীরে পূর্ণ শিরাজের পানি এবং আরেকটা আড্ডার ভিটামিন। সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী.... জয় হোক।

205

9

দীপঙ্কর বসু

চঞ্চলের টাইগার ব্রিগেড ও আমরা

গতকাল রাতে আমাদের লাইম লাইটের আড্ডার গল্পটা লিখে ঠিক তৃপ্তি পাইনি | ধৈর্যের অভাবে লেখাটা অতি বাজে ধরনের হয়েছে |লেখাটা আড্ডার পাতা থেকে মুছে ফেলতে পারলে |কিন্তু সে কাজটা বোধ হয় ঠিক হবেনা |তাই লেখা মোছামুছির রাস্তায় না হেঁটে নতুন করে লিখে ব্লগে রেখেদিলাম| বাজে লেখার চেয়ে পুনরাবৃত্তি ভালো | ষড়যন্ত্রটা চলছিল অনেক দিন ধরে ই ।চঞ্চল দিল্লী থেকে ফোন করে জানিয়েছিল তার ইচ্ছে নভেমবর মাসে সে যখন তিনদিনের কড়ারে কলকাতায় আসবে তখন আড্ডাধারীদের নিয়ে একটা বৈঠকি আড্ডার আয়োজন করবে । অবশেষে গতকাল এলো সেই প্রতীক্ষিত দিনটি ।কিন্তু কে জানত অলক্ষ্যে বরুণদেব মুচকি হেসেছিলেন আমার ছেলে বেলার সেই ক্ষ্যাপাটে বন্ধুর মত । খেলা ধুলোয় তার আগ্রহ ছিলনা ,তার আনন্দ ছিল আমাদের খেলা ভন্ডুল করে দেওয়ায় ।কতযে অভিনব কায়দায় সে দুষ্কর্মটি করত তার ফিরিস্তি না হয় ভিন্ন লেখায় দেওয়া যাবে ।আপাতত ফিরে আসি গতকালকের কথায় । সকালে ঘুমচোখ খুলেই দেখেছিলাম আকাশ মেঘে ঢাকা ,চারিদিক বিবর্ণ নিরানন্দ আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে ।মনে মনে প্রমাদ গণেছিলাম -এই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে কেউ আসবে কিনা সন্দেহ হয়েছিল । আশা নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে তবু বেরিয়েছিলাম এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশন এ ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে বিবাদী বাগের দিকে হাঁটছিলাম আর তখনি যেন বৃষ্টির বেগটা আরও বেড়ে গেল । আরে বাবা রাধার অভিসারে তো যাচ্ছিনা ,যাচ্ছি প্লেন অ্যান্ড সিম্পুল আড্ডার টানে -তাতেও বাগড়া !! যাই হোক অনেক কষ্টে,মাথার ছাতা ,রাস্তার ইতিউতি জলভরা খানাখন্দ পেরিয়ে নাকালের একশেষ হয়ে অকুস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি টেলিফোন ভবনের উল্টো দিকের লাইম লাইট রেস্তোরার সামনে মনোজদা বেজায় ব্যাজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আর তার দু হাত দূরে স্তুতি কাঁচুমাচু মুখে কয়েকজনের সঙ্গে কি সব কথা বার্তা বলে চলেছে । হঠাৎ মনে হল আমার আশঙ্কাটাই বুঝি সত্যি হতে চলেছে ।বৃষ্টি বাদলা দেখে সবাই আড্ডার মোহ ত্যাগ করেছে । ব্যপারটা খোলসা হল ওদের কাছে গিয়ে ।জানতে পারলাম ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দেবার সময়ে কোনক্রমে স্তুতির হাত থেকে তার মোবাইল ফোনটি মাটিতে পড়ে গেছে । এবং সেটি স্তুতি টের পেয়ে খোঁজ খবর করার অবসরে ফোন বাবাজি ডানা মেলে উড়েগেছেন কোন এক অজানা ঠিকানায় । কিন্তু নানান জনের নানান পরামর্শ মত তত্ত্বতালাশ চালিয়ে যখন বোঝা গেল "তা আ আ রে এ এ ফেরান যাবেনা কিছুতেই " তখন উপায়ান্তর না দেখে আমি স্তুতি এবং মনোজদা রেস্তোরায় ঢুকে পড়াই সাব্যস্ত করলাম । সেখানে তখন আগ্রিম বুক করা আমাদের টেবিল আলো করে বসেছিলেন দুই আয়োজক - চঞ্চল এবং জল । ক্রিকেট খেলায় মাঠে নামার সময় ফিল্ডিং করা দলের খেলোয়াড় রা যেমন একটু অকারণ ছুটোছুটি করে গাটা ঘামিয়ে নেয় ,বলটাকে নিজেদের মধ্যে লোফালুফি করে পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয় ,আমরাও তেমনি এ কথা সেকথা বলাবলি করে নিজেদের মানিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ । তারপরে কে জানি প্রস্তাব দিল বাকি রা যতক্ষণ না এসে পড়ছে ততক্ষণ কিছু হাল্কাপুলকা কিছু অর্ডার দেওয়া যাক বসে বসে চিবনোর জন্য ।তারপর কিছুক্ষণ চলল মেনুকার্ড টা নিয়ে লোফালুফি - এ বলে তুমি অর্ডারটা দাও ,সে বলে আরে তুমিই দাওনা ।।চঞ্চল জিজ্ঞেস করে "বাসুদা কি খাবেন" আমিই বা ত্যাঁদড়ামিতে কম যাই নাকি ? ধ্যানী বুদ্ধের মত মুখ করে বললাম "আহা ,তোমরা যা খাবে আমিও তাই খাবো" অগত্যা চঞ্চলকেই রাশ ধরতে হল শেষ অবধি । স্থির হল আমরা হাল্কা কোন সুরাঘটিত পানীয় এবং বালিকাদের জন্য ফ্রেশ লাইম সোডা । মনোজদা কিন্তু কন্তু করছেন দেখে অর্ডার নিতে আসা স্টাফটি পরামর্শ দিল একটা ভাল করে বানান "মক টেল" ট্রাই করে দেখতে ।কিন্তু মকটেল আর ককটেল শব্দদুটোর মধ্যে এত মিল যে মনোজদা সকলের হাজার বোঝানো সত্বেও কোন ঝুঁকি নিলেননা । অরেঞ্জ জুস এই শেষে মেস ডোবালেন নিজেকে । ইতিমধ্যে সোমা "টাইগার ব্রিগেডের" দুই সদস্যের সন্দেশ নিয়ে এসে গেছেন । জানা গেছে তারা আসছেন । তাঁরা মানে নান আদার দ্যান শিবাজি ওরফে "শিবাংশুদা" এবং অবশ্যই শঙ্খ সায়েব । এই অবধি আমার স্পষ্ট মনে আছে । এর পরে কি গল্প হল কি খাওয়া হল সে সব বিবরণ জানতে চেয়ে লজ্জা দেবেননা । আমি কিছু দেখিনি ,কিচ্ছুটি শুনিনি । নাহ ,ভুল বললাম - কখন যেন একবার দেখলাম শঙ্খ সায়েব পরম ভক্তিভরে "শিবাংশুদার" পানপাত্রে ওয়াইনের বোতল থেকে ওয়াইন ঢালার চেষ্টা চালাচ্ছেন । কিন্তু যতই চেষ্টা করুন যতই বোতলকে ঝাঁকুনি দিন ওয়াইন আর বোতল থেকে পানপাত্রে যাবার নামটি করেনা । সে এক মহা বিপদ । ঠিক সেই সময়ে কে জানি আবিষ্কার করল সায়েব উৎসাহের আতিশয্যে বোতলের ছিপিটিই মুখ থেকে খুলতে ভুলে গেছেন ! ভুলেও কিন্তু ভাববেন্না যে আমি সায়েবের পিছনে তাকে নিয়ে খিল্লি করছি ।আমি কিন্তু সেইক্ষনেই বলে রেখেছিলাম যে এ সংবাদটি আজকের আবাপ তে হেডলাইন হবেই ।আমার তাই কোন দোষ নেই ভাই । Li

211

9

মনোজ ভট্টাচার্য

ঝাড়গ্রাম এবং - - !

ঝাড়গ্রাম এবং - - ! অনেকদিন ধরেই মনস্থ করছিলাম – ঝাড়গ্রাম থেকে চিল্কিগড় হয়ে যে কনকদুর্গার মন্দির আছে – সেখানে একবার যাবো ! – অকস্মাৎ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের বিজ্ঞাপন দেখে মনস্থির করেই নিলাম – ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুক করলাম ! নির্দিষ্ট দিনে সকালে বি বা ডি বাগের অফিশের সামনে থেকে বাস ছাড়ে ! বাসটা আহা মরি নয় – সীটগুলো খুবই শুস্কং কাষ্ঠং – তিন ঘণ্টা সাড়ে তিন ঘণ্টা জার্নির পক্ষে একটু কষ্টকর বৈকি ! কিন্তু ব্রেক ফাস্ট ! আহা - অতি উত্তম ! যদিও বাস-ছাড়ার সময় ছিল আটটা – কিন্তু আগের দিন হঠাৎ ফোন করে দেড় ঘণ্টা এগিয়ে সাড়ে ছটা করে দিল । কারন হিসেবে মাওবাদী জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা ইত্যাদি বলে – বেশ গা-ছম ছমিয়ে দিল ! বিনা কারনেই ব্যাপারটা বেশ গম্ভীর হয়ে গেল ! দ্বিতীয় হুগলী সেতু দিয়ে বাস কলকাতা ছাড়তেই – মনের মধ্যে বেশ স্ফূর্তি – যাক অন্তত দুদিনের জন্যে বাইরে তো বেরনো গেল ! প্রকৃতপক্ষে কলকাতার বাইরে বের হলেই – স্বল্প দূরই হোক বা অনেকটা দূরই হোক – মনে হয় যেন বাইরে যাচ্ছি ! – একটু যেন হ্যাংলা হ্যাংলা শোনাচ্ছে ! – তা হোক ! হাতে যে ব্রেক-ফাস্টের প্যাকেট ছিল – তা তো কোলাঘাটের আগেই শেষ হয়ে গেছে – এবার তাহলে চায়ের পালা ! একটা দোকানে খুব ভালো চা খাওয়াল ম্যানেজার ! ব্যস এর পর থেকে সরকারী আতিথ্য শেষ ! এবার যার যার নিজস্ব ! এদিকে মেদিনীপুর জেলা পড়তেই রাস্তার চেহারাও ক্রমশ পাল্টে যেতে লাগল । বিরাট বিরাট শাল, ইত্যাদি গাছে রাস্তা ঢেকে যেতে লাগল ! গাড়ি ছাড়া পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা কমে যেতে লাগল ! ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্সে আমাদের ঘর দেওয়া হল ! বেশ সুন্দর সাজানো কোয়ার্টার । এক একটা বাড়িতে দুটো করে ইউনিট । - এখানে একটু মুখ হাত ধুয়ে খাওয়ার অর্ডার দেওয়া হল । আবার তো আমাদের বেরতে হবে ! ইতিমধ্যে বাঁদিকে তাকাতেই দেখি ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির গেট ! রাজা নরসিংহ মল্লদেব সরনী! বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢোকা নিষেধ – তাই আপাতত গেটের কাছেটাই দেখলাম ! লাঞ্চের পর রাজবাড়িতে গেলাম । মুল রাজবাড়িতে – ঢোকা বারন ! কিন্তু আমাদের তো অনুমতি নেওয়া হয়েছে । মানে যারা রাজবাড়ি ট্যুরিস্ট লজে থাকছে – তাদেরই অনুমতি হয়ে যায় ! – সেখানে একজন কেয়ারটেকার এক পা তুলে বসে আছে – মুখে শুধু ‘না’ শব্দ ! ব্যবহার অতি বাজে ! - আমরা যখন বললাম – আমরা কলকাতা থেকে আসছি – অনুমতি নেওয়া আছে – আপনি এরকম ব্যবহার করবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি – ততক্ষণে তার বোধগম্য হল ! – ‘তাহলে দেখুন’ – খুবই নিঃস্পৃহ গলায় যেন তেতো ওষুধ গিললেন আরে দেখব টা কি ! শুধু একটা ডাইনিং রুম ! গ্রে স্ট্রিটের মিত্র কাফের মতো ! – ভেতরে বা ওপরে যাবার সব দরজাই বন্ধ! তো আমরা বাইরের কিছু ছবি তুললাম ! এই রাজাদের কিছু ইতিহাস আছে – সেই গল্পের ধান্দাতেই তো আমরা এখানে ওখানে যাই! দিল্লির সম্রাট আকবরের নির্দেশে রাজস্থানের রাজা মান সিংহ - সুবেদার সর্বেশ্বর সিং চৌহান ও তার ভাইকে নিয়ে - তৎকালীন মল্ল রাজাদের পরাস্ত করে ঝাড়গ্রাম দখল করে ! আগে নাম ছিল ঝারি-গ্রাম । মান সিংহ ফিরে গেলে, - সর্বেশ্বর সিং চৌহান ও তার ভাই - আঞ্চলিক রাজাদের মতো - নাম পাল্টে মল্লদেব পদবী নিয়ে রাজত্ব করতে লাগলেন ! বর্তমানে তাদের ২১তম বংশধর শিবেন্দ্রবিজয় মল্লদেব রাজত্ব করছে – ও তৃণমুল সামলাচ্ছে ! এবার নাম পরিবর্তনের ওপর কিছু জ্ঞান ! – আদিবাসী অঞ্চলে বীরদের নাম হত উগাল ও সান্ডা । তাই সর্বেশ্বর সিং চৌহান আঞ্চলিক নাম নিয়ে হলেন রাজা সর্বেশ্বর সিং মল্ল উগাল সান্ডা দেব ! যেমন পরবর্তী বংশধর হলেন রাজা নরসিংহ মল্ল উগাল সান্ডা দেব ! পরবর্তীকালে অবশ্য আবার পরিবর্তন হয়ে শুধু মল্লদেব হয় ! নতুন রাজবাড়ির স্থাপত্যের দিকে তাকালে বোঝা যায় মোগল স্থাপত্যের সঙ্গে ব্রিটিশ স্থাপত্যের বেশ কিছু সহাবস্থান আছে ! যেমন প্রাসাদের সামনে প্রশস্থ সোপান-শ্রেনীর প্রাধান্য ব্রিটিশ ধাঁচের! আবার বিরাট গোলাকার গম্বুজ মনে পড়িয়ে দেবে মোগল স্থাপত্য রীতি ! – পাশে একটা অতিথি নিবাস ! ব্রিটেন থেকে কোন গন্যমান্য অতিথি এলে সেখানে নাকি স্থান পেত ! – এখন সেই অতিথি-নিবাস দেখে বিশেষ কোন অনুভুতি হল না ! মনে হল ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির নামটাই শুধু অবস্থান করছে ! কি দেখেছি তার ধারাবাহিক বিবরন দিলে স্মৃতির ওপর চাপ পড়বে ! তার চেয়ে ভালো - বিশেষ দ্রষ্টব্যগুলো বলে নিলে । লাল জল নামে এক যায়গায় বাস দাঁড়াল । ব্যাপারটা হল – সেখানে একটা পাহাড়ের গুহায় নাকি ভালুক বা গুহা-মানুষ ছিল । এখন অবশ্য নেই ! ভালুক নেই । কিন্তু আছেন একজনা - এক আদিবাসী মহিলা – বয়স পঞ্চাশ থেকে একশো পঞ্চাশেরই মধ্যে কিছু - একটা লালজল দেবীর আস্তানা গেড়ে একাই ওখানে থাকেন ! ঠিক একা নয় – ওনার ঘরের মধ্যে কিছু সাপও থাকে । তবে ওঁকে কিছু বলে না ! ওনার কাছ থেকে কলকাতা থেকে অনেকে আসে – জড়িবুটি কিনে নিয়ে যায় ! স্থানটা বেশ পরিস্কার ! আর ওখানে খাবার ইত্যাদি সরবরাহ করে – কেউ না কেউ ! – আমাদের অনেকেই দেখলাম – ভক্তি বা ভয়ে প্রনামী দিচ্ছে ! আমার আগে থেকে কনকদুর্গা মন্দিরের সম্বন্ধে একটা কৌতূহল ছিল ! বেশ মুখরোচক গুল্প ! চিলকিগড়ে চিলকিগড় রাজবাড়ি ও কনকদুর্গা মানে সোনার দুর্গার মন্দির ! রাজবাড়িগুলোর স্থাপত্য এমনিতেই বেশ দর্শনীয় – তার ওপর জড়িয়ে থাকে গল্প – মানে খানিকটা ইতিহাস ! চিল্কিগড়ের রাজবাড়িও বেশ দর্শনীয় ! বরং এটা দেখে তবু কিছু সম্ভ্রম বোধ হল ! এই রাজবাড়ি রাজা জগতদেও তৈরি করেছিল । এই রাজবাড়ির বৈশিষ্ট হল এর পরিচারক মহল ! সেটাই প্রায় একটা প্রাসাদপম ! খুবই জীর্ণ হয়ে গেছে ! এর পাশে একদিকে গায়ত্রী মন্দির ও আরেকদিকে মহাদেবের মন্দির ! আবার আসি কনকদুর্গা মন্দির ! এ মন্দিরটাও যথারীতি একই গুল্প-জাত ! প্রায় পাঁচশো বছর আগে মধ্যপ্রদেশ থেকে রাজা জগতদেও এখানে এসে রাজা ধবলদেও কে পরাস্ত করে একটি মন্দির তৈরি করে ! জগতদেওর কোন এক বংশধর গোপীনাথের স্বপ্নে কনকদুর্গা দেখা দেন ও মন্দিরে স্থাপনা করতে আদেশ দেন ! পরের দিন গোপীনাথের সঙ্গে যোগেন্দ্রনাথ কামিল্যা নামে এক শিল্পী ও রামচন্দ্র সারাঙ্গি নামে এক পুরোহিতের সাক্ষাত হল – তারাও নাকি দেবীর কাছ থেকে একই স্বপ্নাদেশ পেয়ে গোপীনাথের কাছে এসেছে । তিনজনের প্রচেষ্টায় তৈরি হল মন্দির ও ভেতরে অধিষ্ঠিত হল এক মূর্তি – যাকে অলঙ্কৃত করা হল সোনায় ! অতঃপর মন্দিরের প্রসিদ্ধি হল বড়ামহল নামে আর দেবীর নাম হল চণ্ডী – যে কিনা শক্তির প্রতিক ! – জঙ্গলাকীর্ণ এই মন্দিরে আগে মোষ বলি দেওয়া হত আকছারই । পরে অবশ্য ছাগ-বলি দেওয়া হয় ! – পুরনো ভেঙ্গে পড়া মন্দিরটা বা দিকে এখনো আছে একটু বিপজ্জনক ভাবে ! এরই পাশ দিয়ে ডুলুং নদীর রাস্তা ! মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ডুলুং নদী ! অনেকটা জায়গা জুড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই মন্দির প্রাঙ্গন – বেশ রোমাঞ্চকর ! গেট থেকে মন্দির পর্যন্ত দুধারে উঁচু উঁচু গাছের সারি – নাকি একশো আট রকম প্রজাতির গাছ আছে ! অনেক গাছের গায়ে নামও লেখা আছে ! – বেশ বোটানিক্যাল গার্ডেন ধরনের ! ঘাগরা ফলস ! বর্ষাকালে এর রূপ হয় ভয়ঙ্কর ! দু-কুল ছাপিয়ে যায় ! এখন একেবারে শুকনো পাথুরে ! কিছু ছেলে ওরই মধ্যে এক যায়গায় সাঁতার কেটে স্নান করছে ! পাথরের ওপর দিয়ে নামা ওঠাই সার ! তবু বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস ! এছাড়া সাবিত্রী মন্দির , মিনি চিড়িয়াখানা ইত্যাদিও আছে ! ঝাড়গ্রাম – প্রায় কলকাতার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে – খুবই মনমুগ্ধকর বেড়ানোর জায়গা ! মনোজ

233

8

সুকান্ত ঘোষ

হকার সঙ্গমে

ভারতবর্ষে যদি রেলে যাতায়াতকে কেবল পরিবহন বলে কেউ ভাবেন তা হলে তিনি নির্ঘাত বিশাল একটা ভুল করে বসেন না জেনেই। ভারতে রেলে যাতায়াতের দার্শনিক নাম হল – রেলযাত্রা। যে কোন তীর্থ যাত্রার মত গুঁতো গুঁতি, না বেঁচে ফিরে আসার ভয়, সব খুইয়ে বসার আশঙ্কা এই সব সারক্যাষ্টিক জিনিস পত্র যদি বাদও দিই, তাহলে আমাদের রেলকে ‘যাত্রা’য় উন্নীত করতে যাদের অবদান অনৈস্বীকার্য তারা হল ট্রেনের ‘হকার’ এবং তাদের প্রতি আমাদের সমাজিক স্নেহ। ভারত থেকে বিদেশে এসে যখন প্রথমদিকে কেউ কেউ ট্রেনে চাপেন তা হলে বিশাল একটা ঝটকা লাগে – টাইমে ট্রেন আসছে , বসার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে,পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ইত্যাদি । তা এই সবে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে এলে একটা অভাব অনুভূত হতে শুরু করে – কিছু যেন একটা মিস করছি । অনেক ভেবে আমি বার করলাম সেটা আর কিছুই নয়, ট্রেনে হকার দের অনুপস্থিতি ! ট্রেন অনুমোদিত কয়েকটা কফি ভেন্ডর ছাড়া বিদেশের ট্রেনে হকার কোথায় ! আমাদের দেশে ট্রেনে হকার দের উপস্থিতি যাত্রাকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়ে থাকে, নাহলে ওই নরক যন্ত্রণা সহ্য করা দায় ! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আমি এখানে ট্রেনে হকারদের আলোচনা মূলত সীমিত রাখব হাওড়া- বর্ধমান লাইনের মধ্যে কারণ এই লাইনের মধ্যেই আমার ফার্স্ট- হ্যান্ড অভিজ্ঞতা রয়েছে । তবে সমস্ত ট্রেন হকার প্রজাতির মধ্যে জীনগত পার্থক্য তাতটাই যতটা আমাদের আর শিম্পাঞ্জীর মধ্যে ! যাই হোক হাওড়া- বর্ধমান মেইন লাইন লোকালের হকারদের চার ভাগে ভাগ করতে হবেঃ এক) শুধু হাওড়া স্টেশন - এদের এক্তিয়ার ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত দুই) হাওড়া থেকে ট্রেন ছেড়ে ব্যান্ডেল দাঁড়ানো পর্যন্ত তিন) ব্যান্ডেল ছাড়ার পর ও বর্ধমানে থামার ঠিক আগে চার) বর্ধমান স্টেশন শুধু এদের মধ্যে তৃতীয় প্রজাতির সাথে আমার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল বহুদিন । অনেকে আবার বন্ধুস্থানীয় বলা যেতে পারে । এরা অনেকেই চমকপ্রদ খাবার বিক্রী করত । মানুষের মত খাবারেরও যে বিবর্তন হয় তা এই ট্রেন লাইনের হকারদের খাবার অনুসরণ করলেই বোঝা যায় । পার্থক্য একটাই, খাবারের বিবর্তনের টাইম স্কেল ডারইন স্কেলের থেকে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত । যখন ট্রেনের ভেন্ডর কম্পার্টমেন্টে ভাত বিক্রি শুরু হল তখন বেশ একটা চমক লেগেছিল । এই ভাত বিক্রি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল সকাল ১০টা থেকে ১২ টার মধ্যে ট্রেন গুলিতে । এই সময়ের ট্রেনে বর্ধমানের দিক থেকে কলকাতায় ছানা আসত ।এই ছানাওয়ালারা সকালে আশে পাশে গ্রামে গোরুর দুধ দুইয়ে, সেই দুধে ছানা কেটে তারপর কলকাতা। ফলত এরা সত্যিকারের টাইম প্রেসারে থাকত , কর্পোরেট জগতের মত ফলস টাইম প্রেসার নয়। তা ট্রেনে ভাতের ব্যাবস্থা শুরু হওয়ায় অনেকের সুবিধাই হল । একজন বৌদি প্রথম এটা শুরু করে এক হাঁড়ি ভাত ,ডাল ,সব্জি ,মাছ ও খোপ কাটা থালা বা কলাপাতা বিছানো থালা দিয়ে ব্যাবসা শুরু । সঙ্গে বালতিতে জল- দাম মনে হয় ১০ টাকার মত ছিল । অনেক খানবালার মতে রীতিমত হোমলি খাবার । ট্রেনে ভেন্ডর কামরা নিয়ে অনেকের ভুল ধরণা আছে – ভুল ভাঙানোর জন্য কিছুদিন যাতাযাত করতে অনুরোধ করব। ছানার গন্ধ, পচা সব্জির গন্ধ এই সব সহ্য এলে ভেন্ডরে যাতাযাত কিন্তু খুবই আরামপ্রদ। উপরি পাওনার মধ্যে রয়ে যায় হকারদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে জিনিস পত্র কেনা। ভাত ছাড়া পেট ভরানোর নিকটতম খাবার ট্রেনে যা পাওয়া যেত তা হল মশলামুড়ি । মশলা মুড়ি যারা বিক্রি করত তাদের অনেকেরই আমাদের আশে পাশের গ্রামে বাড়ি। আমাদের নিমো গ্রামে মশলা মুড়ি বিক্রেতা ছিল সাকুল্যে তিন জন – ময়রাদের তপন, তপনের ভাই বাঁকু আর বাউরিপাড়ার হারা। আর মশলামুড়ি পরিবেশনের যে কাগজের ঠোঙা তা তৈরী করত কলুদের বুধোর বউ, যে বুধো আমাদের পিকনিকে রান্না করত বলে অন্য পর্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি আগেই। তপন ছিল আদ্যান্ত সংসারী মানুষ, লাইফে তেমন ঘটনার ঘনঘটা নেই। আমাদের পরিবারের সাথে তপনের খুবই ভালো সম্পর্ক। পুজোর কদিন তপনদা হকারি করতে যায় না – আমাদের বাড়িতে রান্না করে। আমাদের বাড়িতে পারিবারিক দূর্গা পূজা হবার জন্য আত্মীয় সজনের সমাগমে বাড়ি গম গম করে ওই সময়ে। ইয়ং জেনারেশেনের বাড়ির বঊরা আজকাল জবাব দিয়েছে এই বলে যে সারা বছর হেঁসেল ঠেলে ওই কটা দিন তারা সাজুগুজু করে রিল্যাক্স করতে চায়। তাই শুধু হেল্পিং হ্যান্ড নয়, পুজোর কদিন সব রান্না-বান্নার ভারও তপনদা এবং তার সহকারীর উপর ন্যস্ত থাকে। বাঁকুর ব্যাপারটা একটু সাইকোলজিক্যাল – বিয়ের আগে পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু চাঁপাকে বিয়ে করে আনার পর ব্যালান্স চেঞ্জ হয়ে যায়। বাঁকুর হাইট খুবই শর্ট থাকার জন্যই সেই ব্যালেন্সের খেলা – চাঁপা সুন্দরী, বাপের ধারদেনা থাকার জন্য বাঁকু পয়সা দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চাঁপিকে (চাঁপাকে আদর করে আমাদের গ্রাম চাঁপি বলত) তুলে আনে। চাঁপি কিছুদিন বিয়ের পর ঠিক থাকে – কিন্তু বাপের বাড়ির গ্রামের তুলনায় নিমো গ্রাম মর্ডান হবার জন্য সেই সজীবতার রেশ চাঁপির মনেও লাগে। কুজনেরা বলে চাঁপির নাকি পরপুরুষের প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়। তো এমন অবস্থায় বাঁকুর জীবনের ইক্যুলিব্রিয়াম নষ্ট হয়ে গিয়ে ফ্রী এনার্জী কোলাহলে নষ্ট হতে শুরু করে। লাষ্ট ট্রেন পার করে বাড়ি ফিরে বাঁকু পাড়া জানিয়ে চাঁপিকে শাসন এবং ততসহ চাঁপির একজিজটেন্ট ও নন-একজিসট্যান্ট নাগর-দের প্রতি ‘দেখে-নেবার’ চেতাগ্নি শুরু হত। বাঁকুর চেতাগ্নি নিয়ে আমাদের চিন্তা ছিল না – চিন্তা ছিল এই নিয়ে যে এই সব সাত-পাঁচ ভেবে বাঁকুর মুড়িমশলার কোয়ালিটি না কমপ্রোমাইজড হয়ে যায়। মুড়ি মশলার লাইনের কম্পিটিশন সফটওয়্যার আউট সোর্সিং-এর থেকেও লগ্‌ স্কেলে বেশী। আমার চেনা সমস্ত মুড়ি মশলা বিক্রেতাদের মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার নিঃসন্দেহে ছিল হারা । আগে হারা আমাদের জমিতে কিষেনের কাজ করত। একদিন কোথা থেকে ট্রেনে করে ফেরার সময় দেখি গাংপুর স্টেশন থেকে হারা মুড়ি মশলা নিয়ে উঠছে প্যান্ট-জামা পড়ে এবং সব চেয়ে বড় কথা চোখে একটা চশমা পড়ে! আমার সঙ্গের জনতা এক ঐতিহাসিক ভুল করে ফেলে যা ভাবলে আমি এখনও লজ্জিত হই – জানলা দিয়ে পাবলিক হেঁকে উঠে, “এই হারা - *ড়া, চশমা পড়ে কি *রাচ্ছিস, আর গলায় ওটা কি”? গলায় মুড়ি মশলার ডাব্বা বুঝতে আরো যোগ করে, “তোর *লের মুড়ি কে খাবে রে”? হারা সেই পাবলিক দেখে ট্রেন কমপার্টমেন্টে থেকে অনেক রানিং অবস্থায় নেমে যায় – তখনো ওর বেশী প্র্যাক্টিস হয় নি চলন্ত অবস্থায় ডাব্বা নিয়ে ট্রেন থেকে নামা। হারা ট্রেনের তলায় ঢুকে গেলে আমরা শিওর খুব দুঃখ পেতাম তৎকালে। তবে হারাও শোধ নিতে চেয়েছিল। সে কোন সময় রাতের বেলা তন্ত্র প্র্যাকটিস করতে শুরু করে আমরা জানতে পারি নি। নিমো স্টেশন ও গ্রামের মধ্যে ১০০ মিটার মত জমির ফাঁক আছে। হারা রাতে বাড়ি ফিরত না – নিমো স্টেশনের ধারেই একটা গুমটিতে থাকত। আমাদের বন্ধু রাজু এক সময় ঠিক করে নিমো স্টেশনে একটা ইমিটেশনের দোকান করবে – তা রাত জেগে সেই দোকানের কাজ চলছে। তখন হারা অফার করে যে অত রাতে বাড়ি না ফিরে রাজু ওর গুমটিতে থাকতে পারে। রাজুর সরল মনে থেকে যেতে রাজী হয়। একদিন রাতে শুনি বিশাল চিৎকার আর দরজায় রাজুর ধাক্কা। কিনা স্টেশন থেকে রাজু গ্রামে ছুটে আসছে আর তার পিছনে পিছনে খাঁড়া হাতে তাড়া করেছে হারা। পরে জানা যায় হারার বিছানার তলায় একটা খাঁড়া রাখা থাকত এবং কোথা থেকে সে একটা মাথার খুলি ও একজোড়া টিবিয়া-ফেবুলা জোগাড় করেছিল । সেই খুলির ভেতর ঢেলে হারা নাকি মাল খেত । সেই দিন রাত্রে খুলিতে মাল খেয়ে হারা সিন্দুর দিয়ে খাঁড়া পুজা শুরু করতে শুরু করতে। রাজু নাকি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সব মজা দেখছিল – এর পরে কি হবে সেটা সে অনুমান করে নি। পুজা শেষে হারা নাকি মায়ের আদেশ পেল যে সেদিন নরবলি দিতে হবে! অতঃপর রাজুকে বলি হতে রিকোয়েষ্ট করে মহা পূণ্যের কাজ বলে, এবং রাজু রাজী না হলে খাঁড়া নিয়ে তাড়া করা মাঝরাতে ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে মিউচ্যুয়াল হয়ে যায় – ট্রেনের কমপার্টমেন্টে আমাদের দেখতে পেলে, হারা সেই খানটায় আর মুড়ি বিক্রী করত না। চশমা ঠিক করে সরে যেত। আগেই বলেছি মুড়ি মশলা লাইনে কম্পিটিশন একটু বেশি ছিল । এখনও দেখা যায় এক কামরায় চারজন মশলামুড়ি নিয়ে উঠে পড়ল ! কোনও নির্দিষ্ট টাইম না থাকলে যা হয় আর কি? মুল সারবস্তু সবারই প্রায় সমান ছিল- মেশিনে ভাজা মুরি,চানাচুর, পেঁয়াজকুচি, আলুর টুকরো, ছোলা ভেজানো, তাতে খাঁটি সরষের তেল খানিকটা –আর তাছাড়া ছিল একটা স্পেশাল মশলা । সেই স্পেশাল মশলা প্রায় সব হকারই একজায়গা থেকে কিনত ।এবং সেই মিশ্রণে যে কি আছে সেটা কেউ জানত না । আমি শুনেছিলাম ওই মশলায় নাকি কুলের বিচি গুঁড়ানো থাকে ! এত্য ফল থাকতে কুলের বিচি কেন সেই বিষয়ে আমি ধন্ধে ছিলাম ! সব মিশিয়ে স্টিলের কৌটোয় চামচ দিয়ে নাড়ানোর যে শব্দ তাতেই জিভে জল চলে আসার মত ব্যাপার । মাল ঠোঙায় ঢেলে সর্বোপরি একটা লম্বা নারকেলের টুকরো ।এই খাবার বহু ক্ষুধার্ত স্কুল ফেরত ছোকরা , অফিস ফেরত বাবু ,সিনেমা ফেরত গৃহবধূ ,সন্ধ্যেয় রেলাক্স করতে বেরানো যুবক যুবতী দের প্রাণে জোর সঞ্চার করেছে দিনের পর দিন । তবে কম্পিটিশন মার্কেট থাকায় কোনও কোনও হকার স্ট্যান্ডার্ড রেসিপি থেকে ডিভিয়েট করত একটু আধটু – যেমন একজন আমদানী করল আমতেল দিয়ে মুড়ি। আর কিছু নয় মুড়ি , আমতেল আর নারকেল ।বললে বিশ্বাস করবেন না এই ভাবে সে নিজের একটা মার্কেট গড়ে তুলেছিল নিজের চারদিকে । বর্ধমানে মেইন লাইন যে ট্রেন টা ৫।৪০ তে ছাড়ত সেই ট্রেনের পিছন দিক থেকে তৃতীয় কামড়ায় সে উঠত। দিনে ওই একটাই ট্রেন ও কভার করত –বর্ধমান থেকে ব্যান্ডেল ও ফেরত । প্রায় ১০০ ঠোঙা মত মাল সে বিক্রী করত । দুটাকা ঠোঙার যুগে আমতেল মুড়ি ছিল তিন টাকা ।আর বর্ধমান স্টেশনে দেখেছি সস দিয়ে মশলা মুড়ি বিক্রী করতে । স্পেশাল বলতে হত এবং তার দাম তখনি ছিল পাঁচ টাকা মত ।তবে সেই সস মেশানো মুড়িতে মুচমুচে ভাবটা থাকত না বরং মাখা মাখা কাদা কাদা একটা ভাব । কাগজের প্লেটে সেই জিনিস ঢেলে দিত এবং আইসক্রীম খাওয়ার চামচ দিয়ে তা খেতে হত । ট্রেনের খাবার বিষয়ে আলোচনা করতে হলে একটা তুলনা মূলক প্যারালাল না চাইলেও আনতে হবে যেটা হল ঘটি বনাম বাঙাল ।আমাদের দিকে এই ব্যাপারটা মাঝে মাঝে কলকাতা সুলভ ড্রয়িংরুম জাত টিক্কা-টিপ্পনীর মত সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজজীবনে প্রভাব ফেলত !দেখা গেছে যে ট্রেনের হকারদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ বা তার বেশী বাঙাল !এর সমাজতত্ব গত ব্যাখ্যা আমি জানি না তবে আপাত দৃষ্টিতে যা মনে হত তা হল বাঙাল ছেলে পুলেরা ঘটি কাউন্টার পার্ট গুলোর থেকে বেশি কর্মঠ ।ঘটি যুবক গন যখন আগের দিনের ক্রিকেট ম্যাচের আলোচনা করতে ও গ্রামের বাঁশের মাচায় বসে বিড়ি ফুঁকতে ব্যাস্ত , তাখন বাঙাল ছেলেদের দেখেছি বাড়ির গাছে হওয়া এক ঝুড়ি পেয়েয়ারা নিয়ে ট্রেনে বেচতে যেতে ।আর তাছাড়া আমাদের ওদিকের বাঙালদের ব্যাবসা বুদ্ধি প্রখর ছিল । ট্রেনে ইনিভেটিভ যা কিছু হকাররা বিক্রী করে সবই বাঙাল মস্তিষ্ক প্রসূত। ভাবুন – বিটনুন দিয়ে কাঁচা আমলকী , চালের পাঁপড় ,টম্যাটো দিয়ে ছিলা মটর সিদ্ধ (তেঁতুল গলা জল সমেত), ঘটি গরম ,গরম দিলখুশ, ঘুগনি ইত্যাদি । এখানে শুধু তাও আমি খাবার নিয়ে আলচনা করছি বাকি ট্রেনে বিক্রীত ষ্টেশনারী দ্রব্যের ইনভেশনের ম্যাগ্নিটিউড এডিসন ও স্টিভ জোবসের মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিল প্রায় । সেই প্রসঙ্গ অন্যসময় আসা যাবে । ইদানিং শুনলাম বিটনুন আমলকির এক নতুন ভারসান বের হয়েছে- সেটা হল বিটনুন – আমলকী ও তার সাথে ধনে পাতা । এই মালের চাহিদা আগের চেয়ে বেশি ছিল। এই মুহূর্তে আরও যা যা মনে পরছে তার মধ্যে ছিল আমসত্ব , গুড়বাদাম ।তবে এই দুই প্রোডাক্টের মধ্যে কিঞ্চিত মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজী মিশে আছে এবং এই দুই প্রডাক্টের কোয়ালিটি কন্ট্রোল খুবই নিম্নমানের । কস্মেটিক্স ইন্ডাস্ট্রির মত ইহাও শুধু মাত্র বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ওপর ভর করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে । আগে ১০০ বা ২০০ গ্রাম ওজনের আমসত্বের টুকরো বিক্রী হত । তারপর কোনও ধুরন্ধর (বাঙাল হাওয়ার চান্সই বেশি) মস্তিষ্ক প্রসূত হল এই আইডিয়া যে চকোলেটের মত করে পুরিয়ায় আমসত্ব বিক্রী হবে, ১ টাকা পিস । সেই যুগান্তকারী ভিউ চেঞ্চের পর এখন হই হই করে আমসত্ব পুরিয়া বিক্রী হচ্ছে ট্রেনে । আফসোস এই যে দেশটি ভারত হাওয়ায় আইডিয়াটি পেটেন্ট করা যায় নি ! না হলে ভদ্রলোক আমেরিকান গৃহবধুর মত যিনি স্লাইস পাউরুটির পেটেন্ট নিয়ে কোটিপতি হয়েছিলেন টার মত হতেই পারতেন । ভাবলে অবাক হতে হয় যে পাউরুটি স্লাইস করে বিক্রীর আইডিয়ার জন্যে আমাদের বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে । তাতে যদি ওই ভদ্রমহিলার পাঁচ ছটা ছেলে মেয়ে না থাকত, তাহলে হয়ত আমাদের অপেক্ষা আরও বাড়ত ! যাই হোক ওই আমসত্বের মধ্যে আমের ভাগ কিন্তু খুবই কম ছিল।আপনি নিশ্চিন্তে ওই আমসত্ব খেতে পারেন এই জেনে যে ওর সিংহ ভাগটাই কুমড়ো থেকে তৈরী – তার সাথে মিশেছে আম সেন্টেড কিছু কেমিক্যাল ।আর ওই গুড় বাদামের মধ্যে খারাপ কেমিক্যাল কিছু থাকত না, কেবল ভাল বাদাম-ভুয়ো বাদামের অনুপাত প্রায় ২০-৮০ হয়ে যেত । ট্রেনে ডাব বিক্রীও এক যুগান্তকারী প্রচলন ।প্রথমদিকে সেই ডাব খাওয়ার পর ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলাই নিয়ম ছিল-কারন তাতে ট্রেন নোংরা কম হবে । চলন্ত ট্রেন থেকে ছোঁড়া ডাব হতে বেশ কিছু পাবলিক শহীদ বা হাসপাতাল জাত হওয়ার পর ডাব খেয়ে চেয়ারের নীচে রাখাটাই নিয়ম বলে চালু হল । ফলত ট্রেন বেশি নোংরা হতে শুরু করল । কোন পদ্ধতিটি সঠিক সেই বিষয়ে প্রথম দিকে ডেলি প্যাসেঞ্জার মহল আলোচনায় সরগরম থাকত । ট্রেনে আরও যে সব ফল পাওয়া যেত তার মধ্যে কমলালেবু ও পানিফলের খোসা পাবারই সম্ভাবনা বেশি ছিল ট্রেনের কামড়ায় । তবে সবচেয়ে বেশী ব্যাবহৃত ফল শসার খোসা কিন্তু ছড়ানো অবস্থায় খুব কম পাওয়া যেত। কারন বহুবিধ শসা মূলত হকারটি ছাড়িয়ে বিটনুন মাখিয়ে,কাগজে মুড়িয়ে প্যাসেঞ্জারের হাতে চালান করত । তাই খোসা থাকত হকারটির ঝুড়িতেই এবং সেই খোসার কুলিং এফেক্টটা হকার ব্যাবহার করত তার বাকী শসাকে ঠাণ্ডা রাখতে ।আর দিনের শেষে জমা হওয়া খোসা সযত্নে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হত পোষা গরুর জন্যে ।একেবারে ইকো ফ্রেন্ডলি –গ্রীন অবস্থা যাকে বলে । ট্রেনের ডাবের চলনের পেছনে কিন্তু খবরের কাগজের রূপচর্চা বা স্বাস্থ্য কলামগুলির অবদান অনেকখানি । কাগজ খুললেই দেখবেন কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া অস্বাস্থ্যকর। তার বদলে ডাবের জল খান এই সব । আর তা ছাড়া সকালে ঘুম থেকে উঠে ডাবের জল দিয়ে মুখ ধুন, চোখের পাতায় শসার টুকরো রাখুন – এই সব তো ছিলই ।তবে আমি আজ পর্যন্ত কাউকে ট্রেনের ভিতর ডাবের জল দিয়ে মুখ ধুতে দেখি নি । যদিও অনেককে ট্রেন থকে শসা কিনে বাড়ি নিয়ে যেতে দেখেছি , মনে হয় সে যতটা চোখের পাতায় দেবার জন্যে, তার ছেয়েও বেশী মুড়ি দিয়ে খাওয়ার জন্যে। এখন ডাবের পিস কত করে হয়েছে আমি জানি না-আমি এক কালে আমাদের গাছের ডাব পাইকারী দরে বিক্রী করতাম ১১০ টাকা ১০০ ডাবের জন্যে । এই কয়েক মাস আগে আমি বাড়িতে গাছের ডাব ৬০০ টাকা শয়ে বেচে এলাম। সেই ডাব ১৫ টাকা করে ট্রেনের কামড়ায় বিক্রী হত মনে হয়। তাহলেই বুঝতে পারছেন লাভের মার্জিনটা কেমন ছিল ! আর আগে যেমন উল্লেখ করলাম, ডাবের প্রচলন হঠ করে যেন বেড়ে গেল ট্রেনে কোল্ড ড্রিঙ্কস বিক্রী কমে যাওয়ার পর । আগে গরম কালে ট্রেনে আকছার বরফ ত্রিপলের ব্যাগের মধ্যে নিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস বিক্রেতাদের দেখা যেত ।এইসব কোল্ড ড্রিঙ্কস বর্ধমানের মেহেদীবাগানের দিকে তৈরী হত বলে আমার কাছে খবর ছিল । মানুষ যে ব্র্যান্ড দেখেই খাদ্য কেনে এবং মুল স্বাদ কেমন হাওয়া উচিৎ সে বিষয়ে প্রায়শই প্রত্যক্ষ কোনও জ্ঞান রাখে না , তা এই কোল্ড ড্রিঙ্কসের বিক্রী দেখেই বোঝা যেত। ওই সব প্রোডাক্টই যে নাকল তা বোধগম্য হতে হতে বহু লোক মাটির বাড়ি থেকে দোতলা পাকা বাড়ি হাঁকিয়ে নিয়ে ছিল । ডাব বিষয়ে আমার বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে –অন্যত্র বলা যাবে ডিটেইলসে তবে এখানে একটা ছোট্ট ব্যাপার বলে রাখি ।আমাদের সময়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দুই হাফে হত, দিনে দুটো পেপার ।তা মাঝের ব্রেকটায় গার্জেনরা টিফিন আনতেন – এবং এপ্রিল মাস নাগাদ পরীক্ষা হবার জন্যে পরীক্ষার্থীর মাথা ঠাণ্ডা করার জন্যে ডাব । বাবা মা ডাব ধরে আছে আর ছেলে স্ট্র দিয়ে ডাবের জল টানছে ,চোখ হাতের নোট বইয়ের দিকে ।এমন দৃশ্য তখন অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল । সবার দেখাদেখি আমার বাপও দ্বিতীয় দিন গাছের একটা ডাব নিয়ে টিফিনের সময় হাজির । তা দেখে আমি যা শক পেয়েছিলাম তাতে ইংরাজী দ্বিতীয় পত্রে আমার ১০ নম্বর মত কমে গিয়েছিল প্রায় । বাড়িতে প্রত্যহিক ব্যবহারের জন্য ডাব গাছ থেকে পেরে দিত আমাদের বাড়িতে কাজ করার কমলদা। তা সেই কমলদারো বয়স হতে থাকল – এক সময় বলল, আর নারকেল গাছে উঠতে পারব না বুঝলি। আমিও ততদিনে নারকেল গাছে ওঠা ছেড়ে দিয়েছি – নিজের এবং পরের নারকেল গাছ সাফ করে, বেশ কিছু বার নারকেল গাছ থেকে পড়ার পর জীবিত থাকার আনন্দ নিয়ে এবং বাপের রামপ্যাঁদানির হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য। একবার আমার গ্রামের বাড়িতে ইংল্যান্ড থেকে আমার বন্ধুরা বেড়াতে আসে – বেশির ভাগই মেয়ে। তো সেই মেম মেয়ে দেখে কমলদা বলল আবার গাছে উঠে ওদের ডাব খাওয়াবো। তার উপর আইরীন প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে কমলদাকে দেওয়াতে, ফেলে আসা যৌবন চেগে ওঠে তার। লুঙ্গি পড়ে কমলদা গাছে উঠেছে আর নীচে থেকে মেম মেয়েরা ছবি নিচ্ছে, সে এক জটিল দৃশ্য! এখন গরমকালে ট্রেনে যেটা সহজলভ্য তা হল বিমলের দই লস্যি (সলিড দণ্ডাকৃতি), তরল দইলস্যি (বাড়িতে বানানো),ও কাঁচা আমের সরবত(বাড়িতে বানানো),অনেকে আবাব কায়দা করে আম পোড়ার শরবতও বিক্রী করতেন । এই সব মালে প্রফিট মার্জিন খুবই বেশী- রঙ বা কেমিক্যাল প্রয়োগের কথা বলতে পারব না ,তবে স্বাদে সেই- তিনটাকার প্ল্যাস্টিক প্যাকেটের শরবত , OH CALCUTTA রেস্টুরেন্টের ১৩০ টাকা গ্লাসের শরবতের কাছা কাছি ছিল । দণ্ডাকৃতি দই-লস্যি একটি বিবর্তিত প্রডাক্ট- এবং যথারীতি বাঙাল মস্তিষ্ক প্রসূত । বিমলের বাড়ি বৈঁচির কাছাকাছি- সকাল ৮ টার ডাউন লোকালে মাল এসে ষ্টেশনে ষ্টেশনে নেমে যায় একটা বড় বাক্স করে । সেখানে তাবৎ হকার জড়ো হয় মাল কেনার জন্যে-সাদা শোলার পেটিতে । ১০০ পিস মাল বিক্রী করতে পারলে ৩০ টাকা কমিশন । দিনের শেষে গলে যাওয়া অবিকৃত মাল কারখানায় পুনরগমন সলিড হাওয়ার জন্যে । এই ভাবেই চক্রাকারে ঘুরতে থাকে দই-লস্যি ।আপনি যে দই-লস্যিটি কিনলেন সেটা কতদিনের পুরনো আপনি জানতে পারবেন না। লাকি হলে আপনি একটা পুরনো মাল পেতেও পারেন কারন দই-লস্যি যত পুরনো হবে , তত গেঁজবে ও তার স্বাদ খুলবে ।দই-লস্যির ব্যাবসা রম রম করে চলে গরম কালে – আমরা লোকাল ছেলে হবার জন্যে মাঝে মাঝে দু একটা গ্যাঁজানো দই- লস্যি ফ্রী পেতাম , যদিও এই বস্তুটি আমাদের তেমন আকর্ষণ করত না তার উৎপত্তি ও গমন পথ সম্পর্কে সম্যক ধারনা থাকা হেতু । আরও দুটি খাদ্য বস্তু যা আমাদের জীবনে খুব ভালো ভাবে জড়িয়ে ছিল এবং ট্রেনের কামরায় দাপটের সাথে বিচরন করত তা হল খেঁজুর ও শনপাপড়ি । ‘খেজুরে আলাপ’ কথাটার সারমর্ম আমরা খুব গভীর ভাবেই ছোটবেলায় অনুভব করে ফেলেছিলাম । নিমো ষ্টেশন মাস্টার আমার নিজের জ্যাঠা তাই সেই সুত্রে রেল টিকিট কাউন্টারে অবাধ বিচরণ । আমাদের গ্রামে তখন বিদ্যুত ছিল না এবং ওই টিকিটঘরই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে টিউব লাইট জ্বলত। ঘরের আয়তন বেশ বড় – অ্যাসবেসটস চাল, এক কোণে টিকিট রাখা দেওয়াল খাপ ও তার পাশে পাঞ্চ মেশিন। বাকি পুরো ঘর ফাঁকা – সেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহৃত হত ট্রেনের হকারদের ঝাঁকা রাখার কাজে। আমার জ্যাঠা সেই জায়গা ভাড়া দিয়ে টু-পাইস কামাত কিনা বলেতে পারব না, তবে জ্যাঠার ছেলেদের দেদার ফলমূল খেতে দেখেছি। সেই সব ফলই ঝাঁকা থেকে আসত – লেবু, আপেল, বেদানা সহ প্রচলিত সব ফলই প্রায়। তা সেই ঘরে খেজুরের প্রসেসিংও চলত। যাঁরা দোকান থেকে বা ট্রেন থেকে কোয়া কোয়া ইণ্ডিভিজুয়াল খেজুর খান তাঁদের সম্ভবত কোন ধারণা নেই যে ওই খেজুর বাংলায় কিভাবে আবির্ভূত হত! খেজুরের স্ল্যাব বস্তায় (আমরা বলতাম ‘চিকচিকি’ বস্তা, পরে জানলাম উহার নাম ‘নাইলন’) করে – ইনফিনিট নাম্বার অফ খেজুর চাপসৃষ্ট অবস্থায় জড়াজড়ি করে এক আয়তকার স্ল্যাব তৈরী করত। সেই বস্তা হাজির হত টিকিটরুমে আমরা ছোটরা ভলেয়েন্টারী সার্ভিস দিয়ে খেজুর সেপারেট করতাম। আমাদের মজুরী ছিল পেটভর্তি খেজুর খেতে পারা। এটা চাইল্ড লেবার এর আওতায় পড়ে কিনা বলতে পারব না, তবে সেই কাজ আমরা আনন্দের সাথেই করতাম। খেজুরের চাঙরগুলিকে বালতির জলে ডোবাও ও আলাদা কর – প্লেন এ্যণ্ড সিম্পিল! সেই আলাদা করা খেজুর খোলা বিক্রি বা প্যাকেট করে বিক্রী হত মধ্যপ্রাচ্য বা মরুদেশীয় বিভিন্ন দেশের নামাঙ্কিত হয়ে। এটা খুবই স্ববাভিক ছিল যে একই বস্তার খেজুর চারটে আলাদা দেশের নামে চিহ্নিত করা হল – সেই ক্ষেত্রে আমাদের ভোগলিক জ্ঞান কাজে লাগানো হত। তবে মানুষের জেনারেল নলেজ সীমিত বলে অনেক সময় নামকরণের হ্যাপার মধ্যে না গিয়ে, ‘আরব’ দেশের খেজুর বলেও চালানো হত। তাহলে বাকী রইল শোনপাপড়ীর গল্প – এই এমন এক ব্যাবসা যা বিগত ৩০ বছর ধরে স্থিতাবস্থায় রয়েছে – যাকে বলে only change is constant টাইপ আর কি! শোনপাপড়ী তৈরী এক খুবই আকর্ষনীয় ব্যাপার। ইন ফ্যাক্ট তৈরী দেখতে খুবই ভালো লাগে – যে জিনিসটা সব খাবারের ক্ষেত্রে বলা যায় না। ধরুণ মাখা সন্দশ তৈরী – এটা খুবই ক্লান্তিকর একটা ব্যাপার। আমাদের নিমো স্টেশন সংলগ্ন ক্লাবের একটা বড় ঘর তেমনই এক শোনপাপড়ী কারিগরকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। ‘দিলীপের’ শোনপাপড়ী নাকি কি যেন একটা নাম ছিল। ভাই বলব কি, সে ব্যাবসা বিশাল ফুলে উঠেছিল। আমি খুবই সিওর যে যাঁরা এই লেখা পড়বেন তাঁদের কারো কারো পেটে ওই শোনপাপড়ী চালান গেছে। প্যাকেটস্থ হবার পর সেই শোনপাপড়ী দেখতে খুবই ভালো, সোনালী রঙের। কিন্তু যে পাত্রে বা পরিবেশে মাল তৈরী হত তা প্রায় কহতব্য নয়। ওই শোনপাপড়ী খেয়ে যাদের পেটে কিছু হয় নি, তাঁরা নির্দ্ধিধায় অন্য যে কোন খাবার না ধুয়েই মুখে চালান করতে পারেন। আমাদের ক্লাবে পিকনিক হলে আমরা ওই শোনপাপড়ী তৈরীর পাত্রগুলো অনেক সময় ব্যবহার করতাম। পাঁচ টাকা প্যাকেট ছিল তখন শোনপাপড়ীর । উত্থান ও পতন যেহেতু জাগতিক নিয়ম, তাই প্রাকৃতিক নিয়মেই একদিন সেই শোনপাপড়ী কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। মালিকের ছিল জুয়া দোষ – একদিন প্রায় সব খুইয়ে সে উধাও। তার কর্মচারীরাও কিছুদিন অপেক্ষা করে বিদায় নিল – আমাদের গ্রামের কিছু মেয়ে প্রেমিক হারা হল। সে এক জটিল সমাজতাত্ত্বিক গল্প – ডেটেলসে অনত্র। আমাদের লাভ বলতে হয়েছিল সেই ফেলে যাওয়া বাসনপত্র ও মাল বইবার একটা তিনচাকা রিস্কা ভ্যান, সেই ঘটনা পরের কোন এক পর্বে।

275

22

ঝিনুক

চাঁদটা তখন খুব কাছে

“মাদার জান‚ আমাকে যেতেই হবে| ভয় পেয়ে ঘরের কোনে লুকিয়ে বসে থাকলে আমরা কোনদিনই আর পৌঁছতে পারব না|" -- সালেমের এই প্রো-লগ দিয়ে বইটার শুরু| তারপর গল্প শুরু হয় ফারেবার জবানীতে| কাহিনীর প্রথমাংশ ফারেবার পরিপ্রেক্ষণে‚ পরের অংশ বেশিটাই সালেমের| ফারেবার দুর্ভাগ্যজনক জন্মের মুহূর্ত দিয়ে সূচনা‚ যেখানে ধাই নাড়ি কাটার পরমুহূর্তে ফারেবার জন্মদাত্রী শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন| জন্মলগ্নেই মাতৃহারা‚ সৎমায়ের সংসারে বড় হয়ে ওঠা ফারেবার ছোটবেলার স্মৃতি মোটেই মধুর নয়| কিন্তু ছেলেবেলার সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে চুপচাপ লড়াই করার অসীম অধ্য়বসায়ের পাঠ শেখা হয়ে গিয়েছিল ফারেবার| মাহমুদের সঙ্গে বিয়ের পর জীবনটা বদলে গেল আজন্ম দু:খিনী ফারেবা জানের| ভালোবাসায়‚ সম্মানে‚ যত্নে‚ আদরে ভরে দিলেন ফারেবাকে স্বামী মাহমুদ আর শাশুড়ি মা খানুম জেবা| পড়াশোনা শেষ করে স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি শুরু করলেন ফারেবা| ছেলে সালেম এল জীবনে‚ তার চার বছর পরে মেয়ে সামেরা| স্বামী সরকারী ইঞ্জিনিয়ার‚ তাঁর নিজের শিক্ষকতার চাকরি‚ কাবুলে নিজেদের বাড়ি‚ বাগান‚ উঠোন….. বিশাল বৈভবশালী না হলেও অভাব কিছু ছিল না জীবনে| আর ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ধন‚ সন্তোষ| বন্ধু-বান্ধব‚ আত্মীয়-পরিজনে পরিবৃত নিশ্চিন্ত জীবন| কিন্তু আফগানিস্থানের আকাশে ঘিরে এল যুদ্ধের কালো ছায়া‚ বাতাসে বারুদের গন্ধ‚ রক্তে পিছল পাড়ার অলিগলি| আত্মীয়-স্বজন‚ প্রতিবেশী‚ চেনা-অচেনা সকলেই পালাতে শুরু করল দেশ ছেড়ে| যারা রয়ে গেল‚ তাদের অনেকের মতই মাহমুদও ভেবেছিলেন একদিন এই যুদ্ধ শেষ হবে‚ আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে| কিন্তু আদতে হল উল্টো| তালিবান শাসনের অন্ধকার যুগ শুরু হয়ে গেল| ফারেবাকে স্কুলের চাকরি ছাড়তে হল‚ মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল‚ বোরখার ভারি আড়াল ছাড়া মাথায় শুধু স্কার্ফ জড়িয়ে বাইরে বেরোন বন্ধ হয়ে গেল| আশেপাশের প্রতিবেশী বাচ্চা মেয়েদের ডেকে এনে ঘরে বসে অ‚ আ‚ ক‚ খ শেখাচ্ছিলেন আজন্ম শিক্ষার অনুরাগিণী ফারেবা‚ কিন্তু তালিবান আইনের প্রহরীরা এসে ভাঙচুর করে সমঝে দিয়ে গেল‚ ভয়ে প্রতিবেশীরা আর পাঠায় না মেয়েদের‚ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল পড়াশোনা| মাহমুদ ঠিক করলেন আর নয়‚ এবার যাবার সময় হয়েছে| নিজেদের না হোক ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের জন্যই কাবুল ছাড়তে হবে| গন্তব্য ইওরোপ‚ লণ্ডন| কিন্তু যাব বললেই যেতে দিচ্ছে কে? তাই গোপনে জাল নথিপত্র খরিদের ব্যবস্থা করতে হল মাহমুদকে‚ স্বামীস্ত্রী আর ছেলেমেয়ের জন্য জাল ইওরোপিয়ান পাসপোর্ট| কোনক্রমে একবার লণ্ডনে গিয়ে পৌঁছতে পারলে অ্যাসাইলামের আরজি জানাবেন রানীর চরণে| নীতি আঁকড়ে বসে থাকলে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত অন্ধকার| তালিবানি অনুশাসন যখন জীবনের টুঁটি চিপে ধরে‚ তখন অতি বড় নীতিবাগীশেরও নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে| তবে এই সব বেআইনী কাগজপত্র তো আর রাতারাতি পাওয়া যায় না‚ সময় লাগে‚ আর মূল্যের কথা না হয় বাদই থাক| প্রত্যেকটা দিন কাটে উৎকন্ঠায়‚ গাট্টাগোট্টা পুরুষ অভিভাবকের সাথে ছাড়া মেয়েদের বাইরে বেরোন বিলকুল মানা‚ তাই তেরো বছরের ছেলেকে নুন কিনতে দোকানে পাঠিয়ে অপলকে পথের পানে চেয়ে বসে থাকতে হয় ফারেবাকে| এর মধ্যেই আবার সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লেন ফারেবা জান| তবু তৈরী হতে থাকেন মাহমুদ আর ফারেবা দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য| দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল তখনই| তালিবান ষণ্ডাগুণ্ডারা এসে মাহমুদকে ধরে নিয়ে চলে গেল‚ তালিবান ঈশ্বরই একমাত্র জানেন কি তাঁর অপরাধ| “বাচ্চাদের খেয়াল রেখো‚ জানম"…… চলে যেতে যেতে মাহমুদের শেষ কথা ফারেবার উদ্দেশ্যে| আশায় আশায় পথ চেয়ে থাকে মা আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুটি‚ কিন্তু বাবা আর ফেরে না| খাতার পিছনে দাগ দিয়ে দিয়ে দিনের হিসেব রাখে সালেম বাবার চলে যাওয়ার| প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে বহু সূর্য ডুবল রক্তপাতে অকরুণ আফগান পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়‚ মাহমুদ আর ফিরলেন না| খবর এল তাঁর নৃশংস হত্যার| জানতেন ফারেবা‚ এই খবরই আসবে একদিন‚ অস্থিতে মজ্জায় অনুভব করতে পারছিলেন তিনি‚ কিন্তু তবু| যতক্ষণ না বলা থাকে‚ ততক্ষণ প্রতীক্ষাটা বেঁচে থাকে| সালেম ছুটে এসে জানতে চায়‚ “বাবা আর ফিরবে না?” সেই প্রশ্নের নিরুক্ত উত্তরের সামনে দাঁড়িয়ে এক লহমায় বাচ্চা ছেলের খোলস ছেড়ে বড় হয়ে যায় সালেম‚ নয় বছরের সামেরার মুখের বুলি হারিয়ে যায়| এক ছাদের নীচে তিনজন মানুষ‚ দুরন্ত শোকের সেই নিষ্ঠুর দিনেও শোকের প্রকাশ সামলে রাখে‚ ফারেবা শক্ত থাকতে চেষ্টা করেন ছেলেমেয়ের জন্য‚ সালেম মায়ের মুখ চেয়ে‚ সামেরা পাথর হয়ে| নিষ্ফল আক্রোশে গাছের গায়ে লাথি মাড়তে মাড়তে পায়ের পাতা ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে সালেম‚ নি:শব্দ ঘরে বাবার জিনিষপত্র ঘাঁটাঘাটি করে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে‚ বাবার ঘড়িটা নাড়াচাড়া করতে করতে হাতে পরে নেয়‚ বাবার শার্টে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নেয়‚ আড়াল থেকে দেখেও না দেখার ভান করেন ফারেবা| অনেক চেষ্টা করেন ফারেবা সামেরার মুখ থেকে একটাও অন্তত শব্দ বার করতে‚ কিন্তু নিশব্দে ঘাড় নেড়ে সায় দেওয়া বা না দেওয়া ছাড়া আর কোন কথা তার কাছ থেকে আদায় করতে পারেন না তিনি| সামান্য সঞ্চয় যা ছিল প্রায় শেষের মুখে| বাজার ঘাটে খাবার দাবারও অমিল‚ দুর্মূল্য‚ বিপদ‚ শুধু বিপদ চতুর্দিক ঘিরে| মাহমুদশূণ্য ঘর আঁকড়ে পড়ে থাকার কোন কারণও নেই| ছোট ছেলে আজিজের জম্মের তিনমাস পরে ফারেবা প্রস্তুত হলেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে কাবুল ছাড়ার জন্য| মাহমুদের অসম্পূর্ণ কাজটা তাঁকেই করতে হবে| মাহমুদ যে বাচ্চাদের সব দায় তাঁর হাতে সঁপে দিয়ে গেছেন সেই শেষদিনে‚ পিতৃহীন সন্তানদের ভালোমন্দের সব ভার এখন তাঁর একার| শান্তি আর সুরক্ষার জীবন ওদের ফিরিয়ে দিতেই হবে‚ যত বিপদই থাকুক সে পথে| মাহমুদের ব্যবস্থা করা সেই সব জাল পাসপোর্ট‚ টাকাপয়সা সব গুছিয়ে নিলেন| নিলেন যেটুকু খাবারদাবার ঘরে ছিল‚ তাও| আর নিলেন ছবির অ্যালবাম| বিয়ের ছবিটাতে মাহমুদ সোজা তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার দিকে‚ কিন্তু ফারেবার নিজের দৃষ্টি মাটির দিকে| তাঁর সব ভয়‚ সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মাহমুদ ভালোবাসা দিয়ে জয় করে নিয়েছিলেন‚ তাঁর সব অপ্রাপ্তি‚ অপূর্ণতা মাহমুদ ভরে দিয়েছিলেন পরম প্রেমে| মাহমুদ‚ তাঁর 'হামসার'….. প্রতিবেশী দম্পতি অনেক সাহায্য করলেন‚ চুপচাপ রাতের অন্ধকারে আফগান সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে পৌঁছে দেবার সব আয়োজন করে দিলেন তাঁরা| তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে আজিজকে বোরখার নীচে বুকে বেঁধে‚ সালেম আর সামেরার হাত ধরে বাসে উঠে বসলেন ফারেবা| বাস থেকে ভ্যান‚ তারপর তিনজনে হাত ধরাধরি করে রাতের অধকারে মাইলের পর মাইল দুরূহ পাহাড়ী পথ পেরিয়ে ইরানে| ইরান থেকে টার্কী‚ বোরখা খুলে নি:শ্বাস নিলেন ফারেবা| টার্কীতে এক সম্পূর্ণ অচেনা অজানা সহৃদয় সুধীজনের ঘরে মিলে গেল সাময়িক আশ্রয়| এইখান থেকে শুরু হয়ে গেল সালেমের পাল্টে যাওয়া জীবনের গল্প‚ রাতারাতি মায়ের কোলের সন্তান থেকে পরিবারের অভিভাবকের ভূমিকায় বদলে যাওয়া সালেমের গল্প‚ স্কুলের বইখাতা‚ মাঠের ফুটবল ফেলে যে সালেম স্থানীয় কৃষকের জমিতে উদয়াস্ত মজুর খেটে ক্ষুদকুড়ো রোজগার করবে মায়ের জন্য‚ ছোট ভাইবোনের জন্য| আজিজের স্বাস্থ্যের অবস্থা প্রথম থেকেই খুব একটা ভালো ছিল না‚ টার্কীতে এসে আরো অবনতি হল‚ বিপদ কখনো একা আসে না| ডাক্তার দেখানো হল‚ বিজাতীয় ভাষার দুস্তর অন্তরায় পেরিয়ে যেটুকু বোঝা গেল‚ আজিজকে শহরে বড় ডাক্তার দেখানো দরকার‚ তার হার্টের অবস্থা ভালো নয়| ছোট্ট শহরের ছোট ডাক্তারবাবু কোন পয়সা নিলেন না‚ প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন| আজিজ আপাতত সুস্থ হল| পরের স্টপ অ্যাথেন্স‚ গ্রীস| এইবার সেই সব বহুমূল্য জাল পাসপোর্ট বেরোল ব্যাগ থেকে ফেরি পার হতে| আফগান মরু থেকে আসা মা‚ ছেলে‚ মেয়ের জীবনে প্রথম সমুদ্র দর্শন| প্রথম দেখার বিস্ময়‚ আনন্দের দ্যুতি মিলে মিশে যেতে থাকল অজানিত ভবিষ্যতের অন্ধকার আশঙ্কার সাথে| প্রতি মুহূর্তে ভয় কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ার‚ পুলিশ দেখলেই এড়িয়ে যাওয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা| আশা নিরাশায় দুলতে দুলতেই নিরাপদে পৌঁছে গেল সালেম সপরিবারে অ্যাথেন্সে| এ পর্যন্ত যাহোক তবু মন্দের ভালো কেটে গেল যাত্রাপথ ওয়াজিরি পরিবারের| তবে পথ এখনও অনেক বাকি গন্তব্যে পৌঁছতে‚ গ্রীস থেকে ট্রেনে ফ্র্যান্স হয়ে লণ্ডন| কিন্তু সমস্যার শুরু হল এইখান থেকেই| সামান্য সঞ্চয় শেষের মুখে| ভাঙাচোরা হোটেলের ঘরের ভাড়া‚ চারজনের খাবারের ব্যবস্থা‚ প্রত্যেকটা ইউরো যেন সোনার থেকেও দামী বলে মনে হতে থাকে সালেমের| সে চুরি করতে শিখে যায়‚ মা-ভাইবোনের মুখে খাবার তুলে দিতে| অজস্র ঘটনা‚ দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে দিন পেরিয়ে যেতে থাকে| আলাপ হয় রোকসানার সাথে| তারই সাহায্যে ট্রেনের টিকেট কেটে মায়ের হাতে তুলে দেয় সালেম| আর একটা দিন‚ ভুয়ো বেলজিয়ান পাসপোর্ট আর ট্রেনের টিকেট --সব রেডি| একটা দিন পরেই তারা রওনা দেবে| একের পর এক সীমান্ত পেরিয়ে‚ অজানা সব ভাষার দুর্বোধ্য বাধা পেরিয়ে ঠিক পৌঁছে যাবে লণ্ডনে--- স্বাধীনতায়‚ স্বস্তিতে‚ শিক্ষায়| এত পরিশ্রম‚ এত বিপদের ঝুঁকি শেষ অবধি সার্থক হবে| কিন্তু হাত একেবারেই খালি হয়ে গেছে| শেষ অবলম্বনটুকু বার করে দেন ফারেবা‚ মায়ের হাতের দুটো বালা| বিয়ের দিন বাবা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন অনেক সাবধানে সৎমায়ের থেকে লুকিয়ে রাখা মায়ের শেষ এবং একমাত্র চিহ্ন সেই কঙ্কন জোড়া| তারপর থেকে কোনদিন ফারেবা হাতছাড়া করেন নি বালাজোড়া| মায়ের স্পর্শ আর মমতা হয়ে রিনিঠিনি করত ও দুটো তাঁর হাতে| কিন্তু ছেলেমেয়ের মঙ্গলের জন্য তিনি সব দিতে পারেন‚ বালাজোড়া তুলে দিলেন তিনি শ্রান্ত‚ ক্লান্ত সালেমের হাতে| মায়ের মন‚ কেন যেন হঠাৎ কু ডাকল| তিনি সালেমকে বললেন‚ "বাচেম‚ আজ থাক| কাল স্টেশনে যাবার পথেই নয় সবাই মিলে একসাথে যাব বন্ধকী দোকানে|" কিন্তু লায়েক সালেম জান‚ হঠাৎ করে বড় হয়ে যেতে বাধ্য হওয়া সালেম জান‚ মায়ের অভিভাবক হয়ে যাওয়া সালেম জান শুনতে চাইল না| মাকে বললো‚ "মাদার জান‚ আমাকে যেতেই হবে| ভয় পেয়ে ঘরের কোনে লুকিয়ে বসে থাকলে আমরা কোনদিনই আর পৌঁছতে পারব না লণ্ডনে|" সেই বালা বন্ধক দিয়ে দোকান থেকে বেরোতেই পুলিশ ধরলো সালেমকে সেদিন‚ হোটেলে আর ফেরা হল না তার পয়ের মোজায় লুকানো টাকা নিয়ে| তারপর সে এক অকথ্য অত্যাচারের কাহিনী‚ গ্রীস পুলিশ তাকে ফেরি করে পাঠিয়ে দিল আবার টার্কীতে| সেখান থেকে অনেক ঘাটের জল খেয়ে সালেম যখন ফের এসে অ্যাথেন্সে নামবে ফারেবা তখন সামেরা আর আজিজকে নিয়ে লণ্ডনে পৌঁছে গেছেন‚ অ্যাসাইলামের আরজি জমা করে দিয়েছেন| লণ্ডনে পৌঁছে আজিজের হার্টের অপারেশনও হয়ে গেছে| সালেম একা অ্যাথেন্সে‚ না আছে কোন কাগজপত্র‚ জাল বা সত্যি‚ কোনটাই নেই| এক রেফিউজি ক্যাম্প থেকে আর এক ক্যাম্প‚ পুলিশের তাড়া খেতে খেতে‚ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অ্যাথেন্স থেকে পালিয়ে রোম‚ রোম থেকে ফ্র্যান্স| অ্যাথেন্স ছড়ার আগে সেই বন্ধকী দোকান থেকে টাকা ফেরত দিয়ে মায়ের বালাজোড়া সে ছাড়িয়ে এনেছে| শত কষ্টতেও মায়ের বালা বাঁধা দেওয়া টাকার একটি নয়াও সে নিজের জন্য খরচ করে নি| চ্যানেলের ওপারে বসে বসে লণ্ডনের আলো দেখে আর মনে মনে মাকে ডাকে সালেম‚ মায়ের কোলে মুখ গুঁজে দেয়| ফারেবা জানও কান খাড়া করে থাকেন তার বাচেমের পথ চেয়ে‚ মনে মনে স্পর্শ করেন এলোমেলো চুলগুলো| কিন্তু ফ্র্যান্সের ক্যালেই থেকে লণ্ডনে মায়ের কাছে সালেম কি পৌঁছতে পারবে? সেটুকু আর বলব না| নিজেরাই পড়ে নিন‚ খুঁজতে গিয়ে লিঙ্কও পেয়ে গেলাম…… http://1.droppdf.com/files/OHHUW/when-the-moon-is-low-nadia-hashimi.pdf একটা জীবন এক নিমেষে কিভাবে ছারখার হয়ে যায়‚ মুহূর্তের মধ্যে সব কিভাবে বদলে যেতে পারে নিশ্চয়তা থেকে চূড়ান্ত অনিশ্চিতে‚ ফারেবা জানের কাহিনী পড়তে পড়তে নতুন করে উপলব্ধি করলাম| কত সামান্য খুঁটিনাটি নিয়ে আমরা রোজ কত অভিযোগ‚ অনুযোগই না করি! অথচ কত ফারেবা জান‚ কত সালেম জান রোজ এইভাবে বাস্তুহারা হয়ে লড়াই করতে বাধ্য হয়| সব লড়াই কি জেতার লড়াই? জেতার থেকে হারার সংখ্যাই বোধ হয় বেশি| বইটা পড়তে শুরু করে আর থামতে পারি নি| প্রত্যেকটা পদক্ষেপে বাচ্চাদের কষ্ট দেখে ফারেবা জান নিজেকে প্রশ্ন করছেন‚ "ভুল করলাম না তো?" মাহমুদের ওপর রাগ করছেন‚ এই সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি কেন করলেন? বুক ভেঙে যাচ্ছিল আমার| সালেমকে ফেলেই লণ্ডনে চলে গেলেন ফারেবা‚ পারলেন? যেতে হল যে| আজিজের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল| তাকে বাঁচাতে হলে আর অন্য কোন পথ খোলা ছিল না ফারেবার সামনে সেদিন| ডান আর বাঁ হাতের মধ্যে একটা দিয়ে দিতে বললে মনস্থির করা বোধহয় ততটা শক্ত হবে না‚ যতটা কঠিন পরিস্থিতি হয় যখন কোন মাকে তাঁর দুই সন্তানের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হয়| ফারেবার দ্বন্দ্ব যেন আমার নিজের বলে মনে হচ্ছিল| একটা সম্ভ্রান্ত‚ স্বচ্ছল ঘরের বাচ্চা ছেলে যে কিভাবে পরিস্থিতির চাপে পড়ে চুরি করতে বাধ্য হয়‚ সেই হৃদয়বিদারক বর্ণনা পড়লে অতি বড় পাষণ্ডেরও চোখে জল আসবে| সব থেকে বড় কথা‚ একটা তেরো বছরের বাচ্চাকে যখন সাবালকের দায়িত্ব নিতে হয় আর মাকে তাই দেখতে হয়…..

213

10

মুনিয়া

Tell me something good

আজকাল ঘন ঘন সাক্ষী থাকি মানুষের নিত্যনতুন দুর্দশার! প্রত্যক্ষ করি, কখনো মানুষ নিজেদের বিনাশ মন্ত্র জপছে তো কখনো প্রকৃতি সে ভার তুলে নিচ্ছে নিজের হাতে। লাস ভেগাসের যন্ত্রণাময় অধ্যায় ধূসর হওয়ার আগেই উতল হাওয়ার সহযোগীতায় জংলি আগুন পুড়িয়ে খাক করে দিল নর্দান ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন কাউন্টি নাপা ভ্যালি, সোনামা কাউন্টি এবং স্যান্টা রোজার শত শত একর বিস্তৃত জায়গা-জমি, ক্ষেত, বাসস্থান। প্রায় পাঁচ হাজার সাতশো কাঠামো নিমেষে ছাইয়ে পরিণত হল, নব্বই হাজার সর্বহারা মানুষ গৃহচ্যুত হল, ছত্তিরিশ জন মানুষ মৃত। তাঁদের মধ্যে যেমন দম্পতি চার্লস এবং সারা আছেন তেমন চোদ্দ বছরের ফুটফুটে কাই ও আছে। একশো মাইল দূরে বসেও চোখে দেখা যায়না মানুষের এই কষ্ট, ক্ষয়-ক্ষতি। গত তিনদিন হাওয়ার টানে আমাদের বাতাসেও পোড়া গন্ধ। নাক ঢেকে, দরজা-জানালা বন্ধ রেখে দৈনন্দিন জীবনধারণ চলছে। বাইরের কাজ-কর্ম, খেলাধূলা সব বন্ধ। শ্বাস কষ্ট, বুকজ্বালা, এই একশ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে আমাদের কাবু করেছে। কিছুতেই ভাবতে পারছিনা তাঁদের জীবনসংগ্রামের কথা যাঁদের চারিপাশ ঘিরে আছে ধ্বংসস্তুপ আর ঘন কালো বিষাক্ত বাতাস। তবু প্রতিজ্ঞা, দু:খ বেদনাকে কিছুতেই মন মন্দিরে চিরস্থায়ী আসন দেওয়া চলবে না। জীবন অমূল্য। শোক, বেদনা, তিক্ততা, হতাশাকে জীবনের সিংহভাগ ছেড়ে দিলে কাক-পক্ষী জীবনইতো ভালো ছিল! এক বিচক্ষণ ব্যক্তি একবার এইপাতাতে লিখেছিলেন, ভগবান পারে না, মানুষ বলেই পারে, দু:খ-বেদনাকে ঠেলে উঠে বসতে, আবার হাসতে, আবার গাইতে! তাই আজকে আমরা উৎযাপন করব চার্লস আর সারার দীর্ঘদিনের দাম্পত্যের স্মৃতি, আমরা গর্ববোধ করব কেসি আর ডেভরির জন্য, যাঁদের অমানুষিক চেষ্টা প্রবল প্রতাপশালী প্রকৃতিকে পিছু হটিয়েছে। গত রবিবার রাত্রে যতবার তাঁদের চোখ যাচ্ছিল অনতিদূরের ওই পাহাড়ের দিকে, মনে হচ্ছিল আগুন চোখের এক রাক্ষস যেন তাঁদের গিলতে আসছে। খবর অনেক আগেই পৌঁছে গেছে; তাঁদের লোকালয় গ্রাস করতে লেলিহান অগ্নিশিখা ক্রমশ: গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে পাহাড় বেয়ে। সারা পাড়া খালি করার নির্দেশ জারি হয়েছিল অনেক আগেই। কেসি আর ডেভরিও ব্যস্ত হাতে তাঁদের দুই গাড়ি ভর্তি করে জিনিস ভরছিলেন প্রতিবেশিদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে। তাঁদের দুই কুকুর এবং দুই বেড়াল অনেক আগেই গাড়িতে বসে তাঁদের অপেক্ষায়। দরকারী সব জিনিসে যখন ভর্তি হল গাড়ি, তাঁরাও রওনা দিতেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু শেষ অব্দি পেরে উঠলেন না। ষোলো বছরের দাম্পত্যের স্মৃতিবিজরিত বাড়িকে আহুতি দেবার আগে তাঁদের মনে হল শেষ চেষ্টা করা দরকার। তাই বাগানের জলের পাইপ নিয়ে এই দম্পতি সারা রাত এক অসম যুদ্ধে মাতলেন। তাঁদের চোখের সামনে চারিপাশের প্রতিবেশিদের বাড়ি একের পর এক ভস্মীভূত হয়ে গেল কিন্তু এক মুহূর্তও নিজেদের লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার উপায় ছিলনা তাঁদের। অবশেষে একজন ফায়ার ফাইটারের সাথে মিলিত নিরলস চেষ্টায় প্রকৃতি হার মানতে বাধ্য হল। জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া শূন্য পাড়ার একমাত্র অটুট বাড়িতে বসে যুদ্ধ জয়ী ক্লান্ত, বিমর্ষ দম্পতির মনে এখন প্রশ্ন, “ You see everything, and you question: why were we saved?” তাঁদের প্রশ্নের উত্তর এখনো কারুর কাছে নেই। তবে আমার মনের একান্ত বিশ্বাস, একরাতের সংগ্রামের বিনিময়ে নিজেদের অন্তর্হিত যে সুবিশাল শক্তির সাথে তাঁরা পরিচিত হয়েছেন, সে শক্তি নিশ্চিতভাবে মানবজাতির মহৎ কাছে লাগবে। ************* চার্লস আর সারার মৃত্যুসংবাদ যখন শুনছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না দু:খিত হব নাকি আশ্বস্ত! কোনোকিছুই আলাদা করতে পারেনি তাঁদের, না যুদ্ধ, না আগুন। চালর্স ছিলেন দ্বিতীয় World War এর এক যোদ্ধা। কর্মসূত্রে ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকাতে জীবনের প্রথমভাগ কাটিয়ে নাপা ভ্যালিতে এসে বসতি গড়েন। সারা সারাজীবনই গৃহবধূ। পাঁচটি বাচ্চার রক্ষণাবক্ষণ আর অবসর সময়ে ব্রিজ খেলা ছিল তাঁর নেশা। দুজনের দেখা হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়ে। তারপর ১৯৪২ এ বিয়ে। সেই থেকে ১০০ বছরের চার্লস এবং ৯৮ বছরের সারার একসাথে পথ চলা। এই সদ্য তাঁরা তাঁদের ৭৫ তম বিবাহবার্ষিকী পালন করেছিলেন। ওঁদের ছেলে সংবাদদাতাকে বলছিলেন, অনেক সময়ই আমরা আলোচনা করতাম, মৃত্যু এসে যখন দুজনকে পৃথক করে দেবে, একে অপরকে ছাড়া কেমন করে এঁরা বাকী জীবন কাটাবেন! বিশেষ করে আমাদের বাবা, আমার মাকে চক্ষে হারাতেন! চার্লসের মৃত্যুও হয়েছে স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে। আগুন লেগেছে টের পেয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সারার ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন, পৌঁছতে পারেননি। স্ত্রীয়ের কাছে পৌঁছতে পারলেও তাঁকে যে উদ্ধার করতে পারতেন সেরকম সম্ভাবনা একেবারেই ছিলনা। খবরটা শোনার পর থেকে যখনই কল্পনা করি। চোখের সামনে দেখতে পাই একশ বছর বয়সী এক সুপারম্যানকে, বিপদের আভাস পেয়ে যিনি প্রাণ বাঁচাতে দরজার দিকে নয়, আগুনের দিকে ছুটে চলেছেন প্রিয়াকে বাঁচাতে। <img class="emojione" alt="🙏" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F64F.png?v=1.2.4"/> &gt;

980

97

মনোজ ভট্টাচার্য

দেশ মনে কী !

হঠাৎ দেখছি – দেশ কী ! বা - মানে কি ইত্যাদি নিয়ে কথা উঠেছে ! মাঝে মাঝেই দেখেছি এই কথাগুলো ওঠে ! কেন ওঠে ? আসলে দেশের জন্যে ভাবাবেগ – এই প্রসঙ্গটা মনে করিয়ে দেয় ! – দেশ কি ? এই প্রশ্নটার উত্তরে আমি বলবো – দেশ থেকে বেশ কিছুদিন বাইরে না থাকলে বোধগম্য হবে না ! দেশের বা বিদেশের নানারকম সুবিধে অসুবিধে থাকেই ! – সুযোগ সুবিধে পেলেই দেশটা ভাল – আর অসুবিধে হলে দেশটা খারাপ হয়ে যায় না ! – এখানে কেউ একজন লিখেছেন – কুড়ি বছর দেশের বাইরে আছেন – দেশে নাকি আসেন নি ! – এটা সত্যিই কষ্টকর ! আমি বিদেশে ছিলাম ৩২ বছর ! ওখানকার সব রকম সুবিধে অসুবিধে ভোগ করেছি ! তার মানে সেই দেশটা আমার হতে পারে না ! – আমার দেশ আমারই ! – আমার দেশটা খারাপ – কত খারাপ ইত্যাদি – আমরা জন্ম থেকেই জানি ! আমরা কিছু স্বর্গে বাস করতাম না ! যে ভাবে – অন্য দেশটাও যে স্বর্গ – সেই ভাবনাটাই সঠিক নয়! আমরা কি জানতাম না – ব্যাঙ্কে বা সরকারি অফিশে গেলে কোন কাজ একদিনে হয় না ! সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে হলে হাজার হাজার লোকের পেছনে দাঁড়িয়ে কতটা সময় লাগে ! রাস্তা সব জায়গায় কতটা খোঁড়া ! – তাই এসব যুক্তিগুলো বড় ছেঁদো লাগে ! প্যান কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, গ্যাস কার্ড - ইত্যাদি ইত্যাদি সব ঝামেলার ! আমি কিছু রাজারহাটে থাকি না – থাকি মধ্যবিত্ত সিঁথি অঞ্চলে ! – অনেকেই বলেছিল এক বছরের মধ্যে পালিয়ে যাবো ! – আবার এ-কথাও ঠিক নয় – বিদেশের সরকার ইচ্ছে করলেই ক্যাঁৎ করে লাথি মেরে দেশ থেকে বার করে দেবে ! – এসব গসিপ – রাত্রে ডিনারের পর হাতে গেলাস নিয়ে অনেকে করে থাকে ! শেষ করি একটা অনুরোধ করে ! জীবিকার ধান্দায় যাদের বিশ বছর ত্রিশ বছর চল্লিশ বছর দেশের বাইরে থাকতে হচ্ছে – তাদেরও কিছু ভাবাবেগ আছে ! আমাদের এই আলোচনার মাধমে অনেক শব্দ ব্যবহার হচ্ছে – যেগুলো খুব একটা শোভন নয় ! – তাই অনুগ্রহ ওসব না ব্যবহার করলে – আমাদের ও সবার ভাবাবেগকেই সন্মান জানানো হবে ! মনোজ

224

7

মনোজ ভট্টাচার্য

অসুর জাতি আজও রয়েছি !

অসুর জাতি আজও রয়েছি – সুষমা অসুর ! (দ্বিতীয় অংশ ) কিছু চমকপ্রদ উদ্ধৃতি দিচ্ছি ! পাণ্ডবেরা ময়দানবকে দিয়ে এমন বাড়ি তৈরি করেছিলেন, যার মেঝের ঝাঁ চকচকে রূপ দেখে – জলে পা দিচ্ছেন মনে করে দুর্যোধন কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন ! – শরৎচন্দ্র এই কাল্পনিক ঘটনার বাস্তব অস্তিত্ব পেয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের আজিমগড়ে । আজিমগড় থেকে ২৪ মাইল দূরে ঘাসিতে মাটি খুঁড়ে এমনই এক বিশাল মাটির দুর্গের সন্ধান পান । স্থানীয়রা এই দুর্গ অসুরদের বলে বিশ্বাস করে । এখানে খনন করে দেখা যায়, এককালে এই অঞ্চলের সঙ্গে কুনওয়ার ও মুঙ্গি নদীর সংযোগ ছিল । তাই আজও ‘অসুরীন’ রয়েছে । এবারে অসুর জাতির কথা । যুগ যুগ ধরে ছোটনাগপুরের পালামৌ জেলায় পাহাড়ি উপত্যকায় – বর্তমানে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের আমরা – অসুররা রয়েছি । আমাদের শাখা মুলত তিনটি – বীর অসুর, বীরজিয়া আর আগারিয়া । বিহারে রয়েছে বিরজীয়া গোষ্ঠী তফসিলি উপজাতি হিসেবে । আগারিয়া গোষ্ঠী আছে মধ্য প্রদেশে । আমরা কিন্তু বীর অসুরগোষ্ঠীর মানুষ ! রাচী আর পালামৌ জেলা জুড়ে ১০,৭১২ জন রয়েছি । আর পশ্চিমবঙ্গের পুরুল্যা জেলায় কাশীপুর থানার ঝালাগউরা ও উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জে আমাদের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলেও পরবর্তী কালে আমরা মুল স্রোতে মিশতে পারিনি বলে শিক্ষার হার মাত্র ১০‘৬৬%! অসুর জাতির আদি ইতিহাস যেমন ‘অসুর কাহিনিতে’ আছে, তেমন সারা বিশ্বে কাছে তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনজন বাঙ্গালীর অবদান আছে । রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ডক্টর অনন্ত প্রসাদ ব্যানার্জী-শাস্ত্রী ও শরৎচন্দ্র রায় । ভারতের আদি ইতিহাস লুকিয়ে আছে মুলত হরপ্পা সভ্যতার মধ্যে । বৈদিক সভ্যতা এসেছে তার অনেক পরে । ১৯২৪ সালে স্যার জন মার্শাল ‘ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ’ পত্রিকায় এই হরপ্পা সভ্যতার সচিত্র বিবরন বের করেন । হিন্দু ধর্মের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আজকে হিন্দুত্ব বলতে যা বোঝায় – বেদ উপনিষদের যুগে কিন্তু ভিন্নতর ছিল । কয়েক শতাব্দী ধরে নানান পরিবর্তনের মাধ্যমে হিন্দুত্বের উদ্ভব ! পূর্বে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা, যজ্ঞ, বলিদান ও স্তোত্রপানের ছন্দ আর ধ্বনিকেই প্রাধান্য দিত নিশ্চিত ফলাদায়ি মনে করে ! – পরবর্তী কালে অন্তর্মুখী, কল্পনাপ্রিয় চিন্তা – মানুষের চেহারায় মূর্তি, রহস্যময়তা, ঐশ্বরিক শক্তি ইত্যাদিকে বিশেষ গুরুত্ব পেল । ইন্দ্র, বরুন, মরুত ও অগ্নির বদলে এসে গেল মানুষিক চেহারার দেব-দেবী ! মন্দির । ভক্তির প্রাবল্যে দেশ ভাসতে লাগল । আর ঋক বেদের স্রস্টা অসুর কিল্লির (কুলের) বাইগারা (দৈবশক্তির অধীশ্বর) সংমিশ্রণের ফলে কুলপুরোহিত আখ্যায়িত হল ! জয় সাহার প্রতিবেদন (এই সময় ) - সারা দেশ যখন দুর্গোৎসবের আনন্দে মত্ত – ঠিক সেই সময়েই অন্ধকারের অবহেলিত এক আদিম জাতি – সারা দেবীপক্ষ নিজেদের বাসায় অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বসে শোক প্রকাশ করে ! কারন তারা মনে করে – মহিষাসুরের মৃত্যু আসলে একটা জঘন্য চক্রান্ত ! বিদেশ থেকে আগত তথাকথিত আর্যরা ভারত দখলের সময়ে প্রাচীন মগধ, বঙ্গ অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে অসুর রাজাদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না ! মহিষাসুরের মত এক পরাক্রমশালী রাজাকে ছল করে এক সুন্দরী রমণীকে বিয়ে করিয়ে – বিয়ের নবম রাতে তাকে হত্যা করে ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পরে দেবী দুর্গার বিজয় কাহিনী বলে প্রচার করে । কালক্রমে সেটাই একটা আরজদের উৎসবে পরিনত হয় ! – যদিও এই কাহিনীর কোন প্রামান্য পাঠ্য হিসেবে পাওয়া যায় না – পুরো ঘটনাটাই আদেবাসীদের নিজস্ব লোকগাথা ! পুরানবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর বক্তব্য ‘মহিষাসুর বোধ আসলে শুভ ও অশুভের মধ্যে লড়াই ।‘ - নৃতত্ত্ববিদ পশুপতি মাহাতো বক্তব্য –‘ বেদ পুরানে অসুরের ইতিহাস না থাকাটাই স্বাভাবিক। ব্রাহ্মন্যবাদীদের এই একমুখীতার বিরুদ্ধে দলিত মানুষেরা বহুদিন কোন কথা বলতে পারেন নি ‘! দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় অনেকদিন ধরেই আদিবাসী মানুষেরা অসুর উৎসব বা অসুর স্মরণসভা পালন করে আসছে ! ক্রমশ আরও আরও মানুষ এই স্মরনসভায় সামিল হচ্ছে ! এ বছর রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রায় সাড়ে আটশো থেকে ন-শো স্মরনসভা পালিত হবে ! এগুলো ফল করার জন্যে কো- অরডিনেশান কমিটি গড়ে তোলা হয়েছে ! ঠিক হয়েছে দলিত-প্রান্তিক, আদিবাসী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের সামিল করা হবে ! এই স্মরনসভাগুলোতে মুলত যুদ্ধবিরোধী শোভাযাত্রা, আদিবাসী নৃত্য, অসুর ও দুর্গাপুজা নিয়ে আলোচনা করা হবে ! সুমনা চক্রবর্তী ও সঞ্জিত গোস্বামির প্রতিবেদন (এই সময় ) মহিষাসুরকে অন্যায়ভাবে খুন করা হয়েছে – এই বিশ্বাসে অসুরকুলের নানা উপজাতি দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে ঘরে আলো জ্বালায় না । পুরুলিয়ার খেরোআলরা ‘হুদুরদুর্গা’ উৎসব নিয়ে । হুদুরদুর্গা কিন্তু দুর্গা নয় – নারীও নয় ! ওদের ভাষায় হুদুর মানে – পরাক্রমশালী বীর ! এই হুদুরদুর্গাকে ছল করে হত্যা করা হয় ! পুরুলিয়ার ভালাগোরা গ্রামে ২০১১ সাল থেকে হুদুরদুর্গার পুজো চালু হয়েছে । মহিষাসুরের মূর্তি গড়ে পুজো হয় । পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক চারিয়ান মাহাতো বলেন – ‘হুদুরদুর্গার পুজো হওয়ার পর দিল্লির জে এন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সম্পাদক জিতেন্দ্র যাদব ছবি এঁকে সমর্থন জানিয়েছিল ‘। - খেরোয়ালদের মুখে মুখে প্রচলিত গানে গানে বার বার ফিরে আসে পুরনো ইতিহাস ! চ্যাঁইচম্পা বা চম্পা ছিল ওদের বাসভূমি । আর্য দের দখলদারি শুরু হলে হুদুরদুর্গার সঙ্গে যুদ্ধে পেরে না ওঠায় ছলের আশ্রয় নেয় । মহিলার সঙ্গে লড়াইয়ে নীতিগত আপত্তি ছিল হুদুরদুর্গার ! তাই তাঁর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নবম রাতেই তাকে হত্যা করা হয় ! যেহেতু আর কোনও নেতা ছিল না ঐ উপজাতির – তাই ধর্মগুরুর নির্দেশে সবাই সরস্বতী নদীতে স্নান করে মহিলাদের পোশাক পরে নৃত্যরত ভাবে পূর্ব দিকে পালিয়ে যায় । এই নাচকে দাসাই নাচ বলে ! এর অর্থ অসহায় ! আশ্বিন মাষকেও দাসাই মাস বলে ! এই গানের অর্থ – ‘দুর্গা অন্যায় সমরে মহিষাসুরকে বধ করেছে । হে বীর, তোমার পরিণামে আমরা দুঃখিত । তুমি আমাদের পূর্বপুরুষ । প্রনাম নাও ‘! নবমীর দিন হুদুরদুর্গার স্মৃতিতর্পণের পর মহিষাসুরের উদ্দেশ্যে ছাতা উত্তোলন করে – ‘ছাতা ধরা’ উৎসব পালন করে । বীর বন্দনার এই উৎসব ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে ! – দেশে এখন প্রায় ১৫০ এলাকায় হুদু্রদুর্গা উৎসব হচ্ছে ! – লোকসংস্কৃতি গবেষক দিলীপকুমার গোস্বামী বলেন – ‘পুরানের কোন কোন কাহিনীতে মহিষাসুর যুদ্ধের আগে দুর্গাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল । আবার এও ঠিক অসুর নামে একটি উপজাতি গোষ্ঠী ছিল । অদুরদের সঙ্গে দেবতাদের যুদ্ধের কাহিনীও পুরানে আছে !’ আমার স্বীকারোক্তি – মনে হচ্ছে – সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে চোরা স্রোতে অনেক দুর চলে এসেছি ! আর ভেসে উঠতে পারছি না ! এত বড় বড় পণ্ডিত সমাজতাত্ত্বিক প্রত্নতাত্ত্বিক এই ব্যাপার নিয়ে লিখেছেন যে তাদের সারাংশটুকু নিয়েও – আমার এই লেখা শেষ হবে না ! – তাই যত তাড়াতাড়ি পাড়ের কাছে আসা যায় – ততই মঙ্গল ! ইচ্ছে আছে – পরে কোনও সময়ে - অসুর জাতির সঙ্গে বেদ-পুরাণ ইত্যাদির সাদৃশ্য প্রত্নতত্ত্বে আবিষ্কৃত – সে সব নিয়ে আবার আলোচনা করব ! (আপাতত শেষ ) মনোজ

337

12